কবিতার ভেতর-বাহির

কথা

কারো মাতৃভাষা বাংলা, কারো চাকমা, কারো-বা ফারসি, ফরাসি, আরবি, ইংরেজি, চৈনিক, হিন্দি, হিস্পানি, জাপানি…। পৃথিবীতে কত জাতি, কত জনগোষ্ঠী, আর তাদের ভাষা, তাদের বুলি কতটা বিভিন্ন ও বিচিত্র! কিন্তু অনুভূতির মৌলিক ভাষা এক, অভিন্ন। আর সেই বিমূর্ত অনুভূতির সৎ ও মূর্ত প্রকাশই কবিতা। কবিতাকে তাই বলা হয় সমগ্র মানবজাতির মাতৃভাষা। মাতৃভাষা আমাদের যা-যা দেয়, যা-কিছু জোগায়— সৌন্দর্য, মাধুর্য, সহজতা, জৈবটান, মাধ্যাকর্ষণ, শুশ্রুষা, উপশম, প্রেরণা, এষণা, সাহস, শক্তি, উদ্দীপন, অক্সিজেন, করণ, বাহন, মাধ্যম…, সে সবের অনেক কিছুই আমরা পাই কবিতার কাছ থেকে।

কবিতা একটি শিল্পমাধ্যম। অপরাপর সৃজনশীল শিল্পমাধ্যমের মতো এটিও একটি সৃজনশীল মাধ্যম, একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম। কারণ, মানুষের অনুভূতির ও উপলব্ধির সবচাইতে সৎ ও অকৃত্রিম প্রতিফলন ঘটে কবিতায়, আর সেই অনুভূতি ও উপলব্ধি একজন সৃজনশীল শিল্পীর অনুভূতি ও উপলব্ধি।

শিল্পীর অনুভূতি ও উপলব্ধি— কথাটি এজন্য বলছি যে, একজন শিল্পীর ফার্স্ট সিগনালিং সিস্টেম থাকে শক্তিশালী। কবিদের, শিল্পীদের ইন্দ্রিয় থাকে নিত্যজাগর, সদাপ্রখর। বাইরের জগতের যে-কোনো সংকেত— হোক তা সুখের কিংবা অসুখের, আনন্দের কিংবা ব্যথার, ভয়ের বা নির্ভয়ের, হোক সে-সংকেত উত্তাল কিংবা নিস্তরঙ্গ, লাউড কিংবা হাস্কি কিংবা মাফল্ড— সবচেয়ে আগে ধরা দেয় শিল্পী তথা কবির অ্যান্টেনায়। সাড়া তোলে তাঁর সংবেদী চেতনায়, তৈরি হয় সে-সম্পর্কিত অনুভূতি ও উপলব্ধি। আর যেহেতু কবি সৃজনশীল, তাই তাঁর সেই অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রতিফলন তিনি ঘটান এমন এক কাব্যিক জগৎ তৈরির মধ্য দিয়ে, এমন এক প্রকৃতি-সৃজনের ভেতর দিয়ে যে, সেই জগৎ, সেই প্রকৃতি, এই প্রচলিত জগতের বস্তু-বাস্তবতা, শব্দ-নৈঃশব্দ্য দিয়েই গড়ে ওঠে বটে, কিন্তু গাঁথা হয়ে ওঠে এক ভিন্নতর সম্পর্কসূত্রে, বিন্যস্ত হয় যেন এক অপ্রাকৃত বিন্যাসে, এক আপাতছদ্ম যুক্তিসিলসিলায়। এজন্যই, কবি যা সৃষ্টি করেন তাকে বলা হয় ‘বিকল্প জগত’, ‘বিকল্প প্রকৃতি’, যেখানে খেলা করে অন্য আলো-ছায়া, অন্য মেঘ-রোদ্দুর, অন্য নিসর্গ—ভিন্ন চালে, ভিন্ন লজিকে। আর এই ‘বিকল্প জগত’ সৃষ্টির যে-রসায়ন, তাতে অবলীলাক্রমে, এক অকপট বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, সংশ্লেষ ঘটে নানা ছন্দ ও স্পন্দন, প্রতিমা ও প্রতীক, উপমা ও রূপকের। আর মানুষের মনের ওপর ছন্দ-স্পন্দন, প্রতিমা-প্রতীক, উপমা-রূপকমেশানো ভাষার অভিঘাত সবসময়ই হয় তীব্র ও কার্যকর। ভালো কবিতা তাই ছুঁয়ে যায় পাঠকের যুগপৎ হৃদয় ও মনন, দুলিয়ে দেয় তাকে, হন্ট করে চলে প্রতিনিয়ত। একটি উৎকৃষ্ট কবিতা কোনো-না-কোনোভাবে ছাপ ফেলেই যায় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে।

এগুলি তো আছেই, কবিতার গুরুতর দিক আমার বিবেচনায় অন্যত্র। কবিতা লেখা হয় শব্দ দিয়ে, যে-শব্দরাশি একটি জনগোষ্ঠীর ভাষার অন্তর্গত, যে-ভাষা ফের সামাজিক সম্পদ। আর ভাষার সবচেয়ে সূক্ষ্ম, সংবেদনশীল, স্থিতিস্থাপক, সৃজনমুখর ও সৃষ্টি-উন্মুখ দিকগুলি নিয়েই কবিতার কারবার। শব্দের প্রচলিত, অভিধানসিদ্ধ অর্থেও অতিরিক্ত, সম্প্রসারিত ও নব্য অর্থের সম্ভাবনাকে ক্রমাগত উসকে দিতে থাকে কবিতা। টালমাটাল করে দিতে থাকে শব্দের প্রথাগত অর্থ, উৎপাদন করে নতুন-নতুন অর্থ। ভাষার বিভিন্ন সুপ্ত শক্তি ও সম্ভাবনাকে বিচিত্র ধারায় উন্মোচন করে করে এগিয়ে চলে কবিতা। পোয়েট্রি ইজ দ্য সুপ্রিম ইউজ অব ল্যাংগুয়েজ। মানুষ ভাষিক প্রাণী; সমাজ একটি ভাষাবদ্ধ ব্যবস্থা। আর কবিতা সেই ভাষার মধ্যে ঘটিয়ে দেয় এবং নিত্য জারি রাখে একধরনের বৈপ্লবিক অন্তর্ঘাতের ধারা, নীরবে-নীরবে, আস্তে-আস্তে, গেরিলা কায়দায়। আর এভাবে প্রতিনিয়ত ঝাঁকুনি-খেতে-থাকা ভাষার মধ্য দিয়েই ঝাঁকুনি খায় সমাজের নানা ক্ষেত্রের স্থিতাবস্থা, রক্ষণশীলতা। কবিতা ঢেউ তোলে ভাষার সাগরে আর সেই ঢেউয়ের ধাক্কা গিয়ে লাগতে থাকে সমাজে প্রচলিত নানা প্রথা ও মূল্যবোধে। কবিতার কাজ এক্ষেত্রে নীরব, অন্তর্ঘাতমূলক। আপাতদৃষ্টিতে, বাইরে থেকে হয়তো বোঝা যায় না, কিন্তু কাজ চলে নীরবে, ভেতরে-ভেতরে। আর বলাই বাহুল্য, এই অন্তর্ঘাত সদর্থক। এই অন্তর্ঘাত ইতিবাচক।

কবিতা ও দর্শন :

কবিতা দর্শনের আগে-আগে-থাকা একটি শিল্পপ্রপঞ্চ। এটি সবসময় তা-ই ছিল। একটি কালপর্বের কবিতার মধ্যে আগাম পাওয়া যায় সেই কালের অস্ফুট ও স্ফুটমান বিভিন্ন চিন্তা ও দর্শনের রূপরীতি, তাদের নানারকম উদ্ভাস। একটি কালখণ্ডের মধ্যে জন্ম-নেওয়া কাব্যসমুদয়ের বিপুল হাঁড়িতে টগবগ করে ফুটতে থাকে, আকার পেতে থাকে সেই সময়কালের নানা চিন্তা, ভাব ও দর্শন।

কবিতার ভাষা :

কোন কবিতা যে কোন ভাষাভঙ্গি নিয়ে বেরিয়ে আসবে সার্থকরূপে, কবিতার হয়ে ওঠার ব্যাপারটি অর্থাৎ ভেতরকার ফুল ফুটিয়ে দেবার কাজটি সুন্দরভাবে সাধিত হবে যে ঠিক কোন ভাষায়, নির্দিষ্ট করে তা বলার চেষ্টা বৃথা। আগেই বলেছি, একটি কবিতা হচ্ছে কবির একটি বিশেষ অনুভূতি বা উপলব্ধির সবচাইতে সৎ ও অকৃত্রিম প্রকাশ, তাই যে-ভাষায় সেই অনুভূতি প্রতিফলিত হতে পারবে সবচেয়ে অকৃত্রিমভাবে, অর্থাৎ যে-কবিতা দাবি করবে যে-ভাষা, সেই ভাষাতেই লেখা হবে ওই কবিতা। ভাষার ব্যাপারে কবিতার তাই কোনো প্রেজুডিসও নাই, শুচিবায়ুও নাই। বলে-কয়ে-দেওয়া কোনো সুনির্দিষ্ট ভাষা নাই কবিতার। কোনো ফতোয়াও খাটে না কবিতার বেলায়। আর তা ছাড়া, এমনিতেই, কবিতার স্বভাবগত কারণেই, এর ভাষা সরাসরি কখনোই মিলবে না কোনো ভাষার সঙ্গে— না নিত্যব্যবহারের ভাষা, না চলতি, না কথ্য, না প্রমিত-কোনো চেনা ভাষাভঙ্গির সঙ্গেই না, আবার হয়তো সবরকম ভাষার সঙ্গেই। কারণ কবিতায় ভাষার প্রথাগত লজিক, শৃঙ্খলা, ব্যাকরণ সবই ভেঙে পড়ে; অনুভূতির তীব্র চাপে ভাষা যায় বেঁকেচুরে, ফেটে-ফেটে। অর্থাৎ ভাষাকে ফাটিয়ে, বিশৃঙ্খল করে দিয়ে, নেমে আসে কবিতা। ভাষার ভিতরে ঘটিয়ে দেওয়া এক তুমুল রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে কবিতা। ভাষার এক শুদ্ধসৎ আরতিকতার ফসল কবিতা। উপমা-উৎপ্রেক্ষায়, রূপকে, প্রতীকে, প্রতিমায় আর ভাষা ও যুক্তির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক নতুন শৃঙ্খলা, এক অভিনব গোধূলিভাষ্য। সে যেন খোদ অনুভূতিরই এক অবিকৃত সৎ প্রতিচ্ছবি, উপলব্ধিরই এক অকপট আলপনা— কবিতা। কবিতার ভাষা তাই ফাটা-ফাটা, বাঁকাচোরা, বিশৃঙ্খল ও প্রহেলিকাপূর্ণ।

কবিতা ও নিত্যব্যবহারের ভাষা :

আমাদের প্রাতহ্যিক যাপনপ্রক্রিয়া প্রায়শই থাকে নিয়ন্ত্রিত, কনডিশন্ড— সময় ও পরিবেশ-পরিস্থিতির নানা শর্তের চাপে। প্রাত্যহিক যাপনক্রিয়া তাই সম্ভব করে তুলতে পারে না আমাদের অনুভূতির, আমাদের উপলব্ধির সৎ ও অকৃত্রিম প্রকাশনা। অন্যদিকে কবিতার কাজ বা উদ্দেশ্যই হচ্ছে অনুভূতির অকৃত্রিম প্রতিফলন ঘটানো। কবিতাকে তাই কণ্ঠে তুলে নিতে হয় বিশেষ স্বর, বিশেষ ভাষা। কোনো চেনাজানা ভাষাই পারে না কবিতার দাবি মেটাতে পরিপূর্ণরূপে, প্রতিদিনকার ভাষা তো নয়ই। তবে নিত্যব্যবহারের ভাষা, তার শব্দ, বাগধারা, তার চলনভঙ্গি, এসবের জোরালো অভিক্ষেপ পড়তে পারে কাব্যভাষায়। সেটা সম্ভব, খুবই সম্ভব; তবে সে-ও অনুভূতির সৎ বহিঃপ্রকাশের তাগিদেই।

কবিতা তথা শিল্পের পরম্পরা ও প্রাসঙ্গিকতা :

সময়ের সাথে বদলে যায় সমাজ-পরিস্থিতি। বদলায় ভাষা। বদলে যায় বয়ান। চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রেও উন্মেষ ঘটে নতুন নতুন দিগন্তের। স্বভাবতই বদলে যায় সংবেদনাও। অবশ্য এই বদলে যাওয়ার মধ্যে থাকে একটা যোগসূত্র, একটা ধারাবাহিকতা। পরিবর্তনশীল সমাজ-পরিস্থিতির সাথে সাথে শিল্পকলাও তার যোগসূত্র ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই এগিয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। অনেকটা সোপানবিন্যাসের মতো। সোপানের যে কোনো একটি ধাপের ভিত্তি যেমন তার অব্যবহিত আগের ধাপসহ পূর্ববর্তী সমস্ত ধাপ, কবিতা তথা শিল্পকলার ক্ষেত্রেও তেমনি পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাজসমূহ হচ্ছে নতুন প্রজন্মের কাজের ভিত্তিভূমি। নতুন প্রজন্মে শিল্পসোপানের নতুন যে ধাপটি নির্মিত হয়, তার সঙ্গে যুক্ত থাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন নতুন সংবেদনা। অতএব, পূর্ববর্তী কাব্যকৃতির সম্ভারকে ভিত্তিভূমি ধরে নতুন সংবেদনা ও অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ভাবকে নতুন আধারে অর্থাৎ নতুনতর স্বর-সুর-ভাষা-শৈলীতে উপস্থাপন করে নতুন প্রজন্ম। এখানে অবশ্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত থাকে, তা হলো কবি বা শিল্পীর স্বকীয় সৃজনপ্রতিভা ও প্রাতিস্বিকতা, সেইসঙ্গে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টিও ।

কবিতা বা যে কোনো শিল্পবস্তু যা করে তা হচ্ছে সমকালের অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে নিয়ে নিজেকে ভবিষ্যতের সওদা হিসাবে তুলে দেয় প্রবহমান কালের গাড়িতে। এখন কোন সওদা কালের গাড়িতে কতদূর যাবে, তা নির্ভর করবে কোন মাত্রায় কতটুকু সর্বজনীনতা বা কালান্তরগম্যতা-গুণ আছে সেই সওদার ভেতর ।

যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন থাকবে তার আবেগ, অনুভূতি, সংবেদনা; ততদিন থাকবে কবিতা। বহির্জগতের নানা ঘটনাসংকেতে আলোড়িত হবেন কবি, সেগুলির ছাপ পড়বে তার চেতনায়, তৈরি হবে সে-সংক্রান্ত অনুভূতি আর সেই অনুভূতির প্রতিফলন ঘটাবেন তিনি কবিতা লিখে। আর মানুষ যেহেতু থাকবে সংবেদনশীল, অনুভূতিপরায়ণ, তাই সে পড়বে সেই কবিতা।

দ্রব্যগত কোনো মূল্য নাই কবিতার। ভবিষ্যতে, খোদা-না-খাস্তা, মানুষ যদি কখনো হয়ে পড়ে নিরঙ্কুশ দ্রব্যের দাস; দ্রব্যমূল্য নাই অজুহাতে, কিংবা উল্টিয়ে দিতে পারে দ্রব্যতন্ত্রের গণেশ— এই ভয়ে যদি কোনোদিন নিষিদ্ধও করে দেওয়া হয় কবিতাকে, সম্ভবত তারপরও থেকে যাবে কবিতা। মানুষ তখনো, কবি রণজিৎ দাশের ভাষায়, ‘শহরের একপ্রান্তে ফেলে দেওয়া ভাঙা অতিকায় টেলিভিশন বাক্সের মধ্যে বসে মাফিয়া, মগজ-ব্যাংক আর রোবট-পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে লিখে যাবে কবিতা’, গেরিলা কায়দায়; তারপরও পড়তে থাকবে কবিতা। বেরিয়ে আসবেই কবিতা যে কোনো বন্দিদশা থেকে, যে কোনো দমন-দলন উপেক্ষা ক’রে— হয়তো ভিন্ন ভাব ভাষা রূপরীতি নিয়ে, কখনো কখনো বাউল কিংবা অন্য কোনো রূপে (অতীতে যেমন হয়েছে), কিন্তু বেরিয়ে সে আসবেই।

কবিতা

বাণিজ্য

হ্যাকটিভিস্টরা এলোধাবাড়ি হ্যাক করে চলেছে

শত্রুদেশের ওয়েবসাইট।

তাদের সুরের চেয়ে লহরী অধিক

গমকের চেয়ে গিটকিরি…।

ওইদিকে, জন্ম—, মৃত্যু— আর বাণিজ্য-দেবতা…

তিনজনে মিলে শলাপরামর্শ শেষে

সোল্লাসে হাই-ফাইভ মেরে

তর্জনী ও মধ্যমায় ক্রস ফিঙ্গার দেখিয়ে

কল্পনায় রৌপ্যরেখা জাগিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে—

যদি বাড়ে জন্মহার,

বাণিজ্য বাড়বে তবে শিশুখাদ্য ও ডায়পারের

আর মৃত্যু বাড়লে চিরবিদায় স্টোরের।

জন্ম মৃত্যু যেটাই বাড়ুক

বাণিজ্য বাড়বেই।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা