ইতি হতঃ চিরকৌমার্য্য

লেখক : সবুজ মন্ডল

ধূলি ধূসরিত পৃথিবীর বুকে মানুষ যতোদিন যতোক্ষণ আছে কেবল ততোদিন ততোক্ষণ সত্য। আরও সত্য নিত্যবৃত্ত ঘটমান কার্যাবলীর অমায়িক কর্তা বা কর্তী। কর্তা বা কর্তীর নিজস্ব চারিত্রিক আয়নার মাপকাঠিতে সে সম্পূর্ণরূপে অমায়িক নির্দোষ। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিপক্ষে পারমানবিক মন সর্বদা মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে অতিশয় ব্যতিব্যস্ত। তা যদি হিরোসিমা ও নাগাসাকি ধ্বংস হয়ে যায় তবুও মন হোয়াইট হাউসের শ্বেত পাথরের মতো সম্পূর্ণ কলুষমুক্ত। নির্বিবাদে আগ্রাসন চলে মানবিকতার বিপক্ষে, অথচ স্বপক্ষের স্লোগানের বিষয়বস্তু মানবিকতা। স্বীকার্য হয় মন ক্রিয়া-বিক্রিয়া, মিথস্ক্রিয়া অথবা নিয়ন্ত্রণকারীর দুর্বল উপাদান। দিকনির্দেশনায় কড়া শাসন ছেলেখেলা বালির বাধের মতো ক্রমশ ধ্বংস নামে জলের অন্তরে। তাই ও বড়োই স্বেচ্ছাচারী।

অন্যায়কারীর নিঃসঙ্গ মন ভাবে অন্যায়ে কোনো ন্যায় নেই। আর ন্যায়কারী ভাবে ন্যায়ে কোনো ন্যায় নেই। এখানেই সংঘর্ষটা বাঁধে অণু-পরমাণুতে। যার ফলস্বরূপ কুমোর ডাক্তার কিছুটা সময় বাস্তবতা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজ কৃতকর্মের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। উচিত-অনুচিতের পাল্লায় তুলনামূলক সাহিত্য বিচারের মাপকাঠির মতো মিল-গরমিল, উৎকর্ষ-অনুৎকর্ষতা, বিশিষ্টতা-সমিলতা নিয়ে ভাবিত হয়। নিঃসঙ্গতায় হাজার বছরের ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়েও বেঁচে যায়। যতক্ষণ সে একা আছে ততক্ষণ ন্যায়ের ন্যায় অন্যায়ের অন্যায় নিয়ে শামুকের মতো নিজেকে সংকুচিত করে ফেলে। সংকুচিত জীবনের ক্ষণটিতে নিঃশ্বাসের পালা কামারের ঝাপরের মতো ওঠানামায় ব্যস্ত থাকে। আগুনটা তাতিয়ে দেওয়াই তার কাজ। অথচ সঙ্গীর সঙ্গ পাওয়া মাত্রই ভুলে যায় অতীত অন্যায়ে ভরা জাগতিক কর্মকাণ্ড। তার কাছে মূর্তিমান হয়ে ওঠে আজকের চলমান জগত। বাকিসব ফুৎকারে নিভে যাওয়া মোম। ঘোর ভাঙে অন্ধকার জগতে আলোর সম্ভাষণে-

— কিই্, গালে হাত দি ওরাম ক্যুরি বুসি রুইসো ক্যান

— বেরাম ইন্তি হেডুন র্সদা বাড়িত্তে খেই আসতি এতোসময় লাগে, আমি এট্টু ঘোম পড়বো

— ওরে তা দুডো খাই্ই আসপো তো। তা তোমার এতো তাড়া ক্যানো।

চলমান আলাপাংশ দু’জন খ্যাতিসম্পন্ন গ্রাম্য ডাক্তারের। একজন বসে থাকা আলাপরত দোকানটির মালিক প্রবাল ডাক্তার। অন্যজন আশেপাশের পাঁচ-ছটা গ্রামের কুমোর ডাক্তার। গ্রামগুলো আবার পদবি অনুযায়ী মোল্লে বাড়ি, র্সদা বাড়ি, সানা বাড়ি, ঢালি বাড়ি নামে পরিচিত। ডাক্তার প্রবাল এই আশেপাশের গ্রামগুলির ওষুধদাতা। মূলত ঔষধ বিক্রেতা হলেও লোকে সম্মানের সাথে প্রবাল ডাক্তারই বলে। প্রবালের কাছে এটি বেশ উপভোগ্য একটি ব্যাপার। কিন্তু বিষয়টি সে ন্যায্য বলেই মানসিকভাবে দাবি  করে এবং পেয়েও থাকে। অস্বস্তির কোনো অবকাশ ঠাঁই পায় না মনে।

প্রবাল ডাক্তার নিজের সুবিধার্তেই কুমোর ডাক্তারকে একপাশে একটি বসার জায়গা করে দিয়েছে। বসার জায়গায় দুটি চেয়ার একটি ছোট টেবিল আর টেবিলের সামনে লম্বা একটা বেঞ্চ। রোগীদের সাথে আসা ব্যক্তিরা বসে সামনের লম্বা বেঞ্চটায়। আর একটি চেয়ারে কুমোর ডাক্তার অন্যটিতে রোগী-

— জোরে জোরে শ্বাস নেওদিন। রোগী যথাসাধ্য চেষ্টা চালায় ফুসফুসটাকে আন্দোলিত করার।

— হুম্ম দেখি জিব, আরেকটু বের করো আরেকটু।

কিছু না পেয়ে সোজা হয়ে বসতে বলে। রোগী সোজা হয়ে বসে। এবার কুমোর ডাক্তার রোগীর পাজরা কাঠির নিচে ভিতরের ডান দিকে চাপ দেয়-

— ব্যথা করে

— এট্টু এট্টু

তারপর আর দেরি হয়না। সনাক্তকারী রোগ মোটেও মুখ্য বিষয় নয়। তাই সে এ্যাপিন্ডিসাইটিস, বি ভাইরাস, লিভার সিরোসিস, আলসার, বদহজম অথবা কোষ্ঠকাঠিন্যই হোক। পটাপট গড়ে পাঁচ-ছটা ঔষধের নাম লিখে হাকে- এ্যই প্রোবাল, ওষুদ গুণ ঠিকঠাক দি দে। প্রবাল ওয়াক্ত বুঝিয়ে বুঝিয়ে ঔষধ দিয়ে কাম্য লক্ষীকে স্বযত্নে  ড্রয়ারে বন্দি করে ফেলে। এভাবেই কুমোর ডাক্তার ও প্রবাল ডাক্তারের দীন-ই খাস সূর্য ডুবিয়ে সূর্য তোলে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর পরম শ্রদ্ধার ব্যক্তি হয়ে।

প্রবাল ডাক্তারের ডেরাটি কুমোর ডাক্তারের অবসরকালীন স্থায়ী আবাসস্থল। তার মূল জীবিকা বাড়ি বাড়ি যেয়ে রোগী দেখা। সম্মানীর পাশাপাশি যাতায়ত খরচও রোগীর পরিবার বহন করে। এটা মিটে যায় সবার আগে। এই টাকা কুমোর ডাক্তার কখনো নিজে হাতে ছোঁয়ায় না। মটরসাইকেলে আসলে মটরসাইকেলের চালকের হাতে দিতে হয়। ভ্যানে আসলে ভ্যান চালককে। আর যাদের এই দুটোর সামর্থ্য নেই তারা সাইকেলের পিছনে বসিয়ে নিয়ে চলে সেবার উদ্দেশ্যে। কুমোর ডাক্তারের তাতে কোনো আপত্তি নেই। বরং স্বাচ্ছন্দ্যে রোগীর কথা চিন্তায় মনোনিবেশ করে। রোগীর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়। ভাবগতিক মন্দ হলে বলে দেয়- শাতক্ষীরি‌্য নি যাও। আমি পারবোনা। অবশ্য ব্যবস্থা সেই-ই করে। পরিচিত ক্লিনিকের নম্বরে নোকিয়া বারোশ মডেলের ফোন দিয়ে নাম ঠিকানা সবই বলে দেয়। দরকার হলে সঙ্গেও যায়।

হোক শীত হোক গরম অথবা ঝড় বাদলের দিন রাত কোনো মুহূর্তেই তার অপারগতা নেই। রাস্তায় কাদা হলে খাল দিয়ে নৌকায়, নৌকা নাহলে হেঁটে খাটো মানুষটি ঠিকই পৌঁছে যায় রোগীর শিয়রে। রোগীও ভরসা পায় সাথে ডাক্তারও।

স্বল্প কথা বার্তা সেরে নিজের বসার ঘরে আসে কুমোর ডাক্তার। লম্বা বেঞ্চটায় গড়িয়ে গড়িয়ে এবার আদুল গায়ে বিশ্রাম নেবে বেশ কিছুক্ষণ। এসময় একজন খরিদ্দার আসে ঔষধ নিতে। জামাটা টেবিলের ওপর রাখতে যেয়ে জিজ্ঞেস করে- কি রে, তোর মাগী আছে কিরাম। ‘তোমার জন্যি ব্যাঁচি আচে ডাক্তার।’

এটুক পরিতৃপ্তির খোরাক একান্তই চিরকুমার ডাক্তারের। এরকম বহু উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত রয়েছে। গুনে গেঁথে শেষ করা যাবেনা। নিজের বলে তো কিছুই নেই আছে ঐটুকুই। কুমোর ডাক্তারের প্রতাপের ঠেলায় নিজের আসল নামটাই ভুলতে বসেছে। কেউ আর এখন নাম ধরে ধরে ডাকে না। চিরকুমার থেকে কুমার, কুমার থেকে কুমোর ডাক্তার হয়ে সেবা বিলিয়ে চলেছে গ্রাম কি গ্রাম। নিজস্ব বাচ্চা-কাচ্চার কোনো ঝুট ঝামেলা তার নেই। পেলে পুষে মানুষ করা, স্ত্রীর চাহিদা কোনো কিছুই তাকে মেটাতে হয়না। দিব্যি হাসি পায় গেরস্থ বেটাগুলোকে দেখে। বেটাগুলো কি প্রচণ্ড আবেগ মিশিয়ে ভালোবাসে বউগুলোকে। এইতো কয়েকদিন আগে ভয়ানক ঝড় বৃষ্টির রাতে আনারুল্লা এসে কেঁদে-কেটে পড়েছিলো- ‘ডাক্তার এট্টু না আসলি হবেনা, আমার বউডা ম্যুরি গেল’। নিরাশ করেনি গিয়েছিলো। গিয়ে দেখে ভয়ানক অবস্থা। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে। সামলানোর কোনো উপায় নেই। বুঝতে পেরেছে ভিজে আবহাওয়ায় আবেগ সামলে উঠতে পারেনি। কিন্তু বউটা এখন যে মারাই যাবে। বারান্দায় বসে আনারুল্লা কাঁদছে আর প্রলাপ বকছে- প্রোবাল নাড় আমার খ্যায় ক্যুরি। কি বাল টেস ক্যুরি কুলো বাঁদেনি। ডাক্তার আর ধৈর্য রাখতে পারেনি- তিন তিনডি ছেলি মেই তোর, এট্টু হিশিব ক্যুরি কত্তি পারিসনি। বাড়া টাটালি আর টের পাওনা, না! কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি আনারুল্লার কাছ থেকে। কি আর করবে বেঁধে গেছে। বোঝাই যায় বউটাকে খুব ভালোবাসে।

রাত অনেক হয়েছে। ধারে কাছে এখন আর কাউকে পাওয়া সম্ভব না। ধরানী মাগীটাকেও আনা যায়নি। পাশের বাড়ির আশ্রিত একটি ছেলেকে বসিয়ে রেখে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে আনারুল্লা। ছেলেটা এখনও ঠায় বসে আছে। ডাক্তার ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলো- কি কইস মাগীর দৌড় কতোদুর এট্টু দেই। আনারুল্লার বউ এর তখন যাই যাই অবস্থা। এ্যই মাগী কোতন দে জোরে। কোতন দেয় ঠিকই জোর হয়না। ডাক্তার হঠাৎ জোরে হেঁকে বলে ওঠে- আনারুল্লা বাঁশ নিইই্ আয়। বলে দ্রুততার সাথে উঠে দাঁড়ায় কুমোর ডাক্তার। মাটির দেয়ালে সুবিধামতো হেলান দেওয়া মাথা ধরে সবেগে পিঠে চড় বসিয়ে বলে- কোতন দেএএ মাগী…। অযাচিত আতঙ্কিত বিষম চড় খেয়ে ভয়ানক চিৎকার করে কোতন দেয় আনারুল্লার স্ত্রী- ওরেএ বাবাগো ও্। তাতেই অসাধ্য সাধিত হয়। সে ধাক্কা মৃত একটা অপূর্ণ মানব শিশুর জন্ম দিয়ে বেঁচে যায় বৌটা। এরকম কতো উপস্থিত বুদ্ধিতে হাত পাকিয়েছে কুমোর ডাক্তার। সবই সুখস্মৃতি। কিন্তু অসময়ে স্মৃতিতে প্রায়শঃ খচখচ করে কেবল মায়ের পেটের সহদর বড়ো ভাই। তাকে আপামর ছেলে-বুড়ো, জোয়ান সবাই বড়োদা বলেই ডাকে। বড়োদা যদি না থাকতো শুধু যদি…। অসহ্য লাগে বড়োদাকে। ভালো থাকতে কোনোদিন যে সহ্য হয়েছে তা নয়। তখন কান ঝালাপালা হতো বাবা-মার উপদেশে- বড়োদার মতো হ, ওর মোতো এট্টু লেহাপড়া কর। শালা ভালো থাকতেও শান্তি দেয়নি পাগল হয়েও ভরিয়ে রেখেছে অশান্তিতে। স্মৃতি থেকে সেই অসহ্য বড়োদাকে সরিয়ে পরিতৃপ্তি গেঁথে জৈষ্ঠ্যের দ্বিপ্রহরে ঘুমানোর চেষ্টা করে কুমোর ডাক্তার।

২.

— ঐ চড় এট্টা খালি শেষ।

স্কুল পড়–য়া ছেলেদের এই আতঙ্ক অবশ্য কোনোদিন সত্য হয়নি। বড়োদা চড় ওঠায় ঠিকই, কাউকে মারেনা। স্টাইলটাও ভিন্ন কায়দার। জিহ্বা দিয়ে ওষ্ঠের গোড়া সামনে ঠেলে, সামান্য হা করে, বাঁহাত পিছনে নিয়ে যায়। এসময় পুরো বডিটা সামনে নিয়ে চড়ের নিশানা লাগায়। মনে হয় প্রচণ্ড ক্ষোভ আছে কোনো ব্যক্তির ওপর। তার উচিত শিক্ষা বড়োদার হাতের ঐ মহাঔষধে। কাকে, কেনো সেটা মোটেও স্পষ্ট নয়।

ছেলেদের হাসির ফোয়ারা ক্রমশ শূন্য চৌবাচ্চার শেষ নলের মতো হয়ে আসে। তবুও এই স্কুল পড়–য়া ছেলেদের মাঝে বড়োদাকে নিয়েই আলাপ চলে। ওরা অংকের প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিলো সরদার বাড়ির মোজাম্মেল সরদারের কাছে। মোজাম্মেল সরদার স্কুল পড়–য়াদের একমাত্র ভরসা। প্রাইভেট পড়ে ফেরার পথে রাস্তার ধারে একটি দোকানে বড়োদাকে পেয়েছিলো ওরা। কেউ একজন একটা সিগারেট দেওয়ার লোভ দেখিয়ে বলে- বড়োদা আমাগে এই অঙ্কডা ক্যুরি দেও দিন। বড়োদা বিজ্ঞের মতো হাত পাতে নিঃশব্দে। খাতা কলম চাওয়াতে ওরা বোঝে বড়োদা মুডে আছে। একজন একটা সিগারেট ধরিয়ে বড়োদার মুখে দেয়। অন্য একজন খাতা কলম দিতে বাকীরা চর্তুপাশ ঘিরে বসে। কেউ বড়োদার স্বপক্ষে বলে- দেইস ঠিকই্ করবেনি। বড়োদা কিন্তু বরাবর এসব সমালোচনার ঊর্ধ্বে। এসব কোনো কিছুতেই তার খেয়াল নেই।  মস্ত সমস্যা সমাধানে জীবনের গাণিতিক সূত্র আকাশের ভাসমান নক্ষত্র হতে ধরে এনে খাতায় বসাতে ব্যস্ত। নাহ ওরা খুব বেয়াড়া। হে হে পাগল চোদা ভুল ক্যুরি বুইসে। এই বাক্যে হাসির কলরোল ওঠে ব্যাপকভাবে। বড়োদা আর পারেনা। আক্রোশ ঝেড়ে কামড় দেয় ঢোঁড়া সাপের মতো-

— হুহ্, মানুষ পোড়া গোন্ধ। এতো মানুষ মরে, ও সোরের বাচ্চা মরে না।

— এ হে পাগোল খেপিচে, পাগোল খেপিচে।

বড়োদার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। পাঁচ-ছয়জন ছেলেকে ঠেলে রাস্তায় নেমে পড়েছে। ওদের নাগালের বাইরে যেয়েও অদৃশ্য শত্র“কে বিস্তর চড় বসিয়ে যাচ্ছে। আর হাঁটছে অজানা গন্তব্যে সোজা। হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় রাগের কারণটা ভুলে যায়। সামনে বয়স্ক কাউকে পেলেই বিড়ির আবদার- এট্টা বিড়ি দেও। কেউ দয়াপরবশ হয়ে হয়তো একটা বিড়ি দেয়। কিন্তু ধরানোর আগুন দেয়না। এটাও একটা অভিনব মজা। এই আগুনের সন্ধানে বড়োদা এবার  কোনো না কোনো বাড়ির অন্দরে ঢুকে পড়বে।

এজাতীয় ঘটনা ঘটে কোনোদিন সকালে আবার কোনোদিন ভর দুপুরে। দুপুরের দিকে হলে মহিলারা একটু বেকায়দায় পড়ে যায়। খাওয়া-দাওয়া আর সংসারের ঝুট-ঝামেলা সরিয়ে কাঁথা বোনে। তাদের এই খণ্ডকালীন স্বাধীনতায় স্থুলতা পায় বুকের বসন। আর তখনই বাগড়া বাঁধায়- এক গেলাস খাওয়ার জল দেও অথবা আগুন দেও, বিড়ি ধরাবো। সকালে হলে কোনো সমঝদার মন্তব্য আসেনা। কিন্তু দুপুর হলেই সমঝদার এক নারী অপর নারীকে দেখিয়ে বলে- আজ কুমোর ডাক্তার বাড়ি। মাঝে মধ্যে এক গেলাস পানি খেয়ে বিড়িতে চিন্তিত বৈজ্ঞানিক টান মারে বড়োদা। বিড়ি শেষে হাতের জামাটা মাথায় দিয়ে সটান শুয়ে পড়ে, যেনো নিজের বাড়ি। বড়োদাকে জামা গায়ে দিতে দেখেছে খুব কম মানুষ। প্রচণ্ড উত্তাপ ওড়াতে ঊর্ধাঙ্গ নাঙ্গা রাখা অধিকাংশ সময়। নাঙ্গা ঊর্ধাঙ্গের বড়োদা প্রয়শঃ বিতাড়িত হয় অন্যের বাড়ি থেকে এমনকি নিজের বাড়ি থেকেও।

আমাদের সজ্ঞায়িত শুদ্ধ পৃথিবীর বারান্দায় অযতেœ লালিত হয় কিছু অশুদ্ধ কর্মকাণ্ড। আমাদের খল শুদ্ধতার আড়ালে কোনো মতেই সে মত প্রকাশের ক্ষমতা পায়না। নজর এড়িয়ে ক্রমশ শুদ্ধতার পিউরিফাইং প্যাকেটে পরিবেশিত হয়। তবু সেটা অশুদ্ধ। আমাদের নজর এড়িয়ে গেলেও বড়োদার নজর এড়ায় না কোনোদিন। বড়োদা নিষ্কর্মা জগতের একমাত্র কর্ম অশুদ্ধতার প্রতিবাদক। প্রতিবাদটা তার পরিমিত ও অক্ষম। দৃঢ়তা এটাই বড়োদা কোনোদিন সহ্য করেনি আর করবেও না। জ্বলে পুড়ে মরে শুধু নির্ঝঞ্ঝাট দুপুরের কর্তা কুমোর ডাক্তার। দাঁতে দাঁত কষে বড়োদাকে মারতে যায়, তাড়াতে যায়। কোনোদিন বড়োদা সহজেই নিষ্ক্রান্ত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। রাস্তায় বেরিয়ে কোনো মেয়ে অথবা বৌ পেলে বড়োদা পাজাকোলা করে খালের জলে ফেলে। আবার কোনো কোনোদিন  প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়। অন্যদের মতো সেতো আর বলতে পারেনা- পাগোলের হেদি নেই হোদিই আচে। কুমোর জানে বড়োদা জীবনের ক্রিয়াকর্মের নিরপেক্ষ দর্শক। নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতার দাবি হতে বড়োদাকে অপসারণের জন্য কোমরবেঁধে নেমে পড়তে হয় কুমোর ডাক্তারকে। রাগের মাথায় বড়োদাকে মারে প্রচণ্ড মারে। অতিরিক্ত রেগে গেলে মোটা দড়ি হাতে পাঁকড়াও করতে হয় বড়োদাকে। বড়োদা জানে এবার তাকে মোহিনী ইনজেক্শন দেওয়া হবে। তাই এলোপাতাড়ি প্রাণপণ ছুটতে থাকে বড়োদা। কি মনে করে একটু থেমে দেখে কুমোর আসছে কিনা। থেমেই চালাতে থাকে অক্ষম প্রতিবাদ। কেনো জানি তাতে অস্বাভাবিক রেগে যায় কুমোর ডাক্তার। অসহায়ভাবে সাহায্য চায় রাস্তার মানুষের কাছে- সালাম ভাই ধরো ধরো। একটা সময় পারস্পরিক সহযোগিতায় ধরেও ফেলে। প্রাপ্তির  হিংস্রতা ঝরে জিহ্বার অগ্রভাবে শা-আ-লা উচ্চারণে। বড়োদা কাঁদে, কুমোর ডাক্তারের মনও নরম হয়। কিন্তু নিয়ম মাফিক বন্ধ হয়না ইনজেক্শন দেওয়া।

৩.

দিনের আলো রাতের তারা সারাদিন সারা রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রমেও একফোঁটা পরিশ্রান্ত হয়না কখনো। ওদেরই মতো আমরা অনবরত খেটে চলেছি নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে দিনের পর রাত রাতের পর দিন। কর্মব্যস্ততার মাঝে একফোঁটা সময় হয়না নিজের জন্য। ফেলে আসা সময়কে ভুলে নতুন সময়কে নতুনভাবে উপভোগের চরম লালসায় লালায়িত জিহ্বা। বিশ্বগ্রাম ধারণা সত্যিই গ্রামকে হাজির করেছে নেতিবাচক বিশ্বে। ঘোলাটে মত্ততায় জীবনের সামগ্রিক সুস্থতা অস্থিরভাবে ডুগডুগির তালে বাদর নেচে চলেছে। লুটাতে বসেছে জীবনের স্বাভাবিক মাত্রা। অসুস্থ মানসিকতা সুস্থ মানসিকতার স্থলে প্রতিস্থাপিত হয়ে স্বাভাবিক নিয়মে চলছে জীবন। পুরাতন ভুলে নতুনের ভিড়ে অক্ষত আছে কেবল গ্রামীণ কানাঘুষা। স্পষ্ট নয় অথচ তীব্র। সামনা সামনি না থেকেও অনেক বেশি মনের সামনে। যেটা বৌদির জীবনকে ঘনঘটা বর্ষার সামনে ফেলে দিয়েছে। নিরক্ষর গ্রামের বউটি একবার দুঃসাহস করে ভাবতে বসেছে ন্যায়-অন্যায়ের পরস্পর সঠিক এবং বেঠিক মূল্যবোধ। ঘটে যাওয়া সাক্ষ্যতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে বিচারক মন বলে দেয়- যা হয়েছে ভালো হয়নি, যা হবে সেটাও ভালো হবে না। আর অস্ফুট দীর্ঘশ্বাস উপায় বলে দেয়- এডা আমায় কত্তি হবে।

সংসারের বড়ো বৌ। স্বামীর সিনিয়রিটির ভিত্তিতে নাম ভুলে বৌদিতে রূপান্তরিত হয়েছে। মুছে গেছে নিজের নাম-ধাম-পরিচয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আদ্যান্ত একটা মৌলিক চাহিদা মনের কোণে বাবুই পাখির মতো বাসা বেঁধেছে। গৎবাঁধা নিশ্চয়তার জীবনে নিজের বলে তার কেউ নেই। অথচ স্বামী সংসার, ছেলে, দেওর কুমোর ডাক্তার সবাই চারপাশে আত্মীয়তার পরশ বুলিয়ে ঘুরপাক খায়। এদের মধ্যে না থাকার মতো আছে কেবল দুটি ছেলে। ছেলেদের খবর কুমোর ডাক্তার রাখেনা আর স্বামী যে রাখবে সে আশা নেই। অবহেলিত এই ছেলেদের মাঝে নিজেকে ফিরে পাওয়ার গুপ্ত বাসনা জেগেছে বৌদির। কিন্তু সেখানে সন্তানের দাবির বিপরীতে মাতৃত্বের অধিকার যেনো অস্পৃশ্য। তারা আজও সবাই মিলে জীবনের শেষ আশাটুকু মাড়িয়ে চলেছে। বিশেষ করে বড়ো ছেলেটি। ঘটনা যা বৌদি কোনোদিন আশা করেনি তা চাপা থাকবে। এটাও ভাবেনি এতোটা তীব্রভাবে মুখের পরে হুটহাট বলে দেবে। অন্তত মা হিসেবে সে এই মানসিক দাবিটুকু করতেই পারে। মানসিক দাবি আর বাস্তবতা দুটোই ঘোরলাগা আলেয়া। দাবি এক বাস্তবতা অন্য আর এক । আবার বাস্তবতা এক দাবি ভিন্ন। জগতের স্বপ্রণীত নিয়মে চলছে সব। ভাত দিচ্ছিলেন বৌদি। কুমোর ডাক্তার কিংবা বড়োদা কেউ বাড়িতে নেই। বড়ো ছেলেটির বয়স সবে চৌদ্দ কি পনেরো হয়েছে। দেখে শুনে বোঝার বয়স নিশ্চয়ই হয়েছে। বুঝেছেও যথাযথ। কিন্তু দেখে শুনে বুঝে চুপ করে থাকার মানসিকতা থেকে সে মুক্ত। অবশ্য বয়সও সেটা করতে দেয়না। গাম্ভীর্য এবং রাগের সম্মিলন ঘটিয়ে ভাতের থালাটি ছুঁড়ে মেরেছিলো বৌদির পায়ের কাছে। অতর্কিত আত্মার স্ব-বিস্ফোরণে কিছুটা আতঙ্ক ছেয়ে গিয়েছিলো চোখে মুখে। কিন্তু ছেলের একটি কথা ভালোলাগা গানের মতো নিয়ত বেজে চলেছে— তোর হাতে ভাত খাতি ঘেন্না লাগে। এটি ভোলার কোনো স্বাভাবিক নিয়ম বৌদির জানা নেই। বরং চক্রবৃদ্ধি আকারে ক্রমে বাড়তেই আছে। ইন্ধন জোগাচ্ছে মহাজনের সমূল ভালোমানুষিটুকু উৎপাটনের জন্য। নিজের জন্য নয় অন্তত সন্তান এবং তাদের মানসিক প্রশান্তির জন্য কাজটা করা দরকার। বৌদি এটুকু জানে সন্তান তাকে আর কোনোদিন স্বীকার করবে না। তবুও আশা হয়তো মহাজনকে দেখতে না পেয়ে ভুলে যাবে, গ্রহণ করবে তাকে। না করলেও বা কি। যে জীবন বঞ্চনা করেছে তার কাছে কিবা আশা করা যায়।

ছোট ছেলেটি এখনও খুব বেশি বুঝতে শেখেনি। ওকে কাছে রেখে কিছুটা হলেও বুকে জেগে ওঠা চর ভরাট লাগে। মুখ আঁধার থাকলে চুপি চুপি এসে জড়িয়ে ধরে নাহলে কোলের ভেতর বসে পড়ে। ও কি যেনো ভাবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে। হয়তো তার কষ্টটা ভাবে। ধূর ওর এহনো কি চিন্তের বয়স হুই নাই। মনের অবাধ্য চিন্তা তাকে একটু হাসিয়েই দিয়ে যায়। এ্য নু যাদিন, দোকান তে এট্টা বেলেড নিয়ে আয় দিন। তিন টার যেডা ওইডা আনবি। আর এই দুটা তোর খাবার কেনার জন্যি। ছেলেটি খুশিতে ডগমগ হয়ে দোকানে চলে যায়। বৌদি অন্তর্লীন একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যায় প্রাত্যহিক দুপুরের রান্নার কাজে।

আগে ধান হতো এখন লিজ। বাগদার চাষ হয় প্রায় আশে-পাশের সবগুলো গ্রাম জুড়ে। একটির পর একটি গ্রাম গ্রাস করে নিয়েছে লোনা জল। ধানের সময় যে মাঝ বিলে মানুষ রাতে যেতে দুঃসাহস দেখাতো না। এখন সেখানে রাত তিনটার সময় অনায়াসে ঘেরের বাসায় নিশ্চিন্তে ঘুমায়। চাঁদের আলোয় লোনা খয়রা জলের বুকে হীরের আলো জ্বালায়। ছোট একটা ঢিল মারলে তার কৃতিত্ব প্রদর্শন করে সগর্বে। লোনা জল হতে পারে কিন্তু সে দিয়েছে অর্থবিত্ত, সচ্ছলতা। তবুও লোনা জল পেরে ওঠে না। মানুষগুলো তখনও বলে— ধানের সোময় ভালো ছিলাম। এই লবণজল শত্র“তায় কতো প্রাণ নিয়েছে তার কোনো লেখাজোখা নেই। প্রতিবছর কোনো না কোনো কিছু হয়েই থাকে। ওমুক ঘেরের বাসায় তমুক খুন। ডাকাতি কত্তি এ্যাসি হাত পা বাইন্ধি যম্মের মাইর মেরি। এইসব ধরনের কথাবার্তা শোনা যায়। বৌদির দেওরটির কোনো ভয়-ডর নেই। বেশ বড়ো একটি ঘের, তাও আবার শ্মশানের কাছে। নির্বিকারভাবে দেওরটি চোর-ডাকাত ভূত-প্রেত তাড়িয়ে সেখানে ঘের পাহারা দিয়ে আসছে এই বছর তিনেক। রাতে ভাত খেয়েই সেখানে চলে যায়। বাড়ি থেকে ঘেরের রাস্তা দিয়ে হাঁটলে দশ পনেরো মিনিটের পথ ঘেরের বাসা। রাতে ভাত খাওয়ার পর পান চিবোনোর অভ্যেস আছে দেওরটির। তাই সাংসারিক সেবা সম্পন্ন করার পর এক খিলে পান হাতে ছুটতে হয় ঘেরের বাসায়। একটি টর্চ হাতে নিয়ে নির্ভাবনায় পান খাওয়াতে রওনা হয় বৌদি। ভয়-ডরের বালাই তারও নেই। কোনোদিকে মাথা না ঘামিয়ে সোজা বাসার দিকেই হেঁটে চলে যায়। নিত্যকার সেই নির্ভিকতার মাঝে আজ কেনো জানি ভয় ভয় করছে। না চাইলেও এদিক ওদিক চোখ চলে যাচ্ছে। সামান্য কথার এতো শক্তি আছে তা বৌদির জানা ছিলো না। তোর হাতে ভাত খাতি ঘেন্না লাগে। ভাবা যায় আজ কি হবে।

— ঠাউরপো ঘুমোই পইড়ল্যে নাকি?

— নাহ্, নতুন এট্টা কায়দা দেখছি।

— ওও, আমি ভাবলাম তুমি ঘুমোই পুড়িছো।

— পান না খাই ঘুমোনি যায়?

দেওরটির হাতে এখন ভিডিও ফোন। নতুন নতুন কলাকৌশল, কায়দা-কানুন দেখায়, শেখায়। আজ নতুন কি একটা শিখিয়ে দেবে। আজগুবি ব্যাপার। কিন্তু সেটি মনে অপরিসীম একটা সহজলভ্যতার ঢেউ দিয়ে যায়। সময় বেরহম থেকে এতো অনুকূলে আসলো কি করে। যাক তাকে নষ্ট না করে কথাটার মীমাংসা করাই শ্রেয়। বৌদি অগ্রসর হয় ধাপে ধাপে নতুন কায়দায়। মুখের সামনে ঊর্ধ্ব সীমান্তে ঝড়ে বাঁশ ওঠে আর নামে। ওকে ভালোভাবে ধরতে দেরি হয় কিছু। তাড়া আসে তাৎক্ষণিক- কি হুলো? প্রতিউত্তর- কিছুনা। বেশ ধারালো জবাব, হাতিয়ারও ধারালো। শেষ কথার পরে মাত্র আড়াই পোঁচে বাঁশ গাছটা ঝাড় থেকে নেমে যায়। তারপর লবণাক্ত জল চাঁদের আলোয় লবণাক্ত স্বাদ গ্রহণে তৎপর হয়। সঞ্চিত তরল ফোঁটা শেষ হওয়ার কালে দ্রুত থেকে ধীর হয়, পাতলা থেকে গাঢ়। নিঃসরণ শেষে একসময় স্তব্ধ হয় আদান-প্রদানের মানসিক যুদ্ধ।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা