কদলি ও কবিতা

কথা

এক.

খুব প্রিয় ও পুষ্টিকর বিধায় জনৈক ভদ্দরলোক বাজার থেকে এক হালি সুদৃশ্য পাকা কলা কিনে আনলেন। কিন্তু খাওয়ার সময় মনে হলো : অপোক্ত, কৃত্রিম উপায়ে পাকানো; খাওয়ার পর : বিস্বাদ, পেট ব্যথা, বমি বমি ভাব, অস্বস্তির এক ছার। ফলটির প্রতি বিতৃষ্ণায় বুক ভরে গ্যালো তার।

দুই.

কলা’র লা-টাকে ফেলে দিয়ে যদি ‘বিতা’ শব্দটি যুক্ত করা হয়, তাহলে ক্যামন হয় ? ভাবছেন তাই আবার হয় নাকি? বিস্বাদ, পেট ব্যথা, বমি বমি ভাব…এর সাথে কবিতার আবার কী সম্পর্ক? আছে। বাজারে য্যামন রাশি রাশি কদলি ফলের অধিকাংশই অকালপক্ব ও বিবিধ পার্শ¦প্রতিক্রিয়াশীল; তেমনি ভরি ভরি কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে, যার একটা বিরাট অংশ আবাল হাতের, কৃত্রিম ভাবযুক্ত এবং পাঠোত্তর অনুভূতিতে আবর্জনাস্বরূপা।

তিন.

কলার য্যামন ভেতর-বাইরেই কলা হতে হয়, তেমনি কবিতারও হতে হয় ঘরে-বাইরে কবিতা। নামে বা বাইরের চেহারায় কবিতা হলেও ভেতরে কবিতার কোনো সুর যদি না থাকে, প্রকৃত পাঠকের অন্তরে যদি অপরূপ অনুভূতিতে ব্যঞ্জিত না হয়; তবে সে কোনো প্রেমিকাই নয়; শরীরসর্বস্ব নিশিরঙ্গিনীর চাইতেও খেলো, অপাঙ্ক্তেয়। আবার শরীর ছাড়া প্রেম য্যামন অনেকটা কাল্পনিক, অপূর্ণ অনুভবসদৃশ; তেমনি কবিতারও কবিতার মতো শরীর থাকতে হয়। কখনও কখনও প্রথাগত ছন্দ, অলঙ্কার বা অন্য কোনো শৃঙ্খলার বাইরেও কবিতা হতে পারে, কিন্তু অন্তরে একটা অকপট গতিসৌন্দর্য, বক্তব্যভাষার একটা অমোচনীয় অনিন্দ্য আবেদন না থাকলে কবিতা শিল্পিত সুন্দর হতে পারে না। অমরত্ব লাভ করেছে অথচ ছন্দ ও অন্যান্য শরীরী সৌন্দর্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে, এমন কোনো কবিতা : আমাদের সাহিত্যে আছে কি ?

কবিতা

ট্রেনে যেতে যেতে

হোক সে রাত্রি ভ্রমণ, শীতরতি, মিতরব আঁধারের সাঁই

তা’বলে, জানালারহিত রেল ! নৈব নৈব চ, ভাই!

‘এটা চেয়ার কোচ, জানালা চাইলে সুলভে যান।’

সুলভেই ! দুর্লভদিগের বুঝি নেই চোখ-কান!

চোখ আছে, দৃষ্টি নেই; সেই চোখ, চোখে রাখো ক্যানো ?

জানালার অনালাপে ভ্রমণ ভিখিরি হয়, জেনো

সুতরাং,

কোনো অনাগত যাত্রীর জানালা লাগোয়া আসনে

বসলাম চুপে, আনমনে।

ভেতরের আলো ভুলে অন্ধকার ধরণীতে রাখলাম চোখ

অনুভবে জ্বললো আলোক;

ধানের ক্ষেত, গানের চাষা

সীমাহর সবুজের সুকুমার ভাষা

শীর্ণ শিশুদল, জীর্ণ জনপদ; কদাচিত জীবনের ঘনো মূলতবি

আগেকার সেইসব চিরায়ত ছবি

আজ নেই,

দৃষ্টি তবু ছুটে চলে ওই আঁধারেই!

পৃথিবীটা আজ আঁধার ভেলায় ভাসে

চোখ দুটো থেমে গ্যালো পচিম আকাশে

আশে-পাশে আগুন নেই; তবু কী সবিস্ময়ে পুড়ে যাচ্ছে চাঁন্!

আমাগো নারান কামার কি তার দা’য়ে দিচ্ছে শান!

তাই ক্যানো হবে?

সে তো মরেই গিয়েছে ক’বে!

মেয়ের ইজ্জত গেলে, থাকে কোনো বাপ?

তা’বলে মালাউন ! মালাউনের ঠাপ!

কুকুরের হিস্যু সহ্য সয়

সংখ্যালঘুর উচিতবচন কখনই নয়!

ঘর গ্যালো, মণ্ডপের মূর্তিগুলো পুড়ে হলো ছাই

নারানের জীর্ণ খুড়ো কেঁদে বলে, ‘ঠাকুর! তুমি আছো? না কি নাই?’

সন্তানেরা নারানের খুনের বিচার চেয়ে, শেষে

নিজেরাই গিয়েছে যে ভেসে!

নারান কামার আর হারুন মোড়ল এক নয়, আইনের বাঁধা চোখে

এমনই জেনেছে লতিকা; ধর্ষিতা নারানকন্যা; আরও ক’জন লোকে।

তাই,

ভিটে-মাটি পড়ে আছে, সুখেনেরা নাই।

পড়ে আছে ! নাকি হারুন কিংবা করিমেরা গড়েছে নতুন কোনো বাড়ি?

আজও জানিনা, জননীর মতো সেই গ্রামখানি কতো দিন, আমিও এসেছি ছাড়ি!

পশ্চিম আকাশে নেই মাজাভাঙা চাঁদ; কোথা গ্যালো, মুখপোড়া?

নারানের দা’য়ের মতন জ্বলে যার চোখজোড়া!

চোখ ঘষে বার বার, তাকাই আকাশে; দা নয়, চাঁদও নয়

দানব আগুনে পোড়ে মানব হৃদয়!


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা