20728100_1464956210238134_7554614045820284866_n

ক্রো ড় প ত্র

সাহিত্যে দর্শন দর্শনে সাহিত্য
আলাপচারিতা
হাসান আজিজুল হক
আমাদের প্রস্তাবিত ক্রোড়পত্র ‘সাহিত্যে দর্শন দর্শনে সাহিত্য’ নিয়ে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক (জ. ১৯৩৯) লিখতে চাইছিলেন। কিন্তু পরে নানা কারণে লেখার বদলে আলাপচারিতাতেই তিনি অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেন। গত ১৫ মে ২০১৭ তারিখ সন্ধ্যার পর তাঁর রাজশাহীর বাসা ‘উজানী’তে আমরা আড্ডায় মেতে উঠি। ঘনিষ্ঠ এ আড্ডায় নানারকম বিষয় উঠে আসলেও তার অংশবিশেষ চৌম্বক কিছু পাঠকের জন্য আমরা পত্রস্থ করতে সক্ষম হই। আসুন, জেনে নিই দর্শন ও সাহিত্যের ওতপ্রোত সম্পর্কের সূত্রটি :

চিহ্ন : আমরা যেটা ফিল করছি সেটা হল যে আপনি দীর্ঘদিন দর্শনের অধ্যাপনা করেছেন। সক্রেটিস এবং ছোড়ানো ছিটানো দর্শনের মৌলিক চিন্তা বিভিন্ন সময় করেছেন। এখন বিষয় হচ্ছে যে আপনি তো বাংলাদেশের সাহিত্যে একটি বড় ভিত্তি এবং বটবৃক্ষ। সেক্ষেত্রে সাহিত্যের ক্ষেত্রে দর্শন ও দর্শন সাহিত্য এই বিষয়টা আমাদের জানা দরকার। কারণ আজকালকার লেখালেখির ক্ষেত্রে প্রচার প্রপগা-া, তারপর যে সমাজ বাস্তবতা চলছে— যেটা আমরা প্রতিনিয়ত ফেস করছি, সেখানে দর্শনের একটা বড় অভাব। আর একই সঙ্গে লেখালেখি যা চলছে তাতে দর্শন বা দার্শনিক চিন্তাভাবনাটা ততোটা প্রকাশ পাচ্ছে না। লেখালেখিতে যেন সমাজের উপরিতলটাই থাকছে— চলতি কিছু জিনিস কিংবা বলা যায় যে তারল্য কিংবা তাৎক্ষণিক যা কিছু ঘটছে সেইটারই প্রকাশ করার একটা তারল্যসূলভ চেষ্টা যেন। অর্থাৎ সাংবাদিকসুলভ সাহিত্য। সেখানে আমরা আজকাল যে আপনার গল্পে দেখছি— যেমন কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে যে পঞ্চাশটি গল্পের সংকলন বেরিয়েছে, সেখানে মোটামুটি চুম্বক সব গল্পই আছে— সেখান থেকে হাসান আজিজুল হককে পাঠ করা যায় এবং তারপর একটা ফিলোসোফিও তার মধ্যে আছে (সেটাই গোচরে-অগোচরে গল্পের মধ্যে উঠে এসেছে) সেটা আমাদের ভেতরে কাজ করে। লেখকের সাথে দার্শনিক চিন্তা এবং সত্তার একটা যোগাযোগ সংস্রব আছে, চেতন— অবচেতনভাবেই আছে। কিন্তু আমাদের স্যার, যেটা মনে হচ্ছে আজকাল লেখালেখিতে এই যে দার্শনিক মুকুর সেটা আসলে মিলছে না। দর্শন ছাড়া তো গল্প হয় না! সেটাই স্বল্প— যদি তাতে একটা নির্ধারিত দর্শন থাকে। লেখকের বক্তব্যও তা-ই! এমনটা বুঝি আজকাল নেই। সেজন্য আমরা গল্পে ঠিক— বেশিক্ষণ থাকতে পারছি না, আমরা উপন্যাসেও বেশিক্ষণ থাকতে পারছি না। কিংবা গল্প উপন্যাস লেখা হলেও সেইটা আমাদের মনে তেমন একটা দাগ কাটছে না কিংবা পাঠক যেটা চায় কিংবা পাঠকের যে উপলব্ধি সেই উপলব্ধিতে আঘাত বলি বা অভিঘাত বলি সেটা পাচ্ছি না। তো এই জায়গাটা— স্যার আসলে— এই বিষয়ে আমরা আপনার কাছে এসেছি, কিছ,ু নতুন-পুরোনো ব্যাপার নয়! সাহিত্যে তো দর্শনটা দরকার এখানে সেই জিনিসটা আপনার বোধ-বুদ্ধি চিন্তা— সবকিছু মিলে আমরা একটু জানতে চাই। আর বহুকাল আগে আমরা প্রথম আলোতে বোধহয় পড়েছিলাম— অনেক আগে আপনি একটা লেখা লিখেছিলেন, ‘কান্ডজ্ঞানের দর্শন’…

হা. আ. হ. : হুম হুম। আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়ে

চিহ্ন : সেটা আমাদের মনে আছে— পড়েছিলাম। এই কান্টকে নিয়ে, হেগেলকে নিয়ে, সক্রেটিসকে নিয়ে— আপনার চিন্তা আছে। আমাদের জন্য, ছাত্রজীবনে এসব কঠিন পাঠ ছিল। কিন্তু, আপনার কাছে তা দেখছি যে অনেকটা সহজ, সহজ করে বলা, বুঝিয়ে বলা সমাজের সাথে মিলিয়ে বলা, বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে বলা। তত্ত্বকে তত্ত্ব না রেখে, সেটাকে পিষে ফেলে জীবনের অংশ করা। আজকে বড় সাহিত্যিক হিসেবে এসব বিষয়কে আপনি কীভাবে দেখেন। দর্শন ছাড়া তো মানুষ হয়না— লেখক তো বটেই…

হা. আ. হ. : একটু ভেতরে যাতে ঢোকা যায় এইবস্তুজগতের যেন আরো ভেতরে ঢুকতে পারা যায়…

চিহ্ন : তো এই বিষয়গুলো নিয়ে… আসলে এগুলোর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা না। জাস্ট একটা কথাবার্তা এমনি লেখার বদলে কথালোচনা আর কি!

হা. আ. হ. : হুম, ঠিক আছে। এটা করতেই পারি। এই প্রশ্নগুলো কিন্তু খুব প্রাথমিক প্রশ্ন! দর্শনের শুরু থেকে এই প্রশ্নগুলো হয়েছে। এই পৃথিবীটা কি দিয়ে তৈরী? এর আল্টিমেট ম্যাটেরিয়ালটা কি? এখন দেখো এটা বিজ্ঞানেরও প্রশ্ন। তার মানে বিজ্ঞান ও দর্শন হাতধরাধরি করে চলছে। এবং প্রথম যুগে বিজ্ঞান যখন প্রায় একেবারেই শিশু অবস্থায়, যখন দর্শনের সূত্রপাত হলো, তখন দর্শনও কিন্তু বিজ্ঞানের প্রশ্নটাই তুলেছিলো। যেমন সর্বপ্রথম দার্শনিক,আমরা যেটা পশ্চিমা দর্শনে পাই ৬২৫ খ্রি. পূর্বাব্দে (এ সময় থেলিস এর জন্ম হয়) এবং এই থেলিস একজন ‘প্রকৃতিবিদ’, জিয়োম্যাট্রিশিয়ান এবং ফিজিসিস্ট। এই সবগুলো তার মধ্যে ছিল। তখনকার দিনে তো এই ভাগগুলো ছিল না। এখন তাঁদের কথাবার্তা শুনে মনে হয়, আচ্ছা তাই তো হবে। তিনিই প্রথম এই প্রশ্নটা করলেন যে বিশ্ব কি দিয়ে তৈরী? বিশ্বটা তৈরি কি দিয়ে এবং এই প্রশ্নটা তো সেই অর্থে দার্শনিক নয়। সেগুলো যদি সবকিছু দূর করে, যাই হোক না কেন! কিন্তু ‘আল্টিমেট স্টাফ’টা কি? গ্রীক দর্শনের সূত্রাপাতটাই হচ্ছে প্রায় বিজ্ঞানকে দিয়ে। এবং প্লেটো পর্যন্ত বিজ্ঞান ছিল আরকি। সক্রেটিস পর্যন্ত বিজ্ঞান ছিল। সক্রেটিসের পর থেকে মানবিক হতে শুরু করলো। তার আগে মানুষকে নিয়ে কোন কথাবার্তা পৃথিবীতে হয়নি।

এঁদের মধ্যে নাম হল থেলিস, তার আগে জেনো; তার পর এসেছে এনাক্সিমেন্ডার, তারপর আছে এনাক্সিমিডিস,  ক্রমে বারমিনাইডিস, তারপর প্রোটোগোরাস। এঁরা সকলেই কিন্তু মোটামুটিভাবে বৈজ্ঞানিক ছিল। আমার তাই মনে হয়। কারণ এঁদের ভাবনা একটাই জিনিস- সেটা হল যে পৃথিবীর একেবারে শেষ জায়গায়-কোন জায়গায় গিয়ে কী ম্যাটেরিয়ালটা পৌছাবে সেই ম্যাটেরিয়াল দিয়েই সমস্ত পৃথিবী তৈরি এবং ওয়ান ম্যাটেরিয়ালটা কি, এটা অনেকেই জানতে চেয়েছেন। তখন বিজ্ঞান যেহেতু একেবারেই অপরিণত, সেখানে জবাবগুলো শুনলে, ছেলেমানুষী মনে হবে- সেই অর্থে ছিল বলে তোমার মনে হবে না। কিন্তু একটু ভাবলেই বোঝা যাবে। থেলিস বলেছিলেন, পৃথিবীটা কী দিয়ে গঠিত? এটা আল্টিমেটলি পানি দিয়ে গঠিত। শুনে মনে হতে পারে, এর থেকে বাজে কথা আর কী হতে পারে। এটা কি করে হলো! তখন উনি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন, পানিই সেই বস্তু, ওয়াটার— যা একই সাথে বায়বীয় যদি তাকে আগুন দিয়ে তাপ দেওয়া যায়, আবার ঠা-ার মধ্যে থাকলে শক্ত বা কঠিন এবং তরল তো হয়ই। আমাদের দৃশ্যমান জগতের যে ত্রিমাত্রিক চেহারা, পানি সেই চেহারাই তৈরি করে— ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ বাস্পীভূত তারপরে তরল পরে শক্ত। তাহলে আলিটিমেট স্টাফ— ‘পানি’। এরপরের দার্শনিক যারা যেমন এনাক্সিমিডিস। তাঁরা নানা রকম বিবেচনা করেছেন। কেউ বলেছেন- যেমন, হেরাক্লিটাস বলেছেন, না না এটা তো ওভাবে না। এক অর্থে ‘ফায়ার’। আসলে সবচাইতে ‘ফ্রিড’ জিনিসটা হচ্ছে গতি। ওরই বক্তব্য একই নদীতে দুবার ¯œান করা যায় না। ‘সেম রিভার ইউ ক্যাননট … টোয়াইস’— যেখানে পা দিচ্ছ তুমি সেখান থেকে সরে যাচ্ছ— তাই দার্শনিক জেনো কতোকগুলো পাজেলড দিচ্ছেন… দ্যাখো একিলিস দৌড়বিদ বলে খ্যাত। ওর চেয়ে দ্রুত কেউ দৌড়াতে পারে না। হেক্টরকে মারলো তো দৌড়ে। কচ্ছপকে যদি এগিয়ে দেওয়া যায় আর একিলিসকে দু‘পা পিছিয়ে আনা যায় তারপর যদি হুইসেল বাজিয়ে বলা হয় তোমরা যাও তাহলে কিন্তু একিলিস কচ্ছপকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। কেন? তুমি বলবে মূহুর্ত অল্প একটু সময়তো মাত্র। তাইতো? সময়টাকে ভাগকরো করতে করতে একটা জায়গা পাবে যেখানে মূহুর্তটা স্থির। আর এই স্থির জায়গাগুলো যদি যোগ করা যায় তাহলে যে জায়গাটা পাওয়া যাবে যে পুরো বিন্দু যেটা সেটাও স্থির। তাহলে ভাবগতি দেখে মনে হবে যে – দৌড়িয়ে পার হয়ে গেল! আসলে সেটা করতে পারেনি। এগেুলো হল জেনোর কতোগুলো প্রব্লেম আরকি! এগুলো আমাদের খুব ভাবিয়ে তোলে। এগুলো বলার সময় প্যারামেডাইসিস বলে একজন ছিলেন। তিনিও একই কথাই বলেছেন ভয়। আর ভয় মানে শূন্যতা। পরবর্তীতে প্লেটো যখন আসলেন তিনি বললেন, না না। শুধুমাত্র বস্তু জগতকে নিয়ে ভাবলে চলবে না। বস্তুটা জগতের একটা পার্ট। বস্তুজগতের ওপরে কর্ম করতে পারে। আবার বস্তুজগতও তার ওপর কর্ম করতে পারে। এমন একটা প্রাণী হচ্ছে মানুষ। যা প্রকৃতি থেকে তৈরি। আমাদের দেহ তো প্রকৃতি থেকে তৈরি, হ্যাঁ, এই মাটি, পানি – এসব দিয়েই দেহ গঠিত। কিন্তু আমরা আবার মাটি ও পানিকে নানারূপ আমরা দিতে পারি। এটা আমাদের মানুষের অসাধারণ একটি ক্ষমতা। তাহলে কোথা থেকে এলো এ ক্ষমতা, কোথায় থেকে পাওয়া গেল?

চিহ্ন : এর উৎসটা কোথায়?

হা. আ. হ. : খুব ছোট, এই ক্ষমতাটা কি? এইটা এরিস্টটল দেখাতে গিয়ে বলেছেন যে, অতএব আমরা দৃশ্যমান পৃথিবীতে যা দেখছি সেটা এর আসল রূপ নয়। আমরা প্রকৃত বস্তু কি জানি না, আমি বলতে পারি না আমি কী? আমি বড়জোর কি করতে পারি- আমি আমাকে জানার নাম করে মানুষের একটা কপি দেখাতে পারি। মূলটা তো একই রকম কিন্তু কপি নানা রকম করা যেতে পারে। আর্কিটাইপ যেটা। চিরকালের জন্য যেটা আছে সেটা হচ্ছে মূল। টাইপটা হচ্ছে চিরকালের! তাহলে মানুষের কি কোন টাইপ আছে? যে টাইপটা এক কিন্তু যেখান থেকে তৈরি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ। তুমি যদি পাঁচ টাকার একটা মুদ্রা বার করো তো সব মুদ্রাই তো একরকম। মুদ্রাযন্ত্র থেকেই তো বেরিয়ে আসছে। ঠিক মানুষও একইভাবে বেরিয়ে আসেছে। কিন্তু ওই মুদ্রাতেও একটার সাথে আর একটার তফাৎ চাইলেই খুঁজে পাবে। মানুষের মধ্যেও তাই। অমিল পাওয়া যাবে। আর মানুষকে আমরা সম্পূর্নরূপে কখনোই জানতে পারি না, বুঝতে পারি না, আমরা তাহলে কি করবো? আমরা তাহলে বলবো, মানুষ রিয়ালিটি নয়! এই যে পৃথিবীটা দেখছি এটাও রিয়েল নয়! আমি নিজেও রিয়েল নই! সবটাই ছায়া, ফগ!

চিহ্ন : ছায়া?

হা. আ. হ. : হ্যা,ঁ ফগ। আমরা বাস্তব দেখি না। আমরা বাস্তবের ছায়া দেখি।

চিহ্ন : তারপরে স্যার… এটা হল বস্তুর ছায়া?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, এটা বস্তুর ছায়া। তাহলে আমরা বস্তুর ছায়া দেখে বিভ্রম হচ্ছি কেন? তোমরা যখন দেখছো আমার ছায়া দেখছো অর্থাৎ মানুষ হিসেবে যে ফর্মটা আছে সেটা দেখছো। এই মানুষের ফর্মটা কিন্তু পৃথিবীর ছ‘শ কোটি মানুষের মধ্যে আছে। এই ফর্মটাকে যখন আমরা ব্যবহার করি তখন নানা রকম হয়ে যায়। কিন্তু তাদের ভেতরের মূল যে জায়গাটা সেটা কিন্তু এক। মানুষকে আনরিয়াল বলা এজন্যই— যে সে ফর্ম নয়, ফর্মেও একটা কপি মাত্র। কপি কি কখনো মূলের সাথে তুলনীয়? তাহলে আমরা রিয়েল নই, রিয়েলিটি দেখতে পাই না। রিয়েলিটি আমাদের চোখে পড়ে না। এবং এই কারণেই ফর্ম রিয়ালিটি, মেটার রিয়ালিটি নয়। মেটারটা আমাদের ভ্রম মাত্র।

চিহ্ন : ভ্রম?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ ভ্রম। বোধহয় একটা উদাহরণ দিলে খুব ভালো হত। দ্যা এক্সাম্পল অব দ্যা কেভ। একটা পাহাড়ের গুহা,পাহাড়ের গুহার সামনে একটা উঁচু রাস্তা আছে। আর ভেতরে একটা আলো জ্বলছে, কিছু লোক আছে যাদের হাত বেঁধে ঐ গুহার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তারা ঘাড় ফেরাতে পারবে না। ধরো, জন্ম থেকে তারা ঐখানে বসে রয়েছে। আর তাদের পেছনে আলো জ্বলছে, তার পেছনে বড় একটা রাস্তা আছে। এবারে রাস্তা দিয়ে যারা যাচ্ছে তারা তো ঘাড় ফিরিয়ে তাদের দেখতে পারবে না। দেখার উপায় নেই। তাহলে কি দেখছে বলো তো! যেহেতু আলো আছে ওদের পেছনে, সুতরাং যারা সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, তারা তাদের ছায়া দেখছে। আচ্ছা, জন্ম থেকে যদি তুমি এভাবে এটাই দেখো, তাহলে ছায়াকেই তোমার মনে হবে আসল। তার মানে আসলতো তুমি কোনদিন দেখোই নি। সিমিলারটা বুঝলে! সিমিলার অব দ্যা কেভ— কিরকম? যে এরকম করে তুমি বসে আছো, পেছনে আলো। কিন্তু, তুমি কিছুই দেখতে পাচ্ছো না, শুধু ছায়া দেখতে পাচ্ছো। জন্ম থেকে তুমি এইটাই দেখছো তোমর ছায়াটাকেই মনে হবে দিস ইজ রিয়েল। রিয়েলিটি দেখা যায় না। এ জন্য তার মৃত্যু হতে পারে না, কারণ কপিটার মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু মূলটার মৃত্যু হতে পারে না

চিহ্ন : ওটা আছেই?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, তাহলে সমস্ত বাস্তব জগতটাকে এক অর্থে ছায়ার জগত, সত্যজগত নয় বলে অ্যারিস্টটল রায় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারপরও এই ছায়াদেরকেও তো চালাতে হবে। এই জন্য রাষ্ট্রের চিন্তাটা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের চিন্তা থেকে তখন তিনি আবার ওই রিপাবলিকের ধারণাটা দিয়েছেন। যে আমাদের তিন শ্রেণিতে ভাগ করতে হবে। দাস শেণি আছে একটা, তারপরে বণিক শ্রেণি, আর একটা হচ্ছে যারা ওই নগরে জন্ম নিয়েছে তাদের বলা হচ্ছে প্রকৃত সিটিজেন। সেজন্য তখনকার সিটিজেনটা খুব কড়াকড়ি ছিল। এক জায়গা হতে অন্য জায়গায় পালিয়ে গেলে সোজা ধরা হত নির্বাসন। এবং, সে ক্যাননট কামব্যাক। বেনিশমেন্ট খুব মারাত্মক জিনিস আরকি! অর্থাৎ তোমাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হলো, অথবা প্রায় কাছাকাছি তোমাকে নির্বাসিত করে দেওয়া হল। সিটি স্টেট তো ছোট ছোট স্টেট, খুব বড় নয়। এথেন্সও ঐ রকম ছিল। সিটি স্টেটগুলোর প্রত্যেকেরই স্বাধীন একটা ব্যাপার ছিল। ইলিয়ডের গল্প – কতোগুলো মিথটিতে এগুলো আছে। তো উনি তো এসব মিথটিথ বিশ্বাস করেননি কোনদিন। কোন এথেনা বলি বা কোন দেবী বলি বা কোনকিছুতেই বিশ্বাস করেননি। বিশ্বাস করার কোন জোর কারণ নেই। তো এইভাবে পৃথিবীটা এগুলো। ফর্মগুলো তাহলে কবে থেকে আছে? আদি-অন্তহীন অবস্থা থেকে আছে। অমুক দিন থেকে এই ফর্ম তৈরি হয়েছে মানুষের, এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। কারণ ওটার তো মৃত্যু নেই— তাহলে ফর ইটারনিটি আছে, বুঝেছো! আর আমরা ফর ইটারনিটি, আমাদের সমস্ত জীবনটাই তাহলে কেটে যাচ্ছে বিভ্রমের মধ্যে। সমস্ত জীবনটাই কেটে যাচ্ছে রিয়ালিটি না জানার মধ্যে। পৃথিবীতে আসছি জ্ঞান হচ্ছে, এটা-ওটা-সেটা দেখছি, পঞ্চইন্দ্রিয় কাজ করছে, পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে বাহ্যিক জগতটাকে দেখছি। সেই জগতের ভেতরে যেটা আছে, সেটা দেখতে পাচ্ছি না। সেই জন্য নলেজ ইজ ইমপোসিবল। সেইজন্য আমরা চালিয়ে নেবো কোনরকমে রিপাবলিক দিয়ে। এবং রিপাবলিক বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছেন সবাই সিটিজেন নয়…

চিহ্ন : স্যার তাহলে অ্যারিস্টটলের এই যেটা। ‘বিভ্রম বলেছেন আসলে …

হা. আ. হ. : অ্যাঁ, না। প্লেটো বলেছেন এটা বিভ্রম। আর এরিস্টটল বলেছেন যে না। যদি তুমি ফর্ম ছাড়া ভাববার চেষ্টা করো, তুমি পারবে না। ফর্ম চিন্তা করতে গেলেই তোমাকে ম্যাটার চিন্তা করেতে হবে। তুমি যদি বলো ফর্ম কি? বলবে না দেখলে পারবে না। ‘উইদাউট ফর্ম ম্যাটার ডাজ নট এক্জিস্ট… মাথায় আসবে কোনদিন? ম্যাটার কোনো একটা আকার না নিয়ে থাকবে কী করে বল!

চিহ্ন : আসবে না?

হা. আ. হ. : আসবে না কোনদিন। আর ফর্ম কি ইটারন্যাল আর মেটার পরবর্তীকালীন? কোনটা আগে এসেছে, ফর্ম না মেটার? আসলে প্যারালাল। মুরগী আগে না ডিম আগে, তর্ক করে লাভ নেই। দুইটা একটা ছাড়া আর একটা কনসীভ করা যায় না। একটা বাস্তব হয়ে গেলে, আর একটা গড়ে ওঠে। রিপাবলিকে যা লিখেছেন, অ্যারিস্টিটলের পলিটিকসের প্রেরণায় এবং এটা আরো কনক্রিট, এই সব মানুষ, ফর্ম-মেটার দিয়ে। কনক্রিট এগজিসট্যান্স, তাহলে এদেরকে একসাথে থাকার জন্য সমাজ গড়তে হয়। সমাজ করতে হলে রাষ্ট্র করতে হবে এবং তখনকার যুগে রাষ্ট্র ছিল অন্যরকম। এজন্য গ্রীসে সিটি স্টেট বলে একটা কথা আছে, সবচেয়ে বড়যোদ্ধা আলেকজে-ার সেও কিন্তু একটা ছোট স্ক্রীপ্ট। সেখান থেকে গোটা পৃথিবী শিকার করেছেন। এই ছোটছোট সিটি স্টেটগুলোও ছিল স্বাধীন। এবং এশিয়া মাইনরে প্রচুর ছোটছোট দ্বীপপুঞ্চ ছিল। এবং সেই দ্বীপগুলো সব স্বাধীন। এইভাবে মানুষ তখন সভ্যজীবন কল্পনা করতো, এবং নিজেদের রিয়ালাইজট মনে করতো। গ্রীসকে যখন আলেকজেন্ডারের পতনের পর রোমানরা এসে দখল করে নিল তখনতো রোমানরা সোজা বগলদাবা করে ফেলল গ্রীসকে।

চিহ্ন : গ্রীসকে?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। তারপর থেকে ঐ যে গ্রীস পিছালো আর এগুতে পারেনি। রোমও পিছিয়েছে তবে রোম এখনও আছে, ইতালি আছে। তাদের সাম্রাজ্য তাম্রাজ্য  আর নেই? তারা যখন ওইগুলো লিখলো পুরো গ্রীকদেশের সিটিজেনের জগতটাই বিনাশ হয়ে গেল। কিন্তু তাদের চিন্তাগুলো থেকে গেল। অনেকেই বলেন হোল ইউরোপিয়ান ফিলোসোপি ইজ নাথিং বাট এ ফুটনোট’ এরিসটোটাস ফিলোসোপি। প্লেটোর দর্শনের মধ্যে যে বিশাল সম্ভাবনা আছে সেখানে ওটা হচ্ছে প্রুফ নোট।এদের থেকে সক্রেটিস এগিয়ে বলেছেন পৃথিবী কি দিয়ে তৈরি এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। তার থেকে মানুষের জগতটাকে জানো। কি দিয়ে তৈরী (পাহাড় থেকে, নাকি মাটি থেকে) কিছু জানার দরকার নেই। তার থেকে (নিজেকে দেখিয়ে) এই মালটা কি তাকে দ্যাখো। নো দাইসেলফ মানে আত্মাকে জানতে হবে। তোমার মধ্যে কি কি আছে ? কোন প্রবৃত্তি আছে? কোন প্রবৃত্তিকে দমন করতে পারছো না? -এগুলো। প্লেটো বলে গেছেন মহৎ প্রবৃত্তি যেগুলো আছে (দয়ামায়া) সেগুলো মানুষের মনের ক্ষেত্রে আছে এবং জৈবিক চাহিদাগুলো শরীরের ক্ষেত্রে আছে (ক্ষুধা-তৃষ্ণা)। মানুষ তাহলে এ রকম তার আত্মা অজানা।

আমাদের প্রত্যেকের ভাবনার বিষয় মানুষ এবং মানুষের সৃজন কেমন হবে ইত্যাদি। সর্বপ্রথম বাইরের জগতটাকে জানার চেষ্টা করে নিজের পকেটের ভেতরকে জানার চেষ্টা করতে হবে এবং এটাই হচ্ছে আসলজ্ঞান। আত্মজ্ঞানই আসল জ্ঞান। উইসডোম করতে গেলে নিজেকেই জানতে হবে। ওই জিনিসগুলো তাদের সব আছে, আমাদের লালনও বলতেন , তবে লালন সহজ সরল স্বরে বলেন আর ওরা কঠোর ভাবে বলেন। কাজেই সক্রেটিস বলেছেন নিজেকে পরীক্ষা করো। আর জ্ঞানের দ্বারা পরিতৃপ্ত হও, আর জ্ঞান মানে জানা। জানা কোনটা— জানা ও প্রয়োগ। জানলেই জ্ঞান নয়, তার প্রয়োগ করতে হবে। সাইকেল চালনার জ্ঞান আমার আছে কিন্তু প্রয়োগ করতে পারছি না- এটা জ্ঞান নয়। জ্ঞান ও তার প্রয়োগ একসাথে যাবে, আলাদা করা যাবে না। এজন্য আমার লেখায় বায়ুভূত কোনকিছু নেই। যতোটা যা লিখেছি কংক্রিট হিউম্যান এক্সজিস্টটেন্স এবং সেটাই। আমার বস্তু ভুল হতে পারে লোড বেশি দিতে পারি। কিন্তু ভাবাবেগে ভেসে যাওয়া কোন লেখা লিখিনি। জীবন তো নিষ্ঠুর, স্ট্র্র্যাগল। এই নিষ্ঠুরতাটা আছে, আর নিষ্ঠুরতার ভেতর দয়াও আছে এজন্যই … বলেছেন ভারচু ইজ নলেজ। ‘মৃত্যুভয় নেই ’ এই জ্ঞান আমার আছে, মৃত্যু যে হবেই। তবে জ্ঞানটা সত্যি কি সত্যি না, এটা মৃত্যুকালেই বোঝা যাবে। তখন তুমি ভয় পাও কি না? জাহাজের ক্যাপ্টেন হওয়ার জন্য মেটামোটা বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করলাম, কি জানতে হয় সব জানলাম। তবে চালাতে পারলে জ্ঞান আছে, না পারলে নেই। তার মানে- যে জ্ঞান প্রয়োক্ত নয়, সে জ্ঞান জ্ঞান নয়। আমরা মুলত কেউ ই জানিনা। অজ্ঞানতার তিমিরেই আমাদের জীবনটা কেটে যায়, আর সচেতনতা আছে বলেই নিজেকে জানা নিজের জীবনকে পরীক্ষা করা, বিশ্লেষণ করা আরকি! এজন্যই ‘আনএক্সামিনি লাইফ ইজ নট বিলিভাবল’। কার দ্বারা এক্সামিন করাবে? নিজের দ্বারা নিজেকে। ওখানে নো দ্যাইসেলফের মধ্যে কোন আধ্যাত্মিকতা নেই নিজেকে কংক্রিটভাবে জানো এবং এটা খুবই কঠিন। উনি (সক্রেটিস) অনেকজায়গায় প্রমাণ দিয়েছেন, এ্যাপোলোজি নামে বই লিখেছেন। তাঁকে মৃত্যুদ- দেওয়া হল এবং তার মৃত্যুদ-ের সময় সে বললো তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য নয়। কি অভিযোগ আনা হল— নাস্তিকতা, ছেলেদের মাথা খেয়েছেন। তিনি তো তখন ঘুরে বেড়াতেন মৃতদেহ পড়ে আছে, তিনি সৎকার করেছেন। তখন কিন্তু যুদ্ধ চলছিল এবং যুদ্ধে ডেডবডি ফেলে আসাটা অপমানজনক। যেমন করেই হোক ডেডবডি নিয়ে আসতে হবে।

চিহ্ন : ডেডবডি নিয়ে আসতে হবে?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ অবশ্যই। হেক্টরকে মারার পর একেলিস ডেডবডি বেঁেধ নিয়ে এসেছিল। এ ধরনের কতোগুলো ব্যাপারকে শক্ত করে দেখা হতো। সক্রেটিস তাই মনে করতেন যে, না জানলে আবার অপরাধ কি! আমার অপরাধ কি প্রমাণ করো, কি অপরাধ করেছি আমি? নাস্তিকতার? যুবকদের বিপথগামী করেছি? এসব! তিনি তাঁর এ্যাপোলোজিতে বলেছেন প্রথমে বিচারব্যবস্থা খুবই ডেমোক্রেটিক ছিল। পাঁচশ লোকের মধ্যে অর্ধেক সক্রেটিসকে নির্দোষ বললো। ও হ্যাঁ প্রথমেই তাকে বলা হল যে, তুমি দোষস্বীকার করবে কি করবেনা? তখন সক্রেটিস বলেছিলেন যে, আমি অপরাধই করিনি, তাহলে স্বীকার করবো কেন? আর হ্যাঁ ভালো কাজ করার জন্য রাষ্ট্রের উচিত আমাকে কৃতজ্ঞতা জানানো। তা না করে তোমরা বলছো আমি অপরাধ করেছি। তারপরই সক্রেটিসের পক্ষের লোকজন বিরক্ত হয়ে তার বিরুদ্ধে চলে গেল। তিনি এতো একগুয়ে ছিলেন যে অপরাধ করিনি দোষস্বীকার করার প্রশ্নই আসে না। তারপর আবার তাকে বলা হল, তুমি বেছে নাও মৃত্যু অথবা জীবন। তখনও তিনি বলেছিলেন মৃত্যু-জীবন নয়, সত্য ও মিথ্যা বেছে নিতে হবে। দার্শনিকেরা এ রকম কথা বলেছেন, যা কাজে আসে তাই ঠিক। অনেকেই বলেছেন কারও অন্যায় না করে যদি মিথ্যা বললে লাভ হয় তবে মিথ্যা বলা যাবে। ডেকার্ড বলেছেন, আদি উপাদান দুটো ‘ম্যাটার’ এবং ‘মাইন্ড’। এই দুটো জিনিস দিয়ে সমস্ত বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে যদি ম্যাটারের এক্সটেনশন থাকে তাহলে বিজ্ঞান সম্ভব। ম্যাটার যদি ফ্ল্যাট হয়, তাদের এক্সটেনশন বিস্তৃতি থাকে তাহলে ম্যাটারটাকে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে। ম্যাটার স্বীকার মানে ম্যাটেরিয়ালকে স্বীকার করা।

সাইনথেটিক এ- সাবজেক্ট যে খবর দেয় প্রেডিকেট তার থেকে বেশি খবর দেবে। আর এনাথেটিক এ- সাবজেক্ট ও প্রেডিকেট সমান খবর দেবে। ফিলোসোফিতে ইন্টারশিপ পড়ানো হলে ভালো লাগবে। দরকারীও। কান্ট উল্টো দিক থেকে একই প্রশ্ন করেছেন বলেছেন, হাউ আর সিনথেটিক ডাচমেন্ট এপরাইজ পসিবল। তার মানে তিনি জানতে চাচ্ছেন জ্ঞান কিভাবে হয়। এটা নিয়ে অনেকেই তো কথা বলেছেন। লক বলেছেন, হ্যাঁ মনটা জন্মের সময থাকে সাদাকাগজ। যত বয়স হয় তত ছাপ পড়ে। যে ছাপটা পড়েনি সেইটা সে জানেও না। আমি যদি হিমালয়ে গিয়ে না থাকি তাহলে ট্যাবেলরতে হিমালয়ের ছাপ থাকবে না। মানুষের মনটা ফাঁঁকা হয়ে জন্মগ্রহন করে তারপর এই পৃথিবীতে নানা রকম ছাপ তার মধ্যে পড়ে। পঞ্চইন্দ্রিয় এই ছাপ দেয়। তুমি যদি বলো জীবনটা কিছুই নয়, প্রতিমূহূর্তে এক্সপেরিয়েন্সের স্ট্রিম বা ¯্রােত। একটা বইকে দেখে বলতে পারছো এটা বই। কিন্তু এর আলাদা আলাদা পার্টস আছে এবং এগুলো একত্রিত করেই বই। আলাদা আলাদা জিনিসগুলোকে কে একসক্সেগ করে? কিংবা কজ আর ইফেক্ট এর সম্পর্কটা কিভাবে তৈরি হয়? হিউম বলেছেন এটা বাস্তব অভিজ্ঞতা, তখন প্রশ্ন হয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা হয় কিভাবে? জ্ঞান কিভাবে হয় (কাণ্টের একটা বই দেখিয়ে) এই একটা বইই যথেষ্ট। জ্ঞানের কিছু আকার আছে সেগুলো বাইরে থেকে আসে না। তিনি বলেছেন বাইরে যা দেখি নাই, তা আমার জ্ঞান নয়। বা প্লেটো বলেছেন, অস্তিত্বকার আছে, যেটা পার্টিসিপেন্ট। আমি যেটা দেখি নাই ও জ্ঞান আমার নেই তো। তাহলে প্রত্যক্ষই হচ্ছে জ্ঞান। কিন্তু কান্ট বলেছেন প্রত্যক্ষই তো জ্ঞান হতে পারে না। অনেক অপ্রত্যক্ষ জিনিসও আছে যেগুলো জ্ঞানের ভিত্তি। প্রত্যক্ষ জ্ঞান হলো কি করে, তাকে কি কি শর্ত পূরণ করতে হয়? অভিজ্ঞতা ; অভিজ্ঞতা! ভালো কথা তবে কুকুরের বেড়ালের সবারতো অভিজ্ঞতা আছে। একদিকে বাইরের জগত ইম্প্রেরেশন দিচ্ছে আর একদিকে আমার কেবল ইম্প্রেরেশনগুলোকে নানানভাবে একত্র করেছে। একত্রিত করার নানা কর্ম আছে। প্রথম কথা হলো এক্সপেরিয়েন্সের দুটো রিকন্ডিশনই হচ্ছে স্পেস এন্ড টাইম। তুমি এমন একটা ইম্প্রেরেশন লাভ করো যেটা কোন জায়গায় ঘটছে নাকি, কোন সময়ে ঘটছে না, আবার স্পেসটাও ব্যাখ্যা করতে পারবে না।একটা ফাঁকা বললে আর একটা কি? ভরাট জায়গার জিনিস সরিয়ে নিলে কি স্পেস হলো না? এ এক কঠিন ধাঁধা। কাজেই আমাদের জ্ঞান পেকে গেলেই সেই জ্ঞানটা কোন একটা স্পেসে থাকতে হবে বা কোন একটা সময়ে করতে হবে। স্পেস এবং টাইম দুটোই হচ্ছে আমাদের জ্ঞানের প্রাথমিক ফর্ম। এটাকে তিনি বলেছেন সেনসিবিলিটি। তারপর ও গুলোকে ভাগ করা ইউনিটি-রুয়ালিটি, একত্ব-দ্বিত্ব তারপর বহুত্ব, এ রকম করে বারোটা ক্যাটাগোরি আছে যেগুলো অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া যায় না। এগুলোকে আত্মার ভেতর থেকে সাপ্লাই দিতে হয়। আর এ-গুলোকেই পরিস্কার করলেন কান্ট। তখনতো আমার প্রশ্ন জেগেছিল তাহলে আমরা যে ইম্প্রেরিশন পাচ্ছি সেটা দিয়েই জ্ঞান হচ্ছে? ইম্প্রেরেশনটাকে আমি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে আমার জগত তৈরি করি। আমার একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর জগত তৈরি হয়ে গেছে, সেখানে কারো অধিকার নেই। অর্থাৎ আমরা যা দেখি এবং মনে করি সেটা ফেনামেনন ঘটনা আর এই ঘটনার ভেতরে যে কারণ আছে সেটা আমরা কখনো জাানতে চাই না। আর সেটার নাম হচ্ছে রৌমনা। রৌমনা হচ্ছে আসল রিয়ালিটি যেটা কখনো তুমি জানতে পারবে না। আর রৌমনা প্রকাশ পাবে যখন তুমি চক্ষু-কর্ণ, স্পেস, টাইম কিংবা কোন একটা জায়গায় দশটা জিনিসকে একখানে করা এগুলো হচ্ছে ক্যাটাগুরি ও আন্ডারস্ট্যান্ডিং। এই ক্যাটাগুরির প্রয়োগ আর টু ক্যাটাগুরির জ্ঞান হয় না। কান্ট এটাই বুঝিয়েছেন। এগুলো এর মধ্যে পড়ে যায়। তুমি যা কিছু আলোচনা করছো তার মধ্যে এগুলো আছে। তাই তো? এর পরে তোমার পরবর্তীকালে পজিটিজম এলো, অর্থাৎ মেটাফিজিক্যাল গ্রান্ড যেটা এক্সিসটিসিজম এর মধ্যে আসে নাই। বাদ দাও। ম্যাটাফিজিকাল না ফিজিক্যাল বেয়ন্ড। ফিজিক্যাল স্পন্ডের বেয়ন্ড যেটা সেটাকে ম্যাটাফিজিক্যাল ওয়াল্ড বলে। তাহলে দরকার নেই। আর কান্ট এগিয়ে নিচ্ছে আস্তে আস্তে। বুঝতে পেরেছো, যে অভিজ্ঞতা ছাড়া সব শূন্য আরকি। অভিজ্ঞতাটা সেজন্য লাগবে। হ্যাঁ ঠিক আছে। অভিজ্ঞতাগুলো সাজিয়ে নিলে জ্ঞান। আর নোমেনা মানে কি? অভিজ্ঞতার বাইরে। জানিনা আর জানলে তুমি সেটাকে রিয়েল বলো, ঠিক আছে। আমরা কিছু রিয়ালিটি জানিনা। আমরা শুধু ছায়া জানি। সবাই এক ভাবে জানি কেন? যদি হয় এটাকে তুমিও কাঠের চেয়ার বলছো- আমিও বলছি – কেন এটা হয়, যা কিছু দেখছি আমরা পরস্পর তো দ্বিমত করছি না। কেন আমরা এ রকম করে বলছি আমরা তো আসল জানি না। তার মানে তুমি চশমার ভেতর দিয়ে নকল পৃথিবী দেখছো। দেখাটাই নকল। ধরো সবার চশমার রং নীল , তাহলে সবাই কি দেখবে একই পৃথিবী দেখবে। তার মানে সবাই নীল দেখবে। সেইটেই তাহলে সত্য। এদের সাথে তো তর্ক করে পারা যাবে না। লিগুয়াসিজম,পজিটিজম সব অভিজ্ঞার মধ্যে। অভিজ্ঞার বাইরে কিছু নেই। হতে পারে না, সম্ভব না। তারপরে এগুলোকে একসঙ্গে যুক্ত করা। তারপর ভিয়েনা সার্কেল বলে আট দশজনের একটা গোষ্টি আছে তারা নাম দিয়েছে লিগ্যাল পজিটিজম। রাসেল টাসেল সবাই ছিলেন- তারা জ্ঞানের ক্ষুদ্রতম অংশটাকে নির্ণন করেছেন। এই অংশটা কি? অভিজ্ঞতা; কিন্তু ক্ষুদ্রতম অংশ! এটমিক থিউরি অব নলেজ। তো এই বিষয়গুলো সাহিত্যের সাথে যুক্ত করা, মানে সরাসরি যুক্ত করতে হবে। পাগলের কাজ এটা- কে করবে? কেন করবে? এগুলোতে একটু অন্তদৃষ্টি দিতে হবে খুব গভীরভাবে। টু জাজ হিউম্যান বিংস, টু জাজ দিস ওয়াল্ড।

চিহ্ন : সাহিত্যের সাথে দর্শনের রিলেশনটা তাই?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, এইটাই। তখন তোমার মানুষ আঁকতে ভুল হবে না। তখন তুমি মানুষের যে জিনিসটা দেখাবে তোমার মনে হবে যে, এভরি হিউম্যান ইজ ইউনিক। এই মধ্যবিত্ত সাহিত্য যেটা তোমরা একেবারে যেস্তাঘেচাং করে দিলে কলকাতার লেখকেরা! তাদের সাহিত্যে শুধু কলকাতার মধ্যবিত্তের খবর। তার বাইরে আর কিছু নেই, এমনটা মনে হয় না? কলকাতার মধ্যবিত্ত বাবুদের মধ্যে ডিফারেন্স থাকা সত্ত্বেও তো একটা মিল আছে। দে আর ডিফারেন্ট তারা একজনের থেকে আরেক জন আলাদা। কিন্তু কতোগুলো অদ্ভত ব্যাপারে মিল আছে, যেটা আবার অন্য এলাকার লোকদের মধ্যে নেই। তাহলে মানুষকে গুচ্ছ মানতেই হবে। কথা বলার সময় গুচ্ছ মানতে হয়। তোমাদের রংপুরে লোক যেভাবে কথা বলে, সেরকম ভাবে বগুড়ার লোক কথা বলে না। বগুড়ার লোক যেভাবে কথা বলবে কুষ্টিয়ার লোক সেভাবে কথা বলবে না। আমি যে রকম করে কথা বলছি এরকম করে রাজশাহীর লোক কথা বলবে না। সেজন্যই বলছি যে, ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ পারসোনালিটি। ল্যাঙ্গুযেজ মানুষকে তৈরি করছে কারণ ল্যাঙ্গুয়েজ ই হচ্ছে প্রকাশ। এটা কিন্তু ভাববার কথা – যেখানে ল্যাঙ্গুয়েজ পৌছায়নি সেখানে কি আছে ডিক্রিসন বলেছেন সাইলেন্স। যেখানে ল্যাঙ্গুয়েজ দাড়ানো রিক্স সেখানে সাইলেন্স আর সাইলেন্স মানে অনস্তিত্ব

চিহ্ন : না, কিন্তু ঠিক আছে স্যার..

হা. আ. হ. : এইবারে আমি লেখালেখি নিয়ে বলছি আরকি। তাহলে আমি মুলত অভিজ্ঞতার দিক থেকে লেখক। ধরো, আমি কল্পনা করে কিছু লিখি না, বানিয়ে কিছু লিখি না, যা যা কিছু লিখতে পারি, তা তা লিখছি। তখন যদি কেউ প্রশ্ন করে এর ভিত্তি কি? বলবো, এই দেখো আমার অভিজ্ঞতা।

চিহ্ন : এই যে আমরা প্রাচীন দর্শন, গ্রীক দর্শন থেকে একেবারেই বিজ্ঞান পর্যন্ত দীর্ঘ দর্শনের একটা চকিত আলোচনা শুনলাম, তো এইটা তো আপনি আপনার মতো করে ধারণ করেছেন। এটা কি আপনার লেখার মধ্যে কোন প্রভাব ফেলেছে?

হা. আ. হ. : আপত্তি করছি না, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু আমি দর্শনের প্রবন্ধ তো লিখতে বসি নাই, দর্শনের ইতিহাস লিখতে বসি নাই, আমি লিখতে বসেছি জীবন্ত মানুষকে নিয়ে। তবে হ্যা মূল তফাৎটা এই জায়গায় এভরি হিউম্যান ইজ ইন্ডিভ্যুজুয়ালি ইউনিক। এই কথাটা আমার সাহিত্য জীবনের মূল কথা। প্রত্যেকেই পরস্পর থেকে আলাদা আর যদি না থাকতো সাহিত্য থাকতো না। আমরা বলি বটে একটা শ্রেণি মধ্যবিত্ত শ্রেণি, কিন্তু সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সব মানুষগুলো কি এক রকম? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন অনেক চরিত্র এঁকেছেন সবটা কি একটা মানুষের? বলো তো কোথায় কুবের আর কোথায় হোসেন

চিহ্ন : হুম, কোনটাই একরকম না

হা. আ. হ. : অবশ্যই। আমার হাতেই ডিফারেন্ট। তাহলে মানুষ এমনিতেই বাইরে ভেরি ডিফারেন্ট। এট দ্যা সেম আর অল হিউম্যান বিং। তারা সবাই মানুষ কাজেই তাদের মধ্যে অমিল-মিল এবং সাদৃশ্য থাকবে। দুটোই এক্সজিস্ট।

চিহ্ন : স্যার এখানে আর একটা জিনিস আপনি যেটা বললেন ল্যাঙ্গুয়েজ, ল্যাঙ্গুয়েজটা ফিলোসোফিক্যাল ভিউ এ একটা পার্ট হয়তো। ধরলাম ল্যাঙ্গুয়েজটা ইম্পরট্যান্ট জিনিস এবং এই সময়টাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে অনেক ল্যাঙ্গুয়েসটিকসের চমস্কি সহ অনেক তত্ত্ব আছে। কিংবা ধরেন, স্ট্রাকচার তারপরে ডেট অব দা এটন। এটা-সেটা এগুলো লেখা হচ্ছে, মানে হচ্ছে স্যার পোস্ট মর্ডাণ কিংবা পোস্ট কলোনিয়াল – তো একধরনের ইয়ে চলছে আরকি। তারপরে পোস্ট স্ট্রাকট্রানিজম ও আছে। এখন এগুলো নিয়ে যে বিষয়টা সেটি হচ্ছে থিউরি এন্ড এ্যাপলাইজড থিউরিটা তো একধরনের দর্শন। এখন তো আপনি লেখক এবং লেখালেখিই কাজ। লেখাটাও শিল্প এবং লেখাটা এক্সপারিনিওন এবং লেখার মধ্যে আমরা যখন শকুন পড়ছি তো সেটা তো হচ্ছে আপনার একটা পারপেকশন কিংবা কাউরনিওন ইফেক্ট। এসব কিছুর মধ্যে, কোন ব্যাপার কিংবা ভলানটিয়ারি কিছু ঘটেছে কিনা, স্যার?

হা. আ. হ. : ভোলানটিয়ারি ঘটেছে কিনা?

চিহ্ন : বাস্তবে ঘটেছে কিনা?

হা. আ. হ. : ধরো ভূষণের একদিন ঠিক এ জিনিসটা আমি দেখিনি। তবে এভাবে যে মানুষকে মেরেছে পাকিস্তানিরা সেটা আমি জানি। চুক নগরের হত্যাকা- আমি জানি, সবাই জানে। সাতক্ষীরার দিকে বহু মানুষ মেরে ফেলেছে : কত? লক্ষাধিক এর কাছাকাছি। লোকগুলো পালাবে বলে একটা জায়গায় জড়ো হয়েছিল। সেই সময় তাদের হত্যা করা হয়েছে। কাজেই ভূষণের একদিন এ তুমি যেটা দ্যাখো ভূষণকে তো একা মরতে হয়নি। সে তার ছেলেকে খুঁজতে এসেছিল। সে মরলো, তার ছেলে মরলো, তারপরে দেখা গেল ওখানে কতো মানুষ ছিলো ওটা তো আর চোখের দেখা নয়।

চিহ্ন : স্যার এইখানে আমাদের আর একটু জিঙ্গাসা আছে আপনার সাথে, সেটা হচ্ছে যে-ঐ এখানে মানে কার্ল মার্কস। একটু বোধ হয় মার্কসীয় যে ফিলেসোপিটা যেমন- আমরা অনেক সময় বলি হাসান আজিজুল হকের সাহিত্য মার্কসীয় দর্শনের। কিংবা হাসান আজিজুল হকের সাহিত্যের মধ্যে মার্কসীয় প্রভাব সাম্য কিংবা ডায়ালেক্ট ইত্যাদি ইত্যাদি, কিংবা প্রান্তিক মানুষ, কিংবা একটু অন্তবাসী এই ধরনের মানুষদের উনি এনেছেন বা প্রাইরোটি দিচ্ছেন। কিংবা তাদের লাইফটা তাদের মর্যদার প্রশ্নটা তাদের কাছে মূখ্য। স্যার এই জিনিসটা মার্কসীয় ফিলোসফিটা কি সত্যি আপনার কোন এ্যাসাইনমেন্ট কিনা?

হা. আ. হ. : না। আলাদা এ্যাসাইনমেন্ট নয়। আমি যা দেখেছি তার সাথে এটার মিল আছে। হিসট্রিক্যাল ম্যাটারিজমে যা বলে তার সঙ্গে এটার মিল আছে। অর্থাৎ সমাজের যে সংগঠনগুলোর সাথে, হ্যাঁ গৃহস্থালি গ্রাম। এগুলো কি করে তৈরি হয়েছে? তুমি যদি একটু হিসেব করো তাহলে তুমি সহজেই বুঝতে পারবে মানুষের মাঝে সহযোগীতাও যেমন আছে আবার স্ববিরোধীতাও আছে। মার্কস যা করেছিলেন, শ্রেণিচরিত করে উনি সব একাকার কওে দিয়েছিলেন। বড়লোক শ্রেণিরা বড়লোক শ্রেণির, তারপরে মধ্যবিত্ত শ্রেণিরা মধ্যবিত্ত শ্রেণির, বুর্জোয়ারা বুর্জোয়ার এবং প্রলেতারিয়েতদের প্রলেতারিয়েত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু একটা জায়গায় তিনি যাননি সেটা হচ্ছে প্রলেতারিয়েতদের মধ্যেও যতো মানুষ আছে তারা প্রত্যেকে একজন থেকে আর একজন আলাদা। না মানে ‘প্রলেতারিয়েত, বিশ্বের প্রলেতারিয়েত এক হও ’ এটা কেমন স্লোগান হয়ে গেল না? বিশ্বের শ্রমিকগণ এক হও এসব স্লোগান হিসেবে ভাল। কেননা আন্দোলন করতে গিয়ে এসবের দরকার আছে। কিন্তু শ্রমিকগণ বলতে তো একজনকে বোঝায় না। একদম যারা ডিফারেন্ট তার মানে ওই শ্রমিকদের মধ্যেও রিএকশনারি লোক থাকতে পারে। ‘বিশ্বের শ্রমিক এক হও’-তার মধ্যে দু ‘চারটা বড়লোকও হতে পারে। এই যে জেনারেলাইজেশনের যে অসুবিধা সেটা কান্টের মধ্যেও হয়েছিল। আমি যেটা করার চেষ্টা করি সেটা হচ্ছে কংক্রিট, এক একটা লোককে ফিলোসোপিতে ধরার অসুবিধা হয়। সাহিত্যে তো ব্যক্তিটাকে উঠে আসে। হ্যাঁ জনগন ওই ভাবে আসেনা আরকি

চিহ্ন : এখানে স্যার, যেটা বিষয় সেটা হল যে, ওই আপনার ভাষার আমি আগেও বলেছিলাম যে-আপনার ভাষার মধ্যে একধরনের প্রাকটিক্যাল হওয়া বা একেকটা চরিত্রকে, একেকটা জীবন, একটু খুঁটিনানি করে দেখা। এটা আছে এবং সেটা থাকার জন্যই একটা ভিন্ন রকমের শৈলীর ব্যাপার আপনার লেখার মধ্যে আমরা পাচ্ছি। তো সেইখানে স্যার ব্যাপারটা যে মার্কসীজম, বৈষম্য, শ্রেণিশোষন- সেটা একটা ফেনোমেনা হতে পারে। কিন্তু আসলে আপনি তো অন্ধভাবে আরোপ করেননি, সেটা তো প্রশ্নই আসে না …

হা. আ. হ. : না না। আমি এইটা সত্যি তোমার সাথে একমত। লোকে যে নির্ধারন করে যে মার্কসস্টি লেখক, এই ধরনের আরকি। আসলে অনেকেই বিপ্লব বিপ্লব বলে চিল্লায় আমি আসলে সেই রকম নই, আমি একটু আলাদা অন্যরকমের।

চিহ্ন : আপনাকে তো স্যার অনেকেই বলেন বামলেখক। হাসান আজিজুল হক বামপন্থী। তিনি বামপন্থী রাজনীতিকে একধরনের সমর্থন দেন। আসলে বামপন্থী তো কিছু না, মুল কথা মানুষ।

হা. আ. হ. : মানুষ। সমাজে বাস করে তো তাই তাকে বড়লোক হয়ে বাঁচতে হয়, গরীব হয়ে বাঁচতে হয়, নানাভাবে বাঁচতে হয়। ইউ আর কনসার্ন টু দ্যা হিউম্যান বিং। আমি সেইটা মনে করি। এবং সেজন্য আমার মনে হয় যে, হিউম্যান লাইফটা ইজ বিউটিফুল। আমার কাছে ঠিক মনে হয়। খুবভাল। সেই হিউম্যান লাইফ যদি বাধাগ্রস্থ হয়। বাস্তবকারণে সেই কারণগুলোকে আমার আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে না? তখন আমার খারাপ লাগবে না? যদি শেখ হাসিনা বলেন যে, আমরা এই করছি সেই করছি, তখন আমি বলি পেটে ভাত দিলে সব দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল? আমার ছেলে লন্ডনে থাকে, ইংল্যান্ডে থাকে। তোমাদের মতো যারা সাধারণ- লেখাপড়া শেখাচ্ছো .. বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ কতোজন মানুষ থাকে? ক‘জনের ছেলে মেয়ে আসে? এই পরিসংখ্যানটা কখনো লক্ষ্য করেছো? আচ্ছা ভাত হলেই কি হয়ে গেল? অজ্ঞ-মূর্খ ভাত খাচ্ছে তার ভাত খাওয়া আর গরুর ভাত খাওয়া একই কথা। যে দেশে শিক্ষিত সচেতন মানুষ বেশি, অধিকার চেতন মানুষ বেশি, সেই দেশের জনগন একরকম করে গনতন্ত্র তৈরি করবে। আর আমাদের এখানে অন্যরকম – যেহেতু মূর্খ। কাজেই এই গনতান্ত্রিক সরকার ‘আমরা সকলের পেটে ভাত দিয়েছি বলে, বাজে কথায় আমাদের ভোলাতে পারবে না।

চিহ্ন : স্যার আপনার সারা জীবনের যে দর্শন চর্চা। দর্শনের লেখাপড়া, এবং দর্শনের শিক্ষকতা, ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক- আলাপ -আলোচনা -যোগাযোগ -সেমিনার -সিম্পোজিয়াম — এটা হোক একাডেমিক বা নন একাডেমিক- সেটা আপনার লেখালেখিতে একটা বিরাট প্রভাব ফেলেছে। এবং আমরা যে হাসান আজিজুল হককে পাচ্ছি, কথাসাহিত্যিক হিসাবে, মনে হয় যে দর্শনের ভিত্তিটা পোক্ত জন্যই হয়তো এই গ্রেড মনে করছি। এটা আমাদের কথা …

হা. আ. হ. : তোমাদের হলে তো আমার বলার আর কিছু নেই; তাই না?

চিহ্ন : না স্যার, আমাদের এই ফিলিংসটার সাথে আপনি কি একমত?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। সেটা আমি একমত! কেননা আমি এর বাইরে দেখার চেষ্টা করি না। যদি লেখায় বড়লোক আসে তো বড়লোকটা যেমন তেমনী লেখার চেষ্টা করেছি। এই যে একজন বড়লোক বললো যে, তার ছেলে, তিনটা মেয়ের সাথে শুতেই পারে। ধর্ষণ করতেই পারে। দিনে দু‘লাখ টাকা করে তার হাতখরচ করতেই পারে। এরকম মানে সোয়াইন বলবো না আমি? বলো না কেন বলবো না, বলবোই তো। সেই জন্যই বলছি যা দেখছি ,শুনছি তাই আঁকছি ,লিখছি। মানুষের মাঝে সৌন্দর্যস্পৃহাও আছে তো। এই যে প্রত্যেকদিন আমার টেবিলে ফুল রেখে যায়, না রাখলেও তো পারতাম, কি ক্ষতি হতো? বকুলগুলো কুড়িয়ে আনা তারপর এর মৃদু গন্ধ-খারাপ লাগে না! সে জন্য রাখি আর এজন্য আমি আলাদা।

চিহ্ন : সেই জন্য এটা যতোটা অপ্রয়োজনিয় হোক না কেন, মানুষ-এজন্য প্রয়োজন?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। আমার চুল থাকবে আর মাথাটা আচড়ালেই দোষ, টেরি কাটলে কি দোষ! কাজেই আমি যদি একটা সৌখিন জামা পড়ি তাহলে দোষ হয়ে গেল? এগুলো কোন ব্যাপার নয়। যখন দেখবে অতিশয় গরীব মানুষ একবিঘে জমি বিক্রি করে একটা সিল্কের পাঞ্জাবী পড়ে ঘুরে বেড়ায়- আর তুমি সেটা জানতে পারলে তখন তোমার মনে হবে এই ব্যাটাকে শাস্তি দেওয়া দরকার, ধরে পেটানো দরকার। মানে এটাই হচ্ছে কা-জ্ঞান

চিহ্ন : তাহলে স্যার আমরা যারা শুধু সাহিত্যই পড়ছি হয়তো মাস্টারি করার জন্যই হোক বা ছেলে মেয়েদের নিয়ে আসা-যাওয়ার জন্যই হোক, আমাদের তো দর্শনের কা-জ্ঞান এতো প্রখর নয় কিংবা কা-জ্ঞানের বোধ যেটা অভিজ্ঞান – সেটা হয়তো আপনার মতো সার্প হবে না। এই পৃথিবীর অনেক লেখকেই দর্শন না পড়েও তার মতো করে একটা দর্শন বানিয়ে নেয়

হা. আ. হ. : নিশ্চয় নিশ্চয়ই।প্রত্যেক বড় লেখক নিজেই দার্শনিক। রবীন্দ্রনাথ কান্ট পড়েছেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। কিন্তু ইশ্বরচন্দ্র যে কান্ট পড়েছেন, সেটা আমি জানি। বঙ্কিমও পড়েছেন। কান্ট না পড়–ক পজিটিভিজম পড়েছেন। কোঁৎ টোৎ এগুলো পড়েছেন। কাজেই পড়লে আমার মনে হয় লোকসান হবে না। নীরস দর্শন পড়া তো নীরসই বটে। কেবলমাত্র কার্তিক মাসে খেজুরের রস হয়। সেখানে যে পাটালী তৈরী হয়, সেটা ভাঙলে চিকচিক করবে। যেহেতু রসে পরিপূর্ণ। এ রকম পাটালীগুড় যদি লেখ তবে মন্দ হবে না। অর্থাৎ এখানে তোমার একধরনের উদ্ভাসন ঘটবে। সাহিত্য এরকম উদ্ভাসন ঘটায়। সাহিত্য দেখালো জীবন সুন্দর। সাহিত্য দেখালো জীবনকে পঙ্গু করে ফেলা যায়! সাহিত্য দেখালো তুমি আটকে থাকলে, তোমার ম্যানারিজম তৈরি না হলে, একটা গড়িয়ে না নিলে হবে না – যেটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষের দিকে হয়েছিল

চিহ্ন : হ্যাঁ হ্যাঁ ম্যানারিজম।

হা. আ. হ. : প্রথম দিকে তো হয়নি! ছোট বকুলপুর আমি তো ভুলতে পারি না, এ রকম গল্প আবার ভুলতেও পারি না। ছোট বকুলপুরের যাত্রী এর মতন বা তার প্রথম যে গল্পটা!

চিহ্ন : আতসী মামী?

হা. আ. হ. : না না, তার পরের

চিহ্ন : আত্মহত্যার অধিকার?

হা. আ. হ. : না ওই যে ভিক্ষু টিকু আছে যে

চিহ্ন : প্রাগৈতেহাসিক?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। প্রাগৈতেহাসিক গল্পটা। ওটার মধ্যে কোন দর্শন নেই। নায়ক অন্ধকারের মানুষ যার ভেতরে কোন আলো নেই। এ রকম মানুষ তো আছে…

চিহ্ন : জীবনের অভিজ্ঞতাটা স্যার দরকার। যেটা আমাদের সময়ে মনে হচ্ছে ভালো লেখা হচ্ছে না, ভালো গল্প, ভালো উপন্যাসের অভাব…

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। এ গুগুলো তোমাদের বলা দরকার। দ্যাখো ফাঁকা জিনিস আওয়াজ দেয় শুধু ভরা কলসি ড্যাবড্যাব করে বাঁজে। আবার ভরা কলসির একটা ফুটো থাকে, তাহলেও জল থাকবে না বের হয়ে যাবে। তখন তুমি ভাবলে কাঁদা দিয়ে সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করবে কিন্তু জলের চাপে এটা খুলে যাবে। তবে পুটিংটা ভেতরে দিলে ঠিক থাকবে। এগুলো খুবেই কমনসেন্স। এগুলো কাউকে শেখাতে হয় না। কা-জ্ঞান এ রকমই

চিহ্ন : এখন যেটি বিষয়— আপনি তো ষাট থেকে শুরু ( ৪৭-৭১) একটা বিরাট সময় তখন আপনি লিখছেন, শওকত আলী, শওকত ওসমান, সত্যেন সেন, শহীদুল্লা কায়সার, জহির রায়হান সবাই লিখছে। এবং আপনাদের লেখালেখির যে সমৃদ্ধি – এইভাবে লেখা যায়, এভাবে চলছে। এমনকি বাঙালি মুসলমানের যে জাতিসত্ত্বার উত্থান এটাও কিন্তু ঘটে গেল প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে। সেই প্রতিকূলতাটা কিন্তু একধরনের ভালো সাহিত্য দার্শনিক চিন্তা চেতনা সমৃদ্ধ সাহিত্য কমবেশি পেয়েছি। হয়তো মানিক-তারাশঙ্কর পাইনি কিন্তু আক্তারুজ্জামন ইলিয়াসকে তো পেয়েছি। তাহলে আজকালকার প্রজন্ম আমার বয়সও তো ফিফটির কাছাকাছি-কিংবা আমার কন্টেমপোরি যারা লিখছে বা আমাদের সিনিয়র যারা ফিফটি ফাইভ বা সিক্সটি হয়েছে, একটা হিসেব তো আছে যে কি কি জিনিস আমাদের সামনে থাকবে বা আছে। এটা নতুন করে বলার দরকার নেই। হাফসেঞ্চুরী তো এনাব টাইম, এখন এটা-ওটা বলে তো লাভ নেই। যে- আমরা বুঝতে পারি নি, দেশস্বাধীন হয়নি, লেখাপড়া কমছিল, নকলবাজি হয়েছে। (হাসান আজিজুল হক- তাহলে আমরাও তো তাই) তাহলে এই কৈফিয়তটা কি স্যার? এটা কারো পক্ষে-বিপক্ষে বলা নয় স্যার কিন্তু এটা একটা পারসেপশন

হা. আ. হ. : আমারও মনে হয় এটা একটা খারাপ প্রীয়ড যাচ্ছে। বা একালের, বিশ্বসভ্যতা বা বিশ্বসাংস্কৃতিতে একটা বড় কন্ট্রিবিউশন। কবিতার যুগ প্রায় শেষ। মার্কিন কবিতা তো দেখাই যায় না। ইউরোপে অনেক কবিতা ছিল, ল্যাতিন আমেরিকায় অনেক কবিতা আছে কিন্তু গদ্য তার থেকে বেশি এগিয়েছে। এই জিনিসটা হচ্ছে কেন? তাহলে এখানে বাস্তবে সফল কে? এই বাস্তবতাকে নির্মূল করতে আমাদের ওপর প্রযুক্তির ইফেক্ট পড়বে। এটা একটা প্রযুক্তির প্রহার। প্রযুক্তি সর্বগ্রাসী এ জন্যই যে, প্রযুক্তি নিজে খারাপ নয় কিন্তু প্রযুক্তি যিনি ব্যবহার করবেন তার তো নির্দিষ্ট একটা উদ্দেশ্য থাকবে যে, আমি এই কারণে ব্যবহার করছি। সারারাত আমি রাত জেগে কথা বললাম, এটা খুজলাম, ওটা খুজলাম, -মানে সবকিছু সহজ করে পেলাম। সহজ জিনিস ভালো নয় তো! সেজন্য রাজ-রাজারার জীবন খুবেই মুশকিল। রাজপুত্রদের জীবন- রূপকথা। রূপকথা না হলে দুঃখ- কষ্ট, দেখানো যাচ্ছে না, কাজেই রাক্ষস- খোক্ষস ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু মানুষকে ফেস করতে হয় রক্তাক্ত। আলালের ঘরের দুলাল হলে চলবে না। আমাদের এখনকার দিনগুলো কি সহজ হয়ে গেছে?

চিহ্ন : সেটাই স্যার যে, একটা সোসাইটি কোনদিকে যাচ্ছে, একটা ক্লাস কোনদিকে যাচ্ছে – যে ফাইভ স্টার হোটেলে দিনে দু লাখ আড়াই লাখ টাকা খরচ করছে – মানে বিকারের সর্বোচ্চ স্তর। আর একটা অংশ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে যাচ্ছে— খাবার নেই, টাকা নেই, লেখাপড়া নেই, কমন সেন্স নেই অথচ গণতন্ত্রের কথা, এই গণতন্ত্র দিয়ে আমি কি করবো? অচেতন মানুষদের নিয়ে গণতন্ত্র করে কি লাভ? কিন্তু এসব লেখকদের টাচ করছে না কেন?

হা. আ. হ. : জানিনা। তবে লেখকতো এখন নেই। গদ্য লেখক তো একেবারেই নেই। দ‘ুএকজন প্রবন্ধ লিখছে। আর উপন্যাস লিখে ক‘জন? ছোটগল্প তো গুড়িয়ে গেছে।

চিহ্ন : আপনাদের যে ডেভলোপমেন্ট, একধরনের দর্শন পড়ে আসি আর না আসি, একধরনের দার্শনিক কা-জ্ঞান তৈরি হওয়া, নিজের মধ্যে সেটা ফেস করা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশিলিত হওয়া, নিজেকে একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যে অন্তরদর্শনটা নিজের মধ্যে থাকা এবং অন্যকে দেওয়া। এই যে জিনিসটা আজকাল লেখাপড়া হচ্ছে না, নাকি? সোসাইটিতে তো চরম গরপরতা, উল্টোপাল্টা চলছে সেটা তাদেরকে টাচ করছে না কেন?

হা. আ. হ. : চিন্তামূলক গদ্যে ক‘জনের নাম বলতে পারবে? বলতে গেলে ঐ আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং বিশেষ ব্রান্ডের বদরুদ্দিন উমর। তাঁরা তো সবাই আশি পেরিয়েছে। আমিই ছুঁই ছুঁই। তাহলে কি করা যায় বলোতো? এতোবড় গ্যাপ, চিন্তার গ্যাপ, সৃষ্টি-সৃজনের গ্যাপ, কল্পনার গ্যাপ

চিহ্ন : তাহলে কি সমাজে কথা বলার দরকার নেই? নাকি কথা বলার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে?

হা. আ. হ. : কি করবো বলো, এখন সেটাই লক্ষ্য করছি। খুব কম হচ্ছে, কেন এ রকম হচ্ছে? দু‘একজন মেয়ে ভালো লিখছে- অতিমুন, শাহাদত মল্লিক, শাহিন আকতার কিংবা পাপড়ি রহমান লেখার চেষ্টা করছে। ছেলেরা কোই? মার্সেল কোই? নাই তো…

চিহ্ন : এক্ষেত্রে স্যার যেটা আপনি বারবার বলেন নির্ভয় এবং সাহস- এটার সংকট। কিংবা কর্পোরেট পুঁজির সাথে যোগসূত্র?

হা. আ. হ. : এটা হল আসল প্রশ্ন! একবার যদি কেউ মনে করে যে শর্ট সময়ে নাম কামাবে তাহলে সর্বনাশ। কতো পদক আছে, এই পদক আছে ওই পদক আছে

চিহ্ন : তাহলে এইটাও একটা বড় সমস্যা?

হা. আ. হ. : প্রলোভনের কাছে নত স্বীকার করে না এ রকম মানুষ কম। প্রলোভনে পড়লে সব শেষ। আমি এতো বেশি পুরস্কার পেয়েছি যে তার অন্ত নেই, মাঝে মাঝে মনেই থাকে না। এটা পেয়েছি কিনা। কিন্তু কখনো মনে করিনি এগুলো আমার ডেকোরেশন।

চিহ্ন : আসলে টোটাল ব্যাপরটা যে আমাদের যে জেনারেশন (ডিজ জেনারেশন) এই জেনারেশনের মধ্যে কেউ সাহসী হয়ে উঠছে না, কেউ বুক ফুলিয়ে তাচ্ছিল্য করে নিজের সত্যটাকে বলছে না। কিংবা লেখকের যে প্যাসন এটার অভাব আছে?

হা. আ. হ. : তোমার সাথে একমত আমি

চিহ্ন : তা হবেনা কেন? বৈষম্য প্রচুর, তীব্র শোষণ চলছে

হা. আ. হ. : যদি লেখা পড়ার কথা বলো তো আরজ আলী মাতুব্বর কতোটুকু পড়ালেখা করেছে? তারাশঙ্কর মেট্রিক। কাজেই এটার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। প্রথাগত বিদ্যার সাথে তো কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে এখনকার সাকসেস কি? কাকে যেন বললাম, ছেলে মেয়ে কয়টি? বললো দুটো। একটা দুবাইয়ে একটা আমেরিকায়। তো আজকাল অনেকেই মনে করছে আমি বাঙ্গালি থাকবো কেন? আমি তো বিশ্ব নাগরিক। এই যে স্বেচ্ছায় দেশান্তরিত হওয়া, এর আগে যাদের জোর করে দেশান্তরিত করা হয়েছে তাদের দু‘জনের ফিলিংস এক নয়। স্বেচ্ছায় তো লোভে পড়ে…

চিহ্ন : হুম স্যার লোভে পড়ে মানুষ অ্যাটলান্টিক সাগর পাড়ি দিচেছ। কি প্রবণতা। এবং সহজভাবে টাকা পয়সা কারেন্সি এটা তো একটা ব্যবসা।

হা. আ. হ. : আদম ব্যাপারীতো আলাদা ব্যবসাই। অনেককে পাঠাচ্ছে কাজ দেবে বলে, টাকা নিচ্ছে (যেমন করে হোক ,জমি বিক্রি হোক আর যাই হোক দিচ্ছে) আর গিয়ে মালেশিয়ায় মরছে। ইন্দোনেশিয়ায় মরছে, ইতালী থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার চেষ্টা করে মরছে। কেবলি মৃত্যুর ¯্রােত। এতো বিনাশী অবস্থা। দর্শনশূন্য  ভূঁইফোড় জিনিস শিক্ষিতের ক্ষেত্রে তাই। আর অশিক্ষিতের ক্ষেত্রে প্রলোচিত করছে। মেয়েদের বলা হচ্ছে ভাল চাকরি পাবে সৌদি আরবে – সেখানে গিয়ে তারা ঝি-চাকর-বাদী হওয়া ছাড়া আর কিছু জুটছে না।

******************************************************

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
‘দর্শন ছাড়া সাহিত্য নেই’
যথার্থ সাহিত্য বারবার পড়া যায়, কখনোই পুরাতন হয় না। উল্টো প্রতিপাঠেই নতুন চেহারায় ধরা দেয়। এর কারণ সাহিত্যের ভেতর একটা রহস্য থাকে। রহস্যটা কী? থাকে সে কোথায়? সেসব কথা একেবারে পরিষ্কার করে বলা যাবে না, বলতে গেলে কারণের একটা ফর্দ তৈরি করতে হবে। ফর্দে উল্লেখ থাকবে লেখকের কল্পনার, তাঁর অনুভূতির, এবং তাঁর দর্শনের। কোনটা আগে, কোনটা পরে সেটার মীমাংসাও একটা সমস্যা। কারণ ওই তিনটি মিলেমিশে যায়, অভেদ্য হয়ে পড়ে। তবে এটা খুবই সত্য যে, দর্শন ছাড়া সাহিত্য নেই। সাংবাদিকতা যে সাহিত্য নয়, তার প্রমাণ কারণ ওই দর্শন। সাংবাদিকতা দর্শনকে এড়িয়ে চলে, ওদিকে দর্শনের সন্ধান না পেলে সাহিত্যের একেবারেই চলে না। তা দর্শন বলতে আমরা কী বোঝাবো? দর্শনের মূল কথাটা হচ্ছে জীবন ও জগতের ব্যাখ্যা। সে ব্যাখ্যা অন্যত্রও পাওয়া যায়, কিন্তু দর্শনের ব্যাখ্যাটা আসে যুক্তির পারম্পর্যের ভেতর দিয়ে। এখানে তার আত্মীয়তা আছে বিজ্ঞানের সঙ্গে। কিন্তু বিজ্ঞান যে পরিমাণে নৈর্ব্যক্তিক দর্শন সে পরিমাণে নৈর্ব্যক্তিক নয়। দর্শনের চরিত্রটা সর্বদাই মানবিক, এবং মানুষের অমঙ্গল যদি করে ফেলে তাহলে সে মানবিকতার গুণ ও সীমা লঙ্ঘন করে না। এই মানসিকতাই সাহিত্যকে দর্শনাভিমুখী করে তোলে।

দুই

কবিতাই প্রথমে এসেছে, তার পরে দর্শনে। কিন্তু কবিতা দর্শনকে খুঁজেছে। যদিও দুয়ের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর- জন্মসময়গত যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি চরিত্রগত। কবিতার তথা সাহিত্যের উপজীব্য হচ্ছে বিশেষ; দর্শনের উপজীব্য নির্বিশেষ। তাদের অবলম্বন ভিন্ন ভিন্ন; সাহিত্য বিশ্বাস করে সংশ্লেষণে, দর্শনের আগ্রহ বিশ্লেষণে। তবু সাহিত্যের জন্য দর্শনানুসন্ধান অপরিহার্য। কেননা, মানুষের বিশেষ অনুভূতিগুলোর প্রবণতা থাকে নির্বিশেষ সাধারণীকরণের দিকে; সব সময়েই তাই দেখা যায় তারা কোনো জ্ঞানের অভিমুখে যেতে চাইছে। অন্যদিকে আবার দর্শন যদিও বিশ্লেষণধর্মী ও চিন্তানির্ভর, তথাপি দর্শন বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞানের মতো খ- খ- করে অবলোকন করে না সে জীবন ও জগৎকে, সংলগ্ন ও ঐক্যবদ্ধ করতে চায়, অনেক সময় আকাক্সক্ষা রাখে সমগ্রকে ব্যাখ্যা করবে একক কোনো মানদ-ে। তবে সত্য থাকে এটা যে, দর্শনের তবু সাহিত্যকে বাদ দিলে চলে, কিন্তু সাহিত্য কখনো চলতে পারে না দর্শনকে বাদ দিয়ে।

তাই দেখি ইন্দ্রিয়সংবেদী কবি, কীটস, চরমভাবে যিনি আস্থা রেখেছিলেন ঝবহংধঃরড়হং-এ, তিনিও বারংবার বলছেন দর্শনের কথা, ভয় পাচ্ছেন চিন্তাবিহীন অনুভবকে, দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন মননশীলতার দিকে, এবং গভীরতম অনুভবশক্তির প্রকাশে সমৃদ্ধ কবিতাসমূহেও অনুপ্রাণিত দার্শনিক উক্তি করেছেন। সেটা একটা দিক। অপরদিকে এও অনিবার্য সত্য যে, কোনো মানুষই তার সমসাময়িক দার্শনিক আবহাওয়ার বাইরে নয়, লেখক তো ননই। যেমন করে প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রভাবিত করে মানুষের দৈহিক স্বাস্থ্যকে, ঠিক তেমনিভাবে দার্শনিক আবহাওয়া প্রভাব রাখে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। এই প্রভাব একজন লেখক অন্য মানুষের তুলনায় অধিক পরিমাণে গ্রহণ করেন, কেননা লেখক সাধারণ মানুষের তুলনায় অধিক সংবেদশীল, গ্রহণসমর্থ। টেনিসনের ‘ইন মেমরিয়াম’ কবিতায় বিবর্তনবাদী চিন্তার উপস্থিতি কোনো গোপন ব্যাপার নয়; এই কবিতা কিন্তু লেখা হয়েছিল ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্বের বই প্রকাশের নয় বছর আগে। ডারউইনের বই প্রকাশের পূর্বেই বিবর্তনবাদী চিন্তা অগ্রসর হয়ে এসে পৌঁছেছিল অগ্রসর মানুষের মনে, এবং সেই অগ্রসর চিন্তা থেকে দূরে ছিলেন না কবি টেনিসন, মূলত যিনি সৌন্দর্যপিপাসু; বিশেষ দক্ষতা যার দার্শনিক ভাবনার চঞ্চল অনুসরণের নয়, অনুভবের অচঞ্চল চিত্রায়ণে।

জীবনানন্দ দাশ ও জসীমউদদীন পরস্পরের সমসাময়িক। দুজনেই পূর্ববঙ্গের মানুষ, শ্যামল ও সিক্ত প্রকৃতির প্রতি দুজনেরই গভীর ভালোবাসা। কিন্তু তাদের কবিতায় সে পারস্পরিক দূরতিক্রমণীয় ব্যবধান তার কারণটা মূলত দার্শনিক। সময়কে জয় করবার প্রয়োজনে বিপন্ন জীবনানন্দ যে একটি ইতিহাস চেতনা নীরবে গড়ে তুলেছিলেন নিজের মতো করে, জসীমউদ্দীনের লেখায় তেমন কোনো দর্শনানুসন্ধান আমরা পাবো না। এখানে জীবনানন্দ বড় জসীমউদ্দীনের তুলনায়; একই সঙ্গে তিনি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও গভীর। অথবা ধরা যাক, কাজী নজরুল ইসলামের কথা। বড় মাপের কবি তিনি। কিন্তু মনে হবে কবিতায় তিনি বড়ই অগোছালো, অনেক সময় স্ববিরোধী। আসলে নজরুল ইসলামের ভেতরে ন্যায় অন্যায়ের প্রকারভেদের বোধ আছে, রয়েছে সুন্দর জীবনের জন্য আকাক্সক্ষা, আর তার বিপরীতে অসুন্দরে জন্য প্রবল ঘৃণা। দেখা যাবে প্রবহমান ঘটনা ও নির্যাতিতের দুঃখের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত আগ্রহী। সব মিলিয়ে একটি দার্শনিকতা রয়েছে, যেমনটা আমরা পাই ইংরেজী রোমান্টিক কবিদের লেখায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে একজন কালজয়ী সাহিত্যিক সে কেবল হৃদয়গ্রাহী ও কৌতুহলোদ্দীপক গল্প বলার দরুণ নয়, আরো বড় কারণ তার দৃষ্টিভঙ্গি, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য গভীর মমতা; এবং যে দৃষ্টিটি উল্লেখযোগ্য এই বৈশিষ্ট্যর কারণেও বটে যে, এতে একই সঙ্গে রয়েছে সামন্তবাদের প্রতি ঘৃণা ও ভালোবাসা।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে সৃজনীকল্পনা ও দার্শনিকতা একেবারে হাত ধরাধরি করে আছে। একই সঙ্গে তিনি ইহজাগতিক ও আধ্যাত্মিক। তার রচনায় রক্ত-মাংসের মানুষেরা রয়েছে, তাদের নিজস্ব দাবি নিয়ে। বহু বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের বৈজ্ঞানিক কৌতূহল। সমসাময়িক জগৎ ও ঘটনা সম্পর্কে তিনি সজাগ, যেমন সচেতন তিনি অতীত ইতিহাস বিষয়ে। গতির প্রতি তার স্বাভাবিক পক্ষপাত। অন্যদিকে আবার রয়েছে তার ধর্মচেতনা। তিনি উপনিষদের উত্তরাধিকারী। ধর্ম তাকে সাম্প্রদায়িক করে নি, বরঞ্চ বাংলা সাহিত্যকে তিনি যে-পরিমাণে অসাম্প্রদায়িক করে গেছেন তার আগে তেমনটি আর কেউ করতে পারেন নি। আধ্যাত্মিকতার প্রতি তার স্বাভাবিক টান। এবং এও মোটেই তাৎপর্যহীন নয় যে, তার গান যেমন ভারতের তেমনি বাংলাদেশে জাতীয় সংগীত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের বহুমুখিতা ও বৈচিত্র্যকে ধারণ করে রয়েছে একটি দার্শনিকতা, যেটি ছাড়া তার সাহিত্যকে ভাবাই যায় না। রবীন্দ্রসাহিত্য অবশ্যই আদর্শ-নিরপেক্ষ নয়, রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত গভীরভাবে আদর্শবাদী।

সাহিত্যিক-শ্রেষ্ঠ শেক্সপীয়র মত-প্রচারক ছিলেন না আদৌ, কোনে বিশেষ দার্শনিক মতবাদের স্থিরপ্রতিজ্ঞ উপস্থাপকও নন তিনি; জীবনের জটিলতাকেই নাট্যায়িত করেছেন এই লেখক-নিরাসক্ত পক্ষপাতবিহীন অবস্থানে দাঁড়িয়ে। তিনি দার্শনিক নন- দান্তে নন, গ্যেটে নন, নন টলস্টয়, কিন্তু তাই বলে কি তার রচনায় জীবনের কোনো ব্যাখ্যা নেই, চিন্তা নেই গভীরতম? অবশ্যই আছে। বস্তুত শেক্সপীয়রের রচনায় অনুভূতি ও চিন্তাশক্তি—এ দুই শত্রুর মধ্যে জীবনমরণ, সামনাসামনি সমান-সমান মল্লযুদ্ধের যে চিত্র কবি-সমালোচক কোলরিজ দিয়েছেন তা অসত্য নয় মোটেই। সাদায়-কালোয় জীবন আঁকেন নি তিনি, শুভ ও অশুভ সর্বক্ষণ আছে তার লেখায়, আছে তাদের ক্ষান্তিহীন রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব।

রেনেসান্স ও রিফরমেশনের যে দার্শনিক আবহওয়ার মধ্যে শেক্সপীয়রের অবস্থান তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যে; শুধু প্রতিফলিত নয়, সেই আবহাওয়া গভীরতর ও সমৃদ্ধতর হয়ে উঠেছে তার রচনার মধ্য দিয়ে। ঈশ্বর নয়, মানুষই থাকবে বিবেচনার ও মূল্যবোধের কেন্দ্রভূমিতে-এই দর্শন রেনেসান্স শিখিয়েছে তাঁকে। মানুষের চরিত্র যে অপার বিষ্ময়ের এক রহস্যলোক, এই বোধও ওই রেনেসান্সেরই। রিফরমেশন দৃঢ়তর করেছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের এই চেতনাকে, ধর্মের ক্ষেত্রে বিবেকের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নিয়ে। সেই সঙ্গে ধর্মনিহিত মূল্যবোধকেও গ্রহণ করেছেন শেক্সপীয়র, এলিজাবেথীয় জগৎ-দৃষ্টিকেও। স্পেনীয়দের পরাজিত করে এবং নাবিকদের সাহায্যে নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার করায় যে বহির্মুখী উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল সেকালে তার প্রভাও পড়েছে শেক্সপীয়রে। এক কথায় বলতে গেলে, ইহলৌকিকতার এবং জীবনকে নিরুদ্বেগে নির্দ্বিধায় গ্রহণের ফলে যে-একটি মানববাদী শক্তি তৈরি হয়েছিল, সেই শক্তিই আপন সৃজনক্ষমতা অবারিত করেছে শেক্সপীয়রের অসামান্য রচনাবলীর মধ্যে দিয়ে। শেক্সপীয়রের ব্যক্তি-মনীষাকে খাটো করার আবশ্যকতা নেই, কিন্তু তার মনীষা অবশ্যই একটি বিশেষ সামাজিক ও দার্শনিক পরিবেশের আনুকূল্যে বিকশিত হয়েছিল; সেই পরিবেশটি মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। গ্রীক নাট্যকাররাও একটি বিশেষ আবহাওয়ার মানুষ, এবং তিনজন শ্রেষ্ঠ নাট্যকার যখন একই বিষয়ের ওপর তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নাটক রচনা করেন, তখন একটি বড় ও সাধারণ দার্শনিক পরিম-লের ভিতরে থেকেও তাঁদের নিজস্ব দার্শনিক অবস্থানের স্বাতন্ত্র্যকে উদ্ভাসিত করেন তাঁরা। কীটসের মধ্যে শেক্সপীয়রের গুণ ছিল। কিন্তু কীটসের তুলনায় শেক্সপীয়র যে বড় লেখক তার একমাত্র কারণ এটা নয় যে, শেক্সপীয়র দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন কীটসের তুলনায়; কারণ এটাও যে শেক্সপিয়রের দার্শনিকতা গভীরতম ছিল কীটসের অপেক্ষা। ট্র্যাজেডি গীতিকবিতার চাইতে উচ্চতর রূপকল্প- দার্শনিক গভীরতার কারণে।

মূল কথা দাঁড়ায় তাহলে এ রকম। কোন লেখকই দার্শনিক বলয়ের বাইরে নন—তখন তো ননই যখন তিনি সেই বলয়কে মান্য করেন, যেমন শেক্সপীয়র করেছেন; তখনও নন যখন তিনি তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, যেমন মাইকেল মধূসুদন করেছিলেন। মাইকেল প্রসঙ্গ এলে স্মরণ করা যায় যে, তাঁর ওপর হোমার-মিল্টনের সাহিত্যিক ও দার্শনিক প্রভাব সক্রিয় ছিল। সেই তুলনায় তার লেখায় শেক্সপীয়রের প্রভাবটা পড়েছে কম। বাংলা সাহিত্যে শেক্সপীয়রের প্রভাব গভীর নয়। শেক্্সপীয়রের মৃত্যুর এতো বছর পরেও বাংলায় তাঁর সার্থক ও যথার্থ অনুবাদ হয়নি। এর কারণ ভাষাতাত্ত্বিক তো বটেই, তার চেয়েও অধিক পরিমাণে দার্শনিক।

যে বিশেষ দার্শনিক পরিম-লে শেক্সপীয়রের অবস্থান, বাঙালীর মনন থেকে তার দুরবর্তিতা নিতান্ত সামান্য নয়। শেক্সপীয়রের দি টেমপেস্ট নাটক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, “নাটকের নামও যেমন, তাহার ভিতরকার ব্যাপারও সেইরূপ। মানুষে প্রকৃতিতে বিরোধ এবং সেই বিরোধের মূলে ক্ষমতালাভের প্রয়াস। ইহার আগাগোড়া বিক্ষোভ।” এই বিক্ষোভ পছন্দ হয় নি রবীন্দ্রনাথের। না-হওয়ার কারণটি নিছক ব্যক্তিগত নয়, ব্যক্তিগত হলেও তা সমষ্টিগত ও আদর্শিক বটে।

এই আদর্শগত কারণেই আমাদের, বাঙালীদের পক্ষপাত গীতিকবিতার প্রতি। নাটক এসেছে ধীরে ধীরে। এবং সেখানেও কমেডি প্রাধান্য পেয়েছে ট্র্যাজেডির তুলনায়। ট্র্যাজেডি চূড়ান্তরূপে ইহজাগতিক, অন্যপক্ষে বাঙালী জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মভিত্তিক ভাববাদ শিক্ষা দেয় যে, জগৎ অনিত্য, নিত্য হচ্ছে মানুষের আত্মা ও তার পরকাল। ইহকালের দুর্ভোগ চূড়ান্ত নয়, বরঞ্চ এই দুর্ভোগের পুরস্কার পাওয়া যাবে পরলোকে—এই যে ধারণা, এটি ট্র্যাজিডির জন্মবিরোধী। শুধু ভাববাদের কারণে নয়, দারিদ্র্যের কারণেও “মরলে বাঁচি”র জীবনদর্শন গড়ে উঠেছে এই দেশে। এই দর্শন ট্র্যাজেডির শক্র; ট্র্যাজেডি মরার পর বাঁচার কথা বলে না, বাঁচার মধ্যে বাঁচাকেই চরম ও চূড়ান্ত জ্ঞান করে। তপোবনে দ্বন্দ্ব নেই, কেননা সেখানে প্রতাপান্বিত অশুভ নেই। পারলৌকিক স্বর্গেও ওই একই ব্যাপার। আমাদের শুভ সংঘর্ষে যেতে চায় না অশুভের সঙ্গে, ফলে তার শক্তি কখনো যথার্থ রকমে বিকশিত ও সম্পূর্ণরূপে পরীক্ষিত হতে পারে নি। শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব নিতান্তই যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে সাহিত্যে, নিরুপায় লেখক তখন পক্ষ নেন, বিপন্ন হয়ে। অশুভ তাঁর ব্যক্তিগত শক্রতে পরিণত হয়েছে মনে হয়। তিনি সমবেদনা প্রকাশ করেন শুভের প্রতি, এমনকি অশ্রুপাতও করতে বলেন পাঠককে, যেমন শরৎচন্দ্র বলেছেন, দেবদাসের অন্তিম লাইনগুলোতে।

এই ভাববাদী ও তপোবনপ্রিয় চেতনায় ট্র্যাজেডি অনাহূত, স্বভাবতই। গিরিশ ঘোষ ম্যাকবেথ অনুবাদ করেছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ওই নাটক দু-চারদিনের বেশি চলে নি, শূন্য হয়ে গেছে রঙ্গালয়, পরে যখন ‘আবু হোসেন’, এলো তখন যেন ভোজবাজি, আবার ভরে গেল আসনসমূহ। পাঠক-দর্শক হাসি চায়, পরিহাস চায়, চায় উৎফুল্লতা, চায় না দুর্ভোগ, চায় না দ্বন্দ্ব। আপন ঘরে দুর্ভোগ যার নিত্যসঙ্গী, কোন দুঃখে সে দুঃখকে খুঁজবে রঙ্গমঞ্চে। পয়সা দিয়ে?

শেক্সপীয়র অনুবাদ ব্যর্থতার ভাষাতাত্ত্বিক কারণটাও দর্শননিরপেক্ষ নয়। ভাষা ওপর থেকে আসে না, নীচের থেকেই গড়ে ওঠে; ওপর থেকে এলেও টেকে না, টেকে তা-ই যা গড়ে উঠেছে নিজের প্রয়োজনে। বাংলা বাঙালী মানুষেরই ভাষা। এই ভাষার বিজ্ঞানচর্চা ছাপ যেমন অল্প, তেমনি অল্প দর্শনচর্চার ছাপও। কারণটা অন্যকিছু নয়। সেটি হচ্ছে যে,আমাদের চেতনায় কাব্যের শান্ত ও নিরীহ কিন্তু শক্ত ও অচঞ্চল আচ্ছাদনটি ভেদ করে মননশীলতার, বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলনের প্রবল ঐতিহ্য গড়ে ওঠে নি। আমাদের প্রধান গৌরব গীতিকবিতা, প্রধান অগৌরব বিজ্ঞানের ও দর্শনের অভাব। সেই গৌরব ও অগৌরবের যুগ্ম পতাকা ভাষা তার পেলবতা ও কাব্যময়তার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত আন্দোলিত করছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনাকালে একজন সমালোচক বলেছিলেন, বাংলা ভাষা কেবলি এলাইয়া এলাইয়া পড়ে, ধরি ধরি করিয়া তাহাকে রাখা যায় না। সে সত্য- অপ্রাণিত হয়নি অদ্যাবধি।

রবীন্দ্রনাথ ম্যাকবেথের অংশবিশেষের অনুবাদ করেছিলেন, তার গৃহ শিক্ষকের শাসনের মুখে। সে অনুবাদটি রক্ষা করার মতো আগ্রহ কবির ছিল না। সেই অনুবাদের প্রথম দৃশ্যের এই ধরনের পঙক্তি আছে, ‘পোড়ারমুখী বোল্লে রেগে ডাইনী মাগী যা তুই ভেগে।’ ওই যে শব্দ “মাগী” তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ওই পরিবেশে। বিদ্যাসাগর অনায়াসে ব্যবহার করেছেন ওই শব্দ। পরে মধ্যবিত্ত মানসের বর্জনপ্রিয়তা এইসব শব্দকে অশ্লীল জ্ঞানে জিভে কেটে পরিত্যাগ করেছে। বলা বাহুল্য, এর কারণ ভাষাতাত্ত্বিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক। এই প্রবণতা শেক্সপীয়রের নিজের কালে ছিল না এবং ছিল না বলেই তিনি তার রচনাবলী সৃষ্টি করায় অনুকূল্য পেয়েছিলেন। আমরা শেক্সপীয়রের যথেষ্ট ও যথার্থ অনুবাদ করতে পারি নি, কেননা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিধিটা এখনো বিস্তৃতির ও গভীরতার অপেক্ষায় আছে।

রবীন্দ্রনাথ অন্য সবার চেয়ে বড়; কিন্তু ভক্তিবাদের অবস্থান তাঁর সাহিত্যেও উজ্জ্বল। তাঁর বিশ্বাস ‘স্থূলত্ব বর্জন করতে করতে তপস্যার মধ্য দিয়েই মানুষই দেবতা হয়ে উঠবে’। এই বিশ্বাসে উঁচু আশাবাদ আছে, কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখবার বাস্তবিক ইচ্ছার কিছুটা অভাব রয়েছে। মানুষ মানুষই, এই সত্য এমনকি রবীন্দ্রনাথও গ্রহণ করছেন না, মানুষকে দেবতা করতে চাইছেন। তদুপরি মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশ যে তপস্যার দ্বারা হয় না, হয় সংগ্রাম ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে, এই বৈজ্ঞানিক সত্যও অস্বীকৃত রয়ে যাচ্ছে। রক্ত-মাংসের মানুষ রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যে উপস্থিত আছে; কিন্তু তিনি প্রধানত কবি-ই, ঠিক যে অর্থে শেক্সপীয়র প্রধানত নাট্যকার। এবং তার কবিতায় মানুষের চাইতে মনুষ্যত্ব সম্পর্কে তার ধারণাটাই বড়, দ্বন্দ্বের চাইতে অধিক মূল্যবান সমন্বয়। যে তপোবনই চাইছেন তিনি, তপস্যার জন্য। গীতাঞ্জলির সেই অসাধারণ চরণগুলো স্মরণ করা যাক, যেখানে বলেছেন তিনি যে, ঈশ্বর স্থপতি নির্মিত মন্দিরে নেই, তিনি আছেন, ‘যেথায় মাটি ভেঙ্গে করছে চাষা চাষ/ পাথর ভেঙ্গে কাটছে যেথায় পথ, কাটছে বারো মাস/ রৌদ্র জলে আছেন সবার সাথে/ ধূলা তাহার লেগেছে দুই হাতে।’ কিন্তু কর্মের এই যে জগৎ সেও তো মন্দিরই, বৃহৎ মন্দির। অথবা তপোবন একটি। শ্রমিককে শ্রমিক হিসেবে স্বীকার করেছেন না কবি, দেখছেন তাকে ঈশ্বরের প্রকাশ ভূমি হিসেবে। শ্রমিক কিন্তু নিজেকে জানে মেহনতি মানুষ বলেই; ঈশ্বর তাকে সুখ দেয় নি, মেহনত দিয়েছে, দিয়েছে অনাহার ও দারিদ্র্য। এইভাবে রবীন্দ্রনাথ বাস্তবকে কোথাও কোথাও অবাস্তব করে তুলেছেন তার আলোকসামান্য প্রতিভার জাদুকর ও গীতিময় স্পর্শে। মানুষের ধর্ম বক্তৃতাতে তিনি জ্ঞান, অনুভূতি ও কর্মের মাধ্যমে জগৎকে জানার বিষয়ে বলেছেন; বলে নিয়ে নিজের স্বাভাবিক পক্ষপাতে প্রদর্শন করেছেন অনুভূতির প্রতি। জ্ঞান ও কর্ম কম মূল্য পেয়েছে তুলনায়।

জ্ঞান ও কর্মের এই অবমূল্যায়নটা আমাদের অধিকাংশ লেখকের বেলাতেই সত্য। কল্লোল যুগের লেখকেরা হুজুগ তুলেছিলেন বিদ্রোহের। বিদ্রোহ ছিল যৌনালোচনা সম্পর্কে সামাজিক নিষেধের এবং রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক নীতির বিরুদ্ধে, মূলত। কিন্ত সেই বিদ্রোহে বড় রকমের স্থান ছিল না জ্ঞান জগৎটাও ভাববাদী। তফাৎ এই পরিমাণে যে, কর্মের স্থলে এরা স্থাপন করেছেন আবেগকে; আবেগের কাছ থেকে এরা সেই ধরনের তৃপ্তি কামনা করেছেন ধার্মিক যা পায় ধর্মানুশীলনের মধ্যে দিয়ে। বেদের লেখক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত যখন পরমহংসের জীবনী রচনায় নিয়োজিত হন, তখন আসলে বিস্ময়ের বিশেষ কোনো কারণ থাকে না। কেননা তিনি এবং তাঁরা সকলেই ভাববাদীই ছিলেন, শুরু থেকেই; একটা ভাবের জন্য অন্য জায়গা করে দিয়েছে মাত্র, এর বেশী নয়। তবু মানতেই হবে যে বেদের জীবন থেকে পরমহংসের জীবনে চলে আসাটা জীবন সংকোচন এক প্রকারের। যেমন, রবীন্দ্রনাথের গোরার জগৎ থেকে বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে আসা উন্মুক্ত প্রান্তর থেকে সরে এসে বন্দি হওয়া ড্রয়িংরুমে। ড্রয়িংরুম তথা বন্ধ ঘরের দিকেই গোপন ও সক্রিয় পক্ষপাত অধিকাংশ ‘আধুনিক’ লেখকের। সেজন্য পরবর্তীকালে দেখি, সমরেশ বসু গঙ্গার তীর ভেঙে আহ্লাদিতচিত্তে বিবরে প্রবশে করেছেন, মধ্যবিত্ত কলকাতার। সেই একই পলায়ন, জীবন থেকে। পুঁজি হিসেবে জীবনকে সঙ্গে নেন নি, সঙ্গে নিয়েছেন জীবন সম্পর্কে খ-িত কিছু ধারণাকে। পুঁজি নিঃশেষিত হয়ে গেছে দ্রুত, তখন তাঁরা নানাবিধ উত্তেজনাকে মূলধন হিসেবে খাটাবেন ভেবেছেন তাদের লেখায়। অনেক দিক দিয়ে শরৎচন্দ্র অত্যন্ত বস্তুবাদী। কিন্তু তিনি আবার ভাববাদীও; সংস্কারে বিশ্বাস রাখেন, আস্থা রাখেন ভক্তিতে, পরিত্যাজ্যকে মোহনীয় করে তোলেন নানাভাবে। চেতনাগত পরিচয়ে তারাশঙ্কর হচ্ছেন সংশোধিত শরৎচন্দ্র।

গদ্যের অবস্থাই যদি হয় এমন তবে কবিতার পরিস্থিতি অধিকতর শোচনীয় হতে বাধ্য। হয়েছেও। সেখানে ব্যক্তির সমন্বয়বাদী ও গীতিধর্মী অনুভবই প্রধান সত্য; এবং সেই অনুভব জীবনে যেমন সাহিত্যেও তেমনি, ইন্দ্রিয়সংবেদী ও প্রগতিবিরোধী। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বন্ধুদেব বসুর মধ্যে মনে হবে দূরত্ব বিস্তর; কিন্তু দূরত্ব নেই প্রকৃত প্রস্তাবে। দুজনেই ভাবাবাদী।

ব্যতিক্রম কি নেই? আছে। বিদ্রোহ হয়েছে। বিদ্যাসাগর করেছেন বিদ্রোহ, করেছেন মধুসূদন, নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য। কিন্তু এঁদের সকলেরই পরিণতি বেশ করুণ, তাঁদের লেখা মূল ধারায় পরিণত হতে পারে নি। সমাজ, এমনকি প্রকৃতিও সহ্য করতে চায় নি তাদের দার্শনিক বিদ্রোহকে। বঙ্গভূমির মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির প্রবণতা মূলতঃ বশ্যতার, বিদ্রোহের নয়।

রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, বাঙ্গালা সাহিত্যে নারীর মর্যাাদা পুরুষের তুলানয় অধিক। তাঁর মতে, পুরুষ এখানে মহাদেবের ন্যায় নিশ্চলভাবে ধূলিয়ান এবং রমণী তাহার বক্ষের উপর জাগ্রত জীবন্তভাবে বিরাজমান। এর কারণ হিসেবে তিনি সরাসরি বলেছেন পুরুষ এদেশে অকর্মা। কিন্তু অকর্মণ্যতা একমাত্র কারণ নয়; সাহিত্যে নারীর আধিপত্যের আরো একটি কারণ বোধ করি এই যে, এ সাহিত্য অত্যন্ত কোমর, ভাবালু ও অনুভূতিপ্রবণ, এক কথায় বেশ মেয়েলি। দার্শনিক চিন্তায় তা যথেষ্ট পুষ্ট বা সমৃদ্ধ নয়। সেই অপুষ্টি ও অসমৃদ্ধি রবীন্দ্রনাথ-নির্দেশিত অকর্মণ্যতা থেকে এসেছে বললে হঠকারী কথা বলা হবে না।

তিন

বাংলাভাষায় সাহিত্যচর্চার সঙ্গে রাষ্ট্রের একটা প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্ব ছিল। ইংরেজ আমলে যেমন, পরেও তেমনি। ইংরেজের শাসনামলে মনে হয়েছিল রাষ্ট্র ভাষা সাহিত্যকে বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে। তা করেছে বটে। বাংলা গদ্যের সৃষ্টি ইংরেজ আগমনের ফল, এ-কথা ইতিহাসে লেখা আছে। যে-মধ্যবিত্ত শ্রেণী আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে অতটা এগিয়ে নিয়ে গেল তারাই বা কোথা থেকে আসতো, ইংরেজ না এলে? ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তন না করলে, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে না দিলে, কেইবা পড়তো বাংলা সাহিত্য? সবই সত্য।

কিন্তু বাঙালি যে ইংরেজির চর্চা না-করে বাংলা চর্চা করলো এটা একটা রাষ্ট্রবিরোধীতা তো বটেই। বাঙালী মিশে গেল না। কেউ কেউ অবশ্য গেল, তারা যারা ইংরেজ হতে চাইলো। কিন্তু অত্যন্ত বড়মাপের বেশ কিছু মানুষ যে গেলেন না, তাঁরা যে মাতৃভাষার চর্চা করলেন সেই ঘটনা তো বলছে এ কথা যে, তাঁদের গ্রহণের অন্তরালে সুদৃঢ় একটা বর্জন কার্যকর ছিল। মধুসূদন চলে গিয়েছিলেন; তিনি সাহেব হয়েছেন, মেম সাহেব বিয়ে করেছেন, ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়েছিলেন, ইংরেজিতেই লিখবেন ঠিক করেছিলেন; কিন্তু এই যে ফিরে এলেন, হলেন বাঙালী লেখক, ওইখানেই তার আসল বিদ্রোহ, ইংরেজ হওয়ার অভিনাটকীয় বিদ্রোহের চেয়ে যা অনেক গভীর।

রাষ্ট্রভাষা ছিল ইংরেজি। বাঙালী সে ভাষার চর্চা করেছে; কিন্তু সে ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করে নি। না করে বাংলা ভাষাকেই বরঞ্চ এগিয়ে নিয়ে গেছে। স্বাধীনতার দাবি সেই সাহিত্যে এসেছে, নানান ভাবে, নানান সুরে। কিন্তু রাষ্ট্র ছিল অত্যন্ত প্রবল। তার ক্ষমতা ছিল অপরিমেয়। তার ক্ষতিকর দাপটকে যে অস্বীকার করা যাবে তা সম্ভব ছিল না। না, সাহিত্যও পারে নি অস্বীকার করতে।

রাষ্ট্রীয় দাপটে সাহিত্যের বিশেষ রকমের ক্ষতি হয়েছে দুটো। একটি সাম্প্রদায়িকতা অপরটি শ্রেণীবিভাজন। বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টান্ত সহজেই আসে। তিনি অসামান্য ছিলেন যেমন ইহজাগতিকতায়, তেমনি স্বাধীনতাপ্রিয়তায়। স্বাধীনতার পক্ষে লিখতে গিয়ে তার লেখবার ছিল না বলে আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরাণীতে শক্র হিসেবে দাঁঁড় করালেন অনুপস্থিত মুসলমানকে। সাহিত্যে ওই যে সাম্প্রদায়িকতা প্রবেশ করলো, ওই যে নদী ঘুরে গেলো তার স্বাভাবিক ধারা থেকে ভিন্নদিকে, তার প্রভাব পরবর্তীকালে অনেক ক্ষতির কারণ হয়েছে। বাঙালীর জন্য। ১৯৪৭-এ এসে বঙ্গদেশ যে দু-টুকরো হলো তার প্রধান কারণ সাম্প্রদায়িকতা এবং সেই কারণকে সাহিত্য প্রতিহত করার ব্যাপারে সক্রিয় থাকে নি, বরঞ্চ পুষ্টই করেছে।

আর রইলো শ্রেণী। ইংরেজের রাষ্ট্র বিদ্যমান শ্রেণীবিভাজনকে আরো শক্ত করেছে। সাহিত্য তাকে ভাঙতে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয় নি। সাহিত্য রয়ে গেছে বিত্তবান শ্রেণীর সাংস্কৃতিক অঙ্গ।

তখনকার পূর্ব-পাকিস্তানে আমরা বাংলা সাহিত্যের চর্চা করেছি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নয়, রাষ্ট্রীয় বৈরিতার ভেতরে। হ্যাঁ, পুরস্কার ছিল, পত্রিকা ছিল, গণমাধ্যমে প্রচার পাওয়া যেতো; কিন্তু মূল সত্যটা ছিল এই যে, ওই রাষ্ট্র বাংলা ভাষাকে রাখতে চেয়েছিল উর্দুর নীচে, ঠিক যেমন ইংরেজরা চেয়েছিল ইংরেজিই হবে প্রধান; মোগলরা চেয়েছিল ফার্সীর প্রাধান্য; আর্যরা সংস্কৃতের। দমনের ওই চেষ্টা বাঙালী মানে নি।

সাহিত্যে রাষ্ট্রবিরোধীতা কতোটা এসেছে বা আসে নি সে-প্রশ্নটা থাকে। না, বেশি আসে নি। সাতচল্লিশের পরে আমাদের সাহিত্য ছিল কবিতাপ্রধান। আমাদের প্রধান কবিরা রাষ্ট্রের মহিমাকীর্তন করে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোনো গ্লানি দেখা যায় নি। ফরাসী বিপ্লব কিংবা রুশ বিপ্লবের পেছনে যেমন সাহিত্যের একটা ভূমিকা ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পশ্চাৎভূমিতে তেমন কোনো সাহিত্যিক ঘটনা ঘটে নি।

রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ব্যাপারটিকে গভীর ও প্রবল করতে না পারা সাহিত্যের জন্য অবশ্যই একটা দুর্বলতা। সে দুর্বলতা সেদিনও ছিল, আজো রয়েছে। মানুষের জীবনের অচরিতার্থতা ও দুঃখকে (কেবল বৈষয়িক অর্থে নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ও অনুভূতিগত অর্থেও) সাহিত্য নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে নি। সেজন্য তার স্তরটা রয়ে গেছে প্রধানত বিনোদনের। আর ওই স্তরে যেহেতু টেলিভিশন ও ইন্টানেট কাজ করছে আরো জোরেশোরে, সাহিত্য তাই নিজেকে ততটা প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারছে না, যতটা প্রয়োজনীয় হওয়ার তার নিজের জন্য তো বটেই, আমাদের সংস্কৃতির স্বাস্থ্যের জন্যও প্রয়োজনীয় ছিল।

বিষয়টা যে কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের ব্যাপার তা নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থারই ব্যাপার বটে। রাষ্ট্রগঠনে সাহিত্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে হয়তো, করেছেও কখনো কখনো; কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সাহিত্যের দ্বন্দ্বটা একেবারেই মূলগত, এবং দার্শনিক। রাষ্ট্র হচ্ছে রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠান, চরিত্রগতভাবেই। অপরদিকে সাহিত্য চায় মুক্তি। প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের পক্ষে সাহিত্যকে তার নিজের দিকে টেনে আনবার চেষ্টা ফলকে বৃন্তচ্যুত করার সমতুল্য হয়ে দাঁড়ায়।

কবিতা না-লিখলেও দার্শনিক প্লেটো যে একজন কবি ছিলেন সেটা তার গদ্য রচনার পরতে পরতে প্রমাণিত। উপমায়, রূপকে, শব্দ চয়নে ওই দার্শনিক তার অন্তর্গত কবির কল্পনা ও সৌন্দর্যবৃদ্ধি, উভয়কেই ব্যবহার করে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে কবিতার গুণ ও আবেদন তিনি যে জানতেন তাতেও সন্দেহ করবার অবকাশ নেই। কিন্তু তিনি তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রে কবিদের জন্য কোনো জায়গা রাখেন নি। জায়গা রাখবেন কী, উল্টো নির্দেশ দিয়েছেন তাঁদেরকে বের করে দেওয়ার জন্য। কবিদের সম্মান দেয়া হবে, মালা ও সুগন্ধী দিয়ে তাদের সজ্জিত করা যাবে, কিন্তু তাদেরকে সবিনয়ে বলতে হবে, মহাশয়বৃন্দ, আমরা দুঃখিত, আপনাদের জন্য আমাদের রাষ্ট্রে কোনো স্থান নেই।

কেউ নেই? অভিযোগটা আপাতত এটা যে, কবিরা মিথ্যা কথা বলে। কিন্তু গভীরে আরো একটা ব্যাপার রয়েছে। সেটা এই যে, কবিরা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলাকে বিপন্ন করে। প্লেটোর সাম্যবাদ ফ্যাসিস্ট ধরনের; অর্থাৎ শ্রেণীবিভাজনকে মেনে নিয়ে, তবেই সাবই সমান, বিভাজনের ভেতরে সমান, ভেঙে দিয়ে নয়। সে-রাষ্ট্রে দার্শনিকেরা শাসন করবে, সৈনিকেরা করবে যুদ্ধ, শ্রমিকরা করবে উৎপাদন। এই বিভাজন কিছুতেই ভাঙা যাবে না। কাব্য তথা সাহিত্য যে গ্রহণযোগ্য নয় তার মূল কারণটা নিহিত রয়েছে না ভাঙার এই রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের ভেতরেই।

তা সাহিত্য করেটা কী? সাহিত্য মানুষের আবেগকে জাগিয়ে দেয়। মানুষকে সংবেদনশীল করে, যার ফলে মানুষ শ্রেণীবিভাজনকে ডিঙিয়ে যেতে চায়। সাহিত্য পাঠ করলে দার্শনিক হয়তো শ্রমিকের দুঃখ দেখে কাতর হবে, শ্রমিক হয়তো চাইবে সে শাসক হবে, সৈনিক হয়তো ক্ষমতার লোভে ওপরে যেতে চাইবে, কিংবা বলপ্রয়োগের জন্য নীচে; রাষ্ট্র তখন ভেঙে পড়বে, তখন ন্যায় বলে কিছু থাকবে না, অন্যায়ে ছেয়ে যাবে সমস্ত কিছু। প্লেটোর রাষ্ট্রের প্রধান কথা হলো নিরাপত্তা অক্ষুণœ রাখা, সেখানে তাই সাহিত্যের স্থান নেই। প্লেটোর রাষ্ট্রের জন্য সাহিত্য বিপজ্জনক, যেমন তা বিপজ্জনক ছিল হিটলারের রাষ্ট্রের জন্য।

রাষ্ট্রের অনেক কিছুই থাকে। সিপাহী, সান্ত্রী, আইন, আদালত—সবকিছুই আছে তার। বিবেক নেই? হ্যাঁ, বিবেকও আছে বইকি। সেই বিবেক হচ্ছে শাসক শ্রেণীর স্বার্থ। ‘ন্যায়’ও তাই। শাসক শ্রেণীর স্বার্থ। ওদিকে সাহিত্যের কাজটাই হলো মানুষের ভেতর যে বিবেকবান, অর্থাৎ সংবেদনশীল, মানুষটি থাকে তাকে জাগিয়ে রাখা, তাকে সতেজ করা। সাহিত্য তাই শ্রেণীবিরোধী এবং সে কারণে রাষ্ট্রবিরোধী।

প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যে এন্টিগনির যে-গল্পটি আছে সেটি একটি বিদ্রোহের কাহিনী। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তির বিদ্রোহ। শাসনের বিরুদ্ধে বিবেকের অভ্যূত্থান। এন্টিগনি বলেছে, মৃত ভ্রাতাকে সে করব দেবে। দেবেই দেবে। কেননা, এটি তার দায়িত্বও কর্তব্য। রাষ্ট্র বলছে কবর দেওয়া যাবে না, কারণ লোকটি ছিল রাষ্ট্রদ্রোহী। এই বিশেষ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মুখপাত্রটি অন্য কেউ নন, তিনি হচ্ছেন এন্টিগনিরই আপন মামা, ক্রিয়ন। কিন্তু এখানে আত্মীয়তা কাজে দেয় না। রাজা বন্দী রাষ্ট্রীয় স্বার্থের শৃঙ্খলে। এন্টিগনি এগিয়ে গেল, ভাইকে কবর দিতে। রাজা ক্রিয়ন কী করলো? ভগ্নিকন্যা বিদ্রোহী এন্টিগনিকে আটক করে কবর দিয়ে দিলো,জ্যান্ত। ক্রিয়নের পুত্র এন্টিগনিকে ভালোবাসে; এনটিগনির কবরে গিয়ে সে মারা গেল, কাঁদতে কাঁদতে। কিন্তু ক্রিয়নের কিছু করার ছিল না। রাজা হয়ে তিনি বন্দী। ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় রাজা তখন রাষ্ট্রের পক্ষে এবং ব্যক্তির বিরুদ্ধে, অতি অবশ্যই; নইলে তিনি রাজা কেন?

এন্টিগনির মতো যারা বিবেকবান মানুষ, রাষ্ট্র তাদেরকে ভয় করে। আর সাহিত্যের কাজই তো হচ্ছে সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে মানুষকে বিবেকবানে পরিণত করা। সাহিত্য আনন্দ দেয় এ আমরা জানি; সাহিত্য শিক্ষা দেয় এ ও আমরা মানি; কিন্তু তবু সাহিত্য বিনোদনের বিচিত্রানুষ্ঠান নয়। যেমন নয় সে প-িতের পাঠশালা। সাহিত্যে ওই দুয়েরই ভূমিকা থাকে, বিনোদনের যেমন, তেমনি শিক্ষা। কেননা, এরা উভয়েই সাহিত্যের মূল কর্তব্যের অংশ, যেটি হলো মানুষের হৃদয়কে সংবেদনশীল করা। সাহিত্যের শিক্ষাটা কেবল মস্তিষ্কের নয়, হৃদয়েরও। হৃদয়ই হচ্ছে প্রবেশপথ; আর হৃদয়বান মানুষেরাই সহজে বিবেকবান, যেজন্য হৃদয়কে রাষ্ট্রের বড় ভয়।

রাজনৈতিকভাবে শেক্সপীয়র ছিলেন রক্ষণশীল। তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বড় শিল্পী ছিলেন বলেই শেক্সপীয়র বারবার তার নাটকে দেখিয়েছেন রাষ্ট্র কী করে ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করে। রাজপুত্র হ্যামলেট একা লড়ছেন রাজার বিরুদ্ধে। কিন্তু রাজা একা নয়, রাষ্ট্র আছে রাজার আজ্ঞাবহ রূপে দাঁড়ায়। হ্যামলেট দেখছে একই দুর্বৃত্ত যেহেতু বসে আছে সিংহাসনে, তাই সবকিছুই রওনা হয়েছে নষ্টের অভিমুখে। রাষ্ট্র বড়ই কঠিন প্রাণী।

চার

টলস্টয় (১৮২৯-১৯১০) শেক্সপীয়রকে পছন্দ করতেন না। মনে করতেন, শেক্সপীয়র রাজা বাদশাদেরই গ্রহণ করেছেন পাত্র পাত্রী হিসেবে; জনগণকে বিশেষ মর্যাদা দেন নি। তার ধারণা, শেক্সপীয়রের দেশপ্রেম ছিল সংকীর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন তো চরিত্রের অবস্থান কী তা নয়, প্রশ্ন হচ্ছে চরিত্রের মানবিক পরিচয় কী সেটা। পোশাক, কিংবা সামাজিক অথবা জাতীয় পরিচয় যাই হোক, শেক্সপীয়র দেখছেন অন্তর্গত মানুষটিকে। সেই মানুষটি রাজা নন, রাজপুত্র নন, শুধুই একজন মানুষ। ডেনমার্কের বিবেকবান রাজপুত্র হ্যামলেটের জন্য রাষ্ট্র মিত্র নয়, শক্র বটে। রাষ্ট্র তাকে হত্যা করার প্রচেষ্টা কোনো অবধি রাখে না।

সাহিত্য দেশ মানে না। কাল মানেনা। রাষ্ট্র মানে না। শুধু মানেনা বললে যথেষ্ট বলা হবে না, সাহিত্য ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বটাকে তুলে ধরে। সাহিত্য স্থানবিরোধী ও কালবিরোধী যতটা নয়, রাষ্ট্রবিরোধী সে তুলনায় অনেক বেশি। কেননা, রাষ্ট্র স্থানে সত্য, কালেও সত্য।

টলস্টয়ের নিজের লেখাতেও রাষ্ট্রবিরোধিতা অত্যন্ত স্পষ্ট। স্বভাবতই। সেই অতিবৃহৎ উপন্যাস যুদ্ধ ও শান্তিতে টলস্টয় দেখাচ্ছেন, দুর্ভোগটা সাধারণ মানুষেরই। আর রাষ্ট্রনায়কেরাও সাধারণ মানুষই শেষ পর্যন্ত, যদিও তারা ভান করতে ভালোবাসে অসাধারণত্বের।

টলস্টয়ের আন্না কারেনিনার নায়ক নায়িকারা অধিকাংশই রাষ্ট্রের সেবক। আন্নার স্বামী মস্ত বড় আমলা, তার প্রেমিক সেনাবাহিনীর অফিসার। আন্নার ভাইও বড় এক সরকারি কর্মচারী। ওই সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ভেতরেই আন্নার চলাফেরা, ওঠাবসা ও জীবনযাপন। অনেক দিন দিয়েই অসাধারণ এই মেয়ে; সৌন্দর্যে ব্যক্তিত্বে, মেধায় ও আচরণে নিজের বৃত্তের সব মানুষকে ছাপিয়ে ওঠে, বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী হলো তার আন্তরিকতা। এই মানুষটিকে চরিতার্থতা দেওয়ার ক্ষমতা তার স্বামীর নেই, তার প্রেমিকেরও নেই। বেচারা আন্না বেশী বয়সী স্বামীকে ছেড়ে প্রায় সমবয়সী প্রেমিকার কাছে যায়, কিন্তু তাকে চরিতার্থ না দিলো তার আমলা স্বামী, না দিলো তার সৈনিক প্রেমিক। উভয়েই সামান্য তারা, রাষ্ট্রলালিত বুর্জোয়া স্বার্থপরতার বন্ধনে আবদ্ধ হবার কারণেই, বিশেষভবে। এ উপন্যাসে রাষ্ট্রবিরোধী রাজনৈতিক লোকেরাও রয়েছে, যদিও তারা ছায়াছায়া, খুব প্রত্যক্ষ নয়। তারা নতুন ব্যবস্থার কথা ভাবে, কমিউনিজমের কথাও তাদের চিন্তায় আসে। মোট বিষয়টা দাঁড়ায় এই যে, প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে গেছে, এটা ভেঙে পড়ছে। আন্নার মতো মানুষদের পক্ষে এখানে তাই আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকছে না। টলস্টয়ের এ উপন্যাসে আসন্ন বিপ্লবের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। রেলগাড়ির নীচে পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া আন্নার সুশ্রী দেহটি যেন বলে দিচ্ছে, ওই রাষ্ট্র ও সমাজ মানুষের স্বপ্নগুলোকে ওইভাবেই কেটে টুকরো টুকরো করবে, যদি বিপরীত কিছু না ঘটে।

এক অর্থে টলস্টয় রক্ষণশীল। তিনি রক্তপাত পছন্দ করতেন না, রাষ্ট্রবিপ্লবও নয়; কিন্তু তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে রুশ বিপ্লবকে তিনি এগিয়ে আনছিলেন; বিদ্যমান রাষ্ট্রের অন্তঃসারশূন্যতা ও নিষ্ঠুরতাকে উন্মোচিত করে দিয়ে। তাঁর পক্ষে এটা করাই স্বাভাবিক ছিল; হৃদয় দিয়ে বুঝেছেন এবং অন্যের হৃদয়ে সেই বুঝটাকে সংক্রমিত করে দিয়েছেন।

আন্না কারেনিনার পরের উপন্যাস পুনরুজ্জীবন। এতে রাষ্ট্রের মুখচ্ছবি আরো প্রত্যক্ষ। কাটিউসা মাসলোভা একজন নিরপরাধ গরীব কিশোরী। সামন্ত পরিবারের যুবক নেখলিউদভ তাকে নষ্ট করলো। মাসলোভার সন্তান হবে, কিন্তু সন্তানের পিতা নেখলিউদভ তখন অনেক দূরে। সে তখন সেনাবাহিনীর নবীন অফিসার। জীবিকার জন্য মাসলোভা কাজ করে, দেহ বিক্রয় করে, জেলও খাটে। সবই ঘটে বাঁচার চেষ্টায়। আসামী হিসেবে আদালতে এসেছে মাসলোভা। অদৃষ্টের কী কৌতুকবোধ, তার বিচারে জুরিদের একজন হয়ে বসে আছে নেখলিউদভ স্বয়ং। নেখলিউদভ চিনেছে ওই মেয়েকে। তার ভেতরে পাপের বোধ জেগেছে। সে চাইলো মাসলোভাবে রক্ষা করবে; কিন্তু পারলো না। বিচারে জেল এবং নির্বাসন হয়েছিল মাসলোভার। জেলটা মওকুফ করালো নেখলিউদভ, আমলাদের কছে দেনদরবর করে; কিন্তু নির্বাসন বলবৎ রইলো।

মাসলোভা চলেছে সাইরেরিয়ায়। নেখলিউদভ চলেছে পিছু পিছু। তার পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। সে প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। সে মাফ চাইবে। মাসলোভা যদি রাজি হয় তাহলে তাকে বিয়ে করবে। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটা নেখলিউদভ করতে পারলো মাসলোভার কাছে, সাইবেরিয়ায় গিয়ে। আশা করেছিল মাসলোভা কালবিলম্ব করবে না, সম্মত হতে। কিন্তু মাসলোভা ওই প্রস্তাবে সম্মত নয়। তার প্রত্যাখানটা খুবই দৃঢ়। সে বললো, বুঝেছি সেবার আমার দেহটা ব্যবহার করেছো, এবার ব্যবহার করতে চাইছো আমার আত্মটাকে। না, তা হবে না।

আসলে মাসলোভারও পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। সেও আর আগে সেই পথহারা মেয়েটি নেই। পথের সন্ধান পেয়ে গেছে সে। সাইবেরিয়ায় তার সহবন্দীদের মধ্যে কয়েকজন ছিল রাজবন্দী। ওরা অন্য ধরনের মানুষ। এরা সংযমী, মেধাবী, এরা বই পড়ে। একজনের থলের ভেতর দেখা যায় মার্কসের পুঁজি বইটি উকি দিচ্ছে। এদেরই একজন হচ্ছে সাইমনসন। তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে মাসলোভার। তারা ভালোবেসে ফেলেছে পরস্পরকে। তাদের বিয়ে হবে।

নেখলিউদভরা যতই যা করুক, তারা বন্দী বটে, রাষ্ট্রের বৃত্তের ভেতর তারা আবদ্ধ। ওই বৃত্তে কারোরই মুক্তি নেই, না নেখলিউদভের, না মাসলোভার, না সাইমনসনের। বিশেষভাবে পীড়িত হবে মাসলোভারা; একে তো নারী, তদুপরি দরিদ্র। নেখলিউদভ তাদেরকে ব্যবহার করবে নিজেদের বিশেষ প্রয়োজনে। মানুষের মুক্তির জন্য নতুন ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। যে ব্যবস্থার পক্ষে সাইমনসনেরা লড়ছে। বলা বাহুল্য, ওদের মধ্যেই লেনিন ছিলেন লুকিয়ে, যার সন্ধান টলস্টয় তখনো পান নি; পুনরুজ্জীবন উপন্যাসটি যখন তিনি লিখে শেষ করেন, ১৮৯৯ তে।

লেখক যদি রক্ষণশীলও হন তবু এটা নিশ্চয় করে বলে যাবে না যে, তাঁর লেখা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার পক্ষে যাবে। এক্ষেত্রে ব্যালজাকের (১৭৯৯-১৮৫০) কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে। ব্যলজাক রক্ষণশীল ছিলেন। কিন্তু মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতারা যথার্থই মনে করেন যে তাঁর লেখা সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী ধারাকে সাহায্য করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এমিল জোলা (১৮৪০-১৯১২) ব্যালজাকের তুলনায় অনেক বেশি প্রগতিশীল, কিন্তু এঙ্গেলস মন্তব্য করেছেন যে, একজন ব্যালজাকের যা মূল্য তা একশ’জন জোলা পরিশোধ করতে পারবে না। কেননা, ব্যালজাকের নিজের রাজনৈতিক মতবাদ যাই হোক না কেন তার সাহিত্যর বাস্তববাদিতা সামজের নিষ্ঠুরতা ও অন্তঃসারশূন্যতাকে ভীষণভাবে উন্মোচিত করে দিয়েছিল।

পাঁচ

সাহিত্য ছাড়া দর্শন তাও চলতে পারে, কিন্তু দর্শন না থাকলে সাহিত্য একেবারেই অচল। সাহিত্যের লক্ষ্য থাকে কালজয়ী হওয়া, এবং কালজয়ী হতে হলে তার দরকার দার্শনিক গভীরতা। নইলে সে হালকা হয়ে ভাসবে হয়তো, তবে ভেলার মতো নয়, শুকনো পাতার মতো; এবং ডুবে যাবে অল্পকাল পরে। দর্শনে কল্পনা থাকে, থাকে দার্শনিকের অনুভূতি; কিন্তু অতিরিক্ত যা থাকে সেটাই প্রধান, তা হলো জীবন ও জগতের ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যা আসে চিন্তার সঙ্গে কল্পনা ও অনুভূতির একত্রযাত্রায়।

একালে আমরা অনেক রকমের রচনা পাচ্ছি। কিন্তু অত্যন্ত উন্নত সাহিত্য পাওয়া যাচ্ছে না। তার বড় কারণ দর্শনে অনাগ্রহ। ঘটনাটা বিশ্বব্যাপী সত্য; বিশেষভাবে সত্য আমাদের দেশে। এমনিতেই আমাদের জ্ঞানের চর্চা সীমিত। ঠেলায় ধাক্কায় চলছে; তবে যা বিপজ্জনক তা হলো, দর্শনের বিষয়ে উৎসাহটা হ্রাস পাচ্ছে।

একটি অভিজ্ঞতার কথা দিয়ে শেষ করি। সম্প্রতি আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছি, নাম ‘দর্শনের সুখানুসন্ধান’। অন্তত দুজন বিজ্ঞ ব্যক্তি প্রবন্ধটির শিরোনামটি তাঁদের আকর্ষণ করে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু শিরোনামটি তাঁরা উভয়েই পড়েছেন অন্যভাবে; দর্শনের ‘সুখানুসন্ধান’ হিসেবে নয়, দর্শনের ‘সুখানুভূতি’ হিসেবে। সুখের সন্ধানকে সুখের অনুভূতি মনে করবার এই ব্যাপারটাকে আমার কাছে মোটেই বিস্ময়কর ঠেকে নি। ঝোঁকটা এখন অনুভূতির দিকেই, সন্ধানের দিকে নয়। জীবিকার, অর্থের, ক্ষমতার সন্ধান সবেগে চলছে; কিন্তু দার্শনিক অনুসন্ধান অপ্রচুর। বিপরীতে অনুভূতির জগৎটা বড় হচ্ছে, স্ফীত হচ্ছে। এই স্ফীতি সাহিত্যের জন্য মঙ্গলজনক নয়, সমাজের জন্যও মঙ্গলজনক নয়। আমরা কী করে এগুবো সাহিত্য ছাড়া, এবং সাহিত্য কী করে এগুবে দর্শনবিমুখ হলে?

আমরা সাহিত্য চাই; এবং সাহিত্য চায় দর্শন। সাহিত্য ছাড়া চলবে না, যেমন, সাহিত্যের পক্ষে চলা সম্ভব নয় দর্শনকে বাদ দিয়ে।

[উৎস : ‘সাহিত্যের চাহিদা’ শিরোনামে ঢাকা’র কালি ও কলম, ফাল্গুন ১৪২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত]

******************************************************

ইমানুল হক
সাহিত্যের দর্শন দর্শনের সাহিত্য
‘দর্শন’ শব্দের ১৮ টি অর্থ করেছেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় : বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধানে : ১. দ্রষ্টা, ২. দর্শয়িতা, প্রদর্শক, বোধক ৩. অবলোকন ৪. উপলব্ধি, বোধ, জ্ঞান ৫. বুদ্ধি ৬. সাক্ষাৎকার শক্তি ৭. সাক্ষাৎকার ৮. জ্ঞানমাত্র, দর্শনোপলব্ধি ৯. স্বপ্ন ১০. প্রকাশন ১১. সমীপে আনয়ন, হাজির করা ১২. অধ্যাত্মজ্ঞান সাধন শাস্ত্র ১৩. দৃষ্টিসাধন, নেত্র ১৪. শাস্ত্র ১৫. ধর্ম ১৬. যজ্ঞ ১৭. দর্পণ ১৮. রূপ (বঙ্গীয় শব্দকোষ, পৃ. ১০৮৮) এগুলি ছাড়াও সংসদ বাঙ্গালা অভিধান জানাচ্ছে : তত্ত্বজ্ঞান, যুক্তি ও প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্র বা তত্ত্ব। আসলে দর্শন মানে শুধু দেখা নয়, ভবিষ্যৎকে দেখা। যুক্তি, তত্ত্ব, সমাজ, অর্থনীতি, পরিবেশ, রাজনীতি, নি¤œবর্ণ, ধর্মশ্রেণি—সবকিছুকে মাথায় রেখে দেখা। তিনিই তো দার্শনিক যিনি ভবিষ্যৎকে দেখতে পান। আর সাহিত্য মানে যা সবার হিত সাধন করে। কিন্তুু সব সাহিত্য কি সবার হিতসাধন করে? না হিতসাধন লক্ষ্য? এই হিতসাধনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে—রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, ভূগোল, ধর্ম, পরিবেশ, যুক্তি, তর্ক ও জ্ঞান। কি লিখছি গুরুত্বপূর্ণ? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কেন লিখছি? সেই আদ্যিকালের প্রশ্ন : শিল্পের জন্য শিল্প, না জীবনের জন্য শিল্প? এইবার প্রশ্ন উঠবে কোন জীবন? কোন বাস্তবতা? যৌনতা কি বাস্তব নয়? পেট না তলপেট কোনটা মুখ্য হবে? ব্যক্তি না সমাজ? ব্যক্তি না সমষ্টি? সমষ্টি আবার কোন সমষ্টি? ১% ধনী ৩০% মধ্যবিত্ত, নাকি ৬৯% সুবিধাবঞ্চিত মানুষ? সাহিত্য কার জন্য লিখবেন? কিভাবে লিখবেন? সহানুভূতির জারক রসে ভোবানো তাঁর কলম! এখন কার প্রতি সহানুভুতি? তিনি শুধু মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস লিখবেন? টিন এজ মার্কা সুড়সুড়ি দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করবেন? বইমেলায় তাঁর নামে ভিড় জমে যাবে? বেস্টসেলার হবে? নাকি সময়, সমাজ, সমস্যা, সমাধান মূর্ত হবে তাঁর কলমে?

বিশশতকের শুরুতে তিনটি উপন্যাস দুনিয়াকে খুব প্রভাবিত করেছিল। এক. ম্যাক্সিম গোর্কির মাদার বা মা। দুই. জেমস জয়েসের ইউলিসিস। তিন. ন্যুট হ্যামসুনের হাঙ্গার। তিনজন লেখক, তিনভাবে দেখেছেন জীবনকে। তিনটেতেই সমস্যা আছে। কে কিভাবে সমস্যাটাকে দেখেছেন, তা নির্ভর করছে লেখকের জীবনদর্শনের ওপর। ব্যক্তিপ্রেম নয়, শ্রেণিপ্রেমে উদ্বুদ্ধ গোর্কি। তাই মার পাভেল এবং তার মা পেলাগেয়া নিলোভনা সমাজ বদলের, বিপ্লবের স্বপ্নে-সংগ্রামে নিজেদের বিসর্জন দেন। ইউলিসিসর মানুষটি খোঁজে তার হারানো সত্তা, হারানো প্রেম। হাঙ্গার-র নায়ক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সাথে লড়ে। কিন্তু সে লড়াই একক। শ্রেণি-বিপ্লব, সংগ্রাম সেখানে নেই। ব্যক্তির সমস্যা, ব্যক্তির প্রেম, ব্যক্তির কাম—তাঁর উপজীব্য।

আবার বালজাক রাজতন্ত্রী লেখক। কিন্তু তাঁর লেখায় রাজতন্ত্রের অন্তঃসারশূন্যতা। তলস্তয় ঈশ্বরবিশ্বাসী। কিন্তু তাঁর উপন্যাস সমাজ বাস্তবতায় ভরপুর। শুধু ঈশ্বর দিয়ে পরিবর্তন হবে না, বুঝতে পারেন পাঠক। এমিল জোলার রচনায় বাস্তবতা আমাদের শিকড়ের দিকে ফেরায়। বিশেষ করে জামিন্যাল। কিন্তু, তার সঙ্গে সলোকভের অ্যান্ড কোয়ায়েট ক্লোজ দ্যা ডনকে মেলানোর চেষ্টা ঠিক নয়। রাশিয়ার সোভিয়েত বিপ্লব, সেই বিপ্লবকে ঘিরে কয়েক সম্প্রদায়ে প্রতিক্রিয়া। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের ওঠাপড়া, সংগ্রাম অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে এই মহাকাব্যিক উপন্যাসে। আবার, মায়াকোভেস্কিও কবিতাও সোভিয়েত, সোভিয়েত বিপ্লব ও তার পরিপার্শ্ব নিয়ে। একদল মায়াভোস্কির দেখায় ভুল খোঁজেন। কিন্তু স্তালিন তাঁর পক্ষে দাঁড়ান। তবু আত্মহত্যা করেন মায়াকোভস্কি। মায়াকোভস্কি মার্কসবাদী। তাঁর সমালোচকদের দাবী তারাও মার্কসবাদী। তবু তীব্র সমালোচনা, ঈর্ষা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে গেল। শ্রেণি রাজনীতির ভবিষ্যৎবাদী দার্শনিক বিশ্ববিখ্যাত জার্মান নাট্যকার ব্রেখট্ লিখেছিলেন, সাহিত্যের প্রতিরূপ নির্মাণেই যথেষ্ট নয়, নাট্যকারের কাজ অন্তর্গত সত্যকে ফুটিয়ে তোলা। রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন—‘সাহিত্য শুধু লেখকের নহে যাহাদের জন্য রচিত তাহাদের পরিচয়ও বহন করে।’

এখন অনেকের ঝোঁক বস্তুর প্রতিরূপ নির্মাণে। অন্তর্গত সত্যে সত্য চলে যায়  আড়ালে। কিন্তু চাইলেই কি অন্তর্গত সত্যকে লেখক আড়াল করতে পারেন? বা পারবেন? গিরিশচন্দ্র ঘোষ যখন প্রফুল্ল লিখেছেন উঠে  আসছে আধাসামন্ততান্ত্রিক, আধাপুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পণ্যায়নের রূপ। ভাই ভাইকে ঠকাচ্ছে। ব্যক্তিগত আখের গোছাতে। বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে তীব্র সওয়াল আছে গিরিশ ঘোষের নাটকে। বেসরকারি ব্যাঙ্ক ফেল করে যাচ্ছে। যোগেশের ‘সাজানো বাগান শুকিয়ে যাচ্ছে’। চরম আর্থিক সংকটে পড়ে মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়ছেন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী যোগেশ। বলিদানে উঠে আসছে কন্যাপণ এর সমস্যা। বেসরকারী বিদ্যালয়গুলির অর্থগৃধœুতা, লোভ। কিন্তু, বর্তমানকালের নাটকে দুই বাংলাতেই কি এর বিরুদ্ধে স্বর আছে? বেসরকারীকরণ, কন্যাপণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবসা, সা¤্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পনের বিরুদ্ধে লড়াই ততোখানি প্রতিভাত যতখানি দাবি করছে সময়। কর্পোরেট আনুকূল্য, বিজ্ঞাপন গিলে খাচ্ছে বাংলা নাটকের শরীর। ব্যতিক্রম নেই তা নয়। কিন্তু, সত্যি কি সা¤্রাজ্যবাদী অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যতখানি সফলতা দাবি করছে সময় ও সমাজ—বাংলা সাহিত্য কি তার ধারে কাছে ঘেঁষছে? নাকি নিজেরাই আরেকটা প্রতিষ্ঠান হয়ে আরো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের তাঁবেদারীতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।

চলচ্চিত্র সবচেয়ে আধুনিকতম শিল্প। পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রে দায়বদ্ধতা শব্দটি ইদানিং অনুপস্থিত বললে কম বলা হয়। সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এবং গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু চক্রবর্তীরা যে সাহস, শক্তি ও দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁদের সামাজিক জীবনদর্শন থেকে তার কি দেখা মিলেছে? বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা ও জীবনকে ঘিরে তবু কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে—পশ্চিমবঙ্গে ইচ্ছা, মুক্তধারার দু-একটি ছবি বাদ দিয়ে দায়বদ্ধতার দর্শন অনুপস্থিত। সেখানে আছে প্রবলভাবে ভোগ এবং ভোগবাদ। কমিনিউজমকে প্রতিস্থাপিত করছে কনজিউমারিজম ও কমিউন্যালিজম। বিদ্বেষ এখন হাতিয়ার। তার বিরুদ্ধে দর্শনগত চিন্তাগত লড়াই কোথায়?

কর্পোরেট পুঁজির সামনে শিল্পসাহিত্য নতি স্বীকার করছে। নারী শরীর মর্দন, ¯ু’’ল দুটি বর্তুলাকার মাংসপি-, ব্যক্তিগত ঈর্ষা অসূয়া, দ্বেষ রিরংসা—সাহিত্যের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গণমানুষ সাহিত্যের কেন্দ্রে থাকছে না। মার্কেজকে নিয়ে প্রবন্ধে আদিখ্যেতা করছি, সেমিনারে লাফাচ্ছি বব ডলান নিয়ে—লেখার সময় মার্কেট নিয়ে চিন্তা। লোকে খাবে তো? বাজার—আবার কোন বাজারটা বড়? বাংলাদেশ না ভারত? ভারত না আমেরিকা? এইসব ভাবনাও চলে আসছে লেখকের প্রকৃত দর্শন চিন্তার অভাবে। ফলে মানুষের সাহিত্য খুবই কম রচিত হচ্ছে। ব্যক্তি, নায়ক বা নায়িকার বাইরে বের হতে পারছি কই?

উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক সাহিত্য চিন্তা আজো কুড়েকুড়ে খাচ্ছে। ত্রিকোণ বা চতুষ্কোণ শরীর, যৌনতা, রিরংসা, চাপা-ঈর্ষা, অসূয়াই হয়ে উঠছে সাহিত্যের বিষয়। এগুলো ঘটছে দর্শনের অভাবে। প্রচুর সংবাদপত্র, ফোনবুক, হোয়াটসঅ্যাপেও আজকাল সাহিত্যিকীয় ছড়াছড়ি। কিন্তু, কালজয়ী রচনা প্রায় নেই। যদিও লাইক আছে, কমেন্ট আছে, পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানি আছে, নিন্দা-মন্দও কম নেই—কিন্তু গণমানুষের, গণজীবনের, গণসংগ্রামের সাহিত্য কই? গণসংগ্রাম নেই, কিন্তু গণবিনোদন আছে। খেটে খাওয়া মানুষের দুর্দশা বাড়ছে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে জীবন হাঁসফাঁস। চাকরি নেই, বেকারত্ব তীব্র, আর্থিক মন্দা, ছাঁটাই, লে-অফ, লক-আউট—লেগেই আছে। ভারতে কৃষক আত্মহত্যা বাড়ছে, বাড়ছে সাম্প্রদায়িক হিংসা—নন-ইস্যু নিয়ে রাজনীতি। আসল ইস্যু এই উপমহাদেশে হারিয়ে যাচ্ছে। সংঘ, জামায়াত তালিবানরাই যেন নির্দেশ করছে সংবাদপত্রের প্রথম পাতা। সাহিত্যে কিন্তু তার প্রতিফল দেখি না।

শঙ্খ ঘোষ একবার বলেছিলেন, এখনও যিনি সবচেয়ে ভাল লিখছেন তাঁর নাম জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দ দাশের অপ্রকাশিত কবিতা প্রকাশ সম্পর্কে তাঁর এই মন্তব্য। আবার মোদ্দা কথা, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলা কবিতা গাড্ডায় পড়েছে। হাজার হাজার কবিতা ছাপা হচ্ছে—কিন্তু তাতে কোনও দিকনির্দেশ নেই। নানাবিধ হল্লা আছে, প্রকরণিক দক্ষতা ও নির্মাণ কৌশলের দেখানদারি আছে, কিন্তু দর্শন নেই। দর্শনহীন সাহিত্য সমাজকে অন্তঃসারশূন্য ভোগবাদী হতে আরো সাহায্য করছে।

বুর্জোয়া দর্শনে সৌন্দর্যচিন্তা খুব বড় করে দেখা হয়। ক্রিস্টোফার কডওয়েল ফার্দার স্টাডিজ ইন এ ডায়িং কালচার গ্রন্থে লিখেছেন—‘সৌন্দর্য হল বুর্জোয়ার একটা অবস্থা।’ হেগেলের পরে বুর্জোয়া দর্শনের যে অবক্ষয় দেখা যায়, প্রত্যক্ষবাদের (পজিটিভিজম) উত্থানের মধ্যেই তার প্রমাণ। বুর্জোয়ার কাছে সত্য হল প্রতিভাস (ফেনমেনন, বর্ণনার সুমিত পদ্ধতি, ইকনিমিক্যাল মেথড)। কার্যকারণতা হয়ে ওঠে প্রতিভাস সমন্ধে  চিন্তা করার জন্য বুর্জোয়ার কাছে একটা উপযোগী পন্থা। সৌন্দর্য বর্ণনার দিকে বুর্জোয়া সাহিত্যিকদের একটা প্রবল ঝোঁক আছে। আছে তীব্র রূপতৃষ্ণা। আমাদের দেশে বঙ্কিমের সাহিত্যে এই সৌন্দর্য বর্ণনা বা রূপতৃষ্ণা প্রবল।

সৌন্দর্য তৃষ্ণার হাত ধরে আসে আদিম প্রবৃত্তিকে উসকে দেওয়ার এক অবক্ষয়ী দর্শন। যাকে বুর্জোয়া, পাতি-বুর্জোয়া চিন্তক ও ধারক বাহকরা ‘সাহস’ বলে চিহ্নিত করতে চায়। যৌনতা, চুম্বন, সঙ্গম—এগুলি স¦াভাবিক জৈবিক প্রবণতা। কিন্তু, তা প্রকাশ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রকাশ্যে এসব করা যদি ভাল কাজ করা হত তাহলে কুকুর হতো শ্রেষ্ঠ সাহসী জীব। কুকুর বা সারমেয়বৃত্তিকে সাহসী হিসেবে চিহ্নিত করার এক সাহিত্যিক অবক্ষয়ী ভাবনা বা দর্শন এপার-ওপার দুপারেই প্রবল। বীনা দাস, মাতঙ্গিনী হাজরা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, জাহানারা ইমাম, ইলা মিত্ররা এদের চোখে ‘সাহসী’ নন। এরা নন ‘মডেল’। ‘সাহসী’ বা ‘মডেল’ তারাই যারা আদিম রিপুকে উত্তেজিত করবে, এমন পোশাকে যৌনাঙ্গ, ক্লিভেজ অথবা ইত্যাদি সম্পর্কিত অঙ্গগুলিকে আভাসিত, উদ্ভাসিত অথবা প্রদর্শন করেন। এবং সেইসব ঘটনার বর্ণনা চিত্রায়িত করেন আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। এতো ভয়ংকর ব্যাপার। আদিমতাকে আধুনিকতা বলে চালানোর অবক্ষয়ী চেষ্টা। পোশাকের মুক্তি নয়—চিন্তার মুক্তি; আধুনিক  মানুষ পোশাক পরে সভ্য হয়েছিল। পোশাকহীনতা বা স্বল্পতা মানসিক দারিদ্র্যের লক্ষণ। আধুনিকতা তো বাইরের বিষয় নয়, মন-মনন চিন্তন-ভাবন প্রক্রিয়ার অঙ্গ।

ধর্ম একটি দর্শন হিসেবে ৫০০০ বছর উপস্থিত। সাহিত্যের একটি বড় অংশ ধর্মীয় নৈতিকতার দর্শন দ্বারা সমাচ্ছন্ন। ইতিহাসের অচেতন অস্ত্র হিসেবে ধর্ম অজ্ঞাতে কাজ করে। সতীত্ব ইত্যাদির প্রশংসা তার প্রকাশক। ধর্ম কী? শুধুই আফিম? ধর্ম কি বেহেস্ত বা স্বর্গের সরণি? মার্ক্স ধর্ম প্রসঙ্গে গ্রন্থে লিখেছিলেন—‘(ধর্ম হল) একই সঙ্গে বাস্তব দুঃখকষ্টের একটা প্রকাশ এবং সেই বাস্তব দুঃখকষ্টের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ।’ মার্ক্সের একই সঙ্গে সংযোজনা : ‘ধর্ম জনগণের জন্য আফিম।’ লক্ষ্যণীয় জনগণের জন্য শব্দবন্ধটি। বিপন্ন নিরন্ন ক্ষুধার্ত সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ধর্মকে আঁকড়ে ধরে সান্ত¡না খোঁজে, তার দুঃখলাঘবের চেষ্টা করে। কিন্তু তা তো সবসময় সফল হয় না। খুব সৎ লোকের সঙ্গে দেখা তার হয় না। শিকার হয় ভ-, ভেকধারী প্রতারকের। কিন্তু ধর্মীয় নৈতিকতা সাহিত্যে প্রবলভাবে জড়িয়ে থাকে। পুরুষের আর্থিক সততা আর নারীর সতীত্বে সে কারণে জোর আরোপ। চামড়ার ঘর্ষণে যে চরিত্র নির্ভর করে না—তাই চরিত্রের প্রমাণ নয়—তাকে বোঝাবে? চরিত্র মানে বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী মানুষ। চরিত্রবান সেই যে চরম বিরুদ্ধতার মুখে দাঁড়িয়েও আপন বিবেক ও নীতিবোধে অচল অটল থাকতে পারে। আহার, যৌনতৃপ্তি, গর্ভধারণ—সেই সঙ্গে জৈবিক অন্য আবেগের মতোই ধর্মকেও একটা আবেগ হিসেবে কি চিহ্নিত করা যায়? এর পক্ষে বিপক্ষে দুটো মতই প্রবল।

তবে, ধর্মীয় নৈতিকতার দর্শন সাহিত্যকে যদি প্রভাবিত করে ফেলে তা বিপজ্জনক। একধরনের সাদা পোশাক শোকের প্রতীক, অন্যের কাছে বিবাহের চিহ্ন। কারো কাছে কালো অশুভ, কারো শুভ। তবে সব ধর্মেই নারীর শারীরিক সতীত্বে ঘোর জোর। কৌমার্যে প্রবল আসক্তি। ফলে আমাদের মহাদেশীয় সাহিত্যেও খুব ঢক্কানিনাদ।

বিজ্ঞানী এবং শিল্পীর দর্শন কি এক? বিজ্ঞানী এবং শিল্পী দুজনেই আবিষ্কারক। একজন খোঁজেন বস্তুকে আর একজন বস্তুর অন্তর্গত সত্যকে। মানুষের মন-মননকে; রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, ধমর্, পরিবেশের প্রেক্ষাপটে। ১৯১০ এর ফার্মির অনু সম্পর্কিত আবিষ্কার শুধু বিজ্ঞানের জগৎটাকেই পাল্টায়নি—পাল্টে দেয় সাহিত্যের আভ্যন্তরীণ চিন্তন প্রকরণকেও। জন্ম হয় চেতনা-প্রবাহরীতি বা স্ট্রিম অব কনসাসনেস এর সাহিত্যরীতিতত্ত্ব। জেমস জয়েস কেবল নন, বাংলার অন্যতম বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লেখেন চেতনা-প্রবাহরীতিতে। অন্তঃশীলা। আসলে মন-মানসিকতা, তার জটিলতা অন্বেষণে মানব সমাজ খুবই আগ্রহী। এর সঙ্গে থাকে অবদমিত যৌনচেতনা। সামাজিক পরিবর্তন, সমাজ কাঠামো বদলের সংগ্রামে যদি মানুষ নিয়োজিত না থাকে, যদি জনকল্যাণ, জনসেবা, সমাজহিতৈষণা প্রধান না হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, আত্মপরায়ণতা প্রধান হয়ে দেখা দেয়, তবে মনের জটিল গূঢ়ৈষা—আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।  সুখ-সন্ধানী মধ্যবিত্ত মানসে তাই চাপা যৌনতাকেন্দ্রিক রচনার প্রবল ও আত্যন্তিক আগ্রহ। জগদীশ গুপ্তের গল্পে তাই পাঠক মন আঁকুপাঁকু খায়। রন্্্্্জন রচনায় রবীন্দ্রজীবনের যৌনবিদূষণ খুঁজে বেড়ায় বুভুক্ষু মন নিয়ে। শরীর দেখানো, শরীর বর্ণনা ‘সাহসী’ বলে চিহ্নিত হয় । বেলেল্লাপনা, নির্লজ্জতাকে মনে হয় দারুণ কাজ। আসলে এটা দর্শনগত সমস্যা।

কেন বাঁচি, কার জন্য বাঁচি—কেন লিখি, কার জন্য, কাদের স্বার্থে লিখি? Ñএই উন্নতবোধ নেই অধিকাংশ লেখক-কবি-প্রাবন্ধিকের। বঙ্কিম সতর্ক করেছিলেন—‘কদাচ যশের জন্য লিখিবেন না’। আজকাল অধিকাংশ লেখা, পত্রিকা, সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যমের বিষয় তো আত্মপ্রচার, আত্মযশ এবং অপরের মুখ ম্লান করে দিয়ে তীব্র গোপন হিং¯্র উল্লাস উদ্যাপন।

কডওয়েল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, ইলিউশন এন্ড রিয়ালিটিতে লিখেছেন :

যে কোন বুর্জোয়া শিল্পী, যিনিই কালের প্রথাগুলিতে এক পুরুষব্যাপী সময়ের জন্যও আবদ্ধ থাকেন তিনিই হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠানধর্মী (অ্যাকাডেমিক) এবং তাঁর শিল্প হয়ে ওঠে নিষ্প্রাণ।

ইংরেজি কাব্যেও একই প্রবণতা বলে কডওয়েলের কঠোর মন্তব্য। বাংলা সাহিত্যেও প-িতি দেখানোর আড়ালে তাই ঘটছে। এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের নামে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও তার অন্তঃসারশূন্য স্বাধীনতার বাহ্যস্ফুরণ। ‘সামাজিক সম্পর্কহীন স্বাধীনতা যে আদৌ কোনও  স্বাধীনতাই নয়’ (কডওয়েল), এটা খেয়াল থাকে না বহু লেখক-সাংবাদিক শিল্পী ও অক্ষরকর্মীর। আত্মশ্লাঘা আছে, আত্মঅভিমান আছে, আত্মমর্যাদাবোধ নেই। তাই অনেকে মুখে বলেছেন বাংলাভাষা, বাংলাদেশ, ভাষা-জননীর কথা কিন্তু নিজের সন্তান সন্ততিকে তৈরি করছেন বিদেশে চাকরির দিকে তাকিয়ে।

বুর্জোয়া লেখকের স্বপ্ন—‘একজন মানুষ একাই জগতের সমস্ত প্রক্রিয়া সৃষ্টি করছে’ এই স্বপ্ন। সে ফাউস্ট, হ্যামলেট, রবিনসন ক্রুসো, স্যাটনন এবং প্রুফক; একাই সবকিছু (কডওয়েল)। বাজারের মাধ্যমে বৃহৎ পুঁজিপতি তার সঙ্গী পুঁজিপতিদের অবিরাম মজুরে পরিণত করে এবং আস্তে আস্তে তাকে বেতনভুক্ত কর্মচারীতে রূপান্তরিত করে। পুঁজিবাদের সেবা দাস বৃহৎ প্রতিষ্ঠানও এইভাবে লেখককে কিনে ফেলে, গিলে ফেলে, গ্রাস করে; লেখক তখন যশ, কীর্তি অর্থ ছাড়াও আপন প্রতিপত্তি বা প্রতিষ্ঠার জন্য লেখেন—বাজার কি খাবে ভেবে। তিনি ভাবেন, তিনিই এর ¯্রষ্টা। আসলে আধা সামন্ততান্ত্রিক আধা পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থাই তাঁর লেখার নিয়ামক।

কাব্যের জন্ম একসময় হয়েছিল যৌথ আবেগ এবং গোষ্ঠী উৎসবে। কডওয়েল জানাচ্ছেন—রিয়ালিটি এন্ড ইলিউশন এ এই আবেগের জন্মের আসল কারণ: ‘শত্রুকে দেখে মৃগযূথের মধ্যে ভীতি জাগার মত একটা অনপেক্ষ (আনকন্ডিশনাল)  সহজপ্রবৃত্তিগত ধরণের যৌথ আবেগ নয়, এ হল অর্থনৈতিক সংঘবদ্ধতার প্রয়োজনের দ্বারা সাপেক্ষীকৃত কোন উদ্দীপকের যৌথ আবেগ।’

ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী বুর্জোয়া কবির মধ্যে একটা স্ববিরোধীতাও থাকে। একদিকে তিনি নিজেকে ভাবতে থাকেন নিঃসঙ্গ ও একাকী, অন্যদিকে বিশাল শক্তিশালী। অপর কারও কারও মধ্যে কাজ করে একটা সামাজিক বোধও। যাঁদের মধ্যে এই সামাজিক বোধ বেশি, তাঁরা চলে যান সর্বহারা শ্রেণির পক্ষে। কমিউনিস্ট ইস্তেহার এ চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বিষয়টির।

সুতরাং পূর্ববর্তী যুগে যেমন অভিজাতদের একটি অংশ বুর্জোয়া শ্রেণির দিকে চলে গিয়েছিল, ঠিক তেমনই বুর্জোয়াদের একটি অংশ বিশেষত; বুর্জোয়া মতাদর্শীদের একটি অংশ এই ঐতিহাসিক গতিকে সামগ্রিক ও তত্ত্বগতভাবে  উপলব্ধি করার স্তরে নিজেদের যারা উন্নীত করেছে, তারা এখন যোগ দেয় শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে…। এইভাবে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিটাকে পরিত্যাগ করে সর্বহারা শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি তারা  গ্রহণ করে। যার মধ্যে গ্রহণ বর্জনের পালা সদা জাগ্রত থাকে তিনি কালজয়ী হন। সমাজের ৭০%এর দায় নেন। গরিব খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ তাঁর কাছে নিছক মধ্যবিত্ত ভাববিলাসের বস্তু নয়—সংগ্রামী নায়ক। কিন্তু লেখককেও তো পাতি বুর্জোয়া সমাজে বাঁচতে হয়। জীবিকা, জীবন, সম্মান, পরিতোষিক ও সাম্মানিক নিয়ে। তাই হাড্ডি খিজিররা সংখ্যায় তেমন বাড়ে না—তমিজের খোয়াব বদলে যায়। জমিলাকে সে মা ভাবে না—রমনযোগ্য নারীর মতো মনে হয় তাঁর—কারণ, লেখকের মধ্যবিত্ত মন। কৃষককে কৃষক হিসেবে বাঁচতে দিতে পারে না—চায় না। তার শুধু মধ্যবিত্তে উত্তরণ ঘটাতে চায়।

সিন্ডারেলা গল্পটির কথাই ধরা যাক। কীভাবে বদলে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের একটি কাহিনী। যার তৈরি জুতো  গিয়ে পড়ে এক মিশর রাজের কোলে। চামড়ার জুতোর অনুপম কাজে মুগ্ধ রাজা চান তার ¯্রষ্টাকে বিয়ে করতে। এই গল্পই চীনে একরকম। ইন্দোনেশিয়ায় আরেকরকম। ইংল্যান্ডের রূপ সামান্য হলেও ভিন্ন। এই গল্পটাই ফিরে আসে শেক্সপীয়রের নাটকে, কিং লিয়ারে; ট্রাজেডি হিসেবে। ডিকেন্সের ডেভিড কপারফিল্ডও যেন আরেক সিন্ডারেলার গল্প। গরিবের দুঃখের অবসানের একটা নৈতিক আগ্রহ আছে প্রায় সব গল্পেই।

সামন্ত সমাজে পুঁজিবাদী বা বুর্জোয়া শ্রেণির স্বাধীনতা মানে সামন্ত শাসনের অবসান। মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকরা এভাবেই ভেবেছেন। কিন্তু ভারত উপমহাদেশের সমস্যা এই, এখনও সামন্ততন্ত্র ও পুঁজিবাদ হাত ধরাধরি করে চলছে। স্বার্থগত, শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব নেই, তা নয়—কিন্তু সংস্কৃতির যে বিকশিত রূপ আমরা দেখছি—তা সামন্ত ও বুর্জোয়া  সংস্কৃতির সম্মিলিত, বিভ্রমময় রূপ। যে কোন যুগের জনগণের সংস্কৃতি আসলে শাসকের সংস্কৃতি। যদিও জনগণভাবে এটা আমাদের নিজস্ব। এই যে মায়া, এই যে বিভ্রম—এর ফলে  শিল্পী নিজেকে স্বাধীন ভাবেন। কিন্তু তিনি তো স্বাধীন নন—তার মাথায় অদৃশ্য শিকল। রাষ্ট্র, সমাজ, দল, ধর্ম, পরিবার, চাকরিদাতা, প্রশাসক, বিপণক—বাঁধা সবার কাছে কম কিংবা বেশি। এই শৃঙ্খল থেকে বের হওয়ার জন্য তীব্র আকুতিই শিল্পী ও ¯্রষ্টাকে জাগরুক রাখে। কখনও কখনও কোন নেশা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। নেশা, মদ, মদিরা ও যৌনতার মধ্যে তাকে আপাত মুক্তি খুঁজতে হয়। সঠিক দর্শনচিন্তাই তখন শিল্পী কিংবা ¯্রষ্টাকে সঠিক দিশা দেখাতে পারে।

শেক্সপিয়রর সমস্ত নায়ক যুবরাজোচিত, লিখেছেন কডওয়েল, এইকালে মানুষের আচরণের আদর্শ হল রাজকীয়তা। ‘ইংল্যান্ডে সামন্ততন্ত্রকে ভেঙে ফেলার প্রয়োজনে নিরঙ্কুশ রাজার শক্তি ও নির্মমতার দরকার ছিল’—তাই যুবরাজোচিত নির্মাণ শেক্সপিয়রের। মিল্টনকে প্রকৃত বিপ্লবী মনে হয়েছে কডওয়েলের। কারণ তিনি অন্তর দিয়ে বুঝেছিলেন আত্মিক তৃপ্তি অদ্ভূত পরাজয়ের তুলনায়… কবিতার পরিতৃপ্তিহীনতাতেই প্রমাণ।

ওয়ার্ডসওয়াথ এক বিপ্লবী আগুনে সেকা কবি। যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বমুখর ইংল্যান্ডে ও ফ্রান্সের মধ্যে বিপ্লবী ফ্রান্সের প্রতিই তার আগ্রহ। ফ্রান্সের বিপ্লবকে অভিনন্দিত করেছেন, মিলিটারি.. কবিতা লিখে প্রত্যাখ্যান করেছেন শিল্পবিপ্লবের ফলে উদ্ভূত অর্থগৃধœু সমাজ ও সংস্কৃতির প্রবণতাকে। টাকা টাকা টাকা এই বোধ থেকে—শ্রেণিবৈষম্যবৃদ্ধিকে মানতে পারছেন না—তার আশ্রয় হচ্ছে প্রকৃতি। ‘অ্যাঙ্কর অব মাই হাটর্’, ‘দ্য নার্স’, ‘দ্য গাইড’ বলে মনে হচ্ছে প্রকৃতিকে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ চেয়েছিলেন সেই প্রকৃতি শিল্পযুগের দ্বারা কলুষিত নয়, কিন্তু তিনিও তো বেঁচেছিলেন শিল্পবিপ্লবের ফলে উদ্ভুত উন্নয়নের সুফল নিয়ে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ স্বাভাবিক কথোপকথনের ভাষা বেশি পছন্দ করতেন। কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষার বদলে। মিল্টন চেয়েছিলেন পিউরিটান ‘আত্মা’, ওয়ার্ডসওয়ার্থ ‘সর্বেশ্বরবাদী’ প্রকৃতি।

কীটস প্রকৃতিতে ফিরে যেতে চাননি পুরোপুরি ওয়ার্ডসওয়থের মত। তিনি সবসময় পীড়িত হয়েছেন অর্থাভাবে, দারিদ্র্যে। তাঁর বিপ্লব বাস্তব থেকে পালানো। শেলি চেয়েছিলেন  সমস্ত মানবজাতির হয়ে বলতে। কিন্তু সমস্যা একটাই। সেটা হচ্ছে তাঁদের কাক্সিক্ষত বিপ্লবী শ্রেণির সমাজ ও সবর উপস্থিতি ও সক্রিয়তার অভাব। কডওয়ের চমৎকার লিখেছেন:

এযুগে বুর্জোয়া কবিদের অভিশাপ হল এটাই যে জগতের দুঃখকষ্ট, তাদের নিজেদের দুঃখকষ্ট সমেত, তাদের শান্তিতে থাকতে দেয় না, অথচ সেই কালের মেজাজ যে শ্রেণি সৃষ্টি করেছে সেই শ্রেণিকেই সমর্থন করতে বাধ্য করে।

এই সমস্যা তীব্রভাবে দেখি কবি র‌্যাঁবোর ক্ষেত্রে। গেরাউ দ্য নাইভলের মতো কোন কোন কবি ‘টাকা টাকা টাকা’—এই মনোভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু বিপ্লবী দল এবং বিপ্লবী মতাদর্শের  অভাবে বিদ্রোহেও সামিল হতে পারেন নি। ফরাসি কবি র‌্যাঁবো বুর্জোয়া ব্যবস্থাকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতেন। কবিতায় বহু বৈপ্লবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। কিন্তু কী হল তার শেষ পরিণতি? র‌্যালফ ফক্সের ভাষায় :

র‌্যাবো আবিসিনিয়াতে নিজেকে ন্বেচ্ছায় জীবন্ত কবরস্থ করেছেন। এক বর্বর মানব বিদ্বেষ নিয়ে তিনি মানবদেহ ও অস্ত্রাদির এবং আফ্রিকায় উৎপন্ন যাবতীয় দ্রব্যাদির এমন এক ব্যবসায়ে নেমেছেন যেগুলি বর্তমানে তারই ঘৃণার পাত্র বুর্জোয়ার লোভের বস্তু।’ (নেভেল অ্যান্ড দ্য পিপল; পৃ ৩৬)

র‌্যালফ ফক্স আরও লিখেছেন :

(চিত্রশিল্পী) গ্যঁগ্যা নির্বাসন নিয়েছেন তাহিতিতে, পলিনেশিয় আদিম সাম্যবাদীদের সংসর্গে থাকার জন্য। নিজের লতাপাতার ছাউনি তিনি সজ্জিত করেছেন মহান শিল্পকর্মে। ভ্যানগগ উন্মাদাগারে স্থান পেয়েছেন শেষ পর্যন্ত।

এমিল জোলা পেরেছিলেন যিনি কিছুটা বিশৃঙ্খলা হলেও একনিষ্ঠ প্রতিভাধর; পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন শ্রমিকশ্রেণির কাছে।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যয়, আমার মতে, বাংলার প্রথম মৌলিক উপন্যাস নির্মাতা, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নভেলের বাইরে যিনি বের হতে পেরেছিলেন সক্ষমভাবে। পথের পাঁচালীতে কোন খল নায়ক নেই, নেই ত্রিকোণ প্রেম সম্পর্ক, পথের পাঁচালী আসলে বাঙালি জীবনের শ্রেষ্ট নির্মাণ। বাঙালি জীবনকে খুঁজতে হলে পথের পাঁচালীতেই খুঁজতে হবে।

বিভূতিভূষণ পথের পাঁচালী লেখার কারণ হিসেবে জানিয়েছিলেন ‘বাংলা একদিন ফবধফ ষধহমঁধমব হইয়া যাবে, বাঙালি একদিন ফবধফ ৎধপব হইয়া যাইবে, অপু ইহাদের কথা লিখিয়া যাইবে।’ বিভূতিভূষণের মতে, সাহিত্যিকের জীবন ঐতিহাসিক ও সাংবাদিকের। আমাদের জীবনে মাও সেতুং কথিত উদ্দেশ্য আর ফলাফলের সমন্বয় ঘটাতে গেলে ঐতিহাসিক ও সাংবাদিক ভূমিকা নিতে হবে। আর মনে রাখতে হবে : ‘যেদিন থেকে মানুষজাতি শ্রেণি বিভক্ত হয়ে গেছে সেদিন থেকেই সর্বাত্মক ভালোবাসা বলে কিছু নেই।’ মাও সেতুং এটা বলে বলেছেন—‘বিশ্বজনীন ভালোবাসার প্রশংসা করে শাসকশ্রেণি। কিন্তু নিজেরাই তা বিশ্বাস করে না।’

আমাদের কালের সাহিত্যদর্শন হচ্ছে পক্ষ নিতে হবে। ১%, ৩০% অথবা ৬৯% এর পক্ষ। শোষিত, নির্যাতিত, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের পক্ষ  নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। নারীর বক্ষের একতল মাংসপি-ের, উরুর ভাঁজে লুক্কায়িত বদ্বীপ গহ্বরের, রূপালী শঙ্খের, মরাল গ্রীবার, এলোকেশী তন্দ্রার বন্দনা অনেক হয়েছে—এবার শ্রেণি সমাজ ও শৃঙ্খল ছেঁড়ার লড়াইয়ে সামিল হওয়া যাক। ইতিহাস না হলে ক্ষমা করবে না। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, আধা-সামন্তবাদী, আধা পুঁজিবাদী শোষণ ও শাসন ভোগবাদী দর্শনের শৃঙ্খল ছেঁড়াই আগামীর অক্ষরকর্মীর মহত্তম সাহিত্যিক দর্শন হোক। গোর্কির কথাকে উদ্ধৃত করেছেন র‌্যালফ ফক্স নভেল অ্যান্ড দ্য পিপল গ্রন্থে। গোর্কি লিখেছেন : ‘ভাষার মূল্যবান কোষাগার খুঁজে পাওয়া যাবে সাধারণ মানুষের কথার মধ্যে, জনসাধারণের লোকগাথা এবং কাহিনীর মধ্যে। এখানেই পাওয়া যাবে ভাষা ও সাহিত্যের মহত্তম সম্পদ।’

আমাদের কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের শুধু নিছক অভিধান নির্ভর হলে চলবে না; পুঁথিপত্রে মুখ ডুবিয়ে থাকলে হবে না—যেতে হবে প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকদের মধ্যে, যেতে হবে বস্তিতে, যেতে হবে মাঝি মল্লার আর নাবিকদের মাঝে।

তাদের সঙ্গে কাটাতে হবে জীবন। খেতে হবে তাদেরই খাবার। থাকতে হবে তাদের মতো করে; তাদেরই আস্তানায়। তবেই সৃষ্টি হবে মহত্তম সাহিত্যিক দর্শন ও নৈতিকতার নতুন মানদ-। গোর্কিরা এমনি এমনি তৈরি হননি। গুন্টার গ্রাস টানা দুবছর পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েছিলেন দরিদ্রতম মানুষের সঙ্গে।

আমাদের সমাজের, এই উপমহাদেশের প্রধান সমস্যা চারটি: সা¤্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ এবং এদের সম্মিলিত যোগফলের সহায়তাপুষ্ট ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা। ভারতে তার অতিরিক্ত সমস্যা জাতিবাদ ও অস্পৃশ্যতা। এখন মুশকিল হচ্ছে কাব্যে, উপন্যাসে, নাটকে, চলচ্চিত্রে এর বিরুদ্ধে বাংলা সাহিত্য নেই বললেই চলে। রেগে যাবেন জানি! কিন্তু খুব কম; প্রবন্ধে আছে। হিন্দি বা উর্দু—আমাদের পছন্দের ভাষা নয়; কিন্তু সেখানে এর বিরুদ্ধে লড়াই জাগ্রত।

আমাদের এ থেকে শিখতে হবে। শুধু গোরা আর লালসালুর নাম করে তর্কে জিতলে হবে না। রবীন্দ্র-নজরুলের সময় ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা এই উপমহাদেশে এতো তীব্র ছিল না—বুর্জোয়ারা অন্তত ধর্মের হাত সেভাবে ধরেনি। কিন্তু এখন টিভি, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, অন্তর্জালে নিয়ত সেই হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধবাদী অপশক্তির প্রচার।

এই সময়ে সুবিধাবঞ্চিত, স্বল্পবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে হবে খিদের ও ভালোবাসার কোন মানচিত্র নেই। পাখি, মেঘ, হাওয়ার ভিসা লাগে না, পার্সপোট লাগে না। কোন কাঁটাতার তাদের বাঁধতে পারে না। জলকেও অবাধ হতে দাও, মনকেও। মানবতা এবং মানবিক সত্তাকেও।

******************************************************

গৌতমগুহ রায়
সময়, সমাজ ও স্বরাজ :
ব্যক্তি লেখকের চৈতন্য ও সাহিত্যের দর্শন
আমাদের নিস্তরঙ্গ আধা-মফঃস্বল শহরের এক শীত সন্ধ্যার কবিতা আড্ডা হঠাৎ তর্কমুখর উষ্ণ ছোঁয়ায় জমে উঠলো। কবিতা দর্শনের চাপে নষ্ট হয়ে যায় এই কথায় কেউ কেউ জমিয়ে দিয়েছিলেন সেই সন্ধ্যা। ভাষামুক্তি, যুক্তিমুক্তি, ইমেজমুক্তি নিয়ে ইতিপূর্বে অনেক কবিতার আসর হাততালি মুখরিত হয়েছে, কিন্তু শেষ কথা হয়ে রয়ে গেছে ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়’। আসলে মূল জায়গাটা হলো চিন্তার স্বাধীনতা। যে কোনো রকম বিধিনিষেধ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আরোপিত হয়ে যখন সে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায় তখন সেই বন্ধন অনুভব করতে পারেন একজন সংবেদনশীল সৎ লেখক, তৎক্ষণাৎ যার ভেতর এর বিরোধী প্রতিক্রিয়া জন্ম নেয়। যে লেখকের ভেতর এই পর-নিয়ন্ত্রিত অবস্থার বিরুদ্ধে বিরোধিতা জন্মে না তিনি চলতি হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন নিজেকে, এদের অজান্তেই চারপাশে ক্রমশ জেগে ওঠে এক ধাতব খাঁচা। পরনিয়ন্ত্রিত এই চৌহর্দির মধ্যে বেঁচে থাকার রসদ মেলে কিন্তু মুক্তি থাকে না, সৃষ্টির উড়ান এখানে রুদ্ধ হয়ে যায়। এভাবেই চিহ্নিত হয় সৃষ্টিশীল লেখক সাহিত্যিক ও মনোরঞ্জনী সাহিত্যিকদের ব্যক্তিগত দর্শন। সৃষ্টিশীল সাহিত্যিকদের দর্শনটাই হয়ে ওঠে সময়-সাহিত্যের দর্শন। ব্যক্তি লেখক তাঁর লিখন কর্ম থেকে জীবনধারণের উপযোগী আর্থিক নিশ্চিন্ততা লাভের প্রশ্নে ভাবিত থাকবেন এটা স্বাভাবিক, কিন্তু যখন তাঁর চিন্তার স্বাধীনতার সঙ্গে এই যাপনের সংঘাত ঘটবে তখন এই ‘বেঁচে বর্তে থাকা’য় তাঁর ভূমিকা নির্ধারণ করবে তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন। চলমান সমাজ প্রবাহের অনুভব যদি ধারণে অক্ষম হন সৃষ্টিশীল লেখক, তবে তা তাঁর ব্যর্থতা, চিত্র ও চরিত্র রূপায়ণে বর্তমান সময়ের সঙ্গে, জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত অবস্থায় রোমান্টিকতার কুহুক সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু সেটা জীবন থেকে পালানোরই নামান্তর।

সময়ের দিকে পেছন ফিরে তাকালে আমরা কিছু উদাহরণ দেখতে পাবো। জার্মান সাহিত্যিক গ্যেটের ¯্রষ্টাজীবনকে দুভাগে ভাগ করা যায়, প্রথম জীবনে তাঁর তরুণ মন তৎকালীন ইউরোপের রোমান্টিক আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো দারুণভাবে, লিখেছিলেন ‘তরুণ বার্থারের দুঃখ’, কিন্তু এর প্রভাব জার্মান তারুণ্যের উপর সুখকর হয় নি। উপন্যাসের ঘটনাবৃত্ত এবং চরিত্র পাঠক্রম এমন গভীর হতাশার ও নৈরাজ্যের জন্ম দেয় যে জার্মান তরুণ পাঠকদের কাছে এই উপন্যাস পাঠের পর জীবনটাই অর্থহীন মনে হতে থাকে। গ্যেটে তাঁর সৃষ্টির এই ঋণাত্মক ভূমিকা উপলব্ধি করে নিজের সাহিত্য দর্শনকে একদম বিপ্রতীপে নিয়ে যান, গ্রহণ করেন ক্লাসিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি, লেখেন কালজয়ী ক্লাসিক কাব্যনাট্য ‘ফাউস্ট’। যেখানে উচ্চারিত হয়েছে জীবনের ধ্রুব সত্য, ডি ডি কোসাম্বির অনুবাদে, ‘ঙাবৎ ধষষ  Over all the peaks is peace, in all the tree-tops can’t thou discern hardly the stir of breath; the little bird fall silent in the woods, but wait, thou too shalt soon have thy rest’,  The final rest from the long journey of a whole lifetime.। বিশ্বসাহিত্যে আমরা এমন অনেক উদাহরণই পাবো যেখানে লেখকের দর্শন, তাঁর বিবেকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে সময়ের ও অভিজ্ঞতার নিরিখে পাল্টে গেছে।

আমাদের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ আইকন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এই কথাটি খাটে। রবীন্দ্রনাথ তার কৈশোরে বড়দাদা, সেজদাদা, পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ এবং ঠাকুর পরিবারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পরিচালিত হিন্দুমেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। হিন্দুমেলার আদর্শ বাস্তবায়নে তিনি কবিতা ও গান লিখেছিলেন, জ্যোতিদাদার নাটকের জন্য গান লিখেছিলেন। এখানে হিন্দুমেলার প্রেক্ষাপট ও দর্শনটা তুলে ধরা প্রয়োজন। হিন্দুমেলা প্রকাশ্যে হিন্দুত্ব ও হিন্দুজাতীয়তাবাদ জাগরণের মেলা। সেই মেলায় যে জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন বোনা হতো তা ছিলো সম্পূর্ণতই  হিন্দু-জাতীয়তাবাদ। মেলার সম্পাদক গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর মেলার দ্বিতীয় অধিবেশনে বলেছিলেন, ‘এই মেলার প্রথম উদ্দেশ্য বৎসরের শেষে হিন্দুজাতিকে একত্রিত করা। যত লোকের জনতা হয় ততই ইহা হিন্দুমেলা ও ইহা হিন্দুদিগের জনতা এই মনে হইয়া হৃদয় আনন্দিত ও স্বদেশানুরাগ বর্ধিত হইয়া থাকে’ (যোগেশচন্দ্র বাগাল, হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত)। এই মেলার সাফল্যে উৎসাহিত রাজনারায়ণ বসু ১৮৬৯-এ জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা তৈরি করেন এবং সেটা শুধুই হিন্দুদের জন্য, তাঁর উক্তির উল্লেখ করা যায়, ‘খ্রিস্টান ও মুসলমানদের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন একেবারে অবান্তর এবং তাদের বাদ দিলেও জাতীয় সভার মর্যাদা ক্ষুণœ হয় না।’ এই চেতনার সংকীর্ণতাই হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিষবৃক্ষ রোপনের প্রাথমিক কাজ করেছিলো। অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ যথার্থই বলেছেন যে হিন্দুমেলা কিংবা জাতীয় সভার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে বিপুল সাহিত্য রচিত হয়েছিলো তাতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের কেবল অবনতিই হয় নি, রীতিমতো স্থায়ীভাবে বিনষ্ট করেছিলো। ১৮৭৪-এ হিন্দুমেলার সাফল্যে উৎসাহিত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখে ফেললেন ‘পুরু-বিক্রম’ নাটকটি। সেখানে সরাসরি যবন বা মুসলমানের ‘নিপাত’ করার এবং ‘যবনের রক্তে ধরা হোক প্লাবমান’ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপর লেখেন ‘সরোজিনী’। মুসলিম বিদ্বেষ ও হিন্দুত্বের জয়গান গাওয়া সেই নাটকটির প্রুফ দেখেন বালক রবীন্দ্রনাথ। রাজপুতানীর আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়া নিয়ে জ্যোতিন্দ্রনাথের গদ্য রবীন্দ্রনাথের ভালো লাগে নি, তিনি তা পাল্টে লেখেন ‘জ্বল জ্বল চিতা! দ্বিগুণ দ্বিগুণ।’ একদিকে হিন্দুমেলা অন্যদিকে জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের হিন্দু বীর বিক্রমের স্তব। মুসলমান-বিরোধী পালা রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিলো। জীবনস্মৃতিতে তিনি হিন্দুমেলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কথা লিখেছেন। এই দর্শনের প্রভাবে ‘হিন্দুমেলার উপহার’ নামে একটি কবিতা হিন্দুমেলায় পড়েন তিনি, লেখেন যবন বিদ্বেষী ‘পৃত্থীরাজ পরাজয়’, পরবর্তীতে ‘রুদ্রচ-’ (১৮৮১)। যে সময়টা ছিলো তাঁর কথায় ‘মোটের উপর এই সময়টা আমার পক্ষে একটা উন্মাদনার’। এই রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিজ্ঞতায় ও আন্তর্জাতিক মননে নিজেকে উত্তরণ ঘটান কৈশরের বিদ্বেষের বিভ্রান্তি থেকে ঘুরে দাঁড়ান। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের জমিদারি দেখার দায়িত্ব পালনের সময় কৃষকদের দেখেন যারা ছিলেন অধিকাংশ মুসলমান, তাদের বিপন্নতা রবীন্দ্রনাথকে স্পর্শ করেছিলো। ‘সাহা’দের হাত থেকে ‘শেখ’দের বাঁচানোর কথা বলেছিলেন। ১৮৯১-তে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জাত-ধর্ম-কুলের অতিরিক্ত বাছবিচার উপশম করে প্রজাদের একাসনের ব্যবস্থা করেন। ‘সব আসন তুলে দিয়ে হিন্দু-মুসলমান-ব্রাহ্মণ-চ-াল সবাইকে একই ধরণের আসনে বসার ব্যবস্থা করতে হবে।’ ১৯৩৩ এর ১৬ ডিসেম্বর পয়গম্বর দিবসের উদ্যাপনের বার্তায় লেখেন ‘জগতের যে সামান্য কয়েকটি ধর্ম আছে ইসলাম ধর্ম তাদেরই অন্যতম, মহান এই ধর্মমতের অনুগামীদের দায়িত্ব তাই বিপুল। ইসলামপন্থীদের মনে রাখা দরকার, ধর্ম-বিশ্বাসের মহত্ত্ব আর গভীরতা যেন তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ওপর ছাপ রেখে যায়। আসলে এই দুভাগ দেশের অধিবাসী দুটি সম্প্রদায়ের বোঝাপড়া শুধু জাতীয় স্বার্থের  সপ্রতিভ উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না; ¯্রষ্টাদের বাণী নিঃসৃত শাশ্বত প্রেরণার ওপরও তার নির্ভরতা, সত্য ও শাশ্বতকে যাঁরা জেনেছেন ও জানিয়েছেন, তাঁরা ঈশ্বরের ভালোবাসার পাত্র। এবং মানুষকেও তাঁরা ভালোবেসে এসেছেন।’ ১৯৩৪ এ ফতেয়াদহম উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘ইসলাম পৃথিবীর মহত্তম ধর্মের মধ্যে একটি। …আজকের এই পুণ্য অনুষ্ঠান উপলক্ষে মুসলিম ভাইদের আমার ভক্তি উপহার অর্পণ করে উৎপীড়িত ভারতবর্ষের জন্য তাঁর আশীর্বাদ ও সান্ত¡না কামনা করি।’ রবীন্দ্রনাথের সুদীর্ঘ জীবনের শেষ ২৫ বছরে মানব ইতিহাসের বেশ কিছু বিপর্যয় ঘটে। একদিকে দুই মহাযুদ্ধ এবং বিভিন্ন দেশে স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার উত্থান অন্যদিকে মানবচরিত্রের আত্মঘাতী প্রবণতা বিষয়ে বিস্তারিত জ্ঞান চিন্তাশীল মানুষের মনেও শুভনাস্তিক্যের ভাবকে প্রবল করে তোলে। রবীন্দ্রনাথ এই চিন্তা ও ঘটনার ¯্রােতের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। কবির মননে দুটি সম্পন্ন ঐতিহ্যের মিলন ঘটেছিলো। প্রথমটি ভারতীয় উপনিষদিক ঐতিহ্য, বিশ্বজগৎ কোনো কল্যাণময় উপস্থিতির বিভিন্ন প্রকাশমাত্র, অন্যটি রেনেসাঁস-উত্তর পশ্চিমের মানবতন্ত্রী ঐতিহ্য।

নির্ভীকতা ও সত্যবাদিতা লেখকের বৃত্তিগত যোগ্যতার প্রাথমিক শর্ত। এই শর্তে স্থির থাকাটা অনেক সময়ই লেখকের কাছে দুরূহ হয়ে ওঠে। প্রবল রাষ্ট্রযন্ত্র সমালোচনা সহ্য করে না, সত্যের পথে লেখককে প্রতিনিয়ত তাই আক্রমণ ও উৎপীড়নের সম্ভাবনার সঙ্গে যাপন করতে হয়। ‘তরুণদের বিদ্রোহ’তে শরৎচন্দ্র লিখেছেন : ‘সত্য-বাক্য সমাজের বিরুদ্ধে বলা যেমন কঠিন, রাজশক্তির বিরুদ্ধে বলা ততোধিক কঠিন। … ভাষা যেখানে দুর্বল শঙ্কিত, সত্য যেখানে মুখোশ না পরিয়া মুখ বাড়াইতে পারে না, যে রাজ্যে লেখকের দল এতবড় উঞ্ছবৃত্তি করতে বাধ্য হয়, সেদেশে রাজনীতি, ধর্মনীতি, সমাজনীতি সমস্তই যদি হাত ধরাধরি করিয়া কেবল নীচের দিকেই নামিতে থাকে তাহাতে আশ্চর্য হইবার কি আছে?’ লেখক তাঁর নিজস্ব দর্শনে স্থির থাকেন, তাঁর চিন্তার বা মননের স্বরাজের জন্য লড়েন তখন তাঁকে অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে যুঝতে হয়। আমাদের দেশে যেমন সা¤্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে আদর্শবান লেখকদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখেছি, ইউরোপ, আমেরিকা বা আফ্রিকাতেও সেই প্রতিবাদী ভূমিকায় লেখকেরা থেকেছেন। ফরাসি দেশের প্রকৃতিবাদী লেখক জোলা ‘উৎবুভঁপং অভভধরৎ’-এর চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়ানো এখনও বিশ্ব-শিল্প-সংস্কৃতির জগতের মূল্যবান স্মৃতির সম্পদ হয়ে রয়েছে। রুশ দেশের প্রণম্য লেখক টলস্টয় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে গ্রাহ্য না করে শুধু মাত্র ন্যায়ের পথে থাকতে স্বৈরতন্ত্রী জারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ‘দুখোবর’দের আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ও তাদের দেশত্যাগে সাহায্য করেছিলেন। জারতন্ত্রে রুশ কৃষকদের নিপীড়নের কথা তিনি তুলে ধরেন তাঁর লেখায়। দুই বিশ্বযুদ্ধের অর্ন্তবর্তী সময়ে, ত্রিশের দশকে যে সকল লেখক স্পেনের গৃহযুদ্ধে গণতন্ত্রীদের পক্ষে লড়াই করে যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মদান করেছিলেন তাঁদের স্মৃতি অমলিন থেকে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে ফ্রান্সকে রক্ষা করতে সে দেশের লেখকদের প্রতিরোধের গল্প আমরা জানি। সেই যুদ্ধের অন্যতম যোদ্ধা জাঁ পল সাঁত্রে পরবর্তীতে নবতিপর বৃদ্ধ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে মিলিত হয়ে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে মার্কিন নৃসংশতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পথে নামেন। কমিউনিস্ট বিরোধী শিবিরের মানুষ হিসেবে পরিচিত বার্ট্রান্ড রাসেল মানবতার চেতনায় মার্কিন বরবরতার বিরুদ্ধে সেদিন পথে নেমেছিলেন। যুদ্ধ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করার জন্য রোমা রোঁলাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় দেশবাসী উগ্র জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা নিগ্রহ করা হয়েছিলো। দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ড চলে গিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত এখানেই থাকেন। চিন্তার স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য এ ছিলো তাঁর স্বেচ্ছা নির্বাসন। এমন আনেক উদাহরণ আছে। জার্মানিতে নাৎসি উত্থানের সময় সে দেশের একাধিক প্রথম শ্রেণির শিল্পী, বিজ্ঞানী ও মনীষী দেশ ছেড়ে দেশান্তরে চলে যান। এজন্য তাঁদের বহু ক্লেশ সহ্য করতে হয়েছে কিন্তু হিটলারি একনায়কতন্ত্রের সামনে মাথা নামান নি। শাসকের চিন্তার দর্শনের সামনে স্বাধীনচিন্তার চর্চাকে সমর্পণ করেন নি। আইনস্টাইন, ফ্রয়েড, টমাস মান, হাইনরিখ মান, হারমান হেস এমন উদাহরণ। ইতালিতেও মুসোলিনির স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষের লেখক শিল্পীরা হয় কারারুদ্ধ হয়েছিলেন অথবা দেশ ছেড়ে ছিলেন। গ্রামচি, বেনদেত্ত ক্রোচে তাঁদের অন্যতম।

পশ্চিমী আলোকপ্রাপ্ত চেতনাই ব্যক্তির চিন্তার স্বরাজের মূল্যবোধের ধারক হয়ে ছড়িয়েছে সর্বত্র। ব্যক্তির মধ্যে যে মুক্তির স্পৃহা থাকে তার স্ফুরণ ছাড়া সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়, ব্যক্তির বিকাশই সর্বাধিক কল্যাণের উৎস। সব মানুষের অধিকার ও সম্মানের প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই সভ্যতা স্বীকৃত হয়, মানবতন্ত্রের এই মূল প্রত্যয়টি থেকেই মুক্তসাহিত্যের উন্মেষ। এই মানুষের স্বরাজ ও অন্ধ জাতীয়তার মধ্যে ফারাক রয়েছে। জাতীয়তাবোধে অন্ধ হয়ে অনেক সময়ই মননের স্বাধীনতাকে হত্যা করে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে উল্লেখ করা যায়।

‘ন্যাশনালিজম প্রবন্ধমালায় তিনি দেখিয়েছেন যে জাতীয়তা একদিকে মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার মনুষ্যত্বকে গ-িবদ্ধ করে, অন্যদিকে এক কাল্পনিক সমষ্টির হাতে ব্যক্তিকে বলি দিয়ে মানুষের সমস্ত সৃষ্টিশীল বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়। ‘..for the sake of humanity, we must stand up and give warning to all that Nationalism is a cruel epidemic of evil that is sweeping over the human world of the present age and esting into it’s moral vitality.’

জাতীয়তা মানববিরোধী হলে বিকল্প কি? ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে স্বীকার করা। মানুষের যথার্থ মুক্তি তার বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে তার মধ্যে সঙ্গতি সাধন। রবীন্দ্রনাথ সে সময় দাঁড়িয়ে অসমসাহসিকতায় এই কথা উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন যে, ‘জাতীয়তা এবং সভ্যতা পরস্পরের শত্রু’। তাঁর বিশ্বমানবতা ছিলো জাতীয় সমষ্টিবাদের আধুনিক সংস্করণ, ভিত্তি ছিলো স্বাধীনতা এবং সহযোগ। এই মুক্তবুদ্ধিকে কিন্তু সমকালের বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই স্বাগত জানান নি। কিন্তু এই বিরোধকে তিনি তোয়াক্কা করেন নি। এন্ডরুজ কে ১৯২০ এর ২৫ নভেম্বর এক চিঠিতে লিখলেন : আমাদের জায়গা করতে হবে মানুষের জন্য, যে মানুষ এ যুগের অতিথি; জাত যেন তার পথ আটকে না দাঁড়ায়। লেখকের নিজস্ব দর্শনের প্রতি বিশ্বাস শক্তির এক উদাহরণ।

বাংলা সাহিত্যের প্রথমদিককার চিন্তাশীল প্রবন্ধকার অক্ষয়কুমার দত্ত, মানুষের জীবন ও অস্তিত্ব বস্তুজগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তিনি যখন এই মুক্তচিন্তায় আধুনিক ভাবনার অনুশীলনের কথা বলেছেন তখনও আমাদের চিন্তাজগৎ আচ্ছন্ন করেছিলো সনাতনী জীবন ও জগত- বীক্ষায়। এই মরজগৎ অশুদ্ধ ও অপবিত্র, একে পবিত্র করে শুদ্ধ করে মানুষকে মোক্ষের পথে এগোতে হবে, এই চিন্তার স্থিতাবস্থায় দাঁড়িয়ে অক্ষয়কুমার দেখান যে বাহ্য জগৎ এর রীতি নিয়মকে যথাযথভাবে জানতে হবে। তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানুষকে বাঁচতে হবে। এই বাঁচা হবে মানুষের বুদ্ধি ও বিচার নিয়ন্ত্রিত। বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি প্রয়োগ করে মানুষকে বাহ্যজগৎ ও মানব প্রকৃতির মধ্যে সামঞ্জস্য করতে হয়। অধ্যাপক ভবতোষ দত্তের মতে, অক্ষয়কুমারের আগে এমন ভাবনা আমাদের সাহিত্যে দেখা যায় নি। অধ্যাত্ম-সুখের সন্ধান হয়েছে, কিন্তু মানব জীবনের সুখের সন্ধান হয় নি। এই চেতনা তিনি আহরণ করেছিলেন জর্জ কুম্বের বই থেকে।

চিন্তার মুক্তি, যাকে অম্লান দত্ত বলেছেন ‘মননের স্বরাজ’ তা কোনোদিনই সহজলভ্য ছিলো না। লেখক শিল্পী কলাকুশলীদের এই মননের স্বরাজ অর্জন নির্ভর করে তাঁর নিজস্ব দর্শনের ভিত্তির উপর। তিনিও সমাজবদ্ধ জীব, বহু সামাজিক বিধি ও দায় তাকে বহন করতে হয়, এই দায় মান্য না করলে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ‘বিচ্ছিন্নতা ক্লেশকর, এমনকি অনেকের পক্ষে অসহ্য। মান্যতাই সাধারণ ভাবে নিরাপদ পথ। সমাজের লিখিত ও অলিখিত বহু বিধানের বিচারশূন্য আজ্ঞাবহতাকে আর যাই বলা হোক না কেন মননের স্বরাজ বলা যাবে না।’ (অম্লান দত্ত)। লেখকের নিজস্ব দর্শন ঠিক করে দেবে তিনি কোন দিকে দাঁড়াবেন, একদিকে ঝুঁকিহীন নিরাপদ পথ, সমাজের স্বীকৃত বিধানের বিরোধিতা না করে সামাজিক ঐতিহ্যের আজ্ঞাবহ হওয়া। অন্যদিকে যারা মনে করেন সমাজের প্রচলিত ঐতিহ্যের রূপলাভ হয়েছে ক্ষমতাবানদের স্বার্থে। স্থিতাবস্থা সবসময় ক্ষমতার স্থায়িত্ব চায়, তাই স্থিতাবস্থায় বিরোধিতা না করলে ক্ষমতার পেশী নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা যাবে না। এই দুপক্ষের মাঝের বিভাজন রেখা অনেক প্রাচীনকাল থেকে বহমান, হয়তো চলবেও অনন্তকাল। যদিও বৃহত্তর অংশের সাহিত্যিক প্রচলিত বিধানের অনুগমনে অভ্যস্ত তবু কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ চিন্তার মুক্তি বা নিজস্ব উপলব্ধির মূল্যে আস্থা রেখে চলতি ¯্রােতের প্রতিকূলতায় দাঁড়াতে ভয় পান না। এদের মৌল প্রত্যয় চেতনার এক গভীরতর অন্তঃস্তলে প্রোথিত। তাঁর সৃজন-সাহিত্যের দর্শনও সেই শেকড়ের ভিত্তি থেকেই ক্রমশ বৃক্ষরূপ নেয়। এখানে স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ আসবে, ঐতিহ্য দীর্ঘ অতীতের গৌরব বহন করলেও চোখ বন্ধ করে তাকে অনুসরণ করার বিরোধিতা প্রগতিপন্থিরা করবেন এটাই স্বাভাবিক। ঐতিহ্যকে, তার মিথকল্পে হাতিয়ার করে সংস্কার বিরোধিরা আচ্ছন্নতায় ঢেকে রাখতে চান মানুষের চেতনাকে। বর্তমান উপমহাদেশেও ধর্মব্যাপারীরা এই কুহকের জালে বেঁধে ফেলতে চাইছে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতাকেও। আসল কথা মননের স্বরাজ কখনো চায় না যুক্তিহীন সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করতে। যুক্তির দ্বারা পরীক্ষিত না হলে কোনো প্রত্যয় আধুনিক মানুষের মননে প্রবেশাধিকার পায় না। আধুনিক মনন বলতে কেউ কেউ পশ্চিমী চিন্তাভাবনার প্রতি নিবেদিত মানুষদের চিহ্নিত করেন এবং এই চিন্তা-চেতনা স্বরাজের পথে প্রতিবন্ধক বলে উল্লেখ করেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে আমি বিশ্বাস করি না পশ্চিম মানেই প্রতিবন্ধক, দেশজ মানেই আত্মবিকাশের একমাত্র পথ।

আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে মুক্ত দেশগুলো তাদের অবদমিত অতীতকে চর্চায় এনে তার অনুশীলনের উপর গুরুত্ব শুরু করেন। তাদের সামনে ঔপনিবেশিক অবদমনকে ভুলে যাওয়ার আকাক্সক্ষা প্রধান হয়ে উঠেছিলো। চর্চায় আসে পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব বা ভাবনা। ‘ঔপনিবেশিক অতীতের রহস্যঘন বিস্মরণের বিরুদ্ধে এ হ’ল এক তাত্ত্বিক প্রতিরোধ’। শুরু হলো ঔপনিবেশিক মানুষদের বিষয়ী সত্তার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আত্মপরিচিতির অনুসন্ধান ও বহুমুখী বহুবিধ চর্চা। এর ফলে গোটা বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশ মানুষের অভিজ্ঞতা ও তাদের নব্যকৃষ্টির নবপাঠ প্রক্রিয়া সূচিত হলো, প্রধানত ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের ফলশ্রুতিতে বিবর্তিত ঐতিহ্যের পুনচর্চাও শুরু হলো। Post Colonial discourse analyzes how the historical fact of European colonialism continnes to shape the relationship between the west and the non-west after former colonies have won their independenceÕ

চিন্তাচর্চায় ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার আলোচনা প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, ঔপনিবেশিকতা প্রথম থাবা বসায় দখলিকৃত ভূখ-ের উপর, নিজস্ব উৎপাদনী ব্যবস্থা চূর্ণ করে তা করায়ত্ত করে এগোয় অধিকৃত অংশের জনতার আত্মতার বোধকে লুপ্ত করে। (ঊঢ়রংযবসড়ষরমঁপধষ বীঢ়ষড়রঃধঃরড়হ)… সমাজের অন্তর্কাঠামো দখল নিয়ে এগোয় উপরিকাঠামোর দখল স্থায়ী করতে, সে চায় স্থানীয় সংস্কৃতিকে তাঁদের ছাঁচে ফেলে মনন-চিন্তনের এমন এক পরিকাঠামোর খাঁচা তৈরি করা, যেখানে দেশজ ভাবনা নসাৎ হয়ে যাবে। আমাদের সাহিত্য দর্শনও এই ঔপনিবেশিক সংকট আক্রান্ত হয়ে এক দোলাচলে থেকেছে, যার পরিণাম আজকের সময়েও শেকড়ের অন্বেষণের আত্মসংকট ও বিপন্নতা। আমাদের এই উপমহাদেশীয় ভূখ-ের প্রতাপী প্রভুত্ব মুক্ত হয়ে, ঔপনিবেশিক সাঁড়াশি চাপমুক্ত হয়ে স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রিত অবস্থায় মুক্তির স্বাদ নেওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’ থেকে মুক্তি অত সহজ হলো কই? ঔপনিবেশিক প্রভুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে যে জাতীয়তাবাদ দানা বেঁধেছিলো মুক্তির স্বাদ তার বাঁধন আলগা করে দিলো। ‘আধিপত্য দেখার অভ্যাসটা আধিপত্য করার অভ্যাসে পরিণত হলো। ক্ষমতার রাজনীতিতে দেশের মধ্যেই অজ¯্র উপনিবেশ, উচ্চবর্গের উপনিবেশ নি¤œবর্গ, উচ্চবর্ণের উপনিবেশ নিম্নবর্ণ, প্রথম লিঙ্গের উপনিবেশ দ্বিতীয় লিঙ্গ। কায়েমি স্বার্থে ক্ষমতাবানরা সবাই লুটেরা। মানুষের মনের জমিতেও তাঁরা উপনিবিষ্ট।’ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা)।

আনুষ্ঠানিকভাবে ঔপনিবেশিতাবাদের অবসান যে আশাবাদের কথা বলে তাও অনেক প্রশ্নের সামনে চৌচির হয়ে যায়। কারণ, মননের গভীরে, অস্তিত্বের শেকড়ে, সংস্কৃতি-জীবন-চর্যায় ঔপনিবেশবাদ রয়ে যায়। পোস্টকলোনিয়ালিটির মধ্যে তাই রয়ে যায় এক অনিবার্য স্ববিরোধিতা, দ্বিচারিতা। একদিকে উত্তর-উপনিবেশিক বাস্তবতা ও পরিস্থিতি, বিপরীতে তার বহন করে চলা উপনিবেশিক ক্ষমতার অহংকার- তার মননে, যাপনে আবৃত, অগোচরে। জ্ঞান ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কলোনিয়াল হায়ারার্কি- দৃঢ় ঔপনিবেশিক স্তরবিন্যাস কাঠামো। গভীর থেকে গভীরতর এর বিস্তৃতি।

আজকের পোস্টকলোনিয়াল তত্ত্ব মূলত পাশ্চাত্যের ক্রিটিক অব মার্ডানিটি ঘরানার দ্বারা উদ্বুদ্ধ, তবে একথা একবারেই সত্য নয় যে এদেশে চর্চিত উত্তর-ঔপনিবেশিক চৈতন্য সার্বিকভাবে পাশ্চাত্য উৎস থেকে আরোহিত। এদেশের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রায় অচর্চিত বাঙালি দার্শনিক কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য ১৯২৮-৩০ নাগাদ তিনি হুগলীতে ছাত্রদের সভায় এক বক্তৃতায় যে কথা তুলে ধরেছিলেন তা পরবর্তীতে পোস্ট-কলোনিয়াল চর্চার সূচিকথন বলা যেতে পারে। সেই সময়টাকে মনে রাখবেন, যখন এডোয়ার্ড সোঈদ বা ফুকো-চর্চায় আসেন নি। কৃষ্ণচন্দ্র বলেছিলেন : ইদানিং আমরা স্বরাজ অথবা রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলে থাকি। মানুষের উপর মানুষের প্রাধান্য সব থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় রাজনীতির ক্ষেত্রে। চিন্তার রাজ্যে এক সংস্কৃতির উপর আর-এক সংস্কৃতির আধিপত্যের আরো সূক্ষ্ম এবং তার পরিণতি আরো ভয়াবহ। তার কারণ একে সচরাচর অনুভব করা যায় না। রাজনৈতিক পরাধীনতা বলতে বোঝায় মানুষের বহিরঙ্গ জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ, যদিও ধীরে ধীরে তা চেতনার অন্তর্লোকে অনুপ্রবেশ ঘটাতে চায়; তবু যখন এ সম্বন্ধে কেউ সজ্ঞান থাকে, তখন সেই সচেতনতাই এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকে। যতোদিন একটা কোনো নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ব্যক্তির সচেতনতা থাকে ততোদিন পর্যন্ত একে প্রতিরোধ করা অথবা একে এক অবশ্যম্ভাবী অশুভ বলে মেনে নেওয়া চলে এবং তার ফলে চেতনা ততক্ষণ তা থেকে মুক্ত থাকে না। যখন এই অনুভব করার ক্ষমতাটুকু চলে যায়, তখনই শুরু হয় দাসত্ব এবং তা আবার নিবিড়তর হয় যখন অশুভকেই শুভ বলে বরণ করা হয়। সাধারণত সাংস্কৃতিক আনুগত্য একটা অবচেতন ব্যাপার। গোড়া থেকেই এর মধ্যে এক ধরনের দাসত্ব নিহিত থাকে। সাংস্কৃতিক আনুগত্যের কথা বলতে গিয়ে আমি বহিরাগত সংস্কৃতির আত্তিকরণ সম্বন্ধে কিছু বলছি না। … সাংস্কৃতিক পরাধীনতা একমাত্র তখনই হয় যখন নিজের ঐতিহ্যগত ভাবধারা এবং সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো চাপা পড়ে যায় তুলনামূলক বিচার অথবা প্রতিযোগিতা ছাড়াই এবং একটা বিজাতীয় সংস্কৃতির নতুন পরিম-ল ব্যক্তিকে ভূতে পাওয়ার মতো পেয়ে বসে। এই পরাধীনতাই হল চেতনার দাসত্ব যা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মুক্ত হতে পারলে মনে হয় চোখের উপর থেকে একটা আবরণ যেন সরে গেল। তখন এক নবজন্মের অভিজ্ঞতা জাগে। তাকেই বলি মননের ক্ষেত্রে স্বরাজ।’ (কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য। মননে। পৃ; ৯)।

সাংস্কৃতিক আনুগত্য, দাসত্ব ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতা নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র সেদিন যে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কথা বলেছিলেন পরবর্তীতে গ্রামশি (ওফরড়ষড়মরপধষ যবমবড়সড়হু) সেই কথাই বলেন। আমাদের ন্যুব্জ মন অবদমিত হয়ে মেনে নেয় আমাদের সংস্কৃতিহীন, অধঃপতিত, নিকৃষ্টতর, প্রাগাধুনিক, রক্ষণশীল, সেকেলে, সংকীর্ণ ও অনগ্রসর। পাশ্চাত্যের সবকিছুই অগ্রসর আধুনিক। মিশেল ফুকোও এই পশ্চিমী আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের অদৃশ্য তন্ত্রজালের উল্লেখ করেছেন। এই তন্ত্রজাল আমাদের মননে খুব নিঃশব্দে তার জাল বিস্তার করে। আধুনিকতার ডিসকোর্স আমাদের মননে আমাদের অজ্ঞাতসারে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে, আমরা একে আধুনিকতা বলে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করি।

চিন্তাশীল মানুষ, একজন লেখক তাঁর নিজের বিচার ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিজস্ব কর্মপন্থা কি করে ঠিক করবে? এই জিজ্ঞাসার সামনে বারংবার ঠোক্কর খেয়েছে আধুনিক মনন। পাশ্চাত্য আধুনিকচর্চায় দেখা যাবে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে ১৭৮৪ তে ইমানুয়েল কান্ট একটি প্রবন্ধ লেখেন, ‘এলাইটেনমেন্ট’ বা আলোকপ্রাপ্তি। কান্টের মতে আলোকপ্রাপ্ত মানে সচেতন হয়ে অপরের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হওয়া, স্বনির্ভর হওয়া। যতক্ষণ সে স্বনির্ভর বা আলোকপ্রাপ্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ তার নিজের বিচারবুদ্ধি সক্রিয় হচ্ছে না ততক্ষণ সে অপরকে অভিভাবক হিসেবে মেনে নেয়, অপরের নির্দেশ মেনে চলে। জাগতিক ব্যাপারে কোনো কিছু নিজের মতো ব্যাখা করার প্রয়োজনীয়তা সে অনুভব করে না। সে মনে করে যে ‘ধর্মগ্রন্থে সব আছে’, নিজের থেকে ন্যায় অন্যায় বিচারের চেষ্টা সে করে না। ধর্মযাজক, পুরোহিত বা নিয়ন্ত্রক যে নির্দেশ দেন বিনা বাক্য ব্যয়ে তাই সে পালন করে। তার খাওয়া-দাওয়া, পরিধান, বচন সবই সেই প্রভুর আজ্ঞায় নির্ধারিত হয়। এই ধরনের মানুষই সংখ্যায় বেশি এবং সমাজের অভিভাবকেরা সেটাই চেয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমান যুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য যে মানুষ, বিশেষ করে সৃজনশীল মানুষ তার স্বনির্ভরতার প্রয়োজন অনুভব করে তার জন্য সক্রিয় হলেন, নাগরিক স্বাধীনতা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলো। কান্টের এই আলোচনাকে সামনে রেখে এই সময়ে দাঁড়িয়ে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (ডযধঃ রং ঊহষরমযঃবহসবহঃ) কান্টের আলোচনার নতুনত্ব কোন দিকটা সেটা তুলে ধরলেন, বললেন যে এই প্রথম একজন দার্শনিক তাঁর নিজের যুগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন, সমসাময়িক পরিবেশের ভেতর থেকে জ্ঞানচর্চার অনুকূল সামাজিক শর্তগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করলেন। ফুকোর এই মূল্যায়নকে মাথায় রেখে আমরা কান্টের ‘এনলাইটমেন্ট’- এর মূল দুটো বিষয়কে সামনে আনতে পারি, তিনি যুক্তির ব্যবহারের দুটি ক্ষেত্রকে পৃথক করে দিয়েছিলেন। একটিতে তিনি সর্বসাধারণের (পাবলিক) আলোচনায়, চিন্তায়, যুক্তি যেখানে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা বিশেষ কোনো সামাজিক অবস্থানকে পুষ্ট না করে, অন্যটি যুক্তির ব্যক্তিগত (প্রাইভেট) ব্যবহার, যা ব্যক্তিগত এবং বিশেষ স্বার্থ বা অবস্থানকেই আশ্রয় করে। প্রথমক্ষেত্রে চিন্তা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা মোটেই কাম্য নয়। উদাহরণ দিতে গিয়ে কান্ট বলেছেন যে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা নিয়ে অর্থনীতির প-িতেরা মতামত দিতেই পারেন, তাঁর সেই স্বাধীনতা আছে। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তিনি বলতে পারেন না যে আমি সরকারের রাজস্ব নীতির বিরোধী—তাই কর দেবো না। পরবর্তীকালে এই প্রাইভেট/পাবলিক মতবাদ খুব একটা গ্রহণীয় থাকে নি, তবে তাঁর অভিমতকে অস্বীকার করা যায় না- ব্যক্তি হিসেবে আমি কোনো বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনের অংশ মাত্র, সমাজযন্ত্রের একটি যন্ত্রাংশ মাত্র, সেখানে আমার কাজ এই স্বীকৃত নিয়মের বশবর্তী থাকা ও মেনে চলা। কিন্তু যুক্তি ও প্রয়োগের অন্য ক্ষেত্রটিতে ব্যক্তির ব্যক্তিগত অবস্থানগুলো দিয়ে আবদ্ধ নয়, যা মুক্ত ও সর্বজনীন সেটাই হলো স্বাধীন চিন্তা, জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা। ‘আলোকপ্রাপ্তি কাকে বলে?’ বলতে গিয়ে দুশো বছর বছর আগে কান্ট যা বলেছিলেন তা ছিলো বাক্স্বাধীনতা, চিন্তার মুক্তি, সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত যুক্তি নির্ভর আলোচনা ক্ষেত্র। এর কয়েক শতক পার হয়ে এসে উত্তরণ ‘আধুনিকতাবাদ’।

আধুনিকতাবাদ প্রথম সমাজ দর্শন যা সর্বস্তরের মানুষের চেতনাতেও স্বাতন্ত্র্য আর কর্তৃত্বের স্বপ্নজাল সৃষ্টি করে। আধুনিক সময়ে ক্ষমতা প্রয়োগের প্রক্রিয়াই এমন যে তা কোনো সার্বভৌম প্রভুর আজ্ঞা না হয়ে প্রতিটি ব্যক্তি-বিশেষের নিজস্ব যুক্তিপ্রসূত অনুশাসন হিসেবেই কাজ করে। এক সময় যে আধুনিকতা ভারতের পরাধীনতার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিলো যে এত ভারতবাসী আলোকপ্রাপ্ত হবে। সেই আধুনিকতার যুক্তিতেই একদিন আমরা শিখলাম সা¤্রাজ্যবাদ অন্যায়, স্বাধীনতা কাম্য।

সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার প্রভাবে প্রভাবিত হয় ¯্রষ্টার ব্যক্তিগত দর্শনও। নতুনভাবে ভাবা বা ভিন্নচর্চায় উৎসুক লেখক শিল্পীদের চিন্তার জগতকেও দেশ-কালের প্রবল ‘দর্শন’ এবং সমাজের ইতিহাসকে প্রভাবিত করে চালিত করে এই নিয়ন্ত্রক শক্তি। যেখানে অনেক সময়ই পরাভূত হয় ব্যক্তির ‘মননের স্বরাজ’। জাঁ পল সাঁত্রে তাঁর বিতর্কিত প্রবন্ধ ‘ÔMATERIALISM AND REVOLUTIONÕএ লিখেছেন, ‘এই ভাবে, তাদের চিন্তার জগতে শিকারী কুকুরের মত ঢুকে পড়া হয়, তাদের চিন্তা উৎসকে বিষিয়ে দেওয়া হয়। তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা দর্শনের প্রতি আনুগত্য দেখাতে তাদের বাধ্য করা হয়। এই দর্শন তারা ঘৃণা করে, তবুও নিয়মানুবর্তিতার জন্য একটা নীতিকে তাদের মেনে নিতে হয়, যে নীতি তারা বিশ্বাস করে না।’ সাঁত্রের মতে তাদের সাহায্য করার একটা রাস্তা হলো তাদের নিজেদের প্রশ্ন করা, জড়বাদ এবং বাস্তবতার উপকথা কি সত্যিই বিপ্লবের কারণের জন্য প্রয়োজনীয়?’

জড়বাদ প্রসঙ্গে আলোচনায় তিনি লিখেছেন, ‘কোঁন্তের শিষ্যরা বিনয়বশতঃ মানুষের জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। এর কারণ হলো একমাত্র তার মধ্যে যুক্তি কার্যকর হতে পারে। বিজ্ঞানের সফলতা তাদের কাছে একটা বাস্তব ঘটনা ছিলো, কিন্তু সেটা ছিলো মানবীয় বাস্তবতা, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এবং মানুষের জন্য বিজ্ঞান সফল, একথা সত্য। …বিজ্ঞান তার আলোচ্য বিষয়ের জন্য নীতি ও পদ্ধতির জন্য দ্বান্দ্বিকতার বিপরীত। বিজ্ঞান যখন বিভিন্ন শক্তির কথা বলে, যে শক্তিগুলি পদার্থের একটি বিন্দুতে প্রযুক্ত হয়, তখন তার প্রথম আগ্রহ হল তাদের স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করা। প্রত্যেকটি বিন্দু এমনভাবে কাজ করে, তা যেন নিত্যসঙ্গী। বিজ্ঞান যখন বিভিন্ন পদার্থের একের উপর অন্যের আকর্ষণ আলোচনা করে, তখন তা সতর্কভাবে আকর্ষণকে  বাইরের সম্বন্ধ বলে মনে করে, তাকে গতির দিক এবং বেগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয়। বিজ্ঞান কখনো কখনো সংশ্লেষণ।’ বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ যখন এলোই, এই উপমহাদেশের নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী পদার্থবিদ আবদুস সালাম এর একটি কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে তাজমহল ও সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল এ দুটোই স্থাপত্যকলার উজ্জ্বল নিদর্শন—একটি প্রাচ্যের অন্যটি প্রতীচ্যের। দুটি সৌধই প্রায় সমকালে নির্মিত এবং এদের দেখলে মনে হবে স্থাপত্যের ক্ষেত্রে উভয় সংস্কৃতিই তুলনীয় উৎকর্ষে পৌঁছেছিলো। কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে ইউরোপ বা ইংল্যান্ড পেয়েছিলো নিউটনকে, বিজ্ঞানচর্চার একটা জোয়ার এসেছিলো সে দেশসহ প্রায় গোটা ইউরোপ জুড়েই। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বিজ্ঞানের উন্মেষ শুধু রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতাই পেয়েছে এমন নয়, ব্যক্তিগতভাবে কিছু ধনবান অভিজাতও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। রয়্যাল সোসাইটি, ফ্রেঞ্চ আকাদেমী এবং অপর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একযোগে বিজ্ঞানের উন্নয়নে ব্রতী হয়েছিলেন। ভারতবর্ষে কিন্তু অনুরূপ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। উদার কলাসমূহের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন অনেকেই, কিন্তু বিজ্ঞানের বেলায় কোন পৃষ্ঠপোষক পাওয়া যায়নি। এই বিজ্ঞান সংস্কৃতিই বিকাশশীলতার দিক থেকে ভারত ও ইউরোপের মাঝখানে ভেদরেখা টেনে দিয়েছিলো।’

কবিতা প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু হয়েছিলো, শেষেও কবিতার কথাই বলছি। এই সময়টা মানুষের স্মৃতিকে চটকে দেওয়ার খেলায় মত্ত। স্মৃতিহীন স্বপ্নহীন এক গতিসর্বস্বতায় মানুষ। বেনিয়াবাদের ক্লেদে তার অতীত বলে যা কিছু, স্মৃতি বলে যা কিছু, তা থেকে মুক্তির জন্য বর্তমান সর্বস্বতার এক হাউই রকেট চেপে বসেছে উত্তর-আধুনিক এই সময়। স্বপ্ন থেকে পালিয়ে যেতে যেতে সে শুনছে কানে কানে কেউ কেউ বলছে, পেছনে তাকিয়ো না, পা পিছলে যাবে, তুমি হেরে যাবে। শুধু সামনেটা দেখো, শুধু এই সময়টা নিয়ে থাকো। বোধশূন্য সংবেদনহীন এই যন্ত্র-প্রজন্মকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে পারে সাহিত্য, কবিতা। জীবনানন্দর ভাষায় : কাব্যের আকাশের ওপারে স্বাদিত, অনাস্বাদিত নক্ষত্রের মতো সব খুঁজে পায় মানুষ, যে নিয়ন্ত্রণহীনতার সাধক, যে মাথা ঝাঁকিয়ে অপছন্দকে নসাৎ করে দিয়ে চলে যেতে পারে সেখানে, যেখানে স্বপ্নের দেশে ¯স্রোত বিনা, জল বিনা/ অগণ্য নৌকা ভাসে…।

******************************************************

অনিরুদ্ধ কাহালি
সাহিত্যে দর্শন দর্শনে সাহিত্য
ব্যক্তিগত একটি স্মৃতি দিয়ে শুরু করি। যদিও এই স্মৃতিতে বিষয়ের কোনো নতুনত্ব নেই, মনে রাখার মতোও কিছু নেই। কিন্তু এই শিরোনামের সঙ্গে মিল আছে বলেই অনেক বছর পরে মনে পড়ল ঘটনাটি। চাকরি জীবনের প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতির মৌখিক পরীক্ষায় সভাপতি মহোদয় আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখন কী করছ? বললাম পিএইচ.ডি.-এর কাজ করছি। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন পিএইচ.ডি. কী? উত্তর শুনে বললেন শিক্ষকতা কর সাহিত্য নিয়ে, গবেষণা করছ সাহিত্য-প্রসঙ্গে, এখানে দর্শনের সম্পর্ক কী? জবাব কী দিয়েছিলাম মনে নেই, তবে সভাপতি মহোদয়ের চেহারায় খুব একটা অখুশির ভাব দেখিনি। ঘটনাটার অবতারণার কারণ হয়তো এখন বোঝা যাচ্ছে। আরেকটু উল্লেখ করি, আমরা এখানে দর্শন ও সাহিত্য নিয়ে কথা বলব সত্য কিন্তু দর্শনের শিকড় আসলে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। জীবনের সর্বত্রই বলা যায়, অন্যভাবে বললে আমাদের জ্ঞানকা- বা বিদ্যাশৃঙ্খলা বা শিল্প ও শিল্পতত্ত্বের সবকিছুতেই দর্শনের আধিপত্যের কথা মেনে না নিয়ে উপায় নেই। আর সাহিত্য; যে-কোনো কিছুই হতে পারে সাহিত্যের উপকরণ।

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর দর্শন দিগ্দর্শন গ্রন্থের ভূমিকায় দর্শনের বিকাশ কাল চিহ্নিত করতে গিয়ে লিখেছেন : ‘দর্শনের সুবর্ণ যুগ ৭০০ খৃষ্টপূর্ব থেকে শুরু করে পরবর্তী তিন চার শতাব্দী পর্যন্ত ধরা যেতে পারে; এই সময়ের মধ্যে ভারতে উপনিষদ থেকে শুরু করে বুদ্ধ পর্যন্ত, ইউরোপে থালেস থেকে শুরু করে অ্যারিস্টটলের যুগ পর্যন্ত দর্শন বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যেও এই দুই দর্শনধারা আপসে মিলিত হয়ে সমগ্র বিশ্বেরই দর্শনধারার উৎসে পরিণত হয়েছিল, আর এই উভয় ধারার প্রতিনিধি হয়ে নব্য-প্লেটোনিক দর্শন যে কিভাবে নতুন প্রগতির পথ দেখিয়েছে…।’ বিকাশ পর্বের কিছুটা আগে দর্শনের উৎপত্তির সময়কে নির্দেশ করেছেন তিনি। এখানে ভারত-প্রসঙ্গ বিবেচনা করলে লক্ষ করা যায়, দর্শনের বিকাশের একটি অবলম্বন হিসেবে হয়তো মনীষী রাহুল সাংকৃত্যায়ন উপনিষদকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু আমরা যদি উপনিষদকে সাহিত্যের মাপকাঠিতে বিচার করি তাহলে? উপনিষদ নিঃসন্দেহে কাব্যসুষমাম-িত রচনা। সে সূত্রে বিবেচনা করলে জন্ম-বিকাশ-সূত্রেই দর্শন ও সাহিত্যের পারস্পরিক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়ে আছে।

কাছাকাছি সময়ের রচনা গীতা—শ্রীমদ্ভাগবদগীতা। জীবন-জগৎ সম্পর্কে গভীর অনুধ্যান-অভিজ্ঞান-দর্শন সমৃদ্ধ গ্রন্থ গীতা। মহাভারতের কাহিনিতে অর্জুনকে কৃষ্ণ জীবন সম্পর্কে যে উপদেশ প্রদান করেছিলেন তাই গীতা। কিন্তু গীতা কি ক্লাসিক সাহিত্যের সমপর্যায়ভুক্ত নয়? অন্যভাবে যদি দেখি, কালিদাসের মেঘদূতম। বিশ্বসাহিত্যেই যার স্থান। কিন্তু নারী-পুরুষ সম্পর্ক, প্রকৃতি ও জীবনের নিবিড়তা কিংবা অব্যক্ত অনুভূতি প্রসঙ্গে গভীর দার্শনিক বোধ প্রকাশ করে মেঘদূতম। তাহলে এই গ্রন্থের যে বিশ্ববিস্তারী গুরুত্ব তা-কি সাহিত্যের নিপুণ কলাকৌশলের জন্য, না-কি তার দর্শনিক উপলব্ধির জন্য—এমন প্রশ্ন করা যেতেই পারে।

এবার বাংলা সাহিত্যের কথায় আসি—আদিকালের শুরুতে চর্যাপদগুলো লেখা হচ্ছে কী কারণে? এখন পর্যন্ত গবেষকরা যা বলছেন তাতে বিশ্বাস করতেই হবে সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যে চর্যাপদ রচিত হয়নি। ধর্মদর্শন প্রকাশই পদকর্তাদের উদ্দেশ্য ছিল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহার তৃতীয় সংস্করণের (পুনর্মুদ্রণ : মাঘ ১৪১৯) ভূমিকায় পবিত্র সরকার জানাচ্ছেন, ‘চর্যাপদের লক্ষ খুব সরল,—নিজেদের দীক্ষিত গোষ্ঠীর মানুষদের এই উপধর্মের সুনির্দিষ্ট সাধনচর্যার সন্ধান দেওয়া, অন্যদের তার বাইরে রাখা।’ সে ধর্ম আসলে প্রান্তজনের ধর্ম। ফলে এ কথা বলা কি অযৌক্তিক হবে যে, চর্যাপদ আগে দর্শন তারপর সাহিত্য। তাহলে বাংলা সাহিত্য শুরু হচ্ছে দর্শনের সাহিত্য দিয়ে। জগত-জীবন আর কুশল শিল্পবিন্যাস সিদ্ধাচার্যদের দর্শনকে সাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত করল। চর্যাপদ ছিল দিকদর্শক। সেই পথেই বাংলা সাহিত্য চলল হাজার বছর। তবে চর্যাপদে দর্শন যত তীব্র—স্পষ্ট, অন্যগুলোতে হয়তো তত নয়—কোথাও প্রত্যক্ষ, কোথাও বা রূপক-প্রতীকের আড়ালে দর্শন লুকিয়ে থাকে। কেন চর্যাকাররা সাহিত্যের আশ্রয় নিলেন? এর কারণ সবারই জানা, ভারতবর্ষে ধর্মদর্শন কিংবা শাস্ত্রকথা ছন্দোবদ্ধ-গীত আকারেই রচিত হতো। মধ্যযুগে সুফি দর্শন, বৈষ্ণব দর্শনের আধিপত্য সর্বজনবিদিত। মধ্যযুগের সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বৈষ্ণব দর্শন বা তত্ত্ব সাহিত্যের মোড়কে পরিবেশিত হচ্ছে। একই কথা বলতে হবে সুফিদের প্রসঙ্গেও। দর্শনের মাহাত্ম্য সাহিত্যের আঙ্গিকে রূপ নিতে গিয়ে তা হয়ে উঠছে হৃদয়গ্রাহী। তখন তা বিশেষ ধর্ম বা দর্শনের গ-িকে অতিক্রম করে হয়ে উঠেছে সর্বজন আস্বাদ্য। যে কারণে, দেখা যায় বিশেষ ধর্ম বা দর্শনের অনুসারী না হয়েও সেই দর্শন ও সাহিত্যাঙ্গিক দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা সাহিত্যচর্চা করছেন। কী অসাধারণ কবি বৈষ্ণব পদকর্তারা, কিন্তু তাদের কবিতার অন্তর্নিহিত বক্তব্য তো শেষপর্যন্ত একটি দর্শনের কথাই বলে। এখানে উল্লেখ করতেই হবে বাউলদের গীতবাণীর কথা। নাথদের ধর্ম-দর্শন প্রকাশের মাধ্যমও সাহিত্য। নাথসাহিত্যই আমাদের এই ধর্ম-দর্শনের কথা জানিয়ে দেয়।

এবার মূল কথাটা একটু সরল করে বুঝে নিতে চাই, একপক্ষ সাহিত্যসৃষ্টি করতে গিয়ে দর্শনের সহায়তা নিচ্ছেন অথবা শিল্পীর অজ্ঞাতেই অবলীলায় তাঁর বোধ-বিশ্বাসের অংশ হিসেবে সাহিত্যে দর্শনের বা দর্শনের কোনো প্রত্যয়ের প্রকাশ ঘটছে। লেখকের দিক থেকে বিচার করলে, এখানে সাহিত্য মুখ্য আর দর্শন গৌণ। অন্যপক্ষ আসলে দর্শনচর্চা করছেন। জীবন-জগতের নানা প্রসঙ্গে তাঁদের বিশ্বাসকে ব্যক্ত করতে গিয়ে সাহিত্যের আশ্রয় নিচ্ছেন। অথবা তাঁরা যেভাবে তাঁদের দর্শনকে প্রকাশ করছেন—কৌশলগত চারুতার জন্যেই দর্শন তখন সাহিত্যে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ দর্শন ও সাহিত্যের একটা অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক রয়েছে। বোঝার কিছু ত্রুটি তৈরি হবার সম্ভাবনা এখানে তৈরি হতে পারে, বিষয়টি এমন নয় যে, সাহিত্য মানেই দর্শন-সংশ্লিষ্ট কিংবা সমৃদ্ধ। অথবা সব দার্শনিক গ্রন্থই উৎকৃষ্ট সাহিত্য। অবশ্য এখানে একটা মান বিচারের প্রসঙ্গ থাকে সব সাহিত্যই যেমন সাহিত্য নয় আবার সব দর্শনই অনুসরণীয় নয়।

বৈষ্ণব কবিতার কথা বিবেচনা করতে গেলেই মনে পড়তে পারে ওমর খৈয়ামের কথা। জীবনের প্রতি কী গভীর বিশ্বাস খৈয়ামের! কখনো কি মনে হয় খৈয়াম কোনো স্বাভাবিক মানুষ। কিন্তু কি অস্বাভাবিক তাঁর রুবাইগুলো। জীবন সম্পর্কে অনুভবের, জীবনের প্রতি দুর্মর আকর্ষণের কী অনবদ্য প্রকাশ। তাঁর সময়ে খৈয়াম একজন জ্ঞানী-প-িত মানুষ ছিলেন, বিরোধিতা ছিল কিন্তু সর্বজনমান্যতাও অর্জন করেছিলেন। একজন ধ্যানী মানুষের মত তিনি বলেছেন জীবন সম্পর্কে তাঁর দর্শনের কথা :

কাল কি হবে কেউ জানে না, দেখেছ ত, হায়, বন্ধু মোর!

নগদ মধু লুঠ করে লও, মোছ মোছ অশ্রুলোর।

কিংবা স্মরণ করা যেতে পারে :

কারুর প্রাণে দুখ দিও না, করো বরং হাজার পাপ,

পরের মনে শান্তি নাশি বাড়িও না তার মনস্তাপ।

অথবা,

ছেড়ে দে তুই নীরস বাজে দর্শন শাস্ত্রপাঠ,

তার চেয়ে তুই দর্শন কর প্রিয়ার বিনোদ বেণীর ঠাট;

জীবন সম্পর্কে উপলব্ধিই তাঁকে মাতাল করেছিল, মদ খেয়ে মাতাল তিনি হতেন কি-না তাতে সন্দেহ আছে অনেকের। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘ওমরের রুবাইয়াতের সবচেয়ে বড় জিনিস ওর প্রকাশের ভঙ্গি বা ঢং।’ জগৎ-জীবন বিষয়ে প্রগাঢ় উপলব্ধি প্রকাশের এই ‘ঢং’ই ওমর খৈয়ামকে উৎকৃষ্ট সাহিত্যিকের মর্যাদা দিয়েছে। জীবন সম্পর্কে এই বিশেষ বোধ দেশ-বিদেশের মানুষকে নানাভাবে আকৃষ্ট করছে। ফলে নানা ভাষাভাষী মানুষ তাঁর রুবাই অনুবাদ করছে। সঙ্গে তাঁর পরিবেশন রীতিকেও গ্রহণ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের মত মহান কবিও বিমোহিত হয়েছেন ওমর খৈয়ামের জীবনদর্শনে আর আর আকৃষ্ট হয়েছেন রুবাইগুলোর অন্তর্গত কাব্যসৌন্দর্যে।

বিল ময়ার্সের সঙ্গে মিথ সম্পর্কে জোসেফ ক্যাম্পবেলের কথোপকথনের গ্রন্থরূপ ঞযব চড়বিৎ ড়ভ গুঃয (মিথের শক্তি, অনুবাদক : খালিকুজ্জামান ইলিয়াস)-এ জীবন-পরিচালনা এবং জীবনের নানা অনুষঙ্গের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে মিথকেই সহায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ক্যাম্পবেল। তাঁর বক্তব্যে মনেই হয়ে আমরা মিথের রাজ্যেই বসবাস করি। মিথও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো দর্শনকে প্রকাশ করে। ফলে সেই বিবেচনায় আমরা আসলে দর্শনের জগতেই বসবাস করি। ফলে ব্যক্তিগত জীবন, সমষ্টি জীবন সর্বত্রই থাকে দর্শনের প্রভাব। প্রাজ্ঞ মানুষ তাঁর জীবনজিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে দর্শনের মুখোমুখি হন। তবে খুব বিস্তৃত করে ভাবলে প্রত্যেক মানুষেরই জীবন সম্পর্কে একটি ধারণা থাকে, থাকে উদ্দেশ্য—যা তাকে পরিচালনা করে। এইটি হতে পারে তার দর্শন। অন্য কেউ তা জানতে পারে, না-ও পারে; মানতে পারে না-ও পারে। দর্শনের একটা সর্ববিস্তারী প্রবণতা আছে এবং তা অবারিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত। তাই ব্যক্তিগত এবং সমষ্টি জীবন থেকে শুরু করে সর্বত্রই দর্শনের প্রতিফলন ঘটতে পারে। আর এই জীবন নিয়েই তো সাহিত্য।

বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ আরজ আলী মাতুব্বর। সাধারণ কৃষক কিন্তু জ্ঞানে, পঠন-পাঠনে আর জীবনাভিজ্ঞতায় ছিলেন অনন্য। ব্যক্তিগত জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর দুর্বহ বেদনা থেকে জীবন ও জগতকে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। অনেক কষ্ট স্বীকার করে স্বশিক্ষিত হয়েছেন। তাঁর মনে জন্ম নেয়া নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে লিখেছেন সত্যের সন্ধান ও সৃষ্টি-রহস্যের মত গ্রন্থ। বাঙালি পাঠকের চিন্তা ও বিশ্বাসের জগতে কুঠারাঘাত করল তাঁর এই সব গ্রন্থ। আরজ আলী মাতুব্বরকে আমরা সাহিত্যিক বলব—বললেও হয়তো বলা যায় কিন্তু তিনি দার্শনিক তো বটেই। যুক্তিবাদী দৃষ্টি দিয়ে তিনি পৃথিবীকে দেখেছেন, মানুষের অন্ধত্ব ঘোচানোর জন্য অবিরাম চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের প্রান্তবাসী মানুষ হয়েও দার্শনিক প্রজ্ঞায় শিক্ষিত, আত্মগর্বী মানুষের ভাবনার জগতকে তিনি নাড়া দিয়েছেন।

স্মরণ করতে হবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র চাঁদের অমাবস্যার কথা। এখানে পাশ্চাত্য অস্তিত্ববাদী দর্শন নিপুণভাবে রূপ নিয়েছে উপন্যাসে। এখানে যুবক শিক্ষক আরেফ আলী একটি ঘোরতর ঘটনার ব্যাপারে দ্বিধাসংশয় কাটিয়ে পরি¯্রুত মানসিকতায় উত্তীর্ণ হয়। ব্যক্তিগত প্রভূত ক্ষতির সম্ভাবনা সত্ত্বেও আত্মপীড়ন ও দোদুল্যমানতা থেকে আরেফ আলী মুক্তির প্রত্যাশা করে। দায়বোধ তাকে তাড়িত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে। শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাঁর এই সদর্থক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আরেফ আলী অস্তিত্ববান হয়ে ওঠে। কিন্তু কোন দায়বোধের তাড়না সে অনুভব করে, সেটা কি ব্যক্তিগত দায়বোধ না সামাজিক দায়বোধ? এটা এক ধরনের সামাজিক দায়। কারণ আমরা জানি, সংকটাপন্ন মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তখন সে সমাজের সকলের পক্ষ থেকে সকলের মঙ্গলার্থেই তা গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে আরো উল্লেখ করা যায় শ্রাবন্তী ভৌমিকের কথা; বুদ্ধিজীবীর নোটবই গ্রন্থে একজিস্টেনসিয়ালিজম প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, ‘একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত সমস্ত মানুষের পক্ষ থেকে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত। যা সে নিজের জীবনে ঘটায়, তা স্পর্শ করে অন্যের জীবনকেও। অন্য একজন যে-কাজ করে, সে দায়িত্বও বর্তায় তার ওপর। এইভাবে নৈরাশ্যময়তা কাটিয়ে ব্যক্তি-মানুষের সঙ্গে সমাজের ঐক্যের কথা বলেন সার্ত্র।’ আরেফ আলী যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা আসলে তার সামাজিক সত্তারই সিদ্ধান্ত। কারণ সে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামগ্রিক কল্যাণকেই প্রাধান্য দিয়েছে। অর্থাৎ অস্তিত্ববাদী দর্শনের নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে চাঁদের অমাবস্যায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ রচনাবলীর সম্পাদক সৈয়দ আকরম হোসেন জানিয়েছেন, ‘কামু-সার্ত্রের দর্শন স্বাভাবিকভাবে ওয়ালীউল্লাহ্কেও করেছিল প্রভাবিত। তাঁর এ-পর্বে রচিত উপন্যাস ‘চাঁদের অমাবস্যা’ (১৯৬৪) ও ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ (১৯৬৮) তে সমকালীন ফরাসি-দর্শনের এবং কামু-সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের প্রভাব লক্ষণীয়।’ কোপন নদীর ধারের ছোট্ট চাঁদপারা গাঁয়ের আরেফ আলীর জীবনের এক ভীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্যে অসাধারণভাবে প্রবেশ করছে বহির্বিশ্বের দর্শন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ যেমন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামজীবনের বাস্তবতার শিকড় ও স্পন্দনকে অনুভব করেছিলেন ঠিক একইভাবে আধুনিক ও প্রাজ্ঞ মানুষ হিসেবে অস্তিত্ববাদে আস্থা স্থাপন রেখেছিলেন। সৌভিক রেজা ‘চাঁদের অমাবস্যা : ভিন্ন-এক অবলোকন’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘এবং তিনি আর যা-ই হোক, ‘অস্তিত্ববাদ’-কে ‘ফ্যাশন’ হিসেবে গ্রহণ করেননি।’ ফলে উপন্যাসটি দর্শন ও সাহিত্যের যুগলবন্দিতে পরিণত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবি—মহাকবি কিন্তু তিনি কি দার্শনিক নন? এই প্রশ্নের ফয়সালা হয়েছে বহুকাল আগেই। এমন কবি বিশ্বসাহিত্যেই কম আছে যিনি প্রায় শুরু থেকেই কবিসত্তার সঙ্গে দর্শনকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। দিন যত গেছে, সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ একীভূত হয়ে উঠেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজস্ব দর্শনকে তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন শিল্পিত করেছেন, তেমনি আবার অন্য দর্শনকেও অবলীলায় সাহিত্যে ঠাঁই দিয়েছেন। তবে অবশ্যই তা নিজের মত করে। বের্গসঁর গতিতত্ত্বকে তিনি দার্শনিক ভিত্তি দিয়ে দেন তাঁর কাব্যে। বাউল দর্শনকে তাঁর গীতবাণীতে আনায়াসে ব্যবহার করেন তিনি। এমন অনেক উদাহরণই দেয়া যাবে তাঁর কাব্য ও গদ্যসাহিত্য থেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তিম দশ বছরের কাব্য নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। যেখানে তাঁর কবিতা কবিতাকে অতিক্রম করে অন্য এক উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছে—এখানে কবিতার কলা-কৌশলের চেয়ে সেই উপলব্ধিটাই বড় হয়ে উঠেছে। এই উপলব্ধিই স্পর্শ করে দর্শনিক বোধকে। তাই শেষ পর্যায়ের রবীন্দ্রনাথকে আমরা দার্শনিক হিসেবেও উপলব্ধি করি, কখনো কখনো ‘ঋষি’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেও উৎসাহি হই। আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে ‘অন্তিম পর্বের দুটি কবিতা’ আলোচনাংশে আবু সয়ীদ আইয়ুব বলেছেন, ‘বেদ-উপনিষদের, বাইবেলের, রুমির মস্নবীর, হাফিজের গজলের শ্রেষ্ঠ অংশ যেমন শুদ্ধ কবিতা হ’য়েও শুধু কবিতা নয়, রবীন্দ্রনাথের শেষ পর্বের রচনার শ্রেষ্ঠ ভাগও তেমনি কবিতার চেয়ে বেশি হ’য়েও কবিতার চেয়ে কম নয়।’ এখানে ‘শুদ্ধ কবিতা হ’য়েও শুধু কবিতা নয়’ কিংবা ‘কবিতার চেয়ে বেশি হ’য়েও কবিতার চেয়ে কম নয়’ এই দুটি বক্তব্য নিদের্শ করে যে, এই পর্বের কবিতা, কবিতা হয়েও অন্য কোনো দিগন্তকে স্পর্শ করে। তা আসলে কী বা কোথায় সেটি বুঝতে কষ্ট হয় না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মহত্তম কবি যেমন তেমনি দার্শনিকও বটে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞানকে আমাদের চেতনালোকে সঞ্চার করে রবীন্দ্রসাহিত্য।

কী দিয়ে সাহিত্য দেশ-কাল অতিক্রম করে? এমন কথা আমরা অহরহই ভাবি। বিশেষ করে উপন্যাসের শিল্পত্ব নিয়ে কথা বলার সময় এই প্রসঙ্গটি বারবারই ঘুরে ফিরে আসে। আমরা যখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি তখন বলি, উপন্যাসে জীবন সম্পর্কে কোনো মহাবাণী পরিবেশিত হয়, জীবনবেদ প্রচারিত হতে হয়, স্থান ও কালাতিক্রমী কোনো বক্তব্য থাকতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ উপন্যাসটির কাহিনি, চরিত্র ইত্যাদি নিংড়ে যা পাওয়া যায়, তা সব সময়ের সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য কি-না, তাই উপন্যাসটির তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধরা যাক হেমিংওয়ের ঞযব ঙষফ গধহ ধহফ ঃযব ঝবধ-এর কথা। গত শতাব্দীর মধ্য সময়ে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি সারা বিশ্বে এই উপন্যাসকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, কেন? এর উত্তর তো একই। উপন্যাস সম্পর্কে এই কথাগুলো আসলে কীসের ইঙ্গিত করে  তা অনুমান করতে আমাদের কষ্ট হয় না। ফলে সাহিত্যের ক্লাসিক মর্যাদা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দর্শনের ভূমিকার কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। দর্শনের ক্ষেত্রেও প্রায় একই কথা প্রযোজ্য। কারণ দর্শনও সাহিত্যাঙ্গিককে আশ্রয় করে জনমানুষের ভেতরে প্রবেশের অনায়াস সুযোগ করে নেয়। দর্শনের তাত্ত্বিক রূপ প্রাজ্ঞজনই অনুধাবনে সমর্থ হয় মাত্র। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দর্শনের নির্যাস সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরেই থেকে যায়। সাহিত্য সেই ঘাটতিটার অনেকাংশই পূরণ করে বলেই মনে হয়। অন্য দিকে কোনো দর্শনও কখনো কখনো দার্শনিকের উপস্থাপন কৌশলের কারণে সাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ থেকে আবু সয়ীদ আইয়ুবের আরেকটি মন্তব্য উদ্ধৃত করছি, ‘গদ্য দরকার পড়লে কাব্যধর্মী হয়ে ওঠে—যেমন উপনিষদে; প্লেটো আর বের্গসঁর দর্শনে; গিবন আর মম্সনের ইতিহাসে; তুর্গেনেব্, লরেন্স আর জয়েসের উপন্যাসে; মোপাসাঁ আর রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে।’ অর্থাৎ অনেক সময়ই দর্শনও সাহিত্যকে নিজের ঘরবাড়ি বানিয়ে নেয়। আসলে সাহিত্য ও দর্শনের সম্পর্ক যথেষ্ট নিবিড়, প্রায় অচ্ছেদ্য বললেও বোধ হয় খুব বেশি বলা হয় না।

******************************************************

খোরশেদ আলম
সাহিত্যে দর্শন, দর্শনে সাহিত্য
চিহ্ন থেকে এই শিরোনামের লেখাটি লিখতে অনুরুদ্ধ হয়েছিলাম। তবে বেশ খানিকটা ঝাঁকুনি খেয়েছিলাম এজন্য যে, দর্শন এক জটিল বিষয়। দার্শনিক রচনা সাহিত্য পদবাচ্য হতে পারে কিন্তু সাহিত্য দর্শন নয়। কেননা দর্শন বিশেষ শাস্ত্রের নাম স্বয়ং যা এক পদ্ধতি, কোনো পরিণতি নয়। সাহিত্য স্বয়ং সম্পূর্ণ, তার পরিণতি সে নিজেই। একথা সত্য—সাহিত্য ও দর্শন পরস্পর-বিরুদ্ধ নয় আবার নিকট-আত্মীয়ও নয়। অন্তত শাস্ত্রীয় বিবেচনায় উভয়ের মধ্যে পার্থক্য যথেষ্ট। জ্ঞানীজন বলেন, প্রত্যেক সাহিত্যকর্মেরই একটা দর্শন থাকে। আবার দর্শন হতে পারে দেখা বা ‘প্রত্যক্ষণ’। সে-অনুযায়ী লেখক একজন পর্যবেক্ষক। এ-নেহায়েৎ-ই শব্দার্থের জটিলতা। প্রথমত আমরা মেনে নিচ্ছি যে, দর্শন তথা দার্শনিক অনুভব সাহিত্যে অন্তস্থ-প্রবাহিনী। রবীন্দ্রনাথের মতে, প্রত্যেক মানুষই সৃজনশীল। সে-অর্থে মানুষ স্বভাবশিল্পী। আবার দার্শনিকরাও বলেন, জীবনের মৌলিক বিষয়ে প্রশ্ন তোলাও দার্শনিকতা। যেমন, কীভাবে পৃথিবীতে এলাম? কী হবে মৃত্যুতে? এই কী জবাবের রহস্য-কিনারা করতে না-পারা মানুষ প্রত্যেকেই ভাবুক, প্রত্যেকেই দার্শনিক। কিন্তু আধুনিকতা প্রত্যেকটি সাবজেক্ট-ম্যাটারের ওপর এক একটি লেবেল এঁটে দেয় তথা নামজারী করে। ফলে সৃজন-অনুভব-চিন্তন যে-প্রক্রিয়ায়ই হোক না কেন এর উত্তরাধুনিক অধ্যাত্ম মূল্য থাকলেও প্রত্যেকটি বিষয় আধুনিকভাবে আলাদা। যে-কারণে সাহিত্যের সঙ্গেও দর্শনের হাজারটা ঐক্য থাকার পরেও নীতিশাস্ত্রীয় অর্থেই তা স্বতন্ত্র। সর্ববাদী সম্মত সত্য কীনা জানি না, সাহিত্যের কাজ মোটেও ‘দার্শনিক সত্য’ প্রতিষ্ঠা করা নয়।

সাহিত্যে দর্শন চিন্তায় এখন সাহিত্যকে না-হয় জগত-জীবন কেন্দ্রীভূত কোনো অর্থবাচকতা তৈরির মাধ্যমে দার্শনিক চিন্তন-অভিজ্ঞায় সিক্ত করা গেল, দর্শনের সাহিত্যের কী গতিক? দর্শন যদি লেখকের পর্যক্ষেণ না হয় (শাব্দিক অর্থে) তাহলে ‘দর্শনের সাহিত্য’ বলতে দার্শনিক তত্ত্ব-উদ্ভূত সাহিত্যকর্মকে বুঝব কি? নাকি খোদ সাহিত্যে কোনো দার্শনশাস্ত্র সিদ্ধ দর্শন-উপচ্ছায়া পড়েছে তা বুঝব? বিষয়গুলোর গোলমাল থেকেই নানারকম চিন্তা-প্রক্রিয়া মাথা গ-োগোল করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। তবুও চিন্তার পরত খুলে অস্বচ্ছতা থেকে কিছুটা স্বচ্ছ দুনিয়ায় আসা যায় কীনা সে-ই অভিপ্রায় বর্তমান লেখকের। এরপরও যদি কোনো দায় থাকে তবে তা শিরোনামের।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের ধর্মকে বলেছিলেন, ‘দ্য রিলিজিয়ন অব আর্টিস্ট’ তথা শিল্পীর ধর্ম। সৌন্দর্যের সঙ্গে সত্য আবিষ্কার তাঁর আরেকটি শিল্পচৈতন্য। বলাবাহুল্য, এই সত্য একধরনের দার্শনিক অভিধা। শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, নজরুল-জীবনানন্দ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ-কীটস-কোলরিজ যে-কারো সাহিত্যে দার্শনিকতা থাকা সম্ভব। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘একদমই সম্ভব না বলার থেকে এটা বলা ভালো যে, দর্শন ছাড়া কখনোই মহৎ সাহিত্য সম্ভব না। সাহিত্যকে গভীর করতে হলে অবশ্যই সেখানে দর্শন থাকতে হবে। পৃথিবীর এমন কোনো মহৎ সাহিত্য নেই যেখানে দর্শন নেই।’ একথার সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ সীমিত। তবে তা লেখকের দিক থেকে, না পাঠকের দিক থেকেও, সেটাও পরিস্কার করার দায় থেকে যায়। কারণ রবীন্দ্রনাথ থেকে কোলরিজ যেই হোন না কেন লেখক-চৈতন্যের জায়গা থেকে প্রত্যেকেই দার্শনিক। হয়ত শাস্ত্রীয় দার্শনিক নন। কারণ দর্শনের সঙ্গে ইতোমধ্যে সাহিত্যের শাস্ত্রীয় ব্যবচ্ছেদটি ঘটে গেছে।

এখন এই শাস্ত্রীয় পার্থক্য রেখে অনুভব ও আদর্শিক অবস্থানে একজন লেখককে বিচার করাই সাহিত্যের দর্শন হতে পারে। আবার পাঠকের পক্ষ থেকে সেই সাহিত্যকে গ্রহণ করার টীকাভাষ্য রচয়িতার দ্বারস্থ পাঠককে মাত্রই সহজেই রাবীন্দ্রিক-নজরুলীয় কি জীবনানন্দীয় দর্শনকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয় না। যদিও উত্তরাধুনিক টেক্সট ও রিডিং-এর প্লুরাল অর্থ পাঠককে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখিন করতে পারে। সে-সবই সাহিত্য তৈরি বা সাহিত্য-আস্বাদের জন্য বাস্তব ঘটনা। যদিও এই বাস্তবতাটি কল্পনা-প্রসূত কখনো অভিজ্ঞতাজাত। কখনো তা কল্পনা ও অভিজ্ঞতা বা প্রত্যক্ষণের মিলিত প্রক্রিয়া। হাসান আজিজুল হক তাঁর সাহিত্যচিন্তা প্রকাশে বারবারই এই অভিজ্ঞতার কথা বলেন। এই অভিজ্ঞতা কখনো নিরেট কল্পনা থেকেও আসতে পারে। যেমন নি¤œবর্গের জীবন নিয়ে লেখা কোনো রচনায় পাঠক সরাসরি এই অভিজ্ঞতার শিকার হতে পারেন। আবার সৃজনশীল কল্পনার সঙ্গে নিজেকে সমীকৃত ভাবতে পারেন। এমনকি যে-নি¤œবর্গ নিয়ে সাহিত্যিক কথা বলছেন, সেই নি¤œবর্গই হয়তো ও-ভাবে জীবনকে দেখেনি যেভাবে সাহিত্যিক তাকে তুলে ধরেছেন। এমনকি পাঠকও ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার জালে তাকে বন্দি করছেন। এই বিষয়গুলো একান্তই মনস্তাত্ত্বিক, এক অর্থে দার্শনিক।

সাহিত্যের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ব্যক্তির ইন্দ্রিয়-অনুভূতির মধ্য দিয়ে চৈতন্যকে জাগিয়ে তোলা। সাহিত্য একধরনের সৃজন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়—সেকথা রবীন্দ্রনাথ না বললেও আমরা হয়ত সহজাত চিন্তার আলোকে বুঝতে পারতাম। ব্যক্তির সত্তা থেকেই তৈরি হয় একটি স্বাধীন চৈতন্য-জগৎ। নৈতিকতা এখানে সাহিত্যের শিল্প হিসেবে গৌণ। লেখক কতটা মনোজাগতিকভাবে পাঠকে অনুপ্রবেশ করতে পারছেন এবং কতটা পারঙ্গমতার সঙ্গে সেটাই শিল্প-প্রকৌশল বা সাহিত্যিক প্রক্রিয়া, এমনকি সাহিত্য হবারও ফল। এর সঙ্গে নীতিশাস্ত্রীয় নৈতিকতার দূরত্ব যত বৃদ্ধি পায় সাহিত্যের জন্য ততই মঙ্গল। এই নৈতিকতার সংজ্ঞার্থ নির্মিত হয় কোনো মতাদর্শিক পাটাতন থেকে। সাহিত্য এই বিষয়টির ঘোর বিরোধী। কারণ সাহিত্য বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে না। যে সাহিত্য যত বেশি শ্রেণিচ্যুতি ঘটাতে সক্ষম তা তত বেশি মহৎ। এ-প্রসঙ্গে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ কিংবা শহীদুল জহীরের সাহিত্য স্মরণ করা যেতে পারে।

রবীন্দ্র-অর্থে সত্য আবিষ্কার সাহিত্যের কাজ। আবার এই সত্য আবিষ্কার দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক যেভাবেই হোক না কেন সাহিত্যের সঙ্গে তার বিরোধ আছে। দ্য আর্ট অব নভেল নামক বইতে মিলান কুন্ডেরা ‘ডিজঅনেস্ট লিটারেচার’ বলে একটি টার্ম ব্যবহার করেছেন। প্রথমে মনে হতে পারে তিনি বোধ হয় সাহিত্যের কোনো নৈতিক মানদ- দাঁড় করাতে চান। কিন্তু তিনি আসলে সাহিত্যে একধরনের সত্য আবিষ্কারের কথা বলেন। এই সত্য কিন্তু দার্শনিক ‘সত্য’ না। এই সত্য নতুন কিছু আবিষ্কারের বিষয়। অক্টাভিও পাজ বলেন, ‘প্রত্যেক কবিরই জন্ম হয় নিজস্ব কিছু বলবার জন্য।’ এই নিজস্ব কিছু বলার মধ্য দিয়ে সে অক্টাভিও পরিভাষায় ‘রিফিউজাল অব এ্যানচেস্টর’ তথা পূর্বজদের অস্বীকার করে। এই অস্বীকার ঠিক অকৃতজ্ঞতা নয়, নতুন কিছু সৃষ্টি-প্রণোদনা। তাই বলে নতুন বোতলে পুরনো মদ পূর্তিও নয়, শৈলীগত কারণে বিশিষ্টতা-অর্জন।

কথাসাহিত্যের বেলায় বলতে হয়—কীভাবে জীবনকে সাহিত্যে ব্যবহার করতে হবে? হুবহু জীবনতে তুলে আনা সাংবাদিকতা, সাহিত্য নয়। আবার নিছক কল্পনা-রঙে ফানুস ওড়ানোও সাহিত্য নয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষ্যেই শোনা যাক—গল্পে কল্পনা ও বাস্তবতা নিয়ে তিনি যা বলেন, ‘আমার গল্পে বাস্তবের অভাব কখনো ঘটেনি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।’ গল্পগুচ্ছে সংকলিত গল্প-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতা-বর্ণন সে-বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাহিত্য-কথনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাঁর দ্বিমত হয়েছে, তবু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখেছিলেন, ‘পোস্ট মাস্টারটি আমার বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।’ উইলিয়াম ফকনারও একই কথা বলেন, ‘রোজ ফর এমিলি’ নামক গল্প সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য, ‘গল্পটা কল্পনা থেকে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা চারপাশে বিরাজমান। গল্পটা নতুন কোনো বাস্তবতার আবিষ্কারক নয়। তরুণিরা কাউকে ভালবাসার স্বপ্ন দেখে, সংসার চায়, সন্তান চায়—এটা মোটেও আমার আবিষ্কার না। তবে তার ট্রাজিক পরিণতি আমার তৈরি করা।’ বলাবাহুল্য এখানেই লেখকের শিল্প-প্রক্রিয়ার সফলতা। এভাবে গল্পটা পাঠকের হয়ে ওঠে।

দার্শনিক দেকার্ত বলেন, ‘আমাদের অন্তর্গত ধারণাসমূহ আমাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।’ দর্শনের এই অভিজ্ঞতা বা এক্সপেরিয়েন্সের সঙ্গে সাহিত্যের পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক দর্শনের ভিত্তি ‘রিজন’ আর সাহিত্যের ভিত্তি চৈতন্য। ‘এপিস্টমোলজি’ বা জ্ঞান অথবা জ্ঞানের ধারাবাহিক ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কচ্যুতি ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। ১৯৫৮ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি আমেরিকান ফিকশনের ক্লাসে ফকনার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমার মতে তুমি যাই অনুধাবন করতে পারো তা-ই অভিজ্ঞতা। এটা বই থেকেও আসতে পারে। এটা এমন বই এমন গল্প এবং এমন জীবন্ত যা তোমাকেও নাড়িয়ে দেয়।’ কাজেই সাহিত্যের দর্শনটা আলাদাই। কিন্তু দর্শন-শাস্ত্র সাহিত্য বা শিল্পকে তার শাস্ত্রীয় কাঠামোর আলোয় এনে বিচার করতে চেয়েছে বারবার।

ইমানুয়েল কান্ট, ফিকটে ও হেগেলের মতো বড় বড় দার্শনিক শিল্পকলা নিয়ে মতবাদ হাজির করেছেন। কান্টের নন্দন তাত্ত্বিক ধারণা—ক্রিটিক অব জাজমেন্ট নামক গ্রন্থে সৌন্দর্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা রুচি সংক্রান্ত যেসব অবধারণ করি সেগুলো সুন্দর ও অসুন্দরের পার্থক্য নির্দেশ করে। স্বরূপ বা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এসব অবধারণ যৌক্তিক বা বস্তুনিষ্ঠ নয়। এসব আমাদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে না। আবার কোনো কিছু সম্পর্কে আমরা যেসব নৈতিক বিচার করি সেগুলোর সঙ্গেও এদের কোনো সংশ্রব নেই।’  অবশ্য ‘শিল্পকলা ও শিল্পী’ নামক অন্য একটি অধ্যায়ে কান্টের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন ‘যথার্থ কলার সঙ্গে বিশেষ উদ্দেশ্যের কোনো যোগ নেই। কলার এই দিকটি সংরক্ষণ করাতেই শিল্পীর প্রতিভা নিহিত।’ (আমিনুল ইসলাম, আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন)

কান্টের মতো ফিকটেও মনে করেন, সুন্দর বস্তু ‘উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্যবাদী’। অপ্রত্যাশিত হয়েও শিল্প আমাদের বাসনা পূরণ করে। শৈল্পিক সৃজনশীলতা নিজের জন্য কোনো লক্ষ্যের ব্যবস্থা করে না; কিন্তু তা আকাক্সক্ষার স্বাধীন উদ্দেশ্যকে পূরণ করে। তবুও তাঁর মতবাদে শিল্পীর ব্যক্তিচরিত্র প্রাধান্য পায়। যে-শিল্পী সমাজ ব্যতিরেকে শুধুমাত্র নান্দনিক অনুভূতিতে পাড় মাতাল হয়ে আছেন তার সৃষ্টিকে তিনি নৈতিক সাহিত্য বলতে চাননি। অন্যদিকে হেগেল পুরো সাহিত্য-প্রক্রিয়াকেই ধর্মের প্রতিনয় ভাবতে চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে, ‘বিষয়ীর মাধ্যমে বিষয়ের স্বাধীন সৃষ্টির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে গিয়ে কলা শুধু পরমাত্মার ক্রিয়াপরতাই ইঙ্গিত দিয়ে থাকে।’ হেগেল তাঁর নন্দনশাস্ত্র ভাবনায় প্রাচ্য, ধ্রুপদী, খ্রিস্টীয়, রোমান, গথিক নানা শিল্পকলা ও কাব্যের কথা ব্যক্ত করেন। সুচিন্তিত নানা মতামত প্রকাশ করেও তিনি সাহিত্যকে শেষ পর্যন্ত একটি উদ্দেশ্যবাদী ধরন রূপেই বিবেচনা করেছেন। যে-কারণে রোমান্টিক শিল্প সম্পর্কে ‘পরমাত্মা’, ‘বিষয়গত চিদাত্মা’ ও ‘বিষয়ী চিদাত্মা’র ব্যর্থ-সমন্বয়ের কথা তিনি তুলে ধরেন।

আমাদের বিবেচনায় প্রকৃত সাহিত্য কোনো মতবাদের ধার ধারে না। ঔপন্যাসিক সুসান সোনট্যাগ সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘একজন সিরিয়াস লেখক নিজের ছাড়া কারো মুখপাত্র নন।’ (‘প্যারিস রিভিউ’)। মিলান কুন্ডেরার অবশ্য ভিন্ন মত, ‘ঔপন্যাসিক কারো মুখপাত্র নন। এমন নিজের ভাবনারও মুখপাত্র নন।’ (দ্য আর্ট অব নভেল)। বস্তুত রাইটিং একটি স্বনিয়ন্ত্রিত শক্তি অর্জন করে। এই নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় শিল্পীর বা লেখকের হাতেও থাকে না। তবে শিল্পীভেদে সাহিত্যকরন-প্রক্রিয়ার পার্থক্যও থাকতে পারে। এই একেকটি পার্থক্যও সৃজনশীলতার একেকটি মাত্রা। পৃথিবীতে বহু ধরনের লেখক থাকেন। যেমন: কারো কারো ক্ষেত্রে আখ্যানটা আগেই তৈরি থাকে কেবল তিনি তাকে শিল্পিত ভাষিক রূপ দান করেন। কারো ভাবনা-পথ কাহিনি ও চরিত্রকে আস্তে আস্তে তৈরি করে নেয়। বায়বীয় চরিত্রগুলো বাস্তবের চরিত্রের পথনির্দেশক হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা কাউন্ট লিয়েফ তলস্তয় প্রথম ধারার, হারুকি মুরাকামি দ্বিতীয় ধারার। কাফকার মতো লেখকরা কেবলমাত্র ঘটনার অবভাস তৈরি করে ছেড়ে দেন, বাদবাকি নির্মাণ পাঠকের।

অবক্ষয়ী আধুনিকতা বাদ দিলে পুরো ধ্রুপদী-রোমান্টিক আবহের মধ্যে সাহিত্যকে মহত্তম উচ্চমূল্যে ধারণ করা হয়েছে। উত্তরাধুনিকতা সাহিত্যকে পরম জ্ঞানে গ্রহণ-বর্জন দুটোই করেছে। আধুনিকতায় সাহিত্যিক হয়ে উঠছিলেন কখনো জ্ঞানের কা-ারি, কখনো বিশুষ্ক সমাজ-বিচারক। কিন্তু এই ধারণাও কালে বদলে গেল। উত্তরাধুনিক বহুবিস্তারী মিডিয়ার অপ্রতিরোধ্য দাপট সাহিত্যের মৃত্যু ঘটাতে তৎপর হয়ে উঠল। জাতির বিবেকী মুখপাত্র রূপে পরিগণিত ডিকেন্স, দস্তয়ভস্কি, তলস্তয়, পামুক ব্যাপক সংখ্যক সাহিত্যিক আর গোটাসমাজের বিবেকী মুখপাত্র নন। কেননা মিডিয়ার প্রবল প্রতাপে এরমধ্যেই হলিউড বলিউড আর ডিজনিল্যান্ডের  ভৌতিক পরিসর মানুষের মনোজগত কেড়ে নিল। বিখ্যাত লেখক হোসে ওর্তেগা, জার্মান ভাবুক ভাল্টার বেনিয়ামিন, কথাশিল্পী হিসেবে রোলাঁবার্থ, গোর ভিদাল, জন বার্থ প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ লেখক উপন্যাসের সম্ভাব্য মুত্যু নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। এ-অবস্থায় সাহিত্যকে নতুন মোড় নিয়ে দাঁড়াতেই হল। কর্লোস ফুয়েন্তেস এই নতুন প্রক্রিয়ার নাম দিলেন ‘সার্বজনীন মানবিক বৈশিষ্ট্য’। যে-বৈশিষ্ট্যে সাহিত্য নতুনরূপে দাঁড়িয়ে যায়। এখানে ব্যক্তি নিজ আলোয় সাহিত্যকে চিনে নেবে। সাহিত্য সেই আলোরই যোগানদাতা। ভাল-মন্দের প্রচলিত মানদ-ের পরিবর্তে ভাল বা মন্দের এসেন্সকে সাহিত্য তুলে ধরবে। সৌন্দর্য ও কদর্য বিষয়ের উপস্থাপনায়ও একই নীতি অনুসৃত হবে।

তবে আগেই বলে নিয়েছি যে, সাহিত্য কোনো নীতিশাস্ত্রীয় মানদ- দ্বারা বিচার্য নয়। কারণ সাহিত্য দর্শনের চেয়েও সরল ও জীবনমুখি। দর্শনের জ্ঞান, জ্ঞানের ইতিহাস ও যুক্তির সিঁড়িকে উপেক্ষা করে সাহিত্য তরতর করে মানুষের মনোগহনে প্রবেশ করে। আধুনিক থেকে উত্তরাধুনিক দর্শনশাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ক্রমশ মানুষের জীবনকে জটিল-ভাবনা পুঞ্জের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যেখান থেকে সাহিত্যের মুক্তি প্রায় অসম্ভব। চিন্তা ও চিন্তন-প্রক্রিয়ার নতুনত্বের সঙ্গেও তাকে বারবার যুগপৎ পর্যুদস্ত ও খাপ খাওয়াতে হয়েছে। উনিশ শতকের বিধ্বংসী এক পৃথিবীর বাস্তবতা থেকে সাহিত্যকে বেছে নিতে হয়েছিল কখনো অ্যাবসার্ডিজম কখনো অস্তিত্ববাদ, মার্কসবাদ, নারীবাদ কিংবা মনোযোগ আকর্ষণী মনোবিশ্লেষণবাদ। তবে কীনা সাহিত্যে প-িত-অপ-িত, ভব্য-চাকুরিয়া কিংবা উঠতি মধ্যবিত্ত, চালচুলোহীন নি¤œবিত্ত সবারই সমান অধিকার। একথা স্মরণেও রেখেও আধুনিক-অধুনান্তিক সাহিত্যকে হতে হয়েছে কখনো কখনো মারাত্মকভাবে চিন্তাপ্রবণ। এই চিন্তাপ্রবণতা যতটা না সাহিত্যের শৈলীতে ততটাই দার্শনিক প্রশ্নে। এই প্রশ্ন একান্তই পাঠকের মনে তৈরি করে দেয়ার বিষয়। যাতে আবার পাঠক সাহিত্যচর্চা করতে করতেই পঠনের এক নিভৃত জগতে হারিয়ে পরমার্থিক চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে প্রকৃত বাস্তব ভুলতে না পারে।

তবে সাহিত্যের দার্শনিক প্রশ্ন অনেক আধুনিক-উত্তরাধুনিক সাহিত্যিকের কাছে গুরুত্ব পেলেও নিছক তত্ত্বের বিরুদ্ধেও কেউ কেউ দাঁড়িয়েছেন। যেমন মিলান কুন্ডেরাই এর বড় প্রমাণ। তিনি শিল্পকে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ধারা প্রভাবিত পরবর্তীকালের সৃষ্টি বলে মানতে নারাজ। তিনি মনে করেন, উপন্যাস ফ্রয়েডের পূর্বেই ‘অচেতনতা’ নিয়ে কথা বলেছে, মার্ক্সের পূর্বেই শ্রেণিসংগ্রামের প্রসঙ্গে বলেছে, তাত্ত্বিকদের পূর্বেই তা ইন্দ্রিয় ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে ডিল করেছে। তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, ফ্রয়েড তাঁর ‘ইডিপাস কম্পেøক্স’-এর ধারণা পান সফোক্লিসের সাহিত্য পাঠ করে। কাজে কাজেই সাহিত্যিক একটা বিরাট সম্ভাবনাকে আগেই আবিষ্কার করে ফেলেছেন। অন্যদিকে তত্ত্ব-দার্শনিকরা সেসব উপাদানকে দর্শনচর্চার অঙ্গীভূত করে সূত্রাবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। ইবসেনের ডলস্ হাউসের নোরা চরিত্র নিজেই যথেষ্ট একজন প্রতিবাদী নারীর কণ্ঠস্বরকে ব্যক্ত করতে। তেমনি করে রবীন্দ্রনাথের কুমুদিনী, চিত্রাঙ্গদা, সোহিনী, মৃণাল প্রত্যেকটি চরিত্রকেই একেকটি উজ্জ্বল নারীমুক্তির কাঠামো বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। অন্যদিকে সাহিত্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণাই ছিল ‘সুপার পারসোনাল ম্যান’ বা ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যান স্পিরিট’কে জাগিয়ে তোলা।

বাজারি সাহিত্যের তকমা আঁটা অনেকেই জনপ্রিয় বা পপ-লিট্রেচারের নাম করে সস্তা জিনিস খোঁজেন আতিপাতি করে। অনেকে মনেও করেন বিনোদন জগতে সিনেমা বা সঙ্গীতের ধারে কাছেও নেই সাহিত্যের ক্ষমতা। তাদেরকে পাওলো কোয়েলোর ‘দ্য আলকেমিস্ট’-এর মতো স্বপ্নপ্রবণ রচনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া যেতে পারে। তবে কীনা সস্তা সাহিত্যের বাজার ধরার ক্ষমতা বিস্ময়কর। একথা মেনেও বলা যেতে পারে, ভাল সাহিত্যের মানের কাছে বাজারটা আপনিই মার খায়। হেনরি ফিল্ডিং-এর ভাষায়, ‘অসৎ সঙ্গ শুধুমাত্র ব্যবহার নষ্ট করে। আর বাজে বই ব্যবহারের পাশাপাশি রুচিও নষ্ট করে দেয়।’ (‘অন রিডিং ফর এ্যামিউজমেন্ট’)। এমন রুচি নষ্টকারকের ভেষজ আজো আবিষ্কৃত হয়নি। চিকিৎসাশাস্ত্র মানুষের শরীরের ব্যাধি সারায় কিন্তু মনের ব্যাধি সারাতে ভাল পাঠের বিকল্প নেই। তাই বলে সাহিত্য আবার চিকিৎসাশাস্ত্র নয়। চিনুয়া আচেবের একটি উক্তি দিয়ে লেখাটি পরিসমাপ্ত করি।

‘প্রত্যেকে গল্প বোনে তাঁর নিজের জন্য—নিজের বেঁচে থাকাকে উপভোগ্য করে তুলতে। গল্পটা সত্য হোক মিথ্যে হোক, ভাল হোক মন্দ হোক—তার চোখ দিয়ে জগৎকে দেখবার অসম্ভব এক শক্তি নিয়ে হাজির হয়।’ (‘দ্য ট্রুথ অব ফিকশন’)

সাহিত্য তাই তাত্ত্বিক পদ্ধতি-কাঠামোর নতিজা নয়। অবশ্য একাডেমিক দর্শন একটি রীতিসিদ্ধ চিন্তন-পদ্ধতি। কাজেই একটা পার্টিকুলার সাহিত্য তা গদ্য-পদ্য যা-ই হোক না কেন তা (দর্শনশাস্ত্র অভিহিত) দর্শন নয়। আবার যাচ্ছে-তাই রকমের মনোভাব নিয়ে রচিত-পঠিত শব্দমালাও সাহিত্য নয়। নৈতিক বাধন-শাসন তার নেই, আছে কেবল ‘নিছক’ সৌন্দর্য সৃষ্টি। নিছক এজন্যই যে তা ‘উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্যবাদী’। তবে আদর্শবাদের ধোয়া তুলে সাহিত্য কখনোই মতাদর্শের খোঁয়াড়ে বন্দি করার জিনিসও নয়। সাহিত্য আপনি-উদ্ভূত, মানস-ক্রিয়ার সংযোগ-বিয়োগে নির্মিত ‘অপূর্ব নির্মাণবস্তু’ কলা, যা—সকলের হয়েও কারোরই নয়, মনের।

******************************************************

মাসুদ রহমান
লালন সাঁইয়ের সাহিত্যিক অভিজ্ঞান ও ভাবদর্শন
লোকায়ত ধর্ম মাত্রই দর্শন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত ধর্মের তত্ত্ব-তথ্য, আচার-বিচার হতে অঞ্চল বিশেষে সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভিতর দিয়ে কিংবা বিশেষ বিশ্বাসের লোকসাধকের পরম্পরায় যে ধর্ম বা জগৎজীবন বিষয়ক বিশ্বাস বা বিশিষ্ট ধর্মাচার গড়ে ওঠে, তা-ই লোকায়ত ধর্ম। প্রবলপ্রতিষ্ঠিত ধর্মধ্বজীরা সেসব ধর্মকে যেমন কোনো ধর্ম বলেই স্বীকার করে না, তেমনি উন্নাসিক দার্শনিকদের কেউ কেউ হয়তো সেগুলোকে খাঁটি দর্শন বলতেও নারাজ। তাই যদি লোকায়ত দর্শন বলে, একটু যেন নিম্নেতর শ্রেণিতে ফেলে দিয়ে এর দর্শনবৈশিষ্ট্য আলোচনায় প্রবৃত্ত হওয়া যায়, তাহলে বোধ করি দার্শনিকগোষ্ঠির কেউ কেউ আপত্তি করবেন না। তা এই দৃষ্টিকোণে হলেও ফকির লালন সাঁই (১৭৭৪-১৮৯০) তথা বাউল সম্প্রদায়ের দর্শন নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা একদম কম হয়নি। এখনো সে আলোচনা যে চলমান তার ঐতিহাসিক মূল্য ও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতাও হয়তো রয়েছে। তবে আমাদের আজকের অনুসন্ধেয় শ্রেষ্ঠ বাউল সাধক ও গীতিকার লালনের গানে তথা চিন্তা-চেতনায় যে দর্শন পাওয়া যায়, তার কতোটুকু দর্শনশাস্ত্রীয় প্রণালী-পথ বেয়ে আমাদের সামনে পৌঁছেছে।

দর্শন হচ্ছে, জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত অভিজ্ঞান। বিস্ময়-সংশয়-সন্ধিৎসা-যুক্তি-বিচারের পথ ধরে এক অভিজ্ঞানে পৌঁছানো। বিজ্ঞান যেখানে তথ্য-প্রমাণের অভাবে নিশ্চুপ, দর্শন সেখানে যুক্তি-ধারণা নিয়ে মুখর। জগৎ-জীবনের সামান্য অংশই মানুষের অধীত, তাই বিজ্ঞানের অধিক্ষেত্রও সীমিত। কিন্তু দর্শনের চোখ অনেক; যথা: বিস্ময়, প্রশ্ন, সন্দেহ, চিন্তন প্রবণতা, যুক্তি-যাচাই, জ্ঞানানুরাগ, কল্যাণমুখিতা প্রভৃতি। এগুলোর সাহায্যে দর্শন দর্শনেন্দ্রিয়ের দিগন্ত সীমা ছাড়িয়ে অন্তহীন অসীমকেও দেখে নিতে চায়, ‘অজান খবর’ জানতে-জানাতে চায়।

লালন যে ধর্মমতে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তাকে এক যৌগদর্শন বলা চলে। প-িতদের সিদ্ধান্ত, বাউলমতাদর্শ সাংখ্য-যোগ-বৌদ্ধ-বৈষ্ণব-সুফি প্রভৃতির প্রভাবে উদ্ভূত। প্রবর্তক অনির্দিষ্ট ও শাস্ত্র অনুপস্থিতির কারণে গুরুশিষ্য পরম্পরায়, স্থানভেদে বাউল সাধনায় ভিন্নতা কিছু এসে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মোটের উপর বলা চলে, গুরুনির্দেশিত পথে দেহবাদী যুগলসাধনায় পরম সত্তাকে ধরার বাসনানির্ভর এই ধর্মীয়দর্শন। গুরুবাদী এই গুহ্য সাধকদের চলাচল ‘গভীর নির্জন পথে’। তাই তাঁদের ধর্মসংগীত চর্যাপদের মতো ‘আলোআঁধারি’ ভাষায় রচিত—সাধারণের কাছে তার মর্মোদ্ধার অনেকাংশেই অসম্ভব ছিল। কিন্তু লালনের গান সে বিশিষ্টতা থেকে বেশ প্রভিন্ন। বাউলের পারিভাষিক শব্দপদের কারণে তাঁরও অনেক গানই হেঁয়ালিপূর্ণ। কিন্তু যেহেতু তিনি ছিলেন এক অনন্য শিল্পপ্রতিভার অধিকারী, তাই তাঁর অনেক সংগীত শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে। তাঁর সুগভীর জীবনভাবনা গানগুলোকে করেছে ভাবসমৃদ্ধ। আর এই জায়গায় ধর্ম, জীবনদৃষ্টি ও সৃজনকুশলতা মিলে এক দর্শন আমরা পেয়ে যাই। আর সে দর্শনের শাস্ত্রীয় ভিত্তিও সুদৃঢ়। সেসব ভিত্তি কিছু উদাহরণযোগে আমরা দেখতে পারি।

নিঃসন্দেহে জিজ্ঞাসা থেকে দর্শনের যাত্রা শুরু। সে জিজ্ঞাসা জগৎ-জীবন নিয়ে; কীভাবে এর সৃষ্টি, কেন সৃষ্টি, সৃষ্টিকর্তা আছেন কি, থাকলে তাঁর স্বরূপ কী, আগামী দিন কী ঘটবে, মৃত্যুর পরবর্তী পর্যায় আছে কিনা, খেকে থাকলে তা কীরকম ইত্যাদি। এসব জিজ্ঞাসা চিরন্তন। ধার্মিকজন এগুলোর উত্তর খুঁজে নেয় তার স্বধর্ম থেকে; কিন্তু তারপরও ধর্মবিশ্বাসী মানুষ এসব নিয়ে কমবেশি জিজ্ঞাসু হয়েছে। এই জিজ্ঞাসা তার জ্ঞান বৃদ্ধি করেছে, বিজ্ঞানে সমৃদ্ধি এনেছে। তবে যেসব চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর অনির্ণেয়, সেগুলোই দর্শনশাস্ত্রকে বিস্তৃৃতি দিয়েছে। লালনকেও এমনই ‘পুরাতনী তুমি নিত্য নবীনা’ কিছু প্রশ্ন করতে শুনি। যেমন :

জগতের মূল কোথা হতে হয়/ আমি একদিন চিনলাম না তায়

কোথায় আল্লার বসতি/ কোথায় রাসুলের স্থিতি/ পবন পানির কোথা গতি/ কিসে তা জানা যায় (জগতের মূল কোথা হতে হয়/ আমি একদিন চিনলাম না তায়)

জীব মলে যায় কোনখানে

সব সৃষ্টি করল যেজন, তার সৃষ্টি কে করেছে

সৃষ্টি ছাড়া কীরূপেতে সৃষ্টিকর্তা নাম ধরেছে

“শুনতে পাই সাধু সমাচার/ পূর্বে থাকলে পরে হয় তার/ পূর্বে না থাকিলে এবার/ তাহার কি আশায়” (পাপ ধর্ম যদি পূর্বে লেখা যায়)

কী করিতে এলাম ভবে / কী করিতে জনম গেল (গুরুপদে মতি আমার কই হলো)

[উদ্ধৃতি-অংশে প্রথম কলি না থাকলে, তা ব্র্যাকেটে দেয়া হয়েছে]

স্মর্তব্য, লালন একজন লোককবি হয়ে এসব বিষয় ভাবছেন মধ্যযুগের উপান্তে, অথচ যার আরো অনেক পরেও রেঁনেসাস্নাত কলকাতার অনেক শিক্ষিতরাই এসব বিষয়ে নির্বিকার বা শাস্ত্র-সংস্কারবচনেই আশ্বস্ত। লালন উত্তর খুঁজতে গিয়ে নানারূপ জবাব পেয়েছেন। সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাই বলছেন, “অনেকে কয় অনেক মেতে/ ঐক্য হয় না মনের সাথে” (কোন রসে প্রেম সেধে হরি)। তাই তাঁকে একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হতে হয়—“কী হবে আমার গতি/ কতই জেনে কতই শুনে/ ঠিক পড়ে না কারো প্রতি।” তবে যে লালন একটি ধর্মমতে বিশ্বাসী ছিলেন! এমনকি সেই প্রসঙ্গেও তাঁর পর্যবেক্ষণ— “গুরুতত্ত্ব বিধি শোনা যায়/ তাও তো দেখি একরূপ সে নয়/ লালন বলে যে যা বোঝে / তাই করে॥ (আমি কী সাধনে পাই গো তারে)।” এভাবেই বিশ্বাসীর বাইরে একজন প্রশ্নশীল দার্শনিককে পাওয়া যায়।

প্লেটোর মতে বিস্ময়বোধ থেকে দর্শনের উদ্ভব। মানুষ সৃষ্টিজগতের বিশালতা-বৈচিত্র্য-রহস্য দেখে বিস্মিত। সে অনেককিছু জানতে চায়, অনেককিছুর ব্যাখ্যা চায়। সেই জানা-বোঝার আলোচনাই দর্শন। লালনের মনেও এই বিস্ময় প্রবল হয়েছে বাউলিবিশ্বাস ছাড়িয়ে। ‘হাওয়া দমে’ তারে দেখা বা ধরা যায় বলেই জেনেছেন গুরুর কাছে, কিন্তু এ মানবদেহের দিয়ে তাকিয়ে যে তাঁর বিস্ময় যায় না তা স্পষ্টত হয় যখন বলেন, “কে বানালো এমন রংমহলখানা।” ভা- বা ব্রহ্মা-ে কে একজন “নড়ে চড়ে হাতের কাছে/ খুঁজলে জনমভর মেলে না”—এসব এক বিস্ময়বিমূঢ়েরই অনুভূতি। “অমাবস্যার দিনে চন্দ্র থাকে না/ যায় কোন শহরে/ প্রতিপদে হয় সে উদয়/ দৃষ্ট হয় না কেন তারে”— তাঁর গানে গানে রয়েছে এমনি কতো সপ্রশ্ন বিস্ময়।

সন্দেহ-সংশয় দার্শনিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সে একটি ধারণায় উপনীত হয় তো আরেকটি ধারণার প্রতি সন্দেহ-সংশয় পোষণ করেই। একদিকে তিনি পরমসত্তায় বিশ্বাস করছে, ‘মকরউল্লার মক্কর’ দেখে বিস্মিত আবার নিজেই কতোবার স্বীকার করেন ‘মনের ঘোর তো যায় না’। ‘কোন সাধনে পাই গো তারে’—এই সন্দেহাত্মক প্রশ্ন কতোবারই না করেছেন। এই সন্দেহের অপনোদন করতে সত্যানুসন্ধানে ছিলেন আজীবন অর্থাৎ এক অর্থে দর্শনচর্চাই করে গেছেন।

দুঃখ-হতাশাও দর্শনচিন্তার উৎপত্তির একটি কারণ বলে স্বীকৃত। গৌতম বুদ্ধ তো মানবজীবনকে অনিবার্যভাবে দুঃখময় বলে উপলব্ধি করার পরই তাঁর মতাদর্শ গঠন করেন। লালনের অনেক জ্ঞানেই জাগতিক হতাশা, ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা-ব্যর্থতার কথা রয়েছে। যেমন :

আশা পূর্ণ হলো না/ আমার মনের বেদনা।

দিনের দিন হলো আমার দিন আখেরি/ আমি ছিলাম কোথা এলাম হেথা/ (আবার) যাব কোথা সদাই তা ভাবি

এদেশে তো এ সুখ হলো/ আবার কোথা যায় না জানি।

চিরদিনে দুঃখের অনলে প্রাণ জ্বলছে আমার

তবে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, পারিবারিক অপ্রাপ্তি, সামাজিক হতাশা থেকে মুক্তিলাভের জন্যে মানুষ যে পথসন্ধান করে সে পথের আরেক নাম দর্শন। শেষ পর্যন্ত জীবন সম্পর্কে একটি সন্তোষজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মধ্যেই দর্শনচিন্তার সার্থকতা, হোক তা শোপেনহাওয়ারের ‘আত্মহত্যা’র পরামর্শ দেওয়ার মতো তত্ত্ব। লালন নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি—মানবজীবনেকে অমূল্য জ্ঞান করেছেন, মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।

দার্শনিকের বিচার পদ্ধতিতে কার্যকারণতত্ত্ব একটি বহুল ব্যবহৃত প্রক্রিয়া। কার্য ও কারণ একে অন্যের পরিপূরক বা পর্যায়। লালন এ মতে বিশ্বাসী হয়ে যেসব যুক্তিবিন্যাস করেছেন সেগুলোর কয়েকটি :

তুষে যদি কেউ পাড় দেয়/ তাতে কি চাল বাহির হয় (কীর্তিকর্মার লেখাজোখা আর কি ফিরিবে)

জানো না মন শুকনা কাঠে/ কবে তার মালঞ্চ ফোটে (শুদ্ধপ্রেম না দিলে ভজে কে তারে পায়)

না জেনে করণ কারণ/ কথায় কি হবে

কথায় যদি ফলে কৃষি/ তবে বীজ কেনে রোপে॥

আসমানে বরিষণ হলে/ জল দাঁড়ায় মৃত্তিকা স্থলে (প্রেম-ইন্দ্রবারি অনুরাগ নইলে কি যাই ধরা)

কেতাবে খবর জানা যায়/ নাপাক জলে জান পয়দা হয়/ ধুলে কি তা পাক করা যায়/ আসল নাপাক যেখানে” (নাপাকে পাক হয় কেমনে)

প্রাচীন গ্রিসের সোফিস্ট দার্শনিকদের থেকেই অভিজ্ঞতা জ্ঞানলাভের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। আধুনিককালে লক, বেকন তার আধুনিকায়ন করেছেন। সত্যানুসন্ধানী হিসেবে আমরা লালনকেও অনেকসময় অভিজ্ঞতাবাদীর সুরে কথা বলতে দেখি। তাঁর বক্তব্য : “অচানক অচিনাই কখন/ জ্ঞানইন্দ্রিয় না সম্ভবে (আপনার আপনি ফানা হলে সকল যাবে জানা)।” লালনের প্রত্যক্ষবাদমূলক আরো কিছু উচ্চারণ :

গুড় বললে কি মুখ মিষ্টি হয়/ দীপ না জ্বাললে কি আঁধার যায়/ অমনি জানো হরি বলা/ হরি কি পাবে

(না জেনে করণ কারণ)

স্বপ্নে যদি রাজরাজ্য পায়/ চেতন হলে সব মিথ্যা হয় (আজ আমায় কোপিন দে গো)

ভ্রান্তিমূলক প্রত্যক্ষ নিয়ে দর্শনশাস্ত্রের বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘রজ্জুতে সর্পভ্রম’। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি এই কথাটি লালন কীরূপ নিজস্ব করে বলেছেন—“কলার ডোগায় সর্প হলো।” রজ্জুতে সর্পভ্রম হলেও সেটি আসলে সাক্ষাৎ প্রতীতি, তবে ভ্রম প্রত্যক্ষ। প্রত্যক্ষবাদের বিভ্রান্তি সম্পর্কে লালন একাধিক গানে জলে চাঁদ দেখার উপমাটি প্রয়োগ করেছেন। যথা: “জলে যেমন চাঁদ দেখা যায়/ ধরতে গেলে হাতে কে পায় (এই মানুষে সেই মানুষ আছে)”, “জলে যেমন চাঁদ দেখি/ ধরতে গেলে সকল ফাঁকি (দেখলাম সেই অধরচাঁদের অন্ত নাই)।”

লালন নির্বিচারে কোনো শাস্ত্র-সংস্কারকেই মেনে নেননি। দর্শনশাস্ত্রের বিচারবাদ দিয়ে সেসব মূল্যায়নে প্রয়াসী হয়েছেন। যেমন, প্রাচীন ভারতীয় দর্শন মোতাবেক পৃথিবী, পানি, আগুন, বাতাস ও আকাশ এই পঞ্চ উপাদানের নানা বিক্রিয়া-রূপান্তরের মধ্য দিযেই সমগ্র সৃষ্টি। মানবদেহও এই পঞ্চভূতে সৃষ্টি এবং এগুলোর মাঝেই বিলীন হয়। এখানেই লালনের বক্তব্য : “ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোম/ এরা দোষী নয় দুষি আদম (জীব মলে যায় জীবান্তরে)।” জাতপাতের ভেদ প্রচারের বিরুদ্ধে তাঁর এই বিচারবোধ সত্যিই দার্শনিকসুলভ। এবিষয়ে জল-অচল অনুষঙ্গে লালনের যুক্তিপ্রদানের নমুনা নিই: “গর্তে গেলে কূপজল হয়/ গঙ্গায় গেলে গঙ্গাজল কয়/ মূলে এক জল,সে যে ভিন্ন নয়/ ভিন্ন জানায় পাত্র অনুসারে (সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে)।” অন্য এক গানে : “কূপজলে সে গঙ্গাজল/ পড়িলে হয় রে মিশাল/ উভয় এক ধারা (সাঁই দরবেশ যারা)।” শাস্ত্র সম্পর্কে লালনের বিচার : “যদি একই খোদার হয় রচনা/ তাতে তো ভিন্ন থাকে না/ মানুষের সকল রচনা/ তাইতে ভিন্ন হয় ( কী কালাম পাঠালেন)।”

কখনো কখনো লালনের সিদ্ধান্ত সিদ্ধার্থের মতো। বস্তুত বুদ্ধের মতবাদ ছিল খাঁটি দর্শন—নিরীশ্বরবাদী বিশ্ববিধান। সেই দর্শনকে ধর্ম বানাতে গিয়েই ঈশ্বর-আত্মার অনিবার্য আমদানি। কিন্তু লালন গৌতমের আদি অভিজ্ঞানের সুরেই বলেন:

মলে ঈশ্বর প্র্প্তা হবে কেন বলে।

সেই যে কথার পাইনে বিচার

কারো কাছে শুধালে॥

যে পঞ্চে পঞ্চভূত হয়

মলে তা যদি তাতে মিশায়

ঈশ্বর অংশ ঈশ্বরে যায়

স্বর্গ নরক কার মেলে॥

এরকম ভাবনা থেকে কখনো লালনের কণ্ঠে উপমহাদেশে চার্বাক দর্শন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ওমর খৈয়ামের মতো ইহবাদী সুর শোনা গেছে। যেমন : “মলে পাব বেহেস্তখানা/ তা শুনে আর মন মানে না/ বাকির লোভে নগদ পাওনা/ কে ছাড়ে এই ভুবনে (সহজ মানুষ ভজে দেখনা রে)॥”

এ-অঞ্চলের পৌত্তলিকতা লালনের বিচারে বাতুলতা। কলকাতায় রামমোহন রায় পৌত্তলিকতা নিয়ে ভট্টাচার্যদের সাথে গদ্যে তর্ক করেছেন —সে নবসৃষ্ট গদ্যে, স্বল্পপরিসরে— লালন গানে গানে তাঁর প্রশ্ন প্রচার করেছেন ; তিনি বলেন : “প্রতিমা গড়ায় ভাস্করে/ মন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে/ আবার গুরু বলে তারে/ এমন পাগল কে দেখেছে (শিরনি খাওয়ার লোভ যার আছে)।” আবার আরেক বৃহত্তর ধর্মসম্প্রদায় মুসলিমদের একটি আচার নিয়ে তাঁর বিচারবোধ বলছে, “কাকে শুধাব গো সে কথা কে বলবে আমায়/ পশু বধ করিলে কি খোদা খুশি হয়।” আমরা দর্শনের আরো কিছু বহুল আলোচিত প্রসঙ্গ ও পরিমাপক ধরে লালনের দর্শনসম্পৃৃক্ততা দেখতে পারি।

বিজ্ঞান ও দর্শনের পার্থক্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, দর্শন নিয়তিকে বিচার করে থাকে। বিজ্ঞানীর অনুবীক্ষণ-দূরবীক্ষণে নিয়তি বলে কিছু এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়নি। তবে নিয়তিকে স্বীকার এবং অস্বীকার করে—এমন দুদল দার্শনিকেরই দেখা মেলে। তা যুক্তিবাদীদের মধ্যে এমন মতও আছে যে, কোনো কিছুর অস্বীকার-ঘোষণার মধ্য দিয়েও বিষয়টির অস্তিত্ব সম্বন্ধে এক ধরনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কারো কারো বর্ণনায়, নিয়তি পরাজিতের সান্ত¡না, আশাবাদীর আশ্বাসও বটে। সাধক লালন “ভাগ্যে কী আছে”, “এমন ভাগ্য আমার কি হবে”, “কীর্তিকর্মার লেখাজোখা আর কি ফিরিবে”—এরকম কথা বললেও, দার্শনিক লালন ভাগ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এই বলে: “পাপ ধর্ম যদি পূর্বে লেখা যায়/ কর্মে লিখন কাজ করিলে/ দোষগুণ কী হয়”। আবার বলেছেন, “সকলি কপালে করে/ কপালের নাম গোপালচন্দ্র।”

ভারতীয় ধর্মদর্শনে জন্মান্তরবাদ রয়েছে অনেক জায়গা জুড়ে, প্রবলভাবে। মধ্যপ্রাচ্যীয় ধর্মগুলোতেও স্রষ্টার নিকট থেকে পৃথিবীতে আসা, মানবজন্ম শেষে পুনরুত্থান-প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সীমিত অর্থে হলেও জন্মান্তরের তত্ত্ব পাওয়া যায়। লালন এই জন্মান্তরের বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন, কথা বলেছেন অনেক গানে। যেমন : “দেখনা রে মন পুনর্জনম কোথা হতে হয়/ মরে যদি ফিরে আসে স্বর্গনরক কে বা পায়।” আরেকটি গানে বলেছেন : “মলে হয় ঈশ্বর প্রাপ্ত/ সাধু অসাধু সোমত্ত/ তবে কেনে তপজপ এত/ করবে জলেস্থলে (মলে ঈশ্বরপ্রাপ্ত হবে কেন বলে)।” আবার এই জন্মের পাপপুণ্যের প্রতিফল সম্পর্কে ধর্মের যে বক্তব্য সেটিও লালনের কাছে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এভাবে : “একজনে দুই কায়া ধরে/ কেউ পাপ কেউ পুণ্যি করে/ কী হবে তার রোজহাশরে/ নিকাশের বেলায় (শুনি নবীর অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়)।”

আত্ম-অনুসন্ধিৎসা একই সঙ্গে একটি জ্ঞান বা দর্শন এবং জ্ঞানলাভের উপায়। বাউলের বিশ্বাস মানবের দেহে পরমসত্তার লীলা চরম পয়ায়ে পৌঁছে। লালন এই আত্মতত্ত্বকে বিশ্বাস করেছিলেন আপন অভিজ্ঞানে। তাই আত্মতত্ত্বের কথা তাঁর বহু গানে আন্তরঙ্গিক রাক্সময়তা লাভ করেছে। যেমন, “আপন ঘরের খবর নে না”, “আপন খবর না যদি হয়/ যার অন্ত নাই তার অন্ত কিসে পাই”, “আপনার আপনি ফানা হলে সকল  জানা যাবে”, “আমি কী জানলে সাধন সিদ্ধ হয়”, “খোদকে চিনিলে খোদা চিনি/ খোদ খোদা বলেছে আপনি/ মারন আরাফ নাফছাহু বাণী/ বোঝ কী তার মানে (কুদরতী সীমা কে জানে)”, “ক্ষ্যাপা তুই না জেনে তোর আপন খবর/ যাবি কোথায়”, “আপনাকে আপনি চেনা/ সেই বটে উপাসনা” (বল কারে খূঁজিস ক্ষাপা দেশবিদেশে)—এরকম প্রচুর উদাহরণ চয়ন করা যাবে লালনের গান হতে। আত্মতত্ত্বে কথা তো সেই কবে উপনিষদে ঘোষিত হয়েছিল—‘আত্মনং বিদ্ধি’; ‘নো দাইস্লেফ’ বলে আপনাকে জানার তাগিদ দিয়েছিলেন সক্রেটিস, ‘মান আরাফা নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু’—নফস্কে জানলে রবকে জানা যায়—এমন নির্দেশনা ইসলামেও আছে। লালন যেন এসবের অনুবাদ নয়, আপন অভিজ্ঞানের কথা হিসেবেই বলেছিলেন।

আমরা এরকম বলতে চাইছি না যে, লালন সাঁই দর্শনের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ নিয়েছেন এবং তারই আলোকে মত-মন্তব্য পেশ করেছেন। আমাদের বক্তব্য, চিন্তাশীলতা তাঁর মধ্যে দার্শনিক মনোভঙ্গির জন্ম দিয়েছিল। এছাড়া সেসময় ধর্মমত নিয়ে বেশ বাহাস বা বিতর্ক হতো। সেই সূত্রে তাঁর গানে যুক্তিবিন্যাস এসেছে। কিন্তু তারপরও শেষকথা হিসেবে বলবো, দার্শনিক এক স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রতিকূল প্রতিবেশের পরিবর্তে অনূকূল সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেন। সক্রেটিস-প্লেটো থেকে শুরু ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন দার্শনিকের নিকট থেকে যে সমাজমনস্কতা দেখছি, সমাজ বা রাষ্ট্রের গ্রঠন-প্রকৃতি নিয়ে যেসব প্রস্তাব পাচ্ছি, সবই এক কল্যাণধর্মী মানবসমাজ প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকে প্রদত্ত। শুধু টমাস মুর নয়, বহু দার্শনিকের সমাজ-রাষ্ট্রদর্শনই রাজনীতিক-সমাজপতিদের কাছে বা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছেও ‘ইউটোপিয়া’ বলেই বোধ হয়, তারপরও  জা জাঁক রুশো যে বলেছেন, দর্শনের প্রধান কাজ অসাম্য দূরীকরণের পথ বের করা—সেটিই সন্ধান করেছেন দার্শনিকেরা। লালনও তাঁদের উত্তরসূরি; ধর্ম নিয়ে ভেদাভেদ ও বাড়াবাড়ি দেখে তিনি কামনা করেছিলেন :

এমন মানবসমাজ কবে গো সৃজন হবে।

যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান

জাতি গোত্র নাহি রবে ॥

লালনগান আমরা যা পেয়েছি, তার মধ্যে অবশ্য দার্শনিক ও ধার্মিক সত্তার যুগপৎ বিরোধ ও সম্মিলনও স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য করা যায়। কারণ, সর্বোপরি তিনি বাউল মতাবলম্বী। তাঁর একটি বিখ্যাত গান আরেকটু মনোনিবেশ নিয়ে দেখি: ‘এমন মানব জনম কি আর হবে’ এটুকু দর্শন, ‘মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে’—ধরে নিলাম এ-ও দর্শন, তারপর ‘দেবদেবতাগণ/ করে আরাধন/ জন্ম নিতে এই মানবে’—এখানে মনবতাবাদী দর্শনের কথা যেমন আছে বটে, তবে দেবদেবতা. সাঁইয়ের অনন্তরূপ সৃষ্টি করার প্রসঙ্গ প্রচলিত ধর্মমত মাত্র।

তারপরও বলব, কার্ল মার্কস যে বলেছিলেন, দার্শনিক ভাবনার জন্যে প্রথম প্রয়োজন সাহসী মন, সে মনোভঙ্গিই লালনের বেশিরভাগ গানে লভ্য। সৃষ্টিজগৎ ও তার স্রষ্টা, ধর্ম-সংস্কার, শাস্ত্রবিচার, পাপপুণ্য, মানবআত্মা-পরমসত্তা প্রভৃতি প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য বিষয়ে তর্কবিতর্ক থাকতেই পারে—ধর্ম হিসেবেও সে তর্ক, দর্শন হিসেবেও। কিন্তু সময়ের বিবেচনায় কী সাহসী সব উচ্চারণ করে গেছেন। যখন আরো আরো কথার সাথে সাতবাজারে জাত বিকিয়ে দেওয়া কিংবা জাত হাতে পেলে আগুনে পোড়ানোর ঘোষণা দেন তখন সমাজদরদি দার্শনিকের সাহসী সত্তার পরিচয় প্রকাশিত হয়। মূলত এই কারণেই লালন আজকেও আরাধ্য। তিনি বাউলশিরোমণি, আধুনিকমানের লোককবি, একই সাথে জ্ঞানানুরাগী ও সমাজমনস্ক দার্শনিকও বটে। আমরা এখানে এই ভেবে বিস্মিত ও তৃপ্ত হতে পারি যে, দর্শন যার ইংরেজি প্রতিশব্দ ফিলোসফি বা জ্ঞানানুরাগ তা কি গভীরভাবেই নাম আমাদের এক লোকমনীষীর সত্তায় পরিব্যাপ্ত ছিল!

******************************************************

মোহাম্মদ শেখ সাদী
সাহিত্যে দর্শন, দর্শনে সাহিত্য : প্রসঙ্গ শাহ আবদুল করিম
‘দর্শন’ কথাটির সাধারণ মানে দেখা। তবে ‘দর্শন’ কথাটির তাৎপর্যগত বা নিহিতার্থ এবং দর্শনের সেই বিশেষায়িত রূপটি কীভাবে সাহিত্যে এবং দর্শনে ‘সাহিত্য’ কীভাবে অবলীলায় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েÑ সেটিই আমাদের কাছে বিচার্য এবং বিবেচ্য। জীবন ও জগতকে নিয়ে বিশেষ চিন্তাধারা সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই প্রচলিত রয়েছে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় সেই চিন্তা-দর্শনও নব নব রূপ পরিগ্রহ করেছে। জীবন ও জগতকে বিশেষভাবে দেখার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে অর্জন করে থাকে। তবে ব্যক্তির জীবন, সমাজ ও প্রতিবেশ থেকেই স্ব-স্ব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। জীবন ও জগতকে দেখার বিশেষ এই বীক্ষা নিয়ে কোনো সাহিত্যিক বা দার্শনিক যখন কোনো সাহিত্য বা দার্শনিক-তত্ত্ব সৃষ্টি করেন,তখন অনায়াসেই তাতে জীবন-অভিজ্ঞতার ছাপ পড়বে। সাহিত্য ও দর্শন মানবজীবনের এমনই প্রায় অভিন্ন চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্র যেখানে ব্যক্তির অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখতে পাই। আর এভাবেই সাহিত্য ও দর্শন পরস্পর সম্পর্কিত।

শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯) লোকায়ত সাধনার ধারায় একজন শক্তিমান লোকসাধক। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির সর্বাঙ্গীণতাকে ধারণ করেও, যিনি কেবল জীবন-অভিজ্ঞতার সামর্থ্যইে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তাঁর গান এবং তাঁর জীবন-দর্শন একই সূত্রে গাঁথা। তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকর্মের পরতে পরতে জীবন-দশনের গভীর ছাপ পরিলক্ষিত হয়। তাঁর জীবনের নির্যাসই তাঁর গান। সীমাহীন দারিদ্র্য ও প্রতিকূল সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠতে উঠতে তিনি হয়ে ওঠেন একজন তাত্ত্বিক-দার্শনিক, একজন সুসাহিত্যিক। আমরা বাউল করিমের জীবন ও গান থেকে সাহিত্য এবং দর্শনের চমৎকার সংশ্লেষাত্মক রূপটি আবিষ্কার করতে পারি। কারণ তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকর্মে কেবল অধ্যাত্মবাদী ভাবনাই প্রতিফলিত হয়নি; বরং প্রচলিত ধর্মাচারের বাইরে যাপিত জীবনের সাথে সম্পৃক্ত ধর্মচিন্তা অর্থাৎ অলৌকিক ধর্ম বিশ্বাসের চেয়ে লৌকিকতাকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। গুরুত্ব দিয়েছেন জীবন-বাস্তবতার ওপর। সমকাল-সংলগ্নতা, মানবমুক্তি ভাবনা, স্বদেশ ও সমাজ চেতনার গভীরতায় শাহ আবদুল করিমের স্বন্ত্র্য সহজেই চোখে পড়ে। বাউল আঙ্গিকের গানের একঘেয়েমিপূর্ণ সুরের সীমারেখা ডিঙিয়ে তিনি যে সুর-বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন, তা অতুলনীয়। হাওর-বাওর, নদী-বিধৃত বাংলার ‘ভাটি অঞ্চল’ বলে খ্যাত সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত দিরাই উপজেলাধীন ধল আশ্রম গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর গান গ্রামীণ ও শহুরে উভয় শ্রেণির মানুষের কাছেই সমানভাবে সমাদৃত। কেননা লোকায়ত ঐতিহ্য, সহ¯্র বছরের লালিত প্রাণের স্ফুরণ এবং আধুনিকতা তথা সমকালীনতার অপূর্ব সন্নিবেশ ঘটেছে তাঁর গানে। অত্যন্ত সহজ-সরল শব্দে-ছন্দে মানবীয় সুগভীর আবেগ-উপলব্ধির এমন সহজ প্রকাশ খুবই দুর্লভ। তিনি বাংলার চিরায়ত তত্ত্বগানকে নতুন মাত্রা দান করেছেন। পুরাণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও খুব সহজ করে, সমকালীন ভাব- মাধুর্যে উপস্থাপন করেছেন:

আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা

কেমনে ভুলিব আমি বাঁচি না তারে ছাড়া।

উল্লিখিত গানটিতে বৈষ্ণব-প্রেমতত্ত্বের আলোকে রচিত। তবু গানগুলোতে তত্ত্ব ছাড়াও সমঝদার রসিকজনেরা চিরন্তন প্রেমানুভূতি ও বিরহের রস আম্বাদন করতে পারেন।

শাহ আবদুল করিমের কবি-মানসে বৃহত্তর ভাটি অঞ্চলের জন-জীবন প্রবাহ, তাদের দুঃখ-দুর্দশা, লোকায়ত ঐতিহ্য, সমকাল-চেতনা, প্রতিবাদী চেতনা সর্বদা ক্রিয়াশীল ছিলো। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভে ব্যর্থ হন তিনি। গ্রামের একটি নৈশ বিদ্যালয়ে মাত্র ৮ দিন যাবার সুযোগ হয়েছিলো তাঁর। মাত্র ১০ বছর বয়সে মাসিক ২ টাকা বেতনে রাখালের চাকরি নেন অন্যের বাড়িতে। উন্মুক্ত উদার প্রকৃতির বুকে গরু চড়াতেন আর গান গেয়ে বেড়াতেন আপন মনে। কবি জসীম উদ্দীন যেমন তার এক অন্ধ দাদার কাছ থেকে লোককাহিনী, রূপকথা প্রভৃতি শুনে শৈশবে দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, শাহ আবদুল করিমও তেমনি তাঁর দাদার ছোট ভাইয়ের দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। গান পাগল ‘বাউল করিম’ হয়ে উঠার পেছনে এই দাদার ভূমিকা যাদু-মন্ত্রের মতো কাজ করেছে। তাঁর দাদা ছিলেন ফকির। তিনি সারিন্দা বাজিয়ে গান-টানও করতেন। তাঁর দাদার একটি গান :

ভাবিয়া দেখ মনে

মাটির সারিন্দারে বাজায় কোন জনে।

বালক করিমকে ধীরে ধীরে চিন্তক ও তাত্ত্বিকে পরিণত করে। ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’-পঙক্তিটি শৈশবে রবীন্দ্রনাথকে যেভাবে ব্যাকুল করে তুলেছিলো। বালক করিমকে তেমনিভাবে আন্দোলিত করতে লাগল। তিনি বুঝে গেলেন গানই তাঁর আসল গন্তব্য। বাংলার লোকয়ত গানের ধারায় এমন গান-পাগল লোক-সাধক সত্যিই বিরল। গানকে ভালোবেসে জীবনে-সমাজে তাঁকে যেভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে; এমনটি কেউ হয়নি। তবু দারিদ্র্য আর সমাজ-ধর্মের অনুশাসন তাঁকে দমাতে পারেনি। মসজিদে, ঈদের নামাজে তাঁকে গান ছেড়ে দিতে নির্মমভাবে তিরস্কার করা হয়। গান পাগল সাধারণ মানুষ তখন তাঁর পাশে দাঁড়ায়। গানকে ভালোবাসার তীব্রতা ওঠে আসে তাঁর গানে, এটিও ব্যতিক্রমী একটি ব্যাপার। যেমন :

আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া

ভাবে করিম দীনহীন

আসবে কী সেই শুভদিন

জল ছাড়া কী বাঁচিবে মীন

ডুবলে কী ভাসে মরা।

অর্থাৎ পানি ছাড়া যেমন মাছের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, আবদুল করিমের পক্ষেও গান ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। তিনি তো মূলত বাউল গানের শিল্পী ছিলেন। সারা বাংলায় গান গেয়ে বেড়িয়েছেন মাসের পর মাস। তাঁর পীর বা মুর্শিদ ছিলেন মৌলা বক্শ। সঙ্গীতে একই গ্রামের করম উদ্দীনের কাছে তালিম নেন শুরুতে। পরে বিখ্যাত বাউল সাধক নেত্রকাণোর রশিদ উদ্দীনের কাছে উচ্চতর দীক্ষা গ্রহণ করেন। বাউলা গান আবদুল করিমকে পাগল করে তুলেছিলো। এই ধারার গানে আত্মনিবেদিত কবি গাইলেন :

মন মজালে ওরে বাউলা গান (২)

যা দিয়েছ আমায় তুমি কী দেব তার প্রতিদান

অন্তরে আসিয়া যখন দিলে তুমি ইশারা

তোমার সঙ্গ নিলাম আমি হাতে নিয়ে একতারা

মন মানে না তোমায় ছাড়া

তোমাতে সঁপিব প্রাণ॥

গানে সমর্পিত মন-প্রাণ কেবল নির্লিপ্তভাবে আত্মবিস্মৃত হয়ে রইলো না, বরং আত্মনিমগ্ন বাউল-আত্মা মরমি চেতনার মদ্যে দিয়েই সমাজমনস্ক, গণ-মানুষের শিল্পী হয়ে উঠলেন। খুব অনায়াসেই তিনি তত্ত্বগানের গ-িকে অতিক্রম করে শোষিত বঞ্চিত মানুষের ‘শান্তি বিধানের’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ধারা যাক, “মন মজালে ওরে বাউলা গান”-গানটির কথা। জনপ্রিয় এই গানটিতে শুধু বাউলাগানের প্রতি আসক্তি আর অনুরাগেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। তাঁর পূর্ববর্তী লোককবিদের মরমি চেতনার ধারাকে স্বীকার করে, শোনালেন বিস্ময়কর নতুন স্বর! তত্ত্ব গান গাইছেন তো গাইছেন, কিন্তু শেষে এসে সমকালীনতার অনুষঙ্গে অনিবার্য দাবিটি উচ্চারণ করলেন :

তত্ত্বগান গেয়ে গেলেন যারা মরমি কবি

আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি

বিপন্ন মানুষের দাবি করিম চায় শান্তি বিধান।

বিষয়-ভাবনায়, সহজ-সরল অভিব্যক্তিতে সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়তবদ্ধতার বহিঃপ্রকাশে এমন সুস্পষ্ট বক্তব্য তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় সমাসীন করেছে। লালন-হাসন, মনোমোহন-রাধারমণের প্রমুখের গান তত্ত্ব গান। লালনের গানে তবু জাত-পাতের ভেদনীতি, মানবতাবাদী চেতনা রয়েছে। শাহ আবদুল করিম আরও বহুদূর হাঁটেন। শুধুমাত্র ধর্মীয় গোঁড়ামী, প্রচলিত ধর্মনীতির অসারতা, অসামপ্রদায়িকতাকেই তিনি আশ্রয় করলেন না; বরং যাপিত জীবন থেকে উৎসারিত জীবন-দর্শনকে সম্পৃক্ত করে বাউলা গানের অধ্যাত্মবাদী ধারার মধ্যে সঞ্চার করলেন সঞ্জীবনী শক্তি। সমকালীন স্বদেশ, সমাজ ও মানুষের বিবিধ ভাবনা রূপায়িত হয়েছে তাঁর রচনায়। মানুষের জীবনে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ধর্মাচার বা ধর্মচিন্তার দিকে ঝোঁকে পড়া। বাউল আঙ্গিকের লোকসাধকদের প্রায় সকলের মধ্যেই এমনটি লক্ষ্যযোগ্য। কুষ্টিয়া অঞ্চলের ‘গ্রামবার্তা’ সম্পাদক কাঙাল হরিনাথের কথা, হাসন রাজার কথা, উকিল মুন্সির কথা এক্ষেত্রে প্রতিতুলনায় এনে শাহ আবদুল করিমের স্বাতন্ত্র্য নিরূপণে প্রয়াসী হওয়া যায়। জমিদারদের প্রজা-পীড়ন, শোষণ-সম্পর্কিত সাহসী সংবাদ ছাপিয়ে কাঙাল হরিনাথ জমিদারদের রোষানলে পড়ে, মামলায় জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে আপোসহীন মনোভাব থাকা সত্ত্বেও আধ্যাত্মবাদের দিকে ঝুঁকে জীবন-যন্ত্রণার উপশম খুঁজলেন। গাইলেন :

হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল

পার কর আমারে।

জমিদারের জৌলুস আর প্রতাপ ছেড়ে হাসন রাজা নিজেকে সমর্পণ করলেন মরমিবাদে। গাইলেন, ‘ছাড়িলাম হাসনের নাওরে।’ প্রেমে মজে ঘর ছেড়ে ভাবে মজলেন উকিল মুন্সি। মসজিদে ইমমাতি আর মক্তবে পাঠদান এবং অধ্যাত্মবাদী চেতনাশ্রিত গান রচনা ও গাওয়াই সঙ্গী হলো উকিল মুন্সির। শাহ আবদুল করিম এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী উত্তরাধিকার তত্ত্বগানের চেয়েও ‘বিপন্ন মানুষের শান্তি বিধান’ তাঁর কাছে জোরালো হয়ে উঠে। তিনি হয়ে উঠেন শ্রেণি-সচেতন একজন সমাজচিন্তক। তার অবশ্য কারণও রয়েছে। কৃষি-নির্ভর জীবিকা এক ফসলি জমি, হাওর-বাওর, নদী বিধৌত নিম্নাচলের অধিবাসীদেরকে বছরে প্রায় ৭-৮ মাসই পানির মধ্যে কাজ-কর্মহীনভাবে থাকতে হয়। ফলে এই অঞ্চলের মানুষ নিয়মিত অনিবার্য নিয়মেই দরিদ্র এবং দুঃখী। শাহ আবদুল করিমকে সেই নির্মম দারিদ্র্যের মধ্যেই জীবন অতিবাহিত করতে হয়। এমনকি টাকার অভাবে তাঁর প্রিয় স্ত্রী সরলার চিকিৎসাও তিনি করাতে পারেন নি। বৃহত্তর হাওর অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশনার চিত্র এবং তা থেকে উত্তরণের দাবি ও স্বপ্নের কথা উঠে আসে তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকারে :

আপনারা আমার গাঁয়ে এসেছেন, দেখে যান এখানে, এই বিশাল ভাটি অঞ্চল জুড়েমানুষগুলো কী অপরিসীম দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে বাস করছে। যখন শহরে যাই মাঝে মাঝে, স্তম্ভিত হয়ে এই ব্যবধান লক্ষ করি। লোকে কয়, আমি নিরন্ন-দুঃস্থ মানুষের কবি। আমি আসলে তাক ধরে দুঃস্থদের জন্য কিছু লিখিনি। আমি শুধু নিজের কথা বলে যাই। ভাটি অঞ্চলের বঞ্চিত দুঃখী মানুষ আমি। আমার কথা সব হাভাতে মানুষের কথা হয়ে যায়। … দ্যাখেন তো এই অঞ্চল ঘুরে, মানুষের আয়ের কোনো উৎস আছে কি না? চারিদিকে ভাসান পানি। জলে থই থই করছে প্রতিটি বাড়ির উঠান। মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে? দিন তিন বেলা নয়; শুধু একবেলা দুমুঠো যদি খেতে না পারে, এই জন্ম কি মানুষের জন্ম? … একদা তত্ত্বের সাধনা করতাম, এখন দেখি তত্ত্ব নয়, বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।

শাহ আবদুল করিমের বাস্তব জীবনের নির্যাসই তার গানে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই দ্রোহী ও প্রতিবাদী চেতনা উচ্চকিত হয়েছে সহ¯্রধারায়। তাঁর প্রিয় শিষ্য আকবর মারা গেলে মোল্লারা তার জানাজা পড়তে দেয়নি। এই ঘটনাটি গভীরভাবে রেখাপাত করে আবদুল করিমের মনে। তিনি অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন কিন্তু ভেঙ্গে পড়েননি। এই কষ্টই তাঁকে কষ্ট জয়ের দীক্ষা দেয়। প্রাবন্ধিক যতীন সরকার তাঁর গানকে ‘দুঃখ জয়ের মূলমন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আরজ আলী মাতব্বরের মায়ের মৃত্যুর একটি ছবি তোলায়, তাঁর মায়ের জানাজা পড়েন নি মোল্লারা। এই ঘটনাই আরজ আলী মাতব্বরকে ক্রমান্বয়ে স্বশিক্ষিত দার্শনিকে পরিণত করে। আবদুল করিমের জীবনেও সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনা ঘটল। নিত্যদিনের দারিদ্র্য, সমাজের বিরূপতা, ধর্মবেত্তাদের বিধি-নিষেধের বালাইকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, প্রচলিত শাস্ত্রাচারের বাইরে গিয়ে সুরের মাধ্যমেই তিনি ¯্রষ্টা প্রেমে বিভোর রইলেন। একই গানে সমকালীন সমাজ-মানুষের হিংসা, নিন্দাবাদ এবং সুফিবাদ ও বাউল মতের চমৎকার সন্নিবেশ সকল বিরূপতা থেকে উত্তীর্ণ হবার প্রেরণাকেই প্রতিফলিত করে :

হিংসা খোরগণ বলে দেখ,

আবদুল করিম নেশাখোর

ধর্মকর্মের ধার ধারে না,

গান বাজনাতে রয় বিভোর

মসজিদকে খোদার ঘর বলি

মন্দির ভগবানের ঘর

আসলে খোদার আরশ

হয় মমিনের অন্তর

যে করে তার নিজের খবর

আমি বলি সে চতুর

বাউল আবদুল করিম কয়

নয়ন রাখো মাশুকপুর।

‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে ‘ঈশ্বর ভদ্রপল্লী’তে থাকেন বলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে বস্তুবাদী জীবনদৃষ্টির আলোকচ্ছটায় বিমোহিত করেছিলেন পাঠককুলকে; আধুনিক সাহিত্যের পাঠক না হয়েও শাহ আবদুল করিম আরও সাহসী উচ্চরণ করেছেন তার একটি গানে :

জিজ্ঞেস করি তোমার কাছে বলো ওগো সাঁই

এ জীবনে যত দুঃখ কে দিয়াছে বলো তাই।

এই কি তোমার বিবেচনা কেউরে দিলা মাখন ছানা

কেউর মুখে অন্ন জোটে না ভাঙা ঘরে ছানি নাই

জানো শুধু ভোগ বিলাস জানে গরিবের সর্বনাশ

কেড়ে নাও শিশুর মুখের গ্রাস তোর মনে কি দয়া নাই।

পূর্বেও বলেছি, মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অধ্যাত্মবাদের দিকে ঝুঁকে; এটাই সাধারণের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আবদুল করিমের জীবনদৃষ্টি এক্ষেত্রে বিপ্রতীপ। দুর্বিন শাহ এক্ষেত্রে অনুশোচনাগ্রস্ত :

নামাজ আমার হইল না আদায়

নামাজ আমি পড়তে পারলাম না

দারুণ খান্নাছের দায়।

কিন্তু দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট, শ্রমজীবী, অনাহারী-দুঃখী মানুষের যে ক্ষুণিœবৃত্তি নিবারণেই সময়ক্ষেপণ হয়, নামাজ পড়ার অবকাশটুকুও পান না, এমনকি বেহেশত, দোযখের স্বরূপ কল্পনাও ফুসরত পান না; দুর্বিন শাহ যে কারণে শনাক্ত করতে পারেননি, আবদুল করিম তা অব্যর্থভাবে শনাক্ত করেছেন। কারণ তিনি ভাটি অঞ্চলের গণমানুষের মর্মবেদনা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন :

বেহেস্ত ধনীর জন্য রয় গরিবের নাই অধিকার

স্বচক্ষে দেখিলাম যাহা গরিব হলে দোযখ তাহার।

গরিব হয় খোদার দুশমন, না হলে কি জ্বালাতন?

তত্ত্বগান ছাড়া ক্রমশ গণসংগীতের দিকে ঝুঁকে পড়া তাঁর কাছে কোনো ফ্যাশন ছিলো না। গণমানুষের মুক্তি কামনার সঙ্গে খুব গভীরভাবে তিনি একাত্ম হয়ে পড়েছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলতে থাকেন : বর্তমান আমার কাছে কোনো গৌণ বিষয় নয়। …কিন্তু আমার কান্না পায়, ভেতরে তীব্র হাহাকার অনুভব করি যখন দেখি যে চোখের সামনে অবিকল যন্ত্র হয়ে উঠল মানুষগুলো। …সবচেয়ে আক্ষেপ লাগে, যখন দেখি এই যে বিজ্ঞান বা যন্ত্রসভ্যতার ফল ভোগ করছে কয়েকজন হাতেগোনা কোটিপতি। এই যন্ত্র সভ্যতা ফলত ধনী, গরিবের মধ্যকার বৈষম্যকে আকাশ-পাতাল পর্যায়ে উন্নীত করেছে। বিশ্বব্যবস্থায় পুঁজিবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদের প্রভাব এবং সমাজ কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের সূচনা, মূল্যবোধের সামূহিক বিপর্যয়, ভোগবাদী মানসিকতা, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প আবদুল করিমকে আবহমান লোকজীবনের অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাঙালি-সংস্কৃতির প্রতি নষ্টালজিক করে তোলে। একই সঙ্গে লোকায়ত সংস্কৃতির ধারা, সময়চেতনা, পরিবর্তনশীল সমাজ-ব্যবস্থার পটভূমিকায় ভবিতব্য নির্ধারণে এবং সংকট নিরূপণের কালজয়ী ভাষ্য :

দিন হতে দিন আসে যে কঠিন

করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম।

কিংবা,

আমার মজুর-চাষী

দেশকে যদি ভাােবাসি

সবার মুখে ফুটবে হাসি

দুঃখ যাবে দূরে।

প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ও সমাজ ব্যবস্থায় বিশেষ করে অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতি চরম বিক্ষুব্ধ শাহ আবদুল করিমের সকল দরদ ও মমত্ববোধমূলক মেহনতি কৃষক-শ্রমিক, সর্বহারা-শোষিত-বঞ্চিত-লাঞ্ছিতের প্রতি উচ্চকিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক মুক্তি আসে না। শাসক-শোষকের চারিত্র্য একইরকম থেকে যায় তাঁর কাছে। দৃপ্তকণ্ঠে তাই তিনি গাইলেন গণজাগরণের গান :

রক্ত দিয়ে স্বাধীন হলেম

দুর্দশা কেন যায় না?

শোষিতগণ বেঁচে থাকুক

শোষক তাহা চয়া না।

বাউল আবদুল করিম বলে

স্বার্থপর শোষক দলে

ব্যক্তি স্বার্থ নিয়ে চলে

সমষ্টির গান গায় না।

ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টির প্রতিই তাঁর গুরুত্ব। তাই তিনি সমাজবাদী। গণমানুষের অতি আপনজন। স্বাধীনতা সংগ্রামের যে মৌল উদ্দেশ্যÑ অর্থনৈতিক মুক্তি; তা-ই যখন অর্জিত হলো না তখন ‘স্বাধীনতা’ অর্থহীন হয়ে পড়ে তাঁর কাছে। নব্য স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশেও সাম্য দেখতে না পেয়ে, তিনি বৈষম্যমূলক নীতিকে নির্দেশ করেন কারণ হিসেবে :

চেয়েছিলাম প্রেমপ্রীতি

পেয়েছি ভয়-ভীতি

চলেছে বৈষম্যনীতি

কেউ খায়, কেউ খায় না।

তবু স্বদেশকে, স্বদেশের মানুষকে তিনি সমানভাবে ভালোবাসেন। দুঃখ-দুর্দশা, দারিদ্র্য আর ক্ষুধার বিরুদ্ধে নিয়ত সংগ্রামশীল থেকেও স্বদেশকে তিনি আমৃত্যু ভালোবেসেছেন :

আমি বাংলা মায়ের ছেলে

জীবন আমার ধন্য যে হায়

জন্ম বাংলা মায়ের কোলে।

দেশকে তিনি মা হিসেবে জ্ঞান করেন। তাই হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকল সন্তানই এক মায়ের সন্তান। সাম্প্রদায়িক ভেদ-নীতির বিপ্রতীপ অসাম্প্রদায়িক উদারনৈতিক ভাবনার সহজ-সরল অভিব্যক্তি সুর পায় তাঁর কথায় :

এইসব নিয়ে দ্বন্দ্ব কেন

কেউ হিন্দ্ ুকেউ মুসলমান

তুমি মানুষ আমিও মানুষ

সবাই এক মায়ের সন্তান।

করিমের দেহতত্ত্বের গানগুলোতে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে অনন্ত জিজ্ঞাসা উচ্চারিত হয়েছে। আবার ¯্রষ্টার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুফিবাদী প্রেরণাও আছে। অবিমিশ্র বাউলদর্শন এতে নেই। যদিও তাঁর গানে ভণিতায় ‘বাউল আবদুল করিম বলে’-এই আত্মস্বীকৃত ‘বাউল’ অভিধার প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। যেটি অন্য কোনো লোককবি; এমনকী বাউল পুরোধা লালন ফকিরও ব্যবহার করেন নি। এটিও স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক। রূপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি সমকালীনতার অনুষঙ্গ ‘গাড়ি’কেও দেহের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, মানবগাড়িতে চড়ে তিনি বন্ধুরূপী ¯্রষ্টার বাড়িতে রওনা হয়েছেন :

চড়িয়া মানব গাড়ি

যাইতেছিলাম বন্ধুর বাড়ি

মধ্য পথে ঠেকলো গাড়ি

উপায় বুদ্ধি মেলে না।

কিংবা,

আমি তোমার কলের গাড়ি

তুমি হও ড্রাইভার।

এভাবে তাঁর গানের সমৃদ্ধ ভা-ার হতে দর্শন ও সাহিত্যের সম্পূরক রূপের অজ¯্র নজির উপস্থাপনে অসম্ভব নয়। শাহ আবদুল করিমের গানকে আমরা যেমন সাহিত্যরূপে গণ্য করতে পারি, তেমনি তাতে প্রতিফলিত চিন্তাসূত্রকে দর্শনরূপেও বিবেচনা করতে পারি।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা