Chinno_35 Cover

ক্রো ড় প ত্র ১

… একটা লোকও বলেননি, ‘নৌকাডুবি’ ভালো উপন্যাস কিন্তু আমার বিচারে ‘নৌকাডুবি’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাংলা উপন্যাস

দেবেশ রায়ের সাক্ষাৎকার
দেবেশ রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মোস্তাক আহমেদ
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ৩১ মে ২০১৮ খ্রি.

[এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায়। নিবিষ্টচিত্ত নিপুণতায় তিনি মৌলিক রচনার মুক্ত প্রাঙ্গণে দোসরহীন চরম আধুনিক গবেষক। বাংলা কথাসাহিত্যকে পরিণত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর প্রাণপাত, বিরামহীন মহাকাব্যিক বিস্তৃতিতে ভাস্বর। তিনি মনে করেন, তাঁর সমস্ত লেখা তাঁর সত্তাকেই ধারণ করছে, ফলে আলাদা করে সাক্ষাৎকারের মতো কৃত্রিমতার কোনো অর্থ হয় না। অনেক সাধ্য সাধনার পর কথায় কথায় সাক্ষাৎকার জমে ওঠে। কখনও রাগান্বিত স্বর, কখনও হাসি হাসি মুখ, কখনও মৃদু বকুনি কিংবা আবেগে ভিজে যাওয়া চোখ— এসব সে সাক্ষাৎকারের সম্পদ। তৈরি করে নিয়ে যাওয়া প্রশ্ন তখন সাক্ষাৎকারে গড়ায়— চলে যায় ছকের বাইরে, ঠিক যেভাবে দেবেশ রায় বার বার ভাঙেন তাঁর লেখার ছক। এই সাক্ষাৎকারের অনুঘটক সুশীল সাহা। তিনি না থাকলে সাক্ষাৎকার জমতই না। সমস্ত সাক্ষাৎকারটি চলমান ক্যামেরাবন্দি করেছেন সার্থক দাস। অনুলিখনেও তার সহযোগিতার ঋণ স্বীকার করতেই হয়।]

মোস্তাক আহমেদ : কেমন ছিল আপনার ছোটোবেলার জীবন, পড়াশুনো, কেমন সে স্মৃতিকাতরতা! …

দেবেশ রায় : আমার জীবনে খুব গোপন তথ্য কিছু নেই। সবটাই প্রকাশ্য। আমি বাংলাদেশের পাবনা জেলার একটি গ্রামে জন্মেছি।১ গ্রামটা সম্পন্ন গ্রাম। স্বভাবতই ব্রাহ্মণ-প্রধান। সেখান থেকে ছ-সাত বছর বয়সে সপরিবারে জলপাইগুড়ি চলে আসি।২ সেখানেই আমার বসবাস। জলপাইগুড়িই আমার জায়গা। জলপাইগুড়ির স্কুল-কলেজে পড়েছি এবং সেখানে বি.এ. পাশ করার পর কলকাতায় এসেছি এম.এ. পড়তে।৩ দু-বছর পর জলপাইগুড়ি ফিরে গিয়ে ঐ কলেজেই পড়িয়েছি। তারপর ১৯৭৫ সালে কলকাতায় চলে আসি ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস’৪ এ গবেষক হিসেবে। এর মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই।

মোস্তাক আহমেদ : আসলে যেটা জানতে চাইছি, সেটা হল, স্মৃতি আপনার লেখাকে কীভাবে প্রভাবিত করে? ব্যক্তিগত স্মৃতি, ব্যক্তিগত জীবন? পাবনা জেলার বাঘমারা গ্রাম থেকে জলপাইগুড়ি চলে আসা…

দেবেশ রায় : ঔপন্যাসিক বা গল্প লেখকের স্মৃতি কী করে কাজ করে, আপনার এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, আমার স্মৃতিতে ভীষণ রকম ছায়া ফেলে আছে আমার গ্রাম, আমার মামাবাড়ি নাটোর এবং এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা। এটা মেকানিকালি বলা যাবে না যে, এই স্মৃতিটা এইভাবে অপারেট করছে। আমার মনে হয়, আরেকজন আরেকরকম ভাবতে পারেন। একজন লেখকের স্মৃতির জগৎ যদি সঞ্চয় ভা-ার না হয়ে ওঠে, যখন যা দরকার তখন তা ঐ স্মৃতি থেকে যদি না পাওয়া যায়, তাহলে সেই লেখকের সীমাবদ্ধতা ঘটে যায়। গল্প বা উপন্যাসে স্মৃতির জায়গা অনেক বড়ো এবং জটিল এবং অজ্ঞাত। লেখকের কাছে জানতে চাইলেও সে বলতে পারবে না যে, এটা ঐ স্মৃতি থেকে এসেছে। কিন্তু যখন সে লিখছে তখন একটা পার্টিকুলার সিচুয়েশন— বিশেষ পরিস্থিতি, ঠিক কোনো গহন থেকে সেই স্মৃতিটাকে জাগিয়ে তোলে এবং এটার মধ্যে একটা ম্যাজিক থাকে। হয়তো আমার চেনাজানা কারোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। ওই যে ঘটনাটা আমি লিখছি, কিন্তু সেখানে মানুষ হিসেবে উপস্থিত হচ্ছে হয়তো আমার খুব পরিচিত আত্মীয়জন। মানে, একজন গল্প লেখক বা ঔপন্যাসিক একজনের পায়ের উপর একজনের ধড়, আরেকজনের মাথা বসান। আমার এরকম জীবনে অনেকবার হয়েছে যে, একটা উপন্যাস লিখছি, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না যে, সেই উপন্যাসের একটি চরিত্র এরকমভাবে চলছে কেন! কিছুতেই চিনতে পারছি না। কিন্তু লিখেই যাচ্ছি। খুব পরিচিত লোক কেউ, তাকেই অনুসরণ করে লিখে যাচ্ছি। কিন্তু আমি মনে করতে পারছি না যে, এটা কার চেহারা। অনেক পরে মনে হয়েছে অন্য একজনের কথা, আরে ওই তো! ওর মতো করেই চলাফেরা, ওর অভ্যেস, ওর মুদ্রা, ওর কথা বলা, এগুলিই তো এসেছিল। ঠিক বোঝা যায় না। এই রহস্যটার মধ্যে দিয়ে যদি না যাওয়া যায়, তাহলে উপন্যাস সংগঠিত হয় না। স্মৃতি সঞ্চয় হল গল্পকার এবং ঔপন্যাসিকের প্রায় সবচেয়ে বড়ো সঞ্চয় এবং এই স্মৃতিটাকে তিনি প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন কিনা, যা তার মনের গহন থেকে বেরিয়ে আসে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্মৃতিই আসলে নির্মাণের কাজ করে। যেমন আমি যোগেন ম-ল৫কে কোনোদিন দেখিনি, যোগেন ম-লের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী উপন্যাসটা পড়ে বলেছিলেন, ‘এ তো আশ্চর্য, উনি কোনোদিন দেখেননি, অথচ যোগেন ম-ল কীভাবে খেত, কীভাবে হাঁটত, কীভাবে চলত সমস্তটাই অবিকল আছে। মনে হচ্ছে উনি সিনেমা দেখাচ্ছেন।’ এ নিয়ে তিনি আমাকে একদিন প্রশ্ন করেছিলেন। আমি বলেছি, ওনার চেহারা, চরিত্র— এগুলো তো আমি জানি। মানে, স্মৃতিকথায় পড়েছিলাম। তারপর ওনার যে ভূখ-, সেই ভূখ-ে যখন পা ফেলছি, তখন ওনার পায়ের স্টেপ আমি দেখতে পাচ্ছি এবং সেই পায়ের যে পদক্ষেপ, সেই পদক্ষেপটাই দেখছি। লম্বা মানুষ, একটু ভারিক্কি চেহারা, তাছাড়া উনি কলকাতায় যে বাড়িতে এসে থাকতেন, সেই বাড়িতে ওনার অনেক ছবি দেখেছিলাম। আমি এই কথাগুলো আপনার সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারেই বোধহয় প্রথম বললাম। অভিজ্ঞতা নয়, স্মৃতিই গল্পলেখক এবং ঔপন্যাসিকের প্রধান ভিত্তি।

আমার ধারণা, বাংলা সাহিত্যে অভিজ্ঞতা কথাটাকে খুব… খুব ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়। খুবই ভুলভাবে। এবং সেই ভুল ব্যবহারের ফলে গল্প, উপন্যাস নষ্ট হয়ে যায়। অভিজ্ঞতার মানে এটা নয় যে, সে কত বিচিত্র দিকে ঘুরেছে। এ ভুল ধারণা লেখকদেরও আছে। ধরুন সমরেশ বসু। সমরেশ বসুর মতো পরাক্রান্ত লেখক, ওনার মতো কল্পনির্মাণ ক্ষমতা বাংলা সাহিত্যে খুব কম লেখকের আছে। কিন্তু যেভাবেই হোক উনি অভিজ্ঞতা বলতে বুঝতেন, প্রত্যক্ষভাবে একটা জিনিস দেখছি কিনা। ধরুন, উনি বালুচরি নিয়ে লিখবেন। উনি বালুচরি তাঁতিদের সঙ্গে থাকলেন, কষ্ট করলেন, তাদের জীবনের ব্যাপার জানলেন তারপর লিখলেন। এগুলোকে ইংরেজি ভাষায় বলা হয়, ন্যাচারালিস্টিক লেখা। কিন্তু ইউরোপে ন্যাচারালিস্টিক লেখকদের মধ্যে এমিল জোলা (ঊসরষব তড়ষধ)-র মতো লেখকও আছে। আমাদের দেশে এই অভিজ্ঞতা ব্যাপারটাকে অনেক ছোটো করে আনা হয়েছে। কেউ চাকরিসূত্রে কোনো জায়গায় গেছেন, তিনি সেখানকার কথা লিখেছেন। এটাকে অভিজ্ঞতা বলে না অভিজ্ঞতা একমাত্র সেটা, যা স্মৃতিতে জমা হচ্ছে এবং যা স্মৃতি থেকে উদ্ধার করা যায়। অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির এই সংযোগটা না হলে গল্প, উপন্যাস হয় না। আমার অভিজ্ঞতাতে নানা কিছু থাকতে পারে। কেউ যদি কোথাও বেড়াতে যায়, তাহলে সে ফিরে এসে তো বেড়ানোর গল্প বলবে। সেটা অভিজ্ঞতা নয়। যতক্ষণ না অভিজ্ঞতাটা তার সারাৎসার নিয়ে, স্থায়ী স্মৃতির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে ততক্ষণ তা অভিজ্ঞতা নয়।

আপনি যেভাবে আমার ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে প্রশ্নগুলো সাজিয়েছেন— তার মধ্যে একটা কৃত্রিমতা আছে।৬ আপনি যে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মেলাতে চাচ্ছেন, তা মিলবে না। আমি যতদিন জলপাইগুড়িতে ছিলাম, আমি উপন্যাস লিখতে পারছিলাম না। কিছুতেই উপন্যাসের আকার পাচ্ছিলাম না। সবসময়ই সেটা হয়ে যাচ্ছিল আমার পঠিত সাহিত্যের রিফ্লেকশান। আমার নিজের আকার পাচ্ছিলাম না। সেটা আমি প্রথম পাই, আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে৭ লেখাটাতে। ওটা উপন্যাস হিসেবে আমি লিখিনি। গল্প লিখছিলাম। কিন্তু হঠাৎ একসময় বুঝলাম, গল্পটা বেড়ে যাচ্ছে। আমি সেটাতে বাধা দিলাম না। গল্পটা বাড়তে থাকল এবং গল্পটা বাড়ছে যখন, তখন আমি বুঝতে পারছি, গল্পটা একটা অন্য জায়গায় যাচ্ছে। আমি আটকালাম না। না আটকে আমি গল্পটাকে তার নিজের ঢালের মতো বইতে দিলাম, নদী যেমন। নদী তো চলে নিজের ঢাল অনুযায়ী, মাটির ঢাল অনুযায়ী। আপনি নদীটাকে উপর থেকে দেখে বুঝতে পারছেন, নদীর তলার ঢালটা কীরকম। গল্পও তাই। গল্প তার নিজের ঢাল খুঁজে নেয়। আমি যখন আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে লিখছি, তখন আমি দেখতে পাচ্ছি, গল্পটা নিজের ঢাল খুঁজে নিচ্ছে। আমার পক্ষে স্বাভাবিক ছিল, ওখানে গল্পটাকে থামিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া। আমি থামলাম না। তা থেকে তিনটে গল্প তিন জায়গায় বেরল। তারপরে ওটা একটা বই হল।

মোস্তাক আহমেদ : সেটা শুধু আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে উপন্যাসটির ক্ষেত্রে নয়, আপনার অনেক লেখার ক্ষেত্রেই তো এই রকম ঘটনা ঘটেছে?

দেবেশ রায় : হ্যাঁ— এটা ঘটেছে। মানুষ খুন করে কেন৮— এই উপন্যাসটা আমি প্রায় আট-দশ বছর ধরে লিখেছি। লিখেছি— ফেলেছি, লিখেছি— ফেলেছি। ওটা এখনও পড়তে ভালো লাগবে। কিন্তু ওটাও উপন্যাস পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি একটা উপন্যাস। ওটা আমার মৌলিক উপন্যাস বলে ঠিক মনে হচ্ছিল না। ফলে নানান সময়ে লেখাটা বদলাচ্ছিল। লেখা তো বদলাতেই পারে! এখনও ওই বইটা অনেকে পড়ে।

মোস্তাক আহমেদ : এই যে, উপন্যাস পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ খুন করে কেন লিখেছেন বলছেন, কোন্ ঔপন্যাসিক পড়া বেশি কাজে লেগেছে বলে মনে করেন? কোন্ ধরনের উপন্যাস?

দেবেশ রায় : আমি বরাবরই ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক্স’ এর ছাত্র। নিবিড় ছাত্র। আমার কলেজ জীবনে, আমার কলেজ লাইব্রেরির সৌজন্যে ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক্স’ পড়া আমার শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের লাইব্রেরি ছিল ভীষণ ভালো, সমৃদ্ধ। তলস্তয়, দস্তয়েভস্কির অজ¯্র, অজ¯্র লেখা পাওয়া যেত। ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক্স, গ্রিক নাটক, দান্তে কৈশোরে এবং যৌবনে আমাকে ঘিরে রাখত। তখন আমি খুব একটা লিখতাম না। কিন্তু লেখা কাকে বলে, সেই প্রশ্ন যখন নিজের মাথায় আসত, তখন ওই লেখাগুলোই মনে পড়ত। আর বাংলা গল্প, উপন্যাসকে খুব অসম্পূর্ণ বলে মনে হত। মনে হত, বৃহৎ কিছু নেই— বড়ো কিছু নেই। তবে ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে। ব্যতিক্রম বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর (তারাশঙ্করের প্রথম দিকের নয়, গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম থেকে), বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় খুব একটা ধরতে পারতাম না। বুঝতাম একটা অন্যরকম গ্রেটনেস আছে, উপস্থাপন অন্যরকম হচ্ছে, উনি সবসময় একটা অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ধরতে পারতাম না। তার জন্য অনেক সময় দিতে হয়েছে আমাকে। আমরা যখন বই পড়া শুরু করি তখন মানিকবাবুর খুব নিন্দে। ভীষণ নিন্দে। তিনি লিখতে পারছেন না, কমিউনিস্ট হয়ে লেখা নষ্ট হয়ে গিয়েছে— অমুক, তমুক ইত্যাদি সমালোচনা। কিন্তু আমি যখন পড়তাম তখন আমি বুঝতে পারতাম, উনি এমন একটা আড়ালের কথা বলছেন, এমন একটা জগতের কথা বলছেন, যা শব্দ ব্যবহারের সঙ্গে শব্দ ব্যবহারে তৈরি হচ্ছে। আমি ধরতে পারছি না আড়ালটা ঠিক কী?

আমার দাদাও একজন সাহিত্যিক ছিলেন।৯ বাড়িতে প্রায়ই আড্ডা হত। আমি আড়াল থেকে সব শুনতাম এবং তাতে আমার সব সময়ই মনে হত ওরা ঠিক বলছে না। আমি সেটা বলবার মতো সাবালকত্বও তখন অর্জন করিনি। আর ওরা যে সমস্ত কিছুতে উত্তেজিত থাকতেন, সুবোধ ঘোষের গল্প, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের গল্প এগুলো পড়লেই আমার মনে হত যে এখানে মিথ্যে আছে। লেখকের নিজের লেখা সম্পর্কে একটা ধারণা আছে, সেই ধারণা অনুযায়ী তাঁরা গল্পটা বানাচ্ছে। সত্য নেই এখন আপনি যদি আমাকে বলেন যে গল্প, উপন্যাসের সত্য কী? আমি বলতে পারব না। ওটা বলা যায় না।

মোস্তাক আহমেদ : মানুষ খুন করে কেন লেখার ক্ষেত্রে আপনার মনে হয়েছে, ‘ওটা উপন্যাস পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি একটা উপন্যাস’— তারপর তো অনেক উপন্যাস লিখেছেন, লিখছেন— লেখবার এই ধারাবাহিকতায় বদল কীভাবে এল?

দেবেশ রায় : জানি না। শুনুন, এগুলো কোনো সরলরৈখিক প্রক্রিয়ায় ঠিক হয় না। আমি যখন মানুষ খুন করে কেন লিখছি এবং বারবার, বারবার, বারবার লিখছি এবং তৎসত্ত্বেও মনে হচ্ছে, লেখাটার উজ্জ্বলতা আছে, দার্জিলিং পাহাড়কে নিয়ে একটা রোমান্টিক আবহাওয়া আছে, সবই ঠিক আছে। কিন্তু আমি এটা বুঝতে পারছি, এটা আমার উপন্যাস নয়। ঠিক তার মাঝখানে আমি আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে পুজোর সময় লিখতে বাধা হলাম। তখনও আমার মানুষ খুন করে কেন উপন্যাসটি লেখা শেষ হয়নি। মানুষ খুন করে কেন-র ড্রাফট যখন করছি, তখনই আমি আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে লিখে ফেলেছি এবং মনে হয়েছে যে, এটা আমারই লেখা। কিন্তু মানুষ খুন করে কেন-র ক্ষেত্রে মনে হয়নি। তারপরেই আমি হাত দিলাম মফস্বলি বৃত্তান্ত-তে।১০ এর আগে আমি গ্রাম নিয়ে লিখিনি। মফস্বলি বৃত্তান্তই জলপাইগুড়ি থাকাকালে আমার অ্যারাইভাল পয়েন্ট। মফস্বলি বৃত্তান্তটা অনেক জটিল ব্যাপার। জলপাইগুড়িতে লিখেছি, এখানে এসে আবার বদলেছি। ওর তিনটে সংস্করণে তিনরকম অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে। কিন্তু যেটাকে আধার বলে, আমি সেই আধারটা পেয়ে গেছি, যেখানে ওসব অ্যারেঞ্জমেন্ট তুচ্ছ হয়ে যায়। এই চ্যাপ্টারটা তো ওখানে ছিল না, এখানে এল কী করে? ওটা আসলে অন্য লজিকে চলে এসেছে। নিজের থেকেই বেড়েছে উপন্যাসটা।

মোস্তক আহমেদ : আচ্ছা, এই বাড়ছে বলেই কী আপনার লেখার শেষে বৃত্তান্ত শব্দটা যোগ করেছেন? শুধু মফস্বলি বৃত্তান্ত নয়, আরও অনেক লেখাতেই ‘বৃত্তান্ত’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। একই শব্দের এই পুনরাবৃত্তি কেন?

দেবেশ রায় : না না। এটাই প্রফেসরদের নিয়ে মুশকিল (হাসতে হাসতে)— সবসময় একটা কারণ খুঁজতে হবে। সাহিত্য বা শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে এরকম কোনো কারণ থাকে না। যতক্ষণ আপনি কারণটাকে ফলো করছেন, ততক্ষণ হয় আপনি ব্যর্থ হচ্ছেন, নয় লেখক ব্যর্থ হচ্ছেন।

মোস্তাক আহমেদ : কিন্তু একটা থিওরিতে পৌঁছতে গেলে তো সেই কারণগুলো ব্যাখ্যা করেই পৌঁছতে হয়? মানে…

দেবেশ রায় : (থামিয়ে দিয়ে) একটা থিওরিতে পৌঁছতেই হবে কেন? আপনার দায়িত্ব তো পড়া। আপনার দায়িত্ব তো থিওরি নয়। থিওরি দিয়ে পড়তে গেলেই মুশকিল, আমাদের আচার্য স্থানীয়েরা এতদিন ব্লান্ডার করে এসেছেন। সেই ব্লান্ডারে তাঁরা কোনো উপন্যাসই পড়তে পারতেন না। শ্রীকুমারবাবু, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু এমনকি বিষ্ণু দে, সুধীন দত্তেরাও। এরা মহান ইনটেলকচুয়াল। অসামান্য পঠন-পাঠন। কিন্তু ওঁরা যখন একটা বাংলা উপন্যাস পড়তেন, তখন আসলে একটা ইউরোপিয়ান উপন্যাস পড়তেন। এঁরা জানতেনই না, একটা উপন্যাসের স্থানিকতা কতটা ইমপর্টেন্ট। যেটাকে আমি ইউরোপিয়ান মডেল বলি সেটা বাংলায় হতে পারে না। সেইজন্য এইসব খুচরো প্রশ্নে ফেঁসে যান এঁরা। যেমন চোখের বালি-র বিনোদিনীর শেষটা ঠিক হল না— ঠিক হল না মানে, ওঁদের মতো গল্প হল না। কিন্তু যাঁরা বাংলাদেশের ইতিহাস জানেন, বাঙালি সমাজকে চেনেন তাঁরা জানেন যে, ওটাই একমাত্র পরিণতি। যে কারণে আমি এতো বেশি বলছি আজকাল নৌকাডুবি ইজ ওয়ান অফ দ্য মেজর নভেল। একটা লোকও বলেননি যে, নৌকাডুবি ভালো উপন্যাস কিন্তু আমার বিচারে নৌকাডুবি অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাংলা উপন্যাস।

মোস্তাক আহমেদ : আপনি ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথকে ঠিক কেমনভাবে দেখেন? ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তো অনেক প্রশ্ন ওঠে, অনেক বিতর্ক ওঠে। আদৌ রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলি উপন্যাস কিনা, সেটা নিয়েই অনেকে অনেক কথা বলে। নৌকাডুবিকে যদি এই স্থানে রাখেন, তবে সামগ্রিকভাবে ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথকে ঠিক কোন স্থানে রাখবেন?

দেবেশ রায় : গ্রেট। গ্রেট।

মোস্তাক আহমেদ : কেন? একটু যদি ব্যাখ্যা করেন…

দেবেশ রায় : এবার আমি একটু ছোটো কথায় আসছি। আপনাদের পক্ষে, প্রফেসরদের পক্ষে ব্যাপারটা সহজ। আমি থিওরির কথায় আসছি। একজন উপন্যাস বা একজন ঔপন্যাসিককে বিচার করার দুটো উপায় আছে। আমি তো উপন্যাস লিখি, গল্প লিখি। আমি কীভাবে বিচার করব সেটা তো একরকম কথা, আর আপনারা কীভাবে বিচার করবেন সেটা আরেকরকমের কথা। আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। আমার সেই প্রাইভেসিটা কী?

আমি দুটো শব্দ খুব ব্যবহার করি। ঔপন্যাসিক কল্পনা আর ঔপন্যাসিক ক্রিয়া- কৌশল। ডায়লগ বা প্রকৃতি বর্ণনা বা কোনো স্থানিক বর্ণনা— এইগুলো হচ্ছে ক্রিয়াকৌশল। উপন্যাসের স্ট্রাটেজি। একটা উপন্যাসে যদি ঔপন্যাসিক কল্পনার ছিটেও না থাকে, তাহলে শুধু ক্রিয়া-কৌশলের গুণেই একটা উপন্যাস, উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে। ব্রিলিয়ান্ট উপন্যাস। শুধুমাত্র ক্রিয়া-কৌশল দিয়ে। আবার একটা উপন্যাসের ক্রিয়া-কৌশল কিছুই অপারেট করছে না, কিন্তু ঔপন্যাসিকের কল্পনাটা দারুণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে উঠেছে, যেমন ধরুন, কপালকু-লা এবং তিতাস একটি নদীর নাম। তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটিতে ঔপন্যাসিক ক্রিয়া- কৌশলের দুর্বলতা এত বেশি যে, ভাবা যায় না। কোনো কার্যকারণের সম্পর্ক নেই, ইনকমপ্লিট আখ্যান কিন্তু ঔপন্যাসিক কল্পনা একটা ভূখ-ের ভেতরের সত্যকে এমন জায়গায় টেনে তুলেছে যে, তার বিস্তারের উপন্যাসটা মহত্ব পেয়ে গেছে।

রবীন্দ্রনাথকে ঔপন্যাসিক হিসেবে কোন স্থানে রাখব? এই প্রশ্নের আমি উত্তর দিলাম ‘গ্রেট’। কেন বললাম? একজন ঔপন্যাসিক কল্পনা করতে পারছেন, ১৮৫৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, সিপাহি বিদ্রোহের সময় একটা আইরিশ দম্পতি মারা গেল এবং তাদের ছেলেকে রাস্তায় ফেলে দিল। এমন একটা ইমাজিনেশান। একটা, ওয়ান— সমস্ত উপন্যাসটিকে যেখানে তুলে দিয়েছে পৃথিবীর কটা উপন্যাস তার তুল্য? ওয়ার অ্যান্ড পিসের বেজোকভও বাবার বেআইনি ছেলে। ইউরোপেই কাটিয়েছে, বিশাল বড়োলোক। সে রাশিয়ায় এসে যুদ্ধের মধ্যে পড়েছে, কিন্তু কোনো তালগোল খুঁজে পাচ্ছে না। এটাকে বলে ঔপন্যাসিক কল্পনা। ইমাজিনেশান। সে যদি রাশিয়াতেই থাকত তাহলে সে ছোটবেলা থেকেই সবকিছু জানত। ও এই যে কার্যকারণ বোধ হারিয়ে ফেলছে বুঝতে পারছে না লজিকটা, কে কী বলছে, কে কী করছে কিছুই বুঝতে পারছে না, জলের ভেতর দিয়ে হাঁটছে, অচেনা জলের ভেতর দিয়ে হাঁটছে, সেটাই ওকে হিরো করে দিয়েছে।

মোস্তাক আহমেদ : গোরার প্রসঙ্গ যখন এল, তখন জানতে ইচ্ছে করছে যে, এই উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ আত্মপরিচয়ের সীমায়িত গ-িকে অতিক্রম করে একটা ফিলজফিতে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, সেটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

দেবেশ রায় : চেষ্টা করেছেন আবার কী? রবীন্দ্রনাথ কী সেইরকম আর্টিস্ট যে চেষ্টা করলে ফেল করবেন?

মোস্তাক আহমেদ : না, আমি আসলে সেভাবে বলতে চাইনি— আমি জানতে চাইছিলাম…

দেবেশ রায় : (থামিয়ে দিয়ে) শুনুন, ডিসকভারির একটা টাইটেল ছবি আমার বেশ প্রিয়। একটা হরিণ দৌড়াচ্ছে, আর সিংহ তাকে তাড়া করেছে। দু-জনেই একসঙ্গে ছুটছে। একসময় হরিণটা একটা ছোটো খাল পেরিয়ে ওপারে চলে গেল আর সিংহটা কয়েক স্টেপ গিয়ে থেমে গেল। অ্যাটাক করল না। কেননা, হরিণের দৌড় আর সিংহের দৌড়ের মধ্যের একটা সিম্ফনিক মিল আছে। কিন্তু একটা পয়েন্টে গিয়ে সিংহ বুঝল, তার জাম্পটা আর হবে না। সে আর নড়বে না। তারা কখনো ফলস্ জাম্প দেয় না। রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন সেই লেভেলের লেখক, যাঁদের কোনো ফলস্ জাম্প হয় না।

মোস্তাক আহমেদ : আমি বলতে চাইছি যে, রবীন্দ্রনাথ একটা উত্তরণের জায়গায় সেই সময়ই পৌঁছে যাচ্ছেন, আর আজকের ২০১৮-র ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে আপনার কী মনে হচ্ছে?

দেবেশ রায় : না উত্তরণ-ফুত্তরণ বলবেন না। আমরা অত্যন্ত কন্ক্রিটলি আলোচনা করছি রান্নাবান্না নিয়ে। শিল্প-সংক্রান্ত আলোচনাটাকে প্রবন্ধ করবেন না। সবসময় একটা তত্ত্বের দিকে যাওয়া …। আমি ছোটো একটা উদাহরণ দিচ্ছি। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসটির হয়তো দ্বিতীয় খ-ে আছে, একটা হাতি কাশবনে ঢুকেছে, বেরিয়ে আসছে যখন, ওর সারা শরীরে সাদা কাশ ফুল লেগে আছে। আমি ওটা যেদিন পড়লাম, আমি ছটফট করলাম। আহাঃ আহাঃ। কী ঔপন্যাসিক কাজ! এটা যদি আমি করতে পারতাম! এটা উপন্যাসের কল্পনার জগৎ নয়, এটা উপন্যাসের কারুকাজ। মণিকারির কাজ।

মোস্তাক আহমেদ : আচ্ছা, এটা তো ঠিক যে, গোরা পড়ে পাঠক হিসেবে আমার একটা আত্ম-উপলব্ধি হবে এবং সেই আত্ম-উপলব্ধিতে একটা আত্ম-পরিচয়ের সংকট থেকে মুক্ত হতে পারব আমি। কিন্তু ২০১৮-তে একে আজকের ভারতবর্ষে যে রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট, সেখানে দাঁড়িয়ে কোথাও মনে হয় না যে, ওখান থেকে আমাদের অনেকটা অবনমন ঘটেছে?

দেবেশ রায় : কিন্তু তার সঙ্গের রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কি? অবনমন ঘটেছে তাতে রবীন্দ্রনাথ কী করবেন?

মোস্তাক আহমেদ : রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কে জানতে চাইছি না। জানতে চাইছি, আজকে আপনার উপলব্ধিটা কেমন হচ্ছে এই সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে?

দেবেশ রায় : আরে, একটা উপন্যাস কী একটা জাতির আধ্যাত্মিক চিন্তার পরিবর্তন ঘটাতে পারে নাকি? একটা উপন্যাস কয়েক পাতার গল্প মাত্র। সকলের কাছে সব চান কেন? আপনি যদি একটা গরুকে বলেন বাঘের মতো দুধ দাও, দেবে? একটা গল্পকে গল্পের দিক থেকে বিচার করুন।

ঔপন্যাসিক কল্পনা আমাদের খুব কম ঔপন্যাসিকের আছে। কিন্তু উপন্যাসের কারুকাজ অনেক লেখকের আছে। সেই কারণে আমাদের উপন্যাসে পাঠে গোলমাল হয়ে যায়। আমরা ঠিক বুঝতে পারি না কী দিয়ে বুঝবো। আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস নিয়ে আপনার কী কী আপত্তি আছে?

মোস্তাক আহমেদ : না। আমার ব্যক্তিগতভাবে কোনো আপত্তি নেই। বরং আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস একপ্রকার ডিকনস্ট্রাকশন একটা বিনির্মাণ— আঙ্গিকের— ভাষার বিষয়ের। প্রত্যেকটা উপন্যাস আলাদা আলাদা ধাঁচে তৈরি। প্রথাগত ধাঁচ থেকে অনেকটা মৌলিক। সেটা হয়তো ধরতে পাঠকের অসুবিধা হয়েছে।

দেবেশ রায় : ধরতে অসুবিধা হওয়ার কী আছে? অনেক বছর পার হয়ে গেছে। এখনও যদি ধরতে না পারে, আর কবে পারবেন?

মোস্তাক আহমেদ : উত্তর বাংলা, উত্তরদেশ, পরিচয়, প্রতিক্ষণ, ইংরাজি পাক্ষিক পয়েন্ট কাউন্টার পয়েন্ট— এতসব পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, সম্পাদনার অভিজ্ঞতা নিয়ে যদি কিছু বলেন… জানা যায়, কোনো সময় পত্রিকার জন্য কাজের কর্মস্থল থেকেও ছুটি নিতে হয়েছিল, যেতে হয়েছিল ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায়… কেন সম্পাদনায় এই অগ্রাধিকার? সম্পাদনাকে কী আপনি কর্মজীবনের প্রক্ষেপ হিসেবে ভেবেছেন? সেটা কী সম্ভব হয়েছে? আর আজকের সময়ে এসে ‘সেতুবন্ধন’ প্রকাশ— কেন এ তাগিদ?

দেবেশ রায় : আমার কাগজ করতে ভালো লাগে। আমি ছোটোবেলা থেকেই কাগজ করি।

মোস্তাক আহমেদ : এই ভালো লাগারও তো কারণ থাকে? এমনি এমনি তো আর ভালো লাগে না— একটা উদ্দেশ্য বা একটা কোনো ভাবনা বা একটা কোনো ইডিওলজি তো কোথাও কাজ করে। আপনার কাজ থেকে…

দেবেশ রায় : (মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে) ওই ভাবনাগুলোই তাড়া করে— অন্য কাগজগুলো পড়ে একটা অসন্তুষ্টি তৈরি হয়। মনে হয় যে, ঠিক হচ্ছে না। এটাকে খুব গভীরভাবে দেখবেন না। আমার কাগজ করতে ভালো লাগে। প্রেসের গন্ধ ভালো লাগে। প্রুফ দেখতে ভালো লাগে, একটু বদলাতে ভালো লাগে। এটা খুব বড়ো ব্যাপার নয়। একে খুব ছোটো ব্যাপার হিসেবেই দেখুন।

মোস্তাক আহমেদ : কিন্তু, ‘সেতুবন্ধন’?

দেবেশ রায় : ‘সেতুবন্ধন’-এর একটা পার্পাস আছে। আমি মনে করি, ভারতবর্ষে ফ্যাসিজম পরাক্রান্তভাবে আসছে, এবং তার এগেইনস্টে ফাইট করা দরকার। সেইজন্যেই ‘সেতুবন্ধন’ করেছি।

মোস্তাক আহমেদ : ব্যক্তিক জীবনে আপনি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। এই বিশ্বাস আপনার সৃষ্টিকে কীভাবে প্রভাবিত করে? আর সেই মতাদর্শগত কোনো সমস্যা… আবার এটাও তো বলা হয়ে থাকে, বিশ্বাসের কোনো চোখ থাকে না, বিশ্বাসমাত্রই অন্ধ…

দেবেশ রায় : শুনুন, আমি মাতৃগর্ভ থেকেই কমিউনিস্ট। আমি মনে করি, সমাজের পরিবর্তন করা দরকার। আর এই পরিবর্তন করতে হলে সংগঠিত বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে করা দরকার। আমি পার্টিতে বিশ্বাস করি। পার্টি ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন, আপনি পার্টির এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন— আমি হয়তো অনেকক্ষেত্রেই না বলব। কিন্তু আমি এটা জানি, ইতিহাস পাঠ করে বুঝেছি যে, একটা রাজনৈতিক শক্তিমান পার্টি ছাড়া সমাজকে বদলানো যায় না এবং সমাজকে বদলানোটা খুবই দরকার।

আমার কথাটা খুব সরলভাবে বলছি— আমি মার্ক্সিজমে বিশ্বাস করি। মার্ক্সিজম বিজ্ঞান। মার্ক্সিজম ছাড়া কোনো মুক্তি নেই। গভীরভাবে, দার্শনিকভাবে এ কথাটা বিশ্বাস করি। আমি যখন পৃথিবীটাকে বদলাতে চাইছি, সমাজটাকে বদলাতে চাইছি, সমাজটাকে নতুন করতে চাইছি, তখন কি আমি পুরনো ধরনের লেখা লিখতে পারি? মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী কোনো শিল্পী বা সাহিত্যিক পুরোনো কোনো চোখে দুনিয়াটাকে দেখতেই পারে না। তাকে নতুন করে দেখতেই হবে। মার্ক্সবাদী না হয়েও নতুন করে কেউ দেখতে পারে। কিন্তু মার্ক্সবাদী হয়েও যদি কেউ নতুন করে দেখতে না পারে তাহলে সে আর মার্ক্সবাদী থাকে না। আমার লেখাটাকেও তো নতুন হতে হবে। যে প্রশ্নটা আপনি করেছেন, আমাকে কোনোদিন এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। আমার সামনে কেউ কোনোদিন বলেনি। কিন্তু এই কথা তো আমি জানি যে, আমার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, মানে আপনারা যখন ছোটো তখনই বলা হত, আমি নাকি ফর্মালিস্ট। ভাষার উপর জোর। আমি যখন জলপাইগুড়ি থেকে কলকাতায় আসতাম এবং এগুলো কানে আসত, আমি বলতাম আমি তো ফর্মালিস্টই। আমি যে কথাটা বলছি সেটা এতো নতুন কথা যে, সেটা পুরনো ফর্মে বলাই যাবে না। আমি দর্শনের দিক দিয়ে বিশ্বাস করব মার্ক্সবাদে, যে মার্ক্সবাদ পৃথিবীটাকে নতুন করবে আর আমার লেখা হবে পুরনো তা কী করে সম্ভব? এর মধ্যে কোনো জটিলতা নেই। আর লেখা আরও জটিল কেন হচ্ছে না এটাই আমার জিজ্ঞাসা! আরও কঠিন কেন হচ্ছে না! পাঠককে কষ্ট করে যদি লেখার ভেতর দিয়ে না আনা যায়, তবে পাঠক সেই নতুনত্ব বুঝবে কী করে!

মোস্তাক আহমেদ : কিন্তু সারা পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে মার্ক্সবাদ তো এখন ইউটোপিও ভাবনা ছাড়া আর কিছু নয়!

দেবেশ রায় : না। একদমই না। সম্পূর্ণ ভুল কথা। মার্ক্সবাদের সবচেয়ে বেশি চর্চা হয় আমেরিকায় এবং ইউরোপে। আমেরিকায় যখনই ক্যাপিটালিজম বিপদে পড়ে, তখনই তারা মার্ক্স পড়ে, ঠিক কোন জায়গায় ফাঁকটা আছে তা বোঝার জন্যে। এখন সবচেয়ে বেশি মার্ক্সিজম নিয়েই লেখা হচ্ছে মার্ক্সিজম একমাত্র দর্শন, যা একইসঙ্গে দলীয় এবং একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক।

মোস্তাক আহমেদ : আজকের ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে?

দেবেশ রায় : আমি তো সমাজের নেতা নই, আমি কী করে বলবো? আমি আমার কথা বলতে পারি। আমি তো অন্য লেখকের কথা বলতে পারি না। আমার রাজনৈতিক দর্শন বা আধ্যাত্মিক দর্শনের সঙ্গে আমার গল্প-উপন্যাসের ফর্মের কোনো বিরোধিতা নেই। আমি নতুনভাবে সমাজকে ভাবতে চাই— সেটাই আমাকে বাধ্য করে, একটা কৃষক রাস্তা পার হচ্ছে, সে কীভাবে পার হচ্ছে সেটাকে অন্যভাবে বলার। এটাই তো সোজা কথা।

মোস্তাক আহমেদ : কিন্তু রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে আধ্যাত্মিক দর্শনকে আপনি মেলাবেন কীভাবে?

দেবেশ রায় : আধ্যাত্মিক দর্শন বলতে আমি যা বোঝাতে চেয়েছি, যে কোনো দর্শন মানেই তো আধ্যাত্মিক। মনে, স্পিরিচুয়াল সাবজেক্ট। ওটার মধ্যে কোনো মেটাফিজিক্স নেই। কেউ যদি বলে আমি সমাজটাকে বদলাব সেটাই তো এক অদৃশ্য কথা। আর অদৃশ্য কথা মানেই তো আধ্যাত্মিক কথা। ধর্ম নয়।

মোস্তাক আহমেদ : সাহিত্য নিয়ে আপনার আঙ্গিক ভাবনা রীতিমতো গবেষণার বিষয়, ইউরোপিয়ান মডেল না দেশীয় মডেল তর্ক চলতে পারে দীর্ঘক্ষণ। এক্ষেত্রে, ভড়ৎস না পড়হঃবহঃ কোনটি সাহিত্যের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? বক্তব্যের সাহিত্য না সাহিত্যের বক্তব্য— কোনটাতে আপনার বিশ্বাস? সেই বিশ্বাসকে কীভাবে প্রতিষ্ঠা দেওয়া সম্ভব বলে মনে হয়?

দেবেশ রায় : আমার লেখার ফর্মটা আলাদাভাবে আসে কিনা, বা আমি ফর্মটাকে প্রাথমিক মর্যাদা দিই কিনা, আপনি ঠিক এই জায়গাটায় পৌঁছতে চাইছেন। আমি বুঝতে পেরেছি।

তা নয় ফর্ম ওভাবে বদলানো যায় না। একটা গল্প বা উপন্যাস তার নিজের ফর্ম তৈরি করতে থাকে এবং লেখক অত্যন্ত বিশ্বস্ত ভৃত্যের মতো গল্পটাকে ফলো করতে থাকে এবং এক সময় গল্প তার নিজের আকার নিতে থাকে। আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে লেখাটা যখন ওই দিকে যাচ্ছে, আমি তখন আর আটকালাম না। এই যে, লেখকের মাথায় একটা ফর্ম থাকে, সে তার ফর্ম অনুযায়ী লেখাটাকে সাজায় আমার ক্ষেত্রে তা হয় না। আমার ক্ষেত্রে আমি ততক্ষণ লিখতেই পারি না, যতক্ষণ গল্প কথা না বলে। গল্প অজস্র কথা বলতে থাকে, কথা বলতে থাকে, এগোতে থাকে, পেছোতে থাকে। কোনো এক সময় আমি আর না পেরে কাগজে কলম ঠেকাই। গল্পটাকে ফলো করে যাই।

মোস্তাক আহমেদ : বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে যদি কিছু বলেন?

দেবেশ রায় : দারুণ গল্প লেখা হচ্ছে। দারুণ গল্প। বাংলাদেশে দারুণ গল্প লিখছে কম বয়সীরা। ইমিগ্রেশান নামে একটা দারুণ উপন্যাস লিখেছে সালমা বাণী। বিরাট লেখা। অসামান্য। বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তুলনীয়। একটা ভাষায় ওপারে সালমা ওটা লিখেছে, এপারে স্বপ্নময় হলদে গোলাপ লিখেছে। ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক্সে লেখা হয়েছে এমন লেখা? এখন পৃথিবীর কোনো জায়গায়, বাংলা বাদ দিন, সেখানে এই দুটো লেখা যদি হয়ে থাকে তবে আর কত চান? প্রত্যেক সপ্তাহে একটা করে উপন্যাস বেরুবে? তবু সাধারণভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের গল্প দারুণ হচ্ছে। উপন্যাস এই একটারই নাম বললাম। আরেকটা নাম বলছি শাহীন আখতারের সখী রঙ্গমালা। একটা লোককথাকে উপন্যাস করেছে। অসামান্য কাজ। দুনিয়াতে অমন কাজ হয়নি।

পশ্চিমবঙ্গে ছোটোগল্পের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। ছোটোগল্প লেখাই হচ্ছে না। ‘রাবিশ’। কাগজে ছশো শব্দ, দেড় হাজার শব্দ, এক হাজার শব্দ, দু হাজার শব্দের গল্প হয়ে হয়ে গল্পের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। গল্পটা লেখা হচ্ছে ওখানে, উপন্যাসটা লেখা হচ্ছে এখানে। এখানে উপন্যাস মাসিভ সাকসেসে দাঁড়াচ্ছে। ম্যাসিভ। এখানে উপন্যাসের এমন একটা অবস্থা হয়েছে, যে কোনো একটা লেখাকেই উপন্যাস বলে চালানো যাবে না। উপন্যাসের অন্য একটা জাজমেন্ট পাঠকের এসে গেছে। সেটা আমি পার্সিভ করতে পারি।

মোস্তাক আহমেদ : নাটক নিয়েও তো আপনি লেখালেখি করেছেন। বাংলাদেশের নাটক নিয়ে ধারণা ঠিক কেমন?

দেবেশ রায় : সবাইকে নিয়ে নয়। আমি সেলিম আল দীনকে নিয়ে কিছু বলতে পারি। নাটক এখানেও দারুণ হচ্ছে। সুমন মুখোপাধ্যায় বেশ উল্লেখযোগ্য।

মোস্তাক আহমেদ : আর বাংলাদেশের সিনেমা?

দেবেশ রায় : খুব একটা আমার দেখা নেই। কিন্তু একটা দুটো সিনেমা দেখেছি। একটা দেখেছিলাম ‘চাকা’ নামে। কী অসামান্য, কী অসামান্য! তানভীর মোকাম্মেলের ‘জীবনঢুলী’ সিনেমাটিও দারুণ। আমার আসলে বাংলাদেশের প্রতি একটা পক্ষপাতিত্ব আছে।

মোস্তাক আহমেদ : আপনি তো অনেক পুরস্কার পেয়েছেন— সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, ভারতীয় ভাষা পরিষদ-এর ভুয়ালকা পুরস্কার প্রমা, নতুন গতি পত্রিকার পক্ষ থেকেও পুরস্কৃত হয়েছেন এবং আরও আছে। এই স্বীকৃতি কী যথেষ্ট বলে মনে হয়? আবার পুরস্কার নিয়ে যেভাবে চারদিকে বিতর্ক ওঠে…

দেবেশ রায় : না না। আমি কোনো পুরস্কার টুরস্কার পাইনি। (হাসতে হাসতে অন্য প্রসঙ্গে চলে যান)

মোস্তাক আহমেদ : বরিশালের যোগেন ম-ল যখন লিখছেন, তখন তো একেবারে সমস্ত তথ্য, ম্যাপ সব কিছু সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিয়ে একাকার অবস্থা। আপনি শঙ্খ ঘোষকে যখন দিতে গেছেন বইটা, তখন আপনি বলেছিলেন যে, অনেক কিছু বাদ দিতেও হয়েছে। পুরোটা নেওয়া যায়নি। সেই অভিজ্ঞতার কথা যদি কিছু বলেন? এই সংযোজন-বিয়োজন ব্যাপারটা ঠিক কেমন ছিল?

দেবেশ রায় : না না। ওসব লোকজন বানিয়ে বলে। আরে উপন্যাস লিখেছি এই তো কাজ। আর কী করেছি? আমাকে যদি কোনো বই উপর থেকে নামাতে হয়, আমাকে তো কোনো কিছুর উপর উঠতে হবে—এই যা।

কোনো গ্লোরিফাই করবেন না। আমি অত্যন্ত সাধারণ একজন লেখক। বাংলা সাহিত্যে আমার থেকে অনেক বড়ো বড়ো লেখক কাজ করেছেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের পাঠ, উপন্যাস পড়া— এটা মানুষ শেখেনি। তাই অনেক বড়ো বড়ো লেখকও ভুল পড়েছেন। আমি যা কিছু শেখার বাংলা উপন্যাস থেকেই শিখেছি।

মোস্তাক আহমেদ : কিন্তু আপনি তো প্রবলভাবে মার্কেস পড়েছেন…

দেবেশ রায় : প্রবল পড়বো কেন?… অনেক কিছুই প্রবলভাবে পড়েছি। ল্যাটিন আমেরিকান, ওয়েস্ট আফ্রিকান, প্যালেস্তিনিয়ান। মার্কেস সম্পর্কে আমার কোনো মুগ্ধতা নেই। কিন্তু মার্কেস রেয়ার এবিলিটির ন্যারেটর। গল্প বলেন অসামান্য। তুলনাহীন। কিন্তু ঔপন্যাসিক হিসেবে পৃথিবীতে যে স্ট্যান্ডার্ড তৈরি হয়েছে, আমার কাছে উনি সেই জায়গায় নেই। আপনি যখন বড়ো একটা উপন্যাস শেষ করেন যেমন ম্যাজিক মাউন্টেন, ওয়ার অ্যান্ড পিস আপনার কাছে আর ঘরের দেয়ালটা থাকে না। আপনি অন্য একটা জগতে চলে যান। মার্কেসে সেই হাইটটা পাই না। বরং, কার্পেন্টিয়ারে পাই। মার্কেসের গুরু যিনি।

মোস্তাক আহমেদ : আপনি গবেষণার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন—বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণায় আপনি কী সন্তুষ্ট? যেভাবে বাংলা সাহিত্যে গবেষণা হচ্ছে সেসব নিয়ে আপনার মত কী?

দেবেশ রায় : এককথায় বলা যায় না। আমি গবেষণা-গ্রন্থ খুব বেশি পড়ি না। আজকাল তো গবেষণার সংখ্যা বেড়েছে— কোনো একটা বই পড়ে এমন মনে হয় না যে, দারুণ লিখেছে। সমালোচনার নতুন নিরিখ তৈরি করতে পারছে না। নতুন শব্দ বের করতে হবে। বাংলা সমালোচনা— বাংলা গল্প-উপন্যাসের খুব ক্ষতি করছে বলে মনে হয়। খুব ভুল ধারণা তৈরি করছে।

মোস্তাক আহমেদ : যে লেখা লিখতে চেয়েছিলেন, অথচ এখনও লেখা হয়ে ওঠেনি— যে আক্ষেপ এখনও তাড়িয়ে বেড়ায়— যে স্বপ্ন এখনও ঘুম ভাঙিয়ে দেয়…

দেবেশ রায় : যা লিখতে চাই তাই লিখি। আমি খুব একটা রোমান্টিক লোক না, আমি কাজের লোক।

মোস্তাক আহমেদ : কবিতা লেখেননি কেন কখনো?

দেবেশ রায় : পারি না।

মোস্তাক আহমেদ : কিন্তু কবিতা তো ভালোবাসতেন ছোটবেলা থেকেই।

দেবেশ রায় : হ্যাঁ। অনুবাদ করতে এখনও ভালোবাসি। দুটো অনুবাদ করেছি। একটা ট্রয়ের মেয়েরা, আরও একটা রোমিও এন্ড জুলিয়েট। কবিতাটা অনুবাদ করতে ভালোবাসি। কারণ মূল কবিতা তো বানিয়েছে আরেকজন, সেখানে আমার বানানোর কাজ নেই। আমি শুধু ওটার ভাষা বদলে দিতে পারি। কবিতা আমি লিখতে পারি না। এখনো আমার কাছে রহস্য— কবিরা কীভাবে লেখেন, কবিরা কীভাবে একটা ইউনিভার্সালে আসেন— তবে বাংলা কবিতা যে বেশ একটা বিপদে পড়েছে সেটাও বুঝতে পারি।

মোস্তাক আহমেদ : এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুরজিৎ দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘জলার্ক’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘নিশিগন্ধা’ গল্পটি আপনার প্রথম প্রকাশিত লেখা…

দেবেশ রায় : (মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে) আপনাদের এখানে ভুল আছে। আমি মনে করি হাড়কাটা১১ আমার প্রথম গল্প। তার আগে কলেজ ম্যাগাজিনে কিছু কিছু বেরিয়েছে।

(এরপর ঠিক প্রশ্নের উত্তরে নয়, গল্পে গল্পে বলে যাওয়া কিছু কথা। গল্প চলে সুশীল সাহা, সার্থক দাস, মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে।)

গতকাল কয়েকজন লেখক এসেছিলেন। তাঁদের আমি বললাম যে, আমি ঠিক করে ফেলেছি এ বছর শেষ। এরপরে আর লিখব না। আমার লেখা কেউ পড়ে না, আর না পড়ে প্রশংসা পাওয়ার একটা লোক পাওয়া গেলে পড়তে যাবে কেন? আসলে লেখাটা ভীষণ পসেসিভ। আর এখন বিরাশি বছর বয়স কেন লিখব? আপনি দেখান দেখি বিরাশি বছর বয়সে কোনো ঔপন্যাসিক উপন্যাস লিখেছেন— আমি বলতাম ষাটের পর আর লিখব না। সেটাকে বাড়িয়ে করলাম পঁয়ষট্টি। সেটাকেও বাড়িয়ে করলাম সত্তর। এখন বোধহয় বন্ধ করা দরকার। আসলে, এই বয়সে তো অ্যালার্টনেসটা কমে আসে, তাই নিজের অজ্ঞাতে নিজের দুর্বলতা ধরা পড়ে যায়। তবে, এখনও আমি গল্প শুনতে পাই। কাল রাতে এক প্যারাগ্রাফ মতো লিখলাম। কিন্তু লিখে খাওয়া দাওয়া করে শোবার পর ঠিক ঘুম আসছিল না। মনের মধ্যে একটা অশান্তি। কী লিখলাম? রাত দুটোর সময় উঠে আবার একটা প্যারাগ্রাফ লিখে শুতে গেলাম। আমি ঠিক জানি না, কোথায় আমার ল্যাপ্স ঢুকে যাচ্ছে। এটা কোনো লেখক জানেন না। এটা মনে রাখবেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকও জানেন না। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকও ওই ঠিক সিংহের মতো। ঠিক জায়গায় বোঝেন যে, জাম্প দেব না। এই যে অটোমেশান, এই অটোমেশান যদি ফেল করে যায়, তবে আমি তো টেরও পাব না আর আপনারাও বলবেন না যে, দেবেশদা অনেক হয়েছে এবার থামুন। সেজন্য ভাবছি তিরাশি বছর বয়সে আর লিখব না। তবে প্রবন্ধ কিছু লিখব।

তথ্যসূত্র

১.            ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর পাবনা জেলার বাঘমারা গ্রামে দেবেশ রায়ের জন্ম। পিতা ক্ষিতীশচন্দ্র রায় (১০৯-৫-৬৬) ও মাতা অপর্ণা রায় (১৯১২-১৯৯৮)

২.           ১৯৪৩ সালে দেবেশ রায় গ্রামের বাড়ি থেকে জলপাইগুড়িতে চলে আসেন।

৩.           জলপাইগুড়ি জেলা স্কুল থেকে দেবেশ রায় ১৯৫২ সালে স্কুল ফাইনাল পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র কলেজে। ১৯৫৬ সালে বি.এ. অনার্স পাশ করেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে এম.এ. সম্পূর্ণ করেন ১৯৫৮ সালে। এম.এ. সম্পূর্ণ করার পর জলপাইগুড়িতে ফিরে এসে আনন্দচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন।

৪.           ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রায় সদ্য গড়ে ওঠা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস-এ ১৯৭৫ সালে দেবেশ রায় যোগদান করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি কর্মক্ষেত্র থেকে অবসর নেন।

৫.           বরিশালের যোগেন ম-ল উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায় এপ্রিল ২০১০-এ। ১০৫৯ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের প্রকাশক দে’জ পাবলিশার্স, কলকাতা। এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ এর অবিভক্ত বাংলা। বাংলাতে এ সময় যে সকল ঘটনা ঘটেছে এবং যে সকল ঘটনা ঘটার ফলে বাংলা সারা ভারতের শাসননীতি ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার নানা গল্প উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে। উঠে এসেছে যোগেন ম-ল নামক চরিত্রের বিচিত্র মাত্রা।

৬.           লিখিত আকারে কিছু প্রশ্ন সামনে রাখা হয়েছিল। প্রশ্নগুলি ছিল অনেকটা এরকম : ১৯৩৬-এর ১৭ ডিসেম্বর আপনার জন্ম— দেশ যখন স্বাধীন হচ্ছে তখন আপনার বয়স ১০-১১ কেমন ছিল সে সময়ের অনুভূতি? পরাধীনতার এই স্মৃতি আপনার সাহিত্য জীবনে কীভাবে ছাপ ফেলেছে?/ পাবনা জেলার বাঘমারা গ্রাম থেকে জলপাইগুড়ি চলে আসা তখন আপনার ৭ বছর বয়স— কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা কী মনে পড়ে? কোনো শেকড় হারানোর বেদনা?/এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুরজিৎ দাশগুপ্ত সম্পাদিত জলার্ক’ পত্রিকায় প্রকাশিত নিশিগন্ধা’ গল্পটি আপনার প্রথম প্রকাশিত লেখা। লেখালেখির জগতে কীভাবে প্রবেশ? ঠিক কবে? কোনো অনুপ্রেরণা কী কাজ করেছিল? কেমন ছিল সেই প্রথম প্রকাশের অনুভূতি?/আপনার পড়াশুনো বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে— প্রথমে আনন্দচন্দ্র কলেজ, তারপর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়— কাদেরকে পেয়েছেন মাস্টারমশাই হিসাবে? তাঁরা কী কখনো আপনার সাহিত্যজীবনে অনুঘটকের কাজ করেছেন? আর তখনকার প্রেসিডেন্সি… কলেজস্ট্রিট চত্বর… কফি হাউস…

৭.           আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে উপন্যাসটির রচনাকাল ১৯৭২। এ বছর শারদীয় দেশ, শারদীয় কালান্তর ও শারদীয় পরিচয় এ একই নামে তিনটি অংশ প্রকাশ পায়। গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় মে ১৯৭৩-এ। ১২৬ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের প্রকাশক বিশ্ববাণী প্রকাশনী, কলকাতা।

৮.           মানুষ খুন করে কেন উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায় মার্চ ১৯৭৬-এ। ৬৮৬ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের প্রকাশক মনীষা গ্রন্থালয়, কলকাতা। এর রচনাকাল ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৬।

৯.           দেবেশ রায়েরা চার ভাই, তিন বোন। প্রয়াত দাদা দিনেশচন্দ্র রায় গল্প, উপন্যাস লিখতেন। অকাল প্রয়াত ছোটোভাই সিদ্ধার্থ রায় লিখতেন কবিতা। অন্য ভাই সমরেশ রায় বিশিষ্ট গল্প লেখক ও কাব্যনাট্যকার।

১০.         মফস্বলি বৃত্তান্ত উপন্যাসটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় অক্টোবর ১৯৮৬ তে। ১৪৭ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের প্রকাশক মনীষা গ্রন্থালয়, কলকাতা। ১৯৭৪ সালের মে-জুনে উপন্যাসটি লেখার পর, পরবর্তী ছয় বছরে শারদীয় কালান্তর, দেশ সাপ্তাহিক, অনুক্ত ত্রিমাসিক প্রভৃতি পত্রিকায় বিভিন্ন অংশ কখনো উপন্যাস হিসাবে, কখনো বড়োগল্প বা ছোটোগল্প হিসাবে ছাপা হয়।

১১.         ‘হাড়কাটা’ গল্পটি প্রকাশ পায় ১৯৫৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দেশ পত্রিকায়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : সমরেশ রায়, সুমন সমাদ্দর, ‘শিল্প সাহিত্য’ পত্রিকা (ফেব্রুয়ারি ২০১০), ‘কঙ্ক’ পত্রিকা (আগস্ট ২০১৪)

*******************************************

হাসান আজিজুল হক : আলাপচারিতা
‘এই জীবনটাকে আমি ট্রান্সফার করেছি ল্যাঙ্গুয়েজে’

চিহ্ন : আমরা এবারে চিহ্নর যে সংখ্যাটি করবো, সেটি উপন্যাস নিয়ে। এবং, আমরা ভেবেছি প্রতি সংখ্যাতেই ক্রোড়পত্র অংশে আপনার আলাপচারিতা ছাপবো; এটি অন্য কোনো বিষয় নয়, আপনাকে একজন ‘ড্রিমম্যান’ হিসেবে সামনে রেখে আমরা কাজগুলো করতে চাই। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের এবারের ভাবনা উপন্যাস নিয়ে কিংবা উপন্যাসের তত্ত্ব, উপন্যাস কি-কেন? এসব আর কি! অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতাই হবে। আমরা জানি, আপনি উপন্যাস দিয়েই শুরু করেছিলেন ষাটে; শিউলি, বৃত্তায়ন, শামুক দিয়ে। আবার, আপনার গল্পেরও অনেকগুলো স্তর আছে। কড়িকোমল দিয়ে আরম্ভ করে ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে ষাট, সত্তর; সেই আত্মজা ও একটি করবী গাছ, এদিকে মা-মেয়ের সংসার; সব মিলিয়ে অনেককিছু, যাত্রাটা বেশ দীর্ঘ। আবার, একটা সময়ে, খানিকটা পরে এসে উপন্যাসের দিকে আপনার ভাবনাটা গড়ালো। সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি— আগুনপাখি, যেটি আমাদের কাছে এ সময়ের বাংলা ভাষার একটি বিশেষ উপন্যাস। উপন্যাসে বর্ধমান, রাঢ়বঙ্গ কিংবা আপনার স্মৃতি; এগুলো পেরিয়ে এই বয়সে এসে, বিশেষ করে ১৯৪৭ এর পরে এসে পূর্ব-বাংলায় আপনার যে বসবাস; কিংবা, তারপরে বর্ধমানের গদ্যের ভাংচুর, কাটোয়া অঞ্চলের ভাষার সাথে আমাদের এই অঞ্চলের ভাষার একটা ব্লেন্ডিং আগুনপাখির মধ্যেও আছে। এখন বাংলাদেশেও বহু রকমের উপন্যাস আছে। আমরা যে অঞ্চলেই বাস করি— হোক পূর্ব-বাংলা, হোক পশ্চিমবাংলা, হোক বর্ধমান, হোক রাজশাহী, হোক ঢাকা— আমাদের আগুনপাখি পড়তে কোনো সমস্যা নেই। এই যে সমস্যা নেই, এটা একটা দিক, সেটা নিয়ে আমরা পরে গভীরে প্রবেশ করবো। কিন্তু, প্রথমেই যেটা বিষয়, সেটা হলো উপন্যাস সম্পর্কে আমরা আপনার ভাবনাটা শুনতে চাই। আসলে উপন্যাস তো গল্পের বিস্তার, গল্প বেড়ে গেলে উপন্যাস হয়— যেমন গীতিকবিতা বা মহাকাব্য। আমরা সাহিত্যের লোক হিসেবে যেভাবে পড়ি আর কি— একসময় মহাকাব্যের যুগ ছিল, সেটা ধীরে ধীরে লোপ পেয়ে গীতিকবিতার দিকে আসল। সে রকম আমরা যদি বলি উপন্যাস বা গল্প চলছে; মানুষের ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গেছে। কিংবা, গল্পের মধ্যে দিয়েই উপন্যাসের স্বাদটা পাবার চেষ্টা। এগুলো হচ্ছে বা আছে। আবার এটাও আমলে রাখি যে টলস্টয়ের আনা-কারেনিনা, ওয়ার এন্ড পিস কিংবা দস্তয়ভস্কির ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট; এমনকি টমাস মানের সেই ঢাউস উপন্যাসটা— ম্যাজিক মাউন্টেন কিংবা ব্রাদার্স কারামাজভ; এসব বড় বড় ফিগার। এসব পেরিয়ে এসে এখন বাংলা উপন্যাসেও আমরা দেখেছি যে— বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র; এমনকি তারাশঙ্করের হাঁসুলী বাঁকের উপকথা। এসব মিলিয়ে একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে, একজন কথাশিল্পী হিসেবে, একজন শিল্পী হিসেবে আমরা আপনার দৃষ্টিকোণটা জানতে চাই। আপনি এটা কিভাবে দেখেন বা এটার পরিক্রমাটা কেমন?

হা.আ.হক : আমার মত হচ্ছে— এটা নিয়ে তোমাদের সাথে আমার আগেও আলাপ হয়েছে; যে কোনো কিছুর সংজ্ঞা দেওয়াটা খুব জরুরি বিষয় নয়। এবং, সাধারণত যেটার সংজ্ঞা দেয়া হচ্ছে সেখানে স্থির থাকা যায় না। যেমন ধরো, দর্শন জিনিসটা কি! সঙ্গে সঙ্গে আমরা কিন্তু বিভিন্ন দার্শনিকের পনেরো-বিশটা সংজ্ঞা দিয়ে দিতে পারি। দর্শন সম্পর্কে তাঁরা যা বুঝেছেন, ছোটগল্প সম্পর্কেও তাই; বিভিন্ন সংজ্ঞা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে; অনেকেই বলে থাকেন রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষাযাপন’ কবিতার মাধ্যমেও ছোটগল্পের একটা সংজ্ঞা দেবার চেষ্টা হয়েছে। আমার নিজের ধারণা যে— সাহিত্যের যে জায়গা, তার মূল ব্যাপারটা যদি ধরা যায়, তবে তাকে কোনো সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা যায় না। অনেকটা বলতে পারো মহাকাব্যগুলো তো উপন্যাসই; এখন সেগুলো গদ্যাকারে লেখা হয়েছে, মহাভারতকে এখন আমরা একটা বিশাল উপন্যাস বলতেই পারি। ওডিসি ও ইলিয়ডও যখন গদ্যাকারে লেখা হলো; তখন সেগুলোকে বিশালাকার উপন্যাস বলাই যায়। কিন্তু, আমরা জানি এগুলো আসলে মহাকাব্য। সেইজন্য কোনো একটা জায়গাতে স্থিরভাবে সংজ্ঞা দেয়াটা; আমার মনে হয় এটা ঠিক নয়। এখন উপন্যাস নিয়ে কোথাও কোনো স্থির মত দেয়া যাবে না। সাম্প্রতিক ঔপন্যাসিকদের মধ্যে যারা খ্যাতনামা; সেখানেও তুমি দেখো যে মিলেন কুন্ডেরা, ওরহান পামুকই বলো; কাউকে কারুর সাথে মেলানো কঠিন। সম্প্রতি পেলাম এরিচ মারিয়া রিমার্কের ব্ল্যাক ওবেলিস্ক, অল কুয়েট অন দ্যাস ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট আগেই পড়েছি। সে তো প্রথম মহাযুদ্ধের পরে পরেই লেখা। হেমিংওয়ে আমার প্রিয় লেখক, তাঁর ফেয়ারওয়েল টু আর্মস; তারপরে ধরো স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ; এগুলো নিয়ে তাঁর প্রচুর লেখা আছে। আবার এর সঙ্গে স্টিফেন ক্রেইন [ঝঃবঢ়যবহ ঈৎধহব (১৮৭১-১৯০০)] একটাই উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু, এত অসাধারণ তার ভঙ্গি ছিল যে হেমিংওয়ে যদি গদ্যে কাউকে সামান্য অনুসরণ করে থাকেন; সেটা স্টিফেন ক্রেইন। এবং তাঁর ‘ওপেন বোট’ বা এ রকম দু-চারটা গল্প যদি পড়া যায়; তাহলে সত্যি সত্যিই বোঝা যায়— কি অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। ভাষা ছাড়া আমি বিশেষ কিছু দেখি না; এই ভাষাই শক্তি, এই ভাষাই সব, তাকে নানানভাবে এরেঞ্জ করা যায়। সেই জন্য উপন্যাসকেও তুমি একেবারে নির্দিষ্ট গ-িবদ্ধ করতে পারবে না, মোটাদাগে করতে পারো— গল্প থাকবে, প্লট থাকবে, একবারে এলোমেলো হবে না; সাজানো থাকবে, কোনোটা লুজ হবে, কোনোটা কমপ্যাক্ট হবে। তারাশঙ্করের লেখা সাধারণত লুজ লেখা, মনে হয় তিনি ছেড়ে দিয়েছেন— চলুক ওটা; হাঁসুলী বাঁকের উপকথা কিংবা ধরো কবি, বা নাগিনী কন্যার কাহিনী কিংবা পরবর্তী সময়ে লেখা আরো; খুব বড় বড় উপন্যাস তো তিনিই লিখেছেন। প্রচলিত কোনো সংজ্ঞা আমি জানতে পারি না। কোনো একটা বস্তুকে দেখা, এই উদাহরণ বারবারই দিয়েছি। দশ জনের দেখা একটা বস্তুকে কি দেখলেন বললে দশ রকমের জবাব দেবে আবার একই মানুষকে যদি একটা বস্তু কি দেখলেন বলা হয় তারপর যদি তাকে সরিয়ে নিয়ে অন্যত্র দাঁড় করা হয়, এবার দেখুন তাহলে ঐ বস্তুটাকে আর একভাবে দেখবে। তারপর কারো ঘরে আলোটালো নিভিয়ে দিয়ে পরে বলা হয় কি দেখছো, সে আরেকরকম করে দেখবে, এই দেখার কোনো অন্ত নেই।

চিহ্ন : আসলে স্যার, ক্রেইনের কথা বলেছিলেন, ভাষাটাই হচ্ছে আসল।

হা.আ.হক : ক্রেইন ভাষাটাকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, এতো শক্তিশালী করে ব্যবহার করেছেন। তার ‘ওপেন বোট’ বড় গল্পটা মানুষের পড়া দরকার এবং ওরই বোধহয় আর একটা লেখা একজন সুইডিস নরম-সরম লোক, সে একটা ক্লাবে গেল, ক্লাবে গিয়ে আকস্মিকভাবে তার মাথা খারাপ হয়ে গেল। মানে রাগ হয়ে গেল। একজনের সাথে তর্ক করতে করতে ছুরি বসিয়ে খুন করল। এই মুহূর্তটাকে ধরবার জন্য গল্প যে কিরকম করে লিখেছে সেটা ভাবা যায় না। সে রকম ‘অ্যান অকারেন্স অ্যাট আউল ক্রিক ব্রিজ’ বলে আর একটা গল্প আছে। খুব সাংঘাতিক গল্প। ব্রিজ থেকে লাফিয়ে একজন নিচে পড়েছিল এবং জ্ঞান হারিয়ে ঘুমে চলে যায়। সে কিন্তু তার পুরো অতীতের জীবনটা দেখতে পেয়েছে। সেটার অবসান ঘটলো ঘুম থেকে ওঠবার পরে। এ রকম অনন্ত নাই। সেজন্য বলছি যে, এককথায় বলা যায় যে জীবনের গল্প যে জীবনটা এরকম, বাস্তবে যে মানুষ জীবনটা কাটাচ্ছে, সে কিন্তু উপন্যাসের চরিত্রও নয়, উপন্যাস লিখছেও না এবং আমরা সেভাবে তাকে পড়ছিও না। রাতদিন দেখছি কিন্তু আমরা তাকে উপন্যাস বলছি না। এই পার্থক্যটা কেন হচ্ছে? অথচ, এই জীবনটাকে আমি ট্রান্সফার করছি ল্যাঙ্গুয়েজে, আরেক জায়গায় দিচ্ছি। এটা যখন লিখছি, দেখছি হ্যাঁ একটা অস্বাভাবিক কথাও নাই, এগুলো তো করে, দেখা যায়। এ রকম করেই তো চলে। তারপরে দেখা যায় কেউ হয়তো অনেক বেশি খোঁড়াখুঁড়ি করছে, কেউ হয়তো একটা লোকের মনের ব্যাপারটা দেখবার জন্য অনেক গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কতরকম উপন্যাস লেখা হচ্ছে। ওয়াইড এক্সপ্যান্ড স্পেস নিয়ে একটা উপন্যাস লেখা— ওয়ার এ্যান্ড পিস পড়ো।

চিহ্ন : স্যার, আপনি গল্প শুরু করেছেন ‘শকুন’ থেকে। তারপরে অনেকগুলো গল্প লেখা হলো। বেশ লেখা হলো এবং গল্পকার হাসান আজিজুল হক গল্প লেখেন। কিন্তু আপনি উপন্যাসের দিকে কেন গেলেন বা কি ধরনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছেন?

হা.আ.হক : হ্যাঁ, ‘শকুন’ দিয়েই শুরু। প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। আমার কাছে মনে হয়েছে সাহিত্যের কোনো শাখাই অগুরুত্বপূর্ণ নয়। কোনো একটা জায়গায় মনোনিবেশ করতে হয় তো, আমি যেমন বরাবর তোমাদেরকেও বলেছি, উপন্যাসই লিখতেই চেয়েছিলাম, যখন আমি সেকেন্ডারি এডুকেশন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি তখন আমি একটা উপন্যাস লিখেছিলাম। বেশ বড়, ছাপলে প্রায় দেড়শ পাতা হতো। তাহলে আমি উপন্যাস দিয়ে শুরু করেছিলাম। আত্মজীবনীমূলক আর কি, পরে দেখলাম সেটা তেমন কিছু হয়নি। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী পড়ার একটা তীব্র প্রভাব আমার উপরে এসেছিল, সেটা ভাষাকেও প্রভাবিত করেছে, কাহিনিকেও তাই। লেখার কোনো মানে হয় না। আমি ঐ জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছি। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন মনে হলো যে আচ্ছা একটা ঘটনা ঘটল, এটাকে অবলম্বন করে কিছু লেখা যাক না। তখন ঐ যে ‘শকুন’-এর ঘটনা, ঐ ঘটনাটা আমার মনে হয়েছিল চোখ বন্ধ করে যা ঘটেছিল সেটা লিখবো। কিছু বানিয়ে লিখবো না। কিন্তু, তাতো হয়নি। শেষ পর্যন্ত তার একটা নানা রকমের ব্যঞ্জনা, নিগূঢ় অর্থ ইত্যাদি  অনেক কিছু এসে গেছে এবং সে ক্ষেত্রে আমি নিজেই সচেতন ছিলাম না। যারা পাঠক তাদের মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত সচেতন, কথা বলতে দেখেছি। গল্প মোটামুটি প্রশংসিত হলো, একটার পর একটা গল্প চললো।

চিহ্ন : কিন্তু, আপনার গল্পে যেটা দাঁড়ালো যেমন জীবন ঘষে আগুন, পাতালে হাসপাতালে, মা মেয়ের সংসার- এক ধরনের একটা গাল্পিক ব্যাপার তৈরি হলো। সেটাকে যদি আমি সিরিয়াসলি নেই। দেশভাগের ব্যাপারটা আপনার গল্পগুলোয় এসেছে ছড়ানো ছিটানো ভাবে, সেইটা কি আসলে আগুনপাখিতে গিয়ে একটা পরিপূর্ণতার দিকে গেল?

হা.আ.হক : আগুনপাখিতে এখন দেখা যাচ্ছে পরিপূর্ণতা পেয়েছে কিন্তু আমি যখন লিখতে বসেছি, মনে হয়েছে না, এটা কিছু না। আমার বাড়ির একটা চরিত্র, তার জীবন নিয়ে লিখি, এখন দেখা যাচ্ছে আমার মায়ের চরিত্র সেখানে এসে গেছে আরকি, মায়ের আত্মজীবনী লেখার মতো, মায়ের যেন বায়োগ্রাফি লিখবো। কিন্তু তা তো হলো না, কোথা থেকে কি হয়ে গেল আমি বলতে পারবো না। আমি একদম শুরু করেছিলাম মায়ের যে গ্রামে জন্ম, তাঁর মায়ের অল্প বয়সে মৃত্যু, বাবার দ্বিতীয় বিবাহ করা, স্কুলে পড়তে না যাওয়া, তারপর অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া এবং এখানে এসে সংসারে লিপ্ত হওয়া, একটা পুরোজীবন। তখন লিখতে লিখতে সত্যি সত্যি থিওরাইজ হলো— আচ্ছা এইটা ফেস করলে আমার লেখাটাতে তো ফেস করছে। আমার মা যেখানে এসেছে, তার বর্ণনা করতে করতে দেখা যাচ্ছে তার অনেকগুলো সমস্যা  হচ্ছে, কিংবা বলা যায় যে, এডজাস্টমেন্টের অসুবিধা হচ্ছে, তখন একটা মানুষের জীবনের যে অবস্থাটা, সমাধানের পথ বাতলে দিতে হচ্ছে, এছাড়া আর উপায় থাকছে না। লেখায় তোমার অজানাতে তোমার অভিজ্ঞতা ঢুকে পড়তে পারে, আমি হঠাৎ দেখলাম দুর্ভিক্ষ ঢুকে পড়েছে, কারণ আমি যে সময়টার কথা লিখছিলাম— তখন আমার বয়স সাত-আট বছর, ঐসময় দেশভাগ হচ্ছে, ঐ সময় দাঙ্গা হচ্ছে, ঐসময় দুর্ভিক্ষ হচ্ছে, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ চলছে। এটা খুব জটিল সময় আরকি। এটা ঢুকে গেল ওর মধ্যে, যুদ্ধের কথা ঢুকে গেল, অথচ শুরুতে ওটার কথা একদমই ভাবিনি। দেখা গেল রেশন চালু হলো। রেশন কি বস্তু, এটা আজকালকার লোকেরা বোঝে? আগে তা এটা কোনো ব্যাপারই ছিল না, রেশন আবার কি জিনিস? পরে দেখা গেল, চাল কিনতে পাওয়া যাচ্ছে না, গম খেতে হচ্ছে, বাজারে অনটন, তখন দেখা যাচ্ছে ব্লাক মার্কেট বলে একটা জিনিস গজিয়ে গেল। কালোবাজার থেকে জিনিস কেনা শুরু হলো। তখনই সরকার দেখলো অর্থনীতির অবস্থা ভেঙে পড়বে তো, তারা বলছে ঠিক আছে, অঢেল খরচ যাতে কেউ না করে, মৌলিক যে প্রয়োজন, সেটা যেন সকলেই পায়, এজন্য রেশনের ব্যবস্থা করল। তখন গ্রামে গ্রামে কন্ট্রোলের দোকান বসল। আমার চাচা একটা দায়িত্ব পেল, তিনি ঐ সমস্ত মালপত্র নিয়ে আসতেন। জমির সার, চিনি, কেরোসিন— আলো তো জ¦ালাতে হবে। সরিষার তেল দিয়ে তো প্রদীপ জ¦ালানো যায় না। তখন একটার পর একটা ঢুকে যাচ্ছে বিষয়গুলো। তেমনি জীবন ঘষে আগুনে মেলাটা ঢুকে পড়লো। আমি তো ওটা করতে চাইনি। রাজার হাতি এসে গেল। এজন্য, লেখা যে কিভাবে আসে এটা বলা মুশকিল। এটা একটা ¯্রােতের মতো। এর উৎসটা ঠিক জানা যায় না। তুমি স্টার্ট করো উইথ এ সেনটেন্স অর উইথ এ ওয়ার্ড অর উইথ এ লেটার।

চিহ্ন : তাহলে স্যার, যারা ফিকশন লিখছেন তাদের কোনো প্রস্তুতি লাগে না?

হা.আ.হক : গড়পরতা হয়তো ভাবা যায় এইটা বিষয়। একটা ঘটনা ঘটেছে, ঘটনা ঘটেছিল যে, আমাদের ওখানে ১৬ বছর বয়সী একটা মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে এসেছিল, তারপর সে কেবলি হাতবদল হতে থাকে। ১৬ বছরের অবিবাহিত কুমারী সুন্দরী মেয়েটি কতো হাত যে বদল হয়। কত লোক যে তাকে ধর্ষণ করে, সম্মিলিতভাবে করে, আলাদাভাবে করে, পথে-ঘাটে, যেখানে যেখানে সে গিয়েছে। তারপর মামলা একটা হলো। যখন যে ছাড়া পেল ঐ মামলার কিছু নথিপত্র আমাদের বাড়িতে ছিল, আমার বাবা ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। লোকাল মোকদ্দমাগুলো বাবাই শুনানি করতেন। কাগজ ছিল সাদা আর একটু হলুদ রংয়ের, সেই কাগজের ওপর লেখা থাকতো মামলার বিবরণ। ছোট্ট করে বিবরণ। আমি এগুলো নিয়ে অপরপৃষ্ঠা যেদিকে ফাঁকা থাকতো খাতা তৈরি করতাম, এক পৃষ্ঠায় মামলা লেখা আছে আর একপৃষ্ঠায় আমার স্কুলের নানারকমের পড়ানো হচ্ছে এইসব। ওর মধ্যে কি নিয়ে মামলা হচ্ছে তা পড়ি। বাবা একদিনের জেল দিতে পারতেন, বাড়িতেই আটকে রাখা হত। কি নিয়ে মামলা— সে আমাকে ধরে নিয়ে পিপঁড়ের গর্তের মধ্যে মুখটা চেপে ধরেছিল, (হাসি) বাবা অনেক সময় এরকম মামলায় ধমক দিয়ে সমাধান দিতেন। তো এই ব্যবস্থাগুলো ছিল তো।

চিহ্ন : কিন্তু স্যার, যখন আখ্যান তৈরি হচ্ছে তখন একটা লিয়াজোঁ মেইনটেন তো করতে হয়?

হা.আ.হক : হ্যাঁ, লিয়াজোঁ তো মেইনটেন করতে হবেই। কিন্তু, আমি তো দেখতে যাইনি যে আমার বাবা ঘোড়ায় চড়তেন, সেটা লেখার তো কোনো দরকার ছিল না, কিন্তু এসে গেল। তখন মনে হলো, আমার বাড়িতে তো ঘোড়া থাকতো এবং দামি ঘোড়াই থাকতো।

চিহ্ন : আপনি একটা ইন্টারভিউয়ে বলেছিলেন চরিত্র তৈরি করতে গেলে চরিত্র নিজে নিজেই বাহাদুর হয়ে ওঠে।

হা.আ.হক : হ্যাঁ, বাহাদুর হয়ে ওঠে। তোমার হাতের বাইরে চলে যাবে তো, তুমি কিছুই করতে পারবে না। ওটাই বোধ হয় মানুষের ক্রিয়েটিভিটি। আজকে তোমার সাথে আমার কথাবার্তা হচ্ছে, আগামী এক মাসের মধ্যে আমার মৃত্যু হলো। তার এক বছর পর আবার তুমি একটু ভাবছো, এই দিনটার কথা ভাবতে পারো, কিন্তু আজ তোমার যে অভিজ্ঞতাটা হচ্ছে তখন কিন্তু অন্যরকম হবে, হতে বাধ্য। নিজের কিছু জিনিস তার মধ্যে ঢুকে যাবে, কিভাবে তুমি ইন্টারপ্রেট করেছিলে।

চিহ্ন : স্যার, ফিকশনে সংজ্ঞা হয় না এটা মানছি কিন্তু যেটা বিষয় সেটা হলো কডওয়েল যদি আমরা বলি কিংবা আমরা যদি ই. এম. ফ্রস্টারের অ্যাসপেক্ট অব দ্যা নভেল তারপরে আমরা যদি গিওর্গি লুকাস-এর কথা বলি— উনারা কিন্তু একটা কথা বলেছেন যে উপন্যাসের মধ্যে একটা বৃহত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামষ্টিক একটা ব্যাপার থাকবে। আইন, আদালত, বিচার, রাষ্ট্র এসব বিষয়ও চলে আসবে এবং মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যত রকমের  ব্যাপার রয়েছে সবকিছুই উপন্যাস ধারণ করতে পারে। তাহলে উপন্যাস শিল্প বলতে আমরা যেটা বুঝি— আগুনপাখি নিয়ে লিখতে গেলেও ফিকশন অব দ্যা আর্ট কিংবা সাবিত্রী উপাখ্যান নিয়ে লিখতে গেলেও ফিকশন অব দ্যা আর্ট এ রিডার কিংবা ইন এ টেক্সট কিংবা ডেড অব দি ওথার— রোলাবার্থ যেটা বলছেন- ইট মে বি… হতেই পারে, এটা নিয়ে একটা জ্ঞানচর্চার ব্যাপার তৈরি হতে পারে। হয়তো হাসান আজিজুল হক সাবিত্রী উপাখ্যান নিয়ে যেটা ভাবেননি, সেটাই আমরা বলছি। তাহলে ফিকশনে আপনি বললেন যে ভাষাটাই সব এবং ভাষার মধ্যেই সমাজ বলি, রাজনীতি বলি, দ্বন্দ্ব বলি, সমস্যা বলি, সমাধান বলি, সবকিছুই ভাষার মধ্যে থাকে। তাহলে স্যার, এটা কি সময়ে সময়ে পাল্টায় না?

হা.আ.হক : অবশ্যই পাল্টায়, ভাষাও পাল্টায়। কিন্তু, ভাষার মূলটা কি, অর্থাৎ— ভাষা তো একরকম নয়, হাতের একটা ভাষা আছে, দেহের একটা ভাষা আছে, চোখের ভঙ্গির ভাষা আছে। যে কোনো জিনিসে তোমাকে প্রকাশ করে দেয় যে, উনি এটা ভাবছেন, উনি এটা চিন্তা করছেন। তুমি যদি আমাকে ভেঙাও তাহলে বোঝা যায়, তুমি আমাকে বিদ্রুপ করলে। এজন্য ভাষাটাকে আমি বলবো এর যে নানা রকম বৈচিত্র্য, এটাকেই বলা হয় হিউম্যান একজিস্টেন্স, এটাই মানুষের অস্তিত্ব, এইটা মাইনাস করে দাও, মানুষ দেখতে পাবে না।

চিহ্ন : তাহলে স্যার, এখনকার সময়ের মানুষের যে ভাষা, এখন আমরা দেখছি জীবনটা অনেক জটিল। এবং আমরা যদি বলি, আপনি ব্রিটিশ শাসন দেখেছেন, পাকিস্তান শাসন দেখেছেন, বাংলাদেশও প্রায় ৪৮ বছর দেখছেন। এখন একটা প্রযুক্তির যুগ চলছে এবং প্রযুক্তির যুগে, গল্প-উপন্যাস লেখা হচ্ছে। কিন্তু, আসলে যেটি বিষয় সেটি হচ্ছে, দেবেশ রায় একটা কথা বলেন— উপন্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। তো উপন্যাসের সংকটটা আসলে কি? তিনিও উপন্যাস লিখছেন তিস্তা পারের বৃত্তান্ত সহ কিছু লিখেছেন। আসলে উপন্যাসের সংকট, যেমন— ইলিয়াস বলেছেন, গল্প মরে যাচ্ছে, উনি (দেবেশ রায়) বলছেন, উপন্যাসের সংকট। তো এগুলোর মিনটা কি?

হা.আ.হক : ব্যক্তির চরিত্র যতক্ষণ প্রধান হয়ে না উঠছে ততক্ষণ উপন্যাস হচ্ছে না। এগ্রিকালচার যে সোসাইটি, ওটাতে তো ব্যক্তির আলাদা চেহারা নেই। ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটিতে সবাই ভিন্ন ভিন্ন। তখন ফ্রিডমের কথাটা উঠছে ব্যক্তি ইমেজ দাঁড়াচ্ছে এবং সেই সময়েই উপন্যাসের উদ্ভব হচ্ছে। সংঘবদ্ধ মানুষ একসাথে থাকতে নানান কারণে বাধ্য। যেমন— দাসপ্রথা, সমস্ত গ্রীক রাষ্ট্রগুলোর শারীরিক পরিশ্রম দাসরা করত। যেখানে চারভাগে ভাগ করা হত তার মধ্যে দাস শ্রেণি, তারপর যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে— তাদের অধিকারও কম। যারা ব্যবসা করতো তাদের অনেক অধিকার ছিল কিন্তু রাজনীতি করার অধিকার ছিল না। একটা শ্রেণি— যারা ক্রীতদাস তাদের কোনো রাইটসই ছিল না। তারা গৃহপালিত জন্তুর মতো আরকি। এ নিয়ম সমাজই দিয়েছে। তার মানে সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে।

চিহ্ন : স্যার, আমরা বলছি উপন্যাস আধুনিক সময়ের সৃষ্টি। তাহলে, আমাদের সোসাইটিটা এসেছে একটা কলোনিয়াল ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে। দেবেশ রায় যেটা বলছেন পাশ্চাত্য উপন্যাসের প্রভাব আমাদের উপন্যাসে থাকলেও আসলে উপন্যাসে যে উপাদান বা বিষয়বস্তু সেটা অবশ্যই ওয়েস্টার্ন না, সেটা আমাদের নিজস্ব। আলালের ঘরের দুলালই বলি কিংবা হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখি বা সাবিত্রী উপাখ্যানের কথাই বলি এই ফর্মটা কি ওয়েস্টার্ন কিছু, নাকি ফর্মটা আমাদের ভেতরে থেকে আমাদের ইউনিটির ভেতর থেকে এসেছে?

হা.আ.হক : ডাল আর চাল যদি একসাথে মিশে যায়, তাহলে তোমাকে আলাদা করতে দিলে আলাদা করতে পারবে না, এজন্য ইউরোপ, ইউরোপিয়ান আর্ট, নভেল এমন করে মিশে গেছে যে— তখন ঐটুকু বোঝা যায় মানুষ ছাড়া আর কোনো বিষয় নেই। এই মানুষের বিভিন্ন ক্যারেকটারিসটিক্স জায়গা বিশেষে, অর্থনৈতিক অবস্থা বিশেষে একেক জায়গায় একেক রকম।

চিহ্ন : এখানে আর একটা জিনিস যেটা হচ্ছে যে— বিষাদ-সিন্ধু নিয়ে আপনার একটা লেখা আছে এবং বিষাদ-সিন্ধুর যে জায়গাটা, বিষাদ-সিন্ধুতে যে উপাখ্যানটা কিংবা যে ঘটনাগুলো, সেটা কি একেবারেই রক্তমাংসের হয়তো মনে হয়, কিন্তু জিনিসটা তো আমাদের না, একেবারেই বাইরের। কিন্তু সে জিনিসটা তিনি আমাদের করে নিলেন। এবং, যখন আমরা দেখছি এজিদ কিংবা হাসান কিংবা হোসেন হয়তো যে বর্ণনা সবটাই মানবিক মনে হচ্ছে!

হা.আ.হক : মানবিক হয়ে গেছে। যতই চেষ্টা করো— ফেরেস্তা নিয়ে তুমি যদি গল্প লিখতে যাও, শেষ পর্যন্ত ফেরেস্তাকেও হিউম্যান ফিগার দিতে হবে। মানুষ তার নিজের ইমেজেই অন্য জিনিসকে কল্পনা করে। সেই জন্য মানুষের ব্যাপারটা একটা চিরন্তন ব্যাপার, সে নানান অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর নানান চাপ— সামাজিক চাপ, পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক চাপ, সোসাইটি ক্রমে বদলে যাচ্ছে, মানুষগুলো এক থাকলেও বদলাচ্ছে। কিন্তু বদলানোর পরেও দেখছো, আরে মূলটা তো ঠিকই আছে। তখন দেখা যাচ্ছে, হারকিউলিসই বলি বা একিউলিসই বলি তারও রাগ আছে, ক্রোধ আছে, তারও অনুতাপ আছে, অনুশোচনা আছে। অবিকল আমার মতই।

চিহ্ন : স্যার, বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, বিষবৃক্ষ কিংবা রাজসিংহ- এগুলো তো কোনোটা রাজনৈতিক, কোনোটা ঐতিহাসিক, কোনোটা সামাজিক, তাহলে এই যে তিনি লিখেছেন, সবটাই তো মানুষ নিয়েই। মানুষের মানবিক রূপটাই উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। সেই প্রবাবিলিটিটাই তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

হা.আ.হক : হু, তাই তো। আবার মুসলমান সমাজ নিয়ে তার তেমন কোনো লেখা নেই। হয়তো জানতেন না, সমাজ সম্পর্কে জানতে হবে। অনগ্রসর একটা সমাজ; ঐ সময় তো মুসলমানরা ভীষণ অনগ্রসর। ব্রিটিশরা আসার পরে, মুসলিম সম্প্রদায়েরা তাদেরকে একসেপ্ট করতে চাইছে না। তাদের শিক্ষা নেবো না, কিছু নেবো না। দেরি করে ফেললো এক শতাব্দী। পরে মুসলমানরা দেখলো দেরি হয়ে গেল তো, ইতিমধ্যে ওখানে বিদ্যাসাগর এসে গেল, আলালের ঘরের দুলাল, হুতুম পেঁচার নকশা এসব জিনিস একটু একটু করে তৈরি হলো। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলো। খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করতে হলে বাংলা শিখতে হবে। বাংলা শিক্ষা করতে হলে, সে রকম ব্যাকরণ তৈরি করতে হবে। মুন্সিরা সব করলো। কাজেই ইংরেজদের দুর্নাম করলে তো হবে না। ব্যাপার তো তা না, ইমপ্যাক্ট বলে একটা কথা আছে।

চিহ্ন : স্যার, আরেকটা জিনিস, সেটা হচ্ছে— আখরুজ্জামান ইলিয়াস (আপনার খুবই একজন প্রিয় লেখক এবং মানুষ) আমরা যতটা জানি ইলিয়াস আপনাকে খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তার উপন্যাস যেমন চিলেকোঠার সেপাই এবং খোয়াবনামা- একটা ৬৯ একটা ৪৭ এর বিষয় নিয়ে, এখন এখানে যে প্ল্যান বা পরিকল্পনাটা এটাকে স্যার আপনি কিভাবে দেখেন? কিংবা, আমি যদি বলি, এখন যারা লিখছেন যেমন শাহীন আখতার— সখী রঙ্গমালা কিংবা আমাদের জাকির তালুকদার যেমন লিখছেন মুসলমানমঙ্গল বা পিতৃগণ। ওগুলো দিয়ে ফিকশন আসলে কি ম্যাসেজটা দিচ্ছে? আমাদের হিস্ট্রিটা শেখা, না রাজনীতিটা শেখা, না হিস্ট্রি রাজনীতির ভেতর দিয়ে মানুষটাকে দেখা? অথবা ৪৭ এর যে জিনিসটা আগুনপাখির মধ্যে আছে, সেটা দিয়ে ৪৭ এর ক্রাইসিসটা দেখানো? আসলে একজন আর্টিস্ট কি দেখাতে চায়? এবং এটা তো উপন্যাসের ফর্মেই সম্ভব। এটা তো গল্পে কিংবা কবিতায় সম্ভব না। তাহলে উপন্যাসের ফর্মে এই জিনিসটা…

হা.আ.হক : আমারও তাই মনে হয়, বিস্তারিত সমাজের যে জীবন, রাষ্ট্রের যে জীবন, রাষ্ট্রের যে কাঠামো, রাষ্ট্রের যে চেহারা- সেটাকে ডিটেইল ধরতে গিয়ে উপন্যাসের দরকার হয়েছে। কিংবা, সভ্যতার যে রূপ কিংবা এক সভ্যতা আরেক সভ্যতাকে ট্রাবল করছে, তাই না, এখন লাতিন অ্যামেরিকান উপন্যাস, কিংবা আফ্রিকান, নাইজেরিয়ান উপন্যাস অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। কাজেই বাংলা উপন্যাসে যে সাত ভেজালে খাস্তা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ওরাও তাই পাবে। ওদের যে যুগও ট্রেডিশন— ওরাও তো মিলেমিশে একাকার হয়েছে।

চিহ্ন : আমি রবিশঙ্কর বল পড়ছিলাম— আপনার কাছ থেকেই নিয়েছি, তিনি পশ্চিমবঙ্গে লিখছেন। আপনি বললেন অনেক কিছু মিলে একটা খাস্তা খিঁচুরি। একটু মিলে যাচ্ছে কথাটা যে তার লেখার মধ্যেও আমি দেখতে পাচ্ছি যেমন জন্মজান নামে একটা বই তিনি লিখেছেন সেইখানে দেখা যাচ্ছে ঐ দুই-তিন বন্ধু মিলে তারা বরিশালে যাবে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে তারা ফ্লাইটে ঢাকায় আসলো। নামার পরে সেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা তিন বন্ধু মিলে তারা বরিশালে যাবে। বরিশালে তাদের পুরোনো ভূমি সেইখানে যাচ্ছে আর কি। যাওয়ার সময় সদরঘাট হয়ে বরিশালের নৌকায় উঠেছে। এখন এটা নিয়ে তর্ক-বির্তক। কখনো ঢাকাইয়া ভাষা। এখানে ঢাকার বন্ধু ওখানে কলকাতার ভাষা আর সেই সাথে সাথে এই যে মোবাইলে গান শুনছে ইউটিউবে গান শুনছে এবং তাদের মধ্যে খুব চটকদার গল্প বলছে এবং কথা বলার মধ্যে আলাপ-আলোচনার মধ্যে প্রচ- স্পিড, ফ্রিডম। কিন্তু, দেখা যাচ্ছে আসলে কিছুই না রেজাল্টটা জিরো। কিন্তু, কথোপকথন যা কিছু এর মধ্যে হয়তো মাল-মসলা কিছুই নাই। কিন্ত কথাবার্তা যেটা চলছে আজকাল যেমনটা হচ্ছে প্রচ-, খুব স্পিড, একটা লেখার মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এবং তাদের যে সংলাপ আপনি-আমি এখানে বলছি বটে এখানে আরেকজন আছে এখানে তাকে আবার রেফার করছে এই কথার মধ্যেই আবার তৃতীয় ব্যক্তির কথা মনে পড়ছে, মানে একটা নানা রকম ব্যাপার আছে। রবিশঙ্কর বলের মধ্যে আমরা এটা দেখি। এখন যেটা বিষয় সেটা হচ্ছে— আমাদের এ বাংলাদেশে লেখালেখির যেটি বিষয় অনেকটাই দেখা যাচ্ছে যে, একটু আত্মকথন  মেমোয়ারস বা হিস্ট্রির দিকে চোখটা বেশি এবং বর্ণনাটাই একটা বড় ব্যপার। এখন যেটি বিষয় সেটি হচ্ছে এই বর্ণনার মধ্যে আখ্যান হারিয়ে যাচ্ছে কিনা? গল্প হারিয়ে যাচ্ছে কিনা? বর্ণনাটাকে; যেমন আপনি মেমোয়ারস লিখছেন তিন-চারটে খ-ে, এখন মেমোয়ারস এর ভেতরে কি মেমোয়ারস; স্টোরি তো আর এক জিনিস না? স্টোরিতে তো চরিত্র সৃষ্টির ব্যাপার আছে। আমরা কিন্তু আজকাল যেমন দেখছি যে শহীদুল জহির কিংবা পরে যারা আসছেন কিংবা আমি যদি ইমতিয়ার শামীমের কথা বলি একধরনের রাগ-অনুরাগ কিংবা জ্যো¯œা দেখছে কিংবা বৃষ্টি পড়ছে কিংবা মামুন হুসাইনের লেখার মধ্যে দেখতে যেটা পাচ্ছি— একটা জার্নি। জার্নি তো স্টোরি না। সেই বিষয়টিই কি স্যার আসলে আমাদের ফিকশনের ফর্ম পাল্টে দিলো?

হা.আ.হক : স্থির ছিল কবে? স্থিরও তো কখনো ছিল না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পদ্মানদীর মাঝি লিখলো, কিংবা পুতুলনাচের ইতিকথা লিখলো, তখন আগে কোনো নিদর্শন ছিল কি, আমাদের বাংলা উপন্যাসে? শরৎচন্দ্র যা লিখেছে, চোখ দিয়ে পানি বার করার উপন্যাস আর কি, হ্যাঁ তার আগে কি বঙ্কিমচন্দ্র, মধুসূদনরা ছিল? প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে একই জিনিস, বাংলা ভাষা। কিন্তু, বাংলা ভাষা যা বহন করে, সেই বহন করা জিনিসগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। তো ভাব ভাষাকে সব করতে হয়। ভাষা ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব নেই। কাজেই এই ভাষাকে অবলম্বন করেই কিন্তু উপন্যাসগুলি লেখা হয়; তার আগে তো উপন্যাস ছিল না। অন্নদামঙ্গল তো লেখা হয়েছে। উপন্যাস না হোক কাহিনিমূলক তো বটেই। তাহলে কোনো না কোনো ফর্মে মানুষ, মানুষের সমাজটাকে পুনর্গঠন করেছে। কল্পনায় বা ভাবনায়, দেবজগত নিয়ে এসেছে কিংবা পাঁচালীর পাঠ— এগুলো শুনেছে। এগুলোকে ছোট করার কোনো কথা ওঠে না। আচ্ছা ঠিক আছে হয়েছে। এখন আবার ওরকম হবে না। সেই জন্য ওরকম কোনো একটা জায়গায় স্থির হয়ে যেটা দেবেশ রায় বলেছে, আমরা আমাদের শিকড়ে ফিরে যাচ্ছি। একথাটাও ঠিক ওভাবে বলা যাচ্ছে না। পাঁচরকম কোনো জিনিস একসঙ্গে না মিশলে কোনো জিনিস হয় না। সব সময় মিশ্রণ ঘটছে, ঘটেছে। দর্শনেও ঠিক এ কথাটাই আছে আরকি। আমরা এক এ পৌঁছাতে চাই, কিন্তু এক এ পৌঁছানো সম্ভব না। আল্টিমেটলি পানি দিয়ে তৈরি সব, কেন তৈরি? পানিকে তাপ দিলে বাষ্প হয়, ঐ চেহারাটা পানির, ঠা-া করলে বরফ হয়— কঠিন হয়ে যায় ওটাও পানির আর একটা অবস্থা। তার মানে আমি যদি ধরি পানি আদি বস্তু খুব অন্যায় হবে না। একটা কারণ তো এখানে আছেই। কারণ নানান জন নানানভাবে একেকটা কারণ দেখিয়েছে। এমপিডক্লিস বলেছে চাররকমের উপাদান দিয়ে পৃথিবী তৈরি হয়েছে। তারপরেই এসেছে ডেমোক্রেটাস, একদম আধুনিকভাবে। তিনি বলেছেন সমস্ত কিছুর অণু দিয়ে পৃথিবী তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, রসগোল্লাও একটা জায়গায় গিয়ে অণু। এই অণুগুলোর যে নানান রকমের এ্যারেজমেন্ট, এই এ্যারেজমেন্ট থেকেই বস্তুর বিভিন্নতা দেখা যায়। ধরো, একজন খুব আস্তে কথা বলছে, কিন্তু তুমি বুঝতে পারছো সে প্রচ- রেগে আছে। কিন্তু, ওভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না। কান হয়তো লাল হয়ে গেছে। কিংবা, একটা মেয়ে একটু লজ্জা পাচ্ছে, সেটা মুখে ফুটে উঠেছে। এটাও তো একটা ল্যাঙ্গুয়েজ। এসব ল্যাঙ্গুয়েজ কিংবা ভাব প্রকাশের উন্নতি হতে হতে মানুষ ভাষায় পৌঁছেছে। সেই জন্যই আমি ভাষার উপর এতো গুরুত্ব দিই। উপন্যাসের কথায় এটা তো একরকম ভাষারই মারপ্যাঁচ। এরকম বলা যেতে পারে।

ইলিয়াস দুটো উপন্যাস লিখেই তো বিখ্যাত হয়ে গেল। কী আছে তাতে? পড়ে দেখতে হয়। গল্প আছে, চমৎকার টানা একটা গল্প। খোয়াবনামার মধ্যে যদি দেখি, সেভাবে তো গল্প নাই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়া আরকি।

চিহ্ন : প্রচুর ম্যাটার, কয়েক জেনারেশন।

হা.আ.হক : হ্যাঁ প্রচুর ম্যাটার, তো এভাবে চলতে চলতে একটা জায়গায় এসে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু শেষ করার অবস্থায়ও কিন্তু ছড়ানো ছিটানোই আছে। অতো গোছানোর চেষ্টা সে করেনি।

চিহ্ন : এবং, কোনো সমাধানও করেনি।

হা.আ.হক : হ্যাঁ, ইলিয়াসের এই সৃষ্টি করার যে ব্যাপারটা, এটা চমৎকার ব্যাপার। দারুণ ক্ষমতা। তাঁর ভাষা সাংকেতিক নয়, অত্যন্ত পড়হপৎবঃব ভাষা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো একটা সংকেত-ই বহন করে। কুলসুম-তমিজ, যে চরিত্রগুলো তৈরি হয়েছে; মানে, সৎ পুত্রের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক তৈরি হওয়া পর্যন্ত। এসব অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে, শেষটা আমার খুব মনে আছে। কিভাবে টেনে নিলো, তমিজের বাপ হাত লম্বা করে তবনটা খুলে নিল।

চিহ্ন : এবং, অত্যন্ত সংযমের সাথে। এবং এই সংযম যে এতো আর্টিস্টিক হয়ে গেলো, অনেক কিছুই না বলেই যেনো সব বলা হয়ে গেলো। তার গল্পের মধ্যে এই ব্যাপারগুলো আছে। যেমন— ‘তারাবিবির মরদপোলা’। মানে সেক্সকে সোসাইটির সঙ্গে এ্যাটাচ করা। কিংবা, নাগরিক জীবনের বিকারের সাথে যুক্ত করা। এগুলো খুব ইন্টারেস্টিং।

হা.আ.হক : হ্যাঁ, ইলিয়াস এই জন্যই খুব উল্লেখযোগ্য লেখক। এই কাজগুলো সে করেছে। অবশ্য খুব কঠিন জায়গাগুলো। তখন মনে হয় যে, ইলিয়াস খুব ইস্পাতকঠিন লোক ছিল। সেই জন্য আমি অভিযোগও করেছি। মানুষকে এভাবে দেখা ঠিক না। এটা অনেকটা মেকানিক্যাল। মানুষ অনেক সফট। মানে আটাতে পানি দিয়ে গোলানোর পরে তুমি চৌকোনা করতে পারো, গোল করতে পারো, যা ইচ্ছা তাই করতে পারো। যাই হোক, লেখার ক্ষেত্রে একটা জিনিস মাথায় এসেছে, প্রথম বাক্য লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে হলো না, ফেলে দিয়েছি; একসময় মনে হয়েছে লিখে যাই। তাতে করে আমার ভাষা কেমন, কৃত্রিম না অকৃত্রিম, সেটা অন্যরা বলতে পারবে। কেউ বলে, হাসান স্যারের লেখা পড়লে বোঝা যায় এটা হাসান স্যারের লেখা। এটা কিন্তু অন্যরা বলতে পারবে, আমি বলতে পারবো না। কিন্তু, ইলিয়াসের লেখা কেমন, সেটা আমি বলতে পারবো। শহীদুল জহিরের লেখা কেমন, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের লেখা কেমন সেটা আমি বলতে পারবো।

চিহ্ন : স্যার, আমাদের এখানে যারা যারা লিখছে, ইলিয়াসের পরে, তো এখন যেটা হচ্ছে, উপন্যাস আসলে বড়ো গল্পের মতোই হচ্ছে। শরৎচন্দ্রের বড় গল্প যেমন আরকি। ১০০-১৫০ পৃষ্টা। তাহলে উপন্যাসের ফর্মটা কি একটু হুমকির মুখে? এই যে বড় হলে পড়তে সময় লাগছে। বড় উপন্যাস পড়ার সময় নেই। মানুষের জীবনের জটিলতা এখন বেড়েছে। বড় জিনিসকে ছোট ছোট টুকরো টুকরো করে নিয়ে আসা আরকি, এটাই তাঁরা করছেন।

হা.আ.হক : এই যে তুমি বলছো— এই কারণ, সেই কারণ; যে কারণে বদল ঘটছে। এটা কিন্তু নির্দিষ্ট নয় ওরকম। এই জন্য বলতে হয় রাই কুড়িয়ে বেল। মানে একটু-একটু, একটু-একটু করে বদলাচ্ছে। এই বদলটা তুমি হয়তো দেখছো না। কিন্তু, বদলাচ্ছে তো। আজকের এই রাজশাহীর সাথে আমি প্রথম যখন রাজশাহী আসি, তার সাথে একশভাগ মিল নাই। রাস্তা-ঘাট, বিল্ডিং, মাঠ, ফাঁকা জায়গা, সমস্ত মিলে আরকি, আজকে আর চিনতে পারবো না। সে চেষ্টাও করি না। কখনো মনে হয়, এখানে ওটা ছিল, ওখানে ওটা ছিল। এখন নাই। মানুষের আর্ট ফর্মও সেরকম হয়ে যাচ্ছে। এখন আর ঢাউস সাইজের উপন্যাস লেখার কথা কেউ ভাবেও না। তবু তিস্তাপাড়ের বৃত্তান্ত লেখা হয়। বড় উপন্যাস, তবু মনে হয় নতুন। সেই কথাই বলছি যে, মানুষের স্বাতন্ত্র্য, একটা মানুষের সাথে আরেকটা মানুষের যে তফাৎ, এটা তুমি চাইলেও থাকবে, না চাইলেও থাকবে। এটা এমন না যে তুমি একজনকে নকল করছো। শত চেষ্টা করার পরেও, নকল করেও তুমি আলাদা হয়ে যাবে। হতেই হবে কোনো উপায় থাকবে না।

চিহ্ন : স্যার, আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পার হতে যাচ্ছে। আমাদের অনেক ক্রাইসিস গেছে। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর হত্যা, স্বৈরশাসন এসেছে, সেখানেও একটা হত্যাকা- হয়েছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্নভাবে মারা গেছে। একদম এলোমেলো একটা পরিস্থিতি। এসব ঘটনা নিয়ে কেউ কেউ উপন্যাস লিখেছে।  যেমন আমি সেদিন জাকির তালুকদারের সাথে কথা বললাম, জাকির বলেছেন— খালেদ মোশাররফকে নিয়ে তিনি উপন্যাস লিখছেন। তারপর শাহবাগে গণ-আন্দোলন হলো, এটা নিয়েও কেউ কেউ উপন্যাস লিখছেন। একাশির জিয়া হত্যাকা- নিয়েও কেউ উপন্যাস লিখছেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান নিয়েও কেউ লিখছেন। কিন্তু, মার্কিং হওয়ার মতো তো কিছু দেখা যাচ্ছে না। আপনি যেটা বলছিলেন— প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কিংবা রুশ বিপ্লব, এসবকে কেন্দ্র করে যেসকল রাইটাররা বেরিয়ে এসেছে, আমাদের একাত্তরের পর; কিন্তু, স্যার তেমন কিছু আসেনি। মানে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেরিয়ে আসা তেমন কিছু তো দেখছি না।

হা.আ.হক : হ্যাঁ, তেমন কিছু তো দেখছি না। এখন যেমন অবস্থা দেখি, তাতে আরো খারাপ লাগে। এরপরে, কিছু লেখা হবে কিনা জানি না। লেখাই তো পড়ে যাচ্ছে। উপন্যাস লিখতে গেলে বাংলাভাষাটা আলাদা করে শিখতে হবে, সেটা হয়তো নয়; কিন্তু, ভাষাটা তো লিখতে হবে। সেটার জন্য একটা জায়গা তো প্রয়োজন। এখন উপন্যাসের ভবিষ্যৎ, তুমি যেটা বলছিলে আরকি। এখন এই মুহূর্তে আমি দেখছি না। এখন গভীর অনুসন্ধানী উপন্যাস হচ্ছে না। লেখকও আবার বেড়ে যাচ্ছে। আমি লিখছি, সে লিখছে আরো অনেকেই লিখছে। আবার নানা রকম পুরস্কার-টুরস্কার হয়েছে। পুরস্কার পেলে যা হচ্ছে, চুলের ভেতরে যে ছোট ছোট শিং আছে, সেগুলো তখন বড়ো হচ্ছে। এখন শিংওয়ালা মাথা অনেক বেশি। আমি বলি— ভাই আমাকে তোমরা বিরক্ত করো না। আমি এক কোণায় চুপ করে বসে আছি। কিছু লিখি, কখনো গল্প, কখনো উপন্যাস, কখনোবা স্মৃতিকথা।

চিহ্ন : স্যার, আরেকটা বিষয়। আপনি বর্তমান সমস্যা সংকট নিয়ে লিখতে তেমন আগ্রহী হলেন না কোনো?

হা.আ.হক : সব লেখকই একটু পিছিয়েই লেখেন। কলকাতায় বসে বসে পদ্মানদীর মাঝি লেখা হচ্ছে। কিংবা পুতুলনাচের ইতিকথা। একটা গ্রামের গল্প। তারাশঙ্করও সব রাঢ় কেন্দ্রিক গ্রামের গল্প লিখেছেন। কিন্তু সব লেখা হচ্ছে কলকাতায় বসে। কাজেই পিছিয়ে-টিছিয়ে কোনো ব্যাপার না। তোমার মনের ভেতরে যে ইমপ্রেশনটা ফেলেছে, তুমি সেটা এড়িয়ে যেতে পারবে না। সুতরাং, তুমি যেখানে বড়ো হয়েছো, জন্ম নিয়েছো, সেই জায়গাগুলোই কেন্দ্র করছো, কিন্তু ছড়াচ্ছো বহুদিকে। আমি রাঢ় নিয়ে লিখেছি একটু বেশিই হয়তো। তোমরা সেটা বলতে পারো। কিন্তু, রাঢ় নিয়ে লিখেছি বলেই সেই লেখার ভালো বা মন্দ নির্ভর করছে তা কিন্তু নয়। আমি তো কুমিল্লা নিয়েও লিখতে পারতাম। যেমন আমি খুলনা নিয়েও বেশ কিছু লেখা লিখেছি। উত্তরবঙ্গের ভাষা নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি। এগুলো লেখকদের নানান চেষ্টা। তুমি বলেছো পেছনের কথা, ওটা কোনো কথা নয়। আমার সত্ত্বার ভেতরে যেটা সঞ্চিত আছে, ওটাকে অবলম্বন করেই আমাকে লিখতে হবে। তবে হা, বর্তমান নিয়েও আমি লিখেছি। পাতালে হাসপাতালে তো বর্তমান নিয়েই লেখা। জিয়ার খাল খনন নিয়ে লিখেছি। এই রকম কিছু লিখেছি আর কি!

[কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকের উজানে ‘উপন্যাস নিয়ে’ আড্ডাটি বসে গত জুনে, এটি তারই লিখিত রূপ।]

*******************************************

এলোমেলো দু’চার ছত্র
ইমতিয়ার শামীম

এই ধারণায় বোধকরি কারও আর কোনো আপত্তি নেই যে, বাংলা কথাসাহিত্য— আরও এগিয়ে বললে বাংলা সাহিত্যই আধুনিকতার নৈকট্যে আসে ইংরেজি সাহিত্যের সংস্পর্শে আসার মধ্যে দিয়ে। তবে সেই আধুনিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে আমাদের লাতিন আমেরিকান ও আফ্রিকান সাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতার কারণে। পাশাপাশি এমন একটি মতও এখন অনেক বেশি আলোচনার দাবি রাখে যে, উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যে কবিতা-উপন্যাস-গল্পের আরম্ভবিন্দু মাইকেল মধুসূদন দত্ত কিংবা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে। বিচ্ছিন্ন আরম্ভবিন্দু থেকে অভিন্ন লক্ষ্যে দুইটি ধারা কাজ করেছে বলে যে আভাস বিভিন্ন চিন্তক-গবেষক গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকে তুলে ধরতে থাকেন, তা এখন অনেকটাই পরিণত রূপ পাওয়ার পথে।

এ ধরণের চিন্তা দানা বেঁধে ওঠার রাজনৈতিক-দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিতও ফেলে দেয়ার মতো নয়। সাদা চোখেই দেখা যায়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে-পরে সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের যে ¯্রােত বয়ে যায়, তা সাহিত্যেরও বিশ্বায়ন ঘটিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য আমাদের ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতাকে চ্যালেঞ্জ করতে শিখিয়েছে, গভীর থেকে গভীরতর নতুন অন্তর্দৃষ্টি অর্জনে সাহায্য করেছে। ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ পৃথিবীর অসংখ্য দেশের অসংখ্য জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে বিলুপ্ত এবং/অথবা বিপণœ করে তুলেছে; আবার এ-ও অস্বীকার করার উপায় নেই, বিশেষত ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি ভাষারও আগ্রাসন ঘটেছে এবং মূলত ওই ভাষার মাধ্যমেই নানা দেশের নানা সাহিত্য আমাদের কাছে এসেছে। সা¤্রাজ্যবাদ তার স্বার্থে উপনিবেশের সব সম্পদই দুই হাতে লুট করেছে, এমনকি বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য, ব্যাকরণরীতি এবং শব্দরাজিকেও সুবিধা অনুযায়ী নিজের ভাষায় আত্মস্থ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতেও দ্বিধাবোধ করেনি।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে কারও কারও আপত্তি থাকলেও এই ধারণাকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই যে, ঈশ্বরগুপ্ত আর মাইকেল, প্যারীচাঁদ আর বঙ্কিমচন্দ্র নতুন কবিতা ও নতুন কথাসাহিত্যের দুই বিচ্ছিন্ন আরম্ভবিন্দু ছিলেন। যদিও এই তত্ত্বই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বঙ্কিমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় বাংলা কবিতা ও উপন্যাসের আধুনিকতার প্রথম পুরুষ এবং এই ধারণা নিয়ে নতুন করে নাড়াচাড়া করাও পরিশ্রমসাধ্য গবেষকের কাজ। তবে মনে রাখা ভালো, আধুনিকতার কোনো মৌলিক সংজ্ঞা নেই এবং ইংরেজ আরোপিত আধুনিকতা অখ-ক ছিল না এবং সেই আধুনিকতার এই দুর্বলতাই পরে বাংলা সাহিত্যকে ঋজুতা অর্জনের দিকে এগিয়ে নেয়।

আধুনিকতা নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সেসব চিন্তার দিকে ফিরে না তাকিয়েও বলা যায়, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আধুনিক সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা আর সোজাসাপটা ও একরৈখিক থাকেনি। বিশেষত সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও চীনের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সংস্কৃতিকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, নতুন ভিত্তি দেয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার ক্লাসিক সাহিত্য ও গণসংস্কৃতির মধ্যে আমরা নতুন এক মেলবন্ধন গড়ে উঠতে দেখি। রুশ বিপ্লব ও চীনের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব ওই সব দেশের নানা ভাষার সাহিত্যকে বাংলা ভাষার কাছে নিয়ে আসে। আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এই জগত আরও বিস্তৃত, প্রসারিত হয়। এসব দেশের বিভিন্ন ভাষার ধ্রুপদ সাহিত্য এই প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষার পড়–য়াদের সমৃদ্ধ করে। বললে অত্যুক্তি হবে না, বাংলা ভাষা-সাহিত্যের পথিকৃৎদের বড় একটি অংশই তখন সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে দর্শনগতভাবে মূলত রাজনৈতিক-সামাজিক অঙ্গীকারকেও বড় করে দেখতে থাকেন।

তবে বাংলা কথাসাহিত্যের শুরু তো এসবেরও আগে, আর উপন্যাসের এইসব বিষয়গুলোও ততদিনে নির্ধারিত হয়ে গেছে বলে মনে করেন দেবেশ রায়—  যেমন, কয়েকশ’ বছর ধরে চলমান কাহিনী-বিবরণের ধারার সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস-বিবরণের বিচ্ছেদের মধ্যে দিয়েই এখানে উপন্যাস যাত্রা শুরু করেছে আর তার মডেল হয়ে উঠেছে ইংরেজি উপন্যাসেরই একটি প্রকরণ। এর ফলে বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসকে আমাদের অধ্যাপকরা আসলে ইংরেজি উপন্যাস-বিবরণের সঙ্গে বাংলা উপন্যাস-বিবরণের সংযোগের ইতিহাসে পরিণত করে ফেললেন। মুশকিল হলো, এই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর সময় থেকে রুশ উপন্যাস বা রুশ কথাসাহিত্য এবং তারও পরে ষাটের দশক থেকে আফ্রিকান ও ল্যাতিন আমেরিকান উপন্যাস কী অভিঘাত ফেলেছে, তার ইতিহাস ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার দিকে তাদের চোখই পড়ল না।

তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্বের মানুষরা একদিন নিশ্চয়ই এসব নিয়ে কথা বলবেন; তবে কোনো না কোনোভাবে অভিঘাত যে পড়েছে, তা বেশ গভীরভাবেই অনুভব করা যায়; কেননা এই সব সাধাসিধে ব্যাপারগুলো আজকাল আমাদের চোখের সামনেই ঘটতে দেখি, বেশির ভাগ গল্পকার-ঔপন্যাসিককেই বেশ খুশি-খুশি মনে হয় এ কথা বললে যে, তার ‘কথাসাহিত্যে’ বেশ মাখো-মাখো ‘জাদু-বাস্তবতার’ ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে। আবার কোনো কোনো সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার কিংবা মন্তব্যেও পড়েছি, তারা বেশ ‘পুলকিত হরষে’ নিজেরাই বলছেন যে, তাদের লেখায় জাদু-বাস্তবতা আছে।

সা¤্রাজ্যবাদিতার সঙ্গে আফ্রিকান ও ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের সম্পর্কের একটি বিশেষ প্যাটার্ন আছে— যার জের ধরে এসব অঞ্চলের সাহিত্যের বিশ্বায়ন ঘটেছে বলতে গেলে বন্ধনহীন ভাবেই; ভারতীয় উপনিবেশের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের ক্ষেত্রে তেমনটি আমরা ঘটতে দেখি না। সা¤্রাজ্যবাদ তার নিজের স্বার্থে সাহিত্যের যে বিশ্বায়ন ঘটালো, তা যে বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে পুঁজি ও সা¤্রাজ্যের বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতও রচনা করল, তা বলা বোধকরি অত্যুক্তি হবে না। সঙ্গীতকে উদাহরণ ধরে এগুলে এই আলোচনা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারত; কিন্তু বিশ্বায়নের যে আদর্শিক ও দার্শনিক ভিত্তি, তাকে সাহিত্যের মধ্যে থেকে আবিষ্কারের চেষ্টার মধ্যে দিয়ে আরও তীব্রভাবে অনুভব করা সম্ভব যে, কত সুদূর থেকে এবং কত গভীরভাবে বিশ্বায়নের এই বিন্যাসকে বিস্তৃত করার প্রচেষ্টা চলেছিল।

একদিকে সাহিত্যের বিশ্বায়ন, অন্যদিকে পুঁজির বিশ্বায়ন— কথাসাহিত্যের সঙ্গে সমাজ ও মানুষের সম্পর্ক আর বৈরিতাকে এগুলো বিন্যস্ত করেছে নতুনভাবে। এই প্রসঙ্গে আমরা ম্যাক্সিম গোর্কীর ‘মা’য়ের কথা ভাবতে পারি। পুঁজিবাদী ধ্যান-ধারণায় অভ্যস্ত সমালোচকরা গোর্কীর এ উপন্যাসকে মেকানিক্যাল টাইপের বা যান্ত্রিক কলাবাদী কথাসাহিত্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে আজও পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে চলেছেন। ‘মা’কে যে এভাবে এমনকি সেই সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পরও অভিযুক্ত হতে হচ্ছে, তার কারণ ‘মা’ পুরো পৃথিবীর কাছে একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল, একটি প্রতীক হয়ে আছে। যদিও ‘মা’য়ের চেয়ে আমার কাছে আরও প্রিয় তার ‘তিনজন’। তবে সমাজতান্ত্রিক ও জনগণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক ও দার্শনিক বিশ্বায়নের একটি ইতিবাচক পরিপ্রেক্ষিত সূচিত হয়েছিল, ‘মা’ উপন্যাস হয়ে উঠেছিল তার সাংস্কৃতিক বিচ্ছুরণ। সমাজের পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো এমনভাবে কোনো কোনো কথাসাহিত্য প্রতীক হয়ে ওঠে, যাকে শুধুমাত্র শিল্পগুণ ও শিল্পতত্ত্বের প্রচলিত মানদ- দিয়ে বিচার করতে যাওয়া মুর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ‘মা’র আগেও এভাবে অনেক ফিকশন বা উপন্যাস প্রতীক হয়ে উঠেছে; ‘আঙ্কল টমস কেবিন’, ‘লা মিজারেবল’ কিংবা ‘টেলস অব টু সিটিস’-এর মতো লেখাগুলো এমন প্রতীকী ঐতিহ্যের। ‘মা’ উপন্যাস মানুষকে চিরপুরাতন এক আকাক্সক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় নতুন করে, কিন্তু এর গুরুত্ব এখানেই যে, মানুষ তার নিজের অন্তঃক্ষরণের প্রতিটি বিন্দু ঝরে পড়ার শব্দ পায় এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে। মানুষের আকাক্সক্ষার জায়গাগুলো এতে নিছক আবেগের রূপে প্রকাশিত হয়নি, বরং যৌক্তিক অনিবার্যতার রূপ নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। তা হলে আপত্তি কোনখানে? আপত্তি এখানেই যে, তাতে নি¤œশ্রেণীর সংস্কৃতি উঠে এসেছিল। মানুষ গল্প-উপন্যাসে তার নিজের সংস্কৃতি দেখতে অভ্যস্ত, নিজের সংস্কৃতির চোখ দিয়ে অন্য শ্রেণীর সংস্কৃতি দেখতে অভ্যস্ত। মধ্যবিত্তের উপন্যাস-গল্পেও নি¤œবিত্ত অহরহ থাকে বইকি, কিন্তু সেখানে নি¤œবিত্তকে দেখা হয় তারই চোখ দিয়ে। মধ্যবিত্তের চেতনার রঙে নি¤œবিত্তের ‘চুনি রাঙা হয়ে ওঠে, সবুজ হয়ে যায় পান্না;। কিন্তু ‘মা’তে, ‘তিনজনে’ উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তরা নি¤œবিত্তের সাংস্কৃতিক আঁচে ঝলসে উঠল, নি¤œবিত্তের চোখে দেখা দিল। নিজেদের চেহারা দেখে তারা বিব্রত হলো, নিজেদের নিয়ে তারা সংকুচিত হলো, তাদের অনেকের অবস্থানের পরিবর্তনও ঘটল, কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, তারা ক্রুদ্ধ হলো। আর এই ক্রোধের আঁচে ‘মা’ যান্ত্রিক কলাবাদী কথাসাহিত্যের খোঁটা পেতে শুরু করল। বাস্তবত বিশ্বসাহিত্যে ‘মা’ যুক্ত হওয়ার মধ্যে দিয়ে বোঝা গেল, মধ্যবিত্ত— যারা সাহিত্যের মূল ভোক্তা— তাদের ‘রাজধানী যত বড়ই হোক’ না কেন, ‘হৃদয়পুর তত বড় নয়’। তারা নি¤œবিত্তের সংস্কৃতির সৌন্দর্যে অবগাহন করতে রাজি নয়, তাদের কাছে নি¤œবিত্তের সংস্কৃতি বড় বেশি ভুলে-ভালে ভরা, স্থূল হৃদয়বৃত্তিতে ভরা; যদিও মধ্যবিত্ত পাঠকের জনপ্রিয় সাহিত্যের দিকে তাকালে, বিশাল পর্ণসাহিত্যের বাজারের দিকে তাকালে এক নিমিষেই বোঝা যায়, স্থূল হৃদয়বৃত্তিকে পাঠযোগ্য ও বইয়ের পাতায় ধারণের যোগ্য করে তোলার মধ্যে দিয়ে মধ্যবিত্ত তার সাহিত্য চর্চার একেবারে শুরু থেকেই তরল হৃদয়বৃত্তিকে ধারাবাহিকভাবে প্রবাহিত করার যজ্ঞে লিপ্ত রয়েছে।

মার্কসবাদী আন্দোলনের আন্তর্জাতিকতাবাদের সূত্রে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার যে বিশ্বায়িত রূপ দেখা দিল, তা ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক চর্চার দিকে প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ কতটুকুই বা ছুঁড়ে দিতে পেরেছিল! কিন্তু তার পরও তা ঔপনিবেশিকতার জন্যে ভীতিকর হয়ে উঠেছিল। আর এই প্রক্রিয়ায় সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে জড়িয়ে পড়া মধ্যবিত্তের ব্যাপক অংশ শুধু ইংরেজি সাহিত্য নয়, বিভিন্ন দেশের ধ্রুপদী সাহিত্য থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্যের সংস্পর্শে এসেছে, তেমনি বাংলা সাহিত্যের দিকেও নতুন দৃষ্টিতে ফিরে তাকিয়েছে। লেখকরাও এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকতে পারেননি। কাজেই বাংলা সাহিত্যে, কথাসাহিত্যে ইংরেজি সাহিত্য থেকে পাওয়া আধুনিকতাকে যত সহজে, যত অনায়াসে এবং শুধুমাত্র ‘ঔপনিবেশিক শাসনতত্ত্বের’ জোরে চাপিয়ে দেয়া হয়ে থাকে, এই আধুনিকতাকে যেমন ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে, বোধকরি বিষয়টি তত সহজ নয়। কারণ বাংলা সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতায় খুব দ্রুতই আমরা যেসব সাহিত্যিককে পাই এবং যারা খুব দ্রুত বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতায় নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে নেন, ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী গণমুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে এমনকি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্কও খুব সুপ্রতিষ্ঠিত। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকেই সাহিত্যক্ষেত্রে আমরা এমন দেখতে পাই। রুশ সাহিত্যের সংস্পর্শে এসে শুরু হয় লেখক-পাঠকের নতুন এক অভিযাত্রা। কালক্রমে ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় বিকশিত সাহিত্যের সংস্পর্শে আসায় উপনিবেশের মূল্যবোধকে অগ্রাহ্য করে নিজস্ব ছন্দে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাংলা সাহিত্যে একটি সুস্পষ্ট অবয়ব পেতে থাকে। এই অবয়বকে আখতারুজ্জামান বলতে গেলে একাই শক্তিশালী একটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে গেছেন ‘খোয়াবনামা’ লিখে। তবে সাহিত্যের এই ধারার কোনো চ্যালেঞ্জ নেই ভাবলে ভুলই হবে। কেননা এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বদৌলতে সাহিত্যের বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারগুলো ঘটছে, তাতে বিশেষত উপন্যাসের আদল পাল্টে যেতে শুরু করেছে, তা আখ্যানকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক পর্বের আখ্যানের সঙ্গেও এ আখ্যানের দূরত্ব রয়েছে এবং বাংলা কথাসাহিত্যের অনেককেও দেখা যাচ্ছে, আখ্যান হোক বা না হোক, লেখার বিষয়ীকরণের ক্ষেত্রে ‘আখ্যান’ প্রত্যয়টিকে ব্যবহার করতে। এসব লেখার পরিতৃপ্তিবোধে আহ্লাদিতও হতে দেখা যাচ্ছে তাদের। বাস্তব আর পরাবাস্তবের মিশ্রণে আখ্যানে যে আদল সৃষ্টি হতে পারে, সময়-সমাজ-ব্যক্তির দ্বিবাচনিক প্রক্রিয়ায় সমগ্রতার যে ধারণা উঠে আসতে পারে, কাহিনীর মধ্যে কাহিনী কিংবা গল্পের মধ্যে গল্প যেভাবে আসতে পারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আখ্যানগুলোতে তার গ্রন্থনা কতটুকু আছে, তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহ রয়েছে। আখ্যানকে যদি ভাবি, বহুত্ববাদের আয়ুধ কিংবা কাহিনীর আদল থাকার পরও কথকতার মধ্যে দিয়ে জেগে ওঠা কাহিনীর উদ্বৃত্ত পরিসর, তার আস্বাদ আমরা কবে পাব, তা এখনও অনিশ্চিত।

এসব বলার অর্থ এই নয় যে, কথাসাহিত্যের ধারা এখনও বাংলা সাহিত্যে পরিণত হয়নি, বাংলায় যথেষ্ট ভালো কথাসাহিত্য লেখা হয়নি। পাঠক হিসেবে আমরা মুগ্ধ হব, সংশ্লিষ্ট হব, উদ্বিগ্ন হব, জাবর কাটব, অনাবিল আস্বাদে ভেসে যাব কিংবা বেদনায় মথিত হব— এমন কথাসাহিত্য বাংলায় যথেষ্টই বলতে হবে এবং এখনও এই সৃষ্টিশীলতা অব্যাহত রয়েছে। আবার এ-ও সত্য যে, বাংলা কথাসাহিত্যের পাঠকের উল্লেখযোগ্য অংশেরই ভালো লাগার গতি-মাত্রা এখনও এর সংলাপ নির্ভর। গত প্রায় দুই শতাব্দীতে আমরা অনেক ভালো উপন্যাস পেয়েছি বটে; কিন্তু ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিবরে দাঁড়িয়ে, ভবিষ্যতমুখীনতার ধারার মিশেলে সেগুলো থেকে নির্বাচনের প্রশ্ন এলে হয়তো প্রথমেই রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাসকে। কারণ তা আমাদের জাতীয়তার চিন্তাকে উজ্জীবিত করেছে, একই সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধও করেছে। রবীন্দ্রনাথের ওই গোরা এখনও নিত্যনতুন গোরা হয়ে আমাদের বাঙালি সমাজে জন্ম নিয়ে চলেছে। যদিও আমাদের কথাসাহিত্যিকরা নতুন প্রেক্ষাপটের এই গোরাদের নিয়ে লিখতে পারছেন না। তবে এরকম সব আলোচনাই শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য। যেমন, আমাদের কথাসাহিত্যে বাঙালি মধ্যবিত্তের উত্থানের সূত্রগুলো তা হলে আমরা কী ভাবে দেখব? হয়তো এখানে আমরা ভাবতে পারি একদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ ও অন্যদিকে বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাস দুটো নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ আমাদের চিনিয়েছে মধ্যবিত্তের সেই অংশটিকে, যারা তাদের বিকাশমানতার পথে পুঁজি আর ভাবালুতার সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন হয়ে মধ্যবিত্তসুলভ প্রেম-কামজ নষ্টামির দিকে এগিয়ে যাবে (তখনও তাদের পুরোপুরি আবির্ভাব ঘটেনি); আর বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ আমাদের চিনিয়েছে মধ্যবিত্তের সেই ধারাকে যারা গ্রাম থেকে উঠে আসছে নিঃস্ব অবস্থাতে, সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ঠাঁই করে নিচ্ছে শহরে, কিন্তু একই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট দূরত্ব রেখাও টানছে শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে। মধ্যবিত্ত মনের এই গতিপ্রকৃতির আলোচনায় মানিকের ‘চতুষ্কোণ’কেও রাখা যায়, রাখা যায় ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’কেও। নিভৃত কামনা-বাসনার সঙ্গে জীবনযাপনের সংঘর্ষ নিয়ে বিব্রত মধ্যবিত্তকে শেষ পর্যন্ত একটি প্রান্তরে এসে দাঁড়াতে দেখি আমরা ‘চতুষ্কোণে’, যেমনটি দেখি এসবেরই অনির্দিষ্টতা, অনির্দেশ্যতা ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’য়। কিন্তু যদি বলি, এই যে এত বড় বাংলার সমাজ আর তার সবচেয়ে বড় অংশ কৃষক— তারা কি কোনো উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসতে পেরেছে, তা হলে হতাশই হতে হয় আমাদের। উনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর কোনো কথাসাহিত্যিকের মধ্যেই আমরা এত বাস্তবতাবোধ ও মমত্ববোধের ধারায় জেগে উঠতে দেখি না যে, কৃষককে একটি মানবিক সৃজনশীল জনগোষ্ঠীর মর্যাদা দিয়ে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিবর থেকে তাকে কোনো মানবিক দূরযাত্রায় যুক্ত করবেন। এই কাজটি বোধকরি প্রথম করলেন অমিয়ভূষণ মজুমদার। আর শুধু কৃষক সমাজ নয়, পূর্ব বাংলার মানুষও বোধকরি সেই প্রথম বড় ক্যানভাসে বাংলা সাহিত্যে উঠে এলো, উঠে এলো মুসলমান জনগোষ্ঠীও। এর আগে মানিক বন্দোপাধ্যায় এই পূর্ববঙ্গের মানুষদের নিয়ে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ লেখেন বটে, আর তাতে হোসেনের মতো শক্তিশালী মুসলিম চরিত্রও বিকশিত হয়, তবে অমিয়ভূষণ মজুমদারের দেশ বিভাগের প্রেক্ষাপটে লেখা ও ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত ‘গড়শ্রীখ-ে’ এমন একটি একটি ভূখ- আর জনগোষ্ঠীকে নিরচ্ছিন্নভাবে, সামগ্রিকভাবে উঠে আসতে দেখা যায়, যাদের জীবনযাপনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে ভূখ-ের অন্তর্লীনে প্রবাহিত রাজনীতি। দ্বিধাহীন ভাবেইবলা যায়, ‘গড়শ্রীখ-’ লেখা না হলে জানাই যেত না, শক্তিশালী অনেক কথাসাহিত্যিক থাকার পরও বাংলা কথাসাহিত্য উনবিংশ-বিংশ শতাব্দী জুড়েকী ভীষণ জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় বয়ে চলছিল। অমিয়ভূষণ বাংলা কথাসাহিত্যে পূর্ববাংলার জনজীবনকে ভিন্ন ও শক্তিশালী মাত্রায় উপস্থাপন করলেন, বাংলা কথাসাহিত্য হিন্দু-মুসলমান শক্তিশালী চরিত্রের মিশেলে নতুন এক রূপ পেল, বাংলা কথাসাহিত্যে সময় ও ভূগোল নতুন এক মাত্রা নিয়ে হাজির হলো। একেবারেই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ১৯৪৮ সালে লেখা ‘লালসালু’ একই পথের পথিক। লেখককে নয়, লেখার সময়কালকে যদি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া যায়, তা হলে কথাসাহিত্যে নতুন করে শক্তিশালী ভিত নির্মাণ করলেন শহীদুল জহির ১৯৮৮ সালে ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ লিখে। আর দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ‘খোয়াবনামা’ লিখে নি¤œবর্গের মানুষকে জীবন ও ইতিহাসের রৈখিকতায় একাই ঋজুভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

আবারও পুরানো প্রশ্নের কাছে ফিরতে পারি আমরা— সাহিত্যের বিশ্বায়ন কি এই যাত্রাপথে কোনো ছাপ ফেলছে? সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, অমিয়ভূষণ মজুমদার, শহীদুল জহির কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস— এদের প্রত্যেকেই বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে, বিশেষত ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার সাহিত্যের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত এবং এদের লেখালেখিকে সেই আধুনিকতার ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, যা একদিন পাওয়া গিয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথদের মধ্যে। আর এখন যারা আন্তর্জাতিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন, তাদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটছে আরও অনায়াসে। এখনকার কথাসাহিত্যিকদের হাতে বোধকরি সেই সুযোগ আর নেই যে, কারও ধারণার রূপান্তর ঘটিয়ে বই লিখে অনায়াসে পাঠককে মুগ্ধতার চোখে তাদের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করবেন।

ঢাকা, ৩০ আষাঢ় ১৪২৫

*******************************************

উপন্যাস-পাঠ ও প্রক্রিয়া : লেখক-পাঠক প্রতিক্রিয়া
খোরশেদ আলম

উপন্যাস-পাঠের প্রক্রিয়া বিষয়টি জটিল। উপন্যাসের লেখক যেভাবে উপন্যাস লেখেন পাঠক সেভাবে ভাবেন না। উপন্যাসের পাঠ-প্রক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে লেখক-পাঠকের এক বিশেষ ক্রীড়া তৈরি হয়। তেমনি পার্থক্য ঘটে লেখক-লেখককে কিংবা লেখক-পাঠক-সমালোচকে। বস্তুত বিষয়টি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। সমালোচকমহল উপন্যাসের তত্ত্ব তৈরি করেন। তাঁরা তৈরি করেন উপন্যাস বা কথাসাহিত্য-পাঠের নানা ফর্মুলাও। এই ফর্মুলা মাফিক শিল্প-তত্ত্ব হাজির হয়। এই তত্ত্ব হাজিরের প্রক্রিয়াটি সমালোচকের স্বকপোলকল্পিত নয়। যদি, তারা তা করেনও, আশ্রয় নেন পূর্বতন নানা প্রক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ওপর।

বিশ্বে উপন্যাসের তত্ত্ব তৈরি হয়েছে বিস্তর। এমনকি উপন্যাস নিয়ে পাঠক মহলের বিচিত্র সাড়া, কল্পনার উদ্ভাবন-প্রক্রিয়াও চলেছে সমান তালে। বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনকি পরবর্তীকালেও অনেকেই উপন্যাস তৈরি, লেখা, সম্ভাবনা কিংবা শিল্প নিয়ে বিস্তর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু উপন্যাস পাঠ-প্রতিক্রিয়ার স্থান থেকে পাঠক অনেকটাই দূরবর্তী। তারা আশ্রয় নিয়েছে সাহিত্য-পত্রিকার পাতায়, আড্ডা ও বন্ধু মহলের ঘরোয়া পরিবেশ-প্রতিক্রিয়ায়। তবুও উপন্যাস যেহেতু লেখকের কল্পিত বিশ্বের বাস্তব-উপস্থাপনা, সেখানে চরিত্রও তাঁর আশপাশের মানুষ। এমনকি সমসাময়িক ঘটনাবলির প্রতিক্রিয়াও উপন্যাস দেহে সন্নিবেশিত, কাজেই উপন্যাসের পাঠ-প্রক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। বরং ঔপন্যাসিক তাঁর সমকাল, জীবন, বোধ, শিল্পের বিচিত্র স্থানেই পাঠকের মতামতের ওপর নির্ভরশীল।

একজন সৎ লেখকের দায়িত্বও পাঠকের কাছাকাছি পৌঁছানো। তাদের মানস-প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই কেবল তিনি গভীর অনুকৃতি-স্বকৃতিতে যথার্থ-উপস্থাপনের দায়িত্বটা সুসম্পন্ন করতে পারেন। অন্যদিকে সমালোচক মহলে প্রচলিত উপন্যাস-কৌশলের নানা অভিক্ষেপ তুলে ধরার মাধ্যমে পাঠক হিসেবে সমালোচকের নির্দিষ্ট টেক্সটে উপস্থিতি, অনুভব, দূরত্ব এবং পাঠক-চৈতন্য প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে তার সাযুজ্য-বৈপরীত্যের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠার দাবি রাখে। তাই সমালোচক হিসেবে লেখকেরও পাঠক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি জটিল ও কঠিন। তাই সেটি গবেষণার অবকাশ রাখে। এর মধ্য দিয়ে উপন্যাস লেখক-পাঠক-সমালোচক এই ত্রিধারার ঐক্য ও সম্ভাবনা তথা উপন্যাসের পাঠজনিত এক মনস্তত্ত্ব ও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিত প্রস্তুত হয়।

বর্তমান প্রবন্ধে বাংলা-উপন্যাসের পাঠ ও পাঠ-বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এতে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস নিয়ে সাধারণ ও ক্রিটিক্যাল পাঠক এবং সমালোচক মহলে যে পাঠ ও বিশ্লেষণ-প্রক্রিয়া চলত এবং এখনো চলছে তারই তাত্ত্বিক আলোচনা উপস্থাপন করা হবে। এমনকি সীমিত আকারে উঠে আসতে পারে উপন্যাস-পাঠকেরও মনস্তত্ত্ব। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্যই কথাশিল্প তথা উপন্যাসের পাঠ-প্রক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিশ্লেষণ।

মানব সভ্যতার প্রথম পর্যায়েও সাহিত্যকে লেখন বিশ্বে আলাদা কোনো মর্যাদাভিষিক্ত করা হত না। তখনো সাহিত্য-দর্শন-ধর্ম-বিজ্ঞানের সব লেখাকেই সাহিত্য বলে অভিহিত করা হতো। একসময় আলাদা অভিধায় অভিষিক্ত হয় সাহিত্য নামক বিষয়টি। কিন্তু তারও আগে কাহিনি বা গল্পকথন মানুষের সহজাত। প্রাথমিক পর্যায়ের সাহিত্যে শ্লোক, কাব্য, মহাকাব্য, ট্র্যাজেডি ও নাটক এসবই ছিল। বলা যায়, আঠার শতকের দিকে ‘কথাসাহিত্য’ বা ‘ঋরপঃরড়হ’-এর জন্ম। এটি এমন একটি সাহিত্য রূপ যা গদ্যে লিখিত এবং কল্পনা-নির্ভর। অথচ এই কথাসাহিত্যই সবচেয়ে বাস্তব-ঘনিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত। বাস্তব-কল্পনার পরস্পর-বিরোধিতা থাকলেও কথাসাহিত্য তার বিশালত্ব নিয়েই পাঠক সমাজে হাজির হয়।

কথা অমৃত, কথাসরিৎসাগর, বৃহৎকথা ইত্যাদি প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য। সেখানে ‘কথা’ শব্দটির ব্যাখ্যা কিছুটা অন্যরকম। ‘কথা’ এসেছে ‘কথ্ম’ শব্দ থেকে। এটি মূলত একটি প্রশ্নবোধক অব্যয়। ‘কথ্ম’ মানে ‘কেন?’, ‘কেমন করে?’ বা ‘কোন উপায়ে?’— ইত্যাদি অর্থজ্ঞাপক। মানব মনের আদিম ঔৎসুক্য ও কৌতুহলের স্মারক এই শব্দ। সুতরাং কথাসাহিত্য মানুষের জানার আগ্রহ বা কৌতুহল কেন্দ্রিক। তবে কথাসাহিত্য বললেই স্পষ্ট কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় আসে। যেমন— ‘গদ্যে লিখিত’, ‘আখ্যানধর্মিতা’, ‘বাস্তব ও কল্পনার মিশ্রণ’ ইত্যাদি। ছোটগল্প ও উপন্যাস ফর্মের বৈসাদৃশ্য সত্ত্বেও একই গোত্রের। কিন্তু গল্প শোনার ও বলার আগ্রহ মানুষের আদিম স্বভাব। মানুষের শিকারের অভিজ্ঞতা থেকেই গল্পের উদ্ভব সাহিত্য-শিল্পকলা। গুহাচিত্র কিংবা মানুষের শিকার-সম্পর্কিত গল্প এর অন্তর্গত। গল্পের মধ্যে অভিনয় যুক্ত হয়ে উদ্ভব ঘটে নাটকের। বিবেচনা করলে দেখা যায়— কাব্যের আগে গল্পের আবির্ভাব। কিন্তু পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গল্প, আখ্যান, উপন্যাস সাহিত্যের নবীনতম শাখা। আধুনিক যুগের শিল্পবিপ্লবের প্রত্যক্ষ প্রভাবে এদের সৃষ্টি।

একইসঙ্গে আমরা দ্বিমত প্রকাশও করতে পারি। কারণ মানুষ ভাষা ব্যবহার করতে সক্ষম হওয়ার পরপরই গল্প বলতে ও শুনতে শিখেছে। এমনও হতে পারে মানুষ আকার-ইঙ্গিতেই গল্প বলার প্রক্রিয়াটি চালিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাষা-ব্যতিরেকে মনুষ্য-যোগাযোগের অবস্থাকে বলেন ‘বাণীশূন্য’তা, ‘উৎসবমন্ত্রহীন’ ‘সুরের বিচিত্র বর্ণ’ ও ‘দৃশ্যহীন’।  মানুষের ইন্দ্রিয়-ক্ষমতা অসীম নয়, সসীমও নয়। তার গভীর অন্তর্দেশে সৃষ্টিশীল-আবেগপ্রবণ সাঙ্গীতিক মন, যা কিনা ভাষার থেকেও শক্তিশালী। আর আদিম মানুষের কাছে গল্প বলা ছিল স¦াভাবিক জীবনযাপনের অংশ। আমাদের প্রাচীন ও ধ্রুপদী সাহিত্যও ছিল গল্পচ্ছলে লোককথা। কারণ রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি ছিল মুখে-মুখেই প্রচলিত গল্প।  কিন্তু পরবর্তী কালে মৌখিক সাহিত্যের অভিধা হলো লোকসাহিত্য। এমনকি উনিশ শতকেও সাহিত্যের ভাষা নিয়ে সাহিত্যিক-সমালোচকরা তর্ক-বির্তকে লিপ্ত। সাহিত্য মাধ্যমগুলো নানাভঙ্গি ও শৈলিতে বিভাজিত-নির্মিত হয়েছে। তবু উপন্যাস সম্পর্কে ‘এ-বিষয়ে আমরা সবাই একমত যে, উপন্যাসের মৌলিক বিষয় হচ্ছে এর গল্প।’ (ফরস্টার : ২০১১)। তাই উপন্যাস-উদ্ভবে রয়েছে মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তি-সংশ্লিষ্টতা। তবে উপন্যাস নতুন সাহিত্যিক ফর্ম। উপন্যাস তৈরির পরিপ্রেক্ষিতে রয়েছে পৃথিবীর সমাজ-রাজনীতি-অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন। মুদ্রণযন্ত্র থেকে শুরু করে শিল্পবিপ্লব পুরোটাই এর আত্মীকৃত। এমনকি সেখানে রয়েছে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারণও। রণেশ দাশগুপ্তর ভাষ্য :

মুদ্রণযন্ত্রের প্রচলন ব্যতীত উপন্যাস-শিল্প সম্ভবপর হতো না। অবাধ ব্যবসায়ের অন্যতম পণ্য হিসেবে এর সরবরাহের ব্যবস্থা না হলে উপন্যাস ব্যাপক সংখ্যক পাঠক-পাঠিকার নিভৃত নিলয়ে পৌঁছাতে পারত না। সামন্ততান্ত্রিক-সাম্রাজিক ব্যবস্থা ভেঙে যে মাতৃভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র গড়ার প্রবণতা গড়ে ওঠেছিল শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতির মুখে তার সর্বজনগ্রাহী মুখরতা পেত না। (দাশগুপ্ত : ২০১২)

শিল্পবিপ্লবপূর্ব মানুষের গোষ্ঠীভিত্তিক বা দলবদ্ধ জীবন যান্ত্রিক ছিল না। কর্মব্যস্ততা তাদের ছিল তবে অবসরও ছিল সুপ্রচুর। তাদের অবসর বিনোদনের মাধ্যম ছিল পারফমেন্সভিত্তিক শিল্প। ঐসব পারফমেন্সভিত্তিক শিল্পের পাঠকশ্রেণি নয় বরং ছিল শ্রোতা-দর্শক শ্রেণি। এই শ্রোতা-দর্শকের আর্ট-ফর্ম কখনই উপন্যাস হতে পারে না। কারণ উপন্যাস মূলতই পাঠ ও পাঠক-সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে উপন্যাস-লেখকের থাকে বিশাল-আয়তনিক জীবন ফুটিয়ে তোলার অবকাশ। এ-ক্ষেত্রে পাঠক রুচি, গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও উপন্যাস-রচনায় লেখকের স্বাধীনতাও বেশি। আধুনিক উপন্যাসে কখনো মনস্তÍত্ত্ব, কখনো দুর্বোধ্যতার ছাপ পড়েছে। এ-সত্ত্বেও উপন্যাস সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। বর্ণনায়তনিক জীবনে বড় গল্পের মধ্যে পাঠক সহজেই নিজেকে চিনতে, পরিপূর্ণ গল্প-স্বাদ পেতে চেয়েছে। এমনকি রহস্যসঙ্কুল জীবনে বাস্তবতার ঘনিষ্ঠতা পেতেও উপন্যাসের সান্নিধ্যে এসেছে। সমালোচকের ভাষায় :

ভাষা-শিল্পে বাস্তবতার দাবি যতটা জোরালো ততটা যেন নয় ভিন্নতর শিল্পমাধ্যমের ক্ষেত্রে। আধুনিক চিত্রকলা সম্পর্কে তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না, প্রাচীনকালেও ছবি অনেক সময়েই চোখে দেখা বাস্তবতার আনুগত্য করেনি। নৃত্যশিল্পের বা সংগীতশিল্পের কাছে আমাদের বাস্তবতাজনিত কোনো দাবিই নেই। আর ভাষা-শিল্পেও কথাসাহিত্যই যেন আমাদের কাছে সেই বাস্তবতার প্রকৃত আধার— কবিতা নয়। (চক্রবর্তী ২০১৪ : ১৯৪)

উপন্যাসের ভিত্তিভূমিতেই জাগতিক বাস্তবতা-প্রসঙ্গ। এমন একটি সময়-কাঠামোতে উপন্যাস-সূচনা যেখানে মানুষের সঙ্গে সমাজ ও প্রকৃতির ভারসাম্য টলায়মান। উপন্যাস মধ্যযুগের ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস ও দেব-প্রাধান্য অস্বীকার করে জীবন্ত মানুষের প্রতিষ্ঠা। অন্যদিকে সমাজ ও জীবন-অন্তর্গত সমগ্রতাই তার অভীষ্ট গন্তব্য। কিন্তু আমাদের উপন্যাস ইউরোপের আদলে নির্মিত হয়েছে। দীর্ঘকাল উপনিবেশ-শাসিত লেখক-পাঠক উভয়ই গল্প-স্বাদের জন্য ইউরোপীয় মডেলেরই অনুসারী হয়ে উঠেছে। মাঝখান থেকে হারিয়ে গেছে পারফর্মেন্সভিত্তিক মধ্যযুগের শিল্প উদ্যাপন-কৌশল। ইউরোপের মধ্যযুগের ‘বর্বরতা’ ও ‘অন্ধকার’ নামক শব্দগুচ্ছ দ্বারাও আক্রান্ত হয়েছে বাঙালি-সংস্কৃতিলোক। সেই অনিবার্য বাস্তবকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সেই সঙ্গে নেই উপন্যাসের নতুন বিশ্বকে অস্বীকার করার অবস্থা। কিন্তু আমরা যদি আফ্রিকার দিকে তাকাই তবেই শুধু ব্যতিক্রমী অবস্থা পরিদৃষ্ট হতে পারে। নচেৎ উপনিবেশের বাস্তবতা এবং তার নির্মিত একরৈখিক সাহিত্য-ফর্ম সৃষ্টি ও বিকাশের সূত্রকেই মনে-প্রাণে গ্রহণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

উপন্যাস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে অনেকটাই স্বতন্ত্র আফ্রিকীয় কথকতা। উপন্যাসের কেন্দ্রে থাকে ব্যক্তি, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তি-গোষ্ঠী-সমাজ-পরিবেশের দ্বন্দ্ব। কিন্তু আফ্রিকার উপন্যাসে তা দেখা যায় না। বরং আফ্রিকায় উপন্যাস-আঙ্গিকে উঠে এসেছে সমস্ত আফ্রিকার অতীত পরম্পরা, গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব-সংক্ষুব্ধতা। তাদের উপন্যাসের বড় অংশজুড়ে রিচুয়াল-মিথ-কৃত্য প্রভৃতি। এছাড়াও রয়েছে এসবের ভালো-মন্দ ও বিরোধ-নিষ্পত্তির প্রকাশ। অর্থাৎ সমগ্র আফ্রিকার ব্যক্তি নয়, গোষ্ঠীর বৃহৎ জীবনই আখ্যান হিসেবে আর্বিভূত। উপন্যাস-ফর্মটাই ঔপনিবেশিক শক্তির নিদর্শন বহন করে। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই আফ্রিকার বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়। ঐ ইংরেজি শিক্ষিত শ্রেণির হাত ধরেই উপন্যাস তথা লিখিত সাহিত্যের যাত্রা শুরু হয়। এর পূর্ব-পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাস-সমৃদ্ধ মৌখিক সাহিত্যের প্রচলন ছিল। আফ্রিকান উপন্যাসের শুরুতেই যে-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় তা হচ্ছে ভাষা-প্রসঙ্গ। সেখানে শিক্ষিত শ্রেণির একদল ইংরেজি ভাষাতেই উপন্যাস রচনা করে। অন্যরা তাদের নিজস্ব ভাষায় উপন্যাস লেখার দাবি জানায়। এঁদের মধ্যে চিনুয়া আচিবি, নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গা, পেটার আব্রাহামস, ওসমান সেববেন, ইয়াম্বো ওয়োলোগুয়ম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ইংরেজি অথবা তাঁদের নিজস্ব ভাষায় রচনা করলেও এঁদের উপন্যাসে ফুটে উঠেছে আফ্রিকান জীবনের বিচিত্র প্রসঙ্গ। উঠে এসেছে ঔপনিবেশিক কালের নির্যাতন-নিপীড়নের কাহিনি। এঁদের উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র ব্যক্তিবিশেষ থেকে হয়ে ওঠে সমগ্র গোষ্ঠীর মডেল চরিত্র। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চিনুয়া আচিবির Things Fall Apart, Arrow of God অথবা নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গার অ A Grain of Wheat উপন্যাসের নাম।

অন্যদিকে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না ইউরোপীয় উপন্যাস প্রবলভাবেই ব্যক্তিবাদের বিকশিত রূপের বহিঃপ্রকাশ। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পবিপ্লব, রেনেসাঁ, রিফর্মেশন, মানব-বিপ্লব বিচিত্র ইতিহাস-রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক অভিক্ষেপ তাদের উপন্যাসের বৃহত্তর জগতের অন্তঃসার। উপন্যাসের প্রধান প্রধান তত্ত্ব ও দার্শনিক অভিজ্ঞানসমূহ তাদেরই শিল্পী-সমালোচকদের আলোচনায় পূর্ণ। তাদের উপনিবেশগুলোতেও প্রায় সমভাবেই তাদের ভাষা ও সাহিত্য পঠিত। উপনিবেশিতের সাহিত্য ও সাহিত্য-সমালোচনাও তাদেরই তত্ত্ব ও দর্শন-ভাবনা-আক্রান্ত। শুধু তাই নয়, এ-অঞ্চলের উপনিবেশিত পাঠকও তাদের রুচি-আকৃষ্ট হয়ে উপন্যাস পাঠে আগ্রহী। এমনকি ঔপনিবেশকের দ্বারা ভাবাক্রান্ত হয়েছে লেখক-মনস্তত্ত্বও।

আলোচনা-সূত্রে ইউরোপীয় উপন্যাসের ধরণ-ধারণ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা যেতে পারে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক নানাভাবেই সেখানকার উপন্যাস ইউরোপীয় সমাজ-রাজনীতি ও ভাবচিন্তার প্রকাশক। যেমন: সারভান্তেসের উড়হ ছঁরীড়ঃব ইউরোপীয় সমাজের নতুন অর্থনৈতিক শ্রেণি ও নতুন শক্তি-উদ্ভবের ইঙ্গিত। উপন্যাসের যে দুটো প্রধান লক্ষণ— বাস্তবধর্মিতা ও চরিত্রসৃষ্টি, সার্ভান্তেস দুটোরই সন্নিবেশ ঘটান। ডালসিনিয়া ও সাঙ্কোপাঞ্জা পুঁজিবাদী বুর্জোয়া সমাজ-উদ্ভূত। আর এই বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যে দিয়েই উদ্ভূত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। উপন্যাসের এই ব্যক্তি প্রাধান্যের কথা অনেকেই বলেছেন। যেমন, বিনয় ঘোষের বয়ানে :

উপন্যাসের সর্বপ্রধান উপজীবিকা হচ্ছে ব্যক্তি। সমাজের বিরুদ্ধে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে ব্যক্তির যে-সংগ্রাম তারই কাহিনী উপন্যাসে লিপিবদ্ধ করা হয়। সেই কারণেই মানুষ ও সমাজের মধ্যে সাম্য যখন আর বজায় রইল না, মানুষ যখন নিজেকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সৈনিক হিসাবে আবিষ্কার করল, একমাত্র তখনই সম্ভব হলো শিল্পকে এই নূতন রূপে ভূষিত করা, তখনই হলো উপন্যাসের জন্ম। (ঘোষ ১৯৯৭ : ৮৫)

জোনাথন সুইফট, ড্যানিয়েল ডিফো, হেনরি ফিলডিং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিকাশে ইংল্যান্ডের সমাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরকে ধারণ করেন। ১৭৪৯ সালে হেনরি ফিলডিংয়ের টম জোন্স প্রকাশিত হয়। এটি সমকালীন সমাজের সর্বস্তরের নরনারীর একান্ত বিশ্বস্ত চিত্র। ফিলডিং থেকেই প্রকৃতপক্ষে বাস্তবধর্মী উপন্যাসের প্রতিষ্ঠা। স্তাঁদাল ফরাসি উপন্যাসে আনলেন সমকালীন ইতিহাস, বাস্তবধর্মিতা ও মনস্তাত্ত্বিকতা। রোমান্টিকতা-ক্ল্যাসিকতার বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি জীবনধর্মিতাকেই প্রাধান্য দেন। এর উৎকৃষ্ট নিদর্শন স্কারলেট অ্যান্ড ব্ল্যাক। বালজাকের অ্যজেনি গ্রাঁদ নায়িকা অ্যজেনির জীবনের করুণ কাহিনি। এই কারুণ্যের মূল কারণ সামাজিক অর্থকৌলীন্য। এমন আরেকটি উপন্যাস ওল্ড গরিঅ। সেখানে শেক্সপীয়রের কিং লিয়র-এর ছায়া। তবু এসব উপন্যাসে বাস্তব-জগতের ইঙ্গিত প্রকাশ করেছেন দেবীপদ ভট্টাচার্য।  (ভট্টাচার্য ১৯৮২ : ৩৫)। বালজাকের তীক্ষèদৃষ্টি, সমাজ-বিশ্লেষণী মনোভাব তাঁর উপন্যাসকে করে তোলে আরও বেশি বাস্তবনিষ্ঠ। এ-সম্পর্কে তাত্ত্বিক মত :

স্তাঁদাল মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার দিক থেকে স্মরণীয় হয়েছেন কিন্তু বালজাকের তীক্ষèদৃষ্টি মানুষের জীবনের ইতিহাসে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূত্র সন্ধান করেছে। বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ ও তথ্যনিপুণ উপস্থাপনা বালজাকের বিশিষ্ট মানসভঙ্গিকেই প্রকাশ করেছে। এই বৈজ্ঞানিক-ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি বালজাকের পূর্বে আমরা সুস্পষ্টরূপে পাই না। (দাশগুপ্ত ১৯৮২ : ৪৬-৪৭)

অন্যদিকে বাস্তবতার সঙ্গে রোমান্টিকতার যোগ উপন্যাসকে আরো জীবনমুখি ও অংশগ্রহণমূলকরূপে গড়ে তোলে। যেমন আঠারো শতকে মারিভো, ল্যাসাজ, ভলতেয়ার এবং পরবর্তী সময়ের দিদেরা, রুশো, উগো প্রমুখ ঔপন্যাসিকের রচনায় ফুটে ওঠে পুঁজিভিত্তিক জীবন-ব্যবস্থার নানাদিক, তার বিরোধিতা এবং সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের প্রতি প্রবল সহানুভূতি। পুশকিন-গোগলের সাহিত্য জার ও অভিজাততন্ত্র-অধ্যুষিত রাশিয়ায় ভূমিদাসদের করুণ জীবন-কাহিনি এবং ধনীদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও অতৃপ্তির কথকতা। গোগলের বিখ্যাত উপন্যাস উবধফ ঝড়ঁষং তীক্ষè জীবনবোধ ও বাস্তবদৃষ্টির দৃষ্টান্ত। ইভান তুর্গেনেভ ও ফিওদর দস্তয়ভস্কির গুণে রুশ উপন্যাস পরিণত ও সমৃদ্ধ হয়। তুর্গেনেভের ঋধঃযবৎ ধহফ ঝড়হং এবং ঠরৎমরহ ঝড়রষ সমকালীন রাষ্ট্র-ব্যবস্থার প্রতি বৈপ্লবিক মনোভাব। বাস্তবদৃষ্টি ও গীতধর্মী স্বাপ্নিকদৃষ্টির চমৎকার সমন্বয় তাঁর সৃষ্টি। দস্তয়ভস্কির Crime and Punishment, The Brothers Karamazov, Anna Karenina, War and peace, Resurrection Crime and Punishment, The Brothers Karamazov, Anna Karenina, War and peace, Resurrection স্বতন্ত্র মর্যাদার। এই উপন্যাসদ্বয় রুশীয় জীবনের নিখুঁত চিত্র। লিও টলস্টয়ের হাত ধরেও রুশ উপন্যাস পূর্ণতা ও শ্রেষ্ঠতর মর্যাদা লাভ করেছে। বস্তুত ‘পুশকিনের রোমান্সধর্ম, গোগলের সমাজনিষ্ঠতা, তুর্গেনেভের কবিদৃষ্টি ও প্রগতিশীল চেতনা, দস্তয়ভস্কির দক্ষ মনোচিত্রণ সবই তলস্তয়ের রচনায় সমন্বিত হয়েছে।’ (ভট্টাচার্য ১৯৮২ : ৬৯)। রোমান্স-বাস্তবতাবাদ-আধুনিকতা-দার্শনিকতা, জটিল ভাষিক-ক্রিয়া প্রভৃতি গ্রন্থনে আমেরিকান উপন্যাসও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।

এবার আলোচনা-সূত্রে আসা যাক ভারতীয় সাহিত্যের বিচিত্র বিষয় সম্পর্কে। ভারতীয় সাহিত্যের উদ্ভব, বিকাশের সঙ্গে রয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার মৌখিক ও লিখিত নানা সাহিত্যিক নিদর্শনের যোগসূত্র। তবে এ-উপমহাদেশে উপন্যাস-আরম্ভ ঔপনিবেশিক শক্তি প্রতিষ্ঠার পর। মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য-বিশ্লেষণে লক্ষণীয়— তাঁর কাহিনি-বর্ণন, চরিত্র-সৃজন এবং চৈতন্যগত বৈশিষ্ট্য উপন্যাসেরই আদর্শ। কিন্তু উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য গদ্যধর্মিতা সেখানে অনুপস্থিত। অধিকাংশ সাহিত্যিক, সাহিত্য-সমালোচক এ-বিষয়ে একমত যে, উপন্যাস গদ্যে লিখিত আখ্যান। এতে কাব্যের মাধুর্য অপেক্ষা গদ্যের গাঁথুনি প্রাধান্য পায়। সেদিক থেকে ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যের নিদর্শন পাওয়া যায় ঔপনিবেশিক আমলেই। ঔপনিবেশিক ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়-সূত্রে নব্যশিক্ষিত শ্রেণিতে জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি হয়। এসময় বিচিত্র রচনাকর্মের সঙ্গে উপন্যাসেরও উদ্ভব-সূচনা হয়। সামাজিক নক্শাধর্মী রচনা লিখে ভবাণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রমুখ উপন্যাস-সম্ভাবনা সৃষ্টি করেন। এঁদের লেখা নববাবু বিলাস, নববিবি বিলাস, আলালের ঘরের দুলাল, হুতোম পেঁচার নকশা ইত্যাদি রচনায় নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থপরতা এবং ভাঙন-উন্মুখ প্রাচীন সমাজের ইতি-নেতিবাচক দিক ফুটে উঠেছে। বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস হিসেবে আলালের ঘরের দুলাল— এর স্বীকৃতি সর্বজনমান্য নয়। সে-অর্থে ভারতবর্ষের প্রথম উপন্যাস রচনা করেন বাংলা ভাষার ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর দুর্গেশনন্দিনী প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাস। বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক ওয়াল্টার স্কটের অনুরাগী বঙ্কিমচন্দ্র প্রাথমিক পর্যায়ে ইংরেজি উপন্যাস অনুকরণ-অনুসরণ করেছিলেন। তবে অতিশীঘ্রই তা কাটিয়ে নিজস্বতা সৃষ্টি করেন তিনি। যে-পথ সৃষ্টি করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, তার একটি পূর্ণাবয়ব আনেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ শতকের দ্বারপ্রান্তেই বাংলা উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষাগুলোতেও এ-সময়ে উপন্যাস রচনার প্রবণতা দেখা যায় এবং অল্প সময়েই একটি দৃঢ় অবস্থান লাভ করে।

ইউরোপে পুঁজিবাদের প্রত্যক্ষ প্রভাবে উপন্যাস-সাহিত্য ফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। উপন্যাস আসলে এক ধরনের বিদ্রোহের স্মারক, যে বিদ্রোহ প্রকৃতপক্ষে জীবন-অসঙ্গতিকে আক্রমণ। অথচ এই অসঙ্গতিই উপন্যাসের উপজীব্য হওয়ায় পাঠকের কাছে পেয়েছে গ্রহণযোগ্যতা, হয়ে উঠেছে জনপ্রিয়। এর প্রকৃত কারণ উপন্যাসের সঙ্গে পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক। একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক-সূত্রেই উপন্যাস অল্প সময়ে পেয়েছে অনেক বেশি মর্যাদা। প্রাক মধ্যযুগে অর্থনৈতিক জীবন ছিল সামন্তবাদ-আক্রান্ত। তখন সামাজিক সাম্য এমনকি মানবিক মর্যাদার বিশেষ কোনো তাৎপর্য ছিল না। তখন মানুষের কর্ম ও শ্রম মূলত সামন্ত-ব্যবস্থাকেই উন্নত করছিল। শিল্পবিপ্লব ও রেনেসাঁ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে সে-অবস্থা থেকে কিছুটা মুক্ত করে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রতিষ্ঠা হয়। অন্যদিকে শহুরে জীবন পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয়। এটি প্রথম দেখা যায় মূলত ইতালির শহরগুলোতে এবং উপকূলীয় দেশগুলোতে। উনিশ শতকে পুঁজিবাদ তার ক্ষমতা ও প্রভাবকে যে-অবস্থানে নিয়ে গেছে তা সম্ভব হয়েছে দ্রুতগতির উন্নত রাষ্ট্র দ্বারা।  (ঐবহৎর ংবব ২০০৪ : ৯৫)

বর্তমানে পুঁজিবাদ তার ক্ষমতাকে এতটাই বিস্তৃত করেছে যে পুঁজির দাপটে ব্যক্তির দশাসই অবস্থা। মানুষের ব্যক্তিত্ব মূল্যবোধ আবেগ অনুভূতি সবকিছুই পুঁজির কাছে জিম্মি। পুঁজিবাদের শেকড় এখন শেয়ার বাজার থেকে বাজার অর্থনীতি পর্যন্ত।  পুঁজি সমাজ-পরিবর্তনের পাশাপাশি সাহিত্যেও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ মুখের ভাষানির্ভর সাহিত্য ক্রমশ হ্রাস পেতে শুরু করে, বাড়তে থাকে লিখিত সাহিত্যের জনপ্রিয়তা। প্রাক-পুুঁজিবাদী যুগের শ্রোতা ও দর্শক শ্রেণি রূপান্তরিত হয় পাঠক শ্রেণিতে। এই পাঠকের শ্রেণিচরিত্র মধ্যবিত্তিক, নতুন সমাজ-ব্যবস্থা-সৃষ্ট। বিনয় ঘোষের ভাষায়— ‘বুর্জোয়া সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ দান হল উপন্যাস। বুর্জোয়া শ্রেণীর অহঙ্কার, বুর্জোয়া-শ্রেণীর গৌরব শিল্পের এই নূতন রাজ্য আবিষ্কারে।’ (ঘোষ ১৯৯৭ : ৯৩)। এটা স্পষ্ট যে, পুঁজিবাদের সঙ্গে ইউরোপীয় উপন্যাসের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এই সম্পর্কের জায়গা থেকেই উপন্যাস আধুনিক বিশ্বে প্রভাবশালী ধারা হিসেবে আবির্ভূত। কিন্তু পুঁজিবাদের সর্বগ্রাসী-অবস্থা মানবিক নৈঃসঙ্গ্য জন্ম দেয়। ব্যক্তির সামাজিক সংযোগ-স্থাপন ব্যর্থতা এই নৈঃসঙ্গ্য-আক্রান্তের কারণ। আত্ম-কেন্দ্রিকতা, সঙ্গী-সঙ্গিনীর অনাকর্ষণ, বন্ধুত্বের অভাব এবং দলবদ্ধহীনতা থেকেও তা উদ্ভূত হয়। মানুষ তার অবস্থান পরিস্থিতি পরিপ¦ার্শ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হতে নিঃসঙ্গতার দিকে এগোয়। এর সঙ্গে রয়েছে কর্মহীনতারও সম্পর্ক। অর্থনৈতিক অসাম্য, আকাক্সক্ষার ব্যাপকতা ক্রমশই মানুষকে করে পরস্পর-বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্নতা তথা নৈঃসঙ্গ্যের সঙ্গে পুঁজিবাদের দাপুটে সহাবস্থান। সাহিত্য-পাঠের ধারণাও এ-দাপটের সঙ্গে সম্পর্কিত। লেখকের প্রত্যক্ষ জ্ঞানে রচিত হয় তাঁর উপন্যাস। তবুও কল্পনাকে শানিত করার মধ্যেই যেন ঔপন্যাসিকের সাফল্য। অ্যালাঁ রবগ্রিয়ের বক্তব্য :

অন্য আর পাঁচজনের ন্যায়, বাস্তবতার বিভ্রমের শিকার আমিও হয়েছিলাম। ঞযব ঠড়ুধমবৎ লেখার সময়, যখন শঙ্খচিলের যথার্থ উড্ডয়ন বা তরঙ্গের আন্দোলনের খাঁটি চিত্র আঁকতে চাচ্ছি, সে সময় ব্রিটানির উপকূলে দীর্ঘ শীতকালীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমার ছিল। পথে নিজেকে বললাম, এবার জীবনকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে ও স্মৃতিকে ঝালাই করা হবে। কিন্তু আমার দেখা প্রথম পাখিটিই এ ভুল ভাঙাল: এক দিকে যেসব পাখি দেখছি তার সঙ্গে যেসবের বর্ণনা করছি তার মিল নেই এবং অন্যদিকে মিল থাকা বা না থাকায় আমার কিছুই এসে যেত না। সেই মুহূর্তে যেসব পাখি আমার মাথার মধ্যে ছিল তারাই বিবেচ্য। সম্ভবত তারা এক না এক উপায়ে এসেছে, বহির্বিশ্ব থেকে ও সম্ভবত ব্রিটেন থেকে। কিন্তু তাদের রূপান্তর হয়ে গেছে, একই সঙ্গে বাস্তবের অধিক, কারণ তারা এখন কাল্পনিক। (রবগ্রিয়ে : ১০২)

অ্যালাঁ রবগ্রিয়ের বক্তব্য আঠার-উনিশ শতকের লেখক-শিল্পী-সমালোচকদের দীর্ঘদিনের মতানৈক্য সমাধান করতে পারে। বাস্তবকে তুলে ধরা মানেই কল্পনা-বিবর্জিত কিছু সৃষ্টি, কাল্পনিক কিছু রচনা মানেই অবাস্তব— এমন ভাবনা একপেশে। ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণ, কার্ল মার্ক্সের বস্তুবাদ, উত্তরাধুনিকতাবাদসহ বিবিধ মতবাদ সাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অধিকাংশ শিল্পী-সাহিত্যিক-সমালোচক-গবেষক পুনঃপাঠ-প্রবণ হয়ে ওঠেন। মানুষের মন তখন হয়ে ওঠে বিজ্ঞানের একটি পাঠ্য বিষয়। সুমিতা চক্রবর্তী বলেন :

আধুনিককালের মনোবিজ্ঞান-চর্চা আমাদের নিঃসংশয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে যে স্বপ্ন, কল্পনা, দিবাস্বপ্ন— সবকিছুই মানসিকভাবে বাস্তব। কাজেই সাহিত্যে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা আমাদের সাধ্যাতীত। আমরা কেবল দেখতে পারি- কিভাবে এই বাস্তবতার বিভিন্ন আকার প্রতিবিম্বিত হয় কথাসাহিত্যে। (চক্রবর্তী ২০১৪ : ১৯৫)

তাঁর এই বক্তব্যে সাহিত্য যে বাস্তবতাকে নিয়েই রচিত তা নিশ্চিত। পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধ বিষয়ই শুধু বাস্তব নয় বরং রয়েছে মানব মনের জটিল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। সাহিত্যকে বিশেষত কথাসাহিত্যকে তা পৌঁছে দেয় অন্যরকম উচ্চতায়। ঔপন্যাসিকরা এই মনোগহীনতা-অঙ্কনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এমনকি সমালোচকদের কাছেও সাহিত্য-বিশ্লেষণে তা গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। ফলে মানব-মানবীর জটিল হৃদয়-সংবেদের রূপায়ণই হয়ে ওঠে উপন্যাসের প্রধান কাজ। রণেশ দাশগুপ্ত বলেন, ‘মানুষের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় বিষয়বস্তুর প্রতিকৃতি আঁকাই হচ্ছে ঔপন্যাসিকের কাজ।’ (দাশগুপ্ত : ৪৮)। তবে এর মানে এই নয় যে বহির্বাস্তবতা উপেক্ষিত হবে। বরং, বস্তুজগত-জাত পরিস্থিতির অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়াতেই গড়ে ওঠে অন্তর্বাস্তবতা। তিনি আবার বলেন, ‘ঔপন্যাসিকের কাজ হচ্ছে জীবনের প্রতিকৃতি আঁকা, জীবনে যারা লিপ্ত তাদের অভিজ্ঞতাময় জীবনধারার ছবি আঁকা।’ (প্রাগুক্ত : ৪৮)। প্রথম থেকেই উপন্যাসের চেষ্টা ছিল মানুষের জীবনের অনেকটা কাছাকাছি যাওয়ার। এজন্য রবিনসন ক্রুশো বা টম জোনসের চরিত্রগুলোর ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা ঔপন্যাসিকদের ছিল। কিন্তু বাস্তবতায় ব্যক্তি মনের কথা উঠে আসতে পারেনি। এমনকি ব্যক্তি তখনও তার স্বাতন্ত্র্যিক মর্যাদা পায়নি। চরিত্রগুলোও টাইপ চরিত্র হিসেবেই থেকে গেছে। উনিশ শতকে এমন অসংখ্য উপন্যাস রচিত হয়েছে যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য মর্যাদা পেয়ে যুগপৎ বাহ্যিক ও মনোবিশ্বকে হাজির করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে বাংলা উপন্যাস ব্যক্তি-অন্তর্সত্তার গুরুত্ব ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে নিছক ‘আনন্দ উৎপাদনের জন্য শিল্প’, সৌন্দর্য তৈরির জন্য শিল্প’, ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ নাকি ‘জীবনের জন্য শিল্প’ এইসব বির্তক জিইয়ে রেখে শিল্পী-সাহিত্যিকরা স্বতন্ত্র মনোভাব পোষণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য-সমালোচনায় ছিলেন সৌন্দর্যবাদী-আনন্দবাদী। সে-মনোভাব তাঁর উপন্যাসের কাহিনি ও চরিত্র-অঙ্কনে সূচিতও হয়েছে। তিনি রোমান্টিকতা অতীন্দ্রিয়বাদ আর প্রেম-দ্বারা আবিষ্ট হলেও চতুরঙ্গ, যোগাযোগ, ঘরে-বাইরে কিংবা গোরা উপন্যাসে জগত-জীবনের রূঢ়তাতেই প্রকাশ করেছেন। কিন্তু জটিল জীবনের রূপায়ণ সত্ত্বেও জগদীশ গুপ্তের রিয়ালিটিকে রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করলেন না বরং ঘৃণাই করলেন। অন্যদিকে চল্লিশ দশকের মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা আক্রান্ত রবীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এর বড় কারণ— রবীন্দ্র-সাহিত্যের বুর্জোয়া-মনোভাব সম্পর্কে সমালোচকদের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি। ১৩১৮ বঙ্গাব্দে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় বিপিনচন্দ্র পাল ‘চরিতচিত্র’ প্রবন্ধে অভিযোগ করলেন— ‘রবীন্দ্র-সাহিত্য বস্তুতন্ত্রহীন।’ (বসু ১৯৯৭ : ৩১)। রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে সাহিত্য-সমালোচনা করেছেন কিন্তু বিশ শতকের প্রথম কয়েকবছর পরে সে-ভূমিকা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। এমনকি আধুনিক সাহিত্যের বিশ্লেষণপন্থার প্রতিও তিনি নাখোশ। তাঁর ভাষায়— ‘সাহিত্যের বিচার হচ্ছে সাহিত্যের ব্যাখ্যা, সাহিত্যের বিশ্লেষণ নয়।’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাঙালির প্রাণের লেখক। কিন্তু তাঁর সাহিত্য-সম্পর্কেও হয়েছে বিতর্কিত সমালোচনা। যেমন : ‘শরৎ চাটুজ্জের গল্পটা বাঙালির, কিন্তু গল্প বলাটা একান্ত বাঙালির নয়…।’ (প্রাগুক্ত : ৪৭)। শুধু এঁরাই নন সমালোচনা-দ্বারা শরবিদ্ধ হয়েছে নতুন কালের সাহিত্যিকরাও। মোহিতলাল মজুমদারেরই অভিযোগ ছিল— ক. তরুণ সাহিত্যিকদের রচনায় কেবলই কামনার ক্লিন্নতা; ২. তাঁদের ঘোষিত বাস্তবতা নব সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতির উপর নির্ভরশীল; ইত্যাদি। (প্রাগুক্ত : ১৬৯)। এইসব সমালোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার তা হলো উপনিবেশ-আক্রান্ত বাংলা সাহিত্যের নিজস্ব ভাষা ও আঙ্গিকের জন্য আকুতি।

এদিকে উনিশ শতকের ইউরোপীয় উপন্যাস বিশেষত ফরাসি, রুশ ও ইংরেজি সাহিত্যের স্বভাবধর্ম লক্ষ করা যেতে পারে। যেমন: ১। উপন্যাসের সবকিছুকেই বিশ্লেষণের প্রবণতা; ২। ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিবেশের দ্বন্দ্ব; ৩। প্রেম ও পুঁজির দ্বন্দ্বের চিত্রায়ণ; ৪। ধনতন্ত্রের চাপে ব্যক্তির অন্তর্জগতের যন্ত্রণা; ৫। বর্ণনা দিয়ে বাস্তবকে যতটা পারা যায় নিখুঁত করে তোলা। তলস্টয়, দস্তয়ভস্কি, তুর্গেনেভ, বালজাক, ডিকেন্স, হেনরি জেমসসহ বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের রচনা-বিশ্লেষণ করলেই এসব বৈশিষ্ট্য উপলব্ধ হয়। টলস্টয়ের আনা কারেনিনায় তো একই সঙ্গে এ-বিষয়গুলো উপস্থিত। দস্তয়েভস্কির চরিত্র রাসকলনিকভ ধনতান্ত্রিক জীবন-ব্যবস্থায় ব্যক্তিমানুষের নিঃশেষিত হওয়ার চিত্র। অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ রোমান্টিক শিল্পী হিসেবেই নন্দিত। তবে রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে যোগাযোগ গোরাসহ অনেক উপন্যাসেই রয়েছে বাস্তব জীবনচিত্র— সেকথা পূর্বেই উল্লিখিত। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস সামন্ততান্ত্রিক গ্রামীণ সমাজের দীর্ঘকালীন অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, বঞ্চনা ও শোষণের বেদনাদায়ক আলেখ্য। তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণও আনেন নিরেট বাস্তবের বর্ণন। তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সূক্ষ্মতম মনস্তÍত্ত্ব উপস্থাপনের প্রয়াস পান। অহিংসা, পুতুলনাচের ইতিকথা পদ্মানদীর মাঝি এর প্রমাণ। এসময় আরো অনেক শিল্পী অত্যন্ত নিখুঁত জীবন-অঙ্কন-প্রয়াস চালান। যেমন: জগদীশ গুপ্ত, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, সতীনাথ ভাদুড়ী।

বিশ শতকের বাংলা উপন্যাস বাস্তব ও মনস্তাত্ত্বিক আবহে জীবনসত্য উন্মোচন করেছে। উপন্যাসে এ-শিল্পভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই শিল্পসত্যের মধ্য দিয়েই লেখক-পাঠকে সংযোগ তৈরি হয়। কার্ল মার্ক্সের মতে শিল্প-সাহিত্য সমাজের উপরিকাঠামো। অর্থাৎ উৎপাদক-শক্তির সমন্বয়ে গড়া অর্থনৈতিক কাঠামো তার ভিত্তি। তিনি মনে করেন, ‘যেহেতু শিল্প সমাজের উপরিকাঠামোর অঙ্গ, তাই এটি সমাজের মতাদর্শের অঙ্গ। সুতরাং শিল্পকে বুঝতে গেলে সমগ্র সামাজিক প্রক্রিয়াকে বুঝতে হবে।’ (নায়ক ২০১৪ : ৩১০)। মার্ক্সবাদ বস্তুতান্ত্রিক দ্বান্দ্বিকতাকে শিল্প-সাহিত্য মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট করেছে। পুঁজিবাদী বিশ্বে উপন্যাসের বিষয়বস্তু এবং লেখক-পাঠকের অবস্থান সুনির্দিষ্ট। মার্ক্স মনে করতেন সাহিত্য রহস্যপূর্ণভাবে অনুপ্রাণিত হয় না বা একে শুধু লেখকের মনস্তত্ত্ব দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় না। লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর যুগের মতাদর্শের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মানুষ তার পছন্দমাফিক সামাজিক সম্পর্ক পেতে পারে না বরং যে-ধরনের সামাজিক স্তরে সে অবস্থান করে তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য থাকে। এবং লেখক যতই স্বীকার করতে চাক বা না চাক, এটি মানতেই হবে যে কোনো কাল্পনিক সৃষ্টিই হলো, তার সৃষ্টিকারী যে বাস্তব জগতে বাস করছেন, তার প্রতিফলন। এই বাস্তব জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক, এর প্রতি তার আকর্ষণ বা ঘৃণা ইত্যাদি থেকেই তার সৃষ্টির সূত্রপাত।

উপন্যাস-পাঠের মনস্তত্ত্ব

বিশ শতকের সূচনালগ্নেই সাহিত্যতত্ত্বে মনস্তত্ত্ব নামক বিষয়টি সংযোজিত হয়। প্রাচীন সাহিত্যে যে মানুষের মনের গুরুত্ব ছিল না তা বলা অসমীচীন। সংস্কৃত সাহিত্যে কালিদাসের মেঘদূতম মানুষের মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া-অধ্যুষিত। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যেও মানব মনের ক্রিয়া লক্ষণীয়। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটলও তাঁদের যুক্তিনির্ভর রচনায় যাবতীয় মানবিক কর্মকা-ের দার্শনিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কখনও কখনও মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার আভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু মানব মনের গভীরতম ক্রিয়াগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পুরোধা সিগমুন্ড ফ্রয়েড। তিনি ইঙ্গিত করেন যে, মানুষের মনোজগতে নানা অবদমন থাকে, যা ব্যক্তি কখনোই সচেতনভাবে প্রকাশ করতে চায় না। ফ্রয়েড তাঁর চিকিৎসা ও গবেষণার প্রথম দিকে লক্ষ করেন— তার রোগীরা প্রায় সবাই অসুস্থ মূলত যৌন-উদ্দীপনায় পীড়িত। মানুষ অবদমনের প্রকাশ ঘটায় ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক ও মানসিক রোগের মাধ্যমে। এজন্যই ফ্রয়েডের তত্ত্বে যৌনতা গুরুত্বপূর্ণ। এই যৌনতা পরবর্তী সময়ে উপন্যাসে ব্যাপক গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়। ফ্রয়েড তাঁর গবেষণায় আরও অনেক রকম অনুভূতি ও উপলব্ধিকে সংযুক্ত করেন, যেমন: ভয়, আতঙ্ক, অপরাধবোধ, আক্রমণাত্মক ও হিংসাত্মক মনোভাব সম্পর্কিত অলীক-কল্পনা। এছাড়াও রয়েছে কোনো নির্ভরশীল আন্তঃসম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্নায়নের ফলে সৃষ্ট নৈঃসঙ্গ্য ও একাকিত্ব। এই ‘সাইকোএনালাইসিস’ উপন্যাসের লেখক-পাঠক প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণে অভিনব ভূমিকা রাখতে পারে।  বাস্তবজীবনে মানুষের বিভিন্ন আচরণের অন্তরালে প্রকাশ পায় ইদ ইগো ও সুপার ইগোর কারসাজি। অথচ মানুষ সবসময় তার গোপন বিষয়গুলো গোপনই রাখতে চায়। অবদমনের চূড়ান্তে তার নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক বিকারগ্রস্ততার প্রকাশ ঘটে। প্রতিবেশের চাপে কষ্টপীড়িত মানুষগুলোর মানস-প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট নির্মিত হয়। তাই মনোসমীক্ষণ কেবল সাহিত্যে যৌনতা-উপস্থাপন নয়। টেরি ঈগলটন বলেন :

…মনোসমীক্ষণবাদী সমালোচনা শুধু শৈশ্নিক প্রতীক খঁুঁজে বেড়াবে তা নয় : সাহিত্য-টেক্সট কীভাবে সত্যি সত্যি গঠিত হয় সে-সম্পর্কেও সে কিছু বলতে পারে, এবং ঐ গঠনের অর্থের কিছুটা প্রকাশও করতে পারে। (ঈগলটন ২০০৪ : ১৮৩)

রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি উপন্যাসে, রবীন্দ্র-সমসাময়িক ও রবীন্দ্রোত্তর সময়ে ধূজর্টিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, অমিয়ভূষণ মজুমদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহসহ অনেকের সৃষ্টিতে এই মনস্তাত্ত্বিক উপাদানের উপস্থিতি। বিদেশি সাহিত্যে আলবেয়ার কামু, ফ্রাঞ্জ কাফকা প্রমুখের রচনাতেও প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে মানুষের মন। তবে সবাই যে ফ্রয়েডের তত্ত্বকে অনুসরণ করে এগিয়েছেন তা নয়। তবু মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে ফ্রয়েডের তত্ত্বই বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়। উপন্যাসে মনস্তত্ত্বের কার্যক্রম যতটা না বৈজ্ঞানিক, তার থেকে বেশি ভাবগত। এই ভাবগত বিষয়টি লেখকের স্বেচ্ছাধীন। ঠিক যে কারণে একজন লেখক একটি গল্প বা উপন্যাস লিখতে বসেন তার সঙ্গে রয়েছে এর সংযোগসূত্র। লেখক অনুসন্ধান করেন একটি বিকল্প জগতের, যে-জগতে তার নিজস্ব ভাবনা-চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটতে পারে। লেখক সে-অনুযায়ী চরিত্রের মনস্তত্ত্ব উপস্থাপন ঘটান। বর্তমানে সাহিত্যতত্ত্বে সৃষ্টিকর্মের মধ্যদিয়ে লেখকেরও মনস্তত্ত্ব পাঠ করা হয়। লেখক-মনস্তত্ত্বের পাশাপাশি পাঠক-মনস্তত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা পাঠক কেন উপন্যাস পড়ে এবং ঔপন্যাসিক কেন উপন্যাস লেখে? এ-প্রশ্নের ভেতর লুকিয়ে আছে লেখক-পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। মানুষ মৌলিক চাহিদা মেটাতে অবিশ্রান্ত সংগ্রাম করছে। কিন্তু ধনতন্ত্রের ক্ষয়-অবক্ষয় ধারণ করে সে হয়ে পড়ছে অবদমিত। কারণ আকাক্সক্ষা নামক বিষয়টির পরিণতি সেখানে নেই। যে নৈঃসঙ্গ্য বোধের মধ্যদিয়ে একজন ব্যক্তি লেখক বা পাঠক হয়ে ওঠে, তার পেছনে সক্রিয় মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া। পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্ব বা জবধফবৎ জবংঢ়ড়হংব ঞযবড়ৎু-র আলোক-প্রক্ষেপও বর্তমান সাহিত্য-বিবেচনায় জরুরি। একটি যোগাযোগ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয়। পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্ব সাহিত্যতত্ত্বের এমন একটি শাখা, যা পাঠকের সাহিত্য-পাঠ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেয়। অন্যান্য তত্ত্বের সঙ্গে এর পার্থক্য স্পষ্ট, যেহেতু তা লেখক এবং তার নির্মাণশৈলির সঙ্গে গুরুত্ব দেয় পাঠকের অভিজ্ঞতাকেও। পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্ব পাঠককে মূল্যায়ন করে একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে। কোনো একটি টেক্সটে পাঠক ‘বাস্তব অস্তিত্ব’ নিয়ে উপস্থিত থাকে। শুধু তাই নয়, পাঠক সংশ্লিষ্ট সাহিত্যকর্মটিকে অর্থের পূর্ণতা দান করে। এ-তত্ত্ব দাবি করে প্রতিটি সাহিত্যকর্মকে হতে হবে ‘চবৎভড়ৎসরহম অৎঃ’ যাতে প্রত্যেক পাঠকই নিজস্ব চিন্তা ও অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যকর্মে সংশ্লিষ্ট করতে পারে। পাঠক সহজাতভাবেই কোনো একটি উপন্যাস পাঠ করতে গিয়ে কাহিনি-চরিত্র-পরিবেশে স্বীয় অবস্থান তৈরি করে। সেই অবস্থান অনুসারে উপন্যাসে সে সক্রিয় থাকে। পাঠকের এই সক্রিয় ভূমিকার জন্যই একটি সাহিত্যকর্ম ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপে মূল্যায়িত হয়। স্থান-কাল-পাত্রভেদেও অনেক সাহিত্যকর্মের মর্যাদা, গুরুত্ব ও মূল্যায়নে পার্থক্য ঘটে। পাঠকের এই সক্রিয়তাকেই তুলে ধরে পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্ব। জড়ষধহফ ইধৎঃযবং বলেছিলেন ‘অঁঃযড়ৎ রং ফবধফ’. তাঁর এ-বক্তব্যের অর্থ ছিল সৃষ্টি-¯্রষ্টা-স্বাদ-মূল্যায়ন নানাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। একটি সাহিত্যকর্ম সৃষ্টির পর ঐ লেখক বা ঔপন্যাসিকের সঙ্গে সাহিত্যকর্মটির ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক থাকে না। অবিরত পাঠ-প্রক্রিয়া ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্মটি তখন পাঠকের হয়ে ওঠে। পাঠকই বিবেচনা করে কাহিনি, প্লট, বিষয়বস্তু, গঠনশৈলি ইত্যাদি। উপন্যাসের প্লট, কাহিনি-বিন্যাস ও নানা মাধ্যমে যে অর্থ সৃষ্টি হয় তা লেখকের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও কল্পনাকে পৌঁছে দেয় পাঠকের কাছে। পাঠক তার নিজস্ব চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে নেয় লেখকের জগতকে। আর এ-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি উপন্যাস প্রকৃত সৃষ্টিরূপসম্পন্ন হয়ে ওঠে।

শিল্প-সাহিত্যে লেখকের সঙ্গে পাঠকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। লিও টলস্টয় তাঁর সঞ্চারবাদে এ-কথাটিই উল্লেখ করেছিলেন বহুপূর্বে। তবে সমস্ত মানবিক ক্রিয়াই তলস্তয়ের কাছে শিল্প নয়। ‘শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমে শিল্পীকে ভাব বা অনুভূতি সঞ্চারিত করে দিতে হয়।’ (ঘোষ ২০০২ : ১৫৩)। অন্যদিকে মানবকল্যাণমুখিতাই শিল্পের মুখ্য উদ্দেশ্য বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে যে-কোনো শিল্পই শুধু ভাল লাগার ভিত্তিতে তৈরি হতে পারে না। সঞ্চারবাদের মাধ্যমে লেখক-পাঠকের সংযোগ-স্থাপনকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন। পৃথিবীর বিখ্যাত সব রচনা যেমন: রামায়ণ, মহাভারত, ওডিসি, ইলিয়ড থেকে শুরু করে শেক্সপীয়র, মিল্টন, গ্যেট্যের রচনা এখনও প্রবলভাবে আকর্ষণীয়, এমনকি মুদ্রণ ও প্রচারেও অনেক বেশি গতিসম্পন্ন। এর কারণ হিসেবে শনাক্ত করা যায় গ্রন্থগুলোর যোগাযোগ পারঙ্গমতা। একজন ঔপন্যাসিকের উপন্যাস-রচনার প্রস্তুতির মধ্যেই সক্রিয় থাকে এই যোগাযোগ-প্রসঙ্গ। এই সংযোগ হারিয়ে তলস্তয়ের মতো শিল্পীও জীবনের শেষপর্যায়ে শেক্সপীয়র বা গ্যোটের মতো অনেক বড় শিল্পীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে উপন্যাস বা যে-কোনো শিল্পের এই যে সংযোগ-প্রচেষ্টা তা লেখকেরও নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। বরং উপন্যাস কোনো বার্তা নিয়ে নিজেই পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়।

উপন্যাস সম্পর্কে অন্যান্য শিল্পের যে বিমিশ্র সম্পর্ক ভাবা হয় তা-ও হয়ত এই কারণে যে, উপন্যাস সর্বগ্রাসী শিল্পমাধ্যম বলে সর্বরূপকল্পগ্রাহকও। সমস্ত শ্রোতা বা পাঠককে তা নিজের দিকে ক্রমশই অক্টোপাসের মত টানে। বাখতিন এজন্যই উপন্যাস সম্পর্কে বলেন, ‘…এমনি শিল্পকর্ম, যা কোনো কাঠামোতে, কোনো কাঠামোতেই আঁটে না।’ (রায় ২০০৩ : ৪৮)। বস্তুত উপন্যাস তা-ই। কোনো কাঠামো তার জন্য প্রযোজ্য নয়। শুধু গল্প বলবে তা, সেও নয়। ফলে ছোটগল্পের সঙ্গে তার স্পষ্ট বিরোধ আঙ্গিকের কারণেও। অন্যদিকে লিরিক এপিক বা নাটকে সুদীর্ঘকালের অভিজ্ঞতার তত্ত্বকাঠামোও তার জন্য প্রযোজ্য নয়। বাখতিনের মতে, উপন্যাস এমন একটি শিল্পরূপ যা ইতিহাসের বিশেষ সময়ের সৃষ্টি। আর এই শিল্পরূপ সচেতন সাহিত্যসৃষ্টির কাল থেকেই চলে আসছে। ফলে উপন্যাস সব শিল্পমাধ্যমকে অকাতরে গ্রহণ করেও এপিক-লিরিক-নাটকের বাইরে শিল্পসৃষ্টির মাধ্যম হিসেবেই স্বতন্ত্র সৃষ্টিগুণ সম্পন্ন। উপন্যাসের এই সর্বব্যাপী ক্ষমতার কারণে আমরা বলতে পারি— উপন্যাস বহুসংখ্যক পাঠককে কাছে টানার ক্ষমতা সৃষ্টি করেছে। উপন্যাসে সৃষ্ট ‘পলিফনি’ তথা স্বরসঙ্গতিও বহু সত্যের উৎপাদক। যে কারণে অনেক শিল্পসত্যের সঙ্গে তার সমীকরণ সম্ভব। রোমান্সকর কাহিনি কি রাখালিয়া কাহিনি কি স্বীকারোক্তি কি ব্যঙ্গবিদ্রুপ তথা সকল কল্পকথাসম্ভাব্যতার সঙ্গে তার আত্মীয়তা।

একুশ শতকের পৃথিবী বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্যে প্রবেশ করেছে। মাত্র কয়েক দশকেই তথ্য-প্রযুক্তির অভিনব পরিবর্তন পুরো বিশ্বকে বদলে দিয়েছে। প্রতিনিয়ত মানবিক-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করতে করতে বিজ্ঞান এখন জীবনকে অনেক প্রসারিত করেছে; আবার অন্য দৃষ্টিতে করেছে সংকীর্ণ। ইন্টারনেটের কল্যাণে মানুষ ঘরে বসে পুরো পৃথিবী পরিভ্রমণ করতে পারছে। বাইরে তার পদাঙ্কনের প্রয়োজন পড়ছে কম। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা-চাহিদা-স্বপ্ন-কল্পনা-অনুভূতি সবকিছুর পরিবর্তন ঘটেছে। শিল্প-সাহিত্যের জন্য মানুষের আবেগ-অনুভূতিও অনেকখানি বদলে গেছে। তবে শিল্পের ভঙ্গিগত পরিবর্তন ঘটলেও শিল্প-সাহিত্যের মৌলপ্রবণতার বিনাশ ঘটেনি। তাই এখনও পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উপন্যাস রচিত হয়, ছাপা হয়, বিক্রি হয় এবং পাঠকও ঘণ্টার পর ঘণ্টা তা পঠন করে। মানুষের বর্তমান জীবন-কাঠামোয় উপন্যাস-পাঠের সময়-সুযোগ সীমিত। তবু পাঠক শ্রেণি আছে, আছে লেখকগোষ্ঠী। একথাও সত্য যে, যে হারে পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে সে হারে পাঠক বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তবু যারা এখনও পাঠক, মোটাসোটা উপন্যাসের প্রতি এখনো যাদের আকর্ষণ বজায় রয়েছে, তাদের মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তর গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া একজন ব্যক্তি কেন লেখক হয়ে উঠবেন বা উঠতে চাইবেন? সে প্রশ্নের উত্তরও অনুসন্ধান করা যেতে পারে গবেষণার মাধ্যমে।

এখন ভার্চুয়াল পৃথিবী, আধিপত্য থ্রিজি ফোরজি ফাইভজির। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক-টুইটার কিংবা অ্যাপ্স-গেমস হাতের মুঠোয়। ফলে মানুষের বিনোদন-মাধ্যমের অভাব নেই। সঙ্কুচিত সময়ে উপন্যাস-পাঠের বিকল্প হিসেবে ভার্চুয়াল জগতকে বেছে নিচ্ছে অনেকে। তাতে শ্রম দিতে হয় কম, চিন্তা-কষ্টও সীমিত। উপন্যাস অনেক পাঠকের কাছে নিছক আনন্দ-গ্রহণ মাধ্যম। বিনোদনে শারীরিক, মানসিক শ্রম না দিতে হলেই তারা খুশি, তাও যদি হয় চিন্তা করে পাঠের বিষয়। তবু সাধারণ-ক্রিটিক্যাল উভয় পাঠকই উপন্যাস পড়ে। কিন্তু ক্রিটিক্যাল পাঠকরাই মেধাবী সচেতন পাঠক। আবার এই পরিশ্রমী ও মেধাবী পাঠকরাই উপন্যাসের গ্রহণযোগ্য সমালোচক। তারাও আবার দু ভাগে বিভক্ত। একদল একাডেমিক আরেকদল একাডেমির বাইরে শিল্প-সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা-আকাক্সক্ষী। তারা কখনও কখনও শুধু নিজেদের মধ্যেই শৈল্পিক বোঝাপড়া করে। সাধারণ পাঠক তাদেরকে বোঝে না কারণ তাদের শিল্প-প্রক্রিয়া জটিল। অন্যদিকে শিল্প-সাহিত্যের রুচির জগতের নির্ধারকও জটিল লেখকরাই। উদাহরণ স্বরূপ কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির বরাবরই সাধারণ পাঠকের মেরুদূরত্বে। এঁদের শ্রেণির সাহিত্যবোদ্ধাগণের দ্বারাই সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত জগত নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রণে কোনো দোষ নেই। তবুও সাধারণ পাঠকের সঙ্গে জটিল লেখকের (ভালো লেখক) দূরত্ব চিরকালীন। একারণে জেমস জয়েস কিংবা উইলিয়াম ফকনারের উপন্যাসও তাঁদের কালে খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে না।

উত্তরাধুনিক আখ্যান বিষয়-শৈলীর প্রায় সমস্তটাকেই ভেঙেচুরে দিচ্ছে। সেই আখ্যান-পাঠে মেধাশ্রম ব্যয়ের লোকজনও দিন দিন কমছে বৈ বাড়ছে না। তবুও পাঠক কেন উপন্যাস পড়ে? অন্যদিকে একজন মানুষ কেন উপন্যাস লেখা শুরু করেন? এটা কি তার পেশা বা জীবিকার মাধ্যম? বর্তমানে মানুষের জীবন-জীবিকায় ব্যাপক পরিবর্তন ও সুযোগ এসেছে। সে চাইলে হতে পারে একজন প্রকৌশলী, কম্পিউটার প্রোগ্রামার, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মোটাবেতনের চাকুরে। তবু কেউ কেউ ঐ দিকে অগ্রসর না হয়ে কাগজ-কলম-কীবোর্ডে শব্দের খেলায় মেতে ওঠেন। তাদের মনস্তত্ত্ব এবং ভাবনা-জগতের অন্বেষণ অন্তত সাহিত্য-গবেষণায় জরুরি হয়ে উঠেছে।

একটি গল্প-উপন্যাস বা সাহিত্যকর্মের গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে নির্ধারিত হয়? ধ্রুপদী সঙ্গীত যেমন চিরকালীন তেমনি গল্প-উপন্যাসের অস্তিত্বও চিরকালীন। কিন্তু কেন এই অবিনশ্বরতা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে গিয়ে ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা, লেখক-পাঠক সম্পর্কের গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন পড়ে। প্রথমত, একটি বিষয় লক্ষ করতে হবে যে, ঠিক কারা লেখালেখির প্রতি আগ্রহ পোষণ করেন? তাদের বৈশিষ্ট্য কী কী? তারপর দেখতে হবে ঠিক কারা পাঠক এবং তাদেরও প্রবণতার জায়গা কোনগুলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের উপর নির্ভর করে লেখক-পাঠক সংযোগ-স্থাপনের বিষয়। ব্যক্তি কথকতা রচনার প্রতি আগ্রহী হন যখন অসঙ্গতি নিয়ে বলার থাকে, পাঠকেরও তা পাঠের প্রতি সায় থাকে। বর্তমান যুগের ইন্টারনেটভিত্তিক ব্লগার, লেখক-লেখিকাদের ক্ষেত্রে এ-সত্যটি সহজেই উপলব্ধ হয়। লেখক-পাঠক উভয়েই সামাজিক অসঙ্গতি-বিকৃতি তথা সূক্ষ্মতম বিষয়-সচেতন। এরা গতানুগতিক জীবন-ব্যবস্থার প্রতি অনুগত-অনুরাগী নয়। এদের ভেতর একধরনের ফ্যান্টাসিও কাজ করে। লেখক-পাঠক দু জনেই সন্ধান করে ভিন্ন জগতের, যার অপর নাম ‘বিকল্প বাস্তবতা’। যে বাস্তব-জগতে প্রতিনিয়ত বসবাস লেখকের, তার ত্রুটি-বিচ্যুতি-অসঙ্গতি অতিক্রম করে তারা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চান অন্যজগত। লেখক-পাঠকের এই যে বিকল্প বাস্তবতার অনুসন্ধান, এটাও তাদের মধ্যে সংযোগ-স্থাপনের কারণ। আর বাস্তবজীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি-অসঙ্গতি যত বেশি বৃদ্ধি পায় লেখক-পাঠক তত বেশি বিচ্ছিন্ন হতে থাকে, তাদের মধ্যে তৈরি হয় প্রবল নৈঃসঙ্গ্য। বর্তমান বিশ্বে তাই লেখক ও সাধারণ পাঠক হয়ে উঠছে ক্রমশ ‘এলিয়েন’। এই বিচ্ছিন্নতা তাকে শিল্পের কাছে নিয়ে যাচ্ছে, কখনো বিমুখ করছে। অবশ্য এর মানে এই নয় যে, শিল্প-সাহিত্য বাস্তবজীবন-বিচ্ছিন্ন— এমন কিছু। বরং বাস্তবের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা অধিক বলেই তার সৃষ্টি জীবন্ত। বিনয় ঘোষ বলেন :

বাস্তব জগৎই উপন্যাসের বিষয়ী অনুভাবের (ঝঁনলবপঃরাব অংংড়পরধঃরড়হং) উৎস। সেই জন্য উপন্যাসে বা আখ্যায়িকার মধ্যে আমরা আমি-র সন্ধান পাই না, উপন্যাসের সৃষ্ট জগতের মধ্যে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করি, ক্বচিৎ নায়কের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম ভেবে তারই সঙ্গে তার প্রতিবেশের ‘অপরত্ব’-এর (ঙঃযবৎহবংং) চারিদিকে চেয়ে দেখি। সহজ-প্রবৃত্তি ও প্রতিবেশের অন্তঃস্থিত বিরোধকে প্রকাশ করা উপন্যাসের উদ্দেশ্য নয়, প্রতিবেশের অর্থাৎ জীবন-অভিজ্ঞতার পরিবর্তনের জন্য এই বিরোধের যে রূপান্তর ঘটে তাকে ব্যক্ত করাই উপন্যাসের লক্ষ্য। (ঘোষ, ১৯৯৭ : ৮২)

পাঠকের ব্যক্তি-অনুসন্ধান থাকে উপন্যাসে। তবে সেটা ঠিক ‘আত্ম-অন্বেষণ’ নয় বরং পাঠকের নিজস্ব অবস্থান-অন্বেষণ। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে মানুষে-মানুষে অভিজ্ঞতার পার্থক্য এতটাই বিস্তর যে ঔপন্যাসিকও তাঁর সচল লেখন-জগতকে পরিবর্তন করে নেন। তবে যা-ই হোক না কেন লেখক-পাঠকে যোগাযোগ স্থাপিত হওয়াটাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। লেখক-পাঠকে কখনো বিচ্ছিন্নতা কাজ করলেও তারা অনেক বেশি সংবেদনশীল। লক্ষ্য-অলক্ষ্য সমস্ত বিষয় নিয়েই লেখক লিখতে বসে। পাঠকও তার রুচিমাফিক কোনো বই পড়তে বসে। অবশ্য পাঠক কখনো সস্তা-কাহিনিভুক কল্পনাচারী কখনো চিন্তাশীল দার্শনিক বহু ধরনের। অধিকাংশের কাছে বই পড়ার শখটা মূলত সময় কাটানো, অনেকের কাছে আভিজাত্য-বর্ধনের উৎস। উল্লেখ্য যে, এখানে নির্দিষ্ট কোনো পাঠক গোষ্ঠীকে অবজ্ঞা করার অভিপ্রায় নেই। তাদের রুচি-অভিরুচি নিয়ে কথা বলার মধ্যদিয়ে লেখক সম্পর্কে বিচিত্র অজানা বিষয় বের হয়ে আসে। অনেক পাঠকই কেবল পড়ার জন্য পড়ে না বরং সাহিত্য-পাঠের আনন্দ লাভের পাশাপাশি চিন্তা-জগতকেও শানিত করতে থাকে। এই পাঠকদের সঙ্গেই ভাল লেখকদের সংযোগ স্থাপিত হয় বেশি। অন্যদিকে জটিল কাহিনির চেয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ-সরল আবেগপ্রবণ ও প্রেম-ভালবাসার কাহিনিসমৃদ্ধ উপন্যাস অধিক পাঠক-প্রিয়তা অর্জন করে। এ-কারণেই একজন কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সতীনাথ ভাদুড়ী বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নিবিষ্ট কথাকার হলেও তাঁদের পাঠক-সংখ্যা সীমিত।

উপন্যাস-রচনা ও পাঠ প্রকৃতপক্ষে সমাজ-কাঠামো নির্ভর। ইন্টারনেটভিত্তিক বিশ্বে মানুষ এখন চাইলেই ভার্চুয়াল সম্পর্ক-স্থাপনে সক্ষম। সেখানেও অনেকে নিভৃতে উপন্যাস রচনা করে। আবার কেউ কেউ মগ্নচিত্তে শত শত পৃষ্ঠার মোটা মোটা উপন্যাস-পাঠরত। গতিশীল বিশ্বে এটি সত্যি চমক সৃষ্টি করার বিষয়। কীভাবে একটা বই পড়া উচিত ভার্জিনিয়া উল্ফের ধারণা ব্যক্ত করা যায় :

Virginia Woolf, in a lecture (later an essay), simply entitled ‘How Should One Read a Book?’ said, ‘Every literature, as it grows old, has its rubbish heap’. What is on this rubbish heap has no value, she argues. ‘It is negligible in the extreme; yet how absorbing’ (my emphasis)

উল্ফ বলতে চাচ্ছেন একটা গ্রন্থের বিষয় পুরনো হতে হতে আবর্জনা হয়ে ওঠে। এই আবর্জনা-স্তুপের ওপরে দঁাঁড়ান বিষয়ের কোনো মূল্যই নেই। তাঁর কথা যদি সত্য হয় প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, তাহলে কেন লিখবেন লেখক? একসময় তো তাঁর লেখা অপরিচিত হয়ে উঠবে! কিন্তু জীবন সম্পর্কে নতুন ভাবনা ও ব্যাখ্যা একটি গ্রন্থকে নতুন করে তোলে। অথচ Professor Belinda Jack ej‡Qb wfbœ K_vÑ ÔWe all know how a lightweight novel bought in an airport bookshop can distract us from the tedium of a long flight.Õ[1]

[1] ibid

 এমনকি চমকপ্রদ ব্যাপার মনে হলেও দীর্ঘ উপন্যাস রচনা এবং তা পাঠের মধ্যে আছে কিছু বৈজ্ঞানিক কার্য-কারণ। বারবার উচ্চারিত কথাটিই আবার বলতে হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে উপন্যাস এমন একটি যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে উঠেছে যা দ্বারা সমাজের বিশেষ এক শ্রেণির মানুষ তাদের সমগোত্রীয়দের সঙ্গে সংযোগ-স্থাপন করতে পারছে। বিষয়টা এমন যে, লেখক তার সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে এমন কিছু মানুষকে তার ভাবনা-চিন্তা-কল্পনা-আশা-আকাক্সক্ষার কথা জানাচ্ছেন যাদের তিনি চেনেন না, জানেন না, যাদের সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। তবে একজন লেখক তার সৃষ্টিকর্মের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পাঠকশ্রেণিকে চিনে ফেলতে পারেন। যারা বিকল্প বাস্তবতার অনুসন্ধান করেন অর্থাৎ এমন এক জগতের স্বপ্ন দেখেন যার বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই, অথচ কল্পনায় প্রবলভাবে সত্য, তারাই উপন্যাস রচনা করতে পারেন, পারেন উপন্যাস পাঠ করতে। কারণ উপন্যাস প্রধানত ব্যক্তি নিয়ে কাজ করে এবং ব্যক্তির জন্য নির্মাণ করে একটি কাল্পনিক জগৎ। ঠিক ঐ কাল্পনিক জগতের অনুসন্ধানকারী হচ্ছে লেখক নিজে এবং তার পাঠক। উপন্যাস যতই আঙ্গিক-বিষয়শৈলীগত নিরীক্ষা মাফিক হোক না কেন পাঠকের কাছে কিছু চাহিদা অপরিবর্তনীয়। পাঠক উপন্যাস-পাঠের সঙ্গে সঙ্গেই তার বাস্তবজীবন অতিক্রম করে চলে যায় এবং চেষ্টা করে নিজেকে কেন্দ্রীয় বা নায়ক-নায়িকার চরিত্রে অভিষিক্ত করতে। তবে পার্শ্ব চরিত্রেও কখনও কখনও পাঠক নিজেকে সংস্থাপন করে ফেলে। তারপর তার বিচরণ ঘটে পুরো উপন্যাস জুড়ে। যে-উপসংহারই আসুক পাঠক তার তৃপ্ত-অতৃপ্ত পাঠ সমাপ্ত করে। এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুক্তি পাঠককে কিছু সমস্যার সমাধান দেয়। যে দুঃখ-কষ্ট উপন্যাস-পাঠ শেষেও রয়ে যায়, তার চেয়েও বড় দুঃখ-কষ্ট সে বাস্তবে ভোগ করছে বলে বিবেচনা করে। এই যে পাঠকের ভাবনা এখানেই লেখকের সঙ্গে পাঠকের বিনিময়। তবে সকল উপন্যাসের পরিসমাপ্তি যেমন একরকম নয়, সকল উপন্যাস-পাঠে পাঠকের প্রতিক্রিয়াও একরকম নয়। তবু বাস্তবের সঙ্গে পাঠক একটা যোগসূত্র খুঁজবেই। এই সত্য জেনেও পাঠক বিকল্প বাস্তবতা-সন্ধানী।

মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাত ধরেই উদ্ভব ঘটেছিল উপন্যাসের। সমাজ-সংস্কৃতির আয়োজক তারা, ন্যায়-নীতির প্রশ্নে তারাই যেন সবচেয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। তাই পুঁজিবাদ যতই প্রসার হতে থাকল, ততই মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিপাকে পড়তে থাকল। যে পুঁজিবাদের কল্যাণে মধ্যবিত্ত শ্রেণি নতুন বিন্যাসে জীবনযাত্রাকে নিশ্চিত করে, সে-ব্যবস্থাই ধীরে ধীরে তাদেরকে পরাস্ত করতে থাকে। শুধু তাই নয়, আমরা এমন একটি সমাজে বাস করছি যখন আমাদের ‘ইগো’ চাপ দিচ্ছে তাৎক্ষণিকতাকে চরিতার্থ করার জন্য। অন্যদিকে এই চরিতার্থতাকে নিরন্তর অবদমিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে বিশাল সংখ্যক নির্বিত্ত জনগোষ্ঠীকে। অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমস্ত ক্ষেত্রসমূহ যৌনতাপিত হয়ে উঠছে। কিন্তু ভোগবাসনাকে যারা উস্কে দিচ্ছেন তারা ঠিকই ভোগ করছেন, কিন্তু সাধারণ নর-নারীর যৌন সম্পর্ক হয়ে উঠছে ক্রমশ রুগ্ন-বিড়ম্বিত। চারিদিকে এখন চকচকে লোভনীয় দ্রব্য, তার ভিড়ে হারাচ্ছে মনুষত্ব। তাই ক্ষমতাবানের ধর্ষকামী পরিতৃপ্তির সঙ্গে হাত মিলাচ্ছে ক্ষমতাহীনের মর্ষকামী আনুগত্য। আমরা আরো জানতে পারি এই ‘সভ্যতার প্রকৃতি সম্পর্কে, যে-সভ্যতা তার এত বিশাল সংখ্যক সদস্যকে অপরিতৃপ্ত রাখে এবং বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দেয়, […] যার না আছে দীর্ঘ অস্তিত্বের সম্ভাবনা, না সে তার জন্য যোগ্য।’ (ঈগলটন : ১৯৭)। ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলা কথাসাহিত্যের বেশিরভাগ স্রষ্টা মধ্যবিত্ত। অতৃপ্তি-অপ্রাপ্তির জীবনে এঁরা বিকল্প জগৎ-নির্মাণে নিমগ্ন হয়/হয়েছে। তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে কাজ করেছে একাকিত্ব-নৈঃসঙ্গ্য-নৈরাশ্য। সমাজে বাস করেও তারা বিচ্ছিন্ন তথা এলিয়েন। বর্তমান যুগে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংগ্রাম কঠিনতর হচ্ছে, তাদের মধ্যে ব্যতিক্রমী মানুষের আবির্ভাবও বাড়ছে। একজন লেখক বা সমালোচকও পাঠক। একই গোত্রভুক্ত লেখক-পাঠক-সমালোচকে সংযোগ-স্থাপিত হয় প্রায় একই রকম জীবন-যন্ত্রণা থেকে। লেখক-পাঠক দু জনেই লক্ষ করে যে, সামাজিক-রাষ্ট্রিক আইন-কানুন ও বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা করছে না উচ্চশ্রেণি। নিম্নশ্রেণি ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণে আইন ভঙ্গ করে, বিধি-নিষেধ লঙ্ঘন করে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির রয়েছে সমাজ-সাংস্কৃতিক ওয়াচডগ। অথচ আইন-কানুনে উচ্চবিত্তের সুযোগ-সুবিধা প্রায় সুনিশ্চিত। ফলে সংবেদনশীল মানুষ নৈরাশ্যে নিমজ্জিত হয়। তাদের মধ্যে তৈরি হয় পলায়নপর কল্পনা-জগৎ। ঐ-জগতটাকেই রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন একজন ঔপন্যাসিক। সেই জগতে তিনি সন্নিবেশ ঘটান এক একটি চরিত্রকে। চরিত্র নিয়ে তিনি খেলা করেন, চেষ্টা করেন তাকে বাস্তবসম্মত এবং যথাবিহিত জীবন্ত করে গড়ে তুলতে। কখনও কখনও তিনি আরও বিস্তৃতভাবে একটি সময়কালকে ঐতিহাসিক কল্পরাজ্যে নিয়ে যান। যেমন :

…এক বিকালবেলা মজনু শাহের বেশুমার ফকিরের সঙ্গে মহাস্থান কেল্লায় যাবার জন্য করতোয়ার দিকে ছোটার সময় মুনসি বয়তুল্লা শাহ গোরা সেপাইদের সর্দার টেলরের বন্দুকের গুলিতে মরে পড়ে গিয়েছিলো ঘোড়া থেকে। বন্দুকের গুলিতে ফুটো গলা তার আর পুরট হলো না। মরার পর সেই গলায় জড়ানো শেকল আর ছাইভস্মমাখা গতর নিয়ে মাছের নকশা আঁকা লোহার পান্টি হাতে সে উঠে বসলো কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়গাছের মাথায়। সেই তখন থেকে দিনের বেলা রোদের মধ্যে রোদ হয়ে সে ছড়িয়ে থাকে সারাটা বিল জুড়ে। আর রাতভর বিল শাসন করে ওই পাকুড়গাছের ওপর থেকেই। তাকে যদি এক নজর দেখা যায়— এই আশায় তমিজের বাপ হাত নাড়াতে নাড়াতে আসমানের মেঘ খেদায়। (ইলিয়াস ১৯৯৬ : ৯)

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামার এরকম সূচনা পাঠককে একটি কাল্পনিক জগতে, বিস্তৃত এক ইতিহাসের মধ্যে নিয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক ঔপন্যাসিকই তার উপন্যাস শুরু করেন কাল্পনিক জগত-নির্মাণের ভেতর দিয়ে, যা তাকে একটি বিকল্প জগতের স্বাদ দেয়। আর প্রত্যেক পাঠকই তার যাপিত জীবন-নৈরাশ্যের বিপরীতে বিকল্পজগত পরিভ্রমণ আকাক্সক্ষায় উপন্যাস-পাঠে নিমগ্ন হয়। দু জনের এক জায়গাতেই মিল তা হলো জীবন-যন্ত্রণা। বাস্তবজীবনের অসঙ্গতিজাত নৈরাশ্য ভুলে থাকতে লেখক-পাঠক উভয়ই সন্ধান করে বিকল্প বাস্তবতার। একজন ঔপন্যাসিক বাস্তবকে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করলেও তিনি সূক্ষ্ম বিশ্লেষক হিসেবে জীবনেরই ব্যাখ্যা দেন। আর পাঠকও তার মনোগহন, ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাস মিলিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। উপন্যাসের সঙ্গে মনস্তত্ত্ব ও মনঃসমীক্ষণবাদের যে যোগসূত্র তা-ও লেখক-পাঠক সংযোগের অন্যতম কারণ। উপন্যাসে লেখক-জীবনের ছায়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে। যেমন : শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবীর সামাজিক অসঙ্গতি ও বিপ্লবী পটভূমি তাঁর নিজস্ব জীবন-জাত। ঢোঁড়াই চরিতমানসে সতীনাথ ভাদুড়ীর নি¤œশ্রেণির শাসন-শোষণ মাত্রা অনুভব কিংবা জাগরীর আত্মোপলব্ধি তাঁর ব্যক্তি-অনুভবেরই ফল। মধ্যবিত্ত নন কিন্তু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গণদেবতা উপন্যাসটির নাম প্রথমে ‘চ-ীম-প’ রাখতে চেয়েছিলেন। এই নাম রাখার পেছনে ‘তারাশঙ্করের ব্যক্তিপ্রবণতা ও ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা ব্যাপকভাবে ক্রিয়াশীল ছিল।’ (তালুকদার ২০১২ : ৩১)। ধূর্জটিপ্রসাদের অন্তঃশীলার খগেন উচ্চমধ্যবিত্তিক এটিটিউড-আক্রান্ত। কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথার শশীর টানাপড়েন মধ্যবিত্তিক-ঔপনিবেশিক শিক্ষার। এগুলোর ভেতর দিয়ে লেখক-মনস্তত্ত্বেরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাস নিজেই একটি বুর্জোয়া পণ্য। সেখানে লেখক একজন বিক্রেতা, পাঠক ভোক্তা। লেনিন উচ্চারণ করেন : ‘বুর্জোয়া লেখকের স্বাধীনতা আসলে টাকার থলির ওপর প্রচ্ছন্ন নির্ভরতা মাত্র।… নিরপেক্ষ লেখকরা গোল্লায় যাক।’ (ঈগলটন ২০০১ : ৬৬)। তবে মার্ক্স ধারণা করেন যে বুর্জোয়া শ্রেণির ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে উদ্ভূত হলেও উপন্যাস বুর্জোয়া জীবনের করুণতম কাহিনিই বয়ান করে চলেছে। আর সেজন্যই সাহিত্যের সকল শাখার মধ্যে উপন্যাসই সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখা হয়ে উঠতে পেরেছে অল্প সময়ের ভেতর। মার্ক্সের মতে উপন্যাসে প্রতিফলিত হয় বুর্জোয়া জীবন-ব্যবস্থার নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি যেগুলো বুর্জোয়া শ্রেণির জন্য যন্ত্রণাদায়ক কিন্তু সমাধানাতীত। বুর্জোয়া সাহিত্যে রহস্য-সৃষ্টির ব্যাপারে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক আর্নেস্ট ফিশার বলেন :

সাম্প্রতিক বুর্জোয়া জগতে রহস্যম-িতকরণের দিকে শিল্প-সাহিত্যের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। রহস্যম-িতকরণের সহজ অর্থ হলো বাস্তবতাকে রহস্যের অবগুণ্ঠন পরিয়ে দেয়া। এই প্রবণতা সর্বোপরি বিচ্ছিন্নতাবাদের ফল। (ফিশার ১৯৯৭ : ৮৫-৮৬)

এই বিচ্ছিন্নতাবাদের মধ্যে উপন্যাসের রচন-পঠন উভয় প্রক্রিয়াই যুক্ত। অন্যদিকে শিল্পী বা পাঠকের বিচ্ছিন্নতার ফলে জন্ম পলায়নপরতা। রহস্যের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি সমাজের মৌলসমস্যা থেকে পালাতে সাহায্য করে। শিল্পের জন্য এটাই দুর্ভাগ্য তাকে যদি সরকারি সম্মানলাভ কিংবা শুধুই নিষ্ফলা মধ্যবিত্ত ছকে আটকান হয়। এই বের হওয়ার রাস্তাটাই শিল্পসৃষ্টির অভিনবত্ব। তেমনি পাঠ-প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও শিল্প বা উপন্যাস সাংস্কৃতিক অভিগমনে পাঠক মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনও জরুরি।

একুশ শতক প্রবলভাবে তথ্য-প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শাসিত। এ-শতকে মৌলিক চাহিদার পাশাপাশি শিক্ষা-বিনোদন-রুচির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ভূমিকা যথেষ্ট। হাতের মুঠোয় থাকা ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ জানছে পৃথিবীর সর্বপ্রান্তস্পর্শী বিষয়। নিছক সময় কাটাতে তাকে উপন্যাস-পাঠের কোনো প্রয়োজনই নেই। তবু ছাপাখানার উন্নতি হচ্ছে, লেখকরা একের পর এক উপন্যাস-গল্প লিখে চলছেন, বইমেলা হচ্ছে, লক্ষ-কোটী বই বিক্রি হচ্ছে। এর যথার্থ কারণ অনুসন্ধান করা বস্তুতই কঠিন। পাঠক কি নিজে উপন্যাসে নার্সিসিস্ট? নাকি অতল পুঁিজবিশ্বে অনিকেত ব্যক্তিমানুষ ক্রমশ হয়ে ওঠে স্কেপিস্ট। পাঠকের পক্ষে শত শত পৃষ্ঠার উপন্যাস ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাঠের প্রকৃত কারণ কী? কোনো একটি বিকল্প জগত যেখানে চেনা পরিবেশের নিত্য-যন্ত্রণা নেই সেখানে আত্মসমর্পণ, নাকি এরচেয়েও অধিক গুরুতর কিছু। তবু আমরা দেখতে পাচ্ছি— দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি বিশ্বের প্ররোচনা তাকে যতই আবিষ্ট করে রাখুক উপন্যাস-পাঠ কিন্তু থেমে নেই। ঔপন্যাসিকও নির্মাণ করছেন এক একটি কাল্পনিক সত্যের বিকল্প জগত। অন্যদিকে সচেতন সমালোচকও করছেন উপন্যাস নিয়ে এই ঘটমান প্রতিক্রিয়া সমূহের পাঠ-পুনঃপাঠ-বিশ্লেষণ।

সহায়কপঞ্জি

ইলিয়াস,  আখতারুজ্জামান, ১৯৯৬, খোয়াবনামা, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা

ঈগলটন, টেরি, ২০০১, ‘লেনিন ট্রটস্কি এবং দায়বদ্ধতা’, মার্কসবাদ ও সাহিত্য সমালোচনা (অনু: নিরঞ্জন গোস্বামী), দীপায়ন, কলকাতা

ঘোষ, অজয়কুমার, ২০০২, ‘লিও টলস্তয়’, নন্দনতত্ত্ব জিজ্ঞাসা (সম্পা. তরুণ মুখোপাধ্যায়), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

ঘোষ, বিনয়, ১৯৯৭, শিল্প সংস্কৃতি ও সমাজ, দ্বিতীয় সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ, অরুণা প্রকাশনী, কলকাতা

চক্রবর্তী, সুমিতা, ২০১৪, ‘সাহিত্যে বাস্তবতা’, পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ধ্রুপদী ও আধুনিক(সঙ্কলক-সম্পাদক: হাবিব রহমান), কথাপ্রকাশ, ঢাকা

ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ, ‘বৃক্ষবন্দনা’, বনবাণী, রবীন্দ্র রচনাবলী (যঃঃঢ়://িি.িৎধনরহফৎধ-ৎধপযধহধনধষর.হষঃৎ.ড়ৎম/ হড়ফব/১০১৬৬)

ফিশার, আর্নস্ট, ১৯৯৭, দি নেসেসিটি অব আর্ট(অনু: শফিকুল ইসলাম), সংঘ প্রকাশন, ঢাকা

তালুকদার, জাকির, ২০১২, ‘গণদেবতার তারাশঙ্কর’, সম্প্রীতি(বিশ শতকের বাংলা উপন্যাস সংখ্যা; সম্পা. স্বকৃত নোমান), রোদেলা প্রকাশনী, বাংলা বাজার, ঢাকা

দাশগুপ্ত, রণেশ, ২০১২, উপন্যাসের শিল্পরূপ, প্যাপিরাস, ঢাকা

নায়ক, প্রণবকুমার, ২০১৪, ‘মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্ব’, পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ধ্রুপদী ও আধুনিক(সঙ্কলক-সম্পাদক: হাবিব রহমান), কথাপ্রকাশ, ঢাকা

ফরস্টার, ই এম, ২০১১, ‘কাহিনী’, উপন্যাসের যত বিষয়(অনু: বদিউর রহমান), পলল প্রকাশনী, ঢাকা

বসু, সুদীপ, ১৯৯৭, বাংলাসাহিত্য সমালোচনার ধারা, পুস্তকবিপণি, কলকাতা

ভট্টাচার্য, দেবীপদ, ১৯৮২, ‘উপন্যাসের জন্ম’, উপন্যাসের কথা, দ্বিতীয় সংস্করণ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

রবগ্রিয়ে, অ্যালাঁ, ‘বাস্তববাদ ও বাস্তবতায়’, নব উপন্যাসের পক্ষে(অনু: শামসুদ্দিন চৌধুরী), বর্ণায়ন, ঢাকা

রায়, দেবেশ, ২০০৩, উপন্যাস নিয়ে, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

Henri see, Modern Capitalism, 2004, Trans. Homer B. Vanderblue & Georges F. Doriot, Batoche Books, Kitchener, Chap. 9: The Progress of Capitalism in the nineteenth Century

Merrill, “Putting ‘Capitalism’ in Its Place: A Review of Recent Literature.

http://www.gresham.ac.uk/lectures-and-events/reading-as-a-reader-and-reading-as-a-critic (Accessed : 09.12.15 )

*******************************************

উন্মেষ-পর্বের বাংলা উপন্যাস : মুসলমানদের দ্বিধা-দুর্বলতা
মাসুদ রহমান

শুধু বাংলা নয়, নিখিল ভারতবর্ষের সার্থক উপন্যাসের সূত্রপাত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) হাতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী বেরিয়েছিল ১৮৬৫ সালে। বাঙালি মুসলমান এই দেখিয়ে সান্ত¦না পেতে চায় যে, এর মাত্র চার বছর পরই বের হয়েছিল মুসলিম গদ্যশিল্পী মীর মর্শারফ হোসেনের (১৮৪৭-১৯১২) রতœবতী। আখ্যাপত্রে বইটিকে ‘কৌতুকাবহ উপন্যাস’ বলা হয়েছে এবং ‘বিজ্ঞাপন’ শিরোনামে ভূমিকায় লেখক জানিয়েছেন, ‘একটি কৌতুকাবহ গল্প অবলম্বন করিয়া ইহার রচনাকার্য্য সম্পন্ন করা হইয়াছে।’ তারপরও দুর্গেশনন্দিনী নয়, বিদ্যাসাগরের অনুবাদ-অমৌলিক আখ্যানজাতীয় রচনার সাথেই এর অন্তরের যোগ বেশি। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকুমার সেন কোনো আলোচনা ছাড়াই সম্ভবত আখ্যাপত্র দেখেই এটিকে উপন্যাস বলেছিলেন। রতœবতী যেমন নয়, তেমনি শিবনাথ শাস্ত্রী দাবি করলেও কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের (১৮৩৩-১৮৯৬) বিজয়বসন্ত ও (১৮৫৯) উপন্যাস ছিল না— এ-দুটোই রূপকথাশ্রেণীয় গদ্য আখ্যানমাত্র। সত্য যে, প্যারীচাঁদ মিত্রের (১৮১৪-১৮৮৩) আলালের ঘরের দুলাল ও (গ্রন্থরূপ : ১৮৫৭) সার্থক উপন্যাস হয়ে উঠতে পারেনি শেষপর্যন্ত। তবে সঙ্গত ও স্বাভাবিক কারণেই দুর্গেশনন্দিনী ছিল রোমান্সধর্মী; সব দেশের সাহিত্যেই উপন্যাস বা নভেল ধারার শুরুতে ব্যাঙের বেঙাচি-পর্যায়ের মতো রোমান্স-পর্ব পেরুতে হয়। তারপরও রোমান্স শেষত আধুনিক সাহিত্যাঙ্গিকই বটে আর রূপকথার জন্ম সুদূর অতীতে। তবে মর্শারফের বিষাদ-সিন্ধু (১৮৮৫)তে অলৌকিকতা অধিক থাকলেও ব্যক্তিত্ব, প্রেম, সংসার, সমাজ, মনস্তত্ত্ব, জীবনদর্শন ইত্যাকার উপাদানের কারণে তা মহাকাব্যিক উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করেছে। গদ্যটাও ছিল উপন্যাসোচিত; আমরা শুরুতেই তাই মশাররফকে গদ্যশিল্পিই বলেছি। তাঁর মতো গদ্য লিখতে পারলে বাঙালি হিন্দুও কৃতার্থ বোধ করবে এ ধরনের মত কিংবা মুসলিম নামের অন্তরালে এই গদ্যকার হিন্দু কিনা এরূপ সন্দেহ মীরের সাহিত্যসমালোচকেরা প্রকাশ করে থাকলেও সেকালে আরও কিছু মুসলিম লেখক ভালো বাংলা গদ্য লিখতেন। তবে তাঁরা কেউ উপন্যাস বা উপন্যাসপ্রতিম কিছু লিখে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেননি।

এমনকি এমত বলা চলে যে, করতে চানও নি। সামগ্রিক জীবনধর্মী এই আধুনিক শিল্পরূপ সৃষ্টিতে মুসলমানদের এক ধরনের অনীহা ছিল। শুধু অনীহা নয়, উপন্যাস রচনা ও পাঠ-প্রচারেও তাদের আপত্তি-বিরুদ্ধতা ছিল। একথা অবশ্য পুরো সম্প্রদায় সম্পর্কে প্রযোজ্য নয়, তারপরও যেহেতু সিংহভাগ একসময় এরকম চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন ছিল তাই এভাবে বর্ণনা করা চলে। উন্মেষ যুগে উপন্যাস বিষয়ে বাঙালি মুসলিমের ব্যর্থতা-বিরুদ্ধতার কারণ অনেকগুলো। প্রথমত, বিষয়বস্তু নিয়ে ধর্মীয় মনোভাব। দ্বিতীয়ত, হিন্দু সাহিত্যিকদের রচনার কারণে উপন্যাস সম্পর্কে রিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ। তৃতীয়ত, বাঙালি মুসলমানের জীবনযাত্রার বিশিষ্টতা। চতুর্থত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাংগঠনিক অপূর্ণতা। পঞ্চমত, শক্তিশালী গদ্য লেখকের অভাব। এ-রকম আরো কিছু কারণ নির্ণয় করা যেতে পারে।

কোরআন শরীফে প্রাক্তন কাহিনির বর্ণনা রয়েছে বিশ্বাসীদের নিদর্শনসহ বোঝানো ও যথাযথ নির্দেশনা দেয়ার জন্য। রসুল (দ.)-এর কবিপ্রীতির উদাহরণও আছে। তা সত্ত্বেও মুসলিম সমাজে শিল্পসাহিত্য বিশেষ করে ললিতকলা নিয়ে নানা নেতিবাচক মত-মন্তব্য রয়েছে। এমন ভাবনা এখনও কেউ কেউ লালন করে থাকেন। এর উপর উপমহাদেশের সমকালিক পরিস্থিতিও সুবিধার ছিল না। বাংলা-ভারতে মুসলমান শাসকের নিকট থেকে শাসনদ- কেড়ে নেওয়ার কারণে বিদেশি ব্রিটিশ শাসকের প্রতিও মুসলমানদের ক্ষোভ ছিল প্রথম পর্যায়ে। শাসকবর্গও স্বাভাবিকভাবেই মুসলিমদের সেসময় বিশ্বাস করতে পারেনি। অপরদিকে দ্রুতই প্রতিদ্বন্দ্বী হিন্দুসমাজ ইংরেজদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। তাই ইংরেজ আমদানিকৃত ও হিন্দু অধিকৃত বিষয়-ক্ষেত্র থেকে মুসলমানরা স্বতোপ্রণোদিত হয়ে সরে যায়। পরবর্তীকালে সহজে সেসব স্থান লাভ করা সহজ হয়নি। আধুনিক যে কোনো বিষয়ের প্রতিই তারা বেশ বিরূপ ছিল দীর্ঘদিন। আধুনিক শিক্ষাবিহীন মুসলমানরা যে আধুনিক সাহিত্যবিমুখ হবে এটা অনেকটা অনিবার্যই ছিল।

বিশেষত উপন্যাসের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া নব্যশিক্ষিত হিন্দুরা পরিচিত হয়েছে রোমান্স-নভেলের সাথে। অপরভাষায় পড়ে তো পুরো পরিতৃপ্তি আসে না। নিজের ভাষাতে, নিজ দেশের প্রেক্ষাপটেও চাই। জীবনের পর্যায় ও মানবিক সম্পর্কের হাজারো রূপ থাকলেও যৌবনে পদার্পণের মধ্য দিয়ে মানব পূর্ণ হয় এবং প্রণয় সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানবজীবন পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধ হয়। তাই রোমান্স-নভেলে প্রেমকাহিনি একরকম অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু মাত্র মধ্যযুগ পেরিয়ে আসা বাঙালি জীবনে তা কই? বাল্যবিবাহ ও পর্দাপ্রথা এই দুই কালো হাত প্রসারিত করে যেন এক প্রবল খলনায়ক দাঁড়িয়ে ছিল। উপন্যাস সূত্রপাতের পরবর্তী শতকেও এই পরিস্থিতির প্রতিকূলতার কথা অনুভব করেছেন মুসলিম ঔপন্যাসিক নজিবর রহমান সাহিত্যরতœ (১৮৬০-১৯২৩); তাঁর আনোয়ারা (১৯১৪) উপন্যাসের ‘মুখবন্ধ’-এ লিখেন :

প্রসিদ্ধ বান্ধব-সম্পাদক কালীপ্রসন্ন ঘোষ-বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবিতকালে জনৈক মান্যবর রাজপ্রতিনিধি ঢাকা সফরে গিয়াছিলেন। তিনি কথা প্রসঙ্গে ঘোষ-বিদ্যাসাগর মহাসাগরকে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনাদিগের দেশে ভাল উপন্যাস জন্মে না কেন?” তিনি তদুত্তরে বলিয়াছিলেন, “ছোটবেলায় আমাদের দেশের মেয়েদের বিবাহ হয় বলিয়া।” ঘোষ-বিদ্যাসাগর মহাশয় সত্য কথাই বলিয়াছিলেন, তবে তৎসঙ্গে আর একটি পদ প্রয়োগ করিলে উত্তরটি সার্ব্বজনীন হইত।— সেটি অবরোধ-প্রথা। ফলতঃ যে দেশে যে জাতির মধ্যে বাল্যবিবাহ ও অবরোধ-প্রথা পূর্ণমাত্রায় প্রচলিত, তথায় প্রকৃত ভিত্তির উপর স্বাভাবিক জাতীয় উপন্যাস সৃষ্টি করা যে কত কঠিন, তাহা প্রকৃত উপন্যাসকার ব্যতীত অন্যের অননুভাব্য।

এই অবস্থায় বঙ্কিম এক কাজ করলেন। অতীতে নিয়ে গেলেন নায়ককে, দেখা করিয়ে দিলেন মুসলিম নায়িকার সাথে। যেন সাপও মরলো, লাঠিও ভাঙলো না। কিন্তু এতে পরিবেশ নষ্ট হলো। হিন্দু লেখকেরা এই সূত্র অবলম্বন করলেন কমবেশি। মুসলমান সম্প্রদায়ের লেখকেরাও এ থেকে মুক্ত থাকতে পারলেন না। প্রবণতাটি চিহ্নিত করে সৈয়দ আবু মোহাম্মদ এসমাইল হোসেন নবনূর জ্যৈষ্ঠ ১৩১০ সংখ্যায় “সাহিত্য শক্তি ও জাতি সংগঠন” প্রবন্ধে লেখেন :

সর্ব্বাপেক্ষা উত্তম উপন্যাস লেখা। গাঁজায় দম দিয়া একটা গল্পের ¯্রােত বহাইয়া দাও। নায়ক নায়িকার রসালাপ, অভিসার ও পলায়ন লইয়া খুব জমকাল বর্ণনা কর এবং সুকুমার সাহিত্যের ভিতর দিয়া স্বদেশীয় ভিন্ন জাতির প্রতি প্রচুর পরিমাণ গালিবর্ষণ কর,— বিষের ¯্রােত প্রবাহিত কর, দেশোদ্ধার হইবে।

বঙ্কিমের প্রথম পর্যায়ের উপন্যাসে যেটা ছিল উপলক্ষ্য, পরবর্তী উপন্যাস ও অনুবর্তী ঔপন্যাসিকদের কাছে সেটাই হয়ে উঠলো লক্ষ্য। ঘরের মেয়েরা বিধর্মী পুরুষের সাথে প্রেম-সম্পর্কে জড়াচ্ছে এতে অখুশি হলো মুসলিম সমাজ। আধুনিক যুগের আত্ম-উদ্বোধন নিয়ে নয়, এই অসন্তুষ্টি নিয়ে বাঙালি মুসলিম উপন্যাস লেখায় অবতীর্ণ হলেন। মুসলিম-রচিত প্রথম সামাজিক উপন্যাস হিসেবে পরিচিত আর্জ্জুমন্দ আলীর প্রেম-দর্পণ (১৮৯১) মূলত এরূপ প্রতিক্রিয়ারই ফসল। বইটির আখ্যাপত্রে লেখা হলো “সত্য ঘটনা-মূলক উপন্যাস”। ভূমিকায় (‘বিজ্ঞাপন’) লেখক জানালেন :

এতদ্বারা সর্ব্বসাধারণকে জ্ঞাত করা যাইতেছে যে, এই যৎসামান্য ক্ষুদ্র প্রেম-দর্পণ নামক বহিখানাতে আমার এ ক্ষুদ্র বুদ্ধি ও অনুপযুক্ত লেখনীর বলে, যথাসাধ্য সত্য ঘটনা বর্ণন করিতে প্রয়াস পাইয়াছি। বিশেষতঃ ইদানীং উপন্যাসে অনেক বিষয় কাল্পনিক চিত্রিত হইয়া থাকে, কিন্তু এই ক্ষুদ্র বহিখানিতে তাহা পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই।

নাতে রাসুল (‘স্তোত্র’) লিখে ‘হজরত মোহাম্মদের (দরুদ) পবিত্র চরণারবিন্দ বন্দনা করত” এবং “পরম করুণাময় আল্লাহতা-লার নামে আরম্ভ” করা হয়েছিল উপন্যাসটি। ভূমিকা ছাড়াও রচনামধ্যে বারবার জানানো হচ্ছিল কাহিনিটি সত্যঘটনা অবলম্বিত— মানে মুসলমান যুবকের সাথে হিন্দু বালিকার প্রেম। বঙ্কিমের উপন্যাস ও চরিত্রের প্রসঙ্গ টেনেও উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট করা হয়েছিল। এরকম উদ্দেশ্যমূলকতা শিল্পের জন্যে ক্ষতিকর হলেও লেখকের উদ্দেশ্য এক রকম সফল হয়েছিল বলে মনে হয়। কারণ অচিরেই বইটির সংস্করণ বের করতে হয়েছিল। প্রেম-দর্পণ-এর সাফল্যে অর্থাৎ মুসলিম পাঠকপ্রিয়তা দেখে অনেকেই এই ধরনের উপন্যাস লেখায় আত্মনিয়োগ করেন। এ-বিষয়ে বাংলা উপন্যাসের সনিষ্ঠ গবেষক সারোয়ার জাহান বলেন :

ভূদেব-রঙ্গলাল-বঙ্কিম-রমেশচন্দ্র “প্রমুখ হিন্দু সাহিত্যিকের সাহিত্যে মুসলিম চরিত্রের বিকৃত চিত্রণ, বিশেষত মুসলিম নারীর সঙ্গে হিন্দু যুবকের প্রেমের চিত্র একদা মুসলমান সমাজকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিলো। বিষয়টি তারা সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সম্প্রদায়গত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করেছিলো। সেকালের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের কথা স্মরণ করলে তাদের এই মনোভাবকে অস্বাভাবিক ভেবে দোষ দেওয়া যায় না। (‘বাংলা উপন্যাস : সেকাল-একাল’)।

‘মনোভাবের’ দোষ না-হয় না-ই হলো, তবে শিল্পের দোষ হলে তা তো ধরতেই হবে। ধরেছিলেন সেকালেই অনেক মুসলিম মনীষী। যেমন, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, তৃতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মিলন (১৩২৫)-এর সভাপতির ভাষণে বলেন :

আমাদের শক্তিশালী লেখকেরাও কালের ¯্রােতে গা ঢালিয়া দিয়া ফবংঃৎঁপঃরাব (সংহারমূলক) উপন্যাস রচনায় প্রবৃত্ত হইতেছেন। অবুঝ হইয়া হউক আর আড়ি করিয়াই হউক একজন আমার পর্ণকুটিরটি ভাঙ্গিয়া ফেলার চেষ্টা করিয়াছে বলিয়া আমি তাহার ঘরে ইঁট পাটকেল ছুড়িতেই যদি আমার আপনার সামান্য শক্তিটুকু ব্যয় করিয়া ফেলি, তাহা হইলে এ ভাঙ্গা ঘর মেরামত করিব কি দিয়া?

মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ (এম-এ, বি-এল) এর আগেই আহ্বান জানিয়েছিলেন, “আমাদিগকে উপন্যাস ও নাটক দ্বারা দেখাইতে হইবে, মুসলমানের কিরূপ হওয়া উচিত, মুসলমানের রাষ্ট্রীয় জীবন কিরূপ হওয়া উচিত। খালি প্রেম কাহিনী লিখিয়া কোন লাভ নাই (“আমাদের সাহিত্যিক দরিদ্রতা”, আল্ এসলাম, জ্যৈষ্ঠ ১৩২৩)।” এই আহ্বানের মধ্যেও উদ্দেশ্যমূলকতা আছে বটে, তবে তা সেকালের বিবেচনায় কিছুটা গ্রহণীয়।

তবে ততোদিনে হিন্দুবিরুদ্ধতা শুধু নয়, উপন্যাস সম্পর্কেই বিরূপতা প্রবল হয়েছে মুসলমানদের মধ্যে। উপন্যাস-কাহিনির সাধারণ প্রসঙ্গ প্রেম নিয়েই এই আপত্তির শুরু। অথচ মধ্যযুগে প্রণয়কাহিনি লেখার কারণেই মুসলিম কবিরা বাহবা পেয়েছিলেন। অবশ্য এ-ও স্বীকার্য, কাহিনিগুলো সুফি বা ধর্মতত্ত্বের রূপক বলে প্রচার করে বিরুদ্ধবাদীদের শান্ত করা হয়েছিল। এবারেও কিছু কৌশল গ্রহণ করা হয়। যেমন নজিবর রহমানের আনোয়ারর  নায়ক-নায়িকার যোগাযোগ ঘটলো যেখানে— “বালিকা খিড়কী-দ্বারে বসিয়া বন্যার জলে ওজু করিতেছিল”। আর নায়ক নুরল এস্লাম নিকটস্থ “নৌকার ছে মধ্যে বসিয়া স্বাভাবিক মধুর কণ্ঠে কোরাণশরিফ পাঠ” করছিল। কোরআন পাঠ ও আরবি-পারসি মিশ্রিত মোনাজাত শুনে যুবকের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয় আনোয়ারার। তবু “ইহা কোন “আশরাফ” (সম্ভ্রান্ত) মুসলমান ঘরে সম্ভবে না” বলে অভিযোগ করেছিলেন গোলাম মোস্তফা (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, বৈশাখ ১৩২৬)। তাঁর দাবি, “ধর্ম্ম ও সমাজের দিক দিয়া দেখিতে গেলে ওরূপ পূর্ব্ব-বিবাহ-প্রেম আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়।” এই প্রেমকে প্রধান প্রসঙ্গ ধরে “উপন্যাস” শীর্ষক এক আলোচনায় (আল্-এসলাম, জ্যৈষ্ঠ ১৩২৭) নাজির আহমদ উপন্যাসকে পরিত্যাজ্য মাদকদ্রব্যের সাথে তুলনা করে বলেন :

নীতির দিক দিয়া উপন্যাস নিতান্ত গর্হিত ব্যাপারের সহায়তা করিতেছে, নায়ক নায়িকার রূপলাবণ্যের মজাদার রসাল বর্ণনা, প্রেমিক প্রেমিকার মধুর আলাপন, মিলনের আনন্দ, বিচ্ছেদের জ্বালা, সোহাগপূর্ণ প্রেম-সঙ্গীত এ সকল মুখরোচক বিবরণ পাঠে বালক-বালিকা ও যুবক-যুবতীগণের অন্তরে অকালে প্রেমরাজ্যের নিত্য নিত্য নতুন কল্পনা জাগ্রত হয়…।

তবে আনোয়ারা উপন্যাস প্রসঙ্গে গোলাম মোস্তফা পূর্বোক্ত প্রবন্ধে এটুকুও বলেছিলেন যে :

গল্প উপন্যাসের যদি সেরূপ কিছু মূল্য নাই থাকিবে, তবে বোধ হয় আজ আমরা এত শীঘ্র হিন্দুদের জাতীয় জাগরণ দেখিতে পাইতাম না। উপন্যাস দ্বারা রাশিয়ার জাতীয় জীবন সঞ্জীবিত হইয়াছে। উপন্যাস দ্বারা বাঙ্গালী হিন্দুর জীবন¯্রােত অন্যদিকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছে। তাই আমার মনে হয়, যাঁহারা সমাজের মঙ্গলকামী, যাঁহারা সমাজকে নূতন পথে চালাইতে চাহেন, তাহারা এই শ্রেণীর আদর্শ উপন্যাস প্রণয়ন করুন বা করিতে উৎসাহ দিউন।

স্মর্তব্য, নজিবর রহমান সাহিত্যরতœও মুসলিম নায়ক ও হিন্দু নায়িকা চরিত্রে কল্পনা করে উপন্যাস লিখেছেন। যেমন, চাঁদ তারা বা হাসান গঙ্গা বাহমণি (১৯১৭)। তবে আনোয়ারার পর অনেক মুসলিম লেখকই উপন্যাস রচনায় যুক্ত হয়েছেন বটে, কিন্তু সেগুলোর ‘অধিকাংশই অসার, অপাঠ্য’, ‘রাবিশ বা বিষভা- বিশেষ’ বলে মনে করেন মুন্শী মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ। এই মন্তব্য শিল্পগুণ বিবেচনায় নয়। তাঁর বিবেচনায় সেগুলোয় কোরান-হাদিস, আলেম-ওলামা বিষয়ে নেতিবাচক কথাবার্তা আছে। তাই “ধর্ম ও সমাজের পবিত্রতা রক্ষা করিতে হইলে ঐ শ্রেণীর পুস্তক স্পর্শও করা উচিত নহে” বলে মত দেন (“আদর্শ উপন্যাস” : ইসলাম-দর্শন, আষাঢ় ১৩২৭)। “বঙ্গীয় মোছলমান সমাজে উপন্যাসের বন্যা” নামক আল্-এসলাম পত্রিকার (আশ্বিন ১৩২৭) আরেক নিবন্ধে রেয়াজুদ্দীন একই মস্তব্য করেন। ওই আলোচনায় আরো তথ্য দিয়েছেন যে, উপন্যাস রচনা করে মুসলিম লেখকেরা আর্থিক দিক দিয়ে বিশেষ লাভবান হচ্ছেন। তবে জনৈক এম, আনসারী সেসব উপন্যাসের কাহিনির বৈচিত্র্যহীনতার দিকটি নির্দেশ করেন সরস বিশ্লেষণ-ভাষ্যে (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, কার্তিক ১৩২৩) :

এপর্যন্ত মুসলমানদের যে কয়খানি বাঙ্গালা উপন্যাস বাহির হইয়াছে সেগুলিকে মোটামুটি নি¤œলিখিত কয়েকটি ধাপে বিন্যস্ত করা যাইতে পারে— (১) বালক বালিকা বা যুবক যুবতীর প্রথম সন্দর্শন ও প্রণয় সঞ্চার; (২) ইহাদের একের জল-নিমজ্জন ও অন্য কর্ত্তৃক উদ্ধার— তদ্দারা প্রেমের প্রগাঢ়তা সাধন; (৩) একটি প্রতিবন্ধকের আবির্ভাব—প্রায়ই হয় পিতামাতার মতাভাব, অথবা অন্য প্রণয়ীর দুরাভিলাষ; (৪) পূর্ব্ব প্রণয়ী প্রণয়িণীর কিছুকাল বিড়ম্বনা ভোগ; (৫) পরিণয় বা অন্য প্রকারে মিলন। ইহার মাঝে মাঝে মিলনের উল্লাস ও বিরহের হা-হুতাশ সজ্জিত আছে।

“সাহিত্যে বৈচিত্র্য” শিরোনামীয় প্রবন্ধটির এরকম বিশ্লেষণের সত্যতা ও যৌক্তিকতা আছে। তিনি এ-প্রবন্ধে আরও যে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন, তা হলো— “মুসলমান লিখিত অনেকগুলি উপন্যাসেই হিন্দু নায়িকার সহিত মুসলমান নায়কের প্রণয় প্রদর্শন করা হইয়াছে। প্রেমের রাজ্যে জাতি বিচার নাই, এবং সাহিত্যের দিক দিয়া ইহা একটি বৈচিত্র্যও বটে। কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টি এক কথা আর প্রতিহিংসা সাধন এক কথা। প্রতিহিংসার বশবর্তী হইয়া কেহ যেন এই বৈচিত্র্যের অবতারণা না করেন।”

কিন্তু, এ-রকম আহ্বানে কেউ তেমন সাড়া দেননি। কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), কাজী আবদুল ওদুদের (১৮৯৪-১৯৭০) মতো উদারহৃদয় ব্যক্তিবর্গ সমাজের মতো সাহিত্যেও জাতিদ্বেষ পরিহারের জন্য হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আহ্বান জানিয়েছিলেন। “হিন্দু-মুসলমান ও বঙ্গ-সাহিত্য” নামক প্রবন্ধের শুরুতে “বঙ্গীয় মুসলমানের এখনও সম্পূর্ণ চৈতন্য হয় নাই” —এরূপ আত্মসমালোচনা করে “ইউনাইটেড ইন্ডিয়া” গঠনের লক্ষ্যে হিন্দু লেখকদের কাছে কী করুণ স্বরেই না প্রার্থনা করেছিলেন! “সাহিত্য-গুরু বঙ্কিমচন্দ্র যদি একটু রহিয়া-সহিয়া একটু রাখিয়া-ঢাকিয়া মুসলমান-বিদ্বেষ ব্যক্ত করিতেন” বলে একবার আর্তি জানাচ্ছেন, আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন “বাঙ্গালী মুসলমানের সহিত বাঙ্গালী হিন্দুর রক্তের সম্বন্ধ আছে, একথা যেন আমরা কখনও না ভুলি” রবীন্দ্রনাথের এরকম মিলনমুখি বক্তব্য। তবে আমাদের আজকের আলোচনা মুসলমানদের মানস ও সাহিত্য নিয়ে। কাজেই উদাহরণ এ-প্রসঙ্গেই চয়ন করি। এ-পর্যায়ে কংগ্রেসনেতা, অনলপ্রবাহ (১৯০০)-এর বিপ্লবী কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর (১৮৮১-১৯৩৯) কথাসাহিত্য রচনার কারণ ও পরিণতির কথা উল্লেখ্য। তাঁর প্রথম উপন্যাস রায়-নন্দিনী (১৯০৮)-এর ‘উপক্রমণিকা’য় বলেন :

একই দেশের অধিবাসী হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব থাকা সর্বদা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাঙ্গালী ভ্রাতারা কাল্পনিক আর্যামীর গৌরবগানে বিভোর হইয়া কা-জ্ঞানহীন অবস্থায় লেখনীয় পরিচালনায় দারুণ অসদ্ভাবের বীজ রোপণ করিতেছেন। দেশমাতৃকার কল্যাণের নিমিত্ত তাঁহাদের সাবধানতার জন্য ও মুসলমানদের আত্মবোধ জন্মাইবার জন্যই, উপন্যাসের ঘোর বিরোধী আমি  কর্তব্যের নিদারুণ তাড়নায় “রায়-নন্দিনী” রচনা করিয়াছি।…       …        …

বাঙ্গালীদিগের রচিত উপন্যাস পাঠ করিয়া যাঁহারা নিদারুণ মর্মজ্বালা ভোগ করিয়াছেন তাঁহারা এই উপন্যাস পাঠে কথঞ্চিৎ শান্তি পাইলেও শ্রম সফল জ্ঞান করিব। পক্ষান্তরে আশা করি, বাঙ্গালী লেখকগণ তাঁহাদের মোসলেম কুৎসাপূর্ণ জঘন্য উপন্যাসগুলির পরিবর্তন করিয়া সুমতির পরিচয় দিবেন এবং ভবিষ্যতে মুসলমানের বীর্যপুষ্ট গৌরবম-িত আদর্শ চরিত্র অঙ্কিত করিতে চেষ্টিত হইবেন। নতুবা তাঁহাদের চৈতন্য উৎপাদনের জন্য আবার ঐসলামিক তেজঃদীপ্ত  অপরাজেয় বজ্রমুখ লেখনী ধারণ করিতে বাধ্য হইবে।

উদ্ধৃতি অংশের বেশ কিছু বক্তব্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। “বাঙ্গালীদিগের রচিত উপন্যাস” পাঠে ‘মর্মজ্বালা ভোগ” করা “মুসলমানদের আত্মবোধ জাগানো”র জন্য এবং “উপন্যাসের ঘোর বিরোধী” হয়েও ‘কর্তব্যের নিদারুণ তাড়নায়” উপন্যাস লেখা! সেই শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত-এ বাঙালি আর মুসলমানদের মধ্যে খেলার ভেদরেখাই টানা হলো নয় কি? এই ধারাবাহিকতায় সিরাজী সাহেব আরও কয়েকটি উপন্যাস লেখেন। তবে সেগুলোর মূল্যায়নে কাজী মোতাহার হোসেনের বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। ‘আধুনিক মুসলিম সাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি যথার্থই বলেন :

ইসমাইল হোসেন সিরাজী তীব্র ধরনের অনেকগুলি বই রচনা করে গেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হিন্দুর পাল্টা জওয়াব দিতে গিয়ে সেগুলি সাহিত্য হয়নি, প্রতিবাদ মাত্র হয়েছে। এই প্রসঙ্গে এ কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে কোন সময়ের চাহিদা মিটিয়ে লিখলেই সাময়িক সাহিত্য হয় না। সিরাজী সাহেবের সময় মুসলমান সমাজে নবজাগরণের সূচনায় প্রবল পক্ষ হিন্দুর বিরুদ্ধে যে প্রতিক্রিয়ার ভাব দেখা দিয়েছিল, তিনি তারই চিত্র আঁকতে চেয়েছিলেন। সে-চিত্র যদি আর্ট পর্যায়ের উপযুক্ত হ’ত তাহলে এতদিন বেঁচে থাকত এবং তাতে হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই উপকার হ’ত।

এক্ষেত্রে কাজী আবদুল ওদুদ আরেকটু সতর্ক ও সহৃদয়তার সঙ্গে পর্যালোচন ও আহ্বান করেছেন। “মুসলমান সাহিত্যিক” শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লেখেন :

আজকাল বাংলা সাহিত্যে একটা কথা-সাহিত্যের যুগ আসিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না। মাঝে মাঝে উৎকৃষ্ট গ্রন্থও প্রকাশিত হইতেছে এবং বাংলাদেশে আজকাল পাঠক-সংখ্যা বাড়িয়াছে বলিয়া অনেকেই ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনায় মন দিয়াছেন। মুসলমান সমাজেও উপন্যাস-পাঠকের সংখ্যা পূর্ব হইতে অনেক বাড়িয়াছে, তাই অতি অল্পদিনের মধ্যেই আমাদের সমাজে দশবারোখানা উপন্যাস ও ছোটগল্পের বই প্রচারিত হইয়াছে। অবশ্য এইসব উপন্যাসের অধিকাংশই যে সাহিত্যের আসরে স্থান পাইতে পারে না সে-কথা আমরা অনেকেই জানি। সুসাহিত্যিকের আবির্ভাবে যে-সমস্ত জিনিস বসন্তের আগমনে গাছের শুক্না পাতার মত আপনা হাতেই ঝরিয়া পড়িবে সেই-সব নির্জীব স্বল্পপ্রাণ নভেল ইত্যাদির উপর সমালোচকের কঠোর আঘাত প্রদান করা যে পৌরুষহীনতারই কাজ তা নয় শুধু, নির্মমের কাজ বলিয়াও আমি মনে করি। যাঁহারা অধিকাংশ স্থলে শুধু বাজার-দরের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া তাড়াতাড়ি করিয়া এরূপ সাহিত্যের জঞ্জাল সৃষ্টি করতঃ কিছু অর্থোপার্জনের চেষ্টা করিতেছেন, তাঁহারাই যদি তাঁহাদের অল্প শক্তি লইয়াই একটু সাবধান হইয়া উপন্যাস সৃষ্টির মূল সূত্রগুলি মনে রাখিয়া— অন্ততঃ কয়েকখানি ভাল উপন্যাস মনোযোগ দিয়া পড়িয়া উপন্যাস রচনায় মন দিতেন, তবে তাঁহাদের বর্তমান রচনা হইতে অনেক ভাল জিনিস তাঁহারা পাঠকের সামনে ধরিতে পারিতেন এবং তাঁহাদের সাহিত্য সমালোচনাও অনেক অংশে সার্থক হইতে পারিত।

বাঙালি মুসলমান সমাজের জীবনধারার বিশিষ্টতাও মুসলিম-রচিত উপন্যাসগুলোর শৈল্পিক দুর্বলতার একটি কারণ। কথাটা তর্কসাপেক্ষও হতে পারে। কারণ, জীবনমাত্রই সাহিত্যের উপকরণ হতে পারে যদি রূপদক্ষ সাহিত্যিক তা শিল্পিত করে পরিবেশন করতে পারেন। কাজী আবদুল ওদুদ নদীবক্ষে (১৯১৮)-এ কিংবা হুমায়ুন কবির (১৯০৬-১৯৬৯) নদী ও নারীতে তা করে দেখিয়েছেনও বটে। তবে প্রথমটির নায়ক-নায়িকা চাচাত ভাইবোন, আর দ্বিতীয় উপন্যাসে পিতৃব্য নয় পিতৃবন্ধুর সন্তান হিসেবে পরস্পরের এক পরিবারে বসবাস ঘটলেও পরে জানা গেল তারা একই মায়ের গর্ভের সন্তান। তা উপন্যাসে যখন জঙ্গম জীবন চাই, তখন এতোটা স্বল্প পরিসরের প্রেক্ষাপটে মুসলিম লেখকেরা বৈচিত্র্য আনবেন কী করে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) পদ্মানদীর মাঝিতে (১৯৩৬) হিন্দুর তুলনায় মুসলমান জেলেদের কথা বলতে গিয়ে প্রথমে জানালেন, “ধর্ম যতই পৃথক হোক দিনযাপনের মধ্যে তাহাদের বিশেষ পার্থক্য নাই। সকলেই তাহার সমভাবে ধর্মের চেয়ে এক বড় অধর্ম পালন করে—দারিদ্র্য।” তবে মুসলমান জেলেদের “বাড়িগুলিতে বেড়ার বাহুল্য দেখিয়া সহজেই চিনিতে পারা যায়। যত জীর্ণ হইয়া আসুক, ছেঁড়া চট দিয়া সুপারি গাছের পাতা দিয়া মেরামত করিয়া বেড়াগুলিকে এরা খাড়া করিয়া রাখে।” মেয়েদের প্রর্দায় রাখার জন্য এ-প্রচেষ্টা; যদিও নানা বাস্তব কারণে সেভাবে তাদের নারীদের রাখা সম্ভব ছিল না। তারপরও যথাসাধ্য চেষ্টা তো ছিলই। তাই মুসলিম প্রেক্ষাপটে যেসব প্রেমকাহিনি পাওয়া গেছে বেশিরভাগেরই পাত্রপাত্রী আত্মীয়-পরিজনদের মধ্যে। ওদিকে কলকাতার মতো শহরে হিন্দু মেয়েরা কিছুটা বাড়ির বাইরে আসছে, লেখাপড়া করছে, গান-বাজনা শিখছে; তাই সেখানে ব্যক্তিত্বশালী, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা নারীপুরুষের দেখা মিলছে। কাজেই উপন্যাসের কাক্সিক্ষত জীবনসংগ্রামের ঘটনা পেয়ে যাচ্ছেন ওই প্রেক্ষাপট গ্রহণকারী ঔপন্যাসিকেরা। অপরদিকে মুসলমানের অন্দরের খবর না-জানার কারণে তাদের জীবনচিত্র আঁকার অপারগতার কথা তো পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথও বলে গেছেন। দীর্ঘদিনের ধারবাহিকতায় আরও একটা আবহ  চলেছে যে, হিন্দু লেখকেরা হিন্দু আর মুসলিম লেখকেরা মুসলিম পাত্রপাত্রী-পরিবার-সমাজের কথা লিখবেন। এ শুধু জানার সীমাবদ্ধতার কারণেই নয়, একের লেখনিতে অন্যের চরিত্র কালিমালিপ্ত হলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে একটি পক্ষ। এমনকি কোনও লেখক যদি শিল্পিজনোচিত সহৃদয়তা ও সত্যনিষ্ঠতা দেখিয়ে বিধর্মী চরিত্রকে বেশ মাহাত্ম্য দিয়ে আঁকেন তাতেও স্বসম্প্রদায় লেখকের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। প্রবল বাতাসের মতো এই অদৃশ্য অথচ স্পর্শেয় সীমারেখায় এখনও বাধা পড়ে আছেন বেশিরভাগ লেখক।

এবার ব্যক্তিগত শিক্ষা-সক্ষমতার কথায় আসি। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মতো অসাধারণ প্রতিভাধরদের কথা সসম্মানে ছেড়ে দিয়েও বলা যায়, উপন্যাসের মতো আধুনিক ও পাশ্চাত্য থেকে আসা সাহিত্যাঙ্গিক চর্চার ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষাগ্রহণ ও সমকালীন সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণ জরুরি ছিল। কিন্তু পরিস্থিতিটা হুমায়ুন আজাদের পর্যবেক্ষণে বলা যেতে পারে :

উন্নত শিক্ষা উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি হিন্দু-কবি-ঔপন্যাসিক-নাট্যকারদের যেমন উন্নত সাহিত্য সৃষ্টিতে সমর্থ করেছিলো, সে-উন্নত শিক্ষা বাঙালি মুসলমান লেখকেরা বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত পাননি; তাই তাঁদের সৃষ্ট সাহিত্য প্রধানত স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভার প্রকাশ। বিশশতকের তৃতীয় দশকে যে-আধুনিকতা দেখা দেয় বাঙলা সাহিত্যে, বাঙালি মুসলমানেরা শিক্ষাগত কারণে তার থেকে দূরে থাকে। (‘ভাষা আন্দোলন : সাহিত্যিক পটভূমি’)

উন্মেষ যুগের দু-একজন ঔপন্যাসিক প্রসঙ্গে একটু তুলনা করার আগে উপন্যাস সম্পর্কে পুরোনো কথা বলি বিনয় ঘোষের ভাষায় : “উপন্যাস বুর্জোয়া সমাজের (ইড়ঁৎমবড়রবং ঝড়পরবঃু) শুধু সাধারণ সৃষ্টি নয়, শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি (“উপন্যাস”)।” তা মুসলমানরা প্রথমত পশ্চাদ্পদ, দ্বিতীয় মুসলমান সমাজের মধ্যে যে অংশ অন্তত আর্থিক দিক দিয়ে উপরতলার, তারা আবার নিজেদের বাঙালি মনে করতো না, বাংলাকে স্বভাষাও ভাবতো। অর্থাৎ নি¤œবিত্ত-নি¤œমধ্যবিত্তরা বহুমুখী সীমাবদ্ধতার মধ্যে যা একটু বাংলা পড়াশুনায় এগিয়ে এসেছিল। এই পরিস্থিতি মনে রেখেই তুলনাটা করি। প্যারীচাঁদ মিত্র হিন্দু কলেজের ছাত্র ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটসদস্য, বঙ্কিম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট, রমেশচন্দ্র দত্ত আইসিএস অফিসার। এদিকে আর্জ্জুমন্দ আলী, নজিবর রহমান দুজনেই প্রবেশিকা বা একালের এসএসসি পর্যন্ত পড়েছিলেন। সিরাজিও দারিদ্র্যের কারণে স্কুল পেরোতে পারেননি। পাঠকের অবস্থাও তথৈবচ। তার উপর আজন্ম বিভাষাপ্রিয়, সেদিনও দোভাষি পুথিচর্চাকারী মুসলমানের বাংলা ভাষা ও গদ্য সম্পর্কে ধারণা ছিল অনেকটাই অবাস্তব। বাঙালি মুসলিমের প্রথম সার্থক উপন্যাস বলে কথিত ‘আনোয়ারা’ গ্রন্থের ‘মুখবন্ধ’-এ নজিবর রহমান বলেন :

মাতৃভাষার সহিত ধর্ম্মভাষার মিশ্রণ না থাকিলে ভাষার ভাবে জোর বাঁধে না; এবং জাতীয় জীবন পুণ্যপথগামী ও সঞ্জীবিত করার যে উদ্দেশ্য, তাহাও সফল হয় না। আমাদের হিন্দুভ্রাতৃগণ, মূল হইতে একথাটি ভাল রূপে বুঝিয়া বাঙ্গালা ভাষার সহিত তাঁহাদের সাড়ে পনর আনা ধর্ম্মভাষার সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করিয়া আসিতেছেন, দীন লেখক মনে করে, তাহাতেই তাঁহাদের জাতীয় গৌরব অক্ষুণœ রহিয়াছে ও থাকিবে। পরন্তু বাঙ্গালা তাঁহাদের যেমন, আমাদেরও তেমনি মাতৃভাষা; কিন্তু এই ভাষায় আমাদের সুলেখকের সংখ্যা বিরল বলিয়া ইহার সহিত এ পর্য্যন্ত আমাদের ধর্ম্মভাষার ‘খাপ’ খাইয়া উঠিতেছে না। আজ কাল আমাদের দুই চারিজন যাঁহারা মাতৃভাষা-বাঙ্গালার পরিচর্য্যায় রত হইয়াছেন, ভাগ্যদোষে তাঁহারাও ভিন্ন ধর্ম্মী লেখকগণের পন্থানুসারে যাইয়া জাতীয়ত্ব হারাইতে বসিয়াছেন। আমাদের দুর্গতির শত কারণ মধ্যে ইহা একটি প্রধান কারণ।

এই যে মাতৃভাষা আর ধর্মভাষা—এরূপ বিভক্তিকরণই বিস্ময়কর ও বিভ্রান্তিমূলক। সাহিত্য হবে রসসিক্ত জীবনচিত্র; এতে ধর্মভাষার ‘খাপ’ খাওয়ানোর চিন্তা ও চেষ্টা সাহিত্যের স্বাস্থ্যের জন্য সংগত নয়। কিন্তু নজিবর রহমান সেই প্রয়াস পেয়েছিলেন। নিজেই আল্লা, খোদা, পানী, ওজু, নামাজ, রোজা, ফুফু, মামানী, দাদী, বাবাজান, খোসএল্হান, আছর, মগবর প্রভৃতি শব্দ ব্যবহারের উদাহরণ দিয়েছেন। এসব শব্দের অর্থও ফুটনোটে দিতে হয়েছিল। আবার এ-ও স্বীকার করেছেন, “তবে এইরূপ করায় ইহা যে পাঠক পাঠিকাগণের অরুচিকর অফুটন্ত খিচুড়ী হইয়া উঠিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। তথাপি কর্ত্তব্য প্রণোদিত হইয়া তাহা করিয়াছি।”

অবশ্য একথাও ঠিক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং উচ্চশ্রেণিয় পাঠক ও বৃহত্তর জনজীবনের দূরত্ব— এসব মিলিয়ে বাঙালি মুসলমানের পক্ষে যুৎসই ও শিল্পিত ভাষানির্মাণ কঠিন হয়ে পড়েছিল। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কী—উর্দু না বাংলা— এ নিয়েও তর্ক ছিল দীর্ঘদিন। তা তর্ক-বিতর্কের পথ ধরে বাঙালি মুসলমানদের চলতে হয়েছে। দেশবিখ-তার মধ্য দিয়ে তারা আরো ঘাত-অভিঘাতের মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞান অর্জন করেছে। যার ফলে উপন্যাসের মতো বহুভঙ্গিম রচনায় তারা সিদ্ধ হয়েছে। ভাষা-আন্দোলন, সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ধরে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা যাঁদের ঠিকানা, সেই লেখকেরা বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিনব উপন্যাস লেখা আয়ত্ত করেছেন। এবং এখন এই সম্প্রদায় নির্বিশেষের স্বাধীন রাষ্ট্রে হিন্দু লেখক, মুসলমান লেখক বর্গবিভাগের কোনো প্রয়োগ-উপযোগিতা আর্থ-সামাজিক মানদ-ে অবান্তর হয়ে গেছে।

*******************************************

শ্যাম-নৌকা : প্রপঞ্চে পুষ্পিত প্রাণ
চঞ্চল কুমার বোস

প্রপঞ্চ বা মায়ার ভুবনে মানুষ এক নিরন্তর পদাতিক। পঙ্ক থেকে পঙ্কজের সন্ধানে কমলকুমার অনিদ্র দৃষ্টি মেলে রাখেন সতত। শ্যামের বাঁশি কল্পনায় যতোটা শোনা যায়, বাস্তবে ততোটা নয়। তবে গ্লানি আর যন্ত্রণার জীবনেও মায়াস্বপ্নের হাতছানি থাকে। কদর্য বাস্তবতার সঙ্গে বোঝাপড়া করে মানুষকে টিকে থাকতে হয়। ধর্ম-শাস্ত্র আর নিয়তির আবহমান কাঠামোতে বেড়ে ওঠা মানুষ দ্বন্দ্বে নামে, আপোষও করে— খুঁজে নেয় টিকে থাকার গ্রহণযোগ্য কোনো ডাঙা। শাস্ত্রবন্দি মানুষের ছায়া কমলকুমারের উপন্যাসে মূর্ত নানাভাবে, গ্রামীণ আবহে বেড়ে ওঠা ব্যক্তির মনোজগতে সনাতন বিশ্বাসের মূল অনেক গভীরে। বিশ্বাস ও বাস্তবতার দ্বৈরথে দোলাচল মানুষের উপাখ্যান শ্যাম-নৌকা। কিন্তু শাস্ত্রীয় কিংবা আধিভৌতিক বিশ্বাসকে দূরে সরিয়ে জীবনের প্রাকৃত রূপকে উন্মোচন করেছেন তিনি।

শ্যাম-নৌকা উপন্যাসটি কমলকুমারের লোকজীবনদর্শনের অভিজ্ঞান। খরখরে পোড়ো মাটির জীবন ছাপিয়ে উঠেছে এর ক্যানভাসকে। মাতৃভক্তির রসে জারিত এর চরিত্রেরা, ফলে সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যের ভাবরূপটি ফিরে ফিরে আসে এর নানা প্রসঙ্গে। থিমভিত্তিক আখ্যানের পরিবর্তে ঘটনার সম্মিলন এ কাহিনিতে লক্ষ করা যায়। পঙ্ক¯্রােতে বহমান জীবন অনিবার্য সত্য নিয়ে দেখা দিলেও এই জীবনাসক্তিই এ উপন্যাসের মূল কথা। কমলকুমারের উপন্যাসে সংস্কার-বিশ্বাস-ভক্তিপ্রবণ মানুষের উপস্থিতি লক্ষণীয়; কিন্তু জীবন এতো দুর্লভ মূল্য নিয়ে জেগে থাকে তাঁর লেখায় যে, এই জীবন খোঁজাই লেখকের শেষ পাথেয় হয়ে ওঠে। প্রায় ছিন্নমূল কিশোর কালাচাঁদ শ্যাম-নৌকা উপন্যাসের সূচনাপাত্র। মহিষ অপহরণের কাজটি নির্বিঘেœ সম্পন্ন করার জন্য বনবিবির পূজার মধ্য দিয়ে কালাচাঁদ ও রসিকের পরিচয় মেলে। বনবিবির পূজা আয়োজনটি সনাতন শাস্ত্রীয় জীবনাচারের ছবি, গভীর বিশ্বাস নিয়ে লোকায়তজন ভক্তি নিবেদন করে দৈবশক্তিতে। কালাচাঁদ আর মা-রসকে বা রসিক এই দু’জনও সেই প্রথার আশ্রয় নেয় :

মহিষ অপহরণ কার্য্য যাহাতে নির্ব্বিঘেœ সম্পন্ন হয় সেই মানসে তাহারা দুইজনে, সে এবং মা-রসকে, এ কারণ যে দুকড়ি তখনও অনুপস্থিত, প্রথমে আসে, বনবিবির পূজা দিতে হইবে, বনবিবি আতুরের মনস্কামনা পূর্ণ করেন, তাঁহার পুণ্য নামে মাছ ঘোগ ছাড়িয়া জালে পড়ে, এমন কি ধানে পোকা লাগে না ; মা-রসকে অতীব নিষ্ঠার সহিত পূজার যোগাড় করে, মেয়েলী সুলভ কেয়ারীতে কয়েকটি কচুপাতা ধুইয়া, একটির উপর মুড়কী পয়সা খানেকের, একধারে পাঁচটা বাতাসা, আমপাতায় তেল সিন্দুর, তাহারই পাশে একটি পয়সা চারেকের গাঁজা ঠাসা কল্কে, যেমন যেমন দুকড়ি বলিয়াছে, একান্তে একটি মুঙরী ঘট জলপূর্ণ; সমস্ত কিছু গোছাইয়া একটি মস্ত কচুপাতা চাপা দিল। [পৃ. ১৫৬]

কালাচাঁদের ছোট্ট জীবনটা লড়াই আর দুঃস্বপ্নে ঠাসা। শ্যাম-নৌকার প্রধান অংশই তাকে কেন্দ্র করে গড়া। ব্যাধি-অসুস্থতা আর প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সে জীবনের পাঠ নিয়েছে। অসুস্থ পিতার স্মৃতি তাকে বিষণœ করে, ক্লান্ত করে। আরো কম বয়সে চ-ী অপেরায় রসিকদের সঙ্গে কাজ করতো সে। ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথে পিতার কথা মনে পড়ে তার— কালাচাঁদের পিতা, যার দেবভক্তি আর ঈশ্বরবিশ্বাস অভাবিত। প্রবল আস্তিক্যবোধ তাকে প্রাণ দান করে এবং চারপাশের অজ¯্র ক্লিন্নতা-গ্লানির মধ্যেও তাকে দেয় বেঁচে থাকার নির্ভরতা। প্রচ- ব্যর্থতা আর দুঃখের মধ্যে তিনি সুখের জগৎ কল্পনা করতে পারেন। সেই পিতার স্মৃতি কালাচাঁদকে নিয়ে যায় বিপন্ন ঘোরে :

গিরিশঙ্করপুরে পালা গাহিয়া সন্ধ্যার ট্রেন ধরিয়াছে, রসকে-কে সে ‘ভাসানের’ গান গাহিতে বলে, গানটি বিলাসখানি টোড়ীতে বাঁধা; যদিও এ রাগ এ সময়ের নহে, তথাপি কালাচাঁদের বালক মনকে এ গীত এক রহস্যময় সময়ের মধ্যে লইয়াছে, যে সময় পদ্মপত্রে জলের ন্যায় ক্ষণিক নয় ; ট্রেনের একটানা অদ্বুত শব্দ এ গীতকে অন্তরতম করে, ব্যাহত করে নাই এবং এই প্রথম তাহার বাবার জন্য এক অশ্রুতপূর্ব্ব খেদ, বড় যন্ত্রণা, উপস্থিত হইল;  [পৃ. ১৫৬]

কালাচাঁদের সঙ্গীসাথীরাও ভাগ্যহত জীবনে জর্জরিত। কালাচাঁদের সঙ্গী রসিকের জীবন মাতৃ¯েœহবঞ্চিত— অপহৃত তার শৈশব। রসিকের অনাসক্ত মা নিরুদ্দেশ হলেও রসিক ভগবানে আস্থা হারায় না। জীবনের সব শূন্যতাকে ভগবানের নাম স্মরণ করে ভরিয়ে তোলে সে। কমলকুমার দীনহীন মানুষের চিত্রকে অসামান্য মমতায় চিত্রিত করেন এবং অন্তর্গত অনুভূতির ছায়া ঘিরে রাখে এই ক্ষুদ্র মানুষগুলোকে। মাতৃ-পরিত্যক্ত রসিকের ইতিহাস মর্মে আলোড়ন জাগায় :

যে রসিকের বাল্যকাল নাই, আঁচল, যাহা প্রাচীনতম বটপত্র, তাহার নিরবচ্ছিন্ন মায়া হইতে সে ঠকিয়াছে এবং এই সূত্রে যিনি সতত জর্জ্জরিত তাঁহাকেই পুনরায় মানুষে, বেচারী, আহত করিবার মানসে ঔদ্ধত্য লাভ করিয়াছে, যে রসকের মা তাহাকে ফেলিয়া আনপুরুষ করে, এখন সে যে কোথায় ভগবান জানেন। [পৃ. ১৫৭]

এই কালাচাঁদ অসহায়ভাবে চোখের সামনে দেখে তার মা আবারও সন্তান জন্ম দান করতে যাচ্ছে অথচ কোনো ডাক্তার-বদ্যির ব্যবস্থা করতে পারেনি তার বাবা। অসহায় নিরাপত্তাহীন মৃত্যু ঝুঁকির মধ্যে এখানে জন্ম নেয় মানবসন্তান। স্বপ্নের মরীচিকা বারবার প্রলুব্ধ করে কালাচাঁদকে— তাই শৈব্যার ভূমিকায় তার অভিনয় করার ইচ্ছেটা অপূর্ণই থেকে যায়। জগতে লুকিয়ে থাকা এমন এক ধন্বন্তরী খুঁজে বের করবে সে যার কারণে সুস্থ হয়ে উঠবে তার বাবা। নিজের মতোই ভাগ্যহত সঙ্গীরা কালাচাঁদের জীবনপথের পথিক— শীতল ঠাকুজ্জি থেকেও নেই রসিকের, দুকড়ি বানরের খেলা দেখিয়ে কাশী যাবার বাঞ্ছা করে কিন্তু একটি আধলাও দেয় না কেউ। বানর নিয়ে যাদুর ভেলকিতে মানুষকে মাতিয়ে রাখে দুকড়ি কিন্তু দুবেলা তার আহার জোটে না। এক মনোরম জীবনের কল্পনায় বিভোর থাকতে চায় সে অথচ নিদারুণ বঞ্চনার ছায়া ঘিরে রাখে তাকে—

বাঁশী বাজাইয়া একটি ছোট বানর কপালের, যাহা মাটি স্থিত, চারিপাশে চক্রাকারে ঘুরিয়া হঠাৎ দাঁড়াইয়া যাদু দেখাইতে আরম্ভ করিল, ‘এক পয়সা দশ করিতে পারি কিন্তু খাতি (খেতে) পাই না’; ইহার বিষাদ কণ্ঠস্বর, স্পষ্ট শোনা যায়; দুকড়ির ফ্যাকাশে মুখম-ল কালাচাঁদকে মনমরা করে, বেচারী দুকড়ির জন্য তাহার বড় কষ্ট হইল, [পৃ. ১৬৩]

এই জন্মে দুঃখকাতর জীবন পেলেও পরজন্মের স্বপ্ন দেখে দুকড়ি। শীতলের বদান্যতায় হাজতবাস থেকে রেহাই পেলেও কাশী গিয়ে ‘ইচ্ছা-কুয়োর’ কাছে গিয়ে মনোবাঞ্ছা জানাবে— ‘সেখানে একটা কুয়ো আছে সেই কুয়োতে যে যা ব’লে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরে যায়, আসছে জন্মে তাই হয়’ [পৃ. ১৬৩] ঐ কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে গরীব দীনহীন আকবর এই জন্মে স¤্রাট হয়েছেন বলে দুকড়ির বিশ্বাস, তাই পরজন্মে সন্ন্যাসী হবার বাসনায় তার সমস্ত চেষ্টা। এই বিকল্প নন্দনের ঘোরে দুকড়ি, রসিক আর কালাচাঁদের জীর্ণ জীবন কেটে যায়। ধুলোমাটির জীবনে থেকেও দুকড়ি বাদশাহ-স¤্রাটের সঙ্গে তুল্যমূল্য হয়ে ওঠে যদিও এরা জানে জলে-স্থলে কোথাও কোনো স্বস্তি-আশ্বাস বা নিরাপত্তা তাদের জন্য অপেক্ষা করে নেই। কারণ— ‘ড্যাঙ্গায় বাঘ জলে কুমীর সব, কেঁচো, যেখানে ইচ্ছে যা…’ [পৃ. ১৬৫] কালাচাঁদের শাস্ত্রবিশ্বাসী মনে এই কদর্য পৃথিবী সিদ্ধপীঠরূপে আভাসিত হয়ে ওঠে কিন্তু সে জানে না, ব্যাধিগ্রস্ত পিতার মুক্তির পথ কোন্ পথে মিলবে। চুরি করা মহিষের পিঠে বাবাকে তুলে কালাচাঁদ বিদড়ার খাল পেরিয়ে হাসপাতালে রওনা হয়। যে বাবা কালাচাঁদকে সূর্যের গ্রহণ দেখানোর জন্য আতশি কাচ এনে দিয়েছিল একদিন, আজ তারই জীবনে ভয়াল গ্রহণ লেগেছে। পিতার এই জীবন এখন কত তুচ্ছতার, কত অবহেলার, মানুষ হিসেবে কত অবমাননাকর :

এখন সেই বাপ, সে নিজে আর্ত্ত, ছিটকে পড়া ব্যাঙের মত, দেহটি মহিষের পৃষ্ঠে মেলান, মহিষের পিঠে অনেক খড়, উপরে এক জীর্ণ চট, সেখানে অবশ শরীর, গায় শতচ্ছিন্ন কাপড়ের খুঁট; আর চারিদিকে আধখাওা অন্ধকার, বীভৎস; পুনরায় যাত্রা আরম্ভ হইল, এ পথের কোথায়ও পদ্মবন নাই, ছায়া নাই, শুধু কর্ম্মহীন প্রান্তর আর প্রান্তর। [পৃ. ১৬৬]

অ্যালিগোরির আবরণে খটখটে বাস্তবতা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে কমলকুমারের দৃষ্টিতে। পদ্মফুলের মোহন রূপ কালাচাঁদের জন্য ছায়ানিবিড় সুবর্ণভূমি তৈরি করে রাখে না। রুগ্ন পিতাকে নিয়ে এই যাত্রায় হতাশা আর রুক্ষতারই প্রকোপ।  খ্যাপা শেয়ালের ডাকে পথে অমঙ্গলের সূচনা ঘটে, গায়ে কাপড় থাকে না বাবার, আর কালাচাঁদের চুরি করে আনা মহিষের কথা তো উচ্চারণই করা যাবে না। কারণ ভগবানবিশ্বাসী পিতা একমাত্র এই সত্যই জানেন—‘চৌর্য্যরে পাপে কুষ্ঠ হয়, গলিত কুষ্ঠ!’ [পৃ. ১৬৭] পিতার মনোজগতে শাস্ত্রীয় বিশ্বাসের যে ভিত্তিটি সদাজাগ্রত সেইটি দিয়েই তিনি পুত্র কালাচাঁদের পূর্বজন্মের রূপ বলে দিতে পারেন— ‘জানিস তুই খুব যখন ছোট ছিলিস আমি আর তোর মার মধ্যে ঠিক যেন ড্যাঙ্গার মাছ… তুই আর জন্মে মাছ ছিলি আঁকপাক করে খেলা করতিছ..কত খেলা করতিছ…।’ [পৃ. ১৬৯] ভগবান জগৎপিতা নিয়তিবদ্ধ করেছেন বলেই কালাচাঁদকে এই কদর্য জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়, সেই অদৃশ্য প্রভু তাকে অনেক ভালোবাসেন বলে পিতা মনেপ্রাণে আস্থাশীল। ভগবানের ছত্রছায়ায় নিজেকে নিরাপদ মনে করলেও অনেক কষ্টে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কালাচাঁদ শুনতে পারে বাবার মৃত্যু অবধারিত। ডাক্তারের মনটিতেও বাস করে অন্ধকারাচ্ছন্ন ভারত— জাতপাত- ছোঁয়াছুঁয়ির মধ্যযুগীয় বিভাজনরেখা ডাক্তারকেও চালিত করে। মানুষের চেয়ে জাতের মর্যাদাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় তার কাছে। নিরুপায় কালাচাঁদ অসুস্থ পিতাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিতে চাইলে ডাক্তার তড়িৎ বলে ওঠেন— ‘পাগল, এখনই নিয়ে যাও,’ …বামুন না, বারোজাত ডোমে ছোঁবে মড়া…ভাল হবে…।’ [পৃ. ১৭১] একদিকে নিশ্চিত মৃত্যুর আশঙ্কা অন্যদিকে রুগ্ন পিতাকে ফেলে কালাচাঁদের জুয়া খেলায় মেতে ওঠা জীবনের কুৎসিত অভিজ্ঞতাকেই সামনে নিয়ে আসে। জুয়ারিরা টাকাপয়সা নিয়ে হঠাৎই চম্পট দিলে কালাচাঁদ সংকটের আরো গভীরে তলিয়ে যায়। পঙ্কমলিন জীবনের অন্ধকার ও তুচ্ছতাকে ক্ষমাহীনভাবে কমলকুমার তুলে আনেন এবং শ্যাম-নৌকায় সেই কদর্যতার চূড়ান্ত প্রকাশ হয় পিতা-পুত্রের অশালীন অভব্য আচরণে-প্রতিক্রিয়ায়। সামান্য ক’টি টাকার জন্য পিতা-পুত্র আদিম অশ্লীল গালাগালিতে লিপ্ত হয় :

রুগ্ন মরণাপন্ন পিতা, চট ফেলিয়া উঠিয়া কাশি চাপিয়া বলিল, ‘দে শালা, হারামী টাকা না হলে তোকে লাথিয়ে’ ইহাতে অপমানিত কালাচাঁদ, যে অপরাধ জর্জ্জরিত, ইতরের কণ্ঠে বলে ‘ইঃ টাকা তোমার বাবাকেলে ধন কি না’ সঙ্গে সঙ্গে তাহার বাপ কহিল, ‘তবে রে শালা খানকির ছেলে, বেজম্মা’। [পৃ. ১৭৪]

এই কুৎসিত গালাগালি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর বিভীষিকায় পরিণতি পায়। কালাচাঁদকে ক্ষিপ্তভাবে লাথি মারতে গিয়ে নৌকার উপরে পিতার পতন ও মৃত্যু। মনুষ্যেতর জীবনের গ্লানি শ্যাম-নৌকা উপন্যাসের পটভূমিকাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রাখে শেষাবধি। বিরাট গঙ্গার উন্মত্ত বুকে ভাসমান নৌকায় মৃত পিতার শবদেহ নিয়ে কালাচাঁদের জীবনমরণ পরীক্ষা। পাশবিক মত্ততা ও হুঙ্কার নিয়ে অগাধ জলরাশি পৌরাণিক দানবের মতো আবির্ভূত হয় এবং তারই বুকে মৃত পিতার পৈশাচিক মুখম-ল এবং এক চক্ষু খোলা ভয়াবহ রূপ। অসহায় বালক কালাচাঁদ প্রাণহীন পিতার দেহে প্রাণ সঞ্চার করার মানসে ভিন্ন পন্থায় অবতীর্ণ হয় :

এখন বাপের পৈশাচিক মুখম-ল, একটি চক্ষু যাহার খোলা, হাওয়া দাড়ি অল্প কম্পিত, দেখিয়া সে অত্যুগ্র ক্ষিপ্ত হয়, যে কোন কিছু বিবেচনা না করিয়া ঝটিতি চোখের প্রতি চাহিয়া রুষ্ট কণ্ঠে কহিল, ‘আমাকে ভয় দেখিও না, ভয়, বন্ধ করো চোখ’ বলছি এ কথার সঙ্গে, বাপের চোখে সে ঘুষি বসাইয়া দিল, মৃতের মুখ উন্মুক্ত, খানিক রক্ত বাহির হয়, এবং যুগপৎ, বেচারীবালক, কাঁদিয়া উঠিল; কাঁদিতে কাঁদিতে সে অবশ, একদা সে ঘুমাইয়া পড়িল। [পৃ. ১৭৫]

এই বিপন্ন গ্লানিময় জীবনপঙ্কেও কালাচাঁদ সৌন্দর্যের সন্ধান করে। ঘৃণ্য আদিম জীবনচর্যা পেরিয়ে ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের অন্বেষণই শ্যাম-নৌকা উপন্যাসের অন্তিক লক্ষ্য। পবিত্র গঙ্গার বুকে কৃষ্ণনাম স্মরণ করতে করতে কালাচাঁদ কোনো মোক্ষ চায়নি, ঐশ্বর্য কামনা করেনি, ব্যাকুলভাবে প্রার্থনা করেছে— ‘আমায় দুঃখ দাও নাথ, দুঃখ যা সুন্দর, কেননা দুঃখই একমাত্র সৌন্দর্য্য।’  [পৃ. ১৭৫] পিতার কাছ থেকে কালাচাঁদ পরমব্রহ্মের যে বিশ্বাস উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছে, সেই বিশ্বাসই তাকে দেয় দুঃখ মোকাবেলার সাহস। গঙ্গার স্পর্শ তাকে সুখী করে এবং এই গঙ্গার জল স্পর্শ করেই পুনর্জন্মের প্রার্থনাটিও সে নিবেদন করে — ‘পৃথিবীতে আবার যদি আসি; আমি আসবোই… ভালোবাসা দিও…’ [পৃ. ১৭৫] কালাচাঁদের শ্যাম-নৌকা অবশেষে মায়ানৌকা হয়ে সুদূর গঙ্গায় মিলিয়ে যেতে চায়। সমস্ত জীবনভর কীটপতঙ্গের মতো কাটিয়ে দিলেও কালাচাঁদের ভেতরে সনাতন মরমী অস্তিত্বের প্রকাশ লক্ষণীয়। ‘পিতার নৌকা ক্রমাগত সাগর অভিমুখে যায়’— এই বাক্যের মধ্যে খুঁজে নেয়া যায় ভারতের আস্তিক্য ঐতিহ্যের সূত্র। বিশ্বজগতের মায়ারূপ ধরে পরম ব্রহ্ম অনন্ত আনন্দ ও সৌন্দর্যের দিকে আহ্বান করে কালাচাঁদকে। পিতার রক্তে বহমান মাধবভক্তি পুত্রের চৈতন্যেও মরমীবোধের উৎস রেখে গেছে। কমলকুমার ব্রহ্মভাবনার সনাতন ভারতীয় ঐতিহ্যে অন্বেষণ করেছেন সুখ-আনন্দ-সৌন্দর্য আর অপার নির্ভরতা। সাগরের রূপক এক অনন্ত জগতের ইশারা তৈরি করেছে এ উপন্যাসে, শ্যাম বা কৃষ্ণ মনোজগতে অস্তিত্বশীল পিতা-পুত্রের। তাঁরই নিগূঢ় অনুভবে গ্লানিজীর্ণ জীবনেও কালাচাঁদ অমৃত সৌন্দর্য খুঁজে বেড়ায়।

*******************************************

মানবজমিন প্রসঙ্গে
আহসানুল কবির

১. অষ্টাদশ শতকের কবি গীতিকারগণ মানুষের স্বরূপ উদ্ঘাটনে বেশি মনোযোগী ছিলেন। মানুষহবার প্রতিশ্রুতি তাঁদের বিবেকবান নির্বিবাদী করে তোলে। তাই মানুষই তাঁদের নিত্যজ্ঞানের বিষয়। মানবসেবা মানবিক কর্ম। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।১ এমন উচিৎ সিদ্ধান্ত সমাজ-রাষ্ট্রে এখনও বহাল। ‘মনরে কৃষি কাজ জাননা/এমন মানব-জমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলতো সোনা’।২ কবিতার ভাবাবেগ বা বাউল পন্থার দর্শন মানব মনের বিস্তৃত জমিনের মতো। এবং সে কারণেই মানুষের মনের ভেতরই শুদ্ধতা সৃষ্টি হয় ফুল ও ফসলের। তবে সেক্ষেত্রে সঠিক আবাদকার্যের ওপরই তা নির্ভরশীল হয়। এসব কবিতার যুগ বা পদ্যের যুগ পার হয়ে মানুষ আর শুধু মনের জমিনে থাকতে চাইল না। সে বেরিয়ে আসলো সামাজিক সম্পর্কে, গ্রামে, নগরে-রাষ্ট্রে। জীবনের আঙ্গিনা গেল বেড়ে। এই বিস্তর আঙ্গিনায় প্রবেশ ঘটলো গদ্যের। গদ্যের স্বাধীনতায় সৃষ্টি হলো গল্প উপন্যাস অর্থাৎ কথাসাহিত্যের বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র এঁদের সাহিত্যে এলো নীতি-সমাজচ্যুতি, জাত-পাত, যুক্তি, প্রীতি ও মানবরীতি। তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখার ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেল শ্রেণিশত্রু, নি¤œবর্গের মানুষ, বাস্তবতা. রাজনীতি ও আচার অধিকার। আর বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জামানাতে জাগ্রত হলো মানুষের যাপিত জীবন, দাম্পত্য, প্রেম, ফ্রয়োডীয় যৌনতা, নগর নিবাস, বস্তুতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। তাই জীবনের চাহিদা এখন আর ভাবাবেগের নয় ভোগে বস্তুতে শরীরে সম্পদে। এমন দর্শন জাত উপন্যাসের নামই মানবজমিন। উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশ ১৯৮৮ সালে। আর পরের বছর ১৯৮৯ সালেই উপন্যাসটির ভাগ্যে জোটে ‘সাহিত্য আকাদমি পুরস্কার’।৩ ‘শ্রী শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণে তিনি আমাদের বিমুখ করেননি, তাও স্বীকার্য। তার শেষতম পরিচয় মানবজমিন নামক বিশাল উপন্যাসটি। অসংখ্য চরিত্র, ডালপালা ছাড়ানো কাহিনি অনেক ঘটনা তবু তারই মধ্যে জীবন-অন্বেষণের একমুখিতা ও একাগ্রতা অনুধাবন করা যায়’।৪ আধুনিক জীবনের বাস্তব উপলব্ধি কৃষিভিত্তিক সমাজ এবং পেশাভিত্তিক সমাজের নানা চালচিত্র উপন্যাসে উঠে এসেছে। যুদ্ধ, এপার-ওপার বাংলা, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, মধ্যবিত্ত মন, সা¤্রাজ্যবাদ, সমাজতন্ত্র, ফ্রয়োডীয় যৌনবাদ এবং নাগরিক চেতনার তাবৎ দ্বান্দ্বিক বিষয় জীবনের ওপর যেভাবে ক্রিয়াশীল তারই কাহিনি উপন্যাসে প্রধান্য পেয়েছে। ‘মানবজমিন’ অর্থাৎ মানব + জমিন = মানুষের ভূমি বা মানুষের আবাস বললেও ভুল হবেনা। ‘মানব’ শব্দটি মানুষের প্রতিশব্দ। যেমন মানবধর্ম, মানবসমাজ, মানবপ্রেম, মানবজাতি, মানবজন্ম ঠিক তেমনি মানবজমিন (শব্দ গঠন)। সেই জমিন হচ্ছে মাটির পৃথিবী। এই মানব আর পৃথিবী নিয়েই সৃজনশীল ভাবনার দ্বারা বলা হয়েছে মানবের জন্য মাটির পৃথিবী দানবের জন্য নয়। কিংবা ‘জগৎ জুড়িয়া একজাতি আছে, সে জাতির নাম ‘মানুষজাতি’৫ বা মানবজাতি। ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় জায়গাটা একটু বাড়িয়ে নিয়ে মানুষের সহঅবস্থানের নানারূপ লোভ, অতৃপ্তি এবং বাসনার ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রবৃত্তি থেকে পারিবারিক এবং পেশাগত প্রবৃত্তির মিল-অমিলের মনোবিকলন তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে বহুমানুষের সমাজবদ্ধতা উপন্যাসটির একটি বৈশিষ্ট্য। বাস্তবজীবনের বিস্তার শ্রেণিবিভক্ত জনজীবন এবং তার প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণ সাংবিধানিকভাবে (প্রচলিত বিধান) করা হলেও এর বিকাশ মুখিনতায় বাহুবলের বিকৃতি-বিশৃঙ্খলতা আছে। এমন সীমাহীন ভূগোলের হুবহু ইতিহাস গড়াই লেখক মনোযোগী না হয়ে মনোযোগী হয়েছেন মানবজমিনের শিল্পিত ভূগোল ধরে তাদের সংস্কৃতি তুলে ধরা। এই সংস্কৃতি নি¤œমধ্যবিত্ত সমাজের যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার গঠনের :

‘এই ঘরে এই বাড়িতে বাস করতে গিয়ে প্রতি মুহুর্তেই শ্রীনাথের মনে হয় সে পরের ঘরে বাস করছে। প্রতি মুহুর্তেই সে বোধ করে, এ বাড়ির দখল নিয়ে তারা ঠকাচ্ছে কাউকে। মল্লিনাথের বিষয়-সম্পত্তির দাবিদার আরো দুজন আছে। শ্রীনাথের ছোটো দুই ভাই দীপনাথ আর সোমনাথ’।৬

২. মল্লিনাথ চরিত্রটি মানবজমিন উপন্যাসের ভূস্বামী। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার কলকাতাতেই বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকুরি করা সৌখিন মানুষ। প্রকৃতিপ্রেমী গ্রামপ্রিয় এই মানুষটি কলকাতা থেকে একটু দূরে রতনপুর গ্রামে বসতি গড়েছে। যা উপন্যাসের কাহিনিভূমিতে প্রভাব রেখেছে। কলকাতা কেন্দ্রিক-শিক্ষা এবং কর্মের গোড়া মেনেই একজন চাকুরিজীবী চরিত্রের ভেতর গ্রামীণ ঐতিহ্যের টান লেখক এই উপন্যাসে তৈরি করেছেন। ক্যাপিটাল চরিত্র দাদা মল্লিনাথ সে লেখাপড়া শিখে গাড়ি ঘোড়ায় চড়েও আজ রতনপুরবাসী হয়ে জীবন উপভোগ করছে। সে গল্পের শুরু থেকেই মৃত চরিত্র হিসাবেই কেবল উদাহরণ হয়ে এসেছে। ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষিত মানুষদের ভেতর ইংরেজিপনার একটা আদিখ্যেতা ছিল। সেই আদিখ্যেতার নমুনা হচ্ছে বদভ্যাসের। এই বদভ্যাস ভোগবাদের নেশার। এই নেশা থ্রি ডাব্লু এর (ঃযৎবব ‘’ি) মদ, সম্পদ এবং নারীর। এসব নারী ঘরের নয় পরকীয়ার, বাইরের। ‘দাদা মল্লিনাথ ছিল মস্ত ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু একটু ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের দরুন এক চাকরি বেশীদিন করত না। তারপর একদিন খেয়ালের বশে মারকিনী কায়দায় ব্যঞ্চ বা খামার বাড়ি বানিয়ে চাষবাস করে একটা বিপ্লব ঘটানোর জন্য এইখানে চলে এল। উন্মার্গগামী ও অসম্ভব সু-পুরুষ মল্লিনাথকে ভালবাসত সবাই। সে বিবাহে বিশ^াসী ছিল না কিন্তু একটু হয়তো মেয়ে মানুষের দোষ ছিল। প্রচ- মদও খেত। খুব খাটত অনিয়ম করত শরীরের যতœ নিত না’।৭ এমন মানুষটিকে ধরে গল্পের ভেতর সামন্তপুঁজি তৈরি হয়েছে। এই পুঁজি সাংসারিক শক্তি বৃদ্ধির পুঁজি যা সম্পদ হয়ে তৃষার হাতে এসেছে। সম্পদ বা পুঁজি স্থায়ী হয়েছে বটে কিন্তু মল্লিনাথের ঠাঁই হয়নি গল্পের বেশি দূর। ফলে মালিক নেই সম্পদ রয়ে গেছে। আর এই সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়েই শরিকদের মধ্যে অর্ন্তদ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব মালিকের ভাইয়ের, ভাইয়ের স্ত্রীর, ভাইয়ের শ্যালকের এবং ভাইয়ের পুত্রের মধ্যে। শ্রীনাথের স্ত্রী তৃষা হচ্ছে মল্লিনাথের ভাইয়ের স্ত্রী। এই চরিত্রটি হচ্ছে গল্পের নেত্রী চরিত্র বা কাহিনির মুলধনী চরিত্রও বলা যায়। স্বামীর থেকে তার অর্থবল, জনবল, বুদ্ধিবল বেশি। শরীর এবং মন মিলিয়ে যে নারী, সেই নারীই হচ্ছে তৃষা। নারী শক্তির সাথে পুরুষতন্ত্র মিলে চরিত্রটি হয়েছে কৌশলী এক জাঁহাবাজ গৃহিণী। এই শক্তির ওপর ভর করে তৃষা তার ভাশুরের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে যার সুফল সে উত্তরাধিকার হয়ে ভোগ করছে। এমন শক্তিধর মহিলার প্রতি তার শ্রদ্ধা ভক্তি প্রেম জমেনি জমেছে ঘৃণা। এই ঘৃণার কারণ তার কর্তৃত্ববাদী মন এবং সম্পদের লিপ্সা। এই লিপ্সা এত প্রবল যে সেখানে সে কোনো বিরুদ্ধোবাদকে সহ্য করেনা। তবে সে তার স্বার্থের জন্যে সব রকম আপসরফা করতে রাজী থাকে। ‘দেহের শীতলতার জন্যই সে দেহের সতীত্ব সম্পর্কে উদাসীন। মল্লিনাথকে সে তাই বাধা দেয়নি। এমন কি দেহ দিয়ে মল্লিনাথকে খুব বেশী কিছু দেওয়া হয়েছে বলে কখনো ভাবেওনি সে’।৮ উপরন্তু সে অবিবাহিত মল্লিনাথকে আরও দিয়েছিল সেবা, সঙ্গ, আনন্দ। সে কারনেই মল্লিনাথ তার দয়ায় শেষ জীবনটা নিরুপদ্রব ভাবেই কাটিয়ে গেছে। তাই মল্লিনাথের বিষয় সম্পত্তি ভোগ করতে তৃষার আজ আর কোনো সংকোচ নেই। সে মল্লিনাথের সাথে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে জেনে গেছে সেই তার একমাত্র আপনার এবং কাছের মানুষ।

৩. পারিবারিক জীবনের এই বিষয় আশায় এবং উত্তরাধিকারের নানা প্রশ্নে গল্পের ভেতর অনেক চরিত্রের উপস্থিতি ঘটেছে। এই গল্পের মহাসড়কের সাথে ফাস্ট ইলেভেনের চরিত্রগুলি হচ্ছে মল্লিনাথ, তৃষা, শ্রীনাথ, সোমনাথ, শমিতা, দীপনাথ, দিলু, সজল, নিতাই, দীননাথ, সরিৎ। এরা বলতে গেলে সবাই একই সম্পত্তি এবং সম্পর্কের সাথী। সেক্ষেত্রে মূল কাহিনির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তৃষার হাতে। তৃষা উত্তরাধিকার সূত্রে কলকাতার উপ-শহরের এই রতনপুরের ঘরবাড়ি, জমি-জিরাত, খামার, পুকুর, গাছপালা, বাগান সবকিছুর মালিকানা ঠিকঠাক বুঝে নিয়ে সংসার চালাচ্ছে একহাতে। এ কারনেই তৃষা আজ পরিচিত হচ্ছে সাহসী, জাঁহাবাজ নারী হিসেবে। স্বামী শ্রীনাথ নীরব ভীতু স্ত্রৈণ চরিত্র। তৃষাকে সে ভয় এবং ঘৃণা করে বলে, এড়িয়ে চলে। তাই ছোট ভাই সোমনাথ যখন তৃষার কাছে সম্পত্তির দাবি তুলে তখন শ্রীনাথ দূরে সরে যায়। তৃষার কাছে সম্পত্তির সকল দাবি অগ্রাহ্য হয় সে সব সময় ভেবে থাকে এই সম্পদ তার কষ্টে অর্জিত। শ্রীনাথ তার দাম্পত্য জীবনে বড় একা। সে তৃষার কাছে স্বামীত্বের দাবি নিয়ে প্রাকৃতিক কাজে এগুতে পারে না। তাই মনের দুঃখ মনে এবং যৌনজীবনের চাহিদা সে কলকাতায় বেশ্যাপাড়ায় দীনার কাছে পূরণ করে। কলকাতায় প্রুফরিডারের চাকরি, সকাল-বিকাল অফিস এর মধ্যে জীবনের চাহিদা ধরে নিষিদ্ধ পল্লীতে সন্ধ্যার আঁধারে যাওয়া আসা তার। ‘যতবার বেশ্যাপাড়ায় গেছে ততবার ফিরে এসে ¯œান করতেই হয়েছে তাকে। নইলে ভারী খিতখিত করে’।৯ স্ত্রীর প্রতি তার ভয় আছে কিন্তু শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা নেই। সম্মুখে তার ভয় যতই থাকুকনা কেনো তার দৃষ্টির আড়ালে শ্রীনাথ এভাবেই স্ত্রীর প্রতি প্রতিশোধ নেই। এই প্রতিশোধ একজন স্বামীর যে স্বামী একসময় স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতাতে নি¤œমধ্যবিত্তের কষ্টের মধ্যে থেকেছে তারই। এই স্বাভাবিক সাধারণ জীবনের মধ্যে যে দাম্পত্যের শান্তি ছিল তা ফেলে তৃষা যখন তার লোভ নিয়ে দাদা মল্লিনাথের বাড়ি চলে আসে তখনই শ্রীনাথের সাথে তৃষার সম্পর্কে চিড় ধরে। তৃষা মল্লিনাথের বাড়ির অন্দরমহলের সকল দায়িত্ব নিয়ে যে সুখ অনুভব করেছে তাই-ই তার নারীত্বের অসম্মান বলে শ্রীনাথ ভেবেছে। শুধু স্বামীর কাছেই বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে তা নয়। ওই বাড়ির চাকর-বাকর নিতাই পর্যন্ত জানতে বাকি ছিলনা যে বড় বাবু অর্থাৎ মল্লিনাথের ঘরে রাতে তৃষা বউদির অবাধ যতায়াত ছিল। এই ঘটনাগুলি গত সময়ের হলেও তা এখন নতুন করে মল্লিনাথের অনুপস্থিতিতে শ্রীনাথের মধ্যে ক্রিয়া করছে দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। ‘শ্রীনাথ ভাবে, স্ত্রী বা মেয়ে মানুষের ওর অধিকারবোধটা ভুলে যেতে পারলে পৃথিবীটা কি আরো একটু সুন্দর হয়? কুকুর, বেড়াল, পাখি, পতঙ্গের তো বউ থাকে না। ওরকম হলেই কি ‘ভাল’? তা হলে সজল কার ছেলে, তার বউ কার সঙ্গে শুয়েছে না শুয়েছে এসব বাজে চিন্তায় আর কষ্ট পেতে হয় না’।১০ এই কষ্ট নিজের দাদা আর নিজের স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্কের কষ্ট। তাই শ্রীনাথ অব্যক্ত যন্ত্রনা নিয়ে নীরব ভাবেই জীবন-যাপন করে চলেছে। প্রুফরিডারের কাজ শখ বলতে ঐ একটি বাগানের পরিচর্যা করা আর মাঝে মাঝে ফাঁক বুঝে বেশ্যাপাড়া প্রাকৃতিক কাজ সম্পন্ন করে আসা। তা’হলে গল্পের ভেতর মানুষগুলে সমাজের ওপর বাস করলেও তারা সুযোগ পেয়ে আঁধারের পথে নষ্ট কাজও করেছে। এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের চরিত্রের পতন বা পরকীয়া দেখানো হয়েছে। অথচ সমাজে শ্রীনাথ দাদা, স্বামী, বাবা, ভাশুর এবং চাকুরিজীবী মানুষ। আবার তৃষা চরিত্রটিও তেমনি স্ত্রী, বউদি, জা, মা, বোন এবং নিতাইয়ের কর্তা মা। তারপরও নারী বলেই তৃষার চরিত্র নিয়ে যত সমালোচনা ততখানি শ্রীনাথের ওপর আসেনি। আসলে ঘটে যাওয়া ঘটনার উত্তর-পর্বের কাহিনিতে তৃষা এখন এসবের উর্ধ্বে। সে এখন এই বিশাল বাড়ি আর সম্পদের মালিক। তার ব্যাপারে সম্মুখে বা পিছনে কথা বলার সাহস কারো নেই। তবে সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে শ্রীনাথ দীপনাথ কথা না বললেও কথা বলে চলেছে সোমনাথ এবং তার স্ত্রী শমিতা। দেবর সোমনাথের এ দাবি তৃষার কাছে অগ্রাহ্য হয়। তারপরও সোমনাথ নাছোড় হলে তৃষা তার লোকজন দিয়ে তাকে পিটুনি দেয়। ‘সোমনাথ মার খেয়ে ফিরে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই দাদার সম্পত্তির ভাগ দাবি করে মামলা ঠুকেছে। সেই মামলাও একা চালাচ্ছে তৃষা’।১১ এই সংসার চালাতে তৃষা শক্তি পায় বুদ্ধি পায় কিন্তু শ্রীনাথ সংসারের ভেতর দুর্বল এবং অখুশি মানুষ। এমন দুর্বলতা তার ভেতর তৈরি হয়েছে স্ত্রীর দ্বিচারিতার কারণে। নিজ দাদার সাথে যে স্ত্রী স্বামীর ঘর করার মতো থেকেছে-তারই সংসারে এখন সে কোন অধিকারে স্বাভাবিক জীবন যাপন করবে? তাই স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা বিশ^াস, শরীর, অর্থ কোন কিছুতেই তার টান নেই। শীতের রাত কলকাতা থেকে ফিরে আজকাল রাতেই শ্রীনাথ জল গরম করে স্লান করে। প্রায় রাতে স্লান করাতে তৃষার মনে সন্দেহ হয়, সে স্ত্রীর দাবি নিয়ে ভাবতে থাকে দাম্পত্যের কথা। যে দাম্পত্যের সম্পর্কে যৌনতা থাকে, শরীর এবং অভ্যাস থাকে। হঠাৎ করেই তৃষা ভাবে এমন অভ্যেস তো অনেকদিন ধরেই নেই, তবে শ্রীনাথের এই নিষ্ফলা জীবনে জল দিচ্ছে কে? তাতেই কি তার এত বিমুখতা এমন ভাবনাতে আজ সে ঈর্ষান্বিত হয় এবং রাত ভারী হলে শ্রীনাথের ঘরে চলে আসে :

তৃষা বসা স্বরে ফিস ফিস করে বলল, আজ নাও। দিতে এসেছি। অভিমান কোরো না, মুখ ফিরিয়ে থেকো না। লক্ষ্মীটি। …পুরুষকে জাগিয়ে তোলার যতরকম মুদ্রা তা প্রয়োগ করে যায় সে। টর্চ জ্বেলে পরীক্ষা করে তাকে তারপর গভীর এক শ্বাস ফেলে তাকে ছেড়ে দেয়। শ্রীনাথ উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে থাকে ঘেন্নায়। তৃষা জানল, সে আজ অন্য মেয়ে মানুষের কাছে গিয়েছিল।১২

৪.  এই হচ্ছে নারী পুরুষের দাম্পত্য জীবনের চিড় বা ফাটল। তবে তৃষা চরিত্রের এমন বাঘিনীরূপ রক্তের স্বাদ পাওয়ার মতোই মনে হয়েছে। তৃষা অতীত জীবনে এমন ছিল না। যখন দারিদ্র ছিল তখন মেয়ে চিত্রা জন্মেছিল। চরিত্রের সেই সংকীর্ণ সংসার থেকে মেয়েকে মানুষ করার জন্যে এলাহাবাদে মাসির বাড়ি মেয়েটিকে পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেখানেই মেয়ে চিত্রালেখা বড় হয়। সেই মেয়ের বিয়েতে তৃষা গেলেও শ্রীনাথ যায়নি। ছেলে সজল রতনপুরে বাড়িতেই বড় হচ্ছে তবে তার বড় হওয়ার মধ্যেও নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। সে প্রথম দিকে যেমন বাবাকে অমান্য করত এখন করে তার মা’কে। মা-বাবার চারিত্রিক ত্রুটি তাকে ক্রামান্বয়ে অবাধ্য করে তুলেছে। এখন বড় হবার পর ছেলেটি নিজেই বাবার কাছে এসে তার মায়ের আচরণের সমালোচনা করে। তৃষা এটা জানার পর খুবই মর্মাহত হয়। যার জন্যে তৃষা এই সম্পদ সম্পত্তি করেছে সেই যদি আজ তার বিরুদ্ধে চলে যায় তাহলে সে এখন কোথায় যাবে! কেবল দেবর দীপনাথই বউদি তৃষার বেশ ভক্ত। এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে তৃষা তার এক ভাইকে সম্পত্তি দেখভাল করার জন্যে বাড়ি এনেছে। তৃষার ভাই সরিৎ, সে খুব একটা সুবিধের লোক নয়। তাই তৃষা কেবল দীপনাথকে পছন্দ করে। দীপনাথ ছাত্র-রাজনীতি করা দেবর। সে বর্তমানে চাকুরিজীবী। এই দেবরই বউদির ওপর আস্থা রাখতে পারে। কারণ সে বউদিকে দায়িত্বশীল এবং বুদ্ধিমতি মনে করে। দীপনাথ তার বসের বউ মণিদীপকে রতনপুর গাড়ী করে নিয়ে আসে। এই রতনপুরই তৃষা বউদির বাড়ি। তৃষা বউদির সম্পর্কে যে কথা চাউর আছে তাতে তার আতিথিয়তা সবার জন্য প্রযোজ্য না হলেও দীপনাথের জন্য বউদির আন্তরিকতার অভাব নেই। ‘তৃষা দারুণ সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে কিমা রান্না করছিল। দুটো বিশাল চোখে ফিরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, অন্যের বউ নিয়ে টানাটানি না করে নিজে একটা বউ জুটিয়ে নিলেই তো হয়’।১৩ বউদি বলেই এমন কথা বলার অধিকার তৃষার রয়েছে। মণিদীপা সারাদিন বাড়িটার চারপাশ ঘুরে ঘুরে সময় কাটিয়ে নেয়। এরই মাঝে মণিদীপা কতকগুলো সাধারণ মানুষ জুটিয়ে তাদের কমিনিউজম বুঝিয়ে দেয়। অর্থাৎ এই উপন্যাসের যারা প্রধান চরিত্র বলে উল্লিখিত হয়েছে তাদের সহযোগী চরিত্রগুলো সামাজিক কারণেই তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে। ফাস্ট ইলেভেনের চরিত্রগুলো বেশিরভাগই একই রক্তের একই পরিবারের। এদের মূল্যায়নে সামাজিক প্রয়োজনে কাহিনির প্রয়োজনে চরিত্রের সাথে চরিত্রের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মণিদীপা, দীপনাথের প্রয়োজনে কাহিনিতে ভূমিকা রেখেছে। তার একটি সাধারণ পরিচয় হচ্ছে সে দীপনাথের বস, বুধোর স্ত্রী। কিন্তু তার চরিত্রের মধ্যে অসাধারণ রাজনীতির একটি অভ্যাস রয়েছে। সেই অভ্যাস সমাজ মানুষের বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার। তবে এই বিশ^াসের নৈতিক গণভিত্তিতে অগ্রগতি হতাসাব্যঞ্জক। মণিদীপার স্বামী বুধোদা এই রাজনীতির পক্ষে থেকেও এখন সে একজন উচ্চবিত্তের মানুষ। মণিদীপা চরিত্রটি এই মানুষটির কোম্পানির সাথে যুক্ত হয়েও মাটি ও মানুষের স্বার্থে বিপরীত এবং আলাদা। তবে একই অফিসে কাজ করার সুবাদে মণিদীপার সাথে নুতন করে দীপনাথের একটা আদর্শিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মণিদীপা স্বামীর ভোগবাদী মানসিকতার পীড়ন থেকে নিস্তার পেতে দীপনাথের আশ্রয় প্রত্যাশী। বিবাহিত নারী মণিদীপা তাই দীপনাথের সাথে অবাধ বিচরণ যেন পরকীয়ারই আচরণ। ‘দীপনাথ ভেবেছিল, মণিদীপা নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাটেই নিয়ে যাচ্ছে তাকে কিন্তু তা নয়। খিদিরপুরের খিঞ্চি ও নোংরা পাড়ায় একটা দু’নম্বর চেহারার রেস্টুুরেন্টের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে মনিদীপা নামল।১৪ এখানেই সে মাঝে মাঝে এসে খাওয়া দাওয়া করে যায়। দাম্পত্য জীবনের ফাটল নিয়ে স্বামীর সাথে মণিদীপার যে সম্পর্ক তা দীপনাথকে ভাবিয়েছে। বস বুধোদা বড় সম্পদশালী হলেও স্ত্রী মণিদীপার সাথে তার সম্পর্ক বহু পূর্বে থেকেই খারাপ রয়েছে। সে কারণেই বুধোদা এখন অন্য নারীতেও আসক্ত। মণিদীপা তারই প্রতিশোধ নিতে দীপনাথকে কবজা করতে চাইছে। বিশাল এই গল্প কাহিনির দু’টি চরিত্র বেশ সাধারণ এবং জীবনমুখী এক মণিদীপা দুই নিতাই। এই চরিত্র দু’টির মাধ্যমে তৎকালীন সমাজের নীচু তলার মানুষদের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। ‘এদের জাত-টাত নেই। সব একাকার এক রকম। দরিদ্র, লোভী, ক্ষুধার্ত, হিং¯্র এবং ক্রুদ্ধ। সেই সঙ্গে ওপর তলার লোক সম্পর্কে সন্দিহান, দ্বিধাগ্রস্ত এবং ভীতু। …এমনি/ ভাল লাগে। পাবলিক রিলেশন? আই লাইক দিজ মেন। আই লাইক দিজ এনভারনমেন্ট।’১৫

৫. এই হচ্ছে মণিদীপার মানসিকতা। এই মানসিকতার সাথে নব্য বিকশিত সমাজের পার্থক্য মণিদীপাকে কষ্ট দেয়। সে কারণেই স্বামীর সাথে হচ্ছেনা হচ্ছে না ¯িœগ্ধদেবের সাথে এমন কি দীপনাথের সাথেও না। বাম রাজনীতির নেতা ¯িœগ্ধদেব এখন আমেরিকায় বসে মণিদীপার কাছে পত্র লেখে। হতাশার পত্র নিরুৎসাহিত করার পত্র। ‘ভারত বর্ষের প্রোলেতারিয়েতদের চরিত্র আলাদা। তাদের দিয়ে কিছুই হওয়ার নয়। এত অপদার্থ এলিমেন্ট পৃথিবীর কোথাও নেই। প্রতি তিনজন ভারতবাসীর একজন চোর, অন্যজন অলস, তৃতীয় জন কাপুরুষ। আরো লিখেছে, ভারতবর্ষে বিপ্লবী আর এ্যান্টিসোস্যালদের মধ্যে তফাত প্রায় নেই-ই।’১৬ নেতার এমন পত্র মণিদীপাকে তার কাজ থেকে বিরত করতে পারেনা। তার বিশ^াস এবং আশাতে হতাশাবাদের স্থান নেই। সে দেশের গ-ির মধ্যে থেকেও যতটুকু সম্ভব মানুষের সমাজের কাছের হয়ে থাকতে চায়। তবে জীবনসঙ্গী বাছায়ে তার ইচ্ছার বাস্তবায়ন হয়নি। এটিই তার দাম্পত্য জীবনের ব্যর্থতা। স্বামীও পরকীয়াপ্রীতির মানুষ বলে তার প্রতিও অনাস্থা, ঘৃণা সমান সমান রয়েছে। দীপনাথ এই উপন্যাসের নায়ক চরিত্র। তার ভেতর নানারকম দোষগুণের মিশ্রণ ঘটলেও চরিত্রটি উপন্যাসের সকল চরিত্র থেকে বুদ্ধিদীপ্ত, রুচিশীল ব্যালেন্স চরিত্র। সে উপন্যাসের মূল একাদশেরই চরিত্র। পরিবারের আত্মসমালোচনা থেকে শুরু করে সকল চরিত্রকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রেও একটা ভূমিকা রেখেছে। একজন ব্যাচেলর পুরুষ, বিয়েতে তার আগ্রহ নেই। তবে সকল দিকের সম্পর্ক রক্ষায় তার জুড়ি পাওয়া ভার। গল্পে চরিত্রটি ভেতর বাইরে একই রকম অবস্থান নিয়ে বিকশিত হলেও তার হতাশা কখনো কাহিনিকে আক্রান্ত করেনি। সে গল্পের প্রায় নারী চরিত্রের সাথে মিশলেও শেষপর্যন্ত সে তার তৃষা বউদিরই প্রশংসা করেছে। তার দাদা শ্রীনাথ স্ত্রী তৃষাকে ‘লেডী ম্যাকবেথ’১৭ বললেও দীপনাথ এর উত্তরে বলেছে ‘তবু বউদি তার কর্তব্য করে গেছে। এ বাড়ির দরজা এখনো আমাদের মুখের উপর বন্ধ করে দেয়নি। বাবাকে আমরা কোনো ভাই-ই দেখিনি। বউদি দেখেছে’।১৮ কাহিনির নায়ক চরিত্রের এমন প্রশংসা চরিত্রটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই এই তৃষা চরিত্রটি মানবজমিন উপন্যাসের ফাস্ট ইলেভেনের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার সাথে অপরূপর চরিত্রগুলো পারিবারিক ভাবে যুক্ত। তার একমাত্র ননদ চরিত্র বিলু সম্পর্কে তার উক্তি ‘বিলু কোনোকালেই সংসারী ছিল না। একটু উড়ু উড়ু উদাসীন মেয়ে। কুমারী অবস্থায় অনেক জল ঘোলা করেছে। তৃষা কানাঘুষা শোনে এখনো নাকি একজন পুরুষবন্ধুর সাথে গোপন সম্পর্ক রাখে’।১৯ তৃষা বিবাহিত ননদের দাম্পত্য সমস্যার কথা শুনে পূর্বের এই কথাটি মিলিয়ে নেয় বিলু এবং প্রীতমের দাম্পত্য জীবন নিয়ে কাহিনির ভেতর একটি শাখা কাহিনি গড়ে উঠেছে। এই কাহিনির সাথে যুক্ত-প্রীতম, বিলুু, অরুণ, অচলা, লাবু, শতম, বীথি, সুখেন এবং দীপনাথ এরাই চরিত্র। এখানে প্রীতম বিলুর স্বামী সে দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত অসুস্থ। তাদের দাম্পত্যের ফসল একটি মেয়ে লাবু। বিলু অফিসে কাজ করে বলে প্রীতমের সেবায় কমতি হয়। অরুণ বিলুর পূর্বের পরিচিত প্রেমিক। দুজনের মধ্যে এখনও যা হয় তা পরকীয়া। প্রীতম অসুস্থ হলেও স্ত্রীকে এমনটা সন্দেহ করে। প্রীতম এ কারণে বিলুর প্রতি উদাসীন। প্রীতমের বন্ধু দীপনাথ। দীপনাথ বিলুকে প্রীতমের প্রতি যতœশীল হতেও পরামর্শ দেয়। অচলা বাড়িতে কাজের মেয়ে। প্রীতমের ভেতর ক্রমশ, হতাশা বাড়তে বাড়তে সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। একথা জেনে সহোদর শতম শিলিগুড়ি থেকে ভাইকে বাড়িতে নিতে আসে। শিলিগুড়িতে প্রীতমের বাবা মা থাকে। প্রীতম শতমের সাথে চলে গেলে। বিলুর ভেতর ডিপ্রেশন এবং আবেগ তৈরি হয়। সে তখন ছুটে যায় অরুণের কাছে। ‘অপ্রতিরোধ্য অরুণকে ঠেকাবে কি করে বিলু? কে জানে। ইচ্ছে অনিচ্ছের মাঝামাঝি দোল খায় বিলু। আর সেই দ্বিধায় রন্ধ্রপথে অরুণ তার পথ করে নেয়। সেই সাজানো সুন্দর ঈর্ষণীয় তিন ঘরের ফাঁকা পড়ে থাকা ফ্ল্যাটে নিজেকে বিসর্জন দেয় বিলু’।২০ গল্পে এই কাজটি হবার পর আর বিলু অরুণের মাখামাখি দেখা যায়নি। বরং এরপর আবার বিলু নিজেকে শুধরে নিয়ে প্রীতমের কাছে শিলিগুড়ি চলে যায়। এই শিলিগুড়িতে বোন বিলুর সম্পর্ক উন্নয়নে দীপনাথও সেখানে যায়। দীপনাথ সেখানে গিয়ে তার পুরাতন প্রেমিক বীথি এবং সুখেনকে খুঁজে পায়।

৬. এখান থেকেই আবার গল্পের দ্বিতীয় শাখা কাহিনির বিস্তার ঘটে। এই কাহিনির মূল চরিত্র দীপনাথ। দীপনাথ প্রসঙ্গে তার ছাত্রজীবনের ঘটনা এখানে চলে আসে। চরিত্রটি ছাত্র অবস্থা থেকেই আকর্ষণীয় সে মেয়েদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল। ‘মেয়েটির  নাম বকুল। মেয়েটিকে প্রায় ভিখিরি করে ছেড়ে দিয়েছিল দীপনাথ। আর তখনই তাকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছিল’।২১ এই ভালোবাসাও টেকেনি ছাড়তে হয়েছিল। দীপনাথ ছাত্রবেলা থেকেই পার্টি-পলিটিক্স করা ছেলে তার সাথে মেয়েদের সম্পর্ক হলেও একই ভাবে তা সময়ের হয়ে রয়েছে। এমন একটি সম্পর্কের চরিত্র বীথি। ‘একটা দীর্ঘ শ^াস ফেলল দীপনাথ। বীথি তাকে দেহ দিয়েছিল। তার জীবনের প্রথম নষ্ট মেয়ে মানুষ। এরই সঙ্গে তার জীবনের প্রথম আনন্দ’।২২ এই বীথি এখন তারই বন্ধু সুখেনের বিয়ে করা বউ। এসব এক সময়ের স্মৃতিকথা এখন তা নষ্ট্যালজিক ভাবনা। দীপনাথ তার চরিত্রে বদল এনেছে সে এখন বড় চাকুরিজীবী এক ভদ্র মানুষ। বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতায় সে মণিদীপার স্বামীর কোম্পানিতে বিশ^স্ত চাকুরে। মণিদীপার স্বামী বুধোদা বস। সেও এক সময় সাধারণ মানুষ নিয়ে রাজনীতি করেছে। সেই সুবাদেই মণিদীপার সাথে তার বিয়ে হয়। বর্তমানে এই বিয়ে আর টিকছেনা। মণিদীপা দীপনাথকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করেই চলেছে। কিন্তু মণিদীপা তার বসের স্ত্রী বলেই দীপনাথ শেষপর্যন্ত পিছু হটে। আর এই পিছু হটা বিষয়টি মণিদীপাকে হতাশ করে না কষ্টও দেয়না। বরং সে আবার সাহসী হয়ে পূর্বের ন্যায় গণসংযোগ তৈরি করতে থাকে। মণিদীপা সে কারণেই এই উপন্যাসের শিক্ষিত একটি আশাবাদী নারী চরিত্র। দীপনাথ প্রতিভাধর উচ্চাভিলাসী চরিত্র বলেই কর্মক্ষেত্রে তার সাফল্য রয়েছে। এই সাফল্যের কারণেই সে এখন আমেরিকা যাবার সুযোগ পেয়েছে। তার চোখেমুখে এ আনন্দ পরিস্ফুটিত হলেও সে কাহিনির শেষধাপে এসে স্মৃতিকাতরতায় নিমগ্ন হয়েছে। ‘এই দেশের সীমা আগে কখনো ডিঙ্গোয়নি দীপনাথ। এখন ডিঙ্গোতে চলেছে। এখানে তার কোনো পিছুটানও নেই তবু বুকের মধ্যে এক একটা পাক দেয় মাঝে মাঝে’।২৩ তার পরিবারের কথাও মনে হয় যে পরিবারটির ঐতিহ্য বেশি গৌরবেরও নয়। ‘একজন পাগল, একজন স্বার্থপর আর একজন দ্বি-চারিণী। এদের পাশে নিজেকেও দাঁড় করাল সে। নিজেও কি সে ভাল? বীথির কথা মনে নেই’?২৪ সুতরাং তার তিন ভাই বোনের পাশে নিজেকেও দিব্যি মানিয়ে যেতে দেখল সে। তারপর গল্পের ভেতরই  দীপনাথ তৃষা বউদির রতনপুরের সম্পত্তির অশুভরূপের বর্ণনা দেয়, যেটি এই পরিবারের জন্য কল্যাণকর না হয়ে তা হয়েছে অভিশাপ আর বিষবৃক্ষের এক ‘মানবজমিন’। যেখানে ভোগে ভাগে স্বার্থপরতায় মানুষ কেবলি নষ্টের কষ্টে কাতর।

তথ্যনির্দেশ

১. লালন : গান।

২. রামপ্রসাদ সেন : গান।

৩. শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় : ভূমিকা, মানবজমিন ।

৪. অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় : কালের প্রতিমা।

৫. সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত : কবিতা।

৬. শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের : মানবজমিন। [২৪ পর্যন্ত সকল উদ্ধৃতি এই গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।]

*******************************************

রবিশংকর বল–তাঁর উপন্যাস
পারমিতা চৌধুরী

লেখা সবসময় সমাজের বিপরীতে দাঁড়ানো। কোনও সমাজই ব্যক্তিকে তার স্বপ্নে-আকাক্সক্ষায়-স্বাধীনতায় গ্রহণ করতে পারে না। লেখককে তাই সমাজের বিরোধিতায় নিজের লেখাকে দাঁড় করাতে হয়। তবুও ব্যক্তি-সমাজের মধ্যেই বাঁচে। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে সমাজ সচতেন লিখিয়ে হতে না চাইলেও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই যায়। সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই সমাজের বিপ্রতীপ অভিক্ষেপে গড়ে ওঠে রবিশংকর বল (১৯৬২-২০১৭)র একের পর এক উপন্যাসÑ ‘স্বপ্নযুগ’ (১৯৯০), ‘তিমিরের হার্লেম’ (২০০১), ‘মধ্যরাত্রির জীবনী’ (২০০৪), ‘দোজখনামা’ (২০১০), ‘ছায়াপুতুলের খেলা’, ‘আয়নাজীবন’, ‘জন্মযান’ (২০১৫) ইত্যাদি।

দার্শনিকতা, ঐতিহাসিকতা, সামাজিকতা এবং শৈল্পিকতার সমস্ত নির্যাসটুকু নিজের মতো করে আত্মস্থ করে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে স্বীকার করেছেন রবিশংকর বল। নিরবচ্ছিন্ন ক্রোধ, অভিমান, একাকিত্ব সবটুকু নিয়ে নিজের মধ্যে নীলকণ্ঠরূপে সমাজের সমস্তটুকু বিষয়ে ধারণ করে ম্যাজিশিয়ানের মতো এই সমাজটাকে আদ্যন্ত এক নতুন রূপে দেখতে চেয়েছেন তিনি। সেই সমাজে প্রেম আছে, আছে জীবনের প্রতি আসক্তি। আছে মরণের জন্য আশঙ্কা। তবু সব ছাপিয়ে আছে একটা ম্যাজিক্যাল টাচ্। প্লেটোর ‘এ্যালিগরি অফ শ্যাডো’তে গুহায় শেকলে বাঁধা বন্দিরা সামনের দেয়ালে নানা অবয়ব দেখতে পেতো। তাদের পেছনে থাকতো জ্বলন্ত আগুনের কু-। যা এই ছায়াগুলো তৈরি করতো। এই নানারকম ছায়াগুলোই তারা সত্যি মনে করতো। এটাই তাদের কাছে বাস্তব। এই ছদ্ম-বাস্তবকেই একজন প্রকৃত লেখক ভাঙতে চান। চোখের সামনে দেখা ছায়াগুলো আসলে সত্যি তবু সত্যি নয়। তাদের উন্মোচনের মাধ্যমে বাস্তবের পটে স্থাপন করা হয়। ‘ছায়াপুতুলের খেলা’ উপন্যাসটি ২০১৬ সালে লেখা ১৮৩ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস। যার মধ্যে এই ছায়াপুতুলগুলোকে উন্মোচনের চেষ্টা, প্রতিটি চরিত্রকে নতুন করে জীবনের পাঠ দেওয়ার চেষ্টা।

উপন্যাসটির শেষটুকু আরম্ভের সঙ্গে মিশে গেছে সহজেই। এখানেই উপন্যাসটির অভিনব গঠন কৌশল।  ফর্ম ভাঙার শুরু। উপন্যাসটির সূচনাÑ ‘এখানে সমুদ্র নেই। তবু নানারকম হাওয়া কোথা থেকে আসে?’ সত্যিই তো এই তরঙ্গ আসলে জীবনের। বিচিত্র জীবন প্রবাহে ভেসে চলেছে প্রতিটি মানুষ। ঘর এবং বাহির এই দুই আপাত বিষম অবস্থানের সংযোগস্থল হল চৌকাঠ। যেখানে অনন্তকাল ধরে বসে থাকে মানুষ। কখনো সে জীবনের চারাচরে কোনো একটাকে বেছে নিতে পারে না। দুটোর প্রতিই তার তীব্র আকর্ষণ। এই দ্বিচারিতার দ্বন্দ্বে তার মানিয়ে নেয়ার শুরু। প্রতিবাদের নিস্পৃহতা। একদিকে চৈতন্য অন্যদিকে মগ্ন-চৈতন্য মাঝখানে স্বপ্নের বিছানা। তাই জীবনানন্দের মতো বাস্তব ও পরাবাস্তবতার দোলাচলে জীবনকে অবস্থান করিয়েছেন লেখক। বিড়ালের বর্ণ কালো কিন্তু চোখ গভীর সবুজ। যা আসলে জীবনের গতিকে নির্দেশ করে। একই সঙ্গে নির্দেশ করে স্বপ্নহীনতা বন্ধ্যা সময় ও স্বপ্নের আবিলতা।

উপন্যাসটির সূচনা লেখকের ফ্ল্যাশব্যাকের মধ্য দিয়ে। যেখানে একদিকে পিতা ও পিতৃকুল অন্যদিকে মাতা ও মাতৃকুল। বাবাকে নিয়ে লেখক পুরনো বাড়িতে যান। সেখানে তাদের বাসস্থান। ছোটোবেলার স্মৃতি। ঠাকুমা দাদু। উদ্বাস্তু প্রসঙ্গ। কিন্তু বড় অদ্ভুতভাবে জীবনের মূলছবিতে তিনি মিশিয়ে দেন যাদুবাস্তবতার রঙিন বর্ণালীম্পন। যেখানে এক বাস্তবের মধ্যে ঢুকে যায় অপর বাস্তব। এক স্মৃতির জন্মে খেলা করে অন্য জন্মের বৃত্তান্ত। সমস্ত জন্মের কতো রঙিন রঙিন মুখ স্বপ্নে সেজে ওঠে পিতৃবাসের ‘তসবির মহল’।

একের পর এক ফ্ল্যাশব্যাকে লেখক বর্তমান ও অতীতের পট পরিবর্তন করেন বারবার। মায়ের বাড়ির বিলাসিতার পাশে বাবার বসতির মহাস্থান প্রমাণ করে লেখকের দ্বিধা জড়ানো জীবনের অস্থিরতা। জার্মানি থেকে আনা ক্লক, হিরের আংটি, অনেক অনেক ময়ূর ঘুরে বেড়ানোর প্রসঙ্গ লেখকের মাতৃকুলের বনেদিয়ানাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসে সহজেই। ঘড়ির পে-ুলামের মতোই স্মৃতিকথার ভেতরে চৈতন্যের অতলে মগ্ন চৈতন্যের আঁধার। যার একটার পর একটা দরজা পেরিয়ে আসতে হয় বর্তমানের বাস্তবালকে। ‘স্মৃতি বড়ো প্রতারক, মায়া’ এই মায়ায় তো অচৈতন্যের অন্ধকারে মগ্নচৈতন্যের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

স্মৃতিচারণায় উঠে আসে বেলজিয়ামের কাচের আয়নার কথা। গ্রীষ্মের দুপুরের আলোয় ঝকঝকে সরোবর। যে আয়নায় আচ্ছন্নতা সেই শিশু বয়স থেকে আজও লেখককে পরাবাস্তবতার ঘোর থেকে মুক্ত করতে পারে না। দশফুট উঁচু এই আয়না নিলামে কিনেছিলেন তার মায়ের দাদু। আয়নার ভেতর দিয়ে অনেক পায়রা ওড়ার, ঘুড়ির কাটাকুটি খেলার, ছাদের আলসেয় হারমোনিয়ামের কতো যে ছবি দেখতে পেতেন এই উপন্যাসের কথক। পরাবাস্তবের যে পৃথিবী আয়নার ভেতর প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করে অহরহ। আয়নার মধ্যে দেখা বাস্তব তো আসলে ছদ্ম বাস্তব, পরাবাস্তব। জীবনের বর্তমান ছবি এই পরাবাস্তবের হাত ধরে অতীতে ফিরে যায় আবার অতীত ছুঁয়ে ফিরে আসে বর্তমানে। এই আসা যাওয়া পথের হিসেব মেলানো যায় না। বংশ গৌরব একদিন ম্লান হয়ে আসে ধূসর ছবির বিবর্ণ প্রতিচ্ছবিতে। যা ছিলো তা থাকলেও সেই থাকায় আর কোনো ঔজ্জ্বল্যতা থাকে না। মনের জগতে তার নিত্য বিচরণ। মরা ময়ূরও তখন জ্যান্ত হয়ে ওঠে। এই তো মগ্নচৈতন্যে জেগে ওঠা পরাবাস্তব যার হাত ধরে লেখক রবিশংকর বল ক্রমান্বয়ে অতীত ও বর্তমানের চাঁদোয়া বুনে চলেন। মগ্নচৈতন্য অন্ধকার আর সেই অন্ধকারে ভেসে আসে একের পর এক ছায়ার প্রতিবিম্ব। ছায়াপুতুলের খেলা চলতে থাকে অহরহ। চৈতন্যের মগ্নশিষে সেই পরাবাস্তব আছে বলেই চেতনার উজ্জ্বল আলোকমালায় জীবন আনন্দ খুঁজে নেয়। অচেতনের অন্ধকার যদি থাকতো শুধু তাহলে স্বপ্নের কুহক থাকতো না। থাকতো না বাস্তবকে অপর বাস্তবে খুঁজে পাওয়া। গল্পকথক এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন খুব সুন্দর করে। প্রত্যেকটি শিল্পের জন্য এই কল্পনার অত্যন্ত প্রয়োজন। ইমাজিনেশন অর্থাৎ ইমেজ তৈরীর অসাধারণত্ব। যা মগ্নচৈতন্যের বাস্তবে লীন হয়ে থাকে। তাকে আনার জন্য সাধনা দরকার :

অনেক পরে আমি সেইসব আর্বাব মিনিয়েচার চিত্রশিল্পী ও লিপিচিত্রকরদের কথা জেনেছি, যারা অন্ধ হওয়ার জন্য সাধনা করতেন। তারা বিশ্বাস করতেন চিত্রের আগে আছে অন্ধকার, পরেও অন্ধকার। চিত্ররচনার মুহূর্তটুকু আলোকিত। আর সেই আলো আসে স্মৃতি থেকে। তাই অন্ধ হওয়ার পরেই একজন মিনিয়েচার চিত্রশিল্পী তার জীবনের উজ্জ্বল স্মৃতি উপহার দিতে পারে।

বাস্তবের এই পৃথিবীতেই অবাস্তব ভেসে থাকে। সেই বাস্তবের ভেলায় অপর বাস্তবের অধিষ্ঠান। সুপারন্যাচারালিটির সেই বোধ ই একটা মানুষকে ক্রমাগত আচ্ছন্ন করে। হতাশ করে। অস্তিত্ব সংকট তৈরী করে। মানুষ ক্রমশ খুঁজতে থাকে তার প্রকৃত স্বরূপ। ক্রমশ কল্পনায় গড়ে তোলা বুদ্বুদগুলো আসতে আসতে জমাট বাঁধতে শুরু করে। অবয়ব হতে শুরু করে। জন্ম থেকে জন্মান্তরে সেই অবয়বের ছায়াপুতুলগুলো খেলা করে। আলো থেকে অন্ধকারে, অন্ধকার থেকে আলোয়। ‘অন্ধকারের উৎস থেকে জাগ্রত যে আলো সেই তো তোমার আলো। সকল দ্বন্দ্ব বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো সেই তোমার ভালো।’ এভাবেই আসে পাপ-পূণ্য, জাগতিক বিস্ময়। স্বপ্ন বাস্তবের ভাঙাগড়া। পৃথিবীর পথে নির্মিত হয় হাজার বছরের পথচলা। জীবনানন্দের ভাষায় হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা মানুষের অন্তরাত্মা খুঁজে পায় বনলতা সেনকে। র্মাকুইজ তার শতবর্ষের কালো রাত পেরিয়ে এসে পৌঁছায় জীবনের আলোকবৃত্তে। তবু জীবনের চঞ্চলতা শেষ পর্যন্ত শান্ত হয় মৃত্যুর শীতলতায়। সঙ্গম জীবনও স্থবির হয়।

উপন্যাসের প্রথম বেশ কয়েকটি পরিচ্ছেদ স্মৃতিচারণা। হঠাৎই স্মৃতির অতল গহ্বরে ঢুকে পড়ে পুর্বজন্মের কথা। ইউসুফ মির্জা মির্জা গালিব। শব্দের রহস্য। নিজেকে শোনানো নিজের জীবন। স্বপ্নে পাওয়া কোনো গল্প যেনো। এমনই এক গল্পের মতো গল্পে উঠে এসেছিলো লেখকের অন্য একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘দোজখনামা।’ মির্জা গালিব আর সাদাত হাসান মান্টো হিন্দুস্থান ও পাকিস্তানের কবরে শুয়ে পারস্পারিক বিনিময় উন্মোচন করছেন দোজখনামায়। গালিব দেশভাগ পাননি। আগ্রা ও লখনউতে কেটেছে তাঁর কবিজন্ম। মান্টো দেশভাগের জন্য পাকিস্তান চলে গেলেও তাঁর মন পড়েছিলো ভারতেই। দুজনের বয়সের তফাৎ ১১৫ বছর। সেই সময়সীমাকে জাদুবাস্তবতার রঙিন সুতোয় গেঁথে নিলেন রবিশংকর বল। দুই সময়, দুই দেশ, দুই ব্যক্তিত্ব, কবিতা ও গদ্য ওতপ্রোত হয়ে যাচ্ছিল একটু একটু করে। ইতিহাস-শিল্প, মানবাত্মা, মৃত্যু সবকিছু কাহিনির পরতে পরতে মিশে যাচ্ছিলো একটু একটু করে। বাস্তবতারহিত, পরাবাস্তব, বাস্তবতাতিরিক্ত লেখায় রবিশংকর তার স্বতন্ত্র জীবনবোধটি বুনে নিয়েছেন কাহিনির বয়ন। রচনা করেছেন নিজস্ব শৈলী। ২০১০ এ লেখা বইটি ২০১১ তে বঙ্কিম পুরস্কার পেয়েছে। ইতিহাস ও কল্পনার মিশেলে কি করে একটা রচনা শিল্পের উৎকর্ষ সীমায় পৌঁছাতে পারে তার সার্থক উদাহরণ দোজখনামা। একটা উপন্যাসের শেষ থেকে আরেকটি উপন্যাসের সূচনা ‘নায়িকা সংবাদ।’ কিসসা থেকে কিসসার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে মির্জা গালিব, মান্টো, তানসেন, লখনউ, মুঘলসংস্কৃতি, বারানসী, কবির, নবাব, ইংরেজ আরো কত কত কি! ইতিহাস, বাস্তব, কল্পনা, শিল্প, গান, গদ্য কাহিনীর অন্তর্জালে ক্রমশ জড়িয়ে যায় পাঠকমন। সিপাহী বিদ্রোহ থেকে দেশভাগ, ভারতীয় ইতিহাসের আড়াইশ বছরের আখ্যান ধরা আছে এই উপন্যাসটির মধ্যে। কিন্তু এই উপন্যাসের বয়নজুড়ে অন্ধকার, লাঞ্ছিত, নিপীড়িত মানবতার অস্তিত্বের সংকট তাই এই উপন্যাসের নাম ‘বেহেস্তনামা’ না হয়ে, হয়ে ওঠে ‘দোজখনামা’। কিন্তু আমাদের আলোচ্য দোজখনামা নয় ‘ছায়াপুতুলের খেলা’। কিন্তু দুটি উপন্যাসেরই আলোচ্য মানবাত্মার ক্রম-অন্বেষণ। কখনো তা আসে ইতিহাসের চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তাদের পারস্পরিক আলাপচারিতায়, কখনো বা নিজের মনের চেতন অবচেতন স্মৃতি-বিস্মৃতির দোলাচলে। জন্মজন্মান্তরে নিজের অগোচরে এই ছায়াপুতুলেরা খেলতে থাকে অবিরত। কখনো আয়না জীবনে সেই ছায়াগুলো প্রতিবিম্ব আঁকে কখনো বা বিস্মৃতির অন্তরালে তলিয়ে যায়।

দোজখনামা উপন্যাসের চরিত্রগুলো ঐতিহাসিক সত্য এবং মৃত হয়েও জীবিত। কবরে পাশাপাশি শুয়ে থাকা মান্টো ও গালিব একাধারে লেখকের কল্পনাপ্রসূত কাহিনির ধারক ও বাহক। কথক শ্রোতা ও লেখক। আখ্যানের বহুস্বর এভাবেই কি নির্মিত হয়। মির্জার সময় এবং সাদাত হাসান মান্টোর সময় দুই-ই আমাদের দেশের সমাজের এক ক্রান্তিকাল। দীর্ঘকালীন মুসলিম শাসনের পর ইংরেজদের বাণিজ্য কোম্পানির কাছে যখন আমাদের দেশ বশ্যতা স্বীকার করল সেই ক্রান্তিকালীন সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন মির্জা গালিব। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে যখন আট-নশো বছরের বাঙ্গালি হিন্দু মুসলিম কালচার বিপর্যস্ত, তৎকালীন জীবনের হাহাকার, যন্ত্রণার অনুভূতি চিরে উঠে এলো গালিবের কবিতার ছন্দ, সুরের মায়াজাল যা দোজখের যন্ত্রণা বিভীষিকাকে মুহূর্ত মধ্যে বেহেশতের পারিজাত সুরভীতে রূপান্তরিত করলো। এই ভাঙাগড়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্রকল্প রবিশঙ্কর বল তার অনন্য লেখনী কৃতিত্বে উজ্জ্বল করে তুলেছেন গালিবের নানা অনুভূতির বাস্তব চিত্রনে। অন্যদিকে পরবর্তী শতকের দেশভাগজনিত বিপন্নতা ও অসহায়তা তথা মূল্যবোধের সংকট সাদাত হাসান মান্টোর কথোপকথনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আড়াইশো বছরের ইতিহাস রবিশংকরের দোজখনামায় রক্তমাংসের শরীরী আত্মায় জীবন্ত বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করেছে। এই উপন্যাসের কথা বয়নে নানা টুকরো টুকরো কোলাজ সৃষ্টি হয়েছে কখনো প্রাচীন লোককথা কখনো পুরানের অভিজ্ঞান, কখনো কবিতা, কখনো আলাপচারিতা, কখনো গদ্যোর সরসতায়, কখনো রাজনৈতিক প্রতিবেশ বা সামাজিক অভিক্ষেপ সমস্ত কিছুর সমন্বিত শিল্পায়নে।

‘ছায়াপুতুলের খেলা’ উপন্যাসটির মধ্যেও বারংবার এই কোলাজ মুহূর্ত রচনা করে। উপন্যাসটির গঠনশৈলি আসলে খেলা ভাঙ্গার খেলা। কেন্দ্রাতিগতা ছেড়ে কেন্দ্রকে ধ্বংস করে এক নতুন পাঠ অভ্যাস তৈরী করে এই উপন্যাস। কেন্দ্রীয় কোনো চরিত্রই নেই অথচ একটি উপন্যাসে প্রান্তবর্তী চরিত্রগুলিই ঘটনা বা স্মৃতির টুকরো নিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রের বিনির্মান ঘটায়। গল্পকথক ক্রমাগত নিজেকে হারায় আবার খুঁজে পায় আবার হারিয়ে ফেলে। নামহারা, পরিচয়হারা হয়ে অন্য কারো নিয়তি বা স্বপ্নের অনুভূতিতে বেঁচে থাকে সে। অথবা থাকে না। জীবিত ও মৃতর এই দ্যোদুল্যমান সময় যাবতীয় অরিজিন্যালিটিকে ধ্বংস করতে করতে নির্মাণ করে এক অন্য সময়ের ইতিবৃত্ত। এ যেন লেখকেরই প্রতিস্থাপিত হয়ে চলা প্রতিটি মুহূর্ত। ‘ছায়াপুতুলের খেলা’ উপন্যাসটি এভাবেই শুরু থেকে শেষ হয় আবার শেষের পরে শুরু হয়। ‘রোজ বিকেলে আমি বাবাকে নিয়ে এই বাড়িতে আসি।’ প্রকৃত পক্ষে এক প্রকৃত লেখকের সত্তা কখনোই নিজের কাহিনী শেষ করতে পারে না। মৃত্যু, বিচ্ছেদ, নিরুদ্দেশের ভেতর দিয়ে লেখক ক্রমশ বৃত্তের পরিধিতে চক্রাকারে আবর্তন করেন। লুইস বোর্হেস বারংবার এই গোলকধাঁধার আবর্তনকে স্বীকার করেছেন তার নানা উপন্যাসে। ম্যাজিক রিয়ালিটির এই ক্রম দ্বন্দ্বময় সংবদ্ধতায় মানুষ নিজেকে স্বপ্নের কাজলে নির্মাণ করে। যা নেই তাকে খুঁজে পেতে চায়। যা আছে তাকে হারিয়ে ফেলে। অতীত মিশে যায় বর্তমানে। বর্তমান স্বীকৃতি চায় অতীতের রহস্যলোকে। এই নির্মাণ ও বিনির্মাণের খেলায় মানুষের প্রকৃত স্বরূপ ছায়ার মতো খেলা করে। জীবনানন্দ যেমন বেড়ালদের ঘুরে ফিরে বেড়াতে দেখেছেন, অবিরত জীবনের নানা প্রকৃতিতে, উপাখ্যানের ছায়ামানুষেরাও সেই প্রকৃতিতেই নিত্য বিচরণশীল। পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব, কল্পবাস্তব, সমস্ত কিছুরই আধার তো আসলে বাস্তব জীবন পটভূমি। তাই বাস্তবের অন্বেষণ এক সীমান্ত পেরিয়ে অন্য সীমান্তের দিকে। ঘটনার পারম্পর্য নয় একটি ঘটনা থেকে অন্য একটি ঘটনায় উত্তরণ। ছেলে ভোলানো ছড়ায় যেমন একটি পংক্তির সঙ্গে অন্য পংক্তির কোন মিল নেই, শুধু যেন মেঘের মতো আকাশের গায়ে ভেসে ভেসে কল্পনার চিত্রকল্প তৈরী করা। কোলাজের ক্রম সম্পৃক্ততায় তেমনি জীবনের গ্রন্থিবন্ধন। কখনো লাল, কখনো নীল, কখনো সবুজ কিন্তু সবকিছুর নির্যাস শুধু নিকষ কালো। এই কালোতেই যাত্রা শুরু রবিশংকর বলের। কালোতেই শেষ। শুধু মাঝখানে বুদ্বুদের মতো ক্ষণিকের আলোর ঝলকানি। এই ঝলসে ওঠা মুহূর্তগুলোই জীবনের ক্যানভাসে স্থায়ীত্বের মণিকণা। বাকি সবটুকুই আপতিক। মানুষ কিসের অন্বেষণে তার অন্তরাত্মার হাহাকারকে অহর্নিশ হিসেবের গ-ীতে মাপতে চায়। জন্ম ও মৃত্যুতো আসলে একই মুদ্রার দুটি পীঠ। মাঝখানে জীবনের আয়না। তাই ছায়াপুতুলের খেলা উপন্যাসেও শুরু ও শেষ এক মাঝখানে কখনো অতীত কখনো বর্তমানের স্মৃতির কোলাজ জীবনকে ছুঁয়ে জীবনের আখ্যান রচনা করে।

রবিশংকরের উপন্যাসগুলি যেন অনেক গুলো ফুল কিন্তু একটি সুতোয় মাল্যবদ্ধ। তিনি অনায়াসে ডিসকোর্স চালাতে পারেন পরের উপন্যাসটির সঙ্গে আগের উপন্যাসের। প্রত্যেকটি উপন্যাস যেন জলের মত একটি ¯্রােতে অনবচ্ছিন্ন ভেসে চলে। সবই একই প্রবাহের অর্ন্তভুক্ত। ছিন্নতাহীন। তাই ‘দোজখনামা’ বা ‘ছায়াপুতুলের’ ‘খেলা’ বা ‘আয়নাজীবন’ সর্বত্রই ইতিহাস ও শিল্পের অবাধ অনাগোনা গালিবের উপস্থিতি। নির্বাসিত ছায়া মানুষ তার জীবনের ইতিবৃত্ত লিখতে চায়। কিন্তু যার ইতিবৃত্ত শেষ পর্যন্ত সে লিখে উঠতে সক্ষম হয় সে এক অচেনা মানুষ। ‘কে যেন একদিন আমাকে ডেকে বলল, ‘আয়নাটাকে মোছো গালিব, নিজেকে দেখাও। সৈনিক বা জ্ঞানী হওয়া তোমার কাজ নয়, তুমি দরবেশ হতে পারবে না; আয়নায় যা দেখাবে সেটুকুই লিখে রাখো এই-ই তোমার কাজ।’ আমি এত বছর সেই কাজই করেছি মির্জা সাহেব; আয়নায় যাকে দেখেছি, তার জীবনের কথা লিখে গেছি; সে মির্জা আসাদুল্লাহ গালিব নয়, অন্য কেউ যাকে আমি আজও চিনতে পারিনি। শুধু জানি, সে সারা জীবনের জন্যে নির্বাসিত।’’ টুকরের জীবন ইতিবৃত্তে গল্প কথক জীবনের আঘ্রাণটুকু খুঁজতে চান বারবার। যে সময় প্রতিনিয়ত ঢুকে যাচ্ছে  সময়ের গর্ভে সেই সময়কে যতদিন মানুষ পিছনে ফেলে রাখে ততদিন সে তাড়িয়ে বেড়ায় মানুষকে। কিন্তু তাকে সামনে রাখলে মানুষ লক্ষ্য খুঁজে পায় জীবনকে উপভোগ করতে পারে। এই আখ্যানে লেখক সময়ের গর্ভ থেকে সময়কে তুলে এনেছেন। তাকে রোমন্থন করেছেন। ছেলে তার বাবা-মা কে খুঁজছে অতীত এবং বর্তমানে। তার জন্মের ইতিবৃত্তকে জীবনের ¯্রােতে বহমিত করছে। তাই বাবার স্মৃতি চারণায় লেখক নিজেকে বাবার অদলে স্থাপনা করছে। পারিপাশ্বিকতার ছায়ায় তার বাবা পরিমলকে খুঁজে পাচ্ছে। কখনো কখনো সে নিজেও নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। আসলে মধ্যবিত্ত জীবনের চালচিত্র এটাই যে মধ্যবিত্ত নিজেকে আসলে একটা গ-ীর মধ্যে বেঁধে রেখেছে। সেই গ-ীর বৃত্তে সে ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে। বৃত্ত থেকে বেরোনোর কোন তাগিদ তাদের নেই। সেই বৃত্তের মধ্যে মধ্যবিত্ত পরিচয়কেই হারিয়ে ফেলছে। বাবা, ছেলে, ভাই, বন্ধু সব সেখানে একাকার এই ক্রমশ বিলিয়মান মানবসত্তা তাই নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেই চূড়ান্ত দ্বিধান্বিত। আমার ভেতর যে আমি, সেই আমি আসলে সত্যই কি আমি? এই আমিটা আসলে কে? এই প্রশ্নে মধ্যবিত্ত মানবাত্মা নিরন্তর দোদুল্যমান :

আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, আপনি যার সঙ্গে কথা বলেছেন, হাসছেন, আমি সে নই,… কিন্তু আয়নাতে আমি আমাকেই দেখতে পাচ্ছি। নাকি এতদিন ধরে আয়নাতে যে মুখ আমি দেখেছি, তার সঙ্গে আমার মুখের কোনও মিল নেই? তা হলে আমি কে? আয়নার প্রতিবিম্ব, না এই মহিলা যার সঙ্গে কথা বলছে, সে-ই আমি?

এই বিপন্ন অস্তিত্বের আত্ম-অন্বেষণে সময় আবর্তিত হয়। সময় প্রবাহিত হয়। সেই সময় পারদের মত আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যায় তাকে ধরা যায়না। তাই সময়ের সেই অপসৃয়মান বাস্তবকে লেখক রবিশংকর বল ব্যাখ্যা করেন এইভাবে ‘সারাঘর মানুষগুলোর চলাচলের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে। কয়েকটা ইঁদুর তাদের দেখা যায় না এদিক-ওদিক দৌড়ে চলে যায়।’ এরা সবাই নিজের জীবনে বেঁচে থাকে না। অন্যের জীবনে বেঁচে থাকে। তাই গল্পকথক স্মৃতিচারণার নির্মোকে নিজের অভিলাষকে চারিয়ে দেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। উপন্যাসের ভেতর থেকে জন্ম নেয় অন্য উপন্যাস :

এ আমার এক নতুন নির্বাসনের জীবন মির্জা সাহেব। আমি বেঁচে থাকতেই একটা শহরের মৃত্যু দেখে গেলাম, যে শহরে এখন বেঁচে আছি, তাকে আমি চিনি না। বিদ্রোহীরা লুঠতরাজ, হত্যা চালিয়েছেÑ বহু ইংরেজ তো আমার বন্ধু ছিলেন, তাদের মৃত্যু আমি ভুলতে পারিনা কিন্তু শাস্তি ফিরিয়ে আনার নামে ব্রিটিশ যে দুঃস্বপ্নের নগরী তৈরী করেছে, তা কবরে শুয়েও আমি ভুলতে পারবো না। কোথাও খাবার নেই, দুর্ভিক্ষের দিন এসেছে পৃথিবীতে। … বাবার স্বপ্ন ছিল মির্জা গালিবকে নিয়ে উপন্যাস লিখবে। বাবার এই রকম অনেক স্বপ্ন ছিল; আমি এখন সেগুলো বয়ে বেড়াচ্ছি।

এ উপন্যাসের অভ্যন্তরস্থ স্বগতোক্তি কি আমাদের অন্য এক আখ্যানের কথনবিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় না?

শুধু বাবা বা ঠাকুমা নয় মায়ের শরীরের আঘ্রাণ ও গল্পকথকের গল্পের ছায়াশরীরে সর্বদা সুবাসিত। মাকে সে খুঁজে ফেরে সর্বদা। মৃত অতীতে যে মায়ের শরীরে সে টগর ফুলের বা ভাজা কালোজিরের গন্ধ পেত তা বদলে যায় কচি পাঠার মাংসের আঘ্রাণে। আবার প্রতিটি নিঃশ্বাসে কখনোবা ভেসে আসে মায়ের বিকেলবেলার গা ধুয়ে আসা আফগান ¯েœার গন্ধ। সমগ্র কাহিনীর মধ্যে লেখকের মায়ের উপস্থিতি। যেন রূপকথার কল্পমায়া মায়ের রূপ ধরে লেখককে নিয়ে যায় স্বপ্নের এক অপর জগতে। তাই তার মাতৃগৃহের স্মৃতি জুড়ে বেলজিয়ামের কাচের আয়না। আভিজাত্যের জল ছোপানো বৈভব আর কল্পমায়ার তুলির রঙে বাস্তবের ধূসর রঙের ক্রমাপসারণ। মায়ের বুকে কমলালেবুর গন্ধ। পৃথিবীর মানুষদের কানাকানি গল্পকথা। কথার পিঠে কথারা বেঁেচ থাকে। একটি কথার মধ্য থেকে জন্ম নেয় অন্য কথা। এভাবেই তৈরী হয় বহুস্বর। যেই বহুস্বরের পরিধি থেকে লেখকের আখ্যানবৃত্তে আর্বতন। যার মধ্যে বহু চরিত্র থাকলেও শেষ পর্যন্ত সব চরিত্র যেন এসে মিশে যায় একক পাঠকৃতিতে। ঝিনুকের মধ্যে থাকে প্রাণ। যে প্রাণের কোন চেহারা নেই। কিন্তু সেই প্রাণের মৃত্যু তে জেগে ওঠে এক অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। শিল্পেরও জন্মদাতা মানুষ। কিন্তু সেই মরণশীল মানুষের গতি যখন রুদ্ধ হয় তখনই সৃষ্টি হয় অমর শিল্প। শিল্পের ¯্রষ্টাকে কেউ মনে রাখে না। কিন্তু শিল্প অবিনশ্বর, যুগে যুগে চিরস্থায়ী। মৃত্যু মানে আয়নার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া। হারিয়ে যেতে যেতেও থেকে যায় ভাঙ্গা সম্পর্কের মেদুর মায়া। যে জাদু ক্রমশ বিস্তৃত গোপালপুর থেকে দূর ক্রোয়েশিয়ায়। পুরনো শহর খুঁজে মানুষ তুলে আনে স্বপ্ন, খোয়াব, বাদশাহ ওয়াজেদ আলির মর্জি, ইঁদুরের সাদা পাতা না চিবিয়ে খাওয়ার খাম-খেয়ালের কোলাজ। যেখানে নদীর উপরে মৎস্যকন্যার বিয়ে হয়। নদী হারিয়ে যায়। কাঠ চকচকে টাউন শিল্পের বাস্তব দুনিয়া, আর ফুলদিদি মণিদের ফিরে না আসার সম্ভাবনা। এভাবেই আয়নার মধ্যে জন্ম নেয় প্রেম, যৌনতা। পরিত্যক্ত পোড়োবাড়ির ভেতর জুলেখার সবুজ আস্তিত্ব। আয়নার মধ্যে একা জুলেখার মধ্যে অতীত জৌলুস, রামধনু, ময়ূর, রাঁজহাস, ভোরের শিশির, স্বপ্ন-মায়া, অজাগতিক সুখানুভবের মুহূর্ত। কিন্তু আয়নার পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী। আয়নার ভেতর থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষ আর ফিরে আসে না। এই মানুষ আসলে মানুষেরই অতিবাহিত অতীত। যেখানে ফিরতে হলে তাকে রক্তাক্ত হতে হয়। ক্ষত-বিক্ষত হতে হয়। তাই সামনে এগুতে এগুতেও সেই ফিরে যাওয়ার আকাক্সক্ষা প্রতিনিয়ত মানুষের অন্তরাত্মাকে তাড়িত করে। পীড়িত করে। তবু সামনে চলতে চলতেও মানুষ কুড়িয়ে পায় কিছু সুন্দর খুঁজে পাওয়া ঝিনুক। উজ্জ্বল কিছু মুহূর্ত। কিছু বেঁচে থাকার হঠাৎ আলোর ঝলকানি। এই স্ফুলিঙ্গগুলো নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। বাঁচার আনন্দ উপভোগ করে। হোক না স্ফুলিঙ্গটুকুর নিভে যাওয়ার মুহূর্তে কালো ধোঁওয়ায় জেগে ওঠা কিছু ছায়ামানুষের গল্প। থাক না সেই ছায়া পুতুলগুলোর এলোমেলো খেলা। সব গল্পেরই কি শেষ হয়; জীবনের গতি তো অবিরত। কল্পনার রঙিন ভুবনে এই সাদা কালো ছায়াপুতুলগুলো তো আসলে ছোট ছোট জীবন। বোকা বোকা, হাবা হাবা, পাগল ইডিয়ট, ইডিয়টরা তো কখনো বড় হয় না, তাই এই জীবনের আখ্যান আসলে একটা লম্বা সাপ হয়ে হয়েই থেকে যায় যে তার লেজ থেকে নিজেকেই খায়। শেষ থেকে খেতে খেতে আবার ফিরে আসে শুরুতেই। ঠিক এই ছায়াপুতুলের খেলা উপাখ্যানের মতই।

তথ্যসূত্র

১.            ছায়াপুতুলের খেলা, রবিশংকর বল, পৃষ্ঠা সংখ্যা-১১

২.                             ”                                 ১৯

৩.                             ”                                 ২২

৪.                             ”                                 ১১

৫.                             ”                                 ৪০

৬.                             ”                                 ৩০

৭.                             ”                                 ৩১

৮.                             ”                                 ৪৪

পত্রিকাসূত্র

১.            রক্তমাংস, সাল ১৪২৪, জানুয়ারী ২০১৮,সম্পাদক গৌতম ঘোষদস্তিদার

২.           তাঁতঘর, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৭, সম্পাদক অরূপ আম

*******************************************

মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস : সমাজ আর রাজনীতির দলিল
গুরুপদ অধিকারী

[দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শুরুতে ১৯৩৯ সালে জন্মলাভ করেন মলয় রায়চৌধুরী। একান্নবর্তী আর দুস্থ পরিবারে বসবাসের সূত্রে লড়াই ছিল তাঁর জীবনের অন্য নাম। বাংলার বাইরে দেখেছেন বৃহত্তর ভারতবর্ষকে। বার বার বদলেছে ঠিকানা। বাল্য আর কৈশোর কেটেছে বিহারি অন্ত্যজ সমাজে, পরে গরিব সুন্নি মুসলমান পাড়ায়। ছেলেবেলা থেকেই ছিল যাযাবর জীবনের প্রতি অন্তহীন আকর্ষণ। ছাত্রাবস্থায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় পালিয়েছেন বেশ কয়েকবার। জীবন তাঁর কোনদিনই স্থিতিশীল নয়, চাকুরিজীবনেও নানা পেশায় তাঁর যোগ দিতে হয়েছে। রাজনীতি আর সামাজিক অবস্থার কঠিন ঠোক্করে বলিষ্ঠ হয়েছে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, আঘাত, প্রত্যাঘাতে জর্জরিত মানুষকে দেখেছেন। তাদের হালভাঙ্গা জীবনের কঠিন পরিস্থিতির মাঝে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন প্রচুর। মাত্র বাইশ বছর বয়সে ১৯৬১ সালে কোটি কোটি টাকার পচা নোট জ্বালানোর চাকরি দিয়েই জীবন সংগ্রামের সূত্রপাত। তারপর কৃষি বিশ্লেষক এবং গ্রামোন্নয়ন। সর্বত্রই দেখেছেন ক্ষমতা আর পেশিশক্তির উদগ্রতা। স্বার্থপর আর সংকীর্ণ মানুষের সুযোগের কুঞ্চিত রূপ। নীতিহীন লড়াই। রাষ্ট্র আর প্রশাসনের পুতুলময় রূপ। ব্যথা বা যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন তাঁর লেখায়। উত্তর ঔপনিবেশিক পর্বে সংস্কৃতি কীভাবে বদলেছে, কীভাবে আমরা মেরুদ-হীন বাঙালিরা নিয়ন্ত্রিত হয়ে চলেছি অন্যের দ্বারা। আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার জলন্ত আর বিষাদময় রূপ, ইত্যাদি নানা দিক প্রতিভাত হয় তাঁর লেখায়। লেখালেখির জগতে ইতিমধ্যে তিনি প্রতিষ্ঠিত। হাংরি আন্দোলনে ‘প্রচ- বৈদ্যুতিক ছুতার’ লেখার জন্য তিনি কারারুদ্ধ হন। তাঁর সাহস, লেখালেখির মৌলিকতা শিক্ষিত সম্প্রদায়ের নজরে আসে। কবিতা ছাড়াও লেখেন প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ বা জীবনী। তাঁর লেখা উপন্যাসগুলি হলো, ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ^াস’, ‘জলাঞ্জলি’, ‘নামগন্ধ’, ‘এই অধম ওই অধম’ এবং ‘নখদন্ত’। আমাদের বর্তমান আলোচনা লেখকের উপন্যাসগুলিকে ঘিরে, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির কম্পাস কোনপথে তা চিহ্নিত করা।]

এক.

প্রসঙ্গ : তিনটি উপন্যাস — ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’, ‘জলাঞ্জলি’ ‘নামগন্ধ’

‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ ‘জলাঞ্জলি’ ‘নামগন্ধ’— এই তিনটি উপন্যাস মিলিয়ে মলয় রায়চৌধুরীর তিনশো পাতার ট্রিলজি, গ্রন্থের শিরোনাম ‘তিনটি উপন্যাস’। ‘তেহাই’-এর পক্ষ থেকে প্রকাশ পেয়েছিল। উপন্যাস না বলে বোধহয় ‘দর্পণ’ শিরোনাম দিলেই উপযুক্ত হত। অবশ্য সে দায় লেখকের। পুরো কাহিনি লেখা হয়েছে স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবাংলা আর বিহারকে কেন্দ্র করে। রাজনীতি আর সামাজিক পরিস্থিতির জটিল বীভৎস চেহারাকে সামনে রেখে। রচনার সূত্রে চরিত্র যে— কটি এসেছে তারা গৌণ। প্রত্যেকের জীবনে সেখানে কেন্দ্রচ্যুত বা উপকেন্দ্রিক। পচা নোট গোনার ক্লান্তিকর চাকরিই এজন্য তাদের ক্ষেত্রে যোগ্য। নিজের ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা এক্ষত্রে তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে। কঠিন সময়ের বৃত্তে সমাজকে আলোকিত করাই আসলে তাঁর লক্ষ্য। এজন্য সনাতন উপন্যাস রচনার ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছেন মলয় রায়চৌধুরী। দেশভাগ ও স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা উপন্যাস রচনার চিরাচরিত ধারায় এসেছিল পরিবর্তন। এই অভিনবত্বের সূত্রপাত ঘটেছিল বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্যে। ঔপনিবেশিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে অপেক্ষাকৃত শোষিত, ঔপনিবেশিতের দিক থেকে বিষয়বস্তুর নবমূল্যায়ন শুরু হয়েছিল। ফলে অত্যাচার, শোষণ, লাঞ্ছনা, বঞ্চনার কাহিনি উঠে এলো আখ্যানে। এতদিনের নাম পরিচয়হীন ‘ওরা’ এবার প্রাধান্য পেল। এদের প্রথাগত ‘ইতর’ বা ‘অসভ্য’ বলা গেল না। ‘অপর’ নামেই সাহিত্যে এদের সম্মান দেওয়া হল। রাষ্ট্রযন্ত্রের পীড়নে তাদের পেশী নিংড়ানো শ্রমের মূল্যায়ন ঘটাতে, তাদের বকেয়া শ্রমের দাম মেটাতে দায়বদ্ধ হয়ে উঠল সাহিত্যও। এই কারণে কোনো প্রথাগত নায়ককে খাড়া করাটা হত অর্থহীন। এরা দলে একক নয়, অসংখ্য। শ্রেণিশোষণে কম-বেশি প্রত্যেকেই নানাভাবে পীড়িত। তাই লেখক বুঝেছেন এদের মঞ্চে তোলা দরকার। সে কারণে নায়ক মুখ্য করেন নি আলোচ্য ট্রিলজিতে। কিন্তু কাহিনি লিখতে গিয়ে, ‘প্রটাগনিস্ট-কেন্দ্রিক মেট্রোপলিটন সাহিত্য বহির্ভূত’ সনাতন সাহিত্যরীতিটিকেই অনুসরণ করতে হয়। গড়ে ওঠে এর প্রথমাংশ ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’। কিন্তু মনের মধ্যে ছিল প্রচুর মালমশলা। সেই বারুদ ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে নির্দিষ্ট চরিত্রের আওতা থেকে লেখককে বেরোতেই হয়। তার ব্যতিক্রম এখানেও হয়নি। ‘লেখকের কথা’ অংশে তিনি জানিয়েছেন ‘‘ডুবজলে’ লেখার সময় প্রচুর তথ্য মশলা যোগাড় করেছিলুম। চাকরিসূত্রে গ্রাম বাংলায় ঘোরাঘুরির সুবাদে বিশদে মাইক্রোলেভেল তথ্য ভাঁড়ার গড়ে উঠেছিল। সামগ্রিক কাঠমো ও গদ্যবিন্যাস নিয়ে পরীক্ষা করার চেষ্টা করেছিলুম।’ এভাবে এক সময় উপন্যাস রচনার প্রটাগনিস্ট-কেন্দ্রিক ধারাটি তিনি বদলে দিলেন।

পাটনায় কয়েন আর নোট এক্সামিনের অফিসে কম-বেশি এক হাজার কর্মীর বিরাট মিলনক্ষেত্র। কাজের সূত্রে এখানে উপস্থিত হয়েছে সুশান্ত, অতনু, অরিন্দম, মৌলিনাথ, অভিজিৎ এবং ইন্দ্রাণী বা ইনি। প্রত্যেকেই বাঙালি। বিহারের রাজনীতি আর সমাজনীতির উত্তাপ এদের অপরিচিত। উপরন্তু ছিল চাকরির একঘেয়েমি। সেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করতে গিয়ে এদের প্রত্যেকের জীবন এক-একরকম পরিণতি পেয়েছে।  প্রসঙ্গ ও পরিশ্রমের নিপুণ বিশ্লেষণে কাহিনিকে সচলতা দিয়েছেন লেখক। খুনের দৃশ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ এবং ‘নামগন্ধ’ উপন্যাস। প্রথম খুনের কেন্দ্র বিহার, দ্বিতীয় পশ্চিমবঙ্গ। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষের রাজনীতি, বিশেষত বিহার আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, সন্ত্রাস, জাতপাত বিভাজন, দাঙ্গা, ক্ষমতাবানের আধিপত্য বিস্তার, শোষণ, রাষ্ট্রক্ষমতার প্রবল নাটুকেপনা, ভ-ামি, ভীরু, দুর্বল মানুষের অসহায়তা ইত্যাদি বিভিন্ন দিক মলয় রায়চৌধুরীর লেখার অন্যতম দিক। নেহাত কাহিনির ফাঁদে ফেলে পাঠককে তিনি অন্ধ করেননি। তাঁর পেশীবহুল কলমে তিনি ফালা ফালা করে তুলে ধরেছেন সমাজ-রাজনীতির অন্তর্নিহিত সত্যকে। রাজনৈতিক নেতা থেকে মন্ত্রী কেউই রেহাই পায়নি, কাউকেই রেয়াত করেননি। ঘটনার খাতিরে কোনও সত্যতে গোপন করেননি লেখক। আশ্চর্যের বিষয়, ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ পড়ে জানা যায়, লেখক নিজেই ছিলেন অফিসার। অফিসার অরুণ মুখোপাধ্যায়ের ভায়েরা ভাই-এর ছোটো ভাই। বাংলা, বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্ম উপলক্ষ্যে তাঁর ঘোরাঘুরি। যে কারণে, সেইসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ছিলেন তিনি, আর তা প্রকাশে মধ্যবিত্ত লেখকের কোনো দুর্বলতা নেই। এমনকি কোনো ছলনা বা কপটতার আশ্রয় নেন নি তিনি। নাম উল্লেখ করে প্রত্যক্ষ ভাষায় তুলে দিয়েছেন তাদের কীর্তিকলাপের জানা-অজানা নানা তথ্য। ফলে তাঁর লেখালেখি ঘিরে তৈরি হয় বিতর্ক।

বিষাক্ত সমাজ আর রাজনীতির বর্ণনার সমান্তরালে এগিয়েছে কাহিনি। প্রাথমিক পর্বে অরিন্দম মুখোপাধ্যায় ক্যাশ ডিপার্টমেন্টের কয়েন নোট এগ্জামিনার। ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে পাটনাতে অরিন্দমের বাঙালি বন্ধু সুশান্ত ঘোষ, অতনু চক্রবর্তী আর মৌলিনাথ। ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপন্যাসে এদের পরিচয় আছে। কৃষিবিজ্ঞানে সুশান্ত যোগ দিয়েছেন নোট পরীক্ষকের পেশায়। নোট পরীক্ষকের কাজ রীতিমতো ধৈর্যের আর সময় সাপেক্ষের। টাটকা নোট আর পচা নোট আলাদা করে একশোটা নোটের প্যাকেট তৈরি করা হয়। প্যাকেটের শেষ নোটে নিজের নামের সাংকেতিক ছাপ্পা বা সই করে দশটা ভালো প্যাকেটের এক-একটা বা-িল বাঁধা হয়। খারাপ যে প্যাকেটগুলো থাকে ডাইস মেশিনে ফেলে সেগুলোতে গোল গোল ছ্যাঁদা করিয়ে পোড়াতে পাঠানো হয়। একটানা কাজ করতে লাগে বিরক্তি। ‘চাকরিটা আসলে কেরানি আর মজুরের দো-আঁশলা, শুনতে জমজমাট, ব্যাংক নোট এগ্জামিনার, টাকাকড়ি পরীক্ষক।’ (ঐ/১৫)। চাকরিটা একঘেয়েমির। অশিক্ষিত পাতি পুরুষ নোট গুনিয়েদের মাঝে পড়ে বিভ্রান্ত মৌলিনাথ। সুশান্ত বা অতনুও সেই একঘেয়েমি মেনে নিতে পারে নি। প্রত্যেকেই অবিবাহিত। বন্দিজীবনে এরা নারীর প্রেমে কাতর। অরিন্দমের মনে হয়, ‘এই দুর্গতি থেকে আরোগ্যের উপায় নেই। … পালাতে হবে। দুঃখের নিজস্ব আনন্দ থেকে পালাব’। (ঐ/৩০)। ইন্দ্রণী সাধুখাঁর সাথে মিউচুয়াল চেঞ্জ করে অরিন্দম কলকাতায় চলে গেছে। অরিন্দমের পরিচয়ে আমরা আসব বর্তমান আলোচনার শেষ অধ্যায়ে।

মৌলিক মুখোপাধ্যায় ওরফে মৌলিনাথ ফর্সা তেল চুকচুকে তিরিশোর্ধ্ব জুনিয়র অফিসার। বিহারিরা ডাকে মুখো। কুতকুতে চশমা। বসলেই ঠ্যাঙ নাচায়। একা থাকে। আর পদোন্নতি চায় না। পাটনায় টিউশনিও করে। ইন্দ্রাণীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাহত। চাকুরি-রত মেয়েই তার পছন্দ। শেষে স্ট্যান্ডার্ড চ্যাটার্ড ব্যাংকের মোটা মাইনের কর্মী তপতীকেই সে বিয়ে করতে রাজি। বিয়েটা তার কাছে কেরিয়ার। তার কাছে সৌন্দর্যের কোনও আলাদা সংজ্ঞা নেই। ইন্দ্রাণীকে জানিয়েছে, ‘অন্ধকারে জড়িয়ে ধরলে সব মেয়েই সুন্দরী, একইরকম।’ (জলাঞ্জলি/৯৬)।

সুশান্ত ভালো ছেলে। কৃষিবিজ্ঞানে ¯œাতক। তাদের বিরাট একান্নবর্তী কৃষক পরিবার। এতটাই বড় যে, প্রতি সপ্তাহে লাগে একটা গ্যাসের সিলিন্ডার। জ্যাঠা-কাকাদের প্রত্যেকের সাথেই প্রত্যেকের সদ্ভাব। সেখানে কোনো গ্লানিবোধ বা দুঃখ নেই। আত্মীয়-পরিজনহীন অতনু মাঝে মাঝে তাদের বাড়ি আসে। মেমারিতে তাদের জমিজিরেত, চাষবাস দেখাশুনা করে তার ন-কাকা, নতুন কাকা। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও তাদের জমিজমা ছিল মুঙ্গেরে। সেখানে দুশো একর জমি আর সাত একর ফলবাগান আর রোববারি হাট ছিল সুশান্তর দাদুর, মুঙ্গেরের পিপরিয়া গ্রামে। সুশান্তর দাদু ছিল নামকরা ঠগি। কজ্জল ধানুকদের দৌরাত্ম্যে সুশান্তর বাপ, জ্যাঠা, কাকা আর পরে পিপরিয়া মুখো হতে পারে নি। ফসল তোলা, এতোয়ারি থানায় খাজনা আদায় সব তাদের বন্ধ। ধানুক, বিন্দ, ভূমিহাররা তখন একদিকে আর যাদবরা একদিকে। যাদবদের নিত্যদিন খুন করেছে ধানুকরা। বাঙালি বলে সুশান্তকে সেখানে কেউ পাত্তা দেয়নি। ভূমিহার আর নিচু জাতের খুনোখুনি সেখানে নিয়ত লেগেই আছে। গ্রামে গ্রামে নামকাওয়াস্তে পুলিশী চৌকি। কখনো ভূমিহাররা মরে তো কখনো কুরমি, মাহাতোদের হাতে খুন হয়ে যায় নিচুজাতের মানুষ। ‘খুনোখুনিতে ঝামরে নষ্ট হয়ে গেছে গ্রামের পর সবুজ গ্রাম। কনসারা, দরমিয়া, নোহনি-নগাওঁয়া, মলবরিয়া, দনওয়র-বিহটা, মিনবরসীমা, বাবা— উড়ন্ত ধুলোয় মানুষহীন প্রান্তর, সাপের পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে সন্দেহময় শুকনো পাতার পদক্ষেপ, লেঠেলঘেরা ধানের ক্ষেত।’ (ঐ/১২)

ধানুকদের ইতিহাস একটু কিছুটা পুরানো। ক্ষমতাবিস্তার আর তার পালাবদল নিয়ে বিহারের রাজনীতি রীতিমতো সরগরম। এক সময় যাদবরাই ছিল- শীর্ষে। অধিক যাদব জোতদারের স্যাঙাত থাকার সম দুধ বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে কিষান-কামিনের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি আন্দোলন পিষে ফেলেছে লেঠেল বাহিনীর সাহায্যে। জমিজমার দখল নেওয়া সে নিজেই শুরু করে দিয়েছে। কানপুর থেকে চটের থলেয় করে এসেছে পিস্তল, কারতুজ, হাতবোমা, দোনলা। তাই দিয়ে অত্যাচারী কৃষক থেকে পুলিশ সবাইকে সে রুখে দিয়েছে ঝাঁক ঝাঁক গুলিতে। গাঁড়াসা দিয়ে সীমান্ত চাষি, পুলিশের ভুঁরি ফাঁসিয়ে লাশ ফেলে দিয়েছে নদীর জলে। অধিক যাদবের মৃত্যুর পর ক্ষমতা চলে যায় কৈলু যাদবের হাতে। কৈলু শুরু করেছে অপহরণের নাটক। কৈলুকে ধরার জন্য সরকার ‘অপহরণ কোবরা’ চালু করলে সে গা ঢাকা দেয়। দ্রুত ক্ষমতা বদল হয়েছে। কৈলুর জায়গা দখল করেছে কজ্জল ধানুক।

ভাগলপুরের নাথনগর আর বিহপুর থানার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল জুড়ে খুনে ডাকাতদের বসবাস। মলহোরিয়া ম-ল, লালে ম-ল, তারিণী ম-ল, ডুব্বা ম-ল আর সন্তান ম-ল। ‘আধুনিক মানবসমাজের বাইরে এই অঞ্চল। ইংরেজদের সময় থেকে কোনও তারতম্য হয় নি আজ অব্দি এখানকার মানুষদের জীবনযাত্রায়, সংঘর্ষে, দারিদ্র্যে, শোষণে। যার যত পেশীশক্তি তার তত জমিন। ১৯৫৯ থেকে ভাগলপুরে গঙ্গানদীর তীরে একশো আটত্রিশটা গ্রামে ভূমি সংস্কারের চেষ্টা বারবার ভেঙ্গে গেছে। কাগজে-কলমে যেই মালিক হোক না কেন, খুংখার গিরোহদের সমর্থনে দখল রাখতে হয় ছুঁচের ডগা সমান ভুখ-ও।’ (‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’/৩৮)। ধানুকদের হাত থেকে জমি উদ্ধারের জন্য তারিণী ম-ল নামে এক নির্মম ক্রিমিন্যালের সাহায্য নিতে গেলে সুশান্তকে তারা কিডন্যাপ করে। সুশান্তকে পছন্দ হওয়ায় তারিণী নিজের চোদ্দ বছরের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছে সুশান্তর। নিছক উপন্যাস লেখার জন্য এ গ্রন্থ মলয়বাবু লেখেননি, পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই বিহারের রাজনৈতিক গতিবিধির নানা ইঙ্গিত গ্রন্থের মধ্যে লেখক দিয়েছেন। বছরের পর বছর এখানে বিক্ষিপ্ত হিংসার রাজনীতি। দক্ষিণ বিহারে জঙ্গল ইজারা নিয়ে কাঠের চোরাচালানকারী দিকু মোতি ভগতের সাথে বনরক্ষক এরিক হাঁসদার বখর নিয়ে শুরু হয় অশান্তি। একদিকে দিকু আর রাষ্ট্র অন্যদিকে অরণ্য আর উপজাতি।

দেশ স্বাধীন হবার পাঁচ মাস আগে পুলিশের গুলিতে ডাকাত সন্দেহে ঝাঁজরা হয়ে যান কংগ্রেস দলের অধ্যক্ষ আবদুল বারি। শাহাবাদ জেলার কোইলোওঅর গ্রাম থেকে নিঃস্ব অবস্থায় গান্ধীজির সাথে নুন বানাবার আন্দোলনে সে যোগ দিয়েছিল। তবে ‘লড়াইটা হিন্দু মুসলমানের গোপন কাজিয়া না রাজনৈতিক হত্যাকা- তা কেউ জানেননি।’ (ঐ/৩৪)। মুখ্যমন্ত্রীর বারবার বদল ঘটেছে। অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি। এসেছে কর্পোরেশনের ডাক্তার সুনীলরঞ্জন নাহাবিশ্বাস। রঙিন ছাতার তলায় তাঁর বেতের ধবধবে চেয়ার। ‘শ্মশানগামী লাশের সংখ্যা, গয়া, অওরাঙ্গবাদ, জাহানাবাদ, নওয়াদায় এম সি সি আর লিবারেশনের বিপ্লবে, বেড়ে চলেছে প্রতিদিন। এই মাটির জীবনে খাপ খেয়ে গেছে নাহা বিশ্বাস, অট্টহাসির বদলে ঠহাকা দিতে পারে।’ (‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’/৮২)। ‘লালুপ্রসাদ যাদব মুখ্যমন্ত্রী হবার পর যাদব ক্রিমিন্যালরা তাদের হৃতরাজ্য ফিরে পেয়েছে, লড়ে নিয়েছে। অপরাধের জাতীকরণ হয়েছে অনেক গাঁয়ে। জেলাশাসককেই পিটিয়ে মেরে ফেলেছে হাজিপুরে। ’(২৬১)। বিহার হয়ে উঠেছে দুর্নীতি আর অপরাধের স্বর্গরাজ্য।

পাটনাতে নোট বাছাইয়ের একই কাজে নিয়োজিত ছিল সুশান্তর বন্ধু অতনু চক্রবর্তীও। বয়স তেইশ বছর। সে কোনও উদ্বাস্তু বা সুশান্ত ঘোষের মত কোনও রাজ্যের ভূমিপুত্র নয়। নিত্যদিন ভার্জিন কর্মচারিদের মত মন আর সততা খরচ করে টাটকা আর পচা নোট আলাদা করা, পচা নোট ছ্যাঁদা করে নষ্ট করতে করতে তার মধ্যে আসে ক্লান্তি। কাজের চাপ নেওয়ার মত মানসিকতা তার ছিল না। একটানা বসে বসে থাকার মধ্যে থাকে একঘেঁয়েমি আর অসহ্য বিরক্তি। পাড়া গ্রাম থেকে দালাল, নোট বদলকারীরা আসে বাসি, ছেঁড়া, তাপ্পি দেওয়া নোট নিয়ে। বাঁধা কমিশন তারা হাত পাচার করে। কাউন্টারে কিউ দেবার জন্য সিকিউরিটি পালোয়ানদের টাকা খাওয়ায়। কলকাতার বাঙালি ছেলে সুশান্ত কাজে যোগ দেওয়ার পর অবসর কাটানোর সে-ই হয়ে ওঠে ইয়ার দোস্ত। সৎ থাকতে তার ফাঁকিবাজি মন সায় দেয় না। ‘ভালো নোট হোক খারাপ নোট হোক, পচা হোক বা আনকোরা, পকেটের সব কটা টাকাকে, প্রতিটি, অতনু পচা ছাপ মেরে নষ্ট করায় … দরকার নেই গোনার। এহাতে প্যাকেট নাও, ছ্যাঁদা করাও, নিজের কোড চিহ্ন দাও শেষ নোটে, এবার তুলে দাও সহকারী খাজাঞ্চির হাতে; ছুটি, বাড়ি যাও, সহকারী খাজাঞ্চি খুশি, খাজাঞ্চি খুশি, খুশি সব্বাই। দশটা-পাঁচটার টুঁটি টেপা চাকরি হয়ে গেল এগারোটা-একটায়। না গোনার মধ্যে ঝুঁকির তড়াস। সে ঝুঁকি সবাই নিচ্ছে। অতনু কেন মাঝখান থেকে সৎ হতে যাবে। চাকরির জন্য তো আর দায়বদ্ধতা গজায় না। তাই চাকরিকে চাকরি মনে হচ্ছিল না অতনুর। ভেতো জীবন হয়ে উঠেছিল নিরলস কুঁড়েমিতে মুখর।’ (‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’/১৫) এদের মধ্যে বদলি হয়ে কলকাতা অফিসে জয়েন করেছে রমা, রাঘব। বিহার সংস্কৃতির অপরাধের মুক্তমঞ্চ থেকে মুক্তি পেয়েছে তারা।

চোখের সামনে অতনু, সুশান্তরা দেখেছে অফিসারদের দুর্নীতি। ‘নোট যত পচা তত বেশি নষ্ট, আবদার তত বেশি, অনুমোদনের নিয়ম তত খুঁতখুঁতে, পাশ করার অফিসারের পাদানি তত উঁচু।’ (ঐ/ ১৮)

সমাজের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠে কাহিনি। অফিসারের নতুন বাড়িটা তৈরির সময়ে সিমেন্টে মেশানো হয়েছিল গঙ্গামাটি। ভিজিল্যান্স হাতেনাতে ধরলেও ব্লাক লিস্টেড ঠিকেদার নতুন নামে কোম্পানি খুলে বসেছিল। অপরাধ আর দুর্নীতি ঢুকে পড়েছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ইতিহাস সন্ধানের প্রতি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নস্ট্যালজিয়া ছিল, সে ইতিহাস অনতিপ্রাচীন উনিশ-বিশ শতকের ইতিহাস। তার মধ্যে তিনি তুলে ধরেছেন সত্য আর সাহিত্যের জড়াজড়ি রূপ। নস্ট্যালজিয়া থাকলেও যন্ত্রণা আর বেদনার জ্বালা সেখানে নেই। সভ্যতা আর ক্ষমতার ভূজঙ্গকুটিল হানাদারিও নেই। মলয় রায়চৌধুরীও হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর ধূসর নগরীতে প্রবেশ করেন নি। বরং তার সময়কাল আরও আধুনিক। স্বাধীনতার পরবর্তী বিশ শতাব্দীই তাঁর উপন্যাসের প্রসঙ্গ। সেই উপন্যসের খাদ খুঁজে তার কাদা বালি তিনি তুলে এনেছেন। বীভৎস ছোবলে নীল হয়ে ওঠা সে সভ্যতার না বলা ইতিহাসে বাণীলিপি হয়ে উঠেছে তাঁর সাহিত্য।

এমনিতে অতনু কুঁড়ে আরামপ্রিয়। বাড়িতে বিধবা মা। কোনো ভাই বোন নেই। পড়াশুনায় চিরকেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। খেলাধূলার প্রতি তেমন আগ্রহ নেই। বাড়িতে শাদা থান আর অতনুর শাদা ধুতি পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য কোনো রং নেই জামাকাপড়ের। বাড়ি ফিরলেই ওর মন খারাপ। মায়ের সঙ্গে বড় একটা কথা হয় না। অতনু মাছ মাংস কেনে না। ডালভাত-আলুভাতে তরকারি-এই ওদের লাঞ্চের মেনু। ছাপা জিনিস পড়তে ও ভালোবাসে। ভীষণ লাজুক। এমনকি মাইনে পেয়ে সবার সামনে নিজের মাইনের টাকা পর্যন্ত তার গুণতে লজ্জা। চাকরিতে ঢুকে পুরানো স্যাঁতস্যাঁতে নোটের গুঁড়ো নাকে ঢুকে এলার্জি হয়েছিল। বিরক্তি আর একঘেঁয়েমির সাথে আপোস করে সে কোনদিনও পারে নি। কাজের প্রতি চির উন্নাসিক অতনু একসময় একঘেঁয়েমি কাটাতে স্বেচ্ছায় টাকা নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। প্রহরীদের সাথে টাকা ভর্তি বাক্স নিয়ে গেছে উত্তর-পূর্ব ভারতে, শিলাচরে। আশ্রয় পেয়েছে রোসালিয়ংদের বাসায়, গেস্ট হাউসে। তাকে দেখাশোনা করেছে দুই নেপালি যুবতী বোন, জুলিয়েট আর জুডিথ। শুয়োরের মাংস, মদ আর দুই নেপালি যুবতীর সাথে উদ্যোম যৌনতার পর রীতিমতো জীবনরসের স্বাদে সে তখন মশগুল। অসুস্থতা কাটিয়ে নেপালি নারীস্পর্শে কাটাবার জন্য আরও একমাস ছুটি নিয়েছে। মা’কে লেখা চিঠিতে প্রকাশ করেছে, ‘জায়গাটা ভালো লেগেছে। যৌনতা অপ্রতিরোধ্য অলিগলি দিয়ে, প্রতি রাতের নতুন আঙ্গিক, কখনও সখনও দিন-দুপুরে, সম্পূর্ণ আলাদা এক সংস্কৃতির একেবারে মদ্দিখানে, একটু একটু করে সেঁদিয়ে গেছে অতনুু— খাওয়া-দাওয়া, চার্চ সংস্কার, বিশ^াস-অবিশ^াস, পোশাক-আশাক, ভয়-ঘেন্না এ এক আলাদা সংসার।’ (৬৫)। অভিজ্ঞতা তার জীবনকে দিয়েছে অন্য মাত্রা। ‘অতনু মূর্খের জীবন চায় নি। চেয়েছে রক্তমাংস। জুলি, জুডির হাতে খেয়েছে নানা নিষিদ্ধ রান্না। ‘নারীর শরীর ওকে গভীর বোধে তুলে নিয়ে গেছে।’ তরল ইন্দ্রপতনে কেঁপে উঠেছে প্রতিরাতের মুহুর্মুহু অন্ধকার। দোলের ছুটি কাটিয়ে অফিসের কাজে যোগ দিতে এসে দেখেছে অফিস বন্ধ। তৃতীয় আর চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের অনশন ধর্মঘট। অফিসের ইউনিয়ন দু’ভাগে বিভক্ত। অফিসের কর্মী ননী-সুলতানার নবজাতক শিশু বেড়েছে মানসী বর্মণের গর্ভে। ননী-মানসী পিছড়া জাত আর সুলতানা মুসলমান বলে উঁচু জাত থেকে ইউনিয়ন চলে গেছে নিচু জাতের আওতায়। জাতিগত বিভাজন বিহারি রাজনীতির মুখ্য অঙ্গ।

অতনু চক্রবর্তী ক্রমশ নারী সঙ্গে পরিণত হয়েছে। তার দু’চোখ থেকে উবে গেছে লজ্জাবোধ। মানসী বর্মণকে সে অকাতরে বিয়ের কথা পাড়তে পারে। শিবু পালিতের গাড়িতে কালো কুচকুচে বাউরি মেয়ে শেফালির সাথে গেছে নালন্দায়। যৌনতার চিট ফান্ডে উজ্জ্বল শেফালি। অপরাধ, হিং¯্রতা, খুন-দাঙ্গা, ধর্ষণ সবকিছুর মধ্যেও বিহারকে ভালো লেগে যায় অতনুর। মায়ের মৃত্যু তাকে প্রথমে বেদনার্ত করে। ‘বিহারের সবাই যেভাবে বাঁচতে চাইছে, তাইতে মিশতে চেয়েছে অতনু। বাঙালিরা যা কিছু খারাপ মনে করে অথচ বিহারিরা করে না, তা কেন খারাপ মনে হবে অতনুর, বিহার থেকে? এখানেই তো মরা আর বাঁচা। পশ্চিমবাংলায় ওর কেউ নেই, কিছুই নেই তাই নিজেকে প্রবাসী বলে চালাবার কোনো মানে হয় না। ঢাকা আর কলকাতা থেকে বহির্বাংলার দূরত্ব সমান।’ (‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’/৮২)।

ইতোমধ্যেই বিহারের রাজ্য রাজনীতিতে আসে পরিবর্তন। কংগ্রেস রাজত্ব শেষ হলে শুরু হয় যাদব রাজত্ব। অফিসের ইউনিয়ন চলে গেছে যাদবদের কব্জায়। যাদব মুসলমান, তফসিলি কর্মীরা এখন ক্ষমতার নিয়ামক। নোটবদলের যে কাউন্টারটায় দালালদের কাছ থেকে উপরি সবচেয়ে মোটা, তাতে ম্যানেজমেন্ট পালা করে বসায় যাদব, মুসলমান, তফসিলি। ট্যুরে যায় যে ডিপার্টমেন্টের অফিসাররা, সে ডিপার্টমেন্টগুলোয় পোস্টিং-এর কোটা মেনে নিয়েছে প্রশাসন। প্রায় অফিসের গেটের বাইরে, সুলভ শৌচালয় নিঃসৃত গ্যাসবাতিতে রক্তারক্তি ঘটছে। (‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’/৮৯)। বাঁকহীন হয়ে পড়ে অতনুর জীবন। মানসী বর্মণ কাজে রিজাইন দিয়ে চলে যায় ওরসলিগঞ্জের গান্ধী আশ্রমে, বিপ্লবও মুসহর অনাথ ছেলেমেয়েদের সেবার ব্রত নিয়ে। পৃথিবীর কাজ-কারবার থেকে সে যেন বঞ্চিত। এরই মধ্যে অরিন্দম জানায় কলকাতায় তার মিউচুয়াল চেঞ্জের খবর। ফ্লাট কিনে সংসার ভাবনার কথা। মৃত অসীম বর্মণের নোট চুরির খবরে তাকে জেরা করা হয়। মানসী সে সব নোট ব্যাগে ভরে তাকেই দিয়ে দিয়েছে। যদিও সে ধরা পড়েনি। কিন্তু অতনু অনুভব করেছে, তার অজান্তে তাকে বিসদৃশ ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে দিয়েছে সবাই, খেলা করছে তার ইনোসেন্স নিয়ে। কাহিনির শেষে অতনু বড় একা। বন্ধু সুশান্ত, অরিন্দ, তার মা, মানসী বর্মণ সবার থেকে একা হয়ে মনে মনে শূন্যতাবোধ তাকে ঘিরে ধরেছে। একদিন হঠাৎ কাউকে না জানিয়ে উধাও হয়ে যায় অতনু। পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে নিয়ে রটেছে নানা রটনা। শেষে ‘অরিন্দম ওকে দেখতে পেল হাজারিবাগের ঘন জঙ্গলে। মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টারে নিখোরাখি খেত মজুরদের ছেলে-মেয়ের অনাড়ম্বর গণবিবাহে। রেড বুক থেকে ইংরেজি মন্তর পড়ে বিয়ে দিচ্ছিল। দের-দুশো হতদরিদ্র, ম্যলা, ¯œানহীন, হাফ ল্যাংটা, গ্যাঞ্জামে বিয়ে শেষে অতনুর দিকে ভিড় ঠেলে এগোবার আগেই লোপাট হয়ে গিসলো।’ (নামগন্ধ/২৬২)

‘জলাঞ্জলি’ উপন্যাসে ইন্দ্রাণী সাধুখাঁ ওরফে ইনির পরিচয় আছে। অতনু চক্রবর্তীর ফেলে যাওয়া কোয়ার্টাসে বিনা ভাড়ায় আশ্রয় পেয়েছে ইনি। উচ্চতা পাঁচফুট দশ ইঞ্চি। ‘ঘাড় অবধি কোঁচকানো চুল, সতত রুক্ষ, তেল দিলে মাথাব্যথা করে। হাত দেখে কেউ বলেছিল নীলকান্ত মণি পরতে, তাই নাকছাবি। গায়ের রং তামাটে। নাক কুঁচকে হাসে, জোরে অনেক সময়। হাসলে টোল পড়ে। চোখ বেশ বড়, রাঙাতে সুবিধে হয়। ও জানে, চোখ, গ্রীবা, বুকের মাপ আর চেঁচিয়ে কথা বলা ওর যুদ্ধাস্ত্র। অঙ্কে ¯œাতকোত্তর একটা বাড়তি।’ (‘জলাঞ্জলি’/১০০)। অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের সাথে মিউচুয়াল চেঞ্জ করে সে আসে পাটনার অফিসে। ইনির বাড়ি বীরভূমের লাভপুর থানায় থিবা গ্রাম পঞ্চায়ের অন্তর্গত খাঁপুর গ্রাম। একেবারেই নিঢাল অনুন্নত গ্রাম, বিজলিবাতি থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিছুই সে গ্রামে নেই। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই নিরক্ষর।  অঙ্কে ¯œাতকোত্তর পড়ার পর কেরানি থেকে জুনিয়র অফিসার পদে সে প্রোমোশন পায়। প্রোমোশনের জন্য তার পাটনায় আসা। ম্যানিলায় ডেপুটেশনে যাবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে ইনি, প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই পুরুষ। ইন্দ্রাণী অনুভব করে, ‘পাটনা শহরটাই যেন পুরুষের। … পুরুষের পেশী আর যথেচ্ছাচার শাসিত অফিসটায় ও টিকে থাকছে। প্রতিটি চাল জিতছে পদে পদে গড়া সুকৌশলে। অন্ধকারে দাঁড়িয়েও চোখে অন্ধকার দেখেনি আর। বড়সড় করে পোস্ট করা হয়েছে ট্যুরে যাবার বিভাগে।’ (ঐ/১০৩)। বিহারের কঠিন হিং¯্রতার মধ্যে ঘন ঘন ট্যুরে যেতে রাজি হয় না কেউই। মারাঠি, গুজরাটি, মারোয়ারি পুরুষ অফিসাররা বেঁকে বসেন। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় প্রতি মুহূর্তে তাকে অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। নারাজ হলে বলা হয়েছে, ‘না যাবে তো, অফিসার হয়েছে কেন, নোট গোনার কেরানি করে খুন্তি নাড়লেই পারতে, ভাতার পুষে, বাচ্চা বিইয়ে।’ আড়ালে তাকে নিয়ে দেওয়া হয়েছে অপবাদ, ‘ও একটা ফ্লেশি মাল, কুত্তি চিজ, বদতমিজ মাগি, হিরিম্বা।’ ইন্দ্রাণী ব্যক্তিত্ব সচেতন।

অভিজিৎ লশরকে সাথে নিয়ে অফিসের কাজে ইন্দ্রাণীর প্রথম ধানবাদ। এলাকাটা কয়লা মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য। ‘পাটনায় স্থানান্তরিত হয়ে অবধি ধানবাদের কয়লা মাফিয়াদের গল্পগাছা, রঙচটা, আর অতিরঞ্জিত, শুনেছে ইন্দ্রাণী। তফসিলি আর ওবিসিদের কাছে একরকম, আরেক ভাষ্য উঁচু জাতের। কেউ বলেছে দাঁতে দাঁত চেপে মা-বাপ তুলে। কেউ ব্যাঁকা ঠোঁটে নাক ফুলিয়ে। দফতরের কেরানি চাপরাশি নোটগুনিয়েরা মাফিয়াদের জন্য গর্বিত। বিশ^নাথ পরতাব সিং, চন্দ্রশেখর, অরজুন সিং সব্বাই ওদের ভালোবাসা আর সোহাগ চায়। অফিসের চাপরাশি, কেরানি নোটগুনিয়ে ইউনিয়ন যখন রাজপুত কর্মীদের দখলে ছিল, তখন মাফিয়াদের অনুদান পেতো। কর্মীদের মাথা ঘুরিয়ে দিল ম-ল কমিশন। ধানবাদের রোগে অফিসটাও আক্রান্ত’ (‘জলাঞ্জলি’/১০৪)

ইন্দ্রাণীর ধারণা, শ্রমিক আন্দোলনে মাফিয়া শৈলীর প্রবর্তন জহরলালের আমলে। নেহেরু অর্থনীতি আর ইন্দ্ররার গোপন রন্ধ্রপথে। ধানবাদের প্রথম চাঁই ছিল বি পি সিনহা, মজদুরক নেতা ভূমিহার। বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীও ভূমিহার। জেলার সমস্ত আধিকারিক এমনকি জেলা প্রশাসক পর্যন্ত সকাল সন্ধ্যা হাজিরা দিত বি পি সিনহার দরবারে। এরপর তারই অনুগ্রহে ধানবাদ আর ঝরিয়ায় তৈরি হয় ছোট-বড় একাধিক শ্রমিক নেতা। সিনহার লেঠেল বাহিনী খুন, জখমের মধ্য দিয়ে এলাকায় ত্রাস সঞ্চার করে রেখেছিল। কূটনীতির ভুলে ভূমিহার সিনহা দালাল রাজপুতদের শাস্তি দিলে পাল্টা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় বি পি সিনহা। মাথা বাঁচাতে ভূমিহাররা আশ্রয় নেয় কমিউনিস্টদের ছায়ায়। তৈরি হয় নতুন নেতা এস কে রায়। খনি শ্রমিকদের নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিন্দেসরি দুব আর জগন্নাথ মিসিরের মধ্যে ছিল ঘোর রেষারেষি। দুজনেই ছিল কংগ্রেসের কট্টর ব্রাহ্মণ। ভূমিহার মুকুটমণি এস পি রায়কে বিধানসভার টিকিট দিয়েছিল বিন্দেসরি দুবে। কিন্তু দুবেকে পরাজিত করে এস পি রায় জগন্নাথ মিশিরের ছাউনিতে আশ্রয় নিলে দুবে কংগ্রেসে ভাগিয়ে আনে এস কে রায়কে। তারই দয়ায় শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হয় এস কে রায়। ভূমিহার আর ব্রাহ্মণদের এ হেন মাতব্বরি সহ্য করতে পারে না রাজপুতরা। শুরু হয় দুই গোষ্ঠীর মধ্যে লাঠালাঠি। ছোটখাটো ভীমহার আর ব্রাহ্মণ নেতাদের হাপিশ করে ধানবাদ আর ঝরিয়া কয়লাখনি দখল করে নেয় রাজপুতরা। ওদের নেতা সূরজদেও সিং। জনতা দলের টিকিটে বারবার জিতে বিধানসভায় ঢুকেছে। বিপক্ষ ইনটাক ইউনিয়নকে সে নস্যাৎ করে দিয়েছে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনির সাহায্যে। ¯্রফে পালোয়ানির জোরে সে ছিল বি পি সিনহার এক নম্বর লাঠিয়াল। কয়লা রাজত্ব থেকে ভূমিহারদের নিকেশ করার জন্য সে অতর্কিতে হামলা চালায় রাষ্ট্রীয় কোলিয়ারি ইউনিয়নের বাড়িটায়, এস কে রায়ের ওপর। ঘটনার পর সূরজদেও সিং নিখোঁজ হয়। পুলিশ তাকে ধরতে পারে নি। চর লাগিয়ে ভূমিহাররাও তাকে খুঁজে পায় নি। পরে সে মারা যায়। রামকানালি কোলিয়ারির ত্রাস ছিল জগদীশ নারায়ণ প্রসাদ। খুনের দায়ে গ্রেপ্তার হয় ছাত্রনেতা হলধর মাহাতো। এলাকার দখলদারি নিয়ে নেতায় নেতায় হামলা এ কোলিয়ারি এলাকায় নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। সব থেকে বেশি মারা যায় সাধারণ শ্রমিকরা। বিভিন্ন দুর্গত এলাকা থেকে খাবারের সন্ধানে আসা খনির শ্রমিকদের জীবন বড় কষ্টের। হোলি, দেয়ালি, দশেরায় নিরীহ শ্রমিকদের পিটিয়ে মারে শ্রমিকনেতা সূরজদেও সিং, সকল দেও, সিং রা। তার ওপর আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বর্ষার বেগতিক নদী ঢুকে পড়ে খনি সুড়ঙ্গে। কয়লাখনি সরকারিকরণের পর থেকে নিরাপত্তা আধিকারিকেরাও ঘুষ নেয়। জল মাপা হয় না ঠিক মত। ফলে নিরীহ শ্রমিকরা খনিগর্ভেই মারা যায়।

অভিজিতকে সাথে নিয়ে ইন্দ্রাণী এরপর গেছে উত্তর বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। ব্যাঙ্কের দেওয়া ঋণে এই অঞ্চলের ক্ষুদ্রসেচ, ভূমি সংরক্ষণ, দুধ প্রকল্প, ভেড়া, মুরগী, শুয়োর পোষা, বৈদ্যুতিকরণের কাজ তদারক করতে। দশ সপ্তাহের টানা কর্মসূচী। ওদের রিপোর্ট বম্বের অফিস হয়ে জমা পড়বে আন্তর্জাতিক অর্থভা-ারের সদর দপ্তরে। উত্তর বিহারের পুরো তিরহুত এলাকায় রাজপুতদের রাজত্ব, কৃষিজমির এরাই মালিক। ধীরে ধীরে এরা চাকরি, ব্যবসা, ঠিকেদারি প্রভৃতি পেশায় যোগ দিয়েছে। চাকলা, মানঝাওল, কিষণগঞ্জ ভূমিহারদের রাজত্ব। পেশি আর হুংকার ভূমিহারদের মূলধন। মাত্র গোটাকয়েক গ্রামে কায়েতদের বাস। মোগল আমলে ফার্সি আর উর্দু এবং ইংরেজ আমলে ইংরজি শিখে বিপুল আমলা আর কেরানির চাকরি নিয়েছিল। সচল রেখেছিল প্রশাসনকে। অনুন্নত জাত বলতে কোয়রি, কুরমি, বেনে, যাদব। কোয়রি আর যাদব পরিবারের লেঠেলরা ছিল রাজপুতদের ক্ষমতার উৎস। একে অপরের নারীকে তুলে নিয়ে যেত। গুম হওয়া, যুবতীদের লাশ ভেসে উঠত নদীর জলে। যাদবদের একাধিক উপশ্রেণি ছিল। গোরিয়া, কেন্নৌজিয়া, কিশনৌট আর মাঁঝরৌট। সময়ের সাথে সাথে চাকরি আর ঠিকেদারিতে মজেছে সবাই। শুরু হয়েছে গুঁতোগুঁতি। সর্বত্র ছিল ফর্সা চেহারা আর উঁচু জাতের রমরমা। আত্মসম্মান ধার নিতে, ভয়ে কোয়রি, কুরমি, বেনে যাদব, ধানুকেরা দ্রুত পদবি পাল্টে সিং বা সিনহা হয়ে যেত। চাকুরিসূত্রেই লেখাপড়ার দিকে বেড়েছে আগ্রহ। উত্তর বিহারের ধনী সম্প্রদায়রা নিজেদের ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দিয়েছে জহরলাল নেহেরু বিশ^বিদ্যালয়ে, হিন্দু বিশ^বিদ্যালয়ে। মুসলমানেরা পাঠায় জামিয়া, মালিয়া, আলিগড়।

টুকলি ¯œাতক আমলারা ইংরেজি জানে না। গোরু, মোষ না কিনেই ঋণের ভুয়ো হিসেব দেখানো হয়। রন্ধ্রে রন্ধ্রে চলে দুর্নীতি। সাসারসা জেলার এমনই এক দুর্নীতিপরায়ণ বৃদ্ধ অখিল যাদব। ধরা পড়লে সে কেঁদেকেটে হয়রান হয়। শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ভোট পর্যন্ত চলে এদেরই খেয়ালে। পাপ্পু যাদবের সাগরেদরা ইচ্ছে মত ছাপ্পা মারে। মাধেপুরায় বন্দুকবাজি করে পাপ্পুর লোকজন। মাত্র পনের মিনিটের বেশি পাপ্পুকে গ্রেপ্তার করে রাখা যায় নি। বদলি হয়ে গিয়েছিল জেলা পুলিশের ওপর থেকে নিচের কর্তারা। রাজ্যরাজনীতিকে এভাবেই নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাবানরা। সরকারি, বেসরকারি চুরি, জোচ্চুরি নজরে আসে প্রতিদিন। ‘বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পঞ্চায়েত প্রধানদের যোগসাজশে সরকারি আধিকারিকরা প্রকল্প খাতে যে সব খরচ দেখিয়েছে, মেরামতির খরচাপাতি দেখিয়েছে, ¯্রফে কাগজে-কলমে। লক্ষ লক্ষ টাকা ফাঁকা চালের কল, ডালের কল, হিমঘর, পোলট্রি, বিলিতি গাইবাছুর কতো রকমের ফিতে কাটা হয়েছে, কোথাও তাদের পাত্তা নেই, টাকাগুলো যে কোথায় যায়। ব্যাঙ্কেও তো জমা পড়ে না। গ্রামগুলো যেমনকার তেমনই ধুঁকছে। পথ চলতি জাতীয় সড়কের দু-পাশে হয়ে উঠছে আরও অপরাধপ্রবণ। চুবড়ি-চেঁচারি বানিয়ে তুলেছে ডোমপুত্র আর দুসাধ গৃহিণীরা, নালি নর্দমার ধারে।’ (‘জলাঞ্জলি’/১৭৮)। প্রশাসন সেখানে ঠুঁটো জগন্নাথ। ধনতন্ত্রের মানদ-ে উন্নয়ন ঘটাতে বিহার রাজনীতিতে সবাই অবাস্তবতা সৃষ্টি করতে চায়। সততা বা পরিশ্রম উন্নয়নের রাস্তা দেখাতে পারবে না। তাই দরকার ভিন্ন পথ। অবাস্তবতা ছাড়া এ পৃথিবীকে ভোগ করা যাবে না। যে যত বড় দুর্নীতিবাজ, যে যত বড় মিথ্যাবাদী তার কদর তত বেশি। যারা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সত্যটাকে চাপা দিতে পারবে, মিথ্যেটাকে বড় করে প্রকাশ করতে পারবে বিহারের রাজ্য রাজনীতিতে তারাই হবে দীর্ঘজীবী। চম্পারণ, বেগুসরাই বা মুঙ্গের বা মুঙ্গের গল্প সর্বত্র এক। কুরমি অধ্যুষিত চামারি মাহাতোর ছেলে রাজকুমার মাহাতোর হাতে খুন হয় চম্পারণের বগাহা সংরক্ষিত আসনের বিধায়ক তিরলোকি হরিজন।

অভিজিৎ আর ইন্দ্রাণীকে পাশে পেয়ে বেগুসরাইয়ের গল্প বলেছে কেয়ারটেকার। বেগুসরাই ছিল কম্যুনিস্টদের এলাকা। রাজনীতির রেষারেষিতে কম্যুনিস্ট সাথে পেরে না ওঠায় কংগ্রেসের সাহায্য চেয়েছিল। এখানকার প্রতাপান্বিত নেতা কামদেও সিং। মাথায় হাতুরি পিঠে, বুকে শাবল ঢুকিয়ে, ঘাড়ে টাঙ্গির কোপ আর পেটে গাঁড়াসা মেরে কংগ্রেস বিরোধীদের লোপাট করেছে সে। পুলিশের সাথে তার ছিল গোপন বখরা। বখরার গ-গোলে পুলিশের গুলিতে খুন হয় কামদেব। কিছুদিন ঠা-া থাকলেও গিরোহগুলো এ পার্টি ও পার্টিতে ঢুকে পড়ে। পাটনায় দিন-দুপুরে খুন হয়ে যায় বেগুসরাইয়ের কমিউনিস্ট নেতা যোগী সিং। বেগুসরাইয়ের সাতটা বিধানসভা আসনের একটা লোকদলের নারায়ণ যাদবের, তিনটে ভূমিহারদের, আর বাকি তিনটে কমিউনিস্ট দলের নিচু জাতের।

অভিজিৎ লশকর ইন্দ্রাণীর অধঃস্তন কর্মী। কোঁকড়াচুল, অ্যাথলিটপ্রতিম সুঠমি চেহারা। পাটনা বিশ^বিদ্যালয়কে একশো মিটারে সোনা এনে দিয়েছিল পরপর চারবার। বিশ^ ইতিহাসে ¯œাতকোত্তর পাশ। ¯œাতক আর ¯œাতকোত্তরে প্রথম হয়েছিল। গোড্ডা কলেজে কিছুদিন অধ্যাপনাও করেছিল। তারপর সে যোগ দেয় পাটনার অফিসে। উন্নয়ন ঘটে দ্রুত গতিতে, নোটগুনিয়েদের চাকরি থেকে দু’বছর কেরানি আর পরে দু’বছরে অফিসার। অভিজিৎ ইন্দ্রাণীর সহকর্মী হয়ে উত্তর বিহারের ধানবাদ, ভাগলপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরেছে। ব্যাঙ্কের দেওয়া ঋণের তদারকির কাজে তাদের ঘুরতে হয়েছে। কেয়ারটেকার অমরুতমলের মুখে তারা শুনেছে উত্তর বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলের সন্ত্রাসের রাজনীতি আর ক্ষমতাবানের গল্প। অভিজিৎ অবিবাহিত। অমরুতমলেই তাকে জানিয়েছে, বড় অফিসার হিসেবে তাকে কিডন্যাপ করার ষড়যন্ত্র চলে গোপনে। লাঠিয়াল বা বন্দুকধারীদের প্রহরায় এভাবে এখানে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল তমাড় গ্রামের ক্যাশ ডিপার্টমেন্টের সুরেন্দর সিনহার, পণবন্দী হয়েছে পাটনা হাইকোর্টের বিচারপতি নগেন্দ নায়ের ভাই দ্বারিকা রায়, মুঙ্গেরে তারিণী ম-লের চোদ্দ বছরের মেয়ের সাথে বিয়ে দেওয়া হয় সুশান্ত ঘোষের। মানুষের পণের টাকাকে এরা বলে ফিরৌতি।

কিন্তু মেয়েদের বেলায় ‘ফিরৌতি নিয়ম খাটে না। ইনির প্রশ্নের জবাবে অভিজিৎ বা ইন্দ্রাণীকে কেয়ারটেকার অমরুতমল জানিয়েছে, মেয়েদের বেলায় কোনও পণবন্দি চলে না। ‘জন্তু জানোয়ারের তবু পনহা হয়, মেয়েদের বেলায় তাও হয় না …বাড়িসুদ্ধ, গ্রামসুদ্ধ সবাই মজা লুটবে তারপর রেখে দেবে রাখেল করে। উঁচু জাতের হলে কাজ ফুরোবার পর খুন করে পুঁতে দেবে, কিংবা বেহুঁশ করে নিয়ে গিয়ে বেচে দেবে অন্য শহরে। নিচু জাতের হলে চাকরানী করে নেবে, বিয়ে দিয়ে দেবে কোনও জিহুজুরি চাকরের সঙ্গে। একবার ধরে নিয়ে গেলে আত্মীয় স্বজনেরাও ফেরত নেবে না। বিনা পয়সাতেও নেবে না।’ (‘জলাঞ্জলি’/১৭৩)। নারী সেখানে নিতান্তই ভোগ্যপণ্যে পরিণত।

বিত্ত আর ক্ষমতা বিহারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিত্তশালী পুরুষকে দখল করতে চেয়েছে নারীও। কলকাতার মেয়ে সুজাতা কাজারিয়ার খপ্পরে পড়লে মনে মনে বিব্রত বোধ করে অভিজিৎ। সুজাতা অবশ্য অভিজিতকে প্রতারিত করতে চায়নি। অলঙ্কার ভর্তি শরীরে যৌবনের শেষ প্রহরে দাঁড়ানো সুজাতা চেয়েছিল অভিজিতের শরীর আর সন্তান। তার স্বামী কলকাতার ট্যাক্সি চালক টালি, মানে রাজকুমার। স্বামীবঞ্চিত জীবনে সন্তান সাহচার্যের ব্যাকুলতায় কেঁদে উঠেছিল তার নিঃসঙ্গ, বুভুক্ষু জননী হৃদয়। রাত সারে নয়টা বাজলে প্রতি রাতে গায়ে কম্বল জড়িয়ে প্রায় নগ্ন অবস্থায় সে হাজির হয়। অভিজিতের ঔরসেই এক সময় সন্তান আসে সুজাতার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচেনি অভিজিৎ। রাস্তার এক পাগলির নগ্নতা ঢাকতে গেলে সে তার কাঁধ কামড়ে খুবলে নেয় মাংস। কাজারিয়া, ডালমিয়া, বিষকন্যাদের সাথে ক্রমাগত দেহসঙ্গ কিংবা পাগলির কামড়ানির জলাতঙ্কে ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে অভিজিতের জীবন। ইন্দ্রাণীও বেশিদিন আর বিহারে থাকেনি। তার কাজে খুশি হয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে পাঠায় ম্যানিলা।

অরিন্দমের চোখে একদিকে যেমন কলকাতার রাজনীতি, সমাজনীতির জ্বলন্ত চেহারা ফুটে উঠেছে বিহারের রাজনীতির বিচিত্র চেহারা ফুটে উঠেছে। পাটনা থেকে গাড়ি কিনে গয়া হয়ে আসার পথে অরিন্দমের চোখে পড়েছে, পাটনাকে ঘিরে জেলাগুলোর বেশিরভাগেই নকসল্লিদের এলাকা। সাধারণত যারা নানহো, মানে নিচু জাতের খবরের কাগজে তাদেরই বলে নকসল্লি। দেশ স্বাধীনতার চার দশক পরেও এদের কোনও ভোটাধিকার নেই। ভূস্বামী আর পুলিশের অত্যাচারে এরা সর্বদাই তটস্থ। পাটনা জেলার পুনপুন ব্লকের কুরমি ভূস্বামীরা পুলিশ প্রশাসন আর রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্রে চালাবাড়ি সুদ্ধ পুড়িয়ে মেরেছিল চোদ্দ জন নিচলি জাতের মানুষকে। জোতদার রাধিকা সিং হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করেছিল তারামতি নামে নিখোরাকি খেতকিসানিকে। বর্গাদারদের বেদম পেটাতো। মজুরি দিত না। বেগার খাটাতো। ছোটজাতের লোকেরা প্রতিবাদ করেছিল বলে তিন ক্রোশ দূরের উঁচু জাতের পা-ারা এসে তাদের গ্রামসুদ্ধ আগুন লাগিয়ে দিল। পুড়িয়ে মারল জলজ্যান্ত। সরকার, প্রশাসন, আইন আদালত, জমিজমা আর টাকাকড়ির মৌলিক এইসব ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নিচুজাতের নেই।

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী অবস্থার থেকে সময়ের পরিবর্তন ফুটে ওঠে। তখন অবশ্য এই পরিবেশ ছিল না। কোয়ারি, দুসাধ, মুসাহার, ডোম, চামার, কুমবাহারাদের নিজস্ব আয়ত্তে রাখতে পেরেছিল ভূস্বামীরা। তাদের সাথে ছিল প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক। লিবারেশন আর পার্টি কর্মীর লোকেরা এই শোষণ আর বঞ্চনার বিপক্ষে মানুষকে সচেতন করেছে। মাওবাদী কম্যুনিস্ট সেন্টার ছেয়ে গেছে আওরঙ্গাবাদ, পলামু, গঢ়ওয়া, চাতরা, হাজারিবাগ, গিরিডিহি, বোকার, ধানবাদ, জেহানাবাদ, নওয়াবাদ। নকসল্লীদের সাথে ভূস্বামীদের তৈরি হয়েছে শত্রুতার সম্পর্ক। পুলিশ আর ভূস্বামীরা এদের গাছে বেঁধে হাত-পা কেটে দেয়, গাছে ফাঁসি দেয়। গয়া জেলার টিটকারি থানা আগুন ধরিয়ে দেওয়া কিংবা পুলিশ খুন করার কাজে এরাই ছিল নিয়োজিত। তবু জমিজমার আইন কার্যকর করতে পারেনি মনোজ শ্রীবাস্তব কিংবা শ্রীব্যাসের মত ঝানু আই এ এসরা। বিহারের জঙ্গলমহলের অন্ধকারে দিনের পর দিন পরিব্যাপ্ত হয়েছে মানুষের অত্যাচার আর অরাজকতার ইতিহাস।

বিহারের জনজীবনের চিত্রণে তাঁর মত আর এক সন্ধানী লেখক প্রফুল্ল রায়। উত্তর বিহার থেকে মুম্বাইয়ের নিরন্ন কুলিকামিনদের মধ্যে মিশে গিয়ে তিনি তাদের বেদনা আর মাটির গন্ধকে তুলে ধরেছেন। মলয় রায়চৌধুরীর লেখার মধ্যে মাটির সেই পরিচয়ের থেকেও রাষ্ট্রক্ষমতা বা শ্রেণি শোষণের ছবিটাই মুখ্য। প্রফুল্ল রায়ের গল্পের মধ্যেও উঠে আসে মহাজনী অত্যাচার, লুটপাট, নারী-নির্যাতন, ক্ষমতার লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য ভোট রাজনীতির কুৎসিত তামাশা, নর-নারী সম্পর্কের রসায়ন ও নাগরিকতার চিত্রবিচিত্র কাহিনি। এককথায়, প্রফুল্ল রায় লিখেছেন গল্প, যেসব গল্পের অবয়বে মাটি আর মানুষকে ভালোবেসেছেন। সেই গল্পে ওদেশ আর এদেশের মাটির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকেনি। মলয় রায়চৌধুরী সমাজ আর রাজনীতির ইতিহাস তুলে ধরেন। ক্ষমতার কুটিলতায় যা ঘর্মাক্ত, হানাহানি আর নিরবচ্ছিন্ন শোষণে যা বেদনাময়। সেই রূঢ়তার ছবি মলয় চৌধুরীকে ভাবায়।

অরিন্দম মুখুজ্জ্যে ছিল অবিবাহিত। পাটনার অফিসে কাজ করত। এক সময় পাগলের মত উস্কোখুস্কো চুল, লাল চোখ আর দাঁড়ি নিয়ে ওকে মোগলসরাই স্টেশনে আবিষ্কার করে শিবু পালিত। সুস্থ হয়ে সে যোগ দিয়েছে কাজে। দশটা-পাঁচটার নির্ভুল এবং নামকরা কেরানি ছিল অরিন্দম। পাগল হওয়ার পর সে কিছুটা মোটা হয়েছে। তার পাগল হওয়া নিয়ে অবশ্য রহস্য আছে। ও যখন চিকিৎসাধীন তখন ওর নামে, ওর অনুপস্থিতিতে বরাদ্দ হয়েছিল নতুন ফ্ল্যাট। মা আর ভাই ছিল নতুন কোয়ার্টারের বাসিন্দা। ফিরে আসার পর নোট পরীক্ষক গৃহবধূরা ওকে ঘিরে ধরে নানা রসালাপ করে। আসলে ওদের সংস্থায় কাজের চাপ আর নির্ভুল কাজের একাগ্রতা রাখতে গিয়ে প্রত্যেক বছর একজন করে পাগল হয়। পাগল হওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য অসীম পোদ্দার, মামুদ জোহার মিলে গড়ে তুলেছে এক সান্ধ্যদল। নিজস্ব মৌতাতেই ওরা বুঁধ হয়ে থাকে। কোনো উচ্চাকাক্সক্ষা বা কেরিয়ার তৈরির চিন্তা তাদের নেই। ‘ওদের কথা বলার ঝাঁঝ থেকে জানিয়ে দেয় যে কেউ কিছু হয়ে ওঠে না, বুদ্ধিজীবীর কাজ আদর্শবাদ এড়ানো, বেঁচে থাকাটা জ্বরভারের আনন্দ, স্মৃতি জিনিসটা বানানো, বাস্তব বলে আদপে কিছু হয়না বলে কোনো দুশ্চিন্তায় ভোগার দরকার নেই।’ (ঐ/৪৫) পাটনার জীবনে তার ভালো লাগেনি। জীবনে স্থিতিশীলতার জন্য ইন্দ্রাণী সাধুখাঁর সাথে মিউচুয়াল ট্রান্সফার করে কলকাতার বিবাদি বাগের অফিসে সে চলে আসে।

স্বাধীনতার পর শান্তি শৃঙ্খলায় অবগতি বহারই নয়, পশ্চিমবঙ্গেও চূড়ান্তভাবে স্পর্শ করেছিল। ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে মলয়বাবু পশ্চিমবঙ্গের অপরাধের চেহারা তুলে ধরেছেন। একারণেই অরিন্দমকে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে এসেছেন। উপন্যাসের শুরুতেই প্রকাশ্য অপরাধের হাড় হিম করা চেহারা জয়বিবি রোডের প্রকাশ্য জনপদে নৃশংসভাবে খুন হয়েছে বালি পুরসভার কমিশনার মহম্মদ শামিম খান। হত্যার পর পরপর চারটে বোমা ফাটে। আতঙ্কে পালিয়েছে পথচারীরা। পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর আদিত্য বারিক অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের বন্ধু। তার নীতি কিছুটা আপসের। অত্যাচার, অবিচার দেখেও সে মারাত্মক হয়ে ওঠেনি। পুলিশ হত্যা বিহারের মত এ রাজ্যেও দুর্লভ নয়। লুকোছাপা, প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা দেখলে যখন খেপে উঠেছে পুলিশ তখন আড়ালে আবডালে অপরাধীরাও হয়ে উঠেছে হিং¯্র। ভদ্রেশ্বর থানার ওসি ভোলানাথ ভাদুড়ী, ডোমকলে কনস্টেবল তপন দাস, জয়নগরের এস আই অশোক ব্যানার্জিরা জনগণের হাতে বেঘোরে যেমন মরেছে, তেমনি ডেডিকেটেড অফিসার বিভূতি চক্রবর্তী, বরীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি, রাজকুমার চ্যাটার্জি, নীহার চৌধুরী, রবি কর, উমাশংকর লাহিড়ির মত সৎ পুলিশ অফিসারেরাও ছিল। প্রাণ বাঁচাতে আদিত্যদের মত আপোষ নীতি ছাড়া উপায় নেই। অত্যাচার আর ঘুষ-ই প্রশাসনকে পরিণত করেছে প্রহসনে। অত্যাচারের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য অপরাধীদের জামিনদার ভাড়া করতে হয়। ‘জি আর পির সঙ্গে বেশ ভালো বোঝাপড়া আছে জমিদারের। রেস্ত রখালেই ছাড়া পেয়ে যাবে লোকগুলো’। (নামগন্ধ/২৬৪)।

অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টরের চাকরি পেতে দেড় লাখ টাকা খরচ করেছে আদিত্য। সে নিজেও একসময় পাটনার অরিন্দমের সাথে কয়েন আর নোট এগ্জামিনের চাকরি করেছে। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা রোজগারের মোহ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে পারেনি। চোখের সামনে দেখেছে রাজনীতির কড়া ধাপ্পাবাজি। শঠ আর শাঠ্যের তা-ব নৃত্যলীলা। সরকারি দফতরে নেতা কর্মীদের মুখে সততার মুখোশ। যার অপর নাম সংস্কৃতি। দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু আর সর্বহারা সেজে লালে লাল হয়ে উঠেছে একশ্রেণির ধান্দাবাজ। রাজনীতি করে, মস্তানি করে তারা কব্জা করেছে এদেশের আইন আর প্রশাসন। স্বাধীনতার পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা আর প্রতিষ্ঠার দিক থেকে এরাই শীর্ষে। ইংরেজদের অনুকরণে এরা চালু করেছে বড়োদিন, নিউ ইয়ার্স, হ্যাপি বার্থ ডে। সর্বত্রই অনুকরণ আর কৃত্রিমতার নির্মম ধাপ্পাবাজি। কৌশল আর বুদ্ধিমত্তার জেরে কমিউনিস্ট পার্টিকে এরা দখল করেছে, উদ্বাস্তু সেজে থাকা এই শ্রেণিচিহ্নিত মানুষরাই প্রাইমারি স্তরে ইংরেজি ভাষা নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে আসল উদ্বাস্তু রমণীরা হাড়ডিগডিগে চেহারা নিয়ে আর শতচ্ছিন্ন পোশাক পরে ভিক্ষে করে শহরের রাজপথে, অলিতে গলিতে। কোলে পেটফোলা রুগ্ন শিশু। বিন্দুমাত্র আত্মসম্মান তাদের নেই। বলাবাহুল্য, স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতির পরিবর্তমানতার ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মলয়বাবুর লেখায়। সমাজতাত্ত্বিকদের মত তাঁর সন্ধানী দৃষ্টি। বৈজ্ঞানিক যুক্তি আর অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণী শক্তিতে ফালা ফালা করে তিনি দেখাতে চান সামাজিক বিন্যাস।

পুলিশ অফিসার আদিত্যর চোখে ফুটে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের হতচকিত পরিস্থিতি আর পূর্ববঙ্গ থেকে আসা বাঙালদের বাড়বাড়ন্ত অবস্থা। সে মেনে নিতে পারেনি। রাজ্যের কর্তৃত্ব তাদের দখলে। ছলছুতো, গু-াবাজি, খুন রাহাজানি করে, ‘সর্বহারা’ নাম নিয়ে তারা আজ এ রাজ্যের কর্ণধার। এক কাপড়ে তারা আজ কোটিপতি। সেন্ট্রাল-ক্যালকাটা, আলিপুর, সল্টলেক সব আজ তাদের দখলে। অথচ, ‘শ্যালদায় একপাল লোক নাকে কাঁদছে, দেঁশ ভাঁগ চাইনি, দেঁশ ভাগ চাইনি বলে।’ (নামগন্ধ/৩০৪)। শুধু বাঙালরাই নয়, অবাঙালিরা দখল করে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের অন্য সব কাজকর্ম। ট্যাক্সি ড্রাইভারদের অধিকাংশই বিহরী, ট্যাক্সি আর বাসের মালিকগুলো পাঞ্জাবি। ধোপা, সুতোর, নাপিত, মুচি, কামার, মিস্ত্রিদের অধিকাংশই হয় বিহারী নয় ইউ পি সাইডার। বাঙালিরা ঘরকুনো। চাকরি ছাড়া বাঙালিরা কিছুই বোঝে না। বাঙালিরা আড্ডা দেয়। ‘আড্ডাটা হল মায়ের কোল। চাকরিটা মায়ের কোল। মায়ের কোলের আরাম চাই বাঁধা টাকার মাই খেয়ে।’ (ঐ/৩০৫)

স্বাধীনতার পর থেকে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের দরুণ ধনী আর দরিদ্রের দাঁড়িপাল্লায় উত্থান-পতন ঘটেছে। হাওড়া জেলার ভোটবাগান অঞ্চলে এশিয়ার সবচেয়ে বড় লোহার ছাঁটের স্ক্রাপ ইয়ার্ড। সার সার পাঁচমিশালি খুপরি খুপরি ঘরে নর মরদদের আড্ডাখানা। ছাঁট আর লোহার টুকরোর সা¤্রাজ্যে দখল নেওয়ার জন্য ‘গান্ধী’ গোল ওয়ালকার, মার্ক্সের কুলাঙ্গারদের কাজিয়া। ‘নদীয়া জেলার কালীগঞ্জে কাঁসা পেতলের ভাংরি। স্টেনলেস স্টিলের আসার পর থেকে কাঁসা পিতলের কারিগররা বিদায় নিয়েছে। নানা পেশায় আজ ক্ষতবিক্ষত তাদের বর্ণহীন জীবনকাহিনি।

স্বাধীনতার পর যে যেমন পেরেছে ক্ষমতা দখল শুরু করে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। গ্রামেও ক্ষমতা দখল নিয়ে চলেছে এক ধরণের সংকীর্ণতা। মুর্শিদাবাদ সাগরপাড়া হাইস্কুলের শিক্ষক প্রার্থীপদে জোর করে রেজিস্টারে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইন্টারভিউয়ের নামে চলেছে প্রহসন। পৈতে পরা ব্রাহ্মণরা ক্ষমতা প্রদর্শনের রাজনীতি শুরু করেছিল। উঁচু জাতির ব্রাহ্মণদের ধাক্কায় নীচু জাতিরা কল্কে পায়নি। সাঁওতাল, মু-া, ভূমিজ, খেড়ে, শবর, কৈবর্ত, তেঁতুলে বাগদিদের মত নি¤œবর্গের মানুষ শহরের প্রান্ত ঠেলে পৌঁছে গেছে শহরের কিনারে, জঙ্গলে। কেন্দুপাতা, সাবাই ঘাস, মহুয়া বীজ, শালবীজ, শালপাতা, কুসুম, নিম, কালমেঘ, কুড়–চি, আমলকী, এমনকি ময়ুরের মাংস এরা টাউনে নিয়ে আসে। ভালো দাম পায়। ‘যা কিছু দেখতে ভালো, তাকেই সাবড়ে ভুষ্টিনাশ করতে চায় শহরের মানুষ। জিনিসটার নয়, মানুষ আহ্লাদিত হয় ভুষ্টিনাশের স্বাদে। প্রতিটি সৌন্দর্য বস্তুর চর্বণ পদ্ধতি আলাদা। চেবাবার আওয়াজ আলাদা আলাদা।’ (ঐ/৩০৭)। ‘শহর মানেই দাপটের কেন্দ্র’ (ঐ/২২৫)। শহর কলকাতা-ই সে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।

স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের নব রূপায়ণের চেহারাটা ভবেশের কাহিনিসূত্রে উঠে এসেছে। ভবেশ এপার বাংলার নয়, ভবেশের বাড়ি বাংলার খুলনা জেলায়। দেশভাগের সময় নিঃস্ব, অভুক্ত ভবেশ খুশিকে কাঁধে চাপিয়ে বনগাঁ থেকে শেয়ালদা লোকালে ওঠে। সেখান থেকে চটকলের গুদামে। তারপর বালিগঞ্জের যশোদাভবন ক্যাম্প। তারপর কলকাতায় জলাজমির দখল শুরু হয়ে যায়। সে সব জমির পরবর্তী নামকরণ হয় সূর্যনগর, আজাদগড়, নেতাজিনগর, শ্রীকলোনি, গান্ধী কলোনি, বাঁশদ্রোণি, বিজয়গড়, রামগড় প্রভৃতি। আচমকা মানুষ ভরে যাওয়ায় ঠ্যাঙাড়েরা রাত-বিরেতে তুলে দেবার চেষ্টা করতে উঠে আসা স্বজন হারানো লোকগুলোকে। ভবেশ ছিল এদেরই দলে। কিন্তু নেহাত উদ্বাস্তু রূপে চোরচোট্টা গিরি করে সে হারিয়ে যায়নি। কলেজে পড়ার সময়েই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে ভবেশ। ট্রামভাড়া যখন এক পয়সা বাড়ল, প্রথম ট্রামটায় আগুন ধরিয়েছিল ভবেশ। নিত্যদিন কলকাতায় গিয়ে পিকেটিং, ট্রাম জ্বালানো, বাস পোড়ানো, ব্যারিকেড, বোমা, অ্যাসিড বাল্ব। বোমা বাঁধতে গিয়ে বাঁ হাতের কড়ে আঙুল উড়ে গিয়েছিল ভবেশের।

সময় ছয়ের দশক। কলকাতায় রাস্তায় চলে সেনা অভিযান। শোভাবাজারে ভিড়ের ওপর গুলি চলে। বিধান রায়ের আমলে ছেষট্টি সালে পশ্চিমবঙ্গের বুকে চলে খাদ্য আন্দোলন। ‘খাদ্যমন্ত্রী তখন প্রফুল্ল সেন। তিরিশ হাজার পুলিশকে ধান চাল জোগাড়ের তদারকির কাজে লাগিয়ে দিলে। দাম বাঁধার হুকুম আর লেভি অর্ডার তুলে নেওয়া সত্ত্বেও, চাল গম ডাল তেল মশলার দাম বাড়তে লাগল। হু হু। হু হু। বিধান রায়ের বুকের ব্যারাম ধরিয়ে দিলে প্রফুল্ল সেন। সে একেবারে দুর্ভিক্ষের জোগাড়। রাতারাতি খলনায়ক হয়ে গেল প্রফুল্ল সেন আর অতুল্য ঘোষ। খাদি-খদ্দর জামাকাপড় তো তারপর উঠেই গেল পশ্চিমবঙ্গে।’ ভবেশদের জন্য শুরু হল ব্যাপক ধরপাকড়। ডালহৌসী স্কোয়ার, এসপ্ল্যান্ডে ইস্ট, ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট ঘিরে শুধু মিছিল আর মিছিল। পুলিশী একশো চুয়াল্লিশ ধারাকে উপেক্ষা করে বাসে আগুন, ট্রাম লাইন উপড়ে ফেলার কাজ চলতে লাগলো যথেচ্ছভাবে। শেষমেষ ছেষট্টির খাদ্য আন্দোলনের পর ভবেশ পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় মু-েশ্বরী নদীর ধারে শেষপুকুর গ্রামে।

ভবেশের পরিচিতি নিয়ে বিশেষত খুশির সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রেখেছেন লেখক। দেশভাগের আগে খুলনা জেলার মাইড়্যা গ্রামের বাসিন্দা ছিল ভবেশ। নমঃশূদ্রদের অত্যাচারের মুখে পঞ্চাশ সালে কচি ফুটফুটে সৎ বোন (!)  খুশিকে নিয়ে সে পালিয়ে আসে। তার দাদু, ঠাকুমা, মা, দাদা-বউদির কেউই বাঁচেনি। তবে খুশি সৎ বোন কিনা সে নিয়ে আছে প্রশ্ন। কাহিনির শেষে ডাকাত সন্দেহে যিশু বিশ্বাস আক্রান্ত হলে তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে ব্রিফকেস। সেই ব্রিফকেসের ভেতর বহুকালের পূর্ব পাকিস্তানের খবরের কাগজ থেকে পাওয়া যায় খুশির পরিচয়। ‘প্রথম পৃষ্ঠার তলার দিকে ডান কোণে ফুটফুটে আড়াই বছরের নাতনির ফোটোর তলায় তার হারিয়ে যাবার বিজ্ঞাপন দিয়েছে দাদু মিনহাজুদ্দিন খান। মেয়েটির নাম খুশবু। ডাক নাম খুশি।’ (‘নামগন্ধ’/৩৩৬)। উল্লিখিত চিহ্নের সবকটিই প্রৌঢ় খুশির দেহে স্পষ্ট। এমনকি খুশিকে নিজের কাছে আটকে রেখেছে ভবেশ। তার বিয়ের বন্দোবস্ত করেনি। নিজেও বিয়ে করেনি। যিশু এ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে উত্তর এড়িয়ে যায় ভবেশ। তখন ভবেশ-খুশির সম্পর্ক বেশ কিছু রহস্যময় প্রশ্ন পাঠকের মনে দানা বাঁধে। প্রশ্ন ওঠে ভবেশের সততা নিয়েও।

ষাটের দশকে আলুর দাম বাড়লে খাদ্য আন্দোলনে তুলকালাম করেছিল ভবেশ। নোংরা ধুতি শার্ট পরে থমথমে চোখে-মুখে চ্যাঁচাত ‘দেশভাগ আমরা চাইনি।’ আজ হিমঘরের অংশীদার ভবেশ সংরক্ষণ ক্ষমতার দ্বিগুণ আলু ঢুকিয়ে, লাখ কুইন্ট্যাল আলু পচিয়ে, সেই একই হুগলি জেলায় চাষিদের ভয়ংকর বিপদে ফেলেও সে আজ নির্বিকার। চাষিরা পথে বসেছে। মহাজনের দেনা না মেটাতে পেরে তারা ডাকাতি করে, আত্মহত্যা করে। ‘জমি যার, লাঙল তার’ দিয়ে আন্দোলন শুরু করে সে আজ হুগলি জেলার সমৃদ্ধ, সম্পন্ন চাষি ভবেশ। ত্রিশ বছরের মধ্যে বিভিন্ন কমিটি, প্রকল্প থেকে শুরু করে সরকারী, বেসরকারী সমস্ত ক্ষমতার সে-ই পুরোধা। হিমঘর থেকে আরম্ভ করে হুগলির প্রত্যন্ত অঞ্চলে সে বহু জমিজমার মালিক। ঠাকুর দেবতা, ঝাড়ফুঁক, দলাদলি করে সে পালটে ফেলেছে নিজের বেশভূষা। মাদুলি, গোমেদের আংটি পরে সে এখন রীতিমতো আস্তিক। এককালের ডাকাবুকো ভবেশের এখন পায়ে গোদ, বিশাল ভুঁড়ি। শ্রমিক আর শোষিতের নেতা ভবেশ আজ হাতিয়ার ভাড়া ভাটায়। ক্ষমতা আজ তার করায়ত্ত। কৃষিপ্রধান শেষপুকুর গ্রামে লাঙল, জোয়াল, ডিজেল, পাম্পসেট সব সে ভাড়া খাটায়।

যিশু বিশ্বাস এ কাহিনির আর এক মুখ্য চরিত্র। তার বাড়িও ছিল ওপার বাংলায়। হিমঘরে আলু পর্যবেক্ষণের কাজে তার ঘোরাঘুরি। ময়ল রায়চৌধুরীও এক সময় কৃষিবিশ্লেষকের চাকুরি নিয়ে ঘোরাঘুরি করার সূত্রেই বাংলার রাজনীতি আর সামাজিক অচলাবস্থার চেহারা দেখেছিলেন। মূলত যিশুই এখানে কহিনির সূত্রধর। তার ওপর আক্রমণ, খুশির সাথে তার সম্পর্ক এ সব দিয়েই কাহিনির সমাপ্তি। পার্কস্ট্রিটে নিজের ফ্ল্যাটে সে আন্তর্জাতিক কনসাল্টেন্সি খুলেছে। ব্যাচেলার। দুর্ঘটনায় তার বাবা মা দুজনেই মৃত। মেদিনীপুর, বর্ধমান, বাঁকুড়া আর বারাসাতে হিমঘর পর্যবেক্ষণ, আলু সম্পর্কিত রিপোর্ট লেখালিখি করে। দীর্ঘ ত্রিশ বছর আগে যিশুর সাথে পরিচয় ছিল ভবেশদের। খুশির সাথে তার সুসম্পর্কও ছিল ভালো। আজ খুশির বয়স পঞ্চাশ। জীবনে ভালোবাসা পায়নি। দীর্ঘদিন পর তাকে পেয়ে ত্রিশ বছর আগের অতৃপ্ত শরীরচর্চায় মেতে উঠেছে যিশু। খুশিদি সেকেল। আট বা নয়ের দশকেও ব্রত, আচার নিষ্ঠাভাবে পালন করে খুশি। মুসলমান হলেও হয়তো ভবেশের সংস্পর্শে তার মনে জেগেছিল হিন্দুয়ানি, তাছাড়া সে নিজের অতীত পরিচিতি জানত না। লেখক তাকে সেসব জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। সিনেমা দেখে, টিভি দেখে, উপন্যাস পড়ে মানুষ-মানুষীর যৌনতার বোধ যখন কলুষিত তখন খুশিদি পঞ্চাশেও অকৃত্রিম। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে বাস দুর্ঘটনায় মারা গেছে যিশু বিশ্বাসের বাবা-মা। উলঙ্গ বাবা-মাকে মর্গে আনতে গিয়ে কালু ডোমের স্পর্ধিত হাসির উল্লাস দেখে স্তম্ভিত যিশু। ‘চাষবাস, গ্রামজীবন থেকে বঙ্গসংস্কৃতি এখন পৌঁছে গেছে কলকাতা শহরের শেকড়হীন নাচা-কোঁদা, বাজনা-থিয়েটারে। পশ্চিমবাংলার ভূ-জমিন থেকে আর সংস্কৃতির সত্য অঙ্কুরিত হয় না। তা নকল কায়দায় পয়দা হয় আকাদেমি, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, পার্টি অফিসে।’

ক্ষমতা আর আধিপত্য বিস্তারের পালা চলেছে সর্বত্র। যে যেমনভাবে পেরেছে সে তেমনভাবে সেই ক্ষমতা ভোগ করেছে, ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। বিদ্যালয় খোলার আগে বালিকা বিদ্যালয়ে চলেছে রাজনৈতিক মিটিং। প্রতিবাদে হেডমিস্ট্রেসকে সকলের সামনে মারধোর আর কান ধরে ওঠবোস করানো হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যিশু দেখেছে সেখানেও চূড়ান্ত অরাজকতা। সেখানকার ‘ইনসেন্টিভ কেয়ারটা ছিল বিশৃঙ্খলা, অযতœ, দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা আর অকর্মণ্যতার স্বর্গরাজ্য। ছোকরা ডাক্তার ডাক্তারনী গুলো শোবার পোশাক পরে রাত্তিরে ঘুমুতে চলে যায় রুগীদের খেয়াল রাখার বদলে। সেবিকা, নার্স আর ঝি চাকরগুলো ঢুলত পালা করে আর নাকও ডাকত। মাঝে মাঝে বকম বকম ফস্টিনস্টি।’ (২৩৮)। ইয়ার্কি থামিয়ে ডাক্তার ডেকে আনতে আনতে রুগী মারা যায়। তারপর মিথ্যা নাটক করে রোগীর নিকট আত্মীয়কে ধরানো হয় খরচের লম্বা বিল। বিবরণ জানতে গেলে অজুহাত দেখানো হয় ঈশ্বরের। যিশুর মনে হয়, ‘ভগবান লোকটা হিন্দুদের অসাধারণ আবিষ্কার। তা না ঈশ্বর, না দেবতা’। (ঐ)। এভাবেই প্রতারণা আর ধাপ্পাবাজি ছেয়ে গেছে সব বিভাগেই। হাসপাতাল কর্মীদের অতর্কিত স্ট্রাইকে মারা যায় ইনসেন্টিভ বিভাগের রোগীরা। দয়া, মায়া, বিবেক, করুণা সবকিছুর পণ্যায়ন ঘটে গেছে। যিশুর প্রত্যক্ষ চোখে মূর্ত হয়ে উঠেছে দেশভাগের পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের করুণ অবস্থা। সেখানে ‘নার্স’ নামের বদলে সেবিকা কথাটা বড় বেমানান। ‘কলকাতায় শব্দের খেলায় বেশ্যারা যেমন যৌনকর্মী, মুটেরা যেমন শ্রমিক, ঝিরা যেমন কাজের লোক, তেমন ফালতু কাজের জন্য সেবিকা।’ (২৩৯)। এমনই একজন সেবিকার বর্ণনা, লেখকের চটুল কলমে জীবন্ত রূপ পেয়েছে। ‘মেনকা নিজের নাম বলেছিল ম্যানকা। লেখা না বলে, বলত ল্যাখ্যা। জোড়া ভুরু, ছিপছিপে স্বাস্থ্যবতী, কালোর মধ্যে চটক, অতি সোনালি কানের দুল, প্যাতপেতে লালফুল, ছাপা শাড়ি, মুখম-লে ঘামের ফসফরাস দ্যুতি, দুচোখে দুষ্টুবুদ্ধি, বন্যার অদৃশ্য চোরা¯্রােত, চকচকে কোঁকড়া চুল টানটান বাঁধা।’ (২৩৯)। কেটলিউলির বান্ধবী সে। বাড়ি তিলজলা-তপসিয়ায়।

সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। পশ্চিমী সভ্যতা গ্রাস করেছে বাঙালির নিজস্বতা। অরিন্দমের চোখে, ‘বাউল ফকিরেরা হয়তো আর টিকবে না বেশিদিন। লালন থাকবে ইস্কুল কলেজের পুঁথিপত্তরে। টিভি আর নাটক মাচানে থাকবে পূর্ণদাস বাউল’। মলয় রায়চৌধুরী তাঁর ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ (২য়) গ্রন্থে বাঙালি সংস্কৃতির অবক্ষয়ে বিপণœতা বোধ করেছেন। এ সম্পর্কে সেখানে তিনি বিস্তৃত আলোচনা করেছেন, প্রসঙ্গক্রমে তার কিছুটা না বললে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ‘বঙ্গ সংস্কৃতির আদলটির বারোটা বাজিয়েছেন, বাজাচ্ছেন রাজনীতিকরা, আর তাঁরাই চ্যাঁচাচ্ছেন অপ সংস্কৃতির হল্লা তুলে। …কলকাতায় দেখলুম নি¤œবিত্ত বাঙালি বউরা ছটপুজো করতে বেরিয়েছেন। মাড়োয়ারিরা পয়সার জোরে বঙ্গসংস্কৃতির বেশ কিছুটা দখল করে নিয়েছেন। বাংলা সিনেমাকে নিয়ন্ত্রণ করেন বাজোরিয়া, কুন্দলিয়া কানোরিয়ার দল। নায়ক-নায়িকারা তাদের ইচ্ছেমতন জামাকাপড় পরেন। …পাড়ায় পাড়ায় এখন ফিরি হয় ধোসা-সাম্বর, অফিসপাড়া জুড়ে চাউমিন আর চিকেন রোল। বাঙালির তাবৎ জলখাবার উবে গেছে। কলাপাতায় ভাত, মাছের ঝোলের পাইস হোটেল আর নেই। বাঙালির পানজর্দার জায়গায় এসেছে বেনারসি পানে পানপরাগ। …জনতার সংস্কৃতিতে কলকাতাতেই তৈরি হচ্ছে জয়নগরের মোয়া, বর্ধমানের মিহিদানা, ঢাকার মিষ্টান্ন, জনাইয়ের মনোহরা। …শাড়ির সঙ্গে পেনসিল হিল জুতো বা ধুতি পাঞ্জাবির সঙ্গে যেমন কাবলি স্যান্ডেল। ফ্রেঞ্জকাট দাড়ি যেমন কিংবা পিগটেল চুল। ক্যালেন্ডারে দেখি শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে হলস্টিন ফ্রিজিয়ান গোরু,গণেশের পায়ের কাছে সাদা গিনিপিগ। বরাহ অবতারের চেহারায় ইয়র্কশায়ার পিগ। আসলে ধর্মের এলাকায় যেমন মৌলবাদী গজায়, তেমনই আবির্ভূত হয় সংস্কৃতির জগতে’। (ঐ/১৩-১৫)। এখানে রেশম চাষিরা পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে। চিন আর কোরিয়ার উন্নতমানের সস্তা রেশম সুতো চোরাপথে আসছে মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বাঁকুড়ায়।

কলকাতায় ফিরে আদিত্য বা যিশুদের সাথে অরিন্দমের পুরানো সম্পর্ক জমে ওঠে। ছাত্রজীবন থেকে একের পর এক প্রেমাস্পদের সঙ্গে অরিন্দম সম্পর্ক গড়েছে আর তা ভেঙে গেছে। পাটনাতেও তিরিশোর্ধ্ব মহিলা অতসী বৌঠানের আবরণ উন্মোচনের মজায় ও পাগল হয়ে গিয়েছিল। অতসী বৌঠানের আগে টেলিফোন অপারেটর রমা ব্যানার্জির সাথে। কলকাতাতে প্রেমপর্ব জমে ওঠে গল্পটা তুলি জোয়ারদারকে নিয়ে। ক্যানসারে তার একটা স্তন বাদ দিতে হয়। তার মা তাকে মেনে নিতে চায়নি। তুলিও এগিয়ে এসে পিছিয়ে গেছে। কারণ সে জানে মৃত্যু তার অবধারিত। ছোটো ছেলে বিয়ে করে নিয়েছে বলে বড়ো ভায়ের মা এখন যা হোক একটা বউ চায়। ছোটো ভাইয়ের বৌ সুপর্ণা অরিন্দমের সাথে একই গাড়িতে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে অফিস যায়। চলন্ত গাড়িতে হাসাহাসি করে ভাসুর-ভাদ্দর বউ। সময় বদলেছে। পৈতে পরাটার মধ্যে কোনও জাতিভেদ ওর মাথায় আসেনি। ইচ্ছেমত খুলেছে, আবার লোকের কথায়, সংস্কারের তাগিদে আবার পরেও নিয়েছে। আগে সমাজের চাপে বাড়ির বাইরে মদ খেত সবাই। এখন সমাজের ভয়ে বাড়ির মধ্যে বাড়িসুদ্ধ সবাই মদ খায়। সবাই মিথ্যাগ্রস্ত মাতাল। পিসি পিসেমশাই বেঁচে থাকতে যে বাড়ি ছিল গোঁড়া, মুরগির মাংস, মুরগির ডিম প্রবেশ করত না, খেতে বসে গ-ূষ না করা ছিল অপরাধ, এখন সে বাড়িতে মদ মাংসের অবাধ ছাড়পত্র। সময়ের সাথে সাথে মানুষ হয়েছে আত্মকেন্দ্রিক। শব্দের ফাঁসে টিকে আছে মানুষের সাথে মানুষের নিত্যদিনের সম্পর্ক। ‘কলকাতার বেগুনউলিকে লোকে বলে মাসি, অথচ নিজের মাসিকে পাত্তা দেয় না। বাসযাত্রী বা পথচারীকে যুবকরা বলে দাদু, কিন্তু নিজের দাদুকে দুবেলা দুমুঠো খেতে দেয় না।’ (‘নামগন্ধ’/২৭৯)

কলকাতায় এসে অরিন্দম প্রথম প্রথম কোনও বিভাগে খাপ খাওয়াতে পারে না। একজন বাচাল, উটকো আর বহিরাগত বলে ওকে আড্ডাতেও নেওয়া হয় না। কারোর মতের সঙ্গে ওর মত মেলে না। নিজেকে মনে হয় সন্দেহজনক। নিজের চেষ্টায় বদলি হয়ে ঋণবিভাগে দেখলো, সেখানেও দুর্গতির একশেষ। ‘হিসেবের খাতাপত্তর লেখা হয় না গত ক-বছর। শাখাপ্রধানরা মেরে ভাগিয়ে দিয়েছে সরকারি অডিটরকে। চারটে ইউনিয়ন প্রতিদিন মারপিট করে। দেয়ালে দেয়ালে হরতাল, কর্মবিরতি নিয়ম মাফিক কাজের সুলিখিত দুরঙা পোস্টার’ (‘জলাঞ্জলি’/১৯০)। এরপর আসে পরিকল্পনা বিভাগে। ‘আধিকারিকেরা এখানে বিদেশ যাবার জন্যে ল্যাং মারামারিতে কাহিল’। ভবানীপুরের মত অধিকাংশ থানা এছাড়া রাস্তার দু’পাশের অলিগলিতে অজ¯্র ভাঙা গাড়ির কঙ্কালস্তুপ। ‘সহিষ্ণু শহর। বোবা হয়ে মেনে নিচ্ছে সব রকমের জবর দখল।’ (ঐ/১৯১)। কলকাতায় পাকাপাকি আসার এক সপ্তাহের পর মনে হয়েছিল এখানকার সব কিছুই বানানো, মেকি। তবু, ‘এখান থেকে ও আর কোথাও বদলি নেবে না। অবাস্তবতার সঙ্গে আপোস করে, মেকিকে ভালোবেসে থেকে যাবে এখানে। বদলি নেবে না আর কেন না পদোন্নতি চাই না।’ (ঐ/১৯২)। এখানে বাঙালিদের রেনেসাঁসকে মুছে ফেলার জন্য শহরের বুকে চেপে বসেছে ‘জবরদখল সংস্কৃতি।’

শহর কলকাতাতে থাকতে থাকতে শেষবারের মত অরিন্দম চা-এর দোকানের কেটলিউলির মোহে পড়ে যায়। কেটলি আর ওর বন্ধু মেনকার বাড়ি তিলজলা তপসিয়ায়। গ্রামে ওর সৎ ভাই যোগ দিয়েছিল মাওবাদী-কমিউনিস্ট সেন্টারে। পুলিশের গুলিতে সে প্রাণ হারায় বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার জঙ্গলে। গ্রাম ছেড়ে এসে ওরা সরকারি গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের রান্নাঘরে ঠিকেমজুরের কাজ নেয়। তারপর যোগ দেয় ট্যাংরায় পাউরুটির কারখানায়। কেটলিউলির দাদুর নাম ছিল কেষ্ট বাহাদুর জাহোর্বাদি। বেশ নামকরা লোক ছিল। তাঁর বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখকের ভাষাগত দক্ষতা, ‘কুচকুচ করছে চুল। থমথম করছে মুখ। কুতকুত করছে চোখ। টনটন করছে জ্ঞান। খসখস করছে কণ্ঠস্বর। তিরতির করছে চাউনি। গটগট করছে চলন। কনকন করছে আঙুল। দশাসই।’ বাপমায়ের মৃত্যুর পর ফেকলু কেষ্টকে পুষ্যি নেয় শুয়োর মাংসর এক কসাই। ‘পাড়ার বজ্জাতগুলোর সাকরেদিতে শিখে গেল চুরিচামারি চাক্কুবাজি, হার ছিনতাই, ব্লেডমারা, পার্স তুলে চিতাবাঘ দৌড়’। ছেচল্লিশের প্রাক-স্বাধীনতা দাঙ্গায় মলঙ্গা লেনে গোপাল মুখুজ্জের হিন্দু বাঁচাও দলে যোগ দেয়। খুন খুন আর মানুষ খুন। যত খুন করে তত তার পদোন্নতি বাড়ে। শার্টের কলার উঁচু করে ঘুরে বেড়ায়। অন্তত শ খানেক মুসলমান জখম হয় তার হাতে সাতচল্লিশে টালিগঞ্জ থানার বন্দুক কারতুজ লুট, আটচল্লিশের নভেম্বরে মহরমে মারপিট। পঞ্চাশে ফেব্রুয়ারি-মার্চের দাঙ্গায় গোপালবাবু-সুধাংশুবাবুদের স্যাঙাত হয়ে দেশপ্রেমিকে উন্নীত। মাস্তানরাজ কায়েম হল পশ্চিমবঙ্গে। কেষ্ট ছাড়া সরকার অচল, রাজনীতি অচল। এরপর কেষ্ট শুরু করে ডাকাতি। খুল্লমখুল্লা স্টেনগান হাতে নিয়ে ডাকাতি শুরু করে দেয় কেষ্ট। ধরা পড়ার পর কেষ্টর মোকদ্দমা চলেছে দীর্ঘকাল। সাতান্ন সালে ফাঁসির হুকুম হয় তার। শেষে রাষ্ট্রপতির দয়ায় মুক্তি পায়।

স্বাধীনতার পর থেকে দ্রুতগতিতে মস্তান আর মাফিয়াদের দখলে চলে গেছে কলকাতা। কলকাতার টানা রিকশার মালিক পলিটিকাল মাফিয়াদের দল। তাই টানা রিকশা সহজে তোলা যায় না। পুলিশের রেকর্ড বুকে সকলের নাম। গৌরীবাড়ি লেনের হেমেন ম-ল মারকুটে তোলাবাজ। যে গৌরীবাড়িকে ভারতীয় সংবিধানের বাইরে নিয়ে যেতে সফল হয়েছিল। হেমেন ছিল রুণু গুহ নিয়োগীর স্যাঙাত ঠ্যাঙাড়ে। যে কিনা পুলিশের রোল মডেল! প্রশাসনের আপাত স্বচ্ছতার তলায় তলায় চলেছিল দুর্নীতি আর প্রভুত্ব বিস্তারের পালা। বাঙালির বোধ আর সংবেদনকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে নেতা-মন্ত্রী পুলিশের সাথে এদের যোগসাজশ।

কেটলিউলির অন্তরে কোনো প্রেমের সংবেদন নেই। ‘হিন্দি আর বাংলা সিনেমাও কেটলিউলির কাছে প্রেম বালোবাসাকে হাস্যকর আর ফালতু করে দিয়ে থাকবে। প্রেমের সমস্ত অভিব্যক্তিকে ফোঁপরা করে দিয়েছে আধুনিকতা।’ (ঐ/২৮৮)। প্রেম বলতে সে বোঝে শরীর। তাই বেড়াতে যাবার প্রস্তাবে তার দ্বিধাহীন প্রশ্ন, ‘কুতোদিনের জন্য?’ আসলে প্রেমের কথা কিংবা নরনারীর স্থ’ূল দেহরসের বিলাসিতা দেখানো মলয় রায়চৌধুরীর ধাতে নেই। সমাজ আর রাজনীতির সংরক্ত রূপ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, জটিল বিশ্লেষণে যান। আর সে কারণেই তাঁর কাহিনির আলম্ব দ্রুত বদলে যায়। শহর থেকে গ্রামে। উত্তরবঙ্গের অন্ত্যজ উদ্বাস্তু গ্রাম ভাঙাপাড়ার কাহিনি। সেখানে পার্টির দলাদলিতে মারা যায় নিরীহ মানুষ, রেহাই পায় না ছোট্ট শিশুও। সেখানে মহাজনদের দাপট, মাহাতোদের প্রভুত্ব। স্বাধীনতার পরেও ধার-দাদনের কাগজে টিপছাপ দিয়ে হাতিয়ে নেয় কুটনিদের জমি। ধান কুটে চাল বানায় বলে এরা সমাজে কুটনি নামে পরিচিত। তারা অবিশ্বাস্য রকমের গরীব। ‘একচালা, হোগলা, চ্যাঁচারি, ডিগডিগে, ক্যাঁতরা-কানি, লাল চাল, জলে তেলের গন্ধ, পানাপুকুরের চান, নোংরা ছোটোখাটো মাছ আর শাকশেকড়।’ এরা উদ্বাস্তু, এরা মহাজন মাহাতোদের হাতে খুনে হয়। তাদের পুনর্বাসন নিয়ে কংগ্রেস, সিপি এম, বিজেপি, সিটু, আর এস পি সবাই পরস্পর পরস্পরের ঘাড়ে দোষ চাপাতে ব্যস্ত, সবার গলায় আলটপকা মন্তব্য।

কেটলিউলি লেখাপড়া জানে না, এমনকি বাংলা পড়তেও জানে না। দিকে দিকে, দেয়ালে দেয়ালে সাক্ষরতা অভিযান সফল হওয়া নিয়ে ছড়া লেখা হয়, গল্প চলে, অথচ খোদ শহর কলকাতার বুকে কেটলিউলি নিজের মুখে স্বীকার করে, বাংলাও পড়তে জানি না। কুনো ইশকুলে পড়ি নাই গো। আমি লিখাপড়া জানি না।’ (২৯৩)। প্রশাসনের কি নিদারুণ ভ-ামি! মলয় রায়চৌধুরী বারবার প্রশাসনকে নগ্ন করেন, শাসনব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতাকে তুলে ধরেন। মানবিকতার হীন অপমান আর অত্যাচার তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই তাঁর কমল হয়ে ওঠে খরশান। কেটলিউলির স্পর্শে, তার হাসির মহাজাগতিক তরঙ্গে বিদ্যুৎ খেলে যায় অরিন্দমের সারা শরীরে। গাড়ি সামলে রাখনে পারেনি। দুর্ঘটনায় দুজনেই মারা যায়। ঝলসে যায় দুজনের শরীর। উপন্যাস লিখেছেন বলেই ময়ল রায়চৌধুরী চরিত্রগুলোকে অপরিণত রাখেননি। যিশু বিশ্বাসকেও পরিণতি দিয়েছেন। সে তার চোখের সামনে দেখেছে আলু চাষিদের সর্বস্বান্ত চেহারা। হুগলী জেলার প্রতিটি হিমঘরে হাজার হাজার টন আলু পচে গেছে। প্রশাসন নীরব। রাজনৈতিক দলগুলো এ ওর পিঠে দোষ চাপাতে ব্যস্ত। খাবারের অভাবে আলু চাষিদের ভিখারির মত জরাজীর্ণ পরিস্থিতি। গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা ছাড়া তারা নিরুপায়। অন্ধকারে খুশির হাত ধরে পালাবার সময় ডাকাত সন্দেহে গণরোষের মাঝে পড়ে মুমূর্ষু অবস্থা তার। এভাবেই কাহিনি থেকে সে বিদায় নিয়েছে।

তিনটে উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে মলয় রায়চৌধুরী বিহার আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। কোথাও কোনও আপোস নেই। ক্ষমতাবান মানুষের হাতে নির্মমভাবে মার খেয়েছে নিচুস্তরের মানুষ। উপন্যাসের কাহিনি সমাজ আর রাজনীতির সন্ত্রস্ত পরিবেশে বেড়েছে। প্রচলিত রোমান্স বা নারী-পুরুষের সম্পর্ক এখানে নেই। উপন্যাস রচনার পরিচিত ছক বা কাঠামো থেকে তিনি সরে এসেছেন। এ পথ লেখকের নিজস্ব। উপনিবেশ-উত্তর লেখার নতুন মালমশলা দিয়ে কাহিনিকে সাজাতে চেয়েছেন বলেই এখানে ডিসকোর্স সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুশান্ত, অরিন্দম বা ইন্দ্রাণীর কাহিনির সূত্রধর মাত্র। বস্তুতপক্ষে সমাজ আর রাজনীতির তপ্ত পরিবেশ উদ্ঘাটন লেখকের লক্ষ। সেই পরিবেশে লেখক নিজেও কোনও আশাবাদের সুর খুঁজে পাননি। উপন্যাসের নামকরণের মধ্যেই সেই আবছায়া লুকিয়ে আছে। ডুবজলে প্রশ্বাস মেলে না। জীবন সেখানে হাঁপিয়ে ওঠে। অরাজকতার মাঝে সুস্থ হয়ে ওঠার বা সুস্থ সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারের কোনও ‘নামগন্ধ’ নেই। স্বাধীনতা-উত্তর একপেশে ক্ষমতার উদগ্র হানাদারিতে ‘জলাঞ্জলি’ গেছে সাধারণ মানুষের জীবন। নিজেদের কোনও আইডেন্টিটি তারা খুঁজে পায়নি। পশ্চিমবঙ্গবাসীরাও স্বভূমিতে নিজেদের মনে করেছে বিচ্ছিন্ন। অস্তিত্ব সংকট আর শূন্যতার মধ্যে দুই রাজ্যে জীবনের ভয়ংকর পরিণাম দেখেছেন লেখক।

দুই

প্রসঙ্গ ‘এই অধম ওই অধম’

‘এই অধম ওই অধম’ উপন্যাসটি ‘কবিতীর্থ’ থেকে ২০০১ সালে প্রকাশ পায়। উপন্যাসে গল্প-কথক এক কিশোর, ক্লাস সিক্সের এক স্কুল পড়–য়া ছাত্র। তার ডাক নাম ফণা। তারা বিহারের ইমলিতলা গলির বাসিন্দা। কিশোর, ক্লাস সিক্সের এক স্কুল পড়–য়া ছাত্র। ইমলিতলা গলিতেই ফণার ‘মেজদা’ বুড়ো বা ‘বুঢুয়া’র মৃত্যু ঘটেছে। যদিও তার সাথে এই দাদার রক্তের সম্পর্ক নেই। সে তার বড়ো জ্যাঠামশাইয়ের পালিত পুত্র। বুড়োর পাঞ্জাবি বা নেপালি মা মাত্র দেড়শো টাকার বিনিময়ে তাকে বিক্রি করে দেয়। মৃত্যুর কারণে শারীরিক নানা অত্যাচার বা অনাচার। গ্রন্থ পরিচয় দিতে গিয়ে জানানো হয়েছে, ‘এই উপন্যাসটির নায়ক বিছানায় শয়ান এক যুবক। পাঠবস্তুর কথক এক স্কুল বালক। নায়কের মৃত্যুজনিত শোকের আবহে বালক কথক অবিরাম বুনে চলেছে সমান্তরাল মনন-উল্লাস। শোককে অগ্রাহ্য করা কথকের পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ মৃত্যুকে সে অমোঘ বলে মনে করতে পারছে না। ইওরোপীয় আধনিকতাবাদের প্রভাবে বাংলা কথাসাহিত্যে এতাবৎ সন্দর্ভের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নায়কোচিত নায়ককে। তা সে গোরা হোক বা চোটিমু-া। সেই শবনায়কের অভিষেক ঘটিয়ে বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল আনলেন মলয় রায়চৌধুরী।’

মৃত যুবক বুঢুয়াই নায়ক। বয়স তার কুড়ি বছর। সে বাড়ির প্রচলিত নিয়ম কানুনের পরিপন্থী। চালু বাংলাতে সে বাড়ির লোকেদের সাথে কথা বলে না। ভোজপুরী-মগহি তার কথ্য ভাষা। বড়দের সাথেও তার তুইতোকারি সম্পর্ক। সে ছিল বেপরোয়া, এবং সব শাসন নীতির ঊর্ধ্বে। তাই বাড়ি ঢোকা বা বেরোনোর ব্যাপারে তার ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম খাটত না। তার চেহারার পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘ফর্সা, ঝাঁকড়াচুল, থ্যাবড়া নাক, ফিকে গোঁফ, ছোট ছোট গভীর চোখ। তখনও কিছুটা স্বাস্থ্যবান, পেশিদার, সুঠাম ছিল। ইয়াচ্চেহারা। রূপকুমার অ্যাঞ্জেলওয়ালা।’ (‘এই অধম ওই অধম’/১৭)। সে নিজেকে ছোট বলে ভাবেনি। তাই বাড়ির অন্যান্য ছোটদের সাথে মেশা বা ছোটদের মত লাট্টু খেলা সে পছন্দ করত না। পাড়ার যত নিষিদ্ধ সংগঠনে তার ছিল আড্ডা। নানাভাবে বড়রা শোধরাবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও সে অপরিবর্তিত। বশীকরণের নাম করে বড়জেঠিমা শেকড়গুঁড়ো আর বমভোলা বাবার থনের বিভূতির পুরিয়া এনে ডাল আর ছোলার ঘুগনির সাথে মিশিয়ে তাকে খাওয়াত। শোধরাবার নাম করে রামপতিয়া তাকে ধুতরো ফলের চাঞি এনে খাওয়াত। এতে দিন দিন তার স্বাস্থ্যও ভেঙ্গে পড়েছিল। আচরণও হয়ে উঠেছিল অসামাজিক। বড়জ্যাঠা এসব সহ্য করতে পারত না, তাই তার কপালে মারধর জুটত খুব। ‘মেরে তাড়িয়ে দেবার পরদিন ফেরেনি মেজদা। আগেও অনেকবার বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে মেজদা, বাড়ির কিছু চুরি করে, কিংবা খালি পকেটে। যা পরে থাকে তাতেই। ফিরে এসেছে দিনকতক পর। ফিরে, মার খেয়েছে, হালকা বা বেদম। চুনে হলুদ লাগিয়ে দিয়েছেন বড়জেঠিমা, কালসিটের দাগে। হলুদ আর কালোমরিচ বেঁটে গরমজলে গুলে খাইয়েছেন। ঘৃতকুমারী পাতার শাঁস লাগিয়ে দিয়েছেন মাথায়। তিন চার হপ্তা পর আবার পালিয়েছে। পড়াশোনার বালাই ছিল না। প্রথমে টি কে ঘোষ স্কুলে, সেখান থেকে রাস্টিকেট হলে পাটলিপুত্র স্কুলে ভর্তি করেছিলেন বড়োজ্যাঠা। কিন্তু স্কুলে যাবার নাম করে সে অন্য কোথাও চলে যেত। পালটিপুত্রকে সবাই বলে রাস্টিকেটওয়ালাদের স্কুল। সেখান থেকেও বহিষ্কৃত হল মেজদা। ব্যাস, বই খাতা বেচে দিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট।’ (ঐ/২৫)। এই দু’মাসে তার আচার-আচরণ আর সংস্কৃতির খোলনলচে একেবারে বদলে যায়। লালচে লুঙ্গি আর ফতুয়া, মুখে ভোজপুরি-মগহি বুলির ছয়লাপ।

একধরনের আত্মনির্বাসনের বেড়াজালে নিজেকে বুড়ো আবদ্ধ রেখেছিল। দুর্বিপাকগ্রস্ত জীবনে পাগলামিই ছিল তার আশ্রয়। সে চেয়েছিল অতীতকে মুছে ফেলতে। নিজের মায়ের কোনও সঠিক তথ্য তার জানা ছিল না, বাবার স্বঘোষিত কোনও স্বীকৃতি নেই। ধর্মসম্প্রদায়ের কোনো হদিশ নেই। এইভাবে ভাবতে ভাবতে তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল একধরণের বিকার, যার হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য সে নানা উপায় খুঁজত। মনোকষ্টের অসম্ভব যন্ত্রণায় সে পালিয়ে গিয়ে একধরনের মুক্তিসুখ খুঁজে পেত। নিজের আত্মপরিচয় বা আইডেন্টিটির খোঁজে অসংস্কৃত জীবনে তৎপর হয়ে উঠেছিল বুঢুয়া। ‘মেজদা জেনে গিয়েছিল যে নকল অতীত বয়ে বেড়ানোর জন্য ও যাবজ্জীবন দ-িত। জ্ঞানগম্যি বা পড়াশুনাটুনা নয়, ওর মনের মধ্যেকার লটবহর বলতে কেবল বানানো-ফেনানো স্মৃতি। সে স্মৃতিশক্তির এমনই তেজ যে নিজেই নিজেকে ধাঁধিয়ে দেয়।’ (ঐ/৪৩)। কুসংসর্গে পড়ে সে তখন উপভোগ করেছে সস্তা আনন্দ। ‘মস্তানা গোলি’ খেয়ে নিজের পুরুষত্বকে সবল রেখেছে। এভাবেই হঠাৎ করে একদিন বাড়ির মধ্যে সে নিয়ে আসে তার থেকে বয়সে অনেক বড় এক বেশ্যাকে। বাড়ি বড়োরা ক্ষোভ ঘৃণা আর লজ্জায় ফেটে পড়ে। এজন্য বুঢুয়ার মধ্যে অবশ্য কোনও ভয়, গ্লানি বা বিব্রতভাব নেই। লালচে লুঙ্গি আর সাদা শার্ট গায়ে বাড়িতে ঢুকে সে ভোজপুরি-মগহি আঞ্চলিক হিন্দিতে অশ্রাব্য কথাবার্তা বলে তার মা-কে। কথা বলতে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে সে জ্ঞান হারায়। তার মৃত্যু ঘটে। আত্মপরিচয়ের সংকট বিশ শতকের উত্তর আধুনিক উপন্যাসের একটা প্রধান দিক। দেশকাল পরিত্যাগের সূত্রে নামহীন, পরিচয়হীন মানুষ নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করেছে, তার পুরানো স্মৃতি বা তার সংস্কৃতিকে লালন করতে চেয়েছে। কিন্তু এ উপন্যাসে মাতৃপিতৃ পরিত্যক্ত বুঢুয়ার যন্ত্রণা সেরকম নয়। জন্ম থেকে বাবা-মাকে হারিয়ে কোনো কিছুকে সে আপন ভাবতে পারেনি। এক বুক শূন্যতা আর হতাশা তাকে কোথাও স্থির থাকতে দেয়নি। সুস্থ জীবনযাপনে তাকে বাধ্য করে তুলতে চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সে বাধ্য থাকতে চায়নি। সে মুছে দিতে চেয়েছে তার চারপাশের বানানো, মেকি, ঝুটা পরিচিতি। সব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সে একা হতে চেয়েছে। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে সমস্ত নিষিদ্ধ বস্তুর আশ্রয় নিয়ে ভালোবাসাহীন পৃথিবীতে সে চেয়েছিল নিজের মত করে বাঁচতে। যৌনতা আর মাদক দ্রব্যের মধ্যে আত্মবিস্মৃত হতে চেয়েছিল। শরীর মেনে নিতে পারেনি তার আঘাত। তাই মৃত্যুই হল তার শেষ পরিণতি।

বুড়োকে কেন্দ্র করে নানা স্মৃতির মধ্যে দিয়ে বিহারের ইমলিতলার গলি জীবন্ত হয়ে উঠেছে বর্তমান উপন্যাসে। অবশ্য শুধু গলির পরিচয় দানই নয়, এ গলিকে কেন্দ্র করে মানুষের অস্তিত্বের গভীর সংকট ফুটে উঠেছে। বাঙালিরা থাকে না এ পাড়ায়। গরিব অন্ত্যজ বিহরীরা এ পাড়ার বাসিন্দা। এ গলিতে মানুষের আশা-ভরসার চির মধ্যভূমি। পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা, বেশিরভাগ বাড়িই ছিল গোলটালির চালাবাড়ি। ভেতরে একটা বড় আস্তাকুঁড়ে। সেখানে অবস্থা এমন ঘিঞ্জি যে রিক্শা, টমটম, ঠেলা কিচ্ছু ঢুকতে পারে না। বিদ্যুৎ নেই। দিনেরবেলা তুখোড় হাসিঠাট্টা, চিৎকার, পরচর্চা, গালমন্দ আর হই হট্টগোলের মধ্যে দিয়ে কাটে। কোনো লুকোছাপা নয়, সবকিছুই প্রকাশ্যে। সন্ধ্যেয় অন্ধকার নামলে কুপি-লণ্ঠন জ্বালিয়ে বসে থাকে পাড়ার মানুষ। পাড়ার বেশিরভাগ মানুষ পেশা চুরি, ডাকাতি, পকেটমার, ছিনতাই, সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক, বেশ্যার দালালি, চোরা কারবার, গাঁজা-আফিম পাচার ইত্যাদি অসামাজিক কাজের সাথে জড়িত। ম্যালেরিয়া টাইফয়েড থেকে শুরু করে আন্ত্রিক, পক্স, প্রমেহ, উপদংশ, নানা চর্মরোগ ইত্যাদি রোগব্যাধি থাকে জড়াজড়ি করে। সেখানে নানা জীবজন্তুর আবাসভূমি। ‘ইমলিতলা পাড়ার বাড়িগুলোয়, আমাদেরও, গৃহসজ্জা বলতে ইঁদুর, ব্যাঙ, চিক্কির, ছুঁচো, টিকটিকি, চড়–ই, আরশোলা, মাকড়সা, চামচিকে, পিঁপড়ে, তেঁতুলেবিছে, ঝিঁঝিঁ, কেন্নো, উচ্চিংড়ে, উঁইপোকা। পাড়ার অনেকে স্মৃতিহীন বা স্মৃতির কোনো বালাই নেই। তাই গতকালও অনেকের মনে হয় কয়েক শতক পুরানো। কানা গলির কৃষ্ণন্না যাদবরা ওদের যে উন্মাদ কাকাকে ছাগল-গোরুমহিষের সঙ্গে একই গোয়ালে ডানপায়ে চেন দিয়ে বেঁধে রাখে, সেখানে মুখ দিয়ে ছাগল-গোরুমহিষের দুধ খায়, আর বক্না বাছুর কিংবা মাদি ছাগলের সঙ্গে সঙ্গম করে, নিজের চোখে দেখেছে বদ্রি পাটিকমার, ছাগলের বাচ্চা চুরি করতে গিয়ে। এরকম একটা পাড়ায় জন্মাবধি থাকলে, অনন্তের ফিসফিসানি শোনার আপনা থেকেই কান প্রশিক্ষিত হয়ে ওঠে।’ (ঐ/৩০)। ইমলিতলায় কল প্রতিষ্ঠার পর বুজিয়ে দেওয়া হয় সেখানকার কুয়োটাকে। পাড়ার লোকেদের মনে ছিল আপত্তি, কেননা, এই কুয়োর জল ছিল তাদের কাছে পবিত্র। কুয়োর জলে ছটপুজোয় ঠেকুয়া বানানো হত, কুয়োর পাড়ে ঘোমটা-ঢাকা বিয়ের কনেকে এনে রসালো ঢলাঢলি আর গীত গেয়ে রসম পুরো করে এয়োস্ত্রীরা। গলির মানুষদের মনে এখনও ঘুলিয়ে ওঠে আদিম সংস্কার।

বিশ শতকে স্বাধীনতা-পরবর্তী গলিকেন্দ্রিক বাংলা উপন্যাস লেখা হয়েছে একাধিক। মতি নন্দীর লেখা এরকম উপন্যাস ‘নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান’। এ গলি অবশ্য বিহারের কোনো প্রত্যন্ত গলি নয়, এর অবস্থান কলকাতায়। গলিটি সংকীর্ণ, মাত্র আট হাত চওড়া। অবস্থান জয়রাম মিত্র লেন। সেই সংকীর্ণ গলির বাসিন্দাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা তন্ন তন্ন করে প্রত্যক্ষ করেছেন। লেনের মোট চুয়াত্তরটি বাড়ির অধিবাসীরা পরস্পর গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসবাস করে। অভাব, যৌনতা ঘেরা জীবনের পরিধি এদের বড় সংকীর্ণ। ‘অধিকাংশ বাড়ির পলেস্তারা খসে জিরজিরে ইট বেরিয়ে পড়েছে। এই গলিতে ভোটার সংখ্যা সাতশো, খবরের কাগজ রাখে বত্রিশটি, বছরে বিয়ে হয় গড়ে তিনটি, শ্রাদ্ধ তিনটি, অন্নপ্রাশনও তিনটি। সাতটি আস্তাকুঁড়, একটি টিউবওয়েল, রাস্তায় আটটি ইলেকট্রিক বাতি, একটি খাটাল, একটি পাঠশালা, গুটি পঞ্চাশ রেডিয়োর শব্দ এবং কমপক্ষে আড়াইশো শিশুর চিৎকার জয়রাম মিত্র লেন দিয়ে হেঁটে গেলে চোখে বা কানে আসবে।’ (মতি নন্দীর ‘দশটি উপন্যাস’, আনন্দ/৮৯)। গলিজুড়ে স্যাঁতসেঁতে ভ্যাপসা গন্ধ। নতুন মানুষ গলিতে ঢুকলেই চতুর্দিকে কৌতূহলী চোখের ভিড় তাদের গতিবিধিকে নজর করতে থাকে। প্রেম, ভালোবাসা বা যৌনতা সবকিছুই বেড়ে ওঠে গলিকে আশ্রয় করে। এ হেন গলিতে হঠাৎই প্রবেশ করেছে আকাশি-নীল স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড গাড়ি। গাড়ির যাত্রী সিনেমার জনৈক নায়ক। সেই গাড়িকে ঘিরে অধিবাসীদের প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে এসেছিল ভিন্ন সুর। গলির বাসিন্দাদের এক করার জন্য দরকার একটা পরিবেশ। মতি নন্দী হাজির করেছিলেন জনৈক নায়ক বা নায়কের গাড়িকে, নায়কের দেখা মেলেনি। এখানে মলয় রায়চৌধুরী ঘটিয়েছেন মৃত্যু।

উপন্যাসের নামকরণ ‘এই অধম ওই অধম’, সেহেতু এখানে দুই অধমের পরিচয় আছে। এক অধম বুড়ো, অন্য অধম ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ফনা। সে বাস করেছে গলির বিষাক্ত পরিবেশে, বাড়ির ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে। শাসন গর্জন ছিল সেই সংস্কৃতির চেহারা। মেজদা বুড়োকে দেখে গল্প-কথক ফনার কিশোর মনে ছাপ পড়েছে। তার সেই মানস চেহারা তুলে ধরেছেন লেখক। তাদের প্রতি একান্নবর্তী সংসারে ছিল আলাদা শাসনব্যবস্থা। বিকেল শেষ হতে না হতেই বাড়ির যত কচিকাচারা বাড়ি ঢুকে পড়ত। ফনার ‘মেজদা’, যাকে পাড়ার লোক বুঢুয়া বলে ডাকত, মেজদা ওরফে বুঢুয়া ফনার বড়ো জ্যাঠামশাইয়ের ছেলে। গালিগালাজ এখানকার দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম অঙ্গ। ‘এ পাড়ায় রোজই তো কারো না কারো বাড়িতে চেঁচামেচি, ঝগড়া-ঝাঁটি, হাতাহাতি হয়, যা গায়ে মাখে না কেউ, স্বাভাবিক সংসারধর্ম মনে করে সেসব কিচাইনকে।’ (১৪)। টালির ছোটো বাড়িগুলো থেকে বেরিয়ে আসে চাকু, ভালা লাঠি ফরসা টাঙি তমঞ্চা কাট্টা। অসামাজিক পরিবেশের মুক্তাঞ্চলে বসবাস করে ফনার এগারো-বার বছরের কিশোর মনে ছিল অতৃপ্তির যন্ত্রণা। শাসন মানতে মন চাইনি তার। ইমলিতলার গলিতে একাকিত্বেই বেড়ে উঠেছিল কিশোর ফনা। ইমলিতলার বাসিন্দা থেকে শুরু করে বাড়ির বড়দের আচার-আচরণের প্রতি ছিল তার তীব্র কৌতূহল। মেজদার জন্মরহস্য নিয়ে প্রশ্নের কোনো মীমাংসা তার হয়নি। মেজদার খারাপ হওয়া যে কী, তার ছোট্ট মনে তা নিয়ে জেগেছিল মীমাংসাহীন প্রশ্ন। মেজদার মনোকষ্ট স্পর্শ করেছিল ফনাকে।

বাড়ির পরিবেশে থাকলে খারাপ হওয়ার সম্ভাবনায় বাড়ির বড়রা ফনাকে পাঠিয়ে দিয়েছে দরিয়াপুরের দরজা জানালাহীন অসম্পূর্ণ ঘরে। বদ্রি পাটিকমারের বউয়ের ছাগলের পালন দেওয়ার ব্যবসা, মেয়েদের বাড়ন্ত শরীরের দিকে সে তাকিয়ে থাকে দুচোখ মেলে। ‘আমার ক্লাসে আঠারোটা মেয়ে পড়ে; চারজন ফ্রক, বাদবাকি শাড়ি। সহপাঠী সুবর্ণ উপাধ্যায়ের কাছ থেকে জেনেছি গতর দেখে কীভাবে চিনতে হয় কে শঙ্খিণী, কে পদ্মিণী, কে চিত্রাণী, কে হস্তিনী। সুদামিয়া দিদি চিত্রাণী ছিল। এখন বিয়ে আর এক গ-া বাচ্চাকাচ্চার পর হয়ে গেছে হস্তিনী।’ (‘এই অধম ওই অধম’/৪০)। মেজদা বা বুড়োর থেকে নিজেকেও সে আলাদা বলে ভাবতে পারেনি। মিশনারিতে আর ব্রাহ্ম সেমিনারিতে পড়াশোনা, বাঙালি হয়েও পাটনার বাসিন্দা, বাড়িতে বাংলা আর বাইরে হিন্দি কথাবলার মধ্যে ফনাও নিজেকে ভালো খারাপের দো-আঁশলা বলে মনে করে। দরিয়াপুরের বাড়িতে বুজিদার সাথে ফনা খেয়েছে নিষিদ্ধ মাংস। শিখ পাঞ্জাবি ভাড়াটিয়ার ঘরে প্রতি রাতে দেখেছে রংবেরঙের বেশ্যার আগমন। চারপাশে খারাপ হওয়ার প্রবল হাতছানি। মেজদা বা বুড়োর মধ্যে প্রকাশ ছিল, সামাজিক উত্তেজনায় সে গা ভাসিয়েছিল। তাই সমাজের চোখে সে অধম। ফনা সব দেখেছে। সে সব জানে। সে অন্তর্মুখী। ‘মেজদা কিন্তু একটুতেই রেগে যেত। খারাপ খারাপ গালাগাল ঝেড়ে দিত। আমি সব গালাগালগুলো জানি, কিন্তু দিতে পারি না, কেমন বাধো বাধো ঠেকে। নোংরা গালাগাল দিতে পারি না বলে খারাপ লাগে।’ (ঐ/৫৭)। আত্মপ্রকাশে অক্ষমতার জন্য ফনা নিজের কাছে নিজেই অধম।

তিন

প্রসঙ্গ ‘নখদন্ত’

‘হাওয়া ঊনপঞ্চাশ’ প্রকাশনী থেকে ২০০২ সালে প্রকাশ পায় মলয় রায়চৌধুরীর অন্যতম উপন্যাস ‘নখদন্ত’। সোমবার থেকে রবিবার পর্যন্ত সাতদিনের কাহিনির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য-রাজনীতির সাতকাহন তিনি তুলে ধরেছেন রামায়ণের সপ্তকা-ের ঢঙে। ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে ছিল পশ্চিমবঙ্গের হিমঘরের দুর্দশার ছবি, বর্তমান উপন্যাসে পাট চাষিদের কাহিনি রাজনীতি আর শ্রেণি শোষণের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছেন। মলয় রায়চৌধুরীর পরিবেশনের মধ্যে থাকে অভিনবত্ব। সনাতন উপন্যাস রচনার প্রচলিত রীতি বা কাঠামোকে তিনি এড়িয়ে চলেন। নির্মাণ আর বিনির্মাণের মধ্যে দিয়ে তিনি তৈরি করেন তাঁর অভিনব গদ্যশৈলী। আসলে এটি ডায়ারি, ব্যক্তিজীবনের সূত্রে পাট চাষিদের প্রসঙ্গ এখানে ঠাঁই পেয়েছে। তাই এ উপন্যাসের (উপন্যাস বলা বোধহয় সঙ্গ নয়) মধ্যে লেখক নিজেই সরাসরি একটি চরিত্র হয়ে উঠেছেন। অন্য উপন্যাসগুলিতে লেখকের ব্যক্তিজীবনের কথা চরিত্রসূত্রে উঠে আসে। নিজেকে তিনি আড়াল করেন না। কখনো স্পষ্ট, আবার কখনো বা অস্পষ্টভাবে কাহিনিসূত্রে লেখককে খুঁজে পাওয়া যায়। আলোচ্য উপন্যাসে লেখক সরাসরি কাহিনির সূত্রধর। ব্যক্তিজীবনের দিনলিপি তিনি কাহিনির ফাঁকে তুলে ধরেছেন।

‘সোমবার, ধরা যাক আদিকা-’-নামক প্রথমাংশটি লেখকের ব্যক্তিগত দিনলিপি। চা, পেপার, ওষুধ, টাকা তোলা, খাওয়া ও অন্যান্য কাজকর্মের খতিয়ান। ‘মঙ্গলবার, অযোধ্যাকা-’-অংশে দিনলিপি চর্চা। মোমবাতি জেলে ডিনারের শেষে ‘অনার্য’ সাহিত্যের জন্য ‘শেষ হাসি’ নামক গদ্য লিখেছেন। থানার লকআপে কাংগাল চামার নামক এক নিরীহ চট শ্রমিকের ওপর নৃশংস পুলিশী উৎপীড়নের বর্ণনা। বিহারের সীতামড়হি জেলার হিদায়েতপুরের হরিজন পল্লীর বাসিন্দা সে। গ্রামে রাজপুত-ভূমিহারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তার দাদু ১৮৯৭ সালে পালিয়ে এসেছিল এ রাজ্যে। পরে হুগলি জেলার এলিজাবেথ জুটমিলের শ্রমিকের পেশায় নিয়োজিত ছিল কাংগাল। সে নির্দোষ। মাস শেষে শ্রমিকদের বেতনের সময় এলিজাবেথ চটকল কোম্পানির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে উপযুক্ত টাকা নেই। শ্রমিকদের দেওয়া পে-স্লিপ ভাঙানো যায়নি। মহাজন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন নেতারা সস্তায় শ্রমিকদের পে-স্লিপগুলো কিনে রাখে। পরে ক্যাশ এলে টাকা ভাঙ্গিয়ে নেয়। দরিদ্র শ্রমিকরা পে-স্লিপ বেঁচে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে। সমস্ত চটকল মিলিয়ে আঠারোটা ইউনিয়ন, সদস্য সংখ্যা বারোশো। অধিকাংশ বিহারী খোট্টারা চটকল বেশিদিন চলবে না ভেবে সদস্য হতে নারাজ। কড়া পুলিশী প্রহরায় শ্রমিকদের বেতন নিয়ে চটকল কর্তৃপক্ষের সাথে ইউনিয়ন নেতাদের গোপন শলা চলে। চটকল অসুস্থ বলে শ্রমিকদের মাইনে কাটা হয়। সংঘবদ্ধ শ্রমিক খেপে উঠে তাড়া করে। কাংগাল চামারের ঘরের সামনে মজুরদের আক্রমণে মারা যায় জনৈক রাজপুত কনস্টেবল। নিরীহ কাংগাল চামারকে মিথ্যা ফরিয়াদি সাজিয়ে ফুসলিয়ে ঘর থেকে থানায় নিয়ে আসে ডাকবাবু বিপিন নামহাটা। নৃশংস প্রহারে মারা যায় সে। তার মৃত্যু লোপাট করার জন্য পাথর বেঁধে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় মাঝ গঙ্গায়।

ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম মজুরি দিলে শ্রমিকরা পেমেন্ট অব ওয়েজেস কোর্টে মামলা করতে পারে, কিন্তু সে কোর্টে কয়েক হাজার বছর ধরে কোনো বিচারপতি নেই। নিরীহ শ্রমিকরা কোনো ঝুটঝামেলায় যেতে চায়না। কেটে নেওয়া টাকায় সংসার চালানো দায়। তাই বেছে নিতে হয় অন্য পথ। ‘কাটৌঁতি সামলাতে অনেক মজদুর নিজের কুলি লাইনের ঘর কোনো বাবুকে ভাড়া দিয়ে নিজেরা গিয়ে ঝুগগি ঝুপড়িতে সস্তায় থাকেন। যে মজদুর একা থাকেন তিনি কাটৌঁতির পয়সা তুলতে নিজের ঘরটা কোনো র‌্যান্ডিকে ছেড়ে দ্যান, সন্ধ্যেবেলা ধান্দা করার জন্যে।’ (‘নখদন্ত’/২৪)।

‘আজকে বুধবার অর্থাৎ অরণ্যকা-’ নামক তৃতীয় অংশে লেখকের ব্যক্তিগত দিনচর্চার পাশে চটশ্রমিকদের নেপথ্য জীবনচর্চা। কাংগাল চামার ছিল নম্বর দেওয়া শ্রমিক। ইবি নম্বর ০০৫৭। আটঘণ্টার মজুর। সে মারা গেলে তার জায়গায় রাখা হয় দু’জন বিনা নম্বরের মজুর, খালেদালি ম-ল আর বৈকুণ্ঠ নস্কর। কাটৌঁতি করে মিলের লোকসান সামলান দেয় মালিক। ‘বিনা নম্বরের শ্রমিক তো শ্রমিকই নয়। দিনের মজুরি ভাউচারে সই করিয়ে ক্যাশ দিয়ে দিলেই হল। খালেদালি ম-ল পাঁচ ঘণ্টা কাজ করতেন। বৈকুণ্ঠ নস্কর তিন ঘণ্টা। হাজিরাবাবু এদের দৈনিক মজুরি থেকে পাঁচ দশ টাকা কেটে নিতেন প্রতিদিন, ইচ অ্যাকর্ডিং টু হিজ এবিলিটি। ইউনিয়ন নেতাদেরও, প্রতিটি চটকলে, বিনা নম্বরের মজুররা কড়ার অনুযায়ী দ্যান। হাজার হোক কাজটা তো ওনারাই পাইয়ে দিয়েছেন। মজুরি বিলির সময় ওনারা টুল পেতে বসে থাকেন। মুখ বুজে দিয়ে দেন মজুররা। গাঁইগুঁই করে লাভ নেই। করলে কাল থেকে অন্য লোক ঢুকে যাবেন, ঢুকিয়ে দেবেন। মালিকের চিন্তা শুধু নম্বরঅলা মজুরদের নিয়ে। বিনা নম্বরের মজুর থাকেন না মালিকের নথিতে। নথিতে যাঁরা থাকেন তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, ই এস আই, দুর্ঘটনা ভাতা, এসবের ঝক্কি পোহাতে হয় মালিককে। জিরো নম্বর শ্রমিকের ক্ষেত্রে এসব ঝক্কি পোহাতে হয় না। মালিক তো আসলে মালিক নন, মিলটাকে ভাড়া দিয়ে চালান। ঝক্কি-ঝামেলা পোয়াতে না পারলে অন্য কাউকে ভাড়া দিয়ে কেটে পড়েন। এভাবে ভাড়াটে বদলে হাতে হাতে ঝক্কি-ঝামেলা থেকে যায় মিলের খাতায় কলমে, আর রেগুলার শ্রমিকের ঘাড়ে। রেগুলার শ্রমিক যত কমে তত সবাইয়ের মঙ্গল।’ (ঐ/৩৩)। শ্রমিকদের আদায় করা টাকায় চলে ইউনিয়ন, ওঠে নির্বাচনী খরচ। নিজেরেদ দাবি আদায় করতে শ্রমিকরা সরব হয়, তারা গড়তে চায় বিকল্প ইউনিয়ন। ভাড়াটে মালিকদের মতিগতি শেয়ারবাজারের মত ওঠানামা করে। কখন কে যে ছাঁটাই হয়ে যায় তার ঠিক নেই।

শ্রমিকরাই রাজনীতির বোড়ে। তাদের নিয়ে চলে নিত্য নতুন রসায়ন। আইনরে সুবিচার তারা পায় না। সেখানে যাবার ক্ষমতাই তাদের নেই। কাংগাল চামারের খুন হবার ঘটনাটা ভুলে যাবার, চেপে দেবার, কেস হাপিশ করার চেষ্টা চলে। শহীদ হওয়া তার হয়ে ওঠে না, কারণ শহীদের মর্যাদা নির্ণয়ের ভার যাদের হাতে তারাই কাংগাল চামারের খুনী। অবশেষে ৯৯৪ কোটি টাকার ঘাটতি দেখিয়ে বন্ধ হয় এলিজাবেথ চটকল। কাটৌঁতি বাবদ শ্রমিকদের তিনকোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে আগেকার ভাড়াটে মালিক। এছাড়াও আছে ই এস আই, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, বোনাস। ফলে নিরুপায় শ্রমিকদের আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। শ্রমিকদের নির্মম ভাগ্য বিপর্যয়ের সাথে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে থাকে মালিক, কাঁচা পাটের দালাল, লম্বরদার ইউনিয়নের নেতারা, শ্রমিকরা, অর্থনৈতিক সংস্থা, বি আই এফ আর, রাজ্য সরকার, আদালত, কেন্দ্র সরকার ইত্যাদি সবাই।

‘সুন্দর সুন্দর কা–কারখানা, বৃহস্পতিবার’, কুলি ব্যারাকের নোংরা পরিবেশে শ্রমিকদের থাকতে হয়। কুলি লাইনে বর্ষাকালে যে পাঁক জমে তাতে ফি বছর আন্ত্রিকে মরে বাচ্চারা। দিনের বেলায় ডাঁশ ওড়ে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে থাকতে ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায় মারা যান শ্রমিকরা। পাঁচ ঘণ্টায় মজুরিতে দিন চলে না। বাকি সময়ে রোজগারের জন্য আলাদা চেষ্টা করতে হয়। খালেদালি ম-লের বাড়তি কোনো রোজগার নেই। মিল বন্ধ হয়। আবার খোলে। খোলা আর বন্ধ হওয়ার মাঝখানে শ্রমিকদের উদ্বেগ আর নানা কিসিমের হরেক নেতার সংগ্রামী ভাষণ। কারখানা বন্ধ হলে খালেদালিকে ভিক্ষায় বেরোতে হয়। কিন্তু পেটে দানাপানি না পড়ায় খালেদালি অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালে এলে খালেদালি মারা যায়। মর্গে লাশ বদল হয়ে যায়। খালেদালি ম-ল মারা যাওয়ার পর ওর পাঁচ ঘণ্টার শিফটা পেয়েছেন বৈকুণ্ঠ আর বৈকুণ্ঠর তিন ঘণ্টার শিফটা পেয়েছেন জীবন হাটুই। খালেদালি পারেনি, কিন্তু বৈকুণ্ঠ সুযোগ পেলেই ছুতোরের কাজটা চালিয়ে যায়। রাজনীতি আর প্রশাসনের চাপে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে চট শ্রমিকেরা। ক্ষমতার সেই নখদন্ত তুলে ধরেছেন লেখক।

মলয় রায়চৌধুরী নিছক স্টোরি টেলার নন। গল্প বলার জন্য বা কাহিনি ফাঁদার জন্য তিনি কলম ধরেন না। তাঁর লেখা উদ্দেশ্যধর্মী। রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপে শ্রেণিশোষণের কদর্য রূপ লেখক তুলে এনেছেন তাঁর সমস্ত লেখায়। লেখা হয়ে উঠেছে তথ্যভা-ার। দৃষ্টিভঙ্গি নির্মোহ বৈজ্ঞানিকের। কাহিনি পরিবেশনের দিক থেকেও লেখক নানাভাবে গবেষণা করেন। সাংবাদিকের চোখ দিয়ে সমাজকে দেখেছেন তিনি। বিষয়কে উপন্যাসের আদল দিতে লেখককে নানাভাবে ভাবতে হয়েছে। এজন্য ফর্মের দিক থেকে তাঁর লেখায় এসেছে অভিনবত্ব। ‘নখদন্ত’ উপন্যাসে ডায়ারির আদল। ব্যক্তিগত জীবনচর্চা, নিজের লেখালেখি, সংসার, শরীর নিয়ে কিছু বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তিনি তুলে ধরেছেন চটশ্রমিকদের যন্ত্রণার চেহারা। সাতকা-ের মধ্যে চটশ্রমিকদের জীবন সংগ্রামের সাতকাহন।

বাংলা উপন্যাস-ভাবনার এক বিরাট পরিবর্তন। উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বে মহাশ্বেতা দেবী, দেবেশ রায়, মলয় রায়চৌধুরী ও রবিন ঘোষ প্রমুখের লেখায় দেখা গেল, আসলে এরা কেউই তথাকথিত কাহিনিকার নয়, দেশ, রাজ্য-রাজনীতির পরিবর্তনের চেহারা এদের রচনার মূল সুর। এ সময় থেকে বিশ্বসাহিত্যে ‘অপর’-কে নিশ্চিহ্ন করে ব্যক্তির নিজস্ব মুখ, তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে অকপটভাবে তুলে ধরার প্রয়াশ শুরু হয়েছে। সেল্ফ বা আত্মানুসন্ধানের যন্ত্রণা প্রকট চেহারা নিয়েছে এঁদের লেখায়। ক্ষমতা কীভাবে প্রান্তিক মানুষকে কোণঠাসা করে রাখে, তাদের এগিয়ে চলার গতিকে রাশবদ্ধ করে রাখে সেই বিশিষ্ট দিকটি উঠে আসে আধুনিক লেখায়। কেন্দ্রকে দেখাতে চেয়েছেন তাঁরা, অত্যাচার আর অনাচারের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভাষাহীন চোয়াল আর রক্তহীন মুখের বাণীলিপি তাঁদের লেখা। তাই গল্প খুঁজে কোনো মনোরঞ্জনের ইচ্ছা নয়, বরং গবেষকের চোখ দিয়ে সামাজিক বিশ্লেষণ এবং আঙ্গিক ভাবনার সেই বিশিষ্ট সংরাগটিই এঁদের রচনার এক বিকল্প অনুসন্ধান।

গ্রন্থসূত্র

১.            মলয় রায়চৌধুরী, ‘তিনটি উপন্যাস’, তেহাই, এ বি ২৯, অটল আবাস, দেশবন্ধুনগর, কলকাতা-৫৯, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি, ২০১০।

২.           মলয় রায়চৌধুরী, ‘এই অধম ওই অধম’, তিনটি উপন্যাস, কবিতীর্থ, ৫০/৩, কবিতীর্থ সরণি, কলকাতা-২৩, প্রথম প্রকাশ, ডিসেম্বর, ২০১১।

৩.           মলয় রায়চৌধুরী, ‘নখদন্ত’, হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, বি ২৪, ব্রহ্মপুর, নর্দান পার্ক, বাঁশ্রদ্রোণী, কলকাতা-৭০, প্রথম প্রকাশ, মে ২০০২।

৪.           মলয় রায়চৌধুরী, ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ-২’, আবিষ্কার প্রকাশনী, ১২এ আদিগঙ্গা রোড, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা-৭০, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি, ২০১২।

*******************************************

শেষের কবিতা : অমিত ও লাবণ্য চরিত
মুহম্মদ নূরুল্লাহ্

রবীন্দ্রনাথের শেষের দিকে রচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘শেষের কবিতা’। সাহিত্যবোদ্ধাদের মূল্যায়নের ভাষা-আঙ্গিক ও রচনারীতিতে এটি অনেক পরিণত। এর প্রধান দুটি চরিত্র : অমিত আর লাবণ্য। ঔপন্যাসিকের কলমের আঁচড়ে সৃষ্ট এই দুটি চরিত্রের মানসপট বিশ্লেষণই আমাদের লক্ষ্য। তবে তার আগে পাঠকের সুবিধার্থে উপন্যাসের কাহিনীটি সংক্ষেপে বর্ণনার প্রয়োজন আছে।

অমিত রায় ব্যারিস্টার। আইন পেশায় নাম লেখানো আছে, কিন্তু পেশায় মন নেই। বিত্তবান। পিতা অঢেল সম্পদ রেখে গিয়েছেন, উপার্জন না করেও দু’হাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করতে সমস্যা নেই। বিলাতে সাত বছর থেকে এসেছে। সে সাহিত্যের সমজদার, কথায় কথায় ইংরেজী বাংলা কবিতার উদ্বৃতি দিতে পারে। ফরাসি দেশের অনেক প-িত ব্যক্তির সান্নিধ্যেও তার কিছুটা সময় কেটেছে, তাদের সাথে তার যোগাযোগও আছে। সে স্বভাবে অস্থির, মনের খেয়াল খুশি মত ঘুরে বেড়ায়। বিলেত থেকে ফিরে এসে সে কিছুদিন কলেজের অধ্যাপনাও করেছে। অমিত বাকপটু, আবার হালকা কথার মধ্যে অনেক ভারী জীবন-দর্শন ও ছড়িয়ে দিতে পারে। বিবাহের পাত্র হিসাবে কন্যাদের পিতামাতার কাছে বা অবিবাহিতা কন্যাদের কাছে তার কদর অনেক। মেয়েদের ব্যাপারে তার ‘আগ্রহ না থাকলেও উৎসাহ আছে।’ সে শিলং এ এসেছে একা একা শিলং পাহাড়ের নির্জনতা উপভোগ করতে।

একটি হালকা মোটর দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে অমিত আর লাবণ্যর পরিচয়। লাবণ্য শিলং এসেছে এক উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারের মেয়ে সুরমার গৃহশিক্ষিকা হিসেবে। সে ঐ পরিবারের সাথেই থাকে। সে ঐ পরিবারের প্রধান বিধবা যোগমায়া দেবীর বিশেষ ¯েœহের পাত্রী। লাবণ্যর পিতা পশ্চিমের এক কলেজের অধ্যক্ষ, ইতিহাসের প-িত। স্ত্রী বিয়োগের পর দীর্ঘদিন আর বিয়ে করেন নি। সম্প্রতি লাবণ্যর জেদে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছেন। আর, পিতাকে সংসারী করে লাবণ্য সংসার ছেড়েছে। সে পণ করেছে নিজ উপার্জনে চলবে। সেও ইতিহাসে এম. এ— ভাল ছাত্রী ছিল, পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করেছে। শিলং এর রাস্তায় মোটর দুর্ঘটনার পর সৌজন্যবশত যোগমায়ার বাড়িতে অমিতের প্রথম যাওয়া। কিন্তু যোগমায়া দেবীর ¯েœহের প্রশ্রয়ে ঐ বাড়িতে তার ঘনঘন যাতায়াত এবং লাবণ্যর সাথে ঘনিষ্ঠতা ও প্রেমের সর্ম্পক গড়ে ওঠে। যোগমায়া কামনা করেন তাদের প্রেম পরিণয়ে পরিণত হোক। ঘটনা ক্রমে ক্রমে সেদিকেই গড়ায়। যদিও অস্থিরমতি অমিতকে নিয়ে লাবণ্যর মনে অনেক সংশয় তবুও সে শেষ পর্যন্ত বিয়েতে সম্মত হয়, যোগমায়ার প্রভাবকের ভূমিকা সে অস্বীকার করতে পারে না। স্থির হয় পরবর্তী অঘ্রাণেই তাদের বিয়ে হবে কোলকাতায়।

এ সময়ের দৃশ্যপটে আর্বিভাব কেতকীর ওরফে কেটির। অতি আধুনিকা বিলেতি চালচলনে অভ্যস্ত কেটির সাথে বিলাতে দেখা হয়েছিল অমিতের বছর সাতেক আগে। তখন কোন এক উদার মুহূর্তে সে কেটির হাতে একটি আংটি পরিয়ে দিয়েছিল। সেই দাবীতে আজ সে উপস্থিত হয়েছে অমিতের কাছে। লাবণ্যর সামনে অমিতকে সে স্মরণ করিয়ে দেয় সে কথা, আর ফিরিয়ে দেয় তার দেওয়া হীরার আংটিটি। লাবণ্য নিজেকে গুটিয়ে নেয়। আর তখনি মঞ্চে আর্বিভূত হয় আরেকজন, শোভনলাল তার বাবার ¯েœহভাজন ছাত্র, তার বাবার লাইব্রেরিতে ছিল তার অবাধ প্রবেশাধিকার। লাবণ্যর প্রতি তার অনুরাগ ছিল কিন্তু তা প্রকাশের সাহস সে পায়নি। উপরন্তু কোন এক ঘটনাক্রমে বিনা দোষে সে লাবণ্যর ভৎসনার শিকার হয়ে, সে লাইব্রেরিতে যাওয়া আসাও ছেড়ে দিয়েছিল। লাবণ্য-অমিতের সম্পর্ক যখন কেটির আগমনে শীতল ঠিক সেই সময়টিতে শোভনলাল শিলং এ আসে। সে লাবণ্যর কাছে জানতে চায় কেন সে বিনা দোষে শাস্তি ভোগ করেছে। লাবণ্য আকঁড়ে ধরে শোভনলালকে, ফিরিয়ে দেয় অমিতকে। সে অমিতকে ঠেলে দেয় কেটির দিকে। প্রত্যাখ্যাত নিরুপায় অমিত অগত্যা কেটির দিকে  মনোনিবেশ করে, কেটিতেই স্থিত হয় তার ভালবাসা উচ্ছ্বাস, ঘর বাঁধতে মনস্থ করে কেটির সাথে। আর লাবণ্যর ভালবাসার নৌকা গিয়ে ভিড়ে শোভনলালের ঘাটে, তাদের প্রেমও পরিণয়ে স্বার্থকতা পায়। শেষের কবিতার গল্পটির পরিসর খুব একটা বিস্তৃত নয়, গ্রন্থনাও খুব একটা জটিল নয়। কিন্তু এই উপন্যাসের নায়ক- নায়িকাকে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত যতেœ একেঁছেন, তারা পাঠকের মনে ঠাঁই করে নিয়েছে চিরকালের জন্য। দুজনেই অত্যন্ত বিদ্বান, মার্জিত, কথাবার্তায় দারুণ পটু। তাদের জীবনদর্শনও অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ থেকে উৎসারিত। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে অমিতের প্রেমিক সত্তা পাঠকের মনে এক উজ্জ্বল জোতিষ্কের রূপ নেয়, গৌণ হয়ে পড়ে লাবণ্য।

প্রথমে ভাল করে তাকানো যাক লাবণ্যের মানসপটের দিকে। লাবণ্য পিতার আশ্রয় ছেড়ে এসেছে সে একা। গৃহশিক্ষিকা হিসেবে সে আশ্রয় পেয়েছে মাতৃসমা যোগমায়ার ঘরে। কিন্তু, তার একটি নিরাপদ ঠাঁই প্রয়োজন। অস্থিরমতি অমিতের উপর কি নির্ভর করা যায়? এই চিন্তা বার বার তাকে বিচলিত করেছে— প্রেমাবেগ তাকে ব্যাকুল করেনি, উচ্ছ্বাস তাকে ভাসিয়ে নেয়নি। অমিতের প্রতি তার ভালবাসা বড় মাপেরই, কিন্তু তা তাকে বেহিসাবি করে তোলে না। প্রথমদিন থেকেই সে তুলাদ-ে মাপতে শুরু করেছে ভবিষ্যতে তার জন্য কতটুকু নিরাপদ থাকবে অমিতের ঘর। তার উদ্বেগ হয়ত একদিন অমিতের কাছে সে মূল্যহীন হয়ে উঠবে, উচ্ছ্বাস কেটে গেলে অমিতের চোখে হয়ত সে বিবর্ণ, নেহায়েত সাদামাটা হয়ে উঠবে। এই দুর্ভাবনায় লাবণ্য বারবার থমকে দাঁড়ায় অমিতের ডাকে সাড়া দিতে যাবার পথে। প্রতি মুহূর্তেই সে সজাগ অমিতের স্থিরতা-অস্থিরতার বিচার বিশ্লেষণে। কখনও তার মনে হয়নি যে অমিতকে হারানো চলবে না, তাকে ছাড়া জীবন বৃথা হয়ে যাবে। তার চিন্তা ভাবনা নেহায়েত একজন বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন নারীর মত। সে শোভনলালের জীবনসঙ্গীর সময় সে নিজে শোভনলালকে কতটুকু ভালবেসেছে তার বিচার করতে বসেনি বরং সে কতটুকু নির্ভরযোগ্য সেটাই ভেবেছে। অমিতের উদ্দেশ্যে লেখা  তার শেষ কবিতায় তার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি :

যে আমারে দেখিবারে পায়

অসীম ক্ষমায়

ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,

এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।

তার মানে লাবণ্যর বিবেচনায় শোভনলাল তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে তার হৃদয়ে লাবণ্যর আসন চিরস্থায়ী থাকবে। কোনদিন সে শোভনলালের কাছে অপাংক্তেয় বা অনাকর্ষণীয় হয়ে পড়বে না।

কেটিকে অমিত একদিন একটি আংটি দিয়েছিল, এ কথা জানার পর লাবণ্য তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অমিতকে ঠেলে দেয় কেটির দিকে। তারই পরামর্শে অমিত তার বোনদের নিয়ে আর কেতকীকে নিয়ে সাত দিনের জন্য চেরাপুঞ্জিতে বেড়াতে যায়। শিলং এ ফিরে এসে আর লাবণ্যর দেখা পায়নি। ঐ পরিবারটি  ইতোমধ্যে শিলং ছেড়ে কোলকাতায় চলে গেছে। তার অনেকদিন পর পায় লাবণ্যর নিমন্ত্রণপত্র। বিয়ে হচ্ছে শোভনলালের সাথে। নিমন্ত্রণপত্রের পিছনের পাতায় যে কবিতা লিখে লাবণ্য অমিতের কাছে বিদায় নিয়েছে তার ভাষ্যের দিকে যদি তাকাই তাহলে লাবণ্যর মনটিকে দেখতে পাওয়া যাবে। ঐ কবিতায় লাবণ্যর মনে কোন হাহাকারের চিত্র পাওয়া যায় না। আছে ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্নের কথা- যে স্বপ্ন আবর্তিত হচ্ছে শোভনলালকে ঘিরে। লাবণ্য আত্মপ্রত্যায়ী, তাই বলতে পারে :

 মোর লাগি করিয়ো না শোক

আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।

ঐ কবিতায় লাবণ্যের ঘোষণা :

মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই

শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।

লাবণ্যর ভালবাসার সুধা এখনও জমা আছে, শোভনলালের জন্য। সে নিজেকে উজাড় করে দেয়নি। তার হৃদয়ে কোন হাহাকার নেই। তাই সে বলতে পারে :

উৎকণ্ঠ আমার লাগি

 কেই যদি প্রতিক্ষিয়া থাকে

সেই ধন্য করিবে আমায়।

লাবণ্যর এ বিশ্বাস নিজের প্রতি ছলনা নয়, এ বিশ্বাসের বাস্তব ভিত্তি আছে। শোভনলাল তার প্রতিক্ষায় ছিল। তার উপর তার আস্থা আছে। অমিত থাকবে না তার জীবনে তাতে কি আসে যায়?

লাবণ্যকে বুঝতে হলে তার একটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। অমিতের সাথে লাবণ্যর বিয়ে হবে তখন তা ঠিক হয়ে গেছে। অমিত কোলকাতায় চলে যাবে, সে তার মালপত্র পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থাও করে ফেলেছে। যেদিন যাত্রা করবে সেদিনই টেলিগ্রাম আসে যে তার বোনেরা আসছে শিলং-এ বেড়াতে। অমিতকে কোলকাতায় যাওয়া স্থগিত করতে হল। বোনদের থাকার জন্য বিলাসবহুল আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থা হল। এ সংবাদ শোনার পর লাবণ্য কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নেয়। তাদের আগমন সংবাদ তার জন্য আহ্লাদেরও হতে পারত। কিন্তু সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সে ধরে নিয়েছে অমিত বোনদের সামনে তাকে নিয়ে বিব্রতবোধ করবে। বোনদের ব্যাপারে তার কোন কৌতূহল লাগে না বরং শ্রেণিবৈষম্যের কারণে সে লাঞ্চনার শিকার হবে বলে আশঙ্কা করে। এবং ক্ষণিকের মধ্যেই অমিতের প্রতি তার আচরণের শীতলতা প্রকাশ পায়। এই পর্যবেক্ষণ থেকে লাবণ্য চরিত্রে উদারতার অভাব আছে এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। তাদের প্রেমের গভীরতা সম্পর্কে নিজের মনে আস্থা ষোল আনা থাকলে লাবণ্যের দুশ্চিন্তার কোন কারণ ঘটত না।

এবার আসা যাক অমিত প্রসঙ্গে। অমিত কিছুটা ছন্নছাড়া স্বভাবের। ব্যতিক্রমী হওয়ার মধ্যেই তার আনন্দ- তবে সে ব্যতিক্রমী হয় প্লান করে, এটা তার মৌলিকতা নয়। সে বাকপটু, তবে তার কথার মধ্যে অনেক উচ্চভাবনা আর দার্শনিকতার প্রমাণ মেলে। কোন চারিত্রিক দোষের আধারও সে নয়,— সে বিলাতে সাত বছর বাস করে এসেছে কিন্তু বখে যায়নি।

অমিত স্বপ্নবিলাসী, কল্পনাবিলাসী। লাবণ্যর প্রতি তার ভালবাসার কোন খাদ নেই, পাওয়ার ইচ্ছাতেও কোন দ্বিধা নেই। লাবণ্যকে নিয়ে সে ভবিষ্যত জীবনের রোমান্টিক কল্পনায় বিভোর। কেতকী যার হাল ফ্যাশনের নাম কেটি, তাকে সে কোন এক দুর্বল মুহূর্তে একটি আংটি পরিয়ে দিয়েছিল— ওটা ছিল আসলে এক প্রতিযোগিতায় বিজয়োল্লাসের স্মারক। কেটির প্রতি তার কোন প্রেম নেই, কিন্তু কেটির সাথে এই ঘটনার অজুহাতেই লাবণ্য তাকে প্রত্যাখ্যান করে। আর অনিবার্যভাবেই কেটিকে গ্রহণ করতে হয় জীবনসঙ্গী হিসেবে। অথচ কেতকীতে তার উৎসাহও ছিলনা আগ্রহও ছিলনা। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাকে সে গড়ে তোলে প্রেমে নয় যতনে। আমরা দেখেছি, বোনেদের সাথে হোটেলে থাকার সময় কেটিকে এড়াবার জন্য সারাদিন নানা ছল করে শিলং জুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছে আর বিকালে লাবণ্যর সাথে দেখা করেছে। লাবণ্যকে পাওয়ার ইচ্ছায় কোন ঘাটতি ছিলনা অথচ লাবণ্য তাকে ফিরিয়ে দিল। আর ঠেলে দিল কেটির দিকে। সে কেতকীর কেটি হয়ে ওঠার দায় চাপিয়েছে অমিতের উপর। অমিত লাবণ্যর পরামর্শ গ্রহণ করেছে বিনা প্রতিবাদে। কেটির সাথেই যখন ঘর করতে হবে তখন তাকে নিজের মনের মত করে তোলা দরকার— তখন সে তার উগ্র বিলাতি ফ্যাশন ছাড়িয়ে ঘষে মেজে বাঙালি করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।

উপন্যাসের শেষদিকে অমিতর মানসিক অবস্থার প্রকৃতচিত্র পাওয়া যায় যোগমায়ার পুত্র যতিশংকরের সাথে কথোপকথনে। যতিশংকর কলেজ পড়–য়া ছাত্র, অমিতের সে ¯েœহের পাত্র। বয়স কম হলেও মানুষের হৃদয়বৃত্তির সূক্ষ্ম টানাপোড়েনের গতিপ্রকৃতি বুঝতে অপারগ নয়। যতিশংকরকে সে জানায় যে কেটির সাথে তার বিয়ে হবে। সাথে সাথে সে লাবণ্য প্রেমে তার আস্থার কথাও জানাতে ভোলে না।

‘একদিন আমার সমস্ত ডানা মেলে পেয়েছিলুম উড়ার আকাশ; আজ আমি পেয়েছি আমার ছোট্ট বাসা, ডানা গুটিয়ে বসেছি। কিন্তু আমার আকাশও রইল।’ অমিত বিষয়টা স্পষ্ট করার জন্য আরো বলে :

… কেতকীর সঙ্গে আমার সমন্ধ ভালবাসারই; কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল, প্রতিদিন তুলব প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার যে ভালবাসা সে রইল দিঘি; সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।

কথাটা যতির পছন্দ হয়না, সম্ভবত পাঠকেরও না। দুজনের কথপকথনের সুতা ধরে আর একটু এগিয়ে যাওয়া যাক :

‘কিন্তু অমিতদা, দুটোর মধ্যে একটাকেই কি বেছে নিতে হয় না?’

‘যার হয় তারই হয় আমার হয়না’

‘কিন্তু শ্রীমতি কেতকী যদি’

‘তিনি সব জানেন। সম্পূর্ণ বোঝেন কিনা বলতে পারিনে। কিন্তু সমস্ত জীবন দিয়ে বোঝাব যে, তাঁকে কোথাও ফাঁিক দিচ্ছিনে। এও তাঁকে বুঝতে হবে যে লাবণ্যর কাছে তিনি ঋণী।’

যতিশংকরের সাথে অমিতের আরো অনেক কথা হয়েছে। সে সব কথায় বিবাহবন্ধনহীন এক মুক্ত ভালবাসার জয়ধ্বনি শোনা যায় অমিতের ভাষ্যে। অমিত লাবণ্যর সাথে এই ভালবাসা আর কেতকীর সাথে নিত্যদিনের সবকিছুর সাথে যুক্ত হয়ে থাকা ভালবাসা দুটোই এক সাথে চায়। অমিতের ভাষায় :

যে ভালোবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ, যে ভালোবাসা বিশেষভাবে প্রতিদিনের সবকিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় অসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।

অমিত আসলে লাবণ্যকে এতটাই ভালবেসেছে যে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব তার কাছে অবান্তর। সে ভালবেসেছে এটাই তার পাওয়া। না-পাওয়াটা সে উপলদ্ধি করতে পারে না। মনঃসমীক্ষণের (ঢ়ংুপযড়ধহধষুংরং) জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে এই গল্পটি বলা হলে তিনি অমিতের মানসপটকে কিভাবে ব্যাখ্যা করতেন তা বলে দেওয়া যায়। তিনি বলতেন, অমিত তার না পাওয়ার বেদনাকে ভুলে থাকার জন্য অবচেতন মনের প্রভাবে একটি কৌশল অবলম্বন করেছে। সেই কৌশলটি হল অবহৃত (ফবহরধষ) বাস্তবে যে ঘটনা ঘটছে এবং পীড়াদায়ক হিসেবে ব্যক্তিকে কষ্ট দিচ্ছে তা অস্বীকার করা বা ঘটছে না বলে মনে করা হয়। অমিত লাবণ্যর প্রত্যাখ্যানের কষ্ট ভুলে থাকার জন্য আত্মপ্রবঞ্চনার মাধ্যমে নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছে যে এরকম কিছু ঘটেনি। সেজন্যই সে বলতে পারে— ‘আমার আকাশও রইল’, অর্থাৎ লাবণ্য প্রেম আকাশের ব্যপ্তি নিয়ে তার কাছে অস্তিত্বশীল, সেখানে সে ডানা মেলে উড়তে পারবে অথবা ‘আর লাবণ্যর সাথে আমার যে ভালবাসা সে রইল’ দিঘি; সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাঁতে সাতার দেবে অহম (বমড়) কে উদ্বেগের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অমিত এভাবেই প্রতিরক্ষা কৌশল (ফবভবহপব সবপযধহরংহ) ব্যবহার করেছেন। লাবণ্যর কোন প্রতিরক্ষা কৌশলের প্রয়োজন হয়না, অবচেতন মনে বাস্তবতাকে বদলে নিয়ে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে নিতে হয় না, কিন্তু অমিতের হয়। অবচেতন কৌশলে অমিত মনে করে নেয় যে সে কিছুই হারায় নি। অমিত লাবণ্য উপাখ্যান প্রকৃতপক্ষে অমিতের জন্য ট্র্যাজেডি, লাবণ্যর জন্য নয়।

*******************************************

‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের বঙ্গদেশ
কাজল কাপালিক

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৮০ সালে লিখেছিলেন, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালী, তাহাকেই লিখিতে হইবে।’১ বঙ্কিমচন্দ্রের এই আক্ষেপ সত্ত্বেও তাঁর সময়ের আগে থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষে স্বজাতির ভাবনা চলছিলো। এই ভাবনার সবটাই বস্তুনিষ্ঠ হয়ে না উঠলেও সেগুলোকে স্বজাতির ইতিহাস চেতনার মর্যাদা না দিয়ে পারা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্র এসবের সঙ্গে কমবেশি পরিচিত ছিলেন। জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাঙালি জাতির ইতিহাসকে কথাসাহিত্যে ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। উনিশ ও বিশ শতকে কথাসাহিত্যে শিল্পসম্মতভাবে এজাতীয় উপকরণ ব্যবহারের প্রথম কৃতিত্ব তাঁরই। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর চৌদ্দটি উপন্যাসের মধ্যে নয়টি উপন্যাসে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক বিষয়কে সাহিত্যের উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নয়টি উপন্যাসে বারো শতক থেকে আরম্ভ করে উনিশ শতক পর্যন্ত সময়কালের ইতিহাস পাওয়া যায়। বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদেশে সেন শাসন আমলের প্রকৃত ইতিহাস খুঁজতে তাঁর তৃতীয় ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘মৃণালিনী’ (১৮৬৯) রচনার সময়ে প্রচলিত ইতিহাসের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বলাইবাহুল্য, তাঁর অব্যবহিত পূর্ববর্তী সময়ে প্রকাশিত বঙ্গদেশের ইতিহাসের পরিমাণ আশানুরূপ ছিলো না। বিশেষভাবে বঙ্কিমচন্দ্রের মতো ঔপন্যাসিকের বঙ্গদেশের ঐতিহাসিক উপকরণ সরবরাহ করার জন্য তা সত্যিই অপ্রতুল ছিলো। বঙ্কিমচন্দ্রকে তাই বাধ্য হয়ে ভিন্ন উৎসের অনুসন্ধান করতে হয়েছে। কারণ বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যবহৃত ইতিহাসের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলো অবাঙালিদের রচিত ইতিহাস। এগুলোর মধ্যে প্রায় সবগুলোই ইতিহাস পদবাচ্য, তবে এর উৎস প্রধানত ইংরেজি ও ফারসি। বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহাসিক উপন্যাসের উৎস-উপকরণকে এভাবে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা যায় : এক. দেশীয় ইতিহাস ও ইতিহাসের উপকরণ, এবং দুই. অবাঙালিদের ইতিহাস। উপন্যাসের ইতিহাস বিষয়ক দেশীয় উপকরণকে আবার ভাগ করা যায় অলিখিত এবং লিখিত এই দুই ভাগে। প্রশ্ন জাগে, ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস সৃষ্টিতে বঙ্কিমচন্দ্র কী যথাযথ ইতিহাসের দ্বারস্থ হতে পেরেছিলেন? বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনা প্রসঙ্গে ইতিহাসের প্রতি তিনি কতটা আনুগত্য ছিলেন? অনৈতিহাসিক চরিত্রের আগমন ঘটিয়ে থাকলে তিনি সমকালীন জাতীয়তাবাদী মনোভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন কিনা? বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সরকারি চাকুরের পক্ষে ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস সৃষ্টি ব্রিটিশ বিরোধিতার কোনো মাধ্যম ছিলো কিনা উপন্যাসের ইতিহাস অংশ চিহ্নিত করে এ জাতীয় বিষয়াদি একে একে দেখা যেতে পারে।

২. ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস

প্রথম প্রকাশের পর ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসটিকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে বিহার-বিজয়ী বখতিয়ার খিলিজিকে সম্মুখ সমরে পরাজিত করার জন্য মাধবাচার্য লক্ষ্মণাবতীর হেমচন্দ্রকে দীক্ষিত করেন। অশ্ববিক্রেতার ছদ্মবেশে বখতিয়ার খিলিজি লক্ষ্মণাবতী জয় করেন। বিশ হাজার সৈন্যের অত্যাচারে তখন নবদ্বীপ বিধ্বস্ত হয়। মাধবাচার্যের আদেশে দক্ষিণে সমুদ্রতীরে বীর হেমচন্দ্র নতুন রাজ্য গঠন করেন। সেখান থেকে বখতিয়ারের উপর আক্রমণ শুরু এবং তাঁর কামরূপ অভিযান ব্যর্থ হয়। প্রত্যাবর্তনের পথে বখতিয়ার আসামের কালাজ্বরে আক্রান্ত হন এবং হিন্দু-দেবীর শরণাপন্ন হন। অসহায় অবস্থায় সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। এটিই এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয়।

বঙ্কিমচন্দ্র ‘মৃণালিনী’ প্রকাশের পূর্বে মুসলমান ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দীনের ‘তবকাত্-ই-নাসিরি’ পড়ে থাকবেন। ঐতিহাসিক মিনহাজ বঙ্গ-বিজয়ের প্রায় ৬০ বছর পর গৌড়ে এসে সমসুদ্দীন নামক একজন বৃদ্ধ সৈনিকের মুখ থেকে শোনা গল্পের প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। মিনহাজের মতে, বখতিয়ার খিলিজি তাঁর সৈন্যবাহিনী জঙ্গলে লুকিয়ে রেখে সপ্তদশ অশ্বারোহীকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানী নদীয়াতে আসেন। বখতিয়ার খিলিজি রাজপুরীর প্রহরীদের হত্যা করে পুরীর মধ্যে প্রবেশ করলে বৃদ্ধ রাজা ‘লছমনিয়া’ শঙ্খঘাটে বা পূর্ববঙ্গে পালিয়ে যান।২

‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে সংক্ষিপ্ত পরিসরে মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয়ের কাহিনি বঙ্কিমচন্দ্র উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি যে, মাত্র সপ্তদশ অশ্বারোহী সৈন্য দ্বারা বঙ্গবিজয় সম্ভব হয়েছিলো। বঙ্কিম সমকালের বাঙালি শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই প্রায় মিনহাজ উদ্দীনের ফার্সিতে লেখা ইতিহাসের ইংরেজি অনুবাদের সুবাদে বিশ্বাস করেই নিয়েছিলেন যে, বখতিয়ার খিলিজি সতেরো জন সৈন্য নিয়েই বঙ্গবিজয় করেছিলেন। অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্র যখন ১৮৬৯ সালে ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস প্রকাশ করেন, তখন তিনিও যে এই ইতিহাস কমবেশি মেনে নিয়েছিলেন তা বোঝা যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৮৮১ সালে তিনি ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় যে মন্তব্য করেছিলেন, তা নিশ্চয়ই অন্যান্য প্রামাণ্য ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট ইতিহাসের উপর ধারণা করেই। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র তাঁদের উপর দৃঢ় ক্ষোভ প্রকাশ করেন, যাঁরা একচেটিয়াভাবে প্রামাণ্য ইতিহাসের বদলে মিনহাজের ইতিহাসকেই প্রামাণ্য বলে মনে করেন, পূর্বেই উপন্যাসে তাঁদের সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র বলেন —

বাস্তবিক সপ্তদশ অশ্বারোহী লইয়া বখতিয়ার খিলিজি যে বাঙ্গালা জয় করেন নাই, তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। সপ্তদশ অশ্বারোহী দূরে থাকুক, বখতিয়ার খিলিজি বহুতর সৈন্য লইয়া বাঙ্গালা সম্পূর্ণরূপে জয় করিতে পারে নাই। বখতিয়ার খিলিজির পর সেনবংশীয় রাজগণ পূর্ববাঙ্গালায় বিরাজ করিয়া অর্দ্ধেক বাঙ্গালা শাসন করিয়া আসিলেন। তাহার ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে উত্তরবাঙ্গালা, দক্ষিণবাঙ্গালা, কোন অংশই বখতিয়ার খিলিজি জয় করিতে পারে নাই। লক্ষ্মণাবতী নগরী এবং তাহার পরিপার্শ্বস্থ প্রদেশ ভিন্ন বখতিয়ার খিলিজি সমস্ত সৈন্য লইয়াও কিছু জয় করিতে পারে নাই। সপ্তদশ অশ্বারোহী লইয়া বখতিয়ার খিলিজি বাঙ্গালা জয় করিয়াছিল, এ কথা যে বাঙ্গালী বিশ্বাস করে, সে কুলাঙ্গার।৩

বঙ্কিমচন্দ্র উক্ত মন্তব্য প্রকাশ করলেও পূর্বেই যে তিনি মিনহাজের ফার্সি ভাষায় লিখিত ইতিহাসের উপর সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, তা ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসেই উল্লেখ করেছেন—

ষষ্ঠী বৎসর পরে যবন-ইতিহাসবেত্তা মিনহাজউদ্দীন এই রূপ লিখিয়াছিলেন। ইহার কতদূর সত্য, কতদূর মিথ্যা কে জানে? যখন মনুষ্যের লিখিত চিত্রে সিংহ পরাজিত, মনুষ্য সিংহের অপমানকর্তা স্বরূপ চিত্রিত হইয়াছিল, তখন সিংহের হস্তে চিত্রফলক দিলে কিরূপ চিত্র লিখিত হইত? মনুষ্য মূষিকতুল্য প্রতীয়মান হইত সন্দেহ নাই। মন্দভাগিনী বঙ্গভূমি সহজেই দুর্বলা, আবার তাহাতে শত্রু হস্তে চিত্রফলক!৪

বখতিয়ার খিলিজি কর্তৃক বঙ্গবিজয় বঙ্কিমচন্দ্রের কল্পনা ও কৌতূহলকে বিশেষভাবে উদ্দীপিত করেছিলো। মৃণালিনীতে বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গবিজয় ও সপ্তদশ অশ্বারোহী সম্পর্কিত কাহিনির স্বরূপ চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন। সপ্তদশ অশ্বারোহীর আবির্ভাব ও লক্ষ্মণসেনের অন্তঃপুর হতে পলায়ন কাহিনি তিনি ইতিহাস বা কিংবদন্তি হতে গ্রহণ করেছিলেন বলে সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত মনে করেন।৫ বর্তমান আধুনিক যান্ত্রিক যুগে সতেরো জন মিলে একটা অসমসাহসিক কাজ এবং তাদের দ্বারা সতেরো হাজার সৈন্য সমবেত করা কষ্টসাধ্য নয়। কিন্তু প্রায় হাজার বছর পূর্বে সে সম্ভাবনা ছিলো না। বখতিয়ার খিলিজি আলেকজান্ডার-হানিবল-নেপোলিয়ানের মতো ক্ষমতাশীল হলেও মাত্র ষোলো জন অনুচর নিয়ে এই প্রকা- প্রদেশ অধিকার করবেন, তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।৬ বঙ্কিমচন্দ্রকে তথ্যের অভাবেই ইংরেজি লেখকদের দ্বারস্থ হতে হয়েছিলো। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘লক্ষ্মণসেনের পলায়ন-কলঙ্ক’ নামক প্রবন্ধে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বঙ্গবিজয়ের কাহিনি নিয়ে আলোচনা করেছেন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তো স্বীকারই করেননি যে, বখতিয়ার খিলিজি লক্ষ্মণসেনকে আক্রমণ করেছিলেন। তিনি বলেছেন যে, সম্ভবত লক্ষ্মণসেন তখন জীবিত ছিলেন না। তবে ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ গ্রন্থে তিনি লক্ষ্মণসেনের বহু গৌরবসূচক চিহ্নের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি মনে করেন যে, লক্ষ্মণসেন নয়, বরং অন্য কোনো সেনরাজাকে বখতিয়ার খিলিজি আক্রমণ করে থাকবেন।৭

‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের প্রথম দুইটি পরিচ্ছেদ বঙ্কিমচন্দ্র সপ্তম বা অষ্টম সংস্করণে পরিত্যক্ত করেন। কিন্তু ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেখানে পাঠককে সামান্য হোঁচট খেতে হয়। যে পরিচ্ছেদ দুইটি বাদ দেওয়া হয়েছে, সে দুইটি পূর্বের মত বহাল থাকলে কাহিনি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠতো। উল্লেখিত দুইটি পরিচ্ছেদে যে কাহিনি ছিলো, সামগ্রিক ঘটনার সঙ্গে যে তা সংশ্লিষ্ট ছিলো তা উপেক্ষা করা যায় না। যেমন, ‘রঙ্গভূমি’ নামে প্রথম পরিচ্ছেদে ছিলো মহম্মদ ঘোরির প্রতিনিধি তুর্কস্থানীয় কুতুব-উদ্দীন, যুধিষ্ঠির ও পৃথ্বীরাজের সিংহাসন আরোহণ করেন। দিল্লি, কান্যকুব্জ, মগধ ইত্যাদি প্রাচীন সাম্রাজ্য যবনের করকবলিত হয়। বঙ্গীয় ৬০৬ অব্দে যবন কর্তৃক মগধ জয় হয়। বিভিন্ন রতœরাশি সঞ্চয় করে বিজয়ী সেনাপতি বখতিয়ার খিলিজি রাজপ্রতিনিধিকে উপঢৌকন প্রদান করেন। কুতুব-উদ্দীন প্রসন্ন হয়ে বখতিয়ার খিলিজিকে পূর্Ÿ ভারতের আধিপত্যে নিযুক্ত করেন। এই গৌরবে বখতিয়ার খিলিজি রাজ-প্রতিনিধির সমকক্ষ হয়ে ওঠেন। বিজয়ী সেনাপতির সম্মানার্থে কুতুব-উদ্দীন মহাসমারোহে উৎসবের জন্য দিন নির্ধারণ করেন। নির্ধারিত দিনে ‘রায় পিথোরার’ পাথরের দুর্গে হিন্দু-মুসলমান সকলেই সমবেত হতে থাকে। রাজপ্রতিনিধিরা নানা ধরনের বীরত্বপূর্ণ ক্রীড়া প্রদর্শন করতে থাকেন। বিহার জয় করা তুর্কি বখতিয়ার হাতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে রণাঙ্গনে নামেন। ক্ষুদ্র বানর বা হনুমান আকৃতি বখতিয়ার তাঁর হাতের কুঠার দিয়ে হাতির মাথায় আঘাত করলে মগধজয়ী বখতিয়ারের উপর হাতি চড়াও হয়ে ওঠে। বখতিয়ার পালিয়ে যাওয়া লজ্জাজনক মনে করে মৃত্যুকেই শ্রেয় ভেবে থেকে যান। এবার হাতি তার চরণ উত্তোলন করে বখতিয়ারের কাঁধে দিতে না দিতেই হঠাৎ হাতিটি মাটিতে পড়ে যায়। সকলেই মনে করে যে, খিলিজি কোনো কৌশলে হাতিকে বধ করেছেন। এই ভেবে মুসলমানের দলটি উচ্চৈঃস্বরে জয়ধ্বনি করতে থাকে। কিন্তু রহস্য ভেঙ্গে গেলো। দেখা গেলো হাতির গ্রীবার উপর একটি তীরবিদ্ধ আছে। কুতুব-উদ্দীন বিস্মিত হয়ে নিজে মৃত হাতির নিকট এসে দেখতে পেলেন যে, একটি ভিন্ন ধরনের তীর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গ্রীবার যেখানে মাথা ও মেরুদ-ের মধ্যে মজ্জার সংযোগ রয়েছে সেখানে বিদ্ধ হয়েছে। কুতুব-উদ্দীন তীর নিক্ষেপকারীকে অসাধারণ বাহুবলশালী, বিচিত্র শিক্ষিত এবং অতি লঘুগতি হাতধারী মনে করলেন। তিনি একজন পরিষদকে ডেকে তীর নিক্ষেপকারীকে খুঁজে বের করতে আদেশ দেন এবং উপস্থিত সবাইকে বখতিয়ার খিলিজিই এই হাতি বধ করেছে প্রচার করে খিলিজির প্রশংসা করতে বলেন। উদ্দেশ্য মুসলমানের পক্ষে জয়ধ্বনি।

পরিত্যক্ত দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের ‘গজহন্তা’য় আছে, হেমচন্দ্র নামক ২৫ বছর বয়সের নিচে হিন্দু যুবককে সশস্ত্র অবস্থায় রাজপ্রতিনিধির সম্মুখে আনা হলো। সুস্বাস্থ্য, “রাজদ-” নামক পরিচিত শিরাধারী কপাল, বীর হেমচন্দ্রকে কুতুব-উদ্দীন আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে হাতি মারার কারণ জানতে চান। হেমচন্দ্র জানালেন যে, হাতিকে না মারলে সেনাপতি খিলিজি মারা পড়তো। তখন খিলিজি নিজের সাহসের কথা বললে হেমচন্দ্র তাঁকে অপমানসূচক কথা বলেন। সেনাপতিকে অপ্রতিভ দেখে কুতুব-উদ্দীন মুসলমানের বাহুবলের কথা জানান। তথাপি সেনাপতির মঙ্গল কামনায় তীর নিক্ষেপ করায় কুতুব-উদ্দীন হেমচন্দ্রকে শতমুদ্রা পুরস্কার দিতে চান। পরে সহস্রমুদ্রা দিতে চাইলেও দিল্লির শ্রেষ্ঠীরা হেমচন্দ্রকে লক্ষমুদ্রা দিবে বলে জানান। এ সময় হেমচন্দ্র জানান যে, যমুনার তীরে মগধে তাঁর বাসস্থান। বখতিয়ার দস্যু কর্তৃক মগধ জয় হয়েছে এবং কুতুব-উদ্দীন যবনদস্যুর ক্রীতদাস। যুবকের এই অপমানজনক কথা শুনে সম্রাট কুতুব-উদ্দীন বিস্মিত ও রাগান্বিত হয়ে তাঁকে বধ করার আদেশ দেন। কিন্তু খিলিজি কুতুবকে বিনয়ের সাথে বলেন, এই যুবক হিন্দু বাতুল এবং একে বধ করা কাপুরুষতা। যুবক খিলিজিকে বলেন, ‘আমি আপনার মঙ্গলাকাক্সক্ষায় হস্তিবধ করি নাই। আপনাকে একদিন স্বহস্তে বধ করিব বলিয়া আপনাকে হস্তিচরণ হইতে রক্ষা করিয়াছি।’ হেমচন্দ্র আরো বলেন যে, ‘তুমি আমার পিতৃরাজ্যাপহরণ করিয়াছ। আমি মগধ-রাজপুত্র। যুদ্ধকালে হেমচন্দ্র মগধে থাকিলে তাহা যবনদস্যু জয় করিতে পারিত না। অপহারী দস্যুর প্রতি রাজদ- বিধান করিত।’ হেমচন্দ্রের এহেন স্পর্ধা এবং উত্তপ্ত বাক্য শুনে কুতুব-উদ্দীন দ-াজ্ঞা দিয়ে হেমচন্দ্রকে কারাগারে নিতে আদেশ করেন। হঠাৎ পুররক্ষীগণ সংবাদ দিলো যে ‘বন্দী পলাইয়াছে’। জানা গেলো, দুর্গের মধ্যে জনৈক মুসলমান ব্যক্তি ঘোড়া ফেরাচ্ছিলো, তার ঘোড়া নিয়ে বন্দী দ্রুত বেগে দুর্গদ্বার পেরিয়ে চলে গেছে। বন্দীর দিকে মনোযোগী ও তীর নিক্ষেপ করেও তাঁকে আটকাতে পারেনি। এদিকে যে মুসলমান লোকটি ঘোড়া ফেরাচ্ছিলো ফিরে এসে তাকেও পাওয়া যায়নি।

পরিত্যক্ত দুইটি পরিচ্ছেদে বখতিয়ারের মগধ জয়ের পর আনন্দ উৎসবের আয়োজন এবং বখতিয়ারের সঙ্গে হাতির যুদ্ধের চিত্র পাওয়া যায়। বঙ্কিমচন্দ্র এই বর্ণনা ইংরেজ ঐতিহাসিক চার্লস স্টুয়ার্টের ‘হিস্টরি অব বেঙ্গল’ গ্রন্থ থেকে নিয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র বখতিয়ারের যে দৈহিক বর্ণনা দিয়েছেন, তা স্টুয়ার্টের ইতিহাস গ্রন্থে আছে। তবে স্টুয়ার্টেও এই গ্রন্থে বখতিয়ারের যে বীরত্বের কথা বলা হয়েছে, বঙ্কিমচন্দ্র ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে তা হেমচন্দ্রের উপর ব্যবহার করেছেন। স্টুয়ার্টে আছে, হাতিকে মেরে ফেলার পর বখতিয়ার খিলিজি কুতুব-উদ্দীনের নিকট হতে যে পুরস্কার পেয়েছিলেন, তা তিনি তাঁর অধীনস্তদের দান করেছিলেন। কিন্তু মৃণালিনীতে পুরস্কার দেওয়ার প্রসঙ্গ হেমচন্দ্রের উপর বর্তিত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিলো হেমচন্দ্রকে নিজের মতো করে হিন্দু বীরপুরুষের চরিত্রে দাঁড় করানো। আর তাই হিন্দু হেমচন্দ্রকে দিয়ে তিনি গোপন স্থান থেকে হাতির উদ্দেশ্যে তীর ছুঁড়েছিলেন। ফলে হাতি তীরবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলো।

দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদটি বঙ্কিমের কাল্পনিক তৈরি হলেও প্রথম পরিচ্ছেদটির প্রথম অংশ কিঞ্চিৎ, অথচ ইতিহাসমুখী। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র এই অংশ পরে বাদ দিয়েছিলেন। ফলে বর্তমান ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস পাঠে ইতিহাসের সূত্রতা খুঁজে বের করতে একটু ভেবে নিতে হয়। যদিও পরবর্তীতে এই কার্যকরণ ২সূত্র হেমচন্দ্র ও মাধবাচার্যের কথোপকথনে নিহিত আছে।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে ব্যবহৃত এসব ইতিহাসের প্রামাণিকতা কতোটা? অথবা বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র কতটুকু মিল রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন? ইতিহাসকে সাহিত্যে রূপায়িত করতে গিয়ে তিনি যদি ইতিহাসের মূল ঘটনা ও বাস্তব অবস্থাকে পরিবর্তিত আকারে উপস্থাপন করে থাকেন, তাহলে তার মাত্রা কী এবং সেই পরিবর্তনের পেছনে কী মনোভাব সক্রিয় ছিলো? ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের উপর্যুক্ত চিহ্নিত ইতিহাস বিচারে এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের চেষ্টা করা যাক।

৩. ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদী চেতনার স্বরূপ

৩.১ ঐতিহাসিক স্থান প্রসঙ্গ এবং প্রাসঙ্গিক ঘটনা

‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খিলিজি কর্তৃক গৌড়েশ্বর লক্ষ্মণসেনের পরাজয়ের ঘটনার সঙ্গে এমন কয়েকটি স্থানের নাম উপন্যাসে পাওয়া যায় যা ইতিহাস সংশ্লিষ্ট। উল্লেখযোগ্য স্থানগুলিতে নাটকীয়ভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি ইতিহাসে অমরত্ব এবং প্রতœস্থান হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করতে ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের ঘটনা ও স্থান নির্বাচন করে জাতির মন জয় করে নিয়েছিলেন। ফলে উপন্যাসের দোষত্রুটি আর সহজেই পাঠকের নিকট ধরা পড়ে না।৮ উক্ত উপন্যাসে বেশ কয়েকটি স্থানের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তুর্কি সেনাপতির আগমন এবং লক্ষ্মণাবতী পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে স্থানগুলির নাম জড়িত থাকা গুরুত্ব¡পূর্ণ। এ জাতীয় স্থান নামগুলি যথাক্রমে প্রয়াগতীর্থ (১৩৫), মগধ (১৩৫), গঙ্গা-যমুনার সঙ্গম স্থান (১৩৫), মথুরা (১৩৫), গৌড়নগর প্রদেশ (১৩৭), নবদ্বীপ বা নদীয়া (১৩৭, ১৫১), লক্ষ্মণাবতী নগরী (১৩৮), উপবন (১৯৬), কামরূপ (১৯৯) ইত্যাদি।৯

ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাস হতে জানা যায়, মগধ জয় করার দুই বছর পরে বখতিয়ার খিলিজি তাঁর সৈন্য গঠন করে বিহার হতে যাত্রা শুরু করেন। তিনি হঠাৎ করেই এত দ্রুত নদীয়ায় প্রবেশ করেন যে, তাঁর সঙ্গী আঠারোজন সৈন্য ছাড়া বাকি সবাই পিছনে পড়ে যায়। নদীয়ায় এসে নগরের দ্বারে তিনি কোনো অত্যাচার না করে নীরবে বিনীতভাবে এমনভাবে প্রবেশ করেন যে, কেউ কোনো সন্দেহ করতে পারেনি। নগর মধ্যকার জনতা তাঁদেরকে আগন্তুক ব্যবসায়ী বলে মনে করে। দ্বিপ্রহরে রাজপ্রাসাদে এসেই বখতিয়ার খিলিজি তরবারি দ্বারা বিধর্মীদের হত্যা শুরু করেন। অতঃপর প্রাসাদের ভিতরে ঢুকে মানুষকে হত্যা করতে থাকেন। রায় তখন নগ্নপায়ে প্রাসাদের পিছন দরোজা দিয়ে পালিয়ে যান।১০

মিনহাজের বর্ণনা হতে জানা যায়, নবদ্বীপ সেন রাজাদের রাজধানী ছিলো না, ছিলো গঙ্গাতীরবর্তী একটি তীর্থস্থান এবং সেখানকার গঙ্গার তীর ঘেঁষে ছিলো রাজার প্রাসাদ। এই রাজপ্রাসাদ তখন সুদৃঢ় অট্টালিকা ছিলো না। এটি ছিলো সেকালের প্রাচীন বাংলার রুচি অনুসারে কাঠ ও বাঁশের তৈরি সমৃদ্ধ বাংলা-বাড়ি।১১

উপন্যাসের মধ্যে যে নবদ্বীপের পরিচয় পাওয়া যায়, ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় বলেন, সেটি কোনো দুর্গ নয়। এটিও একটি তীর্থস্থান। নগর প্রচীরও বাঁশ এবং কাঠের তৈরি বেড়া ও দরজা ছাড়া আর কিছুই নয়। মোগল আমলের রাজপ্রাসাদ বা দুর্গ বলতে যা বোঝায় এ স্থানে তার কিছুই ছিলো না। এরূপ একটি স্থানে উনিশ জন সৈন্য মাত্র ঘোড়া ব্যবসায়ী ছদ্মবেশে আক্রমণ করতে সাহস পাবে সেটা খুবই স্বাভাবিক। ইতিহাসে এই রকম স্বল্প সংখ্যক সৈন্যসহ আক্রমণ ও নগর অধিকার করা নিছক কল্পনার দ্বারা সৃষ্টি হয়নি। আরো একটি বিষয় যে, সেখানে শত্রু আক্রমণের কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থাও থাকবার কথা নয়। তবে বখতিয়ার খিলিজি স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে শুধু নবদ্বীপ জয় করেন, সমগ্র বঙ্গদেশ নয়।১২

ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, তুর্কি আক্রমণই সেন রাজবংশের পতনের একমাত্র কারণ নয়। সম্ভবত আভ্যন্তরিক বিদ্রোহও তা ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করেছিলো।১৩ বখতিয়ার খিলিজি কোন পথে সৈন্যসহ নবদ্বীপে প্রবেশ এবং আক্রমণ করেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। রাজমহলের নিকটবর্তী তেলিয়াগড়ের কোনো একটি স্থান ছিলো সম্ভবত দক্ষিণ-বিহার হতে বাংলায় প্রবেশের পথ। সেখানে যে কোনো শত্রু প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকা সম্ভব ছিলো এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এমনকি ঝাড়খ-ের দুর্ভেদ্য জঙ্গল এবং দুর্গমপথ অতিক্রম করে কোনো শত্রুসৈন্য যে বীরভূমের পথে বাংলায় প্রবেশ করতে পারে, সেন রাজা হয়তো তেমনটা আশঙ্কাও করেননি। ১১৯৪ সালে গাহড়বালরাজ জয়চন্দ্রের পরাজয়ের পর পূর্বদিকে একমাত্র পরাক্রান্ত স্বাধীন রাজ্য ও রাষ্ট্র ছিলো লক্ষ্মণসেনের। এই রাজ্যের কিছু অংশ যখন অধিকৃত হয়, তখন বিহার ধ্বংস ও লুণ্ঠিত হয় আরব, তুর্কি প্রভৃতি বিদেশিদের দ্বারা। এরও পূর্বে প্রায় কয়েক শতাব্দী যাবৎ উত্তর-ভারত একটু একটু করে বিদেশি এসব আক্রমণকারীদের প্রভুত্ব স্বীকার করে নিতে থাকে।১৪ এর পিছনে প্রধানত ছিলো রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। উত্তর ভারতের সৈন্য অপেক্ষা আরব-তুর্কিদের ঘোড় সওয়ারি সেনাদল ছিলো অধিকতর অগ্রগামী। লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকালে রাজ্যের কিছু অংশে যখন আক্রমণ এবং অবাধ হত্যা চলছিলো তখন জনসাধারণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পূর্ববঙ্গে এবং কামরূপ অঞ্চলে পালিয়ে যেতে থাকে। প্রাচীন কামরূপ রাজ্য ছিলো লৌহিত্য বা ব্রহ্মপুত্রের শীতলক্ষ্যার তীরে অবস্থিত। তাছাড়া বৌদ্ধ ভিক্ষু ও বহু ব্রাহ্মণের দলও এসময় নানা দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। উপন্যাসে দেখা যায়, জ্যোতিষী ব্রাহ্মণ এবং মন্ত্রীবর্গ লক্ষ্মণসেনকে যুদ্ধ না করে দেশ ত্যাগ করে চলে যেতে বলেছিলেন। রাষ্ট্রের প্রতিরোধ ব্যবস্থা যে বিশেষ ছিলো না তা সহজেই বোঝা যায়। ঐতিহাসিক মিনহাজও এই জ্যোতিষ গণনা ও শাস্ত্রের দোহাইয়ের কথা বলেছিলেন।১৫

তবে ধারণা করা যায়, লক্ষ্মণসেন যদি কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা করেও থাকেন, তবে তা নবদ্বীপ প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট ছিলো না। মূলত বখতিয়ার খিলিজির বুদ্ধি এবং আক্রমণ কৌশলই হয়তো তা ব্যর্থ করেছিলো। মিনহাজ উদ্দীনের বিবরণী থেকে এমনটাই জানা যায় যে, বখতিয়ার খিলিজি একবারেই বিনা বাধায় বিহার ও বাংলাদেশ জয় করেছিলেন। বৃদ্ধ লক্ষ্মণসেনের রাষ্ট্র যে পূর্বেই দুর্বল হয়ে পড়েছিলো তা সহজেই অনুমান করা যায়। অথচ পূর্বেই তিনি তার সুদক্ষ সৈন্য দ্বারা কলিঙ্গ, কামরূপ এবং কাশী জয় করেছিলেন। নবদ্বীপ ত্যাগ করে লক্ষ্মণসেন পূর্ববঙ্গে যান এবং সেখানেই অল্পকালের মধ্যে ১২০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।১৬ বঙ্কিমচন্দ্র নিজেও ‘বাঙ্গালীর বাহুবল’ প্রবন্ধে লক্ষ্মণসেন সম্পর্কে বিভিন্ন কবির প্রশংসনীয় বক্তব্যের বিরূপ মন্তব্য করেছেন। যেমন “লক্ষ্মণসেনের দুই একখানি তাম্রশাসনে তাঁহাকে প্রায় সর্ব্বদেশজেতা বলিয়া বর্ণনা করা আছে। পড়িলেই বুঝা যায় যে, সে সকল কথা চাটুকার কবির কল্পনা মাত্র।”১৭ উপন্যাসে বখতিয়ার খিলিজি স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে নবদ্বীপ জয় করার পর মাধবাচার্য হেমচন্দ্রকে কামরূপ যেতে বলেন। প্রাচীন বাংলায় এই কামরূপের অবস্থান ব্রহ্মপুত্র নদীর পশ্চিম সীমায়। কামরূপের রাষ্ট্রসীমা কখনোবা করতোয়া নদী অতিক্রম করে বাংলার একেবারে উত্তরের রংপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি অতিক্রম করে উত্তর বিহারের প্রাচীন কোশনদী পর্যন্ত বিস্তৃত। ঐতিহাসিক কালের অধিকাংশ সময় ব্রহ্মপুত্রের উত্তর ও দক্ষিণ উপত্যকাভূমিতে কামরূপের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রভুত্ব বিস্তৃত ছিলো। মধ্যযুগে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভুত্বে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার পশ্চিম প্রান্ত বিশেষ ভূমিকা পালন করতো।১৮

উপন্যাস হতে জানা যায় বখতিয়ার খিলিজি নদীয়া বা নবদ্বীপ আক্রমণের পূর্বে তিনি মগধ জয় করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র বলেন, “মথুরা হতে মগধ এক মাসের পথ।”১৯ নবদ্বীপ লুণ্ঠন করে বখতিয়ার অনেকটা স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কোন পথে নবদ্বীপে এসেছিলেন এবং কোন পথেইবা ফিরে গিয়েছিলেন, কোন বছরের কোন মাসে লক্ষ্মণাবতী অবরুদ্ধ ও বিজিত হয়েছিলো এবং সেনবংশের তখন লক্ষ্মণাবতীর সিংহাসনে কে অবস্থান করছিলেন তার কিছুই সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে এটুকু মাত্র জানা যায় যে, দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে লক্ষ্মণাবতী বিজিত হয়েছিলো। নবদ্বীপ লুণ্ঠনের পর লক্ষ্মণাবতী বিজিত হয় এমন কথা ইতিহাসে প্রচলিত আছে। আর লক্ষ্মণাবতী বিজিতের পর গৌড়বঙ্গ মুসলমানদের অধীনে গিয়েছিলো কিনা তাও সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি।২০ পাল ও সেন বংশীয় রাজাগণ মগধ অধিকারের জন্য বহুকাল যাবৎ যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন। এ সময় তুর্কি বখতিয়ার সীমান্ত অরক্ষিত দেখে মগধের নানা স্থান লুণ্ঠন করতে থাকেন। মগধ (দক্ষিণ-বিহার) লুণ্ঠনের অর্থ দিয়ে তিনি সেনা সংগ্রহ করে অবশেষে উদ্দ-পুরের প্রাচীন সংঘারাম অধিকার করেন। নবদ্বীপ বিজয়ের পর লক্ষ্মণসেন বা সেনবংশের অধিকার লুপ্ত হয়ে আসলে বখতিয়ার পিছনে ফিরে লক্ষ্মণাবতীতে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন কেন তা জানা যায় না। আবার এও জানা যায় না যে, নবদ্বীপ বিজয়ের পঞ্চান্ন বছর পর পুনরায় নবদ্বীপ বিজয়ের প্রয়োজন হয়েছিলো কেন; এ জাতীয় ঐতিহাসিক সমস্যা বর্তমানকালে এসেও প্রকৃতপক্ষে সুরাহা হয়নি।২১ মিনহাজ উদ্দীন যখন ‘তবাকত-ই-নাসিরী’ রচনা করেন, তখনও বাংলাদেশে (পূর্ববঙ্গে) লক্ষ্মণসেনের বংশধরদের অধিকার লোপ হয়নি। লক্ষ্মণসেন মুসলমান বিজয়ের পরে অন্তত ছয় বছর (১১৯৯-১২০৫) পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন বলে নগেন্দ্রনাথ বসু দাবি করেন।২২ গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের বা পদ্মা-যমুনার সঙ্গম স্থানে ইছামতী নদীর তীরে যাত্রাপুর অবস্থিত। সেকালে যাত্রাপুর হতে ইছামতী নদী পথে ঢাকা যাওয়া ছিলো সহজতম পথ।২৩ বড়গঙ্গা বা পদ্মার  ইছামতী প্রবাহ কাজিহাটার নিকট দুইভাগে বিভক্ত হয়েছে। একটি প্রবাহ পূর্ববাহিনী হয়ে পদ্মাবতী নাম নিয়ে চট্টগ্রামের নিকট সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। এই পদ্মাবতী নদীই তীর্থ¯œান স্থান। চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা (১৩৪৫-৪৬) চীন দেশে যাওয়ার পথে সমুদ্রতীরবর্তী চট্টগ্রামে (চাটগাঁ) নেমেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামকে হিন্দুতীর্থ গঙ্গানদী এবং যমুনা নদীর সঙ্গম স্থান বলে বর্ণনা করেছেন।২৪ ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে আছে, “একদিন প্রয়াগতীর্থে, গঙ্গাযমুনাসঙ্গমে, অপূর্ব প্রাবৃট্দিনান্তশোভা প্রকটিত হইতেছিলো।”২৫ আবার “একখানি ক্ষুদ্র তরণীতে দুইজন মাত্র নাবিক। তরণী অসঙ্গত সাহসে সেই দুর্দমনীয় যমুনার স্রোতোবেগে আরোহণ করিয়া, প্রয়াগের ঘাটে আসিয়া লাগিল।”২৬

৩.২ তুর্কিদের বঙ্গবিজয় প্রসঙ্গ

‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের ইতিহাস সেন বংশের শেষ সময়কার ইতিহাস। তুর্কি বীর বখতিয়ার খিলিজি কর্তৃক সতেরো জন সৈন্য নিয়ে রাজা লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত করা কতোটা সহজ ছিলো, বা এর পিছনে কোনো ষড়যন্ত্র কাজ করেছিলো কিনা তার একটি পূর্ণ রূপ দানের চেষ্টা করতে বঙ্কিমচন্দ্রকে দেখা যায়। আবার ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র তুর্কি জাতির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মকভাবে শুধু বখতিয়ার খিলিজির দৈহিক গড়নের ধাঁচে। বঙ্কিমচন্দ্র খিলিজিকে ক্ষুদ্রাকার মর্কটাকার এবং ধূর্তই বলেননি এও বলেছেন —

যবনেরা নিষেধ না শুনিয়া মুক্ত দ্বারপথে প্রবেশ করিতে উদ্যত হইল। সর্বাগ্রে একজন খর্বাকায়, দীর্ঘবাহু, কুরূপ যবন।২৭

মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাস হতে জানা যায়, বিহারের লুণ্ঠিত ধনরতœসহ বখতিয়ার স্বয়ং দিল্লিতে কুতুব-উদ্দীনের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বহু সম্মানপ্রাপ্ত হন। দিল্লি হতে ফিরে এসে তিনি বিহার প্রদেশ জয় করেন। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার যথার্থই বলেছেন—

বখতিয়ার খিলিজি কর্তৃক বাংলা দেশ জয় সম্বন্ধে যত কাহিনি ও মতবাদ প্রচলিত আছে, তাহা উল্লিখিত বিবরণের উপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ এ সম্বন্ধে অন্য কোন সমসাময়িক ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় নাই। মিন্হাজুদ্দিনের বিবরণ সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক বলিয়া গ্রহণ করিলেও প্রচলিত বিশ্বাস অনেক পরিমাণে ভ্রান্ত বলিয়াই প্রতিপন্ন হইবে।২৮

ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাস যে বঙ্কিমচন্দ্র গ্রহণ করেছিলেন, তা ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। মৃণালিনী উপন্যাসের নায়ক হেমচন্দ্র। বঙ্কিমচন্দ্র হেমচন্দ্রের চরিত্রটি নিজে সৃষ্টি করে ইতিহাসরূপে স্থাপন করেছেন, শুধুমাত্র কাহিনির ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটানো সম্ভব। কিন্তু হেমচন্দ্র ও ব্রাহ্মণ মাধবাচার্যের কথোপকথনে মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাস ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, ব্রাহ্মণ মাধবাচার্যের সঙ্গে হেমচন্দ্রের কথোপকথন—

ব্রাহ্মণ কহিলেন, “দিল্লীর সংবাদ আমি সকলই শুনিয়াছি। বখতিয়ার খিলিজিকে হাতীতে মারিত ভালই হইত, দেবতার শত্রু পশুহস্তে নিপাত হইত। তুমি কেন তার প্রাণ বাঁচাইতে গেলে।”

হে। তাহাকে স্বহস্তে যুদ্ধে মারিব বলিয়া। সে আমার পিতৃশত্রু, আমার পিতার রাজ্যচোর। আমারই সে বধ্য।

ব্রা। তবে তাহার উপর যে হাতী রাগিয়া আক্রমণ করিয়াছিল, তুমি বখতিয়ারকে না মারিয়া সে হাতীকে মারিলে কেন?

হে। আমি কি চোরের মত বিনা যুদ্ধে শত্রু মারিব? আমি মগধবিজেতাকে যুদ্ধে জয় করিয়া পিতার রাজ্য উদ্ধার করিব। নহিলে আমার মগধ-রাজপুত্র নামে কলঙ্ক।২৯

বঙ্কিমচন্দ্র বখতিয়ার খিলিজির মগধ জয়ের ইতিহাসকে অত্যন্ত সুকৌশলে কাহিনির মধ্য দিয়ে পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন।৩০ হেমচন্দ্র দিল্লিতে বখতিয়ার খিলিজির প্রাণ বাঁচিয়ে আসার কারণ, তিনি নিজ হাতে বখতিয়ারকে বধ করতে চান। হেমচন্দ্র তাঁর গুরু মাধবাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ঐতিহাসিক স্থান প্রয়াগের ঘাটের আশ্রমে আসেন। কিন্তু হেমচন্দ্র দিল্লি থেকে ফিরে আসতে বিলম্ব করে ফেলেন। এই বিলম্বের কারণ তিনি মথুরায় তাঁর বিবাহিতা স্ত্রী মৃণালিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু দেখা হয়নি। এই বিবাহের কথা তখনও পর্যন্ত কেউ জানেন না, গোপন আছে। মাধবাচার্য মনে করেন যে, মথুরা থেকে মৃণালিনীকে না সরিয়ে দিলে হেমচন্দ্র যুদ্ধে মনোযোগী হতে পারবেন না। বিশেষ বারো বছর দেবারাধনা ত্যাগ করে তিনি এই শিষ্যকে সকল বিদ্যা শিখিয়েছেন। হেমচন্দ্র কর্তৃক বখতিয়ার খিলিজিকে হাতের নাগালে পেয়ে ছেড়ে দিয়ে আসা এবং মথুরায় মৃণালিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ায় মাধবাচার্য তিরস্কার করেন। পূর্বেই মাধবাচার্য, মৃণালিনীকে লক্ষ্মণাবতীনিবাসী ব্রাহ্মণ শিষ্য হৃষিকেশের নিকট কৌশলে পাঠিয়ে দিয়েছেন। মাধবাচার্য হেমচন্দ্রকে বলেন, ‘যবননিপাত তোমার একমাত্র ধ্যানস্বরূপ হওয়া উচিত।’৩১ অতঃপর হেমচন্দ্র দিল্লিতে যবনের মন্ত্রণা সম্পর্কে জানান যে, ‘যবনেরা বঙ্গবিজয়ের উদ্যোগ করিতেছে। অতি ত্বরায় বখতিয়ার খিলিজি সেনা লইয়া, গৌড়ে যাত্রা করিবে।’৩২

ঘটনার এক পর্যায়ে মাধবাচার্য লক্ষ্মণ সেনকে বলেছিলেন, ‘মহারাজ, তুরকীয়েরা আর্যাবর্ত প্রায় সমুদয় হস্তগত করিয়াছে। আপাততঃ তাহার মগধ জয় করিয়া গৌড়রাজ্য আক্রমণের উদ্যোগ আছে।’৩৩ তিনি রাজশত্রু দমনের কি ব্যবস্থা করেছেন তা জানতে চাইলে বৃদ্ধ রাজা বিচলিত হয়ে বলেন, ‘তুরকীদিগের কথা বলিতেছেন? তুরকীয়েরা কি আসিয়াছে?’৩৪ বৃদ্ধ রাজা বলেন, ‘আমি কি করিব— আমি কি করিব? আমার এই প্রাচীন শরীর, আমার যুদ্ধের উদ্যোগ সম্ভব না। আমার এক্ষণে গঙ্গালাভ হইলেই হয়। তুরকিয়েরা আসে আসুক।’৩৫ এ কথা শুনে সভার সকলেই নীরব থাকেন। কেবল মহাসমন্তের কোষের অসি অকারণ অল্প শব্দ করে ওঠে। কিন্তু অধিকাংশ শ্রোতাবর্গের মুখে কোনো ভাব ব্যক্ত না হওয়ায় মাধবাচার্যের চোখ হতে একবিন্দু অশ্রুপাত ঘটে। এ সময় সভাপ-িত দামোদর বিষ্ণুপুরাণের দোহাই দিয়ে জানান যে, ‘যেরূপ রাজাজ্ঞা হইল, ইহা শাস্ত্রসম্মত। শাস্ত্রে ঋষিবাক্য প্রযুক্ত আছে যে, তুরকীয়েরা এ দেশ অধিকার করিবে। শাস্ত্রে আছে অবশ্য ঘটিবে— কাহার সাধ্য নিবারণ করে? তবে যুদ্ধোদ্যমে প্রয়োজন কি?’৩৬ কিন্তু মাধবাচার্য দৃঢ়ভাবে মুক্তকণ্ঠে জানান যে, বিষ্ণুপুরাণ বা মনুতে বা ‘তুরকজাতীয় কর্তৃক গৌড়বিজয়বিষয়িণী কথা কোন শাস্ত্রে কোথাও নাই।’৩৭ মাধবাচার্য একজন পারিষদকে বলেন যে, জগতে ‘মূর্খ তিনজন। যে আত্মরক্ষায় যতœহীন, সে সেই যতœহীনতার প্রতিপোষক, আর যে আত্মবুদ্ধির অতীত বিষয়ে বাক্যব্যয় করে, ইহারাই মূর্খ।’৩৮ এ সময় পশুপতি বলে ওঠেন, ‘যবন আইসে, আমরা যুদ্ধ করিব।’ পশুপতি সকলকে নিশ্চিত করেন যে, অশ্ব, পদাতি এবং নাবিকসেনা সংগ্রহের কাজ চলছে এবং কিছুদিন এই নগরী পর্যটন করলে তা জানা যাবে। মাধবাচার্য জানান যে, তিনিও এসবের কিছু কিছু শুনেছেন। তবে তিনি নবদ্বীপে আগত বীরপুরুষ মগধের যুবরাজ হেমচন্দ্রের বীর্যের পরিচয় দেন। পশুপতি জানতে চান যে, এ ধরনের বীরপুরুষের বাহুরক্ষিত মগধরাজ্য শত্রুর হস্তগত কিভাবে হলো। মাধবাচার্য তখন জানালেন যে, ‘যবন বিপ্লবের কালে যুবরাজ প্রবাসে ছিলেন। এই মাত্র কারণ।’ তিনি গৌড়রাজকে হেমচন্দ্রের সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করে দস্যুর দ-বিধানপূর্বক উভয়েরই শত্রুবিনাশ মঙ্গলজনক হবে বলে জানান। পশুপতি হেমচন্দ্রের জন্য উপনগর প্রান্তে গঙ্গাতীরবর্তী এক অট্টালিকায় যথাযোগ্য বাসগৃহের ব্যবস্থা করেন। একসময় এতদঞ্চলের শিক্ষার একমাত্র মূল কেন্দ্র ছিলো নবদ্বীপ। দেশ-প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে সাধারণ মানুষ এবং প-িতগণ এখানে শিক্ষা গ্রহণের জন্য উপস্থিত হতেন।৩৯ নবদ্বীপে এই সুরম্য অট্টালিকায় জনার্দন নামে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁর স্ত্রী ও মনোরমা নামের পূর্ণযৌবনা তরুণী পৌত্রীকে নিয়ে বাস করেন। হেমচন্দ্র তাঁদেরকে অন্য কোথাও যেতে না দিয়ে সেখানেই তাঁর সঙ্গে বসবাস করতে বলেন।

‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের উক্ত কাহিনি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে, বঙ্কিমচন্দ্র কয়েকটি ঐতিহাসিক বর্ণনার সঙ্গে তাঁর কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাসে রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় এই শত্রুদমন বিষয়ক আলোচনা ইতিহাসসম্মত। সেকালের রাজা এবং রাজপ-িত যে জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর বিশ্বাস রেখে সমস্ত কার্যসম্পাদন করতেন, তাও ইতিহাস থেকে নেওয়া। এই জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস রাখার বিষয়টি পরবর্তীতে মোগল সম্রাটদের মধ্যে প্রচলিত থাকতে দেখা যায়। রাজা লক্ষ্মণসেন যে শত্রু আগমনের কথা শুনে সেনা প্রস্তুত করছিলেন— সেটাই সম্ভব। জ্যোতিষশাস্ত্রে অগাধ বিশ্বাস এবং তুর্কি আক্রমণের ভয়ে ভীত পরিষদগণ যে পালিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করছিলেন, তা ঐতিহাসিক মিনহাজের বর্ণনায় আছে।৪০ কিন্তু জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর বিশ্বাস রেখে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে এরকম পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা এক প্রকার কাপুরুষতা। কিন্তু শত্রু আগমনের খবর পেয়েও সকলেই পালাতে চাইলেও রাজা লক্ষ্মণসেন যে রাজধানী ত্যাগ করতে স্বীকৃত হলেন না, এই কথা মিনহাজের ইতিহাসে আছে। সেখানে আরো আছে যে, বিহার ধ্বংস ও মগধ অধিকারের পর গোপন সংবাদে এই তুর্কি বিজয়ীর চেহারা কিরূপ, তাও শাস্ত্রে আছে। গুপ্তচর পাঠিয়ে বখতিয়ারের আকৃতির বিবরণ এনে দেখা গেল যে, শাস্ত্রের বর্ণনার সাথে তাঁর সম্পূর্ণ মিল আছে। এক্ষেত্রে লক্ষ্মণসেন যে প্রথমে না পালিয়েও রাজপ্রাসাদেই অবস্থান নিয়েছিলেন, তাতে তিনি একজন আদর্শ রাজপুরুষের পরিচয় দিয়েছেন। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় মনে করেন, জনসাধারণের মধ্যে শত্রু দমনের মনোবৃত্তি যে ছিলো না এবং তা প্রতিরোধের চেষ্টাও কেউ করেনি, এ তথ্য  একেবারে অস্বীকার করার উপায় নেই। জ্যোতিষী ব্রাহ্মণ ও মন্ত্রীবর্গ যে লক্ষ্মণসেনকে যুদ্ধ না করে দেশ ত্যাগ করে চলে যেতে বলেছিলেন, তাতে ধারণা করা যায় রাষ্ট্রেরও প্রতিরোধ ইচ্ছা বিশেষ ছিলো না। ভাগ্যনির্ভর পরাজয়ী মনোবৃত্তি রাষ্ট্রকে গ্রাস করেছিলো।৪১

গঙ্গাতীরবর্তী নগরের উপকণ্ঠের অট্টালিকায় অবস্থানকালে একদিন গভীর রাতে হেমচন্দ্র জানালার নিকট একটা মনুষ্যমু- মাত্র দেখতে পান। সেখানে —

বাতায়ন, ভূমি হইতে কিছু উচ্চ— এজন্য হস্তপদাদি কিছু দেখিতে পাইলেন না— কেবল একখানি মুখ দেখিলেন। মুখখানি অতি বিশালশ্মশ্রুসংযুক্ত, তাহার মস্তকে উষ্ণীষ। সেই উজ্জ্বল চন্দ্রালোকে, বাতায়নের নিকটে, সম্মুখে, শ্মশ্রুসংযুক্ত উষ্ণীষধারী মনুষ্যমু- দেখিয়া, হেমচন্দ্র শয্যা হইতে লম্ফ দিয়া নিজ শানিত অসি গ্রহণ করিলেন।৪২

হেমচন্দ্র বাইরে গিয়ে কাউকে কোথাও আর দেখতে পেলেন না। তিনি পিতৃদত্ত যোদ্ধৃবেশে নিজেকে আপাদমস্তক ম-িত করেন। তিনি বুঝতে পারলেন বঙ্গে তুর্কি এসেছে। ‘ব্যাঘ্র যেমন আহার্য দেখিবামাত্র বেগে ধাবিত হয়, হেমচন্দ্র তুরক দেখিবামাত্র সেইরূপ ধাবিত হইলেন।’৪৩ তিনি দ্রুত রাজপথে যাত্রা করেন। ‘বিশেষ যবনবধে হেমচন্দ্রের আন্তরিক আনন্দ। উষ্ণীষধারী মু- দেখিয়া অবধি তাঁহার জিঘাংসা ভয়ানক প্রবল হইয়াছে।’৪৪ হেমচন্দ্র পথে বাপীতীরে সোপানে মনোরমার নিকট জানতে পারলেন মনোরমা তুরকবেশী একজনকে দেখেছেন। হেমচন্দ্র মনোরমাকে জানালেন যে, তিনি ঐ তুর্কিকে বধ করবেন। বঙ্কিমচন্দ্র হেমচন্দ্রের মুখ থেকে জানালেন যে, তুর্কি হেমচন্দ্রের পরম শত্রু এবং যেখানে যতো তুর্কি দেখবেন ততই মারবেন। মনোরমা হেমচন্দ্রকে সাথে নিয়ে পশুপতির গৃহ দেখিয়ে বললেন যে সেখানে তুর্কি ঢুকেছে। এই ব্যক্তির নাম মহম্মদ আলি, তিনি ‘তুরকসেনাপতির বিশ্বাসপাত্র’।

৩.৩ গৌড়েশ্বর লক্ষ্মণসেনের পরাজয় প্রসঙ্গ

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কখনোই বিশ্বাস করতে পারেন না যে, লক্ষ্মণসেনের পরাজয় খুব সহজভাবেই হয়েছিলো। এজন্য উপন্যাসে তিনি ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পশুপতি চরিত্রটিকে সৃষ্টি করেন।৪৫ (সম্ভবত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের ‘পশুপতি’ চরিত্রটির নাম বা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মির্জা নাথানের ‘বাহারীস্তান-ই-গায়বী’ থেকে নিয়ে থাকবেন।) বঙ্কিমচন্দ্র বিশ্বাস করেন যে, ষড়যন্ত্রও এই পরাজয়ের একটি প্রধান কারণ। বঙ্কিমচন্দ্র পশুপতির উত্থান সম্পর্কে বলেন

গৌড়দেশের ধর্মাধিকার পশুপতি অসাধারণ ব্যক্তি; তিনি দ্বিতীয় গৌড়েশ্বর। রাজা বৃদ্ধ, বার্ধক্যের ধর্মানুসারে পরমতাবলম্বী এবং রাজকার্যে অযতœবান হইয়াছিলেন, সুতরাং প্রধানামাত্য ধর্মাধিকারের হস্তেই গৌড়রাজ্যের প্রকৃত ভার অর্পিত হইয়াছিল। এবং সম্পদে অথবা ঐশ্বর্যে পশুপতি গৌড়েশ্বরের সমকক্ষ ব্যক্তি হইয়া উঠিয়াছিলেন।৪৬

লক্ষণীয় যে, বঙ্কিমচন্দ্র বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণসেনকেই একচেটিয়া পরাজয়ের গ্লানি দিতে রাজি নন। তাঁর ধারণা এবং হতেও পারে, যা ইতিহাসে নেই, অথচ সম্ভাবনা ছিলো, বৃদ্ধরাজা এককভাবে রাজকার্য পরিচালনা করতে না পেরে কোনো একজন প্রধানামাত্যকে গৌড়ের শাসনভার অর্পণ করেছিলেন। ফলে সুযোগ বুঝে পশুপতিও আত্মসিদ্ধির লক্ষ্যে গৌড়েশ্বরের সমকক্ষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু বৃদ্ধ রাজার তিনটি পুত্র আছেন। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁদেরকে নিলেন না কেন? হতে পারে, তাহলে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস এবং এর নাটকীয়তা হয়ে ওঠে না। আর সেজন্য বঙ্কিমচন্দ্র পঁয়ত্রিশ বছরের পশুপতি সম্পর্কে এও প্রকাশ করেছেন

পশুপতি জাতিতে ব্রাহ্মণ, কিন্তু তাঁহার জন্মভূমি কোথা, তাহা কেহ বিশেষ জ্ঞাত ছিল না। কথিত ছিল যে, তাঁহার পিতা শাস্ত্রব্যবসায়ী দরিদ্র ব্রাহ্মণ ছিলেন।৪৭

পশুপতি গৌড়দেশে অত্যন্ত বড় প-িত এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি বলে লোকে মনে করতো। সেনাপতি বখতিয়ার খিলিজির বিশ্বাসপাত্র মহম্মদ আলি পশুপতির নিকট আসলে পশুপতি বিশ্বাসজনক অভিজ্ঞান দেখতে চান। মহম্মদ আলি অভিজ্ঞান দেখালে পশুপতি যা সংস্কৃতে বলেন, তার বাংলা এরূপ

বুঝিলাম আপনি তুরক সেনাপতির বিশ্বাসপাত্র। সুতরাং আমারও বিশ্বাসপাত্র। আপনারই নাম মহম্মদ আলি? এক্ষণি সেনাপতির অভিপ্রায় প্রকাশ করুন।৪৮

আগত মুসলমান দূত সংস্কৃতে যে উত্তর দিলেন, তার তিন ভাগ ফারসি এবং অবশিষ্ট অংশ যেরূপ সংস্কৃত, তা “ভারতবর্ষে কখন ব্যবহৃত হয় নাই। তাহা মহম্মদ আলিরই সৃষ্ট সংস্কৃত। পশুপতি বহুকষ্টে তাহার অর্থবোধ করিলেন।”৪৯ মহম্মদ আলি যা জানালেন তাহলো, খিলিজি সাহেবের অভিপ্রায়, বিনা যুদ্ধেই গৌড় বিজয় করবেন। বখতিয়ার খিলিজি বিহার থেকে এসে এই আক্রমণ করবেন বলে জানা যায়।৫০ বিনিময়ে পশুপতি কী চান তা জানতে চাইলে পশুপতি জানালেন , “আমি এ রাজ্য তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিব কিনা, তাহা অনিশ্চিত। স্বদেশবৈরিতা মহাপাপ। আমি এ কর্ম কেন করিব?”৫১ দেখা যাচ্ছে যে, পশুপতি একটা পাপিষ্ঠ এবং সেয়ানাবাজ ষড়যন্ত্রকারী। পশুপতির সঙ্গে মহম্মদ আলির কথোপকথনে জানা যায় যে, খিলিজি সাহেব যুদ্ধেই আনন্দ পান। এও জানা গেলো যে, পশুপতি খিলিজির নিকট দূত প্রেরণ করেছিলেন। দরকষাকষির এক পর্যায়ে মহম্মদ আলি চলে যেতে চাইলে পাপাত্মা পশুপতি বলেন

ক্ষণেক অপেক্ষা করুন, আর কিছু শুনিয়া যান। আমি যবনহস্তে এ রাজ্য সর্ম্পণ করিতে অসম্মত নহি; অক্ষমও নহি। আমিই গৌড়ের রাজা, সেনরাজা নামমাত্র। কিন্তু সমুচিত মূল্য না পাইলে আপন রাজ্য কেন আপনাদিগকে দিব?৫২

পশুপতি এক পর্যায়ে তাঁর নিজ স্বার্থ পাকা করতে কৌশলে মহম্মদ আলিকে জানালেন

আমরা যুদ্ধ করিতে একেবারে অনিচ্ছুক বিবেচনা করিবেন না। বিশেষ মগধে বিদ্রোহের উদ্যোগ হইতেছে, তাহাও অবগত আছি। তাহার নিবারণ জন্য এক্ষণে খিলিজি ব্যস্ত, গৌড়জয় চেষ্টা আপাততঃ কিছু দিন তাঁহাকে ত্যাগ করিতে হইবে, তাহাও অবগত আছি। আমার প্রার্থিত পুরস্কার না দেন না দিবেন; কিন্তু যুদ্ধ করাই যদি স্থির হয়, তবে আমাদিগের এই উত্তম সময়। যখন বিহারে বিদ্রোহসেনা সজ্জিত হইবে, গৌড়েশ্বরের সেনাও সাজিবে।৫৩

উপরোক্ত বিষয়ের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পেয়েছে। মগধ রাজ্য পূর্বেই খিলিজি কর্তৃক লুণ্ঠিত হয়েছিলো। সেখানে এই তুর্কি সেনাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিলো। হতে পারে, লক্ষ্মণসেন নিজেও এরকম প্রস্তুতির কথা ভেবেছিলেন। মহম্মদ আলি পশুপতির কী পুরস্কার অভিপ্রায় তা জানতে চাইলে পশুপতি বলেন

আমিই এক্ষণে প্রকৃত গৌড়ের ঈশ্বর, কিন্তু লোকে আমাকে গৌড়েশ্বর বলে না। আমি স্বনামে রাজা হইতে বাসনা করি। সেনবংশ লোপ হইয়া পশুপতি গৌড়াধিপতি হউক।৫৪

পশুপতির এই দৃঢ় বাসনার বিপরীতে মুসলমান বিনিময়ে কী পাবেন তা মহম্মদ আলি জানতে চান। তখন পশুপতি বলেন “মুসলমানের অধীনে করপ্রদ মাত্র রাজা হইব।” কিন্তু এই বাসনা পূরণ করতে হলে মুসলমানের সাহায্য প্রয়োজন। কারণ

প্রথমতঃ সেনরাজ আমার (পশুপতির) প্রভু; বয়সে বৃদ্ধ, আমাকে স্নেহ করেন। স্ববলে যদি আমি তাঁহাকে রাজ্যচ্যুত করি―তবে অত্যন্ত লোকনিন্দা। আপনারা কিছুমাত্র যুদ্ধোদ্যম দেখাইয়া, আমার আনুকূল্যে বিনা যুদ্ধে রাজধানী প্রবেশপূর্বক তাঁহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া আমাকে তদুপরি স্থাপিত করিলে সে নিন্দা হইবে না। দ্বিতীয়তঃ রাজ্য অনধিকারীর অধিকারগত হইলেই বিদ্রোহের সম্ভাবনা, আপনাদিগের সাহায্যে সে বিদ্রোহ সহজেই নিবারণ করিতে পারিব। তৃতীয়তঃ আমি স্বয়ং রাজা হইলে এক্ষণে সেনরাজার সহিত আপনাদিগের যে সম্বন্ধ, আমার সঙ্গেও সেই সম্বন্ধ থাকিবে। আমাদিগের সহিত যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকিবে। যুদ্ধে আমি প্রস্তুত আছি―কিন্তু জয় পরাজয় উভয়েরই সম্ভাবনা। জয় হইলে আমার নূতন কিছু লাভ হইবে না। কিন্তু পরাজয়ে সর্বস্বহানি। কিন্তু আপনাদিগের সহিত সন্ধি করিয়া রাজ্য গ্রহণ করিলে সে আশঙ্কা থাকিবে না। বিশেষতঃ সর্বদা যুদ্ধোদ্যত থাকিতে হইলে নূতন রাজ্য সুশাসিত হয় না।৫৫

পশুপতির এরূপ রাজনীতিজ্ঞের ন্যায় কথা শুনে মহম্মদ আলির সম্পূর্ণ প্রত্যয় জন্মে। মহম্মদ আলি বলেন

আমিও এইরূপ স্পষ্ট করিয়া খিলিজি সাহেবের অভিপ্রায় ব্যক্ত করি। তিনি এক্ষণে অনেক চিন্তায় ব্যস্ত আছেন যথার্থ, কিন্তু হিন্দুস্থানে যবনরাজ একেশ্বর হইবেন, অন্য রাজার নামমাত্র আমরা রাখিব না। কিন্তু আপনাকে গৌড়ে শাসনকর্তা করিব। যেমন দিল্লীতে মহম্মদ ঘোরির প্রতিনিধি কুতুবউদ্দীন, যেমন পূর্বদেশে কুতুবউদ্দীনের প্রতিনিধি বখতিয়ার খিলিজি তেমনই গৌড়ে আপনি বখতিয়ারের প্রতিনিধি হইবেন। আপনি ইহাতে স্বীকৃত আছেন কি না?৫৬

পশুপতি এই প্রস্তাবে স্বীকৃত হলেন। ষড়যন্ত্রকারী সেনাপতি পশুপতি গৌড়রাজ্য দখলের কৌশল জানিয়ে দিলেন

আমার অনুমতি ব্যতীত একটি পদাতিকও যুদ্ধ করিবে না। রাজকোষ আমার অনুচরের হস্তে। আমার আদেশ ব্যতীত যুদ্ধের উদ্যোগে একটি কড়াও খরচ হইবে না। পাঁচজন অনুচর লইয়া খিলিজিকে রাজপুরে প্রবেশ করিতে বলিও; কেহ জিজ্ঞাসা করিবে না, “কে তোমরা?”৫৭

কিন্তু মহম্মদ আলি একটি দাবি করলেন। তাহলো, “এই দেশে যবনের পরম শত্রু হেমচন্দ্র বাস করিতেছে। আজ রাত্রেই তাহার মু- যবন-শিবিরে প্রেরণ করিতে হইবে।”৫৮ আর এ কাজটি মুসলমান সেনারা করতে পারবেন না। কারণ যবনসমাগম শুনতে পেলে উক্ত ব্যক্তি নগর ত্যাগ করে পালিয়ে যাবেন। কাজেই পশুপতি এই হত্যার দায়িত্ব নিলেন। আবার মহম্মদ আলি জানিয়ে দেন যে, পশুপতির কথায় নির্ভর করে অল্প কিছু সেনা নিয়ে দূত পরিচয়ে মুসলমানেরা পুরমধ্যে প্রবেশ করবেন। এখানেই বঙ্কিমচন্দ্র কল্পনার দ্বারা ভাঙা ইতিহাসের জোড়া লাগিয়ে দিলেন। যেমন : মহম্মদ আলি চলে যাওয়ার পর পশুপতির গুপ্তদ্বার দিয়ে শান্তশীল নামক একজন চৌরান্ধরণিক প্রবেশ করেন। পশুপতিকে তিনি জানালেন যে, চিত্রগৃহে তিনি একজনকে বন্দী করে রেখে এসেছেন। পশুপতি শান্তশীলকে যবন সেনাপতির ইচ্ছাক্রমে মগধরাজপুত্র হেমচন্দ্রের ছিন্নমস্তক আনতে আদেশ দেন। বলা বাহুল্য, শান্তশীল পূর্বেই যাঁকে বন্দী করে রেখেছেন তিনিই হেমচন্দ্র।

বঙ্কিমচন্দ্র একটি বিষয় ইতিহাসের সঙ্গে সংযোজন করতে চেয়েছেন এভাবে যে, আক্রমণের খবর শুনে অন্যান্য ক্ষুদ্র রাজারা লক্ষ্মণসেনকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন এবং নৃপতি লক্ষ্মণসেন একেবারেই চুপচাপ হাত-পা গুটিয়ে বসে ছিলেন না। তিনিও মুসলমানের আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। হেমচন্দ্র তাঁর গুরু মাধবাচার্যকে জানালেন যে, সেন রাজাকে সাহায্যকারী দল আজই সেখানে না পৌঁছালে সব বিফল হবে। মহাবনে অবস্থানরত মুসলমান সেনারা আজকালের মধ্যে আক্রমণ করবে। এ কথা শুনে মাধবাচার্য শিহরিত হয়ে জানতে চান, “গৌড়েশ্বরের পক্ষ হইতে কি উদ্যম হইয়াছে?” কিন্তু হেমচন্দ্র জানালেন যে, গৌড়েশ্বরের পক্ষ হতে মুসলমানের আক্রমণের যথোচিত ব্যবস্থা কিছুই নেওয়া হয়নি। হয়তোবা এ খবর রাজসন্নিধানে প্রচারও হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্র এখানেই আবার ইতিহাসের অনুসারী হয়েছেন। যদিও বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর “বাঙ্গালীর বাহুবল” প্রবন্ধে লক্ষ্মণসেন সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন।৫৯

সেনাপতি পশুপতির ডান হাত হলেন শান্তশীল। পশুপতি রাতে প্রদত্ত সংবাদ ও অদক্ষতার জন্য শান্তশীলকে ভর্ৎসনা করেন। কিন্তু শান্তশীল তাঁর কুচক্রের অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পর্কে পশুপতিকে যা যা জানান

১.            পশুপতি ও তাঁর কুচক্রীমহলের আদেশ না হওয়া পর্যন্ত লক্ষ্মণসেনের সৈনিকেরা প্রস্তুতি নিবে না;

২.           প্রান্তপাল ও কোষ্ঠপালকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে, “অচিরাৎ যবন সম্রাটের নিকট হইতে কর লইয়া কয়জন যবন দূতস্বরূপ আসিতেছে, তাহাদিগের গতিরোধ না করে।”৬০

৩.           দামোদর শর্মা পশুপতির উপদেশ অনুযায়ী খুব বড় চতুরের মতো কাজ করছেন। তিনি “একখানি পুরাতন গ্রন্থের একখানি পত্র পরিবর্তন করিয়া তাহাতে আপনার রচিত কবিতাগুলি বসাইয়াছিলেন। তাহা লইয়া অদ্য প্রাহ্ণে রাজাকে শ্রবণ করাইয়াছেন এবং মাধবাচার্যের অনেক নিন্দা করিয়াছেন।”৬১

৪.           কবিতায় ভবিষ্যৎ গৌড় বিজেতার রূপবর্ণনা সবিস্তারে লিখিত আছে। সে বিষয়ে মহারাজ অনুসন্ধান করিয়েছিলেন। জানা গেলো মদনসেন সম্প্রতি কাশীধাম হতে প্রত্যাগমন করেছেন। এ খবর মহারাজ জানতেন এবং মদনসেনকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলে, মদনসেন বখতিয়ার খিলিজির যথার্থ যে রূপ দেখেছেন, তাই বর্ণনা করলেন। কবিতাতেও সেরূপ বর্ণিত আছে। সুতরাং গৌড়জয় ও তাঁর রাজ্যনাশ নিশ্চিত বলে মহারাজ জানলেন।

৫.           এরপর রাজা রোদন করতে থাকেন এবং বলেন, “আমি এ বৃদ্ধ বয়সে কি করিব? সপরিবারে যবনহস্তে প্রাণে নষ্ট হইব দেখিতেছি।” তখন চতুর দামোদর শর্মা পূর্বশিক্ষা মতো বলেন, “মহারাজ! ইহার সদুপায় এই যে, অবসর থাকিতে থাকিতে আপনি সপরিবারে তীর্থযাত্রা করুন। ধর্মাধিকারের (পশুপতি) প্রতি রাজকার্যের ভার দিয়া যাউন। তাহা হইলে আপনার শরীর রক্ষা হইবে। পরে শাস্ত্র মিথ্যা হয়, রাজ্য পুনঃপ্রাপ্ত হইবেন।”৬২

৬.           রাজা এ পরামর্শে সন্তুষ্ট হয়ে নৌকা-সজ্জা করতে আদেশ করেন। শীঘ্রই তিনি সপরিবারে তীর্থযাত্রা করবেন বলে জানান।

৭.           পশুপতি দামোদর এবং শান্তশীলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। পশুপতি তাঁর মনস্কামনা সিদ্ধির সম্ভাবনা দেখতে পান। ষড়যন্ত্রের সাহায্যকারীদের উপযুক্ত পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, “কাল প্রাতেই যেন তীর্থযাত্রার জন্য নৌকা প্রস্তুত থাকে” বলে আদেশ দিলেন।

উপরোক্ত প্রসঙ্গগুলোর প্রতি গভীর দৃষ্টি দিলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, রাজা লক্ষ্মণসেনের পতনের পিছনে কী কী অনুষঙ্গ কাজ করেছে। বঙ্কিমের ধারণা, সম্ভবত এই কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারী মহল রাজা লক্ষ্মণসেনের সময় থেকে থাকবে। কিন্তু ইতিহাসে এর মধ্যে জ্যোতিষ বিশ্বাস ব্যতীত আর কোনোটাই বলে না। হতে পারে, মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাস যখন বঙ্কিমচন্দ্র পড়েছিলেন, তখন তিনি বেশ কিছু ঐতিহাসিক অসঙ্গতি দেখে থাকবেন। পরবর্তীতে উপন্যাস রচনাকালে এসব অনুষঙ্গকে তিনি তাঁর ধারণা দ্বারা পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছিলেন। যদিও পরে তিনি ১৮৮২ সালে “ভারতবর্ষ পরাধীন কেন” প্রবন্ধে আরো যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্য দ্বারা বঙ্গজয়ের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক কাঠামো দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।৬৩ বর্তমানে আধুনিক যৌক্তিক বিশ্লেষণে তাঁর উপর আস্থা রাখা চলে। পূর্বেই এ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে দেখা যায়, পশুপতির সঙ্গে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সপ্তদশ অশ্বারোহী মুসলমান সেনা নবদ্বীপে রাজপুরী আক্রমণ করতে আসেন “যবনরাজার দূত” হিসেবে। উপন্যাসে দেখা যায়—

বেলা প্রহরেকে সময় নগরবাসীরা বিস্মিতলোচনে দেখিল, কোন অপরিচিতজাতীয় সপ্তদশ অশ্বারোহী পুরুষ রাজপথ অতিবাহিত করিয়া রাজভবনামুখে যাইতেছে। তাহাদের আকারেঙ্গিত দেখিয়া নবদ্বীপবাসীরা ধন্যবাদ করিতে লাগিল। …পর্বতশিলাখ-ের ন্যায় বৃহদাকার, বিমার্জিতদেহ, বক্রগ্রীব, বল্গারোধ-অসহিষ্ণু, তেজোগর্বে নৃত্যশীল! আরোহীরা কিবা তচ্চালনকৌশলী―অবলীলাক্রমে সেই রুদ্ধবায়ুতুল্য তেজঃপ্রখর অশ্ব সকল দমিত করিতেছে দেখিয়া গৌড়বাসীরা বহুতর প্রশংসা করিল।৬৪

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলমান সেনাদের দৈহিক গঠন, সৌন্দর্য, বেশভূষার পারিপাট্য, চলনভঙ্গি, তেজ প্রভৃতির প্রশংসা করেছেন। সমালোচক সারোয়ার জাহান বলেন, এ থেকে স্পষ্টই অনুমতি হয়, বঙ্কিমচন্দ্র সৌন্দর্য এবং বীর্যের পূজারী— তা স্বজাতি বা বিজাতি যার-ই হোক।৬৫ দেখা যায়, এই সপ্তদশ অশ্বারোহী মুসলমান সেনা রাজদ্বারে বিনা বাধায় পৌঁছে যান। “বৃদ্ধ রাজার শৈথিল্যে আর পশুপতির কৌশলে রাজপুরী প্রায় রক্ষকহীন।” দৌবারিক তাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা জানান যে, “আমরা যবন-রাজপ্রতিনিধির দূত; গৌড়রাজের সহিত সাক্ষাৎ করিব।” কিন্তু মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাসে মুসলমান সেনার সংখ্যা আঠারো জন উল্লেখ করা হয়। পূর্বেই তাঁরা নদীয়াতে পৌঁছে ঘোড়া ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং এভাবেই রাজপুরীতে পৌঁছেন। মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাসে আছে, বখতিয়ারের আক্রমণের এক বছর আগেই শাস্ত্রবিদ এবং বিশ্লেষকগণ রাজা লক্ষ্মণসেনকে অতি শীঘ্রই তুর্কিদের আক্রমণ ঘটবে বলে জানিয়েছিলেন। জ্যোতিষীদের কথা মতোই যথারীতি বখতিয়ার খিলিজি বিহার থেকে নদীয়া আক্রমণে আসেন। মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাসে পাওয়া যায় —

Appeared before the city of Nudia, in such wise that no more than eighteen horsemen could keep up with him, and the other troops followed after him. On reaching the gate of the city, Muhammad-i-Bakht-Yar did not molest any one, and proceeded onwards steadily and sedately, in such manner that the people of the place imagined that may have his party were merchants and had brought horses for sale, and did not imagine that it was Muhammad-i-Bakht-Yar, until he reached the entrance to the place of Rae Lakhmaniah, when he drew his sword, and commenced an onslaught on the unbelievers.66

সপ্তদশ সৈন্যদেরকে রাজঅন্তঃপুরের দৌবারিক জানিয়ে দেয় যে, মহারাজাধিরাজ গৌড়েশ্বর এখন অন্তঃপুরে গমন করেছেন বিধায় এখন সাক্ষাৎ সম্ভব নয়। কিন্তু মুসলমান সেনারা নিষেধ না শুনে মুক্ত দ্বারপথে প্রবেশ করতে উদ্যত হলেন। উপন্যাসের বর্ণনা অনুযায়ী সবার সামনে আছেন খর্বাকায়, দীর্ঘবাহু, কুরূপ বখতিয়ার খিলিজি। দুর্ভাগ্যবশত দৌবারিক তাঁর গতিরোধ করতে শূল হাতে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “ফের— নচেৎ এখনই মারিব।” “আপনিই তবে মর।” এ কথা বলেই উক্ত ব্যক্তি দৌবারিককে নিজের তরবারির আঘাতে ছিন্ন করলে তার মৃত্যু ঘটে। এরপর খিলিজি নিজ সঙ্গীদের আদেশ করেন, “এক্ষণে আপন-আপন কার্য কর।” বাকি ষোড়শ অশ্বারোহী তখন ভীষণ জয়ধ্বনি করে রণসজ্জাহীন দৌবারিকদের হত্যা করতে থাকলে কেউই আত্মরক্ষার সুযোগ না পেয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তখন খিলিজি বলেন, “যেখানে যাহাকে পাও, বধ কর। পুরী অরক্ষিতা— বৃদ্ধ রাজাকে বধ কর।”৬৭ আর ঠিক “তখন যবনেরা পুরমধ্যে তাড়িতের ন্যায় প্রবেশ করিয়া বালবৃদ্ধবণিতা পৌরজন যেখানে যাহাকে দেখিল, তাহাকে অসি দ্বারা ছিন্নমস্তক, অথবা শূলাগ্রে বিদ্ধ করিল।”৬৮

পৌরজন তুমুল আর্তনাদ করে এদিক-ওদিক পালাতে থাকে। বৃদ্ধ রাজার কানে আর্তনাদের শব্দ পৌঁছায়। রাজা তখন ভোজন করছিলেন। তাঁর মুখ শুকিয়ে গেলো এবং আর্তনাদের কারণ জানতে পারলেন। পলায়নরত পৌরজনেরা রাজার উদ্দেশ্যে বলতে থাকে, “যবন সকলকে বধ করিয়া আপনাকে বধ করিতে আসিতেছে।” তখন কবলিত অন্নগ্রাস রাজার মুখ হতে পড়ে যায় এবং এ সময় তাঁর শুষ্ক শরীর কাঁপতে থাকে। নিকটেই রাজমহিষী ছিলেন। রাজা ভোজনপাত্রের উপর পড়ে যান দেখে মহিষী তাঁর হাত ধরে বলেন, “চিন্তা নাই— আপনি উঠুন।” উপন্যাসে আছে রাজার হাত ধরে ওঠানোর পর, রাজা কলের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন। মহিষী আরো বলেন, “চিন্তা কি? নৌকায় সকল দ্রব্য গিয়াছে, চলুন, আমরা খিড়কিদ্বার দিয়া সোনার গাঁ যাত্রা করি।”৬৯এরপর মহিষী রাজার অধৌত হাত ধরে খিড়কিদ্বারপথে সুবর্ণগ্রাম যাত্রা করেন। বঙ্কিমচন্দ্র বলেন, “সেই রাজকুলকলঙ্ক, অসমর্থ রাজার সঙ্গে গৌড়রাজ্যের রাজলক্ষ্মীও যাত্রা করিলেন।”৭০ মিনহাজ উদ্দীনের ভাষাতেই যেন বঙ্কিমচন্দ্র কথাগুলো বলেন। প্রসঙ্গত মিনহাজ উদ্দীনের বক্তব্য স্মরণীয় —

At this time Rae Lakhamaniah was seated at the head of his table, and dishes of gold and silver, full of victuals, were placed according to his accustomed routine, when a cry arose from the gateway of the Rae’s place and the interior of the city. By the time he became certain what was the state of affairs, Mahammad-i-Bakht-Yar had dashed forwards through the gateway into the place, and had put several persons to the sword. The Rae fled barefooted by the back part of his palace;71

অতঃপর ষোড়শ সহচর নিয়ে বখতিয়ার খিলিজি গৌড়েশ্বরের রাজপুরী অধিকার করেন। কিন্তু স্বল্পসংখ্যক যবন সেনা কর্তৃক বঙ্গবিজয়ের এই মুখরোচক কাহিনি বঙ্কিমচন্দ্র স্বীকার করেননি। তিনি এই কাহিনিকে হিন্দুজাতির পক্ষে একটি ভিত্তিহীন এবং অন্যায় কলঙ্ক বলে বিবেচনা করেছিলেন।৭২

ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দীন আবার তাঁর ইতিহাসে লক্ষ্মণসেনকে সেই যুগের দাতা হাতেম কুতুবউদ্দীনের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। এমনকি লক্ষ্মণসেনের দানশীলতার সুখ্যাতি ও তাঁর শাসনরীতির প্রশংসা করেছেন। মিনহাজ উদ্দীন অন্য কোনো অমুসলমানদের সম্পর্কে যে উক্তি করেন না, লক্ষ্মণসেনের ক্ষেত্রে সেরূপ উক্তি করেছেন। সুতরাং মিনহাজ উদ্দীনের এই উক্তি সত্য বলে গ্রহণ করলে লক্ষ্মণসেনের চরিত্র ও খ্যাতি সম্বন্ধে উচ্চ ধারণাই পোষণ করতে হয়।৭৩

বখতিয়ার কর্তৃক নদীয়া অধিকারের জন্য যে বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণসেন অপেক্ষা তাঁর মন্ত্রী, সেনাধ্যক্ষ ও প্রজাবর্গই অধিকতর দায়ী, সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। যিনি আকৌমার যুদ্ধক্ষেত্রে শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিয়েছেন; গৌড়, কামরূপ, কলিঙ্গ, বারাণসী ও প্রয়াগে যাঁর বীরত্বের খ্যাতি বিস্তৃত করেছিলেন, তাঁর পূত চরিত্রে মিনহাজ উদ্দীন এরূপ কলঙ্ককালিমা লেপন করেননি। তা সত্ত্বেও মিনহাজ উদ্দীনের ইতিহাসের নদীয়া অভিযান কাহিনি সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করেননি বঙ্কিমচন্দ্র। প্রধান কারণ হয়তো এই যে, মিনহাজ উদ্দীন ৬০ বছর পর বাংলায় এসে বিশ্বাসী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের নিকট হতে সংবাদ গ্রহণ করেছিলেন, তাদের বিদ্যা এবং বুদ্ধি কতদূর ছিলো তা লক্ষ্মণসেনের অদ্ভুত জন্মবৃত্তান্ত ও আশি বছরের রাজত্বকালের ইতিহাস হতে বোঝা যায়। কিন্তু নীহাররঞ্জন রায় অন্যান্য ঐতিহাসিকদের মতের সঙ্গে একমত না হয়ে তিনি মিনহাজ উদ্দীনকেই অনুসরণ করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র ও সামাজিক কারণে লক্ষ্মণসেন দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।৭৪ অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র লক্ষ্মণসেনের এই পরাজয় সহজে মেনে নিতে পারেননি বলেই ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস লেখার পরেও প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে এবং প্রায় অভিন্ন মনোভাবের প্রতিফল ঘটিয়ে কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যেগুলোর নাম : “বাঙ্গালির বাহুবল”, “ভারত-কলঙ্ক”, “বাঙ্গালার ইতিহাস”, “বাঙ্গালার কলঙ্ক”, “বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা” প্রভৃতি প্রবন্ধ।

৩.৪ নিষ্কলঙ্ক বাঙালি জাতি

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাঙালি জাতিকে অল্পসংখ্যক পাঠানের হাতে পরাজিত হওয়ার কলঙ্ককে মুছে ফেলতে ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস রচনার প্রেরণা লাভ করেন, তা সহজেই বোঝা যায়। উপন্যাসের কাহিনিকে বিশ্বাসযোগ্য রাখতে তিনি ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দীনের অনেক মতকে গ্রহণ করেন, আবার সেই সঙ্গে এমন কিছু কাহিনির পুনর্নির্মাণ ঘটান, যা তাঁর কাক্সিক্ষত বাস্তব, কোনো ইতিহাস-গ্রন্থে যা পাওয়া যায় না। একই  কারণে বখতিয়ার খিলিজি নবদ্বীপ জয় করার পর পশুপতিকে ডেকে পাঠানোর ঘটনা ঘটানো হয়। এবারে ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে কল্পিত পশুপতি চরিত্রটির প্রতি একবার দৃষ্টিনিক্ষেপ করা যাক।

উপন্যাসে দেখা যায়, লক্ষ্মণসেনের পতনের পরে পশুপতি ইষ্টদেবীকে স্মরণ করে মনোরমার নিকট হতে বিদায় নিয়ে বখতিয়ার খিলিজির সম্মুখে আসলেন। খিলিজি পশুপতিকে সাদরে গ্রহণ পূর্বক কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। কিন্তু “পশুপতি রাজভৃত্যবর্গের রক্তনদীতে চরণ প্রক্ষালন করিয়া আসিয়াছেন, সহসা কোন উত্তর দিতে পারিলেন না।”৭৫ বখতিয়ার খিলিজি তাঁর মনের ভাব বুঝতে পেরে বলেন

প-িতবর! রাজসিংহাসন আরোহণের পথ কুসুমাবৃত নহে। এই পথে চলিতে গেলে, বন্ধুবর্গের অস্থিমু- সর্বদা পদে বিদ্ধ হয়।৭৬

পশুপতি তাঁর পূর্ব প্রতিশ্রুত সন্ধির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তখন খিলিজি তাঁকে এক আদেশ পালন করতে বলেন —

কুতব্উদ্দীন গৌড়-শাসনভার আপনার প্রতি অর্পণ করিলেন। আজ হইতে আপনি বঙ্গে রাজপ্রতিনিধি হইলেন। কিন্তু যবন-সম্রাটের সঙ্কল্প এই যে, ইসলামধর্মাবলম্বী ব্যতীত কেহ তাঁহার রাজকার্যে সংলিপ্ত হইতে পারিবে না। আপনাকে ইসলামধর্ম অবলম্বন করিতে হইবে।৭৭

কিন্তু একথা শুনে পশুপতির মুখ শুকিয়ে গেলো। তিনি শুধু বলতে পারলেন, “সন্ধির সময়ে এরূপ কোন কথা হয় নাই।” তখন বখতিয়ার জানালেন —

যদি না হইয়া থাকে, তবে সেটা ভ্রান্তিমাত্র। আর এ কথা উত্থাপিত না হইলেও আপনার ন্যায় বুদ্ধিমান ব্যক্তি দ্বারা অনায়াসেই অনুমিত হইয়া থাকিবে। কেন না, এমন কখনও সম্ভাব না যে, মুসলমানেরা বাঙ্গালা জয় করিয়াই আবার হিন্দুকে রাজ্য দিবে।৭৮

পশুপতি খুব দৃঢ়ভাবে সদর্পে জানালেন যে, “আমি স্থিরসঙ্কল্প হইয়াছি যে যবন-সম্রাটের সাম্রাজ্যের জন্যও সনাতনধর্ম ছাড়িয়া নরকগামী হইব না।”৭৯ একথা শুনে বখতিয়ার খিলিজি বলেন —

ইহা আপনার ভ্রম। যাহাকে সনাতনধর্ম বলিতেছেন, সে ভূতের পূজা মাত্র। কোরাণ-উক্ত ধর্মই সত্য ধর্ম। মহম্মদ ভজিয়া ইহকাল পরকালের মঙ্গলসাধন করুন।৮০

পশুপতি বুঝতে পারলেন যে, খিলিজি তাঁর সঙ্গে শঠতা শুরু করেছেন। তিনি আরো বুঝলেন যে, কার্যসিদ্ধি করে খিলিজি তাঁকে নিবদ্ধ সন্ধি ছলক্রমে ভঙ্গ করবেন। আর ছলক্রমে না পারলে, বলক্রমে করবেন। অতএব তিনি কপটের সাথে দর্প করে যে ভালো করেননি, তা বুঝতে পেরে কিছুসময় চিন্তা করে বলেন, “যে আজ্ঞা। আমি আজ্ঞানুবর্তী হইব।” অর্থাৎ পশুপতি তাঁর বিবেকের দংশন পেতে শুরু করলেন। বখতিয়ার যখন জানালেন যে, পুরোহিত উপস্থিত এবং দেরী না করেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা উচিত; তখন পশুপতি একবার মাত্র অবকাশ প্রার্থনা করেন, সপরিবারে দীক্ষিত হবেন। আসলে পশুপতি এভাবে পালিয়ে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা করতে থাকেন। কিন্তু বখতিয়ার জানালেন যে তিনি পশুপতির পরিবারের সদস্যদের আনতে লোক পাঠাচ্ছেন। পশুপতিকে প্রহরীর সঙ্গে বিশ্রামে যেতে বললে পশুপতি বুঝলেন যে, তিনি বন্দী হলেন। পশুপতি রাজপুরীমধ্যে নিরুদ্ধ হলেন। পশুপতি নিজেই নিজের জালে জড়িয়ে পড়লেন। এবং সেইদিন রাতেই মহাবন হতে বিশ হাজার যবন এসে নবদ্বীপ প্লাবিত করে। তখন নবদ্বীপ জয় হলো। বঙ্কিমচন্দ্র আক্ষেপ করে বলেন, “যে সূর্য সেই দিন অস্ত গিয়াছে, আর তাহার উদয় হইল না। আর কি উদয় হইবে না? উদয়-অস্ত উভয়ই ত স্বাভাবিক নিয়ম!”৮১

বঙ্কিমচন্দ্র চতুর পশুপতির থেকেও আরো চতুর বলে আখ্যায়িত করেছেন বখতিয়ার খিলিজিকে। আর তা না হলে এতো সহজেই গৌড় জয় করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হতো না। তিনি চতুর বখতিয়ার খিলিজি কর্তৃক বঙ্গজয়ের বিষয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন্তব্য করে বলেন —

বঙ্গভূমির অদৃষ্টলিপি এই যে, এ ভূমি যুদ্ধে জিত হইবে না; চাতুর্যেই ইহার জয়। চতুর ক্লাইভ সাহেব ইহার দ্বিতীয় পরিচয় স্থান।৮২

একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, বঙ্কিমচন্দ্র ১২০৪ সালে সংঘটিত মুসলমান কর্তৃক বঙ্গজয়ের ইতিহাসকে মৃণালিনী উপন্যাসে গ্রহণ করলেও, তিনি চলে এসেছেন তাঁর সমকালের প্রায় কাছাকাছি ইতিহাসে, ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন তথা লর্ড ক্লাইভের শাসনামলে। মূলত তিনি এরকম নিকটবর্তী ইতিহাসকে নিয়েছেন, উদ্দেশ্য তাঁর সমকালের জাতীয়তাবোধকে উজ্জীবিত করা এবং জাতির মধ্যে নিকটবর্তী ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে পূর্ববর্তী ইতিহাসের সঙ্গে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ স্পষ্ট করা। ফলস্বরূপ বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের সঙ্গে চতুর ক্লাইভের ইতিহাস স্মরণীয়, যার মাধ্যমে বাঙালি জাতি পুরাপুরিভাবেই স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছিলো।

বখতিয়ার খিলিজি তাঁর সাথে আগত বিশ হাজার মুসলমান সৈন্য দ্বারা এরূপ লুণ্ঠন ও হত্যাকা- চালালেন যে, “সেই নিশীথে নবদ্বীপ নগর বিজয়োন্মত্ত যবনসেনার নিষ্পীড়নে বাত্যাসন্তাড়িত তরঙ্গোৎক্ষেপী সাগর সদৃশ চঞ্চল হইয়া উঠিল। রাজপথ, ভূরি ভূরি অশ্বারোহিগণে, ভূরি ভূরি পদাতিদলে, ভূরি ভূরি খড়্গী, ধানুকী, শূলি সমূহ সমারোহে আচ্ছন্ন হইয়া গেল। সেনাবলহীন রাজধানীর নাগরিকের ভীত হইয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল; দ্বার রুদ্ধ করিয়া সভয়ে ইষ্টনাম জপ করিতে লাগিল।”৮৩ সমালোচক সারোয়ার জাহান বলেন, এবার ঔপন্যাসিক বিজয়ী-পাপিষ্ঠ-যবনদের অত্যাচারের দীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে তাদের উপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন।৮৪ (বঙ্কিমচন্দ্র ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে প্রথমবার, মহাবনে পঁচিশ হাজার সৈন্য লুকিয়ে থাকার কথা বলেছেন। ‘মৃণালিনী’, বর, ১, পৃ. ১৬২। আবার বিশ হাজার সৈন্যের কথাও বলেছেন। তদেব, পৃ. ১৯১। এটি মুদ্রণজনিত প্রমাদ কিনা তা যথাযথ ভাবে নিরূপণ করা যায় না।) দেখা যাচ্ছে যে, বখতিয়ার খিলিজি এই অত্যাচারের পূর্বেই জোরপূর্বক পশুপতিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করাতে চেয়েছেন। এরূপ ঘটনা যে সেকালে ঘটতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র মুসলমান বাহিনীর যে দীর্ঘ অত্যাচার কাহিনি, হত্যা, লুটপাটের বর্ণনা দিয়েছেন, তা সেকালের রাজনৈতিক ইতিহাসসম্মত। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে দেখা যায়, যবনেরা নগর লুটপাট করে তৃপ্ত হলে, বখতিয়ার খিলিজি অনর্থক নগরবাসীদের পীড়ন করা নিষেধ করেন। মুসলমান সৈন্যের অত্যাচারের কথা শুনে হেমচন্দ্র দিগি¦জয়কে অশ্বসজ্জা করতে বলেন এবং হেমচন্দ্র একাকী “সেই অসীম যবন-সেনা-সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন।” মুসলমান সেনারা লুটপাটে এতই ব্যস্ত ছিলো যে, হেমচন্দ্রকে দেখেও তারা মারার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করলো না। তিনি দেখলেন যে, মুসলমানরা যুদ্ধ করছে না। আর তাঁর একার পক্ষেও একটি একটি করে মুসলমান শত্রুকে হত্যা করাও সম্ভব নয়। এও ভাবলেন “যবনবধেই বা কি সুখ? বরং গৃহীদের রক্ষার সাহায্যে মন দেওয়া ভাল।”৮৫ কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, যে হেমচন্দ্রের মধ্যে মুসলমান হত্যার দৃঢ় সংকল্প পূর্বে দেখা গিয়েছে, এখন আর তা নেই। বঙ্কিমচন্দ্র কেন এটা করলেন? তার কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। বঙ্কিমচন্দ্র কি তাহলে এটাই বোঝাতে চান যে, লক্ষ্মণসেনের পরাজয়ের পিছনেও এরকম নানাবিধ নিষ্ক্রিয় কারণ বর্তমান ছিলো? উপন্যাসে দেখা যায় যে, মাধবাচার্য হেমচন্দ্রকে আশ্বাস বাক্য শোনালেন, যা বঙ্কিমের স্বউক্তি। বঙ্কিমচন্দ্র এখানে ইতিহাসের সঙ্গে কাল্পনিক বিষয়কে সংযুক্ত করেছেন। আশাবাদী বঙ্কিম বলেন —

যবন পরাভূত হইবে, তখন নিশ্চয়ই জানিও, তাহারা পরাভূত হইবে। যবনেরা দ্বীপ অধিকার করিয়াছে বটে, কিন্তু নবদ্বীপ ত গৌড় নহে। প্রধান রাজা সিংহাসন ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছেন। কিন্তু এই গৌড় রাজ্যে অনেক করপ্রদ রাজা আছেন; তাঁহারা ত এখনও বিজিত হয়েন নাই। কে জানে যে, সকল রাজা একত্র হইয়া প্রাণপণ করিলে, যবন বিজিত না হইবে?৮৬

তবে, যবনেরা ক্ষণকাল স্থির নয়। গৌড়ে এরা সুস্থির হলেই কামরূপ আক্রমণ করবে। কিন্তু মগধ পুনরায় কীভাবে জয় হবে এ বিষয়ে হেমচন্দ্র প্রশ্ন করলে উপন্যাসে আশাবাদী মাধবাচার্য জবাব দেন —

এই যবনেরা এই পর্যন্ত পুনঃপুনঃ জয় লাভ করিয়া অজেয় বলিয়া রাজগণমধ্যে প্রতিপন্ন হইয়াছে। ভয়ে কেহ তাহাদের বিরোধী হইতে চাহে না। তাহারা একবার মাত্র পরাজিত হইলে, তাহাদিগের সে মহিমা আর থাকিবে না। তখন ভারতবর্ষীয় তাবৎ আর্যবংশীয় রাজারা ধৃতাস্ত্র হইয়া উঠিবেন। সকলে এক হইয়া অস্ত্রধারণ করিলে যবনেরা কতদিন তিষ্ঠিবে?৮৭

অন্যদিকে দেখা যায় যে, সেনা বিপ্লব সমাপ্ত হলে কারাগারে মহম্মদ আলি পশুপতিকে সম্ভাষণ করতে আসেন। মহম্মদ আলি পশুপতিকে জানালেন যে, তিনি বিধর্মী যবনকে বিশ্বাস করে প্রতিফল পেয়েছেন। মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে অন্য ভরসা সব ত্যাগ করেছেন। পশুপতি জানালেন যে, তিনি প্রাণত্যাগ করতে প্রস্তুত, তথাপি যবনবেশ পরিধান করবেন না। যাই হোক, এক পর্যায়ে পশুপতিকে মহম্মদ আলি নিজ হাতে যবন বেশ পরালেন এবং বাইরে এনে খিলিজির পরিচয় দিয়ে বলেন —

ধর্মাধিকার! আপনি আমাকে বিনা দোষে তিরস্কার করিয়াছেন। বখতিয়ার খিলিজির এরূপ অভিপ্রায় আমি কিছুই অবগত ছিলাম না। তাহা হইলে আমি কদাচ প্রবঞ্চকের বার্তাবহ হইয়া আপনার নিকট যাইতাম না। যাহা হউক, আপনি আমার কথায় প্রত্যয় করিয়া এরূপ দুর্দশাপন্ন হইয়াছেন, ইহার যথাসাধ্য প্রায়শ্চিত্তও করিলাম। গঙ্গাতীরে নৌকা প্রস্তুত আছেআপনি যথেচ্ছা স্থানে প্রস্থান করুন। আমি এইখান হইতে বিদায় হই।৮৮

পশুপতি বিস্মিত হয়ে গেলেন। মহম্মদ আলি বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্টি একটি সজীব চরিত্র। এখানে শিল্পী বঙ্কিমের অপক্ষপাতদৃষ্টি দিবালোকের মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। তিনি মহম্মদ আলির প্রায়শ্চিত্তের মধ্য দিয়ে তাঁর নিরাপরাধ এবং অনুতপ্ত অন্তরের চিত্র উদ্ঘাটন করেছেন। এতে অবশ্য তাঁর আর একটি উদ্দেশ্য চরিতার্থ হয়েছে; হিন্দুর পরম শত্রু বখতিয়ারের প্রবঞ্চনাকে একজন মুসলমানের জবানিতে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। কিন্তু দেশদ্রোহী পশুপতি স্বদেশপ্রেমিক বঙ্কিমের দ- থেকে মুক্তি পাননি।৮৯ পশুপতি মুক্তি পেয়ে ফিরে এসে নিজ বাড়িঘর জ্বলন্ত পর্বতের ন্যায় জ্বলতে দেখলেন। তাঁর মনোরমার কথা মনে পড়লো। কিন্তু মনোরমা যে পূর্বেই পালিয়েছেন, তা তিনি জানতে পারেননি। পশুপতি কোনো চিন্তা করতে না পেরে চিত্তবিকল হয়ে পড়ায় “শেষে মহাবেগে সেই অনলতরঙ্গ মধ্যে ঝাঁপ দিলেন।” এর ফলে “অন্তর মধ্যে যে দুরন্ত অগ্নি জ্বলিতেছিল তাহাতে তিনি বাহ্য দাহযন্ত্রণা অনুভূত করিতে পারিলেন না।”৯০ তিনি দেবী অষ্টভুজার মন্দিরে প্রবেশ করে মস্তিষ্ক বিকৃতিহেতু ধাতুমূর্তিকে দোষারোপ করে গঙ্গার জলে বিসর্জন করতে চাইলেন। আর তখনই “দগ্ধ মন্দির, আকাশপথে ধূলিধূমভস্ম সহিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গরাশি প্রেরণ করিয়া, চূর্ণ হইয়া পড়িয়া গেল। তন্মধ্যে প্রতিমা সহিত পশুপতির সজীবন সমাধি হইল।”৯১

৪.

বঙ্কিমচন্দ্রের সমকালে যেসব ইতিহাস পাওয়া যেতো, তার প্রামাণিকতাই ছিলো গুরুতর একটি সমস্যা। তখন প্রচলিত ইতিহাসগুলোর মধ্যে ছিলো ব্রিটিশদের রচিত ইতিহাস, যার বড়ো একটি অংশ ছিলো ফারসি ভাষায় লেখা ইতিহাসগ্রন্থগুলোর অনুবাদ। এইসব ইতিহাস ছিলো অন্তত দুই দিক দিয়ে পক্ষপাতমূলক। প্রথমত মুসলিম শাসকদের যেসব সভাসদ এইসব ইতিহাস রচনা করেছিলেন, স্বভাবতই তাঁরা তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের গুণগান একটু বেশি করেই করেছিলেন; অন্যদিকে ইংরেজরা যখন তার উপর ভিত্তি করে ইতিহাস রচনা করলেন, সেখানে আবার প্রাপ্ত খারাপ দিকগুলোকে খানিকটা বেশি করে অতিরঞ্জিত হলো। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস বিষয়ক আলোচনায় বিষয়টি মনে রাখা হয়েছে এবং তা নির্দেশ করা হয়েছে। যেমন, আলোচ্য ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের বঙ্গবিজয় বিষয়ক কাহিনির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। ফারসি ভাষায় লেখা ইতিহাসের ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র বখতিয়ার খিলিজির বঙ্গবিজয় সম্পর্কিত সামান্য একটি তথ্যকে কিভাবে উপন্যাসের মূল কাহিনিতে রূপান্তরিত করে ফেলেন, প্রাসঙ্গিক আলোচনায় তা দেখা গেছে। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে বঙ্গদেশের স্থান-ইতিহাস ব্যবহারে বঙ্কিমচন্দ্র এভাবে অনেকটা প্রাপ্ত ইতিহাসের কাছাকাছি গিয়েছিলেন দেখা যায়। কিন্তু চরিত্র ও ঘটনা প্রসঙ্গে ইতিহাসের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের এই আনুগত্য ততোটা সহজলভ্য নয়। এজন্য ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের মধ্যে ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি তিনি অসংখ্য অনৈতিহাসিক চরিত্রের আগমন ঘটিয়েছেন। তবে এসব ক্ষেত্রে তিনি চরিত্রগুলোকে উপন্যাসের মধ্যে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা এক কথায় বিশ্বস্তই হয়ে ওঠে। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে পশুপতি ও হেমচন্দ্র চরিত্র বঙ্কিমের কাল্পনিক সৃষ্টি হলেও ইতিহাসের স্থান, কাল ও ঘটনার সঙ্গে তা যথেষ্ট ইতিহাসানুগ হয়ে ওঠে।

বঙ্কিমচন্দ্র কর্তৃক বঙ্গদেশের এই জাতীয় ইতিহাস গ্রহণে কয়েকটি ধরনও লক্ষ করা যায়। যেমন, কোনো কোনো চরিত্র ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের ব্যাপারে তাঁকে কখনো কখনো বেশ উৎসাহী মনে হয়েছে, আবার কোনো কোনো চরিত্রকে তিনি সচেতনভাবেই নেতিবাচকভাবে তৈরি করেছেন বলে মনে হয়। সেগুলোর মধ্যেও বঙ্কিমচন্দ্রের মনোযোগের হ্রাসবৃদ্ধি অলক্ষণীয় নয়। উদাহরণ হিসেবে মুসলমান শাসক চরিত্র সৃষ্টির বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। ইংরেজ চরিত্রের প্রতিও বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট অনুকূল ছিলো, এমন মনে হয় না। ঐতিহাসিক চরিত্রসৃষ্টিতে বঙ্কিমচন্দ্র সমকালীন জাতীয়তাবাদী মনোভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, সে কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সেই জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিলো মূল ব্রিটিশ বিরোধিতার মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের জনপ্রিয় ইতিহাস ও কাহিনির মধ্যে ইংরেজ চরিত্র খুব বেশি ছিলো না। সেগুলো ব্যবহার করাও বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সরকারি চাকুরের পক্ষে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণও ছিলো। তার ফলে তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসের রসদ নিতে হয়েছে ব্রিটিশপূর্ব বা মোগল-পাঠানপূর্ব শাসনামল থেকে। কেননা যে কোনো জাতীয়তারই একটি শত্রুপক্ষ চিহ্নিত করার দরকার হয়। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর জাতীয়তাবোধে চূড়ান্ত অর্থে এভাবে সমকালীন শাসকদের শত্রু ভাবাতেই পূর্ববর্তী কালের শাসকদের এনে হাজির করা হয়েছিলো। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে বঙ্গের শেষ স্বাধীন সেন রাজা লক্ষ্মণসেনের কাহিনি, রাজত্বকাল এবং তুর্কিবীর বখতিয়ার খিলিজি কর্তৃক পরাজয়ের কাহিনিও বঙ্কিমচন্দ্র প্রায় একই আদর্শিক দৃষ্টিকোণে উপস্থাপন করেছেন। মীরজাফরের মতো ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে সেখানে যে তিনি একজন ‘পশুপতি’ নির্মাণ করেন, সেও বঙ্কিমের জাতীয়তাবাদী আদর্শকে পুষ্ট করে তোলে।

বঙ্কিমচন্দ্রের এই জাতীয়তাবাদ আপাত দৃষ্টিতে অন্তত দ্বিধাবিভক্ত : এক. ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তা; এবং দুই. বাঙালি জাতীয়তা। এই দুই ভাগ বঙ্কিমের চেতনায় এমনভাবে মিশে থাকে, যার ফলে কোন উপাদান কতোটা শক্তিশালী সব সময়ে তা নিরূপণ করা যায় না। চরিত্র তৈরি করার সময়ে বা প্রাসঙ্গিক কাহিনি বর্ণনা করার সময়ে বঙ্কিমচন্দ্রকে নিঃসন্দেহে ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তার প্রতিভূ বলে মনে হবে। কিন্তু তিনি যখন বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় সেন শাসকদের ভূমিকার কথা বর্ণনা করেন, তখন বঙ্কিমচন্দ্রের বাঙালি জাতীয়তা অন্য জাতীয়তাকে ছাপিয়ে ওঠে। এমনকি উপন্যাসে বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রকৃতি বর্ণনা প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র যেভাবে বাংলার আর্থসামাজিক সমৃদ্ধি, ভৌগোলিক সৌন্দর্য ও উন্নত লোকবলের প্রশংসা করেন, তার সবগুলোই বঙ্কিমের বাঙালি জাতীয়তাকেই পুষ্ট করে। বঙ্কিমচন্দ্রের এই জাতীয়তাবাদী মনোভাব পরবর্তীকালে ‘আনন্দমঠ’ এবং ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে বিশেষভাবে ধরা পড়ে। বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহাসিক উপন্যাসের সাহিত্যিক মর্যাদায় এটি একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।

  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিম রচনাবলী, ২য় খ-, যোগেশচন্দ্র বাগল, সম্পা. (পুনর্মুদ্রণ; কলকাতা : সাহিত্য সংসদ, ২০০৩ [প্রথম প্রকাশ ১৯৬৪]), পৃ. ২৯১। অতঃপর বঙ্কিম রচনাবলীকে খ-সংখ্যাসহ ‘বর’ হিসেবে উল্লেখ করা হবে।

২ সতীশচন্দ্র মিত্র, যশোহর-খুল্নার ইতিহাস, ১ম খ- (কলকাতা : দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানী প্রা. লি., ১৯৬৩), পৃ. ২৫৯।

৩ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ২৯১।

৪ তদেব, পৃ. ১৯০।

৫ সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র  (কলকাতা : এ মুখার্জি অ্যান্ড কোং প্রা. লি., ১৯৯৪), পৃ. ৬০।

৬ তদেব, পৃ. ৬০।

৭ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঙ্গালার ইতিহাস, ১ম ভাগ (কলকাতা : বেঙ্গল মেডিকেল লাইব্রেরি, ১৯১৪), পৃ. ৩।

৮ বিজিতকুমার দত্ত, বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস (কলকাতা : মিত্র ও ঘোষ, ১৯৬২), পৃ. ৯৬।

৯ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৩৫-১৯৯। মূল পাঠে বন্ধনীর মধ্যে নির্দেশিত সংখ্যা রচনাবলীর পৃষ্ঠাসংখ্যা।

১০ Minhaj-ud-din, Tabakat-i-Nasiri, Vol. I (Tr.) Rept. Major H. G. Raverty (New Delhi, 1970), p. 551.

 ১ নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, (কলকাতা : দেজ পাবলিশিং, ১৯৯৩), পৃ. ৪১৩।

 ২ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঙ্গালার ইতিহাস, ২য় খ- (কলকাতা: দে’জ, ১৯৮৮ [প্রথম প্রকাশ ১৯১৭]), পৃ. ৬।

 ৩ রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলা দেশের ইতিহাস, ১ম খ- (কলকাতা : জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স, ১৯৮১), পৃ. ১৫৭।

 ৪ বঙ্কিমচন্দ্র ‘ভারতবর্ষ পরাধীন কেন?’ প্রবন্ধে এ জাতীয় মুসলমানদের আক্রমণের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। বর ২, পৃ. ২০৫।

 ৫ গরহযধল-ঁফ-ফরহ, ঞধনধশধঃ-র-ঘধংরৎর, ঢ়. ৫৫৬.

 ৬ নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, পৃ. ৪১৫।

 ৭ বর ২, পৃ. ১৮৪।

 ৮ নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, পৃ. ৬৮।

 ৯ ‘মৃণালিনী’, বর, ১, পৃ. ১৯৮।

২০ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঙ্গালার ইতিহাস, ২য় খ-, পৃ. ৩।

২১ তদেব, পৃ. ২।

২২ উদ্ধৃত, তদেব, পৃ. ১২।

২৩ নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, পৃ. ৮০।

২৪ তদেব, পৃ. ৮১।

২৫ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৩৫।

২৬ তদেব।

২৭ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৮৯।

২৮ রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলা দেশের ইতিহাস, ১ম খ- (কলকাতা : জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স প্রা. লি., ১৯৮১), পৃ.১৪৮-১৪৯।

২৯ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৩৫।

৩০ বখতিয়ার খিলিজির মগধ লুট সংক্রান্ত তথ্যের জন্য দ্রষ্টব্য, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঙ্গালার ইতিহাস, ২য় খ-, পৃ. ৩।

৩১ ‘মৃণালিনী’ বর ১, পৃ. ১৩৬।

৩২ তদেব, পৃ. ১৩৭।

৩৩ তদেব, পৃ. ১৫১।

৩৪ তদেব।

৩৫ তদেব।

৩৬ তদেব।

৩৭ তদেব, পৃ. ১৫২।

৩৮ তদেব।

৩৯ সতীশচন্দ্র মিত্র, যশোহর-খুল্নার ইতিহাস, ১ম খ-, পৃ. ৪৫৬।

৪০  Minhaj-ud-din, Tabakat-i-Nasiri, Vol. I (Tr.) Major H. G. Raverty (London, 1881), p. 556.

৪১ নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদিপর্ব, পৃ. ৪১৪।

৪২ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৫৭।

৪৩ তদেব।

৪৪ তদেব।

৪৫ সম্ভবত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের ‘পশুপতি’ চরিত্রটির নাম বা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মির্জা নাথানের ‘বাহারীস্তান-ই-গায়বী’ থেকে নিয়ে থাকবেন। দ্রষ্টব্য, মির্জা নাথান, বাহারীস্তান-ই-গায়বী, পৃ. ৫১৮, ৫১৯, ৫২০।

৪৬ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৫৯।

৪৭ তদেব।

৪৮ তদেব।

৪৯ তদেব, পৃ. ১৬০।

৫০ Charles Stewart, History of Bengal, p. 27.

৫২ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৬০।

৫৩ তদেব।

৫৪ তদেব।

৫৫ তদেব।

৫৬ তদেব, পৃ. ১৬১।

৫৭ তদেব।

৫৮ তদেব।

৫৯ তদেব।

৬০ বর ২, পৃ. ১৮৪।

৬১ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৮৫।

৬২ তদেব।

৬৩ তদেব।

৬৪ বর ২, পৃ. ২০৬।

৬৫ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৮৮-১৮৯।

৬৬ সারোয়ার জাহান, বঙ্কিম-উপন্যাসে মুসলিম প্রসঙ্গ ও চরিত্র, পৃ. ৩০।

৬৭  Minhaj-ud-din, Tabakat-i-Nasiri, Vol. I (Tr.). Major H. G. Raverty (New Delhi, 1970), p. 551.

৬৮ ‘মৃণালিনী’, বর, ১, পৃ. ১৮৯।

৬৯ তদেব।

৭০ তদেব।

৭১ তদেব।

৭২ গরহযধল-ঁফ-ফরহ, ঞধনধশধঃ-র-ঘধংরৎর, ঢ়. ৫৫৮.

৭৩ সারোয়ার জাহান, বঙ্কিম-উপন্যাসে মুসলিম প্রসঙ্গ ও চরিত্র, পৃ. ৩১।

৭৪ রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলা দেশের ইতিহাস, ১ম খ-, পৃ. ১৫০।

৭৫ নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, পৃ. ৪১৫।

৭৬ ‘মৃণালিনী’, বর, ১, পৃ. ১৯০।

৭৭ তদেব।

৭৮ তদেব।

৭৯ তদেব।

৮০ তদেব।

৮২ তদেব।

৮৩ তদেব, পৃ. ১৯১।

৮৪ তদেব, পৃ. ১৯০। মীরজাফর কর্তৃক ক্লাইভকে প্রদত্ত জমিদারির দলিল ও মানচিত্র দ্রষ্টব্য, পশ্চিমবঙ্গ, পৃ. ৪২৫।

৮৫ ‘মৃণালিনী’, বর ১, পৃ. ১৯১।

৮৬ সারোয়ার জাহান, বঙ্কিম-উপন্যাসে মুসলিম প্রসঙ্গ ও চরিত্র, পৃ. ৩৭। বঙ্কিমচন্দ্র ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে প্রথমবার, মহাবনে পঁচিশ হাজার সৈন্য লুকিয়ে থাকার কথা বলেছেন। ‘মৃণালিনী’, বর, ১, পৃ. ১৬২। আবার বিশ হাজার সৈন্যের কথাও বলেছেন। তদেব, পৃ. ১৯১। এটি মুদ্রণজনিত প্রমাদ কিনা তা যথাযথ ভাবে নিরূপণ করা যায় না।

৮৭ তদেব, পৃ. ১৯২।

৮৮ তদেব, পৃ. ১৯৯।

৮৯ তদেব।

৯০ তদেব, পৃ. ২০০।

৯১ সারোয়ার জাহান, বঙ্কিম-উপন্যাসে মুসলিম প্রসঙ্গ ও চরিত্র, পৃ. ৩৮।

৯২ ‘মৃণালিনী’, বর, ১, পৃ. ২০১।

৯৩ তদেব, পৃ. ২০২।

*******************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা