50314526_809495946058671_3871654047995920384_n

ক্রো ড় প ত্র–১

॥ স্মরণ ॥
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (১৯২৪-২০১৮)

তোমাকে বলেছিলাম, যত দেরীই হোক,
আবার আমি ফিরে আসব।
ফিরে আসব তল-আঁধারি অশত্থগাছটাকে বাঁয়ে রেখে,
ঝালোডাঙার বিল পেরিয়ে,
হলুদ-ফুলের মাঠের উপর দিয়ে
আবার আমি ফিরে আসব।
আমি তোমাকে বলেছিলাম।

আমি তোমাকে বলেছিলাম, এই যাওয়াটা কিছু নয়
আবার আমি ফিরে আসব।
ডগডগে লালের নেশায় আকাশটাকে মাতিয়ে দিয়ে
সূর্য যখন ডুবে যাবে,
নৌকার গলুইয়ে মাথা রেখে
নদীর ছল্ছল্ জলের শব্দ শুনতে-শুনতে
আবার আমি ফিরে আসব।
আমি তোমাকে বলেছিলাম।

আজও আমার ফেরা হয়নি
রক্তের সেই আবেগ এখন স্তিমিত হয়ে এসেছে।
তবু যেন আবছা-আবছা মনে পড়ে,
আমি তোমাকে বলেছিলাম।

[‘তোমাকে বলেছিলাম’, অন্ধকার বারান্দা]

****************************************

একটুখানি…

আমাদের কালের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অনেকেই ‘পোস্টমডার্ন’ কথাটা মানতে চান না। নিছক ‘ধাপ্পাবাজ’ বলে একে বাতিল করে দিতে চান। কিন্তু বিপরীতে আবার নতুন-পুরনো অনেকেই গুরুত্বের সঙ্গে এটাকে গ্রহণও করেন। কারণ, ইউরো-আমেরিকায় বা পশ্চিমবঙ্গে এ নিয়ে বিস্তর চর্চা হচ্ছে, প্রায় দেড়যুগ ধরে সেখানকার অনেক কথা আমরা শুনে আসছি, নানা পত্র-পত্রিকায়। আর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘লিরিক’ পোস্টমডার্ন নিয়ে তো তোলপাড় করা একটা সংখ্যাও করেছিল। সেটা বোধ করি ১৯৯৪র দিকে। এছাড়া এদেশের কিছু লেখক বা ইংরেজির অধ্যাপকও এসব নিয়ে বেশ তত্ত্বকথা বলেন, এর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রায়শই গুনগুন করেন, প্রবন্ধ লেখেন। এমনটা চলছে অনেককাল। আর এখন তো ‘ঃযব যড়হবংঃ ংযরৎঃ’, ‘পধঃং বুব’র যুগ। কতো তাত্ত্বিক আছেন, পোস্টমডার্ন করে করে এখন প্রাণপাত করে চলেছেন। আর পড়ালেখা বা তত্ত্বজ্ঞানের তো শেষ নেই। পোস্টমডার্ন, উত্তর আধুনিকতা, ডিকনস্ট্রাকশন ইত্যাদি কতো কী! এরকম নানা মত ও পথের কিনার ধরে আমাদের এখনকার এ সংখ্যাটি তৈরি করেছি। নতুন-পুরনো মিলে প্রায় ‘এক কুড়ি’ লেখা মিলেছে এতে। এটা কোনো নির্দিষ্টতা নয়, কে কী ভাবছে, বা বিষয়ের ধারণাটা নিছক কতোটা অগ্রসর সে বিষয়ে একটা কিছু প্রস্তুত করা আর কি! বস্তুত, আরও আলোচনা উস্কে দেওয়া। এর যৌক্তিকতা খুঁজে বের করা। এ লক্ষ্যে আমরা কলকাতার দমদম জংশন (বইমেলা ২০১৮) পত্রিকা থেকে মলয় রায়চৌধুরীর একটি গল্পও মুদ্রণ করেছি।

অন্য বিষয়গুলোর সঙ্গে আছেন শাহ্যাদ ফিরদাউস-র ‘লালন’ চিত্রনাট্যটি। এইটিই আক্ষরিকভাবে লালনের জীবনকাহিনি নিয়ে প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ পত্রস্থ রূপ। পরে এটি অবলম্বিত করেই চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ ছবি বানান। পশ্চিমবঙ্গের একটি অনতি-প্রচারিত পত্রিকায় এটি প্রকাশ পেয়েছিল; বাংলাদেশে এখন আমরা তা মুদ্রণ করলাম, লেখকের অনুমতি নিয়ে। প্রবালকুমার বসু বড় সাহিত্যিক। বরাবরের মতো এবারও সাক্ষাৎকার অংশটিতে তাঁকে পেয়েছি আমরা। আর পত্রিকায় নিয়মিত বিভাগগুলো এবারও যথারীতি বিন্যস্ত হয়েছে।

সম্পাদকীয় লিখতে লিখতে এখন খবর এলো ‘রোদ্দুরের কবি’ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নেই, আজ দুপুর সোয়া বারোটায় তিনি লোকান্তরিত হয়েছেন। কষ্টে চোখ ধরে এলো। তাঁকে পত্রিকার পৃষ্ঠায় প্রথমে প্রণতি জানাতে চাই। কবিতা ও কবিতার ছন্দের নিরীক্ষায় তিনি আরও অনেককাল আমাদের মাঝে থাকবেন বলে বিশ্বাস হয়।
সকলকে শুভেচ্ছা।
shiqbal70@gmail.com

****************************************

 

উত্তরাধুনিক পরিস্থিতি ও লেখকের ভূমিকা
হামীম কামরুল হক

উত্তরাধুনিক, উত্তরাধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকবাদ (দয়া করে উত্তরাধুনিকতাবাদ, আধুনিকতাবাদ-এর মতো ভুল শব্দ পড়বেন না কেউ) নিয়ে কিছু দিন পড়াশোনার করার পর আমার মনে হয়েছিল, এ আর এমন কী ব্যাপার দুম করে একদিন লিখে ফেলা যাবে। কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখি এর কোনো কিছুরই আর তাল পাচ্ছি না। উত্তরাধুনিক মতবাদের অনির্ণেয়তার মতো বর্তমান রচনাটিও অনির্দিষ্ট দিকে চলে যেতে পারে। এর কোনো সরলরৈখিক চেহারা সামনে আনা সম্ভবই নয়। কারণ এটা নিজেই তো সরলরৈখিক নয়, একমুখী তো নয়ই। একে তো এটা জটিল প্যাঁচানো পথ দিয়ে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতে হয়, তারওপর এটার মারাত্মক রকমের বহুরৈখিক। আদতে সব রকমের কর্তৃত্ববাদকে অস্বীকার করার ভেতরেই দিয়ে উত্তরাধুনিকবাদ নিজের বিশিষ্টতা ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে খারিজ করে আগের সমস্ত মত ও পথের চলন পদ্ধতি, বয়ানপদ্ধতি। এজন্য উত্তরাধুনিকবাদ দিয়ে একজন লেখক যা করতে পারেন, তাকে তার সামনে নির্দিষ্ট ছক নেই। দিশা (পষড়ংব) যদি না পান, তিনি চলে যান বিদিশা (ড়ঢ়বহ)য়। এই বিদিশার দশার ভেতরেই হয়ত আছে তার মুক্তি।  যে পথের কথা কেউ জানে না, সেই পথই একেকজন লেখকের নিজের পথ, নিজস্ব জগতে যাওয়ার পথ।

সবসময় সব প্রকৃত লেখকের লক্ষ্যই হলো মুক্তি। তিনি সেটা কোনো মতবাদের মধ্যে বা মাধ্যমে পাবেন কি পাবেন না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, কেউ ভাববেন না, আমি সিনেমার প্রেমে পড়ছি, আমার বলার কথাগুলি বলবার জন্য এরচেয়ে ভালো মাধ্যমে পেলে আমি সিনেমাকে লাথি মেরে সেটা বেছে নেব। একই কথা বলেছিলেন হো চি মিন মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সম্পর্কে। তিনি বলেছিলেন, দেশ গড়ার জন্য যদি আমি এর চেয়ে ভালো পথ পাই তো এটাকে ছেড়ে দিয়ে সেটাই গ্রহণ করব। ফলে কাজ কতটুকু হলো সেটাই আসল। দ্যা এন্ড অলওয়েজ জাস্টিফাইস দ্যা মিনস। লেখকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি দিনের শেষে কী রচনা করতে পারলেন। তারপরও একালের লেখককে কেবল লেখা নিয়ে মেতে থাকলে চলে না। তাকে হাল আমলের লিখনপদ্ধতিকে কীভাবে দেখা হয় সেটি জানা লাগে। তাকে জানতে হয়, ফার্দিনান্দ দ্যা স্যোসুরের ভাষা বিষয়ক তত্ত্বদি থেকে কীভাবে এলো কাঠামোবাদ এবং উত্তরাধুনিকবাদ কীভাবে হয়ে উঠল কাঠামোবাদের প্রধানতম অভিমুখ। তাকে জানতে হয়, ক্লদ লেভি স্ত্রস কীভাবে দেখছেন জগতকে। জানতে হয়, জ্যাক দেরিদা লিখন নিয়ে কী বললেন, কী ভেবেছিলেন রোলাঁ বার্ত? আর সবচেয়ে বড় কথা যে জীবন জগৎ থেকে তিনি তার রচনার মালমশলা সংগ্রহ করবেন সেই জগৎকে কীভাবে দেখেছেন মিশেল ফুকো বা জ্যাক লাঁকা। তাকে জানা লাগে

—জাঁ বদ্রিলা কী বুঝিয়েছেন সিমুলাক্রা ও সিমুলেশান বলতে। হাইপাররিয়েল থেকে তিনি কীভাবে দেখবেন তার বর্তমানের সময়কে, মানুষকে। তাকে জানতে হয় বেদপুরাণ উপনিষদের চিন্তার জগৎ কি রঘুনাথ শিরোমণির নব্যন্যায় থেকে শুরু করে নি¤œবর্গের ইতিহাসের গড়ন-গঠন।

তবে এও সত্য, লাঁকা-ফুকো-দেরিদা-বদ্রিলা বা রিচার্ড রোর্টি তাকে পথ দেখাবেন নাকি আরো গোলকধাঁধায় ফেলবেন, সেটা প্রশ্ন। কারণ তার জগৎ তো তত্ত্বের জগৎ নয়, তার জগৎ সৃষ্টির জগৎ। কিন্তু হাল আমলে লেখকের জন্য সৃজনে ও মননের এমন এক স্তরে উন্নীত হতে হয়, যে বাধ্যবাধতা আগে ছিল না। এক উপন্যাসের কথা চিন্তা করলেই সেটি পরিষ্কার বোঝা যায়।

ফরাসি নবউপন্যাসের ধারা থেকে শুরু করে জাদুবাস্তববাদী ধারা ফ্যাক্ট ও ফিকশনের মধ্যে সবধরনের দ্বৈধতার সঞ্চার করেছে। ব্রায়ান ম্যাকহল-এর মতে, উত্তরাধুনিক কথাসাহিত্যের জোরালো দিক হলো— মানবঅস্তিত্বের স্বরূপ-দর্শনের অনিশ্চয়তা ও অনির্দিষ্টতা উঠে আসে টেক্সটটি যে জগতকে নিয়ে তৈরি হয়। গভীর এক দোলাচলের ভেতর দিয়ে যেতে হয় পাঠককে। তিনি তাঁর এই বক্তব্যের সমর্থনে স্যামুয়েল বেকেট, আলা রব-গ্রিয়ে, কার্লোস ফুয়েন্তেস, ভøাদিমির নবকভ, টমাস পিনচন প্রমুখের উপন্যাসের দৃষ্টান্ত হিসেবে মনে করেন। রবগ্রিয়ের লজিক্যাল কন্ট্রাডিক্টশন বা যুক্তিময় বৈপরীত্য, পিনচনের প্যারানয়া, ডোনাল্ড বার্থেলমে-র কমিক ফ্যান্টাসি, পল অস্টারের লেখায় গল্পের বাক্স খুলে খুলে বেরিয়ে পড়া গোয়েন্দাধাঁচের গল্প উত্তরাধুনিক উপন্যাসের লক্ষণটি দেখায়। (ইঁঃষবৎ, ২০০২ : ৬৯) তবে সত্তর দশকের একেবারে শেষ দিক থেকে আশির দশকের শেষাবধি নানান উপন্যাসের ভেতরে এসব লক্ষণ দেখা দেয়। এর ভেতরে উল্লেখযোগ্য কটি উপন্যাসে নাম করা যায়, যেমন টমাস পিনচনের ঞযব ঈৎুরহম ড়ভ খড়ঃ ৪৯ (১৯৬৭), জন ফাওলসের ঞযব ঋৎবহপয খরবঁঃবহধহঃ’ং ডড়সধহ (১৯৬৯) ই.এল. ডক্টোরো-র জধমঃরসব (১৯৭৫), জর্জ পেরেকের খরভব অ টংবৎ’ং গধহঁধষ (ফরাসিতে প্রকাশিত ১৯৭৮)। কিন্তু তারপরও ঔপন্যাসিকের ভূমিকা কতটুকু বদলায়? জন ফাওলস একবার বলেছিলেন, যে-ব্যক্তিটি ঔপন্যাসিক হয়, সে তা জানুক আর না জানুক, অল্প বয়সেই সে সেটি হতে শুরু করে।— কেন তিনি এ কথা বলেছিলেন— এ সম্পর্কে বিবিসির মার্ভিন ব্রাগ জন ফাওলসের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে কথা আমি সব কথাশিল্পীর কথা মনে রেখেই বলেছি; ঔপন্যাসিক হিসেবে আমার যে অনুভূতি, সেটা সব ঔপন্যাসিকের ক্ষেত্রেই খাটে।’ ঔপন্যাসিক কে? সেই বাতিকগ্রস্থ ব্যক্তি যে তার লেখা নিয়ে লেগে থাকে দিনরাত। আমি মনে করি ঔপন্যাসিকের লেখার এই তাড়না, এই অদ্ভুত অবসেশনের, একটা বিশেষ কারণ আছে। ঔপন্যাসিক মনে করে, সে যদি এক্ষুণি একটা জিনিস লিখে না রাখে, সেটা হারিয়ে যাবে। ‘না লিখে রাখলে হারিয়ে যাবে’— এই চিন্তাটা ঔপন্যাসিককেই আক্রান্ত করে, আর কাউকে করে না। নিশ্চয়ই অত্যন্ত অল্প বয়স থেকে আমি তা অনুভব করেছি, যদিও বুঝিনি। বুঝেছি পরে, লিখতে গিয়ে; আসল কথা কি জানো— এটাও বুঝতে হয় উপন্যাস লিখেই, যে লেখেনি সে বুঝবে না। উপন্যাসের মধ্যে একটা পশ্চাৎমুখো ব্যাপার আছে: কেননা উপন্যাস হলো একটা হারানো জগতে ফিরে তা পুনরায় উদ্ধার করার চেষ্টা।’ (সালাহউদ্দীন, ২০১৮ : ৯৫-৯৬)-এ বিবেচনায় সেই অল্প বয়সী মানুষটির ভেতরে আগে উপন্যাস জেগে উঠতে শুরু করে। তত্ত্ব তো অনেক পরের ব্যাপার। এমন কি যে ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠার পরও তত্ত্বের এতটুকু সহায়তা নাও নিতে পারে, তাতেও তার কোনো ক্ষতি নাও হতে পারে। অমিয়ভূষণ মজুমদার যেমন বলেছিলেন, মানুষ আর পৃথিবী দেখে দেখেই উপন্যাস লিখে ফেলা যায়। কথাটা তাঁর কাছ থেকেই তুলে আনতে চাইছি, তিনি লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীময় উপন্যাসের উপাদান, প্রতিটি মানুষ উপন্যাসের নায়ক হওয়ার যোগ্যতা রাখে, পৃথিবীকে দেখে দেখেই তো উপন্যাস রচনা করা হয়।’ (অমিয়ভূষণ, ১৯৯৬ : ২৬) আমরা বলতে পারি, জীবনজুড়েই উপন্যাসের উপাদান। প্রত্যেকের নিজের অন্তঃস্থ সুদূরের যাত্রায় কিছু দূর পর পর দেখা মেলে এক একটি নতুন উপন্যাসের। সেজন্য জীবনের বাঁকে বাঁকে জেগে ওঠে একজন লেখকের নানা বিভঙ্গের উপন্যাস।

তারপরও উপন্যাস আর আগের জায়গায় নেই। উপন্যাস বা শিল্পকলার কোনো কিছুই আর আগের জায়গায় নেই। টমাস কুনের মতো বলতে হয়, এখানেও প্যারাডাইম শিফট ঘটে গেছে। তিনি বলেছিলেন, বিজ্ঞানীরা তাদের নিজ নিজ যুগের প্যারাডাইম আঁকড়ে ছিলেন। অ্যারিস্তোতল তাঁর যুগের প্যারাডাইম আঁকড়ে ছিলেন, নিউটন তার যুগের, এবং আইনস্টাইন তার যুগের। ফলে পরেরটি আগেরটিকে খারিজ করে দিয়ে দিয়ে চলতে পারে। কিন্তু কুনের ভাষ্যানুযায়ী একযুগের বিজ্ঞান আরেক যুগের বিজ্ঞানকে খারিজ করলেও দুটোই স্বীকৃত বিজ্ঞান। ঠিক তেমনি এক যুগের উপন্যাসের আগের যুগের উপন্যাসের সব ধারাগতি বাতিল করে দিলেও সবই স্বীকৃত উপন্যাস। ফলে ইভান তুর্গেনেভের রুদিন, কি দস্তয়েভস্কির দ্যা ব্রাদার্স কারামাজভ কি তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস, একালের উপন্যাসের ধরনের কাছে রদ্দি হলেও উপন্যাস হিসেবে তাদের অবস্থান টলে যায় না। বোধকরি এখানে মূল ব্যাপারটা ঘটে গেছে। তবে আগের মতো বাস্তববাদ বা আধুনিকবাদী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে মিল ছিল, সেই মিল উত্তরাধুনিকবাদী লেখদের মধ্যে প্রায় নেই বললেই চলে।

উত্তরাধুনিকবাদ সম্পর্কে সবচেয়ে প্রভাবশালী টেক্সট জাঁ ফ্রাসিস লিওতারের The Postmodern Condition : A Report to Knowledge (1979)-এর একেবারে শেষে লিওতার উত্তরাধুনিক শিল্পী বা লেখকের ধরন সম্পর্কে বলেন,A postmodern artist or writer is in the position of a philosopher : the text he writes, the work he produces are not governed by preestablish rules, and  they can not be judged according to a determining judgment, by applying familiar categories to the text or the work. (Lyotard,1984 : 81) যদি এ কথাই হয়, তাহলে লেখকের যা চিরন্তন দায়িত্ব তা থেকে উত্তরাধুনিক লেখকের তফাত কোথায়? এক কেবল লেখককে দার্শনিকের ভূমিকা গ্রহণ করার বিষয়টি ছাড়া? তাও বহু আগে থেকেই লেখকরা পালন করে এসেছেন। দস্তয়েভস্কি যতটা লেখক, ততটাই কি দার্শনিক নন? বেদব্যাস কি হোমার দার্শনিক নন? হ্যাঁ, এখন যদি কেউ সজ্ঞানে, লেখার কাজটি গ্রহণই করেন একজন দার্শনিকের দিক থেকে, তাহলে কী দাঁড়ায়?

দার্শনিক যে কাজ করেন সে সম্পর্কে যেমনটা নিৎসের বরাতে আমরা শুনি জিল দলয়জ ও ফেলিক্স গাত্তারি-র What is Philosophy? বইতে : Nietzsche said that philosophy invents mode of existence or possibilities of life. (Deleuze-Guattari,1994:72)অস্তিত্বের ধরন নির্ধারণ বা জীবনের সম্ভাবনা সন্ধান। তাহলে তো দেখা যাচ্ছে— লেখকের কাজ হচ্ছে প্রথমটি— অস্তিত্বের ধরন নির্ধারণ : আমরা কারা, কী নিয়ে বেঁচে আছি, কেন ও কীভাবে আমাদের বেঁচে থাকাটা বজায় আছে— এই তো। অস্তিত্বের তদন্ত। কিন্তু সম্ভাবনার কথা বলা ঠিক লেখকের কাজ নয়, মানে গল্প-উপন্যাসের লেখকের অন্তত। ফলে দার্শনিকের মতো জ্ঞানের বিষয়াদি নিয়ে লেখক যদি তদন্তে নামেন তাহলেই হয়ত উত্তরাধুনিক লেখকের দিকটা প্রকট হয়ে ওঠে। কারণ লেখক কেবল অনুভূতি ও কল্পনা দিয়ে তার রচনাটি তৈরি করেন না, তার পেছনে স্পষ্টত একটি দার্শনিক প্রতীতি কাজ করবে, কিন্তু সেটা এক রৈখিক দিক থেকে নয়, তা বহুত্ববাদী একটি গড়ন নেয়। এবং লেখক কোনো পূর্বনির্ধারিত পথে পা ফেলেন না, কোনো পূর্বপ্রতিষ্ঠিত নিয়মের বশবর্তীও হন না। তিনি সমস্ত কেন্দ্রিকতা ভেঙে দেন। আধুনিকবাদে এককেন্দ্রিকতার গুণগান করা হয়েছে, সেখানে উত্তরাধুনিকবাদে এল বহুকেন্দ্রিকতা। মহীরুহের বদলে সৃষ্টি হলো বিশাল বিস্তৃত তৃণভূমি এবং সেখানে যে যেখানেই থাকুক সে তার প্রান্তিকতা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ভরসা পেল।

সবচেয়ে বড় কথা, লেখক যেমন কোনো কেন্দ্রিকতায় থাকেন না, পাঠকও লেখক যা বলতে চেয়েছেন— সে জায়গা থেকে পাঠ/ টেক্সটকে দেখেন না। ফলে একই টেক্সটের বহু ব্যাখ্যা তৈরি হয়। একেক পাঠক তার নিজের মতো করে সেটি সৃষ্টি করে নেন। আর সেটা নিতে বাধ্যই থাকেন, কারণ লেখার ভেতরে কোনো কিছুর কেন্দ্র থাকে না। বিচিত্র স্তর থেকে স্তরে লেখকের ভাষাপ্রবাহ যাওয়া আসা করতে থাকে। চরিত্র, কাহিনি কোনো প্রথাগতধারায় অবগাহন করে না। বৃক্ষের বিষম শেকড়-বাকড় কি ডালপালার মতো যেন বিস্তার লাভ করে সেই রচনা।

আর সেটা না হয়েও কি উপায়? একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। আগে ঢাকার শহরের কেন্দ্র বলা হতো গুলিস্তানকে। কোনো বিজ্ঞাপনেও বলা হতো : ঢাকার প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তানে…কিন্তু এখন ঢাকা শহরের কেন্দ্র কোথায়? মিরপুর উত্তরা কাওরানবাজার শাহবাগ মালিবাগ মগবাজার রামপুরা থেকে বাড্ডা নদ্দা বারিধারা বসুন্ধরা শাহজাদপুর? আর বনানী গুলশাল তো আছেই। মানুষজনও জীবন ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে, জীবিকার ক্ষেত্রে কেন্দ্র ভেঙে ফেলেছে, বা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে। বিচিত্র মিশ্রিত জীবনের ভুবন তৈরি হয়েছে জগতের প্রায় সব মানুষের। আছে সাইবার স্পেস আর ইন্টারনেটের জগৎ। অসংখ্য কিছুর ভেতর থেকে বেছে নেওয়ার সুবিধা, এবং অসংখ্য সম্ভবনা।  চেক লেখক রাজনীতিবিদ, ভাস্লাভ হাভেলের মতে, আমরা উত্তরাধুনিক যুগে বাস করছি, যেখানে সব কিছুই সম্ভব, কিন্তু কিছুই সুনির্দিষ্ট নয়। এরই সঙ্গে সংকটও কি তাল মিলিয়ে বাড়েনি? সম্ভাবনার যেমন কোনো সীমা নেই, কেন্দ্র নেই; সংকটেরও তেমন সীমা নেই, কেন্দ্র নেই। জ্ঞানের একটি এলাকার ভেতরে ঢুকে পড়েছে আরেকটি এলাকা। ইন্টারটেকচুয়ালিটি, ইন্টারডিসিপ্লিনারিটির সঙ্গে তাই তাল মিলাতেই হচ্ছে। ফলে টেক্সটও খ- বিখ- হয়ে যাচ্ছে, নানান স্তরে ও বিন্যাসে। এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন উপন্যাস।

উত্তরাধুনিকতার আরেক দিক স্থাপত্যকলা। বর্তমানের সমস্ত নগরে বহু স্থাপত্য আছে যাতে কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে আকাশসহ আশেপাশের সবকিছু। এ যেন অদ্ভুত এক লীলা— সব কিছু গায়ে মেখে নিজের মতো থাকবার লীলা। বাস্তবের ছায়া আছে, কিন্তু কায়া নিজস্ব। সেই সঙ্গে পোষাক আশাক খাদ্যাভ্যাসে যোগ হচ্ছে সারা বিশ্বের কত না খাদ্যদ্রব্য। সব মিশ্রিত ভাবে ও ভঙ্গিতে বিপুলভাবে গ্রহণ করছে নিজের মতো করে। মেরেলিন মনরোর এই বর্গকার একগুচ্ছ ছবি নিয়ে যে ছবি, যেখানে মূল ছবি কোনটা তা বোঝা যায় না।

তাই অরিজিনালিটির বিলোপ ঘটছে। একই বহু, বহুই এক। দ্বৈতাদ্বৈতবাদের সঙ্গেও যেন মিল খায় উত্তরাধুনিকতা। বহুর সঙ্গে অবলীলায় মিল খায়। তাতে যেন কোনো বাধা নেই যেন। কিন্তু এখানেই আছে সেই বিরাট ধাঁধা যেখানে দেখা যায় ব্যক্তি, সমাজ সব উবে গেলেও রাষ্ট্র প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠছে। রাজনীতিও একক দলের হাত থেকে সরে জোটমুখী ও বহুমুখী।

কতদিক থেকে কত বিচিত্রভাবে এই বিচিত্রতাকে ধরাই উত্তরাধুনিক লেখকের চ্যালেঞ্জ। তার লেখার ভেতরে মিশ্রিত হয়ে যাচ্ছে বাস্তববাদ, প্রতীকবাদ কি আধুনিকবাদ যে গুচ্ছখানিক শিল্পমতবাদের যোগফল, সেসব। আরও নানান কিছু, দাদাবাদ কি পরাবাস্তববাদ মিলছে আস্তিত্ববাদে, যোগ হচ্ছে জাদুবাস্তববাদের মতো উত্তরাধুনিক অভিব্যক্তি।

সমস্ত কিছুর মহাবয়ান/গ্রান্ড ন্যারেটিভ ভেঙে দিয়ে আখ্যান নিচ্ছে মিশ্রিত এক রূপ। অনেক ক্ষেত্রে ভাষার প্রচলিত প্রকরণ, বাক্যের শুদ্ধতা নস্যাৎ করে শব্দের বানানে নৈরাজ্যবাদও দেখা দিচ্ছে। ফলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলাও তৈরি হচ্ছে।

বলা হয়ে থাকে আধুনিকবাদ ঐতিহ্যকে বাতিল করে দিয়েছিল। প্রযুক্তি, যন্ত্র  ও নাগরিতা নিয়ে তৈরি হয়েছিল আধুনিকবাদ। উত্তরাধুনিকতা ফের ঐতিহ্যকে গ্রহণ করেছে। গ্রাম ও শহরের ভেদ ঘুঁচে গিয়ে তৈরি হচ্ছে মিশ্রিত অনেক এলাকা। এদিকে নতুন করে ধর্মীয় ভাবধারারও পুনরুত্থান ঘটছে। পুরাণের নতুন প্রতিগ্রহণ ঘটেছে। এসব মিলে মনে হয়, উত্তরাধুনিকবাদকে চিনতে গেলে আদি থেকে শুরু করতে হবে।

আদিতে ছিল মন্ত্র। আধুনিকরা নিয়ে এল যন্ত্র। এবং উত্তরাধুনিকরা আদিম মন্ত্রের ঐতিহ্যের সঙ্গে যন্ত্রকেও গ্রহণ করল। আবার আরেক রকমের উত্তরাধুনিকতাও আছে। যেমন আদিতে মানুষ কথা বলেছে ঈশ্বরের সঙ্গে, আধুনিকরা কথা বলেছে মানুষের সঙ্গে, আর উত্তরাধুনিকরা কথা বলেছে নিজের সঙ্গে নিজে, কিন্তু সেখানে পরমসত্তা ও জীবাত্মাও এসে হাজির। আধ্যাত্মিকতা, সুফিবাদ, মরমীবাদ ও বাউল মতবাদের নতুন পর্যালোচনা চলছে সবখানে। নামটা ও লক্ষণগুলি একটু আলাদামাত্র। রুমির মতো কবি এখন সারা বিশ্বের সবচেয়ে সমাদর পাওয়া, খলিল জিবরানেও টান বোধ করছেন অনেকেই।

ফলে শুদ্ধচারের কোনো সুযোগ থাকছে। কোনো কিছু অবিমিশ্র থাকছে না। এর সবচেয়ে ভালো নমুনা যেকোনো বাজার। শপিংমলের স্থাপত্য থেকে শুরু করে সেখানে দ্রব্যাদির যে বিন্যাস তা আগে কল্পনাও করা যেত না। কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি করতে বিজ্ঞাপনেরই যেন পশরা বাসিয়েছে সমস্ত টেলিভিশান। ক্রেতারাও দিশা হারাচ্ছে। নানান ধরনের ভোগ্যপণ্য ও তাদের খদ্দের হলো উত্তরাধুনিক বাজারের সারসত্তা। সামাজিক বসবাসকে চূড়ান্তভাবে নস্যাৎ করে দিয়ে তৈরি হচ্ছে বহুতল অ্যাপার্টমেনন্ট। বিচ্ছিন্নতার কোনো সীমাপরিসীমা নেই। গর্ভভাড়া, নারীবাদীদের নতুন বিন্যাস, এল.জি.বি.টির আন্দোলন ও অধিকার, মা-বাবার পরিচয় লোপ করার দিকগুলিও তো শুরু হয়ে গেছে। অন্যদিকে মানুষের শরীরই হচ্ছে অস্ত্র। দৃষ্টান্ত ৯/১১ হামলা। সর্বোপরি প্রগতি ও প্রতিক্রিয়াশীলতা দুদিকেই চরমরূপ ধারণ করেছে। সভ্যতা আরেকটি বিস্ফোরণের জন্য হয়ত তৈরি হচ্ছে।

এইসবের ভেতর থেকে লেখক তার সেই বিষয়াদি বেছে নিতে পারেন যা আগের সাহিত্যে প্রকট ছিল না। যদিও বলা হয়, বার্নাড শর মতো লোকই বলেছিলেন, শিল্পসাহিত্য নতুন কিছু যোগ করার নেই, কেবল বিজ্ঞান প্রযুক্তি কিছু যোগ করছে। বেকেটের সেই কথা যে, সূর্যের নিচে আর নতুন কিছু বলবার নেই। কিন্তু উত্তরাধুনিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে কেবল বলবারই আছে সীমাহীন বিষয়, যার এক দিক থেকে শুরু করলে অন্য দিকে তাল রাখতে পারবে না। আগে শেষ করার দায় থাকত। এখন তাও নেই। অসমাপ্ততা-ও যেন এর আরেক লক্ষণ।

ক্ল্যাসিক, রোমান্টিক, রিয়ালিস্টিকের সীমা ভেঙে যে আধুনিকবাদ, সেই আধুনিকবাদের গর্ভ থেকে যদি উত্তরাধুনিকবাদের জন্ম হয়, তাহলে এর বীজ কীসের? বীজ তো ওই একটাই: মানুষের মুক্তির সন্ধান। মুক্তির এই সন্ধান কত না রঙে রূপে ঢঙে মানুষ করে চলেছে। কিন্তু মুক্তির অভিমুখ তৈরি হতেই হাজির হচ্ছে নতুন নতুন সব সংকট। সংকট হলো প্রকৃতি আর মুক্তিসন্ধান হলো পৌরুষ। দুয়ের সঙ্গমে মুক্তির বীজ প্রোথিত হয় সংকটের গর্ভে। সেখান থেকে নতুন নতুন পথের সন্ধান।— এভাবেও কি দেখতে পারি না বিষয়টাকে?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যে আধুনিকবাদের পালে হাওয়া পেয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে তার মৃত্যুঘণ্টা বেজেছে, তারপর সোভিয়েত ব্যবস্থার পতনের পর শুরু হয়ে যায় মতাদর্শগত উৎকেন্দ্রিকতা। উত্তরাধুনিকবাদ অনেকের মতো সেই উৎকেন্দ্রিকতারই আর্তনাদ। কারো মতে নতুন ভাববাদ। কারো মতে পুঁজিবাদের নতুন কৌশলমাত্র। নোয়ম চমস্কির মতে, উত্তরাধুনিকবাদ অ্যানালিটিক্যাল ও ইম্পিরিক্যাল জ্ঞানের ক্ষেত্রে কিছুই যোগ করতে পারেনি।(বিপ্লব,২০১২:২৪) তারপর উত্তরাধুনিকবাদ কোনো শ্রেণি গোষ্ঠীর( কৃষক-শ্রমিক-সর্বহারার মুক্তির জন্য যেমন মার্কসবাদ) মুক্তিকামী নয়। এর অভিমুখ আগের সমস্ত কিছুকে বিদীর্ণ করে প্রকাশিত হতে চায়।

আধুনিকবাদের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনার ভেতর দিয়ে উত্তরাধুনিকবাদকে বুঝে নেওয়া যেতে পারে। যুক্তিকাঠামো, ঐহিক জীবনকামী, ও মানবতাবাদের ঝান্ডা ওড়ানো আধুনিকবাদ আদলে পৃথিবীকে কী দিয়েছে? ঔপনিবেশিকতা ও দুটো বিশ্বযুদ্ধ, হলোকাস্ট। নানান অসন্তোষও কাজ করেছে আধুনিকবাদ নিয়ে। যদিও জুর্গেন হাবারম্যাস মনে করেন, আধুনিকবাদই যথেষ্ট, কেবল এর কিছু সমস্যা ঠিকঠাক করে নিতে হবে। আধুনিক প্রতর্ক/ ডিসকোর্সগুলি কেবল জগতকে বোঝার জন্যই নয়, এগুলি জগতকে পরিবর্তনও করতে চায়। (গধষঢ়ধং, ২০০৭ : ৫৫) তিনি আদতে মার্কসের দার্শনিকদের যে দায় সেটিকেই নিজের মতো করে আবার বলেছেন। যে এতদিন ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এখন দরকার বদলানোর। ক্রিটিক্যাল তত্ত্ব চিন্তার তাত্ত্বিকগণ এর সঙ্গে যোগ করেছেন অনেক কিছু। সবমিলিয়ে মজার যে বিষয়টি আমার মনে জেগে ওঠে তা হলো— উত্তরাধুনিকবাদ দার্শনিককে মিয়্রমাণ করে দিয়েছে। প্রগাঢ় হয়েছে তাত্ত্বিকদের বাকবিত-া।

আর এর ভেতরেই আত্মরক্ষা করতে হবে লেখককে। তিনি কোনো কিছুতে আবদ্ধ হবেন না। কারণ তিনি এক ও অদ্বিতীয় মানবের আদিম সত্তার চিরয়াত প্রতিনিধি। তার কাছে হাসি-কান্নার, প্রেম-ঘৃণার কোনো আধুনিকতা উত্তরাধুনিকতা হয় না। উত্তরাধুনিক হাসি বা উত্তরাধুনিক থুতুফেলা হয় না। তারপরও যৌনতা অন্যমাত্রিকতায় উন্নীত হয়েছে, কিন্তু সেটা কতভাগ মানুষের জন্য? সর্বোপরি উত্তরাধুনিকবাদ নিয়েই বা কতভাগ মানুষ চিন্তা করে? জগত চলে তার নিজস্ব গতিতে। সেই গতি আদিম ও অকৃত্রিম। সেখানে হাওয়া আসে, মেঘ করে এখনো। মৌসুম বদল ঘটেছে। শীতের সময় শীত নেই। বৃষ্টি হয় শ্রাবণ চলে গেলে। তবু আকাশে কখনো কখনো রঙধনু ওঠে, যা কোনো মতবাদের বা তাত্ত্বিকতার ধার ধারে না।

তথ্যসূত্র

অমিয়ভূষণ মজুমদার (১৯৯৬)। লিখনে কী ঘটে, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা

বিপ্লব মাজী (২০১২)। আধুনিকতা ও উত্তরআধুনিকতার তুলনামূলক পাঠকৃতি, অঞ্জলি পাবলিশার্স, কলকাতা

সালাহউদ্দীন আইয়ুব (২০১৮)। ফরাশি তত্ত্ব, পল দা মান ও সাহিত্যের অগস্ত্যযাত্রা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা

Butler, Christopher (2002). Postmodernism: A Very Short Introduction, Oxford University Press

Deleuze, Gilles-Guattari, Felix (1994). What is Philosophy? Trans. byHugh Tomlinson and Graham Burchell, Columbia University Press, New York.

Lyotard, Jean-Francois (1984). The Postmodern Condition: A Report to Knowledge, Trans. by Geoff Bennington and Brian Massumi, University of Minnesota Press, Minneapolis

Malpas, Simon (2007). The Postmodern, Routlefge, London and New York

***************************************

 

পোস্টমডার্নিজম : ফোবিয়া ও ডিসকোর্স
শিমুল মাহমুদ

পশ্চিমা সভ্যতায় পোস্টমডার্নিজম ডিসকোর্সটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে গত শতকের গোড়ার দিকে; আমাদের দেশে শতকশেষে এসে বিভ্রম ছড়িয়েছে; যার পেছনে ক্রিয়াশীল থেকেছে এবং এখনও ক্রিয়াশীল রয়েছে আধিপত্যবাদের কারসাজি। সে বিষয়ে প্রসঙ্গক্রমেই আসা যৌক্তিক। তার আগে আমাদের যে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত তা হল, আমাদের জন্য ‘পোস্টমডার্নিজম’ অভিধাটি কেন এবং কীভাবে প্রযোজ্য ও প্রাসঙ্গিক? পা-িত্যের দাসত্ব/চিন্তার দাসত্ব থেকে আমাদের অ্যাকাডেমিশিয়ানরা মুক্ত হওয়ার যোগ্যতা না রাখার কারণে পোস্টমডার্নের অনুবাদ করা হয়েছে উত্তরাধুনিকতা; যেন বা আধুনিকতা শেষে উত্তরাধুনিকতার ভেতর বসবাস করছি আমরা। বিষয়টি এহেন সরলরৈখিক নয় মোটেও; নয় শুধু কালপ্রকাশজ্ঞাপক অভিধা; বরং, ইহা হয় গ্লোবাল পলিটিক্স; সভ্যতা-নির্দেশক সূচকচিহ্ন। অথচ এমনতর গ্লোবাল পলিটিক্সের বিষয়টি কেন প্রাসঙ্গিক, কী কারণে অনিবার্য এবং কোন বাস্তবতায় তা আমলযোগ্য (?) সে বিষয়ে কোন দায়িত্বশীল অভিধা চিহ্নিত না করেই ইতোমধ্যে পশ্চিমাদের নব্যজ্ঞানের তকমা বাজারিকরণ প্রক্রিয়ায় বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে পোস্টমডার্নিজম ডিসকোর্সটি কোর্সকারিকুলামের আওতায় নিয়ে আনা হয়েছে। ইহাও উদ্দেশ্যবাচক বৈশি^ক পলিটিক্সের দাসত্ব বটে।

আমাদের দেশে বিশ^বিদ্যালয়ের পাশাপাশি লিখিয়েদের ভেতর বিষয়টিকে আমলে আনা হয় গত শতকের নব্বইয়ের দশকে; যখন পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি এক দল কবিতাসেবক দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন নিজেদের বিশেষ অভিধায় চিহ্নিত করার গোয়ার্তুমিতে; দাবি করতে থাকলেন, চর্চা করতে থাকলেন বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে তারা নতুন ইতিহাসের নির্মাতা। অবশ্য এ হেন গোয়ার্তুমি বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে যে শেষাবধি সম্ভাবনার ভূমি নির্মাণ করতে পেরেছে সে কথা এখন দায়িত্ব নিয়েই বলা সম্ভব। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিগত শতকের আশি / নব্বইয়ের উল্লম্ফনের ধারাবাহিকতায় বাঙালিদের কবিতা স্পর্ধার সাথেই তার প্রথাগত ফর্ম থেকে এমনকি প্রথাগত অন্তর্বস্তু থেকেও অনেকটা সরে এসেছে।

০২.

এক্ষণে প্রসঙ্গের প্রয়োজনে আমাদের কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করে নিতে হচ্ছে। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, কারণ বিষয়গুলো অর্থাৎ অনুসন্ধানসমূহ নতুন প্রসঙ্গ নয় মোটেও; সময় পরম্পরায় ধারাবাহিক তো বটেই সেইসঙ্গে পুরোনোও বটে। অথচ প্রাসঙ্গিকতার কারণেই বিষয়গুলো নতুন করে ভাবার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। দায়িত্ব নিয়েই বলা সম্ভব, আলোচ্য বিষয়টি বর্তমান শতকে এসে আবারও প্রাসঙ্গিক ডিসকোর্সের সুযোগ উন্মোচন করতে সক্ষম :

ক. পোস্টমডার্নিজম কি মডার্নিজমের ধারাক্রম প্রকাশজ্ঞাপক অভিধা?

খ. আধুনিক এবং উত্তরাধুনিকের সম্পর্কটা কেমন?

গ. পশ্চিমের মডার্নিজম ও পোস্টমডার্নিজমের নিকট তৃতীয় বিশে^র অর্থাৎ আমাদের অবস্থান কোথায়?

ঘ. পশ্চিমবঙ্গে কেন পোস্টমডার্নিজমের বিপরীতে উত্তর আধুনিকতার সূত্রপাত হল?

ঙ. আমাদের দেশে উত্তর আধুনিকতার বিষয়টি কীভাবে চর্চা করা হয়েছে, হচ্ছে এবং এর যৌক্তিকতা ও ফলাফল কেমন?

চ. বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী? অর্থাৎ সতর্কতা কতটুকু এবং কেনই বা এই সতর্কতা?

প্রাসঙ্গিক পরিবেশ পেলে আমি বিষয়গুলো নিয়ে এভাবে কথা বলার চেষ্টা করে থাকি, প্রকৃত বাস্তবতায় ‘মডার্নিজম’ হল একই সঙ্গে পুঁজির বিকাশ ও পুঁজি-কুক্ষিগতকরণ-কৌশল। আর ‘পোস্টমডার্নিজম’ মূলত পুঁজি প্রদর্শনের পুঞ্জিভূত প্রকাশ। বিশ^ এখন এই প্রকাশ-প্ররোচনায় আত্মহারা। মজার বিষয়টি হল, এহেন প্রকাশবৈশিষ্ট্য ব্যক্তিমানবের অনেকগুলো অনিবার্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি; যা অনিবার্য এবং সার্বিক বিবেচনায় গুরুত্ববহ বটে; যাকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে ‘আর্কেটাইপ’ প্রিফেক্সটি দিয়ে। এই ‘আর্কেটাইপ’ এখন সামষ্টিক অর্থাৎ পরিণামে গ্লোবাল ভূমিকায় ক্রিয়াশীল। বৈশি^ক বিবেচনায় লেট-ক্যাপিটালিজমের মতই পোস্টমডার্ন এক জটিল ঘিরিঙ্গি; যার ফলশ্রুতিতে পশ্চিমারা যেভাবে বিষয়টিকে নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই খেলছে আমরাও তা অনুসরণ করছি বা সেই খেলায় যুক্ত হচ্ছি।

পোস্টমডার্ন প্রবক্তাদের ভেতর একদিকে যেমন সক্রিয় ছিলেন জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার অন্যদিকে বদ্রিআর। আবার পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই, মার্কসবাদী ফ্রেডারিক জেমসনকে; যিনি মার্কসবাদী হওয়া সত্ত্বেও পোস্টমডার্নের গুরুত্বকে হ্যাঁ-বাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিতর্ক উত্থাপন করেছেন। নওম চমস্কি বিষয়টি আমলে আনলেও তিনি নিজেকে পোস্টমডার্ন বলে স্বীকার করেন না বা তার সাথে পোস্টমডার্নের তকমা যুক্ত করা সম্ভবও নয়। নওম চমস্কি প্রসঙ্গক্রমে দুটো বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র দুটো বিষয়কে ভয় পায়, প্রথমটি ‘জাতীয়তাবাদ’; যার ভিত্তিতে জাতিগুলো সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়টি, ইসলাম ধর্মে নয়; বরং ভয় আছে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-এর ভেতর।১

সঙ্গত কারণেই যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গিবাদের মাধ্যমে ইসলামকে টিকিয়ে রাখতে চায়; যাতে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ জেগে উঠতে না পারে। যদিও ভিন্ন অর্থে ‘ইসলাম’ মূলত ‘ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ’; যার জন্য ভারত বিভাজিত হতে বাধ্য হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হল, পোস্টমডার্নিজমের সাথে জাতীয়তাবাদ এবং জঙ্গিবাদের সম্পর্ক কোথায়? সম্পর্ক আছে, পোস্টমডার্নিজম স্পষ্টভাবেই বিপ্লবে বিশ^াসী নয়; কাজেই মার্কিনিদের পক্ষে / পশ্চিমাদের পক্ষে অর্থাৎ পোস্টমডার্নের পক্ষে ‘জাতীয়তাবাদ’ টিকিয়ে রাখা যৌক্তিক নয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যৌক্তিক, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পোস্টমডার্ন ভাবনা ও অন্যান্য’ পুস্তকে বিবিধ প্রমাণাদি হাজির করে দেখিয়েছেন যে তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবেই পোস্টমডার্নে পরিত্যক্ত।

এক. টোটালাইজেশন অর্থাৎ মৌলিক মানবসত্ত্বা, সামূহিক লক্ষ্য ও সীমা অতিক্রান্ত অজ্ঞেয় বিষয়-বিষয়ী সংক্রান্ত ডিসকোর্স।

দুই. টেলিওলোজি, তা অথরের দিক থেকেই হোক বা ঐতিহাসিক অনিবার্যতার কারণেই হোক ‘পরম-কারণবাদ’ পোস্টমডার্নে পরিত্যক্ত।

তিন. ইউটোপিয়া বা কল্পস্বর্গ পোস্টমডার্নে পরিত্যক্ত; হোক তা প্রগতি-বিজ্ঞান-শ্রেণিসংগ্রাম এবং যাবতীয় বিশ^াসজাত; লিওতার যেগুলোকে বলেছেন ‘মৎধহফ ৎবপরঃং’।২

আমরা জানি, মডার্নিজমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘জাতীয়তাবাদ’। জাতীয়তাবাদ অতিক্রম করে প্রথম বিশ^গুলো এখন গ্লোবালাইজেশনের প্রাকটিস করছে। পোস্টমডার্নিজমের অনিবার্য ভিজ্যুয়াল সূচকচিহ্ন ‘গ্লোবালাইজেশন’। আমরা জাতীয়তাবাদ অর্জন করার আগেই গ্লোবালাইজেশনের দিকে পতঙ্গের মতো ছুটতে বাধ্য হচ্ছি। বিশ^ায়ন সভ্যতায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কোন প্রকার সতর্কতা কাজে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। যদিও আমরা পশ্চিমাদের নিকট ‘আদার্স’/‘অপর’/‘হীন’। তথাপি আমরা আত্মপ্রসাদ লাভ করি এই ভেবে, আমরাও আধুনিক যুগের প্রাপ্তি ও সংকট অতিক্রম করে আরও এক ধাপ সভ্য হয়ে উঠতে শুরু করেছি; আমরাও উত্তরাধুনিকের সিড়িতে পা রেখেছি। অথচ আসুন খতিয়ে দেখা যাক, প্রকৃত বাস্তবতা কেমন?

জন্মগতভাবেই মানুষ স্বার্থপর। স্বার্থ হস্তগত করার তাড়না থেকে আধিপত্যের সূচনা। মানুষ যখন বলে, সে নিরপেক্ষ; তখন সে মিথ্যা বলে। প্রকৃত বাস্তবতায় সে তার স্বার্থ রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠিত সিস্টেমকে সচল রাখতে প্রয়োজন মাফিক ছাড় দেয় মাত্র। সিস্টেমটা আসলে কী? সিস্টেমের নাম আধুনিকতা। এই সিস্টেমকে জায়েজ করতে বুর্জোয়ারা আধুনিকতার ভেতর দুটো অভিজ্ঞানের উৎপাদ করেছে। একটি হল ‘মানুষ’ আরেকটি ‘জাতি’। অভিজ্ঞানের এই উৎপাদনকে বলা হয় ‘মূল্যবোধ’। ‘মূল্যবোধ’ আধুনিকতার আরেকটি সূচকচিহ্ন; যার সাথে সম্পৃক্ত ধর্ম এবং বর্ণ।

প্রকৃত প্রস্তাবে ‘আধুনিকতা’ ধর্মীয় মূল্যবোধের দান। পশ্চিমা আধুনিকতা আমাদের পেটে-পিঠে হামলে পড়ার আগে আমরা অতিক্রম করে এসেছি দাস যুগ / সামন্ত যুগ। যাই হোক না কেন এই সামন্ত যুগের পেটের ভেতর থেকেই কিন্তু বেরিয়ে এসেছিল আধুনিক যুগ; যার রক্ষাকবচ হল ‘ধর্ম’। এমে সেজায়ার খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় অপরাধী খ্রিস্টধর্ম প্রচারকগণ। সভ্যতায় এরাই অন্যায্য সমীকরণ তৈরি করেছে : খ্রিস্টধর্ম=সভ্যতা, পৌত্তলিকতা= অসভ্যতা।৩ প্রকৃত বাস্তবতায় এহেন সমীকরণ থেকেই ঔপনিবেশিকতার উত্থান। আধুনিকতার আরেকটি হাতিয়ার হল, ‘ঔপনিবেশিকতা’। তৃতীয় বিশ^ অর্থাৎ আমরা ঔপনিবেশিক আধুনিকতার দাস; চৈতন্যে, জ্ঞানে, মননে ও রাষ্ট্রগঠনে।

১৯৪৭-এর পর ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সরে এসে আমরা এখন উত্তর-ঔপনিবেশিক দাসত্বের সভ্যতায় বসবাস করছি; যা পক্ষান্তরে পোস্টমডার্নিজমের সূচকচিহ্ন। অর্থাৎ পশ্চিমারা মডার্নিজমের অবক্ষয় থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের পথ পরিহার করে উত্তর-ঔপনিবেশিকতার প্রাকটিস জারি করেছে; যে প্রাকটিসের সামনে প্রতিপক্ষ বলতে বোঝায় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়া জাতি/গোষ্ঠী/রাষ্ট্র; যারা মূলত ‘অপর’/ ‘আদার্স’ অর্থাৎ ‘হীন’। এই হীনদের পথ বাতলাবার পায়তারা চালাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রথম বিশ^গুলো ভার্চুয়াল সভ্যতায় বিমূর্ত মানবতার আশ্রয়ে গ্লোবাল বিশে^ অধিকতর সভ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে; পক্ষান্তরে যা পোস্টমডার্নিজমের চেহারা।

প্যারোডি করলে যে সত্যটি প্রকাশ পায় তা হল, প্রথম বিশ^ যখন তৃতীয় বিশ^গুলোতে উপনিবেশ কায়েমের মাধ্যমে শাসন চালিয়ে সভ্য-জীবনের পথ বাতলায় তখন তা হয়ে ওঠে ‘আধুনিক’; আর যখন পশ্চিমারা ঔপনিবেশিক শাসনপ্রক্রিয়া উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয় এবং তখন যে উত্তর-ঔপনিবেশিক দাসত্ব জারি থাকে তা মূলত পোস্টমডার্নিজমের ক্যারিজমা; যার বদৌলতে তারা ‘পোস্টমডার্ন’ আর আমরা হলাম ‘আদার্স’, ‘অপর’, ‘হীন’; যে পোস্টমডার্নিজমের বদৌলতে প্রথম বিশ^গুলো আমাদের নিয়ন্ত্রিত করে; এবং আমরা অনুগত থাকতে বাধ্য থাকি। প্রকৃত প্রস্তাবে পোস্টমডার্নিজমের আতুরঘর হল ‘ফ্যাসিবাদ’। কেউ মডার্নিজমের ধারাবাহিকতায় একে মিলিয়ে দেখেন কেউ বা আধুনিক যুগের সাথে বিচ্ছেদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের প্রাথমিক পর্যায়ের প্রধান তাত্ত্বিক কবি এমে সেজায়ার (১৯১৩-২০০৮), জন্ম মার্তিনিকে, যার অবস্থান ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জে। দ্বীপটি ১৬৩৫ সালে ফরাসি ঔপনিবেশিক দখলে আসার পর ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের শাসনাধীন বিভাগে পরিণত হয়। অথচ ফ্রান্সের সঙ্গে মার্তিনিকের দূরত্ব প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার; যেখানে উৎপাদনের স্বার্থে সেনেগাল, অ্যাঙ্গোলা, গিনি প্রভৃতি আফ্রিকান দেশ থেকে দাসদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হার্লেম রেনেসাঁর উত্তরসূরি ও নেগ্রিচুড আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা সেজায়ার ১৯৫০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ডিসকোর্স অন কলোনিয়ালিজম’ বইটিতে বলেন, ‘ঔপনিবেশিকতা সবচেয়ে সভ্য মানুষটিকেও অমানুষে পরিণত করে’৪। বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ কীভাবে ‘অপর’ বিশ^ এশিয়া ও আফ্রিকায় সা¤্রাজ্য বিস্তার করেছে; বর্ণবাদী দাম্ভিকতা কীভাবে চার্চ এবং বুদ্ধিজীবীদের মদদে সবকিছুকে মানবিক ও আধুনিক মূল্যবোধে রূপান্তরিত করে একচেটিয়া পৃথিবীর শাসক হয়ে উঠেছে।

সেজায়ারের এমনতর বাস্তবতা নির্ভর সমাজবিশ্লেষণ থেকে পোস্টমডার্নিজমের চেহারাটি ক্রমশ খুঁজে নেয়া সম্ভব। এরই সূত্র ধরে বলা যায়, পোস্টমডার্নিজম মূলত আধিপত্য বিস্তারকারী বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর জাগতিক-মানবীয়-দৈত্য থেকে ক্রমশ ভার্চুয়াল বিশে^ অতিমানব হয়ে ওঠার এক ধরনের অতিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থা; যা মুক্তবাজার অর্থনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; যার বাইরে আমরা কেউ নেই; কারও থাকা সম্ভবও নয়। যে অবস্থাকে সেজায়ার বলেছেন, আমেরিকান আধিপত্যবাদ; এমন এক আধিপত্য যা থেকে অক্ষত অবস্থায় দূরে থাকা কারো পক্ষেই, অর্থাৎ কোন জাতি রাষ্ট্র বা সংস্কৃতির পক্ষে সম্ভব নয়। প্রসঙ্গক্রমে পোস্টমডার্নিজমের কট্টর সমালোচক নওম চমস্কি বলেছিলেন, ‘নিজের ব্যাপারে একান্ত যতœশীল হও এবং অন্য সবাইকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দাও— এটি ব্যবসায় আইনের মৌলনীতি। […] যুক্তরাষ্ট্র একটি ব্যবসায়-চালিত সমাজ, তার তুল্য অন্য যেকোনো সমাজের চেয়ে বেশি।’৫ পশ্চিমা মডার্নিজম তথা পোস্টমডার্নিজমের চেহারা বুঝতে হলে বর্তমান সভ্যতায় পশ্চিমাদের সাথে অপরাপর বিশে^র এহেন ব্যবসায়িক সম্পর্ক অবশ্যই আমলযোগ্য।

উপনিবেশবাদ, উত্তর-উপনিবেশবাদ প্রসঙ্গ দুটো পোস্টমডার্নিজম প্রসঙ্গে অনিবার্যভাবেই একাধিকবার চলে আসে। কীভাবে মেধা ও জ্ঞানকে আয়ত্বে রাখতে হয়, তা প্রথম বিশ^ পোস্টমডার্নিজম প্রকল্প মারফত নিশ্চিত করে দেয়। উদাহরণ হিসেবে নাইজেরিয়ার ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবের কথা বলা যেতে পারে। চিনুয়া তার ঞযব অভৎরপধহ ডৎরঃবৎ ধহফ ঊহমষরংয খধহমঁধমব প্রবন্ধে ইংরেজি ভাষার আধিপত্যের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিও আনুগত্য দেখাতে কার্পণ্য করেননি। চিনুয়া আচেবে তাঁর প্রবন্ধে বলেছেন :

বৃটিশ শক্তি এখানে অনেক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করেছে যেগুলো এর আগে নিজ নিজ বিভক্ত পথে চলত। বৃটিশ উপনিবেশ তাদের সকলের জন্য ব্যবহারের একটি যৌথ ভাষাও দিয়েছে যা দিয়ে এক গোষ্ঠীর সাথে আরেক গোষ্ঠী এখন ভাষাগত অভিন্নতায় কথা বলতে পারে। উপনিবেশ তাদের যৌথ অনুভবের একটি গান দিতে না পারলেও কমপক্ষে তাদের দীর্ঘশ^াসগুলো প্রকাশের জন্য একটি জিভ দিয়েছে। […] সুতরাং আফ্রিকার যে লেখকরা কলোনাইজারের ভাষা ইংরেজি বা ফরাসিতে লিখছেন তাঁরা দেশপ্রেমিক নন কিংবা তাঁরা বিদেশের মাটিতে সৌভাগ্যের দাও মারার ধান্দায় রয়েছেন এমনটা ভাবা ঠিক নয়। যে পদ্ধতিতে আফ্রিকার নতুন জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে তাঁরা সে পদ্ধতির একটি উপজাত মাত্র।৬

নর্থ ক্যারোলিনা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আফ্রিকান সাহিত্যের অধ্যাপক ওদে এস. ওগিদি তাঁর ‘দ্যা কনটেক্সটস অব আচেবেস রাইটিঙস’ প্রবন্ধে চিনুয়া আচেবের ভেতরে ঔপনিবেশিকতার প্রতি আনুগত্যের কারণ অনুসন্ধান করেছেন। এই কারণসমূহ আমাদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক; যা কীনা উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণে সহায়ক। ওদে ওগিদি চিনুয়া আচেবের ‘নেমড ফর ভিক্টোরিয়া’ এবং ‘কুইন অব ইংল্যান্ড’ প্রবন্ধ দুটোর প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন :

ঔপনিবেশিক শাসনের বড় বড় কৌশলগুলোও বুঝতে আচেবে ব্যর্থ ছিলেন এবং এ ব্যর্থতা ছিল চমকে দেয়ার মতো। আরো পরোক্ষে এই ব্যর্থতা ইঙ্গিত করে যে, কলোনাইজারদের অর্থাৎ সা¤্রাজ্যবাদীদের হাতে ছিল তাদের মূল্যবোধগুলো তৈরি করার ও মানুষের মগজে গেঁথে দিতে পারার গোপন সব পথপ্রক্রিয়া। […] মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই চর্চা ছিল একটি মোক্ষম অস্ত্র যা দ্বারা তারা তাদের অধীনস্থদের তাদের মানবতার প্রাথমিক শর্ত বা অবস্থাগুলো থেকেও বঞ্চিত করতে পারত। এই অস্ত্র তথা এই বিষ পশ্চিমা আকর্ষণের মধ্যে মোড়কবদ্ধ ছিল এবং আছে। আচেবে সেই আকর্ষণে আবিষ্ট থাকার কারণেই সাংস্কৃতিক সা¤্রাজ্যবাদ যে জটিল পন্থায় কাজ করেছে সে-পন্থাগুলো আচেবে সন্দেহও করতে পারেননি এবং উন্মোচিতও করতে পারেননি। অনুভবই করতে পারেননি যে, তার মনোরাজ্য ক্রমশ শাসিতদের নিয়ন্ত্রণের মাঝে আটকে পড়েছে।৭

পোস্টমডার্নিজম খুব সূক্ষভাবে একটি কাজ করে চলেছে, তা হল আধুনিকতার সুবিধাসমূহ যা বুর্জোয়াদের পক্ষে কার্যকর, এর বিপরীতে তৃতীয় বিশে^র বা ‘আদার্স’ চিন্তকদের প্রতিক্রিয়াসমূহকে বৈধতা দান করা; যেন বা দেখুন আমরা কতটা সহিষ্ণু ও সভ্য; সৎ ও মানবিক। এভাবে চলতে থাকে অতিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ার চর্চা; যা সচল রাখতে পোস্টমডার্নিজমের খাঁচায় আশ্রিত বুদ্ধিজীবীগণ সক্রিয়; যেটা ঘটেছে চিনুয়া আচেবের ক্ষেত্রেও। এমে সেজায়ার এহেন অবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, পক্ষান্তরে পশ্চিমারা প্রতিনিয়ত অত্যন্ত সুচতুরভাবে বৈশি^ক মানবিক সমস্যাগুলোর ভ্রান্ত উপস্থাপনা করে চলেছে; অর্থাৎ সমস্যাগুলোর ঘৃণ্য সমাধানকে তারা বৈধতা দান করছে। এগুলো মূলত ছদ্মবেশী মানবতাবাদ। পোস্টমডার্নিজম আধুনিক মানবতাবাদকে ছদ্মবেশী মানবতাবাদে রূপান্তর প্রক্রিয়ায় কার্যকর ও গতিশীল করতে সক্রিয়। সেজায়ার বলছেন, ‘ছদ্মবেশী মানবতাবাদের বিরুদ্ধে আমার প্রধান অভিযোগ এই যে, অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এটি মানুষের অধিকারকে খর্ব করে আসছে। তাদের মানবাধিকারের ধারণাটি আগেও খুব সংকীর্ণ ও ভঙ্গুর, অসম্পূর্ণ এবং পক্ষপাতদুষ্ট ছিল, এখনো তা একই রয়ে গেছে। এর সমস্ত আদর্শ ও কর্মকা- ঘৃণ্য। এর সমস্ত আদর্শ ও কর্মকা- উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বর্ণবাদপ্রসূত।’৮

সেজায়ারের এ মন্তব্যের সূত্র ধরে বলা সম্ভব, মডার্নিজমের প্রাক-প্রচেষ্টা ছিল, বৈশি^ক সমস্যাগুলোকে অর্থহীন ধারণায় রূপান্তর করে বিকৃত সত্যকে বিশ^াসযোগ্য করে তোলা; পক্ষান্তরে পোস্টমডার্নিজমের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গতিশীলতার একটি চিহ্নিতকরণ চেহারা হল, মানবসমাজের সবচেয়ে গুরুত্ববহ সমস্যাগুলোকে আয়েশি ধারণায় উন্নীত করার অবিরাম বুর্জোয়া প্রচেষ্টা জারি রাখা।

অরিয়েন্টালিজম বইতে এডওয়ার্ড সাইদের অবস্থান স্ট্রাকচারালিজম ও পোস্টস্ট্রাকচারালিজমের বিপক্ষে। যদিও প্রথম বিশে^র দাদাগিরিকে সাইদ সমর্থন করেন না তথাপি শেষ পর্যন্ত ওরিয়েন্টালিজম পরিণত হয় সা¤্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানে। পোস্টমডানির্জমের চেহারা বোঝার জন্য ওরিয়েন্টালিজমের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ আবশ্যক। ওরিয়েন্টালিজমের আলোচনায় ভারতবর্ষ একটি জনপ্রিয় ডিসকোর্স। সেখানে ভারতবর্ষকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাতে মনে হয়েছে বিগত দু তিন শ বছরের ভেতর ভারতবর্ষে কোন পরিবর্তন আসেনি; ভারতবর্ষ যেন একটা রূপকথার দেশ; নির্বোধ, গর্দভ এবং অসভ্য।

অরিয়েন্টালিস্টদের দৃষ্টিতে ‘অরিয়েন্ট’ হলো নিঃশব্দ ও নির্বাক, অক্রিয় ও অপরিবর্তিত, ক্ষমতাশূন্য ও প্রতিবাদহীন। এই বিশ্লেষণ থেকে পশ্চিমী বিশেষজ্ঞদের মনোভঙ্গিটা বেরিয়ে আসে; তা হলো : পশ্চিমই প্রতিভূ ও সক্রিয় ও বলীয়ান; আর প্রাচ্য নিষ্ক্রিয় ও অচেতন ও দুর্বল; পশ্চিমের সংস্কৃতি আছে এবং সে সংস্কৃতি উৎকর্ষে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, প্রভাববিস্তারে তুলনাহীন; প্রাচ্য যেহেতু স্থবির, জড়বৎ ও আলোড়নহীন কাজেই তার সংস্কৃতি যদি থাকেও তবু তা তুচ্ছ ও আলোচনার অযোগ্য। যেহেতু পশ্চিম উন্নত, যেহেতু পশ্চিম সক্রিয়, যেহেতু পশ্চিমের সাংস্কৃতিক ঐশ^র্য আছে, কাজেই সেই ঐশ^র্যের জোরে পশ্চিম অধিকার রাখে প্রাচ্যকে শাসন করার, কর্তৃত্বপ্রয়োগ ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার। এভাবে অরিয়েন্টালিজমের ডিসকোর্সে ঔপনিবেশিক শাসনের বৈধতা তৈরি হয়েছে। প্রথমদিকে ‘অরিয়েন্টালিজম’ ছিলো বিশেষজ্ঞদের একটা ডিসকোর্স, ধীরে ধীরে তা পরিণত হয় সা¤্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানে।৯

ক্ষমতাশীলদের এচিভমেন্টগুলোর প্রচার-প্রক্রিয়াই বস্তুত ইতিহাসের বয়ান বা টেক্সট। তা সত্ত্বেও আমরা সময়ের অভিজ্ঞানে ‘ধারাবাহিকতা’কেই ইতিহাসের ক্যানভাস বলে স্বীকার করে আসছি। যেখানে জড়াজড়ি করে থাকে বৈচিত্র্যমুখী মুহূর্তের সমষ্টি এবং মিথ; যা বস্তুত ‘ঐতিহ্য’ নামক অভিধায় নিরবিচ্ছিন্ন আবর্তন। অথচ এই নিরবিচ্ছিন্নতাও অস্থিরতায় ঠাসা; যে ‘ঐতিহ্য’ সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং ঔপনিবেশিকতার মধ্য দিয়ে বদলে যেতে বাধ্য। এভাবে বার বার বদলে যাওয়া ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তৃতীয় বিশে^র দেশগুলোর পক্ষে মিথ ও সংস্কৃতির ধরন-ধারণ সংরক্ষণ যখন অসম্ভব হয়ে ওঠে তখন তা আধুনিকতার চেহারা নিয়ে প্রকাশমান।

এ অর্থে আধুনিকতা হল ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে ক্রমশ প্রথম বিশে^র দেশগুলোর ধরন-ধারণ, চিন্তা-ভাষা ও সংস্কৃতি অনুসরণ করার এক অবচেতন তাড়না যা শেষাবধি জাতিগত চেহারায় ভিজ্যুয়াল হয়ে ওঠে; যার ফলশ্রুতিতে আমাদের ভাষা-চিন্তা-সংস্কৃতি ক্রমশ ভার্চুয়াল সভ্যতার / সেটেলাইট সভ্যতার অনুগামী। এরই ধারাক্রমে উদাহরণ টানা সম্ভব। আমি সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে সময় কাটাচ্ছিলাম নির্ধারিত ডোমেস্টিক ফ্লাইটের জন্য। এ অবস্থায় লন্ডনগামী একটি পরিবারের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। ভদ্রলোক লন্ডনে রেস্তোরাঁর ব্যবসা করেন। তার দুই পুত্র, দুই কন্যা। তারা পোশাকে, চেহারায়, আচরণে, বিশেষ করে ভাষায় না ব্রিটিশ না বাঙালি না সিলেটি।

এই যে প্রথম বিশ^গুলো ভিন্ন বিশে^র মানুষ ও সংস্কৃতিকে আত্মকৃত করে চলেছে, এর ফলে সভ্যতায় তৈরি হচ্ছে এক ধরনের মিশ্রসংস্কৃতি। সারা বিশে^ এই মিশ্রসংস্কৃতির তোড়জোর পশ্চিমা আধুনিকতার গোড়া থেকে শুরু হলেও বিশেষ করে বর্তমান শতকে এসে তা ভিজ্যুয়াল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। অভিভাসিরা এখন সংশ্লিষ্ট স্টেটগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকা-ের সাথে যুক্ত হতে শুরু করেছে। তো এভাবেই হাই মর্ডানিজম ‘অপর’ বা ‘হীন’ সংস্কৃতিকে আত্মকৃত করার, পক্ষান্তরে ‘অপর’দের সংস্কৃতিকে বিলুপ্তকরণের পথ বাতলে দিচ্ছে; আর ‘পোস্টমডার্নিজম’ তাকে গ্লোবালাইজেশনের তকমা লাগিয়ে ব্রান্ডিং করে দিচ্ছে। তো এ অবস্থায় এভাবেই চলমান বৈশি^ক প্রেক্ষিতে পোস্টমডার্নিজম নিয়ে পুনর্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে; হতে থাকবে।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও যুক্তিবাদ আধুনিক যুগের একটি বিশিষ্ট লক্ষণ বলে স্বীকার করা হলেও আমাদের ভাবতে হয়, যখনই এ চিন্তনের আড়ালে বিকৃত সত্যের উদ্ভাসন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই ধর্মনিরপেক্ষতা এবং যুক্তিবাদের প্রয়োগ ব্যহত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে স্বাভাবিকভাবেই আধুনিক যুগের আপাত নিরীহ চেহারাটি অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয়েছে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাবহারকে আধুনিকতার মাপকাঠি হিসেবে আমলে নেওয়া হলে দেখা যাবে, অর্থনৈতিক প্রবৃত্তির সমবণ্টনের প্রশ্নে প্রযুক্তি বিকাশের শুভাশুভ সম্পর্ক নির্ণয়ের অবকাশ আধুনিক সভ্যতায় আমলে আসেনি। অথচ পশ্চিমা চিন্তাবিদগণ মনে করেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলো যে প্রক্রিয়ায় উন্নত দেশগুলোর ধরন অর্জন করে আসছে সেই প্রক্রিয়াতে সংযুক্ত থাকতে পারাই ‘আধুনিকতা’।

মজার বিষয়টি হল, এই প্রক্রিয়াতে সংযুক্ত থেকেও আমরা বুঝতে পারি, এ প্রকারের আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার ভেতরে কার্যকর থাকে এক ধরনের রোমান্টিক তাড়না যা আমাদের পশ্চিমামুখী হতে বাধ্য করে। জীবনানন্দের ভাষাপ্রকল্পের মত এ তাড়নাও এক ধরনের সামাজিক সম্ভাবনার সূচনা করে। যা বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে গত শতকের ‘হাই মডার্নিজম’কে অগ্রবর্তী করেছিল বলে ধরে নেওয়া হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে কী এমন নতুন চৈতন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছিল যার জন্য ‘হাই মর্ডানিজম’-এর প্যারালাল ভাবনায় পোস্টমডার্নিজম ডিসকোর্সটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে?

কালপর্ব এবং যুগদর্শনের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় রেঁনেসাস থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত সময়কে মর্ডান-এজ বিবেচনায় রেখে তাঁরা পরবর্তী সময়কে পোস্টমর্ডান-এজ-এর আওতাভুক্ত করতে চায়। কেননা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই তাঁদের দর্শনে, সমাজে, রাষ্ট্রে, সংস্কৃতিতে, সহিত্যে বিশেষ করে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন সূচিত হতে শুরু করেছে, যা কিনা বৃহত্তর অর্থে পশ্চিমাদের সার্বিক জীবন প্রণালীকে পালটে দিয়েছে।

ইহাব হাসান ১৯৮২ সালে তার ‘দ্য ডিজমেমবারমেন্ট অব অর্ফিয়ুস : টোয়ার্ড এ পোস্টমডার্ন লিটারেচর’-এ মডার্নিজম এবং পোস্টমডার্নিজমের তুলনামূলক চেহারা চিহ্নিতকরণের চেষ্টা করেছেন। হাসান বলতে চেয়েছেন, মডার্নিজম মূলত রোমান্টিসিজম ও প্রতীকবাদের অনুসারী; যা ফর্মবদ্ধ, উদ্দেশ্যবাহিত, স্তরবিন্যাসে আবর্তিত তথা যুক্তিবাহিত, লক্ষাভিমুখী শিল্প যার সমাপ্তি অনিবার্য; দূরত্ব সংরক্ষণকারী ও টোটালিটিতে বিশ^াসী ফলে সমন্বয়কের ভূমিকায় অগ্রবর্তী; প্রকরণ ও সীমা সচেতন; উপস্থিতি ও নির্বাচনমুখী; টেক্সট ও ব্যাখ্যা অনুসারী; দ্যোতিত এবং ঈশ^র-আক্রান্ত তথা অধিবিদ্যা ও আয়রনি অনুসারী হলেও সিদ্ধান্তপ্রবণ।

পক্ষান্তরে পোস্টমডার্নিজম রোমান্টিসিজম ও প্রতীকের পরিবর্তে ম্যাটাফিজিক্স তথা দাদাবাদের আশ্রয়ী; ফর্মকে অস্বীকার করে অ্যান্টিফর্মমুখী; উদ্দেশ্যবাহিত শিল্পের পরিবর্তে ক্রীড়াবৈচিত্র্যে গতিশীল; স্বরবিন্যাসের জায়গায় বেছে নিয়েছে নৈরাজ্য বা বিশৃঙ্খল অবস্থা; আর যুক্তির পরিবর্তে নৈঃশব্দ। পোস্টমডার্নিজম মনে করে সৃজনশীলতা তথা সমাজ সমাপ্তিবিহীন; এটা বরং ঘটমানতা বা পারফরমেন্স আশ্রিত; দূরত্ব নয় বরং অংশগ্রহণ; শিল্পের বা সমাজের টোটালিটি বা সমগ্রায়ন সম্ভব নয় বরং যা ঘটে তা হল বি-সৃজন বা বিনির্মাণ; সমন্বয়ের প্রয়োজন অর্থহীন, উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয়; প্রকরণ প্রধান শর্ত নয় বরং প্রধান শর্ত হতে পারে অন্তর্বস্তু ও অন্তর্বয়ান; নির্বাচন বা যথেচ্ছ নির্বাচন নয় বরং তা হতে পারে একত্রায়ন; পাঠনির্ভরতা অপেক্ষা অ-ব্যাখ্যা বা ভুল পাঠই শ্রেয়; যেখানে থাকে শিল্পের সম্ভাবনা।

এক্ষেত্রে হাইডেগারের যোগ্য উত্তরসূরী, যিনি নিৎশেকে আমলে রেখেছেন যৌক্তিক পরম্পরায় তিনি জাক দেরিদা; দেরিদা মনে করেন, শিল্পের কাজ ডিফারেন্স মানা এবং ডিফারেন্স ভাঙা। সময় ও মানুষের বৈচিত্র্যে যে কোন বয়ানের ‘কনটেক্সট’ পালটে যেতে বাধ্য। কারণ টেক্সট ব্যক্তির বয়ান বটে, অথচ তার পাঠক অসংখ্য। পাঠের পদ্ধতি, পাঠের মনস্তত্ত্ব আর পাঠ-ব্যাখ্যার সংস্কারও বহুমাত্রিক। এ কারণেই দেরিদার অনুসরণে বলা হয়ে থাকে টেক্সট মূলত ‘সিস্টেম অব ডিফারেন্স’; যেখানে বয়ানের মর্মপাঠে থাকে অজস্র রূপ ও রূপান্তর; ক্রিয়া ও ক্রীড়া। এ প্রসঙ্গে দেরিদার বিনির্মাণবাদের সারকথা উদ্ধৃতিযোগ্য, ‘বিনির্মাণবাদ যুক্তির বাইরে অবস্থান নেওয়া ব্যাখ্যা-মন্তব্যের এক নিরন্তর, শৃঙ্খলাহীন এমনকি বুনো স্বাধীনতার নাম। বিনির্মাণবাদ মৌলিকভাবে ইতিবাচক। এটি স্মৃতির পুনরাধিষ্ঠানকে হ্যাঁ বলে। বিনির্মাণবাদী সমালোচনা কোনো গ্রন্থের পূর্ণতা পাওয়ার পথ দেখায় না, বরং আবশ্যকীয় অপূর্ণতাকেই দেখায়। বিনির্মাণবাদ বলে যে, কোনো টেক্সট কোনো কিছুর প্রতি পর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না, এবং দেখানো উচিতও নয়। অপূর্ণতা, অপর্যাপ্ততা, অনপরিহার্যতা এসব বিনির্মাণবাদের সূত্র।’১০

এক্ষণে বিনির্মাণবাদের সূত্র ধরে বলা সম্ভব, টেক্সট মূলত দ্যোতকরাশির অনন্ত সম্ভাবনার এক্সক্লুসিভ মঞ্চ; যেখানে উপস্থিত থাকে রিসিভার ও মাউথপিস; সেই মাউথপিসের আড়ালে রয়েছে চেতনা-উন্মোচক বা মর্মোন্মোচক অনুশীলন; যা বহুস্বরপূর্ণ বিপদজ্জনক প্রতিসংকেত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে টেক্সট প্রথাগত ভাষিক ব্যাকরণ ও বাগার্থকে অ¯বীকার করে নতুন ভাষিকসংকেত, প্রতিসংকেত, অধিসংকেতের বয়ানভূমি হাজির করতে বাধ্য থাকে। যেখানে বিরাজ করে এক শব্দ থেকে আরেক শব্দের ভেতর গ্রহান্তরের ফারাক। এই ফারাক থেকেই পোস্টমডার্ন-আশ্রিত টেক্সট আমাদের প্ররোচিত করে।

আমরা জানি মডার্নিজম দ্যোতিতকে বেশি গুরুত্ব দেয় অথচ পোস্টমডার্ন দ্যোতকআশ্রিত পাঠে বিশ^াসী; যে পাঠ অসম্ভব সম্ভাবনাকে মুক্ত করে দিতে উন্মুখ; যা বাসনানির্ভরও বটে; যা শেষাবধি এক ধরনের সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তও বটে; যা ঈশ^রের পরিবর্তে পবিত্র ভূতের উপাসক; যার কোন মীমাংসা কখনোই সম্ভব নয়।

পোস্টমডার্নিজম বাচনের ক্ষেত্রে মনে করে বাচন দুশ্রেণির। প্রথমটি দলিত বাচন দ্বিতীয়টি কর্তৃত্বকারী বাচন। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, নারী এবং পুরুষ। এক্ষেত্রে নারী দলিত বাচন আর পুরুষ কর্তৃত্বকারী বাচন। এখানে দলিত বাচন অগ্রসরমান ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, ফলে কর্তৃত্বকারী বাচন ছাড় দিতে বাধ্য হয় আর এই উভয় অবস্থার মধ্যে বিনির্মাণ সংঘটিত হয়। ফলাফলে গণতন্ত্রের জমি তৈরি হতে থাকে।

আরেকটি উদাহরণ আবশ্যক। ধরা যাক শ্রমিক এবং মালিকের সম্পর্ক। এক্ষেত্রে শ্রমিক দলিত বাচন আর মালিক কর্তৃত্বকারী বাচন। এখানেও শ্রমিক অগ্রসরমান আর মালিক ছাড় দিতে বাধ্য হয় ফলে বিনির্মাণের দ্বারা পাওয়া যায় গণতন্ত্রের জমি। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে উভয় উদাহরণের জন্যই প্রতিটি সম্পর্ক পৃথক। এহেন দলিত বাচন আর কর্তৃত্বকারী বাচনের আবর্তনে বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে বিপ্লব হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না। কিংবা উভয় উদাহরণে ভাববিনিময় সম্ভব নয়। কেননা পোস্টমডার্নিজম কোনো নির্ধারণবাদে অর্থাৎ উবঃবৎসরহরংস এ বিশ্বাস করে না। সুতরাং সভ্যতার বর্তমান পর্যায়ে বিপ্লব অথবা রাস্ট্র ক্ষমতায় তাদের কোনো আস্থা নেই।

প্রথম উদাহরণের পুরুষ বাচনটি স্ত্রী বাচনের বিপরীতে কর্তৃত্বকারী বাচন হওয়া সত্ত্বেও ঐ পুরুষ বাচনটি যদি দ্বিতীয় উদাহরণের শ্রমিক বাচন হয়ে থাকে তবে সে হয়ে যাবে দলিত বাচন। এভাবে সমাজে প্রতিটি বাচনই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন বাচনে রূপ নিয়ে থাকে। এভাবেই সমাজে দলিত বাচন কোন কোন ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে কর্তৃত্বকারী বাচন আবার কর্তৃত্বকারী বাচন কখনও বা দলিত বাচন। ফলে সমাজে প্রত্যেক স্তরেই তৈরি হতে থাকে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি; ফলে কারো পক্ষেই জোট বাঁধা সম্ভব নয় এবং সম্ভব নয় বিপ্লব, শ্রেণিসংগ্রাম অথবা বৃহৎ কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসা। প্রণিধানযোগ্য, পোস্টমডার্নিজম বিপ্লবে বা শ্রেণিসংগ্রামে বিশ্বাস রাখে না।

দলিত বাচন এবং কর্তৃত্বকারী বাচনের সম্পর্ক স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে শহীদুল জহিরের ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’ গল্পটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হওয়ার যোগ্যতা রাখে। প্রথম অংশের মতো গল্পটির শেষ অংশেও ছক কেটে উল্লিখিত বাচন দুটোর সম্পর্ক চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। গল্পের শেষ অংশে পাওয়া যাচেছ, ‘এই খেলার শেষ নাই, খেলোয়াড়ের শেষ আছে; খেলোয়াড় খেলা ছেড়ে যায়, কিন্তু খেইল জারি থাকে। উল্লেখ্য যে, বালকদের খেলা ছাড়া অন্যান্য খেলার ক্ষেত্রে, বিভিন্ন কারণে, যেমন : বুইড়া হয়ে গেলে বা মরে গেলে অথবা খেলতে খেলতে ক্লান্ত বা বিরক্ত হয়ে গেলে কিংবা জীবনে হঠাৎ দরবেশি ভাব দেখা দিলে, কেবল বিলাইরা ইচ্ছা করে খেলা ছেড়ে যেতে পারে, ইন্দুররা পারে না; বিলাই খেলতে চাইলে ইন্দুরকে খেলতে হবে।’১১

বৈশি^ক সভ্যতার প্রেক্ষিতে বলা যায় মধ্যযুগকে নিয়ন্ত্রণ করেছে ‘মৃত্যু’। আর আধুনিক যুগের মানুষের স্বভাব হল নিজেকে অতিক্রম করা। ফলে মৃত্যু অনিবার্য জেনেও তারা মৃত্যুর কারণ উন্মোচন করে মৃত্যুকে বিজ্ঞানের বাটখাড়ায় মেপে নিয়ে ঈশ^রের জায়গায় নিজেকে প্রতিস্থাপন করেছে। আমার তো মনে হয় পোস্টমডার্নিজমের যুক্তিহীন শৃঙ্খলাভঙ্গপ্রক্রিয়া শেষাবধি মানবপ্রজন্মকে স্বর্গ-নরক মৃত্যু এইসব ফোবিয়া থেকে মুক্ত করে অতিমানবের পর্যায়ে টেনে তুলতে শুরু করবে। যদিও আধুনিক যুগের যন্ত্রসভ্যতার মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটির শুরু হয়েছে অনেক আগেই; যে প্রক্রিয়াতে দেখা গেছে মানুষের জায়গা দখল করে নিচ্ছে যন্ত্র; আর পোস্টমডার্নে এসে মানুষ নিজেই ক্রমশ যন্ত্রে রূপান্তরিত হতে হতে তৈরি করে নিচ্ছে কর্পোরেট লাইফ; মানুষের পাশাপাশি ‘সোনিয়া’ নামের রোবটটিকে দেয়া হয়েছে নাগরিকত্ব। গ্লোবাল পলিটিক্সের আওতায় সোনিয়াকে নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি পোস্টমডার্নিজম ডিসকোর্সটিকে আরও একটি ধাপে বিতর্কিত করে বটে।

হেগেলের বক্তব্য অনুসরণ করে মধ্যযুগের সংকট থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের সমাজ-মানস-চেতনা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। হেগেল মনে করতেন, যদিও মানবসমাজ বস্তুর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম; তথাপি মানুষ এও জানে শরীরের ক্ষয় অনিবার্য অথচ সময় অনন্ত। এ অবস্থায় যুক্তিবোধ মানুষকে কীভাবে সুখী করবে? অর্থাৎ চৈতন্য মূলত অসুখী এবং অসুখী চৈতন্য শেষাবধি বুঝতে পারে, যুক্তি অকার্যকর।

এ ধরনের সংকট দস্তয়েভস্কি, আঁদ্রে জিদ অথবা নিৎশে সহ অনেকের ভেতরই দেখা গিয়েছে। যুক্তিবাদিতার ওপর ক্রিয়াশীল থেকেছে এক ধরনের নৈরাশ্য; যা আধুনিক যুগের সংকট; যে সংকট বস্তুত মধ্যযুগের ধারাক্রম। অথচ যুক্তি থেমে থাকেনি। যুক্তির পাশাপাশি আকাক্সক্ষা অর্থাৎ স্বপ্নও দমিত হয়নি। আমি তো সেই স্কুলে থাকা অবস্থাতেই যুক্তিহীনভাবেই বিশ^াস করতাম মানবসমাজ এক সময় মৃত্যুকে অতিক্রম করবে। এই যে যুক্তিহীন স্পর্ধা ও আকাক্সক্ষা ও বিশ^াস, এই বিশ^াস ও স্বপ্ন কিন্তু আধুনিক যুগের যুক্তিবাদিতা থেকেই উৎসারিত। কেননা আধুনিকতার যুক্তিবাদী চৈতন্যই মানুষকে স্পর্ধিত করে তুলেছে; সীমা লঙ্ঘন করতে শিখিয়েছে।

একই ভাবে আমরা সভ্যতার যাবতীয় ক্ল্যাসিকের ভেতর দিয়ে সীমা লঙ্ঘিত হওয়া স্পর্ধা প্রকাশ পেতে দেখেছি। দেবতারা পরাজিত হয়েছে মানুষের কাছে; প্রমিথিউস নয় পক্ষান্তরে মানুষই দেবতা হয়ে উঠেছে। আধুনিক যুগ যুক্তি পরম্পরায় মানুষকে স্পর্ধিত করে তুলেছে; আর পোস্টমডার্নিজম সেই স্পর্ধাকে প্রয়োগ করতে মানুষের আকাক্সক্ষাকে তাড়িত করেছে। অর্থাৎ মডার্নিজম যুক্তিনির্ভর হলেও পোস্টমডার্নিজম সেই যুক্তির সাথে যোগ করে নিয়েছে স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা ও স্পর্ধা; সীমা লঙ্ঘন করার স্পর্ধা। পক্ষান্তরে প্রথম বিশে^র নাগরিকগণ ক্রমশ দেবতা হয়ে উঠেছে। এভাবেই মডার্নিজম-এর অবক্ষয়ে পোস্টমডার্নিজমের মধ্য দিয়ে দেবতার জায়গায় আমরা দেখতে পাচ্ছি মানুষকে; যে মানুষগুলো প্রকৃত বাস্তবতায় দেবতা না হলেও অতিমানব তো বটেই; তা না হলে ক্রিতদাস প্রথার যুগ পিছে ফেলে এসে আমরা এখনও দাসত্ব করছি কেন? চিন্তার দাসত্ব, অর্থনীতির দাসত্ব, সংস্কৃতির দাসত্ব এমনকি অহমের দাসত্ব। প্রকৃতির সিস্টেমটাই কি যোগ্যতমের দাসত্ব? এই হল বুর্জোয়া সভ্যতার চেহারা; যার সাথে সব ক্ষেত্রেই রয়েছে দলিত বাচন আর কর্তৃত্বকারী বাচনের পারস্পরিক সম্পর্ক; যে বাচন দুটো পোস্টমডার্নিজম দ্বারা চিহ্নিত।

আধুনিক যুগের লক্ষণ, ‘প্রচারেই প্রসার’। আর পোস্টমডার্নিটি হল ‘ভোগেই প্রসার’। মডার্নিজম বর্তমান ও ভবিষ্যতের ওপর বিশ^াসী; অতীতের অথরিটি সে স্বীকার করতে ইচ্ছুক নয়। পোস্টমডার্নিজম অতীতকে জাগিয়ে তুলতে ইচ্ছুক। এই জাগিয়ে তোলার পেছনে ক্রিয়াশীল থাকে প্রশ্ন করার প্রবণতা; হতে পারে তা যে কোন রকমের প্রাকধারণা বিষয়ে প্রশ্ন, হতে পারে মডার্নিটি, পোস্টমডার্নিটি অথবা আভাগার্দ বিষয়ে। কিন্তু পোস্টমডার্নিজম কোনো প্রশ্নের উত্তর প্রদান যৌক্তিক বিবেচনা করে না। বরং প্রকৃত সত্যের উন্মোচনে তারা একটি প্রশ্নের উত্তরে আরও প্রশ্নের জন্ম দেওয়াই বিধেয় মনে করে। কেননা তারা মনে করে জ্ঞানের রাজ্যে কোন উত্তরই নিজ অবস্থানে স্থিও বা ধ্রুব নয়।

স্থাপত্যকলা, নাট্যকলা, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, সংগীত অথবা নৃত্যকলায় পোস্টমডার্নিটি যে অর্থে চিহ্নিত করা সম্ভব; যতটা সম্ভব হয়েছে সমাজবিন্যাসের রূপ সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে পোস্টমডার্নিটি চিহ্নিত করা, সে অর্থে সাহিত্যে তা সম্ভব নয়। কেননা পোস্টমডার্নিটি শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে কোন বিস্ময়কর বিকাশ ইঙ্গিত করে না; বরং পোস্টমডার্নিটির ভেতর রয়েছে এক ধরনের পেছনমুখিতা; অতীতচারিতায় আছে তার এক ধরনের আসক্তি। পোস্টমডার্নিটি মনে করে, আধুনিকতা তার বিশাল কর্মযজ্ঞ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করেছে। এখন প্রয়োজন ভোগের। ভোগের জন্য প্রয়োজন স্মৃতিআক্রান্ত নস্টালজিক চৈতন্য। গত শতকের সত্তর আশির দশকে মার্কিন সংস্কৃতিতে এই নস্টালজিয়া বেশ প্রকট হয়ে উঠেছিল। এটাকে বলা হয়ে থাকে ‘নব্য রক্ষণবাদী নস্টালজিয়া’; যার পরিণাম উত্তর-পুঁজিবাদী যুগে সৃষ্টিশীলতার পতন। ফলশ্রুতিতে বলা সম্ভব, উগ্রতায়, হঠকারিতায় ও নস্টালজিয়ায় শেষ পর্যন্ত পোস্টমডার্নিজম সাংস্কৃতিক অগ্রগতির পরিচয় বহন করতে অক্ষম।

গত শতকের ষাটের দশকে ফ্রান্সে দেখা দিয়েছিল মডার্নিজমের দিকে প্রত্যাবর্তনের ঝোঁক; যখন পোস্টমডার্নিজমের লক্ষণে দেখা দিয়েছে এক ধরনের অব্যবস্থাপনা বা ধারাচ্যুতি; এই সময়ে আমরা পাই পোস্টমডার্নিজমের গুরু মার্সেল দুকাম্পেকে। এ সময়ে সিভিল রাইট মুভমেন্ট, এন্টি-ওয়ার মুভমেন্ট, কাউন্টার কালচার বিবিধ চেহারা নিয়ে পোস্টমডার্নিজম ক্রমশ দৃশ্যমান হতে থাকে। যদিও তখনও সবকিছুই ছিল আবেগতাড়িত। পিটার বার্জার এ পর্যায়ের পোস্টমডার্নিজম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, এ সময়টাকে বলা সম্ভব ইন্সটিটিউশন আর্টের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠা।

থিওরি অব দ্য আভাগার্দ বইতে পিটার বার্জার দেখিয়েছেন, আভাগার্দ আন্দোলনের সময় অর্থাৎ যখন ইন্সটিটিউশন আর্ট অর্থাৎ ‘বুর্জোয়া-প্রতিষ্ঠান শিল্প’-এর বিপক্ষে জনমত তৈরি হতে শুরু করেছে তখন আমেরিকায় পোস্টমডার্নিজমের ক্ষেত্রেও ঠিক এমন জনমত দেখা গেছে। যদিও আভাগার্দ আধুনিকতারই এক ধরনের সমান্তরাল রূপ, তথাপি এই চেহারাটি আমেরিকাতে ভিন্নভাবে পোস্টমডার্নিজমের সাথে যুক্ত হতে থাকে। আমরা দেখতে পাই, তখন মডার্নিজম আশ্রিত উচ্চমার্গীয় শিল্পকলা সমাজ ও রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদকে বৈধতা দিয়েছে; কালচারাল এসটাবলিশমেন্টকে সমর্থন করেছে। এই এসটাবলিশমেন্টের বিপক্ষে আভাগার্দ ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ। বলা সম্ভব, ষাটের দশকের পোস্টমডার্নিজম এই আভাগার্দ থেকেই পুষ্টি পেয়েছে।

ষাটের দশকের নান্দনিকতাকে বলা হয়ে থাকে ‘টেকনিক্যাল এসথেটিকস’। এই টেকনিক্যাল এসথেটিকসের কারণে পপুলার কালচার ও উচ্চমার্গীয় এই দু ধরনের কালচারই হুমকির সম্মুখিন হয়। এটাও এক ধরনের পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়। এরপর সত্তরের দশকে আমেরিকায় নব্য-বাম মুভমেন্ট, কাউন্টার কালচার তথা যুদ্ধবিরোধী মুভমেন্ট পোস্টমডার্ন তথা আভাগার্দ মুভমেন্টকে ক্রমশ দৃশ্যমান করে তোলে। হাই-কালচারের সাথে মাস-কালচারের মুখোমুখি অবস্থান, ¯œায়ুযুদ্ধ, পুঁজিবাদী বিশে^র সঙ্গে কম্যুনিস্ট বিশে^র বিরোধ; ক্রমশ কম্যুনিস্ট বিশ^গুলোর অসারতা বৈশি^ক প্রেক্ষিতে নতুন ডিসকোর্সের পটভূতি তৈরি করতে থাকে। পাশাপাশি বিশ^সভ্যতায় সূচিত হতে থাকে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন অব ওয়ার’ অর্থাৎ যুদ্ধের শিল্পায়ন। এই যুদ্ধের শিল্পায়নের প্রাক্কালে ম্যাক্স ওয়েবারের মতো অনেকেই বিশ^াস করেছেন আমলাতন্ত্রের বিকাশ ব্যতিত বস্তুগত প্রগতি সম্ভব নয়। অথচ বুরোক্রাসি প্রাকটিসের ক্ষেত্রে সফলতার মন্ত্রটি লুকিয়ে রয়েছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর সৃষ্টিশীলতার গলা টিপে ধরার ভেতর। আধুনিকতার এই রহস্যটিকে পোস্টমডার্নিজম কীভাবে পাশ কাটিয়েছে তা ভাববার বিষয়। অথবা আদৌ তা সম্ভব কিনা এ বিষয়ে ডিসকোর্সের অবকাশ রয়েছে।

এ অবস্থা অতিক্রম না করতেই সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সমাজতত্ত্বে জায়গা করে নিতে থাকে ফেমিনিজম। এ সময় এনলাইটমেন্ট-এর পাশাপাশি মডার্নিজমের সঙ্গে আফ্রিকী ও অরিয়েন্টাল শিল্পকলার সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের রাজনীতি পোস্টমডার্নিজমের ক্ষেত্রে নতুন ক্ষেত্র নির্মাণ করে। এ অবস্থায় হেবারমাস পোস্টমডার্নিজমকে নব্যসংরক্ষণবাদের সমান্তরালে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন পোস্টমডার্নিজমের ভেতরও রয়েছে রক্ষণশীলতা; যার জন্য পোস্টমডার্নিজমকে পেছনে ফিরতে হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে নস্টাজিয়া-আশ্রিত অতীতকেন্দ্রিকতা পোস্টমডার্নিজমকে যুক্তির পরিবর্তে আবেগনির্ভর করে তোলে।

পোস্টমডার্নিজম নিয়ে কথা বলতে হলে জর্মন চিন্তাবিদ হেবারমাস এবং ফরাশি চিন্তাবিদ লিওতারকে আমলে আনা প্রাসঙ্গিক। হেবারমাস অনেকটাই ছিলেন এনলাইটেনমেন্ট মুভমেন্ট দ্বারা আলোকিত আধুনিকতার ব্যাখ্যার সহযোগী। জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা প্রেস থেকে ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত ‘দ্য পোস্টমডার্ন কনডিশন : এ রিপোর্ট অন নলেজ’ এবং ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘দ্য পোস্টমডার্ন এক্সপ্লেইনড’ বইয়ে বলার চেষ্টা করেছেন, পরিণত পুঁজিবাদের গন্তব্য ‘পারফরমিটি প্রিন্সিপল’ অর্থাৎ প্রদর্শনযোগ্যতা; স্পষ্ট করে বললে দাঁড়ায় ‘সম্ভাব্য সর্বোত্তম প্রদর্শনযোগ্যতা’; যা শেষ পর্যন্ত এনলাইটেনমেন্টকে ছাপিয়ে পোস্টমডার্নিজমের ক্ষেত্র নির্মাণ করে। লিওতার বলতে চেয়েছেন, পুঁজিবাদ অনিবার্যভাবেই সবকিছুকে পণ্য করতে ইচ্ছুক অথচ আধুনিক শিল্পকলা পণ্য হতে অনিচ্ছুক; পণ্যের স্বভাব বিনিময়; আধুনিক শিল্পকলা বিনিময়ে বিশ^াসী নয়। কিন্তু পোস্টমডার্নিজমের প্রশ্ন, শিল্প কি শেষ পর্যন্ত পণ্য নয়? শিল্প কতদূর পর্যন্ত নিজেকে পণ্যের আওতামুক্ত রাখতে সক্ষম?

এই প্রশ্নের সূত্র ধরে বলা সম্ভব, মডার্নিজম জীবনকে স্বীকৃতি দিতে চেয়েছিল নান্দনিকতার সুতোয়; অথচ পোস্টমডার্নিজম জীবন উপভোগের ক্ষেত্রে নান্দনিকতাকে মনে করছে বিভ্রম যা কিনা প্রবৃত্তিকে প্রতিহত করে। পোস্টমডার্নিজম দেখিয়ে দিতে চেয়েছে প্রেরণা ও প্রমোদই মোক্ষ; যা কিনা জীবন-উদ্দীপক বাস্তবতা; এর বাইরে সবকিছুই নিউরোসিস ও মৃত্যু; উপভোগের প্রধান শত্রু ‘যুক্তি’; যুক্তিকে ঝেটিয়ে দিলে যে বাসনাসমূহ আমাদের ঘিরে রাখে, শরীরের সেই বাসনার নাম সুখ; এই সুখই পরম সত্য; বস্তুনিষ্ঠ চৈতন্য অকার্যকর, আবেগই কার্যকর। এ প্রসঙ্গে ফ্রয়েডের কথা স্মরণযোগ্য। সিগমুন্ড ফ্রয়েড সভ্যতার বিকাশের সাথে মানুষের লিবিডোবৃত্তির সঙ্গতি খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন একদিকে প্রবৃত্তির দাবি অন্যদিকে সভ্যতার ট্যাবু বা নিষেধ; পোস্টমডার্ন এই নিষেধ বা ট্যাবুমুক্তিতে বিশ^াসী। অতীতকে আমলে এনেই তারা ট্যাবু থেকে মুক্ত হতে চেয়েছে; জেনে বুঝেই আধুনিক যুগের নীতিবোধ ও মূল্যবোধ থেকে নিজেদের বিযুক্ত করতে চেয়েছে। এই হল লিবিডোতাড়িত অতিমানব যা পোস্টমডার্নের প্রডাক্ট।

মিশেল ফুকোর মতে যুক্তির যুগকে অর্থাৎ আধুনিক যুগকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে মানুষের ‘পাগলামি’। ফুকো তার ‘পাগলামি ও সভ্যতা’ বইতে যে কথাটি বলতে চেয়েছেন তা হল, পাগলামি জ্ঞানের একটা রূপকল্পই শুধু নয় বরং পাগলামি হল তা-ই যেখানে অযুক্তির উপর যুক্তির কোন প্রাধান্য থাকবে না; যার রয়েছে এক ধরনের মেটাফিজিক্যাল পাওয়ার। এই পাগলামিরই একটা চেহারা পর্নোপপ কালচার। এভাবে ভাবতে থাকলে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে, পোস্টমডার্ন এমন এক মুড যা কিনা প্রবৃত্তির কাছে যে কোন ধরনের শৃঙ্খলা ও বিবেচনা তছনছ করে দেয়; ছিড়ে ফেলে শিকল ও সীমা। মিস্টিসিজম অর্থাৎ আধুনিক যুগের যে শক্তি, রহস্যবাদ যা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, সেই রহস্যবাদকে সেই আধ্যাতিœক সত্তাকে অস্বীকার করে পোস্টমডার্ন। ফলে পোস্টমডার্নিটি এলোমেলো করে দেয় শরীর এবং মনের জৈব ও আধ্যাতিœক সত্তা, অনুভব ও আধুনিকতা-নির্ভর তাবৎ নৈয়ায়িক ব্যাকরণ।

পশ্চিমাদের দিকে তাকালে বোঝা যায় তাদের প্রাত্যহিক জীবনচর্চা, সংস্কৃতিজগতের সংবেদনশীলতা ও ডিসকোর্সে উল্লিখিত বিষয়গুলো এততাই দৃষ্টিগ্রাহ্য যে পোস্টমডার্নিটিকে এখন আর অস্বীকার করার কোন জো থাকে না। এ অবস্থায় পোস্টমডার্নিজম বিষয়ে মন্তব্য করেছেন সরকার আজিজ তাঁর ‘ঔপনিবেশিকতা, কবিতা ও উত্তর আধুনিকতা’ নিবন্ধে। তিনি বলেছেন, ‘চড়ংঃ গড়ফবৎহরংস বলে যে ধারণা পশ্চিমা সভ্যতায় চালু হয়েছে তা মূলত বিশৃঙ্খল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে তৈরী যা মানুষের রোগ, শোক ও চিকিৎসার নিমিত্তে উদ্ভাবিত এবং তা কেবল সিনেমা নির্মাণেই সহযোগিতা করতে পারে। অথচ উত্তর আধুনিক বচনের প্রকরণ হবে সহজিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে যা ইউরো-আমেরিকার চড়ংঃ গড়ফবৎহরংস এর সম্পূর্ণ বিরোধী ও একই সাথে মৌলিক।’১২

বাংলা ভাষাভাষিদের ডিসকোর্সে যে বিষয়টি ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তা হল ‘পোস্টমডার্নিজম’ এর পরিভাষা ‘উত্তরাধুনিকবাদ’; আর এর থেকে সরে এসে নিজেদের জন্য যে মতবাদের কথা তারা বলতে চাইছেন তা হল, ‘উত্তর আধুনিকবাদ’ অর্থাৎ এখানে পদগুলোকে সমাসবদ্ধ করা হয়নি। সে অর্থে আমি ‘উত্তরাধুনিক’ এবং ‘উত্তর আধুনিক’ প্রিফেক্স দুটো পৃথক তাৎপর্যেই ব্যবহার করেছি। যাই হোক এ কথা ঠিক যে, ভারতীয় ‘উত্তর আধুনিকতা’ কোনোক্রমেই পশ্চিমা পোস্টমডার্নিজমের সাথে সঙ্গতি রক্ষা করে না। অথবা সঙ্গতি রক্ষা করা সভ্যতা বিবর্তনের যৌক্তিকতায় সম্ভবও নয়। বাঙালি সংস্কৃতি আশ্রিত ‘উত্তর আধুনিকতা’ মনে করে, আমাদের ভারতবর্ষের আধুনিক যুগটি ছিল মূলত ঔপনিবেশিক আধুনিকতা। সুতরাং এই আধুনিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের জাতিগত সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা সম্ভব হয়নি বরং লঙ্ঘিত হয়েছে। সুতরাং আমাদের লুপ্ত ধারাবাহিকতাকে পুনরুদ্ধার করতে হলে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার আগ থেকে যাত্রা শুরু করতে হবে। অথচ আমাদের ওপর চেপে বসে আছে দু’শ বৎসরের ঔপনিবেশিক আধুনিকতার পরিম-ল।

এক্ষণে কেন ‘উত্তর আধুনিকতা’, এ বিষয়টিও পরিস্কার হওয়া দরকার। আশির দশকের শেষ দিকে পশ্চিমবঙ্গের অমিতাভ গুপ্ত, অঞ্জন সেন, ধীরেন চক্রবর্তী প্রমুখ এ বিষয়ে বেশ কিছু ধারণা উপস্থাপন করেন। ইনারা প্রস্তাব আকারে ধারণাটিকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মতে ‘উত্তর আধুনিকতা’ কোনো কালবাচক অভিধা নয় বরং এই অভিধা বিগত সময়ের ঔপনিবেশিক অবক্ষয়ের আধুনিকতাকে পাশ কাটাতে চায়। এ বিষয়ে আরও লক্ষ রাখতে হবে, ইংরেজি পোস্টমডার্নিজম আর উত্তর আধুনিকতা অবশ্যই একই অর্থবহ বিষয় নয়। তারা এও মনে করেন, পশ্চিমা আধুনিকতা তিরিশোত্তর কবিদের প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে।

এ পর্যায়ে আমি বলতে চাই, তিরিশোত্তর কবিদের প্রতি অন্যায় আচরণ নয় বরং এই সময়ের কবিগণ ঔপনিবেশিক আধুনিকতার মদদ যুগিয়েছেন। এই ঔপনিবেশিক আধুনিকতা অর্থাৎ অবক্ষয়ের আধুনিকতা মূলত একটি বিকারগ্রস্ত আধুনিকতা। ‘উত্তর আধুনিক’ মতবাদ অনুসারে বুর্জোয়া মানবতাবাদের আবেগপ্রবণতা তথা বিকৃত যৌনতাবাদের বিপরীতে ‘উত্তর আধুনিকতা’র অবস্থান। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে ‘উত্তর আধুনিক’ মতবাদ মনে করে আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের লুপ্ত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে খুঁজে বের করতে হবে।

বাংলা ভাষাভাষি উত্তর আধুনিকগণ মনে করেন বা বলে থাকেন, আর্থ-সামাজিক তথা সভ্যতার বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, তথা শিল্পতত্ত্বের নান্দনিক ব্যাখ্যায় শেষ আশিতে এসে বাংলা কবিতা গ্রহণযোগ্য বাঁক পরিগ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রশ্ন হল এর জন্য কি আমাদের উত্তর আধুনিকদের প্রেসক্রিপশনকে অনুসরণ করতে হয়েছে? অনিবার্যত বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি বাঙালি ঐতিহ্য-বিযুক্ত নয়। এর জন্য উত্তর-আধুনিক ধারণাকে মতবাদ হিসাবে অথবা ধ্রুব বলে মেনে নেবার যৌক্তিকতা কতটুকু? বাঙালি জনজীবনে উত্তর-আধুনিকতা বলতে কি আমরা শুধুই বাংলা কবিতার বিবর্তন ধারাকে বুঝবো? নাকি এটা কোনো সমাজ-পরিবর্তনজনিত দৃষ্টিগ্রাহ্য মুভমেন্ট? অথবা এ কথাটিও ভাববার বিষয়, উত্তর আধুনিক মতবাদ সার্বিক অর্থে বৈশি^ক প্রেক্ষিতে আমাদের সামগ্রিক শিল্প-সংস্কৃতির রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম কিনা।

যাই হোক, ‘পোস্টমডার্ন’ এবং ‘উত্তর আধুনিক’ প্রিফেক্স দুটোকে গুলিয়ে ফেলার অবকাশ নেই। বরং আমি বিষয় দুটো নিয়ে আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশিদের আপ্লুত বোধ করার আপাতত কোন কারণ দেখছি না। যদিও কিছু কিছু প-িত আজও উইলিয়াম কেরী কৃত পাঠশালার প-িতদের মতো ঔপনিবেশিক ধ্যান ধারণা লালন করে পোস্টমডার্নিজমের প্যারালাল হিসাবে অথবা পোস্টমডার্নিজমের বাংলা প্রতিশব্দ উত্তরাধুনিকতাবাদকে বিবেচনায় এনে পক্ষান্তরে উত্তর-ঔপনিবেশিক দাসত্বকে পুষ্টি দিয়ে চলেছেন। এ অবস্থায় পাঠ্যপুস্তকনির্ভর ঔপনিবেশিক শিক্ষা এবং উক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত অধ্যাপকগণের অন্ধভাবে পুস্তক অনুকরণ, সেইসাথে নতুন প্রজন্মকে নিজেদের জাতিগত পরিচয়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের বিষয়ে কীভাবে সতর্ক হওয়া সম্ভব; বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা যেতে পারে। পাশাপাশি বাঙালি আধুনিকতা বলতে আমরা কী বুঝবো সে বিষয়গুলো পরিষ্কার হওয়া আবশ্যক।

পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯১ সালে প্রকাশিত তার ‘পোস্টমডার্ন ভাবনা ও অন্যান্য’ গ্রন্থে বাঙালিদের ভেতর পোস্টমডার্নিজমের বিপরীতে উত্তর আধুনিক কবিতা চর্চার অসরতা উপস্থাপন করেছেন; যা অবশ্যই আমলযোগ্য। কেননা বাংলা সাহিত্যকে পোস্টমডার্নিজমের সাথে গুলিয়ে ফেলার কিছু নেই। ১৯৯৪ সালে আমাদের দেশে দায়িত্ব নিয়েই পোস্টমডার্নিজম বিষয়ে লিখেছেন সালাহউদ্দীন আইয়ুব। তিনি ইহাব হাসান, ডানিয়েল বেল, জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার, রোলা বার্থ, মাতেই কালিনেস্কু, জেরোমি মেজারো, চার্লস রাসেল, অক্টাভিও পাজ, এস. ল্যাশ, ডি. হার্ভে, ই. এ. কাপলান, এন. নিকলসন থেকে শুরু করে জাক দেরিদা পর্যন্ত অনেকেরই টেক্সট অনুসন্ধান করে বিস্তারিত প্রমাণাদিসহ আমাদের কাছে পোস্টমডার্ন ডিসকোর্সটি উপস্থান করেন। তিনি আমাদের দেশে ‘লিরিক’ পত্রিকা আশ্রিত আবেগনির্ভর উত্তর আধুনিক কবিতা চর্চার তত্ত্বীয় কাঠামোর অসারতার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

চট্টগ্রামে ছোটকাগজ ‘লিরিক’কে আশ্রয় করে পোস্টমডার্নিজমের বিপরীতে উত্তর আধুনিকতার চর্চা মূলত আমদানি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের অমিতাভ গুপ্তসহ বেশ কয়েক জনের অবিরাম লেখালেখির প্রভাবে। তাদের সমাজ-পর্যবেক্ষণের বেশকিছু বিষয় আমলে না আনার কোন কারণ দেখি না। তবে কবিতার ক্ষেত্রে এ কথা বলতেই হচ্ছে, বাংলা ভাষায় উত্তর আধুনিক কবিতা বলে পৃথকভাবে কবিতাকে চিহ্নিতকরণের যৌক্তিকতা এখনও খুঁজে পাওয়া মুশকিল; বরং বাঙালি সংস্কৃতিতে অধুনা যে পশ্চিমা সংস্কৃতি মিশ্রণের ছটা দেখা যাচ্ছে তার প্রেক্ষিতে আমাদের চেতনা ও অভিজ্ঞান যেমন বদলে যাচ্ছে তেমনি কবিতার আঙ্গিক ও অন্তর্বস্তুর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তা পরিবর্তনশীল সময়কে অনুসরণ করবে এটাই স্বাভাবিক; আমরা তা চাই আর না চাই; আমরা তা বুঝি আর নাই বা বুঝি।

এক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ও সাহিত্যসমালোচক টেরি ইগলটনের মন্তব্যটিও ভাবনায় ফেলে; যদিও আমি তার সাথে এখনও একমত নই। তিনি মনে করেন, ‘সাহিত্যের প্রচলিত মূল্যায়ন বুর্জোয়া সমালোচনার দান বলে তাকে উড়িয়ে দেয়ার অতি-বাম চিন্তা একেবারেই ভুল; বরং মার্কসবাদী সমালোচনার কর্তব্য এই সমস্যার দায়িত্বপূর্ণ আলোচনা করা। সাহিত্যের মূল্যায়নে পাঠকের ভূমিকাই বড়ো যেমন পণ্যের মূল্য ক্রেতার চাহিদার উপর নির্ভরশীল। উভয় ক্ষেত্রেই বিনিময়ের দ্বারা মূল্য নির্ধারিত হয়। অন্যভাবে বলা যায় মূল্যবান লেখা তার পাঠক সৃষ্টি করে, আবার এই পাঠকের ফলেই লেখার সৃষ্টি সম্ভব।’১৩

তো এ অবস্থায় সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতির জগতে ভোক্তাচাহিদা ও রুচি যেভাবে পালটে যেতে শুরু করেছে সেক্ষেত্রে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিও বদলে যেতে বাধ্য কিনা, বিষয়গুলো নিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণের অবকাশ রয়েছে। পাশাপাশি আমরাদের সংস্কৃতির জগতে আমরাও পশ্চিমাদের পোস্টমডার্নিটি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি কিনা, সমাজবিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও অনুসন্ধানযোগ্য।

আলোচনার শেষে এসে, যদিও আমি আদার ব্যাপারি হয়ে জাহাজের সন্ধান রাখার যোগ্যতা রাখি না তথাপি আমি আমাদের অনুসন্ধানসমূহ মিলিয়ে নিতে ইচ্ছুক। অনুসন্ধানে প্রশ্ন রেখেছিলাম পোস্টমডার্নিজম কি মডার্নিজমের ধারাক্রম প্রকাশজ্ঞাপক অভিধা? অনেকের মত আমারও মনে হয়েছে, মডার্নিজমের ধারাক্রম পোস্টমডার্নিজম নয়। এ বিষয়ে আমি সালাহউদ্দীন আইয়ুবের সাথে একমত। তিনি অনেকটা এভাবে সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করেছেন,

(১) মডার্নিজমকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে— একটি ব্যাখ্যা নান্দনিক; অন্যটি সমাজরাজনীতিনির্ভর (২) মডার্নিজম একটা অসম্পূর্ণ প্রকল্প (৩) মডার্নিজমের সঙ্গে মডার্নাইজেশনের সম্পর্ক ঘনিষ্ট এবং সেই ঘনিষ্ঠতা এই অসম্পূর্ণতার জন্যে দায়ী (৪) মডার্নিজমের সঙ্গে পোস্টমডার্নিজমের বিশেষ কোনো যোগ নেই (৫) পোস্টমডার্নিজম মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়পর্বের সংস্কৃতির ব্যাখ্যা (৬) পোস্টমডার্নিজমের সঙ্গে পোস্টস্ট্রাকচারালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই, কারণ প্রথমটি মূখ্যত আমেরিকার একটি ঘটনা, দ্বিতীয়টি ফরাশি দেশের; প্রথমটির লক্ষ্য মার্কিন সংস্কৃতির রূপান্তর নির্দেশ, দ্বিতীয়টির উদ্দেশ্য মডার্নিজমেরই নান্দনিক উত্তরভাষ্য (৭) অনেক বিতর্ক থাকলেও পোস্টমডার্নিজম থেকে জ্ঞানজগতে ও সংস্কৃত অঙ্গনে বহু অভিনব ডিসকোর্সের জন্ম হয়েছে : যার মধ্যে নারীতন্ত্র আছে, সংস্কৃতি-ব্যাখ্যায় লৈঙ্গিক বাস্তবতার ভূমিকা আছে, অরিয়েন্টিলিজম, পশ্চিম-বহির্ভূত সমাজ-সংস্কৃতি, এমনকি আধুনিকতার পুনর্বিবেচনা আছে।১৪

পরবর্তী অনুসন্ধান ছিল, আধুনিক এবং উত্তরাধুনিকের সম্পর্কটা কেমন? এই সম্পর্কের বিষয়টি ইতোমধ্যে সামান্য হলেও আমাদের কাছে এক ধরনের অবয়ব লাভ করেছে। যেখান থেকে আমরা দেখার চেষ্টা করেছি অবক্ষয়ী আধুনিকতা থেকে কীভাবে পোস্টমডার্নিজম বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে এবং আমাদের এখানে তা ভিন্ন ডিসকোর্সে একটি পৃথক অর্থাৎ পোস্টমডার্নিজমের সমান্তরাল নয় বরং বিপরীতে ‘উত্তর আধুনিক’ প্রিফেক্সটি তৈরি হয়েছে।

আমাদের তৃতীয় অনুসন্ধান ছিল, পশ্চিমাদের মডার্নিজম ও পোস্টমডার্নিজমের নিকট তৃতীয় বিশে^র অর্থাৎ আমাদের অবস্থান কোথায়? এ বিষয়ে ইতোমধ্যে নানাবিধ নমুনা ও মতাতম হাজির করলেও আমি নেডারভিন পিটারসের ‘এম্পায়ার এন্ড ইমানসিপেশন’ থেকে উদ্ধৃতি দিতে ইচ্ছুক। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতার বিতর্কে তৃতীয় বিশে^র প্রসঙ্গ অনুচ্চারিত। প্রবল বিশে^র প্রতিপক্ষে বিপুল প্রান্তের পৃথিবী সেখানে আক্ষরিক অর্থে অনুপস্থিত। এই বিতর্ক সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমের নিজস্ব বিতর্ক; এই বিতর্ক হলো পশ্চিমের এক কুইজ : পশ্চিমের প্রশ্ন এবং পশ্চিমের জবাব।’১৫

শেষ তিনটি অনুসন্ধান ছিল, পশ্চিমবঙ্গে কেন পোস্টমডার্নিজমের বিপরীতে উত্তর আধুনিকতাবাদের সূত্রপাত হল? আমাদের দেশে উত্তর আধুনিকতার বিষয়টি কীভাবে চর্চা করা হয়েছে, হচ্ছে এবং এর যৌক্তিকতা ও ফলাফল কেমন? বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী? অর্থাৎ সতর্কতা কতটুকু এবং কেনই বা এই সতর্কতা? এ পর্যন্ত আলোচনায় এ বিষয়গুলোর অল্পবিস্তর ডিসকোর্স ইতোমধ্যেই আমাদের চিন্তনে দানা বাঁধতে শুরু করেছে বলে মনে করছি। যদিও এ জিজ্ঞাসাগুলোর পাশাপাশি এর বাইরেও ইতোমধ্যে প্রাসঙ্গিকতার প্রয়োজনেই নানাবিধ অনুসন্ধান ও নমুনা হাজির করতে বাধ্য হয়েছি। এক্ষেত্রে হয়তো সবকিছু গুছিয়ে যুক্তি পরম্পরায় উপস্থাপিত হয়নি। এ জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কেননা এমন একটি বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করছি যেখানে নিজের অংশ গ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে; তথাপি যে সকল সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যা আমার নিজেস্ব, যদিও বৈশি^ক সভ্যতা পর্যবেক্ষণে নিজেস্ব বলে কিছু থাকে না বরং আমরা সতর্ক পর্যবেক্ষণ থেকেই সবকিছু গ্রহণ-বর্জন ও মূল্যায়ন করে থাকি তথাপি বলছি আমার পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যার পেছনে আমি আমার কা-জ্ঞান ও সততা থেকে উপযুক্ত নমুনা হাজির করার চেষ্টা করেছি।

অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আমি সততার সাথেই পর্যবেক্ষণের প্রচেষ্টা জারি রাখার চেষ্টা করেছি। অনুসন্ধান করেছি ইহাব হাসান, জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার, ফ্রেডরিক জেমসন, এডওয়ার্ড সাইদ, মিশেল ফুকো, জাক দেরিদা, এমে সেজায়ার, চিনুয়া আচেবে সহ প্রাসঙ্গিক লেখক ও চিন্তাবিদদের রচনাসমূহ। বাংলা ভাষায় অনূদিত ও সম্পাদিত বইগুলোর মধ্যে আমাকে সাহায্য করেছে লায়লা ফেরদৌস অনূদিত ‘ফ্রেডরিক নিৎশে : ভালো-মন্দের সীমানা পেরিয়ে’, তপোধীর ভট্টাচার্যের ‘টেরি ঈগলটন’, পারভেজ হোসেন ও ফয়েজ আলম সম্পাদিত ‘জ্যাক দেরিদা : পাঠ ও বিবেচনা’, অভিজিৎ চক্রবর্তীর ‘জাক দেরিদা’, পারভেজ হোসেন সম্পাদিত ‘মিশেল ফুকো’, রফিকুল রনি অনূদিত ‘নোয়াম চমস্কির সা¤্রাজ্যবাদীদের উচ্চাভিলাষ’, ফয়েজ আলম অনূদিত ‘এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদের অরিয়েন্টালিজম’, ফয়েজ আলমের ‘উত্তর-উপনিবেশী মন’ সহ প্রাসঙ্গিক গ্রন্থাদি। প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনে কে কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেগুলোও আমলে রাখা হয়েছে।

এতকিছু মিলিয়ে দেখতে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, বর্তমান সভ্যতায় ঘটমান বর্তমানের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে পোস্টমডার্নিটির গতিবিধি ব্যাখ্যা করার এখনও যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আমার সংশয় জেগেছে, আমাদের মত তৃতীয় বিশে^র মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি কি কিছুটা সংক্ষুব্ধ নয়? যার ওপর দাঁড়িয়ে আদৌ কি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্ভব? আদৌ কি নিরপেক্ষতা বলে কিছু আছে, বা সম্ভব? আমাদের কি সবসময় সতর্ক অবস্থায় থেকে অর্থাৎ আমরা ‘আদার’ / ‘হীন’— এই সতর্কতা মাথায় নিয়ে বৈশি^ক বিষয়াদি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে না? সম্ভবত তৃতীয় বিশে^র মানুষের ভেতর এহেন সংশয়বোধ চালান করে দেওয়াটাও ছিল পোস্টমডার্নিজমের আরেকটি অভিসন্ধি।

অনুজ বন্ধু সুদীপ্ত হাননানের সাথে আড্ডায় আমি সংশয় প্রকাশ করে বলেছিলাম, আমরা নতুন করে আশলে কিছুই বলছি না বা ভাবতে পারছি না। আমি যা-ই ভাবছি না কেন, অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তা কেউ না কেউ অনেক আগেই বলে গেছেন; বা আশে পাশে আপনার মত আরও অনেকেই ভাবছেন। আমি বিষয়টিকে পজেটিভলি দেখি; কারণ এতে নতুন ভাবনার সন্ধান পাওয়া না গেলেও অন্তত একটি বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে আমাদের ভাবনার সহযোদ্ধা রয়েছে; আর ভাবনাবিষয়ক সহযোদ্ধা থাকার কারণে ভানাগুলোর আশ্রয়ে ভাবনার জগতে মুভমেন্ট আশা করা যেতে পারে।

সুদীপ্ত হাননান পোস্টমডার্ন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেছিল, চর্বিতচর্বন, তবে বার বার ভাবতে ইচ্ছে করে। পোস্টমডার্ন/ পোস্টকলোনিয়াল/ পোস্টস্ট্রাকচারাল যা-ই বলি তাকে একটা ধাপে উত্তীর্ণ হয়ে অতঃপর নিজের অবস্থানে আসতে হয়। একই চিন্তায় স্থিত হয়ে আমরা ‘পোস্ট’ করতে পারি না নিজেদের। পৃথিবীর প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাওয়ার সাথে তা সে ‘সভ্যতায়’ হোক বা ‘সংস্কৃতিতে’ — সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজের চিন্তাকে এগিয়ে নিতে না পারলে আমরা মডার্নেই বা কলোনিয়ালেই বা স্ট্রাকচারালেই ডুবে থাকি। ফলে মার্কসবাদী যদি নিজেকে দাবি করতেই হয় তো মার্কসকেও আনতে হবে বর্তমানের মাপকাঠিতে। অ্যান্তনিও গ্রামসিসহ কেউ কেউ মার্কসকে ‘পোস্ট’ করার চেষ্টা করেছেন। চেষ্টাটি মার্কস জীবিত থাকা অবস্থায় করেছিলেন ইউজিন ডুরিং কিন্তু তা তিনি করেছিলেন বিপরীতভাবে বা ভুল ব্যাখ্যার আশ্রয়ে। ফলে আপনি যা-ই ব্যাখ্যা করুন না কেন বিষয়টির মূলসুর থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন কি-না তা বিবেচনায় অন্যদের রাখতেই হয়।

‘বিচ্যুতি’ আমাদের চারপাশে নানাভাবেই হয় বা হচ্ছে। বিচ্যুতি মানে ‘পোস্ট’ না বা বিবর্তনও না। তবে তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের অজান্তেই হতে পারেন; অন্যদের করতে পারেন। এখানেই তাত্ত্বিক বিষয়ে চর্চার প্রবহমানতার বিষয়টি জরুরি। প্রায় তত্ত্বই গড়ে ওঠে নিকট বা দূর ও সমকালের নানা ঘটনা, জ্ঞান, তত্ত্বকে আশ্রয় করেই, ভবিষ্যতের জন্য বা কখনও সমকালকে এগিয়ে নিতেও। ফলে আপনি দেরিদা, ফুকো, লাকা, সাঈদ এভাবে যাঁকে যাঁকেই পাঠ করুন বা বুঝেন, আপনাকে আপনার নিজের পথ বা মতকে অন্যের সাথে না মিলাতে পারলে তা ‘অন্যে’ গ্রহণ করবে না।

আমরা তৃতীয় বিশে^র মানুষ, আমাদের সমস্যা হল আমরা আমাদের জানাকে এগিয়ে নিতে চাই না এবং একবার ওই যে মানুষ হয়ে বা কোনো গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে জন্ম নিয়েছি তা আর এগিয়ে নিই না। ফলে আমাদের নির্ভর করতে হয় ছলচাতুরি বা জোরজবরদস্তির ওপর। পশ্চিমাদের জোরজবরদস্তির ওপর নির্ভরশীল থেকে সেইসাথে ছলচাতুরির সাথে সম্পৃক্ত থেকেও তৈরি হতে থাকে সামাজিক চিন্তাসমূহ। এবং তাকেও আমাদের জানতে হয়, বুঝতে হয়। নইলে চলমান জীবন বা সমাজ বা রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি বা সমস্যাকে আমরা অন্ধের হস্তিদর্শনের মত জ্ঞাত হই।

তথ্যসূত্র

১.            ডেভিড বারসামিয়ান, নওম চমস্কির সাক্ষাৎকার : পাওয়ার সিস্টেম, অনু., শফিকুল ইসলাম, (ঢাকা : র‌্যামন পাবলিশার্স, ২০১৫), পৃ., ১০

২.           পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, পোস্টমডার্ন ভাবনা ও অন্যান্য, (কলকাতা : র‌্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, ১৯৯৭), পৃ.,মুখবন্ধ

৩.           এমে সেজায়ার, ঔপনিবেশিকতার মুখোশ উন্মোচন, উরংপড়ঁৎংব ড়হ ঈড়ষড়হরধষরংস, কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, সাজ্জাদ জাহিদ ও শামিম ম-ল অনূদিত, (ঢাকা : প্রকৃতি, ২০১৪), পৃ., ১৯

৪.           তদেব, পৃ., ৫

৫.           ডেভিড বারসামিয়ান, প্রাগুক্ত, পৃ., ৪০-৪১

৬.           ড. তপন বসু, ‘‘থিংস ফল এ্যাপার্ট পাঠের জন্য’’, মুহম্মদ মুহসিন সম্পা., ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবে পাঠ ও বীক্ষণ, (ঢাকা : কবি, ২০১৬) পৃ., ৮৯

৭.           ওদে এস. ওগিদি, ‘‘দ্যা কনটেক্সটস অব আচেবেস রাইটিঙস”, মুহম্মদ মুহসিন সম্পা., ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবে পাঠ ও বীক্ষণ, প্রাগুক্ত, পৃ., ৭৯-৮০

৮.           এমে সেজায়ার, প্রাগুক্ত, পৃ., ২৩

৯.           সালাহউদ্দীন আইয়ুব, আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা, (ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৪), পৃ., ৩৬

১০.         সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ‘‘জ্যাক দেরিদা : বিনির্মাণবাদকে হ্যাঁ বলুন’’, পারভেজ হোসেন ও ফয়েজ আলম সম্পা., জ্যাক দেরিদা : পাঠ ও বিবেচনা, (ঢাকা : সংবেদ, ২০০৬), পৃ., ৩৯

১১.         শহীদুল জহির, ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প, ‘‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’’, (ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৪), পৃ., ৮০

১২.         সরকার আজিজ, “ঔপনিবেশিকতা, কবিতা ও উত্তর আধুনিকতা’’, সরকার আজিজ সম্পা., ময়মনসিংহ জং, ফেব্রুয়ারি ২০০০, পৃ., ৯৬

১৩.         টেরি ইগলটন, মার্কসবাদ ও সাহিত্য সমালোচনা, নিরঞ্জন গোস্বামী অনু., (কলকাতা : দীপায়ন, ১৯৯১), পৃ., ভূমিকাংশ

১৪.         সালাহউদ্দীন আইয়ুব, প্রাগুক্ত, পৃ., ৩৭

১৫.        তদেব, পৃ., ৬৪

***************************************

পোস্টমডার্নিজম : অভেদের সন্ধানে যাত্রা
কামরুল ইসলাম

পোস্টমডার্নিজম কোনো মুভমেন্ট কিনা, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এটি একটি অনিশ্চিত, অস্পষ্ট ও অনিয়ন্ত্রিত মতবাদ। এর সঙ্গে যুক্ত নানা অনুষঙ্গ। পোস্টমডার্নিজম ও পোস্টমডার্নিটি এক হলেও উভয়কে একটু আলাদা করেও ভাবা যায় :

Postmodernism is an aesthetic, literary, political or social philosophy, which was the basis of the attempt to describe a condition, or a state of being, or something concerned with changes to institutions and conditions (as in Giddens, 1990) as postmodernity. In other words, postmodernism is the “cultural and intellectual phenomenon”, especially since the 1920s’ new movements in the arts, while postmodernity focuses on social and political outworkings and innovations globally, especially since the 1960s in the West.

কোনো কোনো তাত্ত্বিক পোস্টমডার্নিজমকে আভাঁগাদ কিংবা নিওআভাঁগাদের ব্যাপার বলেও মনে করেছেন। হাই মডার্নিজম কিংবা আলট্রা মডার্নিজম-এর বিষয়গুলোও আমাদের স্মরণে রাখা দরকার। অনেকেই আবার পোস্টমডার্নিজমকে মানতেই নারাজ,তারা মডার্নিজকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। এভাবে আজও পোস্টমডার্নিজম একটি বিতর্কের মধ্যেই আটকে আছে। ফরাসি তাত্ত্বিকদের মধ্যে আবার  পোস্টমডার্নিজম নয় বরং পোস্টস্ট্রাকচারালিজম নিয়েই মাতামাতি বেশি। জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার ও জ্যাক দেরিদার-এর পোস্টমডার্ন চিন্তাধারাকে কঠিনভাবে সমালোচনা করেছেন য়ুর্গান হেবারমাস।মিশেল ফুকো কিংবা ফকেমা উত্তরাধুনিকতাকে প্রাচুর্যময়, আয়েশী সমাজের তত্ত্ব হিসেবে ভেবেছেন। গায়ত্রী  চক্রবর্তী  স্পিভাক ও এডওয়ার্ড সাঈদ মিশেল ফুকোর এই অভিমতের ব্যাপারে অভিযোগ তুলেছেন।

ফকেমার মতে : : The notion of postmodernity presupposes the stage of a modern,affluent society- Postmodernist literature can thrive only in affluent societies. আবার টেরি ঈগলটন যখন পোস্টমডার্নিজমকে মতাদর্শগত শূন্যতার মধ্যে ঠেলে দেন, তখন  এসব বিষয়ের এক নেগেটিভ ছায়া এসে আমাদের আচ্ছন্ন করে।আবার কেউ যখন পজিটিভ দৃষ্টিতে এই তত্ত্বের দিকে এগোতে থাকেন কিংবা কোয়ান্টাম ভ্যাকুম হিসেবে ভাবেন, তখন এ বিষয়ে ভাবনার জানালাগুলো খুলে যেতে থাকে। অনেকেই পোস্টমডার্ন-এর বাংলা করেছেন ‘অধুনান্তিক’  ‘উত্তর আধুনিক’,কিংবা ‘আধুনিক-উত্তর’।গিডেনস এবং হেমারমাস পোস্টমডার্নকে কাউন্টার মডার্ন, বিয়ন্ড মডার্ন কিংবা প্রি-মডার্ন  হিসেবেও দেখেছেন।পশ্চিমে এই শব্দটি কেবল ‘উত্তর’ হিসেবেই ভাবা হচ্ছে না, কেউ কেউ আবার পূর্ববর্তী বা প্রাক্তন অর্থেও ব্যবহার করেছেন।যে কারণে উদয় নারায়ন সিংহ বলছেন : ‘উত্তর আধুনিকতা আধুনিকতার পরে আসবে এমন কোনো নিয়মের বাধ্যবাধকতা নেই।এই মুহূর্তে যদি এই সম্ভাবনার কথা উপরব্ধি করা কঠিন হয়তো আশ্চর্য হবার কিছু নেই; … তিনি আরো জোর দিয়ে বলেছেনউত্তর আধুনিকতা কোনো জাতি দেশ সমাজ শিল্প বা সাহিত্যের ইতিহাসে মাত্র আধুনিকতার উত্তর পর্ব নয়।’এইসব বিবেচনা মাথায় রেখে,অনেক মতামত ও বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে আমরা এখানে পোস্টমডার্ন-এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে ‘উত্তরাধুনিক’ শব্দটি ব্যবহার করতে চাই।

১৯৬৬ সালে আমেরিকার হপকিনস্ বিশ্ববিদ্যালয়ে ÔStructure,Sign and play in the discourse of Human ScienceÕ শিরোনামে দেরিদা একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। এই প্রবন্ধপাঠ সেই সময়ের ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিকদের দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল এবং আমেরিকায় একটি নতুন সাহিত্যসমালোচনার পথ তৈরি হয় যা উবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ বা বিনির্মাণতত্ত্ব হিসেবে পরিচিত। দেরিদা এবং এডওয়ার্ড সাঈদ উত্তরাধুনিক চিন্তনের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছেন নানাভাবে। দেরিদা জোর দিয়েছেন টেক্সটের ওপর আর সাঈদ টেক্সটের দিগন্ত বেয়ে রাজনীতির খোলা মাঠে এসে দাঁড়াতে চেয়েছেন। বরং বৈপরিত্যের মধ্যেও কোথাও একটি যোগসূত্রের সন্ধান রয়েছে তাদের উত্তরাধুনিক ডিসকোর্সে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক একজন নারীবাদী, মার্কস্বাদী এবং বিনির্মাণবাদী হিসেবে উত্তরাধুনিক চিন্তার জগতকে এগিয়ে নিয়েছেন। উত্তর-ঔপনিবেশিকতার নানা দিক নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন এবং সা¤্রাজ্যবাদের শোষণ-পীড়নের মধ্যে মানুষের অবস্থানকে সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

১৯৭৮ সালে প্রথম প্রকাশিত ওরিয়েন্টালিজম গ্রন্থে সাঈদ স্পষ্ট করেছেন কীভাবে পশ্চিমী প্রাচ্যবাদীরা প্রাচ্যকে হেয় করেছেন। তিনি পশ্চিমের ডিসকোর্সের অসারতা প্রমাণ করেছেন তার গ্রন্থে। উত্তরাধুনিকতা পশ্চিমী বিশ্বের সাংস্কৃতিক পরিম-লকে তুলে ধরলেও তৃতীয় বিশ্ব রয়েছে অবহেলিত। যদিও এর মূল স্পিরিটটা নিহিত  মূলত বহুত্ববাদী, বিকেন্দ্রিকরণ, নি¤œবর্গীয় অবলোকনের মধ্যে। জ্যাক দেরিদার বিনির্মাণবাদী তত্ত্ব উত্তরকাঠামোবাদী সাহিত্যতত্ত্বের ব্যপারে যে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে তা বলাই বাহুল্য। দেরিদার পিছনে রয়েছে জার্মান দার্শনিক নীটশে ও হাইডেগার। বিনির্মাণবাদী দর্শনের ফলে টেক্সট-এর গতানুগতিক ব্যাখ্যায় আসলো আমূল পরিবর্তন। বিনির্মাণতত্ত্ব ফেমিনিজম, পোস্টকলোনিয়ালিজম, নয়া-মার্কসিজম ইত্যাাদি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করে। রোলাঁ বার্থ বললেন :

a text is not a line of words realeasing a single `theological’ meaning (the message of the Author–God) but a multidimentional space in which a variety of writings none of them original,blend and clash.The text is a tissue of quotations drawn from the innumerable centres of culture.

২.

উত্তরাধুনিকতা আসলে আধুনিকতার প্রতি একধরনের রি-অ্যাকশন। আধুনিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় উত্তরাধুনিকতার দরবারে। আধুনিকতার বাহুল্য, অসংগতি, কেন্দ্রিকতা এবং রক্ষণশীলতাকে চিহ্নিত করে উত্তরাধুনিকতা।

Postmodernism was originally a reaction to modernism. Largely influenced by the Western European disillusionment induced by World War II, postmodernism refers to a cultural, intellectual, or artistic state lacking a clear central hierarchy or organizing principle and embodying extreme complexity, contradiction, ambiguity, diversity, interconnectedness or interreferentiality, in a way that is often indistinguishable from a parody of itself. It has given rise to charges of fraudulence.

খ-বাদী ধারণা থেকে অখ-বাদী ধারণায় বিশ্বাসী পোস্টমডার্নিজম। আধুনিকতা কিংবা উত্তরাধুনিকতা উভয়েই পশ্চিম থেকে আসা তত্ত্ব হিসেবে এদের গায়ে সাম্রাজ্যবাদের গন্ধ রয়েছে এটা যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি যে, শিল্প-সাহিত্যের বিচারে, মূল্যায়নে এগুলি আমরা ব্যবহার করছি এবং করতে হচ্ছে নানা কারণেই। উত্তরাধুনিকতার বিষয়টি কোনো একটি বিশেষ তত্ত্বের মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে না, অনেক অনেক তত্ত্বের, সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রপঞ্চসমূহের মধ্যে এর আশ্রয়। অনেকেই মনে করেন উত্তরাধুনিকতা মূলত কোনো তত্ত্ব নয়, এটি একটি কালখ-ের নাম। সামষ্টিক কিংবা মাইনর জিনিসের প্রতি পোস্টমডার্নিজম-এর ঝোঁকটা বেশি। মেলবন্ধন কিংবা অখ-তার দিকে, পরিপূরকতার দিকে, এক মহাচেতনার দিকে এর নিরন্তর যাত্রা। ওপেন এন্ডেডনেস এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।তবুও এ এক মহাবিতর্ক।

পোস্টমডার্নিজম নিয়ে আলোচনার পূর্বে মডার্নিজম-এর বিশাল ও ব্যাপক পরিসর নিয়ে কিছুটা আলোকপাত দরকার। এর শুরু ও শেষ নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘পাঁজি মিলিয়ে মডার্নের সীমানা নির্ধারণ করবে কে? এটা কালের কথা ততটা নয় যতটা ভাবের কথা।’ মডার্নিজম-এর স্রোতধারায় মিশে আছে অনেক ছোট ছোট মুভমেন্ট, যেগুলো আধুনিকতাবাদের পরিসরকে আরো বিস্তৃত করেছে। এর মধ্যে সিম্বোলিজম, ডাডাইজম, সুররিয়ালিজম, ইমপ্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, ইমেজিজম, কিউবিজম, ভর্টিসিজম, ফিউচারিজমসহ আরো অনেক মতবাদ। এসব নিয়ে ব্যাপক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি আমার উদ্দেশ্য নয়, সংক্ষিপ্ত পরিসরে শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলোর একটি ছক তৈরির চেষ্টা মাত্র।

সেই প্রাচীনকাল থেকে হিসেব করলে এই সত্য প্রতিভাত হবে যে, সব কবি-শিল্পীই তাঁদের নিজ নিজ কালে আধুনিক ছিলেন। আধুনিকতাকে নানাভাবেই ভাবা যেতে পারে, কিন্তু শিল্পে-সাহিত্যে যে মডার্নিজম বা আধুনিকতাবাদ তাকে বিশেষভাবে ভাবতে হবে আমাদের। এই মডার্নিজম সাম্প্রতিকতা অর্থে নয়, একটি বিশেষ সময়ের শিল্প-সাহিত্যের আন্দোলন। আধুনিক ও আধুনিকতাবাদের পার্থক্যটাও আমাদের বোঝা দরকার। মাইকেল কিংবা রবীন্দ্রনাথকে যদি আমরা আধুনিক বলি তাহলে তিরিশের কবিদের আমরা আধুনিকতাবাদী বলবো। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতাবাদের উন্মেষকালের অন্যতম যাত্রিক, যদিও পুরোপুরি আধুনিকতাবাদী নন। মডার্নিজম-এর ধারণাটি অস্পষ্ট, অস্থির হলেও সাহিত্য-শিল্প আলোচনায় এর একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশশতকের পশ্চিমী শিল্প-সাহিত্য আলোচনায় তো বটেই, বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এই আধুনিকতাবাদের বিষয়টি গুরুত্ববহ। উনিশশতকের যন্ত্র-সভ্যতার বিকাশ ও পুঁজিবাদের চরম পর্যায়ে মডার্নিজম-এর আবির্ভাব। উনিশশতকের শেষপ্রান্তে এটি একটি মুভমেন্ট হিসেবে দেখা দেয় এবং বিশশতকের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাপী সংক্রমিত হয় নানা ভাব ও ভঙ্গিতে। এই সময়ে কবিতা, ফিকশন, চারুকলা, নাটক, সঙ্গীত ও স্থাপত্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন দেখা দেয়।

মডার্নিস্ট আন্দোলনটা কখন শুরু হলো আর কখনই বা শেষ হলো, এ নিয়ে যে মতান্তর রয়েছে সেকথা আমরা আগেই বলেছি। কারো কারো মতে, ১৯২০-তে ছিল এর চরম পর্যায় , কেউ কেউ মনে করেন ১৯৪০-এ এর চরম পর্যায় এবং পোস্টমডার্নিজম-এর আরম্ভ। তবে স্থান ও সময় ভেদে এর  শুরু ও শেষের একটি আলাদা আলাদা হিসেব রয়েছে। মনে করা হয়, ফরাসী দেশে ১৮৯০ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। আবার ইংল্যান্ডে বিশ শতকের শুরু থেকে ১৯২০ কিংবা ১৯৩০ পর্যন্ত, আমেরিকায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে এর শুরু এবং সমস্ত যুদ্ধব্যাপী এর বিস্তার। এটি ছিল আসলে একটি ইউরো-আমেরিকান সাহিত্য আন্দোলন যার কেন্দ্র ছিল রাজধানী শহরগুলো, যা পরবর্তীতে সারা পৃথিবীর শিল্প-সাহিত্যে প্রভার বিস্তার করেছে।

Astradur Eysteinsson ej‡Qb :

There is a rapidly spreading agreement that modernism is a legitimate concept broadly signifying a paradigmatic shift, a major revolt, beginning in the mid and late nineteenth century, against prevalent literary and aesthetic traditions of Western world. (The Concept of modernism)

নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে আধুনিকতাবাদী সাহিত্যেরও বিকাশ ঘটেছে। মডার্নিজম-এর লক্ষ্য ছিল গতানুগতিক প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-কানুন থেকে বেরিয়ে আসা এবং ফর্ম ও স্টাইল নিয়ে নানা নিরীক্ষা, বিশেষ করে ভাষা ও তার বহুমাত্রিক ব্যবহারের মধ্যে আধুনিকতাবাদের উজ্জীবন। যে-কারণে স্ট্রাকচারালিজম প্রথম থেকেই মডার্নিস্ট প্রবণতাগুলোর সাথে সম্পর্কিত।

আধুনিকতাকে প্রমূর্ত করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘নদী সামনের দিকে চলতে চলতে হঠাৎ বাঁক ফেরে। সাহিত্যও বরাবর সোজা চলে না। যখন সে বাঁক নেয় তখন সেই বাঁকটাই বলতে হবে মডার্ন।’ আমরা আগেই বলেছি মডার্নিজম-এর হাওয়া রবীন্দ্রনাথের গায়েও লেগেছিল এবং বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের ভাবধারার প্রবেশ পথে তাঁকে দেখা গেলেও তিনি সেই অর্থে মডার্নিস্ট ছিলেন না। আধুনিকতা নিয়ে  সে-সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও তিরিশের কবিকুলের মধ্যে নানা বিতর্ক ও বাগ্বিতন্ডা ছিল এবং এ বিষয়ে আমরা সকলেই অবগত। এখানে স্মর্তব্য যে, রবীন্দ্রনাথ ও তিরিশের কবিদের মধ্যে আধুনিক  কিংবা আধুনিকতা নিয়ে যে তর্ক-বিতর্কের অবতারণা হয়েছিল, তা কিন্তু মূলত শিল্প-সাহিত্যের যে মডার্নিস্ট মুভমেন্ট বা আধুনিকতাবাদ সেটিকেই বুঝানো হয়েছিল। তখন আধুনিকতাবাদ শব্দটি কেউই ব্যবহার করেননি।

আমরা আগেই বলেছি মডার্নিজম-এর সাথে যোগ হয়েছে আরো অনেক বিষয় বা মুভমেন্ট যা মডার্নিজম-এর মূল স্রোতধারাকে আরো বেগবতী করেছে। সেইসব আন্দোলনও মডার্নিজম-এর আলোচনায় বিশেষভাবে আলোচিত হবার দাবী রাখে। ১৯১৬ সালের দিকে জুরিখে শিল্প-সাহিত্যের এক নতুন আন্দোলন সূচিত হয়, যা দাদাইজম নামে পরিচিত। পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে শিল্পী-সাহিত্যিকরা সম্পূর্ণ প্রথাবিরোধী উদ্ভট সব সৃষ্টিতে মেতে উঠলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই প্যারিসে এই আন্দোলন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধও ধারণাগুলো অস্বীকার করে উন্মত্ততার দিকে এক ধরনের উত্তুঙ্গ আচরণের বহি:প্রকাশ দেখা গেল। তারা বললেন, জীবন অর্থহীন ও উদ্ভট। ত্রিস্তান জারা, হুগো বল, হ্যান্স আরপ ছিলেন দাদাবাদের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। বিশশতকের দ্বিতীয় দশকে এই দাদাবাদীরা পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। ‘দাদা’ নামে তারা একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। দাদাবাদীরা প্রচলিত সিনট্যাক্স না মেনে এমন ভাষারীতির উদ্ভাবন করতে চাইলেন যা কোনো কিছুই অর্থ করবে না। জার্মানিতে তারা শুধু নানা উন্মত্ততায়ই মেতে ওঠেনি, কমিউনিস্ট রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন এবং নান রকম কর্মকা- চালাতে থাকেন। ১৯২০ সালে বার্লিনে দাদা সম্মেলনের আয়োজনও করা হয়েছিল।

বলা যায় দাদাবাদের আধো আধো আলোয় সুররিয়ালিজম-এর ঘরগেরস্থির পাড়ামো হয়েছিল। একটি আন্দোলন যখন শেষ হতে থাকে কিংবা তার প্রয়োজন যখন ফুরিয়ে যায়, তখন অন্য একটি আন্দোলনের গোড়াপত্তন সময়েরই অনিবার্যতা। সেই ক্ষেত্রে দেখা যায় আগের আন্দোলনের অনেক বৈশিষ্ট্যই পরবর্তী সময়ের আন্দোলনে থেকে যায়। সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ মডার্নিজম-এর পরিসরকে আরো বাক্সময় করে তোলে। ফ্রয়েড-ইয়ং-এর মনোসমীক্ষণ চেতনার জগতে আনে আরেকটি বড় ধরনের পরিবর্তন। জগতের নানাবিধ অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, অবক্ষয় প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতাকে ভেঙে-চুরে দেওয়ায় শিল্পীর মধ্যে সেই তাগিদ দেখা গেল ভেতর থেকে আরেক বাস্তবের অšে¦ষণ। সেইক্ষেত্রে অবচেতনের তলদেশ থেকে আলো নিয়ে যুক্তি-তর্ক ও সমস্ত নিয়ম-নীতির বিপরীতে দাঁড় করালেন অন্যতর বাস্তব। অন্যকথায় চেতন ও অবচেতনের মিশেলে যে বাস্তবতা সেটাই সুররিয়ালিজম। এই আন্দোলনটি ১৯২০তে ফরাসী দেশে শুরু হয়। পরাবাস্তববাদীরা তাদের কাজে যুক্তির কোন ধার ধারলেন না।  তাদের শিল্পকর্ম ছিল অচেতন মনের ক্রিয়াকলাপ। এপোলিনিয়ার (১৮৮০-১৯১৮) একে ‘সুপার রিয়ালিজম’ হিসেবে চালিয়েছিলেন অন্তত ১৯২৪ সাল পর্যন্ত। পরবর্তীতে আঁদ্রে ব্রেতো সুররিয়ালিজম-এর প্রথম মেনিফেস্টো প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিষয়টি আরো গতিশীল করে তোলেন। তিনি তাঁর মেনিফেস্টোতে এই মত প্রকাশ করেছিলেন যে, মনকে অবশ্যই লজিক ও রিজন থেকে মুক্ত রাখতে হবে। স্বপ্ন ও অলীক কল্পনার বিষয়টি ছিল পরাবাস্তববাদের প্রাণ। ব্রেতোঁ মনে করতেন, মনের মধ্যে এমন একটি জায়গা আছে যেখান থেকে বাস্তবতার বাইরের নতুন জ্ঞানের হদিস পাওয়া সম্ভব।

১৯২৯ সালে আঁদ্রে ব্রেতোঁ তার দ্বিতীয় মেনিফেস্টোতে ব্যাখ্যা করেছিলেন :

… how the surrealist idea was to revitalize the psychic forces by a ` vertiginous discent’ into the self in quest of that secret and hidden territory where all this is a contradictory in our everyday lives and consciousness will be made plain.( Cuddon)

এ আন্দোলনের সূত্রপাত, উন্নয়ন ও নিরীক্ষার কাজগুলো মূলত ফরাসি দেশেই হয়েছে। আঁদ্রে ব্রেতোঁ, লুই আরাগঁ, পল এ্যালুয়ার, বেঞ্জামিন পেরে প্রমুখ এ নিয়ে কাজ করেছেন। সুররিয়ালিস্ট পেইন্টারদের মধ্যে পিকাশো ও সালভেদর দালির নাম করা যেতে পারে। জীবনানন্দ দাশ ও শক্তি চট্টেপাধ্যায়-এর কবিতায় স্যুররিয়ালিজম-এর চর্চাটা চোখে পড়ার মতো।

পৃথিবীব্যাপী সুররিয়ালিজম-এর প্রভাবের কথা সর্বজনবিদিত। কবিতা ছাড়াও ফিকশন, সিনেমা-থিয়েটার, পেইন্টিং ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব লক্ষণীয়। অনেক লেখকই চেতন-অর্ধচেতনের অনাবিষ্কৃত ক্ষেত্রগুলো খুঁড়ে দেখার, আবিষ্কারের নতুন নেশায় মেতে উঠে দেখতে চেয়েছিলেন মনের সেই গোপন প্রকোষ্টগুলো। আর এটা করতে গিয়ে তারা ‘চেতনাপ্রবাহ টেকনিক’-এরও আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইদানিংকালের কবিতায় সুররিয়ালিজম-এর বিষয়টি অনেক কমে আসলেও নাটক ও নভেলের ক্ষেত্রে এখনও এর প্রভাব লক্ষণীয়। ইউজিনও আইওনেস্কে, জাঁ জেন, স্যামুয়েল বেকেট প্রমুখের নাটকে সুররিয়ালিজম-এর ব্যবহার দেখা যায়।

সিম্বোলিজম শিল্প-সাহিত্যের একটি অন্যতম আন্দোলন। ফরাসি দেশে উনিশশতকের শেষের দিকে সিম্বলিস্ট আন্দোলনের জন্ম। বোদলেয়ার, মালার্মে, র‌্যাঁবো ও ভের্লেন এই প্রতীকবাদী আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেন। পল ক্লদেল, পল ভ্যালেরি এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিযে যান। বাস্তববাদ ও প্রাকৃতিকবাদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন। সিম্বলিস্টরা ভেতর জগতের দিকে মুখ ফেরালেন। সরাসরি অর্থকে বাদ দিয়ে সাংকেতিকতার মধ্য দিয়ে কবিতাকে বর্ণনা করার কথা ভাবলেন তারা এবং কবিতাকে কড়া ছন্দের শাসন থেকে মুক্ত করে কবিতার সগৌরব বিস্তৃতি বাড়িয়ে দিলেন। ফরাসি সিম্বোলিস্ট কবিদের ইম্প্রেশনিস্ট বলা হয়ে থাকে। একদল পেইন্টার যারা মূলত কাজ করেছিলেন আলোর ক্ষণস্থায়ী বর্ণিল অভিঘাত এবং একান্ত মন্ময় অনুভূতির প্রক্রিয়া নিয়ে, তাদেরই বলা হলো ইম্প্রেশনিস্ট। রঙের বিবিধ খেলা এবং খোলা আকাশ, প্রান্তর, সমুদ্র ইম্প্রেশনিস্টদের প্রিয় অনুষঙ্গ। ইম্প্রেশনিজম একটি অস্পষ্ট টার্ম হলেও এটি সারা দুনিয়ার শিল্পসাহিত্যকে প্রভাবিত করেছিল এবং মডার্নিজম-এর বাহুতে  যুগিয়েছিল অমিত শক্তি। ইংরেজ কবি অস্কার ওয়াইল্ড এবং আর্থার সাইমনকে ইম্প্রেশনিস্ট বলা হয়। নভেলের ক্ষেত্রে এটা একটি টেকনিক যেখানে  বহির্বাস্তবতার পরিবর্তে চরিত্রের ভেতর জগতের আবিষ্কারই মুখ্য হয়ে ওঠে। জেমস জয়েস, ডরোথি রিচার্ডসন এবং ভার্জিনিয়া উল্ফের লেখায় এইসব বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে। অন্যদিকে বিশশতকের প্রথম দিকে জার্মানিতে এক্সপ্রেশনিজম আন্দোলনের শুরু । এটিও পেইন্টিং-এর মধ্য দিয়ে একটি আন্দোলনে রূপ নেয় এবং পরে সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করে। একদল পেইন্টার কোনো বস্তুর বাহ্যিক বাস্তবতার বর্ণনাকে এড়িয়ে জগতের সবকিছুকে একান্ত ব্যক্তিগত মানসপ্রক্রিয়ায় আঁকতে চাইলেন, অবচেতন মনের নানা রঙে।

১৯০৯ সালে আর্নস্ট লুদভিগ কার্শনারের আঁকা ছবি ‘রিক্লাইনিং ন্যুড’ অভিব্যক্তিবাদী চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। এক্সপ্রেশনিস্টরা গুরুত্ব দিলেন ফর্মের দিকে তথা চিত্রকল্প, যতি, বাক্যবিন্যাস ইত্যাদির ওপর। এই মতবাদ জার্মানি ও স্ক্যান্ডেনেভিয়ায় বেশি প্রভাব ফেলেছিল। ১৯২০-এর দিকে নাটকের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি প্রবল হয়েছিল। নাটকের ক্ষেত্রে এটি ছিল নিতান্তই রিয়ালিজম-এর বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া। ভর্টিসিজমও মূলত শিল্প-সাহিত্যের একটি আন্দোলন। ১৯১২ সালে চিত্রকর ও লেখক উইন্ডহাম লুইস এর নেতৃত্বে এ আন্দোলনটি শুরু হয়। ‘ব্লাস্ট : দ্য রিভিউ অব দ্য গ্রেট ইংলিশ ভর্টেক্স’ নামের একটি ম্যাগাজিন ১৯১৪  এবং ১৯১৫ সালে পরপর দুবার প্রকাশিত হয় এবং এই পত্রিকায় লুইস ও এজরা পাউন্ড তাদের এ আন্দোলনের মেনিফেস্টো প্রকাশ করেন। পাউন্ডের ইমেজিস্ট আন্দোলনের সাথে এই আন্দোলনের সম্পৃক্ততা ছিল। পাউন্ড ও এলিয়টের প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু কবিতা ব্লাস্ট-এ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২০ এর পরে এই আন্দোলন স্তিমিত হযে পড়ে। অ্যান্টিরোমান্টিক ক্ল্যাসিসিজম শিল্পচেতনার সম্মোহনেই ইমেজিজম-এর গোড়াপত্তন। একে অনেকেই ‘ক্ল্যাসিক্যাল মডার্নিজম’ও বলে থাকে। বিশ্বকবিতার আধুনিক পর্বে ইমেজিস্ট আন্দোলন এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছিল্ । আধুনিক কবিতার অভিযাত্রায় এজরা পাউন্ড ছিলেন ইউরোপ ও আমেরিকার সংযোগকারী কবি, যিনি হ্যারিয়েট মনরোর চিকানো ম্যাগাজিন ‘পোয়েট্রি’-এর কন্ট্রিবিউটিং এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সামান্য আগে কয়েকজন কবি বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। এদের মধ্যে এজরা পাউন্ড, এমি লয়েল, টি.ই. হিউম, রিচার্ড অলডিংটন এবং হিলডা ডুলিটল উল্লেখযোগ্য। এই কবিরা বিশ্বাস করতেন যে, কবিতার জন্য দরকার কঠিন ও স্বচ্ছ ইমেজ। তারা আরো মনে করতেন, কবিতায় ব্যবহৃত হবে প্রাত্যহিক জীবনের ভাষা এবং বিষয় নির্বাচনে থাকবে অবাধ স্বাধীনতা। আমরা আগেই বলেছি এই আন্দোলনের প্রধান পুরোহিত ছিলেন এজরা পাউন্ড। এই ঘরানার নতুন কবিতা আন্দোলনে তিনি কবিতা বিষযে নানা ধরনের কথা বলেছেন। পরে তিনি ইতালিতে গেলে ফ্যাসিজম-এর খপ্পরে পড়েন এবং ইতালি রেডিও-তে ফ্যাসিস্টের হয়ে প্রচারণা চালানোয় বিতর্কিত হন । কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সৎ ও সংযমীসাধক, নতুনত্বের সন্ধানী।

পাউন্ড ইমেজিজম-এর বিষযটি তাঁর নানা প্রবন্ধ, বক্তৃতা এবং একটি সংকলনে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেছেন এবং পৃথিবীব্যাপী এর প্রভাবকে বিশেষভাবে কবিতার ক্ষেত্রে অনিবার্য় করে তোলেন। ১৯১৫ সালে মনরোর কাছে লেখা তার এক চিঠিতে তিনি আধুনিক সময়সঞ্জাত ভিজ্যুয়াল কবিতার কথা বলেন, যেখানে থাকবে না গতানুগতিক ধারণা এবং বহু-ব্যবহৃত পদসমষ্টি (পষরপযবং ধহফ ংবঃ ঢ়যৎধংবং)। ইমেজিজম এবং পাউন্ডকে আলাদা করে ভাবা মুশকিল। এই আন্দোলন ইংলিশ এবং আমেরিকান সাহিত্য বলয়ে ১৯১২ থেকে ১৯১৭ পর্যন্ত বিকাশ লাভ করেছিল। পাউন্ডের ভাষায় এই আন্দোলন ছিল ৎধঃযবৎ নষঁৎৎু, সবংংু… ংবহঃরসবহঃধষরংঃরপ সধহহবৎরংয এর বিরুদ্ধে একধরনের বিদ্রোহ। কবিতার সাঙ্গীতীক দ্যোতনায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন এবং পাশাপাশি এব্যাপারে উদ্বিগ্নও ছিলেন কীভাবে কবিতা কাগজের পাতায় সঙ্গীতের আবহসহ উপস্থিত হয়। সঁংরপধষ ধপঃরারঃু ড়ভ ড়িৎফং এর বিষয়টি মূলত ইমেজিস্ট আন্দোলনেরই একটি দিক। অ ঋবি উড়হঃং ড়ভ ধহ ওসধমরংঃব (১৯১৩) গ্রন্থে পাউন্ড ইমেজ বলতে সেই বিষয়কে বুঝিয়েছেন যা ঢ়ৎবংবহঃং ধহ রহঃবষষবপঃঁধষ ধহফ বসড়ঃরড়হধষ পড়সঢ়ষবী রহ ধহ রহংঃধহঃ ড়ভ ঃরসব. ১৯১৪ সালে তিনি ইমেজিস্ট কবিতার সংকলন উবং ওসধমরংঃবং প্রকাশ করেন এবং এই সংকলনে ১০ জন কবির কবিতা স্থান পায়। এদের মধ্যে ইউলিয়াম কার্লোস ইউলিয়ামস, হিলডা ডুলিটল এবং এমি লয়েলের নাম করা যেতে পারে।

পরবর্তীতে এমি লয়েল তিনটি ইমেজিস্ট কবিতার সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঝড়সব ওসধমরংঃ চড়বঃং-এর ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন মুক্তভাবে যেকোনো বিষয়কে বেছে নেওয়া, নিজস্ব ছন্দ নির্মাণ, সাধারণ কথ্য ভাষার ব্যবহার, একটি ইমেজের উপস্থিতি যা হবে সুস্পষ্ট ও ঘন এবং গতানুগতিক কাব্যিক উপকরণ ও কাব্যনির্মাণকৌশলকে ত্যাগ করা  এগুলোই মূলত ইমেজিস্ট কবিতার বৈশিষ্ট্য। পাউন্ডের ‘ওহ ধ ঝঃধঃরড়হ ড়ভ ঃযব গবঃৎড়’ একটি ইমেজিস্ট কবিতা। কবিতাটি কেন্দ্রীভূত ভাবের সাজুয্যে এবং প্রকাশের সংযমীতায় অতুলনীয়। এটি মাত্র দুলাইনের কবিতা এবং একটি ইমেজিস্ট কবিতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ : ঞযব ধঢ়ঢ়ধৎরঃরড়হ রহ ঃযব ভধপবং ড়ভ ঃযব পৎড়ফি;/ চবঃধষং ড়হ ধ বিঃ, নষধপশ নড়ঁময. সামান্য একটু রঙের ছোপে এবং পেইন্টিং-এর আদলে কবিতাটি গড়ে উঠেছে। এই কবিতাটির লেখন-কৌশলে জাপানি হাইকুর প্রভাব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। অন্যান্য আন্দোলনের সাথে ফরাসিদের সম্পৃক্ততা থাকলেও ইমেজিজম আন্দোলটা মূলত ইংরেজি ভাষাভাষীদের আন্দোলন। সেসময়ের কিউবিজম-এর চর্চাটাও চোখে পড়ার মতো, বিশেষ করে শিল্পকলায় বস্তুকে তার নিজস্ব আঙ্গিকে দেখার প্রয়াস এবং জ্যামিতিক আকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ করা। চিত্রকলায় আঁভাগাদ আন্দোলনের একটি পর্যায় এটি। এজরা পাউন্ড এবং এলিয়টের কবিতায় কিউবিজম-এর প্রভাব রয়েছে।

ফিউচারিজমও আধুনিক শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক একটি আন্দোলন। এর মূল ধারণা ছিল গতি, এক অরোধ্য গতি। এটিও ফরাসিদের একটি আন্দোলন। এর দার্শনিক ছিলেন বার্গস। রবীন্দ্রনাথ এবং জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ফিউচারিজম-এর লক্ষণগুলো দেখা যায়। এভাবে অনেক মুভমেন্ট তাদের নিজস্ব আলোয় মডার্নিজম-এর সমূহ সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলেছিল এবং সময়ের আবর্তনে এর তেল ফুরিয়ে এলে তার পথের শেষে পোস্টমডার্নিম-এর আরেকটি আলো জ্বলে উঠল যার মধ্যে মডার্নিজম-এর অনেক প্রাণরসায়নের বৈভব খুঁজে পাওয়া যাবে।

পশ্চিমী জগতে অবক্ষয়িত মডার্নিজম-এর প্রান্তে দাঁড়িয়ে যায় পোস্টমডার্নিজম। অনেকগুলো ডাইমেনশন নিয়ে এই তত্ত্ব মডার্নিজম এর একটি অনিবার্য সম্প্রসারণই বটে।

The Compact Oxford English Dictionary পোস্টমডার্নিজম-এর ব্যাখ্যা দিয়েছে এভাবে : a style and concept in the arts characterized by distrust of theories and ideologies and by the drawing of attention to conventions.’ ‘পোস্টমডার্নিজমো’ শব্দটি প্রথম লিখেন স্প্যানিশভাষী কবি ফেদেরিকো দ্য ওনিস ১৯৩০ সালের দিকে। তিনি ছিলেন ল্যাটিন আমেরিকান কবি। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে শিল্পসাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে পোস্টমডার্নিজমের প্রবেশ। তবে ১৯৮০ এর দিকে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পথ করে দেন প্রথম লিওতার তাঁর ‘দ্য পোস্টমডার্ন কন্ডিশন : অ্যা রিপোর্ট অন নলেজ’ (১৯৭৯) প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এর পর ফরাসি চিন্তক জাঁ বদ্রিলা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সিমুলেশনস’ (১৯৮১) এ পোস্টমডার্নিজম নিয়ে কথা বলেন। পরবর্তীতে পশ্চিমে এই নিয়ে অনেক ডিসকোর্স, অনেক বিতর্কের ঝড় বয়ে গেছে, অনেকেই পোস্টমডার্নিজম বলে কিছু আছে কিনা  এ নিয়েই সন্দেহ পোষণ করেছেন। অতঃপর তা আমাদের বঙ্গদেশেও প্রবেশ করেছে এবং বেশকিছু চিন্তকের চিন্তনের জগৎকেও আলোড়িত করেছে। এখানের অনেক বাম বুদ্ধিজীবী কিংবা লেখক এই বিষয়টি মানতেই নারাজ। তথাপিও আমরা মনে করি পোস্টমডার্নিজম-এর অখ-বাদী বৈশিষ্ট্যসমূহ মানবিকীকরনের ক্ষেত্রকে উসকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে ।

ঘরধষষ খঁপু-র কথায় পোস্টমডার্নিজম-এর বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে :

This, I think, is the basis of the postmodern idea that everything is a text. For postmodernism, the problem of inside/outside relations is not confined to the question of literature but extends rather across the whole field of culture and society. What was once the romantic space of the literary becomes, for postmodernism, a general plane of human exist­ence, on which concepts of identity, origin and truth are seen as multiple and structureless assemblages rather than as grounds for understand­ing human ‘being’ and culture.  … I think ‘postmodernism’ refers to the generalization or flattening out of the romantic theory of literature which marks it as a ‘radical’ theory of the nonfoundational, structureless ‘structure’ of truth. (Post Modern Literary Theory : An Introduction)

অ্যান্টিকলোনিয়াল চেতনার মধ্যে পোস্টমডার্নিজম-এর জন্ম। পোস্টকলোনিয়ালিজম ও ম্যাজিক রিয়ালিজম পোস্টমডার্নিজম-এর দুটি বিশিষ্ট স্তম্ভ। বিশ্বায়ন, নারীবাদ, ইকোলজি, ইত্যাদির মধ্যে পোস্ট-মডার্নিজম কাজ করে যাচ্ছে উন্মুক্ত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে। সমীর রায়চৌধুরী বলছেন : পোস্টমডার্ন চিন্তাচেতনা পৃথক পৃথকভাবে বিশ্বায়ন, প্রকৃতিবাদীতা, নারীবাদ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বংশজ এবং ক্ষেত্রজ, পার্টিসিপেটরি ডেমোক্রেসি এগুলি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আলোচনা করে চলেছে, খ-বাদী ভাবকল্পগুলি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য। আজ ভাবুকেরা সমগ্র বিশ্বচরাচরকে যেভাবে দেখতে চাইছেন তা আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথক। আগেই বলা হযেছে ব্রহ্মবাদিতার একটি লক্ষণ মহাপারিবারিক দৃষ্টিকোণ। অর্থাৎ ইংরেজিতে ফ্যামিলি বলতে যে সংকীর্ণ ধারণা বোঝায় তার সঙ্গে এই সনাতন ও অধুনান্তিক ভাবনার ব্যাপ্তি মেলে না। ঔপনিবেশিক ফ্যামিলি-র ধারণা বলতে বোঝায় যার কর্তা একজন পুরুষ, আর তার স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির অর্থাৎ পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ। এমনকি নারীকেও সে প্রধান্য দেওযা হযনি। যার দাবি রয়েছে উত্তর-ঔপনিবেশিক উচ্চারণে।

ইহাব হাসান মডার্নিজম এবং পোস্টমডার্নিজম-এর মধ্যে একটি ভেদরেখা টেনেছেন এভাবে :

মডার্নিজম                                         পোস্টমডার্নিজম

ফর্ম                                                    অ্যান্টিফর্ম

পারপোস                                              প্লে

ডিজাইন                                               চান্চ

হাইয়ারার্কি                                            অ্যানার্কি

ক্রিয়েশন/ টোটালাইজেশন                           ডিক্রিয়েশন/ডিকনক্ট্রাকশন

সেন্টারিং                                               ডিসপারসাল

সিগনিফাইড                                           সিগনিফাইয়ার

লিসিবল /রিডারলি                                    স্ক্রিপটিবল/রাইটারলি

ন্যারেটিভ                                              অ্যান্টিন্যারেটিভ

পিতা ঈশ্বর                                            পবিত্র ভূত

লজিক                                                 সাইলেন্স

সিদ্ধান্ত                                                অমীমাংসা

সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তির এক দুর্নিবার তাগিদ কিংবা ঐতিহ্যসংলগ্নতার সাথে পোস্টমডার্নিজম-এর নিবিড় সখ্য রয়েছে। নিম্নবর্গীয় চেতনা-কাটামোর বিস্তার ও সংহতি উত্তরাধুনিকতাবাদের অন্যতম ক্ষেত্র। এটি শুধু পিছনে ফেরা নয়, বরং অনেকানেক সংশ্লেষক স্রোতধারায় উত্তরাধুনিকতাবাদের প্রাণপ্রবাহের খেলা। অঞ্জন সেন বলছেন :

আমরা সেই আধুনিকতাকে মানি না যার ভিত্তি ঔপনিবেশিক। বোদল্যের, মালার্মে এলিয়ট, পাউন্ড, রিলকে, মায়াকোভস্কি, ব্রেশট, আরাগঁ, লুসুন, নেরুদা, ভাসকো পোপা, গ্রাস আজ বাঙালি কবিদের কাছে অবশ্য পাঠ্য হতে পারেন, তেমনি লুইপাদ, বড়–-দ্বিজ। সহজিয়া চন্ডিদাস, কৃত্তিবাস, কবিকঙ্কণ, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস,কাশীরাম দাশ, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, বিজয় গুপ্ত, ঘনারাম, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ বা রামনিধি গুপ্ত; অসংখ্য লোকগাথা, বাউল গান আমাদের অপরিচিত থাকবে কেন? উত্তর আধুনিকতা সেই সংশ্লেষণ সমন্বয় চায়, উত্তর আধুনিকতা সাহিত্যে সীমাবদ্ধভাবে কেবলমাত্র ইউরোপ অনুসরণের অপক্ষপাতী।

অঞ্জন সেন আরো বলছেন : ‘ঔপনিবেশিক চিন্তাধারায় লালিত আমাদের কবি-সাহিত্যিক সমালোচকরা ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণার বাইরে কিছু ভাবতে পারেন না। … রবীন্দ্রনাথের পর থেকে ক্রমে ক্রমে ইউরোপীয় সাহিত্য বর্গগুলি বাংলা কবিতায় প্রবল হয়ে উঠেছে এবং বাংলা ভাষার নিজস্ব বর্গগুলি ক্রমশই অবহেলিত।’ আমাদের একথা মনে রাখা দরকার যে, পশ্চিমে পোস্টমডার্নিজম নিয়ে যেসব ডিসকোর্স কিংবা আলোচনা-সমালোচনা দেখা যায় তা উপনিবেশ-উত্তর স্বাধীন দেশসমূহে যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি উপনিবেশ কর্তৃক দলিত কিংবা অবহেলিত ছিল তাদের সাথে পুরোপুরি মিলানো যাবে না।লিওতারের ধারণা উত্তরাধুনিকতা অনেক উন্নত ও বিকশিত সমাজ-সভ্যতার ব্যাপার। পোস্টমডার্নিজম-এর ধারণাটি নিজস্ব আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বাঙালি চিন্তকদের যেসব ডিসকোর্স কিংবা আলোচনা-সমালোচনা আমরা পেয়েছি তা উত্তর-ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিচর্চায় শিল্পীসাহিত্যিকদের আধুনিকতাবাদী শিল্পচেতনা থেকে সরে এসে শেকড়সন্ধানী করে তুলতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে  বলে আমাদের বিশ্বাস।

মার্কস্বাদী চিন্তকেরা পোস্টমডার্নিজমকে সাম্যবিরোধী বলে ভেবে থাকেন। তবে উত্তর-মার্কসবাদ আবার মেলবন্ধনে বিশ্বাসী। সমীর রায়চৌধুরী মনে করেন :

যে সব মার্কসবাদী পোস্টমডার্ন চিন্তাচেতনাকে সাম্যবিরোধী বলছেন,তাঁরা অজ্ঞানতা থেকে এসব কথা বলার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন। তাঁরা মৌলবাদী ও অভিমুখ অজ্ঞানী। এটা পরিষ্কার হওয়া দরকার যে, এ পৃথিবীকে ‘ব্রাত্য’করণ আজ অচল, দ্বিপাক্ষিকতার গোঁড়ামি অকেজো হয়ে আসছে। ব্যবধান মিটিয়ে ফেলাই একমাত্র পথ। এই বোধ দুদিকের পক্ষে সমান সত্য। যেজন্য সর্বত্র ডায়ালগ বা অবিরাম কথা চালাচালির প্রসঙ্গ উঠছে। আলিমুদ্দিনে যাচ্ছেন শিল্পপতি। আর ‘মউ’ সই করাতে শিল্পপতি খুঁজতে হচ্ছে মার্কসবাদী মুখ্যমন্ত্রীকে। সর্বত্র মেলবন্ধনের বাধ্যবাধকতা দেখা দিচ্ছে।

তবে কোনো কোনো মার্কস্বাদী চিন্তকের উত্তর মার্কসবাদী ধ্যান-ধারণায় উন্নীত হওয়ার বিষয়টি আমাদের অনেকখানি আশাবাদী করে তোলে। ধর্মীয় মৌলবাদীরা আবার কখনো কখনো উত্তরাধুনিকতার ভুল ব্যখ্যা দিয়ে এই তত্ত্বের প্রতি সমর্থন দিয়ে গেছেন।

উত্তরাধুনিক শিল্পসাহিত্যের আলোচনায় যাদুবাস্তবতার বিষযটি অনিবার্যভাবেই এসে যায়। সাহিত্যের, বিশেষ করে ফিকশনের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক ম্যাজিক রিয়ালিজম। ম্যাজিক রিয়ালিজম বা ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজম বা যাদুবাস্তবতা আসলে সেই জিনিস যে বিষয়ে পাঠক আগে থেকে অবগত নন, কল্পনার বাস্তবধর্মী বয়ান যা পাঠক বিশ্বাস করে ফেলে কিংবা বিশ্বাস করতে চায়। এটাকে অনেকেই ‘এনহ্যান্সড রিয়ালিটি’ বলতে চেয়েছেন। ইসাবেলা আলেন্দে যেমন বলেছেন, ‘যাদুবাস্তবতা হলো বাস্তব ও পরাবাস্তবের সংমিশ্রণ।’ এটি বাস্তবতার ভেতরে আরেক বাস্তবতা যা লেখকের বয়ান-ভঙ্গি ও দক্ষতার উৎকর্ষে বাক্সময় হয়ে ওঠে। ফ্যানটাসি কিংবা কল্পকাহিনীর সাথে একে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। লেখক যখন কোনো ফ্যান্টাসির বর্ণনা দেন, তিনি বিষয়টি যে অবাস্তব সে বিষয়ে স্পষ্ট আভাস দেন, কিংবা তার অবিশ্বাসকে বাক্সময় করে তোলেন। যাদুবাস্তবতার ক্ষেত্রে লেখকও পাঠকের সাথে চরিত্রগুলোর মধ্যে বিলীন হয়ে যান। ঘটনার সত্যাসত্যের ব্যাপারে পাঠক নিশ্চেষ্ট হয়ে যায় এবং বর্ণনার মায়াস্পর্শে পাঠকের কাছে তা সত্য হয়ে ওঠে। ১৯২৫ সালে ফ্রানজ রোহ (জার্মান সাংবাদিক ও চিত্রসমালোচক) মিউনিকে জার্মানির শিল্পীদের একটি চিত্র প্রদর্শনীর পর তাদের সেই শিল্পকর্মের আলোচনায় ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ টার্মটি প্রথম ব্যবহার করেন। এই শিল্পকর্মগুলো ছিল পোস্ট-এক্সপ্রেশনিস্টিক ফর্মের। এবস্ট্রাক্ট-এর বিপরীতে তিনি এই টার্মটি ব্যবহার করেন। এইসব চিত্রকর্মগুলোতে ছিল একধরনের স্বপ্নালু ভাব কিছুটা পরাবাস্তবতার ছোঁয়া :

Their work was marked by the use of still, sharply defined , smoothly painted images of figures objects depicted in a somewhat surrealistic manner. The themes and subjects were often imaginary, somewhat outlandish and fantastic and with a certain dream-like quality (Cuddon)

পরবর্তীতে চল্লিশের দশকে এর প্রয়োগ দেখা যায় আমেরিকার চিত্রকর্মে। ১৯৪৩ সালে ‘নিউইয়র্ক মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট’-এ যে চিত্র প্রদশর্নী হয়েছিল তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আমেরিকান রিয়ালিস্টস অ্যান্ড ম্যাজিক রিয়ালিস্টস’। তখন থেকেই এর সংক্রমণ ও বিস্তার বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার সাহিত্যে মূর্ত হয়ে ওঠে। হিস্পানি লেখকদের লেখায়ও এর প্রয়োগ দেখা যায়। চল্লিশের দশকের শেষের দিকে অস্ট্রিয়ান নভেলিস্ট জর্জ সাইকো (১৮৯২-১৯৬২) একধরনের ‘কোয়াসি সুররিয়ালিস্টিক’ ফিকশন প্রকাশ করতে থাকেন, যাকে তিনি ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে এই ধারণা পুরোপুরি প্রথম সাহিত্যে আসে কিউবান লেখক আলেহে কার্পেন্তিয়ারের (১৯০৪-৮০) মাধ্যমে ১৯৪৯ সালে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের লেখায় এর সার্থক প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে তার ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিট্যুড, লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা, আ ভেরি ওল্ড ম্যান উইথ এনোরমাস উইংস কিংবা কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে নি ইত্যাদি উপন্যাসে যাদুবাস্তবতার সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়। তার আগেও হোর্হে লুই বোর্হেস, মারিও ভার্গাস য়োসাসহ আরো অনেক লেখকের লেখায় যাদুবাস্তবতার খোঁজ পাওয়া যায়।

পৃথিবীর সবদেশের কথাসাহিত্যেই কারো-না-কারো লেখায় খুঁজলে এই যাদুবাস্তবতার হদিস পাওয়া যাবে। লেখকের নিজের অজান্তেই এটা হয়ত চলে এসেছে। বাংলা ফিকশনেও বঙ্কিম থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর, জগদীশ গুপ্ত, সতীনাথ ভাদুড়ী থেকে শুরু করে আজকের শূন্যের দশকের কোনো ফিকশন রচয়িতার লেখায় এই যাদুবাস্তবতার বিষয়টি খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু আধুনিক ফিকশনের একটি টেকনিক হিসেবে যে যাদুবাস্তবতা, তার কিছুটা প্রয়োগ বাংলা কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে কেবল শহীদুল জহিরের লেখায়ই পাওয়া সম্ভব। যদিও মার্কেসের মতো কিংবা ল্যাটিনো, আফ্রিকান কিংবা হিস্পানি লেখকদের মতো এর সার্থক প্রয়োগ তার লেখায় হয়ত মিলবে না।

পোস্টমডার্নিজম-এর প্রাণপাখির উড়ে চলার সানন্দ গতি লুকিয়ে রয়েছে পোস্টকলোনিয়ালিজম-এর মধ্যে। উপনিবেশ-উত্তর স্বাধীন দেশসমূহে উপনিবেশ কতর্ৃৃক আরোপিত ছকে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক কাঠামোটি ভেঙে দেশ-কাল ঐতিহ্যের মোহনায় দাঁড়িয়ে শিল্প-সাহিত্য করার তাগিদ দেখা গেল। বহুবাচনিক স্বর, লোকায়ত জীবনের বৈচিত্র্য নতুন ভাবে ও ভাষায় স্ফুরিত হলো আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা কিংবা এশিয়ায় :

Postcolonial literatures have emerged from heterogeneous linguistic sources comprised of indigenous languages (oral and written) which colonising languages have attempted to stifle. The opposition of language as stasis and language as growth parallels the conflict between political hegemony and human inventiven. (Postcolonial Literatures).

উপনিবেশ কীভাবে একটি জাতির সমগ্র জীবন-কাঠামোয় প্রভাব ফেলে, সেই বিষয়টি কলিম খানের কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘ইউরোপ কেবল ভারতে  উপনিবেশই স্থাপন করেনি। ভারতীয়দের জীবনের সর্বত্র তার ভাষায়, আচার ব্যবহারে, মনে, জীবিকায় শিল্পে সাহিত্যে এককথায় সমগ্র জীবনযাত্রায় উপনিবেশ স্থাপন  করেছিল।’ আফ্রিকার অনেকগুলো দেশেই আমরা লক্ষ করেছি কীভাবে উপনিবেশবাদীরা তাদের ভাষার আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সেইসব দেশের ভাষাকে পঙ্গু করে ফেলেছিল। ঔপনিবেশিক আধিপত্যে ভাষার যে রূপ আমরা দেখেছি, পরবর্তীতে এশিয়া-আফ্রিকাসহ পৃথিবীর নানা দেশে ভাষাকে নিজস্ব শেকড়ে দাঁড়াতে দেখেছি, দেখেছি ভাষার মুক্তি, পরাধীনতার বন্ধন থেকে, সা¤্রাজ্যবাদের আধিপত্য থেকে। নগুগির কথায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে :

We therefore learnt to value words for their meaning and nuances.Language was not a mere string of words. It had a suggestive power well beyond the immediate and lexical meaning.Our appreciation of the suggestive magical power of language was reinforced by the games we played with words through riddles, proverbs, transposition of syllables, or through nonsensical but musically arranged words.So we learned the music of language on top of the content.The language, through images and symbols, gave us a view of the world.But it had a beauty of its own.( The Language of African literature)

১৯৭২ সালের আগে সোমালিয়ায় সাহিত্য তৈরির উপযোগী কোনো ভাষারই অস্তিত্ব ছিল না । আফ্রিকার ক্ষেত্রে লিওপোল্ড সেডার সেঙ্ঘর, চিনুয়া আচেবে, গাব্রিয়েল ওকারা, আতুকেই ওকাই, নগুগি, ওলে সোয়িঙ্কা প্রমুখ লেখক আফ্রিকার নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে সাহিত্য করেছে, যাকে আমরা পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্য বলতে পারি। এডওয়ার্ড সাঈদ অবশ্য তাঁর কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম গ্রন্থে   ফেননের ‘নিড টু রিক্লেইম দ্য পাস্ট’ এর সূত্র ধরে ডব্লিউ. বি ইয়েটসকেও পোস্টকলোনিয়াল লেখক হিসেবে মনে করেছেন। পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্যের বিষয়টি চবঃবৎ ইধৎৎুর কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে :

Characteristically, postcolonial writers evoke or create a precolonial version of their own nation, reject­ing the modern and the contemporary, which is tainted with the colonial status of their countries. (Beginning theory)

ইউরোপিয়ান কলোনিস্ট লেখকরা পৃথিবীর বিশাল ভূখ-কে ভাবতো‘blank spaces, lands without narrative’’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এডওয়ার্ড সাঈদ যেমন বলেছেন, ‘… there has been massive intellectual-and   imaginative overhaul and deconstruction of western representation of the non-Western world. আফ্রিকার ক্ষেত্রে চিনুয়া আচেবে, নগুগি, ক্যারিবিয়ান কবি ডেরেক ওয়ালকট এবং ইন্ডিয়ান লেখিকা অনিতা দেশাই-এর লেখায় উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের পরিণত রূপের সন্ধান পাওয়া যায়। নগুগির কথায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে ইউরোপের চৌর্যবৃত্তি এবং আফ্রিকার যা যা করা জরুরি :

In the eighteenth and nineteenth centuries Europe stole art treasures from Africa to decorate their houses and museums; in the twentieth century Europe is stealing the treasures of the mind to enrich their languages and cultures. Africa needs back its economy, its politics, its culture, its languages and all its patriotic writers.

আমরা আগেই বলেছি, এ নিয়ে পশ্চিমে যেমন, তেমনি আমাদের বাঙালি চিন্তকদের মধ্যেও রয়েছে নানা বিতর্ক। পশ্চিমে কেউ কেউ ‘ইজ দেয়ার আ পোস্টমডার্নিজম? শিরোনামে গ্রন্থও রচনা করেছেন। আমাদের দেশেও অনেক লেখক-বুদ্ধিজীবী পোস্টমডার্নিজম-এর কোনো অর্থ খুঁজে পান না। এসব নিয়ে কথা আরো বাড়তেই পারে। তবে সেসব বিষয়ে আলোচনায় না গিয়ে এটুকু শুধু বলা যায় যে, পোস্টমডার্নিজমকে মহামিলনের সড়ক হিসেবে ভাবা যায়। পোস্ট-পোস্টমডার্নিজম-এর কথা বাতাসে ভাসতে শুরু করলেও সে বিষয়ে আমার নিজের আগ্রহ এখনো সামান্যই। সময় অনুভবের দরজায় কীভাবে ধরা দেবে, সেটি আমাদের সমূহ প্রস্তুতির বিষয়ও বটে।

ডানিয়েল বেলসহ অনেকে উত্তরাধুনিকতাকে আমেরিকার সমাজ-সংস্কৃতির বিষয়ে সীমাবদ্ধ রেখে আলোচনা করতে উদগ্রীব হলেও ইহাব হাসানসহ অনেক উত্তরাধুনিক ভাবুকই এটাকে শিল্পসাহিত্যের সৌন্দর্যের বিবেচনায় দেখতে চেয়েছেন। ইহাব হাসান উত্তরাধুনিকতাকে ‘ধ সড়াবসবহঃ ড়ভ ঁহসধশরহম’ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। লিওতার যেভাবে পোস্টমর্ডানের সহজ ব্যাখ্যায় ব্রতী হয়েছেন, সেটি আমাদের আধুনিকতাবাদী বোধের কাছে অনেকটাই অচেনা লাগে :

Simplifying to the extreme, I define postmodern as incredulity toward metanarratives.This incredulity is undoubtedly a product of progress in sciences: but that progress in turn presupposes it. To the obsolescence of the metanarrative apparatus of legitimation corresponds, most notably,the crisis of metaphysical philosophy and of the university institution which in the past relied on it.The narrative function is losing its functors,its great hero,its great dangers its great voyages,its great goal.It is being dispersed in clouds of narrative language elements- narrative, but also denotative, prescriptive, descriptive and so on.

আমাদের এখানে যেখানে আধুনিকতাবাদই পূর্ণতা পায় নি, সেখানে উত্তরাধুনিক চিন্তাকে অবান্তর ভাবা হলেও উদয় নারায়ণ সিংহসহ অনেকেই বলছেন এই অবস্থাতেও উত্তরাধুনিকতার উত্তরণ হতে পারে।

বিশেষ করে মডার্নিজম থেকে পোস্টমডার্নিজম পর্যন্ত যতগুলো শিল্প-সাহিত্য আন্দোলন আমাদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে আছে, এগুলো নিয়ে ব্যাপক পরিসরে লিখতে গেলে একটি গ্রন্থ রচনা ছাড়া তা শেষ হবে না। আজকের এ আলোচনায় ব্যাপক পরিসরে লেখার কোনো সুযোগ নেই। মডার্নিজম এবং পোস্টমডার্নিজম নিয়ে নানা দেশের পন্ডিতদের মধ্যে অনেক তর্ক-বিতর্ক, বাদ-বিতন্ডা হয়েছে এবং এসব নিয়ে শতশত গ্রন্থও রচিত হযেছে। সুতরাং এই তত্ত্বকে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের আলোকে আলোচনা করা মুশকিল। সমীর রায়চৌধুরীর মতে :

পোস্টমডার্ন চিন্তাচেতনা মূলত ব্রহ্মবাদী। অখ- চেতনায় ভরসা রাখে। ডেভিড বম তৃতীয় তরঙ্গের বিজ্ঞানকে বলেছেন পোস্টমডার্ন বিজ্ঞান।এই বিজ্ঞান সনাক্ত করতে চায় অখ-বোধক চেতনার লক্ষণগুলি।গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থয়োরি ব্রহ্মবাদীতার বৈজ্ঞানিক স্বরূপ।এমনকী সম্প্রতি মণি ভৌমিকএই একই কথা বলেছেন।যা পরিব্যাপ্ত,অনির্ণেয়, রৈখিক যুক্তির বাইরে।আর ঠিক একই কথা বলা হচ্ছে কবিতার লক্ষণ সম্পর্কে।

পশ্চিমে যখন শিল্প-সাহিত্যের পাঠ বদলে যায়, পরিবর্তিত হয় সামূহিক নান্দনিক বোধ তার অনেক পরে সেই পরিবর্তনের হাওয়া আমাদের গায়ে লাগে। সেখানে যখন পোস্টমডার্ন, পোস্টইন্ডাস্ট্রিয়াল যুগের বাতাসে ওদের শিল্পসাহিত্যে এসেছে পরিবর্তনের জোয়ার, তখন আমাদের হিসেব কষে দেখতে হবে আমরা আজকের এই সমাজবাস্তবতা নিয়ে কোন যুগে অবস্থান করছি। পাশ্চাত্য শিল্পদর্শন কিংবা নন্দনতত্ত্বের একটি প্রভাব যে থাকবে (যেটা ঐতিহাসিক কারণেই অনস্বীকার্য) সেটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, আমরা তা কতটুকু গ্রহণ করবো। পাশ্চাত্যের অনুকরণে শিল্পসাহিত্যের ফর্ম পাল্টিয়ে রাতারাতি উত্তারাধুনিক হওয়ার মধ্যে বিস্তর ফাঁক থেকে যায় এ কারণে যে, এই ভূগোলের মানুষের মানসভূমির যে যুগ-বাস্তবতা সেটাকে তো আর দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। সুতরাং পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান-নন্দনকলা পাঠ যেমন অপরিহার্য, তেমনি মনে রাখা দরকার যে, আমাদের নিজস্ব শেকড়-ঐতিহ্যে, আমাদের সাংস্কৃতিক আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠবে আমাদের কবিতা কিংবা অন্যকিছু। পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী স্বার্থনির্ভর দর্শন কিংবা নন্দনকলার স্বরূপাটাও আমাদের কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার।

জীবনানন্দ দাশের ‘কবিতার কথা’য় কবিতার নানাদিক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আধুনিক-উত্তর সময়ের কবিতা নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আধুনিকদের কাল কেটে গেলে আরেক রকম স্বতন্ত্রতায় দাঁড়াবে কবিতা; সে কবিতাকে গ্রহণ করবার জন্য অনুভূতি ও আলোচনা ঠিক আজকের ভাবনা বিচারের কোণ থেকে কাজ করতে পারবে না।’ (কবিতার কথা : পৃ. ৯৮)। জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথের কবিতায় দেখেছিলেন একটি বিস্তৃত যুগের প্রাণ পরিসর এবং এমন অনেককিছু যা সমায়াতীত। তপোধীর ভট্টাচার্য জীবনানন্দ দাশকে আমাদের প্রথম উত্তরাধুনিক কবি ও ঔপন্যাসিক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এই বিবেচনার বিষয়ে সমালোচকদের সবাই যে একমত হবেন, সে রকম ভাবাটা ঠিক হবে না, তবে তাঁর যুক্তির সততায় বিশ্বাস রাখা যায়। ‘… ইতিহাস ভাবাদর্শ-প্রগতি-সত্য প্রভৃতির উদ্ধত মৃত্যুঘোষণার বিরুদ্ধে পুনরাবিষ্কৃত জীবনের অপরাজেয় মহিমার প্রতিষ্ঠা। খ-কালের প্রতি একমাত্রিক অভিনিবেশ থেকে মহাসময় ও মহাপরিসরের নবায়মান উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠাই বঙ্গজ উত্তর আধুনিকতার অন্বিষ্ট। এই নিরিখে জীবনানন্দই বাঙালি জীবনের প্রথম উত্তর-আধুনিক চেতনাসম্পন্ন কবি এবং প্রথম ঔপন্যাসিকও।’ (জীবনানন্দ, ‘আধুনিকতা পেরিয়ে’, একবিংশ)। জীবনানন্দ দাশ একইসাথে আধুনিকতাবাদী ও উত্তরাধুনিকতাবাদী কবি এ বিষয়ে তপোধীর ভট্টাচার্য বিশদ আলোচনায় যাননি। পরবর্তীতে এই বিষয় নিয়ে অন্য কোনোখানে আলোচনা করার ইচ্ছে রয়েছে। আমরা আগেই বলেছি উত্তরাধুনিকতা কোনো সাহিত্য আন্দোলনে যেমন পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় নি, তেমনি এর বিস্তৃত ইশতেহারও লিখিত হয়নি এবং সেটি সম্ভবও নয় একারণে যে অনেকানেক বিষয়ের সমন্বয়ের বিষয়টি অনেকখানি জটিলই বটে যার অনেক বিতর্ক পেরিয়ে তীরে ভেড়া মুশকিল। তবু তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে পশ্চিমে কিংবা ভারতবর্ষের যে পোস্টমডার্নিজম-এর অবয়ব আরো আলোকিত হচ্ছে, এটিকে সদর্থকভাবে গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

আজকে আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা নিয়ে যে বিতর্ক সাম্প্রতিক সময়ের কবিতাকে আমরা আধুনিক বলবো না উত্তরাধুনিক বলবো এর একটা সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। আর তা না হলে কবিতা আলোচনার বিষয়টি গোলমেলে কিংবা রক্ষণশীল  হয়ে পড়বে। ‘পোস্টমডার্ন কবিতা অভেদ, অখ-তা মহাসাম্যের দ্বারা প্রতিস্থাপিত। বাইনারি অপোজিট বা বৈপরীত্যবোধ দিয়ে তাকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। আধুনিক কবিতায় ছিল হিউম্যানিস্ট চেতনার প্রতিফলন। সেখানে মানুষের জয়গান গাওয়া হয়েছে। আজ কীট-পতঙ্গ, পশুপাখি, গুল্মলতা, কাপ-ডিস-চামচ, ফ্রিজ, ডিনার, টেবিল, অ্যাসট্রে, নাকছাবি, ওয়েবসাইট, আলুচাষ, যতিচিহ্ন সবই কবিতার বিষয়। একটি মাত্র দিক তার লক্ষ নয়। কবি বিদিশামশগুল। … বিষয় কেন্দ্রিকতার অভাব … যুক্তি কাঠামোর অনুক্রম অনুপস্থিত … বহু রৈখিক, বহু কৌণিক, বহুত্ববাদী ও বিদিশাময়।’ (‘পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতার ভূমিকা’ : প্রভাত চৌধুরী)। এসবের বাইরেও অনেককিছু আছে যা পোস্টমডার্ন কবিতার পরিসরে যুক্ত হয়েছে।

ঔপনিবেশিকতার শিল্পভাষা ও চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে না আসতে পারলে উত্তরাধুনিক সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে না। এই বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন। অঞ্জন সেনের মতে :

ঔপনিবেশিকতা একটি জাতির মেরুদ- ভেঙে দেয়, সমাজ-সংস্কৃতি,শিল্প-সাহিত্য চেতনার যে স্বাভাবিক গতি তা ধীরে ধীরে কৃত্রিমতা দিয়ে ঢেকে দেয়। ১৯ শতকে বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদ এরকমভাবে বাঙালির মেরুদ- ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিজ্ঞান আর কারিগরির লোভ দেখিয়ে। সে সময়ে অগ্রসর বাঙালি বদ্ধিজীবীরা সবাইএই ঔপনিবেশিকতার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি কিন্তু এক বিপুল অংশ আত্মসমর্পণ করেছিলেন, আজকের বাংলা সাহিত্য তার থেকে মুক্ত হয় নি।

সংশ্লেষণধর্মী ভাবনা-চিন্তার মধ্যে উত্তরাধুনিকতার বীজ নিহিত। অ্যান্টিকলোনিয়াল মানসিকতার মধ্যে এর মৌল দিগন্ত উন্মোচিত। সাবঅল্টার্ন ভাবুকতার মধ্যে এর স্পিরিটটা খুঁজে পাওয়া যাবে এবং আমাদের মিথ, পুরাণ লোককথা রূপকথা নতুনভাবে কবিতা কিংবা সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হবে আমাদের নিজস্ব সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে উত্তরাধুনিকতার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় আগ্রহী হতে হবে। পশ্চিমী ছকে নয় উত্তরাধুনিকতাকে আমাদের হাজার বছরেরও বেশি সময়ের বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আলোকে  গুরুত্ব দিতে হবে, যে আধুনিকতার গায়ে উপনিবেশের চাদর জড়ানো, সেই আধুনিকতার প্রতি আমরা ক্রমশ আগ্রহ হারাচ্ছি। আধুনিকতার চিহ্ন কিংবা লক্ষণগুলো আজ আর আমাদের কাছে তেমন আবেদন রাখে না, কিংবা প্রাচীন বলে মনে হয় কখনো কখনো। সুতরাং, উত্তরাধুনিকতার একটি সদর্থক প্রণয়ের দিকে আমাদের নতুন যাত্রার এই আয়োজনকে আরো বেগবতী করার মধ্য দিয়ে শিল্পসাহিত্যের পথকে নতুন আলোর সন্ধান দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক মিথস্ক্রিয়া ও সময়ের বিবর্তনে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নানান আবিষ্কার ও বৈভবে আমাদের  ভাষার ভেতরেও ঢুকে গেছে অজ¯্র অচেনা ন¤্র আলোর রেখা ও সংকেত। ভাষারও রয়েছে অবিরাম যাত্রা, এই যাত্রার সাথে এগোতে না পারলে বড় মাপের লেখক হওয়া যায় না। তাই কবিতা কিংবা সাহিত্যের নানা শাখায় সিনট্যাক্টিক আয়োজনে ভাষার চেহারাটা আর আগের মতো থাকছে না ( সিরিয়াস ও কসমোপলিটন লেখকদের বেলায় বিষয়টি দেখা যেতে পারে)। এই বোধ যত গভীর হবে ততই বোঝা যাবে উত্তরাধুনিকতার মর্মকথা। একথা ঠিক যে, তত্ত্ব জেনে বা মুখস্থ করে শিল্পসাহিত্য হয় না, তবে এ-ও সত্যি যে সৃষ্টিশীল মানুষদের যে কোনো সাহিত্যতত্ত্ব কিংবা সাহিত্য-আন্দোলনের বিষয়গুলো জেনে রাখা ভালো। এতে বরং মঙ্গলই বেশি।

আমরা বার বারই বলার চেষ্টা করেছি উত্তরাধুনিতা আজও একটি বিতর্ক এবং এই বিতর্কের শেকড়ও অনেকদূর। এতসব পরেও বলা যায় পোস্টমডার্নিজম নিয়ে আদৌ কিছু বলা হলো কিনা। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে পোস্টমডার্নিজম-এর ব্যাপকতা ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা আমার মতো সামান্য মানুষের পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব। এখানে কেবলই একটি আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। পশ্চিমবাংলা কিংবা ভারতের অন্যান্য জায়গায় এই তত্ত্ব নিয়ে একসময় ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক হেেয়ছে এবং তা এখনো চলমান। বাংলাদেশে খুবই অল্প সংখ্যক চিন্তক এ নিয়ে লিখেছেন। আমি আশা করবো, এই তত্ত্ব নিয়ে আমাদের দেশের, বিশেষ করে তরুণ ভাবুক ও চিন্তকদের মধ্যে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আরো উৎসাহ জাগবে এবং উত্তরাধুনিকতার বিষয়টি বিতর্কের মধ্যেই এগোতে থাকবে। বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যতত্ত্ববিদ উদয় নারায়ণ সিংহ উত্তরাধুনিকতা নিয়ে বেশকিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। তাঁর কথা দিয়েই আজকের  এ প্রবন্ধের সমাপ্তি টানছি :

আজ যা উত্তরাধুনিক কাল তা আমাদের ঐতিহ্যে ও পরম্পরার অংশ, ঐশ্বর্য হতে পারে কিন্তু তাকে অবসরকালের তুলনায় অনাধুনিক বলা অসম্ভব। এই কারণেই ‘আধুনিকতা’-র তুলনায় ‘উত্তর আধুনিকতা’ অপেক্ষাকৃত কালছিন্ন বলবো। … বরং, উত্তর আধুনিকতা কবিতার গল্পে গাথায় সর্বত্র একটা সৃজ্যমান লক্ষ্যবিশেষ যেখানে পৌঁছনো সাধনা ও গৌরবের বিষয়। বরং উত্তর আধুনিকতা যৌবন ও প্রজ্ঞানের সমন্বয়ে জাত একটি আন্দোলন বলা যায় যা স্মৃতিশীল সভ্যতা মিথশ্রুতি ও প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকারে গাঁথা এবং এসবেরই মূল্যায়ন ও মূল্যমান নিরূপণ নির্ভর। (উত্তর আধুনিকতা : বাংলা কবিতার প্রাকৃতায়ন, ১৯৮৭)

উৎস

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “আধুনিক কাব্য” ‘সাহিত্যের পথে’ কলকাতা ১৪১৪

২. Astradur Eysteinsson ‘The Concept of modernism’ CornellUniversity Press, 1990

  1. 3. Nial Lucy ‘Postmodern Literary Theory: An Introduction Blackwell, 1997
  2. 4. A . Cuddon ‘Dictionary of Literary Terms And Litrary Theory’, 1999
  3. Peter Barry, Beginning Theory, New York 1995
  4. 6. Michael Parker & Roger Starkey Postcolonial Literatures, London 1995
  5. 7. An Outline of American Literature, USIA 1989
  6. 8. Edward W. Said “Culture and Emperialism” London, 1993
  7. 9. Ihab Hasan, The Dismemberment of Orpheus: Towards a Postmodern Literature Madison, 1982
  8. 10. Ngugi wa Thiong’o, Decolonising the Mind, Zimbabwe, 1987
  9. mgxi ivq†PŠayix ÔDËivaywbK cÖeÜ msMÖnÕ, KjKvZv eB‡gjv 2002
  10. AÄb †mb Ômvs¯‹…wZK eqvb: DËi AvaywbKZv ev ms‡kølYev`, 1989
  11. Jean Francois Lyotard ‘The Postmodern Condition:A Report on Knowledge (1979)
  12. evsjv KweZvi cÖvK…Zvqb : DËi AvaywbK KweZv (m¤úv`bv: ex‡i›`ª PµeZ©x, 1991)
  13. 15. Ngugi Wa Thiong’o, Post Modernism and other writings
  14. GKwesk, †Lv›`Kvi Avkivd †nv‡mb m¤úvw`Z, msL¨v : 22, b‡f¤^i 2003
  15. Michael Parker & RogerStarkey, Postcolonial Literatures, London 1995
  16. Roland Barthes, The death of the Author’, in Image-music-Text (NewYork, 1977)

১৯. প্রভাত চৌধুরী, পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতা, কলকাতা, ২০০২

***************************************

 

উত্তরাধুনিক সাহিত্যের সুলুক-সন্ধান
শরীফ আতিক-উজ-জামান

যে কোনো মতবাদকে ভারি, দুর্বোধ্য, দূরবর্তী এবং প-িতপ্রবরদের চর্চার বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার একটি বিশেষ প্রবণতা আমাদের মাঝে বিদ্যমান। আবার অনেকের জ্ঞানের অহংকার মতবাদকে জটিল করে উপস্থাপনে উৎসাহ জোগায়। ফলে গড়পরতা মেধার মানুষের কাছে তা অগম্য এক বিষয় হিসেবেই রয়ে যায়। দার্শনিক মতবাদে যুগবৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি অপরিহার্য এক বিষয়। মানুষ সচেতন বা অবচেতনভাবে সেই বৈশিষ্ট্যের মাঝেই বসবাস করে। তারপরও তার চর্চা খুব সাবলীল ও ব্যাপক, এমন নয়। সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যতত্ত্ব হিসেবে এক সময় উত্তরাধুনিকতাবাদের ব্যাপক উদ্ধৃতি লক্ষ করা গেছে এবং শিল্প, সাহিত্য, সামাজিক বিজ্ঞান, স্থাপত্যকলা, ফ্যাশন, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ইত্যাদির ক্ষেত্রে তা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই মতবাদ কারো কারো মতে এখনো চলমান, আবার কেউ কেউ মনে করেন তা শেষ হয়ে গিয়ে উত্তর-উত্তরাধুনিক যুগবৈশিষ্ট্য শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ, বিমানবিকীকরণ ও পুঁজিবাদের ভয়াবহ আগ্রাসনের সাথে এর গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

উত্তরাধুনিকতার সাথে আধুনিকতার যোগসূত্রের বিষয়টি নামের মাঝেই প্রকাশিত। বিশ শতকের প্রথম পাদে শুরু হওয়া আধুনিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় উত্তরাধুনিক শিল্প ও সাহিত্য গতিধারার সূচনা হয়েছে। কিছু নতুন বৈশিষ্ট্যের সংযুক্তি ও কিছু প্রাচীন বৈশিষ্ট্যের সংস্কার এই আন্দোলনকে নতুন অবয়ব দান করেছে। সেই সময়ে ভার্জিনিয়া উলফ, জেমস জয়েস, টিএস এলিয়ট, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, উইলিয়াম ফকনার প্রমুখ পরীক্ষামূলকভাবে নানা শৈলী নিয়ে কাজ করতে শুরু করলেন। আধুনিকতাবাদীরা সত্যানুসন্ধানে ব্যক্তির চৈতন্যের ওপর নির্ভর করেছেন। আর তাই চেতনাপ্রবাহ (ঝঃৎবধস ড়ভ ঈড়হংপরড়ঁংহবংং), দৃষ্টিভঙ্গি (চড়রহঃ ড়ভ ারব)িএর মতো শৈলী সৃষ্টি হয়েছে। তারা সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিসত্তার ওপর নির্ভর করেছেন। হেমিংওয়ে মনে করতেন যে একজন তরুণ লেখকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, যা তিনি সত্য বলে জেনেছেন তার বদলে তিনি যা অনুভব করেন সঠিকভাবে তার সত্যতা যাচাই করা। কিন্তু উত্তরাধুনিকতাবাদে ব্যক্তিসত্তাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। ভণিতার ভিতর দিয়ে মানুষ নিজের যে প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম, প্রকৃতপক্ষে সেটাই তার আসল রূপ। সুতরাং ভণিতা করার সময় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমরা আমাদের থেকেও বৃহৎ শক্তির হাতে জিম্মি হয়ে আছি। বিশেষ ¯œায়ুবিক তাড়নায় আমাদের সৃষ্টি হয়েছে।

কুর্ট ভনিগার্টের উপন্যাসে দেখা যায় কোনো চরিত্র বা কোনো নাটকীয় সংঘাত নেই, কারণ প্রতিটা মানুষ এতটাই অসুস্থ এবং বৃহৎ শক্তির হাতের ক্রীড়ানক যা মূলত যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট। তাই তারা কোনো চরিত্র হয়ে উঠতে পারে না। আধুনিকতাবাদে শিল্প ধর্মের স্থান গ্রহণ করেছে। কিন্তু ওয়ালেস স্টিভেন্স-এর মতো উত্তরাধুনিক কবিরা মনে করেন যে অবিশ্বাসের এই যুগে কবির দায়িত্ব হলো তার নিজের মতো করে বিশ্বাসের তৃপ্তি জোগানো। আর ভাষা ব্যতিরেকে আমরা বাস্তবতা থেকে কোনো ধারণা লাভ করি না। ভাষা শুধু বাস্তবতা বর্ণনা করে না, তাকে অবয়বও দান করে। নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে মানুষ যা চিন্তা করে এবং যেভাবে জগত দেখে ভাষা সেইভাবে তাকে অবয়ব দান করে।

আধুনিকতাবাদীরা হাহাকার করেন যে কেন্দ্র কোনো কিছু ধরে রাখতে পারে না, সব ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কিন্তু উত্তরাধুনিকতাবাদীরা মনে করেন যে সত্য ও ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রাচীন ধারণা আদতে মিথ্যা। এইসব ধারণা থেকে মুক্ত হওয়াই ভালো। কেন্দ্রের সবকিছু ভেঙেচুরে যাওয়াতে হাহাকারের কিছু নেই। সেটা একদিক দিয়ে ভালোই। উভয় মতবাদ উঁচু ও নিচু শিল্পের মধ্যকার বিভেদরেখা মুছে দিতে চেয়েছে। উত্তরাধুনিকতা আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নিচু শিল্পকে উঁচু শিল্পের সাথে, অতীতকে ভবিষ্যতের সাথে এবং সাহিত্যের এক শাখাকে আরেক শাখার সাথে মেশাতে চেয়েছে। ভিন্নধর্মী ও সঙ্গতিহীন উপাদান মিশ্রণের মধ্য দিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক রূপ (চধৎড়ফু) নির্মাণের ঝোঁক কিংবা অন্য শৈলীর অনুকরণ (চধংঃরপযব) উভয় মতবাদেই বহুল ব্যবহৃত। এই ধরনের কলকব্জা ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো পাঠককে মনে করিয়ে দেওয়া যে এই রচনা বা সৃষ্টি বাস্তব নয়; কাল্পনিক ও আরোপিত। আধুনিক ও উত্তরাধুনিক রচনা খ-িত, অসম্পূর্ণ এবং খুব সহজে একটি সামগ্রিক ধারণা উপস্থাপন করে না। এই কারণেই এই রচনাগুলো অস্পষ্ট এবং তার বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব। এখানে উপস্থাপিত বিষয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বা জীবনের একটিমাত্র লক্ষ প্রকাশ করে না। বিমানবিকীকরণের মধ্য দিয়ে বিশেষ বৈশিষ্ট্য হারানোর পরিবর্তে তা হয়ে ওঠে কোনো যুগ বা সভ্যতার প্রতিনিধি। যেমন, এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’র টাইরেসিয়াস।

আধুনিকতাবাদ বর্তমান বিশ্বকে বিয়োগান্ত মনে করে বিচূর্ণিত ও বিকেন্দ্রিভূত হিসেবে তুলে ধরে। জীবনের সংহত ও কেন্দ্রীয় রূপ হারিয়ে যাওয়ার জন্য বেদনাবোধ করে এবং তাদের মতে শিল্প আধুনিক জীবনের সর্বস্তরে সংহতি, ঐক্য, ধারাবাহিকতা ও হারানো অর্থ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। আধুনিক বিশ্ব নিষ্ফলা বলে এলিয়ট হাহাকার করে উঠেছিলেন এবং ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতার কাঠামোতে সেই বিচ্ছিন্নতা, বিচূর্ণন প্রত্যক্ষ করা যায় এবং তিনি জীবনের হারানো অর্থ ও সংহতি পুনরুদ্ধারে প্রাচ্য সংস্কৃতির কাছে ছুটে আসেন।

উত্তরাধুনিকতায় বিচূর্ণন ও বিচ্ছিন্নতা মোটেও বিয়োগান্ত নয়, বরং এই মতাদর্শ বিচূর্ণনকে স্বাগত জানায়, কারণ বিচূর্ণন ও বিকেন্দ্রিকতা অস্তিত্ব ধরে রাখার সম্ভাব্য পথ; তা বাস্তবতা থেকে পালাতে উৎসাহ জোগায় না। এখানেই উত্তরাধুনিকতাবাদ ও উত্তরকাঠামোবাদ একসাথে এসে মিশেছে। এই দুই মতবাদই সুসংহত কেন্দ্রের ধারণাকে খারিজ করে দেয়। দেরিদা বলতে চেয়েছেন যে কেন্দ্র প্রান্তের দিকে এবং প্রান্ত কেন্দ্রের দিকে সর্বদা সঞ্চরণশীল। অন্য অর্থে, কেন্দ্র, যা ক্ষমতার উৎস, প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাশীল নয়। তা ক্রমেই ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে, আবার প্রান্ত যাকে ক্ষমতাহীন মনে করা হয় তা ক্ষমতাশীল হয়ে উঠতে চায়। তাই বলা চলে যে কেন্দ্র বলে কিছু নেই অথবা অনেকগুলো কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু এভাবে কেন্দ্রকে খারিজ করে দেওয়ার ফলে কেন্দ্র ক্ষমতা ধরে রাখতে কিংবা আরো ক্ষমতাবান হতে মরিয়া হয়ে ওঠে। একে দেরিদা বলছেন উরভভবৎধহপব। এই ফরাসি শব্দটি দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে ঐক্য, প্রচলিত অর্থ ও সংহতি অনবরত বদলে যায়।

সংহতি ও মিলের বিষয়ে অবিশ্বাস ও সন্দেহ উত্তরাধুনিকদের সাথে আধুনিকপন্থীদের আরেকটি মৌলিক পার্থক্য। আধুনিকতাবাদীরা মনে করেন সঙ্গতি বা মিল থাকাটা সম্ভবপর, আর তাই তারা যুক্তি ও শৃঙ্খলার ওপর জোর দেন। যত যুক্তি তত শৃঙ্খলাআধুনিকতাবাদীদের এই বক্তব্যের সাথে উত্তরাধুনিকতাবাদীরা একমত নন। তাদের মতে সমাজের কোনো অংশে শৃঙ্খলা থাকলে অপর অংশে প্রবল বিশৃঙ্খলার অস্তিত্ব নজরে পড়ে। যুগল-বৈপরীত্যের (ইরহধৎু ঙঢ়ঢ়ড়ংরঃরড়হ) কথা বলতে গিয়ে কখনো কখনো তারা চরম নৈরাশ্যবাদীর মতো বলে থাকেন যে জগতের সবকিছুতেই বিশৃঙ্খলা।

আধুনিকতাবাদীদের মহান বৃত্তান্তের (সবঃধহধৎৎধঃরাব) ধারণাকে উত্তরাধুনিকরা খুব যৌক্তিকভাবেই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন না। তারা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন এবং বিনির্মাণ করেন। কোনো সমাজ বা সংস্কৃতি তার বিশ্বাস ও চর্চা নিয়ে অনবরত যে গল্প বলে চলে সেটাই মহান বৃত্তান্ত। যেমন, ভারত সবসময় নিজেকে একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে থাকে, কিন্তু সেখানে অজ¯্র গণতন্ত্র-বিরোধী ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠী আছে যারা বিপরীত ¯্রােতে চলে। তার অর্থ দাঁড়ায়, ভারত একটি মিথ্যা বিশ্বাসের চর্চা করে। গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এখানে ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মহান বৃত্তান্ত বা সবঃধ-হধৎৎধঃরাব। মহান-বৃত্তান্ত আসলে একটি মহৎ প্রচারণা, কিন্তু তা সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি মিথ্যা ধারণা তুলে ধরে। উত্তরাধুনিকতাবাদীরা উপলব্ধি করেন যে মহান-বৃত্তান্ত সমাজের বিরোধিতা, অস্থিরতা বা অসঙ্গতির প্রসঙ্গ লুকিয়ে রাখে, অস্বীকার করে কিংবা সেই বিষয়ে পরিপূর্ণ নীরবতা পালন করে। উত্তরাধুনিকতাবাদ উৎসাহ জোগায় সীমিত বয়ান (সরহর-হধৎৎধঃরাবং) উপলব্ধিতে যার মাধ্যমে ছোট ছোট সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চা বা অভ্যাস, স্থানিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি উঠে আসে কোনো প্রকার সর্বজনীনতার ভণিতা ছাড়াই। কোনো চর্চার শেষ কথা বলে কিছু নেই এবং ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির মহান বৃত্তান্তের পুরোটাই শাসকদের গালগল্প যা মিথ্যা ও অসম্পূর্ণ সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

উত্তরাধুনিকরা সচেতন ও পদ্ধতিগতভাবে সাহিত্যে বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গবঃধ-ভরপঃরড়হ পদটি ব্যবহার করছেন। কথাসাহিত্যের মৌলিক কাঠামো নিরীক্ষার সাথে সাথে তারা গ্রন্থে বর্ণিত কাহিনির বাইরের জগতের সম্ভাব্য কল্পিত বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে থাকেন। সাহিত্য সবসময় তার নিজস্ব কৃত্রিম জগতের দিকে মনযোগ কাড়তে চায়। নিজস্ব কল্পিত জগত সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে। পাঠক বর্ণিত চরিত্রের মধ্যে সর্বদা নিজের প্রতিফলন দেখতে পান। সবসময় মনে মনে বলেন, ‘এতো আমি!’ সৃষ্ট চরিত্ররা বৈচিত্র্যহীন ও নীরস। তারা ব্যক্তিত্বহীন এবং গভীর অনুভূতি থেকে তাদের অবস্থান অনেক দূরে। ব্যক্তির বিষয়ে উত্তরাধুনিকরা সবসময়ই সংশয় প্রকাশ করেন এবং তাদের লেখনীতে পারমানবিক বিস্ফোরণ, হলোকাস্ট ইত্যাদি মহাপ্রলয়তুল্য ঘটনাপ্রবাহের উল্লেখ থাকে।

একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত বাস্তবতাকে বিনির্মাণের মাধ্যমে উত্তরাধুনিকতাবাদ ভাষার ধারণায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আধুনিকপন্থা অনুযায়ী, বাস্তবতা ও যৌক্তিক মন তুলে ধরার ক্ষেত্রে ভাষা একটি স্বচ্ছ ও যৌক্তিক মাধ্যম। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু উত্তরাধুনিক মতবাদ অনুযায়ী, গভীরতা বলে কিছু নেই, আছে শুধু ভাসা ভাসা উপরিতল। ফরাসি দার্শনিক বদ্রিলার্দ উত্তরাধুনিক উপরিতলের সংস্কৃতিকে ভ্রান্ত প্রতিমূর্তি (ংরসঁষধপৎঁস) বলেছেন। মিডিয়া ও অন্যান্য আদর্শবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো একটা ভুয়া ও দূরবর্তী বাস্তবতা তুলে ধরতে চায়। এটা শুধু অনুকরণ বা নকল নয়, বরং ভুয়া আদলে মূলের একটি বিকল্প নির্মাণ করে। সমসাময়িক জগত ভুয়া, কারণ সেখানে ভুয়া প্রতিরূপের মাধ্যমে প্রকৃত বাস্তবতার প্রতিস্থাপন ঘটে থাকে। যেমন, উপসাগরীয় যুদ্ধের খবরাখবর আমরা যা মিডিয়ার মাধ্যম পেতাম তার সাথে প্রকৃত ঘটনার খুব সাদৃশ্য ছিল না। ওই যুদ্ধের ভুয়াচিত্র তখন বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সেগুলো বাস্তব অপেক্ষা বেশি বাস্তব মনে হতো। উত্তরাধুনিক আদর্শে মূল বলে কিছু নেই, সব ভুয়া প্রতিরূপ। কোনো নির্দিষ্ট ভূখ- নেই শুধু মানচিত্র ছাড়া; কোনো বাস্তবতা নেই শুধু ভণিতা বা অনুকরণ ছাড়া। বদ্রিলার্দ আরো উল্লেখ করেছেন যে আমরা বাস্তবতা ও কৃত্রিমতার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছি যেভাবে জীবনের বাস্তবতার সাথে আমাদের কোনো সংশ্রব নেই। আবার যেসব পণ্য আমরা ব্যবহার করি সেগুলোর বাস্তবতা থেকেও দূরে সরে গেছি। যদি গণমাধ্যম উত্তরাধুনিক কালের একটি বড় চালিকাশক্তি হয়ে থাকে, তবে বহুজাতিক পুঁজি ও বিশ্বায়নও সেই যুগের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। উত্তরাধুনিকতা পুঁজির দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে গিয়ে সম্পৃক্ত হয়েছে। ১৮-১৯ শতকের প্রথম পর্যায়ের বাজার অর্থনীতি বাষ্পচালিত যানের মতো প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে সাথে নিয়ে চলেছে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর সূচনাকালে তা বিদ্যুৎ ও জ্বালানিচালিত মোটরগাড়ির সাথে একচেটিয়া পুঁজি ও আধুনিকতা দেখতে পেয়েছে।

উত্তরাধুনিক যুগ পারমাণবিক, ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি ও ভোক্তাপুঁজির সাথে যুক্ত হয়েছে যেখানে বিপণন, বিক্রয় ও ভোগ উৎপাদনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে আসছে। বিমানবিকতা ও বিশ্বায়নের খপ্পরে পড়ে বহুজাতিক বিপণনের পক্ষে ব্যক্তি ও জাতিগত পরিচয় মুছে যাচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে উত্তরাধুনিকতাবাদ লায়োটার্ড, বদ্রিলার্দ, জেমারসন, হেবারমাস, ফুকো প্রমুখের কাছে ঋণী। দেরিদার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। নারীবাদ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকোণ থেকেও উত্তরাধুনিকতাবাদকে দেখা হয়েছে। একেবারে বাঁধা ছকের মধ্যে ফেলে এই দর্শনকে দেখার সুযোগ নেই, কারণ এখানে শেষ কথা বলে কিছু নেই। এই তত্ত্ব নির্মাণে বহু বিষয়ের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।

উত্তরাধুনিকতাবাদ বাস্তবসত্যকে অস্বীকারের মাধ্যমে নির্মাণবাদী (পড়হংঃৎঁপঃরারংস) তত্ত্বকে অস্বীকার করেছে এবং সবকিছুই আদর্শিকভাবে নির্মিত এই ধারণাকে খারিজ করে দিয়েছে। উত্তরাধুনিকতাবাদ বলে যে গণমাধ্যম আমাদের ‘পরিচয় নির্মাণ’ ও ‘বাস্তবতা’ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানের ইলেকট্রোনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রতি এই মতবাদ সক্রীয় সাড়া প্রদান করে এবং জগতের প্রাচীন পদ্ধতির বিবর্তন প্রত্যাশা করে। নির্মাণবাদ সবসময়ই আপেক্ষিকতার পথে হাঁটে। আমাদের পরিচয় নির্মিত হয় এবং সামাজিক পরিবেশসূত্রে বদলে যায়। আর তাই বহু ও বিচিত্র পরিচয়, নানাবিধ সত্য, নৈতিকসূত্র এবং বাস্তবতা ধারণের সুযোগ থাকে। বস্তুনিষ্ঠ সত্যের কোনো অস্তিত্ব নেই এবং উত্তরাধুনিক-তত্ত্ব অনুযায়ী তার মাঝে ব্যক্তির বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকে। সত্যের অজ¯্র চেহারা রয়েছে যা গতানুগতিক। ব্যক্তির বিশ্বাস বা ধারণার ওপর নির্ভর করা বা প্রভাবিত হওয়ার অর্থ নতুন স্থানিক ও বিশেষ অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়। আর তা মোটেও সর্বজনীন নয়, বরং বিমূর্ত। তা মহান-বৃত্তান্ত নয়, সীমিত বয়ান।

চূড়ান্তভাবে উত্তরাধুনিকতাবাদ সবকিছু বিশ্লেষণে বিনির্মাণবাদের ওপর নির্ভর করে। উত্তরাধুনিকতাবাদ সবসময় সমালোচকের আক্রমণের শিকার হয়েছে। এই মতবাদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ‘অবিশ্বাস’ যা সমাজ ও ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা অস্বীকার করে। যেমন, এটা দাবি করা সহজ যে উপসাগরীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। কিন্তু অজ¯্র হত্যাকা-, উদ্বাস্তু মানুষের বেদনা, নির্যাতন ইত্যাদির ব্যাখ্যা কী? বাংলাদেশের একজন দ-িত যুদ্ধাপরাধী একদা দাবি করেছিলেন যে এদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই। তারও আগে থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এখানে কোনো গণহত্যা সংঘটিত হয়নি দাবি করে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ও তাদের দুষ্কর্মের এদেশীয় সহযোগীরা বিবৃতি দিয়ে আসছিল। তাহলে এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির দালিলিক প্রমাণের সূত্র কী? উত্তরাধুনিকরা তাই মনে করেন ‘সত্য’ বলে কিছু নেই, আছে ‘সত্যসমষ্টি’। ইতিহাস (ঐরংঃড়ৎু) তাদের কাছে গল্প (ঝঃড়ৎু)। প্রকৃত ঘটনা অপ্রাসঙ্গিক। একটি ঘটনা ঘটতে পারে কিন্তু তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, আবার একটি ঘটনা না ঘটেও প্রকৃত সত্যের চেয়েও অধিক সত্য হয়ে উঠতে পারে। কখনো কখনো গল্পের সত্য সংঘটিত সত্য অপেক্ষা বেশি সত্য বলে প্রতীয়মান হয়।

উত্তরাধুনিকতাবাদ যাপিত জীবনের বড় শক্তি সংস্কৃতি সম্পর্কেও এক ধরনের গভীর হতাশাবাদী (পুহরপরংস) দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে। যে শক্ত আদর্শিক ভিত্তির ওপর মানবসভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে উত্তরাধুনিকতাবাদ তাকে একবারেই খারিজ করে দিয়ে সমসাময়িক সমাজ সম্পর্কে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করে যা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বের কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য জরুরি। যখন তৃতীয় বিশ্ব ইউরোকেন্দ্রিক নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করলো তখন উত্তরাধুনিকতাবাদ ঘোষণা করল যে প্রান্তের ক্ষমতা সীমিত ও সাময়িক। যেহেতু ইউরোপ তার ঔপনিবেশিক ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি, উপনিবেশগুলোর নতুন অর্জিত ক্ষমতাও টিকে থাকবে না।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে উত্তরাধুনিকতাবাদ যুক্তি ও বিজ্ঞান বিকাশের কাল (ঊহষরমযঃবহসবহঃ) -এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বেশিমাত্রায় নির্ভর করেছে বিনির্মাণ, বিচূর্ণন, প্রশ্নবোধক বর্ণনা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের ওপর। আধুনিকরা যেখানে একটি বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে একটি অর্থপূর্ণ শৃঙ্খলা খুঁজেছেন, উত্তরাধুনিকরা সেখানে খেলাচ্ছলে অর্থ খোঁজার সম্ভাবনাকে এড়িয়ে গেছেন এবং এই বিষয়টি নিয়ে কৌতুক (ঢ়ধৎড়ফু) করেছেন। সামগ্রিক শৃঙ্খলা ও আত্মসচেতনতার প্রতি অবিশ্বাস উত্তরাধুনিকতাবাদের বৈশিষ্ট্য। একদা বহু ও বৈচিত্র্যম-িত সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের একাধিক শাখার সংমিশ্রণ সাহিত্যের জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করা হতো না। কিন্তু উত্তরাধুনিকতাবাদীরা সেই সম্ভাবনার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাকে সম্ভবপর করে তুলতে চেয়েছেন। উত্তরাধুনিকতাবাদ বিশ্বযুদ্ধোত্তর সাহিত্য সম্পর্কিত একটি ছত্রীপদ (ঁসনৎবষষধ ঃবৎস), যা অ্যাবসার্ড নাটক, বিট জেনারেশন ও ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজমকে অন্তর্ভুক্ত করে। স্যামুয়েল বেকেট, হোর্হে লুই বোর্হেস, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, নাগিব মাহফুজ, অ্যাঞ্জেলা কার্টার, মিলন কুন্ডেরা, উমবার্তো একো প্রমুখের লেখনীতে বৈশ্বিক বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার একটি জটিল অবস্থা অনুসন্ধানের চেষ্টা লক্ষ করা যায়। মানুষের জীবনে সময় ও স্মৃতির ভূমিকা, সত্তা ও বিশ্বের ঐতিহাসিক নির্মাণ এবং ভাষার জটিল চরিত্র নিয়ে উত্তরাধুনিকরা নতুন যে মতাদর্শ সামনে তুলে এনেছেন তা নিয়ে বিতর্ক করা চলে, খারিজ করা চলে না।

***************************************

 

খুঁটিয়ে দেখি নতুন মোড়কে চোরাবালি প্রাচীন
শেখ নাহিদ হাছান

‘না শিখেই কিছু করে ফেলার প্রবণতা দেখা দিয়েছে আজ কাল’। না শিখে কিছুই কি করা যায়? ভালো খারাপ মাঝারি কিংবা স্বাভাবিক? স্বভাবের নিয়মে মানুষ যা করে সেটাও কি শিক্ষা নয়? সবই যদি শিক্ষা, তাহলে আর জ্ঞানহীন মূর্খ কে?  অশিক্ষিত হতেও তো শিক্ষা লাগে! তাই কি? একটা মরা কাঠ দৌড়াতে জানে না তার অর্থ সে দৌড়াতে না জানার শিক্ষায় শিক্ষিত? অর্থাৎ শুন্যতা হল অনুপস্থিতির

উপস্থিতি। প্রশ্ন হল উপস্থিতিই যদি থাকবে তবে অনুপস্থিতি হয় কিভাবে? একটি প্যারাডক্স। সুতরাং কথাটি ভুল। কাজেই মূর্খতা হল শিক্ষার অভাব। যে এককোষী প্রাণীটি আজ বিভাজিত হয়েছে বুঝতে পারছি  সে বিভাজিত হওয়া শিখেছে। সেই অর্থে কোন প্রাণীর পক্ষেই জ্ঞানহীন হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে বস্তুরও কি জ্ঞান আছে? লোহা যে বাতাসের সাথে বিক্রিয়া করে সেটা কি তার শিক্ষা? না তো! সেটা কে বলি লোহার ধর্ম। তাহলে ধর্ম এবং শিক্ষা এই দুই এর মধ্যে তফাৎ কোথায়? ধর্ম হল বস্তুমাত্রই যা অবধারিতভাবে করে থাকে। যেটার বাইরে কিছু করার ক্ষমতা ঐ বস্তুর নেই। অর্থাৎ  একটি বিশেষ অবস্থায় বা নির্দিষ্ট শর্তসমূহ ঠিক থাকলে ঐ বস্তুর সাপেক্ষে যে কার্যের অন্যথা হওয়া সম্ভব নয় সেটাই ঐ বস্তুর ধর্ম। এখন ঐ শর্তসমূহের মধ্যে যদি কোনটি পরিবর্তিত হয় তাহলে নতুন একটি শর্ত কাঠামো তৈরী হবে এবং ঐ শর্তকাঠামোতে বস্তুর নতুন ধর্ম এর সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। সেটা হল ঐ অবস্থার সাপেক্ষে ঐ বস্তুর ধর্ম। তাহলে  ধর্ম হল নির্দিষ্ট অবস্থা বা শর্তের সাপেক্ষে বস্তুর কার্যকারণ। এখন আবার সেই প্রথম প্রশ্নটি করা যাক- যে এককোষী প্রাণীটি বিভাজিত হয়েছে এটা কী বস্তুর ধর্ম নাকি শিক্ষা? অর্থাৎ বিভাজিত হওয়া কি তার জন্য অবধারিত ছিলো যেমন বস্তু করে যায় সব অবধারিত বাস্তব কাজ? নাকি এর অন্যথাও ঘটা সম্ভব ছিল? তাহলে প্রাণ এবং বস্তুর ধর্ম কি একই  না তফাৎ আছে? প্রাণের প্রথম উৎপত্তি হয়েছে কিভাবে? বস্তুর ধর্মগুণেই নাকি বস্তুরও শিক্ষা হয়েছিলো প্রাণের জন্ম দেবার? তাহলে কী বস্তুরও শিক্ষা হয়? বস্তুর যদি শিক্ষা না থাকে শুধু ধর্মই  থাকে এবং প্রাণীর সকল কার্যক্রমও যদি শুধু বস্তুর ধর্মই হয়ে থাকে তাহলে এটা বলা যাবে যে শিক্ষা বলে আসলে কিছু নেই। প্রাণের প্রমেয় উৎপত্তি তত্ত্ব থাকলে এই প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয়া যেত। সেটা যেহেতু নেই  কাজেই শিক্ষা কোথাও আছে কিনা সেটা বোঝার জন্য একটু উল্টা পথে হাঁটার চেষ্টা করি।

ধরা যাক, স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষ বাতাসে ডুবে থাকে। যে সকল স্বাভাবিক শর্তসমূহ ঠিক থাকলে সে বাতাসে ডুবে থাকত তার বিশেষ কোন শর্ত ঐ মানুষটি পাল্টে দিলেন এবং বাতাসে ভাসতে থাকলেন। এই ঘটনাটিকে আমরা কী বলবো?

এই ঘটনাটির সাথে পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কয়েকটি ঘটনা জড়িত আছে। প্রথমত বাতাস এবং মানুষ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। দ্বিতীয়ত সেসব তথ্য বিশ্লেষণ প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিচালন এবং সংঘবদ্ধকরণ করে তাদের ধর্ম স¤পর্কে ধারণা করতে হয়েছে। তৃতীয়ত কোন কোন শর্ত পরিবর্তন করলে কোন কোন নতুন অবস্থা হতে পারে এবং সেই অবস্থায় ঐ বস্তুর ধর্ম  কী হতে পারে সেটি জানতে হয়েছে। এবং সর্বশেষে তাদের অবস্থার স্বাভাবিক শর্তসমূহকে পরিবর্তন করে নতুন ধর্মের মুখোমুখি করতে হয়েছে। সুতরাং বস্তুর অবধারিতভাবে করে যাওয়া ধর্ম স¤পর্কে আমরা যেরকম জানি এটা সেইরকম নয়। কারণ এখানে প্রাথমিকভাবে বস্তুসমূহের নতুন কোন ধর্মের তৈরী হচ্ছে না কিন্তু তাদের মধ্যকার অবস্থান বা শর্তসমূহের মধ্যে নতুন জোড় তৈরী করার ফলে বস্তুসমূহ নতুন রকম কার্য তৈরী করছে। এই যে শর্ত বা অবস্থা পরিবর্তন করার প্রক্রিয়া এটাও যদি বস্তুর ধর্মই হয় তাহলেও এটা বস্তুর বিশেষ রকমের ধর্ম। প্রাণী যদি বস্তু নাও হয় তবুও সে এই ধর্মটি ধারণ করে এবং এই ধর্মের ভেতরই জ্ঞান এবং শিক্ষার স্বরূপ পাওয়া যাবে। শুরুতেই জ্ঞান স¤পর্কে আমাদের মানসিকতায় তৈরী হওয়া ধারণাগুলো লক্ষ করি। এবং তারপর ঘটনাটির সাথে কোন আন্তঃস¤পর্ক আছে কিনা সেটা বিবেচনা করার চেষ্টা করবো। জ্ঞান; একাধিক তথ্যকে বিশ্লেষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিচালন এর মাধমে কিছু তথ্যকে যদি সংঘবদ্ধ বা আন্তঃস¤পর্কে যুক্ত করা যায় এবং তার দ্বারা নির্দেশিত অস্তিত্বের কার্য এবং কারণ

স¤পর্কে ধারণা পাওয়া যায় তখন তাকে বলে জ্ঞান।

তাহলে তথ্য কী? কয়েকটি উপাত্ত একত্রিত করে তাদের মধ্যে আন্তঃস¤পর্ক স্থাপন করা হলে এবং সেটি যদি ঐ সকল উপাত্ত দ্বারা নির্দেশিত অস্তিত্বের স¤পর্কে কোন ধারণা তৈরী করে তখন তাকে বলা হয় তথ্য।

আর উপাত্ত? উপাত্ত হল অস্তিত্বের কোন নির্দিষ্ট অংশের গুণগত ও পরিমাণগত ধর্মের বিমূর্ত প্রকাশ। যেহেতু কোন অস্তিত্বের একাধিক অংশ থাকে এবং একটি অংশেরও গুণ ও ধর্মের বিভিন্ন প্রকাশ থাকতে পারে সুতরাং এদের একাধিক সঙ্কলনও হতে পারে। অর্থাৎ কোন অস্তিত্ব বা সেই অস্তিত্বের কোন নির্দিষ্ট অংশ স¤পর্কে আমরা একাধিক তথ্য পেতে পারি। সুতরাং জ্ঞান এর সংজ্ঞাটি আর একটু পরিশীলিত করে বলা যায়, কোন অস্তিত্বকে নির্দেশ করে এরকম আন্তঃস¤পর্কে যুক্ত এক সেট তথ্য এবং তার ভিত্তিতে প্রাপ্ত সেই সব তথ্যের দ্বারা নির্দেশিত অস্তিত্বের কার্য-কারণ স¤পর্কে ধারণাই হল জ্ঞান। কিন্তু এই সংজ্ঞার দ্বারা জ্ঞান এর সম্যক স্বরূপ উপলব্ধি হয় না। আরো ¯পষ্টভাবে জ্ঞান বিষয়টা উপলব্ধি করতে হলে এর শব্দগত অর্থের দিকে তাকাতে হবে।

জ্ঞান : ⇃জ্ঞা+ অন(ল্যুট)-ভাববাচ্যে (তথ্যসুত্র : বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়); ‘জ্ঞ’ ক্রিয়া অন যাহাতে। ‘জ্ঞ’ অর্থ জননের রহস্যরূপ থাকে যাহাতে বা জানে যে। ‘জ্ঞ’ শব্দটি তৈরী হয়েছে জ্ এর সঙ্গে ঞ্+অ যোগ করে। জ্ এর অর্থ জনন ক্রিয়া অর্থাৎ অস্তিত্ব যে আত্মরূপকে আপন (দেহমন) হতে বহির্গত করে; কিংবা অস্তিত্ব হতে তার আত্মস্বরূপ বহির্গত হবার ক্রিয়াই হল জ্। ঞ হল রহস্যরূপ-করণ একে আমরা মানসিক ধারণারূপও বলতে পারি। জ্ঞ-এ সাধারণ জ্ বা জনন ক্রিয়াটি নেই, রয়েছে লিঙ্গিত হওয়ার পরবর্তী জনন বা প্রতিক্রিয়া জনন। এই লিঙ্গ বিষয়ক ধারণাটিই জ্-এর অঞ্রূপিণী বা জ্-ঞ। জ্ঞ এর সাথে প্রকৃতিশক্তি আধার রূপে যুক্ত হলে জ্ঞা হয়। প্রকৃতি বলতে বুঝায় আধার। যে আবিষ্কার করতে পারে তিনি পুরুষ পদবাচ্য আর সেই আবিষ্কারকে জেনে নিয়ে তার পুনরাবৃত্তি করতে পারে তিনি প্রকৃতি পদবাচ্য। পুরুষ যে জোড়  তৈরী করে প্রকৃতি তাকে ধারণ করে প্রতিনিয়ত পুনরাবৃত্তি করে যায়। কাজেই প্রকৃতির ভেতর প্রতিনিয়ত নতুনকে ধারণ করবার স্বাভাবিক প্রবণতা দেখা যায়। তাহলে প্রকৃতিশক্তি হল পুরুষ পদবাচ্যের আবিষ্কার বা নতুন জোড়কে ধারণ করে পুনরাবৃত্তি করে যে।

এখানে প্রতিক্রিয়া-জননের বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। প্রকৃতপক্ষে জনন ঘটে দুভাবে সত্তার জনিত-ক্রিয়া এবং সত্তার জনিত প্রতিক্রিয়া থেকে। লিঙ্গিত হবার পর অর্থাৎ সঙ্গমলব্ধ হবার পর বিপরীত তরফ থেকে সন্তান জনিত হলে তাকে বলে প্রতিক্রিয়া-জনন। জনিত প্রতিক্রিয়া থেকে যে সন্তান পাওয়া যায় তাকেই বলে জ্ঞাত। জ্ঞাত গতিশীল হলে হয় জ্ঞাতি। আর সঙ্গমলব্ধ হোক বা না  হোক সন্তান হলেই হয় ক্রিয়া-জনন। জনিত ক্রিয়া থেকে যে সন্তানকে পাওয়া যায় তাকে বলে জাত।

জাত গতিশীল হলে হয় জাতি।

অন্য শব্দের অর্থ হচ্ছে  অস্তিত্বের ন-অন যাহাতে; অস্তিত্বের না করণ যাহাতে; যে অস্তিত্ব আপনার অন্তের দিকে চলিয়াছে। অর্থাৎ সক্রিয় করা অর্থে ব্যবহার হয়। তবে অস্তিত্ব সক্রিয় হলেই সক্রিয় হবার শক্তি কমতে থাকে এবং অস্তিত্বের না- করণও শুরু হয়ে যায়। (দ্রষ্টব্য : বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ; কলিম খান, রবি চক্রবর্তী)

এইবার স¤পূর্ণভাবে জ্ঞান এর সংজ্ঞাটি দাঁড়াচ্ছে অস্তিত্বের আত্মস্বরূপ আপন থেকে বহির্গত হয়ে বিপরীত তরফে রহস্যরূপ-কারণ বা মানসিক ধারণারূপ সন্তান জনিত হবার ক্রিয়াটি কোন শক্তিরূপের আধারে ধারণ হতে শুরু করে এবং ধারণ ক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে বা ধারণ পরিপূর্ণতার দিকে মানে সমাপ্তির দিকে যেতে থাকে তাকে জ্ঞান বলে। সংক্ষেপে প্রতিক্রিয়া জননের রহস্যরূপ-কারণ প্রকৃতিশক্তির আধাররূপের সাথে যুক্ত হতে থাকলে বা যুক্ত হওয়া সমাপ্তির দিকে যেতে থাকলে তাকে জ্ঞান বলি। এখানে একটা  বিষয় ¯পষ্ট যে জ্ঞান কোন স্থির বিষয় নয় এটা চলমান।

এবারে আসা যাক শিক্ষার ব্যাপারে।

শিক্ষা হল অর্জিত জ্ঞান পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে নিয়মিত কাজে পরিণত করা। মানে শি-কে ক বা কর্মে পুনরাবৃত (ষ) করার বিদ্যাকে শিক্ষা বলে। (তথ্যসূত্র; অবিকল্প সন্ধান: বাংলা থেকে বিশ্ব; উত্তর প্রজন্মের লালন-পালন ও শিক্ষা-দীক্ষা;  কলিম খান, রবি চক্রবর্তী) সুতরাং আমরা পূর্বে যে উদাহরণ দিয়েছিলাম সেখানে প্রথম অংশ জ্ঞান এবং শেষটায় শিক্ষা। এখন, জ্ঞানী কে? সেই  প্রশ্নটির উত্তর দেয়ার সময় হয়েছে।  অস্তিত্বের বহির্গত আত্মরূপকে যিনি মানসিক ধারণারূপে ধারণ করতে শুরু করেন এবং পরিপূর্ণতার দিকে চলমান থাকেন তিনিই জ্ঞানী। আর যিনি সেই জ্ঞানকে কাজে লাগাবার জ্ঞান ধারণ করেন বা করতে থাকেন তিনি শিক্ষিত। এইবার আমরা জ্ঞান এর বিস্তারণের দিকে খেয়াল করি।

ভিন্ন ভিন্ন অস্তিত্ব বা কোন অস্তিত্বের ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে যেহেতু নানা স্বরূপ বহির্গত হয়ে থাকে সেহেতু তাদের স¤পর্কে বিভিন্ন মানসিক ধারণারূপও তৈরী হবে এবং যেহেতু সে ধারণারূপ প্রকৃতি শক্তির আধাররূপের সাথে যুক্ত হয় সে জন্য একটি ধারণা অন্য একটি ধারণারূপের সাথে যুক্ত হবার প্রক্রিয়াও চলমান থাকবে। ফলে একটি মানসিক ধারণারূপ অন্য ধারণারূপের সাথে জোড় তৈরী করবে এবং নতুন ধারণার জন্ম দেবে। এই প্রকৃয়াটি হবে চলমান। ফলে যে অস্তিত্বের থেকে স্বরূপ বহির্গত হয়েছে সেই জগৎ থেকে ভিন্ন একটি নতুন ধারণারূপ জগৎ তৈরী হতে পারে। কারণ অস্তিত্ব থেকে যে স্বরূপ বহির্গত হয় সেখানে তার আংশিক রূপ বের হয়ে আসে। এবং সেই আংশিক রূপের সাথে আর একটি আংশিক রূপ জড়িত হবার পর নতুন রূপের তৈরী করবে। এভাবে পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকলে জ্ঞান এর এমন একটি জগৎ তৈরি হবে যার সাথে বাস্তব জগতের স¤পর্ক থাকবে অতি দূরবর্তী। জ্ঞান এবং বাস্তব স¤পূর্ণ আলাদা দুটি অস্তিত্ব হয়ে যাবে, এই দুই এর মধ্যে কোন প্রকার সাদৃশ্য পাওয়া যাবে না। তখন মানসিক ধারণা মানে কেবল মানসিক ধারণাই হয়ে যাবে। তখনই রাতের বেলায় সাদা কাপড় জন্ম দেবে অতিপ্রাকৃতিক কোন জান্তব অস্তিত্বের ধারণা। কাউকে ঘুষি

দিয়ে বলা যাবে তাহাকে মিষ্টি খাওয়াইয়াছি। এর অর্থ হল জ্ঞান কেবল জ্ঞান এর জগতেই সক্রিয় আর বাস্তব কেবল বাস্তবের জগতেই সক্রিয় থাকবে। দুই এর মধ্যে সংযোগ বা জ্ঞানকে বাস্তবে ব্যবহার এর যে জ্ঞান অর্থাৎ শিক্ষা প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। একে অব্যাহত রাখতে হলেই দরকার হবে জ্ঞান এর বিভাজন। সেটি কীরকম?

আমরা আগে জ্ঞান এর সংজ্ঞা থেকে জেনেছি যে জ্ঞান মূলত একটি প্রক্রিয়া যার থেকে মানসিক ধারণারূপ তৈরি হয়। সেই ধারণাটি যদি স¤পূর্ণভাবে বাস্তবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয় তাহলে একরকমের ধারণা হবে আর যদি বাস্তবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ না হয় তাহলে আর একরকমের ধারণা তৈরী হবে। বাস্তব-সদৃশ ধারণাটিকে বলি সত্য আর অন্যটি হল মিথ্যা। তাহলে জ্ঞানও হবে দু প্রকার। একধরনের জ্ঞান তৈরী করে সত্য আর একধরনের জ্ঞান তৈরী করে মিথ্যা। এখন প্রশ্ন হল কিভাবে তৈরী করে? আর সত্য এবং মিথ্যাকে আলাদাই বা কীভাবে করা যাবে? যেহেতু কোন ধারণা সত্য হতে হলে নির্দিষ্ট কোন অস্তিত্বের সদৃশ হতে হয় সে জন্য আমরা বলতে পারি নির্দিষ্ট অবস্থায় কোন অস্তিত্বের সাপেক্ষে সত্য নির্দিষ্ট। এখানে নির্দিষ্ট অবস্থা কথাটি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। আমরা জানি পুরুষ এবং প্রকৃতি মিলে হয় অস্তিত্ব। অর্থাৎ নতুন জোড় আবিষ্কার, ধারণ জনন এবং তাকে পুনরাবৃত্তিকরণ চলতেই থাকে। সুতরাং অস্তিত্বের স্বরূপ বলতে কোন নির্দিষ্ট অবস্থার স্বরূপ এবং ঐ অবস্থায় তার চলমানতার বা গতির স্বরূপকে বুঝায়। এই গতির স্বরূপ স¤পর্কে সত্য ধারণা পেতে হলে কী কী শর্ত দিয়ে ঐ অবস্থাটি তৈরী হয়েছে এবং তার পূর্ববর্তী অবস্থা ও স্বরূপ কী সেটা খুঁজে পেতে হবে এবং কীভাবে পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে পরবর্তী অবস্থার তৈরী হয়েছে তার ধারণা পেতে হবে। এইবার ঐ বস্তুর স্বরূপ এবং ঐ বস্তুর গতির স্বরূপের  সদৃশ যে ধারণা পাওয়া যাবে সেটাই হল সত্য।

আর এই সত্য ধারণার জন্ম দেয় যে জ্ঞান সেটাকে বলা হয় বিশেষ জ্ঞান বা বিজ্ঞান। কিন্তু আর একটু বাকী থেকে যায়। সেটা হল, এ পর্যন্ত অস্তিত্বের যেসব অবস্থা তৈরী হয়েছে শুধু তার সদৃশ ধারণাই যদি সত্য হয় তবে অস্তিত্ব বিপরীত তরফে ঠিক যতটুকু ধারণারূপ তৈরী করবে সত্য কেবল ততটুকুই হবে। মানে অন্য সত্য জ্ঞান এর সাথে জোড় তৈরী করবে না। জ্ঞান থেকে আধাররূপ প্রকৃতিশক্তি বিলীন হয়ে যাবে। কাজেই সত্য ধারণা জননকারী জ্ঞানেও জোড় তৈরী হতে হবে। সেটা কীভাবে?

আমরা যেহেতু বিশেষ অবস্থা, তার পুর্ববর্তী অবস্থা ও তার শর্তসমূহ জানতে পারছি এবং কী কী শর্তসমূহ পরিবর্তন করলে পরবর্তী অবস্থা তৈরী হচ্ছে তার ধারণাও পাচ্ছি অর্থাৎ অস্তিত্ব কোন অবস্থানে কী কাজ করে তার পূর্ববর্তী অবস্থার কী কী শর্ত পরিবর্তিত হলে নতুন অবস্থা তৈরী হয় সেটার অনুরূপ ধারণাও তৈরী করতে পাচ্ছি। ফলে ঠিক সেই একইভাবে তার পরবর্তী অবস্থা কী হবে তার ধারণাও তৈরী করা যাবে। ফলে বাস্তবের অনুরূপ কাঠামোয় জ্ঞান এর জোড় তৈরী হবে এবং বাস্তবের সদৃশ জ্ঞান জগৎ পাওয়া যাবে।

কিন্তু সত্যিই যাবে কি? এইখানে এসে আমরা সংশয়গ্রস্ত হয়ে যাই। কারণ অস্তিত্বের থেকে আংশিকভাবে স্বরূপই বহির্গত হয় এবং তাও হয় বিভিন্ন অবস্থার সাপেক্ষে। ফলে যে জ্ঞানরূপ ধারণার জন্ম হয় সেটি বাস্তবের সদৃশ না হবার সম্ভাবনা থাকে মানে তার ভেতর মিথ্যা ঢুকে যায়। তখন আবার মিথ্যাকে সত্য থেকে বর্জন করার জন্য পুনঃপ্রচেষ্টা (পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচন, বিশ্লেষণ) চলতে থাকে এবং পরিপূর্ণতার দিকে যাবার চেষ্টাও এভাবেই অব্যহত থাকে। এই যে বাস্তবের সদৃশ ধারণা তৈরী এবং মিথ্যার ভেতর থেকে সত্যকে আলাদা করার পদ্ধতি এটাকেই বলা হয় যৌক্তিক পদ্ধতি।

কাজেই যৌক্তিক পদ্ধতি যুক্ত জ্ঞানই হল বিজ্ঞান।

শুরুতেই তথ্য উপাত্ত দিয়ে জ্ঞান এর যে সংজ্ঞাটির উল্লেখ করা হয়েছে সেটি মূলত বিষেশ জ্ঞান। আর মিথ্যার যেহেতু কারো সদৃশ হবার বাধা নেই কাজেই মিথ্যা হবে অবাধ এবং অসীম। এবং সচারাচর ব্যবহৃত জ্ঞান মূলত বিশেষ জ্ঞান। কারণ মিথ্যা জ্ঞান বাস্তবের সদৃশ নয় কাজেই বাস্তবে এর ব্যবহার হতে পারে না। সুতরাং যে কোন ভাবে ধারণা তৈরী হলেই তাকে জ্ঞান বলা যাবে কিন্তু তার ভেতর থেকে সত্য ধারণা খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়া হবে নির্দিষ্ট। এই প্রক্রিয়াটির নাম যুক্তি-প্রক্রিয়া। সঠিক যৌক্তিক প্রক্রিয়া ব্যবহার না করা হলে এই বিশেষ জ্ঞানে মিথ্যা ঢুকে যাবে এবং যেই মুহূর্তে যুক্তি প্রক্রিয়াকে বাদ দেয়া হবে সেই মুহূর্তেই বিজ্ঞানও বাদ যাবে। বিজ্ঞান বাদ যাবার অর্থ জ্ঞানকে কাজে লাগাবার উপায়ও বন্ধ হবে।

এ পর্যন্ত জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিক্ষা স¤পর্কে বলা হয়েছে। এর সাথে আর একটি বিষয়ও এসেছে সেটা হল কাঠামোবাদ। কারণ সত্য ধারণা মূলত একটি কাঠামোই। যার থেকে কোন নির্দিষ্ট অবস্থা স¤পর্কে ধারণা হলে তার পরবর্তী এবং পূর্ববর্তী অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়।

আমরা মূলত উত্তরাধুনিকতা তত্ত্বের আলোচনা করতে বসেছি। এই তত্ত্বে বলা হচ্ছে ‘উত্তরাধুনিকতাবাদীরা সকল বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গীকে চ্যালেঞ্জ করে। মার্ক্সবাদ, ক্রিশ্চিয়ানিটি, ফ্যাসিবাদ, স্ট্যালিনবাদ, পুঁজিবাদ, উদার গণতন্ত্র মানবতাবাদ, নারীবাদ,  ইসলাম, এবং আধুনিক বিজ্ঞানসহ সকল বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গীকে যুক্তিনির্ভর বলে বাতিল করে (উত্তরাধুনিকতা : অথর, রিডার, টেক্সট; হুমায়ুন কবির; উত্তরাধুনিকতা; স¤পাদনা : রতনতনু ঘোষ) ‘এর (উত্তরাধুনিকতার) লক্ষ্য প্রকৃত জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করা যে অসম্ভব, তা প্রমাণ করা’ (ঐধংংধহ, ১৯৮৭ : ১৬৯) ‘উত্তরাধুনিকতায় জ্ঞানতাত্ত্বিক অসম্ভব্যতা-কে তুলে ধরা হয়েছে’ (ঈধষরহবংপঁ, ১৯৮৭ : ৩০৫) এই  স্থানে চলে আসে উত্তর কাঠামোবাদ। বলা হয় ‘মহাবাচন ভেঙ্গে পড়েছে বহু সত্যের পরীক্ষায়, মহাআখ্যান বিশ্লিষ্ট হয়েছে খন্ড-ক্ষুদ্র আখ্যানে। মহামতবাদ ব্যার্থতার পথ ধরে মতবাদহীনতায় উপনীত হয়েছে।’

কিন্তু প্রশ্ন হল বহু সত্যের পরীক্ষায় মহা-আখ্যান বিশ্লেষিত হলে ক্ষুদ্র আখ্যান ভেঙ্গে যায় কী? আর সত্যের পরীক্ষায় যে আখ্যান ভেঙ্গে যায় মহাসত্যে তার অবস্থান কোথায়? যুক্তিনির্ভর জ্ঞান কাঠামোয় তার স্থান আছে কী? যুক্তিকে বাদ দিলে সত্যের পরীক্ষা করাই কি সম্ভব? ‘আধুনিকতাবাদীরা অন্যদের জ্ঞানতত্ত্ব, যুক্তি, বিচারবোধ, জীবনবোধ, সংস্কৃতি ও সমাজপ্রক্রিয়াকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, ঘৃণা ও উপেক্ষা করে… সুতরাং তা বর্জনযোগ্য।’

আধুনিকতাবাদ কীরকম? তারা অন্যের যুক্তি বলতে কি বোঝে এবং কী বোঝে না? সেসব প্রশ্ন করা যায় তবে আমরা কোনবাদ আবাদী নই। দর্শনের মৌলিক জায়গা থেকে যৌক্তিক বিশ্লেষণ করে দেখবো সেটা যদি সঠিক বলে মনে হয় তাকে গ্রহণ করবো সেটা আধুনিকতা হোক প্রাচীনতা হোক তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু এইখানে উত্তরাধুনিকরা বলবে ওসব যুক্তি নির্ভর চিন্তাকে আমরা বাদ দিয়েছি বহু আগেই। আমাদের কাছে সত্য বহু মাত্রায় বহু রেখায়। এ স্থানে তাদের বিশেষ কিছু বলবার থাকবে না। আমরা শুধু তাদের পূর্ববর্তী আলোচনাটুকু আরো একবার পড়ে দেখতে বলবো এবং তারপর প্রশ্ন করবো যুক্তিকে বাদ দিলে প্রমাণের সাদৃশ ধারণা মানে সত্য পাওয়া যাবে কি? বহু রেখার অর্থ বহু অবস্থা আর প্রতিটি অবস্থায় আলাদা আলাদা শর্তকাঠামো। নির্দিষ্ট অবস্থার শর্ত সাপেক্ষে সত্য কাঠামো নির্দিষ্ট। তাছাড়া বহু সাপেক্ষ অবস্থার তৈরী হলেই যুক্তিহীন জ্ঞান কাঠামো তৈরীর পথ সুগম হয় কি? যে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকে এ আলোচনার সূত্রপাত সেই তত্ত্বটিও কি জ্ঞান কাঠামোর বাইরে কিছু তৈরী করে?

করে না! তখন আমাদের সামনে অন্য একটি অবস্থা এসে দাঁড়ায়। সন্দেহ হয়! খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করি। যিনি একটি অবস্থার সাথে অন্য একটি শর্ত কাঠামোর তুলনা করে যুক্তিহীন কাঠামোর যুক্তি দেখান, বহুরৈখিকতার দোহাই পাড়েন তার উদ্দেশ্য কী? সত্য প্রাপ্তি নাকি ভ্রান্তি তৈরী? ভ্রান্তি তৈরী হলে সেটাই বা কেন?

বলা হচ্ছে, ‘আমরা বাস করছি উত্তরাধুনিক কালের পরিসরে। গ্লোবাল নেটওয়ার্ক সোসাইটি এবং ইলেক্ট্রিক সুপার হাইওয়ে আমাদের বৈশ্বিক যোগসূত্রকে ক্রমপ্রসারিত করে চলেছে দ্রুত বেগে। তথ্যভিত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক সমাজের প্রেক্ষাপটে মানুষ ডিজিটাল অর্থনীতি, বাজার, শিক্ষা ও চিকিৎসার স¤পর্কসূত্রে এবং জৈব-প্রযুক্তির কৌশলে ঐরমযঃবপয নবরহহম’রূপে গণ্য হচ্ছে। উত্তরাধুনিক সমাজ হয়েছে ংড়পরবঃু ড়ভ ংপরবহপব ভরপঃরড়হ রূপে।’ (উত্তরাধুনিকতার পূর্বাভাস; রতনতনু ঘোষ) ‘আমরা যান্ত্রিক বিজ্ঞানের এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি যে বাড়িতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বিচিত্র কিছু নয়। দূরদর্শনের মাধ্যমের একই সঙ্গে বা পরপর, একই ঘরে বসে দশ পনেরটি ভাষায় কথোপকথন শোনাও আশ্চর্যের নয় আজকাল। ক¤িপউটার, টেলিভিশন… এটাই হল উত্তরাধুনিক অবস্থান, পোস্টমডার্ন প্রেক্ষিত।’ (উত্তর-আধুনিকতা; আনন্দ ঘোষ হাজরা)

প্রশ্ন আসে বিজ্ঞানের এই পর্যায় কোন যুক্তিহীনতার যুক্তি? কোন বিজ্ঞান বিরুদ্ধতার ফল? জ্ঞান প্রক্রিয়া পরিপূর্ণতায় তো পৌঁছায়নি পরিপূর্ণতার দিকে চলমান। কিন্তু পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে কি? মানে অন্তের দিকে যে চলা শুরু করেছে সে কি পরিপূর্ণ অন্ত্যে পৌঁছাবে? এতদিনে যেহেতু পৌঁছাতে পারে নি কাজেই পৌঁছানোর চেষ্টা বৃথা! ওসব আশা স্বপ্ন মিছে হয়ে গেছে। আজ ‘বন্দরে জাহাজ ভেড়ানোই সংকীর্ণতা’। আমরা গা ভাসাই। এইখানে এসে কানের মধ্যে কোন এক হীরক রাজা মনে হয় গুণ গুণ করে ‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই, লেখাপড়া করে যে, অনাহারে মরে সে।’ তাই তো! অতীতে তো বহু লোক শিক্ষা নিয়েও মরেছে, কাজেই মরে মরে আমাদের শিক্ষা হয়েছে আমরা আর ওসব জ্ঞানের কথায় আস্থাবান নই। এই সব মুখস্থ স্রোতের বাঁধা ছন্দে গা ভাসানোতেই

নব রসের স্বাচ্ছন্দ। আসুন! কাল থেকে পাঠশালা বন্ধ।

আমরা আসতে থাকি। কিন্তু আসা হয়ে ওঠে কি? আমরা ভেসে যেতে থাকি। ঠিক ভেসেও কি যাই? না ক্রমাগত ডুবে যেতে থাকি? প্রশ্ন জাগে। মন্ত্রমুখের প্রবল স্রোতেও প্রশ্ন করি। কেন কারণ প্রশ্ন করার অধিকার আমাদের ডুবে যাচ্ছে খুবই দ্রুত! খুঁটিয়ে দেখি। কীভাবে? কেউ কেউ বলে ওঠে এভাবে ছিঁড়ে ছিঁড়ে উত্তরাধুনিকতা বোঝা যাবে না। আধুনিকতার যুক্তিকাঠামো দিয়েও বোঝা যাবে না। এইসব অতি দেবতাদের ধর্মকথা ঠিক বোধে আসে না। তাই বুদ্ধির সহজ পথেই এর বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি।

আধুনিকতার অর্থ হল হাল আমলের অর্থাৎ বর্তমানের। ‘শুরুতই খটকা লাগে উত্তর-আধুনিকতা শব্দটি নিয়ে। আধুনিক যদি হয় সাম্প্রতিক বা বর্তমান কালের তবে উত্তরাধুনিকের কালিক অবস্থান কোথায়?’ (‘কালের যাত্রার ধ্বনি’; কথায় ও কথার পিঠে; সনৎ কুমার সাহা) ‘আধুনিকতা তখনই হবে, সমকালীনতা তখনই হবে যখন সেই সময়ের সমাজ, মানুষ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থা তার সঙ্গে স¤পর্কযুক্ত হবে।’ (সময় ও উত্তরাধুনিকতা; হাসান আজিজুল হক)

তাহলে উত্তরাধুনিকতা বলতে কি আধুনিকতার পরের কিছু বুঝায় মানে ভবিষ্যতের? নাকি যা মানুষের সাথে স¤পর্কযুক্ত যা হয়েছিলো তার পরের অবস্থা মানে স¤পর্কযুক্ত নয় এমন বর্তমান অবস্থা? নাকি মানুষের সাথে যা কখনোই স¤পর্কযুক্ত হয়ে উঠবে না সেরকম অবস্থা? এমন অনেক বিষয়বস্তু রয়েছে যা সমসাময়িকরা গ্রহণ করে নি করেছে তারও পরে। তাহলে গ্রহণ করার পর কি সেটা আধুনিক হয়ে উঠেছিল? আর পূর্বে ছিলো উত্তরাধুনিক? ‘এখন কথা হচ্ছে, আধুনিকতা শুধু একটি কালখ- দিয়ে চিহ্নিত হয় নি। চিহ্নিত হয়েছে কিছু লক্ষণ দিয়ে। যেমন ইহজাগতিকতা, যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা যেমন বিজ্ঞানমনষ্কতা, যেমন যুক্তিবাদিতা। মানুষ তার বিবর্তনের পথে যেসব অর্জন নিয়ে শ্রদ্ধাবোধ করত ইহজাগতিকতা বিজ্ঞানমনষ্কতা যুক্তিবাদিতা ইত্যাদি হচ্ছে সেগুলোর অন্যতম। (হাসান আজিজুল হক)

‘উত্তরাধুনিকতা আধুনিকতার চেতনাকে বাধা দেয়, দ্বিতীয়ত এটা আধুনিকতার সমগ্র জ্ঞানকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। (উত্তরাধুনিকতা : অথর, রিডার, টেক্সট;  হুমায়ুন কবির) আধুনিকতাকে অস্বীকার করতে গেলে এসব (আধুনিকতার) অর্জনকেও অস্বীকার করতে হয়। হয় অস্বীকার করতে হয়, অথবা বলতে হয় যে এগুলোর চেয়ে উন্নততর বোধ বা উত্তর আধুনিকতা মানব জাতিকে দিয়েছে বা দিতে যাচ্ছে।’ (হাসান আজিজুল হক) বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, জ্ঞানকাঠামো এবং এ সব নিয়ে উত্তরাধুনিক ধারণা ও তার ফলাফল স¤পর্কে এতক্ষণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলাম। এবার উত্তরাআধুনিকতা তত্ত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী চমকের একটি, ডেথ অব অথর এর কথা বলা যাক। ‘ডেথ অব অথর মনে হলেই একটা চিত্রকল্প মাথায় আসে; দেখি দুজন ছাত্র পরীক্ষার খাতায় একটা বিষয় নিয়ে লিখেছেন এবং দুটি লেখাই মূলত একই রকম। অথচ শেষে দেখা গেল একজন নম্বর পেয়েছে বেশি আর একজন নম্বর পেয়েছে কম। কেন পেল? কারণ যে কম নম্বর পেয়েছে পরীক্ষক এর কাছে ব্যাক্তি তার স¤পর্কে খারাপ ধারণা বা স¤পর্ক আছে। তাহলে যখন বিচার করার সময় আসছে তখন আমরা যা বিচার করার প্রয়োজন তার থেকে ওই বিচারের ক্ষেত্রে এমন একটি বিষয় এর প্রতি নজর দিচ্ছি যেটা স¤পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। তাহলে ঐ লেখার সাপেক্ষে অপ্রাসঙ্গিক কী? ঐ লেখাটি যিনি লিখেছেন তার ব্যাক্তিজীবন। অর্থাৎ একটি কর্মের বিচার (অন্য একটি কর্ম বা মানসিক ধারণার সাথে তুলনা) করতে গিয়ে তার সঙ্গে আপাততভাবে সংযুক্ত মনে হওয়া (প্রকৃতভাবে সংযুক্ত নয় এমন) ঘটনাকে সংযুক্ত করে তার সাপেক্ষে ঐ কর্মটির বিচার করা হচ্ছে। ঘটনাটি স¤পূর্ণ অযৌক্তিক এবং ভ্রান্তিমূলক। ডেথ অব অথর-এ যদি এই রকম ভ্রান্তিমূলক কোন প্রক্রিয়াকে বাদ দেবার কথা বলা হয় তাহলে আমাদের কাছে মনে হবে এটা একটা অতি অসাধারণ চমকপ্রদ বিষয়। কিন্তু ‘ডেথ অব অথর’ মানে কি আসলেই তাই? তার আগে অথর, রিডার, টেক্সট বলতে আমরা কী বুঝি বা বুঝতাম সেটা বলা দরকার। শুরুতেই টেক্সট; কোন অস্তিত্ব তার অর্জিত ধারণা দ্বিতীয় অস্তিত্বে (প্রাণী বললে বিষয়টা নিশ্চিত হয় কারণ আমরা জানি না যে বস্তু কিংবা শক্তির জ্ঞান হয় কিনা) দেবার জন্য যে অস্তিত্বের তৈরী করে তাকে বলা যায় টেক্সট।

যে নিজের অর্জিত ধারণা থেকে টেক্সট তৈরী করে মানে প্রথম অস্তিত্ব হল অথর আর দ্বিতীয় অস্তিত্ব  হল রিডার। টেক্সট শব্দ, রঙ, রেখা বা অন্য যে কোন অস্তিত্ব দিয়ে তৈরী হতে পারে। যেহেতু টেক্সট নিজেও একটি অস্তিত্ব কাজেই সে কোন অস্তিত্বে যেকোন রকম ধারণা (সত্য/ মিথ্যা) তৈরী করতে পারে। আবার প্রথম অস্তিত্বে যে ধারণা তৈরী হয় সেটাও সত্য বা মিথ্যা হতে পারে। এখানে একটা বিষয় ¯পষ্ট করে রাখতে হবে যে টেক্সট অস্তিত্বের স্বাভাবিক নিয়মে তৈরি হয় না। তৈরী হয় জ্ঞান কাঠামো ব্যবহারের ফলে। অর্থাৎ টেক্সট তৈরী করতে হয়। ফলে টেক্সট যে জ্ঞান কাঠামোর সদৃশ হয় সেটাই ঐ টেক্সট এর অর্থ। এবং টেক্সট এর এই অর্থই অথরের ধারণা। তাহলে টেক্সট এর এই অর্থ কিভাবে বের করা যাবে? এই অর্থ বের করতে হলে প্রথমে দেখতে হবে স্বাধীন অস্তিত্বের থেকে প্রথম অস্তিত্বে অর্থাৎ অথরের জ্ঞান-কাঠামো কিভাবে তৈরী হয়েছে এবং তার অস্তিত্বের সদৃশ ধারণার কাঠামোটি কী। এরপর দেখতে হবে ঐ টেক্সট থেকে কোন ধারণা তৈরী হচ্ছে এবং তার সাথে ঐ জ্ঞান কাঠামোর সাদৃশ্য কোথায় সেটাই হবে ঐ টেক্সট এর অর্থ। ধরা যাক পাঠক এর পক্ষে অথরের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব নয়।

তাহলে কী হবে? এই প্রশ্নের অর্থ যদি সশরীরে অথরের কাছাকাছি যাওয়া হয় মানে অথরের জ্ঞান কাঠামো কিভাবে তৈরী হয়েছে তা জানার উপায় না থাকে তাহলে পাঠক তার নিজের জ্ঞান কাঠামোর দিকে খেয়াল করবে। ঠিক একই রকম একটি টেক্সট যদি সে নিজে তৈরী করে তাহলে তার নিজের জ্ঞান-কাঠামো কী হত সেই কাঠামোর সদৃশ হবে ঐ অথরের ধারণা, এই টেক্সট এবং তার অর্থ। এখানেও পাঠক ভিন্ন পথে টেক্সট থেকে অথরকেই খুঁজে বের করছে। তাহলে ডেথ অব অথর কীভাবে হবে? ডেথ কথাটা থেকে এটা বুঝা যায় যে অথরের অস্তিত্বকে তারা অস্বীকার করছেন না কারণ অথরের জন্ম না হলে মৃত্যু হবে না। কিন্তু টেক্সট যতক্ষণ আছে ততক্ষণ অথরের মৃত্যু ঘটা তো সম্ভব না। অথরকে মারতে হলে হয় টেক্সটকে অস্বীকার করতে হবে। টেক্সটকে অস্বীকার করার অর্থ এটা বলা যে টেক্সট এর জন্মই হয় নি তাহলে টেক্সট এর জন্ম হয়নি মানে অথরেরও জন্ম হয়নি; যার জন্ম হয়নি তার মৃত্যুও হতে পারে না।

তাহলে ডেথ অব অথর এর মানে কী হতে পারে? অথর টেক্সট তৈরি করেছে মানে টেক্সট আছে, টেক্সট আছে মানে অথর আছে। অথচ কেউ একজন ঘোষণা করছে অথর নেই। মানে সে অথর এর অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে না কারণ টেক্সটকে গ্রহণ করছে এবং তারপর বলছে এটা টেক্সট নয় স্বাধীন অস্তিত্ব এ দায় স¤পূর্ণই আমার অথরের কোন দায় এতে নেই। প্রশ্ন হল রিডার কেন এরকম করবে? স্বাভাবিকভাবে এরকম করে কিনা? উদাহরণ দেই। ধরুন আপনার হাতে পচা একটা বিস্কুট বিক্রি করা হল। সেটা খেয়ে দশ জন মানুষ মারা গেল। এইবার যদি কেউ বলে যে মরে গিয়েছে এ দায় কেবল তারই কারণ দশটি কুকুরও এ বিস্কুট খেয়েছে কিন্তু মরে নি। কাজেই যে মরে সে তার নিজের অবস্থার জন্যই মরে। তার দায় বিস্কুটের বা যে বিস্কুট  বানিয়েছে তার নয়। ঠিক এই কথাগুলো যে বলে আমরা ধরেই নিই যে সে আর যেই হোক বিস্কুট খেয়ে মরেছে তার পক্ষের লোক নয়। অর্থাৎ যে উৎপাদক বা অথর এই কথা তারই। ‘উত্তরাধুনিকতায় জগতের সবকিছুকেই টেক্সট হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এই টেক্সটের কোনো মূর্ত এবং বাস্তব আধেয় অনুপস্থিত। রিডার এবং  টেক্সটে আন্তঃনির্দেশক। টেক্সটে কোন অর্থ থাকে না, অর্থ থাকে রিডার এবং টেক্সটের মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে। প্রতিটি মিথস্ক্রিয়া অনন্য, স¦তন্ত্র, সাময়িক এবং কখনো তা চুড়ান্ত নয়। রিডার টেক্সট নির্মাণ করে টেক্সটও রিডার তৈরী করে।’ (জড়ংবহধঁব, ১৯৯২,২ন) (উত্তরাধুনিকতা : অথর রিডার টেক্সট; হুমায়ুন কবির) এরপর বিকেন্দ্রীকরণ একটু খেয়াল করি। ক্ষমতার কেন্দ্রে যিনি থাকেন তিনি সবচেয়ে ক্ষমতাধর।

আর যিনি কেন্দ্র থেকে থাকেন সবচেয়ে দূরে তিনি নিসঃন্দেহে কম ক্ষমতার অধিকারী। কাজেই দুজনের একই যোগ্যতা বা বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও যখন দুজনের শুধুমাত্র অবস্থানের কারণে মান ভিন্ন হয়ে যায় বা ক্ষমতার তফাৎ হয়ে যায় তখন প্রশ্ন আসে, এই বৈষম্যের কারণ কী? এর সমাধান কী হতে পারে? সহজ উত্তর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। এখন, বিকেন্দ্রীকরণ করতে হলে শুরুতে কোথায় কোথায় কেন্দ্র আছে সেটা চিহ্নিত করতে হবে এবং তারপর সেই কেন্দ্রটি ভেঙ্গে দিলেই হবে। খেয়াল করি, কোথায় কোথায় কেন্দ্র আছে? সূর্য, চন্দ্র, মহাকাশ, বস্তু, অনু, পরমাণু, পার্টিকল, শক্তি প্রত্যেকটা জায়গায় কেন্দ্র। কেন্দ্র থেকে বের হলেই অস্তিত্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। আবার হারিয়েও শেষ হয় না কারণ আমরা জানি শেষ বলে কিছু নেই। কেবলি শুরু। অস্তিত্ব হারিয়ে হয় নতুন অস্তিত্ব। এক কেন্দ্র হারিয়ে তৈরী হয় নতুন কেন্দ্রের। ছোট ছোট কেন্দ্র তৈরী করে বড় কেন্দ্রের, বড় বড় কেন্দ্র তৈরী করে মহাকেন্দ্র। এভাবে চলতেই থাকে। তাহলে বিকেন্দ্রীকরণ হবে কিভাবে? হবে না। বস্তুর কেন্দ্র স¤পূর্ণভাবে ধ্বংস করা গেলে বস্তু নিঃশেষ হয়ে শক্তি তৈরী হবে,তখন আবার তৈরী হবে শক্তির কেন্দ্র।

এবারে আসি প্রাণের কেন্দ্র বিকেন্দ্রীকরণে প্রাণের বিকেন্দ্রীকরণ বললেই আমার সেই গল্পটা মনে পড়ে। ওই যে যখন হাত পা মুখ সবাই বিদ্রোহ করে বসে যে আমরা কেবল খেটে মরি আর বেচারা পেট কেবল খায় আর খায়। এ কেমন বিচার? কিন্তু আমাদের প্রশ্ন সেসবও নয় আমাদের প্রশ্ন হল মানুষের ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে। যখন পৃথীবীর ভেতর রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের ভেতর জাতি-বর্ণ-সমাজ এত এত বিভাগ। প্রতিটি বিভাগ এক একটা ক্ষমতার কেন্দ্র আর বাকিরা ক্ষমতাহীন দুর্বল। এত দিন এই হয়ে এসেছে। আজ যখন ইন্টারনেটের যুগ মানুষ ঘরে বসেই বিশ্বের সমস্ত জায়গায় যোগাযোগ রাখতে পাচ্ছে পৃথিবীর প্রতিটি জায়গায় পাচ্ছে কর্মের সুযোগ ঘরে বসেই সেখানে প্রতিটি মানুষ নিজেই পারে নিজের কেন্দ্র হয়ে উঠতে। কিন্তু আসলে পারে কি? আপনি পৃথিবীর যেকোন জায়গায় থেকে যে কোন ওয়েব সাইটে ঢুকতে পারার ক্ষমতা আপনার হয়ত হতেও পারে কিন্তু কোন সাইটের মালিক আপনি হতে পারবেন না। আপনাকে ডোমেইন হোস্টিং কিনতে হবে কোন নির্দিষ্ট কো¤পানির কাছে থেকে। আপনি নিজে নিজে আপনার তথ্য মেমরি স্টোরেজ করে রাখতে পারেন সার্ভার তৈরিও করতে পারেন কিন্তু সেটা করে দিতে হবে ঐসব নির্দিষ্ট কো¤পানির অংশ হিসেবে তার চেয়েও বড় কথা হল এর জন্য যে চুক্তিপত্র হবে সেটা হবে স¤পূর্ণভাবে একতরফা। অর্থাৎ স¤পূর্ণ আপনার শ্রম মেধা স¤পদ বিনিয়োগ করবেন কিন্তু তার লাভ হবে নির্দিষ্ট কো¤পানির। তার সাথে যেহেতু আপনার সামনাসামনি যোগাযোগ নেই কাজেই কিছু জিজ্ঞাসাও করা যবে না। তার চেয়েও বড় কথা সে আপনার দায় নেবে না নিতে বাধ্য নয়। যে বাধ্যবাধকতা আছে রাষ্ট্রের কাছে মানুষের। আপনি রাষ্ট্রের কাছে জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে আমার প্রাপ্তি কতটুকু। কতটুকু আমার অধিকার। ফলে আপনার রাষ্ট্রযন্ত্র যতটা দূর্বল হতে থাকবে আপনি রাষ্ট্র থেকে যতটা বিচ্ছিন্ন হতে থাকবেন ততটাই হয়ে উঠবেন অসহায়। আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বলে আসলে হতে থাকবে বা থাকছে ক্ষমতার মহাকেন্দ্র। সারা পৃথিবীর সমস্ত ক্ষমতা চলে যেতে থাকবে এক কেন্দ্রে। আর প্রতিটি মানুষ হবে রাষ্ট্র থেকে পাশের মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। কোথাও থাকছে না কারো দায়। প্রশ্ন হল এসব কেন এত একতরফা হবে? এত এত তথ্য আপনার হাতে আসবার সুযোগ রয়েছে অথচ চাইলে আপনিও ক্ষমতাধর হয়ে যান। বিশ্বের যেকোন রাষ্ট্রের চাইতে ক্ষমতাধর হতেই পারেন। পারেন না? না। পারি না। যাতে না পারি সেই ব্যবস্থা করতেই সচেষ্ট আছে উত্তরাধুনিকতার মলম। আপনার চোখের মধ্যে ডলা দিয়ে বলছে জ্ঞান নাই, বিজ্ঞান নাই, মত নাই, আপনারে খাওয়ালাম সেটার জন্য আমার কোন দায় নাই, আপনার কোন রাষ্ট্র নাই। এসব বিশ্লেষণ করবার জন্য যা দরকার আপনার যুক্তিবোধ উত্তরাধুনিকতা তারও বিরোধিতা করে। তাহলে আপনার আছে কী? আছে আপনার অস্তিত্ব, অভাববোধ, প্রয়োজন এবং সেসব প্রয়োজন মেটাবার মত অসীম ক্ষমতাধর কোন কো¤পানি। তাদের সে ক্ষমতার উৎপত্তি হয়েছে যার ফল থেকে আলগোছে আপনি সেসবেরই বিরোধী হয়ে উঠছেন। তাহলে আমরা কী করতে পারি? কী করার আছে? জিজ্ঞাসা করি।

এত খারাপ যদি অবস্থা হয়ে যায় তাহলে কিছু একটা তো আমাদের করতে হবে? করবো না কারণ কিছু করতে হলে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যারা উত্তরাধুনিকতাকে ধারণ করবে তারা সিদ্ধান্ত-বিরোধী। সিদ্ধান্ত বিরোধীতার অর্থ সিদ্ধান্তহীনতা নয়  নতুন সিদ্ধান্ত নিতে না পারার অবস্থা। এটা এমন এক স্থিতাবস্থা যখন নিজে ঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে ওঠে না। আবার ঐ দিকে থাকে মহাকেন্দ্রের প্রবল স্রোত কিন্তু এই যদি উত্তরাধুনিকতার সর্বোপরি অবস্থা হতে থাকে তাহলে দুনিয়ার এত এত মানুষ মহা মহাজ্ঞানী কেউ কি ভাবছে না এসব? উত্তরাধুনিকতা কেন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে? তার ভেতর কি ভালো কিছু নেই? কারা উত্তরাধুনিকতাকে গ্রহণ করতে পাচ্ছে না? কেন? কারা গ্রহণ করছে? কেন? আমরা প্রশ্ন করি কারণ প্রশ্ন করা এখনো শেষ হয় নি। কারণ প্রশ্ন করার অধিকার আমাদের আছে।

*********************************

 

আধুনিকতা : ‘পূর্ব’ ও ‘উত্তর’কে পার হয়ে
স্বামী শাস্ত্রজানন্দ

অনেকদিন আগে ছাত্রজীবনের এক পর্যায়ে একজন শিক্ষক মহাশয় জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, সাহিত্য যখন পড়ি তখন কেমনভাবে পড়ি? সে প্রশ্নের উত্তর সেদিন খুব স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়তো সম্ভব ছিল না। কারণ ছোটবেলা থেকেই যখনই কোন বই হাতের কাছে পেয়েছি, তা পড়ে ফেলার চেষ্টা করেছি। আর সেই পড়ার ধরণটাও মোটামুটি একইরকম থাকত; বই পেতাম পড়তাম  ভালো লাগতো কিংবা ভালো লাগতো না। কেন যে ভালো লাগতো, অথবা কেন যে ভালো লাগতো না  সেটা খুব গভীরভাবে চিন্তা করে দেখতাম না। আবার কোন একটি বই পড়ার সময় চিন্তন প্রক্রিয়ার কোন বিশেষ ধরন অবলম্বন করলে ভালোলাগা জন্মাবে কিনা সেটাও খুব গভীরভাবে ভেবে দেখিনি। মনে হয় সংসারের যে কোন পাঠক, দর্শকের জীবনের প্রথম দিকে ব্যাপারটা এইরকমই ঘটে থাকে একটা শিল্পকর্ম বা সাহিত্যকৃতিকে আমরা যখন পড়ি কিংবা সেটা নিয়ে ভাবি, তখন প্রাথমিক স্তরে ভাবনার প্রক্রিয়া হয় স্বতঃস্ফূর্ত। স্বতঃস্ফূর্ত এই অর্থে যে, সেখানে বাইরের থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোন চিন্তন প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল থাকে না। কিন্তু এটাও ঠিক যে, লব্ধ অভিজ্ঞতার পথে আমাদের প্রত্যেকের জীবন যখন পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে, তখন কি, কেন কিভাবে; এইরকম দ্বিধায় জড়িত, সংশয় দোলাচল প্রশ্নাবলী ক্রমাগত মনের রুদ্ধদ্বারে জোরে জোরে আঘাত করতে থাকে। আর সেই আঘাতের ঠেলাতেই পাঠককে প্রশ্ন করতে হয় তার নিজেরই ভালোলাগাকে, মন্দলাগাকে। কিন্তু এখানে আবার আর একটি অন্য ব্যাপারও মনে রাখা দরকার। এই প্রশ্ন করা কাজটা যে কোন পাঠক যে করবেনই বা করতে পারবেনই, এমনও কিন্তু সবসময় নয়, কেননা ঠিক ঠিক প্রশ্ন করতে পারার জন্যে একটা বেশ শক্তপোক্ত রকমের যোগ্যতার দরকার হয়, অধিকারিত্ব অর্জনের প্রয়োজন পড়ে। যদি এই অধিকারিত্ব কোন পাঠক তার অধ্যয়ন ও নিরন্তর মানস কর্ষণের মধ্য দিয়ে আর্জন করতে পারেন, তাহলে প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের মধ্য থেকে একটি উত্তরের সম্ভাবনাও তৈরি হয়ে যায়। সেই উত্তর অবশ্য আবার নতুন প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে, একটি চিন্তন প্রক্রিয়াকে জন্ম দিতে পারে। এই যে প্রশ্ন করার দক্ষতা অর্জন, এর জন্য পাঠককে শিক্ষিত হতে হয়। এখানে শিক্ষিত হওয়া মানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার লাইসেন্স প্রাপ্তি নয়। এমন অনেক সার্টিফিকেট হাতে রাখা, গলায় পদক ঝোলানো শিক্ষিত পাঠক আছেন, যাঁরা পড়েন প্রচুর কিন্তু সংখ্যার গৌরব ছাড়া বোধের দীপ্তিতে আলোকিত হওয়ার সৌভাগ্য তাঁদের ঘটে না। এবং এর জন্যে তাঁদের কোন আক্ষেপ বা বেদনাও থাকে না। সুতরাং এই ক্ষেত্রে ‘শিক্ষিত হওয়া’ নামক ব্যাপারটার সঙ্গে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ব্যাপারটার সমানুপাতিক কিংবা ব্যস্তানুপাতিক কোন সম্পর্কই নেই। যারা ভগবৎগীতা মন দিয়ে পড়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, অর্জুনের অনেকগুলি প্রশ্নের উপর দাঁড়িয়ে আছে গ্রন্থটি। প্রশ্নগুলো যেমন ধারালো তেমনি গভীরতার সন্ধানী। স্বভাবতই উত্তরগুলো হয়ে উঠেছে চাঁচাছোলা অথচ বহুপাঠের মাধ্যমে বোধের তল খুঁজে পাওয়ার উৎস। অমনতর প্রশ্নকর্তা থাকলে এমনতর উত্তরদাতা আসবেনই  ‘আশ্চর্যো বক্তা কুশলোৎস্য লব্ধ, আশ্চর্যো জ্ঞাতা কুশলানুশিষ্টঃ’। এমন প্রশ্নকর্তা আর উত্তরদাতার আলোচনাকেই আমরা মৌলিক বলি। তাদের ভাবনা কোন ধার করা, পরমুখোপেক্ষী ভাবনা বা আলোচনা নয়। বরং তা কালের মহাসমুদ্রের সীমানা ছাড়িয়ে চিন্তাতরঙ্গকে পৌঁছে দিতে পারে ‘চোখের বাহিরে’।

সুতরাং একজন পাঠক তার চিন্তন প্রক্রিয়াকে যখন তৈরী করেন, তখন তাঁকেও নিজের ভিতরে ভিতরে পড়তে হয়। এটি বাইরের কোন বই পড়া নয়। এটি নিজের মনে ভিতরে অনবরত লিখিত হতে থাকা অগণিত পৃষ্ঠাগুলিকে পড়া। এই মানস ঞবীঃ পাঠ করা অবশ্যই এক সাধনার মত যথেষ্ট ধৈর্যশীল, সংযত, অপক্ষপাতী, উদার মননের জগতেই এমন পাঠ ঘটে থাকে। এতে বাইরের জগতের একটি পাঠক  ঞবীঃ কেন্দ্র করে সেই নিজস্ব মতামত ব্যক্ত হতে পারে, যা অপরাপর মতের সঙ্গে আদানপ্রদানের মাধ্যমে, ভূয়োদর্শী সংপ্রশ্নের মাধ্যমে একধরনের সারস্বত পরম্পরা নির্মাণ করে। যাঁরা শঙ্করাচার্যের উপনিষদ, গীতা প্রভৃতির উপর লিখিত বিভিন্ন ভাষ্য তথা আলোচনাগুলি পড়েছেন, তাঁরা জানেন যে, নিজের মতটি উপস্থাপনের আগে কেমন করে বারে বারে শঙ্কর সমকালে থাকা প্রশ্নগুলিকে বিতর্কগুলিকে, আলোচনাগুলিকে পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছেন। এটি যে কোনো শিল্পকর্ম, সাহিত্যকৃতিযোগ্য পাঠকের কাছে দাবি হিসেবে পেশ করে। একজন পাঠক হিসেবেই শঙ্করাচার্য এমনটি করেছেন। আর এর ফলে তৈরি হয়েছে পূর্বোক্ত সারস্বত পরম্পরার দৃঢ় ভিত্তি বনিয়াদ।

একথাগুলো বললাম একারণে যে, আমাদের সাহিত্য আলোচনায় বিশেষত বাংলা সাহিত্যের আলোচনায় একটি বড় প্রবণতা হল ইউরোপ-আমেরিকার সারস্বত সাংস্কৃতিক পরিবেশে, বিদ্যায়তনিক চর্চায় নানাভাবে ব্যবহৃত চিন্তন প্রক্রিয়াগুলিকেই কেবল ধার করে এনে নিজেদের সৃষ্টিসম্ভারের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। এটার কারণ অবশ্যই আমাদের অন্য এক দুর্ভাগ্যের ইতিহাস। সে ইতিহাসের ভিতরে ঢুকলেই আমরা বুঝতে পারি যে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিশ্ববিদ্যার বহুস্বরের সঙ্গে আমরা প্রায় পরিচিত হইনি। উপনিবেশ ছিলাম বলেই অনেকটা ঘাড় ধরে আমাদের পরিচিত হতে বাধ্য করা হয়েছিল। দেশজনতাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বিদেশজাতিকে তারিফ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। ঔপনিবেশিকতার এই দুর্ভাগ্য আমরা বহন করছি আজও। তার মানে একথা বলতে চাইছি না যে, নয়া দুনিয়ার রঙমশাল জ্বালানো বিদ্যাচর্চার বহুবর্ণ দ্যুতি থেকে আমরা নিজেদের নির্বাসিত করে রাখবো। নিশ্চয়ই আমাদের জ্ঞানবিদ্যার অঙ্গনের সিংহফটক অবারিত থাকবে। অচলায়তনিক পদধ্বনিতে আমাদের আত্মগ্লানির মহড়া যেন কখনো না প্রকাশিত হয়। কিন্তু তার সঙ্গে এটাও যেন মনে রাখি যে, বিশ্ববিদ্যাচর্চার এই অবাধ আবাহনে আমাদের দেশ, আমাদের সংস্কৃতির নিজস্ব সুরপ্রতিমার অবোধ বিসর্জন যেন না দিয়ে ফেলি। আমদের সারস্বত চর্চার প্রাঙ্গণে, আমাদের বিশ্লেষণের প্রেক্ষাগৃহে অতীত বর্তমান দেশ-বিদেশের সপ্তস্বরা রাগিণী পঞ্চমে বাজতে থাকুক, কেবল আমরা যেন নিজেরা স্বেচ্ছায় সারস্বত সামন্ততান্ত্রিকতায় নিজেদের বলি না দিয়ে ফেলি। আমাদের মধ্যে তৈরি হোক নিজস্ব ভাবনা-কাঠমো। তাতে অন্য অনেকের অনেক উপাদান মিশে থাকতেই পারে। আমাদের বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় এই স্বতঃস্ফূর্ত নিজস্বতা তৈরি হওয়ার প্রয়োজন আজ খুব বেশি।

আসলে আধুনিক মননের দাবিটাই তো এই যে, বহুত্বকে নিমন্ত্রণ জানিয়েও নিজস্বকে ভুলে না যাওয়া। এ একধরনের সংগতি সাধন, যেখানে আত্মবিশ্বাসী আত্মপ্রকাশ বহুবিচিত্র সংসারকে উপেক্ষা করে না, দূরে ঠেলে দেয় না, আপন করে নেয়, নিজের করে নেয়। আধুনিকতার মধ্যে তাই একধরনের গ্রহীষ্ণুতার দায় থাকা উচিত। সেখানে প্রগতি মানুষের বহুরকমের চিন্তাগত সংঘাতের ফসল। এই সংঘাত-সংঘটনের জন্যেই সমস্ত মতের, বোধের একসমতলে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন আছে। কিন্তু এটাও ঠিক, মানুষের সভ্যতায় প্রগতির যাত্রায় বারেবারেই দেখা গেছে একধরনের নির্দয় বহিষ্করণের চেষ্টা। ফলত প্রগতি বাধা প্রাপ্ত হয়েছে, প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়েছে। আধুনিকতার যাত্রায় তাই ভাঙন এসেছে খবড়ঃধৎফ গবঃধহধৎৎধঃরাব-এর বিলোপ লক্ষ করেছিলেন। তাঁর ভাষায় :

Simplifing to the extreme, I define post Modern as increduluty toward metanarrative… The narrative function is losing its functions, its great hero, its great dengers, its great voyages, its great goal. It is being dispersed in clouds of narrative language… where, after the metanarratives, can legitimacy reside? (Leotard, Jean-Francois. Introduction : The post Modern Condition : A Report on knowledge 1979; XXIV-XXV.

যেসব ধ্রুব বোধগুলো শাশ্বত মূল্যমানগুলো মানুষের সভ্যতায় নির্দিষ্ট মর্যাদা পেয়ে এসেছে মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিজীবন নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেগুলির অস্তিত্ব প্রয়োজনীয়তা, কার্যকারিত্ব নিয়ে এভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আধিপত্য, বিশ্বাসের জায়গায় যুক্তি-বুদ্ধির কর্তৃত্বকামিত্ব, শিক্ষা ও মানবিক সুযোগ সুবিধার গণায়ন (গধংংরভরপধঃরড়হ) প্রভৃতির অপূর্ব আবির্ভাবের ফলে সত্য, ঈশ্বর, কল্যাণ, আদর্শ ইত্যাদি ধারণাগুলোর দেশ-কাল-পাত্র নিরপেক্ষ চরিত্রধর্মকে আমাদেরই সভ্যতার একদল মানুষ সংশয়ের দৃষ্টিতে দেখেছে, অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখেছে। সাহিত্যে তার ভূয়ো প্রতিফলন আজ অনায়াসলব্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী পৃথিবী অস্থিরতার মধ্যে স্থিতাবস্থার জন্যে তীব্র এক ব্যগ্রতা প্রকাশ করছিল। ধনতান্ত্রিক দুনিয়ার চেহারা বদল হয়েছে, সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার দেওয়ালের উপরের রঙটুকু কেবল আছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের এক বড় সংখ্যক জনতার কাছে ভোগ্যপণ্যের বাজার বিরাট হাঁ-করা মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তথ্যের বিস্ফোরণ পৃথিবীকে সংবাদের ভৌগোলিকতায় অত্যন্ত ছোট করে ফেলেছে। লাভ আর লোভের দুনিয়াটা অত্যন্ত কটু আকারে তার স্বভাবকে প্রকাশ করছে। দ্রুত সাফল্য আর খ্যাতির শিখর ছোঁওয়ার চেষ্টায় অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাত্রাতিরিক্ত প্রবণতা ব্যক্তির সামনে অনিবার্য নৈরাশ্যকেই ভবিতব্য করে তুলছে। বিগত শতাব্দীর শেষ দুই দশক থেকে বর্তমান শতাব্দীর প্রায় শেষ হতে চলা এই দুই দশকের মধ্যে বৈদ্যুতিনকেন্দ্রিক তথ্য দুনিয়ায় অরেক রূপান্তর এসেছে। যেখানে সবকিছুই অত্যন্ত দ্রুত পাওয়া চাই, করা চাই এবং ফেলে দেওয়া চাই। ব্যবহারিক জিনিসের মতো আমাদের মানসিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াসম্ভূত চিন্তন প্রক্রিয়াগুলো হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, যারা এক অনিশ্চিত অস্থিরতার মধ্যে চলতে পছন্দ করছে বলে মনে হয়। এই বিচিত্র গতিমান জনমিছিলের মধ্যে আত্মপ্রকাশ লাভ করছে নেতিবাচক প্রবণতা। একাকিত্ব আত্মহত্যা প্রয়াস, অসিহষ্ণুতা আত্মপ্রীত প্রতিযোগিতা হয়ে উঠছে দুরারোগ্য ব্যাধি, যার ফসল ব্যক্তিকেন্দ্রিক, পরিবারকেন্দ্রিক, প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক, সমাজকেন্দ্রিক ও জাতি-দেশকেন্দ্রিক পারস্পরিক সংঘাত ভাঙন আর বিনাশ। চোখের সামনে তা ঘটতে দেখে ভয় ঢুকছে সবার ভিতর, অথচ আমাদের সারস্বত সাংস্কৃতিকতায় এর থেকে কোন উত্তরণের দিশা দেখানোর সাধনা উঠে আসছে না। বহুত্বকে স্বীকার করার প্রবণতার মধ্যেও এসে জুটছে বহুত্বের মধ্যে থাকা খ-িত একককে পৃথক করে মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা। খ- ব্যক্তিত্বের বিচ্ছিন্ন আত্মত্বের ভিত্তিতে খ- সময়ের কিছু মূল্যবোধ, মূল্যমান বিধানের প্রযতœ তাই আজকের কালের লক্ষণীয় অভিজ্ঞান। ২০০১ সালে A. Michael peters, ‘post structuralism Marxism and Neo-liberalism : Bet ween Theory and politics, Rowman and Littlefield 2001, p-7 MÖ‡š’ Multiplicity of theoretical stand point -এর কথা বলেছেন, যা কিনা গবঃধহধৎৎধঃরাব-এর স্থান নেবে। এই প্রেক্ষাপটে প্রত্যক্ষের উপস্থাপনা ছাড়া দৃশ্যের বর্ণনার অতীত কোন সত্যের অস্তিত্ব আর থাকবে না। জরপযধৎফ জড়ৎঃু বলেছিলেন ১৯৮৯ তে প্রকাশিত তাঁর  ‘Zuvi  ‘Contingency, Irony and solidarity’’ নামক লেখায় :

Truth cannot be out there – cannot exists independently of the human mindÑ because sentences cannot so exists, or be out there. The world is out there, but descriptions of the world are not only descriptions of the world can be truth or false. The world on its own unaided by the describing activities of humans cannot.

মানুষের সভ্যতার অগ্রগতিতে তার সাংস্কৃতিক অবয়ব নির্মাণের বিরাট ইতিহাসে অতীতের যে ঐতিহ্য পরম্পরার একটি সুনির্দিষ্ট একক তৈরি হয়ে আছে, সেই এককগুলি চরিত্র-পরিচয় যুগব্যাপী ও যুগান্তর ছোঁয়া। কিন্তু উত্তর-আধুনিকের এই বোধায়ন যাত্রায় এদের মূল্য অস্বীকৃত হয়ে যায়। বদ্রিলারও তাই মনে করেছিলেন। তাঁর কাছে বিশ্বায়ন ইতিহাসের প্রগতির কোন শেষ কথা নয়, বরং ইতিহাসের প্রগতির রুদ্ধসংগীত। দ্বিধাহীনভাবে তিনি লিখেছেন :

The end of history is, alas, also the end of the dustbins of history. There are any dustbins for disposing of old ideologies, old regimes, and old values. Where are we going to throw Marxism, which actually in invented the dustbins of history? (yet there is some justice here since the very people who invented them have falen in.) Conclusion : If there are no more dustbins of history, this is because history itself has become a dustbin. It has become its own dustbin, just as the planet itself is becoming its own dustbin.

(The illusion of the end, or selected writings, page-263)

এখন প্রশ্ন, সত্যই কি সমগ্র বিশ্বজুড়ে আপামর মানুষের চিন্তা ভাবনায় আধুনিকতার উত্তরকালে এমনই রূপান্তরশীল বিশ্ববীক্ষণ ঘটেছে, যার ফলে মানবের অন্তর্লোকে ও বহির্লোকে আমোঘ বিবর্তন প্রত্যাসন্ন? নাকি কিছু সংখ্যালঘু তাত্ত্বিক তথা মেধাসম্পদে ধনী মানুষের দুনিয়াতেই এর চলাচল বেশি। এবং সেই মেধাবিত্তশালী সংখ্যালঘু মানুষের ‘ওহঃবষষবপঃঁধষ ঐবমবসড়হু’ তথা বৌদ্ধিক আধিপত্যের শিকার করা হচ্ছে দুনিয়ার মধ্যমেধা বা অল্পমেধার কোটি মানুষের মিছিলকে।

আমদের পৃথিবীতে মানুষের বহুস্বর প্রকাশ, বহুবর্ণ অধিষ্ঠান কেবল বহুত্ববাদের কথা বলে না, তারই সাথে মানুষের নিজস্বতাকেও মর্যাদা দেয়। তারই ঘাতে-প্রতিঘাতে মানুষের এগিয়ে যাওয়ার আখ্যান রচিত হয়। এজন্যই একথা মান্য যে, কোন একটি মাত্র তত্ত্বের সরলরৈখিক ভাবনার ছত্রছায়ায় সময়কে এবং তার ছত্রছায়ায় সকল শ্রেণির মানুষকে নিয়ে আসা যায় না। প্রত্যক্ষসম্ভূত ক্ষণিক মূল্যবোধগুলির মর্যাদা, গুরুত্ব ও প্রভাব ব্যষ্টি ও সমষ্টি জীবনে চিরকালই অনস্বীকার্য। বস্তুত সেই অর্থে এই জাতীয় কালভিত্তিক, প্রয়োজনভিত্তিক মূল্যবোধগুলি একইরকম হয়ে ওঠে আর একটা নতুন গবঃধহধৎৎধঃরাব। এটাও স্মর্তব্য যে, আধুনিকতার ধারণাতেই অনেক সময়েই সমসাময়িকতার ধারণা, তাৎক্ষণিকতার ধারণার প্রভাব এসে পরে। এর ফলে কোনটা ক্ষণকালের আর কোনটা চিরকালের তা আলাদা করে চেনা সমস্যার হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় আধুনিকতার এই কাললক্ষণকে বোঝাতে গিয়ে চমৎকার বলেছেন :

কাজটা সহজ নয়। কারণ পাঁজি মিলিয়ে মর্ডানের সীমানা নির্ণয় করবে কে?… এই আধুনিকটা সময় নিয়ে নয়, মর্জ্জি নিয়ে। (সাহিত্যের পথে, ১ম সংস্করণ, পৃ ১৩১)

সময়ের বিচারে বেশ পুরনো কথা হলেও এর গুরুত্ব মনে রাখার ও বোঝার মতো। কোনোদিনই কেউ বলতে পারবে না যে, গতকাল রাত্রি অবধি ছিল প্রাক-আধুনিকের রাজত্ব আর আজ সকাল থেকে পালটে তা চলে গেলো আধুনিকের দখলে। তাই সময়ের দাবীর চেয়েও আধুনিকতায় ভাবের দাবীটাই বেশী জোরালো, যেটাকে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘মর্জ্জি’। মানুষের চিন্তার জগতে পরিবর্তমানতায় নির্ণিত হয় একটি সভ্যতার প্রগতির রেখাপত্র। আধুনিকতার প্রকৃতি বিশ্লেষণে তাই চিন্তার জগৎটাকে গুরুত্ব না দিলে সর্বৈব ভুল হবে। বিচার করে দেখতে হবে তাই, ব্যক্তির ও সমষ্টির চিন্তার ক্ষেত্রে কেমন করে এবং কখন একটা চরিত্রগত রূপান্তর ঘটছে। পুরাতন ঐতিহ্যের স্থান নিচ্ছে একটি নতুন ঐতিহ্য। সেই নবনির্মিত ঐতিহ্য আবার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে, সমাজবিন্যাসের মধ্যে একটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে এটাও আধুনিকতার কাছে প্রত্যাশিত। ইউরোপীয় নবজাগরণ মানবসভ্যতার চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে যা যা পরিবর্তন এনেছিল তার সবগুলিই যে এক সদর্থক আধুনিকতার মুক্তাঙ্গন তৈরী করেছিল, এমন নয়। বস্তুত তার পরও ইউরোপীয় মনীষাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে একটি দীর্ঘকালব্যাপী ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার উপর যে প্রক্রিয়া গ্রহণের উদারতা নিয়ে এসেছে বিচারের ইচ্ছাকে গভীর করে করেছে। আর সেই সঙ্গে এমন একটি উত্তরকালের পথ তৈরি করেছে যেখানে পালটে চলা কালের চিহ্নগুলি আশ্রয় পাবে। অতএব যথার্থ অর্থে আধুনিকতা সাহিত্যে এবং মানবজীবনে সময় আর ভাবনার উদারতা এবং বিচারপ্রবণতাকে সাথী করবে।

এখানেই মনে রাখা দরকার যে, আধুনিকতার মুক্তপথে যাই এসে পড়বে তাই চিরস্থায়ী নয়; সমসাময়িকতার ধুলিঝড় অধুনিকতার শরীরে এমনভাবে মিশে থাকে, যে তাকে অনেকসময় আলাদা করে চেনা যায় না। আর সেই সাময়িকতার তুফানকেই অনেকে আধুনিকতা ভেবে ভুলও করে বসেন। আধুনিকতায় তাই যে চিরন্তনত্বের দাবী থাকে, তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে একটি সংঘাত। এই সংঘাত যেমন পুরানোর সাথে নতুনের, তেমনি আবার নতুনের মধ্যেকার নানান পরস্পরবিরোধী প্রবণতার  যেখানে সাময়িকতা আর চিরায়তির লড়াইটাও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত গান আছে :

                                পতন অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থা যুগ যুগ ধাবিত যাত্রী

                                হে চিরসারথী তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি।

মানুষের সভ্যতাই এই চিরসারথী। তাই তার পতন আর অভ্যুদয়ের বন্ধুর পথে চলতে চলতে মুখরিত দিনরাত্রির মঝেই এসে পড়ে চিরায়ত। সজাগ সচেতনতায় তাকে বরণ করে নিতে হয়। না হলে খেসারত দিতে হতে পারে। বস্তুত এভাবেই প্রতিটি পরিবর্তিত কাল তার ভাবীকালের জন্য রেখে যায় এরকম কিছু চিরকালীন সম্পদ, যা জাতিকে দেশকে বাঁচিয়ে রাখবে, বড় হওয়ার প্রেরণা দেবে, দুর্যোগের মধ্যে যুঝতে অপরিহার্য সাহায্য করবে। সাহিত্যের মধ্যেও আধুনিকতার চরিত্রসন্ধান করতে গেলে সাময়িকতার সঙ্গে সংঘাত শেষে যে চিরায়তকে সে রেখে যাবে, তাকে খুঁজে পাওয়াটা জরুরি। অবশ্য সঙ্ঘাতটার প্রকৃতি-বিশ্লেষণও এখানে প্রয়োজনীয়। একালের বাংলা সাহিত্যের এক বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক গোপাল হালদার আধুনিকতার মর্মবাণী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন :

ইতিহাসের তিনটি বড় রকমের সমুত্থানের মধ্য দিয়ে আধুনিকতার এই ক্রমবিকাশকে আমারা চিহ্নিত করতে পারি। ইউরোপীয় রিনাইসেন্সে উদবোধন ঘটেছে মানুষের মহিমা-বোধের, ফরাসী বিপ্লবে ঘটেছে মানুষের অধিকারের ব্যক্তিগত গণতান্ত্রিক  ফরাসী-বিপ্লব ঘটেছে মানুষের অধিকারের ব্যক্তিগত ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠা : আর সোভিয়েত বিপ্লবে ঘটেছে মানুষের বিপ্লবী যাত্রার সূচনা। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মানুষের এই স্বীকৃতি, এই মানবসত্য ব্যক্তিমহিমার ও জাতীয় স্বাধীনতার বাণীরূপে কতটা প্রকাশ লাভ করেছে, তা একটা মূল প্রশ্ন। (আধুনিক সাহিত্য, একালের সমালোচনা সঞ্চয়ন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৮০, পৃ ১১৯)

প্রাবন্ধিক আধুনিকতার মূল সুরটাকে ধরতে চেয়েছেন মানবত্বের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠায়। কোন ভুল নেই আধুনিকতার এ এক স্পষ্ট অভিজ্ঞান। কিন্তু তার সাথে এটাও মনে রাখা একান্ত দরকার যে, মানবত্বের এই পূর্ণ প্রতিষ্ঠা কখনই আমাদের সভ্যতায় সম্ভব হয় নি, যতক্ষণ না মানুষের বহুমাত্রিক জীবনভাবনা এবং মানব-অভিপ্রায় বা কর্মধারার বিচিত্র স্বরগুলিকে ধরা গেছে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে সাবেক সোভিয়েত রাশিয়া মানব-সভ্যতায় আধুনিকতার যে বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন, তা সন্দেহাতীতভাবে ছিল যুগান্তকারী এবং অনন্য : কিন্তু সেখানে মানুষের জীবনের এই ভূয়ো মাত্রা বা স্বরকে চেনার চেষ্টা করা হয় নি। এক ধরনের একদেশদর্শিতাকে তাঁরা প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। শতাব্দী পেরোনোর আগে সেই ভ্রান্তির খেসারত দিতে হয়েছে তাঁদের। বস্তুত অতি পুরাতন কাল থেকে মানুষ জীবন সম্পর্কে যা ভেবেছে এবং যা যা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে, তার সবকিছুই মানুষের আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সূচক। এই সূচকগুলিকে আলাদাভাবে বের করে আনতে হয় এবং দেখতে হয় পরিবর্তমান কালের যাত্রপথে এদের মধ্যে কারা ভাবীকালের জন্যে কিছু বিচায়ত সম্পদ রেখে যাচ্ছে।

এইখানে এসেই আমরা একটি বিতর্কিত প্রসঙ্গের অবতারণা করতে চাই। দেশে-বিদেশে যাঁরা নিজেদের আধুনিকতার বিশ্লেষক বলে মনে করেন, তাঁদের মধ্যে একটি সুপ্রচলিত ধারণা এই যে, আধুনিকতার চরিত্রে ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, ঈশ্বর-বিশ্বাস, ধ্রুব বিশ্বাস থাকতে পারে না। ইরাসমাস যেমন প্রচার করেছিলেন যে, ঈশ্বর গতকাল মারা গেছেন এবং আজ মানুষের জন্ম হয়েছে। অথবা নিটসে যেমন ঘোষণা করেছিলেন যে বুড়ো ঈশ্বরটা তাহলে মরেছে। এরকম কিছু ব্যক্তিগত মতামতের ওপর নির্ভর করে অনেকেই ভাবতে শুরু করেন যে, ঐ এক অদৃশ্য বা দৃশ্যমান ঈশ্বর বেঁচে থাকার জন্যেই বোধহয় আধুনিকতার আসাটা আটকে থাকা। আর যারা ঈশ্বরবিশ্বাসী তাদেরও ধারণা যে, যারাই আধুনিক তাদের কেউই এই জাতীয় বিশ্বসগুলিকে নিয়ে থাকেন না। নিঃসন্দেহে এও এক কুসংস্কার। যাঁরা ধর্মীয় সাহিত্য বলে সাহিত্যের একটি আলাদা গোত্র তৈরি করেন এবং তাকে সাহিত্যের অন্যান্য শ্রেণির সঙ্গে সম পংক্তিভোজনে বসতে দিতে চান না, তাঁরা ভুলে যান যে, মানবজীবনের অন্য অনেক বৈশিষ্ট্যের মতই একটি বৈশিষ্ট্য তার ধর্মবোধ এবং তার অনুসারী জীবনযাপন। এই বোধ থেকে সম্পূর্ণ বিবিক্ত করে কোন মানুষকেই চেনাও যাবে না এবং বোঝাও যাবে না। তাই আধুনিকতার পরিবৃত্তে যদি নিরীশ্বর মানুষের বিচিত্রমুখী জীবনের ধ্বনি লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা প্রকাশিত হয়, তাহলে সেখানে ঈশ্বর মানুষের মর্মজগতকেও আনা দরকার। সমসাময়িকতার ধূলিধূম আচ্ছন্নতায় কেউ মনে করতেই পারেন ঈশ্বর মৃত, আবার কেউ মনে করতে পারেন ঈশ্বর অমর। তাই চিরকালীন মূল্যবোধগুলিকে ভেঙে দেবার চেষ্টাতেই কেবল আধুনিকতার চরিত্রসন্ধান করায় কখনই আধুনিকতার পুর্ণবয়ব নির্মাণ ঘটবে না। মানুষের সভ্যতা অনেক ভাঙ্গনের মধ্যে যেসব বোধগুলিকে ধরে রাখছে সমষ্টি ও ব্যক্তিগত জীবনে সেগুলি যখন আমাদের সাহিত্যে, আমাদের জীবনে একটা সদর্থক ভূমিকা নেবে, তখনই আধুনিকতার যথার্থ উত্তরণ ঘটবে। এতে ভয় পাওয়ার দরকার নেই এই ভেবে যে, তাহলে সাহিত্য বা শিল্প নীতিবাদ প্রচারের যন্ত্র হয়ে দাঁড়াবে। সাহিত্য বা শিল্প যেমন সমাজের ও ব্যক্তির জীবনের আয়নার মতন সবকিছুকে প্রতিবিম্বিত করার চেষ্টা করে, তেমনই করবে। বিভিন্ন স্রষ্টার হাতে তার বিভিন্ন রূপ নির্মিত হবে। বিশ্বসাহিত্যে এমনটিই অবশ্য ঘটে চলেছে আমাদের গোচরে অগোচরে, আমাদের কারুর কারুর ইচ্ছার বিরুদ্ধেও; এমনকি কোনও কোনও সময়ে স্রষ্টার নিজের ইচ্ছার বিপক্ষেও। ঔ. অ ঈঁফফড়হ ‘সড়ফবৎহরংস’ সম্পর্কিত ধারণা বোঝাতে গিয়ে এই বিষয়টি আমাদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন:

As far as literature is concerned modernism reveals a breaking away from established rules, traditions and conventions, fresh ways of looking at man’s position and function in the universe and many (in some cases remarkable) experiments in from and style.

(The penguin Dictionary of Literary Terms, and Literary Theory, 1999, P 515-516) এই নৎবধশরহম ধধিু-ই সাহিত্যের আধুনিকতার পথ তৈরি করে। সেখানে সংঘাত থাকে, থাকে নতুন করে গড়ার চেষ্টা। ডেভিড ফারগ্যাকস একেই বলতে চেয়েছিলেন ‘পড়হভষরপঃ রিঃযরহ সড়ফবৎহরংস’ যা তাঁর ভাষায় আধুনিকতার রহহবৎ ফুহধসরপ তৈরি করে।

আবার ফারগ্যাকসের বলা এই পড়হভষরপঃ আধুনিকতার ভিতর থেকে জন্ম দিয়েছে উত্তর-আধুনিক হয়ে ওঠার ইচ্ছাকে, ক্রিয়াশীলতাকে। তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে একটি নতুন তত্ত্ব। অবশ্য এই কথা বলার সময় এটাও মনে রাখব যে, ব্যাপারটা আসলে নতুন একটা তত্ত্বসন্ধান মাত্র নয়। এর মধ্যে ছিল একটা নতুন জীবনবীক্ষাকে তৈরি করা, একটা মানস মনন প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত পরিশীলিত করা  যা না হলে আমাদের সভ্যতার পথে এগিয়ে চলার আখ্যানটা ঠিকঠাক গড়ে ওঠে না। তাই আধুনিকের পথ ধরেই উত্তর-আধুনিকের উঠে আসার চেষ্টা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। আবার, সেই একই পথ ধরে অতি সম্প্রতি জন্ম নিচ্ছে মেটা-মডার্নিজম। এতেই নতুন করে প্রশ্ন জাগে যে, এত সব জটিল তাত্ত্বিকতার ভিড়ে আমাদের জীবনজিজ্ঞাসার মূল সত্যগুলিই হারিয়ে ফেলে আমরা কোন দিশাহীনতাকেই আশ্রয় করছি নাতো।

হৈ চৈ করে উঠে আসা উত্তর-আধুনিকতা ও এই জাতীয় তত্ত্বগুলির সীমাবদ্ধতাটা তাই বোঝা একান্ত দরকার। একটু দীর্ঘ হলেও অধ্যাপক পবিত্র সরকারের এই সম্পর্কিত একটি মন্তব্যকে এক্ষেত্রে উদ্ধার করা প্রয়োজন বলে বোধ হচ্ছে :

এই সচেতনভাবে স্ববিরোধী এবং আত্মগ-গোলে উল্লসিত তত্ত্ব দক্ষিণ এশিয়া বা তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষের জন্য কোন বড় আশ্বাস বহন করে আনে না। জেমসন যেভাবে তাদের সদ্যতন শিল্প ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছেনসে শিল্পব্যবস্থা তৃতীয় বিশ্বে কী ভূমিকা নিচ্ছে সে বিষয়ে তারা অবহিত কিনা জানি না। এখনও যে পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ আধপেটা খেয়ে থাকে, যুুদ্ধে, দুর্ভিক্ষে ও মহামারীতে পলে পলে মরে, অশিক্ষা ও কুসংস্কারে ডুবে থাকে (বিশ্বকাপের ভারচুয়াল রিয়্যালিটি সত্ত্বেও) সেই রিয়্যালিটিকে অস্বীকার করতে চায় যে মতবাদ, তা সহিত্যতত্ত্ব, শিল্পতত্ত্ব, নীতিতত্ত্ব যে রূপ ধরেই আসুক না কেন তার সম্পর্কে আমাদের একটা অবস্থান নিতেই হবে। খ্রিস্টফার পরিস অবশ্য জানিয়েছেন যে (ঘড়ৎরং, ১৯৯৩) এ শ্রেণির দার্শনিকেরা সহস্র ইহুদি নিধনকেও ‘ঞবীঃঁধষরঃু’ বা ভাষাপাঠ হিসেবে দেখেন; ফলে তার সত্যতা সম্বন্ধেও তাঁরা প্রশ্ন তোলেন। কারণ ভাষা বাস্তবের নিখুঁত প্রতিলিপি একথা তাঁরা মানতে রাজি নন। এই চূড়ান্ত সংশয়বাদীদের কাছে (নরিস এর মত নামবাদী হড়সরহধষরংঃ বা অবস্থান) যুদ্ধ, অনাহার, মহামারী কতটা সত্য বলে গণ্য হবে কে জানে? উত্তর আধুনিকতাকে অবশ্যই বুঝতে চাইব না এমন নয়, কিন্তু আধুনিক পাশ্চাত্যে তৈরি তত্ত্ব মানেই চূড়ান্ত ও চরম আমাদের তাতে মুগ্ধ হয়ে আত্মসমর্পণ করতে হবে, এই প্রয়াসের মধ্যে একটা লজ্জাকর হীনমন্যতা আছে বলে অন্তত এই লেখকের ধারণা।

(‘উত্তর-আধুনিকতা ও তৃতীয় বিশ্ব’, পবিত্র সরকার, পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য ভাবনা, নবেন্দু সেন (সম্পা.), রতœাবলী ২০০৯, পৃষ্ঠা. ৫৯৫)

উদ্ধৃত কথাগুলোর মধ্যে যে ক্ষোভ রয়েছে তাঁকে একেবারেই অমূল্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রে যে সাধারণীকৃতির ধারণা নিয়ে আসা হয়েছিল, কুন্তক যে অনির্বচনীয় মনোহারিণী ব্যবস্থিতির কথা বলেছিলেন, তা আসলে সৃষ্টিকে জনতার দরবারে হাজির করে। সে জনতা ঐ সৃজন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একধরনের আস্বাদ্যমানতা লাভ করে, সেই লাভটাও পাঠক হিসেবে তাঁর একটি প্রাপ্ত শিক্ষা। এই শিক্ষার্জনের পথে তার চিন্তন প্রক্রিয়াগুলি প্রভাবিত হয়, নির্মিত বিনির্মিত হয়, আবার সেই পথেই সৃষ্টিও নতুন আলোকে উদ্ভাসিত হয়। সৃষ্টির মধ্য থেকে যেন আরেকটা সৃষ্টি জন্ম নেয়। পাঠ ও পাঠকের মধ্যকার অন্যান্য সম্পর্ক ক্রিয়াই আসলে একটি এমন পটভূমি তৈরি করে যা কালের দিগন্তরেখাকে মুছে দেয়। মহাকালের দিকে এগোতে থাকে। পৃথিবীর সবকালের সাহিত্য পাঠের বিশ্লেষণে এমনটা অনেক সময়ে ঘটেছে আমাদের গোচরে অগোচরে। একটি পূর্ব নির্ধারিত তাত্ত্বিক কাঠামোয় পাঠ ও পাঠক বন্দী হয়ে গেলে উভয়ের মৃত্যু ঘটে। সেখানে সৃষ্টির আলো নিভে যায়। অথচ পূর্বকথিত অন্যান্য ক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় শিল্প সাহিত্যকে দেখার সেই দৃষ্টিভঙ্গি যা একটি নির্দিষ্ট দেশ, একটি নির্দিষ্ট কালকে গ্রহণ করে, আত্মীকরণ করে, আবার কালোত্তরকেও খোঁজে। খুঁজে পেলে প্রতিষ্ঠা করে মাহাকালের অনশ্বর শুভ্র বেদীতে। এখানেই যে কোন কালের সৃষ্টি মূল্য পায়। এমন একটি মানসপ্রক্রিয়া বা দৃষ্টিভঙ্গিকে আমরা কালের বিচারে কি বলবো গড়ফবৎহ, ঢ়ড়ংঃসড়ফবৎহ না গবঃধ-সড়ফবৎহ না শাশ্বত আধুনিক। নাকি এসব কিছু ছেড়ে দিয়ে একটি নতুন ধারণা নিয়ে আসতে পারি আমরা যে ধারণার একটা মহাকালিকতা থাকে আর সে মহাকালিকতায় স্বভাবতই দীর্ঘকালবোধ মানব চিন্তনপ্রক্রিয়ায় এই অজস্র সহস্র বিহঙ্গগুলো অনায়াসে আছড়ে পড়তে পারে, গৃহীত হতে পারে, বর্জিত হতে পারে। যেন সেই মহাকালে অন্তর্গত একটি মানসিক ক্রিয়ার আবর্তে মিশে যেতে যেতে সবকিছুর মধ্য থেকে তৈরি হয় একটি সর্বগ্রাহী বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি।

কিছুদিন আগে একটি লেখা লিখেছিলাম বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাসের একটা ব্যাপার নিয়ে। তাতে বলবার চেষ্টা করেছিলাম, আমাদের জীবনযাপন ও মননের বাসভূমিতে এই বিরাট কালের অনিঃশেষ ভূমিকাকে। কিছুটা বড় হলেও সেই কথাগুলিকে এখানে আর একবার বলতে চাই। একবার প্রকাশিত হয়েছে বলেই নিজির লেখা সত্ত্বেও উদ্ধৃতি হিসেবেই ব্যবহার করলাম :

‘ঔ. গ. ঊ. গপঞধমমধৎঃ তাঁর ঞযব টহৎবধষরঃু ড়ভ ঞরসব গ্রন্থে ঘটনা এবং ঘটনা সম্বন্ধে সময়ের ধারণাকে বোঝাবার জন্যে তিনটি সময় ধারণার কথা বলেছিলেন। ১. অ ঝবৎরবং,  ২. ই ঝবৎরবং এবং ৩. ঈ ঝবৎরবং। প্রথমটির ধারণা আমরা ব্যবহার করি যখন ক্রিয়ার কাল অনুসারে ঘটনা ও তৎসংক্রান্ত সময়কে নির্দেশ করি, অর্থাৎ ভবিষ্যত, বর্তমান ও অতীতকাল সম্পর্কিত ধারণা। দ্বিতীয় ধারণা আমরা ব্যবহার করি যখন কোন একাধিক ঘটনার পারস্পরিক সময় অবস্থা বোঝাই, অর্থাৎ কোনটি আগে ঘটেছে বা কোনটি পরে ঘটেছে। বস্তুত এই দুটি ধারণা সাধারণভাবে আমাদের ব্যবহারের সব সময়ই উপস্থিত থাকে। কিন্তু এর বাইরে তৃতীয় যে সময়-সংক্রান্ত তত্ত্বটি তিনি নিজে যোগ করলেন সেটি ঈ ঝবৎরবং। বস্তুত এই ধারণায় ঘটনা সংঘটনের একটি শৃঙ্খলাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়, কিন্তু সেখানে সময়ের কালানুক্রমী অথবা পৌর্বাপর্যগত ধারাকে মানার প্রয়োজন হয় না। এই ধারণাগুলি নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে অন্যত্র অবতারণা করা যেতে পারে। আমাদের কাছে যেটা প্রাসঙ্গিক, সেটা হল এই যে, সময়ের এই তিনটি ধারণার কোনটিই অনন্তের বৈদান্তিক ধারণাকে গ্রহণ করে নি। যদিও তিনটি সিরিজের মধ্যে বৌদ্ধ দর্শনের সময় সম্পর্কিত আলোচনার সম্বন্ধ কম-বেশি খুঁজে পাওয়া সম্ভব। চৎবংবহঃরংস প্রথম দুটি সিরিজকে মেনে নেয়, আর তৃতীয়টি আসলে চৎবংবহঃরংস-এর ধারণার একটি বর্ধিত রূপ। কিন্তু এখানেই ইউরো-আমেরিকান বিজ্ঞান ও দর্শনের সময় সম্পর্কিত ধারণার ঊঃবৎহধষরংস এর প্রসঙ্গটি এসে পড়ে। এই ধারণা মনে করে যে, আগে বা পরে, ত্রিকালিক অবস্থান বা যৌক্তিক শৃঙ্খলার ধারণা ছাড়াও মানুষ বুঝতে পারে যে, সময়ের যে কোন পর্বে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা অবশ্যই বাস্তব। আর এই বাস্তবতা যুগপৎ একাধিক অস্তিত্বের সাপেক্ষে ঘটতে পারে। ১৯৮৬-৮৭-তে অসবৎরপধহ ঈড়সরপ-নড়ড়শ খরসরঃবফ ঝবৎরংব নামক প্রকাশক সংস্থা থেকে অষধহ গড়ড়ৎ-এর লেখা ডধঃপযসধহ বেরোয়, যার বিখ্যাত চরিত্র ড. ম্যানহাটান জানান যে, কেমন করে তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে একটি নির্দিষ্ট সময়েই একেবারে বাস্তব হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন। এই গ্রন্থের একেবারে শেষে ড. ম্যানহাটান বলেছেন ‘ঘড়ঃযরহম বহফং অফৎরধহ. ঘড়ঃযরহম বাবৎ বহফং.’ এত কথা বললাম এই কারণে, যে উপরে উদ্ধৃত অপুর স্বগতোক্তি আর লেখকের প্রতিক্রিয়া দুটি পড়তে পড়তে মনে হয়, বিভূতিভূষণ যেন এক ধরনের নতুন ঞরসব ঝবৎরবং তৈরি করতে চেয়েছেন, যে চৎবংবহঃরংস-কে অতিক্রম করে যায়। ঊঃবংহধষরংস-এর কাছাকাছি পৌঁছেও স্বভাবসিদ্ধভাবে বিভূতিভূষণ নির্মাণ করেন ঘটনা ও সময়ের সম্পর্কের নিজস্ব অভিধান। যে দিন অপু রওনা দিল, দুর্গা মারা গেছে তার থেকে বেশ কিছুটা আগে। কিন্তু অপুর স্মৃতিতে সে বেঁচে আছে। শুধু স্মৃতিতে বেঁচে আছে, তাই নয়। ঝঢ়ধপব-কে সঙ্গে নিয়ে একটা অনন্ত বর্তমান ঞরসব-কে অপু ক্রমাগত নিজের মনে আউড়ে যাচ্ছে। আদ্রিয়ানকে ম্যানহাটান যেমন বলছেন কিছুই না  শেষ হওয়ার কথা, অপুও যেন নিজেকে সেই সান্ত¦না বাক্যটাই শোনাতে চাইছে। আর তখনই উপস্থিত হচ্ছেন লেখক স্বয়ং। যে ভবিষ্যত জীবনটা অপু এখন পার হয় নি, সেই ভাবীকালে ছবিটা আগে থেকেই বলে দিয়ে তাকেও টেনে আনছেন এই বর্তমানে। দুর্গার মৃত্যুর অতীত অপুর ভাবীকালের পথ চলা অপুর অশ্রুক্লান্ত বর্তমানের অনুভূতির নিবিড়তায় ধরা পড়ছে। ঝঢ়ধপব এবং ঞরসব দুটিই যেন লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে মনে হয় আসলে লঙ্ঘন নয়, যা ঘটেছে তা হল ‘ঞরসবষবংং’ যে ‘ঊঃবৎহধষ’ তাকেই ‘জবধষ’ করে তোলা’।

বিশ্বব্যাপী মানবচৈতন্যের প্রেক্ষাপটে এই মহাকালে ক্যানভাসটাকে দেখা যায়, বোঝা যায়। বোঝা প্রাণ বোঝে যার আর এই বোঝার প্রযতœ যত করতে থাকবে, আমাদের নিরাশাকরোজ্জ্বল দুনিয়ায় আমরা ততই উদ্বাস্তু হতে থাকব, এক ধরনের মানস দুর্ভিক্ষে, মনন মাহামরীতে আক্রান্ত হব আমরা। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির তাই আজ দায় এসেছে, সময় এসেছে সেই মহাকালব্যাপী চৈতন্যের বিচ্ছুরিত কণাগুলিকে খুঁজে বের করার। যার ফসল ফলবে সর্বাবয়ব শ্রেণীহীন এক সভ্যতার জাগৃতি-সম্ভাবনায়। জানি না কল্পনার এ বোধহয় সীমাহীন ঔদ্ধত্য প্রকাশ হয়ে গেল কিন্তু করবটা কী সাহিত্যের শিকড় যে কল্পনায়, আর তার ফুল-ফল পাতা-ডালপালা ক্রমে উঠতে উঠেতে ছুঁতে চায় অনন্তকে মহাকাল, মহাদেশ পার হয়ে যায় সীমানা চৈতন্যের কোন সুদূরে কে জানে!

*********************************

 

উত্তর আধুনিকতা : নয়া সাম্রাজ্যবাদী সূক্ষ্ম দর্শন ও মার্কসবাদ
ইমানুল হক

আধুনিক আমার শাস্ত্র বিচারসহ নয়উচ্চারিত হচ্ছে ‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃতে’ ষোড়শ শতকে। এই বাংলায়। প্রতিদ্বন্দ্বী বেশে প্রায় যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিস্পর্ধীকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন শাসকের অপ্রতিহত প্রতিনিধি চাঁদ কাজী। প্রতিস্পর্ধীর নাম চৈতন্য বিদ্যাসাগর বাদিসিংহ। তিনি অধিকার চান, ক্ষমতার নয়, নিজের কথা উচ্চারণের। নাম গানের মধ্য দিয়ে ভাঙ্গতে চান জাতিভেদ নারী-পুরুষভেদের ব্রাহ্মণ্যবাদী আগল যা আজো রয়ে গেছে সমাজে। তিনি উচ্চারণ করছেন মন্দির বা মসজিদ নয় হৃদয়, কোন বিশেষ মন্ত্র নয় গান, শাস্ত্র নয় বিচার বুদ্ধি সেই চৈতন্যের সামনে কাজী জানাচ্ছেন, তাঁর শাস্ত্র অর্থাৎ কোরান আধুনিক।

এখানে ‘আধুনিক’ মানে সাম্প্রতিক।

আর আধুনিক জীবনের অগ্রদূত বলে পরিচিত ইংল্যান্ডে ‘মডার্ন’ শব্দটি উৎকীর্ণ হচ্ছে বিজ্ঞানী নিউটনের সমাধিলিপিতে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে। (রেমন্ড উইলিয়ামস জানাচ্ছেন, ইংল্যান্ডেও ‘মডার্ন’ শব্দটির জন্ম ষোড়শ শতকে। নিউটনের সমাধিফলকে লেখা হচ্ছে এখানে শুয়ে আছেন একজন ‘মডার্ন নাইট’। ‘নাইট’ শব্দটির অভিঘাত বদলে যাচ্ছে। অস্ত্র দিয়ে জ্ঞান, তথ্য, যুক্তি ও পরিশ্রম দিয়ে লড়তে হবে তোমায় তবেইতুমি মডার্ন, তবেই তুমি নাইট। ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ উপন্যাসে তা লেখা হচ্ছে। অবশ্য ভিঞ্চি কোড অনুযায়ী নিউটন, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যীশুর উত্তরপুরুষ।

‘আধুনিক’ শব্দের অর্থ করছে অভিধান সাম্প্রতিক, বর্তমান, হালের, অধুনাতন। ‘উত্তর আধুনিক’ শব্দটি হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষে’ নেই। নেই সংসদেও। আগামীতে নিশ্চিত আসবে। ‘উত্তর আধুনিক’ নানা শব্দ ও অভিধাতে পরিচিত।

‘আধুনিক যুগ’ মানে যুক্তিবাদ, শিল্পবিপ্লব, বুর্জোয়া বিকাশ, পুঁজিবাদ ও পুঁজিবাদী গণতন্ত্র, আলোকায়ন বা দীপায়ন, সমাজতন্ত্রের ধারণা, মার্কস বাদী সাম্যচিন্তার ধারণা, শ্রমিকশ্রেণির ক্ষমতায়ন, এক্ক বীরত্বের বদলে যৌথজীবনের আপাত অঙ্গীকার। উত্তর আধুনিকতা আক্রমণ করে যুক্তিবাদ, আলোকায়ন এবং এই যুগের দুই গ্রান্ড ন্যারেটিভ বা মহাআখ্যান/মহাবাচন/মহাকথনকে। পুঁজিবাদ, যুক্তিবাদ, আলোকায়ন, মার্কসবাদ এবং ফ্রয়েডবাদ আধুনিক যুগের মহাআখ্যান। এর মধ্যে পুঁজিবাদ ছাড়া বাকি চারটি মহাআখ্যানকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন উত্তর আধুনিকতাবাদীরা। তাঁরা অস্বীকার করেন এই চার তত্ত্ব ছিলেন। এদের অনেকেই মার্কসবাদী ছিলেন। কিন্তু মার্কসবাদের অসম্পূর্ণতা ও অপূর্ণতা চিহ্নিত করার নামে এরা ভোগবাদ ও পুঁজিবাদের তাত্ত্বিক নির্মাতা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। যদিও এদের পুঁজিবাদের বা সাম্রাজ্যবাদের দালাল বলে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। কিন্তু এরা ভোগবাদী অর্থনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করেছেন, করে চলেছেন মুহূর্তে বাঁচা, অখ- চৈতন্যের বদলে খ- চৈতন্যের কথা বলে। এবং পুঁজিবাদ ও তাঁদের প্রচার মাধ্যম যুক্তিবাদ এবং মার্কসবাদের চরম শত্রু উত্তর আধুনিকতত্ত্ব নির্মাতাদের পরিপোষণা করে চলেছেন প্রচার দিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে দ্রুত ও অতি বিশিষ্টতায় এই মতবাদকে জায়গা দিয়ে।

আধুনিকতা এবং উত্তর আধুনিকতার সম্পর্ক  কী?

লেখক ও চিন্তাবিদ হাসান আজিজুল হক চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন :আধুনিকতাকে শুধু একটি কালখ- দিয়ে চিহ্নিত করা হয়নি। চিহ্নিত করা হয়েছে কিছু লক্ষণ দিয়ে, কিছু অর্জন দিয়ে। যেমন ইহজাগতিকতা, যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, যেমন বিজ্ঞানমনস্কতা, যেমন যুক্তিবাদিতা।…আধুনিকতাকে অস্বীকার করতে গেলে এসব অর্জনকেও অস্বীকার করতে হয়। হয় অস্বীকার করতে হয়, অথবা বলতে হয় যে, এগুলোর চেয়ে উন্নততর বোধ বা উত্তর আধুনিকতা মানব জাতিকে উপহার দিয়েছে বা দিতে যাচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবে উত্তর আধুনিকতা কী তা দিতে পারছে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে জানা জরুরি উত্তর আধুনিকতা আসলে কী?

‘উত্তর আধুনিকতাবাদ’ নামটি সাড়া জাগানো। চমকপ্রদ। আগেই বলেছি, এর অনেকেই শুরুতে প্রবল মার্কসবাদী। অতি উগ্র-বামপন্থী বলাই অধিকতর তত্ত্ব নির্মাতারা সমীচীন। এর প্রচারকর্তারাও অনেকে বামপন্থী বলে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গেই ‘উত্তর আধুনিকতা’বাদের সবচেয়ে পরিচিতমুখ ‘ডি-কন্স্ট্রাক্শন’ বা বিনির্মাণ বা অবিনির্মাণ তত্ত্বের উদ্গাতা জাঁ দেরিদাকে নিয়ে এসে নন্দনে সংবর্ধনা ও বক্তৃতার ব্যবস্থা করেছিলেন বামফ্রন্ট সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। পার্টির মুখপত্র ‘গণশক্তি’তে উচ্ছ্বসিত-উল্লসিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। উত্তর আধুনিকতা যুক্তিবাদ, জ্ঞানদীপ্তি বা দীপায়ন বা আলোকায়ন (এনলাইটমেন্ট) তত্ত্বের চরম বিরোধী। বিরোধী যুক্তিবাদের। জ্ঞানদীপ্তি বা যুক্তিবাদের সর্বোত্তম ফসল মার্কসবাদের চরমতম তাত্ত্বিক শত্রু ‘উত্তর আধুনিকতাবাদ’। এরা উনিশ শতকীয় যুক্তিবাদের বিরোধী। অথচ পুঁজিবাদের বিরোধী নন। বরং উল্টো। পুঁজিবাদের তাত্ত্বিক মোড়ক নির্মাতা। উচ্ছ্বসিত প্রশংসক। পুঁজিবাদ ছাড়া বিকল্প নেই এই এদের অনেকের প্রতিপাদ্য। উত্তর আধুনিকতার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ফরাসি চিন্তক জাঁ ফ্রাঙ্ক লিওটার্ড (১৯২৪-১৯৯৮) ‘পোস্টমডার্ন কন্ডিশন: এ রিপোর্ট অন নলেজ’ (১৯৭৯)গ্রন্থে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন, আমি উত্তরাধুনিকতাকে ইতিহাস-রূপান্তরের যে কাহিনি (দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ) তার অস্বীকৃতি হিসেবে ঘোষণা করছি’। এটুকু বলেই থামলেন না লিওটার্ড।জানালেন:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কৌশল ও কারিগরি বিদ্যার ক্রমোন্নতির ফলশ্রুতি হিসাবেই ইতিহাসের (দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের) পতন হিসাবে দেখা যেতে পারে। দেখা যাচ্ছে এখন প্রতিক্রিয়ার বদলে উপায়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এমনকী ১৯৩০-৬০ সাল পর্যন্ত কেইনসিয় সুরক্ষার আড়ালে থাকা পতনোন্মুখ পুঁজিবাদ থেকে এটাকে উন্নত উদার পুঁজিবাদের বিকল্প হিসাবে দেখা যেতে পারে, যে পুনর্নবীকরণসাম্যবাদী বিকল্পকে উৎখাত করে প্রতিটি স্বতন্ত্র মানুষের বস্তু ও পরিসেবার মাত্রাকে আরও উন্নীত করে তুলেছে। (কবিরাজ :২০১৪)

লিওটার্ড ছিলেন ১৯৫০র দশকে একজন কট্টর স্তালিন-বিরোধী। কট্টর ট্রটস্কিপন্থী। তাঁর বইগুলির নাম : দ্য পোস্টমডার্ন কন্ডিশন, দ্য কোলাপ্স অফ গ্রান্ড ন্যারেটিভ, লিবিডিনাল ইকনমি। লিওটার্ড ইন্টারন্যাশন্যাল কলেজ অফ ফিলোজফির অধিকর্তা। যে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জাঁ দেরিদা (১৫.০৭.১৯৫৩-০৯.১০.২০০৫ )। লিওটার্ড ঘোষণা করলেন, আমরা এক উত্তর আধুনিক যুগে প্রবেশ করছি (১৯৭৯)। পুঁজির নতুন ব্যাখ্যা হাজির করলেন, খারিজ করলেন উদ্বৃত্ত মূল্য, মুনাফার তত্ত্বকে। ‘লাভের তৃষ্ণা’ বা অন্য কোন মানবিক বাসনা থেকে নয়, নিউগুয়েনোট্রফি বা সৃষ্টির আকাক্সক্ষা থেকে মানুষ সৃষ্টি করে।তাঁর সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন মানব-সভ্যতার আবিষ্কার নয়, মনুষ্যজাতিই উন্নয়নের আবিষ্কার। প্রসঙ্গত, শুধু মার্কসবাদ নয় ফ্রয়েডবাদকেও ‘গ্রান্ড ন্যারেটিভ’ বা মহাবাচন এবং এককেন্দ্রিক আধিপত্যবাদী হিসেবে ঘোষণা করে খ- বাচন বা বহুত্ববাদের পক্ষে সওয়াল করেন লিওটার্ড।

উত্তর আধুনিকতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার আগে উত্তর আধুনিকতা তত্ত্বের জন্মের ইতিহাস জানা জরুরি। এই তত্ত্বের সূতিকাগার ফ্রান্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লড়াকু ভূমিকার কারণে যুদ্ধোত্তরকালে ফ্রান্সে কমিউনিস্ট পার্টি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়। সংসদের প্রায় ২৬ শতাংশ আসন দখল করে। লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কিন্তু ফ্রান্সের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের শক্তি পুরোপুরি অর্জন তারা করতে পারেনি। যে কোন দেশে মার্কসবাদের বিকাশে শ্রমিকশ্রেণির পাশাপাশি ছাত্র-আন্দোলন এক প্রবল-প্রভাব বিস্তার করে থাকে। থাকে বুদ্ধিজীবীদের অগ্রসর ভূমিকা। বিশ্বে সংস্কৃতির রাজধানী বলে পরিচিত প্যারিস তথা ফ্রান্স-ও এর ব্যতিক্রমী ছিল না।১ নভেম্বর ১৯৫৪ থেকে ১৯ মার্চ ১৯৬২পর্যন্ত আলজেরিয়ায় ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চালান সেখানকার প্রগতিশীল বামপন্থীরা ন্যাশন্যাল লিবারেশন ফ্রন্টের (এন.এল.এফ) নেতৃত্বে। এই সময় ৩ লাখ গেরিলার বাহিনীর বিরুদ্ধে ফ্রান্স চার লাখ সত্তর হাজার সৈন্য পাঠায়।৬০০০০ সাধারণ মানুষ সহ এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ খুন হন। ফ্রান্সের নগর এলাকায় মেরে ফেলা হয় ৪৩০০ জন আলজেরিয় অভিবাসীকে। মারা যান ২৫৬০০ জন ফরাসি সেনা। আলজেরিয়ায় বর্বর অমানুষিক নির্মম অত্যাচার চালায় ফরাসি সরকার। এর বিরুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টি, জাঁ পল সার্ত্রে (২১.৬.১৯০৫-১৫.৪.১৯৮০)সহ বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্ব ফরাসি ছাত্রছাত্রীরাও বিপুল সংখ্যায় পথে নামেন নিজের দেশের সরকারের বিরুদ্ধে। এর ছয় বছর পরে হলোনানতেরে তথা আজকের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ছাত্র-আন্দোলন। ২ মে শুরু হয় আন্দোলন। চলে ২৩ জুন পর্যন্ত। এই আন্দোলন নড়িয়ে দেয় ফরাসি সরকারের ভিত। ভোগবাদ ও পণ্যবাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। শিক্ষায় মার্কিনি সাহায্যও, ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রমুখিনতার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়। চায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা। ছাত্রদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নামে। প্রতিবাদে পাশেও দাঁড়ান  শ্রমিকরা।প্রতিষ্ঠিত শ্রমিক নেতারা আপোস করতে চান ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেআধুনিকতার প্রবক্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত পল মিশেল ফুকো (১৫.০৭.১৯২৬-২৫.০৬.১৯৮৪)। তিনি দার্শনিকদের কাছে ঐতিহাসিক আর ঐতিহাসিকদের কাছে দার্শনিক। তিনি নিজেকে উত্তর বলতে রাজি ছিলেন না। ফুকো যৌবনে ছিলেন ফ্রান্স কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য।

আধুনিককালের সবকিছু বর্জনীয় নয়, যেমন গ্রহণীয় নয়, উত্তর আধুনিকতার গ্রান্ড ন্যারেটিভ বা মহাআখ্যান বা মহাবয়ান বা মহাবাচনকে আধিপত্যবাদী বলে দেগে দেওয়ার মহা প্রবণতা। উত্তর আধুনিকরা আধুনিকতার বিরোধিতার নামে সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছেন মার্কসবাদের। তাঁদের মতে, এটা একটা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ বা মহাবাচন। এটা একরৈখিক এবং আধিপত্যবাদী। ক্ষমতা নির্মাণের লক্ষ্য।মজার কথা, উত্তর আধুনিকতত্ত্বের উদ্গাতারা অনেকেই একদা ছিলেন প্রবলভাবে মার্কসবাদী। জাঁ দেরিদা, ফুকো, লাকা সবাই।এরা যাঁদের গুরু মানেন, আকারে-ইঙ্গিতে, সেই আন্তনিও গ্রামশিও এবং লুই আলথুজার ছিলেন কট্টর মার্কসবাদী। পরে এরা সোভিয়েত রাশিয়ার নীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে হয়ে উঠলেন মার্কসবাদের সমালোচক। আন্তনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭)ইতালির কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক। ব্যক্তিগত জীবনে অসম্ভব সততা, নিরপেক্ষতা আর সাহসের জন্য বিখ্যাত। দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে যোগ দেন ইতালির সোস্যালিস্ট পার্টিতে। তিনি জেল খেটেছেন কিন্তু সোভিয়েত বা স্তালিন বিরোধিতার জন্য নয়, ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির স্বৈরাচারী নীতির তীব্র বিরোধিতার জন্য। একদেশে সমাজতন্ত্র সম্ভব নয়,  ট্রটস্কির এই ভাবনা তাঁর মধ্যেও ছিল। তবে তিনি ট্রটস্কিপন্থী একথা ভাবা সরলীকরণ হবে। তিনি ছিলেন স্তালিনের কট্টর সমালোচক। মনে করতেন সোভিয়েত রাশিয়ায় কৃত্রিমভাবে সমাজতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এর ফল ভালো হবে না। রবীন্দ্রনাথও সোভিয়েতকে তীর্থভূমি ভেবেওএর চিরস্থায়িত্ব সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। গ্রামশির তত্ত্বে মার্কসের হেজিমনি বা আধিপত্যের ধারণার বিরোধিতা আছে। মার্কসের ধারণা বড় বেশি অর্থনীতিনির্ভর মনে করেছিলেন গ্রামশি। আধিপত্য কেবল উৎপাদন সম্পর্কের নিরিখে হয় না, মুনাফার পাহাড় গড়ার ওপর নির্ভর করে না, তা সাংস্কৃতিকও। বলতেন গ্রামশি। কিন্তু মার্কসকে আক্রমণে এখানে ভুল হয়েছে গ্রামশির। মার্কস বলতেন, যে কোন যুগের জনগণের সংস্কৃতি আসলে শাসকের সংস্কৃতি। মুসোলিনির সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বিস্তার ছাড়া কি সম্ভব হতো?

আরো তিনটি জায়গায় মার্কসের সঙ্গে গ্রামশির মতভেদ।

ক. ভিত্তি ও উপরিসৌধ বা বেস এবং সুপারস্ট্রাকচারের সম্পর্কের প্রশ্নে। ভিত্তি ও উপরিসৌধের মার্কসিয় ধারণা একপাক্ষিক সমালোচনা ছিল তাঁর।কিন্তু দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ অনুযায়ী এই ধারণা তো একপাক্ষিক নয়। ভিত্তি ও উপরিসৌধ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ঘোড়া যেমন গাড়িকে টানে গাড়িও ঘোড়াকে টানে। ভিত্তি ও উপরিসৌধ পরস্পরকে প্রভাবিত করে।

খ. সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজ বা পৌর সমাজের কথা মার্কসের লেখা নেই অভিযোগ গ্রামশির। এ প্রসঙ্গে বলা যায় মার্কসের মৃতু্যু ঘটেছে এই সমাজের জন্মের ৫০ বছর আগে। এত আগে বসে এই ধারণা করা কি সম্ভব?

গ. শিল্পোন্নত দেশে সমাজতন্ত্র আসবে মার্কসের এই চিন্তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে সোভিয়েত-রাশিয়ার বিপ্লবে, এটা তাঁর মতে মার্কসের চিন্তার পরাজয় বক্তব্য গ্রামশির। গ্রামশির এই বক্তব্য স্ববিরোধী। গ্রামশি নিজেই বিশ্বাস করতেন একটা দেশে সমাজতন্ত্র সম্ভব নয়। রাশিয়া তো পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে পারেনি। সমাজতান্ত্রিক বহু ধারণার বাস্তবায়ন ঘটেছে রাশিয়ায়। কিন্তু নিরন্তর পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং ফ্যাসিবাদী ও অভ্যন্তরীণ বিরুদ্ধ শক্তির মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকতে থাকতে যান্ত্রিকতা এসেছে। মার্কসবাদকে আপ্ত বাক্য ভাবার প্রবণতা এসেছে। মার্কস নিজে কিন্তু যান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি তো কোন আর্ম চেয়ার সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট নন।

মার্কস লিখেছেন :আমার লেখালেখির উদ্দেশ্য হলো, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং বড় জোর নতুন আবিষ্কৃত আমেরিকায় শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির লক্ষ্যে সমাজ পরিবর্তনের কিছু ক্লু দেওয়া। কিন্তু আমার লেখাকে কখনই একটি আপ্ত-বাক্যে পরিণত করে বিশ্ববীক্ষা বা ‘ওয়ার্ল্ড ভিউ’-তে পরিণত করা উচিত নয়। (শমিত কর, উত্তর আধুনিকতা কী বলছে, কেন বলছে)। তিনি নিজে বলেছিলেন, থ্যাঙ্ক গড আই অ্যাম নট অ্যা মার্কসিস্ট। (শমিত কর, ২০১৬)মার্কসবাদকে ‘সর্বশক্তিমান’ ভাবার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল পুঁজিবাদের আগ্রাসী রণনীতি ও রণকৌশল ঠেকাতে। এতদ্সত্ত্বেও বলতে হবে সব মার্কসবাদীর অবশ্য পঠনীয় হওয়া উচিত গ্রামশির সিলেকশন ফ্রম প্রিজন নোটবুক(১৯৭১)। মৃত্যুর ৩৪ বছর পর প্রকাশিত এই গ্রন্থ।

উত্তর আধুনিকটা সম্পর্কে ‘উইকিপিডিয়া’র মন্তব্য দেখা যাক। ‘আধুনিকতাবাদবিরোধী একটি দার্শনিক আন্দোলনের নাম। বস্তুত উত্তর-আধুনিকতার কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞার্থ নেই। ইতোমধ্যে ‘পোস্টমডার্ন কন্ডিশন’, ‘রিঅ্যাকশনারি পোস্টমডার্নিজম’ এবং ‘কনজ্যুমার পোস্টমডার্নিজম’ ইত্যাদি বিবিধ ধারার অভ্যুদয়ে অবস্থাটি ঘোলাটে হয়ে পড়েছে। তবে অনুধাবনের স্বার্থে উত্তর-আধুনিকতাকে কয়েকটি চারিত্র্যলক্ষণের সমষ্টি হিসেবে গ্রহণ করলে হয়।‘দু’ বাংলায় উত্তর আধুনিকরা ‘উত্তর’ ও ‘পোস্ট’-এর পার্থক্য হাজির করে বলছেন, উত্তর আধুনিকতা ও ‘পোস্টমডার্নিজম’ এক কথা নয়। ‘আধুনিকতা’র আগে ‘উত্তর’ প্রয়োগ দ্বারা তারা ‘আধুনিকতা-উত্তীর্ণ’ হওয়াকে বোঝাচ্ছেন। পাশ্চাত্যে কিন্তু পোস্টমডার্নিজম দ্বারা তা বোঝানো হয়নি। তারা মডার্নিজমের-এর আগে ‘পোস্ট’ ব্যবহার করে কালগতভাবে মডার্নিজমের পরবর্তী ধাপকে বুঝিয়েছে।

অন্য এক সমালোচক জানাচ্ছেন : ‘উত্তরাধুনিক সমাজবাস্তবতা হলো হাইপার রিয়েলিটি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও ম্যাজিক রিয়েলিটি। আধুনিকোত্তর সমাজে বহুমাত্রিক মানুষেরা নির্মাণ ও বিনির্মাণের যুদ্ধে সক্রিয়। অহিংস ও রক্তপাতহীন এ যুদ্ধে সবাই সবার টার্গেট। এ যুদ্ধে একবাচনে যিনি নির্মাতা অন্যবাচনে তিনিই বিনির্মাতা। এক স্থানে যিনি আক্রমণকারী অন্য স্থানে তিনিই আক্রান্ত। সকল মতবাদের পতন-পথ নির্দেশ করে উত্তরাধুনিকতা নিজেই মতবাদবিমুখ ও মতবাদঘাতী হয়ে পড়েছে। বর্তমানের সংকটময় বিকাশকালকে নানামাত্রিক প্রবণতায়, বহুস্বরে ও বহুকণ্ঠে, অনেকান্তিক ব্যাখ্যায় এবং বহু দৃষ্টিকৌণিকতা পুনর্গঠন, সংস্কার ও নবায়নের প্রচেষ্টা চলছে। …এক মহাসত্য অপেক্ষা বহু সত্যে আস্থাবান উত্তরাধুনিকতা। সত্যের বস্তুভিত্তি নেই, তা বিষয়ীভূত। সত্য টেক্সট নির্ভর; টেক্সট নির্মিত হয় ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন টেক্সট নির্মাণ করেন বিচিত্র অভিজ্ঞতার আলোকে। বহু বাচনে বহু সত্য সৃষ্টি করা হয়। এ জন্য উত্তরাধুনিকতায় মহাসত্য নেই, কোন গ্র্যান্ডন্যারেটিভ নেই। সমগ্রকে খ–বিখ- করে বিশ্লেষণের প্রয়াস সৃষ্টি হয়েছে। একচেটিয়াকরণে নয় বরং বহুমুখী প্রতিযোগিতার দিকেই তার দৃষ্টি’। (রতনকুমার ঘোষ, পূর্বাভাস, উত্তর আধুনিকতা)।এগুলো আসলে যত না উত্তর আধুনিকদের ব্যাখ্যা তার চেয়ে বেশি আপন মনের মাধুরী মেশানো চিন্তা।

আধুনিকতা মানে যা কিছু অতীত তার থেকে একটি সীমারেখা, এভাবেই ভেবে প্রখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক রেমন্ড উইলিয়ামস জানাচ্ছেন, ‘মডার্ন’ শব্দ বোঝাত বর্তমানকে, এখনকে। আধুনিকতার সঙ্গে ইতিহাস, সময়, কাল-যুগ জড়িত।রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, পাঁজি মিলিয়ে মডার্নের সীমা নির্ণয় করবে কে?

‘আধুনিকতা’ যত না সময়কেন্দ্রিক তার চেয়ে অনেক বেশি চিন্তাধারা ও দৃষ্টভঙ্গিকেন্দ্রিক। উত্তর আধুনিকতাও অনেকটা তাই। দুটোই মনোভঙ্গি। কিন্তু বিপরীতার্থক। ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ’ কিন্তু আধুনিকের পরের কোন পর্বকে নির্দেশ করে না। আধুনিকতাবাদী চিন্তুকদের মতে, আধুনিকতাবাদ বা মডার্নিজম হচ্ছে একটি দৃষ্টিভঙ্গী, একটি মনোভঙ্গী। একই সাথে কিছু চিন্তুক বলছেন, উত্তর-আধুনিকতাবাদও হচ্ছে একটি দৃষ্টিভঙ্গী এবং একটি মনোভঙ্গী’। (উইকিপিডিয়া)একটি সুন্দর তুলনামূলক আলোচনা করেছেন ইহাব হাসান। আধুনিকতার লক্ষণের তুলনায় উত্তর-আধুনিকতার তুলনামূলক লক্ষণগুলি এইভাবে সূত্রাবদ্ধ করেছেন :

আধুনিকতা উত্তর-আধুনিকতা

রোমান্টিসিজম/প্রতীকধর্মিতা মেটাফিজিক্স/ ডাডাইজম

ফর্ম (কাঠামোর চক্রাবদ্ধতা) এ্যান্টিফর্ম/(চক্রহীনতা, উন্মুক্তি)

উদ্দেশ্য নির্ভরতা ক্রীড়াময়তা

শ্রেণীলগ্নতা নৈরাজ্য

যুক্তির শাসন নিঃস্পন্দন, নীরবতা

ফলাফলপ্রধান, শিল্পসৃষ্টি, প্রক্রিয়াপ্রধান

দূরত্ব অংশগ্রহণ

সৃজন/সমগ্রায়ন অবনির্মাণ/বিনির্মাণ

সমন্বয় বিরোধাভাস

উপস্থিতি অনুপস্থিতি

প্রকরণ/সীমা বয়ান/অন্তর্বয়ান

নির্বাচন একত্রায়ন

ব্যাখ্যা/পাঠ অ-ব্যাখ্যা/ভুল পাঠ

দ্যোতিত দ্যোতক

লক্ষণ বাসনা

প্যারানইয়া সিজোফ্রেনিয়া

পিতা, ঈশ্বর পবিত্রভূত (পবিত্র-আত্মা)

অধিবিদ্যা আয়রনি

সিদ্ধান্ত, মীমাংসা-অমীমাংসা

ব্যক্তির অস্তিত্ব, চৈতন্য, চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং স্বাধীনতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করে ভাবনা তাই হলো অস্তিত্ববাদ। (শিক্ষাকোষ, শিক্ষার জন্য নাগরিক সমাজ, ঢাকা, ২০০৩)

আধিপত্য শাব্দিক অর্থ কর্তৃত্ব, প্রভুত্ব। আধিপত্য বলতে মূলত কারো ওপর প্রাধান্য বিস্তারকে বোঝায়, তা জনগোষ্ঠীর ওপরও হতে পারে, আবার ভূখ-ের ওপরও হতে পারে। এ হলো সামাজিক অসমতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে কাঠামোকৃত ক্ষমতা-সম্পর্কের আচরণগত বহিঃপ্রকাশ। ক্ষুদ্র-জনগোষ্ঠীর ওপর বৃহৎ-জনগোষ্ঠী কিংবা ক্ষুদ্র-সংস্কৃতির ওপর উন্নত-সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তার ও প্রভুত্ব বোঝায়। ফলে এ হয় আক্রমণের বহিঃপ্রকাশ ও এর নিয়মতান্ত্রিকীকরণ।(সৈয়দ আমীরুল ইসলাম, ম. হাবিবুর রহমান। শিক্ষাকোষ, শিক্ষার জন্য নাগরিক সমাজ, ঢাকা, ২০০৩) রতনতনু ঘোষ ‘উত্তরাধুনিকতা : প্রবণতা ও গন্তব্য’রচনাটিতে উত্তরাধুনিকতার ধারণা, প্রেক্ষাপট, বিকাশ, বৈশিষ্ট্য প্রভৃতির বিশ্লেষণ করে লিখছেন,‘আধুনিকতা থেকে উদ্ভূত পুঁজিবাদ শোষণ, গ্লানি, বৈষম্য, হিংসা সৃষ্টি করে মানুষের অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করেছে। বিপরীতে সমাজতন্ত্র উপহার দিয়েছে একনায়কতন্ত্র, দমন-পীড়নের প্রবণতা।’তাঁর মত,‘উত্তরাধুনিক প্রত্যয়টি বহু অর্থজ্ঞাপক, জটিল ও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। উত্তরাধুনিকতার অন্যতম লক্ষণ অনির্ণেয়তা ও পরিব্যাপ্তি। এটি একটি স্ববিরোধী মতাদর্শ। মানুষের সমমর্যাদা ও অভেদের সন্ধানে তৎপর এ মতাদর্শ বিরোধিতা করে কর্তৃত্ববাদ, আধিপত্য, প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রমুখিতার প্রতি।

উত্তরাধুনিকতা বিশ্বাস করে ক্ষমতার বহুকেন্দ্রে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পথে উত্তরাধুনিকতা অগ্রসরমান।উত্তরাধুনিকতার ভাষ্যমতে: চূড়ান্ত বলে কিছু নেই, শেষ বলেও কিছুই নেই, একমাত্র সত্য বলে কিছু নেই, শাশ্বত বলে কিছু নেই, ব্যাখ্যাহীন ও প্রশ্নহীন বলে কিছু নেই, সন্দেহের ঊর্ধ্বে কিছু নেই। এসব বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেই এগোতে চায় উত্তরাধুনিকতা। চরম কর্তৃত্বে তার আস্থা নেই। বিকল্পহীনতায় তার বিশ্বাস নেই। প্রচলিত প্রথা আর মতবাদের পীড়নে নয় বরং মুক্তমতে, প্রথাহীনতায় গতিশীল থাকে উত্তরাধুনিকতা। অধীনতায় নয় স্বাধীনতায় এবং মুক্তপরিসরে ক্রমাগত বিনির্মাণ ও নতুন কিছু সৃষ্টির চাঞ্চল্যে উন্মুখ উত্তরাধুনিকতা। উত্তরাধুনিকতা সবকিছু ভাঙতে চায়, সংস্কার করতে চায়। নানামুখী বর্ণনা, বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বনে উত্তরাধুনিকতা পুনর্গঠন করতে চায় যাবতীয় ডিসকোর্স, ন্যারেটিভ ও টেক্সটগুলোকে। সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে চায়, আগাগোড়া বাজিয়ে দেখতে চায়, সমগ্রকে ভেঙে খ-িতভাবে বিশ্লেষণ করতে চায় উত্তরাধুনিকতা। বাচনের পাল্টা বাচন গঠন করা, অবয়ববাদ পেরিয়ে অধুনান্তিক নারীবাদে পৌঁছানো, আন্তর্জাতিকতা পেরিয়ে বিশ্বায়নের পথ ধরা, মাস্টার-টেক্সটকে ভেঙে ইন্টার-টেক্সটে রূপায়ণ, প্রচলিত সংস্কৃতিকে সংকর-সংস্কৃতির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, বহুজাতিক সংস্থাকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করা এবং বৈশ্বিক ইস্যু, এজেন্ডা ও এগ্রিমেন্টের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও সরকারের ব্যর্থতাগুলো অতিক্রমের প্রয়াস চালায় উত্তরাধুনিকতা।

উত্তরাধুনিকতাপন্থীরা প্রয়োজনমতো অতীতের অনেক জ্ঞানের সারগ্রাহী। তবে কোনো মতবাদই তাদের নিকট চূড়ান্ত ও অকাট্য নয়। তাঁরা সাম্যের ধারণা চাপিয়ে দেয়ার বদলে সাম্যবাদী হয়ে ওঠার তাগিদ দেন। তারা মার্কসবাদী কর্তৃত্ববাদ আর একরৈখিকতার বিরোধী। তারা বিশ্বাস করেন বহুরৈখিকতায়। তাদের মূল সুর বহুত্ববাদিতায়। উত্তরাধুনিকতা কোন মতবাদ নয়, বরং মতাদর্শ।

যুক্তিহীন, বিশ্বাসহীন, সিদ্ধান্তহীন, নির্ধারণহীন, নিশ্চয়তাহীন প্রবণতা নিয়ে উত্তরাধুনিকতাবাদীরা বিশৃঙ্খলা ও জটিলতার দিকেই অগ্রসর হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। অনৈক্য ও বিভ্রান্তির পথে সবাইকে সবার বিরুদ্ধে ঠেলে দিয়ে মূলত নৈরাজ্যবাদের অভিমুখেই এগিয়ে চলেছেন তারা।

উত্তরাধুনিকতা আসলে উদারতাবাদের সর্বসাম্প্রতিক উগ্ররূপ বলে চিহ্নিত হয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্র ও সংগঠনের কাঠামোতে উত্তরাধুনিকদের আছে অনাস্থা। কারণ তাদের মতে কাঠামো মানেই আধিপত্য, মহাআখ্যান মানে স্বৈরাচার, তত্ত্ব মানে আধিপত্য। এজন্য তারা আপ্তবাক্য, মহাবাচন, তত্ত্ব ও সাংগঠনিকতার বিরুদ্ধে। উত্তরাধুনিক মতাদর্শের প্রভাবে শিল্প-সাহিত্য ও দর্শনে জ্ঞানের নতুন উৎস ও প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।’

যা হোক, উত্তর আধুনিকতা বলতে বুঝায় সেই অবক্ষয় বা স্বেচ্ছাচারিতা থেকে উত্তরণের প্রয়াসকে, যে অবক্ষয় বা স্বেচ্ছাচারিতা দোর্দ- প্রতাপবান আধুনিকতার আস্তাকুড়ে জন্ম লাভ করেছে। উত্তর আধুনিকদের মতে, আমরা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি আধুনিকতার কারণে। অবশ্য কোনো কোনো মহল, যেমন দৃষ্টান্তবাদীরা, এমন কিছু মনে করেন না। তাদের মতে, অবক্ষয় বিভিন্ন কারণে আসতে পারে, কিন্তু এর জন্য কেবল আধুনিকতাকে দোষারোপ করা যায় না। যদি করা হয়, তবে পরোক্ষভাবে যুক্তিবাদিতা, ধর্মনিরপেতা ইত্যাদির মতোন আধুনিক আলোককে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে ফেলা হয়। উত্তর আধুনিকরা আধুনিক-পূর্ব সময়ের মিথ, উপকথা, লোকবিশ্বাস, ধর্মবিশ্বাস, কৃষ্ণ, হাছন, লালন ইত্যাদিকে সামনে রেখে পুনর্চচায় ব্রতী হতে সবাইকে আহ্বান করে। উত্তর আধুনিক কবিতার লক্ষণ সম্পর্কে মাহরাজ খান লিখেছেন :

১.            বিষয়কেন্দ্রিকতার অভাব। পোস্টমডার্ন কবিতায় কোনো নির্দিষ্ট বিষয় কেন্দ্র, ভাবনা কেন্দ্র থাকবে না।

২.           পোস্টমডার্ন কবিতায় যুক্তি কাঠামো অনুক্রম অনুপস্থিত থাকবে। কবিতাটি পষড়ংব বহফবফ হয়না ঙঢ়বহ বহফবফহয়, কবিতাটি শেষ হলেও মনে হবে তা শেষ হয়নি।

৩.           পোস্টমডার্ন কবিতা বহুরৈখিক, বহুকৌণিক, বহুত্ববাদী ও বিদিশাময়। এর যে কোনো দিকে ছড়ায়ে পড়ার অভিমুখ খোলা থাকে।

৪.           পোস্টমডার্নিজম কোনো পূর্ব নির্ধারিত সূত্র নয়, জীবনকে দেখেশুনে মনে মনে তার লক্ষণগুলো যোগসূত্র ঠাউরে নিয়ে পোস্টমডার্ন পোস্টমডার্নিজমের যাত্রা শুরু। পোস্টমডার্নিজম কোনো আন্দোলন নয়, একটা কালখ-ের প্রবণতা মাত্র।

৫.           পোস্টমডার্ন কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো যুক্তিতে ফাটল ধরানো লজিক্যাল ক্রাক ক্লেফটের উপস্থিতিতেই এর লক্ষণ হিসেবে বিবেচ্য।

৬.           পোস্টমডার্নিজম কবিতা কোনো আদর্শ খাড়া করতে চায় না, এর গতি যে কোনো যাত্রার দিকে ইঙ্গিত দেয়।

৭.           পোস্টমডার্নিজম কবিতায় কবির ইমেজ তৈরি সম্ভব নয়।

[ঈষৎ সংক্ষেপিত]

*********************************

 

প্রসঙ্গ : ‘পোস্টমডার্নিজম’ বা উত্তরাধুনিকতা
আহমেদ মাওলা

বিশ্ব-মননে, চিন্তার ভূগোলে, Postmodernism বা ‘উত্তরাধুনিকতা’ নামের যে ডিসকোর্স বা আর্গুমেন্ট আজকাল উচ্চারিত হয়, তা কি কেবলই একটা শব্দ? এই ‘উত্তরাধুনিকতা’ শব্দের অর্থ, তাৎপর্য, বৈশিষ্ট্য আসলে কী? এর উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি প্রসঙ্গ সামনে এসে যায়। যেমন, মধ্যযুগের পর রোমান্টিসিজম, ক্লাসিসিজম পেরিয়ে রেনেসাঁস ঘটে, রেনেসাঁসের  অর্জন এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকপর্ব, আলোকপর্বের অনিবার্য পরিণতি Modernism ‘আধুনিকতা’। ঘটনাগুলো পারস্পরিক এবং মানব প্রগতির আখ্যান হিসেবে গণ্য করলে আধুনিকতা হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক ধারাবাহিক বৃত্তান্ত। যাকে আমরা ‘ইতিহাস’ বলছি, তা কেবল সময়ের সমষ্টি নয়, তার মধ্যে অস্থির, আবর্তময় মুহূর্ত অনেক আছে। পশ্চিমের মননবিশ্বে ডারউইন, মার্কস, বোদলেয়ার, নীটশে, ফ্রয়েড, আইনস্টাইন এবং আরো অনেকে পাশ্চাত্য মনোজগত, জীবনদৃষ্টি বদলে দিয়েছিলেন। উনিশ এবং বিংশ শতাব্দীতে সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে দুটো বড় রকমের পরিবর্তন দেখা যায় উনিশশতকের মধ্যপর্যায়ে, শিল্পবিপ্লব উত্তর সমাজে অর্থনৈতিক চেহারার বদল ঘটে, ফলে মানুষের বস্তুগত সকল চাহিদার পূরণ সম্ভব হয়। অন্যটি হচ্ছে, আত্মসচেতনতার আইডিয়া, এই আইডিয়া প্রথম পাওয়া যায় হেগেল এবং মার্কসে, তারা বললেন, মানুষ তার নিজের ভেতরে লাভ করতে পারে যুক্তিসম্মত মর্মোপলব্ধির ক্ষমতা, চেতনার উৎকর্ষ এবং তার মেকানিজম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মর্ডানিজমের কিছু চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা যায়। মডার্নিজম আসলে প্রাক্তন শৈলীর বিরুদ্ধে একটা সপ্রতিভ দ্রোহ, একটা মনোভঙ্গি, একটা মুড এবং মুভমেন্ট। মডার্নিজম কাজ করেছে দুভাবে : শৈলীগত : মনোগত ও সমাজসম্পর্কিত দূরত্ব কমিয়ে, স্থানকালের ব্যবধান ভেঙ্গে দিয়ে যোগাযোগের মাধ্যমে দূরকে নিকটতর করেছে, কাছের মানুষকে করেছে বিচ্ছিন্ন, দুর্বোধ্য। দ্বিতীয়ত, বিষয়গত : মডার্নিজম মানবসত্তার মহিমা ও তার সীমাহীন সৃষ্টিশীলতার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আধুনিক মানুষ ধ্রুপদী শিল্পকলার বোধ ও উপলব্ধির বিরুদ্ধে শাণিত অভিযাত্রা করেছে। যোগাযোগ, গতি, সচলতা, যুক্তিতে মুক্তি, আলোকপ্রাপ্তি, বিজ্ঞান নির্ভরতা এসবই মডার্নিজমের উদ্ভব এবং বিকাশে নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করেছে। ফলে মৌলিক মানবীয় বোধ ওলোটপালট হয়ে যায় বন্ধুত্ব, প্রণয়, অনুরাগ, রিরংসা, ভালোবাসা, সামাজিকবন্ধন সবকিছুতে ধাবমান গতির সচলতায় পরিবর্তন আসে। আগে পায়ে হেঁটে বা প্রাণির ওপর সাওয়ার হয়ে দূরদূরান্তে যেতে হতো, আধুনিককালে অল্পসময়ে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে বহুদূর পরিক্রমা সম্ভবপর হয়। প্রকৃতি নির্ভরতাতর স্থলে এলো বিজ্ঞান প্রযুক্তির নির্ভরতা, নিস্তরঙ্গ গ্রাম, জমাট অন্ধকার থেকে মানুষ এলো ঝলমলে উজ্বল শহরে, ধর্মীয় শুভত্বে অবিশ্বাস, স্বর্গ-নরকে আস্থাহীনতা, আলোড়ন, গতি, ও পরিবর্তনে সাড়া দেয়ার ফলে পুরোনো সমাজ কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে, সংস্কৃতি এবং শিল্পকলায় নতুন ফর্ম, ব্যাকরণ রচিত হয়। এই পরিবর্তন সূক্ষèভাবে ব্যক্তি-মানুষকে প্রবিষ্ট করে দেয় গভীর শূন্যতাবোধে। জীবনের অর্থহীন, গন্তব্যহীন বিমূঢ় শোভাযাত্রা দেখে সংবেদী মানুষের ভেতরে জমাটবদ্ধ হয় শূন্যতাবোধের মহাসংকট।

মধ্যযুগের প্রধান ভীতি ছিল ‘মৃত্যু’। যুক্তিবাদের উদ্ভবের ফলে মানুষের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি হয়। মানুষ নিজের ভেতরে খুঁজে পায় ঈশ্বরের আনুরূপ্য। আত্মচেতনার ফলে ব্যক্তি চিহ্নিত হয় একক ব্যক্তি হিসেবে, তার ভয় ও যন্ত্রণা, শাস্তি ও প্রশান্তি ব্যক্তি একাই বহন করে। রোমান্টিসিজমের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে ব্যক্তি-মানুষ। আধুনিক মানুষ তাই মৃত্যুর জানে কিন্তু মানে না, নশ্বরতা, সীমাবদ্ধতার কথা জানে, তবু স্বীকার করে না। নৈতিকতা ও সংস্কৃতির বাঁধন ছিঁড়ে সে ধাবমান এক অসীমতার দিকে। এটা তার মুক্তি, নাাকি ব্যাধি, সেটা বলা দুষ্কর। আধুনিক চেতনার ফলে দাসপ্রথার বিলুপ্তি, নারী অধিকার, শিশুশ্রম নিরোধ, সবারজন্য শিক্ষা যুক্তি ও বিজ্ঞানে নির্ভরতায় মানবকল্যাণের ভিত রচিত হয়। মডার্নিজমের লক্ষ্য কেবল বর্তমান, কেবল ভবিষ্যত, অতীত নয়। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, অতীত থেকে বিযুক্ত মানুষ কি ভবিষ্যতের ভয় বা ত্রাস পালাতে পারবে? ব্যক্তি-মানুষ তার নৈঃসঙ্গ্য ও শূন্যতার মহা আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারবে? পোস্টমডার্নিজম এই প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে।

Postmodernism বা ‘উত্তর-আধুনিকতা’কে বুঝতে হলে তাই আগে মডার্নিজমের স্বরূপ বোঝা দরকার। জাঁ জ্যাঁক রুশো Inquiry into the Nature of the social contract (1763 গ্রন্থে ঘোষণা করেছিলেন সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। এই নতুন চেতনাই ইউরোপে দুটি বিপ্লব ঘটে ১৭৭৪ সালে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং ১৯৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব। এগুলো মডার্নিজমের পাটাতন তৈরি করেছিল নিঃসন্দেহে। ঝঃবঢ়যবহ ঝঢ়বফবৎ তাঁর ঃযব ঝঃৎঁমমষব ড়ভ ঃযব গড়ফবৎহ (১৯৫৩) গ্রন্থে বলেছেন আধুনিকতা একটি কালখ- এবং ইতিহাসের পর্যায়। কিন্তু আধুনিক শিল্প ও সাহিত্য টেকনিকের বিষয়, দৃষ্টিভঙ্গির একটি বাঁক-বদলের নাম। সে অর্থে বোদলেয়ার, র‌্যাঁবোকে প্রথম আধুনিক ভাবা যায় কারণ তাঁরাই ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক এইজের ওয়ার্ডসওযার্থ, শেলী-কীটস্ প্রমুখের বিরোধীস্রোতের কবিতা রচনা করেছেন। বোদলেয়ার নগরের কুৎসিত দৃশ্য ও ক্ষয় তুলে ধরেছেন। র্যাঁবো প্রথম কবিতার ভাষাকে পরিচিত আবহ ও সূত্র থেকে মুক্ত করেছিলেন। টি. এস. এলিয়ট, এজরা পাউন্ড, ডি এইচ লরেঞ্জ, ফ্রানৎস কাফকা আধুনিকতার নেতি ও নৈরাশ্য রূপায়িত করেছেন। স্টিফেন স্পেন্ডার তাঁর গ্রন্থে আধুনিক শিল্পের স্বভাব সম্পর্কে দুটি তাৎপর্যময় উক্তি করেছেন :‘Modern art is that in which the artist reflects awareness of an unprecedented modern situatioon in form and idiom. The principle of reality in our time is peculiarly difficult to grasp, and the ‘realism’ is not an adequate answer to it.’’ আধুনিকতার এ জটিল, বিমিশ্র, ইতি-নেতি, শূন্যতাবোধ ও নৈরাশ্য প্রায় শতাব্দীকাল ধরে একটা ‘গ্রান্ড ন্যারেটিভ’ তৈরি করেছে। আধুনিকতার এই ইতিহাস কেবল প্রগতির উল্লাস এবং আত্মদম্ভের নয়, প্রশ্নহীন নয়, তার মধ্যে অনেক নিষ্ঠুর অন্ধকারপর্ব আছে, আছে অনেক হত্যা, লুণ্ঠন, বিশ্বযুদ্ধ, সহিংসতা, সাম্রাজ্যবিস্তার, উপনিবেশ স্থাপনের মহাযজ্ঞ। আধুনিকতার ইতিহাস তাই নিরঙ্কুশ বিজয় উল্লাস নয়, সভ্যতার বাঞ্চিত মুক্তির দুয়ার খুলে দিতে পারেনি আধুনিকতার জ্ঞান ও প্রগতির প্রকল্প। জ্যাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার The postmodern condition : A Report on knowledge (1979) গ্রন্থে আধুনিকতার এই ইতিহাসের সামলোচনা করে বলেন, আধুনিকতার প্রধান অহং ‘যুক্তিবাদ’। তিনি যুক্তিতন্ত্রের ঘোর বিরোধীতা করে বলেন, রেনেসাঁসের পর মধ্যযুগীয় অন্ধকার কাটিয়ে আধুনিকতার সূত্রপাত। আধুনিকতা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে এক ধরনের বৈধতা দিয়েছে। এ বৈধতার ফলে মনে করা হয়েছে বিজ্ঞানই সত্য অন্বেষণের একমাত্র পথ। বিজ্ঞানের সূত্রাবলি প্রয়োগ করে সভ্যতার বিবিধ প্রয়োজন মিটিয়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে মডার্নিজমের গ্রান্ড ন্যারেটিভ বা ‘মহাআখ্যান’। এই মহাআখ্যান মানবমুক্তির একটা উপকথা মাত্র, এটা ভাষার খেলা ছাড়া কিছুই নয়। তিনি প্রশ্ন করেন, জ্ঞানের বৈধতা থেকে যদি মানবমুক্তি ও মানব কল্যাণ সাধিত হয়, তবে কেন জন্ম নিল একনায়কতন্ত্রের, বোমা, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, গণহত্যা, মানব অস্তিত্বের মহা হুমকি? এসবের আঘাতে আধুনিকতার আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ল, প্রগতি ও আধুনিকতার ‘মেটান্যারেটিভ’ মহাভাষ্য শুধু উন্মোচিতই হয়নি, লুপ্ত বা ধ্বংস হল। তার বদলে জন্ম নিল অসংখ্য ছোট ছোট ‘প্রতিআখ্যান’। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠিগুলো শতাব্দীকাল পরেও নিজস্ব ভাষা-উপভাষা নিয়ে স্বতন্ত্র রয়েছে এবং কোনো অবস্থাতেই তারা নিজস্ব ঐতিহ্য নষ্ট করতে চায় না। এভাবে স্থানীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ সাংস্কৃতিক মোটিফগুলো স্থাপত্যে, সঙ্গীতে, নৃত্যে, চিত্রকলায় চলচ্চিত্রে ফুটে বেরুতে শুরু করেছে। যে নীতিগুলো দ্বারা বিজ্ঞান বৈধতা পেয়েছে, সেগুলোর উৎস খুঁজেছেন ফ্রাঁসোয়া লিওতার। য়ুর্গেন হেবারমাস তাঁর দি ফিলোসফিক্যাল ডিসকোর্স অব মডাডর্নিটি (১৯৮৭) গ্রন্থে সন্ধান করেছেন যুক্তিনির্ভর সামাজিক নৈতিকতা। তিনি নীৎসের যুক্তির সার্বিক দাবির সমালোচনা করে দেখান যে, এর কোনো নৈতিক বৈধতা নেই। মহাআখ্যানের বৈধতার দুটি ভিত্তি : রাজনৈতিক ও দার্শনিক। সে অনুসারে বৈধতা ‘স্বাধীনতা’র ধারণা ও ‘জনগণের মুক্তি’র উপর নির্ভরশীল এবং বিজ্ঞান ‘উদ্দেশ্য সাধনের উপায়’ হিসেবে ব্যবহৃত। বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ওপর সব মানুষের অধিকার আছে, তাদের মুক্তির জন্য অবশ্যই বিজ্ঞান ব্যবহৃত হবে কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নিজে কোনো বৈধতা পায় না বরং মানবিকতার মুক্তির প্রশ্নে কেবল বৈধতা পায়। য়ুর্গেন হেবারমাস আধুনিকতা সমর্থক, তিনি আধুনিকতাকে ‘অসম্পূর্ণ প্রকল্প’ এবং উত্তরাধুনিকতাকে ‘নব্যরক্ষণশীলতা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ফ্রাঁসোয়া নিওতার এখানে য়ুর্গেন হেবারমাসের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয়েছেন। লিওতারের মতে উত্তরাধুনিক সংস্কৃতি শিল্প বিপ্লবোত্তর জ্ঞানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। শিল্প বিপ্লবোত্তর সমাজের দিকে তাকালে দেখা যাবে, যার ওপর ভিত্তি করে জ্ঞানের বৈধতার প্রশ্ন সূত্রাবদ্ধ হয়েছে, তার পরিবর্তন হয়েছে। বিজ্ঞানের মহাআখ্যান তার উপযোগিতা হারিয়েছে তা সে যুক্তি বা আখ্যানেরই বৈধতা হোক না কেন। লিওতার মনে করেন, উত্তরাধুনিক অবস্থা, সংস্কৃতির এমন একটি অবস্থা, যার মধ্যে গ্রা- ন্যারেটিভ বা মহাআখ্যান লুপ্ত হয়েছে। যেখানে সংস্কৃতির কাজ হলো, ছোট, বহুমুখী, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আখ্যানগুলোর মধ্যে জোড়াতালি মারা, যার বাইরে একক ঐক্যে মিলে যাওয়ার গ্যারান্টি নাই।

‘উত্তরাধুনিকতা’ এখন সাহিত্য আলোচনা এবং এ্যাকাডেমিক জ্ঞানচর্চায়ও একটা তোলপাড় করা প্রসঙ্গ। নতুন পরিভাষা, হয়ত সেই কারণে খুব হুলুস্থুল পড়ে গেছে। ওজনদার শব্দটি সবাই ব্যবহার করতে চায়, বুঝে অথবা না বুঝে। যদিও  এর প্রতিপাদ্য বিষয় ও ধারণা অনেকের কাছে অস্পষ্ট। অনেকে হয়ত জানেন, ফেদেরিকো ওনিস মাদ্রিদে প্রকাশিত তাঁর কবিতা সংকলনে (১৯৩৪) এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। তারপর ডাডলি সম্পাদিত সমকালীন লাতিন আমেরিকা কবিতা (১৯৪২) সংগ্রহে এ শব্দটি পুনর্বব্যবহার পাওয়া যায়। এ দু’টি সংকলনে মূলত মডার্নিজমকে হালকা তিরস্কারসূত্রে ‘উত্তরাধুনিকতা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। চড়ংঃসড়ফবৎহরংস বা ‘উত্তরাধুনিকতা’ কে সংজ্ঞায়িত করার ব্যর্থ চেষ্টা অনেকেই করেছেন কিন্তু কোনো শব্দ বা বাক্যবন্ধনে ‘উত্তরাধুনিকতা’ কে নির্দিষ্ট করা অসম্ভব। ‘উত্তরাধুনিকতা’ শব্দটি নিজের ভেতর ধারণ করে একই সঙ্গে স্ববিরোধীভাব, বহুভুজ ধারণা। ১৯৫৯ সালে আরভিং হো, ১৯৬০ সালে হ্যারি লেভিন বলেছেন, পোস্টমডার্নিজম যেন এক পতন, আধুনিকতা মহান ঐতিহ্য থেকে নেমে আসার নামই পোস্টমডার্নিজম। পোস্টমডার্নিজমকে নির্ধারণ করে দেয়ার মতো কোনো চারিত্র্য নেই। পোস্টমডার্নিজমের আছে অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য, মুখ ও  মুখশ্রী, নানা রকম প্রবণতা। তবে পোস্টমডার্নিজম কোনো ফ্যাশন নয়, সত্য ঘটনা, তাকে অন্তঃসারশূন্য বলে উড়িয়ে দেয়া অসম্ভব। কেউ কেউ উত্তরাধুনিকতাকে আধুনিকতার বিপরীত মেরুতে ফেলে ঝগড়া বাঁধিয়ে ফেলেন। ব্যাপারটা এরকম নয় যে, ‘রোমান্টিসিজম’ এবং ‘ক্লাসিসিজম’ এর মতো বিপরীতভাবাপন্ন। এক্ষেত্রে দুধরনের ধারণা আমরা পাই : ১. পোস্টমডার্নিজম মূলত মডার্নিজমেরই ধারাবাহিকতা। ২. দুটোর মধ্যে গুরুতর সংঘর্ষ এবং বৈপরীত্য বিদ্যমান। যারা প্রথমটার কথা বলেন, তারা আধুনিকতা-উত্তরাধুনিকতাকে পৃথক মনে করেন না। অন্যদিকে যাদের বিশ্বাস, মডার্নিজমের ভাঙ্গনের পরিণামই পোস্টমডার্নিজমের উদ্ভব হয়েছে, তারা ইতিবাক অথবা নেতিবাচক অর্থে পোস্টমডার্নিজমকে ব্যাখ্যা করেন।

আধুনিকতা মূলত যুক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি আকল্প, উত্তরাধুনিকেরা এই যুক্তিতন্ত্রে ঘোর বিরোধী। মিশেল ফুকো তাঁর লেখায় প্রমাণ করেন, কিভাবে রাষ্ট্র সকল নিষ্ঠুরতাকে বৈধ করে নিল, চরম নির্মমতাকে যুক্তির মোড়কে সুন্দর করে উপস্থাপন করা হলো। জাক দেরিদার ‘ডিকনস্ট্রাশনে’র কথা হচ্ছে আধুনিক যুক্তির খোপ থেকে বেরিয়ে আসার একটা প্রয়াস মাত্র। যুক্তির নির্দিষ্ট কাঠামোতে টেকস্টকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি অর্থকে প্রধান করে তোলা হয়েছে, ফলে অন্য অর্থগুলো নির্যাতিত, অবহেলিত, অবসিত হয়েছে। যুক্তির ভেতর একটা আধিপত্য, আরোপণ জবরদস্তি আছে, এই আরোপন, আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং টেকস্টকে ব্যবহার করতে হবে বহুভাবে, উন্মুক্ত পরিসরে। এই ডিকোর্স-বহুবাচনিক মানবিক প্রক্রিয়াকে পোস্টমডার্নিজম বা উত্তরাধুনিক প্রবণতা বলা যায়। ঐক্য ও ভিন্নতা, আনুগত্য ও বিদ্রোহ পোস্টমডার্নিজমে একই সঙ্গে মঞ্জুরিত, প্রবিষ্ট। পশ্চিমের সমাজ ও সভ্যতায় সত্যি সেরকম কিছু ঘটেছে, যার ফলে ষাটের দশকে এই ডিকোর্সের জন্ম হয়েছে। যতো ভিন্ন অর্থই ধারণ করুক না কেন, পোস্টমডার্নিজমের ডিসকোর্স সত্যি অভিনব, অভূতপূর্ব। সত্তর দশকের মধ্যভাগে এই পরিভাষাটি আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং সত্তর দশকের শেষের দিকে পোস্টমর্ডানিজম ফ্রাঙ্কফুট ঘরানার মিডিয়ার কল্যাণে পুরো ইউরোপে পরিব্যাপ্ত হয়। জুলিয়া ক্রিস্তেভা, ফ্রাঁসোয়া লিওতার নিয়ে যান ফ্রান্সে, য়ুর্গের হেবারমাস জার্মানিতে তারপর ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদে ভারত-বাংলাদেশে ‘পোস্টমডার্নিজম’ বা উত্তরাধুুনিকতার ধারণা ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। যদিও পোস্টমডার্নিজমের প্রভাব, স্থাপত্যে, চিত্রকলায়, চলচ্চিত্রে, সঙ্গীতে চিহ্নিত করা যায়, সাহিত্যে এখনো তা স্পষ্টভাবে দেখানো সম্ভব নয়।

পোস্টমডার্নিজম যদিও উদ্ভব হয় ষাটের দশকে কিন্তু পরের দশকগুলোতে পোস্টমডার্নিজমের রূপান্তর ঘটেছে। আমাদের মনে পড়ে, সে সময় ডাডাইজম, সুররিয়ালিজম, স্টাকচারালিজম, পোস্টকালচারালিজম, সিভিল রাইট মুভমেন্ট, এন্টি ওয়ার মুভমেন্ট, কাউন্টার কালচার মুভমেন্টের পটভূমিতে পোস্টমডার্নিজমের উদ্ভব হয়েছে, ফলে এর এসথেটিকস ভিউতে স্ববিরোধী প্রবণতা ছিলো। দ্বিতীয় পর্যায়ে, সমাজে শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে কতগুলো ধারণা, বোধ, বিশ্বাস, উপলব্ধি স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠে, পিটার বার্জারের মতে, এগুলো হচ্ছে ‘ইনস্টিটিউনাল আর্ট’। উন্নাসিক, হাই আর্ট প্রাত্যহিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। পোস্টমডার্নিজমের দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘প্রতিষ্ঠান শিল্পের’ বিরুদ্ধে, আক্রোশ, প্রতিক্রিয়া এবং সমালোচনা ছিলো। য়ুর্গেন হেবারমাস এবং ফ্রাঁসোয়া লিওতারর মধ্যে বিতর্ক হলো হেবারমাস মনে করেন, পোস্টমডার্নিজম এবং নিও কনসারভেটিজম দুটোর কোনোটা দিয়ে মডার্নিজমের সাফল্য ব্যর্থতা পরিমাপ করা যাবে না। হেবারমাস আলোকপর্ব বা এনলাইটেনমেন্টবাহিত আধুনিকতার সমর্থক। অন্যদিকে ফ্রাঁসোয়া লিওতার এনলাইটেনমেন্ট বাহিত আধুনিকতার শরীর থেকে সব জামাকাপড় খুলে ধুয়ে-মুছে দিতে চান। ডানিয়েল বেল তাঁর দি কারচারাল কনট্রাডিকশন ইন ক্যাপিটালিজম (১৯৭৬) গ্রন্থে আধুকিতাকে একটা নান্দনিক প্রাপ্তিই মনে করেন এবং উত্তরাধুনিকতার বিপক্ষে অবস্থান নেন তবুও তিনি বলেন, মডার্নিজম ও পোস্টমডার্নিজম দুটোই সকালীন পুঁজিবাদের সংকটের জন্য দায়ী। অনেক বিতর্ক থাকলেও পোস্টমডার্নিজম থেকে জ্ঞানজগতে, সংস্কৃতির ভুবনে অনেক অভিনব ডিসকোর্সের জন্ম হয়েছে, আধুনিকতার পুনর্বিচারের একটি তত্ত্বভিত্তি তৈরি হয়েছে। অবিরাম প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার জায়গা সৃষ্টি করেছে, ওখানেই তার প্রাণবন্ত বহমাত্রিক রূপ এবং টেকনোলজিক্যাল এসথেটিকস্ অবলোকন করা যায়।

*********************************

 

উত্তরাধুনিকতা, মেটান্যারেটিভ ও মেটাফিকশন নমুনা-গল্প : ছুঁয়ে দেখা জীবন

মোজাফ্ফর হোসেন

উত্তরাধুনিকতা যেহেতু সব ধরনের নির্দিষ্টকরণের বিরুদ্ধে তাই উত্তরাধুনিকতার সর্বজন স্বীকৃতি একক কোনো তত্ত্ব নেই। তাত্ত্বিকরা যে যেভাবে বোঝেন, ব্যাখ্যা করেন। আধুনিকতা থেকে বের হওয়ার জন্য কতগুলো প্রবণতাকে উত্তরাধুনিকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মোটা দাগে আধুনিকতার দুটো অবস্থান উত্তরাধুকিতায় খ-িত হয়: এক. আধুনিকতা যে কেন্দ্রের ধারণা এনেছিল সেটা ভেঙে যায়। দুই. আধুনিকতা সবকিছু ভেতরে আদর্শবাদ ঢুকিয়ে দিয়েছিল, সেটা আদর্শবাদকে প্রশ্ন তোলে উত্তরাধুনিকতা। একটু বিশদে গেলে আমরা  দেখবো, আধুনিকতা সবকিছুর মধ্যে একটা কেন্দ্র দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যেমন, ইউরোপ হচ্ছে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রগতির কেন্দ্র। সুবিধাভোগী শ্রেণি সবকিছুর মধ্যে একটা সরল বাইনারি অপোজিশন প্রতিষ্ঠা করেছেন; যেমন: সাদা ভালো-সুশ্রী-উন্নত, কালো খারাপ-কুশ্রী-অজ্ঞ। এডওয়ার্ড সাঈদ এখান থেকে ওরিয়েন্টালিজমের ধারণা আমাদের দিয়েছেন।

আধুনিকতাবাদ ইউরোপীয় ধারণা হিসেবে ঔপনিবেশিক দেশগুলোর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। জাতীয়তাবাদ হয়ে ওঠে উৎকৃষ্ট বিষয়। ফলে এই জাতীয়তাদের বশ্যতা স্বীকার করে মানুষ স্বদেশি শোষন-জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। যেমন, ঔপনিবেশিক অঞ্চলে ব্রিটিশদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে অধিকাংশ ইউরোপীয় লেখক-বুদ্ধিজীবী কোনো কথা বলেননি। অর্থাৎ জাতীয়তাবোধের বশ্যতা স্বীকার করে নেওয়া নীতি-নৈতিকতার মতো একটি প্রতিষ্ঠিত মানদ-ে দাঁড়িয়ে গেছে।

উত্তরাধুনিকতা এই আধুনিকতার চাপিয়ে দেওয়া বা প্রতিষ্ঠানস্বরূপ আচরণের বিরুদ্ধ-ধারণা নিয়ে আমাদের মাঝে আসে। যে কোনো শাসকগোষ্ঠীর আদর্শবাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। জাতীয় সংস্কৃতির খ-িত ধারণাকে বাতিল করে দেয়। কাঠামোকে ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রকে ছড়িয়ে দিতে চায়। মোটা দাগে, প্রান্ত আর কেন্দ্র বা বহির্কাঠামো ও ভেতরকাঠামো বলে কিছু থাকে না। এলিট-সাবঅলটার্ন এই বিভেদরেখা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। উত্তরাধুনিকতাবাদ নিজেও কোনো চিন্তার কেন্দ্র হয়ে থাকতে চায় না। উত্তরাধুনিক লেখকদের বলা হয় উত্তরকাঠামোবাদী Freeplay of Structure)। জ্যাক দেরিদা Freeplay of Structure-এর যে ধারণা দিয়েছেন, তা উত্তরাধুনিক লেখকদের লেখায় লক্ষ করা যায়। দেরিদা বলছেন The Center is at the center of the totality, and yet, since the center does not belong to the totality (is not part of the totality), the totality has its center elsewhere. The center is not the center.Õ [Jacques Derrida, Writing and Differece, trans. Alan Bass, London: Routledge, p 278].

উত্তরাধুনিকতাবাদের জন্ম বিংশ শতকের সত্তরের দশকে। দার্শনিক ফ্রেডরিক নিৎসে, লিয়েতার, দেরিদা, হাইডেগার বা লাকা উত্তরাধুনিকতাবাদ বিষয়ে নিজ নিজ দার্শনিক অবস্থানকে উপস্থাপন করেছেন। উত্তরাধুনিকতার এই মৌলপ্রবণতা শিল্পেও চলে এসেছে। শুরুর দিকে উত্তরাধুনিক ধারণার আলোকে স্থাপত্য বা চিত্রকলার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়। শিঘ্রই আলোচনার ব্যপ্তি শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফিকশনের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি— প্রচলিত-প্রতিষ্ঠিত কাঠামো ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ঐতিহ্যগত বর্ণনাশৈলী, কাহিনির নির্মিতি, আখ্যান ও নন্দনতত্ত্বের ধারণা সব কিছু থেকে বের হয়ে আসছেন উত্তরাধুনিক গল্পকার। তাঁর সামনে কোনো আদর্শিক মানদ- থাকছে না।

মেটান্যারেটিভ বা গ্রান্ডন্যারেটিভ

আধুনিকতা অনেকগুলো বৃহৎ আদর্শ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে যা দ্বারা মানুষ গোষ্ঠীগতভাবে বিভিন্নমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত। যেমন ধর্ম, মার্কসবাদ, সাম্যবাদ, ইতিহাস, মানবিকতাবাদ প্রভৃতি। এইগুলো হলো মেটান্যারেটিভ বা গ্রান্ডন্যারেটিভ। বাংলায় বলতে পারি বিশদ প্রেক্ষাপট। উত্তরাধুনিক পর্যায়ে এসে মেটান্যারেটিভসমূহের মধ্যে ভাঙন দেখা দিয়েছে জেগে উঠছে ছোট ছোট বিকল্প-ন্যারেটিভ। উত্তরাধুনিকতাবাদ মেটান্যারেটিভ বা বৃহৎ পরিপ্রেক্ষিতসমূহের ভেতরকার সকল অসঙ্গতি-স্ববিরোধী বিষয় সমূহকেও পৃথকপৃথক ভাবে তুলে ধরছে। এই কারণে জঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার বলেছিলেন, ‘পোস্টমডার্ন মিনস ইনক্রেডুলিটি টুয়ার্ডস মেটান্যারেটিভ।’

মেটাফিকশন

মেটাফিকশন উত্তরাধুনিক কথাসাহিত্যের কতগুলো প্রবণতায় সমন্বয়। মেটান্যারেটিভের সঙ্গে মেটাফিকশনের পার্থক্যটা সরলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে the living handbook of narratology-G : ÔMetanarrative comments are concerned with the act and/or process of narration, and not with its fictional nature. In contrast to metafiction, which can only appear in the context of fiction, types of metanarration can also be found in many non-fictional narrative genres and media.Õ

মেটাফিকশনের কতগুলো বৈশিষ্ট্য বা নির্ণায়ক আছে। যেমন, মোটাদাগে—একটি গল্প বলা হচ্ছে একজন ব্যক্তি বা চরিত্র সম্পর্কে, সেই ব্যক্তি বা চরিত্র আবার নিজেই ঐ গল্পের ন্যারেটিভে যুক্ত হয়ে গল্পের বাকবদল করে দিচ্ছে। অথবা, একটা গল্পের মধ্যে আরেকটা গল্প ঢুকে পড়েছে। অথবা, কোনো গল্পে চরিত্র নিজেই সেই গল্পের লেখক হিসেবে দাবি করছে এবং গল্পের প্লট পরিবর্তন করে দিচ্ছে। কখনো কখনো আবার পাঠকও লেখকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে গল্পের পরিণতি বদলে দিচ্ছে। অথবা, গল্পের চরিত্ররা সরাসরি পাঠকের সাথে কথা বলছে। চরিত্ররা ঐ গল্পের লেখকের আগের  কোনো লেখা বা সৃষ্ট-চরিত্র নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, গল্পের চরিত্রটা অবগত থাকবে যে এটা একটা গল্প। যেমন, ‘জুমাঞ্জি’ সিনেমায় কোনো বিপদ আসলে চরিত্ররা বোর্ডে গুটি চেলে তার সমাধান খোঁজে। তারা বুঝতে পারে তারা একটি গল্পের ভেতর আছে। ‘স্পেসবলস’ সিনেমায়ও আমরা দেখি মহাকাশে আটকে পড়ে চরিত্ররা গেমসয়ের মতো নির্দেশনাবলী পড়ে পরের ধাপে এগিয়ে যায়।

মেটাফিকশন শব্দটি প্রথম পরিচিত করান উইলিয়াম এইচ গাস ১৯৭০ সালে তাঁর ফিকশন অ্যান্ড ফিগারস অব লাইফ বইতে। পরে এটি নিয়ে আরও বিশদে ধারণা দেন কানাডীয় অধ্যাপক তাত্ত্বিক লিন্ডা হাসিয়ন। আত্ম-উল্লেখের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি ১৯৮০ সালে মেটাফিকশনকে ‘হধৎপরংংরংঃরপ’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, মেটাফিকশনে পাঠককে বার বার মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে তারা যা পড়তে সেটি বাস্তব নয়, নির্মিত। কখনো কখনো পাঠকদেরও গল্পে যুক্ত করে নেয়া হয়। সাহিত্যতত্ত্বের অধ্যাপক ওয়েরনার উলফ বলেন, মেটাফিকশন উত্তরাধুনিক সাহিত্যের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও হোমার থেকে রুশদি পর্যন্ত অনেকের লেখায় মেটান্যারেটিভের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়।

হোমারের মহাকাব্য অডিসি, সার্ভেন্তেসের দন কিহোতে উপন্যাসে মেটান্যারেটিভ টেকনিকের যথার্থ প্রয়োগ ঘটেছে। পরবর্তীকালের উপন্যাসের মধ্যে হুয়ান রুলফোর পেদ্রো পারামোর কথা বলতে হয়। তবে সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্যে খ্যাতিমান উত্তরাধুনিক ধারার লেখক হলেন ফরাসি কথাসাহিত্যিক জন ফাওলস্।

আমি এখানে দন কিহোতে থেকে মেটাফিকশনের ব্যবহার সম্পর্কে ছোট্ট একটা নমুনা দিচ্ছি : উপন্যাসের ভেতর লেখক সেরভান্তেস এক জায়গায় বলছেন, মূল কাহিনিটি তাঁর নিজস্ব নয়। আরব লেখক সিদি হামিদ বেনেনগালি প্রথম দিন কিহোতের জীবনী-উপন্যাস রচনা করেন। সেটির অনুবাদ হয় স্প্যানিশ ভাষায়। সেই অনুবাদ পড়েই সেরভান্তেস এই গ্রন্থ রচনায় হাত দেন। অথচ মজার বিষয় হল, এর পুরোটাই সেরভান্তেসের কল্পনা। বা বানানো গল্প। সিদি হামিদ বেনেনগালি নামে কোনো আরবি লেখকই নেই। তাই এই উপন্যাসের মূল কাহিনিটি অনুবাদ হওয়ারও প্রশ্ন আসে না।

১৬০৫ সালে প্রকাশিত হয় দন কিহোতে-র প্রথম খ-। একজন অসৎ লেখক এর দ্বিতীয় খ- নিজ নামে লিখে বাজারে ছেড়ে দেন। ক্রোধে, ক্ষোভে সেরভান্তেস নিজেই আবার লিখতে লাগলেন দ্বিতীয় খ-। এখানেও মজার ব্যাপার হল, বর্ণনায় মধ্যে মধ্যে দেখা যাচ্ছে যে, দন কিহোতে তার জীবনকাহিনি নিয়ে সেরভান্তেসের লেখা বইটি পড়েছেন, প্রথম খ-টি নকল হওয়ার গল্পও তাঁর জানা আছে।

এভাবেই এখানে ফিকশনের মধ্যে বাস্তব ঢুকে গেছে। আবার উল্টো বাস্তবের মধ্যে ফিকশন ঢুকে গেছে; যেমন, লেখক বলছেন বইটি তিনি পুনলেখন করেছেন। তার একটি বাস্তবসম্মত গল্প তিনি ফেঁদেছেন, যেটি অনেকে বিশ্বাসও করেছেন। গল্পে লেখক নিজে ঢুকে পড়েছেন কোথাও কোথাও। যে কারণে, দন কিহোতে উপন্যাসটিকে মেটাফিকশনধর্মী উপন্যাস বলা চলে।

ঢাকার মঞ্চে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটেনের বিশ্বখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার আকরাম খানের ‘দেশ’ ও আনিকা মাহিনের ‘ম্যাকাব্রে’ দেখেছি। দুটিই থিয়েটারে মেটাফিকশনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে। চলচ্চিত্রে মেটাফিকশ নির্মাণ-কৌশলের প্রয়োগ অনেক বেশি দেখা যায়। ঔড়ংবঢ়য কঁঢ়ভবৎ দুর্দান্ত একটি বই-ই লিখেছেন এ নিয়ে। বইটির নাম গবঃধ-ঘধৎৎধঃরাব রহ ঃযব গড়ারবং : ঞবষষ গব ধ ঝঃড়ৎু। ন্যারেটিভের এই কৌশলগত প্রয়োগ আমরা অংশত দেখেছি আকুতাগাওয়া রিউনোসুকে রচিত ‘ঝোপের মধ্যে’ গল্পের ভেতর। আকুতাগাওয়ার এই গল্পটিকে উপজীব্য করে এবং তাঁর ‘রাশোমন’ গল্পের পটভূমিকাসহ শিরোনামটি দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে খ্যাতি অর্জন করেছেন কুরোসওয়া আকিরা। মূলত তাঁর সেই ‘রাশোমন’ সিনেমা দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত হয়েছেন আকুতাগাওয়া। ওঁর ‘ঝোপের মধ্যে’ গল্পে আমরা দেখি, একটি খুনের তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং একজন ভিক্টিম (যে খুন হলো তার আত্মা) একই ঘটনা ভিন্নভাবে ব্যক্ত করছে। খুন করলো কে এই প্রশ্নে প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রত্যেকে নিজেদের খুনি বলে দাবি করছেন। অন্যদিকে খুনির আত্মা বলছে সে আত্মহত্যা করেছে। এভাবেই ঘটনার জট খুলতে গিয়ে সেটি আরও পাকিয়ে যায়।

বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই ইন্ডিয়ান-মার্কিন পরিচালক তারসেম সিংয়ের ‘দ্য ফল’ ছবিটির কথা। মুক্তি পায় ২০০৮ সালে। অনন্য এর নির্মাণশৈলি। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এক শিশুকন্যাকে গল্প শোনাচ্ছে। গল্পে তারা দুজনই চরিত্র হয়ে উঠছে। গল্পের কথক এবং শ্রোতা গল্পের ভেতর নিজেদের চরিত্রদের সঙ্গে কথা বলতে পারছে। আলোচনা করে তারা গল্পটির বাক পরিবর্তন করে ফেলছে।

উত্তরাধুনিক ছোটগল্পে কখনো কখনো কাহিনি নিজেই খুব জটিল হয়ে পড়ে। যেমন স্বপ্নবাস্তবতার বিষয় থাকলে বা চেতনাপ্রবাহ চলে আসলে, গল্পটির কাঠামো আপনাআপনিই জটিল হয়ে ওঠে; যেমন ‘ছুঁয়ে দেখা জীবন’ গল্পটি হয়েছে। গল্পটি আমি সরলভাবে লিখতে চাইলেও চরিত্র আমার কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে। সজ্ঞানে সে তার বর্তমানকে বিনির্মাণ করতে চায়। তাকে একসময় বলা হয়েছিল শিক্ষিত এবং শহুরে জীবন ভালো। প্রতিটা ব্যক্তির জন্য এটাই কাক্সিক্ষত। সভ্যতা এবং ভব্যতার আলো ছড়িয়ে আছে এই জীবনে। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় শুয়ে গল্পের মূলচরিত্র সৈয়দ রহমানের উপলব্ধি হচ্ছে তথাকথিত কেন্দ্রগত ধারণার পেছনে ছুটে-চলা জীবন তার জন্য প্রকৃত জীবন ছিল না। সে মনে করে তার জন্য আদর্শ জীবন পড়ে আছে গাঁয়ে, কৃষক পরিবারে। সে এখন তার স্মৃতির টাইম মেশিনে চড়ে বা স্মৃতিশক্তির সঙ্গে স্বপ্নশক্তির সংযোগ ঘটিয়ে ‘উইশ ফুলফিলমেন্ট’-এর মতো করে তার ভবিষ্যৎ অর্থাৎ আজ যা বর্তমান সেটি নির্মাণ করছে। আশেপাশের চরিত্রগুলোও দুটি সময়ের চরিত্র হয়ে উঠছে। যখন সৈয়দ রহমান নিজের বর্তমান নির্মাণ করতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে তখনই তার মৃত্যু ঘটছে। হতে পারে এই মৃত্যুর ভেতর দিয়েই তার কাক্সিক্ষত জীবনে পুনর্জন্ম ঘটছে।

নমুনা গল্প

ছুঁয়ে দেখা জীবন

সৈয়দ রহমান পপুলার ডাইআগ্নস্টিক সেন্টারের তিনতলার দক্ষিণ পাশের কেবিনে শুয়ে। পাশে স্ত্রী শায়লা আধবসা। শায়লার শরীরটাও বিশেষ ভালো যাচ্ছে না। তার ওপর কয়েক রাত না-ঘুম কাটানোয় প্রথম দর্শনে কে চিকিৎসারত ঠাওর করা যায় না। কেবিনের এক কোণায় চেয়ার পেতে বসা স্বপ্না—ছেলেবৌ। খানিক আগে এসেছে। দুই ছেলেবৌ আর এক মেয়ে এখন পালা করে আসছে। শুরুর দিকে সকলে একসঙ্গে এসে ভিড় জমাত বলে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ভীষণ বিরক্ত হত, এখন ওরা নিজেরাই বিরক্ত হয়ে আসে না। আসতে হয় তাই পালা করে আসা। স্বপ্না ঘড়ির দিকে তাকাল, ‘মাত্র আধা ঘণ্টা হলো। হাসপাতালে সময় যেন যেতেই চায় না। এখানে জীবনটা বড্ড স্থির আর একঘেয়ে। মনে হয় যেন বিষণœ একটা ছবির মধ্যে আটকে গেছি’—মনে মনে ভাবে সে।

সকালে দেরি করে বিছানা থেকে ওঠাটা স্বপ্নার অভ্যাস। চাইলেই সন্ধ্যা শিফটের দায়িত্ব নেয়া যেত, কিন্তু তাতে করে জি-বাংলার সিরিয়ালগুলো মিস হতো। তার চেয়ে বরং ঘুমটা কামায় দেওয়া ভালো। তাছাড়া ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আজকাল শরীরটাও মুটিয়ে যাচ্ছে। বিয়ে-বাচ্চা-সংসার সব মিলে ফিগারটা এমনিতেই গেছে, যেটুকু আছে একটু মেইনটেইন না করলে তাও টিকবে না। স্বপ্না ভাবে, ভাবতে ভাবতেই জিজ্ঞেস করে, ‘মা, দেখেন তো, জিন্স আর ফতুয়াতে আমাকে কেমন মানাচ্ছে?’

‘মানাচ্ছে মা!’ শায়লা দেখে কি না-দেখে উত্তর করেন। শাশুড়ির নিরাসক্ত উত্তর শুনে আরো কী কী জিজ্ঞেস করতে গিয়ে দমে যায় স্বপ্না। কেবিনের থাই গ্লাসে নিজের অবয়বটা আরো একবার পরখ করে, উঠে-বসে শরীরটা এদিক-সেদিক করে দেখে। ‘আর একটু ঝরাতে হবে’—নিজেকেই নিজে বলে।

রহমান আধো ঘুম, আধো জাগা। আজ তিন দিন থেকেই এই অবস্থায় আছেন। স্বপ্নে বায়োস্কোপ দেখছিলেন। পাকুড়গাছের নিচে বসে লাল-নীল রঙের ফিতায় সজ্জিত বাক্সের ছিদ্রপথে দৃষ্টি চুবিয়ে উপভোগ করছিলেন নিজেরই বাল্যকালের কোলাজচিত্র। একের পর এক চিত্র এক-একটা স্মৃতি নিয়ে আসে যেন! সেদিন ঘুম ভেঙে গেলেও পুরোপুরি স্বপ্নের জগৎ থেকে ফেরাতে পারেননি নিজেকে। এক চোখ তার আটকে আছে বায়োস্কোপে, অন্য চোখে অনীহা নিয়ে দেখছেন কেবিনের দেয়ালের মরা একটি-দুটি মাছি আর থেকে থেকে কয়েকটি ধাড়ি টিকটিকির শিকারি জীবন। একেকবার একেক চোখ বন্ধ করে দুই জীবনের মধ্যে তিনি আসা-যাওয়া করছেন, কখনো কখনো দুটি চোখ খোলা রেখে একসঙ্গে যাপন করছেন দুই জীবন। থেকে থেকে কিসব আপাত অর্থহীন কথাবার্তা বলছেন।

হঠাৎ করেই নিজের অ-কোষটা হাত দিয়ে চেপে ধরলেন রহমান।

‘শ্যালা মফায়, এভাবে কেউ মারে?’ খটখটে গলায় বললেন তিনি।

ফের শুরু হলো। শায়লা নড়েচড়ে বসলেন।

‘মফা কে মা?’ স্বপ্না জিজ্ঞেস করে।

‘বোধ হয় ওর চাচাতো ভাই মফেদুলের কথা বলছে।’

‘ওহ!’ স্বপ্না আর আগ্রহ দেখায় না।

‘আমি তো আর আড়ি করি মারিনি। বলটা তুই ওইভাবে ঠেকাতি গেলি ক্যানে? কিছুক্ষণ শুয়ি থাক, ঠিক হয়ি যাবে।’ মফেদুল বলে।

রহমান হাত-পা ছেড়ে দেন। অসুবিধা হচ্ছে দেখে শায়লা পায়ের তলের বালিশটা বের করে আনেন। ওপরের দিকে মাথাটা তুলে একটা টানা নিঃশ^াস নেন। ‘আহ! কী নীল।’ ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে রহমান।

‘রহমান ওঠ। ওঠ বুলছি, অ্যাটাকে আসছি।’ সবুর নিচ ব্যাক। ব্যতিব্যস্ত হয়ে রহমানকে ডাকে। রহমান কোনো সাড়া দেয় না। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেসে যাওয়া আলগা মেঘগুলোকে থামিয়ে কী যেন আঁকার চেষ্টা করে।

‘রহমান ওঠ, ওঠ। গোলটা হয়ি গেল তো!’ বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের নাম ধরে ডাকেন রহমান।

‘ইশ রে! হলো তো।’ রহমান কিছুক্ষণ থেমে থেকে বলেন।

‘কী হলো বাবা?’ স্বপ্না জিজ্ঞেস করে।

‘গোল! গোলটা হয়ি গেল। জিততি জিততি হেরি গ্যালাম মধু। আব্বার পকোটে একমাসে হাত চালি একশ’ ট্যাকা হয়ল। সবটা গেল।’ পুকুরে পা ধুতে ধুতে কথাগুলো বলে রহমান। ওপরে গামছা হাতে দাঁড়িয়ে মধুমালা।

‘এত হারিস যেকুন, তেকুন ট্যাকা দি না খেললিই পারিস। বুললাম, জুমাতের ভ্যান থেকি আমাকে একটা মালা কিনি দে। দিলি নি তো, এখুন বোঝ!’ মধুমালা টিটকিরি মেরে কথাগুলো বলে।

‘দিতাম তো। ট্যাকাটা দ্বিগুণা করি তোকে মালার সাথে টালাও দিতাম।’

‘টালা আবার কী?’

‘একুন আর বুলি লাভ কী?’

‘না, বল না দেখ।’ আবদার করে বসে মধুমালা।

রহমান হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে মধুমালা আর রহমানের আলাপ শোনেন। মাঝেমধ্যে মনে হলে তিনি নিজেও সেই আলাপে অংশ নেন।

‘আর একদিন জিতি তেকুন বুলবু।’ জবাব দেয় রহমান।

‘তালি আর গামছা দিলাম না। যেদিন জিতবি সেদিন দেব।’ বলে মধুমালা পা বাড়ায় বাড়ির দিকে।

‘এই মধু শোন। শুনি যা। যাসনি বুলছি। ভেজা গা! এভাবে বাড়ি গেলি মা বকি রাকবি না!’ স্বর চড়া করে শোনায় রহমান।

‘বকুক। সেটিই তো আমি চাই।’ বলে মধুমালা চোখের আড়াল হয়ে যায়। রহমান কিছুক্ষণ একা বসে থাকে। সন্ধ্যার আধো ছায়া আধো আলোতে পুকুরের কালচে নীল জলে মাছের পোনাগুলো সব ওপরে ভেসে ওঠে। সন্ধ্যের শেষ আলোয় ওরা স্নান সেরে নেয়। রহমান মায়াভরে দেখে।

‘কী আনন্দময় জীবন!’ বিছানা থেকে ঘাড়টা ঘুরিয়ে বলেন রহমান।

‘সারারাত আমাকে ঘুমুতে দেয়নি। বুকটা জ্বলে গেল, জ্বলে গেল বলে বাচ্চার মতো কেঁদেছে। আর এখন বলছে—কী আনন্দময় জীবন!’ শায়লা ক্ষোভে-রাগে কথাগুলো আপনমনে বলেন।

‘মা কাল রাশির বাড়ি যাওয়া হয়নি।’ গুন গুন করা থামিয়ে বলে স্বপ্না।

‘বলিস কী?’ সহসা খানিকটা চাঙ্গা হয়ে ওঠেন শায়লা বেগম; কিংবা চাঙ্গা হয়ে ওঠার ভান করেন তিনি।

এরপর স্বপ্না অতি আগ্রহ নিয়ে রাশি নাটকের গত পর্বের কাহিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করে চলে।

২.

‘দ্যাক, এভাবে সব সুময় আমি শাগ তুলবু আর তুই ঘুঘুর পেছনে দৌড়ুবি; আর বাড়ি ফিরার সুময় আমার তুলা আদ্দেক নি চাচিকে বুলবি, তুই তুলিছিস, এটা হবে না। আজ তুই আমার সাথে শাগ তোল, না হলি আমি আর ভাগ দেব না।’ ফিনফিনে গমের জমিতে সাদা-মসৃণ পা দুটো চুবিয়ে কথাগুলো বলে মধুমালা।

‘ওসব বতু তুলা আমাক দি হবে না।’ উত্তর করে রহমান।

‘তালি কী হবে শুনি? পাখি ধরা? একটাও ধরিছিস এতকালে?’

‘আমি পাখি ধরতি যাই, একথা তোকে কে বুললু? আমি যাই পাখিদের সাথে মিলামিশা করতি। তাদের ভাষা বুঝতি।’

‘যে আমার ভাষা বোঝে না, সে বুঝবি পাখিদের ভাষা!’ মুখের কোণে ব্যঙ্গ হাসি হেসে বলে মধুমালা।

‘ক্যাচক্যাচি পাখি চিনিস?’ প্রশ্ন করে রহমান।

‘উড়ার ক্ষেমতা নেই! খালি ক্যাচক্যাচ করে।’

‘তোর কাছে মনে হয় খ্যালি ক্যাচক্যাচ। উরা আসলে মেলা কথা বলে।’

‘কী বলে তার একটা নমুনা দে তো শুনি।’

‘সেদিন আমি মবুর আমবাগানে গিছি ঘুঘুর তল্লাসে। দেখি, আমাকে দেকি একটা ক্যাচক্যাচি পাখি আরেকটাকে বুলচি, ক্যাচ ক্যাচ! ক্যাচ ক্যাচ!’

‘ক্যাচ ক্যাচ! ক্যাচ ক্যাচ!’ ভেংচি কেটে কথা ভাঙায় মধুমালা।

‘ঠিক হচ্ছে না মধু!’ শাসিয়ে বলে রহমান।

‘ক্যাচ ক্যাচ তো আমিও বুঝলাম। মানে কী ক?’

‘ও আসলে বুলছিল, ঐ দেখ যে ছেলিটা আসছি ওর পাছে পাছে একটা পাগলি থাকে, তার গা-দি’ গবরের গন্ধ বেরুই! ওয়াক! ছিঃ!’

‘তালি, সেদিন আমাদের একসাথে দেকি একটা গরু কী বুলছিল বুলি?’ তড়িৎ ভেবে নিয়ে মুখে দুষ্টু হাসি হেসে বলে মধুমালা।

‘বুলা লাগবি না। গরুর ভাষা যে তুই বুঝিস তা আমি জানি। যে যার জাত, সে তার ভাষা বোঝে। এটা আমি না, জ্ঞ্যানি মানষে কয়।’

‘তালি তো তুই ক্যাচক্যাচি পাখি। ক্যাচ ক্যাচ! ক্যাচ ক্যাচ!’

‘হলাম। আমার তো ইতে আপত্তি আছে বুলিনি। পাখি হওয়া কত ভাগ্যির বুঝিস তুই? যেমনে খুশি উড়ি যাওয়া যায়। একদিন দেখিস, আমি ঠিকই উড়ি যাব।’

‘আমাকে সাথ নিবি?’

‘পাখি গরুক সাথ নেয় কেমুন করি! মেলে তুই ক?’

‘যাহ্, তুই তোর পাখির কাছে। তোর সাথে বকবক করলি আজ আর বতু তুলা হবে না।’

রহমান লাফাতে লাফাতে পাশের সেগুন বাগানের ভেতর দিনে দুপুরে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিছুক্ষণ সেই শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকে মধুমালা। তারপর খানিক দূরে শাক তোলা ছেলেমেয়েদের দিকে এগিয়ে যায়।

৩.

‘কুক… কুক…কুউক…!’ রহমান ডাক দিয়ে ঘুঘু ডাকে।

‘কুক… কুক…কুউক…!’ একটা ঘুঘু শিশুগাছের মগডাল থেকে উত্তর নেয়।

‘কুক… কুক…কুউক…!’ রহমান বিছানা থেকে পাল্টা জবাব দেয়ার চেষ্টা করেন। শব্দগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে।

‘মা, বাবা মনে হয় মেন্টালি আর সাউন্ড নেই। খালি আজেবাজে বকছে কয় দিন থেকে।’ ইরা বলে।

ইরা মেজো বৌ। ছোট বৌ স্বপ্না উঠে যাওয়ার ঘণ্টাদুয়েক পর ইরা এল। স্বপ্না থাকতে থাকইে দুপুরের খাওয়া-গোসল সেরে নিয়েছেন শায়লা বেগম। ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে ঘুমের নেশাটা আরো বেড়ে গেছে। কিন্তু রহমানের আচরণগত পরিবর্তনে ঘুমানো সম্ভব হচ্ছে না। মানসিক একটা সমস্যা নিশ্চয়ই হয়েছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা, কিডনি ফেইলিওর ও হার্ট অ্যাটাক। যদিও মাইনর অ্যাটাক, তবে বিশেষ কেয়ারে না রাখলে বড় কিছু হয়ে যেতে পারে। ডাক্তার বলেছেন, আপাতত কিডনি আর হার্টের ট্রিটমেন্ট চলুক, পরে মানসিক ব্যাপার নিয়ে ভাবা যাবে। শরীরটা সুস্থ হলে অটোমেটিক সেরেও উঠতে পারেন।

‘ডাক্তার তো বলছেন ঠিক হয়ে যাবে।’ শায়লা ইরার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও আশ্বস্ত করেন।

‘মা, মাথার সমস্যা হলে ভেবে দেখেন, কী সমস্যায় না পড়ব আমরা! ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে উঠছে, বাড়িতে কত বাইরের লোকজন আসে। একটা প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে না?’

‘বউমা, তোমার শ্বশুর এখনো পাগল হয়ে যাননি। আর তাছাড়া তোমার বাসাতেও সে পাগলামো করছে না।’ শক্তগলায় কথাগুলো বলতে গেলেন শায়লা, কিন্তু পারলেন না। হাসপাতালের অর্ধেক খরচই চালাচ্ছে ইরার স্বামী, অর্থাৎ শায়লা রহমানের মেজো সন্তান। কথাটা ভেবে কণ্ঠস্বর নত করে বললেন, ‘দোয়া করো বৌমা, তা যেন না হয়।’

‘রাইট মা।’ ইরা বলে। ‘দোয়া তো কম করছি না। সান্টুর কাল থেকে এক্সাম। ওর পাশে না বসে থাকলে পড়তেই বসে না। গতবার একটা নম্বর কম পাওয়ায় রোল দশে নেমে গেছে। এবার যে কী হবে, গড নোজ! সারা দিন হাসপাতাল আর জায়নামাজে বসে দোয়া করতে করতেই কেটে যাচ্ছে। বাবা ভালো হলে, আমি আর আপনার ছেলে ঠিক করেছি আজমির শরীফে সিন্নি দিয়ে আসব। ভালো হবে না, মা?’

‘গত বছরই না তোমার মায়ের জন্য মানত করেছিলে? তোমরা বোন সকলে ঘুরে এলে ওখান থেকে।’

‘গিয়েছিলাম। কিন্তু ঘোরা আর হলো কই? আমরা কেবল আজমির শরীফ আর শহরের লেকগুলো ঘুরে দেখতে পেরেছি। তখনই তো বাবা বিছানায় পড়ে গেলেন। আপনার ছেলে বলল, তিন দিনের মধ্যে চলে আসতে। কত কী দেখতে বাকি থেকে গেল, এবার গেলে পুরো রাজস্থান ঘুরে আসব।’

ইরার কথায় আগ্রহ পান না শায়লা। তবুও কী এক অজানা কারণে তাল দিতে হয় তাকে।

‘যেও মা। তোমাদের তো এখনই বেড়ানোর সময়। আমার মতো বয়েস হলে আর কিচ্ছু দেখা হবে না। তোমার শ্বশুরের সঙ্গে নামেই কানাডায় থাকলাম। নায়াগ্রা ফলস্ পর্যন্ত দেখা হলো না। তোমার শ্বশুর এনজিওর কাজটা নিয়ে কম শহরে তো আর ঘুরল না। সবখানেই তার একই স্বভাব। অফিস শেষ করে সোজা বাড়ি এসে ঘরের মধ্যে লাইট অফ করে বসে থাকা। এভাবে থাকলে কি আর ঢাকা-টরেন্টো আলাদা করা যায়, বলো?’ শায়লা কথাগুলো শেষ করে দেখেন ইরা কানে হেডফোন লাগিয়ে কার সাথে যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। নীরব হয়ে যান তিনি।

‘মধু, এক দৌড় দি একমগ পানি নি আয় তো। খাব।’ রহমান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে। বউতোলা খেলায় রহমানের দক্ষতা হিংসে করার মতো। মধুমালা ওদের বাড়ি থেকে বদনা ভরে পানি নিয়ে আসে।

‘পানি! পানি!’ খুব কষ্ট করে বলেন রহমান। ইরা পানির বোতলটা তুলে ধরে। শায়লা গ্লাসের অর্ধেক ভরে রহমানের মাথা তুলে ধরে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন।

‘বদনায় পানি?’ ক্ষেপে যায় রহমান।

‘বাবা, বদনা হবে কেন? গ্লাস। এখানে বদনা আসবে কোত্থেকে!’ ইরা বোঝানোর চেষ্টা করে। মুখের কোণে তার চিকন হাসি।

‘আরে, ওজুর বদনা। আব্বা এই বদনায় ওজু করে, পানিও খায়।’ মধুমালা রহমানকে বোঝায়। রহমান বদনার নলটা মুখের মধ্যে নিয়ে ঢকঢক শব্দে পানি গিলতে থাকে।

‘রহমান হাগার বদনায় পানি খায়! ওই বদনায় নইতন বুড়ি ছোঁচে’—বলে চেঁচিয়ে পাড়াময় করে তোলে বাচ্চু। রহমান বদনা ফেলে বাচ্চুর দিকে তেড়ে যায়।

এক ঝটকায় শায়লার হাতে ধরা গ্লাসটি ফেলে দেন রহমান। ‘তোর একদিন কি আমার একদিন। শ্যালা বাচ্চু!’ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলেন। সবটা বোঝে না শায়লা-ইরা।

‘আম্মা, বাবা কি-সব নাম বলেন, কাউকে চেনেন আপনি?’

‘কারো কারো নাম শুনেছি ওর মুখে। সবাই হয়ত আর বেঁচেও নেই।’

‘বাবার বন্ধু না আত্মীয়?’ ইরা প্রশ্ন করে।

‘আমি তো কখনো ওর গ্রামের বাড়ি যাইনি। আমার শ্বশুর দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে শাশুড়ি ওকে নিয়ে ঢাকায় ভাইয়ের বাসায় চলে আসেন। তারপর শাশুড়ি আর ওকে গ্রামে যেতে দেননি, যদি না ফেরে—এই ভয়ে। আমরা কানাডায় থাকাকালীন শ্বশুর মারা যান। কয়েক বছর পর শাশুড়িও গত হলেন। এরপর তোমার শ্বশুরের মুখে আর কখনো গ্রামের বাড়ির বা আত্মীয়স্বজনের গল্প শুনিনি। দেশে ফিরে এলাকার মানুষজনকে না চেনার ভান করে এড়িয়ে যেতে থাকল। গ্রামের কথা তুললেই ক্ষেপে যেত। বলত, গ্রামে মানুষ বাস করে নাকি! এ নেই, সে নেই। যত সব মূর্খের বাস! আমি মেহেরপুরের এক আমব্যবসায়ীর মুখে শুনেছি, ওর দ্বিতীয়পক্ষের এক ভাই ছিল। সে-ই গ্রামের বাড়ি-জমিজমা দেখাশোনা করত।’

‘মা, আমি মামাবাড়ি যাব না। শহর আমার ভাল্লাগে না।’ শায়লার মুখের দিকে মুখটা তুলে পিটপিট করে তাকিয়ে কথাগুলো বলেন রহমান।

‘আচ্ছা যেতে হবে না।’ মাথায় হাতটা রেখে উত্তর করেন শায়লা। তৃপ্তিতে চোখটা বন্ধ করেন রহমান।

‘চল, তোর ভালো না লাগলি চলে আসবি। আমি তো আর তোকে জোর করি আটকাচ্ছি না।’ মা কুরুচে-উলে স্যান্ডো গেঞ্জি বুনতে বুনতে বলেন।

‘কেন্তু তুমি তো একেবারেই যাচ্ছ? তুমার ওকিনে যদি ভালো না লাগে? ফিরি আসবা?’ রহমান প্রশ্ন করে।

‘না।’ দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর করেন মা।

‘তালি আমি?’

‘হয় এখানে থাকবি, না হলে মা’র সঙ্গে থাকবি। তোর সিদ্ধান্ত।’

‘শক্ত সিদ্ধান্ত মা।’

‘শক্ত কেন? মা’র চেয়ি অমন বাবাই তোর কাছে বড় হয়ি গেল? সৎমা’র সংসারে থাকতি পারবি?’ মা প্রশ্ন করেন।

‘ব্যাপারটা শুধু বাবা আর সংসার না। একিনে আরো অনেক কিছু আছে আামার।’ বোঝানোর চেষ্টা করে রহমান।

‘কী আছে শুনি?’ মা সেলাইয়ে মনটা চুবিয়ে জানতে চান।

‘কী করে বোঝাই মা?’ রহমান নিজেও বুঝে উঠতে পারে না তার ঠিক কী কী আছে এখানে।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে ‘ক্যাচ ক্যাচ! ক্যাচ ক্যাচ!’ শব্দ করে চলেন রহমান। ‘কুক…কুক…কুউক…!’ ডেকে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করেন।

‘তুই বড় হয়ে গেছিস।’ মা বলেন। ‘এজন্যেই তোকে জোর করছি না। তোর ভালো আমি তোর ওপরে ছেড়ে দিলাম। তবে এটুকু বলে রাখি, তোকে ছাড়া তোর মা বাঁচবে না।’

৫.

‘মা, তুমি সারা দিন বাবার এমন অদ্ভুত আচরণ টলার করো কী করে? এত শিক্ষিত মানুষ এমন ননসেন্স বিহ্যাভ করে কেমন করে?’ শোয়েবকে বেশ উত্তেজিত দেখায়। শোয়েব রহমানের ছোট ছেলে।

‘এভাবে বলিস না ছোট।’ বড়বোন সাদেকা শোয়েবকে থামিয়ে দেয়।

‘বলব না? সেদিন কী হয়েছে জানো আপা, বাবা ইরাকে কি বিশ্রী একটা কথা বলেছে। বলেছে, তোমার…! ছিঃ আমি ভাবতেও পারছি। ছেলেবৌকে কেউ এ কথা বলে?’

‘ওটা ইরাকে না, মধুকে বলেছে।’ শায়লা উত্তর দেন।

‘এই মধু-টধু আবার এল কোত্থেকে? বাবার কি অন্য কোথাও প্রেম-টেম ছিল, মা? কী একটা সিনেমাটিক নাম! ডাজ শি রিয়েলি এক্সিস্ট?’ বিরক্তির সুরে প্রশ্ন করে শোয়েব।

‘বাইরে সফিক তোর জন্যে অপেক্ষা করছে। একটা জরুরি আলাপ আছে।’ সাদেকা শোয়েবকে ঘর থেকে ঠেলে বের করে দেয়। সফিক তাদের মেজো ভাই। পেশায় আইনজীবী। ঢাকায় ভালো নামডাক আছে। সফিক আর শোয়েব হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়ায় বসে।

‘বাবাকে দেখে কী মনে হলো?’ সফিক কথা পাড়ে।

‘ম্যাড! টোটালি ম্যাড!’ শোয়েব উত্তর দেয়।

‘আমি সেটা বলছি না। মানে আর কত দিন আছে বলে মনে হলো? আমার তো মনে হয়, বাবার সময় শেষ। ডাক্তারও আমাকে আকারে-ইঙ্গিতে সেটাই বললেন। নো ইম্প্রুভমেন্ট। যে কোনো সময় একটা কিছু হয়ে যেতে পারে।’

‘কী বললে? না না, অসম্ভব। বাবা চলে গেলে আমি ঝগড়া করব কার সঙ্গে!’— বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলার উপক্রম হয় শোয়েব।

‘কুল ডাউন। আমরা তো চাই বাবা বেঁচে থাকুক, নাকি? কিন্তু সিদ্ধান্ত তো ওপরআলার হাতে। এখন প্রশ্ন হলো, বাবার হঠাৎ করে কিছু একটা হয়ে গেলে, কোথায় কবর দেয়া হবে—এসব কি আমরা ঠিক করেছি?’

‘জানি না।’ ছোট্ট করে উত্তর দেয় শোয়েব। জানার ব্যাপারে তার আগ্রহ আছে বলেও মনে হয় না।

‘কিন্তু জানতে তো হবেই। লাশ হয়ে গেলে তো আর বাবাকে আমরা হাসপাতাল-বাড়ি কোথাও রাখতে পারব না।’

‘তুমি কী ভাবছ?’

‘বড় আপার সঙ্গে কথা বললাম। আমরা সকলে থাকি গুলশানে। আশপাশে কবর দেয়া হলে ভালো হত।’

‘হুম। তাহলে তা-ই করো। আমার কোনো আপত্তি নেই।’

‘কিন্তু এদিকে কবরস্থানের দাম কত জানিস? বাবা তো কিছু রেখে যাননি। আমরা তার চিকিৎসার জন্যে তো আর কম করছি না। সামনের বছর আমার পড়াশোনার জন্যে কানাডা যাবে। আমি সেই খরচ গোছাতেই হিমশিম খাচ্ছি। বড়ভাই জাপান থেকে কোনো রেসপন্স করছে না। আমি আর তুই মিলে কত পারব বল?’

‘তাহলে কোথায় ব্যবস্থা করতে চাইছ। আজিমপুর না জুরাইন?’ শোয়েব জিজ্ঞেস করে।

‘মা বলেছেন, ২৫ বছর মেয়াদে যেন বাবার কবরটা দিই আমরা। এটাই নাকি আমাদের কাছে তার শেষ চাওয়া। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এই মেয়াদে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, উত্তরা সেক্টর ১২নং কবরস্থান, আজিমপুর কবরস্থান ও জুরাইন কবরস্থানে খরচ হবে ১১ লক্ষ টাকা।’

‘আর বনানী ও উত্তরা ৪নং সেক্টর কবরস্থানে?’

‘ওখানে আরো বেশি। ১৫ লক্ষ টাকা। আবদুল্লাপুরের ওইদিকে একটা কবরস্থান আছে। বেশ সস্তা আবার নতুনও। ওয়েল অ্যারেঞ্জড্। তুই কী বলিস?’

‘কিন্তু একটু বেশি দূর হয়ে গেল না?’

‘তা হলো। আমরা বিশেষ দিনগুলোতে গেলাম। তোর-আমার-বড় আপার গাড়ি আছে। শহরের বাইরে আমাদের খুব একটা যাওয়া হয় না। এই সুযোগে না হয় গেলাম।’

‘আম্মার একটা মত নেয়ার দরকার আছে না?’

‘মা কি বলবেন? মা’র কথা রাখতেই তো আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কোনো মেয়াদি না হলে তো আমরা যে কোনো কবরস্থান বুক রাখতে পারতাম। মা তো আমাদের কাছেই থাকছেন, নাকি? বড়বোন মায়ের খোঁজ নেবে ভেবেছিস। দুদিন পরপর এসে মাতব্বরি ফলাবে। বড়ভাই ভাবিদের নিয়ে জাপানেই থেকে যাওয়ার বন্দোবস্ত করছে। আমরা হলাম কী যে গিনিপিগ। সব বুলডোজার আমাদের ওপর দিয়েই যায়।’

‘কাউকে না কাউকে তো করতে হয়।’

‘সে জন্যেই তো আমরা করে চলেছি। শোন, তোর সায় থাকলে একটা কাজ করতে পারি। বাবার কিছু সম্পত্তি আছে গ্রামে। বাবার সৎভাইয়ের ছেলেরা সেটা ভোগ করছে বলে খোঁজ নিয়ে জেনেছি। আমরা একটা শক্ত করে কেইস ঠুকতে পারলেই, একটা মোটা অংশ পেয়ে যাই। তুই কী বলিস? আমি সব করব, তুই খালি সঙ্গে থাকবি।’

‘ভাইয়া, আমাকে একটু উঠতে হবে।’ বলেই উঠে পড়ে শোয়েব।

‘ওকে। জানিয়ে রাখলাম, ভেবে দেখিস।’ শেষ কথাটা বলে সফিক।

৬.

কেশে ওঠেন রহমান। মিনিট পাঁচেক টানা কাশেন। জ্বরটা এখনো নামেনি। খানিক আগে সাবোসিটার দিয়েছেন শায়লা। আশা করছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই কমে যাবে। জ্বর থাকা অবস্থায় রহমানের উল্টোপাল্টা কথা বলার মাত্রাটা আরো বেড়ে যায়।

‘মা, আমি একটু মবুর বাগান থেকি ঘুরি আসি?’ রহমান অনুরোধের সুরে বলে।

‘সময় নেই। চুয়াডাঙ্গা থেকে দুটোর ট্রেন ধরতে হবে। এখান থেকে কম করেও ঘন্টাদুয়েক সময় হাতে নি বেরোতে হবে।’

‘আমি এই আলাম বুলি—বলেই অনুমতির অপেক্ষা না করে দৌড় দেয় রহমান। মা আজই যাচ্ছেন, এটা ঘণ্টাখানেক আগেও টের পেতে দেননি। বাবা রহমানকে আটকে দিতে পারেন, এই ভয়ে চেপে গেছেন। এখন সুযোগ মতো মেহেরপুর থেকে বের হতে পারলেই যেন মায়ের সব চিন্তার অবসান ঘটে। রহমান এই যায়, এই আসে। হয়ত মাঝপথ থেকেই ফিরে এসেছে। কোনো কিছুই যেন সে বুঝে উঠতে পারে না। ঘুমের ঘোরে চলার মতো করে সে মাকে অনুসরণ করে। কার কথা যেন ভাবতে থাকে। এতটা পথ সে ভাবতেই থাকে। ট্রেনে উঠে বসার পর তার নামটা মনে আসে।

‘মধু!’ রহমান জ্বরগায়ে শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে উচ্চারণ করেন।

‘যাসনে রহমান! যাসনে! নেমে পড়! ওটা মরণফাঁদ! রহমান!’ ট্রেন ছাড়ার আগমুহূর্তে সতর্ক-হুইসেল দেয় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা তেল চিটচিটে খাঁকি পোশাক পরা আধা বয়স্ক লোকটি। পেছনে চিৎকার করে দৌড়ে আসে মধুমালা। রহমান ট্রেনের জানালা গলিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। কেমন কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে আসে চারপাশ। রহমান খুব শক্তি দিয়ে চোখের পাতা মেলে ধরার চেষ্টা করেন। শায়লা রহমানের দিকে এগিয়ে যান। আজ দুদিন পর রহমান একটু রেসপন্স করেছেন। মরার মতো পড়ে ছিলেন। রহমানের একটু নড়ে ওঠায় শক্তি ফিরে পান শায়লা। এই সংসারে এই শরীরটাই এখন তার একমাত্র শক্তি, এটুকু এ কয়দিনে ভালো মতোই বুঝেছেন তিনি। শায়লা যেন জোর করে রহমানকে বাঁচিয়ে রাখতে চান, নিজের প্রয়োজনেই।

ট্রেন হাঁটার গতিতে চলা শুরু করে।

‘যাসনে রহমান! যাসনে! নেমে পড়! ওটা মরণফাঁদ! রহমান!’ মধুমালা আরো একবার চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে। মধুমালার চেহারা রহমানের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ট্রেনে রহমানের একটা হাত ধরে বসে আছেন মা, অন্য হাত ধরে যেন টানছে মধুমালা। কোনো এক জীবনকে এখন বেছে নিতে হবে তাকে।

‘আসিস না রহমান। আসিস না। নেমে পড়। এটা মৃত্যুফাঁদ। রহমান।’ রহমান হাসপাতালের বিছানা থেকে মধুমালার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলে ওঠেন। মায়ের হাত গলিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়ে রহমান। মধুমালার দিকে ছুটে যাওয়ার আগমুহূর্তে ট্রেনের ভেতর মাকে শেষবারের মতোন দেখার জন্যে ফিরে তাকায়; দেখে মায়ের নিবিড় বন্ধনে বসে আছে অন্য এক রহমান। হুবহু সে যেন। তার মুখে মিটমিট করে জ্বলছে এক রহস্যময় হাসি। শায়লা কাঁদতে কাঁদতে রহমানের সেই হাসিমাখা মুখে নিজের মুখ লাগিয়ে শেষবারের মতোন আলিঙ্গন করেন।

***********************************

অধুনান্তিকতা ও ‘রাধা’
রামকৃষ্ণ মণ্ডল

পৃথিবী জুড়ে মানুষের সমাজের বাস্তব বিন্যাসের সঙ্গে সমান্তরালে সৃষ্টি হয়ে চলেছে বুদ্ধির নতুন বিন্যাস। আজকে তাই ‘মাল্টিপল ইন্টেলিজেন্স’ ধারণা বহুল প্রচলিত। এই বাস্তবতায় আবেগ ও মূল্যবোধের রুঠো রূপান্তর সম্পন্ন হচ্ছে, জন্ম নিচ্ছে নতুন সমাজতত্ত্ব, দর্শনতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ইতিহাসতত্ত্ব, শিল্পতত্ত্ব এবং সাহিত্যতত্ত্ব। পাশ্চাত্যের আধুনিকতা-অধুনান্তিকতা আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিণাম। এটি অসেতুসাধ্য মানসিক দ্বীপান্তরলোকের শিল্প নয়। ঐশ্বর্যময় জীবন, লাগামহীন ভোগবাসনা, বিপ্লব, বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পোস্টমর্ডানের জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর পরে সি. রাইট তাঁর বিখ্যাত দি সোসিওলজিক্যাল ইমাজিনেশন বইতে লেখেন : আধুনিকতা শেষ। অনন্ত পোস্টমর্ডানের সামনে উপস্থিত আমরা। পোস্টমর্ডানিজমের অন্যতম লক্ষণ জটিলতা এবং বহুমাত্রিকতা। যুগ এবং জীবনের অনিশ্চয়তা, জীবনদর্শনের বৈচিত্র্য, সমাজ-কাঠামোর বহুত্বের চোরাগলিতে এখন সমাজ দাঁড়িয়ে রয়েছে।  বহুরৈখিক জটিলতার সংক্রমণ আমাদের মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরায়। এই জটিলতা এবং বহুরৈখিকতা পাঠককে দিশা থেকে বিদিশার দিকে পৌঁছে দেয়। জন্ম নেয় পাঠক নির্ভর তত্ত্ব (জবধফবৎ ঙৎরবহঃবফ ঞযবড়ৎু)। পাঠকের জন্ম হয় লেখকের মৃত্যুর বিনিময়ে। পাঠকের পাঠ এবং পুনঃপাঠের মধ্য দিয়ে রচনা ভিন্ন মাত্রা পায়। নতুন নতুন অর্থ উদ্ভাসিত হয়। কারণ রচনার সার্থক বয়ান হল বহুমাত্রিকতা। পাঠকের নিবিড় পাঠের প্রিজমে তা নতুন থেকে নতুনতর অর্থের গ্যালাক্সি নির্মাণ করে।

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের পোস্টমর্ডান ভাবনার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রাচ্য বর্তমানে পশ্চিমায়নের আলোয় আলোকিত হতে চায়। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড হতে চায়। তাই প্রতীচ্যের পোস্টমর্ডান ভাবনার সাথে প্রাচ্যের পোস্টমর্ডান ভাবনাকে গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়। এটি সঙ্গত নয়। কারণ যদিও লুইস মর্গ্যান সমাজ ও সংস্কৃতির বিবর্তনের একটি সিঁড়ির কনসেপ্ট দিয়েছিলেন কিন্তু আদতে পৃথিবীর নানা দেশের নানা অংশের সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশ একটা নির্দিষ্ট নিয়ম-রীতি মেনে একই রকমভাবে সংঘটিত হয়নি। ফলে আমরা আমাদের পরিপ্রেক্ষিতেই পোস্টমর্ডান বিষয়টি পর্যালোচনা করবো।

অধুনান্তিক পৃথিবী, এই অতি বর্তমান সভ্যতা আমাদের বাধ্য করেছে অতীতকে পুরোপুরি ত্যাগ করতে। কারণ অতীত খরচ হয়ে যাওয়া সময়, বিগত। তবুও আমি নিজের তাগিদে শেকড়ের কাছে ফিরতে চাই। অধুনান্তিকতাকে দেখতে সময়ের মৃতদেহকে তুলে আনতে চাই। কারণ বর্তমানে যে পোস্টমর্ডান উপাদান নিয়ে সারা পশ্চিমা-দুনিয়ায় এত মাতামাতি চলছে তা বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে বীতশোক ভট্টাচার্য পর্যন্ত প্রবাহিত। বীতশোক ভট্টাচার্য পর্যন্ত সীমারেখা টানলাম কেননা তিনি আমার কালের উত্তর-আধুনিক কবি। অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে আমি বলতে চাইছি আমাদের আবহমানকালের কবিতাচর্চার ধারায় অধুনান্তিকতার অনায়াস যাতায়াত। প্রসঙ্গত একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন যে এই ধারার প্রত্যেক কবি এবং তাঁদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করার সুদীর্ঘ পরিসরের জন্য একটি প্রবন্ধ যথেষ্ট নয়। তাই আলোচনার ক্ষেত্র এখানে নির্বাচিত। পোস্টমর্ডান কালখ-ের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রাধাকে কেবলমাত্র  বিশ্লেষণ করতে চাই।

সভ্যতা মানুষকে কৌশলে পোষ মানিয়েছে। মানুষকে গৃহপালিত করেছে। মানুষ মানুষের  উপর নানা নিয়ম-কানুন চাপিয়ে দিয়েছে। মানুষ সমাজের অনেক বিধি-নিষেধ মেনে নিয়ে ব্যাকরণের ফাই-ফরমাস খেটে চলেছে সুপ্রাচীন কাল থেকে। ‘বিবাহ’ একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঘটনা— যা আপাদমস্তক এক গ-ীবদ্ধতাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। সেখানে গৃহপালিত হওয়ার মধ্যেই নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয়। নির্মিত হয় গৃহশান্তির ব্যাকরণ। স্বকীয়া ও পরকীয়া বিষয়টি এই বিবাহ-তত্ত্বের ভিত্তিতে নির্মিত। বিবাহিত নারী-পুরুষের মধ্যে যে প্রেম-ভালবাসার দাম্পত্য সম্পর্ক তাকে স্বকীয়া বলা হয়। বিবাহ-বহির্ভূত এই সম্পর্ককে বলা হয় পরকীয়া। বিবাহের অনুষঙ্গে নারীর ওপর বর্তিত হয়েছে সতীত্বের দায়ভার। নারীর সতীত্বকে মিথ করে সতী-সাবিত্রী থেকে বেহুলা নানা সময়ের অনেক গল্প পরিবেশিত হয়েছে, নারীকে অনুপ্রাণিত করার জন্য নির্মিত হয়েছে সতীত্বের মহা-আখ্যান। সতীর বিপরীতে অসতী। স্বকীয়ার বিপরীতে পরকীয়ার অবস্থান। অর্থাৎ পরকীয়া শব্দের অর্থ বিবাহিত নারীর পর-পুরুষে গমন, কিংবা বিবাহিত পুরুষের পরনারী আসক্তি। খুব সাদা চোখে দেখলে বোঝা যায় রাধা ও কৃষ্ণের পরস্পরের প্রতি যে প্রেম এবং আসক্তি তা পরকীয়ার সার্থক নিদর্শন। এই ব্যাপারটি মনস্তত্ত্বের ‘থিওরি অব পলিগ্যামি’র নিরিখেও বোধ করি বিশ্লেষ্য। রাধা এবং কৃষ্ণ উভয়ের পরিপ্রেক্ষিতেই এই বিশ্লেষণ সঙ্গত।

শৃঙ্গার রস বা মধুর রতির অর্থ নারী-পুরুষের পারস্পরিক যৌন-সংসর্গ। রাধাকে  নায়িকা বানিয়ে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে শৃঙ্গার রসে মাখো মাখো করে জয়দেব প্রথমে সকলের সামনে উপস্থাপিত করেন। জয়দেবের অনুসরণকেই বড়– চ-ীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য লেখেন। কাব্যের ভাষা ভিন্ন হওয়ার কারণে একই রসের দুরকম গন্ধ। জয়দেবের রাধার সাথে আবার বড়– চ-ীদাসের রাধার বিস্তর ফারাক। জয়দেবের গীতগোবিন্দে শৃঙ্গার রসে নিমজ্জিত রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্ক বিবাহের সাত পাকে বাঁধা। তাই জয়দেবের রাধা স্বকীয়া নায়িকা। অন্যদিকে বড়– চ-ীদাসের রাধা কৃষ্ণের পরকীয়া নায়িকা। অন্যদিকে বড়– চ-ীদাস যে রাধাকে সৃষ্টি করলেন সে পুরোপুরি গ্রাম্য বালিকা। সে সদ্য যৌবনে পা রেখেছে। যাকে দেখলে অবিবাহিত পুরুষ মুখে আঙুল ভরে সিটি মারে। যাকে দেখলে অনেক বিবাহিত পুরুষেরও হৃৎকম্প হয়।

পুরাণের সঙ্গে সঙ্গতি রাখার জন্যেই কাব্যের শুরুতে বড়– চ-ীদাস বলেছেন :

কাহ্নাঞিঁ সম্ভোগ কারণে। লক্ষ্মীকে বুলিল দেবগণে ॥

আল রাধা পৃথিবীতে কর অবতার। থির হউ সকর সংসার। আল রাধা ॥

স্বয়ং লক্ষ্মীদেবী কৃষ্ণরূপী নারায়ণকে সম্ভোগ দেয়ার জন্য ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু রাধা যেন পৃথিবীতে এসে সেই  কথা ভুলে গেছেন। তাই তিনি জানেন আইহন তাঁর স্বামী, কৃষ্ণ হল পর-পুরুষ। তাই কাব্যের মধ্যে আমরা যে রাধাকে দেখি সেই রাধার দুই অবস্থা, বলা ভালো দুই পর্যায়। যার একটি পর্যায়ে রাধা কৃষ্ণের প্রেমের প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করেছে। সতীত্বের গর্ব করেছে। বড়ায়ি প্ররোচনা দিলে রেগে গিয়ে তাকে চড় মেরেছে। কৃষ্ণকে বাপ তুলে গালাগালি দিয়েছে। কৃষ্ণের কাছে কাকুতি মিনতি করেছে। কৃষ্ণকে ধর্মের কথা বলে তাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। সমস্ত শক্তি দিয়ে রাধা এখানে একটি প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তুলতে চেয়েছে। নারী পুরুষের শক্তির কাছে সহজে আত্মসমর্পণ করবে না, সে বীরভোগ্যা; তাকে জয় করতে পুরুষকে অনেক সংগ্রাম করতে হবে। কোন পুরুষ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তাকে সম্ভোগ করতে পারবেনা— এটাই তো আধুনিক নারীর অধুনান্তিক ভাবনা। রাধা এখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যময়ী এবং আত্মসচেতন এক নারী। রেনেসাঁস যুক্তিবোধের কথা বলে, ব্যক্তির বন্ধনমুক্তির কথা বলে। বন্ধনমুক্তির ভাবনার অনুষঙ্গে জন্ম নেয় আত্মসচেতনতা এবং স্বাতন্ত্র্যবোধ। এরই সূত্রে তৈরী হয় বিচ্ছিন্নতাবোধ। অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন এবং নতুন উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে সামন্ততান্ত্রিক সমাজের বিলুপ্তি এবং ধনতান্ত্রিক সমাজের জন্ম হয়। শিল্পায়ন, টেকনোলজির উন্নতি যৌথপরিবার এবং যৌথসমাজকে ধ্বংস করেছে। মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে আত্মসচেতনতা, স্বাতন্ত্র্যময় ব্যক্তি ‘আমি’। টেকনোলজির নতুন আবর্তে তার সমাজ বিচ্যুতি ঘটেছে। নির্জন এক বধ্যভূমিতেই তার পথচলা। সেদিক থেকেও রাধা অধুনান্তিক। আবার রাধা সাহসী এবং চতুর। হাট থেকে ফেরার পথে কৃষ্ণের আশা মেটানোর অঙ্গীকার করে রাখা কৃষ্ণকে দিয়ে দই এবং ঘিয়ের পসরার ভারবহন করিয়ে নেয় :

না বোল না বোল কাহ্নাঞিঁ হেন রুখ বাণী।

আসিতেঁ পুরিবোঁ আশা তোর চক্রপাণী।

রাধা বড়াইয়ের মাধ্যমে কৌশলে কৃষ্ণকে দিয়ে তার মাথার ছাতা ধরার বন্দোবস্ত করেছে। যে বলেছে :

আপণ মাথার ছত্র ধরা মোর মাথে।

তবেঁ মো শৃঙ্গার বড়ায়ি দিবোঁ জগন্নাথে ॥

এইরকম বুদ্ধিমতী এবং স্পষ্টবাদী নারী মধ্যযুগের নারীর আর্কেটাইপ ভেঙে আধুনিক নারী হয়ে উঠেছে। যে পুরুষকে সুকৌশলে ব্যবহার করেই পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে। পুরুষকে তার মোহজালে নিষ্পেষিত করে তার আধিপত্য কায়েম করেছে। এখানেও তাই রাধাকে আমার অধুনান্তিক বলে মনে হয়।

সমাজবিকাশের সহজাত প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুশাসনের চেয়ে প্রকৃতির প্রভাব অতি মাত্রায় সক্রিয়। নর-নারীর যৌন স্বাধীনতাকে বিবাহ নামক বিধি এবং অনুশাসনের মাধ্যমে শৃঙ্খলিত করা হলেও তার স্বভাব কিংবা প্রকৃতিকে পরিবর্তন করা সম্ভব হয় নি। নর-নারীর বিবাহ বহির্ভূত প্রেম তাই একটি স্বাভাবিক এবং চিরন্তন বিষয়। বড়– চ-ীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের মধ্যে অন্য পর্যায়ে রাধা যে শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণের প্রেমে সাড়া দিতে বাধ্য হবে এটা একটি অনিবার্য ঘটনা। এ যেন এক আধুনিক কবির অধুনান্তিক রাধার নির্মাণ। আইহন নপুংসক। রাধার দীর্ঘকালের অতৃপ্ত কামনা বাসনা চরিতার্থ করার এমন মোক্ষম সুযোগ সে তাই কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারেনি। কারণ মন থেকে সে উপেক্ষা করতে চায় নি। সমাজের অনুশাসনের ফলে উপেক্ষার ভান করতে বাধ্য হয়েছিল। সমাজ অনুশাসনের এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট ধরা পড়ে যখন বনের মধ্যে রাধা কৃষ্ণের সাথে মিলিত হওয়ার পরে কৃষ্ণকে বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখার অনুরোধ করে। অনেক সমালোচক বলেন রাধা কৃষ্ণের জোর-জবরদস্তির ফলে নতিস্বীকার করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। আমি এই কথা বিশ্বাস করি না। জোর-জবরদস্তি মানে তো ধর্ষিত হওয়া। তাহলে যে বীর স্বামী এবং দজ্জাল শাশুড়ির কথা বলে রাধা কৃষ্ণকে ভয় দেখিয়েছিল এইরকম একটি জঘন্য কাজ করার পরে রাধার তো প্রতিশোধ স্পৃহা জন্মানোর কথা। অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে জ্বালা জুড়ানোর কথা। কই সেই রকম তো কোন প্রতিক্রিয়া রাধার মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় না। বরং গোপনীয়তার বিষয় এসেছে। কিন্তু কেন? রাধা কৃষ্ণকে অনুরোধ করে বলেছে :

অতিশয় না  চাপিহ আধর দাঁতে

সখি সব দেখিআঁ বুলিবে দন্তাঘাতে

নখঘাত না দিহ মোর পয়োভারে

আইহন দেখিলেঁ মোর নাহিঁক নিস্তারে ॥

এখানেই শেষ নয়। পরবর্তীকালে ছবিটা আরও বললে যায়। কৃষ্ণ মিলনের সুখকর স্মৃতি রাধাকে বেপরোয়া করে তোলে। কৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য সে উন্মাদ হয়ে ওঠে। ‘কালীয়দমন খ-ে’ রাধা সবার সামনেই কৃষ্ণকে ‘পরাণ পতী’ বলে সম্বোধন করেছে। কৃষ্ণকে ছাড়া জীবন অর্থহীন বলে মনে করেছে। রাধা বলেছে :

কে না বাঁশি বাএ বড়ায়ি কালিনী নইকুলে

কে না বাঁশি বাএ বড়ায়ি এ মাঠ গোকুলে ॥

আকুল শরীর মোর বেআকুল মন।

বাঁশীর শবদেঁ মো আউলাইলোঁ রন্ধন ॥

রাধা কৃষ্ণের জন্য এতোটাই পাগলিনী বিনোদনী হয়ে উঠেছে যে সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলতে কিংবা হাতের শাঁখা পর্যন্ত ভেঙে চুরমার করার কথা ভাবতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। এখানে রাধা এক সাহসী নারী। যুক্তিক্রমের বাইরে এক অনির্দেশ্যতা পোস্টমর্ডান পরিভাষায় যাকে ‘ওহফবঃবৎসরহধপু’ বলা হয় তারই প্রতিভূ এক অধুনান্তিক নারী। স্বকীয়া এবং পরকীয়ার দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে সে বাস্তবতাকে অকপটে স্বীকার করেছে এবং স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে। যে স্বাভাবিক ঘটনা সব দেশে, সব কালে ঘটছে এবং ঘটে চলেছে রাধা শেষ পর্যন্ত তারই প্রতিভূ হয়ে উঠেছে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের এই সম্পর্ককে একালের ত্রিকোণ প্রেম কিংবা ‘লিভ-টুগেদার’ সম্পর্কের নিরিখেও অনেকে পর্যালোচনা করতে পারেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও মনে রাখা প্রয়োজন রাধা কোন বিশেষ কালের কোন বিশেষ ইজমের খ-িত চেতনা নয়; বহুমাত্রিক, অখ- এবং শাশ্বত। কেননা মানুষের স্মৃতি থেকে আদিম স্বভাবকে মুছে ফেলা কখনোই সম্ভব নয়। আর রাধা-কৃষ্ণের প্রেম সেই বাস্তবতার একটি প্রতীক। বেঁচে থাকার জন্য উৎসাহ ও উদ্দীপনার নতুন উৎস খোঁজা, কিছুটা ইন্দ্রিয়াসক্তি এবং কিছুটা শরীর ও মনের অতৃপ্ত কামনা বাসনা চরিতার্থ করার জন্যেই পরকীয়া অবৈধ জেনেও মানুষ পরকীয়াতে মগ্ন হয়। এটি একটি মানসিক প্রক্রিয়া। আর এই প্রক্রিয়ায় রাধা এবং কৃষ্ণ দুজনেই অনাবিল শান্তি খুঁজে পেয়েছে। রাধা সমাজের দেখানো দিশা থেকে দিশাহীনতার দিকে কিংবা বহুদিশাময়তার এক অপার সম্ভাবনার মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করতে চেয়েছে।

***********************************

 

আমরা উত্তর-আধুনিক নই, আমরা উত্তর-ঔপনিবেশিক
দেবেশ রায়

ইয়োরোপীয় সা¤্রাজ্যশক্তিগুলি ও আমেরিকা তাঁদের ‘মডার্নিজম’ বা আধুনিকতার ধারণা সারা পৃথিবীতে সর্বজনীন করে তুলেছে। সেই ‘আধুনিকতা’ ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী যুক্ত। তাই তাঁদের কাছে ধনতন্ত্র ও সা¤্রাজ্যবিস্তার এই মডার্নিজম বা আধুনিকতার অংশ।

সারা পৃথিবীতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নতুন-নতুন দেশ স্বাধীন হচ্ছে ও নতুন-নতুন (আসলে প্রাচীন, পরাজিত জাতির ভাষা) ভাষা পৃথিবীর সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। তাদের এই জাগরণ ও কর্মদ্যোগ ও সৃষ্টিশীলতাকে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে পাশ্চাত্য ও আমেরিকা এই এক নতুন ধারণা চালু করেছে যে আমরাও আর ‘মডার্ন’ নেই, ‘মডার্নোত্তর’ হয়ে গেছি। আমরা পোস্টমডার্ন।

এই ধারণা প্রবর্তন ও প্রচারের প্রচীনতম উদ্দেশ্য প্রাক্তন উপনিবেশ ও আধুনিক স্বাধীন দেশগুলিকে সেই প্রতিষ্ঠিত ও বাতিল সা¤্রাজ্যবাদী ‘মডার্নিজম’ বা ‘আধুনিকতার’ ধারণা-বলয়ের মধ্যে আটকে দেয়া ও আটকে রাখা।

আমাদের সদ্যস্বাধীন দেশগুলির অনেক লেখক, নতুন পরিভাষার মোহে নিজেদের পোস্টমডার্ন বা উত্তর-আধুনিক বলতে গৌরব বোধ করি। পোস্টমডার্ন বা উত্তর-আধুনিকের কোন জ্ঞানতত্ত্বই নেই— যে জ্ঞানতত্ত্ব দিয়ে উত্তর-আধুনিককে নিশ্চিত ভাবে চিহ্নিত করা যায়।

আমাদের পরিচয় হওয়া উচিত উত্তর-ঔপনিবেশিক বা পোস্ট কলোনিয়াল। উপনিবেশ বিস্তারের প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত এই ঔপনিবেশিক অস্তিত্ব আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমার লেখা ‘বিপরীতের বাস্তব : রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প’ ও ‘উপন্যাসের বিবিধ সংকট’ বইদুটিতে এই উত্তর-ঔপনিবেশিক ধারণার ঐতিহাসিকতা ও জ্ঞানতত্ত্ব আমি খানিকটা ব্যাখ্যা করেছি। পাশ্চাত্যে ও আমেরিকায় এই উত্তর-ঔপনিবেশিক ধারণা একেবারেই গৃহীত হয় নি। তাঁরা মনে করেন— উপনিবেশ গঠন তো সা¤্রাজ্যবিস্তারের ইতিহাসেরই অংশ, তার কোনো আলাদা ইতিহাস হতে পারে না।

আমরা যদি আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে উত্তর-আধুনিকতার নিরিখে (যদিও তেমন কোনো নিরিখই নেই) বিচার, বিবেচনা করি, তা হলে আমরা আবার সেই আত্মপরিচয়হীনতার ঘূর্ণিতে তলিয়ে যাব, যেন, পাশ্চাত্যের তৈরি সাংস্কৃতিক বর্গীকরণের অধীনতা ছাড়া আমাদের কোনো মুক্তি নেই।

এর বিপরীতে আমরা যদি উত্তর-ঔপনিবেশিকতার নিরিখ তৈরি করে তুলি ও সেই নিরিখে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিচার বিবেচনা করি, তা হলে পাশ্চাত্যকেও সেই নিরিখ শিখতে হবে ও আমরাও আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির সা¤্রাজ্যবাদের প্রভাবমুক্ত এক নিজস্ব স্বাধীনক্ষেত্র আবিষ্কার করতে পারব।

বাংলাদেশের পক্ষে এ-কথা অনেক বেশি সত্য কারণ তাঁরা প্রথমত সা¤্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিকতা ও দ্বিতীয়ত অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতা দ্বারা পিষ্ট, অত্যাচারিত ও শোষিত হয়েছেন।

***********************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা