অপরাধী

 অপরাধী

১.

আইজকাল আন্ধার-রাত্রি বারোটা পার হয়া গেলেই বাসাবো নিঝুম হয়া যায়। রোডলাইটগুলার আশেপাশের চিপাচুপা থাইকা চৌকিদারগো হুইসেল, মইদ্যে-সদ্যে ট্রাকের ইঞ্জিনের ভুস-ভাস আর তাই শুইনা কুত্তাগো কাউ কাউ। বারোটার পর আইজকাল শব্দ কইতে এই। অবশ্য এলাকার কোন বাসিন্দাই জোর দিয়া বলবে না এই পরিবেশ অস্বাভাবিক। সময়টাই এমন, কোনো কিসু অস্বাভাবিক কওয়াটাই অস্বাভাবিক। এই রকম বেজান রাইতেরাতো মাস-ছয় আগের কোনো সোমবার থাইকাই এলাকায় নামতে শুরু করসে। কোনো সোমবার রাইতে লোডশেডিঙের মইদ্যে আচানক পুলিশের দাবড়া-দাবড়ির পর এলাকাটা এই রকম নিঝুম হয়া গেসে। পরে খবর শোনা গেসে পুলিশ নাকি ব্যাপক মাদকদ্রব্যসহ কানকাটা সাল্টু না বল্টু গ্যাঙের কয়টা পোলারে এ্যারেস্ট করসে। ছয়-মাস পুরানা গল্প। দ্যাশে তহন পলিটিক্সের আমদময় গ্যাঞ্জাম চলতেসে। সেই গ্যাঞ্জামের মইদ্যে অমুন দাবড়া-দাবড়ির পর এলাকাটা বিলকুল ঠাণ্ডা হয়া গেসে আর সেই যে হইসে, গ্যাঞ্জাম থাইমা যাবার পরও হয়াই আসে। যদিও দেশের রেওয়ামিল কোন চিপায় মিলতেসে, এলাকার রাইতগুলা কেন শান্ত হয়া গেল, সত্যি সাল্টু বা বল্টু গ্যাং নামে কিসু আসিল কিনা, অত মাদকদ্রব্য কইথিকা আইসিল এইসব গুরুতর বিষয় লয়া জনাব সাদ্দাম হোসেন লেবু একটুও চিন্তিত নন। এইসব নাখারাস্তি বিষয় লয়া চিন্তা করনের টাইমই নাই তার। সপ্তাহে ছয়দিন সতেরো ঘণ্টা অফিস তায় রোজ ছুটি আবার রাইত এগারোটার পরে, কখন আর এইসব লয়া ভাবা যায়? আইজ আবার রাস্তায় নাইমা একখান বাড়তি ঝামেলাও তিনি টের পাইসেন। আইজ বাস চলে নাই। মিরপুর মতান্তরে গাবতলি থিকা একটা হেলপাররে নাকি রাইতেই পুলিশ তুইলা নিয়া গেসে, সেই উসিলায় বাস স্ট্রাইক। কিসু পথ হাইটা, কিসু পথ ম্যাক্সিতে এইভাবে ভাইঙা ভাইঙা তারে অফিস যাইতে হইসে। অফিস যাওয়ার পথে ম্যাক্সিতে এই ঘটনা শুইনা তার মাথায় অবশ্য একটা হাইপো-থিসিসরে সেকে-খানেকের জন্য ঘোরাফেরা করতে দেখা গেসে। সেকে-খানেকের মইদ্যেই তার মনে হইসে, পুলিশ শালা মানুষের হাফ ফ্রেন্ড, হাফ এনিমি। কিন্তু বিষয়টার দিকে তার মগজ বেশিক্ষণ দৌড়াইতে পারে নাই। চাকরি-বাকরি ধরার পর এই হইসে জ্বালা। কোনো কিসু নিয়াই বেশিক্ষণ ভাবতে পারেন না। ভাবতে গেলেই মাথা কেমন ডিপ্ ডিপ্ করে।

ফিরার পথেও সেই একই প্যেনা। শালার বিশ্বরোডের ঢালে ঢুকতেই বাইজা গেলো সাড়ে বারো। ম্যাক্সি দিয়া কোনমতে তিনি আসতে পারসেন খিলগা রেলগেট আর তারপর থাইকাই হাটা শুরু করসেন। যখন শুরু করসেন তখন হাটার গতি ভালোই আসিল। ভাব দেইখা মনে হইতেসিল পনেরো মিনিটে বাসায় পৌঁছায়া যাবেন। কিন্তু এখন বয়সের লগেলগে বিশ্রী রকম ভারি হয়া যাওয়া ভুড়িটা হাঁপসাইতেসে, পনেরো মিনিট পার হয়া পঁচিশ, তিনি হাটতেসেন বিশ্বরোডের ঢাল দিয়া উত্তর বাসাবোর দিকে। ওই এলাকায় বিশ বসর আগে ৩২/এ পল্টনের দোতলা সাদা ডিস্টেম্পার খইসা যাওয়া পুরান বাড়িটার নিচতলায় পশ্চিমদিকের দুই রুমের ফ্ল্যাটে নবাবপুরের মেয়ে জরিনা বেগমের লগে তিনি সংসার পাইতা বসছিলেন।

২.

অফিস থাইকা বাড়ি ফেরার সময় ম্যাক্সিতে বইসা জনাব সাদ্দাম হোসেন লেবু যখন গরমে ঝিমাইতে ঝিমাইতে সিদ্ধ হইতেসেন, জরিনা বেগম তখন টেলিভিশনের সামনে বইসা চোখের পানি ফেলতেসেন। বড়ই বেদনাদায়ক দৃশ্য। এইমাত্র স্টার জলসার কোনো এক সিরিয়ালের নায়ক নায়িকারে অষ্টমবারের মতো তালাক দিয়া দিলো। এর আগের সাত তালাকের দৃশ্যও তিনি মনোযোগ দিয়া দেখসেন আর একইভাবে চোখের পানি ফেলসেন একইভাবে দোআ করসেন, ‘আল¬া মাইয়াডারে আর মাইরো না’।

ঠিক সাড়ে এগারোটায় এই সিরিয়াল শুরু হওয়ার আগে, সাড়ে আটটার সিরিয়ালটা শেষ হবার পরে মানে ওই দুই সিরিয়ালের মাঝামাঝি হইলো জরিনা বেগমের রাইতের সাংসারিক কামের সিডিউল টাইম। এর মইদ্যেই তিনি টমেটো দিয়া পাবদা মাছ, ঝাল ঝাল মুরগির মাংস, পাতলা ডাল রান্না কইরা একমাত্র মেয়ে ঝিলমিলরে খাওয়াইয়া পড়তে বসায়া দিসেন। মেয়েটার সামনে বোর্ড ফাইনাল। জরিনা বেগম এই নিয়া বিশেষ চিন্তিতও আসেন। মেয়েটার এক্কেবারে লেখাপড়ায় মন নাই। ভালো পাশ না করলে ভালো বিয়া হবে না ওর। শেষে দশা হবে সিরিয়ালের নায়িকাগোর মতো। খালি তালাক খাবে আর তালাক খাবে। ওর ভবিষ্যতের দিকে তাকাইলেই জরিনা বেগমের কলিজাটা প্রায়শই চিন্ মাইরা ওঠে। তিনি খালি ভাবেন,‘কী যে দিন পড়লো বিয়া বইতেও পাশ দিতে অয়’। তার এই দুশ্চিন্তা অবশ্য বেশিক্ষণ ঠিক-লাইনে থাকে না। এর মইদ্যেই সিরিয়াল ঢুইকা পড়ে, ঢুইকা পড়ে নায়ক-নায়িকা আর তালাকনামা, ব্যাস, জরিনা বেগম খাটের উপর বইসা বুকে বালিশ বাইন্ধা কানতে বইসা যান।

জরিনা বেগম যখন বিগত সাতবারের মতো এইবারো একইভাবে নায়িকার করুণ পরিণতি দেইখা কানতে বইসা যান তখন তাদের মেয়ে ঝিলমিল পড়ার টেবিলে ঝিমায়। মাথার উপর ফ্যান ঘোরে, ফ্যানের বাতাস বিদ্যার পাতা উল্টায়। পাতার শব্দ ফ্যানের শব্দের জোড়তাল সুরে মেয়েটা ঝিমায়। ঝিমাইতে ঝিমাইতে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নের মধ্যে সে দ্যাখে পরাণ খান তার সামনে দাঁড়ায়া আসে,‘ঝিলমিল তোমার গলা খুব মিষ্টি, তুমি আমার সাথে গাইবে?’ এতে মেয়ে খুশি হয়, খুশি হয়া লজ্জা পায়, লজ্জা পায়া হাসে, হাসতে হাসতে ঘুম গাঢ় হয় আর পরাণ খান পাশের বাড়ির সবুজ হয়া যায়।

৩.

বিশ্ব রোডের ঢাল বাইয়া উত্তর বাসাবো দিকে হাঁটতে হাঁটতে হাপসাইতে হাপসাইতে জনাব সাদ্দাম হোসেন লেবু বারবার মনে মনে বলতেসেন,‘আগামী বছরই আল¬া বাঁচাইলে হজ্জ্বে যাবো’ (এই কথাটা প্রতি বছরই প্রতিবার নতুন কইরা অন্তত একশোবার নিজেরে বইলা আসতেসেন, নিজেরে বলতে গিয়া যে তিনি কারে বলতেসেন তা অবশ্য বোঝা শক্ত)। এই নেকদার কথা মনে আউড়াইতে আউড়াইতেই তিনি যখন ইকবাল স্টোরের পাশ দিয়া যাওয়া চিপা গলিটায় ঢুইকা পড়সেন এবং তখন ঢুকতে গিয়াই অনুভব করসেন মুতের থলিতে জ্বালা। এই জ্বালায় সেকে-কয় দ্বিধাগ্রস্ত থাইকা শেষে গলির মুখেই কান্ধে ঝোলানো সাইড ব্যাগটা ডাস্টবিনের পাশে একটা ফাঁকা জায়গায় রাইখ্যা তারে দাঁড়াইয়া পড়তে হইসে মিউনিসিপাল্টির ডাস্টবিনটার সামনে। ডাস্টবিনটার সামনে দাঁড়ায়া আকাশের দিকে তাকায়া জিপার খুইলা মুতের থলি হালকা করতে গিয়াই তিনি আচানক খেয়াল পাইলেন আকাশে বিদ্যুৎ খ্যালতেসে আর আকাশের দশা দেইখাই গতি বাড়াইবার লাইগা নাদু ভুড়িতে ‘হুক’ কইরা চাপ কসাইতে গিয়া তার কান শুনতে পাইলো ডাস্টবিনের মইদ্যে থিটা কু কু কইরা কি য্যান একটা আওয়াজ পাড়তেসে। আওয়াজটা শুইনা তার মন বললো,‘কুত্তার বাচ্চা’। প্র¯্রাবের গতি কইমা আসতেই তিনি টের পাইলেন আওয়াজটা ঠিক ডাস্টবিনের ভিতর থিকা আসতেসে না ওইটা আসলে আসতেসে তার প্র¯্রাব যেইখানে পড়তেসে সেইখান থাইকা আর সেই বিষয়টা বুইঝা ওঠার লগে লগেই সে মনে মনে বইলা উঠলো,‘আরে আল্লা, কই নাকি মুতলাম?’।

ঘটনাটা এইখানেই শেষ হইয়া যাইতে পারতো যদিনা জনাব সাদ্দাম হোসেন লেবু মুতার জায়গাটা চেক করতে না যাইতেন। কিন্তু ঘটনা এইখানেই প্যাঁচখায়া গেল কারণ তিনি তাই কইরা বসলেন যা তার করার কথা আসিলো না। তিনি মুতা শেষে বার দুই নুনু ঝাকাইয়া প্র¯্রাবের শেষ ফোটা-দুই মাটিতে ফালাইয়া বারদুই এইদিক ওইদিক তাকাইয়া পকেট থাইকা মোবাইল ফোনটা বাইর কইরা আলো জ্বালাইয়া ভুড়ি ঝুকাইয়া সেই জায়গাটা চেক করতে গেলেন যেইখানে প্রথম প্র¯্রাবের বিন্দুটা পড়সিলো। আর আফসা আন্ধারে মোবাইলের টিমটিমা আলোয় তিনি প্রথমে টের পাইলেন ওইখানে কিসু একটা নড়তেসে। কিসু একটা ময়লার মইদ্য থিকা বাইর হয়া আসতে চাইতেসে। বিষয়টা আরো ভালো কইরা দেখবার জন্য তিনি আরো একটু আগায়া গেলেন আর আগায়া দেখলেন ‘হ কুত্তার বাচ্চাই বটে’, ময়লার মইদ্যে ফাইসা আসে। কিন্তু ঠিক সেই সময় বিকট আওয়াজ দিয়া যখন আকাশে আলো ছড়ায়া পড়লো, সেই আলো ডাস্টবিনের ময়লায় ঠিকরা পইরা তার চোখ ধাঁধাঁইয়া দিলো আর তখনই সেই ধাঁধাঁ লাইগা যাওয়ার মুহূর্তেই হঠাৎ তিনি দ্যাখতে পাইলেন কুত্তার বাচ্চা না অথবা কুত্তার বাচ্চাই বা কুত্তার বাচ্চাটা মানুষের বাচ্চার মতো হয়া আসে। তার চোখ মুহূর্তের মইদ্যে ঠাওর পাইলো যে মুখটা ক্ষণিকের জন্য দ্যাখতে পাইসেন সেই কালা কুচকুচা হা হয়া থাকা মুখটারেই একটু আগে তিনি মুইতা ভরায়া দিসেন। ওই দৃশ্য কল্পনা করতেই তার প্যাটের মধ্যে ক্যামন এক পাক মাইরা উঠলো। তার বুকের মইদ্যে ধড়ফড় শুরু হয়া গেলো। মানুষ না কুত্তা না মানুষ। ওই ধড়ফড়ানি নিয়াই তার একবার মনে হইলো এইখান থাইকা দ্রুত পালায়া যাওয়া দরকার। কিন্তু যতই সে সইরা পরার কথা ভাবতে লাগলো ততই তার পা ডাস্টবিনের মইদ্যে আগায়া গেলো আর সে একরকম নির্বোধের মতোই আলো ফেললো ঠিক সেইখানে যেখানে কালো কুচকুচে মুখটা তার কাসে দৃশ্যমান হয়ার লাইগা অপেক্ষা কইরা আসে।

৪.

জরিনা বেগম এখন আর কানতেসেন না। আগের সিরিয়ালটা শেষ হয়া গেসে। তিনি নতুন একটা চ্যানেল লাগায়া বসসেন। নতুন একটা সিরিয়াল, এইটা থ্রিলার। তার ঠিক মন লাগতেসে না। থ্রিলার তার ভালো লাগে না। খালি খুনাখুনি দ্যাখায়। তার চোখ আস্তে আস্তে অস্থির হয়া যাইতেসে। তিনি একটু পরপরই দেয়াল ঘড়িটা দ্যাখতেসেন, ভাবতেসেন,‘এখনো আসে না ক্যান, নাকি…।’ নাহ একবার ভাইবাও তিনি পর মুহূর্তে নিশ্চিন্ত হয়া যাইতেসেন কারণ তার স্বামী বিশ বসরে তারে রাইখা কোথাও রাত্রি যাপন করে নাই। লোকটা একটু রগচটা। অল্পতেই চোটপাট করে, গায়ে হাত তোলে কিন্তু ওইসব অভ্যাস তার নাই। এইদিক দিয়া তিনি নায়িকাগোর চাইতে ভাগ্যমান। কিন্তু সেইটা কথা না, কথা হইলো তার প্যাটে ডাক দিতেসে। ক্ষুধায় শরীর কাঁপতেসে। টেবিলে খাবার সাজানো, জুড়ায়া যাইতেসে। কিন্তু স্বামী ছাড়া খাওয়াটাও তো একটা ক্যামন ব্যাপার তারপরও,‘আরতো পারা যায় না।’ জরিনা বেগম বালিশের তল থাইকা মোবাইল ফোনটা বাইর কইরা ঝিলমিলের ঘরে গিয়া দেখলেন মেয়েটা পড়ার টেবিলেই ঘুমায়া পড়সে। তিনি মনে মনে বিরক্ত হইলেন। মেয়েটার বিবাহ সংক্রান্ত দুশ্চিন্তা আরেকবার তার মাথায় চাইপা বসলো,‘কি যে ঘুমাইতে পারে মাইয়াটা, ধামড়ি হয়া গেলো ঘুম কমে না’। ‘অই ঝিলমিল, অই…উঠ’ তিনি মেয়েটারে ধাক্কাইয়া জাগাইবার চেষ্টা করলেন। ‘উ’ ‘উ’ কইরা ধাক্কাধাক্কির জবাব দিতে দিতে ঝিলমিল হঠাৎ পুরা শরীর ঝাকাইয়া কাঁপাইয়া সোজা হয়া বসলো। সে তখনও স্বপ্নে দেখতেসিলো। পরাণ খান ওরফে সবুজ তারে কাছে ডাকতে ডাকতে লাফ দিয়া আইসা কুত্তার মতো তার গলা কামড়াইয়া ধরসে। ওই দৃশ্য আর মাথার বাইরে কারো ডাকাডাকিতে ঝিলমিল খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খায়া বইসা রইলো। শেষে জরিনা বেগম যখন তার মাথায় জোরে চাটি কসায়া দিলেন তখন সে ট্যার পাইলো মা ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফ্যালতেসেন। যুগপৎভাবে সে বিরক্ত এবং লজ্জিত হইলো। ‘আম্মা দেইখা ফ্যালেন নাইতো?’ জরিনা বেগম তারে মোবাইলটা আগায়া দিয়া কইলেন,‘তর বাপরে ফোন দে, জিগা আর কত দেরি হইবো, লোকটা যে আইজ কই আটকাইসে!’ ঝিলমিলও নিজের হাত ঘড়িতে চোখ রাইখা অবাক হয়া গেলো, চিন্তিত মার মুখের দিকে তাকায়া বেকুবের মতো প্রশ্ন করলো,‘অহনো আসেন নাই?’

৫.

জনাব সাদ্দাম হোসেন লেবু যখন নির্বোধের মতো কালা কুচকুচা মুখটা আরেকবার খুঁজতে মোবাইলের আলো ফ্যালাইলেন ঠিক তখনই হঠাৎ তার কলিজা কাপায়া দিয়া ফোনটা বাইজা উঠলো। আচানক নিশুত রাইতে তার হাতের যন্ত্রটা জীবিত হয়া উঠলে তার বুকে ঘাবড় ধরলো। ঘাবড়ে তার হাত কাঁইপা উঠতেই ফোনটা পইড়া গেলো ডাস্টবিনের ময়লায়। আর তখনই তিনি স্পষ্ট দ্যাখতে পাইলেন সেই হা হয়া থাকা কালা কুচকুচা মুখটা। মুখটা চদ্দো-পনারো বছরের একটা ছেলের। সাদ্দাম হোসেন টের পাইলেন তার শিরদাঁড়া দিয়া চিকন ঘাম বাইয়া পড়তেসে। বুকের ধড়ফড়ানি আরো বাইড়া গেসে। তার ঝুইকা থাকতেও কষ্ট হইতেসে আর এর মইদ্যেই ফোনটা বাইজা যাইতেসে। তিনি ফোনটা তুইলা নিয়া কলটা কাইটা দিলেন। তারপর ছেলেটার নাকের সামনে অনামিকা ঠ্যাকাইতেই একটু আশ্বস্ত হয়া মনে মনে বললেন,‘এখনো বাঁইচা আসে।’ সে আন্ধারে কোনো লাশের উপর মুইতা দেন নাই এই ধারণা তারে য্যান একটু প্রশান্তি দিলো। তিনি এও টের পাইলেন, ‘কোঁ’ ‘কোঁ’ আওয়াজটা ছেলেটার গলা দিয়াই আসতেসে, যে আওয়াজটা অর্থ এতক্ষণ তিনি বুঝতে পারের নাই, যে আওয়াজটার অর্থ ‘পানি চাই’ বইলা তার বোধ হইলো আর সেইটা বুঝতেই তিনি ছুইটা গ্যালেন তার হ্যান্ডব্যাগটার কাসে। ব্যাগটার চেন খুইলা পানির বোতলটা বাইর করলেন। তারপর ব্যাগটা কান্ধে চড়ায়া তিনি বোতলটা নিয়া ফিরা আসলেন মুখটার কাসে। তারপর তিনি যখন বোতলের মুখটায় কইরা একটু একটু পানি কালা কুচকুচা মুখটায় ঢালতে শুরু করসেন তখনই দ্বিতীয়বারের মতো প্রবল বজ্রে চমকাইয়া উঠলো আকাশ। সেই বিদ্যুতের আলোতে তার চোখ পড়লো ছেলেটার চোখের দিকে। তিনি প্রথম টের পাইলেন চোখটা একটু আগেও এমন আসিল না যেমন এখন এর মইদ্যেই নিথর হয়া গেসে। তিনি পানির বোতলটা ময়লার উপর রাইখা আবার নাকের কাছে অনামিকা ঠেকাইলেন। নাহ, নিশ্বাস পড়তেসে না। নিশ্বাস পড়তেসে না এই অনুভূতির তার শরীরে ঘাম পুনরায় জমাইতে শুরু কইরা দিলো। আরো ফিরা আসলো শরীরের কাঁপন। কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি বোতল উচায়া দুই ঢোক পানি গিললেন। তারপর কোনো কিছু না ভাইবাই ময়লার মইদ্যে উবলাইয়া থাকা মুখের আড়াআড়ি হাত ঢুকায়া দিলেন। ছেলেটার গলা, বুক, ঘাড় আসেতো? এইভাবে গলা, শরীর, ঘাড় তালাশ করতে গিয়া তার হাতে আজিব কিসিমের আঠালো গরম কিসু মাইখা যাইতে শুরু করলো। তিনি প্রথমে বুঝলেন ময়লার পানি। এদিক সেদিক হাত ঢুকায়াও শরীরটা বিচরাইয়া না পাইয়া তিনি বোতল উচায়া আরো দুই ঢোক পানি গিললেন আর তারপরে তার মনে হইলো মোবাইলের আলো জ্বালায়া ভালো কইরা বিচরানো দরকার। কেন যে দরকার তা না জাইনাই তিনি মোবাইলের আলো জ্বালাইলেন আর জ্বালাইতে গিয়াই তার চোখে ভাইসা উঠলো তার বাম হাত। তার বাম হাত রক্তে ভইরা গ্যাসে। এই রক্তে ভরা হাত দেইখা বিস্ফারিত সাদ্দাম হোসেন লেবু আর নিশ্চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি ধরা গলায় কাপা গলায় ভাঙা গলায় চিৎকার কইরা উঠলেন, ‘খুউউন’, তখনই কোনো কানাগলির চিপা থাইকা হুইসেল বাইজা উঠলো। হুইসেল, চৌকিদারের হুইসেল। হুইসেল শুইনা খানিক স্তব্ধ হয়া গেলেন। চোখ য্যান কোটর থাইকা বাইর হয়া আসতে চাইতেসে এমন ভাবে তার মগজও য্যান চোখের রগে বাইর হয়া আসতে চাইতেসে। আর এইসব কিছুর মইদ্যেই আচানক তার মন কয়া উঠলো,‘আর থাকা যাবে না, একখনই সইরা পড়তে হবে, কোনোভাবেই থাকা যাবে না।’ তিনি তড়িৎ কাঁপতে কাঁপতে মোবাইল ফোনটা পকেটে ভইরা, প্যান্টের হাঁটু ঝাইরা, ব্যাগটা ভালোভাবে কান্ধে জড়ায়া বাসার দিকে হাটা শুরু করলেন। তার পায়ের গতি বাইরা গেলো দ্রুত, তিনি বুঝতেই পারলেন না কিসের বলে তার পা আর হাটার মুডে না থাইকা রীতিমত দৌড়ানোর মুডে চইলা গ্যাসে!

৬.

৩২/এ নম্বর দোতলা সাদা ডিস্টেম্পার খইসা যাওয়া পুরান বাড়িটার নিচতলার পশ্চিমদিকের ফ্ল্যাটে রাত দেড়টায় কলিংবেল বাইজা উঠলে জরিনা বেগম বিস্কিটের টিনটা রান্না ঘরে রাইখা আইসা দরজা খুললেন। দরজা খুইলা তার স্বামীরে দ্যাইখাই মহিলা আস্ফুট স্বরে চিৎকার পাইরা উঠলেন,‘কী হইসে আপনার?’ সাদ্দাম হোসেন ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুইকাই দরজা আটকাইয়া দিয়া বুক ভইরা নিশ্বাস নিলেন একবার। তারপর জরিনার দিকে রাগান্বিত চোখে তাকাইয়া দাঁত চিবাইতে চিবাইতে কইলেন,‘কথা ঘরে ঢুকার পরে কওয়া যায় না?’ এমতো বিরক্তি ঝাইড়া তিনি ব্যাগটা বউয়ের হাতে ধরায়া দিলেন। গলা যথাসম্ভব স্বাভাবিক কইরা আনলেন,‘ব্যাগে টাকা আসে গুইনা আলমারিতে উঠায়া রাখো।’ এই কথা কইতে কইতেই তিনি বেসিনের দিকে আগাইলেন আর হাতে পানি ঢালা শুরু কইরা দিলেন। জরিনা বেগমের বিস্ময় তখনো বাকি আসিলো, তিনি ক্ষীণকণ্ঠেই কইলেন,‘আপনার হাতে রক্ত ক্যান?’ সাদ্দাম হোসেন এইবারো বউয়ের দিকে তাকাইলেন তবে এইবার আর চোখে রাগ প্রকাশ পাইলো না। ক্যামন জানি অসহায় এক ভাব ধইরা হাত ধুইতে ধুইতে তিনি গল্প ফান্দলেন,‘আর কইয়ো না, গাড়ি এ্যাক্সিডেন্ট করসিল, ক্যামনে যে চালায় শালারা। আমার পাশের লোকটার মাথায় কাচ ঢুকসিলো, তারে সামলাইতে গিয়াই…।’ জরিনা বেগম আবার জিগাইলেন,‘গাড়ি কি ময়লার মধ্যে পড়সিলো নাকি।’ সাদ্দাম হোসেন কইলেন,‘হ, সেরমই, ঝিলমিল ঘুমাইসে?’ এমতো আলাপ চলতে চলতেই জরিনা শোয়ার ঘরে গিয়া ব্যাগ রাখলেন, বারান্দা থাইকা স্বামীর তাতের গামছা নিয়া আসলেন আর সেই গামছা তার হাতে ধরায়া দিয়া কইলেন,‘গোসল কইরা আসেন, খাবার গরম করি’। তার গলার আওয়াজ শুইনা সাদ্দাম হোসেন বুঝলেন, বউ তার কথায় নিশ্চিন্ত হয় নাই। অতঃপর তিনি বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতেই জরিনারে শুনায়া বইলা গেলেন,‘তোমার জন্য একভরি গয়নার অর্ডার করসি, আগামী সপ্তাহে পায়া যাবো’। জরিনা এতেও বিস্মিত হইয়া রইলেন।

সাদ্দাম হোসেন পুরা দস্তুর ল্যাংটা হয়া বাথরুমের ঝর্নার তলে খাড়ায়া গেলেন। দুই একবার চেষ্টা করলেন চোখ বন্ধ করবার। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই তার মনে হইতে লাগলো শরীর রক্তে ভিজা যাইতেসে। তিনি চোখ বন্ধ কইরাই আবার খুইলা ফালাইলেন। ঝর্নার থাইকা সইরা আইসা ভালো কইরা পানির ঝির ঝির নাইমা আসা দ্যাখলেন। নাহ পানি সাদাই আসে নাকি একটু একটু লাল, তিনি ঠিক ঠাহর করতে পারলেন না। কোনো মতে গোসল সাইরা খাওয়ার টেবিলে বসবার পরও তিনি হাতজোড়া তার পারর্কিনসন রোগীর মতো কাঁপতেসে। বিষয়টা জরিনা বেগমেরও চোখে বিনলো। তিনি বুঝলেন বউ তার হাতের দিকে তাকায়া আসে। ‘আপনার কী শরীর খারাপ লাগতেসে’ জরিনার আচমকা প্রশ্নে সাদ্দাম একটু থম মাইরা রইলেন। তারপর জরিনার বাইরা দ্যাওয়া ভাত স্টিলের প্লেটে গুছাইতে গুছাইতে কইলেন,‘একটু খারাপ লাগতেসে, তরকারি বারো মনে হয় খিদা বেশি লাইগা গেসে’। জরিনা স্বামীর পে¬টে বড় চাইয়া পাবদাটা তুইলা দিতে দিতে কইলেন,‘একটু ঝোল ঝোল কইরা রানসি, খান আরাম লাগবো’। কিন্তু পাবদা দিয়া ভাত আর গিরা হইলো না সাদ্দামের। একগ্রাস মুখে তুলতেই চোখ ক্যামন আন্ধার হয়া গেলো আর হড় হড় কইরা তিনি পে¬টের উপরই বমি করতে শুরু করলেন। ভয়ঙ্কর পাক মাইরা পেট য্যান নাড়িভুড়ি সুদ্দা বাইর কইরা দিতে চাইতেসে। পেটের গরলে নাক-মুখ-চোখ য্যান গইলা যাইতেসে। ‘ওয়াক’ ‘ওয়াক’ কইরা সারা ঘরে বমি ছড়াইতে ছড়াইতে সাদ্দাম বাথরুমের দিকে আগাইতে চাইলেন। হঠাৎ ঘইটা যাওয়া ঘটনাটা জরিনারে মুহূর্তের লাইগা পাত্থর বানাইয়া ফ্যালসিল। চমক ভাঙতেই তিনি স্বামীর অনুগামী হইলেন। কোনো মতে পিছন থিকা ভারি শরীরটা ধইরা ধইরা তিনি সাদ্দামরে বাথরুমের দিকে নিয়া গেলেন আর যাইতে যাইতেই চিৎকার কইরা ঝিলমিলরে ডাকতে লাগলেন। শালার মাইয়াটা এ্যারই মইদ্যে আরেকবার ঘুমাইয়া পড়সিলো। সে আবার পরাণ খানের কাছে ফিরা যাইতে চাইতেসিল কি মায়ের ডাকাডাকিতে আবার ধড়মড় কইরা জাইগা বসলো।

৭.

বহুত কিচ্ছা কাহিনি কইরা জনাব সাদ্দাম হোসের লেবুরে ঘুম পাড়াইতে জরিনা বেগমের তিনটা বাইজা গেলো। মাইয়াটা একটুও কামের হয় নাই। বাপের মাথায় একটু পানিও ঢালতে শিখলো না। ওর বিয়া হইবো ক্যামনে। জরিনা বেগম মাইয়ার উপর বিরক্তি ঝাড়তে ঝাড়তে তারে সামনে বাসাইয়া রাইখা মাঝরাইত পর্যন্ত স্বামীসেবা কইরা গেলেন। দেখুক, ওই দেখুক, দেইখা শিখুক স্বামীসেবা ক্যামনে করতে হয়। অবশ্যাষে স্বামী একটু শান্ত হয়া ঘুমাইয়া পড়লে মাইয়ারে শুইতে পাঠাইয়া জরিনা সারা ঘরের বমি সাফ কইরা বিছানায় শরীর এলাইয়া দিলেন। জরিনা যখন ঘরের লাইট নিভাইয়া নিশ্চিন্তে শুইয়া পড়লেন সাদ্দাম হোসেন তখন গভীর ঘুমে তলায়া আসেন।

আর তোমার জীবনে এলো পুত্র। আমি আমার বৃক্ষ থেকে তোমার শুধু তোমার জন্য ওকে খসিয়ে দিলাম। তুমি আনন্দিত হলে। উদ্ভাসিত হলে। আমি দেখলাম তোমার চোখে আনন্দ-অশ্র“। তুমি তোমার স্ত্রী কাছে ছুটতে শুরু করলে। তুমি তাকে ডাকতে শুরু করলে এই বলে,‘জরিনা, জরিনা দ্যাখো আমাদের পুত্র জরিনা, কালো মানিকের মতো পুত্র। মহান কুরণাময় তিনি জরিনা, তিনিই আমাদের পুত্র উপহার দিলেন। তুমি তার শুকর গুজার হও জরিনা। তিনি জাহান্নামেও ফুল ফোটাতে পারেন।’ তুমি চিৎকার করতে করতে এসব কথা বলে গেলে। আর আনন্দ খুঁজে বেড়ালে সেই সমস্ত ভূমিতে যা তোমার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। আর এভাবেই পনেরো বছর কেটে গেলো তোমার। তোমার পুত্র তোমার সাথে সাথেই বড় হলো। তারপর একরাতে আমি তোমাকে বললাম, সাদ্দাম তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো পরীক্ষা দিতে হবে। তুমি বললে প্রভু তাই হবে। আমি বললাম তোমাকে কোরবানী করতে হবে তোমার সবচাইতে প্রিয় বস্তু। তুমি বললে প্রভু তাই হবে। তারপর আর এক রাতেই আমিই তোমাকে দেখালামÑ তোমার প্রিয় বস্তু। তুমি শিহরিত হলে আর তুমি শিহরণে জেগে উঠলে, বললে প্রভু তাই হবে। তুমি তোমার পুত্রের কাছে গেলে। তাকে বললে প্রস্তুত হতে। তারপর অনেক কাঁদলে তুমি তারপর অনেক ভাবলে তুমি আর তারওপর এক নির্দিষ্ট দিন তুমি সাদ্দাম তোমার বাধ্যগত পুত্রকে নিয়ে চললে উদ্ধত ছুরি হাতে। আমি আবার তোমাকে দেখালাম তোমার প্রিয় বস্তু কি। তোমার পুত্রকে তুমি বাঁধলে ভেঁড়ার মতো তুমি নির্ভর আমার করুণার উপর। আমি তৃতীয় এবং শেষবারের মতো দেখালাম তোমার প্রিয় বস্তু কী। তুমি ছুরি চালালে আপন পুত্রের গলায়। আর তার গলা বেয়ে গল গল করে বেরিয়ে এলো রক্ত, আর তুমি চোখ বন্ধ করে শুধুই শুনলে, নাহ আমার স্বর নয় তোমার পুত্রের জবান,‘পানি, আব্বা পানি দেন, আমি পানি খাবো আব্বা’। তার মাথা ধরছিন্ন হয়ে পরার পরো সেই একই কথা বলে গেলো, ছিন্নস্কন্দ বেয়ে গলগল করে বেরিয়ে এলো রক্ত আর সেই রক্তে ভেসে ভেসে তুমি বন্দি হলে বোতলে। সেই বোতল যার ভেতর বইছে রক্তের সমুদ্র শুধু, সেই বোতলের রক্ত সাগরের গভীর অতলে তোমাকে বন্দি করা হলো। তোমার পিঠের চামড়া ছিড়ে ফেলা হলো কাঁটার চাবুকে। তোমার মাথায় পরিয়ে দেওয়া হলো কাঁটার মুকুট। আর তোমার অঙ্গ… কেন এমন করলে তুমি সাদ্দাম, আমি কি তোমাকে দেখাইনি তোমার প্রিয়তম বস্তুর খোয়াব?

সুভেসাদিকে ফজরের আযানের লগে লগেই ধড়মড় কইরা ঘুম থাইকা জাইগা বসবেন সাদ্দাম। তার খালি গা ভিজা থাকবে ঘামে। তিনি অনুভব করবেন বাম হাত তার আপন নুনু খামচায়ে ধইরা আর তার পাশে শুয়া তার স্ত্রী জরিনা বেগম চিতল মাছের মতো ঘুমে। এইসব দ্যাখতে দ্যাখতে ভাবতে ভাবতে তার হঠাৎ মনে পইড়া যাবে বোতলের কথা। বোতল হ, হ, বোতল। পানির বোতলটা কই। সাদ্দাম তাড়াতাড়ি কিন্তু সাবধানে বিছানা থাইকা নামবেন। আর ঘরময় খুইজা বেড়াইবেন বোতল গেল কই। আর খুঁজতে খুঁজতেই রাতের স্বপ্নের ভিতরের স্বপ্ন বা স্বপ্নের ওইপারের বাস্তবের কথা তার মনে পইড়া যাবে। তার মনে পড়বে লাশটার কথা। আর মনে পড়বে ফেইলা আসা বোতলটার কথা। মনে পড়বে চৌকিদারের হুইসেলের কথা। আর এইসব মনে পড়তেই তিনি গায়ে জামা জড়াবেন সাবধানে। হাতে তুইলা নেবেন দুই ব্যাটারির টর্চটা আর পকেটে ঢুকাবে গেটে চাবি। আর গেটের চাবি পকেটে ঢুকাইতে ঢুকাইতেই তার চোখে ভাইসা উঠতে থাকবে একে একে,‘পুলিশের ভ্যান, লাশের পাশে পইরা থাকা বোতলের ফিঙ্গার প্রিন্ট, বিচার, লকআপ, ফাঁসি।’ নাহ গতরাত থাইকা ঘইটা যাওয়া সব অপরাধের মইদ্যে বড় অপরাধ এইটাই। তিনি বোতলটা কি কইরা ফেলায়া আসতে পারেন কিসুতেই বুইঝা উঠতে পারবেন না আর সেইটা বুঝতেই সে তাড়াতাড়ি বাইর হয়া যাবেন বাসা থেকে আর বাইর হয়াই তিনি বুঝতে পারবেন টিপ টিপ বৃষ্টি পড়তেসে রাস্তায়।

তিনি ফিরা যাবেন সেই ডাস্টবিনটার কাছে সকালের আবছা আলোতে যে জায়গাটায় ময়লার স্তুপ দৃশ্যমান হয়া উঠসে। তার সমগ্র একটু একটু কইরা ভিজা যাবে বৃষ্টিতে আর তিনি ভিজতে ভিজতেই খুঁজতে শুরু করবেন সেই কালো কুচকুচা হা করা চোদ্দ-পনেরো বসরের মুখটা। তিনি শুধু খুইজাই যাবেন আর খুইড়াই যাবেন ময়লার ভীতরের ময়লা, কিন্তু সেই মুখরে ময়লার স্তুপে কোথাও পাওয়া যাবে না। আর সেই দ্যাইখাই তিনি নিশ্চিত হবেন রাইতেই পুলিশ লাশটা তুইলা নিয়া গেসে, কিন্তু বোতলটা? তিনি পাগলের মতো আবার ময়লা ঘাটতে শুরু কইরা দিবেন। ডাস্টবিন থাইকা একটার পর একটা বোতল বাইর হবে। চ্যাপটা, গোল, লম্বা, চাপ খাওয়া, ভাঙ্গা কতো জাতের বোতল আসে দুনিয়ায় কিন্তু কোনটাই তো তার বোতল না। কোনো বোতলেই তো রক্তের চিহ্ন নাই, নাই হাতের ছাপ। তার কণ্ঠের কোঁ কোঁ ধীরে ধীরে আওয়াজ হয়া উঠবে,‘আমার বোতল, আমার বোতল কই, আমার বোতল আমার লাশ কই, মুখ কই…’ আর সেইমতো পানি প্যাঁচপ্যাঁচে আবর্জনা ঘাটতে ঘাটতে কোঁ কোঁ করতে করতে তিনি ক্রমশ সমগ্র বিষয়টার আরো গভীর আরো গভীরে তলায়া যাইতে থাকবেন এবং সেই দৃশ্য দ্যাখতে দ্যাখতে ডাস্টাবিনের উপর আর কারেন্টের তারে বইসা থাকা এলাকার সাতটা পাতিকাক বৃষ্টিতে ভেজা পালকে জড়ায়ে বইসা বিস্মিত হয়া যাবে। তারা বিস্মিত হয়া ভাববে বৃষ্টিতে পঁইচা ওঠা পানি-কাদা-আবর্জানা ঘাটতে ঘাটতে মানুষ কিভাবে কুত্তা হয়া যায়, দৃশ্যত অথবা প্রকৃতার্থেই কুত্তা হয়া যায়।

আর এইসব ঘটতে ঘটতেই ভোরের আলো আরেকটু উজ্জ্বল হয়া আসলে নিয়মমত জরিনা বেগমের ঘুম ভাঙবে। আর ঘুম ভাঙার লগে লগেই তিনি বাকরুদ্ধ হয়া যাবেন এবং তিনি কেবল তিনিই প্রথম জানতে পারবেন তার স্বামী জনাব সাদ্দাম হোসেন লেবু রাতের আন্ধারে ঘুমের মধ্যেই দুনিয়া থিকা অদৃশ্য হয়া গ্যাসেন।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা