আহমেদ ইউসুফের কবিতা

বৃষ্টির নৈবেদ্য

বর্ষা আসে নাই; আমি খণ্ড খণ্ড মেঘ বৃষ্টিরূপে ঝরি
পথহীন পথে …
ঘরের চাল কি ভিজে যায় শাড়ির আঁচলে?
শাড়ির শিশির জলে তবু ভেসে যায় মানবরমণ।
তখন তো আমি পৌরাণিক চিত্রে কোনারক-অজন্তার গুহা :
ধূসরে ধূসরে সৌন্দর্যের ধূতি;
আহত সালিনী
মধুচক্রে অধিক মৌমাছি রানি
বনের মধ্যে মাংসাশী!

দ্বিধার জন্মে শিকার; বনেতেও নেই ঘাইমৃগী
তবু কেমন আমেজে ছুটে আসে মাদক মাধুর্যে
খণ্ডিত কুস্তরী
আমি তবু খণ্ড খণ্ড মেঘ তোমাকে–তোমারে
বৃষ্টির নৈবেদ্য বলে চিনি …

এলান; তামাক খেয়ে মৃত্যুকে ডরাই

যে যে মেঘ মেঘবতী নয় সে মেঘের ষোড়শী কলস ডুবিয়েছে
বোরো মওসুম রবিশস্যের ভাণ্ডার,
হাড় ও করোটির গান গেয়ে ডুবিয়েছে গবাদিপশুসহ বিকালের সোনা
অধিক ডুবেছে কবি–মেঘহীন পূর্ণস্তনী তোমার মেঘবতী মেঘে…
বসন্ত পেরিয়ে হেমন্তের রক্তরাগে…

ভেসে ওঠে মায়াবৃক্ষের শিকড়,
জেগে ওঠে অফলার মূলে জগদীশের ক্রিস্ট্যাল রিসিভার;
জাগতে জাগতে জেগে ওঠে তোমার কালো বেদেনী কেশদাম।
জেগে উঠল বুঝি তামাক দৃশ্যে হারানো প্রেমঅনল?

ফেরেনি–আসেনি–ফেরে নাই
শোকভ্রম ধূলি–
কিংবা উদিত নক্ষত্রবীথি
তবু ধূলিকে বলি, তুমিই হও মায়াবতী বৃক্ষনদী; হয়েছো নিঃশ্বাসের গন্ধমুকুল মৃগনাভী …

একদা তুলসী পাতায় বেঁধে জীবন হয়ে যাবে মদ ও তামাক
একদা লাবণ্যে ধেঁড়ে ইঁদুর অথবা দিন ও রাত্রির আবর্তন
বৃষ্টির বর্ষায় ফোটাবে ডুমুরে ফুল
একদিন এই পদ্মা-মেঘনা যৌবনও হবে করোটি ও হাড়
কখনো পাথরগুণে কষ্টি অথবা পরশ …
তবু বৃক্ষ নদী পুশ ও পর্বত সাক্ষী
সাক্ষী আসমানের তারা
সাক্ষী পৃথিবীর শেষতম পবিত্র গ্রন্থের …
বসন্ত কিংবা হেমন্তে, শীত কিংবা গ্রীষ্মে
রমণী মানে এখনো তুমি; কত রাধিকা ফুরালো …

মুদ্রারহস্য

নেচেছি মুদ্রার তালে–খালি কলসের শব্দ জনপদে জনপদে।
সূর্যাস্তের রোদ আদম ও ঈভের প্রত্ননাব্যতা খুঁজতে খুঁজতে স্থানু গন্ধমরহস্যে।
কারুন-সেকান্দার-সোলায়মান-শাদ্দাদ আজো কি মুদ্রারহস্যে খুঁজে নদী সমুদ্রের বালিকণা?
জানি তোমার আঁচল ধরে উড়ে যায় বোরো মওসুম, রবিশস্যের ভাণ্ডার।

অধিক নেচেছে মুদ্রাপশ্চিমী সুরা রহস্যে
হিমশৈলের আঘাতে তাই বুঝি ভাঙতে থাকে টাইটানিকের বিত্ত-বৈভব?
তেলরহস্যে অমীমাংসিত ত্রিখণ্ডিত সাদ্দাম বীরপুত্র ইরাক
কখনোবা মুদ্রারহস্যে মুদ্রিত আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরে শা’জাহানের তাজমহল …

উড়ে যায় প্রাণপাখি। খাঁ খাঁ ঘরদোর। বাড়ির উঠোন।
শূন্য বুঝি শীতল সবুজে খড়ের আগুন?
নিভে যায় চাঁদ; নিভে যায় সূর্য; নিভে আসে অনন্ত নক্ষত্রবীথি
তবু জ্বলতে থাকে হৃদয়রহস্যে লাল নীল পাথরে পরশ পাথর….

একদিন আনাচে কানাচে, মাঠে-ঘাটে অথবা বন্যার ধাবমান স্রোতে
চোখের জলে ফ্রেমবন্দি হয়ে নদীরহস্যে
নেমে পড়ে, নেমে যায়
বিকালের সূর্য … বর্ষার কদম্ব ফুল …

সিডরের ধূলি

ধূলিকে সিডরের নিকট পাঠাতেই ধূলি হল
মেঘনার নদী 
গঙ্গায় ফারাক্কা;
জানি অবহেলা পেতে পেতে অবহেলার অন্যনাম ভলগা হয়ে যায়
নিরন্তরে লেলিনগ্রাডে পুঁজির ঊর্ধ্বগতি …

তবু যে জ্ব্লে জ্বলে ভাবনার লোবানজ্বলে যায় প্রাণের পিদিম
যে জল পুড়ে ধূলির অনু-পরমাণু
অথবা নোনা উপকূলে লাশের পর লাশ …
সে কি তবে আলোহীন নিরাকারে বিম্বিত আঁধার?
তার কোলাহলময় নাচ শূন্য প্রণিধান …

অধিক গেয়েছে মানুষ বেদনার সাযুজ্যস্বর;
মাঠ ও ঘাটের মাঠে শুয়ে দেখেছে বুঝিবা কার্তিরে চাঁদ?
ভাবনার অষ্টকলা জাতিস্মর ভেবে
ভেবে যায় মধ্যরাতে মদ-ফেনিলের নিশিফণা …

তবু হে মুগ্ধযামিনী, দেখো, সিডরের ধূলি
পাহাড়পুর-অজন্তা-কোনারক হতে হতে
উড়ছে দুবলার চরে, উড়ে যায় উপদ্রুত শরণখোলায়…

লেজীয় সুসমাচার

কার লেজ নেই? সমুদ্র-জঙ্গলে বেদান্তের লেজ দেখি,
আর্য নাম হয়ে গেলে পরে থাকে আর্যলেজে অনার্যীয় বহ্নি,
ইলিশের পেটে দেখেছি তিমির আনাগোনা; বনসাইয়ের বন বোনে
ঘাই হরিণীর মৃগনাভী কামের ছন্দতুলে নূপুর তানে;
বিয়ারের লেজ বড় হতে হতে সভ্যতীয় লেজ
বোমাঘাতে তবে লেজের লেজত্ব বেড়ে যায় চতুর্গুণে।

গির্জায় লেজ মন্দিরে লেজ; লেজের বিস্তার দেখি মসজিদ-প্যাগোডায়
যারা কিনা পেঁচা-ভূতো চোখে দেখে ফেলে
অদ্ভুত আঁধারেও আলোর সুবর্ণ রেখা; জন্ম-অভিলাষে
পরজন্মে নিমগাছ হবার প্রার্থনা অথবা কৃষকি মাঠে
ফেনালেজে বসন্তের মাঠ অথবা নদীজন্মের আগে মেঘলা আকাশ…

তুমিও রয়েছো লেজে বাঁধা; কোনারক ইলোরা অজন্তায় অজস্র তোমার লেজত্ব
হৃদয়েতে করেছি ধারণ; আফ্রোদিতে ভেনাসের লেজত্ব মহিমা
লোক মুখে মুখে। বল কে দেখেনি হেলেন-ক্লিওপেট্রার শরাবী শরীরে মজে?

কামের লেজ তো সমুদ্র গর্জন; নিরন্তর স্নিগ্ধতার জলে
একদা রঙিন লেজ উড়ে যায় রূপের অরূপে মজে …

শিকড়

মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বে মজে শরীরের ঘ্রাণ ভেসে আসে চিদাকাশে।
ভাবিমন্দির দেহলিতে এ কার ঘ্রাণ?
মাধবের ঘাণ অনুভব করেছি অশান্ত নোনাজলে
গন্ধবতী দেহ উড়ে গেছে বসন্ত-ফাগুনে
জাফলং-এর যাদুময় দৃশ্য হাতড়ে ফিরেছি পতেঙ্গার ঘোলাজলে
তবে এ কার কামিনী ঘ্রাণ অনুভব করি জীর্ণ সাদা পৃষ্ঠে?

জোনাকঅলা দেশ তেলের গন্ধ খুঁজে হয়রান
পশ্চিমের কিউবিজমে ফানুস পাবলো পিকাসো
ভ্যানগগের সূরায় বোদলেয়ারের ক্লেদজ কুসুম
ইলিয়ট কি তবে ডাকছে প্রত্নতত্ত্বে?

শূন্যতার ঘ্রাণে আমি অরণ্য গড়েছি
পুণ্যতায় মায়ার বাঁধন
একদা দেহের ঘ্রাণে ঘ্রাণে নোঙর ফেলেছি গ্রাম্যজলে
কোথায় এ গন্ধবতী ঘ্রাণ?

ভাঁজে ভাঁজে গন্ধ খুঁজি তোমার দেহসন্ধিতে;
তোমার শরীরও নিঃস্ব লেহনে পেষণে–
তবে কোন ঘ্রাণ ছড়ালো শরীরে?

আবার মজি ফ্রয়েডে। মনঃসমীক্ষার ফ্রে’ডি হয়ে
ফ্রে’ডির ফ্রয়ডে আমি ম’জে যাই আমার ফ্রয়েডে॥

বৃত্তসমগ্র

আত্মবৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে বন্দি নিজস্ব বৃত্তেই।
যত স্বপ্ন তত আমার কোলন সবই মরীচিকা হয়ে উড়ছে
এখন দিগন্তের পথ ও পথান্তরে।
মিথ বলে প্রত্নতত্ত্বে দেখি, চক্র আবর্তনে নদীর দু’কূল ভাঙে
জলের বিভ্রমে …
আঁকছি তোমাকে আত্মবৃত্তেজলচরে জলযান ওঠবে কি জেগে?
শূন্যের অসীম এখানে নিশানা ফেলুক যুগ্মসরলে …।

০২
গ্রাম্যধ্বনি তুলে নিজস্ব বৃত্তের বৃত্তে আরেক নিজস্ব বৃত্ত গড়ি।
যেথা তুমি কিনা উঠোনের মেয়েনদী অষ্টদশী
তীরের গর্জনে ফণার তরঙ্গধ্বনি!
প্রত্নতত্ত্ব ভুলে গ্রামীণ রমণী ….

নেপথ্যে তবু লোকের শ্লেষধ্বনিহরষে বিষাদ
তবু বৃত্ত নাচ ভেঙ্গে অসীম বৃত্তে মিশছি …

ময়না দ্বীপ

‘এসো, অন্ধকারে নামি’ বলতে বলতে নেমে যাচ্ছি অতল আঁধারে।
আশ্চর্য নিজেরা–এ অতলে এক স্বর্ণ পাখি
কণ্ঠেতে যার ঝরছে বসন্ত সঙ্গীত
কিয়দ্দূরে তার স্বর্ণালী পালক
বুঝি যেথায় বুদ্ধের নিগূঢ় নির্বাণ …
‘না, না, আরো অতল আঁধারে জীবনের সুখ।
ওই বৈদগ্ধ্য অতলে যাও’।

ডুবোরণতরী বেগে যাচ্ছি মনুষ্য জীবন।
সেখানেই বুঝি মোহনা মোহন?

বেদনা মুখস্থ মুখ–ডানা ঝাপ্টে নাই চিরায়ত চিঠি
আত্মা, তোমরা কি যাচ্ছো অতলের অতল আঁধার?

কাঁদছি মাতম বেগে …
অচেনা সুখদ সুখ পালক রহস্যে উড়ে যাচ্ছে
বিমোহভোর বাতাসে …

 

বসন্তে ফাগুন আসে

মাটির মূর্তি ভেঙ্গে পড়ে; জেগে থাকে কৃষ্ণপক্ষের স্বাতী তারা
চাকার শব্দে জাগে আদিম পাহাড়পুরের পুরান কথা
লখিন্দরের লোহার বাসর কি ভেঙ্গে যায় ফণী-মনসায়?
আজো তবু মহাস্থানগড়ের ভূমি সর্পে ভীত চাঁদ সওদাগর।

মানুষ হেঁটে হেঁটে হেঁটেছে চাঁদ-মঙ্গলের দেশ;
পাথ ফাইন্ডার ডিস্কোভারী পৌঁছে যায় শূন্য গগন;
সুপার নেটে এসে যায় বিশ্বায়ন
কবির কলম একটি আঁচড়ে আঁকে
জীবন জটিলতার সমুদ্র সংঘাত …

তবু হারি তবু জিতি তবু হৃদয়ে ঘন বেদনার সংশয়
তবু অজানা আঙুল হেলনে কাটে আমাদের অষ্টপ্রহর।

পুনশ্চ সম্পা নদী

সম্মুখে যে নদী বেজে ওঠেতার নাম রাখি বিবেকানন্দের মায়াবাদ
গৌতমবুদ্ধের হীনযান মহাযান;
যিশুর ত্রিত‘ত্ত্ববাদ রাখতে পারাতম!
তবু নির্বাণ রহস্যে এক অদৃশ্যিত নদীফোঁটা ফোঁটা জল হয়ে নাকফুল
নাকফুলই বা বলি কেমনে–সেটা হয়ে যায় মুহম্মদী স্রোতসিনী।
জানি, স্মৃতির নদীতে অসংখ্য গাঙচিল উড়ে যায় ডানা মেলে
পালক রহস্যে
জানি, রঙধনুর আবিরে মেতে ওঠা বর্ষা সন্ধ্যা আঁকে
যৌবনের ব্যথিত বেদন …
বুঝি ধূলিছাই ধূলোজল ধূলোপথ–হয়ে যাবে শীত রাত্রির উষ্ণতা!
হবে বুঝি?
তবু, কেটে যায় অনন্ত সময়–বেঠোফোনী অন্ধগীতে
চোখের পলকে
অস্তমিত কালের গৌরবে
জীবনের বোধিদ্রুমে
কে যেন পাবক শিখা জ্বেলে ডেকে যায় মদহর্ষে
রাত্রির নরকে।
কে? সে তুমি? বলে নড়ে চড়ে বসি।
পুনশ্চ সম্পা নদীতে ডুব দিয়ে খুঁজতে যাই
যে জলে আগুন জ্বলে
সে জলের ভস্মাধার॥

 

প্রার্থনার ভাষা

এ মুখ নিষ্পাপ বলতেই তুমি নীলাম্বরী মেঘ হতে হতে
গঙ্গাজল-নিরঞ্জনা নদী।
কী রূপে ভাসিব জলে?
সাঁতার বিদ্যা তো রপ্ত করি নাই অধিকন্ত নামিনি কখনো
জলের বিভ্রমে, মুখ কতটা সূর্যিত রৌদ্রে রবে দাঁড়ানো ঈশ্বর?
জানি না হে মুগ্ধরাত্রি, যামিনীভেনাস।
জেনেছি জলেও নাকি মৎস্য সম্প্রদায় সম্মিলিত সুরে ধরে
কুয়াশা সঙ্গীত
মেঘেদের গান।
মেঘ বুঝি জলেরও প্রণয়িনী?
ভাস্কর্যরূপে বেষ্টিত আধুনিক যুগনেমে যাচ্ছি জলে।
জলের ভিতর কি জলের মায়া মায়াময়রূপে অনবদ্য বৃষ্টি হবে?

অগ্নিঝরা দিন ঘরে ঘরে প্রস্ফুটিত হয়
রবীন্দ্র-নজরুলের গীতো হয়ে …

স্বপ্ন-মৃত্যু

চোখে যার পুরোনো কালের স্মৃতি; তারই তো ক্ষোভে বেঁকে আসে
মায়াবী শৈল্পিক হাসি।
হাতের অদৃশ্য যাদুতে ঝরছে বুঝি ম্যাডোনা সঙ্গীত?
হৃদয়ের রক্তে তবু নেচে ওঠে ব্রাত্যজনের বারোমাসী গীত।

মাঠে নেমে ঘাটের শূন্যতা
দু’একটা ইদুর সেজেছে বসন্ত কোকিল …

জেনে যাচ্ছি তোমার উনুনে
আমার স্বপ্নসমেত পুড়ছে পুরো পৃথিবী॥


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা