67089695_1205629756286621_1569702463835996160_o

ক্রো ড় প ত্র ১ ন ন ফি ক শ ন

প্রসঙ্গ : ননফিকশনাল গদ্য
নাসিমুজ্জামান সরকার

ফিকশন বা ননফিকশন আমরা যেটাই বলি, সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী হলেও, মূলে এদের প্রধান মিল হচ্ছে— এরা উভয়ই গদ্যধর্মী। এদের ভেতরকার পার্থক্য মূলত লুকিয়ে রয়েছে বিষয়ের মধ্যে। এই যে গদ্যের কথা বলা হচ্ছে সেটাও কিন্তু আমরা পেয়েছি অনেক দেরিতে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে আমরা কোনো গদ্যরূপ পাইনি। সেই সময় যে যৎসামান্য লিখিত গদ্যের সাক্ষাৎ মেলে তার ভেতরে কোনো সাহিত্যিক মোটিফ নেই। আবার সেই গদ্যের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপও ছিলো না। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে প্রকাশিত গদ্যে রচিত পাঠ্যপুস্তকগুলো যে প্রাতিষ্ঠানিক গদ্যের সূচনা করেছিল তাই পরবর্তীতে গদ্যসাহিত্য রচনায় প্রেরণা যুগিয়েছে। ফলশ্রুতিতে আমরা নববাবু বিলাস (১৮২৫), নববিবি বিলাস (১৮৩১), ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২), আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮), হুতোম প্যাঁচার নকশা (১৮৬১) প্রভৃতি গদ্যে রচিত গ্রন্থের সাক্ষাৎ পাই। এরই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের একটি সার্থক কল্পকাহিনি দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)। এই মাইলফলক ধরেই বাংলা সাহিত্যে একটি সমৃদ্ধ উপন্যাসের ধারা গড়ে উঠেছে। উপন্যাস সৃষ্টির কিছুকাল পরে মানবজীবনের অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা বা সূক্ষ্ম অনুভূতি বা ভাবনাগুলোকেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বল্পায়তনে গদ্যবন্ধ করলেন ছোটগল্প শিরোনামে। এভাবে গড়ে উঠল বাংলা সাহিত্যে দুইটি সার্থক কল্পকাহিনির ধারা— উপন্যাস এবং ছোটগল্প যাকে ইংরেজি সাহিত্যে ফিকশন বলে অভিহিত করা হয়েছে। এগুলো মূলত কল্পনা থেকে সৃষ্ট কোনো গল্প বা জগতের বৈচিত্র্যময় কাহিনি যাতে রয়েছে বাস্তবের নির্যাস, যা বাস্তব ঘটনা বা ইতিহাস পুরোপুরি মেনে চলে না। কল্পকাহিনি একধরণের বর্ণনাধর্মী সৃজনশীল সৃষ্টি তাই এর বাস্তবানুগ হওয়া আবশ্যক নয় তবে তা অবশ্যই উদ্ভট হবে না। ফিকশন মূলত কল্পনা হতে প্রত্যাশিত তথ্য ও ঘটনাবলির বর্ণনা যাতে বাস্তবতার নির্দেশনা রয়েছে। পক্ষান্তরে বৃহৎ অর্থে বলতে গেলে কথাসাহিত্য বহির্ভূত সকল গদ্যই ননফিকশন যদিও সাহিত্যে এই প্রসঙ্গটির ভিন্ন উপযোগিতা রয়েছে। ননফিকশন সাধারণত যুক্তিবাদী ও কার্যকরী তথ্যের আলোকে, কখনো মতামতের ভিত্তিতে শিল্প বা সাহিত্যের ওপরে রচিত জীবনী, স্মৃতিকথা, সাংবাদিকতা এবং বৃহদার্থে ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক লেখা। জার্নাল, ফটোগ্রাফ, পাঠ্যপুস্তক, ভ্রমণ বই, ব্লুপ্রিন্ট প্রভৃতি প্রায়শই অ-কাল্পনিক হিসেবে বিবেচিত হয় বিধায় একার্থে এগুলোও ননফিকশন। সত্যাসত্যের ভিত্তিতে লেখকের কাছে অসত্য বলে বিবেচিত যা নয় তা বৈধভাবে কথাসাহিত্য বা ননফিকশন হতে পারে, যেমন— স্ব-অভিব্যক্তি, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ এবং কল্পনার অন্যান্য অভিব্যক্তি। আবার কিছু কথাসাহিত্যে ননফিকশনাল উপাদান অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কিছু অযৌক্তিকতার মধ্যে একটি বর্ণনাকে মসৃণ করার উদ্দেশ্যে অযৌক্তিক অনুভূতি বা কল্পনার উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে কিন্তু খোলা মিথ্যাবাদগুলো অন্তর্ভুক্ত করা— এটি ননফিকশনের একটি কাজ হিসেবে বিষয়টিকে বিকৃত করবে। সাহিত্যে ফিকশনের সাথে ননফিকশনের বুদ্ধিজীবী বক্রতার সাথে কাজগুলোকে আলাদা করার জন্যে সাহিত্য ‘ননফিকশন’ শব্দটি ব্যবহার করে।

ননফিকশনে বর্ণিত নির্দিষ্ট বাস্তব কথোপকথন এবং বিবরণগুলো সঠিক হতে পারে বা নাও হতে পারে এবং প্রশ্নটির একটি সত্য বা মিথ্যা অ্যাকাউন্ট দিতে পারে। তবে, এই ধরণের অ্যাকাউন্টের লেখক সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করেন বা তাদের রচনায় সত্যিকারের সত্য বলে দাবি করেন অথবা অন্তত, তাদেরকে বিশ্বাসী বা পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তববাদী হিসেবে দৃঢ় শ্রোতার কাছে উপস্থাপন করেন। অযৌক্তিক বিন্যাসে অন্যদের বিশ্বাসের প্রতিবেদনের অর্থ এই বিশ্বাসগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা যাচাইয়ের পক্ষে নয়, এটি কেবল সাধারণ কথা বলে যে মানুষ তাদের বিশ্বাস করে। ননফিকশন এছাড়াও কল্পনা থেকে লেখা যেতে পারে, সাধারণত এগুলো সাহিত্য সমালোচনা হিসেবে পরিচিত, যার অন্যতম কাজ— তথ্য এবং বিশ্লেষণ প্রদান। তবে ননফিকশন অবশ্যই লিখিত টেক্সট হওয়া প্রয়োজন, স্থিরচিত্র কিংবা সিনেমা বা নাটকের ক্ষেত্রে প্রসঙ্গটি ভিন্ন।

ননফিকশন যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তিক এবং কল্পকাহিনি প্রসৃত ঘটনার চরিত্রনির্ভর বর্ণনামাত্র নয় সেহেতু এর লেখককে প্রথমত ভাবতে হবে— পাঠক এর বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ। অজ্ঞতার সত্যতা সত্ত্বেও পাঠককে ধারণাগুলোর সাথে একমত হওয়ার জন্যে প্রায়ই বাধ্য করা এবং তাই একটি সুষম, সুসঙ্গত এবং জ্ঞানী যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। আবার একধরণের বর্ণনা দেখা যায় যা একটি সত্য কথা বা সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বর্ণিত একটি কাল্পনিক বিবরণ যেগুলোকে অনেক সময় সেমি-ফিকশন বলে অভিহিত করা হয়।

তবে ননফিকশন যে কাল্পনিক উপাদানগুলোকে কড়াকড়িভাবে বর্জন করে সেটাও অবশ্য নয়। ননফিকশন যেহেতু একটি সাহিত্যকর্ম সুতরাং প্রয়োজন অনুসারে এতে কাল্পনিক উপাদান থাকতে পারে যেমন— ব্যক্তিগত প্রবন্ধ, জীবনী, স্মৃতিকথা, আত্মকথা, দিনলিপি, ভ্রমণকাহিনি প্রভৃতি রচনা।

এখন, কথাসাহিত্য বহির্ভূত সকল গদ্যই আমরা ননফিকশন হিসেবে গ্রহণ করব কিনা এই হচ্ছে প্রশ্ন। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি সাহিত্যের কোনো নির্দেশিত সীমানা থাকা উচিত নয়। আঙ্গিক কিংবা বিষয়গত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সাহিত্যের পৃথক বিষয়গুলোর প্রত্যেকটিই মানুষের হৃদয় নিংড়ানো কথাগুলোই উপস্থাপন করে। মানুষের জীবন ও অনুভূতিগুলো যেমন জটিল হয়েছে, জালের মতো একটির সাথে অন্যটি জড়িয়ে পড়েছে সেভাবে সাহিত্যেও এসেছে ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ, ফলেই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে। তাই সাহিত্য বিচারে এদেরকে পৃথক করে দেখার প্রয়োজন পড়ে তবে সাহিত্য বিচারের পৃথক মানদ-ের কথা এখানে বলা হচ্ছে না, লেখকের স্বাধীনতার পক্ষে অন্তত আমি সেটাকে ইগনর করি। সাহিত্যে যেটাকে ননফিকশন বলি সেটা অবশ্যই পুরনো নথিপত্রে লিপিবদ্ধ বা ব্যবসায়ের চিঠিতে ঢোকানো বা কেবলমাত্র তথ্যের একটি পৃথক বার্তা হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতিগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আবার কোনো বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক তত্ত্ব বা ধর্মীয় তত্ত্বকথা কিংবা কোনো ক্ষুদ্র লেখা যা কোনো নান্দনিক উদ্বেগ প্রকাশ করে না— ননফিকশনে সেগুলোর কোনো অন্তর্ভুক্তি নেই। তা সত্ত্বেও ননফিকশনের বিষয় প্রায় অসীম বিভিন্ন আবরণ, আকার ও অনুমানে। সাহিত্যের কণিষ্ঠ শাখা হিসেবে অগ্রণী সাহিত্যের সাথে ননফিকশনাল গদ্যের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে। এই রচনাশৈলির ভেতরে রাজনৈতিক ও পুরাতত্ত্ব রচনা, জীবনী এবং আত্মজীবনীমূলক সাহিত্য এবং দার্শনিক, নৈতিক বা ধর্মীয় রচনাগুলোও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যদি সেখানে সাহিত্যের নান্দনিক উদ্বেগ প্রকাশ পায়।

ননফিকশনাল গদ্যের একক চারিত্রীকরণের প্রচেষ্টা কার্যত অসম্ভব। স্পষ্টতই ননফিকশনাল গদ্য সাহিত্য হিসেবে সীমাহীন এবং বৈচিত্র্য হিসেবে একটি সুবিশাল রাজত্ব যেখানে কোনো উদ্দেশ্য, কৌশল বা শৈলি এর একক ঐক্য হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। প্রবন্ধের লেখার, সাহিত্য সাংবাদিকতা, পলিয়েমিক বিতর্ক, ভ্রমণসাহিত্য, স্মৃতিকথা এবং ঘনিষ্ঠ ডায়েরিগুলো লেখার জন্যে কোনো প্রেষণমূলক অভিব্যক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। সংলাপ, স্মীকারোক্তি, ধর্মীয় বা বৈজ্ঞানিক লেখার একটি অংশ— সেটি চমৎকার, মধ্যযুগীয় বা পুরোপুরি খারাপ তা নির্ধারণের জন্যে কোনো বিশেষ আদর্শ স্বীকৃত হয় না এবং প্রত্যেক লেখককে বস্তুত নিজেদের স্বার্থেই প্রধানত স্বচ্ছন্দ মূল্যায়ন করা উচিত।

ফিকশনে যা অস্বাভাবিক বা কাল্পনিক বলে দাবি করা হয় ননফিকশনে তা সাধারণত গল্পের উদ্ভাবনের চেয়ে আরও ঘনিষ্ঠতার সাথে জড়িত হওয়া অথবা কল্পনাপ্রসূত কল্পনাগুলোর ফ্রেমগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত করা প্রয়োজন। অনেক পাঠক ভ্রমণ বইগুলো, বহিরাগত প্রাণীর জীবন বর্ণনা থেকে, অন্যান্য জাতির মনোবিজ্ঞানের ওপর প্রবন্ধের দ্বারা, নোটবুক দ্বারা বা ডায়েরি দ্বারা কবিতার চেয়ে অনেক বেশি বা উপন্যাসগুলো দ্বারা অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে যা অবিশ্বাসের কোনো স্থগিতাদেশ নিরসনে ব্যর্থ হয়— তার চেয়ে অনেক বেশি আকৃষ্ট হয়। বর্তমান সময়ে এর কার্যকারিতা আরো বহুদূর প্রসারিত হয়েছে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের কল্যাণে। সাহিত্য এখন আর কেবল গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, এখন সাহিত্যের এক বিশাল ভা-ার গচ্ছিত থাকে মানুষের হাতের মুঠোয়। কেবল সাহিত্যের সংরক্ষণ নয়, সাহিত্য সৃষ্টির একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবেও এখন ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এটাকে অনেকাংশে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া বলা হয়ে থাকে যা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে তাদের তথ্যাবলী প্রেরণ করে। কেবলমাত্র চলচ্চিত্র নয়, পাশাপাশি মুদ্রিত মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র, সাময়িকী, ব্রোশিওর, নিউজলেটার, বই, লিফলেট, পাম্পলেটে বাহ্য বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়। এছাড়া গণমাধ্যমগুলোর পাশাপাশি ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের ফলে এবং ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের সহজলভ্যতার ফলে লক্ষ করা যাচ্ছে— এগুলোই বর্তমান প্রজন্মকে সবচেয়ে বেশি গ্রাস করে নিচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, বই-পুস্তক বা খাতা-কলমের চেয়ে বর্তমান প্রজন্মের কোনো তরুণ ল্যাপটপ বা নোটবুকে বেশি আগ্রহী। অতি সাম্প্রতিক ঘটনাপঞ্জির মধ্যে ব্লগ ও মিডিয়ায় প্রচলিত লেখাগুলোর দিকে তাকালে আমরা একটি বিশাল মনোজগতের সন্ধান পাবো এবং দেখতে পাবো সেখানে তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল ঢল নেমেছে। এর অন্তত বেশ কিছু রচনায় নিঃসন্দেহে সাহিত্যিক উদ্বেগের প্রকাশও লক্ষ করা যাবে। এগুলো নিয়ে বিস্তর গবেষণা হলে সাহিত্য ও মানবজীবনের জটিল অধ্যায়ে একটি নতুন দিক উন্মোচিত হবে। ননফিকশনের এক বিস্তৃত অধ্যায় লুকিয়ে রয়েছে এই মিডিয়া জগতে। দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে লেখকের মনোভাব, লেখার দিক থেকে এটি নির্ণয় করা যেতে পারে, ননফিকশনাল গদ্য লেখার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলোর মূল হলো একটি অহং এবং বুদ্ধিবৃত্তিক, পরিচিত স্বর ব্যবহারের ডিগ্রী। যে মাধ্যমেই হোক, ফিকশন বা ননফিকশন উভয়েরই লেখার মৌলিক পদ্ধতিগুলো বর্ণনামূলক এবং যুক্তিবাদী, কল্পনার ব্যবহার উভয়ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়, তবে তা ভিন্ন ভিন্ন ডিগ্রীতে— এখানেই মূলত পার্থক্য। ফিকশনে কল্পিত কাহিনি ও চরিত্রের বাস্তবসম্মত উপস্থাপন পক্ষান্তরে ননফিকশনে বোধ, বুদ্ধি ও বিষয়ের যুক্তিগ্রাহ্য, সত্য ও স্পষ্ট বর্ণনা যা একজন লেখকের সাহিত্যিক উদ্বেগ প্রকাশ করে।

********************************

ছোটপত্রিকা ও সাহিত্যপাঠের সমাজতত্ত্ব
দেবেশ রায়

যে সাহিত্য নিজের সংজ্ঞা বদলাতে পারে না— সে সাহিত্যের ভিতর এক প্রবাহহীনতা এসে যায়। আমাদের এই বাংলা ভূখ-ের এমন কোন মাঝারি নদীও আছে কি? যার খাদ বদলায়নি? সেই পুরনো খাদ যে শুকিয়ে যায়— তা নয়, কোন বিল বা জলা বা নিচু জমি হয়ে টিকে থাকে। বসবাসও হয়, চাষবাসও হয়— কিন্তু সেই খাদটি আর নদী থাকে না। নদীর একটা নিশ্চিত উৎস চাই, সেটা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রই হয়— এ নদী, ও নদী করতে করতে। সাহিত্যের সংজ্ঞা বদলের সঙ্গে নদীর খাদ বদলের তুলনাটা বাড়াতে গেলে বিপদ আছে। তাই এই উপমা আর বাড়াবো না। হয়তো, এরপরেও আর দু’একবার এই উপমা ব্যবহার করব কথা বলার সুবিধার জন্য। কিন্তু, তার বেশি নয়। বাংলা সাহিত্যের এই এক সমস্যায় আমাদের পড়ে আসতেই হচ্ছে মোটামুটি সেই ১৮০০ সাল থেকেই; যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা হলো; যেন এর আগে বাংলা সাহিত্য বলে কিছুই ছিল না! সাহেবরা ছাপার যন্ত্র এনে বাংলা ভাষার সাহিত্য তৈরি করতে লাগলেন, আর সংস্কৃতজ্ঞ কিছু বাঙালি লেখককেও লাগালেন। এই প্রশ্নটা তখন কেউ করেনি— সাহেবরা যে ভাষাকে বাংলা বলে চেনে; কিছুটা বুঝে ও অনেকটাই না বুঝে বই লেখালো, সংকলন বের করলো। সেই ভাষাটাকে তো অন্তত তখন ছ’ সাতশ বছর টিকে আসতে হয়েছে। এই ছ’ সাতশ বছর ধরে— অর্থাৎ ইংরেজরা আসার ছ’ সাতশ বছর ধরে তো কত আখ্যান গাওয়া হয়েছে; যা আমরা এখন মঙ্গলকাব্য বলে চিনি। পাঁচালির মতো গান তৈরি হয়েছে, বৈষ্ণবদের কত পালা গাওয়া হয়েছে, কত পুঁথি খাগের কলমে লেখা হয়েছে, মুসলমানি কত কেচ্ছা, কাহিনী আকার নিয়েছে। ইংরেজরা আসার মুখোমুখি ভারতচন্দ্রের মতো কবির হাতে বিশাল কাব্যের, ছন্দের, গল্পের নতুন আকার তৈরি হয়েছে। একই সময়ে চৈতন্য ও মহন্তদের নিয়ে সব বাংলা পুরাণ লেখা হয়েছে। আবার, বিদ্যাসুন্দরের মতো ঘোর শারিরীক কাব্য লিখে সুর দিয়ে হাটে-মাঠে-ঘাটে একই আসরে গরীব চাষীদের, জমিদারদের শিল্পতৃপ্তির জন্য গাওয়া হয়েছে। সেটি কি বাংলা ভাষা ছিল না? এই প্রশ্নটি তখন কেউ করেননি। কিন্তু, এর একটাই উত্তর এবং একটাই মাত্র উত্তর অন্তত ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত সবাই মেনে নিয়েছেন। এই সবাই হচ্ছে নব্যশিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত। কলকাতা ও তার আশপাশ তখন তৈরি হয়ে উঠছে। আর, উত্তরটা হচ্ছে সে বাংলা ছিল অনাধুনিক, গ্রাম্য বাংলা ভাষা, অশ্লীলতায় আকীর্ণ, সভ্য বিষয়ের বিনিময় অযোগ্য। আমরা আমাদের ভাষাকে চিনতেই পারি না— যেহেতু সে ভাষা ইংরেজির অবিকল নয়। এখানে আমি শুধু একটা ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছি— সতীদাহ প্রথার পক্ষে ও বিপক্ষে বাংলায় নতুন সাংবাদিকতা, তর্ক-বিতর্কে যে বাঁকা কথা, চোরা কথা, প্রবাদ, প্রতিপক্ষকে খিস্তি করা, খেউর করার ধারালো চলচ্ছক্তি দেখিয়েছিল। ঈশ^র গুপ্ত সংবাদ প্রভাকর-এ পদ্য সাংবাদিকতায় পদ্যের পরিচিত ভঙ্গির সঙ্গে নতুন অপরিচিত বিষয়ের যে বিস্ময়কর সংযোজন ঘটিয়েছেন, তার উৎস কিন্তু কবিগানের খেউর-খিস্তি। আজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের একচক্ষু ব্যাখ্যার ফলে ‘খিস্তি-খেউর’ এইসব শব্দের একটি মাত্র অর্থই আমরা জানি। এগুলো যখন সামাজিক ব্যবহারের শব্দ ছিল— তখন বাক্যের গড়ন, উপমা ব্যবহার, প্রতিপক্ষকে আক্রমণও বোঝাতো। আর শব্দের সেই লক্ষ্য ভেদে এটা গ্রাহ্যই হতো না, কোনটা শ্লীল আর কোনটা অশ্লীল। আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি ঈশ^র গুপ্ত থেকে— ‘ইচ্ছা করে ধন্না পাড়ি রান্না ঘরে ঢুকে/ কুক হয়ে মুখকানি লুক করি সুখে/ তেড়া হয়ে তুড়ি মারে টপ্পা গীত গেয়ে/ গোচে গাচে বাবু হয় পঁচা শাল চেয়ে/ কোনরূপে পিত্তিরক্ষা এঁটো কাঁটা খেয়ে/ শুদ্ধ হন ধেনো গাঙে বেনোজলে নেয়ে/ ‘এ, বি’ পড়া ডবি ছেলে প্রতি ঘরে ঘরে/ সাজায়েছে গাঁদা-গাদা ডেক্সের উপরে।’ আমি বুঝতে পারছি— আপনাদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, আমি আমার বিষয় গুলিয়ে ফেলছি কি না? না, আমি জানি আমার বিষয় ‘ছোটপত্রিকা ও সাহিত্যপাঠের সমাজতত্ত্ব’। ইচ্ছে করেই একটু গম্ভীর নাম দিয়েছিলাম। যাতে আপনাদের এমন ভুল ঘটে যে— আমি খুব একটা চিন্তাশীল তত্ত্বকথা বলছি! আমি আপনাদের শুধু এই কথাটা জানাতে চাইছিলাম যে— ইংরেজরা এদেশে এসে বাংলা ভাষা বানালো, আর বাঙালিরা বাংলা ভুললো, তার একটা লাগসই উদাহরণ দিয়ে আমি এ প্রসঙ্গ থেকে সরে আসব। ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবাবিবাহ বিষয়ক দ্বিতীয় প্রস্তাব বাংলা লোকগদ্যের এক মহান নিদর্শন (এই ‘লোকগদ্য’ শব্দটায় আমি আজকে সকালে পৌঁছেছি; গদ্যের তো নানা রকম থাকে; কোন গদ্য সংযোগের গদ্য, কোন গদ্য সাহিত্যের গদ্য, কোন গদ্য উপন্যাসের গদ্য, এরকম অনেক ভেরিয়েশন আছে। ‘লোকগদ্য’ বলতে আমি বোঝাচ্ছি ‘চঁনষরপ চৎড়ংব’। অর্থাৎ, যে গদ্যভাষা আমি জনসাধারণকে বোঝাতে চাই। আজকে সকালবেলায় এই শব্দটা পেলাম যে ‘চঁনষরপ চৎড়ংব’ বলব না, ‘লোকগদ্য’ বলব)। সেই প্রস্তাবটিতে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিঃসঙ্কোচে কবিগানের, খেউরের, আখড়াইয়ের নানা বাগভঙ্গি প্রয়োগ করেছেন; এমনকি প্রচলিত আধুনিক অর্থে অশ্লীল কেচ্ছাও, শেষ অংশটাই তাই। যা থেকে বাংলায় একটা প্রবাদ আছে ‘মাদার গাছ তেল হয়েছে’।

২.

এই বিভ্রাটের ফল কি হলো? বাঙালি বাংলা জানে, কিন্তু চেনে না; ইংরেজরা ইংরেজি চেনে, কিন্তু জানে না। ১৮৫৪ সালে রাধানাথ শিকদার ও প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলায় একটা কাগজ বের করলেন, নাম মাসিক পত্রিকা। পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন অস্পষ্টতা নেই, বাংলায় প্রথম লিটলম্যাগাজিন। এবার উদ্ধৃতি— ‘এই পত্রিকা সাধারণের, বিশেষত স্ত্রীলোকের জন্য ছাপা হইতেছে। যে ভাষায় আমাদিগের সচরাচর কথাবার্তা হয়, তাহাতেই প্রস্তাবসকল রচনা হইবেক। বিজ্ঞ প-িতেরা পড়িতে চান পড়িবেন, কিন্তু তাহাদিগের নিমিত্ত এই পত্রিকা লিখিত নয়।’ সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে লিটলম্যাগাজিনের যে চরিত্রলক্ষণ বিশ শতকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে সেই লক্ষণগুলিকে চিহ্নিত করেছিলেন দুই সম্পাদক। লক্ষণগুলো— এক. উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্পষ্ট। দুই. পত্রিকার বিশিষ্ট একটি ভাষাভঙ্গি আছে। তিন. পত্রিকার স্পষ্ট প্রতিপক্ষ আছে। আজও আমাদের এই বাংলাভূমিতে প্রতিদিন যে অজ¯্র লিটলম্যাগাজিনের জন্ম-মৃত্যু ঘটছে, ঘটে থাকে ও যে লিটলম্যাগাজিন ছাড়া বাংলা সাহিত্যের কোন বিকাশ সম্ভবই নয়; তার প্রত্যেকটিরই এই একটিই নীতি এবং প্রয়োজনবোধ আছে। আজ থেকে ১৬৫ বছর আগে বাংলার প্রথম লিটলম্যাগাজিন মাসিক পত্রিকায় সেটি নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল— এক. ভাষার প্রচলিত ভেদ থেকে বেরিয়ে আসা। দুই. স্পষ্ট পাঠকলক্ষ্য। তিন. স্পষ্ট প্রতিপক্ষ। মাসিক পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকে প্যারীচাঁদ মিত্রের টেঁকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে আলালের ঘরের দুলাল বের হতে শুরু করে। লেখক-পাঠক সবাই এই রচনার অভূতপূর্বতা বুঝতে পারছিলেন। এরকম লেখা যে আগে কখনো লেখা হয়নি, সেটা বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু, তারা কেউই তাদের চেনা কোন আকারের সঙ্গে এর কোন মিল পাচ্ছিলেন না। ভীষণ দরকারী কথা— তারা বুঝতে পারছিলেন এরকম লেখা বাংলায় কখনো লেখা হয়নি। কিন্তু, এটা কিরকম ভাবে লেখা হয়েছে তা বুঝতে পারছিলেন না। উপন্যাসের ধারণাই তখন তৈরি হয়নি। বিজ্ঞ প-িতেরা অর্থাৎ যারা ইংরেজি জানেন— তারা এমন কোন ইংরেজি বই মনে করতে পারলেন না; যে ইংরেজি বই থেকে এটা অস্বচ্ছন্দ বাংলা গদ্যে অনুবাদ গোছের কিছু করা হয়েছে। কেন পারলেন না? যেহেতু, এই বইটির সমতুল্য কোন ইংরেজি বই সত্যিই ছিল না; ও এই বইটির নির্ভেজাল, অনারোপিত, স্বাধীন স্বাদেশিকতা (এই বইটা নিয়ে কেউ বলতে পারবে না— তখনকার বাঙালি সমাজ নিয়ে লেখা নয়। আর, এই বইটা নিয়ে কেউ বলতে পারবে না যে— এটা কোন ইংরেজি বইয়ের নকল। অদ্ভুত ব্যাপার, তাহলে এটা কি? এই কথাটিই পরিষ্কার হয় বইটির নির্ভেজাল, অনারোপিত, স্বাধীন স্বাদেশিকতায়)। আমি অন্য একটি প্রবন্ধে আধুনিক উপন্যাসতত্ত্বের ভিত্তিতে আলোচনা করেছি— কেন আলালের ঘরের দুলাল একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস; ও বাংলার প্রথম উপন্যাস। তাই এখানে এই আলোচনার ভিতর ঢুকছি না। সাধারণত যে যে দোষকে আলালের ঘরের দুলালের দুর্বলতা বলে দেখানো হয়, সেই সবই এই উপন্যাসের গুণ। একটি লিটলম্যাগাজিন ছাড়া এই উপন্যাস বেরতেই পারত না। সাহিত্যপাঠের সমাজতত্ত্বের কার্যকারণে পাঠক এই রচনাকে উপন্যাস বলে চিনতেই পারল না। কারণ, পাঠকের সমাজতত্ত্বে উপন্যাস বলে একটা চেহারা আছে, সাহেবদের লেখা। আর, এ বইটা অন্যরকম। ফলে, ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাহিত্যপাঠের সমাজতত্ত্বের ফারাক হয়ে গেল। এবার, আমি একটু উল্টো দিক থেকে বুঝতে চাই, এ কথাটা খুব দরকারী— কখন একজন লেখকের লেখা প্রকাশের জন্য একটি লিটলম্যাগাজিনেরই প্রয়োজন হয়? দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫), কপালকু-লা (১৮৬৬), মৃণালিনী (১৮৬৯) বঙ্কিমচন্দ্রকে একজন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আজও তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস কপালকু-লা বিশে^র অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। আমি ‘ঐতিহাসিক আখ্যান’, ‘রোমান্স’— এই শব্দগুলি ব্যবহার করতে চাই না। শব্দগুলির ব্যবহারে অপ্রধান বিষয় প্রাধান্য পায়। ঔপন্যাসিকের অবলম্বন ঔপন্যাসিক কল্পনা ও ঔপন্যাসিক কৌশল। এই দুটোই মাত্র অবলম্বন (এই অবলম্বন দুটি পরস্পর সাপেক্ষ নয়। অর্থাৎ, আমার কল্পনা থেকেই যে কুশলতা আসবে তা নয়)। ঔপন্যাসিক কল্পনাই একটি উপন্যাসের অবলম্বন হতে পারে। আবার, ঔপন্যাসিক কল্পনার বিভা বা দীপ্তি বা খনন বা উড্ডয়ন ছাড়াই শুধু ঔপন্যাসিক কুশলতা; তা থেকেই একটি উপন্যাস উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে। ঘটনা, সংলাপ, নিসর্গ বর্ণনা, নাটকীয় বিপরীত, পরম্পরা, মন বিশ্লেষণ, ভঙ্গি বিবরণ, বিশদ বিবরণ— এ সবই উপন্যাসের কুশলতার অংশ। কল্পনা ও কুশলতার মধ্যে বিনিময়ের অসমতা ঘটা খুব স্বাভাবিক। খুব বড় ঔপন্যাসিক সেই অসমতা ধরতে দেন না; যেমন— রবীন্দ্রনাথের চতুরঙ্গ ও যোগাযোগ। ঔপন্যাসিককে অদৃশ্য তুলাদ-ে এই সমতা নিরূপন করতে হয়। কপালকু-লায় বঙ্কিমচন্দ্রের ঔপন্যাসিক কল্পনার বিষয় মৃত্যু। কাপালিক কপালকু-লার অবধারিত মৃত্যুর অবলম্বন। কপালকু-লার ছোট আকার ঔপন্যাসিক কল্পনার সঙ্গে ঔপন্যাসিক কুশলতাকে একেবারে এক করে দিতে পেরেছে। উপন্যাসের রচনা কোন ইচ্ছাধীন প্রক্রিয়া নয়। কোন কোন ঔপন্যাসিকের সারাজীবনেও কল্পনা ও কুশলতার মিল ঘটে না। কারুরবা, একবার বা দু’বার ঘটে। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো আত্মসচেতন ঔপন্যাসিক কপালকু-লার পর মৃণালিনীর ব্যর্থতা বুঝতে পারেন নি; এমন হওয়া খুব স্বাভাবিক নয়। একেবারে গ্রন্থাকারে প্রকাশের ভিতর কিছুটা তো অনিশ্চয়তা থাকেই। বঙ্কিমচন্দ্রের ঔপন্যাসিক কল্পনা ইতিহাস ও কল্পিত কাহিনীর বেষ্টন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষাও বোধ করে থাকতে পারেন। আবার, তিনি তাঁর সমকালের মুখোমুখিও হতে চাইতে পারেন। সময়টা তখন এমনই ক্ষুব্ধ। ভাবতে চাই, বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাসকে সন্দর্ভের আকারের অন্য অবলম্বন দিতে চাইছিলেন। সন্দর্ভ— ডিসকোর্স নয়, অন্য আকার। তাঁর চতুর্থ উপন্যাস বিষবৃক্ষ প্রধানত ডিসকোর্স বা সন্দর্ভ বা প্যাশনের উপন্যাস। এই নতুন আকারের জন্য তাঁর একটি স্বতন্ত্র কাগজের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তিনি বঙ্গদর্শন প্রকাশ করলেন; ও তার প্রথম সংখ্যা থেকেই বিষবৃক্ষ ধারাবাহিক বেরুতে লাগল। বঙ্গদর্শন একটি পুরোপুরি লিটলম্যাগাজিন; তার লক্ষ্য আছে, ভাষা আছে, উদ্দেশ্য আছে ও প্রতিপক্ষ আছে। এমন একটি উদাহরণ সুলভ নয়— যেখানে লেখক তাঁর নিজের প্রয়োজনে একটি কাগজ চাইছিলেন (এই লেখাটা শেষ হওয়ার পরে আমার মাথায় এলো ঐ যে আমি লিখেছি কপালকু-লা হচ্ছে মৃত্যুর উপন্যাস, মৃত্যু তাড়া করে ফিরছে, দুর্গেশনন্দিনীও তাই। বঙ্কিমচন্দ্র মনন দিয়ে বুঝলেন যে আমাদের তো বাঁচতে হবে। মৃত্যুর কাহিনী লিখে কী করে হবে? সুতরাং তিনি জীবনে ফিরে আসতে লাগলেন, চাইলেন। বিষবৃক্ষ থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক, পারিবারিক জীবনের কাহিনী লিখতে আরম্ভ করলেন। এ কথাটাকে আমি আরেকটু বাড়াতে চাই যে— তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে যখন এলেন, তখন সীতারাম, চন্দ্রশেখর, আনন্দমঠ, কমলাকান্তের দপ্তর এবং মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত্র— এগুলো জীবনের কাহিনী। কোন কোনটা জীবনের ঔচিত্য ব্যাখ্যা, দার্শনিক আখ্যান, কোন কোনটি রসিকতার আখ্যান। কিন্তু, তিনি বঙ্গদর্শন বের করেছিলেন তাঁর নিজের প্রয়োজন থেকে, জীবনের কথা বলবেন বলে)। এবারে আমি আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি— প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে। ঠাকুরবাড়ি থেকেই সাপ্তাহিক হিতবাদী বের হতে শুরু করে। এই সাপ্তাহিক কাগজে রবীন্দ্রনাথ একটি করে ছোটগল্প লিখতে শুরু করলেন। একটি কথা এখানে বলে রাখা ভাল যে— ছোটগল্প, এই সাহিত্য প্রকরণটি কে প্রথম আবিষ্কার করেন? তা নিয়ে নানারকম মত দেখা যায়। ছোটগল্প বলতে যদি ছোট একটি কাল্পনিক কাহিনী বোঝায়— তাহলে এই প্রকরণ প্রথম আবিষ্কার করেন রবীন্দ্রনাথ। এডগার এলেন পা নন, কারণ— তাঁর কাহিনী ছোট নয়। চেখব নন, কারণ— চেখব খবরের কাগজে জীবিকার কারণে দেড় কলম করে লিখতেন, সেইটা ধীরে ধীরে গল্পের আকারে আসে। মোঁপাসা নন— সাংবাদিকতার কারণেই। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ; যিনি শিল্পগত কারণে একটা কাহিনী ঐ আকারের মধ্যে লিখলেন। রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন পৃথিবীর সর্বপ্রথম এবং একইসঙ্গে সব সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পকার, ছোটগল্পকার। বাংলা ভাষায় লেখা রবীন্দ্রনাথের ছয়টি গল্প হিতবাদীতে ছয় সপ্তাহে প্রকাশিত হয়। এবং, এগুলিই বিশে^র পূর্ণাকার, প্রথম, নিরূপণেক্ষ ছোটগল্প। কোন উপলক্ষ্য নেই, কোন ছোট ঘটনা না, কোন নকশা না, অত্যন্ত সরলভাবে একটা শিল্পপ্রকরণ। ১২৯৮ এ হিতবাদীতে পরপর তাঁর সাতটি ছোটগল্প বের হয় (হিতবাদীর কোন ফাইল পাওয়া যায় নি, সেজন্য এগুলো একটু আন্দাজে কথা বলতে হয়)। বাংলার পাঠক এমন রচনার জন্য প্রস্তুতই ছিলেন না, তাঁরা এই গল্পগুলি পড়ে উঠতেই পারলেন না। ঐ যা ঘটেছিল আলালের ঘরের দুলাল নিয়ে। এই ব্যর্থতাকেও আমরা সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব বলছি। এই সাতটি গল্প পৃথিবীর যে কোন শ্রেষ্ঠ গল্প সংকলনে সংকলিত হতে পারে। হিতবাদীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে গেল। কিন্তু, তাঁর একটি কাগজের প্রয়োজন; ভ্রাতুষ্পুত্র সুধীন্দ্রনাথকে সম্পাদনার দায়িত্ব দিয়ে সাধনা বের করলেন ১২৯৮ অগ্রহায়ণে (হিতবাদী ছেড়ে দিলেন, হিতবাদী হিতবাদীর মত চলছিল—

হিতবাদীর ওরা বললো যে তোমার কি লেখা বেরুচ্ছে, কেউ কিছু বুঝছে না)। সাধনা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প লেখার কাগজ হয়ে উঠেছিল। সাধনার চার বছরে গল্গগুচ্ছের অনেক প্রধান গল্প প্রকাশিত হয়েছে। কৌতুকের কথাও একটু আছে; রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলি খুবই কম সময়ে, ধরা যাক চার-পাঁচ বছরে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠল যে— নাট্যপ্রযোজক অমরেন্দ্রনাথ দত্ত, তিনি গল্পগুচ্ছ নাম দিয়ে নাট্যাভিনয়ের টিকিটের সঙ্গে সেগুলি বিতরণ করতেন (অন্তত ৫০-৫২ টি গল্প টিকিট বিক্রির জন্য থিয়েটারের টিকিট ঘরে দেয়া হত সংকলন করে, তাহলে জনপ্রিয়তাটা, প্রকরণের জনপ্রিয়তাটা খুব বড় কিছু না, খুব বড় লেখক হেলায় সেটা খেলতে পারেন)। এতগুলো উদাহরণ দিয়ে এটুকুই শুধু বুঝতে চাইছিলাম যে— বাংলা সাহিত্য বা বাংলা ভাষা যখন শিক্ষিত বাঙালির কাছে অবোধগম্য, তখন লিটলম্যাগাজিনই বাংলা সাহিত্যের নতুন বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে এই অবিচলিত লক্ষ্যে যে— তার ভাষা নতুন, লক্ষ্য নতুন ও প্রতিরোধনীয়তার একটা চিহ্ন আছে। লিটলম্যাগাজিন সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের পুরনো তত্ত্বকে বাতিল করে দেয় ও নতুন সমাজতত্ত্বকে সক্রিয় করে তোলে।

[চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা ২০১৯ উপলক্ষে দেবেশ রায়ের বক্তৃতা]

********************************

ঘৃণার ব্যাকরণ
বিষয় : জাতিগত বিদ্বেষ
প্রথম কিস্তি
মহীবুল আজিজ

আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের শোশা উপন্যাসের নায়ক এ্যারন গ্রাইডিংগারকে সহসা এক অপ্রতিরোধ্য ভাবনা চেপে ধরে। ওর পূর্বপুরুষেরা ছয়/সাতশ’ বছর ধরে বসবাস করে আসছিল পোল্যান্ডে। হিব্রু, এ্যারামেইক, ঈডিশ এবং সবশেষে পোলিশ— এক বিচিত্র সাংস্কৃতিক উদ্গম ও আবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল এ্যারনের পূর্বসূরীরা। কিন্তু এতকাল পরে হঠাৎ তার মনে হতে থাকে, পায়ের নিচে থাকা তার পোলিশ মৃত্তিকায় সে পরবাসী। তখন দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের কাল। এর মানে হিটলার, এর মানে গোয়েবল্স্, এর মানে নাজি এসএস-গেস্টাপো, গ্যাসচেম্বার, আউশভিচ-ডাচাউ। যখন হিটলারের সৈন্যরা পোল্যান্ডে ঢুকে পড়ে তখন (এ্যারনের চোখে আমরা দেখি এবং ওর ভাবনার রেখা ধরে আমরাও অনুভব করি) পোলিশরা এই ভেবে উৎসাহ বোধ করতে থাকে, যাক, তাদেরকে আর কষ্ট করে আগ্রাসী হতে হবে না। তাদের হয়ে হিটলারের লোকেরাই পোল্যান্ডের ইহুদিদের মেরে-কেটে সাফ করে দেবে দুনিয়া থেকে। ভাবা যায়! যুগ-যুগ একই রোদ-হাওয়া-জল ভাগাভাগি করে বেড়ে ওঠা প্রতিবেশিত্ব নিমেষে উধাও। কেবল ধর্মে এবং জাতিতে ভিন্ন হওয়ার কারণে ঘৃণার তীব্র অগ্নিতে অন্তরে ঠাঁই দেওয়া হননেচ্ছা তবে কী আকস্মিক কোন ঘটনার পরিণাম! নাকি তারও রয়েছে কোন সূত্রিতা, কোন ঐতিহাসিক পরিণতির ফল!

নয় ঘণ্টার একটা চলচ্চিত্র দেখেছিলাম— ডকুমেন্টেশন ধরনের চিত্র— সোয়াহা। কোথাও পড়েছিলাম, ইতিহাস হলো ক্যানিবালিস্টিক, মানুষখেকো। আর স্মৃতি হলো দুই বিপরীত গতির মধ্যকার দ্বন্দ্বের একটা আবর্ত। একটা হলো বিস্মৃতি যাকে ক্ষতিও বলা যায়। কিন্তু ক্ষতির চাইতেও বড় কথা হলো বিস্মৃতি হচ্ছে অতীতের বিরুদ্ধে সরাসরি রকমের তৎপরতা। পাশাপাশি বা সমান্তরালে চলতে থাকে স্মৃতিতে ধরে রাখবার একটা প্রক্রিয়া, ভুলে যাওয়াটাকে সরিয়ে ক্ষতিটাকে পুষিয়ে নেওয়ার ব্যাপার যেটি। এটা কোন ব্যক্তিগত প্রক্রিয়া নয়, বরং একে বলা যায় যৌথ অবচেতনা। একটা বিপুল সমষ্টির পক্ষে কী একসঙ্গে একটা অতীতকে ভুলে যাওয়া সম্ভব! আবার, এমন যদি হয়, একটা অতীত সম্পূর্ণ নতুন রূপে, বা অন্য এক ছদ্মবেশ নিয়ে পুনরায় আবির্ভূত হলো! আজ থেকে একশ’ বছর আগে সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর স্বপ্ন, টোটেম এবং ট্যাবু বিষয়ক রচনাবলিতে একক এবং যৌথ দুই ধরনের চেতনাকে সমান্তরালে স্থাপন করেছিলেন যেটি কার্ল ইয়ুং-এর যৌথ অবচেতনা সংক্রান্ত রচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে আসে। পোল্যান্ডে এবং পূর্ব-ইউরোপে হিটলারের ইহুদিনিধনের ওপর নির্মিত ফরাসি চলচ্চিত্রকার ক্লদ লাঞ্জম্যানের সোয়াহা ছবিটি দেখলে ফ্রয়েড এবং ইয়ুং দুজনকেই মনে পড়বে। যে-লোকটি সিঙ্গারের উপন্যাসে বসে-বসে ভাবছিল, বেশ মজাই হবে, ইহুদিরা সব মারা পড়বে— সে-লোকটি কী আসলে একা নাকি সে আরও এক বড় সমষ্টির প্রতিনিধি! ছবিতে একজন নাপিতের সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছিল যে গ্যাসচেম্বার থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারে। তাকে আসলে বাঁচিয়েই রেখেছিল হিটলারের সৈন্যরা। ওর কাজ ছিল ইহুদি মেয়েদের চুলের গোছা ধরে দশ সেকেন্ডের মধ্যে একেকটা মেয়ের মাথা থেকে যতটা সম্ভব চুল কেটে নেওয়া। চুলটা হলো প্রমাণ। হত্যার সাক্ষ্য এবং সংখ্যার হিসাব পরিমাণে। সেই চুল বস্তাভর্তি হয়ে চলে যেত জার্মানিতে এবং সেটা দেখে হিটলার এবং তার দল জানতো, কত-কত নারীকে হত্যা করা হলো, মানে ছাইয়ে পরিণত হলো কত ইহুদি মানব। কোথাও কোন কাগজে বা দলিলে হিটলার এমন হত্যাযজ্ঞের আদেশ দেন নি কিন্তু ইতিহাসের ভয়াবহতম হত্যাযজ্ঞ ঘটে গেল নির্বিবাদে। কাগজ-কলম বা দলিলের চাইতেও ভয়ংকর হতে পারে অদৃশ্য আদেশ ও নিয়ন্ত্রণ।

সবকিছুর মূলে ঘৃণা। এতগুলো শতাব্দী একসঙ্গে পাশাপাশি থেকেও সেই ঘৃণাকেই তীরের মত লক্ষ্যভেদী করে রেখেছে মানুষ। সাত-আট হাজার বছর আগে মানুষই ব্যাবিলনে কাঠের সম্পদ নিয়ে একে অন্যকে হত্যা করেছে পরস্পর একই জাতির লোক হওয়া সত্ত্বেও। গ্রিস আর পারস্য একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তীব্র উন্মাদনায়। পেলোপনেশিয় যুদ্ধের কথা ধরা যাক। কিংবা রোমানরা যে কার্থেজ জাতিকে রক্তগঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে পতাকা ওড়ালো বিজয়ের। আলডুস হাক্সলি তাঁর  ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড-এ বলেছিলেন, জন্তজানোয়ার নয়, একমাত্র মানুষই পারে খুব সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিতভাবে খুন করতে মানুষকে। তাই রক্তে যে বীজ সে বীজ হন্তারকের। তার চাই একটা কারণ আর উপযুক্ত প্রতিবেশ। সে ঠিক-ঠিক রক্তের ইতিহাস তৈরি করবার জন্যে প্রস্তুত। একই গায়ের রঙ, রক্তেরও কিন্তু যুগ-যুগ পাশে থাকা একে অন্যকে খুন করতে হাত কাঁপে না। নাইজেরিয়ায়— ইউরোবা, গিকুয়ু আর হোক্সাফুলানি। এই যে তিনটে সত্তা একটা সমধর্মী মানবম-লীকে পৃথক করে দিল সেই পৃথকতা রক্তময় পরিণতিতেই শেষে রচনা করলো এপিলোগ। ভারতবর্ষে— হিন্দু-মুসলিম রক্তের ইতিহাস ভয়াবহ ঘৃণার বৃত্তান্ত হয়ে রয়েছে আজও। ইউক্রেনে— বোগ্দান শ্মিয়েলনিকির দল ইহুদি রক্তে সার্থক করে তুলল তাদের পতাকা। একই ধর্মের অনুসারী কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বাঙালিকে। এই তো সেদিন— সিকি শতাব্দীকাল আগেকার ঘটনা। সার্বিয়রা ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞে মেতে অসংখ্য বসনিয় নর-নারী-শিশু হত্যা করলো সভ্য বিশে^র পটভূমিতেই। মনে করা যাক দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস। ঘৃণা বর্ণবাদ হয়ে জাতিগত বিদ্বেষের রক্তরঞ্জিত ছাপ রেখে গেছে মানুষেরই মানচিত্রে। পৃথিবী যতই সভ্য হোক না কেন ঘৃণার ব্যাকরণ যেন তার সভ্যতার এক অনিবার্য ভাষা-প্রকরণ। বহু-বহু প্রাচীন কালের গর্ভে নিহিত সেই শেকড়।

বিশে^র সভ্যতাগর্বী দেশগুলো যখন জাতিবিদ্বেষের সংকীর্ণতার কাদায় নিজেদের আটকে থাকা পা’কে কোনভাবেই ছাড়িয়ে আনতে পারে না তখন তাদের ধন-সম্পদ-বিজ্ঞান-সভ্যতা সবকিছু ম্লান-বিবর্ণ মনে হয়। অথচ তারাই ফের জাতি-সম্মিলনের আসনে বসে কর্তব্য ঠিক করে ভবিতব্যের। জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, রাশিয়া, ইউক্রেন, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া— কে নয়! পোল্যান্ডের ক্র্যাকফ গ্রাম কেবল পোলিশ জাতির জন্যেই গর্ব ছিল না। সমগ্র ইউরোপে এখানকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের মনীষা প্রতিনিধিত্ব করতো একদা। সেই ক্র্যাকফের ঐতিহ্যকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে গেস্টাপোর দল। যেহেতু ক্র্যাকফের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অধিকাংশ অবদান ইহুদিদের। সোয়াহা-ছবির সেই নরসুন্দরের কথা মনে পড়ে। পোলিশরা বলতো, ইহুদি মেয়েরা সুন্দর, ইহুদিরা অনেক মেধাবী, ইহুদি লোকেরা ব্যবসায়ক্ষেত্রে তীক্ষèবুদ্ধিসম্পন্ন হয়। এগুলো মানুষের দোষ হতে পারে সেটা এই প্রথম জানা গেল। আর তখন বহুকাল আগেকার একটি লোক শাইলক যার নাম, সটান দাঁড়ায় সামনে। হ্যাঁ, উইলিয়ম শেক্সপিয়র তার ¯্রষ্টা। এখন মনে হয়, একা শেক্সপিয়র নয়, জাতিতে ইহুদি শাইলকের ¯্রষ্টা ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানেরাই। গোটা দেশের মালিক খ্রিস্টানেরা অথচ একজন অমানবিক ব্যবসায়ীর চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলবার জন্যে প্রয়োজন পড়ল শেক্সপিয়রের একজন সংখ্যালঘু ইহুদি লোক। শেক্সপিয়রের সমকালে ইংল্যন্ডের মূল শহরে ইহুদিদের প্রবেশাধিকার ছিল নিয়ন্ত্রিত। সূর্যোদয়ের সঙ্গে-সঙ্গে তারা ঢুকতো শহর এলাকায় এবং বেরিয়ে যেতো সূর্যাস্তের সঙ্গে-সঙ্গে। তাদের প্রস্থানের পর গোটা এলাকাটা ঝাড়– দিয়ে জল ছিটিয়ে পবিত্র করা হতো। এবারে আমরা ধীরে-ধীরে ইতিহাসের, ভাল করে বললে নির্মম ইতিহাসের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারি।

উনিশ শতকে ইংল্যন্ডের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আধুনিকতার দৃষ্টিভঙ্গি চার্চের রক্ষণশীল আধিপত্যবাদের কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্যতা পায় নি। জমিদার শ্রেণি থেকে শুরু করে পূর্বেকার চার্চের সুবিধাভোগী সকল শ্রেণিই খ্রিস্টিয় আশীর্বাদপুষ্ট ক্ষমতা হারানোটাকে মেনে নিতে নারাজ ছিল। সবচাইতে বড় কথা চার্চের নিয়ন্ত্রণমুক্ত ‘সুশীল’ সমাজে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের আগমনটাকে তারা ভালভাবে নেয় না। কেননা, ইহুদিরা ছিল তাদের দৃষ্টিতে ঘৃণ্য। যে-সময়টাতে ইংল্যন্ডে ইহুদিরা আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজেদের অঙ্গীভূত করে নিচ্ছিল প্রকারান্তরে তখনও পূর্ব ইউরোপিয় দেশগুলোতে ইহুদিরা প্রাচীন ধরনের জীবনযাপনের বৃত্তে বন্দি। বস্তুত ইংল্যন্ডীয় রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় ইহুদিদের চাইতেও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিল উদারনীতিবাদ, শিল্পায়ন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এইসব। কাজেই পুরনো এবং নতুনের সন্ধিক্ষণে ‘ইহুদি’-ধারণাটা একটা বিভাজনরেখা হয়ে দেখা দিল সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বলে পরিগণিত ইংল্যন্ডে।

১৮৭৯ সাল— বিসমার্কের নতুন জার্মানির কথা ধরা যাক। ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া এবং ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধ করে এরিমধ্যে জার্মানি প্রভূত ক্ষতির অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। যারা বড়-বড় জমির মালিক তারা চাইল পুরনো নিয়ম-কানুন বজায় থাকুক। আর ন্যাশনাল লিবারেল পার্টির আধুনিকপন্থীরা চাইল শিল্পায়নের কৌশলকে আশ্রয় করে এগোতে। শিক্ষিত মধ্যশ্রেণি শিল্পায়নের সঙ্গে-সঙ্গে ইউরোপিয় আঙিনায় শিল্প-সংস্কৃতির জগতে নিজেদের পরিচয়টাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবার পক্ষপাতী ছিল। আর সাংস্কৃতিক অগ্রগামিতার সমান্তরালে রাজনৈতিক পরিচয়টাও যে জার্মানিকে ইউরোপের জাতিসমূহের মধ্যে একটা সম্মানজনক আসনে দাঁড় করাবে সে-বিষয়ে বুদ্ধিজীবী-শ্রেণি ছিল সচেতন। এখানে একটা বিষয় লক্ষ করা দরকার। ইংল্যন্ডের সঙ্গে জার্মানির রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় বেশ পার্থক্য ছিল। ইংল্যন্ডে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মত সরকারপ্রধান তথা প্রধানমন্ত্রীর জন্যে অনিবার্য ছিল। কিন্তু জার্মানিতে স¤্রাটের মত হলেই চলতো। ইংল্যান্ড তখন ‘ম্যানচেস্টারিজম’ বা মুক্ত বাণিজ্য এবং ‘ওয়েস্টমিনিস্টার’-গণতন্ত্রের বদৌলতে বিশ^সভায় চালকের আসনে। অন্যদিকে স্বয়ং বিসমার্ক এবং বৃদ্ধ স¤্রাট প্রথম উইলিয়ম দুজনের কারুরই উপর্যুক্ত দুটি ধারণার একটিও পছন্দ ছিল না। ১৮৭৯-র দিকে বিসমার্ক মোটামুটিভাবে নিজের অবস্থানকে মজবুত করবার ফলে নিজের মত করে এগোবার পথ খুঁজে পান। তাঁর জন্যে দু’টি করণীয় অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। প্রথমত, রাজতন্ত্রের ক্ষমতা যাতে রাজার হাতেই থাকে, সংসদের অভিমুখে যেতে না পারে। গেলে সেটা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিসমার্কের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পক্ষে অনুকূল না-ও হতে পারে। দ্বিতীয়ত, অর্থের নির্ভরতা। তাঁর অর্থের যোগান আসতো ভিন্ন-ভিন্ন প্রদেশের অনুদান থেকে। কিংবা তার সঙ্গে যোগ হতো সংসদীয় অনুদান। বিসমার্ক চাইলেন একটা বিশেষ ধরনের কর আরোপ করে সেই উপার্জনে তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি শক্তিশালী করে তুলবেন। কিন্তু ছোট-ছোট রাজনৈতিক দল যেগুলো সেন্টার পার্টির মূল উপাদান যেমন জাতীয়তাবাদী এবং ক্যাথলিক দল— বিসমার্কের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না।

বিসমার্কের জন্যে কার্যত সহায়ক ভূমিকা বয়ে আনে ফ্রান্স। বিসমার্ক ১৮৭০-এর যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ফ্রান্সের নিকটে ২০ কোটি পাউন্ড দাবি করেন এবং ফ্রান্স তিন বছরের মধ্যেই বিসমার্কের দাবি পূরণ করে দেয়। এই অর্থ একটা প্রলয়ংকরী আবর্তের সৃষ্টি করলো জার্মানিতে। পুঁজির স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের নিয়মে অর্থনীতির যে-স্বাভাবিক স্থিতাবস্থা গড়ে উঠবার কথা তার পরিবর্তে ফ্রান্স থেকে আসা ২০ কোটি পাউন্ডের দমকা হাওয়ায় জাগলো এক অর্থনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত। ১৮৭৩ সালের মে মাসের দিকে অবস্থা দাঁড়াল শোচনীয়। সর্বনাশ দেখা দিল পুরনো জমিদারশ্রেণির এবং তারা সেই সর্বনাশের দায় চাপিয়ে দেয় উদারনীতিবাদী শিল্পপতি আর ব্যাংকারদের ওপর। তারা বিসমার্কের সরকারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে যেহেতু বিসমার্কের সঙ্গে শিল্পপতি এবং ব্যাংকারদের সংযোগ ছিল ইতিবাচক। একই সঙ্গে তাদের চক্ষুশূল হয়ে যায় ধর্মনিরপেক্ষ, উদার ও মুক্ত চিন্তার অনুসারী মানুষজন। সবচেয়ে খারাপ হলো ক্যাথলিকদের সঙ্গে বিসমার্কের সম্পর্কের ব্যাপারটা। বিসমার্কের সময়কার জার্মানিতে প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ক্যাথলিকদের সংখ্যানুপাত ছিল যথাক্রমে ২ ঃ ১। রাজ্যের কেন্দ্র ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট প্রুশিয়া। উত্তর ও পশ্চিম দিককার ক্যাথলিকপ্রধান অংশগুলোতে ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা। ক্যাথলিকপ্রধান অস্ট্রিয়াকে জার্মান স্বার্থ থেকে বাইরে রাখাটাকে তারা অপছন্দের চোখে দেখে। ১৮৭০-এ ভ্যাটিকান কাউন্সিলের পর থেকে ব্যাপারটা বিসমার্ককে ভাবিয়ে তোলে। পরিস্থিতির উন্নয়নকল্পে তিনি আশ্রয় নিলেন চরম পন্থার। বস্তুত এরকম চরম পন্থার নজির দুর্লভ। রক্ষণশীলদের লক্ষ করা বিসমার্কের এ-আঘাত ইতিহাসে ‘কুর্ল্টুকাম্ফ’ নামে পরিচিত। এর প্রভাব বেশ কয়েক বছর বিদ্যমান থাকে। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সদস্যরা শুধু নয় বৃদ্ধ-সর্বমান্য বলে কথিত বিশপ-প্রিস্ট কেউই রেহাই পেলেন না। মোটকথা ক্যাথলিকদের সঙ্গে চ্যন্সেলরের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেল।

১৮৭৩ এর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে বেশ বড়সড় আঘাতের সম্মুখীন হলো ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা। জার্মানির ব্যবসা-বাণিজ্যে ঐতিহ্যগতভাবেই প্রাধান্য ছিল ইহুদিদের। ন্যাশনাল লিবারেল পার্টির দু’জন বিখ্যাত নেতা ছিলেন ইহুদি— এডুয়ার্ড ল্যাস্কার এবং লুড্ভিগ ব্যাম্বার্গার। জার্মানির একটা প্রভাবশালী পত্রিকার মালিক ছিলেন গোঁড়া-রক্ষণশীল অগাস্টাস রোলিং। ইনি ছিলেন আরেক নামকরা রক্ষণশীল ফাদার কাফলিনের পূর্বসূরী। রোলিংয়ের দৃঢ় বিশ^াস ছিল, সবকিছুর মূলে আসলে ইহুদিরা। ১৮৭৯-র দিকে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে তেমন কিছুই ঘটলো না কিন্তু হঠাৎ করে সমগ্র জার্মানিতে এমন একটা প্রচারণা ভিত্তিমূল হয়ে গেল, ন্যাশনাল লিবারেল পার্টি মানেই ইহুদিদের দল। বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাস সৃষ্টি হলো। খ্রিস্টানরা সব বিপর্যয়ের মূল হিসেবে দায়ী করতে লাগলো প্রতিপক্ষ ইহুদিদের। বস্তুত বিসমার্ক এর জন্যে দায়ী ছিলেন এমনটা বলা মুশকিল। অর্থনৈতিক মন্দার কালে তাঁর দুঃসময়ে সংসদীয় ব্যবস্থায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিখ্যাত ইহুদি সদস্যদের অবদান ছিল। ল্যাস্কার এবং ব্যাম্বার্গারের সঙ্গেও বিসমার্কের ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তাছাড়া অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন বিখ্যাত ইহুদি ব্যাংকার ব্লাইখরোডার-এর। কিন্তু প্রচারণার লক্ষ্যটাই ছিল যেভাবেই হোক ইহুদিদের আক্রমণ। বস্তুত বিসমার্কের জার্মানিতেই ইহুদিবিদ্বেষ বা জাতিবিদ্বেষের আনুষ্ঠানিক তথা দৃশ্যমান সূচনা।

ইহুদিবিদ্বেষের সূচনার জন্যে হয়তো বিসমার্ক প্রত্যক্ষভাবে দায়ী নন কেননা, প্রগতিশীল গোষ্ঠির লোকেদের কথা মনে রেখে তিনি যে রাজকীয় সংবিধান পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেন  সে-সংবিধানের প্রণেতা ছিলেন ধর্মান্তরিত ইহুদি কার্ল রুডল্ফ ফ্রিডেন্থাল। আরেকজন ছিলেন ফ্রিডরিখ জুলিয়াস স্টাল— তিনিও একজন ধর্মান্তরিত ইহুদি, কনজারভেটিভ পার্টির একজন প্রতিষ্ঠাকারী। বিসমার্ক দলটির সমর্থন কামনা করেছিলেন তাঁর প্রয়োজনের সময়। আরেকজন ইহুদি ছিলেন যাঁকে ১৮৭৯ সালে আইন-মন্ত্রী করা হয়— এমিল ফন ফ্রিড্বার্গ। ইহুদিবিদ্বেষী পুরো ব্যাপারটাই ছিল মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যচালিত। এর সঙ্গে ধর্মীয় গোষ্ঠি হিসেবে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের ঘৃণার চোখে দেখার বিষয়টা সক্রিয় ছিল না। কিন্তু রাজনীতির এমনই বদস্বভাব, সে ঠিকই সুযোগ পেল একটা অস্ত্রে শাণ দেবার এবং শাণ দিয়ে সেটাকে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবার। জার্মান রক্ষণশীলরাই মূলত এর জন্যে দায়ী। তাদের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হলো ইহুদি-বিরোধী দল (এ্যান্টিসেমিটিক লিগ)। তারা দলপতি হিসেবে খুঁজে পেল একজন ঝানু লুথারিয়ানকে। পেশায় চ্যাপলেন এ্যাডল্ফ্ স্টয়িকার যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ক্রিশ্চিয়্যান সোশ্যাল ওয়ার্কিংমেন্স ইউনিয়ন। রক্ষণশীলদের নিকটে স্টয়িকারের আধা-সমাজতন্ত্রী ইহুদিবিরোধিতা, যেটির পুঁজি ইহুদিরা— ততটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। স্টয়িকার স্বয়ং সংসদে বসেন রক্ষণশীলদের সঙ্গে। তারা দেখল স্টয়িকারের মধ্যে সমাজতন্ত্রের গন্ধ থাকলে থাকুক, কিন্তু মার্ক্স এবং লাসাল-এর প্রবর্তন করা ‘ইহুদি রোগে’র বিরুদ্ধে তাকে তো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। মোট কথা ইহুদিরা যে প্রতিপক্ষ সেটা প্রতিষ্ঠিত করবার একটা পর্ব উদযাপন করা গেল। ইহুদিবিরোধিতা আরও একটি দলকে নিকটে নিয়ে এলো বিসমার্কের যেটির সমর্থন তাঁর প্রয়োজন— রোমান ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট কনজারভেটিভ। আরেক দিকে থাকলো ইহুদিদের পরিচালনায় উদারনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষদের দল। ঘটনার আরও দিক লক্ষণীয়— হয়তো সমাপতনই। বিসমার্কের ক্যাথলিকবিরোধী আইন প্রণয়নের কা-ারী ছিলেন হাইনরিখ ফন ফ্রিডবার্গ, ধর্মে ইহুদি। তিনি আবার আইনমন্ত্রীরই ভাই। তিনি বহু বছর আগে ইহুদি থেকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হ’ন— ক্যাথলিক নয়, তিনি নেন প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ। পুরো ব্যাপারটা এক ধরনের জট পাকিয়ে গেল। স্টয়িকার এবং খ্রিস্টান সমাজতন্ত্রদের নিকটে ইহুদিরা ছিল একটা অর্থনৈতিক শ্রেণি। আবার, রোলিং এবং রোমান ক্যাথলিকদের নিকটে ইহুদিরা একটা ধর্মীয় শ্রেণি। অন্যদিকে, বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা হাইনরিখ ফন ট্রাইট্স্খে এবং কনজারভেটিভ বুদ্ধিজীবীদের নিকটে ইহুদিরা একটা জাতি। আসলে ইহুদিদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ এসব তৎপরতার লক্ষ্য যতটা না ছিল ইহুদি ধর্মের বিরুদ্ধে তারও অধিক ছিল উদারনীতিবাদের ধারণার বিরুদ্ধে। ১৯১৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত জার্মানির রাজনীতিতে ইহুদিকেন্দ্রিক তৎপরতা প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের বিষবাষ্প ছড়ানোর কাজ করতে থাকে। এর ফলে জার্মানির রাজনীতিতে প্রগতিশীল ধারণার অনুসারী মানুষ এবং দলের সাফল্য হয়ে পড়ে সুদূরপ্রসারী। নোংরা রাজনীতি, সন্ত্রাস আর বিশ্রী ভাষার ব্যবহার কায়েম করে রাজত্ব। ১৯১৮ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রের এবং মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকার ফলে পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি ঘটে কিন্তু ইহুদি-বিরোধিতার আবহ পুরোপুরি বিদূরিত হয়ে গিয়েছিল এমনটা বলবার উপায় থাকে না।

অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ক্ষেত্রেও বলা যায়, বৃত্তান্ত প্রায় সমধর্মী। বরং দ্বৈত রাজতন্ত্রের মধ্যে সেটা ভিন্ন মোড়কে উপস্থিত হলো। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সা¤্রাজ্য ছিল এক নড়বড়ে ধরনের রাজত্ব। এর সীমানার মধ্যে ছিল অস্ট্রিয়া এবং বোহেমিয়ার সীমান্তে জার্মানরা, বোহেমিয়ার দিকে চেক-রা এবং গ্যালিসিয়া সীমান্তে মোরাভিয়, স্লোভাক এবং পোলিশরা আর ছিল হাঙ্গেরিয়রা এবং উত্তরের বিভিন্ন স্লাভিক জাতির গোষ্ঠি। যে-সময়টাতে এখানে জাতিগত বিদ্বেষের সঞ্চরণ তখন ফ্রাঞ্জ জোসেফের একচ্ছত্র রাজত্ব। ১৮৪৮ সালের এক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাঁর ক্ষমতায় আরোহণ এবং ১৯১৬ সালে প্রথম মহাসমরের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর মৃত্যু। আর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইউরোপের মানচিত্র থেকে মুছে যায় ‘অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি’। জার্মানির মত অস্ট্রিয়া-হােিঙ্গরিতেও উনিশ শতকের মধ্যভাগে একটা শহুরে, মধ্যশ্রেণি-নিয়ন্ত্রিত, উদারনৈতিক, প্রগতিশীল দল ক্ষমতা লাভ করে। জার্মানির মত এখানেও এবং আরও জটিলভাবে জাতিবিদ্বেষ ছড়ানো হয় রাজনৈতিক দলটির বিরোধিতার মাধ্যমে। প্রগতিশীলদের লক্ষ্য ছিল একটা আধুনিক, উদারনৈতিক, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র গড়ে তুলতে। যার ফলে পুরনো সংস্কারকে হটিয়েই শুধু নয়, জার্মানির মতন এখানেও সংঘাতমূলক আধুনিক জাতীয়তাবাদের বিপরীতে একটা প্রশস্ত আঙিনা গড়ে উঠবে। জাতীয়তাবাদীরা জার্মান প্রাধান্যের ধারণাকে বাদ দিয়ে কোন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অনুমোদন করবার পক্ষে ছিল না। আবার, জার্মান রক্ষণশীলরা ছিল উদারনীতিবাদের বিরুদ্ধে। হাঙ্গেরি চাইল সম্পূর্ণ স্বাধীনতা— হাঙ্গেরিয়দের জন্যে যেখানে তাদের সংখ্যালঘুদের ওপর অন্য জাতীয়দের নয়, নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদের। কাজেই সেখানে রক্ষণশীলেরা চাইল কেন্দ্রীয় শাসন এবং প্রগতিশীলেরা ফেডারেলিজম কিংবা অন্তত স্লাভ ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের প্রতি নমনীয় আচরণ। আর কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চ্যান্সেলরের  দায় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিতেও সংসদের প্রতি নয়, ছিল স¤্রাটের প্রতি, ঠিক জার্মানির মতন। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বিপুল হওয়ার কারণে তিনি চাইলেই বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বাঁধিয়ে দিতে পারতেন। সেটা সম্ভব ছিল জার্মানিতেও। সেই দ্বান্দ্বিক প্রবাহের মধ্যে প্রগতিশীলদের শত্রুপক্ষের জন্যে একটা ট্রাম্পকার্ড হলো ইহুদিবিরোধিতার বিষয়টি। তারা তাদের নিজেদের স্বার্থে ইস্যুটাকে নিজেদের মত করে ব্যাখ্যা করবার পক্ষপাতী।

তবে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয় ইহুদিবিদ্বেষের বিষয়টার ভিন্ন মাত্রিকতা লক্ষ করা দরকার। ১৮৭৮ সালের দিকে ফ্রান্সে বঁত্যু নামক একজন ‘খ্রিস্টান’ পুঁজিপতি ‘ইউনিয়ন জেনারেল’ প্রতিষ্ঠা করে ব্যাংকটাকে একটা ‘খ্রিস্টান’ ব্যাংক হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলেন। এর লক্ষ্য হলো ‘ইহুদিদের আন্তর্জাতিক প্রভাব’-এর পাল্টা জবাব। আসলে ইহুদি মানে সে সময়কার রাজনৈতিক প্রভাবশালী রথচাইল্ড যারা অর্থনৈতিকভাবেও সমান শক্তিশালী। অভিজাত শ্রেণি এবং রোমান ক্যাথলিকদের ক্ষমতাবান লোকেরা বঁত্যু’র পরিকল্পনাকে সমর্থন যোগালো। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকের শেয়ারের অবনতি ঘটতে থাকে এবং ১৮৮২ সালের দিকে প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যায় এর সঙ্গে সংযুক্ত সকলকে আর্থিক সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিয়ে। অবনতি এবং বিপর্যয়ের পুরো ব্যাপারটার জন্যে দায়ী করলে করতে হয় মূল মালিক বঁত্যুকে কিন্তু আর্থিক বিপর্যয়ের শিকার লোকেদের ধারণা হলো, ইহুদি ঈর্ষা এবং শত্রুতার ফলেই তাদের এমন আর্থিক ক্ষতি। এদেরই একজন দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো, যে-করেই হোক এ-ব্যাপারটার প্রতিশোধ নিতে হবে। তিনি হলেন ফ্রান্সের সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার কঁৎ দ্য শামবোঘ-এর অস্ট্রিয় স্ত্রী আর্ক-ডাচেস মারিয়া থেরেসা। এরিমধ্যে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে আরেক অস্ট্রিয়’র সঙ্গে যিনি ছিলেন বঁত্যু’র সহকর্মী এবং সহযোগী— রিটার ফন যারবোনি ডি স্পোরেটি। ১৮৮১ সালে মারিয়া তাঁকে কাগজপত্র দিয়ে বিশেষ নির্দেশনাসমেত জার্মানি পাঠান। উদ্দেশ্য সেখানকার ইহুদিবিরোধী কৌশল এবং তৎপরতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানলাভ এবং সেগুলো ভাল করে অধ্যয়ন করে আসা। ফিরে আসেন যারবোনি এক গাদা টীকাভাষ্য-রচনাবলি আর ভাবধারা সঙ্গে নিয়ে। একই সময়ে চার্চ-অধিভুক্ত এক অস্ট্রিয় যুবরাজের ওকালতিতে রাজকীয় সরকার জার্মানির কুখ্যাত এক ইহুদিবিরোধী রোমান ক্যাথলিক লেখককে প্রাগ বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিলেন। তাঁর নাম অগাস্টাস রোলিং। তিনি উনিশ শতকের ইহুদিদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মকা-কে নয়, ইহুদি-টালমুড গ্রন্থেরই প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন। আসলে তাঁর কোন হিব্রু-বিদ্যাই ছিল না। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিককার ভয়ংকর রকমের ইহুদিবিদ্বেষী রচনা য়োহান আন্দ্রিয়াস আইজেনমেঙ্গার-এর ‘জুডইিজম রিভিল্ড’-এর প্রতিধ্বনিই ছিল তাঁর অবলম্বন।

এভাবেই সমস্ত আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষীয় এবং রক্ষণশীল লোকেদের মধ্যে ও তাদের একজোট করে একটা যোগসাজশ গড়ে তোলা যেটা তখন প্রেসিডেন্টের জন্যে খুবই প্রয়োজন ছিল। বঁত্যু’র অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ব্যাপারটা তাদের স্মৃতিতে গাঁথা। তাদের বিশ^াস এবং লক্ষ্য হলো, অস্ট্রিয় ভূমিকে ইহুদি ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এই শোরগোলের ফলে কাজ হলো— ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়্যান সোশ্যালিস্ট দলকে কাছে টেনে আনা গেল। এই দলটা বলতে গেলে জার্মানিতে ইহুদিবিদ্বেষ ছড়ানোর মূল কা-ারী প্রোটেস্ট্যান্ট ক্রিশ্চিয়্যান সোশ্যালিস্ট দলেরই অনুরূপ। অস্ট্রিয়া থেকে এবার যারবোনি তাঁর কর্মতৎপরতা রপ্তানি করলেন হাঙ্গেরিতে। হাঙ্গেরিয় এক সংসদ সদস্য গেজা ফন ওনোডি’র সঙ্গে যারবোনি’র আগেভাগেই যোগাযোগ ঘটে। প্রথম প্রকৃত যুদ্ধটা হয় হাঙ্গেরিতেই। যুদ্ধটা হলো অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয় সা¤্রাজ্যের বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক ইহুদিবিদ্বেষের মূল ভাবটাকে আঘাতের যুদ্ধ। ইহুদিবিদ্বেষীদের অস্ত্রটা ছিল সেই প্রাচীন ধারণার আশ্রয়ী। মধ্যযুগে প্রচলিত ধারণা ছিল, ইহুদিরা তাদের ‘পাসওভার’-আয়োজন উপলক্ষ্যে খ্রিস্টানদের হত্যা করে তাদের রক্ত দিয়ে উৎসবের রুটি তৈরি করে। এটা আসলে উনিশ শতকের উদার, ধর্মনিরপেক্ষ এবং শিল্পমনস্ক জনগোষ্ঠির চেতনাকে আঘাত করবার একটা কৌশল। প্রথমটায় ভাবা গিয়েছিল, বিদ্বেষীদের প্রচারণায় কাজ হচ্ছে।

১৮৮২ সালের ১ এপ্রিল, ইহুদিদের পাসওভার-উপলক্ষ্যের চারদিন আগেকার ঘটনা। গেজা ফন ওনোডি যে-শহরটায় থাকতেন সেই তিসা এসলার-এর অধিবাসী একটা মেয়ে এস্থার সলিমোসি নিখোঁজ হয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ ওনোডি প্রচার করতে শুরু করলেন, ইহুদিরা ধর্মীয় ব্রত পালন করবার উদ্দেশ্যে হত্যা করেছে মেয়েটাকে। সিনাগগের তত্ত্বাবধায়ককে গ্রেফতার করে থানায় চালান দেওয়া হলো। ওর পাঁচ এবং চৌদ্দ বছর বয়েসী মেয়ে দুটোকে তাদের বাবা’র কৃত্য সম্পর্কে বোঝানো হলো— তাদেরকে গল্পের মত করে বুঝিয়ে দেওয়া হলো, তাদের বাবা কিভাবে অপরাধটা সংঘটিত করেছে। মেয়েদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা সেভাবে সেটা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপন করে গেল। কিন্তু ওনোডি এবং তাঁর বন্ধুদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, ঘটনার খুঁটিনাটি বিষয়ে তারা অতটা সচেতন ছিল না। মেয়েরা বললো, ওরা ঘরের দরজার চাবি’র ছিদ্র দিয়ে পুরো ঘটনাটা দেখেছিল। এখন চাবির ছিদ্র দিয়ে দেখা ঘটনা এবং বাস্তবে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে ফারাকের কারণে বিসমিল্লাতেই গলদ ধরা পড়লো। কোনভাবেই প্রমাণ করা গেল না, এস্থার আসলেই খুন হয়েছে কিনা। মেয়েটা শুধু নিখোঁজই হয়েছিল। তবে ভাগ্যের চাকা ঘোরে ফের ওনোডির দিকেই। অল্প পরেই নদীতে একটা মেয়ের মৃতদেহ পাওয়া গেলে এস্থারকেন্দ্রিক ঘটনা ফের চাড়া দেয়। ওনোডির অভিযোগের সূত্র ধরে এরিমধ্যে বেশ কয়েকজন ইহুদিকে জেলখানায় বন্দি করা হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা গেল, নদীর মৃতদেহটি এস্থারের চাইতে কয়েক বছরের বড় এবং তার শরীরে ছুরিকাঘাত বা হত্যার জন্যে করা রক্তপাতেরও কোন চিহ্ন নেই। তা সত্ত্বেও বিচারের কাজ চলতে লাগলো এবং বেশ কয়েক মাস ধরে গোটা দেশ উত্তেজিত হয়ে থাকলো এস্থার-কা-ে। এক বছরেরও অধিককাল পরে যখন আসল ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ পেল তখন মামলাটা উঠিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়ে গেল। কিন্ত অনেকগুলো হতভাগ্য ইহুদি তখনও কারাবন্দি। শেষপর্যন্ত হাঙ্গেরিতে ইহুদিবিদ্বেষ হালে পানি পেল না কিন্তু ব্যাপারটার মোড় ঘুরে গেল ভিন্ন পথে। জার্মানিতে আয়োজিত ইহুদিবিদ্বেষী জনসভায় ‘হত্যার শিকার’ মেয়েটার একটা তৈলচিত্র প্রদর্শন করা হতে থাকলে দলে-দলে লোকেরা তার প্রতি মনোযোগী আর সমবেদনাপ্রবণ হয়ে উঠতে থাকে।

একদিকে হাঙ্গেরিতে বিষয়টা নিয়ে হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছায় ইহুদিবিদ্বেষীরা। ওদিকে অস্ট্রিয়াতে প্রফেসর রোলিংয়ের আচরণের পরিণামে লোকেরা বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিতে থাকে। প্রফেসর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যান এস্থার সলিমোসি’র ‘হত্যাকারীদের’ মুক্তিতে। যখনই কোন ফুরসৎ হয়, তিনি জোরগলায় বলতে থাকেন, এস্থার-হত্যার সমস্ত প্রমাণ রয়েছে হাতের নাগালে, তাকে ইহুদিরাই হত্যা করেছে ধর্মীয় ব্রত পালনের উদ্দেশ্যে। অস্ট্রিয়া’র বিচারকেরা ছিলেন জ্ঞানী-শিক্ষিত। প্রফেসরকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে সহায়তা করবার মত লোকও আর খুঁজে পাওয়া গেল না। কিন্তু তারপরেও ক্ষান্ত হ’ন না রোলিং। বইপত্র-প্যাম্ফলেট ইত্যাদি ছেপে প্রচার করতে লাগলেন  নিজের মনগড়া বক্তব্য দিয়ে ভরিয়ে। মূলত তাঁর সেই আদি কর্ম যেটা তাঁর প্রতি মানুষকে উৎসাহী করে তুলেছিল সেটারই চর্বিত-চর্বণ— দ্য টালমুড জ্যু। বস্তুত এসব বক্তব্য নেওয়া হয় আইজেনমেঙ্গারের বই থেকে। গাজাখুরি আবিষ্কার আর ভুল অনুবাদে পরিপূর্ণ একটা পিলে-চমকানো সংগ্রহ রোলিংয়ের বইখানা। সত্যি কথা বলতে কি, তাঁর নিজের বইতেই তিনি সহজ-সাধারণ টালমুড-টেক্সট সঠিকভাবে অনুবাদ করতে পারেন নি। রোলিংয়ের টালমুড জ্যু বইটাই এস্থার-হত্যা সম্পর্কিত ঘটনাটাকে জিইয়ে রাখে। কনজারভেটিভ সদস্যদের পরবর্তী পদক্ষেপটি ছিল যথার্থই কৌতূহলোদ্দীপক। তিসা এসলার শহরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা চাইল সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে একটা ইহুদিবিদ্বেষী দল তৈরি করতে। তারা চেষ্টা করলো সব শ্রেণির লোকেদের নিয়ে একটা ‘খ্রিস্টান’ ঐক্য গড়ে তুলতে। অস্ট্রিয় শ্রমিক শ্রেণির লোকেরা ছিল অশিক্ষিত আর ধার্মিক ধরনের। রক্ষণশীলেরা অর্থ দিয়ে ভিয়েনার শিল্পাঞ্চলীয় মফস্বলে একজন লোক নিয়োগ করলো যার কাজ হচ্ছে লোকেদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি করা। তার প্রচারণার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ইহুদিবিদ্বেষ জাগিয়ে তোলা। তার প্রচারিত বক্তব্যের মর্মবস্তু হলো, ধনি ইহুদি পুঁজিপতিরা তাদের একই ধর্মের লোক হওয়াতে দরিদ্র খ্রিস্টান মেয়েটার হত্যাকারীকে অভিযোগমুক্ত করে নিয়েছে। কয়েক মাসের জন্যে মনে হলো তার প্রচারণায় মানুষ বিশ^াস করছে। গোটা ঘটনাটার যখন ঘনঘটা চলছিল তখন এই একটামাত্র ঘটনাই একটা দেশের সমাজতন্ত্রী দলকেও বিশ^াস করাতে সক্ষম হলো যে হ্যাঁ ‘ইহুদিরাই’ হলো আসলে শত্রু যাদের সঙ্গে লড়া দরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চক্রান্তটাকে রুখে দেওয়া হলো। সেই মফস্বল এলাকার র‌্যাবাই ডক্টর ব্লখ-এর সাহসী হস্তক্ষেপ এবং তৎপরতার ফলে মিথ্যে সে-প্রচারণা ব্যর্থ হলো এবং পরে আর তা মাথাচাড়া দিতে পারলো না।

কনজারভেটিভরা এরপর ছোটখাট ব্যবসাীয়দের লক্ষ করে এগোতে লাগলো। এ-ধরনের লোকগুলোকে সহজেই স্তোক দেওয়া যেতো। ইহুদিদের ব্রত পালনের জন্যে খুন আর রোলিংয়ের টালমুড ইহুদি-গল্প মিলিয়ে-মিশিয়ে একটা উর্বর ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া গেল। বস্তুত এর পরিণাম এমন একটা ভয়ংকর সন্ত্রাসবাদী মোড় নিল যে শেষ পর্যন্ত ভিয়েনা পুলিশ বাধ্য হলো কনজারভেটিভ-দলের নেতা কাউন্ট বেলক্রেডি-কে জনগণের শান্তিভঙ্গের এবং উসকানির দায়ে সমন জারি করতে। রোলিংয়ের সপ্রমাণ বক্তব্য-উপস্থাপনার ফলে বেলক্রেডি ছাড়া পেয়ে গেলেন। প্রাগ বিশ^বিদ্যালয়ের হিব্রু বিষয়ের রাজ-অধ্যাপক শপথ নিয়ে আদালত কক্ষে থাকলেন শুনানিতে। বেলক্রেডির ছাড়া পাওয়াটার একটা অপ্রত্যাশিত ফল ফলল। ভিয়েনার ইহুদিরা আসলে সেরকম একটা ধার্মিক ধরনের ছিল না। তারা ছিল অত্যাবশ্যকীয়ভাবেই একটা মধ্যবিত্ত, সংস্কৃতিমনস্ক আর স্বাধীন জনগোষ্ঠি। বিচার আর রায়ের গোটা ব্যাপারটায় তারা হতভম্ব হয়ে গেল। টালমুড-শাস্ত্র বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ লোকগুলো বিশ^াসই করতে পারল না কী করে একজন রাজ-অধ্যাপক যে কিনা স্বয়ং চার্চের নিয়ম-কানুনের প্রতিনিধিত্ব করেন, তিনি শপথ নিয়ে স্বেচ্ছায় এমন মিথ্যে আর বানোয়াট সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তারা বিশ^াস করতে বাধ্য হলো, নিশ্চয়ই রোলিং যেসব কথা বলেছেন সেসব মারাত্মক কথাবার্তা টালমুডেই লেখা আছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় তাদের জানা ছিল না। ভিয়েনার প্রধান র‌্যাবাই উত্থাপিত অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পাঠালেন কিন্তু তাতে তেমন একটা কাজ হলো না। রোলিং যেভাবে টালমুডের ব্যাখ্যা দিলেন সবাই সেটাকেই আঁকড়ে ধরে থাকল। ভিয়েনার ধর্মনিরপেক্ষ উদারনৈতিক ইহুদিদের লক্ষ করে ধর্মীয় গোষ্ঠির এমনতর আক্রমণ থেকে অস্ট্রিয় ইহুদিবিদ্বেষের চেহারাটা আঁচ করা যায়। দশ বছর ধরে পরিস্থিতির তেমন একটা পরিবর্তন ঘটল না। দুটো বছর লেগে গেল রোলিংকে বাগে আনবার জন্যে। শেষতক সেই ভিয়েনার র‌্যাবাই ডক্টর জে ব্লখই সাফল্যের দেখা পেলেন। ড. ব্লখ স্বতোপ্রণোদিতভাবে রোলিংকে নিয়ে এমনসব কুখ্যাতিপূর্ণ লেখা লিখতে লাগলেন যে রোলিং বাধ্য হলো ড. ব্লখের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হতে। কিন্তু ট্রায়ালের ঠিক আগের দিন রোলিং তার অভিযোগ উঠিয়ে নেন। তিনি স্বীকারোক্তি দিলেন যে তাঁর বক্তব্য আসলে বানোয়াট। এর জন্যে বেশ বড় অংকের ক্ষতিপূরণের খেসারত দিতে হলো তাঁকে। কিন্তু উত্থাপিত আদি অভিযোগের কোন সুরাহা হয় না। ইহুদিদের ব্রতবিষয়ক হত্যাকা–ঘেরা নানা অভিযোগ উঠতে লাগল বছরের পর বছর ধরে অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে। যখনই কোর্টে একটা করে মামলা ওঠে সেটার সত্যতা কিন্তু প্রমাণিত হয় না। তবু ব্যাপারটা চলতেই লাগল।

১৮৮০ থেকে ১৮৯০ এই দশ বছরের হিসেবটা নিলে দেখা যায়, এই সময়টাতে সরকারের প্রধান সমর্থক ছিল মূলত কনজারভেটিভদের একটা বড় অংশ। তার সঙ্গে মিলেছিল গোঁড়া জাতীয়তাবাদীরা আর চার্চপন্থী লোকজন। ইহুদিবিদ্বেষটাকে তারা বিরোধী উদারনীতিবাদী পত্রিকাঅলাদের ওপর আঘাতের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলো। ঐ পত্রিকাগুলো ছিল প্রধানত ইহুদি সাংবাদিকদের দ্বারা পরিচালিত। তবে ১৮৯০-এ উদারনৈতিকদের নিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠিত হলে তখন আবার জাতীয়তাবাদী এবং চার্চপন্থীরা পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের ইহুদিবিদ্বেষী প্রচারণার ধরনটা পাল্টালো। বস্তুত, ঠিক জার্মানির মতন অস্ট্রিয়াতেও একটা নির্দিষ্ট দল গঠিত হলো যেটার নামই হলো ‘ইহুদিবিরোধী দল’। জাতীয়তাবাদী দলগুলোর একেবারে গোঁড়া আর চার্চপন্থীদের মধ্যকার ক্রিশ্চিয়্যান-সোশ্যালিস্টদের (আসলে কনজারভেটিভ) নিয়ে গঠিত হলো দলটা। এর নেতা ছিলেন যুবরাজ লয়স ফন লিয়েখটেনস্টাইন এবং ডক্টর কার্ল লুয়েগার। ১৮৯৫ সালে, নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে দলটা তাদের নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল এবং পত্রিকার মধ্যে পোপের বাণীকে অন্তর্ভুক্ত করলে এর বিরুদ্ধে একটা ক্ষোভ আর ঘৃণা জেগে উঠলো। দেশের রোমান ক্যাথলিকদের হর্তাকর্তাদের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত উদার এবং দূরদর্শী তারা এতে বেশ সংক্ষুব্ধ হলো। জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ইহুদিবিরোধীরা  সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলো। এরপর তারা চেষ্টা করলো ভিয়েনার পৌর নির্বাচনগুলিতে প্রভাব বিস্তার করতে। সেখানে তারা সফল হলো— দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতে নিল তারা। স¤্রাটের তীব্র সংক্ষোভ সত্ত্বেও ডক্টর লুয়েগার ভিয়েনা শহরের প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচিত হলেন। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর ধরে তিনি থাকলেন সে-পদে। তাঁর মেয়র থাকার সময়টাতেই ভিয়েনার নির্বাচনগুলোতে ইহুদিবিদ্বেষ ব্যাপারটা ছিল একটা প্রধান সাইনবোর্ডের মতন। তখনই অস্ট্রিয় যুবক এ্যাডল্ফ্ হিটলার (১৮৮৯-১৯৪৫) ভিয়েনায় আসেন এবং ইহুদিবিষয়ক তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। কিন্তু পরিস্থিতির এমনই উপহাস, যেটা গুরু লুয়েগারের ছিল ¯্রফে একটা নির্বাচনী হাতিয়ার সেটা শিষ্য’র জন্যে হয়ে দাঁড়াল একটা তীব্র আবেগাত্মক পণবিশেষ। লুয়েগার ব্যক্তিগত জীবনে ইহুদিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণভাবেই মিশতেন। আর শিষ্য মানে হিটলার প্রকাশ্যে প্রায় প্রতিটি উপলক্ষ্যে স্পষ্টই ইহুদিদের নিন্দামন্দ করে বক্তব্য রাখতেন। তার ইহুদিবিরোধিতা হয়ে দাঁড়াল উদারনৈতিকতাবিরোধী একটা প্রকাশ্য হাতিয়ার। তাঁর গুরু তাঁকে দিনরাত পরিশ্রম করে শিখিয়েছিলেন যে জার্মান জনগণের সবচাইতে বিপজ্জনক শত্রু হলো ইহুদিরাই। আর শিষ্য হিটলার তাদেরকে একেবারে দৈহিকভাবেই নির্মূল করবার প্রতিজ্ঞা নিয়ে নামলেন।

পশ্চিম ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে ইহুদিবিদ্বেষের ব্যাপারটা সেরকম ঘায়ের সৃষ্টি করে নি। স্কেন্ডিনেভিয়া, স্পেন, পর্তুগাল এবং ইতালিতে ইহুদিরা সংখ্যায় এত কম ছিল যে নানা অবিচার বা প্রভাবের বিষয়াদির প্রচারণা সংবলিত রাজনৈতিক উত্থাপনা তাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব। গ্রেট বৃটেনে কনজারভেটিভ দলের নেতা এবং অসাধারণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বেঞ্জামিন ডিজরায়েলির দৃঢ়-বিচক্ষণ ভূমিকার ফলে ইহুদিবিদ্বেষের রাজনৈতিক অপব্যবহার দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। হল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের রাজনীতিতেও ইহুদিবিদ্বেষ তেমন একটা লক্ষ করা যায় নি। হল্যান্ডের ক্ষেত্রে বলা যায়, ইহুদিরা ছিল এক উন্নত এবং বিশ্রুত জনগোষ্ঠি। তাছাড়া সেখানে খ্রিস্টানদের মধ্যে রোমান ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্টরা ছিল প্রায় সমান-সমান। ফ্রান্সে ইহুদিবিদ্বেষ বেশ মারাত্মকভাবে দেখা দিল যখন সেটা জার্মানি এবং অস্ট্রিয়াতে প্রায় কেটে যাওয়ার পথে।

এপ্রিল ২০১৯

********************************

উত্তর-উপনিবেশতত্ত্বের প্রাথমিক চিন্তাভাবনা
প্রদীপ বসু

জন ম্যাকলিওডের মতে ‘উত্তর-উপনিবেশবাদীতত্ত্বে’র উদ্ভবের প্রক্রিয়াকে বুঝতে গেলে বৌদ্ধিকচর্চার দুটি ক্ষেত্রকে আগে একটু জানা দরকার। এগুলো হল; ১. কমনওয়েল্থ সাহিত্য এবং ২. উপনিবেশিক সন্দর্ভ (Discourse) সংক্রান্ত তত্ত্ব। এই দুটি ক্ষেত্র উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বের উদ্ভবের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে।

কমনওয়েল্থ সাহিত্য

১৯৫০-র দশক থেকে সাহিত্যে সমালোচকরা বিশেষ কিছু দেশে রচিত ইংরেজি সাহিত্যকে ‘কমনওয়েল্থ লিটারেচার’ বলে বর্ণনা করতে শুরু করেন। এই দেশগুলোর অতীত উপনিবেশবাদের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস রয়েছে। একদিকে এরূপ সাহিত্য রচিত হয়েছিল সেসব দেশে যেখানে উপনিবেশ স্থাপন করতে এসে ইউরোপীয়রা স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিল। যেমন কানাডা, অস্ট্রোলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা; অন্যদিকে এরূপ সাহিত্য রচিত হয়েছিল ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করছে এমন দেশগুলোতেও, যেমন : আফ্রিকার ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া; দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ক্যারিবিয়ান দেশ যেমন জামাইকা, ত্রিনিদাদ, টোবাগো। দ্রুত বিকাশমান ইংরেজি ভাষায় লিখিত এই সাহিত্যের মধ্যে মর্মবস্তু হিসেবে ছিল এইসব দেশ ও সমাজের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, জীবন-যাপনের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, লোকাচার, সামাজিক প্রথা, প্রাত্যহিক অভ্যাস, মানুষে মানুষে সম্পর্ক, মূল্যবোধ, পারিবারিক জীবন ইত্যাদি। এতে যুক্ত ছিলেন ভারতের আর. কে. নারায়ণ, বারবাডোজের জর্জ ল্যামিঙ, নিউজিল্যান্ডের ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ড, নাইজেরিয়ার চিনুয়া অচিবে প্রমুখ। প্রথমদিকে ভাবা হতো যে, ‘কমনওয়েল্থ’ শব্দটা একটা নিরীহ, নির্দোষ শব্দ। এর মধ্যে ক্ষমতা, সংঘাত, অসাম্য, অবিচার কিছু নেই। বিভিন্ন জাতিগুলোর মধ্যেকার মূল্যবান এক সাহিত্যিক উত্তরাধিকার হল ‘কমনওয়েল্থ’ লিটারেচার যার উৎসাহী অংশীদার ঐ জাতিগুলো। এর নীতি ছিল ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’। কিন্তু ক্রমশ কেউ কেউ মনে করতে লাগলেন যে ঐ অভিন্ন উত্তরাধিকার আসলে ‘কমনওয়েল্থের’ সদস্য জাতিগুলোর উপর ইংরেজি সাহিত্যের ধ্রুপদী কেন্দ্র ব্রিটেনের প্রধান্যকেই আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। হয়তো ‘কমনওয়েল্থ লিটারেচার’ শব্দটি সৃষ্টি করা হয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রচনাসমূহকে সমমর্যাদার ভিত্তিতে একত্র করার উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও ধরে নেওয়া হয়েছিল যে এইসব ইংরেজি রচনা পাশ্চাত্যের ইংরেজি-ভাষী পাঠকদের উদ্দেশ্য রচিত। অর্থাৎ ‘কমনওয়েল্থ লিটারেচার’ শব্দটির মধ্যে অতীতের উপনিবেশবাদী ক্ষমতার প্রচ্ছন্ন প্রভাব ও প্রভুত্বের রেশ থেকে গিয়েছিল। বস্তুত অনেকের মতে এই সাহিত্যের লেখকরা যেভাবে তাঁদের নিজেদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক আত্ম-পরিচিতি (Identity)-কে গড়ে তুলেছিলেন সেই প্রক্রিয়ার সাথে তাঁদের এইসব রচনার নিবিড় যোগ ছিল, অর্থাৎ জাতীয়তা আর সাহিত্য এ দুয়ের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র বিদ্যমান ছিল।

এ প্রসঙ্গে এটি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ‘কমনওয়েল্থ’ সাহিত্যের মধ্যে একটি অন্তর্দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। একদিকে প্রকাশ্যে ঘোষিত ছিল এই নীতি যে এ হল সমস্ত সমমর্যাদা সম্পন্ন ও সহযোগী জাতিগুলোর এক অবাধ ও মুক্ত বিচরণক্ষেত্র। অন্যদিকে, এর গভীরে নিহিত ছিল এদের সকলের এক অভিন্ন সাধারণ ইতিহাস— উপনিবেশিক শক্তির হাতে শোষিত হবার ইতিহাস। এরা ছিল পর-নির্ভরতা, দাসত্ব ও লুণ্ঠনের তিক্ত অভিজ্ঞতার সংবেদনশীল অংশীদার। ‘কমনওয়েল্থ’ সাহিত্য প্রথমটির অর্থাৎ সমতার প্রকাশ্যে ঘোষিত নীতির প্রচারক, বিশ্বমানবতার কল্যাণের প্রবক্তা। কিন্তু পরবর্তীকালে তার পোস্টকলোনিয়াল তত্ত্ব তুলে ধরল দ্বিতীয়টিকে অর্থাৎ শোষণ ও বঞ্চনার চিত্রকে। লুণ্ঠন ও বৈষম্যের অমানবিক অতীতকে।

উপনিবেশিক সন্দর্ভ সংক্রান্ত তত্ত্ব

পোস্টকলোনিয়াল তত্ত্বকে বুঝতে গেলে তার পূর্বসূরি হিসেবে  শুধু ‘কমনওয়েল্থ সাহিত্য’কে জানলে চলবে না। তার আর এক পূর্বসূরি উপনিবেশিক সন্দর্ভভিত্তিক তত্ত্বকেও জানতে হবে। উপনিবেশিক সন্দর্ভের দুই প্রধান তাত্ত্বিক হলেন ফরাসি উপনিবেশ আলজেরিয়ার লেখক ফ্রান্জ ফানো (Fanon) এবং ব্রিটিশ উপনিবেশ মিশরের চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাইদ (ঝধরফ)। উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্বের বিকাশের প্রক্রিয়াকে এঁরা রীতিমতো প্রভাবিত করেছিলেন। সাধারণভাবে, তাঁরা দেখালেন কীভাবে উপস্থাপনা (Representation) এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভব বা প্রত্যক্ষকরণের পদ্ধতিসমূহ (Modes of perception)-কে পাশ্চাত্যের উপনিবেশিক প্রভুরা মৌলিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, কীভাবে ঐ অস্ত্রগুলো করে তারা উপনিবেশের পরাধীন মানুষকে পদানত করে রাখে। তাই তো আমরা উপনিবেশের মানুষ জেনেছি সাদা মানুষ উন্নততর, কালো বা বাদামি মানুষ নিকৃষ্টতর। এটা স্বাভাবিক বলে জেনেছি যে, অশ্বেতকায় মানুষের ওপর প্রভুত্ব করার যোগ্যতা একমাত্র শ্বেতকায় মানুষেরই আছে। সেটাই ন্যায্য যথার্থ, বৈধ। হঠাৎ কখনও যদি দেখি একদল সাদা মানুষের ওপর প্রভুত্ব করছে কোনো এক কালো মানুষ, তাহলে আমরা চমকে উঠবো, আমাদের প্রাত্যহিক নিয়ম-বোধে আঘাত লাগবে এই তো স্বাভাবিক। জগতের স্বাভাবিক নিয়মের বিরোধী অতএব অন্যায্য, অবৈধ! ‘একজন সাদা মানুষকে তুমি এভাবে কষ্ট দিতে, হীন করে তুলতে পারো না।’ বিশ্বকাপ ফুটবলে শ্বেতকায় দেশের টিম জিতবে এই প্রত্যাশা হল সহজ ও স্বাভাবিকতার নিয়ম-সঞ্জাত। আবার দেখুন আমরা কালো তাই আমাদের যথোচিত ও স্বাভাবিক শ্লোগান হওয়া উচিত ছিল অত্যাচারীর সাদা হাত ‘ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’। কিন্তু উপনিবেশের কালো মানুষ শৈশব থেকে জেনে এসেছে যে যা কিছু কালো তাই খারাপের প্রতীক। তাই তার স্লোগান হয়েছে : অত্যাচারীর কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও। এটা ঠিক যে, কেউ ধরে বেঁধে জোর করে আমাদের একথা বিশ্বাস করতে বাধ্য নাও করে থাকতে পারে। কিন্তু উপনিবেশের মানুষ হিসেবে নিয়ম মাফিক নিকৃষ্টতার এই বোধ আমাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকে মাথায় ঢুকে আছে। এ হল নিকৃষ্টতা বোধের অন্তর্লীনিকরণ (ওহঃবৎহধষরংধঃরড়হ)। উপনিবেশবাদ শুধু দমন-পীড়ন বা অত্যাচার চলায় না। সে এই অন্তর্লীনিকরণের মাধ্যমেও কাজ করে। এভাবে আমাদের মননকে নিয়ন্ত্রণ করে অদৃশ্য সুতোয়। জগতকে বিশেষ একভাবে আমরা বুঝতে শিখেছি, দেখতে, ভাবতে শিখেছি। উপনিবেশবাদী পাশ্চাত্য হল উৎকৃষ্টতর, কারণ তারা উন্নত সুসভ্য, আধুনিক সভ্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, উপনিবেশিক সন্দর্ভ পর্যালোচনার মূলে আছে জগতকে এভাবে দেখার বিশেষ ভঙ্গি। এ হল মনের উপনিবেশিকীকরণ (Colonising the mind) তখন উপনিবেশের মানুষ উপনিবেশবাদীর মতো করে ভাবে, তাদের ভাষায় কথা বলে, তাদের যুক্তিকে গ্রহণ করে। তাদের মূল্যবোধ ও ধ্যান-ধারণাকে নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করে। উপনিবেশবাদী দেশের মানুষকেও বোঝানো হয় যে অন্য জাতি অনুন্নত হলে তাকে সভ্য দেশের অধীনে আনা প্রয়োজন। সেটা ন্যায়সঙ্গত ও যথার্থ। অসভ্য ও বর্বর জাতির উন্নয়নের স্বার্থেই তাকে সভ্য পশ্চিমী জাতির পদানত করে রাখা প্রয়োজন। ‘ওদের সভ্য করে তুলতে হবে’। এ হল ( Civilising Missionion )। এ ভার পাশ্চাত্যকেই নিতে হবে। এ হল ডযরঃব সধহং নঁৎফবহ। ওই বর্বররা যখন পাশ্চত্য শক্তির উপনিবেশে পরিণত হবে, তখন ওরা পাশ্চাত্যের উপনিবেশিক প্রভুদের মতো করে বাস্তব জগতকে, সমাজকে, মানুষকে প্রত্যক্ষ করবে (ঢ়বৎপবরাব)। যেভাবে উপনিবেশবাদীরা জগত সংসারকে সমাজকে উপস্থাপনা করে (ৎবঢ়ৎবংবহঃ) সেইভাবেই নেটিভরাও দুনিয়াটাকে উপস্থাপনা করে প্রকাশ করবে, চিত্রিত করবে, ব্যাখ্যা করবে, তুলে ধরবে। উপনিবেশিক সন্দর্ভর বিশ্লেষণকারী তত্ত্বগুলো (ফানো, সাইদ) এ ক্ষেত্রে ভাষার তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকাকে তুলে ধরেন। ভাষার মাধ্যমে উপনিবেশের মানুষ জগতকে উপর্যুক্ত বিশেষ ধরণে বুঝতে থাকেন। ভাষা তাকে শেখায় জগত এরকম, অন্যরকম নয়। জগত সম্পর্কে তার জ্ঞানকে নির্মাণ করে ভাষা। উপনিবেশিক সন্দর্ভগুলো ভাষার মধ্যে দিয়ে ক্রিয়াশীল থাকে। সুসভ্য ইউরোপীয় নাবিক কলম্বাস আমেরিকা ‘আবিষ্কার’ করেছিল সগর্বে। হায়! কোনো আফ্রিকান কালো মানুষ কোনো নিগ্রো সুসভ্য ইউরোপকে ‘আবিষ্কার’ করতে পারে না। উপনিবেশিক সন্দর্ভগুলো সেইসব ছেদবিন্দুকে গঠন করে যেখানে ভাষা ও  ক্ষমতা পরস্পরের সাথে মিলিত হয়। ভাষা তো শুধু একটা যোগাযোগের মাধ্যম মাত্র নয়। এটি তার চেয়ে বেশি কিছু। এটি বাস্তবতাকে অর্থপূর্ণ বিভিন্ন এককে বিভাজিত করে এবং বাস্তবতাকে নিয়ম শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করে রাখে। এভাবেই ভাষা আমাদের জগত-সংক্রান্ত ধ্যান-ধারণাকে গঠন করে। বিভিন্ন বস্তুতে আমরা যেসব অর্থ সংযুক্ত করি সেগুলো আমাদের বলে দেয় আমরা কোন কোন মূল্যবোধকে গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবি। সেগুলো আমাদের আরও বলে দেয় কীভাবে আমরা একটি উৎকৃষ্টতর গুণ ও একটি নিকৃষ্টতর গুণের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখি, একটির তুলনায় অন্যটিকে বেছে নিতে শিখি। কেনিয়ার ঔপন্যাসিক এন. গুগি ওয়া থিয়োনগো (ঘ. এঁমর) বলেন ভাষা সংস্কৃতিকে বহন করে আর সংস্কৃতি বহন করে সেই সমগ্র মূল্যবোধের সমষ্টিকে যার সাহায্যে আমরা নিজেদেরকে এবং জগতে নিজেদের স্থানকে প্রত্যক্ষ করি। আর যেভাবে মানুষ নিজেদেরকে প্রত্যক্ষ করে সেটা তাদের সংস্কৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। সেটা তাদের রাজনীতির প্রতি, সম্পদের সামাজিক বণ্টনের প্রতি, প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের প্রতি, এমন কি অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্কের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। আমরা বহু মানুষকে নিয়ে গঠিত এক একটি লোকসমাজ (ঈড়সসঁহরঃু)। আমাদের এক একটি নির্দিষ্ট রূপ ও চরিত্র আছে, আছে নির্দিষ্ট ইতিহাস, আছে জগতের সাথে নির্দিষ্ট সম্পর্ক। আমাদের সাথে ভাষা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককালে আবদ্ধ। এন গুগি আরও দেখান যে ভাষা নিছক নিস্ক্রিয়ভাবে জগতকে প্রতিফলিত করে না। বরং জগতকে একজন ব্যক্তি যেভাবে বোঝে তার অনেকটাই সৃষ্টি করে থাকে ভাষা। ভাষা সেইসব মূল্যবোধকে ধারণ করে থাকে যেগুলোর সাহায্যে আমরা স্বেচ্ছায় বা বল প্রয়োগের দ্বারা বাধ্য হয়ে, আমাদের জীবনকে যাপন করি। উপনিবেশের আমলে সমাজে যা উপনিবেশিক মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে এবং তাতে সমর্থন জোগায় তেমন সব দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য থাকে। এইসব দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে জগতকে দেখা হয়ে থাাকে। উপনিবেশের মানুষের ওপর এইসব দৃষ্টিভঙ্গি প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে। একটি বিশেষ মূল্যবোধ-ব্যবস্থাকে জগত সম্পর্কে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিকে অর্থাৎ উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও যথার্থ সত্য বলে দেখানো হয়। এর বিপরীতে বলা হয় উপনিবেশের জনগণের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের মধ্যে ঘাটতি যে অনেক। তাই তার মূল্য অনেক কম। তারা যে অসভ্য বর্বর। সেই অবস্থা থেকে তাদের উদ্ধার করতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ব্রিটিশ বা ফরাসি সা¤্রাজ্য শুধু সামরিক ও দৈহিক শক্তির সাহায্যে শাসন করেনি, এটি উপনিবেশবাদী দেশের মানুষ ও উপনিবেশের মানুষ উভয়কেই শিখিয়েছিল একটি বিশেষভাবে তাদের জগতকে ও তাদের নিজেদেরকে দেখতে। সা¤্রাজ্যের ভাষাকে তারা অন্তর্লীনিকৃত করেছে যেন তা জীবনের স্বাভাবিক ও সত্য নিয়ম-ব্যবস্থাকে উপস্থাপনা করছে। এভাবেই টিকে থাকে সা¤্রাজ্য। লক্ষণীয় যে, দ্বিত্ব বিভাজন (নরহধৎু ফরারংরড়হ)র আশ্রয় নেয় উপনিবেশবাদ। পশ্চিম হল পরিণতবুদ্ধি, প্রাচ্য অপরিণত-মনস্ক। পাশ্চাত্য আধুনিক, প্রাচ্য ঐতিহ্যবাহী। পশ্চিম মানেই সুসভ্য, এশিয়া-আফ্রিকা মানে বর্বরতা। ইউরোপ উন্নত, উপনিবেশ অনুন্নত, অনগ্রসর, পশ্চাৎপদ। ইউরোপ প্রগতিশীল, এশিয়া-আফ্রিকা আদিম, প্রতিক্রিয়াশীল ইউরোপে ঘটেছে রেনেসাঁস, এনলাইটেনমেন্ট, বিজ্ঞান বিপ্লব, সেখানে প্রতিষ্ঠিত যুক্তিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রযুক্তি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। উপনিবেশ পড়ে আছে অযুক্তি ও কুসংস্কারের অন্ধকারে। এই বাহিনীর যুক্তিতে উপনিবেশের আদি সংস্কৃতিকে উৎখাত বা বিকৃত করে দেয় উপনিবেশবাদ। মীনাক্ষী মুখার্জী লিখেছেন ‘Colonialism disrupted or uprooted patterns of original culture in the colonised countries.’

ফানো

উপনিবেশিক মূল্যবোধের অন্তর্লীনিকরণ অশ্বেতকায় মানুষকে ক্ষমতাহীন করে তোলার কার্যকরী হাতিয়ার। একই সাথে তা উপনিবেশের জনসাধারণের পক্ষে এক গভীর আঘাতের উৎস। কারণ, তাদের শেখানো হল তাদের নিজের দেশের মানুষকে দেশী সমাজকে স্থানীয় প্রযুক্তিকে নেতিবাচক দিক থেকে দেখাতে। তাঁদের নিজেদেরকে নিজেদের সংস্কৃতিকে ছোট করে দেখতে। ১৯৫০-র দশকে এমন সব রচনা প্রকাশিত হল যেখানে উপনিবেশের মানুষকে উপর্যুক্ত মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত ও ক্ষয়ক্ষতি বর্ণিত হল। ঐসব মানুষ উপনিবেশিক সন্দর্ভগুলোকে রীতিমতো আত্মস্থ করেছিল। এ প্রসঙ্গে মনস্তত্ত্ববিদ ফ্রান্জ ফানোর গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন রচনাগুলো উল্লেখযোগ্য। ফরাসি উপনিবেশবাদ যে সুদূরপ্রসারী ক্ষয়ক্ষতি ও দগদগে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল তার বিশ্লেষণাত্মক বিশদ বর্ণনা পাওয়া গেল তার এইসব রচনায়। জাতিগত বৈষম্যবাদ (জধপরংস)র প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর রচনার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর দুটি প্রখ্যাত গ্রন্থ হল : Black Skin, White Masks (1952) Ges The Wretched of the Earth (১৯৬১)। তিনি দেখলেন কীভাবে একজন মানুষকে তাঁর গাত্রবর্ণের জন্যে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের উপহাসের উপেক্ষা ও অসম্মানের পাত্র হতে হয়। সে এক ‘আজব’ ‘অদ্ভুত’ প্রাণী। সেই ব্যক্তির মনে সৃষ্টি হয় সুগভীর অন্তঃকরণ। তাঁকে ভয়ঙ্কর মূল্য দিতে হয় এর জন্য। যারা ক্ষমতায় আসীন তারা ফানোর আত্ম-পরিচিতি (ওফবহঃরঃু)-কে নেতিবাচক অর্থে সংজ্ঞায়িত করেছিল। তিনি তখন একথা ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, তিনি নিজে কোনো স্বাধীন ক্রিয়াকারী চিন্তনকারী মানব বিজয়ী (ঐঁসধহ ঝঁনলবপঃ) নন। তাই তাঁর নিজের কোনো চাহিদা ও প্রয়োজন থাকতে পারে না। তিনি নিছক একটি বিষয় (ড়নলবপঃ) মাত্র। তিনি অদ্ভুত, বিকট, নিকৃষ্টতর। সম্পূর্ণ মানুষের থেকে ‘কম’ কিছু; মনুষ্যতর ইতর প্রাণী মাত্র অ-মানব। ক্ষমতাবান গোষ্ঠী নির্ধারণ করবে তাঁর আত্ম-পরিচিতি, তার সত্তা, তার সংজ্ঞা, তার উপস্থাপনাকে। তার আত্ম-পরিচিতির ‘সংশোধন’ ঘটবে তারা। এ যেন তার অঙ্গ-প্রতিস্থাপন।

এ হল নির্দোষ স্বাভাবিক সংশোধনের রূপে কৃত একে প্রায় অদৃশ্য হিংস্রতা (ঠরড়ষবহপব)। ফানো তীব্রভাবে অনুভব করেন এই হিংস্রতাকে, আত্ম-পরিচিতির এই ‘সংশোধনকে বিকৃতকরণকে লঙ্ঘনকে স্বাধীন মানব বিষয়ী হিসেবে নিজের আত্ম-পরিচিতিকে স্থির করার বিন্দুমাত্র অধিকার তার নেই। উপনিবেশবাদ ঐ অধিকার থেকে তাকে চিরবঞ্চিত রেখেছে। ফরাসি উপনিবেশবাদীরা তৈরি করে দেয় তার আত্ম-পরিচিতিকে। তার আত্মবোধকে ভেঙে চুরে গুঁড়িয়ে দেয়, ঘটায় নিঃশব্দ আগ্রাসন ও হিংস্রতা। সুসভ্য আধুনিক শ্বেতকায় ফরাসি জনতা তাঁকে দেখে চীৎকার করে ওঠে দেখ দেখ একটা নোংরা, ঘৃণ্য বিকার, একটা নিগ্রো।’ বর্ণনা করার নামকরণের এই অঘোষিত সর্বত্রগামী ক্ষমতাকে কখনোই ছোট করে দেখা চলে না। ভাষা ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিঃসন্দেহে সুদূরপ্রসারী ও মৌলিক। উপনিবেশের কালো মানুষকে বাধ্য করা হয় ‘অপর’ (ড়ঃযবৎ) হিসাবে আত্মকে গ্রহণ করতে আত্মস্থ করতে। উপনিবেশবাদী ফরাসি যা কিছু নয়, সেসব কিছুর সারাংশ হল ‘নিগ্রো’। উপনিবেশবাদী হল সভ্য, শুভ্র, স্বচ্ছ আলোকপ্রাপ্ত যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনষ্ক, পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, বুদ্ধিমান। তাই সে উৎকৃষ্টতর স্বাভাবিক। নিগ্রো হল তার ‘অপর’। ফানো  দেখলেন, নিগ্রোর মনে সৃষ্টি করা হল নিজেদের নিকৃষ্টতর বলে গভীর বিশ্বাস। এ হল এক মনস্তাত্ত্বিক আঘাত (ঃৎধঁসধ)। এই আঘাত থেকে নিষ্কৃৃতি পাওয়ার একটি রাস্তা হল ‘ফরাসি মাতৃভূমির সুসভ্য আদর্শ, শিক্ষা, মূল্যবোধ, ভাষা, বিশ্ব-দর্শন, সংস্কৃতি রুচি, নীতি ও জীবনধারাকে গ্রহণ করা অর্থাৎ সভ্যতার উজ্জ্বল সাদা মুখোশকে পরিধান করা— যা দিয়ে তার বিবর্ণ কালো চামড়াকে, তার অসভ্য বর্বর জংলী প্রকৃতিকে ঢেকে রাখা যাবে। কিন্তু তাতেও রেহাই নেই। উপনিবেশের অশ্বেতকায় মানুষকে কখনোই সমান বলে মেনে নেওয়া হবে না। ফানো লেখেন : ‘The white world, the only honourable one, barred me from all participation. A man was expected to behave like a man. I was expected to behave like a black man’। ‘মানুষ’ আর ‘কালো মানুষ’ যেন দুটি পৃথক সত্তা। এই কাল্পনিক পার্থক্য হলো উপনিবেশিক প্রভুত্বের এক মোক্ষম অস্ত্র। শুধু দেহকে নয়, মনকেও তা শৃঙ্খলায়িত করেছে। ফানোর মতে, উপনিবেশবাদের অবসানের অর্থ শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়। বরং মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। আত্ম-পরিচিতি সম্পর্কে এভাবে ভাবাকে ধ্বংস করতে না পারলে উপনিবেশবাদকে শেষ করা যাবে না।

সাইদ

১৯৭৮ সালে এডওয়ার্ড সাইদের Orientalism গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এর প্রভাব ছিল অপরিসীম। ফানোর মতো তিনিও দেখালেন উপনিবেশবাদ জগতকে দেখার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করছে। জগতের সবকিছুর এমন এক নিয়ম-ব্যবস্থা (Order of Things) সৃষ্টি করেছে যাকে প্রকৃত সত্য ও যথার্থ বলে শেখানো  হয়েছে। ফানো গুরুত্ব দেন উপনিবেশের মানুষের মানসিক ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ওপর। কিন্তু সাইদ উপনিবেশের মানুষের চেয়ে বরং উপনিবেশকারী লোকদের চিন্তনের প্রতি বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। ইতালিয়ান মার্কসবাদী আন্তোনিও গ্রামশি এবং ফরাসি উত্তর-কাঠামোবাদী দার্শনিক মিশেল ফুকোর চিন্তার দ্বারা  সাইদ প্রভাবিত ছিলেন। সাইদ দেখালেন তাদের নিজেদের উপনিবেশ সম্পর্কে পশ্চিমি সা¤্রাজ্যবাদী শ্বেতকায় প্রভুরা কীভাবে জ্ঞান উৎপাদন করেছিল এবং কীভাবে সেই জ্ঞান উপনিবেশের ওপর তাদের প্রভুত্বেকে ন্যায্যতা ও বৈধতা জোগায়। সুদীর্ঘকাল ধরে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মতো পশ্চিমি দেশগুলো এরূপ ‘সত্য’ ও ‘জ্ঞান’ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন রচনায় মিশর ও মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত যে উপস্থাপনা দেখা যায় সাইদ সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। দেখালেন যে পশ্চিমি পর্যটকরা দেশী মানুষ (ঘধঃরাব)-দের সম্পর্কে জানার চেষ্টা বিশেষ করেন নি, তাদের থেকে শেখারও চেষ্টা করে নি। বরং তারা প্রাচ্য সম্পর্কে কতকগুলো চালু  ভিত্তিহীন, সস্তা ধারণার ওপর ভিত্তি করে মন্তব্য করে গেছেন।  যেমন প্রাচ্য হলো অজানা অদ্ভুত অচেনা বিদেশি এক স্থান যা রহস্যময়তায় পূর্ণ। যেমন বন্য অশ্লীল প্রাচ্যে রয়েছে নৈতিক স্খলন, যৌন অবক্ষয় ইত্যাদি। এই মন্তব্যগুলোকে নিঃসংশয় বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই সত্য আবার ইউরোপের নগ্ন উপনিবেশিক প্রভুত্বকে ন্যায্যতা ও বৈধতা জুগিয়েছে। উপনিবেশের সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে সৃষ্টি করা হয়েছে জ্ঞান। সেই জ্ঞান শক্তি ও যৌক্তিকতা জুগিয়েছে উপনিবেশিক শক্তিকে। পাশ্চত্যের চোখে ঐ জ্ঞান সুদূর প্রান্তিক প্রাচ্য সম্পর্কে নিরন্তর রচনা করেছে এক কালিমালিপ্ত অবক্ষয়ী নেতিবাচক ভাবমূর্তি। সাইদ ভাবমূর্তিকে ধাক্কা দিয়েছেন। স্পিভাকের মতে ‘The white world, the only honourable one, barred me from all participation. A man was expected to behave like a man. I was expected to behave like a black man.

ভাবা ও স্পিভাক

১৯৮০-র দশকে ফানো ও সাইদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে এলেন সাহিত্য সামালোচকদের এক নতুন প্রজন্ম। ফানো ও সাইদের ধ্যান ধারণাকে তারা প্রয়োগ করলেন সাহিত্য সমালোচনা ও সাহিত্য-রচনা পাঠের ক্ষেত্রে। তারা দেখলেন সা¤্রাজ্য আমাদের কল্পনাসমূহের মধ্যেও উপনিবেশ স্থাপন করে। কল্পনার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় সা¤্রাজ্যের প্রভুত্ব। দেশ হারা মানুষকে তার দেশে ফিরিয়ে দিলেই উপনিবেশবাদের বিলোপ ঘটে না। সা¤্রাজ্যের দ্বারা যারা শাসিত ছিল তাদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিলেই হলো না। এর জন্যে আরও প্রয়োজন জগতকে দেখার প্রাধান্যকারী প্রবল দৃষ্টিভঙ্গিকে ধবংস করা। প্রয়োজন বাস্তবতার এমনভাবে উপস্থাপন যা উপনিবেশবাদী মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি নয়। তাই কেনিয়ার ঔপন্যাসিক এন. গুগি বলেন ‘ফবপড়ষড়হরংরহম ঃযব সরহফ’র কথা। এর সাথে ভাষা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ভাষাকে উপনিবেশবাদ থেকে মুক্ত করতে হবে। শুধু স্বাধীনতার অনুষ্ঠানিক ঘোষণা, সনদ রচনা, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ এসব দিয়ে সর্বব্যাপী পশ্চিমি উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তি আসে না। মনেরও পরিবর্তন চাই। জগতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টানো প্রয়োজন। উপনিবেশের মানুষ ও উপনিবেশকারী দেশের মানুষ উভয় জাতির ক্ষেত্রেই একথা সমভাবে প্রয়োজ্য। সা¤্রাজ্যের প্রতিটি অংশের জনসাধারণকে ক্ষমতার প্রভুত্বকারী ভাষাকে প্রত্যাখান করতে হবে। কারণ ঐ ভাষা তাদের প্রভু ও দাসে বিভক্ত করেছে। ফানো লিখেছেন : ‘The white world, the only honourable one, barred me from all participation. A man was expected to behave like a man. I was expected to behave like a black man’। তাই অন্যভাবে পড়া ও লেখার সামর্থ, জগতের নিয়ম-ব্যবস্থাকে আমরা যেভাবে বুঝি তার থেকে আলাদাভাবে নতুনভাবে ভাবার সামর্থ কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে সৃষ্টি করতে পারে। ‘স্বাভাবিক’ ও ‘সত্য’ বলে যাকে চিনে এসেছি এতকাল, এভাবে যাকে আমাদের চেনানো হয়েছে, তার সম্পর্কে আজ নতুন করে ভাবতে হবে। না হলে উপনিবেশবাদী দার্শনিক নিয়ম-ব্যবস্থাকে ভাঙা যাবে না।

১৯৮০-র দশক থেকে নতুন লেখকরা বেশি বেশি করে তত্ত্বের দিকে ঝুঁকলেন। ‘কমনওয়েল্থ সাহিত্য’ সংক্রান্ত সমালোচনা ছিল অনেকটাই বিমূর্ত ও উদার মানবতাবাদী। আর এখন উত্তর-উপনিবেশবাদের সূচনায় সুতীক্ষ্ম তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ গুরুত্ব পেতে থাকলে পাঠ্য-রচনা (ঃবীঃ)-এর সমালোচনা সম্ভার তত্ত্বগতভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। নারীবাদ দর্শন, মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি, নৃতত্ত্ব, সাহিত্য-তত্ত্ব এসবের সাহায্যে। একদল লেখক ফরাসি উত্তর-কাঠামোবাদী দার্শনিক মিশেল ফুকো,জাক দেরিদা ও জাক লাঁকার চিন্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেন। বিভিন্ন উপনিবেশিক পাঠ্য-রচনায় উপনিবেশের বিষয়ীকে কীভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে বিশেষ করে সে ব্যাপারেই তারা আগ্রহী। শুধু সাহিত্য রচনায় নয়। অন্যান্য উপনিবেশিক রচনা সম্পর্কেও তারা উৎসাহী। সাইদ দেখিয়েছিলেন পাশ্চাত্য প্রভুরা অন্যান্য দেশের মানুষ সম্পর্কে জ্ঞান উৎপাদন করেছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল এসব মানুষের নিকৃষ্টতর সত্তাকে সত্য ও প্রমাণ্য বলে তুলে ধরা। এখন উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিকরা বোঝার চেষ্টা করলেন ঐ রচনাগুলোকে প্রচলিত প্রথার বিপরীতে গিয়ে নতুনভাবে পাঠ করা সম্ভব কিনা। এমন কোনো মূহুর্তে কি ঐসব রচনার মধ্যে আবিষ্কার করা সম্ভব যখন উপনিবেশের বিষয়ী তার উপনিবেশিক উপস্থাপনাকে প্রতিরোধ করে, কারণ ঐ উপনিবেশিক উপস্থাপনা উপনিবেশিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত! হোমি কে ভাবা এবং গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের রচনায় এক সাবলটার্ন স্টাডিজ গোষ্ঠির গবেষকদের কাজে বিভিন্নভাবে এই প্রয়াস লক্ষণীয়। হোমিভাবা দেখালেন উপনিবেশবাদী সন্দর্ভগুলোকে এমনভাবে পাঠ করা সম্ভব যাতে তাদের নিরন্তর দ্ব্যর্থবোধক, বিভাজিত ও অস্থিতিশীল চরিত্র উন্মোচিত হয়। তারা যেসব উপনিবেশিক মূল্যবোধকে সমর্থন করে বলে মনে হয় সেগুলোকে আসলে তারা নিশ্চিতরূপে প্রতিষ্ঠা করতে কখনই সক্ষম  হয় না। আবার গায়ত্রী বললেন, যাদের উপনিবেশিক উপস্থাপনার বিষয়ী করা হয়েছে, বিশেষত নারীদের, তাদের কণ্ঠস্বরকে কি আদৌ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? তাদের কণ্ঠস্বরের মধ্যে কি ভাঙন ঘটানো ও অন্তর্ঘাত সৃষ্টির কোনো সম্ভবনা থাকে? তাদের কণ্ঠস্বরকে কি সেভাবে পাঠ করা যায়?

উত্তর-উপনিবেশিক সাহিত্য

ফানো সাইদ এবং পরবর্তীকালে ভাবা ও স্পিভাকের রচনাকে ব্যবহার করে অনেক উত্তর-উপনিবেশিক তাত্ত্বিক বললেন, একদা উপনিবেশ ছিল এমন দেশগুলোতে রচিত নতুন সাহিত্যগুলো প্রাথমিকভাবে ‘ৎিরঃরহম নধপশ ঃড় ঃযব পবহঃৎব’ এর লক্ষ্যে নিয়োজিত। অর্থাৎ এ হলো কেন্দ্রের বিরুদ্ধে লিখনে প্রতিরোধ। এগুলো উপনিবেশিক সন্দর্ভকে প্রশ্ন করে, ঐ সন্দর্ভের প্রহসন রচনা করে। এইসব  লেখকদের ক্ষেত্রে আর ‘কমনওয়েল্থ সাহিত্য’ শব্দটি ব্যবহার করা হলো না, বরং এদের রচনাসমূহকে ‘পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্য’ কর্ম বলে বর্ণনা করা হলো। কারণ ‘কমনওয়েল্থ সাহিত্য’ শব্দটির মধ্যে একদিকে ছিল প্রভুর প্রচ্ছন্ন ঔদ্ধত্য, অন্যদিকে, নিছক ভাসা-ভাসা বিশ্বজনীন উদারনৈতিক মানবতাবাদ। কিন্তু ‘পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্য’ অনেক বেশি আন্তঃশাস্ত্রভিত্তিক (ওহঃবৎফরংপরঢ়ষরহধৎু), রাজনৈতিক দিক থেকে মৌলিক চরিত্রের (ৎবফরপধষ) এবং বিশ্বজনীন  হওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট স্থান-ভিত্তিক। উপনিবেশায়িত প্রান্তদেশ থেকে উপনিবেশিক ইউরোপীয়-কেন্দ্রকে তারা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। প্রাধান্যকারী বিশ্বদর্শনের প্রতি প্রশ্ন হাজির করে, জগতকে নতুনভাবে দেখার কথা বলে, এশিয়া-আফ্রিকার উপনিবেশ ও একদা উপনিবেশের মানুষের কন্ঠস্বরকে তুলে ধরে। উত্তর-উপনিবেশিক সাহিত্য মনকে উপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা করে, এন. গুগি যাকে বলেছিলেন— ‘ফব-পড়ষড়হরংরহম ঃযব সরহফ’। এই সাহিত্য আর নিরপেক্ষ বিমূর্ত ‘নিষ্পাপ’ সরল, ‘পবিত্র’ উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে উপনিবেশের সাহিত্যকে পর্যালোচনা করে না, বরং পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্য অনেক বেশি রাজনৈতিক প্রতিবাদী পক্ষভুক্ত বিরোধ-মূলক। উপনিবেশের জনসাধারণের জীবন ও সংস্কৃতি, মনন ও বাস্তবতার মধ্যে অতীত উপনিবেশবাদের যে তিক্ততম ভয়ংকর অভিজ্ঞতা বিধৃত, তারই প্রকাশ ঘটে পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্যে। এই অভিজ্ঞতাকে ভুলে গিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখে একদা উপনিবেশ অর্থাৎ সদ্য-স্বাধীন দেশ। কিন্তু এই ভুলে যাওয়া, এই বিস্মরণ যে অসম্ভব। তার চৈতন্যে এর স্থায়ী চিহ্ন রয়ে গেছে। বিস্মরণের এই অসম্ভাব্যতাকে তুলে ধরে উত্তর উপনিবেশিক সাহিত্য।

ভাষার রাজনীতি

১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হল The Empire Writes Back : Theory and Practice in Post-Colonial Literature গ্রন্থটি। এর লেখক হলেন অস্ট্রেলিয়ার তিনজন সাহিত্য-সমালোচক  : বিল অ্যাশক্রফট, গ্যারেথ গ্রিফিথস্ ও হেলেন টিফিন। এঁরা বললেন ইংরেজি ভাষাকেই উপনিবেশবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে, অর্থাৎ ফবপড়ষড়হরৎব করতে হবে। সদ্য-স্বাধীন একদা উপনিবেশ দেশের সাহিত্য ইউরোপীয় উপনিবেশিক শক্তির ভাষাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। যে বিশ্বদর্শন তাকে শেখানো হয়েছে তাকে ঝেড়ে ফেলতে হবে, ভুলে যেতে হবে, সচেতনভাবে ঁহষবধৎহ করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে উপস্থাপনার নতুন নতুন পদ্ধতি। এই গ্রন্থের লেখকরা আরও দেখালেন, উপনিবেশের লেখকরা ইংরেজিকে পুনর্গঠন করছেন। এরূপ পুনর্গঠনের মাধ্যমে তারা তাদের নিজস্ব আত্ম-পরিচিতি বোধকে প্রকাশ করেন। তাদের উদ্দেশ্য হলো ইংরেজিকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করা যাতে সে তাদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতাকে ধারণ করতে ও প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। উত্তর-উপনিবেশিক দুনিয়ায় বিভিন্ন ভাষা-গোষ্ঠির দ্বারা ইংরেজি প্রতিস্থাপিত হতে থাকে। তাদের লক্ষ্য পশ্চিমি উপনিবেশিক মূল্যবোধকে প্রশ্নের মুখে ফেলা, যে মূল্যবোধকে ইংরাজী ভাষা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এইসব ভাষা-গোষ্ঠির সাংস্কৃতিক পার্থক্যের চেতনা গুরুত্ব পেল। ঐ লেখকরা বললেন ভাষা হলো ক্ষমতার একটি মাধ্যম। সেই হিসেবে ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বা কার্য দাবি করে যে উত্তর-উপনিবেশিক রচনাসমূহ কেন্দ্রের ভাষাকে দখল করবে এমন এক সন্দর্ভে যা উপনিবেশের পরিসরের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। একক ভাষা ঊহমষরংযর পরিবর্তে সৃষ্টি হতে থাকে একাধিক বহমষরংযবং। তা ঘটে বিভিন্ন বর্ণনারীতির মাধ্যমে, যেমন — তাঁদের রচনার মধ্যে এমন শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়া যাকে অনুবাদ করা অসম্ভব। যেমন— দুর্বোধ্য শব্দ বা টীকা-টিপ্পনি যোগ করা। যেমন আদর্শ ইংরেজি বাক্য-গঠন (ংুহঃধী) রীতিকে ইচ্ছে করে লঙ্ঘন করা। অথবা অন্য ভাষা থেকে কাঠামো ধার করে ইংরেজিতে সেগুলোকে ব্যবহার করা। অথবা মিশ্র জাতির (পৎবড়ষব) ইংরেজিকে তাদের রচনায় প্রয়োগ করা।

এই গ্রন্থটি দেখালো যে উত্তর-উপনিবেশিক রচনাসমূহ কেন্দ্র থেকে উৎসারিত ও শেখানো আদর্শ ইংরেজিকে লঙ্ঘন করে। বরং ঐ ইংরেজিকে তারা দখল করে নেয়। ঐ ইংরেজিকে দেশী কোনো ভাষার প্রভাবের বৃত্তে নিয়ে আসে। স্থানীয় ভাষার জটিল কথন অভ্যাসের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে তাকে। এ হল নতুন ইংরেজি উপনিবেশের ইংরেজি। কেন্দ্রের ইংরেজির থেকে এ প্রকৃতই পৃথক। এই  পার্থক্য কোনোভাবেই ঘুচে যাবার নয়। তবে অবশ্যই এই পার্থক্য নেতিবাচক নয়, বরং ইতিবাচক। এই পার্থক্যের মাধ্যমে এক আত্ম-পরিচিতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে যার পুনরুজ্জীবন ঘটেছে অথবা নতুন করে যা সৃষ্টি হয়েছে। এই নতুন ইংরেজিগুলোকে আর আদর্শ (ংঃধহফধৎফ) ইংরেজিতে রূপান্তরিত করা যায় না। কারণ তারা আদর্শ ইংরেজির সীমাকে ডিঙিয়ে গেছে, তার নিয়ম-কানুনকে ভেঙে দিয়েছে। সাহিত্য সমালোচনার বিমূর্ত, বিশ্বজনীন, চিরায়িত দৃষ্টিকোণ এভাবে ধসে পড়লো। জন্ম নিল ঐতিহাসিক স্থানীয় ও ভৌগোলিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে, রাজনীতিক বিশ্লেষণের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যা সাহিত্য পর্যালোচনা ও সমালোচনায় আনলো এক দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন। এ হলো পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্যতত্ত্ব। এই সাহিত্যতত্ত্বেরও অবশ্য অনেক রকম সমালোচনা হয়েছে। এটি সামাজিক লিঙ্গবৈষম্য, শ্রেণিবৈষম্য, বিভিন্ন উপনিবেশ ও প্রাক্তন উপনিবেশের নিজেদের মধ্যেকার পার্থক্য, জাত-পাতের বিভেদ এসবকে উপেক্ষা করেছে এটাই সমালোচকদের অভিযোগ। অন্য সমস্ত প্রকার বৈষম্যকে অবহেলা করে কেবল উপনিবেশিক জাতিগত বৈষম্যকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়ার ফলে প্রতিরোধ হয়ে উঠবে সংকীর্ণ, আক্রমণের বর্শাফলকের ধার কমে যাবে, ক্ষমতা ও প্রভুত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একচোখেমিতে ভুগবে এটাই সমালোচকদের আশঙ্কা। এই সাহিত্যতত্ত্ব অন্য ধরনের বৈষম্যের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল হতে পারেনি, বৈষম্যের সূক্ষ্মতর মাত্রাগুলোকে চিহ্নিত করতে এটি অক্ষম এটাই অভিযোগ।

উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্ব

১৯৯০-এর দশকে পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্য সমালোচনার তত্ত্ব থেকে অনেকটা স্বতন্ত্র স্বাধীনভাবে গড়ে উঠতে থাকে পোস্টকলোনিয়াল তত্ত্ব। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হল Colonial Discourse and post colonial Theory। এর সম্পাদক প্যাট্রিক উইলিয়ামস ও লারা ক্রিসম্যান। ১৯৯৫-এ প্রকাশিত হল অ্যাশক্রফট, গ্রিফিথ্স ও টিফিন সম্পাদিত The post colonial stadies Reader। সাইদ, ভাবা ও স্পিভাকের দীর্ঘ সমালোচনা  মেলে দুটি গ্রন্থে :) White maythologis : Writing History and the west (১৯৯০)। লেখক রবার্ট ইয়াং : (২) Post colonial Theory : contexts practices, politics (১৯৯৭)। লেখক বার্ট মুর গিলবার্ট হোমি ভাবা সম্পাদিত ঘধঃরড়হ ধহফ ঘধৎৎধঃরড়হ (১৯৯০), ভাবা রচিত ঞযব খড়পধঃরড়হ ড়ভ পঁষঃঁৎব (১৯৯৪), গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ঞযব ঢ়ড়ংঃ পড়ষড়হরধষ পৎরঃরপ (১৯৯০), অ্যাশক্রফ্ট গ্রিফিথস ও টিফিন সম্পাদিত ঞযব ঢ়ড়ংঃ পড়ষড়হরধষ ংঃঁফরবং জবধফবৎ (১৯৯৫), পদ্মিনী মঙ্গিয়া সম্পাদিত ঈড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু চড়ংঃ পড়ষড়হরধষ ঞযবড়ৎু : অ জবধফবৎ (১৯৯৬), লীলা গান্ধীর চড়ংঃপড়ষড়হরধষ ঞযবড়ৎু : অহ ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ (১৯৯৮) ইত্যাদি গ্রন্থ একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে লীলা গান্ধী লিখেছেন : উপনিবেশিক অতীতের রহস্যময় বিস্মৃতির বিরুদ্ধে এক তাত্ত্বিক প্রতিরোধ হিসেবে উদ্ভূত হল উত্তর-উপনিবেশিক তত্ত্ব। উপনিবেশিক অতীত ইতিহাসকে জেরা করবার মনে করিয়ে দেবার ও নতুন করে দেখার এ হল এক অ্যাকাডেমিক অর্থাৎ বিদ্যাচর্চাগত উদ্যোগ। লীলা গান্ধী আরও বলেন উত্তর উপনিবেশিক তত্ত্ব আমাদের উপনিবেশিক অতীতের— সে বোধ ও অভিজ্ঞতার— তাত্ত্বিক অর্থ বা তাৎপর্যের সন্ধানরত। একদিকে উপনিবেশবাদের দুঃসহ নিপীড়নের স্মৃতি, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক প্রভুর ক্ষমতার কুহকিনী মোহ। এই দোলাচলের মধ্যে অবগাহন চলে উত্তর-উপনিবেশিক তত্ত্বের।

উত্তর-উপনিবেশবাদের ক্রমবিকাশে বহু চিন্তাবিদ, লেখক, ঔপন্যাসিক, তাত্ত্বিক, সাহিত্যক, ঐতিহাসিকের অবদান রয়েছে। এডওয়ার্ড সাইদ, রণজিৎ গুহ, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌরী বিশ্বনাথন, দীপেশ চক্রবর্তী; নাদিন গর্ডিমার, সি এর আর জেমস, সেঙঘর, আনিয়া লুম্বা, কুমকুম সাঙ্গারী, আশিস নন্দী, সাহিদ আমিন, হোমি ভাবা, অজিত চৌধুরী, ওলে সোইনকা, টি, এন মদন, জ্ঞান প্রকাশ, প্রদীপ জোগনাথন, জ্ঞহানেন্দ্র পান্ডে, সুমিত সরকার, সুদীপ্ত কবিরাজ, কল্যাণ সান্যাল, ডেভিড হার্ডিমান, গৌতম ভদ্র, বিল অ্যাশক্রফট, এনগুনি, আচের, সালমান রুশদি, ডেভিড আর্নল্ড, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিতাভ ঘোষ, বিক্রম শেঠ, ঝুম্পো লাহিড়ি, অরুন্ধতী রায়, ভি এস নাইপল প্রমুখ তাত্ত্বিক ও সাহিত্যেকের মননে, সৃজনে, অবদানে পোস্টকলোনিয়ালিজম সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। এঁদের মধ্যে মতবিরোধ অবশ্য যথেষ্ট। বিতর্কও অনেক। তবুও কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য তাদের রয়েছে। তাই মোটামুটিভাবে বলা চলে উপনিবেশবাদের অভিঘাতে উপনিবেশে ও উত্তর-উপনিবেশে যে সংস্কৃতি সৃজন ও মনন ঘটে, তাকে বিশ্লেষণের প্রয়াস হল উত্তর-উপনিবেশিক তত্ত্ব। উপনিবেশের সমাজ যখন সা¤্রাজ্যবাদী সন্দর্ভকে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে, তাকে বোঝার তাত্ত্বিক পদ্ধতি এটি। বিল অ্যাশক্রফট লিখেছেন : Post-colonial theory developed as a way of addressing the culturel production of those societies affected by the historical phenomenon of colonialism. In this respect it was not conceived as a grand theory but as a methodology : first, for analyzing the complex strategies by which colonized societies have engaged imperial discoures, and second, for studing the ways in which many of those strategies are shared by colonized societies re-emerging in very different political and cultural cicumstances উপনিবেশিকীরণের ঐতিহাসিক বাস্তবতাই হল পোস্টকলোনিয়াল তত্ত্বের ভিত্তি। অ্যাশক্রফট্ বলেছেন ‘We can only understand the signifcance of post-colonial discourse if we understand its basis in the historical fact of colonization, and consequently in Modernity itself as its agonitic other। উপনিবেশের মানুষ যে সাংস্কৃতিক ফসল, সাহিত্য, শিল্পকলা উৎপাদন করেছেন তার থেকেই উদ্ভব ঘটেছে উত্তর-উপনিবেশবাদী চেতনার। বিশেষত ভারতীয় ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রিকান লেখকদের ইংরাজীতে লেখা সাহিত্যিক রচনা থেকে। অ্যাশক্রফট লিখেছেন, ‘The postcolonial emerges from the cultural production, of colonized people, most notably from the literary production, in English of African, Caribbean and Indian write and it was first systematized in another post-coloneal coumtry, Astralia (not the u.s. although the us academy qickly moved in to colonize the field)’। উত্তর-উপনিবেশিক জনগণের অভিজ্ঞতা ও চেতনায় যে কলোনিয়ালিজম বিধৃত হয়েছে তার যে স্মৃতি, স্মৃতির বিস্মরণ, সচেতন বিস্মরণ ও অসচেতন বিস্মরণ, তার আকর্ষণ, মোহ তার ব্যঞ্জনা, যে যন্ত্রণা-বোধ, অবমাননা, আজ স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পরেও একদা উপনিবেশের জন-চেতনায় ওই যে কলোনিয়ালিজমের উপস্থিতি, তার সম্পর্কেই রাজনৈতিক দৃষ্টিপাতকে বলব পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্ব। অর্থাৎ এ হল এক অর্থে কলোনিয়াল শাসনের পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনর্মূল্যায়নের তত্ত্ব। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র অধ্যাপক শিশিরকুমার দাশের দীর্ঘ উদ্ধৃতি এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য :

দুশো বছর ধরে আমদের দেশে ঔপনিবেশিক শাসন চলছে, সেই ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্র ছিল ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের বোধ। ইংরেজি ভাষা পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান, পাশ্চাত্য ইতিহাস আমাদের চৈতন্যে একটা বড়ো ধাক্কা দিয়েছিল। সেই অভিঘাতে আমরাও — ইংরেজি শিক্ষিত সমাজ — মোটামুটি ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছিলাম। সব ব্যাপারে না হলেও কোন কোন ব্যাপারে তো বটেই। আমাদের সাহিত্য দর্শন, ধর্ম, আমাদের সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গ বিচারে এবং মূল্যায়নে আমাদের চৈতন্যে ক্রিয়াশীল হতে শুরু করল পাশ্চাত্য মডেল। যারা আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের জয় গান করেছেন, তাদেরও পদে পদে পশ্চাদ্ধাবন করেছে ইউরোপীয় ‘মডেল’গুলো। আর আমাদের আধুনিকতার গর্বই ছিল আমরা কতটা ইউরোপীয় হয়ে উঠছি।

ভারতীয় চিন্তাশীলেরা আমাদের বলেছেন যে, ঔপনিবেশিক শাসনে এটাই হয়, এটাই হয়ে থাকে। অর্থাৎ ইউরো-কেন্দ্রিকতা— ইউরোপের ইউরো-কেন্দ্রিকতা নয়। আমাদের ইউরো-কেন্দ্রিকতা ঔপনিবেশিক শাসনের স্বাভাবিক ফল। ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব বোধ এই ঔপনিবেশিক শাসনকে ন্যায্যতা দিতে চাইছিল আর আমরা সেই শাসনের মধ্যে ছিলাম বলেই তার শ্রেষ্ঠত্বকে ক্রমশই মেনে নিতে শিখেছিলাম। আজ আমরা আর সেই শাসনের মধ্যে নেই। আমাদের দেশে এবং সমগ্র তৃতীয় বিশ্বেই ইউরো-কেন্দ্রিকতাকে ধিক্কার দেওয়া হচ্ছে।

মলয় রায়চৌধুরী লিখেছেন ক্রিকেট নিয়ে সর্বস্তরের ভারতীয়দের যে উদ্দীপনা, তা ‘একটি উত্তর-উপনিবেশিক সংস্কৃতির হল্লা’। পশ্চিমবঙ্গে ‘উঠতি শহুরে বানানো উচ্চারণভঙ্গীকে চাপিয়ে দেবার চেষ্টা হয় গ্রাম বাংলার আপামর বাঙালির ওপর। যেন পার্থক্য থাকাটা অশোভন, অসভ্য, অনৈতিক ও অবৈধ— কলকাতায় পাতিবুর্জোয়া নকল সংস্কৃতিটির মিডিয়া-সমর্থিত ভয়ঙ্কর প্রভাবে ভাষার সৌকর্যটি বিধ্বস্ত হয়ে যাচ্ছে। বাংলা কবিতার এখনকার আবৃত্তিকারদের এবং দূরদর্শনের সংবাদ পাঠক-পাঠিকার কৃত্রিম উচ্চারণ এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়’। সায়েবদের দেখাদেখি বাঙালি ‘কালা আদমি’ও প্রগতি, সুরুচি, সভ্যতা, পরিশীলিত কালচার চায়। উপনিবেশিক পাঠবস্তুগুলো বিনির্মাণ করে হোমি ভাবা লক্ষ করেছেন : কীভাবে ইউরোপীয় লেখকরা উপনিবেশিক সায়েব মেমদের বড়ো করে দেখিয়েছেন নেটিভদের ছোট করে দেখানো বাঁধাধরা চরিত্রচিত্রণের মাধ্যমে। ‘বাঙালা সাহিত্যেও দেখা গেছে, পাশ্চাত্য মানদ- আঁকড়ে গড়ে তোলা কাঠামোটিতে আঘাত হানলেই, গেল-গেল রব ওঠে… পশ্চিমবঙ্গ পূর্ববঙ্গের সাহিত্যের ক্যানন এসেছে ডক্টর জনসন, টি এস এলিয়ট, আই এ রিচার্ডস, উইলিয়াম এস্পসন, অফ আর লিভিসের কাছ থেকে, ভায়া কলকাতা-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। ‘জায়গা বা জিনিসের নাম তারা ইচ্ছে করে বিকৃত করেছে। এমন লাই দেবার কোনো কারণ নেই যে তারা উচ্চারণ করতে পারত না’। ঢাকাকে ডাককা, বাংলাকে বেঙ্গল, কলকাতাকে ক্যালকাটা, মুখোপাধ্যায়কে মুখার্জী। আমরা সেগুলো এতকাল আওড়েছি। ভাবিনি কোনো গেঁয়ো বাঙালি যদি লন্ডনকে লন্ডুন বলত সায়েবরা সেটাকে কি মর্যাদা দিত? রবীন্দ্রনাথও ঠাকুরের বদলে টেগোর লিখেছেন, ইংরেজিতে হলিউডের অনুকরণে বোম্বাই সিনেমা জগতকে বলা হচ্ছে বলিউড।

জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছিলেন, উপনিবেশকে স্বাধীনতা এবং নেশনত্ব দেওয়া নিশ্চিতভাবে খারাপ। সাইড দেখিয়েছেন, জেন অস্টেন, কিপলিং-কানরাডের উপন্যাসে সা¤্রাজ্যবাদের গরিমা। একই জিনিস ফর্স্টার চার্লস গোল্ড জন রাইসে’। ‘এককালে বাংলা উপন্যাসে নায়কদের প্রায়ই বলা হতো  ‘বনেদি ঘরের ছেলে’। এই বনেদি জিনিসটা হলো গভর্নর কর্ণয়োলিসের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সা¤্রাজ্য কীভাবে মস্তিস্ক দখল করে এটি তার নমুনা’। নেটিভের ভাষা ও ভাষার মাধ্যমে তার মস্তিস্কে সা¤্রাজ্যটি বসানোর উদ্দেশ্যে বেরোয় হ্যালহেডের দ্যা গ্রামার অয় দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ (১৭৭৮), অ্যাপ-জেনের ইংরেজি ও বাঙলা ভোকাবুলারি (১৭৯৩), মিলারের শিক্ষা গুরু (১৯১৭), ফস্টারের ভোকাবুলারি (২খ- : ১৯৯৯-১৮০২)। ইউরোপ ধরে নিয়েছিল উপনিবেশের সংস্কৃতি মানেই অধ্যয়নের বস্তু। তাই উলঙ্গ যুবতীকে নিয়ে লন্ডন আর প্যারিসে ‘হটেনটট ভেনাস’ নামে প্রদর্শনী করা হয়েছিল। অথচ ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর-এ ইতরতা খুঁজে পান জেমস লঙ। পাঁচালিগুলোকে বলেন নোংরা, লালসা-উদ্রেককারী। বেতালপঞ্চবিংশতি স্থূল ও অশোভন। ‘সায়েবদের দেখাদেখি আমরা বটতলার বই নামে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডিসকোর্সকে তাচ্ছিল্য করতে শিখেছিলুম’। সায়েবি মূল্যবোধ এবং বাঙালি মুৎসুদ্দি-বেনিয়ান সংস্কৃতির প্ররোচনায় ১৮৫৬ সালে অশ্লীলতা নিবারণ আইন পাশ হয়।

একটি সাবলটার্ন আলাপচারিতা ছিল কবিওয়ালা, তাদের মধ্যে ছিলেন : নিতাই বৈরাগি, নীলমনি পাটনি, বলরাম বৈষ্ণব, রামসুন্দর স্যাকরা, ভোলা ময়রা, জগন্নাথ বেনে, কেষ্টা মুচি, ভীমদাস মালাকর, মতি পসারি। এই ডিসকোর্সটি ধ্বংস করে ফেলা হল এলিট প্রচারের মাধ্যমে। এলেক বোহমারের মতে, নেটিভদের সৃজনশীল কাজগুলো ম্যান ফ্রাইডে (রবিনসন ক্রশো) বা হটেনটট ভেনাসের দৃষ্টিতে পশ্চিমের ভাবজগতটি। ‘আস্ত আয়নায় পাশ্চাত্য জগত নিজের ভাঙাচোরা চেহারাটি দেখবে। দেখবে যে তারা নিজেরাই বুনো, অশিক্ষিত, গ্রাম্য অসংস্কৃতিবান রুচিহীন, নোংরা ফোঁফরা’। নিউইয়র্কে কাব্যপাঠ বাঙালি কবি গর্বিত হন। চোস্ত ইংরেজি বলতে পারলে আদালতে-অফিসে-থানায়-সেমিনারে দাপট দেখানো যায়। অমিয় দেব লিখেছেন, ‘এক আধুনিক ভারতীয় ভাষা সাহিত্যের আমি বিশেষজ্ঞ, এক প্রতিবেশী দেশের কোনো তুলনীয় ভাষা সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ আমাকে প্রথম আলাপেই সসম্ভ্রমে জিজ্ঞেস করে বসলেন, আমি কোথাকার পাশ, লন্ডন না শিকাগোর; অথচ আমি অবাক হলাম না — এমন উদ্ভট নাটক যে আদৌ ঘটে না তা কি হলফ করে বলা যায়। সেই সঙ্গে কোনো নিজসভায় যদি কেউ প্রস্তাব করে বসেন, আসুন আমরা আজ থেকে ইংরেজি সাহিত্য মাতৃভাষায় পঠন-পাঠন করি, তাহলে কেবল ভ্রুকুঞ্চন নয়, ‘গেলো গেলো’ রব উঠবে এমনকি দু-একজনে হয়তো চোখ মটকিয়ে বলেও ফেলতে পারেন, এটা কি নাট্যশালা! তা নাট্যশালা তো বটেই খানিকটা নইলে তথাকথিত ইংলিশ মিডিয়া স্কুলে-স্কুলে দেশটা ছেয়ে থাকে। মলয় চৌধুরী আরও দেখিয়েছেন, ‘ঔপনিবেশিক সঙ্কেত পদ্ধতিটি নেটিভ অভিব্যক্তিকে এলিটের স্তর ছাড়িয়ে যে আরো তলায় নিয়ে গেছে তা কালো (সাদা চামড়ার উল্টো) রঙটি যেভাবে উত্তর-উপনিবেশিক আলাপচারিতায় ব্যবহার হচ্ছে তা থেকে টের পাওয়া যায়। যেমন কালো হাত গুড়িয়ে দাও’। যেমন : কালা দিবস, ব্ল্যাকশিপ কালা কানুন, কালোবাজার, কালো টাকা। বিয়ের বাজারে ফর্সাপাত্রী কাম্য। বিদ্যাচর্চায় পশ্চিমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী ছাপ না হলে চলে না।

তিনটি দিক

প্রায় ৬৫০ বছর ধরে ইউরোপ উপনিবেশ স্থাপন করেছিল লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার অসংখ্য দেশে। সেইসব দেশের কোটি কোটি মানুষ উপনিবেশবাদের শিকার। রাজনৈতিক পরাধীনতা, অর্থনৈতিক শোষণ চলেছিল নিরবচ্ছিন্নভাবে। চলেছে দমন-পীড়ন, অত্যাচার, সন্ত্রাস, লুণ্ঠন। সেসব তো আছেই। কিন্ত উত্তর-উপনিবেশিক তত্ত্ব (ঢ়ড়ংঃপড়ষড়হরধষ) আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আরও তিনটি দিকের প্রতি, সেগুলো হলো : (১) রাজনৈতিক পরাধীনতা ও অর্থনৈতিক শোষণ ছাড়াও যেটা উল্লেখযোগ্য তা হলো সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ উপনিবেশের আশ্বেতকায় মানুষের সাংস্কৃতি, চিন্তা-ভাবনা, চৈতন্য, জ্ঞানতত্ত্ব উপস্থাপনা (ৎবঢ়ৎবংবহঃধরড়হ), মনন বৌদ্ধিক ক্রিয়া-কলাপ মূল্যবোধ, জগত সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি রচনা পাঠের পদ্ধতি, এ সব কিছুর ওপর উপনিবেশবাদ তার প্রায়শ অদৃশ্য ক্ষমতার জালকে ছড়িয়ে দিয়েছে।

(২) উপনিবেশবাদ তার ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণকে ছড়িয়ে দিয়েছে আমাদের সংস্কৃতির ওপর শুধু তাই নয়। আমাদের মননে তাকে এমনভাবে সঞ্চারিত করেছে যে আমরা উপনিবেশিক মনন ও মূল্যবোধকে নিজেরাই আত্মস্থ করেছি। এ হল অন্তর্লীনিকরণ (ওহঃবৎহধষরংধঃরড়হ)। আমরাই বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে আমরা নিকৃষ্টতর। শ্বেতকায় প্রভুরা সভ্য, উন্নততর। তাদের দৃষ্টিকোণের আত্মীকরণ (ধংংরসরষধঃরড়হ) ঘটেছে আমাদের মধ্যে।

(৩)  আর এ ঘটনা শুধু উপনিবেশিক আমলেই ঘটেছে তা নয়। আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করার পরে যে সব দেশ আজ উত্তর-উপনিবেশিক বলে পরিচিত (যেমন : ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ঘানা, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি) তাদের জনসাধারণের জীবনযাত্রায় ও জীবন-দর্শনে মননে ও মূল্যবোধে, চিন্তায় ও সংস্কৃতিতে, জ্ঞানতত্ত্ব ও বাস্তব জগতের উপস্থাপনায়, উক্ত উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ আজও নিরন্তর প্রবহমান।

উত্তর-উপনিবেশিক তত্ত্ব আজ আমাদের চৈতন্যে বিদ্যাচর্চায়, জ্ঞানতত্ত্বে, ইতিহাসবোধে ঐ উপনিবেশকারী পশ্চিম বা ইউরোপের অদৃশ্য অস্তিত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের সচেতন করে তোলে।

ইউরো-সেন্ট্রিজম

প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস রচনার তত্ত্বগত ভূমিকেই প্রশ্ন করেন সাবঅল্টর্ন স্টাডিজ। অ্যাকাডেমিক ইতিহাস বিশ্লেষণে তারা হস্তক্ষেপ করতে প্রয়াসী। তারা চান সমাজের সাবলটার্ন শ্রেণিগুলোর স্বনির্ধারিত বিষয়ী সত্তা (ধমবহপু)-কে পুনরুজ্জীবিত করতে। শ্রেণি সামাজিক লিঙ্গ, জাতিকুল (ৎধপব) এবং সংস্কৃতির নিরিখে যারা অধঃস্তন ক্ষমতার লক্ষ্যবস্তু, তারাই নিম্নবর্গ (ংঁনধষঃবৎহ) অবস্থানে রয়েছেন। এইসব গবেষকরা মনে করেন, কলোনিয়াল, জাতীয়তাবাদী ও এমনকি মার্কসবাদী ইতিহাসরচনাও শেষ পর্যন্ত ভিত্তিবাদী (ভড়ঁহফধঃরড়হধষরংঃ) কাঠামোয় বিশ্বাসী। এর বিপরীতে সাবলটার্ন ঐতিহাসিকরা যে কোনোরকম ভিত্তিবাদের সমালোচনা করেন। জ্ঞান প্রকাশের মতে, সাবলটার্ন স্টাডিজ হল প্রকৃতিগতভাবে পোস্টকলোনিয়াল সমালোচনা। দীপেশের ভাষায় :

Europe remains the sovereign, theoretical of all histories including the ones we call Indian, Chinese, Kanyan and so on. There is a peculiar way in which all these other histories tend to become variations on a master narrative that could be the history of Europe, In this sense, Indian histore itself is in a position of subaltlernity; one can only articulate subaltern subject positions in the name of this history… That Europe works as silent referent in historical knowledge itself becomes obvious in a highly ordinary way. There are at least two everyday symptoms of the subalternity of non-Westrn : third histories. Third-world historians feel a need to refer to works in European history; historians of Europe do not feel any need to reciprocate. Whether it is an Edward Thompson, a Le Roy  Ladurie, a George Duby, a Cario Ginzburg, a Lawrence Ston… to take but a few names at random from our contemporary world– the greats’ and the  models of historians are alwayes at least culturally European. They produce thir work in relative ignorance of non-Western histories, and this does not seem to affect the quality of their work. This is a gesture, however, that we’ cannot return, We cannot even afford an equality or symmertry of ignorance at this level without taking the risk of appearing old-fashioned or outdated।

বিভিন্ন দেশের অ্যাকাডেমিয়াতে ইতিহাসচর্চার পেছনে অদৃশ্যভাবে একটি মানদ- সক্রিয় থাকছে। সে মানদ- পশ্চিম ইউরোপে উদ্ভূত তথাপি তার দাবি সে বিশ্বজনীন। তার অদৃশ্য ক্ষমতা স্থির করে দেয় বিভিন্ন সমাজের নিজস্ব ইতিহাসবোধকে, ইতিহাস ব্যাখ্যার একেবারে মৌলিক আদি ধারণাগত বর্গ (পধঃবমড়ৎু) গুলোকে। শিশিরকুমার দাশ সুগভীর ক্ষোভের সাথে লিখেছেন :

আজ আমাদের ভারতবর্ষে একটা প্রবল ইউরো-মুখিনতা। আর এই ইউরো-মুখিনতার কারণ আমাদের চৈতন্যে ইউরোপের আধিপত্য। আমাদের আধুনিকীকরণের কেন্দ্রেই রয়েছে পশ্চিমায়ন। অনেকেই দুটোকে সমার্থক বলেই মনে করেন। প্রাক-স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষের ইউরোমুখীনতাকে উপনিবেশিক শিক্ষা ও আবহাওয়ার ফল বলে আমরা জানি। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতবর্ষে— আজ আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি স্তরেই আমাদের ইউরোমুখীনতা আজ অনেক প্রবলভাবেই প্রকট। আমাদের চিন্তার প্রত্যেকটি স্তরেই কাজ করছে ইউরো-কেন্দ্রিকতা এবং একে আমরা ব্যাখ্যা করছি উপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার হিসেবে। যদি তাই হয় তাহলে তো শেষ পর্যন্ত আমরা ইতিহাসের নিয়ামক শক্তির ক্রীড়ানক মাত্র। ইউরো-কেন্দ্রিকতাকে ধিক্কার দেওয়া ভ-ামিমাত্র। কারণ আমরা ইউরো-কেন্দ্রিকতাকে যেভাবেই হোক মেনে নিয়েছি। আর তার কারণ তার বিরোধিতা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্তত এইরকম একটা সিদ্ধান্তে কেউ কেউ পৌঁছে যেতেই পারেন।

ইউরোপ বা পশ্চিমই পৃথিবী আরো বড়ো, আরো বিচিত্র। এই বোধটা যদি আমাদের মধ্যে স্পষ্ট হয় এবং দৃঢ় হয় তাহলে বোধটাকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বও আমাদের। আমরা যারা প্রত্যেক ব্যাপারে ইউরোপেরই সমর্থন খুঁজেছি আমাদের চিন্তায় ও ভাবনায়, আমরা যারা আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বুঝতে চাইছি অবিরাম ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে— তারা কেন ইউরোকেন্দ্রিকতার কথাটা তোলেন সেটা আমি বুঝতে পারি না।

পোস্টকলোনিয়াল তত্ত্ব মানে হল চৈতন্যের ওপর ক্ষমতা কীভাবে ক্রিয়ারত সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠা। আমাদের চিন্তনক্রিয়া অদৃশ্যভাবে বদলে গেছে ‘পশ্চিম’-র দ্বারা। রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান— সর্বক্ষেত্রে এ ‘বদল’ অনুভব করা যায়। অন্যত্র (ঔঐঝঝ) আমি এটা মাত্র ব্যাখ্যা করেছিলাম এভাবে :

The West distorted in fundamental ways how we think and do things our moral values notions of good and bad, understandung of our social life, our conceptions of time, history, progress, science, turth and nature, views on work and leisure, social relation, family bonds, relations between man and plants and animals, our attitude to sex, the old and the childern, the mad and the `abnormal’, the differnt, the diseased and the diseases, life and death, war and peace, the sense of fulfillment in life  politics relation between private and public spheres meaning of economic activities, productivity and consumption. We have learn to measure our life and culture on the basis of the Western standards and feel inferior. We have belived naively that all this, even the very process of believing this, is only natural and untainted by power. We have murmured to ourselves that ours are substandard as compeard to certain (apparently) universal criteria (In fact laid down in a clever way by the power of the west). This is the outcome of a hidden and ambiguous violence on our culture and knowledge which the colonial modernity made happen. I would like to refer here to such researchers in a wide range of fields such as politics, history, education, sociology, cultural studies, anthropology, psychology, linguistics, fine arts, literary criticism, philosophy, economics, geography, women and gender studies, tribal studies, theater and film studies even history of and philosophy of natural sciences, etc.

প্রাত্যহিক আটপৌরে জ্ঞানের আকারও বদলে যেতে পারে— মলয় রায়চৌধুরীর একটি উদাহরণ মনে পড়ছে। নেতিবাচক কিছু বোঝাতে আমরা বলি ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা। কথাটা ঔপনিবেশিক। খারাপ তাৎপর্যের দ্যোতক। অথচ বাঙালি প্রথম পাতেই করলা-উচ্ছে খেতে ভালবাসে। ফাল্গুন-চৈত্রে নিম-বেগুন দিয়ে ভাত খায়। শুক্তো তার প্রিয়। মেথিফোড়ন তার পছন্দের। বরং ইংরেজদের মধ্যে তেতো খাবারের চল নেই। শাসকের অভিব্যক্তি হয়ে গেছে বাঙালির অভিব্যক্তি। এটা লক্ষ করার বিষয় যে, উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্ব নিজেও বহুলাংশে অনুপ্রাণিত হয়েছে কতকগুলো ইউরোপীয় চিন্তন-ধারার দ্বারা যথা উত্তর-আধুনিকতাবাদ, উত্তর-কাঠামোবাদ, মাকর্সবাদ, অস্তিবাদ, ব্যাখ্যাশাস্ত্রে বিনির্মাণ ইত্যাদি। যেমন লীলা গান্ধী লিখেছেন :

In the main intellectual history of postcolonial theroy is marked by a dialectic between Marxism, on the one hand, and poststructuralism/postmodernism, on the other… While the poststructuralist critique of Western epistemology and theorisation of cultural alternity/ difference is indispensable to postcolonial theory, materialist pholosophies, such as Marxism, seem to supply the most compelling basis for postcolonial politics. Thus the postcolonial critic has to work toward a synthesis of, or negotiation between, both modes of thought.

বিল অ্যাশক্রফট লিখেছেন : ‘I suspect distinction beteween the postmodern and the post-colonial is becoming increasingly blurred এই বিভ্রান্তির কারণ কী? অ্যাশক্রফট একে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :

This confusion is caused party by the fact that major project of postmodrnism- the deconstuction of the centralized, logocentric master narratives of European culture is very similar to the post-colonial project of dismanting the center/ Margin binarism of imperial discoures, These concerns : The decentering of discourse, the focus on the significance of language and writing in the construction of experience, the use of the subversiv strategies of mimicry, parody and irony – all overlap prominent teatores of postmodernism and so a conflation of the two discourses has often occurred..

তিনি বলেন-colonial theory is therefore deeply implicated in the critique of Modernity. But it is not a grand narrative, it directs its attention to that very cultural production through which colonized and formerly colonized peoples engaged the cultural power of empire’। উত্তর-উপনিবেশিকতত্ত্ব ‘ইউরো-কেন্দ্রিকতা’র ক্রিটিক করে। ইউরোপ সেখানে নিছক একটি ভূখ- মাত্র নয়। বরং তা এক বিশেষ ‘ইউরোপ’ আধুনিকতার ক্ষমতার প্রতীক। ঐ আধুনিকতা ১৮ শতকের ইউরোপের বা বৃহত্তর অর্থে পাশ্চাত্যের এনলাইটেনমেন্টকে কেন্দ্র করে বিকাশ লাভ করে ও পরে বিশ্বের অন্যত্র উপনিবেশক পথে বা অন্যভাবে বিস্তার লাভ করে। তাই উত্তর-উপনিবেশিক তত্ত্ব হল কলোনিয়াল মডার্নিটির ক্রিটিক।

পাঠের রাজনীতি

জন ম্যাকলিওডের মতে প্রাথমিকভাবে ও সাহিত্য আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পোস্ট-কলোনিয়ালিজমে নি¤েœাক্ত কোনো একটি বা একাধিক বিষয়ের সাথে জড়িত :

১. যেসব দেশের উপনিবেশবাদের ইতিহাস বা অতীত আছে সেখানকার লেখকদের রচনাকে পাঠ করা। বিশেষত সেইসব রচনা যা অতীত বা বর্তমানের উপনিবেশবাদের ঐতিহ্য ও কর্মধারার সাথে যুক্ত।

২.  যেসব দেশের উপনিবেশবাদের ইতিহাস বা অতীত আছে সেখান থেকে দেশান্তরী হয়েছেন যারা তাদের রচনা পাঠ। এ রকম অভিবাসী পরিবারের সন্তান-সন্ততিদের রচনাও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। প্রবাসী সম্প্রদায় (ফরধংঢ়ড়ৎধ)র অভিজ্ঞতা ও তার বহুবিধ ফলাফলকে তুলে ধরে এইসব পাঠ রচনা।

৩. উপনিবেশিক সন্দর্ভের তত্ত্বসমূহের আলোকে, উপনিবেশবাদের সময়কালে লিখিত রচনাসমূহকে পুনরায় পাঠ করা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হল দুধরনের রচনা : প্রথমত যেগুলোতে সা¤্রাজ্যের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষভাবে বর্ণিত; দ্বিতীয়ত, যেগুলোতে মনে হয় তা বর্ণিত নয়।

এখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যতম মূল শব্দটি হল ‘পাঠ’ (ৎবধফরহম)। উত্তর-উপনিবেশিক পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ-ক্রিয়া কোনোভাবেই একটি নিরপেক্ষ কাজ নয়। আমরা ‘কী’ পড়ি সেটার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা ‘কীভাবে’ পড়ি। উত্তর-উপনিবেশিকতা দাবি করে সে প্রথাগত পাঠ-পদ্ধতি ও ব্যাখ্যার আদর্শরূপ (সড়ফবষ) গুলোকে নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। তবেই একমাত্র উপনিবেশিক সন্দর্ভসমূহ (ফরংপড়ঁৎবং)-কে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা যাবে। পাঠ-ক্রিয়া কোনো নিষ্পাপ নিরপেক্ষ, বিমূর্ত নিরামিষ, অরাজনৈতিক ক্রিয়া মোটেই নয়। বরং প্রতিটি পাঠ-ক্রিয়া সংঘাত-মূলক, তীব্রভাবে রাজনৈতিক। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার হিংস্র প্রতিযোগিতা ও বিরোধের ভিত্তিতেই পাঠক্রিয়া থেকে অর্থ নিরূপিত হয়।

বিকল্প?

পরিশেষে প্রশ্ন উঠবে বিকল্প পথ কি কিছু আছে? আধুনিক সভ্যতা বর্জন করে নিশ্চয়ই কেউ প্রাগাধুনিক সমাজে যেতে চাইবেন না। আসলে তবে কি উপনিবেশবাদ-বিরোধী বিকল্প কোনো আধুনিকতা, হয়তো এক ধরনের জাতীয়তাবাদী আধুনিকতার সন্ধান হতে পারে? সেদিকেই পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ইঙ্গিত। আবার সা¤্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ-উপনিবেশবাদের বিকল্প এক সামজতান্ত্রিক আধুনিকতার সন্ধানও হয়েছে। নাকি অন্য কোনো বিকল্পের কথা ভাবতে হবে? এর উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। শিশিরকুমার দাশের মন্তব্যটি এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য :

ইউরোপের গলদ যে সেই জ্ঞান-বিজ্ঞান তাকে দিয়েছে আধিপত্য বিস্তারের শক্তি আর সেই জন্য সে মনে করে বিশ্ব তাকে অনুসরণ করবে। আমাদের গলদ— যদি একে কেউ গলদ মনে করে— আমরা আমাদের জগতকে বুঝতে পাচ্ছি ইউরোপেরই চোখ দিয়ে। আমি যদি সাহিত্য থেকে উদাহরণ দিই, কথাটা বোধ হয় স্পষ্টতর করতে পারব। গত দেড়শ বছর ধরে আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ যে সাহিত্য সৃষ্টি করেছে তার মানদ- হিসেবে আমরা ব্যবহার করেছি ইউরোপীয় সাহিত্যে। আমাদের মধ্যে কে কতটা ইউরোপীয় সেই নিরিখে স্থির হয়েছে— কে কতটা ‘আধুনিক’ অর্থাৎ কে কতটা মূল্যবান। সেইজন্যই ইউরোপীয় প্রশংসাপত্র আমাদের শিক্ষিত সমাজের কাছে এত মূল্যবান। এবং এটা শুধু উপনিবেশক মনোভাব মাত্র নয়, আজ এই মনোভাব অনেক বেশি সুদৃঢ়। অনেক বেশি ব্যাপক, এবং অনেক বেশি দ্বিধাহীন ভাষায় উচ্চারিত। যদি বলেন যতদিন ইউরোপ তার বিশাল শক্তি— রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক শক্তির অধিকারী থাকবে— ততদিন ইউরো-কেন্দ্রিক এবং ইউরো-মুখিনতা অবশ্যম্ভাবী। তাহলে হয় ইউরো-কেন্দ্রিকতার বিরোধিতার অর্থ হতে তৃতীয় বিশ্বেরও অনুরূপ শক্তি অর্জন এবং ইউরোপ (বা পাশ্চাত্য) কে ঐ শক্তির দ্বারা পরাজিত করা, নয় ইউরো-কেন্দ্রিকতার কাছে আত্মসমর্পণ করা। কিন্তু আমাদের শিক্ষিত সমাজ একদিকে ইউরো-কেন্দ্রিকতাকে যেমন ধিক্কার দেন, অন্যদিকে ঐ ইউরোপকেই করে নিয়েছেন তাঁদের নিজস্ব বা দলীয় স্বার্থ প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র। যার সঙ্গে যুক্ত থেকে সম্মানিত হতে চাই, তা ঐ ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান, যার মানদ-ে দেশের ইতিহাস, ধর্ম, সাহিত্য, চিত্র বিচার করতে চাই তা ইউরোপীয়, যার প্রশংসাপত্রে দেশের শিক্ষিত অশিক্ষিত মানুষের ওপর আধিপত্য অক্ষুণœ রাখতে চাই তা ইউরোপের। তারপরও কি আমাদের পক্ষে ইউরো-কেন্দ্রিকতাকে সত্যি সত্যি টলিয়ে দেওয়া সম্ভব? তবু আমি বিশ্বাস করি অবশ্যই কোনো পথ আছে— যে পথ আমাদের বিশিষ্টতার সঙ্গে অন্যের বিশিষ্টতার সংযোগ ঘটাতে পারে, এমন একটি বিশ্বে বসবাস করতে পারি আমরা যেখানে শাসন শুধু একটা কেন্দ্র থেকেই উৎসারিত হয় না, যেখানে কেন্দ্রই সমগ্র নয়— এমন একটা বিশ্ব যেখানে এই বৃত্তের রূপকটাই মিথ্যা, যেখানে তার অস্তিত্বের সামগ্রিকতা কোনো রূপকের সাহায্য ছাড়াই আমাদের কাছে প্রতিভাত হতে পারে।

যে সমস্ত গ্রন্থ থেকে অবাধ সাহায্য নেওয়া হয়েছে

1. John Mcleod, Beginning Postcolonialism, Manchester University Press, Manchester & New York, 2007
2. Partha Chatterjee, The Nation and its Fragments, OUP, Delhi, 1994
3. ………Nationalist Thought and the Colonial World, Zed, London, 1986.
4. …..(ed). Texts of power, samya, calcutta, 1996.
5. cv_© P‡Ævcva¨vq, BwZnv‡mi DËivwaKvi, Avb›`, KjKvZv, 2000|
6. Leela Gandhi, postcolonial Theory : A Critical Introduction, OUP, New Delhi, 2001 (1998)
7. Edward said, Orientalism, penguin, Hammondsworth, 1991 (1978)
8. Harish Trivedi and Meenakshi Mukherjee (ed.), Interrogating postcolonialsim, llAs Shimla, 1996
9. Elleke Boehmer, Colonial and Postcolonial Literature : Migrant Metaphors, OUP, Oxford, NY, 1995
10. B. Ashcroft, G, Griffiths and Helen Tiffin, The Empire Writes Back, Routledge, London, 1989.
11. Journal of Humanities and Social Sciences, Scotish Church College, 3 (August 2006), Special No, on Modernity. Hereafter, JHSS.
12. Sisirkumar Ghose(ed), Four Indian Critical Essays, Jijnasa, Calcutta, 1977.
13. Deepik Bahri, Introduction to postcolonial Studies, Postcolonial Studies at Emory, Fall 1996, www.englisj.emory,edu
14. Padmini Mongia (ed), Contemporary postcolonial Theory: A Reader, OUP, New Delhi, 1997
15. Bill Ashcrft, Post-colonial Transformation, Routledge, London & N.Y. 2001

১৬.        অঞ্জন সেন, বীরেন্দ্র চক্রবর্তী, উদয় নারায়ণ সিংহ (সম্পা.) ইউরোকেন্দ্রিকতা ও শিল্প সংস্কৃতি, গাঙ্গেয় পত্র, কলকাতা, সংকলন ১৩, ১৯৯২।

১৭.         হাওয়া ৪৯, ‘পোস্টকলোনিয়ালিজম, উত্তর ঔপনিবেশিকতা, বিশেষ সংখ্যা (শারদ ১৪০৩), ১৯৯৬।

18. Dipes chakrabarty, Provincializing Europe, OUP, Delhi, 2001
19. Franz Fanon, Black Skin, White Masks, Pluto, 1986
20. Bill Ashcroft, Gareth Griffiths, Helen Tiffin, The Eupire Writes Back, Routledge, 1989

********************************

কবিতার ভিন্ন প্রস্থ
শোয়েব শাহরিয়ার

আশ্চর্য, শুধু প্লেটোই নয়, প্রাচীনকালে ভারতীয় কিছু ‘হিতচিকীর্ষু’ তাত্ত্বিকবৃন্দ কাব্যকে অপাঙক্তেয় করার বিধান দিয়েছিলেন। কবিতাবিমুখ প-িতপ্রবরদের অভিযোগ ছিল মূলত তিনটি: কাব্যে অসত্যের বর্ণনা করা হয়, অসৎ উপদেশ প্রদান করা হয় এবং কবিতায় অসভ্য বা অশ্লীল বস্তু প্রাধান্য পায়। তবে যৌক্তিক মানদ-ে তাত্ত্বিক রাজশেখর তাঁর জবাবও দিয়েছিলেন। প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে কবিতার অঙ্গ ও অন্তরকে মজবুত ভিত্তি প্রদানের অনুকূলে বৌদ্ধিক, যৌক্তিক ও তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণের প্রকৃত মেধা তখন সমাজ ধারণ করত। একদল কাব্য-রসজ্ঞ, যাঁরা কবিতাবৈরী বা কবিতার সমুন্নতিবিমুখ, তাঁরা কবিতা কেন অপঠনযোগ্য এবং পঠনের নেতিদিক কী কী ইত্যাকার বিবেচ্য বিষয়গুলোর পক্ষে আপন আপন যুক্তিগুলো উপস্থাপন করেছেন, ঠিক তেমনি কবিতার সারস্বত রসে, বোধে সতত আর্দ্র, সঞ্জীবীত ও উচ্চকিত যাঁরা তাঁরা কবিতার অভ্যন্তরীণ ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা, প্রসাদীয় গুণ-বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে নানা বর্ণের ও রঙের ক্ষেত্র কর্ষণ করেছেন। কবিতা যে জীবন প্রেষণা, প্রাণৈষণার মূলমন্ত্র, গহন ও গহীন অন্ধকার তলদেশ থেকে দীপ্তি বিচ্ছুরণক্ষম হীরকখ- তাও প্রমাণ করে ছেড়েছেন। অর্থাৎ কবিতার ভেতর-বাহির,ডান-বাম, সদর্থক-নঞর্থক বাচনগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরে প্রাসঙ্গিক ও বিস্তৃত পরিসরে ব্যাখ্যা প্রদানের মত ওজোগুণসম্পন্ন রসবিশ্লেষক ও তত্ত্বপ্রবর সেকালেও বর্তমান ছিলেন। সেকালে এই মান ও দৃষ্টিভঙ্গির তীক্ষèত্ব অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণের অপরিমেয় দক্ষতা, বিশ্লেষণের ব্যাপ্তি, বোধের কলাচারুত্ব সত্যিই বিস্ময়কর! নাট্য তত্ত্ববিশারদ ভরত নেতি-সমালোচনার যথাযথ জবাব দিয়েছেন ব্র‏হ্মার জবানীতে : ‘নাট্য ধর্মে প্রবৃত্তি জাগায়, অধর্মে নিবৃত্তি ঘটায়, কর্মীদের কামবৃত্তি চরিতার্থ করে, দুর্বিনীতকে শাসন করে, বিনীতদের সংযত করে, ক্লীবদের স্পর্ধিত করে, বীর ও মানীদের উৎসাহ যোগায়, মূর্খকে জ্ঞানী, প-িতকে প্রাজ্ঞ করে।’

কবিতা (সাধুকাব্য সেবনম অর্থাৎ কাব্যসেবা) ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ এবং কলাসমূহে বিচক্ষণতা এবং কীর্তি ও প্রীতি সম্পাদন করে (করোতি কীর্তিং প্রীতিং), আলংকারিক ভামহের সাধনালব্ধ বাণী-উৎসার। ভামহের সামান্যতম ব্যাখ্যা এখানে উল্লেখ্য : কবিতা-চর্চায় বিচক্ষণতা জন্মে এবং রসোত্তীর্ণ পদ বা শ্লোকসমূহ কাব্য¯্রষ্টা কবির পরম কীর্তি আর সম্মানিত পাঠকের ফললাভ হলো প্রীতি। অর্থাৎ সন্তুষ্টি, তৃপ্তি, বন্ধুত্ব,সখ্য, প্রণয় ইত্যাদি। এরই সূত্র ধরে প্রায় আটশো বছর পর বিশ্বনাথ কবিরাজ উপর্যুক্ত চতুর্বর্গফল প্রাপ্তির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিশ্বনাথের আর একটি বচন অতীব উচ্চমার্গীয় দার্শনিক তত্ত্বে শোভিত কান্তি যেন। মহত্তর কাব্য চিত্তে শূন্য আকাক্সক্ষার বোধ তৈরি করে এবং অধিকতর কাব্য অনুশীলনে মোক্ষোপযোগী বাক্যে নত হয় এবং মোক্ষলাভের জ্ঞান অর্জিত হয়। শাস্ত্র যে নীরস, বিকর্ষণস্বভাবী, দুরূহ এবং প্রায় দুষ্পাঠ্য একথা সেই প্রতœকালীন রসবেত্তারা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিলেন, ধর্মীয় অপবুদ্ধির পৃষ্ঠে তার জবাবও দিয়েছিলেন : ‘বেদশাস্ত্র নীরস, তা থেকে পরিণত বুদ্ধির পক্ষেও চতুর্বর্গ ফল প্রাপ্তি দুষ্কর, কিন্তু আনন্দজনক কাব্য থেকে অল্পবুদ্ধিও তা লাভ করতে পারে।’ এই আনন্দই হলো মূল। কবিতা আমাদের যত কিছুই দিক না কেন, নিখাদ আনন্দ-প্রাপ্তির মধ্যেই কবিতার সাধু আস্বাদন নিভৃতে লুকিয়ে থাকে। বিদগ্ধগণের ভাষ্য অনুসারে প্রীতি আনন্দ শব্দেরই সমার্থক। মম্মট ভট্টের উচ্চারণ: ‘আনন্দই সকল প্রয়োজনের মূল। এই আনন্দ লোকোত্তর শুদ্ধ, অনির্বচনীয়, এ-এক আত্মোপলব্ধি।’ অলৌকিক আনন্দ আস্বাদনকারী অশুভকে পরিহার করে।

যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কবি কবিতা রচনা করেন তাকে কেউ বলেন অলৌকিক ক্ষমতা, কেউ বলেন প্রতিভা। ভামহ বলেন প্রতিভা, রহঃঁরঃরাব ঢ়ড়বিৎ, মম্মট বলেন, শক্তি, অভিনবগুপ্ত বলেন, প্রজ্ঞা, যে-প্রজ্ঞা অপূর্ব বস্তুনির্মাণ করতে সক্ষম, অপূর্ব বস্তুনির্মাণক্ষম প্রজ্ঞা। আবার প্রজ্ঞার সাথে অতিরিক্ত একটা কিছু সংযোগ করে হেমচন্দ্র বলেছেন: নবনবোল্লেখশালিনী প্রজ্ঞাযে-প্রজ্ঞা সবকিছুর মধ্যে নতুনত্ব আবিষ্কার করতে পারে।

মধ্যযুগে শিল্পকলা-ভুবনে মান বিচারে সঙ্গীতের স্থান নির্ধারিত হয়েছিল একেবারে তলানীতে অর্থাৎ নি¤œতম অবস্থানে, আর উজ্জ্বল তারকাখচিত শিল্প ও ললিতকলার সোনার খাতায় তালিকাভুক্তির সৌভাগ্যই হয়নি কবিতা নামক ললিতলবঙ্গলতার। সমগ্র মধ্যযুগ জুড়েই প্লেটোর আপ্তবাক্যের ছিল শিরোধার্যতা। রোমীয় কলাতাত্ত্বিকবৃন্দ সেকালিক শিল্পজগতের স্বীকৃত সাতটি ধারা বা শাখাকে মোদ্দা দুইটি ভাগে আলাদা করেছিলেন। মধ্যযুগীয় কালের দাবি, রুচি ও শিল্পবোধের দায় থেকে স্তরান্তর ঘটেছিল বলে আমাদের ধারণা। একটি পর্যায় হল ট্রিভিয়াম যার মধ্যে ছিল ব্যাকরণ, রেটোরিক ও লজিক, অন্য পর্যায়ের নামটি হল কোয়াড্রিভিয়াম, আর এর অধিভুক্ত ছিল পাটিগণিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা এবং সঙ্গীত। রেনেসাঁর তুরীয় সময় চিত্রকলাকে এ-ভাগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ছন্দের নির্ধারিত ছাঁচের মধ্যে কবিতার দর্শন ও পঠনযোগ্য আদল ধরা পড়ে বিধায় অনেক কষ্ট করে কবিতাকে ‘রেটোরিক’ শাখার মধ্যে স্থান দেয়া হয়েছিল।

কবিতা মৌলিক, স্বয়ম্ভর, অনপেক্ষ, আত্মাশ্রয়ী ও সারস্বত কল্যাণমন্ত্র এমত সত্য স্বীকৃতি অর্জন করতে সভ্যতার অনেকখানি পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। চলতি পথে এক ধরনের স্বীকৃতি পেলেও বিশেষ জাতীয় দর্শন বা নৈতিকতার শিখ-ী হিসেবে কবিতাকে ব্যবহৃত হতে হয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে, তা বিশ্বের যে-কোন ভাষার কবিতাকলার ক্ষেত্রে হোক না কেন শাস্ত্রের আচার-সর্বস্ব অন্ধ-সংস্কারের পুরু ঠুলি কবিতার চোখে-মুখে-অন্তরে পরানো হয়েছে, আবার পরবর্তীকালে সাম্যবাদী বিল্পবীরা কবিতাকে সমাজ-বদলের হাতিয়ার বা মন্ত্র হিসেবে ব্যবহারও করেছেন। করতে গিয়ে অতিবিপ্লবীরা কবিতায় ব্যবহৃত রুগ্ন, অপুষ্ট জলোথলো আবেগ, কল্পনার আতিশয্য ও জীবন বিমুখ রোমান্টিকতাকে আক্রমণের লক্ষ্য বলে ঠাউরেছেন। ব্যক্তিক অনুভাবনাকে, মধ্যবিত্তসুলভ স্বার্থচিন্তা ও মানসিকতাকে, অনুদারিক চেতনাকে কবিতায় পরিহার করা বিপ্লবাত্মক দায় বলে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু কবিতা তো একান্তে, গভীরে, একক উত্তাপে ও উষ্ণতায়, অদর্শনে, সত্যে ও সততায় ভূমিষ্ঠ হয়। ভূমিষ্ঠ হয় কবির মনোভূমিতে, নাকি অন্তরের অন্তরীক্ষে নাকি অন্য কোথাও, যা হয়ত ব্যক্তিকবির পক্ষেও জানা সম্ভব নয়। তবে কবিতার জন্মভূমি কবির অভ্যন্তরে কোন এক অনির্ধারিত, অনিশ্চিত, অজ্ঞাত পবিত্রভূমিতে, এটা নিশ্চিত, কিন্তু সেই আঁতুড়ঘর কালনিরপেক্ষ, সমাজ নিরপেক্ষ তো হতে পারে না। কবিকেও একটা কালে ও দেশে জন্ম নিতে হয় এবং জন্ম নিয়ে চলমান সমাজের, দেশের, সংস্কৃতির ও সংস্কারের তথা ধর্মের পরিম-লে নিঃশ্বাস নিতে হয়, বাড়তে হয়, পুষ্ট হতে হয়। তবু কবির অন্তঃপুর ভিন্ন রকম, অঙ্কে মেলে না। কবির ভেতরের তোলপাড়, উথাল-পাতাল, বেদনা অপার, অপ্রাপ্তি, যতœলালিত কষ্ট, সব কিছু আলাদা, অন্য মাপের, ভিন্ন স্বাদের, ভিন্নগোত্রের, ছিন্ননাড়ি যেন।

দুই.

এই পর্বে আমার ভাল লাগা বিদেশী কয়েকজন কবিকে স্বল্প পরিসরে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। যাঁরা কালজয়ী এবং আকাশ ফুঁড়ে যাবার মত উচ্চীয় স্তম্ভ সারস্বত বোধায়নে যাঁরা সন্দেহাতীত এবং কবিতায় বিশ্বচেতনাকে শিল্প মর্যাদায় অভিষেচনে অব্যর্থ তাঁদের বন্দনা করার প্রয়াস চালিয়েছি মাত্র।

স্পেনের লোকনায়ক এবং মহত্তম কবি লোরকা। ঘৃণ্য সা¤্রাজ্যবাদী চক্র কবিকে হত্যা করে ১৯৩৬ সালে। এক গভীর, গোপন, অনাবৃত, তুমুল বেদনার ঘনপরল লোরকার কবিতার মুখ্য স্বর :

ও কাঠুরিয়া,

আমার ছায়াটা কেটে ফেল তুমি।

নিষ্ফলা নিজেকে দেখার নিয়ত অত্যাচার থেকে,

বাঁচাও, বাঁচাও আমাকে।

পুণ্য-উষ্ণতা দিয়ে ধোওয়া সনেটগুচ্ছের টসটসে নতুন পা-ুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল লোরকার, গৃহযুদ্ধের সময় হারিয়ে যায়। বিশ্বকবিতার সে এক অপূরণীয় ক্ষতি। স্পেনের আর এক নোবেল-লরেট আলেকজান্দ্রে সেই হারিয়ে যাওয়া হীরক-দীপ্তি অনুভব করেছিলেন এভাবে : ‘সে যখন আমার কাছে কবিতাগুলি পড়ছিলো, আমি তাঁর দিকে নিষ্পলক তাকিয়েছিলাম, বলেছিলাম, ফেদেরিকো, কী হৃদয় তোমার! কত ভালবেসেছো তুমি! কতো কষ্ট পেয়েছো?’

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বয়স্ক ভৃত্যদের কাছ থেকে শোনা প্রাচীন আন্দালুসিয় লোককথা, লোকগাথা ও জিপসিদের প্রতœকাহিনী কবির মনে বিপুল প্রভাব ফেলে। লোকজ-বৃত্তকে কবি আধুনিক ভাষা ও চেতনার মোড়কে বিনির্মাণ করে স্পেনকে উপহার দেন এবং ফোক-হিরো হিসাবে সম্মানিত হন। শিশুকালে দোলনায় শুয়ে শুয়ে শ্রুত ‘অ্যা ল্যা ন্যানা ন্যানা ন্যানা’ ঘুমপাড়ানি গানের সুর লোরকার আত্মার তারে গেঁথে গিয়ে স্থায়ী হয়েছিল এবং পরে তাকে তিনি কবিতায় ব্যবহার করেছিলেন সূক্ষ্ম বোধায়নে। জিপসি-ব্যালাড নিয়ে লোরকার ‘রোমানসেরো’ হলো অসম্ভব লোকপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। লোক-সংস্কৃতিকে আধুনিকায়ন এবং তাঁর নাটকীয় মৃত্যু আম-জনতার অন্তরে চিরকালের জন্য ভালবাসার বেদি তৈরি করেছিল। নি¤েœাধৃত কবিতা পড়ে মনে হয় ফ্যাসিস্ট জান্তার হাতে মৃত্যুর আগাম সংবাদ তাঁর অভ্যন্তরীণ অন্য এক অনুভব ক্ষমতা অনেক আগেই আঁচ করতে পেরেছিল :

যদি মরে যাই,

ব্যালকনি খোলা রেখো।

একটি শিশু কমলালেবু খাচ্ছে

ব্যালকনি থেকে ওকে দেখতে পাচ্ছি।

কাস্তে দিয়ে চাষী শস্য কাটছে।

ব্যালকনি থেকে শুনতে পাচ্ছি।

যদি মারা যাই

ব্যালকনি খোলা রেখো।

নিষ্ঠুর আঘাতীয় পীড়নের মত কাল কবির চেতনাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছিলো। মানবিক মর্যাদার অবলুপ্তি ঘটে যাচ্ছে স্বদেশের কৃষ্ণ মৃত্তিকায় কবি বুঝতে পারছেন। কবির চোখে এবং অনুভূতিতে ঘনসর জীবনান্তের করুণ পদচ্ছাপ। জীবনটা যখন চেতনার কাছে, ঋণাত্মক বিবেকের কাছে অসার আর মিথ্যা শূন্যতার নামান্তর হয়ে যায়, বৈনাশিকতা তখন শেষ সীমায় পৌঁছে যায়, আত্মহননই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর কাছে চূড়ান্ত যৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়। ‘আত্মহত্যা’ কবিতায় এই বোধেরই অপূর্ব সঞ্চালন :

ছেলেটা আস্তে আস্তে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিল।

ঘড়িতে সকাল দশটা তখন।

হৃদয় মন্থর ভাবে ছেয়ে ফেলছে

ছেঁড়া ফুল আর ভাঙা ডানার টুকরো-টাকরা।

সে কেবল এইটুকু অনুভব করছিল।

উচ্চারণ করার মত শুধু একটি শব্দ বাকি আছে তার।

আর কিছু নয়।

শুধু আত্মহননের পরাজিত শোক নয়, সংহত হতে থাকা অলক্ষ্য ও সমাহিত রোষ ও ক্ষোভের সমাহার ‘প্রতিটি গান’ কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে :

প্রতিটি গান         হল

জমাট বাঁধা ভালবাসা।

প্রতিটি নক্ষত্র

জমাট বাঁধা সময়।

প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস সময়ের একটি গ্রন্থি।

জমাট বাঁধা আর্তনাদ।

জনতার দীর্ঘশ্বাস জাগ্রত হয় কোন না কোন বুকফাটা কষ্ট থেকে, অফুরন্ত বেদনা থেকে, দুঃসহ কান্না থেকে। স্তূপীকৃত দীর্ঘশ্বাস একদিন তাই জমাট বাঁধানো আর্তনাদে রূপান্তরিত হয়।

লোরকার কলমে সুধা¯িœগ্ধ ভালবাসা শুদ্ধ ঝর্ণাধারার মত প্রবহমান। ‘লোলা’ কবিতায় অফুরন্ত স্বপ্ন আর সুখের আতিশয্য মানুষকে আহ্লাদিত করে তোলে। জীবন এখানে প্রভূত আলো আর শান্তির মধুময় প্রলেপে বর্ণাঢ্য :

কমলালেবুর গাছের নিচে

সে ধুয়ে চলে সুতির কাপড়

তার দু’চোখ সবুজ, গলার স্বর বেগুনি।

আহ! ভালবাসা গজিয়ে উঠেছে কমলালেবুর গাছের নিচে।

কবি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কখনো নন বা হতেও পারেন না, কিন্তু লোরকা ফ্যাসিস্ট বাহিনীর চরিত্র যথার্থভাবে চাক্ষুষ করতে পেরেছিলেন বলেই হিসেব কষে বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁকে হত্যা করা হবে। তাঁর কল্পনা সত্যে পরিণত হয়েছিল। আগাম লেখা একটা কবিতায় অপ্রত্যাশিত মৃত্যু-সংক্রান্ত কল্পতথ্য তিনি দেশবাসী তথা বিশ্ববিবেকের কাছে রেখে গিয়েছিলেন : ‘আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে খুন করা হয়েছে। তারা কফি হাউস, সমাধিক্ষেত্র, চার্চ তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল, তারা খুলে ফেলল পিপে, খুলে ফেলল আলমারি, তারা লুঠ করলো তিনটে কঙ্কাল তাদের সোনার দাঁত সরিয়ে ফেলবে বলে। তারা আমাকে পেলো না। তারা কখনো আমাকে পায়নি? না, তারা কখনো আমাকে পায়নি।’

‘নিঃসঙ্গতার গোলক ধাঁধা’ শীর্ষক মেক্সিকো-সংক্রান্ত একটি মাইলফলকীয় প্রবন্ধ লিখে যিনি চমকে দিয়েছিলেন এবং ইউরোপের অনেক ভাষায় প্রবন্ধখানা অনূদিতও হয়েছিলো, স¤্রাট হুমায়ুনের সমাধিস্তম্ভ সম্পর্কে যিনি ‘নৈঃশব্দের স্থাপত্য’ বলেছিলেন, কবি হিসেবে পরম আরাধ্য বলে যিনি বিশ্বাস করতেন, ‘পাথরের ভিতরে সূর্যের সন্ধান’, ছাত্রদের উপর মেক্সিকোর সরকারী অত্যাচারের প্রতিবাদে যিনি ১৯৬৮ সালে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন, তিনি কবি অক্টোভিও পাজ। যিনি নারীর পদচ্ছাপকে ‘পৃথিবীর দৃশ্যমান কেন্দ্র’ বলে সম্মান জানতেন। পাজ নারীকে দেখেছেন এক ভিন্নমেরু থেকে, সম্পূর্ণ আলাদ-মাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পাজের নারী যেন কুসম-পেলব সৌন্দর্য তীর্থের গভীর অনুভব নিমিত্ত; ‘নারী ত্বক রুটি দিয়ে তৈরি, চোখ চিনি দিয়ে তৈরি, তার চুলে মৌমাছি, তার শরীরে আছে উপত্যকা, যা, কবির ওষ্ঠ জানে এবং সে ‘জলের আঙুল দিয়ে কবির হৃদয় বিদীর্ণ করে।’

কত বিচিত্র ভাবনা-পরিসর হতে পারে কবিতা-লিখন-প্রক্রিয়াকেন্দ্রিক, যা ভয়াবহভাবে কৌতূহলোদ্দীপক। কবিতার অবস্থান কোথায়? কবিতার উপাদানসমূহ নয়, অবয়বগত অবস্থান কোথায় এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হলে কবি কর্তৃক লিখিত পরিসরের মধ্যেই খুঁজে দেখবার পরামর্শ মেলে নিঃসন্দেহে। কারণ কবির উদ্দিষ্ট বক্তব্য, তাঁর অনুভূতি, বোধ, নৈঃসঙ্গ্য, চেতনা, কল্পনা, প্রজ্ঞা তাঁর স্বহস্তে লিখিত ও বিন্যস্ত কবিতা নামধেয় শব্দশরীরের মধ্যেই অস্তিত্বমান থেকে গেছে। এটাই সর্বাংশে সত্যকথন। কবিতার পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা সর্বজনস্বীকৃত ও একক অবয়বায়ন সম্ভব হয়নি আজ অব্দি। যুগ-যুগান্তর পেরিয়ে কবিতা নামক আপাদমস্তক রহস্যাচ্ছন্ন বা ধূসর-আচ্ছাদিত সুদূর, বহুদূর, প্রায় আকাশলোকের অনির্ণেয় অস্পষ্ট আলোকধারায় অর্ধ-দর্শনযোগ্য প্রায়-নির্বস্তুকে অসংখ্য কবি ও কলাতাত্ত্বিক অনিঃশেষ আঙ্গিকে, উপাদানে, উপাচারে, রূপাবয়বে, মাত্রিকতায় সনাক্ত করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ছলনাময়ী কবিতারানী আবেগসন্নত কবির ও মনন বিদগ্ধ ব্যুৎপন্ন-প্রদত্ত সমস্ত অঞ্জলি অকাতরে, নির্বিবাদে, বলা যায় উষ্ণ আদরে গ্রহণ করেছে, আপন করেছে, অঙ্গী ও আত্তীকরণ করে দিব্যি নির্লিপ্ত থেকেছে। সাম্প্রতিককালে কবিতাকে নিয়ে নবমাত্রিক চেতনা উঠে আসছে। বিষয় একটু ভিন্ন কাঠামোর, এর আগে যা নিয়ে এত সূক্ষ্ম ও গভীরভাবে চিন্তা করা হয়নি। পূর্বতন প্রচলিত ঐতিহ্যিক, কবিতার সংজ্ঞার কাছে দ্বিতীয়বার আমাদের যেতে হচ্ছে আলোচনার স্বার্থে- আমরা জানি, আদিগন্ত প্রসারিত কল্পনার প্রসাদ থেকে, বোধ থেকে, অতলান্ত জারণ থেকে, অবাক্সমনসগোচর থেকে উৎসারিত শব্দাবলির সম্মিলিত সমন্বয়ের মধ্যে থাকে কবিতা। কিন্তু সাম্প্রতিক কবিতা-ভাবনা বলছে ওই নির্বাচিত শব্দাবলির মধ্যে কোন কবিতা নেই, বরং শব্দগুচ্ছ যেন একটা অনভিপ্রেত আড়াল, একটা পাঁচিল এবং কবিতার সচকিত, জীবন্ত, রসপুষ্ট, প্রসাদীয় অবস্থিতি রয়েছে সেই আড়ালে অর্থাৎ শূন্যম-লে। আবার কেউ কেউ ভেবেছেন দুই স্তবকের মাঝখানে স্তবক চি‎হ্ননকারী শূন্যস্থানে সংগোপনে কবিতার অশরীরী অবস্থান। কিন্তু কবি অক্টোভিও পাজ আরও এক ধাপ অগ্রসর হয়ে বলেছেন, দুই স্তবকের মধ্যবর্তী শূন্যতায় শুধু নয়, কবিতা রয়েছে দুটি শব্দের মধ্যবর্তী শূন্যতার অভ্যন্তরে। বিষয়টাকে প্রামাণিক করার নিমিত্ত ‘নিশ্চয়তা’ শীর্ষক একটা কবিতা লিখেছেন পাজ। অনূদিত কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো :

যদি সত্য হয় এই ল্যাম্পের আলো,

যদি সত্য হয় এই হাত যা লেখে,

তাহলে কি সত্য সেই দু-চোখ যা চেয়ে থাকে

আমার লেখার দিকে?

একটি শব্দ থেকে আর একটি শব্দে পৌঁছতে পৌঁছতে

আমি যা বলতে চাই উধাও  হয়ে যায়।

আমি জানি, আমি বেঁচে আছি

দুই পদসমষ্টির মাঝখানে।

উপর্যুক্ত সূত্রে আমার ব্যক্তিগত অনুভব হলো, কবিতা রচনা-লগ্নে পার্থিব বা বৈষয়িক চিন্তা থেকে কবিকে মুক্ত থাকতে হয়, বিযুক্ত থাকতে হয়। রচনা প্রক্রিয়ার অভিভূতি বা ঘোরের চলমানতায় যথাযথ, উপযুক্ত, একক বা একমাত্র শব্দটিকে নির্বাচন করতে হয় এবং সে সময় কবিকে দ্বিধান্বিত, সংশয়ান্বিত থাকতে হয় বা যুদ্ধে নামতে হয় যে, কোন শব্দটাকে কবি সম্মানিত করবেন বা শ্রদ্ধার আসনে বসাবেন। কারণ শব্দ নির্বাচনী পরীক্ষাকালীন কবির চিন্তায়, কলমের ডগায়, টেবিলের চারপাশে অসংখ্য শব্দ বিচিত্র সজ্জায়, শোভায়, মাত্রায়, অবয়বে হাজির হয়ে স্ব স্ব রূপ-লাবণ্য, গুণবৈশিষ্ট্য, যাথার্থ্য প্রদর্শন করতে থাকে অনেকটা দেহ পসারিণীর প্রলোভন-সৃষ্টিকারী কলাকৌশলের মত। কিন্তু পাষাণ-হৃদয় প্রেমিকের মত কবিকে নির্মমভাবে একটি শব্দকেই বাছাই করতে হয়, যে-শব্দটি যথাযথ, ব্যঞ্জনাঋদ্ধ, শিল্পঅভিপ্রায়ী, অন্তত কবির শিল্পবোধের নিরিখে। পরিত্যক্ত অসংখ্য শব্দাবলি প্রেমে ব্যর্থ নারী বা পুরুষের মত দীর্ঘকাল অপেক্ষায় থাকে, কেউ আহত হয়, কেউ কষ্ট পায়, ক্রন্দনার্দ্র হয়, হয়ত-বা কিছুসংখ্যক প্রেমিক-শব্দ আত্মহত্যা করে। আর এভাবে ক্ষীণ আশা নিয়ে টিকে যায় যারা তাদেরই অবস্থান কবিতার লিখিত রূপের শূন্যস্থানে হয়ে থাকে। অনির্ধারিত সংখ্যক শব্দের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে একটি সার্থক ও শাশ্বত কবিতার সৃষ্টি হয়। এমনও হতে পারে কবির ব্যক্তিগত পক্ষপাতের কারণে, স্থ’ূল আবেগায়নের কারণে, ভুল নির্বাচনের কারণে অনেক রসপুষ্ট বা প্রসাদীয় বা ব্যঞ্জনাসিদ্ধ শব্দ কবিতা-শরীরে সংযুক্ত হতে পারে না, কালোত্তীর্ণ কবিতাও নির্মিত হয় না। শব্দ নির্বাচন আর বিন্যাসের যুগল অন্বয় সংগঠিত হলে বা অর্ধনারীশ্বরের মত লীন হতে পারলে মহত্তম সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। তাই দৃশ্য মহৎ কবিতার চাইতে অদৃশ্য কবিতা মহত্তর। সূক্ষ্মতর সত্যকথন হলো, বিশেষ একটি ভাবনা কবির ভেতরে পুষ্টি লাভ হল এক পর্যায় আর সেই ভাবনাকে গুচ্ছশব্দের আধারে ভাবনাসম্মত ও রূপবন্ধ করা ভিন্ন পর্যায়। একটি শব্দ নির্বাচিত ও লিখিত হবার পর দ্বিতীয় শব্দে পৌঁছতে পৌঁছতে কবির মূল ভাবনারাশি উবে যায়, হারিয়ে যায়। যে শব্দগুলো কবিভাবনায় পরিপূর্ণ রূপ দিতে সম্পূর্ণভাবে অপারগ,অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই শব্দগুচ্ছই এঁটুলের মত কবিতার দেহে কামড়ে পড়ে থাকে। হয়ত কোমল, ললিত, সুষমাময় পদসমূহ শূন্যঘরে অস্থায়ী বাসস্থানে অদৃশ্যভাবে থেকে যায়।

রদ্যাঁর জীবনী লেখার দায়িত্ব নিয়ে রিলকে প্যারিসে এলেন। রিলকে প্রত্যক্ষ করলেন নিষ্ঠা-প্রত্যয়ী শিল্পী রদাঁ সারাক্ষণ অঙ্কনশালায় কর্মরত। ধ্যানমগ্ন নিবিষ্টচিত্ত শিল্পী রং-তুলিতে নিবেদিত। নিঃসন্দেহে এটা পরম আত্মত্যাগের উদাহরণ, সর্বস্ব খুইয়ে আপন অভ্যন্তরে সেঁধিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত। প্রেরণা-নির্ভর কবি রিলকে ভাবতেন বা জানতেন কোন না কোন কারণবশত আবেগ-আন্দোলিত হলেই কবিতা এসে ভর করে বসে আর কবিতার জন্ম হয়। রঁদ্যা জিজ্ঞাসিত হলে তাঁর জবাব এ-রকম : ‘হ্যাঁ, একজন কবিও তাঁর সৃষ্টিকর্মে সারাক্ষণ মগ্ন থাকতে পারেন। তাঁকে তাকিয়ে থাকতে হয় বস্তুর দিকে ততক্ষণ, যতক্ষণ না তিনি সেই বস্তুর ভিতর থেকে কোন কবিতা তুলে আনতে পারছেন। রিলকে চিড়িয়াখানায় গেলেন। চিতাবাঘের খাঁচার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে রইলেন। অবশেষে রচিত হলো তাঁর সেই বহু আলোচিত কবিতা ‘চধহঃযবৎ’। কবিতার কয়েকটি পঙক্তি :

His gaze, going past those bars, has got so misted

With tiredness, it can take in nothing more.

He feels as though a thousand bars existed,

and no more world beyond them than before.

মৃত্যুর পনের মাস আগে রিলকে কবরে উৎকীর্ণ করার জন্য এপিটাফ লিখেছিলেন। এখানে শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ :

গোলাপ, পবিত্র বিরোধ তুমি, এত সব

চোখের পাতায় থেকে কারো ঘুম না-হবার

সুখ।

বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গীভূত ‘ডুইনো এলিজি’র প্রথম তিনটি এলিজি লেখার পর সম্পূর্ণ করতে তাঁকে আরও দশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ কবিকে এমন হতবুদ্ধি ও রুদ্ধবাক করে রেখেছিলো যে দশ বছর কোন কবিতা রচনা করতে পারেননি।

রিলকে সম্পর্কে ইতিহাসকে ছাপিয়ে ওঠা একটা তথ্য লিখতে আমি উচ্ছ্বসিত হচ্ছি। তথ্য পরিবেশক শ্রদ্ধাস্পদ আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুইজারল্যান্ডে যে গ্রামটিতে কবি চিরবিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিলেন সেই গ্রামে বিশেষায়িত গোলাপের চাষ করা হচ্ছে, যে ফুলটির নাম দেয়া হয়েছে : রাইনার মারিয়া রিলকে। শ্রদ্ধভাজন আলোকরঞ্জনের সুখদায়ক অতিসংযুক্তি : ‘এই গোলাপের রঙ হবে কমলা-রাঙা, ইউরোপের দারুণ শীত আর ঝড়ো হাওয়ার মধ্যেও সে কেবলই বেড়ে উঠবে, বেড়ে উঠতে থাকবে।’ ‘রিলকে পুষ্পের’ মধ্যে কবি মহিমান্বিত হয়েছেন বটে, তবে কবির নামের পুষ্পটি বিশ্বসৌন্দর্যের সংস্কৃতিতে এক অবিনশ্বর সত্তা হয়ে উঠেছে।

ভিয়েতনামের উপর আমেরিকার ঘৃণ্য আগ্রাসন ও নির্বিচার গণহত্যার প্রতিবাদী মিছিলের পুরোভাগে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং গর্ভপাত, মারিজুয়ানা এবং সমকর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তুখোড় কষাঘাত প্রদায়ক কবি এ্যালেন গিনস্বার্গ। যিনি দ্বিধাহীন লিখতে জানেন হিন্দু দেবীদের বহুচারিতাকে লক্ষ্য করে : ঋঁপশ কধষর/ ঋঁপশ ধষষ ঐরহফঁ এড়ফফবংংবং/ নবপধঁংব ঃযবু ধষষ ধৎব ঢ়ৎড়ংঃরঃঁঃবং। স্বদেশকে খুব ভাল করে চিনতেন, জানতেন, বিশ্বজুড়ে নিরীহ মানুষের রক্তপাত আর নিষ্ঠুরতার সাক্ষী তার স্বদেশ তাও কবি বাস্তবতার নিরিখে জানতেন। অকপটে কবিতায় তাঁর স্বদেশ নেতি-বন্দনা :

America when will we end the human war?

Go fuck yourself with your atom bomb…….

তিরিশ বছর বয়সে গিনস্বার্গের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঐড়ষি’। প্রকাশিত এবং বিশ্বজুড়ে তাক লাগানো বিস্ফোরণ। লক্ষাধিক কপি যার বিক্রি এবং এ প্রজন্ম কবিদের কাছে যে-সংখ্যা অবিশ্বাস্য এবং সংজ্ঞাহীনতার সামিল। প্রথম পর্ব থেকেই কবির জীবন-যাত্রা বড়ো সর্পিল, কন্টক-দংশিত। আবাসিক ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কৃত হবার পর মেসে কবির বন্ধুরা হলেন জ্যাক কেরুয়াক, মাদকাসক্ত উইলিয়াম বারোজ এবং সমকামী ক্যাসাডি। কোটিপতির সন্তান সন্তান বারোজ স্পেংলার, দস্তয়েভস্কি, কাফকা, র‌্যাবো, ভিগো, কোরজিবস্কি প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের রচনাবলির সাথে গিনস্বার্গের পরিচয় করে দিয়েছিলেন। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক।

একটি তথ্য রীতিমত চমকে দেবার মত। ভাবতে আশ্চর্য লাগে আজকে এই মুহূর্তে আমার দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের টিপিক্যাল সাহিত্যের শিক্ষক এবং তার সাথে অর্ধ-শিক্ষিত অপশিক্ষকের দল যা করছেন এবং নির্বিচারে করে থাকেন, গিনস্বার্গের কলেজের শিক্ষকবৃন্দও তাই করেছেন অর্ধ-শতাব্দী আগে খোদ আমেরিকায়। হুইটম্যান, শেলির কবিতা পড়ানোর কোন অনুমোদন ছিল না তখন। জয়েস ও লরেন্সকে বালখিল্য আখ্যায়িত করা হত তাঁর প্রতিষ্ঠানে। এডিথ হোয়ারটন-এর গদ্য পড়ানো শুধু জায়েজ ছিল। এজরা পাউন্ড এঁদের কাছে ছিলেন বিকৃত মস্তিষ্ক। হেনরি মিলারের নাম শিক্ষার্থীদের উচ্চারণ নিষিদ্ধ ছিল, করলে অভিভাবক ডাকা হতো। এসব শুনে হাসি পাচ্ছে আমার। মোদ্দা কথা, আধুনিক সাহিত্য নিষিদ্ধ ছিল। ফরাসি ভাষার অধ্যাপকরা ১৯১০ সালের পর ফরাসি সাহিত্যের অগ্রগতি সম্পর্কে হাল তথ্য কিছুই জানতেন না। এ-চিত্র বলে দিচ্ছে যে, গিনস্বার্গের সময় আমেরিকার কলেজগুলোতে অগ্রসর পড়াশুনা ও চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে আমাদের চাইতেও দৈন্যদশা বর্তমান ছিল। কবির জীবন ছিল নেতিবাচক কর্মকা-ে ভরপুর। আমরা সে অন্ধকার জগৎ না হাতড়িয়ে তাঁর কবিতা সৃষ্টির আনুকূলিক ও প্রাসঙ্গিক দুই-একটি ঘটনার অবতারণা করব। ধ্রুপদী সাহিত্য যখন পড়া শুরু করেছিলেন, ১৯৪৮ সাল তখন, অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হলো গিনস্বার্গের জীবনে। ব্লেকের কবিতা পঠনরত অবস্থায় তন্দ্রাক্রান্ত হলে গিনস্বার্গ শুনতে পেলেন তাঁর প্রিয় কবি ব্লেকের উদাত্ত কন্ঠস্বর, আবৃত্তি করছেন স্বরচিত ‘সানফ্লাওয়ার’ কবিতাটি :

Ah Sunflower! weary of time,

Who countest the steps of the sun

Seeking after that sweet golden clime

Where the travelers Journey is done.

Where the youth pined away with desire,

And the pale virgin shrouded in snow

Arise from their graves and aspire,

Where my Sunflower wishes to go.

বিষয়টি ঘন-আবেগমথিত এবং মনস্তাত্ত্বিক, এবং গিনস্বার্গের চেতনায় দৃঢ়মূল ও প্রগাঢ় প্রভাব ফেলে। স্তম্ভিত, হত-বিহ্বল, কর্তব্যবিমূঢ় হয়েছিলেন কবি; এবং এই তীরতীক্ষè ধাক্কাতে চেতনারও চিড় ধরেছিলো আর কবিতার মুগ্ধসর হার্দিক পরিসীমা বাড়িয়ে দিয়েছিলো।

বিখ্যাত কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের একটা সাক্ষাৎকারের জন্য তাঁর বাড়ি গেলেন গিনস্বার্গ এবং আলাপও জমলো বেশ। তারপর জুৎসই সুযোগ পেলেই কবির সান্নিধ্যে এসে সাহিত্যের অনেক তত্ত্ববিষয়ক আলোচনা শুনে সবিশেষ উপকৃত হলেন। আঙ্গিকের ভাঙচুর, বহুমাত্রিক দৃশ্যকে একক দৃশ্যে সংবদ্ধকরণ, কবিতায় সুচারুভঙ্গিতে উপভাষার ব্যবহার, হাইকুর মতন সংক্ষিপ্ত অবয়বায়ন বিষয়গুলো নিয়ে উইলিয়াম্সের ঋদ্ধ আলোচনায় গিনস্বার্গের অন্তর আলোকিত হয়েছিল।

সানফ্রানসিস্কো থাকাকালীন এক ঝাঁক তরুণ আধুনিক কবিদের সাহচর্যে এলেন। এঁরা হলেন জ্যাক স্পাইসার, ফিলিপ লামানটিয়া, এডোওয়ার্ড ডর্ন, লিউওয়েলচ, ফিলিপ হোয়ালেন, মাইকেল ম্যাকক্লুব, গ্যারি ¯œাইডার, লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, কেনেথ রেক্সরথ, রবার্ট ডানকান প্রমুখ প্রতিনিধিস্থানীয় কবি। উইলিয়াম কার্লোস এঁদের সবার কাছে এলিয়টের চাইতে বেশি সম্মানীয় ছিলেন। কোন এক নিভৃত দুপুরবেলা কটেজে বসে বসে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘হাউল’ কবিতার প্রথম সর্গ লিখে ফেলেন গিনস্বার্গ। দ্বিতীয় সর্গটি শেষ করেন নেশায় চুর হয়ে। কবিতাটির প্রথম কয়েক পঙক্তি :

I saw the best minds of my generation

destroyed by madness, starving

hysterical naked,

dragging themselves through the negro

streets at dawn looking for an angry fix,

angelheaded hipsters burning for the

ancient heavenly connection to the

starry dynamo in the mechinery of night,

Who poverty and tatters and hollow-eyed

and high sat up smoking in the

Supernatural darkness of cold-war

flats floating across the tops of cities

Contemplating Jazz, …

আলোড়িত কবিতাটি আবৃত্তির আয়োজন করা হল। আবৃত্তি করলেন কবি রেক্সরথ, ¯œাইডার, হোয়ালেন, লামানটিয়া, ম্যাকক্লুর-সহ প্রায় সবাই। শেষ আবৃত্তিকার হলেন এ্যালেন গিনস্বার্গ। অপ্রস্তুত কবি, কম্পিতকন্ঠে আবৃত্তির সূচনা, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তা কিম্ভূতকিমারে রূপান্তরিত। কবির কন্ঠে অস্বাভাবিক ফোঁপানি, স্বরভঙ্গ, চিৎকার প্রভৃতির সংযোগে আবৃত্তি শুনে এবং ব্যাকরণ-বহির্ভূত ও অভব্য আচরণ দেখে দর্শককুলের চক্ষু চড়ক গাছ। রেক্সরথ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বললেন, ‘এ্যালেন, এই কবিতা তোমায় সেতুর পর সেতু পার করিয়ে নিয়ে যাবে।’ আর কবি কেরুয়াক বললেন,‘এ্যালেন, আমরা এমন এক কালখ-ে প্রবেশ করলাম যে, কোনও বিবৃতি আর ফেরত নেয়া যাবে না।’

আর একটা ভয়াবহ তথা বোহেমীয় জবাব প্রদানের ঐতিহাসিক ঘটনার অবতারণা করা জরুরী। লস এ্যাঞ্জেলেসের অনুষ্ঠানে এক শ্রোতা উপর্যুপরি বিঘ্ন

ঘটাচ্ছিলেন এই বলে যে, কবিতায় তোমরা যা বলছ, মঞ্চে তার বাস্তব প্রতিফলন প্রত্যক্ষ করতে চাই। গিনস্বার্গকে ঘধশবফহবংং চর্চা করার পূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করার কথা বললেন বিঘœসৃষ্টিকারী ব্যক্তিবর। জবাবে ত্যক্ত গিনস্বার্গ নিজের পোশাক সম্পূর্ণ খুলে পোশাকখানা ছুঁড়ে দিলেন ভদ্রলোকের দিকে এবং বললেন এবার তোমার পালা। শুনে লোকটি অনুষ্ঠান ছেড়ে পালিয়ে বাঁচলেন। এ-ঘটনার পর গিনস্বার্গের আবৃত্তির অনুষ্ঠানে দ্বিগুণ জনসমাগম হতে থাকে।

গিনস্বার্গের জীবন উত্তেজনায়, উদ্বেগে, তুমুল ভাঙচুরে এক সীমাহীন অপরিণামদর্শিতা। তবে ভারত ভ্রমণের বৎসরাধিক কালে কবির জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে। ‘পায়ে ছেঁড়া জুতো, গায়ে মৃত বন্ধুর পোশাক পরে’ গিনস্বার্গ ঘুরে বেড়াতেন কলকাতায়, কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস থেকে নিমতলার শ্মশান ঘাট, গাঁজার ঠেঁকে, ভিখিরি ও সাধুবাবাদের আড্ডায়।’ ধর্মীয় চেতনায় বিশেষত বুদ্ধের সাধনমার্গ তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করে, এক পর্যায়ে তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণও করেন এবং মানসিক দিক থেকে তাঁর স্থিরতা ও ধৈর্য চলে আসে।

পরিশুদ্ধ কবির সচেতনতা, মানবিকতা এবং অন্যায়-প্রতিবাদীস্পৃহা আমৃত্যু অভ্যন্তরীণ কোমল ও শান্তি বেদিতে স্থির ছিল। নৈতিকতার তথাকথিত মানদ-ে কবির ব্যক্তি জীবন যতই স্খলিত, নড়বড়ে, শ্লথভঙ্গুর হোক না কেন, অন্যায় আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার বাণী ছিল তীরসদৃশ। আপন দেশের ঘৃণিত পররাষ্ট্র নীতির খলচরিত্রের জন্য কন্ঠে তাঁর সুদৃঢ় সত্য উচ্চারণের নির্ভীকতা ছিল সতত : ‘ভিয়েতনামের জন্যে আমাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত, এল সালভাদরে সামরিক খুনিবাহিনীর খরচ যোগানোর জন্য আমাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত, বিশ্ব আদালতের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিকারাগুয়ার সমুদ্র তীরে বেআইনী খনিজ তোলার জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত, চিলিতে সরকার ফেলে হত্যালীলার জন্যে আমাদের ক্ষমতা চাওয়া উচিত, বিশ্বকে অতিপ্রযুক্তিবাদের প্রদূষণে ধ্বংস করার জন্য আমাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত, কয়েক শো বছর যাবৎ ক্রীতদাস প্রথা বজায় রাখার জন্য আমাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত।’

জীবনমথিত কালকূট সেবনকারী কবি ১৯৯৭ সালে জীবনলীলা সাঙ্গ করেন। সঙ্গে সঙ্গে কবিতার সাম্রাজ্যে এক অনিয়মতান্ত্রিক নৈরাজ্যিক প্রতিভার তেজস্ক্রিয় প্রভাবের অবসান ঘটে। গিনস্বার্গের মৃত্যুতে কবি নির্মলেন্দু গুণ যে প্রত্যাশা করেছিলেন আমারও সে একই প্রত্যাশা; ‘আমি চাই তুমি আবারো জন্মগ্রহণ করো। মানুষ হতে যদি ঘেন্না বোধ হয়, তবে লালনের অচিন পাখি হয়ো…।’

********************************

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস প্রিয়তমেষু :
ধর্ষণ, নারীমূলকতা ও আইনের সীমা
মোহাম্মদ আজম

প্রিয়তমেষু উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে সিনেমা বানিয়েছেন মোরশেদুল ইসলাম। ভালো হয় নাই। হওয়ার কোনো কারণ নাই। বাজেট কম। ভাষা নিয়া কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা নাই। ভাবকে দৃশ্যভাষিক ইমেজে রূপান্তরের ন্যূনতম চেষ্টা নাই। এমনকি উপন্যাসের বয়ানকে ভিজ্যুয়ালে রূপান্তর করতে গেলে চিত্রনাট্যে যে ভাঙচুর করতে হয়, তাতেও দেখলাম পরিচালক-চিত্রনাট্যকারের বিস্তর অনীহা। তাহলে তাঁরা করেছেন কী? তাঁরা আসলে ভাষিক বিবরণীকে দৃশ্যভাষায় অনুবাদ করেছেন। তাতেই ‘কাজ-চলে’ ধরনের ভিজ্যুয়াল বিবরণী [‘ইমেজ’ নয়] পাওয়া গেছে। আমি মূল বইয়ের সাথে এই ভিজ্যুয়াল বিবরণী মিলিয়ে দেখে একটা বিশেষ ধরনের আমোদ পেয়েছি। হুমায়ূন পাঠ এবং বিচার-বিশ্লেষণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে এখানে তা পেশ করছি।
আমি দেখলাম, হুমায়ূনকে অনুবাদ করার জন্য এ সিনেমার চিত্রনাট্যকার বা পরিচালককে প্রায় কিছুই বদলাতে হয় নাই। কাহিনি নয়, সংলাপ নয়, দৃশ্য বা দৃশ্যান্তর নয়, ঘটনাক্রম নয়, বিন্যাস ও সজ্জা নয়, চরিত্রের বাইরের বা ভিতরের রূপ নয় Ñ এক কথায় কিছুই নয়। এ কথা যদি সত্য হয়, তাহলে তার অর্থ দাঁড়াবে এই যে, হুমায়ূনের ভাষিক বিবরণীর সাথে Ñ অন্তত কথাসাহিত্যের জন্য তিনি যা রচনা করতেন Ñ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের গভীর-গভীরতর মিল আছে। কথাটা আমার আছে জল প্রসঙ্গে আমরা আগেই বলেছি। এ-ও বলেছি, এত সিনেম্যাটিক একটা টেক্সট ভিজ্যুয়ালে রূপান্তর করতে গিয়ে স্বয়ং হুমায়ূন কী ভীষণ পলকা জিনিস বানিয়েছেন। কারণটা কী? প্রথম ও প্রধান কারণ নিশ্চয়ই ভাষিক বিবরণীর সাথে দৃশ্যভাষার পার্থক্য নিরূপণ করতে না পারা। অন্যভাবে বলা যায়, দৃশ্যভাষার আলাদা জাত শনাক্ত করতে না পেরে কেবল ক্যামেরায় ধারণকৃত বিবরণীকেই দৃশ্যভাষা হিসাবে সাব্যস্ত করা। কিন্তু এ জাতীয় উচ্চাভিলাষ তো কেবল অতি কুলীন ক্যামেরাশিল্পীর রচনাতেই পাওয়া যায়। দুনিয়ার চলচ্চিত্রকারদের সিংহভাগ আদতে ভাষিক বিবরণীর সমান্তরাল বস্তু হিসাবে দৃশ্যভাষা বানিয়েই সুনাম কুড়িয়েছেন। তাহলে প্রিয়তমেষু বা আমার আছে জলের পরিচালকদের ক্ষেত্রে তা হল না কেন? অনেক কারণ আছে। আমি এখানে একটা কারণ ব্যাখ্যার সুবিধার্থে অন্য একটা উদাহরণ দিচ্ছি।
মরহুম সৈয়দ আলী আহসান আলাওল বিরচিত পদ্মাবতীর বেশ-অর্ধেক সম্পাদনা করে ঢাউস এক বই বের করেছিলেন। পুরানা বই সম্পাদনার ধ্রুপদী নমুনা। এ বইয়ের লম্বা ভূমিকায় আহসান জায়সির মূল কেতাবের সাথে আলাওলের কাব্যের তুলনা করেছেন। এবং এক তাৎপর্যপূর্ণ ফারাকের কথা বলেছেন। আহসান দেখাচ্ছেন, জায়সি কাব্যটা লিখেছেন সুফিধর্মের বেশ মৌলিক রূপক হিসাবে। ফলে কাহিনি বর্ণনার সাথে সাথে ইমেজগুলোকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন ওই রূপকের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকে, আর শেষতক কাহিনিটা রূপক হিসাবে পঠিত হয়। জায়সি আরেকটা কাজ করেছেন। কাব্যটা তিনি লিখেছেন একটু লম্বা স্তবকে ভাগ করে। আর প্রতিটি স্তবকের শেষে দু-পঙ্ক্তির সারমর্ম পেশ করেছেন, যে অংশটা আগে বর্ণিত কাহিনিকে নির্দেশ না করে প্রধানত রূপক তাৎপর্যকে নির্দেশ করেছে। আলাওল অনুবাদের সময়ে এসব ঝামেলায় যাননি এবং যেতে চাননি। তিনি আসলে একটা সোজাসাপ্টা কাহিনি বর্ণনা করেছেন। রূপক তাৎপর্যটা বাদ দিয়েছেন। এর ফলে Ñ বাংলা সাহিত্যের মুসলমান ঐতিহাসিকদের অনেকেই যেমনটা লিখেছেন Ñ আধ্যাত্মিকতার বদলে মানবরসটা বাড়ল কি না, কিংবা খোদ কাহিনিই নতুন তাৎপর্যের আধার হয়ে উঠল কিনা, সে সম্পর্কে আমি মোটেই বাগবিস্তারে যাব না। শুধু সৈয়দ আলী আহসানের বরাত দিয়ে জানাব, আলাওল মূলের স্তবক-শেষের পূর্বোক্ত দুই পঙ্ক্তি বাদ দিয়েছেন। স্বভাবতই। তাঁর লক্ষ্য সুফি রূপকের নির্মাণ নয়। কাজেই ওই অংশগুলো তাঁর জন্য আর প্রাসঙ্গিক থাকেনি। অনুমান করা অসঙ্গত নয়, আলাওল জায়সির কাব্যের ভাষায় গুরুত্ব পাওয়া আরো কিছু ইমেজও বাদ দিয়েছেন বা সেগুলোকে আক্ষরিক কাহিনি হিসাবে ব্যবহার করেছেন।
ঠিক এখানেই কাহিনির সাথে উপন্যাস বা সিনেমা বা অপরাপর বয়ানধর্মী রচনার, যেমন মহাকাব্যের, সম্পর্ক। উপন্যাস কাহিনি নয়। কাহিনিকে প্লটে রূপান্তর করা এবং টুকরা বিবরণীকে লক্ষ্যাভিমুখী ইমেজে বদলে দেয়া উপন্যাসের প্রাথমিক শর্ত। আমরা যখন বলি, ওই গল্প বা উপন্যাস থেকে সিনেমা নির্মিত হয়েছে, তখন ‘মূল’ কাহিনি আর রূপান্তরিত সিনেমাটির সম্পর্ক আসলে এই স্তরেই তুলিত হওয়া উচিত। কাহিনি-স্তরে নয়। এই তুলনার প্রসঙ্গ আসলেই আমাদের সিনেমাবোদ্ধাদের একাংশ বলতে শুরু করেন, দুটি দুই মাধ্যম, ফলে তুলনা না করাই ভালো। বোগাস। প্লট এবং ইমেজকে কাহিনি থেকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে পারেন না বলেই কথাটা ওঠে। একটা হয়ে-যাওয়া ইমেজ, নতুন প্রকাশভঙ্গি বা কোনো কিছু বলার জন্য নতুন ধরনের এনতেজাম আসমান থেকেও নাজেল হয় না, গাছেও ফলে না Ñ প্রতিভাবানের মগজে জন্মে। ওই বস্তু কেউ একজন কবিতার ভাষায় বা সিনেমার ভাষায় অনুবাদ করেই মূলের বাহবা পাবেন, এটা কিছুতেই ন্যায্য হতে পারে না। মাধ্যম পরিবর্তন হলে অন্য ধরনের নানা ঘটনাও ঘটে। উদাহরণ হিসাবে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের টোপ সিনেমার কথা বলি। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প থেকে সিনেমাটির ইমেজগুলো এত আলাদা যে, একে নতুন সৃজন না বলে কোনো উপায় নাই। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, বেশ কিছু ইমেজের কথা, যেগুলো আক্ষরিক অর্থেই ‘সিনেম্যাটিক’। উপন্যাস-গল্পের বিবরণীতে এগুলোকে আঁটিয়ে নেয়া অসম্ভব না হলেও দুরূহ। বুদ্ধদেব তবু সিনেমাটির কাহিনিকার হিসাবে নারায়ণ গাঙ্গুলির নাম রেখেছেন। কারণ, মূল ইমেজটা Ñ রাজা, শিকার, টোপ ইত্যাদি সমন্বিত Ñ নারায়ণবাবুরই রচনা। কিন্তু বিপুল পরিমাণ নতুন ইমেজ আমদানি করে পরিচালক তাঁর নির্মাণটিকে আলাদা করে পড়ার অবকাশ তৈরি করেছেন। এতটাই যে, ‘মূলে’র হিসাব না নিলেও বিশেষ ক্ষতি-বৃদ্ধি হয় না।
হুমায়ূন তাঁর নিজের রচনা আমার আছে জলকে কিংবা মোরশেদ হুমায়ূনের রচনা প্রিয়তমেষুকে ভিজ্যুয়ালে রূপান্তর করতে গিয়ে এ ধরনের কোনো প্রকল্প নেন নাই। ফলে নতুন সৃজনের ‘মর্যাদা’ তাঁরা পাবেন না। পাবেন ‘অনুবাদে’র মর্যাদা। আমি বলতে চেয়েছি, এই অনুবাদকর্মটিও সুবিধার হয় নাই। না হওয়ার কারণ, অনুবাদ করতে গেলে আক্ষরিক অর্থ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ভাবগত বিবেচনাকে আমলে আনতে হয়। প্রিয়তমেষুর ক্ষেত্রে মোরশেদুল ইসলাম তা খুব সামান্যই করেছেন। ভাষিক বিবরণীকে দৃশ্যভাষিক বিবরণীতে রূপান্তরের জন্য কিছু বাড়তি এনতেজাম দরকার হয়। বিবরণে যদি থাকে ‘তার মন খারাপ’ কিংবা ‘পরিস্থিতি বেশ গুমোট হয়ে আছে’, তাহলে অনুমান করা যায়, দৃশ্যভাষিক অনুবাদে এ বস্তু তুলে আনা খুব একটা সহজ কাজ হবে না। এই চেষ্টাটা হুমায়ূন বা মোরশেদ এই সিনেমাগুলোতে করেননি। না করার উদাহরণ দেব মোরশেদুল ইসলামের কাজ থেকে। তার আগে হুমায়ূনের উপন্যাস থেকে রচিত হয়েছে এমন তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরির চলচ্চিত্রায়ণের নমুনা চয়ন করা যাক।
জনম জনম উপন্যাস থেকে নিরন্তর নামের সিনেমা বানিয়েছেন আবু সাইয়ীদ। উপন্যাস থেকে বিশ্বস্ত চিত্রনাট্য নির্মাণের একটা আদর্শ নমুনা হিসাবে এই সিনেমাকে গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় কাটছাঁট করে এবং জরুরি কোনো কোনো প্রসঙ্গে জোরারোপ করে আবু সাইয়ীদ তিথির জীবনের বিড়ম্বনা, নিয়তি ও ফ্যালাসি ভালোভাবেই তুলে এনেছেন। বলার কথাটা হল, তিনি শুধু কাহিনি নয়, ‘উপন্যাস’কেও অনুবাদ করতে পেরেছেন। কৃষ্ণপক্ষ থেকে একই নামের সিনেমা বানিয়েছেন মেহের আফরোজ শাওন। হুমায়ূনের কাহিনি থেকে এ পর্যন্ত যেসব ভিজ্যুয়াল-বিবরণী অন্যরা নির্মাণ করেছেন, তার মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি ‘হুমায়ূনোচিত’। উপন্যাসের ইশারাগুলোর প্রয়োজনীয় বিস্তারে পরিচালকের হুমায়ূন-জ্ঞান ইতিবাচকভাবে কাজ করেছে। মুশকিল হল, কৃষ্ণপক্ষ হুমায়ূনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রেমের উপন্যাসগুলোর একটি। চলচ্চিত্রে এই ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উপন্যাসের ভাষিক বিবরণীতে কম পরিসরের মধ্যেই প্রেম-ধারণার গভীরতা ধরা পড়েছে। পরিচালক দৃশ্যভাষায়ও মূলের আক্ষরিক অনুবাদ করতে গিয়ে পরিসর কম রেখেছেন। উচিত ছিল কম সংলাপের মধ্যেও দৃশ্যের বিস্তার ও গভীরতার মধ্য দিয়ে অন্য প্রসঙ্গগুলোকে ছাপিয়ে যাওয়া। তা না করায় অনুবাদ সার্থকতা লাভ করেনি। তৃতীয় উদাহরণটি নিতে চাই খোদ হুমায়ূন থেকেই। সিনেমার নাম শ্রাবণ মেঘের দিন। নিজের একই নামের উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দিয়েছেন হুমায়ূন। মূলের প্রতি ‘বিশ্বস্ত’ থেকেই একটি সিনেমা মূলকে কত বিচিত্র মাত্রায় ছাড়িয়ে গিয়ে ‘নতুন’ নির্মাণ হয়ে উঠতে পারে, তার নজির হিসাবে এ সিনেমা পাঠ করা যেতে পারে।
উপরে যতগুলো বিভিন্ন ধরনের উদাহরণ দেয়া হল তার মধ্যে মোরশেদুল ইসলামের প্রিয়তমেষুর সাথে, আমরা বলতে চাইছি, সবচেয়ে বেশি মিলবে আলাওলের উদাহরণ। মোরশেদুল ইসলাম কাহিনিরেখা অনুসরণ করতে চেয়েছেন। তাতে করে ভাষিক প্রতিবেদনের গুরুতর সব ইমেজ যে তিনি চেতন-অচেতনে বাদ দিয়ে গেছেন, তার দুটি উদাহরণ পেশ করে মূল কথায় আসছি। ধর্ষণের ঘটনার পর নিশাত পুষ্পকে নিয়ে মোহাম্মদপুর থানায় যায়। এখানে প্রথমে থানার এবং পরে হাসপাতালের নাতিদীর্ঘ বিবরণ আছে। থানায় কেইস ফাইল করা এবং হাসপাতালে মেডিকেল রিপোর্ট নেয়া মূল কাজ। কাহিনির ধারাবাহিকতার অংশ। কিন্তু হুমায়ূন দুই জায়গারই কিছু বাড়তি বিবরণী যোগ করেছেন। বিবরণী দুটি একদিকে থানা ও হাসপাতালের জীর্ণ দশা নির্দেশ করে, অন্যদিকে পুরো পরিস্থিতি ধর্ষিতার মনের উপর যে প্রচ- চাপ তৈরি করে এবং পরিস্থিতির প্রতিকূলতা ধর্ষিতার মনোবল ভীষণভাবে নষ্ট করে দেয়, তার গভীর সাক্ষ্য বহন করে। দৃশ্যভাষায় রূপান্তর করার ক্ষেত্রে এখানে দুটি জরুরি কাজ আছে। এক. ঘরগুলোর এমন সজ্জা নিশ্চিত করা যেখানে এই বোধগুলো পাওয়া যাবে; দুই. চরিত্রগুলোর মধ্যে সেই পরিস্থিতির সার্বিক প্রকাশ নিশ্চিত করা। এ কাজটাই আসলে পরিচালকের কাজ, উৎকৃষ্ট অভিনয়শিল্পী তার যাবতীয় মুনশিয়ানা সত্ত্বেও যে কাজটা কিছুতেই করে উঠতে পারবেন না। ডিরেক্টরস আর্ট বলে কথা। মোরশেদুল ইসলাম কিন্তু এসবের ধারে-কাছেও যাননি। তিনি আসলে শুধু বিবরণীর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। থানায় কেইস ফাইল করা আর হাসপাতালের রিপোর্ট পাওয়া ঘটনার ধারাবাহিকতার জন্য জরুরি। সে কাজটা তিনি করতে চেয়েছেন। কিন্তু করেছেন কাঁচাভাবে। ইন্সপেক্টর নুরুদ্দিন বলে, ‘থানা হচ্ছে একটা বাজার। মাছের বাজার।’ সংলাপ আকারে কথাটা বলা হয়েছে; কিন্তু দর্শককে পর্দায় যা দেখানো হচ্ছে তার সাথে কথাটার সামঞ্জস্য রক্ষিত হচ্ছে না। এটা কি শুধু বাজেটের মামলা? দৃশ্যভাষার বৈধতা এবং সক্ষমতা সম্পর্কে অসচেতনতা নয়? যাই হোক, পরিচালক যদি এ ব্যাপারটায় মনোযোগ দিতেন এবং সফল হতেন, তাহলেও শুধু বিবরণীই হত Ñ ‘ভালো’ বিবরণী হত। কিন্তু প্রিয়তমেষু উপন্যাসের প্রধান যে মাত্রা Ñ নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের মধ্যে ধর্ষণের সম্ভাব্য অনেকগুলো দিক খতিয়ে দেখা Ñ সে পর্যায়ে পা ফেলার জন্য যেতে হত আরো অনেকদূর। পরিচালকের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যম ও আয়োজনের প্রমাণ মেলে না।
দ্বিতীয় উদাহরণ দিতে চাই বিবরণীর আরেকটু পরের অংশ থেকে। মামলা করার পর স্বামী রকিবের সাথে পুষ্পের প্রথম মোকাবেলা। রকিব আক্ষরিক অর্থেই সাধারণ মানুষ; আক্ষরিক অর্থেই বেচারা। স্ত্রীর সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় এলোমেলো, বিধ্বস্ত। ব্যাপারটা সামলানোর কোনো প্রকার কায়দা-কানুনই তার তহবিলে নাই। এমন এক পর্যায়ে হুমায়ূন লিখছেন, ‘বাথরুমের আলোর খানিকটা এসে পড়েছে পুষ্পের গায়ে। কি অদ্ভুত সুন্দরই না তাকে লাগছে। রকিব এগিয়ে এসে পুষ্পের পিঠে হাত রাখল।’ সিনেমায় পরিচালক কিন্তু এ কথাগুলোকে একবিন্দুও পাত্তা দেননি। সজ্জা ঠিক রেখেছেন, আলোটাও রেখেছেন, আগ-পরের সংলাপগুলোর ক্রমও একই আছে। কিন্তু হঠাৎ আলোর মায়ায় স্ত্রীর প্রতি রকিবের যে করুণ-কোমল অনুভূতি তৈরি হল, তাকে আমলে আনার প্রয়োজন পরিচালক বোধ করেননি। এমতাবস্থায় রকিব পুষ্পকে বুঝানোর চেষ্টা করে, এখানে আর থাকা যাবে না। সকালে উঠেই তারা অন্য কোথাও চলে যাবে। আর দুপুরের ভেঙে পড়া পুষ্প এখন এক আশ্চর্য মানসিক বল কণ্ঠে ধারণ করে বলতে থাকে, সে কোথাও যাবে না, এখানেই থাকবে। আর জানাজানি হলেও তার কিছু এসে যায় না। মামলা কোর্টে উঠলে জানাজানি তো এমনিতেই হবে। সে কিছুতেই ছেড়ে দেবে না। ইত্যাদি।
সিনেমার এই বিবরণীতে একটা তাৎপর্য কিন্তু ঠিকই তৈরি হল। নিপীড়িতের কণ্ঠ জয়যুক্ত হল। যদি মনে রাখি, এ কণ্ঠ নারীর, তাহলে এর অন্যরকম পাঠও সম্ভব হবে। সেটা এমনকি যথেষ্ট ‘প্রগতিশীল, নারীবান্ধব আর আধুনিক’ও গণ্য হতে পারে। আর পুরো আয়োজনে রকিব ন্যায়-প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পিছ-পা হওয়া এক খলচরিত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। উপন্যাসেও কোথাও রকিবের অবস্থানকে ন্যায্যতা দেয়ার চেষ্টা করা হয় নাই। এবং একই সাথে তাকে খলনায়ক করে তোলাও যতেœর সাথে পরিহার করা হয়েছে। তার অবস্থানের একজন ‘সাধারণ’ স্বামী এ পরিস্থিতিতে যে ধরনের বিভ্রান্তি আর হতবুদ্ধি দশার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা, তার আচরণে এর চেয়ে বেশি বা কম কিছু দেখি না। অথচ সে যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে অন্যায্যতা তো আছেই। এমতাবস্থায় কোমল আলোর বিভায় স্ত্রীর প্রতি জেগে ওঠা মমতাই তাকে খলচরিত্র হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। ব্যাপারটা শুধু ভালো-মন্দের সরল বাইনারি থেকে বেঁচে যাওয়া নয়, বরং ধর্ষণের মতো ‘ভিন্ন’ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে যে বিচিত্র তলের তল্লাশিতে নেমেছেন হুমায়ূন, তার সম্পূর্ণ নতুন এবং প্রয়োজনীয় তাৎপর্য উৎপাদনই এই ইমেজের লক্ষ্য। যদি পত্রিকার ফিচার হত, যদি মানবাধিকার বা আইনকেন্দ্রের সালিশি হত, কিংবা যদি হত প্রগতিশীলতা বা নারী-অধিকারের ডিসকোর্স, তাহলে এ ধরনের আয়োজনের দরকার হত না। কিন্তু ঔপন্যাসিক কাজ করেন বাস্তব দুনিয়ার বিশেষ ব্যক্তিমানুষকে নিয়ে। ওই বিশেষের দাবি তার যাবতীয় বাস্তবতা আর উপলব্ধির বিচিত্র মাত্রাসহ ধারণ করা সে কারণেই জরুরি হয়েছে। কাহিনির সরল একরৈখিকতার সঙ্গে ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন বা যতেœ গড়া ইমেজের ফারাক এতটাই বিশাল।
আমরা এখানে প্রিয়তমেষু চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ টানলাম সিনেমাটির সমালোচনা বা নিন্দা করার জন্য নয় Ñ আমাদের বিপুল পরিমাণ ‘আর্ট-ফিল্ম’ এরকমই হয়ে থাকে; কিংবা এজন্যও নয় যে এই সুযোগে ভাষিক বিবরণীর দৃশ্যভাষা হয়ে ওঠা প্রসঙ্গটা বিচড়ে দেখা যাবে। বরং উপন্যাসটির একটি চলচ্চিত্ররূপ আছে Ñ এই সুবিধা নিয়ে এখানে প্রিয়তমেষু উপন্যাস পড়ার জন্য একে একটা সুবিধাজনক কৌশল হিসাবে ব্যবহার করা হল। জরুরি বিবেচনা করে এখানে আরো দুটি সতর্কবার্তা টুকে রাখছি। এক. উপরের আলোচনা থেকে মনে হতে পারে, টেক্সটের একটি মোটামুটি নির্দিষ্ট পাঠ আছে, আর সিনেমায় কেবল সেটিরই অনুবাদ হওয়া কর্তব্য। মোটেই নয়। এই লেখায় প্রিয়তমেষু উপন্যাসের কয়েকটি পাঠ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত অবলম্বিত হবে না। আমরা ওরকম ভঙ্গিতে আলাপ করেছি কেবল এজন্য যে, এ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণে উপন্যাসটিকে প্রায় আক্ষরিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। এমনকি চিত্রনাট্যের দরকারেও অন্যথা করা হয় নাই। যে সামান্য কিছু অংশ বাদ পড়েছে সেগুলো, অনুমান করার জন্য যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে যে, সিনেমার দৈর্ঘ্য কমানোর জন্যই বাদ পড়েছে। কোনো তাৎপর্যগত বদলের জন্য নয়। দুই. উপরের আলোচনায় এ কথাটা বলা হয়নি যে, উপন্যাস বা গল্পের চলচ্চিত্রায়ণ আসলে প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট টেক্সটের পাঠ-নির্ণয়, যা আবশ্যিকভাবে নতুন টেক্সট রচনা করে। সেটা কেবল মাধ্যমের ভিন্নতার জন্য নয়, বরং যে অর্থে দ্বিতীয় জনের বলা কাহিনি নতুন কাহিনি হয়ে ওঠে ঠিক সে অর্থেই। ‘বিচ্যুতি’র পরিমাণ বেশি হলে আমরা তাকে বলব ‘বিনির্মিত’ পাঠ। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই নতুন টেক্সটের বিচারে [সাধারণ পাঠে বা উপভোগে দরকার নাও হতে পারে] উৎসের খোঁজ নেয়া আবশ্যক Ñ সহগামী হলে তো বটেই, এমনকি বিপরীতগামী হলেও। ‘মূল’ এবং ‘বিচ্যুতি’ ধারণা দুটি যথাসম্ভব পরিহার করাই কর্তব্য। কিন্তু ‘উৎসে’র বিবেচনা আমলে না আনার দাবি হাস্যকর।


প্রিয়তমেষু উপন্যাস পাঠের ক্ষেত্রে উপরের আলোচনার তাৎপর্য এই যে, এর বরাত দিয়ে আমরা বলতে চাইব, হুমায়ূনের কথাসাহিত্য পঠিত হয়েছে অনেকটা আলাওল যেভাবে জায়সি পড়েছেন কিংবা মোরশেদুল ইসলাম যেভাবে প্রিয়তমেষু পড়েছেন সেভাবে; অর্থাৎ কাহিনিরেখা বরাবর। হুমায়ূন একজন নিপুণ কাহিনিকার Ñ এ কথাটা সাহিত্যের বাজারে যতটা খারাপভাবে প্রচারিত হওয়া সম্ভব, হুমায়ূনের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলিতে হুমায়ূন যে কায়দায় কাহিনিকে ইশারাধর্মী বা সাংকেতিক ভাষায় রূপান্তরিত করে উৎকৃষ্ট ছোটগল্পে পরিণত করেছেন, কিংবা কথাকে ইমেজে রূপান্তরিত করে অথবা নিপুণ প্লটে রূপান্তরিত করে ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছেন, তা বস্তুত অকথিতই থেকে গেছে। ফলে এই মিথ শেষ পর্যন্ত বাজারে প্রভাবশালী থেকে গেছে যে, নন্দিত নরকে বা শঙ্খনীল কারাগারই হুমায়ূনের সাফল্যের পরাকাষ্ঠা, যদিও এই দুই মিষ্টি রচনা প্রাথমিক সাফল্যই কেবল দাবি করতে পারে, আর রচনা দুটি আসলে অনেক কম পরিমাণে হুমায়ূনীয়। এ দুটি এবং অন্য অনেক কাহিনির বরাতে Ñ যেগুলো ইমেজের অভাবে এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভাবে উপন্যাস হয়ে ওঠেনি Ñ খুব সহজেই বলা সম্ভব হয়েছে যে, হুমায়ূন কাজ করেছেন মূলত মধ্যবিত্তের ‘সুখ’ ও ‘দুখ’ নামের দুই আবেগি উপকরণ নিয়ে। বাস্তবে সুনির্দিষ্ট থিম নিয়ে লক্ষ্যাভিমুখী কাজ করেছেন, হুমায়ূনের এমন রচনার পরিমাণ বাংলাদেশের বেশিরভাগ ‘সিরিয়াস’ লেখকের চেয়ে বেশি। বলা দরকার, প্রিয়তমেষু এমনি এক তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাস, যা সম্ভবত মনোযোগের সাথে পঠিত হয়নি।
উপন্যাসের নামটিই বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। নামটি পুরুষবাচক। তার মানে নারীর দৃষ্টিকোণটাই এ নামের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। এ নারী কি উপন্যাসের বিশেষ কোনো চরিত্র নাকি নিখিল নারীসমাজ, তা সাব্যস্ত করা অবশ্য সহজ নয়। যদি মনে রাখি, উপন্যাসটি কাজ করেছে ধর্ষণের মতো একটি ভয়াবহ নিপীড়ন নিয়ে, যেখানে নিপীড়ক আবশ্যিকভাবে পুরুষ, আর নারী নিপীড়িত Ñ তাহলে নামটির মধ্যে একটা বিশেষ ধরনের রসিকতা যুক্ত হয় বটে। [সমধর্মী অপরাপর নিপীড়নের ধারণা হুমায়ূনের কালে আমাদের এ কালের মতো গুরুতরভাবে সামনে আসেনি, এবং এ বইতে তার কোনো ইশারা নাই।] যে পুরুষ প্রিয় সে পুরুষই নিপীড়ক Ñ এরকম একটা জটিল পরিস্থিতির ইশারা খুঁজে পাওয়া যায় নামটিতে। এ দিক থেকে দেখলে ‘ধর্ষণ’ নামের ঘটনাটির জটিলতা শুরু হয় আসলে উপন্যাসের নাম-পৃষ্ঠা থেকেই।
জটিলতার শুরু যদি হয় নামফলকে, চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চয়ই এই যে, এখানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে দুটি Ñ একটি নয়। অব্যবহিত ঘটনাটি সবিস্তার উপস্থাপিত হয়েছে, বিবৃত হয়েছে মুখ্যত ঘটনা আকারে, যদিও অনুভূতির স্তরে মনোযোগের কোনো ঘাটতি ছিল না। বস্তুত ঘটনাটি এমন যে, অনুভূতি-স্তরের জটিলতা ছাড়া ঘটনা উপস্থাপনের কোনো সুযোগই নাই। কিন্তু যে ঘটনাটি ঘটেছে অতীতে Ñ নিশাতের জীবনে Ñ সেটি বিবরণীতে এসেছে পুরোপুরি অনুভূতির চোরা ¯্রােতের মতো। সবসময়েই পরোক্ষে থেকে, ঘটনা বা বর্ণনাস্তরের এক পাট গভীরে থেকে, এই দ্বিতীয় ঘটনাটি নিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে প্রথমটিকে। সে এতটাই যে, দ্বিতীয়বার গোড়া থেকে পঠিত হলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে, নিশাতের ঘটনাটিই জটিলতর, সেটিই প্রধান। আর এ দিক থেকে প্রিয়তমেষু আসলে নিশাতের আখ্যান। দ্বিতীয় পাঠেই কেবল নিশ্চিত হওয়া যাবে, লেখক নিশাতকে পর্যাপ্ত পরিসর দিয়েছেন। আর সে পরিসরে তার সামগ্রিক প্রকাশের মূল সূত্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছে অতীতে ধর্ষিত হওয়ার অভিজ্ঞতা। পুষ্পের সাথে তার ফারাক শ্রেণিগত Ñ শুধু আর্থিক নয়, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক। ধর্ষণের মতো একটি জটিল বিষয়কে শ্রেণিগত বিবেচনায় সীমিত করে ফেলা থেকে হুমায়ূন নিজেকে ঈর্ষণীয় মাত্রায় রক্ষা করেছেন; কিন্তু শ্রেণিগত মাত্রাটি যে প্রধান মাত্রা সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ রাখেননি। হুমায়ূন তাঁর রচনায় শ্রেণিকে পর্যাপ্ত মূল্য দেন, বিশেষত তাঁর রচনার প্রধান যে শক্তি সেই ‘স্বর’ ও পরিস্থিতি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে, কিন্তু কখনোই শ্রেণিকে নির্ণায়ক করে তোলেন না। সেদিক থেকে প্রিয়তমেষু বেশ কতকটা ব্যতিক্রম। এখানে শ্রেণির মাত্রাটি গুরুতর হয়ে উঠেছে। নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। কারণ, ধর্ষণ ব্যাপারটি ‘নারী’র ব্যাপার হলেও এর সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা অতি গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলো সম্পূর্ণত না হলেও মুখ্যত শ্রেণি-নিয়ন্ত্রিত।
নিপুণ কাহিনিকার হুমায়ূন নিশাত আর পুষ্পকে একত্র করেছেন তুলনামূলক দামি এক বাড়িতে। পুষ্পের এ ফ্ল্যাটে ওঠার কাহিনিটি ফেঁদেছেন বিশ্বাসযোগ্যভাবে। এর দরকার ছিল। নিশাতের সাথে সম্পর্কিত হওয়া ছাড়াও তিন মাসের এই বসতি নানান জরুরি ভূমিকা পালন করেছে। পুষ্প ও তার স্বামী রকিবের দ্বিধাগ্রস্ত পদক্ষেপ ও মানসিকতা, জনবিরল পরিস্থিতি নিশ্চিত করা, বাসা খোঁজার ব্যাপারে সাহায্য করার সূত্রে ধর্ষক মিজানের জলচল বৃদ্ধি, অপরিচিত অঞ্চলে অচেনা চারপাশের সুবাদে নিশাতের উপর অধিকতর নির্ভরশীলতা এবং সে সূত্রে নিশাতের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন Ñ এর সবই হুমায়ূন সম্ভবপর করেছেন ওই এক ঢিলে। বেশ নাটকীয়ভাবে নিশাতের সাথে পুষ্পকে সম্পর্কিত করেছেন শুরুতেই, তার শিশুপুত্রের সূত্রে। নিশাত তখনো সন্তান নেয়নি, বোধ করি তার স্বামীর মৃদু অনিচ্ছার কারণে, কিন্তু তার নিজের সম্ভবত সন্তান-বাসনা আছে Ñ এ ধরনের একটি সূত্র ধরে পুষ্পকে পৌঁছে দিয়েছেন নিশাতের কাছে। এরকমটা না ঘটলে আসলে নিশাত আর পুষ্পের হৃদ্যতা তিন মাসের ছোট পরিসরে না-ও ঘটতে পারত। দুজনের শ্রেণিগত-সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তো আসলেই বিস্তর। এ দূরত্ব দরকার ছিল, যেমন জরুরি ছিল সম্পর্কিত হওয়া। পুষ্প যে নির্মমতার শিকার হয়েছে, তা অন্য জায়গায়ও হতে পারত। কিন্তু একজন নিশাতকে পাওয়া যাবে, এমন জায়গায় পুষ্পের থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। আবার মনে করিয়ে দিই, উপন্যাসটি মুখ্যত নিশাতের। তার দরকার ছিল একজন পুষ্প, যে ঘটনা-পরম্পরায় সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠবে তার উপর। আর তাতেই সে এক ধরনের মুক্তির মওকা পাবে।


নিশাতের জীবনে যদি এ ধরনের কোনো ঘটনা নাও ঘটত, তবু নিশাত সাহায্য করতে পারত পুষ্প বা অনুরূপ কাউকে। সে সহানুভূতি ও দায়িত্ব বোধ করতে পারত নিছক মানুষ হিসাবে, দরকার বোধ করতে পারত নারী হিসাবে, কিংবা এমনকি শুরুতে জড়িয়ে গিয়ে শেষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও দায়িত্ব পালনে বাধ্য হতে পারত। তার সেরকম উদার ও স্বাস্থ্যকর মনের পরিচয় আমরা পেয়েছি। কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে তার তৎপরতা এমন এক গভীরতা পেয়েছে, দায়িত্ব বা সহানুভূতি থেকে যা কখনোই পাওয়া যেত না। বস্তুত নিশাতের ঘটনাই এ উপন্যাসের ধর্ষণকা-কে এক অমীমাংসিত সন্দর্ভে উন্নীত করেছে, আইনের চৌহদ্দির মধ্যে যাকে কিছুতেই আঁটানো যায় না। ধর্ষণের আরো কিছু মাত্রা সামনে এসেছে পুলিশ অফিসার নুরুদ্দিন এবং ডাকসাইটে উকিল সরদার এ করিমের মাধ্যমে। নুরুদ্দিন মামলার ব্যাপারে সহায়তা করেছে নিজের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে Ñ তার উচ্চারণের মধ্যে এরকম ভাবার আশকারা আছে। এ অফিসার অন্য সব মামলার ক্ষেত্রে হয়ত এরকম সহায়তা করবে না। তবে তাকে বিশেষভাবে কা-জ্ঞানসম্পন্ন আর সহানুভূতিশীল করে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপন্যাসের কৌশলের দিক থেকে একে বলতে পারি, কিছু কিছু মোটিফ বা অনুঘটক ধ্রুব রেখে অন্য কিছু চলক নিয়ে কাজ করা। পুলিশের চার্জশিটেও গুরুতর ঝামেলা হতে পারত। তাতে পুরো ঘটনাটা আলাদা মহিমাও পেতে পারত। কিন্তু লেখকের মূল ইস্যু অন্য; কাজেই পুলিশের অংশটা তিনি সরল করে আনলেন। তবে একথা নিশ্চিত করে বলা যাবে, পুষ্প পুলিশের বা সরকারি অফিসের ওই আনুকূল্য কিছুতেই পেত না, যদি নিশাত সাথে না থাকত। আর ঝানু উকিলের কাছে পৌঁছানোর কাজটা তো সরাসরি নিশাতই করেছে। তার বাবার সাহায্য ছাড়া এ যোগাযোগটা হয়ত হতই না। উকিলের ব্যয় নির্বাহের ভারটাও নিশাত বহন করেছে, যা পুষ্প বা তার স্বামীর জন্য অসম্ভব ছিল।
প্রিয়তমেষুর বিচারদৃশ্য বেশ সংক্ষিপ্ত, কিন্তু উপভোগ্য এবং কার্যকর। ফৌজদারি মামলার ডাকসাইটে উকিল এরকম ধারায় বিচারকাজকে ঘুরিয়ে দিতেই পারেন, যেখানে তার মক্কেল ধর্ষণের চিহ্নগুলো ধুয়ে ফেলেছে যতœ করে আর সাক্ষী-সাবুদও বিশেষ নাই। তাতেই আসামির সাজা হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদ-। এই রায়ে পুষ্প তার ধর্ষিতা হওয়ার তাবত কালিমা থেকে মুক্ত না হলেও একটা মানসিক স্বস্তি হয়ত পেয়েছে। কিন্তু খোদ উপন্যাসটি তুলনামূলক সহজ কায়দায় শাস্তি নিশ্চিত করে এই সাক্ষ্যই দিচ্ছে, বিচারিক আদালতের শাস্তি আসলে ধর্ষণের মতো অপরাধকে খুব সামান্য অংশেই কাবু করতে পারে। ধর্ষক মিজানের কারাবাস পুরা প্রকল্পের চূড়া নয়, ক্ষুদ্র একাংশ মাত্র। কথাটা একবার উঠেছে সরদার এ করিমের উকিলি যুক্তিতর্কে। তার মত হল, ধর্ষণের ঘটনায় দৃষ্টিগ্রাহ্য আঘাতের পরিমাণ তুলনামূলক কম, অথচ সামাজিক ভাষা ও মন এ দুই নির্বস্তুক উপাদানের প্রাধান্যের কারণে শাস্তির মাত্রা হয় ভিন্নরকম। এই দুই উপাদানের নৈর্ব্যক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ বলে, তার মতে, ধর্ষণ-মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কঠিন। সে নিজেও পুষ্পের মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে এ অবস্থার সুবিধা নিয়েছে। বলেছে, জেরার কালে মেয়েটি যদি অজ্ঞান হয়ে যায়, কথার জবাব ঠিকমতো না দিতে পারে, তাহলেই বরং ভালো। তাতে সবার সহানুভূতি মেয়েটির দিকে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত ধর্ষকের যে সাজা হল যাবজ্জীবন, তার পেছনে নিশ্চয়ই অপরাধ-সংশ্লিষ্ট সামাজিক ভাষা আর মনের হিসাবটাও যুক্ত ছিল।
সামাজিক ভাষা এবং মনের ক্ষতির, পুষ্পের ক্ষেত্রে, সবচেয়ে গুরুতর পক্ষ নিশ্চয়ই তার স্বামী। লেখক পর্যাপ্ত পরিসরে বেশ কয়েকটি সূক্ষ্ম ইশারায় রকিবকে চিহ্নিত করেছেন। নিশাতের ঘরে সংবাদটি শোনার পর তার বিপর্যস্ত অবস্থা, অফিসের লোকজন আর আত্মীয়-স্বজন নিয়ে উদ্বেগ, সংবাদপত্রের রংচঙে ফিচারে নিজেকে আবিষ্কার করে আতঙ্কিত হওয়া, বাড়িওয়ালার ভাগ্নের সাথে কথা বলার অস্বস্তি, মামলা আর পরিস্থিতি পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজের ভয়ানক অসহায়ত্ব ইত্যাদি মিলে তার যে বিপর্যয়, তা হয়ত শেষ বিচারে পুষ্পের বিপর্যয়ের সাথেই কেবল তুলনীয়। পুরুষতন্ত্র পুরুষের জন্য যে দায়িত্ব বরাদ্দ করে দেয়, যে ধরনের সক্ষমতা ওই ভাষাকাঠামোয় তার পৌরুষের ভিত্তি, সেই দায়িত্ব এবং সক্ষমতার কোনো প্রমাণ দাখিল করতে না পারায় রকিব কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে ওঠে। ধর্ষিতা স্ত্রীকে ছেড়ে যাওয়ার বেটাগিরিও সে দেখাতে পারে না। সব খরচ বাদ দিয়ে দুশ টাকা মাসে জমবে কিনা সে হিসাব করতে করতে যে পুরুষ স্ত্রী-পুত্রসহ একটি সুখী সংসার যাপন করে, তার পক্ষে এ সিদ্ধান্ত নেয়া খুব সহজ কাজ নয়। তার অসহায়ত্ব আরো চরমে ওঠে পরের ধাপে। তাকে বাস্তবে শরীরী সংশ্লেষে আসতে হয় এমন একজনের সাথে যার শরীর ‘নোংরা’ হয়ে গেছে। পুরুষতন্ত্রের এই ভাষা তার নিজের তৈরি নয়, কিন্তু সে এ ভাষার অসহায় শিকার।
রকিব হয়ত শেষ পর্যন্ত নিশাতের সাহায্য গ্রহণ করবে। পুষ্পকে নিয়ে শিশুপুত্রসহ দূরে চলে গিয়ে ঘটনার সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেবে। কিন্তু পুষ্পের সাথে তার সম্পর্কের যে করুণ-কোমল স্পর্শকাতরতা তা কতটা কিভাবে সামলাবে, বলা মুশকিল। লেখক এদিকে মনোযোগ দেননি। আমাদেরও মনোযোগ দিতে প্ররোচিত করেননি। কারণ মনে মনোসংযোগের ব্যাপারটি তিনি কার্যত ধার্য করে রেখেছেন নিশাতের জন্য।

দেখা যাচ্ছে, পুষ্পের ধর্ষণ-মামলা নিয়ন্ত্রণ করার মতো কিংবা অন্তত সুষ্ঠু চলন নিশ্চিত করার মতো সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জোর নিশাতের আছে। এমনকি তাদেরকে দূরে কোথাও পুনর্বাসিত করাও তার পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু তার নিজের বেলায়? ধর্ষণের ব্যাপারটি অংকের হিসাবের তুলনায় জটিল হয়ে উঠেছে ঠিক এ জায়গায়।
জটিলতার একদিক ধর্ষণ নামের ঘটনাটির নারীমূলকতা। ধর্ষক নারী হতে পারে Ñ নারী বা পুরুষের ক্ষেত্রে; পুরুষ বিশেষত কম বয়সী পুরুষও ধর্ষিত হতে পারে অন্য পুরুষের হাতে। কিন্তু ধর্ষণের প্রতাপশালী যে ধারণাটির বাস্তবতায় প্রিয়তমেষু কাজ করেছে তাতে স্পষ্টতই পুরুষই নিপীড়ক, আর নারী নিপীড়িত। এই সংজ্ঞায়ন কেবল নিপীড়ককেই চিহ্নিত করে না, বরং অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ বোধ হয় এই যে, নিপীড়িত ঠিক কতটা নিপীড়ন বোধ করবে তার মাত্রাও মুখ্যত এই সংজ্ঞায়নের উপরই নির্ভর করে। পুরুষ কর্তৃক পুরুষ-শিশুর যৌন নিগ্রহকে আমরা বলাৎকার বলে আলাদা করেছি। যৌনতার দিক থেকে নারী কর্তৃক পুরুষ নিপীড়িত হলে সে পীড়নকে চিহ্নিত করার কোনো উদ্যোগই আমাদের সামাজিক ভাষায় এখনো সক্রিয় নাই। দুনিয়ার বহু জায়গায় আছে। বেশি আছে সেসব জায়গায় যেখানে পুরুষতন্ত্রের প্রতাপ সমাজে বা আইনে তুলনামূলক কম। আমাদের সামাজিক ভাষায় ধর্ষণ ব্যাপারটি সম্পূর্ণতই নারীমূলক, আর পুরুষতান্ত্রিক ভাষার দায় টেনে শব্দটি বহন করে এমন এক ব্যঞ্জনা যেখানে অপরাপর শারীরিক-মানসিক নিগ্রহের তুলনায় যৌন-শুচিতার ধারণাই প্রধান হয়ে ওঠে। ওই শুচিতাও বিশেষভাবে নারীমূলক। অনুমান করা যায়, শুদ্ধতা রক্ষার এই প্রেরণা মুখ্যত পুরুষের, যা নারীর জিম্মায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বহুদিন আগে বহু ক্ষেত্রে পুরুষ যখন অন্য নানান সম্পত্তির মতো নারী-সম্পত্তিও লুণ্ঠন করত, তখন এই শুচিতার ধারণা নিশ্চয়ই এরকম ছিল না। অনুমান করা যায়, নারী ও সন্তানের অধিকার নিশ্চিত করে পুরুষশাসিত যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত হল, তাতেই ধর্ষণের সাথে নারীর শুচিতার ধারণাটি বড় হয়ে উঠল। দুনিয়ার বহু জায়গায় এখনো-যে জনগোষ্ঠীর সম্মানহানির জন্য তাদের নারীদের পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণ করা হয়, কিংবা সম্মানহানির বদলা নেয়ার জন্য বিপক্ষের নারীদের দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার বানানো হয়, তাতেই বোঝা যায় দৃষ্টিকোণটা মূলত পুরুষের Ñ এমনকি ক্ষতিও চিহ্নিত করা হয় পুরুষের দিক থেকে। প্রিয়তমেষুর ধর্ষণকা- ঠিক এই প্রকৃতির নয়। এখানে ধর্ষণ অনেক বেশি নারীমূলক। এ ঘটনা কেবল তখনি ঘটতে পারে যখন নারীর কর্তাসত্তা স্বীকৃত এবং ক্রিয়াশীল হয়। পুষ্প-রকিব দম্পতির মধ্যে চৈতন্যের এই স্তরটা খানিকটা ঘোলাটে। পুষ্পের আচরণ ও কথাবার্তা এবং রকিবের মনোভাব ও কথোপকথন ডিসকোর্সের স্তরে পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে নমনীয় পুরুষতন্ত্রের প্রতাপশালী ভাষার দাপটে তাদের কর্তাসত্তার মুক্তি ঘটেনি। পুষ্পের মধ্যে Ñ সম্ভবত কিছু সময়ের জন্য Ñ নারীমূলক কর্তাসত্তা সঞ্চারিত করেছে নিশাত।
আমরা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছি, রকিব-পুষ্পের সংসারে আলাদা ব্যক্তিত্বের ধারণা তো নয়ই, এমনকি আলাদা অস্তিত্বও খুব একটা বিকশিত ছিল না। মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের চাপে থাকা, অথচ সে মূল্যবোধের পোষক হিসাবে প্রয়োজনীয় আর্থিক সঙ্গতি নিশ্চিত করতে না পারাই হয়ত এর কারণ। এমতাবস্থায় পুষ্প যে হঠাৎ বদলে গেল, এমনকি স্বামীর সাথেও নিজের ফারাক ঘোষণা করল, তার একমাত্র কারণ এই যে, সে ধর্ষিতা হয়েছে, আর ধর্ষণের এ ঘটনা রকিবের মধ্যে যত গভীর টানাপড়েনই তৈরি করুক না কেন, তা কিছুতেই ধর্ষিতা নারীর সাথে তুলিত হতে পারে না। এই বাস্তবতাই তার আলাদা অস্তিত্ব তৈরি করেছে, কর্তাসত্তা তৈরি করেছে। পুষ্পের এই পরিবর্তনে আইনের ভূমিকা আছে। আলবত আছে। আইনি প্রক্রিয়ায় নিপীড়কের প্রাপ্য সাজা নিশ্চিত করা সম্ভব Ñ এই জ্ঞান নিশ্চয়ই তাকে আশ্বস্ত করেছিল। স্বামীর উপর নির্ভরশীল আচরণ না করতে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু প্ররোচনাটা সে মুখ্যত পেয়েছিল নিশাতের কাছ থেকে। নিশাত তাকে খুব অল্পেই প্ররোচিত করতে পেরেছিল, কারণ নারীমূলক কর্তাসত্তা তার মধ্যে তৈরি হয়েই ছিল। প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে বেরিয়ে এসেছে মাত্র। আর সেই সুযোগে লেখক বলে নিয়েছেন, পুষ্পের সমস্যা রকিবের পক্ষে যে বোঝা আসলেই সম্ভব নয় তা সহানুভূতির অভাবে নয়, বরং সমস্যার নারীমূলকতাই এর কারণ।
নারীর কর্তাসত্তা, অনুভূতি এবং সংকটের স্বাতন্ত্র্য প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েছে নিশাতের মধ্যে। এই স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার মতো ব্যক্তিত্ব তার মধ্যে ছিল। জহিরের সাথে দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঁজগুলোতে তার নিজের নিয়ন্ত্রণ ছিল। জহিরের চরিত্রে একটা বেশ নিরাসক্ত কাঠিন্য আছে, যা সে পেয়েছে সম্ভবত তার বাবার কাছ থেকে। সতর্ক লেখক একটি চিঠির বরাতে তথ্যটি আমাদের জানতে দিয়েছেন। তাতে জহিরকে বুঝতে সুবিধা হয়েছে। তাদের দাম্পত্য-সম্পর্কে যে অস্বাস্থ্যকর আর্দ্রতা আর নির্ভরতা নেই তার একটা কারণ এভাবে জহিরের দিক থেকে পাওয়া গেল। কিন্তু উপন্যাসের বহু অংশ সাক্ষ্য দেয়, শুধু নিশাতের দিক থেকেই এটা হওয়া সম্ভব ছিল। কারণ, নিশাতের চিন্তা, আচরণ আর অনুভূতির ব্যাকরণ প্রমাণ করে যে, নারী ও পুরুষের স্বতন্ত্র কিসিমের এজেন্সির ধারণা সে তার অস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্বের মধ্যেই ধারণ করত। তার এ সিদ্ধান্ত ও মনোভঙ্গির পেছনে নিজের ধর্ষিত হওয়ার ইতিহাস কি বড় কোনো ভূমিকা পালন করেছে?

নিশাত ধর্ষণের শিকার হয়েছিল আপন ভগ্নিপতি ইয়াকুবের হাতে। নিতান্তই ঘরের লোক। বাইরের লোক হলে ঝামেলা কম হত। মামলা হত। শাস্তি হত। ঘরের লোক হলেও মামলা হতে পারে, শাস্তি হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি অনেক জটিল হয়ে ওঠে। অন্য অনেক অপরাধের বিচার পারিবারিক বা সামাজিকভাবেও হতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে যৌনতাঘটিত যে কোনো ব্যাপারে ট্যাবু এত প্রবল যে, বিচার দূরে থাক নিছক আলাপ-আলোচনার জন্যও প্রসঙ্গটি তোলা মুশকিল। তারপরও নিশাত যদি কথাটা তুলত তাহলে কী হতে পারত? অনুমান করি, যে মনোমুগ্ধকর সংসারচিত্র আমরা উপন্যাসটির শেষাংশে দেখেছি, তা আর হত না। সম্ভবত নিশাতের বোন মীরুর বিয়ে ভাঙত। নিশাতের বিয়ের হিসাব-নিকাশও কি বদলে যেত না? তার মানেই হল, ইয়াকুব যদি ধর্ষণের অপরাধে শাস্তি পেতও, তাহলেও আসলে ‘ন্যায্যতা’ প্রতিষ্ঠিত হত না। কারণ, আনুষঙ্গিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ হত অবর্ণনীয়। অনেকগুলো মানুষের জীবন সম্ভবত খারাপভাবে বদলে যেত। সামাজিক ভাষা আর আইনি ভাষার অসঙ্গতিই এর কারণ। কিন্তু তাই বলে এ কথাও মেনে নেয়া যায় না যে, ক্ষতির পরিমাণ বেশি হবে ভেবে এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে আনা থেকে বিরত থাকতে হবে। তাতে শুধু ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হয় না, পূর্বোক্ত সামাজিক ভাষা ও আইনি ভাষার ফারাক ক্রমশ দূরীকরণের কাজটাও বিলম্বিত হতে থাকবে। তাহলে নিশাত যে ঘটনাটা প্রকাশ্যে আনল না, এমনকি ‘হ্যাশ ট্যাগ মি টু’ আকারেও নয়, সেজন্য তার নিন্দা জানিয়ে এ ঘটনাকে ‘না’ জানালেই কি মামলা চুকে যায়? না, যায় না। প্রিয়তমেষুর ধর্ষণকা- আসলে আরো অনেক গভীর এবং জটিল।
জটিলতার একদিক এই যে, নিশাত এ ঘটনায়, যেমনটি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছি, মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে সম্ভবত সারা জীবনের জন্য। ধর্ষণকে কেবল শারীরিক ব্যাপার গণ্য করে করা সরদার এ করিমের মন্তব্য সে কারণেই নিশাতকে অশ্রুসজল করেছিল। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্বের জোর থাকায় তার মানসিক ক্ষত অন্যদের, এমনকি জহিরেরও, জীবনকে বিপর্যস্ত করেনি। লেখক নিশাতের এই জটিল মনে তীর্যক আলো ফেলে দেখার বেশ কিছু এনতেজাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখেছেন পুরো উপন্যাস জুড়ে। দুটি উদাহরণ দিচ্ছি। প্রথমে জহিরের সাথে তার সম্পর্ক প্রসঙ্গে :
জহির একটা হাত নিশাতের গায়ে তুলে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। নিশাত খুব সাবধানে হাতটা সরিয়ে দিল। স্পর্শ সব সময় সুখকর হয় না। নিশাতের ঘুম আসছে না। অদ্ভুত একটা কষ্ট হচ্ছে। নিজেকে খুব একা লাগছে।
সে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আকাশে খুব তারা। ঝলমল করছে আকাশ। কত নক্ষত্র কত ছায়াপথ। সীমাহীন বিশ্বব্রহ্মা-ে একজন মানুষের নিঃসঙ্গতাও কি সীমাহীন হয়? [পরিচ্ছেদ ৮]
দ্বিতীয় পাঠেই কেবল এই বিবরণীর ইশারাধর্মিতার যথার্থ পরিচয় পাওয়া সম্ভব। পরের উদাহরণটিও প্রত্যক্ষত জহিরকে কেন্দ্র করে, তবে এর শৈল্পিক ও প্রতীকী তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী :
গোলাপগাছগুলোর অবস্থা সত্যিই কাহিল। পানিও দেয়া হয় না। টব শুকিয়ে খট খট করছে। সত্যি খুব অন্যায় হয়েছে। তৃষ্ণায় এদের বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছিল। অথচ পানির কথা কাউকে বলতে পারে না। নিশাত গাছগুলিতে পানি দিল। অষুধ স্প্রে করে দিল। এই অষুধটা দেবার সময় কেন জানি তার গা কাঁপে। কঠিন বিষ। অথচ কি সুন্দর সোনালী রঙ। ইচ্ছা করে পরিষ্কার ঝকঝকে একটা গ্লাসে ঢেলে এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে দিতে। [পরিচ্ছেদ ১২]
প্রিয়তমেষুর টেক্সুয়াল বিচার-বিশ্লেষণ আমাদের বর্তমান প্রকল্পের আওতাভুক্ত নয়। থাকলে বলা যেত, মধ্যপর্বের হুমায়ূন সম্ভাব্য পরিমিততম সরল বাক্যবিন্যাসে কার্যকর প্লট নির্মাণে পারঙ্গম হয়ে উঠেছিলেন; সেই প্লটে কাহিনি এবং ইমেজ নিয়ে এমনভাবে খেলতে শিখেছিলেন যাতে বিবরণী হয়ে উঠবে বহুমাত্রিক এবং লক্ষ্যভেদী; আর কাহিনিধারা পুরোপুরি অনাহত রেখে এমনভাবে কথা বলতে শিখেছিলেন যেখানে ইশারা-ইঙ্গিত প্রায়শই প্রতীকে উন্নীত হয়। প্রিয়তমেষু এ ধারার অন্যতম সফল রচনা। কুশলী পাঠকমাত্রই উপরের উদ্ধৃতির বহুমাত্রিক ইশারা ধরতে পারবেন, যার সবগুলোই নিশাতকে ভিতর থেকে আলোকিত করে। উপরের দুটি উদ্ধৃতির বরাতে আরেকটা গুরুতর সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। একটু আগেই আমরা বলেছি, প্রিয়তমেষুর সংকটগুলো বেশ নারীমূলক। সেসূত্রেই বলা যাবে, এ উপন্যাসের বিবরণীও যথেষ্ট নারীমূলক। অর্থাৎ, বিবরণীর অনেকাংশের মূলে নারীর দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট প্রাধান্য আছে। একজন পুরুষ লেখকের পক্ষে যতটা সম্ভব।
এরকম একটি প্লট যেখানে নারীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য আর সেই নারীদের মধ্যে আবার নিশাতের একচ্ছত্র প্রতাপ, সেখানে নিশাত যদি ধর্ষণের মতো অন্যায়ের শিকার হয়, তাহলে টেক্সটের স্বাভাবিক পরিণতি হওয়ার কথা ধর্ষকের প্রতি তীব্র ঘৃণা উৎপাদন। এ রকম হলে কাহিনির সরল ও স্বাভাবিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হত। কিন্তু লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে, এ ধরনের ‘স্বাভাবিক’ ন্যায্যতা প্রিয়তমেষুর লক্ষ্য নয়। কারণ, মিজানের মতো ইয়াকুবকে খলচরিত্র হিসাবে সাব্যস্ত করা খুব সহজ নয়। অন্তত টেক্সটের অভিপ্রায় বিবেচনা করে নিশ্চিন্তে এ সিদ্ধান্ত নেয়া চলে।
আভ্যন্তর সাক্ষ্য মোতাবেক প্রিয়তমেষু উপন্যাসের ঘটনাকাল ১৯৮০। তাহলে নিশাতের ঘটনাটি আরো কয়েক বছর আগের। স্থান ঢাকা। নিশাতের বাবার এবং স্বামীর পরিবার উচ্চবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির। স্থান-কালের এ ধরনের একটা আবহের মধ্যে পারিবারিক বলয়ে একটা চরিত্রকে যতটা আকর্ষণীয় করে তৈরি করা সম্ভব, ইয়াকুবের ক্ষেত্রে লেখক সে চেষ্টাই করেছেন। বেশ মিতব্যয়ী আখ্যানটিতে এ বাবদ অন্তত দুটি পরিচ্ছেদ বরাদ্দ করা হয়েছে। ইয়াকুবের এই আকর্ষণীয় পরিচয়টা শুধু যে বাইরের নয়, ভিতরেরও Ñ সে কথাটাও পরিষ্কার করে জানানো হয়েছে। স্ত্রীর সাক্ষ্য পাচ্ছি। সেখানে ইয়াকুব সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নাই, বরং পরিমিত উচ্ছ্বাস আছে। শাশুড়ির সাক্ষ্য পাচ্ছি। ইয়াকুবের প্রতি শাশুড়ির পক্ষপাত রীতিমতো নিশাতের অভিমানের কারণ হয়েছে। সচ্ছলতা বা বিদেশবাস তার প্রতি শাশুড়ির পক্ষপাতের কারণ নয়। নিশাতের স্বামী জহিরও উচ্চবিত্ত, সুবেশ এবং মার্জিত। সেই জহির সাক্ষ্য দিচ্ছে, ইয়াকুবের আচরণ গভীরভাবে পর্যালোচনা করে সে তার চমৎকারিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়েছে। আর্থিক অনটন নাই অথচ পারিবারিক স্বাস্থ্য অটুট আছে, এ ধরনের একটা পরিবারের কোনো ধরনের আদবই ইয়াকুব খেলাপ করে নাই। নিশাতের প্রতি তার আচরণ যাবতীয় সংকোচমুক্ত। নিশাতের আচরণে অবশ্য কিছুটা সংকোচ আবিষ্কার করা যেতে পারে। তবে তা শেষ অনুচ্ছেদ পড়ার আগে নয়। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা নাই। এবং সমস্যা না থাকাটাই এ উপন্যাসের সমস্যাকে একটা অন্য রকম উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
সব স্বাভাবিকের ফাঁক গলিয়ে একটা অস্বাভাবিকতা ঘটে যাবে। পুরুষ ইয়াকুবের জীবনের আগ-পরের প্রবাহে এর ফলে সম্ভবত কোনো বদলই ঘটবে না। শুধু নারী নিশাত সারা জীবনের জন্য বদলে যাবে। অপেক্ষা করবে কবে কোন শুভক্ষণে প্রতিবেশী পুষ্প সমরূপ বিপদে পড়বে। সে বিপদ মোকাবেলায় নিজের কোনো ক্ষমতা না থাকায় সে নিশাতের শরণাপন্ন হবে। আর তাতেই নিশাত অন্ধকারের সীমানা বরাবর এক টুকরা আলোর সন্ধান পাবে। আইন, নৈতিকতা, নারীত্ব ইত্যাদির দার্শনিক মীমাংসা নিয়ে হুমায়ূন রচনা করবেন এক চিলতে জরুরি সন্দর্ভ।

**************************

অশরীরী, ঘুম ও আচ্ছন্নতা
আবু হেনা মোস্তফা এনাম

স্মৃতি যেন এক সুপ্ত সমুদ্র; নিস্তরঙ্গ, শান্ত; কিন্তু তার নিদ্রার গভীরে সুদীর্ঘকাল নিস্পন্দ হয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া অতীত, আনন্দ মুখরিত শৈশব, আলোড়িত প্রেম, অতল দুঃখের পলিমাটি। ঘুমের অতলান্তিক অন্ধকারে তলিয়ে থাকলেও হারিয়ে যাওয়া এইসব রৌদ্রছায়াময় গোপন সুখ-দুঃখের সমুদ্র প্রায়শ আলোড়িত করে আমাদের বর্তমান। অন্তর্গত চৈতন্যের বিপুল অনুভবরাশি ও সংবেদন লুপ্তপূজাবীথির পত্রপুষ্পরাশির মতো দুঃখের বেদীতে তার পূজা সমাপন করে। এইসব অদৃশ্য ও অন্তঃপাতি স্মৃতিপুঞ্জ দ্বিধা-থরথর হৃদয়ের ঐশ^র্যে উন্মেষিত করে সময়সন্ধিপথে ব্যক্তির অপসৃত মনোলোকের অনুভব-উপস্থিতির শিল্পকৌশল রচনা করেন মাহমুদুল হক, প্রায়শই তাঁর গল্প-উপন্যাসে এই সৃজনদ্যোতনা অনুসৃত। স্মৃতিরন্ধ্রে অনুভূতির তীব্র সংবেদ তাঁর কথাসাহিত্যের সময়-পরিসর, প্রতিবেশ-পরিস্থিতিচিহ্ন অঙ্কিত করে শাসিত হয় বর্ণ ও বর্ণান্তরের চিত্রময় দৃশ্যকল্প। অশরীরী উপন্যাসের কাহিনিপুঞ্জও স্মৃতির স্বতঃশ্চল অনুভবগুচ্ছ সময়ের পরিসরে উল্লম্ফিত। স্মৃতিলোকের সঙ্গে কাহিনি আবর্তিত সময়যাপনের রয়েছে অনেকার্থদ্যোতনাময় সম্পর্ক। মিখায়েল বাখতিন যাকে বলেছেন ‘দ্বিবাচনিকতা’। একদিকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের মনোলোকের স্মৃতিভারাতুর অনুভূতিগুচ্ছ অন্যদিকে যাপিত সময়-পরিস্থিতিচিহ্নের সুগভীর আচ্ছন্নতা পরস্পরিত এবং সমান্তরাল। মনোলোক ও বাস্তব সময়-প্রতিবেশতাড়িত মুক্তিযুদ্ধকালের ঘটনা এ উপন্যাসে যেন সংকেত-সঞ্চালিত। মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন এবং খেলাঘর উপন্যাস দুটিও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত। এ দুটি উপন্যাসের চাইতে অশরীরীর আঙ্গিকগত পার্থক্য হল চেতনাপ্রবাহের ধারাবাহিক সংক্রাম, যেটি মূলত কেন্দ্রীয় চরিত্র আম্বিয়ার ‘মানসিক আচ্ছন্নতা’র অনুপুঙ্খ অন্তর্বয়ন।
বাখতিনের মতে দ্বিবাচনিকতা হল উপলব্ধির নিরন্তর নির্মাণ, মানবিক সত্তার যথার্থ অস্তিত্ব রূপায়ণের জন্য অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির স্তর থেকে স্তরান্তরে যাত্রা। তাঁর মতে দ্বিবাচনিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া অনুযায়ী চেতনার ভিত্তি হল অপর সত্তার বোধ। এই অপরতা [ড়ঃযবৎহবংং] অর্থ সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো উপস্থিতি নয়, কেননা আপাত-দূরত্ব নিরাকৃত হয় গভীরতর ঐক্যের উপলব্ধিতে। অর্থাৎ তাঁর মতে মানবসত্তার মৌল স্বরূপ দ্বিবাচনিক, সত্তা মানে সম্পর্কের নতুন বিন্যাস : ‘ংবষভ পধহ হবাবৎ নব ধ ংবষভ-ংঁভভরপরবহঃ পড়হঃৎঁপঃ’ জীবন ও জগতের সঙ্গে অবিরাম সম্পর্ক নির্মাণ, ভেঙে ফেলা এবং পুনর্নিমাণ। সত্তা ও অপরতার এই সম্পর্ক মূলত সমান্তরাল, সময় ও পরিসরের বিকাশক্রমে [বাখতিন যাকে বলেছেন ‘ক্রনোটোপ’—ঈযৎড়হড়ঃড়ঢ়ব] এই সম্পর্কের মধ্যে সঞ্চারিত হয় কখনো অভিন্নতা আবার কখনো বৈপরীত্য। আপন অস্তিত্বের সঙ্গে তখন নির্মিত হয় আপাত-দূরত্ব, স্থানান্তর বা বিনিময়যোগ্য পরিসরে নিজের নিভৃত সত্তার সঙ্গে বহিরঙ্গ অস্তিত্বের একান্ত সংলাপ সৃজন করে। যতক্ষণ এই স্থানান্তর বা বিনিময় সম্পাদিত হয় না ততক্ষণ তা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে না। সত্তা তাই দ্বিবাচনিকতার আবহে সঙ্গ ও নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্ব ও নিরস্তিত্বের দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করতে চায়। অশরীরী উপন্যাসের আম্বিয়ার বিরাজমান অস্তিত্বের সঙ্গে দূরত্ব যেমন নির্মিত হয় তেমনি মনোলোকে স্মৃতির স্থানান্তরে সে হয়ে ওঠে অধিকতর নিঃসঙ্গ। শেষপর্যন্ত সে অস্তিত্ব-পরিস্থিতির দ্বান্দ্বিক প্রান্ত অতিক্রম করে জাগ্রত হয় আপন সত্তায়।
স্মৃতিআক্রান্ত এবং মনোলোকে মানসভ্রমণের নেপথ্য কারণ সম্ভবত মাহমুদুল হকের প্রায় প্রতিটি উপন্যাসের কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রের মধ্যবিত্ত মানসিক সংবেদ, নিষ্ক্রিয়তা এবং জীবন-পরিসর থেকে অপসৃয়মানতা। যদিও এসব চরিত্রের মনোজাগতিক আপাত-দূরত্ব অপসৃত হয় গভীরতর ঐক্যের উপলব্ধিতে, বাখতিনের মতে মানবসত্তার এই মৌল স্বরূপ হল দ্বিবাচনিক। অর্থাৎ সত্তার সম্পর্ক নির্মাণের নতুন বিন্যাস, পুনর্নিমাণ। আম্বিয়া চরিত্রের অন্তর্বয়ন এই বিন্যাসের সমীকরণ। সে দায়হীন, ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের গ্লানিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক; অর্থাৎ চাকরিসূত্রে একটি সংবেদনশীল চর্চার মধ্যে তার জীবনযাপন, কিন্তু সে আশ্চর্যরকম নিষ্ক্রিয়; বিস্ফোরণোন্মুখ তরঙ্গসঙ্কুল সময়ের সংশ্রববিচ্ছিন্ন। অথচ মুক্তিযোদ্ধা মণ্টু ও বিপুলের মতো তাকেও হারাতে হয়েছে জীবনের সমূহ সুখ ও সম্ভাবনা। কেবল যুদ্ধাক্রান্ত দেশ সম্পর্কে নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও সে ‘গোঁজামিল দেয়া আলস্য-জর্জর পলকা-সমাধানের তলায় নীরবে মাথা পেতে দেয়াই নিজের পরম দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে’ মনে করেছে। স্ত্রী তাহেরা সংসারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে লঙ্কাকা-ের সূচনা করলেও সমস্ত অভিযোগের বিপরীতে সে সর্বদা নরম মেজাজে, হেসে, ছেলেমানুষি ভেবে খুঁজে নিয়েছে সরল মীমাংসার পথ। কিন্তু আম্বিয়ার অন্তর্চৈতন্যের এই নীরব, নিষ্ক্রিয়, উদ্যোমহীন, প্রতিবাদহীন সারল্য সংসারে সুখ বয়ে আনতে পারেনি, নিয়ে এসেছে অনিবার্য ভাঙনের গ্লানি; এমনকি দেশে যখন যুদ্ধের ভয়াবহতা সকলকে দিশেহারা, দুঃশ্চিন্তাব্যাকুল, উ™£ান্ত ও উৎকেন্দ্রিক করে তুলেছিল তখনও তাহেরা নিজের একরোখা জিদ বজায় রেখেছে। সন্তানের বন্ধন তাদেরকে মিলনের সুতোয় বাঁধতে পারেনি। এরকম শান্ত নিষ্ক্রিয় আম্বিয়া পাকিস্তানি আর্মির টর্চার সেলে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে যাবতীয় মানবিক অনুভূতির ভোঁতা অন্ধকারে নিমজ্জিত, ভীত, বাকরুদ্ধ। এমনকি মণ্টুর সঙ্গে কথা বলতেও সে ছিল দ্বিধাম্বিত ও শঙ্কিত। সেই আম্বিয়া উপন্যাসের শেষে তার আকণ্ঠ নিষ্ক্রিয় নিমজ্জিত চৈতন্য থেকে ক্রমশ উন্মোচিত হয়। টর্চার সেলে নিয়ে আসা নতুন মুক্তিযোদ্ধা বিপুলের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সঙ্গে কথা বলে, জানতে চায় আটকের কারণ। এবং শেষ দৃশ্যে হত্যা করা বাঙালির লাশ মাটি চাপা দেয়ার জন্য তাকে গর্ত খুঁড়তে বলা হলে, আমরা লক্ষ করি—আম্বিয়া উপলব্ধি করে, মৃত্যুবরণ এর চেয়ে শ্রেয়।
টর্চার সেলে অচৈতন্যপ্রায় আম্বিয়ার স্বল্পতর সময়যাপনই এই উপন্যাসের কাল-পরিসর, আর অবশিষ্ট গল্পাংশ নিরূপিত হয়েছে আম্বিয়ার প্রগাঢ় ও অন্তর্লীন মানসিক আচ্ছন্নতাক্রান্ত স্মৃতিপটে। কেননা শরীরের প্রতিটি প্রত্যঙ্গ নির্যাতনে নিষ্পেষিত হলে আম্বিয়া নিমজ্জিত হয় অতলান্তিক আচ্ছন্নতার কালো অন্ধকারে। তবু হয়ত অস্তিত্বের অপরিমেয় ও অন্তর্লীন শক্তি তাকে ধীরে ধীরে জাগ্রত করে বোধ ও স্মৃতিসঞ্চালিত জীবনপরিসরে :
আচ্ছন্নতা কি মনোরম!
এখন ভাঁজ ভেঙে যাচ্ছে আচ্ছন্নতার, পাটে-পাটে খুলে যাচ্ছে; অপ¯্রয়িমাণ অন্ধকার একটি-একটি করে তার সব আবরণ খসিয়ে নিচ্ছে।
পাম্পের মটর পোকার মতো উঁ-উঁ- করে ডেকে চলেছে, ঘরের ভেতরে দেয়াল, চারটে কোণ, সবই এখন স্পষ্ট দেখা যায়।
অপসৃয়মান অন্ধকার সময়সন্ধিপথে স্মৃতিজাগরিত আম্বিয়ার পারিবারিক ও সামাজিক পরিম-লে রয়েছে বাঙালি মধ্যবিত্তের যাবতীয় সংকট, দ্বিধা, ভাবালুতা ও দোলাচলতা—অর্থ, নারীলিপ্সা, চাকরি, আত্মপ্রতিষ্ঠা, ঠুনকো আত্মসম্মান, স্থূল সংস্কৃতিচর্চা, রাজনৈতিক সংশ্রব এড়িয়ে চলা এবং কূট দূরভিসন্ধির মধ্যে সংসারজীবন নিরানন্দময় করে তোলার মতো বিবিধ বৈশিষ্ট্যচিহ্ন। আম্বিয়া এই স্থূল বাঙালি মধ্যবিত্ত। অবশ্য সে প্রতিনিয়তই চেয়েছে নিরুদ্বেগ, নির্দ্বন্দ্ব ও নিশ্চিত স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন; কিন্তু সামঞ্জস্য রক্ষায় সে সীমাহীনভাবে ব্যর্থ। এই ব্যর্থতার নেপথ্যে রয়েছে সময়-পরিস্থিতি ও বাস্তবের প্রতিকূলতার চেয়ে আম্বিয়ার ব্যক্তিস্বভাবের উদ্যোমহীনতা, কা-জ্ঞানশূন্যতার নির্দ্বান্দ্বিক কার্যকারণ। কিন্তু অস্তিত্ব সময়নিরপেক্ষ নয়, এমনকি পরিসরও সময়শূন্য নয়। তাই ব্যক্তিসত্তার সময়পরিসরে সংযোজিত হয় ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, দর্শন এবং অপরাপর বোধের নির্যাস। বাখতিন যেমন মনে করেন চেতনার ভিত্তি হল অপরতা, আম্বিয়াও এই অপর সত্তাবিচ্ছিন্ন কোনো উপস্থিতি নয়। আমরা উল্লেখ করেছি—আম্বিয়ার মনোলোক ও বাস্তব সময়-প্রতিবেশতাড়িত ঘটনা যেন সংকেত-সঞ্চালিত। যেমন, আম্বিয়া-তাহেরার সংসারের জটিলতা, যেন তা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে বাঙালি জাতির সম্পর্কের বৈপরীত্য। টর্চার সেলে আম্বিয়ার অভিজ্ঞতা :
আম্বিয়া জানে তার নিজের গায়ে এসবের কোনো ছিটেফোঁটা গন্ধ নেই, না থাকলেও ন্যায়বিচার আশা করার মতো মানুষের খোঁয়াড় এটা নয়, নিপীড়নের ব্যাপারে বাছবিচার এখানে অমূলক। ধ্বংসাত্মক কোনো পরিকল্পনার সঙ্গে তার কোনো সংশ্রব থাকলে হয়তো নির্যাতনের মাত্রাটা দু’কাঠি বাড়তো, না থাকলে যে অব্যাহতি পাবে এমন আশা করাও অন্যায়। অন্তত একটা অপরাধে সে অপরাধী, সে বাঙালি।
‘দেশের বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক পরিস্থিতি’, যা বর্তমান এবং স্মৃতি-উদ্ভাসিত ব্যক্তিগত সাংসারিক জীবনপ্রবাহ, অর্থাৎ অতীতের সময়পরিসর, পরস্পরিত ও একটি অন্তর্লীন সুরের দ্বিবাচনিক শিল্পপ্রকৌশলে সংক্রমিত। ঘটনার উল্লম্ফন ও আকস্মিকতায় আম্বিয়া-তাহেরার বিয়ে এবং পরবর্তী সংসারপরিসরের সংকটবিদ্ধ অস্তিত্ব বিপ্রতীপের সংকেতায়িত প্রান্ত। তাহেরা একরোখা, অনমনীয়, অমার্জিত, নিষ্ঠুর—পশ্চিমা সামরিক শাসকগোষ্ঠীর প্রতিরূপ। অন্যদিকে আম্বিয়া ‘নির্জীব আনুগত্যে’ সমস্ত অত্যাচার মেনে নিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনাকাক্সক্ষায়। তার স্মৃতিলোক আলোড়িত করে উঠে আসা ভাবনাতরঙ্গে উচ্চকিত আপামর বাঙালির মানসঅভিপ্সা :
রোগই হোক, স্বভাবই হোক, দোষ ছিল তাহেরার; কিন্তু বারবার কেন সে পাশ কাটিয়ে গেছে। এর যে একটা সমাধান দরকার, যা হয়েছে অনেক হয়েছে, আর বাড়তে দেয়া যায় না, উদ্যোগ নিতে হয় এবার, কখনোই সে এভাবে ভেবে দেখেনি।

অশরীরী উপন্যাসের পরবর্তী কাহিনির সময় ও পরিসরের গ্রন্থিসমূহ রূপায়ণের শিল্পসূত্র লক্ষণীয়, বাখতিন যাকে বলেছেন ক্রনোটোপ। এর সূচনাংশেই স্মৃতির অনুপুঙ্খ থেকে বাস্তবে—‘তারপর দুম করে নেমে এলো মিলিটারি ক্র্যাকডাউন, পঁচিশে মার্চের রাত’ এবং তার পরবর্তী ঘটনা আমাদের অবিদিত নয়। মাহমুদুল হক আম্বিয়ার অভিজ্ঞতার ছদ্মপ্রচ্ছদে তুলে এনেছেন ক্র্যাকডাউন-পরবর্তী ঢাকা শহরের কয়েকটি এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী দু-একটি অঞ্চলের উপর অতর্কিতে সংঘটিত হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের খ-চিত্র। সময় ও পরিসর এখানে বিমূর্ত কোনো ধারণা নয়, এবং চরিত্রাবলির উপর তাদের প্রভাবও সুস্পষ্ট। পাত্র-পাত্রিদের নিজস্ব অণুবিশ্বে ঘটমান বাস্তবতার প্রভাব থেকে যায় পরবর্তী সময়-পরিসরে। কাজেই আঙ্গিক বা নির্মাণশৈলীর [ংঃৎঁপঃঁৎব] বিবেচনাতেও অশরীরী উপন্যাসে ক্রনোটপের ভূমিকা ভেবে দেখা যেতে পারে।
আচ্ছন্নতার ভেতর স্মৃতির অদৃশ্য অন্তর্বয়ন, বাস্তব থেকে স্মৃতিলোকে প্রত্যাবর্তন এবং পুনরায় স্মৃতি থেকে বাস্তবের অভিজ্ঞতালোকে ফিরে আসা—এই আবর্তন-প্রত্যাবর্তন দ্বিবাচনিকতা সূত্রে গ্রথিত। টর্চার সেলে নির্মম নির্যাতনে রক্তাক্ত অস্তিত্বের প্রগাঢ় আচ্ছন্নতার অন্তর্প্রবাহে আম্বিয়ার স্মৃতিলোকে মূর্ত হয়েছে ভীতসন্ত্রস্ত, পলায়নপর, জন¯্রােত, মৃত মানুষের গলিত লাশ, আগুনে পোড়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ঢাকা শহর এবং এরই মধ্যে কাহিনির অন্ত¯্রর্ােতে উঠে এসেছে ষাটের দশকের প্রগতিশীল রাজনৈতিককর্মী কথাসাহিত্যিক শহীদ সাবের, দিশেহারা পতিতাপল্লির নারীরা। সম্পূর্ণ উপন্যাসেই রয়েছে এসব কাহিনি¯্রােতের স্মৃতিচালিত মনোকথনময়তা। যেটুকু স্মৃতিসঞ্চালনবহির্ভূত বাস্তব তা হল টর্চার সেল, মণ্টু-বিপুলের আত্মত্যাগ ও প্রকৃতিজগতের দু-এক টুকরো অস্ফুট শব্দ। এই অস্ফুট শব্দই এখানে ‘অপর’। যে শব্দের ক্ষীণ অস্তিত্বের সংস্পর্শে জাগরিত হয় আম্বিয়ার চেতনা ও সত্তা। আম্বিয়া চেতন-অচেতনের আপাত-দূরত্ব অতিক্রম করে উপস্থিত হয় গভীরতর সত্যে :
মানসিক তন্দ্রা কিংবা আচ্ছন্নতার ভেতরে কখনো-কখানো সামান্য একটা শব্দও কতো জরুরি; এই যেমন টুপ করে একটা শব্দের ফোঁটা পড়লো, সেটা মানে দাঁড়ালো ‘আম্বিয়া তুমি—’ তুমি আছো বলেই শব্দটা তোমার কানে গেছে। তাহলে কান আছে। কান আছে, চোখ আছে, নাক আছে, ঠোঁট আছে, মাথা আছে, আছে অনেক কিছুই।
বাখতিনের দ্বিবাচনিকতায় বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের অথবা বর্তমানের সঙ্গে অতীতের যোগাযোগ, সম্পর্ক বা চেতনার স্থানান্তর বা বিনিময় চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে। এই সম্পর্কের নিজস্ব কাঠামো সামাজিক ও দার্শনিক প্রক্রিয়াকে সচল রাখে। কেননা, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক পরিসর ক্রমাগত রূপান্তরিত হচ্ছে। আর সম্পর্ক হল সামাজিক ঘটনাপ্রবাহের সাংগঠনিক কাঠামো, যাকে সময় ও পরিসরের নানান বর্গের মধ্যে বিন্যস্ত হতে হয়। অশরীরী উপন্যাসের কথাবয়ন অনবরত এই সময় ও পরিসরকে অতিক্রম করেছে। টর্চার সেলে ধরে আনা মুক্তিযোদ্ধা মন্টুর কথাবয়নে যেন আমরা তৎকালীন বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ করি। দেশবিভাগের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বা নেতিবাচক যা-ই হোক না কেন, পরবর্তী স্বল্প সময়েই বাঙালি জাতিকে সূচনা করতে হয়েছিল অস্তিত্বের লড়াই, কিন্তু একটি সুসংগঠিত আন্দোলন-সংগ্রাম অগ্নিতপ্ত হয়ে উঠতে অতিক্রম করতে হয়েছে দুই দশক। এর নেপথ্যের কার্যকারণসূত্র [অর্থনৈতিক শোষণ, বিপুল জনগোষ্ঠীর এই উর্বর ভূখ-ে বাণিজ্যের বিস্তার ও বাজার সৃষ্টি এবং কতিপয় ব্যক্তির দ্বারা তা কুক্ষিগত করা] অনুধাবনের জন্য আম্বিয়া চরিত্রটিকে লক্ষ করা প্রয়োজন। আমরা উল্লেখ করেছি সে নিষ্ক্রিয়, উদ্যোমহীন। কিন্তু এই আপাত নিষ্ক্রিয়তার নেপথ্যে তার ছদ্মঅভিজ্ঞতার যে বিবরণ মাহমুদুল হক তুলে এনেছেন তা তৎকালীন বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মনস্তত্ত্বকেই প্রতিফলিত করে :
দেশের বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক পরিস্থিতির চুলচেরা হিসেবের মাথাব্যথা না থাকলেও ভয়াবহ উৎকল্পনায় কখনো-কখানো তার গা শিউরে উঠতো ঠিকই। যতোদূর সম্ভব সে গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করেছে। মানুষের অভাব নেই দেশে, তার মতো এমন দু’একজন আধমরা নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখলেও কোনো কিছু যাবে আসবে না, আগেই ধরে নিয়েছিল আম্বিয়া। আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে একটা গোটা দেশ, তার জাতি, প্রতি মুহূর্তেই এমন তরঙ্গ-সঙ্কুল যে উদ্বেগকাতর না হয়ে কারো কোনো উপায় নেই। কেবল তারই কোনো কিছুর দায়ভাগ ছিল না, ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের গ্লানিতে সে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল, যেন প্যাচপেচে কাদায় জুবড়ে আছে, কিছুতেই মাথা তোলা সম্ভব নয়।
অবশ্য অধিকাংশ বাঙালির উপর এই দায় চাপিয়ে দেয়া অযৌক্তিক। কেননা, যুদ্ধের মতো কোনো সশস্ত্র সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের সামরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র এবং সর্বোপরি অপ্রস্তুত জনগোষ্ঠীর পক্ষে কেবল দেশপ্রেম সম্বল করে কীভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্ভব?—এ প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে। তথাপি, কেবল দেশপ্রেমের আবেগকে সম্বল করেই, অস্বীকার করার উপায় নেই, ক্র্যাকডাউনের পরপরই যে স্বল্পসংখ্যক দুঃসাহসী, অপরিণামদর্শী মুক্তিকামী বাঙালি সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আত্মাহুতি দিয়েছিল, মন্টু-বিপুল তাদেরই প্রতিনিধি। এবং এদের অধিকাংশেরই কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। মন্টু কথা বলতে পছন্দ করে, টর্চার সেলের পরিবেশে, উলঙ্গ-বিধ্বস্ত আম্বিয়া, বাইরে পাকিস্তানি আর্মির সতর্ক পাহারা এবং প্রতিনিয়ত হত্যার বিভীষিকা তাদের তাড়িত করলেও সে কথা বন্ধ করেনি। ভীতসন্ত্রস্ত আম্বিয়াকে দেখে তার মনে হয়েছে ‘একজন নির্ভেজাল প্রভুভক্ত নাগরিক।’ তাই সে বলে ‘তা কি ফায়দাটা পেয়েছেন আপনি তাতে? কই রেহায় তো পেলেন না? ভেবেছিলেন গায়ের গন্ধ শুঁকে শুঁকে মানুষ বুঝে তারপর মারবে ব্যাটারা, ভপ্! শালারা ময়দানে নেমেছে হোলসেল স্লাটার করার জন্য, বোঝেন না কেন!’ সত্যিই আম্বিয়া তখন উপলব্ধি করেনি, তার সত্তা জাগ্রত হয় আরো ক্ষতি স্বীকারের পর, কিন্তু মন্টু ঠিকই বুঝেছিল। আর তার উপলব্ধির কথাবয়নে আমরা আবিষ্কার করি শোষিত-নির্যাতিত সেই মাতৃভূমির কী করুণ ও নির্মম সত্য রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে :
দ্যাখ শালারা দুনিয়ার দিকে চোখ তুলে একবার তাকিয়ে দ্যাখ; তা দেখবে না, চোখে ঠুলি লাগিয়ে দিনের পর দিন একটা বাসি মড়াকে আগলে বেড়াচ্ছে কেবল। চোটপাট কতো, শালাদের সবই বিখ্যাত, সবই এশিয়ার সেরা; সদরঘাটের বাকল্যান্ড বাঁধও এশিয়ার সেরা, পোস্তগোলার আটাকলও এশিয়ার সেরা। আবে গা-ু, এশিয়ার আর কদ্দুর দেখেছিস, সদরঘাটের বাকল্যান্ড বাঁধ দিয়ে এখনো শালার দুনিয়া মেপে চলেছিস, আহাম্মকের দল! ¯্রফে ভাওতাবাজি দেশটাকে করে তুলেছে একটা সারগাদা, আঁস্তাকুড়; এক এক শালা আসবে আর দেশটাকে তার বাপদাদার জমিদারি বলে মনে করবে, শালাদের বস্তাপচা ফতোয়া শুনতে শুনতে কানমাথা ঝালাপালা হয়ে গেছে মানুষজনের।
এবং লক্ষণীয় যে টর্চার সেলে মন্টুর উপস্থিতিও ছিল স্বল্পতর সময়ের জন্য। মন্টুর সঙ্গে আম্বিয়ার কথাবয়নও উঠে এসেছে স্মৃতিরন্ধ্রপথে। নিজের অনুভূতি কোনোদিনই প্রখর ছিল না বলে আম্বিয়ার ধারণা, তবু আশ্চর্য যে ‘এখানে [টর্চার সেলে] আসার পর থেকে প্রতিদিন একটু একটু করে যাবতীয় অনুভূতির ধার মরে গেছে।’ আম্বিয়ার এই অনুভূতি নিতান্তই শারীরিক। শরীরী অনুভূতি ও বোধ ক্রমশ লুপ্ত হয়ে অতলান্তিক আচ্ছন্নতার মৃদু ও অস্ফুট তরঙ্গে জাগ্রত হয় তার সুপ্ত সত্তার ভেতরের সংগুপ্ত সত্তা, সমাজসংসার ও সময়-পরিসরের আটপৌরে মানবজীবনের নিভৃতে লুকানো গভীর উপলব্ধি। উপরিস্তরের ‘অনুভূতির ধার মরে’ মনোরম আচ্ছন্নতার ভেতর এক ভিন্নতর মানবচৈতন্য ও সত্যের সংকেত এ কারণে ‘অশরীরী’।

অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির স্তর থেকে স্তরান্তরে যাত্রার কথান্যাস রূপায়ণসূত্রে অশরীরী দ্বিবাচনিক। কাহিনি বর্ণনায় মাহমুদুল হকের অশরীরী মনোকথনময় চেতনাপ্রবাহরীতির সংশ্লেষে দ্যোতিত। কিন্তু মনোকথনময় চেতনাপ্রবাহে স্বতঃশ্চল স্মৃতির আবর্তনে মানবসত্তা উন্মোচন ও শরীরের উপরিকাঠামোর গভীরে প্রোথিত চৈতন্যের ভিন্নতর মানবসত্যে পৌঁছানোর জন্য মাহমুদুল হকের শব্দনির্বাচন প্রতীকী তাৎপর্যে উপনীত। অশরীরী উপন্যাসের গল্পাংশ সূচিতই হয়েছে ‘মানসিক তন্দ্রা কিংবা আচ্ছন্নতা’র ভেতর মানবচৈতন্যের উন্মোচনে। এ উপন্যাসে, লক্ষণীয়, ‘আচ্ছন্নতা’ এবং ‘ঘুম’ ও ঘুমঅনুষঙ্গবাহী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে বারবার। শব্দদুটি এ উপন্যাসে কখনো ব্যবহৃত হয়েছে শরীরবৃত্তীয় অর্থারোপে, কিন্তু প্রায়শ তা প্রতীকার্থে উজ্জ্বল ও ব্যঞ্জনাময়। যেমন :
রাত্রে ঘুম হয় না ভয়ে, তবু চোখ বন্ধ করে মড়ার মতো পড়ে থাকি। এক-একদিন কানের পাশে মুখ নিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে ও বলতে থাকে—তোকে খুন করবো, তোর রক্ত খাবো। ধড়ফড় করে উঠে বসি, দেখি ও ভালোমানুষের মতো ঘুমুচ্ছে। এক-আধদিন নয়, নিত্য-রোজ। ওর ঘুম আমি খুব ভালো করেই চিনি। মনে করে আমি বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছি। ইচ্ছে করে ও আমাকে এইভাবে ভয় দেখায়, তারপর ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে।
আম্বিয়ার স্মৃতিরন্ধ্রপথে জেগে ওঠা একমাত্র বোন আঞ্জুমের জীবনের করুণ গল্পে ‘ঘুম’ যেন সমগ্র কাহিনির অন্ত¯্রর্ােতে অস্তিত্বপরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক। পুকুরে ডুবে মৃত্যুবরণ করে আঞ্জুম। টর্চার সেলে আম্বিয়ার আঘাতজর্জরিত আচ্ছন্নতার মধ্যে বোনের স্মৃতি তার আতঙ্কিত, অনিশ্চিত ও শ্বাসরুদ্ধ সময়সংবেদে অস্তিত্বপ্রশ্নে সঙ্কটময়। তার নিদ্রাভঙ্গ হলে ‘দুর্জ্ঞেয় আশঙ্কায় রাত্রির ঘুটঘুটে অন্ধকার বিভীষিকা হয়ে ওঠে। আতঙ্কে, অনিশ্চয়তায়, হীনম্মন্যতায় প্রতিটি মুহূর্ত এমন শ্বাসরুদ্ধকর যে, আম্বিয়ার মনে হয় এরকম দগ্ধে-দগ্ধে যন্ত্রণা পোহানোর চেয়ে দুম করে অপঘাতে মরাও অনেক উপাদেয়।’ ঘুম এখানে ‘মরা’, অর্থাৎ মৃত্যুর সমার্থক। কিন্তু এই মৃত্যু-অনুভূতি অন্তর্সত্তার শরীরীবোধে ঘুমের স্থানিক পরিচয় এবং তা শরীরীসংবেদনার বাইরে বিস্তৃত হওয়ার অনুভবে রূপান্তরিত হয়েছে সামগ্রিকতায়। এখানে ‘আচ্ছন্নতা’ এবং ‘তন্দ্রা’ শব্দদুটিও মনোযোগ দাবি করে। কেননা, আচ্ছন্নতা বা তন্দ্রা যতটা শারীরিক, ততটাই সংবেদিত শরীরী বোধে। ভারতীয় দর্শিনিক কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর সাবজেক্ট অ্যাজ্ ফ্রিডম [ঝঁনলবপঃ অং ঋৎববফড়স] গ্রন্থে যেমন বলেছেন, ‘ঞযব নড়ফরষু ভববষরহম রং নঁঃ ঃযব ভবষঃ নড়ফু’ [শারীরিক সংবেদনা সংবেদিত শরীর ছাড়া আর কিছু নয়।— দ্র. অরিন্দম চক্রবর্তী] যেমন :
আচ্ছন্নতা কি মনোরম, দিনের আলো এখন তার খোসা ছাড়িয়ে ছোট্ট একটা লিচুর মতো গালে পুরছে। তন্দ্রার ভেতরে খুব ভালো থাকে আম্বিয়া; এ পর্যন্ত জীবনযাত্রার নামে যতো আবর্জনা স্তূপাকার করেছে দিনের আলোয় তাতে ঝাঁকে-ঝাঁকে কাক এসে বসে, পায়ের নোখ দিয়ে আঁচড়ায়। তন্দ্রা ছুটে গেলেই সাঁড়াশির মতো তাকে চেপে ধরে আতঙ্ক। এটা এমনই একটা জায়গা, যেখানে জীবনের সব সার্থকতা ধুলোয় গড়াগড়ি খায়।
কিন্তু মৃত্যু প্রাণচিহ্নহীন। মৃত্যুর অন্ধকার অন্তঃপুর থেকে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। উল্লেখ করেছি, ঘুম মৃত্যুর সমার্থক, যদিও এ দুটি জ্ঞানই প্রত্যক্ষ বস্তু। ঘুম প্রত্যক্ষের বিষয়বস্তু একটি হর্ষ বা আনন্দের বোধ [পাভলভের মতে, নিদ্রা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ক্লান্তি থেকে রক্ষা করে], মৃত্যু প্রত্যক্ষের একটি বিষাদময় মনোবিজ্ঞান। কিন্তু ঘুম এমনই প্রত্যক্ষের জ্ঞান, যা কেবল শরীরী সংবেদনার একটি বিশেষ স্তর। শরীর তত্ত্ববিদ আইভান প্রেত্রোভিচ পাভলভ [১৮৪৬-১৯৩৬] পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন, নিদ্রা যখনই আসে তখন আমাদের কেন্দ্রীয় ¯œায়ুতন্ত্রের সর্বোচ্চ অংশ ও মধ্যমস্তিষ্ক বাধ অবস্থায় উপনীত হয়। নিদ্রাকে তিনি বলেছেন ‘পরিব্যাপ্ত বাধ’। তাঁর মতে, ‘আভ্যন্তরীণ বাধ এবং নিদ্রা হল একই জিনিস, একই প্রক্রিয়া।’ আভ্যন্তরীণ এই ঘুম—যেটি, বলা যেতে পারে, মূলত পাকিস্তানি সামরিকজান্তার নির্মম শোষণ, পৈশাচিক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ—এই অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষত অস্তিত্বপরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য ঘুম নয়, ঔপন্যাসিক প্রত্যাশা করেছেন জাগরসত্তা :
এক একটা রাত কি নিদারুণ দীর্ঘ। ঘুমের জন্য আম্বিয়ার তেমন মাথাব্যথা নেই, বরং জেগে থাকার অভ্যেসটাকেই সে ভালোমতো রপ্ত করতে চায়, ঘুমের ঘোরে একটা কিছু হয়ে গেলে সে টেরও পাবে না। ঢাকা এখন মৃতের শহর। কোনো চিহ্নই নেই প্রাণের। পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হলেই মনে হয়—যাক এ লোকটি তাহলে এখনো বেঁচে আছে। একদিন শোনে অমুক নেই, একদিন শোনে তমুক লোকটির মাথার খুলি উড়ে গেছে; এইসব শোনে, তারপর সেই লোকটির কথা মনে আসে। পরিচিত সকলের নামই প্রায় ভুলে যেতে বসেছে আম্বিয়া।
কিন্তু দ্বিবাচনিকতা হল উপলব্ধির নিরন্তর নির্মাণ, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির স্তর থেকে স্তরান্তরে যাত্রার সূত্রে মানবিক সত্তার উন্মোচন। ঘুম এবং আচ্ছন্নতা এই উপন্যাসের সময় ও পরিসরকে একটি মানবিক অস্তিত্বপরিস্থিতিতে উত্তীর্ণ করেছে। ঘুম মৃত্যু, ধ্বংস, হত্যাযজ্ঞের সমার্থক। আচ্ছন্নতা মনোরম, স্মৃতিকল্পাশ্রিত। এবং প্রকৃতি-শুশ্রƒষায় স্মৃতিকল্পাশ্রিত এই আখ্যানে ঘুম ও আচ্ছন্নতার জাগর উপলব্ধি ও অনুভূতি মানবসত্তার ভেতরে সংগুপ্ত সত্তাকে মানবিক স্তরে উপনীত করেছে :
আন্দাজ তার ঠিকই। দূরে নদী। ধাতব পাতের মতো মাঝে-মাঝে চকচক করে উঠছে, দু’ভাগে ঘিরে ফেলেছে অন্ধকারকে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, কেবল ঝিল্লিরব। ঝিল্লিরব ছাড়া কোনো দৃশ্য নেই। ঝিল্লিরব ছাড়া কোনো বেদনা নেই। ঝিল্লিরব ছাড়া কোনো স্মৃতি নেই। কোনো স্মৃতি নেই, স্মৃতির বেদনা নেই, বেদনার হাড় নেই, বেদনার মাংস নেই, ঝিল্লিরব ঝিল্লিরব-ঝিল্লিরব ঝিল্লিরব—
আম্বিয়ার পাছায় একটা লাথি পড়লো ধপাস করে, ‘কোদাল মার শালা, কোদাল মার!’
গর্ত থেকে উঠে আসে আম্বিয়া। আচ্ছন্নতা কি মনোরম, মনে তোলপাড় করে একথা। আচ্ছন্নতা কি মধুর! সারা শরীর উৎকর্ণ হয়ে বলে—আমাকে আচ্ছন্নতা দাও, আমাকে আচ্ছন্নতা দাও!
হাঁটু গেড়ে বসে দু’হাত জোড় করে আম্বিয়া বললে, ‘আমাকে গুলি করে মারুন—’

প্রশ্ন উঠতেই পারে, আম্বিয়া-তাহেরার ব্যক্তিগত জীবনের কথান্যাসের প্রাধান্যের কারণে এ কাহিনির সময়-পরিসরের প্রতি ঔপন্যাসিক অনিবার্য দায়বোধকে অস্বীকার করেছেন, রাষ্ট্র ও জাতির মর্মন্তুদ সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহত্তর জীবনের রূপবৃত্তান্ত হয়ে উঠতে পারত উপন্যাসটি, মাহমুদুল হক সেদিকে দৃষ্টিপাত করলেন না। কিন্তু সেখানে বিকল্প প্রশ্নও থেকে যায়, তা হল, আমরা পাঠক বা সমালোচক হিসেবে একটি উপন্যাসে কী চাই, কতটুকু চাই?
অশরীরী উপন্যাসের কথাবয়ন ও অন্তর্বয়নে ঔপন্যাসিক সন্দর্ভের এমন একটি গদ্য ও বিকল্প আদল নির্মাণ করলেন যার স্বতঃস্ফূর্ত প্রবহমানতাই ধীর-মন্থরভাবে আধেয়কে স্পষ্ট করে তোলে। হত্যা করা বাঙালিদের লাশ পুতে ফেলার জন্য গর্ত খুঁড়তে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে আম্বিয়ার আত্মজাগরণ। অপ্রস্তুত ও অপ্রশিক্ষিত জাতির উপর যুদ্ধের ভয়াবহতা চাপিয়ে দেয়ার সেই অমানিষাকালে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের বিভীষিকার মধ্যে বাঙালির এই আত্মজাগরণই বাস্তব। আলস্য, মেরুদ-হীনতা, উদ্যমহীনতা, নিস্পৃহতা ত্যাগ করে বাঙালি জাতিসত্তার এই জাগর চৈতন্যই মাহমুদুল হক নির্মাণ করেছেন তাঁর ব্যতিক্রমী গদ্যে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
অরিন্দম চক্রবর্তী, [২০১১], দেহ গেহ বন্ধুত্ব ছটি শারীরিক তর্ক, অনুষ্টুপ, কলকাতা।
কে. প্লাতোনভ, [২০০২], মানব মন ও মনোবিজ্ঞান, [সম্পাদনা অরুণ দাশগুপ্ত], বিংশ শতাব্দী, কলকাতা।
তপোধীর ভট্টাচার্য, [১৯৯৬], বাখতিন : তত্ত্ব ও প্রয়োগ, পুস্তক বিপণি, কলকাতা।

**************************

রাজা রামমোহন ও কাঙাল হরিনাথ
মাসুদ রহমান

১৮৩৩ সালে রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২?-২৭.০৯.১৮৩৩) ইংল্যন্ডের ব্রিস্টল শহরে প্রয়াত হন, সে বছরই কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৬.০৪.১৮৯৬) ইংরেজ কোম্পানির শাসনাধীন ‘বাংলার ম্যান্চেস্টার’ বলে খ্যাত কুমারখালীতে (বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত) জন্মগ্রহণ করেন। হরিনাথের মৃত্যুও কুষ্টিয়াতেই— স্থানীয় শ্মশানে তাঁর দেহ পঞ্চভূতে লীন হয়। আর রামমোহন জন্মগ্রহণ করেছিলেন হুগলীতে, কৈশোরে করেছেন ভূপর্যটন, কর্মজীবন ছিল পূর্ববাংলা হয়ে রাজধানী কলকাতা, কর্মোপলক্ষেই ইংল্যন্ড গিয়েছিলেন— সেখানে দেহত্যাগ করলেন এবং পেলেন সমাধিসৌধ। দুজনের জন্ম বাংলার দুই অর্ধে, মৃত্যু পৃথিবীর দুই অর্ধে, আর মানুষও তাঁরা দুই প্রজন্মের। ধর্ম-সম্প্রদায়গতভাবে একটু মিল পাই, তো আর্থ-শ্রেণি বিচারে ভিন্নতলার। দুজনের জীবনপ্রবাহেও বেশ ব্যবধান। যদি স্রোতস্বিনীর সাথে তুলনা করি, তবে একটি আন্তঃমহাদেশীয় অপরটি আঞ্চলিক। তারপরও আমরা এ-দুজনের প্রতিতুলনায় প্রয়াসী হয়েছি তার কারণ বাঙালির আধুনিকতার অভিযাত্রায় তাঁরা করেছেন অধিনায়কত্ব। রামমোহন রাজধানীকেন্দ্রিক কথিত রেনেসাঁর প্রধানপুরুষ আর হরিনাথ মফঃস্বলীয় জাগরণের পথিকৃৎ। দুজনের পারস্পরিক চিন্তাকর্মপ্রবাহ কখনো দূরগামী, কখনো নিকটস্থ, কখনো সংমিলিত— এসব মিলিয়েই বাংলার মননক্ষেত্রকে তাঁরা করেছেন পললউর্বরা।
চিন্তা ও কর্মের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তির শ্রেণিগত অবস্থান জানাটা জরুরি। বলেছি, রামমোহন ও হরিনাথ দুই ভিন্নতলার মানুষ। রামমোহন জন্মেছিলেন হুগলির এক বিত্তশালী পরিবারে। তাঁর ঊর্ধ্বতন পঞ্চমপুরুষ পরশুরাম রায় নবাবের নিকট হতে ‘রায়-রায়ান’ উপাধি লাভ করেছিলেন। সেই থেকে উত্তরপুরুষেরা নামের শেষে বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবর্তে রায় পদবি লিখে আসছেন এবং রামমোহন পর্যন্ত কেউ না কেউ বাংলার নবাব এবং সেই সূত্রে মোগলরাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। রামমোহনের পিতামহ ব্রজবিনোদ রায় নবাব আলীবর্দি খাঁর চাকুরে ছিলেন, সেই সুবাদে মোগল স¤্রাট দ্বিতীয় আলমের (১৭৫৯-১৮০৬) সাথে যোগাযোগ হয়েছিল। রামমোহনের বাবা প্রথম দিকে নবাব সিরাজদৌলার (রাজত্বকাল : এপ্রিল ১৭৫৬- জুন ১৭৫৭) অধীনে চাকরি করেছিলেন আর রামমোহন জীবনের শেষপর্বে মোগল স¤্রাট দ্বিতীয় আকবরের (রাজত্বকাল : ১৮০৬-১৮৩৭) নিকট থেকে পাওয়া ‘রাজা’ উপাধি নামের পূর্বে সংযুক্ত করে ইংল্যন্ড গিয়েছিলেন। মুসলমান রাজা-নবাবের সঙ্গে অর্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক থাকলেও ধর্মে যথারীতি নিষ্ঠতা বহমান ছিল এই বৈষ্ণব বংশে। রামমোহনের বাবা সম্পদ বৃদ্ধিতে যথেষ্ট সফল হয়েছিলেন। তালুকদারি বিস্তৃত করেছিলেন, কোলকাতার জোড়াসাঁকোয় বাড়ি করেছিলেন। রামমোহন সম্পদবৃদ্ধির সেই ধারাকে বিস্ময়কররূপে বেগবান করেছিলেন। কোম্পানির দেওয়ানগিরিকালে সামান্য বৈধ অর্থের সাথে প্রভূত অবৈধ অর্থ কামিয়েছিলেন বলে শোনা যায়, একই সাথে কোম্পানির চাকুরেদের চড়া সুদে ঋণ দিতেন। এভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে বড়ো বড়ো কয়েকটি তালুক কিনে একরকম জমিদার বনে যান। বস্তুত, মোগল স¤্রাটের সাম্মানিক রাজা উপাধি পাওয়ার অনেক আগেই দেওয়ানজি রামমোহন অর্থসম্পদে রাজা হয়েছিলেন। কাজেই এই রাজন্যের চিন্তা ও কর্মের মধ্যে যতো প্রাগ্রসরতা থাকুক না কেন, ঔপনিবেশিক শাসকবর্গের শাসনের, সুনামের(?) সামান্য ক্ষতি হয় এমন কিছু করেছেন, এ জাতীয় অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে করা সম্ভব নয়।
হরিনাথের পরিবারও সম্ভ্রান্ত, তবে সম্পদশালী ছিল না। তাঁর কোন পূর্বপুরুষ রাজস্ব কর্মচারী হিসেবে মজুমদার পদবিটি প্রাপ্ত হয়েছিলেন তা জানা যায় না, তবে হরিনাথের জন্মকালে পরিবারের সম্পত্তি ছিল সামান্যই। বিপতœীক পিতার ঔদাস্যে সেটুকুও দ্রুতই শেষ হয়। শৈশবেই মাতাপিতা উভয়েই দেহরক্ষা করেন আর আক্ষরিক অর্থেই হরিনাথ হন অনাথ বা ‘কাঙাল’। আমৃত্যু দারিদ্র্য তাঁকে সঙ্গ দিয়েছে।
ধর্ম ও কর্ম উভয় কারণে রামমোহন পারিবারিক প্রযতেœ পড়াশুনা করেছিলেন— জীবিকার জন্যে আরবি-ফারসি ও ধর্মের প্রয়োজনে সংস্কৃত শেখেন। বাড়ি বা গ্রামের মক্তব-টোলেই শেষ নয় আরবি-ফারসির জন্য পাটনায় ও সংস্কৃত শেখার জন্যে কাশীতে পাঠানো হয়েছিলো তাঁকে। সেসময় দেশীয়দের জন্যে এর চেয়ে বেশি সুযোগ আর ছিল না। এরপর পনের বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে ‘পৃথিবীর সুদূর প্রদেশগুলিতে, পার্বত্য ও সমতল ভূমিতে’ পর্যটন করেন; আর্থিক স্বাচ্ছল্যের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীকালে আরো কয়েকটি ভাষা শেখার সুযোগও তাঁর ঘটে। অপরদিকে অর্থাভাবে অল্পবয়সেই হরিনাথের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে; স্বচ্ছন্দ বিহারপ্রিয় ও চঞ্চল হরিনাথ ‘বিশ^জোড়া পাঠশালা’য় সবার ছাত্র হন। কিন্তু সে-ও ওই জন্মভূমির আশপাশ জুড়েই এবং তা অস্তিত্ব রক্ষার কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পিতৃমাতৃহীন হরিনাথের অন্ন-বস্ত্র-আশ্রয় ছিল অনিশ্চিত। দ্বারে-দ্বারে ঘুরে, দান-খয়রাত নিয়ে চলতে হয়। বিচিত্র পেশাও নিতে হয় অনেকসময়। প্রসঙ্গত, একবার রামমোহন রায়ের ‘চুর্ণক’ বইটি একরাতের মধ্যে নকল করে দিয়ে বস্ত্রের সংস্থান করতে হয়েছিল তাঁকে।
রামমোহনের মৃত্যুর বছরেই হরিনাথের জন্ম হলেও দুজনকে একটি কালপর্বের সদস্য হিসেবেও দেখা যেতে পারে। সেটি হলো, দুজনেরই জীবৎকাল ঔপনিবেশিক শাসনকালে সীমিত। আর এরই মাঝে দুজনের ভূমিকা পথিকৃতের। রামমোহন ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর কলকাতায় উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সংঘটিত কথিত রেনেসাঁর প্রধান পুরুষ। অপরদিকে হরিনাথ সেসময়ের নবসৃষ্ট গ্রামীণ এলিট সমাজের প্রধান প্রতিনিধি। ঐ কলকাতার রেনেসাঁ আর তৎকালীন ‘গড়াই সংস্কৃতি’র প্রকৃতি স্বল্প পরিমাণে হলেও বিবেচ্য। অবশ্য গড়াই সংস্কৃতি কথাটিরই বোধ করি ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তৎকালের গ্রাম বা গঞ্জ কোনোটারই প্রতীক হিসেবে আমরা ‘গড়াই’ শব্দটিকে গ্রহণ করিনি। গড়াই নির্বিশেষ নয়, একটি বিশেষ নদী এবং তার তীরবর্তী সংস্কৃতির কথাই আমরা বলতে চাইছি। সংশ্লিষ্ট জনপদ হলো কুমারখালী। চর্যাপদে (৪৯ নম্বর চর্যা) যে পদ্মাখালের কথা রয়েছে সেটি এই অঞ্চলের গড়াই-মধুমতি কিংবা কুমার নদী বলে শনাক্ত করেছেন নীহাররঞ্জন রায়। এই কুমার নদ থেকেই কুমারখালী নামের উৎপত্তি। কারও মতে কুমার নদ নয়, কালেক্টর কমর কুলি খাঁর নাম থেকে উদ্ভূত। যা হোক, কলকাতা হতে প্রায় পৌনে দুইশ কিলোমিটার দূরবর্তী কুমারখালী সমান্তরাল একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও বটে। কুমারখালী তথা কুষ্টিয়া আশুতোষ ভট্টাচার্যের ভাষায় ‘বাংলার বাউলের লীলাভূমি’, অন্নদাশঙ্কর রায়ের কথায় ‘বাংলাদেশের হৃদয়’। নদীবিধৌত ও শোভিত শস্যক্ষেত্রের এই সমতল নিসর্গভূমিতে উদাসী-বাউলদের মতপথ পরিসর পেয়েছিল দীর্ঘদিন ধরেই। বাউলস¤্রাট লালনের গানে শুধু উদাস-বিবাগের বাণীই নয়, মানবতাবাদ, যুক্তিতত্ত্ব, সমাজসমালোচনা, উদারপ্রাণতা, দার্শনিকসুলভ জিজ্ঞাসাও রয়েছে। আর তা এখানকার গৃহীশিল্পিদের সত্তায়ও প্রভাব ফেলেছে। মীর মশাররফ, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, জলধর সেন প্রমুখ কুষ্টিয়ার কৃতীজনের সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালেই এর প্রমাণ মিলবে। এঁরা সবাই কাঙাল হরিনাথের ছাত্র অথবা শিষ্য। পত্রিকা পরিচালনা, ইতিহাসরচনা, নতুন ধরনের সাহিত্যসৃজন ইত্যাদি ক্ষেত্রে এঁরা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে দিকপাল। এই পাত্রদের স্থান-কাল বিবেচনায় নিলে কি একটি আলোকোজ্জ্বল যুগ পাই না? আরেকটু যোগ করি, বাংলার জাগরণের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের মানস-সংগঠন কিন্তু এখানেই হয়েছিল। তো এই প্রপঞ্চেরই পুরোধা কাঙাল হরিনাথ। ইতিহাসে হয়তো সঙ্গতভাবে কাঙালের তুলনায় অধিক স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রামমোহনের নাম, কিন্তু বাঙালিত্বের সাধনায়, বাংলা সাহিত্যের ধারায়, আজকের বাস্তবতায় কাঙাল ও কাঙালম-লী সম্ভবত কম সংবর্ধনা পাবেন না। আর এ কারণেই আমরা রাজা রামমোহনের সাথে কাঙাল হরিনাথের সমান্তরাল আলোচনায় সাহসী হয়েছি।
ঊনবিংশ শতকের কলকাতায় সামাজিক অবস্থানে বিশিষ্ট ও আর্থবিচারে বড়োলোক শ্রেণির মধ্যে চিন্তা ও কর্মে যে অভিঘাত-উন্মাদনা-উত্তরণ চলেছিল তাকে রেনেসাঁ বলা যাবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। একটি শ্রেণি, শহর ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকাটাও মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু স্বাধীনতার প্রশ্নে ওই শ্রেণির নির্লিপ্তি বিস্ময়কর। ঊনবিংশ শতকে বিশে^র শ্রেষ্ঠ সভ্যজাতির সান্নিধ্যে এসেও স্বাধীনতাস্পৃহ হওয়ার পরিবর্তে পারবশ্যে স্বস্তি বোধ করাকে রেনেসাঁ, পুনর্জাগরণ বা নবজাগৃতি তো দূরের কথা আধুনিকতা বলাই কঠিন। বংশগতভাবে ইউরোপিয়ান হওয়া সত্ত্বেও জন্মসূত্রে নিজেকে ভারতীয় ভেবে ডিরোজিও যেভাবে স্বাজাত্যবোধ ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা অভিব্যক্ত করেছেন চিন্তা-কর্ম-কবিতায় তা আর কারো মধ্যে সুলভ ছিল না। নবজাগরণের প্রধান ব্যক্তিত্ব রামমোহনের স্বাধীনতাচিন্তা আজ সত্যিই আমাদের ধন্দে ফেলে দেয়। ভাগলপুরে কালেক্টর ফ্রেডরিক হ্যামিলটনের সঙ্গে রামমোহনের বিরোধের উল্লেখ করে তার মধ্যে ব্রিটিশবিরোধিতা খুঁজে পান অনেকেই। এই ইংরেজ সাহেব রামমোহনকে অপমান করেছিলেন তাঁর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পালকি থেকে না-নামার কারণে। রামমোহন পালকিতে চড়েই স্থানটি ত্যাগ করেন এবং ১২ এপ্রিল ১৮০৯ তারিখে লর্ড মিন্টোকে এক চিঠিতে এই অপমানজনক ঘটনা অবহিত করে প্রতিকার প্রার্থনা করেন। যথাযথসম্মান প্রদর্শনসহ লেখা চিঠির মূলসুর হলো, ইংরেজ শাসনের সুখ্যাতি এবং এমনটি ঘটলে সে সুখ্যাতি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কাজেই ঘটনাটি রামমোহনের আত্মমর্যাদাবোধের একটি প্রতিক্রিয়া বটে. তবে সেই সাথে ইংরেজ-শাসনের আনুগত্যের পরিচায়ক। সেজন্যই হ্যামলিটনকে সর্তক করা হয়। রিফর্ম বিল গৃহীত হলে তিনি স্বাধীন আমেরিকায় চলে যাবেন বলে হুমকি দিয়েছিলেন, তবে সে বিল ব্যতিরেকে ভারতবর্ষ কি স্বাধীন ছিলো? অবশ্য তিনি যখন ইংরেজদের মহারাষ্ট্র বা নেপাল বিজয়কে নিজেদের বিজয় বলে আখ্যা দেন, তখন তাঁর স্বাধীনতা-ভাবনার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আমেরিকা ও স্পেনের স্বাধীনতা সংগ্রাম তাঁকে এমন প্রভাবিতই করে যে, ইংরেজকে ‘মুক্তিদাতা’, ‘রক্ষক’ বলে এসেছেন! স্বাধীনতার প্রশ্নে হরিনাথও যে পূর্ণ প্রাগ্রসরতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা নয়। তিনিও রানির প্রশস্তি গেয়েছেন। তবে রামমোহন যেখানে নিজ শ্রেণির ব্যবসা-বাণিজ্য অবাধ রাখার দরবার করেছেন, সেখানে হরিনাথ চেয়েছেন কৃষক-শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, তাদের উপর যে নির্যাতন চলছিলো তার প্রতিবিধান। তাই পাবনার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজেস্ট্রেট দরিদ্র-বিধবার গরু কেড়ে নিলে হরিনাথ ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’য় ‘গরুচোর ম্যাজিস্ট্রেট’ শিরোনামে সংবাদ ছাপেন আর রামমোহন ‘মুদ্রাযন্ত্রের স্বাধীনতার’(?) জন্যে যে চিঠি লিখেছিলেন, সেখানে ইংরেজ শাসনের বিরূপ সমালোচনা করা হলে কঠোর শাস্তি রাখার প্রস্তাব দেন।
দুজনেরই চিন্তাধারা প্রচার ও কর্মপরিচালনার অন্যতম হাতিয়ার ছিল সাময়িক পত্রিকা। আধুনিকতার অন্যতম বাহন সংবাদ-সাময়িকপত্র। বাঙালীর উদ্যোগে পরিচালিত প্রথমদিককার কলকাতাকেন্দ্রিক একাধিক সাময়িকপত্রের সঙ্গে রামমোহনের সংযুক্ততা ছিল। এমনকি রামমোহনের বিরোধিতা করতে যেয়ে বেশকিছু পত্রিকা সেকালে বেরিয়েছে, যা বাংলা সাময়িকপত্রের ধারাকেই বেগবান করেছে। আর হরিনাথ মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত। বিরোধিতা নয়, হরিনাথের প্রকাশনাকেই অনেক পত্রিকা আদর্শ-অনুসরণীয় মেনেছিল। কলকাতা ও কুষ্টিয়া— এই স্থানিক পার্থক্য পত্রিকাপ্রকাশনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যর মধ্যেও পার্থক্য রচনা করেছিল। রামমোহনের পত্রিকা প্রকাশের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল ধর্মসংস্কার, কাঙাল হরিনাথের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমাজসংস্কার। খ্রিস্টান মিশনারিদের পত্রিকায় হিন্দুধর্ম ও ভারতীয় প্রথা নিয়ে বিরূপ-বিদ্রƒপমূলক লেখা দেখে তার প্রতিবাদেই রামমোহনের পত্রিকা প্রকাশনা। আর হরিনাথের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নামকরণের সার্থকতা নিশ্চিত করেছিল। বাংলার বৃহত্তর সমাজ গ্রামসমাজের বস্তুনিষ্ট তথ্য সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করে গেছে।
দরিদ্র কৃষিজীবী সম্প্রদায় নিয়ে দুজনের মত-পথ পূর্ণরূপে প্রভিন্ন। বাংলার কৃষকের জীবনেতিহাসের সবচেয়ে দুর্বিষহ অধ্যায় নীলচাষ। নীলকরদের নির্যাতনের রূপ দেখে জেমস লঙের মতো কিছু ইংরেজসাহেবেরও অন্তর কেঁদে উঠেছিল। কিন্তু, রামমোহন দেখেছিলেন, নীলকুঠির আশেপাশের গ্রামবাসীদের অবস্থা নাকি অপেক্ষাকৃত ভালো। কৃষকের পক্ষে তিনি কথা বলেছিলেন বটে, তবে তা ইংরেজকৃষকের। তিনি প্রস্তাব রেখেছিলেন, ইংল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষে কৃষক আনা যেতে পারে, যাতে চাষবাস পদ্ধতির উন্নতি হয়। এক্ষেত্রে তিনি একদিকে খাঁটি জমিদারই বটে, নির্দিষ্ট জমিতে ফসল উৎপাদন আরো বাড়বে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজস্ব আদায় হবে— এটাই তো তিনি চাইবেন। এরই মধ্যে ইংরেজবান্ধবের চূড়ান্ত প্রকাশও দেখা গেল— শাসক ইংরেজ, বিচারক ইংরেজ, চাকুরে ইংরেজ, মিশনারি ইংরেজ, শিক্ষক ইংরেজ বাকি তো ছিল শুধু ইংরেজকৃষক— রামমোহন সেটাই চাইলেন। অপরদিকে হরিনাথ বাংলার দরিদ্র কৃষক সম্প্রদায়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে নিজপ্রাণ বিপন্ন করেছেন, হয়েছেন সর্বস্বান্ত। কাজেই শেষত রামমোহন জমিদার, হরিনাথ জমিদারের চোখে শত্রু।
রামমোহন রাজা উপাধি পেয়েছিলেন ব্যক্তির কাছ থেকে— ইংরেজের অনুগ্রহনির্ভর মোগল স¤্রাট ইংল্যন্ডে যখন তাঁকে নিজ দাবী আদায়ের জন্য অর্থ ব্যয় করে বিলেত পাঠান তখন এই উপাধীটি দেন। রামমোহনের নামের পূর্বে এটির ধ্রুব উপস্থিতি। অপরদিকে হরিনাথের কাঙাল পদবীটি পারিবারিক অর্থদৈন্যের কারণে ব্যক্তিগত, বাউলমনস্কতার কারণে যথার্থ এবং তা তাঁর নামের পূর্বপদ হিসেবে ধ্রুবত্ব লাভ করেছে। তবে উচ্চবিত্ত রামমোহন খাঁটি বুর্জোয়া হতে পারেননি, কিন্তু নিম্নবিত্ত কাঙালের ভূমিকা অনেকটা সেরকমই ছিলো।
রামমোহন একটি ভক্তম-লী গড়ে তোলেন দেশজুড়ে, নিজ শহরে গড়ে তোলেন একটি লেখক গোষ্ঠী। যদিও সে লেখকেরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কোনো স্থায়ী অবদান রাখতে পারেননি। তাঁর ‘আত্মীয়-সভা’ বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রথম সংগঠন। তবে জ্ঞানচর্চা নয়, বেনে বুদ্ধি নেয়ার জন্যেই সেকালের অনেক ধনীলোক রামমোহনের বৈঠকস্থ হতেন। বিপরীতপক্ষে পত্রিকা ও ফিকির চাঁদ বাউলের আসরকে কেন্দ্র করে কাঙাল হরিনাথকে কেন্দ্র করে যে আসর-বাসর বসতো সেখান থেকেই বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির উজ্জীবন ঘটে। হরিনাথ, মীর মশাররফ, জলধর, অক্ষয় মৈত্রেয়, জলধর সেন, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব, দীনেন্দ্রকুমার রায়, চন্দ্রশেখর করের পাশাপাশি লালন শাহের নামোল্লেখেই বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে কাঙালম-লীর অবদান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা আসে। উপন্যাস, নাটক, গান, ভ্রমণকাহিনি, ইতিহাস ও তত্ত্বালোচনায় এঁদের সম্মিলিত সৃষ্টিকে নব-জাগরণের শ্রেষ্ঠ শিল্পিত অভিব্যক্তি বলতেই হবে।
রামমোহন ধর্ম সংস্কার স্বজাতির উন্নয়ন সাধনের জন্য এতো কাজ হাতে নিয়েছিলেন আর এতো যুক্তি-তত্ত্ব সহযোগে লেখালেখি কারার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল যে সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার অবকাশ পাননি। অবশ্য তাঁর প্রত্যুত্তরমূলক রচনায় সরস শিল্পমনের প্রক্ষেপ পাওয়া গেছে। তবে বস্তুত আধুনিক যুগের শুরুতে নবযুগের ধ্যান-ধারণা আত্মস্থ করতে যে সময় যায় তাতে প্রথম দিকে প্রবন্ধচর্চাই চলে, সৃজনশীল সাহিত্যের সৃষ্টি হয় আরো পরে। বাংলা ভাষায় যেমনটি দেখা গেছে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে এসব সাহিত্য শাখার যাত্রারম্ভে। হরিনাথ ও তাঁর শিষ্য-সমানধর্মাদের সেদিক দিয়ে রামমোহনের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবেও চিহ্নিত করা চলে।
বাংলা সংগীতের ক্ষেত্রে দুজনেরই অবদান আলাদাভাবে আলোচ্য। কারণ শুধু এই নয় যে এক্ষেত্রে তাঁদের অবদান ঐতিহাসিক। উপরন্তু গানের মধ্যে তাঁদের একান্ত মনের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসারণ ঘটেছে। রামমোহন বাংলা ব্রহ্মসংগীতের পথিকৃৎ। তাঁর পথ ধরেই ঠাকুরবাড়ির আরো কারো কারো চর্চার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথে এসে বাংলা ব্রহ্মসংগীত একটি সংহত ধারা হয়েছে। বাংলায় ধর্মসংগীতের চল দীর্ঘদিনের। কিন্তু পদাবলি-কীর্তনের বাইরে ব্রহ্মসংগীতের স্বাদ আলাদা। এরকম উচ্চস্তরের ধর্মচিন্তা গানে বিধৃত হতে পারে, তা ছিল অভাবিত। মার্গীয় সংগীতের সাথে পূর্ব থেকে পরিচিত রামমোহনের অনেক গানই উচ্চাঙ্গ ধাঁচের। তারপরও একধরনের সহজতা এসেছিল ভাষায়। আর ধর্মচিন্তা তো জীবনভাবনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়— কাজেই তাঁর কিছু কিছু গান নির্দিষ্ট ধর্মমতের বাইরের মানুষের কাছেও আবেদন সৃষ্টি করেছিল। ‘মনে কর শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর’, ‘ভাব সেই একে/ জলে স্থলে শূন্যে যে সমান ভাবে থাকে’, ‘একদিন হবে যদি অবশ্য মরণ’ ইত্যাদি গানের কথা স্মরণীয়। ‘ওহে দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল, পার করো আমারে’ গানের গীতিকার কাঙাল হরিনাথ বাউল বা লোকজ গানের চর্চা করেছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি পথিকৃৎ নন, লালনের অনুসারীই হয়তোবা। তবে তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা সেই বাউল গানকে আরেকটু পরিশীলিত করেছিল। আর এখানেই দেখি রামমোহনের প্রভাব— অন্তত অনুষঙ্গের অনুসরণ দেখতে পারি। রামমোহনের বিখ্যাত গানের প্রথম দু-কলি : ‘মনে কর শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর/ অন্যে বাক্য কবে কিন্তু তুমি রবে নিরুত্তর।’ আর হরিনাথ লিখছেন : ‘ভাবি দিন কি ভয়ঙ্কর, ভেবে একবার দেখরে আমার মন পায়রা/ আত্মীয় ডাক্তার বদ্দি, নিরবধি, ঔষধ আনি দেবে তারা/ যখন তোর হাত ধরিতে তর্জনিতে, না করিবে নড়াচড়া।’ এটুকু তুলনায় যদি প্রভাবের ব্যাপারে কেউ প্রশ্ন তোলেন, তবে দু-জনের দুটি গানের পুরোটা মিলিয়ে নিতে পারেন। রামমোহন :
কত আর সুখে মুখ দেখিবে দর্পণে।
এ মুখের পরিণাম বারেক না ভাব মনে।
শ্যাম কেশ শ্বে^ত হবে,
ক্রমে সব দন্ত যাবে,
গলিত কপোল কণ্ঠ হবে কিছু দিনে।
লোল চর্ম্ম কদাকার,
কফ কাশি দুর্নিবার,
হস্ত পদ শিরঃ কল্প ভ্রান্তি ক্ষণে ক্ষণে।
অতএব ত্যজ গর্র্ব,
অনিত্য জানিবে সর্র্ব,
দয়া জীবে ন¤্রভাবে, ভাব সত্য নিরঞ্জনে।
পাশাপাশি পাঠ করি হরিনাথের নিম্নোক্ত গানটি :
কত আর আয়না ধ’রে, বারে বারে, দেখবে রে মন মুখ বল না।
কাল কেশ সাদা হবে, ক্রমে সবে দন্ত যাবে, তা জান না;
বলিতে কথা সুধু, মুখে থুতু, পড়বে দিনেক্ তা ভাবলে না।
কদাকার লোলচর্ম্ম, বিষয়কর্র্ম, কফ কাশী গুড়–ক ভজনা;
তখন তোর আত্মস্বজন, স্ত্রীপরিজন, মর বই আর বাঁচ কেউ ব’ল্বে না।
ফিকিরচাঁদ ফিকির ক’রে, দিনের তরে, মুখের পরিণাম ভাবল না;
এখনও আছে সময় ডাক রে তাঁর, দিন গেলে আর দিন পাবে না।
রামমোহনের ধর্মচিন্তা শুরু থেকে শেষাবধি উপনিষদকেন্দ্রিক— উপনিষদের অনুবাদ করেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন, ঔপনিষদিক ¯্রষ্টার কীর্তন করেছেন গানে। কাঙাল কথিত ঐশী-আগত নয়, নিশ্চিতভাবে এ জমিন-সৃষ্ট বাউলমতে বিশ^কে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন তাঁর গানে। তারপরও বলতে হয়, দুজনেই একক স্রষ্টার সত্তায় বিশ্বাসী হয়েছিলেন। এবং পরম স্রষ্টার উদ্দেশ্য নিবেদন-গীতি রচনা করেছেন। রামমোহন তো সকল ধর্মের সার সংগ্রহ করে ব্রাহ্মমত প্রতিষ্ঠা করেন। আর হরিনাথ একসময় ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে আবার সনাতনী ধারায় প্রত্যাবর্তন করেন। প্রত্যাবর্তন তো রামমোহনও একরকম করেছিলেন। তিনি কোনোদিন ব্রাহ্মণের উপবীত ত্যাগ করেননি এবং মৃত্যুকালে উচ্চারণ করেছিলেন ওঁ। রামমোহন ও হরিনাথের এই যে প্রত্যাবর্তন, তা মনে হয় যুগের অনিবার্য প্রভাবের ফল। সে যুগে মীর মশাররফ বলেছিলেন, ‘জগৎ পরাধীন, মন স্বাধীন’। রামমোহন ও হরিনাথও দেখলেন দেশ পরাধীন, কিন্তু চেতনা স্বাধীনতাকাক্সক্ষী। কাজেই সনাতন ধর্মে সান্ত¡না লাভ করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।
কিছু প্রাতিবেশিক অনিবার্য সীমাবদ্ধতা, কিছু ব্যক্তিগত বিভ্রান্তি তাঁদের ছিলো, কিন্তু এ তাঁদের জীবনের একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র— যে অংশ নির্বিশেষের। কিন্তু সাধনার বিশিষ্টতা দিয়ে রামমোহন ও হরিনাথ ছিলেন যুগন্ধর পুরুষ। মহামানব— মানে মানুষই বটে। কাজেই মানবীয় ভ্রান্তি, সীমাবদ্ধতা তাঁদের মধ্যে ছিল। অল্পবিস্তর সীমাবদ্ধতা ধারণ করেই তাঁরা হয়েছিলেন মহামানব। আমরা যদি তাঁদের যোগ্য উত্তরাধিকার হতে পারি তবে ফলশ্রুতি হিসেবে আমাদের উত্তরণও ঘটবে। সেই অধিকারে মিশতে হবে রামমোহনের বিশ^দৃষ্টির সাথে হরিনাথের মানবদরদ। রামমোহনের প্রচুর পঠনপাঠনের সাথে হরিনাথের বিচিত্র লেখনিচর্চা। রামমোহনের কর্মোদ্যমের সাথে হরিনাথের আন্তরিক নিবেদন। এ দুজনের আত্মমর্যাদাবোধ, চিন্তার গতিশীলতা, নবউদ্যোগী সত্তা, সৃজনশক্তি আমাদের সত্তায় সঞ্চারিত হোক।

**************************

হুমায়ুুন আজাদের দার্শনিক প্রত্যয় : আমার অবিশ্বাস
মাহবুব বোরহান

হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন শক্তিশালী লেখক। পা-িত্যে এবং মেধায় তিনি তাঁর সমকালে সুনাম কুড়িয়েছেন। লেখক হিসেবে তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক। চিন্তায় ছিলেন আন্তর্জাতিক। চেতনায় সর্বোতভাবে মানবতাবাদী। বিবেচনাবোধে ছিলেন যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞানমনস্ক। গবেষক হিসেবে ভাষাতত্ত্বে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সৃষ্টিশীল লেখায় ছিলেন বৈচিত্র্যের সন্ধানী। জীবনবোধে প্রথাবিরোধী। এই প্রথাবিরোধিতার স্পষ্ট স্বাক্ষর আছে তাঁর সকল রচনায়। কবিতাতেই শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় সর্বাধিক। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তার গতি-প্রকৃতি বুঝতে হলে শরণাপন্ন হতে হবে তাঁর প্রবন্ধের। কারণ প্রবন্ধ চিন্তার বাহন। হুমায়ুন আজাদ চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক। প্রবন্ধের মধ্যেই তিনি তাঁর দার্শনিক সত্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আমার অবিশ্বাস হুমায়ুন আজাদের গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রবন্ধগ্রন্থ। আমাদের বর্তমান বিবেচনা আমার অবিশ্বাস গ্রন্থের আলোকে হুমায়ুন আজাদের দার্শনিক প্রত্যয়ের স্বরূপ সন্ধান। হুমায়ুন আজাদ তাঁর আমার অবিশ^াস গ্রন্থে সাতটি প্রবন্ধকে সাতটি পরিচ্ছেদে সাজিয়েছেন। পরিচ্ছেদের ক্রম অনুসারে প্রবন্ধগুলো হলো : ‘আমার ইন্ত্রিয়গুলো’, ‘বিশ^াসের জগত’, ‘নাইটিংগেলের প্রতি’, ‘মহাসমুদ্রে ছোট্ট চর : আমাদের গ্রাম’, ‘ধর্ম’, ‘আরণ্যিক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপন’ এবং ‘আমার অবিশ^াস’। শেষ প্রবন্ধটির নামানুসারে তিনি গ্রন্থটির নামকরণ করেছেন। গ্রন্থটির সাতটি প্রবন্ধই দার্শনিক প্রবন্ধ। প্রত্যেকটি প্রবন্ধেই হুমায়ুন আজাদ তাঁর প্রতীত জীবনদর্শনকে ব্যক্ত করেছেন।


‘আমার ইন্দ্রিয়গুলো’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক জীবনকে বৈজ্ঞানিক দ্বাদ্বিক বস্তুবাদের নিরাসক্ত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। তিনি বলেছেন ‘মানুষ হয়ে জন্মলাভ করে তিনি সুখী’। কিন্তু অন্য কিছু হলেও খারাপ লাগতো না, কারণ তখন তিনি জানতেনই না জন্ম, পৃথিবী কী? যেমন সব বিস্মৃত হবেন মৃত্যুর পর। তাঁর যাপিত জীবনের সুখ, দুঃখ সবকিছু। জীবনের পূর্বে এবং পরে শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নেই। তাঁর ভাষায়, ‘জন্মের আগে যেমন শূন্য ছিলাম, ম’রে যাবার পর আমার কাছে আমি সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যাবো।’ জীবন কোন সত্তার মহাজাগতিক পরিকল্পনার বিষয় নয়, নিতান্তই প্রাকৃতিক ব্যাপার। জন্ম-মৃত্যু ‘একরাশ প্রাকৃতিক ক্রিয়াকলাপের’ ফল ছাড়া আর কিছু নয়। বেঁচে থাকাতে সুখ আছে এবং এই সুখ কেবলমাত্র পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়েই উপভোগ করা যায়। তিনি মনে করেন চোখ দিয়ে দেখা, নাক দিয়ে গন্ধ নেয়া, কান দিয়ে শ্রবণ করা, জিভ দিয়ে স্বাদ নেয়া এবং ত্বক দিয়ে স্পর্শ করা — এগুলোই সুখের একমাত্র উপায় অথবা বলা যায় এগুলোর মাধ্যমেই কেবল সুখ পাওয়া যায়। হুমায়ুন আজাদ তাঁর দক্ষ ভাষার নিপুণ প্রয়োগে এগুলোর বিভিন্নমাত্রিক ব্যবহার ও উদাহরণ তুলে ধরেছেন। ব্যক্ত করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত সুখ পাওয়া না পাওয়ার ব্যাপারটিকে। এরই সঙ্গে যুক্ত করেছের তাঁর সুন্দর-অসুন্দর এবং শ্লীল-অশ্লীল ভাবনাকেও। প্রবন্ধটি থেকে বোঝা যায় হুমায়ুন আজাদের সুখ সুন্দর ও শ্লীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে তাঁর অসুখ অসুন্দর ও অশ্লীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর এই সুখ-অসুখ বোধের সাথে গভীরভাবে জড়িত আছে সমাজমনস্কতা ও রাজনীতিচেতনা। তিনি লিখেছেন :
আমার মগজ সামাজিক অধিকাংশ ব্যাপার দেখতে ঘেন্না বোধ করে, তাই ওগুলো পীড়া দেয় আমাকে; যেমন মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি দেখে আমি সুখ পাই না, সাধারণত ওসব দেখতে চাই না, ওঁরা যেখানে থাকেন আমি সাধারণত সেখানে যাই না, ক্ষমতা আমার কাছে অসুন্দর, এমনকি অশ্লীল; দোয়েলচড়ুই দেখে সুখ পাই, রাষ্ট্রপতির মুখের থেকে চড়–ইর মুখ অনেক সুন্দর; উলঙ্গ শিশুরা, ওদের পরার কিছু নেই, মাঘের শীতে পাতার আগুনের উম নিচ্ছে দেখে সুখ পাই; সুখ পেয়ে নিজেকে অপরাধী বোধ করি।
সুখ প্রাপ্তির অভিলাষ ও তা চরিতার্থতায় আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিবন্ধকতার কথাও তিনি ভোলেন নি। বিশেষভাবে ত্বকের মধ্য দিয়ে শরীরী স্পর্শের যে সুখ। ‘আমাদের সমাজে ছোঁয়া খুবই নিষিদ্ধ ব্যাপার; আমরা খুব কম মানুষকেই ছুঁতে পারি, খুব কম মানুষকেই ছোঁয়ার অধিকার আছে আমাদের।’
ইন্দ্রিয়সুখের বাইরেও এক ভিন্ন ধরনের সুখের আস্বাদ হুমায়ুন আজাদ উপভোগ করেন ‘কল্পনা ও চিন্তার জগত’ থেকে। কল্পনা ও চিন্তার জগতের সুখ বা আনন্দকে তিনি ইন্দ্রিয় সুখের চেয়ে ভিন্ন এমনকি উৎকৃষ্ট বলেও উভয়ের প্রতিই তাঁর ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এই ইন্দ্রিয়ের সুখের থেকে অনেক ভিন্ন, উৎকৃষ্টও হয়তো, কিন্তু তা আমি বলতে চাই না, আমার ইন্দ্রিয়গুলোকে আমি কখনোই নিন্দিত করতে চাই না। ইন্দ্রিয়গুলোকে আমি ভালোবাসি, যেমন ভালোবাসি আমার মগজকে, যা আমি দেখি নি, যার ক্রিয়াকলাপ বুঝি না আমি, যা আমার কাছে কিংবদন্তির মতো।’ তবে একদিন সবকিছুর বিনাশ ঘটবে বলে তিনি জীবন এবং জীবনের এসবকে অর্থহীন মনে করেছেন। সবকিছুরই এক সময় বিনাশ ঘটে এই দার্শনি তত্ত্বের উপর তিনি ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’ নামে একটি উপন্যাসও রচনা করেছেন। জীবনের অর্থহীনতা সাহিত্যে কীভাবে রূপায়িত তা তিনি কামু এবং সুধীন্দ্রনাথ থেকে বিশ্লেষন করেছেন। মামুলি আশাবাদেও তাঁর আস্থা নেই। আসলে স্থ’ূল জীবন যাপনের জন্য নিরর্থকতাকে ভুলে আশাবাদ গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরা মিথ্যাকেই আশ্রয় করি। মৃত্যুকে ঘৃণা করে জীবনকে ভালোবাসি। এ যেন মানুষের এক ধরনের দ-। কারণ ‘মৃত্যুকেই বরণ করতে হবে অবশেষে, তার কাছেই আত্মসমর্পণ করতেই হবে। মৃত্যু ছাড়া আর কিছু সম্পর্কেই আমরা নিশ্চিত নই।’ এই ধারনা নিয়েও তিনি ‘কবি অথবা দ-িত অপুরুষ’ নামে উপন্যাস লিখেছেন। তারপরেও হুমায়ুন আজাদের প্রত্যয়,অর্থ হীন হলেও জীবন সুন্দর। আর সে জীবনের পথ অন্য কেউ দেখাতে পারে না প্রত্যেককে তৈরি করে নিতে হয়। তাঁর ভাষায় :
জীবন, আমাদের সুন্দর জীবন, তার কোনো অর্থ নেই, অর্থের দরকার নেই; জীবনের অর্থ হচ্ছে জীবন, জীবনের অন্য অর্থ নেই ব’লেই জীবন সুন্দর। কোনো পূর্ব নির্ধারিত পথ নেই মানুষের জন্যে; কোনো গ্রন্থ পথ দেখাতে পারে না তাকে, কোনো মহাপুরুষ বা প্রবর্তক তার জন্যে পথ প্রস্তুত করতে পারেন না; ওই মহাপুরুষেরা তৈরি করেছেন নিজেদের পথ, অন্যদের নয়। প্রত্যেককে খুঁজে বের করতে হয় নিজের পথ, তৈরি করতে হয় নিজের রাস্তা। (প্রাগুক্ত : ২০-২১ )
হুমায়ুন আজাদ শেষ পর্যন্ত জীবনকেই অর্থপূর্ণ বলেছেন। ‘ কোনো সার্থকতাই অবশ্য সার্থকতা নয়, সবকিছুই পরিশেষে নিরর্থক; অর্থপূর্ণ শুধু দুই অন্ধকারের মাঝখানের হঠাৎ ঝলকানি টুকু।’ অর্থাৎ জন্মের আগে অন্ধকার, মৃত্যুর পরেও অন্ধকার। দুই অন্ধকারের মাঝখানের হঠাৎ ঝলকানিটুকু — জীবন। জীবনই অর্থপূর্ণ জীবনই সত্য জীবনই সুন্দর।
হুমায়ুন আজাদের এই দার্শনিক প্রত্যয় নতুন নয়। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনই শুধু নয়, প্রাচ্য দর্শনে চার্বাকপন্থি ও ওমর খৈয়ামের মধ্যে এই প্রত্যয়ের সন্ধান গভীরভাবে পাওয়া যায়। জীবনের পূর্বে এবং পরে যে মহাশূন্যতা বা অন্ধকার এই তত্ত্বও খৈয়াম ও লালনের রচনায় পাওয়া যায়। খৈয়াম বলছেন :
অজ্ঞানেরই তিমির তলের মানুষ ওরে বে-খবর!
শূন্য তোরা, বুনিয়াদ তোর গাঁথা শূন্য হাওয়ার ’পর।
ঘুরিস্ অতল অগাধ খাদে, শূন্য মায়ার শূন্যতায়,
পশ্চাতে তোর অতল শূন্য, অগ্রে শূন্য অসীম চর।
হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ‘আনন্দ পাই কল্পনা ও চিন্তায়, যাতে সমাজরাষ্ট্রের কোনো দরকার নেই।’ তাঁর একথা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কারণ মানুষের কল্পনা ও চিন্তাকে আশ্রয় করেই তা যেমন চিন্তা বা কল্পনাই হোক সমাজ ও রাষ্ট্র টিকে আছে, বিকশিত হচ্ছে। আমরা যাপিত জীবনে যা কিছু ব্যবহার করি তার সবই মানুষের কল্পনা আর চিন্তার ফল। আর সমাজ-রাষ্ট্র তো ব্যক্তি মানুষেরই সমষ্টি।আসলে হুমায়ুন আজাদ এ প্রবন্ধে বিজ্ঞানমনস্ক বস্তুবাদী জীবনদর্শনের প্রকাশ ঘটালেও উল্লিখিত অভিমত নিছক ভাবাবেগ ছাড়া অন্য কিছু নয়। হুমায়ুন আজাদ দর্শনগত যে প্রত্যয় প্রবন্ধটিতে ব্যক্ত করেছেন তা অভিনব নয়। তবে যে ভাষায় ব্যক্ত করেছেন, যেভাবে ব্যক্ত করেছেন পা-িত্যে এবং শিল্পনৈপুণ্যে তা নিঃসন্দেহে অভিনব।
‘বিশ^াসের জগত’ প্রবন্ধে লেখক বিশ^সের স্বরূপ নিরূপণের প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর বিবেচনায় বিশ^াস হলো এক মহামারীর নাম। বিশ^াসের সঙ্গে জড়িত সন্দেহ, অস্তিত্বহীনতা। যা নিশ্চিতভাবে বা বস্তুগতভাবে আছে তার সঙ্গে বিশ^াসের কোন সম্পর্ক নেই। ‘অসত্য, অপ্রমাণিত, কল্পিত ব্যাপারে আস্থা পোষণই হচ্ছে বিশ^াস।’ মানুষের বিশ^াস কোন ধ্রুব বিষয় নয়। কোনো বিশ^াসই চিরকাল অব্যাহত থাকে না। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মধ্যে বিশ^াসের পরিবর্তন দেখা যায়। পুরাতন বিশ^াস বাতিল করে মানুষ নতুন বিশ^াস ধারণ করে। মানুষের বিশ^াস বিচিত্র । ‘মানুষের বিশ^াসের শেষ নেই, কোটি কোটি বিশ^াস পোষণ করে মানুষ।’ বিশ^াসের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক অন্ধকারের যা কোনো কিছুকে অদৃশ্য, অস্পষ্ট এবং রহস্যময় করে । ‘বিশ^াস হচ্ছে রহস্যীকরণপ্রবণতা, যা বস্তুনিষ্ঠভাবে সত্য জানতে চায় না, বরং মিথ্যাকে আকর্ষণীয় ও শক্তিশালী ক’রে তুলতে চায়। রহস্যীকরণপ্রবণতা মিথ্যাকেই ক’রে তুলেছে সত্য; এজন্যে সত্য শব্দটি এখন বিভ্রান্ত করে আমাদের। বিশ^াসের সম্পর্ক ইন্দ্রজালের সাথে, বিজ্ঞানের সাথে নয়; এখনো মানুষ ইন্দ্রজাল দিয়ে আক্রান্ত, অভিভূত; বিজ্ঞান দিয়ে আলোকিত নয়।’ বিশ^াস কোনো স্বয়ম্ভূ বিষয় নয়। মানুষের বিশ^াসের প্রথম ও প্রধান উৎস পরিবার; তারপর সমাজ, রাষ্ট্র এবং সভ্যতা। মানুষ নিজের ভেতর থেকে নয় পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র থেকে বিশ^াস গ্রহণ করে তাকে পবিত্র, শাশ^ত এবং ধ্রুব মনে করে। তবে কোনো বিশ^াসই পবিত্র শাশ^ত ধ্রুব নয় । একের বিশ^াস অন্যের কাছে মূল্য হীন। পবিত্রতা শব্দটিও নিরর্থক। কোনো কিছু পরিচ্ছন্ন হতে পারে পবিত্র হতে পারে না। পবিত্রতার কোনো বাস্তব রূপ নেই। রহস্যীকরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে ধর্ম, শিল্পকলা এবং সাহিত্য। অজ¯্র বিশ^াসের কাছে আত্মসমর্পণ করে শিল্প-সাহিত্য হয়ে পড়েছে এক ভুলের বিশ^। যদিও তার সৌন্দর্য সীমাহীন। এগুলোর যতটুকু বিশ^াস ততটুকু অশিল্প, অকবিতা বা অসাহিত্য। বিশ্বাসের বাইরের টুকুই শিল্প, কবিতা বা সাহিত্য। বিশ^াস অল্প সময়েই ভেঙে পড়ে কিন্তু সৌন্দর্য দীর্ঘ স্থায়ী। হুমায়ুন আজাদ প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ, এলিঅট, দান্তে এবং নজরুলের উদ্ধৃতি সম্বলিত দীর্ঘ আলোচনায় তাঁর বক্তব্যের যথার্থতা প্রতিপন্নের প্রয়াস চালিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন এঁদের রচনার শৈল্পিক সৌন্দর্য মুগ্ধকর হলেও এঁদের বিশ^াসের জগত সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাংলা সাহিত্যে তিনি সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে চেতনায় সবচেয়ে আধুনিক বিবেচনা করেছেন। তিনিই ভালোভাবে সভ্যতা ও মানুষের বিবর্তন বুঝেছিলেন।
হুমায়ুন আজাদ প্রবন্ধটিতে নজরুল সম্পর্কে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তা সম্পূর্ণ সমর্থনযোগ্য নয়। বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যার অবকাশ এখানে নেই। তবুও সংক্ষেপে কিছু আলোকপাতের চেষ্টা করছি। হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ‘তিনি বাঙলা ভাষার বিভ্রান্ত কুসংস্কার-উদ্দীপ্ত লেখকদের মধ্যে প্রধান।’ এছাড়া নজরুলের ইসলামী ঐতিহ্য নিয়ে লেখা কবিতা-গান এবং শ্যামাবন্দনামূলক কবিতা-গান উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ‘বিধিবদ্ধ ধর্মীয় বিশ^াসগুলো কঠোর, একটি মানলে আরেকটি মানা যায় না, ইসলাম মানলে হিন্দুধর্ম মানা যায় না, একই সাথে কেউ হ’তে পারে না মুসলমান ও হিন্দু; কিন্তু নজরুল তাঁর এক বিশ^াস থেকে আরেক বিশ^াসে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন আগের বিশ^াস সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে।’ প্রথমত উল্লেখ্য যে নজরুলের লেখা থেকে এটা খুব সহজেই প্রমাণ করা যায় যে তিনি কুসংস্কার উদ্দীপ্ত লেখক তো ননই বরং তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে কুসংস্কারকে দূর করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন যেমনটি তাঁর মতো আর কেউ করেন নি। তার ‘জাতির নামে বজ্জাতি’সহ বহু কবিতা, গান তার প্রমাণ। তাঁর গল্প, উপন্যাস থেকেও এর বহু উদাহরণ দেয়া সম্ভব। একজন কবি বা শিল্পী কোনো বিষয় অবলম্বন করে লিখলেই সেই বিশ^াসের ধারক হয়ে যান না। জনমানুষের কবি হিসেবে নজরুল হিন্দু-মুসলমান দুটি সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষের লালিত আবেগকে তাঁর লেখায় রূপ দিয়েছিলেন। এর সবই তাঁর (চেতনার) কথা নয়। অন্য সবার কথা। কবি লিখেছেন ‘সবার কথা কইলে কবি…’ । কবি অন্যের কথা বলেন। রবীন্দ্রনাথ যখন, ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না কেন বেলা হলো মরি লাজে’ অসাধারণ গানটিতে একজন কেলিক্লান্ত বধূর পরিতৃপ্ত ঘুমের পর বিলম্বে জাগরণের লাজ-রাঙা অপরূপ চিত্রকল্প ফুটিয়ে তোলেন তখন তিনি নিশ্চয়ই কোনো নারীতে রূপান্তরিত হন না। একই সঙ্গে হিন্দু-মুসলমান হওয়ার প্রশ্ন আসে না। কারণ নজরুলের যাপিত জীবন এবং রচনা মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করলে পরিষ্কার বোঝা যায় আক্ষরিক অর্থে কোনো ধর্মের সীমারেখা দিয়েই নজরুলকে আটকানো যায় না। হিন্দু অথবা মুসলমান নয়। নজরুল ছিলেন সম্পূর্ণভাবে মানুষ, যে কোনো প্রথাবদ্ধ ধর্মেরই অনুসারী নন। নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতা এবং ‘মন্দির ও মসজিদ’ ও ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধ পড়লেই তা বোঝা যায়। হুমায়ুন আজাদ ধর্ম সম্পর্কে যত কথা বলেছেন তার সার সংক্ষেপ হিসেবে নজরুলের একটি কথাই কি যথেষ্ট নয়? ‘—মূর্খরা সব শোন,/ মানুষ এনেছে গ্রন্থ; — গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।’ এই যাঁর স্পষ্ট প্রতীতী তিনি হলেন ‘কুসংস্কার উদ্দীপ্ত লেখকদের মধ্যে প্রধান’! আসলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তকমা ধারক বুদ্ধিজীবীরা নজরুলের সহজিয়া সত্তার গভীর সর্বমানবীয় চেতনাকে কখনোই বুঝতে পারেন নি। হুমায়ুন আজাদের এই আত্মম্ভরিতাপূর্ণ অপব্যাখ্যা তার প্রমাণ। আসলে নজরুল এক বিশ^াস থেকে অন্য বিশ^াসে ঝাঁপিয়ে পড়েন নি, বুকে টেনে নিতে চেয়েছেন সকল মানুষকে। সে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান যাই হোক না কেন? তবে কোনো মানুষই সম্পূর্ণ স্ববিরোধিতা মুক্ত নয়। নজরুলও তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম নন। যেমন নন হুমাযুন আজাদ নিজেও।
হুমাযুন আজাদের নিকট তাঁর জীবনধারণের নিরর্থকতা যে সব বিষয়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয় তার প্রথমটিই কবিতা। ‘নাইটিংগেলের প্রতি’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক কবিতা কী? কবিতা কীভাবে সৃষ্টি হয়, কবিতার যথার্থ সমালোচনা কী, কবিতা ও দর্শনের সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পরিশেষে ইংরেজ কবি কীটস সম্পর্কে আলোকপাত করে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ঙফব ঃড় ধ ঘরমযঃরহমষব’ কবিতাটির অনূদিত রূপ ‘নাইটিংগেলের প্রতি’ সংযুক্ত করেছেন। প্রবন্ধটি কবিতা বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এখানে লেখকের জীবনদর্শনের একটি দিকই প্রকটিত হয়ে উঠেছে তা হলো রাষ্ট্র, সমাজ, সংঘ, রাজনীতিবিদ বা সুধীজন নয় কবিতার প্রতি বা শিল্পের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় অনুরাগ। কবিতা তার সুখের প্রথম প্রকরণ। তাঁর অভিমত : ‘ব্যক্তির দরকার কবিতা, সমাজের দরকার কবিতা, সভ্যতার দরকার কবিতা। মানুষ সৃষ্টিশীল, তার সম্ভাবনা অশেষ, কবিতা মানুষের সৃষ্টিশীলতার এক শ্রেষ্ঠ প্রকাশ।’
‘মহাসমুদ্রে ছোট্টচর : আমাদের গ্রাম’ প্রবন্ধে হুমায়ুন আজাদ মহাজগত বা মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিভিন্ন শাস্ত্রের কল্পকাহিনির অযৌক্তিকতা তুলে ধরে এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ব্যক্ত করেছেন। মহাজগতে পৃথিবীকে মনে করেছেন ‘একটি ছোট্ট সুন্দর চর’। এই পৃধিবীই তার গ্রাম। ‘আমদের এই পৃথিবী, আমাদের এই গ্রাম।’ পৃথিবীতে প্রাণি ও উদ্ভিদ উৎপত্তির বিবর্তনমূলক বৈজ্ঞানিক ধারণাসহ তিনি বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেছেন সৌরজগতের গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রপুঞ্জের আকার, অবস্থান এবং ইতিহাস সম্পর্কে। প্লেটো-অ্যারিস্টটলের জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ প্রায় যাবতীয় ধারণাকে বিভ্রান্ত এবং একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও মানুষ বিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দাসপ্রথা সমর্থিত গণতন্ত্রকে তিনি মনে করেছেন সমাজের সুবিধাভোগী এবং অভিজাতদের গণতন্ত্র। তিনি প্লেটো-অ্যারিস্টটলকে স্বৈরাচারীদের সেবক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্লেটো সম্পর্কে তিনি লিখেছেন :
তিনি বিধাতার মতোই জ্ঞানের নামে দু-হাজার বছরের জন্যে তৈরি ক’রে যান অসংখ্য বিভ্রান্তি। বলা হয়ে থাকে তিনি সব কিছু দেখে সিদ্ধান্ত নিতেন; —তিনি ছিলেন পর্যবেক্ষণ বা উপাত্তবাদী, আসলে তিনি পর্যবেক্ষণ পছন্দ করতেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীদের দাঁতগুলোও গুণে দেখার আগ্রহ বোধ করেন নি, না দেখেই ব’লে গেছেন পুরুষের থেকে নারীর দাঁতের সংখ্যা কম। মহাপুরুষেরা যেমন মহাউপকারী, তেমনি অনেক সময় মহাক্ষতিকরও। জানি না বলার অভ্যাস ছিলো না তাঁর; তিনি মনে করতেন তিনি সব জানেন। আরিস্ততল বিশ্বের গঠন বর্ণনার জন্যে তৈরি করেন একটি কাঠামো, এতে তিনি সঙ্গে নেন কালিপ্পুসকে। তাঁরা দুজনে ইউডোক্সাসের বিশ্বকাঠামো ভিত্তি ক’রে তৈরি করেন এক নতুন বিশ্বকাঠামো, যা পাওয়া যায় আরিস্ততলের আকশম-ল গ্রন্থে। কাঠামোটি তাঁর দর্শনের মতোই চমৎকার, ও শোচনীয়রূপে ভুল : আরো শোচনীয় হচ্ছে যে এ-কাঠামো দু-হাজার বছর ধ’রে বিভ্রান্ত করেছে, এবং প্যালেস্টাইন অঞ্চলের ধর্মবইগুলোর মধ্যে ঢুকে আজো বিভ্রান্ত করছে মানুষকে।
হুমায়ুন আজাদ উল্লেখ করেছেন, আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিসের কাছাকাছি আইওনিয়ার এজিয়ান সাগরের সামোস দ্বীপে প্রথম ভিন্ন চিন্তার উদ্ভব ঘটে। সেখানকার অধিবাসীরা কোনো প্রকার দেবতার অস্তিত্ব অস্বীকার করে ধারণা পোষণ করতো যে মানুষসহ সব কিছুই অণুতে গঠিত এবং পৃথিবী একটি গ্রহ, যা ঘুরছে সূর্যের চারদিকে; আর নক্ষত্রের অবস্থান বহু দূরে। তিনি লিখেছেন, ‘প্লাতোর জন্মের আগেই আইওনিয়ার আরিস্তারকাস বলেছিলেন পৃথিবী নয় সূর্যই গ্রহম-লির কেন্দ্র, গ্রহগুলো ঘুরছে সূর্যকে ঘিরে; কিন্তু তাঁর কথা আপত্তিকর মনে হয় সকলের। তাঁর আঠারো শতক পর একই কথা বলেন কোপারনিকাস; আমরা এখন মানি কোপারনিকাসকেই।’ হুমায়ুন আজাদ মিল্টন থেকে উদ্ধৃত কর দেখিয়েছেন, কোপারনিকাস, কেপলার আর গ্যালেলিওর জন্মের পরেও জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত অন্ধত্ব সাহিত্য থেকে দূর হয় নি। এরপর বিভিন্ন ধর্ম ও পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর ধারণার অন্তঃসারশূন্যতা তুলে ধরে হুমায়ুন আজাদ প্রবন্ধটিতে মহাজগত সৃষ্টি ও বিলয়ের এডউইন হাবেল এবং স্টিফেন হকিং-এর তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ধর্মবর্ণিত ধারণাসমূহ বর্জন করলেও বিলয়পূর্ব সময়ের যে বর্ণনা দিয়েছেন : ‘তখন সূর্যের প্লাবনের ভেতরে হারিয়ে যাবে মারকিউরি ও ভেনাস; হয়তো পৃথিবীও। তখন সৌরজগতের শুরুর এলাকাটি ঢুকে যাবে সূর্যের ভেতরে। আজ থেকে কয়েক বিলিয়ন বছর পর পৃথিবীতে দেখা দেবে শেষ বিশুদ্ধ দিন। সেদিনের পর সূর্য লাল হবে ধীরেধীরে, ফেঁপে কাছাকাছি এসে যাবে পৃথিবীর।’ তা অনেকটা কোনো কোনো ধর্মসম্মত বর্ণনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এ মিল কাকতালিয় বলা যেতে পারে। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ তা উল্লেখ করেন নি। তাঁর বিবেচনায় ধ্বংস অনিবার্য হলেও মহাজগত এবং পৃথিবীকে ঠিকভাবে বুঝতে পারলে মানুষের অজ্ঞতাপ্রসূত অন্ধকার দূর হবে এবং এসব সম্পর্কিত আদিভৌতিক ভয় থেকে মুক্ত হবে মানুষ। তাঁর অভিমত : ‘মানুষের স্বভাব হওয়া উচিৎ অবিশ্বাস, অবিশ্বাস হচ্ছে আলো; আর বিশ্বাস মানুষকে পরিণত করে জড়বস্তুতে। তবে বিশ্বাস শুরু থেকেই রাজনীতি; সমাজ প্রভূরা বিশ্বাসকে ব্যবহার করে তাদের প্রধান কৌশল ও অস্ত্ররূপে।’
প্রবন্ধটিতে হুমায়ুন আজাদ যেসকল তত্ত্ব এবং দর্শনের কথা ব্যক্ত করেছেন তাতে নতুন, মৌলিক বা তাঁর নিজস্ব কিছু নেই। মহাজগত সম্পর্কিত বিভিন্ন শাস্ত্র, ব্যক্তি ও সমাজের প্রচলিত চিন্তা-দর্শনকেই তিনি তাঁর ভাষায় তাঁর মতো করে উপস্থাপন করেছেন। তবে তাঁর সব কথা প্রণিধানযোগ্য নয়। কারণ অবিশ্বাসের উল্টোটাই তো বিশ্বাস। বিশ্বাস-অবিশ্বাস পরস্পর বিপ্রতীপ সম্পর্কে আবদ্ধ। যেমন এই প্রবন্ধেই হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন মহাজগত সম্বন্ধে প্লেটো বা বিভিন্ন শাস্ত্রসম্মত তত্ত্বকে তিনি মানেন না বা বিশ্বাস করেন না। মানেন বা বিশ্বাস করেন কোপারনিকাসকে। তার অর্থ তিনি অবিশ্বাস করেন প্লেটোকে আর বিশ্বাস করেন কোপারনিকাসকে। ‘বিশ্বাস মানুষকে পরিণত করে জড়বস্তুতে’ হুমায়ুন আজাদের একথা অর্থহীন এবং বিভ্রান্তিকর। বরং বলা সংগত যে, কোনো বিশ্বাসই গ্রহণযোগ্য নয় সংশয়, অবিশ্বাস এবং মানবিক যুক্তির কষ্টি পাথরে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত। কারণ মহৎ বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও প্রত্যয়ের উপর ভিত্তি করেই মানুষ এগিয়ে যায়। সমাজ সভ্যতা বিকশিত হয়। প্রত্যয়হীনতা মানুষকে নিক্ষেপ করে বিভ্রান্তি, হটকারিতা আর নৈরাজ্যবাদিতার অন্ধ গহ্বরে। তবে হুমায়ুন আজাদ যথার্থতই বলেছেন, ‘বিশ্বাস শুরু থেকেই রাজনীতি; সমাজ প্রভুরা বিশ্বাসকে ব্যবহার করে তাদের প্রধান কৌশল ও অস্ত্ররূপে।’ কিন্তু তিনি তাঁর কথায় খুববেশি আস্থা রাখেনি বা জোর দেন নি। অন্তত এই প্রবন্ধে এবং গ্রন্থেও। কারণ তিনি ভুল বিশ্বাস ও অন্ধত্বপোষণকারীদের প্রতি যে তীব্র তিরস্কার ব্যক্ত করেছেন; সে সবের মূল কারণ যে রাজনীতি এবং আর্থসামাজিক বাস্তবতা নিজে উপলব্ধি করেও তার উপর জোর দেন নি। আর্থসমাজিক রাজনৈতিক সমাজকাঠামো পরিবর্তন না করে যে এসব দূর করা সম্ভব না, তা উল্লেখ করেন নি। এটি কি কেবল তাঁর যথার্থ অনবধানতার ফল, না কি শ্রেণিচরিত্রের অমোঘ বাস্তবতার অনিবার্য প্রতিফলন।
পঞ্চম পরিচ্ছেদে হুমায়ুন আজাদ ধর্ম সম্পর্কে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন। এ সম্পর্কিত তাঁর বক্তব্য মনোযোগ সহকারে পাঠ করে নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় তিনি কোনো নতুন কথা বলেন নি। তিনি যা বলেছেন তার পূর্বেই বহু পাশ্চাত্য দার্শনিক এবং অনেক বাঙালি ভাবুক সেসব কথা বলেছেন। হুমায়ুন আজাদ তাঁর আলোচনা প্রসঙ্গে নিজেই লিখেছেন :
পুরাণ ও ধর্মের এ-সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে বোঝা যায়, কোনো ধর্মই কোনো ঈশ্বর পাঠান নি; মানুষই ভুল কল্পনার পর ভুল কল্পনা ক’রে সৃষ্টি করেছে এগুলো। ধর্মের বইগুলো ঋণী মানুষের আদিম পুরাণগুলোর কাছে। মানুষ চিরকাল ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে নানা প্রপঞ্চ, কল্পনা করেছে বহু কিছু; মানুষ সত্য বলতে চেয়েছে, এবং মিথ্যা বলেছে প্রচুর, এবং মানুষ মিথ্যায় যতো বিশ্বাস করেছে, সত্যে ততো বিশ্বাস করে নি; এখনো করে না। মিথ্যার বিহ্বলকর ও সুখকর শক্তি রয়েছে, যা নেই সত্যের। ধর্মের বইগুলো সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, যদিও বারবার নিজেদের সত্য ব’লে দাবি ক’রে, এবং সত্যনিষ্ঠদের ভয় দেখায়। এগুলো প্রতিষ্ঠিত আদিম মানুষের কল্পনা ও পরবর্তীদের সুপরিকল্পিত মিথ্যার ওপর। মানুষ কতোটা মিথ্যা বলতে ও বিশ্বাস করতে পারে, তার অসামান্য উদাহরণ জেসাস বা খ্রিস্ট। জেসাস মানুষের শ্রেষ্ঠ কল্পচরিত্র; গত দু-শো বছরের বাইবেলবিজ্ঞানীরা, যাঁদের অনেকেই ধার্মিক ও পুরোহিত, প্রমাণ করেছেন যে জেসাস নামে কেউ ছিলো না। কিন্তু জেসাস সৃষ্টি হলো কীভাবে, এবং হয়ে উঠলো একটি প্রধান ধর্মের প্রবর্তক? জেসাসকে সৃষ্টি করা, তাকে ঘিরে পুরাণ, ও একটি নতুর ধর্ম বানানোর সমস্ত কৃতিত্ব খ্রিস্টান সুসমাচারপ্রণেতাদের। ক্রাইস্ট এক কিংবদন্তি বা পুরাণ। জেসাসসৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে ব্রুনো বাউআর, জে এম রবার্টসন, ভ্যান ডেন বার্গ, ভ্যান এইসিংগা, আলবার্ট কালথোফ, গাই ফাউ, প্রোসপার আলফারিক, ডব্লিউ বি স্মিথ, জি এ ওয়েল্স্ প্রমুখ তৈরি করেছেন একটি তত্ত্ব, যার নাম খ্রিস্টপুরাণ।
এরপর তিনি প্রবন্ধটিতে বিভিন্ন ধর্মের নানা রকম বিষয়, আচার, অনুষ্ঠান, পরিভাষাসহ বহু কিছুর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন এগুলো অসত্য, অবাস্তব ও অনিষ্টকর। যে কথাগুলো তাঁর উল্লিখিত উদ্ধৃতিতেই বিদ্যমান। হুমায়ুন আজাদের তাবৎ বক্তব্যের মর্মার্থ মুখ্যত তাঁর নিজের উদ্ধৃত রার্ট্রান্ড রাসেলের ‘সব ধর্মই ক্ষতিকর ও অসত্য’— এই উক্তির মধ্যেই প্রতিফলিত।
কৌতূহলের বিষয় হলো এই বিষয়ে তিনি বার্ট্রান্ড রাসেলসহ পাশ্চাত্য দার্শনিক বা সাহিত্যিকদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করলেও বাঙালি বা ভারতীয় কারো উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন নি। অথচ এ বিষয়ে লালন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, রোকেয়া, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, আবুল ফজল, আরজ আলী মাতুব্বর, প্রবীর ঘোষ প্রমুখ অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
লালন বলেছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/ লালন বলে জাতির কিরূপ দেখলাম না দুই নয়নে’ অথবা ‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান/নারী লোকের কি হয় বিধান/ব্রাহ্মণ চিনে পৈতায় প্রমাণ/ ব্রাহ্মণী চেনা যায় কিসে/ সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে। অথবা ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজী/ সব দেখি তা না না না/ একি আজব কারখানা?’ এসব কথার মধ্য দিয়ে কি লালন প্রথাগত ধর্মের অন্তঃসারশূন্যতা ব্যক্ত করেন নি? বিদ্যাসাগর বলেছেন, ‘বেদান্ত ইজ আ ফলস ফিলেঅসফি।’ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ন্যাচার পাওয়ার ইজ গড।’ নজরুল লিখেছেন, ‘মূর্খরা সব শোনো, মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।’ রোকেয়া ‘নবনূর’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে, কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর ‘নাস্তিকের ধর্ম জিজ্ঞাসা’ প্রবন্ধে, মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর ‘সংস্কৃতি-কথা’ গ্রন্থে, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ তাঁর ‘অনন্ত-তৃষা’য়, আবুল ফজল তাঁর ‘মানবতন্ত্র’ গ্রন্থে, আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর ‘সত্যের সন্ধান’ গ্রন্থে এবং প্রবীর ঘোষ তাঁর ‘অলৌকিক নয় লৌকিক’ গ্রন্থমালায় অনেক যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এসবের তাৎপর্য পাশ্চাত্য দার্শনিকদের বক্তব্যের চেয়ে ন্যূন নয়।
প্রবন্ধটিতে হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন : ‘ধার্মিক মানুষকে প্রশংসা করার একটা রীতি প্রচলিত রয়েছে; বলা হয় যে প্রকৃত ধার্মিক মানুষ খুব ভালো মানুষ; কিন্তু সত্য তার উল্টো,—প্রকৃত ধার্মিক মানুষ প্রকৃত খারাপ মানুষ।’ অন্যত্র ভবিষ্যৎবাণী করেছেন : ‘আগামী দু-এক শতকের মধ্যেই মানুষ মুক্ত হবে ধর্মের কবল থেকে। কোনো ধর্মই মানুষের শুরু থেকে ছিলো না ও শেষ পর্যন্ত থাকবে না।’ এসব বিষয়ে এক মত পোষণ করা দুরূহ। কারণ প্রকৃত ধার্মিক মানুষই প্রকৃত খারাপ মানুষ এটা ঠিক নয়। তাছাড়া পৃথিবীব্যাপী প্রথাগত ধর্মগুলোর যে প্রচার প্রসার ঘটছে তাতে শেষ পর্যন্ত থাকবে কিনা বলা কঠিন হলেও দু-একশো বছরের মধ্যে যে এগুলোর বিলয় ঘটবে না তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এ প্রসঙ্গে আবদুল হকের উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি ‘প্রগতি ও ধর্ম’ প্রবন্ধে লিখেছেন :
কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, ধর্মের অনেক উত্থানপতন অতীতে হয়ে গেছে। কোনো ধর্ম যখন অকার্যকর হয়ে গেছে, অথবা সকল মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অসমর্থ হয়েছে, তখনই নতুন কোনো ধর্মের উদ্ভব হয়েছে।
আজও প্রায় ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই এমন কিছু লোক আছে যারা তাদের ধর্মকে ভিতরে বাইরে পুরোপুরি মেনে চলে। তাদের ধর্মাচরণে কোনো বিচ্যুতি নেই, কোনো স্খলন নেই, তাদের ধর্মবিশ্বাসে কোনো ভাঙন আসেনি, ভাঙন আসে না।
এই শ্রেণীর মানুষ আগামী যুগে একেবারেই থাকবে না এরূপ মনে করার বোধ হয় কোনো কারণ নেই। মানুষের প্রকৃতিতে পার্থক্য ও বৈচিত্র্য যখন সত্য, পৃথিবীতে সব রকম লোকের জন্মই যখন সম্ভব, তখন মনে হয় ধার্মিক লোকেরও অভাব হয়তো কোনো দিন হবে না। প্রকৃতি, জীবনের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার বৈশিষ্ট্যের জন্য এক-একজন এক-একদিকে আকৃষ্ট হয়, (যেমন শিল্পকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ধর্মপ্রাণতা, নিরীশ্বরবাদিতা ইত্যাদি বিভিন্ন দিকে), এবং সেদিকেই সে শান্তি, তৃপ্তি ও জীবনের সার্থকতা খোঁজে। কোনো অলৌকিক কারণে নয়, মানব-প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যের জন্যই ধর্ম মনে হয় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা স্বল্প।
আরেকটি বিষয় হলো প্রথাবিরোধী হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন আজাদ তাঁর প্রবন্ধটিতে ‘ধর্ম’ শব্দটিকে সম্পূর্ণ প্রথাগত সংকীর্ণ অর্থেই ব্যবহার করেছেন। সর্বজনীন অর্থবোধক ‘স্বরূপ’, ‘স্বভাব’ বা ‘প্রকৃতি’ (ন্যাচার) অর্থে ব্যবহার করেন নি। সেই অর্থে অক্সিজেনের ধর্ম যেমন নিজে না জ্বলে অন্যকে জ্বলতে সাহায্য করা, তেমনি মানুষের ধর্ম তো মনুষ্যত্ব বা মানবতার ধর্ম। এটি একমাত্র ধর্ম যা কখনো কারো মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে না। সকলকে অভিন্ন মমতায় গ্রথিত করে। যে ধর্মের সাধনা বাংলার আউল-বাউল-সাধু-সন্তরা করেছেন। লালন-হাসন করেছেন। যে ধর্ম এমনকি আস্তিক-নাস্তিকেরও ধার ধারে না। যার মর্মবাণী ‘নানা বরণ গাভীরে ভাই, একই বরণ দুধ। জগত ভ্রমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।’ অথবা ‘শুন হ মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
হুমায়ুন আজাদের বক্তব্য স্ববিরোধিতাশূন্য নয়। তিনি যিশু-বাইবেলকে অলীক বলে বাতিল করে দিয়ে নিজেই আবার বাইবেল বিশেষজ্ঞ যাজকদেরকে বলেছেন ‘বাইবেলবিজ্ঞানী’। শুধু বাইবেল নয়, ধর্ম এবং বিজ্ঞান বিষয় দু’টো পরস্পর বিপরীতমুখী সাংঘর্ষিক। ধর্মের শুরু বিশ্বাস দিয়ে আর বিজ্ঞানের শুরু সংশয় বা অবিশ্বাস দিয়ে। হুমায়ুন আজাদ অন্যত্র লিখেছেন, ‘ধর্ম ও বিজ্ঞান সম্পূর্ণরূপে পরস্পর বিরোধী;’ তাই বাইবেলবিজ্ঞানী নয়, বলা যায় বাইবেলবিশারদ বা অন্য কিছু।
হুমায়ুন আজাদের বক্তব্যে মৌলিকত্ব না থাকলেও তাঁর ভাষার একটা শক্তি লক্ষ করা যায়, যা সহজেই মানুষকে উদ্দীপ্ত বা ক্ষিপ্ত করে তুলতে সক্ষম। তাঁর লেখায় বুদ্ধিজীবীসুলভ মানবতাবাদী দায়িত্ববোধের অভাব দুর্লক্ষ নয়। যা তাঁর লেখার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। তবে হুমায়ুন আজাদ যে পা-িত্য এবং অকপট সাহসিকতা দেখিয়েছেন তার সঙ্গে ভিন্নমতাবলম্বীর প্রতি সহনশীল সাবলিল মমতা এবং দায়িত্ববোধের পরিমিতি যুক্ত হলে প্রবন্ধটি অন্য মাত্রা পেতে পারতো। প্রবন্ধটিতে হুমায়ুন আজাদের বস্তুবাদী নাস্তিক্য জীবনদর্শনের পরিচয় অত্যন্ত স্পষ্ট এবং অকপট।
‘আরণ্যিক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপন’ অধ্যায়টির নাম হুমায়ুন আজাদ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা থেকে গ্রহণ করেছেন। এখানে তিনি মানব সমাজ ও সভ্যতায় সৃষ্টিকর্তা, বিধাতা বা ঈশ্বর বিষয়ক চেতনা ও তার ক্রম বিকাশকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন মানুষের সমাজে সৃষ্টিকর্তা বিষয়ক ধারণা হঠাৎ করে আবির্ভূত হয় নি। অতিদীর্ঘ সময়ের পবির্তন বিবর্তনের মধ্য দিয়েই মনুষ্য চিন্তায় বা কল্পনায় স্থান করে নিয়েছে এই ধারণা। এই চিন্তার তিনটি বড় ধাপের কথা হুমায়ুন আজাদ উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো সর্বেশ্বরবাদ, বহু-ঈশ্বরবাদ এবং সর্বাধুনিক একেশ্বরবাদ। সর্বেশ্বরবাদে মনে করা হয় ঈশ্বর বা আত্মা সর্বত্র বিরাজমান, বহু-ঈশ্বরবাদে ভাবা হয় ঈশ্বর একাধিক। আর একেশ্বরবাদের কথা হলো এই বিশ্বভ্রমা-ের সৃষ্টিকর্তা একজন। সমাজ বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা ও প্রযুক্তির রূপান্তরের পথ ধরেই এগুলোর আবির্ভাব ঘটেছে। একেশ্বরবাদ আধুনিক কালের সৃষ্টি। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব আবিষ্কারের ফলে মানুষের ঈশ্বরবিষয়ক ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে। ধ্বসে পড়ে তার একেশ্বরবাদী ধারণাও। কোনো কোনো মানুষের মনে স্থান করে নেয় নিরীশ্বরবাদী নাস্তিক্যের ধারণা। ব্যক্তি মানুষই নয় শুধু এমনকি নিরীশ্বরবাদী ধর্ম পর্যন্ত গড়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে বৌদ্ধধর্মের নাম উল্লেখ করা যায়। এছাড়া আধুনিক কালে এটাও প্রমাণিত হয়েছে শুধু একেশ্বরবাদী ধারণাই নয়, নিরীশ্বরবাদী নাস্তিক্যের ধারণাও বহুপূর্ব থেকেই কোনো কোনো মানব সমাজে প্রচলিত ছিল। এ প্রসঙ্গে চার্বাকপন্থিদের নাম উল্লেখ করা যায়।
হুমায়ুন আজাদ অভিমত প্রকশ করেছেন তিন হাজার বছর আগে অগ্নি-উপাসক জুরথুস্ত্রীয়রাই প্রথম কল্পনা করেছিলো একদেবতা। পৃথিবীর বিদ্যমান ধর্মগুলো (নাস্তিক্যবাদী দু’একটি ধর্ম ছাড়া) বর্ণিত বিধাতা বা সৃষ্টিকর্তা স্বাতন্ত্যম-িত। সকল মানুষ এক বিধাতার আরাধনা করে না। হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ‘কিন্তু যে-ধর্মগুলো বিশ্বাস করে এক দেবতা বা একবিধাতায়, তারা কি নির্দিষ্ট অভিন্ন একটি বিধাতায়ই বিশ্বাস করে? না; তাদের বিশ্বাস অভিন্ন নয়, বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাস করে বিভিন্ন বিধাতায়; ইহুদি বা খ্রিস্টান বা মুসলমানের বা হিন্দুর বা অন্য কোনো ধর্মের বিধাতা অভিন্ন সত্তা নন; তাদের প্রত্যেকের বিধাতার সত্তা ও গুণাবলি বিভিন্ন। ইহুদি যে-বিধাতার আরাধনা করে সিনেগগে, মুসলমান তাঁর উপাসনা করে না; খ্রিস্টান যাঁর উপাসনা করে, হিন্দু তাঁর পুজো করে না। তাদের প্রত্যেকের বিধাতা ভিন্ন।’ লেখক বিভিন্ন দার্শনিকের বিশেষভাবে বার্ট্রান্ড রাসেল, স্টিফেন হকিং এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ঈশ্বরবিষয়ক ধারণার বর্ণনা করেছেন। তিনি সন্তআনসেল্ম (১০৩৩-১১০৯), টমাস আকুইনাস (১২২৫-১২৭৪)-এর ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টাকে তুলে ধরা প্রসঙ্গে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, ‘ বিধাতাকে প্রমাণ করতে যাওয়া প-শ্রম।… বিধাতা কি প্রমাণের বস্তু।’ একই সঙ্গে তিনি ডেভিড হিউম (১৭১১-১৭৭৬) এবং নিটশে (১৮৪৪-১৯০০)’র নাস্তিক্যবাদী ধারণারও উল্লেখ করেছেন। মোট কথা প্রবন্ধটিতে তিনি মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বর বিষয়ক ধারণার ঐন্দ্রজালিক যাদু স্তর থেকে নাস্তিক্যবাদী স্তর পর্যন্ত বিভিন্ন চিন্তার পরিচয় তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছেন।
আমরা জানি দর্শনের প্রধান দুইটি ধারা; একটি ভাববাদী ধারা, অন্যটি বস্তুবাদী ধারা। এই দুইটি ধারার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে দেখা যায় ঈশ্বরবিষয়ক দার্শনিকচিন্তায় হুমায়ুন আজাদ বস্তুবাদী দার্শনিক ধারার প্রতিই তাঁর প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও তাঁর এই প্রত্যয় ততটা অটুট নয়। কারণ তিনি একস্থলে উল্লেখ করেছেন, ‘পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিমান স্বৈরাচারী পিতা বিধাতা। বিধাতা কেনো হবেন প্রচ-, হিংস্্র, ক্রুদ্ধ, প্রতিহিংসাপরায়ণ; কেনো তিনি উত্তেজিত থাকবেন তাঁর সৃষ্টিকে শাস্তি দেবার জন্য?’ এ উক্তি থেকে বোঝা যায় ঈশ্বরের অস্তিত্বে তিনি প্রত্যয়হীন নন। তাঁর আপত্তি ঈশ্বরের প্রকৃতিতে। এছাড়াও প্রথাগত ধর্মে বর্ণিত ঈশ্বরের কঠোর রূপটির কথাই তিনি ব্যক্ত করেছেন; সেখানে ঈশ্বরের যে দয়াদ্র, কোমল, মহৎরূপটি আছে তার তেমন কোনো পরিচয় হুমায়ুন আজাদ দেন নি। হুমায়ুন আজাদের মূল্যায়ন নিরাসক্ত যুক্তিবাদী দার্শনিকের নির্বিকার মূল্যায়ন নয়। তা কতগুলো প্রচলিত কথিত ধারণারই প্রতিধ্বনি মাত্র। তবে সে ধ্বনি সুরে ও গ্রামে একান্তই তাঁর নিজস্ব।
গ্রন্থটির শেষ অধ্যায় ‘আমার অবিশ্বাস’। বলা যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যে অধ্যায়ের নামে গ্রন্থকার গ্রন্থটির নামকরণ করেছেন। এই অধ্যায়েই ব্যক্ত করা হয়েছে গ্রন্থের মূলবক্তব্য। অধ্যায়টি পাঠ করে দেখা যায় এখানে লেখক বিশ্বাসের অন্ধত্ব, অজ্ঞানতা এবং অবিশ্বাসের আলোকময়তা ও জ্ঞানবীক্ষণকে তুলে ধরেছেন। সমাজে প্রচলিত সকল পুরাণ-সংহিতা, শাস্ত্র-ধর্ম এবং লৌকিক বিশ্বাসের অন্তঃসারশূন্যতা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি তাঁর গড়ে ওঠার পারিপার্শ্বিক আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক পটভূমি উল্লেখ করে দেখিয়েছেন কীভাবে তাঁর চেতনা ক্রমান্বয়ে ধাবিত হয়েছে বিশ্বাসের অন্ধত্ব অতিক্রম করে অবিশ্বাসের আলোকময়তার দিকে। হুমায়ুন আজাদ তাঁর অবিশ্বাস সম্পর্কে লিখেছেন :
দিন দিন আমার ভেতরে অবিশ্বাস জমে উঠতে থাকে; মনে হ’তে থাকে যা কিছু চলছে, যা কিছুকে খুবই মহৎ মনে করা হয়, তা অতো মহৎ নয়; যা কিছুকে সত্য মনে করা হয়, তার সবই সত্য নয়; যা কিছুকে মান্য করতে বলা হয়, তার সবই মাননীয় নয়। —কিন্তু আসলেই কিসে অবিশ্বাস আমার? দেখতে পাই আমার অবিশ্বাস শক্তিতে;—যা কিছু শক্তিমান, দর্পশালী, যা কিছু পীড়ন করে মানুষকে, তাতেই ক্রমশ আমার অবিশ্বাস গভীর হ’তে থাকে। বিনা প্রশ্নে কিছু মেনে নিতে আমার ইচ্ছে করে না; আর যা-কিছু সম্পর্কে কারো কোনো সন্দেহ নেই, যা-কিছুর স্তুতি ক’রে অন্যরা সুখ পায়, সেগুলোতেই আমার বেশি সন্দেহ হ’তে থাকে। এখানে এখন সবাই শক্তির পূজারী; তাঁরা বিধাতায় বিশ্বাস নাও করতে পারেন, কেননা কল্পিত বিধাতা সরাসরি নিজের শক্তি প্রয়োগ করেন না; কিন্তু তাঁরা বিশ্বাস করেন নেতায়, নায়কে, একনায়কে, পিতায়, রাষ্ট্রপিতায়, প্রথায়, ও আরো অজ¯্র বস্তুতে; কেননা এগুলো শক্তিমান। আমি শক্তিতে বিশ্বাস করি না, আমি অবিশ্বাস করি শক্তিতে, ক্ষমতায়, দর্পে। আমার সমস্ত অবিশ্বাস জন্মেছে শক্তিতে অবিশ্বাস থেকে। শক্তি অমানবিক, শক্তি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে মূল্য দেয় না; শক্তি সব ধরনের যুক্তি ও মানবিকতাকে পর্যুদস্ত করতে চায়। নিটশে বিশ্বাস করতেন, এবং নিটশেকে গালি দিয়েও সবাই হিটলারের মতোই বিশ্বাস করে, যে ‘জীবন শক্তিলাভের বাসনা ছাড়া আর কিছু নয়।’ আমি মেনে নিই নিটশেকে যে সবাই প্রচ- শক্তি চায়, যারা যতো আদিম তারা ততো বেশি শক্তি চায়;—শক্তি : সীমাহীন, অযৌক্তিক, প্রচ-, অমানবিক; কিন্তু আমি ওই শক্তির প্রতিপক্ষ, আমি তার মুখোমুখি দাঁড়াতে চাই। কামিনী রায় বা জসীমউদ্দীন আমার শ্রদ্ধেয় পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রী আর আলেকজান্ডারের থেকে। শক্তি মানেরা তুচ্ছ, তারা ইতিহাসের পরিহাস; তাদের শ্রদ্ধা করার কিছু নেই। আমার ছেলেবেলায় চারপাশে খুবই প্রশংসা শুনতাম হিটলার আর নেপোলিয়নের; আমাদের বইতে তাদের সম্পর্কে লেখাও ছিলো; কিন্তু আমি বুঝে উঠতে পারতাম কেনো তাদের মহাপুরুষ ভাববো। তাদের আমি কখনো মহাপুরুষ ভাবি নি। শক্তি সব সময়ই দূষিত ও ক্ষতিকর, শক্তি রোগের মতো। আমি ঘৃণা করি শক্তি ও শক্তিমানদের; তারা রোগ; তারা দূষিত করে মানুষকে, নষ্ট করে মানুষের মস্তিষ্ক আর হৃদয়।
জীবনের এই বিস্তৃত প্রাঙ্গনে তার যাপনই বিবেচ্য হুমায়ুন আজাদের কোনো আদর্শের বাস্তবায়ন নয়। আদর্শ ক্ষতিকর। তাই প্রচলিত প্রথা, বিধিবিধান বা আদর্শমুক্ত জীবন যাপনই তাঁর লক্ষ্য। তাঁর অভিমত :
জীবন হচ্ছে বিস্তৃত, দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়ানো প্রান্তর, তাতে অপরিমিত আলো বাতাস জল রোদ বৃষ্টি ছায়া মাটি মাধুর্য; আদর্শ হচ্ছে ছিদ্রহীন দেয়ালের পরাক্রান্ত বেষ্টনি। অদর্শের ভেতরে যারা আছে, তারা অসুস্থ; হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ, শিখ, বাহাই, কাদিয়ানি, ফ্যাশিবাদী, মৌলবাদী, কঠোর সাম্যবাদী অসুস্থ। ক্যালিগুলার একটি আদর্শ ছিলো, যেমন ছিলো মুসোলিনি, হিটলার, স্তালিন, ও আরো অনেকের, যেমন আছে একনায়কদের; আমরা জানি সেগুলো মানুষের জন্যে কতো মর্মান্তিক। জীবনকে যে কয়েকটি সরল সূত্রে পরিণত করেছে, জীবনে যে শুধু দেখতে চায় ওই সূত্রগুলোর কাজ, সে সুস্থ নয়; আর যারা ওই সূত্রানুসারে বেঁচে থাকে, তারাও সুস্থ নয়।
তাঁর বিবেচনায় প্রথা, বিধিবিধান ও আদর্শ সমার্থক। ‘আদর্শগুলো বিধিবিধান বা প্রথা ছাড়া আর কিছু নয়।’ এগুলোর জন্যই মানুষ সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও পরিবারের বলি হয়ে গেছে। তার সব কিছু ব্যর্থ হয়ে গেছে।
হমায়ুন আজাদ তারপর মানুষের জৈবিক অনুষঙ্গ ‘কাম’ প্রসঙ্গের অবতারণা করে লিখেছেন : ‘মানুষ যে-সব মহৎ ব্যাপার গ’ড়ে তুলেছে বিবাহ, পরিবার, সন্তান নামে, সেগুলো গ’ড়ে উঠতো না, যদিও (যদি?) না থাকতো তার সুন্দর ভয়াবহ অশ্লীল কাম; বিয়ে, পরিবার, সন্তান তার কামের সৃষ্টি। তবে কাম ও সন্তান জৈবিক, বিয়ে ও পরিবার জৈবিক নয়, সামাজিক; কাম থেকে জন্মে তার সন্তান, সমাজ থেকে জন্মে বিয়ে ও পরিবার। কাম ও সন্তান অকৃত্রিম, বিয়ে ও পরিবার কৃত্রিম। কামের রূপ সর্বত্র অভিন্ন, কিন্তু বিয়ে ও পরিবারের রূপ বিভিন্ন। বিবর্তনের ফলে যেদিন উদ্ভব হয়েছিলো কামের, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে মানুষের যন্ত্রণা; ধর্মীয় বিশ্বাসে ঘটে একই ব্যাপার — কামই হচ্ছে নরনারীর জন্যে নিষিদ্ধ গন্ধম। বিজ্ঞানীদের ধারণা দু-বিলিঅন বছর আগে আবিষ্কৃত হয়েছিলো কাম। তার আগে বিভিন্ন জৈববস্তু এলোমেলো পরিব্যক্তি অর্থাৎ জিনগুলোর প্রকৃতিবদলের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করতো অবিকল নতুন জৈববস্তু; কিন্তু কাম বিকাশের পর সব কিছু বদলে যায়। আধুনিক বিশ্বের সব কিছু—সন্তান, কবিতা, নভোযান, কম্পিউটার—জন্মেছে কাম থেকে; সব কিছুই শক্তিমান সুন্দর অশ্লীল কামের আত্মজ।’ এরপর তিনি দীর্ঘ পরিসর জুড়ে বিভিন্ন গল্প, পুরাণ, ধর্মকাহিনি ও ইতিহাসে নারী-পুরুষের যৌন প্রসঙ্গের বিশেষভাবে পুরুষের কামবৃত্তি চরিতার্থতার লম্বা বিবরণ দিয়েছেন বাদ দেন নি শিক্ষার্থীর সাথে আলাপচারিতাকেও। প্রবন্ধের বিষয়বস্তুগত দার্শনিক অভিব্যক্তির জন্যে যা অনিবার্য ছিলো না। এ বিষয়ে পৃথক প্রবন্ধ রচনা করাই যথাযথ হতো।
প্রবন্ধটিতে লেখকের সমাজমনস্কতার যে পরিচয় পাওয়া য়ায় তাতে মার্কসবাদের প্রতি তাঁর মৃদু সহানুভূতির আভাস মেলে। তিনি লিখেছেন, ‘মার্ক্স যে বলেছিলেন দার্শনিকেরা এতো দিন শুধু নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন বিশ্বকে, এখন দরকার তাকে বদলে দেয়া; আমরা কি ফিরে যাবো আবার মার্ক্সের আগে, শুধু ভাষ্যের পর ভাষ্য লিখবো পৃথিবীর? শুধু স্থগিত রাখবো তাকে বদলে দেয়া? গরিব আরো গরিব হ’তে থাকবে ধনী আরো ধনী; আর গরিবেরা শুধু ব্যবহৃত হবে ধনীদের ক্ষমতা দখলের শ্লোগানে?’ মৃত্যু সম্পর্কে তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন সেখানেও তাঁর শ্রেণিসচেতন সমাজমনস্কতা স্পষ্ট। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। তার কোনো যৌক্তিক পরিণতি বা বিশদ বিশ্লেষণ তিনি করেন নি। তবে তাঁর মৃত্যুচেতনায় নির্ভীক নিরাসক্ত দৃষ্টির পরিচয় থাকলেও তা সম্পূর্ণ ভাবাবেগমুক্ত নয়। কারণ যুক্তিনিষ্ঠ বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে মৃত্যুতেই জীবনের সমাপ্তি। মৃত্যুর পর আর নামানো-উঠানো, সাম্য-বৈষ্যম্য অবান্তর। মৃত্যু সকলকে সমান করে এটি নিতান্তই ভাববাদী প্রথাগত ধারণা মাত্র। অথচ তিনি লিখেছেন, ‘মৃত্যু সাম্যবাদী, সবাইকে নামিয়ে আনে একই সমতলে।’ হুমায়ুন আজাদ মনে করেন কিছুই অপবিত্র নয়, যেমন কিছুই পবিত্র নয়; সব কিছুই সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর এই তাৎপর্যহীন জীবন। তিনি অমরতার আকাক্সক্ষী নন। তাৎপর্যহীন জীবনকে ইন্দ্রিয়গুলো দিয়েই তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলার অভিলাষী। প্রবন্ধটিতে লেখকের চিন্তার স্ববিরোধিতার পরিচয় আছে। তিনি একস্থানে লিখেছেন, ‘কিন্তু শান্তি আর সুখ গর্দভদেরই উপভোগ্য, মানুষের নয়।’ অনত্র ‘বেঁচে আমি সুখ পাই; আমার ইন্দ্রিয়গুলো দিয়ে সুখ ঢোকে, আমাকে ভরে তোলে।’ প্রথম পরিচ্ছেদ জুড়েই এরকম সুখ উপভোগের কথা অসংখ্যবার আছে। এছাড়াও মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ [মোঃ বরকতউল্লাহ্] সম্পর্কে লেখা হয়েছে ‘তাঁর লেখায় কোনো প্রশ্ন নেই, নানা ভক্তি আছে, কতগুলো পুরোনো কথা আছে।’ একথা যে সম্পূর্ণ ভুল তা ‘অনন্ত তৃষা’ প্রবন্ধ পাঠ করলেই বোঝা যায়। প্রবন্ধটিতে তিনি মানুষের স্বর্গ-নরক কল্পনার যে বাস্তবসম্মত কারণ বিশ্লেষণ করেছেন তা যেমন যৌক্তিক তেমনি এখন পর্যন্ত আধুনিক। তাঁর চিন্তায় : ‘যুগে যুগে যেমন মানুষের সভ্যতা ও রুচির উন্নতি হইয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের স্বর্গেরও গঠন ও সৌন্দর্যের পরিবর্তন হইয়াছে। পারিবারিক জীবনে যেমন অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আসবাব পত্রের ও গৃহের শ্রী উত্তরোত্তর বর্ধিত হইতে থাকে, জাতি বিশেষের জীবনের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পরলোকের শ্রীও সেইরূপ ক্রমেই অধিকতর রমণীয় মূর্তিতে উদ্ভাসিত হইয়া উঠে।’ মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর লেখা হুমায়ুন আজাদের বাল্যপাঠ্যের অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধ সম্পর্কে উল্লিখিত মন্তব্য করা হয়ে থাকলেও (যদি হয়ে থাকে) এখানে অন্তত ‘অনন্ত তৃষা’ প্রবন্ধের আলোচনা থাকা বাঞ্ছনীয় ছিলো। তা ছাড়া হুমায়ুন আজাদের আলোচ্য প্রসঙ্গে ‘অনন্ত তৃষা’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকও ছিলো। কিছু স্ববিরোধিতা থাকলেও ‘আমার অবিশ্বাস’ অধ্যায়ে হুমায়ুন আজাদের সৌন্দর্য সচেতন ইহলৌকিকতাবাদী জীবনদর্শনের পরিচয় সুস্পষ্ট।


আমার অবিশ্বাস গ্রন্থটিতে হুমায়ুন আজাদের দার্শনিক প্রত্যয়ের যে পরিচয় পাওয়া যায় সেটি নিঃসন্দেহে বস্তুবাদী দর্শন। যুক্তিবাদ এবং ইহলৌকিকতা যার মুখ্য অবলম্বন। জীবনের রূপ-রস-গন্ধ আস্বাদনে আকুল হুমায়ুন আজাদ অমরত্বের আকাক্সক্ষী নন। কোনো মানুষই সম্পূর্ণ স্ববিরোধিতা মুক্ত নন। হুমায়ুন আজাদও তার ব্যতিক্রম নয়। এই গ্রন্থেও আমরা তার জীবন দর্শন বিশ্লেষণে তা দেখিয়েছি। হুমায়ুন আজাদ যে দার্শনিক প্রত্যয় বইটিতে ব্যক্ত করেছেন, তা নতুন বা অভিনব নয়; তাঁর বহুপূর্ব থেকেই দেশি বিদেশি অনেক দার্শনিক-ভাবুক এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তবে হুমায়ুন আজাদের ব্যক্ত করার ভাষা এবং কৌশল সম্পূর্ণ আলাদা। একটি কথা এ প্রসঙ্গে বিবেচনা যেগ্য তা হলো মানুষের সমাজ সংস্কৃতি সভ্যতা এবং প্রযুক্তি এতোদূর অগ্রসর হয়েছে যে এখন আর ধর্ম, বিধাতা, ধর্মীয় বিধিবিধান, আচার-সংস্কার এসব নিয়ে চিন্তায় সময় ব্যয় করা সমীচীন কিনা? বিজ্ঞান বহুপূর্বেই এসব বিষয়ের সমাধান দিয়েছে। মানা না মানা সম্পূর্ণ ব্যক্তির এক্তিয়ার। এখন সময় এসেছে মানবসভ্যতার নতুন নতুন সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার। আর সে চিন্তা হতে পারে মানুষের পরিবেশ-সমস্যা, উদ্বাস্তু-সমস্যা, ন্যায়বোধ ও ন্যায়বিচার, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষাসহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সকল প্রকার বৈষম্য দুর করার সমস্যা। অবশ্যই সকল মানুষের জন্যে। আধুনিক বিবেকবান মানুষ হিসেবে বিবেচনায় নেয়া দরকার সাম্য ছাড়া ন্যায় সম্ভব কিনা? পরিশেষে আর একটি বিষয়। গ্রন্থটিতে হুমায়ুন আজাদের সুগভীর পা-িত্যের পাশাপাশি এক ধরনের চমক সৃষ্টির প্রয়াসও লক্ষ করা যায়; ঠিক বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার সাথে যা সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি যে সমস্ত অবিশ্বাসের কথা বলেছেন তার প্রত্যেকটিরই বিপরীতটি তিনি বিশ্বাস করেন। অবিশ্বাস শব্দটি প্রয়োগ করে লাইনের পর লাইন তিনি যে সমস্ত বাক্য রচনা করেছেন তার সবই বিশ্বাস শব্দ দিয়ে লিখলেও অর্থেও তেমন কোনো হের ফের হতো না। তাই এই গ্রন্থটির নাম ‘আমার বিশ্বাস’ হলেও কোনো ক্ষতি ছিলো না। আর কোনো প্রকার প্রত্যয়, আস্থা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, নীতি-নৈতিকতা, আদর্শের ধার না ধারার পরিণাম তো নৈরাজ্যবাদ। আর তাতে শক্তিধর, ক্ষমতাবান, অত্যাচারী সুযোগসন্ধানীদেরই সুবিধা; হুমায়ুন আজাদ যাদের ঘৃণা করেছেন।

**************************

মীর ও গালিবের কবিতা
তরুণ মুখোপাধ্যায়

উর্দুভাষার দুই সেরা কবি মীর তকী মীর (১৭২২/২৩-১৮১০) এবং গালিব/মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ খান (১৭৯৭-১৮৬৯) মুখ্যত গজল ও শায়েরী রচনার জন্য এরা বিখ্যাত, বিশশতকে আমরা পেয়েছি আরেক উর্দুভাষার কবি ইকবালকে যাঁর সম্পূর্ণ নাম মহম্মদ ইকবাল আল্লামা ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮)। যাঁর সাহিত্য ও রাজনৈতিক ভাবনা স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়। মীর ও গালিবের সঙ্গে আলোচনা করা নিষ্প্রয়োজন।
সাল-তারিখের বিচারে মীর তকী প্রায় তিনশ বছর ছুঁতে চললেন তাঁর জন্মগ্রহণের; আর গালিব পেরিয়ে গেছেন দুশো বছর। যাঁরা অল্প বিস্তর হিন্দী/উর্দুভাষার কবিতার খোঁজ রাখেন, তাঁরা গালিবকে যতটা জানেন, মীরকে ততটা নয়। এই পশ্চিমবঙ্গে গালিব ও মীরের গজলের বিশ্বস্ত অনুবাদ করেছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব (সঙ্গে গৌরী আইয়ুব)। ওপার বাংলায় মীরের গজলের, প্রামাণ্য অনুবাদ ও ভাষ্য রচনা করেছেন জাভেদ হুসেন। এখনও পর্যন্ত এঁদের লেখাই এই দুই কবির আলোচনার উপাদান। সেই ঋণ পূর্বাহ্নে স্বীকার করে রাখি। বঙ্গানুবাদই আমার ভরসা, এও জানিয়ে রাখি। আমি কবিতাপ্রিয় এক অদীক্ষিত পাঠকমাত্র।
জনপ্রিয় হলেও গালিব পূর্বসূরিকে কিন্তু অস্বীকার করেননি। বরং বলেছেন :
তুমি একাই উর্দু ভাষায় ওস্তাদ নও গালিব,
লোকে বলে পুরাকালে মীর নামেও একজন ছিলেন।
(কহতে হ্যঁয় অগলে জমানেমেঁ কোই মীর ভী থা)। এমনকি তিনি এও বলেছেন, ‘সে নিজেই বেরসিক যে মীরের গুণমুগ্ধ নয়।’ (অনুবাদক : আবু সয়ীদ আইয়ুব)।
মীর তকীর জীবন অত্যন্ত ঘাত-প্রতিঘাতময়। অষ্টাদশ শতকের বিপর্যস্ত সময় ও রাষ্ট্রের ঘূর্ণাবর্তে ভারতচন্দ্রের জীবন ও কাব্যবোধের সঙ্গে তাঁকে খানিকটা মেলানো যায়। দুঃখ, দারিদ্র্য-অসম্মান সহ্য করেও কবি হিসেবে ‘প্রমোদের প্রভু’ থাকতে চেয়েছেন। প্রেমই তাঁর দুঃসময়ের অন্ধকারে আলোকবর্তিকা। ঈশ্বর নিয়ে তেমন মাথা ঘামাননি, বরং পরিহাস করেছেন। যেমন করেছিলেন ভারতচন্দ্রও। অবশ্য গালিবও দার্শনিক ভাব রাখলেও ভক্ত ছিলেন না। ভারতচন্দ্র বলেন :
নিত্য তুমি খেলো যাহা নিত্য ভালো নহে তাহা
আমি যা খেলিতে চাহি সে খেলা খেলাও হে।
মীর বলেন :
তোমার অবারিত করুণা দেখলাম, আশা দিয়ে
খেলাচ্ছলে আশাভঙ্গ করার নিষ্করুণাও দেখলাম;
ভালোই হলো যে তোমার মন্দ দিকটাও প্রত্যক্ষ
জানতে পারলাম।
[… তেরী সব বুরুইয়াঁ দেখী]
মীর একথা বলতেও কুণ্ঠিত নন : ‘পারলেও আমি তো ঈশ্বর হতাম না, লজ্জায় বাধতো।’
পিতার অকালমৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত মীর সুখেই ছিলেন। এরপর শুরু হয় ভাগ্য বিপর্যয়। পিতার দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান তিনি। তাই তাঁর দাদা-ভাইয়েরা তাঁর প্রতি অকরুণ। জীবিকার জন্য মীর দিল্লী আসেন। সেখানে একজন সহৃদয় ব্যক্তির আনুকূল্য পান। কিন্তু বছরখানেক পরেই নাদির শাহর ভয়ঙ্কর আক্রমণে দিল্লী তছনছ হয়। মীর কর্মচ্যুত হন। ঐদিকে মাত্র আঠারো বছর বয়সে প্রবৃত্তির বশে মীর নিকট আত্মীয়ার প্রতি আসক্ত হন, যিনি বিবাহিত ফলে পরিবার ও সমাজে লাঞ্ছিত হন। তাঁর প্রতি অত্যাচার এত মারাত্মক হয় যে, কিছুদিন সত্যি তিনি পাগল বা মানসিক বিকারগ্রস্ত হন। ক্রমে সেই দুর্যোগ কাটিয়ে সুস্থ হন। তাঁর প্রতিভা ও কবিত্ব বিকশিত হতে থাকে। নাদির শাহের উত্তরসূরি আহমেদ আবদালী দিল্লীতে যখন অত্যাচারে, ধর্ষণে, লুণ্ঠনে নরক বানিয়ে তোলেন, মীর প্রত্যক্ষদর্শীরূপে যন্ত্রণায় কাতর হন। তাঁর ভাষায়, ‘উজাড় শহর দেখে আসর চোখে জল এসে গেল, মন নিষেদে ভরে উঠল।… সর্বত্র এক ভয়ানক শূন্যতা।’ মনে পড়ে বোদল্যারের খব ঠড়ুধমব কবিতার অংশ :
…ঞযরং পড়ঁহঃৎু নড়ৎবং, ঙ উবধঃয!
খবঃ ঁং ংবঃ ংধরষ…
আগ্রায় ফিরে আসেন কবি। স্বস্তি পান না। দিল্লী তাঁকে ডাকে। কিন্তু সম্মান, অর্থ, খ্যাতি কই? এই সময় কবি ডাক পান লক্ষেèৗতে। ১৭৮২ সাল। নবাব আসিফ উদ্দৌলহকে উপদেষ্টারা বলেন, মীরকে সভাকবি করতে। জীবনের শেষ ভাগটুকু মীর এখানেই কাটান। তবে নবাবের মৃত্যুর পরে তিনি আবার দারিদ্য-দুঃখে পড়েন। নবাবপুত্র স’আদত খান তাকে উপঢৌকন দিলে আত্মসম্মান বজায় রাখায় কবি বলেন, ‘আমি তত গরীব এখনও হইনি’। তাই প্রত্যাখ্যান করেন রাজানুগ্রহ। বলেন, পরিচারক এসে তাঁকে টাকা দেবে, আর তিনি তা নেবেন? এতো অপমান! আরও বলেন, ‘তিনি তাঁর রাজ্যের রাজা হতে পারেন, আমিও তো আমার রাজ্যের রাজা।’ কবির এই অহং অবশ্য গালিবেরও ছিল। লক্ষ্মৌতে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গজলে বলেন :
হ্যাঁ, মীরও ভিখারী, কিন্তু একত্রে ইহলোক ও পরলোক
এই একটিমাত্র ভিক্ষা তার।
রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেন, ‘আমি সন্ধ্যাদীপের শিখা/ অন্ধকারের ললাটমাঝে পরানু রাজটীকা।’ সেইরকম মীর তাঁর শেষ জীবন প্রসঙ্গে জানিয়ে যান :
শেষ রাত্রির প্রদীপ আমি শুনে নাও আমার দুঃখের কাহিনী,
ভোর হতে হতে তো সবই চুকে যাবে।
কবি হিসেবে মীর তকীর আত্মশ্লাঘা কম নয়। যেজন্য পুত্রকে বলেন, তাঁর কোনো পার্থিব সম্পদ নেই। ধনরতœ, জমি, বাড়ি না থাকলেও আছে কবিত্ব, আছে শব্দভা-ার :
…হ্যাঁ, আমার কাছে ভাষার প্রতিষ্ঠা।
আমার ভাষাই আমার জীবন আর সম্মানের
ভিত্তি। আমার তৈরি করা ভাষাই সামান্য
ধূলির আসন হতে আমাকে সুনামের
আকাশে পৌঁছে দিয়েছে। এই সম্পদের কাছে
আমি দুনিয়ার স¤্রাটকেও হীন জেনেছি।
[ভাষান্তর : জাভেদ হুসেন]
কবি মীরের এই অস্মিতাবোধ নিয়ে নাট্যকাব্য লিখেছেন আহমদ ছফা। তাঁর “কবি ও স¤্রাট” সংলাপধর্মী কবিতায় বা নাট্যকবিতায় দেখি রাজার প্রতাপ ও ঐশ্বর্যকে দরিদ্র কবি অনায়াসে উপেক্ষা করেন। রাজা কবিকে নানা দোষে অভিযুক্ত করেন :
অহরহ গাঁজাচ-ু খাও, শরাব খানায়
করো নরক গুলজার, রে-িবাড়ি করো
তুমি নিত্য যাতায়াত। সবচেয়ে আপত্তির
প্রত্যহ দিচ্ছ ছেড়ে লাউডগা সাপের মতো
অবাধ্য কবিতা।
রাজার অভিযোগ আরও মারাত্মক :
তোমার শব্দের বিষ, উপমাঝঙ্কার কেড়ে নিচ্ছে
যুবকের ধর্মকর্মে মতি।
নারীরাও নাকি বিপথগামিনী হচ্ছে। মীরকে ‘কবি’ আখ্যা দিয়ে রাজা বলেন, কবির কথার আলো ও আগুন ভয়ঙ্কর :
নারী ও পুরুষের মনের গোপন ঘরে যেইসব
বিস্ফোরক দাহ্যবস্তু থাকে, চকিতে চকমকি ঠুকে
লজ্জার আগুন যার তেজে আনন্দে কসবী
তুমি স্থির হয়ে একদ- থাকো না কোথাও।
কবি নাকি ঈশ্বরে অবিশ্বাসী। তাঁর রাজ্যে এমন অশুচি কাফেরকে মোল্লারা মেনে নেন না। রাজা বলেন :
ভেবে দেখো, আমাকে তুমি ফেলেছ কেমন মুশকিলে
মোল্লারা তোমার নামে জুড়েছে চিৎকার
কাটামু-ু দাবি করে, তা নইলে ধর্ম নাকি
যাবে রসাতলে।
রাস্তার কাছে তারা প্রতিকার চায়। ‘ধর্মরক্ষা স¤্রাটের কাজ’ রাজা বলেন। তবু গুণগ্রাহী রাজা কবির শুভাকাক্সক্ষী। বুঝিয়ে বলেন :
তোমাকে দাওয়াত করি
চলে এসো দরবারের শান্ত ছায়াতলে।
দরবারই প্রকৃষ্ট স্থান, সমস্ত গুণের ঘটে
সম্যক বিকাশ, পায় সমাদর।
কবি মীর সবিনয়ে রাজকীয় সমাদর প্রত্যাখান করেন :
আমি তো দেহাতি লোক
সর্বক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি, এমন তৌফিক নেই
অক্ষমতা ঢাকি। বুলিতে মাটির গন্ধ, লেবাসে
মিসকিন, ভাঙ্গাচোরা মানুষের সঙ্গে কাটে দিন।
দরবারে যাঁরা আসেন, তাঁরা ‘দিব্যদেহধারী’, ঐশ্বর্যবান। আর কবি?— ‘আমি তো সামান্য লোক ঘুরি পথে ঘাটে।’ ধুলোমাখা পায়ে বাদশাহর রক্তবর্ণ গালিচা কলঙ্কিত করতে ইচ্ছে হয় না। তাই :
মহামান্য বাদশাহ সালামত
ফিরে যাই নিজ বাসে— চাই এজাজত।
কবি আরও বলেন খাঁচার পাখি হতে চান না; বরং ‘জগৎ প্রাণের মাঝে ঢেলে দেবো প্রাণ।’ আর এও জানিয়ে দেন, ‘আমি তো আমার নয়, নেপথ্যে অদৃশ্য শক্তি আমারে চালায়’। শিরোপা সম্মান ফিরিয়ে দিয়ে কবি জানান ‘অভ্যস্ত জীবনে আমি ফিরে যেতে চাই’। রাজা স্বীকার করেন তাঁর হৃদয়ধর্ম নেই; আছে রাজধর্ম। তিনি মেনে নেন এই বাস্তবকে :
স¤্রাট হৃদয়ধনে ভাগ্যবান নন,
স¤্রাটকে চালায় কানুন।
গালিবও ছিলেন আত্মাভিমানী, অহংকারী কবি। তাঁর লেখা সকলের জন্য নয়। ভাবতেন, বলতেন :
হে খোদা, সে না বুঝতে পারে আমাকে,
না বুঝতে পারে আমার কথা
তাকে দাও ভিন্ন হৃদয়, অথবা
আমাকে দাও ভিন্ন বাচনভঙ্গি।
মদ-জুয়া-নারী তাঁকে প্রেরণা দিতো কাব্যরচনায়। হাসিনা নামে এক বারবণিতায় আসক্ত ছিলেন। ঈশ্বরকে বলতেন, ‘হে খোদা, আমার কাছে পাপের হিসাব চেয়ো না।’ তাঁর সমাদর করেন স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। দেশের শ্রেষ্ঠ কবি উপাধিও দেন। গালিবকে স¤্রাট ‘মুরশিদ’ (পথপ্রদর্শক) বলে গ্রহণ করেছিলেন। তবু শেষজীবন দারিদ্র্যেই কাটান। মীর তকীর মতো গালিবের জীবনও সংগ্রামমুখর ছিল।
আবু সয়ীদ আইয়ুব বলেন, ‘মীর তকীকে নারীপ্রেমের কবি বলা যায় সঙ্গতভাবে।’ তুলনামূলক আলোচনায় আইয়ুব জানান, গালিবকে বলা হয়েছে মুশকিল-পসন্দ (দুরূহতা-প্রিয়) কবি; তুলনায় মীরকে বলা যেতে পারে গমপসন্দ (দুঃখপ্রিয়) কবি। (মীরের গজল থেকে) তাঁর গজলে মীর স্পষ্টই বলেন, (যা তাঁর জীবনদর্শনও) :
১. এই পৃথিবীর যত আয়োজন সবই তো প্রেমের জন্য
২. প্রেমাস্পদের কাছ থেকে হৃদয় কত কী-ই যে চায়!
৩. হয় কাঁদলাম নয় কাঁদালাম— আমার তো এমনি করেই কাটল।
৪. হৃদয়ের চেয়েও সুন্দর প্রাসাদ আর কি কোথাও তৈরি হয়।
বিনীতভাবে উত্তরসূরিদের জন্য বলেন, ‘এই মরুতে ওহে হৃদয়! সামলে পা রাখো/ এখানে সব দিকে রয়েছে আমার তৃষার সমধি’।
পূর্বসূরি মীরকে কখনো ভোলেননি গালিব, তাঁর মতো তিনিও ভাবতেন, কবি দ্বিতীয় ঈশ্বর এবং তথাকথিত ধর্মাচরণ ও ঈশ্বরভজনার প্রয়োজন নেই। ‘জানা আছে স্বর্গ বিষয়টা কেমন সেই ভাবনায় মনটা খুশি রাখার চেষ্টা খারাপ ব্যাপার নয়’ জীবন বর্ণহীন, তাই কোনো ¯্রষ্টা আছেন কিনা, এই নিয়ে তিনি সংশয়ী। মীর বা অন্যদের কবিতা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর গজলে তার ছায়াও পড়ে। যেমন, হাফিজ লেখেন :
আমার হৃদয়ে প্রেমের আগুন, বুক
ভরে গেছে প্রেয়সীর শোকে,
আর গালিব লিখলেন :
প্রেমের লুকানো তাপ কী নিদারুণ আহা
হৃদয় পোড়ালো।
[তথ্যঋণ : কালি ও কলম/মাহমুদ আলম সৈকত অনূদিত গালিব-কাব্য]
জীবনের সফেন সমুদ্রে হাবুডুবু খেয়েও কিন্তু মীর তকী ও গালিব দুজনেই প্রেমিক কবি; বিরহীও, তাই মীর লেখেন :
এই মাঠে ঘাটে ঘোরা আর কতদিন,
কতদিন এই ছন্নছাড়া দশা?
আর মির্জা গালিব বলেন :
ভালাবাসাই গালিব, নিষ্কর্মা করে দিলো
নয়তো আমিও কাজের লোক ছিলাম।
গজল বলতে সকলে মুসলমানদের ধর্মীয় সঙ্গীতকে বোঝেন, এটি আরবী শব্দ। ইংরেজিতে এুুঁষব যার মানে প্রেমালাপ/প্রণয়সঙ্গীত, দুজনেই প্রেম ও ঈশ্বরকে একাসনে বসিয়েছেন। মীর বলেন, ‘তুমি যা চাও তাই আমাকে দিয়ে করাও/অথচ মিছিমিছি দোষী করো আমাকেই’। গালিব বলেন, অষ্টাদশ ও উনিশ শতকের দুই জ্যোতিষ্ক মীর তকী মীর ও গালিব। উর্দু সাহিত্যের অনুরাগী ও সমালোচকেরা বলেন, মোগল সা¤্রাজ্য থেকে আমরা পেয়েছি তাজমহল আর গালিবকে। আরও এক পা এগিয়ে কেউ বলেন, পৃথিবীতে অন্তত ভারতবর্ষে দুটি পবিত্র গ্রন্থ আছে বেদ ও গালিবের গজল। গুণগ্রাহীদের এইসব মুগ্ধতা বা অতিশয়োক্তি সরিয়ে যদি গালিবের কবিতা পড়ি, দেখা যাবে, তাঁর অন্তরের বেদনা, আকুলতা, ক্ষোভ কী চমৎকার ভাষায়, উপমায় বিকশিত হয়েছে। যেমন :
উদার সূর্যের কষ্ট দেখে বিচলিত হৃদয় আমার
আমি যে মরুর বুকে কাঁটার ওপরে পড়া শিশির।
রবীন্দ্রনাথ একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশির বিন্দুতে সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা দেখেছিলেন। গালিবের উপমায় ক্ষণিকতা ও নশ্বরতার বেদনা বিদ্যাপতির পদের সঙ্গে তুলনীয়— ‘অতল সৈকতে বারিবিন্দুসম’ এই জীবন ও সুখ। কিংবা যখন পড়ি:
বসন্ত মেঘের বর্ষণ শেষে উন্মুক্ত আকাশ আমার কাছে
যেন বিরহ-বেদনার অশ্রুতে নিজেই ভেসে যাওয়া।
মনে পড়ে, রবীন্দ্র গান— ‘আমার যেদিন ভেসে গেছে চোখের জলে’। কিংবা ‘শ্রাবণ আকাশে আমার প্রিয়ার ছায়া ভাসে’। প্রদীপের চিত্রকল্প গালিবের গজলেও প্রেমের বেদনার্ত মাত্রা এনেছে :
দুনিয়ার এই ভয়ানক উজাড় মজলিশে
প্রদীপের মতো আমি
প্রেমের শিখাকেই আমার সর্বস্ব জ্ঞান করলাম।
মীর যেমন ভিক্ষুকের তুলনা দেন (হ্যাঁ, মীরও ভিখারী, কিন্তু একত্রে ইহলোক ও পরলোক); গালিবও বলেন, ‘সেই ভিখারী শ্রেষ্ঠ, হাত পাতার অভ্যাস হয়নি যার।’ সঙ্গম ও বিরহের মধ্যে বিরহই শ্রেষ্ঠ বলেছিলেন বিকটনিতম্বা। গালিবও সেই ভাবনার শরিক। তাঁর প্রেমানুভূতির শেষ কথা :
বিরহের স্বাদ প্রিয় আমার/ মিলনের স্বাদ চাই না তাই
কবির জুটুক বিরহ আর/ মিলনের স্বাদ পাক সবাই
[অনুবাদক : সায়ীদ উসমান]

ব্যবহৃত গ্রন্থ
১. মীরের গজল থেকে (চয়ন ও পরিচিতি ও অনুবাদ : আবু সয়ীদ আইয়ুব), দে’জ পাবলিশিং, পঞ্চম সংস্করণ, ২০১৬।
২. মীর তকি মীর। ভাষান্তর ও আলোচনা : জাভেদ হুসেন, ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১৮।
৩. গালিবের গজল থেকে (চয়ন ও পরিচিতি) আবু সায়ীদ আইয়ুব। দে’জ পাবলিশিং, ১৯৭৬।
৪. কবি ইকবাল ও আধুনিক মন, তরুণ মুখোপাধ্যায়, ভাষা ও সাহিত্য, ২০১৫।
৫. মিলনসাগরসহ একাধিক ওয়েবসাইট।

**************************

কবি মণীন্দ্র গুপ্ত
অমলেন্দু বিশ্বাস

কবি মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতার অন্দরে প্রবেশ করার পূর্বে তাঁর শৈশব-কৈশোর-যৌবনের যে নানা অভিঘাতে বেড়ে ওঠা তার মানবিক দর্শন ও বোধিবৃক্ষের স্বল্প পরিচয় জ্ঞাপন করার প্রয়োজন রয়েছে। জন্মসূত্রে বরিশালের গৈলা গ্রামে ১৯২৬ সালে জন্ম। অনেক নদী ও নিসর্গ পরিবৃত ছিল তাঁর শৈশব। ১৭ বছরের বালক। তাঁর মা সুপ্রভা সেনগুপ্ত তাঁকে ছেড়ে চলে যান। পিতা শ্রী নগেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত চাকরিসূত্রে বাড়ির বাইরে থাকতেন বলে বালক মণীন্দ্রের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হতো খুবই কম। বাবার মৃত্যুর পরে কিশোর মনীন্দ্রের অভিভাকত্ব বর্তায় তাঁর দাদু-ঠাকুমার ওপর। আকস্মিক দাদু-ঠাকুমার মৃত্যুর পর বরিশাল ছেড়ে নিঃসঙ্গ মণীন্দ্র উঠলেন আসামের শিলচরে দাদু-দিদার কাছে। সেখানে তাঁকে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। পরে ১৯৪১ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। ইচ্ছে ছিল আর্ট স্কুলে ভর্তি হবার, কিন্তু অভিভাবকের ইচ্ছানুসারে তাঁকে ভর্তি হতে হয়েছিল কলকাতার আশুতোষ কলেজে। ভালো না লাগায় কলেজের পাঠ অসমাপ্ত রেখে প্রথমে হাওড়ার এক জুট মিলে, তারপর এক বীমা কোম্পানীর চাকরিতে সাময়িক যোগদান করেন। ১৯৪৩ সালে কবি শিবপুর বি.ই. কলেজে ‘ড্রাফটম্যানশিপ’ শাখায় ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করলেন। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় যোগদানে তাঁর কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটে লাহোরে, পশ্চিম পাঞ্জাবে। ১৯৯৪-র শেষ দিকে সেনাবাহিনীর কাজে ইস্তফা দিয়ে ফিরলেন কলকাতায়। সে সময় দেখলেন বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ। নতুন চাকরির সন্ধানে নেমে তিনি লেবার ইন্ডাস্ট্রি দপ্তরে যোগদান করেন। এর পাশাপাশি গভীরভাবে মনোনিবেশ করলেন চিত্রকলা চর্চায়, স্বচ্ছ জল রং, টেম্পোরা, তেল রং তিব্বতি তনকার রণকৌশল শিখলেন। আরো ভালোভাবে ছবি আঁকা শিখতে গেলেন শান্তিনিকেতনে, আচার্য নন্দলাল বসুর কাছে। নন্দলাল তাঁর আঁকা ছবি দেখে নিয়মিত ছবি আঁকার পরামর্শ দিলেন। এসময় তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থ বের হয় আমরা তিনজন, অন্য দুজন কবির সঙ্গে। তবে আলাদা করে নিজের কাব্যগ্রন্থ বের হয় ১৯৬৯ সালে, নীল পাথরের আকাশ। আর ওই সময়েই তাঁর সম্পাদিত কবিতা পত্রিকা ‘পরমা’ প্রকাশিত হয়। বয়স ৪৩। তার আগে ১৯৫১ সালে প্রথম বিবাহ হয়, স্ত্রীর নাম ছিল চিনি চৌধুরী। তাঁদের একমাত্র সন্তান ১৯৫৫ সালে জন্মে। তাঁর প্রথম স্ত্রী অকালে ছেড়ে চলে গেলে তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেন ১৯৭৫ সালে। দেবারতি মিত্র। বিশিষ্ট কবি। ১৯৮৪ সালে কবির চাকরি থেকে অবসর। প্রসঙ্গত বলে নেওয়া ভালো তাঁর কর্মে অব্যহতির পরমুহূর্তে তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল আমরা তিনজন, নীল পাথরের আকাশ, আমার রাত্রি, মৌপোকাদের গ্রাম, লাল স্কুলবাড়ি। ১৯৮৪ সালে অবসর গ্রহণের পর থেকে প্রয়াণ অবধি তাঁর সর্বসাকুল্যে কাব্যগ্রন্থ গদ্যগ্রন্থ ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে ৩০টি। আর সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা— ৫টি খ-ে (১৯৭২-৭৬), আবহমান বাংলা কবিতা : ১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব। যদি ‘পরমা’ পত্রিকা সম্পাদনা না করতেন তাহলে সম্পাদনার জগতে বেশ খানিকটা শূন্য থেকে যেতে। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকার পরে ‘পরমা’ ও ‘শতভাষা’ বাংলা কবিতার অনেক উজ্জ্বল মুখ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিল, যার ফলে আমরা ৫টি খ-ে এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা তেমনি আবহমান বাংলা কবিতা—তিনটি খ-ে প্রকাশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গৌরবময় কাজ।

এখন তাঁর কবিতার অন্দরমহলে প্রবেশ করার মুখে কবির নিজস্ব অভিমুখ ও তন্বিষ্ট পাঠকের অভিমুখের দিকে আমরা একবার গহন করে নিতে চাই। কবিতা সংগ্রহ (মে ১৯৯৪) গ্রন্থের ভূমিকা থেকে কিয়দংশ উপস্থাপিত করছি : ‘কোনো রকম আবেগ ছাড়াই নেহাত শখ ও অনুকরণ স্পৃহার বশে যখন কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম, তখন আমি নিতান্ত বালক। পরে বয়ঃপ্রাপ্ত হলে, এ বিষয়ে হৃদায়াবেগই হয়েছিল আমার চালিকা শক্তি। যত শেষের দিকে আসছি, ততই আবেগগুলো ক্রমশ বিলীন হয়ে গেছে। এখন কে আমাকে কবিতা লেখায়, হয়তো অখ- কাল, সর্বব্যাপী জগৎ এবং সর্বত্র স্পন্দিত অগণ্য জলবিম্বের মতো উত্থিত নিমীলিত জীবন। বা এই তিনের সন্নিপাতে তৈরি আলোছায়ার অবর্ণনীয় রহস্য —চিরপরিবর্তনশীল নকশা ।’
‘আমি তো সব সময় চেয়েছি— লোকসংখ্যা কমুক, বৈভব, তৈজস কমুক, শব্দ বাক্য কমুক।’ মাছ পাখি পশু বাড়–ক, বন বাড়–ক। পৃথিবী শান্ত সৌন্দর্যে টলমল করুক। মুখরতাকে চাপা দিয়ে বয়ে যাক বনমর্মর।
প্রত্যক্ষ কবিতার দিকে সুনজর দিলে তাঁর এই অনিবার্য অভিমুখের সত্যতা অনুধাবনে সক্ষম হবো বলেই মনে হয় :
আমি শিস্ দিয়ে বাজাই পাহাড়ি হাওয়া
সুর এক ধাক্কায় ওঠে তিন হাজার মিটার গিরিশৃঙ্গে
যেখানে শুধু বরফ, আকাশ আর সূর্য;
স্টান লাফে গোত্তা খেয়ে নামে অতল খরজে
সেখানে অন্ধকার গহ্বরের মধ্যে গুম গুম শব্দে
প্রস্রবণ চাপ দেয় পাথরকে।
আমি শিস্ দিয়ে বাজাই পাহাড়ি হাওয়া;
হাওয়া ঘুরতে থাকে পাহাড়ের কোলে কোলে—
পাইনবনে মেঘ জড়িয়ে যায়, হঠাৎ শনশনিয়ে ওঠে বাতাস
নলখগড়ার ঝোপ বুক চিরে ফেরাতে চায়
তার অনেক দিনের হারানো সুর।
আমরা যদি লক্ষ করি তাঁর কবিতার পটভূমি, চিত্রকল্প ও যে অনুষঙ্গ এসেছে অর্থাৎ কবি মণীন্দ্র গুপ্ত যখন চাকরিসূত্রে পাহাড়ি জঙ্গলে নদী গাছপালার ভেতরে পরিভ্রমণ করেছেন। ফলে পাহাড়ি হাওয়া, গিরিশৃঙ্গ, গহ্বর, পাথর, পাইনবন মেঘ, নলখাগড়ার ঝোপ ইত্যাদি শব্দবন্ধগুলি বিষয়ের গহনে চিত্রকল্প ও রূপকে রূপান্তরিত এক নতুন দ্যোতনাময় যা আমাদের মুখরিত করে। যেহেতু বরিশালের মানুষ, ফলে তাঁর প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ—এটাই স্বাভাবিক। তবে তাঁর দেখার চোখ ভিন্ন।
এখন যদি তাঁর প্রথম দিককার কবিতার দিকে তাকাই, দেখব সেখানে ভাঙা অক্ষরবৃত্তের গ্রাম জীবনের যে চালচিত্র, তাকে তিনি সুনিপুণ চিত্রিত হাতে ভিন্ন সুন্দর রূপ দিয়েছেন— ‘এক খ- জমি, একটি দুপুর, ও আমার শৈশব’ কবিতাটি। এটি তাঁর প্রথমে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ নীল পাথরের আকাশ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত :
বাঁশের ঝাড়ের নিচে খসে পড়া বাঁশের বাকল
শুয়ে থাকে নিরিবিলি।
হলদে ছায়া তালি দেওয়া ফালি জামা গায়ে
দুপুরের রৌদ্র ঘোরে একলা ছেলের মতো
হেঁটে যায় বাঁশতলি দিয়ে—
হাওয়া এসে মাঝে মাঝে তার কচি রোমকূপে কেটে যায় বিলি।
নিটোল গভীর ভরা দিন যেন নুয়ে পড়া বেতের লতায় পাকা বেতফল।
[এক খ- জমি, একটি দুপুর ও আমার শৈশব]
প্রথম দিককার কবিতায় লক্ষ করলে বোঝা যায় প্রত্যক্ষ উপমার দিকে ঝোঁক স্বরূপ— ‘দুপুরের রোদে ঘোরা একলা-ছেলের মতো, ‘নিটোল গভীর ভরা দিন যেন নুয়ে পড়া বেতের লতায় বেতফল’। কিংবা ‘নিবিড় শান্তির মতো ঘুরে ঘুরে খুঁটে খায় ডাহুকের জোড়া’। কোথাও ঈষৎ জীবনানন্দ উঁকি মারলেও কবির বোধ ও চৈতন্য এক অনাবিল বিস্ময় কাজ করেছে। আরেকটু পরেই লক্ষিত হয় তাঁর চিন্তন শক্তির সঙ্গে মননের যে অদ্ভুত রসায়ন ক্রমে ক্রমে ঘনীভূত হতে দেখি তাঁর পরবর্তী অনেক অসাধারণ কবিতায় :
রাস্তায় চেনে না কেউ,
পথে মরলে বলবে, জনৈক অজ্ঞাতনামা লাশ,
কিন্তু এই দশনামী টং ঘরে, আমি রাজা,
প্রথম মনীন্দ্র গুপ্ত।
বহু মুষ্ঠিযুদ্ধ, বহু সাত তাল ভেদ, কুঠেদের গ্রামে বহু স্বয়ম্বর ভেঙে
শেষ জীবনে সিদ্ধমন্ত্র :
শুধু এক স্তব্ধ সিংহাসন, আর একটি গোপন পতন—এই যন্ত্র।
এই নিয়ে অভ্যাস করি রাজ্যভার’।
[প্রথম মণীন্দ্র গুপ্ত, ‘ছত্রপলাশ চৈত্যে দিনশেষ’]
কবি মণীন্দ্র গুপ্তই এভাবে বলতে পারেন—‘এই দশনামী টং ঘরে, আমি রাজা। প্রথম মণীন্দ্র গুপ্ত। এবং তার এই ‘রাজ্যভার’ দু’বার স্বগতোক্তি তাঁকেই মানায়। যাঁর কবিতায় রাজ্যপাট নিঃশব্দে নিভৃতচারী সন্ন্যাসীর মতো গোপন গুস্ফায় প্রস্তুত করেছেন নিজেকে ও নিজের প্রিয়তম কবিতা, গদ্য ও উপন্যাসের ভাষাশৈলী। সুদীর্ঘ প্রায় ৭০ বছরের নিরলস সৃজনশৈলীতে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন তিনি।

তাঁর আত্মপরিচয় মূলক আত্মজীবনীমূলক অসাধারণ গদ্যগ্রন্থ অক্ষয় মালবেরি-তে তিনি জানিয়েছেন— ‘পরিত্যক্ত থাকার কষ্ট এবং অসহায় ক্রোধ এই দ্বৈতই আমার সারাজীবনের সারসংকলন। এই কষ্টই তাঁর দৃষ্টিতে দিয়েছে গভীরতা ও প্রসারতা এবং তাঁকে ক্রমে ক্রমে নিয়ে গেছে শুশতাষু পুস্তক, পত্রিকা ও নিসর্গের গাঢ় সান্নিধ্যে। নিসর্গ তেমনি আস্তে আস্তে কবি মণীন্দ্রের গহন তলদেশে দখল নিয়েছে অবলীলায় তাঁর অবচেতনের প্রকোষ্ঠ। আমরা দেখতে পাই তাঁর ব্যক্তি ও কাব্যজীবনের পরাকাষ্ঠাকে। সংরাগ এবং বৈরাগ্য মমত্ব ও সমতার এক অদ্ভুত সন্নিধান ঘটেছে যাঁর দৃষ্টির বিবরে— ফলে তাঁর কবিতা যে যুগপৎ সরল, কুটিল, উদাস এবং কুহকী মায়ায় প্রতিভাত হবে— এটাই স্বাভাবিক। অদ্ভুত নাটকীয় মোচড়ে শুরু হয়েছে এই নিম্নোক্ত কবিতাংশটি :
সন্ধ্যাবেলা তালা খুলি। ঘর নয়, বোবা কালা মা-মরা সন্তান
ঢলে আছে। থাক। — ক্লান্ত লাগে—
কচিৎ বিকেলে ফিরে দেখি : ঘুলঘুলির রৌদ্র নিয়ে
খুব খেলছে। সমবয়সীর মতো মেতে উঠে হঠাৎ চমকাই।
আমি ছায়ায় ধরে আছি, ও রোদ্দুরের সঙ্গে চলে গেছে।
কষ্ট হয় বর্ষার সন্ধ্যায়—কিছুতে থাকবে না ঘরে—কালো বিড়ালের মতো
রুষে ওঠে, নখ বার করে।
ত্যক্ত হয়ে লাথি মেরে বের করে দিই— উড়ে যায় অভিশপ্ত
বাদুড়ের মতো বর্ষায় বিদ্যুতে অন্ধকারে…
সারারাত রক্ত কিংবা দুঃখ খেয়ে ফিরে আসবে ভোরের আগেই।
[রাত্রি তরঙ্গ, লাল স্কুলবাড়ি]
কবি নিজেই কিন্তু প্রথম ও তৃতীয় পুরুষের দ্বৈত ভূমিকায় অবতীর্ণ। দূর অতীতকে ভিতর ঘর থেকে তালা খুলে বের করে নিয়ে এসে খুব নিকটে তার সঙ্গে কথা বলছেন। এক অদ্ভুত রক্তিম ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ও রক্তিম ঘাত-অভিঘাতময়তার মূর্তরূপ মূর্ত করেছেন কবি মণীন্দ্র তাঁর স্বকীয় ভাষা ও শব্দ-চিত্রকল্প উপমাবৃত উপাদানে। ভীষণ সংবেদী মন ও মননের মৃদু ধাক্কায় আমাদের চৈতন্য, টাল খায় কবিঘরে। ‘বোবা কালা মা মরা সন্তান ঢলে আছে।’ কবির নিজস্ব জীবন ও সত্তা কী অসাধারণভাবে দ্যোতিত করেছে— তা সবিশেষ লক্ষণীয়।
‘এখন ওসব কথা থাক’—এই কবিতাটি যদি আমরা মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করি, স্বভাবত মনে হবেই কবিতাটি অদ্যোপান্ত প্রেমের কবিতা। কেননা কবি যেভাবে শুরুতে সজোরে স্বগতোক্তি করেই পরক্ষণে দ্বিতীয় পংক্তিতে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন পাঠকের মন ও মনন। ‘এক লক্ষ বছর সঙ্গে থাকার পর সাব্যস্ত হবে, তুমি আমার কিনা /ওসব কথা এখন থাক।’
আশ্চর্য ঘটনা হল এই কবিতাটিতে কবি মণীন্দ্র গুপ্ত তাঁর স্বভাবজ বৈশিষ্ট্য থেকে সরে এসে যে ভাষাশৈলী ও চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন তা অতি উচচমানের নয়। তবুও আমাদের টানে তাঁর নিপুণ উপস্থাপনে :
এখন ওসব কথা থাক
এক লক্ষ বছর থাকার পর সাব্যস্ত হবে, তুমি আমার কি না।
ওসব কথা এখন থাক।
এখন চলো মিকির পাহাড়ে বুনো কুল পেকেছে,
চলো খেয়ে আসি।
লাল রুক্ষ্ম চুল
সূর্যাস্তের মধ্যে
অর্কিডের উজ্জ্বল শিকড়ের মতো উড়ছে।
দেখি দেখি, তোমার তামাটে মুখখানা দেখি।
সূর্য এখনি অস্ত যাবে। পশুর মতো ক্ষীণ শরীরে—
আমার হাঁটু পর্যন্ত জলস্রোত পেরিয়ে চলেছি—
জলস্রোত ক্রমশ তীব্র… কনকনে…
৪.
কবিতার বৈচিত্র্যের স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ সমসময়েই আমরা দেখতে পাই ইংরেজি ভাষায় ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভাষায় কবিতা পড়ে। কিন্তু বাংলা কবিতায় কোথায় কী একটা সীমাবদ্ধতা থেকে যাচ্ছে। তবুও এই সূত্রে তিনি তাঁর কবিতার ফর্ম ও কনটেন্টের কথাও বলেন। একটা শব্দের মধ্যে যা একটা চরণের মধ্যে তিনি কবিতাকে খুঁজতে রাজি নন। একটি নারী তার সমগ্রতায় একটি নারী, আর এসটি কবিতাও তেমনি তার সমগ্রতার একটি কবিতা। একদম শুরুর কবিতায় তাঁর চরণান্তিক মিল ছিল, খানিকটা ছন্দের ব্যাপারও ছিল। পরে তাঁর মনে হল, তিনি কী বলতে চান সেটাই আসল কথা। ফর্মের সঙ্গে কনটেন্ট তো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাহলে আলাদা করে আর সাজগোজের ব্যাপারে মাথা ঘামানোর দরকার কী? তাঁর শেষ কথাই ছিল— ‘কনটেন্টটাই অন্যরকম। কনটেন্টটাই যখন বেরিয়ে চলে যাচ্ছে, সেখানে ফর্মের আর তোয়াক্কা করছি না। এখন কী হয়েছে সেটা তো আপনারা বলবেন।
৫.
পল ক্লে যাঁকে ‘ৎবমরড়হ ড়ভ ঃযব ংবপৎবঃ ঢ়ষধপব’ বলেছেন, মণীন্দ্র গুপ্ত তাকেই ভাবেন অন্যরূপে। এই অন্যরূপকে দেখার শক্তি যোগায় কল্পনা প্রতিভা। যদিও কোলরিজের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক (ঢ়ৎরসধৎু, ংবপড়হফধৎু) কল্পনার (ওসধমরহধঃরড়হ) সংগে তুলনীয়। তবে কী মণীন্দ্র গুপ্তের ভাবনার মৌল বীজটি নিহিত আছে কোলরিজেও নয় বরং যেনবা চিত্রকল্প গুঢ়শিকারী— সেই রাইনের মারিয়া রিলকে এবং কিছুটা অবনঠাকুরের চিত্রাবলীর চকিত পরিলক্ষিত হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ দুটি কবিতা উপস্থাপন করছি :
(১)
বনে আজ কনচের্টো
গাছপালাদের মধ্যে তাদের চিরস্থায়ী বাস
তারা পোকামাকড় সরীসৃপ আর কীটপতঙ্গ
কেউ অষ্টপদ, কেউ ষড়বাহু, চক্ষু দ্বাদশ
কারো অন্ধ কপাল থেকে বেরিয়েছে চোখের বদলে শৃৃঙ্গ
কারো ল্যাজ খসে গেলে সেখানে গজায় চঞ্চু
হাত ছিঁড়ে গেলে সেখানে গজায় পালক
মাথা কাটা গেলে স্কন্ধে গজায় মু—-
বোঁচা নাক, খালা কপালে বনের বালক—
তারা উচ্ছ্বাসে দেয় শিস।
বনের মধ্যে পে-ুলামের ডিং ডিং, দূরের হাওয়ায় চেলো
পোকার গলায় বনের ঢাকের শব্দ
হঠাৎ মিষ্টি ক্ল্যারিওনেটের ট্রেমেলো
দারুণ জমেছে বনে আজ কনচের্টো
আসলে এসব ঢ্যাঙা গাছ, পাখি, পোকার, হাওয়ার কা-।
সারাদিন বয় উদাস হাওয়ার ঢেউ—
(২)
‘আনন্দ আমার পিঠ ব্যথা করছে
আমি একটু শোব। সমাগতদের তুমি
আদেশ দাও।’
তথাগত, এই কথা শুনে আমি মজঝিমনিকায়খানি
বন্ধ করি।
আড়াই হাজার চৈত্র—আর এতদিনকার উদবেছিল
অপরাহ্ন, রক্তসন্ধ্যা, নিশীথ আক্ষেপ—
পৃথিবীর আমজামবট বন ঘুরে এসে
আমার ভেতরে শুতে চায়। আমি সেই ক্লান্তি কারণ্য
লক্ষ্য করি।
আনন্দ, আমার পিঠ ব্যথা করছে কৃতকর্ম
আনন্দ, কখন আমি শোব? বড় বেশী ভাবী
পরিশেষে তুলে ধরছি তাঁরই একটি সাক্ষাৎকারের শেষ প্রশ্নোত্তরের অংশবিশেষ—
সবে তো হাজার দেড়েক বছর পেরিয়ে এসেছে এই ভাষার কবিতার ইতিহাস। এরই মধ্যে বাংলা ভাষা যে এত আহ্লাদি, নিষ্পাপ এবং শকর্রী স্নিগ্ধ হয়েছে উঠেছে তা টের পাওয়া যায় এ ভাষায় রচিত কবিতার উচ্চারণ হঠাৎ দূর থেকে কানে এলেও। তার গীতলতাকে অস্বীকার করা যায় না সহজে। সমস্ত বাহারের ফুসলানি সত্ত্বেও কবিতা, বঞ্চিত বেপরোয়া অন্যরকম কবিতা খুঁজে নেবে তার দূর্গ। গেরিলা যুদ্ধের জন্য তৈরি থাকবে যে চিরকাল। আবার মাটি ফুঁড়ে দেখা দেবে তার নতুন চারার নতুন প্রাণের স্পন্দন। তাই অবস্থা যাই হোক না কেন স্বাধীন এবং আত্মস্থ থাকাই আমাদের কাজ। সম্মিলিত আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে নিজেদের বাঁচাতে হবে কবিতা লেখকদের। মূক… বা ভক্ত যদি না-ই জোটে ছাপাখানার কম্পোজিটর বা ছোট এন্টি-অপারেটর এবং মেশিনম্যান বা সিল্কস্ক্রিন ও গ্রাফিক ডিজাইনারের সংগে বন্ধুত্ব করতে পারলে কবিতার বইটি সময়ে এবং নির্ভুল প্রকাশ করা সহজ হবে। শব্দেরা আপনার কবিতায় হরগৌরী নুড়ি হয়ে উঠুক, বারবার এই অপেক্ষায় থাকবে পাঠক। বড় কোমল সে পাঠকের আকাক্সক্ষার আলো।

**************************

দুই কবির গান : কলির উদ্ভাসন ও অলির গুঞ্জরন
তারেক রেজা

বাংলা সাহিত্যের বাগানে ফুল ফোটানোর কাজে যাঁরা আত্মনিয়োগ করেছেন, তাঁদের প্রণতি জানানোর মধ্যে নিশ্চয়ই অপরিসীম আনন্দ আছে। সেই আনন্দ অনেকটাই কবিতার মতো চিন্তা ও চিত্তের চরাচরে ছড়িয়ে পড়তে চায় এবং এই ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে সবাইকে জড়িয়ে ধরার অভিপ্রায়ও মুদ্রিত থাকে কখনো কখনো।অর্থাৎ এই কুসুমকুঞ্জে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাতে ভালো লাগে। ভালো লাগার অনুভূতি যখন শব্দ-ছন্দের সীমানা ছাড়িয়ে আমাদের অন্য দিগন্তে নিয়ে যেতে চায়, দূরকে নিকটবন্ধু হিসেবে ভাবতে শেখায়, তখনই আমরা সুরের সঙ্গে প্রাণকে বেঁধে নেওয়ার প্রণোদনা অনুভব করি। আর এভাবেই আমরা গানের ভুবনে হারিয়ে যেতে থাকি, দাঁড়িয়ে থাকি কালোত্তীর্ণ কোনো শিল্প¯্রষ্টার গানের ওপারে। গানের ভেতর দিয়ে যিনি ভুবন দেখতে জানেন তিনি নিশ্চয়ই মহামানব। আমাদের মতো সাধারণের পক্ষে ভুবন-সন্দর্শনের প্রলোভন এড়িয়ে চলাই নিরাপদ, বরং এই মহামানবদের সান্নিধ্যে এসে আপনার তালে নেচে যাওয়ার শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করে সামনে এগিয়ে যেতে পারলেই অন্তত ‘বেঁচে আছি এই আনন্দে আপনি’ বিভোর থাকা যায়।
বেঁচে থাকার প্রসঙ্গে অনেকেই হয়তো আপত্তি করবেন, বলবেন, অর্থহীন জীবনযাপনের মধ্যে বিশেষ কোনো বাহাদুরি নেই, শরৎবাবুর ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেবেন, ‘টিকিয়া থাকাই চরম সার্থকতা নয়, এবং অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’ এ-জাতীয় আপত্তির বিপক্ষে আমি কোনো যুক্তি হাজির করবো না। এই দুর্মূল্যের বাজারে সম্মান ও সম্ভ্রম নিয়ে সরব-সক্রিয় থাকার কাজটি কঠিন হলেও স্বীকার করছি, টিকে থাকার অনকূলে ঠিকেদারি করা আমার কাজ নয়। ‘লক্ষ্মীর চেলাচামু-াদের উৎপাতে’ যখন শ্রীমতি সরস্বতী ফুটপাতেও নির্বিঘেœ চলতে পারছেন না, তখনও আমি স্বরস্বতী দেবির পদতলেই পুজো দিতে প্রস্তুত। এই পুজোর ফুল সংগ্রহ করতেই আমি বাংলা সাহিত্যের দুই মহাজন— রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের বাগানবাড়িতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করছি।
প্রথাগত বাঙালি হিসেবে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোর অধিকার আমার জন্মগত। সেই অধিকারে নিশ্চয়ই কেউ হস্তক্ষেপ করবেন না। রবীন্দ্রনাথের গীতবাণীর ভক্তমাত্রই জানেন, তাঁর চেতনার রঙে পান্না কীভাবে সবুজ হয়ে যায়, চুনি রাঙা হয়ে ওঠে। গোলাপ কীভাবে তাঁর ইচ্ছের অনুকূলে ‘সুন্দর হল’ সে সত্যও আমাদের অজানা নয়। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের কবিতা-গান ফুল ফোটানোর মন্ত্র হিসেবে অনবদ্য। যখন শুনি, ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কিবা মৃদু বায়’, তখন সেই বাতাসে কান পেতে আমাদের হৃদয়ের ব্যাকুলতাও মুকুলিত হতে দেখি। কিন্তু যে ফুল এখনো ফোটে নি, এখনো কলির ভেতরেই সুপ্ত আছে সমুদয় সৌরভ ও সৌন্দর্য, সেখানে কেমন ছিল রবীন্দ্রনাথের গীতবাণীর অভিঘাত? ‘নতুন ফুটেছে মালতীর কলি,/ঢলি ঢলি পড়ে এ ওর পানে!/মধুবাসে ভুলি প্রেমালাপ তুলি/অলি কত কি-যে কহিছে কানে!’— এই গীতবাণীতে প্রকাশোন্মুখ মালতির কাছে অলির যে কথামালা, তার অন্তর্গত অভিব্যক্তি কি রবীন্দ্রনাথের চিত্তরসে সঞ্জীবিত নয়? রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গীতবাণী থেকে আরো কিছু কলির কথা বলি :
ক. অবশেষে রজনীপ্রভাতে
জানে না সে কখন দুলায়ে গেল চলি
বিপুল নিশ^াসবেগে একটুকু মল্লিকার কলি।
খ. আমার মল্লিকাবনে যখন প্রথম ধরেছে কলি
তোমার লাগিয়া, তখনি, বন্ধু, বেঁধেছিনু অঞ্জলি।
গ. চাঁপার কলি চাঁপার গাছে সুরের আশায় চেয়ে আছে,
কান পেতেছে নতুন পাতা গাইবি ব’লে।
কমলবরণ গগন-মাঝে কমলচরণ ওই বিরাজে
ঘ. শেষে গ্রীষ্মতাপে জ্বলি
শুকাইল ফুল-কলি,
সর্বস্ব যাহারে দিলি সেও গেল পলাইয়া!
ঙ. …শতবর্ষ ধ’রে
একটি পুষ্পের কলি ফুটাবার তরে
চলে তব ধীর আয়োজন।
চ. ফুটো-ফুটো ফুলের কলি!
নীরব নয়নে কী-যে কথা কয়
এ জনমে আর যাব না ভুলি।
রবীন্দ্রনাথের গীতবাণী থেকে কলি-আশ্রয়ী আরো অনেক উদাহরণ হাজির করা যাবে। যে কথা কবি বলতে চান কিন্তু ভাব ও ভাষার সংযোগসূত্রটি কিছুতেই যথাযথভাবে নির্মিত হচ্ছে না, সেখানেই তিনি ফুলের পরিবর্তে কলির কাছে ফিরে গেছেন। ঠিক এই অভিব্যক্তিরই এক আশ্চর্য প্রকাশ লক্ষ করি কবির অন্য একটি গানে— ‘আমার না-বলা বাণীর ঘন যামিনীর মাঝে, তোমার ভাবনা তারার মতন রাজে।’ যে-কথা মুখে বলা যায় না, সে-কথার নিশ্চয়ই ‘কূল নাই কিনার নাই’।তাই তা রাত্রির গভীর অন্ধকার হয়ে বিভ্রান্ত যাত্রীর ‘হৃদয়ের একুল ওকুল’ প্লাবিত করে, দূর আকাশের তারার মতো পথহারা পথিকের চিত্তলোকে আশার প্রদীপ হয়ে জ¦লতে থাকে। কবির ‘না-বলা বাণী’ এ-কারণেই ফুল নয়, কলির রূপকল্পে অসাধারণ শিল্পসংহতি লাভ করে।
সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্যে নানা অবয়ব ও রূপকল্পে কলির অবাধ আনাগোনা লক্ষ করা যাবে। কবিতা ও গান পাঠক-শ্রোতার চিত্তে যে অনাস্বাদিত অভিব্যক্তি সঞ্চার করে তা কেবল শব্দার্থশাস্ত্রের নীতি-নৈতিকতা অনুসরণে সিদ্ধ নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘যে বাক্য কাব্যের উপাদান, অর্থকে সে অনর্থ করে দিয়ে তবে নিজের কাজ চালাতে পারে। তার প্রধান কারবার অনির্বচনীয়কে নিয়ে, অর্থের অতীতকে নিয়ে। কথাকে পদে পদে আড় করে দিয়ে ছন্দের মন্ত্র লাগিয়ে অনির্বচনীয়ের জাদু লাগানো হয় কাব্যে, সেই ইন্দ্রজালে বাক্য সুরের সমান ধর্ম লাভ করে। তখন সে হয় সংগীতেরই সমজাতীয়। এই সংগীত-রসপ্রধান কাব্যকে ইংরেজিতে বলে লিরিক, অর্থাৎ তাকে গান গাবার যোগ্য বলে স্বীকার করে।’ রবীন্দ্রনাথ যে অনির্বচনীয় অভিব্যক্তির কথা বলেছেন, তা কেবল কবিতা-গানে কথিত বা প্রকাশিত শব্দের আশীর্বাদপুষ্ট বলে আমাদের মনে হয় না। এখানেও ‘না-বলা বাণী’র তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা। আপাতত কলির প্রসঙ্গে ফেরা যাক। রবীন্দ্রনাথের গীতবাণীতেই কলির প্রভাব অধিকতর স্পষ্ট এবং লক্ষ্যভেদী। কোনো কথা না বলে অনেক কথা বলার অভিপ্রায় গানের অবয়বকে দান করে ভিন্নতর দ্যোতনা। কারণ গান কেবল শব্দের কাঁধে ভর করে শ্রোতার অন্তর্লোককে উন্মোচিত করে না, সেখানে সুরের আশীর্বাদ শব্দকে তার অভিধানশাসিত অর্থের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়।
বর্তমান নিবন্ধে আমরা কলি-আশ্রিত দুইটি গানের ওপর ভরসা করে কিছু বিশৃঙ্খল ভাবনাকে শব্দবন্দি করতে চাই। এই লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথের যে গানটির দিকে পাঠকের মনোযোগ প্রত্যাশা করি, তা যে আমার মতো অনেক পাঠক-শ্রোতারই অত্যন্ত পছন্দের, সে বিষয়ে সন্দেহ না থাকাই ভালো। ফুলের সঙ্গে ভ্রমরের সম্পর্ক নির্দেশের মাধ্যমে মানবমানবীর মনোদৈহিক সম্পর্ক-সংযোগ প্রণয়ন বাংলা সাহিত্য একটি পুরনো, বহুলচর্চিত প্রথা। শুধু বাংলা কবিতা নয়, দৈহিক-আত্মিক-আধ্যাত্মিক সকল শ্রেণির গীতবাণীর ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। ‘ভ্রমর যখন ফুলের সাথে করে আলিঙ্গন/তখন আমি চাইয়া থাকি কেমন করে মন’, ‘বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধে ভ্রমর হয় আকুল’, ‘যখন ফুলে মধু ছিল, কতই ভ্রমর আইল গেল গো/ও ফুলের মধু খাইয়া ভ্রমর যায় উড়িয়া গো’— ইত্যাদি গানে মানবমানবীর চিত্তলোকের উন্মাদনা যতটা ধরা পড়েছে, তার চেয়ে শারীরিক সান্নিধ্যলাভের বাসনা কিংবাসান্নিধ্যপরবর্তী অভিব্যক্তিই তীব্রভাবে প্রতিভাত। কিন্তু উপমা-রূপকল্পের আড়াল থাকায় শারীরিক ও শাব্দিক পবিত্রতা অক্ষুণœ রেখেই সব কথা বলা হয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথের যে গানটিতে আমরা কলি ও অলির সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে চাই, সেখানে গহন মনের জটিল-গভীর অনুভব-উপলব্ধি মুদ্রিত হয়েছে। ‘না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার গোপন মঞ্জুরি’র মতো মধুর ও মায়াবী অনুভবপুঞ্জকে কবি এখানে ধারণ করতে চেয়েছেন।
পৃথিবীর সমুদয় পুষ্পইহয়তো প্রাণের গরজে ফোটে, ভ্রমরের ইচ্ছে-অনিচ্ছে কিংবা প্রয়োজনকে পাত্তা দেওয়া তার উদ্দেশ্য নয়। ভ্রমরের ভাব ও ভাবনা তবু ফুলের সৌরভে আমোদিত হয় এবং সেই আমোদের আড়ালে মানবহৃদয়ের অনেক অকথিত কথা ডালপালা বিস্তার করতে চায়। মহামানবের আত্মপ্রকাশের এই অভিনব আয়োজন কখনো কখনো কালোত্তীর্ণ শিল্পসংহতি নিয়ে পাঠকশ্রোতাকে বিমোহিত করে। রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়ে অলি ও কলির এই আত্মীয়তার ধরনটি এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক :
অলি বারবার ফিরে যায়, অলি বারবার ফিরে আসে—
তবে তো ফুল বিকাশে
কলি ফুটিতে চাহে ফোটে না, মরে লাজে, মরে ত্রাসে ॥
ভুলি মান অপমান দাও মন প্রাণ, নিশিদিন রহো পাশে।
ওগো, আশা ছেড়ে তবু আশা রেখে দাও হৃদয়রতন-আশে ॥
ফিরে এসো, ফিরে এসো— বন মোদিত ফুলবাসে।
আজি বিরহরজনী, ফুল্ল-কুসুম শিশিরসলিলে ভাসে ॥
কথা দিলে কথা রাখার, প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম না-করার প্রসঙ্গ আসে। কিন্তু কলির সঙ্গে অলির সে-রকম কথোপকথনের কোনো প্রমাণ বা ইঙ্গিত এই গানে নেই। কিন্তু অলির অঢেল আস্থা আছে কলির ওপর, তাই সে বারবার ফিরে আসে। অলির আনাগোনার কারণেই কি ব্যাহত হচ্ছে কলির এই আত্মপ্রকাশের আয়োজন? ফুলের শরীর জুড়ে লজ্জার শিহরন, আর বুক জুড়ে মধুর-মুখর ভয়। এই ভয় ও লজ্জার অনুভব পুষ্পের শরীরেও সঞ্চার করছে মানবীয় উপলব্ধি। রবীন্দ্রনাথও তাই অলি ও কলির জগৎ ছেড়ে মানবমনের গহন অরণ্যে নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের। তাই মান-অপমান ভুলে সমর্পণের কথা বলছেন, সারাক্ষণ পাশে থাকার বিমল অনুনয় জানাচ্ছেন। আশা ছেড়ে দেওয়া ও আশা রাখার দ্বৈরথে যখন দগ্ধ হচ্ছে কবির হৃদয়, তখন হৃদয়রতন লাভ করার সম্ভাবনা কতটুকুই আর অবশিষ্ট থাকে?
তবুও ফিরে আসার আকুল আহ্বান। কারণ, তখন ‘বনে বনে ফুল ফুটেছে’, তারই সুবাসে কবিচিত্ত অধীর-অস্থির। এই অপেক্ষার রজনী বাস্তব কারণেই দীর্ঘ ও দুঃখময়। রাত্রির বৃন্ত ছিঁড়ে ফুটন্ত সকাল যিনি উপহার দিতে পারেন, তারই শোকে সমুদয় কুসুমসজ্জা ভেসে যায় শিশিরের জলে। কী গভীর প্রেম, কী নিবিড় আত্মসমর্পণ! প্রতীক্ষার দুঃখ ও হাহাকারকে তিনি ছড়িয়ে দিলেন প্রকৃতির চরাচরে এবং সেই সঙ্গে জড়িয়ে নিলেন পৃথিবীর সমুদয় প্রেমিকহৃদয়কে, আত্মপ্রকাশের উপযুক্ত ভাষা যাদের আয়ত্তে নেই। শব্দের অভাবে অনেক সম্ভাবনারই অপমৃত্যু হয়। তাই অগণিত প্রেমিকহৃদয়ের মৃত্যুযন্ত্রণাকে কবি এই গানের শরীরে গেঁথে দিয়েছেন। ভালোবাসার জন্য হাতের মুঠোয় প্রাণ নেননি কবি কিন্তু প্রাণের পুরোটাই প্রিয়তমার পায়ের কাছে নিবেদন করেছেন। আর শিশিরভেজা ফুল্লকুসুমের প্রসঙ্গে এই নিবেদন লাভ করেছে প্রার্থনার সম্মান ও স্বীকৃতি।
রবীন্দ্রনাথ কলি ও অলির রূপকল্পে আত্মপ্রকাশ ও আত্মসমর্পণের যে চমৎকার ছবিটি এঁকেছেন, তা প্রকাশোন্মুখ মানবহৃদয়ের দুঃখ ও দীর্ঘশ^াসে ভারাক্রান্ত। যে-কথা বলার ইচ্ছে থাকলেও বলা হয় না, সে-কথাই তো চোখের সামনে সহ¯্রবার দেখার কথা বলেছেন তিনি : ‘যে আনন্দ-বেদনায় এ জীবন বারেবারে করেছে উদাস/হৃদয় খুঁজিছে আজি তাহারই প্রকাশ।’ এই অন্বেষণের অভিব্যক্তিই প্রকাশোন্মুখ কলির চারপাশে ঘুরে বেড়ানো অলির অভিক্ষেপে ধরা পড়েছে। তিনিই আমাদের জানিয়েছেন, ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে/উঠিল ফুটিয়া নয়নে নয়নে।’ কিন্তু চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতা তো সবার থাকে না। তাই অলির মনোবেদনাও কবিকে শব্দে অনুবাদ করতে হয়। যদিও এই শব্দবাণ কলির অন্তর্লোক ভেদ করেছে কি-না তা আমরা জানতে পারি না। যাদের প্রাণ পাষাণে বাঁধা, তাদের চোখের সামনেও দুর্ভেদ্য পর্দা থাকা অসম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের গানে এই অসম্ভবের পাথার পেরুনোর কথা বারবার এসেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের গানের ভক্ত ছিলেন। খোলা গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনিয়ে অনেককেই মুগ্ধ করেছেন তিনি। এই মুগ্ধতা কখনো কখনো প্রেমে পরিণত হয়েছে এবং পরিণয়ের পাশাপাশি উপস্থিত হয়েছে প্রত্যাখ্যান। নজরুলের গানে প্রেমের তীব্রতা যেমন লক্ষ করা যায়, তেমনি বিরহী-হৃদয়ের আর্তনাদও পাঠকশ্রোতার অজানা হয়। বলা যায়, বিরহী নজরুলের আত্মিক অভিক্ষেপই তাঁর পাঠকশ্রোতাকে অধিকতর আকর্ষণ করে। তাঁর অভিভাষণ থেকে প্রেমিক নজরুল আক্ষেপ ও অভিমানের কথা আমরা জানি। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বাস করুন আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি— আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম— সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।’ নজরুলের নীরব অভিমানের অশ্রুবিন্দু দিয়েই গাঁথা হয়েছে তাঁর কালজয়ী সব গানের মালা এবং এই অভিমানের শব্দবাণ কতো প্রেমিক-হৃদয়ের নীরবতা ভেঙে দিয়েছে সে খবরও আমাদের অজানা হয়।
প্রেমিক হিসেবে নজরুল ছিলেন দুঃসাহসী। ভিক্ষালব্ধ ধনে দিনযাপনের গ্লানি তাঁকে স্পর্শ করেনি, যা-কিছু তাঁর চাই তা জয় করে নিতে ভালোবাসতেন। এই ভালোবাসার জন্য তাঁকে মূল্যও কম দিতে হয়নি। তবু ভেঙে যেতে যেতে আবার নতুন করে নিজেকে গড়ে নিয়েছেন তিনি। এই ভাঙাগড়ার পথের ধারে বসেই তিনি নির্মাণ করে নিয়েছেন নিজস্ব পৃথিবী, হয়ে উঠেছেন কালজয়ী শিল্প¯্রষ্টা। তবুও তাঁকে কোথাও কোথাও ভীরু প্রেমিকের অবয়বে উপস্থিত হতে দেখি, মনের কথাটি মুখে বলতে না পেরে আপনমনে আক্ষেপ করেছেন তিনি। আবার মুখে যা বলেছেন, মনে হয়তো লুকিয়ে ছিল অন্য কথা। ফলে মুখের কথায় ভর করে কেউ কেউ তাঁকে ভুল বুঝে দূরে সরে গেছে। তাঁর একটি গীতবাণীর কথা মনে পড়ছে : ‘শুধু মুখের কথাটি শুনে গেছ তুমি/শোনোনি মনের কথা।’ মানুষের মন কী চায় তা তো সব সময় মনের কাছেও স্পষ্ট থাকে না। ফলে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ তৈরি হয়। এই ভুলের পাহাড় ঠেলে ফুলের কাছে পৌঁছানোর কাজটি আমৃত্যু নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন নজরুল। ফুলের প্রসঙ্গে অনিবার্যভাবে হাজির হয়েছে ভ্রমর। একইভাবে কলির কথা বলেছেন, অলির অম্লান আগাগোনাও আমাদের চোখে পড়বে। কয়েকটি উদাহরণ হাজির করি :
ক. কদম্ব-কলি শিহরে আবেশে
বেণীর তৃষ্ণা জাগে এলোকেশে
হৃদি ব্রজধাম রস-তরঙ্গে প্রেম-আনন্দে ভাসিল রে ॥
খ. অরুণ-রাঙা গোলাপ-কলি
কে নিবি সহেলি আয়।
গালে যার গোলাপী আভা
এ ফুলকলি তারে চায় ॥
গ. যবে ভোরের কুন্দ-কলি মেলিবে আঁখি
ঘুম ভাঙায়ে হাতে বাঁধিও রাখি
রাতের বিরহ যবে প্রভাতে নিবিড় হবে
অকরুণ কলরবে গাহিবে পাখি ॥
ঘ. দেবযানীর মনে প্রথম প্রীতির কলি জাগে
কাঁপে অধর-আঁখি অরুণ অনুরাগে
নব-ঘন-পরশে
কদম শিহরে যেন হরষে
ভীরু বুকে তার তেমনি শিহরন লাগে ॥
নজরুলের অনেক গীতবাণীতেই কলি ফুলের সমান্তরাল আবহ সঞ্চার করে।তবে কদম্ব-কলির শিহরনের মধ্যে যৌবনদৃপ্ত রাধার সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধি অধিকমাত্রায় উদ্ভাসিত হয়েছে। কবি যার গালে গোলাপী আভা দেখেছেন, তার সঙ্গে অরুণ-রাঙা গোলাপ-কলির সম্পর্কসূত্র নির্দেশের ভিন্নতর একটি অর্থ কল্পনা করে নেওয়া যায়। একটি সদ্যজাত গোলাপের মধ্যে যে অনাস্বাদিত অভিব্যক্তি থাকে, তা সেই গোলাপী আভাযুক্ত বালিকার সদ্যোদ্ভিন্ন যৌবনের দ্যুতিনির্দেশক বলে আমাদের মনে হয়। ভোরের কুন্দ-কলির চোখ মেলে তাকানোর মধ্যে বিকাশোন্মুখ অভিব্যক্তি অসাধারণ দ্যোতনা সঞ্চার করে। একইভাবে দেবযানীর মনে প্রেমের যে উন্মেষ দেখানোর চেষ্টা করেছেন কবি, তা ফুলের আতিথ্যে অসম্পূর্ণই থেকে যেত।সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে, বলা ও না-বলার ব্যবধান নির্দেশ করার কাজটি নজরুলকেও ফুল ও কলির রূপকল্পে হাজির করতে হয়েছে।
নজরুলের যে গানটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গানের সম্পর্কসূত্র নির্মাণের অভিপ্রায় এই আমরা এই রচনায় অনুপ্রাণিত হয়েছি, এবার সেই গানের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। রবীন্দ্রনাথের অলিকে আমরা একটি বিকাশোন্মুখ কলির চারপাশে ঘুরপাক খেতে দেখেছি। কলি ফুটবে ফুটবে করলেও লজ্জা ও ভয়ের দেয়াল ঠেলে কিছুতেই বাইরে বেরুতে পারছে না, অলির অপেক্ষার পালা কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। অলির পক্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে কলির অনুকূলে প্রণয়লিপি রচনা করতে হয়েছে। নজরুলের গানে এসে আমরা দেখবো, সেই লাজুক কলিই কথা বলতে শুরু করেছে, বলছে, আমার এই ভয়ের দেয়াল ঠেলে তুমি কেন ভেতরে আসলে না। কলি জানান দিচ্ছে, সেও অলির প্রেমেই শতভাগ সমর্পিত। যাকে জয় করা হয়েছে তাকে দখলে নেওয়ার কাজটি অসম্পন্ন থেকে গেল, এই আক্ষেপই নজরুলের গানটিকে বিশেষত্ব দিয়েছে। ভয় ভেঙে কাছে গেলেই কলির আত্মদান সার্থকতা লাভ করতো। প্রিয়তমার না-বোধক প্রত্যাখ্যানের শরীরেও যে হ্যাঁ-সূচক সম্মতি মুদ্রিত থাকে, এটা বুঝতে না পারার দুঃখ ধরা পড়েছে নজরুলের গানটিতে। পুরো গানটিতে একবার চোখ বুলানো যাক :
ভীরু এ মনের কলি ফোটালে না কেন ফোটালে না—
জয় করে কেন নিলে না আমারে, কেন তুমি গেলে চলি ॥
ভাঙ্গিয়া দিলে না কেন মোর ভয়,
কেন ফিরে গেলে শুনি অনুনয়;
কেন সে বেদনা বুঝিতে পার না মুখে যাহা নাহি বলি ॥
কেন চাহিলে না জল নদী তীরে এসে,
সকরুণ অভিমানে চলে গেলে মরু-তৃষ্ণার দেশে ॥
ঝোড়ো হাওয়া ঝরা পাতারে যেমন
তুলে নেয় তার বক্ষে আপন
কেন কাড়িয়া নিলে না তেমনি করিয়া মোর ফুল অঞ্জলি ॥
লক্ষ করছি, শুধু মুখের কথা শুনে ফিরে যাওয়ার ফলেই আজ দুজনের দুটি পথ দুই দিকে বেঁকে গেছে। সাধক লালন আমাদের জানিয়েছেন, ‘সমুদ্রের কিনারায় থেকে জল বিনে চাতকী মরলো/হায়রে বিধি, ওরে বিধি, তোর মনে কি ইহাই ছিল’। আর প্রেমিক নজরুল বলছেন, ‘কেন চাহিলে না জল নদী তীরে এসে,/সকরুণ অভিমানে চলে গেলে মরু-তৃষ্ণার দেশে।’ মোক্ষ বা নির্বাণ লাভের জন্য যে নিবিড় সাধনার কথা আমাদের সাধকপুরুষেরা বলেছেন। নজরুলও প্রেমসাধনায় একনিষ্ঠ হওয়ার কথাই বলেছেন। ঝোড়ো হাওয়ায় বৃক্ষচ্যূত পাতার মতোই বিধ্বস্ত প্রেমিকহৃদয় প্রিয়তমার বক্ষে আশ্রয় অস্বেষণ করেছে। কিন্তু ভাষার সীমাবদ্ধতা কিংবা যোগাযোগবৈকল্যের প্রভাবে এই অঞ্জলি নিবেদন ব্যর্থ হয়ে গেছে। ফলে দুই বিরহী-হৃদয়ের মাঝখানে আজ সাতসমুদ্র তের নদী। নজরুল যখন বলেন ‘কেন কাড়িয়া নিলে না…’ তখন জয় গোস্বামীর ‘¯œান’ কবিতার কথা খুব মনে পড়ে, যেখানে কবি বলেছেন, ‘জানি, পুরুষের কাছে দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছ।’ পুরুষের কাছে নারীর প্রত্যাশার ব্যাকরণ বুঝে নেওয়ার ব্যাপারটি যখন স্পষ্ট হয়ে যায়, তখন আক্ষেপ, দীর্ঘশ^াস ও অশ্রুবর্ষণ ছাড়া আর তেমন কিছু করার থাকে না। ভুল শুধরে নতুন করে জীবনযাপনের মতো দীর্ঘ নয় মানুষের জীবন। এ-কারণেই দুঃখ ও দীর্ঘশ^াস আমাদের নিত্যসঙ্গী। নজরুলের গীতবাণীতেও সেই আক্ষেপ ও আর্তনাদে ভারাক্রান্ত জীবনের রূপকল্প মুদ্রিত।
রবীন্দ্রনাথের গীতবাণীর কলি প্রকৃতির সহজ-স্বাভাবিক প্রাণরস নিংড়ে নিয়েই সরস ও সমৃদ্ধ, একইসঙ্গে মানবচৈতন্যের সমান্তরালে পাপড়ি মেলার প্রত্যাশায় উজ্জীবিত। বাংলার জল-হাওয়ার আনুকূল্য তার মজ্জাগত। তাই এর স্পর্শ অনুভব বা সান্নিধ্যলাভের ব্যাকুলতায় চিত্ত ও চিন্তার প্রসারণ অধিকতর প্রাণবন্ত। অন্যদিকে নজরুলের কলি শুরু থেকে মনের প্রতিনিধি হিসেবে চিত্রিত। কোনো রকম কল্পনার প্রশ্রয় এতে প্রত্যাশিত নয়। মন ও কলির অভিন্ন সম্পর্কসূত্র যে রূপকাশ্রয়ী অভিজ্ঞান রচনা করে, তা কবি-নির্দেশিত মানবচিত্তের সীমানা অতিক্রম করার প্রতিশ্রুতি নির্মাণ করে না। ভীরুমনের অব্যক্ত বাসনাই এখানে কলির কণ্ঠস্বরকে করুণ ও আদ্র করে তুলেছে। রবীন্দ্রনাথ যেখানে বনের শ্যামলিমা থেকে মনের গহনে যাত্রা করেছেন, নজরুল সেখানে মন থেকে বনের দিকে ছুটেছেন, পরম মমতায় মানববেদনাকে প্রকৃতির শরীরে লেপ্টে দিয়েছেন।
কাজী নজরুল ইসলামের এই গীতবাণীকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সমান্তরালে রেখে পাঠ করার মাধ্যমে প্রেমিক হিসেবে এই দুই মহামানবের ব্যক্তিত্ব ও বৈদগ্ধ্যের স্বরূপ উন্মোচন আমার উদ্দেশ্য নয়। একটি সিদ্ধান্তে হয়তো উপনীত হওয়া সম্ভব, কিন্তু তার জন্য এই দুই গীতবাণীর নিবিড় পাঠ ও পর্যালোচনা আবশ্যক। তার জন্য চাই গানের মানুষ, যিনি কথা ও ছন্দের সঙ্গে সুরের নিবিড় সম্পর্কের গতিবিধি অনুধাবনে পারঙ্গম। গানের সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তা কেবল ভালোবাসার, সেখানে যুক্তিতর্ক, ভালো-মন্দ, সম্ভব—অসম্ভবের কোনো জায়গা নেই। নজরুলের ভাষায় বলতে গেলে, ‘ভালোবাসি এই আনন্দে আপনি আছি ভোর।’ বিভোর মনের বিহ্বল উচ্চারণ সঙ্গত কারণেই প্রথাবদ্ধ ব্যাকরণ কিংবা প্রত্যাশিত যুক্তির শৃঙ্খলে সন্নিবেশিত হওয়ার কথা নয়। সুতরাং স্বীকার করা ভালো, কালজয়ী দুটো গান অবলম্বনে বাংলা গানের দুই মহান ¯্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ছাড়া এই রচনার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল গানের ভেতর দিয়ে জগৎ ও জীবনের বিচিত্র আনন্দযজ্ঞে আমাদের আমন্ত্রণ জানান। কেবল গানের মানুষ তাঁরা নন, আমাদের প্রাণের মানুষও। এই দুই মহামানবের অসংখ্য গান বাঙালি পাঠক-শ্রোতার প্রাণের সঙ্গে মিছে আছে।দুটো গানের সঙ্গে প্রাণ বেঁেধ নেওয়ার এই আয়োজন পাঠক-শ্রোতাকে নিশ্চয়ই আরো অনেক গানের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। প্রেমের যে বেদনাকে আমরা সযতেœ অন্তরে লালন করে পরিতৃপ্তি খুঁজি, সেই বেদনারই দুই ভিন্নতর শিল্পস্মারক এই গান। দুই কবির গীতবাণীতেই দুই ভিন্নতর বাস্তবতায় কিংবা অদৃশ্য ও অবাস্তব কারণে বিকশিত পুষ্পের পূর্বাবস্থা অর্থাৎকলির প্রসঙ্গ উপস্থিত। রবীন্দ্রনাথে অলির প্রসঙ্গ থাকলেও নজরুল অলির আড়াল ভেঙে সরাসরি নিজেই মঞ্চে নেমে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথের আড়ালও যে খুব শক্তিশালী কিংবা দুর্ভেদ্য একথা বলা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল— দুজনের গানেইকলির উদ্ভাসন ও অলির গুঞ্জরন ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয়েছে, অর্থাৎ দুজনেই শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে ফিরেছেন; প্রেমিক হৃদয়ের নিবিড়-গভীর অভিব্যক্তিকে ধারণ করে তাঁরা ‘সকল কালের সকল কবির গীতি’ সৃষ্টি করেছেন।

**************************

কবিতার উপযোগ, কবিতার বিনোদনধর্মিতা
সরকার মাসুদ

কোনো পাঠক যখন বলেন, অমুখের অমুক কবিতাটি ভালো লাগলো; তার অর্থ পাঠক স্বীকার করলেন যে, ওই কবিতাটির পাঠ তাকে আনন্দ দিয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, কবিতার আনন্দ দেয়ার ক্ষমতা আছে। আর, যে কাব্য পাঠককে আনন্দ দিতে পারে না তা, আমার মতে, আদৌ কাব্য নয়। কতো অজ¯্র বিষয় নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছে, হচ্ছে। বৈচিত্রের কোনো সীমা নেই। বউভাত বা সেলাইকল নিয়েও কবিতা লেখা হয়েছে আবার সেফটিপিন বা বলপেন নিয়েও হয়েছে। কিন্তু উপজীব্য যা-ই হোক আমরা পাঠকরা চাই সেই কবিতা পড়ে উদ্দীপ্ত হতে, আনন্দিত হতে, কখনোবা অনুপ্রাণিত হতে।
কবিতা যেমন অনেক রকম তার পাঠকও অনেক রকম। কিছু পাঠক আছেন যারা বন্দে আলী মিঞা কিংবা জসীম উদ্দীনের কবিতা বোঝেন। বড়জোর শামসুর রাহমানের অপেক্ষাকৃত সহজ কিছু কবিতা তাদের আনন্দ দেয়। আরেক ধরনের পাঠক জসীম উদ্দীন, জীবনানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আল মাহমুদ— সবার কবিতাই পছন্দ করেন। পাঠক যদি সুরসিক হন, তাহলে তার অর্জিত বিদ্যা-বুদ্ধি বা ইনটেলেক্ট কবিতার রসাস্বাদনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আমরা, যারা স্বাধীনতাযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে আধুনিক কবিতা লিখছি, বরং চাই ওই সুশিক্ষিত-রসিক পাঠকবর্গকেই। তার কারণ আমাদের কবিতার কল্পছবি, ইশারা-ইঙ্গিত, একান্ত ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার নির্যাস, অনুভবের বহুরূপিতা বুঝতে হলে এই শ্রেণীর পাঠকের বিকল্প নেই। তবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রি না থাকলেও একজন মানুষ আধুনিক কবিতার ভোক্তা হতে পারেন। তার সংখ্যা নগণ্য নয় এবং তারা ব্যতিক্রম।
একটা সময় ছিল (কমপক্ষে চল্লিশ বছর আগের কথা বলছি) যখন কবিতা পড়ে মানুষ প্রায় সিনেমা দেখার আনন্দের মতই বিনোদন পেতেন। সেকালে তো আর এখনকার মতো ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এতো হাতছানি ছিল না। বিনোদনের এতসব বিচিত্র মাধ্যমও ছিল না। লোকজন রেডিও শুনতো, যাত্রা-থিয়েটার দেখতো, গৃহবধূদের একটা বড় অংশ পড়তো নভেল। আর যারা একটু উন্নত পাঠক তারা কবিতা পড়তো। অতীতের মতো এখনো অগ্রসর পাঠকরাই কবিতার অনুরাগী। যদি একশজন উপন্যাস পাঠককে হাজির করানো হয়, দেখা যাবে তাদের মধ্যে ১০/১৫ জন কবিতা পড়েন। কিন্তু কবিতা পাঠকদের একটা বড় অংশ গল্প-উপন্যাসও পড়েন। এখানে একটা প্রশ্ন এসে যাচ্ছে, কবিতার কাছে কি মানুষ কেবলই বিনোদী উপকরণ আশা করে? ৪০/৫০/৬০ বছর আগে কবিতা পড়ে লোকজন যে মজাটা পেতেন আজকে তা পাচ্ছেন না বলে কবিতার বিক্রি-বাটা ভীষণ কমে গেছে। অথবা এভাবেও বলা চলে কবিতা আর আগের মতো পাঠকের সনে কমিউনিকেট করতে পারছে না কেননা কাব্য তার পূর্বতন সরলতা-সহজতা খুইয়ে বসে আছে। জীবনানন্দ-উত্তর বেশ কয়েকজন কবির রচনারীতির ভেতর আমরা শব্দের সহজতাকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রযুক্ত হতে দেখেছি। তা সত্ত্বেও ওই যোগাযোগ না ঘটার সমস্যা। এখন কবিরা এক্ষেত্রে কী করতে পারেন? কবিতা বোঝার ব্যপারটা কবিতার পাঠ-অনুশীলনের সঙ্গেও অনেকখানি সম্পর্কিত। রবার্ট ফ্রস্ট ওই যে বলেছিলেন, আধুনিক কবি তিনিই যিনি আধুনিক পাঠককে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম; কথাটা ভেবে দেখুন। আধুনিক পাঠক মানে তো সেই ব্যক্তি যার মনটাও আধুনিক। তিনি সব রকম পশ্চাৎপদতার ঊর্ধ্বে এবং মুক্ত চিন্তা-চেতনার ধারক। কিন্তু আমরা কী ধরনের লোক দেখতে পাচ্ছি চারপাশে? পৃথিবীতে শিল্প-সাহিত্যের এত সব আন্দোলনও বিপ্লব ঘটে যাওয়ার পরেও, এই ২০১৯ সালেও, এখানে মানুষ পদ্যকে কবিতা মনে করে। পঙক্তির শেষে মিল, পরিচিত উপমা, পরিচিত দৃশ্য বা সহজবোধ্য শব্দের ব্যবহার না থাকলে তা কবিতা হিসেবে গৃহীত হয় না তাদের সনাতন ধারণা ক্লিষ্ট মাথায়।
অগ্রসর কবিদের মতো এগিয়ে থাকা পাঠকরাও চান কবিতা মনোরঞ্জক উপাদানের পাশাপাশি চিন্তা বা গভীরভাব-কল্পনা থাকুক। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ইয়েটস, নেরুদা, আখমাতোভা, লারকিন প্রমুখ ‘বড়কবি’ হিসেবে নন্দিত হয়েছেন কেন? কারণ তাদের সমৃদ্ধ জীবনাভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সহজ গভীর এক একটি শৈলী যুক্ত হয়ে ফলিয়েছে অভিনতুন শিল্পফসল। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তো সেই ১৭৯৮ সালেই কবিতায় সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ব্যবহারের কথা বলেছিলেন। মাঝখানে দুশবছরের ভেতর অনেকেই সেই চেষ্টা করেছেনও। ওয়ার্ডসওয়ার্থ নিজেও, অত আগে, সাধ্যমতো ওই কাজ করেছেন। রোমান্টিক যুগের অপরাপর কবিদের পাশাপাশি তার কবিতা পড়লেই এই ভাষাজনিত তফাৎটি চোখে পড়ে। কবিদের অনেকেই, বিশেষ করে তরুণ কবিরা, একটি কথা ভুলে যায়। তা হচ্ছে বিশ্বের তাবৎ প্রথম শ্রেণীর কবিতা প্রথম শ্রেণীর বিনোদনের জোগানদাতা। অনবদ্য কবিকল্পনা, ভাবপ্রকাশের বিশেষ নিজস্ব ধরণ এগুলো তো থাকেই, তার সঙ্গে থাকে ওই শব্দের জাদু যা মজাদার হয়ে ওঠে শব্দের সঠিক প্রয়োগের গুণে। জীবনের অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা অল্প-বিস্তর সবারই থাকে। কিন্তু একজন কবি জীবন সম্পর্কে সঞ্চিত যাবতীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটান তার কবিতায়। তা যদি হৃদয়গ্রাহী হয়ে ওঠে, তাহলে কবির অভিজ্ঞতা ও ভাবকল্পনার অনেক কাছাকাছি পৌঁছে যায় পাঠকের অভিজ্ঞতা। কবিতার পাঠক তখন তৃপ্তি পান। বিনোদনের সূত্রটি আসলে এখানেই নিহিত।
মজা বা শান্তি পাওয়ার মতো বিষয়বস্তু অথবা নানাবিধ শিল্প-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও, আমরা দেখেছি, অপ্রচল কিংবা দুর্বোধ্য শব্দের সমাহার একটি কবিতাকে কীভাবে দরিদ্র করে ফেলে। সুতরাং তারাপদ রায়সুলভ ‘জলের মতো কবিতা’ বা বিনয় মজুমদারের শেষ জীবনের অভাবনীয় সহজ কবিতাগুলো লেখার পেছনে তাদের গভীর ভাবুক মনে কেমন অভিপ্রায় সক্রিয় ছিল ভেবে দেখতে হবে। ভিক্টোরিয়ান আমলে কারো কারো কাব্যে গল্পের উপাদান ছিল। রবার্ট ব্রাউনিং-এ ছিল; রবীন্দ্রনাথেও। তারপর মাঝখানে বহুকাল আমরা গল্পের দেখা পাইনি কবিতায়। এডুইন এরলিঙটন রবিনসনের মতো কেউ কেউ আবার গল্প ব্যবহার করেছেন কবিতায়। সত্তরের প্রজন্মে এটা সবচেয়ে বেশি প্রযুক্ত হয়েছে দেশে-বিদেশে। যদি বলি এর পেছনে আধুনিক কবিতাকে জনপ্রিয় করে তোলার প্রায়-অসম্ভব বাসনা সক্রিয় ছিল; তাহলে কি খুব ভুল বলা হবে? আমরা তো জানি আধুনিক কবিতা একটা বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তিক লেভেলে বড়জোর পাঠকপ্রিয় হতে পারে, যেমনটা ঘটেছে রিলকে, লোরকা, জীবনানন্দের মতো কবিদের বেলায়, কিন্তু জনপ্রিয় হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। নানা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিগণ আমাদের প্রিয় লেখক। এই কবিদের আছে মানুষ সম্বন্ধে পরিচ্ছন্ন ধারণা, অনুভূতির শক্তিমান প্রকাশ, ভালোবাসার বিশাল হৃদয়। আর তাদের কবিতা কোননা কোনোভাবে প্রকাশ করেছে স্বদেশের আত্মার ছবি।
কবিতা, সুতরাং, মানুষকে উদ্দীপ্ত হতে, দয়ায় আর্দ্র হতে, বিস্ময়ে অভিভূত হতেও ভালোবাসতে শেখায়। কবিতা অসঙ্গতি ভরা সমাজের বদল ঘটাবে, সমাজে বিপ্লব আনবে এসব মূল্যহীন কথা। তবে সমাজবাদী কবিতা সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের মৌলিক অধিকার সমূহ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে পারে। সিকিপ্রেমিক বা আধুলিপ্রেমিক মানুষকে পুরোপুরি প্রেমিক বানাতে পারে। উন্নত মানের কবিতা মানুষকে মূল্যবোধের গুরুত্বও বোঝাতে সক্ষম। শেষ বিচারে কবিতা তো শিল্প। অন্যান্য শিল্পকলা যেমন রস-অন্বেষী মানুষকে নির্মল ভালোলাগার অনুভূতি দেয় তেমনি কবিতাও রস উপভোগের মাধ্যমে পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকার গভীরতর অর্থ জোগান দেয়। এভাবে একজন মানুষ, যিনি কাব্যানুরাগী, নিজেকে জীবনের অনেক তুচ্ছতা ও কালিঝুলির ঊর্ধ্বে স্থাপন করাতে শেখেন। কবিতার এর চেয়ে বড় উপযোগ আর কী থাকতে পারে?

**************************

বই, বুদ্ধিজীবী ও ঢাকাই সাহিত্য
মাসুদ পারভেজ

যে কোনো বই দেখলে প্রথমেই যে-প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খায়— কেন পড়বো বই? তারপর মনে হয় এই ধরনের প্রশ্নের আদৌ কোনো পরিস্থিতি আছে কিনা? তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তার কবি উপন্যাসে ‘জীবন এত ছোট কেনে’ কথাটার মধ্যে এমন রোমান্টিক আবহ দান করেছেন যে, মনে হয় আসলেই জীবন বড়োই ছোটো। কী করি আর না-করি এই করতে করতে দম শেষ। তো সীমিত দম নিয়ে এই আদম জীবনে সংসার করে শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ‘সং’ হয়েই কেবল থাকা হলো, জীবনে আর ‘সার’ জমিল না। এই ‘সার’ না-জমার কারণ কী? কিংবা যাদের জীবনে ‘সার’ জমে তারা কারা? এই ‘সার’ কোথায় পাওয়া যায়? ফলে জীবনকে যদি কিঞ্চিৎ সারময় করে তোলার আগ্রহ হয় আর তখন ‘ট্যাসিট নলেজ’ (অব্যক্ত জ্ঞান) থেকে একখানা বই লিখে প্রকাশ করা যায় তাহলে কী ঘটতে পারে বা ঘটে? বাঙাল জগৎজীবন নিয়েই ব্যাপারটা একটু নাড়াচাড়া করা যাক।
বাঙালের দেশে প্রতিবছর বইমেলায় প্রচুর বই বের হয়। তখন এটা নিয়ে স্বভাবসিদ্ধভাবে যে-প্রশ্নটা ঘুরে এত এত বই কিন্তু পাঠক কারা? আরও খোলাসা করে বললে, ক্রেতা কই? কিন্তু প্রশ্নটা আরও গভীরতর যে, এত বই পড়ার সময় কই? তখন সহজভাবে বিষয়টাকে বলা যায়, সব বইয়ের পাঠক তো সবাই না। তাহলে বইয়ের পাঠকের বিভাজন আছে। তখন প্রশ্ন আসে এই বিভাজনটা কি অর্থনৈতিক নাকি সামাজিক নাকি রাজনৈতিক নাকি বুদ্ধিবৃত্তিক? এর বাইরে আরও থাকতে পারে। কিন্তু সংকটটা ঘনীভূত হয় যখন বইয়ের লেখকদের মধ্যে বিভাজন করা হয়। আর এই বিভাজনটা হয় নানাদিক থেকে : কেন্দ্র বনাম প্রান্ত, এক্সপ্লিসিট নলেজ বনাম ট্যাসিট নলেজ, লিটল ম্যাগাজিন বনাম দৈনিক পত্রিকা, সিরিয়াস ঘরানা বনাম পপুলার ঘরানা, মিডিয়ার আশীর্বাদযুক্ত বনাম মিডিয়ার আশীর্বাদমুক্ত ইত্যাদি। এমন বহুধাবিভক্ত বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হওয়া বাঙাল লেখক বই লেখেন। এখন যারা ‘ট্যাসিট নলেজ’-এ একটা বই লিখে প্রকাশ করে ফেলেন এবং স্যোশাল মিডিয়ার এই যুগে ফেসবুক, টুইটার, ইন্সট্রাগ্রাম এসবে বিজ্ঞাপন দিয়ে, বইয়ের কাভার আপলোড করে, ক্রেতাসহ বই বিক্রির ছবি কিংবা অটোগ্রাফ দেয়া ছবি আপলোড করে সত্য হোক বা মিথ্যা হোক বই বিক্রি সংক্রান্ত নানারকম তথ্য উপস্থাপন করেন তখন এই কর্মযজ্ঞকে কীভাবে বিচার করা যেতে পারে? সেক্ষেত্রে উত্তর পাওয়া যাবে, তার পক্ষে এবং তার বিপক্ষে। পক্ষের লোকেরা কিংবা লেখকেরা বলেন, এটা করা যেতেই পারে। পুঁজির এই সময়ে যখন সবকিছুই পণ্য তখন বই বাদ থাকবে কেন! আর বইটা তো লেখকের গাঁটের পয়সা দিয়ে ছাপাতে হয়েছে। ফলে সে টাকা ফেরত পাবার আশায় নিজের বই নিজে বিক্রি করার জন্য সাজনদারি কৌশল নিতেই পারে। তখন প্রশ্ন জাগতে পারে শুধুই কি তার টাকার ধান্দা? তখন উত্তর না-এর দিকে বেশি ঝোঁকে। কারণ জীবনটা সারময় করে তোলার জন্য তার ‘ট্যাসিট নলেজ’ দিয়ে যে-সাহিত্য তিনি রচনা করলেন তাতে তার মধ্যে একটা রোমান্টিক আবহ তৈরি হলো। ফলে তার সংসার জীবনে অনেক না-পাওয়ার কিংবা স্বপ্নভঙ্গের যে-কড়চা সেটা দিয়েই তিনি একটা আখ্যান বানালেন। কিংবা তার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যাকে মর্তবাসী বানিয়ে কিংবা ব্যর্থপ্রেমের পসরা নিয়ে কবিতা লিখলেন। এসব পাঠককে আকৃষ্ট করলো। কোন পাঠক? যে-পাঠকও ‘ট্যাসিট নলেজ’ নিয়ে চলে। ফলে এখন ঘটনা হলো বইটা কিনে পাঠক যখন স্যোশাল মিডিয়ায় প্রশংসা শুরু করলো তখন ওই লেখক অন্য লেখকদের আক্রমণের মুখে পড়ে গেল। এই অন্য লেখক কারা? ‘এক্সপ্লিসিট নলেজ’ (ব্যক্ত জ্ঞান) দিয়ে যারা লেখেন তারা। ফলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়ালো? ‘এক্সপ্লিসিট নলেজ’ধারী লেখকেরা বলতে থাকলেন যে, এইসব মৌসুমী লেখকদের ভীড়ে বইমেলার টিকে থাকা দায় কিংবা এসব বই কিনে পাঠক প্রতারিত হয় এবং সাহিত্যসমাজ কলুষিত হচ্ছে। এইসব বুলি কিংবা ফতোয়া এগুলোও কিন্তু একধরনের রোমান্টিক প্রকল্পনা। কারণ যিনি বা যারা এসব বলছেন তারাও চান পাবলিসিটি, জনপ্রিয়তা কিংবা পাঠকপ্রিয়তা। কিন্তু যে কোনো কারণে তিনি বা তারা যখন এটা পান না তখন তারা এসব প্রকল্পনা তৈরি করেন। যার মধ্যে একটি বাক্য প্রায়ই শোনা যায়, এসব লেখা টিকবে না। এই যে বইয়ের পণ্য হয়ে ওঠা কিংবা লেখক-পাঠক সম্পর্ক তৈরি হওয়া এটা তো বাঙালের বইমেলাকেন্দ্রিক শুরু হওয়া কিংবা ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা না। এটার সঙ্গে রোমান্টিসিজম-এর যোগসূত্র খেয়াল করা দরকার।
আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি অবধি ইউরোপের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে শিল্প-সাহিত্যে একধরনের প্রতিক্রিয়া হল রোমান্টিকতাবাদ। রোমান্টিকতাবাদ সব দেশে একসঙ্গে কিংবা কোনো একধরনের সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঘটেনি। তবে কয়েকটি লক্ষণীয় সূত্র ছিল : ক. ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতার বদলে ‘বাজারের’ আবির্ভাব অতএব লেখক/লেখিকা পাঠক/পাঠিকার মধ্যে নতুন সম্পর্কস্থাপন। খ. ‘জনসাধারণ নামক নতুন ধারণার প্রতিষ্ঠা, গ. শিল্পকে একটি বিশেষরকমের উৎপাদন হিসেবে চিহ্নিত করা, ঘ. কল্পনার জগৎ হল ‘উচ্চতর বাস্তব’-এ নিয়ে শিল্পের নতুন তত্ত্ব সৃষ্টি। ঙ. শিল্পীকে অভিনব এবং স্বতন্ত্র প্রতিভা ভাবার নিয়ম।১
ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতার প্রসঙ্গানুযায়ী যদি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আলোকপাত করা যায় তাহলে দেখা যাবে সামন্তীয় শাসন ব্যবস্থায় সাহিত্যচর্চার যে-প্রেক্ষাপট তাতে সামন্ত শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্য রচিত হয়েছে। রাজসভার কবি হিসেবে তারা পরিচিত। ওইসব সাহিত্যের সাহিত্যিকমূল্য নিয়ে যদিও প্রশ্ন থাকতে পারে কিন্তু সেটা সাহিত্য হিসেবে অস্বীকারের জায়গা নাই। সামন্তবলয় ফুরিয়ে যাওয়ার পর সাহিত্যচর্চার যে-জগৎ গড়ে ওঠে সেখানে লেখক ও পাঠক নামক ধারণার তৈরি হয় আর বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটা পণ্য হিসেবে প্রক্রিয়াজাত হতে থাকে। ফলে বই বিষয়টা জনসাধারণের কাছাকাছি চলে আসে এবং লেখক ও পাঠকের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক সৃষ্টির জায়গা তৈরি হয়। ‘বঙ্কিমচন্দ্র যেমন তাঁর উপন্যাসে উদ্দিষ্ট ভোক্তাকে বারবার সম্বোধন করেছেন ‘পাঠক’ বলে।’২ লেখক ও পাঠকের এই ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গাটা বর্তমান সময়ে ‘স্যোশাল মিডিয়ায়’ আরও খোলাসাভাবে চর্চা করা যায়। এটা গেলো একটা ঘরানা। যারা সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে বেশিদূর যেতে পারে না। কারণ একজীবনের কাহিনি কিংবা ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে যে ‘ট্যাসিট নলেজ’ কাজে লাগানো হয় তার সঙ্গে যদি পরবর্তী পর্যায়ে ‘এক্সপ্লিসিট নলেজ’ যুক্ত না হয় তাহলে তার লেখার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ফলে ওই প্রক্রিয়া পাঠক খুব সহজে ধরে ফেলে এবং লেখকের প্রতি আগ্রহ হারায় এবং লেখক পাঠক হারায়। এই ঘরানার বিপরীত যারা সেই সব লেখকের প্রসঙ্গে আসা যাক। মানে যারা ‘এক্সপ্লিসিট নলেজ’ধারী লেখক। বাঙালের দেশে পেশাদারী সাহিত্যচর্চার কোনো অবস্থা আছে কিনা? উত্তরে অধিকাংশ মত ‘না’-এর পক্ষে যাবে। কারণ প্রকাশক কিংবা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা থেকে খুব কমসংখ্যক লেখক রয়্যালটি বা লেখনী সম্মানী পেয়ে থাকে। আর যা পায় তা দিয়ে জীবিকা চালানো সম্ভব নয়। ফলে সত্যিকার অর্থে বাঙাল লেখকেরা পেশাদার হয়ে উঠতে পারেনি। আর এই পেশাদার না-হয়ে উঠতে পারার যে-ব্যাপারটা তারা কীভাবে দেখে? এই ব্যাপারটা নিয়ে তারা একধরনের ফ্যান্টাসি তৈরি করে। ফলে তারা নিজেদের মধ্যে যে-রোমান্টিক প্রকল্পনা তৈরি করে তাতে নিজেদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে উপস্থাপন করে। কারণ আর্থিকভাবে যখন তারা পেশাদার লেখক হয়ে উঠতে পারে না তখন তারা গল্প, কবিতা, উপন্যাস অর্থাৎ সাহিত্যচর্চা করে নিজেদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত করে একটা আইডেনটিটি তৈরি করতে চায়। এভাবে কি বুদ্ধিজীবী হওয়া যায়? বুদ্ধিজীবী শব্দটা ভাঙলে দাঁড়ায় ‘যারা বুদ্ধির বলে বা বুদ্ধির কাজ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।’ পৃথিবীর সকল পেশাজীবী মানুষকেই তো বুদ্ধি দিয়ে কাজ করতে হয় যতই শারীরিক কাঠামো ব্যবহার করা হোক বুদ্ধি ব্যবহার না-করলে কর্ম সম্পাদন হয় না। সেক্ষেত্রে সাহিত্যচর্চা করে বুদ্ধিজীবী সাজার যে-প্রেক্ষাপট তাতে আবার সামন্তবলয়ের সাহিত্যচর্চার দিকে চোখ ফেরাতে হয়। তো ওইকালে সাহিত্যিকরা সাহিত্যচর্চা করেছেন আর রাজকোষাগার থেকে তার জীবিকার ব্যয়ভার বহন করা হয়েছে। ফলে ‘এক্সপ্লিসিট নলেজ’ধারী যারা সাহিত্যচর্চা করে নিজেকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে দেখেতে চান তারা আসলে ওই সামন্তীয় বলয়ের সাহিত্যিকদের মতো একটা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য চায়। রাষ্ট্রের কি তাদের প্রয়োজন আছে? আছে। রাষ্ট্র তার শাসন কাঠামোকে বৈধ করার জন্য কিছু মুখপাত্র তৈরি করে। যাদের দিয়ে খুব সহজে রাষ্ট্রীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যায়। এই তালিকায় লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকার সবাই থাকেন। ফলে এজেন্ডাভিত্তিক সাহিত্য, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্র তৈরি হতে থাকে। ফলে শাসকগোষ্ঠী যখন কোনো জনবিরোধী প্রকল্প হাতে নেয় তখন জনসাধারণ মনে করে যে, বুদ্ধিজীবীগোষ্ঠী এটার বিরোধিতা করবে এবং কলম ধরবে। কিন্তু ব্যাপারটা বাস্তবে সেরকম ঘটে না। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে তৈরি বুদ্ধিজীবী বরং উলটো কাজটা করে। ফলে তাদের বুদ্ধিজীবীতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়। ওইসব রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যধারী লেখক রাষ্ট্র থেকে স্বীকৃত পদক, পুরস্কার পায় ঠিকই কিন্তু সেটা আশলে সাহিত্যিক হিসেবে না। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের বাইরে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে দেশীয় মিডিয়া হাউজগুলোও বুদ্ধিজীবী পোষে। দেশীয় মিডিয়া হাউজগুলো ওইসব বুদ্ধিজীবীদের বগলদাবা করে রাখে বিনিময়ে কর্পোরেট সুবিধা প্রদান করে যার মধ্যে প্রচলিত সাহিত্য পুরস্কারগুলো অন্যতম। ওইসব বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক দিয়ে তারা নিজেদের এজেন্ডাভিত্তিক কলাম লেখানো থেকে শুরু করে টেলিভিশনের টক শো করায়। এটা যেন পুঁজির সামন্ত শাসন। পরিস্থিতি যখন এমন তখন ঢাকাই সাহিত্য নিয়ে কী বলা যায়? ঢাকাই সাহিত্য বলতে ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার প্রেক্ষাপটকে বোঝানো হচ্ছে। তখন ‘কেন্দ্র’ আর ‘প্রান্ত’ এই বিষয়টা চলে আসে। এই কেন্দ্র আর প্রান্ত ধারণায় ক্ষমতাকেন্দ্রিক যে-প্রেক্ষাপট তাতে উচ্চকোটির সাহিত্য আর নি¤œকোটির সাহিত্য বিষয়টা ধরা জরুরি হয়ে পড়ে। যেহেতু ঢাকা থেকে জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতা বের হয় তাই ঢাকা কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত। এর বাইরে যা কিছু সবই প্রান্ত হিসেবে পরিগণিত। ফলে ঢাকার বাইরে যে-লেখকের আবাস তিনি কেন্দ্রবাসী না-হতে পারলেও তার মধ্যে আকাক্সক্ষা থাকে অন্তত তার লেখাটা যেন কেন্দ্রাভিমুখী হয়। কিন্তু প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে জায়গা পাওয়া তো সহজ কর্ম না। ফলে তাকে কৌশল খুঁজতে হয়। আর দৈনিকের সাহিত্য পাতা যেহেতু তাদের নিজস্ব এজেন্ডা ও ফর্মুলা নিয়ে চলে ফলে চাইলেই তো সেখানে প্রবেশ করা যায় না। ফলে ঢাকাই সাহিত্যে আসন পেতে লেখককে প্রথমে ফর্মুলা আয়ত্ত করতে হয়। কী ধরনের ফর্মুলা? ফর্মুলা সাহিত্যে ভাষা, বিষয়, শব্দসংখ্যা, শাসক, শোষক সবদিক বিচার বিশ্লেষণ করে যদি সেটা পত্রিকার কোনো ক্ষতি না-হয় কিংবা তাদের পক্ষে সাফাই হয় তবেই সেটাকে আমলে নেওয়া হয়। তো লেখা ছাপানোর জন্য এইসব ফর্মুলার ভেতর দিয়ে যখন একজন লেখক যায় তখন তার লেখাটা ছাপানো হয় ঠিকই কিন্তু লেখাটা শিল্পমূল্য হারায়। এই শিল্পমূল্য হারানো সাহিত্য দিয়া ঢাকাই সাহিত্য কোথায় পৌঁছুবে? এই সাহিত্যের না-আছে রাজনৈতিক বাস্তবতা না-আছে শিল্পমূল্য। এই সাহিত্য কেবল পত্রিকার পাতা ভরায়। আবার ঢাকাই সাহিত্যে পত্রিকা কিংবা ওয়েবজিনভিত্তিক একধরনের চক্র লক্ষ করা যায়। যারা একজন আরেকজনকে প্রমোট করে। এই প্রমোট করাটা মন্দ কিছু নয়। কিন্তু সংকটটা দাঁড়ায় যখন তারা নিজেদের এই বৃত্তাবদ্ধ অবস্থাটাকে সাহিত্যের বিশেষ গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা দিয়ে একটা গোঁজামিল তৈরি করে নিজেদের উচ্চাসনে নিতে চায়। যেমন তারা নিজেদের পরাবাস্তববাদী সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সাহিত্যিকদের সঙ্গে তুলনা করেন এই বলে যে, যারা পরাবাস্তববাদী সাহিত্য রচনা করেছেন তারা একটা ‘সিন্ডিকেট’ গড়েছিল। ফলে তাদের চক্র বা সিন্ডিকেট থাকতেই পারে। আশলেই কি পরাবাস্তববাদীরা চক্র বা সিন্ডিকেট গড়েছিল?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তারপরের অর্থনৈতিক মন্দায় সমস্ত সভ্যতা যেন ধ্বস্ত হয়ে গেল, পরিচিত অস্তিত্বের উপর যেন সকলের আস্থা টলে গেল। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার সংকটে জীবন যতই নিরর্থক হয়ে গেল, ততই চেনা-বাস্তব বিষয়ে তরুণ সংবেদনশীল মন ক্ষুদ্ধ অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। তাঁরা বাস্তবের অতিব্যবহৃত বহিরঙ্গকে চূর্ণ করে নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে চাইলেন বাস্তবের পুনর্গঠন করতে এবং সংগতিবোধের এক নতুন সূত্র সন্ধান করতে।৩
ফলে যাবতীয় শাসনকে ভাঙাই ছিল পরাবাস্তববাদীদের লক্ষ্য। তো ঢাকাই সাহিত্যের লেখকেরা সিন্ডিকেট গড়ছেন ঠিকই কিন্তু সেটা কী কামে? বলতে হবে সেটা আকামে। কারণ এইসব সাহিত্য চক্র বা সিন্ডিকেট সাহিত্যে নতুন কোনো প্রবণতা বা বৈশিষ্ট্য বা ধারা কোনোটাই আনতে পারেনি। তারা যেটা করতে চেয়েছে, প্রান্তের লেখকদের সামনে নিজেদের উচ্চকোটির লেখক হিসেবে একটা প্রতিষ্ঠা। সেটা তারা পায় আবার পায় না। সেটা তার পায় প্রান্তের লেখকের কাছ থেকে। প্রান্তের লেখকের সংকট কোথায়? এইখানে ব্যাপারটা মনসা আর চাঁদ সওদাগরের কিস্সার মতো ঘটে। প্রান্তের লেখকের কাছে কেন্দ্র যেহেতু একটা ফ্যান্টাসি তাই সে চায় তার লেখাটা ছাপা হোক কিংবা কেন্দ্রের সঙ্গে একটা যোগাযোগ গড়ে উঠুক। ফলে তারা উভয়েই চাঁদ সওদাগর আবার উভয়েই মনসার চরিত্র ধারণ করে। একজন আরেকজনের পরিপূরক হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটটা কার্ল মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শনের ‘বিপরীতের ঐক্য ও দ্বন্দ্বমূলক প্রক্রিয়া’র ভিত্তিতে দেখা যাক। ‘প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে বিপরীত শক্তির ঐক্য ও সংঘাত। ঐক্যের মধ্যে যেমন বিদ্যমান রয়েছে দ্বন্দ্ব, তেমনি বিপরীত ধারায় দ্বন্দ্বযুক্ত শক্তি দুটি আবার রক্ষা করে চলেছে বস্তুর ঐক্য, একে অন্যকে প্রভাবিত করার ভিত্তিতে।’৪ ধরা যাক এখানে কেন্দ্র হচ্ছে মালিক মানে সাহিত্য সিন্ডিকেটধারী আর প্রান্ত হচ্ছে শ্রমিক মানে প্রান্তসীমার লেখক। ফলে মালিক চায় তার অনুকূলের পরিস্থিতি। ফলে শ্রমিককে দিয়ে উৎপাদন করানোতেই তার স্বার্থ। ফলে কেন্দ্র মানে সাহিত্য সিন্ডিকেটধারী, প্রান্ত মানে প্রান্তিক লেখককে দিয়ে তাদের বইয়ের রিভিউ, শংসাবচন, ফরমায়েশি লেখা এসব করায়। আর প্রান্তিক লেখক এসব করে কেন্দ্রাভিমুখী হওয়ার আশায়। কিন্তু সেরকম তো ঘটে না। মালিক তো কখনওই চায় না শ্রমিক তার সমকক্ষ হোক।
বিরোধী শক্তি বা শ্রেণীর দ্বন্দ্বমূলক প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান অবস্থা যে শ্রেণীর অনুকূলে, সে সাধারণত অবস্থার স্থায়ীত্বই প্রত্যাশা করে। এবং প্রয়াসী হয় বিদ্যমান অবস্থাকে স্থায়ী করতে। কিন্তু বিদ্যমান অবস্থা যে শ্রেণীর প্রতিকূলে, সে শ্রেণী চায় অবস্থার পরিবর্তন এবং প্রয়াসী হয় প্রত্যাশা বাস্তবায়িত করতে।৫
তখনই দ্বন্দ্বটা তৈরি হয়। কারণ প্রান্ত যখন নিজেই কেন্দ্র হতে চায় তখন কেন্দ্রের সিন্ডিকেট তাকে গ্রহণ করতে চায় না। অর্থাৎ সমকক্ষ করতে চায় না। আর যদি প্রান্তের ওই লেখক তার লেখনী দিয়ে কেন্দ্রের সিন্ডিকেটকে অতিক্রম করে ফেলে তাহলে তাকে আক্রমণের শিকার হতে হয়। আর যদি স্বীকারও করে তবে তাকে ওই সিন্ডিকেটের অধীনস্ত হয়ে থাকতে হয়। ফলে এখানে আবার সাবলটার্ন স্টাডিজের একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক নয়া রূপ দেখা যায়। আর পত্রিকার সাহিত্য পুরস্কারগুলোর ক্ষেত্রে এটা আরও পরীক্ষিত। লেখক যখন তার সাহিত্যকর্মের জন্য কোনো একটা পত্রিকার দেওয়া পুরস্কার গ্রহণ করেন সেটা তাকে যেন ওই দৈনিক পত্রিকার অধীন করে ফেলে। ফলে লেখক তার চিন্তার স্বাধীনতা হারায় এবং ওই পত্রিকার কাছে সাবলটার্ন হিসেবে নিজের পরিচিতিটা নির্ধারণ করে। তো লেখক যখন তার চিন্তার স্বাধীনতা হারায় তখন কিন্তু তার বুদ্ধিজীবীতা আর টেকে না। লেখক যখন ভাবনাজগতে, মনোজগতে একটি ঔপনিবেশিক কাঠামোতে আটকা পড়ে তখন আর তাকে দিয়ে রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারিতা, বেনিয়াদের ঠগবাজি এসবের বিরুদ্ধে কলমযোদ্ধার ভূমিকায় নেওয়া সম্ভব হয় না। এবং এই সংকটটা এখনকার ঢাকাই সাহিত্যে পুরোদমে চলছে। আর নিজেকে ‘কেন্দ্র’ ভেবে ভেবে মনের মধ্যে যে-অহং জমেছে তাতে তারা যেন কাউকেই আমল দেয় না শুধু খারিজ করা ছাড়া। যেমন ‘স্টুল-এগজামিন’ করলে জানা যায় দেহের খবরাখবর ঢাকাই সাহিত্যিকদের সঙ্গে বাতচিত করলে টের পাওয়া যাবে ঢাকাই সাহিত্যের খবর।
মানুষের মনের সমস্ত খবর থাকে তার মনের এক্স-ক্রিয়েটাতে বা মানসিক-স্টুলে। আমাদের সমস্ত প্রকারের কথন বাচন ভাষিক-প্রকাশন বা ডিসকোর্সই সেই মানসিক-স্টুল, মনোবিষ্ঠা। তাই মানুষের ভাষণ/কথনকে ঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করে নিতে পারলে আমরা সেই মানুষের মনের অবস্থার সমস্ত খবরই জেনে নিতে পারি।৬
তথ্যঋণ
১. বুদ্ধিজীবীর নোটবই; সম্পা : সুধীর চক্রবর্তী; নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি ২০১০; পৃ. ৫৬৫
২. ধর্ম নি¤œবর্গ ঠাট্টা : সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্তরমহল; সুমন সাজ্জাদ; অক্ষর; ঢাকা; ফেব্রুয়ারি ২০১৯; পৃ. ৮১
৩. বুদ্ধিজীবীর নোটবই; প্রাগুক্ত; পৃ. ৬৬৫
৪ ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিতে দর্শন; শরীফ হারুন; বাংলা একাডেমি; ঢাকা; আগস্ট ১৯৯৭; পৃ. ১১১
৫. প্রাগুক্ত; পৃ. ১১২
৬. আত্মহত্যা থেকে গণহত্যা : আসমানদারি করতে দেব কাকে; কলিম খান; নান্দীমুখ; কলকাতা, ২০০২, পৃ. ৮১

**************************

মানুষের আয়না, আয়নার মানুষ
মামুন মুস্তাফা

আজকাল গৃহসাজের অন্যতম উপকরণ হচ্ছে আয়না। দেয়াল জুড়ে আয়না থাকলে ঘরটাকে বেশ বড় দেখায়। ত্রিকোণ, চৌকো, লম্বা, বৃত্তাকার— বিভিন্ন ধরনের আয়না দিয়ে সাজানো যেতে পারে আপন গৃহ। তার কোনোটাতে দেখা যাবে চোখ, কোনোটাতে ঠোঁট। কিন্তু সমগ্র সত্তাকে দেখতে হলে প্রয়োজন ‘আপন আয়না’। আয়নার নিজের কোনো চেহারা আছে? নাকি জগত-মানুষের চেহারার মাঝে আয়না তার প্রতিবিম্ব খুঁজে পায়! কখনো সে উপলব্ধি করে ভর্ৎসনা, ভয়ঙ্কর বিষাদের চেহারা; আবার কখনো আনন্দ, হাসি আর সৌন্দর্যের রূপ। অথচ কাঁচের, জলের এ আজব জগত আপসহীন নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যে। তার অনুভব অস্তিত্বে মানবমনের সম্পর্ক প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে। এ অনুভূতির মাত্রা কালের যাত্রায় বহুকৌণিক ও বস্তুনিষ্ঠ। তাই বোধহয় কর্পোরেট অফিসের অধিকর্তা, আবার পথের দিশেহারা মানুষগুলো— সকলেরই চেহারায় নিজেকে আবিষ্কার করে জলকাঁচের আয়না।
একদিকে সুবিধাভোগী মানুষগুলো নিঃসঙ্গ সময়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করে নিজেকে, কিন্তু পারে কী সমাজরন্ধ্রে তার প্রতারণার ছবি দেখতে? বিবেকী প্রশ্নগুলো রহস্যময়ী আয়নার অন্তরালে বাধা। অন্যদিকে যাপিত জীবনের যুদ্ধে ক্লান্ত ছা-পোষা মানুষগুলো সক্ষমতা হারিয়েছে আয়নায় মুখ দেখার। পথে পথে ছুটে চলা মার্সিডিজ, করোলা, হাইলাক্স গাড়ির লুকিং গ্লাসে ঝরে পড়ে তাদের ভাগ্যচক্র। আয়নার চেহারায় ধরা পড়ে স্বার্থপর পৃথিবীর শঠতা, কৃতঘœতা, অকৃতজ্ঞ মনোবৃত্তি। কবির ভাষায় যদি বলি, ‘…এমনকি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে/পাশের দোকানপাট, বাসাবাড়ি, বাণিজ্যিক ভবনের/গ্লাসে, গ্লাসে—ইস্পাতে ইস্পাতে,/নিজের প্রতিবিম্ব দেখি, ভাল লাগে, বাঁচতে ইচ্ছে করে।’
এই বাঁচার তাগিদে আয়নার প্রতিফলন ঘটে নিজেরই চোখের আয়নায়। চোখের জমিনে সবই অফেরতযোগ্য। ওই চোখের সরণিতে হেঁটে হেঁটে আবেগতাড়িত আত্মমগ্ন আয়না মূর্ত করে তোলে মনুষ্যজগতের রূপবৈচিত্র্য। মূল্যায়ন, সমৃদ্ধি ভিন্ন ব্যঞ্জনায় স্থির;— দায়বদ্ধতা, নস্টালজিক মন-মনন, সময়ের পরিক্রমায় ধরা পড়ে আয়নার প্রতিসরণ কেন্দ্রবিন্দুতে। তাকে স্বীকার-অস্বীকারের ধর্মে জটিল আবর্তে ঘুরপাক খায় এই সমাজমানুষ। আজ তাই আয়নাকে পাশ কাটিয়ে চলার প্রবণতা বেড়ে গেছে যেন। বদলে গেছে বিবেক, বিবেচনাবোধ। সততার আদর্শ মনের আয়নার প্রতিফলনেও ধরা পড়ে না আর। আজ ঝাপসা হয়ে আসে আয়নার কাঁচ। অতি কষ্টে দেখা যায় সময়পাবক চোখ ঠারে মনের আরশীতে।
মনের আরশীতে বন্দীদশা মানুষের শেকলের ঝনঝনানি শোনা যায়। সমৃদ্ধশালী নগরের কাছে জ্বরা, তাপ, উল্লাস আর অহংকারের আধুনিকতা ছায়া ফেলে ওই আরশীতে। আধুনিক জীবনের বিষফল, কাঁটাগুল্ম যে স্বাক্ষর রেখেছে জীবন নৌকায়, তারও ছায়া ফেলে ওই স্বচ্ছ জলের আরশীতে। একটা প্রলায়োল্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়না নিজেরই প্রতিবিম্বের কাছে। সে কখনো প্রতারণা করে না, বিপরীতে অসংখ্য প্রতারিত জীবনের ছায়া মেখে নেয় সে নিজের শরীরে। তাই মনের আরশীর দরজা খুলে পালাতে চায় এই আধুনিক জীবন। কাঠকয়লার জীবন অবশেষে বাসা বাঁধে স্বচ্ছ নীরের কাছে। কুলুকচি সারতেই স্বচ্ছ জলের আয়নায় দেখা যায় বিশ্বস্ত কিছু দৃশ্যাবলী। রহস্যাবৃত কিছু মায়াবী মুখ জীবনানন্দের ট্রামকেই ভালবেসেছিল যেন। আলট্রাভায়োলেট রশ্মি, সুতোনালী সাপ আর মৎস্যকুমারীর ডুবসাঁতার গেঁথে নেয় যূথবদ্ধ জীবনের কোলাজ। তাই মুখ দেখতে গিয়ে ‘স্বচ্ছ জলের নীচে আবিষ্কার হলো পরস্পরের প্রতি অপরিসীম ঘৃণা আর বিদ্বেষ’।
কখনো কখনো দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে নিজেরই আয়না। ধরা পড়া জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখে আকর্ষণহীন লাগে আয়নার ফ্রেম। এবার মাটির দিকে ফেরা। মাটির আয়নায় প্রতিফলিত ছায়া দীর্ঘ হয়। প্রলম্বিত ছায়ার ভেতরেও উঁকি দেয় জীবন ও জগত। জীবনের নতুন বিন্যাসে প্রচেষ্টা আর নিরীক্ষার ভেতরে সম্প্রসারণ কিংবা রূপান্তর ঘটে ব্যক্তি মানুষের। মাটির আয়নায় সেই প্রলুব্ধ চেহারা নজরে আসে। শুধু কী ত্রস্ত, অবিন্যস্ত, মেকী সংসারের মায়া? বিপরীতে যে অর্থগত, বোধগত গভীর এক সঞ্চয় ছায়া ফেলে মসৃণ অথচ মরচে ধরা আয়নার ফ্রেমে; তাকে সত্যিকারের উচ্চাঙ্গের রূপক-প্রতীকের সাংকেতিক ভাষায় গাঢ় করে তোলে মাটির গভীরের আয়না। এরও এক সত্তা আছে। উদাসীন, নিঃসঙ্গ, ভাবুক মনের কাছে সে নিজেকে মেলে ধরে পরমব্রত বিশ্বাস নিয়ে। আয়না-কথা তখন অনুবাদযোগ্য হয়ে ওঠে মানুষের যৌক্তিক-অযৌক্তিক ঘেরাটোপ মনের কাছে।
আজকে তাই চোখ মেলে দেখি অমিতাভ রেজার ‘আয়নাবাজি’ ওই ঘেরাটোপ মনেরই কথা বলে! বর্তমানের জাহালম ওখানেই আছে। কিন্তু জাহালমের শক্তির কাছে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে সমাজদর্পন। অথচ তা বুঝতে পারে না পার্থিব মানুষ ও তার বিবেকী-আয়না! মনের আয়নায় ছায়া ফেলে তাই হারানো অতীত, প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান আর আশা-নিরাশার ভবিষ্যত। ‘তুমি কী শুনতে পাচ্ছ সব’। কে শোনে কার কথা? একদিন আড়াল থেকে আয়নার যে প্রতিফলিত আলো পড়েছিল কোনো রহস্যময়ীর মুখে, সে আজ ভর্ৎসনার সুরেই গেয়ে ওঠে— ‘কথা যদি শুরু করি শেষ তো হবে না’। ওই শেষ না হওয়ার কথার গোপন অভিসারে উঠে আসে বিবেকী-আয়নার অন্তর্জ্বালা।
তাকে গাঢ় করে আবুল মনসুর আহমদের আয়না গ্রন্থের ‘হুযুর কেবলা’ও! মূলত এও ছিল ধর্ম ব্যবসায়ীদের লোভ ও লালসা চরিতার্থ করার বাস্তব ঘটনা, যা অশিক্ষা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন দরিদ্র বাঙালি মুসলমান সমাজের বাস্তব দলিল। ধর্মের নামে ভ-ামীর এক অসাধারণ চিত্র নিপুণতা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে যে ‘হুযুর কেবলা’-কে আমরা দেখতে পাই, সে আজও বিদ্যমান। আমাদের মনের আয়নার দিকে যদি তাকাই তবে এখনো দেখতে পাই এই মিথ্যাচার ও ভ-ামী থেকে মুক্ত হয়নি এই সমাজ। তাই বিবেকী আয়না এখন ভর্ৎসনা জানায় নিজেকে। আয়নায় প্রতিফলিত ও রূপ কার?
তবে কী সে তোমার বিশ্বস্ত মুখচ্ছবি! যাকে একদিন আবিষ্কার করেছিলাম কোনো এক শীতের রোদেলা সকালে? ছাদে দাঁড়িয়ে আমার আপন আয়নায় যে রোদ খেলা করেছিল, সে রোদের প্রতিসরণ তোমার মুখের পরে গিয়ে পড়ে। সেই কুলকুচি করা রোদে তুমি তোমার দীর্ঘ ঘন কালো চুল শুকালে। গেয়ে উঠলো কেউ আপন আয়নার সত্তায়— ‘তোমার কাজল কালো কেশ ছড়ালে বলে/এই রাত এত মধুর’। রাতের ওই গোপন অভিসারে আয়নার বিজলী বন্ধ রেখেছি আমি। তবু ওই তমস রাতে আপন আয়নায় উঠে আসে পরাক্রান্ত পৃথিবীর পাঠশালা। তখন প্রেম হারাই, তোমাকে হারাই। চারদিকে স্বার্থবাদী চোখ, মন ও বিবেক। নৈতিক শিক্ষার স্খলন। মূল্যবোধের অবক্ষয়। এই যে পথে পথে উঁকি দেয় যুগল মনের প্রেম— সেখানেও দেখি স্বার্থবাদী পৃথিবীর চাওয়া-পাওয়া ছাড়া আর কিছু নেই! আজ তাই আয়না দেখার দিন শেষ। কেউ আর দেখে না মুখ আপন আয়নায়। পাছে নিজের মুখচ্ছবির আড়ালে মুখোশটাই ধরা পড়ে! ফলে জলকাঁচের আয়না, বালিকাঁচের আয়না বিমূঢ়, ইতিহাসের ঝর্নাতলায় তার স্থান।
এই ইতিহাসের আয়না হাজার হাজার বছর আগে সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিশেবে ধরা দিয়েছিল জনমনে। প্রাচীন গ্রীসে ডাইনিরা দৈবদেশ ও বাণী লিখে রাখতো আয়নার মাধ্যমে। প্রাচীন রোমের ধর্মগুরুরা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বর্ণনা করার জন্য ব্যবহার করতেন দর্পণ। প্রাচীন চীনে চাঁদের স্বর্গীয় শক্তি ধরে রাখার জন্য আয়না ব্যবহারের চল ছিল। কথিত আছে, চীনের এক সম্রাট জাদুকরী এক আয়না বসিয়েই নিজের সাফল্য পেয়েছিলেন। গত ২৫ খ্রিস্টাব্দে চীনের সম্রাট কিন শি হুয়াং দাবি করেছিলেন যে, আয়নার দিকে তাকানো মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি তাদের আসল চিন্তাভাবনা ও মনের খবর পড়তে পারতেন। সত্যি, আয়নায় তাকিয়ে থাকা মুখটিতে ভেসে ওঠে তার কল্পজগত। আধুনিক মানুষ আজ নিজের মমতার পাশাপাশি হিংস্রতা, শঠতাকেও আবিষ্কার করতে সক্ষম হয় বিমূর্ত আয়নার ভেতরে। তাই তো আজকের দুনিয়ায় আয়নাকে এত ভয়! আয়নাকে তাই ডাকা হয় বিবেকী আয়না, আপন আয়না, পরমাত্মার আয়না ইত্যাদি নামে। সে যে নিজের সত্তাকে মেলে ধরে এই জগতসংসারে।
বাজারে, শপিংমলে, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে, পর্ণকুটীরে, মধ্যবিত্তের শোবার ঘরে— সর্বত্র বিরাজমান বাহ্যিক আয়নার অন্তর্দৃষ্টি চিরকালীন সমকালের; সমাজ ও জনগণের খোলনলচে ধরা পড়ে বালিকাঁচের আয়নায়। সমাজের অতি-নিকটে দর্পণের বসবাস। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় সে মেলে ধরে নানা অণুঘটনা অভিজ্ঞতার ডালিতে। আর খোলা চোখে দেখা ঘটনাপুঞ্জ ও চরিত্রের সন্নিবেশ ক্যামেরবন্দী করে আমাদের খোলা চোখের আয়না, বিবেকী আয়না— ‘সমাজ দর্পন’! এই আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিকে প্রতিফলিত করে না, বরং এতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়ে। যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে তারাও হতচকিত হয়ে যায় দৃশ্যমান আয়নায় নিজেরেই চেহারা দেখে। আয়না নির্ভরতা আর বিশ্বস্ততার সঙ্গেই মেলে ধরে তার স্বরূপ— উপাসনালয়ে, বক্তৃতার মঞ্চে, রাজনীতির ময়দানে, সমাজ সেবকের অন্তরালে এ জগতমানুষের স্বার্থপরতার কথা।
আর কালপরিক্রমায় তাই আয়না হয়ে ওঠে মানুষের সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু। আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবি দেখা যায় না, সেখানে মানুষের অন্তরের রূপও ধরা পড়ে। যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে বিচরণ করছে তাদের স্বরূপ মূর্তি, বন্য-ভীষণতা আয়নার আপন চেহারায় উদ্ভাসিত হয়। মূলত সমস্যার আবর্তে জটিলতর মানুষের জীবনাচরণ ক্রমশ অনুবাদ করে চলেছে আয়নাকাহিনী। হোক সে স্বচ্ছ জলের আয়না, জলকাঁচের আয়না, মনের আয়না, চোখের আয়না কিংবা মাটির আয়না। আয়নায় প্রতিফলিত যে জীবনের ছবি— সেখানে অন্ধকার, অস্থিরতা, দ্বিধা, ক্ষোভ, ভয়, ভাঙন, নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি আছে সোজা রাস্তা, স্মৃতি, এ্যালবাম, আন্তরিক আহ্বান। মনে হয় আয়নার ছোবল তাই মানুষের চোখে বেঁধে। আয়না ভেঙে যায়, বেঁকে যায়— টুকরো কাঁচের সরণিতে রক্তাক্ত হয় বিমর্ষ, বিষণœ, নির্জন, একাকি, স্বার্থপর, কৃপণ সত্তাটুকু। আর ভালবাসার জীবন উল্টো আয়নাকেই ব্যবচ্ছেদ করে— ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন’! কিন্তু অতসী কাঁচের আয়নায় বৃহৎ প্রতিফলনে ঘটে পোস্টমোর্টেম— সমাজের, জীবনের, পৃথিবীর। এখন ঝাপসা আয়নার কাঁচ, ঝরে গেছে মরীচা ধরা আয়নার ফ্রেম। বিদীর্ণ দর্পণে সমাজ অভ্যন্তরে সংঘটিত মানব মনের সঙ্গতি-অসঙ্গতি রেখাপাত করে না আর।
তবু আয়না এমন এক আপন সত্তা যেখানে ধরা পড়ে মানুষের প্রতিবিম্ব। যে মানুষ মাটির তৈরি আর আয়না বালুর। বলা হয়, বালুমাটির সংস্করণ। মানুষ আর আয়নার সৃষ্টিগত রহস্য তাই এক ও অভিন্ন। ফলশ্রুতিতে আয়না তার স্বজাতির অভ্যন্তরীণ রূপ দেখতে পারে। অন্য কথায়, বালুমাটির সহোদর, তারা একে অপরকে বোঝে ও চেনে। মানুষ যখন আয়নার সামনে দাঁড়ায় তখন আয়না তাকে বলে দেয় সে আসলে কে এবং কি? আয়নার স্পর্শে মানুষের অবয়বে স্বর্গ নরকের প্রতিচ্ছবি বিম্বিত হয়। সুতরাং মনের চিকিৎসার জন্য আয়নাই সর্বোৎকৃষ্ট চিকিৎসক। আয়না শুধু চুল বিন্যাস অথবা বাহিরের চাকচিক্য দেখার জন্য নয়; ভিতরের রূপ-রঙ ও মনের আসল স্বরূপ বলে দেয়। আয়নাও আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আয়না আয়নাকে চেনে এবং বোঝে। কিন্তু মানুষ? মানুষ মানুষের সহগোত্র বা স্বজাতি হলেও শুধু ধর্ম ও দর্শন থেকে আলাদা নয়, কেন যেন তারা একে অপরের সঙ্গে পার্থিব শঠতায় মত্ত। ভালবাসার দৃষ্টি হেনে কুপোকাৎ করে হন্তারকের ছুরিতে। উত্তরাধুনিকতায় পিতার সামনে দাঁড়িয়ে উত্তর পুরুষ অনুধাবন করতে পারে না পিতৃত্বের মহত্ব। পিতা তার ছেলেমেয়ের আয়নায় নিছক ফানুস। পিতার কাছে সন্তান নিছক সৃষ্টি বা আয়নার মতোই চোখের সুন্দর; অথবা অহংকারের ঠিকানা! সৃষ্টিজগতের এ এক অপার রহস্য! মনুষ্য মনের বিরাট জট! এ দুরত্ব অনেক প্রাণিতেও নেই, নেই বালুতেও। আছে সৃষ্টির সেরা মানুষের মধ্যে, যা কখনও স্রষ্টার প্রত্যাশা নয়। আয়না সেই ভেদবুদ্ধির খেলার মনোজাগতিক দৃশ্য ধারণ করে। মাটির মানুষের তাই মাটির আয়নার দিকে শেষ যাত্রা— ‘যখন আশপাশে আয়না নেই, জল নেই-/তখন আমি আমার ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকি,/মাটির আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকি।’ সেই আয়নাকে কখনো কখনো ভেঙে ফেলে পুঁজিবাদ, সা¤্রাজ্যবাদ— যেন আপন মুখটি দেখা না লাগে। তখন বিবেকবর্জিত সমাজমানুষ ঠাঁই নেয় কৃতকর্মের আড়ালে, ছায়ার ভেতরে। আর মনুষ্য মনের মানুষ আয়নায় ধারণ করে তার আপন সত্তা, এ জগতসংসার— একদিকে পার্থিব নিষ্ঠুরতা, অন্যদিকে মানবিকতা সর্বংসহা বসুন্ধরার।

**************************

সে এক ঋতু ছিল আমাদের!
সৈকত হাবিব

সে এক ঋতু ছিল আমাদের। নাম তার হেমন্ত। কিন্তু ‘ছিল’ বলছি কেন? আমাদের ছয় ঋতুর তালিকায় নামখানি তো তার বেশ জ্বলজ্ব¡ল করেÑ শরতের পরে আর শীতের আগে। আর সে ছিল বড় কোমল, স্বপ্নীল আর ফলবতী। অঘ্রানের ঘ্রাণ কী বিপুল ছিল আমাদের জীবনে। কিন্তু সে কেবল প্রতœস্মৃতি, বাস্তবে সে এখন দূর অতীত, ব্যবহারিকতায় মূল্যহীন। তাই সে যেন আজ সেই কাজির গরু, গোয়ালে যার অস্তিত্ব নেই, আছে কেবল কাগজেই। শরৎ তবু পূজা পায় বটে, দুর্গাদেবীর কল্যাণে; দ্রুতগামী পেজা মেঘ ও জলে তার চলৎছায়া আর কাশের শুভ্রতায়, কিন্তু হেমন্ত আজ পায় না কিছুই। অথচ কী ছিল তার দান। হেমন্ত এক আশ্চর্য ঋতুÑ মৃত্যু ও জীবনের, দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্যের, হতাশা ও আশারÑ দুই বিপরীতের এক সুতীব্র যুগলবন্দি। একদিকে এ ঋতুর শুরুতে মরা কার্তিক, ক্ষুধার হাহাকার; আবার শেষে অগ্রহায়ণে ধানের প্রাচুর্য, নতুন ধান, তাই নবান্ন। এভাবে নানা বৈপরীত্যের মিশেল এই হেমন্ত ঋতু।
একদা কত কিছুই না সে দিয়ে গেছে আমাদের যে ভাত খেয়ে আমরা বাঁচি, যে ধানের দানে বাঙালির প্রাণরস প্রবহমান, তার প্রধান অংশটিই একসময় আসত এই হেমন্তে। তার জীবনদায়ী ঘ্রাণে বাংলার গ্রামজীবনের ঘরে ঘরে জীবনের উৎসব লেগে যেত অগ্রহায়ণ মাসে। এসব কথা ভেবেই স¤্রাট আকবর বৈশাখের বদলে প্রথমে অগ্রহায়ণ মাসকেই ঋতুর প্রথম মাস করতে চেয়েছিলেন। এর অর্থটাও তাই তাৎপর্যপূর্ণ: অগ্রে বা আগে যে আসে, তা-ই অগ্রহায়ণ। তবে অর্থ যা-ই হোক, এখন এটি বছরের অষ্টম মাস। আর আসেও অনাড়ম্বরভাবে, চলেও যায় বেশ গোপনে। কারণ যে আমন ধান ছিল বাঙালির প্রধান খাদ্য, সময়ের প্রয়োজনে তার জায়গা দখল করেছে উচ্চফলনশীল ইরি ধান। বিপুল জনসংখ্যার ভার, বিপুল খাদ্যচাহিদা,পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা, নদী ও জলাভূমি হত্যা, নির্বিচার বৃক্ষনিধন, কৃষিজমির বিনাশ, নগরায়ন, যন্ত্রায়ন ইত্যাদি নানা কারণে প্রকৃতির হিসাব-নিকাশ সব উল্টেপাল্টে গেছে। তাই আজকের শহুরে মানুষ নয় কেবল, গ্রামের মানুষও ঋতুর আসা-যাওয়ার হিসাব ভুলে গেছে প্রায়। ঋতুচক্রের আবর্তনে প্রচ- খরতাপ, তীব্র বন্যা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস কিংবা খুব ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ছাড়া ঋতুচর্চা এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত। তাই দেখা যায়, বর্ষবরণের পাশাপাশি গত এক যুগ ধরে নবান্ন উৎসবও আমাদের রাজধানীতে নাগরিক অনুষ্ঠানে পর্যবসিত হয়েছে।


তবে আমাদের ষড়ঋতুর দিকে তাকালে বহু বিচিত্র বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। অনেক ঋতুকে শারীরিক-মানসিক উভয় দিক দিয়েই প্রবল অনুভব করা যায়।ধরা যাক, ঋতুর শুরু গ্রীষ্মকেই। বৈশাখের আগেই তীব্র তা-ব নিয়ে সে হাজির। যেন সবকিছু ভেঙেচুরে তছনছ করে দেবে, উড়িয়ে নেবে সবকিছু; সে যে নবীন, সে যে তীব্র, সে যে কাক্সিক্ষত, তারই আভাস যেন আকাশে-বাতাসে, ফুলে-ফলে বৃক্ষ-লতায়। তারই অপর দিক জ্যৈষ্ঠ। তীব্র গরম, সূর্যের ঝলসানো আগুন। মান্না দের গানে পাই এর জীয়ন্ত বর্ণনা: ‘প্রখর দারুণ অতি দীর্ঘ দগ্ধ দিন/যত দূরে চাই নাই শুধু নাই/দিকে দিকে শুধু নাই নাই নাই/শুষ্ক কানন তরু শাঁখে/বিরস কণ্ঠে পাখি ডাকে/বুক ফাটা পিয়াসায় অগ্নি আকাশ পানে চাহে সদাই…।’ এক টুকরো মেঘ কিংবা কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য তীব্র ব্যকুলতা। কিন্তু এই শুষ্কতার বিপরীতে আছে আরেক মজার দিক। গ্রীষ্মেই ফলে বাংলার সবচে সুস্বাদু ফল আমসহ বহু রসাল ফল, যার রস প্রাণকে ভরে দেয় ¯িœগ্ধতায়, আত্মা ভরে ওঠে প্রশান্তিতে। আর বর্ষার কথা বলার কিছু নেই। কারণ এটি বাঙালির প্রাণের ঋতু। আমাদের গানে-গল্পে-গাথায় তার রূপ-সৌন্দর্যের এত বর্ণনা, হয়তো আমাদের ঋতুরচনারসমগ্র-সংকলন হলে তার সিংহভাগ জুড়েই থাকবে বর্ষাবন্দনা।আর শরৎ যেন বর্ষারই সহোদরা। সতেজ প্রকৃতি, রোদ-বৃষ্টির খেলা, মেঘ ও জলের লুকোচুরি, অপরূপ জ্যোৎ¯œা, শারদীয় দুর্গাপূজা, উষ্ণতা-শীতলতার যুগলবন্দি মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠে। এর পরেই আসে আমাদের প্রায়-পতিত ঋতু হেমন্ত। কিন্তু এ ঋতুর শুরুটা হয় অনেকটা বেদনাদায়কভাবে। দুর্গাপুত্র কার্তিক যদিও খুব সুদর্শন সুপুরুষ হিসেবে বরিত, কিন্তু তার নামের মাসটি ঋতুচক্রের দিক থেকে মহিমান্বিত তো নয়ই, বরং অভাব-দারিদ্র্য-ক্ষুধার তীব্রতার কারণে সে মরা-কার্তিক নামে কলঙ্কিত। কারণ আশ্বিনের স্বল্প-উৎপাদনশীল আউশ ধান এমনিতেই চাহিদার তুলনায় কম, তার ওপর যদি বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে, তাহলে তো কথাই নেই। সাধারণ কৃষিজীবী মানুষের ঘরে ঘরে হাহাকার পড়ে যায়। তার সবচে বেশি প্রভাব পড়ে কার্তিকে। এর চেহারা সেদিনও আমরা দেখেছি দেশের উত্তরাঞ্চলে মঙ্গারূপে। কারণ তখনও মাঠে ধান কেবল পাক ধরেছে, কিন্তু ঘরে নেই ভাত। এ অবস্থার অবসান ঘটে পরের মাস অগ্রহায়ণে। তখন নতুন ধান ঘরে আসতে থাকে, ধানের গন্ধে প্রতি বাড়ির উঠোনে উঠোনে শুরু হয়ে যায় জীবনের উৎসব। তাই তখন নতুন ধানের নবান্নই শুধু নয়, কত যে বিচিত্রভাবে তার উদযাপন শুরু হয়Ñ পিঠে, পুলি, মুড়ি, মোয়া, খইÑ সে বড় সুখের সময়! যা পরের ঋতু শীতকেও বেশ উপভোগ্য করে তোলে। ধানের পরে শীতেই আসে খেজুর রস। ধান আর রসের মিশ্রণে বিচিত্র খাদ্য-আয়োজনে শুষ্ক শীতও বেশ রসময় হয়ে ওঠে।আত্মীয়-আপ্যায়ন আর জামাই-আদর তাই এ সময়ে বেশ জমে ওঠে। বসন্তের কথা বেশি বাড়িয়ে লাভ নেই। বর্ষার পর বসন্তই বাঙালির সবচে প্রিয় ঋতু। তীব্র শীতের পর বসন্তের ফাল্গুনী হাওয়া যখন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমাদের প্রাণ ভেতর থেকেই জেগে ওঠে। সেজন্যই কবি সুভাষ মুখুজ্যে সগর্বে বলতে পারেন ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত।’ কারণ বসন্ত যখন আসে তখন আমাদের হৃদয়ই কথা বলে, বাইরের দিকে না তাকালেও চলে। আমাদের শরীরও ভেতর থেকে এর হিল্লোল টের পায়; দেহের ভেতর থেকে সে আমাদের উষ্ণ-উজ্জীবিত করে তোলে।

আমাদের সাহিত্যে ঋতুস্তব অন্তহীন। বর্ষা-বসন্ত যদিও সবচে সৌভাগ্যবতী, কিন্তু অন্যগুলোও নেহায়েত কম নয়, কেবল হেমন্ত বাদে। আশ্চর্য হয়ে দেখি, বাংলা সাহিত্যে হেমন্তের চেহারা সবচে তীব্র ও নিবিড়ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন একমাত্র জীবনানন্দ দাশ। এর বাইরে বড় আকারে নাম আসে কেবল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের। তবে রবীন্দ্রনাথ তো সর্বঋতুর কবি। সেক্ষেত্রে অন্য ঋতুগুলোর তুলনায় হেমন্তের প্রতি কতটা সুবিচার করেছেন, সেটি আলোচনাসাপেক্ষ।কিন্তু জীবনানন্দ একাই যেন সব পুষিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কবিতার দার্শনিকতা-নৈসর্গিকতা-মনোময়তা সবকিছুর ভেতরেই যেন উপেক্ষিত হেমন্ত ও শীতের রাজত্ব। সেজন্য অনেকেই তাঁকে যে ‘হেমন্তের কবি’ বলেন সেটি যথার্থই মনে হয়। অন্যদিকে যে জাতির সাহিত্য বর্ষাময়, সেখানে খুঁজে-পেতে তাঁর একটি বর্ষাপদ্য পাওয়া যায়, তা-ও হাত-মকশো কবিতা। অন্যদিকে হেমন্তকে তিনি যেন তুলে আনেন এর আত্মা ও ঘ্রাণসমেত। এমনকি তাঁর কথাসাহিত্যেও হেমন্ত এসেছে একই তীব্রতা নিয়ে। এমনটা বোধহয় বলা যায়, আমাদের সাহিত্যের কয়েক প্রজন্ম যতটা না নিসর্গে তারচে বহুগুণ বেশি হেমন্ত-আস্বাদন করেছেন তাঁর কবিতার ভিতর দিয়ে। বাংলা সাহিত্যে তাঁর এই দান অন্তহীন ও অতুলনীয়।কী চমৎকারভাবেই না তিনি কার্তিক-অঘ্রানের দৃশ্যরূপ তুলে ধরেন :
ক. শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে
অলস ধোঁয়ার মতো এইখানে কার্তিকের দেশে।
হেমন্তে ধান ওঠে ফলে
দুই পা ছড়ায়ে বস এইখানে পৃথিবীর কোলে।

খ. প্রথম ফসল গেছে ঘরে
হেমন্তের মাঠে-মাঠে ঝরে
শুধু শিশিরের জল,
অঘ্রাণের নদীটির শ্বাসে
হিম হয়ে আসে…।


যদিও বেড়ে ওঠা গ্রামে, শৈশব-কৈশোরে দেখেছি শস্যভরা মাঠ, অঘ্রানে বাড়ির উঠোনে উঠোনে ধান মাড়াইয়ের উৎসব, দেখেছি নদী-মাঠ-নিসর্গ, উড়িয়েছি মাঠে ঘুড়ি, তবু অনেক সময়ই মনে হয় আসল হেমন্তকে ঠিক কখন দেখেছি?
সম্ভবত বছর আঠারো-বিশ আগে, একদিন মিষ্টি রোদ্দুরভরা বিকেলে, ঢাকা-কুমিল্লা মহাসড়কে, বাসে আসতে আসতে, মেঘনা ঘাটের কাছে হেমন্তের সত্যিকারের চেহারা আমার চোখে ধরা পড়ে। এর কোমল সৌন্দর্য, শীতোষ্ণ আবহাওয়া, ফসলশূন্য নিস্তব্ধ মাঠ আর চরাচরে এক প্রগাঢ় প্রশান্তিÑ সবটা কি আর ভাষায় বলা যায়!আর হেমন্ত এখন এমনই এক লজ্জাবতী ঋতু, কালেভদ্রেই সে নিজেকে হঠাৎ মেলে দেয়।বরং সে আছে আমার বুকে, প্রকৃতির সত্য ও সৌন্দর্যের এক উদ্ভাসরূপে। থাক অনির্বচনীয় এই হেমন্তরূপ আমারই অক্ষয় অন্তরসম্পদ হয়ে।

**************************

সেথা অরণ্যে, আহা! আমি যে কারক হয়ে আছি
শিবলী মোকতাদির

চারপাশে অর্জুনগাছের আধুনিক রোপণ-বৃত্তান্ত সাঙ্গ করে, এইমাত্র খরতাপ হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে, ব্যক্তিগত নদীর নাব্যতায় গাত্র ডুবিয়ে বসে আছি আমি—কিছুটা ইক্ষুরসের আশায়।
ইক্ষু—আহা! লোভের লোলিতা যেন। কত দিন, কত রাত্রি, কত মেঠোপথ ভেঙে তোমারই অšে¦ষণে হেঁটে হেঁটে, ঘুমে শ্রান্ত হয়ে, যেন পুনর্জাগরণে চেয়েছি তাকে। তৃষ্ণা ও তাপের মারপ্যাঁচে। কী যে ক্রিয়া কী যে আবিষ্ক্রিয়া তুমি। বেঢপ মাতালের ন্যায় হুট-হাট দাঁড়িয়ে পড়ো। অবাঞ্ছিত আনাচে-কানাচে। থাকো—টানটান, শিরায় শিরায় শিহরণ তুলে। উপরে ঠিক যেন স্নিগ্ধ, সরল, সত্য আর তরতরা। স্তরে স্তরে উঠে যাওয়া ঋতুচ্ছিন্ন বেগের ব্যক্তিগত বালিকা।
বোঝা দায়— ভিতরে এতটা তরল, এত রস, রসাচ্ছাদিত পাতালের প্রান্তে বয়ে যাও; ওগো গোপন, ওগো রসকান্ত আলেয়া তুমি।
এই যে কারক হয়ে বসে আছি। বিবিধ চিহ্ন আর উপচিহ্নে আছি—ভঙ্গুরের ভাগ্নে হয়ে, ভুলের ভান্তি নিয়ে তবু আছি আমারই নদীর নিত্য ফলাফলে। এ বড় আগামীর অঞ্চলে। সেথা পথ আর পদ্যের নিরাকারে সব মিশে যায়। যেতে যেতে ফের ভুস করে জেগেও ওঠে কিছুটা দূরে। আমাকেই অচেনা করে; চাহনিতে প্রশ্নবোধকের নানান জাতি ও জাতের চিহ্ন ফেলে রেখে। তারা অলস, আরবীয়, লুপ্ত প্রায়—কেউ কেউ মোগলীয়। ঝাঁঝহীন ফালতু মরিচের ন্যায়। অহেতুক সম্রাটি হুংকার ছাড়ে। আমাকে ভয় দেখাবার দায়ে। আমি হাসি। হাস্যে হাস্যে হাসির হাহাকারে বুঝি— ভয়ও পায় তারা।
এত যে সুরক্ষিত, এত যে সম্পাদিত এতদ্ঞ্চল তবুও এরই মাঝে অচেনা বালকের ন্যায় ঠাস করে দেখা দেয় বাতিল কালির কলমের আঁচড়ে লেখা হিজিবিজি সব ইস্তেহারের কথাকলি। আমি ভাবি এই সব নিয়ে, আর নানান একাদশে যুক্ত করে রাখি। তারা রাগে রঞ্জিত হয়ে ওঠে— পাঠ্য ও পাঠের অনুরাগে।
আমি যে কারক হয়ে আছি। রোদে-জলে, অগ্নি আর পবনে। এসবের লবণ্যে তারা কেউ কেউ ফুটে ওঠে। স্থির হতে না হতেই ফের ঝাৎ করে মিশে যায়। আমাকে না দেখার অধ্যায়ে ফেলে রেখে।
ওপ্রান্তে চাঁদ ডুবে গেলে ফের আমি বসি—তাদের পাঠোদ্ধার করার কল্যাণে। তাদের ঔরস ও ঐশ্বর্যের মাঝে ফুটে থাকা জবাফুলের ন্যায় যিনি—একমাত্র তারই ছন্দে, ছন্দিত ছাত্রের মতো কাছে আসি আমি। প্রভূত শুধাই—কথা ও প্রসঙ্গে। তিনি সর্বহারা; পুত্র কন্যা তারিত এক ব্যাকুল প্রশ্নবোধক। বোধের ঘনত্বে ঘনীভূত হতে হতে দূরবর্তী কোনো এক কন্যারাশির হাত ধরে এসেছে এখানে। দেহ তার অলীক আকারে আঁকা। যেন বাঁকা বাঁকা ঘাড়, মোচড়ে মোচড়ে ডানপন্থির বিবিধ আন্দোলনের রূপরেখা ধরে, খেয়ে না খেয়ে অকাল তৈলচিত্রের ন্যায় পেয়েছে ঠাঁই এতদ্ঞ্চলে।
আমি যে কারক হয়ে আছি। কলাবতী ফুলের গর্ভে সিক্ত হয়ে আছি। আজি এ ক্ষেত্রে— কাঠামোর কলঙ্কে নিমজ্জিত মরুসাগরের ন্যায়। জানি ক্ষণিক পরেই তৃষ্ণা ও ক্ষেত্রফলের লোভে বহু ন্যায্য আর অন্যায্য পশু ও পাখির পদচিহ্নে ছেয়ে যাবে এ অঞ্চল। বিরল ও বিপদী সব হুংকারে তারা নেমে আসবে একে একে আরোগ্যনিকেতনের লোভে। তারা রাগ, হিংসা, আতঙ্ক ও ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বরাবরের ন্যায় ম্যান্ডেট চাইতে আসবে আমার কাছে। নানান শাখা-প্রশাখায়, নানান গর্ভ ও গর্ত হতে বেরিয়ে একে একে এসে মিলিত হয়ে, তারা আসন্ন আঞ্চলিক সভার কেন্দ্রে মিলিত হবে। দিনে দিনে রোদে-জলে ঝলসে গিয়ে—প্রায় ফেড হয়ে যাওয়া তাদের দু-এক প্রকার জাত ও জাতি। তাদের বাকি ও বকেয়ার খাতায় মলিন হয়ে যাওয়া নাম। শ্রেণি ও শত্রুর হিসাব নথি—সবকিছু নিয়েই ভাবিত তাই আমি। ফলে, কিছুটা ক্লান্ত ও গা-ুর-বর্ণে আচ্ছাদিত হয়ে, আমি আমার করলা গাছের ডালে নিজছন্দে গঠনকৃত মাচায় নিদ্রাভঙ্গির গোপন কৌশলে শুয়ে আছি— দুষ্প্রাপ্য পদ্যের অববাহিকায়।
পদে পদে, লাইনে চরণে আরষ্ট হয়ে আছি। কাব্যের আকরে আকৃষ্ট হতে হতে তবে কী ভুল করে চাইছি তোমাকে? তোমার বাহু ও বেণীর গন্ধে ডুবে যেতে যেতে দেখেছি কী নারকীয় পাতালের কোন ছবি। তোমার কত কত আখ্যান, কত আংশিক ও সামগ্রিক আজও আমাকে অতিক্রম করে চলে যায়। তুমি কী জানো ওগো জলীয় বাতাস, ওগো বাতাসের বনলিপি? তাদের ঝিরিঝিরি প্রলাপে প্রতিনিয়তই তুমি যে পরো ঝড়ে আমার প্রভূত কা-ে, থরে থরে দেহের অনির্বচনীয় অলি আর গলিতে।
এ এক আচানক পলির পল্লবে আচ্ছাদিত জেগে থাকা এই ভূমি। যেথা হাজারো কীটের, বিস্তৃত শস্যের আলোয় দিনরাত্রি ঝলোমলো। দূরে দৃষ্টির আলিঙ্গনে দেখি যতদূর—শুধু দানা আর দানবের ভোকাবুলি। দেখি যতসব পাঠ্যের জ্যামিতিক নদী। তারা সরল, তারা রম্বস, চৌকো আর মোটা মোটা। সবুজের মধ্যে কেবলই সীমাহীন। সেথা কেবলই বয়ে যায় সাদা সাদা, নীল আর সোনালি রঙের অনন্ত স্রোতধারা। তাদের ঢেউয়ের মধ্যে মিশে আছে—পরতে পরতে বিগত অতীত। বিগত মন আর মানুষের গন্ধের লুকোচুরি।
আমি বুঝি, তাদের কেউ কেউ পাল, গুপ্ত আর কিছু কিছু সেনের অনুরাগী। আমি যে কারক হয়ে আছি। অথচ আজ আমারই এ নদীর বিস্তারিত স্রোত ঠেলে যে মাঝি চলছে আগামীর বন্দরে; তারও মুখে সুর ঘুরে মরে। তারও প্রাণ পাপিয়ার মতো দিনান্তে গেয়ে ওঠে— ‘তোমার সলিলে পড়েছিল কবে কার কানফুল খুলি? তোমার স্রোতের উজান ঠেলিয়া কোন তরুণী, কে জানে। সাম্পান নায়ে ফিরেছিল তার দয়িতার সন্ধানে?’
আমি শুনি, ভাবি আর ভুল করি বারে বারে। যদি সর্বনাশা ঝড় গড়ে ওঠে। যদি আমার সীমিত ঝর্ণাকে কৌশলে লুট করে লুণ্ঠিত সামগ্রীতে গেঁথে রাখে? যদি ওরা আর না আসে সাঁকোর এপারে। মসৃণ বাঁধের ওপারে যদি লীন হয়ে যায় আমাকে ফাঁকি দিয়ে, মোহনার মস্ত কারবারে।
তাই আমি আধুনিক অস্ত্র হাতে চাঁদের কেন্দ্রে ঢুকে পড়ি। তাকে বোঝাই। শাসাই। সন্ধানী পাঠিকার সূত্রে, লোভ ও লালসার বৃত্তে ঢেকে রাখি। বলি— ঢালোতো চাঁদোয়ার রূপ আহামরি। আমার নদী আর নগরে, পরী আর পর্বতে। তোমার বেগুনি রঙের মাঝে ঢালোতো রক্তাক্ত নীল। দেখি তারা কতটা ভয় ও ভাবনার কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে।
আমি যে কারক হয়ে আছি। চাঁদ হাসে। তারা সংখ্যায় সহজ আর সাবলীল। তারা নানান নাম আর উপনামে ছেয়ে আছে আমারই অঞ্চলে। আমারই পালিত তারা। ডিজিটাল বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে। যুগে যুগে বছরের পর বছর ধরে। আমারই নেতৃত্বে। তাদের ওঠা ও নামা, রাত্রি আর রকমারি সবকিছু আমাকেই মেলে ধরে। ফলে আমিও মাঝে মাঝে সুর হয়ে উঠি। সুরের সাম্পানে আধুনিক নাবিকের স্তব্ধ ব্যাকরণে ধরো যদি আমিও গেয়ে উঠি :
আমরাই ধরি আমরাই করি করণীয় সব প্রেমের খেলা
বৃত্ত হতে বৃত্তান্তরে ভেসে আসা কাম দেহের জ্বালা ॥
দৃশ্যান্তরে নির্মিত হই
নদীতে নৌকা উপরে ছই
ছইয়ের মধ্যে অনুগ্রহ, গ্রহণের দায়ে বইছে বেলা
আমরাই পারি পারের কর্তা ফুটে তুলি রূপ, রসের মেলা
বৃত্ত হতে বৃত্তান্তরে ভেসে আসা কাম দেহের জ্বালা ॥
বিনির্মাণের প্রশ্ন ধ’রে
ধাঁধার ধর্মে ধারণ ক’রে
আমাকে লুকাও, লোকায়িত সব দূর দিয়ে সুর চঞ্চলা
এতটাই তুমি সরল-সোজা পথের প্রশ্নে পথভোলা
বৃত্ত হতে বৃত্তান্তরে ভেসে আসা কাম দেহের জ্বালা ॥
কানায় কানায় পূর্ণ করো
দেহের মধ্যে গোপন গাঢ়
মধুতে মত্ত ভ্রমর যথা পুষ্পের পরে হানে ফলা
তোমার তপ্তে আল্গা আমি গলে গলে করি পথচলা
বৃত্ত হতে বৃত্তান্তরে ভেসে আসা কাম দেহের জ্বালা ॥
এভাবেই নিতে নিতে, ফেলে আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যত সব সোনালি সুর আমি প্রবাহিত করি। তাদের নিয়ে গড়ে ওঠা যত তর্ক আর তর্জমা আমি টাওয়ারে টাওয়ারে পেঁচিয়ে নানান গ্রহ আর রকমারি পৃথিবীর সকল সফলতার দিকে তাক করে রাখি। ফলে এ-গানের গুণীন আর সেই সাথে গুণীতক বেড়ে যায়। যেন বিশুদ্ধ চিনির সন্ধানে সমস্ত পিঁপড়ে আর পথভোলা পথিকের দল—সব আজ নৈব নৈবচ। তারা বংশে বংশে, সাথী আর সন্তানে আবর্তিত হতে থাকে এইসব সুরে, সুরের কিসসা আর কাহিনীর অন্তরালে। তারা অবাক হয়। সাধন-ভজন আর ধর্মকে ঠেলে এই সুর তার চৌকাঠ পেরিয়ে ছুটে যায়—নানান শাস্ত্রে, সংঘ আর সাধুর সংযোগে।
হায় রে সুর—কথা আর কলি। ভুবনের কোন ভাগে ক্রুশবিদ্ধ মাথার মুকুটে গেঁথে আছো তুমি? তিরতির করে বয়ে চলা তোমার সূচিবদ্ধ হাসি—আমাদের দেখাও আর স্পর্শে, গন্ধে আপামর বধির হয়ে উঠি। এতসব আর তার মাঝে অলৌকিক দিব্য-বিভা সব কিছু নিয়ে ভাবি আর ভয়ের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি। দেখি—এত যে প্রহর এত যে পাহারা তবুও এরই মাঝে হুট-হাট ঢুকে পড়ে নানান গলিত জাতি আর উপজাতি। তারা অপূর্ব, কালো, বোকা বোকা। তারা পান্তা-পায়েসের ন্যায় সরল আর সহজিয়া। আমার গানে আধুনিক বাদ্য আর ব্যঞ্জনে তবু আমি টপাটপ ঢুকে ফেলি—খোল, পাখোয়াজ, এস্রাজ তথা—সেতার আর সরোদের ফুলঝুরি।
খোল—সে তো কীর্তন আর ভক্তির অনুগামী। সে তো বাউলাঙ্গ আর কীর্তনাঙ্গের জমজ এক পথচারী। আচ্ছা, পাখোয়াজ কী ফার্সির অনুগত! এ তো সন্ধির সহকারী। ধরো যদি পথ—সে তো চিরকাল পবিত্র আর পরিচিত। আর অওয়াজ এর নিয়তিই হলো ধ্বনি। আরও যারা উপসংহারে লুক্কায়িত; যথা : সেতার। বুঝি ইনিও ফার্সির সহোদরা। ‘সেহ’ এবং ‘তার’। এই নিয়ে প্রচলিত। থাকে বাঁশি— এক অপূর্ব বায়ু সন্ন্যাসী। ওগো মুরলী আমার। আর একজন কেবলই একাকি। তিনি একতারা। গহীন বনের অন্তরে বেজে চলে একমনে আনমনা। লোক আর লোকান্তরে, সঙ্গে নিয়ে শুকতারা।
আমি যে কারক হয়ে আছি। তারা চুপচাপ শোনে, কানে কানে নিন্দা ও নয়নে নিদ্রার আভাস জেগে তোলে। তারা শ্রান্ত-ক্লান্ত; বুঝি কামনার ঢঙে ফাঁকি দেয়া রূপ ফুটে তোলে। বিবিধ ঘর আর ঘরনির অজুহাতে। আমি হাসি। হাসিতে ছুটির সান্ত¦না জেগে তুলি। তারা টুপটাপ কেটে পড়ে। ফাঁকা ফাঁকা দূরত্বে তাদের রচিত গৃহ আর গেরস্থালি। ফের আমি নিঃসঙ্গতার মাঝে নিজেকে নিযুক্ত করি। আর ঠিক তখনই গরুড় হতে নেমে, গরলভর্তি গাগরীর গণনায় মনোনিবেশ করতে থাকে ক্রান্তীয় অঞ্চলের সুদেবের মেয়ে—আরাধনা। সম্পাদিত পাখির পালকে পরিবৃত সে আমাকে শুধায়—বাবু কী ঘুমায়? আমায় যে কিছু আমলকী ফলের যোগান দিতে হয়!
আরাধনা—চিকন, পাতলা আর হাতের মুঠোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা থরে থরে যৌবনা। আচারে—বিমূর্ত চিত্রের ন্যায় আধো আধো ধূপছায়া। নিকট আর দূরের দৃষ্টিতে বিবেচিত। হঠাৎ দেখলে মনে হবে ছুটে চলা সরল ফিতের মতো আপন আর পরিচিত। সে বাহুল্য বর্জিত। কবিতার ন্যায় চৌকস আর দৃঢ়তর। নানান ঋতুতে বিচিত্র ভাষা আর ভঙ্গির বর্ণালি চিত্রে সে ফুটে ওঠে। ঋতু তো অনেক আমার। কত যে নাম। কত তরুণ আর মাধ্যমিক। কত যে ক্ষয়ে যাওয়া অস্তিত্বের বিপন্নতায় আজও টিকে আছে তারা। আমি রেখেছি তাদের। বাতিল কিংবা বিগত শব্দে বড়োই বিষণœ আর বিরহের কথা লেখা থাকে। তাই আমি পরিমিত অনুষঙ্গের মধ্যে নানান প্রণোদনা ঢেলে দেই। তাদের ঠিকঠিক ব্যাকরণের নিয়মে উচ্চারিত হতে বলি। যথাসময়ে। ঘড়ি ও ঘণ্টার ঘূর্ণনে।
আমি রসের সংবেদে খেজুরের বন্ধু—ওগো শীত, হলুদ আর হেঁয়ালির মধ্যে জেগে রাখি হেমন্তকে। রাখি নির্মলা, নিরন্তর আর হাস্য-রসে ভরা ভরপুর অপুর্ব সব শ্রেণিবদ্ধ ঋতুমাতাদের।
এই যে আরাধনা, এই যে একনিষ্ঠ লক্ষণীয়া বালিকা আমার। আলোর ক্ষণিক ঝলকানি নিয়ে কাশফুলের মৃদুমন্দ ছন্দে দুলতে-দুলতে নিকটে এসেছে আমার। অথচ হাতে তার অঘোষিত গুচ্ছ কদমের কলতান। এভাবেই কখনো যৌথ, কখনো বা ত্রিমাত্রিক ঋতুর বন্ধনে— তাদের একত্রিত আছরে বিচূর্ণ-বিস্রস্ত অবয়বে ফুটে ওঠে সে। আমার কাল্পনিকতার মধ্যে বাস্তবের দাঁড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—রোজ রহস্যের রসাতলে।
এই যে আমলকী ফলের কথা বলে; ফলে ঘুম আর ঘটনার দ্বারা বাধিত হয়ে, প্রশ্নে আমি নানান বর্ণে, গহীন গাত্রে গর্বিত হতে হতে ঝাট করে নিজেকে নিজের মধ্যে পালিয়ে তাকে বলি—আচ্ছা সুদেব কন্যা, এতসব আখরোট, গায়ত্রী, দারুচিনি, গুনগুনি বা এই ধরো আজই রোপিত অর্জুন বৃক্ষের গল্পের মাঝে আরও কিছু আছে। যথা : তোষকী, গোঁসাইভোগা, তিলত্তমা; এ-রকম আরও বেশকিছু। কিন্তু আমলকী তো আমার এখতিয়ার বহির্ভূত। এ-ফল, তার রোপিত মালিক, প্রকৃত বা প্রভুত মালিক বা তার প্রেরককে তুমি পেলে কই?
এ তো ধূলি-ধূসরের মতো, বাঁশ কিংবা বেতের মতো নিয়মিত বা প্রচলিত নয়! নয় নামি ও দামির দাবিদার। এ তো বৈচিত্র্যে বিরহ জাগানো সংঘবদ্ধ মাফিয়া নেতার চক্ষু লাল করা কোন গুরুতর আদেশ অমান্য করার ঘটনা নয়।
আমার এ ক্ষেত্রে বহমান নানান মেধাবী ফলের ফলাফলে দিনরাত্রি প্রহরে প্রহরে মশগুল থাকে। থাকে তাদের ছোট আর বড়। কাঁচা-পাকার মোহনীয় সব উৎসব। পলকে পলকে তাদেরই যতসব আসা ও যাওয়ার প্রতিযোগিতা।
এই যে তোষকী—অনন্ত ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে একদা এনেছি আমি কোন এক গোস্বামী, নয় তো সান্যাল পরিবারের হাত হতে ধার করে। আমার ব্রোশিওরে তাদের সম্পর্কে চরম সব পুষ্টি আর প্রজ্ঞার কথা লেখা আছে। এই তো এখানে, এ ফলে কত তেজ ভক্ষণে কত ভাব আর ভাবনার কথা—আলতা নয় তো আলকাতরায় ছাপা আছে। আছে আস্বাস। উষ্ণ আর নাটকীয় চৈত্রের চিত্রালী। এরা তো দামি আর বর্ষীয়ান গোত্রের সদস্য আশ্রিত সব।
আর ঐ যে তিলোত্তমা, গোসাইভোগা—এ সব তো বলিষ্ঠ আর বলিয়ান। তারা এসেছে দূর যুদ্ধযাপিত কোন গ্রহ কিংবা গহব্বরের কেন্দ্র হতে। বহু বহু দিন পূর্বে হঠাৎই ছিটকে এসে ঠাস করে মুহূর্তেই বীজ হতে চারা আর পলকেই তা বৃক্ষে নিয়েছিল ঠাঁই। এ সবই স্টাইল। আমার এতদ্ঞ্চলে। আমার ব্যক্তিগত মেঘে মেঘে স্বপ্নের নিসর্গে এরা চিত্রিত পা-ুলিপির আকারে জমা হচ্ছে রোজ। লাইনে তাদের অজস্র ঠেলাঠেলি। হুট-হাট বেয়াদপি। আর বদবাক্য বিচ্ছুরণের নিয়মিত প্রদর্শনী। তবু আমি ছাড়ি না এদের। নতুন কাজে আর কর্মে, নতুন গন্ধ আর রসের জালিয়াতি নিয়ে এরা দাঁড়াতে চায় আমার সার্বভৌম ভূমিতে। নিজ নিজ আকার ও আকৃতিতে।
তাদের মধ্যে দু-একজন তো রীতিমত পলকপ্রসারী। ঐতিহ্যের আল ভেঙে গুচ্ছ গুচ্ছ সবজি সতেজের ন্যায় আমারই নাম ধরে ডাকে। আদুরে ভাষায়, ভঙ্গি আর ভক্তির রসাতলে ডুবে যায়। আমি হাসি, প্রশ্রয় আর পরশ দিয়ে নিকটে বিরাজ করতে বলি।
আমি যে কারক হয়ে আছি। আমার বিবিধ ভাষার মধ্যে গেঁথে প্রশ্নের উত্তরে মৃদু মৃদু হাসে, ঘোরে—ঐ তো আরাধনা, আমাকে কেন্দ্র করে; ব্যাস-ব্যাসার্ধ চাপ আর পরিধির গুনাগুনে। কেঁপে কেঁপে অবগুণ্ঠনের অবতলে। হাসিতে তার তীক্ষ্ম তরবারি ছুটে আসে। যেন জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে ত্রিশঙ্কু ঝুলে আছি আমি। হাসিতে ভিমরতি। হাসিতে হালকা হত্যার রূপ ফুটে ওঠে। দেহের প্রতিটি অক্ষরে নানান গুণ আর লক্ষাণাদির মাঝেও ঝিলিক দিয়ে ওঠে সেইসব ধারালো চাকুর রসিকতা। ক্ষণে ক্ষণে, দুলে দুলে, ছন্দে আমাকে সদা আবৃত করে রাখে।
তবু আমি ভয়ের বিপরীতে মনে পড়া ভুল পদক্ষেপের মাঝেও নাচের দক্ষতা ঘিরে তুলি। আমার চর্চিত সৃজন দিয়ে পরিচর্যার বয়ান ব্যক্ত করি। তারা ঘুরে ঘুরে বায়ুম-লের নানান স্তর ভেদ করে কখনো উপরে কখনো বা নিচের দিকে নেমে যায়। ফলে, অজানা কোন রসায়নে দূরের পাহাড়ে মশালের ন্যায় অবাঞ্ছিত সব আগুনের আলপনা গড়ে ওঠে। ওদিকে যারা থাকে— ঐ যে অলীক সব পূর্বপুরুষ। তাদের কাহিনী ও কল্পনায়; নদীর শিখরে উঠে নৃত্য করা সেইসব জাতি—তারা অচেনা ক্রোধে কাঁপা-কাঁপা অশ্লীল বাক্যের মাঝে আমাকে রোজ হত্যা করে চলে।
মূলত তারা অদ্ভুত। অত্যুজ্জ্বল রঙের অধিকারী সেইসব কলহ-প্রবণ জাতি—যারা রোজ কুমারী মাতাদের বলি দিয়ে যেত ঐ সব অদেখা, অস্পষ্ট গুহার গভীরে। ফলে অবারিত পাপীয়চিহ্নে পরিব্যাপ্ত সেইসব গুহা ভরে যেত যথোপযুক্ত বালি আর বন্যার সমারোহে। যেন শুদ্ধতার বিবিধ উদ্যোগ—তথা উদ্দীপনার কল্যাণে।
তবু আমি নিরাকার হয়ে চেয়ে দেখি—পাহাড়ে পাহাড়ে ধ্বনি আর ধাতুর কলরবে, কত যে পাহাড় কত যে তার খাড়া। আর শৃঙ্গ শীর্ষে অযথাই বেহুদা ঘুরে মরে অচেনা, অলীক সব আলোর বিচ্ছুরণ। তারা স্বভাব সঙ্গে রঙের রাজ্য নিয়ে মিশে থাকে দুর্বোধ্য সব বর্ণালি ঢেউয়ের অন্তরালে। হরেক কিসিমের প্রলেপ তার। আজগুবে সব আস্তরন। যেন স্তর সমৃদ্ধ কালার-কম্পোজিশান।
কিছুটা বায়ে, কিছুটা দক্ষিণে আমারই ব্যক্তিগত মানবিক কিসিমের স্বাগত সুরের ন্যায় ঝিলিকময় বেশকিছু দ্বীপ আর উপদ্বীপ। জানি বহু শতাব্দীর স্বাক্ষরে দামাল দস্যুরা যেথা শুধুই ছাই পেয়েছিল শিল্পীর কোলাজে আঁকা। ধূসর মিশ্রিত। স্মরণীয় শূন্য ক্ষেত্রফলের ন্যায় পুঞ্জীভূত আর লাবণ্যহীন।
তবু আমি যে কারক হয়ে আছি। আমার প্রকাশিত পত্রে; পত্রের ধূলি ও গন্ধের মাঝে আজও লেখা আছে কাটাকুটিময় উচ্চারিত রূপ হয়ে। সেথা উঁকি দিয়ে দেখি কতটা মাতাল আর মাত্রাহীন ছিলো তারা। যাদের তীব্র গন্ধে বমি হয়ে যেত। যেত করোটি হয়ে লাল। তাদের অদৃশ্য বাহুতে প্রলেপযুক্ত নানান সব মধু রঙ। খোকাদের মতো। আর তা দেখেই আচানক ঘিরে ধরতো সূচিপত্রহীন অন্য এক দানবের দল। যারা শুধুই জলীয় ভর আর ভাবনা খেয়েই বেঁচে থাকতো প্রতিটি দিবস। তাদের গতি, স্বর ও সন্ধানী বাক্যের ক্যারিজমা ও কারচুপি সবকিছু সেই মেটাফিজিক্স এর সূত্রে আবর্তিত। তারা শ্রেণিবদ্ধ দল আর দলীয় সম্ভারে—সাহসের সত্যকে পুঁজি করে দমাদম উঠে যেত দূর্গের উপরে। তারা মেধা ও মগজ বিবর্জিত। তারা নিসর্গের গভীরে থাকা নিভৃতচারী আঁধারের উপাখ্যান।
যদিও স্থির বলে কিছু নেই। নেই প্রকৃত সত্যের সমূহ বিন্যাস। তবুও রাত এলে তারা বর্শা ও বর্ণমালা হাতে তারাকে করতো ধাওয়া। আমি পালিত পাখির প্রস্তাবে, তাদের দৃষ্টিকে ধার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম অবলোকনের নিমিত্তে। তারা বেশ ক্ষিপ্ত আর দ্রুতগামী। তাদের কণ্ঠের কম্পনে—দেখতাম ঝুরঝুর করে হাজারো লক্ষ তারা খসে পড়তো মাটি থেকে। আর কী অপূর্ব জ্যামিতিক প্রথায় দ্রুত ও দিলদরিয়ার মতো স্থান করে নিতো মুহূর্তেই।
আজ বুঝি নানান অনুষঙ্গে তাদের এইসব কাহিনী কেন যে অনুষদের অঙ্গে গেঁথে রাখিনি? ভয়ের নতুন প্রজন্মে তাই মাঝেমধ্যেই ভাবিত হই। অযথাই বর্ধিত রাগের রসায়নে ঘেমে যাই আমি। আমার পরিচিত ডিটেলস্ এর অনুপম রূপে মনোমুগ্ধকর সব শান্তির স্রোত ডেকে আনি। ফলে, মুহূর্তে দূর হতে ভেসে আসা পার্বতী বাতাসে আমার উত্তেজিত ক্ষতচিহ্নে, স্নেহের বিশেষণে আগামীর আমেজ ও নির্যাস দিয়ে হঠাৎই শান্ত করে দিয়ে যায় ঐ এক বিদেশি আবেশ।
আহা! বিদেশ। কত বুনোপথ, কত কাদা আর কালির বাস্তবতা পেরিয়ে যেতে হয়। কত প্রচার কত প্রচলিত বাহনের সহযোগে। তাহা না জানি কত ঋতুর বৈচিত্র্যে, তাহা কতটা সবুজের আধিক্যে গড়ে ওঠে। সেথা কোন আচরণে কোন জটিলতা দেখা দেয়। না জানি কোন হুমকির ঝুঁকিতে পড়ে আছে। হায়রে বিদেশ! বালি আর বায়ুতে মিশে থাকা, বর্ণ আর বাক্যের সাথে উচ্চারিত হওয়া, কাঞ্চন-কনিষ্ঠের ন্যায় আদরে, আদেশে আপন করে কাছে টানা, তবুও বিদেশ।
আজ ঝাপসা, অস্পষ্ট সব ফলাফলের মাঝে বসে বসে ভাবি—বহু প্রজন্ম পূর্বে সেই যে এক আঞ্চলিক প্রতিনিধি সভার সভ্য হয়ে গিয়েছিলাম। তোমাতে বিদেশ! ভিন অনুষঙ্গের বল আর বাতাসের ঝাঁঝ কেটে কেটে। ক্রমবর্ধমান বিবিধ নগর, নাগরিক আর নিত্য সব পরিকল্পনার পাশ দিয়ে এঁকে-বেঁকে। খুবই দ্রুত আর দীক্ষিত হবার লোভে। সেই এক—একবারই। সভার সভ্য হয়ে।
মনে আছে অপূর্ব তাদের পদ্ধতির প্রেমগাথা। তাদের সুগঠিত মন, নানান মুখ আর মুখোশে ভরা। মূর্ত-বিমূর্ত ধারায় কেমন তুলতুলে আর বহুধাবিস্তৃত তারা। নানান পরিশীলিত পাখি আর পল্লবে প্রাণবন্ত সেই বিদেশ। তাদের শাসন আর শোষণের টানটান নীতিমালা। প্রসঙ্গক্রমেই দেখেছি কতটা অদ্ভুত তাদের শিশু ও সাবিত্রী। কত উন্নত পাখির পালকে আচ্ছাদিত তাদের রূপরেখা।
তারা কতটা গীতল, কতটা শীতল আর ভাবনায় কতটা গদ্যের গৎবাঁধা। মাঝেমধ্যেই সোনার সূর্য দিয়ে আলোকিত হয়ে যেত তাদের আঞ্চলিক বেলাভূমি। আর চারপাশে ছড়ানো-ছিটানো কত অলস, জলজ আর অলীক পৃথিবীর সব প্রাণী। আমি ভয়ে ভয়ে বিশুদ্ধ বায়ুর সঞ্চালনে; দেখেছি প্রতিটি শ্বাসেই কেমন সুরভীভরা আগামী বসন্তের বুনোছবি। দেখেছি ভূমিকার প্রান্তে রাখা কী সব পাগল করা প্রাণী। তাদের বড় বড় শিং। কী তীক্ষ্ম আর ধারালো। দেহের উজ্জ্বলতায় ঝিলিক মারতে মারতে বিন্দু আর বৃত্তের নিয়মে তারা ঘুরতো, খেলতো আমাকে কেন্দ্র করে।
তাদের পরিধিটা যে কত বড় তার গাণিতিক ব্যাখ্যাই বুঝিনি তখন। শুধু মনে আছে, মাঝে মাঝেই নলখাগড়া আর শালপাতা এনে দিতো তারা আমাকে খাবার মনে করে।
হায় রে কাহিনী! হায়রে ছেঁড়া ছেঁড়া মেদিনীর নৈশ কোলাহল। আমাকে গ্লানির রাজ্যে, রীতির সৃজনে রেখে তুমি তো লুকিয়েছো ফের—সেনা আর সন্তের তাড়া খেয়ে। তোমার প্রসঙ্গে তাই আমি বারে বারে ঘটনার তির ছুঁড়ে মারি। গ্রেফতারের বাঁধানো পোস্টারে গেঁথে রাখি তোমাকে। চিত্রে আমার তেলের তুল্য করে রাখি।
আমি যে কারক হয়ে আছি। সঞ্চারিত ভয়ে—দৈন আর একাকিত্বের লতায় পাতায় ডুবে আছি তোমারই অšে¦ষণে। আমার এ নিশ্চত নিরাপত্তার অন্যতম ভূমির বাহারে বিগত শোক আর সংকীর্ণতাকে ভুলে যেতে—ফলে আমি শীঘ্র শীঘ্র পাখির পরকিয়ায় নিজেকে মনোনিবেশ করি। তাদের প্রেমে, চিহ্নিত পরশে; কাম ও কামনার ঢং ফুটে ওঠে। আর এইসব চন্দ্রকিরণের অভূত চিত্রালীতে আমার মনে, গল্পের দুয়ারে হঠাৎই গেয়ে ওঠে আগামী বাংলার আগমনী। তারা ভাটিয়ালি। কী এক পাট-পচা গন্ধের অন্তরালে ডুবে থাকা সুরের সঞ্চারী। ভাওয়াইয়ার পুত্রবধূ সব। চটকার চটকদারিতে মাথা নুয়ে রূপান্তরিত হয়েছে আমার বিস্তৃত কৃষি ও কলার ভুবনে।
আমার আবিষ্কৃত বৃষ্টি-খরা আর প্রশমিত দাবদাহে এনেছো সাধক—তুমি এর প্রতিকারের প্রতিটি রূপের মধ্যে নিজেকে ধারণ করে।
এনেছো বাউল—প্রতিটি বিশ্বের, হাজারো তত্ত্বের তত্ত্বকে তালাশ করে। এই যে আমি, নিরাকার আমারই অšে¦ষণে। তুমি তো সহজিয়া। তুমি সুফি আর মারফতী। নানান বর্ণ ও ধর্মের মিলনে মাফিয়ার মতো গীত হও। হও শীতল, নম্র আর আলাভোলা। হও মহিমার নৈকট্যে থাকা নৈতিকতার তুমুল আশ্রয়ে আশ্রিত।
আমার সফলতোয়া সব নদীর মাঝি আর ভাড়া করা নাবিকের শ্রমে, তাদের বাক্য আর বেদনার মাঝে—গুরুর গুরুত্ব নিয়ে ঢুকে পরো নদী ও নারীর মিলনের সংযোগে। ফলে আমি ঝুমুরের ছন্দে, তাল আর লয়ে নিজেকে রাঙাই। তিক্ত তোমাদের তামাশার মাঝে ঢেলে দেই আনন্দ আর উল্লাসের যথা—আমি আর আমাকে।
আমি যে কারক হয়ে আছি। ইতিহাসের প্রতিটি প্রান্তে। বঙ্গ, সমতট আর হরিখেলের প্রতিটি খ-ে খ-ে। জেগে আছি মাটি আর মায়ের মধ্যে। আচারে-প্রচারে, পালা আর পঠনের গভীরে ধানের ধর্মে বিস্তারিত বীজ হয়ে আছি। তাই আমি নানান উচ্চতায় ফুটে থাকা উল্লম্ব গাছের কা- হতে নেমে, সেই সব গহন ঘন হয়ে আসা বৃক্ষ আর তাদের বিবিধ পাতার ঝিরিঝিরি বাতাসের করতালির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে কত রীতি, আচার আর আনুষ্ঠানিকতায় নিজেকে সংযুক্ত করি। তাদের নিজ নিজ নির্মিত চিত্রের জ্যামিতিক টোনে আর তার আলো ও ছায়ার দাপটে মাঝে মাঝেই অবাঞ্ছিত মনে হয় নিজেকে।
এদিকে আজকাল অরণ্য হয়ে থাকে। ফলে সত্য-মিথ্যা এইসব বৃক্ষরাশির আগুপিছু রেখা, তাদের আঁকানো-বাঁকানো বা প্রভূত বাস্তব পাতার বর্ণচ্ছটায় ছিটকে আসা রঙ—রঙের বাহরে অযথাই আমিও অংকিত হতে থাকি। মনে মনে তোমার ঢেলে দেয়া সমস্ত সৌন্দার্যানুভূতির অব্যক্ত চিত্রপটে।
তুমি দ্বন্দ্ব-মুখর। বড়ই কেন্দ্রীভূত। স্পেস হতে স্পেসে বেগের মধ্যে আবেগে অযথাই বিরাজ করতে থাকো। তোমার তৃষ্ণার মধ্যে অবদমনের জল হয়ে যদি আমি ঢুকে পড়ি। তোমার সুরের মধ্যে কীর্তনের কাল হয়ে যদি বিরাজ করি ! কী করে ফাঁকিতে চোখ ডুবিয়ে রাখবে জলভূমি?
আমি যে কারক হয়ে আছি। হালকা আগুনের মতো পলাশের পত্রে ভেসে আছি। ফলে আমাকে দেখে লজ্জায় লজ্জিত লাবণ্যতার ভেক ধরে হুট-হাট ছুটে পালায় ঐ তো এক শজারু-শাবক। আমারই তৈরি করা নতুন নতুন সব তাসাহারির ঝোপের গভীরে। রাত ঢলে পড়লে মাঝেমাঝে নিত্য নতুন সব ছোবড়াখেতের আশেপাশে দু-একটা হাবাগোবা বেজির বিচ্ছেদী সুরের অপরূপ বন্দনাও শোনা যায় দূর হতে। আমার কানের মধ্যে তাদের কথ্য-ভাষার এইসব স্বরলিপি বহুক্ষণ ধরে বাজে। গুনগুন করে। বাজে আর মিশে যায়। বাজে আর যুক্তও হয় নতুন নতুন সব পাখিদের পোক্ত প্রলাপে। তাদের কেউ কেউ গভীর চালাক আর চঞ্চলা। তাদের রাজকীয় ঢং আর জ্ঞানীর চেহারার মাঝে নিজেকে বড়ই বার্ডব্রেইন বলে মনে হয়।
তাদের প্রসস্ত আর সৃজনশীল পাখার প্রলেপে হঠাৎই ডার্কজোন বলে ভ্রম হয়—এতদ অঞ্চলে বাস করা তুমুল সব প্রাণী আর পালোয়ানদের। আমি এর মর্মবাণী, কখনোবা আগামির ময়ূরপুচ্ছের বিচিত্র রং আর তার বিন্যাস নিয়ে তাদের আস্বস্ত করি। ভয় আর ভূতের গল্পের মাঝে জেগে ওঠা নতুন ভূমির গল্পে নিজেদের মশগুল থাকতে বলি। তারা ভাবে, মনে মনে ভূষিত হয়।
আমি যে কারক হয়ে আছি। এ রকমই নানান সব উজ্জ্বল উদাহরণের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে অকারণ সব টানাপড়েনের লোভে থামি। ফের চলি। মনোমুগ্ধকর এইসব স্মরণপঞ্জিকা হাতে নিয়ে। একা একা। চলতে চলতে অভূত অহংকারে চেয়ে দেখি—আরও সব কত না জঠরবন্দি বকেয়া খাজনার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে দেখে। বিক্ষিপ্ত ব্রিজের ওপাশে গজিয়ে ওঠা বিকাশী, চিনিরাজ আর যত সব ত-ুলা বৃক্ষের শাখায়-শাখায়, ভয়ে ভয়ে, পাতায় আর পত্রশিরার অধিবাসীগণ।
তারা কসমস আর কামিনী ফুলের প্রতিনিধি। কেউ বা জারুল কিংবা জামরুলে বেঁধেছে জুটি। নানান নকশা আর গ্রাফিক্স-এ ভরপুর তাদের বহুমাত্রিক ঘর আর ঘরনি। নানান ইমেজে তারা ধরা দেয় আমার চোখের অস্পষ্ট কারকে প্রতিদিন। অথচ সেই আমি, তবুও তোমার চুল ধরে রোজ নেমে যেতে চাই—তোমারই পথ হয়ে, পথের ধূলিতে মিশে গিয়ে; বেহুদা বাতাসের হাত ধরে রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ঢুকে যেতে চাই তোমার বিশুদ্ধ অন্তরে প্রতিদিন। এইসব এলোমেলো আর বিক্ষিপ্ত জীবন হতে পালিয়ে, দলীয় তাপমাত্রার একেবারে বাইরে গিয়ে ছিটকে ছুটে যেতে চাই। যেথা চা-য়ে আর অমৃতে নিত্য ঠোকাঠুকি। অজস্র পাগল আর পাতায় ভরা তোমাদের সেইসব কারবারে কত স্মৃতি আর সন্ন্যাসী। যদি ভুল করে শুধু একবার তোমার আঙুলে জড়িয়ে পড়ি—জড়ানোর ব্যাখ্যা সহকারে। তবে কী দেবে ব্যথা! আমাকে—বলো তরু, উত্তরে ও তোমার তর্জনীসকল।
আহা! আমি যে কারক হয়ে আছি। কাব্যে আমার নিশিদিন অন্ধ আলেয়ার ভগ্নি হয়ে আছি। বুুঝি এ সবই আগামি আমার—অতীতের হতে ছিটকে আসা বন্দি বাগানের কেয়ারীতে শুয়ে শুয়ে আমি তানপুরাতে নতুনের সুর হয়ে উঠি। উঠতে উঠতে, চলতে চলতে কেবলই বিশ্রাম আর বিভ্রান্ত সব পথের কাটাকুটি। এরকমই এক বাঁক পেরিয়ে হঠাৎই চেয়ে দেখি, থমকে যাওয়া রাজপুত্রের ন্যায় মিশ্রিত মুখোভঙ্গির এক নায়ক, মৃদুলকান্তি। আমার ব্যাক্তিগত নামের সাথে মামা সম্বোধন করে বলে ওঠে—তোমার হাতি আমার খেতের আস্থা হারিয়েছে।
অনুসন্ধানে আমি বুঝি, এ প্রশ্ন অবান্তর নয়। এ তো বাংলা নন্দনতত্ত্বের অনুসারি। এ প্রশ্নের সূচনা ও সমাপ্তিতে আছে—যথা ধর্ম, যথা দর্শন। আছে সাহিত্য ও স্থাপত্য হারানোর বেদনা। এ প্রশ্নে ধাপ আছে। আছে অভিব্যক্তি আর বিবেচনা। ইহা চিন্তা চর্চিত। কখনো কখনো সংগীতময়ও বটে। আছে এর যৌক্তিক পটভূমি। সত্য সৎ আর স্বাতন্ত্র্যের নানান প্রশ্নবাহী—ইহা শংকরে সংকরা। এ প্রশ্ন সামাজিক। জ্যামিতিক তো বটেই। আছে এর গাণিতিক, নান্দনিক হাজারো বিন্যাস। বিশেষত : এতদ্ঞ্চলে।
তবু আমি ভেকধরা ভাবনার অনুরাগে প্রকৃত শুধাই, উল্টো রেখা টেনে। দৃষ্টিতে দহনের দান চেলে, বলি—হাতি কী মৃদুল? সে বলে, তাহলে হরিণ হবে। হবে—নয়তো তয়তো সন্দেহের তরঙ্গায়িত কোনো তো শাবক। বা তার উচ্চ-ঊর্ধ্ব কোনো প্রতিনিধি।
যেন ভুল করে শুনে, আমি হাসি আর কাশি। কাশিতে কষ্টের কলঙ্ক ফুটে তুলি। বেদনার মুখোশে ঢাকি মুখ। তবু দ্বিধা আর দ্বন্দ্বে যেন শিরোনাম হয়ে ওঠে; এমনই ঢং-এ ফের বলি—আমি তো ইলেকশান করি না মৃদুল? এ সব আজগুবি নাউন তুমি পাও কই? এমন সব নাশকতার নকশা কে এঁকে দেয় তোমাকে মৃদুল?
সে চোদনা-চামারের মতো বাক্যে বাঁধা পড়ে যায়। মুহূর্তেই, আচমকা বিজ্ঞাপনে বাহিত হবার ন্যায় কিছুটা লজ্জিতও হয় বটে। মনে তো হয়, যদি মনোসংযোগে দেখা হয় তাকে। আমার আলো-আঁধারির রহস্য ঘেরা এই বর্ণিল সমতটে।
মূলত মৃদুল গত কয়েক শতাব্দী পূর্বে মৈনাক পর্বত হতে পালিয়ে এসেছিল এতদ্ঞ্চলে। বিবিধ রঙের মধ্যে সাবলীল রেখা আর গতির প্রয়োগে এসেছিল ছুটে একদা মৃদুল, আমারই মঞ্চে। নানান ঘরানায় ঘুরতে ঘুরতে স্থিতুও হয়েছিল সে— নিজস্ব স্বাদ আর মেজাজে। প্রভূত চর্মকারক হলেও নিয়মিত খাজনা দেয় সে আমাকে। নদীতে নাইতে, পাহাড়ে পরতে আমাকে স্মরণ করে। জঙ্গলে ডুবে যাওয়া নদীতে নেমে, মুখে মুখে মাছ ধরে আনে। আমাকে তাজ্জব শ্রেণির অন্তর্গত করে। যেন ক্ষুধার্ত বেড়ালের উচ্চ আর উন্নত রূপের মাঝেও সেই এক ড্যামকেয়্যার ভাব সমগ্র চাহনীতে ফুটে থাকে তার। মাত্রায় মিশে থাকে সহজাত আদান-প্রদানে। যেন বলতে চায়— ‘পাখিজুকি খাই না এখন ধর্মে দিছি মন, বিচুলির দড়ি গলায় দিয়ে যাচ্ছি বৃন্দাবন’।
আমি যে কারক হয়ে আছি। আসলেই সে নিশির নির্দেশনায় নিয়মিত নিবিড় হতে চায়—আমার সহস্র গন্ধ ও গল্পের তালবনে। ফলে, তাকে আমি নিরপেক্ষ নিকেতনের স্বপ্নে নন্দিত নাটকের কোন এক মেঘাচ্ছন্ন নায়িকার আঁখির প্রান্তে গেঁথে রাখি। বিগত বর্ষা আর বাহিত বিকেলের ন্যায়। রাখি—শীতের স্নিগ্ধ সকালে শিউলী কিংবা সমগোত্রীয় কোনো ফুলের; ফোঁটা-ফোঁটা কাহিনীর এক ফাঁকে। রোজ এইভাবে।
আর এভাবেই যেতে যেতে নামাঙ্কিত পথের ধরায় চেয়ে দেখি, এক নভেরা বৃক্ষের নিচে ফের তুমি লিখিত রূপ ধরে দাঁড়িয়ে আছো বিবিধ শূন্যস্থান পূরণের আশায়। আমাকে চমকে দিয়ে রেশমের তন্তু ও তুলায়। ফলে, ফের মগজে আমার মননে তোমার বিশৃঙ্খলা ধরা পড়ে। ভাবি কতটাই না উত্তম ছিলো এর চেয়ে ঝিনুকের পেটে মুক্তা হয়ে বসে থাকা। সেথা হরেক রকম রঙিন দারোয়ান। তাদের দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা। যদি না বাহির হতাম আমি আজ তোমার বীজ হতে, যদি না রোপিত হতাম। যদি না জন্মে জন্মে ছেয়ে যেত প্রেত হয়ে পাতালের সব ছায়া। তাহলে কেউ বলতো না, এই ছেলে—কতটা ত্রিভুজ কুড়োলে আজ। আর এই দ্যাখো এই পথে গেলে নিমিষেই যাওয়া যাবে ঐ তো তাহাদের মঙ্গলমাসি গ্রহে। যেখানে ভাঁট-ফুলের গন্ধে নিমিষেই বিড়াল হয়ে যায় ডাইনোসর। আর এই যে চর্যাপদের কথা বলছো; ওখানে তো শুধুই তেজষ্ক্রিয়া। বৃক্ষের বদলে বালক-রশ্মি। কেউ বলতো না, চলো তো ব্রাদার—ঘুরে আসি হনন মেরুতে মোরা। দু’জনে… যেথা দুরবীন দূরত্বে আজও ঝাপসা, শ্যাওলাময়ী নির্বাহী কোনো এক কলোনির উপকণ্ঠে বাস করে তারা শুধু মধু আর ম্যাজিকের লোভে।
আহা! আমি যে কারক হয়ে আছি। সেথা অরণ্যে, আমি আর আরাধনা। হাসি যে তোমার হালকা হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এতটাই নির্বাক আমি—যখন আমাকে তাক করে জ্বালিয়েছো আগুনের আলপনা তুমি। তবু ধীরে ধীরে জ্যোৎস্নার গোত্রে নিভু নিভু গন্ধে তোমাকে শুধাই—আরাধনা, রাত-বিরেতে এমত বাদর-লাঠির বাগানে করো কী তুমি? এমন বিচিত্র দেহ-রেখা নিয়ে।
আমি ভাবি আর আলোচ্য আগুনের মাঝে ঝাঁপ দিতে চাই। চাই পতঙ্গের প্রেমে পড়া আগুনের আবেগে, সম্পূর্ণ তোমাকে। তোমার কলঙ্কে ডুব দিয়ে যদি স্নানের পূণ্যতাকে ফিরে পাই? তুমি পৃথিবীর সমস্ত জলসাঘর থেকে লুট করে আনা সমগ্র ঘুঙুরের ঘোরে বেজে ওঠো; ফলে নৃত্যে নৃত্যে নেচে ওঠো—এভাবেই তুমি আজি এ উ™£ান্ত প্রহরে। ফাঁকা ফাঁকা চৈত্রমিশ্রিত সাদা-কালো শীতের প্রান্তে এসে।
প্রশ্নে, বিচিত্র ক্রিয়া ও কল্পের মাঝে নিবিড়ে জানাও—দিন তো কর্তা, যত কারক। হেসে খেলে আপনার অমূল্য সব আমলকী। আরও আরও দিন তো কাহিনীর তরে দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে আপন করা এক বাদরলাঠি—আমাকে আপনি। এত এত বায়ুর বিকিরণে, এত তারা আর তসবির বিনিময়ে—দিন তো কবি, জেগে থাকা এইটুকু রাত। রক্তাক্ত কাহিনীর ন্যায় রাখি গেঁথে। আঁচলে, কোমরে আমার। বাহু আর বেণীতে ঢালি তার সুধা। সমস্ত সুর দিয়ে, ডাকি তো আপন করে। নিমিষেই শায়িত হই—মাত্র গঠিত এ ভূ-তলে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খাই। তুমি যে কর্তাকারক—গোপনে গোপন করা তোমারই আজ সমগ্র আমলকী। আহা! কী করে লুকাই; তাহা সঙ্গোপনে— দুহাতে আপন করে আজব করা সেই বাদরলাঠিখানি!

**************************

দেশভাগ : রাজনীতি, জাতীয়তা ও সংস্কৃতির ছিন্ন বৈজয়ন্তী
শামীম সাঈদ

বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতা, তা ব্যক্তির, দলের, সম্প্রদায়ের কিংবা মহৎ-সমষ্টির; প্রকৃতপক্ষে তা মানুষের সংকটও। দেশ-কালের গ-িকে ছাড়িয়ে এটি প্রকৃতই সামগ্রিক মানুষেরই সংকট। প্রসঙ্গটি না জাতীয়তার, না সাম্প্রদায়িকতার। কিন্তু এই বিষয়গুলোই মানুষের অস্তিত্বের অংশ হয়ে, চেতনায় প্রকটরূপে বিরাজ করে, করছে। বিরাজ করছে সংকীর্ণতার সুরত নিয়ে। কিন্তু, মানুষ তো অনুসন্ধান করে ফিরেছে, অনুসন্ধান করছে তার সংহতির সূত্র, ঐক্যের চাবিকাঠি। যা কিছুই তার ঐক্য ও সংহতির মৌল উপাদান, তাই যেন আজ মানুষের প্রধানতম দুর্বলতা। মানুষের বৈচিত্র্যময়, স্বাতন্ত্র্যময় স্বরূপ চিহ্নিতকরণের যেটি স্মারক, সেটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে তার বিভাজনরেখা। সম্ভবত, এটিকে সামগ্রিকতার দৃষ্টিতে না দেখলে, সংকটটির প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হবে না। আলোচ্যে বিভাজনের বিষয় ও পরিপ্রেক্ষিত প্রত্যয় ‘দেশভাগ’। এই প্রত্যয়টির সাথে যুক্ত ‘দেশ’ ও ‘ভাগ’ সুনির্দিষ্ট দুটি শব্দমাত্র নয়, বরং এই শব্দ দুটির ধারণাকাঠামোর সাথে যুক্ত আরো প্রত্যয়সমূহ যা এই ‘দেশ’ ধারণা ও বোধের বাহিরান্তরকে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উপকরণে বিশ্লিষ্ট করে দেখাবে। এবং এই স্বতন্ত্র শব্দ দুটিও স্বতন্ত্র দুটি প্রত্যয়ও বটে। সুতরাং সমাজবিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি ব্যতিত বক্তব্যসংশ্লিষ্ট বিষয়টিকে বুঝতে পারা সহজ নয়, হয়তো বোঝা সম্ভবও নয়। কেন না, দেশ প্রত্যয়টি এককভাবেই যতোগুলো প্রত্যয়গত অন্বয় নিয়ে স্বয়ং স্বরূপতায় প্রকাশিত, সেই প্রত্যয়সমূহই আবার স্বয়ং স্বতন্ত্রতায় ব্যাপ্ত ও নিবিষ্ট মনোযোগ দাবী করে পাঠে ও অনুসন্ধানে। এবং শব্দবন্ধে যুক্ত ‘বিভাজন’ অর্থবাচকতার ‘ভাগ’ শব্দটিও, যা কিছুতেই দ্ব্যর্থকতাহীন নয়, ফলে সেটির প্রতিও ভিন্নার্থক দৃষ্টিকোণসমূহ সমাজে প্রচল রয়েছে। ফলত, কেবল ‘দেশভাগ’ ধারণাটির মধ্যে আদতেই কোনো নির্দিষ্টতার ইঙ্গিত নেই। বহুবিধ প্রত্যয়গত বোধের উন্মোচন ও স্পষ্টকরণের ভিতর দিয়ে দেশ ধারণাটি নিজস্ব স্বরূপে উদ্ভাসিত হলেই কেবল সংকটের মূলে যেতে পারা যাবে বলে ধারণা করি। প্রসঙ্গটি মূলত বিভাজনের। বিভাজন দেশের। এবং এই ‘দেশ’ ধারণাটি একই সাথে মানুষের স্বতন্ত্রতা, বৈচিত্র্য ও সংহতি বোধের ধারক। কিন্তু দেশের বিপরীতে থাকে আরো দেশ, মানুষের বিপরীতে বিরাজিত আরো মানুষ। দেশ ধারণার সাথে যুক্ত ভূখ-, ভূগোলগত রূপরেখা, সীমানার ধারণা, নাগরিকতার বোধ, রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়া, ক্ষমতার আত্মজ প্রবণতা এবং সমাজ-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মানুষ সংশ্লিষ্ট ক্রিয়া-প্রক্রিয়া ও প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার সামষ্টিক ফলাফলগত নতুন সমাজ-রাষ্ট্রিক উন্মেষ। আর এই সমাজ-রাষ্ট্রিক ব্যাপ্তির ভিতর মানুষেরা মূলত তাদের বৈচিত্র্যের, স্বাতন্ত্র্যের দাবীতে বিচ্ছিন্ন হয়; বিভাজিত হয় বিপরীতরূপে ঐক্যের নামে, সংহত হওয়ার মানসে। সুতরাং মানুষের চেতনায়, প্রকৃতিতে সর্বদা এক অনির্ণেয়, প্রতিকারহীন বৈপরীত্য বিরাজ করে। মানুষ বৈপরীত্যে বসবাস করে, বাস করে দ্বন্দ্বের ভিতর, দূরত্ব ও নৈকট্যের বিপরীতমুখী প্রবণতায়। সুতরাং এই সংকটের দার্শনিক অনুসন্ধান হওয়া জরুরি, কিন্তু, দার্শনিক অনুসন্ধানটিকে অন্য পরিসরের জন্য তুলে রেখে বরং এর সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধানেই এখানে নিবিষ্ট হওয়া যাক!
পৃথিবীতে বসবাসরত মানুষদের মধ্যে এখনো পর্যন্ত তাদের নিজেদের সম্পর্কে পারস্পরিক সামগ্রিক অভিজ্ঞতাজাত ধারণাসমূহ অর্থগতব্যঞ্জনায় ও স্বরূপতায় পূর্ণতা লাভ করে নি, স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি। এর প্রধানতম কারণ হলো মানুষেরা বহুধা বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন। তাদের বিচ্ছিন্নতা ভৌগলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং এতদজাত মানসকাঠামোগত। বিশ^জুড়ে তারা বিচ্ছিন্ন বটে নানান দলে-উপদলে, সমাজে, রাষ্ট্রে কিংবা সম্প্রদায়ে; কিন্তু বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও তারা পরস্পরের প্রভাব মুক্তও নয় কিছুতেই আর অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও নিজেদের মধ্যে সংহত। তারা সংহতিপ্রিয় বটে, নিঃসন্দেহে; কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন মানুষেরা (দলে-উপদলে, সমাজে, রাষ্ট্রে কিংবা সম্প্রদায়ে) সর্বদা পরস্পরের সংস্পর্শে এসেছে যে সংহতির খাতিরেই তা নিশ্চিত করে বলা যায় না, বরং তারা সংঘাত প্রবণতায়, লুণ্ঠনমানসে এবং সা¤্রাজ্যিক উচ্চাভিলাষে লড়াই-সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতেও পরস্পরের কাছে এসেছে, এ-ও অনস্বীকার্য সত্য। মানুষের জন্য, আদিতে যে সংগ্রামটি ছিলো প্রধানত প্রকৃতির প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে, কিন্তু সমাজ বিকাশের ধারায় মানুষ অন্য আরেক প্রকৃতির প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এই প্রকৃতি হলো মানুষের নিজস্ব প্রকৃতি, প্রবণতা, সহজাততা। এই মানুষ-প্রকৃতি বা মানুষ-সত্তা যা অবধারিতরূপে আরেকটি সত্তার জন্ম দিয়েছে। এই সত্তা হলো মানুষের সমাজসত্তা যার স্বরূপ প্রকাশ পায় মানুষের সংস্কৃতিরূপে। এবং এটি মানুষ-সত্তা থেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো অস্তিত্ব নয়, মানুষের সমাজসত্তা তথা সংস্কৃতি মানুষসত্তা তথা মানুষপ্রকৃতিরই বাহ্যিক ক্রিয়ারূপ এবং বরং তা মানুষের দ্বৈতসত্তার সমষ্টিগত প্রতিরূপ। বিশ^প্রকৃতির অংশে মানুষ সংগ্রামশীল। সংগ্রামশীলতার দ্বৈতসত্তা নিয়েও, দ্বৈতসত্তা অন্তর্গত দ্বন্দ্বে সর্বদা ক্রিয়াশীল। এই দ্বন্দ্বের স্বরূপ এমন; প্রথমত, মানুষের মানুষ-সত্তাই বিশ^প্রকৃতির সাথে/ভিতরে অস্তিত্বের সংগ্রামে (এখানে বিশ^প্রকৃতির সমগ্র ও অংশও পরস্পর দ্বন্দ্বশীল) সমাজ-সংস্কৃতিকে রূপায়িত করে চলে, কিন্তু এর অব্যবহিত পরে সমাজসত্তাই আবার মানুষকে তার মানুষ-সত্তার বিরুদ্ধে গিয়ে মানুষ-সত্তার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্যে রূপান্তর ঘটাতে সচল হয়ে ওঠে এবং তাতে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যম-িত কাঠামো দান করতেও প্রভাবক হয়ে ওঠে। মনুষ্য প্রকৃতির বিচিত্রতা ও সমাজসত্তার বিচিত্রতার যে পারস্পরিক ও বিপরীতমুখী ক্রিয়াশীলতা যা প্রকারান্তরে প্রতিক্রিয়াশীলতা, তা মানুষের অন্তর-বাহিরে দ্বান্দ্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। মানুষপ্রকৃতিকে কেবল প্রকৃষ্টরূপে চেনা যায় তার দ্বন্দ্ব প্রবণতায়। এখানে, দেশভাগের আলোচ্যের পরিসরে এই মানুষ-সত্তা ও তার সামাজিক সত্তা প্রসঙ্গটির অবতারণার কারণ হলো এই যে, পৃথিবী জুড়েই স্থান ও কালের ভেদে মানুষের সমাজসত্তা তথা সংস্কৃতির বহু স্বতন্ত্ররূপ বা বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে। আর এই বৈচিত্র্যের নিরিখেই আন্তঃসাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বও ক্রিয়াশীল। দেশভাগের আলোচনায় এই সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বই বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। যেকোনো কাল ও ভৌগলিক পরিসরেই ‘দেশভাগ’ মানুষের বহুমুখী ও বহুমাত্রিক দ্বন্দ্বের পরিণতি। সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব অন্যতম। সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে আলোচ্য এই কারণে যে তা মানুষের সত্তারূপ ও সংহতির সূত্র। এই দ্বন্দ্বের মূলে অন্যতম প্রধান নিয়ামক মানুষের জীবিকা, বাসস্থান বা ঠিকানা, পরিচয় তথা তার অস্তিত্বের সংকট। সংকট মোকাবেলার মানসে মানুষের বিরোধাবস্থান স্বয়ং সেই সংহতিকে শিথিল করে দেয়।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামপ্রক্রিয়া নানান সামাজিক প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিকে মানুষকে সংহত করেছিলো বটে, কিন্তু সংহত হবার ফলেই তাদের আত্মপরিচয়ের জিজ্ঞাসাটিও সম্মুখে আসে প্রকটরূপে, স্বতন্ত্রতার স্মারকে ও বিভাজকরূপে। এই বিভাজন সমাজ বিকাশের ধারায় জটিলতর স্তরেরই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য। আর আত্মপরিচয়ের জিজ্ঞাসাটিও তাদের উপলব্ধ হয়, তাদের বিভাজনজাত স্বাতন্ত্র্যচেতনা জাগ্রত হবার পরিণতি হিসেবে। কিংবা এও কি বলা যায় না যে, মানুষের স্বাতন্ত্র্যবোধই তাকে বিভাজিত করছে? জিজ্ঞাসার উত্তর অনুসন্ধানের ফাঁকে এই সিদ্ধান্তে নিঃসন্দেহেই আসা যায় যে, স্বাতন্ত্র্যবোধ ও বিভাজনমানস কিছুতেই বিসমসাময়িক নয়, বরং তা যুগপৎ ব্যাপার, মানুষের মানুষসত্তায় ও সমাজবাস্তবতায়। কিন্তু, নিশ্চয়ই, এই স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগ্রত হওয়ার ঘটনা মানুষের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচকই ছিলো আদিতে। কেননা, আদিতে মানুষের মধ্যে বিশিষ্টরূপে রাজনীতিচেতনার কোনো প্রকাশ দেখা যায় নি। মহান রাষ্ট্রচিন্তক এ্যারিস্টটল মানুষকে জন্মসূত্রেই রাজনৈতিক প্রাণী বলে যে দাবী করেন, তা এখন নিশ্চয়ই বহুমুখী প্রশ্নের অভিঘাতে পূর্বের মতো আর সুরক্ষিত নয়। কীভাবে সমাজ-বিকাশের সাথে মানুষের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও মানসজটিলতার ক্রমাগ্রগমন হয়েছে, তা সমাজতত্ত্ব ও তাত্ত্বিকগণ অতিবিশদেই তুলে এনেছেন আমাদের জ্ঞানপরিম-লে। সুতরাং মানুষের রাজনৈতিক প্রাণী হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার বির্বতনমূলক দীর্ঘ কালপরম্পরা, তার উপস্থাপন এখানে বাহুল্য জ্ঞান করেই এড়িয়ে যাওয়া চলে। তবু, সামান্য কথা এই যে, সেখান থেকেই মানুষের আত্মপরিচয় অন্বেষার একটি বির্বতনমূলক পরিক্রমণরেখা পাই। এই বির্বতনমূলক পরিক্রমণ পথেই সমাজ-সংস্কৃতির পরিবর্তনের কালপরিক্রমায় মানুষের আত্মপরিচয়ের নির্ণীতির সাথে আরো কিছু পালক যুক্ত হয়ে নির্মাণ করেছে তার আত্মপরিচয়ের বৈশিষ্ট্যগত বিবেচনা, চিহ্ন ও তার মাত্রাগত তারতম্য। রাজনৈতিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভৌগলিক পরিচয়, সাম্প্রদায়িক পরিচয়, জাতীয়তাবাদী পরিচয়-চিহ্নিত এইসব পালকসমূহই কি স্বাতন্ত্র্য ও বিভাজনের স্মারক নয়? এবং এইসব চিহ্নিত পরিচয়ের প্রত্যেকটির রয়েছে প্রত্যয়গত স্বরূপ, মাত্রা ও স্বরূপগত বিভিন্নতা যা মানুষকে স্বভাবতই করেছে স্বাতন্ত্র্য মনস্কতায় ও বিচ্ছিন্নতাবোধে বহুধা, বিভাজন-চৈতন্যে বিচিত্র সত্তামান। বিচিত্রসত্তার ধারণাটিও মানুষকে অনিবার্যতায় বিভাজিত করে ফেলে, বিভাজিত করে ফেলছে।
বিশ^জুড়েই বিভাজনের হাজারো উদাহরণ বিদ্যমান। ফলে, এবিষয়ক ভাবনার পরিধিও বিশ^ব্যপ্তই। কিন্তু এসংক্রান্ত ভাবনার পরিধি যা-ই হোক, আলোচনার ব্যপ্তিসীমা আপাতত বৈশি^ক করা আমার ইচ্ছে নয়। এপর্যায়ে এসে কালসীমার রাশ না টানতে হলেও স্থানিক ক্ষেত্রটি নির্দিষ্ট করা জরুরি। তাই পৃথিবীর পূর্বপ্রান্তে বসে তাই সংকট পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে সীমায়িত এই ভারতীয় উপমহাদেশকেই নির্দিষ্ট করা গেলো। চোখ ফেরাতে চাই বিশ শতকের ভারতের দিকে। বিশ শতকের মধ্যভাগের যে ঘটনাটি এখনো পূর্বাপেক্ষাও অধিক, এতদঞ্চলের মানুষের চিন্তায় ঝড় বইয়ে দিচ্ছে, মানস জগতে ট্রমা হিসেবে স্থায়ী হয়েছে তা মূলত ভারতভাগের বাস্তবতা তথা দেশভাগের বাস্তবতা। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রসঙ্গেই আমাদেরকে বারে বারেই অতীতমুখী হতে হচ্ছে। অতীতমুখে আমাদের অনুসন্ধানী নজর ফেলতে হয় এবং জ্ঞানদৃষ্টি ফেরাতে হয়; কেননা, আমাদের কেবলই মনে হয় যে, বর্তমানের নানান সংকটসমূহের নিদান যেন নিশ্চয়ই সেই ভারতভাগ তথা দেশভাগের কার্য-কারণ বাস্তবতার ভিতরেই নিহিত রয়েছে, আর তার পরিণতি ও উত্তর-পরিণতিই আমাদের এই বর্তমানের সংকটকাল। এবং আমাদের বর্তমান সংকটটিও এক পরিচয়সংকটজাত সমাজদ্বন্দ্ব ও তজ্জাত সংঘাতের ফল। আর তার সাথে নিরাময়হীন বিষক্রিয়া ঘটিয়েছিলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তথা রাষ্ট্রচেতনার ভ্রান্তোপলদ্ধি। এবং এই ভ্রান্তিরও নিদান অনুসন্ধান জরুরি এবং তা ভারতের মানুষের কয়েক হাজার বছরের সমাজ-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভাব ও প্রভাব ধারার বিবর্তন ও বিকাশ পরিক্রমার কোন পর্যায়ে এর সূত্রপাত তারও অনুসন্ধান দরকার। কাল পরিসরের কোনো এক অংশে এ অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক মানসপটে নিশ্চয় তার ছাপসূত্র রয়েছে। এবং এ অঞ্চলের হাজার বছরের উপনিবেশ-বাস্তবতাও সেই সাংস্কৃতিক মানসকাঠামো গঠনে কীভাবে ভূমিকা রেখেছে অথবা রাখে নি, তাও অবশ্যই অনুসন্ধানেয়।
প্রসঙ্গ তো এই-ই, বিভাজন : দেশভাগ; ভারত ভাগ। ভারতীয় সমাজের ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দির সংস্কৃতিকাঠামোর মধ্যে এর সুনির্দিষ্ট কারণ তো ছিলোই। কিন্তু, ভারতের সংস্কৃতিতে ঊনবিংশ শতকের পূর্বের প্রায় চার হাজার বছরে নানা জাতির আগ্রাসন, উপনিবেশ ও সাংস্কৃতিক যে প্রবাহ, সেই সাংস্কৃতিক প্রবাহের ভিতরেও কি বিভাজনোন্মুখ কোনো প্রবণতা ছিলো? সেটিও অনুসন্ধানেয়। আদতে ভারত একটি বৃহৎ সমন্বিত ভূখ- এবং এ অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি চরিত্রগতভাবেই সমন্বয়ধর্মী। এখানে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ছিলো বটে, কিন্তু একটি মূলগত ঐক্যও ছিলো। সেটি কেমন? সেটি হলো ভারতীয় সমাজের ভিত্তিকাঠামোর ঐক্য। ঐক্যের কারণ দীর্ঘকাল পরিসরে এর রূপান্তরহীনতা। ধরা যাক, এ অঞ্চলের বিশেষ ধরনের সমাজব্যবস্থা, হাজার বছরে অপরিবর্তিত সমাজের ভিত্তিকাঠামো অর্থাৎ এশীয় উৎপাদনব্যবস্থার (এসিয়াটিক সোসাইটি) বিশেষ ধরনের সাংস্কৃতিক ভিত্তি। যদি বলা হয় যে, ভারতীয় সংস্কৃতির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য কিংবা প্রবণতাসমূহ এই এশীয় উৎপাদনব্যবস্থার দীর্ঘ, সহ¯্র বছরের ধারাবাহিকতা, এটি অনস¦ীকার্য। প্রায় পাঁচ হাজার বছরের ভারতীয় কৃষিসভ্যতার কিছু প্রলক্ষণ তো এখনো বর্তমান। ভারতের সেই বিশেষ ভিত্তিকাঠামোটি প্রায় অপরিবর্তিতরূপে বিশ শতক পর্যন্ত টিকে ছিলো। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা কিংবা মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মতো প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা একেবারে কখনোই লুপ্ত হয়ে যায় নি, বরং ধ্বংস ও ধ্বংসের থেকে পুনঃনির্মাণ, কখনো স্বকীয় ভিত্তির উপরেই অন্য নতুন সংস্কৃতিকে আত্মীকরণ করেই এর ধারাবাহিকতা রক্ষা পেয়েছে। অতীতের সে ছোট ছোট গ্রাম তথা স্বনির্ভর বিশ ও বিশবাসী বা বৈশ্যগণের সে এক অনড় জীবন ব্যবস্থা ছিলো। বিশের প্রধান বিশপতি, জনের শাসক রাজন; এমনই সামাজিক অনুশাসনিক অঞ্চলের প্রাচীন ভারতের মানুষেরা সমাজ বিকাশের ধারায় সামন্ত, মহাসমন্তের শাসনাধীন হলেও, তারা ছিলো এক অনন্য সাস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যে ঐক্যের বলয়ে। এই ঐক্য ছিলো সামাজিক ও জীবন-জীবিকার পদ্ধতিতে। ঐক্যের ভিতরে বৈচিত্র্যেরও অনুসন্ধান মেলা দুষ্কর ছিলো না অবশ্য। বৈচিত্র্যের কার্যকারণও বহুবিধ। অন্যতম সাংস্কৃতিক, সা¤্রাজ্যিক আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক মিশ্রন। ভারতের সমাজের অনড় প্রায় ভিত্তিকাঠামোর এই ঐক্যের ভিতরেও ভারতের মানুষ ব্যাপক সাংস্কৃতিক মিশ্রণের স্বীকার হয়েছে। এ সংস্কৃতি তার উদরে ধারণ করেছে নানান বিশ^াস, রীতি-আচার-অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান, ধর্ম, সাহিত্য-শিল্পের বিচিত্র ধারা ও সমাজ বিকাশের বহুস্তরের বৈচিত্র্যময় দর্শন। এবং এটি মান্য যে, এই সমন্বয়ধর্মীতা ও বৈচিত্র্যে ঐক্য স্থাপনের প্রচেষ্টাও প্রকৃতপক্ষে এ অঞ্চলের শাসক ও শাসিতের অস্তিত্বের স্বার্থে অনিবার্য সাংস্কৃতিক অভিযোজন প্রয়াস, স্বীকার্যে দ্বিধা নেই। প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই ভারত মূলত দ্বন্দ্বমুখর বাস্তবতার ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। ভারতে বহুজাতির উপনিবেশ হয়েছে। আর উপনিবেশ সৃষ্টিকারী বিজয়ীগণ এদেশের মানুষের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নানাবিধ রূপান্তর ঘটিয়েছে। তবে, তারা যেমন সম্পূর্ণ নিজেদের সংস্কৃতি এখানে প্রতিস্থাপন করতে পারে নি, তেমনই এদেশের মানুষের সংস্কৃতিকেও পুরোটা গ্রহণ করে নি বা করতে সক্ষম হয় নি। ফলে, সুদূর অতীত থেকেই ভারতীয় সমাজে সংস্কৃতির তিনটি রূপগত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।১ প্রথমটি ভারতের অভিজাতদের সংস্কৃতি। এই অভিজাতরা সাধারণত সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ বটে, কিন্তু তারা সকলেই শাসক শ্রেণির নয়, বরং তাদের কেউ কেউ শাসনপ্রক্রিয়ায় সুবিধাভোগী ও সহযোগী এবং তাদের অনেকেই বিদেশীও। কিন্তু সমাজে সংখ্যালঘিষ্ঠ হলেও এরাই সমাজের উপরিকাঠামো নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য নি¤œশ্রেণির মানুষের যাপনজাত। যদিও এরা-ই সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংস্কৃতির ভিত্তিকাঠামোর এরা রূপকার কিন্তু নিয়ন্ত্রক নয়। এরা মূলত শাসিত ও শোষিত শ্রেণি। তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি হলো বিদেশী তথা ঔপনিবেশিকদের প্রভাবের উপজাত। এই প্রভাবটি ছিলো নিশ্চিতরূপেই দ্বিপাক্ষিক, গ্রহণ-বর্জনের। কিন্তু, এই সাংস্কৃতিক সংশ্লেষ যে সর্বদাই শান্তিপূর্ণ ছিলো তা মোটেই নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ছিলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। বলা যেতে পারে, ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রভাব, বলপ্রয়োগ ও সংঘাতই সাংস্কৃতিক সমন্বয় প্রবণতার তথা বৈচিত্র্যে ঐক্য প্রচেষ্টার কার্যকারণগত পরিভাষা। আর এই বৈচিত্র্য ও ঐক্য প্রচেষ্টা অনেকটাই কেবল উপরিকাঠামোগত তথা সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক আগ্রাসনের সাথে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হলেও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও দেশীয়-বিদেশীয় পারস্পরিক সমঝোতারূপে সমন্বয়সাধনে এগিয়েছে ভারতের মানুষ, সমাজ ও সংস্কৃতি। শুধু বিদেশী নয়, ভারতের অঞ্চলভিত্তিক শাসক যারা ছিলেন, ছোট কিংবা বৃহৎ সামন্ত, মহাসামন্তগণও অভ্যন্তরীণ দখলদারিত্বে সক্রিয় ছিলো। তারাও আন্তঃআঞ্চলিক সংস্কৃতির মধ্যে প্রভুত্বসুলভ প্রভাবে নিয়ন্ত্রক হতে চেষ্টা করেছে, সাংস্কৃতিক মিশ্রণ ঘটিয়েছে। কিন্তু, তারপরেও এদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা নানারূপে প্রবাহিত হয়েছে, এবং আজ পর্যন্তও তার স্বকীয়তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পূর্ণত বিলুপ্ত হয় নি, তার অনেকগুলোই টিকে আছে এবং তা রূপান্তরিত অবয়বেও চেনা যায়। আর, কালে কালে এ অঞ্চলের শাসকবর্গের চরিত্র, শাসনমানস ও অভিপ্রায় যা ছিলো, তা যা-ই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের জৈবনিক প্রবণতা ও মানসিক স্থিতি ছিলো সম্প্রীতি ও সহাবস্থানোন্মুখ। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলসমূহের মধ্যে আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও সে অঞ্চলসমূহ আলাদা করেই স্বতন্ত্র ও স্বকীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ে সমুন্নত থাকতে সক্ষম হয়েছে এবং থেকেছে, দ্বন্দ্ববাস্তবতার মধ্য দিয়েও। সংঘাতসংকুল সময় পার করেছে তারা কিন্তু, কালপরম্পরার ব্যপ্তিতে তাদের সাংস্কৃতিক-স্বাতন্ত্র্যের অভিব্যক্তি কখনোই বিভাজনমূলক হয় নি। নিশ্চয় বিভাজনের বীজটি অন্যভাবে, অন্য কোনোকালে রোপিত হয়েছিলো।
অনুসন্ধান মানসে ঘটনা ও প্রসঙ্গের অকুস্থলেই আসা জরুরি। ভারতভাগের কাল বিংশ শতক, প্রাসঙ্গিক অনুসন্ধানে না হয় আবারো কালসূত্রে পশ্চাৎমুখী হওয়া যাবে। এখন কথা বিশ শতকের। সবারই সম্ভবত জানা কথা, ভারতসমাজে একটি বাজার প্রচল কথা আছে, বলা হয়ে থাকে যে, ভারত ভাগ হয়েছিলো দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। এটি কি ইতিহাসেরও সত্য, নাকি এ-সংক্রান্ত সত্যের স্বরূপটি অন্য রকম? সংকটটি কি তবে দুটি স্বতন্ত্র ‘জাতীয়তাবোধের’ উন্মেষে? কিংবা, সেটি দ্বিজাতিত্বের বোধ না হয়েও কেবল স্বয়ং জাতিত্বের বোধটিই কি সংকটের স্বরূপ অন্তরে ধারণ করছে? এই আলোচ্যে প্রাসঙ্গিকতায় এই জিজ্ঞাসাসমূহ উঠে এসেছে। জাতি, দ্বিজাতি কিংবা বহুজাতি; সংকট আসলে প্রতিটি স্বাতন্ত্র্য ও আত্মপরিচয়জ্ঞাপক প্রত্যয়ের ক্ষেত্রেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো, ইতিহাস এমনই সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু দ্বিজাতিত্বই কি সংকট? আধুনিককালে জাতীয়তাবোধ যদিও সংকীর্ণতার স্মারক, বিভেদবাচক। আর জাতীয়তাবোধের উন্মেষই হয় স্বতন্ত্র হয়ে, বিচ্ছিন্ন হয়ে, বিপক্ষ বা প্রতিপক্ষের বিপরীত পক্ষ হয়ে। তবু, জাতি এক বা একাধিক হওয়াটা সঙ্কটের কারণ হওয়া বাঞ্ছনীয় নয় মোটেই যা হয়েছে ভারতবর্ষে, কেন না, জাতীয়তার একটি উদার বাহ্যাভিব্যক্তিও আছে আর বিশে^ বহু জাতি তাদের স্বতন্ত্রতা নিয়ে টিকে রয়েছে তাদের ভূমির অখ-তা নিয়েই। একই ভূখ-ের ভিতরেই সার্বভৌমতায় বহু জাতির বসবাস দুর্লভ নয় পৃথিবীর ইতিহাসে। এবং ভারতবর্ষেই প্রাচীন ও মধ্যযুগে স্বাতন্ত্র্যে সমন্বয় ও বৈচিত্র্যে ঐক্য স্থাপিত হতে দেখেছি। তাহলে এই আধুনিককালে ভারতে এই বিভাজন কেন? কি সমস্যা ভারতের সমাজ-রাষ্ট্রিক বাস্তবতায়?
মানুষের আধুনিকতম দল কিংবা সম্প্রদায়গত স্বতন্ত্রতাসূচক ও আত্ম-পরিচয়মূলক প্রত্যয় ‘জাতি’। আর ভারত তো বহু জাতির সমন্বিত ভূমি। তবে, এই কেবল দ্বিজাতিত্বের দাবীটি কেন ভারতে? সংকটটি এখানেই না-কি জাতিত্ব চিহ্নিতকরণের ভিত্তিবোধে? প্রতিটি জাতির জাতীয়তাবোধের একটি ভিত্তিগত বোধ থাকে। জাতীয়তা নামের বৃক্ষটি একদল মানুষের ঐতিহ্যের ভিতর থেকে অঙ্কুরিত হয়। তার ভিত্তি ভাষা হতে পারে, সংস্কৃতি হতে পারে, নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে কিংবা হতে পারে ভূমিভিত্তিক পরিচয়ও। আর ভারতের ক্ষেত্রেও জাতিগত সংহতি ও বিভাজনের মূলে রয়েছে জাতিত্ববোধের বিশেষ ধারণা। কিন্তু ঊনবিংশ শতকে ভারতে বহু জাতিত্বসূচক আদর্শ ও মতধারা থাকা সত্ত্বেও যে আদর্শ ও মতধারা দিয়ে জাতিত্ব চিহ্নিত হলো তা যে কিছু সংকীর্ণ সেটি এখন নিশ্চিত করে, বাজি ধরে বলা যায়, কেন না, তা সংস্কৃতির একটি সংকীর্ণ অংশ মাত্র, এবং তা সামগ্রিক সংস্কৃতিকে মোটেই ধারণ করে না। ঊনসাংস্কৃতিক এই উপাদানটিই ভারতের মানুষের জাতিগত সংহতিতে যেমন শক্তির পরিচায়ক তেমনই দুর্বলতা ও বিভাজনের বীজ। আর জাতীয়তা নির্ধারণ করতে ভারতে মানুষের বিশেষ বিভ্রাট তৈরি হয়েছিলো। বিভ্রাটটি ছিলো এই যে, প্রকৃতপক্ষে কীসের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের জাতিগত পরিচয় চিহ্নিত করা হবে, এই জিজ্ঞাসায়।
উনিশ শতকে, ততোদিনে ভারতের মানুষ সংস্কৃতিগতভাবেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে কয়েকজন ইংরেজ সুশীলই ভারতে ইউরোপীয় আধুনিক জাতীয়তার ধারণাটি এনেছিলো। ভারতীয়দের জাতীয়তাবোধের সে-ই ছিলো অঙ্কুর। কিন্তু, উৎস ও অঙ্কুরকালের ভাবনা ও ধারণাটিও তাদের কাছে দ্বিধাহীন ছিলো না। এখানকার হিন্দু ও মুসলমান, দুই সম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্নরূপে সেখান থেকে জাতীয়তার প্রেরণা নিয়েছিলো। হিন্দুগণ জাতীয়তার প্রেরণার প্রশ্নে ভীষণ দ্বিধান্বিত ছিলো। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিলো না। হিন্দুদের দ্বিধা মূলত এই যে, তারা কিসের ভিত্তিতে তাদের জাতীয়তা নির্ধারণ করবে? ইংরেজ সুশীলগণ ভারতীয়দের সামনে তুলে ধরলেন বেদের গৌরব, প্রাচীন ভারতের শিক্ষা ও দর্শনের মহিমা। ভারতীয়দের তারা আত্মঅহমে দৃঢ় হতে শেখাতে চাইলেন। কিন্তু, ভারতীয়গণ নিলেন সিন্ধুর হিন্দু নাম আর ভাবাদর্শ নিলেন বেদ থেকে। আর কিছু ভারতীয় তো নিলেন গীতা ও মহাভারতের সমাজাদর্শ হিন্দু নামেই। কিন্তু, বিভ্রাট হলো এই যে, হিন্দু বা সিন্ধু একটি আঞ্চলিকতার পরিচায়ক এবং তা খ-িত সাংস্কৃতিক গতিধারার নির্ণায়ক শব্দ যা দিয়ে সমগ্র ভারতের মানুষের জাতীয়তা নির্ধারণ সম্ভব হলো না। যারা বেদের পক্ষে ছিলেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদের নামে তারাও নিলেন মূলত আর্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক আদর্শ।২ ভারতে জাতীয়তার উন্মেষকালে সংকটটি ছিলো এই যে, বহু দার্শনিক চিন্তার, বহু সমাজ-সাংস্কৃতিক আদর্শের, অসংখ্য বৈচিত্র্যপূর্ণ রীতি-আচার ও মানবিক আদর্শের সমাহারের এবং বহু ধর্মমত ও বিশ^াসের ভারত সমাজে সমষ্টির সংহতিবাচক জাতীয়তা নির্ধারণ করতে চেষ্টা হলো কেবল একটি কিংবা দুটি ধর্মমতের ভিত্তিতে। অর্থাৎ ভারতীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ধর্মীতা ও বৈচিত্র্যে ঐক্যের যে পরম্পরাগত প্রবণতা, তাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটানো হলো, তা পরিত্যাজ্য হলো এই আধুনিককালে এসে। কিন্তু, হিন্দুদের ভিতরে যেভাবে ধর্মের আদর্শে জাতীয়তা নির্ধারণের চেষ্টা হলো, তা করেও মানুষকে সংহত করা সম্ভব হচ্ছিলো না, জাতীয়তাবোধের জোসটা ঠিক আসে নি তাদের মধ্যে, এমনকি ধর্মভীরু মানুষদেরকে ধর্মের সংকীর্ণ আদর্শের দোহাই দিয়েও জাতীয়তাবোধে সংহত করা যাচ্ছিলো না। ফলে একটি প্রতিপক্ষ দাঁড় করাতে হয়েছিলো এবং সে প্রতিপক্ষটি ছিলো এদেশীয় মুসলিম সম্প্রদায়, যারা এদেশেরই মানুষ। কিন্তু, জাতীয়তার আদর্শে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে উপনিবেশ থেকে মুক্তির প্রশ্নে প্রতিপক্ষ হবার কথা ছিলো বিদেশী-শাসক ইংরেজকগণই। সাম্প্রদায়িক চেতনার এটি একটি বৈশিষ্ট্য যে, তাদের একটি প্রতিপক্ষ চাই। যদিও আধুনিক জাতীয়তাবাদসমূহও প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িকতাই। কিন্তু, সম্প্রদায়ের পরিচয় যদি হয় ধর্মের পরিচয়ে এবং সেই ধর্মসম্প্রদায় যদি এমন সংঘাত মানসে অস্তিত্ব রক্ষায় ব্রতী হয় ও স্বতন্ত্রতা রক্ষার নামে করতে থাকে প্রতিপক্ষকে অন্যায্য আঘাত, তখন ধর্মাদর্শের মাহাত্ম্য আর থাকে না। ধর্মের ঐশ^রিক আদর্শ হয় ভূলুণ্ঠিত। এভাবেই হয়েছে ভারতের মানুষের জাতি চেতনার উন্মেষ। এই হলো ভারতীয়দের স্বাধিকার চেতনা আর জাতীয়তাবোধের ভিত্তিচিন্তা। আর জাতীয়তাবোধের ভিত্তি হিসেবে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম হিন্দুত্বই প্রাসঙ্গিক, তবে ইসলাম ধর্ম আর মুসলিমরাই বা সে দাবী থেকে দূরে সরে থাকবে কেন? কেন না, ততো দিনে ভারতের আনাচে-কানাচে শুরু হয়ে প্রায় সমগ্র ভারত জুড়েই হাজার বছরের (অষ্টম শতকের শুরু থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ৩) মুসলিম শাসনের অবদানে মুসলিমদেরও সাংস্কৃতিক ভিত্তিটি মোটেই নড়বড়ে নয় আর। ফলে, এই প্রতিক্রিয়াতেই মুসলিমদের ধর্মবিশ^াসকে আশ্রয় করেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের বীজও তখনই অঙ্কুরিত হয়েছে। এই আলোচনায় মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গে ফিরবো যথাপরিসরে। কিন্তু, হায়! ভারতীয়দের আত্মঅধিকার সচেতনতা এই! স্বাধিকারের দাবীতে সংহত হতে গিয়ে সেই বিভাজনের অমোঘ ফাঁদেই তারা ধরাশায়ী। অথবা, সংকট প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা এ-ও হতে পারে—তবে ধর্মের বিকল্প হিসেবে ভারতীয়দের জাতীয়তার ভিত্তিটি কী বা কী কী হতে পারতো? সংস্কৃতি? সেতো পরিবর্তনশীল, নিরন্তর প্রবাহী। আর এমন প্রবাহ কালে কালে বিশে^ অসংখ্য। কোন দিক থেকে কোন সংস্কৃতির ঢেউ এসে এর গতি, রঙ, রূপসহ বৈশিষ্ট্য বদলে দেয় তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে! ভারতের হাজার বছরের সংস্কৃতিই তো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
সংস্কৃতি ভারতীয়দের জাতীয়তার ভিত্তি হতে পারলো না। কারণ? প্রাক-আর্য কাল থেকে আজ পর্যন্ত সিন্ধু অববাহিকার হরপ্পা-সভ্যতার (মহেঞ্জোদরোসহ) তথা ভারতীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যগত স্বরূপ কি একই আছে? তাহলে সিন্ধু, আর্য কিংবা হিন্দু নামের সাংস্কৃতিক পরিচয়েই বা কীভাবে ভারতীয়দের জাতীয়তা স্থির হতে পারে? আর সংস্কৃতির অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের বৈশিষ্ট্যই বা কীভাবে স্থির থাকতে পারে এর অনিবার্য রূপান্তরশীল প্রবণতার কারণে? আর এ সত্যটিও ভুলবার নয় যে হরপ্পা সভ্যতার উত্তরাধিকার বলতে সমগ্র ভারতবর্ষকেই বোঝানো মোটেই ইতিহাসপ্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে না, কেন না, তা কেবল ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমারেখার ভিতরেই নিদর্শন দিয়েছে ও নির্দেশিত হয়েছে। পক্ষান্তরে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলও সমৃদ্ধ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষ্যে উজ্জ্বল এবং এ অঞ্চলও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতার দাবী তুলে জাতিসত্তার নামে আলাদা হতে চাইতে পারে। সংস্কৃতির নামেও ভারত সেই তো বিভাজনের কবলেই পড়ে। ফলে সাংস্কৃতিক পরিচয়ে ভারতের জাতীয়তা স্থির হওয়া সম্ভব হলো না। আর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে জাতীয়তা স্থির হওয়া আধুনিক কালে এসে মোটেই সহজ নয় কিংবা প্রায় অসম্ভব। এই বিভ্রাট কেবল ভারত নয় বরং পৃথিবীর যেকোনো অঞ্চলের জন্যই প্রাসঙ্গিক, কেন না, কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতিই খুব বেশিদিন আর তাদের সংস্কৃতির স্বকীয়তা, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয় না। তবে কি ভৌগলিক সীমারেখা দিয়ে কিংবা রাজনৈতিক ভূগোলের রেখা দিয়ে অথবা রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে জাতীয় পরিচয় স্থির হবে? সেও কি অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সহ¯্রাব্দের কাল ব্যপ্তিতে স্থির রাখা সম্ভব? তবে কি ভূখ-ের সীমারেখা বদলে গেলেই মানুষের আত্মপরিচয়টিও বদলে যাবে? ফলে দেখা যাচ্ছে, সমন্বয় মানস ও ঐক্য প্রচেষ্টা বিবর্জিত সংহতিবাচক জাতিত্বের চেতনাই স্বয়ং আধুনিক মানুষের জন্য এক মহা সংকটরূপে আবির্ভূত হয়েছে। এটি ভারতের মানুষদের জন্যও সত্যি। বিশ শতকের মধ্যভাগে ভারতের সীমারেখার যে কাটাছেঁড়া, তা মানুষের এই সংকটটিকে সামনে নিয়ে আসে, প্রকটরূপে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে থাকে। তাহলে? ধর্মীয় পরিচয়ই কি তবে ভারতীয়দের জাতীয়তার সমাধান ছিলো? তা যে হতে পারে নি ইতিহাসকালে তা প্রমাণ হয়েছে। তাহলে, ভারতীয়দের এই বিভাজন, জাতীয়চেতনার সংকট ও সমাধান আসলে কি কিংবা কোথায়? সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি, এই তিনের কালধারায় কি উল্লিখিত প্রশ্নের জবাব মিলবে? বিভাজন কি রোধ করা যেতো কিংবা রোধ করা যাবে ভবিষ্যতেও? সংস্কৃতির ভিত্তিতে নিরূপিত জাতীয়তা ভারতকে অখ- রাখতে যথেষ্ট ছিলো না উগ্র স্বাতন্ত্র্যবাদ, বিভাজনকামিতা ও একই সাথে সংহতি চেতনা দিয়ে। কেবলই সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তার নজির, এই আধুনিক কালে, বিশে^ বিরল। কিংবা, কোথাও আছে কি এমন? ফলত, ভারতেও তার নজির সৃষ্টি হতে পারে নি।
ভারতীয়গণ অতিপ্রাচীনকাল থেকে ঐতিহ্যিক জাতিত্বে ‘হিন্দু’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই হিন্দু পরিচয়ও মূলত সিন্ধু অববাহিকার কোল ঘেঁষা জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযুক্ত ছিলো খ-িত সীমারেখায়, তা ছিলো আঞ্চলিক সভ্যতা ও সংস্কৃতিরই পরিচায়ক; সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষ নিশ্চয় সে পরিচয়ে চিহ্নিত হতে পারে না। তাও বা যদি করা যেতো, সে ক্ষেত্রেও এটি পরিতাপের বিষয় যে, এই মানুষেরা তাদের আদি সভ্যতার স্থানিক পরিচয়জাত যে সিন্ধু বা হিন্দু জাতীয়তা তাও হারিয়ে ফেলেছে। যা টিকে আছে তা মূলত সংকীর্ণ ধর্মমানস। কেননা, হিন্দু শব্দটি পরবর্তীতে হয়ে ওঠে মানুষের ধর্মচেতনা ও ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতির পরিচায়ক। আর এই ধর্মমানসের মধ্যেও মানবিকতা ও ঐশ^রিক মহানুভবতা রয়েছে সামান্যই। যা আছে তা মূলত সামাজিক স্তর বিন্যাসের সংকীর্ণ রীতিকাঠামো। কিন্তু, এমন সংকীর্ণতা নিয়েও উনিশতকের গোড়াতে ভারতের মানুষ বিভিন্ন অঞ্চল কিংবা প্রদেশ বা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক অঞ্চলের মানুষেরা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর হয়েও স্বভূমিবোধে কিছু একাত্ম হতে পেরেছিলো এবং অঞ্চলসমূহের মধ্যে যে সংহতির সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিলো তারও কারণ ছিলো ধর্মীয় বোধের ঐক্যই মূলত। সংহত, হিন্দুগণ হিন্দুত্বে, মুসলিমগণ মুসলমানত্বে। অখ- ভারতীয় বোধের সংহতি সেখানে নেই। এবং প্রকৃতই যা বলবার তা হলো, এই সম্ভাবনাটি দেখা গিয়েছিলো মূলত ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ দিকেই। এটি ঘটেছিলো হিন্দু ও মুসলমান, দুই সম্প্রদায় থেকেই কিছু মাত্রাগত তারতম্যে। ভারতে কোথাও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যায় নি, কোনোকালেই। দেশভাগ পূর্বকালে তো নয়-ই। ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তার উদাহরণ মূলত, দেশভাগের পরের বাংলাদেশেই আপাত দেখা গিয়েছিলো। কিন্তু, এখন বাংলাদেশের যে ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক জাতিত্বের চেতনা তা হুমকির সম্মুখীন। কারণ উদারনৈতিক ভাষা-সাংস্কৃতিক যে বাঙালী জাতীয়তাবোধ, তা মার খেয়েছে এ-অঞ্চলের মানুষের সংর্কীণ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সমাজ-রাজনৈতিক চেতনার কাছে, হার মেনেছে উদারনৈতিক, মানবিক সংস্কৃতিচেতনা। সংস্কৃতিচেতনা বলতেও যা আছে তাও নেয়া হয়েছে ধর্মচেতনার খোলসে সংকীর্ণ করেই। সংস্কৃতিচেতনার এই সংকীর্ণ স্বরূপটিই প্রকটিত হয়েছিলো ভারতবর্ষে, ভারতভাগের প্রাক্কালে। আর বাংলাদেশ পাকিস্তানের সেই অমানবিক সংকীর্ণ খোলস থেকেই বের হতে চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু, এই দেশটির স্বাধীনতা লাভের যে চেতনাগত ভিত্তি, ধর্মচেতনার সংকীর্ণ খোলস ভেঙে বৃহৎ পরিসরের উদারনৈতিক, মানবিকতাবোধের ভাষা-সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশ প্রবণতা ও প্রচেষ্টা, তারও মুখ থুবড়ে পড়ার বাস্তবতাও দেখতে হয়েছে, হচ্ছেও; খুব বেশি দিন আর তা সুদৃঢ় থাকতে পারে নি।
দেশভাগ বলতে ভারতভাগ, ভারত ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে, বাংলা ভাগ, পাঞ্জাব ভাগ, কাশ্মীর ভাগের নিরাময়হীন মর্মন্তুদ বাস্তবতা। ঘটনার নিদান রয়েছে সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যেই, আর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক বিবেচনাসমূহও অনিবার্য। দেশভাগ বলতে ভূখ-গত বিভাজন না বুঝে বরং বোঝা উচিত সাংস্কৃতিক বিভাজন এবং চূড়ান্তে মানুষেরই বিভাজন। ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা কিংবা সভ্যতা ও ঐতিহ্যের নামে মানুষের বিভাজন। মামুলি ভূখ-ের বিভাজন এ কিছুতেই নয়, কেননা, ভূমির সীমানা বিচারে ভারত অখ- ছিলো না কোনোকালেই। তবে, এ অঞ্চলের মানুষেরা ভূমিগত বিভাজনে থেকেও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় অনন্য ঐক্যে বসবাস করেছে কয়েক হাজার বছর ধরে। মনে রাখা দরকার যে, স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্য কখনোই বিভাজনের পরিভাষা নয়। বিভিন্নকালে ভারতের অঞ্চলসমূহের মধ্যে শাসনসীমার অদল-বদল হলেও সেই ভিন্ন ভিন্ন শাসনসীমার মানুষদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বৈরিতা দেখা যায় নি। সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা কিংবা সভ্যতা ও ঐহিত্যগত চিহ্নের প্রশ্নে শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে নি। শাসককুলের মধ্যে সা¤্রাজ্যিক লড়াই ছিলো কিন্তু কখনোই গণমানুষের মধ্যে আঞ্চলিক বৈরিতা দেখা যায় নি সাংস্কৃতিক কারণে। কখনোই এই সমস্ত মানুষদের কোনো সীমানার অধীনেই থাকতে বিশেষ অনীহা কিংবা দ্রোহীমানসের প্রকাশ দেখা যায়নি সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতার নামে। সংস্কৃতির বহু রূপান্তর সাধিত হয়েছে, কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির যেটি মূলসূত্র, সেটি কখনোই ছিন্ন হয় নি। ভারতীয় সংস্কৃতির রূপটি একটি সামগ্রিক সমন্বিত সংস্কৃতিরই রূপ। নানান উদ্দেশ্যে নানান নৃ-গোষ্ঠী, ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ তাদের মেধা, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতি নিয়ে এসেছে বটে, কিন্তু সংস্কৃতির বিশেষ একটি প্রলক্ষণকে প্রাধান্য দিয়ে ভূখ- নয়, প্রধানত জনগোষ্ঠীকে বিভাজিত করেছে, এমন দেখা যায় নি ঊনিশ-বিশ শতকের পূর্বে।
দেশভাগ বিষয়টি আসলে সাংস্কৃতিক তথা মানুষের বিভাজনই। বিশ শতকের মাঝামাঝি এসে এই যে বিভাজন, সেটিও অবশ্য দুএকশত বছরের সাংস্কৃতিক রূপান্তরের বিশেষ পরিণতি নয়, বরং প্রায় হাজার বছরের রূপান্তরের ফেরের প্রকাশ। কিন্তু, রূপান্তরই কি মূল সমস্যা? তা কিছুতেই নয়। সাংস্কৃতিক রূপান্তর একটি অনিবার্য ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ফলে রূপান্তরে দোষারোপ করা মোটেই উচিত কর্তব্য নয়। তবে? সমস্যাটি অন্যখানে। সমস্যা এই যে, এই দীর্ঘ সময়ের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে কোথাও সংর্কীণতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। সংকীর্ণ সংস্কৃতি চেতনার বীজ রোপিত হয়েছে, তা অঙ্কুরিত হয়েছে এবং তা বৃদ্ধি পেয়ে ফল দিয়েছে এই বিশ শতকে এসে। ভারতীয় সংস্কৃতির রূপান্তরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় একটি বিচ্যুতি ঘটেছিলো। সৃষ্টি, নিমার্ণ, গ্রহণ-বর্জন ও আত্মীকরণই তো সাংস্কৃতিক রূপান্তরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াটিই ব্যহত হয়েছিলো। আর তা ঘটেছিলো মুসলমানদের আগমনের ফলেই। কীভাবে? ব্যাখ্যা করছি পরে, তার আগে বলি যে আর্য, শক, হুন, মোঙ্গল কিংবা ইউরোপীয়দের আগমনে সংস্কৃতির রূপান্তর প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকতায় কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটে নি। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান চলেছে। সাংস্কৃতিক রূপান্তরের রাজনৈতিক প্রচেষ্টাসমূহ ক্রিয়াশীল ছিলো সর্বদাই। কিন্তু, ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে যা ঘটেছে, তা আসলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এবারে বলছি; মুসলমানদের আগমনে সাংস্কৃতিক লেন-দেনটা হতে পারে নি যথানিয়মে। যেটি ঘটেছে ও ঘটাতে চাওয়া হয়েছে তা ছিলো একপাক্ষিক প্রভাব প্রচেষ্টা। ভারতে আগত, বিজয়ী তুর্কী, আফগান, ইরানীয় ও তাজিক মুসলমানদের সংস্কৃতিতে বিশিষ্টতা দান করেছিলো তাদের নব্য গৃহীত ধর্মের প্রেরণা। সে ধর্মের বিশিষ্টতা এই যে, এ ধর্ম মূলত স্বমতসর্বস্ব ও পরতমে অবিশ^াসী৪ অর্থাৎ পরমত গ্রহণে তাদের ধর্মের কঠোর নিষেধাজ্ঞা। যেখানে ধর্ম সমাজের উপরিকাঠামোর একটি অংশমাত্র, সেখানে মুসলমানদের ধর্মই সমগ্র সংস্কৃতি তথা সমাজব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলো, দিকনির্দেশনা দিতে চাইলো এবং অপর সকল মানুষের সংস্কৃতির স্থলে তাদের ধর্মনিষ্ঠ সংস্কৃতি প্রতিস্থাপন করতে চাইলো। মুসলমানদের ধর্মনিষ্ঠ সংস্কৃতিচেতনার এই দিকটি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একদা এমন মত পোষণ করেন যে, খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের সঙ্গে মেলাবার পথে প্রথম বাধা, ওদের সাথে মিশে না গেলে মেলাবার উপায় নেই।৫ অর্থাৎ কোনো সংস্কৃতির পক্ষে মুসলমানদের সাথে মিশবার একটিই উপায় আর তা হলো তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির স্বকীয়তাকে সম্পুর্ণরূপে ত্যাগ করে পরিপূর্ণরূপেই মুসলমানদের সংস্কৃতি গ্রহণ করা। বলা যেতে পারে যে, মুসলিম সংস্কৃতি সর্বগ্রাসী।
এটি ইতিহাস স্বীকৃত যে মোটামোটি অষ্টম শতকের শুরু থেকেই ভারতে মুসলমাদেন বিজয়াগমন ঘটতে থাকে। তবে তা ব্যাপক মাত্রায় নয়। কিন্তু, মধ্যএশিয়ার দুর্ধর্ষ যাযাবর জাতিতের হাতে এই বেগ বৃদ্ধি পেয়েছিলো এবং প্রবল হয়েছিলো। অষ্টম শতকের পূর্বেও মধ্য এশিয়ার জাতিসমূহ বারবারই ভারতের দুর্ভেদ্য দ¦ার ভেঙে ঢুকে পড়েছে। তুর্কী, তাতার, মুঘোল ও মঙ্গোল প্রভৃতি জাতিসমূহ এমনিতেই ছিলো যুদ্ধকৌশলে চরম নির্মম ও প্রায় অপ্রতিরোধ্য, সেই সাথে তাদের সমরাদর্শে যুক্ত হয়েছিলো আগ্রাসী সেমেটিক ধর্মের অনুপ্রেরণা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মার খাওয়া, তাড়া খাওয়া যাযাবর সেমেটিক জাতির সাংস্কৃতিক ও সাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যে রয়েছে চরম উগ্রতার আশ্রয় ও লালন। ফলে তাদের সংস্কৃতিমানস থেকে সৃষ্ট ধর্মটিও যে তেমনই উগ্র হবে সে ব্যাপারে দ্বিধা থাকে না, অন্তত ঐতিহাসিক কার্যকারণেই সে দ্বিধা মনে ঠাঁই পায় না। তার সাথে যুক্ত হয়েছিলো মধ্যএশিয়ার দুর্ধর্ষ, আগ্রাসী যোদ্ধা জাতিসমূহ।৬ ফলে, মধ্যএশিয় মুসলমানদের সা¤্রাজ্য বাড়ানোর তৃষ্ণা ও বিশ^জয়ের অনুপ্রেরণা প্রবল করেছিলো এই সেমেটিক ধর্মটি। আর, ধর্মান্ধতার যে উগ্রতা, তার সাথে অন্য আর সব উগ্রতার তুলনা অসম হয়। মুসলমানদের বিজয়োন্মাদনার প্রকৃত স্বরূপ রাষ্ট্র দখলের মধ্যে নয়, বরং তা অন্য আরেকটি জাতি বা মানবগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সংস্কৃতিকে পদানত করে নিজস্ব সংস্কৃতি ও সামাজিক-ঐশ^রিক অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে উদগ্র হয়। রাষ্ট্রীয় পরাজয় ভারতবাসীর কাছে নতুন কিছু নয়, কিন্তু, মুসলমানদের আগমনে অনেকাংশেই তাদের জীবনানুশাসন ও সংস্কৃতির পরাজয় ঘটেছিলো। এ পরাজয় অন্য একটি সংস্কৃতির আগ্রাসনের নিকট, একটি সেমেটিক ধর্মচেতনার নিকট। ভারতীয়দের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক যাপনে এই সংকটটিই ক্রমশ প্রবল হয়েছে। পূর্বেই উল্লেখ আছে যে, ভারতীয়রা সর্বদাই বিজয়ীদের সংস্কৃতিকে অংশত আত্মস্থ করেছে, আর বিজয়ীরাও ভারতীয়দের সংস্কৃতিকে অংশত গ্রহণ করে এতে নতুন প্রাণ দান করেছে। ভারতীয়দের মধ্যে অন্যের সংস্কৃতি আত্মসাৎ করবার ক্ষমতা ছিলো, সাংস্কৃতিক আত্মীকরণে অভ্যস্ত ছিলো। কিন্তু, ভারতীয় সংস্কৃতি মুসলমানদের সংস্কৃতিকে আত্মীকরণ করতে পারে নি। মুসলিম সংস্কৃতি গ্রহণ বা আত্মীকরণের অর্থ দাঁড়াতো নিজ সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণত বিসর্জন দিয়ে মুসলিম সংস্কৃতিকে পূর্ণরূপে গ্রহণ করা। এ হলো কোনো সংস্কৃতির পক্ষে আত্মবিসর্জন, সত্তাহত্যার সামিল। আর মুসলমান সংস্কৃতিতে আত্মীকরণ বিষয়টি একেবারেই নেই, এ কেবল নিজ সংস্কৃতিকে অন্যের উপরে চাপিয়ে দিতে চায়, চরম অনমনীয়তায়। তাই ভারতে আগমনের শুরু থেকে প্রায় সাতশ বছরে মুসলমানদের সংস্কৃতিতে ভারতীয় সংস্কৃতির দাগও লাগতে পারে নি, কিন্তু, ভারতীয়দের সংস্কৃতির উপরে মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাবচিহ্ন বেশ স্পষ্ট ও গভীর।৭ যদিও শেষের দিকে মুঘোল মুসলিম শাসকদের প্রচেষ্টায় মুসলিম সংস্কৃতির এই অবরোধ, প্রতিবন্ধকতা ভাঙার চেষ্টাও হয়েছে, কিন্তু, সেখানে প্রতিরোধ ও বিরোধও যথেষ্ট ঘটেছে, ভারতের আনাচে কানাচে। ফলে, মুসলমানদের আগমনে সাংস্কৃতিক লেনদেন প্রক্রিয়া তথা সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়েছে ভারতে আর মানুষদের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব অমোঘ হয়ে বিরাজ করেছে।
মুসলমানদের ভারতে আগমনের পর থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই সাংস্কৃতিক সংঘাতটি চর্চিত হয়ে চলেছে। এই সংঘাতটি ক্রমশই সমাজের অন্যান্য উপাদানের সাথেও সংশ্লিষ্ট হতে থাকে। অর্থাৎ অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামগ্রিক সমাজকাঠামোতেই এর প্রভাব পড়ে ও বিভাজন রেখাটি ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে এবং একটি ফাটলের অস্তিত্ব জাগিয়ে তোলে। আর, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই বিভাজনসূচক ফাটলটি কীভাবে স্পষ্ট হয়েছে তারও কিছু ইতিহাসনিষ্ঠ ঘটনাপঞ্জি খতিয়ে দেখা যায়, যেন তা থেকে বিভাজনের কার্যকারণ সূত্রটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইতিহাসসূত্রে জানা যায়, মধ্যএশিয়ার সাথে ভারতের যোগাযোগ অতি প্রাচীন। সেটি ইসলামপূর্ব কাল থেকেই। তাদের অনেকেই এ অঞ্চলে বসতি করেছে, বসবাস করতে থেকেছে। ইসলাম পরবর্তীতে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছে। আর ইসলাম গ্রহণ করেছে নানা কারণেই ভারতীয় অমুসলিমদের উল্লেখযোগ্য অংশ। এবং বলাবাহুল্য যে ভারতীয় মুসলিমদের সমস্তটাই ধর্মান্তরিত মুসলমান নয়। বরং, বিজয়ী মুসলিম শাসকগণ, তাদের শাসন-সহযোগী রাজকর্মচারীগণ, ধর্মপ্রচারকগণ ও শাসনসুবিধাভোগী বহিরাগত মুসলমানগণ মিলেই এদেশে মুসলমান জনবিন্যাস নির্মাণ করেছে। তারা যেমন এদেশের সংস্কৃতির সাথে অন্বয় স্থাপন করে নি, তেমনই ভাষাটিও নিয়ে এসেছে বাহির থেকেই। সংস্কৃতির মতো ভাষাটিও চাপাতে চেয়েছে ভারতীয়দের জিহ্বায়। তারা নানাবিধ পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থনৈতিকভাবে পুষ্ট হয়েছে আর নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে অভিজাত আসনে। তাদের বিপরীতে এদেশীয় ধর্মান্তরিত মুসলমানগণ মূলত ভূমিকা নিয়েছে সেই অভিজাতদের প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত অনুশাসনের অনুগত হিসেবে। এইসব প্রান্তিক মুসলমানদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান প্রান্তিক অমুসলিমদের থেকে বিশেষ পৃথক ছিলো না, ছিলো সমান্তরালের। কিন্তু, তা সত্ত্বেও অনমনীয়, আত্মমতসর্বস্ব, স্বজাত্যশ্রেষ্ঠতাবোধের ধর্মীয়চেতনা তাদেরকে দিয়েছিলো এমন এক অহং যে, তারা প্রান্তিকতার সমান্তরালে থেকেও অপর প্রান্তিকদের থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে চেয়েছে। যখন মুসলমান শাসনের পতন হয়েছে, তখন যদিও প্রান্তিক মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থানের বিশেষ হেরফের হয় নি, কিন্তু অভিজাতদের অর্থনৈতিক পতন হয়েছে আর ধসে পড়েছে তাদের শ্লাঘার ইমারত। আর ব্রিটিশ শাসনাধীনে হিন্দুদের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থানের বিশেষ উন্নতি ঘটে। হিন্দুসমাজে সামাজিক গতিশীলতার ঢেউ লাগে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত। হিন্দুদের বিশেষ প্রতিপত্তিতে মুসলিম অভিজাতগণ ঈর্ষান্বিত হয়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধারে ও মুসলিম ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মানসে তাদের মধ্যে এক নবতর রাজনৈতিক অভীপ্সা গড়ে ওঠে। এই রাজনৈতিক অভীপ্সায় সাম্প্রদায়িক চেতনায় প্রান্তিক মুসলমানদের সমর্থনও ইন্ধন হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনাধীনে আধুনিক ভারতে এই হলো মুসলিম জাতীয়তাবোধের অন্তরকথা।
বিভাজনকে স্পষ্ট করতে মুসলিমদের পক্ষ থেকে আরেকটি যে ভেদসূচক সামাজিক মাত্রা কাজ করেছে তা হলো মুসলিম সংস্কৃতির ওয়াহাবীবাদ। উনিশ ও বিশ শতকের ভারতে মুসলমান সমাজ প্রেক্ষাপটে দুজন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হয়েছে যাদের মাধ্যমে বিভাজনরেখাটি প্রকট হয়েছে। তারা হলেন কিংবদন্তীর দুই সৈয়দ আহমদ। একজন কট্টর শরীয়তবাদী ওয়াহাবী মততাত্ত্বিক অযোধ্যার রায়বেরেলীতে জন্ম নেয়া মুসলিম ধর্ম সংস্কারক সৈয়দ আহমদ শাহ বেরেলী, আরেক জন দিল্লির অভিজাত স্যার সৈয়দ আহমদ খান। এই স্যার সৈয়দ আহমদ খাঁন নিজেকে মুসলমানদের শেষনবীর সাইত্রিশতম বংশধর বলে দাবী করতেন ও স্বীকৃতও ছিলেন।৮ জানা যায় তার পূর্বপুরুষগণ ছিলেন শেষদিকের মুঘোল রাজপরিবাহের অন্তরঙ্গ বন্ধু সম্পর্কের ও উচ্চপদস্থ রাজ-কর্মচারী। সেই বংশ পরম্পরা থেকে আগত সৈয়দ আহমদ খানের মুসলিম আভিজাত্যের শ্লাঘা এমনই উচ্চতার ছিলো যে, তার রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষপ্রসূত মুসলিম জাতীয়তাবোধের ঘোষণায় ও তদমুখী যথাকর্মযোগে দ্বিজাতীয়তায় ভারত ভেঙে গেলো। আর সৈয়দ আহমদ বেরেলী তার স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকেই, যথাকর্মযোগে বিভাজনচিহ্নে কুঠার আঘাত করেছেন। হাজার বছরের সহাবস্থানে থাকার ফলে মুসলিমদের সাংস্কৃতিক অনমনীয় অবস্থান সত্ত্বেও তা ভারতীয় অমুসলিম সংস্কৃতি দ্বারা কিছু তো প্রভাবিত হয়েছেই এবং পরবর্তীকালেও তার কিছু প্রবাহ থেকে যায়। আর, যে ভারতীয়রা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো তারাও নতুন ধর্মের তাবুতলে এলেও পূর্বচর্চিত সামাজিক সংস্কার সম্পূর্ণত ত্যাগ করতে সক্ষম হয় নি। এবং মুঘোল স¤্রাটদের সাংস্কৃতিক উদারনৈতিক শাসননীতির কারণেও মুসলমানদের সংস্কৃতিতে সামান্য মিশ্রণ ঘটে হিন্দু ও অন্যান্য অমুসলিম সংস্কৃতির। আর সেই সাথে উদারপন্থী মুসলিম সূফীদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিলো সেই মিশ্রন ক্রিয়ায়। এমনই পরিস্থিতে ‘শামসুল হিন্দ’ খ্যাত গোঁড়া মুসলিম ধর্মগুরু শাহ আব্দুল আজিজের শিষ্য সৈয়দ আহমদ শাহ বেরেলী সংস্কৃতি ও ধর্ম-সংস্কারের ব্রত গ্রহণ করেন আর সংস্কৃতি থেকে হিন্দুয়ানি দূর করতে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে চলেন। তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক কলহে ইন্ধন দিতে থাকেন, নেতৃত্বে কট্টর মুসলমানদের সংগঠিত করতে থাকেন। ভারতের শিখদের সাথে তিনি কয়েকবার যুদ্ধেও নেতৃত্ব দেন আর একবার তো পাঞ্জাবের পেশোয়ার দখল করে নেন শিখদের পরাজিত করে।৯ শিখদের বিরুদ্ধে এই জয় সৈয়দ আহমদ ও মুসলমানদেরকে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষায় মনে ও দেহে বলিষ্ঠ করে তোলে। আর উনিশ শতকের বিশের দশকে আরব ফেরত, ওয়াহাবী মানসে অসহিষ্ণু হাজী শরিয়তউল্লাহ এবং প্রায় সমসাময়িককালে তিতুমীরের ধর্মচেতনাপুষ্ট কৃষক বিদ্রোহ সমগ্র ভারতের আপামর মুসলিম মানসে অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে। প্রান্তিক পর্যায়েও মানুষে মানুষে সম্পর্কে ফাটলমুখ প্রশস্ত হয়। ওয়াহাবী মতবাদ পুষ্ট হাজি শরিয়তউল্লাহ ও তিতুমীরের আন্দোলন অংশত ব্রিটিশ-বিরোধী হলেও তা ধর্মের লেবাসেই ছিলো দুর্মর এবং তা প্রত্যক্ষে ও পরোক্ষে সৈয়দ আহমদ খানের আলীগড়িয় রাজনৈতিক অভিলাষায় যুক্ত হয়েছে। যদিও সৈয়দ আহমদ খান ওয়াহাবী আন্দোলনকে সর্বতভাবেই সমালোচনা ও নিন্দা করেছেন, কিন্তু তিনি মুসলিম বুর্জোয়াদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অবস্থানের কারণে ও শিক্ষানুরাগের কারণে অবিসংবাদিত নেতা হতে পেরেছিলেন। তারই মতাদর্শে মুসলমানদের রাজনৈতিক অভিলাষ সুদৃঢ় হতে পেরেছিলো। আর বিপরীতপক্ষে হিন্দু বুর্জোয়া ও অভিজাতগণও সম্প্রদায়গত বিরোধ ও দ্বন্দ্বে প্রায় সমমাত্রায় কিংবা কিঞ্চিতাধিক দমন, পীড়ন ও প্রতিরোধে সচল থেকেছে অনেকটা রাজানুকূল্যেই আর থেকে চূড়ান্ত বিভাজনকেই ত্বরান্বিত করেছে।
হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গে আসি ফের। ভারতসমাজে অবৈদিক-বৈদিক আর্য-ক্ষাত্র শাসন, হিন্দুত্বের উত্থান, বৌদ্ধদের জয়যাত্রা, পুনঃহিন্দুদের ক্ষমতায় আরোহন ও নানান অবক্ষয়ে মুসলিমদের কাছে চূড়ান্ত পরাজয় এবং মুসলিমদের প্রায় দীর্ঘ হাজার বছরের আংশিক ও প্রায় সম্পূর্ণ ভারত শাসন এ অঞ্চলের মানুষের সম্পর্কের পরম্পরা বিশ্লেষণের চিন্তাকোণকে জটিল ও দীর্ঘ পরিসর দিয়েছে। ভাবা যেতে পারে, হিন্দুগণ মুসলিমদের পদানত হয়ে দীর্ঘ হাজার বছর থেকে বৃটিশ শাসনাধীন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পুনঃসমাজ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে মর্যাদাবান হতে চাইছে, সেই সাথে হৃত-মর্যাদা পুনরুদ্ধারে মুসলিমগণ মরিয়া, তখন মানুষের সম্পর্ক আর সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের স্বরূপটি কেমন! এমনই ঐতিহাসিক পরম্পরাগত তাৎপর্যে এবং ইংরেজদের আধুনিক শিক্ষা ও ইউরোপীয় জাতীয়তাবোধের মোড়কে হিন্দুদের জাতীয়তাবোধটি কেমন তার স্বরূপ কিছু উন্মোচিত হতে থাকে উনিশ শতকের শেষার্ধে ভারতের হিন্দু চিন্তাশীল, সমাজ-সংস্কারকগণের চিন্তায়, বক্তৃতায়, লেখায় ও সমাজ-রাজনৈতিক নানান তৎপরতায়। সে সবই উঠে আসতে থাকে সে সবের কিছু সাময়িকপত্রে। উল্লেখ করা যেতে পারে হিন্দুরক্ষণশীল ‘ন্যাশনাল পেপার’, ‘নবজীবন’, উগ্র রক্ষণশীল ‘বঙ্গবাসী’ ও ‘আর্য্যদর্শন’ পত্রিকাসমূহের কথা। এই সাময়িকপত্রসমূহই সেই কালে হিন্দু জাতীয়তাবাদের চারাটিকে পানি ও সার দিয়ে মূল-কা-ে দৃঢ় করে তোলে। মুসলিম সম্প্রদায়ে যেমন সৈয়দ আহমদ খান নামটি আসে সর্বাগ্রে, তেমনই হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনারায়ণ বসুর নামটিই আসে আগে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের জনক হিসেবে।১০ আর হিন্দুজাতীয়তাবাদের পালে হাওয়া দিতে দেখা যায় কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের কাউকে। উল্লেখ্য দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। তারই অর্থানুকূল্যে ১৮৬৭ রাজনায়ারণ বসুর ভাবাদর্শে প্রথম ‘হিন্দুমেলা’র আয়োজন হয়। আর এতে প্রাণপুরুষ হয়ে ওঠে শ্রীমান বসুর যোগ্য শিষ্য নবগোপাল মিত্র। বসুর পরে উনিশ শতকের ষাটের দশকে নবগোপাল মিত্রই হিন্দুজাতীয়তাবাদের দৃঢ় বেদী নির্মাণ করেন। সাহিত্যেও হিন্দু জাতীয়তাবাদ চর্চিত হতে থাকে। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’-ই বোধহয় প্রথম প্রচেষ্টা। পরে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর নাটকে, নবীনচন্দ্রসেনের কাব্যেও তা স্বগরিমায় প্রকাশিত। এবং সমসাময়িককালেরই বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ আরেকটি অবশ্য উল্লেখ্য উদাহরণ। আরো উল্লেখ্য, শিশির কুমার ঘোষ ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন’ বা ভারত সভা। ফলে, এইসবেরই প্রতিক্রিয়ায় ও মুসলমানদের সচেতন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষে ১৮৬৩ সালে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠত হয় ‘মহামেডান লিটারারি সোসাইটি’ এবং এই প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলীগড় অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল স্কুল’ যা পরবর্তীতে কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ে রূপ লাভ করে।১১ তিনিই উর্দুকে মুসলমানদের মাতৃভাষা জ্ঞান করে সে ভাষায় অনুবাদ করে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি ‘ট্রান্সলেশন সোসাইটি’ও গঠন করেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি উর্দুকে ভারতীয়দের একমাত্র জাতীয় ভাষা মনে করতেন আর মনে করতেন জাতীয় ভাষার উন্নতি ছাড়া ভারতবাসীর উন্নতি সম্ভব নয়।১২ পরে তিনি অনেক পাকিস্তানি লেখকদের কলমে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা ও পাকিন্তান প্রতিষ্ঠার আদি পিতা হিসেবে আখ্যায়িত হয়েচেন।১৩ এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৭৭ সালে সৈয়দ আমীর আলীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান এসোসিয়েশন’। এই ধারাবাহিকতা অব্যহত থাকে ১৮৮৫ সালের ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ প্রতিষ্ঠায় ও ১৯০৬ সালে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠার মতো ইতিহাসের অমোচনীয় ঘটনাসমূহের মাধ্যমে এবং নানান সমাজ-রাজনৈতিক ঘটন-অঘটন তারিখ পরম্পরায় তা শেষ ১৯৪৭ সালে এসে। বাংলা ঘটে যাওয়া হিন্দুজাতীয়তাবাদের উৎসঘটনাসমূহকে আঞ্চলিকতায় ক্ষুদ্রার্থে দেখার সুযোগ একেবারেই নেই। কেননা, তৎকালে বাংলা ছিলো সমগ্র ভারতের জাতীয়-রাজনৈতিক তৎপরতার রোলমডেল। দেশভাগের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বমূলক কার্যকারণ বোধহয় অনেকটা খোলাসা করা গেলো। আরো স্পষ্ট করে জানতে বরং ভারতের প্রায় অথৈ ইতিহাসে ডুব দেয়া যেতে পারে। এই নিবন্ধে অন্তত সে বিষয়ে আরো বিস্তৃতির সুযোগ দেখছি না।
উল্লিখিত সংর্কীণতাই ভারতীয় সংস্কৃতি ও রাজনীতির অন্যতম প্রধান সংকট। ভারতের সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের নিরসন হয় নি কিছুতেই। হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতি সমন্বয়ের সকল সম্ভাবনা তিরেহিত হয়েছিলো ক্রমে ক্রমে নানান সমাজৈতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে। যদিও মুঘোল শাসকগণ তাদের শাসনের প্রায় পাঁচশত বছরে নিজেদের শাসনকে সুদৃঢ় ও স্থায়ী করতে ভারতের সকল ধর্মচেতনাসংশ্লিষ্ট মানুষের সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাতেও কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি। সমাজের নানা স্তর থেকেই প্রকাশ্য কিংবা গোপন, এই সমন্বয় চেষ্টার বিপক্ষে বিরোধকণ্ঠ সোচ্চার হয়েছে। এই প্রচেষ্টাকে সদার্থক বিবেচনা করাই যায়। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকগণ তাদের প্রায় দুশ বছরের শাসনের শেষের দিকে শাসনকালকে আরো স্থায়িত্ব দিতে বরং মুগল শাসকদের উলটোপথেই হেঁটেছে অর্থাৎ তারা বিভক্তকরণ নীতিতে আস্থা রেখেছে। অবশ্য এই নীতি তাদের ইউরোপীয় শাসননীতিরই ঐতিহ্য। ইংরেজগণ কেবল ভারতীয়দের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংর্কীণতাকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছে তাদের বিভক্তকরণ নীতিতে। অবশ্য ‘উবারফব ধহফ ৎঁষব’ নীতির জন্য ইংরেজদেরকে বিশেষ দোষারোপ করা যায় না। ইংরেজদের গুণগান করবারও অনেক কারণ রয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো সেই বন্দনায় ‘ছোট ইংরেজ বড় ইংরেজ’ শীর্ষক একটি মূল্যবান নিবন্ধই লিখেছিলেন। তবু, ইংরেজগণের কৃতকর্মের প্রাপ্য সমালোচনা তো করাই যায়। তাদের মন্দত্বও তো নেহায়েত কম নয়। একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শেষ জীবনে ইংরেজদের মানসিক কদর্যে বেশ হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি তা প্রকাশও করেছেন তাঁর ‘সভ্যতার সংকট’ শীর্ষক প্রবন্ধে। কিন্তু, পুনঃ প্রশ্ন। এই যে ব্রিটিশদের বিভক্তিকরণ নীতি, তার জন্য সম্পূর্ণ দোষ কি তাদের উপরেই আরোপ করবো? নিশ্চয় নয়। কিন্তু এতোকাল অধিকাংশ বিবেচনাতে তাদের বিভক্তিকরণ নীতিকে সমালোচনা করা হয়েছে একচক্ষুদৃষ্টিতে। যদিও বিভক্তকরণ নীতিতেও তাদের শেষ রক্ষা হয় নি। ভারতীয়দের নিজস্ব সংস্কৃতি ও রাজনীতির অন্তর্দ্বন্দ্বে তারা শেষের দিকে প্রায় ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’র মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। এই সত্যের পরিপ্রেক্ষিতেই এবারে বরং ইংরেজদের অপশাসননীতির সাথে ভারতীয়দের নিজ সাংস্কৃতিক সংর্কীণতাকেও স্বীকার্যে আনার সময় এসেছে। স্বীকার্য এ-ই। ভারতীয় সংস্কৃতির সংকীর্ণতার দিকটি তুলে ধরা গেলো। কিন্তু এই আলোচনার পরিসরে হিন্দু-মুসলিম বাইনারি সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু-সংস্কৃতির অন্তর্গত জাতি-বর্ণভেদজাত সংঘাত ও মুসলিম সম্প্রদায়ের শিয়া-সুন্নি কিংবা অন্যান্য মাযহাবজাত অন্তর্গত সংঘাতসমূহকে আলোচনার বাহিরে রেখেছি, কেননা, তা সমাজের ও সম্প্রদায়ের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণ হলেও কোনো জনগোষ্ঠীকে ভূমির সীমা দিয়ে সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতার চিহ্নে বিভাজিত করে নি অর্থাৎ দেশভাগের মতো দৃশ্যমান বৃহৎ বিভাজনের কারণ হয় নি। আর বিভাজনের কিছু কারণ নিশ্চয় রয়েছে আধুনিক কালজাত ‘দেশ’ কিংবা ‘রাষ্ট্র’ ধারণার ভিতর আর আধুনিকতাপ্রসূত সমূহ জাতি ও জাতীয়তার চেতনার ভিতর। জাতীয়তাবাদ হলো সার্বভৌমত্বের সাংস্কৃতিক বোধ। পরম্পরাগত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও ক্ষমতার সীমাকরণ জাতীয়তাবোধের আধুনিকতম মাত্রা। সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতার সাথে বুর্জোয়া নেতৃত্বমানস যুক্ত হলে তা সাংস্কৃতিক পারম্পর্যের সাথে দ্বন্দ্বশীল হয়ে ওঠে। সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা জাতীয়তাবাদী সাম্প্রদায়িকতায় পর্যবসিত হয়। আধুনিককালে কোনো রাষ্ট্রই জাতীয়তা নামের সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। নিশ্চয় কারো এ স্বীকার্যে দ্বিধা থাকবে না যে মানুষের (ভারতীয়দেরও) আধুনিক জাতীয়তাবোধও বিভাজন প্রক্রিয়ায় খুরধার অস্ত্র। অন্য জাতির প্রতি বিরোধ, বিদ্বেষ কিংবা স্বার্থগত সংঘাত ব্যতিত কোনো বিশেষ জাতীয়তার প্রকাশ নেই। জাতীয়তা সভ্যতার পরাক্রান্ত শত্রু।১৪ ভারতীয় জাতীয়তা ভারতকে অন্যসকল জাতি ও জাতীয়তা থেকে স্বতন্ত্র ও নিজেদের ভিতরে সংহত করতে এবং সংহত রাখতে পারতো। কিন্তু, ভারতীয়দের অন্তর্গত সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব থেকে জাত অভ্যন্তরস্থ দ্বৈতজাতীয়তার সংঘাত সেটি আর হতে দেয় নি। ভারত সংহতও থাকতে পারে নি।

তথ্য ও প্রাসঙ্গিক ধারণাসূত্র
১. ড. তারা চাঁদ, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামের প্রভাব (অনু.) (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ, ২০০৫), পৃ. ১০
২. অমর দত্ত, ঊনিশ শতকের শেষার্ধে বাঙলাদেশে হিন্দু জাতীয়তাবাদ (কলকাতা : প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, ১৯৯৪), পৃ. ২০-২৬
৩. ইরফান হাবিব, মধ্যযুগের ভারত (নয়াদিল্লি : ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া, ২০১৫), পৃ. ৩০
৪. গোপাল হালদার, সংস্কৃতির বিশ^রূপ (কলকাতা : মনীষা গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৮৬), পৃ. ১১৩
৫. শিবপ্রসাদ রায়, রহস্যময় আর এস এস (কলকাতা : প্রেরণা প্রকাশনী, ১৯৯৫)
৬. গোপাল হালদার, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৩
৭. গোপাল হালদার, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৫
৮. ড. জাফর আহমদ ভূঁইয়া, স্যার সৈয়দ আহমদ রচনাবলী পরিচিতি ও পর্যালোচনা (ঢাকা : ঝিঙেফুল, ২০১৩), পৃ. ১৬, ২০
৯. আব্দুল মওদুদ, ওহাবী আন্দোলন, দশম মুদ্রণ (ঢাকা : আহমদ পাবলিশিং হাউস, ২০১৭), পৃ. ১৮, ১৯
১০. অমর দত্ত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০
১১. ড. মৃণালকান্তি চট্টোপাধ্যায়, জাতীয়তাবাদী জিন্না : চিন্তার ক্রমবিবর্তন (কলকাতা : প্রগ্রেসিভ পাবলিসার্স, ২০০১)
১২. ড. জাফর আহমদ ভূঁইয়া, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০
১৩. ড. জাফর আহমদ ভূঁইয়া, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬
১৪. মোতাহের হোসেন চৌধুরী, সভ্যতা, পঞ্চম মুদ্রণ (ঢাকা : কথাপ্রকাশ, ২০১৬), পৃ. ৩২

**************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা