এ জার্নি বাই হর্স এন্ড ফিস

লেখক : সাব্বির জাদিদ

আমি আর সুবন্ত। দুই বন্ধু। আমাদের হঠাৎ একদিন ইচ্ছা করবে— কোনো একটা গ্রাম উড়তে উড়তে দেখার। গ্রাম অনেক দেখেছি আমরা। সে দেখা হাঁটতে-হাঁটতে চলতে-চলতে দেখা। বসবাস করতে করতে দেখা। কিন্তু আকাশ দিয়ে উড়তে উড়তে দেখা— এই অভিজ্ঞতা আমাদের নাই। অভিজ্ঞতা নাই বলেই ইচ্ছাটা আমাদের বুকের ভেতর বটের মতো শেকড় ছাড়বে। কিন্তু আমরা কীভাবে উড়বো? আমাদের তো পাখা নাই। আমাদের ইচ্ছার শক্তিতেই হয়তো একদিন ওড়ার বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। আমি এক ঘোড়া আর সুবন্ত এক মাছ পেয়ে যাবো (মাছ আর ঘোড়া বন্দোবস্ত হওয়ার গল্প অন্য কোথাও করা হবে), যারা কিনা আমাদেরকে পিঠে চড়িয়ে কোনো একটা গ্রামের উপর দিয়ে উড়ে যাবে। এই সুযোগে আমরা উড়তে উড়তে গ্রাম দেখে ফেলব। কঠিন একটা কাজের এতো সহজ সমাধান পেয়ে আমরা খুশিতে গদগদ হয়ে উঠবো।

দেখার জন্য বৈদ্যনাথতলাকেই আমরা নির্বাচন করবো। কারণ, হাতের কাছে সবচে সুন্দর আর বিচিত্রপূর্ণ গ্রাম এই বৈদ্যনাথতলা। আমরা ঢুকবো বৈদ্যনাথতলার দক্ষিণ আকাশ দিয়ে এবং বেরোবো উত্তর আকাশ দিয়ে। ঘোড়া এবং মাছের সাথে আমাদের এমনটাই চুক্তি হবে। যেহেতু আমি একটু মোটা, তাই আমি উঠবো ঘোড়ার পিঠে আর সুবন্ত মাছের। সুবন্ত চিকনা। প্রথমেই আমরা দেখতে পাবো কাজীদের আমবাগান। মানে আমবাগান দিয়েই গ্রামের শুরু। মাত্রই ভোরের রোদ উঠবে বলে আমগাছের পাতায় পাতায় সোনার ঝিলিক। বাগানে কয়েকটা ছেলেমেয়ে কানামাছি খেলবে। যে ছেলেটার চোখবাঁধা, অন্ধের মতো যে ছেলেটা দু-হাত সামনে বাড়িয়ে কিছু একটা স্পর্শ করার চেষ্টা করবে— সে বরুণ, হিন্দুপাড়ার। বরুনের একদম সামনে দাঁড়িয়ে দু-হাতে বাঘের থাবা তৈরি করে চোখবাঁধা বরুণকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করবে যে ছেলে, সে রুহান, মুসলমানপাড়ার। রুহানের পেছনে আরো দশ-বারোটা ছেলেমেয়ে— হিন্দুপাড়ার। মুসলমানপাড়ার। রুহানের মতো তারাও একই ভঙ্গিতে বরুণকে ঘিরে উল্লাস করবে আর বলবে, কানামাছি ভোঁ ভোঁ যারে পাবি তারে ছোঁ। আমগাছে কয়েকটা পাখি ডাকবে। পোকা খাবে। শালিক আর দোয়েল। বাচ্চাদের চিৎকার আর পাখিদের চিৎকার মিলেমিশে তৃতীয় ধরনের আওয়াজ উঠবে। আমরা বুঝতে পারবো— ছেলেদের এই আনন্দ-আয়োজন নিত্যদিনের। এর ভেতর হঠাৎ শামিম ছেলেটার কান্নার আওয়াজ পেয়ে আমরা চমকে উঠবো। এই আনন্দধামে বড়ো বেসুরো, বড়ো বেমানান তার কান্না। কানামাছি খেলতে খেলতে শামিম কেনো কাঁদবে? কাঁদবে, কারণ, সুবাস পেছন থেকে টান মেরে তার লুঙ্গি খুলে দিবে। শামিম নতুন মুসলমান। মানে কয়দিন আগে সে নুনুর আগার চামড়া কাটবে। এর আগে সে হাফপ্যান্ট পরে বেড়াবে। ন্যাঙটাও থাকবে। মুসলমান হয়ে পরনে লুঙ্গি উঠবে। লাল-সবুজ ফুল-পাতার ছাপ দেয়া লুঙ্গি। লুঙ্গি খুলে দেবার ঘটনা আগেও কয়েকদিন ঘটবে। শামিম কাঁদবে না। আজ কাঁদবে, কারণ, দলের ভেতর তিনটে মেয়ে থাকবে। আয়েশা, সোহেলি আর মালতি। মেয়েদের সামনে নুনু বেরিয়ে যাওয়ায় সে লজ্জা পাবে। লজ্জায় কান্না এসে যাবে। বিশ্বজিৎ, বন্ধুরা যাকে বিশ্ব নামে ডাকে, সে ধমক মারবে সুবাসকে— আর কুনুদিন যদি এই কাম করিস, সবাই মিলে তোর প্যান খুলে নেবো। ধমক মেরে সে শামিমের দিকে ফিরবে— কান্দিসনে। এই নে লুঙ্গি। তাড়াতাড়ি পরে ফ্যাল। শামিম চোখ মুছতে মুছতে পায়ের চারপাশে বৃত্ত বানিয়ে মাটিতে শুয়ে থাকা লুঙ্গিটা টেনে তুলবে কোমরে। গিঁট দিবে। দশজনের হল্লার ভেতর একজনের কান্না সুতো ছিঁড়ে দেবে খেলার। বরুণ বাঁধন থেকে চোখ মুক্ত করে বিরক্ত হয়ে বলবে, খেলার মুদি মারামারি করে কিডা!

আয়েশা আর মালতি হৈ হৈ করে উঠবে— এই, এই, চোক খুলবিনে, চোক খুলবিনে! কানামাছি ভোঁ ভোঁ যারে….

আয়েশা আর মালতির প্রলোভনে কাজ হবে না। বরুণ বলবে, আর খ্যালব না। ইস্কুলি যাবো। চোখের গামছা সে হাতে প্যাঁচাবে। খেলা ভেঙে যাবে। শামিম গোঁ গোঁ করে বাড়ির দিকে হাঁটা দেবে। তার পদক্ষেপে থাকবে সুবাসের বিরুদ্ধে মায়ের কাছে নালিশ দেয়ার প্রতিজ্ঞা। শামিমের ব্যাপারে আমাদের কৌতূহল হবে। আমরা তার পিছু পিছু যাবো। ভুল হলো, পিছু পিছু নয়, আমরা তাকে অনুসরণ করে মাথার ওপর ওপর দিয়ে যাবো। বাড়ি গিয়ে সে কী করে জানার ইচ্ছা আমাদের।

ছেলের লাল চোখ আর চোখে শুকিয়ে যাওয়া চটচটে জল দেখে মা উৎকণ্ঠিত হবে আর এই ফাঁকে আমরা বুঝে যাবো শামিম আদর-আহ্লাদে বড়ো হওয়া ছেলে। মা তার দুই গালে দুই হাত চেপে ধরে মুখটা ওপরের দিকে তুলে উৎকণ্ঠিত হয়ে বলবে— খুকা, কানছিস ক্যা? কেউ মারছে তোরে!

খুকা, মানে শামিম, কয়েক সেকেন্ড কিছু একটা ভাববে, তারপর বলবে, কেউ মারিনি মা। খেলা কত্তি কত্তি পড়ে গিছলাম।
—পড়ে গিছলি তে তোর গায় ধুলো কো?
—ধুলো ঝাড়ে ফেলিছি মা।
—কার সাতে খেলছিলি?
—রুহান, ফয়সাল, আয়শার সাতে। শামিম সযতেœ হিন্দু নামগুলো এড়িয়ে যাবে।
মা বলবে, হিন্দুপাড়ার ছাওয়াল পাওয়ালের সাতে খেলিস নি তো! ওগোর সাতে খেলবা না। তুমার তো মুসলমান বন্ধু আছে। তাগোর সাতে খেলবা। এখুন যাও, হাতমুক ধুয়ে খাতি বসো। ইস্কুলির টাইম হয়ে যাচ্ছে। শামিম হাত-মুখ ধুতে কলতলায় যাবে আর মা যাবে রান্নাঘরে ছেলের খাবার বাড়তে। এই ফাঁকে বিশ্বজিতের পোষা ছাগল শামিমদের শানের বারান্দায় উঠে ভ্যাঁ করে ডেকে উঠবে। হিন্দুবাড়ির ছাগল বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতে দেখে শামিমের মার মাথা আওলাঝাওলা হয়ে যাবে। রাগের জ্বালায় সে খুন্তি ছুঁড়ে মারবে ছাগলের পায় আর গজগজ করবে— কতো বড়ো আস্পদ্দা, আল্লার রাইত পুয়াতি পারে না আর ছাগল ছাড়ে দেয় মুসলমানবাড়ি! আমার ধুয়ামুছা বারান্দাডাই নাপাক করে দিলো!

আঘাত খেয়ে ল্যাঙড়াতে ল্যাঙড়াতে বেরিয়ে যাওয়া ছাগলের দিকে শামিম কতেঠক্ষণ তাকিয়ে থাকবে। তারপর খেতে বসবে। খেয়েদেয়ে শামিম স্কুলের পথে নামবে। বিশ্বজিতের বাড়ির সামনে গিয়ে সে বিশ্ব বিশ্ব বলে ডাক ধরবে। বিশ্বজিত তখন ভাত খাবে। তার মা বসে থাকবে পাশে। শামিমের ডাক তার কানে পৌঁছাবে। সে ভয়ে ভয়ে মাকে বলবে, শামিমরে ভিতরে আসতি বলি, মা?

মা চোখ গরম করে বলবে, একসাতে ইস্কুলি যাস এই অনেক। মুলমানের ছাওয়ালেক ঘরে তুলার দরকার নাই। সকাল করে ঘর ধুতি পারবো না।

বিশ্ব জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে বলবে, বাইরি দুই মিনিট দাঁড়া, শামিম। খায়ে নি।

শামিম বিশ্বর অপেক্ষায় থাকবে। আমরা থাকবো না। আমরা ওদের আগেই স্কুলের দিকে যাবো। পথে আরেক কাণ্ড ঘটবে। সুবাসদের টমেটো বাগানে ফয়সালদের গাইগোরু ঢুকে গাছ নষ্ট করবে। সুবাসের আব্বা তেড়ে আসবে লাঠি হাতে। লাঠির ঘাই গোরুর পাছায় বসানোর ঠিক এক মুহূর্ত আগে তার খেয়াল হবে, শয়তানের কুমন্ত্রণায় বিরাট পাপের কাজ সে করে ফেলতে যাচ্ছিলো। গোরু তাদের মা, মা যতো অন্যায়ই করুক, তাকে তো শাস্তি দেয়া যায় না। পরক্ষণে তার খেয়াল হবে, এই গোরু তো মুসলমানবাড়ির, মুসলমানের গোরু তাদের মা কি না, শাস্ত্র কী বলে, তার জানা নাই। সে দ্বিধায় পড়ে যাবে। কতোক্ষণ ইতস্তত পায়চারি করে সে গোরুটাকে বের করে দেবে বাগান থেকে।

স্কুলে পৌঁছে আমরা দেখবো ছাত্রছাত্রীরা স্কুলমাঠে লাইন ধরে দাঁড়ানো থাকবে। ছেলেদের লাইন ভিন্ন। মেয়েদের লাইন ভিন্ন। তারা পিটি করবে। আয়েশা সবার সামনে দাঁড়িয়ে বুকে হাতবেঁধে সুরা ফাতিহা পড়বে। পীনপতন নীরবতা ছেয়ে থাকবে মাঠজুড়ে। ফাতিহা পাঠ শেষ হলে আলম তার সামনে দাঁড়ানো প্রতাপের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলবে, ফাতেহা তো আমারে জন্নি পড়া হয়, তোদের কুনু সুরা নাই? সিডা পড়া হয় না ক্যান!

প্রতাপ পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে একই রকম ফিসফিসিয়ে বলবে, আমি জানিনে। স্যাররা ভালো কতি পারবে।

সুরা ফাতিহার পর জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে। তিনজন ছেলে তিনজন মেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে শুরু করবে। অন্যরা গলা মেলাবে। আমাদের বড়ো ভালো লাগবে। আমাদের বাহন ঘোড়া আর মাছের কাছে আমরা আবেদন করবো— এখানে আরেকটু থেকে যাই। জাতীয় সঙ্গীত শুনে যাই।

আমাদের আবেদনে মাছ আর ঘোড়া বোধহয় একটু বিরক্ত হবে। তাদের গলার স্বরে বিরক্তির দাগ লেগে থাকবে। তারা একসাথে বলবে, কিন্তু এমন তো কথা ছিলো না।

আমরা সমস্বরে বলবো, প্লিজ। না করবেন না। তারা আমাদের আবেদন মঞ্জুর করবে। আমি আহ্লাদে ঘোড়ার গলায় হাত বুলিয়ে দেবো। ঘোড়া গলা ঝাড়া মেরে বলবে, হাত দেবেন না, প্লিজ। কাতুকুতু লাগে।

আমি তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিয়ে জাতীয় সঙ্গীতে মগ্ন হবো। অতিদ্রুত আমাদের ঘোড়া এবং মাছও মগ্ন হবে। সঙ্গীত শেষ হলে ঘোড়া বলবে, এই গান কে লিখেছে?

আমি বলবো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চেনেন? ঘোড়া মাথা নাড়বে। সে চেনে না। মাছ বলবে, আমি চিনি। তার নাম শুনেছি অনেক। এবার ঘোড়া আর মাছ ঝগড়ায় লিপ্ত হবে। ঘোড়া বলবে, চাপা মেরো না। তুমি জলের প্রাণি। তার নাম তুমি কীভাবে শুনবে!

মাছ জেদি গলায় বলবে, যার জগত সম্পর্কে কৌতূহল আছে, সে জলে কেনো, পাতালে থেকেও সবকিছু  জানতে পারে। আর যার…

সুবন্ত মাছের কথা শেষ করতে দেবে না। সে মাছের গলায় হাত দিয়ে বলবে, তর্ক বাদ দেন ভাই। এখনো অনেক ঘোরা বাকি। এবার চলুন। সূর্য মাথার ওপর।

মাছও ঘোড়ার মতোই মাথা ঝাড়া মেরে বলবে, গলায় হাত দেবেন না। আমারও কাতুকুতুর প্রবলেম। সুবন্ত দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অল্প হাসবে। হাসির জবাবে আমিও হাসবো। তারপর আমরা চলতে থাকবো। থুক্কু, চলতে নয়, উড়তে থাকবো। স্কুল পার হয়েই মাঠ। কৃষকরা কাজ করবে। তপনের বাবাকে আমরা চিনতে পারবো। সে ঝালের ভূঁই নিড়াবে আর ফাঁকে ফাঁকে পথের দিকে তাকাবে। কারণ, তার তেষ্টা পাবে। তপনের অপেক্ষায় সে পথের দিকে তাকাবে। স্কুলে যাওয়ার আগে মাঠে বাবার কাছে পানি দিয়ে যাওয়ার কথা তপনের। তপন কথা রাখবে না। সে পানি না দিয়েই স্কুলে চলে যাবে।

নারায়ণ তপনের বাবাকে পরামর্শ দেবে, পানির তিষ্টা নিয়ে থাকতি নি। সোলেমানের কাছে ঠিলে ভরা পানি আছে। চালিই তুমারে দিবিনি। যাও খায়ে আসো। ওই দ্যাখো সোলেমান, কলার ভূঁই কুপায়।

তপনের বাবা বলবে, তপনের মা বারণ করেছে মুসলামানের ঠিলের পানি খাতি। তাই খাওয়া যাবি না।

আরো কিছুদূর এগিয়ে আমরা দিয়ানতকে দেখতে পাবো। সে দুই পায়ে লিঙ্গ চেপে ধরে হাঁটার চেষ্টা করবে। তার পেশাব লাগবে। কিন্তু পানি নাই, কাপড় নাপাক হয়ে যাবে বলে সে পেশাব করবে না। জিয়ারত তাকে পরামর্শ দেবে, কমলের কাছ থেকে পানি নিয়ে পেশাব করতে। কিন্তু দিয়ানতও তপনের বাপের মতো একই কথা বলবে। হিন্দুর ঠিলের পানি ব্যবহার করতে তার বউ বারণ করেছে। তখন সে পানির বদলে ঢিল দিয়ে কুলুপ করবে।

মাঠ পার হয়ে আমরা নদীর কাছে এসে পড়বো। এই নদী দিয়েই বৈদ্যনাথতলা শেষ। নদীর ওপাশে সুরুজপুর। নদীতে আমরা এক আজব জিনিস দেখতে পাবো। বৈদ্যনাথতলার হিন্দু এবং মুসলমান, যাদের সকালবেলা দেখে এসেছি প্রবল বর্ণবাদী, তারা সবাই এক নদীতে এক ঘাটে গোসল করবে। নদীর যে জল বিশ্বর মায়ের গা ধুয়ে দেবে, সেই জল মুখে নিয়ে কুলি করবে শামিমের মা। শামিমের মায়ের মুখে দেয়া জল আজলায় তুলে চোখে ঝাপটা দিবে সুবাসের বাবার স্ত্রী। সুবাসের বাবার স্ত্রীর মুখে ঝাপটা দেয়া জল দিয়ে মনের সুখে বুক ঘষবে দিয়ানতের বউ। ব্যাপারটা যে বেশ উপভোগ্য এবং হাস্যকর সুবন্তর ঠোঁটটেপা হাসি আরো পষ্ট করে দেবে। নদীর জল দেখেই কিনা কে জানে আমাদের বাহন ঘোড়া আর মাছের তেষ্টা পেয়ে যাবে। তারা একসাথে বলবে, আমরা পানি খাবো। আমরা এই নদীর তীরে অবতরণ করবো।

আমি বলবো, আপনারা এই নোংরা পানি খেতে পারেন না। আপনাদের পেটে অসুখ করবে। তারচে আমাদের বাড়ি চলুন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করে দেবো।

তারা বলবে, না, এক্ষুণি পানি না খেলে এই মুহূর্তে আমরা মাটিতে ঝরে পড়বো। আমাদের উড়বার সাধ্য থাকবে না। আর পেট খারাপের কথা বললেন, ওটা মানবপ্রজাতির নিজস্ব রোগ। আমাদের ওসব স্পর্শ করে না।

অগত্যা আমরা অবতরণ করবো সেই নদীর কূলে। আমাদের দেখে গোসলরত হিন্দু-মুসলমান রমণীরা গায়ে ভেজা শাড়ি পেঁচাতে পেঁচাতে ছুটে আসবে কূলে। তাদের চোখে বিস্ময় নয়, বরং বহুদিনের অপেক্ষা ভেঙে কামনার ধন পাওয়া তৃপ্তির সতেজতা। হিন্দু রমণীরা সুবন্তকে ঘিরে গড় হয়ে প্রণাম করবে। আর মুসলিম রমণীরা আমাকে ঘিরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকবে মাথায় ঘোমটা টেনে। আমরা এসবের মাজেজা বুঝতে ব্যর্থ হবো, যতোক্ষণ না তারা কোনো কথা বলবে। হিন্দু রমণীরা প্রণাম থেকে মাথা তুলে বলবে, হে মৎস্যাবতার, বহুকাল পরে আবার আপনে আসেছেন দুনিয়ায়, আমাগোর গিরামে। আমাদের পাপমোচন করেন। আপনের সুনজর না থাকলি আমরা নরকবাসী হবো।

মুসলিম রমণীরা ঝোঁকা মাথা সোজা করে আমাকে বলবে, আমরা জানি, আপনে আরবের দরবেশ। সেই দূর দ্যাশ থেকে ঘোড়ায় চড়ে আমাদের গাঁয়ে আসছেন বরকত দিতি। দয়া করে আজকের দিনডা আমাগেরে মাঝে থাকেন। আমরা ম্যালা সমস্যার ভিতরে আছি। আমাদের অনেকের ছাওলপাল হয় না, অনেকের স্বামী সোহাগ করে না, অনেকের বিপদ যায় না বারো মাস। আপনে যখন আসেছেন, উদ্ধার করেন। আমি একটু ভেবে বলবো, সমস্যা সমাধান করা হবে। আমরা এখন ক্লান্ত। আমাদের ঘোড়া এবং মৎস্য তৃষ্ণার্ত। আগে এদের পানি খেতে দিন।

আমার কথা শেষ হওয়া মাত্র তারা সকলেই ছুটে যাবে নদীর দিকে, পানি আনতে। তাদের কাছে কোনো পাত্র থাকবে না। কীভাবে তারা পানি আনবে, সেই ভাবনা কেউ ভাববে না। তাদের মাথায় একই ভাবনা— পানি আনতে হবে, দরবেশ এবং অবতারকে তৃপ্ত করতে হবে।

আমরা আমাদের বাহনকে বলবো, জলদি এখান থেকে কেটে পড়–ন। মুসলিম মহিলারা আমাকে ভেবেছে আরবের দরবেশ আর হিন্দু মহিলারা মাছকে ভেবেছে মৎস্য অবতার। এখানে থাকলে আমাদের বিপদ হতে পারে।

মাছের গলায় এবার আনন্দ ফুটে উঠবে। সে বলবে, কোনোদিন কারোর কাছ থেকে এতোটুকু ভালো ব্যবহার পাইনি। আজ অবতার হওয়ার সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ আমি হাতছাড়া করবো না। মৎস্য অবতারের অভিনয় করে মানুষের ভক্তি লাভ করবো।

আমি মনে মনে বলবো, বিশিষ্ট হওয়ার লালসা শুধু মানুষের নয়, তোমাদের ভেতরেও আছে দেখছি।

ঘোড়া বোধহয় আমার মনের কথা পড়ে ফেলবে। সে আমাকে বলবে, তোমার সামনেও তো বিশিষ্ট হওয়ার সুযোগ এসেছে। তুমি দরবেশ চরিত্রে অভিনয় শুরু করে দাও। নারীদের ভক্তি লাভ বড়ো দুর্লভ জিনিস।

ঘোড়ার পরামর্শ আমি মাথার ভেতর নাড়তে থাকবো। সুবন্ত বলবে, সেটা হবে  খুবই বিপদজনক। কারণ, এরা আমাদেরকে লোকালয়ে নিয়ে যাবে। সেখানে নিশ্চয় শিক্ষিত মানুষ থাকবে। তারা বুঝে ফেলবে, মাছ কোনো অবতার নয় এবং সাব্বির কোনো দরবেশ নয়। তখন প্রতারণার দায়ে আমাদেরকে শাস্তি পেতে হবে।

সুবন্তর কথায় আমরা সবাই ভয় পেয়ে যাবো। মাছ ঢোক গিলে বলবে, না না, এসবের দরকার নেই তাহলে। আমরা এক্ষুণি পালাই। অন্য কোথাও পানি খেয়ে নেয়া যাবে। ঘোড়াও সায় দেবে। তারা তৃষ্ণা বুকে নিয়েই আবার উড়াল দেবে। উড়তে দেখে বৈদ্যনাথতলার রমণীরা নদীর কূল থেকে আমাদের দিকে ছুটে আসবে। বহুদিনের কাক্সিক্ষত ধন পেয়ে হারাবার অস্থিরতা লেপ্টে থাকবে তাদের ভেজা চেহারায়। তারা ঝাঁকবেঁধে আমাদের পিছু নেবে। যেভাবে কোনো এক দেশের চাঁদের ভেতর কোনো এক আল্লামার ছবি ভেসে উঠলে মানুষেরা ঝাঁকবেঁধে রাস্তায় নেমেছিলো, সেভাবে। আমরা ওপরে উঠতে থাকবো আর রমণীরা ছোট হতে থাকবে। কিন্তু তাদের দৌড় থামবে না। এক সময় মানুষ থেকে ধীরে ধীরে বিন্দু হয়ে যাওয়া রমণীদের চলন্ত জটলাকে মনে হবে দুখিনী কোনো মানচিত্র।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা