ঈশানের বাতাসে ছিল কিছু নিশানা

কবে, একদা সেখানে সাতটি পুকুর ছিল। কাবিখার খালটি পশ্চিম থেকে বেঁকে বায়ু কোণ ছুঁয়ে ঈশান কোণে হারিয়ে গিয়েছিল; সাতটি পুকুর সাক্ষী ছিল তার পাশাপাশি। খাল হারানোর নিখোঁজ সংবাদটি হয়তো রটে গিয়েছিল, আজ তা সকলে বোধহয় মনে রাখে নাই। সেখানে সাতটি পুকুর যে ছিল, তার একমাত্র সাক্ষী খালটি, তার খোলস বেয়ে ওদিকে গেলে গোধূলি উতড়ানো প্রহরে, হারানোর বেদনায় ফুঁ দেয় যে বাতাস, কার কান্নার মতো বেজেছিল! তখন আমি আট ক্লাসে পড়ি। সেই সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে এলে মা বলেছিল—সাতপুকুরের যে তাল-খেঁজুরের বাগান, সেইখানে না-কি জ্বিন-পরিদের বাড়ি। সেখানে সন্ধ্যায় গেলে বাতাস লাগে গায়ে। গায়ে বাতাস লাগলে মানুষ না-কি আওলা রকম করে! কী করে, কী বকে; স্যান-খাওয়ার ওয়াক্তের কোনো ঠিকঠিকানা থাকে না! দুইপরবেলায় আনচান করে না-কি জান।
…একদিন ভাইট্যিল বেলায়, সোজা ঈশানের দিকে সাপের ছড়ানো খোলসের মতো মৃত ক্যানালের গতর বেয়ে, পুকুর পাড়ের তাল-খেঁজুর-নারকেল গাছের চূড়ায় সভয়, সাবধানী নজর রেখে চলে যেতে চেয়েছি; কান খাড়া করে কানে আঙুল দিয়ে শুনতে চেয়েছি জ্বীন-পরীদের বিয়ের বাদ্যি-বাজনা; শুনতে চেয়েছি নয়Ñতটস্থ থেকেছি, যদি শুনে ফেলি সেই ভয়ে। সেইদিন গিয়েছিলাম, কতে দূর…
বাতাস বোধহয় লেগেই ছিল গায়ে, মা-কে তা বলি নি। তা-না-হলে সে তখন স্বপ্নে আসে ক্যান, ক্যান কয়—অমন দুষ্টমি করে না সোনা! কে সে? সে কি ইমা, মরিয়ম না-কি স্বর্ণলতা? যেই নাম হোক তার, তবু সেই নাম ইমা। সেই ঈশান কোণে ইমাদের বাড়ি। কিংবা সেইদিন তাল-খেঁজুরের চূড়ায় জ্বিন-পরী নয়, সাতপুকুরের বিলের সমতলে মিশে যাওয়া সাতটি পুকুরের আত্মার কোলাহল ছিল বোধহয়। কোলাহল না-কি বিদেহী আত্মার রুমঝুম সেই বাতাসে? সেই বাতাস যদিবা ঈশান কোণে ওঠে, ডাল ভাঙা তার কর্তব্য নয় যেন; মিঠে তালে দোলায়, ফিনফিনে হিম হিম; তন্ত্রি বাজানো সে বাতাস; তারে বাউল বাতাস কয়? তবে তা ঝড়ো নয় নিশ্চয়, অন্তত গাছেরা তা স্বীকার করে না। সূচালো খেঁজুর পাতায়, ঝিরিঝিরি নারকেলের ডালে আর তালের যেই পাতা, যেন আসমানের কোনো দানব নেড়ে চলেছে কান সেই বাতাসে; তা তো ঝড়ো নয়। সেইদিন, সেই বাতাস লেগেছিল তবে গায়ে, মা কক্খনো জানে নি। তখন বাতাসে পাতলে কান ঝুমঝুম শব্দ শুনতে পাই। তখন বসন্তদিন, শীত পেরুনো বিকেল, সকাল-দুপুর-রাত… কড়াই ফুলের হলদাভ, শিমুলের লালে ডালে ডালে বসে কাক, না-কি কোকিল! মনে বেজে চলে ‘…কী যে বরষা, কী যে বসন্ত দিন/চোখে চোখ… আমি দৃষ্টি বিহীন’। কিন্ত কারে জানায়? আমার তো চোখে চোখ রাখা হয় নাই, কেবল তার নেচে যাওয়া দেখেছি… সে ঈশান কোণের ঈশানী! গাঢ় লাল কিবা নীলে, পায়ের চপ্পলে তার ধূলি আর নূপুরের ঝুমঝুম। সে যে-পথে যায়, যদি বা ধূলি না-উড়ায় সে—মনে হয় যেন বিরুদ্ধ বাতাস। তার গমনের পথে আম ফুলের রেনুমাখা ধূলি না-নিলে শ্বাসে, আনচান বুক তবে কি দিয়া জুড়াই! ঈশান কোণে মেঘ করলে কাল কালবোশেখী হয় জানি, আবহাওয়া পূর্বাভাসে কয়; কিন্তু, সে তো হয় বৈশাখে; তবে আমার এই বসন্তে কী যে হয়, তার স্কুল ফেরার পথে ভাঁটফুলে বিকেলের শিশির মাড়িয়ে আকন্দ পাতার ধূলোয় আঁচড় কেটে তার নাম লিখে আসি; সেই নামের পাশে যোগ চিহ্নর যাদুতে যুক্ত করে আসি আমার রিক্ত নাম। তখন সাতপুকুরের মোড়ে বাবলা তলায় বান্ধা মহিষের বাথান বাবলা ফল খায়। বাবলার ডালে ডালে তখনো যেন আগুন লাগা; থোকা থোকা ফুল, জড়ানো আলোক লতার আলো, দেখে বলি—এই রূপ তার মুখ রঙ। কোমল আদরে বাবলা গাছে তার জন্য ভালোবাসা রেখে আসি, এ-পথে যাবার কালে সে যেন এই পরশ পায়!
যেই কথা গোপন রাখি; গায়ে লাগে বাতাস, মনে দেয় দোল; চোখ তখন ভিন্ন কথা বলে, পা তখন ভিন্ন পথে চলে, স্থির গন্তব্য বুঝতে পারা ঢঙে তাতে দিশাহীন দোলাচল। বায়ু চাগান দেয়া মাথায় সরিষার তেল মাখা চুলও বশে থাকে না। মুরব্বিগণ বলেন তখন—বায়ুগ্রস্ত ছাওয়াল-পাওয়াল। কী করি কখন, দুপুরের ঘুমের বেলা আমতলা গিয়ে গাছের গায়ের মাছি তাড়াই, কচি আমপাতার ঘ্রাণ শুঁকি আনমনে, তবু এইরূপে আর দুপুর কাটে না। প্রাকবিকেলে, দুপুরটাকে ফাঁকি দিয়ে উত্তর-পূর্বে হারানো ক্যানালের আত্মা ভর করলে, ফিনিক্স সাইকেলটা আর বারান্দায় থাকে না। যদি না-থাকে বাইকের চাকায় হাওয়া, তবু চলে আওলা বাতাসে; লিলেনের জামা গায়ে, স্কুল ড্রেসের নীল প্যান্ট আর রূপসা চপ্পল পায়ে সাইকেল ধায় ঈশানে ডাঙাপাড়ায়। ডাঙাপাড়ার বাতাসে কি গো থাকে অগ্নিলেলিহান, না-কি আলোরও এতো উত্তাপ থাকে! আমি বোধহয় মোমের পুতুল, মনে হয়। কিংবা, পতঙ্গপ্রায় ইমাদের বাড়ির বাহির উঠানে ছুটে যায়। যেই দোল দেখে আসি ইমাদের আমগাছে বাঁধা ঝুলনায়, তার অনুছন্দে দোলে দশদিক। ভূ-তলে দেহ ভেলা ভাসিয়ে মান্দাসি হই পদ্মাপুরানের। এই বেহুলা যদি আসে মাঠের সবুজে, চারা মসুরের পাতা পিষে তার রসে ধুয়ে দেবো তার পা; এ মতন ধ্যান ভাঙে মসুরবীজ খুঁটে খাওয়া পায়রার দল ফটফটায়া উড়ে গেলে উড্ডীন পাখার ধ্বনি বৈকল্যে; যেন বা সহ¯্র কলতালি রোল, তখন পশ্চিমে সুর্যের তীর্যক চোখে মাখা সোনালি উপহাস! সবুজ ঘাসের সাথে এমন বন্ধু ভাবাপন্ন হলে না-কি কেন্নোরা নাক-কান দিয়ে মগজে ঢুকে যায়; ফলে গেঁয়ো রাস্তার বাঁকে বাটুল গাছের ঘাড়ে ঠেকনা দিয়ে রাখা ফিনিক্স সাইকেলে ফেরা হয় ঘরে কাঁচা রাস্তার মেরুদণ্ড বরাবর। ঘরে ফেরার চোখে সন্ধ্যাবিদীর্ণ আসন্ন সকাল, স্কুলঘর, বারান্দা, স্কুলমাঠ আর ছাত্রীকমন রুম আর নীল ফ্রকের রূপালি জরির ঘাগরার কাস এইটের সিলেবাসবিহীন পাঠ।
এই-বেলা জানি মানুষের জীবনে কতো কতো গল্পের জন্ম হয়। সময় পিঠে চেপে বসলে মানুষ এমনি-ই দৌড়ায়, আর পিছনে গল্প পড়ে থাকে। ‘কী করিলে কী হয়’, এই শিরোনামের রেলের হকার থেকে বাবার কেনা বই পড়ে তখনো বোঝা যায় নি—কারণ বিনা হয় না কার্য সাধন। ফলে ঘটনার জন্ম হয়, জন্ম মানবকূলে ও সমাজে, এই কারণেই। তবু, সেইদিন করতে হয়েছিলো গল্পের আয়োজন, যাপনের নয়। যাপনের গল্প তবে সর্বদা যথেষ্ট নয়। সময়কে পিঠে নিয়ে নবম শ্রেণিতে উঠে আসি, সেই কালে সাতপুকুরের বিলের পাওটা পথে মেটে থালার মতো পুকুরের তল থেকে উঠে আসে শাপলা। প্রথমে মাথায় বেণী, গোলাপি ফিতায় বাঁধা, যেন বা শাপলার পাপড়ি পিঠের সবুজ গোপন করে বুকের গোপালি তল চিতিয়ে ধরে হেমন্তের সকালের রোদে; এর পর একে একে উঠে আসে কাঁধ, সাদা ওড়না, নানান রকম পাতার ছাপে বিচিত্র নীল-বেগুনি-সবুজাভা-আকাশির কামিজের পুতুল নাচ; সাদা সালোয়ারের প্রান্তে আঁচলের খুঁট দাঁতে ধরা লাজুক কিশোরীর মতো চোরা মুখ উন্মোচনে আসে রূপালি নূপুর, হাওয়াই চপ্পলে ওড়ানো ধূলির গঞ্জনা তোয়াক্কা না-করে। তার সাথে খুব ভাব হয়। ঢুকে পড়া যায় ইমাদের গল্পবৃত্তে; শাপলা সেই দোর খুলে দেয়। শাপলা-ইমাদের সাথে খুব ভাব হলে তখন অনেক অনেক গল্পের দরকার হয়। ফলে গল্পের জন্য অভিযানে যেতে হয়, গল্পের জন্য ভাবনা হয়, গল্পের জন্য দুপুরের ঘুম কিংবা সন্ধ্যায় পড়তে বসা হয় না। সুতরাং হেমন্তের সন্ধ্যায় পড়তে বসা হয় না শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাকে। এক শেয়াল ডাকলে অনেক শেয়াল ডেকে ওঠে, আর আমার, আর আমাদের শেয়াল তাড়াতে আফাজ বাঙালের বাঁশঝাড় কিংবা যুগোল সরকারের পুকুরের পাড়ে যেতে হয়, যদিও শীতের আগমনীতে হেমন্তের মধুশীত তখন। কিন্তু, মনে হয় কী গরম সে-আবহাওয়া! শরীরের কার্বোহাইড্রেট ভাঙা উত্তাপের জন্ম হলে স্কুলের সাধারণ বিজ্ঞানের তাপবিদ্যুৎ অধ্যায় হাতে কলমে পড়া হয়ে যায়। বহু দূর দৌড়ে গেলে শেয়াল পাওয়া যায় না-মনে হয়, কাল তবে কি শোনাবো ইমাদের! তবু মনে হয়–নাহ, পাওয়া যাবে। পেয়ে যাই, পুকুর পাড়ের নরম কাদামতো মাটিতে শেয়ালের পায়ের চিহ্ন, মুরগি কিংবা হাস কিংবা অচেনা পাখির পালক। তবু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, এগুলো আসলে মুরগির পালক, নিশ্চয় বারেকের মায়ের সেই মুরগিটার, পরশু সন্ধ্যায় যেটি খোয়াড় থেকে খোয়া গেল; যদিও হতে পারে পুকুরে চরা হাসে তা, কিন্তু গল্প হবে বারেকের মায়ের আছাড়ি-পিছাড়ি কান্নার দৃশ্য সংম্বলিত। আর আমাদের ডহরে শেয়ালেরা সন্ধ্যায় মাছ খেতে আসে আমন ধানের নাড়ার ভিতর, মাছ খেতে গেলে কাঁটা বেঁধা গলায় শেয়াল কেমন খক খক কাশে তার গল্পও তুলে রাখা হয় ইমাদের জন্য। কিংবা পুবের জানালা খুলে সন্ধ্যায় আর পড়া হয় না, কেন না, সাতপুকুরের বিল পার তাল-খেজুরের বাগানে সন্ধ্যার পর জ্বিন-পরিদের মেলা বসে; মা এমন বলেন। তখন পুবের জানালা খুললে সন্ধ্যা উৎরালে আমিও দেখিÑদবির ফকিরের পুকুর পাড় থেকে একটা আলোর কুণ্ড দপ করে জ্বলে উঠে লতাইড়ি জবেরের বাপের মৃতপুকুর পাড়ের বেত ঝাড়ে গিয়ে বসে। সুতরাং ভাবনা হয়, ভয় হয়। এমন ভয়ের লোম শিউরানো গল্পটি শোনাবো ইমাদের, এমন পুলকের নিঃশ্বাসে নাকি সাতপুকুরের বিল তাড়ানো খেতি বাতাস ঢুকে পড়ে ঘরে, বোঝা যায় না, তবে কেরোসিনের টিমটিমে বাতি আর টিকে না। পড়া হয় না। অনেকক্ষণ ঘুমও হয় না। এমন ভয়-লাগা পথে শাপলা তবে কীভাবে আসে! একলা আসার পথে যদি কোনো দিন তুলে নিয়ে যায় জ্বিনে! জ্বিনেরা না-কি পরির মতন মেয়েদের তুলে নিয়ে যায়, আর পরিরা না-কি রাজপুত্রের মতো ছেলেদের, আর বিয়ে দেয় তাদের স্বগোত্রে। কিংবা যদি ইমাকেই তুলে নেয়, তবে কী উপায়ে উদ্ধার করা যায়, কী কী যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করা যায় জ্বিনদের বিরুদ্ধে; এই রোমাঞ্চে ঘুম পালায়। এক রাতে মনের সেলুলয়েডে যে কতো কতো আলিফ লায়লা কিংবা সিন্দাবাদের বা আরব্য রজনীর এপিসোড পার হয় হিসেব থাকে না। ফলে, তোমার কতো গল্প চাই ইমা! কতো!
কোথায় আছে মানুষের এমন একান্তের আড়াল! যদি কেউ দেখে ফেলে! কোথাও কি আছে? চিঠির ভাষ্য সামান্য ছিল। কিন্তু তখনো জানা যায় নি কী আছে চিঠিতে। তখন আরো এক বসন্ত চলে আসে। মাঠে মাঠে আখের খেত নাই, কাশবন নাই; নূর দাদার উলুবন ছিল। শুনেছি উলুবনে বড় বড় দাঁড়াস সাপের বাসা, যদিও কোনো দিন দেখি নি, কিন্তু খোলস তো পড়ে থাকতে দেখেছি; সুতরাং বিশ্বাস দৃঢ়; ফলে চিঠি পড়ার আড়াল কোথায়? চিঠি পড়তে গেলে তুতুল দেখে ফেলে, আজগর পিছু নেয়, সেহাম আব্বাকে বলে দেবে বলে হুমকি দেয়; ফলত, গোল করে ভাজ করে হাফ প্যান্টের সেলাইয়ের ভিতর লুকানো চিঠি আর পড়া হয় না। জানা হয় না ইমার মোহন কথা, দুর্লভ অক্ষর-বিন্যাস, আনাড়ি শব্দ সমাবেশ। তারপরে দাঁড়িআলার (দাঁড়িঅলা নামের বহুব্যবহারে উনার আসল নামটি প্রবীণতার সম্ভ্রমে ঢাকা পড়ে) পুকুরের পেছনে যেই ভাঙা কবর তার পাশের খেঁজুর ঝোপের আড়ালে সেই চিঠি পড়তে বসলে কবর থেকে যে শেয়ালটি বেরিয়ে দৌড়ে পালায়, মনে হয়েছিল কোনো প্রেতাত্মাই বোধহয়, কেনো না, প্রথম পলকে দেখা গিয়েছিল তার পা ছিল শূন্যে ভেসে আর ভয় জড়ানো দিশেহারা চোখের রঙান্ধদোষও বোধহয় দেখা দিয়েছিল সেই সময়; ফলে এরপর কিছুক্ষণ আর চোখে কোনো অক্ষর দেখি নি। অকাট রোমাঞ্চবিরহিত শেয়াল। অবশ্য এর আগে-পরে কখনো জানতে পারি নি শেয়ালদের আসলেই কোনো রোমাঞ্চরসবোধ আছে কী-না। যদিও পড়া গিয়েছিল সেই চিঠি, কিন্তু পাঠপর তার লুকানোর কোনো স্থান ইহজগতে সংকুলান হয় না।
দিশেহারা হবার কিংবা দশদিকে ছোটার দিন সেদিন কিংবা আরো অনেক দিন। কিংবা, সে-সকল দিনে মন নাচিছে ঘূর্ণিবায়। আমাদের স্বাধীনতার দিন, আমার স্বাধীনতার দিন ছাব্বিশে মার্চ। হিসাব মৌকুফের দিন। মাত্র পঞ্চাশ টাকা পকেটে থাকলে আর কিছু লাগে না। সারাদিন, সারাদিন! যেমন খুশি তেমন সাজো, বস্তাদৌড়, রিলেরেস, হাইজাম্প, বাদ্যের তালে তালে বালিশ খেলা বা চেয়ার নাচ, বিস্কিট দৌড় আর ইমার নীল ফ্রকে লাল পাজামার ঘেরে রূপালি নূপুর আর ঠোঁটে লাল আইসক্রিম। সারাদিন ঘোরাঘুরি, দৌড়াদৌড়ি আর দুপুরে না-খাওয়ার ক্লান্তি ভুলে যাই আইসক্রিমসিক্ত ইমার ঠোঁটের শীতল লালিমায়। কতোবার কতো ছুতোয় তার কাছে যাই, পাশে বসার বাহানা নানামাত্রিক, তাকে হাসানোর কলাবিদ্যা না-জানায় জোকার হয়ে থাকি; কেনো না, দুর্গাপুরের মাঠে আর হাপানিয়ার বিলের মসুর আর ছোলা খেতের সাদা পায়রার নাচানাচি আমি ভুলতে পারি না, নেশা লাগে; ইমার হাসিতে সেই পায়রার নাচ দেখা যায়। নীল ফ্রক, স্বর্ণলতার আভামাখা চুলের প্রতিবেশে সেই হাসি এক ঝাঁক সাদা পায়রার মতো উড়ে বেড়ায়। কিংবা ষোলই ডিসেম্বরে বিকেলে মুরগি বা হাসের ডিম দিয়ে বনভোজনের খেলা চলে সন্ধ্যা উৎরানোর কালব্যাপী। বড় বড় ঢেলা মাটির ত্রিকৌণিক অবস্থানের মাটির চুলায় আলু-ডিম একসাথে সিদ্ধ হয়। সকলের ঘর থেকে আনা প্রত্যেকের একপোয়া করে চাল জমিয়ে একপাতিলে ফুটতে ফুটতে সাতপুকুরের বিলে সন্ধ্যা ঘনায় আর বাতাসের হিম বাড়ে। তখন গা কিংবা মন ভারি হয়। বনভোজনের রান্না শেষের কালে খেতে আর উৎসাহ থাকে না। রান্নার প্রথম ভাত আগে ভুতেরে ছিটায়, নচেৎ আছর ঠেকানো যায় না—অন্যরা বলে। বিল পেরিয়ে বাতাস মৃতপুকুর আর খালের ধারের খেঁজুর নারকেল গাছে শনশন গীত জুড়লে ইমার কথা মনে পড়ে, বাতাসের সব হিম চোখে ভিড় করে; আমি কেঁদে ফেলি। অন্যরা ভয় পায়, আমার আচরণে বাতাস লাগার লক্ষণ স্পষ্ট হলে, সকলে সাবধানে আমাকে নিয়ে ঘরে ফেরে। মা শুনে বকে, খুব বকে, খুব। আমার শরীর খারাপ হয় না যদিও, মন খারাপ হয়। কিন্তু পর দিন হুজুর আসে, অনেক মন্ত্র পড়ে কাঁসার থালে ফুঁ দিয়ে আমার পিঠে লাগায়, বার বার; কিন্তু লাগে না, হুজুর রেগে গিয়ে বাতাসেরে দোষায়, বলে—বড় ত্যাঁদড় বাতাইস গো! মা কিংবা হুজুর এ-বাতাসের উৎস বোঝে না। তারপর অনেক অনেক হাসি-কাঁদি, নাচি-কুঁদি মা আর সকলের চোখ এড়িয়ে; এই বাতাস আরো অনেক অনেক দিন গা ছাড়ে না!


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা