ক্রোড়পত্র: চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলা ২০১৬

বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি

একটি প্রান্তমুখো সাহিত্য-উদ্যোগ হিসেবে চিহ্ন পত্রিকা সৃজনশীল ও মননশীল ধারায় দু’জন প্রান্তিক অথচ কৃতী, ব্রাত্য অথচ গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যশিল্পীকে চিহ্নপুরস্কার দিয়ে থাকে। সাহিত্যে যথাযথ অবদানের স্বীকৃতির জন্য ছোটকাগজগুলোকেও যুক্ত করা হয়েছে চিহ্ন সম্মাননার জন্য। চিহ্নপুরস্কার ও চিহ্ন সম্মাননা প্রদানের জন্য প্রতি তিনবছর পরপর চিহ্ন আয়োজন করে চিহ্নমেলা। এর ধারাবাহিকতা হিসেবে বিগত ৭ ও ৮ মার্চ ২০১৬-তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলাভবন চত্বরে আয়োজিত হয়েছিলো চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলা। চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, আনিসুজ্জামান, সনৎকুমার সাহা, কবি জুলফিকার মতিন, সেলিনা হোসেন, কবি রুহুল আমিন প্রামাণিক ও পশ্চিমবাঙলার বিশিষ্ট তাত্ত্বিক ইমানুল হক। তাঁরা এই আড্ডা-আয়োজনে মিলিত হয়ে কথা বলেছিলেন বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি নিয়ে। এখানে সেটির মুদ্রিত রূপ প্রকাশ করা হলো।  [সম্পাদক]

হাসান আজিজুল হক : চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলার উদ্বোধনী আয়োজন বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ এই আড্ডা-অনুষ্ঠানের স্নেহভাজন সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শহীদ ইকবাল ও বাংলাদেশের জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর একটি অংশ আজকে মঞ্চে উপস্থিত আছেন। জাতীয়ভাবে যাঁকে নিয়ে আমরা গর্ব করি, সেই আনিসুজ্জামান আমাদের সামনে উপবিষ্ট রয়েছেন। নামের আগে বা পরে তিনি কিছুই ব্যবহার করেন না। শুধু আনিসুজ্জামান। এবং আমরা এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, আনিসুজ্জামানের আগে বা পরে আর কোনো শব্দ ব্যবহার ছাড়াই আমরা তাঁকে অবিকল্পভাবে চিনতে পারি। আনিসুজ্জামানের সঙ্গে মঞ্চে রয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন ছাত্রী সেলিনা হোসেন, কলকাতা থেকে এসেছেন বন্ধু ইমানুল হক; এবং উনি আসার ফলে আন্তর্জাতিক শব্দটা কোনোরকমে ব্যবহার করা যাচ্ছে। এঁদের সঙ্গে উপস্থিত রয়েছেন আমাদের স্থানীয়, সবাই জানে তাঁর সম্পর্কে, সনৎকুমার সাহা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বাংলদেশের জ্ঞানী মানুষ যাঁরা আছেন তাঁদের একেবারেই ওপরের সারির একজন মানুষ সনৎকুমার সাহা। যাঁর বোধ-বুদ্ধি, রচনাশক্তি, ধারণাশক্তি আমাদের কল্পনাতেও আসে না। সেই সনৎকুমার সাহাকে— সেই প্রায় নিশ্চুপ মানুষটাকে আজ আমরা এখানে পেয়েছি। (আপনারা চেষ্টা করুন তাঁকে দিয়ে কিছু বলাতে পারেন কি না।) আর এখানে আছেন জুলফিকার মতিন। তাঁকেও আর পরিচয় করিয়ে দেবার কোনো প্রয়োজন নেই। মনে হয় ইন্টারমেডিয়েট পাশ করার পর থেকেই তিনি রাজশাহীর বাসিন্দা। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তাঁর শেষ ডিগ্রিগুলো করেছেন এবং তারপর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি থেকে গেছেন। সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন এবং এখনো তিনি আমাদের সঙ্গেই থাকেন। কাজেই এখন রাজশাহী শহর এবং জুলফিকার মতিন প্রায় এক কথা। এতে কোনো অসুবিধা নেই। তাঁকে আজ আমরা পেয়েছি। আর আছেন এখানে রুহুল আমিন প্রামাণিক; তিনিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রাজশাহী শহরের সংস্কৃতির যেটুকু কার্যকলাপ, সংস্কৃতি সংক্রান্ত যেটুকু বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকর্ম রাজশাহীতে হচ্ছে তাতে তাঁর প্রণোদনা ও নেতৃত্ব আছে। এই কয়েকজনের উপস্থিতি এখানে আজকে। আমরা এঁদেরকে পেয়ে অনেক খুশি হয়েছি। একটু পরেই এঁদের কাছ থেকে অনেক কথা শুনবো। আর আমাকে যে সঞ্চালকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এটাতে তো আমি কখনোই অভ্যস্ত নই। আমি সঞ্চালনা করতে পারি না। আর একটা না দুটো লাঠি নিয়ে যে সংগীত পরিচালনা করে সেটাও আমি করতে পারি না। কাজেই যা মুখে আসছে তাই বলছি। যেমন করে খুশি তেমন করে বলছি। আজকে আমাদের এই আড্ডার একটি নাম দেওয়া হয়েছে। নামটি হচ্ছে বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি। অবাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি এটা এমন একটা অস্পষ্ট আবছা ধোঁয়াটে জায়গা যে সেটা নিয়ে সুস্পষ্ট করে কিছু বলা যাবে না। কিন্তু বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি আমরা অবশ্যই বাংলার ইতিহাস থেকে উদ্ধার করতে পারি। কিছুটা করতে পারি এবং করিও।

আমি আলোচনার সূত্রপাতের জন্য কয়েকজন বাঙালির কথা বলবো যাঁরা বিখ্যাত। শ্রেষ্ঠত্বের তো আলাদা কোনো সংজ্ঞা নেই। ইনি এক বিষয়ে তো উনি অন্য বিষয়ে শ্রেষ্ঠ। বিদ্যাসাগরকে যদি বলা হতো ১০০ মিটার রেসে আপনাকে দৌড়াতে হবে তবে তিনি সব শেষে থাকতেন। কাজেই সেভাবে বলা যাবে না। তবুও আমাদের এখানে এই বাঙালি জাতির অন্ততপক্ষে আড়াইশত বছরের ইতিহাসে যাঁরা শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে বিবেচিত হতে পারেন তাদের একটা তালিকা করা হয়েছে। আপনারা আলোচনা করবেন। আমি কিন্তু আবার বলছি শেষকথা, তারপর আমি যেটা বললাম অবিসংবাদিত সত্য, এরকম কথা আমিও বিশ্বাস করি না। যাঁরা আলোচনায় অংশ নেবেন তাঁরাও করেন কি না আমি জানি না। তবে তাঁরাও কথা বলবেন। আমরা আলোচনা করবো রামমোহন রায় যিনি ১৭৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৩৩ সালে মারা যান। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৯৪ সালের দিকে মারা যান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—আমার ধারণা উনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কখনো মৃত্যু হয় নি। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, জানি যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষাবিদ, ব্যাকরণবিদ, মহাপণ্ডিত মানুষ। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল যিনি, হোতা, এই কাজটি অর্জন করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এঁদের মধ্যে বা আমাদের চোখে কাকে শ্রেষ্ঠ বলা যায়, এটা নিয়ে আড্ডা হবে তর্ক বোধহয় হবে না। এখানে তর্ক হওয়া অনুচিত মনে হয়। ঐ যে বললাম শ্রেষ্ঠত্বের তো কোনো সংজ্ঞা পাওয়া যাবে না। আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় এবং যাঁকে আমরা সবাই মানি, যাঁকে আমরা সবাই মনে করি যে একটা জাতীয় পরিচয় তাঁর হয়েছে এবং সে পরিচয় ক্ষমতার নয়, শক্তির নয়, প্রশাসনের নয়, বিদ্যার-জ্ঞানের পরিচয়। এই কথাটা আমাদের মনে রাখা দরকার। তিনি হচ্ছেন আনিসুজ্জামান। কাজেই আমি শুরুতে আনিসুজ্জামানের কাছেই যাচ্ছি যে এই বিষয়টাকে যে দেওয়া হয়েছে এই সম্পর্কে আপনি কীভাবে মন্তব্য করবেন সেটা আমরা জানতে খুব আগ্রহী এবং সেই সঙ্গে আপনার চোখে কাউকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলতে চান কি না বা কীভাবে বলবেন। আমরা এখানে আড্ডাই দেই, কথাবার্তাই বলি। তার বেশি কিছু বলবো না। কারণ আনিসুজ্জামান শুধু একবার না বারবারই বলতে পারেন। তাই প্রথমে তাঁর কাছে যাচ্ছি। এই বিষয়টা সম্পর্কে তাঁর কাছ থেকে আমরা শুনবো।

আনিসুজ্জামান : ধন্যবাদ। আমার সম্পর্কে এতো ভালো কথা বলা হয়েছে যে এখন আমি কিছু বলতে ভয় পাচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ একবার যখন বিলেতে তখন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর একটি দল ছাপানো প্রশ্নপত্র তাঁর হাতে দিয়েছিলো উত্তর প্রার্থনা করে। তিনি সবগুলোরই উত্তর দিয়েছিলেন। তার মধ্যে যেমন ছিলো যে, সবচেয়ে বড়ো গুণ কী, সবচেয়ে বড়ো দোষ কী? দুটোরই তিনি উত্তর দিয়েছিলেন একশব্দে ‘ইনকন্সিসটেন্সি’। ওখানে ‘তম’ নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন ছিলো। রবীন্দ্রনাথ সেই প্রশ্নটিরও সরাসরি উত্তর দিয়ে লিখেছিলেন— প্রকৃতি সুপারলেটিভ পছন্দ করে না। এই কথাটি হয়তো প্রশ্নকর্তার কাছে খেলার ছলে বলা। কিন্তু এর মধ্যে গভীরতর সত্য লুকিয়ে আছে। এবং আমি নিজে মনে করি যে, এ কথাটি সত্য। এখানে যে পাঁচজনকে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শহীদুল্লাহ্ ও বঙ্গবন্ধু। এঁরা প্রত্যেকেই নিজের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট। এঁদের একজনের কাজের সঙ্গে ঠিক অন্যজনের কাজের তুলনা হয় না। একজন যা করেছেন আর একজন যে অবিকল কাজ করেছেন তা নয়। তো সেক্ষেত্রে আমরা তুলনা করবো কীসের ভিত্তিতে। এই একটা প্রশ্ন রয়ে যায়। আমি যদি এই তালিকা আরও ছোট করতে যাই তাহলে রবীন্দ্রনাথ এবং বঙ্গবন্ধুতে এসে ঠেকবে। কেননা আমাদের সংস্কৃতির জন্য রবীন্দ্রনাথ যা করেছেন তার কোনো তুলনা বোধহয় নেই। অন্যপক্ষে বঙ্গবন্ধু এই দেশের মানুষকে সচেতন করেছেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিয়েছেন, তাদেরকে প্রস্তুত করেছেন মুক্তিযুদ্ধের জন্য এবং শেষপর্যন্ত বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। এটিরও কোনো তুলনা হয় না। কাজেই এর চেয়ে আমি কমাতে পারি না। অন্যদের কমাতে পারি এই অর্থে যে, তারা একটি ক্ষেত্রকে অবলম্বন করে অনেককিছু করেছেন। শহীদুল্লাহ্ করেছেন ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে, সাহিত্যের ইতিহাসবিদ হিসেবে। বিদ্যাসাগর প্রায় অতুলনীয়, রামমোহন রায়ের তুলনা হয় না। বিদ্যাসাগরকে হয়তো প্রমোশন দেয়া যায়। রামমোহন রায় সমাজসংস্কার করেছেন বিদ্যাসাগরও করেছেন। কিন্তু রামমোহন রায়ের যে বিশেষ ঝোঁক ছিলো অধ্যাত্মবাদের জন্য, যদিও রামমোহন লিখেছিলেন যে—‘সব ধর্মের মধ্যেই মিথ্যে আছে’। এরপরও, ধর্ম নাম দেন নি বটে, তিনি একটি ধর্ম প্রচারের চেষ্টা করে গেছেন। বিদ্যাসাগর সেক্ষেত্রে ধর্ম নিয়ে ভাবেন নি। ঠাট্টা করে বলেছেন ‘ওরে আমারও পরলোক আছে নাকি?’ কিন্তু বিদ্যাসাগরের যে ব্যক্তিত্ব, যে দৃঢ়তা তার তুলনা ঊনবিংশ কেনো বিংশ শতাব্দীতেও আমরা পাবো না। খালি যে সমাজ সংস্কারের জন্য ওঁকে আমরা স্মরণ করবো তা না। তাঁর সমগ্র ব্যক্তিত্বের জন্য, সমস্ত মানবিকতার জন্য তাঁকে স্মরণ করবো আমরা। রবীন্দ্রনাথ আজও আমাদের পথ দেখান। আমরা যখনই কোনো সামাজিক সমস্যায় সম্মুখীন হই তখন যদি আমরা রবীন্দ্রনাথকে খুঁজতে যাই, তবে দেখা যাবে যে তার সমাধান আছে তাঁর কাছে। একথা আমি কখনোই বলবো না যে রবীন্দ্রনাথ সারা জীবনেই অফুরান্ত ছিলেন। তিনিও কিছু সংকীর্ণতার শিকার হয়েছেন জীবনের কিছু পর্বে। তিনিও যা বলেছেন সেটা হয়তো পুরোপুরি নিজেও পালন করতে পারেন নি। কিন্তু তারপরও এই বাঙালিকে তিনি যে একটা বিশেষ দিকে নিয়ে গেছেন— এই যে বাণী, দেশকে ভালোবাসবো বটে কিন্তু দেশের বাইরেও একটা বড়ো ব্যাপার আছে, সেটা সারা পৃথিবী— সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। এটি রবীন্দ্রনাথ যেভাবে আমাদের শিখিয়েছেন তা আর কারো কাছ থেকে আমরা পাই নি। আর বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, যখনই সুযোগ পেয়েছেন। এবং এই রাষ্ট্রের তিনি স্থপতি। তাঁরও কোনো তুলনা হয় না।

হা. আ : আনিসুজ্জামানের কথা আমরা শুনলাম। প্রয়োজনে আবার তাঁর কাছে ফিরে যাবো। এখন দু-একটা কথা বরং সনৎকুমার সাহার কাছ থেকে শুনি।

সনৎকুমার সাহা : যেহেতু এটি একটি আড্ডা সেই জন্য আমি কাউকে কিছু সম্বোধন না করে সরাসরি আড্ডার ধাঁচে কিছু কথা বলছি। আপনারা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছ থেকে যে মূল্যবান কথা শুনলেন, তাঁর সঙ্গে আমার বলার কোনো বিরোধ নেই। তবে আজকের আলোচনার বিষয় নিয়ে আমার মনে কিছু বিভ্রান্তি আছে। বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি এর পেছনে যেনো একটা মানসিকতা কাজ করে— মানুষের চোখে শ্রেষ্ঠ ধর্ম কী? শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা কে? শ্রেষ্ঠ জাতীয় নেতা কে? শ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? সব এক এক করে আমাদের ভাবনাকে সেই জায়গাতে নিবদ্ধ করতে চাই সেটা আমাদের গোলমালে ফেলে। ধরা যাক বাঙালি জাতি। বাঙালি জাতি কি একদিনের? কেউ কেউ বলেন যখন থেকে বাংলা ভাষা আমরা চালু করছি তখন থেকে বাঙালি জাতি। আবার সেটা বললে প্রাক্-বাংলা ভাষার যুগে এই যে অঞ্চল, সেই অঞ্চলের যে সুকৃতি, তার যে বিশেষ বিশেষ কীর্তি যা এই অঞ্চল ছাড়িয়ে তার বাইরেও সেটা প্রসারিত হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে আমরা নিশ্চুপ থাকি। গৌতম বুদ্ধকে কি আমরা ধরতে পারি বাঙালি হিসেবে? তখন বাংলা ভাষা ছিলো না, প্রাকৃত ভাষা ছিলো। যে অঞ্চলকে আমরা বাঙলা বলি, আমাদের বাংলাদেশ না কেবল, পুরো বঙ্গভাষী অঞ্চল— তার একটা অংশ ছিলো প্রাকৃত মাগধিতে আর একটা অংশ ছিলো প্রাকৃত মৈথিলিতে। তারপরে তার মিশ্রণ হতে হতে— এখানে যাঁরা বাংলা বিশেষজ্ঞ আছেন তাঁরা এ বিষয়ে আমার থেকে ভালো জানেন— এভাবে মিশ্রণ হতে হতে বাংলা ভাষার একটা নিদর্শন আমরা পাই এবং সেই নিদর্শন থেকে আমরা নিজেদের বাঙালি বলে চিহ্নিত করি। সেখান থেকে চিহ্নিত করে আমরা নিজেদের ধারাটাকে দেখবার চেষ্টা করি। আমার মনে হয় ধারাটা আরও আদি থেকে দেখা উচিত। এবং যদি বলি জাতি হিসেবে তার কোনো একটা স্থিরবিন্দু আছে, তাহলে সে জাতি কিন্তু সেখানেই মরে যায়। তারপরে তার আর কোনো বৃদ্ধি হয় না। জাতি মানে সেটা প্রবহমান নদীর মতো। এখন নদীর একটা জায়গায় এক বিন্দু জল নিয়ে আমি বললাম এই জলটাই হলো ভালো, গঙ্গার জল নিয়ে এসে আমি প্রত্যেকদিন বাড়িতে নম নম করি— তাহলে কি এটা কোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের কাজ হয়! তা হয় না। বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি তার মানে প্রতিটি পর্বে, প্রতিটি সময়ে, প্রতিটি মুহূর্তে যে ধারা, সেই ধারা অনুসরণ করে তারা সেখানে সবার কাছে সম্মানীয়, গ্রহণযোগ্য এবং ভবিষ্যতের পক্ষে কল্যাণকর পথে নিয়ে গেছেন। সেই বিবেচনায় আমরা এক একটা পর্বে অথবা এক একটা পর্যায়ে এক এক জনের কথা একাধিকজনের কথা আমরা ভাবতে পারি। কিন্তু এককভাবে আমরা সেভাবে ভাবতে পারি কি? এই প্রসঙ্গে একটা উদাহরণ দেই— এই উপমহাদেশে শুধু এই উপমহাদেশে না গত ঊনিশ শতকে এবং বিশ শতকে যাঁরা দেশের এবং বিদেশের কাছে এই দেশের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় প্রতিনিধি, একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, একজন মহাত্মা গান্ধী— এই দুইজনের ভেতরে যে একটা বিরোধ ঘটে সেই বিরোধের কথাটি আমি বলি— মহাত্মা গান্ধী ‘ইয়াং ইন্ডিয়া’ নামে পত্রিকায় একটা রচনায় লেখেন যে রামমোহন রায়, বালগঙ্গাধর তিলক এঁরা হলেন বামন বা খাটো। চৈতন্যদেব, কবীর এবং নানক এদের তুলনায় তাঁরা পিগমি। এই কথা রবীন্দ্রনাথকে ভীষণভাবে আহত করে। রবীন্দ্রনাথ তার জবাবে বলেন যে যাঁকে গান্ধী বামন বলে বা গণনার বাইরে ফেলে দেন তিনি আমার কাছে আধুনিক ভারতের মহত্তম ব্যক্তি। গান্ধী তাঁর জবাবে ‘ইয়াং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় লেখেন যে, যেভাবে চৈতন্যদেব, কবীর এবং নানক মানুষকে নিচ থেকে উপরে টেনে তুলেছেন এবং যেভাবে তাদের গোটা চেতনাকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করেছেন সেই তুলনায় সেই কাজে রামমোহন রায়ের যে অবদান সেটা অকিঞ্চিৎকর। অকিঞ্চিৎকর এই অর্থে তিনি গোটা জাতিকে উদ্বুদ্ধ করে তাদের অনুপ্রাণিত করে, তাদের ভেতরে একটি লক্ষ্যে পৌঁছে দেবার জন্যে তিনি কোনো আন্দোলন করেন নি এবং সেই অর্থে যাকে আমরা বলি এলিটিস্ট— তিনি তাই এবং সমাজের যারা উপরের স্তর তাদের মধ্যে তিনি একধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। এরপরে এই বিষয়ে একটা অমীমাংসিত জায়গায় গিয়ে এর সমাপ্ত হয়। আমরা যদি রামমোহন রায়ের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের একটা তুলনা করতে যাই তাহলে সেই তুলনাও অসঙ্গত এবং অবান্তর হবে। আমরা একইসঙ্গে এটা কী মনে করি না অন্য একদল লোক বলতে পারে কেনো বিদ্যাসাগর? বিদ্যাসাগর ১৮৫৭ সালে আমাদের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে তো তিনি একাত্ম হন নি! তিনি তো বাংলা ভাষা-সাহিত্য ইত্যাদিতে এবং এখানকার মানুষকে শিক্ষিত করতে যতদূর পর্যন্ত সম্ভব যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন কিন্তু রাজনৈতিক মুক্তির জন্য তিনি তো কোনো চেষ্টা করেন নি। এখানে আর একটা বিতর্ক তৈরি হয় যে ঔপনিবেশিক আমলটা সেটা কী আমাদের জন্য সবটাই অকল্যাণকর। না সেখান থেকে আমরা ইউরোপের সঙ্গে এই অঞ্চলে একটা সংযোগ সৃষ্টির ফলে আমাদের চেতনার বিস্তার ঘটেছে এবং সেইজন্য আমরা এই অঞ্চলের মানুষ যারা তাদের ইউরোপের কাছে অনেক কিছু পাওয়ার আছে এবং আমরা পাওয়ার জন্য সচেষ্ট হয়েছি। সেখান থেকে অবশ্য আজকে পশ্চিমবঙ্গে যে ধরনের কূপমণ্ডূকতা দেখি তাতে আমার সন্দেহ হয় তারা বোধহয় বিদ্যাসাগরের যুগে ফিরে যাচ্ছে। আমাদের ভাগ্য যে, এখানে ভাষা-আন্দোলন হয়েছে। দেশের মানুষের ওপরে তার একটা প্রভাব আছে। যারা ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, ভাষা আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন— তারাও এটা যে কোথায় যাবে সেটা উপলব্ধি করতে পারেন নি। কেনো বলছি একথা যারা ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন তার পরে তারা একাত্তর পর্যন্ত তো অনেকেই বেঁচে ছিলেন, তাদের ভূমিকা কী ছিলো? কার কোথায় কী ভূমিকা ছিলো? সেটা যদি আপনারা পরীক্ষা করে দেখেন তাহলে দেখবেন সেখান থেকে ক্রমশ নিজেকে প্রসারিত করতে করতে একটা জায়গায়—

হা. আ : বিদ্যুৎ গেছে। সনৎ আবার তোমার কাছে যাবো। এ তো আলোচনা। এখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন যে বন্ধু, ইমানুল হক তিনি বলবেন—

ইমানুল হক : ‘বল্ল’ শব্দটির মানে হচ্ছে কাপাশ বা কার্পাশ তুলো। কার্পাশ তুলোর সঙ্গে আল যুক্ত হয়েছে। সংস্কৃত আল মানে সমৃদ্ধ। আবুল ফজল বলেছেন আল মানে জমির আইল। তো কার্পাশ তুলো সমৃদ্ধ অঞ্চলকে আমরা বঙ্গাল হিসেবে ধরেছি। এখন প্রশ্ন হলো, বাঙালি কারা? আনিসুজ্জামানের একটা লেখা পড়ছিলাম, যেখানে তিনি লিখেছেন যে, এক সভাতে জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক তিনটা প্রশ্ন করেছিলেন, তারপর সভাটিই পণ্ড হয়ে যায়। সেই তিনটে প্রশ্ন আমি করতে চাই না, যে বাঙালি কারা? আমরা রাঢ়ি, পুণ্ড্র না বল্লাল। আমি যেখানে জন্মেছি সেখানকার মানুষ বলে—‘বল্লাল করে সব বাফোই বাফোই।’ বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব আলোচনা করতে গিয়ে বাঙালির স্বভাব বৈশিষ্ট্যের সাথে আমি কার্পাশ তুলোর মিল খুঁজে পাই। কার্পাশ তুলো এমনিতে নরম, পেলব, মেদুর; তবে পেকে গেলে শক্ত হয়ে যায়। বাঙালি কথায় কথায় ‘মেরে ফেলবো’, ‘দেখে নেবো’, ‘শেষ করে দেবো’ এইসব বলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত বাঙালি এসব কিছুই করে না। এরা আইসক্রিমের মতো গলে যায়। বলে— এই চললাম বাপের বাড়ি কিংবা তোমার জন্য জীবন ভাজা ভাজা হয়ে গেলো। কিন্তু এসব কথা যে গভীর অভিমান থেকে বলা নয় তা বাঙালিমাত্রই আমরা বুঝি। তো, ক্ষমতাগত সাংস্কৃতিক ধারণা থেকে আমরা কাকে শ্রেষ্ঠ কাকে অশ্রেষ্ঠ বলবো সেই মানসিকতা কাজ করে! অনেকে শ্রেষ্ঠ হতে পারেন অনেকে সেরার তালিকায় থাকতে পারেন। এক নম্বর কী হয় কেউ? না হওয়া উচিত? এক নম্বর ধারণাটার মধ্যে একটা আধিপত্যবাদ কাজ করে। আমাদের দেশে যেটা আলোড়িত এবং বহুকাল পর যেটা আমার দেশে আমি দেখতে পাচ্ছি কালো চুলের ছেলেরা, অল্প বয়সের ছেলেরা আমাদের গোটা দেশকে আলোড়িত করে দিয়েছেন। কারো নাম কানহাইয়া কুমার, কারো নাম ভুনুলা, আমরা বলি দলিত। এবং ঘটনাচক্রে আমি দেখেছি রবীন্দ্রনাথ, টলস্টয়, পুশকিন এই কয়েকটা নাম ছাড়া পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে এমন লোক খুব উচ্চবর্গের তাঁরা নন। তাঁরা উঠে এসেছেন একেবারে মাটির সঙ্গে থাকা, না খেতে পারা ঘর থেকে। বিজ্ঞান, সাহিত্য কিংবা শিল্পে বলেন উঠে আসা মানুষেরা অনেকেই দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করেছেন। যারা তথাকথিত দলিত তারাই পৃথিবী বদলে দিয়েছেন। তো এখানে আমরা দেখবো এই আলোচনার মধ্যে শেষ নামটা শেখ মুজিবুর রহমানের। গতকাল ক্রিকেট খেলা ছিলো আমি খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম যে কারা জেতে? কারণ আমাদের দেশে ক্রিকেট একটা মানদণ্ড, ইংল্যান্ডের মতোই। ভারত-পাকিস্তানের খেলার দিনে যাদের নাম আরবি তাদের প্রমাণ রাখতে হয় যে তারা পাকিস্তানের পতাকা ওড়ায় নি। এই প্রমাণ তাকে সারাক্ষণ বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। সুতরাং এখানে বসে কথা বলার একটা বিপদ হচ্ছে কাকে শ্রেষ্ঠ বলবো! কিন্তু এটা ঠিক, গৌতম বুদ্ধ বঙ্গলিপি শিক্ষা করেছিলেন, সনৎবাবু ভালো বলেছেন। সেই অর্থে বাংলার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। দীনেশচন্দ্র সেনের লেখায় এটা আছে। আর একজন মানুষের নাম আমি নিতে চাই, ভুসুকু ছাড়াও— তিনি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। আমি মনে করি তার নামটাও আমাদের যুক্ত করা উচিত। চৈতন্যদেবকেও আমরা বাদ দিতে পারি না। তিনি বাঙালিকে আলোড়িত করে জাতিভেদ প্রথা দূর করতে চেয়েছিলেন। যদি আদৌ বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকা করা হয় তাহলে এই নামগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার দরকার পড়ে। রামমোহন রায়ের নাম আলোচিত হয়েছে আমি তাঁর সম্পর্কে আর বলব না।

হা. আ : অনেক নাম করা যাবে। অনেককে শ্রেষ্ঠ বলা যাবে। শ্রেষ্ঠ বলে কোনো শব্দ নেই তা-ও বলতে পারি। এর আগে আনিসুজ্জামান বলেছেন— প্রকৃতিতে কোনো সুপারলেটিভ নেই। কী সব চাইতে ভালো এটা বলা যায় না কি! রসগোল্লা ভালো নাকি পিঁয়াজি ভালো কে বলবে সেটা। এটা বলা খুব মুশকিল। রাজশাহীর আম ভালো নাকি বর্ধমানের মিহিদানা ভালো। কে বলবে, কেউ জবাব দেবে না। যাই হোক প্রশ্নটা আমরা কী করে বৃত্তবদ্ধ করে নিয়েছি। এ পাঁচজনের মধ্যে আলোচনা আপাতত সীমিত রেখেছি। তা না হলে শ্রীচৈতন্যদেবেরই নাম আসবে না কেনো বা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নামই আসবে না কেন? অনেকের নামই হয়তো আসতে পারে শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে। কাজেই এখন আমরা একটু আমাদের সর্বজনপ্রিয় লেখক সেলিনা হোসেন যিনি সবচেয়ে বেশি পঠিত কথাসাহিত্যিক তাঁর কাছে আমি যাচ্ছি এ সম্পর্কে তাঁর কী বক্তব্য আছে।

সেলিনা হোসেন : মঞ্চে যাঁরা আছেন আমার শ্রদ্ধাভাজন তাদেরকে আমার শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং যাঁরা প্রিয়ভাজন তাদেরকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি এবং যারা এখানে উপস্থিত আছেন সবাইকে শুভেচ্ছা। আজকে যে বিষয়টি নির্ধারিত হয়েছে বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি। হাসান ভাই (হাসান আজিজুল হক) একটু আগে যে কথাটি বললেন শ্রেষ্ঠ এই শব্দটা আমরা ঐভাবে বলবো না কিন্তু একজন মানুষ যে পাঁচটি নাম উচ্চারিত হয়েছে তারা কী অর্থে আমাদের এই শ্রেষ্ঠ শব্দটির কাছে এলেন বা ভেতরে ঢুকলেন সেই জায়গাগুলি যদি আমরা একটু চিহ্নিত করি তাহলে বুঝতে পারবো যে এক এক জন মানুষের হাতে এক একটি বাঁকবদল হয়েছে, যে বাঁকবদল সমাজ প্রথার একটি বড়ো জায়গা নির্মাণ করেছে এবং সেই নির্মাণের জায়গাটি দিয়ে বাঙালি জাতি তার প্রবহমান জীবন যাপন পরিচালিত করেছে। রামমোহনকে সবকিছু বলবো না। যদি বলি তিনি সতীদাহ প্রথা নিবারণ করেছিলেন। উইলিয়াম বেন্টিংক ১৮২৯ সালে এই কাজটি আইনগতভাবে স্বাক্ষর করেছিলেন তাহলে বলতেই হবে যে নারীদের পক্ষে, সমাজের পক্ষে, মানবজাতির পক্ষে তিনি একটি বড়ো কাজ করেছিলেন। যে কাজ নিয়ে তিনি আমাদের মাঝে আজকের দিনেও এভাবে তার নামটি উচ্চারিত হয়। আমি এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলতে চাই, আপনারা সবাই জানেন যে বিশ্ব পর্যটক ইবনে বতুতা ১৪৩৩ সালে দিল্লি এসেছিলেন। তিনি দিল্লিতে কাজি’র পদে সাত বছর কাজ করেছিলেন। তিনি যখন একটি সতীদাহ প্রথা দেখেন এবং যখন দেখেন যে একজন নারী পুড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত স্বামীর গলাটি জড়িয়ে আছে তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন এবং তিনি বর্ণনা করেছেন তাঁর ঐ ইবনে বতুতার ভ্রমণের বইটিতে বর্ণনা পাবেন যে, নারীরা কীভাবে একটি খুব গাছপালা ঘেরা অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় কাপড় পরিবর্তন করতেন, নিজেদের গয়নাগাটিগুলো খুলতেন এবং তারপরে চিতায় উঠতেন। তিনি বলেছেন এ জায়গাটা নরক। আজকে যখন তিনি ১৩৪৫ সালে বাংলাদেশে এলেন—তিনি বর্ণনা করছেন তাঁর লেখার মধ্যে যে এটি একটি সমৃদ্ধশালী দেশ শস্য উৎপাদনের দিক থেকে, ফসলের দিক থেকে এবং শস্যের দামের দিক থেকে এদেশের তুলনা হয় না। কিন্তু তারপরও তিনি বলেছিলেন ইট ইজ অ্যা হেল। এটা নরক। কেনো বলেছিলেন? যেটা আমি মনে করি আমার ব্যাখ্যা যে তিনি দেখেছিলেন যে সোনারগাঁয়ে মেয়েদেরকে বিক্রি করা হচ্ছে। সোনারগাঁয়ের হাটে তখনকার বাঙলার রাজধানীতে। যাইহোক কেনো তিনি নরক বলছেন এতো শস্যবতী একটি দেশকে। আবার আজকের দিনে যদি আমি মনে করি যে জেন্ডার ধারণার বিষয়টি, নারী নির্যাতনের বিষয়টি তার ধারাবাহিকতায়, ইবনে বতুতা একজন জেন্ডার মনস্ক মানুষ ছিলেন। তাই বিষয়টি মানতে পারেন নি। তাই তিনি একে নরক বলেছেন। তাঁর আর কিছু করার ছিলো না। সেই অর্থে যদি আজকে বলি রামমোহন রায় যে প্রথাটি তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন একজন ইংরেজ শাসকের সহায়তায় সেটা আমাদের সমাজব্যবস্থার জন্য একটি বড়ো দিক। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যসাগর; যাঁরা এখানে আছেন, হাসান ভাই বললেন, আমার সনৎ স্যারও বললেন যে শিক্ষার জায়গা থেকে, বাল্য বিয়ের জায়গা থেকে, বিধবা বিয়ের জায়গা থেকে যে কাজগুলো করেছেন সেটাও একটা সমাজব্যবস্থার বড়ো দিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এখানে অবশ্য কাজী নজরুল ইসলাম নেই। ছোট পরিসরে আলোচনা। নাও থাকতে পারে। যারা নির্বাচন করেছেন তারা তাদের চিন্তা থেকেই নির্বাচন করেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তো আমরা বলতে পারবো না। ১৯০৫ সালে যখন বঙ্গভঙ্গ হলো তিনি সেইদিন এই গানটি লিখেছিলেন। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ তারপরে রবীন্দ্রনাথের অজস্র উদাহরণ আছে, যেই উদাহরণ বাঙালি জাতির, বাঙালির শিক্ষার, বাঙালির সামাজিক ব্যবস্থার অনেক কিছুর সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এবং তিনিই বাঙালি জাতির, বাংলা ভাষার কবি হয়ে ১৯১৩ সালে নভেল পুরষ্কার পেলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর আগে আছে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। এখানে একটা কথা বলতে চাই। তিনি একজন অসামান্য পণ্ডিত মানুষ, জ্ঞানের মানুষ কিন্তু তিনি কতোটা সচেতন মানুষ ছিলেন তার একটি উদ্ধৃতি দিয়ে আমি এ কথাটা বলতে চাই যে যখন ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার আগেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় বলছিলো যে এই দেশে ঊর্দু রাষ্ট্রভাষা হবে তখন ১৯৪৮ সালে শহীদুল্লাহ্ তখনই বলেছিলেন যে বাঙলার পরিবর্তে যদি বাঙালিরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেয় সেটা হবে তাদের গণহত্যার সামিল। আজকের দিনে ১৯৭১ একটি গণহত্যা হয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এবং তিনি যে বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলেন সেটি ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বড়ো দিক নির্দেশনা ছিলো বাঙালি জাতির সামনে। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের বিচার আমরা নানা জায়গা থেকে খুঁজে বের করতে পারবো না কিন্তু জাতিকে নির্দেশনা দেওয়ার যে জায়গাটি তিনি নির্দেশ করেছিলেন, চিহ্নিত করেছিলেন সেটি একটি বড়ো জায়গা। শেষে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি যা বলবো তিনি উপমহাদেশের সেই রাজনীতিক নেতৃত্ব যাঁর নেতৃত্বে একটি স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। উপমহাদেশে ভারতবর্ষ ভাগ হয়েছে। পাকিস্থান-ভারত হয়েছে তারপরেও ১৯৪৭ সালের ২৪ বছর পরে আর একটি নতুন রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তিনি বাঙালিকে সেইভাবে তৈরি করতে পেরেছিলেন একটি স্বাধীনতার লক্ষ্যে, তার অধিকারের লক্ষ্যে, তার মর্যাদার লক্ষ্যে। আমরা বলি ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ। সুতরাং তিনি যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হলেন, তিনি রমনা রেসকোর্স ময়দানে তাঁকে দেয়া অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, তার আগে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রনাথকে রেডিওতে, টেলিভিশনে তাঁর গান নিষিদ্ধ করেছিলো। তিনি বলেছিলেন আমরা রবীন্দ্রসংগীত গাইবো, রবীন্দ্রনাচ করবো এবং এদেশে রবীন্দ্রনাথের চর্চা হবেই। এই যে রাজনীতির সঙ্গে সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে যুক্ত করা এটি একটি শ্রেষ্ঠ মানুষেরই কাজ। যিনি চিন্তার দিক থেকে, সমতার দিক থেকে, মর্যাদার দিক থেকে, নিজের জাতিসত্তার জায়গাটিকে সমুন্নত করে বড়ো করে রাখতে পারেন।

হা. আ : এরপরে আমরা আবার সেলিনা হোসেনের কাছে আসবো। জুলফিকার মতিন কিছু বলবেন।

জুলফিকার মতিন : আমরা একটা আড্ডার মধ্যে আছি। তবে এই আড্ডাস্থলে এসে পৌঁছানোর পর আমার মনে হয়েছিলো আমাদের আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়া হয়েছে এবং সেটাকে সার্থক করার জন্য গলায় একটি উত্তরীয়ও ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তো এখানে সিলিং ফ্যান তো দেখছি না গাছের ডাল দেখছি। এখন যদি গাছের ডালে উত্তরীয় বেঁধে আত্মহত্যা করি তাহলে বাঙালিত্বের ব্যবস্থা বোধহয় হয়ে যায় আর কি। বিষয়টা হলো এই যে আজকাল বড়ো বিপদ আছে। কোনো ভালো কাজের জন্য যদি মরেন, তাহলে কীভাবে সমাজ আপনাকে নেবে সেটা তো নিশ্চিত নন। কালকেই মাকিদ হায়দার (সামনে বসে আছে) তাঁকে বলেছিলাম, আমি যদি এখন শহীদ হই, (প্রমিত বাংলা বানানরীতিতে শহিদ) তাহলে শহীদ শব্দ এ যাবৎকাল আমরা যেভাবে বুঝে এসেছি—ইদানিংকালে সেই শব্দের বানান যা করা হয়েছে তাতে আগের শহীদেরা যে কারণে মরেছে এই বানানে সেই শহীদেরা সেই কারণে মরেছে কি না এ নিয়েও কিন্তু সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। বাঙালি কী? আমরা একটি ভাষাভিত্তিক জাতি। এই ভাষাকে কেন্দ্র করেই তো আমরা এতদূর এসেছি। তো ভাষা নিয়ে তো সরকারিভাবে আইন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কোনো ব্যাপার নাই। এটি একটি জনপ্রবহের ব্যাপার, এটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে, মানুষের নতুন চিন্তার উদ্ভবের সঙ্গে, নতুন ভাষা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সেগুলো হয়। কিন্তু একটি প্রচলিত ভাষা যেভাবে প্রবাহিত হচ্ছে, সেখানে যদি আমরা দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন এসব যদি নতুন করে লাগাতে থাকি তাহলে জানি না শেষপর্যন্ত এই ভাষার অবস্থা কী দাঁড়াবে। এবং এই বাঙালি বানানের মধ্যেও ব্যাপারটা সেই রকমেই রয়েছে। তো কাজেই বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি আমরা এখানে যে কয়জন বসে আছি আমরা সবাই বাঙালি। তো আমাদের চোখে কারা শ্রেষ্ঠ বাঙালি বোধহয় উদ্যোক্তারা এই রকম একটা মনোভাব নিয়ে করেছিলেন। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে, আমার মনে হচ্ছে এই উদ্দেশ্য বোধহয় সফল হবে না। আর দ্বিতীয়ত কথা আমরা কোনো ডিবেটিং সোসাইটিতে বসি নাই। বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আমরা লিপ্ত হই নাই। আসলে আমরা বিষয়গুলোকে কে কীভাবে বুঝতে চাই সেটাই বড়ো কথা। আপনারা বাঙালির কথা বলছেন, রবীন্দ্রনাথ বাঙালির শ্রেষ্ঠ কবি, সবই ঠিক আছে। সেই রবীন্দ্রনাথ তো বলেছেন, ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ কর নি।’ কেবলমাত্র একটি ব্যতিক্রম তিনি করেছেন বিদ্যাসাগরের বেলায় তিনি বলেছেন—‘বিশ্বকর্মা বাঙালি গড়িতে গড়িতে ভুল করিয়া একটি মানুষ গড়িয়া ফেলিয়াছে।’ আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাঙালি ছিলেন। সব ঠিক আছে, শেষ বয়সে তাঁর কী হয়েছিলো। শিক্ষিত বাঙালিদের পরিত্যাগ করে তিনি সাঁওতাল পল্লিতে গিয়ে অশিক্ষিত মানুষ যাদের মধ্যে বলা যায় যে এই পাপ তাপ দুর্নীতি প্রতারণা শিথিল আছে সেই সমস্ত মানুষের মধ্যে দিয়ে তিনি শেষজীবন কাটিয়েছেন।

হা. আ : মতিন, ও মতিন আমি তোমার কাছে আবার আসবো। এখন আমরা একটু রুহুল আমিন প্রামানিকের কাছে যাই। রুহুল আমিন প্রামানিক সবাই তাঁকে চেনেন। রাজশাহী শহরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

রুহুল প্রামানিক : চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলার এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটা আড্ডাতে আমরা সমবেত হয়েছি। যে আড্ডাটা উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কদের আড্ডা বলে মনে হচ্ছে আমার। শুধু মঞ্চে উপবিষ্টরাই জ্যোতিষ্ক তা নয় দর্শক শ্রোতার মাঝেও বিশ্ববাঙলার জ্যোতিষ্করাও আছেন। বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি। পাঁচজনকে আপনারা এখানে উপস্থাপন করেছেন। আজ থেকে হাজার বছর আগে একজন বাঙালি কবি ভুসুকুপা হঠাৎ করে বললেন— ‘আজি ভুসুকুটু বাঙালি ভইলী’ আজকেই ভুসুকু তুমি বাঙালি হলে। কার্য-কারণটা কী। তিনি দেখলেন সমস্ত ভেদ-বিভেদের ঊর্ধ্বে তিনি উঠে গেছেন। তার চিন্তার ক্ষেত্রে, দর্শনের ক্ষেত্রে, অনুভব-উপলব্ধির ক্ষেত্রে তিনি এমন একটা ঊর্ধ্বে অবস্থান করছেন যেখানে নিজেকে বাঙালি বলছেন। ইমানুল হক বললেন যে বাঙালি কে? তিনি বাঙালির কিছু চরিত্রের কথা বলেছেন। যেমন ধরা যাক বাঙালিরা নিজের নাম রাখে গেদা-পেদা কিন্তু গোরুর নাম রাখে ধবলি, সোনামুখি। গ্রামের নাম রাখে সুবর্ণগ্রাম। ছাগলের নাম আরও সুন্দর। তো এই বাঙালি তার ছাগল মরে গেলে গোরু মরে গেলে রোযা রাখে। এই তো বাঙালি। বাঙালি আজ থেকে সারে তিনশো-চারশো বছর আগে লেংটিপড়া ছলিমুদ্দি—কলিমুদ্দি-জগাই-মাধাই-আম্বর আলী-তাম্বর আলী-গরীবুল্লাহ-তরীবুল্লাহ এরা সবাই বলছে— সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। তখন পৃথিবীর অবস্থাটা কোথায়। তখন ধর্ম নিয়ে মানুষ মারামারি করছে। তখন লেংটিপড়া এ মানুষগুলো বলছে সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। এই বাঙালি যে নিজেকে ছাড়িয়ে যায়। নিজের সীমাকে অতিক্রম করে। যে পাঁচজন বাঙালিকে এখানে দেওয়া হয়েছে। এ পাঁচজন বাঙালি নিজেকে তো গেছেনই এবং নিজ জীবন ও কর্মে মানব মহিমার গান তাঁরা গেয়েছেন। সবচেয়ে বড়ো কথা এ পাঁচজন বাঙালিই শুধু নয় আরও অনেকে এখনো অনাবিষ্কৃত। ঈশ্বরচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, রামমোহন রায় সবাই। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করার চিন্তাটা রামমোহন রায়ের মাথায় প্রথম এসেছিলো। পৃথিবী পরিবর্তন হচ্ছে জাতিসংঘ তৈরি করতে হবে। এই রামমোহন রায় শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এই শ্রেষ্ঠ বাঙালিরা একে-অপরে কেমন—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা গান আছে—‘হার মানা হার পরাবো তোমার গলে’ মানুষের মধ্যে যখন হার ন্যাচার দেখা দেয় তখন মানুষ শ্রদ্ধা অবনত হয়ে তাকে কদমবুচি করে বসে। এইখানে যাঁরা আছেন আমি সবাইকে শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে কদমবুচি করি। সেলিনা হোসেন আমার নেত্রী। তিনি আমাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই যে এখানে শহীদ মিনার। প্রথম শহীদ মিনার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এখানে হয়েছে। এখানে আপনারা শ্লোগান দিয়েছিলেন। ‘শহীদ মিনার ডাক পাড়ে আয় আয়।’ এই শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা করার পেছনে সেলিনা হোসেনের অবদান আছে। রামমোহন বিদ্যাসাগরকে প্রণতি জানায় বিদ্যাসাগর রামমোহন রায়কে প্রণতি জানায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো নিজেই মহামানব ছিলেন। তারপরেও মহামানবের চিন্তা করছেন— ‘ঐ মহামানব আসে’। এই যে ব্যাপারটি মানব মহিমাকে সবসময় ঊর্ধ্বে তুলে ধরছেন। যে কারণে বাংলাদেশের কবিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কবিতা রচনা করছেন—‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌড়ী যমুনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’। আর এক কবি বলছেন— ‘আমি আর কিছু হব না মাগো মানবাদর্শের প্রতীক হবো/ মুজিব হলে মানুষ হবো/ মানুষ হলে আমরা সবাই বিশ্বমানব বাঙালি হবো।’

হা. আ : রুহুল আমিন আমরা আবার যাবো আপনার কাছে। আমরা তো পারস্পরিক আলোচনা করতে চাই। সময়টা তো আমরা নির্দিষ্ট করে দিয়েছি। আর বিষয়টাও তো নির্দিষ্ট। পাঁচজনের নাম ধরে হয়তো হয় না। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন প্রকৃতিতে কোনো সুপারলেটিভ নেই। এটা তো বটেই। সেটা তো কোনো কথা নয়, কথা হচ্ছে যে আজকে আমরা দিয়েছি পাঁচজনকে, তুলনামূলক বিচারই হবে। নিজেরাই তো স্বয়ংসম্পূর্ণ বৃত্ত। হোক আমরা এ মানুষদের তুলনামূলক কথাবার্তা বলবো। আমরা আবার আনিসুজ্জামানের কাছে শুনবো।

আ : বাঙালি কে এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা রবীন্দ্রনাথের কথা উল্লেখ করব যে আমরা বাংলা ভাষা বলি বলে আমরা বাঙালি, আমরা এই ভূখণ্ডে বাস করি বলে বাঙালি। তো এটি বাঙালির সংজ্ঞার্থ।

স. সা : যারা বাংলায় কথা বলেন তারাই বাঙালি। কখন বাঙালি? আজকে যারা বাংলায় কথা বলেন তারা বাঙালি? কতো বাঙালি বিদেশে স্থায়ীভাবে সেখানে নাগরিকত্ব নিয়েছে তাদের আমরা কী বলবো? আমরা এটা ছাড়া যখন বাঙালির কীর্তি নিয়ে কথা বলতে চাই তাহলে যে অংশে আমরা আছি বাংলাদেশ সেটিকে মনে রেখে বলবো নাকি সমস্ত বাংলাভাষী যে যেখানে আছে তাদেরকে মনে রেখে কথা বলবো। দ্বিতীয়ত বাংলা ভাষাকে অবলম্বন করে যখন কথা বলতে যাই তখন সেই বাংলা ভাষার যে পরিবর্তন ক্রমাগত ঘটে চলে সেটাকেও আমরা খেয়াল করি এবং এ পরিবর্তন কখনো অনর্থক হয় না। পরিবর্তনগুলো হয় তাদের কাজের প্রক্রিয়া বদলায়, মানুষের কাজের প্রক্রিয়া বদলায় এবং প্রযুক্তির ধারণা বদলায়। আজকে যে নতুন প্রযুক্তিতে যেভাবে নিজেদের ভাষাকে নিজেকে প্রকাশক্ষম করার জন্য আমরা ভাষার ওপরে নানারকম কারিগরি করছি, সেটা একসময় আজকের চেহারা থেকে সেটা হয়তো একশো বছর পরে অন্য চেহারা নেবে এটাকে ঠেকানো যাবে না। সেই পরিস্থিতিতে আমরা বাঙালি যদি বলি তাহলে তার পরের প্রশ্ন আসবে বাঙালি বলে কি আমরা নিজেদের সংকীর্ণ করছি, না নিজেদের বিকশিত করছি? একটা সময় বাঙালি বলাতে আমরা বিকশিত হয়েছি তারপরে আমরা কী?

হা. আ : সনৎ আর কোনো কথা। ইমানুল শ্রেষ্ঠ বাঙালি, তার বাইরে যাওয়া যাবে না।

ই. হ : আমি জানতাম যে দ্বিতীয়বার আসবে। একটা প্রাক্কথন থাকবে। একবারে বলাটা শেষ হবে না। রামমোহন রায়ের কথা সেলিনাদি বলেছেন, যে সতীদাহ প্রথা নিবারণ। এটা ছাড়া আর একটি বড়ো কাজ তিনি করেছেন বলে আমার ধারণা। সেটা হচ্ছে যখন মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন ১৪ বছর বয়সে। তাঁর বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে এই কারণে তাঁকে বিতাড়িত হতে হয়। তিনি মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। মাদ্রাসা শব্দটি এখন গালাগাল। আপনাদের এখানে কী জানি না। তো মূর্তিপূজার বিরোধিতা করে তিনি একেশ্বরবাদের ধারণা এনেছিলেন। যেটা হিন্দু মিথ বা উপনিষদের ধারণা, বেদের যে ধারণা, এই মূর্তিপূজা বেদে ছিলো না। তিনি যে বৈদান্তিক মত করেছিলেন এবং পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কঠিন বাংলা ভাষায় লেখাচর্চা করেছিলেন এবং তার জন্য তিনি তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার হতে পারেন বলে আমার ধারণা শুধু সতীদাহ প্রথা নিবারণ বলে না। কারণ সতীদাহ ছিলো কেবলমাত্র তথাকথিত উচ্চবর্গ এবং উচ্চবর্ণের সমস্যা। খেটে খাওয়া মানুষ যাদের আমরা নি¤œবর্গ বা সাবলটার্ন বলছি তাদের মধ্যে ছিলো না। উচ্চবর্গের বা ব্রাহ্মণ্যবাদের সমস্যাকে আমরা আমাদের প্রধান সমস্যা বলে বারবার চিহ্নিত করেছি বলে সমস্যাগুলো আমাদের ওখানে তৈরি হয়। আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যিনি বর্ণপরিচয় লিখেছেন এছাড়াও আমি বলবো বাঙালিকে চিন্তার দিক থেকে অনেক এগিয়ে নিয়েছিলেন। এখানে একটি শব্দ উচ্চারণ হয়েছে ‘ঔপনিবেশিক’। দেখবেন আমরা যারা সরকারি চাকরি করি তারা প্রচুর ঝামেলার মধ্যে থাকি। তো তিনি একটা সরকারি চাকরি করতেন। তাঁকে তাঁর পরিধির মধ্যে থেকে একটি ছেলে গ্রাম থেকে উঠে আসা যে ভালো করে বাংলা বলতে পারে না মেদেনীপুরের বাংলা বলে। তাঁকে ব্রাত্য করে রাখা হয়। তাঁর চেহারার জন্য এবং সব মিলিয়ে। সেই ভদ্রলোকে প্রথম যে শব্দটা অনুবাদ করেন সেটি হচ্ছে ‘ঔপনিবেশিক’। যিনি রেভ্যুলেশনের বাংলা অনুবাদ করেছেন রাজবিপ্লব। যিনি বর্ণপরিচয় শুরু করছেন ‘কর’ ট্যাক্স হতে পারে আবার কাজ করা হতে পারে। ‘খল’ তামাশা। বাঙালির জীবনে নিশান ছিলো বা ভারতীয়র জীবনে নিশান ছিলো, পতাকা ছিলো না। তিনি পতাকা শব্দের অনুবাদ করেছিলেন। রাম হচ্ছে আমাদের খুব পবিত্র শব্দ। বাঙালি কিন্তু বড়ো নাস্তিক জাতি। রামকে নিয়ে তারা রামখচ্চর, রামপাঠা। গোটা ভারতশুদ্ধ বলে ‘রাম তুমি কালি বলে গোলমাল করিয়াছিলে।’ এবং যিনি বইকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বই কেনাকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং গল্পে আছে তিনি ১০ টাকা দিয়ে ঘড়ি সোনা দিয়ে বাঁধাবেন না বই বাঁধাবেন। কোনটা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষা ছাড়া এই শিক্ষা বলতে আমি শুধু ডাটাকে বুঝি না। প্রজ্ঞাকে বুঝি, যেটা যিশুর ছিলো, রামকৃষ্ণের ছিলো যাঁরা সেই অর্থে শিক্ষিত লোক। তিনি প্রজ্ঞাকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলেন। একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ যিনি আমাদের শিক্ষিত করতে শিখিয়েছিলেন। এই সিপাহী বিদ্রোহের কথা উঠেছে, তিনি সংস্কৃত কলেজ ছেড়ে দিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু দু’জন ব্যক্তি টাউন হলের সংবর্ধনা সভায় যোগ দেন নি। কালীপ্রসন্ন সিংহ ব্যঙ্গ করেছিলেন বটে কিন্তু তিনিও গিয়েছিলেন। দু’জন ব্যক্তি যোগ দেননি একজন হচ্ছে মাইকেল মধুসূদন দত্ত আর একজন বিদ্যাসাগর। একজন সরকারি কলেজে চাকরি করা লোকের সেখানে হাজির না হওয়া মানে রীতিমত শ্লাঘার পরিচয় দেওয়া। এই সেই মানুষটি যিনি সমান অধিকার দাবি করেছিলেন যে যদি আমাকে ইংরেজদের সমান বেতন দেওয়া হয় তবেই আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে চাকরি করবো নাহলে নয়। তারপরে তিনি কলকাতা ছেড়ে কারমাটরে চলে যান। যিনি তথাকথিত আর্য ও অনার্য। আর্য-অনার্য ইংরেজি হয় না। কেননা আর্য একটি ভাষাগোষ্ঠীর নাম। বাকীরা অনার্য, এই শব্দটা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের ধারণা। তিনি বলেছিলেন এই তথাকথিত আর্যদের চেয়ে অনার্যরাই আমার কাছে শ্রেয়তর এইভাবে বলেছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে। এই যে সাংস্কৃতিক একটা লড়াই শুরু করেছিলেন একজন ব্রাহ্মণ বংশে জন্ম নেওয়া ব্রাহ্মণ্যবিরোধী চিন্তার জন্যে তাকে আমি শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপায় আনতে চাই। একজনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যিনি বাঙালিকে এক হাজার বছর এগিয়ে দিয়েছেন। আমাদের কবিতা, আমাদের গানে, আমাদের লেখায়। কিন্তু আমাদের জীবনে কী কোথাও আছেন। আমি তো পশ্চিমবাংলায় যারা পড়ান বা লেখালেখি করেন তাদের শতকরা ৯০ ভাগের ছেলে-মেয়েরা কিংবা নাতি-নাতনিরা বাংলা মাধ্যমে পড়ে না। আমাদের জীবনে রবীন্দ্রনাথ আছেন শুধু পঁচিশে বৈশাখে। আমাদের কবিতা-গান শ্লাঘা পোষণ ছাড়া, আমাদের গর্ব বাড়ানো ছাড়া। আমার নিজের অহংকার বা আত্মমর্যাদাবোধে কী রবীন্দনাথ আছেন? আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমি একটু এগিয়ে রাখবো। হেগেল বলেছিলেন যে ‘যিনি জাতিরাষ্ট্র গড়তে পারেন’। এরা কিন্তু কেউ জাতিরাষ্ট্র গড়েন নি, স্বপ্ন দেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু জাতিরাষ্ট্র গড়েছিলেন। সেই কারণে তিনি কিন্তু এককদম আগে এগিয়ে থাকবেন। কারণ তিনি বাঙালি জাতিকে গোটা পৃথিবীর কাছে, আমরা যে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারি, একুশে ফেব্র“য়ারি সব মিলিয়ে জাতিরাষ্ট্র দিয়েছিলেন।

হা. আ : আমরা পারলে আপনাদের অপার সময় দিতাম। দরকার হলে এক এক জন এক-দেড়-দু’ঘণ্টা ধরে বলতে পারতেন। শেষ তো নাও হতে পারে। কিন্তু আমরা তো একটা আলোচনায় নেমেছি, সবাই তো একটু একটু করে কথা বলবেন। সবাই আলো ফেলবেন। কেউ এই কোণায় ফেলবেন কেউ ঐ কোণায় ফেলবেন, কেউ মাঝখানে আলো ফেলবেন, কেউ নিচে আলো ফেলবেন। সবাই তো আলো ফেলবেন। আর সেই কারণে সময়টা বেঁধে দিচ্ছি। কারণ আমি জানি কথা বলতে গেলে এভাবে আটকাতে নেই মানুষকে। কিন্তু তবু আমাদের আটকাতে হয়। আর বারে বারে প্রশ্ন উঠছে যে এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে? শ্রেষ্ঠত্বের কোনো সংজ্ঞা নেই। এরা পরস্পর পরস্পর থেকে এতোই বিচ্ছিন্ন এবং আলাদা এক এক জন মানুষ যে প্রত্যেকেই তার নিজের বৃত্তের মধ্যে বিচার করার দরকার আছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের তুলনা হয় না। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখনো আমি মনে করি যে বাংলা ভাষার সৃষ্টির কাজটা কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাতে করা। আলালের ঘরের দুলাল বা ঐ সময়ের লেখাগুলো নয় আর কী। আমাদের একজন খালি গায়ে পৈতাধারী মোটাসোটা মাস্টারমশাই ছিলেন। সেই মাস্টারমশাই বলতেন বিশুদ্ধ বাংলা শিখতে চাস তাহলে বঙ্কিমচন্দ্র পড়িস না, বঙ্কিমচন্দ্রে ভুল আছে। পড়বি কেবল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ইনিই একমাত্র খাঁটি বাংলা লিখেছেন। আর বাকীরা এই শরৎ-টরৎ ঐসব পড়তে হয় না। এই তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমন্ধে। আমাদের এতেই শিক্ষা। আমরা তখন থেকেই ‘এই সেই জনস্থান মধ্যবর্তী…। তা ওরকম বাংলায় তিনি লিখেছেন। ভ্রান্তিবিলাসর অনুবাদ করেছেন। মহাভারতর অনুবাদ শুরু করেছিলেন। কম কাজ তিনি করেন নি। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো শেখালো কে? বর্ণমালা না শিখলে কী করে বাংলা বাগে আনতাম। এই বর্ণমালা তৈরি করা। পরবর্তীকালে দ্বিতীয়ভাগ বানান শেখানো। কাজেই ঈশ্বরচন্দ্রের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মুশকিলে ফেলে দেয় যখন রামমোহন রায়ের সাথে তুলনা করে। ভারতপথিক রামমোহন রায়। আর নীরদ চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো পাঁচজন শ্রেষ্ঠ বাঙালির নাম বলুন, তিনি বিদ্যাসাগরের নাম বলেননি আর কার কার নাম বলেছিলেন। আপনি বিদ্যাসাগরের নাম বললেন না। তিনি বললেন বিদ্যাসাগর বাঙালি ছিলেন না। অর্থাৎ বাঙালির যে পরিচয় আমাদের রুহুল আমিন বললেন কিন্তু কোথাও কোথাও হয়তো এইসব খারাপ শব্দও শুনতে পাবেন অতিশয় বজ্জাত জাত হলো এই বাঙালি। বাঙালি জাতি, জাতি হিসেবে কী না এটা ওভারলুক করা যায় না আর কী। বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি প্রায় শেষ করে দেব এবার। আর একবার সনৎ বলুন না। মতিন বলো। নির্দিষ্ট করে কথা বলো।

জু. ম : এখানে কিছু কথা উঠেছে তো এটা ডিবেটিং সোসাইটি না সেটা আমি আগেই বলেছি। কিন্তু তারপরেও আমার মনে হয় এই যে বাঙালিত্ব, জাতীয়তা, স্বাধীনতা, পরাধীনতা, গণতন্ত্র, সংসদীয় গণতন্ত্র, এই যে বিষয়গুলো এগুলো তো আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক পরে। এবং এটা বলা হয় যে সিপাহী বিদ্রোহের পরে অর্থাৎ সেপাহী বিদ্রোহ হলো ভারতবর্ষের সর্বশেষ সশস্ত্র বিরোধিতা ইংরেজদের বিরুদ্ধে। ফকির সন্ন্যাসী থেকে শুরু করে, সাঁওতাল থেকে শুরু করে, নানকার, ফরায়েজী বিদ্রোহ যাই বলি না কেনো ওহাবী বিদ্রোহ। তো আসলে এটা দেখা যায় যে সেপাহী বিদ্রোহে সবাই কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত বাঙালি যারা ছিলেন তারা এটা সমর্থন করেন নি। বিদ্যাসাগর সম্পর্কে আমার যেটা তথ্য সেটা হলো যে সিপাহীরা এসে তারা একটা স্কুল ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন কিন্তু তিনি তাদের থাকতে বাধা দেননি। প্রকাশ্যভাবে সিপাহী বিদ্রোহের সমর্থন তখনকার শিক্ষিত বাঙালিরা করেছিলো বলে তো মনে হয় না। অথচ তার দু’বছর পরেই যখন নীল বিদ্রোহ হলো তখন কিন্তু কলকাতাকেন্দ্রিক এই বাঙালি ভদ্রলোকেরা খবরের কাগজ চালাতো হরিশ মুখার্জী এরা সবাই কিন্তু নীল বিদ্রোহে সমর্থন করেছিলো। আসলে জাতীয়তার যে ধারণা, পরাধীনতার যে ধারণা যেটা আমরা ইংরেজি শিক্ষা, ইউরোপীয় শিক্ষা থেকে আমরা পেয়েছি। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন এই জিনিসগুলো ১৮৫৮ সালের আগে আমাদের জীবনে ছিলো না। কাজেই ঐ সময়ের মানুষদের যদি আমরা সেই ছকে ফেলে বিচার করতে যাই তাহলে আমার মনে হয় কিছু সমস্যা হতে পারে আর কি। তো কাজে কাজেই মানুষের যে চলার গতি, সমাজপ্রবাহ সেটা তো থেমে থাকে না। এখন জন্মগ্রহণ করার সাথে সাথে একটা লক্ষ্য নির্ধারিত হয় না। ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরেই কংগ্রেস বলে নি যে আমরা ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চাই। পূর্ণ স্বাধীনতা চাইতে তাদের ১৯৩০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। যে মুসলিম লীগের কথা বলা হয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা যারা এদেশে করেছে এই মুসলিম লীগও তো ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেই বলে নি যে আমাদের পাকিস্তান দরকার। ১৯৪০ পর্যন্ত তাদেরও অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। অর্থাৎ বিভিন্ন পর্যায়গুলো। পাকিস্তান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১৯৪৭ সালে তো বাঙালিরা বলে নাই যে আমরা যুদ্ধ চাই, আমরা মুক্তিযুদ্ধ চাই, ভাষা-আন্দোলন যার মধ্য দিয়ে শুধু ভাষা নয় গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলন ঘটেছিলো। তারই পর্যায়ক্রমে এগোতে এগোতে একেবারে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ এসেছিলো। কাজেই এই সমস্ত পর্যায়গুলো বাঙালির একটা বিষয়। তো ঠিক আছে আমাকে মাফ করে দেন না হয় আপনাদেরই মাফ করে দিলাম।

হা. আ : আমি কিন্তু লক্ষ রাখছি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন শিক্ষক এবং ছাত্র উঠে পালাচ্ছে। কী আলোচনা ভালো লাগছে না? এই একটা মুশকিল ধরে বেঁধে আলোচনা শোনানোটা এখনো চালু হয় নি। সবাই চলে যাচ্ছে এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনা হচ্ছে। এখানে যারা উপস্থিত আছেন অন্তত আমাদের সামনে মহিলারা যখন ওঠে নি তখন আপনারা উঠবেন না। আচ্ছা শ্রেষ্ঠ বাঙালি সম্পর্কে আরো কিছু আলাপ আলোচনা হলো বোধহয় ভালোই হয়।

ই. হ : একটা বিষয় নিয়ে হাততালি দিলেন তরুণ ছাত্ররা। হাততালিতে রবীন্দ্রনাথ খুব বিরোধী ছিলেন আমি তা বলতে চাচ্ছি না। শহীদ শব্দটাতে ‘ই’ বা ‘’ি করাতে  মতিন ভাইয়ের মনে হয় খুব আপত্তি আছে। এখানে আনিসুজ্জামান আমাদের খুব মনীষা ব্যক্তিত্ব, হাসান আজিজুল হক, সেলিনাদি, প্রফেসর সনৎকুমার সাহা পণ্ডিত মানুষ ওনাদের সামনে কথা বলা। আমরা বোধহয় খুব রক্ষণশীল হয়ে যাই। পুরোনো যা ছিলো সেটাই, পাখীকে পাখি বলতে হবে। অনেক সময় ধর্ম ধম্ম লিখতে হবে কারণ বঙ্কিম তাই লিখেছিলেন বিদ্যাসাগর তাই লিখেছিলেন। সর্ব সব্ব লিখতে হবে, সূর্য এর পরে ব ফলা দিতে হবে ভয়ংকর ব্যাপার হয়ে যাবে। সুতরাং বাঙালির জীবন অনুযায়ী করতে হবে। অতগুলো (শ,ষ,ষ) থাকার দরকার নেই। অতগুলো (ন,ণ) থাকার দরকার নেই। আর দয়াকরে সংস্কৃতের মধ্যে আমাদের ঢুকাবেন না। মতিন ভাইকে আমি এই অনুরোধটি করবো। আর আমি ধন্যবাদ দেবো আমরা ওপার বাঙলা থেকে এসেছি। পায়রা ওড়ানো থেকে শুরু করে সবকিছু। আমাকে শামসুজ্জামান খান সাহেব বলেছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটা দেখবেন। তো বাঙালিদের মাথা যারা উঁচু করে দিয়েছেন গোটা পৃথিবীতে, মাতৃভাষার জন্য। কারণ ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারে। সেই জন্য জাতিরাষ্ট্রের ধারণা এই কারণে আর একবার গর্বিত হওয়া উচিত। আর চিহ্ন পত্রিকা তারা একটা চিহ্ন রাখলো। এই যে মনীষা ব্যক্তিদের এক জায়গায় হাজির করা আমি জানি না ইতিহাসে একটা সাক্ষ্য থাকলো। আমাকে বাদ দিয়ে এই ধরনের ব্যক্তিদের একখানে হাজির করা কিন্তু একধরনের চিহ্ন। সে অর্থে বিশ্ববাঙলাও বটে।

হা. আ : সেলিনা কিছু বলতে চেয়েছিলেন । এখন কিছু তথ্য এবং সেইসঙ্গে কিছু কথা বলবেন।

সে. হো : আমি যেটা বলতে চাচ্ছিলাম যে ১৯৫২ সালে আমরা বাংলা ভাষার জন্য যে আন্দোলন করেছিলাম, জীবন দিয়েছিলাম যেটা আজকে ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কিন্তু আমাদের পাশাপাশি আসাম রাজ্যে বাংলা ভাষার জন্য জীবনদান করা আর একটি ঘটনা আছে। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, আমরা যখন বাঙালির কথা বলছি আমাদের পাশ্ববর্তী ভারতের রাজ্য আসাম শিলচর যেটাকে বরাক উপত্যকা বলা হয়। ১৯৬১ সালে আসাম রাজ্য তারা অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের ভাষা করেছিলো। কিন্তু প্রতিবাদ করেছিলো বাঙালিরা, বরাক উপত্যকার বাঙালিরা ১৯৬১ সালের ১৯ মে তাদের উপর মিছিলে গুলিবর্ষণ হয় শিলচর রেলস্টেশনে মারা যায় ১১ জন। ১০ জন ছেলে ১ জন মেয়ে। এটাও আমরা মনে করি বাঙালির ভাষা আন্দোলন এবং বাংলা ভাষার জন্য দুটো জায়গায় জীবন দান এবং এটি বিশ্বের জন্য অসাধারণ ঘটনা। এবার এক মিটিং-এ বাঙালিদের আসাম রাজ্যের যে কথাটি বলবো সেখানে তিন ধরনের বাঙালি পেয়েছি। আমি জানুয়ারি মাসে আসামের একটা সাহিত্য সম্মেলনে গিয়েছিলাম। ওখানে এয়ারপোর্ট থেকে চার ঘণ্টা দূরে একটা সম্মেলন হয়েছিলো মানিকপুর একটা গ্রামের মধ্যে। যে গেস্টহাউসে আমাদের রাখা হয়েছিলো সেখানে এক কেয়ারটেকারকে আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনার নাম কী? তিনি বললেন আযাদ হোসেন। আমি গড়িয়া বাঙালি। আমি একটু খটকা খেলাম যে গড়িয়া বাঙালি কী? আমি তাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করি নি। তারপরে সম্মেলনে একজন কবি ছিলেন মীনাক্ষি তাকে জিজ্ঞেস করলাম গড়িয়া বাঙালি কী? বলে যে আসাম রাজ্যে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে তাদেরকে গড়িয়া বাঙালি বলা হয়। মড়িয়া বাঙালি বলে আওরঙ্গজেবের সময় আসামে যে যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছিলো এবং পরাজিত সৈনিকরা থেকে গিয়েছিলো তারা এখানে বিয়ে করলো তার পরের যে জেনারেশন তাদেরকে মড়িয়া বাঙালি বলা হয়। আর একটা হলো পরিয়া বাঙালি। যারা পূর্ববঙ্গ থেকে আসামে গিয়েছে। চার জন লোক আমাকে বললো আমার বাবার বাবা অনেক আগে এসেছে প্রায় দু’শ বছর আগে। তো আমি যখন এ প্রশ্নটি করলাম যে দু’শ বছর আগে এসে তারা আবার আলাদা বাঙালি হলো কেনো? তখন বললো পূর্ববঙ্গ থেকে আসা তাই স্থানীয় বাঙালি না। সুতরাং আজকে আমরা বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কথা বলছি বাঙালির এই বিভাজনকেও আমাদের মনে রাখতে হবে।

হা. আ : বাঙালি পৃথিবীর সব জায়গায় আছে। লোকে বিরক্ত হয়ে যায় বাঙালি দেখতে দেখতে। সব জায়গায় বাঙালি আছে আর বিশেষ করে এই যে আগরতলা, ত্রিপুরা এই রাজ্যটি আর কি, এখানে অর্ধেকের বেশি বাঙালি। বাঙালি অধ্যুষিত। আছে, অন্য ভাষাভাষীও আছে। এরকম যদি বাংলা করে বলা যায় তাহলে ত্রিশ কোটিরও বেশি লোক বাংলা ভাষা ব্যবহার করে। পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে যেখানে এতো মানুষ একটি ভাষাতে কথা বলে। ইংরেজি হিন্দি এর কথা বাদ দেই। বাকী সবই হলো মরা ভাষা। আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলো যে বাংলা ভাষা কি টিকবে? তো আমি সেখানে একটাই কথা বলেছিলাম এই অবান্তর প্রশ্নটি আমার সামনে করবে না তোমরা। বাংলা ভাষা টিকবে না তো কোন ভাষা টিকবে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার এই রাষ্ট্রগঠন, রাষ্ট্রের জায়গা এসব জায়গা থেকে দেখলে সন্দেহ হয় যে ভাষাকে আমরা কি সত্যি সত্যি ভালোবাসি? এটা মনে হয়। যাই হোক এ ভাষার ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন রামমোহন রায়। থাকলে একটু পড়ে শোনাতাম আপনাদের যে, ‘এই স্থানে ইহা দৃষ্ট হয় যে যদি কেহ বিষ ভক্ষণ করে তাহলে অবশ্যই তাহা তাহার ক্রিয়া প্রকাশ করিবে।’ আর বাক্য সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত না বাক্যে সমাপিকা ক্রিয়াকে না দিয়েছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তাহার অর্থ করিবার প্রয়াস পাইবেন না।’ রামমোহন রায় লিখেছেন। তো এই বাংলা, কঠিন বাংলা। আমাদের আলালের ঘরের দুলাল-এর কথা বলতে হয়, আমরা কিন্তু এ মানুষটাকে শ্রদ্ধা করি না। খাঁটি বাংলা বিশেষ করে কলকাতার আশেপাশে যে বাংলাগুলো ব্যবহার করা হয় ঠকচাচার মুখে বা অন্যদের মুখে অসাধারণভাবে করেছে আর একজন লেখক হুতোম প্যাঁচার নক্শার কালীপ্রসন্ন সিংহ এগুলো পড়লে বাংলা ভাষার প্রাণের স্বাদ পাওয়া যায়। তো এই ভাষা এর সূত্রপাত নিয়েও কিছু কথা হয়েছে। রুহুল আমিন বলেছেন। আলোচনাটা আর এখানে বাংলা ভাষা নিয়ে করা যাবে না। আমরা শেষ করবো। আমাদের ১টার মধ্যে শেষ করতে বলা হয়েছিলো। কাজেই আমার মনে হয় ১টায় যদি নাও যাওয়া যায় তাতে কোনো ক্ষতি হবে না মনে হয়। আর মীমাংসাটা কী হলো? অমীমাংসিত থেকে গেলো। কেননা পৃথিবীর কোনো জিনিসের শেষ নিষ্পত্তি হয় না। সে জন্য বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি রামমোহন রায়ও বটে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও বটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বটে। এক একজনের কাছে এক এক রকম করে পেয়েছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে যা পেয়েছি তা তো রামমোহন রায়ের কাছে পাই নি। আর রামমোহন রায়ের কাছে যা পেয়েছি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর থেকে অনেক উপরে কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রেষ্ঠ-অশ্রেষ্ঠ আমি কিছুই জানি না। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বেঁচে থাকা যাবে না। বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাঁচবে না। সোজা কথা। বাঁচা বলতে অনেক মানে আছে। মানুষের বাঁচা, গোরু-ছাগলের বাঁচা, গাছপালার বাঁচা নানা রকম বাঁচা আছে। কিন্তু মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে গেলে বাঙালি কখনো রবীন্দ্রনাথকে ছাড়তে পারবে না। তাঁকে শ্রেষ্ঠই বলা হোক আর নিকৃষ্টই বলা হোক। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তিনি কাজ করেছেন। তিনি বেশ রসিক মানুষ ছিলেন। তাঁর ছেলের নাম ছিলো মূর্তজা বশির। ঊ ( ূ) কার দিয়ে লিখতেন বলে বলতো তুমি কী মূর্খ? আর একবার একজন গিয়ে বলছেন মূর্তজা বশির আছে শহীদুল্লাহ্ সাহেব গম্ভীর হয়ে বলেছেন এখানে মূর্তজা বশির থাকে না। এখানে যে থাকে তার নাম বশিরুল্লাহ। অর্থাৎ মূর্তজা বশিরের বাবার দেওয়া নাম হলো বশিরুল্লাহ। কাজেই উনি মূর্তজা বশির নামটা স্বীকারই করেন না। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা বাংলাদেশের এই রাষ্ট্রটির পৃথিবীর মানচিত্রে যে এর ঊত্থান ঘটলো এইটার প্রধান কারিগর তিনি আর কি। তিনি এর স্থপতি। সেজন্য তাঁর প্রতি আমরা শ্রেষ্ঠত্ব তো দূরের কথা সবই দেই তাঁকে। শুধু শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আবেদনকে কিছু বোঝানো যাবে। কারণ বঙ্গবন্ধু খুব যে বাংলা ভাষা জানতেন লিখতেন এসব তো নয়। তবে নানান কারণে আমরা এদের পাঁচজনকে সামনে নিয়ে এসেছি। এবং আমাদের কাছে সর্বশেষ কথাটি কী হলো বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি যে পাঁচজন আছে এঁরা সকলেই শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এঁদের মধ্যে আমরা তুলনা করতে পারলাম না। তবে এঁদের কার্যকলাপে আমরা আলাদা আলাদা বিবরণ তৈরি করতে পারি এবং তখন বুঝতে পারি কে কোথায় কাজ করেছেন। আমার মনে হচ্ছে এইবার আপনাদের বোধহয় ছেড়ে দেয়া যায়। এই আড্ডার সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো এবং সেই সাথে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানানো হলো। যারা অংশ নিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
[অনুলিখন ও পরিমার্জন : সৈকত আরেফিন ও সুবিদ সাপেক্ষ]

চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙ্গলা ২০১৬

আড্ডাসঙ্গী  ইমানুল হক
কলকাতা ॥ পশ্চিমবঙ্গ ॥ ভারত

চিহ্ন: আপনি কবে থেকে লেখালেখিতে আসেন?
ই. হক: আমি ক্লাস এইট থেকে সাংবাদিকতা করি, তখন কিশোর পত্রিকাও করতাম, সেখানে কবিতা লিখতাম, আমি ক্লাস সিক্স থেকে রাজনীতি করি, আমার রাজনীতির শুরু হচ্ছে আমি আমার বাবার বিরুদ্ধে স্ট্রাইক করেছিলাম, তখন সিক্সে পড়ি, বাবা ছিলেন স্কুলের সেক্রেটারি, তাছাড়া কয়লা খনির শ্রমিকদের নিয়ে লিখতাম, চাষীদের নিয়ে লিখতাম, এসব আমার আগ্রহের জায়গা ছিলো।

চিহ্ন: মানে পিছিয়ে থাকা মানুষদের নিয়ে?

ই. হক: না পিছিয়ে থাকা নয়, আমরাই বরং পিছিয়ে থাকা মানুষ, তারা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা মানুষ।

চিহ্ন: কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে তারা তো পিছিয়ে থাকা মানুষ।

ই. হক: আমাদের আবার দৃষ্টি আছে নাকি? আমরা দৃষ্টিহীন মানুষ, যদিও আমরা নিজেদের দৃষ্টিবান মনে করি।

চিহ্ন: আমরা আসলে অন্ধ?

ই. হক: অন্ধরাও তো কিছু দেখতে পায়, আমরা আসলে জীবনমৃত, আমরা বেঁচে আছি কি মরে গেছি জানি না, আমরা বেঁচে থাকার ভান করে আছি, কিংবা চিন্তাহীন বেঁচে আছি, আমাদের আসলেও কোনো চিন্তা আছে কী? আমরা একই রকম ভাবি, লিখি, একই রকম বলি, আমাদের নতুন কোনো চিন্তা নাই, আমাদের এতো গল্প কবিতা লেখা হবে, এই ডেকোরেটর কর্মীকে নিয়ে লেখা হবে কী? কিংবা যারা বাঁধাই করে আমাদের এতো সুন্দর বই উপহার দিচ্ছে, তাদের কথা কোথাও লেখা হবে কি?

চিহ্ন: আপনি তো সিক্স থেকে রাজনীতি করেন, তো ক্লাস সিক্সের একটা ছেলে রাজনীতি কিংবা কমুনিস্ট পার্টি কতোটুকু বোঝে?

ই. হক: ওই যে একটা ছেলে বাদাম বিক্রি করে বেড়াচ্ছে, ও কি আপনার চেয়ে কম বুদ্ধিমান? আপনার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, আপনি যান তো দশ টাকার বাদাম বিক্রি করে আসেন। আমাদের ভুল ধারণা, ছোটরা আসলে অনেক বেশি বোঝে, আপনিও বুঝতেন, তিন মাস বয়সের আগে থেকেই আপনি মাকে চিনতেন, মায়ের গন্ধ চিনতেন, বাড়িতে বাবা এলে নড়েচড়ে উঠতেন, বড়ো হতে হতে আপনি নিজস্ব চিন্তা বিসর্জন দিয়ে ফেলেছেন, অন্যের চিন্তা দিয়ে নিজেকে এমন ঝাপসা করে ফেলেছেন যে বুঝতেই পারছেন না এটা আপনার চিন্তা না, ছোটবেলায় আপনার নিজের চিন্তা ছিলো, বাচ্চারা আসলে ছোট না, তারা অনেক বড়ো।

চিহ্ন: আরোপিত চিন্তা আমাদের গ্রাস করেছে।

ই. হক: না আরোপিত না, আচ্ছন্ন চিন্তা, আরোপিত হলে তো বুঝতেই পারছেন রোপণ করা হয়েছে, আর যখন আচ্ছন্ন তখন তো বুঝতেই পারবেন না এটা কার চিন্তা, কিংবা আদৌ চিন্তা কি না।

চিহ্ন: আপনি তো ক্লাস এইট থেকে সাংবাদিকতা করেন এবং বিভিন্ন আন্দোলনের সাথেও জড়িত ছিলেন, কিন্তু এসব কিছুতে আপনার যৌবনসময় কখন ছিলো?

ই. হক: আমি মনে করি সেটা ছিয়ানব্বইয়ের পরে, আমরা সংগঠন করি এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার জন্য আন্দোলন করি, যখন পরমানু বোমা ফাটলো, আমরাই প্রথম মিছিল বের করি।

চিহ্ন: কতো সালে এটা?

ই. হক: ঊনিশ্শ আটানব্বইয়ে। তারপর কারগিল যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন করি, আগে ওখানে একুশে ফেব্র“য়ারি পালন হতো না, আমরা সেটাও চালু করি, কবির সুমন, নচিকেতা এবং সমস্ত শিল্পী আমাদের সাথে ছিলো, পহেলা বৈশাখ চালু করি পান্তা ইলিশ দিয়ে, আমরা বিকল্প খাদ্য বিকল্প পানির জন্য আন্দোলন করেছি, শহরের অধিকাংশ বোর্ড বাংলায় লেখা হতো না, আমরা ওইসব বোর্ড ভেঙ্গে দিই, বাংলায় লিখতে বলি এবং সরকারকে আইন করতে বাধ্য করি, বইমেলাতে বাংলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো, আমরা বাংলায় লিখতে বাধ্য করি এবং অনেক স্টল আমরা মেলা থেকে বের করে দিই।

চিহ্ন: বাংলার বদলে কি ইংলিশ চালু হয়ে যাচ্ছিলো?

ই. হক: হ্যাঁ, বাংলা উচ্চারণে ইংলিশ চালু হয়ে যাচ্ছিলো, যেমন ’তথ্য ঘর’ লেখা হচ্ছিলো ‘tattha ghar’ এরকম, আমরা এর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে তুমুল আন্দোলন করি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অন্নদাশংকর রায়, অরুণ মিত্র, আরো অনেককে নিয়ে আমরা আন্দোলন করি।

চিহ্ন: তাহলে সময়টা এখন কেমন আসলে?

ই. হক: আমাদের জীবন যেমন হবে, যেমন আমরা বাংলা পড়ছি, আমার ছেলে মেয়েরা তো কেউ বাংলা পড়ছে না। বাংলা পড়াচ্ছি না, মনে করি বাংলায় কিচ্ছু হবে না। মানে বিশ্বাস করি না, আমাদের জীবনে রবীন্দ্রনাথ কোথাও আছে? হ্যাঁ আছে কবিতায়, রবীন্দ্রনাথের কবিতার কথা বলে আমরা আত্মার মর্যাদাকে বাড়িয়ে তুলি, কিন্তু আমার আত্মসম্মানবোধ আছে কি? আমার ছেলে আমেরিকায় থাকলে আমি বিরাট খুশি হবো, আমার জামাই আমেরিকায় থাকলে আমি পাগল হয়ে যাবো। এই যে স্ববিরোধীতা নিয়ে আমরা বেড়ে উঠছি।

চিহ্ন: ওখানে আসলে বাংলার প্রতি এমন অনীহা কেনো?

ই. হক: অনীহা, তার মূল কারণ হলো ভণ্ডামি। আমি কালকে যেটা বলার চেষ্টা করছিলাম, আমাদের এই ইতিহাস ঊনিশ শতকে শুরু হয়নি।

চিহ্ন: কোন ইতিহাস?

ই. হক: বাঙালি জাতির ইতিহাস, বাঙালি তো বীরের জাতি, বাঙালি জাতির ইতিহাস পাঁচ হাজার বছরের পুরনো, বাঙালি ধান আবিষ্কার করেছে পৃথিবীতে, বাঙালি তুলোর পোশাক আবিষ্কার করেছে, তুলোর ব্যবহার তো জানতো না ইংল্যান্ড, বা ইউরোপের মানুষ, তারা বাংলা থেকে শিখেছে।

চিহ্ন: এখন তাদের এমন পিছিয়ে পড়া, তাদের শেকড়কে ভুলে যাবার কারণ কী?

ই. হক: না না শেকড়কে ভুলে যাওয়া নয়, তারা শেকড়কে ভুলতে চাইছে, ভুলছে না, এবং তারা নিজেদের সর্বনাশ করছে। আমি গতকাল অনেকগুলো প্রসঙ্গ বলেছি, খেয়াল করেছো কি না? যে তারা রাস্তায় কুকুর বেড়ালের মতো মরে পড়ে থাকছে, শেকড়হীন জীবন হয়ে গেছে।

(একজন অতিথির আগমন এবং ইমানুল হককে তার প্রস্তাব পদ্মায় বেড়াতে যাওয়া)

ই. হক: আমার বাবা যখন মারা যায়, আমি তার মুখ দেখতে চাইনি। পদ্মা আমি দেখতে চাই না, ভেতরটা হু হু করে, আমি যে পদ্মাকে দেখেছি, এবং আমাদের ফারাক্কা ব্যারেজ গড়া, আমাদের ওখানে সভায় একাধিকবার বলেছি যে আমরা যতো বাধ গড়ছি আমরা তো পৃথিবী ধ্বংস করে দিচ্ছি, আমাদের অধিকার আছে নদীকে বেঁধেরাখা? পাখিদের পাসপোর্ট লাগে না, মেঘেদের পাসপোর্ট লাগে না, হাওয়ার লাগে না, জলের লাগবে কেনো? ফলে যা হচ্ছে, আপনাদের শুধু পদ্মা মরছে না, আমাদের মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসের তলায় চলে যাচ্ছে, ওখানে আবার আমাদের গঙ্গা কোথাও এইটুকু হয়ে গেছে, মানে শুকিয়ে গেছে, গঙ্গায় জল নাই, পদ্মায় জল থাকবে কেমনে?

চিহ্ন: আচ্ছা, কলকাতায় যে আগে বুদ্ধি-বৃত্তিকচর্চার ব্যাপার ছিলো, সেগুলো এখন কেমন আছে?

ই. হক: এখনো আছে, তবে কম, কম মানে কি আমাদের একটা প্রধান সমস্যা হয়ে গেছে যে নারী ও নারী প্রেম, প্রেম ভালো, পৃথিবী যতোদিন থাকবে অবৈধ প্রেম থাকবে, সেটা কথা নয়, কথা হলো এটা সাহিত্যের একমাত্র বিষয় হয়ে যাচ্ছে, এটা আমাদের বড়ো বিপদ, এটা তোমাদের ভেতরেও আস্তে আস্তে ঢুকছে।

চিহ্ন: প্রেম তো আসলে খারাপ কিছু….

ই. হক: না শুধু প্রেম না, প্রেম মানে তো শুধু নারীর শরীর না।

চিহ্ন: আমাদের ইউনিভার্সিটি কেমন দেখছেন?

ই. হক: আমার তো এখানকার ছাত্র হতে ইচ্ছে করছে, কারণ স্যাররা তো ইচ্ছে করলেই কিছু করতে পারবে না, ছাত্রের স¦াধীনতা আছে, আর এই পরিবেশে আমি ছাত্র হয়েই আসবো, আমি অনেককে বলেছি, হা হা হা….

চিহ্ন: আপনি তো ঢাকায় অনেকবার এসেছেন, রাজশাহীতে প্রথম এলেন, রাজশাহী কেমন লাগছে?

ই. হক: রাজশাহীতে মনে মনে অনেকবার এসেছি, আমি যেমনটা ভেবেছিলাম, রাজশাহী তার থেকে অনেক ভালো, আমার কল্পনায় রাজশাহীর সুন্দর একটা ছবি ছিলো, কিন্তু এতোটা সুন্দর ভাবি নাই।

চিহ্ন: কোকিলের ডাক কি আশা করেছিলেন?

ই. হক: বাঙালি তো একটাই, সে হলো কোকিল। হা হা হা। আমি যেখানে থাকি ওখানেও অনেক পাখি আছে, আর আমি যেখানেই যাই গাছ লাগাই আর লাইব্রেরি করি, এই দুটো কাজই করি।

চিহ্ন: এখন কি কলকাতা শহরেই আছেন?

ই. হক: হ্যাঁ, কলকাতা শহরেই।

চিহ্ন: আপনি কি আপনার বাসায় উদ্যান করেছেন?

ই. হক: না বাসায় উদ্যান করা তো কঠিন, আমি থাকি আবাসনে, তবে আমরা একটা কাজ করি, আমরা প্রতি বছর বাইশে শ্রাবণে গাছ লাগাই, নিয়ম করে এবং আমি ছেলে মেয়েদের বলি জন্মদিনে একটা করে গাছ লাগাতে। আর ফলের গাছ লাগাই, ফলের গাছ না লাগালে পাখি আসবে না। প্যারিস গাছ দেখতে সুন্দর কিন্তু পাখি আসে না। আমার বক্তব্য হচ্ছে— আমাদের প্রথম মৌলিক উপন্যাসকার হচ্ছেন বিভূতিভূষণ। তাঁর আগে রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো লিখেছেন, আমার একটা বই বের হয়েছে— কথা সাহিত্যের ফাঁকা দুনিয়া। বইটা বের করেছে ‘অনিন্দ্যপ্রকাশ’, তো সেখানে বক্তব্য হচ্ছে যে, এঁরা ইউরোপের নকল করেছে, এবং বঙ্কিমের কাঠামো, মানে চিকন সম্পর্ক থাকবে, তার বাইরে আমাদের উপন্যাস যেতে পারেনি। বিভূতিভূষণ প্রথম উপন্যাস লিখলেন, যেখানে সম্পর্ক আছে, পাগল রানুর জন্যে অপু, কিন্তু সেখানে কোনো প্রেম নাই, তবে দু’জন দু’জনের জন্যে পাগল, এবং সেখানে যতো গাছেদের নাম আছে একটাও বিদেশি গাছ না, কোথাও রজনীগন্ধার নাম নাই, সব দেশি, এই যে ঝুমকো লতা, এই যে ঘেটু ফুল, এই যে ভুঁইচাপা ফুল, এবং আমাদের আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও, চিলেকোঠার সেপাই খুব ভালো, কিন্তু অনেকটা ইউরোপীয় চিন্তা ভাবনায় লেখা, কিংবা খোয়বনামায় তমিজ তার মাকে কামনা করছে, মাটিকে সে ভোগ্য নারী হিসেবে কল্পনা করছে, নারীকে তো দেখবে মা হিসেবে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে এভাবে বললে এদেশের মানুষ মারবে মনে হয়, যেহেতু সে দেবতার আসনে বসে গিয়েছে। কিন্তু তাঁর চিন্তার ভেতরে আছে ইউরোপ।

চিহ্ন: কিন্তু ফ্রয়েড বলেছেন যে….

ই. হক: না না ফ্রয়েড না, এমন একটা শব্দ বলো যেটা ফ্রয়েডের তত্ত্বের ভেতরে ফেলা যাবে না, আসলে যৌনতা মানুষের জীবনে অনেক বড়ো ব্যাপার, একমাত্র ব্যাপার নয়।

চিহ্ন: আচ্ছা আমাদের আধুনিক সাহিত্যের ধারা….

ই. হক: আধুনিক কাকে বলে? আমরা আধুনিক না অ-আধুনিক? আমাদের মধ্যযুগের সাহিত্যে প্রধান কেন্দ্রে কী? নারী, মলুয়া-মহুয়া, আমাদের বাংলা সাহিত্যে কি আরেকটা মলুয়া-মহুয়া আছে? ওরা আধুনিক না আমরা আধুনিক? মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব তেমন আছে? এমন আর একটা লাইনও কি আছে যে, ‘তুমি হও গহীন গাঙ আমি ডুইবা মরি?’ এই একটা বাক্যে, তুমি একটা হও আর আমি আমার সমস্ত নিয়ে তাতে ডুবে মরবো, সমস্ত নিয়ে আত্মসমর্পণ করবো, আমার ভালোবাসা নিয়ে, আমার দুঃখ নিয়ে, আমার খারাপ নিয়ে, আমার ভালো নিয়ে। ভালোবাসা শুধু ভালো নিয়েই না, খারাপ নিয়েও, তুমি একটা মহা অপরাধ করো, কেউ না আসলেও দেখবে জানালার গরাদ ধরে তোমার মা দাঁড়িয়ে আছে, এটাই হচ্ছে ভালোবাসা। এখন আমাদের আধুনিকতা মানেই আমাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন। ‘আধুনিকতা’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার হয় ষোলো-শ আটান্নে মনে হয়, চৈতন্যচরিতে, তো চৈতন্যকে বাদ দিয়ে তো আমি আধুনিক হতে পারি না, কিংবা শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহকে বাদ দিয়েও তো আমি আধুনিক হতে পারি না, সে হচ্ছে প্রথম বাঙালি, শাসক হিসেবে প্রথম বাংলাকে মর্যাদা দিচ্ছেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ, তারপর রুকনুদ্দিন বাবর শাহ এবং জালালুদ্দিন শাহ, যাঁরা টাকা দিচ্ছে কৃত্তিবাস অনুবাদ করার জন্য। তো আধুনিক শব্দটা অনেক পুরোনো, ইউরোপ আধুনিক তথা মডার্ন শব্দটি ব্যবহার করছে অষ্টাদশ শতাব্দীতে, ইউরোপে মডার্নিজম হলো অন্য একটি শিল্পায়ন, যার বিরোধী ছিলেন ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ, তিনি শিল্পায়নের বিরোধী ছিলেন, প্রত্যাখান করলেন, লেকের ধারে চলে গেলেন, তিনি প্রত্যাখান করলেন এই নাগরিক সভ্যতাকে, এ্যাংকারাপ মাই হার্ট, দা নার্স, নার্স ও বললেন না, সেবাদাত্রী না, তার গাইড, সে আমাকে পরিচালনা করলো, ফ্রান্সে বসে রইলেন, ইংল্যান্ডে বসে রইলেন, ভারতে বসে কিংবা বাংলাদেশে বসে যদি পাকিস্তানকে ভালো বলি তো বলবে রাজাকার, কাল কিন্তু মঞ্চে বলেছি যে, মাদ্রাসা মানেই কিন্তু খারাপ না, রাজা রামমোহন রায় কিন্তু মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন কিন্তু ভারতে তিনিই প্রথম আধুনিক পুরুষ।

চিহ্ন: আচ্ছা আমাদের চিন্তাগুলো এমন এককেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে কেনো?

ই. হক: আমরা সবকিছু ক্ষমতায় বিচার করি, আধিপত্যবাদের দিক থেকে আমরা বিচার করি।

চিহ্ন: আমাদের চিহ্নর সাম্প্রতিক সংখ্যা পড়েছেন? ওখানে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চেতনা নিয়ে যে লেখা আছে, আপনি কাকে কাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন যে কারা প্রগত চিন্তা করেছে?

ই. হক: অনেকের মধ্যে আমি প্রথম মনে করবো আব্দুল হাকিম, ‘যে জন বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গ বাণী’, আমি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের কথাও বলবো, আর আমরা তো অনেক কিছুই পাইনি, যেগুলোকে আমরা পুঁথি সাহিত্য বলি, সেগুলোই হয়তো আসল সাহিত্য ছিলো।

আড্ডাসঙ্গী  জাকির তালুকদার
নাটোর ॥ বাংলাদেশ

চিহ্ন: আপনি তো বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন, এবং ফেসবুকে আপনার এমন একটা স্টাটাস দেখেছিলাম যে, ঢাকার বাইরের লেখকদের পক্ষ থেকে আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিতে যাচ্ছি…

জাকির তালুকদার: হ্যাঁ, ছোটকাগজ লেখকদের পক্ষ থেকে আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিতে যাচ্ছি, ঢাকার বাইরের লেখকদের পক্ষ থেকে আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিতে যাচ্ছি, তেল গ্যাস আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে আমি পুরস্কার নিতে যাচ্ছি, এসবই আমি বলেছিলাম।

চিহ্ন: এখন তো পুরস্কার নিয়ে অনেক বিতর্ক শোনা যাচ্ছে।

জা. তা: পুরস্কার? তোমাকে একটা কথা বলি, পৃথিবীর সকল পুরস্কারের সাথে পলিটিক্স জড়িত, এবং অবশ্যই নোংরা পলিটিক্স। তারা এই পুরস্কারের গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখার জন্য পাঁচ বছর ওদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুরস্কার দেবে, তারপর যখন মানুষের ভেতরে অনীহা তৈরি হয়ে যাবে, তখন যোগ্য ব্যক্তিদের পুরস্কার দেবে, দিয়ে আবার গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে। এটা নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, এবং অন্যান্য যে বড়ো বড়ো পুরস্কারগুলো আছে পৃথিবীজুড়ে, সে ক্ষেত্রেও সত্য। আর আমি কখনো কল্পনাও করি নাই যে আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাবো, কোনো দিন আমার এটা নিয়ে মাথা ব্যথাও ছিলো না, কোনোদিন ভাবিও নাই। তবে ঘটনা হলো যারা মনোনয়ন দেন, তারা আমার বইয়ের তালিকা চেয়ে পাঠায়। তো যারা মনোনয়ন দেন, তাদের পঁচিশজনের ভেতরে যদি পঁচিশজনই আমাকে নির্বাচিত করে, তবু বোর্ডের পছন্দ না হলে বাতিল করে দেয়, এরকমই হয়। তো আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম একটা পুরস্কার নিতে, আমি বাংলাদেশে আসার পরে আটাশে জানুয়ারি, দুপুরে বাংলা একাডেমি থেকে ফোন করে বললো যে আপনাকে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে, আমি বললাম ঘোষণা কি হয়ে গেছে, বলা হলো না এখনো ঘোষণা হয়নি, বিকেল পাঁচটায় ঘোষণা হবে, তবে এখন আপনি কাউকে বলবেন না। আমি বললাম আমার বউকেও বলতে পারবো না? বলা হলো হ্যাঁ বউকে বলতে পারবেন, তারপর আমি আমার বউকে বললাম। হা হা হা…. তো তারপর ঘোষণার আগে তারা সংবাদ সম্মেলন করে লাউডস্পিকারে জানতে চান যে, জনাব জাকির তালুকদার আপনাকে কথা সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেয়া হচ্ছে, আপনি কি রাজি আছেন? মানে সবাইকে শোনাতে হবে আমি রাজি আছি, তো আমি বললাম আমি রাজি আছি, তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে আমার নাম ঘোষণা করা হলো। এই হলো আমার বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া।

চিহ্ন: আপনাকে অনেকেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী বলে।

জা. তা: আমি এই সময়ে পুরস্কারটা নিয়েছি যে, এক সময় আমি সার্টিফিকেটটা পোড়াবো।

চিহ্ন:  লেখালেখিতে সংগঠন এবং আড্ডার ভূমিকা কেমন?

জা. তা: হ্যাঁ সংগঠন এবং আড্ডা অনেক সাহায্য করে, তুমি তো আর একা অনেক বই পড়তে পারবে না, কে কী পড়ছে সবাই আলোচনা-সমালোচনা করলে অনেক বিষয় জানা হয়ে যাচ্ছে, সংগঠন কিংবা আড্ডা এই কাজটা করে। তবে লেখাটা একক প্রতিভা, একক নিষ্ঠা এবং একক পরিশ্রমের ব্যাপার, তুমি সামাজিকভাবে অনেক বিষয় জানো, অনেক সাহিত্য পড়েছো, আরেকটা বিষয় মনে রেখো, শুধু সাহিত্য পড়ে কেউ ভালো সাহিত্যিক হতে পারে না, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, সামাজিক গতি প্রকৃতি, এইগুলো স্টাডি তাকে করতেই হবে। আমাদের কোনো কোনো সাহিত্যিক আছেন এমন, যারা শুধু সাহিত্য পড়ে সাহিত্য করেন, তাদের লেখা আমার কোনোদিনও ভালো মনে হয়নি।

চিহ্ন: নতুন যারা গল্প লিখছে এবং বড়োদের যখন দেখাচ্ছে, বড়োরা দশজন দশরকম বলছেন যে, গল্পে তোমাকে আরো খেলাতে হবে, আরো ডিটেইল করতে হবে কিংবা সংক্ষিপ্ত করতে হবে, গদ্য মধুর হতে হবে ইত্যাদি।

জা. তা: আমি শুধু এইটা বলতে পারি যে, গল্পটা ভালো লেগেছে কি ভালো লাগেনি। কিংবা আমি তোমার ব্যাকরণগত ভুলগুলো ধরে দিতে পারি, তোমার অসঙ্গতিগুলো ধরে দিতে পারি, আমার তো এর বেশি কিছু করার নাই। আমার নিজের কথা বলি, আমি প্রায় সত্তরটা গল্প লিখেছি, আমি যখন গল্প লিখতে বসি, আমাকে তো আগের গল্প হেল্প করে না, আগের অভিজ্ঞতা হেল্প করে না, আমাকে গোড়া থেকেই নতুন চিন্তা নিয়ে লিখতে হয়। তাই প্রতিটি লেখাই নতুন, প্রতিটি লেখাই আলাদা ফর্ম দাবি করে। অর্থাৎ তুমি যখন প্রথম গল্প লিখতে বসবে তখন যে অবস্থা হবে, একশ এক নম্বর গল্প লিখতে বসলে একই অবস্থা হবে, যদি তুমি সত্যিই ক্রিয়েটিভ লেখক হও। কারণ ফরমেটের ওপর থেকে তো আর ক্রিয়েটিভিটি হবে না।

চিহ্ন: কারখানার মতো, একই প্রডাক্ট উৎপাদন করবে।

জা. তা: হ্যাঁ, কারখানার মতো।

চিহ্ন: আপনার গল্পের প্রসঙ্গে আসি, আপনার গল্প সমগ্র পড়ে যেটা মনে হয়েছে যে, প্রথম দিকের গল্পগুলো দুর্বল, হালকা চালে বলে যাওয়া এবং ক্রমেই দেখি সেটা আর থাকছে না, আমরা চমৎকারসব গল্প পাচ্ছি।

জা. তা: আমি এভাবেই সাজিয়েছি, দেখাতে চেয়েছি যে একজন ভালো লেখক আকাশ থেকে পড়ে না, যতোই তার বোধ শক্ত হোক, প্রথম দিককার লেখাগুলোতে দুর্বলতা থাকবেই, আমি পরে অনেক গল্পে ত্র“টি পাওয়া সত্ত্বেও ওভাবে রেখে দিয়েছি, ওগুলো ঠিক করলে আগের গল্প আর থাকবে না, নতুন গল্প হয়ে যাবে।

চিহ্ন: আপনার গল্পে আরেকটা চমৎকার দিক হলো ইসলামিক মিথ ব্যবহার।

জা. তা: এইটা আমার আগে কেউ কিন্তু করেনি।

চিহ্ন: হিন্দু ধর্মের মিথ নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে, কিন্তু ইসলামিক মিথ নিয়ে কাজ হয়নি কেনো?

জা. তা: এটা আসলে সূক্ষ্ম খুরের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো ব্যাপার। একটু চ্যুতি হলেই তুমি সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে, আর বিপরীত হলেই হয়ে যাবে ধর্মবিরোধী। আর মিথ তো হলো মৌখিক ইতিহাস, যেটা তুমি না চাইতেই পেয়েছো, এবং এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ, এটা নিয়ে লেখার দরকার আছে।

চিহ্ন: এই সময়ের লেখকদের কোথাও সমস্যা দেখছেন?

জা. তা: তোমাদের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো ছাপা খুব ইজি হয়ে গেছে, আমার সাথে নতুন ছেলে মেয়ে পরিচিত হতে আসে, বলে আমার বিশটা লেখা প্রকাশিত হয়েছে, আমি বলি আমার চোখে কি একটাও পড়লো না? আমি তো নতুন নাম চোখে পড়লেই লেখাটা পড়ে দেখি, ভালো লাগলে সম্পাদকের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাই। কিংবা কেউ বলে আমার পাঁচটা সাতটা বই বের হয়েছে, অথচ আগে কখনো নামই শুনি নাই, আগে এমন ছিলো না, আমার চারটা গল্প প্রকাশিত হবার পরেই সবাই আমাকে চিনতো।

চিহ্ন: কথা সাহিত্যে কেমন কাজ হচ্ছে আসলে, দেশের প্রথমসারির সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমর অধিকাংশ গল্প পড়তে গেলে নতুনরাও লজ্জা পায়, এবং আপনিও তো ওখানে নিয়মিত লেখেন?

জা. তা: না আমি নিয়মিত লিখি না, আবুল হাসনাত সংবাদ-এ ছিলেন, তখন লিখতাম, এখন আছেন কালি ও কলম-এ, তার অনুরোধেই বছরে একবার লিখি, ওটা মোটেও ভালো কোনো পত্রিকা না, পড়তে গেলে মনে হয় এই কি বাংলাদেশের সাহিত্যের মান?

চিহ্ন: চিন্তাশীল মানুষ কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে, আপনার কী মনে হয়?

জা. তা: এখানে কিছু ব্যাপার আছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তারা একাডেমিক লেখা লেখে, যা সাধারণত কোনো কাজের না, তাদের সুবিধা হলো তারা ডিগ্রি পায়, এটা চিরকালই আছে। এর বাইরের ব্যাপার হলো, যারা ডিপ থিংকার আছে, তারা যদি নিয়মিত কলাম লিখতে থাকে, এখন তো মানুষ কলামই বেশি পড়ে। তো ছফা (আহমদ ছফা) ভাই ভয়টা পেতেন, লোকে আমাকে তো প্রাবন্ধিক কলামিস্ট বলবে, অথচ আমি তো মৌলিক লেখক, হুমায়ুন আজাদও এই ভয়টা পেতেন, এবং হুমায়ুন আজাদের কলামগুলোই ভালো টিকে আছে, তার গল্প উপন্যাস কবিতা তেমন কেউ পড়ে না, এই ভীতিটা কাজ করে বলে অনেক ক্রিয়েটিভ লেখক লিখতে চায় না, যেমন আমাকে যতোই চাপ দেয়া হোক আমি কলাম লিখি না। তবে এখন অনেক ছেলেমেয়ে দেখছি যারা ভালো চিন্তা করে, ফেসবুকে কিংবা অন্য কোথাও দেখতে পাই, গভীর চিন্তার ছাপ আছে, কিন্তু সেটা কয়েক লাইনে, বিস্তারিত করার ক্ষমতা তাদের নাই, এটা তৈরি করতে হবে, দিনে ছয়-সাত ঘণ্টা পাঠ ও লেখাচর্চার ভেতরে থাকতে হবে, চিন্তা ভাবনার ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

চিহ্ন: প্রান্তে থেকে যারা সাহিত্য করছে, কেন্দ্র থেকে তাদের ভিন্ন চোখে দেখা হয় কেনো?

জা. তা: হ্যাঁ এটা সত্য, প্রকাশের ক্ষেত্রে, সংকলন কিংবা পুরস্কারের ক্ষেত্রে যারা কেন্দ্রে আছে তারাই অগ্রাধিকার পায়, কিন্তু ভালো কাজ করলে তারা অস্বীকার করতে পারবে না, তবে সহজ যোগাযোগের এই যুগে এই বিভেদ অনেক কমে এসেছে।

চিহ্ন: লেখক-প্রকাশকদের ওপরে সশস্ত্র আক্রমণ কীভাবে দেখছেন?

জা. তা: এটা যদিও নতুন নয়, তবে আগের থেকে বেড়েছে, ভয়ের ব্যাপার, তবে ব্লগারদের অ্যাক্টিভিটি প্রগতিশীল আন্দোলনের অনেক ক্ষতি করেছে, আর আমি এখনো সন্দিহান তাদের মৌলবাদীরা মারছে না গভমেন্ট এজেন্ট মারছে।

চিহ্ন: পশ্চিম বাংলার বাংলা এবং এখানকার বাংলার অবস্থান এখন কেমন?

জা. তা: পশ্চিম বাংলায় তো এখন সৃজনশীল সাহিত্যের অবস্থা খুব খারাপ, আর আমি অনেক লেখকের বাড়িতে গিয়ে দেখেছি তাদের ছেলেমেয়েরা বাংলা জানে না।

চিহ্ন: দুঃখজনক, তবে ওখানে কি শেষ পর্যন্ত বাংলা টিকবে না?

জা. তা: টিকবে, মধ্য ও নি¤œশ্রেণির ভেতরে।

চিহ্ন: আর আমাদের এখানে?

জা. তা: এখানে আগে বাংলাকে ছোট করে অনেকেই ভালো ইংরেজি পারে বলে গর্ব করতো, এখন সময় পাল্টেছে, বিভিন্ন সেমিনারে গিয়ে দেখেছি বাঙালি হয়ে ভালো বাংলা বলতে না পারা এখন লজ্জাজনক মনে করছে।

চিহ্ন: আপনার মুসলমান মঙ্গল আসলে কোন ধরনের উপন্যাস?

জা. তা: এটা হলো নন ফিকশন উপন্যাস, এর একটা ধাঁচ আছে, এটা নিয়ে খুব বেশি লেখা হয়নি।

চিহ্ন: দেখা যাচ্ছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উদ্বৃতি দেয়া, চরিত্রের ভেতরে আলোচনা চলছে তো চলছেই…

জা. তা: আসলে কথাগুলো বলার জন্যই এই রূপটা দেয়া।

চিহ্ন: আপনি কি বিশ্বাস থেকেই লিখেছেন? আপনাকে খুব দ্বান্দ্বিক মনে হয়েছে।

জা. তা: হ্যাঁ, বিষয়টা তো দ্বান্দ্বিক, এটা কি আসলেও মীমাংসিত কোনো বিষয়?

চিহ্ন: দেখা যাচ্ছে আপনিই প্রশ্ন করেছেন, যুক্তি দেখাচ্ছেন, আবার আপনিই তা খণ্ডন করেছেন।

জা. তা: মানে শেষ না করে ছেড়ে দেওয়া।

চিহ্ন: আগের আলোচনার সূত্র ধরে যদি বলি, আগে যেমন বাবা-মায়ের সাথে দর্শন টাইপের কথা বললে সেটা ফানি পর্যায়ে ছিলো, বলতো যে ছেলের মাথাখারাপ হয়ে গেছে। এখন কিছু ছেলে বিষয়টা এমন গুলিয়ে ফেলেছে যে, বিষয়টা চিন্তাও করা যায় না।

জা. তা: কথা হলো অসুবিধাগুলো তৈরি হয়েছে, হঠকারিতা কাকে বলে? কিংবা হঠকারী আন্দোলন কাকে বলে? বাম আন্দোলনের ভেতরে যারা গলা কাটা শুরু করেছে, তাদেরকেই তো হঠকারী বলে, এই সময়ে এই স্টেপ আসে নাই, যে সময়টা আন্দোলনের এই পর্যায়ে না, তো এখন যারা প্রগতিশীল আন্দোলনে আছে তাদের জরুরি হলো সংগঠিত হওয়া, সমৃদ্ধি করা। সেটা হলো বড়ো ব্যাপার। তার জায়গায় তুমি যদি এ্যাটাক করো, তাহলে সেই জায়গাটাতে এই স্টেপ একশভাগ হঠকারী স্টেপ এবং এটা পিছিয়ে দেওয়া। আর আমি নিজেও কিন্তু নাস্তিক।

চিহ্ন: মুসলমান মঙ্গল পড়ে আপনার বিশ্বাসের জায়গা থেকে ধারণা হয় যে, আপনি আস্তিক।

জা. তা: আমি যদি নাস্তিক হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দিই, তাহলে আমাকে কেউ নেবে না, তুমি তার কথাই শুনবে যাকে তুমি নিজের লোক বলে মনে করবে।

চিহ্ন: মুসলমানমঙ্গল পড়ে আমার পরিচিতজনেরাও আপনাকে আস্তিক ভেবেছে, অন্যভাবে, প্রচলিত অর্থে নয়। দেখা যাচ্ছে যে, আপনি নবী সম্পর্কে বলেছেন, তো সেখানে অপার শ্রদ্ধা, যেটা বিশ্বাস থেকেই আসে।

জা. তা: এই কারণেই বইটা নিষিদ্ধ হয়নি, বলার ভঙ্গির কারণে। তসলিমা নাসরিন কি রোকেয়ার চেয়ে কড়া কিছু বলেছে? রোকেয়ার চেয়ে আরো মৌলিক আরো আক্রমণাত্মক কিছু বলেছে? তবু তসলিমা নিষিদ্ধ আর রোকেয়া? রোকেয়া বলে গেছেন ধর্মগ্রন্থগুলো পুরুষদের। তসলিমা কি তার চেয়ে বেশি নারীবাদী হতে পারছে? তার মতো আর কেউ আধুনিক বাঙালি নারী হতে পারছে? আর তসলিমার পেছনে আনন্দবাজার ছিলো, ব্যবসা ছিলো, আমি এদের সম্পর্কে একটা কথাও উচ্চারণ করি না লিখিতভাবে।

চিহ্ন: আচ্ছা, সাহিত্যের মৌলিক কাজ কি এখন লিটলম্যাগেই হচ্ছে?

জা. তা: লিটলম্যাগ তো আসলে সেভাবে হয় না, তবে নিরীক্ষামূলক কাজ লিটলম্যাগেই বেশি হচ্ছে।

আড্ডাসঙ্গী গৌতমগুহ রায়
শিলিগুড়ি ॥ ভারত

চিহ্ন: আপনি তো কবিতা পড়তে গেলেন, কিন্তু পড়লেন না যে?

গৌ. রায়: কেনো যেনো মুডটা চলে গেলো। কবিতা ব্যাপারটা কি, মানে আমাদের যেটা হয় আর কি, কবিতা আমার প্রতিদিনের যাপন যন্ত্রণার সাথে জড়িত, সেটা সব সময় যে উচ্চকিত উচ্চারণে হতে হবে তা তো নয়, কখনো কখনো খটকা লাগে। এখানে মনে হলো আমাকে খাপ খাবে না।

চিহ্ন: আপনার তো জলপাইগুড়ি বাড়ি?

গৌ. রায়: হ্যাঁ, জলপাইগুড়ি।

চিহ্ন: আমি জলপাইগুড়ি সম্পর্কে জেনেছি সমরেশের লেখা পড়ে।

গৌ. রায়: তোমাদের এই বয়সীদের ভালোলাগার উপাদান আছে সমরেশের লেখায়, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, আমরাও রাত জেগে তার লেখা পড়েছি, মুগ্ধ হয়েছি। আর আমরা ছোটবেলায় সমরেশকে যে আদর্শের দেখেছি, লিটলম্যাগ আন্দোলনের সাথে তার খাপ খায় না, তিনি যেটা বলেন তার শৈশবের আত্মজীবনীতে, বাস্তবের সাথে তার কোনো মিল নাই। তিনি নকশাল আন্দোলনের সাথে তার সম্পর্কের কথা বলেছেন, আসলে তার কোনোই সম্পর্ক ছিলো না, কোনো দিনই ছিলো না। এখনো এই সময়ে, জলপাইগুড়িতে একটা অনুষ্ঠানে তাকে ডাকা হয়েছিলো, তিনি যা বলেছিলেন, ওখানে বামপন্থি যারা ছিলেন তারা খুব অপমান বোধ করেছিলেন। তার ভেতরে বামপন্থি কোনো চেতনাই নাই, কিন্তু তিনি নকশাল আন্দোলনের উপকরণ ব্যবহার করেছেন, লিখেছেন এগুলো ভালো ব্যবসা হতে পারে বলে।

জলপাইগুড়ি থেকে জলার্ক নামে লিটলম্যাগ বের হতো, উত্তর বাংলার প্রথম লিটলম্যাগাজিন, ছাপ্পান্ন সালে তখন বুদ্ধদেব বসুর কাছে একটি কবিতা চাওয়া হয়েছে, বুদ্ধদেব এককথায় উত্তর দিয়েছিলেন, আমার কবিতা ছাপতে হলে পাঁচশত টাকা, সরাসরি বলেছে। তার আগে জীবনানন্দের কাছে লেখা চাওয়া হয়েছিলো, শিরিশের ডালপালা, পরে তাকে বলা হলো বুদ্ধদেব তো এভাবে রেট চেয়েছে, আপনার কোনো রেট আছে কিনা? জীবনানন্দ লিখেছেন, আমি তো খুব আর্থিক টানাপোড়েনে আছি, তো আপনি আমাকে কুড়িটা টাকা দেন আমি আমার সব লেখা আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি। এখন কুড়িটা টাকা হাতে আসলেও আমার খুব উপকার হয়। আসলে কে কীভাবে চাচ্ছে, কে সৃষ্টিকে কতোটুকু ভালোবাসে, সৃষ্টিটা কোথা থেকে উৎপাদন হচ্ছে, মজ্জা থেকে না অন্য কিছু থেকে, মজ্জা থেকে হলে তা বিক্রি করতে পারবে না।

চিহ্ন: আচ্ছা এখন ওখানে বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চা কিংবা সাংস্কৃতিকচর্চা কেমন হচ্ছে?

গৌ. রায়: হ্যাঁ হচ্ছে, ভালো হচ্ছে।

চিহ্ন: যেমন কলকাতার অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি, তো যেটা মনে হলো যে বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চা এখনো ভালো হচ্ছে কিন্তু সাংস্কৃতিকচর্চা আগের মতো নেই যেটা গত শতাব্দীতে ছিলো।

গৌ. রায়: ব্যাপারটা হয়েছে কি, তুমি যদি দশ বছর আগে জানতে চাইতে তবু সে বলতো আগের মতো নেই।

চিহ্ন: আপনি কি জলপাইগুড়িতেই আছেন কিংবা ওখানেই কি আপনার জন্ম? আপনার এই বইটা পড়ে আমাদের বিশেষ আগ্রহ জন্মেছে আপনার সম্পর্কে জানতে।

গৌ. রায়: পড়া হয়েছি কি?

চিহ্ন: পড়েছি তবে এখনো শেষ হয় নি।

গৌ. রায়: আমার পূর্বপুরুষ বিক্রমপুরের, বাবাও এখানে জন্মেছিলেন, ছেচল্লিশে কলকাতায় চলে যায়, বিক্রমপুরের বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে।

চিহ্ন: ওখানে এখন কেউ নেই?

গৌ. রায়: একটা নাটমন্দির আছে, ওখানে একটি পরিবার বাস করছে, আর মূল বাড়ি পরিত্যাক্ত। আমাদের রায় বাড়ি, তার উল্টা দিকে বুদ্ধদেব বসুর আদি বাড়ি। যাই হোক সেই জেনারেশনের এখন আর কেউ বেঁচে নেই।

চিহ্ন: আচ্ছা তখন কি আপনাদের পরিবার চলে গিয়েছিলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে?

গৌ. রায়: ওখানে তখন দাঙ্গা হয়নি, অন্যান্য এলাকায় হয়েছিলো, তো আমার বাবারা যে জায়গাটাতে গিয়ে ওঠে, সেটা হলো ভাটিয়াপাড়া, সেখানে বড়ো বড়ো মুসলিম পরিবারের বাড়ি ছিলো, নবাবদের বাড়ি ছিলো, সেখানে উদ্বাস্তু শিবির করা হয়েছিলো, পরে ওখান থেকেই কলোনি করা হয়।

চিহ্ন: আচ্ছা দেশভাগের সময় যারা চলে গিয়েছিলো, তাদের বাড়ি কিংবা সম্পত্তি তো দখল হয়ে গিয়েছিলো, আপনাদের কিংবা বুদ্ধদেব বসুর বাড়ি দখল হয় নি?

গৌ. রায়: না দখল হয়নি, সরকারি হ্যান্ড ওভার না কী যেনো হচ্ছে, এগুলো এখন প্রমাণ দেয়া মুশকিল, আমার বাবার বাবার কী সম্পত্তি ছিলো সেটা আমার জানা নাই।

চিহ্ন: আপনারা যদি এই সম্পত্তি ফিরে চান পাবেন কি?

গৌ. রায়: কিছুই নাই তো, কাগজপত্র, আইডেন্টিটি।

চিহ্ন: আপনি যখন পুরাতন ভিটা, ঠাকুর বাড়ি দেখতে এসেছিলেন, তখন কেমন লেগেছিলো?

গৌ. রায়: হ্যাঁ সেটাই বলতে যাচ্ছি, শৈশব থেকে আমার বাবা, ঠাকুমা, এই যে দেশভাগের যন্ত্রণা, এই যে সীমান্তের কাঁটাতার, এই যন্ত্রণা ঠাকুমা, বাবা থেকে আমরাও বহন করছি। আমি জন্মেছি জলপাইগুড়িতে, কিন্তু দেশভাগের পরে আমার সংস্কৃতি আমার দেশ একটি সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে বিভক্ত হয়েছে, ধর্মে ধর্মে সংঘাত হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে। আমাদের দুর্বল করার জন্য, আমাদের দেশকে ভাঙার জন্য। এই কষ্ট রক্তে বহন করছি, এই কাঁটাতার আমাদের সবচেয়ে বড়ো যন্ত্রণার, সবচেয়ে বড়ো শত্র“।

চিহ্ন: এই কিছুদিন আগেও দেখলাম দুই সীমান্তের মানুষদের মিলনের জন্যে গেট করে দেয়া হয়েছে।

গৌ. রায়: আমাদের ওখানে একটা মেলা হয়, মেলার সময় সীমান্তের গেট ওপেন করে দেয়া হয়। এমন অনেক আছে যে, এক ভাই এদিকে আছে, আর এক ভাই ওদিকে, তো ওখানে একটা মাজার আর মসজিদ আছে, ওটাকে কেন্দ্র করে উৎসব হয়, আর একটি টোকেন ইস্যু করে এপার-ওপার যাবার ব্যবস্থা করা হয়, মিলন হয়, যদিও কিছু সময়ের জন্য।

চিহ্ন: পশ্চিমবঙ্গে এখন বামপন্থিদের অবস্থান কেমন?

গৌ. রায়: গত নির্বাচনে নানা ভুলের কারণে তারা বড়ো একটা ধাক্কা খেয়েছে।

চিহ্ন: আবার তো নির্বাচন এলো।

গৌ. রায়: এই নির্বাচনে অর্থ যেভাবে বেশি ব্যবহার হয়েছে, যেটা আগে কখনো হয় নি, আর এই নির্বাচনে বামপন্থিরা যে বড়ো সাফল্য পাবে তাও নয়।

চিহ্ন: মমতা যখন ভোটে দাঁড়ালো, তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য বড়ো বড়ো সাহিত্যিক তাকে সমর্থন করে গেছে।

গৌ. রায়: সবাই কেটে পড়েছে।

চিহ্ন: তখন আপনার অবস্থান কেমন ছিলো?

গৌ. রায়: আমার অবস্থান আসলে, আমি যে আদর্শে বিশ্বাসী, তা অনেক গভীর থেকে বিশ্বাস করি, একটা দুটো ঘটনায় আমি আমার আদর্শ পাল্টাতে পারি না, কষ্ট হয়েছিলো, কিছু ঘটনা মেনে নিতে পারছিলাম না, এটাও জানি যে, এই সরকার পাল্টে নতুন সরকার এলে তারা কী করবে, চোখের সামনে চেনা মানুষদেরকে রক্তাক্ত দেখেছি, সকালে স্কুলে গিয়ে দেখেছি স্কুল জ্বলতে, তো এসব অরাজকতা কারা করেছিলো সেটা দেখেছি।

চিহ্ন: লিটলম্যাগ নিয়ে কিছু বলুন।

গৌ. রায়: লিটলম্যাগ আন্দোলন সমাজ পরিবর্তনের একটি সক্রিয় দিক, শক্তিশালী একটি আন্দোলন।

চিহ্ন: কিন্তু লিটলম্যাগগুলো কি তার আদর্শের ওপরে আছে?

গৌ. রায়: এইটা হলো সবচেয়ে বড়ো বিপন্নতা, সময়ের বিপন্নতা, লিটলম্যাগের যে আন্দোলনটা ছিলো, সেটা আর নেই। পাছে কি ক্ষতি হয়, মুনাফা দরকার, আগামী সংখ্যা নয়তো করা যাবে না।

চিহ্ন: এটা তো আসলে মুনাফা লাভের ব্যাপার না।

গৌ. রায়: হ্যাঁ, মুনাফা লাভের যদি দরকার হয়, তাহলে তো আলু-পটল বিক্রি করতে হবে।

চিহ্ন: এখন এতো এতো কাগজ হচ্ছে, কিন্তু কোনো লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে কি?

গৌ. রায়: লক্ষ্যহীন হয়ে পড়েছে, সবকিছু গুলিয়ে গেছে।

চিহ্ন: কিন্তু এতো কাগজ হচ্ছে, এতে শ্রম তো আছে। না এটাও এক ধরনের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে?

গৌ. রায়: আত্মপ্রচারের একটা ব্যাপার আছে, এই করছি, এই লিখছি, এসব, তুমি একটি কাপড়ের দোকান খুললে কিন্তু প্রচারটা পাবে না। খ্যাতির লোভ, তাছাড়া বিষয়টা একটু ধোঁয়াশা হয়ে গেছে, সময়ের কারণে। এখানে সঞ্জয়ের সাথে আমার একটা ব্যাপার, ও আমার জুনিয়র, তবে খুব ঘনিষ্ঠ আমরা, ও বলে আমি তো কাগজ নিয়মিত করে যাচ্ছি, প্রচুর বিক্রি করে যাচ্ছি, তুই পারছিস না তার কারণ হলো তুই বিক্রির কথা ভাবিস না, বিজ্ঞাপন নিস না। আমি বলি, বছরে তো আমার তিনটা কাগজ করার দরকার নাই, আমি যদি একটাও করি, তবে আমি মজ্জায় যেটা বহন করি, সেটা দিয়েই করবো, এক সময় আমার, আমাদের বন্ধুদের টাকা পয়সা ছিলো না, খবরেও বের হয়েছিলো, আমরা রক্ত বিক্রি করে কাগজ বের করেছি, এই প্রজন্মের কেউ ভাবতেও পারবে না, এখনো আমরা সেল করার কথা ভাবি না, বিজ্ঞাপন নিই না।

চিহ্ন: এই যে রক্ত বিক্রি করে ছোটকাগজ করেছিলেন, এটা কতো সালে?

গৌ. রায়: আমরা তখন সদ্য এ সি কলেজে উঠেছি, আমি, পার্থ লাহিড়ি, দেবাশিষ, আমরা ছয়জন ছিলাম।

চিহ্ন: আপনাদের ওখানে তো রোববারে আড্ডা হয়?

গৌ. রায়: হ্যাঁ, রোববারে হয়, শনিবারে হয়। আমার ওখানে দোতলায় বড়ো লাইব্রেরি করেছি, ওখানে আড্ডা হয়। তোমাদের এখানকার অনেকেই গিয়েছে ওখানে, কবি ওবায়েদ আকাশকে তো চেনো, ও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর আমাদের ওখানে রোববারে সকালে আড্ডা হয়, আর অন্য দিনে আমরা সন্ধ্যায় মিট করি।

চিহ্ন: আমাদের এখানে যেমন প্রতি রোববারে হয়, আগে থেকে টপিক নির্ধারণ করা থাকে।

গৌ. রায়: আমরাও প্রথমে এরকম করেছিলাম, কিন্তু সমস্যা হয়, দেখা যাচ্ছে কিছু ভাবনা আসে, নতুন চিন্তা আসে, সেগুলো শেয়ার করতে চাচ্ছি, কিন্তু পারছি না, সে জন্য পরে ওপেন করে দিই।

চিহ্ন: আপনাদের ওখানে বোধহয় পরিণত মানুষেরাই আসে আড্ডা দিতে?

গৌ. রায়: না না, সদ্য কবিতা লিখছে এমন ছেলেরাও আসে, সব ধরনের আসে।

চিহ্ন: আচ্ছা আপনার কি ইচ্ছে করে না, যদিও আপনাদের সব কিছু ওখানে আছে, তবু এদিকে থাকা যায় কি না?

গৌ. রায়: সে তো করেই, তা ছাড়া, এদিকটা তো আমারই দেশ, আমরা আলাদা করে কিছু ভাবি না। এই যে মাত্র দু’দিন সময় হাতে নিয়ে এসেছি, ছয় জায়গায় নেমন্তন্ন, কী করে রক্ষা করবো তাই ভাবছি।

চিহ্ন: আরেকটু সময় নিয়ে আসার দরকার ছিলো।

গৌ. রায়: ব্যাংকের ছুটি তো বেশি দিন দেয় না, শুধু তাই নয়, মার্চ মাসে ব্যাংক কোনো ছুটি দেয় না, আমি শুধু দরখাস্ত জমা দিয়ে চলে এসেছি, একদিন দেরি করে গেলে বরখাস্ত হয়ে যেতে পারি।

চিহ্ন: আপনি তো ওখানে খুব জনপ্রিয়?

গৌ. রায়: না ঠিক জনপ্রিয় না…

চিহ্ন: মানুষ ভালোবাসে আর কি?

গৌ. রায়: হ্যাঁ, সেটা আমি পাই। আর এখন তোমাদের সাথে কথা বলে ভালো লাগলো, মনটা চনমনে হয়ে গেলো, একটু কবিতা পড়ে আসি, হা হা….

চিহ্ন: কিন্তু আমরা তো আরো কথা বলতে চাই।

গৌ. রায়: আমি তো আরো আছি, কথা হবে, তা ছাড়া এখানে তো আরো আসবো।

মেলাচত্বর থেকে

চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙ্গলা ২০১৬
উৎসব-অভিজ্ঞতা

এলোমেলো আড্ডা-আলাপ-অভিমত
আড্ডারু : গোলাম মোস্তফা ও সুবন্ত

আলাপচারিতা-পর্ব
সুকুমার মণ্ডল ॥ সম্পাদক পাখিরা ॥ পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

চিহ্ন: কেনো কবিতা লেখেন?
সু. ম: ঠিক জানি না। কেনো লিখি! কবিতা হলো সেই অলীক ধ্র“বতারা, যাকে দেখা যায় কিন্তু ধরা যায় না কিছুতেই— ধোঁয়ার স্পর্শ যেমন উড়ে উড়ে যায়। ধরা যাবে না মেনেও ধরতে চাই, তাই লিখি। না লিখে উপায় নাই।

চিহ্ন: কবিতা কি করে?

সু. ম: কবিতা কাউকে কোনো জয় এনে দিতে পারে না। কিন্তু পরাজিত মানুষকে অনেক দূর পর্যন্ত আলো দেখাতে পারে।

চিহ্ন: কবিতা কেনো পড়বো?

সু. ম: আমি কবিতা পড়ি এই জন্যে যে, কবিতার কোনো কোনো উচ্চতায় ঐশ্বরিক মুহূর্তকে দেখতে পাই। কবিতা পড়ে ঈশ্বরের স্বাদ পাই।

চিহ্ন: কবিতা দিয়ে আসলে কী কিছু হয়?

সু. ম: কবিতা দিয়ে পাহাড় উল্টে দেয়া যায় না। কিছু হারিয়ে যাওয়া ক্ষণিক ঐশ্বরিক মুহূর্তগুলোকে লিপিবদ্ধ করা যায়। আরো কতোকিছু হয়, নিজেও কি সব জানি? কী হয় কবিতা লিখে, আগামী দিনগুলোতে হয়তো জানতে পারবো, এমন ভরসা রাখলাম।

চিহ্ন: কীভাবে লেখার অনুপ্রেরণা পেলেন?

সু. ম: কলেজে পড়ার সময় নির্মল হায়দার নামক এক কবির সংস্পর্শে এসে কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

চিহ্ন: আপনার কি কোনো অভিযোগ আছে মেলা নিয়ে?

সু. ম: চিহ্নমেলার স্যুভিনিয়রে যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকাগুলোর নাম ছাপা হয়েছে, বেদনাই দেয়। কিছু পত্রিকার ক্ষেত্রে সম্পাদকের নাম এবং ঠিকানা এবং কিছু ক্ষেত্রে শুধু পত্রিকার নামোল্লেখ হয়েছে। একটু চোখে লেগেছে।

চিহ্ন: মেলা সম্পর্কে আপনার মতামত?

সু. ম: চিহ্নমেলা আমার কাছে খুব আন্তরিক, হৃদয়স্পর্শী। এখানে আসতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হলো। এখানে পাঠক-কবি-সংগঠকদের তুলনা হয় না। পরিচালনার দিক দিয়ে কোনো ত্র“টি নেই।

চিহ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ।

জুলফিকার কবিরাজ ॥ ছোটকাগজকর্মী ॥ পাবনা

চিহ্ন: আপনার নাম যদিও জুলফিকার কবিরাজ, কবিদের রাজা, কিন্তু আপনি মূলত কী লেখেন?

জু. ক: হা হা, আমি কবিদের রাজা হলেও লিখি ছোটগল্প।

চিহ্ন: পাবনায় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা কেমন হচ্ছে?

জু. ক: ওখানে যে কাজটা হয় তা হচ্ছে, বাংলাদেশে তিনটি জায়গায় বই মেলা হয় এক মাস ধরে, তার ভেতরে বাংলা একাডেমি তো আছেই, খুলনায় একটা হয়, যেটা বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হয়, বাকিটা হয় পাবনায়, যেটা সকাল দশটায় শুরু হয়, শেষ হয় রাত দশটায়। গত বছর আমাদের মেলায় বই বিক্রি হয় পয়ষট্টি লাখ টাকার, এবার একটু কম।

চিহ্ন: বাহ্ চমৎকার, পাবনার মতো ছোট শহরে এতো বই বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু মেলাটা কোন মাসে হচ্ছে?

জু. ক: ফেব্র“য়ারি মাসে, আর ওখানে মেলায় যেটা হয়, পাবনায় ক্ষুদ্র নৃ-জাতি গোষ্ঠী আছে ১৪টা, তাদেরকে ডাকা হয় মেলায়, এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষদের ডাকা হয়, একদিন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ও অন্যান্য কলেজের ছাত্রদের ডাকা হয়, রিকসা চালক, কৃষক, দোকানদার, ডাক্টার-ইঞ্জিনিয়ারদের ডাকা হয়, সবাই সবার চিন্তা ভাবনার কথা বলে, এটা এক ঘণ্টা করে হয়, তারপর কালচারাল প্রোগ্রাম হয়, ক্ষুদ্র নৃ-জাতি-গোষ্ঠীদের জন্য কয়েকদিন থাকে কালচারাল প্রোগ্রাম করার জন্য।

চিহ্ন: বাহ্, ভালো কাজ হচ্ছে তো সেখানে।

জু. ক: হ্যাঁ, যেখানে আগে কিছুই হতো না, সে তুলনায় তো ভালো বলতেই হবে।

চিহ্ন: মেলা ও বইয়ের প্রতি তরুণদের আগ্রহ কেমন দেখছেন?

জু. ক: বুড়োরা তেমন কেউ মেলায় আসে না, তরুণরাই বেশি এসেছে, বই তারাই বেশি কিনেছে, তাদের ভেতরে ভালো আগ্রহ দেখেছি। আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, শিশুদের বইয়ের কয়েকটা স্টল ছিলো, বইয়ের প্রতি ওদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো, টিভি কার্টুন, গেম, অন্যান্য বিনোদনের বাইরে এসে বাচ্চারা বইয়ের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে, যারা বলে এখন পড়াশোনা হয় না কিংবা বইয়ের প্রতি এখন আর তেমন কারো আগ্রহ নাই, আমি তাদের ঘোরবিরোধী, যেমন ধরো ওই যে মেয়েটাকে (তরুণ বয়সী দূরে দাঁড়িয়ে গল্পরত একটি মেয়ে) দেখছো, ওর একটা প্রকাশনী আছে, খুব বড়ো কাজ না, এবার চল্লিশটা বই বের করেছে, কিন্তু এই সমাজের একটা মেয়ে হয়ে এই কাজ কোনো অংশেই ছোট না, তাও কিনা মফস্বল শহরে থেকে, মান যাই হোক, শিল্প সাহিত্যকে ভালোবেসে, আমাদের সংস্কৃতিকে লালন করার জন্য সে এই সব কাজ করে যাচ্ছে।

চিহ্ন: এটা সাহসী কাজ তো বটেই, আর হ্যাঁ, এখন অনেকেই অভিযোগ করছে যে, বই এখন শো করার ব্যাপার হয়ে গেছে।

জু. ক: এমন এক শ্রেণি আছে, ওটা সব সময়েই ছিলো, তবে ওটা নিয়ে খুব হতাশার কিছু আছে বলে মনে হয় না, আমার আশেপাশে অনেককেই দেখি বেশ পড়াশোনা করতে, যেমন আমার বাড়ি হেমায়েতপুরে গ্রামের ভেতরে, মানে পাগলা গারদ যেখানে, এখন অবশ্য পৌরসভা হয়ে গেছে, ওখানে আমি ঊনিশ্শ পঁচাশি সালে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করি, এখন পর্যন্ত খুব ভালোভাবে চলছে লাইব্রেরিটা, প্রতিদিন আটটা করে দৈনিক পত্রিকা চলে, তাছাড়া ওখানে ঘটা করে নজরুল-রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করা হয়, পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়, আর আমরা কিন্তু এগুলো করার জন্য কোনো স্পন্সর নিই না, যদিও তার সুযোগ আছে, আমরাই গ্রামের যে যা পারি গণচাঁদা দিই, দশ-বিশ-পঞ্চাশ যে যা পারে সাধ্যের ভেতরে সবাই অংশগ্রহণ করে।

চিহ্ন: বাহ্ চমৎকার, এই সমাজে এটা তো বিপ্লবের মতো!

জু. ক: পঁচাশি সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে চলছে, অবশ্য খুব সহজে হচ্ছে না, কষ্ট হচ্ছে, যেমন ধরো কয়েক হাজার টাকা কম পড়েছে, তখন তো আর সবার ওপরে চাপানো যায় না, আমরা যারা উদ্যোক্তা আছি, তাদেরকেই মাথাপিছু ভাগ করে দিতে হচ্ছে, তবু এলাকার বাইরে কারো কাছ থেকে নেয়া হয় না। তাছাড়া পাবনা শহরে বড়ো বড়ো কালচারাল প্রোগ্রাম হয়, আর এর অধিকাংশই স্পন্সর করে ইউনিভার্সেল, টেস্টি স্যালাইন যারা বানায়, ওরা কালচারাল প্রোগ্রামে প্রচুর টাকা খরচ করে, স্কয়ার কোম্পানি যদিও ইউনিভার্সেল কোম্পানিকে বেচতে-কিনতে পারবে, তবু ইউনিভার্সেল কোম্পানির মতো অতো কালচারাল প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে না, তবে ওরাও কিছু কাজ করে।

চিহ্ন: আপনি তো ছোটকাগজ করেন, আর ছোটকাগজের একটা কাজ হলো নতুনদের সুযোগ করে দেয়া, যাতে তারা উঠে আসতে পারে, তো ভালো লিখিয়ে কি উঠে আসছে? আপনি কী দেখছেন?

জু. ক: আমাদের কাজ সুযোগ করে দেয়া, আমরা সেটা করছি, তবে তরুণদের ভেতরে যদি মসলা না থাকে, তাহলে তো ভালো কিছু হবে না, আর তারা ভালো করবে কি করবে না সেটা সময় বলে দেবে।

চিহ্ন: আপনি কি শিল্প সাহিত্যের এই সময়ের কাজ নিয়ে আশাবাদী? অনেককেই হতাশ হতে দেখি।

জু. ক: নিঃসন্দেহে আশাবাদী, হতাশ হবার কিছু নাই, কোনটা যে টিকে যাবে, জীবনানন্দ দাশ তার সময়ে মূল্যায়ন পাননি, ওমর খৈয়াম মৃত্যুর তিনশ বছর পরে কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, তার আগে তিনি বিজ্ঞানী বলেই পরিচিত ছিলেন।

চিহ্ন: আমাদের সাহিত্যে অন্ধ সমালোচনার একটা ব্যাপার দেখা যায় যে, ঢাকা থেকে বলা হচ্ছে রাজশাহীতে কিছু হচ্ছে না, রাজশাহী থেকে বলা হচ্ছে নাটোরে কিছু হচ্ছে না।

জু. ক: অখ্যাতদের কথা বাদ, যারা বেশি বিখ্যাত আছে, নজরুল-রবীন্দ্রনাথ, আমরা ক’জন তাদের দশটা কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে পারবো, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র দুটো কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে পারবো? ইউনিভার্সিটিতে যারা বাংলার টিচার, তাদের ভেতরে খোঁজ করলে অনেককেই হয়তো পাওয়া যাবে, যারা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রচনা সমগ্র পড়ে শেষ করেন নাই, হয়তো শুরু করেছে, শেষ করতে পারে নাই। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র তিনটি উপন্যাস, তার ভেতরে ‘লালসালু’ পড়েছে পাঠ্য হিসেবে, বাকিগুলো পড়ে নাই, তো এ হচ্ছে না সে হচ্ছে না এসব বলে লাভ নাই, আগে পড়তে হবে, আমরা যারা ছোটকাগজ করি, দশটা কাগজ অন্তত পড়ি, ভালোলাগা-খারাপলাগা নিয়ে মত বিনিময় করি।

চিহ্ন: অনেক ছোটকাগজ দেখছি যেখানে প্রতিষ্ঠিত লেখকের বাইরে কারো লেখা প্রকাশিত হয়নি।

জু. ক: আমাদের ওখান থেকে যেমন ছয়টি ছোটকাগজ বের হয়েছে, ওখানে এলাকার মানুষই লিখেছে, প্রতিষ্ঠিত বলতে তেমন কেউ নেই, জাকির তালুকদারের আলোচনা আছে এটুকুই।

চিহ্ন: সেও তো এলাকার মানুষ।

জু. ক: হ্যাঁ এলাকার মানুষ।

চিহ্ন: আপনাদের কাগজ কি বাইরে পাঠান?

জু. ক: হ্যাঁ যেখানে লিঙ্ক আছে পাঠাই।

চিহ্ন: লিঙ্ক তো তৈরি করতে হবে সব ছোটকাগজের সাথে।

জু. ক: হ্যাঁ, তবে এটা একটা ভালো আয়োজন, এই চিহ্নমেলা সে জায়গাটা তৈরি করে দিয়েছে।

চিহ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ।

অভিজিত রঘু ॥ সাহিত্যকর্মী ॥ নারায়ণগঞ্জ
(আড্ডায় উপস্থিত একজন, যার নাম অভিজিত রঘু এবং যিনি নারায়ণগঞ্জে ছোটকাগজ করেন, দীর্ঘ সময় নীরবতার পরে মুখ খোলেন)

অভি. র: চিহ্ন যদি একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় তখন ঠেকাবেন কী দিয়ে? দেখা যাচ্ছে এটা একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে গেলো, এর বাইরে কিছু দাঁড়াতে পারছে না, আর আপনি লিটলম্যাগ নিয়ে যে কথাটা বললেন, আমি একটু অন্যভাবে বলি, লিটলম্যাগের উদ্দেশ্য হলো নতুনদের জায়গা করে দেওয়া, আর নতুনদের জায়গা করে দেয়া মানে হলো নতুন একটা চিন্তা আছে, প্রকাশ করার জায়গা নাই, সেটা প্রকাশ করা।

চিহ্ন: হ্যাঁ নতুনরা তো নতুন চিন্তা নিয়েই আসবে।

অভি. র: অনেক নতুন আছে তৃতীয় শ্রেণির চিন্তা নিয়েও আসছে।

চিহ্ন: এটাও সব সময় থাকবে।

অভি. র: আমরা তো সোসাইটিতে কাজ করি, আমি নারায়ণগঞ্জে কাজ করি, ওখানে দেখি এইটটি পার্সেন্ট বর্জ্যমাল। তো তারা বলে যে, আমাদের জায়গা দেন না কেনো? ব্যাপার তো আসলে সেটা নয়, ব্যাপার হলো তার ভেতরে আদৌ কোনো নতুন চিন্তা আছে কিনা, তো প্রতিষ্ঠান তো নতুন চিন্তাকে লালন করে না, নতুন চিন্তার সাথে প্রতিষ্ঠানের একটা সাংঘর্ষিক সম্পর্ক আছে, তো সেই সাংঘর্ষিক জায়গা থেকে আমরা হলাম নতুন চিন্তার পক্ষে, তো এখন চিহ্ন যদি প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় যে, তার পাশে নতুন চিন্তা জেগে উঠতে পারছে না, তাহলে তো নতুন চিন্তা সোসাইটিতে পাবে না, তো সোসাইটিতে যাতে পায়, সে জন্যই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রশ্ন।

চিহ্ন: আপনি হয়তো জানেন চিহ্নর একটি নিয়মিত বিভাগ আছে। সেখানে নতুনদের জন্য বড়ো একটি জায়গা থাকে। প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই চিহ্ন প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সাহস দেখায়। আর চিহ্ন প্রতিষ্ঠান হলে নিজে থেকেই ছোটকাগজীয় তকমা পরিহার করবে। এটা বলতে পারেন ছোটকাগজ চিহ্নর মেজাজ।

অভি. র: হ্যাঁ এমন হয়, দেখা যাচ্ছে যে এই বিষয়ে আমরা এই সংখ্যা করবো, কিন্তু সেই বিষয়ে কোনো লেখা সংগ্রহ করতে পারছিনা, একাধিক লেখকের কাছে লেখা আহ্বান করার পরেও পাচ্ছি না, এভাবে কোনো সংখ্যা করতে করতে ছ’মাস লেগে যাচ্ছে।

চিহ্ন: আর আর্থিক সংকট?

অভি. র: আমি আর্থিক সংকটে পড়ি না বললেই চলে, আমি বিজ্ঞাপন পাই আর পত্রিকা ফ্রি দিই না, বিক্রি করলে আমাদের টাকা চলে আসে।

চিহ্ন: নারায়ণগঞ্জে ছোটকাগজের কাজ কেমন হচ্ছে?

অভি. র: আমরা চারটা লিটলম্যাগ নিয়ে আসছি; হস্তাক্ষর, বিরাঙ, ঠিকানা, আর হলো খনন।

চিহ্ন: ছোটকাগজের কাজ করতে এসে স্বস্তির জায়গাটা কোথায়?

অভি. র: কাজ করার আগে যতোটা কঠিন মনে হয়, কাজ করতে এসে অতোটা কঠিন মনে হয় না।

চিহ্ন: আপনার ওখানে পাঠক মূলত কারা, তরুণরা কেমন আগ্রহী?

অভি. র: তরুণ মানে কারা? আমরা কাজ করতে করতে একটু বয়েসি হয়ে গেছি বলে আমাকে তরুণ বলবে না? হা হা হা….

চিহ্ন: তরুণ বলতে এই প্রজন্ম, পঁচিশের পরে কেউ তো আর তরুণ থাকে না, তবু নিজেকে তরুণ ভাবতে সুখবোধের ব্যাপার আছে, বৃদ্ধ শাহজাহান বন্দী থাকাকালে একজন তার কাছে এসে প্রতি সন্ধ্যায় যৌবনের গল্প শোনাতো, তো এইগুলো হলো একটা সুখবোধের ব্যাপার।

অভি. র: হ্যাঁ সে তো আছেই, যখন জরা চলে আসে তখন যৌবনের গল্প ভাবতে ভালোলাগে।

চিহ্ন: আর তা ছাড়া সাহিত্যেও তো বিভিন্ন বিভক্তি চলে আসে, নতুন, তরুণ কিংবা দশক বিভক্তি।

অভি. র: হ্যাঁ তা তো আছেই, আর অনেকেই বলে যে, আমরা ষাটে এই করেছি সত্তরে সেই করেছি, কিন্তু তারপরে কী করেছো? তারপরে তো আর নিয়মিত কিছু পারছি না, এই ব্যর্থতা কার? এইটাই হলো জরা।

চিহ্ন: এখানে তরুণ বলে এই বিভক্তির একটা কারণ হচ্ছে, অভিযোগ উঠছে তরুণরা বইমুখি হচ্ছে না।

অভি. র: না এটা ঠিক না, বরং তরুণরা অনেক পড়ছে, তবে এখন পড়ার জায়গাটা ব্যাপক হয়ে গেছে, শুধু বই না, ব্লগ পড়ছে, ই-বুকে পড়ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নজনের বিভিন্ন লেখা পড়ছে, বিভিন্ন ওয়েব ম্যাগাজিন হচ্ছে, সেখানে প্রচুর পাঠক ভিজিট করছে, পড়ছে।

অমিতাভ চক্রবর্তী ॥ কবি ॥ পশ্চিমবঙ্গ

চিহ্ন: বাংলাদেশে আসতে কেমন লাগে?

অ. চ: বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। ১৯৪৯ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি আমি বরিশালে জন্মেছি। তো এই মায়ের কোলে ফিরতে বরাবরেই ভালোলাগে।

চিহ্ন: আপনি কেনো লেখেন?

অ. চ: কবি হতে পারিনি। প্রাণের টানে লিখি। যা কাউকে মুখে বলা যায় না তাই লিখে ফেলি। আমার প্রিয় কবি মাইকেল মধুসূদন। তো আমি তো আর মাইকেল হতে পারবো না। তবুও তো ভালোবাসতে পারবো। সেই ভালোবাসা থেকেই লিখি।

চিহ্ন: এখনকার প্রিয় লেখক?

অ. চ: আল মাহমুদ ও বিনয় মজুমদার।

চিহ্ন: ভালো লেখক হতে হলে কী করা দরকার?

অ চ: অন্যের লেখা পড়া দরকার। অন্তত দু’শো বছর আগে থেকে যা লেখা হচ্ছে তা সবই পড়া দরকার। বিশেষ করে সুকান্ত, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাটা পড়া বেশি জরুরি।

চিহ্ন: আসলে সমাজের পরিবর্তনের জন্য কী করা দরকার?

অ চ: খোলা মন থাকলেই সমাজ পরিবর্তন সম্ভব। সমাজের অসংগতিগুলো দূর করতে পরিচ্ছন্ন মনের অধিকারী হওয়া দরকার।

চিহ্ন: আপনার কী তরুণদের প্রতি আক্ষেপ আছে বা তাদের প্রতি প্রত্যাশা?

অ চ: এখনকার বাঙালি ঘরের ছেলে-মেয়েরা ইংরেজি নিয়ে বেশি ব্যস্ত; বাংলা নিয়ে নয়। বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাদের মমত্ববোধ জেগে উঠুক এটাই প্রত্যাশা।

চিহ্ন: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মাকিদ হায়দার ॥ কবি ॥ বাংলাদেশ

চিহ্ন: প্রথম লেখালেখি নিয়ে কিছু বলেন।

মা. হা: প্রথম লেখা শুরু করি ষাটের দশকে। আমি যখন ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ি তখন থেকে লেখা শুরু হয়েছে। এখন গল্প, কবিতা, নাটক এসব লিখে যাচ্ছি।

চিহ্ন: লেখকদের সম্পর্কে আপনার বক্তব্য?

মা. হা: লেখক কখনো ছোট নয়। একজন লেখকের জীবন কাটে পড়ালেখাতে। তাই লেখকের হাড়ে-মাংসেও জ্ঞানের বিচরণ থাকে।

চিহ্ন: তরুণ প্রজন্মের কাছে আপনার প্রত্যাশা।

মা. হা: এই তরুণ প্রজন্মের মনে ইতিহাসের কলুষতা, কূপমণ্ডূকতা ঢুকানো হয়েছে। ১৯৭৫ এর পর থেকে মূলধারাটা অদৃশ্য হয়ে গেছে। কালে কালে তরুণদেরকে শুধু বিভ্রান্তই করা হয়েছে। তাই আমার মনে হয় তরুণদেরকে প্রথমে জিজ্ঞাসু মনের অধিকারী হতে হবে। এই প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের বিভেদ কমিয়ে নিজেদের প্রতি আস্থাশীল হতে হবে এটাই আমার প্রত্যাশা।

(মাকিদ হায়দার এরপর অন্যলেখকদের আগমনে তাদের সাথে বাইরে ঘোরার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। ফলে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিতে হয়।)

এস এম মাসুদ রানা ॥ সম্পাদক জিরোপয়েন্ট ॥ পাবনা

চিহ্ন: কী লিখছেন?

মা. রা: কবিতা লিখছি।

চিহ্ন: কেনো কবিতা লেখেন?

মা. রা: আমার ভেতরে শূন্যতা কাজ করে। সেখান থেকে কবিতা সৃষ্টি হয়।

চিহ্ন: এখনকার কবিদের কবিতা সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

মা. রা: এখনকার কবিদের পড়াশোনা কম হচ্ছে। আমি ১ বছর ধরে একটি কবিতা লিখছি। এখনকার কবিতায় প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ কম। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা প্রাধান্য পাচ্ছে। সামগ্রিকতা থাকছেনা।

চিহ্ন: কবিতা কেনো কবিতা হচ্ছে না?

মা. রা: জানাবোঝার ঘাটতির কারণে হতে পারে। না জেনেই অনেক উঁচুস্তরে উঠে পড়েছি—এমন ধারণার কারণেই তরুণদের কবিতা কবিতা হয়ে উঠছে না।

চিহ্ন: তরুণ কবি হিসেবে সমাজ সম্পর্কে আপনার ভাবনা যদি বলতেন।

মা. রা: আমরা রূপকথার ভূত পড়েছি। আমাদের সমাজে এখন জীবন্ত রূপকথার ভূতেরা তাড়া করছে। তারা ছড়িয়ে আছে সবখানে। এই ভূতেরাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্মদাতা। এরাই সমাজকে নষ্ট করছে।

চিহ্ন: লেখালেখি কবে থেকে শুরু করেন আর প্রিয় লেখক কে?

মা. রা: প্রিয় লেখক স্বদেশবন্ধু সরকার। আর আমার বয়স যখন ২০, তখন থেকেই লিখছি।

চিহ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ।

সঞ্জয় সাহা ॥ সম্পাদক তিতির  ॥ পশ্চিমবঙ্গ

চিহ্ন: কবে থেকে লেখালেখি করছেন?

স. সা: স্কুল জীবন থেকেই শুরু। আর প্রথম লেখা প্রকাশও পেয়েছে স্কুল জীবনে। মনের খোরাক হিসেবে লিখছি।

চিহ্ন: আপনার লেখার জগত সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?

স. সা: ভ্রমণকাহিনি লিখতে ভালোলাগে। আর লিখতে হলে লেখার জগত নিয়ে একটু বেশি ঘাটাঘাটি করতে হয়। আর আমার জগতটা এভাবে দিন দিন গোছাচ্ছি।

চিহ্ন: কেনো লেখেন?

ভালোবাসি বলে আর কাজটা আমার সামর্থ্যে কুলায় বলে লিখি। আর অন্যকে নিজে যা বুঝি তা জানানোটাও একধরনের দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। এসব কারণেই লিখি।

চিহ্ন: চিহ্নকর্মীদের সম্পর্কে আপনার মতামত যদি বলতেন।

স. সা: এরা অসম্ভব আন্তরিক। প্রচুর মানুষকে জড়ো করতে পেরেছে। আর এই যে এতো তরুণ সম্মিলিতভাবে কাজ করছে এটা যেনো ভাষা আন্দোলনেরই আর একটি রূপ।

চিহ্ন: চিহ্নমেলা সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?

স. সা: মেলায় আসতে পেরে আমি সৌভাগ্যবান মনে করছি। মেলা নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই, তবে আমাদের বাংলাদেশ ও ভারত এই দুই দেশের বই বিনিময় নিয়ে বর্ডারে বেশ জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্ডারে অনেকে বলছে ‘ব্যবসা করতে যাচ্ছেন।’ তো তার কাগজ পত্র কোথায়? এটা অনেককেই হয়তো নিরুৎসাহিত করবে। তাই আমার মনে হয় জ্ঞান বিনিময়ের এই মেলবন্ধন দৃঢ় করার জন্য দু-দেশের সরকারকে ভাবা উচিত।

বীরেন মুখার্জী ॥ সম্পাদক দৃষ্টি ॥ মাগুরা

চিহ্ন: মেলায় এসে আপনার কেমন লাগছে?

বী. মু: প্রথমবারের মতো এসেছি। এটা একটা সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন মেলা। আমার খুব ভালো লেগেছে।

চিহ্ন: আপনি তো সম্পাদনার বাইরে লেখালেখিও করেন? তা কি লেখেন?

বী. মু: অনুবাদ বাদে সবই লিখি। ১৯৯৮ সালে কলকাতার চিন্ময় প্রকাশনী থেকে আমার প্রথম বই ‘উদভ্রান্ত সময়’ (কবিতা) বের হয়। এখন পর্যন্ত ১৩টি বই বের হয়েছে।

চিহ্ন: এখনকার লেখালেখি নিয়ে আপনি কী বলবেন।

বী. মু: আমি আসলে লেখা বুঝিই না। কোনো লেখাই বুঝি না তবে বোঝার চেষ্টা করি। যারা লেখা বুঝতে চেষ্টা করে তারাই কেউ কেউ লিখে ফেলে। আসলে লেখালেখি হলো বোঝাপড়ার ফসল।

চিহ্ন: এসব লেখালেখি কী সমাজের কোনো কাজে আসছে?

বী. মু: আসলে এটা তো সুদূরপ্রসারী কাজ। তাই লেগে থাকতে হবে। মূলত যতো লেখালেখি হবে ততো বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পাবে। আর সমাজ তার ভেতর দিয়েই এগিয়ে যাবে।

চিহ্ন: লেখকদের খ্যাতির বিড়ম্বনা নিয়ে কিছু বলেন।

বী. মু: খ্যাতি চাওয়া দোষের নয়। তবে খ্যাতি চাওয়ার আগে বুঝতে হবে, আমি তার যোগ্য কি না। আমরা আবার অনেককে মূল্যায়ন করি না। আগেই ভেবে বসি ও অমুক। ওর লেখা আর কী পড়বো। এভাবে অজানাই থেকে যায় বিষয়টি।

চিহ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ।

মোমিন হৃদয় ॥ সম্পাদক যমুনার ঢেউ ॥ সিরাজগঞ্জ

চিহ্ন: মানুষ হিসেবে আপনার গর্বের জায়গা কোথায়?

মো. হৃ: আমি এস এস সি পাশ করিনি। ৬৯ টি পাণ্ডুলিপি লিখেছি। বাহিরের রূপ অগ্নিসংকেত পারলে হৃদয়ের রূপ নিও অন্বেষণ করে। এটা মনের খোরাক হিসেবে নিয়েছি।

চিহ্ন: বই প্রকাশ নিয়ে যদি কিছু বলেন।

মো. হৃ: ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর টাকায় প্রথম বই প্রকাশ করি। আর বই মূলত আমার গর্বের ধন। নতুন বই প্রকাশ পেলে ভালোলাগে।

চিহ্ন: কেনো লেখেন?

মো. হৃ: মানুষে মানুষে এই যে চারদিকে এতো ব্যবধান। এই ব্যবধান কমানোর জন্যই লিখি। আর লেখার মধ্য দিয়ে আমি যেনো বেঁচে থাকতে পারি— লেখার ক্ষেত্রে এটা আমার প্রেরণা। লেখা শুরু করেছি কবিতা দিয়ে।

চিহ্ন: এস এস সি’তে ফেল করলেন কেনো?

মো. হৃ: মূলত ধরাবাধা কোনো নিয়ম ভালো লাগতো না। তাই একাডেমিক গণ্ডিতে আর আবদ্ধ হয়ে থাকিনি।

লুৎফর রহমান সাজু ॥ সম্পাদক উত্তরযুগ ॥ রংপুর

চিহ্ন: আপনার লেখালেখির কারণ?

লু. র: সমাজের অসঙ্গতি ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত অবস্থানের বিষয়াদি সবার সামনে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার প্রচেষ্টা। সর্বোপরি ভালোলাগে বলার বাইরে অনুভূতিগুলো লিখে প্রকাশ করার জন্য। তাই অন্তরের অতৃপ্তিবোধ বিভিন্ন বর্ণিল রঙে প্রকাশই আমার কবিতা, গগন গল্প।

চিহ্ন: প্রিয় লেখক সম্পর্কে বলেন।

লু. র: সুকান্ত আমার প্রিয় কবি। কারণ সুকান্তই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

সাফিয়ার রহমান ॥ সম্পাদক পড়শি ॥ যশোর

চিহ্ন: লেখালেখি সম্পর্কে আপনি কিছু বলেন।

সা. র: মনে যখন যেটা উদয় হয়, তখন সেটা লিখি। বাউল কবি কানাইশাহ্কে নিয়ে তাঁর জীবন ও গান নিয়ে বর্তমানে গবেষণাধর্মী কাজ করছি। গবেষণাধর্মী কাজ করতে আমার খুব ভালোলাগে। মূলত লোকজ গবেষণা আমার প্রিয় বিষয়।

চিহ্ন: কেনো প্রিয়?

সা. র: লোকজ বিষয় যা মানুষ বৃহৎ পরিসরে জানে না। আবার যেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে তা তুলে ধরার ব্রত পালন করার ইচ্ছা থেকেই প্রিয় করে নিয়েছি। যেমন মাহাত্মা শিশির কুমার ঘোষের কথা অনেকেই জানেন না। এটা তুলে ধরা দরকার।

চিহ্ন: পড়শিকে নিয়ে কী ভাবছেন?

সা. র: তেলে মাথায় তেল না দিয়ে অজ্ঞাত মানুষদের তুলে আনাই পড়শির কাজ।

চিহ্ন: চিহ্নমেলা সম্পর্কে আপনার ভাবনা বলেন।

সা. র: ইলেকট্রনিক যুগে এই মিলনমেলা আমাদের যোগাযোগের একটা সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। মন যা জানে না, চোখ তা দেখে না। এখানে আসলে দুটোই দেখা হয়ে যাচ্ছে। মেলা মূলত আমাদের পাঠককে বই বিমুখ থেকে দূরে রাখে। চিহ্নমেলা এই কাজটাই করছে।

আলী এহসান ॥ সম্পাদক বিরাঙ ॥ নারায়ণগঞ্জ

চিহ্ন: আপনার পত্রিকার নামকরণ নিয়ে কিছু বলেন।

আ. এ: এটার মানে উচ্চৈঃস্বরে ডাকা। মানুষের মধ্যে যে মূল্যবোধ বা সৃজনশীলতা সেটা সীমিত মানুষের মধ্যে আছে। সেটাকে জোরেশোরে প্রচারই লক্ষ্য।

চিহ্ন: তরুণদের নিয়ে কী ভাবছেন?

আ. এ: নতুনদেরকে খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে এনে সাহিত্যের মধ্যে ঢুকানো দরকার। মাদকের পথে তারা যেনো পা না বাড়ায়।

চিহ্ন: নিজের সম্পর্কে বলেন?

আ. এ: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। নিজের আটটি বই বেরিয়েছে। আমার উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে সাধারণ মানুষকে বেছে নিয়েছি। আর তাতে যোগ করি নানা সমস্যা, সংকট ও তা থেকে উত্তরণের পথ।

চিহ্ন: কেনো লেখেন?

আ. এ: মূলত সময়কে ধারণ করার জন্য।

চিহ্ন: বাংলা সাহিত্য নিয়ে আপনার ভাবনা?

আ. এ: আমাদের দেশে শিক্ষার হার প্রকৃত অর্থে কম। তার চেয়ে বড় কথা হলো বই পাঠকের সংকট। এর পেছনে দুর্বোধ্য লেখা অনেকটা দায়ী। এ কারণে সহজ সরলভাবে উপস্থাপন হলে মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। যা সমাজের জন্য কল্যাণকর। তাছাড়া সমাজের গতিশীলতার জন্য বহুমাত্রিকতা দরকার। আর সহজ সরল ভাষায় লেখা বই বহুমাত্রিকতাই বৃদ্ধি করে।

চিহ্ন: মেলা সম্পর্কে আপনার অভিমত।

আ. এ: প্রান্তিক পর্যায়ে এরকম উদ্যোগ দেখার সৌভাগ্য আমার জীবনে দেখা একটি বিরল ঘটনা হয়ে থাকবে।

চিহ্ন: ছোটকাগজ করা দরকার কেনো?

আ. এ: কারণ এর মাধ্যমে নতুন লেখকরা উঠে আসে। নতুন নতুন জীবনের প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়।

চিহ্ন: লেখালেখি সম্পর্কে এককথায় কী বলবেন?

আ. এ: লেখাটা সময়ের সংকটের কারণে কেমন জানি দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছে।

হাসান আজিজুল হক ॥ কথাসাহিত্যিক ॥ বাংলাদেশ
বাংলাদেশের বাঙালি ও ওপারের বাঙালি একটি অভিন্ন সত্তা। বাংলা ভাষার সাহিত্যকে চিহ্ন আরও টাটকা রূপ দিয়েছে দুই বাংলার বাঙালিদের একত্র করে। লোহা যতো মূল্যবানই হোক কাজে না লাগলে তা জং ধরে। তেমনি সাহিত্যের জংটাকে মসৃণ করেছে এই মেলা। সমস্ত দিক থেকে তাই এই মেলা সার্থক।

ইমানুল হক ॥ তাত্ত্বিক ॥ পশ্চিমবঙ্গ
প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটাতে এই আয়োজন। নতুন প্রজন্ম সংস্কৃতিসম্পন্ন হলে দেশ মাতৃকা এগিয়ে যাবে। এই মেলা এই বারতাই বহন করছে।

সনৎকুমার সাহা ॥ প্রাবন্ধিক ও অর্থনীতিবিদ ॥ বাংলাদেশ
চোখ-কান খোলা রেখে গতানুগতিক না হয়ে লিখবেন।

নূহ-উল-আলম লেলিন ॥ সম্পাদক পথরেখা ও রাজনীতিবিদ ॥ বাংলাদেশ
এটা গভীর আত্মপ্রকাশের একটা প্রয়াস। তাই চিহ্ন হোক সৃজনশীলতার উৎস।

হোসেনউদ্দিন হোসেন ॥ সম্পাদক মরাল ॥ যশোর
আমি মাত্র এইচ এস সি পাস। লেখালেখির আগ্রহ ছোটবেলা থেকে। পত্রিকাটি বছরে একবার বের করি। এ পর্যন্ত ৪টি সংখ্যা বেরিয়েছে। লেখালেখির জগতের সাথে সংসারের জগতটা একটা জটিল বিষয়। আমার ছেলের ক্যান্সার হয়েছে। চিকিৎসা করতে পারছি না। তবে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছি নিজের মনটাকে সতেজ রাখতে। আর এই মেলায় এসে আমার মনে হচ্ছে, যারা লিটলম্যাগ করে তাদের সবারই এখানে আসা উচিত।

দেবযানী বসু ॥ কবি ॥ পশ্চিমবঙ্গ
চিহ্নমেলার ডাকে, শহীদ ইকবালের ডাকে নদী-কান্তার পেরিয়ে ছুটে আসা আমার। আমি কবিতা ক্যাম্পাস পত্রিকার সাথে যুক্ত থাকার কারণেই এটা হলো। আমি বাংলা সাহিত্য নিয়েই পড়াশোনা করেছি। আমার পিতৃদেবও ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজের। সাহিত্যকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি বলেইনা লিখে থাকতে পারি না। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য পাবার জন্য এই কবিতাচর্চা, জীবনযাপন নয়। বাংলা ভাষার মোহময়ী জীবনদায়িনী আকর্ষণ উপেক্ষা করতে পারি না বলেই কবিতার জগতে আসা। কবিরা আমার কবিতা পড়েন, মর্যাদা দেন, এই প্রাপ্যটুকুই অমৃত মনে হয়। এই অমৃতের লোভে সাহিত্যের সাথে জড়িত আমি। চিহ্নপরিবার আমাকেও আপন করে নিলো। এই আনন্দ রাখবো কোথায়? এই স্মৃতি জাগরুক থাকবে আমৃত্যু।

নয়ন তালুকদার ॥ সম্পাদক পলিমাটি ॥ বাংলাদেশ
চিহ্নমেলায় দুই বাংলার কবি সাহিত্যিক ও লিটলম্যাগ সম্পাদকদের একটি মিলন মেলা। চিহ্ন নামে এ লিটলম্যাগটি দীর্ঘদিন থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে। পলিমাটি কৃষি-প্রকৃতি- পরিবেশ-সমাজ-সংস্কৃতি-শিল্পকলা বিষয়ক পত্রিকা হিসেবে একটি নতুন ধারার লিটলম্যাগ হিসেবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। শিল্প-সাহিত্য মানুষের মনন ও উপলব্ধিকে বিকশিত করে। মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার আলোয় এনে হাঁটতে শেখায়। যারা শিল্প-সাহিত্য বঞ্চিত জীবনযাপন করেন তাদের সাথে কুকুরের খুব মিল আছে। কুকুর কেবল একাই ভোগ করতে চায়। তাগড়া কুকুরটা, দুর্বল কুকুরগুলোকে তাড়িয়ে দিয়ে মরা গোরুটার লেজ ধরে টানাটানি করে। ছিঁড়তে পারে না। কিন্তু ছেঁড়ার চেষ্টা থেকে বিরত হয় না। হওয়া তো কুকুরের স্বভাব নয়। শিল্প-সাহিত্যচর্চা এই কুকুর স্বভাব মানুষকে নতুন মানুষে রূপান্তরিত করতে পারে। মানুষ বদলে যেতে পারে কুকুর থেকে মানুষে।

সুমন শিকদার ॥ সম্পাদক বেগবতী  ॥ ঝিনাইদহ
চিহ্নমেলায় দেশের লিটলম্যাগ লেখক-পাঠক-সম্পাদকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এখানে আসলেই অজানা শুভ্র অনুভূতি অনুভূত হয়। তিনটি মেলাতেই আমি অংশগ্রহণ করেছি। আগ্রহ কমেনি। ভালো লেগেছে।

চিহ্নমেলা মূল্যায়ন

চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙ্গলা ২০১৬
উৎসব-অভিজ্ঞতা

চিহ্নমেলা : উৎসব নয়, উন্মোচন
তারেক রেজা
কেউ মানুক আর না-মানুক, মান্য করার মতো বিশেষ কিছু থাক আর না-থাক, স্বীকার করুক আর না করুক, স্বীকার করার মতো কিংবা উল্লেখ করার মতো বিশেষ কোনো প্রতিভা থাক বা না-থাক, আমরা স্বভাবতই অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সেইসঙ্গে অন্যের মনোযোগও আমাদের প্রত্যাশিত। মনোযোগ কিংবা দৃষ্টি-কাড়ার এই ব্যাপারটিকে ভোগদখলের মানসিকতা হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ আছে। সময়টা ভালো যাচ্ছে না। সবাই নানামাত্রিক কাড়াকাড়ির মধ্যে আছে। সবাই আছে কি-না এ-প্রশ্ন ওঠা অসঙ্গত নয় কিন্তু আমি যে আছি সে-ব্যাপারে বিস্তর প্রমাণপত্র হাজির করতে পারবো। আছি বলেই ভুলে যাই যে মান্যতা ও স্বীকৃতির ব্যাপারটি কিংবা মনোযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণের কাজটি কেবল ফাঁকা আওয়াজে সম্পন্ন হওয়া অসম্ভব। অন্তত যে-বিষয়ে আমার কিঞ্চিত আনাগোনা, সেই শিল্পসাহিত্যের জগতে তো নয়ই। তাই বলে আমি এ-দাবি করছি না যে, এই ভূখণ্ডে সুবিধাবাদী-বাটপার-ভণ্ড-ভূঁইফোড়-প্রতারকচক্র সক্রিয় নেই। তাদের সক্ষমতার মাত্রা নিয়ে কথা উঠতে পারে কিন্তু সক্রিয়তার প্রশ্নে তারা অপোসহীন। তাদের কর্মকাণ্ড আমার চিন্তার বিষয় সন্দেহ নেই, তবে এই লেখার বিষয় ধান্ধাবাজ লেখক ও সৎ সাহিত্যিকের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ কিংবা ভালো-লেখা মন্দ-লেখার চরিত্রচিত্রণ নয়।

চিহ্ন পত্রিকার আয়োজনে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলাভবন চত্বরে দুইদিনব্যাপী চিহ্নমেলা-বিশ^বাঙলায় উপস্থিত থাকার আনন্দ কিছু লোকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন চিহ্নর কর্ণধার শহীদ ইকবাল। সুযোগটি আমি হাতছাড়া করতে চাই না। কিন্তু আগেই বলে রাখি, ঘোড়ার লাগাম ধরে রাখার মতো দায়িত্বশীল মানুষ আমি নই। তাই এই লেখাটি শেষ পর্যন্ত হয়তো লাগামহীন কথাবার্তায় পরিণত হবে। তাতে বিশেষ কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধির আশঙ্কাকে আমি পাত্তা দিতে নারাজ। এই মহোৎসবকে তারা যেহেতু চিহ্নমেলা-বিশ^বাঙলা নাম দিয়েছেন, আমি তাই মেলায় ঘোরার আনন্দকেই শব্দবন্দি করবো, বিশ^বাঙলার বাস্তব পরিস্থিতি কিংবা বাংলাদেশের বর্তমান বাংলা নিয়েও কোনো কথা বলবো না। কারণ আমার যোগ্যতার বহর সম্পর্কে আমি মোটামুটি সচেতন। সেইসঙ্গে অযোগ্যতারও।

শুরুতেই জানান দিয়েছি যে, গাঁয়ে না-মানলেও আমার মধ্যে এক ধরনের বিপজ্জনক মোড়লিপনা আছে। আমার লেখার পাঠক-সংখ্যা যতোই সীমিত হোক, আমি যে লেখক সেটা নানাছলে সবাইকে মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। সেই চেষ্টাসূত্রেই চিহ্নপরিবারের অনেক সদস্যের সঙ্গে আমার একটা ভাবের সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্ককে অভাবের সম্পর্ক হিসেবে দেখাই অধিকতর নিরাপদ হবে। কারণ অভাবে স্বভাব নষ্টের যে নীতিকথা প্রবাদের শরীরে লেপ্টে আছে তার সঙ্গে টাকা-কড়ি বিষয়-সম্পদের যোগ থাকলেও বিদ্যাবুদ্ধি কিংবা পাণ্ডিত্যের সঙ্গে এর ব্যবধান বিস্তর। তাই আমি আমার অজ্ঞানতাকে আড়াল না করে অন্যের দিকে হাত বাড়াই। এই হাত বাড়ানোর মাধ্যমে চিহ্নর সঙ্গে আমার একটি সম্পর্কসূত্র প্রণীত হয়েছে এবং চিহ্নমেলার আমন্ত্রণপত্র আমার মতো অখ্যাত নাদানের ঠিকানা খুঁজে নিয়েছে।

গবেষক ও সমালোচকমহলে আমার গতায়াতে যাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে, তারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন যে, এই পরিবেশে দুয়েকটি কথা সাহস করে বলে ফেলতে আমার পা কাঁপে না। ভেতরে বস্তুর অভাব থাকে বলে তা কণ্ঠের জোরে, কখনো-বা শব্দের জোরে ও বাক্যের ঘোরপ্যাচে আড়াল করার চেষ্টা করি আমি এবং এ-উপায়ে উতরেও যাই কখনো কখনো। কিন্তু সৃজনশীল মানুষ বিশেষ করে কবিদের সভায় আমার সহজে কণ্ঠ খোলে না। ভয়ানক জড়তা কাজ করে আমার মধ্যে। আমি জানি কবিতা কোনো সহজ জিনিস নয় এবং সেই-সূত্রে কবিরাও সহজ স্বাভাবিক সাধারণ মানুষ নন। গল্পকার ঔপন্যাসিক-নাট্যকারকেও আমি কবিদের দলেই ফেলতে চাই। কারণ, আমি বিশ^াস করি, কবিত্বহীন মানুষ সৃষ্টিশীল কোনো শাখাতেই সাফল্যের মুখ দেখেন না। দেখা সম্ভব নয় এই কারণে যে সৃষ্টিশীল রচনার প্রধান লক্ষ্যই অন্যের সঙ্গে সম্পর্র্ক প্রণয়ন করা এবং সম্পর্ক নির্মাণ ও সংরক্ষণের প্রধান অস্ত্রই হলো কবিত্ব। সৃষ্টি করার ক্ষমতা যাদের প্রবল, আমি তাদের দৃষ্টির আড়ালে থাকতে পছন্দ করি। তাদের কথা ও চিন্তার মর্মে প্রবেশ করতে আমি সাহস করি না। সাবধানে সুকৌশলে এড়িয়ে যাই। সান্নিধ্য এড়ানোর ফলেই সর্বদা এক-ধরনের অপরাধবোধে আক্রান্ত থাকি আমি। এই অপরাধবোধ থেকেই বোধকরি তাঁদের শিল্পকর্মের সঙ্গে আমার জড়িয়ে থাকার চেষ্টা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় থেকে সকালে রওনা দিয়ে আমি যখন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলভবন চত্বরে পৌঁছালাম তখন বেশ জমে উঠেছে চিহ্নমেলা। এতো সুন্দর সাজানো-গোছানো সাহিত্যসমাবেশে উপস্থিত থাকার অভিজ্ঞতা আমার খুব বেশি নেই। বিশাল সুন্দর মঞ্চ থেকে ভরাট কণ্ঠে ভেসে আসছে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের কথাবার্তা। তাঁদের কেউই আমাদের অপরিচিত নন, তাঁরা আমাদের চিরচেনা স্বজন— কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, আনিসুজ্জামান, সনৎকুমার সাহা, কবি জুলফিকার মতিন, সেলিনা হোসেন, কবি রুহুল আমিন প্রামাণিক এবং ইমানুল হক, পশ্চিমবাঙলার বিশিষ্ট তাত্ত্বিক। মঞ্চের শরীরে লেপ্টে আছে তাদের আলোচনার বিষয়— বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি। চোখ ধাঁধিয়ে গেলো আমার। এ আমি কোথায় এলাম? আয়োজনের এই পর্বের আবার নাম দেওয়া হয়েছে আড্ডা। এমনতরো আড্ডার কথা তো জীবনে শুনিনি। এমন বিষয নিয়ে এ-জাতীয় বিশিষ্টজনদের কথোপকথন যে আড্ডা হতে পারে তা আমার মাথায় ধরলো না। একটু স্থির হয়ে বসলাম। বোঝার চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা কী-রকম। খুব বেশি সময় লাগলো না বুঝতে। দেখলাম, দোষটা আয়োজকদের নয়, সীমাবদ্ধতা আমার মাথারই। এই আড্ডার সঞ্চালকের দায়িত্ব হাসান আজিজুল হক এমনভাবে পালন করলেন যে, এই সিরিয়াস বিষয়টিও কঠোর-কঠিন-দু®প্রাপ্য মনে হলো না। বেশ জমে উঠলো আলোচনা। বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় যাঁদের নাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে— রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান— এঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের মালায় কোনো একজনকে ভূষিত করা কি সম্ভব? বাঙালির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এই পাঁচজন মনীষীর অবস্থান ও অবদান নানাভাবে আবিষ্কারের চেষ্টা করলেন আলোচকবৃন্দ। তাতে যে গভীরতর লাভ হলো তা এই যে, এই পাঁচজন মহামানবের জীবন ও কর্মের নানা প্রান্তে আলো ফেলতে গিয়ে বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতির নির্মাণ-বিস্তারে আরো অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তির অর্জন-অবদান বিষয়ে জানা হয়ে গেলো। ‘প্রকৃতি সুপারলেটিভ পছন্দ করে না’— রবীন্দ্রনাথের এই বিবেচনাকে সামনে রেখেই আনিসুজ্জামান প্রত্যেকের কর্মের প্রতি স্বীকৃতি প্রদানের পরামর্শ দিলেন। বাঙালির পরিচয় নিয়েও বিস্তর কথাবার্তা হলো। সংস্কৃতির গতি ও গভীরতার প্রশ্নেও নানাজনের নানা মতের সমাবেশ লক্ষ করলাম এই সভায়। আলোচিত ব্যক্তিবর্গের কর্মের প্রকৃতি ও পরিধি ভিন্ন বলেই শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিতই থেকে গেলো। এই আলোচনা আমাকে মনে করিয়ে দিলো প্রেমেন্দ্র মিত্রের একটি কবিতার কথা। পুরো আলোচনার মর্মার্থকে এই কবিতার আলোকে বুঝে নেওয়া সম্ভব। ‘ঝড় যেমন করে জানে অরণ্যকে’ কবিতায় প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছেন :

কেমন করে আমি বোঝাই আমার ব্যাকুলতা!

বাতি দিয়ে কি হয় বিদ্যুতের ব্যাখ্যা?

সাগরের অর্থ মেলে সরোবরে?

আড্ডা কেবল মঞ্চে নয়, ছড়িয়ে পড়লো কলাভবনের পুরো চত্বরে। মঞ্চ থেকে নেমে বিশিষ্টজনেরাও যোগ দিলেন সেই আড্ডায়। ছোটকাগজের স্টলগুলোতে আনাগোনা কেনাকাটা চলতে লাগলো। প্রদর্শনীর জন্য যে বৃত্তাকার স্টলটি সুন্দর করে সাজানো হয়েছে সেখানেই সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেলো। এতো ছোটকাগজ একসঙ্গে দেখার সুযোগ আমার এই প্রথম। শুধু ছোটকাগজ নয়, প্রয়োজনীয় এবং দু®প্রাপ্য কিছু বইয়েরও দেখা মিললো এখানে। নেড়েচেড়ে দেখলাম। ছবি তুললাম। সম্পাদক-লেখকদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হলো। অনেকের সঙ্গেই অনেকদিন পর দেখা। ফলে উল্লাস উচ্ছ্বাস অনেক ক্ষেত্রেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেলো। কতো কথা, কতো গল্প, কতোরকমের স্মৃতিচারণ। কলাভবন চত্বর তখন আমাদের কাছে শিল্পতীর্থ। এই ভালো লাগার অভিজ্ঞতা ভাষায় ধারণ করা অসম্ভব। কেবল ভালোবাসায় রঙিন করে তোলার চেষ্টা প্রতিটি মুহূর্ত।

প্রতিদিনই আড্ডার আয়োজন। অনানুষ্ঠানিক আড্ডা তো চলছেই সবসময়। আনুষ্ঠানিকভাবে, অর্থাৎ মঞ্চেও লেখক-প্রকাশক-সম্পাদকদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে আড্ডার জন্য। হঠাৎ কানে এলো, এমনই একটি আড্ডার সঞ্চালক হিসেবে আমার নাম ঘোষণা করা হচ্ছে। আগেই উল্লেখ করেছি, আমার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বহর সম্পর্কে আমার ধারণা স্পষ্ট। লেখকমহলে আমার আনাগোনা উল্লেখ করার মতো নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ ছোটকাগজের সম্পাদকের কাছেই তারেক রেজা একটি অপরিচিত নাম এবং আমিও তাদের অনেকের সম্পর্কেই অজ্ঞাত। প্রত্যেকের কাজের পরিধি বিষয়েও আমার ধারণা নির্ভরযোগ্য নয়। আর পশ্চিমবঙ্গ, শিলিগুড়ি, কোচবিহার, ত্রিপুরা থেকে আগত লেখক-সম্পাদকদের সঙ্গেও আমার সেই অর্থে জানাশোনা নেই। তাই সঞ্চালকের আসন ছেড়ে দিয়ে আমি আড্ডার একজন হিসেবে মঞ্চে আসনগ্রহণ করলাম। নানা বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। ছোটকাগজের মান নিয়ে, লেখক ও সম্পাদকের দায়িত্বশীলতা নিয়ে, সাম্প্রতিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন লেখকের সক্রিয়তা নিয়ে, রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতা প্রসঙ্গে লেখক-সম্পাদকদের করণীয় নিয়ে। আড্ডায় যেমনটি হয়, সবাই যে যার মতো বলছেন। দুই বাংলার ছোটকাগজের বর্তমান অবস্থা এবং সাহিত্যচর্চার প্রকৃতি সম্পর্কেও আলাপ আলোচনা হচ্ছে। সবাই যে মনোযোগ দিয়ে শুনছে, তা অবশ্য মনে হলো না। শোনার কথাও নয়। সাধারণ শ্রোতার চেয়ে এই মেলায়, অন্তত মঞ্চের আশেপাশে লেখক-সম্পাদকরাই বেশি উপস্থিত। জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণা যাদের প্রবল, তারা তো ছোটকাগজের স্টলগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, পত্রপত্রিকা কিনছেন, লেখক-সম্পাদকদের অটোগ্রাফ নিচ্ছেন, ছবি তুলছেন। বাজারে চালু আছে যে, লেখক-সম্পাদকরা নিজের কথা বলতে যতোটা পছন্দ করেন, শোনার ব্যাপারে তাদের ততোটা ধৈর্য নেই। তাই আমরা সবাই বলছি। শ্রোতারাও বলেই যাচ্ছেন যে-যার মতো। মন্দ নয়। এমন না হলেও তো তাকে আড্ডা বলা যাবে না। জমজমাট আয়োজন। প্রাণবন্ত উপস্থিতি। একসঙ্গে এতো বেশি উচ্ছল উজ্জ্বল মানুষের দেখা অনেকদিন পাইনি আমি।

জমজমাট গানের আয়োজন আছে প্রতিদিনই। গান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য। বসার জায়গা একবার ছেড়ে দিলে আর ফিরে পাওয়ার উপায় নেই। দাঁড়ানোর মতো নিরাপদ জায়গাটুকুও তখন ফাঁকা নেই। লেখক না হয়ে গায়ক হতে পারলে বেশ হতো। গানের মানুষদের সারাজীবনই আমি ঈর্ষা করি। কয়েকজন বিশেষ মানুষের দেখা মিললো এই মেলায় যারা একই সঙ্গে লেখক ও গায়ক। সম্পাদক হিসেবে খ্যাত দুয়েকজনকেও দেখলাম যারা কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও শ্রোতাদের মুগ্ধ করলেন। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং ম্যাজিকলণ্ঠন পত্রিকার সম্পাদক কাজী মামুন হায়দার এ-রকম একজন বিশিষ্ট মানুষ। তাঁর সম্পর্কে আমি প্রথম শুনি আমার সহকর্মী, কবি সুমন সাজ্জাদের কাছে। রাজশাহীর একটি সাহিত্য সম্মেলনে মামুনের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। সুমন সাজ্জাদ যা বলছিলেন, যেভাবে বলছিলেন, বিশ^াস করতে আমার কষ্ট হচ্ছিলো। সুমন মূলত তাঁর বিস্ময়ের অভিজ্ঞতাই আমার সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন। এবার চিহ্নমেলায় গিয়ে আমিও সেই বিস্ময়ের মুখোমুখি হলাম। কাজী মামুন হায়দার বেশেভূষায় বাউল। জীবযাপনেও। তাঁর গান শুনে আমি মুগ্ধ। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাঞ্চন। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের একটি সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে গিয়ে ওর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। অসাধারণ ভাওয়াইয়া গান করে ছেলেটি। ভাওয়াইয়া গানের একটি দল নিয়ে কাঞ্চন গান শোনাচ্ছিলো। তুমুল করতালি হচ্ছিলো মুহূর্মুহু। একমাত্র গানের সময় কলাভবন চত্বরে মেলার প্রকৃত চেহারা ধারণ করলো। গান শুনতে শুনতে কেউ কেউ পত্রপত্রিকা কেনার প্রয়োজনীয় কাজটি সেরে নিচ্ছিলেন।

রাজশাহীর সন্তান কৌতুক অভিনেতা আবু হেনা রনিকেও একদিন মঞ্চে দেখা গেলো। তিনি কৌতুক পরিবেশন করে দুই বাংলার বাঙালির অন্তর জয় করেছেন। তাঁর জমজমাট পরিবেশনায় উপস্থিত দর্শকের উল্লাস সীমানা ছাড়িয়ে গেলো। মানুষকে হাসানোর মতো কঠিন কাজটি খুব সহজে করতে পারার মতো একটি দুঃসাধ্য বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছেন রনি। অর্থাৎ কেবল জ্ঞানচর্চার মতো নিরস আয়োজনে সীমাবদ্ধ না থেকে উপস্থিত মানুষজনের মনের দিকটিকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। প্রাণের সজীবতা না থাকলে জ্ঞানের বিস্তার যে বাধাগ্রস্থ হয় সেটা বুঝতে পেরেছে চিহ্নপরিবার। তাই জ্ঞানই শুধু নয়, আয়োজকদের কাণ্ডজ্ঞানও আমাদের প্রশংসা দাবি করে।

লেখক হিসেবে আমাকে পাত্তা দেওয়ার বিশেষ কোনো কারণ নেই এবং সাধারণত এই ভুল কেউ করেনও না। কিন্তু এই মেলায় এসে একটি মজার অভিজ্ঞতা হলো। পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকার সম্পাদক আমাকে বললেন, অনেকদিন থেকে আমি আপনাকে খুঁজছি। আমি বললাম, কোথাও বোধকরি ভুল হচ্ছে, আপনি হয়তো অন্য কাউকে খুঁজছেন, আমার নাম তারেক রেজা। তিনি বললেন, হ্যাঁ আমি তারেক রেজাকেই খুঁজছি। বলেই একটি পত্রিকা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। দেখলাম, ওখানে আমার একটি গদ্য ছাপা হয়েছে। লেখাটি কবে দিয়েছি, কার মাধ্যমে দিয়েছি, কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। তারপরে তিনি যা বললেন, তা এই লেখায় উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে না। এই সুযোগে ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখি।

ছোটকাগজ হিসেবে চিহ্ন নিজের কাজটি দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই সম্পন্ন করে বলে আমি মনে করি। ছোটকাগজের টিকে থাকার ইতিহাস মানেই তো সংগ্রামের ইতিহাস। এই সংগ্রামে যারা সক্রিয়ভাবে সংযুক্ত থেকেছেন, সেই চিহ্নপরিবারের সবার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। চিহ্নর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলা সাহিত্য কতোটা সমৃদ্ধ হয়েছে সেটা মূল্যায়নের দায়িত্ব আমি সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে চাই। কিন্তু চিহ্নপরিবার বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ছোটকাগজসমূহের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অকৃপণ থাকতে পেরেছে। তাদের এ প্রয়াস নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। এ-বছর কলকাতার কোরক (সম্পাদক- তাপস ভৌমিক), শিলিগুড়ির মল্লার (সম্পাদক- শুভময় সরকার), কোচবিহারের তিতির (সম্পাদক- সঞ্জয় সাহা), সিলেট বিভাগের চৈতন্য (সম্পাদক- রাজীব চৌধুরী), রংপুর বিভাগের প্রয়াসী (সম্পাদক- জলিল আহমেদ), রাজশাহী বিভাগের কবিকুঞ্জ (সম্পাদক- রুহুল আমিন প্রামাণিক), চট্টগ্রাম বিভাগের পুষ্পকরথ (সম্পাদক- হাফিজ রশিদ খান) এবং ঢাকা বিভাগের দূর্বা (সম্পাদক-গাজী লতিফ) চিহ্নপুরস্কার-এ ভূষিত হয়েছে। পত্রিকাসমূহের সম্পাদকবৃন্দ এবং লেখকদের আমি ধন্যবাদ জানাই। এই স্বীকৃতি সম্পাদকদের আরো দায়িত্বশীল করবে— প্রতিক্রিয়ায় এমনটিই ব্যক্ত করেছেন তারা। মননশীল শাখায় এবার চিহ্নপুরস্কার পেয়েছেন শরীফ আতিক-উজ-জামান এবং সৃজনশীল বিবেচনায় এই পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন মোস্তাক আহমাদ দীন। এই দুইজন মননশীল ও সৃজনশীল মানুষের প্রতিও আমার গভীর শ্রদ্ধা।

বাংলাদেশে পুরস্কার নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরির ইতিহাস বেশ পুরনো। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের পুরস্কার প্রদানে কোন মানদণ্ড ব্যবহার করা হয় তা সবাই জানেন। পুঁজি-শাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ যে সমস্ত পুরস্কার চালু করেছে সেখানেও নানা গলদ চোখে পড়ে। এদেশে পুরষ্কারের রাজনীতি বড়োই নির্মম। তাই সত্যিকারের সৃজনশীল ও মননশীল মানুষ কোনো রকম পুরস্কার বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির তোয়াক্কা না করেই নিজের কাজটি নীরবে সম্পন্ন করে যান। চিহ্নর সঙ্গে আমার সম্পর্কের নিবিড়তা থেকেই আমি এদের নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। পুরস্কারপ্রাপ্ত ছোটকাগজসমূহের ব্যাপারে আমার অল্পবিস্তর জানাশোনা আছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে যারা পুরস্কার পেয়েছেন তাঁদের কাজের খোঁজখবরও আমি কিছুটা রাখি। ফলে স্বীকার করতেই হয় যে, চিহ্নপরিবারের বিবেচনা ও মূল্যায়নের প্রতি ভরসা রাখা যায়।

সাহিত্যের স্বজনদের তাঁদের স্বকাল কিছুটা অবজ্ঞার চোখেই দেখে। এই অবজ্ঞা ও উপেক্ষার ঢল ঠেলেই সামনে এগুতে হয়। শিল্প-সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের এমনটিই শিক্ষা দেয়। কিন্তু আমরা তো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে অভ্যস্ত নই। তাই কিছুই পেলাম না, কিছুই হলো না বলে মাঝে মাঝে হাল ছেড়ে দেই। এই হাল-ছাড়া জীবনের গতি ও গন্তব্য বাস্তব কারণেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস হবেই হবে’— রবীন্দ্রনাথের এই গান আমাদের কণ্ঠে যতোটা উত্তেজনা ছড়ায় অন্তরে ততোটা আলোক সঞ্চার করতে পারে না বলেই ভুলে যাই যে, অন্ধকারে অন্ধকার ঘষে আলো জ¦ালোনোর কাজটি সময়ের সবচেয়ে সাহসী সন্তান হিসেবে সৃজনশীল মানুষকেই করতে হবে। জীবনানন্দ দাশের ওপর নির্ভর না-করে আমি খুব বেশি এগুতে পারি না। হতাশায়, ভালোবাসায় তিনি আমার উজ্জ্বল অবলম্বন। তিনি বলেছেন :

তিমির হননের তবু অগ্রসর হয়ে
আমরা কি তিমির বিলাসী?
আমরা তো তিমির বিনাশী হতে চাই
আমরা তো তিমির বিনাশী

চিহ্নমেলায় এসে একসঙ্গে এতোগুলো তিমির বিনাশী মানুষের দেখা পেয়ে আমার মধ্যেও আশার প্রদীপ জ¦লতে শুরু করেছে। আমি আর হাল ছাড়তে চাই না, বরং কণ্ঠ ছাড়তে চাই জোরে। কেউ শুনলো কি-না সে ভাবনায় আর ডুবে থাকতে চাই না আমি। বরং ভেসে উঠতে চাই স্বরূপে। আমার কথা আমাকে বলতেই হবে। আমার মতো করেই বলবো আমি। যতোই তা আক্রান্ত হোক মর্মান্তিক মুদ্রাদোষে। হয়তো আমারও হবে। অন্য অনেকের যে-রকম হয়।

চিহ্নপরিবারের নানা অর্জনে আমি ঈর্ষান্বিত। ঈর্ষার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি এই যে, এই পরিবার এমন এক দল দায়িত্বশীল কর্মী তৈরি করতে পেরেছে যারা খুব সহজেই যে-কোনো আয়োজনকে বিশেষ উচ্চতায়, বিশেষ সম্মান ও মর্যাদায় পৌঁছে দিতে পারে। চিহ্নমেলার পুরো পরিসরটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মেলার প্রত্যেক অংশের জন্য রয়েছে দায়িত্বশীল কর্মী। কোনো কাজ কোথাও আটকে নেই। সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। আগত অতিথিবৃন্দের দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখছে তারা। কার কী লাগবে, কে কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে, কী খাবে— কোনো ব্যাপারেই তাদের অবহেলা নেই। অতিথি তো কম নয়, আমার অনুমান তিন শতাধিক হবে, কিংবা আরো বেশি। অতিথিদের সবার সম্মান ও মর্যাদা সমান না হলেও তারা কিন্তু প্রত্যেকের ব্যাপারেই সচেতন। এমনতর প্রশিক্ষিত বাহিনী তৈরি করা কী করে সম্ভব হলো? আমাদের মাথার ওপর যারা সারাক্ষণ ছায়ার মতো ছিলো তাদের এই কাজের প্রেরণা কোথা থেকে আসে? কিছুতেই আমার মগজে ঢোকে না। সকল দিকে নজর রাখছেন অত্যন্ত দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষ চিহ্নপ্রধান শহীদ ইকবাল। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ধন্যবাদ প্রদানের নয়। চিহ্ননির্বাহী রহমান রাজুর সঙ্গে এবারই প্রথম ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেলাম। কেবল একটি সফল অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব প্রদানের জন্যই নয়, আমার প্রতি তিনি যে বিশেষ নজর রেখেছেন এজন্য তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অন্তহীন।

যে-কোনো অনুষ্ঠানের সমাপনী-পর্বেরই কিছু আকর্ষণীয় দিক থাকে। চিহ্নমেলার মূল আকর্ষণ ছিলো পুরস্কার ঘোষণা ও পুরষ্কার প্রদান। মঞ্চে যারা উপস্থিত ছিলেন তারাও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁদের কথা শোনার সুযোগ হলো। শিল্প-সাহিত্যের নানা দিকে আলো ফেললেন তারা। সৃজনশীল মানুষের চিন্তা ও কর্ম কীভাবে সমাজকে বদলে দিতে পারে, কীভাবে জনমানসে শিল্পের সৌরভ ও সমৃদ্ধি সক্রিয় থাকে, কীভাবে স্বকালের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মহৎ মানুষেরা একটি আলোকিত আগামী নির্মাণে কাজ করে যান, তা বক্তা ও অতিথিদের কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠলো। একটি চমৎকার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চিহ্নমেলার আয়োজন সমাপ্ত হলো। কিন্তু শেষ বললেই তো আর শেষ হয়ে যায় না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে’। একটি শেষ হয়তো অসংখ্য শুরুর রেশ ছড়িয়ে দেয় মনের গভীরে। আমরা ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথ ধরি কিংবা বাড়ির পথে যেতে যেতে ভাবি, হয়তো জীবনানন্দ দাশের মতো করেই ভাবি :না এলেই ভালো হতো অনুভব করে
এসে যে গভীরতর লাভ হলো সে-সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে;
দেখেছি যা হলো হবে মানুষের যা হবার নয়—
শাশ^ত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।

রাত্রির অন্ধকার মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নামই তো জীবন। গানের মানুষ আমি নই কিন্তু গানের মতো করেই ভাবতে ইচ্ছে করে : জীবন মানে বেঁচে থাকার আশা। এই আশার ভেলায় ভেসে বেড়ানোর কথাই আমি বলতে চাই আমার সমস্ত রচনায়। আমিও প্রাণ খুলে উচ্চারণ করতে চাই— ‘শাশ^ত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়’। এই সূর্যোদয়ের অভিজ্ঞানই হয়তো এই চিহ্নমেলায় উপস্থিত অসংখ্য মানুষের একজন হিসেবে আমার অমর-উজ্জ্বল অর্জন।

অভিবাদন-জাতিগঠনের কাজে ব্রতী চিহ্নমেলা
ইমানুল হক

যাত্রার শুরুতে ছিলো প্রবল রোদের প্রতাপ। গেদে স্টেশনে নেমে বিকেলে বাংলাদেশ সীমান্তে যখন পা দেওয়া গেলো তখন সামান্য মেঘের আভাস। যন্ত্রণাময় কাঁটাতারের পাশ বেয়ে পৌঁছানো গেলো দর্শনা চেকপোস্টে। দর্শনায় ভারতের চলমান যন্ত্রের সংকেত মেলে। কথা সেরে নেওয়া গেলো দেশে। সীমান্তেই টের পাওয়া গেলো বাংলাদেশি আতিথেয়তার। চা না খাই বিস্কুট খেতেই হবে। বাংলাদেশের বিস্কুট আমার খুব প্রিয়। না করা গেলো না সে কারণেও। দর্শনা স্টেশন থেকে ছাড়ে রাজশাহীর ট্রেন। আকিকুল আমার ছাত্র, আর তাঁর সহকর্মী অনিরুদ্ধ আমাদের পথপ্রদর্শক। সঙ্গে মধুছন্দা আর আদিত্য তাপস রায়। ভ্যানে উঠে বসা গেলো দর্শনার উদ্দেশ্যে। ঝড়ো-মেঘ সঙ্গী হলো আমাদের। চারপাশে সবুজের সমারোহ। চোখ জুড়িয়ে দেখার আগেই সামাল সামাল দশা। প্রচণ্ড ঝড়। সঙ্গে অল্প বৃষ্টি। গরমে ভিজতে আপত্তি নেই। ভিজতে ভারী ভালোই বাসি। কিন্তু বাঁধা সঙ্গে থাকা অনেক বই-পত্রিকা। কোরক, সমকালের জিয়নকাঠির দল। এর সঙ্গে জুড়লো আরেক ভয়। রাস্তার পাশে টিনের বাড়ি। ঝড়ে যদি একটাও উড়ে আসে। তাহলে চিহ্নমেলা যাওয়ার পথে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো গলাকাটা কবন্ধের মতো।

দর্শনা পৌঁছালাম অক্ষত শরীরে। খাদ্য রসিক মানুষ। তেলে ভাজার সন্ধান করি। মেলে না। শেষে কাবাব রুটির সঙ্গতে অপেক্ষা। সাগরদাঁড়ির  জন্য। কী সুন্দর নাম ট্রেনের – সাগরদাঁড়ি। মধুসূদনের ‘সাগরদাঁড়ি’ বেয়ে রাজশাহী যাওয়া। জানা গেলো ট্রেন নাকি সময়ে আসবেই না। কিন্তু তার একটু আগেই ‘কপোতাক্ষ’ গেছে কাঁটায় কাঁটায়। আমাদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হলো না। কাঁটায় কাঁটায় ঢুকলো ট্রেন। রেল যাত্রা মানেই হরেক হকারের হরেক আহ্বান। আর সে সব আহ্বানে গলে যেতে সদা বিগলিত মন। বাদাম, ডিম, ঘুগনি, সাড়ে বত্রিশ ভাজা কিছু থেকেই জিভ বঞ্চিত রাখা বাঙালির কাজ নয়।

বাঙালি আর যা যা করে করে থাকে আমরাও তা করলাম। সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপ, দেশের হাল হকিকত জানতে চাওয়া। শুধু একটা ব্যাপার সযতেœ এড়িয়ে গেলাম ক্রিকেট। আমি ক্রিকেট বিরোধী মানুষ। দেখেছি চোখের সামনে একটা খেলার নামে কনজিউমারিজম, করাপশন, আর কমিউনালিজম কীভাবে বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে যৌন আবেদনময় টিভি বিজ্ঞাপন। আর সবচেয়ে বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে ‘ক্রিকেটিয় দেশপ্রেম’। অনেকের কাছে খেলার ভালো-মন্দ বড়ো কথা নয় আসল হলো জয়/ কোক-পেপসি খেয়ে, বিদেশি বিলাসদ্রব্য ব্যবহার করে দেশের টাকা বিদেশে পাঠাতে কোনো দ্বিধা নেই শুধু ভারত-পাকিস্তান খেলার দিনে চেঁচাও আর দেশদ্রোহী খুঁজে বেড়াও।

ইদানীং বাংলাদেশ শক্তিশালী দল হওয়ায় বাংলাদেশ বিদ্বেষ প্রত্যক্ষ করছি। অন্য পক্ষে কী ঘটছে বাংলাদেশের মানুষ ভালো জানেন।

তাই ক্রিকেট এড়িয়ে যাওয়া। সেদিন আবার বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ। রাজশাহী স্টেশনে নেমে দেখি জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে হাজার হাজার লোক। হাল্কা বৃষ্টির ছোঁয়া নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শহীদুল্লাহ্ প্রাঙ্গণে হাজির হওয়া গেলো। বৃষ্টি বেশ হয়েছে, বোঝা গেলো। রেল থেকেই কথা হয়েছিলো চিহ্নপ্রধান শহীদ ইকবালের সঙ্গে। ক্যাম্পাসে এসে দেখা মিললো আরো অনেক পুরনো মুখের কলকাতার-ঢাকার।

অনেক রাতে হেঁটে আই বি এস হলে যাওয়ার সময় রাস্তা দীর্ঘ বলে একটু বিরক্ত হইনি ভুল হবে, মনে হচ্ছিলো অনেক পথ। পরদিন সকালে উঠে মনে হলো এ পথ  যদি না শেষ হতো! রাতে ক্লান্তিতে পথ শেষ হওয়ার দিকে বেশি লক্ষ ছিলো বলে বোধহয়, প্রকৃতির অপার রূপের দিকে চোখ পড়েনি ততোখানি। বিস্মিত মুগ্ধ ক্যাম্পাস দেখে। মুগ্ধ চিহ্নমেলা প্রাঙ্গণ দেখে। আমবাগানের মাঝে কী চমৎকার মন আলো করে দেওয়া আয়োজন। ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত উজ্জ্বল পায়রার দল। কোনো লিটলম্যাগাজিন ঘিরে ঘিরে এতো তরুণ-তরুণী! ঢাকা বইমেলাতেও দেখেছি তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বইয়ের প্রতি নিবিড় আগ্রহ। এখানেও দেখলাম। আর সেই প্রাণ জুড়ানো স্নিগ্ধ সুন্দর আয়োজনের মাঝখানে বসে আছেন জীবন্ত কিংবদন্তি দুই লেখক আনিসুজ্জামান এবং হাসান আজিজুল হক। তাঁদের পাশে মেধাবী লেখক সেলিনা হোসেন। দেশভাগের ফলে বহু মানুষকে এপারে-ওপারে দেশ ছাড়তে হয়েছে। আনিসুজ্জামান স্যার এবং হাসান আজিজুল হক দু’জন এপার থেকে ওপারে যাওয়া। হাসান আজিজুল হক তো আবার আমার জেলার মানুষ এবং তাঁর সঙ্গে এই প্রথম সরাসরি দেখা। চলমান যন্ত্রে আলাপ হয়েছে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মনীষা ব্যক্তিত্ব শামসুজ্জামান খানের সৌজন্যে।

আমি একটু আবেগী হয়ে পড়েছিলাম। স্বাভাবিকও ছিলো। এতো অসাধারণ একটা প্রাঙ্গণ। অসামান্য আয়োজন চিহ্নকর্মীদের। প্রফেসর শহীদ ইকবাল, অধ্যাপক রহমান রাজু সবাইকে ডেকে নিলেন মঞ্চে। পতাকা উড়বে বিশ্ববিদ্যালয় আর চিহ্নর। পতাকা উত্তোলনে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যও, চমৎকার মানুষ। পতাকার পর ওড়ানো হলো পায়রা। শান্তির প্রতীক। আমার হাতেও এসে গেলো একটি পায়রা। উড়িয়ে দিলাম, পিকাসোর ছবি।

পদযাত্রা শুরু হলো। কোনো ক্লান্তি এলো না। পথ হাঁটতে। রঙ্গিন বর্ণিল পদযাত্রা। পদযাত্রা বা মিছিলের সামনে হাঁটতে আমি দ্বিধাবোধ করি। একটু ভিড়ে মিশে থাকি। কিন্তু শহীদ ইকবাল ভাই আর রাজু ভাইয়ের জন্য হলো না। যতো হাঁটি ততো মুগ্ধতা বাড়ে। এতো সুন্দর প্রাঙ্গণ। এতো সম্পন্ন আর ধনী। মনে মনে ভাবি, ইস যদি ছাত্র হয়ে আসা যেতো। পরে সে কথা বলেও ফেলি নিরীক্ষা প্রধান সামাদ ভাই আর মাননীয় উপাচার্যকে। একবার ঢুঁ মেরেও এসেছি এই লক্ষ্যে আই বি এস বিভাগে।

উদ্বোধনে আলোচনার বিষয় ছিলো শ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুজিবুর রহমান না অন্য কেউ। সঞ্চালক ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। কথক আনিসুজ্জামান স্যার, সেলিনা হোসেন, জুলফিকার মতিন, সনৎ স্যার। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান আমাকে রাজশাহী যাচ্ছি শুনে বলেছিলেন হাসান আজিজুল হক আর সনৎ স্যারের সঙ্গে অবশ্যই দেখা করে আসতে। সেই দু’জন মানুষের সঙ্গে উদ্বোধনীমঞ্চে দেখা। সভার শুরুতে পরিমিত কথায় চিহ্নপ্রধান শহীদ ইকবাল চিহ্নমেলার উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। অক্লান্ত কর্মীরা যে চিহ্নমেলার সম্পদ তা যে এমনি এমনি তৈরি হয়নি, তা বোঝা যায় ইকবাল ভাই আর রাজু ভাইদের পরিশ্রম আর নিষ্ঠা দেখে।

আমার ধারণা শ্রেষ্ঠ বাঙালি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে স্বতন্ত্র কোনো প্রতিবেদন থাকবে তাই আমি বিস্তারিত কথায় যাবো না। আমার বলার প্রতিপাদ্য ছিলো শ্রেষ্ঠ কাউকে এককভাবে বলা যায় না। অনেকেই কৃতিত্বের অধিকারী। চৈতন্য, লালন, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র বসু, শেখ মুজিবুর রহমান। যদিও বাকিরা কেউ জাতিরাষ্ট্র নির্মাণে সক্ষম হননি। সেক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমান একক অনন্য।

চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলা লিটলম্যাগাজিন মেলার এই ছিলো শিরোনাম। দেড়শ’র বেশি লিটল ম্যাগাজিন এসেছিলো ভারত আর বাংলাদেশ থেকে। চট্টগ্রামের বান্দরবন থেকে কোচবিহার। নানা বিষয়, নানা ধরনের লেখা। আমার তো বহু পত্রিকা কিনতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। কিনলামও। উপহারও পাওয়া হলো বেশকিছু। মন জুড়িয়ে গেলো। মেলার মাঝখানে লিটলম্যাগাজিন প্রদর্শনী দেখে। বিপুল সংগ্রহ। আর ছিলো আড্ডার জন্য জায়গা। কতো মানুষের সঙ্গ যে মিললো। এদের একজন শিল্পচর্চার মানুষ শরিফুজ্জামান। মুক্তমন মুক্তচিন্তার মানুষ। চিহ্নমেলার কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম করার ক্ষমতা শেখার বিষয়। ঝকঝকে রাখছেন এলাকা। কোথাও কিছু কেউ ফেললেই তা পরিষ্কার করে ফেলছেন। যদিও উল্লেখ্য খুব কম জন মেলায় কিছু ফেলেছেন। সবার এই নান্দনিক মনন বলার মতো বিষয়। কবিতা পাঠ এবং লেখক-পাঠক-সম্পাদক আলোচনা ছিলো সারাদিন ধরেই।

দফায় দফায়। সবগুলি সম্পন্ন হয়েছে ঘড়ির কাঁটা মেলানো সময়ে। এটাও বলার বিষয়।

আর কতো বিষয় যে এসেছে আলোচনায় কবিতা, সাহিত্য তো বটেই পরিবেশ আন্দোলন, সুন্দরবন রক্ষা, রামপুর, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, ভোগবাদ, পণ্যায়ন, পুঁজিবাদী শোষণ, আন্তর্জাতিকতা, বিশ্বায়ন, লেখকের মনোজগত, মন ও মননের সংকট অগ্রজ বিষয়।

আমি চেষ্টা করেছি প্রত্যেকটি আলোচনা মন দিয়ে শোনার, শেখার।

লিটলম্যাগাজিনের প্রাণ বোধহয় প্রবল উত্তেজনা প্রাণোচ্ছ্বাস সংবেদনা। তার কোনো ঘাটতি ছিলো না। নিজের পত্রিকা প্রচার লেখা শোনানোর যে চির তারুণ্য কবি লেখকের সম্পদ তা ছিলো এখানে ভরপুরভাবে।

শুধু কোথাও ঝগড়া-মালিন্য-মনকষাকষি দেখিনি। বাংলাদেশের মানুষদের অতিথি পরায়ণতা বিশ্বখ্যাতির অধিকারী। তার চিহ্ন রেখেছেন চিহ্নর কর্মীরা ।

শহীদ ইকবাল সাহেব বা রাজুভাই তাঁদের কর্মীদের যেভাবে দীক্ষিত করেছেন তাঁরা যে কোনো সংগঠনের সম্পদ বলে গণ্য হবেন।

প্রচুর খরচ, কোনো প্রাযোজক সে অর্থে নেই, এতো বড়ো মেলা করা, এতোজনের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হাসিমুখে ক্লান্তিহীনভাবে কম কথা নয় এই পণ্যায়িত সময়ে। প্রতি তিন বছর অন্তর হয় চিহ্নমেলা। (আহারে কেনো যে প্রতি বছর হয় না। প্রয়োজনে শরিক হতে পারি আমরাও)। কবিতায় সঙ্গীতে শ্যামলে সুষমায় মোড়া এই মেলা। যে মেলার কর্মীদের তীক্ষèধী প্রশ্ন ঋদ্ধ করেছে আমাকে। করেছে প্রাণিত, উদ্বোধিত, উন্মুখ।

একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তার অর্থনীতিকে। অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তার সংস্কৃতিকে। সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তার শিক্ষাকে। শিক্ষাকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তার ভাষাকে। ভাষাকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় তার আত্মমর্যাদাবোধকে। আর জাতিকে জাগাতে হলে জাগাতে হয় তার আত্মমর্যাদাবোধকে। আত্মমর্যাদা জাগলে বিকশিত হয় ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি। আর এ সবের পরিণতি জাতির নব-উজ্জীবন।

সেই আত্মমর্যাদাবোধ ও জাতি জাগরণের লক্ষ্যে কাজ করেছেন চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলার সংগঠকেরা।

তাঁদের অভিবাদন।

চিহ্নমেলা বুকে আঁকা পট তুমি
অতনু ভট্টাচার্য

‘চিহ্ন’ আমাদের মনে চিহ্নিতের প্রত্যাশা জাগায়। যেমন ধূম দেখলে বহ্নির প্রত্যাশা জাগে। এভাবেই ‘মেলা’ ধারণা জাগায় অবশ্যই প্রেমের। শিল্প-সংস্কৃতির আঙিনায় চিহ্নমেলা সেই প্রেমের শপথ নিয়েই এগিয়ে চলেছে। পরপর দু’বার আমন্ত্রণ পেয়ে এবং অংশগ্রহণ করে একথাই অন্তর থেকে অনুভব করেছি। চিহ্নমেলা আমাদের হাজির করে বিশ্ববাঙলার পরিসরে। লেখক-পাঠক-সম্পাদকের মেলবন্ধনই তাঁর পথ। তাঁর স্লোগান হয়ে ওঠে তাই ‘এসো লিখিয়েসব লেখায় লেখায় ভাঙি মগজের কারফিউ।’ ব্যক্তিগতভাবে আমি ঋণী, কেননা বাংলাদেশের সঙ্গে, বাংলাদেশের সাহিত্যের সঙ্গে আমার সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে এই চিহ্নমেলাই। উদ্বোধন অনুষ্ঠান, র‌্যালি, শিরোনামহীন আড্ডা, কবিতাপাঠ, স্মারক প্রদান, চিহ্নপুরস্কার প্রদান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাবার ব্যবস্থা ও থাকার সুবন্দোবস্তো একসূত্রে বেঁধেরাখা মোটেই সহজ কথা নয়। চিহ্নপ্রধান শহীদ ইকবালকে অভিনন্দন। অভিনন্দন রহমান রাজু, সৈকত আরেফিনসহ সকল কুশিলবকে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে সাহিত্য-অঙ্গনকে উজ্জ্বল করার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছেন। পথকার নিজেই পথিক, তখনই প্রশ্ন জাগে, পথের শেষ কোথায়? কিন্তু কে জেনেছে শেষ! শেষ বলে কিছু নেই, আছে শুধু শুরু। আছে শুধু পথ চলা। এমন হলেই কথাবার্তা চলে। পথের কথা, আদান-প্রদান। বিগত শতাব্দীর কালো ছায়া এসে পড়েছে তরুণ এই শতাব্দীর মুখের ওপরেও। প্রযুক্তিতে বলীয়ান এই সময়ে মানুষ নিজের ভেতরে আবিষ্কার করেছে অপরকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করার নানান অভিনব পন্থা। নৈরাজ্যের শাসন। সবকিছুই বিকিকিনির আয়তায়। রকমারি বিজ্ঞাপনের ফ্লুরোসেন্ট ধাঁধা। হিংস্র রাজনীতি। অর্থনৈতিক অসাম্যের চূড়ান্ত। অস্তিত্বের সংকট। আত্মকেন্দ্রিকতা। আদর্শচ্যূত ও মূল্যবোধহীন মানুষের চাষ। ধর্মান্ধতা। স্বাভাবিকভাবেই এই সমস্ত কিছুর প্রভাব শিল্প-সংস্কৃতিকেও ছুঁয়ে থাকবে এ কথাতো বলাই বাহুল্য। এমন একটি দিশাহীন সময়ে দাঁড়িয়ে শিল্প-সাহিত্যকে সঠিক পথে চালনা করার কাজ বড়ো দুরূহ। তবু বিভিন্ন প্রান্তে কিছু মানুষ এই অসম যুদ্ধটা লড়ে। লড়ে যায়। চিহ্নমেলাকে এমনই এক লড়াই বলেই মনে করি আমি। আবার এমতাবস্থায় কোনো লড়াই এখুনি সার্বিকভাবে সুন্দর ও গঠনমূলক হয়ে উঠবে এমন আশা করাটাও বাস্তবসম্মত নয়। শুধু হাল না ছেড়ে সামনের দিকে আত্মবিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়াটাই একমাত্র কাজের কাজ। অতিথি হলেও ‘ চিহ্নমেলাকে বড্ডো আপন মনে করি, তাই তাঁকে ঘিরে ব্যক্তিগত ভাবনা-চিন্তা প্রকাশ করলাম কোনো দ্বিধা না রেখেই। কবিতাপাঠে প্রায় সর্বত্র (পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ) যা দেখা যায় তার প্রতিফলন চিহ্নমেলাতেও অর্থাৎ কবিতার মান বহু ক্ষেত্রেই সাধারণ বা সাধারণের নিচে। আলোচকদের শুধুমাত্র মঞ্চ অভ্যাস থাকলেই হয় না, প্রয়োজন সঠিক যুক্তি, রস, তথ্য ও তত্ত্বের প্রয়োগ করার ক্ষমতা। লক্ষ রাখতে হবে বহু মানুষকে হাজির করার মধ্যদিয়ে যেনো বহিরঙ্গের আস্ফালনই প্রধান না হয়ে ওঠে। কবিতা বা আলোচনা শোনা, বইপত্র কেনার ব্যাপারে আগ্রহ কম থাকলেও বাধভাঙা উচ্ছ্বাস শেষ দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উদ্দমতায়। কর্মকর্তাদের এই বিষয়টিতে মনোযোগী হতে বলবো কেননা চিহ্নমেলা যে মনন ও মেজাজ ক্রমশ তৈরি করেছে তার সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান এই অংশটি। পপুলার হওয়ার সহজ পথটাই একটি গাড্ডা যাকে শুরুতেই মেরামত করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি। আর একটি বিষয় খুবই দরকারি এবং তা হলো পাঠকের সঙ্গে লেখকের ভাববিনিময়, এক্ষেত্রে স্টেজের উচ্চতা বা দূরত্বটাই প্রধান অন্তরায়। মাটিতে চেয়ারে বসে মুখোমুখি আলাপ-আলোচনা মধুর হতে পারে। এ সমস্তই এই সাধারণের প্রস্তাব। আশা যেখানে, ভরসা যেখানে, সেখানেই তো মন খুলে বলা যায়। আমার বিশ্বাস সকলে মিলেই বাস্তবের যাবতীয় অসম্পূর্ণতাকে গঠনমূলক ভাবনা, সিদ্ধান্ত ও হৃদয়াবেগ দিয়ে অতিক্রম করে চিহ্নমেলাকে ক্রমশ আরো আরো সার্থক করে তুলবেন। চিহ্নমেলা পথ দেখাবে আগামীর।

চিহ্নমেলার হাত ধরে শিকড় চিহ্নের সন্ধান
উমাপদ কর

বোঝার বয়সের পর থেকেই অনেক গল্পগাছার মধ্যে হুতাশসহ পূর্বপাকিস্তানের কথা থাকতো যতোটা না বাবার তার চেয়ে ঢের বেশি মার। কেনো এই যন্ত্রণা আর কতোটুকু গভীর, সে আন্দাজ অবশ্য আমার ছিলো না। কিন্তু কিছু জায়গার নাম, নদীর নাম, গাছের নাম, মানুষের নাম, কিছু বিশেষ জিনিসের নাম মনে গেঁথে গিয়েছিলো। আর গল্প থেকে উঠে আসা ভয়, শিহরণ, চোখের জল ভেতরে বাস নিয়েছিলো। খাবারের অভাব আমি অতোটা বুঝিনি যতটা দাদা-দিদিরা। কিন্তু অবস্থাটা যে মা-বাবার সাধ্যের বাইরে, তা বুঝতে পণ্ডিত হতে হয় না। উদয়াস্ত পরিশ্রম, বোধ-বুদ্ধি আর মেধার কসরৎ-এ তাঁদেরকে হয়তো আমৃত্যু কোনো আক্ষেপের সঙ্গেই আপোস করাতে বাধ্য করেছে। হয়তো, এই জন্য যে তাঁদের এ বিষয়ে আর জিজ্ঞাসা করা হয়নি কোনোদিন। মাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি, পূর্বপাকিস্তানে থাকাকালীন গ্রামের বাড়িতে ১৮-২০ জনের পাঁচ-ছ পদ রান্না বা শহরের বাড়িতে (কিশোরগঞ্জ) দাদুর রোগীসহ ১৬-১৭ জনের আমিষ-নিরামিষ সারাদুপুর পার করে দেওয়া আর এখানে কাশিমবাজারে শাক-পাতা, সামান্য সব্জী, বা কোনোদিনের চুনো কিংবা পোনায় ৬-৭ জনের রান্নায় তুমি কোনটাতে সিদ্ধ ছিলে বা আনন্দ পেতে মা? বাবাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি, কিশোরগঞ্জের লক্ষীয়া হাইস্কুল বা আজিমুদ্দিন হাইস্কুলে পড়ানোর চেয়ে এখানে রাণীনগর হাইস্কুল বা মনীন্দ্রনগর হাইস্কুল সংগঠনে বা পড়ানোয় তোমার আলাদা কিছু ভূমিকা ছিলো কি না বা কোথায় স্বস্তি বোধ করতে বেশি? ফলে অমীমাংসিত সেই পর্ব তাঁদের মধ্যে একধরনের প্রতিক্রিয়া হয়তো সৃষ্টি করে থাকবে। কিন্তু আমার মধ্যেও কি তার কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিলো? হয়তো। কিন্তু কালের কাজ কাল করিয়েছে। ভুলিয়েছে। মাঝে মধ্যে সে যে এসে আবার ভাবনাক্রম শুরু করেনি, তা কিন্তু নয়। যখনই কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক কারণে কেঁপে উঠেছে এই উপমহাদেশ তখন একধরনের ওম এসে লাগতো। আর যখন বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি নাম, একটি অবস্থান, তখন ফুটেছি। ১৬ বছর বয়সের মারকাটারি। শরণার্থী শিবিরের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। মানুষের জন্য রাস্তায় রাস্তায় স্কোয়াড করে মানুষেরই কাছ থেকে নিয়েছি ভিক্ষা। কীজন্য তা কি অতশত বুঝেছি? লিগ্যাসি, উত্তরাধিকার সূত্রে, পরম্পরা? মা-বাবা ও দিদির মনে কী হয়েছিলো তা জানা নেই, কিন্তু কেনো যে ‘ফিরে চলো নিজ নিকেতনে’ ভাব কাজ করেনি, তা স্পষ্ট বুঝেছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই এসবই আমার মধ্যে বাস করতো। আবার কাজে কর্মে ভুলেও যেতাম। বাবা-মা গত হলেন। একটা পলি পড়ে গেলো।

কিন্তু একটা ডাক আমায় আবার ভাবিয়ে তুললো। ২০১৩, জানুয়ারি মাস। একটি মেইল। চিহ্নমেলা কমিটির পক্ষে চিহ্নসম্পাদক শহীদ ইকবালের। (সৌজন্য, নিঃসন্দেহে কবি মাসুদার রহমান।) ততোদিনে চিহ্নপত্রিকার দু-তিনটে সংখ্যা আমি পেয়েছি, পড়েছি। এক-আধবার হয়তো আমার লেখাও ছাপা হয়েছে। কিন্তু চিহ্নর সঙ্গে আমার যোগসূত্র মাসুদার রহমান। ২০১১ থেকে আমরা মাঝেমধ্যেই হিলি সীমান্তে দেখা করি, কথা বলি, পত্র-পত্রিকা বই লেখাপত্র আদান প্রদান করি। খুব সামনে থেকে বাংলাদেশকে দেখি, আর ভেতরে কী যেনো চাড়া দেয়। মা-বাবার  কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে, আগেই জেনেছি বাবা কিশোরগঞ্জের ছেলে হয়ে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে পাস করলেও বি.এ পাস করেছিলেন রাজশাহী কলেজ থেকে। ১৯৩৬ সালে। রাজশাহীতেই হবে চিহ্নমেলা। কী অসাধারণ যোগাযোগ। তো চিহ্নমেলার এই ডাকটা আমার মধ্যে দু-ধরনের সিক্রেশন ঘটাতে থাকে। একদিকে কবিতা, মেলা, নতুন পরিচয়, বইপত্রের আদান-প্রদান। অন্যদিকে বাপ-ঠাকুরদার জন্ম ও কর্মভূমি, মার জন্মস্থান, তার ধুলো নদী বাতাস এসবের আকর্ষণ। তো যাওয়াই স্থির। গেলামও। মহা উল্লাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার এক হরতালের দিনে হিলি সীমান্ত পেরিয়ে নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে মাসুদারের সোনাপাড়ার বাড়ি ঘুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের সামনের চত্বরে এসে উপস্থিত হলাম। দু-দিন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেলো। চিহ্নমেলা-২০১৩র সমস্ত কার্য-কারণের সঙ্গে একাত্ম হতে কোনো অসুবিধা হলো না আমার। কিন্তু এর পরের ঘটনাক্রম আমার পক্ষে সহায়ক হলো না। দিন তিনেক ঢাকায় থেকে বন্ধ হরতাল-খুন-বোমা-অস্থিরতা ইত্যাদির জেরে প্রায় পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। অধরা থেকে গেলো আমার অন্য অভিপ্রায়। একটা অতৃপ্তি কাজ করছিলো সেদিন থেকেই।  ভেবেছিলাম, আবার যদি কোনোদিন…

আবার আহ্বান। ২০১৬। চিহ্নমেলা। অধ্যাপক শহীদ ইকবালের মেইল। তারিখ পরিবর্তনের পর ৭-৮ মার্চ নির্ধারণ। আমার যাওয়া জানিয়ে দেওয়া। তাঁরা অপেক্ষায়, জানা। স্বাভাবিকভাবেই এবারও দু-প্রস্থ চাহিদা আর ভাবনা আমার মধ্যে। দর্শনা সীমান্ত পেরিয়ে ট্রেনে নাটোর, সেখান থেকে বাস-এ রাজশাহী। যখন নামবো, কী ঝড়! কী বৃষ্টি! টুকটুক-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও কলাভবন। ভেজা কিন্তু মনটা উড়ুউড়ু। শহীদ ইকবালের চেম্বার। প্রসারিত হাত। কুশল বিনিময়। রবীন্দ্রনাথের ছবি, কথা। শামসুর রাহমানের ছবি, কবিতা। অপেক্ষা, ঝড়বৃষ্টি থামার। দেখে এসেছি মেলাপ্রাঙ্গনের বেহাল অবস্থা। চিন্তা, শহীদের। বিচলিত নয়। অতিথি রিসেপশানে ছোটা তাঁর, বৃষ্টির মধ্যে। আমাদের অপেক্ষা। ঘরাধিকারীর সৌজন্যে ‘জুবেরি ভবন’। সুন্দর অ্যাকোমোডেশন। ভোর থেকে সারাদিনের ক্লান্তি শুষে নেওয়া বিছানাটা মমতাময়। রাতের খাবার যোগাড় তখন আর ঝক্কি মনে হয় না।

পাখির ডাক আপনাকে ভোর-সকাল চেনাবে, সে আপনি যতোই পানান্তে বেশি রাতে বিছানায় যান। এতো গাছ ক্যাম্পাসে, গাছে এতো পাখি। ওরাই ডেকে ডেকে আপনাকে নিয়ে চলে যাবে পদ্মার ধারে। ওদিক থেকে পদ্মাকে তো দেখেছেন, এদিক থেকে একবার দেখুন জলের মহিমা। ঘাটে ঘাটে নৌকো বাঁধা। দু-একটা দূরে। ছবি হোক। খুব ছবি হোক। বড়োকুঠি, ছবি হোক। চা হোক, কথা হোক গ্রাম থেকে লাউ বেচতে আসা মহিলার সঙ্গে। শহরটা কিছুক্ষণ হাঁটুক আপনার সঙ্গে। আপনি ঋদ্ধ হোন। আপনার ভালোলাগাকে আপনি চেখে চেখে উপভোগ করুন।

ঢাকের আওয়াজের একটা উদ্দামতা আছে। পায়ে পায়ে মিছিল হাঁটায় ম্যাগাজিনের সংঘবদ্ধতা বোঝানো যায়। রঙিন পতাকা কিংবা বেলুন মেলার জন্মদিনকে চিহ্নিত করতে পারে। লাল-পাড় সাদা-খোলের অনেক মেয়েমুখ অচেনা অতিথিদের ‘এসো এসো’ জানালে আপনি কবিতা না লিখলেও কিছুটা অস্থির হয়ে উঠবেন, বোঝার চেষ্টা করবেন আপনি নিজেও এক উদ্বোধনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। আপনি পটাপট ছবি তুলছেন মোবাইলে। দূরে মঞ্চে মেজর কবি লেখকদের কথা আপনার কানে আর ঢুকছে না। খোলা মাঠ বাঁধামঞ্চকে দেখে হেসেই ফেললো প্রায়। ওখানে সেলিনা হোসেন। আপনি তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠক। ওখানে হাসান আজিজুল হক। ১৩ সালের সামান্য পরিচয় তিনটি বর্ষা-গমনে মরচে ঝুরা বুঝেও আপনি তাঁর বিদগ্ধ ভাবখানিতে আজও রসিক। আরও আরও সব। জমে উঠেছে। পা কিন্তু খোলা মাঠে কাপড়ে বানানো কুঠুরীগুলোর গোল আবর্তনে। লিট্লম্যাগাজিন  (ছোটকাগজের) মেলা যে। পসারী তখনও সবাই পা রাখেনি, কেউ মেলছে টেবিলে ডানা। কারো পাতা সারা। ওই তো ঝিনাইদহের বেগবতীর পাশেই তিতির, কুচবিহার, ভারত। ওই ওইতো খড়িমাটি, চট্টগ্রামের গা ঘেসে কবিতা ক্যাম্পাস, হাওড়া, ভারত। ক্রমাগত ইন্ডিয়া শুনতে শুনতে আপনি যখন বেশ কিছুটা ক্লান্ত তখনই ভারত-এ আপনার চোখের আরাম, মনের ঔপনিবেশিক কূপমণ্ডূকতার মুক্তি। আহা হা উদ্যোক্তারা! পা এলিয়ে পড়া পর্যন্ত আপনি গোল পরিধি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যান। পাশেই আমবাগানের এক কাপ চা আপনাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত তো রইলোই।

‘কলেবর ছোট নয়, তিন মণ প্রায় ওজন’। ওজন যেনো আপনার ওপর ভারবোধ তৈরি না করে। কোনো চাপ নেওয়া নেই। আপনি হাঁটুন। হালকা হবেন। আপনি তরুণ কবিটির সঙ্গে আজকেই নতুন পরিচিত হোন। আপনার খাঁচার দম বেড়ে যাবে। আপনি কোনো একটি ছোটপত্রিকা হাতে তুলে নিন। নাড়ুন-চাড়ুন, হাসি খেলে যাবে পোড়খাওয়া সম্পাদকের গালে। এরই মধ্যে আপনি পেয়ে যাবেন পূর্ব পরিচিত কাউকে। কুশল বিনিময়ের পর লেখাপত্রের ব্যাট-বল বেরিয়ে আসবে। সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়া বিবরণী, আর তার নতুন প্রকাশিত বইটির একটি কপি আপনার হাতে খুলতে থাকবে মলাট। চোখে এর চেয়ে বেশি উৎফুল্লতা তো আশা করেন না তিনিও। আপনি হাঁটুন। হাঁটলেই সঙ্গী জুটবে। হাঁটলেই কথা হবে। হাঁটলেই আপনি মিনি বাংলাদেশ আর টুকরো টুকরো বঙ্গ (পশ্চিম) পেয়ে যাবেন।

কোকিল ডেকে ডেকে গলায় রক্ত তুলে ফেললো। কোথায়? আপনি বুঝতে পারছেন দূরে কোথাও। কিন্তু দূরত্বের মাপটায় নিশ্চিত হতে পারছেন না। আনমনা ভাবটার মধ্যেই বেঞ্চে বসে থাকা চার-পাঁচজনের ছোট্ট দলের দিকে চা চলে এলো। সঙ্গে কবিতা নিয়ে কেউ একটা প্রশ্ন। আপনি উত্তর করলেন কী যে ডাকে শুধু, কী বলে বুঝি না, কতোদূর থেকে বলে জানি না তাও। প্রশ্নকর্তা অবাক হতে যতোটা সময় নেয়, উত্তরদাতা তারই মধ্যে কোকিল আর কবিতা গুলিয়ে ফেলে। কিছু আলাপ কিছু বন্দীশ আর চা চলে আমের শাখার ছায়া কিছুটা সরে না যাওয়া পর্যন্ত। চিহ্ন ছাপ চটের সাদা ব্যাগ অনেকের বগলেই বগল বাজাচ্ছে, কেউ কেউ পরে ফেলেছে ব্যাগে রাখা নীল গেঞ্জি। আপনার হয়তো পরতে বিড়ম্বনা বোধ হচ্ছে, কিন্তু আপনার দেখতে ভালো লাগছে নিশ্চয়ই। মঞ্চের সামনে বসে বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি আড্ডাটি শুনছেন আর এসবই ভাবছেন তো!

মনোযোগ দিতে হয়, কেউ আপনাকে বললো। আপনি লাঞ্চ-প্যাকেটটা তখন খুলে নিয়েছেন চেয়ারে বসা হাঁটুর ওপরে। স্বাভাবিক, মনোযোগ দিলেন। খুব কি শান্ত হয়ে পড়েছে মেলাপ্রাঙ্গন? মঞ্চও চুপ। কিছুক্ষণ আগেই আজানের রেশ ঠিকরে পড়ছিলো ইউক্যালিপটাসের মাথায় মাথায়। রোদ আর কাঁপা বাতাসের মধ্যে আপনার ঢেকুরটিই হয়তোবা নীরবতা ভাঙলো। শুরু হয়ে গেলো ‘মার্চের কবিতা’। মঞ্চের সামনে রাখা চেয়ারে এবারে আপনি বসুন। শুনুন। এলানো সময়কে হয়তো চাবকে চাঙ্গা করে তুলবে ঐতিহাসিক স্মরণের কবিতা। আপনি ভাতঘুমচোখো শ্রোতাদের হাইতোলা আর স্বপ্নের মধ্যে দৌবারিক হয়ে বসে থাকুন। দেখবেন আপনার খারাপ লাগবে না। আপনি কতোদূর থেকে এসেছেন, বলেন তো! চা চা চা করে কাকগুলো ওই উড়ে যাচ্ছে ঈশানে। বেলা গড়িয়ে পড়লো বুঝি। অগত্যা চা-সিগারেট আর শিরোনামহীন আড্ডা। মঞ্চ আপনাকে ডাকবে, আপনি যেতেও পারেন, নাও পারেন। মঞ্চের ওপরে বসে থাকা কেউ কেউ আপনাকে ডাকতে পারেন। ডাকতে পারেন সঞ্চালক। উনি জাকির তালুকদার, হয়তো আপনার পূর্ব পরিচিতও। তাছাড়া আড্ডা বলে কথা। সে যে আপনার বড়ো প্রিয়। সুতরাং…। আপনারও বলার কথা জমছে। আপনি শুনতে থাকুন মঞ্চে বসে। হালকা হাসুন। সঞ্চালকের আহ্বানে ফুলে ওঠা বেলুনটাকে লিক করে দিন। ধীরে, বন্ধু ধীরে, দমকায় বেরিয়ে না যায়। আড্ডার মেজাজটা তারকাঁটা না হয়ে যায়। শেষবিন্দু বাতাস পর্যন্ত বেলুন চুপসে দিন। আহা হা কী আরাম! দুপুরের খাবার আপনার বদহজম হবে না, নিশ্চিত। দূরে কয়েকজন তরুণ-তরুণী হাততালি দিয়ে উঠলো। কিছুই না শুনে আলসে বসে থাকাটা বা খুচরো কথাবার্তায় সময় কাটুক সামনের দিকে বসে থাকা কয়েকজনের।

এরপরেই কবিতাপাঠ। এই এই, আপনি পালিয়ে যাচ্ছেন প্রায়। আপনার নাম ডাকছে যে। ডাকুক, আজ আর নয়। আহা হা কবিতা করতেই তো আসা! সে ঠিক। কিন্তু তার জন্য মঞ্চে উঠে কবিতা পড়াটাই জরুরি নয়। কী বলছেন আপনি? দেখছেন না সঞ্চালক ঘিরে ছুঁকছুঁকানিটা! চলুক চলুক। আপনি না চাইলে আপনাকে আর কে ওঠায়! কিন্তু আপনি শুনবেন তো? নিশ্চয়ই, চা-সিগারেট আর একটা হাল্কা স্পিনের আড্ডার পর আপনার চেয়ে ভালো শ্রোতা মেলা আর পাবে কি! কবিতা, পরেও কবিতা, আগেও কবিতা। অধিকাংশই অপরিচিত। এঁরা কারা, সেটা বড়ো কথা নয়। কোত্থেকে এসেছেন এঁরা, বড়ো কথা নয়। তারকাঁটা আছে কি নেই, বড়ো নয় সেটাও। এঁরা সবাই বাংলা ভাষায় কবিতা পড়ছেন। আহা হা, আমাদের বাংলা ভাষা। আপনার প্রাণ, আপনার শ্লাঘা। আপনি শুনুন। স্তব্ধ হোন। হেসে উঠুন, কেঁদে ফেলুন, ঠাণ্ডা কিংবা উত্তপ্ত হয়ে উঠুন, আপনার কানের আরামকে মর্যাদা দিন। কবিতা মেলাচ্ছে পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ, মেলাচ্ছে নিসর্গ আর প্রাণ, মেলাচ্ছে বর্ণ আর সম্প্রদায়, মেলাচ্ছে ভাবুক-কামুক, ভূত-ভবিষ্যত। আপনি তার সহযাত্রী। ও হো, কী এক অসাধারণ পাটাতন তৈরি করেছেন উদ্যোক্তারা। আপনার কৃতজ্ঞতা আপনি জ্ঞাপন করুন। একসময় গান গাইবে মঞ্চ। আপনি দুলবেন। রাত বাড়তে থাকবে। ডিনার প্যাকেট ডাকতে থাকবে। আপনার কুপন হারিয়ে গেলেও আপনি প্যাকেট পাবেন। আপনি অতিথি যে। কবিতার রেশ লেগে আছে আপনার চিবুকে। সেখানে কোনো অতিথির অগ্রাধিকার নেই। থাকতে পারে না। কবিতার মহত্ব এখানেই।

সকালে ওঠার অভ্যাস হয়তো আপনার আগেও ছিলো। কিন্তু এই ক্যাম্পাসের পিচ রাস্তা, পাশেই সারি দেওয়া গাছের কেয়ারির মধ্যে হেঁটে যাওয়ার লভ্যতা আপনাকে একটু হলেও অন্যরকম করে দেবে। সঙ্গে কয়েকজন সুহৃদ নিয়ে আপনি হাঁটতে থাকুন অনেক ছেলেমেয়ের কলেজ ব্যস্ততার মধ্যে। বিল্ডিং এর পর বিল্ডিং পেরিয়ে আপনি চলেছেন, গল্প আর খুনসুটিসহ, চা আর ছবি তোলার পোজসহ। বোঝা যাচ্ছে আপনি চলেছেন ‘বদ্ধভূমি’র দিকে। আপনি সেখানে নির্বাক হয়ে খানিকটা মুহ্যমান হয়ে পড়বেন সন্দেহ নাই। তখন সামনের ছোট্ট বাগানের চেনা-জানা ফুলগুলো আর পাশের বড়ো বড়ো গাছের অচেনা ফুলগুলোই আপনাকে স্থিত হতে সহায়তা করবে। ফলকের পাশে দাঁড়িয়ে আপনার ভাবনায় ভিড় করবে শত শত মৃতদেহের কাতার। যাঁরা দেশকে ভালোবেসে, ভাষাকে ভালোবেসে, ধর্ম-সম্প্রদায়ের চেয়ে মানবতার উত্তরসূরী হতে চেয়ে দোষি সাব্যস্ত হয়েছিলেন। ছিলেন চিন্তক তাই বরাদ্দ হয়েছিলো ঘাতক। হয়তো ভালোবাসাই ছিলো এঁদের জীবনের পাসওয়ার্ড, তাই আপনার ছুটে আসায় যে ভালোবাসা লেগেছিলো তাই এখন আপনি নিশ্চয়ই অনুভবে আনতে পারছেন। আপনি বেদনার্ত হয়ে পড়লেও ভাষা নিয়ে আপনার প্রত্যয়ের চোঁয়াল ঢাকা পড়ে যাবে না।

আবার মেলা। চিহ্ন স্বচ্ছ হচ্ছে। চিহ্ন চঞ্চল কিন্তু লক্ষ্যহীন নয়। সেই চিহ্নর দিকেই আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন। আপনার ব্যাগটা আগের চেয়ে ভারী। কতো বই ঢুকছে সেখানে। বেরোচ্ছেও কিছু। একদল ছেলেমেয়ে এলো, ডেকে নিয়ে গেলো আপনাকে, বসালো, প্রশ্ন করতে লাগলো কবিতা নিয়ে, তারা স্টল থেকে আপনার বই কিনে নিয়ে গিয়ে পড়েছে। আপনি উত্তরদিন। আপনি যথাসাধ্য। আপনিও জানতে চাইছেন তাদের কথা, তাদের ভাবনা, তাদের অনুশীলন পর্ব। একটা অলিখিত সেশনই হয়ে গেলো। মঞ্চে, কথা প্রসঙ্গে লেখক-সম্পাদক। কথা চলছে। মূলত ছোটকাগজের সমস্যা আর নোবেলনেস। সঞ্চালক এক কবি। আপনি আহূত। বলুন না কিছু। অতএব বলা। আপনার অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি। আপনার ভাষায়। প্রাণপণ। কতো আলোচক, প্রতিষ্ঠিত আনকোরা, প্রবীণ ভাঁজ-না-ভাঙা নতুন, পোড়খাওয়া-পুড়তে আসা, সবাই বলছেন তাঁর সুচ-এ সুতো পরানোর কথা, কনট্রিবিউট করছেন সাহিত্যের সুন্দর সাঁজিতে তাঁর নাম-না-জানা অনেক ফুলের সম্ভার। মেলাও জমে উঠেছে, বিকিকিনি চলছে। আপনি কোথাও সামিল হচ্ছেন আলাপে কোথাও কোনো পরিচিত লিটলম্যাগ স্টলে, কতো ছাত্র-ছাত্রী যে নেড়েচেড়ে দেখছে মলাট আর আত্মা, দঙ্গলবেঁধে ওরা ওই ঘুরছে হাসছে টিপ্পনী কাটছে, শুধু মেয়েরাও দলবেঁধেছে, দু-চারজনের বোরখার ভেতর থেকে হাত বেরিয়ে ছুঁতে চাচ্ছে বোরখার বাইরেটা। আপনি হেসে উঠতেই পারেন যখন কোনো ফিচকে মুখ বলে ওঠে, ‘টাকা থাকলে অনেক অনেক বই কিনতাম’। আবার যে স্টলে বসে আছেন, যেখানে আপনার কবিতার বই, কোনো ক্রেতা-পাঠকের বই-এর ওপর আপনার স্বাক্ষরের আবদারটি আপনাকে মেটাতে হবে নিপুণভাবে। তার সঙ্গে কথাও বলতে হবে। কথা বলতে হবে, এক দঙ্গল ছেলেমেয়ের মধ্যে লিডার গোছিয় মেয়েটি, ‘আপনার সঙ্গে কবিতা নিয়ে কথা বলতে চাই’, ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রায় সাক্ষাৎকার পর্বের মুখোমুখি বসিয়ে দিলো। নিশ্চিত, কচি-কাঁচাদের সঙ্গে কথা বলতে আপনার ভালোই লাগছে। হোক না কিছু প্রশ্ন কাঁচা, হোক না কিছু প্রশ্ন সাবেকি। এরকম দু-চার বার হতে পারে। আপনি প্রস্তুত থাকুন। ‘সায়ং’ মানে কী? সন্ধ্যাকাল। নদীতে আবার সায়ং ভেসে যায় নাকি? দেখতে পারলে ভেসে যায়। চমকে উঠলো কি ওরা? ‘আলোর হাঁসুয়া’ হয়? তার কাজ কী? হয়। অন্ধকারকে কাটতে এর জুড়ি নেই। ওদের চুপ এর মধ্যে আপনি আরও কিছু কথা বলতে থাকুন।

আজ সারাদিনই প্রায় কবিতাপাঠ চলছে। নামি-অনামি, প্রবীণ-নবীন ইনিংস গড়ার মাঝেরজন। চলছে। মোলায়েম বিষাদ, উচ্চকিত প্রত্যয়ের স্টেটমেন্ট, নিচু স্বরে প্রায় বুঝতে না পারা শব্দজড়িমা, খাদে নামিয়ে সপ্তকে চড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গির উচ্চারণ। চলছে। চড়া রোদ, বেশিরভাগ চেয়ারই ফাঁকা। চলছে। সঞ্চালক ক্ষুব্ধপ্রায়, তাঁকে শেষ করতে হবে সময়ে, কম পড়ুন, একটি কবিতাই মাত্র, আরও অনেক কবি পড়বেন। চলছে। আপনি শুনছেন, ফাঁকফোকরে পাশের মানুষটির সঙ্গে টুকটাক, চায়ের নেশায় আমবাগানে, সিগারেট ধরিয়ে নিচ্ছেন অন্যের সিগারেট থেকে। লাঞ্চ, মেনু এক, হাত ধোয়াও একইভাবে, শিরোনামহীন আড্ডায় ভাতঘুমের বিষয়টি প্রায় মাঠে মারা যাওয়ার সংকীর্তনে। কথায় কথার চাষ। ভাষা শিল্প সাহিত্য আর নন্দনতত্বের গভীর। মানুষ যাপন জীবন আর চলমানতা। রাজনীতি আর্থসমাজ চক্রান্ত আর মানবতা। বাংলা বাঙালি উপনিবেশ আর কাঁটাতার। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি অবিচার রিরংসা আর অভেদের দিকে যাত্রা। বোঝা গেলো নামহীনতায় একটা নাম হতেই পারতো ‘সাহিত্য-ব্যক্তি-সমাজ’।

ছায়া লম্বা হয়ে এলে চা-পানের ঠিক পরপরই শেষ দফার কবিতাপাঠে আপনাকে প্রায় ঠেলে মঞ্চে তুলে নিয়ে গেলো পরিচিত দু-চারজন। ভিড় যথেষ্ট সেখানে। বসবার জায়গাই নেই প্রায়। পেছনের সারিতে গুড়িসুরি। সঞ্চালক, প্রবীণ এক কবি। সহায়িকা, সুন্দরী এক তরুণী। তিনিই আপনার নাম পৌঁছে দেবেন সঞ্চালকের হাতে/কানে। কবিতা শুনুন, মাঝারি পালার মিশাইল, দীর্ঘ লম্ফন প্রতিযোগিতার সেরা লাফটি, দীর্ঘতর সেতুটির দীর্ঘতম ছায়া। ক্ষুদ্র? ক্ষুদ্র কারে কয়? আছে, ৪-৫ টা। সঞ্চালকের কাকুতি-মিনতি-আবেদন-আদেশ কিছুতে ভ্রুক্ষেপ নেই। চলছে কবিদের নামচা। কিন্তু কোথায়? আপনার নাম তো ডাকছে না। আপনার উসখুস তরুণী মেয়েটির প্রতি। আপনি দেখলেন, আপনার সঙ্গে যাঁরা মঞ্চে উঠলেন, কবিতা পড়ে নিচে গিয়ে তাদের কয়েকজন সিগারেট ধরিয়েছেন। আপনার অস্বস্তি লাগতে পারে। কিন্তু আপনি ফেঁসে গেছেন। কয়েকজন আপনার পরে মঞ্চে উঠে কবিতা পড়ে শ্রোতাদের ধন্য করে গিয়েছেন। কী করবেন আপনি? কিছু বলতেও যে পারছেন না। কবিতা পাঠের এ অভিজ্ঞতা তো আপনার নেই। কী করবেন আপনি। ধৈর্যেরবাধ ভেঙে গেছে। কিন্তু আপনি অসহায়। লজ্জার মাথা খেয়ে আপনি তরুণীটির কানে কানে। আপনার নাম তো দিয়ে দিয়েছি। ডাকবে এক্ষুনি ডাকবে। আপনি দেখছেন, শুনছেন কি? আপনি জানেন না। উদ্যোক্তাদের দেওয়া সময়সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে। সান্ধ্যকালীন সবচেয়ে বড়ো এপিসোডটি এখনও বাকি। নিচের বসার প্রথম সারি থেকে সসম্মানে ডেকে নিয়ে আসা হলো বাংলাদেশের এক সেলিব্রেটি কবিকে। হয়তো উনি চাইছেন বলেই। তিনি পড়তে শুরু করেছেন তাঁর বিশ্ব নারী দিবস সম্পর্কিত (৮ মার্চ) দীর্ঘতম কবিতাটি। কী করবেন আপনি? আপনি কি নেমে যাবেন? সহসাই আপনার মনে পড়ে যাবে শহীদ ইকবালের মুখ, বা মাসুদার রহমানের মুখটি। আপনি যে পড়শি থেকে আসা অতিথি। আপনার মানায় না। আপনি বসে পড়বেন। হ্যাঁ, কবিতা পাঠ করে উঠবেন। শেষ করেছেন নারী কবিতার যাত্রা। প্রবীণ সঞ্চালক, বেচারা, এবার ধন্যবাদ ছাড়া কিছুই জানাতে পারলেন না। শেষে একসময় নাম প্রস্তাবে ন পঙ্ক্তির একটি কবিতা আউড়ে নিচে নেমে এসে দেখবেন শরীরে জমা ঘাম আপনার দিকে তাকিয়ে খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হাসছে। হাসুক। আপনি ঠিকই করেছেন। এটুকু…

চা-পান আপনাকে পরিত্রাণ দেবে। বন্ধুদের সঙ্গ আপনার দমবন্ধ ভাবটি কর্পূর করবে। আমবাগানের আলো-আঁধারি পরিবেশটা আপনাকে সিগারেট স্মরণ করাবে। আপনি ভাবতে থাকবেন, এ দু-দিনে কতো কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদক-পাঠক-ছাত্র-ছাত্রী আর সাধারণ মানুষের সঙ্গেই না আপনার পরিচয় হলো। উপহার পাওয়া হলো কতো বই আর পত্র-পত্রিকা। কতো কতো আড্ডা হলো। ছোটখাটো প্রশ্নোত্তর পর্ব হলো। মঞ্চ হলো ৩-৪ বার। ঘুরে বেড়ানো হলো। ছবি হলো প্রচুর। ফেসবুক প্রস্তুত থেকো। সবকিছুর মূলে তো কবিতাই। আর চিহ্নমেলার আয়োজন। আনন্দ যেখানে চিহ্নিত হয়ে আছে। একফাঁকে কোথাও হয়তো আপনার দেখা হয়ে গেলো চিহ্নপ্রধান শহীদ ইকবালের সঙ্গে। আপনি তাঁকে আপনার ভালোলাগা আর কৃতজ্ঞতার কথা জানালেন। বয়ানটা ছিলো সম্ভবত এমনই খুব ভালো লাগলো। আর হয়তো কোনোদিনই আসা হবে না। কিন্তু আমি খুব উপভোগ করেছি। ডাকার জন্য আমার কৃতজ্ঞতা। খুব ভালো থাকবেন, আর চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলা যা আপনাদের ভাবনা ও স্লোগান সফল করবেন।

চিহ্নপুরস্কার ও ছোটকাগজ সম্মাননা মঞ্চের দখল নিয়েছে। গুণিজন আর স্বক্ষেত্রে কৃতিজন আসনে আসনে। দর্শক-শ্রোতা ভরপুর। আপনিও কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে চেয়ারে। সঞ্চালক, চিহ্ননির্বাহী রহমান রাজু, (আচ্ছা, দু-দুবার গেলেন। তবু এঁর সঙ্গে আপনার সামনাসামনি পরিচয় হলো না কেনো? সত্যিই আপনি ক্যালাসমার্কা মুখচোরা) তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে একে একে আহ্বান জানাচ্ছেন গুণিজনদের। ছোট্ট ছোট্ট বক্তৃতার পর হাততালিতে নিয়ন আলোয় লাগছে কাঁপন। আপনি জড়িয়ে পড়ছেন। চলছে পুরস্কার পর্ব। কবি সাহিত্যিক সম্পাদকদের তাঁদের অসাধারণ অবদানের জন্য পুরস্কৃত করা হচ্ছে। পুরস্কৃত হচ্ছে বাংলা ভাষা। জয়তু। আপনি এর শরিক। আপনিও পুরস্কৃত।

জুবেরি ভবন থেকে রাত এগারোটায় বেরিয়ে কাজলা গেট। সাড়ে এগারোটার ঢাকাগামী বাসটা যতোক্ষণ না তুলে নিয়ে গেলো আপনি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন। কবিতার ঘোর, মেলার ঘোর। এটাই চিহ্নমেলার অবদান। আপনি বাসে একটু ঘুমোতে পারেন।

না, ঘুমোলে চলবে না। চিহ্নমেলা তো হলো। কিন্তু চিহ্নমেলার হাত ধরে শিকড় চিহ্নের সন্ধান! এবার তার পালা। ঢাকা। তিনদিন থাকা। খোঁজখবর নেওয়া। কিছুই যে নেই আমার কাছে। এক আত্মীয়ের ফোন নম্বর নিয়ে এসেছিলাম, ২০ ১৩ সালেও কথা হয়েছিলো। এবারে তা আর কাজ করছে না। লেখা-লিখির সুবাদে বন্ধুদের মাধ্যমে যোগাযোগ কিশোরগঞ্জের দু-চারজন কবি ছড়াকারের সঙ্গে। চলো, কিশোরগঞ্জ। তারপর অনুজ এক কবিকে সঙ্গে নিয়ে মা-বাবা ও দিদির কাছে শোনা যায়গার নাম নিয়ে দু-দিনের তোলপাড়। কিশোরগঞ্জ শহরের শোলাকিয়া অঞ্চলে যেখানে বাপ-ঠাকুরদার জন্মভিটে তার সন্ধান। খোঁজ খোঁজ। মিলে গেলো ‘আজিমুদ্দিন হাই স্কুল’, যেখানে বাবা এদেশে চলে আসার আগে ৪৭ অবধি পড়াতেন। নিঃসন্দেহে নতুন রূপের স্কুল। তবু সেই মাটি, সেই বাতাস, হয়তো কিছু গাছও। প্রাণ ভরে দেখা। ছবি তোলা। সবই হলো। আশেপাশেই ছিলো বাড়ি। নাই বা মিললো সেই স্পট, নাই বা মিললো সেই দাগ নম্বর, তবুও প্রাণের আকুতি তো কিছুটা হলেও মিটলো। শিকড়ের কিছু চিহ্ন তো স্পষ্ট হলো মননের মণিকোঠায়। এর মূল্য তো কম নয় আমার কাছে। দাদু ছিলেন নামকরা কবিরাজ। তাঁর নাম মা-বাবার মুখে শুনেছেন কোনো কোনো বয়স্ক মানুষ। কিন্তু বাড়ির হদিস তাঁরা জানেন না। এই বা কম কী? ধুলো সংগ্রহ করে আনিনি, সে রইলো আমার অন্তরে। একটা চিনচিনে ব্যথা কি আমাকে ঘিরে ধরেছিলো? চোখ কি সজলতা থেকে বাস্পাকারের দিকে ছুটে গিয়েছিলো? হয়তো। আমি কি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলাম? একটা আশার আলো ঝিলিক তুলেই কি হারিয়ে যাচ্ছিলো আমার মধ্যে? হতেও পারে। অতএব আরও ছোটা। মার কাছ থেকে শোনা আরও নাম। কবি চন্দ্রাবতীর বাড়ি কিংবা জঙ্গলবাড়ি ফোর্ট। সব মিলিয়ে আহা কিশোরগঞ্জ। শিকড়ের চিহ্ন।

তো, এ সবই হলো সেই ডাকটার জন্য। ছোট বয়সে শোনা গল্পগুলো চোখ পেলো। মিলিয়ে নিলো তার নব রূপের সঙ্গে। চিহ্নমেলার হাত ধরে শিকড় চিহ্নের সন্ধান আমাকে পুষ্ট করলো। আমি কৃতজ্ঞ।

চিহ্ন এবং বিশ্ববাঙলার মিলনমেলা ২০১৬
এস এম তিতুমীর

এক এক করে ষোলো বর্ষের পদচিহ্ন এঁকে দিলো যে ছোটকাগজ তার নাম চিহ্ন।  তাই উৎসবের ধারাবাহিকতাই চিহ্ন ৭-৮ মার্চ ২০১৬ আয়োজন করলো চিহ্নমেলা-বিশ্ববাঙলা শিরোনামে লেখক-পাঠক-সম্পাদকদের মিলনমেলা শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের আম্রকাননে। (৭ মার্চ সোমবার) ষোলো বছর তাই ১৬টি বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, শিক্ষাবিদ এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জান, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, উপাচার্য প্রফেসর মো. মিজানউদ্দিন, প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা, কবি জুলফিকার মতিন, পশ্চিমবঙ্গের লেখক ইমানুল হক, চিহ্নপ্রধান শহীদ ইকবাল, চিহ্ননির্বাহী রহমান রাজু। আর দিনটি ছিলো ঐতিহাসিক সাত মার্চ তাই শান্তির দূত সাতটি পায়রা উড়িয়ে বন্দিত হয় জোহা চত্বর এর সাথে বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও শোভাযাত্রা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। সকাল এগারোটাই শুরু হয় হাসান আজিজুল হক এর সঞ্চলনায় আড্ডা। শিরোনাম— বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শহীদুল্লাহ্ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই পাঁচজন মনীষীকে নিয়ে প্রাণবন্ত আড্ডায় মেতে উঠেন সঞ্চালক। এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তিনি তাঁর ধীমান অভিব্যক্তি ও ভরাট নৈর্ব্যক্তিকতার সাথে সাহিত্যের অন্তর্জালি সূত্রের আলোকিত সোপান মোহনীয় ছন্দে মেলে ধরেন। আর সমহিমায় প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, বাঙলা সাহিত্যের উদ্ভব-ক্রমবিকাশ ও স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর কীর্তি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। আর একজন আধুনিক প্রবন্ধের দিকপাল, প্রাণপুরুষ প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা, জীবনাঙ্গণে সাহিত্যের দ্যুতি, সাহিত্যিকদের অনুপম ব্যঞ্জনা ও কবি প্রতিভার অনন্যতা নিয়ে কথা বলেন। কবি জুলফিকার মতিন, আনন্দের আরতি কিংবা অদৃষ্টে আরাধনা এ দু’য়ের অন্তরে যে জীবনসত্তার অপরিসীম আয়োজন রয়েছে, রয়েছে দারিদ্র্যতার ভেতর সত্য জীবনের সন্ধান, তা মানিকের সাহিত্যভাষ্যে উল্লেখ করেন। এছাড়া রাজশাহী সাহিত্যাঙ্গণের আর এক অনন্য পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সাহিত্য সংগঠনের বটবৃক্ষরূপী বর্ষীয়ান কবি, শিক্ষক ও সংগঠক রুহুল আমিন প্রামানিক কাব্যশৈলীর সংযুক্তি আধুনিক ধারা, বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ ভাষণের কাব্যগুণ ও বাগ্মিতার সম্মোহনী আকর্ষণ, এ সবই আপন শিল্পগুণের সাধনায় তুলে ধরেন। আর ওপার বাংলার অতিথি লেখক ইমানুল হক, বঙ্কিমের সাহিত্যকর্ম ও বাংলাদেশ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনায় মাতিয়ে রাখেন পুরো আয়োজন। বেলা গড়িয়ে যায় তবু কথা ফুরায় না। কিন্তু এক সময়তো থামতেই হয়, থামাতেই হয়। প্রজ্ঞাবান বিদগ্ধ সঞ্চালক তাই মনোমুগ্ধকর কথার মাধুরি মিশিয়ে সন্তুষ্টির জায়গায় সকলকেই কেন্দ্রীভূত করে মেলার দুপুরটাকে নিয়ে গেলেন এক অনন্য উচ্চতায়। প্রতিভাধর এই গুণিব্যক্তিত্বের অসম্ভব গুণ আর আন্তরিকতার নির্মেদ সারল্যে গোটা প্রাঙ্গণ তখন মোহাবিষ্ট। দুপুরের আহার শেষে শুরু হলো দ্বিতীয় অধিবেশন। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ স্মরণে রারি’র আবৃত্তি সংগঠন স্বনন পরিবেশন করে মার্চের কবিতা। এরপর কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদারের সঞ্চলনায় শুরু হয় লেখক-পাঠক-সম্পাদকদের নিয়ে শিরোনামহীন আড্ডা। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হচ্ছে কবিতার ধরন, পাল্টে যাচ্ছে ছাপার বিন্যাস আর সমস্যাসঙ্কুল সমাজে যেখানে স্যাটেলাইট ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগের দারুণ প্রভাবে বিক্ষিপ্ত চিন্তার ক্ষেত্র, সেখানে নতুন লেখক তুলে আনা ও ছাপা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে মনে করেন আলোচকরা। তবু কবিতানুরাগীদের মিলনতীর্থ কবিতার এই উৎসবই জানিয়ে দেয় কবিতার  চিরভাস্বরতা । কবিতা জেগে থাকবে সবার মাঝে, কবিতা জাগিয়ে রাখবে সবাইকে। তারপর বিকেল সাড়েপাঁচটার দিকে শিবলী মোক্তাদির সঞ্চালনায় শুরু হয় কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠের আসর। এই আসরে অংশগ্রহণকারী কাদের নাম বলবো, সারা দেশ থেকে এসেছিলেন কবিরা এসেছিলেন দেশের বাইরে থেকেও—কবি ইসলাম রফিক, মধুছন্দা তরফদার, হোসাইন নজরুল হক, পুলিন রায়, আঁখি সিদ্দিকা, মাসুদ মুস্তাফিজ, বেনজামিন রিয়াজী, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, অনিরুদ্ধ আলী আকতার, শফিক আজিজ, শাকিল মাহমুদ, তুলি রহমান, নাজনীন লুৎফে, মন্জু রহমান, কাওসার আলী, সিকদার ওয়ালীউজ্জামান, সাবের রাহী, সরকার মাসুদ, আমিরুল রুমী, ইয়াং গ্রাং ম্রো, তৌহিদ ইমাম। আর সন্ধ্যা সাড়েসাতটায় শুরু হয় গান আড্ডা। কাজী মামুন হায়দার রানা’র বাউল গান ও কাঞ্চন রায়ের ভাওয়াইয়া মুগ্ধ করে রাখে শ্রোতাদের। আর ৮ মার্চ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সম্মিলনের ভেতর দিয়ে হয় অধিবেশনের প্রারম্ভিক যাত্রা। ‘কথা প্রসঙ্গে’ শিরোনাম নিয়ে লেখক সম্পাদকদের অভিব্যক্তি আর শামীম নওরোজের সঞ্চালনায় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ- রিঙকু অনিমিখ, অরুনাভ রাহা রায়, হাফিজ রশিদ খান, মাসুদার রহমান, চৌধুরী বাবুল বড়–য়া, মোস্তাক আহমাদ দীন, গৌতমগুহ রায়, যতন দেবনাথ, অহ নওরোজ, অমিতাভ চক্রবর্তী, তুষার প্রসূন, নবীন ইসলাম, দিকভ্রান্ত পদাতিক, সাধন কুমার ঘোষ, মাতিয়ে রাখে পুরো বারটা ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে আবারও বসে শিরোনামহীন আড্ডার আসর, এবারে সঞ্চালক কবি আরিফুল হক কুমার। যিনি কাব্যিক ছন্দের সুকুমার আলোড়নে আলোকিত করে তোলেন গোটা জনমহল। কেতাদুরস্ত করপোরেট এই সঞ্চালকের কাব্যিক সত্তা আর ছান্দসিকবাগ্মিতার বর্ণিল বলন, কণ্ঠের কারুকাজ সত্যিই কাব্যালোচনাকে অশেষ করে তুলতে চাইছিলো। তবুও কাব্যচর্চার দারুণ আহ্বান কথার শেষের সারিকে স্বর্ণালী করে তোলে। এরপর বিকেল চারটায় রসসিক্ত ছন্দের রসিক ভাষায় গাজী লতিফ সঞ্চালনা করেন কবি কণ্ঠে কবিতাপাঠ—দীপক চক্রবর্তী, কানাই সেন, কামরুজ্জামান, মামুন মুস্তাফা, উমাপদ কর, সমর চক্রবর্তী, দেবযানী বসু, অলোক বিশ্বাস, সুবীর সরকার, ইউসুফ মুহাম্মদ, সুজন হাজারী, ইসলাম রফিক, শিবলী মোক্তাদির, বাবলু জোয়ারদার, বীরেন মুখার্জী, শামীম হোসেন, শামীম সাঈদ, শহীদ সারওয়ার আলো, মধুছন্দা তরফদার, সুকুমার মণ্ডল, সঞ্জয় সাহা, মাহফুজ আহম্মেদ, সদ্যসমুজ্জ্বল, যাহিদ সুবহান, বাসুদেব পাল, আব্দুল করিম, হোসাইন নজরুল হক, আলীম হায়দার, সৈকত হাবীব, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, সোহেল মাহবুব, সবার অন্ত উৎসারিত ভাবনার ভ্রমণ যাত্রায় যে বর্ণমালার ব্যাপ্তি ঘটেছে তা নিঃসঙ্কচে বহতা আলোয় মেলে ধরেছেন সকলেই। সকলের জীবনেই ছায়া পড়–ক মঙ্গলময় আকাশের, সকলেই সান্নিধ্য পান সেই সত্তার যিনি সুমহান। [আর যারা ছোটকাগজ সম্পদনা করে থাকেন তারা হলেননূহ-উল-আলম লেলিন (পথরেখা), সালিম সাবরিন (এবংবিধ..), অলোক বিশ্বাস (কবিতা ক্যাম্পাস), লুৎফর রহমান সাজু (উত্তরযুগ), জলিল আহম্মেদ (প্রয়াসী), লতিফ জোয়ারদার (চৌকাঠ),  উমাপদ কর, শফিক লিটন (সপ্তর্ষি), অরুণাভ রাহা রায় (আলীপুর দুয়ার), রেহেনা সুলতানা শিল্পি (শীতলপাটি), আঁখি সিদ্দিকা (মলাট), তারেক রেজা (কবি), চৌধুরী বাবুল বড়–য়া (সমুজ্জ্বল সুবাতাস), হিমাংশু রঞ্জণ দাস, মাসুদ রানা (জিরোপয়েন্ট), শামীম হোসেন (নদী), সোহেল মাহবুব (ছায়া), ড্যারিন পারভেজ (চড়–ইপত্র), মাহফুজুর রহমান আখন্দ (মোহনা), জুলফিকার হায়দার (ধারা), মন্জু রহমান (এ্যালবাম), তৌহিদ ইমাম (মারমেইড), প্রত্যয় হামিদ (হাইফেন)] ছন্দময় সুখ আর সুকুমার জীবনের আলোতে সবাই এগিয়ে যান সামনের দিকে এই প্রত্যাশায় ছিলো পরিবেশনার বিদায়লগ্নে। কিন্তু এতোক্ষণ যার কথা বলাই হলো না সে হলো ফারজানা বন্যা। না বললে, অসম্পন্ন থেকে যাবে বলবার একটা অংশ। বন্যা, নামেই যে বিশেষ পরিচিত। কথাকে কবিতা আর কবিতাকে কথার মাঝে বসিয়ে ঊর্মি দোলায় শব্দের ফেনিল মাধুরী বোধকরি এখানেই ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করছেন এই সঞ্চালক। তবে এখানেও সেই বিদায়ের সুর। কেনোনা এতোক্ষণ সঞ্চালনার সুবর্ণতরী যিনি সুচারু করে সন্ধ্যার কিনারে নিয়ে আসলেন তিনি এবার মাইক্রো ফোন তুলে দিলেন চিহ্ননির্বাহী রহমান রাজুর হাতে। আর দিতেই হতো কারণ তখন ঘড়ির কাঁটা ছ’টা তিরিশের কাছে। চিহ্নপুরস্কার ও ছোটকাগজ সম্মননা দেবার পালা। তিন বছর পর পর হওয়া এই মেলা এবার হচ্ছে তৃতীয়বারের মতো। মঞ্চে আছেন হাসান আজিজুল হক, প্রফেসর মো. মিজানউদ্দিন, সনৎকুমার সাহা, জুলফিকার মতিন, ইমানুল হক, শহীদ ইকবাল আর অতিথি নুহু-উল-আলম লেলিন। স্বাগত বক্তব্যে চিহ্নপ্রধান সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশ্বায়নের নামে নিঃস¦ায়ন হচ্ছে পশ্চিম বঙ্গের লেখক ইমানুল হক এই বিদগ্ধ উক্তি দিয়ে কথার শুরু করেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বালাম নৌকা কথার আর বিদ্যাসাগরের প্রথাভাঙার আন্দোলন যেমন করে তৎকালীন সমাজে জাগরণের জোয়ার এনেছিলো তেমনি একটা জোয়ারের প্রয়োজন সাহিত্যসমাজে।

এখন পুঁজিবাদ হচ্ছে, সবকিছুকে আমরা পণ্য করে তুলেছি। তাই সৃজনশীলতা মুখথুবড়ে পড়েছে। তবে, সৃজনশীলতার কাজ যে করে কিংবা যারা করে তাদের কেউ কখনো দমাতে পারেনা। তারাই পারে একটি মেধাসম্পন্ন জাতি গড়ে তুলতে। কথাগুলো বলছিলেন কবি জুলফিকার মতিন। আর সঞ্চালকের ভাষায়, যাঁদের ডাকলে সব সময় সাড়া পেয়েছি যাঁরা কখনোই প্রত্যাখ্যান করেননি, তাঁদের একজন একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক, প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা। ‘নিজেকে যদি প্রশ্ন করি, চিহ্নমেলায় কেনো এসেছি তাহলে বলবো—চিহ্নমেলা তা করে দেখিয়েছে। চিহ্ন যারা করে তারা তাদের চেতনাকে সমৃদ্ধ করে আর চিন্তাকে মুক্ত করে এগিয়ে যাবে এই কামনা করি’ কথাগুলোর ভেতর দিয়েই গূঢ়তত্ত্ব ফুটে ওঠে সনৎকুমার সাহার কণ্ঠে।

আর ‘ছোটকাগজের বড়ো মেলা। এই মেলা নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে। মুক্ত জ্ঞানচর্চা, দেশি-বিদেশি লেখকদের সমাগম, বইয়ের শতাধিক স্টল ও সর্বোপরি উৎসব মুখর পরিবেশ এই প্রাঙ্গণকে এক বিশ্বদরবারে নতুনরূপে তুলে ধরেছে। ‘ছোট জায়গায় বড়ো মেলা’ বলতে হয় ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি, বাজাও আপন সুর’ ছোট জায়গায় চিহ্ন বিশ্বকে তুলে এনেছে। কূপমণ্ডূকতা, পিছনে টেনেধরাকে উপেক্ষা করে বাঙালি বিকাশের যে আয়োজন তাতে আমি অভিভূত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাগজের সম্পাদকদের নিয়ে এধরনের আয়োজন আরো হোক। এখন সাড়া পড়েছে, মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি জেগে উঠেছে। তোমরা আরো জেগে ওঠো পরিচিত করে তোলো দেশকে, এই ক্যাম্পাসকে বিশ্বব্যাপী এই প্রার্থনা রইলো।’ এই বলে শেষ করলেন- প্রফেসর মো. মিজানউদ্দিন।

আর অতিথি নুহু-উল-আলম লেলিন মঞ্চের দিকে তাকিয়ে একটু বিস্ময়ের দৃষ্টিতেই বললেন— নারী নেই, (অতিথি হিসেবে কোনো নারী ছিলো না বলেই হয়তো এই প্রসঙ্গ) রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, রাবেয়া খাতুন ও রিজিয়া পারভিন এমন অনেক লেখিকা আছেন সাহিত্য আন্দোলনে তারা নিজস্ব আসন করে নিয়েছেন। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক যে সংস্কৃতিকে বাঙালি নিজেকে পরিপুষ্ট করেছে তার বিস্তৃতি এখানে। কাগজ বেরোচ্ছে তবে ছোটকাগজ কতোটা মানসম্মত তা ভাবতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল দিক। আমি একজন ছোটকাগজ সম্পাদক হিসেবে বলতে পারি, এতে যুক্ত থাকে গভীর আবেগ আর ভালোবাসা। আশার কথা যে এখন অনেক ছোটকাগজ বের হচ্ছে। বই পড়তে হবে এর কোনো বিকল্প নেই। বলতে পারি ধনের দারিদ্র্যতা দূর করা যায় কিন্তু জ্ঞানের দারিদ্র্যতা দূর করা কঠিন। জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীলতার উৎসব হোক চিহ্ন। এখন থেকে সাতচল্লিশ বছর আগে ঢাকার বীক্রমপুর থেকে এই ক্যাম্পাসে পড়তে এসেছিলাম। এখানে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই নষ্টালজিয়াকাতর কথার মাত্রা ধরে অসাধারণ বক্তা তার কথা থামান।

চিহ্ন ভাঙে, কারণ চিহ্নর শ্লোগানে লেখা আছে— এসো ভাঙি মগজের কারফিউ। এ ভাঙা, গড়ার লক্ষ্যে। রহমান রাজুর নজরুলিও কথার যাদুকরি ব্যঞ্জনা সহজেই তুলতে পারে শ্রোতামহলকে। আর সেই ব্যঞ্জনা দিয়ে এবার ঘোষণা করলেন, চিহ্নসম্মননা। চিহ্ন এবার পাঁচটি বিভাগ থেকে পাঁচটি ছোটকাগজকে সম্মাননা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তা অবশ্যই চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। সম্মাননা পায় (ক) বৃহৎ বিভাগ সিলেট। সেখান থেকে বেরোয় শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির ছোটকাগজ চৈতন্য সম্পাদক রাজীব চৌধুরী। পথ অনেক, গন্তব্য এক। সাহিত্যের প্রতি অসীম দরদ, সমকালীন চেতনায় নাড়া দেয়া দুরন্ত গতির মর্মস্পর্শী সাধনা চৈতন্য করে দেখিয়েছে। ফলে চিহ্নর বিচারিক অনুসন্ধানে নিরঙ্কুশ আস্থায় উত্তীর্ণ হয় চৈতন্য।

(খ) এরপর চাটগাঁ। হ্যাঁ, বৃহত্তর চট্টগ্রাম। ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে ছোটকাগজটি ধ্র“বতারা হয়ে দেখা দিয়েছে সেটা হলো পুষ্পকরথ। যে রথের প্রধান সারথি কবি হাফিজ রশীদ খান। রাজা দশরথের মতো পুষ্পকরথ দীর্ঘকালব্যাপী সাহিত্যাঙ্গণে স্থায়ীভাবে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। ফলে চিহ্নর বিচারক পর্ষদ এর পূর্ণ রায় পায় পুষ্পকরথ।

(গ) প্রান্তীক মানুষের একজন, সংসারের কষ্ট-দৈন্যতাকে উপেক্ষা করে জাতীয় দিবসসহ বিশেষ দিবসও পালন করা বাদ যায় না যার কাছে তিনি হলেন গোপালগঞ্জের গাজী লতিফ। হ্যাঁ, এবার চিহ্ন দৃষ্টি দেয় ঢাকা বিভাগে। সৃজনশীলতায় উদার থেকে গোপালগঞ্জ থেকে গাজী লতিফ যে কাগজটি বের করছেন সেটি হলো দূর্বার। তাই পরীক্ষক চোখের তীক্ষœতায় দূর্বাও উঠে আসে সম্মাননার তালিকায়।

(ঘ) এবারে উত্তরবঙ্গের রংপুর, না। উত্তর সাহিত্য, দিনাজপুর। সাধারণ চাকুরে, এক অসাধারণ নির্মোহ জীবনের অধিকারী জলিল আহম্মেদ। মানবিত মানুষ সৃষ্টির প্রয়াসে যিনি বের করছেন ছোটকাগজ প্রয়াস। তাঁর এ প্রয়াস চিহ্নর নিরীক্ষক রেটিনা এড়িয়ে যেতে পারেনি। সম্মননার রায়ে ঠিকই সিক্ত হয়েছে।

(ঙ) এবার রাজশাহী বিভাগ। কম বয়স, বেশি সংখ্যা বেরোয়নি। যার শুরু হয়েছে জীবনানন্দ দাশ কে দিয়ে, কবির ৬৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে। রাজশাহী অঞ্চলের শিল্প-সাহিত্যের সক্রিয় অন্যতম সংগঠন কবিকুঞ্জ। এ নামেই বের হয় ছোটকাগজটি। সম্পাদক রুহুল আমিন প্রামানিক। এই কাগজটিই তার আপন ছন্দে মাতিয়ে রেখেছে গোটা রাজশাহী অঞ্চলকে। চিহ্নর এবারের সম্মানননা তাই এই কাগজটির পক্ষেই যায়।

এপার নয়, চিহ্নবিচার পর্ষদ এবার চোখ ফেরালো ওপারে, পশ্চিমবঙ্গে। পশ্চিবঙ্গ বাংলা একাডেমি আয়োজিত অনেক ছোটকাগজ বের হয়। তাছাড়া সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়ও অনেক ছোটকাগজ বের হয়। তবে শিলিগুড়ি থেকে আড়াই দশক থেকে চারমাস অন্তর অন্তর প্রকাশিত হয় মল্লার, যার কাণ্ডারী শুভময় সরকার। দারুণ দুঃসাহসিকতা নিয়ে যারা বের করছে এই ছোটকাগজ। সম্মাননা তাদেরই প্রাপ্য।

অতঃপর নগর কোলকাতা থেকে চারমাস পরপর বের হয় কোরক। যার গবেষণার নিষ্ঠা ও ধৈর্য বিচারপতিদের অভিভূত না করে পারেনি। চিহ্নবিচারকদের হাতেই তুলে দিয়েছে পূর্ণ বিচারের ভার।

প্রান্তীকজন, প্রান্তীক মানুষ। কিছুদিন আগেও যার সীমানা নিয়ে ঝামেলা হচ্ছিলো, যারা ছিলেন ঠিকানাহীন একখণ্ড ছিটের মানুষ। সেই ছিটলগ্ন কুচবিহার থেকে সাধারণ মানুষ কিন্তু চেতনায় অসাধারণ সঞ্জয় সাহা। সস্তা নয় মানসম্মত ছোটকাগজের প্রতি যে কাগজটি প্রতিশ্র“তিবদ্ধ সে কাগজ হচ্ছে তিতির। চিহ্নঅতিথি তার হাতেই সম্মাননা তুলে দেয়।

এবারে চিহ্নপুরস্কার। চিহ্নপুরস্কারর ক্ষেত্রে সৎ ও নিরপেক্ষ থাকে এবং এবারও থাকতে চেষ্টা করেছে। যে পুরস্কার দেয়া হবে এর মান, যুক্তি-প্রযুক্তি এমন নানান প্রশ্ন উঠে আসে। কিন্ত প্রশ্ন থাকলে কি হবে এর উত্তরে যিনি অবিকল্প তিনি হলেন শহীদ ইকবাল। তিনি পুরস্কারের মান দ্বিগুণ করে দিলেন, পঞ্চাশ হাজার টাকা। প্রান্তীক হয়েও যার কবিতায় উঠে এসেছে প্রেম, বেদনা, ভালোবাসার সূক্ষ্ম অনুভূতি। যিনি বোঝেন হাওড়ের মন, কথা বলেন হাওড়ের শিল্প-সৌন্দর্য আর পূর্ণায়ত বাংলার সমগ্রতায় তিনি সিলেট জেলার সুনামগঞ্জের কবি মোস্তাক আহমাদ দীন। চিহ্নর সৃজনশীল সাহিত্য শাখায় এবারে পুরস্কার গেলো তাঁর হাতে।

আর মনমশীল শাখায় পুরস্কার পেলেন অধ্যাপক শরীফ আতিক-উজ-জামান। যিনি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে পরিচয় করিয়েছেন। তিনি যেমন প্রবন্ধ রচনা করেছেন তেমনি সম্পাদনাও করেছেন বহু। তাঁর চিন্তাসমূহে উঠে এসেছে মননশীলতার পরিচয়। তাঁকে এ পুরস্কারে ভূষিত করতে পেরে চিহ্ন ধন্য।

এবার, এতোক্ষণ মধ্যমণি হয়ে যিনি মঞ্চ থেকে দ্যুতি ছড়াচ্ছিলেন, তাঁর কথা দিয়েই পরিসমাপ্তি ঘটবে দু’দিনের এই আয়োজনমালার। তিনি আমাদের অভিভাবক, সাহিত্যের পুরোধাজাগৃতি প্রতীম, উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। ‘মেলা মানে সকলের সাথে সকলের মেলা। এই পরিবেশ দেখে বলা যায় সেটা হয়েছে। ¯েœহ ও সমীহ ওসবই আকর্ষণ করি। তাদের ষোল বছর পূর্ণ হয়েছে। এই নষ্ট দুষ্ট দেশে যেখানে সবই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষের সামাজিক মান যখন নিম্নমুখী, তখন একগুচ্ছ ছেলে চর্চা করছে সৃজনশীলতার। সাধারণ মানুষ যদি স্বস্তিতে না থাকে তাহলে দেশের উন্নয়নও অস্বস্তিতে ভুগবে, প্রকৃত উন্নয়ন হবে না। আমরা আর যা করি ‘কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করবো না’। বাংলা ভাষা বিকৃত করার অধিকার কারো নেই। সবার ভাষা আলাদা আলাদা। বিভূতি, তারাশঙ্কর, ভাদুড়ী, মানিক কী পড়েছেন? পড়–ন। জীবন কি তা অনুধাবন করতে পারবেন। যারা চিহ্ন করছে এদের চেতনা খুব অগ্রসর, খুব টাটকা হয়ে আছে। বলবো, সবকিছু বিক্রি করা ভালো নয়। এখন ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতাই বেশি। সব বলাই হচ্ছে, সত্যি সত্যি কিচ্ছু হচ্ছেনা লেখাও পণ্য হয়ে যাচ্ছে। চিহ্ন নানাভাবে ভাঙবার চেষ্টা করছে, মানসম্মত লেখক ও লেখাকে ধরে রাখতে। চিহ্ন উদাহরণ করতে যাচ্ছে। চিহ্ন দাঢ্যতার দৃঢ়তা ধরে রেখেছে। বাংলাভাষাকে ভাঙছে, দাঁড় করাচ্ছে, তার পরিস্কার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে এই চিহ্ন-এ। এগিয়ে চলুক এই ধারা’ বলেই কথার ইতি টানলেন।

তবে এখানে এক পর্বের শেষ হলো ঠিকই কিন্তু  মিরাক্কেল রনি ও ক্ষুদে গানরাজ পায়েলকে নিয়ে আনন্দসন্ধ্যা শুরু হলো এর পর-পরই। জীবনের সমস্ত ক্লান্তি আর অবসাদ কলাভবনের এই বাগানের সন্ধ্যায় ঝেড়ে ফেলে আনন্দের রেশটুকু নিয়ে যে যার গন্তব্যে ফিরলো নিজের মতো করে। শুধু এই সন্ধ্যা অপেক্ষায় রইলো আগামী এক হাজার পঁচানব্বই দিনের। বিশ্ববাঙলার মিলনমেলা স্বার্থক করে তুলেছে সুদৃঢ় চিহ্নকর্মীদল। আসলে একাকীত্ব মানুষের অমোঘ সঙ্গী। মানুষের সাথে মানুষের মিলন হয় বাইরের প্রয়োজনে আবার যেমনি হয় বন্ধুত্বের প্রয়োজনে তেমনি হয় সৃষ্টির প্রয়োজনে আর হয় স্বার্থের প্রয়োজনে। এমন নানা প্রয়োজনে মানুষের মিলন হলেও সৃষ্টির নিবিড় তাগিদ অনুভব করে একাকীত্বের প্রয়োজন। বহু দেশ, বহুভাষার মানুষ। সবকে এক জায়গায় আনার সাহসীকতা চিহ্নই দেখাতে পারে এবং তা দেখিয়েছে। উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র, শিক্ষানগরীখ্যাত পদ্মাবিধৌত ঐতিহাসিক জনপদ রাজশাহীতে বিশ্ববাঙলার মিলনমেলার অনুপম চিহ্ন, চিহ্নই এঁকে চলেছে। চিহ্ন কোনোভাবেই অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে নেই। আমরা বাইরের প্রয়োজনে কিংবা স্বার্থের প্রয়োজনেও কেউ কেউ মিলি তবে এর ফলে অজান্তেই তৈরি হয় আন্তরিক বন্ধন, তৈরি হয় বন্ধুত্ব। আর দূরত্ব যতোই হোক না কেনো কখনো কখনো সেই দূরত্বই বন্ধুত্বকে গভীর ও মধুর করে থাকে। সবাই চিহ্নর বন্ধু, বন্ধুরা এখন হয়তো অনেক দূরে তবে এরিষ্টটলের কথায় বলবো বন্ধুত্ব যতোই পুরাতন হয়, ততোই উৎকৃষ্ট ও দৃঢ় হয়। তাই নয় কি? এতেই চিহ্ন আছে, থাকবে আগামীর অনন্তে।

বিশ্ববাঙলার চিহ্ন ও আমি
হাসান রাকিব

ভাঙা খালোই নিয়ে মাছ ধরতে গেলে যেমন বাড়ি ফেরা হয় না কোনো রঙিন পেটওয়ালা টেংরা কিংবা পুঁটি মাছ নিয়ে তেমনি তলা ছেঁড়া থলে নিয়ে যাত্রার চিন্তাই শুরু হয়েছিলো অনেক আগে থেকেই। অতঃপর একটু একটু করে একটি-দুটি করে পরতে থাকে সেলাই। হঠাৎই আটকে গেলো তলা। ভাবতে ভাবতে সময়ও এসে দাঁড়ালো দরজায়। ‘দে ছুট’ বলে মন নেচে উঠলো। কড়া রৌদ্রসীমাকে পেছনে ফেলে দিলাম ভোঁ দৌড়। গিয়ে পৌঁছালাম রকমারি ঝকমারি রঙ-বেরঙের সীমায়। রঙিন চশমা ছাড়াই হরেক রঙের মেলার হাট দেখতে পেলাম। বাবুই পাখির গাঁথুনিকে লক্ষ করে গেঁথেছিলাম প্রজাপতির ডানায় উড়ে বেড়াবার স্বপ্ন। রসদ সংগ্রহ করবো এফুল ওফুল থেকে, নিভন্ত আলোকে তা-দেবো নুড়ি পাথরের ফকফকা আলোয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চিরসবুজ মতিহার চত্বরে চিহ্ন আয়োজিত ‘চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলা’র কথা বলছি আমরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গানে বলেছেন ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার’— মনটা আসলেই রেখে এসেছি মতিহারে। এখনো খুঁজে ফিরি তাকে। ঘুরে ফিরি স্মৃতির ঝোলা নিয়ে। স্মৃতির উপক্রম ঘটে ‘চিহ্ন-সারথি’র সৌজন্যে। খুলনাতে চিহ্নবৃক্ষের চৌদ্দ কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা-দল আছে। চার দেয়ালের মাঝে ঘুমন্ত বাতাসের সাগরে চলতে থাকে কর্মপরিকল্পনা। সৌভাগ্য হয় তাতে সঙিন হওয়ার।

চিহ্ন-সারথির অনুপ্রেরণায় পেলাম মন্ত্রণা বিশ্ববাঙলায় লেখক-পাঠকদের বৈশ্বিক-সম্মেলনে যাওয়ার। মার্চের শুরুতেই সমস্ত অভিলাষ নিয়ে উঠলাম ট্রেনে। ট্রেনের গতির চেয়ে আরো দ্রুতগতিতে ছুটছিলো মন আমার। পলকে পলকে ভেসে উঠছিলো চিহ্নকে নিয়ে রূপসা ব্রিজের পশ্চিমে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো। ট্রেনের দুই পাশের গাছপালা, পাখি আর সন্ধ্যার রেডিয়াম জ্বালানো জোনাকির আলো আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিলো। কানে কানে যেনো বলতো তোমার মনের গাঙ কানায় কানায় পূর্ণ হোক। মনে অনেক আশা ছিলো হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিন, সেলিনা হোসেন, আনিসুজ্জামান স্যারসহ সকলকেই দেখবো, কথা বলবো। অদেখা হলেও তাঁরা যেনো আকাশের মতো, আমার কাছে চিরচেনা। এক সপ্তাহ আগে পৌঁছালাম মতিহারে। মৌমাছির মতো ঝাক ধরে রূপনগরের রাজকন্যাকে দেখার মতো ঢুকলাম গিয়ে হয়নাকো দেখার লেখক শহীদ ইকবাল স্যারের কক্ষে। আমাদের দেখে তিনি খুশি। রাতে সবাই থাকার সিদ্ধান্ত হলো ক্যাম্পাসের হলে। তারপর খাওয়া হলো বট-পরোটা। সবার কথাই মনে পড়লো, ‘জো খায়া ও পাস্তায়া, জো নেহি খায়া ও-ভি পাস্তায়া’।

আমি না খেয়েই পস্তালাম। জিহ্বা দিয়ে শুধু রসটাই পড়লো। ফেলতে তো পারি নাই। খেয়েই নিয়েছিলাম। সময়ের গতি আমাদের দাঁড় করালো মেলার প্রারম্ভ পূর্বদিনে। রাত পেরোলেই মেলা শুরু। সমস্ত কম্ম প্রায় শেষ। চলছিলো কোন সাহিত্য পত্রিকার স্টল কোনটা তার নির্ধারণী পর্ব। ওপর থেকে যক্ষের দূত প্রিয়ার কাছে সংবাদ না দিয়েই রাগঢাক শুরু করে দিলো। যেনো আমরা তার গতিপথে আটকে আছি। মেঘদূত অন্য রাস্তায় যাবেই না পণ করে বসেছে, আমরাও নাছোড়বান্দা পথ ছাড়ছি না। উপায়ান্তর না দেখে বায়ুদেবীকে ডাকতে লাগলো অশ্র“ভেজা চোখ। অশ্র“পাতে ভাসতে লাগলো মতিহার চত্বর। লক্ষ করলাম যক্ষের চোখের পানির চেয়েও কুলুকুলু ধারায় ঝরছে চিহ্নর হৃদয়ের ও চোখের পানি। উত্তাল সাগর হঠাৎই বিরহে থমকে দাঁড়িয়েছে। এখনি যেনো নোনাজল বাধ পেরিয়ে যাবে। মেঘদূতও নত স্বীকার করে অন্যপথ ধরলো। নানা যুক্তি আর গ্রাম্য প্রযুক্তির ব্যবহারে শুরু হলো পানি সেচ। বালি আর চটের বস্তার পানি চুষে খাওয়াতে ভেজা মাটি ‘উফ্ বাঁচলাম’ বলে বুক টান করে নিশ্বাস নিলো। মতিহারের মাটি বুঝেছিলো কালই আমি ধন্য হবো তারাদের মেলায়। যথারীতি তাই হলো। প্রারম্ভ দিনে ঝকঝকা সকালে প্রতীক্ষার বাধ ভেঙে শুরু উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। র‌্যালি শেষে প্রবেশ করলাম মেলা চত্বরে। আড্ডা বিতর্কে মুখর হলো মতিহার।

চিহ্ন-চত্বরে ‘এসো লিখিয়েসব লেখায় লেখায় ভাঙি মগজের কারফিউ’, ঘাসের বিছানার উপর তনয়ার করা গোলটেবিলে মগজ ধোলাই চলছিলো। মগজ ধোলাই কোনো ধর্মীয়মায়া দিয়ে নয়, অমোঘ বাণী দিয়ে নয়; যুক্তির লড়াইয়ে আর লেখকের দৃষ্টিকোণে। যুক্তির কাষ্ঠে ধীরে ধীরে গর্ভবতী হতো আলোচনা। শিল্পের সমাধানের উত্তেজনায় হঠাৎই গর্ভপাত করতো গোলটেবিলের আড্ডাখানা। চিহ্নবেদি হয়ে সৌন্দর্যের ক্ষেত্র হয়ে ওঠলো আমারই তত্ত্বাবধানে। ভাবছিলাম ওপরের কথা ও কাজগুলি আমিই করি। দিন শেষে সন্ধ্যার পাড়ে এসে যখন দাঁড়ালাম আলোর ফোয়ারায় ঝিকিমিকি করছিলো স্টলগুলো। লেখক-পাঠক কিংবা কবিদের তীর্থক্ষেত্র আরো জমতে থাকলো। সারাদিনের ক্লান্তিকে হার মানিয়ে আরো জোরসে আড্ডা শুরু। স্টল থেকে ফাঁকে ফাঁকে বের হয়ে নাক গলাতাম অন্যের তপ্ত আলোচনায়, কোনো কোনো সময় যেনো মিইয়ে যেতো সবকিছু। কিন্তু পরক্ষণেই আবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠতো— তৈলাক্ত গরম কড়াইয়ে পানি পড়লে যেমন ছ্যাৎ করে ওঠে, আমিও আঁতকে উঠতাম। সবশেষে রাত্রিবাসে চলতাম সবাই মিলে।

দ্বিতীয় গাত্রোত্থান করেই ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ যারে পারিস তারে ছোঁ’, বলে যেনো ফুটবলের মাঠে গোল দিতে ছুটে বেড়াতাম। চত্বরে পূর্বদিনের মতো বিশ্ববাঙলালয়ের সাহিত্যপত্রিকাগুলোর স্টলে ঘুরলাম। সম্পাদকদের তেলের মেশিনে রস নিংড়ে প্রকাশ করা পত্রিকার মসলা জানতে ছুটতাম। মনে করেছিলাম সম্প্রদায়গোষ্ঠী একটু অহংকারী হয়। কিন্তু চেহারার ঔজ্জ্বল্য আর বিন¤্রতা মুগ্ধ করেছিলো সবকিছু।

সারাদিন শেষে চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলার সর্বশেষ আয়োজন ‘সম্মাননা পুরস্কার’। চলছে গুণীদের মহত্তম বাণী। সময়ের কাঠগড়াকে হার মানিয়ে হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিন কিংবা সনৎকুমার সাহা মঞ্চে। ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাঙলার গান গাই, আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাঙলায় খুঁজে পাই’, বাঙলার পেটে কাঁটা ফুটে থাকাকে উপড়ে দিলেন কবি ইমানুল হক। প্রতুল মুখোপাধ্যায় উপর্যুক্ত গানটি যখন গান, তখন হৃদয়ের গহীন থেকে সাড়া দিতে থাকে। কবির মুখেও তারই ভাবছবি দেখা যায়। এপার বাঙলা-ওপার বাঙলা নয় যেনো বাংলা একটাই।

মতিহার চত্বরের সাথে প্রেম, প্রকৃতির সাথে লেনাদেনা, ঘাসের সাথে কথা, শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের সামনের স্মৃতিসৌধের সাথে জড়ানো স্মৃতির দরজা খুলে দিয়েছিলেন রাতে বালিশকে বলা নিভৃতে প্রবাহিত হওয়া কথাগুলো। কবি সরোজ দেবের সাথে পরিচয়েই জানা যায় তিনি রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্র। মতিহারের সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেম, লেনদেন। জীবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে হিসাব চুকিয়ে নিতে চান মতিহারের সাথে। মতিহারের পাশ দিয়ে ছোটরাস্তা আলিঙ্গন করে ডেকে নিয়ে যান টুকিটাকি চত্বরে। নানা লোকের হাকাহাকি, ডাকাডাকি আর মাঝে মাঝে আঞ্চলিক রাজশাহীর ভাষার টান নিজেকে আপ্লুত ও অভিভূত করে ফেলে। নিজেকে উৎসাহ দিতাম দু-একটি কিছু বলতে বলতে। এভাবেই বিদায়ের ঘণ্টা বাজতে থাকে আমাদের। আমরাও চলে এলাম খুলনায়। শুরু হলো লেখালেখির একাত্মতা। যেনো ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল, চট্টগ্রাম খুলনা আলাদা নয়। মতিহারের স্মৃতি আজো মনে ব্যথা দিয়ে যায়। বারে বারে ঘণ্টি বাজিয়ে দেয় দৌড়ে চলার রবীন্দ্রনাথ, আমি কান পেতে রই/আমার আপন  হৃদয় গহন দ্বারে/বারে বারে কান পেতে রই। বা, দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না… সবুজ ঘাসের পর্দা এসে যখন শেওলার ওপর পড়বে তখন আমার পায়ের চিহ্ন নাও পড়তে পারে, ভুলেও যেতে পারে সব। কিন্তু সেই দিনগুলি ভুলবার নয়। পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়/চোখের দেখা, প্রাণের কথা/সে কি ভোলা যায়?

সম্মাননাপত্র

কোরক
কলকাতা ॥ ভারত
সম্পাদক : তাপস ভৌমিক

শংসালিপিকা

চিত্রকর পাবলো পিকাসো বলেছিলেন ‘শিল্প সত্য নয়, তবে শিল্প তা-ই যা আমাদের প্রকৃত সত্যের কাছে পৌনঃপুনিক পৌঁছে দেয়।’ বস্তুত, প্রকৃত সত্যের দিকে ধাবমান থেকে দীর্ঘ আড়াই দশকব্যাপী  ভাষা ও সংস্কৃতির কাগজ কোরক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনপনেয় ছাপ রেখে যাচ্ছে। বহু শ্রম, নিবিড় একাগ্রতা ও গবেষণার প্রণোদনা কোরককে সাহিত্য পত্রিকার ভুবনে অবিকল্প শীর্ষে স্থাপন করেছে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ভাষা, রাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ সংখ্যার জন্য কোরকর নিষ্ঠা ও ধৈর্যশীল কীর্তি আমাদের মুগ্ধ করেছে।

দীর্ঘকাল ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাপস ভৌমিক সম্পাদিত কোরককে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’-এর জন্য নির্বাচিত করা হলো।

কোরককে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’ দিতে পেরে চিহ্নপরিবার আনন্দিত।

শহীদ ইকবাল
চিহ্নপ্রধান                  

রহমান রাজু
চিহ্ননির্বাহী

মল্লার
শিলিগুড়ি ॥ ভারত

সম্পাদক : শুভময় সরকার

শংসালিপিকা

পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে মেঘমল্লার নামে প্রকাশিত ছোটকাগজটি নাম পরিবর্তন করে মল্লার নামে প্রকাশেরও ১৭ বছর পার হয়ে গেছে। সাহিত্য আকাদেমির নথিভুক্ত এই ছোটকাগজে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের লেখকবৃন্দ মলাটবন্দী হয়ে ঋদ্ধ করেছেন এর অবয়ব। দীর্ঘ ১৭ বছরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নবারুণ ভট্টাচার্য, হাসান আজিজুল হক, অমিয়ভূষণ মজুমদার, নোয়াম চমস্কি, উইলিয়াম রাঁদিচে, অমর মিত্র, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখের সাক্ষাৎকার ধারণ করে মল্লার বস্তুত দুই বাংলার মনীষাকেই উচ্চকিত করেছে। ইতোমধ্যে মল্লার বিভিন্ন পর্যায়ে সময়ের ধারাবাহিকতায় নিয়মিত বিভাগসমূহের পাশাপাশি প্রকাশ করেছে—‘নারীবিশ্ব’, ‘তৃতীয় ভুবনের গল্প’, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছরসহ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ও নবারুণ ভট্টাচার্যের ওপর ক্রোড়পত্র। মল্লার তার কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছে ২০০৮ সালে ‘বাংলা আকাদেমি’ পুরস্কার অর্জন করে।

মল্লার এভাবে অগ্রজ ও তরুণ লেখকদের লেখা ধারণ করে হয়ে উঠেছে শিল্পের শহর। যে ধৈর্য, সাহস ও নিষ্ঠা নিয়ে এখনও মল্লার প্রকাশিত হয় তার স্বীকৃতিস্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’-এর জন্য মল্লারকে নির্বাচন করা হয়েছে।

মল্লারকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’ দিতে পেরে চিহ্নপরিবার উজ্জীবিত ও আনন্দিত।

শহীদ ইকবাল
চিহ্নপ্রধান                  

রহমান রাজু
চিহ্ননির্বাহী

তিতির
কোচবিহার ॥ ভারত
সম্পাদক : সঞ্জয় সাহা

শংসালিপিকা

‘একটি সাহিত্য পত্রিকা’—এরকম একটি নরম কিন্তু স্পষ্ট ঘোষণায় পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের প্রান্তিক জেলা কোচবিহারের মাথাভাঙা থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা তিতির বিশ্বাস করে ক্ষুদে পত্রিকার অনিয়মিত প্রকাশের জন্য কেবল অর্থসংকটই দায়ী নয়কেন একটি সাহিত্য পত্রিকা করবএই প্রশ্নেরও একটি স্বচ্ছ উত্তর সম্পাদকের জানা থাকা দরকার। কেননা তিতির মনে করে তাদের পেছনে কোনো রিভলবার তাক করা নেই যে নির্দিষ্ট সময়ে সাপ বা ব্যাঙ বা কসমোপলিটন শহরের নামকরা লেখকদের বাঁ হাতের লেখা যা খুশি দিয়েই নিয়মিত পত্রিকা করে যেতে হবে। বলা বাহুল্য, এরকম সস্তা ‘চানাচুর মার্কা’ জনপ্রিয়তার লোভ সংবরণ করেই তিতির আমাদের শ্রদ্ধা ও বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

বস্তুত, সাহিত্যের পটভূমে উদ্দেশ্যের স্পষ্টতা ও দৃঢ় চেতনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে সঞ্জয় সাহা সম্পাদিত তিতিরকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’-এর জন্য নির্বাচিত করা হলো।

তিতিরকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’ দিতে পেরে চিহ্নপরিবার আনন্দিত।

শহীদ ইকবাল
চিহ্নপ্রধান                 

রহমান রাজু
চিহ্ননির্বাহী

চৈতন্য
সিলেট বিভাগ ॥ বাংলাদেশ
সম্পাদক: রাজীব চৌধুরী

শংসালিপিকা

‘দশ বছর বয়সী শিল্প-সাহিত্যের ছোটকাগজ চৈতন্য কোনো গোষ্ঠীর কাগজ নয়’প্রকাশিত প্রতিটি সংখ্যার পাঠক্রমই এই বিবৃতির অন্তর্সত্যকে নিরূপণ করে। বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আবেগ ও দায়বোধের প্রশ্নে সন্দেহাতীতভাবে এর তরুণ সম্পাদক রাজীব চৌধুরী নিরঙ্কুশ আস্থায় উত্তীর্ণ হন এবং তখন আমাদের মনে হয়, চৈতন্যর জন্ম অনিবার্যই ছিলো।

চৈতন্য সাহিত্যের কোনো একক মতাদর্শে বিশ্বাস করে না। সাহিত্যেরসমগ্র ভুবনই তার কাছে এক অবাধ মুক্তাঞ্চল। পথ অনেক, গন্তব্য এক জেনে আক্ষরিক অর্থেই শিল্প-সাহিত্যের এ ছোটকাগজটি অসংখ্যসাহিত্যকর্মীকে তার ক্ষুদ্র সামর্থ্যে সমবেত করেছে। নতুন চিন্তা ও নতুন লেখককে প্রকাশ করে চৈতন্য মূলত সাহিত্যের প্রতি মানুষের আগ্রহকেই প্রণোদিত করেছে।

বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি দ্বিধাহীন দায়বোধ ও অনাপোষ দৃঢ়তার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের সিলেট বিভাগীয় অঞ্চল থেকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’-এর জন্য রাজীব চৌধুরী সম্পাদিত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির কাগজ চৈতন্যকে নির্বাচন করা হলো।

চৈতন্যকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’ দিতে পেরে চিহ্নপরিবার গর্বিত।

শহীদ ইকবাল
চিহ্নপ্রধান  

রহমান রাজু
চিহ্ননির্বাহী

প্রয়াসী
রংপুর বিভাগ ॥ বাংলাদেশ
সম্পাদক : জলিল আহমেদ

শংসালিপিকা

দিনাজপুর জেলা উদীচীর বৈশাখী প্রকাশনা প্রয়াসী প্রথাগত সাহিত্যপত্র কিংবা নিছকই একটি ছোটকাগজ নয়; বাঙালি অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বৈশাখী আচার-অনুষ্ঠানকে ঐক্যসূত্রে বেঁধে একটি অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতির সমাজ বিনির্মাণে ব্যাপৃত কাগজটি একটি চেতনার আন্দোলনও বটে। মহান একুশে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে প্রয়াসী মানবীয় মানুষ সৃষ্টির অসামান্য যুদ্ধে ত্রিশ বছরব্যাপী নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রয়াসীর এ আন্দোলনকে আমরা স্বাগত জানাই। এই শুভ কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ রংপুর বিভাগীয় অঞ্চল থেকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’-এর জন্য  জলিল আহমেদ সম্পাদিত প্রয়াসীকে নির্বাচিত করা হলো।

প্রয়াসীকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’ দিতে পেরে চিহ্নপরিবার আনন্দিত।

শহীদ ইকবাল
চিহ্নপ্রধান   

রহমান রাজু
চিহ্ননির্বাহী

কবিকুঞ্জ
রাজশাহী বিভাগ ॥ বাংলাদেশ
সম্পাদক : রুহুল আমিন প্রামাণিক

শংসালিপিকা

১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথ যে কবির একটি কবিতা পড়ে মন্তব্য করেছিলেন ‘চিত্ররূপময়’ সেই কবি জীবনানন্দ দাশ কেবল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি নন, চৌদ্দশো বছরের বাংলা কবিতার তথা সাহিত্যের ইতিহাসেরই একজন প্রধান নায়ক। অথচ লাজুক, নিভৃতচারী একাকী এই কবি পারিবারিক কিংবা সামাজিক জীবনে কোথাও একটু স্বস্তি পান নি। মৃত্যুর ষাট বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে তিনি অবহেলিতই থেকে গেছেন। জাতীয়ভাবেও তিনি পেয়েছেন অমার্জনীয় অবজ্ঞা।

বস্তুত, কবিকুঞ্জ নামের সাহিত্যের কাগজটি রাজশাহীভিত্তিক সাহিত্য-সংগঠন ‘কবিকুঞ্জ’র মুখপত্র যেটি বাংলা সাহিত্যে কবি জীবনানন্দ দাশের অবদান বিবেচনায় রেখে কবির ৫৯ তম মৃত্যুদিবসে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। সে হিসেবে এটি প্রথাগত ছোটকাগজ নয়। কিন্তু যে কবি ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়’এর মতো আকাক্সক্ষা করতেন তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদার স্থান দেবার যে সদিচ্ছা চেতনায় ধারণ করে কবিকুঞ্জর আত্মপ্রকাশ ঘটে তা নিশ্চিতভাবেই অভিনন্দনযোগ্য।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির প্রতি এই দায়িত্বশীলতা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগীয় অঞ্চল থেকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’—এর জন্য কবি রুহুল আমিন প্রামাণিক সম্পাদিত কাগজ কবিকুঞ্জকে নির্বাচন করা হয়েছে।

কবিকুঞ্জকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’ দিতে পেরে চি‎হ্নপরিবার আনন্দিত।

শহীদ ইকবাল
চিহ্নপ্রধান                  

রহমান রাজু
চিহ্ননির্বাহী

পুষ্পকরথ
চট্টগ্রাম বিভাগ ॥ বাংলাদেশ
সম্পাদক : হাফিজ রশিদ খান

শংসালিপিকা

মহাকবি বাল্মীকি রামায়ণ কাব্যে যে পুষ্পকরথের কথা আমাদের জানিয়েছেন তার চালক ছিলেন দশরথ। দশদিকে পুষ্পকরথ চালনার সামর্থ্যরে জন্যেই তাঁর নাম হয়েছিলো দশরথ। কিন্তু বিশ শতকের শেষ দশকে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে আত্মপ্রকাশ করে বাংলা সাহিত্যভিত্তিক যে ছোটকাগজ পুষ্পকরথটি তার চালক কবি হাফিজ রশিদ খান। অসংখ্য সাহিত্যশিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে হাফিজ রশিদ খানও উড়ে চলেন বাংলা সাহিত্যের আকাশে। রুচিঋদ্ধ সাহিত্যের ছোটকাগজ হিসেবে পুষ্পকরথ হাজার ফুল ফোটানোর দর্শনে আস্থাশীল। পুষ্পকরথ শত-কুসুমের ততোধিক কিসিমের সুঘ্রাণ বাসনা করে এদেশের মাটি, মানুষ ও জলহাওয়াকে প্রতীক-অর্থে পুষ্পকরথে চড়িয়ে শিল্প-আঙ্গিকে পরিব্যাপ্ত করে দিতে চায় সমগ্র সাহিত্যভুবন।

যে সৎ-আকাক্সক্ষা ও নিষ্ঠা দেখিয়ে পুষ্পকরথ দীর্ঘকালব্যাপী বাংলাদেশের সাহিত্যে ইতিবাচকভাবে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে তার স্বীকৃতিস্বরূপ চট্টগ্রাম বিভাগীয় অঞ্চল থেকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’ -এর জন্য হাফিজ রশিদ খান সম্পাদিত ছোটকাগজ পুষ্পকরথকে নির্বাচন করা হলো।

পুষ্পকরথকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’ দিতে পেরে চিহ্নপরিবার আনন্দিত।

শহীদ ইকবাল
চিহ্নপ্রধান  

রহমান রাজু
চিহ্ননির্বাহী

দূর্বা
ঢাকা বিভাগ ॥ বাংলাদেশ
সম্পাদক : গাজী লতিফ

শংসালিপিকা

প্রান্তিক অনামী প্রতিভা-পরিচর্যার অন্তর্চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের নিবিড় শ্যামলিম গোপালগঞ্জ থেকে দূর্বা নামের যে সাহিত্যের কাগজটি প্রকাশিত হয় তাদের উপশীর্ষনাম ‘একটি মাটিবর্তী ছোটকাগজ’। দূর্বার এ পর্যন্ত প্রকাশিত সংখ্যাসমূহে ব্যাপ্ত হয়ে আছে এই অভিধার যথার্থতা। তারা মনে করে নিরপেক্ষতাও একটা পক্ষ। ফলে অহেতু নিরপেক্ষতার সাইনবোর্ডও দূর্বা ঝোলাতে চায় না। প্রতিভাহীন স্বার্থান্বেষী, ধূর্ত মিডিয়ার আনুকূল্যপ্রাপ্তদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে দূর্বা বরং সৎ-সাহিত্যশিল্পীদেরকে প্রাণিত করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

সৃজনশীল উদারতায় নিবেদিত থেকে চিন্তা ও মননশীলতাকে উস্কে দিয়ে, কলমের মাধ্যমে দেশ ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সৎ সাহস দেখিয়ে দূর্বা এতোদিনে যে দার্ঢ্য অর্জন করেছে, বস্তুত তারই স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিভাগীয় অঞ্চল থেকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’-এর জন্য কবি গাজী লতিফ সম্পাদিত ছোটকাগজ দূর্বাকে নির্বাচন করা হয়েছে।

দূর্বাকে ‘চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৬’ দিতে পেরে চিহ্নপরিবার আনন্দিত।

শহীদ ইকবাল
চিহ্নপ্রধান    

রহমান রাজু
চিহ্ননির্বাহী

সৃজনশীল ও মননশীল শাখায় পুরস্কৃত লেখকের মূল্যায়ন

সৃজনশীল পুরস্কার : পূর্বাপর

মোস্তাক আহমাদ দীন : কবির কর্মপ্রাণনা ও প্রাসঙ্গিক কিছু
কুমার দীপ

বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস আলোচনায়- কে কোন দশকের কবি, এটা এখন একটা প্রায় প্রথাগত পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। প্রকৃত কবি  কোনো দশকের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন; সে চিন্তা থেকে আমি কোনো কবিকে বিবেচনা করতেও চাই না; কিন্তু কোনো কবির আবির্ভাবকালকে চিহ্নিত করা এবং অন্যের মাঝে তার পরিচয়পর্বটাকে সহজ করবার জন্য দশক শব্দটির প্রয়োগ করতে বাধ্য হই। সেদিক থেকে এই গদ্যের উদ্দীষ্ট মোস্তাক আহমাদ দীন (জ. ১৯৭৪) নব্বই দশকের কবি। সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ইসহাকপুরের ভবের বাজার এলাকার জাতক তিনি। ২০০১ সালে তাঁর প্রথম কাব্য ‘কথা ও হাড়ের বেদনা’ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে তিনি লেখেন, ‘জল ও ত্রিকালদর্শী’ (২০০৫); ‘জল ও শ্রীমতি’ (২০০৯); ‘ভিখিরিও রাজস্থানে যায়’ (২০১২) এবং ‘বানপ্রস্থের আগে’ (২০১৪)। কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ, সম্পাদনা এবং অনুবাদকর্মও তিনি করে আসছেন। কবির কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধের বই- ‘কবিতাযাপন’ (২০১১)। অন্য গদ্যগ্রন্থটির নাম- ‘আটকুঠুরি’ (২০১২)। ‘তারিখে জালালি’ (২০০৩) দীনের অনুবাদকর্ম। তাঁর সম্পাদিত বইগুলি হলো : ‘পরার জমিন ॥ মকদ্দস আলম উদাসী’ (১৯৯৯); ‘আবদুল গফ্ফার দত্ত চৌধুরী : তাঁর স্মৃতি তাঁর গান’ (যৌথ) (১৯৯৯); ‘অকূল নদীর ঢেউ ॥ শাহ সুন্দর আলী’ (২০০৪); ‘মাসিং নদীর তীরে ॥ ফকির সমছুল’ (২০০৫) ‘নুরে মারিফত ॥ শাহ ছাবাল আলী’ (২০০৫); ‘ফকির বিলাশ ॥ মুন্সি মোহাম্মদ আশ্রফ উদ্দিন’ (২০১১); ‘কামালগীতি ॥ কামাল উদ্দিন’ (২০১১); এবং ‘আশিকের রতœ ॥ ফকির সমছুল’ (২০১২)। মৌলিক কাব্যাপেক্ষা অন্য বইয়ের পরিমাণ অধিক হলেও কবি হিসেবেই মোস্তাক আহমাদ দীনের পরিচিতি সমধিক।

মোস্তাক আহমাদ দীনের প্রথম কাব্য ‘কথা ও হাড়ের বেদনা’ থেকেই কবি প্রথার বাইরের একজন হয়ে উঠতে চেয়েছেন; ভাবপ্রকাশের ক্ষেত্রে। সেদিক থেকে হয়তো সফলও। কিন্তু এই ভাব ও ভাষা অনেক ক্ষেত্রে অন্যের জন্য অবোধ্যপ্রায়, কখনো কখনো  অপূর্ণ, বিশৃঙ্খল; বিকল্প শব্দে ভরপুর। ছন্দ-উপমাসহ অন্যান্য আলঙ্কারিক দিক তিনি জেনে-শুনেই হয়তো এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু অনেকবারই আমার মনে হয়েছে- এড়িয়ে না গেলেই হয়তো তিনি ভালো করতেন। আমি যখন দেখি কেউ ছন্দকে এড়িয়ে যাচ্ছেন, ভাষা তার ছন্দহীনতাকেই মেনে নিচ্ছে, সাবলীল গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে এবং প্রথাগতভাবে ছন্দহীন হয়েও দারুণ এক নান্দনিক ধ্বনি কানের ভেতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করছে; তখন সেই কবিতাকে হৃদয় দিয়েই গ্রহণ করি। কিন্তু যখন দেখি কবিতায় সাবলীলতা নেই, ভাষা আড়ষ্টময়, শব্দচয়নে অনিবার্যতা নেই; তখন সেই কবিতার ছন্দহীনতা আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না। অবশ্যই কবি আমার মতো পাঠককে সন্তুষ্ট করবার জন্য কবিতা লেখেন না; কিন্তু আমি যখন তাঁর সম্পর্কে কিছু লিখতে চাই; অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রশংসাবাক্য লিখবার মতো বুদ্ধিমান হতে চেষ্টা করি না। এবং না বুঝে বা না অনুভব করে অস্পষ্ট থিসিস লিখবার মানসিকতাও অর্জন করতে পারি না। অতএব, আবার নেতিমন্তব্যের জন্যে কবি ও কবিপাঠক বরাবরে ক্ষমাপ্রার্থী। মোস্তাক আহমাদ দীনের কবিতার যে পঙ্ক্তিগুলো থেকে কিছুটা অর্থোদ্ধার করতে পেরেছি বলে মনে হয়েছে, যেগুলো আমাকে কিছুটা আকৃষ্ট করেছে, সেগুলো নিয়ে সামান্য আলোকপাতের চেষ্টা করছি।

‘কথা ও হাড়ের বেদনা’ : আত্মানুসন্ধানের অস্পষ্টপন্থা

‘কথা ও হাড়ের বেদনা’ কাব্যের ভেতরেই তিনটি স্বতন্ত্র খণ্ডকাব্য বিরাজমান! স্বতন্ত্র খণ্ডকাব্য বলছি একারণে যে, এগুলো কেবল নামে ও ভাবেই ভিন্ন হতে চায়নি; এগুলোর এক একটির আলাদা আলাদা উৎসর্গপত্রও আছে। ‘ডুবোপাহাড়ের ঘরবাড়ি’ বাবা-মাকে উৎসর্গ করেছেন; ‘সময়খণ্ড’-এর উৎসর্জন মমতা, মরতবা, মাহবুব, মাহমুদ ও মানসুরা এই পাঁচ ভাই-বোনকে; এবং ‘হাড়লিপি’ পর্বটি প্রিয়তমাসুকে উৎসর্গীত হয়েছে।

‘ডুবোপাহাড়ের ঘরবাড়ি’ পর্বের প্রথম কবিতা ‘জন্মলজ্জা’তে আছে অকৃতজ্ঞতা আর স্বার্থপরতার বয়ান। জন্মগতভাবেই আমরা আত্মস্বার্থ চরিতার্থকামী। গ্রহণ প্রশ্নে নিজের সহোদর/সহোদরার সঙ্গে মাতৃদুগ্ধ-মাতৃস্নেহকেও ভাগাভাগি করতে রাজি নই। আবার স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে অকৃতজ্ঞও। যে মায়ের অমৃতধারায় যমজ বোনকেই ভাগ দিতে চাইনি, সেই মাকেই একসময় ভুলেই যাই। এরকম একটি বিষয়ের অবতারণা ও আফসোস দেখি মোস্তাক আহমাদ দীনের প্রথম কাব্যের প্রথম কবিতায় :

বারবার ভুলে যাই জন্মদাত্রী আমারই মায়ের মুখ, স্তন

অথচ গ্রহণপ্রশ্নে

যমজ বোনেরে ক্রমে ঠেলিয়াছি দূরে।

অবশ্য গ্রহণপ্রশ্নে সবসময় দীন অভিন্ন নন। প্রেম কিংবা প্রণয়িনীকে তিনি খুব সহজেই গ্রহণ করতে রাজি।  ‘গ্রহণ সংক্রান্ত’  কবিতায় দেখি-  দীন যাকে গ্রহণ করতে চান, তার সবকিছুই গ্রহণ করতে চান। কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাস লিখেছিলেন, ‘আমি তারে ভালোবাসি রক্তমাংসসহ’। আর দীন লিখলেন, ‘তোকে গ্রহণ করছি, তদ্ভব তৎসমসহ/যদি আরো বিশেষণ-অলংকার কিছু থাকে/আমি তারও প্রার্থী হয়ে আছি’। আবার একটু পরেই বললেন, ‘আমি মাংসগন্ধ নিয়ে জেগে ওঠা বাঘ’। অর্থাৎ দীনের কাছেও প্রেম শেষ পর্যন্ত শরীরকেন্দ্রিক। শরীরকেন্দ্রিক বলেই লোভ-লালসা, ভোগ-ভোগান্তি আর মোহময়তায় ভরা আমাদের জীবন। মোহময়তার অপোক্ত প্রকাশ ঘটে ‘ঘোরগ্রস্ত দিন’গুলোতে। তখন; অস্বাভাবিক বা ক্ষণিকের আবেগদ্বারা পরিচালিত সময়ে; কার যেনো ‘রন্ধনপাত্রে আমাদের ঘোরগ্রস্ত দিন পুড়ে যায়’। চারদিকে ‘রূপময় অধ্যায়ের ফাঁদ’ পাতা থাকলে এরকমটা হতেই পারে। দীন অবশ্য সবসময় রূপময় অধ্যাসের ফাঁদে সবসময় পড়তে চান নি। ‘কাঁচাবাজারে’ নামের কবিতায় সেই নমুনাই দেখি। সেখানে কবি বলেন, ‘এত কাঁচা, আমি নত হলে তোমার দেহ থেকে/উঠে আসছে আনাজপাতির ঘ্রাণ।’ এটা আদিমতার চিহ্ন নিঃসন্দেহে, কিন্তু কবির আমি এখানে শেষ পর্যন্ত শুধু শরীরীমুগ্ধতা বা আদিমতা নয় এর সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্কটাও চেয়েছেন। বলেছেন, ‘যার কেন্দ্র ছুঁয়ে পুরোটাই আদিমতা/তার নৈকট্য আমি কখনই কবুল করিনি’।

দীনের কবিতায় বার বার উঠে এসেছে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার চিত্রাংশ, হতাশা এবং পরাজয়ের গ্লানিবোধ। ‘পরাজিতের গল্প-২’,  ‘বাঁদি’, ‘মেঘ কিংবা নিষিদ্ধ অংশ’ প্রভৃতি কবিতায় এর নমুনা মেলে। ‘বাঁদি’তে মেলে আত্মজীবনের ব্যর্থতা-বেদনাময়তার ইঙ্গিত। অতি তুচ্ছ, সামান্য জলখণ্ডের মতো তুচ্ছতর বাঁদিজীবন যা কি না হাতে হাতে উঠে আসে বণিকের ভিড়ে। কিন্তু যাদের হাতে হাতে তার জীবন ঘোরে তাদেরকে সে বোঝে না, বোঝার সুযোগ পায় না। তবু তাদেরকে সে বোঝার চেষ্টা করেই যায়। দীন বলেন, ‘শুধু বৃথা পাঠ করি একা একা/বহুবিধ গৃহ আর বণিকের ভাষা’। ‘মেঘ কিংবা নিষিদ্ধ অংশ’- তে ‘বিবিক্ত ভ্রমণ শেষে’ দীন পেয়ে যান ‘দুঃখ আর জরা’। কিন্তু দুঃখ-জরা-ব্যর্থতা যতোই থাক, মানুষ আশাবাদী প্রাণী। আশার ভেলায় ভেসে থাকতেই পছন্দ করে। হাজার হতাশা তাকে ঘিরে ধরে, ভাঙনের বাদ্যি বাজে বুকের ভেতরে, গন্তব্যের তীর হয়ে ওঠে অধরা আলেয়া; তবু সেই আলেয়াতীরের মুখ চেয়ে সে আশার ভেলায় থাকে ভেসে। এ যেনো গিরিশ ঘোষের  সেই, ‘সংসারে সাগরে দুঃখ তরঙ্গের খেলা/আশা তার একমাত্র ভেলা’র ই সমঅভিব্যক্তি পরিলক্ষিত হয় ‘মান্দাস কাহিনি’তে । হতাশাই সব নয়, আশা হতাশার মাঝে যেমন সে আশার স্বপ্ন দ্যাখে, আগুনে পুড়তে পুড়তেও তেমনি সাগরের প্রত্যাশা করে। ‘আয়ু’ কবিতায় দীন বলেন, ‘আমি পুড়ে যাচ্ছি, ও চিতার আগুন/এত অগ্নি তথাপি শিশুবোধে আমি শুধু আঁকছি সায়র’।

‘পরাজিতের গল্প-২’তে কার উদ্দেশ্যে যেনো বলেন, ‘আমি যে পশ্চাতে ফিরি এরই মধ্যে অঙ্গ ছিঁড়ে নিলে তুমি/বাকি অর্ধাঙ্গ নিয়ে সাপের সম্মানে আমি ঢেলে দেব মধুপাত্রগুলি’। এই তুমিকে ঘিরেই জজিয়তির শুরু। জজিয়তি বা প্রতারণা যেখানে আছে, সেখানে মাছ যে পরিপূর্ণভাবেই শাকের আড়ালে ঢাকা পড়বে এটাই স্বাভাবিক (‘স্পর্শ’)। কেবল প্রতারণাই নয়, পৃথিবীটা একটি ধাঁধাময় ক্ষেত্রও বটে। এই ধাঁধাময় ক্ষেত্রে দুর্বলতা, অনভিজ্ঞতা মানুষকে কেবল ব্যর্থই করে না; পৃথিবীর পথ চলাকে আরও বেদনাময় করে তোলে। এর মাঝে কিছু পথিক ডুবে যায় দিবসের শেষে; কেউ কেউ আবার পদে পদে এই সংঘাতমুখরতা নিয়েই এগিয়ে চলতে চায়। প্রলুব্ধ হতে চায়। একবার বহু পেলে বহুতর প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা তার বেড়ে যায়। মোস্তাক দীনের কবিতায় দেখা যায় কখনও তিনি প্রলুব্ধ হবেন না বলেছেন, আবার কখনও প্রলুব্ধ হয়েই বসে রয়েছেন। কামনা-বাসনাকে বিষ বলেছেন আবার নিজের গোপন ইচ্ছের মাঝেও মগ্ন হতে চেয়েছেন। কখনও আবার আফসোসের সুরে বলেছেন, ‘সকল অর্থই যদি মিথ্যা হবে সাধনার দোষে/আমারও প্রাপ্তি কেন পাক খায় কত্থক মুদ্রায়’ (বীজ)। আসলে মানুষের মনে এক আর বাইরে এক। প্রতিকূলতার কারণে যে মানুষ মনের বাসনা প্রকাশ করতে পারে না, সেই নিরালায় সে মানুষ হৃদয়ের কথা বলতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। দীনের ভাষায়, ‘বাহ্যরূপে মিথ্যে বলো, নিরলে অন্যকথা পাড়ো/পরানের ভাঁজ খুইলা কথা কও মনের বিজনে’ (স্বপ্নকথা)। কিন্তু চাইলেই কামনা-বাসনা পূরণ করা যায় না। মোহময় এই পৃথিবীতে সামান্য প্রাপ্তির জন্যে মানুষ অনেক সময় নিজেকে ছোট করে প্রকাশ করে। দীনের ভাষায় : ‘সামান্য ধূলির মোহে পড়ে গিয়ে/আপনাকে ছোট করে দেখি’ (মোহ)। আবার প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বাধ্যত অবদমিত থাকতে হয় অনেক সময়। ‘গৃহী নও’ কবিতায় এই প্রতিকূলতাকে ইঙ্গিত করেই হয়তো বলেছেন, ‘আমি, বাধাপ্রাপ্ত জলের মতো ঘরে বসে থাকি’ (গৃহী নও)। সবকিছু জেনে-বুঝেই কবি হয়তো খবু বেশি আশাবাদী হতে পারেনা না; স্বপ্নকথাকে বড়ো করে দেখতে চান না। তিনি জানেন, প্রলুব্ধ হওয়ার নেতিবাচক দিক আছে। বিশেষত ব্যক্তিত্ব ও মনুষত্বের মাপকাঠিতে সেটা অনেক সময় অবমাননাকর। আবার ভোগের বিপরীতে ভয়ঙ্কর অধ্যাত্মবাদী পরিণতির আশঙ্কাও করেন : ‘প্রাপ্তির বিপরীতে শুনি/আমারও মাংস নাকি পুড়ে যাবে ওই/পরা কাবাবের শিকে’। এইসব বিবিধ ভাবনাপ্রভাবিত হয়েই হয়তো খ্যাতি কুড়ানোর পথে প্রলুব্ধ হতে না চেয়ে বরং বিপরীত প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, ‘এই বস্ত্র যদি পুড়ে যায় বেগানা হাওয়ায় কিংবা এই তূর্ণজলে যদি ঘুরে আসে ওই রঙিন কলস সব গুপ্ত দ্বিধাগুলি ফেলে দেব তবু আমি লুব্ধ পারব না জেনো’ (‘খোলাপাত্র’)।

যার কাছে যা থাকা উচিত, যার কাছে যা পাওয়া উচিত; আমাদের সমাজে তা নেই । ফলে ‘খুব বড় ও উজ্জ্বল নুলো ভিখিরির’ কাছে ভিক্ষা চাইতে হয়। যে মানুষটা যা নয়, সেই মানুষটা তাই দিয়ে বেড়ায়; দুর্নীতিবাজের মুখে ফোটে নীতিরক্ষার কথা। কিন্তু ক্ষুধা যার লাগে, তার তো উপায় থাকে না; তখন সামান্য তৃণও ‘পূর্ণ ব্যঞ্জন নিয়ে জেগে ওঠে’ (‘অসঙ্গতি’)।

কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন, ‘সহেনা সহেনা মানুষের জঘন্য মিতালি।’ আর মোস্তাক আহমাদ দীন বললেন, ‘আমি চোখ বুঁজে খুব কষ্টে গ্রাহ্য করি ঘৃণ্য লোকালয়’ (‘মাতৃসংক্রান্ত’)। প্রকৃতপক্ষে মানুষের অযোগ্য মানুষ যখন আমাদের সমাজ ভরে থাকে, শকুনি হিংসায় ভরে ওঠে চারপাশ; তখন একজন কবির পক্ষে এমন উক্তি অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে জীবন চলার পথে চারপাশের মানুষকে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। নয়, সেকথা মোস্তাক আহমাদ দীনও ভালোভাবেই জানেন। জানেন বলে মানুষের কাছে যেতে চান; তবে সেই মানুষের কাছেই তিনি যেতে চান, যার কাছে গেলে কিছু বাস্তব জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া যায়। এই প্রত্যক্ষ বাস্তব জ্ঞানের অফুরন্ত ভাণ্ডার হলো আমাদের অভিজ্ঞ মাটিলগ্ন মানুষেরা। দীন নিজেও সেই মানুষদের নিকট থেকেই জীবনের দরকারি অনেক কিছুই শিখেছেন। এখানে যেমন বলেছেন, ‘একজন নাপিতের কাছে আমি শিখেছি খুশকি আর ব্রনের ওষুধ, একজন ধোপার নৈকট্যে গিয়ে বস্ত্র আর রঙের প্রাজ্ঞতা’ (‘অভিজ্ঞান’)। আপন অভিজ্ঞতা আত্মজীবনেরই অংশ। কবিতায় সেই অভিজ্ঞতানির্ভর আত্মজীবনীই লিখেছেন দীন। বার বার নিজের জীবনকে আত্মকেন্দ্রিকতার বয়ানে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন। এবং সেই বয়ানে আত্মব্যর্থতার গ্লানিচিহ্ন বহমান। এখানে নিজেকে দর্জির অনুপূরকে উপস্থাপন করে জানাচ্ছেন; যিনি এমনই যাঁর সুঁচ, সুতা, আঙলানোতেই ঘাটতি আছে। অর্থাৎ পারিবারিকভাবে কবিরা হয়তো খুব ধনী ছিলেন, সেভাবেই পরিচিতি পান এখনও; কিন্তু বাস্তবে দারিদ্র্য এসে ভর করেছে জীবনে (‘আত্মজীবন’)।

মৃত্যুচিন্তাও আছে জীবনের শুরুর পর্বে (টুল্লুক)! আছে স্তব্ধ পাথরের গান (সম্বোধি)। অপ্রকাশের বেদনা নিয়ে আছে চমৎকার পঙ্্ক্তি : ‘যত অনুক্ত কথা তার অপ্রকাশ-বেদনা খুব দগ্ধ করে যায়’ (ছায়া)।

‘সময়খণ্ড’ পর্বের ‘দেয়ালাসিরিজে’র কবিতাগুচ্ছ’র প্রথমটি মার্কসীয় সাম্যবাদের আকাক্সক্ষানির্ভর। তবে মার্কসকে তিনি গ্রহণ করতে চেয়েছেন নিজস্ব ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়েই :

উঁচা-উঁচা পর্বত আমি দেখেছিলাম বৌদ্ধদের কালে

আমি শবরপা আজ অন্য ছুতোয় এসে দাঁড়িয়েছি, যাতে

সকল বৈষম্যপ্রথা রদ করে দিয়ে

ছুঁতে পারি মার্কসের হাত (১)

কিন্তু এই আকাক্সক্ষা তো একা বাস্তবায়ন করা যায় না, লোকের দরকার হয়। অথচ জীবনভাবনায় কুয়াশাচ্ছন্ন এই সমাজে এহেন সাম্যচিন্তাকে ধারণ করে অগ্রসর হওয়া মানুষ কোথায়? এই হতাশাবোধ ঝরে পড়ে কবির কণ্ঠেও, ‘আমাদের ধূমল পাড়ায় সখি খুব বেশি হাতের অভাব’।

৪ সংখ্যক কবিতায় আছে কিশোর প্রেমের কথা। কৈশোরে প্রেম বা ভালোবাসা কী, এটা বোঝার আগেই অনেক সময় প্রেমে পড়ে যায় পুরুষেরা। এর পরিণতিও মাঝে-মধ্যে হয় ভয়াবহ। দীনেরও তাই মনে হয়, ‘সকল কিশোরই নাকি একবার আত্মহননে যায়/চাচাতো-মামাতো মুখ প্রিয় বেসে-’। কবি নিজেও এব্যাপারে অনভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন, ‘আমি যে নামব জলে এমন নগুরে হয়েছি দেখো/শিখিনি সাঁতার’। মেলে প্রকৃতিধ্বংসের চিত্রও : ‘কামারবাড়ি থেকে ঘুরে আসা জিভ/আজ মেতে উঠছে বনবাসীদের ডাকে’ (৭)।

সময়খণ্ডে সীমাহীন প্রতিকূলতার ইঙ্গিত আছে ‘বোঝো’ কবিতাটিতে, ‘বোঝো, ছাল তুলে ফেলছে বালি,/শোনো, হাড় খুলে নেবে কেউ’। এহেন প্রতিকূল পরিবেশে মানবিক অনুভূতি যে ক্ষয়ে যেতে পারে, সে চিত্র পাওয়া যায় ‘রাত্রি’ শিরোনামের দুটি কবিতায়। ‘সকল ঈর্ষালিপি ভুলে গেছি, তার জন্যে কাতরতা/জমা হলে মনে হয়, কিছুটা মানব রয়েছি, বাকিটুকু প্রাণী’। অপরটিতে লেখেন, ‘রাত্রি দীর্ঘ আর কালো হয়ে গেলে হ্রস্ব হয়ে আসে প্রিয় কাঁথা’। সত্যি, জীবনে দুঃসময় ঘনিয়ে এলে ‘প্রিয় কাঁথা’ তথা উষ্ণতা বা উষ্ণ সহযোগিতা প্রাপ্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসে। এবং মন্দ সময় সবসময়ই দীর্ঘ হয়। এজন্যে  দীন বলেন : ‘হায় শৈত্যের  ঋতু, যে কোনো কালের অধিক’। কিন্তু রাত্রিনামের এই দুঃসময় থেকে উত্তোরণের জন্যে কবি নিজেই রাত্রিকে নির্মাণ করতে চান, এবং তা দিবসের সান্নিধ্যে থেকেই- ‘দিবসসান্নিধ্যে থেকে যাতে আমি পথে-পথে রাত্রি বানাই’ (‘রাত্রিনির্মাতা’)। এবং এই নিজের মতো করে রাত্রি বানানো তথা তাৎপর্যপূর্ণ সময় বিনির্মাণের আকাক্সক্ষা টের পাওয়া যায় তাঁর  কিছুটা মানবত্ব টিকে থাকার কথায়। এজন্যে  প্রয়োজনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী বন্ধনসমূহ ছিন্ন করতেও আগ্রহ প্রকাশ করেন। যে বন্ধন নানা সীমাবদ্ধতা আর প্রতিকূলতায় ভরা, সে বন্ধন বোধহয় ছিন্ন করার আকাক্সক্ষায় তিনি বলেছেন, ‘তার চে ইঁদুরলালনে যদি কেটে যেত কাল/তাহলে এ মোক্ষমে ছেড়ে দিলে/অচল হতো দড়ি, যাবতীয় পুরোনো মিছাল’ (মিছাল)।

মোস্তাক দীন মাটিলগ্ন মানুষ। নিজেকে কখনও দর্জি, কখনও ধীবর, কখনও আবার বণিক সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যসন্ধানী তিনি। এই অনুসন্ধিৎসু মন নিয়েই তিনি তাঁবুপাড়াতেও যেতে চান। কেনোনা, তাঁবুপাড়া মানে সেরকম কোনো ঘর-বাড়ি নেই, দারিদ্র্যদীর্ণ ভূমিসন্তানদের পাড়া। এরা পথের ধূলির মতোই অবহেলিত সমাজে। কিন্তু ধূলির যেমন থাকে বিবিধ পথিকের পথ চলার বিচিত্র অভিজ্ঞতা, এসব মানুষেরও তাই। এজন্য দীন এই মানুষদেরকেই গুরুত্ব দেন সবসময়। এদের নিকট থেকেই অর্জন করেন জীবনের মূল্যবান বাস্তবজ্ঞান। কেবল মাটিলগ্ন মানুষ নয়, মাটিলগ্নতার উজ্জ্বলতম উপাদান প্রকৃতিরও তিনি এক পাঁড় ভক্ত। ‘মুহূর্ত বিবিধ জানালা’ সিরিজের ১০ সংখ্যক কবিতায় লিখেছেন, ‘আমার থিতির কথা মনে রাখে বৃদ্ধবটগাছ/চাতুর্যগুলি ভালো রাখে অন্ধ বনভূমি-’।

কিন্তু সর্পবিষয়ে কবির স্ববিরোধিতা আমাদের চোখে পড়ে। ‘সর্পঈর্ষা’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আমি তো সাপের মেয়ে/তবু দেখো সর্পঈর্ষা জাগে না তো জাগে না’। অথচ একটু পরেই লিখলেন, ‘বরং পুষেছি যে সাপ, কোনো এক রাতে/প্রসব করবো দুচারিটি বাচ্চা ও ঘৃণা’ (৬)! আবার ‘স্বপ্ন’ কবিতায় নারী আর সাপকে নিয়ে লেখেন : ‘নারী ও সাপের মধ্যে তিন চামচ রঙের তফাৎ’। প্রতিবারই সাপকে নেতিবাচকভাবে দেখানো হলো; সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু প্রথমটিতে সাপের মেয়ে হয়েও ঈর্ষান্বিত হতে চান না তিনি; দ্বিতীয়টিতে কেবল ঈর্ষান্বিতই হচ্ছেন না, আরো দু-চারটি সাপের বাচ্চা তথা ঈর্ষাবৃদ্ধির কথা বলছেন। আর তৃতীয়টিতে এসে সাপের মতোই নারীকেও তীব্র নেতিবাচকরূপে দেখাতে চেয়েছেন।

হাড়লিপি পর্বটি প্রিয়তমাসুকে উৎসর্গীত বিধায় প্রেমানুসন্ধানী কবিতা থাকাই স্বাভাবিক। তা আছে বটে, কিন্তু খুব সামান্যমাত্রায় এবং ক্ষীনকণ্ঠে। ‘বোবা’ কবিতায় কবি বলেন, ‘প্রগাঢ় সান্নিধ্য পেলে আমি প্রস্তরিত বোবা’। একেবারে উচ্ছ্বাসহীন; তবে প্রিয়জনের ‘প্রগাঢ় সান্নিধ্য পেলে’ মুগ্ধতায় পাথরের বোবা হওয়ার বিষয়টি প্রেমের গভীরতাকে ইঙ্গিত করে। ‘রেখা’ এবং ‘১২টা’ নামক দুটি কবিতায় প্রেমের শরীরীমূর্তিই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে ‘বিবৃতি ৫’ নামক কবিতাটিকেই প্রেমের সাহসী রূপায়ণ বলা যায়। এখানে কবি বলেন, ‘কলঙ্ক যতোই রটে গৃহে গৃহে/আমি তার দানা খুঁটে খাবো’।  প্রেমের ক্ষেত্রে কলঙ্ক হীরের দানার মতোই মূল্যবান। কলঙ্ককে গ্রহণ করতে না পারলে প্রেমিক হওয়া যায় না। দীনও এখানে প্রকৃত প্রেমিকের মতোই সে কলঙ্ককে হৃদয় দিয়ে বরণ করে নিতে চান।

তবু দীন কখনই উচ্চকণ্ঠী বা তীব্র নন। তাঁর কবিতা নিভৃতি চায়। ‘শ্রাবণরাতের কানে’ সত্য হয়ে উঠতে চায়; ‘কূপজলের প্রগাঢ় বেদনা’ অনুভব করে। বস্তুত, এই ‘কূপজলের প্রগাঢ় তাড়না’ বাক্যবন্ধটি দীনের প্রায় সমগ্র কবিতা সম্পর্কে মূল সুর হয়ে উঠতে পারে। কেনোনা, অনুচ্চকণ্ঠী দীন নদী বা সমুদ্রের মতো শব্দ-কল্লোলিত নন, কূপের মতোই ধীরে এবং নীরবে কিন্তু গভীরতায় প্রবাহিত হতে চান। এই গভীরে প্রবাহিত হতে চাওয়ার কাজটি নিবিড় অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমেই করা সম্ভব। এজন্যেই কবি ‘ধুলোপাঠ’-এর মাধ্যমে নিবিড় পথিক হতে চান। ব্যক্ত করেন দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার আকাক্সক্ষা। এই আকাক্সক্ষা কবিকে দৃশ্যাধিক সত্য অনুভব করতে শেখায় (সত্য); স্বপ্নানুভবেও কবি জীবনার্থ সন্ধান করেন। কখনও কখনও জীবনপথের ‘কূটতীর্থে এসে’ বুঝতে পারেন, ‘লব্ধজ্ঞান বৃথা/ধনরতœমূলের দিকে ঠিকই যায়/তস্করের হাত’। তবু তিনি চলা থামান না, চারদিকে মানুষের বক্রতা, কুটিলতার প্রতি বিরক্ত হয়েও ‘অন্ধ ভ্রামণিক’-এর মতো এগিয়ে চলেন। এটা যে কবির তীব্র জিজীবিষার কারণেই সম্ভব সেকথারও ইঙ্গিত মেলে ‘হাড়’ কবিতায়। কবি বলেন, ‘প্রয়োজনে আরো তৃষ্ণা নিয়ে-/সকল কৌটিল্য আমি মাথা পেতে নেব’। কিন্তু জীবন যেখানে আছে, সেখানে মৃত্যুও বিরাজমান। তাই জীবনানুসন্ধানের ভেতরেই মৃত্যুর বারতা পাওয়া যায় ‘নৈঃশব্দের হাওয়া’ নামক কবিতায়। আর ‘পরিণতি ২’-এ কবি বলেন, ‘আমার করুণ দেহ কাল-পরশু/কুঁজো হবে আপন মুদ্রায়।’

‘জল ও ত্রিকালদর্শী’ : স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে যাত্রা

দ্বিতীয় কাব্য ‘জল ও ত্রিকালদর্শী’তে মোস্তাক আহমাদ দীনকে অপেক্ষাকৃত ঋজু, হিংস্রসংস্রবজ্ঞাত, তারুণ্যস্নাত, রোম্যান্টিক, ঐতিহ্যসন্ধানী ও স্বাচ্ছন্দ্য মনে হয়। জল সিরিজের ১ সংখ্যক কবিতায় উগ্র আর হিংস্রপ্রবণ মানুষের উদ্দেশ্যে কবি বলেন, ‘তোমার একটি পায়ের স্পেসে হাত; কিন্তু উড়িয়ে নেওয়ার জন্য ঠিকই আছে দগ্ধ শুকরের স্তব্ধ নৃত্যজামা’। এমন হিংসা বিদ্বেষ আর প্রতিহিংসা পরায়ণ হিংস্র মানুষের কথা আছে ৯ সংখ্যক কবিতাতেও। সেখানে দেখি, ‘ব্যাঘ্রছালে তৈরি হতেছে দেওয়াল, সম্পূর্ণ নিজের ছায়া মিশে যাচ্ছে দ্বেষে’। আর ১০ সংখ্যক যখন কবিতায় দেখি : ‘বন্য শুকরের লেজে কীরূপে ঘুরছে জীবন’, তখন উন্মত্ত জীবন সম্পর্কে অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ পঙ্ক্তির সন্ধান পাই। শুকর শব্দটির আরেক অনন্য ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় ‘তুচ্ছতা’ কবিতাটিতে : ‘এখানে রাষ্ট্র ঝুলে আছে শুকরের দাঁতে’।

এহেন হিংসা-দ্বেষের মাঝেও ব্যক্ত হয় ভালোবাসার আকাক্সক্ষা এবং তা না পাওয়ার বেদনা। ২ সংখ্যক কবিতাতে অনিন্দ্য এক উপমায় উঠে এসেছে মিলনাকাক্সক্ষা, ‘একলা ঠোঁটের মতো কেঁপে উঠছে ধূসর আফসোস’। আর ৩ সংখ্যক কবিতায় কবি বলেন,  ‘আমার আকাক্সক্ষা ছিল, দেহ ঢেকে ফেলবে দীর্ঘ কোনও রাতের পেঙ্গুইন’। উষ্ণ ভালোবাসার এই আকাক্সক্ষা কবিতাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। প্রাণবন্ত কবির কলমে তখন কোনো প্রিয়জন বা প্রিয় কোনো অনুভূতির প্রেক্ষাপটে সবুজ স্বপ্নময় তারুণ্যের ইঙ্গিত মেলে। কবি বলতে পারেন, ‘আমার দেহে সবজি ক্ষেতের উচ্ছ্বাস’।

প্রকৃতিগতভাবে মোস্তাক আহমাদ দীনের কাব্যবৈশিষ্ট্যকে এন্টিরোম্যান্টিক বলেই মনে হয়। সুরেলা বা সুপাঠ্য কবিতাও তাঁর কাব্যে বিরলপ্রায়। সেদিক থেকে ব্যতিক্রম ‘মেঘপ্রবাহ’ সিরিজের কবিতাগুলো। ১ সংখ্যক কবিতাটিকে এই সিরিজের সবচাইতে উচ্ছল কবিতা বলেই মনে হয়। এবং এটিই সম্ভবত দীনের প্রথম রোম্যান্টিক কাব্যস্বাদযুক্ত কবিতাও। উদাহরণস্বরূপ, পুরো কবিতাটিই উল্লেখ্য হয়ে উঠতে পারে :

নানারকম ধূলি ও মেঘ তোমাকে লক্ষ্য রাখে; আমি মনে মনে

বাসতাম শৈশব, পুষতাম কালিদাস পণ্ডিতের ধাঁধা- ভাবছি কী

বিধান রহস্যপর্দাগুলি ঠিক শরতের জ্যোৎস্নাহত রাত এবং বেশ

আলস্যে বাতাসে মেলে দেওয়া শাড়ি

দেখেছি একদিন তার ওপর ছড়িয়ে পড়েছিল রঙ- তখনো

জানতাম না তার উৎস, তার নাম গাঁদাফুল

ধূলি ও মেঘের মৃত্যু উদ্যাপিত হলে হোক, আমি কক্ষনো

গাঁদাফুল শুকোতে দেব না

‘গাঁদাফুল শুকোতে’ না দিতে চাওয়া কবির হলুদপ্রেম ধরা পড়ে ‘ফাঁস’ নামের একটি কবিতাতেও। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি শিমুলগাছের স্বভাব চুরি করে এনে/আজ বিলিয়েছি অন্য চাঁদে সুরত, তার নিচে/অনায়াসে শুয়ে পড়তে পারে/শিশু আর হলুদ মানবী’। হলুদপ্রেমী কবির ভালোবাসা মাঝে কিছুটা বিরহ-বিচ্ছিন্ন হলেও শেষ পর্যন্ত তার নবজন্ম লক্ষ্য করা যায় ১৪ সংখ্যক কবিতাটিতে ‘স্বপ্নে আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে গেলে আমাকে জন্ম দিয়ে গেল কান্নাভর্তি তোমার শুশ্রƒষা’। শুধু স্বপ্নে নয় বাস্তবেও ভালোবাসার পুনঃপ্রাপ্তি ঘটে। ৫ নং পদে কবি বলেন, ‘আমি সাত মাস জলে ডুবে থেকে পেয়েছি আশ্চর্য ডাঙার শুশ্রƒষা’। বস্তুত, এপর্বে দীন প্রেম ও প্রকৃতিমুগ্ধ, মরমীভাবঋদ্ধ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধ। ৮ সংখ্যক পদে তিনি বলেন ‘কণ্ঠে কণ্ঠে আমি দীপ্র, আমি বসন্তরাজ, আমি উঞ্চা গান গাই’। ৯-এ এসে ‘হৃদি এলো করা ভ্রমবায়ু’ দ্বারা মোহিত। রাধারমণ, ভবের বাজার, রাধা-কৃষ্ণ ইত্যাদি অনুষঙ্গগুলি তাঁর গভীর মরমীচেতনা থেকেই উৎসারিত। তিনি যখন বলেন, ‘আমাকে সে ফিরিয়ে দিল ভবের বাজার, আমাকে সে ছড়িয়ে দিল রাধারমণ হাট; এখন আমি রাধাকৃষ্ণ কিংবা আমি রাধার কৃষ্ণ তবু আমার ষোলোশো গোপিনী, চোখে আমার ভুলভুলাইয়া আমি তেমন বাসতে পারিনি ভালো’, তখন রোম্যান্টিকতা ও মরমীভাবের সঙ্গে ঐতিহ্যচেতনাও একাকার হয়ে যায়। কিন্তু কবির ঐতিহ্যচেতনা কেবল ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ভালোবাসা বা স্মরণ করায় সীমাবদ্ধ নয়। আপন ঐতিহ্যকে অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনে তিনি আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে প্রতিরোধ করার কথাও ভাবেন। ১১ সংখ্যক কবিতায় দেখা যায় পূর্বপুরুষের মৃত্তিকালগ্ন অধ্যায়ের খোঁজে, তন্ত্র-মন্ত্র-জাদুর কারিশমার সন্ধানে আসাম-কামাখ্যা-মনিপুরে ঘুরছেন তিনি। এই ঐতিহ্যসন্ধানে ঋদ্ধ হয়ে এবং এর গূঢ় পরিচয় পেয়ে পশ্চিমা সভ্যতাকে প্রতিরোধ করতে বা বিদায় জানাতেও উদ্গ্রীব হয়ে বলছেন, ‘আমি তাই প্রতিরোধস্পৃহ : নিদ্রা-জাগরণে গুণিনবন্দর; পতিতোদ্ধারিণী খুঁজে পেলে ভুলে যাব ধুতুরাবিলেত’।

কবির ঐতিহ্যানুসন্ধানের নমুনা মেলে ‘শোচনা’ নামের কবিতাটিতেও। সেখানে ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিত হয় ইতিহাস। অশোক, বাৎসায়ন, তরুণ কুমার, পাল আমল… এইসব ভারতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনুগামী হয়ে তিনি বলেন, ‘পুবজানালায় বসে আমি পাঠ করছি অশোকের লিপি…/আমিও-/গুচ্ছ গুচ্ছ ঢেলা হাতে তরুণ কুমার’। এমনকি প্রৌঢ়েও কবি এই ঐতিহ্যস্নান ভোলেন না : ‘বলিরেখা এলে তুমি জানবে, পাল-অভিলেখে/আর বাৎসায়নের আমি কিছু সহলিপিকার’। ঐতিহ্যচেতনার সাথে রোম্যান্টিক প্রেমাবেগ প্রবাহিত হয় আরও একাধিক কবিতায়। ‘অব্যয়িত পদগুচ্ছ’ সিরিজের পদগুলোতেও এই ধারাবাহিকতায় শরীরী কামনাও উদ্ভাসিত হয়। দেখা যায়, ‘মরফিয়াস, জিভে তৃষ্ণা ফুটে আছে/নিদ্রাহর রাতে’ (১)। বৃষ্টি নিয়েও পরম রোম্যান্টিক হয়ে ওঠেন কবি।

বৃষ্টিস্নাত নদীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কী সুন্দর স্লিপিং পরে আছে শীতলক্ষ্যা নদী’ (৪)। কোনো কাউকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বৃষ্টি, তোমার স্ত্রীবাচক অন্য ডাকনাম’।

তবু ‘জল ও ত্রিকালদর্শী’র সবটুকু রোম্যান্স বা প্রেমস্নাত নয়; বিরহ, রিক্ততা কিংবা কুটিলতার দেখাও মেলে এখানে। মেলে মৃত্যুচিন্তারও ভাষাচিত্র। ‘চণ্ডালজন’ কবিতায় রিক্তসুরেই কবি বলেন, ‘আমার সহস্র হাতে/ফুটে আছে খরা/আমিও চণ্ডালজন মিশে আছি বৃষ্টিভিখিরিদের ভিড়ে’। ‘ভিক্ষাপাত্র’ তে বলতে শুনি, ‘হাতে হাতে ঝুলি; আমার ভ্রমণ-আশ্লেষ/ঝুলে পড়ে ক্ষুৎপিপাসার থালে/তাতে স্বপ্ন ও ঝনাৎকারসমূহ শুধু স্বপ্নে ভেসে ওঠে’। মেলে মানুষের ভেতর-বাইরের বিপরীত চিত্রও : ‘এই যে সামীপ্য, তাতে বন্ধুকেও মনে হবে খুনি’ (এসথেনোস্ফিয়ার)। এবং শেষ পর্যন্ত  মৃত্যুচিন্তাও অপ্রকাশিত থাকে না : ‘বরং বিকেলে এসে আমি যার মূর্তি দেখে নিই/তার নাম মৃত্যুমহারাণী’। এতোসত্ত্বেও কবি কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। তাই মুক্তির অনুসন্ধান করেন আন্তরিকতার সাথেই। বলেন ‘আজ যদি ভাবো মুক্তিটুকু নিকটে রয়েছে/সামান্য ক্ষমতাসত্ত্বেও আমি ক্রমে সেই অভিমুখী’ (যদি)।

‘ভিখিরিও রাজস্থানে যায়’  : জল আর ডাঙার জীবন

‘ভিখিরিও রাজস্থানে যায়’ গ্রন্থেও মোস্তাক আহমাদ দীন ঐতিহ্যানুসারী, নারীরূপমুগ্ধ, কিছুটা প্রণয়ানুগ এবং বিপর্যস্ত জীবনচিত্রের ভাষ্যকার। কাব্যের প্রথমেই আছে নাম কবিতা- ‘ভিখিরিও রাজস্থানে যায়’। ভাবে কিংবা ভাষায় বিশেষ কোনো তাৎপর্য পরিলক্ষ্য নয় এখানে। খুব সরলভাবেই কবি বলতে চেয়েছেন ভিখিরিও রাজস্থানে যায়, তবে তা বিশেষ কোনো মর্যাদাপ্রাপ্তির জন্য নয়, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে রাজস্থানপ্রাপ্ত হয়। কবি নিজেও সেভাবে যাবেন বলে মনে করেন। এই কবিতাটিকে কেনো নামকবিতা করেছিলেন কবি জানিনে, কিন্তু আমার কাছে কেবল নামমাত্র চমকব্যতীত আর কিছুই মনে হয় না। এইকাব্যের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, নিজের কবিতা সম্পর্কে কবির আত্মমূল্যায়ন প্রচেষ্টা। কবি নিজের লেখা এবং গন্তব্য বিষয়ে লিখেছেন, ‘আমি সেই বেদনা লিখছি/পাখি জলে- পোড়া, আর/সত্যি সত্যি/দূরতীর্থ গমনে প্রয়াসী’। কবিরা তো বেদনাই লেখেন। দূরতীর্থ গমনে প্রয়াসীও হন। দীন নিজেও দূরতীর্থ গমনে প্রয়াসী। ক্লান্ত খাঁচা ফেলে চলে যাওয়া পুরাপাথরের সেই পাখি, যাদের কথা অতি অল্পই লেখা আছে লোকগানে, তা¤্রপাতায়। রোদে ভেজা সেই বর্ণচিহ্নরেখাই কবির ইপ্সিত। এবং এই লেখার কাজটি কবি মাটির কাছাকাছি থেকেই বিনীতভাবে করতে চান। এ জন্যই বলেন, ‘এখনো পাতার ভারে নুয়ে পড়ে আমি/মাটির নিকটে বসে/অবিরত করছি প্রণাম’ (লেখা)। প্রকৃতির সঙ্গে থেকেই দূরতীর্থ গমন তথা দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার মানসতার যুক্ত হয় কবির আরেকটি প্রিয় বিষয়— ঐতিহ্যপ্রীতি। ‘কম্পন’ কবিতায় দেখি কদর রাত, নৃসিংহ রমণী, তাগা-তাবিজ, ইন্দ্রজাল, কামরূপ-কামাখ্যা… এসব অনুষঙ্গ কবিকে খুব আকৃষ্ট করে। এসবের জন্য দীর্ঘপথ চলার প্রত্যয় বার বার বিভিন্ন কবিতায় ব্যক্ত করেছেন তিনি। তবে চলার পথের ক্লান্তিও এখানে অলক্ষ্য থাকে না :

নাও বাইতে গিয়ে আজ নুয়ে যাচ্ছে দাঁড়া

পথ ভরে গেল জরাগাছে আর

পায়ে কেউ বেঁধে দিয়ে গেছে যেন লোহা ও পাথর

অথবা,

আমার নতুন ক্লান্ত প্রাণ ভাঙা কাঁধের ভারে উবুমুখ

হাঁস-ফাঁস করতে থাকে বাতা ও গলুইয়ে

গুঢ়নিবিড় জলের জঙ্গলে

কবির ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতনতা ‘ঝড়-পাতা’ কবিতাতেও বর্তমান। ভূর্জপাতা, তা¤্রশাসন, তীর-ধনুক ইত্যাদি অনুষঙ্গগুলি আমাদের অতীতকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। নারীরূপ কিংবা প্রণয়চিত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এখানে তিনি প্রকৃতি অনুসারী। ‘ঠোঁট দেখে মনে হয়, কথা বলছে এক মুক্ত বনহাঁস, চুল আর বাহু দেখে যে-কোনো দরবেশেরও মনে হবে মঞ্জুলে মকসুদে যেতে পুরাটা প্রস্তুত…’ (জন্ম)। নারীকে সুন্দর পাখি মোহনচূড়ার অবয়বে চিত্রায়িত করে রূপমুগ্ধ হয়ে সে নারীকে কবি অনুসরণ করেছেন খুব সন্তর্পণে; ‘কূপের ঠাণ্ডা জল যেরকম ধীরে বয়’। দীনের এই নারীরূপমুগ্ধতা অনেকটা পুরুষোচিত লোলুপতার সাক্ষ্য হয়ে উঠে এসেছে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ কবিতায়। এমনিতেই পুরুষেরা নারীলোলুপ; তার ওপর সুন্দরী হলে তো কথাই  নেই। শেয়াল কিংবা অন্য কোনো শ্বাপদ যেমন মাংসলোভে এদিক- সেদিক ঘোরে; তেমনি পুরুষও তার লুব্ধ জিহ্বা নিয়ে ঘোরে রূপসী নারীর চারপাশে, ঘোরে নারী শরীরেই লোভে। দীন বলেন, ‘চারদিকে হুক্কা হুয়া… হ্রেষা ও বৃহন…/এ-ভরা শরীরে তুমি ফুল নিয়ে/কী রূপে যে ঘুম যেতে পারো!’ পুরুষরা কেবল নারীশরীরীমুগ্ধ হলেও বাংলার নারীরা শুধু প্রেমই করে না, প্রেমিক বা পতির প্রতি তাদের ভক্তির ঐতিহ্য অসামান্য। নারী তথা এদেশের রাধারা তাদের প্রেমিককে কেবল ভালোই বাসে না, প্রেমিকের জন্য তারা ঘর-বাহির, জল-ডাঙা সবই করতে পারে। কিন্তু শ্যাম তথা প্রেমিক পুরুষটি খুব একটা সুবিধের নয়, হিংস্রতা দিয়েই তারা ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয় রাধার ভালোবাসাকে। দীনের ভাষায় : ‘প্রাণের অধিক তুমি ভালোবাসো নিদারুণ শ্যাম; বংশী বাজায় ঠিকই, চক্ষে তার ডাকাইতি লউ, হৃদয় ছুঁবার নামে যার সুর নখে ছিঁড়ে ঘাগড়া ও চোলি কিচ্ছার কাছিম যেমন শখবশে নৃত্য করে ধুলোর ডাঙায়, সেই রূপ তির তির করে দেখি তীরবর্তী শরীর তোমার ; জলে নামিও না, তোমাকে লক্ষ্য করে কথা বলে ব্যাকুল বাতাস; জারুলের ছন্দ নিয়ে কাগজের নৌকা ভাসে আর কৃষ্ণ কৃষ্ণ ডাকে ভারি হয় রাতের আকাশ’ (রাধা)। প্রেম যেখানে, সেখানে বিচ্ছেদও আছে। ‘নোঙর’ কবিতায় তীর ছেড়ে যাওয়া জাহাজের নোঙর প্রিয়জনের দশটি আঙুলের শেষ স্পর্শ। ‘সহস্র বছর’ এখানে দীর্ঘ বা স্থায়ী বিচ্ছেদের চিহ্ন বহন করে। ‘তীরে ছেড়ে যাওয়া নোঙরের/দশটি আঙুল’কে মিলনের শেষ আকুলতা হিসেবে দেখিয়েছেন কবি।

চলমান সময় সম্পর্কে দু’লাইনের তাৎপর্যবাহী কবিতা ‘আজ’। মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর বলেছিলেন, ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?’ এড়ায় না, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, আগুনের কাছে দোকান-দেবালয়-গৃহ… সবই সমান; সকলই তার কাছে দহনযোগ্য। কিন্তু আজকের দিনের বাস্তবতায় প্রভু-নেতাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এমনই প্রখর যে অনেক সময়ই তারা নিরাপদে থাকেন। পাশের মানুষের পুড়ে যাওয়া, বিধ্বস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া তাদেরকে আক্রান্ত করতে পারে না। একথা ভেবেই দীন বলেছেন :

নগর পুড়ছে, তারপরও দেবালয় বেঁচে গেল দেখি!

শরীর পোড়ার পর যেরকম রয়ে যায় শরীরের শাড়ি

এই দেশ-কালকেন্দ্রিক ভাবনার আরেক প্রতিফলন ‘একতারা’ নামের কবিতাটি। এখানেও স্পষ্টতই স্বদেশ ও স্বসমাজকে নিয়ে কবির হতাশাবোধ ও আফসোস প্রকাশিত। ‘একটাই তার, তাও ছিঁড়ে গেছে রাত পোহাবার আগে’… অর্থাৎ জীবনে জীবন যোগ করা বা জীবনের যথার্থ সুর তোলার সূত্র হিসেবে কোনো একটিমাত্র সূত্র; যা কি না ছিন্ন হয়ে গেছে কোনো কারণে, তারই কথা ভেবে এটি লিখেছেন কবি। কবির এই ভাবনা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, দেশ ও সমাজকেন্দ্রিক। কিন্তু এই দেশ ও সমাজের একটা বিরাট অংশের মানুষ রসবোধহীন ও জীবনচেতনাশূন্য। সে কারণে কবির আফসোসও কম নয় : যে দেশে রটনা-ভয়, সেইখানে পূর্বজেরা কী কারণে পুঁতেছিলো বীজ, এমন ধুলার দেশে কেনোইবা ঘুরতে আসে রসের নিমাই, সে-সব বুঝি না- কেবল জেনেছি ভোর আসে না তো ছেঁড়াতার ঘুণে-ধরা দেহখানি বেয়ে’। এই আফসোস একধরনের আত্মবেদনার নামান্তর। যেখানে সবুজ বন নেই, গাছ-নদী পাখির নিরাপদ আশ্রয় নেই; সেখানে কবি জ্বলন্ত ক্ষোভে এক ব্যথার প্রকার হয়ে ওঠেন। বিধ্বস্ত-বিপদগ্রস্ত মানুষের মতো ঘা-খাওয়া এই  জীবন নিয়ে ব্যথিত হন কবি। বলেন, ‘ঘাই খেতে খেতে যাচ্ছে আমার/জল আর ডাঙার জীবন’ (ঘরে-বাইরে)। অসহায় মানুষের প্রতি দরদ তখন এক অক্ষমের আহাজারিমাত্র।

‘বানপ্রস্থের আগে’ : নামের বিপরীতে দ্যুতিময় উড্ডয়ন

ভারতীয় শাস্ত্রানুসারে মানবজীবনের চারটি স্তর রয়েছেব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। প্রাচীন ভারতে ব্রহ্মচর্য বলতে শৈশবে গুরুগৃহে জ্ঞানার্জনপর্বকে বোঝানো হতো। গার্হস্থ্য মানে যৌবনে সংসার-জীবন, বানপ্রস্থ হলো প্রৌঢ় তথা সংসার ত্যাগ এবং একেবারে শেষপর্বে কেবল পরকালের চিন্তাপর্বই হচ্ছে সন্ন্যাস।

শাস্ত্রমতে পঞ্চাশোর্ধ বয়সে বানপ্রস্থে যাওয়ার কথা থাকলেও মোস্তাক আহমাদ দীন চল্লিশের আগেই বানপ্রস্থে যেতে চান। কিন্তু কেনো? সংসারের প্রতি কি তিনি মোহশূন্য হয়ে গেছেন? না কি তীব্র কোনো হতাশাবোধ তাকে ঘিরে ধরেছে? না কি দুটোই? দীন লিখেছেন, ‘ভাঙা নৌকায় বসে গুড়া গুনে কেটে যাচ্ছে কার। মড়–ঞ্চে গাছের কাছে আমি অযথাই চেয়ে গেছি দুধকান্তি ফল, আমি মানে বিফল আটত্রিশ’ (বানপ্রস্থ)। তার মানে আপাতত তিনি নিজের আটত্রিশ বছরের জীবনকে ব্যর্থ জ্ঞান করে সংসার ছেড়ে বানপ্রস্থে চলে যেতে চান। আপাতত বললাম এজন্য যে, কম-বেশি ব্যর্থতা থাকলেও খুব বেশি জীবন বা সংসারবিমুখতা দীনের কবিতায় পরিলক্ষিত হয় না। বরং তার প্রকৃতি ও অরণ্যমুগ্ধতার বিষয়টি কখনও কখনও আমাদের নজরে পড়ে যায়। ‘তমালপুরাণ’ কবিতায় দীন বলছেন, ‘বটের ঝুরির পাশে মাঝেমধ্যে বসে থাকি আমি, তখন দ্যুতির চন্দে পাহাড়ের অপ্রকাশ ঝরনার গতি। মনে মনে ঘুরে আসি বন,…হঠাৎ-হঠাৎ শুধু মনে পড়ে ধ্যানী বৃক্ষমুখ, তমাল গাছের মর্ম মিশে থাকে অলখের নির্জনতা ঘিরে’।

কিন্তু এই কাব্যটিতেও নাম কবিতার সাথে অন্য কবিতাগুলোর দুস্তর ব্যবধান। ‘বানপ্রস্থের আগে’ নাম দেখে পাঠক যদি ভাবেন কাব্যের ছত্রে ছত্রে মিলবে গার্হস্থ্য জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধা বা নিরাসক্তির চিত্র, তবে তাঁর ভাবনা দুর্ভাবনায় পরিণত হতে পারে। বরং পূর্বের কাব্য বা কবিতা অপেক্ষা এই কাব্যে জীবন ও পৃথিবীর প্রতি আসক্তি অধিকতর প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে। ‘ফুলের মুহূর্ত’ নিয়ে ভাবতে গিয়ে এখানে রূপবতী নারীকেই খুঁজে পান কবি; প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রিয় নারীর দিকেই যাত্রা অব্যাহত রাখেন (যাত্রা)। কবির নারী এখানে ‘রাধিকা’ না হয়েও রাধিকার মতোই কৃষ্ণের আয়নাতে নিজেকে দ্যাখে। কৃষ্ণআয়নার সামনেই সে দাঁড়ায়। আসলে প্রেমে পড়লে যে কোনো নারীই হয়ে উঠতে পারে রাধা। দীনের জীবনাকাক্সক্ষা এখানে ‘অগ্নিস্মৃত, উড্ডয়নে আরও দ্যুতিময়’। এই কাব্যেই কবির জীবনাবাদিতা প্রথমবারের মতো কিঞ্চিৎ উচ্চকণ্ঠীমাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিকূল পরিবেশেও ইতিবাচক থাকার মানসতা ব্যক্ত করেছেন কবি : ‘ধান ও পাটের দেশে নেমে আসে মারি আর জরা, হাওরে হাওরে যদি শুরু হয় ডাহুক শিকার, তবু আমি দাঁড়াবো দক্ষিণে, আজও যদি নাহি আসে সমুদ্রবাতাস, তবু এ-দুয়ারে আমি একলা কাঙাল’ (বসন্ত রাত)। এরকম প্রত্যয়দীপ্ত একলা কাঙাল পৃথিবীর প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করবেন এটাই স্বাভাবিক। বিবিধ প্রতিকূলতাসত্ত্বেও বলবে, ‘পৃথিবী তোমার প্রতি মন ছুটে যায় – প্রাণ ছুটে যায়। পথ-বাতাসের ছাঁটে ডাল ভাঙে- ঝরে পড়ে পাতা- পড়ে যায় হস্ত-পদ, ধীরে-ধীরে ঝরে পড়ে নখ ও আঙুল/পৃথিবী তোমার প্রতি আনচান করতে থাকে আমার পরাণ…’ (মুক্তি)।

একেবারে প্রথম কাব্য থেকেই কবি দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু পথসব সময় একা-একাই চলা যায় না। নিরবচ্ছিন্নভাবেও চলা যায় না। সাহায্যের প্রয়োজন হয়। আশ্রয়ের দরকার হয়। অভিজ্ঞ বৃক্ষের নিচে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু সত্যই কি বৃক্ষ হলেই সে সুন্দর ছায়া দেয়? দেয় না। দেয় না বলেই এরকম কোনো বৃক্ষকে ইঙ্গিত করে দীন বলেন, ‘গাছটি সবুজ, তবু মিথ্যা ও মৃত, তার নিচে কি প্রার্থনা করা সাজে?’ (মিথ্যা মৃত গাছ)। কিন্তু দীনের এই কথা কি কেবল বৃক্ষসম্পর্কে সীমাবদ্ধ? কথাটি তো মানুষ সম্পর্কেও প্রযোজ্য; এবং একটু বেশিই প্রযোজ্য। কারণ, মনুষ্যসমাজেই এমন দেখতে মানুষ আছে, কিন্তু ‘দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য’ কথাটির মতো এই মানুষদের নিকটে যাওয়া যায় না। যায় না বিধায় শেষ পর্যন্ত গতির অভাবে শেষ পর্যন্ত স্থবিরত্ব নেমে আসে। ফলে স্রোতের অভাবে নদী যেমন সমুদ্রে পৌঁছতে পারে না, তেমনি উপযুক্ত গতির অভাবে অকালসমাপ্তি ঘটে জীবনাকাক্সক্ষার। এরকম এক ব্যর্থ পরিণতি থেকে দীনের প্রতিক্রিয়া এরকম – ‘সব নদী ঘুরে-ফিরে সমুদ্রেই যায়- তোমাকে লক্ষ্য করে এই বোধ নির্বোধের রূপ নিলে ভালো হতো বেশ। ক্ষীণস্রোতা বলে আমার ব্যথার জলে নদী নয়, ভেসে যায় ডোবা ও পুষ্কর’ (ব্যতিক্রম )। উদাহরণ :

১. ‘বত্রিশটি দাঁতের কাছে মাংস সত্য’।

২. ‘একলা ঠোঁটের মতো কেঁপে উঠছে ধূসর আফসোস’।

৩.  ‘বন্য শুকরের লেজে কী রূপে ঘুরছে জীবন’।

৪. ‘যে- কোনও ঘূর্ণিকথা ধীরে-সুস্থে ক্রন্দনের মুদ্রা দিয়ে যায়’।

৫.  ‘কী সুন্দর স্লিপিং পরে আছে শীতলক্ষ্যা নদী’।

গদ্যকারের অক্ষম-বারতা

আজ-কালকার দিনে কবিতা পাঠ করাই রীতিমতো একটা বিপ্লবের কাজ; তার ওপর সেই কবিতা পাঠ করে তার আলোচনা লেখা! বোধ করি বিপ্লবের পরের ধাপ! খুব বেশি বললাম বলে মনে হচ্ছে কি? সাধারণভাবে কবিতার পাঠক কম; এটা পুরনো কথা । আবার সেই কবিতা যদি হয়, বিশ শতকের শেষ দুই দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলার কবিতাভুবনে আবির্ভূত হওয়া কোনো কবির লেখা; তবে আমার মন্তব্যটি বিবেচনায় নিতেই হবে! না, এই সময়ে কবিতারাজ্যের সবার ক্ষেত্রেই উক্তিটি সত্য, তা কিন্তু নয়। সত্য তাদের ক্ষেত্রে, যারা নিজের কাব্যভাষাকে অন্যের থেকে আলাদা করতে গিয়ে, প্রথাগত কাব্যসত্যকে অস্বীকার করতে গিয়ে- কখনও কখনও বাংলা কবিতাকে গিনিপিগ বানিয়ে তুলবার চেষ্টা করেছেন; যারা পাঠকের বোধ-বুদ্ধির তোয়াক্কা না করে কেবল নিজের মনোবাঞ্ছাকে নিজস্ব বিভাবের আয়নায় আত্মবিবরস্নাত ভঙ্গিমায় সাজিয়ে তুলতে চেয়েছেন। কেউ রাগ করলে করবেন, কিন্তু আমি বলতে চাই : কবিতা কেবল নিজের ভাবরাজ্যকে আত্মবিবরজাত ভাব-ভঙ্গিমায় প্রকাশ করাই কবিতার কাজ নয়, কবিতাকে যদি অন্যের পাঠের উপযোগী করে তোলা না যায়, কবিতাকে যদি গদ্যের ভাব-ভাষা থেকে আলাদা করা না যায়; যদি প্রথাগত কাব্যালঙ্কারকে এড়িয়ে যেতে গিয়ে কবিতা যদি গজদন্তমিনারের মতো স্বতন্ত্র অসুন্দর হয়; আমি তাকে সফল কবিতা বলতে পারি না। জীবনে জীবন যোগ করতে না পারলে, কবিতা কেবল কবির আত্মরোমন্থননির্ভর শব্দজাবর বলে বিবেচিত হয় মাত্র। বলাবাহুল্য, কবি মোস্তাক আহমাদ দীনের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে অনেক সময়ই আমার এমন অনুভূতি হয়েছে; আমি বুঝতে না পারার ভারে, অনুভব করতে না পারার বেদনায়, আঙ্গিকের অনাবশ্যক আচার-আচরণে; ব্যথিত ও বিপর্যস্ত হয়েছি। এ হয়তো আমারই অক্ষমতা। হয়তো প্রাসঙ্গিক নয়, তবু উল্লেখ করি : এই সময়ে মিডিয়ার আলোয় নিত্য প্রকাশিত হওয়া অনেক তরুণ কবির কবিতা সম্পর্কে তাদের অপছন্দনীয় মন্তব্য লিখে অনেকেরই বিরাগভাজন হয়েছি। মধুসূদন-রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ-সুধীন্দ্র-অমিয়-শক্তি-শামসুর-শঙ্খ-কাদরী-আজাদ-হাসান-রুদ্র প্রমুখে স্নাত আমি এই সময়ের তরুণ হয়েও অনেক তরুণ বা তরুণোত্তর কবিদের কবিতা বুঝি না; তাদের ভাব-ভাষাকে নিজের করে নিতে পারি না; এইসব তীব্র সীমাবদ্ধতা অকপটে স্বীকার করেই দীনের কবিতাপাঠ ও পাঠোত্তর প্রতিক্রিয়া প্রকাশে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। কবি হিসেবে মোস্তাক আহমাদ দীন অনেকেরই প্রশংসাধন্য। আধুনিক কবিতার প্রথিতযশা ভাষ্যকারও তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমি সেই তুলনায় একেবারে নগণ্য এক পাঠক। পাঠক হিসেবেই দেখতে চেয়েছি তাঁর কবিতাকে। কিছু পঙক্তি আর দু-চারটা কবিতা আমাকে স্বস্তি ও আনন্দ দিয়েছে, কখনও কখনও নান্দনিকত্বের স্বাদ দিতে চেয়েছে বৈকি; কিন্তু কবিতায় আমি সবধরনের জীবনসত্য প্রকাশের পাশাপাশি যে শিল্প ও সুন্দরের স্বরূপ সন্ধান করি, তার দেখা খুব একটা পাইনি। এ হয়তো আমার পাঠ-দুর্বলতামাত্র। আর এই দুর্বলতা নিয়ে আমি কোনো কবি বা লেখক সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী মন্তব্য প্রকাশ করতে পারি না। আমি অনুভব করতে না পারলেই যে লেখকের অনুভূতি সার্থক হবে না, তা তো নয়। কারণ, ইতিহাস কবিকে মনে রাখে, কবিতার আলোচককে নয়।

মননশীল পুরস্কার : পূর্বাপর

শরীফ আতিক-উজ-জামান : কর্মকুশলতার ওপার থেকে
দিব্যদ্যুতি সরকার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান চিহ্ন-কর্তৃক আয়োজিত চিহ্নমেলায় চিহ্নপুরস্কার-২০১৬ প্রদান করা হয়েছে শরীফ আতিক-উজ-জামানকে। বাংলাদেশের সাহিত্যের যারা নিবিষ্ট পাঠক, তাদের কাছে শরীফ আতিক-উজ-জামানের নাম পরিচিত হয়ে উঠেছে। সে পরিচিতির অবশ্য নানা ধরন রয়েছে। কারণ নানা ধরনের রচনায় তিনি ক্রমাগত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ছোটগল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ প্রভৃতি তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। চিহ্ন মূলত মননশীল শাখায় তাঁকে পুরস্কৃত করেছে। এতে মনে হতে পারে, শরীফ আতিক-উজ-জামানের সৃজনশীল বৈশিষ্ট্য বুঝি চিহ্নর চোখ এড়িয়ে গেছে! কিন্তু চিহ্নর প্রদত্ত শংসালিপিকাটি পড়লে বোঝা যায়, ব্যাপারটা তা নয়। তারা শরীফের গল্প, গবেষণা, শিল্প-বিশ্লেষণ সব বিষয়গুলোই যথোচিত অধ্যয়ন করেছেন এবং তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। শংসাপত্রটিতে বলা হয়েছে, ‘তাঁর লেখা গল্প সৃষ্টিশীল নৈপুণ্যে ভাস্বর; তাঁর গবেষণাগ্রন্থ সবিশেষ চিন্তা জাগানিয়া। শিল্পকলা বিষয়ক গ্রন্থে কিংবা সম্পাদিত গ্রন্থে তিনি যে গভীর প্রযতœ ও মনীষা নিয়ে হাজির হয়েছেন, তাতে আমরা বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়েছি। মননশীলতার বিবিধ প্রান্তের পরিচর্যার প্রচলতাকে ভেঙ্গেছেন, নিজেকে প্রকাশ করেছেন উদ্যত প্রাচুর্যে।’ ছোটগল্প, গবেষণা বা শিল্প সমালোচনা এমনকি অনুবাদ সর্বত্রই যে মননশীলতার পরিচয় ফুটে উঠতে পারে, চিহ্ন সেটি যথার্থই অনুধাবন করেছে। চিহ্নর এই অনুধাবনকে তাই স্বাগত জানাই।

সাধারণত বাঙালির লেখালেখির শুরু হয়ে থাকে কবিতা দিয়ে। বাংলার জল-হাওয়া, শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এর একটি কারণ অবশ্যই; হবু লেখকের অল্প বয়সের আবেগও তাকে কবিতার দিকে ধাবিত করে। কিন্তু শরীফ আতিক-উজ-জামান কবিতা দিয়ে শুরু করেননি, শুরু করেছেন প্রবন্ধ দিয়ে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি লিখতে শুরু করেন দৈনিকের সাহিত্য পাতা ও লিটলম্যাগে। তখন মূলত লিখেছেন দেশি ও বিদেশি সাহিত্য নিয়ে সমালোচনামূলক নিবন্ধ। তখন তাঁর যা বয়স, সে তুলনায় বেজায় ভারী সব বিষয়ই ছিলো তাঁর পছন্দ। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, অমিয়ভূষণ মজুমদার প্রমুখের লেখা ছিলো তাঁর নিবন্ধের বিষয়। বিদেশি লেখকদের মধ্যে টি এস এলিয়ট, ফ্রানৎস কাফকা, আলবেয়ার কাম্যু, জোসেফ কনরাড প্রমুখ লেখককে নিয়েও তিনি প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। সেসব লেখার প্রায় কিছুই সংকলিত হয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। অনেক লেখার পেপার কাটিং পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়নি। লাইব্রেরি, আর্কাইভসের বিপুল দলিল দস্তাবেজের মধ্যে তা খুঁজে পাওয়াও বেশ কঠিন। এখনকার মতো তখন পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ ছিলো না, ফলে গুগলও তা খুঁজে দিতে পারবে না। অসুবিধা আরও আছে, লেখক নিজেও তাঁর লেখা প্রকাশের দিন তারিখ টুকে রাখেননি। কিছু পত্রিকা এর মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। যেমন দৈনিক বাংলা ও আজকের কাগজ। এসব পত্রিকায় তাঁর লেখা ছিলো; ধনুর্ভঙ্গ পণ করে পুরনো পত্রিকার ফাইল চষে ফেললে তবে সেসব লেখার কিছু খোঁজ মিলতে পারে। কিন্তু কে করবে এই ‘গোরু খোঁজা’র কাজ! স্বয়ং লেখকেরও তেমন আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। জিজ্ঞাসা করলে বললেন, ‘মনের আনন্দে লিখেছি, সব গুছিয়ে রাখা হয়ে ওঠেনি, কিছু রেখেছি। ভালো লিখি বলেতো লিখি না, ভালো লাগে তাই লিখি। ভাবিনি ওসব কারো কাজে আসবে কি না।’ খুবই বেদনাদায়ক নির্লিপ্ততা নিঃসন্দেহে। কিন্তু কী আর করার আছে! যিনি প্রথম যৌবনে কবিতার আবেগ বাদ দিয়ে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন, তিনি যে স্বভাবে নির্লিপ্ত নির্মোহ হবেন, তাতে আর আশ্চর্যের কী? লেখকের এই স্বভাব থেকে অবশ্য একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলো। প্রশ্নটা হলো, লেখা শুরু করার পর প্রথম গ্রন্থ বের হতে কেন পনেরো বছর সময় লেগেছিলো।

অবশ্য, বই একবার প্রকাশ হতে শুরু করার পরে তাতে বেশ গতি এসেছিলো। প্রধানত তিনটি ধারায় তাঁর এই গতি চলতে শুরু করে এখনও চলছে। এক. প্রবন্ধ, দুই. অনুবাদ এবং তিন. ছোটগল্প। প্রবন্ধের মধ্যে তাঁর আগ্রহের বিষয় চিত্রকলা, শিল্প-বিশ্লেষণ, তেভাগা আন্দোলন, উত্তরাধুনিকতা ও সমকালীন বিশ্ব সাহিত্য। একটা দীর্ঘ সময় ধরে তিনি চল্লিশের দশকের তেভাগা আন্দোলনের শিল্প ও সাহিত্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণায় তেভাগার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, তেভাগার গল্প, গান ও কবিতা, উপন্যাস, চিত্রকলা, নাটক ও চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন যা আগামী দিনের গবেষকদের কাজে আসবে। তার লেখালেখির একটি বিশেষ আগ্রহের জায়গা হলো শিল্প-বিশ্লেষণ। শিল্পী এস এম সুলতানের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় এই জটিল কাজটাতে মনোনিবেশ করতে তিনি আগ্রহ বোধ করেছিলেন। বইপুস্তকের প্রাথমিক সহযোগিতাও তিনি তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এই বিষয়ে লেখালেখি করতে গিয়ে তিনি এদেশে ভালো শিল্প-বিশ্লেষণের দৈন্য উপলব্ধি করেন। এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘বাংলাদেশের শিল্প-বিশ্লেষণে ‘হিউম্যান ভ্যালু’ হয়ে উঠেছে মুখ্য বিষয়, শিল্পের ‘প্লাস্টিক ভ্যালু’ বিশ্লেষণ এখানে খুব দুর্বল।’ শরীফ আতিক-উজ-জামানের শিল্প-বিশ্লেষণে আমরা এই দুর্বল জায়গাটিকে সবল করার চেষ্টা দেখি। তবে শিল্পের মধ্যে মানবিকতা বিমানবিকতা খোঁজা যতোটা সহজ, প্লাস্টিক ভ্যালু খোঁজা ততোটা সহজ নয়। এর জন্য লেখককে নানারকম শিল্প মাধ্যমের বিচিত্র সব ফর্ম ও কাঠামো সম্পর্কে বিপুল ধারণা রাখতে হয়। তাঁর দশ পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী, শিল্প ও শিল্পী এবং চিত্রকলার সপ্তরথী গ্রন্থ তিনটিতে আমরা এই বিপুল ধারণার বহু চিহ্ন দেখতে পাই। শিল্প-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি যে ব্যাপক অধ্যয়ন করেন, এই তিনটি বই পড়লে তা খুব সহজে বোঝা যায়।

শিল্পকলা সম্পর্কে এই অধ্যয়ন করতে গিয়ে শরীফ আতিক-উজ-জামান লক্ষ করেন, বাংলা ভাষায় লিখিত কোনো শিল্পকলা বিষয়ক কোষ গ্রন্থ নেই। বাংলা ভাষায় এমনিতেই কোষ গ্রন্থের চর্চা ব্যাপক নয়, শিল্পকলা বিষয়ক কোষ গ্রন্থের চর্চা তো নেই বললেই চলে। এমনকি শিল্পকলায় ব্যবহৃত অসংখ্য ইংরেজি প্রত্যয়ের পরিভাষা পর্যন্তও নেই। যে যেভাবে পারছে নিজের মতো করে পরিভাষা বা অর্থ করে নিচ্ছে। ফলে একই শব্দের নানা প্রতিশব্দ তৈরি হয়ে এলোমেলো অর্থ তৈরি হচ্ছে, জটিলতাও বাড়ছে। এসব থেকে মুক্তির কোনো উপায় না দেখে শরীফ আতিক-উজ-জামান নিজেই শুরু করেন শিল্পকোষ তৈরির কাজ। গভীর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি শিল্পকোষ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটিতে পরিভাষার সাথে সাথে টীকাভাষ্য সংযোজিত হয়েছে। বোঝার সুবিধার্থে প্রাসঙ্গিক চিত্র সংযোজিত হয়েছে। এই বইটি সম্পর্কে পশ্চিম বাংলার খ্যাতিমান চিত্র সমালোচক মৃণাল ঘোষ অত্যন্ত ইতিবাচক ও দীর্ঘ একটি সমালোচনা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘শরীফ আতিক-উজ-জামান রচিত ঢাকার ‘ধ্র“বপদ’ থেকে প্রকাশিত ‘শিল্পকোষ’ বইটি শিল্পকলায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ইংরেজি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ সংকলন। বর্ণানুক্রমে সাজিয়ে প্রায় ২৫০টি প্রতিশব্দ নির্দেশ করেছেন লেখক। কিছু বাংলা প্রতিশব্দ প্রচলিত রয়েছে। কিছু প্রতিশব্দ লেখক তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। এটি একটি জরুরি কাজ। প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে এতোদিনে একটি শিল্পপরিভাষাকোষ হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু হয়নি। ফলে বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করেন। এতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। পাঠকের বোঝার সমস্যা হয়। যেমন ওসধমব কথাটিকে প্রতিমা, প্রতিমাকল্প, রূপকল্প, বিম্ব ইত্যাদি নানা অভিধায় অভিহিত করা হয়। ঊীঢ়ৎবংংরড়হরংস শব্দটিকে কেউ লেখেন প্রকাশবাদ, কেউবা অভিব্যক্তিবাদ। বানানের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি পরিভাষার ক্ষেত্রেও বিকল্পবর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অর্থাৎ একটি শব্দকে একই অর্থে সকলে ব্যবহার করবেন, এটাই বিধি হওয়া উচিত। ইংরেজিতে বা ইউরোপীয় দেশগুলিতে সেটাই হয়ে থাকে। কিন্তু স্বাধীনতা প্রাপ্তির এতোদিন পরেও আমাদের দেশে সেটা করা সম্ভব হয়নি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সচেতনতার অভাবে। সেদিক থেকে শরীফ যেটা চেষ্টা করেছেন সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি শুধু প্রতিশব্দ সংকলন করেই কাজ শেষ করেন নি। প্রতিটি শব্দের অর্থও ব্যাখ্যা করেছেন। ফলে যারা জানতে চান তারা বইটি থেকে যথেষ্ট উপকৃত হবেন।’

এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন। এনসাইক্লোপিডিয়া বা কোষগ্রন্থ রচনা সব সময়ই দুরূহ ও বিপুল পরিশ্রমের কাজ। একজন ব্যক্তির পক্ষে তা আরও দুরূহ। শরীফ আতিক-উজ-জামান একক প্রচেষ্টায় যে কাজটি করেছেন, সেটিকে ভিত্তি ধরে এ বিষয়ে আরও বিশদ একটি কোষগ্রন্থ প্রণয়ন করা জরুরি। বাংলা একাডেমি বা এশিয়াটিক সোসাইটির মতো প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। কোষগ্রন্থ রচনার অভিজ্ঞতা থাকায় শরীফ আতিক-উজ-জামান হতে পারেন এই জাতীয় একটি আকর গ্রন্থের যথার্থ সম্পাদক।

শরীফ আতিক-উজ-জামানের আগ্রহের অন্যতম আরেকটি ক্ষেত্র হলো অনুবাদ। লেখালেখির শুরু থেকেই তিনি অনুবাদ করে আসছেন। মৌলিক লেখনী থেকে তা সংখ্যায় একটু বেশি হওয়ায় অনুবাদক হিসেবে তার গায়ে বিশেষ এক ছাপ্পা লেগে গেছে। তিনটি উপন্যাস, দুইটি ছোটগল্পের সংকলন, একটি আত্মজৈবনিক রচনা, দুইটি সাক্ষাৎকার সংকলন ও একটি প্রবন্ধ সংকলন নিয়ে তাঁর অনুবাদের কাজ বেশ সমৃদ্ধ। সেখানেও তিনি খুব গতানুগতিক নন। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী টনি মরিসন, জে এম কোয়েটজি ও তরুণ ফরাসি ঔপন্যাসিক ফ্লোরেন্স নোয়াভিলের উপন্যাস তিনি অনুবাদ করেছেন। দ্য ব্লুয়েস্ট আই, ফো বা অ্যাটাচমেন্ট-এর মতো ভিন্নমাত্রার লেখনীর সাথে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে তিনটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা এলি উইজেলের নাইটকে তিনি বাঙালি পাঠকের সামনে এনেছেন। হলোকাস্ট লিটারেচার হিসেবে এই গ্রন্থটি বিশ্বের অন্তত পঁয়ত্রিশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হলেও এদেশের পাঠকের কাছে তা তেমন পরিচিত নয়। ফ্রান্সিস বেকনের প্রবন্ধ অনুবাদ সম্পূর্ণ শিক্ষায়তনিক প্রয়োজনে হলেও তাকে সাহিত্য করে তোলা প্রচেষ্টা অনুভূতিশীল পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না। দুইটি ছোটগল্পের সংকলনের তিনি এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও আমেরিকার লেখকদের অপ্রচলিত গল্পের প্রাধান্য দিয়েছেন। বিশ্বের খ্যাতিমান লেখকদের সাক্ষাৎকার অনুবাদ করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার উদ্যোগ বাংলাদেশে বোধহয় তিনিই প্রথম নিয়েছেন। অদ্ভূত ব্যাপার হলো, এমন বিবিধ বিষয়ে যিনি অনুবাদ করেছেন, সেই তিনি এখন অনুবাদ করতেই চান না। কারণ ঐ ছাপ্পা মারা; তিনি শুধু ‘অনুবাদক’ হয়ে থাকতে চান না। আমরা তাঁর ঐ ছাপ্পা মারা পরিচয়ের সাথে একমত নই। কারণ, শুধু অনুবাদক পরিচয়টা তাঁর জন্য যথার্থ নয় মোটেই।

শরীফ আতিক-উজ-জামান যেহেতু ছাপ্পা মারা পরিচয় থেকে বের হতে চান, তাই তাঁর জন্য প্রেরণা হতে পারেন ইমরে কার্তেশ। ১৯৯০ সালে ক্যাডিশ ফর অ্যা চাইল্ড নট বর্ন প্রকাশিত হওয়ার আগে ইমরে কার্তেশকে সবাই অনুবাদক হিসেবে জানতো। এমনকি ২০০২ সালে এটি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে পর্যন্তও ইমরে কার্তেশের গায়ে অনুবাদকের ছাপ্পা মারা ছিলো। এরকম ঘটনা আরও আছে। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী যামিনী রায়কে পটশৈলীর শিল্পী হিসেবে সবাই পরিচয় দিয়ে থাকেন, কিন্তু পট তাঁর বিষয়বস্তু হলেও টেম্পল টেরাকোটা তাঁর শৈলী। ফলে ছাপ্পা একটা শক্তিশালী ব্যাপার বৈকি। তবে এ ছাপ্পা এমন নিন্দনীয় কিছু নয়, এ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য শরীফের অনুবাদকর্ম বাদ দেয়াও উচিত হবে না। একইসাথে তিনি অনুবাদও করুন, সৃজনশীল মৌলিক রচনাও লিখুন। ইমরে কার্তেশও তাই করতেন। আশার কথা, লেখক ইতোমধ্যেই তা করতে শুরু করেছেন এবং এখনও করছেন। বিশেষত তিনি লিখছেন ছোটগল্প। ইতোমধ্যে ছোটগল্পে তাঁর চারটি বইও বেরিয়ে গেছে। প্রথম গল্পগ্রন্থ স্বপ্নঘোড়ার সওয়ারী প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে। খুব হইচই ফেলে দেওয়ার মতো কিছু ছিলো না, তবে যাদের হাতে পড়েছিলো তারা ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। তবে দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ চোখ প্রকাশিত হলে অনেকেই তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকান। এই গল্পগ্রন্থের ‘চোখ’ গল্পটি নিয়ে নির্মিত টেলিড্রামা ২০১৩ সালের শ্রেষ্ঠ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক হিসেবে ‘আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। গ্রন্থটি নিয়ে সাহিত্যিক হোসেনউদ্দিন হোসেন পশ্চিম বাংলার ‘রিভিউ প্রিভিউ’ পত্রিকায় লিখেছেন, ‘একটা দর্শন, একটা ঐতিহাসিক চেতনা তাঁকে গল্পগুলো লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সুস্থিরভাবে সেই দর্শন ও চেতনা গল্পগুলোর শরীরের মধ্যে রক্তমাংসে মিশে আছে।’ একই পত্রিকায় শিবাশিস দত্ত তাঁর খেরোখাতার জীবন নিয়ে লিখেছেন : ‘সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্র গল্পের যাদুশৈলী কিংবা দুর্ধর্ষ জনপ্রিয়তায় বাহাদুরগণ্য হয়ে ওঠা লেখক হুমায়ূন আহমেদের গল্পের পাশাপাশি একঝাঁক গল্পকার ভিন্নধারার গল্পস্রোত বইয়ে দিয়েছেন সমকালীন বাংলাদেশের সাহিত্যে। শরীফ আতিক-উজ-জামান এই স্বাতন্ত্র্যবাদী লেখককুলের একজন। অতিমাত্রায় পরিশীলিত হয়ে ওঠার ঝোঁকে তাঁর গল্প প্রাণপ্রাচুর্য হারায় না, টেকনিকের গাণিতিক কোনো ফর্মুলা মেনে গল্পরসকে বিসর্জন দিতেও নারাজ তিনি। আমরা ভদ্রলোকের ভাষায় গল্পের যে নাগরিক চেতনা তথা আধুনিকতা গড়ি, গল্পকার শরীফ তেমন কৃত্রিম অনুশাসনের ধার ধারেন না।’ পশ্চিম বাংলারই ‘প্রাত্যহিক খবর’ পত্রিকায় সুশীল সাহা লিখেছেন, ‘লেখকের ঝোঁক নিটোল কাহিনি বিন্যাসের দিকে। তাঁর গল্পের মধ্যে কোনো দুর্বোধ্যতা নেই। নেই ভাষার জাগলারি। বস্তুত নিজের দেখা জগত ও জীবনের অভিজ্ঞতার মণিকণিকা তাঁর সহজ-সরল ভাষার বুননে মূর্ত হয়ে ওঠে। তাই আমরা তাঁর লেখা গল্পগুলোর মধ্যে পেয়ে যাই চেনা ভুবনের মানুষজনকে, তাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট দুঃখকথা লেখকের সহানুভূতির কলমের আঁচড়ে ফুটে ওঠে।’এসব মন্তব্য পড়লে বোঝা যায়, শরীফ আতিক-উজ-জামানের ‘অনুবাদক’ ছাপ্পাটি মুছে যেতে শুরু করেছে।

শরীফ আতিক-উজ-জামানের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সম্পাদনা। বিশেষত একবাল আহমেদ : পাঠ ও বিবেচনা শিরোনামে তিনি যে গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন, তা সত্যিই অসাধারণ। একবাল আহমেদ সম্পর্কে বাংলাদেশে খুব বেশি পঠন-পাঠন নেই। কিন্তু তিনি মূলত একজন বিশ্ব-মনীষী, বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তিনি নতুন ধারণা ও ডিসকোর্স তৈরি করেছেন। দেশবিভাগ পরবর্তী সময়ে ভারত থেকে তিনি পাকিস্তানে অভিবাসী হয়েছিলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, পাকিস্তানের নাগরিক হয়েও তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিউইয়র্কস্থ পাকিস্তানি দূতাবাস বরাবর ‘বাঙালিদের স্বাধীন হওয়ার অধিকার স্বীকার করে নিন’ শিরোনামে এক পত্র লিখে আমাদের সংগ্রামকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। অসহায় মানুষদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে তুলে দিয়েছিলেন। বিশ্বখ্যাত এই মনীষীর জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রটিকে শরীফ এদেশের মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

ফিলিস্তিনের কবি মাহমুদ দারবিশকে নিয়ে আরেকটি সম্পাদিত গ্রন্থ তিনি পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন। বিশ্বের নানা প্রান্তে রাজনৈতিক কারণে মানুষ বাস্তুচ্যূত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। মাহমুদ দারবিশের সেই অভিজ্ঞতা অজস্র মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। তাঁর কাব্যের সেই গভীর বেদনা ও জীবন সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়নকে তিনি পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। এই কাজগুলো অনেক ধৈর্য্য ও পরিশ্রমের ফসল। এছাড়াও বিভিন্ন সময় তিনি এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ, জ্যাক দেরিদা, মিশেল ফুকো, আন্তনিও গ্রামসিকে নিয়ে লিখেছেন, তাঁদের লেখা অনুবাদ করেছেন। এমনকি লেখক জীবনের প্রথম থেকে যে কবিতাচর্চা তিনি কখনও করেননি, অনুবাদের মাধ্যমে তিনি সেটিতেও হাত দিয়েছেন। বিশেষত টি এস এলিয়টের দীর্ঘ কবিতাগুলোর চমৎকার অনুবাদ আমাদের মুগ্ধ করে। শরীফ শুধু ইংরেজি থেকে বাংলা নয়, বাংলা থেকেও ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। আমাদের দেশের একজন প্রবীণ লেখক হোসেনউদ্দিন হোসেনের ‘ইঁদুর ও মানুষেরা’ উপন্যাসটি তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। কোলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পাঠ্য। কিন্তু ইংরেজি বই প্রকাশের ব্যাপারে এখানকার প্রকাশকেরা সেভাবে আগ্রহ দেখান না লগ্নিকৃত অর্থ ফিরে না আসার আশংকায়। সেজন্য বইটি এখনো আলোর মুখ দেখলো না। ইংল্যান্ডের একটি প্রকাশনা সংস্থা আগ্রহ দেখিয়েছে, কিন্তু কিছু পুরো নয় আংশিক অর্থ লগ্নির শর্তে। কিন্তু সে পথে তিনি হাঁটতে চাইছেন না। বাংলাদশের সাহিত্যের বৈশ্বিক পরিচিতির জন্য এরকম অনুবাদ প্রকাশ জরুরি।

শরীফ আতিক-উজ-জামান মূলত গদ্যলেখক। তবে তাঁর লেখক সত্তার মতো সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হলো তাঁর সংগীত-সত্তা। রবীন্দ্রসংগীতে তাঁর নিজস্ব একটি গায়কী পরিচিত হয়ে উঠছে। খুলনা অঞ্চলে তিনিই সম্ভবত একমাত্র শিল্পী, যিনি নিয়মিত তাঁর একক গানের অনুষ্ঠান করে থাকেন। চিরায়ত বাংলা সংগীতের নিরন্তর যে চর্চা তিনি করে যাচ্ছেন, তাতে বোঝা যায়, গীতিকবিতার তিনি মুগ্ধ একজন অনুরাগী। ফলে কোনোদিন যদি ছোটগল্পকার হিসেবেও তাঁর নামের পাশে আরেকটি ছাপ্পা মেরে যায়, তখন তিনি যদি গান লেখা এবং তাতে সুরারোপে মনোনিবেশ করেন, তাতে মোটেই অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বরং বাংলাদেশে সংগীত রচনা ও তাতে সুরারোপের ক্ষেত্রে প্রতিভার যে নিদারুণ দৈন্য চোখে পড়ছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য হয়তো তিনি আমাদের জন্য দিশা হয়ে উঠতে পারেন।

প্রতিভাবানরা অধিকাংশ সময় তাঁর নিজের প্রতিভার সবচেয়ে শক্তির দিকটি সনাক্ত করতে পারেন না। পাঠক সেটি পারেন, সমালোচকরা পারেন, আশেপাশে যারা থাকেন তারাও পারেন। আমরা যারা শরীফ আতিক-উজ-জামানকে পাঠ করে চলেছি, অথবা কাছ থেকে তাঁকে দেখছি, তারা জানি, তিনি একই সাথে অন্তত বিরল তিনটি গুণের অধিকারী। প্রথম গুণটি হলো তাঁর নির্মোহ বিশ্লেষণ ক্ষমতা, যা তাঁকে সাহিত্য ও শিল্পকলার একজন প্রথম সারির গবেষকে পরিণত করতে পারে। দ্বিতীয় গুণটি হলো, তাঁর সৃজনশীল প্রতিভা। মনে হয় এটিকে তিনি এখনও ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেননি। এই ক্ষেত্রে তাঁর আরও অনেক কিছু দেবার রয়েছে। বিশেষত ছোটগল্প ও উপন্যাসের ক্ষেত্রে তাঁর কাছ থেকে বিরাট কিছুর জন্য আমরা অপেক্ষা করে থাকবো। তৃতীয় গুণটি হলো, তাঁর সংগীত প্রতিভা। এটিও এখনও বহুলাংশে আড়ালে রয়ে গেছে। বিশেষত তাঁর মতো একজন সংবেদনশীল মানুষ যদি সংগীত রচনা ও সুর প্রদানে মনোনিবেশ করেন, তাহলে তিনি সফল হবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। বাংলা সংগীতের ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখার সামর্থ তাঁর রয়েছে। প্রতিভার এই তিনটি চিহ্ন আমাদের সামনে পরিষ্কার ধরা পড়েছে। এর সাথে যদি যোগ করি তাঁর ইংরেজি পড়া ও লেখার উচ্চতর দক্ষতা এবং পরিশ্রম করতে পারার বিপুল সামর্থ, তাহলে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রবল আশাবাদী হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে। সত্যি বলতে কি, বর্তমানে বাংলা ভাষায় লিখছেন এমন কয় জনের মধ্যে একইসঙ্গে এই বৈশিষ্টগুলোর দেখা মিলবে? শুধু অনুরোধ, এই শক্তির জায়গাগুলোর কথা তিনি যেনো সবসময় মনে রাখেন।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা