ক্রো ড় প ত্র

এ সময়ের গল্প ও গল্পধারার ঐতিহ্য

আলাপচারিতা
হাসান আজিজুল হক

হা. আ. হ. : মুশকিলটা হলো এই জায়গাটায়, নিজের জীবনের কথা নিজের মুখে বললে কতোটা বস্তুনিষ্ঠ হয়, অথবা যা বলতে চাই তার উল্টো একটা মানে হয়ে যায় কিনা, এমন কিছু কিছু বিষয়ে আমি কথা বলতে অসুবিধে বোধ করি। কিন্তু অনেক বিষয়ে আমি স্বচ্ছন্দে  বলতে পারি, বলা যেতে পারে যে ফ্যাকচুয়াল আর কি! আমি সেখান থেকেই শুরু করছি। বাংলাদেশের মানুষ একটু পেছনে ফিরবেই। তার জন্মস্থান গ্রামে এটাই সে প্রথমে দেখতে পাবে। হয়তো কলকাতা শহরে এটা দুশো বছর পুরনো হয়ে গেছে। তবু গ্রাম, কলকাতা শহর তিনটি গ্রাম নিয়েই হয়েছিলো। ঢাকা শহর যে গ্রাম ছিলো সেটা তো আমি নিজের চোখেই দেখেছি। এখনকার বাড্ডা-টাড্ডা এক সময় গ্রামই ছিলো। আমাদের গ্রাম সে ছিলো এক অজপাড়াগাঁ। ‘অজ’ মানে একেবারেই যাকে বলা যায় যে যার নাম নিশানা কেউ জানে না। এককথায় কোন নিভৃতে কোন গ্রাম পড়ে আছে তার খোঁজ কেউ জানে না। আমার জন্মও তেমনি এক অজপাড়াগাঁয়েই। এই অজপাড়াগাঁয়ের একটু পরিচয় না দিলে আমার কথাটা ঠিক বোঝা যাবে না। প্রথম কথা হচ্ছে যে, রাঢ় এমন একটা জায়গা যেখানে বলা যায়, সতেজ, ভেজা মাটি, গাছপালা, খাল-বিল, নদী এসব জিনিস সেখানে অনুপস্থিত। এটাকে ‘খরা’ এলাকা বলা হয়ে থাকে। একটা সময় সরকারকে এমন চাপে পড়তে হয়েছিলো যে সরকারকে তখন ‘দামোদর ভ্যালি পরিকল্পনা’ নিতে হয়েছিলো, গোটা এলাকা জুড়ে খাল খুঁড়তে হয়েছিলো। এই খাল খনন আমরা চোখের সামনেই দেখেছি। এবং তখন এও দেখলাম যে আমার জমিটা যেনো খাল-খননের ভেতরে না পড়ে এজন্য একে ওকে ধরা। সব মিলে শেষ পর্যন্ত বড় খাল খনন করা হলো এবং নানান জায়গায় গেট করা হলো। ওই যে স্লুইচ গেট, যেগুলো সব সময় খোলা থাকতো। বড় খাল থেকে আবার ব্রাঞ্চ লাইন করে এদিক ওদিক সরু খাল খনন করা হয়েছে। যখন জল ছাড়ার প্রয়োজন হতো তখন জলকপাটগুলো খুলে দেওয়া হতো। তখন মূল খাল থেকে সব দিকে জল ছড়িয়ে যেতো, ফসল-টসল ভালো হতে লাগলো। আমাদের আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো না। খুব খরা এলাকা আমাদের জায়গাটা আর কি। মানুষও খুব খরখরে, খরখরে মানে ওই জায়গা থেকে যে, কেউ বলে উচিত বক্তা, কেউ বলে রূঢ়ভাষী। ঝগড়াঝাটির ক্ষেত্রেও একই কথা। মানে বেশিক্ষণ মুখ চালাতে পারে না, তার মধ্যে একটা হাত চলে আসে। আমাদের গ্রামটা মুসলিম প্রধান নয়, হিন্দুপ্রধান গ্রাম। সেখানে মুসলিমরা মাত্র দশ-বারো ঘর হতে পারে। সত্য কথাই বলতে হবে যে, দশ-বারোটি পরিবার ছিলো তার ভেতরে একটা-দুটো পরিবারই ছিলো যাদের উল্লেখ করা যেতো, আশেপাশের গাঁয়েও মূল্যায়ন করতো, তার একটা বাড়ি আমাদের। তখনকার সময়ে আমাদের এলাকার পরিস্থিতি হলো— সম্পূর্ণ নিরক্ষর, সম্পূর্ণ আধুনিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এটা ঠিক কল্পনা করা যাবে না যে, ‘কেউ পাঠশালায় যেতো না’। আমাদের ফ্যামিলিতে আমরা দুই ভাই যেতাম। সেই একটা ভাই আবার ক্লাস এইট-নাইনে উঠে হারিয়ে গেলো। আমি— জানি না— কেমন করে ছ্যাচরাতে ছ্যাচরাতে উতরে গেলাম। এবং খুব অল্প বয়স থেকে সাহিত্যের প্রতি টানটা যে কোথা থেকে এলো সেটা বলতে পারবো না, ব্যাখ্যাও করতে পারবো না। তবে এটা বলতে পারি যে, অনেক কিছুই আমার ভালো লাগতো। বিশাল মাঠ, বাড়িতে বসে থেকেও মনে হতো যে বিশাল মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তো এমন দিবাস্বপ্ন নিয়ে আমার অনেক সময় কেটে যেতো। আর ওই এলাকায় একেক সময় একেক রূপ। যখন শরৎকাল তখন কি অসাধারণ যে সবুজ, সমস্ত ধান তখন এতো এতো বড় হয়েছে, তুমি বাইরে বের হলেই দেখতে পাচ্ছ যে সবুজ ধানের মাঠ, যতোদূর তোমার চোখ যায় শুধু মাঠই দেখতে পাবে। আর মাঠে যে আলগুলো বেশি ব্যবহৃত হয় সে আলগুলো সাদা, সে সাদাটা হচ্ছে পথ, আর দুইপাশে সবুজ ঘাস। আমার শৈশবস্মৃতি আমার জীবনে খুব প্রভাব ফেলেছে। এক্কেবারে সাধারণ বাড়ির মানুষ বলতে যা বোঝায়, তাদের সঙ্গে খেলাধুলা থেকে শুরু করে তাদের সাথে সব কিছু, মানে আমার ভেতরে কোনো আলাদা বৈশিষ্ট্য বলতে কিছু কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। আমাদের ভেতরে একটু পড়াশোনা ছিলো। আমার বড় বোন বর্ধমানে একটা ভালো গার্লসস্কুলে পড়তেন। বড় ভাই যিনি, তিনি তো মারা গেছেন। এরা তখন শখে পড়াশোনা করেছে। তাই বলে এদের বাবারা কি টাকা দিতো না? আমার বাবা তো রীতিমতো টাকা দিতো। আর কাউকে কিছু দিক না দিক, ছেলে-মেয়েরা যখন লেখাপড়া করছে, তবে স্কুলে না, স্কুলের ব্যাপারে আমার বাবা তো খুব কঞ্জুস। স্কুলে আমাদেরও একটা ইয়ে ছিলো, মনেন্দ্রবাবু প্রত্যেক দিন আমাকে বলতেন এই কাল থেকে স্কুলে আসবি না। আমার এখনো মনে আছে সদ্য চা খেয়ে মুখের— মানে যে একদম চমৎকার একটা চায়ের গন্ধ মেখে মুখে নতুন যে হেডমাস্টার এসেছিলেন তিনি বললেন শোন, তোকে বৃত্তি দিয়েছে, মুসলমানদের জন্য আলাদা কি এক সিডিউল থাকে সেখান থেকে বৃত্তি পেয়েছিস, বেতন দেয়া লাগবে না। এটা না হলে কি হতো আমি তা জানি না। হয়তো চালিয়ে যেতাম, যেভাবেই হোক, কিন্তু ব্যাপারটা ওরকমই ছিলো আর কি! লেখাপড়ার গুরুত্বটা তখন একেবারেই ছিলো না। এবং আমাদের পুরো গ্রামে, শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে, পুরো গ্রামে আমিই প্রথম গ্রাজুয়েট হিন্দু-মুসলমান মিলিয়ে। হিন্দু নব্বুই ভাগ। স্কুলেও তাই, স্কুলে আমরা দুজন মাত্র স্কুলে যাই, আর বাকি সব হিন্দুদের, পুরো এলাকা হিন্দু অধ্যুষিত। শুধু একটা ডোমদের ছেলে ছিলো, আর একটা হাড়িদের ছেলে ছিলো। এবং অসম্ভব রকমের নিরক্ষর, আর মুসলমানদের নিয়ে যা কিছু খারাপ ধারণা আছে, সেগুলো মুসলমানরা সত্য বলে প্রমাণ করেছে। এমন নোংরা, মুরগী পোষা, যত্রতত্র মুরগীর বিষ্ঠা, গরুর হাড়, এখানে পড়ে আছে ওখানে পড়ে আছে। একদিন দুদিন পর পর গরু জবাই হচ্ছে, আর সেই গরু জবাই সকলের সামনে হচ্ছে। গরু মরে গেলে তারপর শকুন আসছে। এ একটা ব্যাপার, ওই গ্রামটাতে ঢোকা যেতো না। ঢোকার আগেই নাকে এসে গন্ধ লাগতো। মারামারিও হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে এপাড়া ওপাড়া। মারামারির বিষয় হচ্ছে তোদের মসজিদে আমরা নামাজ পড়তে যাবো না, আমরাও একটা মসজিদ করবো। একবার হাত ভাঙ্গা নিয়ে মামলা চলছিলো, মানে কি বলা যায়, ওই এলাকায় একজন বিশিষ্ট মানুষ ছিলো, খুব লেখাপড়া জানতো তা না, কিন্তু তাঁকে দেখে মনে হতো এর মতো বিদ্বান, এর মতো জ্ঞানীমানুষ যেন সত্যি সত্যিই নেই। তিনি নেতৃত্ব করতেন। ষোলোটা বছর তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, একটানা। তারপর বিভিন্ন মামলায় যে জজদের ডাকা হতো। মানে গ্রাম থেকে একটু যারা জ্ঞানীগুণী লোক, তাদের ‘জজ’ হিসেবে ডাকা হতো শেষ রায়টা দেবার জন্য, এথেন্সের বিচার ব্যবস্থার মতো আরকি! এটা ওভাবেই ঠিক হতো, শেষ বিচারটা জজদের রায়ের উপরেই নির্ভর করতো। বাবা সে জজ বোর্ডের সদস্য ছিলেন। বাবা আদ্ভুত মানুষ ছিলেন। হোম গার্ডেনে আলাদা একটা শিক্ষা দেয়া হতো, মানে সেল্ফ ডিফেন্সির জন্য, উনি সেটাও নিতে গেলেন আর কি! তিনি খুব চমৎকার, মানে তারাশঙ্কর জাতীয় লোক যেভাবে গল্প বলতে পারতেন ঠিক সেইভাবে কথা বলতে পারতেন আর কি! কথা সেভাবেই বলতেন, খুব নিচু স্বরে, শুদ্ধ উচ্চারণে, এবং কোনোরকম মুদ্রাদোষ ছাড়া। এ জন্যে তার বাইরেও খুব সুনাম ছিলো। আর নানান রকমের পরোপকার, আমি বললাম না যে রাস্তাটা সিঁধে হবে না বাঁকা হবে, ওই যে ছোট লাইনের ট্রেন ছিলো, বর্ধমান থেকে কাটোয়া, আমাদের লাইনটা, আবার কাটোয়া থেকে আহমদপুর, ওই ছোটো লাইন দিয়ে আর কি। তো আমাদের স্টেশনে নেমে আমাদের গ্রাম পর্যন্ত, তার মাঝখানটাতে চাড়ালগোরের গাছটা— এখানে এসে আমরা খানিকক্ষণ বসে রেস্ট নিতাম। আর সেখানে ছিলো নিকোবাবুর দোকান। যতো রকম জিনিসপত্র সারা মাসের জন্যে বাড়িতে আনতে হতো। আমি আর আমার ওই ভাই। আমরা ওইখানে বসে বলতাম, যা যা দিয়েছো সমান পরিমাণে নিয়ে যেতে হবে তার তো কোনো কথা নেই, অন্তত তাল মিসরি। তাল মিসরির ভেতরে সুতো লাগানো, সেই তাল মিসরি খসে পড়ছে, ওখানে বসে খাওয়া দাওয়া হতো। মানে একেবারে নিরুপদ্রুপ, এবং স্বাধীন একটা যাপন। বাবা খোঁজও নিতেন না, মা তো খোঁজ নিতেনই না। পাঁচ চাচি, মা-সহ, তারা সন্ধ্যেবেলা খেতে বসতেন আর আমরা তখনো পিঠের উপরে গিয়ে উপদ্রুপ করছি। মা তখন তিন গ্রাস খাচ্ছেন, আর এক গ্রাস ভাত ঘুরিয়ে আমাদের খাইয়ে দিচ্ছেন। তাদের শান্তিমতো খেতেও দিতাম না। আর দেখতেন আমার এক ফুপু। এই ফুপুর মতো দরদী মানুষ— আমার দশটা মায়ের ভূমিকা পালন করেছে সে। আট বছর বয়সে বিধবা হয়েছেন, ভায়ের বাড়িতে চলে এসেছেন, বিয়ের কোনো কথা নেই। তখন মুসলিম বিধবা বিবাহের চলটা ছিলো না। বহু বিবাহের চল একেবারেই না। আমাদের ওখানে কারো দুটো বউ ছিলো না। কোনো মুসলমানেরও দুটো বউ ছিলো না। বিধবা হবার পরে আবার বিবাহ হয়েছে, এটাও ছিলো না। বিপত্নীক বিয়ে করেছে, সেটাও খুব কম। স্ত্রী মরে গেছে আরেকটা বিয়ে করি, সেটাও ছিল না।

চিহ্ন : এখানে একটা জিনিস, গ্রামটা তো আমরা ‘শকুন’ গল্পটার মধ্যেও দেখেছি এবং সম্প্রতি সাবিত্রী উপাখ্যান তো পড়লাম। তো ওই বর্ধমান, কাটুয়া, ধারসোনা এগুলো তো পাচ্ছি এখানে। তো এখানে তো স্যার একটা জিনিস— বগুড়া পর্যন্ত আপনার যে কানেকশান, স্টোরিটা তো বগুড়ার দিকেও গেলো কিছুটা— এটা কিভাবে ঘটলো?

হা. আ. হ. : বগুড়ার নাম তো ছোটবেলায় শুনেছি। কটা গ্রামই বা চিনি, এমনকি আমাদের পাশের গ্রাম গোবর্ধনপুর, একটু দূরে হচ্ছে বামনগ্রাম, ক্ষীরগ্রাম, যেখানে একটা মেলা হতো। আর ওদিকে নিগন, এই আশেপাশের কিছু গাঁ সম্পর্কে জানতাম। বিচিত্র গ্রামও অনেক ছিলো। তারপর তোমার একটা গ্রামের নাম ছিলো নাসিগ্রাম। সেখানে নব্বইভাগ হচ্ছে আগুড়ে হিন্দু। আগুড়ে হিন্দু মানে অত্যন্ত উগ্র ক্ষত্রিয়। তাদের গায়ের রং সাধারণত ফর্সা হয়, তাদের মেজাজটা খুব উগ্র। আমাদের গ্রামেও কিন্তু আগুড়ে ছিলো, কিছু উগ্র ক্ষত্রিয় ছিলো, আর বাকিটা ছিলো তিলি সম্প্রদায়ের লোক। আর আমাদের গ্রামে মহারাজা বনেন্দ্রনন্দী, কাশিমবাজারের মহারাজ যিনি, উনি কিন্তু তিলি সম্প্রদায়ের লোক। ফলে, তার সুন্দরী পাত্রি জোগাড় করতে খুব অসুবিধে হয়েছিলো। কারণ উচ্চশ্রেণি থেকে তো তিনি বউ নিতে পারবেন না। বামন কায়স্থ থেকে তো তিনি বউ নিতে পারবেন না। তিলি সম্প্রদায় থেকেই নিতে হবে। তিনি প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক ছিলেন তো। উনি খুঁজতে খুঁজতে ছোট একটি মেয়ে পেয়ে গেলেন খুবই সুন্দরী ওই তিলি সম্প্রদায়ের। তাকেই উনি বিয়ে করেছিলেন, নাম হলো কাশেশ্বরী। আর কাশেশ্বরী আমার দাদির সখী ছিলো। সে জন্যেই আমাদের গ্রামে কিছু সুবিধে হয়েছিলো। একেবারেই অজপাড়াগাঁ, রাস্তাঘাটের অবস্থা একেবারেই খারাপ ছিলো। যেহেতু মহারাজার বিয়ে হয়েছে, গ্রামে শিবমন্দির হয়েছে তিনটে। পাকা উঠোনওয়ালা, বিশাল সিঁড়িওয়ালা, সেখানে গায়ের সমস্ত মেয়েরা বসতে পারতো। তার মধ্যে একটা মন্দিরে পুজা হতো, আরেকটা মন্দির বন্ধ থাকতো, আরেকটা মন্দিরে কুকুরের বাচ্চা হতো। কিন্তু কুকুরের বাচ্চা এক বছরের বেশি টিকতে পারতো না। এতো আদর তাদের দেয়া হতো, এতো আদর তারা সইতে পারতো না। যাই হোক, তারই পেছনে ছিলো একটা কুঁড়েঘর, সেখানে একজন বাস করতেন। সেই বাড়ির মেয়ে হচ্ছে কাশেশ্বরী। কুঁড়েঘর মানে মাটির বাড়ি, এখানেই কাশেশ্বরীর জন্ম। এই কারণেই তিনি যখন বিয়ে করলেন, তিলি সম্প্রদায়ের উন্নতি করার জন্যে ‘বঙ্গীয় দ্বাদশ তিলি সম্প্রদায়’ বলে তিনি একটা সংঘবদ্ধ সম্প্রদায় তৈরি করেছিলেন। একশ ছেলে তিনি পড়িয়েছিলেন। তিলি সম্প্রদায়ের জন্যে আলাদা জায়গা করে দিয়েছিলেন। আমার বাবাও সেখানে কিছুদিন ছিলেন। বাবার সাথে ওই মহারাজার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো। সে জন্যে যারা মহারাজার আত্মীয় ছিলো, তাদের সাথে আমাদেরও আত্মীয়তা হয়েছিলো। যেমন ধরো ননু কাকা বলে আমাদের একজন ছিলো, মহারাজার ভাগ্নীর ছেলে। তো উনি গ্রামে শিবমন্দির করে দেওয়া, স্কুল করে দেওয়া, আর তার সাথে গ্রামে সবচে বড় দীঘি করে দেওয়া, ওটার নামই ছিলো দীঘি। দীঘির পাড়ের কথা কল্পনা করা যায় না। আর যখন দুবছর একবছর পরে— টানা জাল, ওইপাড় থেকে এইপাড় পর্যন্ত, যারা টানছে তারাও পাড়ে আছে। আর মাঝামাঝি যখন আসছে, এই রকম বড় বড় রুই মাছ লাফ দিয়ে ওইপাড় থেকে এই পাড়ে পড়ছে। সে দৃশ্য দেখার মতো। তারপর যখন জালটা তুলছে, প্রচুর পরিমাণে, অন্তত বিশ-ত্রিশ কেজি ওজনের রুই কাতলা। সেসব মাছ তখন বিক্রিও করা হতো, গাঁয়ের লোকেদেরও দেওয়া হতো। আশেপাশের গাঁয়ের ভেতরে আমাদের ওটাই পাকা স্কুল। গাঁ এতো পশ্চাৎপদ হলে কি হবে, আশে পাশের সব গ্রাম থেকে ছেলে— মেয়ে নাই, একটাও মেয়ে নাই, সমস্তই ছেলে, এ একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করেছিলাম যে, মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর চল, কি হিন্দু কি মুসলিম, কারো ছিলো না। আমাদের গ্রাম থেকে একটিও হিন্দু ছাত্রী আমার সময়ে হয়নি। একটা হিন্দু মেয়ে লেখাপড়া করেনি। পাঠশালা পর্যন্ত বড় জোর, তাও সকলে নয়। প্রচুর পোড়ো মাঠ, সেই মাঠের মধ্যে ছেলেদের জন্যে ভাগাড়, তিন চারটে দীঘি, তারমধ্যে আবার বিরাট একটা মাঠ যাকে আমরা বলি ষাটতলার মাঠ। এটা আমাদের ফুটবল খেলার মাঠ ছিলো। স্কুলের পাশ দিয়ে বোর্ডিং হাউস ছিলো, তালগাছ ছিলো, অনেক। আর তাদের অনেক জমি ছিলো, সে জমির আয় দিয়েই স্কুলের খরচ কিছু উঠতো। আমি পরবর্তীকালে কমুনিস্ট হয়ে গিয়েছি, তারপরও কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক এই ব্যবস্থা অস্বীকার করতে পারি না। ওই ব্যবস্থা না থাকলে আমি যে কোথায় লেখাপড়া করতাম। ওইখানে লেখাপড়া— প্রথমে দাশু মাস্টারের পাঠশালা। প্রথমে তো বামন গাঁয়ে সেখানে আমরা তিন চারজন গিয়ে একটা লোকের বৈঠকখানায় ভর্তি হয়েছিলাম। তারপর দেখা গেলো যে প-িত ওখান থেকে চলে এসে দাশু মাস্টারের পাঠশালায় টিচার হলেন, দুজন টিচার। আর দাশু মাস্টার তার বাড়িতে পাঠশালা করলেন। কালী পুজা করতেন, যেখানে লোকজন এসে দাঁড়াতো। আটচালা, মানে শুধু চাল আছে, দেয়াল-টেয়াল কিছু নেই, রাস্তা থেকে ছয় ইঞ্চি উঁচু হবে মেঝেটা। সেখানে প্রথম শ্রেণি, তারপর দ্বিতীয় শ্রেণি, তারপর তৃতীয় শ্রেণিতে উঠলে আরেকটু উন্নতি হতো আমাদের। উনার যে গরুর গোয়ালটা ছিলো তার একদিকে গরু থাকতো আরেক দিকে আমরা দু পেয়ে গরুগুলো। আমার মনে আছে আমরা সাতজন ছিলাম, ঘষতে ঘষতে মরতে মরতে কে কতোদূর যে গিয়েছে, কেউ ফাইভে ছেড়েছে— কেউ সিক্সে ছেড়েছে, কেউ এইটে ছেড়েছে। আমার চাচাতো ভাইটা এইট-নাইনে ছেড়েছে। তার মানে সত্যিকার অর্থে, নিরক্ষর একটা গ্রাম। যেখানে একেবারেই নি¤œশ্রেণি না হলেও মোটামুটি একটা শ্রেণি বসবাস করতো, খালের ওপার-এপার দিয়ে— তিন ঘর ব্রাহ্মণ, কিছু ক্ষত্রিয়—ডোম আর বাগদী। হাড়িরাও, এরা গ্রামের বাইরে। একদিকে মুচিপাড়া, মুচিপাড়া বরাবর বাউরিপাড়া, এগুলো একেবারে ভাগ করা ছিলো। কেউ কারো এরিয়াতে যেতো না। মুচিরা গরু মরে গেলে চামড়া ছড়াতো, একটা মুচি জুতো-টুতোও বানাতো। আমাকেও ওরা জুতো বানিয়ে দিয়েছিলো, অবলা মুচি। আমি বললাম কাকা দাও বানিয়ে একটা। এদিন ওদিন করতে করতে শেষ পর্যন্ত দিলো। ওটা তো তেমন নয়, দীর্ঘ সময় রোদে পুড়িয়ে শুকিয়ে সে যে কি জিনিস হলো, কোনো কাজই নেই ও দিয়ে। একমাত্র ওই খড়ের আঁটি তুলে গাদা করার জন্যে পায়ে দেয়া হতো, যাতে পা ক্ষতবিক্ষত না হয়ে যায়। তো এরকম এক আধজন মুচি ছিলো। আর দুএকজন ভালো ঢুলি ছিলো, ঢাক বাঁজাতো দু’তিন জন। একজন চড়বরি বাজাতো। এগুলো মুচিপাড়ায়। আর বাউরি পাড়াতে ছিলো কাহার— যারা পালকি বইতো আরকি। আমিও পালকি চড়ে বিয়ে করেছি। তো পালকি আমাদের নিজেদের ছিলো। তারপর তোমার শৌখিন টোপ্পর গাড়ি। মানে গরুর গাড়িরই, মানে ছাপড়া তোলা, তোমরা টোপ্পরই বলো তো বোধ হয়? সে টোপ্পরের আমাদের বাহারী কতো, বাঁশ চেঁছে কোনোটা নীল রঙ কোনোটা লাল রঙ, এভাবে চমৎকারভাবে সাজানো আরকি। আর আমাদের গরুর থেকে মোষের সংখ্যা বেশি ছিলো। শক্ত মাটি, এজন্যে গরু রাখাটা মুশকিল হতো। আমাদের অন্তত সাত আটটা মোষ ছিলো। আর গরু এক জোড়া ছিলো, তা ছাড়া গাই-টাই সেগুলো আলাদা হিসেব। তারপর দুয়েকটা ঘোড়াও পুষেছিলো। সর্বশেষ ঘোড়াটায় আমি চড়েছি। পারিবারিক কলহ তাও আমি দেখেছি। আমাদের বাড়ির পাশে ছিলেন শেখ পরিবার, তাদের সাথে আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিলো। ওই শেখেদের পরিবারেই আমার ফুফুর বিয়ে হয়, যে ফুফু আট বছর বয়সে বিধবা হয়। আমার দুই চাচি তারা ওই পরিবারে একজন এই পরিবারে একজন, পরস্পরে বোন, তারপরেও শত্রুতা, শত্রুতা যেনো করতেই হবে— সাম্প্রদয়িক দাঙ্গা আর কি। আমাদের গ্রামের একটি জামাইকে মেরে ফেলেছিলো পাশের গ্রামের উগ্র ক্ষত্রিয়রা। মেলা হতো, মোষ বলিদান হতো, তারপর তোমার পাঠা বলিদান হতো, সেইখানে ওরা যাচ্ছিলো। মেয়েটা হারিয়ে গিয়েছিলো আরকি। পাশের গ্রামে খোঁজ নেবার জন্যে দুজন যাচ্ছিলো। তো আমাদের গ্রামের একজন জামাই, খুব ভালো মানুষ। একটা ডাক্টার ছিলো, প্রচুর মদ-টদ খেয়েছে, আর প্রচুর পরিমানে যারা হাড়ি, চ-াল ওদের মদ খাইয়েছে। তারপর ওরা একটা বটগাছের তলায় পিটিয়ে মেরেছিলো তাদের। একটাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার আমাদের গ্রামে। আর দুয়েকটা শিকার হয়েছিলো, বর্ধমানে একজন, কাটুয়ায় দুয়েকজন, আর কলকাতার কথা তোমরা তো জানোই। তো এই যে মারামারি হলো, আমাদের গ্রামে কিন্তু লাগলো না। ওরা একটা গলির মুখে আর একটা আস্তানায় গুলি করলো। আমাদের গ্রামের সামান্য কিছু মুসলিম তারা পুরো গ্রামের হিন্দুদের সতর্ক করছে! আয় তোরা আয়। আর রাত্রি বেলা তো স্যার আমাদের পড়াতেন, দাশু মাস্টার। রাতেও পড়তে হতো। রাতে অবশ্য আমরা পড়ার থেকে পরস্পর খেলা করতাম বেশি। মাস্টার মশাই ঠিক মতো আসতো না, আর বৃহস্পতিবারে তো আসতোই না কিংবা এসেই ছুটি দিয়ে দিতো। যাই হোক মন্দ কাটেনি সময়টা। তারপর যখন মারামারিটা বাঁধলো, তখন দাশু মাস্টার বললেন এই আমার সঙ্গে আয় তোরা। আমরা মাস্টারের পিছে পিছে যাচ্ছি, গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছে যারা হিন্দু, আর দাশু মাস্টারের গলাটাও ছিলো উচ্চ, গম্ভীর। তখন মাস্টার মশাই হুংকার দিয়ে বললেন, আমি ছাত্র নিয়ে যাচ্ছি, খবরদার। তারপর বললেন মারামারি করছো করো, আমি আমার ছাত্রদের তার বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছি। তখন এরকম মানুষও ছিলো। তারপর আমি যখন পৌঁছলাম, দেখলাম চেঁচামেচি আর হৈ-হুল্লোড়, অনেক রাত পর্যন্ত। সুতরাং এর ভেতরেই দাশু মাস্টারের পড়াশোনা ছিলো। গ্রামে এমন কিছু ঘটনা ছাড়া গ্রামে কিন্তু সবার ভেতরে সম্প্রীতি ছিলো। আর তাছাড়া আমি মূলত মুসলমান পাড়ার ছেলেদের সাথে বেশি মিশতাম না। ওই মাঝে মাঝে রাতে হা-ডু-ডু এসব খেলতাম। বাকি খেলাধুলা মেশামেশি সব হিন্দুপাড়ার ছেলেদের সাথে। একজন তো অন্তরের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলো। সে এখনো জীবিত আছে। আমি বইও উৎসর্গ করেছি তার নামে। সমরেশ নন্দী। স্কুলের সময়টাও খুব চমৎকার ছিলো। মাস্টার দুয়েকজন কড়া প-িত ছিলেন। দুর্গাশংকর প-িত ছিলেন। সুবিরাম চক্রবর্তী ছিলেন, তার একশ বছর বয়স হয়ে গিয়েছে, হয়তো এখনো জীবিত আছেন। এইভাবে স্কুল, প্রকৃতি, মাঠ-ঘাট— যাকে বলে— এরকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে গ্রাম্যভাবে মানুষ আমরা। স্কুলের লাইব্রেরী থেকেই আমি বেশি পড়াশোনা করেছি। স্কুলের লাইব্রেরীতে আমি ওয়ার এন্ড পিস, ইয়েটস অনুবাদ পেয়েছি পাঁচ খ-ে। আমি সেখান থেকেই ব্রাদার্স কারমাজোভ পেয়েছি, দস্তভস্কির ক্রাইম এ্যান্ড পানিশমেন্ট পেয়েছি আমাদের স্কুলের লাইব্রেরীতে, চিন্তা করো। মনীন্দ্র বাবু খুব রাগ করতেন। সপ্তাহে দুদিন বই দেওয়া হতো তো, স্যার বলতেন কি বই নিবি যা যা…। তারপরে ছিলো সস্তা বই এবং শিশুসাহিত্যের যে সমস্ত বইটইগুলো তখনকার, সেগুলোও ছিলো। তখন আমাদের এই সুনির্মল বসু তারপরে সত্যজিৎ-এর বাবা সুকুমার রায়, তার বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, ওদের বই ছিলো। সত্যজিতের তখন লেখার প্রশ্নই ওঠে না। এদের এই বই তারপরে অলিভার টুইস্ট ডিকেন্সের বই পড়া, দস্তভস্কির বই পড়া, আলেকজান্ডার পোপের বই পড়া। বইগুলো বাংলাতেই ছিলো, খাঁটি ইংরেজি বই তখনও আমরা ঠিক পড়তে পারি না আর স্কুলের ওরকম বই রাখতো না। কিন্তু এই বইগুলিই বা কে আনে! আলেকজান্ডার ডুমার বই তোমরা তো এখনোও দেখোনি। ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের শাপমোচনের গল্প। তার চিতাবহ্নি নামে একটা উপন্যাস আছে, আরে বাপরে বাপ— সে উপন্যাস সকালবেলা পড়তে শুরু করেছি আর সন্ধ্যাবেলায় দেখি আলো আর নেই বইও শেষ, ছেড়ে দিলাম। তারপর শৈলেন্দু মুখোপাধ্যায় যে কি-না কাজী নজরুল ইসলামের ক্লাস ফ্রেন্ড। শৈলেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় নয় তারপরে মানে না মানা এসব অদ্ভুত বই, এগুলো দিয়ে সিনেমা হয়েছিলো, খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো এসব বই। তখন কৃষ্ণচন্দ্র দে টে— এরা গান করত, তখন তো হেমন্তর আর্বিভাব হয়নি। ধনঞ্জয়ের গান একটু বয়স হলে শুনলাম— কোন হিসেবে হরো হৃদে দাঁড়িয়েছিস মা পদ দিয়ে শখ করে জিহ্বা বারায়েছো যেন কতো নেকামি ভারী সুন্দর এসব গানগুলো। যাত্রা গ্রামে হয়েছে অন্য গ্রামে হলেও দেখতে গেছি— রাণী চ-ীদাস। সিনেমাও তখন ছোট ছোট প্রজেক্টর নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন গ্রামে দেখাত।

চিহ্ন : এক ধরনের স্বাধীনতা তো ছিলো তাহলে…

হা. আ. হ. : স্বাধীনতা। বাবা ওসব খবরই রাখতো না। কঠিন কঠোর শাসন, সে শাসনটা মূলত কতগুলো বিশেষ কারণে। প্রথম কথা হচ্ছে উনি যেখানে যে জিনিসটা রাখতেন সেটা হাত দিয়ে নাড়িয়ে অন্য জায়গায় রাখা যেতো না, উনি ধরে ফেলতেন। আর তাকে না বলে কোন জিনিস কাউকে দেওয়াও যেতো না। কোন জিনিস নিজে নিয়ে এসে রাখাও যেতো না। তাছাড়া উনি শাস্ত্র মেনে চলা মানুষ। যে মুহূর্তে আমি ক্লাস নাইনে উঠলাম তখন তিনি আমার বন্ধু হয়ে গেলেন, আর বকাবকি নেই। প্রাপ্তি তো ষোড়শী বর্ষে, ষোড়শ বয়স হলে পুত্রের সাথে মিত্রের মতো আচরণ করতে হবে, এটা বাবা মানতেন। সুতরাং বাবা আর কখনই বকাবকি করেন নি আর এ দেশে আসার পরে সম্পূর্ণ আমার উপর ডিপেন্ড করতেন। আমার তখনই নাম ছিলো এই ছেলেটা বাংলায় ভালো, লিখতে পারে ভালো আর ইংরেজিটাও খারাপ না, ইংরেজি গড়গড় করে পড়ে মানেটাও বলে দেয়। এগুলো আমার অভ্যেস করে নেওয়া, এমন নয় যে— আমি জানতাম বলেই পারতাম। মূলত রাতের বেলায় আমি নোট রেডি করে কন্ফার্ম করে রাখতাম। সংস্কৃতেও তাই, ঝরঝর করে পড়তে পারতাম তাতেই আমার টিচার খুশি। ম্যাথমেটিক্স একেবারেই পারতাম না। এজন্যে মদন বলে আমার একটা বন্ধু ছিলো, সকাল হলেই ওকে বলতাম অংকগুলো টুকে দে, পার কর। রাতে আমার জন্য ও অংক করে রাখতো। জিওগ্রাফি তারপরে হিস্ট্রি, এগুলো তখন খুব ভালো স্ট্যান্ডার্ড ছিলো। হিস্ট্রির রমেশচন্দ্র মজুমদারের মোটা বই ছিলো ভারতবর্ষের ইতিহাস। তখন এই সমস্ত বইগুলো আমাদের আউট অফ সিলেবাস হলেও আমি সেগুলো সব পড়েছি। ডেভিড কপারফিল্ডের একটা ভার্সন স্কুলে পাঠ্য ছিলো। আমার মামাতো ভাই তিনি স্কুলে পড়তেন, তার ঐ বই নিয়ে আমি ক্লাস ফোরে পড়ার সময় পড়েছি। তাছাড়া ক্লাস এইট নাইনের বিভিন্ন বই, শিবনাথ শাস্ত্রীর বই, প্রবন্ধ তারপর সেই সময়কার উপন্যাস, বঙ্কিমচন্দ্র শরৎচন্দ্র এদের সংক্ষিপ্ত সংস্করণের উপন্যাস পাওয়া যেতো। সমস্ত বই গোগ্রাসে পাঠ করতাম, পাঠেতে মন লাগতো এবং সেটা যে মনে থাকতো এটা আমার মনে আছে। আর এমনই ছিলো আমার পাঠাসক্তি, আমার গ্রন্থাসক্তি এবং প্রথম দিকে ঠিক যা হয় তাই। হেমেন্দ্রকুমার রায় সব্যসাচী— যে সমস্ত ডিটেক্টিভ এবং রোমান্সকর বই আছে, অভিযানের বই আছে— বইগুলোকে খুব প্রিয় মনে করতাম। এগুলোই হচ্ছে সেরা সাহিত্য এর মধ্যে আবার দ্বিধার কি আছে কিংবা এর চেয়ে বড় সাহিত্য আর কি হতে পারে! ওইগুলোর খুব ভক্ত এবং কিছু পয়সা জমলেই বর্ধমানে গিয়ে দামোদর পুস্তকালয়ে গিয়ে বলতাম যে কি কি এসেছে! তো যে পর্যন্ত কুলাতো নিয়ে চলে আসতাম। মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি। গাছে যেমন কুল হয় তেমন জঙ্গলেও কুল হতো, এগুলোকে বলতো বনকুল। প্রচুর পরিমাণে হতো। আমাদের একটা কাজই ছিলো পকেটে একটু গুড়ো নুন নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। কেউ খবরই রাখতো না। কি কি খাওয়া যায় এই হলো আমাদের সন্ধানের বিষয়। কাঁচা কোয়াদবেল খাওয়া যায় কিনা, বেল খাওয়া যায় কিনা, আমাদের ওখানে বেল খাওয়া যেতো না। তারপরে বঁইচি খাওয়া যায় কি না। কোনো কোনো বনকুল ভিতরে রয়েছে, পাড়তে গেলে বড় বড় মাটির চাঙ্গড় দিয়ে তার উপর পা দিতে হবে নইলে কাঁটা তো আছেই। সর্বশেষ চাঙ্গড়ে পা দিয়ে দেখি— চন্দ্রগোখরা সাপ, ওরে বাবা প্যাক করে ফিরে চলে আসা। সেজন্য বলছি যে সাপের মাথায় পা দিয়ে কি করে তালগাছে উঠে তাল পাড়া। বাজপড়া তালগাছ, তার মাথায় উঠে পড়া এবং সেখান থেকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে পুকুরের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়া। কেউ বারোন-টারোন করেনি কোনদিন। শুধু লোকের ক্ষতি করলে সেটা মুশকিল হতো, তবে লোকের ক্ষতি তেমন করতাম না। এইসব নিয়ে আমার বাল্যকাল খুব ভালো কেটেছে।

চিহ্ন : তাহলে আপনার গল্পের মধ্যে যে ইমাজিনেশন তার সব এগুলোই?

হা. আ. হ. : এগুলো থেকেই। আমি কিন্তু গল্প লেখার জন্য দৌড়াদৌড়ি করি নাই। ইন সার্চ অব স্টোরি আমি কোনদিনই নই। এখনো আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করি যে আমি গল্প তৈরি করাতে পারদর্শী নই। অনেকে গল্প তৈরি করে দিতে পারে আরকি! ঐ একটা জায়গাতে আমার ঘাটতি আছে।

চিহ্ন : কিন্তু আপনি যে গ্রামগুলোর বা পরিবেশের কথা বলছেন সেরকম আর একটা গ্রাম আপনার মধ্যে আসতে পারে। হয়তো সেটা প্রত্যক্ষ নয় কিন্তু ওটা বানিয়ে তোলা যায়।

হা. আ. হ. : সে তো এমন কিছুই নয়। একটা গ্রাম আর একটা গ্রামের ফটোকপির মতো তো আমার সমস্ত সোর্স ওখান থেকেই এবং প্রকারন্তে সত্যি। আমি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক পড়েছি যখন অধ্যাপনা করি সিরাজগঞ্জ কলেজে। তারপরে প্রেমেন্দ্র মিত্রের তেলেনাপোতা আবিষ্কার অনেক পরে পড়েছি। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের ইন্দিরা ছোটবেলাতেই পড়েছি।

চিহ্ন : কিন্তু এখন যাদের এই জীবনটা নেই তারা যদি এখন লিখতে চায় কিংবা এখন যারা লিখছে তাদের তো এই জীবনটা নেই সেক্ষেত্রে আমরা তো অনেক কিছুই দেখতে পাব না?

হা. আ. হ. : যদি আউট অফ ইমাজিনেশন কিছু লিখতে চায় তাহলে হতে পারে, আমি জানি না। আমার তো নেই। আমি অভিজ্ঞতা ছাড়া লিখতেই পারি না।

চিহ্ন : তাহলে এখনকার যে অবস্থা সেটার মূল কারণ শেকড়ের যে জায়গাগুলো কিংবা বড় হওয়ার যে বিষয়টা আপনি বললেন ‘দুরন্ত কৈশোর’ এই কৈশোর যদি না থাকে, এই অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা না থাকে তাহলে গল্প তৈরি হবেই বা কি করে?

হা. আ. হ. : এ আর আমি জানি না। আই এ্যাম ইন ডাউট এবং এখনকার যারা লেখক আছে তারা কি করে লেখে কি জানি ঢাকাকেন্দ্রিক জীবন নিয়ে লেখে কিংবা শৈশব গ্রামে কেটেছে। কলকাতার লোকজন কিভাবে লেখে— ওখানে তো কলকাতা শহর ছাড়া বাংলা সাহিত্যের আর খবর নেই। হয়তো দৌড়ে-টৌড়ে গ্রাম থেকে ঘুরে এসে লেখে। ওটাও কিন্তু কলকাতাভিত্তিক। হুগলিতে নয় বর্ধমানে নয় কোথাও সাহিত্যকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।

আমি কিন্তু গল্প লেখার জন্য দৌড়াদৌড়ি করি নাই। ইন সার্চ অব স্টোরি আমি কোনদিনই নই। এখনো আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করি যে আমি গল্প তৈরি করাতে পারদর্শী নই। অনেকে গল্প তৈরি করে দিতে পারে আরকি! ঐ একটা জায়গাতে আমার ঘাটতি আছে।

চিহ্ন : শকুন থেকে সাবিত্রী উপাখ্যান কিংবা বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প অথবা আগুনপাখি এগুলোর মধ্যে তো এই গ্রামটাই এই কৈশোরটাই এই যৌবনটাই দেখি— এটারই একটা রেনোভেশন?

হা. আ. হ. : আমার মনে হয় এই জগৎটা যে পেয়েছে সে কিন্তু ভাগ্যবান। সে স্বীকার করুক বা না করুক। আর এই জগৎটা যে পায়নি অর্থাৎ শৈশব হারা মানুষ আমার মনে হয় সত্যিকারের মানুষ হতে পারে না, অসুবিধা আছে তাদের। অনেক ঘাটতি থেকে যাবে তাদের। সবাই হয়তো অপুর মতো হবে না তবে একটা শৈশব আমাদের থাকা দরকার। যেখান থেকে বড় হয়— যেমন সোজা কোনো বটগাছটা হয় না, সেটা চারা লাগাতে হয় তারপর সেই চারাটা আস্তে আস্তে বড় হয়।

চিহ্ন : এই যে লেখার ইন্সপেরেশন এবং হাসান আজিজুল হকের তো অনেক বন্ধু ছিলো কিংবা সেই সময়ে এই রকম লাইব্রেরীতে পড়া, বড় হওয়া এই সমস্ত অনুভূতির মধ্য দিয়ে তা আরও অনেকে বড় হয়েছে, সবাই তো লেখক হয়নি। তাহলে লেখক হওয়ার জন্য ভেতরে যে প্রণোদনাটা সেটা কি আসলে স্বতঃস্ফূর্ত কিংবা আপনি টলস্টয় বা দস্তয়ভস্কি পড়লেন…

হা. আ. হ. : মনে হয় একটু স্বতঃস্ফূর্ত বটে। হিউম্যান নেচার তো একরকম হয় না, সব শিশুও একরকম হয় না। কল্পনাপ্রবণ শিশু আছে স্বার্থপর শিশু আছে— নানান রকম। এতটুকু শিশুই কিন্তু চূড়ান্ত রকমের স্বার্থপর। প্রেমেন্দ্র মিত্রের সেই গল্পটা আছে না…। শিশুও তো নানান রকম হয়ে যায়, নষ্টও হয়ে যেতে পারে। তবে আমার তা হয় নি কেন জানি! বন্দুক ছিলো বাড়িতে, চাচার সঙ্গে অথবা বাবার সঙ্গে শিকার করতে যেতাম আনন্দও পেতাম, পরবর্তীতে ভেবে দেখলাম যে, ‘দ্যা শ্যুড ব্যাড’। খেলাধুলাতে ভীষণ মনযোগ ছিলো। ফুটবলটা কি-যে কীভাবে ভালোবেসে খেলেছি। রাখালদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে এমন করে চার্জ করলে আমার পশ্চিম মুখো পা সোজা উত্তর মুখো হয়ে গেল। তারপর পায়ে আর বল ঠেকাতে পারিনি। কলেজেও চলে আসলাম আর খেলা হয়নি তা না হলে আমি ফুটবল কিন্তু ভালোই খেলতাম। আই ওয়াজ এ গুড রানার। সত্যি বলেই বলছি, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলেই, ‘আমি ফার্স্ট রানার’। তাছাড়া লং জাম্প হাই জাম্প। অবস্টাকেল দিয়ে যে রেসটা করে— হার্ডেল। দৌঁড়াতে শুরু করলাম আমি এগিয়ে আছি তারপর দেখলাম আমার পাশে একমাত্র মনোজ কুমার পাল রয়েছে আর কেউ নেই। তারপর সর্বশেষ যখন পার হতে হবে একটা শতরঞ্জি পাতা আছে যার দুপাশে ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে, সেই শতরঞ্জির তলা দিয়ে গিয়ে ছুঁতে হবে। শতরঞ্জির পরেই হচ্ছে টার্গেট। আমি তখন কয়েক হাত এগিয়ে শতরঞ্জির তলায় ঢুকে পড়েছি। কে করেছে তা আমি জানি না। দুইপাশ থেকে এমন করে চেপে ধরলো যে আমি হাজড়-পাজড় করে শতরঞ্জি থেকে বের হতে পারি না। ইতোমধ্যে আমার পাশের ফাঁক দিয়ে আর একজন বেরিয়ে চলে গেছে। আমি যখন বের হলাম তখন দেখি যারা অংশগ্রহণ করেছিলো তারা সবাই আমার সামনে। এই রান লং জাম্প, আবৃত্তি পারি আর না পারি করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি হলো আমাদের স্কুলে তাতেও আছি অথবা মেঘনাদবধ কাব্য পড়তে হবে সেখানেও। মহারাজা মনীশচন্দ্র নন্দীর পৌত্র সৌমেন্দ্র চৌধুরী নন্দী স্কুল পরিদর্শনে আসবেন তার জন্য প্রশংসা বাক্য লিখতে হবে রাজা মহারাজাধিরাজ সম্বোধন করে। আমাকে মনে হয় হিন্দুরা একসেপ্ট করেছিল তা না হলে এই ভালোবাসাগুলো কোথা থেকে পেয়েছি। আমাদের যে হেডমাস্টার ছিলেন বাংলা এবং ইতিহাসের তিনি বলতেন— এই তোর খাতা দেখছি রে দুনম্বর কম দিলাম— নইলে বাহাদুরী করবি রে… লেটার মার্ক পেয়েছি, সেজন্য আটাত্তর দিয়ে রাখলাম।

চিহ্ন : ষাটের দশক থেকে এই আজকে পর্যন্ত এটাতো একটা দীর্ঘ জার্নি, এই সময়ের মধ্যে আপনি গল্প লিখেছেন, কিছু প্রবন্ধও লিখেছেন— বিশেষ করে সত্তরের পর। সে প্রবন্ধগুলোতে নতুন কিছু চিন্তা আছে এবং এগুলোর বিকল্প কোন পাঠ এখনো তৈরি হয়নি কিংবা দেখা যাচ্ছে না সেভাবে। এগুলোতো আপনার বোধ-বুদ্ধিরই ব্যাপার, ভাষা ও সংস্কৃতি, তাদের মধ্যে সম্পর্ক, সংস্কৃতি কি ইত্যাদি। তারপরে যে উপন্যাসটা ২০০৬-এ, আর এখন তো অনুবাদ করছেন। আসলে একজন লেখকের যে জার্নি সে জার্নির কি কোন ফেজ বা স্পেল থাকে?

হা. আ. হ. : আমার মনে হয় না।

চিহ্ন : হেমিংওয়ে আজ থেকে বিশ বছর আগেও আপনি পড়েছেন, তখন অনুবাদ করতে ইচ্ছা হয়নি কিন্তু এখন কেনো হচ্ছে? এবং গত পাঁচ-সাত মাসে দেখছি এই ধরনের লেখাগুলো, যেগুলো অনুবাদ হচ্ছে এবং হওয়া উচিত কিংবা গ্রেট রাইটার যারা— হেমিংওয়ে, ফাকনার এই দুই-তিন জনের কথা মাঝে মাঝেই আপনার মুখে শুনছি এবং আপনি পড়েই বলছেন অসাধারণ গল্প এমন গল্পতো আমি নিজেও লিখতে পারিনি। আজকাল যারা লেখালেখি করছে তাদের তো এগুলো পড়া উচিত। বিশ্বসাহিত্যের যে গল্প বা আঙ্গিনা তার সঙ্গে একটা যোগাযোগ।

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। আমি একটা যোগাযোগ রাখতে চাই প্রাণপনে এবং এটা আমি করেই যাবো যতোদিন আমার জ্ঞানবুদ্ধি চিন্তাশক্তি থাকবে ততদিন। এই যে আমি মার্কাস জুসাকের, কোয়েড্রির লেখা পড়ছি। তারপর তুমি যার কথা বলছো, যার বাহাদুরী আমার একদমই পছন্দ হয় না- মিলান কুন্ডেরা। সবচেয়ে খারাপ লাগে ও একেবারে ভিতর থেকে কমিউনিস্ট-বিরোধী¬— কোনো যুক্তিতর্ক দিয়ে নয়। ওর শহরে অর্থাৎ চেকোশ্লভাকিয়া, ওখানে কিছু কমিউনিস্ট রয়েছে তারা যেভাবে সমাজটাকে দেখতে চেয়েছে বানাতে চেয়েছেন, ও ভেবেছে যে— তাঁরা নিগড়ে বাঁধতে চেয়েছে।

চিহ্ন : লেখকদের কমিউনিস্ট বা একটু বামপন্থি হওয়া একটা স্বাভাবিক বিষয় এবং এটা তাদের ভেতরেই তৈরি হয়। তাহলে আবার হঠাৎ করে এর মধ্য থেকে কেউ কেউ বেরিয়েও যাচ্ছে।

হা. আ. হ. : কিছুদিন আগে পাঁচজন এসেছিলো চায়না থেকে, তারা স্বীকার করলো যে— উই ক্যান নট রাইট এ সিঙ্গেল লাইন এ্যান্ড পাবলিশ ইট উইদাউট টু পারমিশন অভ গভর্নমেন্ট। তাহলে তো বেঁধে মারা গো। এবং কোন প্রতিকার নেই— অপ্রতিকার্য। চায়না আস্তে আস্তে ফ্রী হচ্ছে— জাপানও। তাই কাউকে তো ছোট করার কারণ নাই। আমাদের বাঙালিরাও কিন্তু ছোট নয়। আমাদের একজন রবীন্দ্রনাথ কিন্তু খুব বড়, একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় খুব বড়। যাই বল জন্মেছে এখানে সাহিত্যিক। এই দেশে আনফরচ্যুনেটলি পিছু হটতে শুরু করলো সাতচল্লিশের পর থেকে। সাতচল্লিশকে ধরে নিয়ে সামনে এগোনো— ওরা ত্রিশ চলে আসবে, মানিকের মতো বুড়োরা লিখবে। সরকার জয়েনউদ্দীনের লেখা দেখ তারপর রশিদ করীম ওর বড়ভাই আবু রুশদ মতিন উদ্দিন— ইস্ সবকিছু…। আধুনিকতার চিহ্ন পর্যন্ত রাখতে পারেনি, কেনো এ কি কথা! এরা সকলেই তখন জীবিত। পঞ্চাশ সালে মানিক জীবিত, তারাশঙ্কর তো একাত্তর সাল পর্যন্ত জীবিত, সাড়া দিচ্ছে— সবশেষে বাংলাদেশ নিয়েও লিখেছেন তিনি।

চিহ্ন : কিন্তু আমাদের এরা পিছিয়ে গেল কেনো?

হা. আ. হ. : আমি জানি না। কেন গো? আমরা কি একধরনের আলাদা দেশ হওয়ার পরে সব কিছু আলাদাভাবে করবো, বিশেষ করে যার ভিত্তিতে দেশটা স্বাধীন হয়েছে সেইটার উপরে বেশি গুরুত্ব দেবো।

চিহ্ন : এইটা কি বাঙালি মুসলমানদের কোন রিজার্ভেশন যে ধর্ম ও সংস্কৃতির কোন দ্বন্দ্ব সেই জায়গা থেকে কিছু?

হা. আ. হ. : তাও তো ঠিক মনে হয় না। এই যে সরদার জয়েনউদ্দীন লেখায় হিন্দু চরিত্র অনেক আছে। যেমন নয়নঢুলি। ১৯৫৬ সালে তাঁর রচিত প্রথম উপন্যাস আদিগন্ত হিন্দু-চরিত্র আছে। তো সেটাও বলা যায় না। মিড-ফিফ্টি থেকে কিন্তু আর অতটা শুরু হয়নি, তখন থেকে শামসুর রাহমানের আবির্ভাব— যদিও সে কেবল আসছে। আমরা যখন ‘পূর্বমেঘ’ বের করছি তখন শামসুর রাহমান এসে গেছেন, সৈয়দ শামসুল হকের নামটাও তখন শোনা যেতো, আসাদ চৌধুরী, আব্দুল মান্নান সৈয়দের নাম তখন বেশ শোনা যায়।

চিহ্ন : হঠাৎ করে ঊনসত্তর সালের দিককার ‘পূর্বমেঘ’-র একটা সংখ্যা দেখলাম। আপনার জীবন ঘষে আগুন গল্পটা ছাপা হয়েছিলো, ঐ সময়ে নাম-টামগুলোতো খুব চোখা ছিলো। এগুলো আসলে চিন্তা কিংবা সংস্কারমুক্তির ধারণাই ভেতরে ডেভলাপ করে এসেছে। এছাড়া পাতালে হাসপাতালে, মা মেয়ের সংসার।

হা. আ. হ. : একধরনের নির্ভিকতা কাজ না করলে আসলে হয় না। জিয়াউর রহমানের আমলে পাতালে হাসপাতালে লেখা কঠিন না কিংবা খনন পূর্ববাংলার খাল-খনন পরিকল্পনা, সেটাকে চূড়ান্ত বিদ্রুপ করেছি। পাবলিক সার্ভেন্ট এমন কিছু ভালো গল্প নয় কিন্তু ধরেছিতো আচ্ছা করে, তারা টের পায় এখন— তাদের চার পয়সা মূল্য নেই।

চিহ্ন : সত্তরের দশকে আপনাদের বন্ধু-বান্ধব পরিম-লের যারা ছিলেন, তাদের তো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল আন্দলোন সংগ্রামে বড় একটা ভূমিকা আছে।

হা. আ. হ. : আছে আছে… এখানে একটা বড় অবদান আছে। প্রগতিশীল শিক্ষকরা বরাবরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে— আমাদের আগেও তারা ছিলেন। এই যেমন হাবিবুর রহমানের মত তেজস্বী লোক, মেরেই তো ফেলল তাঁকে। সালাহ্উদ্দিন স্যারের মত লোক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মতো মুক্তবুদ্ধির মানুষ। সব বড় বড় শিক্ষক— ইনাদের কাছে আমরা মোটামুটি পড়েছি। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী এবং মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ‘পূর্বমেঘ’ বের করাটা বাংলাদেশে সাহিত্যে একটা ঘটনা। ওখানে অ্যারিওপ্যাজিটিকা, শোকাচ্ছন্ন স্যামসন লেখা হচ্ছে একই সাথে বরেন্দ্র জাদুঘরের মুখলেসুর রহমান সাহেবের লেখা বেরুচ্ছে। স্যার প-িত ছিলেন, তপন রায় চৌধুরীর বন্ধু উনি, ক্লাসমেট। মখলেসুর রহমান এমন লোক যে, একবার হোস্টেলে এসে বলছে যে আমার সঙ্গে এক ভাই এসেছে— আসলে তার স্ত্রীকে পুরুষ মানুষ সাজিয়ে নিয়ে এসেছেন। মখলেসুর রহমান সাহেব এমন মজার মানুষ ছিলেন। সনৎ, আমি, আলী আনোয়ার, শহিদুল ইসলাম— রাতে তো বসা হতোই তাছাড়া শুক্রবারে শুক্রবারে শুধু বাড়িতে বসা হতো। ঐ সময়ে আমরা ক্লাব থেকে নাটক করেছি অনেক। নাজিম মাহামুদকে ডেকে আনা হলো।

চিহ্ন : নাজিম মাহমুদের অনেক গুণ ছিল, সুদর্শনও …

হা. আ. হ. : নাজিম মাহামুদের মতো বিশাল মনের মানুষ, আমাকে বলতো যে, ইউ আর মোর দ্যান মাইসেলফ— কোনদিনও ভোলা যাবে না। আমাকে একবার যখন সংবর্ধনা দিল— ‘স্বনন’ তখন নাজিম মাহমুদ বলেছিলেন, পরজন্ম আছে কি-না জানি না, যদি থাকে তাহলে হাসান আজিজুল হকের মতো কাউকে নয় হাসান আজিজুল হককেই আমি বন্ধু হিসেবে পেতে চাই। কত বড় আসলে… চিন্তা কর। মাতিয়ে রাখতেন এই শামসুর রাহমান, তসলিমা নাসরিন, তাঁর ক্লাসমেট আনিসুজ্জামান সবাই…

চিহ্ন : আপনার ‘প্রাকৃত’ সম্পাদনা হলো… সম্ভবত, ৯২ তে— নাজিম মাহমুদই ক্যাম্পাসে এঁদের আনতেন…

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, বহু বাইরে থেকে আনা হয়েছিল। খান সারোওয়ার মুর্শিদ প্রকৃত গুণী মানুষ, তিনি আমাকে ডেকে নিয়েছিলেন, কারণ এখনকার কোয়ালিফিকেশন অনুযায়ী আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার কোন উপায় ছিলো না। সে সময় আবুবকর সিদ্দিককে নেওয়া হলো। নাজিম মাহমুদই আবুবকর সিদ্দিককে এনেছিলেন। নাজিম মাহমুদের ব্যাকুলতার শেষ ছিল না। যা হোক আজকালকার এঁরা কেন যে বসে পড়লো… জানি না। এই যে আহমাদ মোস্তফা কামাল, শাহীন আখতার, শাহনাজ মুন্নী ছেলেদের মধ্যে ওয়াসী কবিদের মধ্যে কই… কবি ওই মোহাম্মদ রফিক, হাবীবুল্লাহ সিরাজী আছে বেঁচে… কে … আর এখন অনেকেই তো চলে গেলেন, আছেই বা কে? তবে আশাটা আছে, কবে কে কখন ঝিলিক দিয়ে উঠবে বলা মুশকিল… ‘যে কবির বাণী লাগি…’

চিহ্ন : পাতালে হাসপাতালে কিভাবে প্রকাশিত হয়, স্যার?

হা. আ. হ. : পাতালে হাসপাতালে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিচিত্রার কোনো এক ঈদ সংখ্যায়। রাজশাহীর দৈনিক বার্তার সম্পাদক কামাল লোহানী আমাকে বললেন যে, হাসান আমি যাচ্ছি (ঢাকায়) আমাকে উনি (দৈনিক বিচিত্রার সম্পাদক) টেলিফোন করে বলেছেন যে, তোমার কাছে একটা লেখা আছে। আমি বললাম, ঠিক আছে। আমি রাতেই লেখাটা শেষ করলাম এবং উনাকে দিয়েছিলাম। এভাবেই পাতালে হাসপাতালে দীর্ঘ লেখাটা পাঠানো হয়েছিলো।

চিহ্ন : মা-মেয়ের সংসার কোথায় বেরিয়েছিলো স্যার?

হা. আ. হ. : মা-মেয়ের সংসার বেরিয়েছিলো বড় অদ্ভুত জায়গায়। আলী আহমদ (আগুনপাখির আনুবাদক) আমাকে বললেন, আমাদের কাস্টমস থেকে একটা পত্রিকা বের করবো। তেমন কোনো উদ্দেশ্য নেই, করে রাখবো আর কি! আমাকে একটা গল্প দিন আপনি। গল্প গল্প, আমি এখন কি করবো, কোত্থেকে গল্প দেবো? ও বললো হাসান ভাই, আমাকে একটা গল্প দিতেই হবে। আর এই ফাঁকে লিখেছিলাম গল্পটা খুব দ্রুত। প্রায় একবারে, একবসাতে না হলেও, দুতিন বারের বেশি বসিনি। গল্পটা লিখে বেশ আনন্দই পেলাম। ভালোই লিখেছি আর কি! সুন্দরবন এলাকাতে আমার আগে একটু যাওয়া আসা ছিলো। বিশেষ করে ঐ জায়গায়, যেখানে মা-মেয়ের সংসার লোকেদের বসতি। সুন্দরবনের গায়ে কিন্তু একেবারে ভেতরে নয়, একটু পাশে। গল্পটা তো বেশ ভালোই, প্রশংসিত আর কি?

চিহ্ন : হ্যাঁ। হ্যাঁ। স্যার, একটা জিনিস মনে পড়লো। সেটা হচ্ছে যে, ‘রিভিশন’ (হ্যরল্ড ব্লুম-কথিত ‘প্রভাবের যন্ত্রণা’) বলে একটা কথা আছে। যেমন, আপনি স্যার এর আগে বললেন যে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প, কিংবা দেব সাহিত্যকুটিরে যা বেরিয়েছিলো। তো সেটার পরে আপনি ষাটের দশকের দিকে শকুন লিখলেন। এভাবে ষাট, সত্তর চললো, তারপর একটা দীর্ঘ সময় ধরে চললো। এখন যেটি বিষয়, সেটি হচ্ছে যে, এটার তো একটা ‘রিভিশন’ থাকা দরকার। অর্থাৎ উনাদেরটা পড়লেন, তারপর আপনি লিখলেন; আপনারটা আমরা পড়ছি, তারপর লিখছি। এই যে একটা ‘রিভিশন’। অর্থাৎ পাঠ ও পাঠসৃজন এবং পাঠসৃজনের ভেতর দিয়ে নতুন পাঠসৃষ্টি কিংবা সৃষ্টিশীল কিছু তৈরি। এ ‘রিভিশন’র ভেতর দিয়ে আজকাল যারা গল্প লিখবে তারা সেটা করবে। তবে যেটা বিষয়, সেটা হচ্ছে যে, আমাদের হাসান আজিজুল হকের গল্প পড়েনি এমন লোকও প্রচুর আছে। একটা হিপোক্রেসিও আমাদের জেনারেশনের মধ্যে আছে। যেটার ধার আপনারা কোনো দিনই ধারেননি। এখন বিষয়টা হলো, এ সময় যারা গল্প লিখছে, সত্তরে-আশিতে-নব্বইয়ে কিংবা এ সময় যারা গল্প লিখছে, তারা কী হাসান আজিজুল হকের গল্প পড়েছেন? গল্প লিখছে তারা! তারা কি লিখছে? আমি মনে করি হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার। এ ‘প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার’ বিষয়টা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। অনেকে বলতে পারে, ‘প্রতিনিধিত্বশীল’— আমি মনে করি না। কিন্তু আমি মনে করি আপনি প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার। এখন যিনি প্রতিনিধিত্বশীল গল্পকার, তাঁর গল্প না পড়ে আমি গল্প লিখবো কিভাবে? কিংবা কোনো রিভিশন তৈরি হতে পারে? আমার তো মনে হয়— পারে না। তো আমাদের জেনারেশনের যে জায়গাটা চলছে অর্থাৎ বাংলাদেশ হওয়ার পরে প্রায় ছেচল্লিশ বছর পার হয়ে গেলো। আর এ সময়ে শওকত ওসমানকে নিয়ে কাজ হয়েছে, সরদার জয়েনউদ্দীনকে নিয়ে হয়েছে, আপনাকে নিয়ে হয়েছে, হচ্ছে— ইলিয়াস, শহীদুল জহির, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্কে নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচ.ডি. হচ্ছে। এঁদের প্রায় সমসাময়িক আপনি স্যার ষাটে লিখলেন শকুন। তারপরে আত্মজা ও একটি করবী গাছ। এরপর ষাট, বাষট্টি, চৌষট্টি, সত্তর, পঁচাত্তর, ছিয়াত্তর, আটাত্তরে লেখা চলছে; ছিয়ানব্বয়ে— আগুনপাখি ২০০৬-এ সাবিত্রী উপাখ্যান— এখনও লেখা  চলছে। পড়ছি আমরা। কিন্তু এখন কি অবস্থা? এখন তো সরদার জয়নউদ্দীনের মতোও কিছুই পাচ্ছি না, আবু ইসহাকও পাচ্ছিনা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তো বাদই দিচ্ছি। এরপর ইলিয়াস খেটেখুটে যা-হোক অনেককিছু করলেন, ১৯৯৭তে তো মারাই গেলেন। তাহলে বিষয়টি হচ্ছে যে, এই লোকগুলোর নাম আমরা তো গুণছি। তাঁরা তো একটা পথরেখা তৈরি করেছেন। কিন্তু এখন আমি এই ২০১৬ সালে দাঁড়িয়ে বলতে পারছি না যে, তারপর জেনারেশন কারা? আমি এখন শওকত ওসমান, হাসান আজিজুল হক, সত্যেন সেন, আবু ইসাহাক, জ্যোতিপ্রকাশের নাম বলছি। কিন্তু এরপর কারা? আমি যদি এখন সুশান্ত মজুমদারের কথা বলি, যদি নাসরিন জাহানের কথা বলি; প্রশান্ত মৃধা কিংবা ওয়াসীর, ইমতিয়ারের কথাও বলি— এঁরা কি আসলে ঐ জায়গায় দাঁড়াতে পারলো? এটা কি কনক্রিট একটা কিছু হলো আসলে? এখানে ইতিহাস সৃষ্টির ব্যাপার তো আর নেই। কারণ, বাংলাদেশে সাতচল্লিশ থেকে আরম্ভ করে ষাট-পয়ষট্টি বছর চলে গেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ছেচল্লিশ বছর, তারও আগের চব্বিশ বছর এখানে তো অন্য কোনো ব্যাপার নেই। আর যে মিডিয়া, যোগাযোগ, পেপার, পত্র-পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা প্রিন্ট মিডিয়া— যতো রকমের মিডিয়া আছে, সমস্ত মিডিয়া এটা সেটা মিলিয়ে তো ‘মাফিয়া’ হয়ে গেছে। কোনো কিছু আমাদের তো অভাব নেই। সবকিছু আমাদের হাতের কাছে আছে। হিউজ ম্যাটার আছে। তাহলে স্যার নামগুলো তো পাচ্ছি না! শুধু ম্যাটার দিয়ে ভর্তি! এখন যেটা আমাদের আলাপ-আলোচনার জায়গা, সেটা হচ্ছে কি, আমরা তো গল্পকার চাই। আমরা কথক চাই। আমাদের কথার যে ঐতিহ্যিক-কারুকার্য, সে কাজটায় যাতে ফ্রটনেস না থাকে, হিপোক্রেসি না থাকে। কারণ, সততা না থাকলে তো শিল্পী হওয়া যায় না। মিথ্যাচার করে কিংবা ‘আমি লেখক’ এই প্রচার করে, নিজের প্রচার নিজে করে, অন্যের দ্বারা প্রচার করে, সমিতি-সংঘের নামে প্রচার করে লেখক হওয়া যায় না। কিন্তু আমরা দেখছি যে, এ সবই এখন চলছে, মানে লেখালেখির বেসিক জায়গাটা নেই। আরেক দিকে আমরা দেখছি যে, সমাজের যে বাস্তবতা, সেখানেও— যে কৈশোর; যে যৌবন হাসান আজিজুল হকের ছিলো, সে কৈশোর যৌবনের জায়গাগুলোয় যারা এখন বড় হচ্ছে তাদের ভেতরে নেই! তাহলে আমরা কি সামনে আরো খারাপ একটা জায়গা দেখতে পাচ্ছি বা দেখতে হবে আমাদের?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। অন্ধকার একটা এসেছে, এটা ঠিকই। কোনো সন্দেহ নেই! আরো তো লেখক ছিলো তাইনা? আমাদের বয়সী লেখক হচ্ছে রাহাত খান, জ্যোতিপ্রকাশ, শওকত আলীও। এঁরা তো এখনো জীবিত, কেউ কেউ মারা গেছে, ইলিয়াসও চলে গেলো। তাহলে কি এটাই বলবো যে, লেখক ঝাঁকে ঝাঁকে জন্মায় না, হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায় একজন লেখক, বাকিরা লেখক নয়। ঐ এককথাই আবার বলা আরকি— লেখক দল ধরে পাওয়া যায় না, ট্রেনিং দিয়ে পাওয়া যায় না। আগলি ডাকলিন গল্পটা কিন্তু খুব সত্যি, তাই না? সবচাইতে সুন্দর হাঁসের বাচ্চাগুলো জন্মের পরেই, আর কিছু দিন পরে কোথা থেকে একটা হাঁসের বাচ্চা এসে ওদের সঙ্গে যোগ দিলো যেটা সবচাইতে কুৎসিত দেখতে। মানে তার গায়ে কিছু নেই, ধরো রুয়া-টুয়া কিছু নেই, ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেইটাই হচ্ছে আগলি, সবচাইতে আগলি। বড় হতে হতে তারপরে  দেখা গেলো ঐ হাঁসগুলো হাঁস হলো। আর ঐটা হলো রাজহাঁস। তখন বোঝা গেলো আগলি ডাকলিন। এই কথাটাই চলে গেলো প্রবাদবাক্যে, আরে ও তো ‘আগলি ডাকলিন’, ও তো আস্তে আস্তে হবে। রাজহাঁসের ছোট বাচ্চাগুলো কুৎসিত হবে দেখতে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অথাৎ সাধারণ হাঁসের চাইতে দেখতে খারাপ হবে। তো আমাদের সেই ‘আগলি ডাকলিন’ আমি তাও তো দেখছি না যে দুই একটা একটু একটু করে আস্তে আস্তে রাজহাঁস হবে! মিডিয়াম কিছু জিনিস দেখতে পাচ্ছি। মাঝামাঝি ঐ দুই-একজনের নাম হয়তো করা যায়। আমার পক্ষে নাম করাটা উচিৎ হবে না। কিন্তু তাতে তো সামগ্রিকভাবে একটা সাহিত্যে কিছুতো যোগ হয় না, কিচ্ছু যোগ হয় না। তবে কি এইটেই বলবো, আজকের এই যে, ভয়ঙ্কর মিডিয়ার অত্যাচারে গ্রন্থপ্রকাশ, গ্রন্থপাঠ এবং রচনা সবটাই অ্যাফেক্টেড হয়ে গেছে খানিকটা! লিখলে কি হবে? তারপরে আনলাইনে লেখা দেয়া অনেকের অভ্যাস হয়ে গেছে। গল্পটা লিখেছি, কিন্তু অনলাইনে? আমি বললাম, আমি তো অনলাইন দেখি না। কাজেই গল্পটা পড়তেও পারি না। তাহলে এখন কি করা যাবে? নানানভাবে হচ্ছে। তাহলে এটা কি হতে পারে যে, একেক সময় এটা বদলে যায়।

চিহ্ন: স্যার, এখানে একটা প্রশ্ন আমার। আপনার কথাসাহিত্যের কথকতা (১৯৮১) নামে যে বইটা আছে সেখান থেকে আমরা বোধটা কালেক্ট করি। এ বইয়ের একটা প্রবন্ধে আপনি বলেছেন, সাতচল্লিশের পর ষাটের দিকে একটু ডেকোরেশন, অর্থাৎ সুন্দর সুন্দর চেয়ার, ডাইনিং টেবিলসহ বিভিন্ন ফার্নিচার দিয়ে সাজানো ঘরটা, খাবারও সাজানো আছে কিন্তু খাবারগুলো সব বাসি, খাওয়া যাচ্ছে না। কথাটা আপনি ৬০-এর প্রসঙ্গে বলেছিলেন। আরেকটা জিনিস হলো, আপনি বলেছিলেন, কাব্য-কবিতার ক্ষেত্রে কিছু হচ্ছে না। এরপর বুদ্ধদেব বসু বোদলেয়ার অনুবাদ করলেন। তখন তাঁরা একটু ভাষা পেলেন, ভাবলেন এভাবে বলা যায়, এভাবে লেখা যায়। কিংবা লোকনাথ ভট্টাচার্য র‌্যাঁবো অনুবাদ করলেন। এটা কিন্তু আমাদের ঐ সময়ের তরুণদের মধ্যে সাড়া জাগায়। বিশেষ করে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরীদের মধ্যে এক ধরণের প্রেরণাও আসলো। তবে বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসুর মাধ্যমে। এখন যেটা বলি সেটা হচ্ছে আপনি স্যার যে ‘রাজহাঁসে’র কথা বললেন, কিংবা হ্যামিংওয়ে, মার্কেজ, ফাকনার বা ও হেনরি, এ্যালেন পোর গল্পের অনুবাদ আপনার মধ্যে তৈরি হচ্ছে এবং এখন আপনার হাতের অনুবাদটাই মনে হচ্ছে সৃজিত গল্প। তো সেগুলোর অনুবাদের ভেতর দিয়ে যদি আমরা আপনার গল্পের টেস্টটা পেতে চাই, সেটা হয়তো আপনি মনেও করছেন। কিন্তু অন্যরা যারা গল্প লিখছেন তারা তো বাইরের অনুবাদ পড়া বা অন্য কিছু করা— এমনটা ভাবছেন কি?

হা. আ. হ. : কেউ না! কেউ-ই না! পড়ছেও না। কোনো খবরই রাখছে না এইসব গল্পের কি হয়েছে, এমন কি বাংলাসাহিত্যেরও কি হয়েছে না হয়েছে একটু উঁকি দিয়ে দেখা। সেটাও কেউ করছে না। পশ্চিমবাংলায় এখনো তো কিছু লেখা হয়। তাঁদের লেখা, আমাদের লেখা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা দেখো? কোনো লেখক কোনো আলোচনার মধ্যে যায়? লেখকরা মনে করে যে, ওরে বাবা! আমার নিজের জনপ্রিয়তা চলে যায় নাকি? সেখানে লেখকরা সাহিত্য সম্পর্কে কিছু লিখতে চায় না, খেয়াল করছো তো? তাঁরা ভাবে, ও যারা সমালোচক আছে তারা করুক। আমাদের এই বিষয়ে কোথাও কোনো মন্তব্য করতে গেলে ঝামেলা হয়ে যাবে, এই মনে করছে কিনা? তরুণরা সাহসী হবে, এগুবে এই জানি। কিন্তু তরুণরা আমার দেশে এমন মনমরা এবং তেজহীন কি করে হলো, জানি না আমি!

চিহ্ন : আপনি গল্প লিখতে লিখতে কিছু প্রবন্ধ লিখছেন, চিন্তাশীল কিছু কথা বলছেন, চিন্তাশীল কিছু বলতে বলতেই কালচার-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করছেন। তারপর রাজনৈতিক কিছু দায়িত্বও পালন করছেন, এখন অনুবাদ করছেন। অর্থাৎ লেখার যে জার্নি, সেটা চলছে। কিন্তু আমি গল্প লিখি জন্যে আমার সমালোচনা বলে কিছু নেই, গল্প লিখি জন্যে আমার কোনো অবজারভেশন নেই, গল্প লিখি জন্যে আমার সাহিত্য হলো কি না হলো সে বিষয়ে আমার কোনো ম্যানসক্রিপ্ট নেই, এটা তো কোনো কাজের কথা নয়?

হা. আ. হ. : হবে না! আনফরচুনেটলি হবে না! আমাদের সামনে এই দৃষ্টান্তগুলো উঠছে না। আমি কার কথা বলবো, ওয়াসী লিখছে কিছু গল্প, লিখছে উপন্যাস। হয়তো মেনশন করা যাবে। অসাধারণত্ব বলা যাক না যাক, কিন্তু মেনশন করা যাবে। তারপরে… কই তেমন তো দেখছি না! প্রশান্ত মৃধা কিছু গল্প লিখছে, কিছু উপন্যাসও লিখছে।

চিহ্ন : আমার কাছে এটা একটা রিপিটেশন মনে হয়। আমি প্রশান্ত মৃধার লেখা পড়েছি স্যার।

হা. আ. হ. : রিপিটেশন হয়! সেলিনাও তো লিখে যাচ্ছে। কিন্তু এখন একটা পড়ন্ত বেলা মনে হচ্ছে! ওয়াসীও তো এখন প্রবীণদের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। সুশান্ত মজুমদার (রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও, সন্দেহ ও নতুন কুটুমর লেখক) লিখছে। জাকিরকেও আমরা গণ্য করতে পারি। সে যেহেতু কতোগুলোর বিষয়, যেমন— পিতৃগণ, মুসলমানমঙ্গল লিখে আলোচিত হয়েছে। তবে সে সাহিত্যচর্চায় বিষয়ের দিক থেকে একটা আলাদা জায়গা তৈরি করেছে।

চিহ্ন : মামুন হুসাইন সম্পর্কে একটু?

হা. আ. হক : মামুন সম্বন্ধে আমার অতি উচ্চধারণা। তার লেখা-পড়া ভালো।

চিহ্ন : ইমতিয়ার শামীম?

হা. আ. হ. : ইমতিয়ার শামীমও তাই। ভেরি সার্প! কিন্তু এদের ব্যাপার হচ্ছে, কোথায় এরা আটকায় জানি না? কিছু করতে শুরু করলে মনে হয় ভীষণ ইমপ্রেস করলো। তারপরে তিন-চারটে জিনিস লেখার পরে মনে হয়, ঠেকে গেছে কোথাও! আর মামুন তো অনেককাল আগে থেকে প্রায় একই রকম। মামুনের লেখা এতো সুন্দর, এতো নলেজেবল। কিন্তু কিছুতেই কম্প্যাক্ট হয় না! আমি সেই দিন (মামুনকে) বলেছি যে, তুমি গল্পবাজ হও, গল্পও দিতে হবে না আমাকে; আমি গল্পও চাই না। কিন্তু একটা কম্প্যাক্ট হতে হবে তো! বিশাল সবুজ মাঠে প্রত্যেক ঘাসের মাথায় যদি শিশিরের কণা থাকে, তাহলে মাঠটা বড় ঝকঝক করে। কিন্তু তুমি যদি মনে করো যে, একফোঁটা পানি আমি খাবো, তাহলে তো পারা যাবে না, ক্ষতি আছে। এটা হতে পারে হীরক কণা! এ রকম অবস্থা। তবে ও খুব নিষ্ঠাপরায়ণ, নির্লোভ, নিষ্পৃহ, তারপরও কোনো কিছুর পিছনে ছুটছে না, সে দৌড়াচ্ছে না, একেবারেই না। ‘বাংলা একাডেমী’ পুরষ্কার-টুরষ্কার কিছুই এখনো তাকে দেওয়া হয়নি। পায়নি কে? এই শাহীন আক্তার থেকে শুরু করে সকলেই পেয়েছে। সেখানে মামুনকে দেওয়া হয়নি!

চিহ্ন : শামীমও কিন্তু স্যার অনেক লিখছে।

হা. আ. হ. : শামীম বাংলা একাডেমি পুরষ্কার পেয়েছে?

চিহ্ন : না, পায়নি।

হা. আ. হ. : অনেক লিখছে, আর আমি দেখতে পাইনি। সাম্প্রতিক তার কোনো লেখা আমি দেখিনি। উপন্যাস-টুপন্যাস যদি দেখা যেতো, তাহলে আলাদা কথা। কেমন লিখছে জানি না। কেমন লিখছে?

চিহ্ন : তার একটা জায়গা আছে এবং লেখার হাতও আছে। কিন্তু উত্তাপটা…

হা. আ. হ. : ওটাই তো ব্যাপার গো! লেখায় নতুন বাঁক, নতুন কর্নার না দেখতে পেয়ে তুমি তো বিরক্ত হয়ে যেতে পারো। সব বড় লেখকরাই কিন্তু শেষের দিকে তাই করেছে এবং তাতে করে তারা গেছে। হলুদ নদী সবুজ বন, বা প্রাণেশ্বররীর উপাখ্যান এখন কে পড়ে বলো তো? কিন্তু পুতুলনাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি, আরোগ্য এইসব উপন্যাস তো কিছুতেই ছাড়তে পারবে না মানুষ। প্রচুর উপন্যাস মানিক বন্দ্যেপাধ্যায় লিখেছেন। কিন্তু একেবারে প্রথম দিকের উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫) পড়েই তো বুঝতে পেরেছি যে, দ্যা গ্রেট রাইটার ইজ কামিং। যাদের নাম আমরা করছি তারা লিখছে ঠিকই। লেখার একটা স্টাইল, একটা রীতি, একটা বৈচিত্র্যও ধরলাম তাদের আছে। কিন্তু ‘চট করে মনে রাখা’ বা দাগ কেটে গেছে, ভুলতে পারছি না, কথা বলতে গেলেই তাদের কথা চলে আসছে, এমন ব্যক্তিকে খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে! পেছনের দিকে না অন্য কিছু… ভূতের মতো আর কি! খুঁজতে হয়।

চিহ্ন : এখন তো আর ডিফেন্সিভ নেই। অর্থাৎ পাকিস্তান নেই, ব্রিটিশ নেই। আমাদের নিজের দেশ এবং এই দেশ নিয়ে আমাদের একটা স্বপ্নও আছে। দেশে নানা রকম দল-মত থাকবে এটা ঠিক। কিন্তু একটা ড্রিম তো আছে। আমাদের জাতিসত্তা আছে। আমরা মুক্তবাতাসে চলতে পারছি, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছি। সেটার যে এনজয়মেন্ট, সেই এনজয়মেন্টটা লেখকরা কেনো দিতে পারছে না? যেটা শিল্প হয়ে ওঠার জায়গা সেটা তো হচ্ছে না। হ্যাঁ লেখকরা লিখছেন, লেখেন বিচিত্রভাবে। যেমন : শহীদুল জহির মুখচোরা মানুষ ছিলেন। তাঁকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অনেকেই হয়তো চিনতো না, জানতো না। একটা-দুইটা গল্প হয়তো অনেকেই পড়েছে। তাঁর দহ নামের গল্পটি প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় বেরিয়েছিলো। এ গল্পে এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের একটা বিষয় আছে। নীলক্ষেতে পুলিশবক্সে পুলিশ দাঁড়িয়ে। ছাত্ররা মিছিল করে আসছে। সে মিছিলে গ্রাম থেকে আসা এক কৃষক যাচ্ছে। তার সাথে পুলিশের কথা হচ্ছে। পুলিশও অসহায়। তারও কিছু বলার নেই। সে তাকে মারবে না রাখবে? আবার তার চাকরি রক্ষা এমন অনেক বিষয়ে ভাবছে। গল্পটা পাঁচ-সাত পৃষ্ঠার মতো। এর মূলবক্তব্য হলো যে, পুলিশ তাকে তো আমরা প্রতিপক্ষই মনে করি কারণ, রাষ্ট্রের হয়েই তারা কাজ করে। অথচ এ গল্পে পুলিশকে একটু সিগনিফিকেন্ট করে তার মধ্যে একটা মানবিক বোধ  দেখানো হয়েছে। এ গল্পের বয়ানভঙ্গি থেকে শুরু করে সব কিছু ভালোই হয়েছে। তারপরে তিনি একে একে লিখলেন সে রাতে পূর্ণিমা ছিল, ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প, কাঠুরে ও দাঁড়কাক। এসব গল্পের মধ্যে একধরনের জড়ানো-প্যাঁচানো ভঙ্গি, জীবনের জটিলতা ও বাস্তবতা রয়েছে। তবে তিনি বাস্তবতাটাকে নির্মম করে গড়ে তুলেছেন। এই সমস্ত লেখকদের মধ্যে টাচিং বা মন ছুঁয়ে দিলো ব্যাপারটা নেই। শকুন আমি প্রথম পড়ি ১৯৯২-১৯৯৩’র দিকে। পড়ার পর মাথায় ঢুকেছে আর বেরোয়নি! এই যে আশ্চর্য একটা বিষয় অর্থাৎ দাগ কেটে যাওয়ার জায়গাগুলো— এখন তো কোনো গল্পকারের মধ্যে তেমন একটা নেই। আপনি দীর্ঘ সময় ধরে গল্প নিয়ে কাজ করেছেন, এ বিষয়ে আপনার দার্শনিক বোধ-বুদ্ধিও প্রচুর। আপনি বললেন যে, গল্প লেখার আগে আমি তেমন অর্থে গল্প পড়িনি। শকুন লেখার জন্য আমার সেই অর্থে দীক্ষা নাই বা প্রস্তুতিও ছিলো না। এটা একেবারেই কা-জ্ঞানের একটা ফিলোসফি।

দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫) পড়েই তো বুঝতে পেরেছি যে, দ্যা গ্রেট রাইটার ইজ কামিং। যাদের নাম আমরা করছি তারা লিখছে ঠিকই। লেখার একটা স্টাইল, একটা রীতি, একটা বৈচিত্র্যও ধরলাম তাদের আছে। কিন্তু ‘চট করে মনে রাখা’ বা দাগ কেটে গেছে, ভুলতে পারছি না, কথা বলতে গেলেই তাদের কথা চলে আসছে, এমন ব্যক্তিকে খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে!

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। ট্রান্সেলেশন অফ এন এক্সপ্রিয়েন্স …

চিহ্ন : সেই এক্সপ্রিয়েন্সটা আমাদের লোকদের মধ্যে আমরা পেতে চাই। এখনকার প্রজন্মরা তো গল্প করতে চায়, কারা গল্পকার সেটা জানতে চায়। সেই রবীন্দ্রনাথ, মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতি কেউ পুরোনো হয়নি। পড়তে গিয়ে ভালো লাগছে, খারাপ লাগছে না। এমনকি আমরা রাজশাহী শহরে গল্প বিষয়ক কিছু একটা হলে হাসান আজিজুল হককেই নিয়ে আছি। আমরা এখন ধরেই নিই হাসান আজিজুল হক একটা ‘কার্ল্ট ফিগার’। কিন্তু ‘ফিগার’ তো আমরা এ প্রজন্মে দেখি না!

চিহ্ন : আমরা যেটা স্যার একটু ভাবছি সেটা হলো এরকম যে, আপনিতো এখন একটা অনুবাদের কাজ করছেন কিংবা অনুবাদের প্রয়োজন অনুভব করছেন কিংবা এইযে অনুবাদের কাজ করছেন কিংবা দীর্ঘসময়ে যে বিচিত্র বিষয়ে ক্রিয়েটিভ কাজ করেছেন, এখন আবার আপনি যে অনুবাদের কাজ শুরু করলেন এইটা আসলে কি এই প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে না আসলে একদম নিজের ভেতরে কিছু তাগিদও তৈরি হয়েছে?

হা. আ. হ. : তাগিদ, প্রধানত নিজের ভিতরে তাগিদ। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অনুবাদ আমি করছি, আর্নেস্ট হেমিংওয়েও তো পুরনো লেখক হয়ে গেছেন। উনি তো মারা গেছেন গত শতাব্দীর ষাটের দশকে, নিজেই আত্মহত্যা করে মারা গেছেন। তাহলে এই মুহুর্তে যাঁরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বড় লেখক রয়েছেন, জ্ঞানে হোক কিংবা ল্যাটিন আমেরিকান-ই হোক তাঁদের সাথে আমাদের পরিচয়টা একটু ঘনিষ্ঠ হওয়া উচিৎ। তাতে হবে কি, আমাদের মনের দিগন্তটা একটু প্রসারিত হবে। আমার একটাই বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে অভিযোগ, এর দিগন্তটা বড্ড ছোট। বাংলা কথা যেমন বাংলা ভাষা ত্রিশ কোটি লোক বলে অথচ সেই হিসেবে এই ভাষার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠা নেই, এটা খুব দুঃখের বিষয়। তা এই ভাষাটি কত যে সুন্দর এবং কত যে শক্তিশালী ভাষা সেটা প্রমাণ করাও দরকার আছে। তা আমি সেই জন্যে এইসব গল্প অনুবাদ করে… বাংলা সাহিত্য কিন্তু আসলে এসব জিনিসগুলোকে মূল থেকে বাংলা ট্রান্সফার করা বা নিয়ে আসা এ বিষয়গুলোও কিন্তু খুব চমৎকার কাজের ভাষা…

চিহ্ন : স্যার এখানে আমার একটা অবজারভেশন এরকম যে, আপনি কিন্তু এই বয়সে এসে এই তাগিদটা বোধ করছেন। এবং ষাট থেকে লিখছেন, ষাট-সত্তর-আশি-নব্বই-শূন্য এই যে দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর লেখালেখির মধ্যে থাকা বা এই চিন্তা জ্ঞানের বা ক্রিয়েটিভিটির চর্চা করা। আপনার ভিতর দিয়েও কিন্তু বাংলা ভাষা একটা দিকে এগিয়ে গেছে, সেটা নানাভাবে নানা আঙ্গিকে, হয়তো কখনো উপন্যাসের ভাষা, কখনো গল্পের ভাষা, কখনো প্রবন্ধের ভাষা, কখনো স্মৃতিকথা যখন লিখছেন এটা কিন্তু একটা দিকে এগিয়েছে। এখন আপনি স্যার যেটা বলছেন যে, আমি এর আগেও শুনেছি অনেকদিন কথা বলতে যে, আপনি ফাকনার পড়ছেন, আপনি হেমিংওয়ে পড়ছেন, তারপর আপনি ও হেনরি পড়ছেন, কিংবা আপনি রুশ সাহিত্যের দস্তোয়ভস্কি পড়ছেন…

হা. আ. হ. : অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান একটা শর্ট সিরিজের কালেকশন পেয়েছি। অনেক পুরনো, সেখানেও সাহিত্য সম্পর্কে আমরা কোনো খবর রাখি না, একটু খবর রাখা যাক— এই আর কি?

চিহ্ন : এই জিনিসটা একটা ব্যাপার সেটা হচ্ছে যে, আমরা যারা নতুন আমাদের বয়স যাদের পয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ চলছে, আমরা কিন্তু এই জায়গাগুলো ফিল না করে, জাহির করছি কিংবা আমরা কি লিখলাম, আমাদের লেখা কে পড়ে, আমাদের লেখা কেউ যদি না পড়ে— এসব করে আমরা মন খারাপ করছি। কিংবা আমাদের লেখা কেন পড়ছে না? কিংবা আমি এতোদিন থেকে লিখছি, আমার তিনটা গল্পের বই বেরিয়ে গেছে আমার কথাতো কেউ বলে না! এই যে মান-অভিমানের জায়গাগুলো তৈরি হয়েছে, এখন মান-অভিমান তো লেখার জায়গায় যতটা তার চাইতে বেশি ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার জায়গায়।

হা. আ. হ. : তা ঠিক।

চিহ্ন : তো এখন এই অনুভবটা হাসান আজিজুল হক কেনো করছে যে হেমিংওয়ে— তাঁকে অনুবাদ করতে হবে? এবং আমি স্যার প্রত্যক্ষভাবেও দেখেছি অনেক সময় পড়তে পড়তে বলেছেন, ‘আহ্, কি রকম একটা জগৎ, গল্পের জগৎ! এই গল্পতো আমরা লিখতে পারি নি।’ অথচ আজকের প্রজন্ম কিন্তু এই জিনিসগুলো ভাবছে না। সে ক্ষেত্রে আমার মনে হয় যে এই অনুবাদটা, যেমন আপনি হেমিংওয়ের কিলিমাঞ্জারোর তুষারপুঞ্জ অনুবাদ করেছেন, বড় গল্প। এই যে শ্রমটা দিচ্ছেন এই সময়ে এসে, এই বয়সে এসে, পড়তে হচ্ছে একবার, পড়ার পরে সেটা আপনি ট্রান্সলেট করছেন এবং ট্রান্সলেট এটাতো আক্ষরিক ট্রান্সলেটে কাজ হবে না, এটাতো ভাবটা উদ্ধার করার ব্যাপার আছে। কিংবা গল্পের শৈলিটাকে হৃদয়াঙ্গম করার ব্যাপার আছে, সে অনুভবটাকে স্পর্শ করারও ব্যাপার আছে। তো সেটা যে আপনি করতে পারছেন সেটা স্যার আসলে আমরা মনে করছি এখানে একটা আলাদা হাসান আজিজুল হকের জায়গা কিংবা একটা দ্বার উন্মোচন হচ্ছে যে, অনুবাদের ক্ষেত্রে তাঁর জায়গাটা— আমাদের এক ধরনের আশাও আছে যে আপনি আরও কাজ করতে থাকেন, কাজ করছেন এবং যদি এভাবে আরও একটা-দুইটা-তিনটা-চারটা, দশটা গল্প, বিশটা গল্প, ত্রিশটা গল্প হয়ে যায় তখন আমরা দেখবো যে, হাসান আজিজুল হকের হেমিংওয়ে কিংবা হাসান আজিজুল হকের ফাকনার কিংবা হাসান-আজিজুল হকের ও’হেনরি— কেমন হচ্ছে? কিংবা অস্ট্রেলিয়ান যে গল্পের সংকলন পেয়েছেন সেখানে হাসান আজিজুল হকের টেষ্টটা কেমন? বাইরের গল্প, বাইরের যে সমস্ত জিনিসগুলো আসছে, সেক্ষেত্রে আপনার নান্দনিকতার ব্যাপারটাই বলি কিংবা আপনার আনন্দের বিষয়টাই বলি, এই কাজ করতে গিয়ে আপনার কেমন লাগছে?

হা. আ. হ. : দেখো আমার মনে হয় কি, ষাট সাল থেকে আমি মোটামুটি আনুষ্ঠানিকভাবে লেখা শুরু করি। তখন ঠিক করি যে লেখাটাই হবে আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। সে থেকেই এ পর্যন্ত চলেছি এবং ওই জায়গা থেকে একটু বদল হয়নি বরং বলা যায় আমি ষাটে যেখানে ছিলাম, যে মনোভাব, যে কৌতূহল, যে আগ্রহ আমার ছিলো তখন, আমার মনে হয়, আমার এখনও একটুও তা থেকে কমে নাই। যেমন তেমনি আছি এখনো। এইটা যেদিন চলে যাবে সেদিন কিন্তু আমিও মনে করি যে, আমি নিজেই লেখা ছেড়ে দেবো। যখন আমি বুঝতে পারবো যে, হয় রিপেটেটিভ হয়ে যাচ্ছি অথবা ক্লান্তিকর হয়ে যাচ্ছে তখন কিন্তু আমি লেখা ছেড়ে দেবো। কিন্তু এখনো আমার মনে হয় যে, আমার মনের ওই অবস্থাটা আসে নি। যার জন্য এখনো নতুন গল্প লেখার কথা ভাবছি। ছকিয়ে রেখেছি গল্পটা আমি কাল বা পরশু লিখবো। কারণ অনুবাদ হেমিংওয়ের যা হলো তাতে একটা ছোট অনুবাদের বই হতে পারে। আর এর বেশি, খুব বেশি করতে যাবো না। অন্য কারও গল্প অনুবাদ করার কথা এখন আর ভাবছি না। আমি এখন দুটো কাজ-ই করতে থাকবো— গল্প লিখতে শুরু করবো আর হচ্ছে যে, আমি ছোটদের জন্য আমার একটা বালক বয়স সম্পর্কে বই লিখবো। এটা হতে পারে যে হাসান আজিজুল হকের শৈশবকাল… তবে এটা স্মৃতিকথাতে যেমন আছে তেমনটি নয়, একেবারে কিশোরদের…

চিহ্ন : কিশোর উপযোগী?

হা. আ. হ. : কিশোরদের উপযোগী করে আমি একটা লিখতে চাই। এ দুটো জিনিস লিখবো। এ দুটো লেখা হলে আমার মনে হয় যে, আমার তৃষ্ণা নিবারণ হয়ে যাবে। এদুটোর পরেই আমি হয়তো ভাববো যে আচ্ছা একটা উপন্যাস ধরে ফেলি দেখি—

অন্য কারও গল্প অনুবাদ করার কথা এখন আর ভাবছি না। আমি এখন দুটো কাজ-ই করতে থাকবো— গল্প লিখতে শুরু করবো আর হচ্ছে যে, আমি ছোটদের জন্য আমার একটা বালক বয়স সম্পর্কে বই লিখবো। এটা হতে পারে যে হাসান আজিজুল হকের শৈশবকাল… তবে এটা স্মৃতিকথাতে যেমন আছে তেমনটি নয়, একেবারে কিশোরদের…

চিহ্ন : এখানে একটা প্রশ্ন আমার কাছে মনে হয়েছে যে, গল্পকার হাসান আজিজুল হক উপন্যাস লিখছে, এখন কিন্তু উপন্যাস লিখতে চাইছেন আপনি, এটা কি স্পেস বেশি হওয়ার কারণে? কিংবা এখনকার যে রিয়েলিটির ভেতরে আমরা আছি, এখন যা চলছে, তাতে কি গল্পের চাইতে আপনার উপন্যাসের দিকটাতে ঝোঁক বেশি হচ্ছে? আপনিতো এমনটা বলতে পারতেন, ‘আমি একটা গল্প লিখবো’ কিন্তু তা না করে কেনো বলছেন যে, ‘এরপর আমি একটা উপন্যাস লিখবো?’ অলরেডি আপনারতো ছয়টা উপন্যাস হয়ে গেছে লেখা। উপন্যাসে স্বাধীনতাটা বেশি—

হা. আ. হ. : হ্যাঁ এটা ঠিক কথা যে, সাধারণভাবে দেখো তুমি ছোটগল্পের উদ্ভব হয়েছে অনেক দেরিতে। সাহিত্যের যে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার কথা বলো তাহলে উপন্যাস আর মহাকাব্য প্রায় কাছাকাছি নিয়ে বিচার করি। তার মানে উপন্যাসের খুব একটা প্রাচীনত্ব আছে তার দিক থেকে, মহাভারত-কে আমি উপন্যাস বলতে পারি। সার্ভেন্টিস তো উপন্যাসের শুরুতেই এরকম আছে। কাজেই উপন্যাসের চেয়ে সত্যি করে, খোলামেলাভাবে, বিস্তৃত জীবনের যে অঙ্গনটা, সেটা কিন্তু ধরে আনা যায়। সেটা ঠিক ছোটগল্পে ঐভাবে আসতে পারবে না। ছোটগল্প ঝিলিক দিয়ে দেবে একটা, তাৎক্ষণিক একটা ছবি দিয়ে দেবে— সেটা মর্মস্পর্শী হতে পারে, সেটা তোমাকে একেবারে ছেড়েখুঁড়ে ফেলতে পারে কিন্তু উপন্যাসের এই প্রসারতা— ওরহান পামুক তুমি যদি না পড়ো, ¯েœা যদি না পড়ো, তাহলে দেখা যাবে যে, আচ্ছা এই মুহুর্তে তুরস্কের যে চেহারাটা, মৌলবাদী যে চেহারাটা, সেটা কিন্তু ধরা যাচ্ছে না। তেমনি আমারও এখন মনে হয় যে, উপন্যাসের এই জিনিসগুলো আমি ধরতে পারি কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশ একদম ডোবার পানির মতো, মোটা পানি, উপরে সর পড়া স্থির হয়ে রয়েছে। এখানে উপন্যাস লিখতে চাইলেই কি লিখতে পারা যাবে? মানে জীবনের জঙ্গমতা এবং জনপদের জঙ্গমতা তো থাকতে হবে, তাই না? আর তা নাহলে ওই পুতুলনাচের ইতিকথার মতো লিখতে হবে স্থির হয়ে আছি, তাই না? মানিক বন্দোপাধ্যায় তো তাই বলেছেন, সব পুতুল, কিছুই করার নেই, স্থির হয়ে আছে। তো তিনি অসাধারণ একটা গদ্যরূপ দিয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই—

চিহ্ন : এবং মেসেজটাও স্যার অনেক…

হা. আ. হ. : অনেক বড়, অনেক বড়, অনেক বড়। ঐ শশীর স্বাদটা শুধু শশীর স্বাদ নয়, আমাদের সকলের জীবনের স্বাদ ঐটাতে— উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়টা দেখবো। সে তো আর কোনোদিন, তাঁর জীবনে হলো না। আমার অবশ্য সেইরকম মনে হয়, গল্প তো লেখা হলো কিছু, গল্পের প্রতি আমার কোনোরকম বিরাগ জন্মায়নি, গল্প লেখাই যাবে, একটু নভেলা জাতীয় গল্প লেখা যায়, একটু বড় সাইজের গল্প তো লেখা যায় আরকি। আমি সে রকম একটা গল্পের কথা ভেবেছি, হয়তো সেই গেসটা লিখবো। ইতিমধ্যে আরও দুএকটা গল্প লিখেছি, এখানো ছাপা হয়নি। দুইটা-দুইটা তো বটেই। আমি আরও কিছু গল্প লিখি, পাশাপাশি ছোটদের জন্য লিখতে থাকি। এইভাবে দুহাত বাড়িয়ে কেবল লিখতে ইচ্ছা করে, ধরতে ইচ্ছা করে। যদি জীবনের স্বাদটা না থাকতো এখনো তাহলে এটা বোধহয় পারতাম না। বাঁচার যে স্বাদ এটা যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষের যায় ততক্ষণ পর্যন্ত সে কিন্তু খুব ‘অ্যাকটিভ’ থাকে।

আমারও এখন মনে হয় যে, উপন্যাসের এই জিনিসগুলো আমি ধরতে পারি কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশ একদম ডোবার পানির মতো, মোটা পানি, উপরে সর পড়া স্থির হয়ে রয়েছে। এখানে উপন্যাস লিখতে চাইলেই কি লিখতে পারা যাবে? মানে জীবনের জঙ্গমতা এবং জনপদের জঙ্গমতা তো থাকতে হবে, তাই না? আর তা নাহলে ওই পুতুলনাচের ইতিকথার মতো লিখতে হবে স্থির হয়ে আছি

চিহ্ন : স্যার এখন যদি আপনি আবার লিখছেন, লিখতে গিয়ে কি স্যার মনে হয় যে, এইরকম কথা আপনি আগে বলেছেন? এইরকমতো মনে হয়না বোধহয়। বা…

হা. আ. হ. : আমি তো তাই মনে করিনি। কিন্তু সেদিন আমাকে প্রশান্ত কি বললো ঠিক বুঝতে পারলাম না। প্রশান্ত বোধহয় বললো, ‘না স্যার, আমি কিন্তু তা মনে করি না।’ তার মানে সে বোধহয় হয় বলতে চায় যে, আপনার এখনো অনেক রিপেটেটিভ হয়ে গেছে বা— এই জিনিসগুলো পাঠক বলতে পারবে। কিন্তু আমার মনে হয় না যে আমি বারবার রিপিট করছি, স্মৃতিকথাতেও নয়। স্মৃতিকথার প্রথম খ-ের গদ্যর সাথে দ্বিতীয় খ-ের গদ্য, দ্বিতীয় খ-ের গদ্যর সঙ্গে তৃতীয় খ-ের গদ্য এবং এখনকার গদ্য একটু একটু চেঞ্জ হচ্ছে কারণ আমার অভিজ্ঞতার উপরে জিনিসটা নির্ভর করছে আর কি। কাজেই নরম স্মৃতিগুলি তারপর একটু শক্ত— সেজন্য আমি সবসময় মনে করি যে আমার ভাষাটা মানে যে খাপে যে কলমটা ঢুকবে সেই খাপে যেনো সেই কলমটা থাকে। সেজন্য আমার ভাষাটা আমার সেই মুহুর্তের যে চিন্তা এবং ইয়ে তার সঙ্গে যেনো একদম মিলে যায়। তাহলে আমি নিজেকে কেনো পুরানো মনে করবো? আমিতো মনে করতে পারবো না যে আমার ভাষা পুরানো হয়ে গেছে, মনে করতে পারিনা। এখনো গদ্য লিখলেই আমার মনে হয় যে আমি, একটু যা গল্প-গদ্য লিখছি কিছু নতুনত্ব সেখানে একটুখানি থাকবেই থাকবে।

চিহ্ন : এ ক্ষেত্রে আমার একটা জিনিস, আমার ক্ষেত্রে মনে হয় যে, আপনার গদ্যটা এক ধরনের মানে চৌম্বক একটা ব্যাপার আছে। এই বিষয়টা যেমন এখানেও (কিলিমাঞ্জারোর তুষারপুঞ্জ) যদি বলি, ‘তুষারাচ্ছাদিত কিলিমাঞ্জারোর উচ্চতা এতো মিটার, এটা আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত’— এই যে চলছে কিংবা শকুন এর শুরুটা, এইসব জিনিসের মধ্যে আমার স্যার মনে হয় যে, ভাষার যে শক্তি এবং আপনি যে ভাষাটা প্রয়োগ করেছেন সেটা কিন্তু আমরা একটু অন্যভাবেই বলি, সমাজের অনুশাসন কিংবা যে কনভেনশনাল কালচার কিংবা ধর্মীয় যে সমস্ত রীতি-নীতি, অনুশাসন, আচার-আনুষ্ঠানিকতা কিংবা আমি তখনকার বা এখনকার এ সমস্তগুলো ঝেড়ে ফেলে একেবারে সার্বভৌম একটা…

হা. আ. হ. : অবিকল, অবিকল তুমি যেটা বলছো— ঠিক প্রকাশ করলে আমার কথাটি, যে আমি সমাজের চেহারা, সমাজের দৈনন্দিনতার এটা-ওটা-সেটা কোনোটাই দেখবোনা তো। আমিতো ‘ক্রিয়েট’ করছি। আমার কাজটাতো তোমরা বলো সৃজনশীল কাজ। তোমরা যারা কবিতা লেখো, কি গল্প লেখো, তোমরাতো সৃজনশীল কাজ করো। সৃজনশীল কাজ মানে হচ্ছে যা আগে কেউ দেখে নাই। সেটা বোঝা গেলো এই প্রথম। যদি আগে দেখে দেখে তোমার চোখ ক্ষয়ে গেছে, আবার সেইটা দেখছো তাহলে সেইটা তো সৃজনশীল কাজ বলা যাবে না। আমার গদ্য লেখার ব্যাপারটাও তাই, গদ্য লেখার ব্যাপার যদি হঠাৎ করে মনে হয়, না এতো অসম্ভব পুরানো জিনিস স্যার আবার শুরু করলো, আমি যদি পাঁচটা লাইনও লিখি…

হা. আ. হ. : হু, আরোপ বা ভয়ে আছি, তাইনা? যে এটা লিখবো—

চিহ্ন : হ্যাঁ। আরও একটা জিনিস আমার বলার ব্যাপার আছে যে, একজন লেখকের ভাষা; হয়ার অ্যাজ আমি কাউকে খাটো করে বলছি না, সৈয়দ হকের গল্পের ভাষা আমার কাছে ঐ পর্যায়ে কিন্তু টানছে না যতোটা টানছে পরাণের গহীন ভিতর কিংবা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কিংবা নুরুলদীনের সারাজীবন; কিন্তু তার যে শেষ দিকের লেখাগুলো তা কিন্তু স্যার ঐভাবে একটা উপরে উপরে ভাব আছে মনে হয়। তারপর এইরকম আরও আছে অনেকের লেখায় আমি দেখেছি যে, এক ধরনের ‘জৌল’ ব্যাপার। কিন্তু আপনার কোনো লেখায় আজ পর্যন্ত যতই আপনি তাড়াহুড়ো করে লেখেন, যত সংক্ষিপ্ত সময় নিয়ে লেখেন, এই ‘জৌল’ জিনিসটা আমি পাইনি কখনো। এটা আমার ক্ষেত্রে একটা মনে হয়েছে— এই ইন্টারভিউয়েও যেটা বললেন, আপনার যে বেড়ে ওঠার জায়গাটা; এতো নিরঙ্কুশভাবে, এতো ফ্রিলি, এতো হজম করে তৈরি হওয়া— সে কারণে বোধহয় ভাষাটার তাপ ও শক্তিটা এতো বেশি। আমি আসলে…

হা. আ. হ. : যেটা বললে, এটা তোমার ‘অবজারভেশন’। আমার কাছে মনে হচ্ছে যে তোমার ‘অবজারভেশন’। আমার মনে হচ্ছে যে অবজারভেশন তোমার নাইন্টি পার্সেন্ট ঠিক। আজকে ধর, শেষ হয়ে গেলো আমার, স্মৃতিকথার চতুর্থ খ-। (স্মৃতিকথার কিছু অংশ পড়ে শোনাতে শুরু করলেন) ‘গাঁয়ের নিভৃত ছোট্ট দুয়ার দিয়ে বাইরে এসে চারদিকে শত শত দুয়ারের দেখা পাই। তাদের কোনোটি খোলা, কোনোটি বন্ধ। হাট করে খোলা, আধা খোলাই, ঠেলা দিলেই খোলা যাবে কিংবা চিরকালের জন্য বন্ধ। এখন উই ধরা, বুনো, ঘাসগজানো, পরিত্যক্ত, সামান্য চেষ্টাতেই ঢোকা যায়। কতো না দুয়ার এই মুহুর্তে পৃথিবীতে, সব ফেলে আমি দাঁড়িয়েছি অজানার অথচ নির্দিষ্ট একটি দুয়ারে’— এই পর্যন্তই।

চিহ্ন : এগজাক্টলি! এডজেক্টলি, এক্কেবারে নির্ভুলভাবে। এটা মানে আমি আর এখানে, কোনো মন্তব্য নাই।

হা. আ. হ. : এখন কি জানি, হয়তো তুমি যেটা বলছো সেইটাই ঠিক। হয়তো কিছুতেই ওই যাকে বলা যায়, ব্যবহারে-ব্যবহারে, ঘর্ষণে-ঘর্ষণে যেটা একেবারেই ধার নষ্ট হয়ে গেছে যার, সেটা কিন্তু করা যাবে না সেইটা নিয়ে আমি সবসময় মনে হয় যে কামারের ঐ হাপোরটা বুঝলে— ওটা আর হাতুড়িটা ছাড়া যাবে না। ভাষাটাকে বিবেচনা করতে হবে যে মাঝে মাঝে গরম করে, পিটিয়ে ঠিক করে নিয়ে পানিতে ডুবিয়ে ঠা-া করে, আবার সেটাকে গরম করে যতক্ষণ পর্যন্ত ঠিক জায়গাটা না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত এই কাজটা করে যেতে হবে। ভাষাকেও তাই মনে করি আমি যা বলতে চাই, তুই বল সেটা। যতক্ষণ না বলছিস ততক্ষণ আমি তোকে ছেড়ে দেবো না। এবং আমি এই করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে যে, বাংলা ভাষা খুব শক্তিশালী ভাষা। ইংরেজি ভাষার চাইতে কোনো অংশে কম নয়। এইটা আমরা কেন প্রচার করি না জানি না। আমাদের ভাষা, আমাদের বর্ণ অসম্ভব রকমের বৈজ্ঞানিক একটা ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। তারপরেও আমরা এই ভাষা নিয়ে লোকের কাছে মন ছোটো করে-করে ঘুরে বেড়াই, এটা ঠিক না। সে জন্যই ভাষার উপরে আমি এতোটা গুরুত্ব দিয়ে থাকি। লেখার সময় বারবার ওই কথাটাই মনে হয় আরকি, আমি যতদূর পারি অন্তত করি। আমি যেনো চর্বিতচর্বন না করি, আমি যেনো একটু নতুন করে লিখতে পারি, ভাবতে পারি, বলতে পারি আরকি। এইটা আসলে করা হচ্ছে।

চিহ্ন : এইটা স্যার আমার আর একটা জিনিস যেটা মনে হচ্ছে যে, আপনিতো আগে বলেছেন আমাকে— সেটা হল, শকুন কিভাবে লেখা হলো আমি জানি না। লেখা হয়ে গেছে, শকুন লেখার জন্য কোনো প্রস্তুতি ছিলো না, কিংবা শকুন লেখার জন্য আমি দশটা গল্প পড়ে শকুন লিখতে বসেছি তা নয়, তাহলে ব্যাপার দাঁড়াচ্ছে যে, শকুন থেকে শুরু করে চলছে যেটা, সত্তর-আশি-নব্বই এই দীর্ঘ সময় ধরে এবং এখনো যা চলছে সেখানে আমরা কিন্তু দেখছি যে কোনো জায়গায় কিন্তু আপনার মানে হসান আজিজুল হক যে ‘সিরিয়াস’ গদ্যকার, আমরা যারা মানে একাডেমিক মানুষরা বলি, আপনি হয়তো স্যার একটু তাচ্ছিল্য মনে করবেন যে গদ্যের আবার ‘সিরিয়াস’ আর ‘নন-সিরিয়াস’ কি আছে? আমি যেটা লিখি সেটাইতো লেখা। এটাতে আবার এক ধরনের ‘বিশেষণ’ যুক্ত করা কিংবা এটার অর্থ কি? এটা সে-টা। এটা হতেই পারে কিন্তু এই যে ‘সিরিয়াস’ গদ্যকার কিংবা হাসান আজিজুল হকের গল্প নিয়ে কাজ করা যায়; ভেরিয়েশন উদ্ধার করা বা সমাজটাকে দেখা দরকার, সমাজের মধ্যে বিভিন্ন প্রান্তগুলো চেনা দরকার। সমাজের ভেতরে দ্বন্দ্বটাকে, দ্বন্দ্বের যে উত্তাপ সেটাকে অনুভব করা দরকার সেটা পড়ে কিংবা উপলব্ধি করে সেই জায়গায় পাঠকের যাওয়ার ব্যাপার, এই জিনিসগুলো আমরা যখন ভাবছি, দেখছি কিংবা হাসান আজিজুল হকের গল্পের ‘ইমপোর্টেন্সি’— যেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত একজন গল্পকার; যেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সৈয়দ শামসুল হকও একজন গল্পকার। যেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে শাহেদ আলী ওই সিক্সটিজ এর দিকে, তারপরে আরও অন্যান্য বিভিন্ন সময়ে যারা লিখেছেন, সত্তর এ লিখছেন— সেখানে কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, গল্প পড়ে জ্ঞানচর্চা করার জন্য হাসান আজিজুল হককে দরকার, গল্প পড়ে পাঠোদ্ধার করাটা দরকার সেটা মানুষ হওয়ার জন্য, জীবনকে বোঝার জন্য। এই জিনিসগুলো যখন ঘটছে, এই জিনিসগুলা যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার স্তরে কাজ করছে, হচ্ছে, সেখানে আমার মনে হয় যে আপনার ভাষাটাই প্রধান দায়ী। আপনার ভাষাটাই এসব কিছুর চিন্তা করাচ্ছে এবং ভাষাটাই প্রধান। এবং এটা শুধু গল্পের ভাষাতেই নয়— যখন অপ্রকাশের ভার পড়ছি সেখানে গদ্যটা কিংবা প্রবন্ধের যে চেইনটা সেটা কিন্তু এক ধরনের যুক্তির সুতোয় বাঁধা। একটার যুক্তিতে আরেকটা চলছে। তো সেখানে কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি যে, চিন্তার স্বচ্ছতার বিষয়টা আছে এবং যেটা আপনি বলতে চাচ্ছেন— সেটা এক ধরনের যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। গদ্যকার হাসান আজিজুল হক— এটা আমার কাছে মনে হয় যে, ‘ডিউ টু ইন ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ’…

হা. আ. হ. : তা তো বটেই,

চিহ্ন : যেটা দাঁড়াচ্ছে গল্পকারের একটা ‘আ্যারেঞ্জমেন্ট’ থাকতে হবে এবং সেটা ভাষারই কারুকাজ…

হা. আ. হ. : তুমি ঠিক-ই বলেছো। ঐ যে তোমরা যেটা বলো, ‘টেক্সট ইজ দিয়ার’, আর তো কিছু থাকবেনা তাইনা? টেক্সটাই থাকবে। এবং তা যতরকম করে পড়বে ততরকমের টেক্সট এটা, এটা যে একটা সাংঘাতিক কথা, পাঠককে তৈরি করে নেবে। আমি তো চলে যাবো, মুক্ত হাসান আজিজুল হক তো এখানে থাকবে না। থাকবে তো তার টেক্সট। কাজেই নিজেই আমাকে ঠিক করে নিতে হবে আমার পথ কি? পন্থা কি? নান ক্যান হেল্প মি রিয়েলি, কেউ আমাকে হেল্প করতে পারবে না, পারলোনা তো। কেউ পারলো না যে আপনি এভাবে, হল না আর কি— সুতরাং আমি কাউকে কোনোরকম পরামর্শ দেই না যে— এইভাবে লেখেন। আমি বলি যে ধরে রাখুন আপনি একটা জঙ্গলাকীর্ণ একটা জায়গার মধ্যে ঢুকছেন আর কি, রাস্তা নাই, আপনাকে একটু জঙ্গলটা পার হতে হবে। দেখেন কিভাবে পার হতে পারেন। পাতা কেটে, ডাল কেটে, ঘাস কেটে—

বাংলা ভাষা খুব শক্তিশালী ভাষা। ইংরেজি ভাষার চাইতে কোনো অংশে কম নয়। এইটা আমরা কেন প্রচার করি না জানি না। আমাদের ভাষা, আমাদের বর্ণ অসম্ভব রকমের বৈজ্ঞানিক একটা ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। তারপরেও আমরা এই ভাষা নিয়ে লোকের কাছে মন ছোটো করে-করে ঘুরে বেড়াই, এটা ঠিক না। সে জন্যই ভাষার উপরে আমি এতোটা গুরুত্ব দিয়ে থাকি।

চিহ্ন : কিন্তু স্যার ঐ যে এখন মানিক পড়তে গেলে কিন্তু এ রকম মনে হচ্ছে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পড়তে গেলে স্যার এরকম লাগছে না কিন্তু। ঠিক আমি যখন আবুজাফর শামসুদ্দীন পড়ছি আর ভালো লাগছে না। পদ্মা মেঘনা যমুনা, ভাওয়ালগড়ের উপাখ্যান কই… বেশি দূর…

হা. আ. হ. : বেশিক্ষণ পড়ে আর ভালো লাগছে না…।

চিহ্ন : আর ভালো লাগছে না। স্যার এখন পড়ার জন্য, পড়ানোর জন্য সেটা অন্য কথা। তৃষ্ণা নিবারণের কথা হচ্ছে। তারপরে আমি যদি একটু এগিয়ে আশির দশকে এটা-সেটা, নাসরিন জাহান তারপরে শিরিন আক্তার কিংবা আকিমুন রহমান কিছু করছে— দেখা যাচ্ছে যে হ্যাঁ কিছু তো একটা-দুইটা-তিনটা গেলো তারপরে আর ফুরিয়ে যাচ্ছে…

হা. আ. হ. : আর তো নাম-ই শোনা যাচ্ছে না।

চিহ্ন : তাহলে এই যে ব্যাপারটা, হয়ার অ্যাজ— আবার তাহলে ফিরি, পিছনেই ফিরতে হবে আবার মানিকের যে উপন্যাসগুলোকে গুরুত্ব আমরা স্যার কম দেই, যেমন চিহ্ন, হলুদ নদী সবুজ বন— তার সাঁইত্রিশটা উপন্যাস— মানে কি, সাঁইত্রিশটার মধ্যে আমরা সাধারণত তিনটা নাড়াচাড়া করি।

হা. আ. হ. : হ্যাঁ।

চিহ্ন : আর বাকিগুলোর কোনো খবর নাই। তা আমরা হয়তো বাংলার মাস্টার বলে পড়তে হয় প্রয়োজনে কিছু, কিন্তু সেটাতেও— একটা ছেড়ে ওঠা যায় না, পড়তে শুরু করলে…। শহরতলী ভালোই লাগে পড়তে। তাহলে স্যার এখানে আমার যেটা মনে হচ্ছে যে, ভাষা বলি, অভিজ্ঞতা বলি, বড় হওয়া বলি, যৌবন বলি, তারুণ্য বলি, জীবনবাদী বলি, জঙ্গমতা বলি; এগুলো তো একেকটা করে আমরা খুঁজে বের করি, একেকটা ‘প্রটোটাইপ’তুল্য কিন্তু আসলে কি আমাদের যে কথাশিল্পী যেটা আমরা বলছি মানে শিল্পীর যেটা কাজ কুঁদেকুঁদে কিছু বানানো— একটা অবয়ব দেয়া, তার কি একেবারে শূন্যতাই চলছে? শূন্যতাই যদি চলে তাহলে তো…

হা. আ. হ. : কথা ঠিকই বলেছো (আস্তে)। খুব শূন্য সময় একদম, খুব শূন্য সময় (আস্তে)। মানে এরকম ঐশ্বর্যহীন, মানসিক ঐশ্বর্যহীন, প্রতিভা ঐশ্বর্যহীন, এসব কিছু আর খুব-ই আকাল, এবং এটা ঠিক ই। আর মানুষের মধ্যে নানান জিনিস ঢুকেছে তো এখন; স্বল্পে তুষ্টি, অন্যান্য জিনিসের প্রতি মনোযোগ বেশি, আর বিশেষ করে কি…

চিহ্ন : কিন্তু স্যার একটা যেটা বিষয় সেটা হল যে, এস. এম. সুলতানের তো কোনো আকাক্সক্ষা ছিলো না।

হা. আ. হ. : না, আকাক্সক্ষা ছিলো না।

চিহ্ন : তো যদি আমি এস. এম. সুলতান হতে চাই, আমার আকাক্সক্ষা থাকবে কেনো?

হা. আ. হ. : তা তো বটেই। আকাক্সক্ষা ছিলো না। এস. এম. সুলতান অসম্ভব অন্যরকম মানুষ। ওঁর মতো মানুষ আমি আর দেখিনি। ওরকম নিরাসক্ত মানুষ আমি দেখিনি। কোথা থেকে জন্মেছে বাংলাদেশে! বাংলাদেশে এরকম মানুষ হতে পারে, অদ্ভুত!

চিহ্ন : তা আমাদের এই জিনিসটা আমরা কেনো…, আমাদেরতো এখন তো কোনো ম্যাটারের অভাব নেই।

হা. আ. হ. : নাহ্, কোনো অভাব নাই।

চিহ্ন : ম্যাটারের অভাব নাই। এস. এম. সুলতানের ঢাকা শহরে প্রায়শই প্রদর্শনী হচ্ছে। অথচ এস. এম. সুলতান যখন ছবি আঁকতেন তখন ওই প্রদর্শনী তো ছিলো না।

হা. আ. হ. : (সম্মতি জানিয়ে) না… কোথায়?

চিহ্ন : কোথায়? এখনতো আমাদের প্রচুর ম্যাটার। একটা মানুষের বড় হওয়ার দৃষ্টান্ত আমরা দেখছি। তার যে নিরাসক্তি প্রবণতা আমরা জানছি। কিন্তু আমরা তো সেটা কাজে লাগাতে পারছি না। কিংবা আমাদের মধ্যে তো সেই প্রবণতাটা নাই।

হা. আ. হ. : কারণ খোঁজ তোমরা, দেখো, প্রযুক্তি দেখো, এখনকার ইনটারেস্টগুলো শিফ্ট করে কিসে কিসে— সেটা দেখো। আদার মিডিয়াগুলি দেখো। তার ফলে কী একদম মানুষ শেষ পর্যন্ত কিসে পরিণত হবে? যেমন কে বলে, অনেকেই তো বলে, তোমার এই যে আলবেয়ার কামু বলতেন, ভবিষ্যৎ-এ মানুষ কি? কিছুই না, থাকবে আর বংশবৃদ্ধি করবে, খবরের কাগজ পড়বে আর বংশবৃদ্ধি করবে। মানুষের আর কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। এটা রেভেলের মধ্যে দিয়ে, কামুর মধ্যে দিয়ে… তো তাকাই না, আমি তো কাফকার দিকেও তাকাই না। তাকিয়ে তো দেখতে হবে যে, জীবনের কতো বিষ আছে? জীবনের কতো… আছে, কতো বিষ আছে, কতো অভিজ্ঞতা আছে, একটা মানুষ একদিন সকালবেলা উঠে দেখলো যে সে নিজে একটা পোকাতে পরিণত হয়েছে, একটা গোবরে পোকাতে পরিণত হয়েছে। কিভাবে সে ই-িকেট করছে? কিভাবে ‘ই-িকেট’ করছে তাকে? মানুষ নিজের অস্তিত্বের জালে নিজে এমন করে জড়িয়ে পড়ছে আর সেখান থেকে বের হতে পারছে না, বের হতে পারা যাবে না, তাই না? অথচ আমরা দেখছি খানিকটা এটাও ঠিক আমরা কিন্তু আস্তে আস্তে এক অর্থে মিনিংলেসটা যদি কেউ কনভেস হয়ে যায় তাহলে সে কিন্তু একটা সম্পূর্ণরকম নিরাসক্ত, পৃথিবীতে নিরাসক্ত, জীবনে নিরাসক্ত, কোনোকিছুতেই তার আসক্তি থাকবে না আরকি। আমার মনে হয় যে, আসক্তিহীন জীবন উচিৎ না, আসক্তি থাকা দরকার। এখন আমি খুব পড়ছি, এই লোকটাকে পড়ছি, হেমিংওয়েকে পড়ছি হেমিংওয়ে দি ম্যান দি রাইটার দি লিজেন্ড (বইটি দেখিয়ে) এখানে এঁরা হেমিংওয়েকে ছেড়ে কথা বলেন নি, ছেড়ে কথা বলেন নি (পুনরায়)। দুর্বলতা কোন জায়গায়, কিসের দুর্বলতা, কোথায় রিপেটেটিভ, সেই সঙ্গে সঙ্গে কি প্রচ- শক্তি তাঁর লেখার…। এতো সিম্পল লেখা, বহু লোক প্রভাবিত হয়েছে যে বাপরে বাপ এইরকম করে লিখবো, কিন্তু ঐ সারল্য আর কেউ পারলো না। এগুলো সব গ্রেট রাইটারের লক্ষণ। এজন্য হেমিংওয়ে থেকে যাবে চিরকাল কিন্তু আমাদের এখানেও সেরকম, আমি সেদিন রবীন্দ্রনাথ পড়ছিলাম, কিসের আধুনিক! রবীন্দ্রনাথ কি কম আধুনিক নাকি? কোথায়, এই সঞ্চয়িতার শেষের কবিতাগুলো পড়ে দেখো তুমি, তাহলে তুমি বুঝতে পারবে। কত টেক্সট, কোথায় গেছেন… তিনি! এখনকার রবীন্দ্রনাথ। কাজে ওটা কিন্তু কাল উপযোগী কথাটা আমি একটু অস্বীকার করি। মানুষ কালে কালে বদলায়, ভালো কথা— কিন্তু কিছু থেকে যায়। সৃজনে তারপরে কল্পনায়— এই জিনিসগুলো বুঝলে, এই জিনিসগুলোর হার-বৃদ্ধি হতে পারে। এখানে মানুষের— মানুষের যে-যার কোনো সম্পর্ক নাই। তার মানে তুমি বলতে পারো যে, পিরামিডের পাথরগুলো কোনোরকম জয়েনিং কোনোকিছু না দিয়েও এরকম করে তৈরি, কি করে পিরামিড তৈরি করা হলো? পিরামিড তৈরি করাটা রহস্য। কোনো সিমেন্ট নাই, কিছু নাই, কোনোকিছু দেয়া নাই। অথচ একচুল ফাঁক নাই। প্রত্যেক-ই প্রত্যেকের ভারসাম্য রক্ষা করেছে। ভারসাম্যের উপরে পিরামিড কিন্তু। কি করে এই জিনিসটা তাদের মাথায় ছিলো…! কাজেই এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে নতুন নতুন সৃষ্টি করার ক্ষমতা আমাদের জন্মাচ্ছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নাই, মনে করতে হবে যে এটা আছে— সেটার ব্যবহার— এখন সেইটার ব্যবহারও কমতে কমতে প্রায় জিরো। মস্তিষ্কের ব্যবহার-ই করলো না। আমার ওই যে ছেলেগুলা, কত হল রে? দশ টাকা, পনেরো টাকা, বিশ টাকা, একশ টাকা, পাঁচশ টাকা; বলার সঙ্গে সঙ্গে ওইটা (ক্যালকুলেটর) ধরছে, বলে দিলো আরকি, নির্ভুল বলে দিলো আরকি! কি দরকার আমার? আমাদের যে অঙ্ক শেখানো হতো বলতো কিরকম করে? একটা গুণ শেখাতে গেলে চারটা অঙ্ক এদিকে— তলায় হয়তো তিনটা দিয়ে গুণ! এইরকম করে যাবে— এইরকম করে, একটা উঠে যাবে একটা বাদ পড়বে, কি সাংঘাতিক জিনিসটা ছিলো! এখন কোনোটার দরকার নাই। শুধু নখ টিপলেই হবে। এখন এগুলো কি জানি আমার মনে হয়…

চিহ্ন : এখান থেকে আর একটা কথা স্যার মনে পড়ছে সেটা হলো, ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র ভর্তি হচ্ছে। নিজের নাম লিখতেও ভুল করছে। বাপের নাম লিখতে ভুল করছে। তার কারণ এদের গড়ে ওঠাটা ‘মাল্টিপুল চয়েজ’র মধ্য দিয়ে। লিখতে পারে না, আম-জাম-কলা কোনটা ঠিক? ক-খ-গ-ঘ কোনটা ঠিক? টিক দিয়ে দাও বা গোল চিহ্ন দিয়ে। বানান দরকার নেই, ক্রিয়েটিভিটি দরকার নেই, বিস্ময়কর ব্যাপার একটা ও. এম. আর. শিটে নিচে বলা আছে, তুমি যে কোনো একটি বাক্য লেখো। লিখতে পারছে না।

হা. আ. হ. : তবে হবে কী? লেখক হয়ে, কবি হয়ে, সাহিত্যিক হয়ে, পেইন্টার হয়ে কি করবে?

চিহ্ন : হ্যাঁ। একটা বড় অংশের কথা আমরা বলছি, এটা হয়তো সরলীকরণ হয়ে যাবে— কিছুতো ব্যতিক্রম হয়— সেটা অন্য কথা, কিন্তু আমাদের মেক্সিমাম এটা চোখে পড়ছে। একটা ভর্তি পরীক্ষায় আমরা যখন দেখতে পাচ্ছি যে, দেড়লাখ ছেলে-মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে, সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রায় অনেকেরই এই দশা।

হা. আ. হ. : তাহলে এটা অসম্ভব রকমের একটা দুশ্চিন্তার কারণ হলো না?

চিহ্ন : স্যার আমি আজকে যেটার জন্য মূলত সেটা হল আপনার ভাষাটা। মানে যেটা আমি উপলব্ধি করেছি…

হা. আ. হ. : তোমার সাথে কিছু কথা হলো। আর কিছু কথা হচ্ছে যে, আমি যেটা নিয়ে খুব ভাবি, এইজন্য আমি আসলে অনেক লেখা লিখেছি। তাতে তোমার সাথে যেগুলো শেয়ার করলাম তার কিছু কিছু লেখা হয়েছে, দেখে নিও। এবং সে বইটাও তুমি দেখে নিও, যে বইটা রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা ভাষা প্রসঙ্গে …

চিহ্ন : আপনি আমাকে দিয়েছিলেন।

হা. আ. হ. : কাজেই ভাষা নিয়ে আমি খুব চিন্তা করি। এবং আমি মনে করি, এগুলো দার্শনিকেরা নানান রকম কথা বলছে বটে, আমিও মনে করি ভাষা কিন্তু অস্তিত্ব। ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ এক্সজিসটেন্স, নো ল্যাঙ্গুয়েজ ইউ নো লঙ্গার এক্সিস্ট। তাই না? পৃথিবীতে কোনো জিনিস নাই যেটাতে ভাষা নাই। যদি তুমি নামকরণ করতে না পারো, সাহিত্যেও তো নামকরণ করতে হবে। সমুদ্র, সমুদ্র… বললে কি সেটা তো বুঝতে হবে, তোমাকে একটা ইয়ে করে বুঝতে হবে। বোবা কি তোমাকে বোঝাতে পারবে সমুদ্র? মুখে বলে, একদম বোবা যে, বোবা-কালা একি সঙ্গে যে, পারবেনা তো। তো সেখানে তার ভাষাটা দরকার, যেভাবেই হোক। বোবাকেও ভাষা শেখানো যায়, আজ-কালতো পারা যায়, তাই না? আর আমরা অন্ধকেও লেখা শেখাচ্ছি। সে সব বেরিয়েছে মোটামুটিভাবে আরকি। এ থেকে বোঝা যায় যে, ভাষা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নাই। ভাষাই মানব অস্তিত্ব। একথা তো আমি স্লোগানের মতো প্রচার করি প্রায়, বলি আরকি মানুষকে।

চিহ্ন : ভাষাতো আর আপনি স্যার হিসেব করে প্রয়োগ করেন নি। কিন্তু…

হা. আ. হ. : এসে যায়।

চিহ্ন : এসে যায় এবং ভাষাটাই পাঠককে ধরে রাখে। ভাষাটাই গল্প বানায়, ভাষাটাই পাঠক সৃষ্টি করে, ভাষাটাই পুনঃপাঠ সৃষ্টি করে, ভাষাটাই লেখকে বাঁচিয়ে রাখে। এখানে ভাষা নিয়ে স্যার অনেক থিওরি যেমন ‘সাংগঠনিক ভাষাতত্ত্ব’ কিংবা সাংগঠনিক যে থিওরি কিংবা আমরা রোলা বার্থ এর কথা বলছি কিংবা আই. এ. রিচার্ডস এর কথা বলছি, বিভিন্ন ‘ক্রিটিসিজম’ এর রকথা বলছি, সাহিত্যে যা কিছু আসছে সবকিছু কিন্তু ভাষাভিত্তিক। এবং ভাষাভিত্তিক যে ‘ক্রিটিসিজম’ সেটাই কিন্তু আসলে মেরিটের জায়গা বলে মনে হয়। ‘মা মেয়ের সংসারে’র ভাষা, এইটা কোন ভাষা? এটার স্ট্রাকচার কি? এটার ইনার-আউটার-রিয়েলিটি কিভাবে কন্ডাক্ট করছে? কিভাবে এটার মধ্য দিয়ে মার্ক্সসিজমটা ডেভলপ করছে? কি করে এটার মধ্য দিয়ে সমাজকে দেখছি? কি করে এটার মধ্য দিয়ে ফ্রেইরির তত্ত্বটা আসছে? কি করে এটার মধ্য দিয়ে ডি-কন্সট্রাকশন থিওরিটা দাঁড়াচ্ছে? ন্যাচারালি এই জিনিসগুলা কিন্তু ভাষার-ই কাজ। সেটা হয়তো আপনারা ক্রিয়েটিভ মানুষরা ওইভাবে বুঝবেন না— কিন্তু এটা একটা মেথডলজি। আপনার ভাষার মধ্যে এই সমস্ত বিচিত্র বিষয় বলবার, কাজ করার, কথা বলার একটা সুযোগ আছে এবং সেই সুযোগটা— নিশ্চয়ই, হতেই হবে। হতেই হবে আমি এইটা একটু জোর দিয়ে বলছি এই কারণে যে, আমার যে পাঠ অভিজ্ঞতা, আপনার গল্প-উপন্যাসের পাঠের যে অভিজ্ঞতা এবং সেখানে যে সবরিন বা সার্বভৌম একটা ক্ষেত্র যেটা তা কিন্তু উদ্ধার করতেই হবে, কেউ না কেউ সেটা করবে। এটা একটা বিষয়। এভাবে আপনার লেখারও মূল্যায়ন এখনও হয়নি। যা হোক, আমাদের কথা প্রায় শেষের দিকে, এখন যেটা বিষয় সেটা হল যে, আপনার লেখালেখি-অনুবাদ এবং অনুবাদ পড়তে গিয়েও আমি আসলে আনন্দ পাই। ভাষার যে আকর্ষণ, আকর্ষণটাই তো প্রধান— এখনো হঠাৎ করে ওয়ালীউল্লাহ্র রচনাবলি থেকে হয়তো লালসালু-র দুই-তিনটা জায়গা অথবা চাঁদের অমাবস্যা-র দুই-তিনটা জায়গা পড়তে ইচ্ছা করে। ইচ্ছাটা কিন্তু স্যার আসলে একদম ভিতর থেকে। কেনো ইচ্ছা করবে? সেটা ভাষার কারণে। আমি আসলে যে প্রশ্নটার দিকে যেতে চাচ্ছি সেটা হচ্ছে, সচেতনভাবেই করুন, অবচেতনভাবেই করুন, আপনি একজন কথাশিল্পী, শিল্পী। এই শিল্পিত্ব সবার থাকে না। সবাই এটা পায় না। এটা বিদ্যালয়ের ভালো ছাত্র হলেও পাওয়া যায় না। এটা পা-িত্য অর্জন করেও পাওয়া যায় না। শিল্পী জোর করেও হওয়া যায় না। জোর করে কেউ এস. এম. সুলতান হতে পারবে না। জোর করে কেউ কামরুল হাসান হতে পারবে না— হাসান আজিজুল হক হতে পারবে না। আপনি শিল্পী এটা নিশ্চিত, সেই জায়গা থেকে আপনার পুরস্কারও অনেক। আজকেই দেখছি একদল পুরস্কার দিতে এসেছে। তারা পড়–ক না পড়–ক, শিল্পীর যে একটা সামাজিক মর্যাদা কথায়-কথায়, বলায়-বলায় এবং আমি এর আগেও একদিন স্যার বলেছিলাম যে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোগ্রাম হচ্ছে, হয়তো কেউ এক কলম না পড়েও হাসান আজিজুল হক নিয়ে বলছে— কেননা সে শিল্পী, কেননা সে জনসমাজে স্বীকৃত শিল্পী, সামাজিকভাবে স্বীকৃত শিল্পী। এই জিনিসগুলা জাস্ট স্যার আমি একটু বিলো জায়গা থেকে বলছি, এই ব্যাপারগুলো স্যার আপনার কেমন লাগে? এটা আসলে আমি একটু আপনার বয়স-টয়স সবকিছু মিলে, আপনিও রক্ত-মাংসের মানুষতো— আসলে জিনিসগুলা কেমন লাগে? সব বাদ, ভাষা কিভাবে হচ্ছে? ভাষা কিভাবে দাঁড়াচ্ছে? আপনার জীবন কেমন? যৌবন কেমন? বা লেখাপড়া শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি, পা-িত্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে আপনি একজন শিল্পী, সামাজিকভাবে স্বীকৃত শিল্পী। সেখানে আপনার প্রচুর মান— উপঢৌকন অনেক। কেউ জেনে দেয়, কেউ না জেনে দেয়, কেউ শুনে শুনে দেয়। কেউ এমনি এমনি বলে, সবাই জানে— উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত কথাশিল্পী। আপনি শহরে গিয়েও শুনছেন, আপনি রাজশাহী শহরে শুনছেন, আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেও দেখছেন কিংবা ঢাকা শহরে গেলে তো অন্যরকম ব্যাপার, মাতোয়ারা অবস্থা। তো এই যে ক্যাচি ব্যাপার— এই জিনিসটা… নতুন প্রজন্মের কাছে আপনার কোনো…

হা. আ. হ. : আমি কোনোভাবেই যেনো এইসব কারণে ভিন্ন রকম আসক্তি, তারপরে ভিন্ন রকম জায়গায় আগ্রহ, এগুলো যেনো আমার তৈরি না হয়। আমি বলবো না যে আমার খুব খারাপ লাগে, খারাপ লাগে সে শব্দটা আমি বলবো না। কিন্তু এই খারাপ লাগাটা আমাকে মাতাল করবে না, আমাকে সেই অর্থে স্থানচ্যুত করবে না। ঠিক আছে, তাহলে  যা খুশি লিখলেই তো ছাপবে, না— সেটা আমি কিছুতেই যে করবো না, আমি এলাউ করবো না নিজেকে এটা এখন পর্যন্ত… এবং লোকেরা যখন আমার প্রশংসা করে, ভালো বলে, তখন আমার ভালো লাগে, এটা কার না ভালো লাগে বলো? কিন্তু আমি যদি অ্যাবাভ অল— সত্যিকারের একজন খাঁটি মানুষ হই, সেটাই তো যথেষ্ট আর কিছুতো লাগে না। আমি লেখক হচ্ছি কি সেটাতো বড় কথা নয়, আমি খাঁটি কিনা— সেইটাই হলো আসল কথা। নিজের খাঁটিত্বটা বজায় রাখতে চাইছি। কোনোকিছু গোপন না করে নিজের খাঁটিত্বটা বজায় রাখতে চাইছি, যতদূর পারা যায়। যদি কোনো জায়গায়, সাধারণ জায়গা থেকে যে পদস্খলন, যে সমস্ত মানুষের, পরিচিত কথা হয় অনেকে— সেও আমার মনে হয় যে আমি কখনো সেটা গোপন করবো না আরকি! নাথিং টু হাইড…নাথিং টু হাইড…। আর অপরের কথা ভালো লাগুক আর মন্দ লাগুক আমি ভেসে যাচ্ছি না কোনোরকমে।

চিহ্ন : এখন স্যার রবীন্দ্রনাথের মতো লেখকের মানে তার জীবনে কিছু নানারকম সমালোচনা ছিলো। এবং রবীন্দ্রনাথও কিন্তু জীবন সম্পর্কে, লেখালেখি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য তিনি জীবনকালেও অনেক শুনেছেন।

হা. আ. হ. : অনেক শুনেছেন, তাঁর গান সম্পর্কে, তাঁর…

চিহ্ন : শুনেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপনি যেটা স্যার— আপনি প্রচুর রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন, সে চর্চা আপনার আছে। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা, কষ্টকে-দুঃখকে দেখা, প্রতিপক্ষকে দেখা, তাকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এসব নিয়ে অনেক কিছু তিনি দেখেছেন— শুনেছেন, শেষ জীবন পর্যন্ত সেটা তাঁর ছিলো। সেরকম কিছু…

হা. আ. হ. : (কিছুক্ষণ ভেবে) নাহ্, কোনো কষ্ট আমাকে ঐভাবে দিয়েছে, ডাহা একটা মিথ্যা কথা বলে, আমাকে যদি কেউ বলে, ওভাররেট করে, তাতে হয়তো আমি বাধা দেবো না; খুশি হবো, কিন্তু নিজে নিজে বুঝবো যে একটু ওভাররেটিং হয়ে গেলো আমার সাথে। আর কেউ যদি আন্ডারওয়েট করে, তাহলে আমি ঝাঁপিয়ে গিয়ে তার উপর পড়বো না, সেটা করবো না কক্ষনোই, সেরকম ঠিক করেছি। আন্ডারওয়েট করলেই বা কি আর না করলেই বা কি। তাহলে তো কাজ করা যাবে না। দুটোর যে কোনোটাতেই তুমি যদি বেশি ঝুলে পড়ো আরকি তাহলে তুমি কাজ করতে পারবেনা তো। নিজের করণীয় কাজ করতে পারবে না। তখন মনে হবে যে, কি কি পছন্দ করছে? ও এই এই জিনিসগুলা। দেখি তাহলে তো এ রকম করে কিছু করা যায় কিনা, এইটা করতে পারা যাবে না। আমি ঠিক করেছি আমি এইটা করবো না। শেষ জীবন পর্যন্ত আমি এইটা…

চিহ্ন : স্যার, আর একটা বিষয় সেটা হচ্ছে— আপনি রাজশাহীতেই থাকছেন, মানে রাজশাহীতে আমাদের যারা আছেন সব আপনাকে কিন্তু ভালোবাসে, এটা সত্য। আপনি আমাদের একটা আমব্রেলা। একটা প্লাটফর্ম। আপনি কিন্তু সেটা চালিয়েও যাচ্ছেন, দীর্ঘদিন ধরে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, সেই এইট্টি-এইট, এইট্টি-নাইনে তখনও আমরা দেখেছি— আপনি ‘স্বনন’ এর অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন, সেমিনারে যাচ্ছেন, সিম্পোজিয়াম এ যাচ্ছেন, আলোচনা হচ্ছে, আড্ডা হচ্ছে, ক্লাবের প্রোগ্রামে আপনি যাচ্ছেন, শিল্প-সমিতির অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন তারপরে দলীয় যে সমস্ত হয়তো ছাত্রমৈত্রী বা এদের অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন, কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে সেখানে যাচ্ছেন। কিংবা রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী, র‌্যানড্যাম চলছে সব জায়গায়, গিয়েছেন, চলছে। এটার মূল কারণ আপনি রাজশাহীর মানুষ— এবং লেখক, আমাদের গর্বও এক অর্থে। কিন্তু যখন ঢাকায় আপনি যান,  সেখানে এর চাইতে কয়েকগুণ বেশি আপনার সমাদর ও আদর আছে। আমরা ঢাকায় গেলেও সেটা বুঝতে পারি। কিন্তু রাজশাহীর প্রেম আর ঢাকার প্রেম একরকম না। কেমন আসলে লাগে? এইটা কি উপভোগ্য? এটা আসলে খুব ডেলিকেট একটা প্রশ্ন হয়ে গেলো—

হা. আ. হ. : উপভোগ্য কিন্তু নয়, বুঝলে? ক্লামজিই বটে। ক্লামজি বটে (পুনরায়)। যতদুর পারি সেটা যাতে না হয় সেই চেষ্টাই করি আমি। যেমন ধরো, ঢাকায় গেলাম— স্যার আপনাকে নিয়ে আসি? না ভাই, আমি যেতে পারবো না, তুমি চলে এসো। মাসুদা ভাট্টি-র মতো মহিলা সে বলছে, ‘তাহলে কি করবো?’ তুমি যদি আমার একটা ইন্টারভিউ নিতেই চাও তাহলে বাসায় আসো, চলে এলো সে বাসায়। মাসুদাও মোটামুটি ভালো… বললাম তোমার নাম ‘ভাট্টি’ কেনো? তারপর বললো যে, ‘তার কারণ হচ্ছে যে আমি রাজশাহীতে যখন ছিলাম তখন একটা পাঞ্জাবীকে বিয়ে করেছিলাম।’ তাহলে সে কোথায়? তার সাথে এখন তো আর আমি থাকি না, ঐ ভাট্টি রয়ে গেছে। এইরকম, নানান জন আসে। তবে ঢাকায় যাওয়া মোটামুটি কমিয়ে দিয়েছি। এইসব জিনিস যে খুব এনজয় করবো না তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঠিক আছে। তোমাদের ধন্যবাদ। আবার এসো।

————————————————

এ ই  স ম য়ে র  ঊ ন ত্রি শ টি  গ ল্প

হাসান আজিজুল হক
ছায়াবাড়ি

রাঢ়দেশের এক সম্পন্ন গৃহস্থ মির্জা গালিব একদিন সন্ধেবেলায় অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখতে পেলেন। আকাশ এদেশে খুব বড় হয় আর দিগন্ত পর্যন্ত একেবারে ফাঁকা থাকে। সেজন্য দুপুরে নির্মেঘ আকাশের দিকে চাইলে উপুড় করা নীল পেয়ালার কথাই মনে হয় বটে, কিন্তু সন্ধের পর তারা ফুটতে শুরু করলে আকাশ যেন পৃথিবী গিলে নিতে আসে। সন্ধ্যাতারাগুলো তখনো সব দেখা দেয়নি। শীতের আকাশ খানিক বাদেই ঝকঝকে হয়ে উঠবে, কিন্তু তারাদের গায়ে যেন তখনো একটু ময়লা মাখানো আছে। মির্জা গালিব তাঁর নিজের বাস করার মাটির ঘরের বারান্দায় একটা লোহার চেয়ারে বসে ছিলেন। তাঁর সামনেই বিরাট খামারবাড়ি। বারান্দায় বসলে আকাশটা দেখা যায় তো বটেই, গোয়াল থেকে গরুদের কান নাড়ার শব্দও আসে।

মির্জা গালিব এই সময়টায় স্থির হয়ে বসে থাকেন, ঠিক যেন কাঠের মূর্তি। মাথার ওপরে মাটির দেয়াল ভেদ করে একটা তালগাছের খুঁটি বেরিয়ে এসেছে। তাতে নতুন কেনা ঘোড়ার জিনটা চাপানো আছে, মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছিল সেখান থেকে। একেবারে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন তিনি। গায়ের মোটা পশমি চাদরটা দিয়ে নাক পর্যন্ত ঢেকে নিয়েছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন, তারার আলো অনেকটা বেড়ে গেছে, অন্ধকার ফিকে হয়ে এসেছে, আর সেই অন্ধকারের মধ্যে বিশাল একটি মাটির বাড়ি তার সামনে ভেসে উঠেছে। এত কাছে যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় বাড়িটির আলকাতরা মাখানো বাইরের দিকের দেয়াল। আকাশের অন্ধকারের চেয়ে আলকাতরার রং কয়েক পোঁচ বেশি। মির্জা গালিব হাত বাড়াতে গিয়েই বুঝতে পারলেন ছোঁয়া যাবে না ঐ নিরেট দেয়াল। বাড়িটা যেমন কাছে, তেমনই দূরে। মাটির বাড়ি, কিন্তু তেতলা। প্রত্যেক ঘরে এতো আলো যে ঘরগুলোতে যা আছে তার সবকিছুই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। দেয়ালে পোঁতা পেরেকের গা বেয়ে টিকটিকিটা দুবার লেজ দুলিয়ে বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে একটা পোকা ধরল, তা পর্যন্ত দেখা গেল। আসলে আলো মির্জা গালিবের নিজেরই চোখ। এত আলো যে সব খুঁটিনাটি দেখা গেল। কড়ি-বরগা, শালকাঠের দরজা আর মোটা মোটা খুঁটিগুলো, ঘরের ভেতরের মাটির দেয়ালে ধবধবে সাদা চুনকাম, ঘরের চালের নিচে বাঁশের বাতার তৈরি রং করা সিলিং—এসব তাঁর চোখে পড়ল। আকাশে অন্ধকার।

বাড়িটা প্রথমে যেন মাটি থেকেই ভেসে উঠল। খামারের চেয়ে অনেক বড় আকারের। কিন্তু এখন খামারের একটা কোণেই অত বড় বাড়ির বেশ জায়গা হয়ে গেল। মাটি থেকে ভেসে উঠেই কয়েক মুহূর্ত যেন কেঁপেছিল বাড়িটা, তারার দিকে চাইলে যেমন মনে হয়। তবে তা একটু সময়ের জন্যই। মাটি থেকে খানিকটা উঠে, মির্জা গালিবের নজর বরাবর সেটা স্থির হলো। তাঁর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো, লোহার চেয়ারটা এঁটে ধরল তাঁকে, তিনি সমস্ত প্রাণ যেন সারা শরীর থেকে টেনে এনে দুই চোখের মণিতে রেখে বাড়িটা দেখতে থাকলেন।

হারিকেন জ্বলিয়ে বেশ কয়েকজন মাহিন্দার কিষাণ খামারবাড়িতে কাজ করছিল। দুদিন ধরে পেটানো ধান মড়াই-এ তোলার কথা ছিল, খামারের উঠানের চার কোণে চারটি আর মাঝখানে দুটি—এই মোট ছয়টি মড়াইয়ের কোনোটা ভরা, কোনোটা আধভরা, দু-একটি ধান দিয়ে পূর্ণ করে চাল তৈরি করা হয়েছে। আজ ধান তোলা হচ্ছে একেবারে উত্তর-পশ্চিম কোণের আধভরা মড়াইটিতে। মাটির বাড়িটিও সেদিকেই ভেসে রয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার, কিষাণেরা ধানের বস্তা কাঁধে স্বচ্ছন্দে বাড়ির দেয়াল ভেদ করে যাতায়াত করছে। কালো আলকাতরার নিরেট দেয়াল কিংবা সাদা কাফন পরানো মুর্দার মতো স্থির ঘরের ভেতরের চুনকাম করা দেয়ালগুলো, এমনকি লোহার সিন্দুক, কাঁঠালকাঠের চৌকি ইত্যাদি আসবাব কিষাণদের যাতায়াতে বিন্দুমাত্র বাধার সৃষ্টি করছে না। মির্জার মনে হলো, বাড়িটাই নিরেট আর কিষাণগুলোর শরীর ছায়া দিয়ে তৈরি। তারা সব তাদের ছায়াময় শরীর নিয়ে বাড়িটাকে পাশাপাশি, কোনাকুনি যেমন ইচ্ছে ভেদ করে চলে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটা মির্জা গালিবকে এতটাই উৎকণ্ঠিত করে তুললো যে যখনই মুনিষদের কেউ ঘাড়ে বস্তা নিয়ে বাড়ির দেয়াল ছুরি দিয়ে জল কাটার মতো পার হচ্ছিল, তিনি তার লোহার চেয়ার থেকে ঝুঁকে এতোটাই সামনে চলে আসছিলেন যে দু-একবার চেয়ারটাও উবু হয়ে পড়ে যাচ্ছিল। তিনি বহু কষ্টে নিজেকে সামলান।

বাড়িটা একবার এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল যে তার মনে পড়ে গেল তাদের কয়েক পুরুষের রাখা ঝকঝকে হিরেটার কথা। তিনি জানেন কোথায় সেটা লুকনো আছে। একমাত্র তিনিই জানেন, কারণ তিনিই বারবার সেটাকে সরিয়ে রাখেন। কাশ্মীরি কাজ করা ওয়ালনাট কাঠের তৈরি পুরনো বাক্সটায় খুব ঠা-া অন্ধকারের মধ্যে সেটা হয়তো ১০০ বছর ধরে ঝকঝক করছে। এখন বাড়িটাও যেন তেমন অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে রাখা উত্তাপহীন সাদা আলো ছড়াচ্ছে। হিরেটায় কতগুলো কোণ আছে, শত চেষ্টা করেও মির্জা কোনোদিন তার সুরাহা করতে পারেননি। এই বাড়ি মোটামুটি চতুষ্কোণ হলেও তিনিও এখন একটি রহস্যের ভেদ খুঁজে পেলেন না।

বেশ বোঝা যাচ্ছিল, ওটা এখনই আকাশ-কুসুমের মতো শূন্যে মিলিয়ে যাবে। শীতের তারা ফোটা কালো আকাশ এখন পৃথিবীর সঙ্গে সংগত হবে। কাজেই শেষবারের জন্য খুঁটিনাটি দেখে নেওয়া দরকার। একটু একটু করে দেখা নয়। চোখ দুটি সম্পূর্ণ বুজিয়ে ফেলে পলকের জন্য তাকালে যে ছবিটা পাওয়া যায়, সমস্ত খুঁটিনাটিসহ গোটাটাকে তেমনি একবারে দেখে নিতে হবে। আর একটুও সময় নেই, সময় এতো কম! অসম্ভব জরুরি কাজ শেষ করার জন্য সময় এতো কম কেন, তা নিয়ে আক্ষেপ হতে থাকল মির্জার। তবু সময়ের এত অপূর্ণতা মেনেই তিনি বাস্তবের মুখোমুখি হলেন। চোখ বুজলেন, পলকের জন্য খুললেন, বাড়িটা মরচে-ধরা একটা সূচক নিজেকে সম্পূর্ণ দেখিয়ে দিল। চোখ খোলাই রেখেছিলেন, নাকি আবার বুজেছিলেন, তিনি আর কোনো দিনই তা বলতে পারেননি।

সমস্ত বাড়িটা গলা-বরফ আর কুয়াশা হয়ে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। লোকজনের কথা কানে এল তাঁর— পিঠে অনেক ভারী বস্তার চাপে কোমর থেকে শরীরের সামনের দিকটা মাটির সঙ্গে সমান্তরাল করে কিষাণদের থপ থপ ধীর পায়ের শব্দ আবার শুনতে পেলেন মির্জা। আর কোনো ভয় নেই, শরীরের চামড়ার ওপরে নীল উল্কির মতো বাড়িটার ছবি তার মনে বসে গিয়েছিল। এ জীবনে আর তাকে হারানোর শঙ্কা নেই। এ ছবি যদি একান্তই যায়, তাহলে তাঁর মৃতদেহের সঙ্গেই যাবে মাটির আন্ধকারে মিশে। মির্জা ঘাড় খাড়া করে সিধে হয়ে আবার বসলেন। পাশে হারিকেনের আলোয় কিষাণেরা তাঁর অস্পষ্ট চেহারা দেখতে পেল। তারা বোঝে যে তিনি ওখানেই আছেন তাঁর কালো শীর্ণ মুখ অন্ধকারের দিকে তুলে। কপালে তিনটে আড়াআড়ি আর তিনটে লম্বালম্বি ভাঁজ আছে, যেগুলো তাঁর জন্মদাগের মতো তাঁর মরা মুখের ওপরেও থাকবে। তাঁর বিষণœতা, বিরক্তি, অসন্তোষ আর তিরিক্ষে মেজাজ— এগুলোকে শারীরিক ব্যাপার করে তুলেছে কপালের এই ভাঁজ আর কপালের দুই পাশে থ্যালানে গর্তের নিচে উঁচু দুটি হাড়।

হারিকেনগুলো এখন আর তেমন আলো দিচ্ছে না। কালো কালি লেপ্টে আছে কাচগুলোতে। কিষাণেরা খুব তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে চায়। খামারের উত্তর-পশ্চিমের মড়াইটা এখন সবাই মিলে ঘিরে আছে, সব কাজ এখন ওখানেই। মড়াই ভরে গিয়ে ধানের স্তুপ দেখা যাচ্ছে। খুব দ্রুত হাতে কাজ চলছে, খড়ের তৈরি গোল মোটা ‘বর’গুলো সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরছে মড়াই। এবার খড় দিয়ে ছাউনি দেওয়ার কাজটুকু বাকি।

একটু পর সব কটি হারিকেন চলে গেলে, কেরোসিনের পোড়া গন্ধটা যেন একবার নাকে টের পেলেন। পায়ের শব্দগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে। ছায়ায় তৈরি মানুষগুলো আবছা আলোর বৃত্তের মধ্যে থেকে সরে গেলে মির্জা একবারের জন্য নিকষ কালো অন্ধকার দেখতে পেলেন। তারপরে আকাশ ভরা তারার আলো তাঁর চোখে সয়ে এল। মাথার ওপর থেকে ঘোড়ার নতুন জিনের তাজা চামড়ার গন্ধটা আর একবার ভেসে এল। মির্জা উঠে দাঁড়ালেন, গরম চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলেন। তারপর ছোটখাটো কালো মানুষটি তিনি ধীর পায়ে খামারবাড়িটা পার হলেন। সরু গলিটায় ঢুকতে কষ্ট হলো তার। চামড়ার চটি জোড়া ঠা-ায় লোহার মতো শক্ত। গলির ভেতরটায় অন্ধকার, রাঢ়ের শক্ত সাদা উঁচু-নিচু মাটিতে বারবার হোঁচট খেলেন তিনি।

বাড়িটা পার হয়ে গ্রাম-লাগোয়া রবিশস্যের মাঠে এলেন তিনি। বড় নালাটায় শীতে পানি প্রায় নেই। ডিঙিয়েই পার হওয়া গেল। তারপর প্রদীপ আকারের পুকুরটার কটু বিস্বাদ আমের বাগানটা পেরিয়ে, আট-দশটা শ্যাওড়া গাছের জমাট অন্ধকার পি-টাকে হাতের বাঁয়ে রেখে বড় মাঠে নেমে পড়লেন।

মির্জা গালিব কোনো দিন আর ফিরে আসেননি।

—————————————————-

নাসরীন জাহান
গরঠিকানিয়া

ছেলেটাকে কুড়াল দিয়ে দু টুকরো করে কাদের আলি যখন উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে গ্রামের শেষ মাথার নদীটির সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। সামনে বেমক্কা দমকা হাওয়া, কখনো নিথর নিস্তরঙ্গ, কখনো এমন চাপড় লাগায়, চমকে উঠতে হয়। প্রকৃতির এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় নদীর জল পড়েছে বিপাকে। ভাগ্যিস ঘুটঘুটে আঁধার নামছে, নইলে বাতাসের এহেন আচরণে স্রোতের আঁচল একদিকে টানতে গিয়ে অন্যদিক মাঝে মাঝেই যেভাবে উদোম হয়ে পড়ছে, বিষয়টা তাকে রীতিমতো বেইজ্জত করে ছাড়ত।

কিন্তু কাদের আলি কি আদৌ নদীর সামনে আছে?

তার সারা শরীরে ছিটকে থাকা রক্তের এক ফোঁটা তরলও এখন বাতাস শুষতে পারে নি, এর মধ্যে জঙ্গল থেকে বেরোতেই বিকট এক ঘুড়ি আকৃতির শকুন তাকে সারাপথ ধাওয়া করতে করতে নদী অবধি এনে ফেলেছে। শকুনটাকে সে জঙ্গল থেকে বেরিয়েই দেখেছিল, আসমান ছেড়ে পাখার ভারে ক্লান্ত হয়ে একটা মরা গাছের কাটা গুঁড়িতে জুতমতো বসার কায়দা করছিল। তখন পর্যন্ত খুনিটি কাদের আলির ভেতর জ্বলন্ত ছিল। শকুন দেখে তা একেবারে লেলিহান হয়ে উঠল। সেই ধাঁই ধাঁই করে কুড়ালটাকে ওটার ওপর ছুড়ে মারতেই— ব্যাটা ছুট ছুট!

কিন্তু বেশ কিছু দূর এসে কানের কাছে খাঁখাঁ বিরান প্রান্তরে কী এক বোঁ শব্দ শুনে মাথা তুলতেই দেহের রক্ত জল হয়ে গেল। শালা সাক্ষাৎ টিকটিকির ভূমিকা নিয়েছে। কাদের আলিকে সে পালাতে দেবে না।

পশুদের এরকম ধুরন্ধর আচরণে কাদের আলি অভ্যস্ত না। যদিও সে এই গল্প শুনেছে, জোড়া গোখরোর একটাকে মেরে ফেললে, যে মারে সে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে গেলেও অন্যটা প্রতিশোধ নেয়। কিন্তু কুড়ালের তাড়া খেয়েও খুনির পেছন ধাওয়া করতে পারে কোনো শকুন, তাও দলে ভারি থাকলে একটা কথা ছিল… একলা… মাস্তানী আর কী… এই বিষয়টা কাদের আলির বোধের মধ্যে কখনো ছিল না।

মাথা থেকে পা পর্যন্ত এতক্ষণ একটা দাউদাউ আগুন ছিল, সুতোহীন পোশাকের মতো ক্রমশ তা পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়তে থাকায় কাদের আলি প্রচ- শীত বোধ করে, শকুনটা কি আমাকে চলন্ত শব ভাবতে শুরু করেছিল?

ছায়া আকাশটা ঘাই খেয়ে ঢেউ খেয়ে কাদের আলিকে গভীর সাগরে রেখে কোথায় যে চলে যাচ্ছে। না, শকুনটা নেই। সে ক্ষিপ্রচোখ চারদিকে ঘোরায়, না নেই। এতক্ষণ সে নিজের মধ্যে ছিল না। কী এক পৈশাচিক দাবানল তাকে তাড়াতে তাড়াতে এ্যাদ্দুর নিয়ে এসেছে। পা ছিঁড়ে গেছে, অকৃষ্ট আলের ঘাস-কাঁটায় লুঙ্গি জড়িয়ে গেছে, কিচ্ছু সে টের পায় নি, যেন কিছুক্ষণের জন্য সে আচমকা দোযখের এমন এক বাসিন্দা হয়ে উঠেছিল, দোযখের আগুন যার চামড়ায় আলাদা কোনো উপলব্ধি দেয় নি।

এইবার নদী সামনে।

পেরোতে হলে ওপার থেকে হাত ইশারায় মাঝিকে ডাকতে হবে। তার সাথে কিঞ্চিৎ বিরতি। তার সাথে নিজের সামনে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়ানোর সুযোগ।

রক্তাক্ত দু’হাত আবছা ছায়ায় মেলে ধরতেই বোঁ বোঁ করে ওঠে মাথা। সে ধপাস করে ঘাসের ওপর বসে পড়ে।

সামনে কী ঘনকালো আঁধার নামছে!

তারও ওই পারে পারুল ফুলের মতো গোল গোল আলোর ফুটকি জ্বলতে শুরু করেছে। বিক্ষিপ্ত জলের ওপারে সেই কমলা চাকতিগুলো যেন আঁধারের প্রাণ। আঁধার নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কাদের আলি ভঙ্গুর নখগুলো দিয়ে মুখের চামড়া খামচে ধরে… বিছানার ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে পদ্মিনী… না, আয়েশা… না, পদ্মিনী… আয়েশা, পদ্মি… আয়ে… সব কেমন জট পাকিয়ে যায়। বুক থেকে হাঁটুর তল অব্দি ঢেকে উঁচু বুকে নিঃশ্বাস টানছে আয়েশা… ওই তো ছেলে কোলে নিয়ে গান গাইছে, সন্ধ্যায় বেড়ার ফোঁকর দিয়ে দেখছে কাদের আলির দোকান থেকে ফিরে আসা। বিয়ের পরে একবারও তার ভাবার প্রয়োজন পড়ে নি, মেয়েটাকে সে প্রথম কোথায় দেখেছিল। কেবল আচমকা জল ফুঁড়ে যেভাবে একটা মাছ লাফ দিয়ে ফের জলের তলায় ডুবে যায়, তেমন করে মাঝে মধ্যে তন্দ্রায় অথবা অলস প্রহরে কাদামাখা সেই ফর্সা সুন্দর রূপ, দুহাত ভর্তি ছিল মাটি দিয়ে; দোল দিয়ে উঠত, মনে হতো ওটা তার নিষিদ্ধ জগতের স্বপ্নের কেউ ছিল। ও আয়েশা ছিল না। ও পদ্মিনী, যাকে সে তার চাচার সাথে মূর্তি বানাতে দেখেছিল, তাকে সে এই জীবনে পায় নি, সে তার স্ত্রী হয় নি, আয়েশা অন্য কেউ। যে কাদের আলির জীবন এবং ধর্মের মধ্যে নিজেকে উপুড় করে নিয়েছিল, সে কখনো পদ্মিনী ছিল না, কখনো মূর্তি বানায় নি।

ওই তো সামনের কল্লোলিত আঁধার ফেনায় সব ভাসছে। যেন বহুকাল পর সার বেঁধে স্মৃতিগুলো আসছে। আহা মূর্তি বানাতে দেখে কাদামাটি ভর্তিও মেয়েটাকে কী রূপসী-ই না মনে হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে বেহেশতের হুরির লোভ, দোযখের ভয় সব সরে গিয়ে সমস্ত অস্তিত্ব অসাড় করে রেখেছিল একটাই অনুভব— এই নারীকে তার চাই। এ না হলে জীবনের সবকিছু অর্থহীন। যথারীতি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ধর্ম। কাদের আলি খুব একটা অবস্থাপন্ন গৃহের সন্তান না হলেও তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন একটা তেজ ছিল যা কেবল জমিদার কিংবা রাজরাজড়াদের থাকে। যখন সে টের পেল বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ধর্ম… তখন এই বিষয়টাকেই আগে ভাঙতে সে আগ্রাসী হয়ে উঠল। বাড়িতে সে নামাজ রোজা সব ছেড়ে ক্রমশ বিবাগী হয়ে যেতে থাকলো। কাদের আলির জেদ সম্পর্কে সবাই জানত। ফলে বাড়ির মুরুব্বিরা পড়ল মহামুশকিলের মধ্যে। তারা নানাভাবে তাকে বোঝাল একটা হিন্দু মেয়েকে বিবাহ করার শাস্তি আল্লাহর দরবারে কত কঠিন হতে পারে।

কাদের আলি ঠোঁট উল্টে বলে, যার ইহকালের কোনো ঠিকঠিকানা নাই, পরকালের শাস্তিরে ডরায়া তার কী লাভ? এইসব কোনো যুক্তির কথা? বুদ্ধির কথা? সবাই যখন এ নিয়ে অতল সাগরে নিমজ্জিত, তখন এক সন্ধ্যায় কাদের আলি পদ্মিনীকে বিয়ে করে এই বাড়ির দরজায় পা রাখল।

নদীর মধ্যে থেকে কী একটা ভুস করে উঠল।

ছটফট করতে করতে কাদের আলি দাঁড়ায়। গলায় কেউ যেন রশি দিয়ে পেঁচিয়ে ধরেছে, সে মহাশূন্যের দিকে তাকায়, মোষের মতো কালো চামড়ায় পানসে নক্ষত্র ফুটতে শুরু করেছে… মাঝখানের দুটি তারা যেন দুটি শিশুচোখ, গলা চেপে ধরে বমির মতোন ছিটকে আসে একটি শব্দ, আকবর আলিরে…এ…এ…।

ওই যে ক্ষুদে আকবর মাথায় জরির টুপি পড়ে বাপের আঙুল ধরে মসজিদে যাচ্ছে নামাজ পড়তে, ওই যে মায়ের হাতের তসবি নিয়ে হুল্লোড় করতে করতে মায়ের সুরার সংখ্যায় গন্ডগোল লাগিয়ে দিচ্ছে। আর তার মা? বিয়ের সময় কী সাহসী! কী প্রেম তার! ইমাম সাহেবের সামনে নিষ্কম্প কণ্ঠে লা ইলাহা পড়ে মুসলমান হয়ে বাসরশয্যায় স্বামীর উষ্ণ আলিঙ্গনে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে বলেছিল, তুমি আমার ধর্ম… ইহকাল পরকাল।

একসময় পদ্মিনীকে নিজের কব্জায় পাওয়ার উত্তেজনায় কাদের আলির সর্বাঙ্গের আগুনে ঝিম ধরে, এই স্বপ্নের পরী তার আয়ত্তে, কোনো রাজপুত্রের সাথে এ জন্যে তাকে যুদ্ধ করতে হয় নি, প্রচুর অর্থ খরচ হয় নি, ধানচালের কারবারি তাগড়া দেহের অধিকারী সে, যথেষ্ট যৌতুক সহকারে বিবাহ করতে পারত, আফসোস এইটুকুই। কিন্তু মাথার মধ্যে এমন একটা জ্বলন্ত আগুন রেখে সে যৌতুকের টাকা নিয়ে কী করত? বরং ওকে দেখার পর তার ব্যবসা লাটে উঠেছিল, পাগল প্রেমে পড়ে বুদ্ধিমান থাকা সম্ভব? না, ধর্ম কোনো সমস্যা করে নি। বরং একটা হিন্দু মেয়েকে মুসলমান বানিয়ে বিয়ে করে সে বেহেশতের একটা শেয়ার কিনেছে। ধর্মগ্রন্থে তো এমনই আছে, মা-বাবাকেও সে তাই বুঝিয়েছিল। তার নিজের মধ্যেও তখন পর্যন্ত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোনো উপলব্ধি ছিল না। কিন্তু মায়ের কাছে যখন পদ্মিনী কায়দা পড়া থেকে শুরু করে কোরআন শরীফ পড়তে শুরু করল, আর কারবালার কাহিনী বয়ান করতে করতে চোখে জল তুলতে শুরু করল, রক্তেমাংসে আয়েশা হয়ে উঠতে থাকা এই নারীকে কাদের আলি নতুন সৌন্দর্যে আবিষ্কার করতে শুরু করে।

দিন যায়।

সংসারে সন্তান আসে। সন্তান বড় হতে থাকে। আশ্চর্য মাটির প্রতিমা পদ্মিনী, কোনোদিন তার অতীত জীবন, তার ধর্ম কিচ্ছু নিয়ে ওকে কাদের আলি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখে নি। কাদের আলি প্রশ্ন করলে বলত— এতে আপনের মনে যদি বিষ ঢুইক্যা যায়? আমি তো কইছিই আমার ইহ পর সব কাল আপনি।

ক্রমশ কাদের আলি টের পায় মেয়েটি এই একটি শক্ত গেঁরো দিয়ে তাকে সারা জীবনের জন্য বেঁধে ফেলেছে। সে যদি বাপ-ভাইকে স্মরণ করত, এই ধর্মটাকে সহজভাবে না নিতে পারত, তবে কাদের আলির যে মেজাজ, ওকে হয়তো মেরেই ফেলত। সে মেয়েটাকে রাতের পর রাত বুঝিয়েছে, পদ্মিনী কত ভাগ্যবান। সে যদি ধর্মান্তরিত না হয়ে এখনো ওখানে পড়ে থাকত, তবে কী ঘোর অন্ধকারে পড়ে থাকত তার জীবন। সে ইসলাম ধর্মের মহান নবীদের সম্পর্কে আলোচনা করেছে, বিবি ফাতিমা, খলিফা ওমর…। এছাড়া অল্প পুণ্যে কত বড় প্রাপ্তি বেহেশতে ঘটবে। অল্প পাপে কী ভয়ানক দোযখ…। এইসব বলে বলে যখন মেয়েটাকে প্রাণের মধ্যে চেপে ধরেছে, একদিন সেই মেয়ে বড় আজব প্রশ্ন করে, আমি মুসলমান না হইলে আপনে আমারে বিয়া করতেন?

কী? কী কইলা তুমি? দুইজন দুই ধর্ম নিয়া এক সংসারে? কী কইলা তুমি? তুমি হিন্দু হইলে… হেঃ হেঃ তাইলে তো বিয়াই জায়েজ হইত না, কাজি বিয়া পড়াইত না।

কী এক গভীর নিঃসীমে তলিয়ে গিয়েছিল পদ্মিনী। এরপর সে কখনো এ ধরনের কথা আর বলে নি। সে বিশ্বাস করেছিল স্বামীর সেই কথা, তাকে ইসলামের আলোতে এনে তাকে অনন্ত জীবনের জন্য রক্ষা করেছে কাদের আলি।

দিন যায়।

ছেলের মুসলমানি করার সময় ঘনিয়ে আসে। ইতোমধ্যে ধর্মেকর্মে গভীরভাবে মন দিয়ে কাদের আলি ধর্মপ্রাণ মানুষ হয়ে উঠেছে। ওয়াজে যায়, তবলিকে যায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। স্ত্রী সরষের তেলে ইলিশের টুকরো ছেড়ে দিয়ে স্বামীকে দেখে মাথায় আঁচল টানে। তার মধ্যেও পরিবর্তন আসছে। গম্ভীর আর ভারিক্কি হয়ে উঠতে শুরু করেছে সে। কাদের আলির বাবা গত হয়েছেন। মা মৃত্যুশয্যায় শুয়ে নাতির মুসলমানি দেখে যাওয়ার আশা পোষণ করেছেন।

কাদের আলি সাধ্যমতো গ্রামের গরিব-দুঃখীকে দাওয়াত করে। ছেলে মায়ের বুকে গুতো খেয়ে খেয়ে প্রশ্ন করে, মা মুসলমানি কী? আয়োজনের চেয়ে কাদের আলির হাঁকডাকেই বাড়ি গরম হয়ে উঠেছে। সে রান্নাঘরের সামনে বসে রসালো কণ্ঠে পদ্মিনীকে প্রশ্ন করে, কী হে আকবরের মা, ছেলের বিয়া দিতে কেমন লাগতাছে? কেমন যেন আচ্ছন্নের মধ্যে আছে পদ্মিনী। সকালের কাঁচা বাতাসে কাঁচা রোদ্দুরে আশ্চর্য এক রহস্য খেলে যাচ্ছে তার মুখে। যেন সে নিজের মধ্যে নেই, কিছু তার ওপর ভর করে আছে। স্বামীর কথা শুনে পলকে চোখ তোলে, মুসলমানি কী?

কী? কী জিগাইলা তুমি? তুমি জানো না মুসলমানি কী? কী হইছে তোমার?

না না তুমি যে কইলা, বিয়া?

ঠাট্টা বোঝ না? অনাবিল হাসিতে ঘর ভাসিয়ে কাদের আলি কাচারি ঘরের দিকে হেঁটে যায়। আয়েশা, আইজ তোমার হইল কী?

আঁধারে স্রোতগুলি সাঁতার কাটছে। বাতাসের বেগ বাড়ছে। ঝিঁঝি পোকা, শেয়াল… আড়মোড়া দিয়ে উঠছে রাত্তিরের প্রাণীগুলো। কাদের আলির বোধ হয় সে এই পৃথিবীতে নেই… রক্ত… রক্ত… কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য! যেন কোরবানিতে বাছুর জবাই হয়েছে… না-না, ও আকবর ছিল না, অন্য কেউ, অন্য কোনো শিশুজন্তু… ইব্রাহিম যেভাবে নিজ সন্তানকে কোরবানি দিয়েছিলেন! হে আল্লাহ! হে আল্লাহ! কোন সে মনের বলে ইব্রাহীম এই কাজ করতে পেরেছিলেন ? না, আমার কোনো অতীত নাই, ভবিষ্যৎ নাই, আমার ধড়ের মধ্যে কোনো প্রাণ নাই… আমি মানুষ না। অস্পষ্ট ভেসে আসে স্ত্রীর মুখ। কাদের আলি দাঁতে দাঁত চাপে… পাপিষ্ঠা!

দুটি পা কাদামাটির মধ্যে ঠেসে যেতে থাকলে পরক্ষণে সে কেমন বোকার মতো হেসে উঠতে চায়… লাগ ভেলকি লাগরে… না না না… ওহ্ হো হো আকবর… যেন কেউ তার মস্তক বরাবর প্রস্তরখ- ছুড়ে মারল, বোধশূন্য অবস্থায় সে ফের মাটির ওপর বসে পড়ে। না, দুঃস্বপ্ন সব। সে এখন ঘরে যাবে, বাতি জ্বালিয়ে পাখা হাতে এগিয়ে আসবে স্ত্রী, বারান্দায় বসে নামতা পড়বে আকবর। না, সে খুন করেছে! সে তো আকবরকে মারতে চায় নি। কোপ বসিয়েছিল পদ্মিনীর উদ্দেশে। সে ধর্ম বাঁচাতে এ কাজ করেছে। কিন্তু ছেলেটা মাকে বাঁচাতে গিয়ে…।

উৎসব শেষ।

নতুন লুঙ্গি পরে আকবর মা’র কোল ঘেঁসে বসে আছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। পদ্মিনীর আচ্ছন্নতা কাটে না। খিড়কি দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে কোন বাতাসে যে সে উন্মনা হয়! কাদের আলির চোখে তন্দ্রা এসেছিল। স্ত্রীর মনোব্যারাম দেখার সময় তার নেই।

ঘুম ভেঙে সে স্ত্রীকে খুঁজে পায় না।

পুত্রকে পায় না। সারাবাড়ি খোঁজে। সারা পাড়া খোঁজে। নেই। কেউ একজন বলে, উত্তরের জঙ্গলের দিকে ওদের যেতে দেখেছে। বিস্ময়ে ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য কাদের আলি কাউকে সাথে না নিয়ে একলা জঙ্গলে যায়। ঘরের পর্দা পেরিয়ে কোন সে রোগে পদ্মিনী জঙ্গলে যায়, এর বিচারের মধ্যে সে কাউকে রাখতে চায় না।

খট খট।

ঘন বুনো লতাপাতায় আচ্ছন্ন বনে কী যেন কাটার শব্দ। পায়ের নিচে রাজ্যির শুকনো পাতা, মাটির ঢেলা। গাছ ধরে ধরে কিছুদূর হেঁটে সে দেখে, গ্রামের হারানলাল গাছ কাটছে। আকবরকে দেখে সে অদ্ভুত ঠোঁটে হেসে ফের গাছে জোর কোপ লাগায়। ওই তো কিছুদূরে খোলা জায়গা!

ওই তো, আকবর! পদ্মিনী!

কাদের আলি টাল খেয়ে পাক খেয়ে ছুটতে ছুটতে কাছে গিয়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যায়। পদ্মিনীর সারাগায়ে মাটি লেপটে আছে। সামনে একটা ক্ষুদ্রাকৃতির কালীমূর্তি। তারই সামনে পড়ে মা আর ব্যাটা মিলে উপুড় হয়ে কাঁদছে।

————————————–

রাখাল রাহা
একটি পুকুরের কাহিনি

ঠিক সেদিন থেকেই রশীদের ঠনঠনে বালুঘাটে পুকুরটা দোষোন্তরে হয়ে গেল। গ্রামে পুকুর আছে পাঁচ-সাতটা। জর্দ্দারগের শানবাঁধানো পুকুর, বিশ্বাসগের পাড়-না-থাকা মাটেলে পুকুর, মোল্লাগের পানা পুকুর, ম-লগের পচাকাদা পুকুর, খাঁগের গোবরে পুকুর, ফিরু মিঞার সাহেবী পুকুর, আর রশীদের এই ঠনঠনে বালুঘাটে পুকুর। রশীদের এই পুকুরের বয়স বেশী না, তার বাপ বশীরের কাটা। খানের আমলে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় রাস্তার ওপারের তিরপুল্য ঘোষ দেশ ছাড়লে রাস্তার এপারে বাড়িঘেঁষা বিঘেদুই জমি বশীর একরকম এমনি-এমনিই পেয়ে যায়। পরের বছরই সে পুরো জমিটায় পাড়বাঁধিয়ে বেশ একটা মানানসই পুকুর কাটিয়ে ফেলে। কাটার সময় মাল-কোদালে কাঁছা মারতে মারতে বলেছিল, ছোট্ভাই, এত ঝরঝরে মাটির পুকোর জীবনে কাটিনি! কুদাল মারলিই ঝুড়ি ভর্তি! তিন দিনি পুকোর কাই্টে পানি উটোয়ে দেবো।

কিন্তু ঝুড়ি ভরতে ভরতে কোদালেরা যখন হাত-বিশেক গভীর এক খাদ কেটে ফেলেও পানির দেখা না পায় তা দেখে বশীরের জান কেঁপে ওঠে। খাল কাই্টে কুমীর আনতিছি নে তো! দশ হাত গভীরিই তো আগে আমরা পানি পাইছি!

কোদালেদের মাথায় চিন্তা বাড়ে। পাতালনাগের মনে কি আছে তা আল্লাই জানে। চিন্তা ভুলতে তারা দুপুরে খাওয়ার সময় পাড়ে বসে ঢোল-সমুদ্দুর পুকুরের গল্প জোড়ে।

কাটলাম কাটলাম পুকোর আমি পোতাপাদিত্যর দ্যাশে

বাঁনলাম বাঁনলাম পাড়ি আমি ঢোল-সমুদ্দুর এসে

খুড়লাম খুড়লাম পাতাল আমি পাতালপুরী মিশে

তবু কার-বা দোষে সেই পাতালে পানি তো না আসে গো

পানি তো না আসে!

পানি পাওয়া যাবি বুলে পাতালনাগ স্বপ্পন দেখায়। সাত-রাণী আর সত্তুর রাজপুত্তর-রাজকই্ন্যা মিলে যদি নিশুতি রাত্তিরি ঢোলডগর নিয়ে উলুঙ্গু হয়ে পুকুরি নাই্বে নাচ-গান করতি পারে তবে গে পানি উটপি। রাজা তা-ই কইরলেন। আমাবস্যের রাত্তিরি নিকষ কালো আন্ধারে স¹লমেলে যাইয়ে নাইবলেন। রাজা নাচে, রাণী নাচে, রাজপুত্তর-রাজকই্ন্যা নাচে— সেই ভুরকুষ্টি আন্ধারে! ঢোলডগরের আওয়াজ চারপাশের পাড়িতি বাড়ি খায়ে কোন আসমানে উঠে যায়! উলুঙ্গু মানুষ নাচতি নাচতি মাতাল হয়ে যায়। কখুন হটাৎ মাটি ফাই্টে বগ বগ করে পানি উটা শুরু করেছে টেরই পায়নি। আহা, সেই পানির এমন তোড় যে তারা আর পুকোরির মধ্যিত্তে উটতি পারলো না! রাজা-রাণী, রাজপুত্তর-রাজকই্ন্যা সব ডুবে মোলো!

— আরে না, তারা নাকি মরিউ নি! এখুনউ নাকি গভীর রাত্তিরি পুকোরির পাশ দিয়ে গেলি তাগের কান্দা শুনা যায়। মা কান্দে বাপের ধই্রে, ভাই কান্দে বুনির ধই্রে, রাজা কান্দে রাণীর ধই্রে।

বশীর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে, ওরে এ মাটি আমি কি করতি কিনতি গেলাম তিরপুল্য ঘোষের কাছতে? ও শালা আমার কি বদ-দুয়া দিয়ে থুয়ে গেল রে?

হেড-কোদালে খাওয়া থুয়ে ছুটে যায়।

— ছোট্ভাই, এতো অস্থির হচ্ছো ক্যা? দ্যাখো পানি কাল সকালেই উটপিনি।

মাল-কোদালে কয়, পানি না উটোয়ে ছাড়েগা নেই, ছোট্ভাই। এ আর কয় হাত গভীর! সিবার বিরামপুর গিরামে পুকোর কাটতি যাইয়ে সে পুকোর হয়ে গেল তিরিশ-পঁয়ত্রিশ হাত গভীর! পানি আর ওটে না। মালিক কয়, পানি উটোয়ে দিওয়া লাগবি, না হলি কুনো কুদালের হাজ্রে নেই। শুনেমিলে তো আমার রক্ত গরম হতি লাগলো। শালার পানি উটপি নে পুকোরি! তা হলি এই রমজান মালের নামই বিথা। গরমের সুমায়। রাত্তিরি বেলায় সব কুদালে ঘোম। কিন্তুক আমার আর ঘোম আসে না। পুকোরপাড়ে শুয়ে আল্লা-আল্লা করি। পাতালনাগের দুহাই পাড়ি। কত রাত কিডা কবি! দেখি ব্যাঙ ডাই্কে উটলো হটাৎ। আমি কই, বিষ্টি-বাদলা নেই, শালার ব্যাঙ আসলো কোনতে? তখুন ডাই্কে তুললাম স¹লির। লাইট মাই্রে দেখি, পানি! সকাল হতি হতি তুমারগে অর্ধেক পুকোর ভরে গেল। সে কি ঝলমলে পানি!

বশীরের চোখে ঝলমলে পানি খেলা করে। পানির বুক জুড়ে তেলতেলে মাছ। মাছের পেটভরা থলথলে ডিম। বশীর মাছ ধরে ধরে খালুই ভরে। চারপাড়ে নারকেল-সুপারীর সারি সারি গাছ। গাছের ছায়ায় পুকুরের পানি আন্ধার হয়ে আসে। সেই আন্ধার পানিতে এক ধেয়ানে তাকিয়ে বশীর পাতাল-কইন্যার দ্যাশে পৌঁছে যায়।

এমন স্বপ্ন তার সেই কবে ছোটবেলায় নানীবাড়ি গিয়ে ফরেন-সাহেবদের পুকুর দেখে দেখা! বেশ দূরে। তবু নানীবাড়ি গেলে চারদিক প্রাচীর দেওয়া নারকেল-সুপারী গাছের সাজানো সারির ওপাশের পুকুরের পানি আর বিশাল শানবাঁধানো ঘাট দেখার লোভ সে সামলাতে পারতো না। কোমরের গেঁজে খুলে সবচেয়ে বড় ডাগা আর চক্রাবক্রা মার্বেলগুলো মামাতো ভাই খবিরকে দিয়ে রাজী করিয়ে তার সাথে প্রায় তিন-চার মাইল পথ পায়ে হেঁটে সে পৌঁছাতো হাজরামণি গ্রামে। প্রাচীরের ভাঙা ইট খুঁজে খুঁজে তাতে পা দিয়ে সে উপরে উঠতো।

ফরেন-সাহেবরা ফরেনে থাকে। এখানে তাদের একঘর গরীব কুটুম আছে, সে বাড়ি দেখাশোনা করে। কারো ভিতরে ঢোকার অনুমতি নেই। বশীর একবার প্রাচীরের উপর থেকে লাফ দিয়ে ভিতরে নেমে পিচ্ছিল শ্যাওলাপড়া শানবাঁধানো ঘাটে গিয়ে বসেছিল। সেই কালচে-সবুজ পানিতে পা ডুবিয়ে শিউরে উঠতেই ঘাটের উপর পাহারাদার দেখে সেই-যে জান হাতে নিয়ে দৌড়ে প্রাচীর পার হয়েছিল সেইদিন থেকে তার প্রতিজ্ঞা, জীবনে পুকোর আমি কাটপোই। আর সুযোগও এসে যায় পাক-ভারত যুদ্ধের সময়। তিরপুল্য ঘোষ কানতি কানতি আই্সে কয়, ছোট্ভাই, কি আর দিবা, তুমার যা মন চায় দিয়ে জমিখেন নেও। আর আমাগের বিদায় দেও। তেরো টাকা তিন সিঁকে দিয়ে এই জমি নিওয়া। আর সেই এতো সাধের পুকোরি এখুন পানি নেই!

— পানি আসপিনি, ছোট্ভাই, ইট্টু ধৈয্য ধরো। যাও, যাইয়ে ইকটু শোওগা। অতো আশা হারালি হয় নাকি!

আশা নিয়ে বশীর পাড়ের ওপাশের কাচারীঘরে শুতে যায়। শুয়ে স্বপ্ন দ্যাখে, ঢোল সমুদ্দুর রাজা তাকে ডাকছে — বশীর রে, তিরপুল্য না তোর খাঁটি গরুর দুধির দই খাওয়াতো? খাঁটি গরুর দুধির দই! পাতে দিলি খাড়া পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়ে থাকতো! পাহাড় কাই্টে কাই্টে তুই না দই খাতি! সেই দই খাবি? খা।

বশীর দই খাচ্ছে। তার পছন্দের দই। তিরপুল্য ঘোষের নিজ হাতে বানানো খাঁটি গরুর দুধের দই। ঢোল সমুদ্দুর রাজা তাকে দই খাওয়াচ্ছে। পেট ফেটে যাচ্ছে! তবু সে খেয়েই যাচ্ছে। হাঁড়া নয়, ভাড় নয়, ইয়া বড় বড় মাটির কোলা থেকে পাতের উপর পড়ছে এক একটা পাহাড়। আর সে সড়াৎ সড়াৎ করে পাহাড় গিলছে! আস্ত আস্ত পাহাড়! তার ইয়া বড় বড় পাথর! তার দাঁত-মুখ-চোয়াল ভেঙে যাচ্ছে! গল গল করে রক্ত পড়ছে। তবু সে গিলছে! গিলতে গিলতেই একসময় চিৎকার করে ওঠে।

— আল্লা রে!

কোদালেরা ছুটে আসে। বশীর ঘামতে থাকে। কোনো কথা বলে না। একসময় ঘাম মুছতে মুছতে বাড়ির দিকে হাঁটে।

সারাদিনের কাজ সেরে কোদালেরা সন্ধ্যায় ফিরে যায়। পরদিন ভোরসকালে এসেই তারা দ্যাখে পুকুরে একহাঁটু পানি। তারা বশীরকে ডেকে তোলে। বশীর তখনও কথা বলে না। কোদালেরা সাক্ষী-নিশানা দেখে মোট মাটির হিসাব কষে। তারপর পাওনা-দাওনা বশীরকে জানিয়ে চলে যায়।

আস্তে আস্তে পুকুরের পানি বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে নতুন পানিতে গোসলের জন্য ছেলেমেয়েরা ভেঙে পড়ে। আস্তে আস্তে বশীর নীরব হয়ে যায়। এবং এর ক’মাস পরেই ক’বছরের ছেলে রশীদকে রেখে কিছু না বলেই সে পরপারে পাড়ি জমায়।

কিশোর রশীদ সহায়-সম্পত্তি হাতে পেয়েই বাপের স্বপ্নপূরণে শানবাঁধানো ঘাট তৈরী করে ফেলে। কিন্তু ঘাটের পাশ থেকে ক’মাস যেতেই হঠাৎ পাড় ভাঙতে শুরু করে। ভাঙতে ভাঙতে পাড়টা এমনভাবে ঢালু হয় আর নীচে এমন ঠনঠনে বালি চিকচিকায় যে সবাই তখন শানের ঘাট বাদ দিয়ে সেখানে নেমে গোসল করতে থাকে। দিনে দিনে শানের ঘাটে শ্যাওলা জমতে থাকে, কাদা জমতে থাকে। শ্যাওলা-কাদায় সেই ঘাট মজে উঠতে থাকে। আর পাশেই জমে ওঠে বালুঘাট। এভাবেই আস্তে আস্তে পুকুরটা হয়ে যায় রশীদের বালুঘাটে পুকুর। আর বশীর তখন হারিয়েই যায়।

তা আজ প্রায় বিশ-বাইশ বছর হয়ে গেল। ছেলেবুড়ো, হিন্দু-মুসলমান, বেটাসাওয়াল-মিয়াসাওয়াল সারা গ্রামের মানুষ সব-পুকুর ফেলে এই বালুঘাটে পুকুরে আসে। গোসল করতে করতে তারা গল্প বলে। কালীগাঙের গল্প। শীতলীডাঙার কাঙালীর ঘাটের গল্প। কি নিজল ঠা-া পানি! কাঙালীর আখড়ার বটগাছের গোড়া থেকে চিকচিকে বালি পানির মধ্যি নাই্বে গেছে। মাছগুনু সব ঝকঝক করতি থাকে। ডুব মারলি ধবধবে ঝিনুক, যিন মনে হয় ডালা-ভরা বাতসা! দুপোর সুমায় ক্ষ্যাত নিড়োয়ে আইসে ঘাটে নাবলি শরীল একেবারে ঠা-া হয়ে যায়। উটতি আর মন চায় না। শীত নেই, বর্ষা নেই গোসল করে উটলি পায়ে এক ফুঁটা কাদা নেই! সারা বছর এক রকম পানি। কমেও না, বাড়েও না। এইরকম পুকোর জীবনে দেখিনি!

কিন্তু গোল বাঁধলো যখন পুকুরের দুঘর পরে তিরপুল্য ঘোষেরই জ্যাঠাত ভাই প্রফুল্ল হঠাৎ পার হওয়ার যোগাড়-যন্ত্র করছে বলে শোনা গেল। কিছুদিন থেকেই সে নাকি ঘন ঘন ওপারে হচ্ছিল। আর সুযোগ পেলেই কয়, এ দ্যাশ মেলেটারীর হাতেরতে আর ফিরবি নে! এ দ্যাশের কপালে আর ভাত নেই!

এ যে ঘটবেই রশীদের তা একরকম প্রত্যাশিতই ছিল। প্রফুল্ল দু-কলম লেখাপড়া শিখে বিটিসি-র দালালগিরি করতো। তামাকের মাঠে মাঠে ঘুরতো। মাঠান জমি যেটুকু ছিল একে একে বিক্রি করে দিয়েছে। সবাই বলে, বিক্রি করে ওপারে জমি রেখেছে। আছে শুধু আশি শতক জমির উপর তার বাপের ঠাকুর্দার করে যাওয়া আটচল্লিশ বন্দের আটচালা টিনের বিশাল একখান ঘর। আর ঘরের চারপাশে ছায়াঘেরা শত বছরের আম-কাঁঠালের কিছু গাছ।

প্রফুল্লর পার হওয়ার খবরটা কানাঘুঁষো হয়েই ছিল, কানাঘুঁষো হয়েই থাকতো যদি না জাসদের বল্টু এর মধ্যে প্রবেশ করতো। সারা এলাকার সবাই তাকে বোম্বেটে বল্টু নামে চেনে। মাঝে মাঝেই সে রশীদের কাছে হাই ফেলে — পুরোন আমলের আম-কাঁঠালের গাছগুনু কি সব! সিন্দুরির মতো টকটক করতেছে! কাটতি গেলি মনেহয় ভিতরেত্তে রক্ত বার হয়ে আসপিনি! এমুন সারি কাঠ! দাম কত সেসব কাঠের! এ কোনোরকমে হাতছাড়া করা যাবিনে।

কিন্তু কিছুদিন থেকে হঠাৎটই বল্টুর আশঙ্কা জাগে — শরাফতের সাথে প্রফুল্লর এতো খাতির কেন? শালা বাকশালী দালাল! মনে রাখিস, এই এলাকায় বল্টু চায় না, এমন কাম কারো বুকির পাটা নেই করার! সে রশীদকে নিশ্চয়তা দেয়।

কিন্তু এমন বুকের পাটা, অথচ একদিন ভোরসকালে সবাই উঠে দেখলো সে বালুঘাটে পুকুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। সে কেন এত ভোরে ঘাটে নামলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, কিন্তু পাত্তা পায়নি। প্রশ্নটা আড়ালে-আবডালে পালিয়ে পালিয়ে তুলেছিল শরাফত। কারণ প্রফুল্ল দিনকতক আগে তার শালার বিয়েতে সপরিবারে শ্বশুরবাড়ি যায় ক’গ্রাম পরে। রাতে ফেরার পথে দেখে বিলের মাঝের বাঁকাপথের ব্রীজের কাছে প্রায় তিন গ্রামের বাড়ি-ফেরতা মানুষের জটলা। সবাই বলে, গুলাগুলি হচ্চে। জাসদ আর কমেনিস। শরাফত কমেনিসগের ডাইকে নিয়াসে রাত্তিরি ঘরে থাকতি দেছে। এই শুনে জাসদ গেছে ক্ষেপে।

দূরে গোলাগুলির শব্দ, আর চারপাশে গোলাগুলির গল্পের মাঝে প্রফুল্ল ব্রীজের রেলিঙের ধারে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে বসে পড়ে।

— এ আর কি ফাইট! সিবার রক্ষীবাহিনী আর জাসদের ফাইটের কথা মনে আছে?

— তা আর মনে থাকপিনে ক্যা? ওই যে কাতলখালির বিলির ধারে, একে চোদনে পাঁচ-সাতটা রক্ষীবাহিনী দিলো শ্যাষ করে!

— তারপর যেদিন ঘিরে ধরলো রক্ষীবাহিনী, সেদিন কিভাবে যে শীতির মধ্যি অত বড় বিল সাঁতরায়ে গুলাম মোজতবা বাঁইচে আসলো, তা এক আশ্চর্য ব্যাপার!

— আশ্চয্যই! সেসব ফাইট কি এখুন আছে নাকি? ওগো প্রফুল্ল, আজ আর ঘরে উঠতি পারবানানে। শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাও।

পাশ থেকে এমন পরামর্শ শুনেও প্রফুল্ল শ্বশুরবাড়ি নয়, অন্ধকারে বসে বাড়ির দিকেই তাকায়। হঠাৎ টিনের ঝন ঝন শব্দ কানে এলে তার বুকের মধ্যে ঝন ঝন করে বাজতে থাকে। সেই শব্দ শুনতে শুনতেই সে একসময় নিরুপায় হয়ে বিলের মাঝের ভাঙাচোরা পথ বেয়ে আবার শ্বশুরবাড়ি ফিরে যায়।

সারারাত তার মাথা থেকে ঝনঝনানি যায় না। বউছেলেমেয়ে রেখে পরদিন ভোরসকালে নিজের ভিটেয় ফিরে সে চিৎকার করে ওঠে। তার আটচল্লিশ বন্দ আটচালা টিনের ঘরের কোনো নিশানা নেই। এক কোণে রান্নাঘরটা পড়ে আছে।

প্রফুল্লর চিৎকারে ফজরের নামাজ-ফেরতা মুসল্লীরা যখন এক-এক করে জমবে, ঠিক তখনই রশীদের বালুঘাটে পুকুরের দিক থেকে চিৎকার ওঠে, ওরে আল্লারে! আমার ঠ্যাং ধরে নিয়ে গেল রে!

সবাই তখন প্রফুল্লকে ফেলে রেখে বালুঘাটে পুকুরের দিকে দৌড় দেয়। দেখে বল্টু ঘাটের উপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার পায়ে কিসের দাঁতবসানো কামড়ের দাগ রশীদই আগে দেখতে পায়। হাত দিয়ে দেখতে গিয়ে তার হাতেই প্রথমে রক্ত লেগে যায়। ভোরসকালের আবছা আলো-আঁধারে সেই কালো রক্ত সে সবাইকে দেখিয়ে বেড়ায়। সবাই নিশ্চিত হয়, এরকম কামড়ের দাগ তারা জীবনে দেখেনি। আর এরকম কুচকুচে কালো রক্ত কোনো জীবজন্তুর আছে বলেও তারা জানে না।

তখন প্রফুল্ল একা একা নিজের ভিটেয় চোখের জল ফেলে। আস্তে আস্তে আলো ওঠে। আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে প্রফুল্ল একে বলে, ওকে বলে। কিন্তু সারা গ্রামের মানুষের আগ্রহ তখন বল্টুর পায়ে দেখা অদ্ভুত দাঁতের দাগ, কুচকুচে কালো রক্ত। প্রফুল্লর আটচল্লিশ বন্দ আটচালা টিনের ঘর কোথায় কোন ঝড়ে উড়ে গেছে!

অবশেষে আটভাগ হওয়া শরীর আর মন নিয়ে সে আবার শ্বশুরবাড়িই ফিরে যায়। এরপর থেকে সবাই বালুঘাটে পুকুরের গল্প বলে, চিকচিকে বালির গল্প বলে, ঠা-া পানির গল্প বলে। কিন্তু পুকুরের দিকে ভয়ে আর পা বাড়ায় না। কি আসেছে এই দোষোন্তরে পুকোরি তা কেউ কতি পারে না!

কিন্তু কোনো দ্যাও-দৈত্য নয়, একদিন হঠাৎ এক ঠাঁ ঠাঁ দুপুরে কে যেন দেখে পুকুরের মাঝে কাঠের জানালার মতো কি একটা ভেসে উঠছে। সারা গ্রামের মানুষ ভিড় করে পড়ে। পাড়ে দাঁড়িয়ে তারা আবার ঢোল-সমুদ্দুর পুকুরের গল্প করে, রাজপ্রাসাদের গল্প করে, খাট-পালঙ্কের গল্প করে, পাতালনাগের গল্প করে। এমন দরজা-জানালা তো আমরা জীবনে কারো বাড়ি-ঘরে দেখিনি!

কিন্তু পরদিন কেউ আর সেই দরজা-জানালার হদিস পায় না। সব পাতালনাগের কায়কারবার! তবু সবাই আরো কিছু দেখার আশায় থাকে। দূর থেকে উঁকি মেরে মেরে হতাশ হয়ে ফিরে যায়। সে কোন রাজার আমলের দরজা-জানলা! আর কি দেখা যাবি?

কিন্তু একদিন ভিন্ন একটা কিছুর দেখা মেলে। খাঁদের বাড়ির অকাটা ছেলে নুবল বলে বসে, পুকোরের পানির মধ্যি টিন আছে। এ খবর সারা গ্রামে গেলবারের বৈকালী অপেরার প্রিন্সেস বিজলী জাপটে-ধরার মতোই হইচই ফেলে দেয়। সবাই নুবলকে জাপটে ধরে — শিগগীর করে ক, কি দেকিচিস তুই!

নুবল কাঁপতে কাঁপতে বলে, তার বল একদিন পানিতে পড়ে গেলে চুপিচুপি তুলতে গিয়ে পায়ে টিন বাধে।

রশীদ কষে একটা ধমক দেয়। নুবলের মা সবার হাতে-পায় ধরে ছাড়িয়ে নিয়ে পরদিনই তাকে ঝাউদিয়ার পীরসাহেবের কাছে নিয়ে যায়। পড়া-পানি খাইয়ে তার বুকে পিতলের আজমিরী তাবিজ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সে আর পুকুরের ত্রিসীমানামুখো হয় না। অকাটা ছেলে নুবল কাঠ হয়ে তখন ঘরে বসে শুধু ঝিমোয়।

তবু ঢোল-সমুদ্দুর পুকুর আর বালুঘাটে পুকুরের গল্পের সাথে নুবলের গল্প মিলেমিশে ঢেউ তোলে। সেই ঢেউ বিলের মাঝের থেবড়ো রাস্তা দিয়ে ক’গ্রাম পরেই যখন প্রফুল্লর কানে পৌঁছে, সে পড়তে পড়তে ছুটে আসে। পুকুরের চারপাশ ধরে সে ঘুরতে থাকে — একদিন … দুদিন … প্রতিদিন। কোনো এক দোষোন্তরে যেন তাকে ঘাড়ে ধরিয়ে ঘোরাতে থাকে।

সে ঘুরছে। হরিপুরের রথের মেলার বিশাল উঁচু রসিকলালের নাগরদোলা যেন। এত উঁচু নাগরদোলা সারা তল্লাটে নেই। ছোটবেলার মতো কোন আসমানে যেন সে উঠে যায়। সেখানে উঠেই দেখতে পায় কোন এক ঘূর্ণিঝড়ে তার আটচল্লিশ বন্দ আটচালা টিনের ঘর, দাদার-দাদার আমলের শাল-সেগুন কাঠের দরজা-জানালা সব উড়ে উড়ে এসে পুকুরের পানিতে ঝপঝপ করে পড়ছে। আর সে শব্দ গুনছে। এক, দুই, তিন, নয়! তার ভুল হতে থাকে। আবার শুরু করে। এক, দুই, তিন, নয় …

এরপর সে কত ভোরসকালে ঘূর্ণি খেলো পুকুরের চারপাশে! ঘুরতে ঘুরতেই একদিন এই দোষোন্তরে পুকুর আর দোষোন্তরে দেশ ছেড়ে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে পার হয়ে গেল।

—————————————

আবু হেনা মোস্তফা এনাম
পদ্মকাঁটা

এভাবে, বালিকা-কিশোরী নিরুদ্দেশ হলে গ্রামের লোকেরা তার সন্ধানে অন্ধকারে যায়, সন্ধ্যা এবং রাতের নিরালম্ব ঘুটঘুটে আঁধার তাদের শরীরের ভেতর জমা হলে তারা আর রাতের নিরবচ্ছিন্ন আলোহীনতার ভেতর যেতে পারে না। তখন, তারা দেখে, গ্রামের যুবকদের শরীরে লুকানো গোধূলি ফুঁড়ে পদ্মকাঁটার মড়ক শুরু হয়েছে।

আঁধারের অপেক্ষার ভেতর পড়ে থাকা একখ- ছায়ার কাছ থেকে গ্রামের লোকেরা বালিকা-কিশোরীকে খোঁজাখুঁজির সূচনা করে, সেখানে, নরম ছায়ার ভেতর দূর্বাঘাসেরা নিশ্চুপ ঘুমে তলিয়ে ছিল। তারা ঘাসের গভীরে প্রবেশ করে; ঘাসের নীরব দৃশ্যাবৃত আহ্বান তাদের মনে হয়, সজীব আর উজ্জ্বল। কিন্তু সেখানে কেবল মৃদু পতঙ্গের বিন্দু বিন্দু নিষ্কলুষ আলোর প্রতিবিম্বের দৃশ্যকল্প ছাড়া অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্ব না পেয়ে তারা দিগন্তবৃত্তের ধূসর ঐকতানের দিকে যায়। দিগন্তের ঐকতান তাদের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তারা দেখে বিলীয়মান ছায়া এবং ধ্বনির বিন¤্র গন্ধে মিশে আছে নক্ষত্রের রুগ্ন জ্যোতির্ময়। বিস্তীর্ণ কুয়াশাপ্রস্তুতিপ্রণীত দিগন্তরেখার ভেতর থেকে আবির্ভূত নীলিমানিসর্গের নীলাভ কারুকাজ ছাড়া আর সবই আঁধারের উপসংহারে পৌঁছানো। সুতরাং গ্রামের লোকেরা ফিরে এসেছিল, তারা উপলব্ধি করেছিল— এমন ধূসর নীলাভ্রের দিগন্তছায়ায় বালিকা-কিশোরীর নিরুদ্দেশ অসুখী কল্পনা মাত্র। তখন তারা খঞ্জমেঘের অনাবিল নিসর্গে ঘেরা নিঝুম সন্ধ্যা এবং রাতের শূন্য আঁধারের ভেতর বালিকা-কিশোরীকে খোঁজে। নিসর্গের প্রবহমান আঁধার তাদের শরীরের ভেতর জমা হতে থাকলে তারা দুঃশ্চিন্তায় পড়ে, নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। তাদের মনে হয়, দুঃশ্চিন্তামুক্ত নিরাপত্তার ভেতরই কেবল মানুষ নির্বিঘেœ ঘুমের গহীনে তলিয়ে যেতে পারে; ঘুম তাদের সুখী জীবনে পদ্মের অনন্য নিরাপত্তা, যেন পৌরাণিক সজীবতায় সংগীত হয়ে আছে। গ্রামের লোকদের মনে হয়, তবে কি বালিকা-কিশোরী চন্দ্রাতপ পুষ্পছায়ায় ঘুমিয়ে পড়েছে? অথবা গাছের পাতার ফাঁক-ফোকর ভেদ করে ঝরে পড়া টুকরো টুকরো জ্যোৎ¯œার এপিটাফে সে নিজেই ফুল হয়ে ফুটে আছে ঘাসের গভীর ঘুমে, আর তারা তাকে বুনো ফুলের বিভ্রম ভেবে চিনতে ভুল করেছে? গ্রামের লোকেরা তখন বালিকা-কিশোরীর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে তমস্বিনী রাত লোকায়তিক হাতে মুছে দেয়; নক্ষত্রকঙ্কনের ভেতর উচ্চারিত বালিকা-কিশোরীর নাম ঝমঝম শব্দে বেজে ওঠে, শূন্য প্রতিধ্বনি ফিরে আসে। মনে হয় এইসব ধ্বনি-প্রতিধ্বনিময় নামের রেশ পৃথুল বিলের দিকে চলে গেছে, নক্ষত্রের মৃদু আলোর দিকে হারিয়ে গেছে, ফুলের সোনালি গন্ধের দিকে নিশ্চুপ। বিলের নীলাঞ্জন জলের রূপালি ছায়ায় পদ্মের খঞ্জপাতার উপর জেগে আছে চঞ্চল মাছের সবুজ গন্ধচিহ্ন। নিথর নিস্তব্ধ বিল পড়ে আছে কুয়াশাপ্রস্তুতিময় আকাশ হয়ে। গ্রামের লোকেরা ফিরে এসেছিল, অজানা আতঙ্কে দুঃশ্চিন্তার নিঃশব্দ ভয়ের ক্রুর গোলকধাঁধায় সারারাত তারা একই ছায়ান্ধকারে ঘুরে ঘুরে ঘুরে ঘুরে বিধ্বস্ত প্রতিভাসে পৌঁছায়। ছায়ান্ধকারে গ্রামের লোকেরা পুনরায় চিৎকার করে, ভেঙে দেয় বিন¤্র লতাকুঞ্জের নিস্তব্ধ ঝিল্লিরব। ছায়ান্ধকারের ভেতর লুব্ধ বিড়াল মাছ খেয়ে ফেলে রাখে নগ্ন কাঁটা। ছায়ান্ধকারের ভেতর পিঁপড়ার দল মুখে মুখে টেনে নিয়ে যায় মৃতের টুকরো মাংস। ছায়ান্ধকারের ভেতর গ্রামের প্রাচীন বৃদ্ধার গুনগুন কান্নার স্বর উড়ে যায়। ছায়ান্ধকারের ভেতর কোথাও বৃক্ষের সহিষ্ণুতা ইন্দ্রনীল গোধূলির অপার নীলিমায় হেসে ওঠে। ছায়ান্ধকারের ভেতর বিস্মৃতিশীল বাতাসের সংকেতে পাখিরা ফেলে রাখে সমাধিফলকের চিহ্ন। ছায়ান্ধকারের ভেতর মঞ্জুশ্রী জলের গভীর তলে ঘুমায় প্রৌঢ় হাড়। ছায়ান্ধকারের ভেতর ঋতুবিধুরতাময় অনাঘ্রাত ফুল ভেসে যায় জাহ্নবীর জলে। ছায়াধূসরিত আঁধারে বালিকা-কিশোরীর সন্ধানে গ্রামের লোকদের তখন নিদ্রাহীনতায় পেয়ে বসলে তাদের দূর অতীতের অপসৃয়মান ঘটনা মনে পড়ে, অথবা তারা নিদ্রা ভুলে যায়। নিদ্রা বলতে তখন তাদের রাতের ছায়াসূচির ভেতর তন্দ্রার অভিনয়, আধো ঘুম আধো জাগরণের ভেতর মাছের চোখের মতো নিষ্পলক শূন্যের নৈঃশব্দ্যে তাকিয়ে থাকা। তাদের সুখনিদ্রাহীন জীবনে মাছের হৃদয় উজ্জ্বল হয়ে এলে লোকেরা মেঘের গল্প বলে, জলের গল্প বলে; লোকেরা পাখির যাবতীয় উড়াল সম্ভাবনার কথা বলে। তারা বলে, মেঘ যদি না থাকে তাহলে তাদের জীবনে জলের অস্তিত্ব দূর অতীত হয়ে গেছে; মেঘ যদি পৃথুল ছায়ার ভেতর একখ- আকাশ ছড়িয়ে না থাকে তাহলে পাখিরা মাটির পখি। তখন গ্রামের লোকেরা এইসব কথা ও গল্পের ভেতর তাদের জীবনের নিশ্চিত ও অনিবার্য আশ্রয় হারিয়ে নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। তারা উপলব্ধি করে কেবল তন্দ্রার অভিনয়ে নিমজ্জিত জীবন কর্মহীন আলস্যমথিত মৃত্যুর অবলম্বন ছাড়া কিছু নয়। তখন তারা মৃত্যুর দিকে ফেরে। দূর অতীতে অপসৃয়মান মৃত্যুঘটনার করুণ ছায়া তাদের করোটির চতুর্দিকে নীল অন্ধকারের জিপসি নৃত্য উদ্দাম ঐকতানে উড়ছে। তাদের মগজ আর অনুভূতির ভেতর গ্রামের সবচেয়ে প্রৌঢ়া অনূঢ়া নারীর বেদনাবহ জীবন পুষ্পগন্ধে উদ্ভাসিত হয়,— সে একা, আর আজন্ম প্রৌঢ়, চিরদিনই; মাথার উপর ক্রুর আকাশ, অন্ধকার নিহারিকা অযাচিতই ছিল। তথাপি, একাকী আত্মীয়বান্ধব বলতে নিরুপায় সে। গ্রামের লোকেরা অনেক অনেক বছর আগে নিকষ মৃত্যুর ভেতর নিঃশব্দ হয়ে যাওয়া অনুঢ়া নারীর সুখদুঃখময় জীবনের করুণ স্মৃতিবিধুরতার নির্জনে প্রবেশ করে।

অনুঢ়া এই নারীকে গ্রামের লোকেরা অনেক অনেক বছর ধরে এক অজ্ঞাত আয়ুষ্মতী প্রৌঢ়ত্বের সহিষ্ণুতার ভেতর দেখতে পেয়েছিল। তখন, তার জীবন একটি অস্ফুট শব্দ উচ্চারণের বিনীত পুরস্কার; সেই অস্ফুট উচ্চারিত একটি শব্দই এরূপ যে, গ্রামের লোকেরা তার বিবিধ অর্থ নির্মাণ করে নিতে পারত। তার প্রতিটি অস্ফুট উচ্চারণের সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে থাকত হৃদয়ের ছায়াগুঞ্জরিত ততোধিক অস্ফুট হাসির অস্পষ্ট রেখা। গ্রামের লোকদের কাছে কখনো ওই হাসির ছায়া-ছায়া রেখা মনে হয় অব্যক্ত ও গোপন অশ্রুনির্ঝর বয়ে চলেছে। তবু সেই হাসির ক্ষীণ রেখার মধ্যে প্রৌঢ়া নারীর যৌবন আর বিন¤্র রূপের শেষ ঐশ্বর্য গোধূলি হয়ে ছিল। আর অনূঢ়া নারীর জরাজীর্ণ বিধ্বস্ত বাড়িটি স্তব্ধতার ঐকতানে ভেসে চলা করুণ সংগীত, চারপাশে কলাগাছের রোমাঞ্চ শিহরিত সবুজতা। প্রৌঢ় কলাগাছের মৃত্যুধ্বস্ত কন্দ ফেড়ে শিশু গাছের অজ¯্রতা অবিরত নিষ্কলুষ প্রেমের প্রতিবিম্ব ছড়িয়ে দেয়। প্রতিমুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ার উন্মুখতা সেই ইট আর জঙ্গলের স্তূপময় বাড়ি ছেড়ে প্রৌঢ়া নারী কোথায় যাবে? গ্রামের লোকেরা তাকে কখনো কোথাও যেতে দেখেনি, তার বিচরণ কেবল কলাগাছের পুষ্ট কা-ের ছায়ার ভেতর। পুরোনো কলাগাছের মৃত্যুর ছায়ায় কচি কচি শিশু কলাগাছ হেসে উঠলে একদিন তারা উঠান পেরিয়ে গ্রামের ভেতর প্রবেশ করে। গ্রামের সকল জমি কলাগাছে ভরে যায়। সকল ছায়ার ভেতর কলাগাছের ঐশ্বর্য। তখন গ্রামের লোকেরা দেখে কলাগাছের ছায়ায় পাখির কিচিরমিচির, দেখে কলাগাছের কচি পাতায় মেঘ জমে আছে। মেঘ তাদের কল্পনা আর স্পর্শের ভেতর পাখির গানে মুখরিত হয়ে ওঠে। স্বপ্ন ও বাস্তবতার ভেতর, কাজ ও চিন্তার মধ্যে, শিল্প ও জীবনের অন্তর্গত উপলব্ধির ভেতর পাখি আর মেঘের গান নিয়ে মুকুলকুসুমিত কলাগাছ ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের লোকেরা কলাগাছ জড়িয়ে ধরে আদর করে, কচি সবুজ ছায়ায় রৌদ্রচূর্ণাবলির ছড়া বলে, কলাগাছের পীতাভনীল কা-ের বিমূঢ় গর্ভের ভেতর হেসে ওঠে পৃথিবীর সকল বিকেল, সকল রাত। যে রাত নিসর্গের সহিষ্ণুতার ভেতর ফুলসমগ্রকে, ফুলের রেণুসমূহে পতঙ্গের ওড়াউড়ির স্পর্শকে, স্পর্শের নিঃশব্দের ভেতর প্রেম প্রাকৃতিক হয়ে ওঠে। তখন তারা বলে— প্রৌঢ় কলাগাছের মতো মৃত্যু আসুক, প্রেম বেঁচে থাক নবীন কলাগাছের ছায়ারূপায়িত লুব্ধ গন্ধে। তখন তারা কলাগাছের জীবনচক্রের ভেতর প্রার্থিত নারীর গর্ভ সঞ্চারের আনন্দে উন্মীলিত হয়।

রাতের কী গৌরব, মেঘের গন্ধে পৃথিবীর সকল রাত তন্ময় হয়ে থাকে! গ্রামে বর্ষা নামে। বসন্ত আসে। গ্রীষ্ম আসে। গ্রামের লোকের সকল ঋতুর তীর্থে, সকল শরীরে রাত অনুসৃত হতে থাকলে তারা বিহ্বল হয়ে পড়ে। রাত যদি ঘুমের আশ্রয়, তাহলে গ্রামের লোকদের নিদ্রাহীনতায় পেয়ে বসলে রাতের সকল গৌরব লুপ্ত হয়। চন্দ্রাতপ রাতের অধিরূঢ় ছেড়ে তারা ভোরের দিকে যাত্রা করে। কিন্তু তারা ভোরের দিগন্তে পৌঁছতে পারে না; দেখে, দিগন্তের কোলে নীলাভ ছাই-ছাই মেঘ আর ধূসর বেগুনি হয়ে আসা আঁধার গাছগাছালি অরণ্যের দুর্ভেদ্য নিয়ে সুদূর সমান্তরাল সরল রেখা আঁকা। গৃহকুঞ্জে ঝুলে আছে অস্পষ্ট আঁধার। শস্যক্ষেতে ছড়িয়ে আছে অন্ধকার কুজ্ঝটিকা। তখন তারা বলে, রাত থাকুক রাতের গৌরব নিয়ে; রাতের আঁধারকারাগার ছিঁড়ে প্রস্ফুটিত হোক সূর্যরেখা। আঁধার হারিয়ে গেলে সূর্যের সূচনায় গ্রামের লোকেরা পুনরায় বিহ্বল হয়ে পড়ে। তাদের তখন মনে পড়ে ঘণায়মান গোধূলিআঁধারে নিরুদ্দেশ বালিকা-কিশোরীর স্মৃতি। সে কি তবে প্রৌঢ় কলাগাছের মতো প্রেমের নতুন দৃশ্যকল্প রচনার জন্য মৃত্যুর ভেতর হারিয়ে গেছে? তাহলে তার মৃত হাড় কোথায়, হাড়ের ছায়া কোথায়, হাড়ের প্রণয়াকুল পিঁপড়া কোথায়? গ্রামের লোকেরা এসব জিজ্ঞাসার সমাধান না পেয়ে ধন্দে পড়ে, তাদের তখন মনে হয়, বালিকা-কিশোরীও সম্ভবত অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর মতো প্রেমের দীর্ঘ প্রতীক্ষার আঁধারে পৌরাণিক হয়ে আছে; তথাপি এমন দুঃশ্চিন্তাদ-িত সময়ে তাদের কৌতূহল শরতের হার্মাদ-জলদস্যু বিকেল উচ্ছল ছিল। কেননা প্রেমের বাক্য উচ্চারিত হলে তার মধ্যে অজানিত কৌতুক আর কানাকানি সুপ্ত আছে— অবিরাম গতি নেই, আবার যেন গতির ঝঞ্ঝা আছে, অনর্গল বদলাচ্ছে; এই গোধূলিমেঘ, এই টুকরো টুকরো স্রোতচিহ্ন রূপায়িত— রঙিন, আবার ফ্যাকাশে, কখনো রুগ্ন বাঘের মতো ঝিমঝিম। গ্রামের লোকেরা এই, তবে, কানাকানির কৌতুক ভালোবাসে এবং তারা একদিন এই কৌতুক ভুলে যায়। কিন্তু কৌতুক গৃহে গৃহে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশী গৃহের রমণীরা প্রেমের মুখরোচক কৌতুকে মশগুল থাকে। নিখাদ শুদ্ধ প্রেমের জ্ঞান লাভ হলে, এখন, হ্রস্ব এক অনুচ্ছেদ চরিতামৃতে তার পরিসমাপ্তি হত না। এ যেহেতু কৌতুক সুপ্ত, তথায় স্রোত কোথায়? কেবল কৌতুকের কা-জ্ঞান থাকে না। পদ্মজঙ্গলের নিচে নিচে সবুজকালো পানির চোরা স্রোতে হিলহিলে সাপের পিঠে এমত কানাকানি পিছলে গেলে একদিন রমণীরা প্রেমের সৌন্দর্য আবিষ্কার করতে শেখে এবং নিরুদ্দেশ বালিকা-কিশোরীর জন্য তাদের মায়া হয়। গার্হস্থ্য রমণীদের তখন মনে হয়, তবে কি গ্রামের লোকেরা জানে বালিকা-কিশোরীর নিরুদ্দেশের কারণ! কেবল তাদেরই কি জানা ছিল বালিকা-কিশোরীর  আঁধার জঙ্ঘায় শোকাতুর সংগীতের অস্ফুট ধ্বনিচূর্ণ কীভাবে কলাগাছের পরিপুষ্ট কা-ের ভেতর নিঃশব্দে মর্মরিত ছিল! রমণীরা বালিকা-কিশোরীর নিরুদ্দেশের গোপন শোক অনুভব করে; গোধূলিপ্রস্থানের নিকষ আঁধারের নৈসর্গিক দৃশ্যকল্পের ভেতর রমণীদের সবল কান্তিময় মাতৃ কলাগাছের মতো স্ফিত হৃদয়ে মাতৃত্বের নিঃশব্দ কান্না ঝিনুক হয়ে ছিল। তখন, এমন কান্নার প্রতিচ্ছায়া বয়ে যাওয়া প্রবল বর্ষাদিনে, গ্রামের রমণী আর পুরুষদের শোক বিষণœতা আর নীরব হাহাকারের ভেতর যুবকদের হৃদয়ে আঁধার শূন্যতার রক্তিমতাবিদ্ধ পদ্মকাঁটা গজাতে থাকে।

পদ্মকাঁটার মড়ক শুরু হলে গ্রামের যুবকদের প্রেমের মৃত্যু ঘটে। তাদের হৃদয়ে প্রবহমান উষ্ণতা নিদারুণ টঙ্কারে ফেটে পড়লে তারা গুটিসুটি কুকুরের খোপ হতে ঝুলন্ত জিহ্বার উৎকট যৌনইচ্ছার কৃতদাসে পরিণত হয়। যুবকদের অনিচ্ছুক অবদমনের ঝিম থেকে বেরিয়ে আসতে গ্রামের প্রবীণরা তাদের প্রেমের উষ্ণতা ভরা ভাত খেতে বলে পঞ্চমীর জ্যোৎ¯œামথিত নবীন পদ্মপাতায়, তবে তারা মুক্ত হোক পদ্মকাঁটার মড়ক। কিন্তু কোথায় পাবে তারা এমন জ্যোৎস্নামথিত পদ্মপাতা! তারা দেখে অনেক অনেক কাল অতীতে, যখন তাদের প্রেমের মৃত্যু— শুকিয়ে গেছে পদ্মবিল। অনেক অনেক কাল অতীত গ্রামে গোধূলিছায়ায় চাঁদ ডুবে গেছে অবিরাম আঁধারে— পড়ে আছে পদ্মের অপভ্রংশ।

কিন্তু গ্রামের আঁধার অপসারিত হয় না, অনন্ত রাষ্ট্রীয় আঁধারের বিবমিষা জং ধরা প্রাচীন তরবারির মতো ঝুলতে থাকে। তাহলে তাদের ভোর কোথায়? গ্রামের লোকেরা দেখে তাদের গৃহের জানালা এবং বারান্দার পাশে বেড়ে ওঠা কলাগাছের শীতল বাতাস আর সবুজ গন্ধের শর্করার ভেতর গৃহের অভ্যন্তরে থোকা থোকা অন্ধকার জমে আছে অনড়, আরূঢ়, অবলীঢ়। কান্তিময় কলাগাছের কা- আর কচি পাতার অধিরূঢ় ছেড়ে ছড়িয়ে আছে এইসব ছায়ান্ধকার— তারা বিহ্বল বোধ করে, নিরাপত্তাহীনতায় ভয় পেয়ে যায়— এইসব আঁধার তাদের গৃহ, শস্যক্ষেত এবং শরীরের ভেতর রাজত্ব বিস্তার করলে তখন লোকেরা জানালায় মুখ বাড়িয়ে থাকা যৌবনবতী কলাগাছ কেটে ফেলে। কলাগাছের শিশু পাতায় লুকানো চৈত্রের রোদে ঝলমল করে বৃক্ষদৃশ্যাবলি, কিন্তু গৃহ এবং তাদের রক্তের ভেতর প্রবহমান আঁধার অপসারিত না হলে তাদের পুনঃপুন নিরাপত্তার অভাবের ভেতর কর্তিত কলাগাছগুলো শুকিয়ে যায়, এবং গ্রামের লোকেরা অবশ্যম্ভাবী বিস্ময়ে লক্ষ করে বালিকা-কিশোরী নিরুদ্দেশের গোপন শোক নিঃশব্দে তাদের হৃদয় থেকে সংক্রমিত হয়ে পড়েছে গ্রামের সকল কলাগাছে। অথবা, শিশু শিশু কলাপাতা কেটে ফেলা কলাগাছের মৃত্যুশোকে অনৈসর্গিক জরাজীর্ণ সবুজতা তাদের শরীরের লাবণ্য নিংড়ে হৃদয়বিদারক। তখন, এইরূপে, কেটে ফেলা কলাগাছের মৃত্যুশোক সকল কলাগাছের নীল আত্মায় সঞ্চারিত হতে থাকলে গ্রামের রাত এবং গোধূলির ভেতর, দিন এবং স্মৃতির ভেতর, ছায়া এবং প্রতীক্ষার ভেতর কলাগাছের মৃত্যু অবধারিত হয়ে ওঠে। গ্রামের সকল উঠোনে, সকল শস্যক্ষেতে কলাগাছের লাশের ভেতর তারা দেখে, রাশি রাশি পিঁপড়া মুখে মুখে কিছু একটা বহন করে চলেছে। গ্রামের লোকেরা বুঝতে পারে না, অথবা প্রথমত, তারা লক্ষই করেনি পিঁপড়াদের মুখে কী। অজ¯্র পিঁপড়ার মিছিল দেখে তারা ভয় পায়; তারা ভাবে পিঁপড়ার দল হয়ত তাদের ঘুম কেটে দেবে কুট কুট, তাদের শ্রবণ কেটে দেবে কুটুস, তাদের দৃশ্য কেটে দেবে কুট কুট, তাদের যৌন ইচ্ছা কেটে দেবে কুটুস। সহসা তাদের ভয় অপনোদিত হয়, তারা দেখে তাদের ঘুম অথবা শ্রবণ অথবা দৃশ্য অথবা যৌন ইচ্ছার ভেতর নয়, পিঁপড়ার দল শোকার্ত অভিনিবেশে ছড়ানো ছিটানো কলাগাছের খঞ্জলাশের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে। পিঁপড়াদের গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চিত শৃঙ্খলা এবং নিঃশব্দ মিছিল গ্রামের প্রেমশূন্য, নিরাপত্তাহীন, নিদ্রাবঞ্চিত লোকদের মাঝে কৌতূহল সঞ্চার করে। তারা শোক ও বিষাদে আচ্ছন্ন পিঁপড়ার মিছিল লক্ষ করলে দেখে, দুইদল পিঁপড়ার পারস্পরিক বিপরীত যাত্রা। একদল পিঁপড়া চলেছে মৃত কলাগাছের ছিন্ন শিকড়ের প্রতœআঁধারে, আর তারা গভীর প্রণয়ে মুখে মুখে নিয়ে যাচ্ছে বিষণœ ধূসর বর্ণের টুকরো কিছু। বিপরীত যাত্রার পিঁপড়ারা শূন্য মুখে ছুটছে, উত্তেজনায় চঞ্চল। পিঁপড়াদের মিছিল অনুসরণ করলে বিপরীত যাত্রার পিঁপড়ার দল গ্রামের লোকদের নিয়ে যায় অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর বিধ্বস্ত ও স্তব্ধ বাড়ির প্রাঙ্গণে। তারা দেখে জরাজীর্ণ একমাত্র ঘরের মেঝের উপর শায়িত অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর শীর্ণ হাড়। পিঁপড়ার দল গভীর কোমলতায় আচ্ছন্ন হাড়ে লেগে থাকা কালো বিষণœ অবশিষ্ট চামড়া পরম মমতায় মুখে মুখে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

এই দৃশ্যে গ্রামের লোকেরা বিষণ্ন হয়ে পড়ে। শোক এবং পিঁপড়াদের গভীর প্রণয়ের ভেতর তারা দেখে, মৃত হাড়ের নিচে একটি প্রতীক্ষার চন্দ্রছায়া অশ্রুময়। তখন তারা আবিষ্কার করে অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর মৃত্যুর ক্ষণ। প্রণয়াকুল পিঁপড়াদের মৃত চামড়া সংরক্ষণের দিন-রাতের হিসাবে তারা বলে, তাদের গৃহের জানালায় মুখ বাড়িয়ে থাকা যৌবনবতী কলাগাছ কেটে ফেলার ক্ষণে অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

অথবা তারা, এখন, এই শোকার্ত প্রতীক্ষার ভেতর, গ্রামের লোকেরা, দিন-রাতের হিসাব ভুল করে; তারা ভাবে অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর মৃত্যু হয়েছিল বালিকা-কিশোরী নিরুদ্দেশ হবার গোধূলিগুঞ্জনে। গ্রামের লোকেরা বলে, যৌবনবতী কলাগাছ কর্তনের সময় লতাগুল্মের সবুজ আঁধারে লুকানো প্রজাপতির ডানায় গুঞ্জন করে ওঠা মৃদু সংগীতের ভেতর বালিকা-কিশোরী গোধূলি হয়ে যায়। আর বালিকা-কিশোরীকে সন্ধানের উত্তেজনা ও দুঃশ্চিন্তায় ব্যাকুল লোকেরা লক্ষ করেনি গোধূলিপ্রস্তুতির নীরব বায়ুপ্রবাহের ভেতর মৃত্যুর নিঃশব্দ পদসঞ্চার। অথবা তাদের শ্রবণ নিবেদিত ছিল কেবল দূর্বাঘাসের কোমল ছায়ায়, যেখানে হয়ত ফুটে ছিল বালিকা-কিশোরীর পদ্মিনী পদচিহ্ন। কিন্তু এসব সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে এলে তারা ভাবে, না কি অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর জীবনের সংহারপিপাসু মৃত্যুর অপ্রতিরোধ্য রক্তপদ্ম কিলবিল করে উঠলে বালিকা-কিশোরী অনন্ত প্রতীক্ষার স্মৃতিবিধুরতাময় সংগীতের ভেতর হারিয়ে যায়। এরূপ, এমত, বিভ্রম গ্রামের লোকদের বিহ্বল করে, এবং মৃত্যু অথবা নিরুদ্দেশ, অসম বয়সী এই দুই নারীর জীবনের সম্পর্কহীনতা এবং সময়শূন্যতার ভেতর তারা দ্বিধা ও শোকের সংক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে চৈত্র পূর্ণিমার নিদারুণ জ্বলজ্বলে দ্যুতি ঠিকরে পড়া গ্রাসিত জ্যোৎস্নায় অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর স্বপ্নাচ্ছন্ন শীর্ণ হাড়গুলো রোদনময় হাতে তুলে নেয়।

কিন্তু এই আয়ুষ্মতী হাড় তারা কোথায় সমাহিত করবে? এমন সমাধিক্ষেত্র কোথায়? চারদিক মৃত কলাগাছের হলোকাস্ট পেরিয়ে তারা গমন করে বিজন জ্যোৎস্নায়, জলশূন্য বালিময় ধূসর বিলের তলদেশে। তারা দেখে, শুষ্ক আর ঝকঝক দৃষ্টিধাঁধানো গোলাকার বিলের তলদেশে শুয়ে আছে চাঁদ। বিলের চাঁদ তাদের শোক হয়ত প্রশমিত করে, অথবা তাদের শরীর ও আত্মার নীল পদাবলির ভেতর চন্দ্রছায়া অশ্রুময়। তখন তারা মানুষ এবং নিসর্গের অন্তর্গত সম্পর্কের স্বপ্ন রূপায়ণ ও রহস্যের ভেতর একখ- সাদা কাপড়ে জড়ানো হাড়গুলো চাঁদের বুকে রোপন করে।

চৈত্র পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় গ্রামের লোকেরা চাঁদের শরীরে পা ফেলে ফেলে ফিরে আসে ভোরের দিগন্তে। চাঁদ মরে যায়। মৃত চাঁদের আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাখা সূর্যের আলোয় তারা দেখে, মৃত চাঁদের বুকে রোপিত হাড় থেকে বেরিয়ে আসছে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ। তখন তাদের বিস্ময় যে, কতদিন কতকাল এই বিল শুকিয়ে পড়ে ছিল— বিকট শূন্য গহ্বর, কতদিন কতকাল জলের নিমগ্ন নাচ দেখেনি তারা— পদ্মময়ূরের বর্ণালি পেখম নেই, কতদিন কতকাল তারা শোনেনি মাছের লাফ— পাখিদের গান থেমে গেছে। গ্রামের লোকদের এই বিস্ময়ের ভেতর আঁধারের যবনিকা অপনোদনের সঙ্গে ক্রমেই মৃত চাঁদের গর্ভকোষ ফুঁড়ে বাহিত পানির উদ্দাম উচ্ছল বৃত্ত-পরিসর বড় হতে থাকে। আর বৃত্তের কেন্দ্রে রোপিত অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর স্বপ্নাচ্ছন্ন বাহুর হিউমেরাস হাড় পদ্মডাঁটায় রূপায়িত হয়, কারপাল হাড়গুলো পদ্মকুঁড়ি, করোটি আর স্ক্যাপুলা সবুজ পাতায় মাধুর্যময় দৃশ্যের দারুণ ছবি মুদ্রিত হলে তখন সূর্যের লাল আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। পঞ্জরাস্থি আর কশেরুকাগুলো রূপময় সোনালি মাছে রূপান্তরিত হয়, আর রাজকুমারী সোনালি মাছ পদ্মের ছায়াপ্রতিচ্ছায়ায় জড়িয়ে থাকে অতল জলের দিনে। এই দৃশ্য উপভোগের জন্য গ্রামের সকল নারী-পুরুষ-যুবক-শিশু জড় হয় পদ্মবিলের চারপাশে, এবং তখন তাদের স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে প্রৌঢ়া অনূঢ়া নারীর মায়াবী করুণ মুখ, যে নারীকে তারা দেখতে পেয়েছিল আয়ুষ্মতী চিরপ্রৌঢ়ত্বের সহিষ্ণুতার ভেতর লাবণ্যময়, যে নারী প্রেমের দীর্ঘ প্রতীক্ষার ভেতর ছিল আঁধার প্রাকৃতিক। আর তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল গৃহের জানালায় মুখ বাড়িয়ে থাকা যৌবনবতী কলাগাছ কর্তনের ক্ষণে, অথবা বালিকা-কিশোরী নিরুদ্দেশের গোধূলিছায়াচিহ্নে, অথবা প্রজাপতির ডানায় নেচে ওঠা উদ্বাস্তু সংগীতের ভেতর। এইসব স্মৃতিদৃশ্যাবলির ভেতর নিমগ্ন ও নিমজ্জিত আচ্ছন্নতা ফিকে হয়ে এলে গ্রামের লোকেরা দেখে, বিল জুড়ে নীলাভ্র জলের পটভূমির উপর ফুটে আছে নারীর নীরব মুখের মতো অগণিত অপরূপ পদ্মফুল।

পঞ্চমী চাঁদের আলোয় গ্রামের যুবকেরা বিলে নামে। বিল জুড়ে পদ্মের দুর্ভেদ্য জঙ্গল। লতায়পাতায় জেগে ওঠা সবুজ চর পেরিয়ে যুবকেরা জলের নীলাভ্র চাঁদে পৌঁছালে জ্যোৎস্নায় দেখে নিঃসঙ্গ পদ্মপাতার ছায়াতরঙ্গে একটি সোনালি মাছ, লাজুক সৌন্দর্যে নিঝুম। পদ্মকুঞ্জে চন্দ্রালি আঁধার নেই, কেবলই আধোনীল এলোমেলো ছায়ার চিত্রকল্প নিশ্চুপ, লাল ছায়াতরঙ্গের সর্পিল রেখায় তার সোনালি শরীর ঝিলমিল করে। তার সোনালি আঁশে নীল জলের দৃশ্যকল্প, নীলের ভেতর চিরন্তন খঞ্জমেঘের নাচ, নীল নাচের অজ¯্র ফেনাতরঙ্গে দিগন্তের ঐন্দ্রজালছিন্ন হৃদয় দ্রবীভূত। তন্দ্রাজড়িত ছায়া-ছায়া জ্যোৎ¯œায় ম্লান কুপির আলোয় রাজকুমারী সোনালি মাছের অপরূপ লীলালুব্ধ বর্ণচ্ছটায় যুবকেরা স্তব্ধ। তারা ভুলে যায় রাতের ঘূর্ণিবাতাসের টঙ্কার আর জ্যোৎস্নামথিত পদ্মপাতা শিকারের অভিপ্রায়। কুপির ক্ষীণ আলোয় অথবা পঞ্চমী চাঁদের নির্লিপ্ত স্পন্দনে যুবকদের ছায়াদৃশ্য রোমাঞ্চিত হয় রাজকুমারী মাছের চোখে। যুবকদের স্তব্ধতার অবসরে সোনালি মাছ জলকুঞ্জের নীল ঘূর্ণি তোলপাড় তুলে পাখনার রূপালি কাঁটা তীক্ষè করে; যেন আক্রোশে রাগী, চিরে দেবে জলদগম্ভীর মেঘের নীলাঞ্জন কন্দর। ভয়ঙ্কর ছটফট চঞ্চল দৃশ্য পদ্মের প্রতিচ্ছায়ায় জড়িয়ে পড়ে গহিন জলের রাতে। এমন, এরূপ, এইখানেই কী, সৌন্দর্য প্রমিতি নিয়ে রঙের বাঁকে বাঁকে পদ্মছায়ায় সে বসে থাকে নিঃশব্দে! মুহূর্তমাত্র দেখা দিয়ে সোনালি মাছ হারিয়ে গেলে যুবকেরা জলের নীলাভ্র পটভূমির বিপরীতে ফিকে হলুদ নক্ষত্রের আলোয় ছুটতে থাকে। তারা দেখে তাদের চারদিকে লাল পদ্মের অগ্নিপাখা দুলছে। তারা হারিয়ে যাওয়া সোনালি মাছ এবং অগ্নিপদ্মের দৃশ্যকল্পের রূপরেখার মাঝে দোদুল্যমান। তখন তাদের মনে হয়, তবে ওই সোনালি তরল তরঙ্গের ঝিলমিল কোনো মাছ নয়? তাদের মনে পড়ে অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারীর অস্থি থেকে প্রস্ফুটিত পদ্মপুষ্প আর সোনালি মাছের উন্মীলিত স্মৃতি, যে নারীর মৃত্যু মিথ হয়ে উঠেছিল বালিকা-কিশোরী নিরুদ্দেশের গোধূলিচিহ্নিত ছায়াগন্ধে, অথবা কর্তিত যৌবনবতী কলাগাছের অমলিন শোকের প্রত্নসূচীর ভেতর, অথবা গৃহহারা উদ্বাস্তু প্রজাপতিদের বিষণœ গানে। আচমকা এই স্মৃতির উন্মোচনে যুবকেরা ভয় পায়— দূরে দূরে জ্বলা সামরিক পাহারাদারের মতো অগ্নিপদ্ম আর হারানো মাছের সোনালি ঝিলমিল আলেয়া তাদের সর্বগ্রাসী দিকচিহ্নহীনআঁধার সুড়ঙ্গে টেনে নিয়ে চলেছে। তাদের ভয় যে, এইসব অগ্নিপদ্ম ও সোনালি মাছ অনূঢ়া প্রৌঢ়া নারী অথবা বালিকা-কিশোরীর প্রতীক্ষিত প্রেমের দগ্ধ হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাসে তাদের তাড়া করে।

কত কত রাত তারা যায় পঞ্চমীর জ্যোৎস্মনাথিত পদ্মবিলে; যায় পদ্মপাতা শিকারে, অথবা যায় সোনালি মাছ শিকারে; অথবা তাদের মনে হয়, তারা যায় জ্যোৎস্না শিকারে। তখন পঞ্চমীর ছায়ান্ধকারে বিল আর ধূসর দিগন্ত জুড়ে বাতাসের দীর্ঘশ্বাস, কখনো কখনো ধূলিঘূর্ণির জলক্ষুব্ধ অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে শিকারীদের শরীরে, তারা সোনালি মাছের ছায়ায় ছায়ায় হাঁটে, দ্রুত সঞ্চরণশীল সোনালি ছায়ায় হেঁটে হেঁটে তাদের ভয় দূর হয়। এবং তারা সোনালি মাছের প্রেমে পড়লে নির্বাক বিস্ময়ে তারা নিশ্চুপ। তারা গভীর আচ্ছন্ন ঘোরের ভেতর ফিরে আসে এবং গ্রামের লোকদের বলে যে, নশ্বর নক্ষত্রের মৃদু আলোয় পদ্মজলের নীলাঞ্জন থেকে উঠে আসা অস্পষ্ট কুয়াশায় সোনালি মাছ তাদের মধ্যে পিছিয়ে পড়া নিঃসঙ্গ শিকারী যুবককে সুর শুনিয়েছে। পাখির স্খলিত পদবিক্ষেপে ধ্বনিময় ছিল সোনালি মাছের সংগীত; কণ্ঠস্বরে ছিল বিলের গোলাকার জলের মুকুরে নভোম-লের বালিকা-কিশোরী চিত্রকল্প, অথবা ছিল উদ্বাস্তু প্রজাপতিদের শোকার্ত উড়াউড়ি।  চন্দ্রালোকিত জলের গহিনে স্পর্শ ও অনুভূতিময় শ্যাওলার সবুজ আত্মার ধূসরতায় বিমূঢ় ঝিলমিল তরঙ্গে সোনালি মাছ একাকী শিকারী যুবককে নিঃশব্দ ইশারায় টেনে নিয়ে যায় জলের অতল আঁধারে, অথবা একাকী যুবক নিরুদ্দেশ হয় জলতরঙ্গের ঘূর্ণিফাঁদে। অথবা শিকারী যুবকেরা বলে, কণ্টকিত পদ্মমৃণালে জড়ানো জলপাই-সবুজ সাপের নিঃশব্দে সে পরিণত হয় রক্তমাংসের দলায়, পদ্মকাঁটাদগ্ধজলসত্রে ভেসে উঠেছিল প্রজাপতির রক্তবুদবুদ।

গ্রামের লোকদের কাছে, তখন, যুবকের ফিরে না আসার শোক দুর্নিবার হয়ে ওঠে। শরীর শিউরানো শঙ্খিল ভয়ের জলজ ঘিনঘিনে অনুভূতি তাদের নিদ্রার ভেতর ঢুকে পড়ে। তখন শরীরে পদ্মকাঁটার কুটকুট নিয়ে যুবকেরা পুনরায় পঞ্চমী চন্দ্রাতপে এগিয়ে যায় ধু ধু ধূসরতাপ্রণীত ছায়াদিগন্তের দিকে। তারা দেখে দিগন্তগ্রাসী চরাচরপ্লাবী বিশাল বিল বিসর্পিল ভয়ের দগদগে উল্কি দাগানো তরঙ্গে জ্বলছে। যুবকেরা ট্যাটা হাতে নামে বিলের চন্দ্রালোকে। জলতরঙ্গে চাঁদ ভেঙে গেলে যুবকেরা ফালি ফালি চাঁদের ভেতর রাজকুমারী সোনালি মাছের উরুসন্ধি লাফাতে দেখে। মাছের লাফে চাঁদ ভেঙে গেলে কেঁপে ওঠে পদ্মপাতার জঙ্গল। কাঁপে, যুবকদের হৃদয়ে যেটুকু যবনিকা ছিল, বালিকা-কিশোরীর বিকীর্ণ রূপালি কৈশোরের প্রেম— সে কি এখন জলের অপভ্রংশ! না কি চাঁদের! অথবা সোনালি মাছের অপরূপ! যুবকেরা তখন চিন্তার সকল ভঙ্গি আর রক্তের উন্মাদে ট্যাটা হাতে ছুটতে থাকে দ্রুত সঞ্চরণশীল মাছের নৈঃশব্দ্যের দিকে, পঞ্চমী চন্দ্রালির ছায়ামাখা পদ্মপাতা শিকারে। ভাঙা চাঁদের চিত্রিত এলোমেলো ছায়াতরঙ্গে ঘৃণা এবং সাহসের উত্তেজনায় চঞ্চল মাছ গভীর শ্যাওলা আর নীলাভ্র জল তোলপাড় করে।  যুবকেরা রাজকুমারী মাছের লাফ লক্ষ করে ট্যাটা ছুঁড়ে মারে— তবে তারা শিকার করুক নবীন পদ্মপাতা। কিন্তু চাঁদ ভেঙে গেলে তারা সকল পদ্মপাতা হারিয়ে ফেলে। মাছের কণ্টকিত লেজের ভয়ঙ্কর ধাক্কায় প্রবল ঢেউ ছড়িয়ে পড়লে যুবকেরা শরীরে পদ্মকাঁটার সামরিক কুটকুট নিয়ে হারিয়ে যায় ভাঙা চাঁদের অপরূপ আঁধার শূন্যতায়।

রাষ্ট্র এবং গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে যাওয়া ভাঙা চাঁদের আঁধার সুড়ঙ্গে, তখন, গ্রামের লোকেরা আর আলোহীনতার ভেতর যেতে পারে না। অথবা আঁধারের প্রতীক্ষার ভেতর সুপ্ত একখ- ছায়ার কাছে তারা হারানো যুবকদের সন্ধান করে, এবং তারা নিরাপত্তার অভাবের ভেতর মৃত কলাগাছের স্মৃতি নিয়ে নিদ্রা ভুলে যায়।

——————————————-

উম্মে মুসলিমা
অভিজাত

ওর চীন থেকে আনা ড্রাগন আঁকা কোটটা পরে নিলাম। যদিও তেমন ঠা-া পড়েনি নভেম্বরের শুরুতে। কিন্তু স্বামী বিদেশ গিয়েছিল তা কি মুখ ফুটে বলতে পারবো শুরুতেই? ওটা দিয়েই সূত্রপাত করা যাবে। যদি ট্রেনের প্রথম শ্রেণিতে সেরকম কোন বোদ্ধা মানুষ মুখোমুখি বসে জিজ্ঞাসা করেই বসে—

‘বাহ্, খুব সুন্দর তো। এদেশে পাওয়া যায়?’

‘কী যে বলেন না! এসব জিনিস এদেশে?’

‘বাইরে থেকে কেউ পাঠিয়েছে বুঝি?’

ব্যাস, মওকা মিল গায়া। তখন তরতর করে স্বামীর দামি চাকরি, বিদেশ যাওয়া, বাসায় ফোন, অফিসের গাড়ি করে ঘুরতে বেরোনো ইত্যাদি বলে ফেলার সুযোগ পাওয়া যাবে। একটা ট্রলিব্যাগও এনেছিল ও। সেরকম মজবুত নয় বলে বেশি জিনিস ভরতে গিয়ে একদিকে ফেঁসে গিয়েছিল। দুটো সেপ্টিপিন দিয়ে আটকে নিলাম। খারাপ দেখাচ্ছিল। কিন্তু ট্রলিব্যাগ বলে কথা! স্টেশনে কজন মেয়ে আর ট্রলিব্যাগ গড়গড়িয়ে ড্রাগন আঁকা কোট পরে এগিয়ে যায়? একটা উঁচু হিলের জুতোও ছিল আমার। কলেজপড়–য়া বোন এসে কদিন আগে চেয়ে নিয়ে গেছে। আর সময় পেল না! কিনবো আরও গোটা দুয়েক না হয় পরে। ওর চাকরিটা একটু পোক্ত হোক। কেবল তো শুরু।

ছোট স্টেশনে ট্রেন এসে দাঁড়ালে প্রথম শ্রেণির কামরা খুঁজতে খুঁজতে আমি নাজেহাল। একহাতে ট্রলি, ঘাড়ে হাতব্যাগ, অন্যহাতে শাড়ির কুচি উঁচিয়ে ড্রাগনআঁকা কোটের মধ্যে ঘেমে নেয়ে যখন কামরা খুঁজে পেলাম ততক্ষণে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। দরজা থেকে এক ভদ্রলোক ট্রলিটা ধরলেন বলে পড়িমরি করে উঠে পড়লাম। ভদ্রলোককে ‘থ্যাংকু সো মাচ’ বলতে পারতাম কিন্তু তার পোশাক-আশাক দেখে কেবল ‘থ্যাংক ইউ’ বললাম। যেন সে-ই ধন্য হয়েছে আমার ট্রলি তুলে নিয়ে। ভদ্রলোক ট্রলির সেপ্টিপিনের দিকে তাকিয়ে কি একটু হাসলেন? না কি কোট পরে আমি ঘামছি দেখে?  না বোধহয়। ওর মুখটাই বেশ হাসি হাসি। মরুকগে। কক্ষের দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখলাম একজন ভদ্রমহিলা চোখে মিস্টি সংবর্ধনা নিয়ে বসে আছেন। মধ্যবয়সী। পরনে তাঁতের শাড়ি। কানে দুটো ছোট্ট মুক্তোর টব। কোলের পরে হাতব্যাগ। ওরকম ব্যাগ এদেশে দেখেছি বলে মনে হয় না। অবশ্য ঢাকার বড় বড় শপিং মলে আমারও তো এখনো যাওয়া হয়নি। হয়তো সেখান থেকেই কেনা। পাশে একটা ঈদসংখ্যা। আমি কায়দা করে ‘হ্যালো’ বললাম। উনি ‘স্ল¬ামালেকুম’ বলে তার জবাব দিলেন। ‘হ্যালো’ বললে ‘হাই’ বলতে হয় এটা বোধহয় ওর জানা নেই। যাক। শ্রোতা তো মিললো।

ট্রলির ছেঁড়া অংশ নিজের শাড়ির দিকে আড়াল করে নব টিপে ধরে হাতলটা ঢুকাতে গেলাম। ঢুকলো না। কয়েকবার চেষ্টা করে ওভাবেই ছেঁড়া অংশ দেয়ালের দিকে ঘুরিয়ে রাখতে যাবো, ভদ্রমহিলা টেনে নিয়ে কী যেন করলেন ওটা ঠিক বসে গেল সহজেই। ছেঁড়া অংশটা দেখে তার মুখে কোন ভাবান্তর লক্ষ করা গেল না। কিংবা তিনি হয়তো ওটা দেখেনইনি। এবার ‘থ্যাংকু সো মাচ’ বলতেই হলো। ভদ্রমহিলা সাধারণ পোশাক-আশাকের, কিন্তু মুখম-লে যে শ্রী ধরে আছেন তাকে সমীহ না করে উপায় নেই। তিনি বললেন ‘না না এ আর এমন কী’।

‘আর বলেন না, উনি চায়না থেকে এটা নিয়ে এসেছেন’। ‘ও’। আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না দেখে উন্মুখ হয়ে বসে থাকলাম। কখন বলেন— ‘উনি কী করেন?’ ‘এইতো সবে বিসিএস পাশ করে সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেছেন। মেধাতালিকায় ওপরের দিকে আছেন। ওর বস নাকি বলেন এমন ব্রিলিয়ান্ট অফিসার তিনি আগে পাননি। যোগদান করার একবছরের মধ্যে চীন ঘুরে এলেন। এই কোটটা দেখছেন না? ড্রাগন আঁকা? এটা চীন সরকার ওকে উপহার দিয়েছে। আবারও মালেশিয়া যাবেন আগামী জানুয়ারিতে। এখন একটা কাজে কুষ্টিয়ায় থাকতে হবে ওকে মাসখানেক। বললেন গাড়ির ব্যবস্থা করি, তুমি গাড়ি করেই চলে আসো। শিলাইদহের কুঠিবাড়ি দেখা হয়নি আমাদের। সার্কিট হাউসে থাকবো, পদ্মার পাড়ে ঘুরবো। আমি ট্রেন ভ্রমণ খুব এনজয় করি। তাই ট্রেনেই যাচ্ছি’— মনে মনে যখন এসব মুখস্ত করছিলাম তখন সহযাত্রী সিটের ওপর পা তুলে বসে ঈদসংখ্যাটা খুললেন। সেই সুন্দর ব্যাগ থেকে চশমা বের করে চোখে লাগিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আবার মিষ্টি করে হাসলেন। কিছুই জিজ্ঞাসা করলেন না। ট্রেন একটু গা ঝাড়া দিয়ে চলতে শুরু করলো। এ কামরায় আর কোন যাত্রী উঠবে বলে মনে হলো না। প্রথম শ্রেণিতে কজনেরই বা ওঠার সামর্থ আছে? আমিও তো এই প্রথম উঠলাম। বিয়ের আগে যখন কোথাও যাওয়ার জন্য মা-বাবার সাথে রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতাম তখন চলন্ত ট্রেনের জানালার ওপাশে বসা প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের মনে হতো ওরা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরের মানুষ। ওদের চুল, পোশাক, চাউনি একেবারে অন্যরকম। ওরাই ট্রেনের বুফে থেকে চিকেন কাটলেট খায়। দৃষ্টির আড়াল না হওয়া পর্যন্ত আমি ওদেরকেই দেখতাম।

আমিও জানালার কাছে সরে এসে ব্যাগ থেকে একটা পুরানো রিডার্স ডাইজেস্ট বের করে পাতা উল্টোলাম। আড়চোখে দেখে নিলাম উনি দেখছেন কিনা। না, খুব মগ্ন পড়ায়। ভাবলাম ‘লাফটার ইজ দা বেস্ট মেডিসিন’-এর জোকস পড়ে একটু শব্দ করে হাসবো। তখন উনি তাকাবেন। দেখবেন আমি ইংরেজি ম্যাগাজিন পড়ছি। কিন্তু উনি যদি আবার জিজ্ঞাসা করে বসেন ‘কোনটা পড়ে হাসছেন? বলুন না জোকটা’— তখন? ইংরেজি কৌতুকে হাসির ব্যাপারটাতো ধরতেই পারি না, তার ওপরে সব শব্দের অর্থও জানি না। কোনমতে টেনেটুনে ডিগ্রি পাশ করে যখন গোটা চারেক প্রেমিককে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছিলাম তখন বাবা আর আমার উচ্চশিক্ষার বিষয়ে সাহস দেখাতে পারেননি। খুব প্রস্তাবও আসছিল চারদিক থেকে। কেন জানি আমার মতো গেছো মেয়েকে ভারি পছন্দ হয়ে গেল আমার স্বামীর। আমি সব প্রেমিককে টা টা দিয়ে মফস্বল থেকে ব্রিলিয়ান্ট অফিসারের ঘর করতে ঢাকায় চলে এলাম। বাপ-দাদা-চৌদ্দ পুরুষের কারো গাড়ি ছিল না, বাসায় টেলিফোন ছিল না, এটাচড বাথরুম ছিল না। আমি এসব পেয়ে ধুমসে সংসার শুরু করে দিলাম। বিবাহিত জীবন এতো আনন্দের! মানুষ জানবে না কেন আমি কতো সুখী? কজন গ্রামের মেয়ে আমার মতন জীবন পায়? ‘ফ্যান ছাড়লে আপনার অসুবিধা হবে?’—সহযাত্রী বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করলেন।

‘না না অসুবিধা হবে কেন? আমিই ছেড়ে দিচ্ছি’—মহা উৎসাহে আমি সুইচ অন করে দিলাম। আমার বাসার প্রতি কক্ষে দু’টো করে ফ্যান—বলতে যাবো, উনি বললেন ‘না, মানে আপনি কোট পরে আছেন কি না’ ওহ্ দারুণ! এটাই তো চাচ্ছিলাম! এতক্ষণে পথে এসেছে! ‘দেখুন না, যখন বাসা থেকে বেরুচ্ছিলাম তখন একটু শীত শীত লাগছিল। কোটটা দেখছেন না? ড্রাগন আঁকা? এটা ওকে চীন সরকার উপহার দিয়েছে। জানুয়ারিতে আবার মালেশিয়া যাবেন’—বলে কোটটা খুলে এমনভাবে সিটের ওপর তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে ফেলে দিলাম যেন এরকম কোট আমার আরও গোটা কয়েক আছে।

‘বাহ্ বেশ’— বলে উনি আবার ডুবে গেলেন ঈদসংখ্যায়। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল সহযাত্রীকে জিজ্ঞসা করি আপনি কোথায় থাকেন, কোথায় যাচ্ছেন, আপনার স্বামী কী করেন। আমার স্বামী বলেছেন যাত্রাপথে সহযাত্রীকে এসব জিজ্ঞাসা করা নাকি অভদ্রতা। বিদেশে এসব কেউ করে না। বড়জোর জিজ্ঞাসা করতে পারি —মহোদয়ার কি এপথে প্রায়ই আসা হয়? আরে বাবা আমি জিজ্ঞাসা করলেই না উনি আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করতে পারবেন? আমি যে এক মন্ত্রীর ভাগ্নের বিয়েতে গিয়েছিলাম, তার জন্যে আমরা আড়ং থেকে মসলিনের টেবিলক্লথ কিনেছিলাম পুরো একহাজার টাকা দিয়ে, আমার সাথে কবি নির্মলেন্দু গুণের দেখা হয়েছে, এক অনুষ্ঠানে কবরী আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসেছে, মনে হয় কথা বলারও ইচ্ছে ছিল ওর, আমিই ব্যস্ত ছিলাম স্বামীর ব্যাচমেটের বউদের সাথে আড্ডায়। আমাকে সুইমিং-এ ভর্তি করে দিয়েছে ও। এটা অবশ্য সহযাত্রীকে বলবো না যে আমি নদী এপার ওপার করা মেয়ে। পুকুরে ডুব দিয়ে কমসে কম দুই মিনিট থাকতে পারি। একবার হয়েছে কি আমি পুকুরে ডুবে থাকার প্রাকটিস করার জন্য নেমেছি। ও মা! কে যেন আমার পা ধরে টানছে নিচ থেকে। আমি তো তার মুখে কষে দুটো লাত্থি দিয়ে ভুস করে ভেসে উঠলাম ওপাড়ে। দেখি এপাড়ে মাথা তুলছে সম্পর্কে আমারই এক চাচা। এসব তো স্বামীকে বলা যায় না। কীভাবে নেয় কে জানে!

সহযাত্রী ঘুমিয়ে পড়েছেন। ট্রেনের দুলুনিতে ওর ঢলে পড়া মাথা একবার ডাইনে-বায়ে, একবার সামনে-পেছনে দোল খাচ্ছে। ট্রেন চলার শব্দ হচ্ছে। আমরা ছোটবেলায় জানতাম ট্রেন নাকি বলে  ‘এক ধামা চাল, একটি পটল… এক ধামা চাল, একটি পটল…।’ এটা অবশ্য শিখিয়েছিল আমার বড়বোনের দেবর। সে আরও অনেককিছু শিখিয়েছিল। সে বলতো ‘আমি যা দেখি, তুমি তা দেখ?’ আমাকে বলতে হতো ‘হুঁ, দেখি’। একবার ভর দুপুরে সবাই ঘুমালে পেছনের বারান্দায় বসে সে বলেছিল ‘আমি দেখি একটা কালো তিল’। তার চোখ ছিল আমার কামিজের নেমে যাওয়া গলার নিচে। আমি ওড়না দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলাম কালো তিল। এর বেশ পরে সে শ্রমিকের চাকরি নিয়ে মালেশিয়া চলে যায়। আমি অনেকদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতাম ‘আমি দেখি উড়োজাহাজ, তুমি কী দেখ?’ ঘুমন্ত সহযাত্রীর কোল থেকে ঈদসংখ্যা পড়ে গেল নিচে। আমি তুলে দিতে গেলে তার ঘুম ভাঙলো। তিনি বললেন—

‘সরি, ধন্যবাদ। বোধহয় এসে গেলাম’ ‘আপনিও কুষ্টিয়াতে?’ — এটা জিজ্ঞাসা করাতে নিশ্চয় দোষ নেই? ‘হ্যাঁ, আমার বাবার বাড়ি’। ‘আমি বেড়াতে যাচ্ছি। আমার স্বামী বিসিএস অফিসার। খুবই ব্রিলিয়ান্ট। আমরা সার্কিট হাউসে থাকবো। শিলাইদহে ঘুরবো। ও স্টেশনে গাড়ি নিয়ে আমাকে নিতে আসবে’। নামার আগে এই একটিমাত্র সুযোগ হাতছাড়া করলাম না।

‘আচ্ছা’— বলে তিনি ব্যাগ তুললেন। আমি ড্রাগন আঁকা কোট পরে নিলাম। এবার সহজেই ট্রলিব্যাগের হাতল তুলে ধরতে পারলাম। ট্রেন থামলে তিনি আগে বেরোলেন। আমি পেছনে। উঁচু হয়ে দেখলাম একটা পুরানো ছাল ওঠা জিপের সামনে আমার স্বামী দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখলেন কিনা জানিনা, তিনি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এলেন আমার সহযাত্রীর সামনে। তার হাত থেকে ব্যাগ কেড়ে নিয়ে তোতলাতে লাগলেন —

‘ম্যা-ম্যাম, আপনি যে আসছেন তা তো জানাননি। আগে জানলে…’ ‘না না ঠিক আছে। আমার মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে হুট করেই চলে আসতে হলো। প্রজেক্টের কাজ ঠিকমতো চলছে তো?’ ‘একদম পারফেক্ট ম্যাম। আপনি দেখে যেতে পারবেন। আসুন গাড়িতে। আগে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি’ ‘কী দরকার? কাছেই বাড়ি। রিকশাতেই চলে যেতে পারবো’ ‘ছিঃ ছিঃ এটা কোনো কথা!’ —বলে তিনি তার ম্যাডামের ব্যাগ গাড়িতে রাখলেন। ড্রাইভার এসে যখন আমার ট্রলিব্যাগ তুলে নিল তখন আমার স্বামীর সম্বিৎ ফিরলো। তিনি কুণ্ঠিত ও বিগলিত গলায় বললেন —

‘ও হ্যাঁ ম্যাম, পরিচয় করিয়ে দিই— আমার ওয়াইফ। ভাবলাম কুষ্টিয়াতেই যখন আছি ক’দিন, শিলাইদহটা ওকে দেখাই। কোথাও তো বেড়ানোর সুযোগ পায় না’। ‘পরিচয় হয়েছে। ভারি ভালো মেয়ে’— বলে তিনি গাড়িতে বসে আমার ঘাড়ে হাত রেখে উষ্ণভাবে আমাকে তার নিজের দিকে একটু টেনে নিলেন। আমি আড়ষ্ট কাকের মতো ওর সান্নিধ্যে কাষ্ঠবৎ বসে রইলাম।

————————————-

মূর্তালা রামাত
ভবিষ্যতের দিকে যেতে যেতে

আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন— মনের ভেতর আমি এখনও একজন কবি, একজন স্বপ্নবাজ। এই যে জোছনা রাত আপনারা দেখছেন:  আকাশে টুকরো মেঘ, মস্ত চাঁদ, মিটিমিটি তারা, মিহি বাতাস— এইসব দেখতে দেখতে আপনি যখন সারাদিনের ক্লান্তি মুছে বেহেশতি কোন অনুভূতির ভেতর একবার ডুব মেরে ভুস করে আবার ভেসে উঠছেন,  তারপর গভীর নিঃশ^াসে পাল তুলে চলে যাচ্ছেন ঘুমঘুম স্বপ্নে, তখন আমার গভীরে তৈরি হচ্ছে বাক্য কিংবা আমি যা দেখি তাই— স্বপ্ন। আমি যদি সত্যি সত্যিই কবি হতে পারতাম তবে হয়তো কোথাও না কোথাও প্রকাশিত এইসব বাক্য— আমার স্বপ্নে বানানো প্রাসাদ— আপনার চোখে পড়তো আর আপনি বলে উঠতেন, বাহ! আফসোসের বিষয় হলো, অনেক ইচ্ছা থাকার পরও আমি শেষ পর্যন্ত কবি হয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারিনি। ফলে আমার কাছে আমি কবি কিন্তু আপনাদের কাছে আমি একজন সামান্য কেরানি। আমার পরণে সাদা শার্ট, কালো কোট, কালো প্যান্ট, কালো জুতো, গলায় লম্বা টাই, চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো, ক্লিনশেভড মুখ— আপনি যখন আমাকে খুব কাছ থেকে দেখবেন তখন আমার কেরানি পরিচয় আপনার কাছে আরো স্পষ্ট হবে; মনে মনে গালি দিয়ে হয়তো বলতে পারেন— শালা, বীমা কোম্পানির চুতিয়া দালাল! আমি অবাক হবো না। যেহেতু আমি যা হতে চয়েছি তা হতে পারিনি সেহেতু নিজের কাছেই আমি নিজের না। অন্যেরা যেমন চেয়েছে আমি সবসময় তেমনটাই হয়ে ওঠার চেষ্টা করে গেছি: আমার বাবা-মা, আমার স্ত্রী, আমার পুত্র-কন্যা এমনকী আমার অফিসের বস পর্যন্ত আমাকে যেমন খুশি তেমন সাজাতে পেরে সন্তুষ্ট। তাই আপনার ইচ্ছার ভেতর আপনারই রঙ তুলিতে আঁকা কেউ একজন হতে আমার কোন আপত্তি নেই। এই যে আমাকে যারা এই মুহূর্তে ব্রিজের ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে, তারা যখন প্রথম আমাকে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুই অমুক? ভালোয় ভালোয় স্বীকার করে নে।’ আমি কোন আপত্তি করিনি। কারণ যে পরিবেশে আমি আজকের আমি হয়ে  উঠেছি— আমার পরিবার, সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র— সবাই আমাকে শিখিয়েছে যে আপত্তি হচ্ছে এক ধরণের অজুহাত, আর অজুহাত হলো অপরাধীর হাতিয়ার। আমি কখনোই চাইনি যে একজন অপরাধীর সাথে আমাকে— যে বরাবরই একজন কবি হতে চেয়েছিল— তাকে গুলিয়ে ফেলা হোক। তাই তারা যখন বলেছিল যে “আমি অমুক” তখন আমি ভেবেছিলাম হয়তো ‘আমি অমুকই’, যারা রাষ্ট্রের মতো জটিল একটা প্রতিষ্ঠানকে সহজ ভাবে চালানোর মতো দক্ষতার সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত তারা নিশ্চয়ই কোন ভুল করতে পারে না! (আমিতো এই শিক্ষাই পেয়েছি!) অথচ তারা যখন সত্যিসত্যিই ‘অমুকের’ খোঁজ পেলো এবং বুঝতে পারলো যে তাদের ভুল হয়েছে তখন আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম যে শিশুকাল থেকে  আমাকে যা শেখানো হয়েছে তা আসলে ডাহা মিথ্যা! তখন আমার মনে হতে লাগলো, আমার পরিবার মিথ্যা, সমাজ মিথ্যা, রাষ্ট্র মিথ্যা— সর্বোপরি আমিই মিথ্যা। এবং আমাকে যারা ধরে এনেছিল তারাও আমাকে মিথ্যা বলার দায়ে অভিয্ক্তু করলো। তারা ভাবলো, আমি হয়তো ‘অমুক’ সেজে ‘অমুক’ কে বাঁচাতে চেয়েছিলাম (আসলে তারা এমনটাই ভাবতে চেয়েছিল, নয়তো তাদেরও যে ভুল হয় এটা স্বীকার করে নিতে হতো)। ফলে ‘অমুকের’ সাথে আমারও শাস্তির বন্দোবস্ত করা হলো। আর এখন আমি শূণ্যে ভাসছি। নিচে নদী বয়ে যাচ্ছে, যেন আপনাদের জীবন। সেই জীবনে আর কিছুক্ষণ পরেই আমি ‘অজ্ঞাতনামা’ একজন হয়ে যাবো। আমি পতনের গতি অনুভব করছি। আমার কপালে ছোট্ট একটা গর্ত। সেখানে জড়ো হয়েছে আমার বাবা, আমার মা, আমার স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আমার সমাজ, রাষ্ট্র। আপনি দেখবেন, তাদের ভিড় ঠেলে নিহত একজন কবির লাল মুখ বাড়িয়ে কেউ ফিসফিস করছে— সব মিথ্যা!

কতোক্ষণ ধইরা বইয়া আছি, কাকা আর কতোক্ষণ? জমির বিরক্তির সাথে গায়ের লেগে থাকা মশা টিপে মারে।

সিগারেটে ছোট্ট টান দিয়ে শুক্কুর মিয়া ওপরের দিকে তাকায়। ডানা ছড়িয়ে দেয়া বাদুরের মতো লম্বা হয়ে মাথার ওপর ব্রিজটা ঝুলে আছে। সে ঘাড় বাঁকা করে ব্রিজের ছায়া থেকে বেরিয়ে চোখ কুঁচকে ওপরে দেখার চেষ্টা করে। তার নড়াচড়ায় নৌকাটা বেশ দুলে ওঠে। ভয় পেয়ে জমির চেঁচায়, ডুইবা যাইবো তো!

চুপ! সাবধানে এদিক ওদিক তাকিয়ে শুক্কুর মিয়া বলে, তোরে না চুপ থাকতে কইছি?

চুপইতো আছি! আর কতোক্ষণ এমনি এমনি বইয়া থাকমু? তুমি শিউর চার লম্বর পিলারের কাছেই ফেলবো?

বারবার একই প্রশ্ন করস! তোর কি মনে হয় আমি না জাইনা শুইনা এইহানে আইছি? সবুর কর সময় প্রায় হইয়া আইছে। এরপর কইলাম ম্যালা কাম। আগেরবার ঠিকঠাকমতো করতে পারস নাই!

আমার কী দুষ? গেলোবার যেইডারে পিস করছিলাম সেইডা এমন চিমসা আছিলো, ছুরিতেই ধরে না!

ছুরি চালাবার না পারলি পারে এইসবই কওয়া লাগে! শুক্কুর মিয়া হাতের ঘড়ি দেখে। তাকে বেশ অসহিষ্ণু মনে হয়। মনে মনে সে গালি দেয়, শালারা ছ্যাপ দিয়া টাকা গইনা নেয় মাগার টাইম একদিনও ঠিক রাখপার পারে না!

ছুরি চালাবার পারি না সে কথা কইয়ো না। গরু, ছাগল হইলে একখান কথা ছিল— ধর মার কাট। এইডা হইলো মানুষ! চোখ আলাদা করো, মগজ আলাদা করো, কিডনি আলাদা করো, কইলজা আলাদা করো, পিত্তি আলাদা করো, সেইগুলান বোয়ামে ভরো। তারপরও শেষ নাই, মাংস আবার এমনভাবে কাটতি হবি যাতে সুন্দর করে গরু ছাগলের লগে মিক্স করা যায়! যে সে কাম! লোকজন দু’এটা বাড়ানো যায় না কাকা?

বাড়ানো যাবি ন্যাকা? অবশ্যি যায়। তয়, লোক যতো বেশি ট্যাকার ভাগ ততো কম আর জানাজানির ভয় ততো বেশি, বুঝসছ? এই খবর যদি একবার বাইরে যায়, হ্যারা— শুক্কুর মিয়া আঙুল দিয়ে ওপরে দেখায়, আমগোরে কী করবো জানোস? সিগারেটের শেষটুকু নদীতে ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে শুক্কুর মিয়া বলে, ¯্রফে হওয়া কইরা দিবো।

তার বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যাতে জমির কল্পনায় দেখে, কসাইখানার ঠা-া মেঝেয় সে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। তার শরীর চুইয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। কপালে টিপের মতো ছোট্ট একটা গর্ত, চোখ খোলা— মাটির পথ ধরে দৃষ্টি চলে গেছে শাপলার বিলে, মুখ হা— যেন সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেছে। এগিয়ে আসছে ছুরি। এখুনি তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে নাই করে দেয়া হবে। অদৃশ্য সেই ছুরির ঠা-া স্পর্শে জমিরের কলিজা কেঁপে ওঠে  ।

ঠিক তখুনি শুক্কুর মিয়া উপর দিকে তাকিয়ে আনন্দের গলায় বলে, জমির তৈরি হ, আইতাছে!

শুক্কুর মিয়ার নৌকার ছায়ায় ঘাপটি মেরে থাকা বোয়াল মাছ মৃদু পাখনা নেড়ে রুই মাছকে বলে, আজ সফল হতেই হবে ।

শরীরের ভার সামলাতে সামলাতে রুই মাছ গম্ভিরভাবে মাথা ঝাঁকায়।

কাতলা কিছুটা ছটফট করে ওঠে, সবাই মিলে নৌকাটা উল্টে দিলেই তো হয়!

শয়তান দুটো পানিতে পড়বে। আমি তখন এক কামড়ে ওদের কান ছিঁড়ে ফেলবো, গজার ঘোত ঘোত করে।

উল্টোপাল্টা কিছু করে নিজেদের জীবন বিপন্ন করা যাবে না, মাগুর সাবধান করে দেয়।

হুম! আমরা যা করতে এসেছি তাই করবো, বোয়ালের কণ্ঠ গমগম করে। উপর থেকে মানুষটা পড়া মাত্রই টান দিয়ে তাকে নিচে নিয়ে যাবো। রুই তুমি থাকবে ডানে, কাতল বামে, আমি পা ধরবো, গজার আর মাগুর তোমরা যতো জোরে পারো নিচের দিকে টানবা। গতবারের মতো ভুল করা যাবে না কিন্তু! একটানে দাদুবুড়োর কাছে নিয়ে তারপর দম নেবে। মনে থাকবে?

হ্যাঁ, কাতলা বলে।

এই সবাই তৈরি হও, মাগুর ভুস করে মাথা তুলে আবার নামিয়ে নেয়, মানুষটা পড়ছে…

রাত অনেক হইছে, এইবার ঘুমা, করিমুন্নেছা রতনকে বলে।

না আমি ঘুমামু না, রতন মাথা ঝাঁকায়। আরেকটা গপ কও?

করিমুন্নেচ্ছা জানলা দিয়ে বাইরে তাকায়। চাঁদের আলোয় নদী হেসে যাচ্ছে। ঘরের জমিনে সেই হাসির দুলুুনির ছন্দ সে টের পায়। তার একবার মনে হয় নদীর ধারে গিয়ে বসে। তারপর প্রতিদিন দেখা ব্রিজটার দিকে তার চোখ যায়। চান্নিপশর রাতকে দুই ফালা করে দৈত্যের মতো ব্রিজটা দাঁড়িয়ে আছে। দেখলেই ভয় লাগে। ব্রিজের কোল ঘেঁষা বস্তি মহল্লায় সবার কানাঘুঁষা, প্রায় রাতেই নাকী ব্রিজে ভূত আসে। একটা, দুইটা না অনেক ভূত— করিমুন্নেছার জয়তুনের মার কথা মনে পড়ে।

তুমি নিজের চোখে দেখছো?

তা আর কলাম কীরে! সেই ভূতের ইয়া বড় ঠ্যাং, ইয়া বড় হাত। মানুষ ধরে‌্য আইনে ব্রিজের ওপর রক্ত খায়।

কই আমিতো দেখি না!

তুই দেখপি কেমন করে? তুই হচ্ছিস ভিতুর ডিম। আমি কাছে যায়্যে দেখছি।

ভূতেরা তোমারে কিছু কলো না?

ভূতেরাতো আমারে দেখপারই পারে নাই। আমার গলায় আজিরা বাবার তাবিজ আছে না! আমি যাইয়া দেহি, এক মানুষরে ধরে‌্য আনছে। সে কতো কান্নাকাটি করলো— আমার ছোটছোট পোলাপান আছে, আমারে ছাইড়া দাও। তয়, ভূতেরা কী আর ছাড়ে! সবাই মিইলা মানুষটার ঘাড় মটকাইয়া রক্ত চুইষা খাইলো।

তারপর?

তারপর ব্রিজের ওপর থেইকা নদীর ভিতরে ছুঁইড়া মারলো।

ও  মাগো!

করিমুন্নেচ্ছা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার বুকটা ঢিপ ঢিপ করে। সে হাত দিয়ে তাড়াতাড়ি জানালার পাল্লাদুটো ভেজিয়ে দেয়।

জানলা বন করো ক্যান, রতন চেঁচায়। আমি চাঁদমামুরে দেখমু।

চুপ! করিমুনেচ্ছা ফিসফিস করে, ‘ধপাসধপ’ আসপেনে।

ধপাসধপের কথা শুনেই রতন চুপ হয়ে যায়। করিমুন্নেচ্ছা তাকে ধপাসধপের বহু কিচ্ছা শুনিয়েছে। তারা ভূতের চেয়েও ভূত, রাক্ষসের চেয়েও রাক্ষস— বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ কোন কিছুকেই তারা পরোয়া করে না। তবে তাদের সবচেয়ে পছন্দ হলো মানুষ। মানুষ পেলেই তার রক্ত খেয়ে তারা নদীতে ছুঁড়ে ফেলে। কল্পনায় সেই ধপাসধপদের আসতে দেখে রতন গুটিয়ে গুঁটিসুটি মেরে করিমুন্নেছার বুকের ভেতর ঢুকে যায়। করিমুন্নেছা তাকে জড়িয়ে ধরে  অভয় দেয়। মাথায় আলতো করে ককেবার হাত বোলাতেই রতনের গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু করিমুন্নেছার ঘুম আসে না। তার মনে হয় ধপাসধপ তার জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভয়ে সে শ^াস নিতেও ভুলে যায়। একটু পরেই, দূর থেকে অস্পষ্টভাবে তার কানে এসে বাজে— ‘ধপাস’।

তারপর?, ছানাপোনারা জিজ্ঞেস করে।

পাখনা দিয়ে পিঠের শক্ত খোলটা একটু চুলকে দাদুবুড়ো চারিদিকে চোখ বোলান। কই, পুটি, ট্যাংরা, চিংড়ি, রয়না, খয়রা, টাকি- কতো কতো মাছের বাচ্চাকাচ্চা। দেখে তার প্রাণ জুড়িয়ে যায়। হেসে তিনি বলতে থাকেন, ফকির শাহ তখন সাহেবদের বিরুদ্ধে জানপ্রাণ বাজি রেখে লড়ে যাচ্ছে। তার দলের আক্রমণে সাহেবদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। তারা নতুন নতুন সৈন্য আনে। সেইসব সৈন্যও ফকির শাহ’র সামনে শুকনো পাতার মতো উড়ে যায়। লোকে বলতে লাগলো, ফকির শাহ জাদু জানে। তার জাদুর শক্তির কথা দিকে দিকে যতো ছড়িয়ে পড়লো, ততোই মানুষজন সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহসী হয়ে উঠলো। ফকির শাহকে কোনমতেই কাবু করতে না পেরে সাহেবরা অন্য পথ ধরলো। তারা টাকা পয়সা নানা প্রলোভন ছিটিয়ে ফকির শাহ্’র কাছের কাউকে হাত করার চেষ্টা করলো। এবং তাদের সেই চেষ্টায় কাজ হলো। যে ফকির শাহকে হাজার ফাঁদ পেতেও ধরা যায়নি সেই  ফকির শাহ্ তার কাছের মানুষের বিশ^াসঘাতকতায় ধরা পড়ে গেলো। সাহেবরা তার হাত কাটলো, পা টুকরো করলো, চামড়া তুলে তাকে কুকুর দিয়ে খাওয়ালো। আর তার চোখ দুটো, দাদুবুড়ো লম্বা একটা শ^াস নেন, উপড়ে নদীতে ফেলে দিলো।

কী ভয়ংঙ্কর! ফকির শাহকে হত্যার কাহিনী শুনে, ছানাপোনারা সব শিউরে উঠে একে অন্যের গা ঘেঁষে আসে।

তাই দেখে দাদুবুড়ো অভয় দেয়ার ভঙ্গিতে পাখনা নাড়েন। পিঠের খোলে খানিকটা ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে বলেন, আমি তখন কোথায় যেন যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি আমার সামনে দুটো চোখ। সেই চোখ আমাকে দেখে বললো, আমি ফকির শাহ’র চোখ।

চোখ কথা বললো? বললো তো! দাদুবুড়ো হাসেন। চোখ কথা বলছে, এই দেখে আমিতো ভয়ে শেষ।

চোখ হেসে বললো, ভয় পাসনে। আমাকে টুপ করে গিলে ফেল। তাহলে ভবিষ্যত দেখতে পাবি।

সে কীভাবে?, আমি অবাক হয়ে বললাম।

চোখ বললো, ফকির শাহ্ জাদু জানতো শুনিসনি? আমি তার জাদুর চোখ। আমি ভবিষ্যত দেখতে পারি।

তারপর তুমি চোখ খেলে?

হ্যাঁ, জাদুর কথা শুনে খুব লোভ হলো। তাই খেয়ে ফেললাম। খাওয়ার পর দেখি, সত্যি সত্যিই ভবিষ্যত দেখতে পাচ্ছি। দেখলাম সাহেবরা হেরে যাবে, নতুন দেশ হবে, সেই দেশ থেকে আরেকটা সোনার দেশের জন্ম হবে…

আমরা কি সেই সোনার দেশে আছি?

হ্যাঁরে, হ্যাঁ।

আচ্ছা,  তুমি তাহলে আমাদের ভবিষ্যত বলো না কেন?

এই তো হয়েছে সমস্যা, দাদুবুড়ো নিজের চোখ কচলান। চোখদুটো ঠিকমতো আর কাজ করছে না!

সে কী, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত কে দেখবে!

নতুন চোখ লাগবে। ‘ফকির শাহ’র চোখ আমাকে বলেছিল। এমন একদিন আসবে যখন আমি আর দেখতে পাবো না। তখন, ‘মরেছে কিন্তু মরে নাই, ভেতরে জ্যান্ত ছটফটাচ্ছে’— এমন কারো চোখ লাগবে। স্বপ্নের চোখ, দাদুবুড়ো ঘোলাচোখে এদিক ওদিক তাকান। কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করেন।

দাদুবুড়ো এই যে নিয়ে এলাম— রুই, কাতল, বোয়াল, গজার, টানতে টানতে লোকটাকে দাদুবুড়োর কাছে নিয়ে আসে।

দাদুবুড়ো বুক হেঁটে সামনে এগিয়ে এসে লোকটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। তার কপালের গর্ত, নাক, মুখ, চোখ— সব। দেখতে দেখতে তিনি অস্ফূট স্বরে বলেন, কবি! চোখ ভরা স্বপ্ন! মরে নাই, বেঁচে আছে!

এর চোখেই তাহলে হবে?, বোয়াল  জিজ্ঞেসা করে।

হওয়ার কথা! দাদুবুড়ো মাথা ঝাঁকায়।

চারিদিকে খুশির হুল্লোড় ওঠে, চোখ পাওয়া গেছে, চোখ!

দাদুবুড়ো লোকটার চোখের কাছে মুখ এগিয়ে আনেন। বিড়বিড় করে কিছু বলতে বলতে তিনি এক এক করে দুটো চোখই গিলে ফেলেন।

সবাই চুপ হয়ে যায়। দাদুবুড়ো এবার ভবিষ্যত দেখবেন।

গলাটা খোলের ভেতর ঢুকিয়ে দাদুবুড়ো নড়েচড়ে বসেন। আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করে তিনি ধ্যানের ভেতর ঢুকে যান।

একটু একটু করে সময় যায়। ভবিষ্যত জানার উত্তেজনায় সবাই উসখুস করে। কিন্তু দাদুবুড়ো কোন কথা বলেন না। শেষে একসময় থাকতে না পেরে তারা দাদুবুড়োকে ধাক্কা দিয়ে বলে, ও দাদুবুড়ো আমাদের ভবিষ্যত কী?

দাদুবুড়োর ঘোর ভেঙে যায়। তিনি চোখ খুলে তাকান। তারপর ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে বিহ্বল কণ্ঠে বলেন— অন্ধকার!

——————————————–

কুয়াশার ফাঁদ
নূরুননবী শান্ত

রাত যখন ফরসা হয়ে আসার আগ মুহূর্ত উপস্থিত হয় তখন তিস্তার চরের ভেজা বালুর ছবি এক হাত দূরত্বেও দেখা যায় না, দুনিয়ার বুক তখন এমন নি—িদ্র ঘন কুয়াশায় ঢাকা। এতটাই ঘন হয়ে কুয়াশার গজব নাজেল হয় যে, এমনকি চোখের কাছে নিজের হাত তুলে ধরেও হাতের চেহারা দৃষ্টিগোচর হয় না।

ভূমিহীন আধিয়ার যুবক কেতাব ফকির নিজেকে তুলোর মতো নরম ঘন সাদা রঙের কবরের ভেতরে আবিষ্কার করে। অথচ সে তিস্তা নদীর কিনারে গিয়ে কিছুটা সময় নির্জনে বসে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু নদীর দিকে যেতে যেতে তার মনে হয়, সে একটা অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত সাদা কবরে দাঁড়িয়ে আছে। তখন বোঝা কঠিন হয়ে ওঠে যে সে আসলে নদীর দিকেই যাচ্ছে কি না। কেননা, কুয়াশার ঘন আবরণে পায়েচলা পথের চিহ্ন ঢাকা পড়ে যাওয়ায় সামনে এগোনো সম্ভব হয় না। পেছনে যাবার সাহসও হয় না। সেই মূহুর্তে সত্যি বলতে কি ঠাওর করাই সম্ভব হয় না ‘সামনে’ অর্থাৎ নদীর অবস্থান আসলে কোনদিকটায়। এই প্রেক্ষাপটে, কেতাব ফকির এই পৃথিবীর অনুল্লেখ্য এক অজানা বিন্দুতে দিকভ্রান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়। নির্জনতার সন্ধানে বেড়িয়ে একটা অনতিক্রম্য বাধ্যবাধকতার ফাঁদে আটকা পড়ে অসীম শূন্যতার মুখোমুখি র্থ র্থ করে কেঁপে ওঠে কেতাবের বুক।

ঠিক সেই একই মূহুর্তে, কেতাব ফকিরের নয়াবউ তিস্তা নদীরই দিকে যেতে থাকে, প্রাণত্যাগ করার জন্য; গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অচঞ্চল তিস্তা নদীতে ডুবে মরাই ভালো মনে করে। কুয়াশার আড়ালে কেতাবের অবস্থানবিন্দুর পাশ দিয়েই যাচ্ছিল, যদিও কেতাবের পক্ষে সে দৃশ্য দেখা সম্ভব হয় না। কেতাবের নয়াবউয়ের পক্ষেও এটা কোনভাবেই জানা সম্ভব হয় না যে, তার পায়েচলা পথের ধারেই কুয়াশায় ঢাকা বালুর উপর দিক হারিয়ে ফেলে কেতাব ফকির সীমাহীন সাদা কবরে জীবন্ত আটকে থাকার অনুভূতি নিয়ে দাঁড়িয়ে  আছে। কুয়াশার এমন প্রতাপ বিষয়ে আগে সে নয়াবউ কোনদিন শোনে নাই, তবু এইরূপ কুয়াশার মুখোমুখি হবার অভিজ্ঞতায় সে প্রাথমিকভাবে আশ্বস্ত বোধ করে। নয়াবউ তো এমন কামনাও করেছিল যে মাটি ফাঁক হলে সে তার ভেতরে ঢুকে যাবে এবং তারপর আবার সে ফাঁক বন্ধ হয়ে গিয়ে দুনিয়ার সমস্ত অস্তিত্ব থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখবে চিরতরে। মাটি ফাঁক যে হবে না তা জেনেই নয়াবউ এ কামনা করেছিল এবং জীবনে প্রথমবার দৃষ্টি-অভেদ্য কুয়াশার দেখা পেয়ে নয়াবউ আসলেই যেন প্রত্যাশিত এক ভরসা পেল। কিন্তু ঘরের মতো দেখতে পাটখড়ির ডেরা থেকে বাইরে বেরিয়ে কয়েক পা সামনে এগোনোর পরেই, কেতাব ফকিরের মতোই, কেতাব ফকিরের নয়াবউ নদীর দিকে যাবার সময় পায়েচলা পথের চিহ্ন হারিয়ে ফেললো। নয়াবউয়ের আচমকাই মনে হয় যেন সে একটা শ্বাসরূদ্ধকর কবরের ঘুটঘুটে সাদা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে  আছে। এমন ঘন থকথকে কুয়াশার গজবে কোনদিকে যাবার কিংবা ফেরার কোন পথ খুঁজে না পেয়ে কেতাবের নয়াবউও অজানা আশঙ্কা বুকে নিয়ে সাদা কুয়াশার অশেষ সমুদ্রের গভীর তলদেশে দাঁড়িয়ে  থাকতে বাধ্য হয়। তার মনে হয় যে, সে অনন্তকাল এভাবেই দাঁড়িয়ে  আছে। দাঁড়ায়ে থাকতে থাকতে অতীত হারিয়ে ফেলে, ভবিষ্যতহীন হয়ে যায়। এমনকি সে যে স্বেচ্ছায় প্রাণত্যাগ করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত বুকে নিয়ে পা বাড়িয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নিয়েও ভীতিকর সংশয় উপস্থিত হয়।

কেতাব ফকিরের নয়াবউয়ের অবস্থানের পাশেই কুয়াশায় আটকা পড়ে বিষন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে  আছে আরও একজন। কেতাবের আধপাগলা বড়ভাই সেতাব উদ্দিন। সেও যেতে চেয়েছিল তিস্তা নদীরই কাছে। কিন্তু, গ্রাম থেকে নদীতে যাবার পথের মাঝখানে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই পথের দিশা হারিয়ে ফেলে সেতাবও। তাকে দৃষ্টিহীন করে ফেলে আকাশ-পাতাল ভরা ঘন কুয়াশার সমুদ্র। হঠাৎ, সেতাব উদ্দিনের একবার মনে হয় যেন থকথকে কুয়াশায় ঢেউ তুলে একটা হালকা বাতাস নয়া শাড়ির গন্ধ মৃদু ছড়িয়ে দিয়ে দুলে ওঠলো। আরো মনে হয়, কে যেন কোনদিকে জোরকদম হেঁটে গিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেলো। পরক্ষণেই কুয়াশা এমন স্থির হয়ে রইল যেন কোন বাতাস কখনোই বয়ে যায় নাই। সেতাব উদ্দিন চোখ বড় বড় করে কুয়াশা ভেদ করে সামনে তাকিয়ে দেখার বৃথাই চেষ্টা করে। সে ব্যর্থ হবে নিশ্চিত জেনেও চেষ্টা করল। তারপর সে বিচলিত না হয়ে কুয়াশার গজব উপরে উঠে আসমানের দিকে উড়ে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। অপেক্ষা করতে করতে সে বোঝার চেষ্টা করে যে তাকে উত্তরে না দক্ষিণে না পূবে না পশ্চিমে যেতে হবে এরপর; নদী আসলে কোনদিক থেকে এসে কোনদিকে বয়ে যায়? সে অবশ্য এটাও বুঝতে পারে না যে, উত্তর বা দক্ষিণ বা পূর্ব বা পশ্চিম দিকটাই বা কোনটা। সবগুলো পায়েচলা পথের চিহ্ন সেতাবের স্মৃতিতে পর্যন্ত ঝাপসা হতে হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। অথচ শৈশব থেকেই গাঁয়ের ভেতরের চেয়ে নদীর দিকেই সেতাবের টান বেশি। চোখ বন্ধ করে সে এই পথে চলতে পারে। অথচ এই অভাবনীয় কুয়াশা তার সমস্ত বিশ্বাস ভেঙ্গে খানখান করে দেয়। এখন সে নদীর কিনারে গিয়ে নিজের সংসার রচনা না করার যুক্তিগুলো নিয়ে আর কখনো ভাবার সুযোগ পাবে কি-না তাই নিয়ে সংশয়ে নিপতিত হয়। তার যুক্তি এই ছিল যে, মানুষের মৃত্যু যখন-তখন এসে উপস্থিত হয় এবং এরকম নিশ্চিত জ্ঞান নিয়ে সংসার রচনা করার পরিকল্পনা করা দুঃসাহসী ও অর্থহীন পাগলামি। একারণেই সমাজ এড়িয়ে সমাজের অপরাপর অধিবাসিদের এড়িয়ে এড়িয়ে চলে সেতাব উদ্দিন। সমাজে আধপাগলা হিসেবে চিহ্নিত সেতাব উদ্দিন একা একা বেঁচে থাকাতেই আনন্দ জেনেছিল। যদিও নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে গহীন কোন অরণ্যের দিকে হারিয়ে যাওয়ার চিন্তা তার কখনো হয় নাই। গল্পে শুনে থাকলেও বাস্তবে অরণ্যের সাক্ষাৎ সে কোনদিন পায় নাই। তবু অরণ্যের নির্জনতাকেই প্রিয় বলে জানে। আর এখন সেই সেতাব কুয়াশায় আটকে পড়ে সমাজেরই কাউকে না কাউকে খোঁজে। কুয়াশায় আক্রান্ত সেতাব এতটাই একা বোধ করে যে একজন না একজন মানুষের সাক্ষাৎ সে এইবার কামনা করে স্বতস্ফূর্তভাবে। যে অস্থিরতার উপশম আশা করে সে নদীর দিকে যাত্রা শুরু করেছিল, কাউকে সামনে পেলে নিজের অস্থিরতার কারণ তার সামনে সেই মূহুর্তেই স্বীকার করতে চায় সেতাব। তার আধপাগলা জীবনে অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটে যাওয়া যে আলোড়ন সৃষ্টিকারি ঘটনা থেকেই এই অস্থিরতার উৎপত্তি সেই ঘটনাটা সে ফাঁস করে দিতে চায়। ঘটনাটা তার ভাবনায় উপর্যুপরি হানা দিতে থাকে, এমনকি এই দুর্ভেদ্য কুয়াশার দেয়াল ভেদ করেও হানা দেয়। এই অসহনীয় হানাদারের কাছ থেকে মুক্তি পেতে নদীর কাছে গিয়ে সে একটা প্রায়শ্চিত্তের পথ বের করতে চেয়েছিল। কেননা, সেতাবের মনে হয় যে সে একটা বিরাট পাপ বয়ে বেড়াচ্ছে। এতবড় পাপ বয়ে বেড়ানোর শক্তি তার নেই বলেই সে এতটা অস্থির হয়ে ওঠে। অথচ কুয়াশা এতটাই ঘন আর সাদা হয়ে দুনিয়ার বুকে আটকে আছে যে নদীর দিকে না অন্য কোনদিকে সে যাচ্ছে অথবা আদৌ সে কোনদিকে যাচ্ছে কি না তা বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না। সে কামনা করে, ঘোর সাদা রঙের অন্ধকার ভেদ করে কেউ একজন আসুক, যার সামনে পাপ স্বীকার করা সম্ভব। কিন্তু তার মনে হয় যে, সে নিজে ছাড়া দুনিয়ার উপরের সমস্ত অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাপ স্বীকার করে আত্মাকে সান্ত¡না দেওয়ার আর কোন দ্বিতীয় উপলক্ষ সম্ভব নয়। যেমন কেতাব ফকিরের নয়াবউ তার দিকবিভ্রান্তিকর পরিস্থিতে সেতাবের মতোই উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম ঠাওর করতে না পেরে নদীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ হারিয়ে ফেলে এবং প্রাণত্যাগ শেষ পর্যন্ত করা হবে কি হবে না সে বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে অপেক্ষা করা শুরু করে যে কখন কুয়াশা উপরে উঠে আসমানের দিকে উড়ে যায়, সেতাব উদ্দিনকে তেমনিভাবেই অপেক্ষা করতে হয় এই পৃথিবীর একটা অনুল্লেখ্য অজানা বিন্দুতে। একটা অনন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সাদা কবরের ভেতরে দাঁড়িয়ে  থাকার আতঙ্কগ্রস্ত পরিস্থিতিতে আটকে গিয়েও সেতাব উদ্দিন অবিচলিত অথচ পাপবোধে বিক্ষত হতে থাকে।

অন্যদিকে, কেতাব ফকির নদীর কিনারে গিয়ে ক্ষীণ স্রোতের কাছাকাছি বসে এমন একটা উপায় খুঁজে পাবার চেষ্টা করতে চেয়েছিল যাতে আধিয়ার থেকে একখ- জমিনের মালিক সে হয়ে উঠতে পারে, তারপর নিজ মালিকানাধীন জমির উপর একটা ছোট্ট পাকাঘর তুলতে সে পারে। কেতাবের মনে হয় যে, নয়াবউ বাসর ঘরে নি—িদ্র আড়াল পছন্দ করে কিন্তু তেমন বন্দবস্ত করার মুরোদ কেতাব রাখে না। ফলে, বাসরমূহুর্তে নয়াবউয়ের মনে অতৃপ্তি ভর করে। এবং তাতেই তার সারা শরীর লোহার মতো আড়ষ্ট হয়ে ওঠে। কেতাবের বিশ্বাস, একটা পাকাঘরে প্রশ্নহীন আড়াল তৈরি করা সম্ভব, তাতে নিঃসংশয় ব্যক্তিগত পরিবেশ রচনা করা যায়। এই পুরো পৃথিবীর কত মানুষেরই তো দেখা যায় ভূপৃষ্ঠের সামান্য অংশের হলেও মালিকানা আছে, কেবল কেতাব ফকির ভূমিহীন আধিয়ার হয়ে ভরা যৌবনকালে নয়াবউ নিয়ে এক গেরস্তের বাড়ির গোয়ালঘরের পেছনে ওঠানো এক ছনের ঘরে থাকার সাহস করেছিল। বউকে বাসরশয্যায় বেজায় আড়ষ্টতায় আতঙ্কে বিষণœতায় ঠা-া ও শক্ত হয়ে আসা মৃতদেহ মনে হওয়ার কারণে কেতাব ফকির বিপর্যস্তবোধ করতে শুরু করে। এর কারণ হিসেবে সে সন্দেহাতীতভাবে পরের জায়গায় তোলা ছনের ঘরটাকেই দায়ি করে। কেননা কেতাব ফকিরের নয়াবউ নামকরা গেরস্ত ঘরের মেয়ে। পাটখড়ি নির্মিত বেড়ায় ঘেরা ফাঁক-ফোকরওয়ালা ছনের ঘরে মেয়েটাকে ইতিপূর্বে কোনদিন থাকতে হয় নাই। ফলে, কেতাব মনে করে, এরকম পরের জায়গায় তোলা ঘরের মতো দেখতে এক ডেরার মেঝেতে পাতা বাঁশের বিছানায় বাসরের উত্তেজনা হারিয়ে ফেলে মেয়েটি কাঠের মতো শক্ত হয়ে গিয়ে থাকবে। যে ঘরের ভেতর শির শির করে শীতল হাওয়া যাওয়া-আসা করছিল, কুয়াশার ঢেউ খেলে যাচ্ছিল এবং এগুলোর কোনকিছুই নয়াবউয়ের বাসরের পক্ষে উত্তেজনাকর উস্কানি হয়ে উঠতে পারে নাই। বরং নয়া চাদরের বাইরে হাত-পা আনতে গেলেই সারা শরীর লোহার মতো ঠা-া আর শক্ত হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। অতএব কেতাবের মনে হয় যে, একটা স্বপ্নে ভরপুর মেয়ের জীবন এলোমেলো করে দেওয়ার অপরাধে সে অপরাধি। তাই সে ভোরের আগেই নির্জনতার ভেতর বসে একবার ভালো করে ভেবে দেখতে চেয়েছিল যে, কেন সে শক্তিশালী যুবক হিসেবে গাঁয়ে বিখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও অন্তত এক শতাংশ ভূ-পৃষ্ঠের মালিক হতে পারবে না। কেতাব ফকির এই অনুতাপে দগ্ধ হতে থাকে যে, কোনরকম পূর্বপ্রস্তুতি না নিয়েই আরেকটা জীবনকে নিজের জীবনের সাথে জড়িয়ে নিয়ে কিছুতেই সে ঠিক কাজ করে নাই। প্রায়শ্চিত্ত করার একটা পথ তাকে খুঁজে অতএব পেতেই হবে। একটা প্রায়শ্চিত্ত পদ্ধতি খুঁজে বের করার জন্যই সে একা হয়ে যেতে চেয়েছিল নদীর কিনারে গিয়ে। কিন্তু কুয়াশার ভেতর দিয়ে নদীর দিকে যাবার পথ হারিয়ে ফেলে একটা বিরাট সাদা কবরের ভেতরে নিজেকে আবিষ্কার করে কেতাব। তার সারা শরীর থর থর করে কেঁপে ওঠে। প্রবলভাবে সে কামনা করতে থাকে যেন কেউ এসে এই ভয়াবহ কুয়াশা-সমুদ্রের জনবিচ্ছিন্ন তলদেশ থেকে তাকে উদ্ধার করে।

আর, হৃদয়ে ভারি অনুশোচনাবোধের ভার নিয়ে কেতাব ফকিরের নয়াবউয়ের মনে হয় যে সে কেতাব ফকিরের সাথে প্রতারণা করেছে এবং কেতাব ফকির নয়াবউকে জড়িয়ে ধরার সময় সব বুঝতে পেরে গেছে। কেতাব ফকির যখন নতুন বউয়ের পেটের উপর নাভীর দিকে ডান হাতের পাঁচ আঙুল দিয়ে খেলা করা আরম্ভ করতে যাচ্ছিল, তখন নয়াবউয়ের তলপেট টন টন করে করে ওঠে। তার মনে হয় যে গর্ভপাতের মতো একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে যেতে পারে। রক্তে ভেসে যেতে পারে বাসরশয্যা। এরকম হলে দিনের আলোয় কোনভাবেই নিজের মুখ দেখানো অসম্ভব হবে ভেবে ভয়ে লোহার মতো শক্ত হয়ে যায় কেতাব ফকিরের নয়াবউয়ের সমস্ত শরীর। কেতাব ফকির কোনদিন কিছু জানতে পারবে না নিশ্চিত হয়েই নয়াবউ তার গর্ভধারণের তথ্য গোপন করে গিয়েছিল। সে নিশ্চিত ভেবেছিলো যে বাসর সম্পন্ন হলেই সমাজে, বিশেষ করে কেতাবের কাছে তার গর্ভধারণ আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠবে। কিন্তু ময়-মুরুব্বীরা যে বলে, গোপন কথা গোপন থাকে না, সেইটাই ঠিক ফলে গেলো। কেতাবের কাছে সে ধরা পড়ে গেলো। কেতাবের মনে সন্দেহ না-ই যদি হবে, তবে সে একটাও কথা না বলে গভীর ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে পারল কি করে! অবশ্য এমনও হতে পারে যে, কেতাব ফকির আসলে ঘুমায় নাই, চোখ বন্ধ করে মড়ার মতো চিৎ হয়ে ছিল। বাসররাতে বউয়ের গর্ভবতী অবস্থা উপলব্ধি করে নিশ্চয় কেতাব ফকির প্রতারিত বোধ করে এবং সেই বোধ নিয়ে নীরবে অবিচলিত থাকার ভান করার মতো আচরণ তৎপরবর্তী বিপদাশঙ্কার জন্ম দেয়। নয়াবউয়ের আতঙ্কগ্রস্ত বুকের ভেতর তিস্তার পাড় ভেঙ্গে পড়তে থাকে। সে অস্থির বোধ করে। অপরাধবোধে জর্জরিত বোধ করে। নিজেও অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঘুমন্তের মতো চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। তারপর কেতাব ফকির বিছানা থেকে আলতো করে উঠে গেছে বুঝতে পেরে নিজেও আলগোছে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। এ জীবন সে আর রাখতে চায় না। সে কোনদিনও মুখ ফুটে কেতাব ফকির তো দূরের কথা নিজেকেও বলতে চায় না যে বিয়ের দিন পনের আগে কার বীজ তার গর্ভে সঞ্চারিত হয়। কেন মাছ মুখে দিতে গেলেই তার বমি আসে। সমস্ত ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সে প্রবল ঋতুশ্রাব কামনা করতে করতে অন্ধকারে চেরাগের আলোয় কবুল উচ্চারণ করেছিল এবং তেমন লক্ষণ দেখা না দেওয়ায় মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কান্নাকাটি না করে অন্যমনস্ক হয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েছিল। কেতাবের তো প্রতারিত বোধ করারই কথা। অতএব গর্ভচিহ্ন সমাজে প্রকাশিত হবার আগেই পৃথিবীকে তার ভারমুক্ত করতে হবে। তবে সাদা কুয়াশার কবরে আটকে পড়ে নয়াবউ সব পথই হারিয়ে এক অজানা বিন্দুতে দাঁড়িয়ে  থাকে। তার কিছুই করা সম্ভব হয় না স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া। স্তব্ধতা অসহনীয় হয়ে ওঠার পর নয়াবউ একটু কাঁদে। শব্দ করে না। অবশ্য নয়াবউয়ের পক্ষে এটা দেখা সম্ভব নয় যে এই মূহুর্তে কেতাব ফকিরের অবস্থান নিকটদৃষ্টির দূরত্বে। কেতাব ফকিরও নয়াবউয়ের সন্দেহ সম্পর্কে স্বপ্নেও কিছু কল্পনা করে না, কিন্তু কার যেন নিঃশ্বাসের শব্দ তার কানে আসে। সেই শব্দকে কেতাব কেবলই মনের সন্দেহ ধরে নিয়ে আলোর অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করতে করতে নয়াবউকে নিয়ে নিজের এক খ- জমিনের উপর নির্মিত একটা ছোট্ট পাকাঘরে বাসর রচনা করার স্বপ্ন দেখে।

নয়া বউয়ের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ আন্দোলন তোলে কেতাব ফকিরের বড় ভাই সেতাব উদ্দিনের আত্মায়। সামান্য বাতাস দিলেই যেমন কুয়াশায় দলা পাকিয়ে ঢেউ ওঠে, তেমনি সে টলে ওঠে। তাতে করে মনে না করতে চাওয়া আলোড়ন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিগত ঘটনার একটা স্বীকারোক্তি কারো না কারো কাছে প্রদান করে খালাস হতে ইচ্ছে করে সেতাবের। মৃত্যুর প্রস্তুতি হিসেবে যে সেতাব একা থাকার জন্য সমাজকে পাশ কাটিয়ে চলেছে, সেই সেতাবেরই সমাজের সামনে একটা গভীর গোপন সত্য স্বীকার করার সাধ জেগে ওঠে। সেতাবেরও কান্না পায়। কিন্তু সেও শব্দ করে না। শব্দ করে কী লাভ যদি তা শোনার মতো সামাজিক বন্ধু বা শত্রু কেউ না থাকে নিকট দূরত্বে। কুয়াশার দেয়াল ঠেলে কিছু না ভেবেই দুই পা এগিয়ে যায় সেতাব, একটা দীর্ঘশ্বাসের উৎসের দিকে। এবং নয়াবউয়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। নয়াবউ চমকে চিৎকার করে ওঠে। সেতাব উদ্দিন আশ্বস্ত করার জন্য বলে, ‘আমি, তোমরা এইখানে ক্যানে, ভাউস্যাল’। অন্ধের ভঙ্গিতে নয়াবউকে স্পর্শ করে সেতাব ছোটভাইয়ের নয়াবউকে ‘ভাইস্যাল’ বলে ডেকে ওঠে।

পাশেই, কেতাব ফকির নিজের মুখের উপর হাত রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে ই একবার দুলে ওঠে। তারপর, স্থির মমির মতো দাঁড়িয়ে  থাকে কুয়াশার সমুদ্রের তলদেশে। সে মনে করে যে, সে একটা স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নে সে ঘোর সাদা কুয়াশার অন্ধকার সমুদ্রের তলায় আটকে আছে, আর, শুনতে পাচ্ছে যে, কানের খুব কাছে তার নয়াবউ বিলাপ করছে, আর, তাকে পরম পরিতাপের ভাষায় সান্ত¡না দিচ্ছে তারই আধপাগলা বড়ভাই সেতাব উদ্দিন।

—ক্যান করিলেন এমন কাম?

—না কান্দেন, ভাউস্যাল। টুটি টিপিয়্যা মোকে মারি ফ্যালান। তোমরা কান্দিলে মোর মায়া নাগি যায়।

—আন্ধারে কেতাব ফকির মনে করি, শরীল মোর অবুঝ হয়া গেল।

—ভাউস্যাল, দোহাই তোমার, এলায় নাই কোন কাকপক্ষি এঠায়, মোকে মারি ফ্যালান নিজ হাতে, দোহাই, ভাউস্যাল।

—পাগলা হন আর যোগলা হন, মরিবার হইলে মোকেই মরিবার নাগে, আত্মা সামালিব্যার পারি নাই, মোর কোন মাপ নাই, ভাইজান। তোমার গতরে তো কোন চিহ্ন নাই, আমার চিহ্ন ঢাকা না যায়।

—ও কতা না কন ভাউস্যাল, নিকেস না নিবের আর চাই, ভাউস্যাল, গতরের স্বভাব আর সমাজের স্বভাব কাক্কো কাঁয়ও মানিয়্যা চলে না।

—কিন্তুক কেতাব ফকির মনে কষ্ট পাইছে বড়, জানি গেইছে গোমর, এইটাই মোর পাপ, না দিবে সমাজে থাকিব্যার…

বলতে বলতে নয়াবউ ডুকরে কেঁদে ওঠে। তারমধ্যে আবার হাসে। কাঁদে-হাসে। কুয়াশার ঘোরে সে ঘূর্ণ অক্ষরেও জানতে পারে নাই, কতটা নিকটে দাঁড়িয়ে  মুখে হাতচাপা দিয়ে স্বপ্নের ভেতরে থাকে কেতাব ফকির। তার মনে হয় যেন স্বপ্নের মধ্যে নয়া বউয়ের বিলাপ শোনা যায়— আল্লা গো, এই কুয়াশার গজব য্যান কোনদিন কাটি না যায়!

—————————————

ইবাইস আমান
উত্তরাধিকারের আঁধি

বিস্ময়ভরা বীজতলার বালুকাবেলায় কারা যেন প্রাণ পসারের হাট বসিয়েছিল। হাট শেষে কেউবা অপেক্ষা করেছিল, কেউ আসবে বলে। যারা পায় তারা অপেক্ষা করে পায়। যারা পায় না, তারা অপেক্ষা করে। যে যার জন্য অপেক্ষা করে সেই বলতে পারে নাম ধাম কাম। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করতে হয় তাই করে, যার জন্য অপেক্ষা করে, তার নাম ধাম কাম না জেনে। অপেক্ষার শেষ হলে মানুষ শেষ হয়ে যায়। কেবল মানুষের মুখোশটা খলখল করে শব্দ করে। শব্দগুলোর ভাষিক অর্থোদ্ধার প্রায় অসম্ভব। বাক্যগুলোর ব্যাকরণে সমিল বিন্যাসের কোন চিহ্ন মেলানো মুশকিল। তবুও শব্দ, বাক্য ওরা ব্যবহার করে। শব্দ, বাক্য ব্যবহার ছাড়া প্রাণীরা কি বাঁচতে পারে?

মানুষের পারার প্রশ্নই ওঠে না। যারা বোবা, বধির, তারাও বলতে চায়, শব্দ করে বলতে চায়। বলতে না পেরে আরও শব্দ করার চেষ্টা করে। পশুপাখিরা শব্দে শব্দে সেরে নেয়-মেখে নেয় শরীরস্বাদ। মানুষের, মানুষের তৃষ্ণার শেষ নেই। একটি মিটে গেলে, অন্যটা হাতছানি দেয়। একেক জনের চাহিদা একেক রকম। এ এক মহাপাগলামি। একে অন্যকে পাগল বলে মজা পায়। ধনের পাগল, মানের পাগল, নর-নারীর পাগল, প্রকৃতি পাগল, সাহিত্য-সঙ্গীত পাগল, দর্শন পাগল, বিজ্ঞান পাগল ছাড়াও রয়েছে অনেক কেছমের পাগল।

আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ হাতে ওরা ছোটে। ওদের বাপ দাদারা ছুটেছিল। ছুটে গিয়ে পেয়েছিল জমি-জমা, ক্ষমতা, সুরা-সাকী আর একটা তাসের ঘর। ঘরের মধ্যে ক্ষণিকের অতিথির মত কিছু সময়ের নাড়াচাড়ায় ওরা কেবল জান্তব জীবনের ছাপ রেখে গেল। আশ্চর্য প্রদীপ হাতে পেয়ে ওদের চোখ ঝলসে গেলে, ওরা আর দেখতে পায়নি— আলোর পথের যাত্রীদলের। সেই থেকে ওরা অন্ধকারের পথে ছোটে। অন্ধকারের পথ শেষ হয় না। আন্দাজে অনুমানে চললে কোনদিনও হয়তো পথ শেষ হবে না। মানবতার মরা গাঙে মনিষার ভেলা ভাসায় কোন পাগল! ‘ও’ ভাসাল ভেলা। ওদেরও পেতে ইচ্ছে করে—

আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ। পেয়েছিলও হয়তো। পেয়ে কি করেছিল? হেলায়-ফেলায় প্রদীপটাকে কাজে লাগায়নি। ওরা আশ্চর্য প্রদীপের বদৌলতে অনেক কিছু পেতে পারলেও ‘বোধিবৃক্ষের’ ছায়ার ধারে কাছে যাবার সম্ভাবনা জাগাতে পারেনি। ‘ও’ পেল। ‘বোধিবৃক্ষের’ ছায়ায় কিছুটা সময় বসলো। আদম-ইভের পাঁজরের মাদকতায় মেতে যেতে গিয়ে ভাবলো— একি সেই বোধিবৃক্ষ? আরব সাগরের জলে ভেসে ভেসে বঙ্গোপসাগরের প্রাণপলিতে শিকড় গাড়ল। একটি ফলে একটি বৃক্ষ। একটি বৃক্ষে অজ¯্র ফল! অজ¯্র ফলে লক্ষকোটি বৃক্ষ! তবে একজন সিদ্ধার্থ থেকে শত সহ¯্র ‘বুদ্ধের’ বোধিবৃক্ষ আর তার ছায়া গেল কোথায়? ‘ওরা’ না জানলেও ‘ও’ জানে বৃক্ষ-মানবের মাখামাখি, বৃক্ষ মানুষের মিলন মোহনায় বোধিবৃক্ষের বুকে কত পারিজাত পাশা খেলে যায়—।

‘ওরা’ বৃক্ষ চেনে না। ঘর গেরস্থালির কাজে বৃক্ষনিধনে মেতে, নিজের ঘর নষ্ট করে। বোধের বালায় ওদের ধাঁতে নেই। ‘ওরা’ জ্ঞানবৃক্ষের নাম শুনতে চায় না। বোধিবৃক্ষ ওদের কাছে বিষবৃক্ষ। বোধিবৃক্ষের ছায়া মাড়াতে ওরা ভয় পায়। এজন্য বৃক্ষনিধনে ওদের এতো তাড়া। লক্ষ লক্ষ বৃক্ষনিধনে ওদের হাত হিস্ পিস্ করে। অসুর-সুর স্বপ্নের বুক বিদীর্ণ করলে ওরা মজা পায়।

আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ ওদের হাতে। কত ক্ষমতা! আরব্য রজনীর দৈত্যরা হার মেনেছে। বঙ্গদেশের বাউল বাঙালদের রক্ষে নেই। প্রাচীন ভারতীয় প্রাকৃতজনের হাল-চাল চলবে না। এক হাজার এক রাত্রির কাহিনী বয়ান করে আউল-বাউলের মাঠ-ময়দান দখলে রাখবে ওরা। আদি পিতা-মাতা ‘গন্ধমবৃক্ষের’ ফল খেয়ে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল বলে ওদের মনে ভয়। শঙ্কা জাগে। ভীরু পদক্ষেপে ওরা স্বর্গের সিঁড়ি মাড়াতে বিড়ালের মতো সাবধানতা অবলম্বন করে। পাছে স্বর্গ ইঁদুর হাতছাড়া হয়ে যায়। ওরা স্বর্গে যেতে চায়। স্বর্গে গেলে সব মেলে কি না! ইহকালে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের জোরে সব পেয়েছে; পরকালেও সব পেতে চায়।

গন্ধমবৃক্ষের ফল খেলে আল্লাহ বেরাজ হয়। এজন্য বৃক্ষনিধনই আসল কাজ। যত নিধন করা যায় ততই মঙ্গল। একটি বৃক্ষে অযুত ফল। একবার কেউ ফল খেলে উপায় নেই। ফল খাবার পর জাতসাপের মত খোলস ছেড়ে নতুন জীবন পাবে। নতুন জীবনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করবে। একসময় ঈশ্বরকে আপন চোখে দেখতে চাইবে। নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত একের পর এক গন্ধম ফল খেতে থাকবে। খেতে খেতে বোধের প্রচল পরিধি ভেঙে বাঙালীয়ানার বিন্যাসে দেখে নেবে জীবনবৃক্ষের কত ফলে একটি বোধিবৃক্ষ জন্মে। একটি বোধিবৃক্ষে চেতনার চৈতি চাঁদের আলো ঠিকরে পড়লে অন্য বৃক্ষগুলো অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। জীবনবৃক্ষের খোলস ছেড়ে বোধিবৃক্ষের বোধিমূলের মুখোমুখি হতে শাখা-প্রশাখা মেলে ধরে। তাই ওরা বৃক্ষ নিধন করে। বোধিবৃক্ষের নাম সহ্য করতে না পেরে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে চায়। কিন্তু তা কি সম্ভব? একবার কেউ বোধিবৃক্ষের সন্ধান পেলে অমৃতবৃক্ষের দিকে ধাবিত হয়। মানুষ অমৃতের সন্তান কি-না।

জননী রহিমা খাতুনের জঠরজ্বালা যাপিত জীবনের দোলুজে কবুতরের মত বাক্বাকুম করে…। তাঁর, একান্ত তাঁদের হিসাবের খাতাটা মেলতে চাইলে, জনক সোলায়মানের কাঁশির শব্দ হৃদপি-ে কাঁপন ধরায়। বংশগতির এ এক আজব কারবার! জীবন নামের নগদ ব্যবসার পাকা খাতায় বাকীর অংক বাড়ে… অংকরা তাঁদের হিমসাগর আমগাছ ও আমের সাথে একাকার হলে আরো বাড়ে…। বাবার কবরে পাঁকা আমগুলো ঝরে পড়ার শব্দে বাবা যতবার চমকে ওঠে, সে ততবার বলে-আব্বা ওঠো, ওঠো আব্বা। বাবা তাঁর স্বভাবসুলভ ঔদাস্যে কী যেন বলতে যেয়ে থেমে যায়। বাবা কথা বলা বন্ধ করলে ১২ মাসের মধ্যে ৩/৪ মাস নিরব নিস্তব্ধ হয়ে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। বাবার নিস্তব্ধতা সহ্য করতে না পেরে সে অনর্গল কথা বলে যায়। বাবা শুধু শুনে যায়। সে-অভ্যাস বাবার এখনও রয়ে গেছে। তা না হলে ২০০৫ সালের জানুয়ারির ২৫ তারিখের পর থেকে বাবা আর কথা বলছে না কেন? ৩/৪ মাসের নিস্তব্ধতা ভেঙে বাবা কথা বলা শুরু করলে আর থামত না। শীতের রাতে বাবা সারারাত জেগে থেকে কোরআন তেলাওয়াত ও নামাজ পড়ে। পাড়াসুদ্ধ মানুষকে জাগিয়ে দেয়। আর এখন কি-না হিমসাগর আমগাছের নিচে নিরবে শুয়ে থাকবে? কথা বলবে না? তা কী-করে হয়! সে বাবাকে অনেক কথা বলতে চায়। জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্যের অনেক কথা তার মগজে গিজ্ গিজ্ করে। বাবার পছন্দ হাদিস-কোরআন ছাড়া আরো কত জানা-বোঝার আছে, বাবা সেসব না জেনে কেয়ামত পর্যন্ত কবরে ঘুমিয়ে থাকবে! না না বাবা তা হয় না। বাঘঅলা বাড়ির ঘর বারান্দায় বই আর বই…। বাবা বই পড়তে ভালবাসে। হাত বাড়ালেই বাবা সব ধরনের বই পেয়ে যাবে। বই পড়ে প্রাণভরে তাঁর সাথে আলোচনা করবে। বাবা ছাড়া এত বই কে পড়বে? হায় কে আর বই পড়তে ভালবাসে? বাবার সাথে তাঁর তর্ক হয়। বাবা কেবল ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান আঁকড়ে ধরার কথা বলে। সে মুক্তমনে পৃথিবীর সকল ধর্মের ভালো-মন্দ অকপটে বলে যায়। একপর্যায়ে বাবা থেমে যায়। বাবা ভাবে-তাঁর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বাবা হয়তো জানে না প্রচলিত ধর্ম ও প্রথার বাইরে এযাবৎ যত মনীষী নতুন কথা বলেছে— তাদেরকে উন্মাদ, পাগল বলে সমাজ প্রত্যাখ্যান করেছে, পুড়িয়ে মেরেছে, হত্যা করেছে, নির্বাসনে পাঠিয়েছে।

বাবার জীবন তৃষ্ণা প্রবল! বাবার চোখে অনেক স্বপ্ন! ৭১-এ মাইনব্রাস্টে পা খোঁড়া হবার আগে বাবার কর্মস্পৃহা ছিল প্রবল! হায়রে মুক্তিযুদ্ধ! কত মানুষ, কত মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-পরিজন হারিয়েছে-কী পেয়েছে? পাবার মধ্যে পেয়েছে একটা লাল-সবুজের পতাকা। দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা ক’জনে পেল? বাবা পঙ্গু হবার ২ বছর আগে সে জন্ম নিল বাঘঅলা বাড়িতে। বাবার রক্তাক্ত পা, গা দেখে তার নতুন ফোটা বোলে সৃষ্টিকর্তার কাছে অসহায় আর্তনাদ ঝরে পড়ে— ‘আল্লা থুদা আমাল আব্বাল ভালো তলো, আমি হন্যেশ খাব-’ আর্তনাদগুলো অনেক অনেক বছর ধরে বাঘঅলা বাড়ির মানুষের মুখে মুখে ফুটেছে। এখনও বাবার পুত্র-কন্যারা বাবার ঘরে বসে রহিমা খাতুনের সাথে বিলাপ করতে করতে বাবার কবরের পাশে চলে আসে। হামেদা খাতুনের বিলাপে জননী রহিমা খাতুনের চোখে বন্যা নামে। অনাদরের সারাবান তহুরা কষ্টের দাবানলে পুঁড়ে পুঁড়ে চোখ হারাল। বাঘঅলা বাড়িতে দাবানল এখনও থামেনি। বাবা হিমসাগর গাছতলা থেকে একবার উঠে এলে, দেখতে পেত— রক্তের ঋণ দিনে দিনে কত বেড়ে যায়! এত বেড়েছে যে অংকের সংখ্যারা কুলাতে পারছে না।

ঋণ, জনকের রক্ত ঋণ কি শোধ করা যায়! শোধ করতে কজন পারে? জননীর জঠর! জঠরে মানবশিশু থাকে নির্বিঘেœ, নিশ্চিন্তে। আর জননী? জননী জানে জঠর যন্ত্রণার দিন, মাস, বছরের তিল তিল হিসাব। জঠরে শিশু লাফালে যন্ত্রণায় নীল হতে হতে জননী অপেক্ষা করে— সন্তানের। সন্তান এ ধরার আলো-বাতাসে আসে, মা বলে ডাকে। মা ডাকে মায়ের নীল বেদনারা সব লাল হয়ে ঝরে। মায়ে-সন্তানের ¯েœহ-সুধায় ওরা বাধ সাধলে ব্যত্যয় ঘটে। ব্যত্যয়ের পরিধি বাড়লে ব্যথা বেদনার বালুচর জাগে। তবুও রক্তের আখরে লেখা জীবন বাধা পড়ে যায়— জনক-জননীর জন্ম জঙ্গমে।

দোলুজটা পঞ্চাশ-ষাট বছরের অভয়াশ্রম কবুতরদের। মনুষ্য বসবাসের উপযোগী করার জন্য দোলুজটার সংস্কার করা হলো। কবুতরগুলো যেতে চায়নি। দোলুজের মাঝ বরাবর ঢালায় দিয়ে ঝুড়ি, টব ফেলে দেয়ার পরও কবুুতরগুলো দীর্ঘদিনের আবাস ছেড়ে যেতে চায়নি। তবুও কবুুতরগুলো চলে যেতে বাধ্য হলো। মানুষ তার স্বার্থে সবকিছু করতে পারে বৈকি! ওদের তাড়িয়ে দিয়ে সে থাকতে পারেনি। হাসনা-হেনার গাছটিও রক্ষা পেল না। জবা ফুলের গাছটার নিশানা নেই। চিরুনির দাঁতের মত বাঘঅলা বাড়ির দোলুজের সিঁড়িগুলোর কথা মনে হলে তার কেবলি দাড়ভাঙা ন্যাংড়া আমগাছটার গোলগাল ডালপালায় ঝুলে থাকা গাছপাকা টসটসে ন্যাংড়া আমের রসে গাল ভরে যায়।

নতুন নতুন কবুতরে দোলুজের টব, ঝুড়ি, কার্নিশ ভরে যায়। দিন-রাতের বাক্বাকুম শব্দে দোলুজের দেয়ালের গর্তে ঘাপটি মারা গোখরা সাপগুলো আরো ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করে কখন জোছনার আলো ঠিকরে পড়বে, দাড়ভাঙা ন্যাংড়া গাছের ফাঁক দিয়ে জামগাছের গা ঘেষে দোলুজের মধ্যে। চাঁদনি রাতে হেলে-দুলে বেরিয়ে যায় সুপারি গাছের গোড়ার মত মোটা সাপগুলো। হিন্দুদের আমলের সাপগুলো মুসলমান আমলে পড়ে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে। পুজোর ঘরের পূজা, মনসা দেবীর অর্চনার সাথে সাপগুলো বেঁচে বর্তে থাকার নিশ্চয়তা ছিলো। মনসাদেবীর বাহিনী বলে জামাই আদরে দুধ-কলা দেওয়া হতো। মুসলমান আমলে সাপ দেখলে রেহাই নেই। সাপ মারা সুন্নত কি না!

হিন্দুদের হাত ঘুরে হিমু মোড়লের পা পড়ে কিছুটা পাক হয়ে হাজী ইজ্জত আলীর বংশধররা শিকড় গেড়েছে। সে কোথাও শিকড় গাড়ল না। ঢাকা, কলারোয়া, সাতক্ষীরা, বগুড়া কোথায় দাঁড়াবে সে? ইজ্জত আলীর বংশধররা ভাদলি থেকে আসার পর দাঁড়িয়ে গেছে। সে দাঁড়াতে পারলো না। কেন পারল না? সে হাঁটতে চায়। তার দাঁড়াবার সময় নেই। সে হাঁটছে। জেগে থেকে বা ঘুমিয়ে থেকে। যারা হাঁটে, তারা ঘুমিয়ে হাঁটতে জানে। যারা হাঁটতে জানে না, তারা জেগে থেকেও হাঁটতে পারে না। সে হাঁটতে হাঁটতে থমকে যায়। পায়ের পাতা বাঘঅলা বাড়ির দোলুজের সিঁড়িতে আটকে যায়। চিরুনির দাঁতের মত সিঁড়ি তাঁর পায়ে সুড়সুড়ি জাগায়। সে হাঁটতে পারে না। সিঁড়িতে বসে মুজিবর দালালের বাড়ির দেওয়ালের রংগুলো বারবার দেখে নেয়। বাঘঅলা বাড়ির রংঅলা দেওয়ালের মিল খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু মেলে না। খানের আমলের খানকির পুতরা সব তছনছ করার পর কোনো কিছুই মেলে না। যারা খানেদের সাথে থেকে অনেক ইজ্জত আলীর বংশে লাল বাতি জ্বালিয়েছে, লক্ষ লক্ষ ছালেমানের পঙ্গু করেছে। লাল বাতি জ্বললে চোখ ধেঁ-ধেঁ যায়। তখন বাঘঅলা বাড়ির রঙের সাথে মুজিবর দালালের বাড়ির রঙে মেলে না। মেলে না বলে সে মিলাতে চেষ্টা করে, করে কেবল ভাবতে থাকে— ধনী-গরিবের ব্যবধান! দশতলা আর গাছতলার সমীকরণ করতে গিয়ে মানব জন্ম ও বিবর্তনের মূলে ফিরে সত্য সুন্দরের মুখোমুখি দাঁড়ায়। বুঝে নেয়ার চেষ্টা করে ধনী-গরিবের রহস্য।

কবুতরদের ওসবের বালাই নেই। পেট খালি হলে উড়াল মারে— বলাডাঙা, রাজবাড়ি, লক্ষ্মীখোলার মাঠে। টোকসা ভর্তি গিলে, বর্দির পুকুর থেকে পানি পান করে দোলুজে উড়ে এসে নিশ্চিন্তে গান করে— ‘খেয়ে দেয়ে ঘুমায়, আমাদের কোনো চিন্তা নাই’। সে শোনে, আর চিন্তা করে গান করে— ‘খাই দায় ঘুমাই না, চিন্তা ছাড়া মুক্তি পাই না।’ তাঁর গানের সুরে কবুতরের গান থেমে যায়। তাঁর গান বন্ধ হলে কবুতরেরা গান ধরে। এক সময় তাঁর ও কবুতরের গান একসাথে চলে। উভয় মিলে এক আশ্চর্য মধুর সংগীতের মূর্ছনা সৃষ্টি হয়। হায়রে, সেই সংগীত কেমন করে যে থেমে গেল! কবুতরেরা চলে গেল। সেও চলে গেল। বাঘঅলা বাড়ির দোলুজে এখন তাঁর গানের সুর বা কবুতরের গান আঁছড়ে পড়ে কি? হয়তো পড়ে। না পড়লে হৃদয় খুঁড়ে জেগে ওঠা স্মৃতিপটের গানগুলো এতো ভাষা খোঁজে কেন? ভাষা পেলে সুর খোঁজে…।

সুর পেলে সুরের উৎস খোঁজে। সুরের উৎস পেতে সে হাঁটতে থাকে। কেবল হাঁটছে আর হাঁটছে। ইজ্জত আলী, সোলায়মানরা বেশি হাঁটতে পারেনি। খানের আমলের খানেরা হাঁটতে দেয়নি। হাঁটার সামর্থ্য থাকলে তাঁরাও হাঁটত তাঁর সাথে, ত্রিকালদর্শীর সাথে, মহাকাশ বিজ্ঞানীর সাথে। আরও মানুষের হেঁটে চলার সাথে। সোলায়মান, ইজ্জত আলীরা হাঁটতে পারেনি বলে এক ঘুমে একেবারে কেয়ামতের দিন জাগবে। তাঁকে দেখে ইজ্জত আলী, সোলায়মান, আছিয়া খাতুন, খতেজানরা অবাক হয়ে ভাবতে থাকে— এই ছেলে এখানে কেমন করে এলো। এখানে তো তাঁর আসার কথা না। এখানে আসতে হলে একঘুমে রোজ কিয়ামত পার করার পূণ্য লাগে। লাগে ইবাদত-বন্দেগি। সে সেই পূণ্য কোথায় পেল? পূণ্য করতে হলে আসমানী কিতাবে বিশ্বাস লাগে। তাঁর বিশ্বাস, জীবনাচার ভিন্ন, একেবারেই নতুন, আনকোরা। কিন্তু, এখানে এ মানস সরোবর এলো কি করে? তাঁর কি আসমানী কিতাবে বিশ্বাস ছিল? না থাকলে এখানে এলো কেমন করে? ভালোই হলো। ইজ্জত আলীর বংশ আবার একসাথে হলো। বংশের অন্যেরা কে কোথায়? ইজ্জত আলী, সোলায়মান পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। কে কার খবর রাখে। তাঁর কাছে জিজ্ঞাসা করলে সে অনর্গল বলে যায়— কে কোথায় আছে, এ বংশে সে ছাড়া এমন নাড়ি নক্ষত্রের খবর কে দেবে? খতেজান, আছিয়া খাতুনের মুখে আনন্দের ঢেউ খেলে। তাইতো, তাইতো, আমাদের কেউ খবর রাখে না, আর তুমি সব খবর রাখে…। কী করে সম্ভব হলো। সে মুচকি হাসে। উত্তর না দিয়ে হাসিতে অনেক উত্তর দিয়ে যায়…। সোলায়মান জানতে চায়— ‘তুমি কোথায় যাবে’? সে সোলায়মানকে আশ্বস্ত করে— বলে- ‘তুমি যেখানে যেতে চাও আমিও সেখানে যেতে চাই।’ তার মানে আমরা একসাথে থাকবো? তুমি চাইলে থাকতে পারি! সোলায়মান অবাক হয়ে বলে— ‘চাইলে’ মানে! সে বলে— ‘তুমিতো আমার কথা শুনতে চাইতে না। আমাকে বিশ্বাস করতে না। তাই সন্দেহ হয়— এখন এখানে আমার সাথে তোমার থাকতে ইচ্ছা হবে কিনা। আমার এসবের কিছু মনে নেই।’ তোমার মনে না থাকলেও আমার আছে বলে সে ইজ্জত আলী, আছিয়া খাতুনের বংশের সব কাহিনী বলতে থাকে। ‘তোমার বাপ-ইজ্জত আলী, মা-খতেজান সেই কবে চলে এসেছিল তা তোমার মনে নেই। তুমি কবে চলে এসেছো তাও মনে নেই। আমার সব মনে আছে। তুমি চলে আসার পর আমি সব জেনেছি। তোমার মা-বাবা আমার সাথে কথা বলে। তোমার কথা জানতে চায়। আমি তোমার কথা তাদের বলেছি। তাদেরকে বলেছি— আমরা সবাই এক জায়গায় মিলিত হবো। তারা প্রথমে আমার কথা বিশ্বাস করেনি। যখন একের পর এক করে সবার খবর জানালাম, তখন তাদের বিস্মৃত স্মৃতিরা ফুলের পাঁপড়ির মত মেলে গেল। খতেজান, আছিয়া খাতুন, রহিমা খাতুন, ইজ্জত আলী, আব্দুস সোবহানরা একে অপরকে চিনতে পারল। রুহুকণার জগতে কিছুই হারিয়ে যায় না। সব থেকে যায়। মানুষতো থাকবেই। ওদের শোনার আগ্রহ বাড়লে তাঁর বলার আগ্রহ বাড়ে। সে বলে, ওরা শোনে। মানুষ হয়তো বলে, নয়তো শোনে। ওরা বলেনি বলে সে বলে। সে শুনেছিল জীবন জিজ্ঞাসা! আসমানী আওয়াজ আর জীবন জিজ্ঞাসার মধ্যে কোনটা সত্য? নাকি সত্য-মিথ্যার কোন বালাই নেই? মানুষ কেবল সত্য-মিথ্যার দোহাই দিয়ে সারাটা জীবন পার করে— আফসোস করে মরে। মরে গেলে থেমে যায়। কেউবা মরার আগে বলে— ‘হায়— কিছুই করা হলো না। অনেক বলার ছিলো, করার ছিল।’

যারা সত্য-মিথ্যার পরোয়া না করে হাঁটতে চায়, তাঁরা হেঁটে যায়। হাঁটলে সবার সাথে দেখা হয়। সবার সাথে দেখা হলে সবার খবর দেওয়া যায়। তাঁর খবরে ইজ্জত আলীদের আনন্দের সীমা নেই। কেবল সেই পারে ইজ্জত আলীর বংশের নিভে যাওয়া বাতিগুলো জ্বালাতে। আর কেউ এ পথে পা বাড়ায়নি। পা বাড়াবার সাহস পায়নি। সত্য কথা, সত্য ইতিহাস, সে ছাড়া আর ওই বংশের কেউ বলতে পারে? সত্যের জ্ঞান থাকা লাগে। সত্য বলার সাহস থাকলে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে থেকে ই¯্রাফিলের বাঁশির হুঙ্কারে জেগে উঠতো না। তাঁর সাথে বাঘঅলা বাড়ির দোলুজের কবুতরদের গান শুনতে শুনতে জীবন-মরণের সীমা পেরিয়ে যেতো। জীবন-মৃত্যুর মাঝের অধ্যায় ওরা বুঝতে পারে না। পারে না বলে একটা বিশ্বাসে থিতু হয়ে কেবল জীবনের দায় শোধ করে পরিশ্রান্ত হয়। নিষ্ফল প্রার্থনায় ওরা অসুস্থ হয়ে স্বর্গ পেতে চায়। ক্ষণে ক্ষণে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আসমানী আদেশ-নিষেধের ফিরিস্তি আওড়ায়। ওরা পরস্পরে বিভেদ বাড়ায়। যদিও ওদের আসমানী আদেশ আছে একতাবদ্ধ থাকার। ওরা আসমানী আদেশ-নিষেধ মানলে কাম, ক্রোধ, অহঙ্কার দেখাত না। মানে না বলেই ওদের এতো আস্ফালন। ওরা মহাবিশ্ব ও মানবজনমকে ব্যাখ্যা করতে জানে না। কেবল কেচ্ছা কাহিনীই ওদের জীবন্মৃত রাখে। জীবনের প্রগাঢ় বিষ্ময়, বিপন্ন বিষ্ময় ওদের মগজে ঢোকে না। ঢুকলে ওদের সাথে তাঁর কথা হতো— অনেক-অনেক…।

————————————–

বোকা বেলুন
সৈয়দ তৌফিক জুহরী

মাছেদের জগৎটা কেমন? এসব জানতেই বুঝি বছরখানেক আগে গ্রামে গিয়েছিল তুলি। শ্যাওলাভরা একটা পুকুর ছিল বাড়ির কাছে। তার জলের রঙ সবুজ। অনেকগুলো ঝক-ঝকে শাদা শাপলা বাতাসের তালে-তালে গান গেয়ে নাচছিল। বহুক্ষণধরে শাদা শাপলার ঢেউয়ের খেলা দেখতে-দেখতে, তাঁর মন চাইছিল পুকুরে নামতে। পুকুরে কি নামা যায়? নাহ্! নামা যাবে না।

পাশের বাড়ি পলা নামের মেয়েটা অনেক করে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, পুকুরে নামলে জিন-পরি আর আস্ত রাখবে না। কাঁকন নামের কোনও এক বেহায়া মেয়ে এইভাবে ডুবে মরেছে। জিন ধরে নিয়ে, বেঁধে রেখে রক্ত চুষে খেয়েছে।

কিন্তু সময়টা আঁধারের ভেতর টুপ করে ডুব দিয়ে ফুরিয়ে যাবার আগে— সেই নির্জন পুকুরের কাঁচা শাপলার নির্মম ঘ্রাণ বড় ভালো লেগেছিল তুলির। হোকনা পুকুরের জলের রঙ গাঢ় সবুজ, কিংবা থাকুক একশ হাত-পাঅলা জ্বিন, যে পেঁচিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে ভালোমত বেঁধে রক্ত চুষে খেতে থাকে। বারবার মনে হচ্ছিল, বহু বছর আগে ডুবে মরা কাঁকন নামের মেয়েটা যদি ভুস্ করে ভেসে ওঠে। না-কি ঐ মেয়েটাই মরে গিয়ে শাপলা হয়ে ফুটে আছে পুকুরের জলে। ঠিক মাঝখানটিতে। গা শির-শির করে ওঠে তুলির।

গ্রাম মানে তখন রাস্ত-ঘাট নেই। মাথায় আউলা চুল, খড়ি ওঠা শরীর। আর তাই রোদে পুড়ে কালো মানুষগুলো যেখান দিয়ে যায়, সেটাকেই পথ বলে ধরে নেয় সবাই। সেবার সেই ঘোরলাগা পুকুর-ঘাট থেকে ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছিল না তুলি। মাথার উপরের ছাই-ছাই, দলা-দলা তুলো উড়ে যাচ্ছে মেঘ হয়ে…। কালো-কালো, মোটা-মোটা কাঁটায় সারা দেহ নিয়ে কটমট করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে শিমুল তুলোর গাছ। সেটার পায়ের কাছে বড়-বড় জ্বল-জ্বলে শিমুল ফুল পড়ে থাকে। গাঁয়ের গরুগুলো গপ-গপ করে সেসব খায়।

সেদিন ওই মোটা, বিশাল, উঁচু তুলো ওড়ানো শিমুল গাছটাই পথ চিনিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে এনেছিল তুলিকে।

কাঁকন নামের সেই মেয়েটি যদি সত্যিই ভেসে উঠে, তাকে টেনে ধরে ডুব দিয়ে চলে যেত মাঝ পুকুরে, তবে ঝুম-ঝুম করে মাথা নাড়া শাপলা ফুলের ভিড়ে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে দেরী করতোনা তুলি। মরে যেতে ইচ্ছে করতো তার।

কেমন সেই জগৎটা? জানতে ইচ্ছে করে। শিউরে ওঠা রোমকূপে হাত বুলাতে-বুলাতে নাক দিয়ে টেনে নিতে ইচ্ছে করে পুকুরের ঘ্রাণ। পারে না।

সেবার গ্রীষ্মের গরমে ঝলসে যাওয়া দুপুরে, ঘুম ভেঙ্গে গেলে, গোড়ালি উঁচু করে শিশিরে আঙ্গুল ডুবিয়ে, বড় মাঠের কোনাটায় ছুঁটে যাবার সময় কানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সাঁই-সাঁই হাওয়ার দিকে নজর থাকতো না। সেখানেই হয়ত মাঠের ঘাসের বুকে, চটচটে আঠালে বিষ ঢেলে রেখে, গর্তঘরে ডুব দিয়েছে  কালগোখরো। সেই বিষ পায়ে লাগার ভয় থাকত। কিন্তু ছুটবার সময় মনে থাকতো না। কারণ মাঠে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে পাড়া বেড়ানি এক তিরিক্ষি মেজাজের মেয়ে পলা। যার দেহবর্ণ অফসেট কাগজের মত সাদা। কিংবা বলা যায় সবকিছুর ছায়া পড়ত সেখানে। জলের পাশে বসলে, জলের একটা  ছায়া খেলে যেত তার গালে। এতটাই সাদা লাগতো যে, মাঝে মাঝে মনে হত চরম কোনও অসুখ বাঁধিয়ে হয়ত বসে আছে।

পলা মেয়েটা বোধহয় পাগল ছিল! পুঁই লাতা থেকে কালচে-লাল রঙের পাকা ফল ছিঁড়ে যখন নিজের ঠোঁটে ঘষে দিত, তখন মনে হত সাক্ষাৎ কোনও ফ্যাকাশে ডাইনি কারও কণ্ঠ চুষে রাক্ত পান করে, ঠোঁট মুছতে ভুলে গেছে। অসম্ভব রক্তলাল ঠোঁট নিয়ে সে শক্তমুখে নিজের ফোলা পেটটায় হাত বুলাতে বুলাতে ব্যথায় কাঁকিয়ে উঠতো। পেট নিয়ে কিছু জানতে চাইলে, কচ্-কচ্ করে চিবিয়ে খাওয়ার এক রক্তহিম দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতো চোখের দিকে। মাঠে ঘুরতে ঘুরতে সে হয়ে উঠেছিল মাঠের মতই, ঋতুর আবর্তে মেঠোসবুজ। কখনও হলদেটে ঘাসের মতন ফ্যাকাসে। আবার কখনও উন্মত্ত হাওয়ার মত ডানপিটে।

সেদিন পলা একটা কাঁঠির মাথায় খানিকটা ঘোলাটে আঠার মত বিষ এনে, চোখের সামনে ধরে, খুব ভালো করে দেখতে শুরু করেছিলো। রোদের উত্তাপে তাতে জমেছে খানিকটা বুদ্বুদ্, কিছুটা হয়ে গেছে শিংমাছের পিঠের মতন কালচে। আর অল্প একটু  জায়গায় লালরঙা কি যেন ভরে আছে। সে খুব ভালো করে দেখতে দেখতে বলে ওঠে, তোর কি মনে হয় … এই বিষ খেলে আমি সাপ হয়ে যাবো?

তুলি তখন সবে বাড়ি পালিয়ে মাঠের উত্তরের বড় আমতলাটার বড়  গুঁড়িতে হেলান দিয়ে হুপ-হাপ বাতাস খাচ্ছে। বড়-বড় দমে, বুকের হাপরে ভরে নিচ্ছিল অনেক বাতাস। মুখ হয়ে উঠেছে লালচে, কাধেঁর কাছে লেগে আছে কয়েকটা শুকনো পাতা, গোড়ালি থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ভিজে আছে শুকনো লাল ধুলোতে। পানির মতই তার অনুভূতিটা কেমন ঠা-া-ঠা-া। তুলি ফ্রক তুলে মুখের ঘামবিন্দু মুছতে-মুছতে বিস্ময়মাখা বলে উঠেছিল, কী?

পলা তাতেই বেশ তেতে উঠে, ফোঁস-ফোঁস করে কানে ভীষণ রকমের কয়েকটা মোচড় কেটে বলেছিল, যা বলি, মন দিয়ে শুনিস না ক্যান্? দে-তো তোর পা-টা, একটু লাগিয়ে দেই। কেমন লাগে বলবি।

তুলি তখন খাবি খাচ্ছে ভয়ের জ্বরে। সে পা-টা সরিয়ে নিয়ে ধুম্ দৌড়  লাগিয়েছিল বাড়ির দিকে। পলা পেছন-পেছন আসছে কি-না সে খেয়ালের পথ নেই।

মাঠের ওপরে সেদিন বুঝি হাওয়া ছিল না। কানের কাছে গুম-গুম করে কেটে যাওয়া পলার ধাওয়া করার শব্দ, মাঠের শক্ত ঢেলা, কাঁটা আর পাথরের ভীতি এড়িয়ে, মনের ভিতর কেবল গোত্তা খাচ্ছিলো চোখ বুঁজে কাকদৌড়ের চেষ্টা।

পলার মতই পাগল ছিল মিলি খালার মেয়ে পপি। এই পপির সাথেও তো বহুদিন দেখা নেই। কোথায় আছে এখন তারা? বাসায় না জানিয়ে, বাজারে গিয়ে, মাঝে-মাঝে লুকিয়ে-চুরিয়ে পয়সা জমিয়ে দুজনে কিনেছিল অনেককিছু। তাতে টাকার অংকটা পপিরই ছিল বড় ধরনের।

মিলি খালার একটা দরজির দোকান ছিল মোড়ের কাছাকাছি, যেখানে বড় ড্রেনের কালচে ময়লার সরগুলো বেশ লাফিয়ে পেরুতে হয়। যেসব টুকরো-টাকরা কাপড় দোকানটা থেকে বাতাসে ভাসতে-ভাসতে ডানা ভারি হয়ে ডুবে যেতো ড্রেনটায়, সেগুলো জমাট ময়লায় আটকে গিয়ে সাপের লেজের মতন নড়ত ময়লা পানির তোড়ে।

তিনু আর পপি সেই বড় ড্রেনটাকে লাফ দিয়ে পেরিয়ে গিয়ে, খালার কাপড় কাটা কাঁচির দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতো। দু-একটা টুকরো কাপড় মাঝে-মধ্যে পেয়ে গেলে, আনন্দে মাথা-কান ঝিম-ঝিম করে উঠতো।

কখনও-সখনও কাঁচের চুরি কিনতো মন ভরিয়ে। তুলির আইসক্রিমের টাকা যেত এসবের পেছনে। পপিও তার মায়ের টাকা রাখার বাক্সটার এক কোন দিয়ে কি এক বিশেষ পদ্ধতিতে অনেক-অনেক টাকা বের করে আনতো। তখন প্রশ্ন জাগেনি, কিন্তু আজ জাগে… এতো টাকা মিলি খালারা পেতো কোথায়? কেন লুকিয়ে বের করে আনলেও খালা বুঝতেন না?

সেই পপি বাসা বদল করে চলে যাবার সময় মুখ-চোখ গরম করে কড়া কণ্ঠে এসে বলল, তোর বাক্সটা বের কর তো। কাজ আছে।

তুলির বাক্সে পপির কিছু চুড়ি, ফিতা, পুতুল, দলা পাকানো রঙিন কাপড়, পুঁতির মালা, নাকফুল, কাজল আরও এইসব ছিল। বাক্সটা বের করতেই, একমুঠো সুন্দর করে গোছানো লাল সুতোয় বাঁধা চুড়ি নিয়ে জুতো দিয়ে মাড়িয়ে গুড়ো করে ফেলল। পুতুলসহ আর যাকিছু ছিল, তা ঐ বড় রাস্তার ড্রেনটার ভেতর দুম করে ফেলে দিয়ে বলল, এগুলো আমার! তারপর বাক্সটা ফেরত দিয়ে, যেমন হুট করে এসেছিল তেমন হুট করেই চলে গেল।

মিলি খালার সেই দরজির দোকানে বড় একটা তালা ঝুলল পরদিনই। পপির এই আজব আচরণ, মিলি খালার চলে যাওয়া, ড্রেনের পাশের সেই দরজির দোকানের দামড়া ধরনের বড় তালাটা, শূন্য এক হাহাকার বইয়ে দিয়ে যেত। পপির জন্য নয়, চুড়ি আর পুতুলগুলোর জন্য মায়া লাগতো বহুদিন। স্কুলে যাবার সময় দেখেছিল তুলি, সেগুলো ভেসে-ভেসে মোড়ের কাছে একটা ফলঅলার দোকানের তলায় আটকে ছিল বেশ কিছুদিন।

অন্য আরেক দিনের কথা মনে পড়ে, সেদিন পলা চোখ দুটি বুঁজে, হাতে একটা পেয়ারা নিয়ে, পুকুরের পাড়ে বসে ছিল। পায়ের শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে, একমাথা চুল সরিয়ে হাসিমুখে বলল, পেয়ারা খাবি।

তুলি কাছে যেতেই কানটা নেড়ে দিয়ে বলল, তোর কান ফুটা করছিস না-কি? দেখি,বলেই আলতো করে খড়খড়ে আঙ্গুলে চুল সরিয়ে কানের কাছে ফু দেয়।

আবার কী যেন ভাবতে-ভাবতে চোখজোড়া কুঁচকে, পায়ের কাছটায় খুব করে চুলকে বলে ওঠে, ব্যথা লাগে। সারামুখে সবসময় ছড়িয়ে রেখেছে ব্যথা-বেদনা আর বিরক্তির রেখা।

পা চুলকানোর সময়, পেয়ারার আঠালো একটা রেখা মেখে যায় হাঁটু অব্দি। পায়ের খড়খড়ে মাটি, ঘাস ও নোনাঘায়ের জল ভরে যায় পেয়ারাটাতেও। তারপরও কামড় বসাতে-বসাতে ঝিম মেরে থাকে কিছুক্ষণ। একটা দমকা বাতাস এসে পুকুরের জলের বুকে ঢেউ জাগালে, কয়েকটা শুকনো পাতা ভাসতে-ভাসতে চলে যায় উত্তরের বাশঁবনের দিকে— তখন সেই জলে সূযের্র ছায়াটা ডিম ফেটানো কুসুমের মতন ফেটে যায়। সেই ফেটে যাওয়া কুসুমের মতন সূর্যডিমের পাশে নিজের ছায়া খুঁজতে-খুঁজতে পলা বিড়বিড় করে বলে, কানে দুলও পরেছিস্ !

হুঁ।

কই দেখি।

আগ্রহভরে দেখতে-দেখতে কানে আলতো করে কটমটে আঙ্গুল বুলিয়ে আবার বলে, ব্যথা  লাগে !

তুলি বলে, খুুউব।

পলা হঠাৎ সিদ্ধান্ত জানায়, আমিও অমন করব।

কীভাবে?

বেতের কাঁটা দিয়ে। দেখিস্ খুব মজা হবে।

বেতের কাঁটা খুঁজতে পলা চলে যায় কালিবাড়ির পিছনের ঘন গাছঝোপের মাঝ দিয়ে একদম তার উদরে। অনেক্ষণ সাড়া নেই কোনও। বাতাসে কি এক পাখি মিষ্টি শীষ দিয়ে ডেকে যাচ্ছিল, সেটার জবাব দিতে-দিতে বেরিয়ে এল পলা। হাতে একটা কাঁটা, খুব বিকট দেখতে। হলদেটে-টিয়ে রঙের সেই কাঁটাটার মাথার কাছটা কেমন যেন কালচে, পেটের কাছে খয়েরি ক্ষত, গোড়ার কাছে ঝুলে আছে কাঁচা বেতের ছালের খানিকটা। পলা হাসিমুখে বলল, ‘এটা দিয়ে কাজ হবে… কি বলিস্…?’

তুলি খুব ভয় পেয়ে  গিয়ে  বলেছিলো, তুই নিজে-নিজে করবি? ইস্! পারবি না রে। ব্যথা লাগবে তো। পলা সেসবের জবাব দেয়নি— ঘামে তার ঢেউখেলানো বুকের কাছটা একদম ভিজে গেছে। মাথার চুলগুলো যেন ঝাউবনের ঝনঝনে পাতার মতো খড়মড়ে। ঠোঁট দুটো বাদামি পাতার মত নিষ্প্রাণ। কেবল চোখের ভিতর কিসের যেন জ্বালা, যেন আগুনের কথা কইতে-কইতে নিজেই আগুন হয়ে উঠবে। বাতাসের কথা কইতে-কইতে নিজেই বইয়ে দেবে ঝড়।

যেমন মাতাল, তেমনই উথালপাথাল চোখের মনিজোড়া। তড়বড় করে কাঁপছে, একদ-ের জন্যও স্থির নয়। আঙ্গুল চুঁচিয়ে ধরে, কাঁটাটাকে বসিয়ে দিল বাঁ কনে। আর দু-চোখ দিয়ে বইতে লাগলো জলের ধারা, বিরাম নেই তার। পাতার সড়সড় শব্দের মাঝে টুপ্ করে ঝরে পড়া কয়েকবিন্দু রক্তের শব্দ শুনতে পেল না কেউ। শুধু পায়ের কাছে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা একটা বদামী পাতা  সিঁথিতে সিঁদুর নেবার মতন ভিজে গেল।

আহ্… বলে একটা শব্দও বুঝি লেখা নেই পলার ডিক্শনারিতে।

আরেকবার গেঁথে দিল বাঁ কানের গোড়ার কাছে। তুলি নিষেধ করতে গেলো, কী করছিস, ওখানে না…। কিন্তু পলা গেঁথে ফেলেছে কান, তারপর আরেকবার। এভাবে আবার। বারবার।

চোখ বুঁজে, ঠোঁটজোড়া কুঁচকে, মাতালের মতন মগ্ন হয়ে, ফোটা-ফোট রক্তে কানের চারপাশটা টকটকে লাল করে সে থামলো। বাম কানটায় জমে উঠেছে এক ভয়াবহ কুৎসিত ক্ষত। অথচ মেয়েটার ঠোঁটে কী অপূর্ব হাসি! তুলি আহত কণ্ঠে বলে  উঠেছিলো, ইস্!

পলা কিছুই শুনতে চায় না, কেবল নিজের ইচ্ছের ঘোরে পুড়ে যায়। তুলিও মজে গিয়েছিল সেই আগুনের আঁচে। কেমন মাদকতায় ভরা মেঘ এসে ভর করেছিলো তার চারপাশে। সেসময় জল ও মাটির বিভেদ বুঝতে ভুলে যেতো মাঝে-মাঝে।

মাঠের কোনের উঁচু ঢিবির ভেতরে যেখানে উঁই পোকাদের ঘর, যেখানে মাটি ভেদ করে বেরিয়ে আসছে লম্বা-লম্বা লালচে খয়েরি কেঁচোর দল, যেখানে পথের পাশে হিম হয়ে শুয়ে আছে বহুদিনের পুরোনো বাঁধাই করা কালচে সবুজ এপিটাফঅলা ধ্বসে যাওয়া কবর— সেসব জায়গায় ঘুরতে-ঘুরতে দিন ফুরিয়ে আসতো।

যদিও আলো নিভে আসার অনেক আগে বাড়ি ফিরে সুবোধ মেয়ের মতন পড়ার ঘরে বসত, তবুও মন পড়ে থাকত পলার বোকামি মাখা পাগলামির ভেতরে। ঘুম কমে  যাচ্ছিল তার। সব কিছুরই শব্দ শুনতে পেতো যেন সে। ঘাসের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ, বাঁশবনের উপর তেড়ে-ফুড়ে যাওয়া কোনো কালচে পাখির ডানা ঝাপটানো, ঝড় আসবার আগে শীষ দেবার মতন একটানা মিহি শব্দ — সব শুনতে পেতো। আরও অনেক রকমের শব্দ— যার কোনও নাম জানে না তিনু। আর নিজেই যেন নিজেকে চিনতে ভুলে গিয়েছিল সে।

একধরনের হিংস্রতা এসে ভর করেছিল তার দেহে। সেটা এক ধরনের পাগলামীর মত। এক ধরনের মাদকতার মত। বুনো ফুলের ঘ্রাণ নেবার মত মাদকতা। কাঁচা বাতাসে নাক ডুবিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার মত মাদকতা। নিজের হাওয়া বেলুনটাকে ইচ্ছেমত উড়তে দেবার মত্ততা ভরা মাদকতা।

একদিন পথের কোনায় শুয়ে থাকা, পচানি রোগে ধুঁকতে থাকা কালচে একটা কুকুরকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখার পর মাথার ভেতরটা খুব ঝিম-ঝিম করতে লাগলো তুলির। দুচোখে বহুক্ষণ অনেকক্ষণ অন্ধকার দেখে বিছানায় শোবার পর জ্বর এলো খুব। তারপর টাইফয়েড। ডাক্তার বললেন হাওয়া বদল হচ্ছে, এমন হবেই।

পলা জ্বর-জারির শুরুতে জানালা থেকে বহু দূরে দাঁড়িয়ে দেখতো তাকে। সে দূরের মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতো একা-একা।

তুলি তেমন কিছু মনে নেই। শুধু জ্বরের ঘোরে মনে হত, তারা দুজনে বুঝি মোটা ডালের ঘায়ে ভেঙ্গে চলেছে একের পর এক উঁয়ের ঢিবি। দুই আঙ্গুলে টিপে ধরে শ্বাসরোধ করে মারছে হাঁসের ছানা। দেখতে-দেখতে মাথায় জেগে উঠতো অসম্ভব ব্যথা। ঘুম ভেঙ্গে যেতো তখন। দেখতো জলপট্টি দিতে-দিতে, ঘুম-ঘুম চোখে ধুঁকছে মা। চোখ ফেটে আসতো গাঢ় জলের ধারা।

একদিন বিছানায় শুয়ে-শুয়েই শুনল, পলারও কী একটা শক্তঅসুখ হয়েছে। খুব নাকি ব্লিডিং হচ্ছে। আরও সেসব ডাক্তারি ভাষা ছিল, তুলি সেসব বুঝতে পারে নি।

পলার বাপ-মা নেই। বুড়ি দাদির কাছে মানুষ। সে বাড়ি-বাড়ি ভিক্ষে করে বেড়ায়। ভিক্ষার টাকায় কী চিকিৎসা করা যায়? দু-একদিনের মধ্যে মরে গেল পলা। পলার মৃত্যুর পর লাশ দেখতে যেতে দিলনা তুলির মা। তুলি অবশ্য সুযোগ খুঁজছিলো। দু-একদিনের মধ্যেই এক নিস্তব্ধ দুপুরে সুযোগ মিলে গেলো। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কাজের লোকটাও গেছে হাটে। চুপিচুপি পা টিপে-টিপে, বাঁশের ঝাড়ের বাদামি বাঁশপাতা মাড়িয়ে, লুকিয়ে, তুলি ছুটে গেল পলাদের বাড়ির দিকে।

পথে ধুলোর বুকে ডেবে যাচ্ছিল অস্থির দুটি পা। গতরাত্রে খুব করে কেঁদে, ঠিক তখনই পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে ভিক্ষার থালাটা বগলদাবা করে পথে বেরিয়েছে পলার বুড়ি দাদি। পথে তুলির সাথে চোখাচোখি। কিন্তু বুড়ি বিড়বিড় করে আর হাঁটে, শুনতে পায়না তিনুর ডাক। বাতাসে ওড়ে শনের মত পাকা চুল। তুলির কিছুই ভালো লাগে না। সে ছুটতে-ছুটতে এগিয়ে যেতে থাকে মাঠের দিকে, যেখানে পলাকে কবর দেয়া হয়েছে।

খুঁড়ে রাখা কবর সে বহু দেখেছে। আরও জানে, ঠিকমত খেয়াল না রাখলে— কীভাবে লাশ টেনে বের করে সাবাড় করে শেয়ালের দল। তিনু দেখলো, পলার কবরের জায়গাটা বেশ করে খুঁড়ে গেছে শেয়ালগুলো। নজর দেবার কেউ নেই। বেড়া দেয়নি কেউ। সাবাড় হয়ে গেছে দেহটা। আর বেশ কিছু দূরে গোলমতন পলার মাথাটা পড়ে আছে। সেটার একমাথা ঝাঁকড়া চুল। আর তাতে— কুঁচকে, ঘষা খেয়ে, চুবড়ে গিয়ে, থল-থল করছে অসহ্য কালো দুটি চোখ।

—————————————-

ওয়াসিকা নুয্হাত
তবুও একা মেয়েটি

নিশাদের বাসাটার একটা বড় সড় দোষ আছে। এ ঘরের কথা ও ঘরে শোনা যায়। প্রাইভেসি নামক জিনিসটা একেবারে নেই বললেই চলে। আজকাল প্রায় প্রতিরাতব্যাপী আর মায়ের ঝগড়া শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাওয়াটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে তার। সে ঘুমিয়ে পড়লেও বাপীদের ঝগড়া চলে প্রায় সারা রাত ধরে। কখনো কখনো আবার নিশার ঘুম ভেঙে যায় মায়ের গোঙানির শব্দ শুনে। বাপী তখন আজেবাজে ভাষায় মাকে গালাগাল দেয়। নিশা দাঁত মুখ খিচিয়ে মটকা মেরে পড়ে থেকে এইসব তা-ব শোনে। আজকে নিশা বাপীকে বলতে শুনলো,

—তোমারে তো দুইদিন আগেই পাঁচ হাজার টাকা হাতে তুইলা দিলাম, এর মধ্যেই উড়ায় ফেলসো?

—উড়াইলাম কখন? তোমার মেয়ের টিউশন ফি দিতেই পুরো চার হাজারটা টাকা চলে গেল, এরপর যা ছিল তা দিয়ে বাজার করলাম, টাকা কি আমার কাসে থাকলে পাঙ্খা মেলে? নাকি আমি টাকার গাছ লাগাইসি!

বাপি রাগে গজগজ করে বলল,

—আমি আর কোনো টাকা পয়সা পারবনা, আমার পক্ষে সম্ভব না।

—ঠিক আসে তুমি দিওনা, আমারে চাকরী করতে দাও! তাহলে তো সংসারে আমি কিছুটা হলেও কন্ট্রিবিউট করতে পারব।

—না আমি মেয়েছেলের চাকরী করা পছন্দ করি না

—তাহলে কি করতে বল? কি করব আমি? এইভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরব!

বাপী বিড় বিড় করে কিসব যেন বলতে লাগলো। মা বলল,

—তোমার মত মানুষের সাথে এক ছাদের নিচে বসবাস করা যে কি দুর্বিষহ ব্যপার এটা শুধু আমি বুঝি, মেয়েটা না থাকলে লাথি মাইরা তোমার এই সংসার ফেইলা চইলা যাইতাম।

বাপীর গলার আওয়াজ বাড়তে থাকে, এক সময় আজেবাজে গালাগাল দেয়া শুরু করে মাকে। সম্পর্কগুলো এভাবে এলোমেলো হতে থাকে আর নিশা এই সম্পর্ক এলোমেলো হবার গল্পটা প্রতি রাতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুনতে থাকে।

আজকে অবশ্য তার মন বিশেষভাবে খারাপ। আজকেই তমালের সাথে ওর ব্রেকআপ হয়ে গেল। তমাল ওর সাথেই এবার এইচ এস সি পরীক্ষা দিল। mentors এ ভর্তি কোচিং করছে দুজন এখন একই সাথে। আজকে রিকশা দিয়ে আসার সময় তমাল হঠাৎ বলল,

—আচ্ছা বলতো? বিয়ের পর আমরা হানিমুন করতে কোথায় যাব?

নিশা চমকে উঠে বলল,

—বিয়ে? বিয়ে করছে কে শুনি?

—কি বলছিস?

—মানে বিয়ের ব্যপারটা আসছে কেন?

—তুই আমার কি লাগিস নিশা? তমাল বলল একটু ঢং করে।

—ফ্রেন্ড+গার্লফ্রেন্ড! বলে নিশা একটা হাসি দিল।

—তো গার্লফ্রেন্ড কেই তো মানুষ বিয়ে করার চিন্তা ভাবনা করে, তাই না?

নিশা আঁতকে ওঠা গলায় বলল,

—প্লিজ তমাল, এইসব বিয়ে টিয়ের চিন্তা ভুলেও করিস না!

— কেন, তমাল কিন্তু ভীষণ অবাক!

—কেন আবার! বিয়ে মানেই ঝামেলা। আমরা বিয়ে না করলেই ভালো থাকব, বিয়ে করলেই দেখবি একজন আরেকজনকে সহ্য করতে পারব না, এটা ওটা নিয়ে ঝগড়া লাগবে সারাদিন, জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে যাবে!

—তুই এসব কি বলছিস নিশা? আমাদের সম্পর্কের প্রায় একটা বছর কেটে যাবার পর তুই এসব কথা বলছিস?

—আরে আজব! আমি কি কোনো দিন তোরে বলসি যে আমি তোরে বিয়ে করতে চাই? তুই বল! বলসি কখনো?

—না, তা বলিসনি।

—তাহলে?

তমাল হতবাক হয়ে প্রলাপ বকার মত বলে,

—তাহলে সব কিছু মিথ্যা!

—কি মিথ্যা?

—আমাদের ভালবাসা!

নিশা খুব গভীরতার সাথে বলল,

—মিথ্যা হবে কেন? আমি তোকে এখনো প্রচ- ভালবাসি! কিন্তু বিয়ে করতে পারব না। বিয়ে করলেই তোকে আমি হারিয়ে ফেলবো! আর আমি তোকে হারাতে চাই না কখনো!

তমাল রিকশাঅলাকে থামিয়ে দিয়ে চট করে নেমে পড়ল রিকশা থেকে। নিশা আর্তনাদ করে উঠলো,

—কি হলো!

তমাল ভূতগ্রস্তের মত বলল,

—না আর একটা মুহূর্তও আমি তোর মত মেয়ের সাথে থাকতে পারব না, why the hell are you playing with me! এত দিন ঘোরাঘুরির পর তুমি এখন বল্তসো আমরে বিয়া করার কোনো প্ল্যান নাই তোমার? মানে কি!

নিশা বিপন্ন গলায় বলল, আহা! তুই কেন কখনই আমি কাউকে বিয়ে করব না! বিয়ে সাদী এইসব

social bindings! I just hate those things!

—okey fine! তোমার মত unsocial একটা মানুষের সাথে আমার থাকা সম্ভব না, আমার সাথে আর কখনো কোনো যোগাযোগ করবা না।

—মানে কি, are you breaking up with me নিশা বলল করুণ স্বরে।

—ইয়েস I am breaking up with you! … you slut!

তমাল চলে গেল। নিশাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই। তমালটা কি বোকা! তমাল জানে না বিয়ে করে মানুষ কখনো সুখী হয় না। বিয়ে মানে সম্পর্কের জোড়া লাগা নয়, বরং ভেঙ্গে যাওয়া। নিশা তার ছোটবেলা থেকে এই সত্যটা অনুধাবন করে এসেছে। বাপীকে, মাকে কত কত দিন হয়ে গেল নিশা এক সাথে হাসতে দেখে না, নরম স্বরে কথা বলতে দেখে না একজন আরেকজনের সাথে। অথচ মায়ের কাছেই নিশা শুনেছে বিয়ের আগে তিন বছর প্রেম ছিল বাপীর সাথে। তাহলে বিয়ের পর কি করে সেই প্রেম কোথায় উধাও হয়ে গেল? ছিঁটেফোঁটাও কেন নেই এখন আর? তমালকে বিয়ে করে নিশা ঠিক এই ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি চায় না। তমাল এই সহজ কথাটা বুঝতে চাইল না। এত বোকা ছেলে!

মাথার ভেতরটা কেমন ওলটপালট লাগতে লাগলো। পাশের ঘরে এখনো তা-ব চলছে। এদিকে তমালের ফোন কোনোভাবেই লাগছে না। ওর সবকটা নম্বর বন্ধ। মনে হচ্ছে চারপাশটা যেন কাঁচের টুকরোর মত ভেঙ্গেচুরে খান খান হয়ে যাচ্ছে। পাগল পাগল লাগছে। আচ্ছা! পাশের ঘরের মানুষ দুটো এতটা স্বার্থপর কেন! দিনের পর দিন তারা একে অন্যের সাথে জন্তুর মত ঝগড়া করে যায় কিন্তু একটা বারও ভেবে দেখে না যে তাদের এই কার্যকলাপ নিশার মনে কি প্রভাব ফেলতে পারে। তারা কি একটাবারের জন্যও বোঝে না তাদের দুজনের এই সম্পর্কের টানাপোড়েন যে নিশাকে দিনকে দিন নিঃশেষ করে দিচ্ছে? হায় খোদা! এমনই যদি নিজেদের মাঝে বুঁদ হয়ে থাকা তো সন্তান জন্ম দেয়া কেন? এ কারণেই! ঠিক এ কারণেই নিশা চায় না বিয়ে করতে, সংসার করতে, বংশবৃদ্ধি করতে। এইগুলা যত্তসব বুলশিট সোশ্যাল কনসেপ্ট। পৃথিবীতে আসলে ভালবাসা বলে কিছু নেই। এই যে তমাল কি সুন্দর লেজ গুটিয়ে পালালো! একটাবার নিশাকে বোঝার চেষ্টা করল না। ভাবলো না যে এভাবে break up করলে নিশার উপর দিয়ে কি যাবে! কেউ নিশার কথা ভাবে না! সবাই স্বার্থপর! এই দুনিয়াটাই স্বার্থপর! কেউ ভালবাসে না তাকে! কেউ না! ভালবাসা বলে আসলে কিছু নেই এই পৃথিবীতে। কিচ্ছু নেই! মনের মাঝে তোলপাড় শুরু হয়। চারপাশ অন্ধকার লাগে। সমস্ত রক্তে রক্তে যেন বিষ ছড়িয়ে পড়ছে। একা লাগতে থাকে। বড্ড একা!

বুকশেলফের এক কোণায় ঘুমের ওষুধের শিশিটা ছিল। নিশা সেটা হাতে তুলে নিয়ে একটা একটা করে দশটা ওষুধ মুখে পুরলো। এক গ্লাস পানি গলায় ঢেলে দিয়ে গিলে ফেলল ওষুধগুলো। এক ঝটকায় পাশের ঘরের দরজাটা খুলে ফেলল খুব সাহসের সাথে। বাপী আর মার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো,

what the hell is going on? প্রতিটা দিন তোমাদের এইসব নাটক না করলেই নয়? আমি! আমি জাস্ট হেট করি তোমাদেরকে! I just hate you!

ঘরের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। বাকি দুটা মানুষ মূর্তির মত থ মেরে রইলো। তারা কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না।

নিশার বাবা মা প্রায় দুএক ঘণ্টা সময় চলে যাবার পর টের পেল যে নিশা suicide attempt করেছে। তড়িঘড়ি করে নিয়ে আসা হলো তাকে হাসপাতাল। তমালও কোথেকে যেন খবর পেয়ে ছুটে আসল। নিশাকে যখন ডাক্তাররা ভেতরে নিয়ে গেল ঘুমের ওষুধগুলো ওয়াশ করে নিয়ে আসার জন্য, বাইরে তখন হসপিটালের ওয়েটিং রুমে বাপীর গলা জড়িয়ে ধরে মা খুব কাঁদছিল। আজকে কত কত দিন পর এই দুটো মানুষ এতটা কাছাকাছি আসলো! তমাল বসে আছে একটু দূরে একটা চেয়ার এ উদ্ভ্রান্তের মত। নিশা চোখ খুলবে কিনা কে জানে! ওরা জানে না নিশা যদি চোখ খুলে তার বাপী আর মাকে এতটা কাছাকাছি দেখত তবে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়েটা হত! ওরা জানেনা নিশা কত কত দিন ধরে অপেক্ষা করছে এরকম একটা দৃশ্য দেখার জন্য। নিশা যদি চোখ খুলে দেখত তবে হয়তো বিশ্বাস করত যে পৃথিবীতে এখনো ভালবাসা নামক জিনিসটা কিছুটা হলেও রয়ে গেছে। সেই ভালবাসার টানেই সম্পর্কগুলো বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকবে।

————————————-

তাশরিক-ই-হাবিব
ভীমরতি

আমি আসলে গুছিয়ে উঠতে পারছি না, কীভাবে আমাদের মনের ভাবনাগুলোকে প্রকাশ করব। ‘আমাদের’ সর্বনামটি ব্যবহার করছি এ কারণে যে, ব্যক্তি আমার সঙ্গে আমার পরিবারের মানুষজনের তো বটেই, পাড়া-মহল্লা-হাট-বাট-নগর-বন্দর-খেত-খামারের আরো অগণিত মানুষের নিত্যদিন না হোক, পুরো বছরে কয়েকবার বেশ আলাপ জমে, নাকি! তখন যেসব প্যাঁচাল আমরা পারি, তা মোটেই ব্যক্তিক নয়, পুরোদস্তুর সামষ্টিক। এটা তো রুশোরই মত— মানুষ সামাজিক জীব— আর বহুজনকে নিয়েই সমাজের উদ্ভব! কাজেই সমাজের সঙ্গে নগর আর রাষ্ট্রকে মিলিয়ে নিলে আমার কথাগুলো শেষপর্যন্ত আর আমার না থেকে চারপাশের বহু মানুষের কণ্ঠস্বরও হয়ে ওঠে না! কি দরকার আছে বাংলা নাগ-নাগিনীর সিনেমার একগাদা ক্যারেক্টার নিয়ে বানানো ওসব প্যানপ্যানানি অনুসরণ করার! তার চেয়ে বরং গ্রিক নাটকের উদাহরণ দিয়ে বলতে গেলে, অ্যারিস্টোফেনিস বা ইউরিপিদিস বা সফোক্লেস বা স্কাইলাস প্রমুখের কোনো নাটকের কোরাস কণ্ঠকে অনুসরণের জন্য আমি আপনাদের উদ্বুদ্ধ করব। আর, মোটাদাগে, আমার কথাগুলো তো আসলে আমার নয়! আর সেই অধিকার দাবি করাও আমার সাজে না। কারণ আমি তো আর স্বয়ম্ভূ নই, যে নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করে আবার নিজেতেই বিলীন হয়ে যাব! আমার মা-বাবার সামাজিক পরিচয় এবং বায়োলজিকাল ফাংশনের জের ধরে আমার জন্ম। আর পরিবারে বেড়ে ওঠার সূত্রে সামাজিকীকরণের সবগুলো মাধ্যমের সঙ্গে আমার দিব্যি পরিচয়ের পালাও শুরু হয়েছে দুধ পানের কাঁসার গ্লাস আর ঝিনুকের চামচ ছেড়ে দেবার বয়স থেকেই! কাজেই আমার কথাগুলোর মধ্যে আপনারা পাবেন বাখতিনকথিত বহুস্বরবিশিষ্ট মানুষগুলোর নানা অভিব্যক্তি, তবে তা কোনোমতেই হেটেরোগ্লসিয়া নয়। আপনারা তো আবার বেশি বোঝেন! পলিফনি আর হেটেরোগ্লসিয়ার ভিন্নতা না বুঝলে ভট্টাচার্যমশায়ের দ্বারস্থ হতে পারেন। এ বিষয়ে তাঁর যে তত্ত্ব আর প্রায়োগিক ধারণা, এর পাশাপাশি বাখতিনের নামধারী বাংলা বই পড়লেও কিছু কাজে আসবে। নিদেনপক্ষে স্মার্টফোনে গুগল নামের দৈত্যকে কাজে লাগিয়ে এ রিলেটেড এন্ট্রিগুলো চেকআপ করতে পারেন। অবশ্য আমি পারতপক্ষে ব্যাকডেটেড মানুষ, টেকনোলজি ব্যবহারে। তাই আদ্যিকালের বাটন সেটেই কাজ চলে। আমি কখনোই স্মার্টফোনের পক্ষপাতি নই। ইন্টারনেট মানে সবকিছু চাইলেই হাতের মুঠোয়। আপনার মনোযোগ কেড়ে নেবার উপায় আর কি! গ্লোবালাইজেশনের একজামপল হিসেবে বেশ লাগসই! দেখুন মশায়, বিনা কারণে আমি এসব লেকচার দিচ্ছি না। আমার কথা যেহেতু আমাদেরই কথা আর আমি শিল্প-সাহিত্যের কলাম দু-চার পাতা লিখে হাত মোকশো করার পাশাপাশি লম্ফঝম্ফ চালাচ্ছি কলেজের গরুগুলোকে মানুষ বানাতে, তাই এসব কথা আগেভাগেই খেয়াল না করলে পরে কিন্তু ধৈর্যে কুলোবে না। আপনি যে বিনা কারণে আমার বাড়ি আসেননি পূর্ণিমাশোভিত চন্দ্রকলাতুল্য বদন প্রদর্শনপূর্বক, তা আমি বেশ বুঝতে পারছি। একবার ‘আপনি’, একবার ‘আপনারা’ এ ধরনের সামঞ্জস্যহীন সম্বোধনের রহস্যটা কি টের পেতে শুরু করেছেন! এখানে আমার বক্তৃতা চলবে ভিন্ন রীতিতে। আপনি আসলে একজনই, যিনি আমার বাড়ি এসেছেন। কিন্তু আপনার ভেতরে লুকিয়ে আছে আরেকজন মানুষ, যে তার মতো করে নিজেকে প্রায়শই মেলে ধরতে পারে না। সে আপনার সামাজিক সত্তার কাছে বরাবর শৃঙ্খলিত। কিন্তু তাতে কি! সেই ভেতরের জন আর আপনি, মানে সহজ ভাষায় আমার চোখের সামনে বসে থাকা দেহকাঠামোবিশিষ্ট মানুষটি আর তার ভেতরে ছায়ার মত লুকিয়ে থাকা আরেকজন বা আপনার ইনার বিয়িং মিলে তো দুজনই হলেন, নাকি! আর দুজন মানে প্লুরাল বা ‘আমরা’! সঙ্গে আছি আমি, আর আপনার কল্পনায় আমার ভেতরের আমি। তো চারজনের কণ্ঠস্বর তো নিদেনপক্ষে দুজনের মুখ দিয়ে শোনা সম্ভবই! হ্যা, কোনো চর্মচক্ষুবিশিষ্ট মানুষের পক্ষে ভেতরের সত্তাকে দেখা বা শোনা অসম্ভব। তবু, ভেবে নিলে, মানে কল্পনা করলে কিছু অসম্ভব নাকি! না, আমি আপনাকে বঙ্কিমবাবুর কমলাকান্ত হবার পরামর্শ দিচ্ছি না। আফিমটাফিমের যুগ বহুকাল আগেই ফুরিয়েছে। এখন হল দারু পিকে ড্যান্স করার যুগ, বুঝলেন! কিন্তু সেটিও আবার আমাদের সমাজে চলবে না। তবে আপনি ঘরের দরজা জানালা এঁটে ছিপি খুলে বোতলে দুচুমুক দিলেন কি না, তা দেখতে আপনার ঘরের কোণে উঁকি মারার মতো অসভ্য সমাজের বাসিন্দা আমরা এখনো হইনি, নাকি বলেন! এবার কাজের কথায় আসি। আপনারা এসব কথা জানেন, শোনেন এবং আলবত বোঝেন। কারণ আমাদের জীবনে তেমন ভিন্নতা বা ছন্দপতন নেই। মোটাদাগে আমরা একই সমাজের একই লেভেলের বাসিন্দা আর একই ক্যাটাগরির লাইফস্টাইলে অভ্যস্ত। কেননা, এই বৈচিত্র্যহীন শহরে ভিন্নভাবে বেঁচে থাকার তেমন সুযোগ যেমন আমাদের মেলে না, তেমনিভাবে আমরা নিজেরাও নতুনত্বের পথে ঝুঁকি নিতে ভয় পাই। আপনার বা আমার পক্ষে কি সম্ভব, লন্ডন-আমেরিকার সাহেবদের মতো সি বিচে উদোম গায়ে ষোড়শীকে নিয়ে সানবাথ করা, নিদেনপক্ষে হাত ধরে হাওয়া খেতে যাওয়া! আহা! অমন আমসির মতো মুখ করে রেখেছেন যে! সুনীলবাবুর উপন্যাসে পড়েননি! আরে, ওই যে, ছেলেটি, যখন প্রথম গেল আমেরিকায়, এক হোটেলে গিয়ে বুড়োর সঙ্গে দেখা করল না, চাকরির জন্য! সেই বেল্লিক তখন কি করছিল! টাইয়ের সাইজের বন্ধনীমোড়ানো রূপসীর সঙ্গে জলকেলি করতে করতে সে কি চমৎকারভাবেই না যুবককে সাইজ করল! আমি আপনি তা সাতবার জন্ম নিয়েও কি পারব! অতদূর বাদ দিন। শীর্ষেন্দুর ‘পার্থিব’ পড়েননি! অনু নামের টগবগে কিশোরীটি যে নায়ক — রামলাল না কি যেন  নাম ছাই, ওই যে দেশবরেণ্য বিজ্ঞানী, যার স্ত্রী আর বড় বড় ছেলেমেয়ে আছে, তাকে দিনে-রাতে ফোন করে বলে, দাড়িগোঁফে তাকে দেখতে হেব্বি ম্যানলি লাগে, কেন তিনি শেভ করেন না, সময়ের অভাব নাকি অন্য কিছু, এরকম কি আপনার আমার কপালে কখনো জুটবে! একালের মেয়েদের কি সময় আছে, আপনার আমার দিকে ভুলেও ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার! আর সিবিচ দূরের কথা, আপনি আমি কি রমনাপার্কেই যেতে পেরেছি আমাদের ইহকাল-পরকালের ধর্মপতœীকে সঙ্গে নিয়ে বেঞ্চে বসে বাদাম খেতে খেতে একে অন্যের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে রবীন্দ্রনাথের বা নজরুলের বা জীবনানন্দের বা  অন্য কোনো কবির রোমান্টিক কবিতার দু লাইন, অন্তত কোনো হিট গানের একটি কলিও একে অন্যকে গেয়ে শোনাতে! আমাদের সম্পর্কটা আসলে একেবারেই বাজারের আলুপটলঝিঙ্গাউচ্ছেশাকপাতাকাঁচকলার মতো আলুনি হয়ে গেছে, জানেন! এই যে, রমনা পার্ক, নামটি শুনতে জব্বর খাসা, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসটুকু এই সুযোগে জেনে রাখুন। আপনি যে সাহিত্যরসিক নন আর ব্যাংকের হিসাব নিয়ে সকাল থেকে রাত অবধি ব্যস্ত থাকেন, আমার পইপই করে জানা আছে। তার মানে আমি যে আপনাকে ক অক্ষর গোমাংস ভাবছি, ভুলেও ভাববেন না। তবু, এ ব্যাপারে যেহেতু সম্প্রতি দুপাতা পড়া হয়েছে আর আপনারও তেমন তাড়া নেই উঠবার, তো বিস্কুটের প্লেট খালি না হওয়া পর্যন্ত কর্ণকুহরে আমার বাচালতাকে নাহয় প্রশ্রয় দিলেনই এক বেলা! যাকে রমণ করা হয়, সে-ই রমণী— সাধারণ কা-জ্ঞানটুকু যার আছে, সে অন্তত এটুকু মুখ ফুটে বলতে পারবে বলে আমার ধারণা। তার মানে আপনিও আমার সঙ্গে একমত। কিন্তু মশাই, এর আড়ালে ভিন্ন প্যাচাল আছে। প্রথমে রমণ শব্দের আড়ালে প্রযুক্ত হত সুন্দর, মনোহর প্রভৃতি বিশেষণ। তার মানে, কোনো সুন্দর  বা সুদর্শন পুরুষকেও বলা হত রমণ, নারীর ক্ষেত্রে রমণী। কিন্তু যখন অর্থ, ক্ষমতা, শক্তির অনুরাগী পুরুষতন্ত্র নারীকে নিজের আয়ত্তে এনে ফেলল, রাতারাতি এ শব্দের অর্থ বদলে গেল! তখন আর এ শব্দের সঙ্গে পুরুষের যোগসাজশ মান্যতা পেল না। ফলে রমণ শব্দের মানে হয়ে গেল পুরুষের কামচাহিদা পূর্ণ করা। আর যেহেতু নারীকে দিয়েই পুরুষ এ কাজ করে, তাই নারী হল রমণী। কিন্তু আপনি ভেবে দেখুন. গ্রিসে, আর অন্য নানা সভ্যতায় প্রাচীনকাল থেকেই পুরুষে পুরুষে দিব্যি সম্পর্ক হত, ছিল। ইলিয়াসের বিভিন্ন গল্পে বারবার হুট করে কেন বালকেরা ‘মালিশ’ এর আমন্ত্রণ জানায়, বলেন দেখি! তার মানে পুরুষকেও রমণ করা হত, আর এখনো যে আড়ালে আবডালে হয়, তা কে না জানে! দেখেন না, হঠাৎ হঠাৎ পত্রিকার পাতায় অনেক লুকিয়ে ছাপিয়ে খবর আসে, অমুক কর্তৃক অমুককে বলাৎকারের/যৌন নিপীড়নের/ধর্ষণের অভিযোগ! আমার কথাগুলোকে আপনি এক অর্থে ধরে নিতে পারেন ফ্রয়েডীয় ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন। মানে, প্রতিদিনের যান্ত্রিক জীবনে নানাভাবে অবদমিত হতে হতে আমরা যে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ি, তা থেকে মুক্তিলাভের জন্য মনের ভেতর জমে থাকা গোপন, অনাকাক্সিক্ষত, লজ্জাজনক আর পীড়াদায়ক অথবা একান্ত কাম্য নানা ভাবনা আর আবেগকে অকপটে বলে ফেলে এরিস্টলীয় ক্যাথারসিস টাইপ অথবা বৌদ্ধিক নির্জ্ঞান টাইপের অথবা সাধারণ মানুষের বীর্যপাতজনিত আনন্দ লাভের মতোই কিছু উপভোগ করি আর কি! স্যরি, অশ্লীল শোনালেও আপনি/আমি পঞ্চান্ন-ছাপান্নোর বা কাছাকাছি বয়সের আর পুরুষ মানুষও, তদুপরি সংসারী এবং এখনো ধ্বজভঙ্গ নই, বোধহয়! কাজেই নিষিদ্ধ শব্দটি প্রকাশের সামাজিক ট্যাবুকে আমি যে! জোর করেই উচ্চারণ করে আপনাকে এক ধরনের অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছি. সেজন্য আপনি কিছু মনে করলেও আমি মোটেই বিব্রত নই। কদিন আগে বাসে চড়ে বগুড়া যাচ্ছি,  উঠতি বয়সের ছেলেপুলে অজস্র। পাশের সিটে বসা দুজন ছোকরার বকবকানিতে ঝিমুনি বারবার কেটে যাচ্ছিল। তাদের কথার টুকরোবিশেষ এখনো মাথায় গেঁথে আছে। একজন বলছিল, ‘যে দাঁড়ায়, সে-ই নায়ক’। অন্যজন হা হা করে হাসতে হাসতে অবলীলায় জায়গামতো হাত বাড়িয়ে তার নায়কত্ব পরীক্ষা করছিল, একটু এদিক সেদিক ফিরে। বুঝুন অবস্থা! অবদমনের কত রকমফের যে নিত্যদিন আপনার আমার মনের ভা-ারে জমছে! যাত্রীবোঝাই বাসে চড়ে যেতে যেতে কত ধরনের অভিজ্ঞতা যে হয়! আপনিও তো আমার পথেরই পথিক! খেয়াল করেছেন, সিট না থাকলে দাঁড়িয়ে যাওয়া যাত্রীদের কেউ কেউ, যারা অলওয়েজ পুরুষ, তাদের শরীরের বিশেষ কিছুর চাপ আপনার কনুই বা আশেপাশের অন্যত্র লাগে, যদি আপনি তার পাশের সিটে বসা থাকেন! আর তারা তখন ভুলেও আপনার দিকে তাকাবে না। এমন ভান করবে, যেন কিছুই ঘটছে না! আরে বাবা, রক্তমাংসের মানুষের শরীরে আগুন তো থাকবেই। পঞ্চভূতের কারবারী আমরা। কাজেই ঘুমন্ত বাঘ যদি জেগেই ওঠে, সেই পরিস্থিতিতে আপনাকে এটুকু নীরবতা সহ্য করতেই হবে। তবে হ্যা, আপনিও যদি পাল্টা ভেতরে ভেতরে ক্ষরিত হতে থাকেন অথবা চোখ বুঁদে ফ্যানটাসির রাজ্যে প্রবেশ করেন, তাহলে সেই বাস্তবতাকেও দিব্যি সহনীয় কি, বরং একান্ত কাম্য মনে করতে পারেন! বুঝতেই পারছেন, একেবারে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া এসব কথা বানিয়ে বলা অসম্ভব! আর আপনি যেহেতু আমারই মতো, তাই আপনিই বিষয়গুলো বুঝবেন, বাচ্চাকাচ্চা পেলেপুষে বুয়ার সঙ্গে নিত্যদিন যুদ্ধ করে যাওয়া আমার ধর্মপতœী নন! আপনি হয়ত জগিং করতে করতে কাল সকালেই অকপটেই আমার কাছে এ গল্পও করতেন! শোনানও তো এ ধরনের নানা গল্প! তবে এবার আমি বাজি জিতে নিলাম, কি বলেন! ফ্রয়েড সাহেব কি করতেন, এ গল্পটা মওকা পেয়ে  বলে ফেলি। অনেক রোগী তার কাছে আসত। তারা তাদের নানা মানসিক সমস্যা নিয়ে কথা বলত। তিনি করতেন কি, তাদেরকে একটি নির্জন কেবিনে রাখা ধবধবে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তাদের যা খুশি বলে যাওয়ার সুযোগ দিতেন। তারপর সেগুলো নিয়ে গবেষণা করতেন। তার ধারণা, বেশির ভাগ মানুষের মানসিক আর বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার মূলে আছে মনের গুহায় জমতে থাকা তথাকথিত পাপ, অন্যায়, আর নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত ভাবনা, ইচ্ছা আর আকাক্সক্ষার সমাবেশ, যেগুলো সে মেটাতে পারেনি। একথা কি আপনার বা আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য! অবশ্যই। একটু আগে গ্রিক বালকদের কথা বলছিলাম। গ্রিসের অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষ ছিলেন এরকম। আর আপনি জানেন, এটা জোর করে হয় না। কেউ যদি নিজে থেকে এর প্রতি আগ্রহ বোধ না করে, এটা অসম্ভব। আবার জোর করে লুকানোর চেষ্টাও অসম্ভব। আপনি আপনার স্বভাবজ প্রবণতাকে কীভাবে এড়িয়ে যাবেন? ইয়ুঙ এর অ্যানিমা আর অ্যানিগমা থিয়োরি জানেন তো! আপনার-আমার প্রবল পুরুষ স্বভাবের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ঘুমন্ত নারীটি কখন জেগে উঠবে আর কখন বাস্তবে বা কল্পনায় যথেচ্ছ বিহারে লিপ্ত হতে চাইবে, কে জানে! এই ধরুন, জাস্ট, কথার কথা, আপনি নিজেই যে কখনো কখনো সেই প্রফেসরের গল্পটি আমায় বলেছেন, এবং সময়ে সময়ে এর ভার্সন বদলে ফেলেছেন, এর পেছনে আমার কিছু লজিক আছে। আগেই বলে নিই, আজ আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে বিনা কারণে আসেননি। এবং ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে যাবার আগমুহূর্তে হলেও বা এর আগেই, এমন কোনো বিষয়ের অবতারণা করবেন, যার সঙ্গে ট্যাবুর ট্যাগ লাগানো এসব বিষয়ের কোনো না কোনো যোগসাজশ আছে! আচ্ছা, মনে আছে আপনার, কার কাছে যেন শুনেছিলেন, আপনার শালাই বোধহয় গল্প করতে করতে বলেছিল আপনাকে, ডাকসাইটে আর ভয়ংকর বদমেজাজি, ড্যামস্মার্ট এক প্রফেসর তার ক্লাস নিতেন।  দেখুন, আমি প্রফেসর শব্দটি দিয়ে পুরুষকেই বোঝাচ্ছি। অথচ এটি একটি পদ, যার অধিকার নারী শিক্ষকদেরও সমান সমান। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার একটি নমুনা এটা। তো, সেকেন্ড ইয়ারের কথা। একদিন তাঁর মেজাজ বেশ ভালো ছিল। তিনি সবসময় রাশভারী থাকেন। ফলে, তার সঙ্গে কথা বলতে কারো সাহসে কুলোয় না। তো, সেদিন তিনি কি কথা প্রসঙ্গে দেখতে বেশ সুঠাম, গোঁফদাড়িওয়ালা এক ছেলেকে হুট করে ক্লাসে দাঁড় করালেন। তার সঙ্গে বই-খাতা নেই, এ নিয়ে প্রফেসরের কোনো বিকার নেই। কারণ তার ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয়ে রেগুলার ক্লাস করে, লাইব্রেরিতে গিয়ে যেসব ছেলেমেয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে, তারা নিঃসন্দেহে গবেট। তবু তিনি তার প্রতি রেগে গেলেন। কারণ, ছয় মাস পেরিয়ে যাচ্ছে, এখনো বুদ্ধদেব বসুর পাঠ্য উপন্যাসটি সেই ছেলে পড়েনি। তিনি তাকে অপমানজনক প্রশ্ন নিক্ষেপ শুরু করলেন। কি কর? বই পড়ার সময় হয় না যে! সে তো থতমত! এ কি সর্বনাশ! ক্লাসে সে কালে ভদ্রে হাজির থাকে। আজ সে উপস্থিত। আর আজই কিনা শনির দশা তার ওপর! সে চি চি মানে  জি জি করছে। একটু সামলে নিয়ে বলল, বাবা প্যারালাইজড, মা ছাড়া ফ্যামিলিতে আছে তিনভাই আর এক বোন। চারজনই তার ছোট, স্কুল-কলেজে পড়ে। তাই দিনরাত কোচিং, টিউশনি নিয়ে ব্যস্ত। তিনি আবার বললেন, বয়স তো দেখেশুনে কম মনে হয় না। ইয়ার ড্রপ আছে নাকি! জি স্যার। আচ্ছা। তো দিনরাত কি সংসারের ঘানিই টানবে নাকি নিজের সংসার-টংসার করতে হবে? না মানে স্যার, নিজের পায়ে আগে দাঁড়িয়ে নিই, এখন তো পড়ালেখা করছি! তা আর ক বছর লাগবে? সে কোনোমতে দায় সারতে বলল, আরো তিন-চার বছর! এত দিন! তা, তুমি যখন নিজের পায়ে দাঁড়াবে, সে কি আর দাঁড়াবে! এক শব্দ দিয়ে তিনি তাকে ‘সাইজ’ করে দিলেন। সেই ছেলে লজ্জায় আর তার ক্লাস করেনি। তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘দাঁড়ানো বাতেন’। এর অন্য ভার্সনে আপনি বলেছেন, প্রফেসর নাকি তাকে বলেছিলেন, বিয়ে না করে তোমার মতো এমন অশেষ স্বাস্থ্যবান যুবক কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে? এর গোপন রহস্য কি? তুমি দেখছি যযাতির ছেলে পুরুকে হার মানাবে! ও, আপনি তো আবার এই বৃত্তান্ত জানেন না। আপনাকে এসব বলে লাভ কি! আপনি আপনার শালাকে জিজ্ঞেস করেননি, যযাতি আর পুরু কে? আমি জানি, আপনি জিজ্ঞেস করেননি! কারণ আপনার কাছে এটা নিছকই একটা গল্প, তাও আবার শালার মুখ থেকে শোনা ইয়ারকি গোছের! কিন্তু এর আড়ালে যে ছ্যাডিজম লুকিয়ে আছে, তা আমার কথা থেকে বেশ বুঝতে পারবেন। প্রফেসর সাহেব যে ঐ ছেলেটি, কি নাম যেন! দাঁড়ানো বাতেন, দুঃখিত, বাতেনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তার কারণ ছিল। সে দেখতে সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান আর পুরুষোচিত। তা নইলে ক্লাসে এত এত ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনি হঠাৎ তার দিকেই চোখ দিতেন না। তারপর আবার, এ গল্পের সূত্রে তিনি যেটুকু ব্যক্তিগত আলাপ করলেন তার সঙ্গে, এমনকি অন্যদের সামনে, তাতে বোঝা যায়, তিনি আড়ালে কিছু না বলে সবার সামনেই যা বলার বলে স্যাটিছফাইড হতে চেয়েছেন। একটি উদাহরণ যোগে ব্যাপারটা ভালো বুঝবেন। পয়ষট্টি পেরুনো আরেক রিনাউন্ড প্রফেসর অনুষ্ঠানে গেছেন, সভাপতি হিসেবে। উপস্থাপিকা তারই ছাত্রী। তিনি সিঁড়ি বেয়ে স্টেজে উঠতে পারছেন না, পায়ে ব্যথা বলে। ছাত্রীর কাঁধে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। সবাই বিষয়টা বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। কেননা, এটা তো সাদা চোখে পরস্পরের প্রতি ভক্তি আর বাৎসল্যের বহিঃপ্রকাশ, তাই না? পরে জানা গেল, মেয়েটি নাকি কাকে কাকে বলে বেড়িয়েছে, ঐ শিক্ষককে সে আর ভক্তি করে না। কারণ তার আঙুলের স্পর্শে এমন কিছু ছিল, যাতে মেয়েটি অপমানিত বোধ করেছিল। শুধু তাই নয়, একপর্যায়ে প্রতিযোগিতায় বিজয়িনীদের একজনের হাতে  ক্রেস্ট তুলে দেবার পর হ্যা-শেক করার সময় তিনি নাকি জোর করে অনেকক্ষণ তার হাত চেপে রেখেছিলেন, ছবি তোলার হাস্যোজ্জ্বল পোজ দেয়ার অজুহাতে। মেয়েটির বোধহয় ধারণা, বুড়োদের মেশিনগান ঠিকমত কাজ না করলে হাতের আঙুলের সঙ্গে একটা অদৃশ্য জিভ গজিয়ে অবদমিত কামনাকে পুরো করে। তো, যা বলছিলাম, বাতেনের প্রফেসর এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে নিজের অবদমিত আকাক্সক্ষাকেও প্রকাশ করেছেন। খোঁজ নিয়ে দেখুন, তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা কেচ্ছা শুনতে পাবেন। এমন দু-চারটা আমার অজানা নয়। ইনি একেবারেই যযাতির স্বভাবের, যে কিনা যে কোনো কিছুর বিনিময়ে যৌবনকে উপভোগ করতে চায়, এমনকি শ্বশুরের অভিশাপে জরাগ্রস্ত হলে নিজের ঔরসজাত ছেলেদের কাছেও যৌবন ভিক্ষা চায়। বুঝুন, এককালে যৌবন কতটা দামি ছিল যে, আত্মসম্মান ভুলে মানুষ একে ভিক্ষা করত! তাও একজন দুজন নয় পাঁচ ছেলের কাছেই। আর এখন তো অবিরাম চলে এর অযাচিত অপচয়! মধুসূদন বলেছিলেন কি, জানেন! ‘যৌবনে অন্যায় ব্যয়ে, বয়সে কাঙালী’। যেন যযাতিকে উদ্দেশ্য করেই বলা, না? পুরু ঠিক বাতেনের স্বভাবের, যে কিনা নিজের কামনাকে পরিতৃপ্ত করার পরিবর্তে অন্যের সন্তুষ্টিকেই গুরুত্ব দেয়। এ ধরনের ছেলেদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ম্যাছোচিজম। সহজ বাংলায় রাজশেখর বসুর সারানুবাদকৃত মহাভারত পড়লে বুঝবেন, অবদমন কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি। আর কত ভাবেই কামনা মেটানো যায়! আপনি মুখের সামনে দিব্যি পেপারটি নিয়ে বসে আছেন, আর আমার সাত রাজ্যের বকবকানি শোনার কি চমৎকার অভিনয়ই না করছেন! এমন ভাব, আমার অমৃতবচন শুনে আপনার হৃদয় প্লাবিত হচ্ছে শান্তিপারাবারের অমিয়ধারায়! আপনাকে যে এসব কথা বলছি, তা তো আর মুখ ফুটে বলা নয়! নিছক একটু হিসেব নিকেশ করে নিলেই বেশ বোঝা সম্ভব, সামাজিক পরিচয়ের খাতিরে আমরা কে কোন ধরনের লাইফ লিড করছি, আর কাকে কি বা বলার আছে! এবার বলি শুনুন, আপনি কেন এ গল্প দুটি বলেছিলেন, সে ব্যাপারে আমার অনুমান! এক, বয়সের বিবেচনায় আপনার পরিচিত মহলে এমন কেউ নেই, যার সঙ্গে এ ধরনের বিষয় নিয়ে মুখ খোলা যায়। অথচ দিনের পর দিন এসব কি সয়ে থাকা যায়! যখন তখন শরীর বিদ্রোহ করে, না? দুই, আপনার স্ত্রী প্যারানয়েডগ্রস্ত বলে আপনি ধারণা করেন, যা ভিন্ন কথাপ্রসঙ্গে আপনি বলেছেন। কাজের বুয়া আপনার বেডরুমে একটু বেশি সময় নিয়ে ঘর ঝাট দিলেও ওনার সহ্য হয় না। সে আপনার কাছে ছুটি চাইলে আপনি দিয়ে দেন, সে খুশি হয়ে হাসে বলে ভাবী বিরক্ত হন। আপনার ফোনও তিনি নাকি মাঝেমধ্যে চেক করেন! এসব ব্যাপার মোটেই হেলাফেলার নয়। তিনি নাকি অমিতের সঙ্গে আপনার মানে বাবা-ছেলের সম্পর্ককেও সন্দেহের চোখে দেখেন! অমিত আপনার আফটার শেভ ব্যবহার করে কেন, এ নিয়েও ওনার রাগ! অমিত সম্পর্কে ইলিয়াস সাহেব কিছু কথা বলেছেন ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ গল্পে। আমিও কিছু কথা আপনাকে বলব ভাবছিলাম, শত হোক সে আমার বন্ধুপুত্র, যদিও আমি তার শিক্ষক। তিন, আপনার শালা আপনাকে বাতেনের গল্প বলেছে, এটা আমি কেন, পাগলও বিশ্বাস করবে না। আপনার গম্ভীর স্বভাবের সামনে সে কি নিজের ব্যক্তিত্বের ওপর ভর করে এ ধরনের ইঙ্গিতময় গল্প বলার সাহস পাবে! সেই ফ্রি স্পেস আপনি কি ওকে দিয়েছেন! মনে হয় না। ধরে নিচ্ছি, সে হয়ত অমিতকে গল্পটা বলেছিল, কারণ ভাগ্নের সঙ্গে মামার বয়সের ব্যবধান কম। কাজেই উঠতি বয়সের ছেলেরা স্বভাবতই নিজেদের মধ্যে এসব গল্প চালাচালি করবে, আপনার মতো বয়স্ক মানুষের সঙ্গে নয়। এভাবেও তারা অবদমনের শৃঙ্খল থেকে মোক্ষ লাভ করে। তবে গল্পটাকে আমি অমূলক বলছি না। কারণ, এই প্রফেসর সম্পর্কে বাজারচলতি কিছু কথা আমিও জানি। মানে, পাবলিকের গল্প-রটনা আর বিনোদনের জগতে তার কিছুটা স্পেস আছে। যা হোক, শুনুন, অমিত দুদিন আগে একটা কা- করেছে। আপনি সকালে মোবাইলে ফোন করে আমি ছুটির দিনটিতে বাসায় আছি কি না যখন জানতে চাইলেন, আমি ‘না’ বলিনি। কারণ, এ বৃত্তান্ত আপনাকে বলা ছাড়া উপায় ছিল না। সে আমাদের টিচাররুমের সামনে যে স্টুডেন্ট টয়লেট, ওখানে গিয়ে দেয়ালে কিছু এস্থেটিক কমেন্টস লিখেছে, যা ওর কাছে আশা করা যায় না। এ ঘটনা দেখেছে টয়লেটের ক্লিনার। সে পিয়নকে বলেছে, পিয়ন সেটা মোবাইলে তুলেছে, সেটা একে একে অনেকের কাছেই শেয়ার হয়েছে। ও লিখেছে এমন কিছু কথা, যা মুখে বলা আমার পক্ষে সম্ভব না। ওই লেখা আর ন্যুড ছবিটার স্ক্যান প্রিন্ট প্রিন্সিপাল আমার কাছে দিয়েছেন, আমি ওর সেকশনের মনিটরিংয়ের দায়িত্বে আছি বলে। অবাক হলেও কষ্ট করে শুনুন। আমি চেষ্টা করছি, শর্টকাটে আপনাকে ব্যাপারটা জানাতে। একটা মেয়েকে নিয়ে খিস্তি লেখা হয়েছে। আর কিছু শব্দ, যেগুলো ওর সার্কেলে কমন কিন্তু মিনিং পারভার্টেড। এই যেমন — ‘বাড়া’, ‘মাল’, ‘খেঁচা’ … বাদ দিন। কিন্তু কথা হল, পুরো দেয়াল জুড়েই তো কালো/সবুজ/লাল মার্কার দিয়ে ওর বা ওর মতো অন্য ছেলেরা এসব লিখছে! এ নিয়ে এত হৈচৈ কেন! যুগ বদলেছে, ছেলেমেয়েদের হাতে স্মার্টফেন, গুগলে এক ক্লিকে দুনিয়ার তাবৎ খুল্লামখুল্লা জিনিস চলে আসে। তাহলে ওকে নিয়ে কেন এত মাতামাতি! কারণ, আপনি জানেন না, যে মেয়েটিকে নিয়ে সে দেয়ালে ছবিটা এঁকেছে, সে হল আমার মেয়ে লাবণ্য। হ্যা, স্কুল আর কলেজের বিল্ডিং আলাদা। তাতে কি, এ মহল্লায় থাকে বলে দুজনের পক্ষেই দেখা করা সহজ। আর মোবাইল তো আছেই! ওদের বন্ধুরাও এসব জানে। ওদেরই কেউ অমিতের আঁকা ছবির নিচে লাবণ্যের নাম আর ওর মোবাইল নাম্বার লিখে দিয়েছে। আমি বলি, অমিতকে একটু সময় দিন। মারধর করবেন না। আর  চেষ্টা করেন বাসার মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে। আপনি ডেইলি রাত করে বাড়ি ফেরেন। আমি বুঝি, আপনি ভালো নেই। অপনার চেহারায় কেমন যেন ভেঙে পড়া ভাব। রাতে ঠিকমত ঘুমানও না বোধহয়। চোখের নিচে কালি, শুকনো মুখ। কাচাপাকা দাড়িতে আপনাকে শেষ কবে দেখেছিলাম, মনে নেই। আপনি না সদা ঝকঝকে মানুষ! এতটা বেখেয়াল হবার কথা তো আপনার না! বাদ দিন। মজার গল্প বলি। আপনি যে আজ কথা শুনতেই চাইছেন, বলতে নয়, তা বেশ বুঝতে পারছি। আমি এর মধ্যে একদিন কথা বলেছি অমিতকে ডেকে নিয়ে, কলেজ ছুটির পর। ও বলেছে, একটা পত্রিকা পড়ে ওর মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। ‘রংধনু’ না কি যেন। অমিত জীবনানন্দ দাশের ‘পরস্পর’ কবিতার কয়েকটা লাইন লিখেছিল দেয়ালে। জানেন তো, রূপকথার ঢঙে নারীর প্রতি পুরুষের নিবিড় আহ্বানকে আলাপচারিতার ছলে কবি তার কাল পর্যন্ত টেনে এনেছেন। ও আকৃষ্ট হয়েছিল সেই বর্ণনায়, যেখানে তিনি রূপবতীদের জলে ভেজা নিরাভরণ দেহের অবারিত সৌন্দর্যের বর্ণনায় টেনে আনেন বরফের কুঁচি, ধবধবে, পিছল, ঠা-া— বিশেষণগুলো; ফেনা, শেমিজ, স্তন প্রভৃতি ইন্দ্রিয়তাড়িত বস্তুঅনুষঙ্গ আর শুয়ে থাকা একাকী নারীর সান্নিধ্যে যাবার ব্যাকুলতা। কিন্তু ঘটনা শুধু এটুকুই না, মশাই। আপনার গুণধর ছেলে যে আমার মেয়েকে কল্পনায় কতবার রেপ করেছে—সত্যি কথাটাই বলছি, কিছু মনে করবেন না, এমনটা আমি আপনিও কি করি না, এ বয়সেও— কে জানে! প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, সে খেয়াল করেনি, টয়লেট ক্লিনার ফ্লোর ক্লিন করার ছলে নেশাগ্রস্তের মতো তার কর্মকা- আড়চোখে দেখছিল! ব্যাটাকে এমন ডাসা দিয়েছি, চাকরি বাঁচাতে সব পইপই করে স্বীকার করেছে। অমিত যে ক্লিনারের সামনেই এসব করেছে, তা আমি বিশ্বাস করতে চাইনি। কিন্তু, এরপর সে যা করেছে, তা শুনলে আপনার হার্টফেল হলেও হতে পারে। তাই সতর্ক থাকুন। সে নাকি মাঝেমধ্যেই ক্লিনারের সঙ্গে-বুঝলেন না, স্রেফ হাতের ব্যাপার, দু মিনিটেই খেল খতম! প্রতিবারের টিপস পঞ্চাশ টাকা। আমি যখন অমিতকে জেরা করেছি, সে থতমত খেয়ে গিয়েছিল। এমনকি ক্লিনারও তখন সামনে ছিল। আমি ক্লিনারের বিরুদ্ধেও স্টেপ নেয়ার জন্য গভর্নিং বডির কাছে সুপারিশ করব। আজ সে অমিতের সঙ্গে এসব করে, কাল যে আরেকজনের সঙ্গে কিছু করবে না, এর গ্যারান্টি কে দেবে? অমিত নাকি লাবণ্যকে ভালোবাসে, কিন্তু আমার ভয়ে ওরা এগুতে পারছে না। আমার মেয়েকে এখনো কিছু বলিনি। ইমোশনাল হয়ে কিছু করে বসলে! এখন শুধু চোখে চোখে ওকে রাখার পালা! আগে অমিতের ঝামেলা মেটাই। বুঝুন, অবদমনের সাইড ইফেক্ট! আপনি হয়ত মনে মনে ভাবছেন, এ কি যন্ত্রণায় পড়া গেল, কেন আমি বকবকানি থামাচ্ছি না! আরেকটু বলি। আপনার সঙ্গে কলেজের গভর্নিং বডির কারো যে দা-কুমড়া সম্পর্ক আছে, তা শেষ পর্যন্ত আমাকে জানতেই হয়েছে। এমন কথাও উঠেছে, যেহেতু মোবাইলে ওসব ডকুমেন্ট আছে, তাই ওই বিশেষ ধারায় অমিত আর ক্লিনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হোক। কি, ঘাবড়ে যাচ্ছেন নাকি! গোবরগণেশ মন্তব্য করেছিল, অস্বাভাবিক সম্পর্কের জের ধরে অনুপ্রবেশ করানো বা অনুপ্রবেশের চেষ্টামাত্রই তা অস্বাভাবিক সম্পর্কেও প্রমাণ হিসেবে মামলা করার মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। এসব হালহকিকত নিয়েই তো সারা সপ্তাহ ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছি। অফিসিয়ালি চিঠি এখনো আসেনি আপনার কাছে! যদি ফাঁসেন, তো বুঝবেন আলম সাহেব এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে। আর যদি বেঁচে যায় অমিত, এর কোনো কৃতিত্ব আমি নেব না। ও বাচ্চা ছেলে! কি করতে কি করেছে ইমোশনাল হয়ে! তবে ব্যাটা ক্লিনারকে প্যাঁদানো দরকার। সে কেন এমন ঘটনায় দিনের পর দিন মুখ বুঁজে ছিল! শুনুন, আমাদের দেশে যেটাকে অস্বাভাবিক বলে চালানো হচ্ছে, এর আইনত কোনো ভিত্তিই নেই। পাশ্চাত্যের উন্নত নানা দেশে এ ধরনের সম্পর্কের পরিণতিতে বিয়ে পর্যন্ত হচ্ছে। ভাবতে পারেন! আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ আছেন, যারা দেখতে নারী বা পুরুষের মতো হলেও মানসিকতায় ঠিক বিপরীত। একই লিঙ্গের প্রতি তাদের  আগ্রহ লক্ষণীয়। তাহলে এসব মানুষের সম্পর্ককে আপনি অস্বাভাবিকতার দোহাই দিয়ে কীভাবে অস্বীকার করবেন? কে এসে দেখবে, জোরপূর্বক বা ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ কারো মধ্যে অনুপ্রবেশ করছে কি না! শারীরিক আর মানসিক আনন্দ লাভের অধিকার রাষ্ট্রের প্রতিটি সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। ওই বিশেষ ধারায় বলা হয়েছে, এ আইন একটি ঔপনিবেশিক আইন। ভিক্টোরিয়ান যুগে  ‘মোরালিটি’ নিয়ে অনেক ধরনের রক্ষণশীল অবস্থান ছিল সেই সমাজে। ফলে ব্রিটিশের কলোনি হিসেবে সেই আইন এদেশে এখনো অহেতুক চলছে। মজার কথা হল, এ আইন অনুযায়ী আমাদের দেশে ‘আনন্যাচারাল অফেন্স’ এর সংজ্ঞাই প্রতিষ্ঠিত হয়নি, ব্যাখ্যা দূরের কথা। ভেবে দেখুন তো, আপনি আর আমি সেই যে সাভারের বাংলো বাড়িতে এক রাত কাটিয়েছিলাম এক বিছানায়, তাতে কারো কোনো ক্ষতি হয়েছিল কি না! অথচ আমাদের বন্ধুত্বে তো এর কোনো ছাপ পড়েনি! সাময়িক আনন্দ লাভকে কেন পাপ আর নোংরা ভাবব, যদি এতে কারো কোনো ক্ষতি না হয়! হ্যা, আমাদের মাঝে কিছু হয়নি! কারণ আমরা তা চাইনি। কিন্তু এটা তো আর আপনি আমাকে বলবেন না, আপনি আমায় নিয়ে কল্পনায় ভেসে গিয়েছিলেন কি না বা এর প্রতিক্রিয়ায় কিছু করেছিলেন কি না আপনার ছেলের মতো, বাথরুমের বন্ধ দরজার ওপারে! কিন্তু আপনার মুখ দেখে আমি তখন দিব্যি কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। ব্যাপারটা আমার ক্ষেত্রেও হতে পারত, বা হয়ত হয়েওছিল! তাতে কি! আমার এসব নিয়ে এত নাক সিঁটকানো নেই। আমার ধারণা, আপনারও নেই। দেখুন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মানুষেরা এসব নিয়ে লিখে গেছেন। জানেন না বোধহয়, অমিতের কল্পনার জগতে আপনি মাসলম্যান। ও আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করে। আরো কিছু করে কি না, তা অবশ্য আপনি আমার চেয়ে ভালো জানেন। হা হা হা! জাস্ট ফর এ ফান, আপনার গোমড়া মুখ সহজ করতে। ও আপনার সঙ্গ চায়। কিন্তু আপনার তো সময় হয় না! বাড়ি করা, গাড়ি কেনার ধান্দা আর শেয়ার বাজার তো আছেই আপনার জন্য! ও কাঁদছিল। আমি ওকে ধমকাইনি। ফ্রিলি সব বলতে দিয়েছি। ও বাসায় থাকতে চায় না। ভাবী ওর সঙ্গে মিসবিহেভ করেন বোধহয়, লাবণ্যকে নিয়ে। অন্তত ওর তা-ই ধারণা। সে কারণেই নাকি দিনরাত রুমের দরজা আটকে থাকে মোবাইল, সিগারেট, ইন্টারনেট এসব নিয়ে! ওর পড়ালেখা তো লাটে ওঠার দশা! প্রিটেস্টে যা করল, এমনিতেই বোধহয় কলেজ থেকে ওর টিসি নেবার পালা ঘনিয়ে আসছে। তো, কমলাকান্ত ‘চন্দ্রালোকে’ প্রবন্ধে চাঁদের জেন্ডার নিয়ে বিচলিত। ইংরেজিতে মুন হি নাকি সি তা বুঝে ওঠা কমলাকান্তের পক্ষে অসম্ভব। সে এরপর অযোধ্যার নবাবের কথাও ভেবেছে, যে কিনা দিনরাত চোখে সুর্মা লাগিয়ে হাঁস-পাখি-গোলাপ নিয়ে সময় কাটায়! রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার মূল সমস্যাই তো ওটা! আবার কমলকুমারের গল্প পড়–ন! শোভনার কথা ভাবুন!  ঋতুপর্ণের মুভিটা দেখেছিলেন! বেচারা! এ সংকটে পড়ে সে যে শেষে এভাবে চলে যাবে, কে জানত! মানসিকতায় এখনো বন্যসভ্যতার তলদেশে পড়ে থাকব, স্বাধীন দেশে কে এমনটা ভাবতে পারে! ভারতে হিজড়াদের জন্য চাকরির বন্দোবস্ত করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মডেলদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা র‌্যাম্পে ক্যাটওয়াক করছে আর তাদের প্রতিবেশী হয়ে আমরা কি করছি! মানুষ হিসেবে যে নিজের সুখ আর স্বস্তিটুকু প্রিয়জনের কাছে খুঁজে ফিরছে, তাকে হত্যা করছি, অথবা এসব দেখেও মুখে কুলুপ এঁটে, দেখেও না দেখার ভান করছি! তারা কি মানুষ না, নাকি! অবদমনের কত উদাহরণ যে দেব! ‘অন্দরমহলে’-র কথাই ধরুন না! ঐ যে, জমিদার বাড়ির বড় বৌ, দশ বছরেও যার ছেলেপুলে হয় না, ধরেই নিন রূপকথার ফর্ম, ছোট বউয়ের সঙ্গে বিছানায় গিয়েও জমিদার ব্যাটা বাপ হতে ব্যর্থ। ভট্টাচার্যি এনে তার পুণ্যমন্ত্র শুনতে শুনতে সহবাস করলে ভাগ্যবান পুত্র হবে, এমন ভরসা দিয়ে সেই ব্রাহ্মণের গুষ্টি উদ্ধার হল না শেষ পর্যন্ত বড় বৌয়ের দ্বারা! আহা! ‘কামাং দা-াং’ আওড়াতে আওড়াতে উদোম গায়ের বড়বৌকে আধো আলো আধো অন্ধকারে দেখে ভট্টাচার্যি কি আর না তুতলে শ্লোক আওড়াতে পারে! দারুণ দেখিয়েছেন ঋতুপর্ণ! রূপা গাঙ্গুলি লা জওয়াব! কলকাতার লেখকরাই কম কি! জয় গোস্বামী থেকে নবনীতা দেবসেন, তিলোত্তমা মজুমদার যদি উপন্যাসে এক হাত দেখান, ওদিকে আছেন রুথ ভানিতা আর সালিম কিদোয়াই, একেবারে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস আর সাহিত্য ধরে। ইলিয়াসের ‘কীটনাশকের কীর্তি’ গল্পে রমিজের সঙ্গে ট্রাক ড্রাইভার যা করে আরকি! হা হা, আপনার গল্পের লেজ ধরেই মনে পড়ল, ঐ ব্যাটা প্রফেসরের নামেও এ ধরনের কানকথা চালু আছে। আপনি নীলক্ষেত মোড় থেকে পুরাতন ঢাকাতে যাওয়ার বাসের জানালার পাশের সিটে বসলে কামোদ্দীপক মালিশের বিজ্ঞাপনের চিরকুট গায়ের ওপর ছুঁড়ে পড়ে না! গন্ধগোকুল আর কালোঘোড়ার বাজিকরণের জাদুশক্তিভরা অমৃত সঞ্জীবনী আপনার বুকের ভেতর গোপনে ধাক্কা দিয়ে যায় না! আমরা কি দিনদিন যযাতির মতো জরাগ্রস্ত হয়ে চলছি না, অমিতদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে! ব্যানানাগার্ডেনে যা ঘটল দুমাস আগে, ওই যে ট্রিপল মার্ডার, তা নিয়ে একদিন বাসে যেতে যেতে শুনলাম, এক ছোকরা বলছে, ঠিকই আছে। কলাবাগানে কলা কোপাবে না তো কি পি-ি চটকাবে! জানেন, কয়েক বছর আগে ওই নামে একটা সিনেমা হয়েছিল, ‘কোপা শালা’ নামে! ‘কোপা’ শব্দের গুণে সেটা সুপারহিট হয়েছিল। কে যেন বলেছিল, শালা বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, ‘কোপা’ মানে অনেকের কাছে ‘ঢুকা’। আবার শহীদুল জহিরের ‘মুখের দিকে দেখি’-তে নায়ক কলা পকেটে নিয়ে ঘোরে, নায়িকাকে কলা খেতে দেয়! বুঝুন অবস্থা! এদিকে এনলার্জমেন্ট ভিডিওগুলোতে কলা দিয়ে টেকনিশিয়ানরা টেকনিক দেখায়. আর বলিউডের হানি বিবি খালিগায়ের দুজন যুবকের সামনে দুই হাতে দুই কলা ধরে চোখের ইশারায় যা বোঝায়, তা দেখলে আপনিও অমিতের মতো টগবগে পঙ্খীরাজ ঘোড়া হয়ে উঠবেন। সেদিন পুরাতন কাগজের ফাইলে রাখা একটা বই বেরুলো। তাতে কি লেখা ছিল, আপনাকে পড়ে শোনাই। দু মিনিট বসেন। … হ্যা, শুনুন ‘যৌবনসুধা’-র বিজ্ঞাপন। কারণ আমাদের মতো যযাতিরা বিশ শতকের প্রথম দিকের কলকাতাতেও প্রচুর ছিল। ‘ইহা শুক্রতারল্য ও ধ্বজভঙ্গের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ঔষধ। যৌবনে নানাপ্রকার অত্যাচারে (আমার মতে হ্যান্ডওয়ার্কিং প্রধান, সঙ্গে নারীঘটিত যতকিছু সম্ভব ছিল, তথাকথিত বাবু সমাজ আর এর তলানি হিসেবে রিচ ক্লাসের মধ্যে) অতিরিক্ত শুক্রক্ষয় হেতু যাহারা হঠাৎ দাঁড়াইলে অন্ধকার দেখে, যাহাদের বুক ধড়ফড় করে, মাথা ধরা, মাথা ঘুরায়, ভাল নিদ্রা হয় না, ঠিক মত ক্ষুধা পায় না, খাদ্য দ্রব্য ঠিক মত হজম হয় না, প্রত্যহ বাহ্যি পরিষ্কার হয় না, শ্রবণ শক্তি হ্রাস, দৃষ্টি শক্তির অল্পতা, অকারণ বা সাধারণ কারণে মনে ভয় পাওয়া, নির্জ্জনে থাকিতে ইচ্ছা, হঠাৎ চমকিয়া উঠা, কিছুই ভাল না লাগা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, কান ভোঁভোঁ করা, এবং প্রত্যহ প্রস্রাব কিম্বা বাহ্যি করিবার সময় কোথ দিলেই শুক্র গত হয়, এমন কি মনে কামোদ্রেক হইবা মাত্র ফোঁটা ফোঁটা করিয়া শুক্রপাত হয়, তাহাদের পক্ষে আমাদের এই যৌবনসুধা নিতান্ত উপকারী। ইহা দ্বারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে জলের ন্যায় তরল শুক্র গাঢ় করে, দুষিত শুক্র বিশুষ্ক হয়, সঙ্গম সময় সহসা বাহির হয় না এবং প্রচুর পরিমাণে শুক্র উৎপন্ন হয়।’ বলা হচ্ছে, এক কৌটা একুশদিন সেবনের জন্য, মূল্য সামান্য, গুণাগুণ অসামান্য। লাগবে নাকি মশাই! বিজ্ঞাপন কিন্তু বেশ কাজের ছিল, নাকি! ওয়েল লিছনার্ছ, আপনারা এতক্ষণ শুনছিলেন ‘একটি পোস্টমডার্ন টক শো’ এর আনসেন্সরড স্ক্রিপ্ট। এটি আমাদের প্রতিদিনের শো-র বিশেষ এপিসোড হিসেবে লিখিত, যার বিষয়বস্তু ‘ভীমরতি’। সেন্সর বোর্ডের কাঁচিকে ফাঁকি দিতেই আমরা আপনাদের জন্য একেবারে হট ম্যাটেরিয়ালসমৃদ্ধ এ এপিসোডটি উপস্থাপন করছি। এটি আগামী ঈদ উপলক্ষে ‘বিলিভ ইট অর নট’ চ্যানেলের জন্য সিনেমা হিসেবে নির্মিত হবে। তখন যেহেতু কাঁচি পড়ার ঝুঁকি আছে এর দৃশ্যায়নে, তাই আপনাদের কল্পনার সুবিধার্থে আমরা এমন অভূতপূর্ব আয়োজনে করেছি। এ শো এর রিভিউয়ের পুরো দায়িত্ব শুধুই আপনাদের মতো লাকি উইনার লিছনার্ছদের। বিজ্ঞাপনের একটা শর্ট ব্রেকের পর আমরা আবারো ফিরে আসব। তবে আমি আগেই আপনাদের গুডনাইট জানিয়ে দিচ্ছি। বাই দ্য বাই, বলে নিই, আপনাদের অপিনিয়ন আমাদের প্রোগ্রামকে আরো সাকসেসফুল করবে। আপনাদের অশেষ ধন্যবাদ, এই ব্যস্ততার যুগেও আমাদের সাথে থেকে এ ধরনের ব্যতিক্রমী ইভেন্টকে চালিয়ে নেয়ার জন্য। আপনারা জানেন, আমাদের এ শ্রুতিকথন অনুষ্ঠান প্রতি শুক্রবার রেডিও এফএম হাওয়া উনপঞ্চাশে সম্প্রচারিত হয় রাত দেড়টা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত। আপনার মূল্যবান অভিমত আমাদের জানাতে ইমেইল করুন — রেডিও এফএম হাওয়া উনপঞ্চাশ@বিলিভ ইট অর নট ডট কম এ ঠিকানায়। যেহেতু আমরা কোনো প্রডাক্টের অ্যাডভার্টাইজমেন্ট  প্রচার করি না, তাই মূল অনুষ্ঠানে ফাঁকে এখন শুনবেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ টেগোরের সঙ্গে বিজ্ঞাপন সম্পর্কিত মজার একটি ঘটনা। ১৮৯০-৯১ সাল নাগাদ আমহার্স্ট স্ট্রিটের এইচ বোস ‘কুন্তলীন’ তেল বানিয়ে বাজারে ছাড়েন। দোকানের বিজ্ঞাপনে লেখা থাকত এইচ বসু, পারফিউমার, বহুবাজার, কলিকাতা। তাঁর তৈরি ‘কুন্তলীন’ আর ‘দেলখোস’ এখনও বহু বাঙালির স্মৃতিপটে অমলিন। এইচ বোস প্রচারিত এসব পণ্য এতটাই সমাদৃত হয়েছিল যে, অচিরেই বাজারে এর নকল আসে। তখন তাঁকে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হয়, আসল কুন্তলীন সম্পর্কে ক্রেতাদের সতর্ক রাখতে। কুন্তলীনের জনপ্রিয়তার কারণে স্টার থিয়েটারের ড্রপসিনে পর্যন্ত এর বিজ্ঞাপন প্রচারিত হত। এ তেলের প্রচারের জন্য এইচ বোস ‘কুন্তলীন সাহিত্য পুরস্কার’-এর প্রবর্তন করেন। প্রথম পুরস্কার ছিল ২০ টাকা। এ পুরস্কার প্রতি বছর দেয়া হত মুখ্যত গল্প রচনার জন্য, যা তখন তখন সারা দেশের লেখক ও পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। মতিলাল নেহরু, লালা লাজপত রায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এইচ বোসের দোকানদারির বিজ্ঞাপনের মডেল। এদের ছবি এবং বাণী ছাপিয়ে কুন্তলীনের বিজ্ঞাপন হত। রবীন্দ্রনাথের অভিমত ছিল, ‘কুন্তলীন তৈল আমরা দুইমাস কাল পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছি। আমার কোন আত্মীয়ের বহুদিন হইতে চুল উঠিয়া যাইতেছিল কুন্তলীন ব্যবহার করিয়া একমাসের মধ্যে তাঁহার নূতন কেশোদ্গম হইয়াছে। এই তৈল সুবাসিত, এবং ব্যবহার করিলে ইহার গন্ধ ক্রমে দুর্গন্ধে পরিণত হয় না।’ এবার আমরা ফিরে আসি মূল অনুষ্ঠানে। এবং আমি, আপনাদের আবারো জানাই টাটা, বাই বাই! সি ইউ! … আপনার হাতের রিমোট বলছে, টিভির দিকে আপনার মনোযোগ। এবার আমার দিকে তাকান। হিন্দি সিরিয়াল দেখা যে আপনার ভাবীর পক্ষে এ বেলা সম্ভব না, বলে এলাম। নইলে, আপনি চলে গেলে আমার সঙ্গে সে কুরুক্ষেত্র চালাবে। নিন, ফ্রুটসগুলো খেতে থাকুন। যা বলছিলাম, এই যে ক্যাটালগ। অনেক কষ্টে জোগাড় করা। পাবলো পিকাসোর ‘রিক্লাইনিং ন্যুড’ সিরিজের চিত্রকর্মগুলো দেখেছেন! বিখ্যাত সব ছবি। একজন নগ্ন নারী একাকী শুয়ে আছে। ভরযুবতী। এটুকুই এর বিষয়। অথচ ভঙ্গিমায়, রঙের বিন্যাসে আর আবেগের বিচিত্র প্রকাশের গুণে এর আড়ালে কত ধরনের অর্থ আপনি/আমি করতে পারি! মশাই, আছেন শুধু টাকার ধান্দায়। ছেলেটাকে লাইনে না আনলে ব্যাংক ব্যালেন্স, বাড়ি, গাড়ি নিয়ে কবরে যাবেন, ফারাওদের মতো? শুনুন, আপনার মনমরা ভাব এক নিমেষেই তাজা করে দিই। কেন আমি এখনো বকবকানি থামাচ্ছি না আর আপনি যা বলার জন্য আমার বাড়িতে এসেছেন, তা শুনতে উদগ্রীব হয়ে উঠছি না! আমার তো জানাই আছে মশাই, আপনি নিজের আখেরের দিক চিন্তা না করে এক কদম বাড়ান না। এবং সম্ভবত যম/আজরাইল এসে ডাকাডাকি করলেও সময় হয়েছে কি না তা যাচাই করে তবেই তার দিকে মুখ ঘুরাবেন! আপনি হয়ত আমাদের প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতিচারণা করবেন! কেননা, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আপনার স্ত্রীর সঙ্গে মোকাররম সাহেবের সম্ভাব্য বিয়ের প্রস্তাব, যার ঘটক ছিলাম আমি! তার মানে একসময় আপনি আমার শত্রুপক্ষ ছিলেন হা! হা! হা! অবশ্য তা মিটমাট করতে আবারো আমাকে দ্বিতীয়বার ঘটকালি করতে হয়েছে অমিতের মায়ের সঙ্গে আপনার বিয়ের প্রস্তাব হাজী সাহেবকে দিয়ে, যে কিনা আপনার শ্বশুর! তা আপনি বুঝি তাহেরা ভাবীর প্রতি এখনো আসক্ত! তা ঘরণী খরদজ্জাল বলেই বিয়ের প্রায় কুড়ি বছর পেরিয়েও কি প্রাক্তন প্রেমিকার কথা ভেবে কখনো কখনো শূন্য হৃদয়ে বুঝি জেগে ওঠে প্রেমের দুরন্ত বন্যা! একটু পর ভাবীর ডাক শুনে মন থেকে সরে যায় ভাবাবেগের পলি! পড়ে থাকে কাদাময় নিষ্ঠুর বাস্তবতাভরা বিশ্রী মুহূর্তগুলো! তাই আবারো বুঝি ঢাকার বাইরে দু-চারদিনের জন্য ঢু মেরে আসার নামে কোনো নন্দনকাননে নিষিদ্ধ পানীয়ের ছোঁয়ায় পানখাওয়া আড়ষ্ট জিভে অমৃতসুধা আস্বাদনের প্রস্তাব দেবেন! শুনুন, আপনি এর আগেও এসব করেছেন, দুবার আমি ছিলাম আপনার ড্রিংকিং পার্টনার, শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলাতে পারেননি, ভাবীর কাছে বেইজ্জত হয়েছেন প্রশ্নবাণ মোকাবেলায় নিঃশর্তে সারেন্ডার করে, মাঝখান থেকে আমার নামে দুনিয়ার কেলেঙ্কারি জড়িয়ে!  কথায় কথায় এসব আপনিই আমায় বলেছেন। ওসবে ভবী আর ভুলছি না। আপনার মুখ নীরব আর বিষণœ চোখ এখন প্লাজমা টিভির পর্দায় কোপা আমেরিকার খেলার মাঠের ফুটবলের দিকে তাক করা থাকলেও মনের ভেতর যে এসব ভাবনা চলছে, তা আমি বেশ বুঝতে পারি। শুনুন, মুখে মুখে আমরা যতই ভদ্র হই না কেন, আমাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা জন্তুটার হালুম ডাক এড়িয়ে চলা  আপনার বা আমার, কারো পক্ষে সম্ভব না। কতদিন আর নিজেকে সামলে রাখা যাবে! ছেলে মেয়ে, স্ত্রী, পরিবারের মানসম্মান, বুড়ো বাবা-মা থাকলে তাদের কথা ভেবে যতই আপনি/আমি মানে আমরা সাধু সাজতে চাই না কেন, ঘোমটার আড়ালে খেমটা নাচ কি বিবেককে ফাঁকি দিতে পারে! আমাদের সেই সাধ্য নেই মশাই! থাকলে আমরা ঘরকুনো ব্যাঙ না হয়ে মহাপুরুষ হতাম এক-দেড় হাজার বছর আগে, আর নানা দেশ ঘুরে ঘুরে মানুষকে ধর্মের আহ্বান জানিয়ে পথ দেখাতাম! আমরা, পথিকেরা পথ হারাইয়াছি, ওগো কপালকু-লা, তুমি কোথায়! আমাদের পথ হারিয়ে গেছে সংসার আর নিত্যদিনের কাজের বোঝার ভারে, অফিসের বাধা নিয়ম আর সপ্তাহান্তের দুদিনের রুটিন অবসর আর বাজার সদাই, গিন্নির বায়না মেটানোর ফাঁদে। এখন আপনার/আমার কাজ আর বিশ্রাম আর বিরতি আর সীমাহীন ব্যস্ততার মধ্যে যে মোটাদাগে তেমন ফারাক নেই, তা আপনার খ্যাপাটে স্ত্রী মানে ভাবী আর আমার  সংসার অন্তপ্রাণ প্রায় বুড়ি বউও বেশ জানে! এই যা, কিছু মনে করবেন না! বয়স হয়েছে তো, এখন আর সব কথা জিভে বেঁধে রাখতে পারি না। কখন কোনটা যে টপ করে লাফিয়ে বেরিয়ে যায়! আপনার ছেলের মা তো আপনার প্রেমে এখনো পাগলই বটে, না! দেখুন, নয় মাস ধরে ছেলেকে পেটে পেলেপুষে বড় করলেন তিনি, আর আমি কি না বলছি আপনার ছেলে! আর আপনিও তা দিব্যি মেনে নিচ্ছেন! তা আপনাদের দাম্পত্য সম্পর্ক যে বেশ সুখের, তা অনুমান করছি আপনার সুখী আয়েশি ভদ্রলোকগোছের  দোপাট্টামার্কা দ্বিতীয় চিবুকবিশিষ্ট চাঁদমুখ দেখে। আমি অনেকটা সময় একনাগাড়ে বকবক করেই চলেছি। আপনি জানেন, ব্যাপারটা একই। হয় আপনাকে নয় আমাকে এ পর্ব চালাতে হবে, এখন। নতুবা আমরা যে যার বাড়িতে থাকলেই হয় বাজারে যেতে হবে, নয়ত মিছিমিছি কাগজপত্র নিয়ে ড্রইংরুমে বসে হাই তুলতে তুলতে ব্যস্ততার ভান করে  সময় কাটাতে হবে। কিন্তু বিছানায় গা এলিয়ে শোয়া চলবে না। তাহলেই হয়ে যাবেন কুঁড়ের বাদশা! তখন এটা সেটা কাজে গিন্নিরা আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে। এখন সকাল সাড়ে এগারোটা। অনেকদিন আপনার সঙ্গে দাবা খেলা হয় না। ধরবেন নাকি বাজি! আরে না না, পকেটে হাত দিতে হবে না। শকুনি মামার কথা মনে আছে! নাকি পঞ্চপা-বের মতো কঠোর পণ করবেন, দ্রৌপদীকে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে হলেও শেষ পর্যন্ত নিজের জেদকেই বজায় রাখবেন! হ্যা, আমার কথায় স্যাটায়ার আছে, উইটের দ্যুতিও, কিন্তু এতে শেষ পর্যন্ত ফল ফলবে কিনা কে জানে!  আরে বাবা, এখন যুগ বদলেছে। এতে যে শেষ পর্যন্ত সবুরে মেওয়া ফলে না, আমরা কি তা হাড়ে হাড়ে টের পাইনি! আমরা বলতে আপনি/আমি/আমাদের পরিবারের/আপনাদের পরিবারের/আমাদের ফ্ল্যাটের ওপরের নিচের ডানের বামের সামনের পেছনের যতগুলো আবাসিক ভবন, এমনকি এ পাড়া পেরিয়ে পাশের অন্য পাড়াগুলো, এবং যেহেতু কয়েকটি পাড়া নিয়ে একটি মহল্লা গড়ে ওঠে বলে সেই ক্লাস থ্রিতে থাকতে ভূগোলের বইতে আংশিকভাবে পৌরনীতি পড়তে গিয়ে শিখেছিলাম এবং তা এখনো হুটহাট কেন যে মনে পড়ে যায় বয়স বেড়ে চলা সত্ত্বেও, বুঝে উঠতে পারি না বলে, ওই দেখুন, কোথা থেকে কোথায় চলে এসেছি, জিলিপির অজস্র প্যাঁচের মতো কথার জাল বিছিয়ে বসে এখন নিজেই মাছ হয়ে আটকে পড়ে আছি, এখন একটু গাইগুই করে দেখি, ভাবনাগুলোকে, নাকি স্বগতোক্তিকে, কি বলব ছাই, যা খুশি হোক, একটু মেলে ধরতে চাই। আর আসলে কিছু বলার জো কোথায় মশাই! চারদিকে যা কিছু ঘটে চলেছে, আপনি আমি গলা উঁচু করলেই কি! কেউ কি আমাদের কড়ে আঙুলের গনায় পোঁছে! বছরখানেক আগে মাঠে নতুন নামা এক চ্যানেলের বিজ্ঞাপনে দেখানো হত, এক মা জলভরা চোখে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে বহুদূরে তাকিয়ে একাকী কাঁদছেন, আর তার পাশে টিভির স্ক্রিনে লেখা আছে, আগুনে পুড়ে তার গার্মেন্টসকর্মী মেয়ে মারা গেছে। তিনি কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। এসব কথা তিনি কাকে বলবেন? কেন! ‘তাফালিং’ টিভিকে! তারাই তো তাকে টিভিসেটের সামনে রিপ্রেজেন্ট করছে! এমন ভাব, যেন এ বিজ্ঞাপন দেখে সবাই এ চ্যানেলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে! পটল তোলার আগ পর্যন্ত কত কিছু যে দেখবেন! আজ সকালে দৃষ্টি টিভিতে দেখাচ্ছিল, মনুর মা জানিয়ে দিয়েছেন, কারা কারা তার মেয়েকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে নিয়েছিল। কেন তার লাশ বাড়ি থেকে অতদূরে নিয়ে ফেলে রাখা হয়েছিল! ‘বিলিভ মি’ চ্যানেলের টক শোতে হাজির অমুক সেলিব্রেটি সাংবাদিক মনু হত্যা মামলার সম্ভাব্য আসামীকে গ্রেফতারের দাবি জানালে আজ আমরা টেলিভিশনে কী দেখব! বলুন, কী দেখব? এটাই তো দেখব, পুলিশ জনমনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ মামলাকে যথেষ্ট গুরুত্বসহযোগে আমলে নিচ্ছে এবং কাজ যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বলে তাদের তরফ থেকে নানাজনের বিবৃতি স্ক্রলে পরিবেশিত হচ্ছে! তাহলেই বুঝুন, আঠারো মাসে বছর কথাটা ঠিক না ভুল! আরে মশাই, বাদ দিন দেখি ওসব বকবকানি! আমার গিন্নি রান্নাঘর থেকে বেরুতে আর মিনিট দশেক বাকি, এই সুযোগে বলিউডের স্লিমফিগার হিরোইনদের ধারালো তলোয়ারের মতো ঝকঝকা আর রসালো শরীরটুকু দেখে নিই! নইলে মিইয়ে যাওয়া বিবিকে নিয়ে রাগমোচন ঘটাব কীভাবে! আহা, ফ্রয়েড সাহেব না কে যেন বেশ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন না অবচেতনলোকের! বাহ! আপনি ব্যাংকার হয়েও সে খবর রাখেন তাহলে! আরে যা, কি বলি! এ খবর তো কিছুক্ষণ আগে আমিই পারলাম! ও, বুঝতে পারছি! আপনি কেন এতক্ষণে মুখ থেকে কুটোটি বের করলেন! আপনি তো বেজায় ত্যাদড়! আমার বাড়ি বসে আমাকেই কি না মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আমি একনাগাড়ে এত কথা বলে চলেছি যে, নিজেই বেমালুম ভুলে বসে আছি, এ কথাটি এর আগে আপনাকে বলেছি! যা বাবা, এতটা চাঁছাছোলা হলে চলে নাকি! তা, আগ্রহ যখন প্রকাশ করলেনই তো সাহেবের কথা বাদ দিয়ে দেশী মানুষের দোহাই পারি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার পড়–ন। ওই যে, লিরিক না তৃণমূল কোন পত্রিকায় যেন! শালা, ষাট পেরুলো না, এর মধ্যেই বেমালুম ভুলে বসে আছি! তিনি জবরদস্ত বুলি আওড়েছেন! কাঁথা পুড়ি কবিসাহিত্যিকদের ওসব আবালমার্কা প্যাচাল! তারা সাহিত্য করার জন্য যা বলেন আর যা লেখেন, তা দিয়ে আলুপটলের বাজার ঘুরে চটের ব্যাগ নিয়ে সাতসকালে একহাঁটু কাদা ঠেঙিয়ে ঘরে ফিরে কোনোমতে দুটো শুকনো রুটি ফ্রিজে রাখা রাতের বাসি আলুভাজার সঙ্গে পেটে চালান আর লিকার চায়ে এক চুমুক দিয়ে ঝড়ের বেগে দুদিনের ঘামা শার্ট আর তোবড়ানো প্যান্ট আর নিচের কাপড়চোপড় চড়িয়ে ফুটোঅলা মুজোকে আড়াল করতে দ্রুত বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় রাস্তার মোড়ে বসা ভজা মুচির ফাঁকিবাজি করে আলতো বুরুশ আর পানিমেলানো কালিমারা পালিশওয়ালা জুতো কাল বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে বৃষ্টিতে ফিকে হয়ে এলেও তা কোনোমতে কাপড় দিয়ে এক ডলা মেরে পায়ে গলিয়ে চোখ কান বুঁজে বগলে ফাইল আর বাম হাতে হটপট ও পানির বোতলের ব্যাগ নিয়ে পড়িমরি করে বাস ধরতে বেরিয়ে পড়া আমার মতো সরকারি ব্যাংক অফিসারের ওসব আতলামিতে পোষাবে না! যারা বেশি উচ্চমার্গীয় ভাষায় গল্প, কবিতা, নভেল লেখে, তাদের লেখা পড়ে আপনার মন ভরলেও আমার বদহজমের সম্ভাবনা ষোলো আনার ওপর বাড়তি দুই আনা! জানেন তো, ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর এমন মানুষেরই আজকাল জয়জয়কার! আপনি দেখি আমার বারোটা এবার বাজিয়েই ছাড়বেন, মশাই! বন্ধের দিনে কোথায় আয়েশি চালে উত্তম</>সুচিত্রার ক্লাসিক মুভিটা দেখতে দেখতে নিজের জীবনের রোমান্টিক স্মৃতির দিনগুলোতে ফিরে গিয়ে নিরিবিলি গুনগুন করে দু কলি আওড়াব, তা না, মাছির মতো কানের কাছে ভ্যানভ্যান শুরু করেছেন! আহা, আপনি আমার বাড়ির কুটুম কাম পাড়ার প্রতিবেশী কাম বন্ধু, আপনাকে সমাদর করে কিছু বললে চটছেন কেন! এ বয়সে কেউই কথা শুনতে চায় না। তা আপনিও কি সে দলেই যোগ দিলেন! কতদিন পর দেখা হল, বলুন তো! সেই যে, বাইশ নম্বর বিল্ডিংয়ের মতিন সাহেব, ব্যাংকারগিরি চালিয়েও এদিকে ওনার সঙ্গে  সাইড বিজনেসে নামার পর থেকে আপনার টিকির নাগাল পাওয়াই তো দুষ্কর! তবু কালেভদ্রে হাই/হ্যালো হয় মর্নিং ওয়াক মানে ডায়বেটিসে ভুগে রুটিনমাফিক হাঁটার ডাক্তারি অর্ডার ফলো করায়! ভাগ্যিস, আপনারও আমার মতো ডায়বেটিস! না না, মুখ ঘুরিয়ে নেবেন না। ভেবে দেখুন, আমাদের একই রোগ না বাঁধলে কি মর্নিং ওয়াক সপ্তাহে-দু-তিনদিন যতক্ষণই হোক, করা হত! নাকি গোপন বিষয়ে সামান্য হলেও, আলাপ জমত! আহা, মুখফুটে সব না বললেও এসব কি আর ছাই চাপা আছে! সুবোধ ঘোষের ‘সাগর-সঙ্গমে’র শেষ বাক্যটিতে মুখুজ্জে বাড়ির বৌ দাক্ষায়ণী যা বলেছিল, আমারও দেখি আপনাকে ব্যাপারটা বোঝাতে তা-ই করতে হবে! টেবিলের নিচ দিয়ে পেটমোটা বাদামি খাম বছরে-দুবছরে কয়েকটা এলে ক্ষতি কি! আপনার কাছে আসে অমুক অমুক প্রজেক্টের খসড়া বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রথম অনুমোদন সাইনের জন্য, আর আমার কাছে গাইড বই কোম্পানির পক্ষ থেকে। তা আপনি যদি দুয়েকটি শূন্য এদিক ওদিক করে কিছু মাল পকেটে পোরেন, ক্ষতি আছে কোনো?  বিদেশী কোম্পানি টেন্ডার পেলেই খুশি। ওরা কি কম ঘাগু! দিব্যি জানে, বৈতরণী সেতু বা এটা সেটা বানাতে একটা এক্সট্রা ফা- থাকতে হবে, ফান্ড গ্রহণকারী দেশের বিশেষদের কাবু করতে! তা একে স্পন্সর বলতেই বা ক্ষতি কি! আমি ক্লাসে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরও বিশেষ কোনো গাইড ফলো করতে বলি, আর প্রশ্নও সেখান থেকেই করি। তাতে দোষ কি! ওদের দরকার গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ, ওরা তা পেলেই তো সবাই খুশি, নাকি!  লুচি-ম-া সবাই খাবে, আর আপনি আমি বসে থাকব! তাহলে বৌয়ের নামে জমি আর মেয়ের হালফ্যাশনের মেকওভার কাম ড্রেসআপের টাকা আসবে আকাশ থেকে? সবাই খাবে, আর আপনি আমি উপোস থাকব! শেষে পোস্টিং নিয়ে টানাটানি পড়লে কোথাকার কোন লিডার, মন্ত্রী-মিনিস্টার এসে ঠেকাবে! না, আপনি আমার বাসায় ছুটির দিনে বেড়াতে এসে ড্রয়িংরুমে বসে চা-নাস্তা গিলতে গিলতে একবার টিভির দিকে, আরেকবার দৈনিকের পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে আমার কথাগুলো এককান দিয়ে শুনে আরেককান দিয়ে বের করে দিচ্ছেন বলে আমি কিছু মনে করছি না। কারণ, অনেকদিন পর মনের বন্ধ দরজা খুলে নিজেকে উপুড় করে দেবার যে সুযোগ আপনি আমাকে দিয়েছেন, তা কি হেলায় হারানো যায়, নাকি উচিৎ! আপনি আর আমি, মানে আমরা, যদি কোনো মন্ত্রগুণে অনেক কথা না বলেও পরস্পরের মনের কথাগুলো বুঝে ফেলতে পারি এবং এসব যে সত্য, তার প্রমাণ হিসেবে একে অন্যের চেহারা লক্ষ করতে থাকি, তাহলে কিন্তু শেষপর্যন্ত আমাদের বন্ধুত্বের গভীরতাই প্রমাণিত হয়, পীথাগোরাসের উপপাদ্যের মতো! আপনাকে নিশ্চয়ই স্পষ্ট করে বলতে হবে না, আমরা ঢাউস ঢাউস সব বক্তৃতায় যা শুনি, সেই ফরমেটে আমাদের আলাপ চালালেও রিয়েলিটি বিচারে কিন্তু মাত্র টুকরো টুকরো কিছু বাক্য বিনিময়ই আমাদের হচ্ছে, আর বাকি ভাবটুকু আমরা নিজেদের গরজেই ভরাট করে নিচ্ছি পরস্পর সম্পর্কে জানা/শোনা/চেনা আর দেশ/জাতি/বিশ্বের হাল হকিকতের হাওয়া দিয়ে! এখানে কোনো লুকোছাপা নেই, তাই না! কেননা, আমরা যে একে অন্যের সঙ্গে কদাচ মিথ্যা কথা বলতে পারি না! আর আপনি তো ভালো করেই জানেন, মিথ্যা কথা বলতে গেলে যেসব শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া, ছাপোজ বক্তার ভয়েছ জড়তাগ্রস্ত ও এলোমেলো হয়ে যাওয়া, কথার পারম্পর্য হারিয়ে ফেলা, দ্রুত কথা বলার চেষ্টা করা এবং যে বিষয় নিয়ে কথা উঠেছিল সেই বিষয় থেকে আরো দ্রুত সরে অপ্রাসঙ্গিকভাবে অন্য কোনো প্রসঙ্গের অবতারণা করা, চোখে চোখ রেখে কথা বলতে না পেরে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখা এবং সর্বোপরি, নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা প্রভৃতি ধরা পড়ে যায়! সেকারণেই কলেজে পড়া আপনার জিমফ্রিক স্বাস্থ্যবান  ছেলেটি যখন আমার এইটে পড়া স্মার্ট মেয়ের মনোযোগ পেতে ঘন ঘন এ বিল্ডিংয়ের সামনে ঘোরাঘুরি করে, কখনো কখনো পার্কের দোলনায় দোল খেতে খেতে আমার ফ্ল্যাটের দিকে হা করে তাকিয়ে হাতঘড়ি দেখতে থাকে আর ওদিকে আমার মেয়ে কোচিং যাবার নাম করে হালফ্যাশনের ড্রেস পড়ে হিরোইনের  মতো উদ্যত ভঙ্গিতে আয়নায় বারবার নিজেকে তদন্ত করে ওর মাথা ঘুরিয়ে দিতে, দৈবাৎ চোখে পড়লেও আমি কিছুই মনে করি না। কারণ, এসব উপসর্গ এ বয়সের ছেলেমেয়ের না হওয়াটাই সমস্যার কথা, আর আপনার/আমার গিন্নি তো এসব বিষয়ে যথাসম্ভব সচেতন, তাই না! কিন্তু সমস্যা হয় ভাই, যখন আপনার ছেলের সমস্যা এই বয়সেও আমাকে কাবু করে! আপনার ফর্সা কপাল আর নাকের ডগা দেখি টকটকে লাল হয়ে উঠছে, কানের লতিও! দেখলেন, আমার চোখ এড়ানো কত সহজ! দেখুন, এসবে এত লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। এই বুড়ো বয়সে বালখিল্য আচরণের প্রকোপ আমার মতো আপনাকেও অবশ্যই পেয়ে বসে, তা কোনো হিসাব নিকাশ না করেই বলি। এটা নরনারীর জৈবিক চাহিদা আর শারীরিক বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের জন্যই হয়। দিনের পর দিন নারীসঙ্গহীন নিরামিষ একাকী জীবন আপনার ভালো লাগে না নিশ্চয়ই! তাই ভারী কোমরে নতুন শাড়ি পরিহিত কাজের বুয়াকে উপুড় হয়ে ঘর মুছতে দেখে বিশেষ কোনো ভাবের তাড়নায় আপনার তাকে কখনো যদি সুন্দর মনে হয়, কোনো দোষ নেই, জাহাপনা! কেন আপনি ঐ মুহূর্তের আবেগটুকুকে পাপ, অন্যায়, লজ্জাজনক ভাববেন! ইয়োরোপীয় রেনেসাঁস কলোনিয়াল ভারতীয়দের, মানে আমাদের পূর্বপুরুষদের ভাবতে শিখিয়েছে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সুন্দর। একে যত ভাবে সম্ভব ভোগ — দুঃখিত! উপভোগ করুন। কেউ কি আপনার ঐ বিশেষ মুহূর্তটুকুর ক্ষতিপূরণ দেবে, যে আপনি তখনকার আবেগ থেকে নিজেকে পাষাণের মতো সরিয়ে নেবেন! আপনার বাধার জন্য তখন ইলিয়াস সাহেবের সাক্ষাৎকারের চুম্বুক অংশটা বলতে পারিনি। আপনার ছেলে অমিত প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, ও আমার মেয়ের কথা ভেবে রাতের অন্ধকারে বা নির্জন দুপুরে, মেঘলা বিকেলে বা ঘুম ভাঙা ভোরে কি করতে পারে, তার নমুনা পাবেন ঐ ভদ্রলোকের ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ গল্পে। কেন এ উদাহরণ দিচ্ছি, বলব? কারণ আপনি এ প্রসঙ্গে আবার আপনার শালার গল্প বলেছেন। সে নাকি আপনাকে বলেছে, তার এক বন্ধু, একেবারে আবুল কিসিমের, ক্লাসে পাঠ্য এ গল্প পড়ে ভয় পেয়েছিল। আর কোর্সটিচারের রুমে গিয়ে বেকুবের মতো প্রশ্ন করেছিল, এসব কি বাস্তবে হয়, নাকি লেখকের কল্পনা! বুঝুন! কোন যুগে পড়ে আছে সে! অবশ্য বেচারা যে ঘাস খায়, তার কারণ আছে। সে কোএডুকেশনে কখনো পড়েনি। আর খুব লাজুক, মিউমিউ করা ছেলে। মা নাকি তাকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত রাতের বেলা চামচ দিয়ে দুধমাখা ভাত খাইয়ে দিত। তাহলে তো ঠিকই আছে! সে কীভাবে বুঝবে, উঠতি বয়সী ছেলেরা শরীরের আগুন কীভাবে নেভায়, যখন সে কারো সঙ্গে কোনো সম্পর্কে যুক্ত নয়! এ তো আর বিলেত আমেরিকা নয়! তো, সেই শিক্ষক কী বলেছিলেন তাকে! আপনি ভাবুন তো, তিনি কি বলতে পারেন? হ্যা, তিনি এক বাক্যে সহজ ভাষায় স্বাভাবিকভাবে বলেছিলেন, এটা তো সাধারণ ব্যাপার, আর বাস্তবেই হয়। তিনি এর ব্যাখ্যা দেবার প্রয়োজনও নাকি বোধ করেননি। আপনি যথারীতি এ গল্পটাই একটু ভিন্ন ভাষায়, ভঙ্গিতে আমাকে বলেছেন। এবং এখন আবারো বলছি, আগের মতোই, এ গল্পও আপনার শ্যালক আপনাকে বলেনি। বরং সে অমিতকে বলেছিল। অমিতের ডায়েরিতে নিজের কল্পনা মিলিয়ে আরেকভাবে তা লিখেছে। আপনি সেটা চুরি করে পড়ে উপযুক্ত প্রসঙ্গে আলাপের সূত্রে আমাকে বলেছেন। অপনি যে ওর ডায়েরি হাতান, ও তা টের পেয়েছে এবং আমাকে মুখ ফসকে বলেও ফেলেছে। সম্ভবত, ভাবী এমন কিছু দেখেই সন্দেহ করেন, আপনাদের বাপ-ছেলের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তিনি জানেন না, কারণ আপনারা তা জানাতে চান না। এটুকু অবশ্য আমার অনুমান। কারণ, আপনি ভাবীকে যতটা ব্লেম দেন, তিনি বোধহয় ততটা দায়ী না। আগুন জ্বলা আর ধোঁয়া ওঠা, একের অন্যকে ছাড়া অসম্ভব। এ আলাপ উঠল ইলিয়াস সাহেবকে নিয়ে, তাই তো! হুবহু মনে নেই। একটা বাক্য মনে আছে। বলছি। তিনি নির্দ্বিধায় বলছেন, ‘সেক্স নিয়ে সাহিত্য করা রিসকি।’ অথচ আমরা সবকিছু লুকিয়ে রাখতে চাই। সাহিত্যে  এ নিয়ে এত বিতর্ক আছে, বলার প্রয়োজন নেই বোধহয়। তবু শর্টকাটে বলে ফেলি, আমি বা আপনি, কেউই কি অস্বীকার করতে পারব, বলিউডের উর্বশী, মেনকা বা রম্ভাদের মতো কেউ আমাদের মধ্যরাতের স্বপ্নে হানা দিয়ে কাছে টেনে নেয় না! বা আমরা তার ওপর বিশেষ ভঙ্গিতে শুই না এবং যথোপযুক্ত কর্ম মহাসুখে সম্পাদন করে পরিতৃপ্ত হই না! অথচ তখন আমাদের পাশেই রয়েছেন গিন্নিরা, যারা এ ঘটনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা থাকলেই নির্ঘাত ঝাঁটাপেটা করবেন, পারলে কচুকাটাও! আপনি অমন উসখুশ করছেন যে! গিন্নি আসার ইঙ্গিত নাকি! উহু, ও আসবে না আপনার সামনে। তাছাড়া আজ আপনাকে বাগে পেয়েছি, কাজেই রিমোট কন্টোল আমার হাতের মুঠোয়। দরজা ভেড়ানোই আছে, কান পাতলেও নিচু গলার আওয়াজ কারো কানে যাবে না। ইলিয়াস সাহেব অবচেতনের কথা প্রসঙ্গে যা জানাচ্ছেন, তা নিজের মতো করে বলছি। আপনি/আমি পথে চলতে গিয়ে অনেক সুন্দরী মেয়ে দেখি। তারা নানা বয়সের হতে পারে। বাস্তবে আমার স্ত্রী বা প্রেমিকা যদি কাকতুল্য হয়, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। এমনকি আপনারও নেই। কারণ, আপনি আমি যখন তার সঙ্গে মিট করি, আমাদের কল্পনায় তখন স্ত্রী বা প্রেমিকার জায়গা দখল করে সিনেমা বা অ্যাডের বা পত্রিকার সেই অপ্সরীটি। কাজেই অর্গাজমের দিক থেকে আপনার ছেলের হাতের ছন্দময় কারুকাজ আর আপনার দাম্পত্যলীলার পরিণতির মধ্যে আকাশপাতাল ব্যবধান নেই! এবার আপনি থামুন মশাই! অনেকক্ষণ হলো, লেকচার দিয়েই চলেছেন। জানি, আমাদের আলাপ অত্যন্ত রহস্যময় স্বভাবের, এবং এসব কথা আমরা এমনভাবে বলছি যে অন্য কারো পক্ষে তা শোনা অসম্ভব। অনেকটা টেলিপ্যাথির মাধ্যমে যেন আমাদের ভাবের আদান প্রদান ঘটছে এবং বাড়িতে যদি আপনার গিন্নি, বুয়া ও মেয়ে না থাকত, তবে আমাদের আলাপ আবার অতিমাত্রায় বেগবান হয়ে বিপদ ডেকে আনতে পারত। তাই সংযম বজায় রাখাই শ্রেয়! তো, যা বলতে আপনার বাড়িতে আসা, সেই লগ্ন ঘনিয়ে এসেছে। এ ঘটনার পাত্রপাত্রী আপনার মেয়ে এবং আমার ছেলে। ইলিয়াস সাহেবের ইন্টারভিউ পড়ার প্রয়োজন বা বয়স তাদের হয়নি, এমনটি আমরা ভাবলেও প্রকৃত ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনি অতিমাত্রায় উত্তেজিত হবেন না। তাহলে হার্টফেলের সমূহ সম্ভাবনা আছে। অন্য কোথাও আপনার সঙ্গে সাক্ষাতে বিষয়টি বলা যেত। কিন্তু এতে আবার মহল্লার কারো চোখে আমাদের সাক্ষাতের বৃত্তান্ত পাঁচকান হবার ঝুঁকি ছিল। এমনকি আমার খরেদজ্জাল স্ত্রী ডিভোর্সের হুমকিও দিয়ে বসতে পারে ভেবে নিছক সৌজন্য আলাপের আদলে আপনার বাড়িতে আসা। তা মিষ্টির প্যাকেট না এনে বোধহয় ভুলই করেছি! আপনাতে দেখে মনে হচ্ছে, ওদের বিষয়ে কিছু আঁচ করতে পারছেন। ভেতরে ভেতরে জ্বলুনি শুরু হয়ে যায়নি তো! আরে ভাই, এটা ইন্টারনেটের যুগ! এখানে এক ক্লিকে কত কিছু চোখের সামনে চলে আসে, চোখের পলকে মহাকালের অগণিত মুহূর্ত মিলেমিশে দিন-রাত হয়ে যায়। এবং এর পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকে। হ্যা, জানি, আপনি প-িত মানুষ, মোবাইল ফোনের চেয়ে বই আপনার প্রিয়! টেকনোলজির হালহকিকত অতটা বোঝেন না বলে এখনো অলস ভরদুপুরে বড়জোর উত্তম-সুচিত্রার জগতে বিহার করেন! আমি ভয় পাচ্ছি বউকে নিয়ে। কোনো কিছু নিয়ে একবার একটা খটকা জাগলে হয়! সেদিন নির্ঘাত রোজ কেয়ামত দিবস। ভাগ্যিস, স্মার্টফোন চালাতে জানে না। আর আমার বাসায় ল্যান্ডফোনও নেই। নইলে কি কা-টাই হত! পুরো ঘটনা যে ফেসবুকে চলে এসেছে, আপনি দেখেছেন! ও, কাকে কি বলি! আপনার তো আবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়া অন্য কোনো অ্যাকাউন্টই নেই! তা একটা খুলে নেন না কেন? ক মিনিট লাগে! আপনার মেয়েকে বলুন, দেখুন ও ঝটপট খুলে দেবে। ওদের মনোযোগ তো এসবেই! বইপত্র নিয়ে বসে নাকি! আর বসেই বা কি হবে! এই দেখুন, হ্যা, ডানের বাটনটা জাস্ট টাচ করুন। নিউজ হয়েছে, এখন নাকি দেশে শিক্ষার্থী নেই। সবাই নাকি পরীক্ষার্থী। তা এ তো একেবারে খাসা কথা। এখন তো ক্লাস ফাইভে, এইটে, টেনে, ইন্টারমিডিয়েটে সমাপনী এগ্জাম দিতে হয়! এরপর শুনবেন, ক্লাস টু-থ্রিতেও এমন কিছু চালু করেছে। তো একটা কাজ করলেই তো পারে গভমেন্ট! দু বছর পর পর ডবল প্রমোশনের বন্দোবস্ত করা হোক না! আগে নাকি এমন ছিল! আমার বাপের আমলে। উনি তো টু এর পর ফোরে পড়েছেন। আবার ফাইভ বাদ দিয়ে সিক্সে। অবশ্য এরও আর দরকার হবে না। এত এত জিপিএ ফাইভ পায় ছেলেমেয়েরা, তাহলে আর বই পড়ার দরকার কি! ওরা তো হাইলি ব্রিলিয়ান্ট! কত কম পড়েই গোল্ডেন জিপিএ পায়! আমরা গাধার খাটুনি খেটেও কোনোমতে থার্ড ডিভিশন কাটিয়েছি। আর ওরা দিনরাত ল্যাপটপ, আইফোন, ইন্টারনেট নিয়ে পড়ে থেকেও বছর বছর গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পায়। আসলেই দেশ দারুণ এগুচ্ছে ভাই। আর স্কুল-কলেজের কথা কি বলব! [আপনার মেয়ে আর আমার ছেলেকে নিয়ে এই যে কা- হল, এখন মুখ দেখাতে পারবেন কাউকে!] কাল দেখবেন, মিডিয়া থেকে লোকজন এসে আমাদের লাইফ হেল করে দেবে। আরে বাবা, একটু স্থির হয়ে বসেন না! আপনার গিন্নিকে দেখা গেল কিচেন থেকে বেরিয়ে বেডরুমে ঢুকতে, কাজের মেয়ের সঙ্গে কি নিয়ে যেন কথা কাটাকাটি করছে। ভাবীর এখন সময় হবে না এদিকে আসার। যা যা দেখাই, নিশ্চিন্তমনে দেখুন। অনেক কথা বলে আমার কানে ঝি ঝি ধরিয়ে দিয়েছেন। ভাই, আপনার মাস্টার হওয়াই দরকার ছিল। এত কথা বললে হিসাব ইহজন্মে মেলাতে পারতেন না, কাজেই ওখানে ব্যাংকার হিসেবে টিকতে পারতেন না। আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়, ওরা আমাদের কথা একবারও ভেবেছে! এমন কা- করার পরও ওদের মধ্যে কোনো সংকোচ, দুঃখ প্রকাশ করতে দেখবেন বলে ভাবছেন! ভাইরে, সে আশায় গুড়ে বালি। হ্যা, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, দশজন দশ কথা দু-চারদিন বলবে, তারপর সব চুপ। ওদের আর দোষ কি? লাবণ্যর বান্ধবী ফ্লোরার বাবা, ওই যে  বনগাঁয়ের শেয়াল রাজা হাওলাদার সাহেবের কা- মনে নেই! সরকারী অফিসারদের ওয়েলফেয়ার ফান্ডের চাঁদা হিসেবে বছর বছর যা জমে, তা দিয়ে সে নাকি শ্যালকের নাম ভাঙিয়ে সমিতি চালায়, আর এদিকে কিনা এই কা-! আমার  মেয়ে তার মায়ের কাছে এসব বলেছে কদিন আগে, রাতে খাবার টেবিলে, ফিসফিসিয়ে। বোঝেন! আপনার কি মনে হয়, মর্জিনার সঙ্গে তার লটরপটর এ যুগে খুব অবাক করা ঘটনা! দিনের পর দিন ভাবী অসুস্থ থাকলে কাজের বেটি মাতারি সুযোগ ছাড়বে কেন! তার গতরের ওপর উনি চড়ে বসলে সে তো সুযোগ খুঁজবেই তাকে ফুসলে টু পাইস আদায় করতে! তবে মর্জিনা মাগী আসলেই খাস্তা চিজ! নইলে পুলিশের কাছে গিয়ে মামলার হুমকি দিয়ে হাওলাদার সাহেবের কাছ থেকে নগদ চল্লিশ হাজার টাকা খসাতে পারে! এদিকে পেটের ছানাপোনার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য সে নাকি মহিলা পরিষদে আবেদন করবে, আপনার ভাবী বলছে! বুঝুন! মজাই মজা, পাঁচশো মজা। যার তার সঙ্গে শোয়া আর ঢোকানোর মজা বুঝুক এবার! দেখুন ভাই, আপনি শিল্প-সাহিত্য গুলে খাওয়া মানুষ, কি সব লেখেন টেখেনও, বাংলা সিনেমা দেখার অশেষ ধৈর্য আপনার আজো আছে। কাজেই শিক্ষিত রুচিশীল মানুষ হিসেবে আপনার ভাবমূর্তিকে এবার পনের-বিশ মিনিটের জন্য ভুলে যান। পেপারে মোহাম্মদপুরের ওই স্কুলের নিউজ! ক্লাস ফাইভের বাচ্চা সেখানে রেপ হয়, ডাইনিংয়ের ফুটফরমাসখাটা বয়ের কাছে। ইন্ডিয়ায় উনসত্তর বছরের নান গ্যাংরেপ হয়, দিল্লিতে চলন্ত বাসে মেডিকেলের স্টুডেন্টকে রেপ করে মেরে ফেলা হয়, আমাদের এখানে মনু রেপ কাম মার্ডার হয় আর্মি এরিয়ায়, এসব থেকে কিসের আলামত পান! আমার-আপনার ফ্যামিলিতে ছেলেমেয়েরা আছে না! তারা কি শিখবে চারপাশে ঘটে চলা এসব ঘটনা থেকে? ওদের উঠতি বয়সের মেজাজ আর শরীরের উত্তাপকে আপনি/আমি কীভাবে সামলাবো? স্কুল-কলেজে ওদের পাঠাই পড়ালেখা শিখতে, আর দেখেন, তারা ধাতুবিদ্যার প্র্যাকটিস কী চমৎকারভাবে করে! ও এই ভিডিও দেখলে হয় হার্টফেল করবে, নয় তো ছেলেকে জুতিয়ে ঘর থেকে বের করে দিবে। আর ওর মা কিছু না করলে আমি কি করব, তার পরামর্শ নিতেই আপনার কাছে আসা। ধর্মকর্মে মতি নাই, নৈতিক আদর্শ বলে কোনো কিছু নাই, যার যেভাবে খুশি, সে সেভাবে চলে। এই যে আপনার মেয়েকে কোচিংয়ে পাঠান, খোঁজ নিয়েছেন, দুটা বখাটে ছেলের সঙ্গে ও মেশে! আমার ছেলের সঙ্গে ওদের ফাইট চলে, আপনার মেয়েকে নিয়ে। ছেলের বালিশের নিচে পাওয়া ডায়েরিতে এইসব লেখা। সে নাকি আপনার মেয়েকে না পেলে সুইসাইড খাবে! বোঝেন! আপনি আমি হয়ত না পেরে বছরে কয়েক প্যাকেট টেবিলের নিচ দিয়ে নেই, কিন্তু প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে তো আমাদের দিনে এসব সমস্যা ছিল না! এখনকার হাওয়াই বদলে গেছে। ঊনপঞ্চাশ পবনের তোড়ে চারদিক দিশেহারা। আমি অনেক কথা বললাম। বাকিটা আপনি নিজেই দেখেন। আরে, লজ্জা পাওয়ার কিছু নাই। আপনি তো ঐতিহাসিক বক্তৃতামালায় লজ্জার লেজ কেটেই দিয়েছেন, তাই না? শেষ পর্যন্ত আমি আর আপনি বেয়াই সাহেব হব। দেখছেন, আমার ছেলে কেমন ডাকু মোরগের মতো লেজ ফুলিয়ে কেশর নাড়িয়ে দলের সব মুরগির ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মত করে এগিয়ে আসছে হাতে টকটকে লাল গোলাপরূপী ওর রক্তাক্ত হৃদয় বুক থেকে খুবলে নিয়ে, আপনার মেয়ের সামনে! আচ্ছা, এক কাজ করতে পারেন না! আমার ছেলে তো এ বছর ইন্টার দেবে। আপনার মেয়ের স্কুল বদলে দিন, আর ওদের যোগাযোগটাও আপাতত বন্ধ থাকুক। বাংলা সিনেমার নিয়মিত দর্শক আপনি, নায়কনায়িকার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর প্যাচ খেলা তো আপনার জানাই আছে। সেভাবে এগুলে আপাতত বোধহয় সমস্যার সমাধান সম্ভব। না, আপনি পুরোটা দেখা শেষ করেন। রুচিতে কুলোচ্ছে না! এই বয়সেই ওরা বন্ধুদের সামনে রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে কলেজের কম্পাউন্ডে লিপ লক করে, জড়িয়ে ধরে, এসব দেখতে পারছেন না! এখনো তো আসল খবরটা বলিনি। ওটা শোনার আগে মনকে শক্ত করেন। আপনি সম্ভব হলে অন্য এলাকায় চলে যান, মেয়েকে ওখানকার ভালো স্কুলে ভর্তি করান। বেশি সমস্যা হলে আমি বড় নেতাদের ধরব। ওদের কলেজ থেকে বের করে দেয়ার ডিসিশন নাকি হয়েছে! আজ সকালে আমি শুনলাম মন্টু ভাইয়ের কাছ থেকে। উনি নাকি গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান রঞ্জু ইসলামের কাছ থেকে জেনেছেন। এমপিও পুরো ঘটনা জানেন। মিডিয়ায় হৈচৈ পড়তে আর বাকি নেই! লেজে আগুন লাগল বুঝি! কি যেন বলেন না আপনি, কি চন্দ্রের কবিতা, হ্যা নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়! কপাল ভালো, সরকারী ছুটির দিন। একবার যাব রঞ্জু ভাইয়ের বাড়ি। দেখি, কত দিলে তার মুখ আর হাত বন্ধ করানো যায়, প্রিন্সিপালকে থামানো যায়! এমপিকে জি হুজুর জি হুজুর এবার বোধহয় করতেই হবে নাক কান মলে। আমি অবশ্য চেষ্টা করব ওকে অন্য কলেজ থেকে পরীক্ষা দেয়াতে, অবশ্য সে যদি আদৌ পড়ালেখা করতে চায়। একটা মাত্র ছেলে আমার!  কবে থেকে যে ও উচ্ছন্নে যেতে শুরু করেছে, টেরই পেলাম না। ভুল হয়েছে, স্মোকিং করছে জেনেও কিছু না বলায়। এর আগে ভালোই ছিল। ঘরের থাকত, পড়ালেখা করত। নাইনে উঠে ঘাড়ত্যাড়ামি শুরু করেছে। যা হয়েছে, তার পরিণতি হিসেবে আমি কোনোভাবেই চাই না, টিনেজ বয়সের বায়বীয় প্রেম-ভালোবাসার পরিণতি হিসেবে ওদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠুক। এর ফল কারো জন্যই ভালো হবে না। ওরা আমাদের কাঁধের বোঝা হয়ে থাকবে। একসঙ্গে থেকে সংসারও করতে পারবে না। কারণ কামাইয়ের মুরোদ তো হয়নি। দশজনের দশকথায় বিভ্রান্ত হয়ে আবারো কোনো ঝামেলা পাকাতে পারে। বলতে পারে, আমার নামে বাড়ি লিখে দাও, সেখানে বউ নিয়ে থাকব! কুবুদ্ধি দেবার মতো মানুষের কি অভাব আছে! তারচেয়ে বরং আমার কথাই ভেবে দেখেন। আমি উঠি। মেয়ের সঙ্গে রাগারাগি করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। সুইসাইডাল অ্যাটেম্পট নেয়া অস্বাভাবিক না। তবে একথা জানিয়ে রাখি, আমার ছেলের সঙ্গে আপনার মেয়ের বিয়ে কখনো হচ্ছে না। প্রয়োজনে আমি ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেব। এ কথাগুলো বলতে বাধ্য হলাম বলে কিছু মনে করবেন না ভাই। চারপাশে যা কিছু ঘটছে, তার বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া আপনার আমার জীবনে কোনো না কোনোভাবে পড়ছে। এর সুরাহা কীভাবে হবে, আমি জানি না। তবু আমি চেষ্টা করব, ছেলেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পড়ালেখাটা শেষ করাতে, যত টাকা লাগে, লাগুক। একই প্রত্যাশা আপনার মেয়ের জন্যও থাকল। ফেসবুকে এখন যা দেখছেন, আগামীকালের পেপারে লাল কালির তিন কলামের বিশাল হেডিংয়ে তা দেখবেন।। এরপর এ ঘটনা হয়ে যাবে আমার মুখে ঝাটার বাড়ি মারার নোংরা ইতিহাস। এসব কথা মুখ ফুটে আমি না বললেও আপনি আগামীকাল পেপারেই পেয়ে যাবেন। কারণ এটাই এখন দেশের সবচেয়ে স্পাইসি নিউজ। আপনি বলবেন, দোষ আপনার ছেলের। কেন আমার মেয়ের সঙ্গে যেচে সে কথা বলতে চায়, পার্কের ডানকোণের দোলনার নিচে অমিত+লাবণ্য লিখে রাখে। এটা সেটা অজুহাতে আমার বাসায় অমিত কেন আসে! এসবের কী ব্যাখ্যা আছে আমার কাছে! জ্বি আছে। কিন্তু তাতে তো ঘনিয়ে ওঠা পরিস্থিতির সুরাহা হবে না! নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়! আপনার মেয়ে যে ফেসবুকে অমিতকে প্রপোজ করেছিল, ও আমাকে দেখিয়েছে। নীল খামের ভেতর মেঘসাদা কাগজের চিঠির ভেতর ও গুঁজে দিয়েছিল হার্ট শেপড রক্তগোলাপের পাপড়ি আর লিপস্টিকমাখা ঠোঁটের চুম্বনচিহ্ন। এসব দুই মাস আগের কথা। এরপর থেকে আমার ছেলের মাথা বিগড়ে যাবার পালা শুরু হয়। এসব কথা আপনার মেয়ের কাছে লেখা আমার ছেলের চিঠিতে পাবেন, অমিত বলেছে। কলেজের প্রিন্সিপাল দুয়েকদিনের মধ্যেই বোধহয় আমাদের ডাকবেন, টিসি হাতে ধরিয়ে দিয়ে। ওদেরকে এখান থেকে ছাড়িয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নাকি ফাইনাল। বোর্ডে প্রথম হওয়া কলেজের  যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে? বুঝুন, ওদের জন্য আমাদের কতভাবে নাজেহাল হবার পালা অপেক্ষা করছে! আমি উঠি। ভাবীকে ব্যাপারটা ঠা-া মাথায় বুঝিয়ে বললে তিনি হয়ত মেয়ের কাছ থেকে তার মত জানতে সফল হতে পারেন। আমি চাই না, আপনার মেয়ের পরিণতি অন্যদের মত ভয়ঙ্কর হোক। এটা আমার হুমকি নয়। কিন্তু তবু, তেমনটি আপনার মনে হতেও পারে। কারণ পুরো পরিস্থিতিই আসলে বড় বেশি ঘোলাটে, এলোমেলো। আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কারণ, আমার স্ত্রী ছেলের বিষয়ে কিছুই জানে না। সে হঠাৎ একমাত্র ছেলের এতবড় ধাত্তা সামলে নাও উঠতে পারে। একনাগাড়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিলাম। তবে আপনার চেয়ে মিনি সাইজের, নির্ঘাত! এখন আমি যে কাজটি করব, আশা করি, কিছু মনে করবেন না। এর সঙ্গে আমার ছেলের বা আপনার মেয়ের কোনো যোগসাজশ নেই। বরং আপনার বিশেষ ভূমিকা আছে। আপনি আমার ব্রেইন ওয়াশ করে যে সফল হয়েছেন, তার প্রমাণ হল, আমি ঘরের দরজা আটকে আপনার কাছে এসেছি। ভাবী হয়ত কিছু মনে করতে পারেন। আপনি তখন নাহয় প্রকৃত ব্যাপারটা তাকে জানাবেন! আপনার অনুমান ঠিক। আমি এমন কিছু করতে চাই, যার সঙ্গে আপনার অনুমানের আশ্চর্য যোগসূত্র আছে। আমি আপনার কাছে চলে এসেছি। এখন আপনি দেখবেন সেই অত্যাশ্চর্যজনক ভিডিওটি, যেখানে আমাদের টিনেজ ছেলেমেয়েরা তাদের সহপাঠী, রাস্তার উৎসুক জনতাকে সাক্ষী রেখে একে অন্যকে প্রবল আবেগে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো চুমু খাচ্ছে। বাবা হিসেবে এটা আমাদের জন্য এমনই চমকের, যার কোনো প্রতিতুলনা হতে পারে না। আপনি অবাক হলেও আমি অবাক হচ্ছি না। প্রথমে হয়েছিলাম, নিউজ ফিডে ওই যে, কয়েক বাক্যের লিখিত বিবরণ পড়ে! এরপর সংযুক্ত লিংকে ক্লিক করে যখন দেখলাম এ কা-, তখন বলতে লজ্জা করে কি হবে, মনে হয়েছিল, আর যা-ই হোক আপনার আমার পক্ষে ওই বয়সে এমনটা কখনো সম্ভব হত না। তা আমরা যতই বেদিশা হই না কেন! আমি এখন যে কাজটা করব, হ্যা, ঠিক আছে, এজন্য মোবাইলটা বন্ধ করা দরকার। আপনারও এতে অংশগ্রহণ প্রয়োজন। হ্যা, এবার সোজা হয়ে বসুন। আপনি ঠিক দুমিনিট পর টয়লেটে চলে যাবেন। কারণ হাইপারডোজ আপনার জন্য বিপজ্জনক। আমি আপনার গালে ঠাস করে একটা চড় মারব। আপনি কিছু মনে করবেন না। যে খেলা আপনি আমায় নিয়ে খেললেন, এটা তারই পুরস্কার।

————————————-

মাসুদ পারভেজ
মনবেড়ী

চাঁদের হিম আলো মন্দিরের স্যাঁতস্যাতে দেয়ালে নেতিয়ে পড়লে মরাছায়া মুখ ভার করে আছড়ে পড়ে মানুষের দেহের জমিনে। চারজন কতোকাল পর আবার মিলিত হয়ে জীবনের একটা হিসাব কষার আয়োজনে মেতেছে। ফেলে আসা কাল কিংবা স্মৃতি যেভাবে গল্প হয়ে টিকে থাকে কিংবা বেওয়ারিশ হয়ে হারিয়ে যায় তারা দুটোকেই আমলে নেয়। তখন চাঁদের হিম আলোতে তারা ধ্যানী হলে মন্দিরটা একটু নড়েচড়ে ওঠে। কিংবা বলা যায়, মন্দিরও নিজের হিসাব কষতে চায় তার জীবনের।

মন্দির ও চারজন তখন একরেখায় ধ্যানী হলে জায়গাটার একটা নিম ইতিহাস কিংবা কাহিনির নাগাল পাওয়া যায়।

প্রত্যেক বছর এই মন্দিরে সোনার যে মূর্তিটা একটা দিনে কয়েক ঘন্টার জন্যে আসে তা নিয়ে মন্দিরের মনে একটা চাপা কষ্ট আছে। শয়ে শয়ে ভক্ত ওই একটা দিনে হাজির হলে সে ম্যালাদিন আগেকার স্মৃতি বিচড়ায়। মন্দির থেকে কয়েকহাত দূরে যে-ঘরগুলো এখন খসে পড়ছে তার সঙ্গে মন্দিরের বেড়ে ওঠার গল্প আছে। ওই যে-সোনার মূর্তিটা একদিন কয়েকঘন্টার জন্যে আসে সেটা-তো এই মন্দিরের একসময়ের বাসিন্দা ছিল। আর  মন্দিরের পাশে যে দিঘিটা এখন জবরদখল হয়ে ভরাট হচ্ছে সেটা আনন্দসাগর নাম নিয়ে কতোদিন রাজবাড়ী থেকে আসা রানী আর তার সখীদের জলকেলির জায়গা ছিল, সেসব এখন দূর অতীত। রানী রাজবাড়ী থেকে নৌকায় করে সখীদের নিয়ে জলকেলি করতে আসতো এই আনন্দসাগরে। আর যে-ঘরগুলো এখন নোনাধরা ইটের চিহ্ন হয়ে আছে কোনোরকম ক্ষয়ে ক্ষয়ে সেখানে এসে জলকেলি শেষে রানী কাপড় পাল্টাতো। তারপর মন্দিরে পূজা দিতো হয়তো-বা কোনো কোনো দিন। তখন সোনার মূর্তিটা এই মন্দিরে ছিল। মন্দিরের কদর ছিল। এখন শুধু গোষ্ঠর দিনে মন্দিরে আসে সোনার মূর্তিটা। তাও রাতযাপন করে না। মন্দির এইখানে কিছুটা নিস্তব্ধ হলে চারজন একসাথে রানীর জলকেলি পর্বে ফিরে যায়।

এই চারজন একসাথে রানীর প্রেমে পড়েছিল কিংবা রানীর রূপের মোহে আটকা পড়েছিল। রাজবাড়ীতে হাজির হয়ে রানীর দেখা পাওয়ার কপাল নিয়ে যদিও তারা জন্মে নাই তারপরেও তারা রানীকে দেখেছিল। আর এই দেখাই তাদের জীবনে কাল হয়ে যায়।

রাজবাড়ীর শুকসাগর থেকে নৌকায় রানী আসতো আনন্দসাগরে। রাজার রানী, তার রূপের বাহারে রাজ্যের কোণে কানাচে কতো ঢেউ তোলা কাহিনি ভাসে। গরিবের ঘরে জন্মিলে কন্যা বাপ-মায়ে কয়, এক্কেরে রানীর মতন। রানী কিন্তু তারা কখনও চোখে দেখে নাই। কারো দেখার সাহসও হয় নাই। ওই চারজন সেই সাহস দেখায়। রানী সখীদের নিয়ে জলকেলি করে। কি নরম সে শরীল, কি মোহ সে রূপের! নিমীলিত হয়ে আসা চোখ বারেবারে রাজা হওয়ার স্বপন দেখায়। তোরা রাজা হো, তোরা রাজা হো। রাজা হওয়া কি মুখের কথা নাকি স্বপন দেখিলে রাজা হওয়া যায়! তাও ধন নয়, সম্পত্তি নয়, রাজ্য নয়, ক্ষমতা নয়, এক রানী পাবার আশায় রাজা হতে মন চায়। রূপের মায়া বড়ো মায়া গো! হেলেন আর ট্রয়ের কাহিনি কে না জানে। রূপের মোহে আটকা প্যারিস  হেলেনকে ট্রয়ে আনে। তারপর সে এক বিভীষিকা। কাঠের ঘোড়া। হেক্টর। মৃত্যু। না এই চারজন রানীকে আনে নাই। চারজন লুকোছাপার মাঝে এক অসীম মায়ার জগত ডিঙিয়ে প্রেমের প্লেটোনিক রূপটাকেই চেয়েছিল। এই মোহে তারা কখন আটকা পড়ে নিজেরাও টের পায় নাই। আর তখন তাদের মনে আশা এসে নাড়া দিয়ে যায়। আশা এসে বলে, একদিন রানীও তাদের ডাকবে। তারপর ‘আশার ছলনে ভুলি’ তারা নিজেরাই নিজেদের মরণ ডেকে আনে।

সেইদিন রানী যখন সখীদের নিয়ে রাজবাড়ী থেকে বের হয় তখন আসমান সাফ ছিল। তারপর রানী যখন জলে নামে তখনও আসমান সাফ ছিল। তারপর আসমান মুখভার করে কালো হয়ে আসে। তখন কালো আসমান দেখে রানী হয়তো-বা ভয় পায় আর তারা চারজন রানীর ভয় পাওয়া চেহারা কখনও দেখে নাই। তখন তারা রানীকে অভয় দেয়ার জন্যে আড়াল থেকে বের হয়ে রানীর কাছাকাছি এলে রানী চিৎকার দেয়। রানী চিৎকার দিলে আসমানের কালো মেঘ তাল দেয়। তারপর তারা চারজন বন্দী হয়। তারা রানীকে ধরতে যায় নাই কিংবা তারা রানীর রূপের মোহে পড়েছে এসব কিছুই বলতে পারে নাই। মন্দিরের যে জায়গাটায় তারা এখন বসে আছে সেখানেই তাদের কতল করা হয়। তাদের রক্তে মন্দিরের মাটি অভিশপ্ত হয়, আনন্দসাগরের পানিতে হাহাকারের বলক ওঠে। এই চারজনকে হত্যার সময় রাজ্যের সকল প্রজাকে ডাকা হয়েছিল যাতে তারা শাস্তি দেখে ভয় পায়। প্রজারা এসেছিল, তারা ভয়ও পেয়েছিল আবার তারা ভুলেও যায়। কিন্তু ভুলে না মন্দিরের মাটি আর আনন্দসাগরের পানি। আনন্দসাগরের পানিতে আর আনন্দ থাকে না। শুকাতে থাকে। মন্দিরের পুজারীও কমতে থাকে। এভাবে একদিন আনন্দসাগরের সব পানি শুকিয়ে যায় আর মন্দিরও হয়ে পড়ে পুজারী শূন্য। রাজ্যের সবচেয়ে বড়োদিঘি আনন্দসাগর জলশূন্য হয়ে পড়ায় রাজ্যের অন্যদিঘিরাও বড়োদিঘির দুঃখের ভাগীদার হয়। তখন তাদেরও জল শুকায়। রাজ্যের জল শুকালে রাজা বিপাকে পড়ে। রাজ্যের সকল পুরোহিত-গণক কেউ এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। তখন রাজা রাজ্যে নতুন দিঘি খনন শুরু করে। আর এই দিঘি আনন্দসাগর দিঘির চেয়েও বড়ো। দিঘির খনন শেষ হয়ে যায় কিন্তু দিঘিতে জল ওঠে না। রাজা আরও বিপাকে পড়ে। তখন একটা ঘটনা ঘটতে থাকে। রাজ্যের সকল প্রজারা এক এক করে স্বপন দেখতে থাকে যে, রাজা মরে গেছে আর শ্মশানে তার চিতা থেকে ধোঁয়ার বদলে জলের ধারা নেমে আসছে। এই স্বপ্ন চাউর হয়ে গেলে রাজা নিজেও একদিন এই স্বপন দেখে। তারপর রাজ্যের পুরোহিত ডেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা চাইলে পুরোহিত রাজার দুর্দিনের ইঙ্গিত দেয়। রাজার চিতা থেকে ধোঁয়ার বদলে পানির ধারা নেমে আসার স্বপ্ন রাজ্যে চাউর হয়ে গেলে রাজার মনে ভয় জাগে। তখন রাজার আদেশে বড়ো যে দিঘিটা খনন করা হয়েছে তাতে একটা মন্দির তৈরি করে রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো পুরোহিতকে দিয়ে প্রার্থনা করানো হয়। কিন্তু তাতেও দিঘিতে পানি ওঠে না। আর স্বপ্নটা এমনভাবে চাউর হয়ে যায় যে, রাজ্যের সকল প্রজারা বিশ্বাস করে ফেলে রাজার মৃত্যু না হলে রাজ্যে পানির সঙ্কট মিটবে না। তখন প্রজারা রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। রাজা বিদ্রোহীদের হত্যা করলে রাজাকে হত্যার জন্যে রাজ্যের প্রজারা হন্যে হয়।

মওলানা ভাসানী হলের পাশ দিয়ে লালইটের যে-রাস্তাটা গেরুয়ার দিকে গেছে সেটা ধরে হিসেবি কয়েক পা ফেললে ছোটোখাটো টিলা নিয়ে গড়া একটা সবুজ বিস্তীর্ণ ভূমির নাগাল পাওয়া যায়। সেই বিস্তীর্ণ ভূমিতে পাওয়া যায় একটা বটগাছ। বটগাছের নিচে বসে ঝাঝাল রোদে ঘাম শুকানো আর বিড়ি ফুকানো দুটোই চালান যায়। আর চাঁদের রাতে যুবকেরা চন্দ্রাহত হয়ে এই সবুজ ঘাসে আশ্রয় নেয়। তবে কারো বেশিদিন চন্দ্রাহত দশা থাকে না। তারা আবার নিজ নিজ ডেরায় ফিরে যায়। কিন্তু চারজন ফিরতে পারে না। তারা রাত পার করে ওই সবুজ ঘাসের ওপর আর দিন হলে থাকে বটগাছের নিচে।

ভোরের আবছা আলো তখনও ভালো মতন নিজেরে জানান দিতে পারে নাই এমন যখন দশা তখন সারারাত লেখালেখির পর ওই আলোতে সেলিম আল দীন ঘর থেকে বের হয়ে যায়। গেরুয়ার ওই রাস্তাটা ধরে সেলিম আল দীন হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে যখন আলো ক্রমে আসতে চায় কিন্তু যুত মতো পারে না এমন দশায় চারপাশের জগতের রং পাল্টায় তখন সেলিম আল দীন বটগাছটার পাশে দাঁড়ায়। এইখানে দাঁড়িয়ে তিনি যখন লেখাটার বাকি অংশটার কথা ভাবছিলেন তখন চারজন চন্দ্রাহত সেই বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর থেকে রেব হয়ে এসে তার পায়ে পড়ে। সেলিম আল দীন হতচকিত হলে তারা চারজন চন্দ্রাহত বলে, আমাদের নিয়া একটা নাটক লেখেন। ওই আলোতে তাদের দেখে সেলিম আল দীন ছিনতাইকারী ভাবে।

সেলিম আল দীন : সন্ত্রাস আর শিল্প একসঙ্গে চলে না।

চন্দ্রাহত চারজন : বাবা, আমরা সন্ত্রাসী না।

সেলিম আল দীন : তাহলে তোরা কারা?

চন্দ্রাহত চারজন : বাবা, আমরা পিরিতের মরা।

এইকথা শোনার পর সেলিম আল দীন চন্দ্রাহত চারজনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। তারপর বলে, তোরা কোথায় থাকিস? তখন তারা আঙুল দিয়ে বিস্তীর্ণ সবুজ ভূমিটার দিকে ইশারা করে। জগতের রং পাল্টানো সেই আলোতে সেলিম আল দীন বটগাছটার নিচে তাদের নিয়ে বসে। যখন তারা কথা শুরু করে জগত তখনও জাগে নাই।

চন্দ্রাহত চারজন তাদের পিরিতের মরা হওয়ার কাহিনি শুরু করে :

অনেকদূর থেকে তারা এই বিশ্বপাঠশালায় পড়তে আসে। পাঠশালার পাঠে তাদের মন না ভরলে জগতের পাঠ নিতে থাকে। আর তখন তাদের পরিচয় হয় এক বাউলের সঙ্গে। ওই বাউলের কাছে তারা শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। এভাবে যখন চলছিল তাদের পাঠ তখন একদিন তার ব্যত্যয় ঘটে। বাউলের বাড়ির পাশ দিয়ে যে জলাঙ্গীটা গেছে তার জলে ¯œান শেষে ভেজা কাপড়ে বুক ঢেকে আর ভেজা চুল খোলা পিঠে ছড়িয়ে যখন বাউলের সাধন সঙ্গিনী গৃহে ফিরছিল তখন তারা চারজন তার প্রেমে পড়ে। ওইদিনের পর তারা প্রতিদিন ওইসময় বাউলের সাধন সঙ্গিনীর ¯œানের অপেক্ষা করতে থাকে। এভাবে দিন গড়াতে থাকলে তারা আর নিজেদের আটকাতে পারেনি। দিনের সঙ্গে নিজেরাও গড়ায়। তখন জগতের পাঠে আর তাদের মন থাকে না। বাউল ব্যাপারটা টের পেলে তার কাছে খোলাসা করতে বলে। কিন্তু তারা কিছুই বলতে পারে না। তখন বাউল তার সাধন সঙ্গিনীর কাছে জানতে চায় তার কোনো কিছু বলার আছে কি-না। সঙ্গিনী সাধনার স্তর পেরিয়েছে। হ্লাদিনীর মাঝে তার বসত। তো সে এই চারজনের প্রেমকে স্বীকার করে না আবার অস্বীকারও করে না। সাধন সঙ্গিনী ব্যাপারটা এমনভাবে করে যাতে ওই চারজন প্রেমের এক নতুন তীরের সন্ধান পায়। আর এটাও তাদের সাধনার একটা স্তরের মধ্যেই ছিল। কিন্তু তারা সে স্তরে পৌঁছার আগেই প্রেমে পড়ে। তাদের প্রেমে মোহ ছিল। এই মোহ রূপের। আর এই রূপের মোহ ধীরে ধীরে কাম জাগায়। যখন তারা মোহকে জয় করতে পারে নাই তখন বাউল তাদের মোহ জয় করার পাঠ দিতে থাকে। কিন্তু তারা সেই পাঠ নিতে রাজী হয় না। তারা বুঝতে পারে এই পাঠ নিলে সাধন সঙ্গিনীর প্রতি যে আকর্ষণ তাদের মনে তা আর থাকেব না। যদিও তারা এটা জানতো না যে, সাধনার কোনো একস্তরে তাদের সাধন সঙ্গিনীর কাছেও শিষ্যত্ব নিতে হতো। হয়তো-বা সাধন সঙ্গিনী তাদের তখন শেখাতো রূপের মোহ বাদ দিয়ে নির্মোহ হওয়ার সাধনা। সে পর্যন্ত তারা যায় নাই। কিংবা সে দিনের নাগাল তারা কোনোদিন আর পায় নাই। সাধন সঙ্গিনীর প্রতি তাদের প্রেম যখন কামে রূপ নিতে থাকে তখন তারা নিজেদের আত্মাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এই হত্যার কথাটা বলার জন্য যখন তারা সাধন সঙ্গিনীর নাগালে যায় তখন সে ভরা জলাঙ্গীতে ¯œান করতে থাকে। তারা চারজন জলাঙ্গীতে নামলে তাদের চেহারায় ভর করে থাকা কাম সাধন সঙ্গিনীর চোখে লাগে। সাধন সঙ্গিনী ভয় পায় আর সেই ভয় জলাঙ্গীতে সঞ্চারিত হলে জলাঙ্গী তাকে আশ্রয় দেয়। হয়তো-বা সাধন সঙ্গিনী রাধার মতো বলেছিল, মেদিনী পসার বিদিআ লুকাও। আর জলাঙ্গীর জল তখন ফুঁসে ওঠে। আর তখন জনমের মতন তাকে আশ্রয় দেয়।

তখন তারা চারজন বলে, তারপর থেকে আমরা টিলার ওপারে জলাঙ্গীর ধারে অপেক্ষা করি সাধন সঙ্গিনীর। আমরা অভিশপ্ত হয়ে গেছি। আর আমাদের মৃত্যু হবে না। কিন্তু আমরা মুক্তি চাই। মৃত্যু চাই। আপনি পারেন আমাদের মুক্তি দিতে।

তখন সেলিম আল দীন বলে, কীভাবে?

চন্দ্রাহত চারজন : আপনি আমাদের নিয়ে নাটক লেখেন।

সেলিম আল দীন : তারপর

চন্দ্রাহত চারজন : তারপর সেই নাটকে আমাদের মৃত্যুদ- দেন।

সেলিম আল দীন : আমি তো শাসক নই যে— মৃত্যুদ- দিব। আর আমি জীব হত্যা করি না। ‘প্রাচ্য’ পবিত্র ভূমি। এখানে রক্তপাতে অভিশাপ নামে।

আলো তখন ক্রমে আসা শুরু হয়ে গেছে। চরাচর জেগেছে। আর তখন চন্দ্রাহত চারজন সেই আলোর সঙ্গে মিশে যায়।

আর তখন সেলিম আল দীন সারারাত যে লেখাটা লিখেছিলেন সেটা নিয়ে ভাবনায় পড়েন। আর তখন হত্যাকারী রাজাকে হত্যার জন্য প্রজাদের যে-খোয়াবের ভেতর তিনি ডুবিয়েছিলেন তা থেকে সরে আসা মনোস্থির করেন। কিন্তু তিনি আবার ভাবনায় পড়েন মন্দিরের মাটিতে বসে জীবনের হিসাব কষতে থাকা চারজনকে নিয়ে।

——————————-

গওহর গালিব
স্বীকারোক্তি

সুখবাসপুর গ্রামের নুরু পাগলাকে চেনে না, এমন একটা লোকও এ তল্লাটে খুঁজে পাওয়া ভার। নুরু সমস্যা তেমন কিছুই করে না, শুধু মুরুব্বীদের দেখলে ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে টাকা চায়। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই নুরু পরনের লুঙ্গিটা উপরে তুলে বলতে থাকে— ‘পোতাটা খুব চুলকায় বাহে, পাঁচটা টাকা দ্যান ওষুধ কেনমো।’ লোকজন বেশির ভাগ সময়ই নুরুকে পাত্তা দেয় না কিন্তু সমস্যা হয় সঙ্গে স্ত্রীলোক থাকলে । কারণ এধরণের বেসময়ে নুরু লুঙ্গি তুলে এমন ত্রিভঙ্গ হয়ে দাঁড়াবে যে, নড়াচড়ার নামটা পর্যন্ত করবে না—এমন হারামজাদা একটা! তাই আচম্বিতে নুরু সামনে পড়ে গেলে লোকজনদের ওকে টাকা না দিয়ে আর উপায় থাকে না ।

সেই নুরু যখন ওর ভাঙ্গা চালাঘরের উঠোনটা দৈনিক ঝাঁড়পোছ শুরু করল— তখন ব্যাপারটার যথেষ্ট গুরুত্ব তৈরি হল বৈকি! কৌতুহলী লোকজন নুরুকে শুধায়— ‘কি রে নুরু ঘরদোর লেপস ক্যাঁ?’ তখন ওর উত্তর— ‘নেম্বার চ্যারম্যানরা আসলে একনা বইসবার দিবার নাগে না বাহে?’ বলা বাহুল্য সুখবাসপুর গ্রামে এখন নির্বাচনী আমেজ ।

তবে নির্বাচনের পরদিন হাঁটবারের গরম জিলেপির রসাস্বাদনের মত, নির্বাচনী ফলাফলের জিলেপিটা যখন সুখবাসপুরের মানুষেরা অন্দরে-বাহিরে, হাটে-বাজারে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে; তখনই অকস্মাৎ গোল বাঁধালো নুরুর চিৎকার। বুধবারের সকালটায় নুরুর চিলের মত চিৎকারে সবাই যে যার জায়গায় সটান দাঁড়িয়ে যায়। লোকজন দেখল নুরু মাস্টার পাড়ার সামনে দিয়ে বড় বটগাছটার শেকড়ে একবার হুমড়ি খেয়ে ছেঁড়া লুঙ্গিটা হাতে ধরে হাটখোলার দিকে দৌঁড়াচ্ছে আর চিৎকার করছে— ‘কায় কোনটে আছেন বাপুহে একনা আগান, ঝোঁপদিঘিত একটা মানুষ মরি আছে, তোমরা আইস বাপুহে…আইস।’ সাথে সাথেই গোটা সুখবাসপুর গ্রামে যেন মড়ক লেগে গেল। সবাই হৈ হৈ করতে করতে ছুটল ঝোঁপদিঘীর দিকে।

সদ্য অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচনে হেরে যাওয়া চেয়ারম্যান প্রার্থী জালালউদ্দীন তার ইটভাটা থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির দিকেই যাচ্ছিল। কিন্তু নুরুর চিৎকার শুনে সে পথেই আটকে গেল। ঘটনা কি সেটা না জেনে সে কেমন করে যায় ! নিজেদের উত্তরপাড়ার দিকে একটা ছেলেকে দিয়ে সে খবর পাঠাল— ‘উত্তরপাড়াত খবরটা দে জামাল আর লোকজনক মোর কাছত জলদি আইসবার ’ক।’ দেখতে দেখতে গোটা সুখবাসপুর গ্রামেটাই যেন ভেঙ্গে চলে এল ঝোঁপদীঘির পাড়ে। এরপর যখন পুলিশের ভ্যান এল তখন জালালউদ্দীনের উদ্দীপনা একটা দেখার মতো ব্যাপার হল বটে! জালালউদ্দীন পুলিশ সদস্যদের এসর্কট করে যখন অকুস্থলে নিয়ে এল, তখন সেখানে জনসমুদ্র। পুলিশ সদস্যদের রাস্তা করে দেয়ার জন্য জালালউদ্দনের হাঁকডাকে লোকজন একপ্রকার ভীতবিহ্বল হয়ে পড়ল। পুলিশদলের নেতা ঝোঁপদীঘির পুরো পরিবেশটা খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে জালালউদ্দীনকে আদেশ করল, ‘ডেডবডি তোলার ব্যবস্থা করেন।’ জালালউদ্দীনের এই তো চাই। প্রতিপক্ষ নির্বাচিত চেয়ারম্যান নজরুল মাতবর যখন এখনও ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছাতে পারে নাই তখন সুযোগটা তার কোনভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। আর লোকজনকেও বোঝান চাই তাকে ভোট না দিয়ে শালারা কী ভুলটাই না করেছে! তাছাড়া সকলের সামনে নিজের নেতৃত্ব ফলানোর সুযোগটাও হাতছাড়া করা উচিত হবে না। আর পুলিশের সামনে তার মান-ইজ্জতের ব্যাপারটাও তো বহুত জরুরি। সুতরাং জালালউদ্দীন সমবেত জনতার উপর চোখ বুলিয়ে এমন একটা মুখ খুঁজতে লাগল যাকে আদেশ করলে সে অমান্য করবে না। ভীড়ের মধ্যে দেখতে দেখতে তার চোখ আটকে গেল নুরুর উপর। নুরুকে উদ্দেশ্য করে জালালউদ্দীন বলল— ‘নুরু, যা পানিতে নাম, লাশটা তোল।’

লোকজনের ভিড় দেখলে নুরুর আমোদ এমনিতেই বাড়তে থাকে। আর এতো একটা বিরাট হাঙ্গামা! নুরুর কাছে এ আদেশ যেন ঈশ্বরের আর্শীবাদ হয়ে নেমে এলো। নুরু পাগল কিছিমের হলে কী হবে? তারও যে একটা চাওয়া পাওয়া আছে সেটাতো সকলকে জানান দেয়া চাই। এখন যে ঘটনা হচ্ছে তাতে তার নুরুপাগলা থেকে মো. নুরুঊল্লাহ হওয়ার এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কী হবে? তার কতদিনের সাধ, সে এমন কিছু একটা করুক যাতে কেউ আর তাকে পাগল না বলে। এই রকম একটা ঘটনা আবার কবে ঘটবে তার ঠিক আছে? তাই নুরু আর কালবিলম্ব না করে তার ছেঁড়া লুঙ্গিটা মালকোছা মেরে দিঘীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এরকম একটা দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্যেও একজনকে বলতে শোনা গেল—‘নুরু তোর পাছাটা ঠিক মত ঢাক রে হারামজাদা ।’ কিন্তু সন্তরণরত নুরুর কাছে সে পরামর্শ পৌঁছাল কিনা সন্দেহ। জলের উপর উপুর হয়ে ভাসছিলো লাশটা। নুরু যখন লাশটাকে টানতে টানতে পাড়ের কিনারে নিয়ে এলো— তখন উৎসুক জনতার মাঝে একটা চাপা ধ্বনির ঢেউ খেলে গেল। লাশটাকে চিত করার সাথে সাথেই মাতবর জালালউদ্দীন একটা গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। সমবেত জনতাও নিজের অজান্তেই একটা কেল্ল দিয়ে ওঠে, কারণ লাশটি আর কারও নয়, জালালউদ্দীনের ভাতিজা কালামের। অকল্পনীয় এ ঘটনায় তাদের বিস্ময় মেশানো শব্দতরঙ্গ ঘুরতে ঘুরতে ক্রমশই মেঘ হয়ে উড়তে থাকে সুখবাসপুর গ্রমের পুবে-পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণে।

ততক্ষণে একদল ব্যস্ত হয়ে পড়ছে জালালউদ্দীনকে নিয়ে। মাথায় পানি ঢালা ও বাতাস করার মধ্যে দিয়ে তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা চলে সমান তালে। পুলিশ অফিসারের মনে হল বডিটা অন্তত বার ঘণ্টার উপর দিঘীর জলে পড়ে ছিল। পোস্টমর্টাম করার আগে কিছুই বলা যাবে না। লাশ মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে তিনি তাকালেন উপস্থিত জনতার দিকে। জনতার সঙ্গে তিনি কথা বলছেন ঠিকই কিন্তু তার সন্ধানী দৃষ্টি বাজপাখির চোখের মতো ঘুরছে দিঘীর চারপাশে । খুঁজে পেতে গিয়ে তিনি দিঘীর পাড়ে পেয়ে গেলেন একটা খালি মদের বোতল আর একটা ট্যাবলেটের পাতা। ততক্ষণে জ্ঞান ফিরে এসেছে জালালউদ্দীনের। তার অসংলগ্ন টুকরো টাকরা বাক্য থেকে অফিসার যা জানতে পারলেন তার মর্মার্থ এই, নির্বাচনের দিন তিনি দুপুরেই কিছু টাকা তোলার জন্য তার ভাতিজাকে পাঠিয়েছিল সদরের ব্যাংকে। নির্বাচনের ডামাডোলে আর তার খোঁজ নেয়া হয় নি। আর থাকতে না পেরে বুকে চাপড় দিতে দিতে জালালউদ্দীন বলতে থাকে— ‘কিন্তু একি হয়া গেল স্যার। ওরে কালাম রে, তুই কই গেলি রে বাপ?’ আপাতত শোকগ্রস্ত এ ব্যক্তিকে ছেড়ে অফিসার পড়লেন জনতাকে নিয়ে। তিনি জানতে চাইলেন, ডেডবডি অর্থাৎ কালামের সাথে কারো ঝগড়া বিবাদ ছিল কিনা। জালালউদ্দীন কিংবা তার বাড়ির লোকজন কিছু বলার আগেই উপস্থিত জনতা একবাক্যে জানাল— গত পরশুদিনই বাজার ভাঙার পর নজরুল চেয়ারম্যানের ছেলে জুলহাসের সাথে কালামের তর্কাতর্কি অতঃপর হাতাহাতির ঘটনা। জালালউদ্দীনের পক্ষের একজন আবার স্পষ্ট করে জানাল, ছেঁড়া শার্টের বোতাম ঠিক করতে করতে জুলহাস নাকি বলেছিল— ‘তোর কত বার বারছে রে কালাম, এইবার তাকে দেইখবার কতা আছে!’ এ জনশ্রুতিকে সাথে সাথেই কয়েকজন সমর্থন করে জানালো— ‘হয় হয় হামরাও শুনছি হামরাও।’ হাওয়া যেদিকে বয় সেদিকেই পাল তোলা সুখবাসপুরের লোকজনের সবিশেষ বৈশিষ্ট্য। অতএব পুলিশ অফিসারও আর অতশত নিয়ে মাথা ঘামালেন না, কারণ তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছেন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে এরকম দু’একটা খুনখারাবি হয়ই। তিনি অধস্তন অফিসারকে নির্দেশ দিলেন, আজকের মধ্যেই জুলহাসকে ধরা চাই। অতঃপর বিদায়ের আগে তিনি জালালউদ্দীনের দিকে ফিরে বললেন— ‘আপনি কোন চিন্তা করবেন না জালাল সাহেব, খুনী যেই হোক তাকে আমরা ধরবই।’ এই বলে তিনি গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। থানার পুলিশ ভ্যান রওয়ানা হতেই ভিড় ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করল।

আজকের এই নিদারুণ ও গোলযোগপূর্ণ ঘটনায় মানুষের তৈরি শব্দে আবারও নতুন করে সুখবাসপুর গ্রামের পথ-ঘাট ঘর-গৃহস্থলি মুখর হয়ে উঠল। থেকে থেকে সেই শব্দতরঙ্গের সাথে মিশে যেতে লাগল নুরু পাগলের একান্ত স্বারালাপ। বিড়বিড় করে নুরু বলতে থাকে—‘মুই সগি জানং কিন্তু কিচ্ছু কবার নং।’ হরিদাসী বুড়ি বাঁকা কোমরটা সোজা করতে করতে বলে—‘এই নুরু এই, কি জানিস তুই?’ নুরুর আপন মনের উত্তর—‘কাইল আইতোত এইটে কোনা অন্য ঘটনা ঘটছিলো বাহে!’ হরিদাসী বুড়ি নুরু পাগলের পাছায় লাঠির খোঁচা দিয়ে বলে ওঠে— ‘পাগলার পাগলা ফির উল্টাপাল্টা কথা কইস, আগের বার মনে নাই? সবায় ধরি যখন দিবে না কয়টা নাগে তখন টের পাইস, যা ভাগ এটে থাকি।’ বলতে বলতে হরিদাসীও বাড়ির পথ ধরে। আর নুরু আপন মনে ঘুরতে থাকে দীঘির চারপাশে।

সেদিন বিকেলে সদর থানায় পুলিশ অফিসার মাহবুবুল হক পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা দেখেই ব্যস্ত হলেন ধৃত জুলহাসকে নিয়ে জেরা করতে। রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা আছে পানিতে ডুবে ভিকটিমের মৃত্যু। তবে সন্দেহের বিষয় হল ডেডবডির পেটে অ্যালকোহলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সবই ঠিক আছে— ভাবলেন অফিসার। নির্বাচনী কেওয়াস। এবার আসামী স্বীকার করলেই ল্যাটা চুকে যায়। আসামীকে রিপোর্ট সহ কোর্টে চালান দিলেই তার দায়িত্ব শেষ। বাড়ি গিয়ে টাকি মাছের ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে একটা ঘুম দিতে পারলেই তিনি এখন বাঁচেন। সারাদিন যে ধকলটা গেছে! তাই মাহবুব সাহেব এক প্রকার অধৈর্য নিয়েই লকআপে ঢুকে গেলেন। একটু পরেই প্রচ- একটা চড়ের শব্দ শোনা গেল, সেই সাথে মাহবুব সাহেবের হঙ্কার— ‘বল হারামজাদা! কালামকে খুন করলি কেন?’ একহাতে ফাঁটা ঠোঁট চেপে ধরে বাঁশপাতার মত কাঁপতে কাঁপতে জুলহাসের উত্তর— ‘মুই খুন করং নাই স্যার।’ ‘তাহলে এলাকার লোক মিথ্যা বলছে। তুই বাজারে কালামকে হত্যার হুমকি দেস নাই?’ ‘সামান্য কথা কাটাকাটি হইছেল স্যার। নির্বাচনের গরমে অর মাথাটাই সেদিন খারাপ আছিল স্যার।’ এবার কৌতুক বোধ করলেন মাহবুব সাহেব— ‘আচ্ছা।’

একটু ভরসা পেয়ে জুলহাস বলতে থাকে— ‘সেদিন বাজারোত একপালা মাইনষের সামনত কালাম মোর বাপ-মা তুলি গালি দেচ্ছেল স্যার। তাতে মোর মাথাটাও…।’ অফিসার জুলহাসের কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে ওঠেন— ‘আর তাতে তুই ওকে হত্যার হুমকি দিলি। আর মওকা মতো খুনটাও করলি।’

‘আল্লার, কিরে স্যার। অক মুই খুন করং নাই। কালাম হামার দোস্ত, অক মুই খুন করিম ক্যা?’

‘আচ্ছা দাঁড়া সত্যি বলবি নাতো? দেখ তোর মামলা কেমনে সাজাই।’ বলে তিনি লকআপ থেকে বের হয়ে ডিউটি অফিসারকে নির্দেশ দিলেন— ‘কেসটা সাজানোর আগে দেখেন তো হারুন সাহেব এই হারামজাদার নামে আগে কোন মামলা ছিল কিনা?’ বলেই তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে এক কাপ চা চাইলেন। শালার নির্বাচনী ঝামেলায় জীবনটাই তার শেষ হতে চলল। মাহবুব সাহেব রাগে গরগর করতে করতে চায়ের কাপটা হাতে নিয়েছেন কি নেন নি, এমন সময় ডিউটি অফিসার জানাল— ‘বছর দু’য়েক আগে এই দু’জনের নামে অর্থাৎ জুলহাস আর কালামের নামে একটা ধর্ষণ মামলা হয়েছিল স্যার।’

মাহবুব সাহেব অবাক হওয়া গলায় উত্তর দেন—

‘বলেন কি, কালাম মানে যে খুন হয়েছে সেই তো?’

‘জ্বি স্যার, এজাহারে লেখা আছে কালাম আর জুলহাস দুই বন্ধু। ওরা দু’জনেই ফুলজান নামে একটা মেয়েকে ধর্ষণের আসামী ছিল। তবে মামলাটা পরে খারিজ হয়ে যায় স্যার। আসামীদের কেউই আর শেষতক ধরা পড়ে নি, গ্রামেই সালিশের মাধ্যমে ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হয়ে যায়।’

‘আশ্চর্য তো?’— বলতে বলতে উঠে দাঁড়ান মাহবুব সাহেব। ডিউটি অফিসারকে তিনি নির্দেশ দিলেন— ‘তাহলে কেসটা সাজাতে আপনার সুবিধেই হবে কি বলেন হারুণ সাহেব? খুনের এজাহারে আগের ধর্ষণ মামলার প্রসঙ্গটাও আনবেন। আর ঐ ফুলজান মেয়েটা এখন কোথায় পারলে একটু খোঁজ নিয়েন তো?’

মাহবুব সাহেব বাড়িতে যাবার জন্য পা বাড়াবেন, এমন সময় হুড়মুড় করে তিন-চারটে লোক তার অফিস কক্ষে ঢুকে পড়ে। তারমধ্যে সবচেয়ে উদভ্রান্ত চেহারার মানুষটি মাহবুব সাহেবের হাত চেপে ধরে কাতর কণ্ঠে বলে ওঠে— ‘স্যার মোর নাম নজরুল, মুই এবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। জুলহাস হামার ছাওয়াল । অয় খুন করবার পারে না স্যার। এটা জালালউদ্দীনের ষড়যন্ত্র। অয় নির্বাচনত হারি যায়া নিজের ভাতিজারে খুন করি হামার ছাওয়ালটার খুনী বানাইছে স্যার।’

‘শুনেন সাহেব। কে কি করছে না করছে সব কোর্টে হবে। আমরা ওকে কোর্টে চালান দেব। আপনি কোর্টে গিয়ে যা করার করবেন।’ এই বলে মাহবুব সাহেব আর কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা গাড়িতে দিয়ে উঠলেন।

সেদিন সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরে ডিউটি অফিসার হারুণ সাহেব যখন ফুলজান নামের এক ধর্ষিত মেয়ের খোঁজ নেয়ার জন্য সুখবাসপুর গ্রামে প্রবেশ করলেন, তখন ঝোঁপদিঘীর মাথার উপর ভেসে উঠছে মস্ত বড় চাঁদ। লোকজন জানালো— সেবার গ্রামের সবাই ফুলজানকেই দোষী সাব্যস্ত করে। অনেকেই সাক্ষ্য দিয়েছিল যে, সে নাকি যখন তখন ঝোঁপদিঘীর ঝোঁপে যাতায়াত করত। তাই গ্রাম সালিশে কামাল-জুলহাসের বিরুদ্ধে ফুলজানের আনিত ধর্ষণের অভিযোগের ব্যাপারটা কেউ আর পাত্তা দেয় নি। বরং গ্রামের উঠতি যুবকদের চরিত্র যাতে আর খারাপ না হয় সেজন্যে জালালউদ্দীন আর নজরুল এই দুই মাতবরের আদেশেই রিক্সাচালক ইদ্রিসকে তার ধর্ষিত মেয়ে ফুলজানসহ গ্রাম ছাড়া হতে হয়েছিল।

‘তা তামরা এ্যালা বোদ হয় ঢাকাত আছে। তা ক্যানে এ্যালা ঐ কথার খোঁজ ফির ক্যানে বাবা?’— বলে এক বয়োবৃদ্ধ ডিউটি অফিসার হারুন সাহেবের দিকে তার ছানি পড়া চোখ তুলে জুলজুল করে চেয়ে থাকে।

‘না চাচা এমনি’— বলে হারুণ সাহেব তার মটরসাইকেল স্টার্ট দেয়।

হারুণ সাহেবের মটরসাইকেলের ভটভট শব্দে সুখবাসপুর গ্রামের নৈঃশব্দ্যে আবারও একটা চিড় ধরে। শুধু নুরু পাগলা তার ভাঙ্গা ঘরের দাওয়ায় বসে কি যেন একটা স্মরণে আনার চেষ্টা করে। নির্বাচনের দিন সন্ধ্যার পর বোরকা পরা কাউকে কি সে ঝোঁপদিঘীর ঝোঁপে যেতে দেখেছে— সেটা ঠিক তার মনে পড়ে না। আপাতত মটরসাইকেলের ভটভট শব্দটাই ওর মাথার ভেতর দারুণ এক অনুরণন তোলে। সে শব্দে নুরু শিশুর মত মুগ্ধ হয়ে, মুখ দিয়ে ভটভট ভটভট শব্দ করার প্রাণান্তকর চেষ্টার মধ্য দিয়ে যেনবা নতুন কোনো খেলায় মেতে ওঠে।

————————————

মেহেদী ধ্রুব
জলকূয়া

গবেষকের গবেষণার বিষয় ‘বাংলাদেশের বধ্যভূমি : প্রেক্ষাপট ও পর্যালোচনা’। এ কাজ করতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয় তাকে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নতুন নতুন গল্প জানতে পারে সে এবং এ গল্পগুলোর সাথে নিজের কল্পনা মিশিয়ে লিখে ফেলে জমজমাট গল্প। গল্পকার হিসেবেও তার বেশ নামডাক। আজ তাকে যেতে হচ্ছে গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের কোন এক গ্রামে। গ্রামে গ্রামে যাওয়া নতুন কিছু নয়; কিন্তু আজ তার মধ্যে খেলা করে অন্য রকম এক রোমান্স। কারণ, কয়েক মাস আগে বাবার কাছ থেকে শুনেছে এ শ্রীপুরের কোন এক গ্রামে বেড়ে ওঠেছে তার বাবা এবং এখানে আছে তার পৈতৃক ভিটা। বিষয়টা জানার পরে বাবাকে দোষারূপ করতে পারে না। কারণ, তখন বাবার করার ছিল না কিছু। তবে এতো দিন ধরে এ কথা কেন চেপে রেখেছে তা এক রহস্য। এ রহস্য জানার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করেনি সে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবার স্বাস্থ্যের কথা ভেবে মেনে নেয়। সব রহস্য ভেদ করার দরকার পড়ে না জগতে। কত রহস্য অজানা থেকে যায় মানুষের। এ রহস্যটাও না হয় অজানা থেকে গেলো। বাবার বয়স হয়েছে। ঠিক মতো কথাও বলতে পারে না। কখন মারা যায় তার ঠিক নেই। তাই বাবাকে প্রেশার দেয়া ঠিক হবে না। তবে বাবা বলে, এখানের কোন এক গ্রামে তাদের বাড়ি ছিলো। সংগ্রামের সময় তার বড়ো মা ও ভাইদের পাঞ্জাবিরা মেরে তাকে গ্রামের স্কুলের ক্যাম্পে আটক রাখে। কিন্তু সে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসে। পালিয়ে আসার সময় পঞ্জাবিরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে; কপালগুণে এ গুলি লাগে তার বাম কানে এবং কান ছিঁড়ে পরে মাটিতে। আর এ ছেঁড়া কান ঢাকার জন্যই লম্বা লম্বা চুল রাখতে হয় তাকে। এসব কথা মনে পড়ে গবেষকের। এতে বাবার প্রতি তার এক ধরনের মায়া জন্ম নেয়; কখনোবা গর্বে তার বুকটা ফুলে ওঠে। কারণ, এক হিসেবে বাবাকে মুক্তিযোদ্ধাও বলা যায়। ফলে একটা অহংকারও কাজ করে। তবে আজ বাবার জন্মভূমির প্রতি গভীর এক অনুরাগ আসে তার। বারবার মনে হয় এ বুঝি তাদের গ্রাম; এ রাস্তা দিয়ে বুঝি তার পূর্বপুরুষেরা চলেছে। এখনো বুঝি রয়ে গেছে পায়ের ছাপ। ইশ, বাবা যদি নাম ঠিকানা বলতো তাহলে খুঁজে বের করা যেতো; ভাবে সে। তার বাবার মতো ভালো মানুষই হয় না। এতো কিছু হারানোর পরেও বেঁচে আছে। তাকে আদর যতœ করে মানুষ করেছে। আজ সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছে। হয়েছে নামকরা গল্পকার। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। এ কি কম পাওয়া? তাই বাবাকে প্রশ্ন করে কষ্ট দিতে ইচ্ছে হয় নি কখনো। কেননা এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে বাবার মন খারাপ হয়ে যায় এবং খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেয় প্রায়। তাই অতীত স্মৃতি মনে করিয়ে সংসারে অশান্তি ডেকে আনার পথ মাড়ায় না সে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে এ পথে যেতে যেতে রোমাঞ্চিত হয়। অটো রিক্সার যাচ্ছে দুর্দান্ত গতিতে; হয়তো তার বাবার গ্রামের মধ্য দিয়ে অথবা বাবার পরিচিত কোন গ্রামের মধ্য দিয়ে অথবা তার কোন আত্মীয়ের গ্রাম দিয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ, আম-কাঁঠাল-লিচুর বাগানকে পিছনে ফেলে। আহা, অজানার মধ্যেও আছে এক অসীম টান। না দেখার মধ্যে আছে গভীর মায়া এবং কিছুক্ষণের পরেই যে গ্রামের উদ্দেশ্যে এসেছে সেই গ্রামে পৌঁছে যায়। তখন গভীর এক আবেগ নিয়ে মমতা নিয়ে মাটির দিকে তাকায়। আহা, কী পবিত্র এ মাটি। এ গ্রামটি উঁচুনিচু টেক-টিলার মধ্যে গাছগাছালির ছায়ায় ঘুমিয়ে আছে যেন। মাথার পিছনে রোদ নিয়ে নির্ধারিত স্থানের দিকে আগায় সে। লোকমুখে শোনা কথার বাস্তবতা নিরুপণ করতে, গবেষণায় নতুন তথ্য তুলে আনতে, গল্পের প্লট খুঁজে পেতে এবং বাবার স্মৃতিবিজড়িত মাটির গন্ধ নিতে তাকে এ গ্রামে থাকতে হবে কিছু দিন। তাই গ্রামের মেম্বারের সাথে তার সমস্ত কথা ও ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেছে ফোনে ফোনে। তার ইচ্ছে অনুযায়ী দিঘির দেউলে একটা ঘর বানানো হয়েছে। দরকার হলে সে হয়তো কোন কোন রাতে এ ঘরে থাকবে। ঢাকা থেকে আসতে আসতে বিকেল হয়ে গেছে। তাই দুপুরের খাবার বিকেলে খেতে হয় তাকে। আর তর সয় না; খেয়েই বেরিয়ে পড়ে। সাথে মেম্বার আর তার এক চ্যালা। তার জন্য বানানো ঘর দেখে ইতিহাস ও প্রকৃতির খুব কাছে যাবার অনুভূতি জাগে মনে এবং আজ রাতেই এ ঘরে থাকার ভূত চাপে মাথায়। এ রকম ভয়ংকর স্থানে রাতে থাকলে কী কী বিপদ হতে পারে তা বুঝিয়ে বলে মেম্বার; কিন্তু তাকে টলানো যায় না। যেন এ শীতের রাতে এ দিঘির দেউলের এক মায়া আছে; আছে এক অশরীরী আত্মার টান। এ মায়া ও অশরীরী আত্মা তাকে টানছে। সে শুনেছে এ দিঘিতে এখনো কোন মানুষ নামে না; এখনো সন্ধ্যার পড়ে কেউ এ পথ দিয়ে যায় না। কারণ, এ দিঘির জলকূয়াতে শত শত মাথার খুলি জমা হয়ে আছে। কেউ দিঘির পানিতে নামলে পায়ের তলায় পড়ে মানুষের হাড়। নিশুতি রাতে এসব মাথার খুলি ও হাড় নাকি উপরে এসে নাচে অথবা কান্না করে অথবা হাসে। এ এক মিথ নাকি রহস্য নাকি মনের ভয় তা জানার আগ্রহ পেয়ে বসে তাকে। এবং তার গবেষণায় বধ্যভূমি না বধ্যদিঘি না বধ্যজল লিখবে তা নিয়েও ভাবছে। এভাবে অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও বাড়িতে যেতে চায় না। রাতের খাবার পর্যন্ত এখানে খেতে চায়। অবশেষে মেম্বার বিরক্ত হয়ে চলে যায় বাড়িতে; কিন্তু রেখে যায় তার চ্যালাকে। রাত বাড়তে থাকে। চার্জার লাইটের আলোতে দিঘির দেউলের খানিকটা দেখা যায়। খুব বেশি কুঁয়াশা নেই; তবে হিম হিম হাওয়া। সে আপন মনে ভাবে; ভেবেই চলে। কিন্তু মাথার খুলি বা হাড় বা ভূত-প্রেত কিছুই চোখে পড়ে না। রাত একটা বেজে গেলেও কোন কান্নার শব্দ বা হাসির শব্দ বা নাচের শব্দ পাওয়া যায় না। তাই তার বুকের কোণে ব্যথা অনুভব হয়; না পাওয়ার ব্যথা। আবার একটা ব্যঙ্গ হাসির রেখা ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকে। সময় কাটছে না; তখন সে ব্যাগ থেকে ট্যাবটা বের করে ফেইসবুকে একটা পোস্ট দেয়। এ পোস্টে তার পুরনো প্রেমিকা কমেন্ট করে : নতুন গল্পের জন্য প্লট খুঁজে বেড়াচ্ছো নাকি : এ কমেন্ট পড়ার সাথে সাথে তার উত্তেজনা বাড়ে। গল্প লিখতে হবে এ দিঘি নিয়ে। এবং আজ রাতেই লিখতে হবে। পড়ে লিখবো বলে রেখে দিলে এ আবেগ বা গতি থাকবে না। তখন মেম্বারের চ্যালাকে ডেকে আনে এবং বলে তার কয়েকটা পিন লাগবে। চোখে ঘুম নিয়ে চ্যালা জানায় এতো রাতে পিন পাওয়া সম্ভব না। তখন সে আরো উত্তেজিত হয় এবং পিন পাওয়া না গেলে কয়েকটা খেজুর কাঁটা নিয়ে আসতে বলে। রাত একটার পরে এ রকম ভয়ংকর স্থানে এ রকম শীতের রাতে খেজুর কাঁটা আনতে যায় চ্যালা আর অস্ফুট গলায় বলে : শালা পাগলের বাচ্চা পাগল : এ সময়টা কাটতে চায় না। এই বুঝি প্লট হারিয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি ফ্রেমবন্দি করতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে চ্যালা চার-পাঁচটা খেজুর কাঁটা নিয়ে আসে। সে সাথে সাথে দুইটা খেজুর কাঁটা তার দুই পায়ের গোড়ালির চামড়াতে সেলাইয়ের মতো করে ঢুকিয়ে দেয়। গ্রামের মায়েরা কাঁথা সেলাই করে যেভাবে। যেন সে তার পায়ের গোড়ালি সেলাই করছে। গোড়ালির চামড়া মোটা বলে রক্ত বের হয় না; বরং পিনিক ওঠে তার। লেখার সময় এ পিনিকটা দরকার হয় তার। তখন ভাব আসে তর তর করে আর লিখতে বসে গল্প : এই দিঘির আছে একটা কাহিনি। অনেক পুরনো কাহিনি। কিন্তু জীবনের সাথে তার ছিলো গভীর মিতালি। পথের পরতে পরতে বাতাসের ভাজে ভাজে আসমানের কোণায় কোণায় তার কথা লেপ্টে আছে¬। তার ছলছলা জলে সাঁতার কাটে কতো পরাণের কথা। কতো স্বপনের কথা। কতো সুখের কথা। কতো দুখের কথা। কতো ডরের কথা। কতো রহস্যের কথা। এই দিঘিতে চৈত্র মাসেও জল থাকতো পাতাল সমান। রোদের দিনেও জল থাকতো ঠা-া আর ঠা-া। এই গল্পের মিডুরি ও তার ছোটভাই ফালাইন্না সারা দিন এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করার পরে অথবা খেলা শেষ করার পরে লাফ দিতো জলে আর সাথে সাথে দিঘি তার বুকের মধ্যে তাদেরকে লুকিয়ে ফেলতো। জলের কণা তার ঠোঁট দিয়া চুষে নিতো তাদের ছোঁয়া এবং সারাদিন খ্যাতে-খামারে কাজ করার পরে মিডুরির বাবা ও তার বড়ো ভাই গোসল করতে নামলে তাদের ঘামের গন্ধ এক টানে পান করতো। এবং জলের কণা তার চোখ দিয়া তাদের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত দেখতো। সারাদিন ঘরে-বাইরে কাজ করার পর মিডুরির মা ও তার বড়ো জা বাতির আযানের সময় দিঘিতে নামলে দিঘি তার হাত দিয়া তাদেরকে আদর করতো অথবা এবং তাদের সমস্ত শরীরে জিহ্বা দিয়া চেটে নিতো। কিন্তু যেইদিন মান্দাইরা চলে গেলো এই দিঘির মালিকানা ফেলে সেইদিন থেকে এই দিঘির পানিতে গন্ধ আর গন্ধ; গন্ধে বমি আসে। অথচ এই দিঘিই ছিলো তাদের একমাত্র সম্বল। কী পরাণের দিঘি; কী সাধের দিঘি। একশো নব্বই বছর আগে এই দিঘি দখল করে নিয়েছিলো ওরা। নিজের বাপ-দাদার দেশে মিডুরিরা তাদের সুখ-শান্তি হারিয়েছিলো। মোজাই গাঙের ওইপাড় থেকে মান্দাইরা আসে এবং তারা দলবল নিয়া দিঘির দেউলে বসত গাড়ে। বসত গাড়ার জন্য দরকার জল। যেইখানে জল আছে সেইখানেই বসত আছে। জীবন আছে। চতুর মান্দাই তা ভালো করে বুঝতে পারে এবং মিডুরির বাপের সাথে হাত মিলিয়ে বসত গড়ে তুলে। এক দিন এক মেঘের রাতে মান্দাই আসে মিডুরির বাপের বাংলা ঘরে। তাদের আলোচনা শুনে মিডুরির মা কয় : মিডুরির বাপ গো মিডুরির বাপ; এইডা তুমি কী করলা : নিজ গ্রামের মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে মান্দাইকে দিঘির দেউলে বাড়ি করার সুযোগ করে দেয় মিডুরির বাপ। সে মনে করেছে মান্দাই তাকে দিঘি শাসন করতে সাহায্য করবে। কিন্তু হায়; কী হলো শেষে। এক দিন দুই দিন করে সময় যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যে মান্দাইয়ের ক্ষমতা বাড়ে এবং একদিন দিঘির দেউলসহ দখল করে নেয় দিঘিটা। এতো চতুর মান্দাই। তার সাথে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের পাড়ার কথা না। মোল্লারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। বিশেষ করে সিরাজ মোল্লা। বাতির শিশের মতন লাল টকটকে এই যুবক শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠে না; রাজনীতিক দূরদর্শীহীনতার কারণে পেরে ওঠে না। অবশেষে সমস্ত ক্ষমতা চলে যায় মান্দাইদের হাতে। চতুর মান্দাইরা ক্ষমতা দখল করার পরে সবার আগে মোল্লাদের দূর করে। এই দিঘির দেউলে মোল্লাদের কোন স্থান হয় না। মান্দাই তার শেয়ালের বুদ্ধি দিয়া সমস্ত দেউলের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং স্বর্ণের দরে দিঘির জল বেচে। চৈত্র মাসে বিল-টিল সব শুকিয়ে গেলে দলে দলে মানুষ আসে জলের জন্য। তখন মান্দাই সের দরে জল বিক্রি করে। তারপর সময় যায় আর যায়। সিরাজ মোল্লার বংশধর; মজুমদারদের বংশধর সচেতন হয়ে ওঠে। পালের হাওয়া বদলাতে থাকে। এবং এক সময় মান্দাইরা মোজাই গাঙের ওইপাড়ে চলে যায়। বাপ দাদার ভিটাতে চলে যাবার আগে সুদের উপর সুদ তার উপর কটকিনা সুদের ব্যবসা করে এবং দিঘির জল শুকিয়ে সমস্ত মাছ নিয়া যায়। একশ নব্বই বছর ধরে দিঘিটা শাসন করার পরে মান্দাইরা চলে গেলে সবাই খুশি হয় এবং মোল্লা বাড়ির জিন্নত মোল্লা ভাবে এইবার দিঘিতে আরাম করে গোসল করতে পারবে। আরাম করে ফরজ গোসল করতে পারবে। আরাম করে পোলাপানের গু-মুত ধুতে পারবে। আরাম করে ডুব সাঁতার খেলতে পারবে। কিন্তু মান্দাইদের পরিত্যক্ত ঘর-বাড়ি থালা বাসন তোশক দখল করার জন্য মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়। তখন জিন্নত মোল্লার হুঙ্কারে আকাশে বাতাসে পর্যন্ত ভয় ঢুকে। গুপ্তহত্যা চলতে থাকে। আর কয়েক দিন পর পর দিঘিতে এক একটা লাশ ভেসে ওঠে। মান্দাইরা চলে যাওয়ার আগে তার এই জমিভিটা মোল্লাদের কাছে বেচে কিছু; কিছু বেচে মজুমদারদের কাছে। যাওয়ার আগে এক নিশুতি রাতে মান্দাই যায় জিন্নত মোল্লার কাছে : মোল্লা সাহেব, এই দিঘির জলকূয়াতে একটা কলসি রাখছিলাম; এই কলসিভরা স্বর্ণ; এই অসময়ে আমি তা খুইজ্যা পাইলাম না; আপনারে পছন্দ করি; আপনি সময় মতো উঠাইয়া নিয়েন; ও হ্যা; এই কথা যেন মজুমদাররা না জানে : এই কথা শোনার পরে জিন্নত মোল্লা মান্দাইয়ের প্রশংসা করে অনেক এবং অনেক আদর আপ্যায়ন করে। কিন্তু এই রাতের শেষের দিকে মান্দাই যায় মজুমদারদের বাড়িতে। গান্ধার মজুমদারের বাংলা ঘরে তাদের আলোচনা শুরু হয়। তখন গান্ধার মজুমদারের কানে কানে কয় : মজুমদার সাহেব, এই দিঘির জলকূয়াতে একটা কলসি রাখছিলাম; এই কলসিভরা স্বর্ণ; এই অসময়ে আমি তা খুইজ্যা পাইলাম না; আপনারে পছন্দ করি; আপনি সময় মতন উঠাইয়া নিয়েন; ও হ্যা; এই কথা যেন মোল্লারা না জানে : এই খবর জানার পরে মোল্লারা এবং মজুমদাররা উতলা হয়। নিশুতি রাতে মোল্লারা দিঘির জলকূয়াতে নামে। নিশুতি রাতে মজুমদাররা জলকূয়াতে নামে। কত বার যে নামে তার হিসাব নাই। কিন্তু কোন বারই জলকূয়ার সন্ধান পায় না তারা। দিঘির মাঝখানে কাদা আর কাদা। তবুও তারা দিঘির কাছাকাছি থাকে। দিঘিতে নামার জন্য সুযোগ খোঁজে এবং দখলদারিত্ব নিয়া হামলা ও হত্যা বাড়ে। প্রত্যেক দিন কোন না কোন মানুষ মারা যায়। দিঘিতে লাশ ভেসে উঠলেও এই লাশ শনাক্ত করার আগেই মাছে খেয়ে ফেলে অর্ধেকের চেয়ে বেশি। এবং কয়েক দিনের মধ্যে পুরো লাশ উধাও হয়ে যায়। তখন গন্ধের কারণে জল স্পর্শ করা যায় না। গন্ধ দূর করার জন্য মোল্লারা চুন দেয় মজুমদাররা চুন দেয়; কিন্তু জল থেকে এই গন্ধ দূর হয় না। তাই মান্দাইয়ের হাত থেকে মোল্লা ও মজুমদারদের হাতে এই দিঘির মালিকানা আসলেও মানুষ আরাম পায় না; কারণ তারা দিঘিতে নামতে পারে না গন্ধের কারণে; প্রত্যেক দিন জলের উপর ভাসে লাশ আর লাশ। গান্ধার মজুমদার মানুষের কাছে বলে বেড়ায় : দশ টাকা দিয়া মান্দাইয়ের দিঘি কিইন্যা রাখছি : জিন্নত মোল্লা মানুষের কাছে বলে বেড়ায় : দশ টাকা দিয়া মান্দাইয়ের দিঘি কিইন্যা রাখছি : পুব পাড়ার বঙ্গ রাখাল মানুষের কাছে বলে বেড়ায় : আমি মান্দাইয়ের কাছ থেইকা এক পাকি জমি কিইন্যা রাখছি : মোল্লা বাড়ির জিন্নত মোল্লা মজুমদার বাড়ির গান্ধার মজুমদার এবং পুব পাড়ার বঙ্গ রাখাল জমির কাগজ দেখায়। কিন্তু সব জমির দাগ একটাই। তারা প্রত্যেকে ভেবেছিলো দেউলসহ দিঘিটা দখল করবে। কিন্তু মান্দাইরা সরল মানুষ থাকলে একশ নব্বই বছর কীভাবে ভোগদখল করে এই জমি-ভিটা-দিঘি? কীভাবে সুদের ব্যবসা করে কামাই করে কাড়ি কাড়ি টাকা? দুই চার গ্রামের মাতুব্বররা সালিশে বসলে প্রত্যেকে দিঘির মালিকানা চায়। দিঘির ভাগ ছাড়তে চায় না কেউ। তাই মাতুব্বরা দেউলসহ দিঘির মালিকানা তিন জনের নামে রেখে বাকি জমি ভাগ করে দেয়। দুই চার গ্রামের মাতুব্বরদের রায় মেনে নেয় তারা। রায় হয় এইভাবে : দিঘিটা তারা সবাই ব্যবহার করবে; গজার মাছগুলা তুলে তিন জনের টাকায় মাছের পোনা কিনে ছাড়া হবে; এই পোনা বড়ো হলে তারা তিন জনে সমান ভাগে ভাগ করে নিবে : কিন্তু এই রায় উল্টে যায় এবং তিন জনে ভাগ পাবার কথা থাকলেও মূলত ভাগ হয় দুই ভাগে। মজুমদারদের ও মোল্লাদের। জমির মাঝখান থেকে বড়ো অংশ পায় বড়ো বংশওয়ালা মজুমদাররা আর মাঝখানের আশেপাশের জমিগুলা পায় মোল্লারা এবং বঙ্গ রাখালরা। মোল্লারা ও রাখালরা এক সাথে ভাগাভাগি করে থাকে। মজুমদারদের বাড়ির পশ্চিম পাশে মোল্লাদের বাড়ি আর পুব পাশে রাখালদের। রাখালদের বাড়ি এই দিঘির দেউলে। কিন্তু দিঘির দেউলে রাখালদের বাড়ি থাকলেও মোল্লারা দিঘির মাছ ধরে বেশি। এই দিঘি পাহারা দেওয়ার কাজ এবং মাছগুলাকে কুড়া খাওয়ানোর কাজ করে বঙ্গ রাখালের পরিবার; কিন্তু মাছ ধরার সময় বড়ো মাছটা নিয়া যায় জিন্নত মোল্লার ছেলে। মাছ নিয়া ক্ষেতের লাউ নিয়া ক্ষেতের কচু নিয়া পাট নিয়া জিন্নত মোল্লার ছেলের সাথে রঙ্গ রাখালের ছেলের লেগে যায়। এক পর্যায়ে খুনোখুনি শুরু হয়। মোল্লারা রঙ্গ রাখালের পরিবারের সতেরো জনকে হত্যা করে দিঘিতে ফেলে। এইভাবে নয় মাস যাবার পরে মজুমদাররা রাখালদের সাহায্য করে এবং তাদের চির শত্রু মোল্লারা শেষ পর্যন্ত লেজ গুটিয়ে চলে যায়। বঙ্গ রাখালদের ত্রিশ জন মানুষ মারা যায়। জমি নিয়া মারামারি লেগে এতো মানুষ মারা যাবার ঘটনা এই দেশে নাই। চব্বিশ মাস পরে রাখালের জীবিত ছেলে এই দিঘির মালিকানা পায়; কিন্তু শুরু হয় নতুন জ্বালা-যন্ত্রণা। এই দিঘির জল দিয়া রাখালের ছেলের পরিবার গোসল করতে পারে না; ওজু করতে পারে না। কারণ, মান্দাইয়ের গায়ের গন্ধ আজও কমে নাই; মজুমদারদের গায়ের গন্ধ কমে নাই; মোল্লাদের গায়ের গন্ধ কমে নাই; লাশ পচার গন্ধ কমে নাই : এ পর্যন্ত লেখার পরে গবেষকের মনে হলো এভাবে সরলরৈখিক বর্ণনা করলে তার গল্প সুপাঠ্য হলেও কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে। তাই সে প্লটের মধ্যে ভাঙন নিয়ে আসার চিন্তা করে। তখন অন্ধকার আরো ঘন হয়। গাছগাছালিরা যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে আর এ নিঃশ্বাসের শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছে সে। আবার লেখা শুরু করে : এই দিঘির জলের গন্ধের কারণে বঙ্গ রাখালদের বংশধররা সমস্যায় পড়ে; কিন্তু এক সময় এই দিঘির ছিলো বিরাট এক গৌরব। এই দিঘির মাঝখানে যে জলকূয়া আছে তাতে বাস করতো এক মনসা। কিন্তু এই মনসার সন্তানরা কোন দিন কাউকে ছোবল দিতো না। মানুষ ভাবতো এইসব সাপ সাপের মতন থাকলেও আসলে এইগুলা মনসার সন্তান। মান্দাইরা আসার অনেক আগে শনি-মঙ্গল বারে এই মনসারে দুধ কলা ভোগ দিতো মানুষ। কিন্তু এক সময় এই ভোগ দেওয়া কমতে থাকলো। গ্রামে আসলো মোল্লারা, আসলো মজুমদাররা, আসলো মান্দাইরা এবং সবশেষে বঙ্গ রাখালরা। কোন বংশই এই ভোগ দেওয়ার প্রচলন ঠিক রাখে নি। তবু কেউ কেউ মাঝে মাঝে ভোগ দিতো তাদের বালামসিবত কাটানোর জন্যে। কারো বাড়ির বউ-ঝিরে জ্বিনে-ভূতে ধরলে অথবা মল্লির পোলাপানের মল্লি ছাড়াতে অথবা শনি-মঙ্গলের আছর ছাড়াতে ভোগ দেওয়া হতো। এই ভোগ দেওয়ারও আছে নিয়মকানুন। প্রথমে কলা গাছ দিয়া একটা ভেলা বানানো হয়। তারপর লাল-নীল কাগজ দিয়া সেই ভেলার উপর ছাউনি দেওয়ার পরে সেই ছাউনি থেকে ফিতা টেনে ভেলার পাড়ে লাগিয়ে বাহারি রঙে সাজিয়ে কাগজের নিশান উড়ানো হয়। তখন তার ভিতরে সবরি কলা, কালো গাইয়ের দুধ, কালো কবুতরের ভুনা, আতব চালের রুটি, জবা ফুল, শিউলি ফুল, কামিনী ফুল অথবা ঋতুভিত্তিক ফুল দেওয়া হয়। কিন্তু এই ভেলাটা পানিতে ছাড়ার কাজ সবাই পারে না। তার জন্য দরকার সাহসী মানুষ। যে বউ-ঝির জন্য অথবা যে বাচ্চার জন্য এই ভোগ দেওয়া হয় তার বাপ অথবা তার স্বামীকে এই কাজটা করতে হয়। অনেক বছর আগে একবার মাইনউদ্দিনের মল্লির ছেলে রাসেলের জন্য এই ভোগ দেওয়া হলে তাকে এই কঠিন কাজটা করতে হয় : শনিবারে বেইল ডুবার সাথে সাথে ভোগের সবকিছু রেডি কইরা আমরা অপেক্ষা করি; আন্ধার নাইমা আসে; রাইত নিশুতি হইলে আমার হাত পাও ক্যামন করতে থাকে; আমার শরীলের সব লোম খাড়াইয়া যায়; রাসেলের মা না করে; কয় যাওয়ার দরকার নাই; রাসেল গ্যালে রাসেল পাওয়া যাইবো; কিন্তু তোমার কিছু হইলে আমার সবই যাইবো; এই ভোগ দেওয়ার দরকার নাই; লিল্লার কপালে এতো দুঃখ লেইখা রাখছিলো আল্লাহ্; মরার ঘরের পিছে শব্দ হয়; ধুম ধুম শব্দ; ঝিঝি পোকা কান্দনের সুরে ডাকে; রাসেলের মা ডরে কাঁপতে থাকে; এইভাবে কাঁপতে কাঁপতে এক সময় রাইত আরো নিশুতি হইলে আমি চোখ বন্ধ কইরা গায়ের সব কাপড় খুইল্যা ফেলি; কলা গাছের ভেলাটা হাতে নিয়া বাইর হওয়ার সময় রাসেলের মা আমার হাতে মুঠি দিয়া ধরে; আমি তারে কই ডরাইয়ো না; তুমি দুআ করো; ঘর থেইকা বাইর হওয়ার সাথে সাথে এক খাব্লা বাতাস জাবরাইয়া ধরে আমারে; মনে হয় আমার পিছে পিছে কিছু একটা হাঁটে; নারায়ণের তেতুল গাছের গোড়ায় আসার পরে তেতুল গাছের ডাইল ভাইঙ্গা পড়ে সামনে; আমি সেই ডাইলের ডাইন পাশ দিয়া যাই; শরীলের লোম সব খাড়াইয়া গ্যালেও দৌড়াইতে থাকি; সব গাছগাছালি আমারে যেন কইতাছে : যাইস না; যাইস না; ফিরে যা; ফিরে যা; ঘরে যা; ঘরে যা : তবু আল্লাহর নাম নিয়া আগাইতে থাকি; নিজের শরীল নিজেই দেখি না; আমি যে একটা মানুষ তা আমার মনে হয় না; মনে হয় আমি একটা ন্যাংটা আজর; মাথার মইধ্যে এই ভাব আসলে আমার সব ডর দূর হইয়া যায়; আমি বিড়বিড় কইরা কইতে থাকি : আয়; আয়; কে আইবি? আয় : এই কথা কইয়া দেই দৌড়; কবিরাজের শিখাইয়া দেওয়া মন্ত্রটা পড়তে থাকি; এইবার দেখি আমি দিঘির সামনে; উত্তরের ঘাটে বইসা পশ্চিমের দিকে মুখ কইরা জলে ভেলাটা ছাড়ার সাথে সাথে চলতে থাকে তা; দিঘির চাইর দিকে ঘুরতে থাকে; তখন দিঘির পুরো জলে বিরাট ঘুরনি; এক সময় নামি দিঘিতে; নামার সাথে সাথে চাইর দিক থেইকা সাপ আসতে থাকে; আমি মন্ত্রটা পড়তে থাকি; কিন্তু সাপগুলা আমার শরীল থেকে আড়াই হাত দূরে থাকে; কাছে ঘেষতে পারে না; মন্ত্রটা পড়তে পড়তে দিঘির মাঝখানে যাই; এই মাঝখানেই জলকূয়া; ডুব দিয়া এই জল কূয়া থেইকা প্যাক আনার কথা মনে হওয়ার সাথে সাথে দম বন্ধ হইয়া যাইবার চায়; মন্ত্রটা পড়তে পড়তে ডুব দিলাম; ডুব দেওয়ার সাথে সাথে মনে মনে মন্ত্রটা কইতে পারছিলাম না; তারপরেও প্যাক খুঁজলাম; কই প্যাক নাইতো; আবার ডুব দিলাম আবার মন্ত্রটা মনে করতে পারলাম না; কিন্তু ডুব থেইকা উঠলে মনে করতে পারি; যে মন্ত্রটা আমার ঠোঁটের আগায় সে মন্ত্রটা ডুব দেওয়ার পরে মনে করতে পারি না; তিন বারের মাথায় না পারলে প্যাকের নাগাল পাওয়া যাইবো না; মন্ত্রটা পড়তে পড়তে আবারো ডুব দিলাম; ঠা-া জলের কারণে হাত পা কান ব্যথা করতে লাগলো; আমি পাতালের দিকে যাইতে থাকলাম; কই মন্ত্র মনে আসে না; পাতালের নিচ থেইকা মনে করার চেষ্টা করলাম; কিন্তু না মনে আসে না; তখন মন্ত্র ছাড়াই জলকূয়ার প্যাক খুঁজতে থাকি; এক সময় প্যাকের সন্ধান পাই; তখন হাতের মইধ্যে একটা কলসির মতন লাগে; আমি আরেকটু ভালো কইরা হাত ভোলাইলে বুঝতে পারি এইটা একটা জলকলসি; জলকলসির ভিতরে হাত ঢুকাইতে পারি নাই; কিন্তু বুঝতে পারি জলকলসিটা কিছু একটা দিয়া ভরা; তখন আমার দম শ্যাষ হয় হয়; আমি জলকলসিটা নিয়া জলে ভাসলাম; সাথে সাথে জলে ঘুরনি আর ঘুরনি; চাইর দিক থেইকা সাপ আসতে থাকে; মন্ত্রটা আর মনে পড়ে না; আমি হাতে জলকলসি নিয়া উঠতে পারি না; কোন রকম লেয়ুর দিয়া মাটিতে উঠি; তখন দিঘির সমস্ত সাপ উপরে উঠতে থাকে; পিতলের জলকলসি নিয়া আমি দেই দৌড় আর আমার পিছে চিৎকার দিতে দিতে আসতে থাকে একটা তুফান; মাথার উপরের সমস্ত গাছগাছালি য্যানো আমার উপর পইড়া যাইবো; গাছগুলা য্যানো আমার দিকে চাইয়া রইছে; আমার দুই ঠ্যাঙের মাঝখান দিয়া একটা বিড়াল মিউ ডাক দিয়া বারি খায়; তবু আমি জলকলসিটা ছাড়ি না; এতো ওজন; তবু ধরেই থাকি; শ্যাষ পর্যন্ত কোন রকমে ঘরে ঢুকি : মাইনউদ্দিন জলকূয়ার কাদা আনতে গেলেও জলকলসি পাওয়ার পরে কাদার কথা ভুলে যায়। কবিরাজের কথামত এই জলকূয়া থেকে কাদা এনে রাসেলের কপালে লেপ দিতে পারলে রাসেলের শরীল আর ফ্যাকাশে হবে না। রাসেলের আগে এক এক করে তিন বোন এইভাবে তিন-চার মাস বাঁচার পরে মারা গেছে। রাসেলের শরীরও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। যেন তার মরার সময় হয়েছে। তাই নানি-দাদিরা কয় : রাসেল পেটে থাকার সময়ই চুষে রক্ত খাইয়া ফেলাইছে; এই মল্লি ছাড়াইতে হইলে দিঘিতে ভোগ দিতে হইবো : তাদের বিশ্বাস এই মল্লি ছাড়ানোর জন্যে যেইদিন মাইনউদ্দিন রাত তিনটার সময় ঘর থেকে বের হবে সেইদিন রাসেল সুস্থ হবে : গবেষক এতোটুকু লিখতে লিখতে রাত দুইটা বাজিয়ে দেয়। মেম্বারের চ্যালা তখন ঘুমে বিভোর। এবার দিঘির দিকে চোখ যায় তার। পশ্চিম দিকে কিসের যেন শব্দ; নাকি সে ভুল শুনছে। মনে হয় সাপের পিলপিল শব্দ। না। এসব কিছু না। একটা সিগারেট ধরায় সে। তার মনে হয় গল্পের ঘোর কাটে নি এখনো। সিগারেট টানতে টানতে একবার ফেইসবুকে ঢুঁ মারে। অনলাইনে এখনো পাঁচ শো ছাপান্ন জন। আহা, মানুষের বুঝি ঘুম নেই। নটিফিকেশনগুলো চেক করে আবার লিখতে বসে : যখন মাইনউদ্দিন ঘর থেকে বের হয় তখন তার বউ রাহেলার জীবন যায় যায় : রাসেলের বাপ ঘর থেইকা বাইর হওয়ার লগে লগে আমার হাতপাও কাঁপতে থাকে; আল্লাহ গো আল্লাহ; রাসেলের বাপ ঘর থেইকা বাইর হওয়ার পরেই ঘরের চালে ধইরা কী যে ঝাকানি; মনে কয় পুতের দরকার নাই; আগে নিজে বাঁইচ্যা লই; আল্লাহ আল্লাহ করি আর রাসেলের মুখের দিকে চাইয়া থাকি; দেখি পুত আমার রঙ বদলায়; এই লাল হইয়া যায় তো এই নীল হইয়া যায়; এইভাবে পুত আমার সাত রঙা হইয়া যায়; ওইদিকে ঘরের পিছে ঘোড়ার খুড়ের শব্দ হয়; রাসেলের বাপে যাওয়ার আগে কইয়া গ্যাছে যাই ঘটুক না কেন তুই কাউরে ডাক দেইস না; ডরাইস না; ডরাইতে না করলে যদি ডরানি না আসতো তাইলে মাগি মাইনষে পুরুষ মাইনষের কাজ করতে পারতো; রাসেলরে কুলে নিয়া বইসা আল্লাহবিল্লাহ করি আর রাসেলের বাপের জন্য বইসা থাকি; আল্লাহ্ আমার পুত দরকার নাই; আমার স্বামীরে ফিরাইয়া আনো; ও মা; ঘরের চালে চাক্কা মারে কেডা জানি; আল্লাহগো আল্লাহ্ তুমি আমগরে রক্ষা করো; বাতির আগুন উড়াল মারতে চায়; হঠাৎ কইরা বাতিটা নিইভ্যা যায়; তখন ডরে আমি কাপড় নষ্ট কইরা ফেলি; কাব্দা লাইগ্যা পইড়া থাকি বিছানার মইধ্যে; মনে হয় এক যুগ পরে রাসেলের বাপের ডাকে হুশ পাই; আমি কই, ও রাসেলের বাপ; আমনে ঠিক আছেন তো? রাসেলের বাপে শীতে থিরথির করে; কই প্যাক পাইছেন? আমার এই কথা শোনার পরে তাইনের হুশ আসে : আমি প্যাক আনার জন্য গেছিলাম নাকি : তখন দেখি তাইনের হাতে একটা পিতলের কলসি; রাসেলের বাপ; ও রাসেলের বাপ; আমনে এইডা কই পাইছেন? আমনে প্যাক না আইন্যা জলকলসি নিয়া আইছেন নাকি; শুনছি এই জলকলসির ভিতরে থাকে সাত রাজার ধন; সোনা, রূপা, মুক্তা; তখন রাসেলের বাপে কয় : চুপ মাগি; একদম চুপ থাক; কাকপক্ষীও যেন টের না পায়; রাসেলের মা আমগর দিন বদলাইয়া যাইবো : আমরা চুপ মাইরা থাকলাম; রাসেলের শরীল আরো ফ্যাকাশে হইতে থাকলো; আমি মাগি সেই দিকে খেয়ালই রাখলাম না; আমি চিন্তা করি এই জলকলসির মুখ ক্যামনে খোলা যায়; এই জলকলসির ভিতরে শব্দ করে হিরা-মুক্তা; রাইতের বেলা টিনের চাল মটমট করে; ঘরের পিছে খটখট করে ঘোড়ার খুড়; আমি তো ডরে মরি; রাসেলের বাপেরে কই; ও রাসেলের বাপ; বড়লোক হওয়ার দরকার নাই; আমনে এই জলকলসি রাইখ্যা আসেন; রাসেলের বাপে তো কথা শুনে না; আমিও জোর করি না; পাওয়া কি সবাই পায় নাকি? আমিও টিক মাইরা থাকলাম; কিন্তু এই জলকলসির মুখ খুলতে পারলাম না আমরা; কার কাছে যাই? কী করি? কিছুই বুঝতে পারলাম না; রাসেলের অবস্থা খারাপ হইতে থাকলো; তের দিন পর পুত আমার মইরা গ্যালো; আমার বুকের মানিক মইরা যাইবার পরে আমার টনক নড়লো; আমার সাত রাজার ধন দরকার নাই; এই ধন সবার সয় না; রাসেলের বাপেরে কই; এই জলকলসি আমনে যেইখান থেকে আনছেন সেইখানে রাইখ্যা আসেন; কিন্তু তাইনে আমার কথা শুনতে চান না; রাসেল মইরা যাইবার সাত দিন পরে ঘরে পড়ে রাসেলের বাপ; জ্বরের চুটে হাত পাও কাঁপতে থাকে; নিশুতি রাইতে রাসেলের বাপ এইবার ধানের ডুলি থেইকা জলকলসিটা পাড়ে; কলসিটার ভিতরে কী জানি শো শো করতে থাকে; রাসেলের বাপ যেই দরজাটা খুইল্যা মাটিতে রাখে সেই চলতে থাকে; চ্যাল চ্যাল কইরা যাইতে থাকে দিঘির দিকে; আর সাথে সাথে রাসেলের বাপের জ্বর ছাড়ে; তার শরীল থেইকা যেন বোঝা নাইমা যায় : এইটুকু লেখার পড়ে তার মনে হয় বাংলা সাহিত্যের নয় বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর একটা হবে তার এ গল্প। তখন দিঘির পানিতে টুপটুপ শব্দ হয়। রাত তিনটার সময় মানুষের শব্দ আসার কথা না। তবু শব্দ আসে। তখন তার গা ছমছম করে। নাস্তিক গবেষক ঈশ্বরকে ভয় না পেলেও আজকের গল্পের আবহ আর এ আবহের কারণে তার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। সে মনে জোর আনে এবং আবার লেখা শুরু করে এবং দিঘি নিয়ে আরো গল্প ফাঁদে : রাসেলের মৃত্যুর অনেক বছর আগে একজন রাজকুমার ছিলো এই দিঘির কাছে। তখন এই দিঘিতে জলডেকচি, জলকলসি, জলথালা, জলবাসন ভেসে ওঠতো। মানুষ এইসব দিয়া তাদের মেজবানি করতো। কিন্তু রাজকুমার মরার পরে এই দিঘি থেকে জলডেকচি জলকলসি জলথালা জলবাসন পাওয়া যায় না। একদিন ঠিক দুপুর বেলা এক মায়ের এক ছেলে রাজকুমার যায় দিঘিতে গোসল করতে। যেই নামে সেই ডান পায়ের মধ্যে প্যাঁচ দিয়া ধরে একটা জিঞ্জির। রাজকুমার ওরে বাবা বলে এক খামচা দিয়া ওঠে দিঘি থেকে। পায়ের সাথে প্যাঁচানো জিঞ্জির নিয়াই বাড়ির দিকে দৌড় দেয়। পায়ের সাথে বাঁধা জিঞ্জির আসতেই থাকে। দিঘি থেকে বাড়ি পর্যন্ত পিতলের জিঞ্জিরের খবর শুনে দুই চার গ্রামের মানুষ ভিড় করে। রাজকুমারের মা বাপ জিঞ্জির ধরে টানে; কিন্তু জিঞ্জির আর শেষ হয় না। টানতে টানতে জিঞ্জিরের পাহাড় জমে। তখন উত্তর বাড়ির ধর্মপাল কয় : এই জিঞ্জির টাইন্যা লাভ নাই রাজকুমারের মা; এই জিঞ্জির শ্যাষ হইতো না : তবু রাজকুমারের মা জিঞ্জির টানতে থাকে। সারাদিন জিঞ্জির টানার ফলে জিঞ্জিরের পাহাড় হয়ে যায়; কিন্তু রাত গভীর হতে না হতেই চ্যাল চ্যাল করে দিঘিতে নামতে থাকে এই জিঞ্জির। নামতে নামতে পুরোটা শেষ হয়ে যায় এবং এক সময় রাজকুমারের পায়ে পড়ে টান এবং তাকে টেনে টেনে নিয়া যায়। রাজকুমারের মা বাপ ঘুম থেকে ওঠে ছেলের পায়ের সাথে প্যাঁচানো জিঞ্জির ধরে টান দেয়। টান দেওয়ার সাথে সাথে জিঞ্জিরের টান থেমে যায়। তখন তার মা বাপ তাকে আবার ঘরে নিয়া যায় এবং আবার জিঞ্জিরটাকে পালঙ্কের সাথে বাঁধে। কিন্তু যতোই বাঁধা হোক না কেন পায়ের বাঁধন খোলা যায় না। কামার পাড়ার কামারেরাও এই জিঞ্জির কাটতে পারে না। একবার এক কামার আগুনে তাতানো ছেনি দিয়া এই জিঞ্জির কাটতে যায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাটতে পারে না এবং ওইদিনই বাড়ি ফেরার পথে রক্ত বমি করে মারা যায়। এরপর থেকে কোন কামার জিঞ্জির কাটতে সাহস করে না। এইভাবে ঊনচল্লিশ দিন পার হয়; কিন্তু ঊনচল্লিশতম রাত শেষ হলে রাজকুমারকে পাওয়া যায় না। জিঞ্জিরও নাই; রাজকুমারও নাই। পুরোহিতরা কয় : চল্লিশাডা কাটাতে পারলে জিঞ্জির ছাইড়া দিতো নিজে নিজে; আহারে রাজকুমার; এই জিঞ্জির চল্লিশ দিনের বেশি পানি ছাড়া থাকতে পারে না; একটা দিনের লাইগ্যা ছেরাডা মরলো : রাজকুমারের পরিণতির কথা চিন্তা করে একটু বিশ্রাম নেয় গবেষক। তখন উত্তর থেকে হাওয়া আসে। ভার ভার হাওয়া। মনে হয় দিঘিতে চিকচক করছে জিঞ্জির। এবার সাহস নিয়ে একটু কাছে যায়; দিঘির পাড়ে যায়; খুব পাড়ে। না; কোন শব্দ নেই। কোন জিঞ্জির নেই। কিন্তু ঘরে ফেরার জন্য ইউটার্ন নেয়ার সাথে সাথে দমকা হাওয়া আসে সামনে থেকে; গরম হাওয়া; আরেকটু হলেই দিঘিতে পড়ে যেতো সে। তখন বুকটা টিক টিক করতে থাকে। প্যারা নরমাল বিষয় নিয়ে গল্প-উপন্যাস পড়েছে; দেখেছে হরর মুভিও; কিন্তু এগুলো তার জীবনে কোন প্রভাব ফেলতে পারে নি। ঘরে ঢুকেই খেয়াল করে মেম্বারের চ্যালা উধাও। তখন সে মনে করতে পারে না কখন থেকে চ্যালাকে দেখে না। হয়তো খেজুর কাঁটা এনে দেওয়ার পরেই চলে গেছে। লেখার নেশায় হয়তো খেয়াল করে নি। তখন আযানের সুর কানে আসে। তখন ঘুম আসে তার। চোখ ভর্তি ঘুম। গল্পের পরেরটুকু পরের রাতে লিখবে বলে মনস্থির করে। ঘুম ঘুম ঠা-া নেমে আসে। এ সময় ঘুমানোর। তবে সকাল সকাল মেম্বার এসে হাজির  হয়। সে ডিস্টার্ব ফিল করলেও মেম্বারকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখে সব। আহা, তার বাবার শ্রীপুর কতো সুন্দর। এই দিঘিটাও সুন্দর। দিঘির উত্তর ও দক্ষিণ পাশে ঘন জঙ্গল। চার পাশের জমি ও জঙ্গল দিঘি থেকে বেশ উঁচুতে। অনেকটা স্ট্যাডিয়ামের মতো। আর পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে পায়ে চলার পথ গেছে দিঘির পাশ দিয়ে। মেম্বার বলে এ পথ দিয়ে সন্ধ্যার পরে কোন মানুষ যায় না। সে আরো বলে সংগ্রামের সময় দুই-তিন শো মানুষকে জবাই করে এ দিঘিতে ফেলা হয়েছে। এসব মানুষের মাথার খুলি এখনো দিঘির জলকূয়াতে জমে আছে। ফলে দুর্গন্ধে মুখে নেয়া যায় না পানি। অবশ্য এক সময় এ দিঘির পানি খেয়েই মানুষ তৃষ্ণা মেটাতো; কিন্তু এখন গরু-ছাগলেও এর পানি খায় না। গবেষক খুটে খুটে সব দেখে। অনেক নোট নেয়। মানুষের সাথে কথা বলে। গল্পের বর্ণনা জীবন্ত হওয়া চাই। তার গবেষণা ব্যতিক্রমী হওয়া চাই। এ যে তার বাবার জন্মভূমি। তাছাড়া বাবা এখান থেকে না গেলে হয়তো এখানকার আলো বাতাসে বেড়ে ওঠতো সে। তাই সময় নিয়ে এ গ্রামের মুরুব্বিদের কাছে সংগ্রামের কথা জানতে চায়; এ দিঘির কথা জানতে চায়। এ দিঘির রহস্য জানতে চায়। আগে কোন গবেষক বা কোন সংস্থা বা কোন কর্তৃপক্ষ এসেছে কি-না তাও জানতে চায়। অনেক গল্প, নোট আর অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে রাতের ঘটনা মনে পড়লে নিজের উপর রাগ হয়; সে কতো সংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলো। দুপুরের খাবারের পরে অনেক টাকাকড়ির বিনিময়েও কোন মানুষ পাওয়া যায় না দিঘিতে নামার জন্য; যে মানুষ একটা মাথার খুলি বা চোয়াল বা হাড় দেখাতে পারবে তাকে। মেম্বারও পারে না। মৃত্যু নিয়ে কেউ খেলতে চায় না। অবশেষে সে নিজেই নামে সিঁড়ি বেয়ে, শ্যাওলায় ছেয়ে আছে সব। মাথা নুয়ে দুই হাত দিয়ে পানি তুলে আনে নাকের দিকে; সবুজ সবুজ পানি। কিন্তু তা মুখে নেয়ার সাথে সাথে ওয়াক শব্দ করে ফেলে দেয়। এতো দুর্গন্ধ। তখন তার মাথা জিম জিম করে এবং মেম্বারের সাথে বাড়ি ফিরে। এভাবে সন্ধ্যা হয়ে যায় এবং গতরাতের মতো আবারো মেম্বারের চ্যালাকে নিয়ে তার সেই ঘরে ওঠে। লেপ তোশক সবই পড়ে আছে। আবার খেজুর কাঁটা আনতে যায় চ্যালা এবং আবার গল্পটা লেখা শুরু করে গবেষক : রাজকুমারের মৃত্যুর পরে তার মা পাগলের মতন হয়ে যায়। তার ছেলেকে জিঞ্জিরে ধরার আগে মাঝে মাঝে এই স্বপ্নটা দেখতো : দেখি একটা সাপ; এই সাপ আমার পুতেরে প্যাঁচাইয়া ধরছে; আমার পুতেরে ছাড়ে না; মাঝে মাঝে দেখি একটা বেডিরে; তার সারা শরীলে সাপ আর সাপ; আমারে কয় : তুই আমার থালা চুরি করছস; আমি তোর কলিজার টুকরা চুরি করবো : আমি ডরে কাঁপি; রাম রাম, আমার কান্দন দেইখা বেডি হাসে; হাসতে হাসতে হঠাৎ কইরা থাইম্যা যায়; আর আমার দিকে চোখ রাঙ্গাইয়া চায়; সরমের কথা কী কইতাম; একবার মেজবানির সময় দিঘির কাছে ডেক ডেকচি চাইছিলো রাজকুমারের বাপে; কালি আন্ধারের সময় গিয়া কইছিলো : হরি কৃষ্ণ হরি বল; হোক তোমার জয়, তোমার দরবারে আর্জি আমার; মেজবানির জন্য ডেকচি লাগবো তোমার : পরের দিন শেষ রাইতে সাতটা ভাতের ডেক, সাতটা সানের ডেক, সাতশো থালি-বাসুন দিঘির দেইলে সারি সারি কইরা বইসা থাকে; রাজকুমারের বাপে আমারে নিয়া এই ডেক-ডেকচি, থালি-বাসুন বাড়িতে আনে; মেজবানির পরে থালি-বাসুন গুনার সময় একটা থালি কম পড়ে; রাজকুমারের বাপের তো মাথায় বাঁশ পড়ে; আমি মাগিও হায় হায় করি; সারা রাইত খুঁজার পরেও পাওয়া যায় না; নিশুতি রাইতে এই ডেকডেকচি নিয়া দিঘির দেইলে সারি সারি কইরা সাজাই; কিন্তু একটা ডেকডেকচিও দিঘিতে নামে না; রাজকুমারের বাপের মাথা খারাপ হইয়া যায়; দিঘির জল আমার দিকে চাইয়া রইছে; আমি তো ডরে মরি; রাজকুমারের বাপেরে কাইন্দা কাইন্দা কই : একটা থালি আমি গোবরের টালে ঢুকাইয়া রাখছি : এই কথা শুনার পরে রাজকুমারের বাপে আমারে ছাইড়া দিবার চায়; আমি মাগি কাইন্দা কাইন্দা মরি; পরে এই থালি গোবরের টালেরতে বাইর কইরা ছাই দিয়া ধুইয়া আনি; তারপরেও দিঘিতে নামে না; আমি কাইন্দা কাইন্দা ক্ষমা চাইছি কতো; আমি একটা খাড়া মাগি; খাড়া মাগি না হইলে এমন কাম কেউ করে নাকি? সারা রাইত কাইন্দা ক্ষমা চাওয়ার পরে শেষ রাইতের সময় সবগুলা এক সাথে দিঘিতে নামে; এই ঘটনার পরে আমি এই বেডিরে খোয়াবে দেখি; দেখি সাপ আইসা আমার রাজকুমাররে প্যাঁচাইয়া ধরছে : এই ঘটনার পরে এই দিঘি থেকে ডেকডেকচি পাওয়া যায় না; হাজার বার করে : হরি কৃষ্ণ হরি বল; হোক তোমার জয়; তোমার দরবারে আর্জি আমার; মেজবানির জন্য ডেকচি লাগবো তোমার : আর্জি জানালেও কোন ডেকডেকচি দিঘির দেউলে ওঠে বসে থাকে না : এ পর্যন্ত লেখার পরে বমি বমি লাগে গবেষকের। মাথাটা জিম জিম করে। পায়ের গোড়ালিতে থাকা খেজুর কাঁটা ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে যেন। না। কাঁটা খুলে ফেলা দরকার। মেম্বারের চ্যালা কয় : স্যার কোন সমস্যা : না, বমি বমি লাগছে : খাড়ান স্যার, দেখতাছি : চ্যালা চলে যায়। রাত বাড়তে থাকে। উত্তর থেকে হাওয়া আসে। চুপি চুপি হাওয়া। তার বমি বমি ভাব কমে। আবার লেখা দরকার। কিন্তু তার জন্য পিনিক দরকার। খেজুর কাঁটা গোড়ালিতে না ঢুকালে পিনিক আসে না। কিন্তু খেজুর কাঁটার মাথা ভেঙে গেছে, আরো কাঁটা লাগবে। ওই দিকে চ্যালাও আসছে না। তার বমি বমি ভাব দূর করার জন্য লেবু পাতা আনার কথা বলে গিয়েছিলো। কিন্তু বিশ-পঁচিশ মিনিট হয়ে গেলেও আসে না সে। এতো রাতে মেম্বারকে ফোন দেয়া ঠিক হবে না। চ্যালার নাম্বারও জানে না সে। কেন যে নিয়ে রাখে নি। তখন তার অস্থির লাগে। নানান প্রশ্ন জাগে মনে। পানিতে গন্ধ কেন? মাথার খুলি ওঠে আসে কেন? এসব প্রশ্ন তার মাথায় কিলবিল করতে থাকে। সময় কাটে না। তখন সে গতকালের পত্রিকাটা বের করে। শিল্প-সাহিত্য পাতায় একটা গল্প দেখা যাচ্ছে। অচেনা এক লেখকের। তার মতন নামকরা গল্পকারের এইসব অচেনা লেখকের গল্প পড়ার সময় নেই। তবে চ্যালা আসার আগ পর্যন্ত পড়া যেতে পারে। সে মাঝখান থেকে পড়া শুরু করে : জমির মোল্লা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা এগারো জনকে জবাই করে এই দিঘিতে ফেলে। এই এগারো জনের মধ্যে আছে যাত্রা দলের নবাব সিরাজদৌল্লা ও তার দুই ছেলে যাত্রাদলের আপন-দুলাল। প্রতি বছর শীতের সময় তিন দিন ধরে যাত্রা হওয়ার রেওয়াজ আছে এই গ্রামে। ভিটিপাড়া কে এইচ কে উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক প্রথম দিন সিরাজদ্দৌল্লার পাঠ নেয়। দ্বিতীয় দিন তার দুই ছেলে আপন-দুলালের পাঠ নেয়। তাই এই পরিবারের মানুষদের খুব খাতির করে মানুষ। কিন্তু সংগ্রামের সময় যাত্রা নামানোর অবন্থা থাকে না। তাই সিরাজদৌল্লা ও তার ছেলেদের মন খারাপ হয়। তখন জমির মোল্লা তার দুই ছেলে আসিফ মোল্লা ও হাসিব মোল্লাকে সাথে নিয়া মুক্তিদের খোঁজ নেয় এবং  ইস্কুল ঘরে বিহারিগর ক্যাম্পে যায়। এক দিন অন্ধকার রাতে টিপ টিপ করে মেঘ নামে। চারদিকে অন্ধকার আর অন্ধকার। এই অন্ধকার রাতে সিরাজদৌল্লাহ আপন-দুলালকে বুকে জড়িয়ে ধরে। পাশের ঘরে তাদের মা বেঘোরে ঘুমায়। তারা তাদের মাকে এক বার দেখে। আপন মায়ের কাছে যেতে চাইলে দুলাল বাধা দেয়। মা এতো সুন্দর ঘুম ঘুমাতে পারে তা জানা ছিল না। মা টের পেলে আর রক্ষা নাই। বাবা তাগাদা দেয়। বাবার মুখ শক্ত। কিন্তু মায়ের মুখ কত নরম। এই অন্ধকার রাতে আলো ছাড়া পথ চলা কঠিন। তবু তারা চলে ত্রিমোহিনীর দিকে। ত্রিমোহিনীর ওই পাড়ে আছে মুক্তিদের ক্যাম্প। কয়দিন আগেই আপন-দুলালদের বাড়িতে তিন দিন থেকে গেলো মুক্তিযোদ্ধা আফসার উদ্দিন। এই আফসার উদ্দিনের কাছেই যাচ্ছে তারা। কিন্তু এই রকম অন্ধকার মেঘের রাতে আপন-দুলাল পথ খুঁজে পায় না। এতো প্যাঁচমোচড়ার রাস্তা দিয়া তের-চৌদ্দ বছরের দুইটা কিশোর হাত ধরাধরি করে আগায়। তাদের নিশানা একটাই। ত্রিমোহিনীর ওই পাড়। কিন্তু শেষ রাতে আপন-দুলালের ডাকে দরজা খুলে বের হয় সিরাজদৌল্লাহ। জমির মোল্লা আপন-দুলালকে পিঠমোড়া করে বেঁধে নিয়া আসছে। সিরাজদৌল্লাহ থ বনে যায়। এতো রাতে কীভাবে ধরা পড়লো তার ছেলেরা? তখন জমির মোল্লার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে পাশের বাড়ির ল্যাংড়া আনারুল। আনারুল জমির মোল্লার সাথে কেন? এই আনারুল তো দিনে-রাতে তার বাড়িতে পড়ে থাকে। এখনো পেটে পারা দিলে মুখ দিয়া এই বাড়ির ভাত বের হবে। ততোক্ষণে আপন-দুলালের মা জেগে ওঠে। হুড়মুড়িয়ে ওঠে আসে। এতো সুন্দর মেঘের রাতে ছেলেদের পিঠমোড়া বাঁধা অবস্থায় দেখে বোবা হয়ে যায় সে; কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে তার চেতন ফিরে আসে এবং বিলাপ করতে করতে আপন-দুলালের কাছে যেতে থাকে। কিন্তু তার আগেই আনারুল ধরে ফেলে তাকে। সিরাজদৌল্লা আর ঠিক থাকতে পারে না। তার হাতের কাছে থাকে একটা কোদাল। সেই কোদাল দিয়া আনারুলের মাথায় এক ঘা বসিয়ে দেয়। তড়ফাতে তড়ফাতে কয়েক মিনিটের মধ্যে আনারুল মারা যায়। আর সাথে সাথে তাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলে জমির মোল্লার লোকেরা। পরের দিন সকালে পাড়ায় পাড়ায় ঘোষণা দেওয়া হয় খুনী ইস্কুল মাস্টার ও তার দুই ছেলের বিচার করা হবে। এবং পরের দিন মানুষ দলা হয়। তিন বাপছেলেকে পিঠমোড়া করে বেঁধে হাজির করা হয়। আপন-দুলালের মাকেও বেঁধে রাখা হয় কাঁঠাল গাছের সাথে। তখন মানুষের বুক টিকটিক করে। কেউ কেউ ডরে কাপড় নষ্ট করে ফেলতে চায় : এ পর্যন্ত পড়ার পরে তার মাথা ব্যথা ওঠে। বমি বমি ভাব বাড়ে। কিন্তু চ্যালা আসে না তখনো। তবুও সে পড়ায় মনোযোগ দেয় : তখন খেজুর গাছ কাটার জন্য যে কাইচ্চা দা বানানো হয় সেই দা দিয়া প্রথমে আপনকে জবাই করা হয়। জমির মোল্লা নিজ হাতে এই কাজ করে। এই দৃশ্য দেখে সিরাজদৌল্লাহ চুপ করে থাকে; তার চোখ দিয়া রক্তের ফোঁটা যেন পড়ে। এতো ক্রোধ না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এবার দুলালের পালা। আহা, ছেলেটা কাঁপতে থাকে। নিজের চোখের সামনে নিজের ভাইকে জবাই করার দৃশ্য দেখে কিংবা নিজের মৃত্যুর দৃশ্য কল্পনা করে ছটফট করে। হায় আল্লাহ্, মৃত্যুর স্বাদ বুঝি এতো কঠিন। কোরবানির পশুর মতন তাকে শুয়ে দেওয়া হয়। এবং জমির মোল্লা আল্লাহু একবার বলে দুলালের গলায় কাইচ্চা দা চালায়। ফিনকি দিয়া রক্ত বের হয়। জমির মোল্লার চোখ-মুখ লেপ্টে যায়। এই দৃশ্য দেখেও সিরাজদৌল্লাহ চুপ করে থাকে। তার এই রকম নির্লিপ্ত আচরণ দেখে জমির মোল্লার রাগ ওঠে। সে কতো মজার দৃশ্য চিন্তা করেছে মনে মনে। চিন্তা করেছে সিরাজদৌল্লা তার পায়ে এসে হুমরি খেয়ে পড়বে। তার কাছে জীবন ভিক্ষা চাইবে। কই, কিছুইতো হলো না। শুয়ারের মতন দাঁড়িয়ে থাকলো। শালার জেদ কম না। অজ্ঞান-টজ্ঞান তো দূরের কথা ওর মাথাটা পর্যন্ত ঘুরলো না। সিরাজদৌল্লাহ হয়তো এতো সাহসী না; হয়তো এতো পাষাণও না। কিন্তু মরণ যেইখানে নিশ্চিত সেইখানে বীরের মরণই শ্রেয়। তাই শেষ কামড়টা দিতে চায় সে। এইবার সে সাপের মতন ফুপাতে থাকে। এবং এক লাফে গিয়া পড়ে জমির মোল্লার ঘাড়ে এবং বাম কানের মধ্যে এইরকম কামড় দেয় যে শেষ পর্যন্ত পুরো কান তার মুখে চলে আসে। আর সাথে সাথে বিরাট এক হুংকার দিয়া জমির মোল্লার লোকদের মধ্যে একজন এক কোপ দেয় তার পিঠে। এই কোপ কিছুটা লাগে এবং কোপ খেয়েও দৌড় দেয় সে আর সাথে সাথে জমির মোল্লার লোকেরা ধাওয়া করে তাকে। কিন্তু যে মৃত্যুর ভয়ে দৌড়ায় তার সাথে এই লোকেরা পেরে ওঠে না। চোখের পলকে গজারিগড়ে ঢুকে পড়ে এবং তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন কানের ব্যথায় অস্থির জমির মোল্লা আপন-দুলালের মাকে জবাই করে মেজাজ ঠা-া করে এবং সিরাজদৌল্লাকে খুঁজে বের করার জন্য লোক লাগিয়ে রাখে। তখন তিন মা ছেলেকে বস্তায় ভরে দিঘিতে ফেলা হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে সিরাজদৌল্লা ধরা পড়ে। রক্তের দাগ দেখে তাকে খুঁজে বের করা হয় : গবেষক আবার থামে। তার গল্পই পড়ছে যেন; তখন তার বাবার কথা মনে পড়ে। একানব্বই বছর বয়স তার বাবার; কিন্তু তার বাবারও বাম কান নেই। খুব অস্থির লাগে। গল্পের সাথে দিঘিটারও কতো মিল। চ্যালার বাচ্চা চ্যালা আসে না তখনো। না শেষটুকু পড়তে হবে। আবার পড়া শুরু করে : ২৩ জুন, বুধবার সকালে বাবা মার সামনে আপন-দুলালকে জবাই করে জমির মোল্লা ভাষণ দিয়েছিলো : আল্লাহ্র রাস্তায় কাফেরদের কোরবানি দিলাম; এই গেরামে এই রকম কাফেরের কোন জায়গা নাই : সিরাজদৌল্লা ধরা পড়ার পরেও এই রকম ঘোষণা দেয়া হয় এবং তিন দিন যাবত তাকে কাঁঠাল গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়। সিদ্ধান্ত হয় ২ জুলাই, শক্রবার বাদ জুম্মা তাকে জবাই করা হবে। মানুষ আবারো দলা হয় এবং সবার সামনে তাকে জবাই করে দুই মণ বস্তার মধ্যে লাশ ভরে দিঘিতে ফেলা হয় : এ পর্যন্ত পড়ার পরে তার পিপাসা লাগে; এই শীতেও গরম গরম লাগে। কান গরম হয়ে যায়। বাম কানে হাত দিয়ে দেখে তার কান ঠিক আছে কি-না। তার মনে হতে থাকে তার আগেই এ দিঘির গল্প লিখে ফেলেছে অন্য কেউ। কিন্তু অন্য মন বলে, না এ দিঘি আর গল্পের দিঘির মধ্যে পার্থক্য আছে। পানি খেয়ে আবার পড়া শুরু করে : তার কয়েক দিন পরে দেশ স্বাধীন হয়। গ্রামে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসে। এই গ্রামেও আসে। কত কিছু করতে হবে। অস্ত্র জমা দেয়া লাগবে। অবশ্য তার আগে একটা বিরাট কাজ করতে হবে। জমির মোল্লা ও তার চার সহকারীকে খোঁজে বের করা দরকার। এক দিনের মধ্যে চার সহকারী ধরা পড়ে। কিন্তু জমির মোল্লা ধরা পড়ে না। সহকারীদের কাছ থেকে জানা যায়, ১৬ তারিখ রাতে বোরকা পরে পালিয়ে গেছে জমির মোল্লা। গ্রাম ছেড়ে কোথায় গেছে তা কেউ বলতে পারে না : গবেষক এবার দ্বিধায় পড়ে এবং আবারো তার বাবার কথা মনে পড়ে। তারাও মোল্লা বংশের সন্তান। সে আর ভাবতে পারে না। না। গল্পের জমির মোল্লার সাথে তার বাবা জমির মোল্লার কোন যোগসূত্র নেই। তার বাবাতো মুক্তিযোদ্ধা। এবার আগ্রহ বেড়ে যায়। চার্জার লাইটের চার্জ শেষ হয়ে আসে; অন্ধকার নেমে আসে ঘরে; শেষটুকু জানার জন্য দ্রুত পড়তে থাকে : এবং কিছুক্ষণের মধ্যে তার চার সহকারীকে লত দিয়ে বেঁধে দিঘিতে ফেলা হয়। এই দৃশ্য দেখার জন্য জুম্মার নামাজের পরে দলে দলে মানুষ আসে। মুরুব্বিরা না করে। কিন্তু সদ্য স্বাধীন দেশের যুবকরা ছোটে ঘোড়ার গতিতে। এতো এতো যুবক এই গ্রাম থেকে যুদ্ধে গেছে তা জানা ছিল না কারো। একটা যুবকও বাদ নাই। যুদ্ধের সময় যে ছেলেটাকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যায় নি সেও এগিয়ে আসে। আহা; কী সুযোগ গো। এই সুযোগ হাতছাড়া করার মতন বোকা না তারা। এরপর থেকে এই দিঘির পানি ব্যবহার করা যায় না। কারণ, পানিতে দুর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ : এ বাক্য পড়ার সাথে সাথে তার মাথায় রক্ত ওঠে। কী করবে বুঝে ওঠতে পারে না। দম বন্ধ হয়ে আসে। না; এ হতে পারে না। দারুণ অস্থিরতা ধরে ফেলে তাকে এবং দিঘির খুব কাছে যায় সে। টার্জারের শেষ আলোতে শেষ বারের মতো ভালো করে পরীক্ষা করে সব। এ দিঘি আর গল্পের দিঘির মিল-অমিল খুঁজে। কোন অমিল খুঁজে পায় না। তার মনে হয় দিঘির পানিতে হাজার হাজার সাপ কিলবিল করছে; পানির উপর নৃত্য করছে। এ অন্ধকারের মধ্যেও শত শত মাথার খুলি উপরে ওঠে আসছে। তার বাবাকে দেখা যাচ্ছে দিঘির পানিতে; কালো কালো সাপ তার বৃদ্ধ বাবার বাম কান খুটে খুটে খাচ্ছে। সে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করে সমস্ত হেলোসিনেশন কিংবা ইলোয়েশনকে জেটিয়ে বিদায় করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দিঘির পানি বাড়ছে; খুব দ্রুত বাড়ছে। সে বুকের মধ্যে তীব্র ব্যথা অনুভব করে। নড়তে পারে না; এক বিন্দুও না। তখন জীবনের সমস্ত স্মৃতি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। বাম কান ছাড়া বাবার ছবিও ভেসে ওঠে। এবং পরের দিন সকালে মেম্বার এসে দেখে দিঘির হাঁটু পানিতে উপুর হয়ে পড়ে আছে গবেষক।

——————————

ইফতেখার মাহমুদ
সাপের মুখে যেতে মই বেয়ে ওঠা

এ বাড়িতে বাকি চারটা ঘরই মাটির। শুধু সুলেখার ঘরটা বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি। বিয়ের পর সে এই ঘরেই উঠেছিল। এটা তার স্বামীর ভাগের ঘর। জীবনে যা কিছু ঔদ্বাহিক প্রাপ্তি, এই ঘরটা তার মধ্যে শুধু কাজে লাগছে। ঘরের অন্দর প্রদেশও দেখবার মত। একখানা চৌকি আর বিছানা, থালাবাটি, দড়িতে ঝুলানো কাপড় চোপড়, একটা পানির কলস, সেটার ঢাকনার ওপরে একটা গ্লাস- এছাড়া আর কিছু নেই ঘরে। যা কিছু ছিল তা অন্য সদস্যটির হাত ধরে তার সাথে বাইরে চলে গেছে। সুলেখা এখন এই ঘরে একাই থাকে। তার পুরুষসঙ্গীটি স্থানান্তরিত হয়েছে।

সুলেখার স্বামীর নাম জয়নাল। এ বাড়ির সেজ ছেলে। মাস আটেক হল জয়নালকে পুলিশ ধরেছে। এর আগেও ধরেছিল কয়েকবার। টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হয়। এবার বোধহয় আর আনা যাবে না। টাকা কোথা থেকে আসবে? কে দেবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছাড়িয়ে এনেই বা কী হবে।

সুলেখা জানে তার স্বামী নেশাটেশা করে। হেরোইন খায়। এও সে জানত, তার ছিল গাঁজার ব্যবসা। এই গাঁজা বেচাকেনা নিয়েই ঝামেলা। মহাজনের সাথে গোলমাল। তার সাথে কাইজা করে এইখানে কেউ থাকতে পারে নি। জয়নালও পারল না। হাজতে গেছে।

যাই হোক, সুলেখার এসব নিয়ে অত চিন্তা নেই। স্বামী থাকলেই কী আর না থাকলেই কী। তাকে তো নিজের পেট নিজেকেই চালাতে হয়। ছোট বাচ্চাটা নিয়ে হয়েছে হাজার ঝামেলা। বুকে দুধ নেই, কী খাওয়াবে। কত পাতা-লতাই না খেলো, বাচ্চা খসলো না। জানে জোর আছে। পাঁয়তারার শেষ নেই। কাকের বাচ্চার মত ক্যাঁও ক্যাঁও।

শিশুরা এখনও বোকাই হয়। কেঁদে কী লাভ। অন্তত এই ফাঁকির দুনিয়ায়। বাচ্চার মুখে পানিভরা ফিডার ঠেসে দিতে দিতে সুলেখা দুধের কথা চিন্তা করে। তার নিজেরই খাওয়ার ঠিক ঠিকানা নেই— দুধ কি আকাশ থেকে আসবে?

বাচ্চাটাকে প্রথম তিন মাস মাত্র দুধ খাওয়াতে পেরেছে। এখন দাদির কাছে থাকে। দাদিই দেখে। ভাতের মাড় খায়। মিছরি মেশানো পানি খায়। বড়টা থাকে চাচার সাথে। চাচাই পালে। ভাত মাছ এইটুকু তো পাচ্ছে। মাছুয়াপাড়ার বলে মাছটা ওরা রোজ পায়।

সুলেখার দেবর জহিরও মাছের ব্যবসা করে। রোজ ভোরে উঠে মাছ কিনতে যায়। সেই মাছ এনে উপশহর বাজারে বেচে। দুপুরে বাড়ি ফিরে মা আর ভাতিজার সাথে খায়। বিয়ে থা করে নি। শান্ত স্বভাবের মানুষ। বিড়ি সিগারেট খায় না। কারও সাথে ঝগড়া ক্যাঁচালে নেই।

এই জহির মাঝে মাঝে রাতে সুলেখার ঘরে চলে আসে। অনেকক্ষণ পাশে বসে থাকে। পাশে শুয়ে থাকে। ভোর হওয়ার আগেই চলে যায়। কখনো কখনো কী জানি কী মনে করে সুলেখাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। খুব কাঁদে। সুলেখা কিছু জিজ্ঞেস করে না। সুলেখা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে দেয়। এটুকুই নিজে থেকে করে সুলেখা।

কাঁদতে ইচ্ছে হয়েছে, কেঁদেছে। কার্যকারণ দিয়ে তার কী। তার শুধু ক্লান্ত লাগে। খুব ক্লান্তি। ওরকম সকালবেলায় একদম কাজে যেতে ইচ্ছে করে না। শরীরের মর্ম সে বোঝে না। পুরুষমানুষ শরীরে যে কী পায় কে জানে। তার কাছে শরীর মানে পেটের খিদা। আর ক্লান্তি। প্রথম জীবনে স্বামীকে একটু ভালো লাগত। এরপর সবকিছু- যেন একটা কোন কাজ, ঘর ধোয়ার মত, কাপড় কাচার মত। শুধু পরিশ্রম। শুধু কষ্ট। পুরুষকে ঠেকানোর শক্তি তার নেই। কষ্ট সহ্য করা তার নিয়তি।

সুলেখা জানে এসব কথা শুনলে লোকে তাকে বেশ্যাই বলবে। সে কাউকেই কিছু বলে না। কেউ তার কথা শোনার জন্যে বসে নেই। এখানে সবারই দু’টো করে মুখ আর একটা করে কান। সুলেখা প্রায় কোন কথাই কাউকে বলে না। ক্ষোভ না, দুঃখের কথা না। আর সুখের কথা তো তার নেইই। মাঝে মাঝে ছোট বাচ্চাটাকে দেখে ভালো লাগে। বড়টা হঠাৎ হঠাৎ আসে তার কাছে। একটা দুটো টাকা চায়। বকা ঝকা তার স্বভাবে নেই। চুপ করে থাকে। পাথরের মত। টাকা পয়সা সে হিসেব করে খরচ করে।

কোনদিন আবার দেয়ও। দুই টাকা দিয়ে দেয়। ছেলেটা এত খুশি হয়, সুলেখার অবাক লাগে। হয়তো খাওয়ার কিছু কিনবে। কিংবা গুলিটুলি। কিনুক। যা খুশি কিনুক। জীবনের আনন্দ তো টাকা পয়সার সাথে বাঁধা। টাকা পয়সা হল জাল। মাছ ধরার মত করে মানুষ এই জাল দিয়ে মানুষ ধরে। তারপর সুখ আর আরাম আয়েশ বানায়।

সুলেখা যখন এই বাড়িতে এসেছিল, তখনও বর্ষাকাল ছিল। কয়েকদিনের ঝুম বৃষ্টি সবকিছুকে নরোম করে দিয়েছে। এমনই বৃষ্টি যে গাছপালার গা পর্যন্ত পিচ্ছিল শ্যাওলাবসা। লোকেদের ঘরের সামনে সামনে কাদা। সড়কের এখানে ওখানে পানি জমে আছে। সেই ময়লা পানিতে ঝকঝকে প্রতিবিম্ব দেখে দেখে সুলেখার মনটা কেঁপে কেঁপে উঠেছিল।

সুলেখার শাশুড়িরা বাড়িতেই ছিল। বরযাত্রীদের সাথে মহিলা বলতে শুধু ছিল সুলেখার বড় জা। রিকশায় চড়ে সেদিন বাড়ি পর্যন্ত এসেছিল সুলেখা আর তার বর। আশে পাশের সব ঘরের বউঝিরা ঘরের নতুন বউ দেখার জন্যে ভিড় করেছে। সুলেখার মনে আছে, লজ্জায় নুয়ে পড়া মুখ আরও যেন নুয়ে যাচ্ছিল মাথার ব্যথায়। অচেনা সব মুখগুলো, সেদিকে না তাকিয়েও, দেখতে পাচ্ছিল সে। ওদের যাচাইয়ের দৃষ্টিতে আটকা পড়ে যাওয়াটাও যেন সেদিনই টের পেয়েছে সুলেখা।

সুলেখার স্বামী জয়নাল আগে মাছের ব্যবসা করত। বিয়ের সময় ডিমান্ড হিসেবে দশহাজার টাকা নিয়েছিল। সেই টাকা দিয়েই মোড়ে একটা সিগারেটের দোকান দেয়। দোকান সিগারেটের হলেও মূল ব্যবসা গাঁজার। ব্যবসা তার ভালোই চলছিল, গাঁজার ব্যবসা কোনদিন খারাপ চলে না। জয়নালের সমস্যা জয়নাল নিজেই। যে মদ বেচে, তার মদের নেশা থাকলে বিপদ। জয়নালের গাঁজার নেশা। গাঁজা হল বরবাদের নেশা। এই নেশার বারোজোড়া বিষদাঁত। গাঁজার ছোবলাক্রান্ত কালচে দেহ এখন জেলে ধুঁকছে।

যে বাড়িতে সুলেখা কাজ করে, সে বাড়ির লোকজন মাত্র তিনজন। বাড়ির কর্ত্রী আর তার দুই ছেলে। ছোট ছেলেটা স্কুলে পড়ে। বড়জনা ভার্সিটি। ছেলেদুটোকে দেখা শুনা করা, রান্নাবান্না কাপড় কাচা, ঘরমোছা— এসবই সুলেখার কাজ। ভদ্রমহিলার প্যারালাইসিস। স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে হার্ট এটাক হয়। তারপর থেকে বাম পাশটা অবশ, বিছানায়ই রাতদিন।

দিনের বেলা সুলেখাই দেখা শুনা করে। রাতে আর একজন মেয়ে এসে থাকে। মাসে সাতশ টাকা পায় সুলেখা। খুবই কম টাকা। এক হাজার টাকার কমে এই কাজ কেউ করবে না। কিন্তু সুলেখার উপায় নাই। সুলেখা জানে, এরা বেশি টাকা দিতে পারবে না। টাকা বাড়ানোর কথা তোলা মানে না বাড়ালে কাজ ছেড়ে দেবার ব্যবস্থা করা। সুলেখা এখন কোথায় কাজ পাবে?

এই বাড়িতে তার অন্য কোন অসুবিধা অবশ্য নেই। শুধু এই বড় ছেলেটা সময় নষ্ট করে। কোন কোনদিন ভার্সিটি যায় না। ছোট ভাইটা স্কুলে থাকে, মা বিছানায়— এই ফাঁকে সে পুরুষ হয়ে ওঠে। জোর করে সুলেখাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে দরোজা বন্ধ করে দেয়। বুকে হাত দেয়। কপালে গালে চুমু খায়। শাড়ি সায়া সব খুলে ফেলে। সুলেখা চুপ করে থাকে। কিছু বলে না, কিছু করে না। প্রথমদিন বাধা দিয়ে দেখেছে, এত সোজা না জীবন। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। মাথার মধ্যে চিন্তা— আজকেও ফের ব্লাউজটা ছিঁড়ে ফেলেছে। মরজিনা ভাবির কাছ থেকে ফের সুতা চেয়ে নিতে হবে। আবার তাকে বলবে, ‘সুলু, একটা সুঁইসুতা কিনতে পারিস না?’। সুলেখা অন্যমনস্ক হয়ে হয়ে এইসব জীবন পার করে দেয়। খেয়াল না করা আর ভুলে যাওয়া এই দুই জিনিস ছাড়া জীবনে আর কাজের কিছু সে শেখে নি।…

পত্রিকাটা হাত থেকে নামিয়ে বিছানার পাশে রাখেন আজিজুল সাহেব। আর পড়তে ইচ্ছে করছে না। ধুৎ। এগুলির নাম গল্প? যা খুশি বানিয়ে বানিয়ে ফ্যাচর ফ্যাচর করলেই হল! তিনি আধশোয়া থেকে উঠে বসলেন। ঘড়িতে সাড়ে ন’টা বাজে। অফিসে যেতে হবে না। তিনদিনের ছুটি নিয়েছেন। তার স্ত্রী সাবিনা ছেলেটাকে নিয়ে ওর বোনের বাড়ি গিয়েছে। ঝিনাইদহ। আজিজুল সাহেব এই ফাঁকে ছুটিটা নিয়ে নিলেন। বাসায়ই থাকবেন এই তিনদিন। কোন কাজ নেই হাতে।

তিনি ফের  ঘড়ি দেখলেন। এতো বেলা হয়ে গেলো, কী ব্যাপার লায়লার মা এখনও কাজে আসছে না কেন?

——————————

বিপম চাকমা
কাঠের খোঁজে

ক্লান্ত শরীর। তপ্ত গরম উপেক্ষা করে দুপুরে খাওয়ার পর ধনঞ্জয় হাত-পাখা নাড়তে নাড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল। গোলমাল, চিৎকার চেঁচামেচিতে জেগে ওঠে। ঘামে জবজবে শরীর। ঘুমের বিষে চোখ দুটো কোকিলচোখ। গত দুটো রাত কেটেছে নির্ঘুম।

দুদিন আগের ঘটনা, তখন রাত ১২টা। দু’তিন মাইল দূরের গ্রাম তৈনছড়ি থেকে লোকজন খবর নিয়ে আসে, বন্যহাতি আক্রমণ করে কয়েকটা বাড়ি নষ্ট করেছে।

এতরাতে পাহাড় ডিঙিয়ে খবর দিতে আসাটা ¯্রফে সংবাদ জানানোর জন্য নয়। চোখে মুখে একধরনের আকুতি। তারা সাহায্য চায়। আকুতির নীরব অর্থ ‘আমাদের রক্ষা করুন’। অথচ তারা সকলে জানে যে এর কোন সন্তোষজনক সমাধান ধনঞ্জয়ের হাতে নেই। রাত জেগে পাহারা বসানো ছাড়া তার বেশি অন্য কোন সাহায্য সে তাদের করতে পারবে না। যা ইতিমধ্যে হয়তো তারা শুরু করে দিয়েছে। তবু নিজেদের অসহায়ত্বকে বড় করে তুলে ধরে সাহায্য চাওয়াটা যেন এদের নিয়ম। নিজেদের বুদ্ধি ও বিবেচনা বোধের দ্বারা নেয়া সিদ্ধান্তের উপর তারা খুব বেশী আস্থা রাখতে পারে না। অথচ বিষয়গুলো সবার নখদর্পণে। তাই সমাধানযোগ্য বা অযোগ্য সব সমস্যাতেই ধনঞ্জয়ের কাছে আসা যেন এক ধরনের অভ্যাস। বন্যহাতির কাছে তারা যেমন, তেমনি ধনঞ্জয়ও; নেই কোন ইতর-বিশেষ।

বিশেষ কিছু করতে পারবে না জেনেও ধনঞ্জয় তাদের বিমুখ করে না। পুরনো একটা শার্ট গায়ে দিয়ে টর্চ লাইট হাতে ‘চল’ বলে লোকজনের সাথে বেরিয়ে পড়ে।

সারারাত পাহারা বসিয়ে রাত জেগে করতে হয়েছে তার তদারকি। সকাল হতেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দেখতে ছুটতে হয়েছে। সব কিছু সামলিয়ে ফিরতে ফিরতে দুপুর। খেয়ে উঠেই তাই ঘুমটা চেপেছে জোরে। অসময়ে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় মেজাজ গেছে ভালোমতো চড়ে।

ছোট ছেলেকে কুঞ্জবালা পেটাচ্ছে। ধনঞ্জয় ঘর থেকে বের হয়ে চিৎকার করে ওঠে। ‘কি হয়েছে কি? এই দুপুরে তোমরা কি একটু ঘুমাতেও দেবে না?’

‘কি হয়েছে শুনতে পাচ্ছ না? ওদিকে ক্যাসেট বাজছে।’ — মাথা না তুলেই কঞ্চি হাতে ছেলের শরীরে কঞ্চি ফেলার জুতসই জায়গা খুঁজতে খুঁজতে কুঞ্জবালা জবাব দেয়।

ক্যাসেট মানে শান্তিমনির মা। মহিলার জিহ্বা অত্যন্ত চঞ্চল এবং দ্রুতগামী। কোন কারণে একবার মুখ থেকে শব্দ নিঃসরণ শুরু হলে আর থামতে চায় না। সেই কারণে ক্যাসেট বলে পাড়া জুড়ে তার এই ছদ্মনাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

অনেক্ষণ ধরে চলছে শান্তিমনি মা’র গালাগাল, গ্রামের কয়েকটা ছেলে-মেয়েকে উদ্দেশ্য করে। যারা তার গাছের পাকা আমে কুনজর দিয়েছে। আর এ অনলবর্ষি ক্যাসেট চালু হওয়ার পেছনে যে মূলহোতা সে হচ্ছে ধনঞ্জয়ের ছোট ছেলে। পাকা আম দেখে স্থির থাকতে পারে নি। ঢিল ছুঁড়েছে।

এপারে ইহলোকে শান্তিমনি মা কর্তৃক প্রতাপী নাম স্মরণে ধনঞ্জয়ের চৌদ্দপুরুষ পরপারে বারবার আত্কে উঠতে বাধ্য হচ্ছে। এভাবে মর্ত্যলোক থেকে শ্বশুরকূলের স্বর্গবাসীদের অসময়ে অতিষ্ঠ করতে প্ররোচিত করায় কুঞ্জবালা আর ধৈর্য রাখতে পারেনি। ছেলেকে পেটানো শুরু করেছে।

স্ত্রীর মুখে বৃৃত্তান্ত শুনেই ধনঞ্জয়ের মেজাজ আরও দ্বিগুণ বিগড়ে যায়। অন্য লোকে অন্যায় কি করলো তাতে তার খুব বেশী কিছু আসে যায় না। কিন্তু তার নিজের ছেলে-মেয়ের কারও মধ্যে যদি সামান্য ভব্যতার বিচ্যুতি ঘটে তাহলে সে আর ক্ষমা করতে পারে না। এটা তার আভিজাত্যের সাদা চাদরে যেন কালি লেপার শামিল।

‘দাঁড়া শুয়োর কোথাকার, তোকে বলেছি শুয়ে ঘুমাতে আর তুই কিনা গেলি পরের গাছে ঢিল মারতে।’ — বলে ধনঞ্জয় একটা কঞ্চি নিয়ে মারতে উদ্যত হতেই কুঞ্জবালা ‘না’ বলে বাধা দিয়ে ছেলেকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়।

কুঞ্জবালার এ এক অদ্ভূত চরিত্র। যখন সে শাসনকর্ত্রীরূপে সন্তানকে শাসন করে সে সময় ধনঞ্জয় শাসন ভারের সামান্য অংশও নিজ কাঁধে তুলে নিতে চাইলে মুহুর্তে কুঞ্জবালার শাসনকর্ত্রী চরিত্র মাতৃ-চরিত্রে রূপান্তর ঘটে। ছেলে-মেয়েকে আর স্পর্শও করতে দেয় না। যেন স্নেহের অগ্রদাবী যেমন তার একার তেমনি শাসনের ভারও তার একার। ধনঞ্জয়কে বাধ্য হয়ে হার মানতে হয়।

ছেলে শাসন বাদ দিয়ে সে ঘরে ঢুকে যায়। শুয়ে শুয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করে। দুপুরে টিনের চাল হয়ে আছে তপ্ত কড়াই। ছাউনির নীচে বাঁশের বেড়ার ছাদ থাকলেও গরমের কমতি নেই। তার উপর স্তব্ধ বাতাস। বছর বছর ছন কিনে ঘর ছাইয়ে আর পোষায় না। দিনকাল এমন যে, ছন পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তার চেয়ে কিছু টাকা খরচ করে ঘরে টিন উঠালে নিশ্চিন্তে বিশ-ত্রিশ বছর চলে যায়। এই চিন্তা করে ধনঞ্জয় ঘরের চালে টিন লাগিয়েছিল।

তাছাড়া এলাকায় তাদের একটা অন্য ঠাটও আছে। বাপ-দাদাদের পদবী কার্বারী এখন তার কাঁধে। আবার এলাকার মেম্বারও। সুতরাং কার্বারী কাম মেম্বারের বাড়ি যদি একটু ঝকঝকে টিনের ছাওয়া না হয়, দূর থেকে নজরে না আসে, রোদ পড়লে ঝলকে না উঠে তাহলে আভিজাত্য কমার সাথে সাথে লোকজনের সমীহও বুঝি উদ্রেক হয় না।

কিন্তু গরমকাল আসলেই ধনঞ্জয়ের ইচ্ছে করে চালের টিন একটা একটা করে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। অভিজাত্যের মর্ম হাড়ে হাড়ে টের পায়। অসহ্য গরম হাড় মুচড়ে গায়ের জল বের করে নেয়। মাঝে মধ্যে যদিও তার মনে দ্বিধা জাগে এটা ঠিক টিনজাত গরম, না কি তার মেদবহুল পৃথুল শরীরের পরিণাম। তখন মনের মধ্যে উঁকি দেয় ছনে ছাওয়া আগের ঘরের শীতল চিত্র। ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙ্গে পড়ার পর যেটা এখন টিনের চালে রূপান্তরিত হয়েছে। এতদিন বাড়ির উঠোনে বড় একটা আম গাছ ছিল। তার নিচে বাঁশের মাচাং। বুড়ো গাছ ফল দেয়া কমিয়ে দিলেও ছায়া দানে কোন কার্পণ্য ছিল না। কত দুপুরের ভাতঘুম সে মাচাঙে শুয়ে ঘুমিয়েছে। গত বছর সে গাছটিও বেচে দিয়েছে ফলে বিশ্রামের এমন শিষ্ট জায়গাটাও আর নেই।

মাঝে মাঝে তার মনে একটা অদ্ভূত পরিকল্পনাও খেলে। একটা পাম্প মেশিন দিয়ে সারাদিন টিনের চালে পানি ছিটালে বোধ হয় ঘর ঠা-া থাকবে। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। তাদের ঘরে বিদ্যুৎ নেই। যদিও বাড়ির পাহাড় চূড়ায় উঠলে দিনের বেলা কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ আবছা দেখা যায়। আর রাতের বেলা খুব সহজেই গ্রামের সদ্য প্রাইমারী স্কুলে যেতে শুরু করা বাচ্চারাও জ্বলতে থাকা ইলেক্ট্রিক বাল্বগুলোকে রাতের আকাশের তারা থেকে পৃথক করতে পারে। তবে এই নিয়ে তাদের খুব বেশী মাথাব্যথা নেই। কেবল মাঝে মধ্যে লোকজন যখন তাদের সামনে বিদ্যুৎ বিষয়ক কোন প্রসঙ্গের অবতারণা করে তখন তারা মনে করে লোকজন ইচ্ছে করেই তাদের খোঁচা দেয়ার জন্য এসব গুরুত্বহীন বিষয় নিয়ে কথা বলছে। তখনই বিদ্যুতের বিষয়টা তাদের কাছে কিছুটা গুরুত্ব পায়। বিদ্যুৎ বিষয়ে যে তাদের খুব বেশী আগ্রহ নেই এ কথা বুঝানোর জন্যই কেবল তখন তারা লোকজনের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়। আর অভ্যাসবশত কাপ্তাই বাঁধটাকে অভিশাপ দেয়। এটা কেন বর্ষার তোড়ে ভেঙ্গে যায় না। তাহলে তাদের আর লোকজনের অর্থহীন উপহাসের লক্ষ্যবস্তু হতে হবে না।

মনের সাধ পূর্ণ করার জন্য ধনঞ্জয় চাইলেই একটা জেনারেটর কিনতে পারে। আর্থিক সামর্থের দীর্ঘ ঐতিহ্য থেকে অনেকগুলো হাত খসে পড়লেও আভিজাত্যের ঝলক দিয়ে লোকজনের সমীহ আদায়ে সাত পুরুষের মজ্জাগত মেজাজ এখনও তার মধ্যে ভালভাবে বজায় আছে। এই বিষয়ে ইহকালে তার বাবা মুক্তরঞ্জন যেমন কার্পণ্য করে নি তেমনি ধনঞ্জয়ও নিজেকে যোগ্য উত্তরসূরী ভেবে এর যথার্থ মূল্যায়ন করে চলার চেষ্টা করে।

কিন্তু হঠাৎ করে জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি তাকে এমন অসহায় করে দেয় যে, মাস শেষে তেল খরচের হিসাবের অঙ্কটা বড়জোর পিদিম জ্বালিয়ে চলার পক্ষে সমর্থন দেয়। সুতরাং বাঁশের শলা আর সুতার সাহায্যে নক্সা করে বোনা হাতপাখা এবং বাঁশের নলের মধ্যে ঘূর্ণনজনিত ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট ‘কি সুখ’ ‘কি সুখ’ আওয়াজ শুনতে শুনতে পাখার বাতাসে শরীর জুড়ানোর চেষ্টা করা ছাড়া ধনঞ্জয়ের আর কোন উপায় থাকে না।

এতে উত্তর পুরুষদের অতীত দিনের বিলাস-স্মৃতি রোমন্থন ছাড়া ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হয়ে চলার মতো ভবিষ্যতে আভিজাত্যের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না জেনেও ধনঞ্জয় সাত পুরুষের মজ্জাগত বড়লোকী মেজাজটাকে আর পাত্তা দিতে পারে না।

‘তখন বলেছি সব গাছ বিক্রি করো না। দু একটা ফলের গাছ রেখে দাও অন্তত ছেলে মেয়েরা খেতে পারবে। কে শুনে কার কথা। এখন পরের গালাগাল শুনতে ভালো লাগে!’

ধনঞ্জয় বুঝতে পারে কুঞ্জবালার লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তিত হয়েছে। গোলাবর্ষণ এখন ছেলের পরিবর্তে ছেলের বাবার উপর। দু-এক মিনিট এভাবে চলবে। তারপর সংসারের অন্যকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে সব থেমে যাবে। কুঞ্জবালার এই স্বভাবটার ব্যাপারে ধনঞ্জয় শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে ভবিষ্যৎ বাণী করতে পারে।

গত বছর গাছ-বাগান আর বুড়ো ফল গাছগুলো বিক্রি করে দিয়েছিল। তখন টাকার নিতান্ত প্রয়োজন। নির্বাচনের হাওয়ায় টাকা না ওড়ালে জেতাও যাবে না। তবে সবগুলো গাছ না কাটলে যে হতো না এমন নয়। ছায়ার নীচে ফসল হয় না এই অজুহাতে অধিক ফসলের দাবীর কাছে গাছগুলোকে করাতের দাঁতে পড়তে হয়েছে।

বদ্ধ গরমে হাতপাখা চালিয়ে কিছু হয় না। তবু ধনঞ্জয় হাতপাখা নাড়তে নাড়তে আরেকটু ঘুমানোর চেষ্টা করে। কারণ রাতে ঘুমানোর কোন উপায় নেই। বন্যহাতির পাল রাত হলেই নেমে আসবে। গত রাতে তাড়িয়ে দেয়া হলেও খুব বেশী দূরে যায় নি। রাত জেগে পাহারার তদারকি করতে হবে। বছরে দু’তিন বার লোকালয়ে, জুমক্ষেতে আক্রমণ করা বিগত পাঁচ-দশ বছরে যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবারই ঘর-দুয়ার ভাঙে, ফসল নষ্ট করে, মানুষ মেরে যায়। তাড়িয়ে দিলে আবার ঘুরে ফিরে চলে আসে। কোথায় বা যাবে? চারিদিকে বনজঙ্গল উজাড় হয়ে গেছে। থাকার জায়গাই নেই। খাবার নেই। যেদিকে পা রাখে মানুষের বসতি। চারিদিক থেকে লোকজন তাড়া করে। যেন বিরাট জালের মধ্যে আটকা পড়েছে। লোকালয়ে না এসে উপায় কি? অন্যদিকে মেরে ফেলারও উপায় নেই। বনবিভাগের ঝামেলা, পুলিশের ঝামেলা।

ধনঞ্জয় নিজে এর স্থায়ী কোন সমাধান বের করতে পারে না। অন্যরাও কেউ তাকে এর সমাধান দিতে পারে না। এ অক্ষমতা থেকেই তারা যে যেদিকে পারে হাতিগুলোকে তাড়িয়ে নিজেদের এলাকা ছাড়া করে। চলে গেলে বাঁচোয়া নয়তো ফিরে এলে ‘আপদ মাথায় নিয়েই বেঁচে থাকো’— এ অবস্থা। সবকিছু সহ্য করে লোকজনের আপাত মেনে নিয়ে ‘নিয়তি’ বলে দিনযাপন ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

বেশীদিন আগের কথা নয়। ধনঞ্জয় সবে কুঞ্জবালাকে বিয়ে করে ঘরে এনেছে। এক রাতে ফসলের কোন ক্ষতি না করে একপাল হাতি তাদের জুমের উপর দিয়ে চলে গেল। এ খবর পাড়ায় প্রচারিত হতেই চারিদিকে হৈ হৈ অবস্থা। তার বাবা বৈদ্য ডেকে ধন-সম্পদের দেবী ‘মা লক্ষ্মী মা’-কে পূজো দিয়েছিলেন। সে উপলক্ষে আশপাশের গ্রামের লোকজনকে পাঁচ মুঠি (হাতের মুঠির সাহায্যে শুয়োরের ওজন বের করার চাকমাদের এক ধরনের আনুমানিক এবং প্রায় নির্ভুল পদ্ধতি) শুয়োর জবাই করে দাওয়াত খাওয়ানো হয়েছিল। এ যে সৌভাগ্যের লক্ষণ। ভাগ্যদেবী ফিরে না চাইলে কি কারও জুমের উপর দিয়ে হাতি চলে যায়। সবাই বলতে লাগলো এ অন্য কিছু নয় আসলে বাড়ির নতুন বউটাই ভাগ্যবতী। এ ঘটনার পর থেকে তাদের বাড়িতে ভাগ্যদেবী এসে বসবাস করা শুরু করেছিল কি না সে বিষয়ে ধনঞ্জয় নিশ্চিত হতে না পরলেও অন্তত এটুকু উপলব্ধি করতে পারে যে, এর ফলে পরিবারে কুঞ্জবালার মর্যাদা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সবারই একটা দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, কুঞ্জবালা ভাগ্যবতী। সুতরাং বাবা-মা, পরিবারের সমস্ত কাজই কুঞ্জবালার হাত দিয়েই সূচনা করা শুরু করলেন। কুঞ্জবালার স্পর্শ ছাড়া যেন কিছুই পূর্ণতা পেত না। পরিবারের ইতিহাসে ১৫ বছরের মধ্যেই বিশ্বাসটা প্রথায় পরিণত হয়। ইতোমধ্যে বাবা-মা মারা গেলেও এই প্রথাকে পাশ কাটিয়ে নতুন কিছু করার ধৃষ্টতা কেউ দেখায় না।

এখন জুমে হাতি আসাকে কেউ সৌভাগ্যের লক্ষণ বলে মনে করে না। ভাগ্যদেবী যখন মানুষের আহারে ভাগ বসিয়েছে তখন সে ‘আপদ’ ছাড়া আর কিছু নয়। অনিষ্ট আর আতঙ্ক নিয়ে আসাটাই যদি নিয়ম হয় তখন কে বলবে ভগবান ভাল?

বারের পালটা অনেক বড়। দুচার জন লোক নিয়ে তাড়ানো যাবে না। বন্দুক থাকলে ভাল হতো। বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজে বেশ কাজ হয়। গ্রামে তাদের একটা গাদা বন্দুক থাকলেও নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কার অজুহাতে সেটা থানায় চিজ করা হয়েছে। এভাবে বেঁচে থাকার অবলম্বনগুলো একে একে হ্রাস পেতে থাকায় ধনঞ্জয় শঙ্কা বোধ করে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একদিন কাউকে না কাউকে তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হবেই। টিক চিহ্নটা কার মাথার উপর যে পড়বে তা সে বলতে পারে না।

পরদিন সকাল হতেই খবর আসে তৈনছড়ির পরের গ্রামে একজন মারা পড়েছে। কয়েকজনকে সাথে নিয়ে ধনঞ্জয় বেরিয়ে পড়ে। প্রায় চার মাইল হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে। ইতোমধ্যে আরও অনেক লোক জমা হয়েছে। লাশের বীভৎস অবস্থা দেখে ধনঞ্জয় একদম থমকে যায়। মেয়েরা ময়লা কাপড় পরিষ্কার করার জন্য পাহাড়ী ছড়ার ঘাটে রাখা বড় পাথর বা গুড়ি কাঠের গায়ে যেভাবে কাপড় আছড়ায় প্রথমে সেভাবে গাছের গায়ে আছড়ানো হয়েছে এর পর হাত-পা ধরে একটা একটা করে শুড় দিয়ে টেনে ছিড়ে চারদিকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। লাশের টুকরোগুলো সংগ্রহ করে এক জায়গায় জড়ো করে ধুয়ে ফেলা হয় গাছের কা-ে এখানে ওখানে লেগে থাকা রক্ত, মাংস, মগজ, নাড়ি-ভুড়ি। নয়তো মৃত্যুর বীভৎস এই চিহ্নগুলো মানুষের স্মৃতিকে মারাত্মকভাবে পীড়ন করে যেতে থাকবে যতদিন মুছে না যায়। ভদ্রস্থ কোন উপায় না দেখে লাশ কলাপাতা আর বুনোলতা দিয়ে বেঁধে সোজা গ্রামের শ্মশানে নিয়ে তোলা হয়। অপঘাতে মৃত্যু তাই আর গ্রামে ঢোকান হয় না।

চিতার কাঠ সংগ্রহ করতে যাওয়া লোকজনের দেরী দেখে লোকজন বিরক্ত হতে শুরু করে। ঘণ্টা দুয়েক পরে যে কয় জন ফিরে আসে বলা যায় একদম খালি হাত। তাদের অবস্থা দেখে ধনঞ্জয় ক্ষেপে যায়। একে ওকে গালাগাল করতে থাকে। কারণ তারা যে কাঠ নিয়ে এসেছে তাতে চিতার একস্তরও সাজানো যাবে না। লোকজন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ দেখালেও প্রায় শূন্য হাতে ফিরে আসাকে ধনঞ্জয় অদক্ষতা আর অবহেলা বলেই গণ্য করে। তার মনে হয় শুধু এই কারণেই সে তাদের উপর রাগ দেখাতে পারে।

মাঝে মধ্যে এভাবে মেজাজ দেখিয়ে সমাজে নিজের অবস্থান সম্পর্কে লোকজনকে একটু সচেতন করে দেয়ার সুযোগটি সে কখনও ছাড়ে না।

নিজেই একটা কুঠার হাতে কাঠ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেয়। পিছে পিছে দা হাতে আরও চার-পাঁচজন তাকে অনুসরণ করে। বেশ কিছুদূর আসার পর একটা জুতসই গাছ দেখে ধনঞ্জয় নিজেই কুড়াল চালাতে শুরু করে। দুএক কোপ দেয়ার পর কে যেন হাঁক দেয়— ‘কে বাগানের গাছ কাটে?’ ধনঞ্জয় জবাব না দিয়ে থেমে যায়, এদিকের জায়গা-জমি কোনটা কার এ সম্পর্কে তার তেমন কোন ধারণা নেই।

কিছুদূর গিয়ে আরও কিছু গাছ দেখতে পায় কিন্তু সুশৃঙ্খল এবং একই প্রজাতির গাছ দেখলে বুঝা যায় এগুলো কারও না কারও লাগানো।

চিতার উপযোগী এবং মালিক ছাড়া বুনো গাছের খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে তারা যে অনেক দূর আসলো এ খেয়াল কারও ছিল না। দলের একজন বললো- ‘দাদা, আর কতদূর যাবো?’

তখনই তাদের খেয়াল হলো, তাইতো! তারা অনেক দূর চলে এসেছে। আর চিতার জন্য কাঠ খুঁজতে এভাবে তো অনন্তকাল হাঁটা যায় না। ফিরতে হবে, বিকেল শেষ প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।

————————–

শফিক আশরাফ
কান্না

‘মর্দাগরে আর সময়-গময় নাই, অই আবার শুরু অইলো।’—বলে চিৎকার করে মালিহা খাতুন সবাইকে ডাকে। ইতিমধ্যে ঘরের টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটার মতো দুএকটা গুলি এসে পড়ছে। উঠানের মধ্যে বেশ বড় গুটি আম গাছ। গুলি লেগে আম গাছের তাজা পাতাসহ দুএকটা ছোট ডাল ঝরে পড়ছে। আমগাছের নিচে খোলা উঠানে রান্না বসিয়েছে মতিউদ্দির দশ মাসের পোয়াতি বউ রঙমালা। ভাত কেবল হয়ে এসেছে। এমন সময় আবার শুরু হলো! গুটি আম গাছ থেকে ছোট একটা ডাল পাতাসহ রঙমালার পায়ের কাছে পড়তেই ঘর থেকে শ্বাশুড়ি মালিহা খাতুনের চিৎকার ভেসে এলো।

হতবিহ্বল রঙমালার হাতের কাছে থাকা পানির কলস জ্বলন্ত চুলার ভেতর ঢেলে দিলো। কিছুক্ষণের জন্য ধোঁয়া এবং আগুন নেভার শব্দে গুলির শব্দ ঢাকা পড়ে গেল। রঙমালার ফর্সামুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম। নিচু হয়ে মাছ ধোয়ার চাড়িটা গরম ভাতের ওপর ঢেকে দিতেই কয়েক ফোঁটা ঘাম চাড়িটার পেটের ওপর পড়লো।

ততক্ষণে আর সকলে বের হয়ে পাশ্ববর্তী গ্রাম কাজি বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করেছে। মালিহা খাতুন ঘর থেকে বের হয়ে রঙমালার দিকে তাকিয়ে ধমকে ওঠে— ওই বউ! মরবা নাকি! তুমি এহন চুলা নেবাইতাছ!! আমার আত ধইরা দৌড় দেও।

রঙমালা দৌড়াচ্ছে। অন্য সবার থেকে কিছুটা পিছিয়ে। ভারি শরীর ও ভারি পেট নিয়ে জোরে দৌড়াতে পারছে না। মুখ দিয়ে হা করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কোথাও বসে একটু বিশ্রাম নিতে পারলে হতো। কিন্তু পেছনে গুলির শব্দ আরো বেড়েছে। ননী মাস্টারের ঘরের পেছন দিক দিয়ে, খোনকার বাড়ির উঠান পেরিয়ে কাগজী পাড়ার ফাঁকা মাঠে এসে পৌঁছায় সবাই। এখানে এসে রঙমালা মাথা উঁচু করে দেখে পাড়ার অন্য সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে। এর মধ্যেই কে যেন হিম ধরানো গলায় চিৎকার করে উঠলো

—পেছনে মিলিটারি আইতাছে! বেবাকে পলাও!

রঙমালা হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়াচ্ছে। মনে মনে আল্লার নাম জপছিলো। কিন্তু কখনো সেটা নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে সশব্দে বেরিয়ে আসছে

—হা আল্লা! হা আল্লা! হা আল্লা!

শ্রাবণ মাসের জ্বালা ধরানো রোদ যাত্রাকে একটু শ্লথ করে দিচ্ছে। রঙমালার কাছে  মনে হচ্ছে এ এক অনন্ত যাত্রা। এই দৌড়ানোর কোনোদিন শেষ হবে না। কিন্তু এক সময় শেষ হলো।

কাজি বাড়ির অলি তালুকদারের ঘরের পেছন দিকে শেওড়া গাছের নিচে এসে যখন রঙমালা পৌঁছাল তখন শরীরের শেষ বিন্দুটুকুও নিঃশেষিত হয়েছে। শেওড়া গাছের নিচে দুপা মেলে বসে পড়লো। পেটের ভেতর চিন চিন ব্যথা শুরু হয়েছে। কাজি বাড়ির পেছন দিকটায় ঝোপ-জঙ্গলের মতো জায়গায় বাড়ির অন্য সবাই শুয়ে বসে হাপাচ্ছে।

মালিহা খাতুন এসে রঙমালার কাছে দাঁড়ালো। তার দিকে তাকিয়ে কি যেন একটু ভাবলো তারপর বললো—

—ও বউ, তুমি তালুকদার বাড়ির ভেতর যাও।

—না আম্মা! আমার পেটটা কেমুন জানি বিষ করতাছে।

—কউ কি! এইডা তো লক্ষণ বালা না। বলেই চারপাশ লক্ষ করে ডাকলো

—মতিউদ্দি! মতিউদ্দিটা কই গেল আবার!

মতিউদ্দিন মায়ের গলা শুনে কাছে এসে দাঁড়ায়।

—কী অইছে কও মা! ডাহ ক্যান!

—হোন, তোর বউর অবস্থা বেশি বালা ঠেকতাছে না। একটা দাই টাই বিছরাইয়া পাওয়া যায় কিনা দ্যাখ।

—আমি এমুন সুময় দাইটাই কই খুজি। মিনমিন করে মতিউদ্দিন। তার মিনমিন দেখে ধমক লাগায় মালিহা বেগম

—যেহানে পারস বিছরা যা।

মতিউদ্দিন মায়ের সামনের থেকে সটকে পগারের পেছনে কদম গাছের আড়ালে বসে পড়ে।

সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসে বড় বউ হফিজার মা।

—আম্মা! অলি তালুকদারের বৌ এই কাজ বালা জানে। ওনারে ডাকলে অয়।

—তো যাও! ওনারে ডাইকা নিয়া আহ!

রঙমালার ব্যথা আরো তীব্র হয়েছে। পেটের পানি ভাঙা শুরু হয়েছে। ব্যথায় গো গো শব্দ বেরুচ্ছে। মাটিতে শুয়ে অসহ্য বেদনায় ছটফট করতে শুরু করেছে রঙমালা। দুনিয়াটা তার সামনে আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে আসছে। এত ব্যথা! এত ব্যথা! এরপর অনেক মানুষের হৈ চৈ, চেচামেচি। সময় স্থির হয়ে গেল রঙমালার কাছে। অনন্ত অনন্তকাল পরে হঠাৎ করেই ব্যথা কমে গেল। শিশুর তীব্র কান্নায় চোখ মেলে চাইলো রঙমালা। অলি তালুকদারের বৌ তেনায় পেচিয়ে রঙমালার বুকের কাছে এসে খুশি খুশি গলায় বললো

—পোলা অইছে গো বৌ! পুলা অইছে! এই দ্যাহ কিরম নাদুস-নুদুস!

রঙমালা চোখ মেলে তেনায় পেচানো বাচ্চার দিকে তাকালো। এক অপার্থিব আনন্দে মুহূর্তেই সকল ব্যথা যন্ত্রণা ভুলে গেল। বাচ্চাটাকে হাত বাড়িয়ে বুকে তুলে নিল।

আতঙ্কে উত্তেজনায় অস্থির হয়ে আছে রঙমালা। আশেপাশে মিলিটারির আনাগোনা বেড়েছে। বাচ্চাটার জন্মের প্রায় সাতদিন পেরিয়ে গেল অথচ কান্না প্রায় বন্ধই হচ্ছে না। সারাক্ষণ ওয়াও… ওয়াও… শব্দে কেঁদেই চলেছে। প্রায় সারারাত কিছুক্ষণ মালিহা খাতুন বুকে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করে আবার কিছুক্ষণ রঙমালার বুকে থাকে। মিলিটারির ভয়ে তটস্থ অবস্থায় সারাক্ষণ এই কান্না পরিবেশকে আরো আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। সেদিন মিলিটারিরা এসে দক্ষিণ পাড়ার দুজন মেয়েকে তুলে নিয়ে যায়। অবশ্য কয়েক ঘণ্টা পরেই ছেড়ে দেয়। কিন্তু মেয়ে দুটো সে রাতেই পিটুঙ্গা গাছের ডালে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। এসব ঘটনা চারপাশের পরিবেশকে ভয়ানক রকম অস্থির করে রেখেছে। রঙমালা নিদারূণ অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতায় শিশুটির কান্না থামানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু কান্না কোনো কিছুতেই থামছে না। জন্মের পর পগারের শীতল পানিতে বাচ্চাটাকে ধোয়ে তোলার পর ঠা-া লেগেছে। নাক দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে। আশপাশে কোনো ডাক্তার কবিরাজ নেই যে চিকিৎসা করাবে। মালিহা খাতুন কয়েকবার নিজেই পানিতে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এর মধ্যেই মতিউদ্দিন কিছু টিন-খুঁটি জোগাড় করে শেওড়া গাছের তলায় একটি ছাপড়া ঘর তোলে। সেখানটায় সবাই গাদাগাদি করে বসবাসের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

শ্রাবণ মাস শেষ হতে চললো। মাঝে-মধ্যে বৃষ্টি আশপাশের পরিবেশটাকে আরো সেঁতস্যাঁতে করে রেখেছে। তবে নদী-খাল-পগার পানিতে টই-টু¤ু^র। এই পরিবারের সবার সমস্যা এখন এই বাচ্চার কান্না। যতক্ষণ জেগে থাকে একনাগারে কেঁদেই চলেছে। এই অবিরাম কান্নার শব্দ সবার ¯œায়ুকে প্রায় অবশ করে দিচ্ছে। এই কান্না কারো কারো রাগ-ক্ষোভ-বিরক্তি বাড়িয়ে চলেছে। ঠিক এই সময়ে অলি তালুকদারের বৌ এসে কান্নার কারণ বলে দিলো। বাচ্চাটার যেখানে জন্ম হয়েছে সেটা আসলে একটা কবরস্থান। আর গোরস্থানের উপর বাচ্চার জন্ম হওয়ার কারণেই বাচ্চার কান্না বন্ধ হচ্ছে না।

বাচ্চার কান্নার কারণ আবিষ্কার করতে পেরে সকলের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি নেমে আসলো। মতিউদ্দিন সকলকে নিয়ে ঘর ভেঙে শেওড়া গাছের তলা আরেকটু দূরে সরিয়ে নতুন করে ঘর তুললো।

এবং অবাক হয়ে সকলে লক্ষ করলো বাচ্চার কান্না বন্ধ হয়ে গেছে!

শাহনাজ নাসরীন
চুকনগর গণহত্যা ও সুন্দরী

তিনি বললেন, ১৯৭১ সালে চুকনগরে একদিনে গণহত্যার শিকার হয়েছে ১০ সহস্রাধীক মানুষ। মূলত ‘‘ETHNIC CLEANSING’  এর ভাবনা থেকেই এই নৃশংসতম গণহত্যা হয়েছিল। যাদেরকে মারা হয় তারা সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষ। প্রায় লাখখানেক মানুষ  বৃহত্তর বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চুকনগরে জমা হয়ে যানবাহন আর গাইডের জন্য অপেক্ষা করছিল বর্ডার পার হয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেবে বলে। কিন্তু সে সুযোগ তাদের হয়নি। পাকবাহিনী পুরো এলাকা ব্যারিকেড দিয়ে পাখির মতো গুলি করে আর বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে মেরেছে অস্ত্রহীন, নিরপরাধ, নির্বিরোধ মানুষগুলোকে।

তবু পৃথিবীর কোনো ইতিহাসে এই গণহত্যার স্থান মেলেনি। একদিনে সংঘটিত বৃহত্তম গণহত্যার নাম হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে ভিয়েতনামের ‘মাইলাইতে’। অথচ মাইলাইতের গণহত্যায় মারা যায় প্রায় ১৫০০ মানুষ। আর বিশ্ব ইতিহাসের কথাই বা বলি কেন বাংলাদেশ সরকারের ‘স্বাধীনতার দলিল’ নামে ১৫ খ-ে লিখিত স্বাধীনতা যুদ্ধেও যে দলিল রয়েছে, সেই ১৫ খ-ের  কোথাও চুকনগরের গণহত্যার স্থান হয় নি।

আমি তার কথা শুনে হতভম্ব! জিজ্ঞেস করি এরকম কেন হলো?

উনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, আমি মনে করি ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিক, যথোপযুক্ত গবেষণা ছাড়া কারণগুলো এখনই নির্দিষ্ট করে বলতে চাই না। আমি নিজে একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে। আমরা কাজ করছি। তোমরা আগ্রহী হলে যোগ দিতে পারো এবং আমি বলবো অবশ্যই যোগ দেয়া উচিৎ, কারণ তোমরা হচ্ছো ভুল ইতিহাস পড়া প্রজন্ম, সুতরাং সত্য উদ্ঘাটনের পাশে না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের মহান ইতিহাস বিকৃত হতেই থাকবে কিন্তু তোমরা কিছুই করতে পারবে না। এভাবে একটা সময় আসবে যখন  মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ তিতিক্ষা আদর্শ কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। থাকবে কিছু বানানো গল্প। আমার শহীদ বাবাকে নিয়েও বিভিন্ন সময় পত্রিকাতে বানানো স্মৃতিচারণ করতে দেখেছি।

জানো, আমার মায়ের বয়স তখন মাত্র পঁচিশ বছর। সেই অল্পবয়সী বিধবা গৃহবধূরা তাদের তিন-চারটি সন্তান কী করে মানুষ করেছে পড়েছ সেই গল্প কোথাও? কেউ কখনও তাদের খোঁজ জানিয়েছে? পড়েছ সেই সময়ে জন্ম নেয়া যুদ্ধ শিশুরা কোথায় গেল? নির্যাতিত নারীদের কী হলো?

আগামী সপ্তাহে আমরা চুকনগর যাবো। খবর পেয়েছি কয়েকদিন আগে সেখানে একটি পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করার কাজ শুরু করার সময় ফ্লোরের নীচে পাঁচটি কঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে। আমরা সন্দেহ করছি একাত্তরেই এদেরকে মেরে পুঁতে ফেলা হয়েছিল বাড়িটি দখল করার জন্য। শুধু যে পাকবাহিনী হাজার হাজার শরণার্থীদের গুলি করে মেরেছে তাই নয় তাদের ‘‘ETHNIC CLEANSING’  কর্মসূচীর সুযোগে হিন্দুবাড়িগুলি দখল করতেই হিন্দু নিধনের সূচনা করেছিল বিহারী ও স্থানীয় রাজাকাররা। যাই হোক তবু পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে নিশ্চিত করে কিছু বলছি না।

আমি সঙ্গে সঙ্গে বলি অবশ্যই যাবো। আমার সাথে থাকা জুনিয়র কলিগ ফার্দিন আর রাইসা বলে আমরাও যাবো আপু। আমি উত্তেজিত চলো চলো বেশ ভালো একটা রিপোর্ট করতে পারবো মনে হচ্ছে। ফার্দিন বলে কিন্তু হঠাৎ নতুন একটা প্রোগ্রাম কী বস অ্যালাও করবেন?

আমিও মনে মনে তাই ভাবছিলাম। এখানে কোনো অফিসিয়াল প্রোগ্রামে আসিনি। ওশিন নিয়ে এসেছে। অনেক হ্যাপা পোহাতে হবে কনভিন্স করতে কিন্তু যা সব দেখলাম আর শুনলাম উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছি আমি। এই সুযোগ ছাড়া যাবে না কিছুতেই। বলি, ফার্দিন সাংবাদিককে তো এভাবে ভাবলে হবে না। সিদ্ধান্ত নিয়েছি যাব তো যাবই।

ওশিনকে ধন্যবাদ দেই বুদ্ধি করে খবরটি দেবার জন্য। ওশিন বলে, আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারিনি আপু! কাল বিকেলে আমি, আফ্রা, আবরার, সাফোয়ান, জামিল, নির্মল লেকে আড্ডা দিচ্ছিলাম, তো জামিল ভাই ওখানে এলেন আর এই  এনজিওর ঠিকানাটা দিয়ে বললেন আরও বন্ধুবান্ধব নিয়ে ওখানে সকাল দশটায় যেন চলে আসি। জামিল ভাইয়ের বড় ভাইয়ের শিক্ষক আলোচনা করবেন মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা বিষয়ে । তো সকালে এখানে এসে রিসেপসানে বসে উসখুশ করছি জামিল ভাইয়ের খবর নেই। শেষে ফোন দিলাম উনি বললেন ম্যাডামকে নিয়ে পথে বিশাল জ্যামে আটকে আছেন, দোতলায় ছোট একটি হলরুম আছে আমরা যেন সেখানে গিয়ে বসি উনি রিসিপশানে বলে দেবেন। তো এরপর  এখানে এসে দেখি কালো এই ব্যানারটিতে লাল হরফে লেখা ‘আজ ২০ মে, চুকনগর গণহত্যা দিবস’। এক কোনে একটি মাল্টিমিডিয়া। সাউন্ড বক্স থেকে কবিতা আবৃত্তি ভেসে আসছে… তখনই মনে হলো তোমাকে জানাই যদি ফ্রি থাকো তুমি নিশ্চয়ই আসবে। কবিতাটা শুনবে আপু মোবাইলে রেকর্ড করেছি :

আমাকে করেছে বাধ্য যারা

আমার জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে

ভাসতে নদীতে আর বনেবাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে,

অভিশাপ দিচ্ছি, আমি সেইসব দজ্জালদের।

অভিশাপ দিচ্ছি ওরা চিরদিন বিশীর্ণ গলায়

নিয়ত বেড়াক বয়ে গলিত নাছোড় মৃতদেহ,

অভিশাপ দিচ্ছি

ফোন আসে, ওশিন সরি আপু বলে ফোন ধরে। কিন্তু বহুবার পড়া কবিতাটি আমার মাথায় বাজতেই থাকে :

প্রত্যহ দিনের শেষে ওরা

হাঁটু মুড়ে এক টুকরো শুকনো রুটি চাইবে ব্যাকুল

কিন্তু রুটি প্রসারিত থাবা থেকে রইবে দশ হাত দূরে সর্বদাই।

অভিশাপ দিচ্ছি… অভিশাপ দিচ্ছি

ওদের তৃষ্ণায় পানপাত্র প্রতিবার

কানায় কানায় রক্তে উঠবে ভরে, যে রক্ত বাংলায় বইয়ে দিয়েছে ওরা হিং¯্র

জোয়ারের মত।

অভিশাপ দিচ্ছি…

না, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমি শুধু অভিশাপ দিয়ে ক্ষান্ত হব না, অভিশাপে কিছু হয় না কিচ্ছু হয়ওনি দজ্জালদের। ওরা বরং ফুলে ফেঁপে উঠেছে, ওদের কণ্ঠ শক্তিশালী হয়েছে এতোটাই যে এখন কণ্ঠ থেকে শুধু হুমকি বের হয়, আর ওদের তেল চকচকে শরীর কখনও জানেনি শুকনো রুটি বা তৃষ্ণা কাকে বলে। এখনও ওরা রক্ত ঝরায়… রক্তমাখা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে আরও আরও ওপরে একেবারে নাগালের বাইরে! না আমি অভিশাপে বিশ্বাস করি না, আমি বিচার চাই, বিচার চাই-ই চাই।

খুলনা সদর থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে ডুমুরিয়া উপজেলায় চুকনগর শহর। কাল ভোরে চুকনগর যাব। আজ সারাদিন জার্নি করে আমরা বৈঠাঘাটায় যাব, ওখানেই থাকব রাতটা। সেখানে কম্যুনিস্ট নেতা অচিন্ত্য নাগ থাকেন। অনেক আগে একবার তার সাথে আলাপ হয়েছিল ঢাকায়। আদর্শের প্রতি সনিষ্ঠ, অকৃতদার এই মানুষটি এখন পার্কিনসন্স ডিজিজে আক্রান্ত। ভাইদের সংসারে আছেন। তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেব। উনি দেশভাগ দেখেছেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং এরপরের সময়টিরও প্রায় চল্লিশ বছর দেখলেন। জিজ্ঞেস করবো তাঁকে কী আমাদের ভবিষ্যত… হিসেব নিকেশ করেছেন কীনা প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির।

আমাদের দলটি একটু বড় হয়ে গিয়েছে। আমি আর ফার্দিনের চার বন্ধু চার সিটের একটি গাড়িতে গাদাগাদি করে চলেছি। ওরা থাকে শহরের পশ এলাকা গুলশান আর ধানমন্ডিতে। কখনোই গ্রামে যায়নি। পড়েছে কঠিন সব স্কুল যেমন ভিকারুন্নিসা, হলিক্রস, সানিডেল বা অন্যকোনো সুপার স্কুলে। সেই যে তিন বছর বয়সে প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল স্কুলে ভর্তি হওয়া দিয়ে এরপর কেবল পড়া আর পড়া। বাবা মার ব্যর্থ স্বপ্ন সফল করার বোঝা মাথায় নিয়ে কাক ভোরে তার ওজনের চেয়ে বেশি ওজনের এক ব্যাগ বই পিঠে চড়িয়ে ছুটেছে স্কুলে, স্কুলের গাদা গাদা বই মুখস্ত শেষে ছুটেছে কোচিংয়ে অথবা হাউস টিউটরের কাছে। সাপ্তাহিক ছুটিতে গান, নাচ, ছবি আঁকার স্কুল। এতসব দলাই মলাইয়ে পরিশীলিত হতে হতে এখন কেউ ইউনিভার্সিটির এক সেমিস্টার করে কেউবা ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে এডমিশন নিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে বের হয়েছে। বছর আঠারো ঊনিশের মধ্যে বয়স। সারাক্ষণ টগবগ করছে।

ওরাই আমার আকাক্সক্ষা পুরো করলো। গন্তব্য সম্পর্কে নিজেরই যেহেতু স্পষ্ট ধারণা নেই তাই অফিসে বুঝাতে পারিনি শেষপর্যন্ত। সিনিয়র বললেন, খুব গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট আছে সে সময় এবং আমাকেই ওটা কভার করার দায়িত্ব নিতে হবে। সুতরাং অসুস্থতা দেখিয়ে ছুটি নিতে হলো। চাকরির যা হয় পরে হবে কিন্তু এখন আমাকে চুকনগর পৌঁছতেই হবে এটুকু জানি স্পষ্ট করে। ফার্দিন আসতে পারলো না তবে গাড়ি ক্যামেরা সবকিছুরই ব্যবস্থা হলো ফার্দিনের বন্ধুদের কল্যাণে। যেতে যেতে গল্প করি। আনন্দ বললো, ‘মা সারাজীবন স্বপ্ন দেখেছে আমাকে ডাক্তার বানাবে। আমার পরীক্ষার সময় মা অসুস্থ হয়ে যেতো টেনশনে। কিন্তু আমিতো ছবি আঁকবো। ছবি আঁকার স্বপ্ন আমার সেই ছেলেবেলা থেকে। আমার ছবি আঁকার প্রতিভা বায়োলজী বা এনাটমিতে খরচ করতে চাইনি আমি। ভালো ছাত্র হলেই ভালো ডাক্তার হওয়া যায় না ডাক্তারিকে ভালবাসতে হবে এটা মাকে বুঝাতে পারি না’। রাইসা বলে, ‘আরে আমারো তো তাই। বাড়ি থেকে ভীষণ চাপ মেডিকেলে পড়তেই হবে। তো চান্স পেলাম ডেন্টালে। বাবার ডেন্টাল পছন্দ না বললো পরের বছর আবার পরীক্ষা দিতে। আমার মেডিকেলে ভর্তি হবার খুব বেশি ইচ্ছা থাকলে প্রাইভেটে অনেক বেশি টাকা খরচ করে ভর্তি হওয়া যেতো কিন্তু আমি সুযোগটা নিলাম আমার শখ পুরণের। ফিল্ম এ- মিডিয়াতে ভর্তি হয়ে গেলাম সবাইকে রাগিয়ে দিয়ে। এমন অদ্ভুত মানসিকতা কী বলবো! প্রাইভেট মেডিক্যালের খরচ দিতে রাজি কিন্তু ফিল্ম স্কুলের বেলায় খরচ বেশি খরচ বেশি বলে গলা শুকাচ্ছে। আমিও তাই টিউশনী করছি, বিভিন্ন প্রোডাকশানে কাজ করে কিছু কিছু ইনকাম করতে শুরু করেছি। বাড়ি থেকে খরচ নেয়া বন্ধ করে দেব।’

বেশ ভালো লাগে দেখে যে ওদের মধ্যে কোনো মেকী ভাব নেই, মধ্যবিত্ততার ছাপোষা টানাপোড়েন নেই, কনফিউশান নেই। বাবা মা’র উচ্চাভিলাসী স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে ইচ্ছে করেই।

বিকেলের নরম আলোয় মেঠো পথ ধরে আমরা হাঁটি। ছেলেমেয়েগুলোর পরনে টি শার্ট আর থ্রিকোয়ার্টার ট্রাউজার। মাথায় ক্যাপ, পিঠে হ্যাভারস্যাক, গলায় ক্যামেরা, কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। অপার কৌতূহল নিয়ে গ্রাম দেখে, ছবি তোলে। নদীর ধারের ঘাসফুল দেখে জানতে চায় ভাটফুল কিনা। আমার হাসি পায় নিশ্চয় জীবনানন্দে পড়েছে। গ্রামের মানুষ ঘাড় ফিরিয়ে দেখে আমাদের। কয়েকটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে পেছন পেছন আসে। ওরা অল্পক্ষণেই ভাব জমিয়ে ফেলে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে। আমার ভাল লাগে এই যোগাযোগ দক্ষতা। আমরা এমন ছিলাম না, অনেক জড়তা ছিল আমাদের। ওরা তা নয়।

আমার জন্ম গ্রামে নয়। বাবা শহরে চাকরি করতেন বলে বেড়েও উঠেছি শহরে। তবে গ্রামে বেশ যেতাম ছোটবেলায়। যখন স্কুলে পড়তাম কয়েকদফা গ্রামে যেতে হতো। ছেলে চাকরি করলে স্ত্রী সন্তান নিয়ে শহরে থাকবে সে নিয়ম ততদিনে চালু হয়ে পোক্ত হয়েছে। কিন্তু ছুটিছাটায় ঈদে পার্বনে গ্রামে যাওয়া ছিল পবিত্র দায়িত্ব। না হলে দাদা-দাদী কষ্ট পেতেন আর পড়শীরা নিন্দা করতো। তাই স্কুলের গরমের ছুটিতে আম কাঁঠাল খেতে, শীতের ছুটিতে পিঠা খেতে আর দাদাদাদীর সঙ্গে বড় ঈদ অর্থ্যাৎ কুরবানী দিতে বছরে এই তিনবার গ্রামে যাওয়া ছিল আইন।

এই তিনবারে বছরের মোট আড়াই থেকে তিনমাস গ্রামে থাকা হতো। দাদাদাদী সেই সময়গুলোতে সারা বছরের কাজকর্ম দায়দায়িত্ব আর আদরগুলো আমাদের নিয়ে সারতেন। বাবার সাথে হিসাব নিকাশ হতো জমিজমার হালহকিকত, আয়-ব্যয়, ফসল, কুরবানীর গরু ছাগল, সালিশ-ভিলেজ পলিটিকস ইত্যাদি নিয়ে। আর আমাদের ছিল ঘুড়ি উড়ানো, ছুটে বেড়ানো, যখনতখন আবদার করা আর যা খুশী যত খুশী খাওয়া। তালগাছ থেকে কাদি কাদি কচি তাল আসছে তো ডাব গাছ থেকে নামছে কাদি কাদি ডাব, রস ভরা কলস, থালা ভরা পিঠে, হাড়ি ভর্তি করে গরুর দুধ জ্বাল করে ক্ষীর করা। আবার কখনো মাছ ধরে ধরে উঠোন ভরে ফেলা, বিশাল বিশাল মাটির হাড়িতে ধান সেদ্ধ করে উঠোনে ছড়িয়ে শুকানো। ধান কাটা থেকে চাল করা পর্যন্ত কত যে পদ্ধতি আর নিজস্ব ভাবনায় কামারের কাছ থেকে বানিয়ে আনা গ্রাম্য যন্ত্রপাতি, মুরগী আর গরু ছাগলের খোয়াড়, মাছ ধরার জাল বড়শি ছাড়াও বাঁশের তৈরী অনেক রকমের যন্ত্র সে সবই দেখতাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। বছরে তিনবার তিনটি ভিন্ন সময়ে যেতাম বলে পুরো বছরের অনেকটাই জানা যেত। একেকবারে থাকতামও প্রায় একমাস করে। সেই সময়ের সাথে মিলিয়েই আত্মীয় পরিজনের বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানগুলোর তারিখ ফেলা হতো। আমাদের গ্রাম দেখানোর জন্য পুরো গ্রাম যেন ভেঙে পড়তো তখন।

সেইসব দিন অবশ্য গত হয়েছে। অনেকদিন হয়েছে গ্রামে যাওয়া হয় না বা একবেলার জন্য যাওয়া হলেও থাকা মোটেই হয় না। ওই একবেলাতে গ্রামের বেশ পরিবর্তন দেখি। লেবু চিনির সরবতের জায়গায় কোকাকোলা, ফ্রুটো বা ট্যাং, পিঠার জায়গায় টোষ্ট, চিপস বা চানাচুর দিয়ে আপ্যায়ন হয় এখন। যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে শহরের সব আয়োজনই গ্রামে পৌঁছে গেছে। জীবন সহজ হয়েছে ভেবে ভালোই লাগে আবার খৈ, চিড়া বা মুড়ির মোয়া, খেজুর রসের পায়েস আর নানারকম পিঠা মিস করি খুব। দাদী কী পরিশ্রমই করতেন আমাদের এসব খাওয়াতে! মুড়ি ভাজা, চিড়ে কোটা, রাতভর ঢেকিতে চাল গুড়ো করা আর দিনভর পিঠে বানানো লেগেই থাকতো।

হঠাৎ তীব্র তীক্ষè আর্তনাদে আমরা হকচকিয়ে এদিক ওদিক তাকাই। যে বাচ্চাগুলো আমাদের পথ দেখাচ্ছিল তারা দৌড় দেয় তাদের পিছু পিছু আমরাও দৌড়াই। একটি বাড়ির উঠোনে দেখি দশ বারো বছরের একটি বাচ্চা ছেলেকে বেদম মারছে এক লোক। অন্য বাচ্চাগুলি গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে সেই দৃশ্য। ছেলেটি উঠানে গড়াগড়ি করে কাঁদছে আর মাফ চাইছে আর কখনও ভুল হবে না বলে কিন্তু লোকটি থামছে না। একটি মহিলা নির্বিকার বাসন মাজছে। আমাদের দেখে মাথায় ঘোমটা তুলে দিল। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় আর বিপন্ন বোধ করি। কিন্তু আনন্দ আর সুমি ছুটে গিয়ে লোকটিকে জাপটে ধরে আর রাইসা তার লঠিটি কেড়ে নেয়। আমি লোকটিকে ধমকাই এমন করে বাচ্চাটিকে মারার জন্য। লোকটি আমাদেরকে গুরুত্বই দেয় না। কটমট করে ছেলেটির দিকে তাকায় আর আস্ফালন করে, ‘শালা বহুত তেল হইছে তোমার, কাজে ফাঁকি দিয়া ঘুমাও…আইজ তোরি একদিন কী আমারি একদিন… বহুত ত্যন্দর হইছ না…আমিও… ’  জানা যায়, ছেলেটি গাছের নীচে ঘুমিয়ে পড়ায় আরেক বাড়ির ছাগল এসে তার ফসল নষ্ট করে ফেলেছে।’

ওরা ছেলেটিকে ধরে রাখে নিজেদের কাছে। ছেলেটির কান্না তখনও থামে না, গুন গুন করে অভিযোগ জানায়, ফজরের ওয়াক্তে উঠে গরুর ঘাস কেটেছে, গরুকে খাইয়েছে, বাড়ি বাড়ি দুধ দিয়েছে আরও নানা কাজের পর দুপুরে ভাত খেয়ে তার খুব দুর্বল লাগছিল তাই গাছের তলায় বসেছিল জিরোতে এরইমধ্যে কেমন করে ঘুমায়ে গেল বলতেই পারবে না।’ আমারও মনে পরে ছোটবেলায় দেখা আমাদের বাড়ির রাখালদের কথা। এরকমই জীবন ছিল ওদের, এত বছর হয়ে গেল, কত কী বদলালো অথচ একটুও পাল্টায়নি ওদের জীবন!

বাড়িটির নাম পনিরের বাড়ি। এখানেই রাতে থাকবো আমরা। তিনটি ঘর থাকার, একটু দূরে রান্নাঘর আরো খানিকটা দূরে বাথরুম, টয়লেট। সামনে বেশ বড় একটা উঠোন। তাতে দু’টি সিমেন্টের বেঞ্চ। একজন একজন করে গোসল সেরে একটু গুছিয়ে নিতেই হেমন্তের নাতিদীর্ঘ বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। বের হয়ে দেখি বাচ্চা একটি ছেলেকে নিয়ে এক মাঝবয়সী লোক দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটির হাতে ট্রে ভর্তি চা আর খৈয়ের মোয়া। হৈ হৈ করে ওরা মোয়া খায় চা এর স্বাদ অন্যরকম কেন জানতে চায়। আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলি খেজুর গুড়ের চা না? ছেলেটি কিচিরমিচির করে বলে রসের চা। ওরা বুঝতে পারে না রসের চা কী? ভদ্রলোক বলে খেজুরের রস জ্বাল করে তাতে চা বানানো হয়েছে। মাহী লাফিয়ে ওঠে, জটিল তো! ওরা ছুটতে শুরু করে। এখনি খেজুর গাছ থেকে রস পড়া দেখবে। থামিয়ে বলি সকালে খেজুর রস খাবো গাছের নীচে বসে, খুব ভোরে উঠতে হবে কিন্তু। ভদ্রলোক জানান ম্যাডাম বলে দিয়েছেন সকালে পিঠে আর খেজুর রসের পায়েস করার জন্য। আর রাতে যদি মাছ খেতে চাই তাহলে এখনি জাল ফেলতে হবে। ওরা আবার ছোটে মাছ ধরা দেখতে। লাফিয়ে লাফিয়ে জাল থেকে মাছ বের করার অনাবিল আনন্দে মেতে ওঠে। জাল ফেলা শিখতে গিয়ে আনন্দ জালসহ ঝপাৎ করে পুকুরে পড়ে হাবুডুবু খায়। বন্ধুরা পচায় ওকে। আমি বকা দেই ওকে ‘সাঁতার না জেনে পানির সাথে খেলছ সাহস তো কম না ডুবে গেলে আমার কী হতো? কিন্তু ওর অবস্থা দেখে হাসিও চাপতে পারি না। গাম্ভীর্য ভুলে হেসে ফেলি হো হো করে।’

উঠানে মাছ কাটা হচ্ছে। মাথার ওপর তারা ভরা কালচে নীল আকাশ। আকাশের দিকে তাকিয়ে রাইসা বলে দেখ দেখ আকাশটা যেন নীল জামদানী। কতদিন এমন ঝকঝকে আকাশ দেখিনি।

সুমি বলে আচ্ছা ঢাকার আকাশে তারা দেখি না কেন রে?

মাহী হাসে তাই? ঢাকার আকাশে তারা নেই? লক্ষ্য করিনি তো!

লক্ষ্য করিস এখন থেকে। তোর তো খাবার ছাড়া আর কোনোদিকে লক্ষ নেই। থাকলে দেখতি ঢাকার আকাশ কেমন ধূসর আর ঘোলাটে। আহ্ পায়ের নীচে শিশির ভেজা ঘাস কোথায় পাবি গ্রাম ছাড়া… আনন্দ খালি পা ঘাসে ঘষে। সুমি ওর মাথায় গাট্টা মারে শিশির না কুয়াশা গাব্বু। টুপিটা খুলে রাখ কিছুক্ষণ তোর মাথাও ভিজে যাবে। ও আবৃত্তি করে :

লাল আলো, রৌদ্রের চুমুক;

অন্ধকার, কুয়াশার ছুরি

মোরে যেন কেটে লয় যেন গুঁড়ি গুঁড়ি

ধুলো মোরে ধীরে লয় শুষে

মাঠে মাঠে আড়ষ্ট পউষে

ফসলের গন্ধ বুকে করে …

রাইসা কন্ঠ মেলায়। তারপর আস্তে করে বলে গ্রামীণ বাংলার রূপ জীবনানন্দের মতো কেউ আঁকতে পারেনিরে। ওরা একটার পর একটা কবিতা আবৃত্তি করে, রাতের ছবি তোলে, গান গায়। তারা দেখে দেখে সপ্তর্ষিম-ল, শুকতারা, লুব্ধক, কালপুরুষ খুঁজে বের করে। ঝোপের মধ্যে ছোটাছুটি করে জোনাকির পেছনে। আমার কাছে শতেক প্রশ্ন ওদের। শামকল পাখি কী, কেমন, দেখেছি কিনা। শঙ্খচিল আর লক্ষ্মীপেঁচার দেখা কী করে মিলবে। মাহী জানায় বিকেলে যে ছেলেগুলো আমাদের সাথে এসেছিল তারা বলেছে আগামীকাল ঘুঘু নিয়ে আসবে। ওদেরকে বলবো লক্ষ্মীপেঁচা দেখাতে। শেয়াল ডাকতে শুরু করলে বলে আরে গ্রাম তো একশ বছর আগেও এমনি ছিল! জীবনানন্দ মাল্যবান এ বরিশালের গ্রামের বর্ণনায় শিয়ালের কোরাস, খেজুরের রস, জোনাকি এসবই লিখেছে। আমি বলি ওই সময়ের গ্রাম দেখলে বুঝতে বদলেছে অনেক। ওরা বলে বলো না দিদি কী কী বদলেছে। আমি আবার বলি অ-নে-ক। তখন ইলেকট্রিসিটি ছিল না, মোবাইল ছিল না এমনকি পত্রিকাও আসতো না নিয়মিত। এখন তো কম্পিউটার আছে তুমি যা জানছো ঢাকায় বসে গ্রামেও ইচ্ছে করলেই তা জানা যায়। কিন্তু এই গ্রামটি তো অনেকটা তেমনই? হুম এখন পর্যন্ত অনেকটাই কিন্তু আমরা তো একে বদলে দিচ্ছি, বদলে দিতেই কাজ করছি তাই না? কয়েক বছর আগেও এখানে অনেক গাছ ছিল, অনেক অন্ধকার আর অনেক অনেক ভূত ছিল। ওরা হাসে ভূত! আমিও হাসি হ্যাঁ জ্বীন-ভূত-পরী-পেত্নী নানারকম।

রান্না করছে যে বৌটি সে মুখ তুলে চোখ বড় বড় করে জানায় ওগুলো এখনও আছে। কিছুদিন আগে সন্ধ্যাবেলা পুকুরপাড়ে একটি মেয়েকে পেতœী থাপ্পড় দিয়েছে। ওরা হেসে উঠলে বলি দেখলে তো, এখনও আছে। যন্ত্রপাতি এলে কী হবে ভূত কিন্তু যায়নি মাথা থেকে।

লাকরির চুলায় রান্না হচ্ছে। আমরা চুলার চারপাশ ঘিরে বসি। ওরা খুব আনন্দ করে পাটখড়ি, খড়, পাতা আগুনে ঢালে। আগুন লকলক করে ওঠে, ওদের আনন্দ দেখে রাধুনী হাসে। বলে, এমনে জ্বাল দেয় না অল্প অল্প কইরে দেতে হয়। আনন্দ সুমিকে খোঁচা দেয় কিছুই পারিস না। সুমিও থেমে থাকে না পাল্টা উত্তর করে হুম এ জন্যেই তো চুল ছেটে ফেলেছি। রাঁধবোও না চুলও বাঁধবো না। তোর চুল তো লম্বা তুই বরং রান্নাটা শেখ ভালো করে। সুমির বাড়ি  থেকে ফোন আসে। সে ভালো আছে ঠিকঠাক আছে জানায়। হড়বড় করে কত কী মজা করলো তার ফিরিস্তি দেয়। হয়তো কোথায় থাকছে এরকম কোনো প্রশ্নের উত্তরে বলে, যে বাড়িতে থাকছে তার নাম মাখনের বাড়ি। ফোন রেখে দিলে আমি বলি মাখনের নয় পনিরের বাড়ি। ও বিব্রত হাসে। বলে, নামটা মনে করতে পারছিল না কিন্তু যখন নামটা বলছিল তখন বাড়ির নামটা যে দুধের সাথে সম্পর্কিত এটা তার মনে ছিল। তো মাখন কমন বলে মনে হয়েছে মাখনই হবে।

সবাই হাসে হো হো করে। এসময় অনন্ত নাগের বাড়ি থেকে যে ছেলেটির আমাদেরকে নিতে আসার কথা সে আসে আর জানায় আজ তার দাদুর শরীরটি ভালো না তাছাড়া রাত হয়ে গেছে যদি ফেরার পথে সকালে বসি তো খুব ভালো হয়। শরীর খারাপ শুনে আমি অস্থির হই, ডাক্তার দেখানো হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করি। ও জানায়, তত খারাপ না, এটা নৈমিত্তিক ব্যাপার। খারাপ লাগছে বলে ঘুমিয়ে পড়েছেন।

ছেলেটিকে বসাই আমাদের সাথে, খেয়ে যেতে বলি। এই ফাঁকে এক সময়ের দুর্ধর্ষ কমিউনিস্ট অনন্ত নাগের এখনকার সময়গুলো জানতে চাই।

রাত গড়ায় এক প্রহর, দ্বিপ্রহর… চিত্রার্পিতের মতো সবাই শুনি তার কথা… ঘুম নেই কারো।

নামটি বেশ জমকালো, রাজকুমারী দাসী সুন্দরী। কিন্তু জীবন জুড়ে কেবলই বিড়ম্বনা তার। কান্নার দমকে মহিলার হেঁচকি উঠে গিয়েছে। একটু পানি চাই কিন্তু কেউ তার জায়গা ছেড়ে নড়তে চায় না। এতো ভিড় জমেছে যে পানি আনতে গেলে তামাশা দেখা থেকে বঞ্চিত হবার সম্ভাবনা প্রবল। সুতরাং যার দিকে তাকিয়েই পানির কথা বলি সে-ই চোখ ঘুরিয়ে নেয়, ভাবটা এমন যেন এদিকে মনোযোগই নেই!

আমি ব্যস্ততম টিভি চ্যানেলের গ্ল্যামারাস রিপোর্টার। নারী ইস্যুতে এর মধ্যে যথেষ্টই নাম কামিয়েছি। কথায় কথায় রেগে যাওয়া, ধমক ধামক দেয়া কোনো ব্যাপারই না আমার জন্য এবং আমি তা বেশ উপভোগ করেই করি। কিন্তু এখন ধৈর্য ধরি। কারণ বিষয়টা ঠিক কোন দিকে মোড় নিতে পারে আমি নিজেও এখনও বুঝে উঠতে পারি নাই। ধর্ম, চেতনা, নারী, বীরাঙ্গনা, মুক্তিযোদ্ধা, গণহত্যা, জনযুদ্ধ সব ইস্যু জড়াজড়ি, আমি একটার থেকে আরেকটায় পেঁচিয়ে যাচ্ছি। আশ্চর্য লাগে জানা ইতিহাসের ভেতর এতসব অজানা গল্প লুকিয়ে আছে, মানুষের এত কিছু বলার আছে! শুরুতে কিছুই বুঝিনি এমন করে!

সুন্দরীকে বার বার সান্ত¡না দেই, সময়  শেষ হয়ে গেলে ক্যামেরার লোকজন চলে যাবে আর তার ফলে যে সুযোগ এই জীবনে একবার এসেছে তাও হারাবে বলে একটু ভয়ও দেখাই। ফলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সুন্দরী বলতে শুরু করে  তার জীবন জুড়ে চলতে থাকা বিড়ম্বনার গাথা।

১৯৭১ সাল। পাকিস্তান আর্মি নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে। বিশেষভাবে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা হয় খুলনার চুকনগরে। এক সকালেই সহ¯্রাধিক মানুষকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু মানুষের মাথা। কয়েকদিন ধরে নদীর পানি ছিল রক্তের মতো লাল। সেদিন সকালের নারকীয় হত্যাকান্ডের তা-ব কিছুটা শান্ত হলে সন্ধ্যায় কিছু মানুষ তাদের স্বজনদের খুঁজতে বের হয়। মৃত মানুষের স্তুপের ভেতর কান্নার শব্দ পেয়ে লাশ সরিয়ে সরিয়ে কাছে গেলে তারা দেখতে পায় ছয় মাসের শিশু মৃত মায়ের বুক থেকে দুধ খেতে চেষ্টা করছে আর কাঁদছে। মৃতের স্তুপ থেকে জীবিত শিশুটিকে কোলে তুলে নেন পলায়নরত এক মুসলমান শরণার্থী। শিশুটি যার বুকের ওপর পড়েছিল সেই নারী হিন্দু ছিলেন তাই মেয়েটি হিন্দুই হবে ধরে নেয়া হয়। হিন্দুর মেয়ে মুসলমান বাড়িতে বড় হলে বিয়েসাদীতে জটিলতা হবে তাই কোনো হিন্দু পরিবারে মেয়েটিকে দিতে চেষ্টা করলেন তিনি। কিন্তু ভারতে যেসব হিন্দু শরণার্থী হয়ে গিয়েছিল যুদ্ধের পর তারা প্রায় কেউই ফিরলো না । রোগে ভুগে মারা গেলো অর্ধেকের বেশি আর বাকীরা  ভারতেই থেকে গেল বেশিরভাগ, অল্প যারা ফিরলো তাদের অবস্থা ভয়াবহ। এমনিতেই গরীব ছিল এখন হলো নিঃস্ব। কে নেবে একটি শিশুর ভরণপোষণের দায়িত্ব! তাছাড়া বাচ্চাটার জাতপাতও জানা যায়নি। মৃত মাকে স্থানীয় লোকজন চিনতে পারেনি। চুকনগরে তো বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক এসে জড়ো হয়েছিল বর্ডার ক্রস করবে বলে। এরাও হয়তো তেমনি অন্য জায়গার কেউ তাছাড়া গ্রামের বউ ঝিদের পুরুষরা চিনবেও বা কেমন করে। শেষপর্যন্ত অত্যন্ত গরীব নিঃসন্তান এক ঋষি পরিবার বাচ্চাটিকে নিতে আগ্রহ দেখায়।

সুন্দরী শুনেছে ওর মতো সুন্দর বাচ্চাটিকে নিঃস্ব মুচির হাতে তুলে দেয়ার সময় লোকটি কেঁদে ফেলেছিল কিন্তু সমাজের চাপে না দিয়েও উপায় ছিল না তার।  ফলে ওকে ওই ঋষি পরিবারের হাতে তুলে দেন তিনি। সুন্দরী খেয়ে না খেয়ে বড় হতে থাকে। তার পালক বাবা মা নিজেরাই এত গরীব কতদিন আর টানবে তাকে। এদিকে দেখতে ভালো বলে নিচু জাত হলেও বার বছর বয়সে সত্তুর বছরের এক দোজবরে বৃদ্ধের সাথে বিয়ের প্রস্তাব আসে। তার বাবা মা অন্য জায়গায় বিয়ে দেয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু‘ অনাথ, গরীব হিন্দু মেয়েকে যার আবার জাতপাতের ঠিক নেই তাকে বিয়েও বা করবে কে? তাই শেষ পর্যন্ত বয়স তের বছর হলে সত্তর ছাড়িয়ে একাত্তরে পা দেয়া সেই দোজবরে বৃদ্ধের সাথেই সুন্দরীর বিয়ে হয়। বিয়ের দিন থেকেই স্বামী সেবা শুরু তার। সৎ ছেলেরা কোনোদিনই সুন্দরীকে মেনে নেয়নি। এখন স্বামীর বয়স পঁচানব্বই। ফলে তাদের দাপট আরও বেড়েছে। সুন্দরীর নিজের দুটি ছেলে হয়েছে। তারাও সৎ ভাইয়েরা থাকার জায়গা দেয় না বলে অল্প বয়সে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার ছেলেগুলান কোনো অধিকার পায় নাই বাপের সম্পত্তিতে, আমারে তিনি ইস্তীরি মনে করেছেন কতটা জানিনে, কিন্তু আমি তার সেবায় কোনো ত্রুটি করিনি এ আমি বুকে বল নিয়ে কতি পারি’।

কথা বলতে বলতে সুন্দরী কান্না সামলে উঠেছে কিছুটা। এখন তার কণ্ঠে রাগ ক্ষোভ অভিমান একসাথে ঝরে পড়ে, ‘আমার পোলাগুলান বাপের সম্পত্তির কিছুই ভোগ করতে পারলো না, আমি মুক্তিযোদ্ধা না বীরাঙ্গনাও না সেজন্যে সরকারের কোনো সুবিধা পাইনে। কী দোষে ভগবান আমারথে মুখ ফিরালো বলতি পারেন আপা?’

আমি সুন্দরীর দিকে তাকাই, কে বলবে এখনও পুরো চল্লিশ হয়নি ওর বয়স! পাকা চুল, কোঁচকানো চামড়া, কপালজুড়ে রেললাইনের মতো দীর্ঘ সমান্তুরাল বলিরেখা! আবার কবিতাটি আমার মাথায় ঘুরপাক খায় :

ওদের তৃষ্ণার পানপাত্র প্রতিবার

কানায় কানায় রক্তে উঠবে ভরে, যে রক্ত বাংলায় বইয়ে দিয়েছে ওরা হিং¯্র

জোয়ারের মত।

অভিশাপ দিচ্ছি

স্নেহের কাঙ্গাল হয়ে ওরা

ঘুরবে ক্ষ্যাপার মতো এপাড়া ওপাড়া, নিজেরই সন্তান

প্রখর ফিরিয়ে নেবে মুখ, পারবে না

চিনতে কখনো;

অভিশাপ দিচ্ছি এতোটুকু আশ্রয়ের জন্য, বিশ্রামের

কাছে আত্মসমর্পণের জন্যে

দ্বারে দ্বারে ঘুরবে ওরা।

প্রেতায়িত

সেই সব মুখের উপর

দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবীর প্রতিটি কপাট,

অভিশাপ দিচ্ছি

অভিশাপ দিচ্ছি

বার বার প্রশ্ন করি নিজেকে, পারবো কি? আমরা কি পারবো তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে, সেইসব মুখের ওপর পৃথিবীর সব কপাট বন্ধ করে দিতে?

সজল বিশ্বাস
চেনা-অচেনা

অনেকবারই সেলফোনটা বেজেছে, টের পাওয়া যায়নি। যাবে কী কোরে, লক্কড়-ঝক্কড়-টাউন সার্ভিসে চড়তেই গলদঘর্ম। চাপাচাপি-ঠাসাঠাসিতে ফাঁসির আসামির মতো ঝুলে থাকা। বাসের ভৌগলিক অবস্থান আর ঘড়ির কাঁটা, এটাই মুখ্য, আর সবই গৌণ। অন্তত অফিস  যেতে রক্তের গ্লুকোজ-লেভেল যে নিচের দিকে নেমে যায়, সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না। হাঁপাতে হাঁপাতে হাতের ব্যাগটা টেবিলে রাখতেই আবার বেজে ওঠে সেলফোন। এমন বাজে সময়ে বাজা-বাজি ভাল না লাগলেও অগত্যা দেখতে হলো। আন-নোন নাম্বার। রিসিভ করতেই, ‘আস্সালামু আলাইকুম, শুনতে পাচ্ছিস? ফোন ধরিস না ক্যান? আমি ঢাকায় আইছি। অনেকদিন তোর সাথে কুনো যোগাযোগ নাই, দেখা নাই, দোষটা অবশ্য আমারই। তোর অফিসের ঠিকানা আমার কাছে আছে, কাজ শেষ কোরে তোর অফিসে আসবো, আমার জন্যে ওয়েট করিস, রাতে তোর ওখানে থাকবো।’ গড়গড় কোরে এত কথা হাইড্রোলিক হর্নের মতো কানে ঢেলে দিলেও রইস বুঝতে পারলো না ‘লোকটি কে?’ যতটা পরিচিত-ভাব নিয়ে কথাগুলো বলেছে, তাতে রইসের শহুরে হাওয়া-লাগা মধ্যবিত্ত-মন  জিজ্ঞেস করতে সায় দিল না ‘কে বললো কথাগুলো, নিশ্চয় খুব কাছের কেউ! ঠিক আছে দেখা যাবে।’ …ভাবতে ভাবতে কাজের ভেতর ডুবে যায়।

কোয়ালিটি-কাজ টাইম্লি ডেলিভার করা কর্পোরেট অফিসে টিকে থাকার অন্যতম শর্ত। ঘড়ির কাঁটা সরতে সরতে কোথায় গেল সেটা স্মর্তব্য নয়। এখন ওঠা গেলেও ‘ওয়েট করিস’ বাধা দিচ্ছে। ভাল না লাগলেও  আকাক্সক্ষা ‘কে সে? আসছে না কেন? আর কতক্ষণ?’ …ভাবতে ভাবতে ইন্টারকম বেজে উঠল। ‘স্যার, একজন আপনার জন্য বসে আছে, পাঠাবো?’ ‘না আমি আসছি’— বলে কম্পিউটার সাট-ডাউন দিয়ে লিফ্টের মধ্যে ঢুকে গেল রইস। রিসিপশনে বসা, চুল স্বাভাবিকের চেয়ে বড়, মুখ-ভরা দাড়ি, রুক্ষ্ম চেহারায় দুটো চঞ্চল-চোখ যেন সার্চ-লাইট। পায়ে চামড়ার হাল ফ্যাশানের দু’ফিতা-স্যান্ডেল, ঢিলেঢালা জিন্স, তার ওপর সাদা টি-শার্ট। রইস চিনতে চেষ্টা করে।

‘কি রে, মনে হচ্ছে চিনতে পারিস নাই। ‘আমি আলিম’ বোলে করমর্দন করলো।

‘ও-আলিমুদ্দিন? চিনবো না কেন? অনেক বছর পর তোর গলা শুনে ঠিক’…

‘চিনতে পারছিলি না তো?’— কথা কেড়ে নিয়ে আলিম বলে।

‘নে চল যেতে যেতে কথা হবে।’

যথারীতি বাস ধরা, জ্যামে জরাগ্রস্থ হওয়া, ঝিমুনি-ঢুলুনি, তার ওপর আলিমের বকবকানি! এক সময় দশ-বাই-বারো ফিটের ঘরখানি। ঠিকা-বুয়ার প্রতিদিনের ঠিকঠাক আলুভর্তা-ডাল-ডিম আজও রেডি, শুধু একটু বাড়তি চাল বসিয়ে দেওয়া। তাই হলো। খাওয়া হলো। অবশেষে ঘুমের আবেশে ফেলে আসা স্মৃতির ভেলায় ভেসে থাকা লখিন্দর।

চৈত্রের খাঁ-খাঁ খাই-খাই দুপুরে গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। পিছে রইস। আলিম ঠিকঠিক মৌচাকের ডালটার গোড়ায় বয়ে-আনা-খড়ে আগুন জ্বেলে দিলে ভোঁ-ভোঁ-গুঞ্জনে মৌমাছিগুলো সরে গেলে আলিম একলাফে গাছে উঠে মৌচাক ভাঙ্গতে থাকে। রইসের তখন যাই-যাই অবস্থা, এই বুঝি চেপে বসলো গায়ে উড়ন্ত-ছুটন্ত-পাগলপ্রায় মৌমাছির দল! উপর থেকে টুকরো টুকরো মধু-মোম ফেলতে থাকে আলিম, আর গামছায় ধরতে থাকে রইস। মিশন শেষ হলে মোমগুলো গামছায় পেঁচিয়ে মোচড় দিতে থাকে, যত মোচড় তত মধু। গায়ে-হাতে-মুখে-ঠোঁটে-চোখে চ্যাটচেটে হয়ে লেগে গেলেও মধু খাওয়াই মুখ্য। সমাজের কাছে ‘ভাল ছেলে’ বলে দলের কারও কারও পরিচিতি থাকলেও এ মুহূর্তে তাদেরকে মূর্খই মনে হয় ওদের।

মধ্য-গগনে যখন সূর্য, কালীবাড়ির পিছনে গাছেদের ঘন-ছায়ার ঠিক মাঝখানে পুরনো-পুকুর। পদ্ম-ফোঁটা বদ্ধ গভীর জলের তলের-তালুতে লেপটে থাকা ঠা-া-কালো-কাদা তুলে এনে বুকে-মুখে মাখার আনন্দ— এ পুকুরে দুপুরে সাঁতার-জানা সাধনার ডুবে-মরার কথা ভুলিয়ে দেয়। আলিম-রইস মহানন্দে একবার ডুব দেয়, আবার ভেসে ওঠে। যেন ‘কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে।’

ছোটবেলার খুনসুটি-ফলচুরি-ফুলচুরি-খেলাধূলা-গড়াগড়ি-রাগারাগি-মারামারি। আবার প্রাণের টানে মিলেমিশে এক হয়ে হুল্লোড়ে মেতে যাওয়া কেবল কিশোরেরাই পারে। আমরা এখন পারি না! সেই মানুষের একজন আজ রইসের পাশে, নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে! রইসের স্বস্তি নেই কেন? অদৃশ্য কোন্ লাল-ভোমরা বিষাক্ত হুল ফুটিয়ে শুষে নিয়েছে তাদের ভেতরের সবটুকুন! সন্দেহ কেন আলিমকে নিয়ে? যুদ্ধের বছর পার হলে পরে পাকিস্তানিদের সহায়তা করায় জনরোষ এড়াতে একরাতে এই আলিমকে নিয়ে ওর বাবা-মা কোথায় যেন চলে যায়। রইস সেদিন কলার ডাগুর কেটে দু’টো বন্দুক বানিয়ে ‘যুদ্ধ-যুদ্ধ’ খেলতে আলিমদের বাড়িতে গিয়ে আর পায়নি। খেলা-খেলা নয়, বড়দের সত্যি যুদ্ধে এভাবেই রইসেরা হারিয়েছে কত খেলার সাথী! সে দুঃখে গলা দিয়ে কদিন খাবার নামেনি রইসের, বুকের গহীনে কী এক চিনচিনে কষ্ট ছিল কত দিন! সে সব কথা পুস্তকে লেখা নাই।

‘দোস্ত শোন, এখন যাই। শহরে অনেক কাজ আছে। কয়েকটা এপোয়েন্টমেন্ট আছে। রাতে বাড়ি যাবো’— বলে আলিম ল্যাপটপ সাট-ডাউন দিতে থাকে। ফজরের নামাজের পর থেকেই কাজ করছিল। একটি ফোন এলে রিসিভ কোরে বারান্দার কোণে নিচু-স্বরে কাকে কী যেন বোলে ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়। রইস-আলিম একসাথেই বের হয়। রাস্তায় নেমে ‘আবার আসবো’ বোলে সিএনজি ডেকে উঠে পড়ে আলিম। রইস নিয়মের পথ ধরে চলে যায় অফিসমুখো।

ঈদ-উল-আজহার ছুটি। বরাবরের মতো এবারেও গ্রামের বাড়িতে রইস। কোরবানির আয়োজন চলছে। বাল্যাটে-বালুতে ঘসে ঘসে ছুরিগুলো ধার দেওয়া হচ্ছে। গা শির-শির-করা ঘ্যাস-ঘ্যাস খ্যাস-খ্যাস আওয়াজ। সকাল থেকেই কোরবানির জন্য বরাদ্দ গরু-ছাগলগুলোকে একে একে গোসল করানোর কাজে পাড়ায় ছোটাছোটি পড়ে যায়। কেউ কলাপাতা কাটছে, কেউ ঢাউস সাইজের পলিথিনের ব্যবস্থা নিয়ে ব্যস্ত। গাছের গুড়ি, গুড়া-হলুদ, ছোট-টুল, দড়ি, দাঁড়ি-বাটখারা, কলাপাতা, পলিব্যাগ কত কী! ইতোমধ্যে একটি চোখাশিং-অলা গরু দড়ি ছিঁড়ে উঠান বরাবর দৌড়। নতুন জামা পরা কতিপয় কিশোর মার্বেল খেলা ফেলে এদিক ওদিক ভয়ে পালায়। নামাজ শেষে নির্দিষ্ট বাগানে একে একে জড়ো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সবাই। কিছুক্ষণের মধ্যে মোল্লা-সাহেব চকচকে লম্বা-ছোরা হাতে পৌঁছে যাবেন অকুস্থলে, তার জন্যে বিশেষ চেয়ারের ব্যবস্থাও রাখা আছে, যেন মর্জি হলে তিনি বসতে পারেন। আসছেন তিনি।

মাথায় কালো পাগড়ি, লম্বা-কালো-পাঞ্জাবী, সাদা পাজামা। দাড়ি, চামড়ার দামি জুতা, কোমরে শক্ত কোরে গামছা বাঁধা, ঘাড়ে আরেকটি লম্বা-লাল-গামছা ঝোলানো। কাছে এলে সার্চ-লাইটের মতো চোখ দুটো দেখে রইসের চিনতে বাকি থাকেনা মো. আলিমুদ্দিন আলিম অর্থাৎ তার বাল্যবন্ধুকে। রইস আলিমকে ঘরের ভেতরে ডেকে নেয়। নিজের ভাগেরটা কার নামে হবে এসবের বিবরণ দিতে খানিক সময় গল্পে মেতে ওঠে।

‘তুই জবাই করিস?’

‘হ্যাঁ, কেন? এটাতো পুণ্যের কাজ, কত করলাম!’

‘ভাল, তোর সাহসটা আগের মতই আছে।’

‘আগের মতো কি রে, বল্ কয়েকশ গুণ বেড়েছে, দেখবি চল।’

‘না আলিম, আমি কাছে থেকে দেখতে পারবো না। আচ্ছা, তুই এসব কবে থেকে?’

‘তোরা তো হাইস্কুলে ভর্তি হলি, আমরা পাকিস্তান চলে গেলাম। সেখান থেকে আফগানিস্তান, তারপর ইরাক-ইরান ঘুরে আবার দেশে। এখানে এসে একটা মাদ্রাসায় মাস্টারি করি আর বছরে বিভিন্ন এলাকায় চুক্তিভিত্তিক এই কাজটা করি।’

শুরু হয় জবাই-পর্ব। কোরবানির পশু জবাই চলছে… মনের পশুটাকে দূর করার জন্যে। খানিক পর পর গাঁ-গাঁ-গোঙানির শব্দ রইসের কানে আসে। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্ত¯্রােত নয়া-কাটা-নালা বেয়ে নদীর দিকে ছুটছে। অদূরে ঘরের জানালায় বসে রইস দেখতে থাকে বন্ধু-আলিমের পূণ্যময়-সাহসী-কর্মযজ্ঞ।

ছুটি শেষ। ঢাকায় কর্মস্থলে যোগ দিয়ে জীবনের সেই পুরনো-ধূসর আঙ্গিনায় নিত্য-চলাচল। একদিন অফিস ফিরতি বাসে আলিমের ফোন পেয়ে ভড়কে যায় রইস। ‘আমি আইজ আসতেছি, আছিস তো? তোর ওখানেই থাকবো।’ রইস কী বলবে বুঝতে পারে না। জবাই করার দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে। গাঁ গাঁ ঘোঁৎ  ঘোঁৎ ফোঁস-স ফোঁস-স শব্দগুলো কান হয়ে প্রাণের দেয়ালে ঘা মেরে সারা চেতনায় জেঁকে বসে। ফিন্কি দিয়ে ছুটে-চলা রক্ত¯্রােত যেন রাজধানীর এই রাস্তাটিকেও ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। অলিতে-গলিতে-পাড়ায়-মহল্লায় শুধু রক্ত আর রক্ত। লাফিয়ে লাফিয়ে বড়-একটা ছোরা-হাতে স্লো-মোশনে পাড়াময় ছুটছে আলিমুদ্দিন। বাসের দুলুনি-ঢুলুনিতে এ সবই দেখতে থাকে রইস। আর, কী এক অজানা ভয়ার্ত-ভূতলে তলিয়ে যেতে থাকে। ভয়ভয় মনে বলে দেয়— ‘আমি অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে।’

কেন ভয়! কেন অচেনা মনে হয়! কেন এই মিথ্যেটুকু বলেছিল সেদিন একদার প্রাণপ্রিয় বন্ধু আলিমকে!

এর উত্তর আজও রহস্যময় রয়ে যায় রইসের মনে।

আনিফ রুবেদ
একদিন নেতাই ডোমের শিশুকাল আর বৃদ্ধকাল হাত মিলিয়ে রক্তজবা ফুটিয়েছিল

‘হামার বেটাকো হাম মারদিয়া হা… না না… হাম লাল ডোমকো মারদিয়া হাঁ… না না… হাম রাঙা সাহাবকো খুন করিয়াছি… না না… হামি খুন করিনি বাদলা লিয়েছি হাঁ। [আমি আমার ছেলেকে খুন করেছি… না না… আমি লাল ডোমকে খুন করেছি… না না… আমি রাঙা সাহেবকে খুন করেছি… না না… খুন করিনি বদলা নিয়েছি।] সন্ধ্যার কিছু পরে এভাবে ন্যাতা ডোম যখন চিৎকার করছিল তখন আশেপাশের মানুষজন প্রথম কয়েক মুহূর্ত তেমন কোনো গুরুত্বে নেয়নি কারণ মদ খেয়ে এমন হল্লা-হক্কা সে নিত্যিদিনই করে। কিন্তু এমন করে আরো কিছুক্ষণ চিৎকার করতে থাকলে এবং চিৎকারের ধরনটি অন্যদিনের চেয়ে আলাদা মনে হলে, তার চিৎকারের চাকুতে আনন্দের গুড় কেটে কেটে সকলের কাছে বিলায়িত হতে থাকলে, তার ঝুপড়ির দিকে হিন্দু পাড়া ও মুসলমানপাড়ার লোকজন পিঁপড়ে হয়।

যে পাড়ার নাম এখন হিন্দুপাড়া সে পাড়াতে আসলে বাস করে মুসলমান আর যে পাড়ার নাম মুসলমানপাড়া সে পাড়াতে বাস করে হিন্দুরা। এখন যেটা হিন্দুপাড়া সেখানে আগে হিন্দুরাই বাস করত কিন্তু সাতচল্লিশের পরে ভারত থেকে চলে আসা মুসলমান আর এখানের মুসলমানপাড়া থেকেও মুসলমানরা একঘর দু’ঘর করে হিন্দু পাড়াতে উঠে আসতে থাকে। অপরদিকে, মুসলমান পাড়াতে কিছু কিছু হিন্দু বসত গড়তে থাকে। বছর দশ পনের’র মধ্যে সমস্ত হিন্দু পাড়াতে বাস করতে থাকে মুসলমান আর হিন্দুরা বাস করতে থাকে মুসলমানপাড়াতে। ব্যাপারটা এভাবে উল্টো হয়ে গেলেও পাড়ার নাম যা ছিল তা-ই থেকে যায়। এ কারণেই হিন্দুপাড়াতে থাকে মুসলমান আর মুসলমান পাড়াতে হিন্দু। হিন্দুপাড়া আর মুসলমানপাড়ার মাঝামাঝি জায়গাতে ডোমপাড়া।

এই মুসলমান আর হিন্দু পাড়ার লোকেরা ‘ন্যাতা ডোম’ বলে ডাকে তাকে। একটু ভাল করে বললে-‘নেতাই ডোম।’ আর পুলিশের খাতাতে তার নাম উঠে গেল ‘নিতাই গঙ্গাপুত্র’ বলে। যখন তার নাম জিজ্ঞাসা করল পুলিশে তখন করুণ মুখেও বেশ গর্ব ফুটিয়ে বলল— ‘নিতাই গঙ্গাপুত্র।’ এরা গঙ্গাদেবীর সন্তান, এজন্যই এমন গর্ব। স্বয়ং মহাদেব এদের পিতা। শ্মশানে একচ্ছত্র অধিকার ডোমদের। ডোমের আশীর্বাদ ছাড়া কেউ, ভবনদী পার হতে পারবে না, ঈশ্বর পাবে না। গর্ব তাদের হতেই পারে। নিতাই গঙ্গাপুত্রের বয়স লেখা হলো ৮০ বছর। এখনো বেশ শক্ত-সমর্থ ধরনের দেহ নেতাই ডোমের। লেখালেখির পাট চুকলে আবারও মুখ করুণ করে বসে থাকে নেতাই ডোম। খুন করার পরপরই চিৎকার চেচামেচি করেছে ঐ কিছুক্ষণ। তারপর থেকে একদম চুপ। তার চারপাশে লোকজনের ভিড়। একটা বাঁশের মোড়ায় বসে আছে দারোগা। অপর পুলিশ ডা-া হাতে দাঁড়িয়ে। ‘এই এই ভিড় করো না’ বলে ডা-া হাতে দাঁড়ানো পুলিশ দাঁড়িয়েই থাকছে আর মানুষজনও তার বলার সাথে সাথে একটু নড়ে-চড়ে সরে যাবার ভান করে আবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে পুলিশ, লাশ আর নেতাই ডোমকে। কয়েকজন পুলিশ খুনের আলামত সংগ্রহ করছে আর খেজুরের পাটি দিয়ে লাল ডোমের লাশ বাঁধছে অন্য ডোমদের নিয়ে।

বিধবা বউটা বসে আছে দাওয়ায় মাথা নিচু করে। নেতাই ডোম মুখ তুলে দাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল— ‘মায়ি, এক গিলাস হামকো জল পিলাদে’ [মা জল দে তো একটু।] যাকে মা ডাকা হলো তার নাম নিরূপা, নেতাই ডোমের বড় পুত্রবধূ। নিরূপা জল দিয়ে আবার বসল খুঁটিতে হেলান দিয়ে। পুলিশের গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে, পুলিশদের হাতে হাতে টর্চ আর দর্শক লোকজনের কারো কারো হাতে হারিকেন। এত রাতে আলোর প্রাচুর্য দেখে খোয়াড় থেকে দু’তিনটা শুয়োরের বাচ্চা বের হয়ে কুঁউ কুঁউ শব্দ তুলে ঘোরাফেরা করছে। নিরূপার ছেলেটা শুয়োরছানাদের সাথে খেলায় মেতে গেল। ঘুমিয়ে সে গেছিল। মানুষের চেঁচামেচিতে তার ঘুম ভেঙ্গেছে। নেতাই ডোমের কাছে বসে আছে দু’পুলিশ। লাশটা বাঁধা হচ্ছে। দু’মাস পরই এই লাশের বিয়ে হবার কথা ছিল শহরের ডোম কলোনিতে, বীরন্ত ডোমের ছোট মেয়ের সাথে। নেতাইয়ের ছোট ছেলে লাল; লালকান্ত গঙ্গাপুত্র। লাল ডোম নামে হিন্দু-মুসলমান সকলেই তাকে চেনে। কুলা বোনাতে তার মত ওস্তাদ লোক আর নেই এই ডোমপাড়ায়। শুধু এই ডোমপাড়া কেন অন্য উপজেলাতেও নেই। সুতরাং নবাবগঞ্জ শহরের বা শিবগঞ্জেরও সকল ডোম, লাল ডোমকে চিনত। তার মত ছেলেকে জামাই হিসেবে পাবার জন্য লালায়িত ছিল বিবাহপোযোগী ডোমকুমারীদের বাবারা। বীরন্ত ডোম তার ছোট মেয়েটার সাথে লালকান্তের বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেছিল প্রস্তাব পাওয়া মাত্র। বীরন্ত শহুরে ডোম। হত্যার খবর পেয়ে সে শহর থেকে এসে হাজির হয়েছে ঘটনাটা বোঝার জন্য। তার সাথে নাছোড়ের মত এসেছে মেয়েটিও। এ মেয়েটির সাথে লালকান্তের বিয়ে হবার কথা ছিল। আসার পর মেয়েটি সবাইকে অবাক করে দিয়ে বেশ জোরে কাঁদতে থাকে আর লাল ডোমের লাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। বীরন্ত ডোম লালকে জামাই হিসেবে পাবে মনে করে খুশি হয়েছিল। সে কাজ করে মর্গে। লাশ কাটে। কিছুদিন আগে এক হিন্দু মেয়ের লাশ কাটতে গিয়ে যে সোনার চেইনটা পেয়েছিল, সেটি তার মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দেবে এমনও ভেবেছিল। সেও তার মেয়ের এমন কান্না দেখে অবাক হয়ে যায়। তারা লালকান্ত ডোমের লাশে পাটি লেপ্টানো দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে।

এই অঞ্চলের সবচেয়ে নিচু জায়গা হচ্ছে এই ডোমপাড়া। বিশাল একটা গর্ত। এই গর্তের মাঝ বরাবর ঢিবির মত উঁচুতে দশ-বারো ঘর ডোম বাস করে। এখানে বাস করার আগে ডোমেরা বাস করত মহারাজপুর হাটের পুব পাশে, বড় রাস্তার ধারে, খাস জমিতে। এখানে তখন এ খালটা ছিল না। যে বছর ডোমেরা এখানে আস্তানা গাঁড়ে তারই বছরখানেক আগে বন্যার জল ছেয়ে ফেলেছিল গোটা দেশ, সাথে সাথে এ অঞ্চলও। নদী দিয়ে সরাসরি জল ঢুকতে পারেনি, ভাতারমারির বিলের বাঁধ কেটে গিয়ে পানি ঢুকে পড়ে গ্রামে, গ্রামালয়ে। পানি যখন কমতে লাগল তখন নদীর দিকের বাঁধটা তোড় থামতে না পেরে কেটে যায় আর পানি বেরিয়ে যায়। পানি বেরিয়ে যায় ঠিকই কিন্তু যাবার সময় জলের দুরন্ত ঘূর্ণির তোড়ে বিশাল একটা খাল, খালের একেবারে মাঝখানে বড় একটা ঢিবি (যেখানে এখন ডোমেরা বাস করছে) আর নদী পর্যন্ত একটা খাড়ি তৈরি করে দিয়ে যায়। যেদিন জল কমতে শুরু করেছিল সেদিন বাজারের লোকজন দেখে (বর্তমানে যেখানে খাড়ি তার উপর) একটা আমগাছের নিচে যে একটু ডাঙা ছিল, সেখানে একটা ব্যাঙ একটা সাপকে গিলছে। এ দৃশ্য দেখে লোকজন ভয় পায় কিন্তু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতেও থাকে। অনেক রাত হয়ে গেলেও ব্যাঙটা অল্পই একটু গিলতে পারে সাপটিকে। সাপটা আছাড়-পাছাড় করে একসময় মরে যায়। লোকজন কী যে দেখতে চেয়েছিল তারা নিজেরাও তা বুঝতে পারে না কিন্তু এই রকমভাবে দৃশ্যটা অনেকক্ষণ ধরে থেকে গেলে তারা দৃশ্যের একঘেয়েমিতে বিরক্ত হয় এবং বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে। যদিও একজীবনে এমন একটা দৃশ্য আর কোনোদিন দেখতে পাবে কিনা জানা নেই। হয়তো এটাই শেষ। অনেক জীবন এমনও যাপিত হয়ে গেছে, যারা এ রকম দৃশ্য দেখতে পাওয়া দূরে থাক দেখতে পাবার কথা চিন্তা করতে পারার আগেই মারা গেছে। লোকজন আশঙ্কা করতে থাকে— ‘এমন দৃশ্য পৃথিবীর এখানে কেন ঘটল! অতি শীঘ্রই হয়ত এখানে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।’ মানুষের ধারণা মত তেমন বড় কোনো দুর্ঘটনা এখানে ঘটেনি কিন্তু পরদিন লোকজন বাজারে এসে দেখে, বাজারের কাছে যেখানে সাপ ব্যাঙের আহার অনাহার চলছিল সেখানের কাছের বাঁধ কেটে গেছে আর হো হো শব্দে পানি বেরিয়ে যাচ্ছে নদীর দিকে। জল কমে গেলে লোকজন দেখে বিশাল লাঙ্গলের ফলার আঁচড়ের মত একটা আঁচড় রেখে গেছে দূর হতে আসা অপরিচিত জলেরা, বেগানা জলেরা। এটাই ডোমপাড়া আর ডোমখাড়ি উৎপন্নের ইতিহাস। খাড়িটার এপারে বাজার। শুকনো সময়ে পানি থাকে না কিন্তু বর্ষাকালে ঢিবির উপর থাকা ডোমপাড়ার চারদিকে গোলাকারে পানি জমে যায়। পরিখার রূপ ধারণ করে। বর্ষার সময় ডোমেরা একটা বাঁশের উপর দিয়ে হেঁটে পরিখা পার হয়।

৪৩ সালের দিকে নেতাই ডোম প্রায় আট বছরের। ডোমপাড়া থেকে ডোমখাড়ি বা ছোট সরু নালাটা নদীর দিকে চলে গেছে। ডোমপাড়ার চারপাশ, ডোমখাড়ি আর নদীটা বর্ষা মৌসুমে তই তই করে। ডোমখাড়ির পাশে বিশাল মাঠ। নীলকুঠির মাঠ। রাঙা সাহেবরা নীল চাষ করাতো এখানে। এখানকার মানুষেরা মাথার ঘাম জমিতে ফেলে নীল চাষ করত। নিয়ে যেত রাঙা সাহেবরা। বড় বড় স্টিমার এসে লাগত মহানন্দার ঘাটে। কেউ নীল চাষ করতে না চাইলে লাল হয়ে যেত পিঠ। চাষীদের জীবন ছিল—হয় নীল নয় লাল। এসব ছোটকালের কথা, ন্যাতাই ডোমের মনে আছে এখনো জীবন্ত ছবির মত। একজন ধর্ষক কত বেশি শক্তিশালী হতে পারে! রাঙা সাহেবের একটা মাত্র লাথিতে দশ হাত দূরে ছিটকে পড়েছিল আট বছরের নেতাই। হঠাৎ এমন লাত্থিতে স্তব্ধ হয়ে গেছিল, কান্না ভুলে শুকনো চোখে দেখেছিল তার মা’র ধর্ষা হওয়া। তখনতো আর জানত না ঐ রাঙা লোকটা ধর্ষক আর তার মা ধর্ষিতা। তার মা রাঙা সাহেবের কুঠিতে ঝাড়– দিত। নেতাই মায়ের আঁচল ধরে নীলকুঠিতে যেত প্রতিদিন। সেদিনও গেছিল। সেদিন রাঙা সাহেবের আচরণটা ছিল অন্যরকম। রাঙা সাহেবের অমন আচরণের পর মার আঁচল ধরেই ফিরে এসেছিল সে। মায়ের কান্নাও দেখেছিল কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছিল থেকে থেকে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে নেতাই অদূরের আমগাছটাকে তাকিয়ে দেখল। তার মা জীভ বের করে ঝুলে গেছিল ঐ আমগাছেই। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ঐ আমগাছটার আম সে খায়নি। প্রথমে আমগাছের উপর রাগ ছিল, তার মনে হয়েছিল তার মাকে ঐ আমগাছটাই মেরে ফেলেছে। পরে যখন বড় হয়ে সবকিছু বুঝতে পারে তখন খুব রাগ হয় রাঙা সাহেবের উপর। ডোমদের কান্নার খুব বেশি গুরুত্ব নেই, নিচু জাত। খাড়ির ধারে পুঁতে ফেলা হয়েছিল মায়ের শরীর। বাড়ি থেকে বড় জোর ৩০-৩৫ কদম দূরে। তারপর অনেকদিন পার হয়ে গেলেও নেতাই ডোমের মনে ধর্ষকের প্রতি একধরণের ক্ষোভ থেকেই যায়। ‘এই ব্যাটা উঠ্’ দারোগা বললে, ডা-া হাতে দাঁড়ানো পুলিশটা দারোগার বিপরীতে বলল ‘স্যার, এখনো লাশ বাঁধা হয়নি।’ নেতাইয়ের স্মৃতির সুতো ছিঁড়ে গেল। ‘এই ব্যাটা উঠ্’ শুনে চমকে ওঠে নেতাই ডোম আর ‘স্যার এখনো লাশ বাঁধা হয়নি’ শুনে আবার পাথরের মতো বসে থাকল।

আজকের দিনের শুরুটাও অন্যান্য দিনের মতই ছিল। সকালে উঠে রাজুর চায়ের দোকান থেকে চা খেয়েছিল। চা পাওয়াও এক হাঙ্গামা। বাড়ি থেকে একটা টিনের খোরা নিয়ে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। দোকানে বসে, দোকানের পাত্রে ডোমদের খাওয়া নিষেধ। ছোট জাতের ছোঁয়ায় দোকান আর দোকানের পাত্র অপবিত্র হয়। অনেকক্ষণ সাধ্য-সাধনা করলে রাজু ছোঁয়া বাঁচিয়ে চা ঢেলে দেয় নেতাইয়ের টিনের খোরাতে, টাকা নিয়ে কাঠের ক্যাশবাক্সে রাখে। টাকা আর টাকার বাক্স কখনো অপবিত্র হয় না। ওখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেয়ে নিয়ে আর এক পাত্র নিয়ে আসে বিমলের ছেলে কমলের জন্য। বিমল নেতাই ডোমের বড় ছেলে। বিমলই কমলকে চায়ের নেশা ধরিয়ে দিয়ে গেছে। ট্রাক চাপা পড়ে বিমলটা অকালে মরেছে। রেখে গেছে ছেলে আর বউটাকে। বিধবা বউটাকে দেখে মায়া লাগে নেতাইয়ের, নিরূপাকে প্রায়ই বলে—‘তু চ্যাংড়া মানুষ আছিত, তু সাদি কারলে বাহু।’ [বউমা, তুই আবার বিয়ে করে ফেল।] নিরূপা বলে— ‘হাম বিহা নেহি কারেগা, তু শ্বশুরজি আছিত, হামারা বেটা আছে, তোদের মো দেখেই হামারা দিন চালিয়া যাইবে’ [না, বাবা আমি বিয়ে করব না। তুই শ্বশুর আছিস, ছেলেটা আছে, তোদের মুখ দেখেই কাটিয়ে দেব জীবন।] আজকেও বলেছে একবার। উত্তরও একই। নেতাই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নাতীর সাথে খেলেছে, দুএকটা ডালি, কুলা বুনিয়েছে। তারপর শুয়োরের মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে শুয়োর চরাতে গেছে নদীর ধারে। সাথে বেঁধে নিয়েছিল এক বোতল পাকা তাড়ি। আজকে জিতুয়া। বউটা উপবাসি ছিল।

নদী ধারের ছোট ছোট ঝোঁপের বুনো ঘাসকন্দ, কচু, শেকড়-বাকড় খেয়ে শুয়োরগুলো যখন বাড়িমুখো হচ্ছিল তখন সূর্য ডুবন্ত। শুয়োরপালের পিছে পিছে হাঁটার সময় খাড়ির মাথায় নেতাই দেখে খড়ের কঙ্কাল। কালীমাতার কঙ্কাল। কয়েকদিন আগেই বেশ জাঁকজমকে হয়ে গেছে কালীপূজা। নেতাই কোনোদিন পূজা-টুজার দিকে যায় না। মদ খেয়ে চুর হয়ে পড়ে থাকে বেশিরভাগ সময়। শুয়োর চরানো আর দু’একটা ডালি-কুলা বানানো ছাড়া তেমন কোনো কাজ করে না। কালীপূজার দিন কালীমন্দিরের সামনে দিয়ে যাবার সময় বাহির থেকেই দেখতে পেয়েছিল কালী মায়ের জীভ বের করা মূর্তি। দড়িতে ঝুলন্ত নিজ মায়ের জীভ বের করা স্মৃতিচ্ছবি আর মন্দিরের ভেতরে কালীমাতার জীভ বের করা রূপ মিলে যায় তার মদ খাওয়া মনের ভেতর। হঠাৎ তার মনে হয়েছিল— ‘কালীমাকে প্রণাম কারিবো’ [কালী মাকে একটু প্রণাম করে যাই।] মন্দিরে ঢুকতে দেয়নি ঠাকুর—‘এই ব্যাটা ডোম, মন্দিরে ঢুকতে পাবি না।’ ‘আচ্ছা ঢুকব না, তোর মন্দিরে বাল ঠেকাই’—বলে চলে এসেছিল নেতাই। সেদিন মন্দিরে মা কালীকে প্রণাম করতে পারেনি কিন্তু আজ শুয়োর চরিয়ে ফেরার সময় কালীমাতার খড়ের কঙ্কালে একটা প্রণাম করেছে নেতাই— ‘[এ কালী মায়ি, তু হামারা বিধবা বাহুকে দেখিস, হামি বুঢ়া ডোম আছি, কিতনা দিন আর হাম বাঁচেগা মা’ [মা কালী, বাড়িতে বিধবা বউমাটাকে দেখিস, আমি বুড়ো ডোম কদ্দিন আর বাঁচব।] এই প্রার্থনা করার সময় বাতাস বয়েছিল। বাতাস লেগে সড়সড় করে শব্দ উঠেছিল কালী মায়ের খড়ের শরীরে। শুয়োরগুলো এগিয়ে গেছিল বেশ কিছুদূর। নেতাই হাঁটছিল ধীরে ধীরে। নেতাইয়ের মার দেহ যেখানে পুঁতে দেয়া হয়েছিল সেখানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে গেছিল নেতাই। সাদা ওটা কী? হাড় কি? তার মায়ের হাড়? মদ পান বেশি হয়েছে বলে কী হাড় চিনতে পারবে না! আর এতদিন কী মানুষের হাড় থাকে! না নিশ্চয়ই হাড় নয়, হাড় হলেও তার মায়ের হাড় নয় বা হতেও পারে। ধর্ষা মায়ের মুখটা আর রাঙা সাহেবের বা ধর্ষক সাহেবের মুখটা তার মনে পড়েছিল এসময়। মায়ের মুখ আর ধর্ষক রাঙা সাহেবের পায়ের ছবি, নেতাই মাথার মধ্যে নিয়ে, মন ভীষণরকম খারাপ করে মায়ের কবরের জায়গাটাতে বসে পড়েছিল। বহুদিন পরে আজ এমন হচ্ছিল তার। ‘এ হাড় মায়েরই’ তার মনে হয় গভীরভাবে। আকাশ-পাতাল চিন্তাঘূর্ণি তাকে তাড়া করে। সন্ধ্যা পার। নিস্তব্ধ চারদিক। একসময় ভাবনার সুতা ছিন্ন হলে আবার হাঁটা ধরেছিল বাড়ির দিকে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল— ‘বহুত দেরি হো গেইসে [বেশ দেরি হয়ে গেছে।] আবার ভাবছিল— ‘দেরি হুয়াসে তো কেয়া হোগা, হামারা বেটা লাল শুয়োরকো খোয়াড়মে ভর দেগা’ [হোক দেরি, নিশ্চয়ই শুয়োরগুলোকে খোয়াড়বন্দী করে রাখছে লাল।]

কদিন পরই লালের বিয়ে শহরের ডোম কলোনিতে। নিজে দেখে এসেছে মেয়েটাকে। লালকান্তের বিয়ের ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে সে হাঁটতে থাকে। মেঘ মেঘ করছে আকাশ। একটা তারাও নেই আকাশে। অমানবিক নিস্তব্ধতা আর অন্ধকার চারদিকে। নেতাই এসব কিছুই খেয়াল করছিল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার দেখছিল মায়ের হাড়টাকে, তারপর আরো একটু দূরে, খড়ের হাড় নিয়ে কালী’মাতা শুয়েছিল বালিতে তা দেখছিল। থামছিল, দেখছিল আর হাঁটছিল নেতাই। বাড়ির দিকে কিছুদূর আসতেই সম্বিত ফিরে পায় সে। শব্দটা আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল কিন্তু তার ভেতরের এলোপাতাড়ি ভাবনার জাল ফেঁড়ে ঢুকতে পারছিল না। বাড়ির কাছে এসে নাচ গানের আওয়াজ শুনতে পেয়ে মনে পড়ে দিনু ভগতের বেটির বিয়ে। বিয়ের গান চলছে ঢোল আর কাঁসির তুমুল তালের সাথে। কান খাড়া করে শুনছিল ন্যাতা, আনমনে মাথাও দোলাচ্ছিল আর গানের তালে তালে একটু একটু করে সুর মেলাচ্ছিল :

বালিয়া হিলে কমরিয়া হিলে না

কমরিয়া হিলে বালিয়া হিলে না…

তার নিজের বিয়ের কথা মনে পড়ছিল এই বিয়েবাদ্য শুনতে শুনতে। বিয়ে হবার সময় একই সঙ্গে ছিল চুল উপড়ানো আর চুল গজানোর মত অবস্থা। তখন পুরুতরা আসতে চাইত না ডোমদের বিয়ে পড়াতে। পুরুত ছাড়াই খুব সহজেই বিয়ে হয়ে যেত মোড়লের সামনে। মোড়ল হুকুম করলেই বউয়ের হাত ধরে বিয়ের মন্ত্র পাঠ। নেতাই ডোম এসব কথা মনে করতে করতে নিজেও একবার মন্ত্রটি পাঠ করে :

চাঁন সুরুজ গুহা

আজকে হামার বিহা

আজ বহুদিন পর আনমনে নিজের কণ্ঠে আবার সেই মন্ত্র উচ্চারিত হতেই চমকে, হেসে উঠেছিল। তার বিয়েতে কনেপক্ষ যে মর্যাদিখানা দিয়েছিল তার তুলনা হয় না। সবাই খুশি হয়েছিল। শুধু হাড্ডিগুড্ডি খানার দিনে কয়েকজন একটু মন খারাপ করেছিল। কনে পক্ষকে নিয়মমাফিক যে বত্রিশ টাকা ও দু’খানা শাড়ি দিতে হয় তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু দেয়া হয়েছিল। দিন বদলেছে। ছেলেরাই এখন টাকা নিয়ে বিয়ে করছে। লালকান্ত বিয়েতে হাজার দশেক টাকা নেবে কনে পক্ষের কাছে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে সে কখন পৌঁছে গেছিল একেবারে বাড়ির কাছে, বুঝতেই পারেনি। বাড়ির ভেতর ঢুকতে যাবার সময় সে দেখে, দিনু ভগতের বেটিকে নিয়ে মেয়েরা, বাচ্চারা আর কিশোর-যুবকরা শহরের ডোমপাড়াতে বাজনা বাজাতে বাজাতে যাচ্ছে আশীর্বাদ নেবার জন্য। বাড়িতে ঢুকা বাদ দিয়ে, এ দৃশ্য নেতাই ডোম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। বিয়েমিছিল কিছুদূর চলে গেলে সে ধস্তাধস্তির শব্দ শুনতে পায়। শব্দটা আসছিল বিধবা বউটার ঘর থেকে। ‘এ বাহু কেয়া হুয়া তেরা ঘরমে… কেয়া হুয়ারে’ [কী হয়েছে রে মা?] উদ্বিগ্ন কণ্ঠে নেতাই চিৎকার করে। তার চিৎকারপ্রশ্নের উত্তর ছিল একটা গোঙানি। শুয়োরের খোয়াড়ের দিকে তাকিয়ে দেখে শুয়োরগুলোকে খোয়াড়বন্দী করা হয়নি। বউটার ঘরে যেতেই তার রাঙা সাহেবের কথা মনে পড়ে। লালকে বা রাঙাসাহেবকে বা ধর্ষককে বাধা দিতে গেলে ভীষণ এক লাথি কষায় রাঙাসাহেব বা লালকান্ত বা ধর্ষক। নিতাই গঙ্গাপুত্র দশহাত দূরে ছিটকে পড়ে আশি বছরের দেহ নিয়ে। সংগে সংগে উঠেই শুয়োর মারা বর্শাটা তুলে নিয়ে লালের দিকে বা রাঙা সাহেবের দিকে বা ধর্ষকের দিকে ছুঁড়ে মেরেছিল নেতাই।

পুলিশেরা লালের লাশ তুলে নিল লাশবাহী গাড়িতে। লাশবাহী গাড়িতেই বলে কয়ে উঠে গেল নেতাই ডোম। গাড়ির মেঝেতে লালকান্তের পাটি মোড়ানো লাশ। পাটিতে মোড়ানো লাশটা দেখে নেতাই গঙ্গাপুত্রের দু’চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে পুলিশের দিকে তাকিয়ে অনুরোধ করে — ‘স্যার, আমি লালের মাথাটা কোলে করে নিচেই বসি, লালের মাথার দিকে পাটিটা একটু খুলে নিই?’ এবার চোখ মুছে বাড়ির দিকে তাকিয়ে একবার নিরূপাকে দেখল, সেও কাঁদছে। নিচে বসে লালের মাথা কোলের উপর তুলে নেবার আগে নিরূপার দিকে তাকিয়ে বলল— ‘তু ভাল থাকিস মায়ি’ [ভাল থাকিস মা।] বীরন্ত ডোমের কন্যা যার সাথে লালকান্তের বিয়ে হবার কথা ছিল তার দিকে একটু তাকার পর লালকান্তের মৃতমুখের দিকে তাকাল নেতাই ডোম। লালকান্তের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে পাথরের মত চোখে। লাশগাড়ীতে থাকা পুলিশেরা নেতাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে বিকারহীনভাবে। লালকান্তের বুকে মুখ রাখল নেতাই যেন লালের গন্ধ, তার রক্তের গন্ধ, তার মৃত্যুর গন্ধ বুকে ঢুকিয়ে নিতে চাইছে। নেতাই ডোম চুপচাপ, একেবারে চুপচাপ। খুব চুপচাপ লালকান্তের বুকে মাথা ঠেকিয়েই আছে।

মর্গের কাছে গাড়ি থামল। লালকান্তের বুকে মাথা রেখে কখন নেতাই ডোম মরে গেছে কেউ বুঝতেই পারেনি। মর্গের ডোমেরা পিতা-পুত্রের লাশ দুটি, খুনি-খুন্যের লাশ দুটি নামাল।

স্বকৃত নোমান
তেত্রিশ বছর

লোকটিকে প্রথম দেখতে পাই মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, ভোরে, গাঢ় কুয়াশায়। লাঠিতে ভর দিয়ে, ঝুঁকে, স্থিরমূর্তির মতো যেভাবে সৌধের মূল স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে ছিল, তাতে মনে হয়েছিল আশির কম নয় বয়স। মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতর চোখ দুটোর পলক পড়ছিল কি না দূর থেকে খেয়াল করতে পারি নি।

হাঁটতে হাঁটতে আমি ভাবি, গ্রাম থেকে আসা বুঝি? হতে পারে। কেননা স্মৃতিসৌধকে যেভাবে তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিল, যেন জীবনে কোনোদিন দেখে নি। চোখ জুড়িয়ে দেখছে এখন। গ্রাম থেকে আসা মানুষেরা স্মৃতিসৌধকে ঠিক এভাবেই দেখে, বিপুল কৌতূহলের সঙ্গে। শুধু স্মৃতিসৌধ কেন, ঢাকা শহরের প্রতিটি বস্তু তাদের চোখেমুখে বিস্ময় জাগায়। সেদিন তো ফার্মগেট ফুটওভারব্রিজ পার হতে হতে একটা লোককে বলতে শুনলাম, এ-কী! রাস্তার ওপর পুল! অথচ আমরা সাঁতরে নদী পার হই। দেখো দেখি কা-!

অশীতিপর লোকটিকে একবার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছিল, বাড়ি কোথায়? কিন্তু এড়িয়ে গেলাম। প্রতিদিন কত লোকই তো ঢাকা শহর দেখতে আসে। শাহ আলীর মাজার, বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, জাতীয় জাদুঘর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক এবং সংসদ ভবন দেখতে আসে। কে কার খবর রাখে? কে কাকে বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করে? তাছাড়া আমার তখন তাড়া ছিল। হারুন স্যার ঠিক ছয়টায় তার বাসায় থাকতে বলেছেন। এখন বাজে পাঁচটা চল্লিশ। মিরপুর থেকে বিশ মিনিটে শাহবাগ পৌঁছা প্রায় অসম্ভব। তবে রাস্তাঘাট এখনো খালি, ডাইরেক্ট সার্ভিস হলে পৌঁছেও যেতে পারে। কিন্তু শাহবাগ থেকে রিকশায় স্যারের বাসায় যেতে লাগবে আরো পনেরো মিনিট। অর্থাৎ পনেরো মিনিটের দেরি। স্যার কি ততক্ষণ আমার অপেক্ষায় থাকবেন?

থাকলেও থাকতে পারেন। যে শীত পড়ছে, কম্বলের ওম কি এত সহজে ছাড়তে পারবেন! অবশ্য যারা ডায়াবেটিস রোগী, যারা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা নিয়ম করে হাঁটে, তারা শীত-গ্রীষ্মের ধার ধারে না। রোজই তাদের হাঁটা চাই। হারুন স্যারও রোজ ভোরে নিয়ম করে এক ঘণ্টা হাঁটেন। রাতে ফোনে বলেছিলেন হাঁটতে হাঁটতে থিসিসের বিষয়ে আলোচনা করবেন। ‘জহির রায়হান : জীবন ও কর্ম’ বিষয়ে তার অধীনে পিএইচডি করছি। থিসিস লেখা শেষ। মাসখানেক আগে পা-ুলিপিটা স্যারের কাছে জমা দিয়েছিলাম। তারপর প্রায় পনেরো দিন আর খবর নেই। একদিন ডিপার্টমেন্টে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি বললেন, থিসিসটা অসম্পূর্ণ। ভাষাগত দুর্বলতা আছে। তুমি বরং আরেকবার রিভাইস দাও। তাছাড়া আরো কিছু বিষয় যোগ করতে হবে। মিরপুর বিহারি ক্যাম্পে গিয়ে বিহারিদের সঙ্গে কথা বলো। সেদিন বিহারি, ছদ্মবেশী পাকসেনা ও আলবদর বাহিনী ঠিক কয়টা নাগাদ বাংলাদেশিদের ওপর গুলি চালিয়েছিল, আনুমানিক কতজন বাংলাদেশি সেখানে ছিল, কতজন নিহত হয়েছিল এবং কতজন বেঁচেছিল তার বিস্তারিত একটা বিবরণ জুড়ে দাও। তাহলে কাজটা আরো ভালো হবে।

স্যারের পরামর্শমতো সব কাজ শেষ করে নতুন করে পা-ুলিপি তৈরি করতে আরো দুই সপ্তাহ লেগে গেল। আজই স্যারের কাছে পা-ুলিপিটা জমা দেব, কিন্তু স্যারের বাসা পর্যন্ত পৌঁছতে বেজে গেল সাড়ে ছয়টা। স্যার ঠিক ছয়টায় বেরিয়ে গেছেন। কোথায় গেছেন তার স্ত্রীও বলতে পারলেন না। হয়ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অথবা রমনা পার্কে অথবা রবীন্দ্র সরোবরে। কোথায় খুঁজব? ডিপার্টমেন্টে আসবেন দশটা নাগাদ। ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

অগত্যা মধুর কেন্টিনের দিকে হাঁটা ধরলাম। এই ফাঁকে নাশতাটা সেরে ফেলি। নাশতার পর আমাকে আবার টয়লেটে যেতে হয়। পেটে এক কাপ গরম দুধচা পড়ার আগে যতই চেষ্টা করি লাভ হয় না। কয়েক চুমুক দেয়ার পরই পেটে একটা মোচড় দেয়। তখন আমি আমার কর্তব্য বুঝতে পারি।

কিন্তু এত ভোরে কি মধুর কেন্টিন খুলেছে? মনে হয় না। তার চেয়ে বরং টিএসসির বেঞ্চিতে বসে কিছুক্ষণ রোদ পোহাই। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। জনমানুষের সংখ্যাও। হারুন স্যারের মতো অনেকে জগিংয়ে বেরিয়েছেন। গায়ে ট্র্যাকস্যুট, পায়ে কাপড়ের জুতো, কারো কারো মাথায় ক্যাপ। তাদের মধ্যে আমি হারুন স্যারকে খুঁজি। জানি তিনি পার্ক ছাড়া রাস্তায় হাঁটেন না, তবুও।

কুয়াশা ঠেলে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছগাছালি উজিয়ে রোদ ততক্ষণে টিএসসি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কিন্তু নিরুত্তাপ। সূর্যের দিকে মুখ করে বসে আমি পা-ুলিপিটা উল্টেপাল্টে দেখি। কদিন ধরে পা-ুলিপিটার মধ্যে একেবারে ডুবে আছি। জহির রায়হানের জীবন, তার কর্ম এবং তার সমসাময়িক কালকেন্দ্রিক যে বৃত্তটা তৈরি হয়েছে আমার মধ্যে, সেই বৃত্ত থেকে কিছুতেই বেরোতে পারছি না। মাথায় কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে জহির রায়হান, মজুপুর, ভাষা আন্দোলন, জীবন থেকে নেয়া, হাজার বছর ধরে, বরফ গলা নদী, আর কতদিন, সুমিতা দেবী, সুচন্দা, বিপুল রায়হান, অনল রায়হান, তপু রায়হান, মুক্তিযুদ্ধ, শহীদুল্লা কায়সার, মিরপুর, বিহারি ক্যাম্প, আলবদর ইত্যাদি স্থান ও নামবাচক শব্দগুলো। এই নামটি ভেসে উঠল তো ওই স্থানটি ডুবে গেল। বুদ্বুদের মতো। ভেসে উঠছে, মিলিয়ে যাচ্ছে। আবার ভেসে উঠছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। এই হয় আমার। ইতিহাসের ছাত্র আমি। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের সময় তো মাঝেমধ্যে মনে হতো আমি বুঝি সুলতানি বা মোগল আমলে বসবাস করছি।

হঠাৎ গাড়ির তীক্ষè হর্ন। একটানা বেজেই চলছে। তাকিয়ে দেখি রাজু ভাস্কর্যের সামনে, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে যে লোকটিকে দেখেছিলাম, সে দাঁড়িয়ে! ঠিক একই ভঙ্গিতে―লাঠিতে ভর দিয়ে, ঝুঁকে, স্থিরমূর্তির মতো। তার পেছনে একটি কালো গ্লাসের প্রাইভেট কার হর্নের পর হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লোকটির কানে ঢুকছেই না। রাস্তায় যানজট লেগে যাচ্ছে। কোনো ট্রাফিক পুলিশ নেই। তারা কি আর এত ভোরে ডিউটিতে আসে! লোকটির পেছনে হর্ন বাজাতে থাকা প্রাইভেট কারটির কালো গ্লাস নেমে গেল। মাথাটা বের করে ড্রাইভার খিস্তি করল, ঐ বুড়া মিয়া, কানে শোন না? না, বুড়োর কানে কিছু ঢুকছে বলে মনে হচ্ছে না। ভারি তো অদ্ভুত কা-! লোকটা যে গেঁয়ো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নইলে কি শহরের রাস্তায় এভাবে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে? সম্ভবত বধিরও। নইলে হর্নের তীব্র শব্দ তার কানে ঢুকবে না কেন? আমি দৌড়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, চাচা, পেছনে গাড়ি। সরেন সরেন।

লোকটি পেছনে ফিরে তাকাল। বুঝতে পারি বধির নয়। তার মন ভাস্কর্যে এতটাই নিবিষ্ট ছিল, পার্থিব কোনো শব্দ এমনকি তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও কানে ঢুকছিল না। সে আমার কাঁধে বাঁ-হাতটি রাখল, আমি তাকে নিয়ে রাস্তার ওপাশে সরে দাঁড়ালাম। গাড়িগুলো চলে গেলে তার হাত ধরে আমি তাকে বহেরাতলায় বেঞ্চির সামনে নিয়ে এলাম। তার ঠোঁট দুটো তির তির করে কাঁপছে, দু চোখের কোণে অশ্রু। চাদরের কোনায় বারবার চোখ মুছছে। বললাম, কোথায় যাবেন আপনি চাচা? লোকটি নিরুত্তর। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। একপাশে লাঠিটা রেখে বেঞ্চির ওপর বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খুব উৎফুল্ল কণ্ঠে সে বলল, আমি তো ফিরে এলাম বাবা। যাব আবার কোথায়?

: ফিরে এলেন? কোথা থেকে? আপনি কি দেশের বাইরে ছিলেন?

লোকটি আমার দিকে তাকাল। মুখে হাসি ছড়িয়ে মাথাটা এদিক-ওদিক নাড়াতে নাড়াতে বলল, আর যাব না। এই দেশটা আমার। আমি চলে এসেছি। বুঝলে, আমি চলে এসেছি। সারা জীবন এ দেশেই থাকব। আর যাব না, হে হে… আর যাব না।

বুঝে না বুঝে আমিও হাসলাম, নিশ্চয়ই। তা আপনার বাসা কোথায়? আমি তো আপনাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে দেখেছি। এত ভোরে আপনি ওখানে কী করছিলেন?

: দেখছিলাম, বাবা। এই দেশ তার বীরসন্তানদের মনে রেখেছে। বুঝলে, মনটা ভরে গেল। আচ্ছা, তোমার বাড়ি কি ওদিকে?

: আমার? বগুড়ায়। থাকি মিরপুর।

: মিরপুর!

লোকটা হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল, মুখের অমলিন হাসি মিলিয়ে গেল, চেহারায় ফুটে উঠল বিভীষিকা। ভাবি, লোকটা হয়ত মিরপুরের সেই গণহত্যার কথা জানে অথবা সে স্বচক্ষে সেই হত্যাকা- দেখেছে। নইলে মিরপুরের কথা শুনে তার দশা এমন হয়ে গেল কেন? আমার কৌতূহল বাড়ল। বললাম, আচ্ছা, স্বাধীনতার পর আপনি কি আর দেশে আসেননি? প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল সে। বলল, কী করো তুমি?

: একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করছি। পাশাপাশি পিএইচডি করছি।

: আচ্ছা। কোন বিষয়ে?

আমি তাকে আমার পিএইচডির বিষয়টি জানালাম। সে বিস্ময়ে, খানিকটা কৌতূহলে আমার মুখের  দিকে তাকাল। মাথাটা দোলাতে দোলাতে বলল, হুম, কর্ম ও জীবন। আচ্ছা। তা তার জীবনের উপসংহারে কী লিখলে?

: লিখেছি, নিখোঁজ বড়ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে মিরপুরে খুঁজতে গিয়ে তিনিও নিখোঁজ হন।

: আচ্ছা। কিন্তু তুমি তো এই সিদ্ধান্তে আসতে পার না।

: কেন?

: সেদিন বিহারি, ছদ্মবেশী পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর বাহিনীর গুলিতে তিনি নিহতও হতে পারেন। নিখোঁজ আর নিহত কিন্তু এক নয়।

: হ্যাঁ, সে কথাটিও তো লিখেছি।

: এটাও কিন্তু তুমি নিশ্চিত করে বলতে পারো না। তিনি মারা নাও যেতে পারেন।

: তা তো বটেই। আসলে আমি কিছুই নিশ্চিত করে লিখিনি। তার কী দশা হয়েছিল আমরা তো কেউ জানি না, লিখব কী করে।

: এমনও তো হতে পারে সেদিন তিনি আহত হয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অথবা কোনো কারাগারে বা পাগলাখানায় বন্দি আছেন। এমনও হতে পারে, বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে পথে পথে ঘুরছেন, কিংবা ঘুরতে ঘুরতে একদিন মারা গেছেন। বেঁচে থাকাটাও কিন্তু বিচিত্র কিছু নয়। মানুষ তো আশি-নব্বই বছরও বাঁচে, তাই না?

লোকটির সঙ্গে আড্ডা জমে উঠল। সে থামছে না, একটা পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। গেঁয়ো নয়, কথাবার্তায় তাকে উচ্চশিক্ষিত বলেই মনে হলো। কিন্তু তার প্রশ্নগুলো একেবারেই বাচ্চাদের মতো। ভাষা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনার কথা বলছে। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। ভাবি, যুদ্ধের সময় হয়ত সে ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আবার ভাবি, তাই বা কেমন করে হয়? পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট তো ছোট কোনো ঘটনা নয়। পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, কোন বাঙালি সেদিনের ঘটনা জানে না? অথচ লোকটা কিনা সেদিনের কথা শুনে আঁতকে উঠল! জিবে কামড় দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মনে হচ্ছিল এক্ষুণি বুঝি মূর্ছা খাবে। আমি তাকে ধরে আবার বসিয়ে দিলাম। সে কাঁদছে। বাঁধভাঙা অশ্রু তাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। কিছুতেই সে কান্না থামাতে পারছে না। কী আশ্চর্য! শিক্ষিত লোক, যে দেশেই থাকুক, পনেরোই আগস্টের ঘটনা তো তার অজানা থাকার কথা নয়।

কে জানে, লোকটি হয়ত মুক্তিযোদ্ধা। হানাদার বাহিনীর হাতে আটক হয়ে হয়ত সে এত দিন পাকিস্তানের কোনো কারাগারে বন্দি ছিল। কিন্তু তাতেও তো হিসাব মেলে না। কারাগারে থাকলেও তো এমন একটা সংবাদ তার অজানা থাকার কথা নয়। তবে কি লোকটা পাগল? এত দিন কোনো পাগলাগারদে আটক ছিল? হলেও হতে পারে। অথবা যুদ্ধের সময় বড় কোনো আঘাতে স্মৃতিশক্তি হারায়। তার স্বজনরা এত দিন তাকে ঘরে অথবা কোনো পাগলাগারদে আটকে রেখেছিল। এখন সুস্থ হয়ে উঠেছে বলে ছাড়া পেয়েছে। আসলে ঠিক মেলাতে পারি না।

লোকটি আমার কাছে যুদ্ধ-পরবর্তী তেত্রিশ বছরের ইতিহাস জানতে চায়। আমার হাতে সময় আছে। হারুন স্যার ক্যাম্পাসে আসতে আরো প্রায় তিন ঘণ্টা বাকি। বসে বসেই তো সময়টা কাটাতে হবে। এত ভোরে আড্ডা দেয়ার মতো কোনো বন্ধুকেও তো পাব না। তারা কি এত ভোরে ঘুম থেকে ওঠে? লোকটিকে পেয়ে বরং ভালোই হলো, সময় কাটাতে পারছি। মধুর কেন্টিনে যেতে ইচ্ছে করছে না। যতক্ষণ সম্ভব লোকটার সঙ্গে আড্ডা চলুক, সে চলে গেলে না হয় নাশতা করা যাবে। না করলেও বিশেষ কোনো ক্ষতি নেই।

আমি তাকে ইতিহাস শোনাই। ডান হাতের দু আঙুলে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে, কখনো সাদা লম্বা দাড়িতে আঙুল চালাতে চালাতে সে আমার কথা শোনে। তার চোখে কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদ, কখনো ভয়, কখনো বা বিস্ময় খেলা করে। শিশুর মতো সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পনেরোই আগস্টের পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল আমি তাদের নাম বলি। সে বারবার চোখ মোছে। আমি যখন বলি, এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মেজর জিয়াও রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন, লোকটি তখন উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, তারপর? নিশ্চয় মুজিব হত্যার বিচার করেছে জিয়া? আমি প্রশ্নটি এড়িয়ে যাই। বলি, চট্টগ্রামে নির্মমভাবে খুন হলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। লোকটি আবারও আঁতকে উঠল। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, আবারও খুন!

: হ্যাঁ, ধারাবাহিক খুন। এর আগে কর্নেল তাহেরও কিন্তু খুনের শিকার হয়েছেন। লোকটি চোখ বন্ধ করল। আবার সে কাঁদতে শুরু করেছে। তার সাদা শ্মশ্রু ভিজে যাচ্ছে লোনা জলে। সে বেঞ্চিটা দু হাতে চেপে ধরে দুলছে আর কাঁদছে। যেন বা স্বজনের মৃত্যুতে শোকের মাতম। আমি তার কাঁধে হাত রাখি। কান্না থামাতে সে মিনিট পাঁচেক সময় নেয়। তারপর চোখেমুখে জেগে ওঠে ভীষণ ক্রোধ। ক্রোধান্বিত কণ্ঠে বলে, কর্নেল তাহেরকে কে খুন করেছে? আমি চুপ করে থাকি। সে বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর নেতারা কিভাবে ফিরল? মেজর জিয়া কেন বাধা দেয়নি?

আমি চুপ করে থাকি। সে একই প্রশ্ন আবারও করল। আমি এড়িয়ে যাই। সে জোর শব্দে থুতু নিক্ষেপ করল। খানিক ছিটা আমার গায়েও পড়ল। বললাম, জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেছেন।

লোকটি বিস্ময়ে আমার দিকে তাকাল। তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর হাসতে শুরু করল―হেহ্ হেহ্…হেহ্ হেহ্…হেহ্ হেহ্…হেহ্ হেহ্…। ভাবি, লোকটি হয়ত মুসলমান বলেই সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার কথাটা শুনে খুশিতে হাসছে। কিন্তু তার হাসিটা ভালোভাবে খেয়াল করে বুঝতে পারি ঠিক স্বাভাবিক হাসি নয়। কিছুটা অস্বাভাবিক। পাগলেরা যেমন করে হাসে। লোকটিকে এবার সত্যি পাগল বলেই মনে হচ্ছে। নইলে কেউ এমন করে হাসে!

হাসি থামিয়ে বলল, তারপর?

তারপর আমি পরবর্তী বছরগুলোতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা এসেছে তাদের নাম বললাম। তার চেহারায় কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদের ছাপ ফোটে। বর্তমান সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর নাম জানতে চাইল সে। আমার জানা কয়েকজন মন্ত্রীর নাম জানালাম তাকে। এত মন্ত্রী, সবার নাম মনে থাকে না। তবে কিছু মন্ত্রীর নাম ভোলা যায় না। যেমন শিল্পমন্ত্রী বা সমাজকল্যাণমন্ত্রীর নাম তো সবার আগে চলে আসে।

দুই মন্ত্রীর নাম শুনে লোকটি তৃতীয়বার অর্থাৎ শেষবারের মতো আঁতকে উঠল। আমার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। আমি বুঝতে পারি না তার চেহারায় দুঃখ, ক্রোধ, ঘৃণা নাকি প্রতিহিংসা। আমিও তার দিকে তাকিয়ে থাকি। বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়াল লোকটি, লাঠিটা হাতে নিয়ে পা বাড়াল।

বললাম, চলে যাচ্ছেন?

বলল সে, হ্যাঁ, চলে যাচ্ছি।

: এখন কোথায় যাবেন?

: জানি না।

: বাড়িতে যাবেন না?

: জানি না।

: আপনার বাড়ি কোথায়?

লোকটি চিৎকার করে উঠল, জানি না শূয়রের বাচ্চা।

আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম। ভয়ে, বিস্ময়ে, ক্রোধে, নাকি শ্রদ্ধায় ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। লোকটা চলে যাচ্ছে। আমি তার চলে যাওয়া দেখি। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখি দশটা বাজতে পনের মিনিট বাকি। হারুন স্যার আসার সময় হয়ে গেছে। ডিপার্টমেন্টের দিকে হাঁটা ধরি। মাথা উঁচিয়ে একবার লোকটাকে দেখার চেষ্টা করলাম। না, তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। আমি আবার আমার পা-ুলিপির বৃত্তে ঢুকে পড়ি। জহির রায়হান সম্পর্কে লোকটার কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। আমি আবার বেঞ্চিতে ফিরে পকেট থেকে কলমটা বের করি। পা-ুলিপিতে জহির রায়হানের জীবনের উপসংহারে লিখি : এমনও হতে পারে জহির রায়হান গুরুতর আহত হয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। পাগলের মতো দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন অথবা কোনো কারাগারে বা পাগলাগারদে বন্দি ছিলেন। একদিন বার্ধক্যের চাপে স্বাভাবিকভাবে অথবা কোনো দুর্ঘটনায় তার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। কে জানে, হয়ত এখনো বেঁচে আছেন। মানুষ তো আশি-নব্বই বছরও বাঁচে। আসলে এই বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই।

পিন্টু রহমান
আড়ালে তার মেঘ হাসে

ডানাভাঙা পাখির মধ্যেও আহাজারি থাকে, চোখের পাতায় কাতরতা থাকে, নতুন ঠিকানার কৌতূহল থাকে— কিন্তু শহীদের মধ্যে নেই; নিজেকে ঝড়ে বিধ্বস্ত পাখির সাথে তুলনা করলেও ওইসব ভাবনা ছুঁতে পারে না। কিংবা বোধহীনতার কারণে তাকে আঁচড় কাটতে অক্ষম। দেখে মনে হয় নিজেকে পুরোপুরি ঝড়ের মুখে সঁপে দিয়েছে। রাতের নির্জনতায় কুয়াশা হামাগুড়ি দেয়। কিন্তু শহীদের শীত নেই। চিড়িয়াখানার পশুদের সম্ভবত শীত থাকতে নেই!

পশুই বটে; মানুষ আর রইলো কই!

আলো-আঁধারির যূপবদ্ধে দৃশ্যমান ঘোর আরো আরো রূপকল্প তৈরিতে সহায়তা করে; ফলে আলো-অন্ধকার ক্রম পরম্পরায় তার চোখেমুখে ছায়া ফেলে যায়; অস্তিত্ব সংকটও প্রকট হয়ে ওঠে। নিজেকে অসহায় মনে হয়। সংকটের শেষ কোথায়! মেঘের আড়ালে যদি সূর্যের দেখা না মেলে! তবে কি হবে তাহলে?

পরিবর্তন আর পরিবর্তন!

পরিবর্তনের ¯্রােতে দুনিয়া যেনো খড়কুটোর মতো ভেসে চলেছে!

হাজিমোড়ের কথাই ধরা যাক— বিপুলা পৃথিবীতে জায়গার অভাব নেই, এমনকি আশেপাশেও না; কিন্তু আলমডাঙা  শহরের এই বিশেষ মোড়ের বিশেষত্বই অন্যরকম। ঘিঞ্জি বস্তির সাথে যোগ হয়েছে ফুটপাত দখলের প্রতিযোগিতা। অতিথি পাখির  ডানায় ভর করে শীতকন্যার আগমনের পূর্বেই ভূমি অফিসের পতিত জমি, স্কুলঘরের বারান্দা, শৌচাগারের প্রবেশ পথ, ম্যানহোলের ঢাকনা পর্যন্ত বেদখল হয়ে যায়। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে অস্থায়ী দোকানঘর— স্বল্প পরিসরে হাজার-হাজার পুরাতন কাপড়ের সমাহার। নামকরণেও পরিবর্তন; কেউ কেউ নিকছন পট্টি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

শীতরাত্রির দৈর্ঘ্যের সাথে সাথে নিকছন পট্টির খ্যাতিও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত মানুষের উপস্থিতিতে পরিবেশ সরব হয়ে ওঠে। চাহিদার সাথে যোগানও বদলে গেছে; বদলে গেছে মানুষের রুচিবোধ। আগে কেবলমাত্র দরিদ্র জনগোষ্ঠীর যাতায়াত ছিল। আর্থিক সক্ষমতার কারণে ওরা না এসে পারতো না। কিন্তু সাম্প্রতিক চিত্র ভিন্ন; ধনিক শ্রেণির বৌ-ঝিরা পর্যন্ত হুমড়ি দিয়ে পড়ে।

হয়তো শহীদের ক্ষেত্রেও তাই; পুরাতন কাপড়ের ঘ্রাণ নিতে কিংবা শীত নিবারণের নিমিত্তে ছেলেটি হয়তো এ পথ মাড়িয়েছিল। কিন্তু কে জানতো এতবড় ভোগান্তি তার জন্য ওঁৎ পেতে বসে আছে!

মফস্বল শহর। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই অনেক রাত। নিকছন পট্টিতে ধীর পায়ে নেমে আসে রাতের নির্জনতা; থেমে যেতে চায় দিনান্তের কোলাহল। এ-সময় খদ্দেরের তেমন ভীড় থাকে না। চোরাই লাইনের বিজলীবাতির স্বল্প আলোয় দোকানদাররা অল্প-অল্প করে দোকান গোছাতে আরম্ভ করে। এর মাঝেও আঁড়চোখে দুএকজন খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করে। শেষ সময়েও যদি কিছু বেচা-বিক্রি হয়! পথচলতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কেউ কেউ আবার দরাজ গলায় হাঁক ছাড়ে, আসেন গো ভাই আসেন, খাঁটি বিদেশী মাল; পানির দরে ছাড়ি দিলাম, আগে আসলি আগে পাবেন। মাল ছিঁড়া-ফাটা হলি ঘোরত নেবো। আসেন গো ভাই জলদি করি আসেন, ইট্টু পরেই দুকান বন্দ করি দেবো।

নানাবিধ কৌশলে ক্রেতাসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতা; ফলও হয়, দোকানীর দরদভরা কণ্ঠস্বরে শহীদ মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়িয়েছিল; লালরঙা সোয়েটারটার পানে চোখ পড়তেই ঘরমুখো পা দোকানমুখী হয়েছিল। থরে-থরে সাজানো কাপড়গুলো উল্টেপাল্টে দেখা শেষে উলের তৈরি বিশেষ সোয়েটারটি পুনরায় চোখের সম্মুখে মেলে ধরেছিল। নিজের মধ্যে ভাঙা-গড়ার খেলা; সম্ভব-অসম্ভবের দোলাচাল— হায় হায়, এও কি সম্ভব!

চোখে-মুখে রাজ্যের বিস্ময়; বিস্ময়ের ফাঁক গলে অনুপমার মুখটা মুহূর্তের জন্য উঁকিঝুঁকি মেরেছিল! আহা, করুণ চোখে মেয়েটি যেনো তার পানে তাকিয়ে। অবিকল আগের মতো দেখতে। দোকানীর চোখে-মুখে কৌতূহল। সারাদিনে বেচা-বিক্রি ভালো হয় নি, আল্লাহ ভালো করলে এবার বোধহয় পুষিয়ে যাবে। হাসি-হাসি মুখ করে লোকটি শহীদকে জিজ্ঞেস করে, কি হোলু ভাই, অরাম করি কি দেকচেন? ছুইটারডা কি আপনের পছন্দ হয়িচে?

শহীদ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে। দোকানী খানিকটা আস্বস্ত হয়। তথাপি হতাশার সুরে আক্ষেপ করে— জব্বর জিনিসরে ভাই, জব্বর একখান মাল। অভাবের সংসার না হলি বেচতাম না, নিজিই রাকি দিতাম। কপাল, কপাল, কপালের দোষ ভাই; কপাল না হলি বাপ-দাদার পিশা ছাড়ি কি একেন আসতাম!

একটা কপট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দোকানী নিজেই সোয়েটারটা হাতে তুলে নেয়। শহীদের বুকে-পিঠে মেলে ধরে রসিকতা করে বলে, খুব ফাইন লাগচে। এডি গায় দি যায়ি বৌর সামনে দাঁড়ালি আপনাক চিনতিই পারবেনান।

রসিকতার মর্মার্থ শহীদের মুখস্থ; বস্তুটার প্রতি কৌতূহলের মাত্রা বৃদ্ধি করতেই যত সব ফন্দি-ফিকির! বস্তুত প্রতিটি  ব্যবসারই কিছু না কিছু কৌশল থাকে; দোকানী তার কৌশলমতো এগিয়ে চলে। কিন্তু শহীদের এতে ভ্রূক্ষেপ নেই, তার নিজের মধ্যে যে অর্ন্তদ্বন্দ্ব তা সামাল দিতেই সে ব্যতিব্যস্ত। নারিকেল গাছের বাঁকানো মাথা থেকে ইঁদুরের বাচ্চা পুকুরের পানিতে পড়ে গিয়ে যেভাবে হাবুডুবু খায়, তার অবস্থাও তাই। মাথার মধ্যে বিস্তর ভাবনা আসে; জোয়ারের পানির মতো ভাবনা এসে ক্রমশ জট পাকায়।  কখনোবা আনমনে মাথা ঝাঁকায়। দোকানীর চোখে-মুখে হতাশার পূর্বাভাস। ম্লানমুখে বলে, জলদি করেন ভাই। দিনুমান খাটাখাটনি করি আর ভাল্লাগচে না; চাড্ডি সদায়পাতি করি বাড়ি যাতি হবে।

ঘরে ফেরার তাগাদা কার না থাকে, কিন্তু চাইলেই কি ফেরা সম্ভব! শহীদ নিজেও সময় মতো ফিরতে পারেনি। কয়েক মূহুর্ত ভেবে দোকানীকে উদ্দেশ্য করে বলে, একখান কতা বুলতাম ভাই।

দোকানীর চোখে-মুখে স্পষ্টই বিরক্তির চিহ্ন। সোয়টারটি যে আর বিক্রি হচ্ছে না, এমন একটি ধারণা তার মধ্যে বদ্ধমুল। কেনোনা ক্রেতার হাবভাব দেখে অনেক কিছু বুঝতে পারে সে। এলোমেলো কাপড় ভাঁজ করতে করতে বলে, এতো বুলাবুলির কি আচে, নিলি নেন না নিলি কাটি পড়েন— মন-মেজাজ ভালো না।

বিচলিত হওয়ার ভঙ্গিতে শহীদ বলে, ছুইটারডা আপনার কাচে আলু কেরাম করি! দোকানী এবার মনে-মনে হোঁচট খায়, ছেলেটি কি তার সাথে রসিতকা করছে! নাহ, অসময়ে এই রসিকতা ভালো লাগে না।  তিরতির করে মেজাজ উত্তপ্ত হতে শুরু করে। রুক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, কেরাম করি আলু মানে! এই রাতির বেলা ন্যাকা ঠাপাইনির জাগা পাচ্চু না, তাইনা? মাতা গরম করি দিয়েন না, ভালোই ভালোই কাটি পড়েন, তা না হলি কপালে বেমত্তি আচে!

সোয়েটার হাতে শহীদ আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। আওলা দৃষ্টিতে ছড়ানো-ছিটানো কাপড়, ভাঙা টুল, পানির বদনা, এক জোড়া চপ্পল, টিফিন বাটি ও দোকানীর অবয়ব লক্ষ  করে।

বেচারা!

ভাঙাচোরা মুখ।

খোঁচা-খোঁচা দাঁড়ি।

উসকো-খুসকো চুল।

তিরিক্ষি মেজাজ।

শুরুতে কিন্তু মেজাজ এমন তিরিক্ষি ছিল না। কিংবা থাকলেও শহীদ খেয়াল করেনি। এই খেয়াল না করার জন্য সে কাকে দায়ী করতে পারে; অনুপমা, দোকানী না কি সে নিজে! নাহ, অন্য কেউ না, দোষ তার অদৃষ্টের, তার চোখের! এতো এতো মানুষ থাকতে তার চোখ ওখানে হোঁচট খাবে কেনো; কেনো পুরানো স্মৃতির তানপুরায় টান পড়বে! আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর শহীদ অসহায় ভঙ্গিতে জানায়, ছুইটারডা একেন অ্যালু কেরাম করি ভাই?

মুহুর্তের মধ্যে দোকানীর মুখচ্ছবি বদলে যায়। শহীদের চোখে-মুখেও বিস্ময়; বিস্মিত হয় দোকানী বাবলুর অঙ্গভঙ্গি দেখে। চোখের পলকে লোকটি যেনো বাঁদুরনাচ নাচতে শুরু করে!  হাতের জামা-কাপড় শূন্যে ছুঁড়ে মেরে মারমুখী হয় ওঠে, অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করে, এই শুয়োরের বাচ্চা এই, চিটারি করার আর জাগা পালি নি!  খানকি মাগীর ছেলি, আমার সাতে চাইলবাজি! দাঁড়া, দেকাচ্চি মজা; ওই তুরা আয় তো, শালাক আগে চুদি নি!