কবিতার ভেতর-বাহির

কথা

কবিতার বাহিরে কী থাকে— শব্দ, উপমা, চিত্রকল্প, ছন্দ কিংবা অন্যান্য অলংকার আর একটি অলৌকিক মুখোশ। ভেতরে বহুবিস্তৃত রহস্য, আলো-অন্ধকার কিংবা অনন্ত আলোড়ন— সেই আলোড়নে লেগে থাকে জীবন ও জগতের বহুবর্ণিল বোধ ও চিন্তনের রঙ ও রেখা , সে-সব পেরিয়ে এক মায়াবী অরণ্যের জনান্তিকে বহমান সংবেদ ও নির্বেদে আঁকা বৈতালিক সময় যা শব্দকে অতিক্রম করে দূর সমুদ্রের গান শোনাতে শোনাতে ফুল ও পাখিদের অন্য কোনো ভুবনে জেগে ওঠে কিংবা জাগাতে চায়। এই মহা-সৌন্দর্য অবলোকনের দৃষ্টি সবাইকে দেন না ঈশ্বর।

ভাষার ঐশ্বর্যেই লুকিয়ে থাকে কবিতার সমূহ সম্ভাবনা, অর্থ কিংবা অনর্থ। ভাব ও ভাষার নিমজ্জনে যে ভাবকল্প কবিতা হয়ে ওঠে, তা নিয়ে অনেক অনেক পথ হাঁটা হয়েছে। নিরন্তর চলাপথের লতাগুল্ম, চিহ্ন ও চারপাশে ভেসে-বেড়ানো অনেক ধ্বনি ও কল্পতরঙ্গের সাথে একাত্ম হয়ে কবিতাযাত্রার যে আয়োজন কালে কালে, সে বিষয়ে উপলব্ধির জগতে একটি বিশ্বস্ত আসন না পেতে রাখলে এই অধরা মাধুরীর সহজ সাক্ষাৎ সম্ভব নয়। ভাষার রোদন-ক্লান্ত অবয়বে সোনালি সাহস ছড়িয়ে তাকে নতুন ঘরের সন্ধান দেবার ক্ষেত্রে সব কবির ক্ষমতা সমান থাকে না। র‌্যাঁবো কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়ার আগে বলেছিলেন যে, তার অনুভূতিগুলো প্রকাশের ক্ষমতা তার ভাষার আর নেই। অনুভূতির সেই চরম পর্যায়ের কথা বাদ দিয়েও বলা যায় যে, কবিতা তো সেইখানে থাকে যেখানে কোনো শব্দ নেই, উপমা নেই, রূপক নেই অনুপ্রাস নেই; কখনো মনে হয় কবিতা কি কেবল এক মহাহাহাকারের মধ্যে রক্তাক্ত হৃদয়ের গভীর থেকে উড়ে আসা কোনো এক মায়াবী পাখির আর্তনাদ, যা বিধ্বস্ত গোধূলির অভিজ্ঞান হয়ে জেগে থাকে কালের চৌকাঠে। কখনো এক অভিনব তুমুল ভর্টেক্স-এ পড়ে কবি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেই ক্লান্তির উপান্তে তখন কেবল এক রক্তাক্ত কবির অবয়বই মুখরিত হয়। কবিতা কি তাহলে সত্তার করুণ গোধূলি— চেতনার অবাধ সন্তরণে ছুটে যাওয়া?

কোনো পরাক্রমশালী মানুষ ভাষাকে একান্ত নিজের করে খেলতে জানেন কিংবা ভাষার মধ্যে জাগাতে পারেন জীবনের বহুমাত্রিক স্পন্দন। জেমস জয়েসের ভাষাকে কেউ অনুকরণ করেনি সত্যি, কিন্তু তিনি ভাষার মধ্যে যেসব মালমশলা ঢুকিয়ে তাকে তার মতো করে লাক্জারিয়াস করে তুলেছিলেন— সেই ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই থাকে। একজন পদ্যকার কিংবা গদ্যকারকে সেই জায়গায় যেতে হয়, যেখানে ভাষা একান্তই তারই হাতের ছোঁয়ায় পাখি হয়, ফুল হয়, জীবনের জাগরণ হয়, রোদ-বৃষ্টির খেলা হয়। ভাষার জরায়ু ফুঁড়ে কবিতা বেরিয়ে আসে সত্যি, কিন্তু এও সত্যি যে, ভাষা ও কবিতার অন্তর্লীন সহবাস ও মিথস্ক্রিয়ায়ও আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। তাই, ভাষা একইসাথে কবিতার ভেতর ও বাহির। কবিতার বাহির বা অবয়ব দেখে খুব সহজেই তার ভেতরের পরিব্যাপ্ত জগৎকে আন্দাজ করা কঠিন, যদিও কবিতার অবয়বেই কিছু কী-ওয়ার্ডস থাকে যা কেবল কবিতা বোঝার ব্যাপারে সহায়তা করে মাত্র।

কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ বাইরের ব্যাপারই বটে। যিনি কবিতা লিখতে চান তাকে ছন্দ বিষয়ে জানতে হয়। অনেক কবিই ছন্দ নিয়ে বেশি বেশি মাতামাতি করতে গিয়ে শুধু ছন্দই লিখে যান, তাতে আর কবিতা থাকে না। ছন্দ কবিতার কাঠামোকে শাসন করে, শব্দ ও কল্পনার অন্তর্যাত্রাকে সংহত করে; কিন্তু পাশাপাশি এটাও বলতে হয় যে, ছন্দের ভলকেনিক ইরাপশন কবিতার মৌলিক অভিগমনকে অনেক সময়ই দুর্বল করে ফেলে। বুদ্ধদেব বসু এক সময় বলেছিলেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা থেকে ছন্দ উঠিয়ে নিলে তা আর কবিতা থাকে না। যিনি মৌলিক কবি হতে চান তাকে ছন্দ বিষয়ে বিশদে প্রবেশ করতে হবে। গদ্য ছন্দ বলি আর মিশ্র ছন্দ বলি — সবখানেই ছন্দের ব্যাপারটা রয়ে যায়, কারণ, বিশ্ব-প্রকৃতি যে এক মহামহিম ছন্দেরই বহিঃপ্রকাশ।

কবিতার ভেতরের রহস্য-গুঞ্জন, আলো-আঁধারীর যে বহুবিস্তৃত খেলা তা কেবল সেই কী-ওয়ার্ডস দিয়ে পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়। এজন্য পাঠককে মেঘমন্দ্রিত আড়ালের খেয়ায় ভেসে ভেসে শুনতে হয় অবিনশ্বর সেইসব কুয়াশা-ভেজা অনিঃশেষ মন্ত্র যা আলোড়িত হয় সমুজ্জ্বল বোধের তৃষ্ণায়। কবিতার ভেতরে, অনেক গভীরে, স্তরে স্তরে সাজানো চিন্তা ও ভাবের জটিল রসায়ন কোনো মৌলিক কবিতাকে অদৃশ্য অজস্র তন্তুতে বেঁধে রাখে। ভাষার মহাসংশ্লেষী প্রশ্রয়ে কবিতার ভেতর কাঠামোয় জেগে থাকে এক সুসম ইশারাময় আলোর সংসার— প্রকৃত কবিকে সেই সংসারের জল-হাওয়া বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়। আমরা আগেই বলেছি কবিতার বাইরে থাকে এক অলৌকিক মুখোশ। সেই মুখোশের অজস্র ছিদ্রপথ দিয়ে কবি বহুবর্ণিল চড়বঃরপ-জধু চালিত করেন সুনিপুণ কৌশলে। এইসব বহুবিধ কৌশলের মধ্যে কবির দিন-রাত একাকার হয়ে যায়। কবি সেই জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে এমন এক অতিবর্তী ম্যাজিশিয়ান হয়ে যান যে সেই ঘর্মাক্ত সময়ে, সেই কবিতার মুহূর্তে, মেতে ওঠেন অতিক্রমণের খেলায়। সেই খেলা ‘জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে’ যেতে থাকে ‘দূরে কোথায়, দূরে দূরে…’

কবিতার ভেতর-বাহির নিয়ে আর কিছু বলার নেই আমার। শুধু সুতোয় বাঁধা একটি ম্যাজিক-ওয়ান্ডকে বাতাসে একটু দুলিয়ে আমি কূল-কিনারাহীন ঘোরের মধ্যে ডুব দিয়ে রূপালি মৎস্যের খোঁজে চলে যাচ্ছি এই…

কবিতার ভেতর-বাহির নিয়ে আর কিছু বলার নেই আমার। শুধু সুতোয় বাঁধা একটি ম্যাজিক-ওয়ান্ডকে বাতাসে একটু দুলিয়ে আমি কূল-কিনারাহীন ঘোরের মধ্যে ডুব দিয়ে রূপালি মৎস্যের খোঁজে চলে যাচ্ছি এই…

কবিতা

কুটুম্ব তালিকার হাতপাখার মেয়েটি

পথগুলো অসমাপ্ত বাঁক নিয়েই ভাবুক

মেঘের কিচেনে তুমি উনুন জ্বালিয়ে কাঁদ, আর রাঁধ সব

                                    লণ্ডভণ্ড স্মৃতি

চারদিকে কারা পোয়াতি পতঙ্গদের ডানা ছিঁড়ে

বয়াতি বাড়ির সাঁঝবাতি ধরে টেনে আনছে পেছনের কাল

সেই নির্বাণ চাতালের খোয়াব থেকে নেমে

ভাবনারা কতদিন হারানো মেধার মাংস হয়ে শুনেছে চার্বাক —

কুটুম্ব তালিকার হাতপাখার মেয়েটি এখন মেঘ ও উনুনের

শৈশব নিয়ে ভাবে আর সমূহ আদরে

পথের বাঁকগুলো বুকে তুলে

চুমুতে চুমুতে ভরে দেয় রক্তস্নাত ঠোঁট—

আর দ্যাখো নেমেছে কত গাংপাখি সময়ের ঘেরে

ওরা মাস্তুলে ডুব দিয়ে তুলে আনছে চরের গন্ধ

বিবিধ রক্তের নেশা মিশে আছে বালির গভীরে…


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা