কুমার দীপ’র প্রবন্ধ

সাহিত্যের চিত্র-চরিত্র : প্রতিদর্পণে চিহ্নিত রূপ

বাংলা সাহিত্যের সমালোচনামূলক গদ্যে যাঁদের কলম, এই সময়ে স্বচ্ছলতার নিরিখে অনিন্দ্য; শহীদ ইকবাল তাঁদের অন্যতম। ছোটকাগজ চিহ্ন (অতি সম্প্রতি, ১৪তম সংখ্যা থেকে এটি কেবল সাহিত্যের কাগজ) সম্পাদক, তারুণ্যদীপ্তি অধ্যাপক, মুক্তপ্রাণ ড. ইকবালের চতুর্থ গ্রন্থ সাহিত্যের চিত্র চরিত্র (বইমেলা : ২০০৭), একজন সংস্কৃতিবান বোদ্ধা পাঠকের সমাজদর্শনাশ্রয়ী নিবিড় পর্যালোচনা। মহীরূহ রবীন্দ্রনাথ থেকে মুকুলিত বিষ্ণুবিশ্বাসও তাঁর আলোচনায় সানন্দে দীপ্যমান।
যতদূর জানি, শহীদ ইকবাল রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ নন, রবীন্দ্রধ্যানে সদামগ্নও নন; কিন্তু রবীন্দ্রনাথে তাঁর আকুলতা কিংবা আবিষ্টতার কমতি নেই। ‘সৃষ্টিশীল ভাবুক’-এ তিনি মার্কসীয় দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছেন, অনেকের কাছে অমার্কসীয় বলে গৃহীত, অথচ সর্বপিপাসী রবীন্দ্রনাথকে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যাঁর সৃজিত বারিবিশ্বে বাঙালির মন্ত্রমুগ্ধ অবগাহন; সেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ড. ইকবালের অভিনব উচ্চারণ, ‘রবীন্দ্রনাথ পিতৃদেবের উপনিষদ বা প্রাক্-মতাদর্শের বিশ্বে তোয়াক্কা না করে মূলত নিজের
বিশ্বাসের জ্ঞানকেই গ্রহণ করেছেন।’ অথচ আমরা তাঁকে উপনিষদের সন্তান বলেই জানি– রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞগণ তাই-ই জানিয়েছেন। কিন্তু আজকের এই সাইবার পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ কতোটা প্রাসঙ্গিক? ইকবাল বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা সমকালীন বাংলাদেশে ক্রমাগত বাড়ছে এবং তাঁর উচ্চারণমন্ত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাকে একদিকে যেমন নানাভাবে দলিত করেছে অন্যদিকে তেমনি মাটির কাছাকাছি মানুষদের প্রবল প্রেরণা ও নিঃশঙ্কচিত্ত দান করেছে।’ বহুকথিত এই কথাটির সাথে ঈষৎ দ্বিমত পোষণের সুযোগ আছে বৈকি। কেননা, রবীন্দ্রসাহিত্যে মাটির কাছাকাটি মানুষের প্রবল প্রেরণা ও নিঃশঙ্কচিত্ততার কমতি নেই একথা সত্য, কিন্তু উদ্দিষ্টদের রবীন্দ্রচর্চা কিংবা রবীন্দ্রজ্ঞান যেহেতু প্রশ্নাতীত নয়, সেহেতু দান করার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ হতে পারে।
আর অতুল্য অসাম্প্রদায়িক কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে শহীদ ইকবালের ধারণা অত্যন্ত স্বচ্ছ, তবে তর্কাতীত নয়; বিশেষত, প্রতিক্রিয়াশীলতার কাছে। একথা সত্য যে, নজরুলের যে চেতনা তা ভারত কিংবা পাকিস্তান (তাঁর ভাষায় ‘ফাঁকিস্তান’) নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেই প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু একথাওতো সত্য স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুলকে রাষ্ট্রায়িত করার প্রক্রিয়াটিও প্রশ্নপ্রদায়ী! অসুস্থ বধির বোবা কবিকে নাগরিকত্ব দেওয়া, টুপি পরিয়ে (টুপিত্ব আর টিকিত্ব দুটোই কবির অপছন্দ ছিলো) একুশে পদক প্রদান, কিংবা মৃত্যুর পর তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দানসুস্থ, যথার্থ নজরুলের কাছে এগুলো অকল্পিত। জীবন্মৃত বা মৃত মানুষকে নিয়ে এমন টানাটানিও যেমন অমর্যাদাপ্রসূত তেমনি এতদ্সংক্রান্ত কর্মপ্রক্রিয়াও প্রশ্নসাপেক্ষ। তবু যশীর জন্ম যেমন গো-শালে হলেও জগতে তাঁর মহত্ত্ব স্বীকৃত, তেমনি প্রদানক্রিয়া যেমনই হোত কোটি কোটি বাঙালির কাছে নজরুল প্রাসঙ্গিক আদ্যন্ত জনপ্রিয়, জাতীয় কবি রূপে গর্বিত।
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার মতোই কংক্রিটপ্রতীম গদ্য ‘সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা– বিরূপ বিশ্বের প্রতিবাদ’। যিনি শহীদ ইকবালের গদ্য সম্পর্কে একেবারেই অবিদিত, তাঁর কাছেও আর সন্দেহ থাকে না লেখকের শক্তিমত্তা সম্পর্কে। নিখিল অনিত্যের কবি সুধীন দত্ত, যাঁর কবিতা পাঠের জন্য অভিধান পাশে রাখতে হয়, পাঠোত্তর ভাবনার জন্য বোদ্ধা হতে হয়, দুর্বোধ্যতার কাঠগড়ায় যাঁর কবিতা দূরপ্রাচ্য, সেই শব্দব্রহ্মা সম্পর্কে শহীদ ইকবালের মূল্যায়ন, ‘সুধীন্দ্রনাথের কাব্য জুড়ে যৌক্তিক রোমান্টিকতায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক আবেগের পরিমণ্ডল চোখে পড়ে সেখানে কাব্যের উৎপত্তি এবং উৎপত্তির পরতে যে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব কবিকে কাব্যের প্রতি অনিবার্য করে তোলে, সেটা বোঝাই সবচেয়ে বড় কাজ। বোধকরি এমনটা বুঝলে সুধীন্দ্রনাথ যেমন দুর্বোধ্য থাকবেন না তেমনি তিরিশের অন্যান্য কবিদের মাঝেও নিরর্থক হারিয়ে যাবেন না।’
জসীমউদ্দীনকে নিয়ে লেখা অনুল্লেখ্য গদ্যটির (জসীমউদ্দীন : কবি) পর পুনরায় ইকবালের প্রেক্ষণীয়তাকে চিহ্নিত করা যায় ‘সিকান্দার আবু জাফরের কবিতা : বিরূপ স্বদেশের প্রসন্ন চিত্ররূপ’ পাঠে। বলতে দ্বিধা নেই, এলেখা পড়তে পড়তে আমার পূর্ব ধারণা; যাতে কেবল কথাসাহিত্যালোচনাতেই ইকবালকে স্বচ্ছন্দ জানতাম–তা পাল্টে গেল। কবি ও কবিতার আন্তর্জগতে প্রবেশের অনিরুদ্ধ অধিকার তিনি আদায় করে নিয়েছেন যেন। বিখ্যাত ‘সমকাল’ সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর সম্পর্কে শহীদ ইকবালের প্রত্যয়ী উচ্চারণ, ‘পরিকল্পিত শব্দবুনুনি নয়, নিছক উচ্চারণের অনুরাগ এবং করোটির ভেতরের অভিজ্ঞতাসজ্ঞাত অনিবার্যতা তাঁর কবিতার শ্রেয়জ্ঞান।’ গ্রন্থস্থ শেষ কবিতাগদ্য ‘আবিদ আজাদের কবিতা : সংগুপ্ত কাতরতার অবিনাশী উচ্চারণ’ আবিদের কবিতার ন্যায় মুগ্ধবৎ পড়ে ফেলা যায়। অকালপ্রয়াত আবিদ আজাদ বিষয়ে ইকবালের যথার্থ মূল্যায়ন, ‘গতানুগতিক নন আবিদ, অনেক কবির মাঝে-অনেক কবিতার তোড়ে, তুলতুলে আবেগে ভাসানো কবি নন আবিদ; আবিদ প্রেমকে অর্থহীন বা মৃত্যুকে অর্থহীন করে তুলতে পারেনকিন্তু স্পষ্ট ও পরিষ্কার-জীবন তাঁর আলেখ্য; জীবন তাঁর কাম্য-জীবনকে প্রেমী ও সুখী করে সংগুপ্ত কাতরতার পলে পলে বিশ্বাসের বাঁধনে নিরঙ্কুশ প্রতিষ্ঠা দিতে চান এবং প্রচেষ্টায় স্পর্শ করেনও তা তিনি।’ অবশ্য আবিদকে ‘বড় কবি’ বললেও তাঁর দিকগুলোও তুলে ধরতে ভোলেননি। যেমন, ষষ্ঠ কাব্য ‘তোমার উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?’ (১৯৯৯) তে ‘নিছক প্রকৃতির তরল পিয়াসে আপ্লুত হওয়া ছাড়া’ কোনো নতুন মেসেজ নেই স্পষ্টতই বলেছেন ইকবাল।
কথাসাহিত্য বিশেষত, উপন্যাস বিষয়ক গদ্যরচনায় শহীদ ইকবাল পূর্ব পরীক্ষিত। প্রথম প্রকাশিত কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৯৯)-এ তার প্রমাণ মেলে। একচল্লিশ পৃষ্ঠার গদ্য ‘শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে’ ইকবালের এম.এ ফল প্রকাশের পূর্বেই প্রকাশিত হয়েছিল রাজশাহীর প্রধান দৈনিক ‘দৈনিক বার্তা’য় শুক্রবাসরীয় সাহিত্য পাতায়; ২৯ মার্চ থেকে ১৪ জুন ১৯৯৬ পরিসরে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি; সুবোধ-শ্রীকুমার থেকে কবির-সামাদীসহ অনেকেই অনেক মৌলিক কথাবার্তা বলেছেন, তাই বলে কি বলার কিছুই নেই? আছে। আছে বলেই আলোচ্য প্রবন্ধের অবতারণা। ইকবাল কেবল কাহিনী ভোজনে তৃপ্ত নন; সমাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, বুর্জোয়াবাদ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, ইতিহাস, অর্থনীতিপ্রভৃতি সমাজবীক্ষণের আলোতে কাহিনীর কুশীলবগুলোকে ছিঁড়ে-ফুঁড়ে পরিচয় করিয়ে দেন পাঠকের সামনে। শ্রীকান্ত-রাজলক্ষ্মী থেকে সতীশ-সাবিত্রী-সকলেই শানিত ব্যবচ্ছেদে দীপ্তমান। গদ্যটির দু’একটি চরণ তুলে ধরার লোভ সংবরণ করা যায় না। যেমন, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রথম শতক সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘আমাদের নিদ্রার ঘোরে সাদা মেধাবীরা গড়ে দিয়েছে তাদের সভ্যতা।’
আর শরৎচন্দ্রনির্মিত চরিত্র সম্পর্কে কয়েকটি আচমৎকার উচ্চারণ–যদিও তাঁর হৃদয়বৃত্তির আতিশয্য কিংবা আবেগবহুল সমাজসংস্কার, ন্যূব্জ সমাজনীতি, দুর্বল কমিটমেন্ট নিয়ে সমালোচকদের নানা মত প্রচলিত আছে, তার সত্যতা স্কন্ধে ধারণ করেই বলব–তিনি গণতান্ত্রিক চরিত্রকে প্রমাণ করেছেন।’
শ্রীকান্ত চরিত্রাঙ্কনে লেখকের কৃতিত্বের কথা বলেছিলেন; এ প্রতিভা ‘বাংলা উপন্যাসে খাপে ঢাকা বাঁকা তলোয়ারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হল।’ শেষাবধি শরৎচন্দ্রকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে, ‘শরৎচন্দ্র বড় মাপের সাহিত্যিক। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা উপন্যাসে অবক্ষয়ী সামন্তবাদ, ক্ষয়িষ্ণু সমাজবাস্তবতা, চলমান ব্যক্তির আত্মব্যবচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ মাত্রিকতা পায়। শরৎচন্দ্র এ সময়েরই প্রতিনিধিত্বকারী। তাঁর উপন্যাসে সমাজ এসেছে, সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত নির্মিতি পেয়েছে, ব্যক্তির স্পন্দন ও চলিষ্ণুমানতা প্রাধান্য পেয়েছে। তবে এক্ষেত্রে নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে, সহজেই ধরা পড়ে তাঁর এ চিত্রায়ন খণ্ড খণ্ড ছাড়া ছাড়া গোছের। সামাজিক অবয়ব অসংগঠিত, ব্যক্তি সেখানে স্থবির গতিহীন।’
বিরল কথাকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বিষয়ক গদ্যচর্চায় ড. শহীদ ইকবাল অগ্রগণ্যদের অন্যতম; ইলিয়াস স্পেশালিস্ট। তাঁর প্রথম এবং ইলিয়াস বিষয়ে বাংলার প্রথম একক গ্রন্থ কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর পাতায় পাতায় ইলিয়াসের গল্পোপন্যাস নিয়ে সূচালো ব্যবচ্ছেদের নমুনা পূর্বলক্ষিত। আলোচিতব্য চিলেকোঠার সেপাই : উপন্যাসের আঙ্গিকে ক্ষয়িষ্ণু ব্যক্তি মানুষ’ ও ‘আখতরুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা : স্বপ্নবাস্তবতার চিত্ররূপ’ গদ্যদ্বৈত্যেও মুন্সিয়ানার পরিচয় মেলে। প্রমাণত, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রূপদক্ষ কারিগরের মতো ভাষায় সৃষ্টি করেন প্রাণনা, প্রাণসৃষ্টি এবং তাঁর গ্রন্থপরিকল্পনায় দান করেন জৈবিক জীবনায়নের অনুভূতি। আধুনিক প্রকরণের যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে বসে ঊনসত্তর-সময় এবং হাজার বছরের বাঙালির প্রত্নজীবনাভিজ্ঞতা সাধ ও সাধ্যের সম্ভাব্য বাতাবরণে নির্মাণে প্রয়াস পান।’ কিংবা বাংলা সাহিত্যের অতুলনীয় উপন্যাস খেয়াবনামার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, চরিত্রসমূহের মাটিলগ্নতা, ঔপন্যাসিকের উদ্দেশ্য ও শিল্প নিপুণতা সম্পর্কে ইকবাল বলেন, ‘তাঁর কোন বিষয় উদ্দেশ্য নির্ভর না; কাহিনীর গতিময়তায় সমাজ সুন্দরের প্রেক্ষণ একটা অনিবার্য তাগিদেই যেন চলচ্চিত্রায়ন ঘটে, দৃশ্যপট বদলায়। Anti-Romantic  ভাবনায় ভাষার নিপুণ প্রয়োগে এমন পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণ করেন, যেখানে আগ্রাসী পুঁজিবাদে ক্লিন্ন ব্যক্তি খোলস ছাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে। Expressionist, Surrealist Impressionist ভাবনায়; সংক্ষুব্ধ জীবনজটিলতার মনস্তাত্ত্বিক ইমেজ ব্যাখ্যা হয়। কখনো হ্যালুসিনেশন কিংবা ইল্যুশনের আওতায় ব্যক্তিসত্তার ভিন্নস্বর বেরিয়ে আসে।’
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে, বিশেষত উপন্যাসে শওকত আলীর স্থান শীর্ষসারিতেই। ইতিহাসের এক জটিল সময়কে আরো জটিল প্রকরণে পরিস্ফুটনের যে প্রয়াস শিল্পী করেছেনতাকেই বিশেষায়িত করতে ইকবালের ‘শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন’। উপন্যাসবিষয়ক আরো দু’টি গদ্য-‘রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি : ব্যক্তি মনস্তত্বের নিরীক্ষা’ ও ‘টলস্টয়’র একটি উপন্যাস’। দুটোই সুখপাঠ্য কিন্তু দ্বিতীয়টি গ্রন্থানুসারে অনেকটা বেমানান।
‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অবাস্তব’এই অবিস্মরণীয় শ্লোগানে মুখর বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পৌরহিত্যকারী, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (১৯২৬) এর প্রবাদপুরুষ কাজী আবদুল ওদুদ সম্পর্কে কাজী মোতাহার হোসেন, অন্নদাশঙ্কর রায়, আহমদ শরীফ, আবদুল হক, আনিসুজ্জামান, খোন্দকার সিরাজুল হক–এঁদের মূল্যবান রচনা রয়েছে। শহীদ ইকবালের ‘কাজী আবদুল ওদুদ : প্রসঙ্গ ও পর্যালোচনা’ আমাদেরকে আরো আধুনিকভাবে, প্রগতিশীলতার সাথে ওদুদকে অনুধাবন করতে সহায়তা করে।
একেবারে শেকড়সন্ধানী, সমাজপ্রত্যয়ী শিল্পজিজ্ঞাসামূলক অনুপম গদ্য ‘আমাদের সাহিত্যের জিজ্ঞাসা সূত্র’। সাহিত্যের যারা লেখক, পাঠকসকলকেই জানতে হবে, সাহিত্য কী? সাহিত্য কেন? একটা জাতির জন্যে সাহিত্যের স্থান কোথায়? যাচিতভাবেই ইকবাল বিশ্বাস করেন, সাহিত্যরচনার সূত্রটা আমাদের জীবনের নিরঙ্কুশ বাস্তবতা থেকেই সরাসরি উঠে আসা উচিত, আমদানিকৃত কোনো যাদুপ্রবণতা থেকে নয়। দৈনিক, মাসিক বা মেলাভিত্তিক, জনপ্রিয় বা ফরমায়েশি রচনা শিল্পসার্থকতা তো নয়ই, সমাজের জন্যও মঙ্গলার্থক নয়এ বিষয়ে ইকবাল দ্বিধাহীন। কেননা, ‘অধিকাংশগুলোরই পরিপ্রেক্ষিত নায়ক-নায়িকার শরীর-ছোঁয়া রোমান্টিক প্রেম কিংবা চুমুর গল্প। বর্তমান বেপথু আগ্রাসী ইলেকট্রনিক্স-এর সমাজে মধ্যবিত্ত পরিবারের টিন এজারদের সুড়সুড়ি দিয়ে আঠালো বিকৃত হৃদ্কম্পন ঘটিয়ে কিছু সময় সেন্সশূন্য করে রাখার প্রয়াস।’ কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রার যে জটিলতা, নৈরাশ্যবোধ কিংবা আত্মপরিচয়ের যে সংকটতারই উত্তরণে যেখানে সাহিত্যের কাছে যাওয়া, ‘সেখানে আন্তরসঞ্জাত জীবন চেতনায় শিল্পীর দৃষ্টি যদি নতুন মাত্রিকতা না পায়, অনন্ত জীবনের পথে উৎসাহ না সৃষ্টি করে, প্রকৃত সমাজস্তরের ভিত না কাঁপায়, তবে কিসের সাহিত্য, আর কিসের বা জীবনের সার্থকতা?’
বহু বছরের বহু মনীষীর চিন্তা-চৈতন্যের দ্বারা, মননের বিবর্তন ঘটেছে আমাদের। ঐতিহাসিক কিংবা ঐতিহ্যিক সব বিচারেই আমরা বাঙালি। তবুও বৈপরীত্যের বিষ ছিটাতে চায় যারা, তাদের উদ্দেশ্যে ইকবালের উক্তি, ‘যে অর্জনে অর্জিত হয়েছে আমার দেশ, ভাষা–তা আমার হৃদয় নিঃসৃতি আকুতি, সেখানে মিশে আছে আমার চৈতন্যের, প্রাণনার উৎসের ফুলেল পটভূমিসেটাই আমার জাতি পরিচয় আর বাঙালিত্ব।’
কিন্তু এ নিয়ে এতো দ্বিধা কেন এখন? হাজার বছরের অর্জনকে বা দীর্ঘ শ্রমে-ত্যাগে অর্জিত মননবৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করার অর্থ কী? (মনন চিন্তার বিবর্তনবাঙালি ও বাংলাদেশ)। গ্রন্থের শেষ গদ্য ‘একবিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্য : বিবেচনার ইঙ্গিত-এর সূত্রবিন্দু উনবিংশ শতাব্দী; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর সাহিত্য নিয়ে সত্যই বোধ হয় বলার সময় আসেনি। শহীদ ইকবালও স্বীকার করেন। কিন্তু হতাশাও লুকিয়ে রাখতে পারেন না। বলেন, এখনকার সাহিত্যে যা রচিত তার অধিকাংশ সত্য নয়সত্য পাই না। আমরা উদ্ধৃত পংক্তিমালা চাই যা আমাদের সত্যকে বলবে, আমাদের অন্তরের সত্যকে স্পর্শ করবে; নইলে সাহিত্যের চলে কী করে সাহিত্যই বা বলবো কাকে? তথাপি ঈষৎ বিচ্যুতি সাহিত্যের চিত্র-চরিত্রকে কিঞ্চিৎ নমিত করেছে মাঝে মধ্যে। যেমন, প্রবন্ধানুক্রমে প্রকাশকালিক কিংবা লেখাভিত্তিক কোনো ধারাবাহিকতাই সুলক্ষ নয়। উপন্যাসগদ্যে শরৎ-রবীন্দ্র-ইলিয়াস-শওকত-ইলিয়াস-টলস্টয় কোনো ক্রমিকতা বিধান করে কি? দ্বিতীয়ত, প্রায় সব গদ্যের শুরুই প্রাক্-ভূমিকা সজ্জিত; যা প্রায় একই কিংবা গতানুগতিক, কখনো বা বিরক্তি উদ্রেক করে বৈকি! ‘শতাব্দীর সমান বয়েসী সুধীন্দ্রনাথ’ কিংবা ‘উপন্যাস শিল্প সামন্তবাদ থেকে বুর্জোয়া উত্তরণের ফসল’এ জাতীয় কথামালা হাজির হয় বারবার। তৃতীয়ত, বাংলা সাহিত্য সমালোচনার অন্দরমহলে ‘টলস্টয়’র একটি উপন্যাসকে বৈমাত্রেয় মেনে নিলেও ‘থিয়েটার চর্চা এবং তার দায়বদ্ধতা’ গদ্যটি একেবারেই অনাত্মিক মনে হয়। চতুর্থত, ১৯৯৬ থেকে ২০০৫, দশ বছরব্যাপী প্রকাশিত গদ্যগুলো বৈবর্তনিক প্রক্রিয়াতে ভিন্ন ভাষা বৈশিষ্ট্যে উপস্থিত।
এতদ্সংক্রান্ত নেতিবাচকতা সত্ত্বেও সাহিত্যের চিত্র-চরিত্র গভীরে অনুধ্যানের দাবি রাখে। বিশেষত, ‘মার্কসবাদী ক্রিটিসিজমকে আয়ত্ত করবার প্রাণান্ত চেষ্টা’য় নৃতাত্ত্বিক সমাজবীক্ষণের প্রেক্ষাপটে, যুক্তিপূর্ণ শিল্পপ্রেক্ষণের পূর্ণতটে, শহীদ ইকবারের গদ্য স্বচ্ছতোয়া নদীর মতো; পিয়াসী পথিক সেখানে সহজেই হতে পারে অপ্লুত, তৃপ্ত অতঃপর পরিণত। সমাজকে ধারণ করে সাহিত্য; যাকে আমরা দর্পণ বলি– সেই দর্পণেরই প্রতিদর্পণ রচনা করেন ইকবাল। তাঁর গদ্য শুকনো খটখটে নয়, রস আছে সেখানে। গদ্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কবিতা, বিশেষত রবীন্দ্রকবিতার সুর, ঝংকৃত হয় কৃতবিদ্য ইকবালের কলমে। যদিও একই গ্রন্থে ভিন্ন সুরের দ্যোতনা মেলে, কিন্তু তা কেবল রচনাকালিক ব্যাবধানের কারণে। এবং এই ভিন্নতা লেখকের ক্রমবিবর্তনের পরিচায়কও। এ যদি ব্যাহত না হয়, একজন ঋদ্ধ গবেষক অধ্যাপকই শুধু নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতির অবারিত এক গদ্যশিল্পীকেও শিরধি করবো নিশ্চয়।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা