কী লিখি কেন লিখি ৫

নূরুননবী শান্ত

পৃথিবীর বিশাল বৈচিত্র্যের কোনো এক নির্দিষ্ট দিকে চোখ রেখে তাকাবার সাহস তৈরি হয় নি বেড়ে ওঠার স্বর্ণসময়ে। ভগ্নস্বাস্থ্য টেনে টেনে মাটির দিকে তাকিয়ে গুবরে পোকার মতো হাঁটি। সমবয়সীদের টিটকারি এক কান দিয়ে মাথার ভেতরে ঢুকে দলা পাকিয়ে পাকিয়ে নিস্তেজ অসাড় ভাব হয়ে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। ওরা সবাই অব্যাহতভাবে দুদ্দার হাঁটে। খইয়ের মতো কথা ফোটে ওদের বাকযন্ত্রের পরতে পরতে। কোন স্বপ্ন ছিল না মনে, ছিল না তথাকথিত ভবিষ্যৎ ভাবনা, না কোনো আমার জীবনের লক্ষ্য। শুধু আমার কানে আন্দোলিত হতে থাকতো ওয়ালমেছ মামার কেচ্ছা বয়ানের ঘটনা পরম্পরাÑএইতো রাজকন্যা। এইতো কী তার রূপ! রাজবাড়ির ঘরের সাথে লাগানো দিঘির ঘাটের সিঁড়ি আলো করে বসে আছে চান্নিরাতে, পাইক-পেয়াদার বারণ উপেক্ষা করে। এইতো, দানব রাক্ষস তাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাচ্ছে রাজবাড়ির দিঘির ঘাট থেকে। রাজকন্যার তাতে ডর-ভয় নাই। আঁচলের মাথায় তার বাধা আছে, এইতো, কুদরতি সরিষার দানা। কোত্থেকে এলো যে সরিষার দানা! (ওয়ালমেছ মামাকে আবার বায়না করতে হবে কেচ্ছাটা জোরার জন্য।) এইতো রাক্ষসের দৈত্যাকার ঘোড়ার লেজে সেই সরিষার দানা বেঁধে দিচ্ছে অপহৃত রাজকন্যা! কী সাহস! সেই সরিষা দানা পথে পথে ছড়িয়ে যাচ্ছে পথ নির্দেশক হয়ে। জাতশিকারী কোটালপুত্র তাই দেখে রাক্ষসের গুহা চিনে নিচ্ছে অনায়াসে। রাক্ষসের আস্তানায় যাওয়া তবু কী যে-সে কর্ম। শেষে তো সব ভয় জয় করে রাজকন্যা উদ্ধার হয়। রাজার মনে শান্তি আসে। রাণীমার চোখে নামে আনন্দাশ্র“! রাজ্যে বেজে ওঠে আনন্দ-ধ্বনি। অথচ, তারপরই তো হরিষে বিষাদ। রাজসভায় প্রশ্ন ওঠে, কোটালপুত্র কেন যাবে রাজকন্যা উদ্ধারিতে! কেন সে রাজপুত্র হলো না, হোক না তা ভিন্ন রাজ্যের! কোটালপুত্রের মর্যাদা সমান হয় নাকি রাজকন্যার মানের?
রূপকথার জগৎ আর চারদিকের বস্তুজগতের স্বভাব-চরিত্র খুব কি আলাদা? কোন্ জগতটা যেন আমার, আমাদের? বৈপরীত্যে ভরপুর মানুষের অমানবিক জগত। আমি সেই কেচ্ছার জগতে বাস করি। বস্তুজগতের ভেতরে গড়ে ওঠা মনুষ্যসভ্যতার ভাবজগত ও রীতিনীতির কঠোর অনুশাসনের মধ্যে থাকি। এতো বিধি-বিধান, বিবেকের রক্তচক্ষুর সামনে তবু অস্তিত্বশীল থাকতে হয় প্রত্যেক স্বতন্ত্র ব্যক্তিকে। নিজের শরীর পাটকাঠির মতো সরু হলেও, পাটকাঠিকে তরোয়াল বানায়ে বাতাসে ঘোরাই। একটার পর একটা রাক্ষস কতল করি। ডানাভাঙা প্রজাপতি না ধরে দূরে উড়ায়ে দেওয়ার অপরাধে যে ছেলেটি আমার কানের উপর চাপড় মারে, চোখ বন্ধ করে তাকে হত্যা করতে থাকি বাতাসে সিন্টার বল্লম খুঁচিয়ে! সেই লড়াই আমার আচমকা থেমে যায় কারো নিন্দুক-পায়ের আওয়াজে। আমি মাথা নিচু করে আমার তরোয়াল দিয়ে মাটিতে কাটিকুটি করতে থাকি। চোখ তুলে দেখতেও ইচ্ছে করে না, কার পা’জোড়া থপ থপ শব্দে আমার অস্তিত্বকে কটাক্ষ করে পাশ দিয়ে চলে গেল। কেবল তার মুখ কল্পনা করি। এ হয়তো সেই লোক, যে তার হালের গরুটাকে খৈল খাওয়ানোর সময় চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয়, আর প্রতিবেশির গরুটা তার ধানক্ষেতে ঢুকেছে বলে হালুয়া পেন্টি দিয়ে পেটাতে পেটাতে মাটিতে শোয়ায়ে ফেলে! এই লোকের দিকে তাকাতে আমার দ্বিধা করে। আবার মনে হয়, সমাজে সবরকম মানুষ না থাকলে চলে না। দ্বন্দ্ব, দ্বিমত, তর্ক ও যুদ্ধের ভেতর দিয়ে মানুষ, প্রকৃতি, সভ্যতা, অসভ্যতার ক্রমবিবর্তন। দ্বন্দ্বে থাকাই মানুষের নিয়তি। দ্বিধাকে পাকিয়ে তুলি সুতরাং। পায়ের শব্দ সৃষ্টিকারী সম্পর্কে অন্য ভাবনা উপস্থিত হয় মনে। হঠাৎ হয়তো বুঝে ফেলি, অথবা মনে করি যে, আরে না, এ তো পূবপাড়ার সেই বুজান। আরে, সেই সেয়ানা মেয়েটা। তার নাম বলবো না। একদিন বৃষ্টির দিনে নানীর ঘরের মেঝেতে পালা করে রাখা সোনারঙের পাটের নরমের মধ্যে দেহ গুঁজে দিয়ে টিনের উপর বাজতে থাকা মল্লারে মশগুল ছিলাম। বুজান কখন আমার পাশে এসে শুয়েছে টের পাই নি। তাঁর ঠোঁট দিয়ে আমার ঠোঁটে বিলি কাটতে শুরু করেছে বুঝতেই পারি নি। বোঝার কী দরকার! হাত-পা ঝিম ঝিম করছিলো যে আমার। সুখ সুখ ¯্রােত একটা আমার অবশ দেহের পায়ের পাতা থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছিলো যে তখন। অতশত বুঝে কাজ কী আমার! বুজানের বুকের গভীরে মুখ রেখে খানিকটা কাতরভাব প্রকাশ করতেই সে কী চোখ-রাঙানি তার! কেন তার বুকের হুক খুলতে গেছি! সবকথা আম্মাকে বলে দেবে যে! আমি কি বলতে পারতাম, আম্মাকে? আমার ঠোঁট কেন থুতু দিয়ে ভেজাইলা? আমিও আম্মাকে কয়ে দেব? কওয়া কি যায় আসলে সবকথা সবাইকে? কেবলি মাথা নিচু করে থাকা। কেবলি দ্বিধার ভারে নূয়ে পড়তে পড়তে মাটিতে লীন হয়ে যাওয়া! তখন তো নানির বাড়িতে থাকি। নানির চূলা থেকে দুধের সর চুরি করে খাই। আবার সর পড়ে। এবার মামা খায়। ছোট মামা। আমি বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখি। কাউকে বলি না। রাত হলে ছোট মামার সাথে সাতনাপাড়া যাবো যে! কীর্তন শুনবো। মন্দিরার বাজনাটা এতো নেশা জাগায়! ঢোলের বাজনাটা বুকের ভেতরে কম্পন তোলে। তারপর বড়িয়াহাটে যাত্রা আসছে আবার। তো কথা নাই। দুপুরে ঘুমিয়ে নাও। রাতে দি বাসন্তি অপেরা। ট্রাম্পেট! ড্রাম। পালার নাম গুনাই বিবি। আর মাখনের তৈরি মেয়েগুলো, ক্ষীরের তৈরি ডানাকাটা প্রিন্সেসরাÑআলো-আঁধারিতে আনন্দ-কামনার ঝড় তোলে। বুকের ভেতরে একইসাথে কনকনে শীতে নাড়া পোড়ানোর উত্তাপ আর কাঠফাটা গরমের দুপুরে বড় দিঘির পাড়ের আমগাছের তলার শীতল হাওয়ার তোলপাড়।
আমার মাথায় কি ঢুকবে স্কুলের অংক! না, বাংলা ভালো। দ্রুতপঠন আরো ভালো! তবু ঠিক গুনাই বিবির পরদিন যখন শাকপালা বিলে মাছ ধরা নিয়ে কাজিয়া লাগে দুই পাড়ায়, একটা খুন হয়, কুকিকালিদাশে আমরা ঘুমাতে পারি না। আতঙ্ক! যদি আমিও একদিন খুন হয়ে যাই। আহা! জীবন, পাগলামিভরা প্রেম আমার, তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে অজানা নিস্তব্ধতার দিকে! ভয়! একা লাগে! শূন্য মনে হয়! গুটিয়ে নেতিয়ে পড়ি মাটির বুকে। মাটি নীরবে স্থান দেয় আমার দেহকে। বিলের দিঘির পাড়ের শিমুল গাছের শিকড়ে মাথা দিয়ে, কাত হয়ে, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের ঢেউ খেলানো সবুজের দিকে চোখ রেখে বাতাস বয়ে যাওয়ার মৃদু শোঁ শোঁ আওয়াজ শুনতে থাকি।
নাহ! এবার মায়ের কাছে যেতে হবে। কুকিকালিদাশে, নানির কাছে থাকলে চলবে না আর। আমডারা গ্রাম। সেখানে আম্মা থাকে। আর থাকে রাজ্যের যতো অভাব, দারিদ্র্য, অন্ধকার, অশ¬ীলতা। ঘরের পেছনে মানুষের গু পড়ে থাকে বলে ঘর থেকে বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না। সে গাঁয়ের কেউ স্কুলে যায় না। কেবল আমি যাই। আর যায় আলাল। আলাল তো আমার বড়। খালি মারে। দেমাগ দেখায়। আমার সাথে ওর পোষায় না। তাতে কী? দশগাঁয়ে আমার মায়ের নামডাক। পাড়ার নানা বয়সী মেয়েরা আমাদের আঙিনায় হেলে পড়া কাঁঠাল গাছের নিচে ভিড় করে। কল কল করে কত কথা কয়। হাসে। কাঁদে। পরচর্চা করে। ফায়সা বকে। পান চাবায়। আমি মাটির বারান্দায় বসে মাটিতে দাগ কাটার ছলে সেইসব ধ্বনি-সর্বস্বতার দিকে কান পেতে থাকি। কেউ আদর করে কথা বলতে এলে পালিয়ে যাই। আলালকে আমার কী দরকার!
খালি হালি বু’কে এড়াতে পারি না। হালি বু’ অনেক মোটাসোটা। ভারী তার পাছা আর বিরাট তার বুক। কোমর দোলায়ে দোলায়ে নাচে আর গীতের বোল তোলে হাফাতে হাফাতে। বুকের ভেতরে কেমন একটা করে ওঠে। টানা টানা সুর। নির্দিষ্ট দুই তিনটা মাত্রার প্রয়োগে দুলে দুলে ওঠা মানবদেহের বিচিত্র ভঙ্গিমার মাতাল ঢেউ। এরকম সবাই হয় না কেন? কেন গাঁয়ের মেয়েদের মুখে শুধু ক্ষুধা আর না-পাওয়ার গল্প! আমডারায়। আর হালি বু’র নামে ছড়ান কুকথা! গীতের সুর আর নাচের ঠাট তার দেহে ঝলকে ওঠে বলেই তাকে কেন গাঁয়ের বিচ্ছিরি দেঁতো মানুষেরা নটী বলবে! কুকিকালিদাশের ওয়ালমেছ মামাও কিন্তু আমনের ক্ষেত নিড়াতে নিড়াতে  হঠাৎ উঠে কোমরের গামছা দিয়ে ঘোমটা বানিয়ে, আঁচল বানিয়ে নেচে ওঠে। তার নামের আগে কোনোদিন নটী বলা হয় নাই। হালি বু’র নামে কথা বলা তাহলে কী রীতি? প্রথা? মেয়েরা নাচলেই যত দুন্নাম হবে? লোকেরা জমি-জিরাতের আইল ঠেলে ঠেলে পরের জাগায় ঢুকে গেলে ‘ক্ষ্যামতাআলা’ হয়ে ওঠে! একটু নাচ দেখাও তো দেখি কেমন মরদ তুমি, শোনাও একটা গীত দেখি কেমন ক্ষ্যামতা তোমার ধানের ভাতের! এইসব কথা জমা থেকে যায় বুকের ভেতরে। কেন জমা করে রাখতাম, জানি না। আলালের দেখাদেখি, আমিও গাঁও থেকে হেঁটে হেঁটে তিন মাইল দূরের শহরের স্কুলে যাই। শহরের ছেলে-মেয়েগুলোর চেহারা সুন্দর! কথা বলে স্টাইল করে। জামা-প্যান্ট পড়ে বাহারি ডিজাইনের। আমি পারি না। নতুন জামা অলৌকিকভাবে পেয়ে গেলে গায়ে চাপাতেই শরমে গুটিয়ে যাই। আব্বার ফুলপ্যান্ট কেটে হাফপ্যান্ট বানায়ে নেই। সবাই হাসে। আমি শুনি না তোদের হাসি হে! যত পারিস হাসাহাসি করে নে। আমার তাতে বাল হইল। আমি স্কাউট করব। তোরা হাসতে থাক। আমি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কবিতা পড়ে নিজেই একটা কবিতা লেখছি, তোদের দেখাব না। সিদ্দিক স্যারকে চুপ করে দেব। আরে কী কাণ্ড! সিদ্দিক স্যার তো সেইটা ছাপায়ে দিল। আমি লেখলাম আমার কথা আর কী বলবো/ যখন বুকের ভেতরে বাজতে থাকা কথা/ শুনতে শুনতেই দিন চলে যায়… হা হা হা, এমনভাবে নকল করলাম কবিতায় আর কী লিখবো/যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম…। সিদ্দিক স্যারও বোঝে নাই আমার নকলবাজি। ছাপায়া দিছে। আর আমার নাম ছড়ায়ে গেল স্কুলে। ঠিক তখনই আমার আমডারা গাঁয়ে অগ্নিকাণ্ড হলো। ছাই হয়ে গেল উঁচু বারান্দাওয়ালা আমার কাঠের বেড়ার স্নিগ্ধ বাড়িটা। কাঁঠাল গাছের ছায়াটা ছাই হলো।
আমি আবার কুকিকালিদাশ গাঁয়ে। আমার কী মজা! কুকিকালিদাশে প্রত্যেক সন্ধ্যায় কীর্তন শোনা যায়। যাত্রা-সার্কাস হয় গাঙনগরের মেলাতেও। কুকিকালিদাশের ছেলেরা সুন্দর করে কথা বলে। মেয়েরা পয়-পরিষ্কার থাকে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সন্ধ্যার আবছা আলোয় আব্বা এসে আমাকে নিয়ে চলে যায় উত্তর সীমান্তের বন্দর রাণীশংকৈলে।
আমি পাল্টে যেতে থাকি সেখানে। হাতের কাছেই পত্রিকার দোকান। সেখানে নবারুণ, সচিত্র বাংলাদেশ, রহস্য পত্রিকা, শিশু শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, রোমেনা আফাজ, মাসুদ রানা, অনুবাদ, বিজ্ঞান না কোরান আরো কত কী! আমি পড়ি। আব্বার কষ্টের টাকা নষ্ট করি বই কিনে। সীমান্ত ঘেঁষা নেকমরদ হাট থেকে ভারতের অ্যাভন সাইকেল একটা কিনি একদিন। তাতে চড়ে সাাঁওয়াল পল্লি, ওরাঁও পল্লি, মালদইয়া পাড়া, রামরাই দিঘি, শালবন চষে বেড়াই। বন্দরের যুবসংঘে নাটক করি। আর প্রেমে পড়ে যাই বেলি আন্টির! একই বিল্ডিংয়ের বেলি আন্টি। তিনি আমায় আদর করেন আর আমি গলে গলে তছনছ হয়ে যাই। কাউকে বলা যায় না সে কথা। তাই লিখি। লিখে লিখে সরকারি কোয়ার্টারের পেছনের শিবদিঘির জলে ভাসিয়ে দিই। একদিন আমার লেখা একটা পাতা দিঘির জলে না গিয়ে উড়তে উড়তে পড়ে মুনসেফ আঙ্কেলের বাবরি চুলের উপর। হাত দিয়ে মাথার ছাদ থেকে নামিয়ে সেটা পড়ে তিনি মুচকি হাসেন। বলেন, ‘লেখ বেটা, ভালোই হচ্ছে’। আমি লজ্জায় আর কোনোদিন লিখি না। আবারও তো উড়ে উড়ে কারো হাতে পড়বে। হায় হায় আমার গভীর গোপন জীবন তো জেনে যাবে মহাবিশ্ব! সমাজ আমাকে শিখিয়েছে সত্য প্রকাশ না করতে। আমার খাতার ছেঁড়া পাতাগুলোতে আমি যে বানিয়ে লিখি না। রবীন্দ্রনাথ কি বানিয়ে লিখতেন? রবীন্দ্রনাথের কী কপাল যে ‘পোস্টমাস্টার’ লিখে তাকে লজ্জা পেতে হয় নি। চিঠিপত্তরগুলোতে কত সুন্দর করে মনের কথা বলেছেন তিনি। লজ্জা তো দেয় নি কেউ তাঁকে। সেগুলো পড়তেও তো কেউ লজ্জা পায় না। মুনসেফ আঙ্কেলের রঙিন টেলিভিশনে রেখা যখন নাচে নাভীতে ঢেউ তুলে, কেউ আমরা সে নাচ দেখতে তার ঘরে গেলে তিনি লজ্জা পান না। কিন্তু আমি যে তুচ্ছ বালক, মনের কথা প্রকাশ করতে শরম পাই; আমি আর লিখব না তাই। রবীন্দ্রনাথকে কেই বা সামনা-সামনি চেনে! কাজী আনোয়ার হোসেন রানা-সোহানার যে বিবরণ দেন তাতে তাকে কেই বা দোষ দেবে, তিনি তো লেখক। আমি কি করে এসব লিখব! আব্বা জানলে মারবে! আর লিখব না তাই। না, লিখি নি। যতদিন না রংপুরের লিজি আপা আমাকে একদিন অভিযাত্রিক্ল-এ নিয়ে যায়। সেখানে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতোই একজন আছে। নাম তাঁর শহীদুর রহমান বিশু। তিনি আমাকে প্রতি শুক্কুরবার দাওয়াত দেন। লিজি যদি না-ও যায় তবু যেন আমি যাইজ্জএইসব বলেন। সেখানে আরজু যায়, ইঝন যায়, জিপশি যায়, রুবি যায়। মাথা নিচু করে বসে থাকতে হয় না সেখানে আমডারার মতো। মনে তখন মাসুদ রানা হওয়ার স্বপ্ন। রানা মাসুদকে একদিন সে কথা বলি। জিমনেশিয়ামে যাই। জুডো-কারাত করি। জেড.এইচ.খান টিপু তো আমার কাছে মাসুদ রানাই। তার বান্ধবী রুনিই তো আমার দেখা বাস্তব সোহানা। তাদের নিয়ে পদ্য লিখে বিশুদা’কে দেখাই। তিনি আবার সেটা আসরে পাঠ করতে বলেন। তাই নিয়ে বিজ্ঞ লোকের মতো আলোচনা করেন জুয়েল মমতাজ (হায় এই লোকটা এখন নানান কোম্পানির হিসাব পর্যবেক্ষণ করতে করতে অন্ধ হয়ে গেছে!) আমার কালো মুখটাও শরমে লাল হয়ে ওঠে। কবিতাচর্চা কম হয় নি। কিন্তু একটাও কবিতা লিখতে পারি নি আমি। অলঙ্কার, উপমা, মেটাফোর, চিত্রকল্পজ্জসব ছুঁয়ে দেখি, কিন্তু কবিতার মায়াবী শরীর ছোঁয়া হয়ে ওঠে না। ছুঁতে চাইও না। আমি বড়বেশি সরাসরি বলতে চাই। কিন্তু ক্যামনে? বললেই কে শুনবে? পড়বেই বা কেন আমাকে? আমি কি আর ইলিয়াস নাকি যে আমার লেখা ছাপবে? হাসান আজিজুল হককে যেদিন প্রথম দেখলাম মনে হলো, আরে, কী আশ্চর্য, কালো, কৃষকের মতো সরলমুখের সাদামাটা পোশাকের এই লোকটাই এত বড় লেখক! কথাশিল্পী! তাইলে যেকেউ লিখতে পারে! লিখতে গেলে নাম লাগে না, চেহারা লাগে না, বংশশক্তি লাগে না, পলিটিক্যাল পাওয়ার লাগে না, জমিদারি লাগে না, দারিদ্র্য দ্বারা মহান হওয়া লাগে না, শোষিত, শোষক কোনো পরিচয়ই তো লাগে না! লিখলেই কেউ এসে পড়বে এমনটাও তো সবসময় লাগে না। বাহ! বাহ! ওয়ালমেছ মামাও আসলে লেখক। হালি বু’ও লেখক। কেউ তাদের জানুক আর না জানুক। তুলোট কাগজের উপর যারা মন্ত্র লিখে দশগাঁয়ে পণ্ডিত হিসেবে খ্যাত ছিলেন তারাও তো বড় বড় লেখক। আমিও লিখবো। কিন্তু কাউকে কবো না। নিজে থেকে দেখাবো না। কেউ বললে অবশ্য…
রাশেদ কাঞ্চন হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন আমার ভেতরের অস্থিরতা। বলে¬ন একটা গল্প লিখতে। লিখলাম। গল্পের নাম তিনিই ঠিক করলেন। ‘সুখলোকে যাত্রা’। তাদের পত্রিকার নাম শাশ্বতিক। পত্রিকাটা বেরোনোর পর আমি একদিন সম্পাদক আমিরুল ইসলামের (রাবি-র সেকশন অফিসার ছিলেন) টেবিলে গেছি। দেখি কবি আবুবকর সিদ্দিক তার সামনে। কবিকন্যা তৃষা আর বিপাশাকে আমি তখন পড়াই। তো কবিকে দেখে আমি দরোজার আড়ালে অপেক্ষা করতে থাকি। কান খাড়া করে শুনি, আবুবকর সিদ্দিক বলছেন, এই নূরুননবী শান্তটা কে? গল্পটা অন্যরকম লাগলো! ভাষাটা তো নতুন! তবে শেষটা নিয়ে সে আরেকটু ভাবতে পারে, ওকে বলবেন তো, আমীরুল। ততদিনে আবুবকর সিদ্দিকের কুয়ো থেকে বেরিয়ে আমি কয়েকবার পড়ে ফেলেছি। তাঁর প্রবন্ধের ভাষায় আমি কুপোকাত। জলরাক্ষস কেমনে লেখা সম্ভব হলো সেসব প্রশ্ন নিজের কাছেই তুলতে শুরু করেছি। এরকম একজন মহান ¯্রষ্টা বলছেন আমার গল্পটা নাকি অন্যরকম হয়েছে। ভাষাটা নতুন নতুন লাগে। আমি আর আমীর ভাইয়ের টেবিলে যাই না। শরম লাগে। কবি যদি বুঝে যান যে, ওনার মেয়েদের হাউস টিউটরটাই সেই লেখক, সেই ভয়। কিন্তু বেশ একটা রোখ চেপে বসে। এই গল্পটা আমি অনেকবার লিখি। শেষটা নানা রকম করি। আরো কয়েক জায়গায় ছাপতে দেই। সবশেষে সমকালের কালের খেয়াতেও দেই। সে অনেক আগের কথা। কালের খেয়ায় ছিলো রংপুর অঞ্চলের ভাষায় লেখা সংস্করণ। তবু শেষাবধি সে গল্পটিকে আমি ঠিক বইয়ে ছাপানোর উপযুক্ত ভাবতে পারি নি। কেমন করে এই ঘটনা ঘটলো? লিখলাম, সেটা নিয়ে স্বনামধন্য সৃষ্টিশীল একজনের মন্তব্য আড়ি পেতে শুনলাম, তারপর সেটা আবার করতে চাইলাম। এমন একটা কাজ যা করে টাকা হয় না, ভাত হয় না, পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার মতো কিছু একটা পাওয়া পর্যন্ত যায় না!
কিন্তু, তবু, কেন যেন, কীভাবে যেন, আমি লিখে চলেছি। নিয়মিত যে খুব তাও নয়। তবে লিখতেই হয় মাঝে মাঝে। কে যেন বলে ভেতর থেকেজ্জএই লেখ্; যতো তাগিদ থাকে থাকুক রুটি-রুজির, লিখতে বস্। কে যে মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটাতে থাকে মাঝে মাঝে, চিনিও না তাকে! কিন্তু আমি হন্যে হয়ে বসি। না লিখলে যেন গা-হাত-পা চিড়বিড় করে। এসবের মানে কী, সত্যিই আছে কি কোনো গুরুত্ব? আমি কি ছাই জানি নাকি অতশত! আমার রূপকথাগুলো, আমার বস্তুজগৎ, আমার স্বপ্ন, প্রত্যাশা, হতাশা, কাম, ক্রোধ, একাকিত্ব, পরিবেষ্টন, সাহস, দুর্বলতা, ক্ষুধা, রসনা, বাসনা, ভঙ্গি, ভয় সবকিছু একসাথে প্রদর্শন করতেই কি লিখি? বিশেষ কোনো ইচ্ছাপূরণের জন্য? খ্যাতি? অমরত্ব? নাকি নিজের সদাপরিবর্তনশীল ক্ষণস্থায়ী জীবনের সংকট ও সম্ভাবনা মানুষের সাথে ভাগাভাগি করার বাসনা? কেউ কি এইসব অবৈষয়িক আপাত অলাভজনক কারবারের ভাগ নিয়ে কাজের সময় নষ্ট করে আসলে? দুনিয়া তো কেজো লোকে ভর্তি! রবীন্দ্রনাথের ভুলস্বর্গে প্রবেশ করার বাসনা তাহলে কেন হলো? এইসব বাসনা মনুষ্যসমাজে, ক্রমবিবর্তমান সভ্যতার কিংবা অসভ্যতার নানান কালপর্বে কিছুই কি অর্থ বহন করে? টিকে যায় কি কি? মহাকালে কিছুই কি টেকসই? কতটা সময়কালের জন্য? টেকসই না হলেই কি সেটা ভঙ্গুর, ক্ষণস্থায়ী? এ জীবনের মতো? ঠিক জানি না! সম্ভবত জানার চেষ্টা হিসেবে আমি লেখাকে বেছে নিয়েছি! ‘সম্ভবত’ বলতে হচ্ছে, কেননা, আসলেই তো জানি না কেন লিখি!
কী লিখি তা হয়তো একরকম চিহ্নিত করা যায়। সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায় কী না সে প্রশ্ন তুলছি না নিজের কাছে। তবে যায় বটে একরকম। আমার লেখালেখির মধ্যে কতটা আমার নিজের কথা? সাধারণত নিজের দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে যাওয়ারই তো চেষ্টা করি বলে বোধহয়। তবে চেষ্টা করে কি সাহিত্য তৈরি হয়? হয় কখনোসখনো। বেশিরভাগ সময় লিখতে লিখতে মনে হয় একটা কিছু পাচ্ছি। তারপর বিচার করো, আগেও কি এরকম কেউ লিখেছে? হুম, লিখেছে, দেখতে পাচ্ছি। শুনতেও পাচ্ছি। তবে ওটা বাতিল। রিপিটিশন। বাদ দিই। বই পড়ে লেখা কঠিন। আগেরকালের লেখা আবার লিখিত হয়ে যায়। তখন মানুষের কাছে শোনা গল্পগুলো লিখি। জীবন-যাপন, স্বপ্ন কল্পনা, আনন্দ, উল্লাস এই তো। এই বিষয়গুলোর পেছনের যুক্তি বেশি জানি না। যখন বুঝতে পারি মন এইরকম করতে চাচ্ছে। মানে লিখে একটা কিছু প্রকাশ করতে চাচ্ছে। মনকে কষ্ট দিই না তখন। মনের ইচ্ছাটা অবদমিত না রেখে সাধারণ একজন খামখেয়ালি মানুষের মতো ইচ্ছাপূরণ করে ফেলি। বিষয়টা কার কাছে কেমন লাগবে না ভেবেই করি। অথচ এই আমি কী না গুটিপোকার মতো নিজের ভেতরে গুটিশুটি মেরে দুমড়ে-মুচড়ে গড়াতে গড়াতে চলেছি, বাল্যে! কিন্তু ঠিকঠাক স্বপ্নটা, মনের ইচ্ছেটা প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে এমনটা মনে করার সময়ে আমি উপনীত হই নি একবারও। মনের রঙ শব্দ দিয়ে ফুটিয়ে তোলার প্রাণান্ত ক্লেশ শেষে ছোটগল্পের শরীরে, আখ্যানে বেজায় খুঁত ধরা পড়ে। ফলে আর লিখতে ইচ্ছে করে না। শব্দ দিয়ে যে ছবি আঁকতে চাই, যে চিন্তা উগরে দিতে চাই, যে গল্পটা তৈরি করতে চাই বা বলতে চাই, তা হয়ে ওঠে না বলে দিনের পর দিন চুপচাপ বসে থাকি। তারপর হঠাৎ কে যেন মাথায় হাতুরি পেটাতে থাকে। আবার লিখি আচমকা। আবার একই অপূর্ণতা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে থাকে আমার সমস্ত অস্তিত্ব। কিন্তু পূর্ণতায় একবার অন্তত অবগাহনের অদমনীয় ইচ্ছেটা লাফালাফি করে, একই গ্লানি-বেদনার জগতে আমাকে আহ্বান করে। মনে হয়, কী করেই বা কী হয়? লিখে কিছু না হলেই বিশ্বজগতের এমন কী আসে যায়? কিন্তু পারি না আর দূরে সরে থাকতে। এও এক প্রকার প্রেম। কামও। অতএব ফিরে ফিরে আসি লেখার চেষ্টার কাছে। ভয়ে ভয়ে থাকি লেখা হওয়া-না-হওয়া নিয়ে। ভয়কে জয় করা হয়ে ওঠে না। জয় করতে চাইও না আসলে। তাই, নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে দাবা খেলে চলেছি যেন।
আমার তো দুই রকম লেখা। সাহিত্য আর অসাহিত্য। অসাহিত্য লিখি সোজা করে সমাজটাকে, দেশটাকে, দেশের মানুষকে, মাটিকে, মানুষের সামাজিক ভিত্তিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা বয়ান করার জন্য। আর ঐ যে স্বপ্ন, আহা! পরিচিত মানুষগুলো এমন হলে হতো, তেমন চর্চায় লিপ্ত থাকলে হতো; সংবিধানটা অন্যরকম হতে পারতো; কৃষক আর কৃষিমন্ত্রীর একই রকম বাড়ি থাকলে হতো, সাদা-কালো-ধর্ম-অধর্মের অসাড় তর্ক বন্ধ হতো যদিজ্জএইসব প্রকাশের উৎসাহ চরিতার্থ করতে পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতাগুলোর উপর ভর করি। বন্ধুরা এই প্রবণতার নিন্দায় মুখর। তবু মনের বিরুদ্ধে যাই না। মনকে বলি, তোমার কথাই শেষ পর্যন্ত রাখবো। তোমারই চেতনার রঙে নিজের রূপ বিসদৃশ হয়ে উঠলেও আক্ষেপ নেই। মন, তুমিই আমার একমাত্র সর্বময় নিয়ন্ত্রক। কিন্তু এই যে কিঞ্চিত সাহিত্য করি, এর উপরে মনের নিয়ন্ত্রণ সবসময় খাটেও না ছাই। শব্দ আর বাক্য নিজেরাই খানিকটা অটোক্র্যাট আচরণ করে। আমিও মেনে নিই শব্দে নির্মিত আখ্যানের আচরণ। একটা জিনিস লক্ষ্য করি, ক্রমাগত বিশেষণ আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। খুব চাছাছোলা বাক্য তৈরি হচ্ছে। হোক, জোর করে কিছু আরোপ করতে চাই না। শব্দেরা স্বাধীনভাবে সজ্জিত হয়ে যা দাঁড়ায় তা যেমনই হোক, সেটাই আমার লেখালেখি। তাতে কী থাকে আর কী থাকে না তা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে না। প্রতিষ্ঠিত পণ্ডিতদের ছক তাতে না থাকলে আমি কি আর জোর করে ছক বানাতে পারি! মানুষের ভাষা ও চিন্তা কাঠামোর মধ্যে পড়ে কি সীমাবদ্ধ হয়ে হাসফাঁস করে না? আমার তো মনে হয়, করে। প্রমিত, অপ্রমিত, প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, শ্লীল, অশ্লীল, সমাজ-স্বীকৃত বা প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা বর্জিত, ব্যাকরণ সিদ্ধ বা বিশৃঙ্খল, শেষ হয়েও শেষ না হওয়া বা এভাবেও বলা যেত ধরনের কোনো কিছুই আমাকে স্পর্শ করে না। মানুষে-মানুষে সম্পর্কের স্বাভাবিক ধরনের ভেতরেও অসমর্থিত অসহ্য এক ধরন যদি এসে পড়ে, তাতে যা কিছুই আহত হোক, যেই নাক সিটকাক, আমি এর বাইরে যেতে পারি না। সবচেয়ে বড় কথা আমি জ্ঞানী মানুষ নই। সূত্র, সংজ্ঞা, দর্শন, তত্ত্ব, ধর্ম ইত্যাদি জ্ঞান আমার নাই। তাই তা ফলানোও হয় না। কোনো কিছুতে বিশ্বাস যেমন পাই না, ঘোর অবিশ্বাসও পাই না। দ্বিধা আমাকে ঘিরে রাখে। দ্বিধার কোনো পিঠ কোনো এক গল্পে যদি দেখাই তো অন্য কোনো রচনায় অন্যপিঠ ভেসে ওঠে। আমি নিশ্চিত নই কোনো কিছু সম্পর্কেই। এমনকি আমি কেন লিখি, কী লিখি তাও ঠিকঠাক জানি না। তবু লিখি। হয়তো লেখালেখি আমার দ্বিধার আধার। পাঠক আমাকে মন্দ কিংবা ভালো বললেই আমি দ্বিধাহীন হয়ে উঠতে পারি না। শরীরের ভেতরে একইসাথে আমি টের পাই উত্তেজনা ও অসাড়তা, আশার আগুন ও হতাশার গ্লানি, পরিতৃপ্তি ও পিপাসা। সংসার, সমাজের হিসেব, রুটির ধান্দা, রাজনীতির নির্লিপ্ততা ইত্যাদি মাড়িয়ে আমার চেতনার বৈপরিত্যগুলো আমাকে কোথাও তো রাখতে হবে! এগুলো আমি গল্পের ভাঁজে, অগল্পের তলায়, গদ্যের তাকে, অগদ্যের বগলের নিচে রেখে দেই। কেউ দেখতে পায়, কেউ পায় না। কাউকে ডেকে এনে দেখানোর স্পৃহাও জাগে না। কেউ তা তলিয়ে দেখার গরজ বোধ করুক তেমন প্রত্যাশাও করি না। হঠাৎ কেউ আমার লেখায় থুতু দিলে আহত হই না, আমার লেখায় চুমু দিলে শিহরিতও হই না। কেবল নিজের দ্বিধাগুলো নানানভাবে লেখার মধ্যে রেখে দিই, হারিয়ে ফেলি, আবার রাখি, ফেলে দিই, আবার তুলে নেই, আবার…
আমি কি আসলে আমাকেই লিখি? আর নানান জীবনের ফাঁক গলিয়ে খুঁজতে থাকি নিজেকেই? আমার সমগ্র শরীরে লেপ্টে থাকা ত্বকের কৃত্রিম রঙ মেলে ধরি, রাজকন্যার অপার্থিব রূপের ভেতরে মানুষের সমতার প্রতি বিরূপ মনোভাব আবিষ্কার করি, শহর আর গাঁয়ের ব্যবধান উপরে ফেলে হাসি, নারী আর পুরুষের ভিন্নতা অস্বীকার করে চিৎকার করতে থাকি, হালি বু’ আর ঐশ্বরিয়া রাইকে একই আসনে নাচাই, বলি, দেখুন, বিশুদা আর শরৎচন্দ্রে কোনো তফাৎ নাই, মনিরুজ্জামান আর সিদ্দিক স্যার তো আসলে একই ব্যক্তির দুইরূপ প্রকাশ, জীবন সত্য, মৃত্যুও সত্য ইত্যাদি ইত্যাদি। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থেকেই যাপিত হোক লেখক জীবন। কিন্তু আসলে এইসবই আমি বলতে চাই কী না, স্পষ্ট জানি না। আমডারা আর কুকিকালিদাশ ভিন্ন দুটি গ্রাম কী না সন্দেহ হয়। দ্বিধা আমাকে তছনছ করতে থাকে। সুতরাং উদ্ধার পেতে লিখি। কেউ বাধ্য করে না, উৎসাহ দেয় না, নিরুৎসাহিতও করে না। জীবন এরকমই প্রবহমান অজ্ঞতার অশেষ অন্ধকার সুরঙ্গপথ; যার কোনো চূড়ান্ত রেখা নেই; আছে অসীমের দিকে যাত্রা। আসলেই জানি না, কেন জন্মালাম, কেন রিপুতাড়িত হয়ে ক্ষয় মেনে নিয়ে নিজেকে টেনে নিয়ে চলেছি আর মাঝে মাঝে লিখছি।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা