একদিন রক্তের দিন

ঘরের সিঁড়িতে বসে রক্তের একটা ধারাকে গুড়ি মেরে এগিয়ে আসতে দেখে মতি। অস্পষ্ট আঁচড়ের মতো সরু ধারাটা আস্তে আস্তে আরো সৈন্য সামন্ত নিয়ে গাঢ় হয়ে এগিয়ে আসে। ঢোয়ার মাঝামঝি এসে পুরো সেনাদল খানিকটা থমকে দাঁড়ায়, যেন গন্তব্যের দিক ঠিক করতে পারছে না। এক সেকেন্ডের বিরতি, তারপর লাল নিশান দুলিয়ে তারা মতির উল্টো দিকেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময়টুকু মতি তাদের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে ছিল। ওর মনে হচ্ছিল, কোন রক্তচোষা গিরগিটির সামনে ও অনন্তকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। গিরগিটির সম্মোহনে ওর চোখের পলক পড়ছে না। রক্তখেকোটি আস্তে আস্তে ওর সমস্ত রক্ত শুষে নিচ্ছে। রক্তের এই থেমে থাকায় মতি ভেতরে ভেতরে ছটফট করে ওঠে। ছটফট করতে করতে ওর মনে হয়, রক্তের থমকে থাকা গিরগিটিটা শেষ পর্যন্ত ওর দিকেই হা করে আসবে, ওকে গিলে খাবে। কিন্তু ওকে তুমুল স্বস্তি দিয়ে, গড়িয়ে গড়িয়ে পুরো ফৌজটি একটা মুখের আকৃতি নিয়ে নরেন সাহার ছড়িয়ে দেয়া পায়ে মাথা নুইয়ে আত্মসমর্পণ করলো।
এতোক্ষণ ধরে ঝিম মেরে পড়ে থাকা নরেন সাহা, লাল তাজা রক্তের স্পর্শে কী খানিকটা কেঁপে উঠলো! মতি তার মুখের দিকে তাকায়। রক্তের মুখ ঘষাঘষিতে নরেন সাহার চেহারায় কোন বিকার নেই। পুজোর ক্লান্তির শেষে সবাই ঘুমিয়ে গেলে, টিকটিকির পায়ে পায়ে যেমন অন্ধকার মুখে বুকে ছড়িয়ে পড়ার পরও সরস্বতীর কোন বোধ হয় না, তেমনই নরেন সাহা একটা মূর্তি হয়ে ঘুণে ধরা বাঁশের খুটিতে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার কাঁচাপাকা চুল আলুথালু, গায়ের জামাটা এখানে সেখানে ছেঁড়া, মুখে ঠোঁটে কিল ঘুষির দাগ, চোখ জোড়া খোলা জানালার মতো হাট হয়ে খুলে আছে। সেখানে উঁকি দিয়ে মতি দেখে, বাঁশের ঝাড়ে দুলে ওঠা বাঁশফুল, তার পেছনে বাদুড়ের আধখাওয়া তাল নিয়ে বিষণœ পর্বতের মতো নিশ্চুপ তাল গাছ, তার উপরে বৃষ্টি জমানো গম্ভীর কালো মেঘ, মেঘের ফাঁকে ফাঁকে আকাশের ফালি ফালি নীল চোখ, সেই চোখের দৃষ্টি ছাড়িয়ে আরো দূরে কোথায় তাকিয়ে আছে নরেন সাহা! মতি ঠাওর করতে পারে না।
উঠোনের তুলসী গাছের গোড়ায় সাপের আড়ামোড়া ভাঙার সরসর শব্দ তুলে প্রস্রাব শেষে সেন্টু উঠে আসে। ডালিম গাছের চিকন একটা ডাল ভেঙে সে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলেজ্জকী জ্যাডা ওমন খাম্বা হইয়া গ্যালা ক্যান? যহন কইছিলাম অতো ফালাইও না, তহনতো শুনো নাই! বড় বাড় বাড়ছিল তুমার, থু দিয়ে নিজের মুখ বুক লেপ্টে একদলা থুতু মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে সে হাসে, অহন বুঝো! সেন্টুর কথায় নরেন সাহার কোন ভাবান্তর হয় না। ভেঙে টুকরো হয়ে পড়ে থাকা গণেশের শুঁড়ের মতোই সে নিষ্প্রাণ, আকাশমুখী। তার সাড়া না পেয়ে সেন্টু হাঁক ছাড়ে, ও জ্যাডা ঘুমাইলা না কি! এতো তাড়াতাড়ি ঘুমাইলে চলবো? খ্যাকখ্যাক করে হেসে সে নরেন সাহার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, কাম কলাম শেষ হয় নাই। মতি অহনো বাকি আছে। মতির দিকে তাকিয়ে সে অশ্লীল ভঙ্গিতে চোখ টেপে, ভাইডি তুমি সবার ছোট, তাই তুমার সিরিয়াল লাস্টে, কিছু মনে কইরো না কলাম। তার কথার মাঝখানে ঘরের ভেজানো দরজা ক্যাচক্যাচ করে খুলে রহমান বেরিয়ে আসে। লুঙ্গির গিঁটটা টাইট করতে করতে সে সাবধানে রক্তের পাশ কাটিয়ে মতির কাছে এসে পিঠে চাপড় দেয়, ভাইডি এইবার তুমি। তাড়াতাড়ি করবা কলাম, সূর্যের দিকে একঝলক উঁকি মেরে সে বলে, আছরের সুময় হয়া গ্যাছে মনে হয়।
মতি অলসভাবে উঠে দাঁড়ায়। যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে সে এখানে এসেছিল, রক্তের সা¤্রাজ্য দেখার পর তার ছিঁটেফোটাও আর সে নিজের ভেতর টের পায় না। লুঙ্গির নিচে বাপমায়ের শক্ত ভিটে হয়ে থাকা যায়গাটা, ওর কাছে নদীর ভাঙ্গনে তলিয়ে যাওয়া কাদাপানির মতো মনে হয়। অথচ সাহা বাড়ির দুধসাদা পরীগুলোর জামা কাপড়ের নিচে কেমন গুপ্তধন লুকানো আছে, বিড়ির ধোঁয়ায় উড়িয়ে এই চিন্তা কতোবার ওকে গভীর রাতে ডেকে তুলে ঘন নিঃশ্বাসের সাথে স্বপ্ন বিনিময়ের কারুকাজ শিখিয়ে গেছে! এমন কী নরেন সাহার স্কুল পড়–য়া মেয়েটাকে না পেয়ে সেন্টুর বড় ভাই মিন্টু যখন আজ সাহার বৌটাকেই টেনে হিঁচড়ে উন্মুক্ত করছিলো, দরজার ফাঁক দিয়ে তার উদোম শরীরের ফর্সা ঝলক ওকে শহরে গিয়ে এক টিকিটে দুই ছবি দেখার শিহরণে টালমাটাল করে তুলেছিল। খানিক আগেও মহিলার ‘তোর পায়ে পড়ি সেন্টু বাপ আমার’ চিৎকারকে তার স্কুল পড়–য়া মেয়ের ‘ছেড়ে দে শয়তান, দেহ পাবি মন পাবি না’ ডায়লগ কল্পনা করে নিষিদ্ধ উত্তেজনায় ওর পায়ের রক্ত মাথায় উঠে দাপাদাপি করছিল। কিন্তু মিন্টু সেন্টু আর রহমানের বিরামহীন আসা যাওয়ায় সেই চিৎকারটুকু ক্ষীণ হতে হতে রক্ত হয়ে পাঁচ আঙুলে নরেন সাহারা সাদা ধুতি আঁকড়ে ধরার পর, ওর কেমন ছুটে পালাবার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু পা দুটো যেন জগদ্দল পাথরের মতো ভারি, নড়ে না।
কীরে ভাইডি খাড়ায় রইলা ক্যা? শত চেষ্টার পরও পায়ে লেপ্টে যাওয়া রক্ত মাটিতে ঘষে উঠাতে উঠাতে রহমান বলে, মালাউন শালিডারে ভইরা দিয়া আয়। সাহা ব্যাটা দেহুক ইন্ডিয়ার দালালগেরে ভুট দিলি কী হয়!
ইন্ডিয়ার দালাল কথাটি শুনতেই মতির চোখের সামনে কালা আজাহারের মুখ ভেসে ওঠে। ভোটে জেতার পর সে আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা গত পাঁচ বছর ধরে এলাকার মানুষকে কম জ্বালিয়েছে! ‘আজহার ভাইকে দিলে ভোট, শান্তি পাবে দেশের লোক’জ্জকীসের শান্তি! তার দাপটে মতিন মাওলানার সাপোর্টাররা কেউ শান্তিতে ঘরে থাকতে পেরেছে? মাওলানার মতো পরহেজগার মানুষকে ভোটে হারিয়ে আজহারেরা ক্ষমতায় আসে কেমনে? এই মালাউনরাই ভোট দেয়। মুখে কতো ইতং বিতং আর ভোটের বেলায় ইন্ডিয়ার দালালগোর মার্কাতেই তাদের সিল দেয়া চাই। মতি মনে মনে রেগে ওঠে, শালারা ভাবছে কী এইটা মগের মুল্লুক, এইটা ইন্ডিয়া? এইটা বাংলাদেশ, মুসলমানের দেশ। মেয়ে দুইটারেতো আগেভাগেই বর্ডার পার করছস, কিন্তু তোরে বাঁচাইবো কেডা? মালাউনের মারে বাপ, বিড়বিড় করে গাল দিয়ে সে এক লাফে ঘরে ঢোকে। মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে এলো চুলে রক্তমাংসের একটা প্রতিমা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। নরেন জেঠির বড় বড় চোখ দুটো খোলা। কাজল টানা চোখে সে সরাসরি মতির দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সে মতির অপেক্ষাতেই ছিল, যেন সে এখুনি বলে উঠবে, কীরে মতি নাড়– খাবি? মতির কেমন অস্বস্তি লাগে। অস্বস্তি কাটাতে ও অন্যদিকে চোখ ফেরায়। দেখে, মাটি কামড়ে এগিয়ে যাচ্ছে রক্তের ¯্রােত। তাই দেখে মতির আবারও মাথা ঝিম ঝিম করে। ওর গর্জে ওঠা মুসলমান জজবা নিমেষেই চৈত্র মাসের পুকুর হয়ে যায়। আবারও এক ছুটে পালিয়ে যেতে ওর ভীষণ ইচ্ছা হয়। নিজের অজান্তেই ও ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু ওর হাতটা কি জেঠি আঁকড়ে ধরেছে! শাখা, সোনার বালা আর কাচের চুড়ির সম্মিলিত ডাকে ও ফিরে তাকায়।
মতি না? জেঠি বলে ।
হ, জেডি।
এতো দেরি করলি যে বাপ, আইজ না তোর জন্মদিন?
আইজ?
হ, আমি সেই কহন থেইকা তোর জন্য অপেক্ষা করতেছি! তোরে একটু দেখমু। কাছে আয়, জেঠি ওর হাত ধরে টান দিলে মতি ঝুঁকে সামনে আসে।
তোর চেহারা এমন লাগতিছে ক্যারে মতি?
কেমুন লাগতেছে, মতি অস্বস্তিতে বলে।
মনে হতিছে রক্ত নাই। সাদা কাগজ হইয়া গেছস! রক্ত নিবি? এই নে, জেঠি এক হাতে খানিকটা রক্ত উঠিয়ে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে।
গায়ে রক্ত লেগে যাবার ভয়ে মতি পিছিয়ে আসে, করো কী জেডি!
জেঠি হাসে, ভয় পাইলি?
মতি ঢোক গেলে,নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে ও ফ্যাসফ্যাসে স্বরে বলে, না।
ভয় কীসের বাপ। আমিতো তোর মা। মায়ের কাছে আইছস, আর ভয় নাই।
মা! আমার মা নাই, তুমি জানো না জেডি?
কেডা কইছে তোর মা নাই। ভালো কইরা দেখ। আমারে চিনবার পারতসছ না?
মতি মাথা নাড়ে, তুমিতো নরেন জেডি!
ধুর বোকা। নরেন জেডি তো মইরা গেছে। আমি তোর মা। মহিলা ওর হাত ধরে টেনে কাছে নিয়ে আসে, দেখ বাপ, চিনোস না?
মতি ভয়ে ভয়ে মহিলার তাকায়। খানিকটা নিচু হয়ে ও চেহারাটা খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করে, খানিকটা চেনা চেনা লাগে। আসলেই মা না কি!
হরে বাপ, ওর মনের প্রশ্নের উত্তরে মহিলা মাথা দোলায়।
তুমি কখন আইলা মা? মতির কেমন ঘোর ঘোর লাগে।
অনেকক্ষণ বাপ। তুই এতো দেরি করলি ক্যান?
আমিতো আগে আসপার চাইছিলাম। মিন্টু সেন্টুরা দেরি করাইয়া দিল…কিন্তু তুমার চাইরপাশে এতো রক্ত ক্যান?
কইলাম না আইজ তোর জন্মদিন। বাড়িতে কেউ নাই। তোর বাপ হাটে। ঘরে আমি একা পইড়া আছি। তুই আসায় পরানডা জুড়াইলো বাপ।
এইভাবে থাকলে তুমিতো মইরা যাবা!
মরার কি আর বাকি আছেরে বাপ! মরার আগে তোরে ধরলাম, দেখলাম, অহন শান্তি, মহিলা চোখ বোঁজে।
মা, ও মা! মতি মহিলাকে ঝাঁকি দেয়।
ঘরের বাইরে থেকে সেন্টুর হাসি শোনা যায়, কীরে মতি সারা শব্দ নাই ক্যা! মজায় জবান বন্দ হয়া গেছে না কি! দুনিয়াছে মজা লে লো, দুনিয়াছে…সে জোরে জোরে শিস্ দিয়ে গান গায়।
গানটা মতির অসহ্য লাগে। দৌড়ে গিয়ে ওর সেন্টুর গলা চেপে ধরতে ইচ্ছা হয়। কোনরকমে ইচ্ছাটাকে চেপে মহিলাকে ও জড়িয়ে ধরে ওঠানোর চেষ্টা করে, আমি তোমারে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যামু মা।
মহিলা চোখ খোলে। মতি, বাপ আমার, থাম।
না, আমি তোমারে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যামু, মতি তাকে টেনে হেঁচড়ে ওঠাতে চায়।
মতি থাম, ব্যথা পাই।
মতি থামে না।
থাম কইলাম মতি, মহিলার কণ্ঠ হঠাৎ তীক্ষè হয়ে ওঠে।
মতি সভয়ে তাকে ছেড়ে দেয়।
বাপরে, এমন করিস না। আমার খুব কষ্ট হইতেছে।
মতি তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। এতোদিন পর মাকে পেয়ে ওর দুই চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়ায়। মায়ের মাথাটা কোলের ওপর নিয়ে অভিমান জড়ানো গলায় ও ডুকরে ওঠে, মা! জানো আমারে কেউ দেখপার পারে না। তুমি নাই, সবাই আমারে দূর দূর করে। আব্বায় কয়, তুই আমার রক্তের কেউ না। সৎ মায় কইছে, কুত্তারে ভাত দিমু তয় তোরে না। ওমা, মা, তুমি ছাড়া আমার কেউ নাই মা, বলতে বলতে মতি কান্নায় গুঙিয়ে ওঠে।
কান্দিস না বাপ কান্দিস না, মহিলা ওর দু হাত ধরে। তুই কানলে আমি কই যামু! থাম বাপ থাম, মহিলা ওর হাতে চাপড় দেয়, যেন এক মৃত্যুপথযাত্রী মা মৃদু ছোঁয়ায় তার সদ্যোজাত শিশুর কান্না থামাতে চায়।
হাতের মমতার স্পর্শে মতি কেঁপে ওঠে। কান্না থামিয়ে সে বলে, তুমি আমারে থুইয়া আর যাবানাতো মা?
যামু না বাপ, যামু না। মহিলা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
সত্যি! মতির চোখমুখ উজ্জ¦ল হয়ে ওঠে।
হ সত্যিরে সোনা। তয় আমার একটা কাম করবি বাপ?
কী করমু মা?
এইখানে একটু চাপ দিবি, মহিলা ওর দুই হাত নিয়ে নিজের গলায় রাখে, খুব কষ্ট লাগতাছে।
এইখানে চাপ দিলে কষ্ট কমবো?
হ, কষ্ট একবারে যাইবো গা।
সত্যি! মার কষ্ট লাঘব হবে ভেবে মতির মন খুশি হয়ে ওঠে। সে আস্তে করে চাপ দেয়।
জোরে বাপ জোরে, মহিলা ওর হাত শক্ত করে টেনে ধরে।
মতি জোর বাড়ায়..
আরো জোরে বাপ, আরো জোরে…
মতির হাতে অসুর ভর করে
আহ!
আরাম পাইতাছো মা?
হু, মহিলার গলা দিয়ে অস্ফুট শব্দ বের হয়।
ও মতি, হইলো? সেন্টু হাঁক ছাড়ে।
থইথই রক্তের উপর ছেদরিয়ে বসে মতি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, আরাম হইতেছে মা? ও মা আরাম হইছে?

জানুয়ারি-মে, ২০১৪
সিডনি ॥ অস্ট্রেলিয়া


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা