আনন্দে আন্দোলিত রাঙা শতদল

লালকমল নীলকমল
আলফ্রেড খোকন

আজ যখন পাখিহত্যার বিরুদ্ধে আমি, এমন একটা দিন আমি পেয়েছিলাম যখন একটার পর একটা পাখির হত্যাদৃশ্য আমাকে আরও বেশি শৈশবের আনন্দ-বেদনায় মুগ্ধ করে দিত। তখন থেকেই মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা এক একটা পাখি আমাকে বিদ্ধ করে তির তির করে আমার ভিতর অন্য এক আমাকে জীবন্ত করতে শুরু করেছিল। সেই পুরনো কথাজ্জমৃত্যুর বিপরীতে জন্ম। প্রাণ নিয়ে  প্রণোদনা! অবশ্যই সেই কিশোরবেলা, সেই আরক্তিম বিকেলের অব্যক্ত হৃদব্যঞ্জনা, সেই অপেক্ষার উঠোন ছাড়িয়ে একটিমাত্র ধানক্ষেত, তারপর একগ্রামে একটিমাত্র বাড়ি ছাড়া অন্য যে কোনো বাড়িকে উপেক্ষা করে প্রতিদিন সন্ধ্যা আসতো, রাত্রি নামতো। তবুও জিজ্ঞাসার সেই বালকবেলার পিপাসা মিটতো না। কিন্তু সেইসব প্রকৃতদিন, সেইসব জীবন্ত দিন, সেই সব দিনের পাশে আমি আর কোনোদিন যে দাঁড়াতে পারবো নাজ্জতা যদি সেদিন বুঝতে পারতাম, তাহলে কী হতো!
ক্লাস এইটের ছাত্র আমি। গ্রামের হাফপ্যান্ট পড়া কিশোর। সেই উপেক্ষা করে না থাকতে পারা বাড়িটিতে থাকতেন তমাল ভাই। আমাদের গ্রামের সর্বাধুনিক যুবক। এই গ্রামে তখন আধুনিক যুবকের অন্যতম বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল একটা সাইকেল আর হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে পারা। তমাল ভাইয়ের আরও একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলজ্জএয়ার গান। মাঝে মাঝে তিনি এয়ারগান নিয়ে পাখি শিকারে বের হতেন। আমি সহজেই তার পিছু নিতে পারতাম। কারণ আমার বড় ভাই তার ঘনিষ্ঠ ছিল। তমাল ভাই আমাকে খানিকটা পছন্দও করতেন। এয়ারগানের একটা গুলি যখন নারকেলের গাছের শাখায় নিবিড় মনে বসে থাকা একটা ঘুঘুর বিরহী কান্নার তুমুল বুক ফুটো করে বেরিয়ে যেত, আমি দৌড়ে গিয়ে ঘুঘুটাকে কুড়িয়ে আনতাম। আজ সেই অসহায় মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর পাখিটির রক্ত আমার হাতে এখনো লেগে আছে!
শীতের ছুটি দিয়ে দিয়েছে স্কুল। একমাস স্কুল ছুটি। আমার আনন্দ ধরে না। ঋতি নিশ্চয়ই দু’একদিনের মধ্যে চলে আসবে। ওরা থাকে বরিশাল শহরে। আমাদের বাড়ি থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে। সুগন্ধা ও সন্ধ্যা নদী পার হয়ে যেতে হয় বরিশালে। তখনো বরিশাল শহর আমার কাছে ঢাকার মতো অজানা। আমার গ্রামে ঋতির মামার বাড়ি। ও পড়ে ক্লাশ সেভেনে। লম্বা ছুটি পেলেই চলে আসে মামাবাড়ি। তমাল ভাই ওর মামা। সেই থেকে তমাল ভাইয়ের যোগসূত্রে ওর সাথে আমার পরিচয়।
শীতের ছুটিতে ওরা চলে এসেছে মামার বাড়ি। সেই বয়সজ্জযে কথা কাউকে কোনোদিনও বলা যাবে না, সেকথা, সে বয়সের কথাজ্জযে কথা কোনোদিন বিস্ময়ের বৈভব প্রান্তর থেকে খোয়াও যাবে না। অথচ যা সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। কী কথা? কথা আসলে কিছুই না। তখন আমার পৃথিবী, পৃথিবীর মানুষেরা সবাই জানতো ওর জন্য আমার কোনো অপেক্ষা নেই। ওর সাথে আমার কথা বলার কোনো অসম্ভব সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সেই নেইয়ে যা যা ঘটেছিল, তার কোনো ফটোগ্রাফ কারো হাতে নেই। অথচ তার একটি স্থির চিত্র আজও আমার পকেটে। আজ বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতা হচ্ছে। কিন্তু আমি কত আগেই প্রথম সুন্দরের সভায় বিশ্বসুন্দরীর দেখা পেয়েছি! তার সাথে আমার কথা হয়েছে। আমরা হাত ধরে হেঁটেছি, যদিও বিন্দুমাত্রকাল। আমার পৃথিবীর সেই ছিল প্রথম সুন্দর। যা আমি দ্বিতীয়বার কখনো পাব না। যা আর কোথাও পাওয়া যাবে না। আমার ধারণা পৃথিবীর সব মানুষই একবার বিশ্বের সেরা সুন্দর অথবা সুন্দরীর দেখা পেয়ে থাকবেন। ফলে এই পুঁজিবাদি বিশ্বসুন্দর সমাবেশ আমার কাছে অর্থহীন তো বটেই, নিরর্থও আনে না।
আমার ভিতর এমন এক অসম্ভব প্রতীক্ষা তৈরি হতো, প্রতীক্ষার হাত ধরে স্বপ্নরা এসে আমাকে রাত জাগাতো, ঘুম পাড়াতো। কখনো আমি এসব রাত্রির পাশে রাজপুত্র কখনো আমি রাজকন্যার পাশে নিঃশর্ত বন্ধু। কিন্তু ভাবনারা তখন কোথায় কোথায় ছুটতো। আমি তাদের পিছে সারাদিন ছুটেও গন্তব্য জানতাম না। তবুও আমাকে যে ছুটতেই হতো। আস্তাবলে ঘোড়া ছিল না। তবুও আমি ঘোড়ার পিঠে চড়ে বন্দি রাজকন্যাকে উদ্ধারের কাজে বেরিয়ে পড়তাম সেই বাবা ঘুমিয়ে থাকা দুপুরবেলা। সেই পাড়া ক্লান্ত দস্যি দুপুরে আমার ঘোড়ার খুর টগবগিয়ে চলছে গ্রাম্যপথের ধুলো উড়িয়ে। তারপর একজন জীবনানন্দ দাশ আমার একমাত্র অগ্রজ সঙ্গী হলে তার সাথে আমার অনুভূতির দেয়া-নেয়া চলতো কিছুক্ষণ। রূপসার ঘোলাজলে দিনমান কিশোর এক সাদা ছেঁড়া পালে রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে…বাড়ি ফিরে আসতো। কিন্তু সেই সে বিশ্বসুন্দরী কি জানতো তার অšে¦ষণে যে কিশোর তার ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে গ্রামের পর গ্রাম!
না জানলেও ক্ষতি থাকবে না আজ। কিন্তু সেদিন খুব ক্ষতি ছিল। আজ যে ক্ষতি নিয়ে সামান্য গাছের ডাল থেকে ফুল ঝরছে। আজ যে ক্ষতি আমাকে বসিয়ে লেখাচ্ছে। আজ যে পাখিগুলো গোপনে খুন হয়ে যাচ্ছে, এসব ক্ষতির পাশে অসহায় সে কিশোর জানা আর না জানার দ্বন্দ্ব দোলায় ভেসে ভেসে চলছিল নিরুদ্দেশে। সেই নিরুদ্দেশের গ্রামে আবার কবে পৌঁছাব, তা আজও জানা হলো না।
তমাল ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো। কাল আমরা সারাদিন পাখি শিকারে কাটাবো। ও ছাড়া সঙ্গে কেউ থাকবে না। এ-থেকে জেনে নিলাম ওর আগমনের খবর। আমাকে সঙ্গে নেবে তমাল ভাই। আমি তার মনোনীত। এত খুশিতে গাছপালা-পাখিরা আর সবুজ ঘাস, সবই কথা বলে উঠল। তমাল ভাই মহান। সারারাত ঘুম হলো না আমার। কখন সকাল হবে তার জন্য অনিদ্রা-জাগরণ। সূর্যের নিয়মে একটুও করুণা নেই। নিয়মের চাকা ঘুরে সকাল হলো। যথাসম্ভব কিশোর বয়সের নিষেধ এড়িয়ে মাকে বুঝিয়ে তমাল ভাইদের বাসায় হাজির। অবশ্য সকালের প্রথম চা খাবারের একটু আগেই বেরিয়ে পড়ায় কিছুক্ষণ যে রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়েছিল, তাতে কিছু যায় আসে না। এতে কোনো অপমান নেই। তাও যদি ও জানতো তাহলে নিশ্চয়ই কষ্ট পেত। তমাল ভাইয়ের ঘুম ভেঙেছে। ও বারান্দায় আমাকে ডাকছে। কিন্তু এ ডাক এই আহ্বান এতটা নিস্পৃহ লাগছে কেন? ও কি তাহলে যাবে না! নিজের কাছে নিজের প্রশ্নজ্জউত্তরহীন এত অপেক্ষা এত অনিদ্রা ও কি টের পায় নি! মানুষ তো তার প্রিয় মানুষের অন্তরের কথা জানে। মা আমাকে বলছে। ও কি তাহলে আমার অন্তর জানে না! আমার অন্তরের কান্না না জানাতো ভীষণ ক্ষতি।
তমাল ভাই এয়ারগান নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। এয়ারগান হাতে নিলে তিনি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। এক নিরিখ, নিবিষ্ট মন। আমাকে একদিন এয়ারগান শেখাবে। কিন্তু এয়ারগান শিখতে হলে চোখের চেয়ে মনের নিরিখ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা তমাল ভাই বলেছেন আমাকে। আমি জিজ্ঞেস করতে পারছি না, ও যাবে কি-না। আবার ওকে দেখেও বোঝা যাচ্ছে না যাচ্ছে কি যাচ্ছে না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমার প্রতীক্ষার সমস্ত আয়োজন ধ্বসে পড়তে লাগলো। একটা প্রসন্ন ভোর অর্থহীন দিন ডেকে আনছে। এখন মনে হচ্ছে পাখি মারা পাপ। কিন্তু এই পাপ কাজে না যেয়ে উপায় নেই। তমাল ভাই তাহলে রাগ করবে। এইসব ভাবনার মধ্যে পুবের পুকুরপাড়ে তমাল ভাই তার প্রথম শিকার সফল করলো। আমার ডাক পড়লো। বক মেরেছে। উৎফুল¬ তমাল ভাই। কিন্তু সব উৎফুল¬তা ছাপিয়ে ও এক দৌড়ে নেমে এল পুকুর কিনারে। আমি বক ধরে আনছি, ও আমার হাত থেকে বক কেড়ে নিলে। ওর আনন্দ দেখে কে?
আমরা রওনা করলাম দক্ষিণ দিক থেকে। নিশ্চিত ঋতি যাচ্ছে। আমার হাতে ব্যাগ। ওর হাতে বে¬ড। আধমরা পাখির মৃত্যু নিশ্চিত করতেই বে¬ডের ব্যবস্থা। অবশ্য এটাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জবাই বলে। প্রাণে বেঁচে যাওয়া পাখিগুলিকে জবাই করে নিতাম। তাতে পাখিগুলি হালাল হত।
আমরা হাঁটছি, তমাল ভাই সর্বদা আমাদের চাইতে একধাপ এগিয়ে। তার চোখ গাছের ডালে, পাতার ফাঁকে, দিঘির জলে। একসময় আমরা গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। আজকের মতো এটাই শেষ বন। এরপর আমরা বাড়ি ফিরবো। তখন ক্লান্ত দুপুর। সবাই যেন হাঁফিয়ে উঠছে। আমাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে না। তমাল ভাই আমাদের দু’জনকে দাঁড় করালেন একটা বেত ঝোপের আড়ালে। বললজ্জ‘তোমরা এখানে থাক। শিকার হলে আমিই আনব। তোমাদের দৌড়াদৌড়িতে পাখিরা টের পেয়ে উড়ে যায়। তোমরা দুজন এখানেই দাঁড়াও। আমি আর ও দাঁড়িয়ে থাকলাম। নিজেকে বোকা বোকা লাগছে। ও বসে পড়ছে ঘাসে। আমাকে বললজ্জ‘দেখছ কী সুন্দর ঘাস! আমি বললামজ্জখুব সুন্দর।’ তখন ও বললজ্জআমি বলার পর সুন্দর হল?’ আমার লজ্জা লাগলো। কারণ এই সুন্দর ঘাসের চেয়েও যে সুন্দর দৃশ্য আমার সামনে। সবুজ কামিজে ঋতিকে অপূর্ব দেখতে লাগছিল, তা তাতো আমার মাথা থেকে যায় নি। ফলে পৃথিবীতে এই সুন্দর সবুজ ঘাসের জায়গা কোথায়? একথা ও যদি জানতো এই সুন্দর সবুজ ঘাসের বিপরীতে আমি যে দৃশ্য দেখে দেখে মুগ্ধ হয়ে ফিরছি, তা কী করে জানাবো! এই দৃশ্যের বিপরীতে একটি অনাকাক্সিক্ষত দৃশ্য তৈরি হচ্ছিল ভিতরে ভিতরে, তা কি আমি জানতাম! ও হঠাৎ শুয়ে পড়লো ঘাসে হাত-পা ছড়িয়ে, আকাশের দিকে চোখ তুলে। ওর ছোট্ট বুকের ওড়ানাটা ততক্ষণে ঘাসে বিছিয়ে গেছে। আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে তমাল ভাইয়ের অপেক্ষা করছি! মুহূর্তের মধ্যে আমার শরীরের সমস্ত শিরা-উপশিরায় বনবিদ্যুত ছুঁয়ে গেল যেন। ও আমাকে শুয়ে পড়তে ডাকছে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমি যেন ক্লান্ত দুপুরে মগডালে একটি স্ত্রী ঘুঘুর ম্ল¬ান অথচ প্রখর ডাক শুনতে পেলামজ্জ‘শোও না ঘাসের উপর।’ কিন্তু জীবনে প্রথম এমন কাক্সিক্ষত ডাক সত্যি সত্যি পেয়ে গেলে পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় শব্দটির সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে অনায়াসে। ঋতি এবার নিজেই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল: ‘আমাকে একটু টেনে তোলো, খুব খারাপ লাগছে।’ বনের গভীর ঘাসের নির্জনতায় দুই হাত বাড়িয়ে দেয়া আহ্বান সেদিন ভয়, অজানা করণীয় আর বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা গোপন অনুভূতির শিহরণ আমাকে অসহায় আর বোকা বানিয়ে ছাড়লো। আমার একটা হাত জোর করে টেনে ধরে ও নিজেই উঠে পড়লো। আমার মুখের কাছে মুখ এনে তখন বলেছিলজ্জ‘তুমি কিছুই বুঝ না, তুমি সত্যি সত্যিই খোকা।’ তারপর এক দৌড়ে তমাল ভাইকে খুঁজে ঝোপের আড়াল ছেড়ে পালাল। আমার না-বোঝা বয়স অথচ কী যেন বুঝতে ইচ্ছে করার বয়সকে তখন একটা কষে থাপ্পড় মারলেও এই বুঝতে না পারার অক্ষমতার শাস্তি হতো কি-না কে বলবে! আর এই ঘটনার পর পরই আমি সত্যি সত্যি বুঝতে শুরু করলাম টেনে তুলবার মানে, শুয়ে পড়ার মানে। কিন্তু ততক্ষণে এসব দৃশ্য হারিয়ে কোথায় চলে গেছে ঝোপের আড়ালে। আর তমাল ভাইও ইতোমধ্যে ফিরে এসেছে তিন তিনটে ঘুঘু শিকার করে। তমাল ভাইকে জড়িয়ে ধরে ওর আবদারজ্জএক্ষুণি চলে যাবে, আর এক মুহূর্তও নয়। একদম ভাল লাগছে না। আর একটাও পাখি মারতে হবে না। যা হয়েছে এতেই চলবে। তমাল ভাই আমাদের দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে, দুই ক্লান্ত কিশোর-কিশোরীকে একবার দেখে নিয়ে বললেনজ্জ‘চল, তোমাদের তো চেনা যাচ্ছে না। এত অল্পতেই কাবু হলে চলে! চলো চলো।’

সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা
অলোক বিশ্বাস

প্রাণে বীণা বাজায় ভোরের তারা
যেগুলো পারার কথা নয়, ঠিক সেখান থেকে শুরু করতে হবে আমাদের, কথা ছিল এরকম। যেসব স্বপ্ন কেউ কোনোদিন দেখে নি, যেসব কবিতার ভাষা কেউ কোনোদিন লিখতে পারে নি, সেসব দেখার ও ভাবার কথা ছিল। আমি কোনো এক বিচ্ছিন্ন আমি নই, পৃথিবীর অনেক উপাদানে আমার সত্তা, অনেক বস্তুর মধ্যে, নিসর্গের মধ্যে আমি, অনেক ঘটনার মধ্যে জুড়ে আছি আমি। মনে হয় এসব শুধু স্বপ্নেরই কথা, স্বপ্নই থেকে যাবে আবহমান। একদিন ঘুড়ি আর লাটাই নিয়ে বেরিয়ে পড়ি, একদিন মাছ ধরার ছিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ি, দেখা যাক কাকে অবলম্বন করা যায়। দেখা যাক ঘুড়ি আর লাটাইয়ের মাধ্যমে কাকে কাকে আয়ত্তে আনা যায় কিম্বা ছিপ টেনে কাকে স্থায়ী আবাসন দেওয়া যায়। তখন রবীন্দ্রনাথের অনেক গল্পই পড়া হয়ে গেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে ‘ছুটি’ গল্পের সেই ফটিককে। শুধু রাগ হতো কেন রবীন্দ্রনাথ ফটিককে কলকাতায়ে নিয়ে এলেন। কেন অনিবার্য হয়ে গেল তার নিয়তি শহরের দুরমুষে। আর কি গ্রাম ছিল না? গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে নিয়ে গিয়ে তার অন্তরসত্তার মুক্তি ঘটাতে পারতেন তো অন্যভাবে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্র থেকে সত্যজিৎ রায় থেকে নারায়ণ দেবনাথ থেকে লীলা মজুমদার থেকে আর্থার কনান ডয়াল আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে রাখতো। আর হাত বদল হতো শিবরাম চক্রবর্তীর রচনাবলি, ত্রৈলোক্যনাথের রচনা আর বার বার ঘুরে ফিরে আসতো শ্রীকান্ত। শ্রীকান্ত কে? শরৎচন্দ্র না অন্য কেউ? প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার হয়ে যেত আমাদের ঘুম, আমাদের জাগরণ। মনে হতো যে আমি নিজেই হয়তো শ্রীকান্ত হয়ে কোথায় কোথায় চলে যেতে চাইছি ইন্দ্রর সঙ্গে। অথবা ইন্দ্রর অন্তর সত্তাটি, ওই দুঃসাহস যেন আমারি হয়ে আছে চিরকাল। তারপর কখন ঘোর ভেঙে যায়। কল্পনার ঘোর কি সত্যি ভাঙে কখনো? এস্কেপিজমের কথা, নাকি জীবন যখন বাস্তবের সবরকম শিকলের ঝনঝনায় মাত্র খাওয়া-পরা-বেঁচে থাকার মধ্যে জায়মান,তখন কল্পনাই এনে দেয় বেঁচে থাকার অন্যতর অর্থ। ভাবতাম। সুদূর আকাশে বল ছুঁড়ে দিয়ে ভাবতাম। ফুটবলের দুরন্ত গতির সঙ্গে চিন্তা ছুটে ছুটে যেতো। মনে হতো গোল পোস্ট পেরিয়ে যাওয়া ফুটবলটা আসলে আমিই সীমা অতিক্রম করে মুক্তির আনন্দে উতলা। উতলা হওয়ার মাত্রাগুলো বাড়তে থাকে যতো শিশুসুলভতার সারল্য থেকে মুক্তি পেতে থাকে জীবন। আর একদিন এইভাবে ঘর ছাড়িয়ে পাড়া, পাড়া ছাড়িয়ে জি.টি রোড, জি.টি রোড ছাড়িয়ে মহানগরের মাঝখানে এসে পড়া। স্কুল ছাড়িয়ে মহাবিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ছাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়। কল্পনার সীমা ক্রমেই বেড়ে বেড়ে চলে। কোনো টোপ দিয়ে তাকে বেঁধে ফেলা যায় না।
আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ
কলেজ জীবন এক বিশাল উল¬ম্ফন মানুষের জীবনে। যদিও মাত্রাগত পার্থক্য থাকে একজন গ্রামজীবনের ছাত্র আর শহরজীবনের ছাত্রের মধ্যে। প্রক্ষোভগুলি হয়তো ঐ বয়সের ধর্মের কারণেই একই গতিতে কাজ করতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ ২১ বছর বয়সে লিখেছিলেনজ্জ‘বড়ো আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও,/ ফিরায়ো না জননী। ‘আবার একই মানুষ যখন চির যৌবনের মানস জীবন নিয়ে বেঁচে থাকে তখনও সে লিখতে পারে ৬৪ বছর বয়সেওজ্জ‘হে চিরনূতন, আজি এ দিনের প্রথম গানে/ জীবন আমার উঠুক বিকাশি তোমার পানে।’ গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম এভাবে যে, প্রথমত পারিবারিক শাসনের শৃঙ্খল তখন আলগা। স্কুল জীবনের একরৈখিকতা স্কুল পরবর্তী জীবনে অচল। দ্বিতীয়ত চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, রাগ-অনুরাগ দর্শনগত সমাজগত ভাবনা, গোষ্ঠীগত এতো বৈচিত্র যা পূর্ববর্তী পরিসরে ছিল না। তো একদিন কলেজের বন্ধুরা স্থির করলো, ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্রথেল, যার নাম সোনাগাছি, আমরা সান্ধ্য কলেজের ছাত্ররা সারা সন্ধ্যা ঘুরে বেড়াবো সেখানে দলবদ্ধ হয়ে। এও কি মহামিলন কেন্দ্র বা পিলগ্রিমেজ! এভাবে সারিবদ্ধ দণ্ডায়মান অজগ্র বিভিন্ন বয়সের নারীকে জীবনে একসঙ্গে দেখার এক মহাকৌতূহল জাগ্রত না করে পারে না। কয়েক হাজার নারী রাস্তায় সারিবদ্ধ, ব্যালকনিতে দরজায় দরজায়, বারান্দায়, জানলায়, ছাদে, রোয়াকে, বাড়ির উঠানে। গুজরাটি থেকে মারওয়ারি, মুসলিম থেকে ল্যাপচা, ভুটানি, বাঙালি, ওড়িয়া, নেপালি, মদেশিয়া, অসমিয়া, তেলেগু-তামিল, মারাঠি, রাজাস্থানি, বিহারি আরো কতো ভাষাভাষী নারী এখানে কীভাবে এলো, কারা নিয়ে এলো এতো সুন্দরী নারীকে, ভারতের ও পার্শ্ববর্তী দেশের? একি ব্রথেল নাকি মেলা? যেমন নারী দেহের বৈচিত্র পোশাকে, তেমনি ডাকে, ছেনালিপনায়, ইশারায় এক বিপুল সমারোহ যা কোনো পিলগ্রিমেজে দেখা যায়। দেহমন বিস্ময়ে, ভয়ে, দ্বিধায়, দ্বন্দ্বে, উত্তেজনায়, চেতনায়, অবচেতনায়, নতুন জগৎ আবিষ্কারের নেশায় কতো গলিপথ কতো শুঁড়িপথ, মদের দোকান, পানের দোকান, লুকোনো গাজার দোকান, তাড়ির দোকান অতিক্রম করে কলকাতার সুপ্রাচীন এই ব্রথেলের বিপুল কোলাহল জীবনের আনাচে কানাচে ঘুরতে ঘুরতে কখন কীভাবে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের ভেতর দিয়ে মপাশাঁর গল্পের ভেতর দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। উত্তর কলকাতা আজো বহন করে চলেছে রাজরাজাদের ঐতিহ্য, তাদের বিলাসবহুলতা, তাদের মদ্যপান, বেলেল¬াপনা, রাতাবিরেতে তুমুল মদ্যপান করে একাধিক নারীসঙ্গের পর ঘরে ফেরা। এই বোহেমিয়ান সংস্কৃতি হয়তো যেকোনো ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিকেও তাক লাগিয়ে দিতে পারে। আমি কি সেদিন বহু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম? পাশেই দিগন্ত বিস্তৃত পণ্য বাজার যা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে হ্যারিসেন রোডের বড়োবাজার চীনাবাজার আর বাগড়ি মার্কেটে গিয়ে। এই সুপ্রাচীন ব্রথেল কি এই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ ব্যবসাকেন্দ্রের এক অনিবার্য অংশ হিসাবে গড়ে উঠেছিল? এই বিশাল বিশাল ব্রথেলের সঙ্গে সোশিও-রাজনৈতিক ব্যবস্থার কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে যা আর কোনোভাবেই অস্বীকার করার মত নয়! একটি ব্রথেলে যতো সংখ্যক নারী কাজ করে, যাদের যৌনকর্মী বলা হয়, একই সঙ্গে সম্ভবত ততোধিক পুরুষ কাজ করে এই ব্যবসা পরিচালনায়। এ যেন পুরুষশাসিত এক অত্যন্ত লাভজনক উৎপাদন ব্যবসা যা পরোক্ষভাবে সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থার সহায়ক, তাই কি?
কার জীবনে প্রভাত আজি ঘুচায় অন্ধকার
বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং তারপর মুক্ত জীবন, স্বপ্নের জীবন, রাজনৈতিক আন্দোলনের জীবন। সমাজতন্ত্র হয়তো কতো সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারে। যেন দিলি¬ কা লাড্ডু। মার্কসবাদ, লেনিনের সফল রুশবিপ্লব, চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো, সব যেন বয়স কুড়ি পেরোলেই রক্তে নেশা ধরিয়ে দেয়। তখন সত্তর দশক, ‘মুক্তির দশক ‘…এই শে¬াগানের রেশ কাটে নি তখনও। চারু মজুমদার, কানু স্যান্যাল হয়ে উঠতে চায় প্রতিটি যুবক। যেন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বেরিয়ে এসে অতর্কিতে আক্রমণ করতে চায় হেজেযাওয়া প্রাচীনের সদর দফতরে। হয়ে উঠতে চায় চে গুয়েভারা অথবা ফিদেল কাস্ত্রো। চতুর্দিকে মার্কসবাদী সাহিত্য সংস্কৃতি প্রচারপত্র বিক্রয়ে তুমুল আলোড়ন। দুনিয়ার মজদুর এক হও… স্লোগান যেন সারাদেহে শিহরণ ঘটে যায়। মনে হতে থেকে আমিও জনগণের নেতা হয়ে যাচ্ছি। কতো লোক আমার কথা শুনতে জমায়েত হচ্ছে, আমি তাদেরকে বলে যাচ্ছি, সমাজতন্ত্র বেশি দূরে নয়। কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনই ব্যর্থ হয় না। ভাষার রক্ষার জন্য আন্দোলন, সামাজিক সুরক্ষার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, মানুষের চিত্তবৃত্তিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যায়। আর মনে পড়তে থাকে অতীতে এভাবেই সমাজ পরিবর্তনের বিপ্ল¬ব ঘটেছিল দেশে দেশে, ফ্রান্সে জার্মানিতে কিউবায় বলিভিয়ায় ভিয়েতনামে এল-সালভাদোরে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তারই এক অংশ। রেডিও খুলে শুনছি, বাংলাদেশের পাকবাহিনীর সঙ্গে চলেছে রক্তাক্ত যুদ্ধ। বগুড়া থেকে পাবনা, কক্সবাজার থেকে রাজশাহী, সে ভয়ঙ্কর রক্তাক্ত উল¬ম্ফন ঢাকার পথে পথে, চট্টগ্রামে। আমাদের যশোরের বাড়িতে গিয়ে দেখেছিলাম সারা দেয়াল জুড়ে পাক ইয়াহিয়া বাহিনীর অত্যাচারের দাগ। সেই ১৯৭১ সাল, আমার প্রথম বাংলাদেশ ভ্রমণ। তখন মুজিব সারা বাংলাদেশের হৃদয় জুড়ে, শুধু মুজিব আর মুজিব।  অত্যাচারী পাকবাহিনীকে আমূল উৎপাটনের রাজনৈতিক আবেগ ও দৃঢ়তা আমাদেরও মনে তখন শিহরণ জাগিয়ে চলেছে। ভাবো পাকবাহিনী কিভাবে বগুড়ায় খোকনকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে! আমরা ভুলতে পারি না সেই মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত, কারণ রক্তে বাংলাভাষা, বাংলা গান, বাংলা কবিতা। রক্তে প্রবহমান আমাদের নজরুল, শামসুর রাহমান, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুজফফর আহমদ। আমাদের রক্তে আবুল ফজল। রক্তে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ইলা মিত্র, শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে সেই অনিবার্য আবৃত্তিজ্জইলা মিত্র, মধুবংশীর গলি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর কবিতা। ৭০ থেকে ৭৭ সাল রাজনৈতিক সন্ত্রাস, ভারতের চতুর্দিকে জরুরি ব্যবস্থা জারি, প্রথমে অঘোষিত পরে ৭৫ সালে ঘোষিত। বিকৃত কংগ্রেস দল, পশ্চিমবঙ্গে ৬৯-এর পর পুনরায় বামপন্থীদের উত্থান। ৭৭-এর নির্বাচনে লাল ফ্ল্যাগে মুড়ে গেল সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা। এক নতুনে আহ্বান সমগ্র দেশজুড়ে। এক নতুন আহ্বান আমাদের চেতনায়, প্রেমের গানে। পুনরায় যেন আবিষ্কৃত রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল, সুকান্ত আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে নাট্য-আন্দোলন, চলচ্চিত্র-আন্দোলন, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, তার আগে ঋত্বিক ঘটক। মেঘে ঢাকা তারা, অযান্ত্রিক… আমাদের যৌবনকে ওলোটপালোট করে দিয়ে যায়। মৃণাল সেনের কলকাতা ৭১ তখন একটা ক্রেজ। আর গৌতম ঘোষের পার আর ক্রেজ মহীনের ঘোড়াগুলির বাংলা গানের ব্যান্ডের  জগৎকে কাঁপিয়ে দেওয়া। ইতোমধ্যে সলিল চৌধুরীর অ্যালবাম ও আলোর পথযাত্রী সারা কলকাতাকে মাতিয়ে দিয়েছে। ফিল্ম উৎসব, রাত জেগে লাইন দেওয়া আর রবীন্দ্রসদনের সামনের রাস্তায় সারা রাত জুড়ে কবিতা পাঠ, আবৃত্তি গান, উত্তাল সমুদ্রের মতো সেইসব আহ্বান আমাদের দিনগুলি, রাতগুলি। শম্ভু মিত্র বয়সের কারণে হয়তো অবসর নেবেন। তাই একগুচ্ছ নাটক অবসরের আগে নতুন প্রজন্মের কাছে যাওয়া। চার অধ্যায়, গ্যালিলিও গ্যালিলি ইত্যাদি। সারা রাত ধরে লাইন দিয়ে যখন সকালে নাটকের টিকিট হাতে পেলাম, আমাদের জীবন যেন অতিক্রম করে গেল কতো অন্ধকার যুগ। রবীন্দ্রসদন, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস তখন কলকাতার সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র। যেমন কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস, যাদবপুরের কফি হাউস থেকে শুরু করে সংস্কৃতির কর্মীদের অজস্র আড্ডার স্থল জমজমাট হয়ে উঠেছে সৃষ্টির আনন্দে। তখন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মণিভূষণ ভট্টাচার্য, শঙ্খ ঘোষ লেজেন্ড হয়ে গেছেন, যেমন  ছয় দশকের শেষের হাংরি আন্দোলন পুনরায় আছড়ে পড়ছে তরুণদের মধ্যে। শোনা যাচ্ছে নিম সাহিত্য আন্দোলনের তিতিবিরক্ত সাহিত্যের প্রসার। কবিতায় শ্র“তি আন্দোলন এবং গল্পে শাস্ত্র বিরোধী আন্দোলন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্যারাডাইম শিফট ঘটাতে আসছে।
গায়ে আমার পুলক লাগে, চোখে ঘনায় ঘোর
১৯৭৭ সাল পশ্চিমবঙ্গের লোকজীবনে একটা টারনিং পয়েন্ট। রাজ্যে বামপন্থি শক্তির ক্ষমতালাভ। সামাজিক উল¬ম্ফন বা অগ্রগতির প্রতীক এবং স্থিতাবস্থাকে ভেঙে, প্রাতিষ্ঠানিকতাকে ভেঙে নতুন আলোর পথ নির্মাণ। এর কিছু সময় আগে-পরে বাংলা কবিতায় আট দশকের কবিদের এসে পড়া। বামপন্থার জাগরণ যেমন দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা স্থিতাবস্থাকে নাড়িয়ে দিলো অনেকটাই, তেমনি আট দশক বাংলা কবিতায় স্থিতাবস্থা ভাঙার সচেতন প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। আমি ছিলাম তার অন্যতম প্রতিনিধি। কোনটা হবে জীবনের অবলম্বন, আমার সেই প্রশ্নে ও ভাবনায় তখন প্রদীপ্তরূপে উত্তেজনায় শিহরিত জীবন। কোনটা অবলম্বন করবো নাটক নাকি ফিল্ম, ক্যারিয়ারিস্ট হয়ে ওঠা নাকি কবিতা, বিদেশী ভাষা রপ্ত করে বিদেশ পাড়ি দেওয়া, নাকি মাত্র জনগণের রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠা। কিন্তু না, কবিতাতেই পেয়ে বসলো আমাকে, আমার নিরন্তর কবিতার সঙ্গে ওঠাবসা শুরু হয়ে গেল কোনো এক রোদ্দুর ভরা সকাল থেকে। সেই ১৯৭৬ সাল। দেখলাম শিল্পের সকল মাধ্যম একে অপরের পরিপূরক। যামিনী রায় থেকে শুরু করে প্রকাশ কর্মকার, রামকিঙ্কর বেইজ থেকে শুরু এসময়ের যেকোনো ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে কবিতার উপকরণ পেয়ে যাই। নান্দীকার, পি.এল.টি., গণনাট্য, থিয়েটার ওয়ার্কশপ, বহুরূপী, থিয়েট্রন, চার্বাক, রঙ্গকর্মী, চেতনা ইত্যাদি গ্র“প থিয়েটারের নাটক দেখতে দেখতে কবিতার  কতো  থিম ও ফর্ম নির্মিত হয়েছে মাথার ভেতরে। ফিল্ম ফেস্টিভালে বার্গম্যান, আকিরা কুরসোয়া ও গোদারের ছবি দেখতে দেখতে মনে হতো এইসব ইমেজারি আমি যদি কবিতায় এনে কবিতাকেও ফিল্মিক করে তুলতে পারতাম। আমি জানিনা, অন্য মাধ্যমগুলির শিল্পীরা, কর্মীরা কবিতার কাছ থেকে কিছু পান কিনা। কবিতা তাঁদের স্ব-স্ব নির্মাণ ও বিনির্মাণ শিল্পে কতোটা ঝড়ো হাওয়া বইয়ে  দিয়ে যায়। তবে  আমি বার বার দেখেছি, যখন বিভিন্ন মাধ্যমে রঙের খেলা থেকে শুরু করে টেকনিক্যাল, ফিলোসফিকাল এবং সামগ্রিকভাবে আঙ্গিকগত দিয়ে পরিবর্তন হচ্ছে, তখন সেই সব প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকেও কবিতায় পরীক্ষা নিরীক্ষার বেলায় অনেকে ‘গেল গেল’ রব তুলে হাত পা ছুঁড়তে থাকেন। তরুণদের কবিতা নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করে ফেলে দেখি আমি বোধ হয় খুব অপরাধ করে ফেলেছি। সেইসব কল্পনাময় ও পরাবাস্তবতার কাছে বারবার চোখ ফেরানো ও চোখ সরিয়ে নিয়ে বাস্তবের কাছে ফিরে আসা দিনগুলিতে, একদিনও কবিতা না লিখতে পারলে জীবন শূন্য মনে হতো। আর সেইসব কবিতা যেন আগের লেখা কবিদের থেকে ক্রমশ আলাদা হয়ে যায় তার অন্তর প্রকাশে তার চলমান সৃজনশীলতায়। এই তো সময় হল রঙকে নিজের মতো খেলে যাবার, রঙের সঙ্গে রঙ মিশিয়ে সৃষ্টি করবো আর এক রঙ, কিংবা ধরো সেই আয়নার কথা যা সিলভিয়া প্ল্যাথের  ‘মিরর’ কবিতার জটর থেকে যদি অন্যরকম হয়ে যায় তাহলে ক্ষতি কী? ভাবা যাক আমরা লিখছি এভাবে যে, আয়নাকে ভূতে ধরেছে বলে মনে করে লোকেরা যখন তাকে ওঝার কাছে নিয়ে গেল, তখন ওঝাই হয়তো বলে দিলেন, আয়না একদম স্বাভাবিক আছে, তাকে ভূতে ধরে নি, বরং লোকেরাই ভূতগ্রস্ত। অথবা যদি ভাবি এভাবে যে, একটা আয়না আর একটা আয়নার সঙ্গে সমুদ্রের গভীরে গিয়ে দেখছে, আকাশ কতো কাছে এসে গেছে অথবা যদি ভাবি যে উড়তে থাকা পাখির পালকের জীন থেকে বুদ্ধদেব বা যীশু খ্রিস্টের জন্ম হয়েছিল। অথবা মহাজাগতিক শক্তির অধিকারী একটি পালকের মধ্যে ধরা আছে কোটি কোটি ঈশ্বরকণা। যে সীমা লঙ্ঘন করে মানুষকবি অপার বিস্ময়ের কাছে চলে যায়, অপার আনন্দ আর ধীশক্তিসম্পন্ন মায়াজগতের কাছে চলে যায়, সেই সীমা কি ভাঙেন নি আমাদের রবীন্দ্রনাথ, আমাদের জীবনানন্দ দাশ? তাঁদের জীবৎকালে কতো অসম্মান আর ভ্রুকুটি সহ্য করতে হয়েছিল। কাজী নজরুলকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লিখতে হয়েছিল ‘কৈফিয়ত’-এর মতো কবিতা। সৃজনশীল কবিরা প্রচলিত সীমা ভাঙার কাজ করে গেছেন যুগে যুগে নানা-ভাবে তাঁদের মতো করে। আমরা আট দশকের একদল কবি সেটাই করে গেছি চিরকাল। বয়স বেড়েছে, কবিতার জার্নি থেমে থাকে নি। ফরাসি ভাষা আত্মস্থ করতে করতে পৌঁছে যাই কবি র‌্যাঁবোর দেশে, বোদলেয়ারের দেশে, লুই আরাগঁর ও মালার্মের শব্দদেশে। পারির কাফেতারিয়াগুলোতে যেখানে তরুণেরা বসে লিখে চলেছে গ্লোবালাইজেশানের পরবর্তী প্রতিক্রিয়াজাত অনন্ত লিরিক। আমার       অন্তর্নিহিত যৌবনের কখনো বয়স বৃদ্ধি হয় না। সে ঘুরে বেড়ায় রাজশাহীর  চিহ্নমেলায়। ঢাকার কাঁটাবনে। শাহবাগ আন্দোলনের প্রবল স্রোতে। অজস্র অনির্বাণ তরুণ কবিদের চোখের আলোয়, প্রশ্নের আলোয়, বিরহকাতর কোনো রাধার ভয়ঙ্কর অভিসার যাত্রায়। মৌলবাদ সব দেশেই  আছে ও রাস্তায় রাস্তায় হুঙ্কারে সন্ত্রাসে আয়ত্তে রাখতে চায় সব কিছু, কিন্তু তাাই চিরন্তন সত্য নয়, তাহাই জীবনের অনিবার্য প্রতীক বা অনুসরণযোগ্য পথ নয়। শুধুমাত্র বাংলা কবিতার ইতিহাসের পাতায় ভ্রমণ করতে করতে এই জাগতিক সত্য বারবার উচ্চারিত হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সকল বাংলাভাষীর কাছে কিম্বা পৃথিবীর যেকোনো ভাষার মানুষদের সম্পর্কে একই অনুভূতি প্রকাশ করা যায়।
তুমি জানো, ওগো অন্তর্যামী, পথে পথেই মন ফিরালেম আমি
জীবনে প্রথম কবিতা প্রকাশের আনন্দে যেমন মনকে বহুদিন আচ্ছন্ন করে রাখে, তেমনি প্রথম বই প্রকাশের আনন্দ কী এক উন্মাদনায় ব্যতিব্যস্ত রেখেছিল আমাকে মাসের পর মাস। আর এই উন্মাদনার চূড়ান্ত রূপ পেত যখন সেই বইয়ের আলোচনা প্রকাশিত হয়েছে কোথাও। অথবা কোনো অগ্রজ কবি সেই বই নিয়ে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করছেন অন্য কোনো কবির কাছে। আমার প্রথম কবিতার বই নীল আয়নার আলোচনা করেছিলেন কবিরুল ইসলাম দেশ পত্রিকার পাতায়। হুমায়ুন কবীর ও আতাউর রহমান প্রতিষ্ঠিত চতুরঙ্গ পত্রিকাতেও এই বই আলোচিত হয়েছিল। তারপর থেকে একের পর এক বইয়ের প্রকাশ চলতে চলতে মনে হয় সামান্য কবি স্বীকৃতি হয়তো আমি পেয়ে গেছি। বাড়তে থাকে কবিবন্ধুর সংখ্যা, আমার কবিতা পাঠকের সংখ্যা, কফি হাউস ছাড়িয়ে লিটল ম্যাগাজিন মেলায়, কলকাতা বইমেলায়, অজগ্র কবিতা পাঠের আড্ডার আসরে। শুরু হয়ে যায় কবিতা-ক্যাম্পাস পত্রিকার প্রকাশ ১৯৯১ সাল থেকে, তৎসহ কবিতার ওয়ার্কশপ। কলকাতা ছাড়িয়ে সিকিমের পাহাড়ি গ্রামের পথে পথে, নদীর ধারে, উপজাতি অধ্যুষিত কোনো জনপদে, জামসেদপুর শহরে, বীরভূম, পুরুলিয়া থেকে দিল্লির কসমোপলিটান শহরের কোনো রিসোর্টে কবিতার আড্ডা দিনভর। আজ কৈশোরের স্বপ্নের কথা ভাবতে গিয়ে দেখি অনেক কিছুই বাস্তবে সম্ভব হয় নি। পথ বদল ঘটেছে। ভেবেছিলাম, গ্র“প থিয়েটারের কর্মী হয়ে কাজ করে যাবো সারাজীবন। পরিবর্তে হয়ে গেলাম কবি আর যৌবনের শক্তিতে উত্তেজনায় ও স্বপ্নে ডানা মেলে ওড়ার কারণে কবিতা ক্যাম্পাস নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছি। কবিতা লেখা থেকেও কোনদিন অবসর নিতে পারি নি। আমি কবিতার গন্ধ পাই সর্বত্র। কবিতার গন্ধে, কবিতার অক্সিজেনে আমার দিন যাপন। ফরাসি ভাষার পণ্ডিত ও প্রয়াত প্রবীণ কবি অরুণ মিত্রকে দেখে ভাবতাম অরুণ মিত্রের স্বপ্নগুলি আমিও যদি ছুঁতে পারি, তাহলে হয়তো বাংলা কবিতার ইতিহাসে কয়েকটি বাক্যের উৎসব রেখে যেতে পারবো। বাংলার নবীন থেকে প্রবীণ কবিরা বারবার আমার চিন্তাকে, আমার সক্রিয়তাকে উস্কে দিয়েছে। আমার কবিতার উপাদান খুঁজতে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয় নি। কতো নমস্য ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এসে মহাজাগতিক কবিতার রূপ রস গন্ধ বর্ণের আস্বাদ পেয়েছি অপরিমেয়ভাবে। সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, বিনয় মজুমদার, আলোক সরকার, রবীন্দ্র গুহ, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তম দাশ, অতিন্দ্রীয় পাঠক, বারীন ঘোষাল, কমল চক্রবর্তী, সন্দীপ দত্ত, প্রভাত চৌধুরী, মণীন্দ্র গুপ্ত, রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী থেকে শুরু করে অজগ্র অগ্রজ সমবয়স্ক ও অনুজ কবি আমার কবিতা ভাবনাকে, আমার স্বপ্নকে জেনে বা না জেনে জায়মান রেখে দিয়েছেন। আমি পৃথিবীর প্রতিটি গ্রহ উপগ্রহ, অণু পরমাণুর ধ্বনি প্রতিধ্বনি শুনতে পাই আর ডানা মেলে নির্ধারিত মানচিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে উড়ে চলি দূর থেকে সুদূরে।

কাকতাড়–য়া রহস্য
সৈয়দ তৌফিক জুহরী

ধুলো-মাঠের ভেতরে আমরা কজন যখন ভিজছি, কাদা-পানি মাখছি, মাখন-মাখন কাদা এঁটে যাচ্ছে আঙুলের খাঁজে-গোড়ালিতে, তখনও কাকতাড়–য়াটা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের দেখে চোখ টিপে দেয়। বাতাসে তার শন-শনে চুল ওড়ে, তালিমারা শার্ট ওড়ে, বুকের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে খড়-রোম। জল-কাদা জমতে-জমতে চোখজোড়া মুছে যায়, মনে হয় চোখ বুঁজে আছে। ঠোঁটে হি-হি হাসি থাকে, এক ঠ্যাঁংয়ে দাঁড়িয়ে থাকবার অভ্যেস থাকে। কেউ দেখে, কেউ দেখে না। ঝড়-বাদলে পড়ে গেলে, মুখ-নাক উুঁবু হয়ে ধানক্ষেতে শুয়ে পড়লে, কেউ টেনে তুলে দেয়। তার আগে নয়।
বাড়ির সাঁতাল কামলা আক্কু বড় সাদা গাইটার দুধ দোয়াতে-দোয়াতে, মাঝে-মধ্যে কাকতাড়–য়াটাকে দেখে, বিড়-বিড় করে কী-সব কয়! বুঝি না। আমরা তখন বাছুরটাকে টেনে ধরে রাখি, অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। দুতিনজন নরম হাতে হাঁচড়-পাঁচড় করলে, বাছুরটা ডাকে; গাইটারও চোখ গোল-গোল হয়। বিকট শব্দে সেও ডেকে ওঠে। আমরা ডাকি, ভেঙচাতে থাকি, চোখ বড়-বড় করিজ্জআক্কুও লাথি থেকে নিজেকে বাঁচাতে হুস-হাস করে। গাইটা তবুও ডাকে। আমরা ছুটতে থাকি, দর-দর ঘাম ঝরে;  আকাশের সূর্যটা তখনও রক্তজবা। এভাবেই মাথায় তেল-জল লাগে না বহুদিন, শরীরে খড়ি উঠছে। দুতিনজন ধাানক্ষেতে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করে, আর বলতে থাকে, এই ধান যে খাইল, সে আমার পেচ্ছাব খাইল! কেউ শোনে না, জানতে পারে না। কাকতাড়–য়াটা শুধু ঠন-ঠন কাঁপে! তখন টুকু মিয়া তার হাফপ্যান্টটা খুলে কাকতাড়ুয়াটাকে দান করতে চায়, পরিয়ে দিতে চায়। বাঁশ-কাঠের কলকব্জা কিছু বলে না, চোখ টিপে হাসে, ভেতরের পচ-পচে জল বেরিয়ে আসে। গাঁয়ে কটা কাক থাকে আর, তবুও তার নাম কাকতাড়–য়া। আমরা কাক খুঁজি, নিজেরাই হুসহাস কাক তাড়াই, প্রজাপতি-ফড়িং তাড়াই, ঘাসমধু খাই, কাটা ঘায়ে থেঁতো করে দুর্বা লাগিয়ে দেই। ফড়িংগুলো বেশিদূর ওড়ে না, প্রজাপতিগুলো এ-ফুলে ও-ফুলে ঘুরতে-ঘুরতে পথভুলে আমাদের হাতেই ধরা পড়ে। কেবল পরেশ কাকা জংলায় শৌচকাজে ঢুকলে ওদিকে যাই না। গালি কার ভাল লাগে! কেন্নোর কয়টা পা থাকে সেটা নিয়ে তর্ক হয়, কালির জিভে আসল রক্ত না-কি নকল রঙজ্জএ-নিয়ে ঝগড়া হয়। এসব ঝগড়া-বির্তকে আমরা কেউ জিতি না,  তেমনি হেরে যাবারও প্রয়োজন বোধ করি না। চারদিকের হাওয়া ঘুর-ঘুর ঘোরে, জল-বাতাসের বাষ্প উদোম দেহে ধাক্কা দিতে থাকে। শরীর শুষে নেয় সূর্যটা। দম বেরিয়ে আসতে চায়, তবুও মার্বেল-গুলতি লাফিয়ে ওঠে, ডেগ্গেলের মায়া ছাড়া যায় না। পকেট বোঝাই মাবের্লে, মায়া-মমতামাখা জলকাদার ছোপ-দাগ লেগে থাকে সারাদেহে। হাঁটাপথ দৌড়ে পেরোই, দৌড়পথ উড়তে-উড়তে। সাপখোপের ভয় জাগে না, জল-পাঁকের ঘেন্না নাই। একটু-আধটু ঘেন্না হয়ত থাকে! সেটুকু জয় হয়ে যায় প্রতিদিনকার ছোটাছুটির ভেতরে, ঘাম-জলের চলনদারিতে।
ঐযে তখন বললাম, ধুলোমাঠের ভেতরে আমরা কজন ভিজছিলাম…সেটি বড় কথা নয়। কাদা আমাদের ভালো লাগে, সেটিই বড় কথা। কাদার তালগুলো জলস্পর্শে টল-টলে আঙুল গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ছোট-ছোট আগাছা তিরতির কাঁপছে। এঁদোডোবাগুলো খুব জল পাচ্ছে। তাদের বুক উঁচু হয়ে উঠছে। সেসবের ভেতরে একটা জলঢোঁড়ার মাথা দেখা গেল। আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। আমরা তখন বৃষ্টি গিলে খাচ্ছি, লুঙ্গি ভিজে এঁটে গেছে শরীরে। বিমল বলল, চল সাপটাকে ধরি।
সাপ কি ধরা যায়? সেটা কি বগলদাবা করে ছুটে বেড়াবার জিনিস, যেন উঠোনের কোনে পড়ে আছে টুক করে তুলে নাও; কেউ বলবার নেই, ধরবার নেই। কে ধরবে সাপ? বিমল আমার দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে, ভেজা চুলের টলটলে জলে খেলা করছে আলোর রেখা। টুকু তার জিপারবিহীন হাফপ্যান্টটায় গিঁট দেয়। একটা বিষম হাওয়া আসে। সাপটাকে দেখা যায়, এখনও রয়েছে, ধরা পড়ার ভয় নেই বোধহয়। কে কী করবে? কোন দিক দিয়ে ছুটবে? একটু নড়-চড় হলেই সাপটা ঢুকে যাবে ধানক্ষেতে, ওখান থেকে স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা একটা গন্ধ আসছে। সেটা বেশ বুঝতে পারছি। এমন অবস্থায় জলিল বলল, পানি খাব। বিমল বিরক্ত হল, খা-না, কে তোকে বাঁধা দিচ্ছে। হা করে থাক। ঝুম বৃষ্টির জলপতনের ভেতরে জলিল গুম হয়ে রইল, হা করল না । কেমন ঘুটঘুটে আঁধার চারদিকে। বৃষ্টির রেশের সাথে আঁধার চলে যাবার কথা, যায় নিজ্জরয়ে গেছে।
হাওয়া দিচ্ছিল খুব। হঠাৎ হাওয়াটা মরে গেল! অমনি আমাদের সকলকে অবাক করে দিয়ে জলিল ঝাঁপ দিল জলে। জলকাদার দপদপানি, ধানক্ষেতের খসখস, হাওয়ার শনশনের ভেতরে জলিল উপুর হয়ে পড়ে রইল। আর উঠল না। তখন সাপখোপের ভয় ভুলে জলে নামতে হল আমাদের। উপুর হয়ে, দম হারানো, জ্ঞানহীন ছেলেটাকে টেনে আনতে দম বেরিয়ে যেতে থাকে। অনুমান করি সেটা ঢোঁড়া সাপ ছিল না। সাঁই-সাঁই বাতাসের ফাঁকে, ভয়ধরানো একটা গন্ধ ফুসফুসে ঢুকে গেছে ততক্ষণে। মরে গেল না-কি ছেলেটা!
গত বছর উত্তর পাড়ায় তিন জন মরেছে সাপের কামড়ে। বিগত বছরের প্রতিটি মৃত্যুঘটনা আমদের মাথায় ঘুরতে থাকে, মৃত্যুর পর তাদের চেহারা কেমন হয়েছিল সেটিও ভাবতে থাকি। মনের চোখে ভাসতে থাকে, উড়তে থাকে, খুব ভেতরে কোথায় যেন গেঁথে যাওয়া সেসব স্মৃতিজ্জআলাদা করা যায় না। আশেপাশে ঘরবাড়ি নেই, দূরে আমাদের পাড়ার রেখামাত্র চোখে পড়ে। জলিলের ঠোঁটের কোনে কষ গড়াচ্ছে, চোখ উল্টে গেছে, নিথর শীতল দেহে পড়ে আছে সামনে। অথচ ওর পাড়ায় ডাক্তার-বাড়ি রয়েছে, শহরের পাশ করা ডাক্তার, নাড়িটেপা হাতুড়ে নয়। সাহেব ডাক্তার, ফোড়াটোড়া গালিয়ে দেবার জন্য সহকারী রেখেছে, একটা কম্পাউন্ডার আছে। কিন্তু, ওদিকে যাব কীভাবে? ভুতুড়ে বৃষ্টির ভেতরে, দশাসই দেহটা কি টানা যাবে? এ-কি সম্ভব!
ডাক্তারের কথাটা মনে পড়তেই গা হিম হয়, ঝড়-বৃষ্টির ভেতরেই কেমন শন-শন লাগে। গত মাসে আমি দিব্যি ভাল মানুষটি ছিলাম, রোগ-বালাইয়ের রেখামাত্র ছিল না, জ্বর-জ্বরভাবও না। বগলে আঁক কষার খাতা ছিল, মাথায় তেল-জল ঘষা এলোচুল, চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। ডাক্তার লোকটা এসেছিল আমাদের বাড়িতে। চোখে চশমা, ফুলপ্যান্ট-ফুলশার্ট পরা, ইন একটু বেরিয়ে এসেছে, চশমার কাঁচটা খানিকটা ঘষা। আক্কুর ক-দিন বেশ জ্বর চলছিল, কাজকর্ম কিছু করে না, বিছানায় পড়ে থাকে, আর বহু আগে মরে যাওয়া পাঁচ বছরের কন্যা সন্তানের নাম ধরে ডাকতে থাকে। সন্ধ্যায় মাঝে-মাঝে যখন মাথার কাছে কুপি জ্বালিয়ে দিয়ে আসি, কপালের ভাপ নেই, তার বিড়-বিড় কণ্ঠ শুনি। ক্লান্ত, ভাঙা, জড়ানো, একটানা ক্লান্তিকর স্বর। মেয়েটির নাম ধরে ডাকতে থাকে। কোথায় গেল সেই মেয়ে? কতদূর? রোগযন্ত্রণায় শুকিয়ে দুচোখ বেরিয়ে এসেছে, দেহ থেকে ঝরছে কটুঘাম, শ্বাসের ওঠানামা চোখে পড়ে। আমার খারাপ লাগে, কষ্ট হয়। কিছুক্ষণ বসে থাকি।
সেদিনও বসে আছি আক্কুর পাশে। দুপুর বেলায়। মাথার কাছের ডালিম গাছটায় ডালিম ফাটছে। পাতা-টাতা ঝরে পড়ছে। আমার কেবল খুব গরম-গরম লাগছিল, চোখ-মুখ জ্বলছিল। ডাক্তার আমাকে দেখে বলল, এই ছেলে তোমার বোধহয় টাইফয়েড হয়েছে। কী কড়া ডাক্তার! চোখ-মুখ দেখে বলে দিল, নাড়ি টেপা লাগল না। তারপর সাত দিন বিছানায় কাটতে হল, কিচ্ছু মুখে দিতে পারি না। কিছুই হজম হয় না। অষুধগুলোও ভাল না, স্বাদ নেই, আর কেমন যেন গন্ধ। যতই নাক বন্ধ কর, চেপে ধরো, ট্যাবলেটের ঘ্রাণটা ভুরভুর করে সরাসরি মগজে চলে যায়। আটকানো যায় না। কদিন খুব জ্বালা-যন্ত্রণা সয়ে যখন দাওয়ায় এসে বসেছি, দেখি আক্কু আমায় দেখে হাসছে। দাঁত বেরিয়ে আছে। সে আগেই সুস্থ হয়ে গেছে। এ কেমন কথা! কেন? রোগ হবার দশটা যন্ত্রণার ভেতরে একটা প্রধান যন্ত্রণ হল বাইরের পৃথিবীতে সব ঠিকঠাকমত চলবে। শুধু আমি নড়তে-চড়তে পারব না। এ মানা যায় না।
আমি যখন নরম-কণ্ঠে মেয়েটির খোঁজ করি, তখন আক্কুর পিতৃহৃদয় কাঁদে। নাম বলতে পারে না, গলা ফ্যাঁস-ফ্যাঁস করে, জ্বরটা বোধহয় আবার জাঁকিয়ে নামতে চায়। সাঁতাল পাড়ার ঝকঝকে ঘরদোরের ভেতরে মৃত্যুশাসিত মেয়েটির মুখ ভেসে ওঠে।  মাটির দেয়ালের আঁককাটা নকশা ভেসে ওঠে, ছিপ বড়শির ফাৎনা নড়ে ওঠে, ঘোলা জলে বুদবুদ ভাসে, আট-দশটা শুয়োর ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে ডাকে। যে দৃশ্যগুলো ভাসে সেগুলো ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, হুসহাস উড়ে যায়। লতায়-পাতায় জড়িয়ে যায়। আক্কুর ছোট একটা ধানি জমি আছে, এই এত্তটুকুন, আমরাও দেখেছি। দূরে দাঁড়িয়ে, চোখের সামনে চার আঙুল তুলে ধরে, মেপে দেখেছি আর-কী! এই মাপের কোনও ঠিকুজি নেই, কোনও মানদণ্ড নেই, মেপে নিলেই হল। সেই এত্তটুকুন জমিটিতে ধানের বীজ ফেলেছিলো। সে-কী খাটুনি! বাপ-বেটি মিলে ছুটোছুটি। বাসি ভাত, খুদকুড়ো, পচানি জল, দম না ফেলা উষ্ণ দিন, সব পেরিয়ে যেতে থাকে হু-হু করে। এক মাস যায়, দুমাস যায়, বছর যায়, কাজ করতে-করতে মেয়েটা শুকিয়ে যেতে থাকে, চোখ দুটি কোটরে ঢুকে যায়। ধাক্কা দিলেই বুঝি ঢলে পড়বে, ঝরে যাবে, টুকরো-টুকরো হয়ে যাবে। ধানে যখন সোনা রঙ ধরল, মেয়ে আর উঠতে পারে না, বাড়ির উঠোনে পড়ে থাকে সারাদিন। কী যে রোগ ধরল বোঝা যায় না। পড়ে-পড়ে শুকিয়ে যেতে থাকে, শুকিয়ে আমসত্ত্ব হয়ে যায়, পা দুটি জির-জিরে হয়ে যায়, কাপড়-চোপড় ঢুল-ঢুল করে। সূর্য পেছনে রেখে বসে রইলে তার দীর্ঘ ছায়া পেরিয়ে যায় বহুদূর। মাথায় আড়-খাড় চুল, বাঁধবার তেল দেবার কেউ নেই। মা নেই। বাপ আর কতদূর কী করতে পারে! আমাদের দেখলেই হাসে। আমরা হাসি না, ভুরু কুঁচকে থাকি, দল-বল নিয়ে ছুটে যাবার সময় উঁকি দেই। কী খাচ্ছে দেখি। কেমন করে খায়, সেটা দেখি। একটা মৃতপ্রায় রোগির খাবার গ্রহণের দৃশ্য দেখে মায়া লাগে। আক্কুর পয়সা-পাতি নাই, শরীরে কেবল মোষের মতন জোর আছে। সে জোর দিয়ে রোগ সারে না, ডাক্তারের ভিজিট হয় না। তাও যেটুকু দেখাতে হয়, ইন্জেকশনে খরচ যায়, সেসব টানতেই হিমশিম। কে দেবে হাজার টাকা? আক্কু সেবা করতে পারে না, ¯েœহ দেখায় না, বোকার মতন মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। মেয়েটার সামনে ভাত থাকে না, জাউ থাকে না, পান্তা থাকে না। কেবল এক বাটি শুকনো মুড়ি। সেটাই নাড়ে, দু-একটুকরো মুখে দেয়, শুকনো জিভে লটপটিয়ে ভেজায়। ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার কালে ঘাড় ঘুরিয়ে যখন দেখি আক্কু ঘরেই আছে, বসে আছে। আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকায়। ঠোঁটে ভাষা নেই, চোখের দৃষ্টিতে কোনও অর্থ নেই। কী যে ভাবছে? জানার উপায় নেই।
আর কতদিনজ্জজানতাম দেখতে-দেখতে মেয়েটা একদিন মরবে। যেন মোমবাতিটা একটুখানি জ্বলে আছে, হালকা হাওয়া দিলে, একটা ছোটা ফুঁ দিলে নিভে যাবে। কেউ বলে উঠবে, এই যাহ্ নিভে গেল! হলও তাই। তবে মরল আগুন লেগে। কেমন করে? কেন?
এদিকে বৃষ্টির তেজ কমে এসেছে। জলিলের দেহটা সেই তেমনিভাবে পড়ে রয়েছে, চোখজোড়া কুঁচকে গেছে, ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে ফ্যান-ফ্যন করে থুতু-সর গড়াচ্ছে । টুকু মুছে দিল। দেখা গেল, আরো বেরুচ্ছে। ফ্যানা, কষ, গাল বেয়ে ঝরছে তো ঝরছেই। শালার দেখি পেট ভর্তি বিষ! টুকু বড়ই বিরক্ত হয়, লুঙ্গির গিঁটটা শক্ত করে বাঁধে, পেটটা চুঁচিয়ে যায়, খেয়াল থাকে না। কিছু একটা করবে সে, এমন ভাব। অথচ কিছুই করে না। হাই তোলে। জলপতনের জোর মাপে, হাওয়া-নকশা খোঁজে, বাম গাল চুলকায়। আমাকে বলে, এই আমার পিঠটা একটু চুলকে দিবি! জ্ঞানহীন একটা ছেলে মাটিতে পড়ে আছে, এসব নিয়ে তার কোনও বিকার নেই, অস্থিরতা নেই। টুকুর বাপ না-কি ডাকাতের রাম-দার ঘায়ে মরেছিল। তখন যদি এমন বয়স থাকত হয়ত তার বিকার থাকত না। বড় অদ্ভুত বালক! আমরা প্রায়ই তাকে নিয়ে অবাক হই। একদিন স্কুল মাঠে বসে আছি, হাওয়াটা মরে ছিল, গাছের পাতা-টাতা নড়ছিল না। টুকু এসে বসেই বলল, একটা খেলা দেখবি। কী খেলা? কী খেলা? দেখা-তো! শার্টের তলা থেকে নিজের বাম হাতটা আমাদের সামনে মেলে ধরে তখন। দেখি, বাম হাতের বুড়ো আঙুল থেকে রক্ত ঝরছে, ঝরেই যাচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে না। আম পাড়তে কোনও একটা গাছে চড়তে হয়েছে তাকে। বড়-সড় পুরোনো গাছ, চড়লে দেখে-শুনে নামতে হয়, নইলে অনর্থ ঘটবে। কীভাবে যেন হাত ফসকে পড়ে গেছে। বুড়ো আঙুলের অনেকখানি খসে এসেছে, সেখান থেকেই ঝরছে রক্ত, অনেক অনেক রক্ত , কালচে-লাল বর্ণের। জ্বল-জ্বল করছে। কেউ বলল, দুর্বা-টুর্বা ঘষে লাগা, কেউবা ডাক্তারের কাছে যেতে বলে। আয়োডিন লাগালে জ্বালা থাকবে না, সেপটিক হবে না, ঘা-টা শুকিয়ে যাবে। টুকু মাথা নেড়ে বলে, নখটা কী থাকবে? সে-তো জানি না। আমাদের কেউ জানে না।
নখটা বাঁচবে না বুঝছিস, তবে রেখে কী লাভ? ভাল প্রশ্ন। কী করবি তবে? টুকুর চোখেও প্রশ্ন। সেলিম বলল, অনেকখানি আটকে আছে। মনে হয় থেকে যাবে। সেলিমের কথায় টুকু বিরক্ত হয়, মাথা নাড়ে। তার মাথা নাড়ানির সাথে সায় দেয় গাছগুলো, হাওয়াটা জোরছে বইতে থাকে। যেন জবাব দিচ্ছে, বুঝে নাও ইশারা।
টুকু পকেটে হাত ঢোকায়, হাফপ্যান্টের পকেটজুড়ে খানিকটা হাতড়ায়, পাতলা পরতের প্যান্টটার ভেতর তার মুঠিবদ্ধ হাত অনুভব করি। কী আছে হাতে? ভাবতে-ভাবতে হাত বেরিয়ে আসে। একটা চিমটে! সেটা যতœ করে মাটিতে নামিয়ে রাখে সে। তারপর আবার হাত ঢোকায়। একটুকরো তুলো, ডেটল, আধময়লা কাপড়ের টুকরো, গোলমতন ঝিনুকের খোলসজ্জএইসব। বের করে সাজিয়ে রাখে। সবাই বুঝতে পারি সে কী করতে চায়। এসব কী দেখা যায়? রক্তারক্তি ব্যাপার-স্যাপার। সেলিম ঢোক গেলে ভয়ে, শুনতে পাই। বিমল ফ্যা-ফ্যা করে বাঁকা হাসি হাসে, যেন এটি কোনও ঘটনা নয়। সে নিত্য-নিত্য এরকম নখটোখ টেনে-হাঁচড়ে তুলে আনে, কাজটা গোপনে করে, তাই আমরা জানতে পারি না। আরও দুতিনজন এসে জমা হয়। কেউ একজন বলে মাস্টারকে বলে দেব। টুকু ভেঙচি কাটে, যা বল গিয়ে, হুঁহ্! তারপর চিমটাটা সযতেœ তুলে ধরে, হাতের তালুতে মুছে নেয়, একবার আকাশের দিকে তাকায়, আমার মুখে দিকে তাকায়। কিছু বলে না। বোধহয় ভেতরে-ভেতরে শক্তি ভরে নেয়, গালের পেশি শক্ত হয়ে ওঠে, চোখজোড়া লাল হয়, মুখ-ঠোঁট কুঁচকে যায়। তারপর একটা হ্যাঁচকা টান!
গল-গল করে রক্ত বেরিয়ে এসে ক্ষতমুখে।  রক্তবিন্দু জমছে। একদলা বড় রক্তবিন্দু টুপটুপ করতে থাকে। টুকু সেদিকে তাকিয়ে আছে, তাকিয়েই আছে, বোধহয় রক্ত দেখতে তার ভাল লাগে, আনন্দ হয়। থক্ করে একদলা থুতু দেয় আঙুলটায়। এমন দৃশ্যে, ছেলেদের হই-হইয়ের ভেতর, দেখি নখের সাথে আঙুলের একটুকরো মাংস খুলে এসেছে তার। সেটা পড়ে আছে মাটিতে। ডেটল নয়, ব্যান্ডেজ নয়, পরিচর্যা নয়, সে-রক্তমাংসের নির্যাসে একদলা থুতু দেয় টুকু। থুহ্!
এদিকে জলা-মাঠের ভেতরে খুব ঘোর-ঘোর লাগলে, হঠাৎ দেখি জলিল উঠে বসেছে। তার কিছুই হয় নি। এতক্ষণ আমাদের বিপদে ফেলে মজা দেখছিল। টুকু এ-দৃশ্যে সাপের মতন শীতল হয়ে যায়, চোয়াল দৃঢ় হয়, মাথা আউলা হয়ে যায়। কিছুক্ষণ কী করবে বুঝতে পারে না বোধহয়। বিমল চোখ পিটপিট করে। আমি হাঁপ ছাড়ি। জলিল থেমে থাকে না, দৌড়-দৌড়-দৌড়, সোজা ঢুকে যায় ধানক্ষেতে ভেতরে।  আমরা ছুটি, ছুটতেই থাকি, বৃষ্টি তখন আরও জাঁকিয়ে নামে, চোখে ঝাপসা দেখি, জলের ঝাপটা নাক-মুখে ঢুকে যায়। হাওয়াটা ভাল লাগে, কানি বক উড়ে যায়, পায়ের তলা গাব-গাব করে। টুকু হাঁচড়ে-পাঁচড়ে জলিলকে ধরে ফেলে, ঘুষি লাগায়, লাথি দেয়, একটা লাঠি তুলে বেদম মারে। জলিল হা-হা করে হাসে, মার থেকে গা বাঁচায়, পা বাঁচায়, মাথা বাঁচায়, বেঁকেচুরে শরীর সরিয়ে নেয়। আমরাও লাঠির মতন তেমন কিছু একটা খুঁজি। কিছুই পাই না। এখানে-তো একটা কাকতাড়–য়া ছিল? কোথায় গেল সেটা? ওটা ভাঙলে লাঠি পাওয়া যাবে, মোটা ড্যাবডেবে লাঠি, সেজন্য খুঁজি। জলিল তখনও হাসছে। মারধরের পরেও হাসছে, হাসতে হাসতে চোখ-মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। কাকতাড়–য়াটা না পেয়ে যখন আমরা কজন হতাশ, ক্লান্ত, বিরক্তজ্জতখন সচেতন হলাম, ধানক্ষেতে কাকতাড়–য়াটা নেই। এখানে নেই। ওখানে নেই। কোত্থাও না। জল-কাদার ভেতরে, আমাদের চমকে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মানুষ। টুকুও থমকে গেছে, একটু আগে যে লাঠি দিয়ে জলিলকে পেটাতে চাইছিল সেটা খসে গেছে হাত থেকে। লোকটা চিনে ফেললাম আমরা সবাই। একমুহূর্তে বদলে গেল দৃশ্যপট। এ-কে আক্কু না কি?
ঠোঁটজোড়া তার নীল আর শীতল, দেহ থরথর কাঁপছে। কাকতাড়–য়াটা ওর পায়ের তলায় পিষে যাচ্ছে। কোনও কথা কইছে না সে। কেবল বহুদিন আগের আগুনে মরা মেয়েটা ওর দুচোখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। হল-হল করে বেরিয়ে আসছে। আমরা দেখলাম!

আমি যেভাবে বড়ো হচ্ছিলাম
অনুপম মুখোপাধ্যায়

খুব আবছাবেলার একটা ছবি মনে  গেঁথে আছে। তখন আমার বয়স হয়তো বছর তিনেক হবে। বর্ষার একটা দিন। ওই সময় আমরা একটা ভাড়াবাড়িতে থাকতাম। তার মাটির দেওয়াল। এসবেস্টসের ছাউনি। বাবার চিরকালের গাছপালার শখ। বাবা ওই ছোট বাড়িটার সামনেও বাঁশের বেড়া দিয়ে কোনোরকমে একটা বাগান বানানোর চেষ্টা করেছিল। সেই বৃষ্টিঝরা দিনে বাবা কিছু গাছ লাগাচ্ছিল। এখনও মনে গেঁথে আছে সেই গাছগুলো…তারা সম্ভবত বেলা অথবা অন্য কোনো ছোট ফুলগাছ। তাদের উচ্চতা আমার চেয়ে বেশি তখন। তারা জলে সবুজে মাখামাখি হয়ে ঝকঝক করছে।
সেইসঙ্গে কাদামাটির গন্ধ।
ভেজা বাতাস।
ওই দৃশ্যটা একটা অমোচনীয় ইম্প্রেসন হয়ে আছে। দৃশ্যটা আমার ছেলেবেলাকে পুরোপুরি রেফার করে না। কিন্তু একটা প্রবণতাকে চিনিয়ে দেয়। কিছুটা হলেও আমাকে চিহ্নিত করে।
বছর তিনেকের একটা বাচ্চার মনে ওই ছবি গেঁথে গেল কেন?
যেমন আমার যখন বছর পাঁচেক বয়স। স্কুলেও ভর্তি হই নি। মায়ের খুব অসুখ করেছিল। আমাদের মফঃস্বল শহরে কিছু হল না। আমরা চিকিৎসার জন্য সপরিবারে কলকাতা গেলাম। শেয়ালদার একটা সস্তা হোটেলে উঠেছিলাম। দোতলার একটা ঘর। তার বারান্দায় বসে ফ্লাইওভার দেখা যেত। হাওড়া স্টেশনে একটা আনন্দমেলা কিনে দিয়েছিল বাবা।
সেটা পড়তাম। তাতে কার্ল লিউইস আর বেন জনসনকে নিয়ে বেশ মাতামাতি ছিল। ফাঁকে ফাঁকে দেখা যেত পুলিশ ট্রাফিক সামলাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে পয়সাও নিচ্ছে। বারান্দায় একটা কালো টেলিফোন ছিল। সেটা থেকে বোধহয় ফোন করা যেত না, কিন্তু রিসেপশনকে ডাকা যেত। সেই প্রথম আমার একটা টেলিফোনকে স্পর্শ করা। সেটা তো বটেই। মনে আছে একবার রিসিভারটা তুললাম, একটু পরেই একতলা থেকে এক মহিলা এবং এক পুরষ এসে হাজির হলেন।
রিসেপশনের পাশে একটা প্রায়ান্ধকার একোয়ারিয়াম ছিল। তাতে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট মাছ। এখন বুঝতে পারি সেগুলো মলি-প¬াটি-টাইগার। এখন আমার নিজের একটা মস্ত একোয়ারিয়াম আছে। তখন…সেই বাচ্চাটির মনে স্কুবা ডাইভিং-এর আমেজ লেগেছিল।
মনে গেঁথে গেছে সেই একোয়ারিয়াম।
ওই একোয়ারিয়ামও কি আমাকে চিহ্নিত করে না?
যেমন একবার পাশের বাড়ির সঙ্গমদৃশ্য দেখে ফেলেছিলাম বছর ছয়-সাত বয়সেই। বুঝতে পারি নি। ভেবেছিলাম বর-বৌ জোর মারপিট করছে। পরে বুঝে ফেললাম। ক্লাসে এসে অদ্ভুত মারপিটটা বললাম। কচি কচি বন্ধুরা বুঝিয়ে দিল। যারা ভাবেন ওই বয়সের বাচ্চারা ওসব জানে না, তারাঁ বুদ্ধিমান এবং…বোকা। মেয়ে এবং ছেলেদের ওই খেলাটা শোনার পর থেকে সেই যে চরিত্র খারাপ হল, আর কোনোদিন একটা সঙ্গমকে রক্তমাংসের স্বাভাবিক ঘটনা ভাবতে পারি না।
ওটা যদি না দেখতাম, আমি কি অন্যরকম হতাম?
অন্য কবিতা লিখতাম?
কবিতা কি লিখতাম না?
সেই ফড়িং এবং প্রজাপতিগুলোর কথাও বলা চলে। আমি কচুপাতায় ফড়িং ধরে তাদের ফরফর শুনেছি। তখন বিভিন্ন রং-এর আসত। এখন সম্ভবত আসে না। কলকাতার মতো না হলেও এখন ঘাটাল একটা প্রায় দূষিত শহর। এত ভিড় তখন ছিল না। হাতে গোনা কয়েকটা মোটর বাইক ছিল। রাস্তায় মোটর বাইক গেলে লোকে তাকিয়ে দেখত। এখন সকলেরই মোটর বাইক হয়ে গেছে ব্যাংক-লোনের দৌলতে। ফলে শ্বাসকষ্ট বেড়েছে শহরে।
কখনো মারাদোনা হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, কখনও কপিল দেব। খেলা শুনতাম রেডিওয়। কেন যে তখন খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম! আমার তো খেলার অনুমতিই ছিল না। মনে আছে, একবার ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় অনেক সাধ করে বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে চাইলাম। বল করলাম। সেই বল ব্যাটসম্যান অবধি পৌঁছল না।
গড়িয়ে গিয়েছিল বলটি।
পরের বল পৌঁছল। আমার মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। দুনিয়ার বৃহত্তম ছক্কা, প্রসন্নময়ী ইস্কুলের সামনের রাস্তায়। সবার ব্যঙ্গ আজও মনে আছে।
আজ তারা কেউ খেলে না। খেলতে পারে না। মোটা হয়ে গেছে। শ্লথ হয়ে গেছে। আমি হই নি। আমি তখন যেমন ছিলাম, শারীরিকভাবে একইরকম তৃষ্ণার্ত আছি। আমি খেলি। ছাত্রদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলি। খারাপ খেলি না। যে খেলাটা তখন খেলার কথা ছিল, আজ তার সুদ-আসল বুঝে নিতে চাই।
কী আমার বড়ো হওয়াটা, আজ বুঝি, সেকালীন বিচারে সমসাময়িক ছিল না। একটা মফঃস্বল শহরেও আমি বেশ কিছুটা পুরনো দিনের আদলেই বড়ো হচ্ছিলাম। প্রায় তিন-চার দশক পিছিয়ে ছিল আমার বড়ো হওয়া।
কেন সেটা বলি।
স্মরণাতীত শৈশবে আমার যক্ষ্মা হয়েছিল। তারপর গুরুতর পেটের গোলমাল। তারপর হাম। এভাবে মৃত্যু থেকে ফিরে এলেও বেশ রুগ্ণ হয়ে গিয়েছিলাম। এলার্জিক রাইনাইটিস এবং সাইনাসের দৌলতে সর্দি লেগেই থাকত। মা আমাকে খেলাধুলো করতে দিত না। হ্যাঁ। অমল। আমি একটা জানালার ধারে বসে ডাকঘর-এর অমলের মতোই পাড়ার বাচ্চাদের খেলাধুলো দেখতাম তৃষ্ণার্ত চোখে। প্রায় এক ভয়্যারের মতো।
এর ক্ষতিপূরণ করা হত বাবার স্কুলের এবং শহরের লাইব্রেরি দুটি থেকে বই এনে দিয়ে। আমার জন্য বই আসত। মায়ের জন্য উপন্যাস আসত। তখন টিভি ছিল না। আমি রূপকথার মলাটছেঁড়া বই পড়তাম। তাতে ছাপাই ছবি থাকত। পাশাপাশি লুকিয়ে লুকিয়ে মায়ের উপন্যাস থেকে নায়িকার স্নান করার রূপও পড়তাম। ফলে না থাকতাম বাচ্চা, না থাকতাম এডাল্ট।
এই দশা আমার আজও কাটল না।
আমি তখনকার বাচ্চাদের মতো সুপারম্যান-স্পাইডারম্যান-ব্যাটম্যান দিয়ে শুরু করি নি। ওসব নাম আমি জেনেছি পরে স্কুলে ভর্তি হয়ে। আমাদের মফঃস্বল শহরে ওসব পাওয়া যেত না। ভাগ্যবান কিছু বন্ধুর বাবা কলকাতা থেকে এনে দিত। তারা সগর্বে সেগুলো দেখাত। আমি একটাও পুরো পড়তে পারি নি। তবে ওসব নায়কের ছবি আঁকতে পারতাম। তার আগে ক্লাস টু-থ্রি থেকে হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে, বাঁটুল দি গ্রেট-ও জেনেছি এবং গোগ্রাসে গিলেছি। চাচা চৌধুরীও বেশ পেশ পরে আমার জীবনে এসেছেন। ক্লাস ফোর হবে সেটা। ইন্দ্রজাল কমিকসের চরিত্রগুলোর সঙ্গে তো আলাপ হয়েছে তখন আমার বয়স দশ পেরিয়ে গেছে। অরুণদেবকে দারুণ লাগত। ম্যানড্রেককে ভাল লাগত না। তবে তার নায়িকা আমাকে খুব টানত। তাকে দেখলেই হিসু করার জায়গায় একটা ব্যথা-ব্যথা উত্তেজনা টের পেতাম।
লিঙ্গে উত্তেজনা নেই, এমন কোনো সময় আমি নিজের জন্য স্মরণ করতে পারি না।
টারজান পড়ে টারজান হতে ইচ্ছে করেছিল। একটা পুরোনো হাফপ্যান্ট ছিঁড়ে নেংটি বানালাম। পরলাম। কোমরে একটা ফলকাটা ছুরি গুঁজলাম। বাড়ির পিছনের ঝোপঝাড় হয়ে গেল আফ্রিকা।
আমি শুরু করেছিলাম উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীকে দিয়ে। খুব দ্রুত হেমেন্দ্রকুমার রায় এবং সত্যজিৎ রায়। ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হওয়ার আগে যখের ধন এবং বাক্স রহস্য পড়া হয়ে গিয়েছিল। রাস্তার লোকেদের মধ্যে আমি তখনই লালমোহন গাঙ্গুলির মিল খঁুিজ। রাত্তিরে মানুষ পিশাচ-এর গল্প মনে পড়ে ভয়ে জেগে থাকি। এই অকালপক্বতা আমার সঙ্গ কোনোদিন ছাড়ে নি।
কোনদিন কোনো বন্ধুকে সমবয়সী ভাবতে পারি নি নিজের পাঠাভ্যাসের কারণে। যখন বন্ধুরা ইন্দ্রজাল কমিকসে পৌঁছেছে, আমার তখন হেমেন্দ্রকুমার রায় রচনাবলি শেষ। যখন তারা সুনীল ধরেছে, আমি তখন কাফকায় বসে আছি। এটাতে আমার কিছু মহত্ব প্রমাণিত হয় না।
এটা একধরনের অসহায়ত্ব।
এতে মানুষ একা হতে থাকে।
এর ফলেই আমার কোনো সমমনস্ক বন্ধু নেই আজ অবধি। লেখালেখির জগতে কিছু কাছের দূরের সহযাত্রী আছে।
কবিতা লেখা শুরু হয়েছিল ক্লাস সেভেন থেকে। আমাদের এক বাংলা শিক্ষক ছিলেন। রামরঞ্জন রায়। বেশ পণ্ডিত মানুষ। প্রেমেন্দ্র মিত্রর উপরে ডক্টরেট করেছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রর কাছের মানুষ ছিলেন। আদি কংগ্রেস থেকে কম্যুনিস্ট পার্টিতে এসেছিলেন। নকশাল আমলে নিজের ইস্কুল পোড়ানোর অভিযোগে জেলে গিয়েছিলেন।
উনি অঙ্গীকার নামে একটা কাগজ করতেন।
বলে রাখা যেতে পারে, আমাদের ঘাটাল শহরের আদি নাম অঙ্গীকার।
একদিন ক্লাসে রামবাবু অর্জুনের অপরাজেয়তার কথা বলছিলেন। আমার মহাভারত পড়া ছিল। আমি বললাম অর্জুন নিজের ছেলের কাছেই হেরে গিয়েছিলেন, সেই ছেলের নাম বভ্রুবাহন। স্যারের খেয়াল ছিল না। স্যারের তাক লেগে গেল। বললেন, ‘এ তো চ্যাম্পিয়ন ছেলে! এই বয়সে এ মহাভারত পড়ে ফেলেছে!’
এরপর আমার কবিতার খাতা আবি®কৃত হল। স্যারকে দেখান হল একদিন। ভূয়সী প্রশংসা করলেন। এবং চিরকালের মতো আমার মাথা খেলেন।
কিছুটা অপু, কিছুটা অমল, কিছুটা এক কামুক বালক…
আমি নব্বইয়ের দশকে বড়ো হচ্ছিলাম।
কিম্ভুত।
একা।

কুড়ানো পালকে বোনা দুঅক্ষর প্রত্নপাণ্ডুলিপি
মর্মরিত ঊষাপুরুষ

একেক মানুষ একেক বাতিক নিয়ে জন্মায়। আমার বাতিক আকাশ দেখা। দিনে নয়, রাতে। পূর্ণিমায় নয়, অমাবস্যায়। এতে চাঁদের চোখধাঁধানো আলোর ঔদ্ধত্য থাকে না, আমার দিনে-দিনে ক্ষীণ হয়ে আসা চোখদুটি স্বপ্নময়ী তারার স্পর্শ পায়। মাঝরাতে নেমে আসে নীরবতা। মানবেরা ঢুকে যায় মানবীয় খোপে। স্বেদসঙ্গমঘুমে বুঁদ হয়ে যায়। জলের ধারে বাড়তে থাকে রাতপোকাদের লাফালাফি। কচুপাতার উপর ফুরফুর করে ডানা ঝাপটায় ফড়িং। ঝিঁঝিঁ পোকারা কী এক ভাবসম্মিলনে লীন হয়ে রয়। আর আমি তাকিয়ে থাকি তারাদের দিকে, খুব মনোযোগে। মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করি, ওর মধ্যে ঠিক কোনটি সে, যার কাছে মিলেছিলো আমার আমার প্রথম কবিতার স্বীকৃতি?
সে ছিলো সাধারণ এক গ্রামবালিকা! আসতো পাশের গ্রাম থেকে। পড়তো আমারই সাথে। মাথা ভাসিয়ে তেল দিতো। সে তেল গড়িয়ে পড়তো কানের পাশ দিয়ে। ওর পাট করে বাঁধা চুলে টান মেরে বলতাম, ‘তেল একটু কম দিতে পারিস না’। ও উহ্ করে শব্দ করতো, হাসতো মুখ টিপে। ঐ হাসিটা ভালো লাগতো খুব। আর হাসির জন্য ভালো লাগতো ওকে। প্রতিদিন ইস্কুলের পথে আমি ওর জন্য অপেক্ষা করতাম। আমার দেরি হলে বটতলায় দাঁড়িয়ে থাকতো সেও। দুজন স্কুলে যেতাম একসাথে, ফিরতামও। এভাবেই দুই অবোধ বালক-বালিকার হৃদয়ে অলীক সুতোর স্বপ্নবোনা চলছিলো। দিনগুলো কাটছিলোও বেশ।
কিন্তু হঠাৎ একদিন, ও আর এলো না। পরের দিনও না। শেষপর্যন্ত জানা গেলো, সে…।
অথচ একদিন আগেও আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম মচমইল রাজবাড়িতে। তখন তো কিছুই বুঝি নি। দুজন অনেকক্ষণ পাশাপাশি হাঁটলাম। একসময় আড়াল দেখে বসে পড়লাম। সামনে কালোদিঘি, দুজনেরই চোখ সেই দিঘির নিকষকালো জলে। হঠাৎ ও মুখখানি গুঁজে দিলো কোলে। নিথর পড়ে থাকলো, যেনো ঘুমিয়ে গেছে। উরুর উপর রাখা তাঁর ঈষৎ-স্তনদুটি ত্রস্ত শালিখের মতো কেঁপে উঠলো। সে কাঁপুনিটা যেন আচমকা ঝিলিক তুলে ছড়িয়ে পড়লো গায়ে। আর হঠাৎই কোত্থেকে এক দমক গরম হাওয়া ছুটে এলো। সে হাওয়ার আঁচ লেগে যেনো পুড়ে গেলো মুখ, গলা, হাত, সমস্ত শরীর। আমি আরও গভীর বন্ধনে লীন হলাম। ও ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো। একবার তাকালো আমার দিকে। কালোদিঘির অথৈ জলের মতো শান্ত আর গভীর সে চোখ। এখন মনে হয়, সে চোখে বুঝি লেগেছিলো কতোশত অনুচ্চারিত শব্দের শবেরা! সে ভেবেছিলো, ঠিক বুঝে নেবো! কিন্তু বুঝি নি। অথচ আমিই ছিলাম ওর সব থেকে কাছের মানুষ! আর বুঝলেই বা কী হতো, কোনো কাজে কি লাগতে পারতাম? তেমন বয়স তো তখনও নয়জ্জমন তখন কচি, বুদ্ধি অপরিণত, হাত জোড় নরোমজ্জবিপন্নের কথা দূরে থাক, নিজের জন্যও সে হাত কোনো কাজে আসে না। শুধু বুকে আকুলতা জাগে। সেই আকুলতার এখনও রেশ বয়ে বেড়াই। আর ঘুরে ফিরে একটাই প্রশ্ন করিজ্জঅতোটুকু বয়সে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকেই একমাত্র পরিত্রাণ হিসেবে বেছে নেবার মতো কি-ই বা এমন দুঃখ ছিলো ওর? জানা হলো না। জানা হয় নি। কিন্তু প্রশ্নটি তাড়িয়ে বেড়ায় আজও।
আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের সেই সনাতন প্রশ্নটি সাম্প্রতিক সময়ের বিশেষ এক ঘটনায় আবার বেপরোয়াভাবে মাথাচাঁড়া দিয়ে উঠেছে। কদিন থেকে প্রায়ই ধড়মড়িয়ে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। একবার ঘুম ভাঙলে কিছুতেই আর ঘুমাতে পারছি না। পারবো কী করে? এটি কোনো কথা হলোজ্জএকটি লোক যে কারণেই হোক ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়েছে, ট্রেন চলে গেছে ওর কোমরের সামান্য নিচ দিয়ে। শরীরের দুই অংশ পড়ে আছে রেলপাতের দুদিকে। দুই পা গোড়া থেকে কেটে গিয়ে ছিটকে পড়েছে অনেক দূর। পেশীগুলো তখনো সচল থাকাতে পা দুটো লাফাচ্ছে সদ্য ডাঙায় ওঠা বোয়াল মাছের মতো। লোকটিকে ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড়। সে তখনো মরে নি। এমন কি জ্ঞানও হারায় নি। বরং বড়ো বড়ো চোখ করে এদিক ওদিক দেখছে। চোখে কোনো ভয় নেই। আছে মরতে না পারার গ্ল¬ানি আর বিস্ময়। অনেকেই অনেক প্রশ্ন করে ওকে। কেউ হয়তো বলে বাড়ি কোথায়? আবার কেউ জানতে চায় নাম। আরও গভীর জিজ্ঞাসা যাদের তারা জানতে চায় ওর মরতে যাওয়ার কারণ? কিন্তু ঘণ্টাখানেক জ্ঞান থাকলেও লোকটি কোনো প্রশ্নের জবাব দেয় নি। বরং কোনো এক ভাবনার জগতে ডুবে আছে সে। তবে সে-কি ভাবছে তা জানা গেলো খানিক পরই। আরেকটি ট্রেন আসতে দেখে হাত দিয়ে মাটি ঠেলে ঠেলে সে পুনরায় এগুতে থাকে রেল লাইনের দিকে। কিন্তু সাধ্যে কুলায় নি। তবুও ট্রেন চলে যাচ্ছে দেখে বারবার মাথাটা ঝাঁকাচ্ছিলো, আবার চাকার নিচে দেবে বলে!
একজন মানুষ তো নানা কারণেই আত্মহত্যা করতে পারে। কিন্তু এরকম শুনেছি যে, রাগে বা অভিমানে মরতে চাইলেও মরবার মুহূর্তে সমস্ত বিরাগ ভুলে শুধু বেঁচে থাকাটাই জীবনের সার বলে মনে হয়। তখন মানুষ প্রাণপণ চেষ্টা করে বাঁচতে। কিন্তু মৃত্যু একবার গলাটিপে ধরলে আর কোনো উপায় থাকে না। অথচ এই লোকটি! যার শরীর কেটে দুই ভাগ হয়ে গেছে সে কি না আবার মাথা বাড়িয়ে দিচ্ছে ট্রেনের দিকে! জীবনের উপর কী এতো অভিমান তার? যতোটা দুঃখ পেলে মৃত্যুকেই একমাত্র পরিত্রাণ বলে মনে হয়, ততোটা দুঃখ সে পেলো কীসে? জীবনের উপর, বেঁচে থাকার উপর এতো বিতৃষ্ণাও জমতে পারে মানুষের! আমরা তবে বেঁচে আছি কেনো, কীসের প্রতীক্ষায়? আমরা এতো ধৈর্য আর নিষ্ঠার সাথে তবে কীসের চর্চা করছি? মরে যাবার?
উত্তর মেলে না। প্রশ্নটি প্রলম্বিত হয়, তার সাথে মিশে থাকে অপার বিস্ময়। এমন বিস্ময়জাত বিবিধ প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজি তারাদের ঝাঁকে। কিন্তু তারাদের স্বভাবই এই, ওরা মৌন থাকে। ওরই মতো হাসতে থাকে মিটমিট। মাঝে-মাঝে দুএক খণ্ড মেঘের মতো ভেসে যায় দৃশ্যাবলি। তারই ফাঁকে জমা হয় শত-শত কাবিন, তৎসম আরবি ফারসি ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে কতোশত দরখাস্ত, কতো সওয়াল! এই নিয়ে দাঁড়িয়ে যাই কর্ণের রথের সামনে। আহ্ বেচারা! স্বর্গের ষঢ়যন্ত্রের শিকার! যদিও ষোলোশো দশ সালের দশই জানুয়ারি গ্যালিলিও গ্যালিলি স্বর্গকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন [ঔধহঁধৎু ঃবহ, ংরীঃববহ ঃবহ : এধষরষবড় এধষরষবর ধনড়ষরংযবং যবধাবহ.জ্জইৎবপযঃ], তবুও এখনও কারো কারো রথের চাকা বসে যায় কাদায়। কিছুতেই টেনে তুলতে পারে না। এই অপরাধ কার? কতোটাই বা দেখতে পাই আমরা। খুব শক্তিশালী লেন্স লাগিয়েও, কতোটুকু? হৃদয় পর্যন্ত তা-কি পৌঁছায়? সেখানে যে, নানা রহস্য চলে অবিরত! পথ অতি সামান্য, শকটও ছোটে লাগামহীন। খাদের ভিতর গড়িয়ে পড়ার আগে শেষবারের মতো জানতে চায় আত্মপরিচয়। না পেলে, পতন ত্বরান্বিত হয়। জীবন বুক থেকে আঁচল সরিয়ে নিলে, উল্কির দাগের মতো ভেতর থেকে কথা বলে ওঠে জীবনযুদ্ধে পুড়ে যাওয়া হৃদয়দেশ। তখন সকল সজীবস্বপ্নেরই অপমৃত্যু হয়। আবার কখনো বা ভাবিজ্জর্ধু, মৃত্যু এত্ত জটিল ব্যাপার নয়। হয়তো হঠাৎ খুব রাগ হলো, আর রাগটা এমন কারণে হলো যে, কোনো কিছুরই মানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, বাঁচাটা বেজায় চাপের হয়ে যাচ্ছে, তখন মাথাটা ফাঁকা হয়ে যায়। আর খালি মনে হয় মরে যাই। তখন অতো ভাবার সময় থাকে না, বাঁচলে কী হবে বা মরার সময় কষ্ট পাবো কি না, এসব কিছুই না। স্রেফ মরে যেতে ইচ্ছা করে। করবেই তোজ্জঙঁৎ ষরভব নবষড়হমং ঃড় ঁং ধহফ ড়হষু ঁং, ধহফ বি যধাব ঃযব ৎরমযঃ ঃড় পযড়ড়ংব ঃড় ফরব ধং সঁপয ধং বি যধাব ঃযব ৎরমযঃ ঃড় ষরাব. আবার মনে হয়, অকারণে এতো সাধের জীবনটা কেউ হারায়? হয়তো প্রকাশ্য নয়, গোপনে একটা কারণ থাকেই। তা না হলে মানুষ বেঁচেই থাকতো? খুব গোপনে কোনো না কোনো দুঃখ থাকে নিশ্চয়ই। কিন্তু তার চেয়ে বেশি দুঃখেও তো মানুষ বেঁচে থাকে। এ তো ছেপে যাওয়া বই নয়, যে ভাল লাগলো না, মলাট বন্ধ করে রাখলাম। এ জীবনের বই, যার আমিই পাঠক, লেখকও আমি নিজে। আমি তো বদলেও দিতে পারি শেষটা। মরে যাওয়াটাকে একটা অপশন বলে না ভাবলেই বেঁচে যেতো অনেকেজ্জদুদিন, শুধু দুটো দিন দিতে হয় জীবনকে। কারো শিক্ষা হয় না কারো চলে যাওয়ায়, কোন বক্তব্যও হয় না। তাছাড়া মৃত্যু কি জীবনের চেয়েও ভালো? যদি নাও হয়, ফিরে আসার উপায় তো নেই। তাহলে? তাহলে, বেঁচে থাকাটা হলো ‘পাথ অফ লিস্ট রেজিস্ট্যান্স’। নিজে থেকে কিছু না করলে মানুষ বেঁচেই থাকে। যেমন ধাক্কা না দিলে পাথর দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে, স্বেচ্ছায় মরে যাবার পক্ষে আর কোনো যুক্তি কি দেওয়া যায়? মানে বেঁচে থাকার বখেড়া কম, এই ছাড়া!
কিন্তু জীবন তো আর পাটিগণিতের খাতা নয়, বখেড়ার হিসেব সবমসয় নাও মিলতে পারে। তাই তো শত কষ্টেও কেউ কেউ বেঁচে আছে, ঘাড় গুঁজে হিসেব মিলানোর চেষ্টা করছে পারছে না, তবু চেষ্টা করেই যাচ্ছেজ্জদেখতেই বেশ লাগে। আর ‘সুইসাইডাল টেনডেন্সি’ ব্যাপারটা আমি একদম বুঝি না। শুধু ধারণা করতে পারিজ্জকিছু মানুষের মধ্যে এর পোকা থাকে। তেমন সিচুয়েশান হলে সেই পোকা নড়ে চড়ে উঠতে পারে। এটিও একটি কারণ। ওর একদিনের কথায় এ-ধারণার মিল পাইজ্জনৌকায় করে নদীর এপার থেকে ওপারে যাবার সময় ওর না-কি ইচ্ছে হতো : ‘নদীতে ঝাঁপ দিই, ঝাঁপ দিই, দিই, দিই…’। আরেকদিন বলেছিলো, ‘কোলের ছোটো ভাইটার মাথার নরম তুলতুলে জায়গাটায় হাত বুলিয়ে মনে হয়, এখানে পেরেক ঢুকিয়ে দিই, দিই…।’ আর ট্রেন দেখলেই মনে হতো : ‘যাই, যাই…।’ কিন্তু আমি কিছুতেই নিজেকে ঐ জায়গায় বসাতে পারি না। ওর এই বোধ আমি বুঝি নি, বুঝি না। না, অপ্টিমিস্ট আমি নই। পৃথিবী এবং তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো ‘রেডি পিকচার’ আমার নেই। বরং নিজেকে একটু দুঃখবিলাসী-টাইপেরই মনে হয়। তবুও আত্মহত্যার কথা কখনো ভাবতেই পারি না। আমার জীবনের প্রতি মায়া বড়ো বেশি।
জীবনের প্রতি মায়ার কথা বলতে গিয়ে একটা সিনেমার কথা মনে পড়ছে। বন্দির এগ্জিকিউশান হবে, অর্ডার এসে গেছে। যেদিন এগ্জিকিউশান, তার আগের দিন। দিনটা ভেজা, স্যাঁতস্যাঁতে। ক্যাম্পের ভেতর প্যাঁচপ্যাঁচে কাদা। বন্দির জুতো ভিজে জল ঢুকে পায়ের মোজা পর্যন্ত ভিজে গেছে। আর লোকটি অনেকক্ষণ ধরে হেঁটে চলেছে একটু শুকনো জায়গা খোঁজার জন্য। মৃত্যুর আগের দিনও পা শোকানোর কী ভীষণ ইচ্ছে লোকটির! ল্য মিথ দ্য সিসিফকে আমি এভাবেই নিই। হ্যাঁ, জীবনটা পাহাড়ের ওপর পাথর ঠেলে তোলার মতোই ফিউটাইল। আমি জীবনের মহান আদর্শ আর পারপাসে বিশ্বাসী নই। কিন্তু ঐ পাথর ঠেলে তোলাতেই আনন্দ। ওর সাথে অন্য কিছু ট্রেড করা ভাবতেই পারি না।
সে কারণেই ছোট্ট সেই মেয়েটি কিংবা অচেনা সেই লোকটির অমন আশ্চর্যরকম মৃত্যু আমাকে এতোটা ভাবিত করে। আর বুঝে যাই, ধরন যাই হোক তারা আসলে মৃত্যুকে টেক্কা দিয়ে জিতে গেছে। মৃত্যুর ভয়ে পালিয়ে বেড়ায় নি, বরং মৃত্যুই ওদের হাত থেকে পালাতে চেয়েও পারলো না। এমনটি অনেকের বেলাতেই হয়। মরে যাবার ধরনটা হয়তো এক নাও হতে পারে, কিন্তু মরে যায় লোকে। আত্মহত্যাতেই। নিজের পাপের গ্লানিতে যদি নাও হয়, কেউ জোর করে চাপিয়ে দিলে না বলতে পারে না, তখন! কিন্তু এর পরও যারা বেঁচে থাকে তাদের বেঁচে থাকার একটা কারণ থাকা ভালো, কিন্তু গ্যারান্টিড নয়। সব কারণই একসময় শেষ হয়ে যায়। আমাদের অনেকের ক্ষেত্রেই দ্রিদার কথাগুলো প্রযোজ্য। ঠিক সেই কারণেই হয়তো ভুল হচ্ছে বুঝতে। আমরা হয়তো সেই প্ল্যানে ভাবতেই পারছি না, ফলে অকারণগুলো খুব স্পষ্ট নয়। কারণগুলোই প্রধান। সেকারণেই কেউ কেউ ভেবে-চিন্তে ধীরে-ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। যেমন, আমি এক লোককে চিনি, যিনি উকিল। রোজ কোর্টে আসেন, কিন্তু কেসটেস নেন না। তো, একদিন তাঁকে প্রশ্ন করলাম, আপনার এতো বয়স হয়েছে, আপনি তো আর ব্রীফ নেন না, তাহলে আসেন কেন?
বুড়ো ভদ্রলোক বলেন, ‘আমার একজন রিক্সাওলা ঠিক করা আছে, তাকে আমি মাসে একটা থোক টাকা দিই; সে আমাকে রিক্সা করে নিয়ে আসে, আবার বিকেলে রিক্সা করে ফেরত নিয়ে যায়, এখন আর হাঁটতে পারি না তো। গাড়ি অন্যরা ব্যবহার করে, আমি গাড়ি চড়া ছেড়ে দিয়েছি। এককালে অনেক উপার্জন করেছি। ষাট বছর বয়স যখন হলো, তখন ছেলে-মেয়ে-বৌ-বৌমাদের ডেকে বললাম, আজ থেকে আমি তোমাদের সংসারে জীবন্মৃতের মতো থাকবো। ধরে নাও, আমি বেঁচে নেই। কোনো সাংসারিক পরামর্শ আমার কাছে চাইবে না; চাইলেও পাবে না। আমি এখন সব বাঁধন আস্তে আস্তে ছাড়িয়ে নিচ্ছি, সেই শেষের দিনের জন্য তৈরী হচ্ছি। যেন সেইদিন এলে পৃথিবীর কোনো কিছুর ওপরেই আমার আর টান না থাকে। এই প্রিপারেশন শেষ হলেই আর মরে যাওয়ার ভয় থাকবে না। আমি আসি, বার লাইব্রেরিতে বসে থাকি, বিকেল হলে আবার রিক্সা করে বাড়ি ফিরে যাই’।
এরই নাম নির্বাণ। আর কিছু নয়, এরই নাম স্বেচ্ছায় ধীরে-ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া।
তাঁর এই নির্বাণতত্ত্বের সাথে আমি একমত কি না, প্রশ্ন তা নিয়ে নয়, বরং মৃত্যুটা যদি এতোই অর্থবহ কোনো ব্যাপার হয় এবং তার জন্য এতো গোছানো প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, তবে বেঁচে থাকার পক্ষেও সে রকম যুক্তি থাকা উচিত। মরে যাবার জন্য তো কিছু করতে হয় না, বরং কিছু করার জন্যেই অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্যই যুক্তির দরকার বেশি। তবে বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই, তেমন কোনও যুক্তি থাকে না। যদি বেঁচে থাকাটাই কোনো কারণ বলে ভাবে কেউ, তবে সেই কারণটা কেটে গেলে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। গণ্ডগোলটা এখানেই। আমি আছি, যেমন অন্য কেউ, যেমন গাছপালা, যেমন ঐ পাখিটা। পুরো ছবিটার মধ্যে নিজেকে ধরলে আলাদা করে বেঁচে থাকার কারণ খুঁজতে হয় না। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, মরে যাবার কারণগুলো এর চেয়েও সহজ হতে পারে। এই যেমন, আমার পরিচিত অনুজ একজন, জীবনের আঠারোতম বছরে নিজেকে শেষ করে দিলজ্জঐশ্বরিয়ার বিয়েকে নিতে না পেরে। ছেলেটির মা কিন্তু তার চেয়েও বেশি আঘাত পেয়েছিলেনজ্জসেই দুর্ঘটনায় তার চোখের সামনেই ছেলে ও স্বামী শেষ হয়ে যান। তিনি তো সারাজীবন ধরে সয়েছেন। তবে? কোন্টা লিস্ট রেজিস্ট্যান্স, মরে যেতে পারে নি বলে বেঁচে থাকা, নাকি বেঁচে থাকতে না পেরেই মরে যাওয়া?
এ প্রসঙ্গে আমার দাদির কথা মনে পড়ছে। বছর সাতেক আগে তিনি মারা গেছেন। প্রায় ৮০ বছর বয়স হয়েছিল। ভালো গান গাইতেন, মেয়েলি গান। আর ছিলেন ভীষণ উইটি। শেষ দিকে মাঝেমধ্যেই বলতেন, ‘হামি তো বাইন্দ্যা-ছাইন্দ্যা ইস্টেশনে খাড়ায়্যা আচি, কিন্তুক টেরেন ককন আসপে?’ ট্রেন এল, একটু দেরি করে, কিন্তু অবধারিতভাবে এল যেদিন, দেরীর ঠেলায় যাত্রীটির একটু চাপ হয়ে গিয়েছিল। শেষদিকে উঠতে পারতেন না, শরীর ভরে গিয়েছিল বেডসোরে। কানে ড্রাই-গ্যাংগ্রিন হয়ে গিয়েছিল। এই সব ব্যথার অনুভূতি ছিল না অনেকদিন, কিন্তু মৃত্যুর আগের দিন সম্পূর্ণ ফিরে এসেছিল। সে দৃশ্যের ধাক্কা তাও যাহোক মানিয়ে নেওয়া গিয়েছিল; কিন্তু দেখলাম, পাশে বসে আছেন বড়ো ফুপু। ক্যান্সারে ভুগছেন দীর্ঘদিন। মরে কুঁকড়ে যাওয়া একজন মানুষের পাশে বসে আছেন, হাত দুটো কোলের মধ্যে জড়ো করে। কী ভাবছেন, কে জানে। ট্রেন কবে আসবে?
বাবা যখন খবরটা দিলেন, তখন দুপুর তিনটে। তখন আমি যে বইটার পাতা ওল্টাচ্ছিলাম, সেটা জীবনানন্দ দাশের কবিতাসংগ্রহ। ধং ষঁপশ ড়িঁষফ যধাব রঃ, সে সময়ে বইটির খোলা পাতায় ক্ষেত্র গুপ্তর লাইনটা চেয়ে আছে : ‘জীবনানন্দের কবিতায় মৃত্যু বড়ো বেশি’। সেদিন জীবনানন্দের জন্মদিন ছিলো।
আমাকে সবচেয়ে ভালোবাসতো যে মানুষটি, আমার সবচেয়ে প্রিয় কবির জন্মদিনেই কেনো তার মৃত্যুদিন হলো? জীবনে এমন বৈপরীত্য কেনো আসে? কেনো মনের কোণে জেগে ওঠে ছেলেবেলার দ্বীপনগরজ্জভেলায় করে মিতালির জলে ঘুরে বেড়ানো, রহিম-বয়াতির গান শোনা ইত্যাদি? এই বিচিত্র নগরীতে আমার এই আজবজীবন তো মৃদুমন্দ বয়ে যাওয়া কোনো শান্ত ধারা নয়, এ এক বিচিত্র সংঘাত, নিজের সাথেজ্জপরিপার্শ্বের সাথে। এই তো নগরীর ধর্ম। মন থাকে না এখানে। মরে যায়। তবুও আমার মরা মনে কেনো প্রতিদিন জমা হয় শত-শত প্রশ্নের অঙ্কুর? আর তার সাথে সেইসব হারানো দিনগুলো কেনো তার সমস্ত দাবি নিয়ে উঠে আসে? কেনো আমার সমস্ত লেখায় সে তার প্রকাশ চায়?
সেই অচেনা লোকটি কিংবা সেই অখ্যাত গ্রামবালিকার এই অসুখটি বেশ বনেদি, পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষই এমন বনেদি অসুখে নিজেদের শেষ করে দিয়েছেন। যেমন, সিলভিয়া প্ল্যাথ। আত্মহত্যা নিয়ে তাঁর অবসেশনের কথা সবাই জানেন। তাঁর শেষ এবং আল্টিমেট অ্যাটেম্পট যখন হয় তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩০। ওপরের শোবার ঘরে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে। বাচ্চাদের জন্য রুটি, দুধ গুছিয়ে রাখেন। রান্নাঘরের দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে, ওভেন অন করে, এক বোতল ঘুমের ওষুধ মুখে ঢেলে, ওভেনের দরজা খুলে মাথা ঢুকিয়ে দেন।
সিলভিয়া প্ল্যাথের স্বামীজ্জটেড হিউস। অত্যন্ত শক্তিশালী কবি। সিলভিয়ার আত্মহত্যার সময় টেড হিউসের সন্তান ধারণ করেছিলেন অ্যাসিয়া ওয়েভিল। সিলভিয়ার সাথে সেপারশনের পরে এর সাথেই থাকতেন টেড। অ্যাসিয়া বিবাহিতা ছিলেন। সিলভিয়ার মৃত্যুর পরে পরেই অ্যাসিয়া প্রেগন্যান্সি টার্মিনেট করেন। এর কিছু বছর পরে আবার তিনি টেডের সন্তান ধারণ করেনজ্জকন্যা। টেডের মন তখন অন্য নারীতে, ক্যারোল, যাঁর সাথে তিনি জীবনের শেষ অবধি কাটান। ৪ বছর বয়েসের এই কন্যাসন্তান মারা যায় মার হাতে। বাচ্চাকে মেরে মা-ও আত্মহত্যা করেন। ঠিক যেভাবে টেডের প্রথম স্ত্রী সিলভিয়া মারা যান। রান্নাঘরের দরজা ভালো করে বন্ধ করেন। হুইস্কিতে ঘুমের ওষুধ গুলে খান, ওভেনের গ্যাস খুলে দিয়ে, মেয়ের পাশে শুয়ে পড়েন।
ভার্জিনিয়া উলফ। ওভারকোটের পকেট পাথরে ভর্তি করে নদীতে ঝাঁপ দিলেন। কী যুক্তি? না, বেঁচে থাকা আর সহ্য করা যাচ্ছে না! আবার সেই পাগলামো ফিরে এসেছে! নিজেই নিজের পাগলামোর কথা বুঝে গেলে কেমন লাগে কে জানে? সেই ষঁপরফ রহঃবৎাধষ, ‘পাগলামো আর না-পাগলামো’র মাঝখানের ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’? ভাল¬াগে না মনে হয়। তাই তো রাশিয়ার কবি, সার্গেই এসেনিন আত্মহত্যা করার আগে নিজের হাতের শিরা কেটে সেই রক্ত দিয়ে লিখেন :

Goodbye, dear friend, goodbye

My love, you are in my heart.

It was preordained we should part

And be reunited by and by.

Goodbye: no handshake to endure.

Let’s have no sadness furrowed brow.

In this life to die is nothing new

and, in truth, to live, is not much newer.

এই কবিতাটি লেখার পরদিনই গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যান এসেনিন।
একই সময়ের কবি মায়াকোভস্কি। অসম্ভব বিরক্ত হন এসেনিনের মৃত্যুতে। তাঁর ধারণা ছিলো শ্রমিক-শ্রেণির কাছে এইসব আত্মহত্যা-জাতীয় জিনিস খুবই ডিমোর্জালাইজিং। উঠে পড়ে লাগেন কীভাবে ঐ শেষ দুটো পঙ্ক্তি থেকে সব অনুভূতি, আবেগ, অসংজ্ঞায়িত সৌন্দর্য নিংড়ে ফেলে দেওয়া যায় এবং লেখেন :

In this life it is not hard to die,

to mold life is more difficult

নিজেই বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য, ঐ শেষ দুই লাইনকে প্যারালাইজ করা,to make Esenin’s end uninteresting. তাঁর বক্তব্য ছিলো, ‘ওয়ার্কিং ক্লাস’-এর কাছে জীবনের বাণী পৌঁছনো অনেক বেশি দরকার। মৃত্যু অনেক সুবিধাবাদী, সহজ রাস্তা। কম্যুনিজমের পথ অনেক কঠিন, কিন্তু তাতে জীবনের সৌন্দর্য্য, আনন্দ অনেক বেশি।
এইসব বড়ো বড়ো কথা বলে, ১৯৩০-এর ১৪ই এপ্রিল, মায়াকোভস্কি নিজেও আত্মহত্যা করেন। এ প্রসঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা অন্য কারো একটি কবিতার লাইন স্মৃতি হাতড়িয়ে এরকম মনে হচ্ছে :
অন্ন আছে?
নেই
বস্ত্র আছে?
না, নেই।
মৃত্যু আছে?
আছে, কিন্তু দেবো না।
পাছে শান্তি পেয়ে যাও!’
তাহলে! কখনও কখনও বাঁচাও কি এমন ভয়ংকর হতে পারে যে মায়াকোভস্কি-এর মতো জীবনবাদী লোকেরাও মৃত্যুতেই পরিত্রাণ খুঁজবে? সেটা বর্তমান জীবন ও তার সম্ভাবনা নিয়ে মানুষটির কল্পিত নরকও তো হতে পারে! আসল কথা মুহূর্তের সিদ্ধান্ত। দীর্ঘকালীন প্ল্যানিং করে কেউ আত্মহত্যা করেছে বলে তো শুনি নি। সে কারণেই একবার মরে যেতে গিয়ে যদি বেঁচে যায়, তবে স্বেচ্ছায় মরবার কথা আর স্বপ্নেও ভাবে না। তাছাড়া, মৃত্যু তো কোনো সমাধান নয়। স্বামী বকেছে বলে যে মেয়েটা মরে গেলো আর যে নিজের ‘অবৈধ-সন্তান’ নিয়ে যে দুনিয়ার অপমান সয়ে বেড়াচ্ছে‘শিশুটির তো কোনো দেষ নেই’-এই বলে, ঝড়ের উল্টোদিকে কে গেলো বেশি দূর? সেই মেয়েটিকে আমি দেখেছি, দুঃসহ অভিমানে কোনওদিন মুখ ফুটে লম্পট পুরুষটিকে বলেন নি পর্যন্তজ্জ‘আমার কথা একটু ভাবলে না তুমি’?
মায়াকোভস্কি, ভার্জিনিয়া উলফ এসব নয় বা জীবনানন্দও নয়, একটা পাতি সুইসাইডের গপ্প। রাজশাহীতে ঘটেছিলো, ৩/৪ বছর আগে। যেমন প্রায়-ই ঘটে। ট্রাকের তলায় ঝাঁপ দেওয়ার আগে ছেলেটা অনেকক্ষণ মোবাইলে কথা বলছিলো, তারপর আচমকা ঝাঁপ দেয়। এসব খবরেই প্রকাশ। বাকিটা এরকম হতে পারে :
[মোবাইল কানে ছেলেটা। জিন্স, স্নিকার, লাল টিসার্ট। অল্প দাড়ি, রোগার দিকে। কোঁকড়া চুল, চশমা। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, কলেজের। দৈনিক বার্তার সিঁড়িতে ঘনঘন উপর-নীচ করছে। অস্থির। শুকনো ঠোঁট]
তুই আজও এলি না, এতো করে বললাম…
জানতিস-ই তো আসবো না, কেন বলেছিলি, আসতে? তুই আর আমাকে ফোন করিস না।
 তুই আমাকে অ্যাভয়েড করছিস কেন্?
 আগেই তো বলেছি এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না, আমি এখন ফোন রাখব…
তুই আমাকে এরকমভাবে রিজেক্ট করছিস! কেন্? বল না! কেন্?
আমি এখন রাখবো…
আমি এখন কী করবো? বল কী করবো?
অমি ছাড়ছি।
আমি, আমি, কালকে আমাকে কেউ আর খুঁজে পাবে না, দেখিস…
 … … …
কিছু বলছিস না যে…?
কী বলবো?
আমি মরে যাবো…
ধুস্স্স (অধৈর্যের নিঃশ্বাস)
দেখিস আমি পারি কী-না, মরতে; তুই বিলিভই করছিস না…!!!
তুই এখন ফোন রাখ আমার কাজ আছে
[ছেলেটা পায়ে পায়ে এগোয় রাস্তার মোড়ে। ভিড়। ছেলেটা ঠেলেঠুলে সামনে এগোয়। কানে মোবাইল।]
তুই প্লিজ, কালকে আয়, একবার…
না (কঠিন স্বর)।
প্লি¬জ
… … …
সত্যি বলছি, কালকে আর আমাকে খুঁজে পাবি না
ফোন রাখছি
দেখিস…
[ট্রাকটা সামনে এলে, মুহূর্তে ছেলেটা ঝাঁপায়, হইহই, ট্রাক থামতে পারে না। পুলিশ, পথচারী এসে সরিয়ে বার করে তালগোল পাকানো দেহ।]
এই আত্মহত্যাটা বেঁচে যেতো, শুধু একটা উত্তর যদি হতো :
 এসব পাগলামি করিস না, এখন রাখি, পরে কথা হবে।
কিংবা কে বলতে পারে, হয়তো, আগে বহুবার শুনেছে, ‘আর আমাকে কেউ দেখতে পাবে না’, হয়তো আগে বহুবার মেয়েটি বলেছে, ‘এসব পাগলামি করিস না…’, হয়তো, আবারও ছেলেটি সেই একই রকমভাবে মেয়েটিকে ছোটো করেছে সবার সামনে, বারবার কথা দিয়েও নিজের দীনতা নিজেই বেআব্র“ করে দিয়েছে। হয়তো বহুবার মেয়েটি ভেবেছে, বদলে যাবে, ঠিক বদলাবে, আর এরকম হবে না, কিন্তু আবার সেই…। হয়তো তারপর আর কোনো অনুভূতিই হয় না। মেয়েটির ক্লান্তি লাগে, মনে হয় একটা দায়। তখন এইসব শুনলে বিরক্তি, একটা গা ঘিনঘিনে ভাব ছাড়া আর কিছুই হয় না। পায়ে জড়িয়ে যাওয়া নোংরা ন্যাকড়ার মতো লাগে, ইচ্ছে হয় লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলতে। কথা বলতে হলে যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, কেউ যেন গলা টিপে ধরছে। কতোক্ষণে ফোনটা রেখে হাফ ছাড়বে। হয়তো…।
এতো গেলো দুঃখের কথা। কিন্তু লোকে বুঝি শুধু দুঃখ পেলেই মরতে চায়? প্রচণ্ড সুখের মুহূর্তেও তো মরতে চাইতে পারে। চাইতেই পারে। যদি মনে হয়, এর থেকে বেশি সুখ আর কিছু হতেই পারে না। যদি মনে হয়, এর পর থেকে যা কিছু হবে, যতো মুহূর্ত আসবে, সব এর থেকে কম সুখের, কি দুঃখেরও হতে পারে। তাহলে, তাহলেও কিন্তু সে সেই মুহূর্তে মরে যেতে চাইতেই পারে। হয়তো তাই! আত্মহত্যাটাই হয়তো বাঁচার একটা ইনস্টিংট। কেউ হয়তো ভাবে, ‘এতোটা প্রবল অনুভূতি সহ্য করতে পারছি না, তাই মরে যাই, মরে গিয়ে এর থেকে বেঁচে যাই।’ আবার কারো কারো কাছে, বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়া দুই-ই সমান। এরকম হলে তার কাছে বেঁচে থাকাটা একটা ‘আনস্টেবল ইকুইলিব্রিয়াম’, শুধু একটু ধাক্কার অপেক্ষা। মৃত্যু বরং স্টেবল, কেউ ফিরে আসে বলে তো কখনো শুনি নি। একটুখানি উদ্যম আর সাহস যোগাড় করতে পারলেই অধ্র“ব থেকে ধ্র“বে পৌঁছানো যায়। ধ্র“বে পৌছাঁনোর যে উপলব্ধি, সেটা জানা গেলো অধ্র“বেই। জানি না এই শব্দটা ঠিক আভিধানিক কী না, শুধু এইটুকু বলতে পারি অধ্র“ব অসীম অন্ধকার, মগজ নেই সেখানে।
অথচ ‘মরণরে তুহু মম শ্যাম সমান’জ্জকতোদিন না বুঝেই আউড়েছি।  আত্মস্থ-ধ্যানস্থ হয়ে আহ্বান করেছি এই শ্যামসম ¯িœগ্ধমধুর মৃত্যুকে। কিন্তু প্রিয়জনকে হারিয়ে বুঝি, মিথ্যে মৃত্যুর এই অধ্যাত্মকল্পনা। মৃত্যু ভয়ঙ্কর, বীভৎস। মৃত্যু অনেক অর্থই কেড়ে নেয় জীবনের, আলোভরা পৃথিবীটাকে ঢেকে দেয় নিকষ আঁধারে। মৃত্যু জীবনের শেষ। মৃত্যুর শেষ মৃত্যুই। মৃত্যুর শেষে জীবন, সে কদাচিৎ। তাই তো স্বেচ্ছায় কেউ মরে গেছে শুনলেই কী এক অতৃপ্তি আর শূন্যতাবোধ ঘিরে ধরে। বিষণœতার অবসাদে চোখ বুঁজি। আর খুঁজে ফিরি সেই রূপকথার সোনার কাঠি যার মন্ত্র ছোঁয়ায় প্রাণ জাগে। কিন্তু যুক্তিতে বুঝি, সে-তো কখনো হবার নয়! তবুও শরীরের গতিটা যুক্তির নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু মনের? শুধু হৃদয় দিয়েই যখন বুঝতে হয়, তখন যুক্তির বাঁধ যায় ভেঙে। দুর্বার এক প্ল-াবনে ভেসে যায় স্বাভাবিক সতর্কতা, জীবনের সব হিসেব। তাই তো যে যুবতী স্বামীর দৈহিক গঠন পছন্দ হয় নি বলে আত্মহত্যা করেছে, তার স্বামী বিয়ে করেছে দ্বিতীয়বার। নতুন বউ মাঝে মাঝেই ‘মরতে যাচ্ছি’ বলে বাগানে গিয়ে বেছে বেছে স্বামীর জন্য ফুল তোলে। অথচ আগের বউ মরার সময় একটা কাগজে লিখে রেখে গেছেজ্জ‘আঃ, মৃত্যু’!
এমনই হয়। সুখের এবং দুঃখের কারণগুলো ক্ষেত্রবিশেষে হতে পারে এক এবং অভিন্ন। আনন্দের এবং অভিমানেরও তাই। সে কারণে আত্মহত্যার সবচেয়ে বড়ো কারণ হতে পারে, অভিমান। কখনো অন্যের ওপর, কখনো নিজের। ঠিক মরার আগের মুহূর্তে ব্রেন অন্য ধরনের অ্যাকটিভ হয়ে যায়। ব্রেন তখন নিজের কন্ট্রোল নিজেই নিয়ে নেয়, অন্য কিছু ভাবতে দেয় না। তাই মরার ঠিক আগের সময়ে যারা চেঁচায়, তারা ঐ কারণেই চেঁচায়, নিজের বিচার বুদ্ধিতে চেঁচায় না। আবার সকলে চেঁচায়ও না। এক ভদ্রমহিলাকে জানি, গায়ে আগুন ধরিয়ে যিনি চুপটি করে বারান্দায় বসে ছিলেন। মুখে একটি আওয়াজ পর্যন্ত করেন নি। ক্লাশ টু-তে আমার এক বন্ধু ভোর বেলা রাস্তার ওপর পিঁড়িকে আসন করে বসে পড়ে সামনে লাল টুকটুকে ট্রাক আসছিলো।
এভাবে প্রতিদিন কতো ছেলে লাইনে গলা দিচ্ছে। কতো মেয়েকে বলা হচ্ছে ফলিডল কিংবা কতোজন খেতাব পাচ্ছে ‘মাইনিংয়ের ওভার সিয়র’। সোজা বাংলায় বললে, শিবের জটার মতো দল নামছে, মরণকামীদের দল।
এই দলের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, ওদের বুকের খুব গভীরে একটা দিকশূন্যপুর লুকিয়ে থাকে বুঝি। ওরা মাঝে মাঝেই ভাবে, ‘যাই সেই দিকশূন্যপুরে’।
অজানা সেই দিকশূন্যপুরে যাবে বলে, আর সব মরণকামীদের দলে নাম লিখিয়েছে সে-ও। যাবার সময় আমার সমস্ত কাব্যগুলো লুট করে নিয়ে গেছে। ওর কোমরের সুতায় বাঁধা ছিলো আমার স্বপ্নঘরের চাবি, সে জানতেই পারে নি!
আমিও কী জানতে পেরেছিলাম যে, সে তার বুকের মধ্যে এতোবড়ো একটা ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে? যদি জানতাম আর এখনকার সমান যদি বুদ্ধি থাকতো তবে, ওকে চিৎকার করে শোনাতাম বিজন ভট্টাচার্যের দেবীগর্জন নাটকে সঞ্চারিয়া সাঁওতালের মনোলগ :
আমি তো মরিবার চাহি না! তুমিও তো মরিবার চাহ না। আরে, কাল যে বাচ্চাঠো পয়দা হইছে, সেও হাত মুঠা করি চিল¬াইছে… হামাকে বাঁচাও, হামি বাঁচবে!
তাতে কি লাভ হতো? বাঁচতে পারতো কি সে? না বোধ হয়! বাঁচবে কী করে! অমন মিষ্টি করে হাসতে পারতো যে, অমন কোমল করে তাকাবার মতো চোখ ছিলো যার, নদীর মতো অমন কলকল করে কথা বলা যার স্বভাব, সে এই পোড়া পৃথিবীতে বুকভরে শ্বাস নেবার মতো একটু পবিত্র বাতাস পাবে কোথায়? তাইতো বুঝি খুব নিভৃতে, বেঁচে থাকতে শীত-শীত করতো ওর, শরীরময় যাতনায় নীল-নীল করতো!
এই শীত আর নীল চুঁইয়ে-চুঁইয়ে জীবনসরোবরের জলে এসে মেশে। সেই জলে নিত্যই ¯œান করি আমি। আর ভাবি সেইসব মৃত্যুবিলাসীদের কথা। তারা তো নেই, তাঁদের রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো আছে, সেগুলো জোড়া-তালি দিয়ে অর্থবহ কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার চেষ্টা করি। কিংবা কে বলতে পারে, বাকি সব হয়তো উপলক্ষ মাত্র, আমি একজনের কথাই ভাবি। ভাবতে ভাবতে জীবন-সাগরের একেবারে কিনারায় এসে দাঁড়াই, দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমি আর ও ছিলাম সাগর আর আকাশের মতো। দূর থেকে কতো কাছে মনে হয়। কিন্তু বেশি কাছে গেলে সাগরের সীমানা ফুরায়, আকাশ তখনও থাকে দূরে। এই দুইয়ের মাঝের প্যারালাল দূরত্ব কখনও কমে না। ঠিক যেমন অসংখ্য প্যারালাল মহাবিশ্বের কল্পনা করেন কোনো কোনো প্রাগ্রসর মানুষ, তেমনি যেনো দুটি প্যারালাল পৃথিবী রয়ে গেছে। এই এক পৃথিবীতে আমি আছি কালোয় আর অপদার্থতায়, ঐ এক পৃথিবীতে ও আছে শুভ্রসুন্দরশোভায়। মাঝে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘ দেয়াল। অন্য পৃথিবীতে সে আলো পাচ্ছে, তকতকে আলো; উঠোনে লেবুফুল ফুটছে। সাঁওতালি নাচ হচ্ছে। সমান্তরাল পৃথিবী, তবু দুজনের একবারও দেখা হয় না। আবার কে জানে, হয়তো হয়। পোড়া এচোখের বিভ্রম তাকে আড়াল করে। সে দেখে আর মুচকি-মুচকি হাসে। সেই হাসিরই উৎস থেকে অর্থহীনতার পরপারে, জাগতিক যা কিছু সব মিথ্যা হয়ে যাবার ঠিক আগে, ধীরে খুব ধীরে ওপারের হাওয়াগুলি আসে, হৃদয় ছুঁয়ে দূর-বনে চলে যায়, আমি এপারে বসে তার কথা শুনি ওপারের কান্নায়। এই কান্নাই ক্রমশ সঙ্গীত হয়ে ওঠে। আর তারই এক চিলতে সুরের মুর্ছনা যেনো তারায়-তারায় খেলা করে আপন মনে। বুকের সবচেয়ে কোমল জায়গায় গিয়ে পড়ে তার প্রতিবিম্ব, সেই প্রতিবিম্বের কোনো চুম্বক আকর্ষণে কেঁপে কেঁপে যায় তারার আলোর ফালিটুকু। স্থির দৃষ্টিতে সে আলোর দিকে তাকিয়ে শুধু বেঁচে থাকার সুখেই আমি আনন্দে আন্দোলিত হয়ে উঠি।

মায়াবী প্রহর ছাড়িয়ে
নূর-ই আলম সিদ্দিকী

বৈচিত্র্যে ঘেরা জগৎ। সুখ-দুঃখ আর হাসি-কান্নার সুরেলা আসর এ ধাম। সময়ের পাখনায় অবিরত শক্তির স্পন্দনে পেরিয়ে যাওয়া প্রতিটি লগ্নের সমষ্টিই জীবন। যার প্রবাহিত তেজের রশ্মি এক এক সময় মানব মনে সৃষ্টি করে ছন্দিত নাচন। সুখ-দুঃখের বিচিত্রবীচিভঙ্গে তা সামনে হয় ধাবিত। আর এমনি করেই বিপুল বিস্ময়ের ভেতর দিয়ে চলে মানব জীবন।
জীবনে হাতের মুঠোয় থাকে না বর্তমান কিংবা ভবিষ্যত। আবার থেমেও থাকে না মনের কল্পনা রথ। নানা অনুষঙ্গকে অবলম্বন করেই তার নির্মাণ। গড়ে উঠে এক একটি স্বপ্নের রঙিন সৌধ। না জানার ভেতর দিয়ে এমনি করে উঠে আসার স্বপ্ন সে তো এক বিরাট বিস্ময়। অবারিত বিস্ময়ের গলি হয়েই প্রত্যেক মানুষ জেগে থাকে অনুক্ষণ। বলতে কুণ্ঠা নেই জীবন তো পরম এক বিস্ময়েরই নাম। জীবনকে নিয়ে সামনে চলা এবং টিকে থাকা এক বিরাট বিস্ময়। চলার রেসে যে যতখানি চোখ মেলে সে ততখানি জাগরূক; যে পারে না সে হয় নির্বোধ। উপলব্ধির অক্ষমতা নির্বোধেরই অন্য নাম।
জীবনের উষালগ্নে কার হাত ধরে প্রথম পাঠ নিতে শুরু হয়েছিল তা স্পষ্ট মনে নেই। তবে স্মৃতির ফিতায় বন্দি আছে আবছা কিছু ছবি। বাজারের পার্শ্বে কয়েকটা বাড়ি পর ঠিক বামে একটি দেয়াল ঘরের তিনটি রুমের একটিতে বসে প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল। সামনে সাদা-চুলে একটি মানুষ বসেছিলেন। তিনি ময়েজ উদ্দিন একটি খাতায় নাম লিখছিলেন। কী কথা বলেছিলেন সেদিন মনে নেই একদম। স্নেহপরায়ণতা আর মমতার আদরে জড়িয়ে জীর্ণ দেহে বাবা দুপুরবেলায় বাড়ি আনেন। খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। ঘুম ভেঙ্গেছিল একেবারে পঞ্চম শ্রেণিতে। ভেঙ্গে দিয়েছিলেন শিক্ষক মৌলভী আরেফুর রহমান। ক্লাসে এসে বাংলা বই হাতে নিয়েছিলেন। আলোচনার গভীরে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক বলেছিলেন, ড. শহীদুল্ল¬াহ বিখ্যাত মানুষ। অনেক অনেক পড়াশুনা করেন। যদি পড়াশুনা কর দেখবে একদিন অনেকটা চেনা জায়গায় দাঁড়িয়ে যাবে। বাক্যটা আজও কানে বাজে চেনা জায়গায় দাঁড়িয়ে যাবে। কিনারা করতে পারিনি চেনা জায়গাটা কেমন? প্রাথমিক পর্বটা শেষ করে এক মাইলের প্রান্তে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে দিয়েদিলেন জন্মদাতা পিতা। কর্মের ঘানিটা ঐ প্রতিষ্ঠানেই টানতেন তিনি।
প্রথম দিনেই দেয়াল ঘরের একটা রুমে এখানেও বসেছিলাম। ক্লাসে ষাটজন ছেলে-মেয়ে। ষাট প্রকার পোশাকে একেবারে অনেক রঙের মাঝে মিল খুঁজে না পাওয়ার জগত। হাফপ্যান্ট পরে সামনে বসে দেখতে পাই পান চিবুতে চিবুতে ঘরে ঢুকলেন দীনবন্ধু মিত্র। খাতায় নাম ডেকে সোজা বোর্ডে গিয়ে সরল অঙ্কে প্রবেশ। প্রথম ক্লাসে মাথাটা ঘুরিয়ে দিয়েছেন যা আজও ঠিক করতে পারিনি। চতুর্থ ঘন্টা পড়ার পর ক্লাস থেকে বেরিয়ে দেখতে পাই টাকসমেত এক রাশভারী মানুষকে। পরে জেনেছি ভদ্রলোক প্রতিষ্ঠানের হেডমাস্টার। অষ্টম শ্রেণিতে হেডমাস্টারকে প্রথম ক্লাসে দেখতে পেলাম। ইংরেজি গ্রামার পড়াতে এসেছিলেন, কথার ফাঁকে কী যেন বুঝাতে গিয়ে তিনি উচ্চারণ করলেন একটি চরণ; আমি পথ ভোলা এক পথিক এসেছি। কথাগুলো শোনার পর অস্থির হয়েছিলাম। মনের সরল রেখাটি নতুন স্বাদে ভরে উঠেছিলো। অনেক কথার মধ্য দিয়ে উন্নত জীবনবোধের সমীরণ ছুঁয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর কথার মধ্যে দিয়েই প্রথম মানবিক মমতা আর স্নেহ পয়মন্ত অনুভূতির অপার আনন্দে মেতে উঠার শুরুটা হয়েছিল।
ভাললাগার মাতনটা সেই থেকে আর পিছু ছাড়েনি। দুই দিন পর স্কুল মাঠে ফুটবল খেলা হয়েছিল। শ্রাবণের দুপুরে অবিরাম বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন। বৃষ্টি শেষ হলেই ছুটি হয়ে গেল। দল বেঁধে বাড়ি ফেরার আনন্দ। সেদিনের ছোট্ট একটা ঘটনা আমার চঞ্চলতাকে পৌঁছে দিল শূন্যে। পথ ধরে হাঁটতেই দশ-বারোজন ছেলেমেয়ের মাঝে একটি মুখ পিছনে একেবারে কাছে এসে বলেছিল চল একসঙ্গে যাই। বাল্যস্মৃতির কুয়াশায় ঘোমটায় আবৃত জীবনানন্দের ধূসর পাণ্ডুলিপির মতো আবহমানকালীন নয়ন সম্মুখচারিণী সে বালিকার মুখটি আমার কম্পিত হৃদয়ে ঘন নিঃশ্বাসের তরঙ্গ সৃষ্টি করেছিলো, রক্তিম হয়েছিলাম কিনা জানিনা। তবে স্বপ্নের হাত ধরে সে সময় হতে আমার উড়াউড়ি শুরু হয়েছিল। শিখেছিলাম কল্পনার জগতে পাখা মেলতে। নবম শ্রেণিতে উঠেই স্কুল পরিবর্তন আর মনুষ্য জীবনের ভিড়াক্রান্ত বিগত মিছিলে সুখময় মায়াঝরানো সেই মুখটা হারিয়ে গেছে সমকালীন পরিচিতির ভীড়ে অচেনা জগতে। তবে ঘোর লাগা কিছু একটা সেদিন গ্রাস করেছিল আমাকে সন্দেহ নেই। কিন্তু যে সুন্দর আবেগময়ী ভাললাগার সায়রে সে আমায় অবগাহন করিয়ে দিয়েছে আজও মুক্তি মেলেনি তা থেকে। হৃদয় অলিন্দে বার বার নিজের সঙ্গে নিজেরই অবাক করা বিস্ময় আমাকে তাড়িত করেছে। নিজেকে নিজেই বলতে শুনেছি, এই যে আমি এমন আমি আমারি অবাক ভাবটা গেলনা। সেই অবাকের পর্বটাকে কী নামে অবহিত করবো, হয়তো বাল্যকাল উত্তীর্ণ কৈশোরোত্তর শুভক্ষণ। তারপর দিনের পিঠে প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্তে চারপাশের দৃশ্যমান নৈসর্গিতা ও প্রাকৃতিক চিত্রকল্পের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আর আত্মীয়তা হয়েছে মননের একান্ত অঙ্গীকারে।
এরপর সময়ের হাত ধরে কখন যেন আস্তে করে মনটা ছড়িয়ে পড়ল অজোপাড়ার প্রান্ত থেকে কাব্য ভুবনে। বোঝাবুঝির ব্যাপারটা কতটা ছিল সেখানে তা জানিনা। হয়তো তার বাইরে কিছু অনুভূতি বা সহজাত বৃত্তি আর কয়েকটা বালকের মতো আমাকে সেখানে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল। যা অবচেতন অতিন্দ্রিয় উষর মনোজগতের আনন্দ উপভোগের মত কিছু না হলেও হয়তো ছিল বহিরঙ্গে বিচরণের ঈষৎ ক্ষমতা। তবুও সেদিনের সেই বিস্ময় আমার গ্রামীণ জীবনের প্রত্যক্ষ দর্শন সঞ্জাত। সে চেতনায় ভর দিয়েই জীবনানন্দের কবিতায় চোখ বুলিয়েই আবৃত্তি শুরু করেছিলাম :
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল
অনেক কমলা রঙের রোদ;
আর তুমি ছিলে;
তোমার মুখের রূপ কত কত শতাব্দী
আমি দেখিনা, খুঁজি না।
কিংবা,
আমরা বেসেছি যারা অন্ধকার দীর্ঘশীত রাত্রিরে ভাল
অশত্থের ডালে ডালে ডাকিতেছে বক
দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হয়েছে হলুদ।
শহুরে বালকের কাছে উপর্যুক্ত লাইনগুলোর নৈসর্গিক বর্ণনা ও চিত্রকল্প ছোট্টমনের ব্যক্তিক দর্শনে কতটা ধরা দিয়েছিল তা আমার জানার কথা নয়, তবে আমার মতো না কেউলে স্বভাবের কিশোরের মনে প্রকৃতি সম্পৃক্ত কবিতার রস কিছুটা বোধগম্য হয়েছিল তা স্পষ্ট বলতে পারি। ক্ষুদ্র প্রান্তিক গ্রাম থেকে উপজেলা স্কুলে আসতে থাকা একটি ছেলে ঝিলের জলে উন্মোলিত শাপলার পাপড়ির সূর্যের দিকে তাকানোর মতো; প্রথম জীবনে বাড়ির সীমানার বাইরে বিশাল জগতের চারদিক মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতাম। প্রতিদিনের মত স্কুলের পথে হাঁটতে হাঁটতে এক সকালে দূর গ্রাম থেকে ইথারে ভেসে আসা আওয়াজ শুনতে পেলাম, ‘খোলা জানালার মন বাতায়ন’ শব্দের ধ্বনিগুলো আমার অঙ্গে নাচন ধরালো। এক অনির্বচনীয় শিহরণে কাঁপলো মনটা। এ যেন-আগুন লাগাইয়া দিল কোনে হাসন রাজার মনে। স্কুলে পৌঁছে দিনের পাঠ শেষ করে আবার বাড়ি ফেরা, তবে একা নয় মনের গভীর থেকে উঠে আসা আনন্দের এক পশলা বৃষ্টি নিয়ে। নবম শ্রেণির পথভোলা এক পথিক হয়ে।
এমনি আসা-যাওয়ার মাঝে একদিন স্কুলের পথে দেখলাম সারি সারি গরুর গাড়ি, সংখ্যায় হবে গোটা বিশ। ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতী-বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধার কলহাস্যে ঠাসা গাড়িগুলো। প্রথম গাড়ির সামনে মাইকে সামনে বেজে চলেছে :
আগে যদি জানতাম মন ফিরে চাইতাম
এই জ্বালা আর প্রাণে সয়না-
ও. ওরে।
গানের শিল্পী কে তা জানতাম না, জানার কথা নয়। কিন্তু গানের কথাগুলো যেন হৃদয়ের লাজের নোঙর ভেঙ্গে মনকে নতুন ভাবনায় ভাসিয়ে দিল। জীবনের ছোট্ট লগ্নটি যেন হাজারো কলরোলে প্রথম গুঞ্জরিত হয়ে উঠলো। পুলকিত ভাবনায় যৌবনের ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে গুঞ্জনের মর্মস্পর্শী প্রীতিময়তার আবেশ যেন আমার বালক মনের স্পর্শকাতর প্রবহমানতাকে লক্ষ মাইল বেগে কালের দীর্ঘ বদ্ধ প্রাচীর পার হবার ইঙ্গিত দিয়ে গেল। দশম শ্রেণিতেই কানে বাজতে থাকল, ‘নেশা লাগিলরে বাঁকা দু-নয়নে নেশা লাগিল’র-আবাহন।
যেতে যেতে দিন বদলায়, সেই বদলের হাওয়ায় প্রাণের প্রবাহে লাগে নতুন দোলা। দু’বছর পরে সতেজ চেতনা আর স্বপ্নের অনেকগুলো রঙিন ফানুস মনের আল্পনায় এঁকে উন্মাতাল অস্থিরতায় আবেগ ভেজা দৃষ্টি আর সৃষ্টির তীব্র আনন্দ নির্মাণের বাসনায় ভর্তি হলাম কলেজে। বিন্যাসের বেদনা নিয়ে স্মার্ট তরুণ রূপে নয় ভীরু চিত্তের এক দুর্বল সদ্য কৈশোর পেরনো তরুণ,-যার হৃদয় বীণা তখন মা, মাটি আর স্বদেশের প্রকৃতির উজ্জ্বল রূপের ঝংকারে হিল্লে¬ালিত। স্বপ্ন জড়ানো হাজার সুষমার কুসুম কুসুম ভালবাসা সেদিন আমার মনে বারং বার অনুরণন তুলে যাচ্ছিল মৌনতায় বিনিদ্র রাতের নিশ্বাসে। কম্পিত প্রানের টলমল আবেগ হৃদয়ে রাঙিয়ে কলেজের প্রথম দিনে হাজির হলাম। কান পেতে নিজের ভেতরে শুনতে পেলাম জীবনের অস্তিত্বকে পাবার প্রয়োজনে নতুন পথের ধ্বনি। পথ হারানোর ভয় নয়, পথ এগিয়ে নেবার তাগিদে ইচ্ছার তরীকে সামনে ঠেলে এগোনোর মাঝেই একদিন দেখা হলো পুরাতন এক মানবীর মুখ। কাছে আসতেই মনের মধ্যকার অনেক দিনের জ্বলিত আবেগ গুমরে উঠলো, না কোন অনুতাপে নয় বিরহী ভাবনার এক কোমল অনুভবে।
অতীতকে সরিয়ে নিয়ে চিনতে যেতেই নির্মলেন্দু গুণের ‘নাম ভুলে গেছি দুর্বল মেধা স্মরণে রেখেছি মুখ’-ছাড়া আর কোন লাভ হলো না। সাহস করে হলোনা বলা কাছে গিয়ে : ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে’ বলার। ডুবে গেলাম নানাভাবে নানা কাছে। কলেজের এক শিক্ষক কোন প্রসঙ্গে যেন ক্লাসে একদিন বলে উঠলেন শুধু পাশ নয়। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে নিজেদের সৃষ্ট পথে এর জন্য প্রয়োজন সবার আগে নিজকে সহজ ও স্বাভাবিক করা। সব থেকে বড় কথা সংস্কার মুক্ত মন ধারণ করা। সংস্কার মুক্ত হওয়া অর্থ আবার এই নয় শালীনতা বোধ হারিয়ে ফেলা। ক্লাস শেষ করে যে যার মত নিজের পথে পা-বাড়িয়েছে আপন মনে। আমার কাছে কথাগুলো যেন প্রেরণার প্রেষণা দিয়ে গেল। কথার মধ্যে রঙ ও স্বপ্নের প্রতিস্বর না থাকলেও আমার মাথায় জলের মত ঘুরে ঘুরে এঁকে বেঁকে যাচ্ছিল শব্দগুলো তারপর নিজেকে ধরতে পারার নেশা কষিয়ে ধরল। খুলে গেল আরেকটি দ্বার। নতুন করে এযেন জীবনের অন্য একটি নতুন পথে হারিয়ে যাওয়া। চারপাশে নানা ঘটনার বর্ণালি দৃশ্য মনে মনে সাজাতে সাজাতে পথ ধরলাম ভাবী দিনের সোনালি সম্ভাবনার জগতে।
এমনি করেই ভাবনার জগতে প্রবেশ করলাম অনেকটা নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিমায়। ফলে সাধারণভাবে সময় অতিবাহিত করার গুরুত্বহীনতা ছেড়ে জীবন যাপনের বাইরের যে জগত তা যেন আলতোভাবে গুরুত্বভারে বুঝতে পারলাম। এরি নাম কী রোজকার জীবনের তুচ্ছতা পার হয়ে বৃহত্তর জীবনের ডাকে সবার কাছে আসা? যেখানে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলা পড়াতে এসে একজন শিক্ষক জীবনকে পান করবার অতৃপ্ত আকাক্সক্ষা জাগিয়ে দিয়েছিলেন প্রাণে। সঙ্গে জীবন চর্চা আর নিবেদিত চিত্তের ঔদার্যের কথাও তিনি মনের সেতারে সাধিয়েছিলেন। জাগ্রত মনে আনন্দ পান করার অত্যুগ্র বাসনা নিয়ে একদিন কলেজের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় সামনে সারিতে বসেছিলাম, এক সুন্দরী আপা গেয়েছিলেন :
কণ্টক হার তারে তুমি বল মালা
লোকে বলে প্রেম আর আমি বলি জ্বালা।
রাত ভোর পর্যন্ত পড়ার টেবিলে কথাগুলোর অর্থ-খুঁজেছিলাম। নবীন বরণ অনুষ্ঠানে হলুদ শাড়িপরা আমার বান্ধবীরা সামনে বসেছিল। সেদিন নবীনদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মূল কথা ছেড়ে গেয়ে উঠেছিলাম:
বাসন্তী রঙ শাড়ি পরে
কোন রূপসী যায়।
স্মরণ হলে আজও আনমনা হই। সঙ্গীত শিক্ষক দৌড়ে এসে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে কী করে যেন পেরিয়ে গেল সে দিনগুলো। মাস- বৎসরের হিসেবে নয় আমার বাল্য-কৈশোর আর যৌবনোদ্গমের পরিসংখ্যান হিসেবে। বর্ণিল বিভাজনে জননীর ক্রোড় বিচ্ছিন্ন করে স্বগৃহে আশ্রয়চ্যুতির তরঙ্গ। অতি পরিচিত শ্যামলিম সঘনতার এলাকা ছেড়ে, একটি গ্রামে অবস্থান ও স্থিতির পসরা সঙ্গে সহপাঠী বন্ধুচক্র বালক কিশোর নানা চেহারার মিলন মোহনায় যেখানে জীবনে জীবন যোগে অপ্রতিরোধ্য বিকাশ বর্ধন। স্মৃতিকে পথের মাঝে ছেড়ে দিলে চলে যাওয়া পথ দেখে করুণ বেহাগে হৃদয় বিউগল সুরে বাজে, ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার।’ আবার আসার রাস্তায় সামনে চোখ রাখলে করুণ রাগিণীতে উথলে যায়-হৃদয় ভারী হয়ে কণ্ঠে আসে ‘মুসাফির মুছরে আঁখি জল ফিরে চল আপনারে নিয়ে’। সত্যি-নানা সুখ-দুঃখ আনন্দের মউজ জাগানিয়া কত বিস্ময়ে ভরা এ জীবন।

এ আমার একার গল্প
মৌসুমী জাহান নিশা

আমার মনে আছে, ঝিমঝিমে কড়া রোদের এক দুপুরে বিছানায় শুয়ে যখন শীর্ষেন্দুর পারাপার উপন্যাসটা পড়ছিলাম, তখন আমার গলাটা ব্যথায় টনটন করছিলো… কান্না চেপে রাখলে গলাব্যথা করে না? এরপর থাকতে না পেরে ঝরঝর করে কাঁদছি আর বইটার পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি। পারাপার উপন্যাসের সেই ছেলেটা, ললিত, যে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতো, আমার ইচ্ছে করতো তার মাথাটা বুকে চেপে ধরে হু হু করে কাঁদি তাকে জড়িয়ে ধরে। আমার ইচ্ছে করতো ললিতের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে মৃত্যুর স্বাদ নিই। তাকে বলি, ‘এই শোন! তুমি একা মরবে না। আমিও তোমার সাথে মরবো। ঠিকাছে?’ আর আমার কথা শুনে ললিত শক্ত করে আমাকে বুকে চেপে ধরবে আর কানে কানে ফিসফিস করে বলবে, ‘মৃত্যুর পরও তুমি আমার থাকবে, বলো…থাকবে…?’ এরপর অনেকদিন আমার একেলা দুপুরগুলোতে ললিত এসে আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকতো। আমি তার গালে গাল রেখে বসে থাকতাম, দুজনের কান্নার জল একসাথে মাখামাখি হয়ে যেতো।
নন্দিত নরক-এর খোকা আছে না? ছেলেটা বড্ড বিষণœ। ছেলেটার এলোমেলো করে দেয়া বিষণœ চোখে চোখ রেখে ‘কালো বরফ’ এর পোকার মতো বলতে ইচ্ছে হতো, ‘এই ছেলে! আমি তোমায় ভালোবাসতে বাসতে পচিয়ে ফেলবো।’ নিলু বা জরী কিংবা রাণুর মতো খুব সাধারণ মায়াবতী একটা মেয়ে হয়ে খোকাকে আগলে রাখতে খুব ইচ্ছে করতো, যেন এই পৃথিবীর বিচ্ছিরি বাস্তবতার কোন ছাট খোকার গায়ে না লাগে। স্কুলের পরীক্ষাগুলোর আগের দিনের দুপুরবেলার অনুভূতিটা ক্যামন যে ছিলো, সবাই ঘুমুচ্ছে, একটা হতচ্ছাড়া কাক ডাকছে, আমি একা একা পড়ছি । কী ভীষণ হাহাকার লাগতো তখন বুকের ভেতর! খুব মন চাইতো, কেউ আমার পাশে বসুক, মাথায় হাত বুলিয়ে দিক…তাপ্পর বলুক, ‘পড়তে হবে না তোকে। উঠ গাধুনি! গোল¬ায় যাক পরীক্ষা! চল আইসক্রিম খেয়ে আসি।’ কেউ বলতো না, আমি বিপুল অভিমান বুকে চেপে রেখে পরীক্ষার পড়া পড়তাম, আমার কাঁদতে ইচ্ছে করতো। এইসব ললিত বা খোকাকে ভালোবাসতে না পারার কষ্ট কিংবা পরীক্ষার কাছ থেকে আমাকে ঝটকা মেরে নিয়ে যাবে এইরকম কারও ভালোবাসা না পাওয়াার অপ্রাাপ্তিগুলোা খুব মধুর ছিলো, ব্যথার মতো সুখ ছিলো তাতে, ছিলো অভিমানী শূন্যতা। এতেই ভরে ছিলো আমার নিঃসঙ্গ সময়গুলো, একেলা আনচান করা মুহুর্তগুলো। আজকাল আমার একেলা দুপুরে ভয় হয়। কল্পনার ললিত কিংবা খোকাকে ভালোবাসতে না পারার কষ্টে যে আমি কেঁদে বুক ভাসাতাম, বাস্তবের এক বিষণœ এলোচুলের যুবককে তার মতো করে ভালোবাসতে না পারার অক্ষমতা একেলা আমার উপর ভয়াবহ অপরাধবোধের নির্যাতন চালায়।
সম্ভবত একেই বড় হওয়া বলে!


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা