Chinno_35 Cover

ক্রো ড় প ত্র ২

উপন্যাসের শিল্প ও সমাজবাস্তবতা
সত্যেন্দ্রনাথ রায়

যদি কোনো মেয়ে ঘটনাচক্রে শিশুকাল থেকে ষোলো বছর বযস পর্যন্ত সমুদ্রতীরে বিজন অরণ্যে কাপালিক কর্তৃক পালিতা হয়, যদি আর কারো সঙ্গে তার সাক্ষাৎ না হয়, সমাজের কিছুই যদি সে না জানে, কেবল বন, সমুদ্রতীর, আর কাপালিক এই যদি সে জানে, তাহলে সে কেমন হয়ে গড়ে উঠবে? পরে যদি কেউ তাকে বিয়ে করেসমাজে নিয়ে আসে, তাহলে সমাজসংসর্গে তার কতটাপরিবর্তন হবে?— প্রশ্নটা বঙ্কিমচন্দ্রের। বঙ্কিমচন্দ্রের ছোট ভাই পূর্ণচন্দ্রের ‘বঙ্কিম-প্রসঙ্গ’ (পৃ.৭৩-৭৫) থেকে আমরা জেনেছি যে, ‘কপালকু-লা’ প্রকাশের দুই বছর আগে একদিন কাঁটালপাড়ার বৈঠকখানায় বন্ধু দীনবন্ধু মিত্র এবং দাদা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ কয়েকজনের সামনে বঙ্কিমচন্দ্র এই প্রশ্ন উত্থাপন করেন।প্রশ্নের উত্তরে সঞ্জীবচন্দ্র বলেছিলেন, সেই মেয়ে নির্জনতা, অরণ্যপ্রকৃতি আর কাপালিকের প্রভাবে সংসারে এসেও কিছুকাল একটা ঘোরের মধ্যে থাকবে।পরে সন্তানাদি হলে, স্বামীপুত্রের প্রতি ভালবাসা জন্মালে বাল্যের প্রভাব মুছে যাবে, ক্রমে সে সমাজেরই একজন হয়ে উঠবে।‘বঙ্কিম-প্রসঙ্গ’ থেকে আমরা এ-ও জেনেছি যে, এ উত্তর বঙ্কিমচন্দ্রের পছন্দ হয়নি। পছন্দ যে হয়নি তা আমরা ‘কপালকু-লা’ বইয়ের মধ্যেই দেখতে পাই। বুঝতে পারি, জীবন সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের বোধ একটু ভিন্ন রকমের।

‘কপালকু-লা’তে আমরা দেখতে পাই, বাল্য ও কৈশোরের ঘোর সে মেয়ে কখনোই পুরো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। পারবে না, কী অবস্থায় পারবে না এবং না পারলে তার পরিণতি কী হতে পারে, এই কল্পনাই ‘কপালকু-লা’র কাহিনীকে এবং তার শিল্পরূপকে নিয়ন্ত্রিত করেছে। লেখকের জীবনবোধ আর তাঁর কল্পনাশক্তি দুয়ের মিলিত ক্রিয়ায় ‘কপালকু-লা’-ও কাহিনী যা হবার হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সমাজবাস্তবতার ভূমিকা কতখানি? নেই তা নয়, লেখকের জীবনবোধের মধ্যে তার ক্রিয়া অবশ্যই আছে। কিন্তু, গোটা বইয়ে সমাজের জন্য স্থান খুব বেশি নেই।

সমাজ কথাটাকে যদি একটু গভীর অর্থে ধরি, তাহলে দেখব, বাল্যে বা কৈশোরেও কপালকু-লা মেয়েটি সম্পূর্ণ সমাজসম্পর্কশূন্য ছিল না। কাপালিক নিজেই তো এক-ধরনের বিশেষ সমাজের সৃষ্টি। তা ছাড়া অধিকারীর সঙ্গে কপালকু-লার পরিচয় ঘনিষ্ঠ। অধিকারীর কথায় জানতে পারি, কপালকু-লা ভক্তিমতী। এ কি সমাজহীনার লক্ষণ? কপালকু-লা কথা বলতে পারে, ভাষাহীনা নয়। ভাষা তো সমাজেরই দান। অন্যদিকে মানুষ যেমন ভাষাকে সৃষ্টি করে, ভাষাও তেমনি মানুষকে অনেকখানি তৈরি করে, এবং সে-ও পরোক্ষভাবে সমাজেরই তৈরি করা। কপালকু-লা যদি নেকড়ে-পালিতা মেয়ে হত তাহলে কি গম্ভীরনাদী বারিধিতটে দেবীমূর্তিও মতো আবির্ভূতা হয়ে নবকুমারকে বলতে পারত, ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’ কপালকু-লা যতটুকু সমাজপালিতা ততটুকুই মানবী, এবং তার নায়িকা হবার দাবিও ততটুকুই। বঙ্কিমচন্দ্র চেয়েছিলেন কপালকু-লাকে একটা বিশেষ ধরনের ছোট আকারের আধা-সমাজ থেকে সংগঠিত বড়-সমাজে এনে ফলাফলটা যাচাই করবেন। কিন্তু বইয়ের মধ্যে সংগঠিত সমাজকে তিনি সে সুযোগ দিলেন না। সমাজকে সংসারকে যদি বঙ্কিমচন্দ্র পুরো সুযোগ দিতেন তাহলে ‘কপালকু-লা’ বইখানিকে পুরোপুরি উপন্যাস বলতে আমাদের আটকাত না।

আমরা জানি, মানুষের মানুষকে দেখার, মানুষকে বোঝার, মানুষকে যাচাই করার চেষ্টার অন্ত নেই। এ কাজে দর্শন-বিজ্ঞান যেমন আছে, নৃ-বিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান-মনোবিজ্ঞান যেমন আছে, তেমনি আছে শিল্প-সাহিত্য। শুধু যদি কথাসাহিত্যেরই খোঁজ-করি, দেখব তারও ভিন্ন ভিন্ন শাখায় ভিন্ন ভিন্ন পথে মানুষের আত্মানুসন্ধান। রূপকথা মানুষকে খোঁজে মানুষের নিত্য-শৈশবে, তার স্বপ্নের মধ্যে। রোমান্স, যা কিনা বয়স্কেও রূপকথা, তা খোঁজে ইচ্ছাপূরণ-কল্পনার মধ্যে দিয়ে বাস্তবের একটি বাঞ্ছিত বিকল্পকে। আর উপন্যাস—নভেল অর্থে উপন্যাস— খোঁজে মানুষের বাস্তব জীবনকে। উপন্যাস অনুসরণ করে বিকল্প-জীবনের পরিকল্পনা। নিজের প্রশ্নটিকে উপলক্ষ করে যে-কাহিনী বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের শোনালেন তাকে কথাসাহিত্যের কোন গোত্রে ফেলা যাবে? ‘কপালকু-লা’ উপন্যাস, না রোমান্স?

‘কপালকু-লা’- তে বঙ্কিমচন্দ্র কপালকু-লার বিবাহপূর্ব জীবনের অরণ্য-পরিবেশ আর তার বিবাহ পরবর্তী জীবনের সমাজ-সংসারের পরিবেশ এই দুটিকে পাল্লার দু’ধারে বসিয়েছেন। এক ধারে বিজন বনভূমি, ঘোর নিঃসঙ্গতা, গভীর সমুদ্র, ভীষণদর্শন কাপালিক, নরকপাল, নরবলির খড়গ—অতি থমথমে পরিবেশ। ঘোর তো কপালকু-লার লাগবেই। কল্পনা করতে করতে বঙ্কিমচন্দ্রের নিজেরও কি একটু ঘোর লেগেছিল? বর্তমান আলোচনায় এ প্রশ্ন হয়তো একটু অসঙ্গত মনে হবে। কিন্তু যাঁরা বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনের তথ্য মোটামুটি জানেন, চাকরি-জীবনের প্রথম পর্বে বঙ্কিমচন্দ্রের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে অদৃষ্ট-অলৌকিক ইত্যাদির সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের গভীর কৌতূহলের কথা যাঁরা জানেন, তাঁদের মনে এই প্রশ্ন আসতেই পারে। সেই সঙ্গে এই তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নও আসতে পারে যে, বঙ্কিমচন্দ্রের সেই সময়কার জীবনদৃষ্টি কি খাঁটি উপন্যাসকারের জীবনদৃষ্টি? সে যা-ই হোক, কপালকু-লার বাল্য-পরিবেশের এই থমথমে দিকটাকে যথেষ্ট ভারী করেই বঙ্কিমচন্দ্র পাল্লায় চাপিয়েছেন। কিন্তু, পাল্লার অন্যদিকটা, সমাজসংসারের দিকটাকে বঙ্কিমচন্দ্র ভারী হবার সুযোগ দেননি। এমন রেখেছেন যাতে মেয়েটার সুপ্ত নারীপ্রকৃতি জেগে উঠে পুরানো সম্মোহনকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে না পারে, যাতে সংসারটা তার কাছে ছায়া-সংসারই থেকে যায়। যে উদাসীনতা, যে নির্বেদ নিয়ে মেয়েটা সংসারে ঢুকেছিল সেই ছেড়ে-দেওয়ার মন নিয়েই যেন সে কাহিনী থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।

যদি অন্য রকম হত? যদি মেয়েটার ছায়া-সংসার কায়া-সংসার হয়ে উঠত? পুরুষ-সংসর্গে ‘কপালকু-লা’ যদি ভাল ক’রে জেগে উঠত? যদি তার ছেলেমেয়ে থাকত? তাহলে তখন স্বামীপ্রেম, গৃহসুখ, ছেলেমেয়ের দায়দায়িত্ব, সংসারের টান সবাই মিলে ক্রমাগত কপালকু-লাকে উল্টো দিকে টানতে থাকত। এ রকম ঘটা যে অস্বাভাবিক ছিল তা নয়। বরং উঠতি-বয়সের মেয়ের ক্ষেত্রে এইটেই বেশি স্বাভাবিক। অন্তত একটা দোটানা তো কপালকু-লার মনে জন্মাবেই? বঙ্কিমচন্দ্র তার অবকাশ রাখেন নি। জীবনের বহুমাত্রিক জটিলতা এখানে বঙ্কিমচন্দ্রের বাঞ্ছিত নয়। তিনি চেয়েছেন একমাত্রিক পরিস্থিতি, সহজ সমাধান। সহজ সমাধান জীবনে কমই মেলে। তাই সহজ সমাধান উপন্যাসের জন্য নয়।

বঙ্কিমচন্দ্র যদি ‘কপালকু-লা’-তে সমাজ-বাস্তবতাকে যথেষ্ট সুযোগ দিতেন, যদি কাহিনীকে একমাত্রিক না রেখে তার মধ্যে জীবনের সমগ্রতার আভাস আনতেন, তাহলে ‘কপালকু-লা’-কে আমরা উপন্যাস বলতে পারতাম। ঠিক কথা, কিন্তু একে পুরোপুরি রোমান্স বলাও যাবে না। রোমান্সের মতো সুখকর পরিণতিও এখানে নেই। পরিবেশ এখানে যে গুরুত্ব পেয়েছে রোমান্সে তা কখনোই পায় না। ‘কপালকু-লা’য় রোমান্স আর উপন্যাসের মিশ্রণ ঘটেছে, এই কথা বলাই বোধ করি সঙ্গত হবে।

মানুষ সমাজে জন্মায়, সমাজে বড়ো হয়, পুরো না হোক তার বেশিটাই সমাজের সৃষ্টি। উপন্যাস যখন মানুষের ছবি, তখন অবধারিতভাবেই তা সমাজেরও ছবি। এ হল উপন্যাসের একদিকের সত্য। আবার এ-ও ঠিক যে, উপন্যাস, তখনই জন্মেছে যখন মানুষ ব্যক্তি হয়ে উঠেছে, তার আগে নয়। এখানে ব্যক্তি কথাটার একটা তাৎপর্য আছে। ব্যক্তি সবসময়ই আত্মসচেতন। ব্যক্তি-মানুষ নিজেকে অন্য সব-কিছুর বাইরে রেখে দেখে। সেই জন্যে ব্যক্তি মানুষের বুকের মধ্যে সব সময় একটা একাকিত্বের কুঠুরি থাকে। উপন্যাস যখন ব্যক্তি-মানুষের ছবি তখন সে মানুষের নিভৃত মনেরও ছবি, মানুষের একলা-মনেরও ছবি। উপন্যাসে মানুষের যৌথতা আর একাকিত্ব মিলেমিশে থাকে। যে-কোনো একটায় যদি ঘাটতি পড়ে, মানুষের আধ-খানা বাদ পড়ে। কিন্তু আসলে সবটাই মিথ্যে হয়ে যায়। কেবল যৌথতা থাকলে, ঘটনা থাকে, কিন্তু আত্মসচেতনতা থাকে না, তাই গভীরতাও থাকে না। আসলে ব্যক্তি থাকে না বলে তা উপন্যাসই হয় না। কেবল একাকিত্ব ভাষার অতীত, কেন না ভাষা জিনিসটাই সামাজিক। ভাষা থাকলে তার পেছনে সমাজও থাকবে। তখন একাকিত্ব থাকবে না।

জীবনে সমস্যা আছে, সংকট আছে, বহুমাত্রিক জটিলতা আছে, বাঁকে বাঁকে কঠিন দোটানাও আছে। গোটা মানুষকে দেখতে হলে এই সবের মধ্যেই দেখতে হবে। ‘কপালকু-লা’য় লেখক একটুও দোটানা রাখেননি, কিন্তু ‘বিষবৃক্ষ’-তে দোটানা আছে। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এও দোটানা আছে, আবর্ত আছে, রূপ থেকে মানুষের রূপান্তর আছে। উপন্যাসকার জীবনের চেহারাটা খতিয়ে দেখতে চান বলেই নিরুপায় নগেন্দ্রনাথের একদিকে ব্যক্তিত্বশালিনী সূর্যমুখীকে আর অন্যদিকে কোমল, স্বপ্ন-সম্মোহিতা কুন্দনন্দিনীকে নিয়ে রাখলেন। তারপর জীবনের লজিকে যা ঘটার তা ঘটুক। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এ উপন্যাসকারের বিশেষ কৌতূহল ফুটে উঠেছে শ্যামাঙ্গী অভিমানিনী ভ্রমর আর রূপসী লাস্যময়ী তৃষিতা রোহিণীকে ঘিরে, দোটানার মধ্যবর্তী গোবিন্দলালকে ঘিরে। কোন গোবিন্দলালকে আমরা প্রথমে জানতাম, আর কোন গোবিন্দলালকে আমরা পরে চিনলাম।এই রকমই সংকট ‘চোখের বালি’-তে প্রভাময়ী, বিধাবা বিনোদিনী আর বিহ্বলা আশাকে নিয়ে। ‘চোখের বালি’তে যেন টানের ঘূর্ণি—আশার প্রতি বিহারীর, বিহারীর প্রতি বিনোদিনীর, বিনোদিনীর প্রতি মহেন্দ্রের, মহেন্দ্রের প্রতি আশার, বলতে পারি প্রেমচক্র।

‘গোরা’ উপন্যাসে টান পড়েছে ঐতিহ্যভক্তি আর নারীপ্রেমে। শুধু তাই নয়, হিন্দুত্ব আর ভারতবর্ষের মধ্যে। এ সবই তো একা গোরার। সুচরিতার কোনো কঠিন দোটানা ছিল না। অতি মোক্ষম দোটানা গড়ে উঠতে পারত, যদি রবীন্দ্রনাথ প্রথমে যেমন ভেবেছিলেন, ‘গোরা’-ও সেই রকম পরিণতিই রাখতেন। তা অবশ্য শেষ পর্যন্ত রাখেননি। কিন্তু তার আগে, যে-সংকট প্রথমে রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পিত ছিল তার কথা বলি।

যদি গোরার সংসর্গে সুচরিতা সুপ্ত হিন্দুত্বের সংস্কার জেগে উঠে একটু একটু করে বাড়তে বাড়তে শেষকালে সুচরিতাকেই ছাপিয়ে যেত, সংস্কার যদি সুচরিতার কাছে তার প্রেমের থেকে বড়ো হয়ে উঠত? সুচরিতা যদি মনস্থির করতে না পারত, তাহলে কী হত? ‘গোরা’ উপন্যাসের পরিসমাপ্তির বিষয়ে বনফুলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যে আলোচনা হয়েছিল তা থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পরিকল্পনার কথাটা আমরা জানতে পারি (রবীন্দ্রস্মৃতি, পৃ.৭৩)। দৃশ্যটি গোরার জন্ম-পরিচয় আবিষ্কৃত হবার পর। সব শোনার পর সুচরিতা গোরার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। গোরা নীরব। সুচরিতা গোরাকে বলল, আপনি বলে দিন আমি কী করব। আপনি আমার গুরু। আপনি যা বলবেন, আমি তাই করব। গোরা নীরব রইল। গোরাকে নীরব দেখে সুচরিতা তাকে প্রণাম করে চলে গেল। —উপন্যাসের এই বিচ্ছেদান্ত পরিসমাপ্তিই নাকি প্রথমে রবীন্দ্রনাথের অভিপ্রেত ছিল। একই সূত্র থেকে আমরা আরো জেনেছি, এই রকম পরিণতি নাকি সিস্টার নিবেদিতার পছন্দ হয়নি। তিনি নাকি রবীন্দ্রনাথকে বলেছেন, জীবন নিষ্ঠুর হতে পারে, কিন্তু সাহিত্য কেন নিষ্ঠুর হবে? জীবনে গোরা সুচরিতার মিলন না হয় না হোক, উপন্যাসে যেন হয়। এরপর বিষয়টির পুনর্বিবেচনা ক’রে রবীন্দ্রনাথ ‘গোরা’ উপসংহার পাল্টে মিলনান্ত ক’রে দিয়েছেন।

নিবেদিতা নিশ্চয়ই খুশি হয়েছিলেন। তার মনে এখানে বিচ্ছেদান্ত পরিণতি বাস্তব হতে পারে, কিন্তু নিষ্ঠুর। তাহলে কি ব্যাপারটা এই রকম দাঁড়ায় না যে,পরিবর্তিত মিলনান্ত পরিণতি বাস্তব না হতে পারে, কিন্তু মধুর? এবং মধুর হওয়াটা সত্য হওয়ার থেকেও বড়ো? এইখানেই কথা। রবীন্দ্রনাথ যদি বাস্তববোধের দ্বারা চালিত না হয়ে আকাক্সিক্ষত মিলনান্ত পরিণতির টানে ‘গোরা’র উপসংহার পাল্টে থাকেন, বুঝতে হবে ‘গোরা’ খাঁটি উপন্যাস নয়, রোমান্স, অন্তত পরিসমাপ্তিতে রোমান্স। কিন্তু তেমন মনে করার কোনো কারণ দেখি না। বরং এইটেই বেশি সম্ভব যে, ভিতরে ভিতরে বাস্তববোধই রবীন্দ্রনাথের মনে প্রশ্ন তুলেছিল। সংস্কারের শক্তি অবশ্যই সত্য, কিন্তু সুচরিতার ভালবাসারও কি কোনো শক্তি নেই? যে সুচরিতাকে উপন্যাসে আমরা বার বার দেখেছি, সে দুর্বল চরিত্রের মেয়ে নয়, শান্ত হলেও তার একটা দৃঢ় নিজত্ব আছে। এই নিজত্বের কি কোনো দাবি নেই? এখানে সুচরিতার নারীপ্রকৃতির কি একটা জোরালো দাবি থাকতে পারে না? এই তো নারীর শক্তি প্রকাশের ক্ষেত্র। সুচরিতা কেন এই সংকট মুহূর্তে নীরব থাকবে? সমাধানের দায়িত্বকে সে কেন গোরার উপরে ঠেলে দেবে? সুচরিতা কি এইটুকু বোঝে না যে, স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় এ-সময়ে গোরার নীরব থাকাই স্বাভাবিক? সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব তো সুচরিতারই। এই সন্ধিলগ্নে কেন সে বাক্যহীনা থাকবে? অন্য কোনো ব্যক্তিত্বহীনা মেয়ে, সংস্কারান্ধ মেয়ে এ সময় চুপ করে থাকতে পারে, সুচরিতা পারে না। তা বাস্তব নয় বলেই পারে না। আমরা জানি সুচরিতার সংস্কারের মূল খুব গভীরে নয়। পরেশবাবুর সংসর্গে তার মন তৈরি। তার সংস্কার থাকবারই কথা নয়, এসেছে অবস্থাগতিকে, তা গোরা প্রতি তার প্রেমমুগ্ধতারই ছদ্মবেশ। প্রেমকে তা ছাড়িয়ে যেতে পারে না, প্রেমাস্পদকে তা শূন্যতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে চলে যেতে পারে না। যে-রবীন্দ্রনাথ ‘সতী’ লিখেছেন তিনি জানেন নারীর সত্য কোথায়। রবীন্দ্রনাথ পরে যা করেছেন, সেইটেই বাস্তবতা-সম্মত। এবং ঠিক সেই কারণে সেইটেই শিল্পসম্মত।

উনিশ শতকের বাঙালি সমাজে কতকগুলি প্রশ্ন, কিছু সমস্যা, কিছু আদর্শঘটিত তর্ক বাঙালির জীবনকে আলোড়িত করেছিল। তাদের ভিতর দিয়েই আমরা সেই সময়ের মানুষকে চিনতে পারি।

বাংলা উপন্যাসের প্রথম পর্বেই তারা নিজের জোরে উপন্যাসে স্থান করে নিয়েছে। উনিশ শতকে আমাদের সমাজ-পরিস্থিতি যে সব প্রশ্ন, সমস্যা বা চিন্তাভাবনার জন্ম দিয়েছে, ‘বিষবৃক্ষ’ বা ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’রচনার সময় সেইগুলিই বঙ্কিমচন্দ্রের চোখের সামনে ছিল। যেমন নারীব্যক্তিত্ব, প্রেমের আদর্শ, দাম্পত্যের আদর্শ, বিধবার পক্ষে প্রেমের অধিকার, বিধাববিবাহ ইত্যাদি। এ প্রত্যেকটিই সেদিন বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে জরুরি। বঙ্কিমচন্দ্র নতুন আদর্শেও বিশ্বাসী আবার ভারতীয় ঐতিহ্যের বিশ্বাসী, স্বাধীন প্রেমও চান আবার সমাজের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্যও ব্যাকুল। প্রশ্নগুলি সেদিনকার সমাজবাস্তবতারই অঙ্গ। উপন্যাসে এরা আসবেই। বিশেষ করে বিধবার প্রশ্ন। মনে রাখতে হবে, ‘বিষবৃক্ষ’ প্রকাশের সতেরো বছর আগে এবং ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ প্রকাশের বাইশ বছর আগে বিদ্যাসাগর এবং তার অনুগামীদের চেষ্টায় বিধাববিবাহ আইনসিদ্ধ হয়েছে (১৮৫৬)।

এই যে আইনের সাহায্যে সিদ্ধ হওয়া, এই ব্যাপারটি বঙ্কিমচন্দ্রের মোটেই মনঃপুত নয় তা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু আদৌ কি তিনি বিধবাবিবাহের সমর্থক?মনে হয় না। বিধবার প্রেম? সেদিনের নতুন আদর্শের হোতা হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের মনে প্রেমের স্থান অতি উচ্চে। প্রেম যখন, তখন অবশ্যই স্বাধীন। কিন্তু বিধবার ক্ষেত্রে? এইটেই বঙ্কিমচন্দ্রের সংকটস্থল। এই সংকটেই সেদিনকার সমাজ আর সেদিনকার মানুষের পরিচয়।

সংকটে উপন্যাসের আপত্তি নেই, বরং আগ্রহ আছে। সংকটের সমস্যার ধাক্কার মধ্যে দিয়েই উপন্যাসের কার্যকারণপরম্পরা প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। সে কার্যকারণে কোথাও অলৌকিকের জন্য বা ইচ্ছাপুরণের জন্য ফাঁক নেই। লৌকিক এবং নীরন্ধ্র কার্যকারণের সম্পর্কে এই রকম প্রত্যয়, এটা একান্তভাবেই আধুনিক কালের। এই জন্যই বলা হয়, উপন্যাস আধুনিক যুগের প্রতিনিধিস্থানীয় শিল্প।

রোমান্স সম্পর্কে একটা কথা এখানে বলে রাখা দরকার। রোমান্স হলেই যে অপরাধ হবে এমন বলি না। উপন্যাসের সঙ্গে অল্পস্বল্প রোমান্সের মিশ্রণ ঘটলেই যে সঙ্গে সঙ্গে মারাত্মক পতন ঘটবে, তা-ও বলি না। ইচ্ছা যেখানে নিয়তই প্রতিহত হচ্ছে, সেখানে দিবাস্বপ্ন কিছু থাকবেই, ইচ্ছাপূরণ কল্পনা থাকবেই। সাহিত্যের নানান শাখায় তার মিশ্রণ ঘটবে, কোথাও কম কোথাও বেশি, এ-ও স্বাভাবিক। মানতে আপত্তি নেই, রোমান্সের মিশ্রণ সত্ত্বেও ‘কপালকু-লা’ অসামান্য সৃষ্টি। এ প্রসঙ্গে শুধু একটা কথাই বলার আছে। তা হল এই যে, রোমান্স বেশি বেশি মিশলে তাকে আর উপন্যাস বলা যাবে না, অন্তত খাঁটি উপন্যাস বলা যাবে না। অবাধ স্বপ্নচারিতার সুখ হতে পারে, সত্যদর্শনের আনন্দ পাওয়া যাবে না। খাঁটি উপন্যাস সত্যান্বেষী।

উপন্যাসের সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। উপন্যাস সাহিত্য-সংসারে নতুন আগন্তুক, সে এখনো সৃজ্যমান। চলতে চলতে সে নানা রকম হয়ে উঠছে এবং উঠবে। বার বার সংজ্ঞা পাল্টাতে হবে। কবিতা প্রমুখ অন্যান্যের মতো উপন্যাস একটা শিল্প এবং মানুষের সৃজনশীলতার প্রকাশ। যেহেতু মানুষের সৃজনশীলতার কোনো সীমানা আমরা জানি না, তাই উপন্যাসেরও কোনো পাকা সীমানা দেগে দেওয়া যাবে না। তবে দেশে দেশে অনেক উপন্যাস লেখা হয়ে গিয়েছে এবং হয়ে চলেছে। এখন নানা রকমের উপন্যাসের মধ্য থেকে উপন্যাসের জন্য কাজ-চলা গোছের একটা পরিচয়-পত্র খাড়া করা হয়তো সম্ভব। বলা বাহুল্য, সে-ও পাকা দলিল হবে না। নতুন একটা বাঁকে এসেই দেখতে পাব, তাকেও পাল্টাবার দরকার  হয়েছে। পরিচয়-পত্র পাল্টালে দোষ হয় না।

উপন্যাস জীবনের রূপ, বিশেষ ক’রে একালের জীবনের। তার মধ্যে আমরা মানুষকে তার যথাসম্ভব সমগ্র চেহারায় দেখতে পাই। একটু অন্যভাবেও পরিচয় দেওয়া যায় : উপন্যাস হল সমাজ-মধ্যগত-মানুষের প্রতিকৃতি যে মানুষ একই সঙ্গে সমাজসচেতন এবং আত্মসচেতন। আর-একটু ভিন্নভাবে বললে বলা যায়, উপন্যাস কল্পনার সাহায্যে গড়া এমন একটি মায়া-জগৎ, যা বাস্তব-অভিজ্ঞতার সারাৎসার দিয়ে গড়া এবং যা মায়া হয়েও সত্য, সুগঠিত সত্য। এ রকম বললেও ভুল হবে না যে, উপন্যাস এমন এক মায়া-দর্পণ যার মধ্যে আমরা নিজেদেরই আসল চেহারা দেখতে পাই, এমন যা জীবনে কখনো দেখতে পাই না।

প্রশ্ন হতে পারে, শুধু একালের জীবন কেন, উপন্যাসে কি আমরা অতীতের জীবনকে, অতীতের মানুষদেরও দেখি না? ঐতিহাসিক উপন্যাস কি তাহলে উপন্যাস নয়? উপন্যাস অতীতেও যায়, কিন্তু বর্তমানকে মনে রেখেই অতীতে যায়। যেত না, যদি অতীতের সঙ্গে বর্তমান অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত না হত। আমরা জানি, উপন্যাসের লক্ষ্য নির্দিষ্ট দেশকালের সত্য, অর্থাৎ বাস্তব, ঘটেছে বলে বাস্তব নয়।

ইতিহাসের সত্য অতীতের সত্য, কিন্তু দেশকালে লগ্ন সত্য, অর্থাৎ বাস্তব সত্য। কল্পনায়-রূপ-নেওয়া নয়, তা ঘটে’ যাওয়া বাস্তব। ঐতিহাসিক উপন্যাস অবশ্যই উপন্যাস তার দেশকালটা নির্দিষ্ট। এবং অতীত, তাই সে উপন্যাস। ঝাপসা অতীত হলে বাস্তব হত না, কাল্পনিক না হলে আর্ট হত না।

সত্য আর বাস্তব খুব কাছাকাছি, খুব মেশামেশি, কিন্তু হুবহু এক নয়। সত্যের পরিধি অনেক বিস্তৃত, বাস্তব তার মধ্যে বিশেষ একটা এলাকা। বাস্তব মাত্রেই সত্য, কিন্তু সত্য মাত্রেই বাস্তব নয়। যে সত্য নির্দিষ্ট দেশকালে লগ্ন, কেবল তাকেই আমরা বাস্তব নামে আলাদা ক’রে চিহ্নিত করি। তার বাইরেও অনেক সত্য আছে, যেমন গণিতের সত্য, অথবা যেমন যে-কোনো সামান্য-বচন। ধর্মের সত্য, দর্শনের সত্য,মরমীয়া সাধকদের উপলব্ধির সত্য, এরা কোনো দেশকালে-গাঁথা সত্য নয়, তাই সত্য হলেও এরা বাস্তব নয়। উপন্যাস বাস্তব এই অর্থে যে, তার বিষয়টা বাস্তব। যে-সত্য দেশেকালে গাঁথা, উপন্যাস তার ছবি। তাকে বলতে পারি কাল্পনিক বাস্তব। যা ঘটতে পারে তার শিল্পসম্মত প্রতিকৃতি বলে তাকে ঈষৎ আলংকারিক অর্থে বাস্তব বলি। এই জন্য বাস্তব বলি যে, নিজের মধ্যে বাস্তবের মর্মসত্যকে রক্ষা করে। ফোটোগ্রাফ নয়, কল্পনায় ধরা-ছবি। এর সত্যতা গভীরতর।

সাহিত্যে অনেক সময় বাস্তব কথাটাকে খুব সংকীর্ণ অর্থে, খুব যান্ত্রিকভাবে ধরা হয়ে থাকে।সেই রকম সত্য-সর্বস্ব সাহিত্যকে গৌরব ক’রে বলা হয় বস্তুবাদী সাহিত্য। দৃষ্ট-সত্যের বাইরে তার কাছে সত্য নেই। এই গোত্রের উপন্যাসের লক্ষ্য বাস্তবের মর্মার্থ ততটা নয় যতটা বাস্তবের বাইরের চেহারা, বস্তুর খুঁটিনাটি তথ্যের পুঙ্খানুপঙ্খতা, বাস্তবের যদ্দৃষ্টং চিত্রণ। পাসপোর্টের ফোটোগ্রাফের মতো এ হল সচল বাস্তবের অচল নকল, বলতে পারি মাছি-মারা বাস্তব। এক সময় সাহিত্যে— বিশেষ ক’রে উপন্যাসে এই রকম আক্ষরিক বাস্তবের একটা হাওয়া এসছিল। সেই হাওয়াকে বলা হত ন্যাচারালিজমের হাওয়া। ন্যাচারালিজ্মের বক্তব্য এই যে মানুষ অবস্থার তৈরি, অবস্থার দাস। অবস্থার নিখুঁত বিবরণেই মানুষের যথার্থ পরিচয়।

উপন্যাস এখনো মোটামুটি বাস্তববাদীই আছে, কিন্তু ন্যাচারালিজ্মের সেই জোলার আমলের রবরবা আজ আর নেই। ন্যাচারালিজ্ম বা যান্ত্রিক বস্তুবাদ বিশেষভাবে টেকনিকের, পদ্ধতি প্রকরণের তথ্যলগ্নতা। এতে অনেক সময় ভিতরের বাস্তবতা হারিয়ে যায়। আসল কথা হল সারটিকে রক্ষা করা, পদ্ধতি যেমনই হোক না কেন। তা যিনি পারেন তিনি রিয়ালিস্ট, ন্যাচারালিস্ট হবার তাঁর কোনো দায় নেই। আসল কথা নির্দিষ্ট দেশের, নির্দিষ্ট কালের মর্মসত্যকে তুলে ধরা। তার জন্য, যদি দরকার হয়, উদ্ভটও আসতে পারে। যেমন এনেছেন কাফ্কা। যদি দরকার হয় মাঝে মাঝে উপন্যাসে রূপকথার ছোঁওয়াও লাগতে পারে। যেমন লাগিয়েছেন গার্সিয়া মার্কেজ তাঁর ‘ঙহব ঐঁহফৎবফ ণবধৎং ঙভ ঝড়ষরঃঁফব’ উপন্যাসে। আসল কথা সব সময় জীবনকে শক্ত হাতে ধরে থাকা। সুখে-দুঃখে মহত্ত্বে-নীচতায়, সুন্দরে-অসুন্দরে, মধুরে-ভয়ংকরে জীবনের অফুরন্ত রূপ। যাঁর কাছে সব রকম রূপই রূপ, তিনি রিয়ালিস্ট। যে-রকম রিয়ালিস্ট টলস্টয় কি ডস্টয়েভ্স্কি। যে-রকম রিয়ালিস্ট টোমাস মান বা সোলোকভ।

সাহিত্যে উপন্যাসে প্রবেশ ঘটেছিল একইদিকে যেমন রোমান্সের প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে, রোমান্সের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের মধ্যে দিয়ে, অন্য দিকে তেমনি সেই রোমান্সের হাত ধরেই রোমান্সকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েই। একটু একটু করে রোমান্সের গোলাপী গন্ধ-স্পর্শ বর্জন করতে করতেই উপন্যাস নিজের স্বতন্ত্র সত্তাকে অর্জন করেছে। উপন্যাসের রোমান্স-বর্জনের ইতিহাস, উপন্যাসের বাস্তবতা-অর্জনের ইতিহাস আর উপন্যাসের যথার্থভাবে আধুনিক হয়ে ওঠার ইতিহাস কার্যত একই ইতিহাস।

বাস্তবতার সূত্রে উপন্যাসের সঙ্গে ইতিহাস জীবনী ভ্রমণকথা দিনপঞ্জী সংবাদপত্র, এদের বেশ খানিকটা মিল আছে। তফাৎ এই যে এরা কেউই শিল্প নয়, কল্পনায় গড়া নয়। আবার অন্যদিকে উপন্যাস যখন কল্পনায় গড়া, তখন সব রকম কল্পনায় গড়া কাহিনীধর্মী রচনার সঙ্গেই তার মিল থাকবে। মিল থাকবে নাটক মহাকাব্য রোমান্স এদের সঙ্গে। তফাৎ এই যে এরা কেউ বাস্তবের  কাছে দায়বদ্ধ নয়, উপন্যাস বাস্তবের কাছে দায়বদ্ধ।

উপন্যাসের একদিকের সীমানা পেরুলেই পৌঁছব তথ্যের এলাকায়— সংবাদপত্র, জীবনী, ইতিহাস ইত্যাদির এলাকা। আর উপন্যাসের অন্যদিকের সীমানা পেরুলে রোমান্স, রূপকথা, কাব্য এদরে এলাকা। তথ্যের দিকে বেশি ঝুঁকলে ন্যাচারালিজম। আরো ঝুঁকলে সংবাদপত্র। কল্পনার দিকে বেশি ঝুঁকলে রোমান্স। আরো বেশি ঝুঁকলে দিবাস্বপ্ন।

বাস্তব হব, অথচ তথ্যবদ্ধ থাকব না, নিঃসন্দেহে এটা কঠিন কাজ। কাল্পনিক হব, অথচ বাস্তবও থাকব, এটা বোধকরি আরো কঠিন কাজ। সংবাদের টান বা তথ্যের টান আর উল্টোদিকে কল্পলোকের টান, দুই দিকের এই দুই টানই উপন্যাস এড়াতে পারে যোগ্যমতো আশ্রয় পেলে। সমাজ এবং সামাজিক সমস্যা, নানান সম্পর্কের বিচিত্র টানাটানি— সংযোগ-বিয়োগ, ছোটবড়ো সংকট ও সংগ্রাম, এরাই— এদের বাইরের দিকটা নয়, এদের গভীরের দিক, এই হল উপন্যাসের সেই আশ্রয়। এই গভীরেই আমরা সেই মানুষকে পাই, উপন্যাস যাকে খোঁজে, যে একই সঙ্গে ব্যক্তি-মানুষ এবং সামাজিক-মানুষ।

প্রথমদিকে উপন্যাসে বাস্তবতার তত্ত্বটা রবীন্দ্রনাথের খুব মনঃপূত ছিল না। উপন্যাসকে যে কাল-সচেতন হতে হবে, একালের উপন্যাসকে যে একালের চরিত্রধর্মই প্রকাশ করতে হবে এ রকম দাবিও রবীন্দ্রনাথের কাছে বহুদিন পর্যন্ত সঙ্গত মনে হয়নি। মতটা বদলেছে একেবারে পরিণত বয়সে। বাস্তব হয়ে ওঠে যে আধুনিক যুগকেই স্বীকৃতি দেওয়া, আধুনিক জীবনজিজ্ঞাসাকেই গুরুত্ব দেওয়া একথা পরে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের  ‘চোখের বালি’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯০৩ সালে। তখন নয়, তার দীর্ঘ সাইত্রিশ বছর পরে ‘চোখের বালি’-র রচনাবলী-সংস্করণের ‘সূচনা’ অংশে (১৯৪০) রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসের আধুনিক স্বভাবের কথাটা তুললেন। তুলে বললেন, “… এবারকার গল্প বানাতে হবে এ-যুগের কারখানা-ঘরে। শয়তানের হাতে বিষবৃক্ষের চাষ তখনও হত এখনও হয়, তবে কিনা তার ক্ষেত্র আলাদা, অন্তত গল্পের এলাকার মধ্যে। এখনকার ছবি খুব স্পষ্ট, সাজসজ্জায় অলংকারে তাকে আচ্ছন্ন করলে তাকে ঝাপসা করে দেওয়া হয়, তার আধুনিক স্বভাব হয় নষ্ট। তাই… নামতে হল মনের সংসারের সেই কারখানা-ঘরে যেখানে আগুনের জ¦লুনি হাতুড়ির পিটুনি থেকে দৃঢ় ধাতুর মূর্তি জেগে উঠতে থাকে। …সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনাপরম্পরার বিবরণ দেওয়া নয়, বিশ্লেষণ করে তাদের আঁতেরকথা বের করে দেখানো। সেই পদ্ধতিই দেখা দিল চোখের বলিতে।”

‘চোখের বালি’র উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ কথাটা বলেছেন বটে, কিন্তু নবপর্যায়ের নতুন পদ্ধতি ‘চোখের বালি’-তে খুব বেশি দূর এগোয়নি। পরের উপন্যাসগুলিতেও তা দেখি না। মনে হয়, যখন নিজের উপন্যাসগুলি রচনা করেছেন তখন উপন্যাসের ‘আধুনিক স্বভাব’ বা ‘সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতি’-র বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ খুব সচেতন ছিলেন না। আরো মনে হয়, পদ্ধতিটা রবীন্দ্রনাথের খুব স্বভাবসম্মতও নয়। ‘চোখের বালি’র সূচনাতে এই যে উপন্যাসে আধুনিকতার সমর্থন, এ সমর্থন ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথের নয়, এ হল সাহিত্যতাত্ত্বিক রবীন্দ্রনাথের পরিণত চিন্তার সমর্থন। সে যা-ই হোক, এখানে আমাদের প্রয়োজনীয় কথা হচ্ছে এই যে, পরবর্তী বাংলা উপন্যাসের প্রধান চেষ্টাই হল বাস্তব হবার এবং আধুনিক হবার চেষ্টা। তবে তার জন্যে যে একটাই মাত্র পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে এমন নয়।

‘গোরা’ উপন্যাসে ‘আগুনের জ্বলুনি হাতুঢ়ির পিটুনি’ নেই,বটে, কিন্তু তার বদলে আছে বহুস্তরান্বিত বিস্তার, আছে প্রখর সমাজসচেতনতা। ‘গোরা’ উপন্যাসটি যে-সময়ের ঘটনা হিসেবে কল্পিত হয়েছে, সেই সময়টি ‘গোরা’য় প্রত্যক্ষ চেহারা নিয়ে আমাদের সামনে দেখা দিয়েছে। সেই সময়ে এবং তার কিছু আগে পরে হিন্দু-ব্রাহ্ম ব্যাপারটা একটা জোরালো প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল। ‘গোরা’ প্রকাশের (১৯১০) সাঁইত্রিশ বছর আগে ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র পার্শ্বচরিত্র ব্রাহ্ম তারাচরণ আর অপ-নায়ক ব্রাহ্ম দেবেন্দ্রকে সামনে রেখে কিছু তির্যক মন্তব্য ছেড়েছিলেন, তেমনি ‘গোরা’ প্রকাশের আট বছর পরে ‘দত্তা’-তে এবং দশবছর পরে ‘গৃহদাহ’-তে শরৎচন্দ্রও কিছু তিক্ততার পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রশ্নটির সঠিক প্রেক্ষাপট ‘গোরা’ উপন্যাসে যেমন পাওয়া যাবে, আর কোথাও তা মিলবে না।

আরো বড়ো প্রশ্ন, বড়ো সংকট— এবং সেই সঙ্গে বড়ো উত্তরণ ‘গোরা’-তে পাওয়া যাবে। সে হল হিন্দু-রিভাইভ্যালিস্ট ভাবনা থেকে, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ভাবনা থেকে উদার ও মানবিক স্বদেশভাবনায় উত্তরণ। এ হল ঐতিহ্যের সার সত্যকে রক্ষা করেই ঐতিহ্যের বন্ধন থেকে এবং ঐতিহ্যের অহমিকা থেকে মুক্তি। এ হল অতীতের সম্মোহন কাটিয়ে বর্তমানের দিকে— এবং হয়তো ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ানো। যেদিকটি ‘গোরা’-র আরো তাৎপর্যপূর্ণ, যা বাংলা উপন্যাসে তখন একেবারে নতুন, তা হল বিস্তৃত ক্ষেত্রে সমাজকে দেখা। এইখানে আমারা পল্লীবাংলার একটা অতিবাস্তব ছবি দেখতে পাই। ইংরেজ শাসনের স্বরূপ, গ্রামের দরিদ্র জনসাধারণের অবস্থা, দেশের জনজীবনের সত্য চেহারা সবই এই উপন্যাসে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। আলাদাভাবে নয়, মূল কাহিনীর সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে। গোরা ও সুচরিতা প্রেম অর্থ পেয়েছে একদিকে যেমন দুজনের ব্যক্তিস্বভাবে, অন্যদিকে তেমনি সেদিনের উদ্বেলিত সমাজজীবনের মধ্যে স্থাপিত হয়ে। ‘গোরা’-র এই বিস্তার, এই সহজ গণমুখিতা বাংলা উপন্যাসে একটি নতুন আধুনিকতার দরজা খুলে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে না হলেও এবং আরো কিছু নতুন চেতনা আত্মস্থ করার পর, কিন্তু এই পথেই পেয়েছি মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’, তারাশঙ্করের ‘পঞ্চগ্রাম’ ইত্যাদি, সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোঁড়াইচরিত মানস’। মাঝখানে অবশ্য একটি ছোট পর্যায় পার হতে হয়েছে। সেই পর্যায়ের অস্ফুট সূচনা শরৎচন্দ্রে। পর্যায়ের বিশেষত্ব ফুটে উঠেছে কল্লোল-কালিকলমের কালে।

বলা দরকার যে, সব আধুনিকতারই গোড়ায় আছে জ্ঞানবিজ্ঞানের অগ্রগতি। বিজ্ঞানের ছোটবড়ো এক-একটা বিপ্লব সমাজজীবনকে পাল্টে দেয়। তখন ধ্যান-ধারণা পাল্টে যায়, জীবনদর্শন পাল্টে যায়, মানুষের ভিতরকার চেহারাও পাল্টে যায়। উপন্যাসে নতুন পর্যায়ের আধুনিকতা আসে এই বদলের সঙ্গে সঙ্গে এবং পেছনে পেছনে। একালে চিন্তাভাবনার বদলের ক্ষেত্রে যাঁদের দান আজ বিশেষভাবে স্মরণ করার মতো, তাঁদের একজন হলেন জীববিজ্ঞানী ডারুইন (১৮০৯), একজন হলেন সমাজবিজ্ঞানী এবং অর্থশাস্ত্রী মার্ক্স (১৮১৮), অন্য একজন হলেন মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড (১৮৫৬)। এই সূত্রে নৃবিজ্ঞানী ফ্রেজারের (১৮৫৪) নামও করা যেতে পারে। ডারুইন বলেছেন বিবর্তনের কথা। মার্ক্স বলেছেন ইতিহাসের পালাবদলের কথা, বিপ্লবের পথে ধনতন্ত্রের অবসানের কথা। ফ্রয়েড বলেছেন অবচেতন মনের অন্ধকারের কথা। আর ফ্লেজার বলেছেন পিতৃঘাতী সন্তানের কথা, সন্তানঘাতী পিতার কথা।

ডারুইন জানালেন, মানুষ অমৃতের সন্তান নয়, পশুর সন্তান। জানালেন, জীবজগতে বিবর্তনই সত্য, বিবর্তনের মূল নীতিগুলিই সর্বজীবের নিয়ন্তা। ঔপন্যাসিকের মনে সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন জাগল, আমাদের মৌল বানরত্ব কি আজো অটুট? এমন তো হতেই পারে যে, উপরকার একটা পাতলা আস্তরণকে আমরা মনুষ্যত্ব বলি, একটু আঁচড় লাগলেই ভিতরকার দগ্দগে পশুত্ব বেরিয়ে পড়বে। কেউ হয়তো তর্ক তুললেন, আদি উৎসটা বড়ো কথা নয়, মানুষ যেদিন থেকে মানুষ সেই দিন থেকেই তার পশুত্বের উত্তরণ ঘটে গিয়েছে। অমৃতত্ত্ব তার পিছনে নয়,সামনে। এই আশার আলোটুকু নিবিয়ে দিলেন ফ্রয়েড। জানালেন মনের চেতন স্তরটা অগভীর, গভীর এলাকা হল অবচেতন-এলাকা। সেখানে দুরন্ত পশুর বাস। কামনাই তার তন্নাত্র। সে-কামনা যৌন কামনা, রিরংসা। মানুষ রিরংসা-নিয়ন্ত্রিত। মানুষের জীবনে সবার উপরে সেক্সই সত্য,তাহার উপরে নাই। মার্ক্স জানালেন, বিশ্বে অলৌকিকতার স্থান নেই। মানুষ যেমন প্রয়োজন ও বুদ্ধি অনুযায়ী সমাজকে তৈরি করতে করতে চলে, সমাজও তেমনি নিজের মতো করে মানুষকে গড়ে। সমাজে আছে শ্রেণীতে শ্রেণীতে স্বার্থদ্বন্দ্ব, মানুষকে রূপ দেয় তার শ্রেণীগত অবস্থান। শ্রেণীদ্বন্দ্ব রূপ পায় বিপ্লবে। —সবার উপরে সেই বিপ্লবই সত্য। ফ্রেজারের বক্তব্য এঁদের মতো ব্যাপক এবং মৌলিক নয়, কিন্তু আদিম সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে পিতাপুত্রের যে মরণান্তিক দ্বন্দ্বর কথা ফ্রেজার আমাদের শোনালেন মানুষের অমৃতত্বের বিষয়ে মোহভঙ্গের পক্ষে তা যথেষ্ট।

এই সব তত্ত্বের প্রত্যেকটিকেই যে ঔপন্যাসিক গ্রহণ করবেন তা না-ও হতে পারে। কিন্তু, সব মিলে চিন্তাভাবনার জগতে যে বিপ্লব ঘটে গেল, তার ঢেউ ঔপন্যাসিকের উপর এসে পড়বেই।

এই বিপ্লব সমাজকে পুরো পাল্টে দেয়নি, চিন্তাভাবনার অনেক দিকেই হয়তো মৌলিক বদল ঘটতে পারে নি, কিন্তু যতটুকু পেরেছে উপন্যাসের পক্ষে তা কম নয়। এরই টানে এসেছে উপন্যাসের আধুনিকতা। এর ছাপ সব উপন্যাসে এক রকমভাবে পড়েনি। কোথাও তা ফুটে উঠেছে মানুষের নিহিত পশুত্বের স্বীকৃতিতে। কোথাও তা ফুটে উঠেছে রিরংসার অলজ্জিত প্রকাশে, তথাকথিক অশ্লীলতায়। আবার কোথাও তার ছাপ দেখতে পাচ্ছি সামাজিক সাম্যের দাবিতে, ধনী ও শোষণকারীর অত্যাচারের ছবির মধ্যে, শোষিত ও বঞ্চিতের প্রতি সহানুভতিতে এবং সাধারণভাবে জনজীবনের কাছাকাছি পৌঁছবার আকাক্সক্ষার মধ্যে।

বলা বাহুল্য, এই আধুনিকতা আগে এসেছে এবং বড়ো ক’রে এসেছে পাশ্চাত্য সাহিত্যে, বাংলা সাহিত্যে এসেছে পরে এবং ছোট স্কেলে। বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতায় প্রথম দিকে হয়তো পাশ্চাত্যের নকলই বেশি ছিল। কিন্তু সবটা নকল নয়। ভাবনাচিন্তা নকল থেকেই আসলে রূপান্তর পেতে পারে। তাছাড়া পরিবেশ-সাম্যও ধীরে ধীরে কাজ করেছে।

শরৎচন্দ্রে ফ্রয়েডীয় মতবাদের ছাপ নেই, অশ্লীলতার চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু আধুনিক মনের কিছু কিছু প্রশ্ন শরৎচন্দ্রের কোনো কোনো উপন্যাসে স্থান করে নিয়েছে। নারীর স্বাধীন প্রেমের স্বীকৃতি,নারীর অধিকারের স্বীকৃতি সেদিনের সমাজপতিদের চোখে শরৎচন্দ্রকে অশ্লীলের অধিক বলে প্রতিপন্ন করেছিল। শরৎচন্দ্রের মার্ক্সীয় মতবাদের ছাপ যৎসামান্য, কিন্তু বঞ্চিতের প্রতি সহানুভূতি শরৎচন্দ্রের স্বভাবসিদ্ধ এবং তাঁর জনসাধারণের দিকে ঝোঁকও সুস্পষ্ট। জীবনদর্শনের দিক থেকে শরৎচন্দ্রকে নতুন গোত্রের বলা যাবে না, তা বলা যাবে নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত ও জগদীশচন্দ্র গুপ্তকে। যৌনতার স্বীকৃতি দুজন উপন্যাসকারের রচনাতেই অকুণ্ঠ। নরেশচন্দ্রের জীবনদর্শনে মার্কস্বাদী চিন্তার ছাপ প্রত্যক্ষ। জগদীশচন্দ্রের দৃষ্টিতে মানুষ অন্ধ নিষ্ঠুর ভাগ্যের হাতের পুতুল। তাঁর জীবনদর্শনের অবস্থান রবীন্দ্রনাথের আনন্দবাদী জীবনদর্শনের বিপরীত কোটিতে। এই সব দিক  থেকে নরেশচন্দ্র এবং জগদীশচন্দ্র দুজনকেই রবীন্দ্রোত্তর ঔপন্যাসিক বলা যায়।

কিন্তু বহু-বিজ্ঞাপিত রবীন্দ্রোত্তর লেখক হলেন কল্লোল-কালিকলমের তরুণেরা। কাঁচা বা ডাঁসা যৌনতা নিয়ে,ভাবালু দারিদ্রবিলাস নিয়ে, বোহেমিয়ান ভঙ্গী এবং কাব্যিক উচ্ছ্বাস মিশিয়ে, উদ্ধত রবীন্দ্রবিরোধিতার শ্লোগান কণ্ঠে নিয়ে এই তরুণ লেখকরা বিশ দশকের গোড়ায় বাংলা সাহিত্যের আসরে এসে উপস্থিত হলেন। সেদিন এঁদের ব্যঙ্গ করে বলা হত অতি-আধুনিক। এঁদেরও দাবি ছিল বাস্তবতার। এঁদের দাবিতে শব্দ যতটা জোরালো ছিল, এঁদের কাজে শক্তি ততটা সংহত ছিল না। এঁদের ভূমিকা খানিকটা আধুনিকতার অগ্রগামী পল্টনের মতো। এঁদের মূল্য বুঝতে হবে সিদ্ধি দিয়ে ততটা নয়, যতটা প্রথম প্রয়াসের সাহস এবং উন্মাদনা দিয়ে।

সেদিনকার বেশির ভাগ বাঙালি পাঠকই এই তরুণদের প্রয়াসের তাৎপর্য বুঝতে পারেননি। বুঝতে পারেননি সমাজজীবনের হাওয়া কোন্ দিকে ঘুরে যাচ্ছে, বুঝতে পারেননি কোন্ হাওয়া সাহিত্যের পাল-তোলা নৌকোকে ভিন্ন খাতে ঠেলে নিয়ে চলেছে। অন্যের কথা দূরে থাক, রবীন্দ্রনাথও সেদিন তা বুঝতে পারেননি। ভেবেছেন এটা পশ্চিমের নকল। নকল যদি নাও হত, এটা সাহিত্যের চিরন্তন সত্য নয়। তাছাড়া এ হল সাহিত্যের এলাকায় বিজ্ঞানের অনধিকারপ্রবেশ। প্রবন্ধে এসব আপত্তি রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করেই ব্যক্ত করেছেন। কল্লোলের কালের অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বুদ্ধদেব বসু প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ তরুণেরা বিশেষ করে, প্রথম দিকে যে একটু বেশি রকম পশ্চিমাস্য ছিলেন, সে কথা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু পশ্চিম থেকে উঠেছে বলেই কি চিন্তার ঢেউ চিরকাল পশ্চিমেই আটকে থাকে? বড়ো অভিযোগ বিজ্ঞান নিয়ে, কেন না অভিযোগটা তত্ত্বগত। বিজ্ঞান সরাসারি সাহিত্যে ঢুকে পড়লে অবশ্যই তা অনধিকার-প্রবেশ। কিন্তু এখানে তা হয়নি। বিজ্ঞান পালটে দিয়েছে ধ্যান-ধারণাকে, জীবনদর্শনকে। জীবনদর্শনের প্রভাব এসে পড়েছে সাহিত্যে। সে তো পড়বেই।

রবীন্দ্রনাথ কল্লোলের কালের তরুণদের সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন সময়ে, কিন্তু একটু খুঁটিয়ে এবং তত্ত্বগতভাবে আলাদাভাবে দুটি প্রবন্ধ লিখে সমালোচনা করেছেন ১৯২৭ সালে। তের বছর পর ‘চোখের বালি’র ভূমিকা। এর মধ্যে মত বদলে গিয়েছে। আগে ‘বাস্তবতা’ আর ‘আধুনিকতা’ দুই-ই রবীন্দ্রনাথের কাছে নিন্দনীয় ছিল। এখন (১৯৪০) আর তা নয়। পরিষ্কার বলেছেন, আধুনিক কালের উপন্যাসে আধুনিক স্বভাব যেন থাকে। বলেছেন, একালের গল্প একালের কারখানা-ঘরেই বানাতে হবে। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে মায়ের ঈর্ষা আর মহেন্দ্রের কামনার প্রসঙ্গে বরেছেন, “যেন পশুশালার দরজা খুলে দেওয়া হল, বেরিয়ে পড়ল হিং¯্র ঘটনাগুলি অসংযত হয়ে।” অলংকার বাদ দিয়ে যদি দেখি, এ-কথার ইঙ্গিত স্পষ্ট। ঘটনাগুলি নয়, পশুশালা থেকে বেরিয়ে পড়েছে মানুষের ভিতরের চেহারা। ঘটনাগুলি নিজেরা হিং¯্রও নয়, অসংযতও নয়। অসংযত মানুষের বৃত্তি। পশুশালা মানুষের মন। এ রকম চেহারায় মানুষকে কল্পনা করা আগের রবীন্দ্রনাথের সম্ভব ছিল না। এখন রবীন্দ্রনাথের কাছে এটাই সব না হতে পারে, তবে এটাও মানুষের সত্য রূপ। শিবম্ কিনা, সুন্দরম্ কিনা, সেটা আপাতত অপ্রাসঙ্গিক। বড়ো কথা এই যে, এটা বাস্তব।

কল্লোলীয় বলে যাঁরা মার্কামারা তাঁদের অধিকাংশের উপন্যাসের বাস্তবতা অসংলগ্ন, ধোঁয়াটে ও গভীরতাবর্জিত। উপন্যাসে বাস্তবতা বা আধুনিকতা যা-ই বলি, তার ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে যাঁরা পথ-প্রদর্শক তাঁদের মধ্যে প্রথমেই মনে পড়বে মানিকের নাম। মানিকের কিছু উপন্যাস ঝুঁকেছে মনের রহস্যের দিকে, কিছু উপন্যাস ঝুঁকেছে সাধারণ মানুষের দিকে, গণচেতনার দিকে। তারাশঙ্করের নামও এই প্রসঙ্গে সকলেরই উল্লেখযোগ্য মনে হবে। প্রথমও মধ্য পর্বের কিছু উপন্যাসে তারাশঙ্কর যেন সমাজ-বদলের বৈজ্ঞানিক সূত্র সামনে রেখে উপন্যাস লিখে গিয়েছেন এবং তারই প্রেক্ষাপটে। মানুষের শ্রেণীস্বভাবকে ধরতে চেষ্টা করেছেন। আর একটি উল্লেখযোগ্য নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচলিত অর্থে তাঁকে আধুনিক বলা যাবে না। বিভূতিভূষণের গ্রামীণতা ও সরল প্রকৃতিপ্রেম তাঁর আধুনিকতাকে অনেকখানি আবৃত করে রেখেছে। বিভূতিভূষণ মনের দিক থেকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি, কিন্তু যাকে আমরা গণমুখী লেখক বলতে পারি, বিভূতিভূষণ একেবারেই সে গোত্রের লেখক নন। তাহলে তিনি কোন্ গোত্রের? আজকাল সকলেই আমরা অনুভব করি, ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক শাসন এবং বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষিত-সমাজ আর গ্রাম-সমাজ দুয়ের মধ্যে একটি বড়ো বিচ্ছেদ রচনা করে দিয়েছে। এই বিচ্ছেদ কাটাবার চেষ্টা এখনকার দিনের একটি মূল্যবান চেষ্টা। বিভূতিভূষণে এ-বিচ্ছেদ প্রায় না-থাকার মতো। তিনি যেন সেতুর মতো বিচ্ছেদের দুই পাড়কে এক সঙ্গে যুক্ত করে আছেন। যে সহজ মমতায় তিনি পল্লীজীবনের সব-কিছুকে দেখেছেন, বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা নেই। তাঁর উপন্যাসে বাস্তবতা এসেছে তাঁর এই সহজ মমতার পথ ধরে।

কিন্তু অতি-সরলতার জন্যই বিভূতিভূষণের উপন্যাসের বাস্তবতা খানিকটা সংকীর্ণ, খানিকটা যেন অর্ধচেতন। সে বাস্তবতা প্রশ্নাতীত, কিন্তু বহুমাত্রিক নয়, রোমান্সের মতো জটিলতাবর্জিত। বিভূতিভূষণের গ্রামজীবন ‘পদ্মানদীর মাঝি’র গ্রামজীবন নয়, তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলীবাঁকে’র গ্রামজীবন নয়, ‘ঢোঁড়াইচরিত মানস’-এর গ্রামজীবনও নয়। বিভূতিভূষণের যে অনায়াসসিদ্ধি আছে তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বা ‘ঢোঁড়াইচরিত মানস’-এর সিদ্ধি অনায়াসসিদ্ধি নয়। দুটি উপন্যাসেই সরল জীবনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বলা হয়েছে স্তরে স্তরে আলো-অন্ধকার ভেদ করে, এক্স-রে দৃষ্টি দিয়ে দেখতে দেখতে, যথাসম্ভব নির্মোহ মন নিয়ে। এর স্বাদ আলাদা।

পশুশালার খোলা দরজা দিয়ে এক পর্যায়ের আধুনিকতা এসেছিল বিশ শতকের প্রথমার্ধে, ভিন্ন এক পর্যায়ের আধুনিকতা এল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং তার পরে। মানুষের ধ্যান-ধারণায় অনুভূতিতে আবার একটা বদল লক্ষ করা গেল। দিনে দিনে উপন্যাসে তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। প্রথমে পাশ্চাত্য উপন্যাসে— জার্মানীতে ফরাসী দেশে। তার পরে অনেক কম পরিমাণে বাংলা সাহিত্যে।

চেহারাটা পরিষ্কার দেখলাম আমরা পাশ্চাত্য উপন্যাসেই। দেখলাম, উপন্যাস যেন আর আগের মতো উপন্যাসোচিত নেই। প্লট যেন প্লটের মতো নয়, নায়ক যেন নায়কোচিত নেই, চিন্তাচেষ্টা ভিন্ন রকমের। তাহলে কি জীবনই আর জীবনোচিত নেই?

ডি. এইচ. লরেন্স উপন্যাসকে বলেছেন, ‘ড়হব নৎরমযঃ নড়ড়শ ড়ভ ষরভব’। জীবনের বই কথাটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু ওই ব্রাইট কথাটাকে নিয়ে একটু প্রশ্ন থেকে যায়। ব্রাইট কে? জীবন, না বই? ধরে নিতে হবে, উপন্যাস যখন সত্যবাদী, তখন জীবন উজ্জ¦ল বলেই জীবনের বইও উজ্জ¦ল, অন্যথায় মিথ্যাচার হত, তা জীবনের বই হত না। কিন্তু জীবন যদি সত্যিই অনুজ্জ¦ল হয়, কালিমালিপ্ত কদর্য হয়, তাহলে তার বই কেমন হবে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে এবং যুদ্ধের পরে জীবনের যে চেহারা আমাদের কাছে ধরা পড়ল, মানুষের যে চেহারা আমাদের কাছে প্রকাশ পেল,এক নিয়ে উপন্যাসকার কী শিক্ষা গড়ে তুলবেন? যুদ্ধের সময় থেকেই এই রকম একটা প্রশ্ন লেখকদের সামনে এসে দাঁড়াল।

আগেও বলা হয়েছে, ঔপন্যাসিক জীবনের রূপকার, জীবনের বহু বিচিত্র রূপে তিনি মুগ্ধ। সাহিত্যে নীতিপ্রচারের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ‘সাহিত্যরূপ’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “বস্তুত তিনি রূপমুগ্ধ রূপদ্রষ্টা রূপ¯্রষ্টা রূপেই বিষবৃক্ষ লিখেছিলেন।” কথাটা একা বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কেই প্রযোজ্য নয়,সব মহৎ ঔপন্যাসিকই জীবনের রূপমুগ্ধ রূপদ্রষ্টা ও রূপ¯্রষ্টা। এর সঙ্গে শুধু যোগ করতে হবে যে তিনি সেই রূপের ভাষ্যকারও। কিন্তু আজ যদি সেই রূপ অতিশয় কুরূপ হয়ে দাঁড়ায়, বীভৎস হয়ে দাঁড়ায়? তখনো কি তিনি রূপমুগ্ধ, তখনো কি তিনি আনন্দিত ভাষ্যকার? রিয়ালিস্ট যিনি তিনি জানেন সব রূপই রূপ যদি সে সত্যের সনদ নিয়ে আসে। সত্য হলে যথার্থ রূপকারের কাছে কোনো রূপই বর্জনীয় নয় যদি সে রূপ শিল্পীর সহ্যশক্তির সীমাকে ছাড়িয়ে না যায়। মানুষের সহ্যশক্তি সীমাহীন নয়, জীবনের কদর্যতা যদি সীমাহীন হয়? তত্ত্বগতভাবে রিয়ালিস্ট হলেও অকম্পিতভাবে মুগ্ধচোখে নরকদর্শন কি সকলের পক্ষে সম্ভব? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এইটেই দাঁড়াল প্রশ্ন।

কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালের বা দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী কালের যে জীবন, সে-ও তো খুব সুদর্শন ছিল না, তখন তো উপন্যাসকার এ-রকম কোনো প্রশ্নের দ্বারা প্রতিহত হননি? উত্তরে বলতে হবে, তখনো সহ্যের সীমা ছাড়ায়নি। হয়তো সীমিত বীভৎসতার স্বাদ দুঃসহ নয়, হয়তো তার ঝাঁঝালো নেশা সেদিন উপন্যাসকারকে একটু টেনেও থাকবে। এখন যে-দ্রষ্টব্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা বীভৎসতা দিয়ে দর্শকের চোখ ঝলসে দিতে উদ্যত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোঝা গেল মানুষ শুধু পাশবিক নয়, দানবিক কিংবা আরো বেশি। আউস্ইভট্জ-বেলজেন প্রমুখ বন্দীশিবিরের ঘটনায়, হিরোসিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক নিধন-যজ্ঞে মানুষের যে-মূর্তি দেখা গেল তা দানবেরও কল্পনার অতীত। আবার বলি, এ-ও রূপ। কিন্তু এর মুখের দিকে তাকাবার হিম্মত সকলের থাকে না।

চিত্রশিল্পী পাউস ক্লে এক সময় বলেছিলেন, বাস্তব যখন শিল্পীর কাছে অসহনীয় হয়, তিনি তখন নির্বস্তুক বা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের দিকে ঝোঁকেন। খুবই হতে পারে, কিন্তু অনুরূপ ক্ষেত্রে উপন্যাসকার ঝুঁকবেন কোন দিকে। ধরে নিতে পারি, সকলে না হলেও বেশির ভাগ উপন্যাসকারই এরকম ক্ষেত্রে কোনো-না-কোনো উল্টো দিকেই ঝুঁকবেন, সোজা পথে যাবেন না। সোজা পথ অবশ্য একটাই— কঠিন।

সোজা পথ হল সোজাসুজি জীবনের দিকে তাকানো, যিনি পারেন তিনি পারবেন। বর্তমানের বীভৎসতাটা হয়তো একটা সাময়িক ব্যাধি। সাহসী সত্যান্বেষী হয়তো জানেন, ব্যাধি সত্য বটে কিন্তু শেষ সত্য নয়, অন্তঃসলিলা সুস্থতাও সত্য, আরোগ্যের প্রয়াসও সত্য। হয়তো তিনি জানেন, মানুষের আত্মসংশোধনের ক্ষমতা সীমাহীন, সমাজেরও আত্মসংশোধনের ক্ষমতা সীমাহীন। হয়তো এ-ও তিনি জানেন, যে-পথে তাঁকে যেতে হবে সেই সোজা পথ সমাজবিমুখতার পথ নয়, বাস্তববিমুখতারও পথ নয়,বরং আরো নিকটে যাওয়াটাই পথ। আপাতত আমাদের প্রশ্ন উপন্যাসের সোজা পথ নিয়ে নয়, উল্টো পথ নিয়ে। কঠিন পথকে নিয়ে নয়, সহজ প্রতিক্রিয়াকে নিয়ে।

বর্তমানের বীভৎস রূপ, কী সমাজে, কী মানুষে, তা যে উপন্যাসের বাধা তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যেটা বেশি বিপদের তা হল উপন্যাসের পণ্যদ্রব্যে পরিণত হওয়া। বাজার আজ জলে স্থলেঅন্তরীক্ষে, উপন্যাসের বড়ো বিপদ চাহিদার জালে জড়িয়ে পড়া। উপন্যাস আজ ক্রেতার মুখাপেক্ষী, প্রচারযন্ত্রের মুখাপেক্ষী। তার চেষ্টা আজ ক্রেতামনোরঞ্জনক হবার। সে আজ ধনতন্ত্রের শিকার। ধনতন্ত্রের স্বভাব, সে যাকে ছোঁবে তাকেই পণ্য হতে হবে। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার এলাকার মধ্যে কে আজ পণ্য নয়, কী আজ পণ্য নয়? যেকানে প্রেম পণ্য, ¯েœহ-প্রীতি-মমতা পণ্য, হৃদয়-মন-বুদ্ধি পণ্য, যেখানে প্রতিভা পণ্য, মনুষ্যত্ব পণ্য, সেখানে উপন্যাস কেমন করে এই ভয়ংকর টানের বাইরে থাকবে?

সোজা পথ যেমন একটাই, উপন্যাসের উল্টো পথ কিন্তু অনেক। তার মধ্যে প্রশস্ততম হল পাঠক-মনোরঞ্জনের পথ। সে পথও একটা নয়। একটা পথ হল, কাহিনীর মধ্যে দিয়ে বহু পাঠকের ইচ্ছাপূরণ, অর্থাৎ ছদ্মবেশী রোমান্স হয়ে ওঠা। পাঠকের ইচ্ছার টানেই আসে গল্পরসে ভরপুর চিত্তচমৎকারী ঘটনার রুদ্ধশ্বাস ঘোড়দৌড়। অথবা সেক্সে-হিং¯্রতায়-ক্রাইমে-আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা-স্পাই মিলিয়ে অন্যের বকলমে উত্তেজনালাভের ব্যবস্থা। অথবা পণ্যের নিয়মেই চরম ধরে নিয়ে অমানবিক ডি-হিউম্যানাইজ্ড মানুষের, অসাড়চিত্ত মানুষের মানবিক বৃত্তির পক্ষাঘাতকে চিত্রিত করা। খানিকটা এই ধারাতেই এসেছে ভগ্নজানু নায়ক, ভাঁড়া-নায়ক,অ্যান্টি-হিরো। এসেছে যাকে বলা যায় অনুপন্যাস, অ্যান্টি-নভেল।

বিরূপ সমাজে শিল্পীরা একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হল বাইরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজের দিকে, একেবারে ভিতরের দিকে চলে যাওয়া, বেশি রকম অন্তর্মুখী হয়ে ওঠা। মানুষের সমগ্রতাকে যিনি দেখতে চান, এ-পথ তাঁর জন্যে নয়। ব্যক্তি আর সমাজের জোড়বন্ধন খুলে গেলে ব্যক্তির যা বাকি থাকে তা অতি শীর্ণ একটি জ্যামিতিক সত্তা। রক্ত মাংস মেদ মজ্জা আসে বিধি সম্পর্কের সঙ্গে সঙ্গে। একান্ত নিঃসঙ্গতার পথ, চূড়ান্ত একাকিত্বের পথ সাধকের পথ হতেপারে, আধ্যাত্মিক উপলব্ধির পথ হতে পারে, এমন কি কবিতার পথও হতে পারে, উপন্যাসের পথ নয়। নিঃসঙ্গতায় মগ্ন হলে তার শেষ নীরবতায়।

হালের উপন্যাসে এই যে এতগুলি রূপ, বিশেষ করে পাশ্চাত্য দেশে, এর সবই কিন্তু আজকের দিনের বিশেষ ধরনের আধুনিকতার প্রকাশ। এদের কোনো সত্যতা নেই তা বলি না, কিন্তু সেই সত্যতার সীমাও আছে। প্রশ্ন হল, আজকের দিনে এই বিশেষ আধুনিকতাটাই কি অনিবার্য এবং সর্বজনীন? এ আধুনিকতা একান্তভাবেই বণিকতন্ত্রের আধুনিকতা। একেই আধুনিকতার শেষ-সত্য বলা যেত, যদি আর কোনো আধুনিকতাকে আমরা কল্পনা করতে না পারতাম। উপন্যাসের সবগুলো ধারাই তো এখনো ঘোলো-আনা চাহিদা মুখাপেক্ষী নয়। উপন্যাসের সব ধারাই আজ সমাজবিমুখ নয়, সব ধারার উপন্যাসেরই নায়ক মানসিক পক্ষাঘাতের শিকার নয়। উপন্যাসের পুরানো ধারা, যাকে বলতে পারি ক্লাসিক ধারা, তা এখানো বাতিল হয়নি। ধনতন্ত্রই যে একমাত্র তন্ত্র, ধনতান্ত্রিক আধুনিকতাই যে একমাত্র আধুনিকতা, অন্যতর আধুনিকতা যে একেবারেই সম্ভব নয়, এ কথা বলার যুক্তি নেই। বিকল্প তন্ত্র যেমন সম্ভব, বিকল্প আধুনিকতাও তেমনি সম্ভব।

হয়তো একথা এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বাংলা উপন্যাসে হালের আধুনিকতা এখনো নানা ধারায় নিজেকে বিস্তৃত করতে পারেনি। যেটুকু পেরেছে, তার পরিমাণও কম, শক্তিও কম। ধারা নয়, এখন যা দেখি তা পূর্বাভাস মাত্র। সমরেশবসুর ‘বিবর’-এর কথা তোলা যায়। শক্তিশালী বলেই ‘বিবর’-এর কথা বেশি করে মনে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ‘বিবর’-এ সমাজবাস্তব অস্বীকৃত নয়। তবে নায়কে আধুনিক অসাড়তার ছাপ স্পষ্ট। ‘বিবর’ সমরেশেরই ‘টানা-পোড়েন’-এর উল্টো গোত্রের উপন্যাস। যদি আভাসকে হিসেবে ধরি তাহলে বলতে পারি,বাংলা উপন্যাসের একটা ধারায় সতীনাথের ‘ঢোঁড়াইচরিত মানস’, আর-একটা ধারায় সমরেশের ‘বিবর’। ‘বিবর’ সেই ধারার অভিমুখী যে ধারায় কাম্যু-র ‘ঙঁঃংরফবৎ’। এই অসাড়তা, উদ্ভটতা অন্তর্মুখিতার পথে আরো অনেকটা এগিয়ে গেলে সাক্ষাৎ পাব বেকেটের উপন্যাসের। আরো এগিয়ে ফরাসী নব্য-উপন্যাস, নুভো রমাঁ, যাকে বলা হয়েছে অনুপন্যাস, অ্যান্টি-নভেল। উপন্যাসের জগতে এরা এখানো ব্রাত্য। বাজার গরম করে রেখেছে এরা নয়, যারা বহু-সমাদৃত পণ্য। যেমন বর্ণচোরা রোমান্স, বহু-উত্তেজনার চাহিদা মেটাবার উপযোগী ঢাউস কাহিনী। ‘বিবর’ বা ‘ঙঁঃংরফবৎ’ এদের আত্মীয় নয়, শুধু সহযাত্রী।

এই সব গোত্রের উপন্যাসই যদি একচ্ছত্র হয়ে ওঠে? অন্তত ব্যতিক্রমস্থানীয় না হয়ে যদি স্বীকৃত ধারা হয়ে ওঠে? উঠতেই পারে। তা যদি ওঠে তাহলে উপন্যাসের যে পরিচয়-পত্র সঙ্গে নিয়ে আমরা এই আলোচনা শুরু করেছিলাম, সেই পরিচয়-পত্রকে একটু পালটে নিতে হবে।

[সূত্র : দেশ, ২১ মাঘ ১৩৯৫ ॥ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ ॥ ৫৬ বর্ষ ॥ ১৪ সংখ্যা]

*************************************

নুভো রোমাঁ ও অ্যালা রব গ্রীয়ে

নুভ্রো রোমাঁ বা নব উপন্যাস অভিধা ফরাসি সাহিত্যের মধ্য পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের শুরুর এক সাহিত্য আন্দোলনকে তুলে ধরে, যা প্রশ্ন চকিত করেছিল সনাতনী সাহিত্যিক বাস্তববাদকে। এই উপপ্লবকে সমৃদ্ধ করেছিলেন অ্যালা-রবগ্রীয়ে, মিশেল ব্যুতর ক্লদ সিমঁ এবং নাতালি সারোৎ প্রমুখ। কেউ কেউ এই আঙ্গিকগত নিরীক্ষাকে আধুনিকতা ও উত্তর আধুনিকতার মধ্যবর্তী সরণীতে স্থাপন করতে চান, এমনকি যে ক’জন বুদ্ধিজীবী উত্তর আধুনিকতার ধারণাকে পুষ্ট করেছেন। তাদের তালিকাভুক্ত হয়েছেন অ্যালা রবগ্রীয়ে, নব উপন্যাসের অন্যতম পথিকৃৎ উপন্যাস রচনায় ও উপন্যাস বিষয়ক সন্দর্ভ উপস্থাপনে। নুভো রোমাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল ফরাসি উপন্যাস দিয়ে-বারজাকসূলভ বাস্তবতাকে প্রত্যাখান করে। আমাদের আলোচনা যে রবগ্রীয়েকে কেন্দ্র করে নুভো রোমাঁর বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করবে তাতে লক্ষণীয় এই আঙ্গিক এক ধরনের আবেশসঞ্চায়ী বস্তুনিষ্ঠতার সন্ধানে রত এবং তা অন্যতর রকমের বাস্তবাদকেই প্রতিষ্ঠা করে।

এই গোষ্ঠী কোনো সম্মিলিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনি। এদের চারজনের স্বতন্ত্রভাবে গ্রহণ করা সিদ্ধান্ত ও অতিক্রম করা পথরেখা এমন একটা নতুন নীতির উপহার দিয়েছে যাকে নুভো রোমাঁ বা নব উপন্যাস বলে চিহ্নিত করা হয়। এই গোষ্ঠীর আবির্ভাব আচমকা নয়, এদের পূর্ব প্রস্তুতির সূত্র ধরিয়ে দিয়েছেন ফরাসি সাহিত্যবিদ অরুণ মিত্র। প্রথা ভাঙার ক্ষেত্রে এদের পূর্বসূরী হিসেবে অতিক্রমণের ছক এভাবে তৈরি করেন তিনি।

রেয়ালিসম’ ও নাত্যুরালিসম্’ এর পর প্রথাগত উপন্যাসরীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা এই শতাব্দীর গোড়া থেকে পরপর অনেক ঔপন্যাসিকই তুলেছেন। মার্শেল প্রুস্ত এর বিরাট উদাহরণ তো উজ্জ্বল হয়ে আছে। পদ্ধতি প্রকরণে আদ্রেঁ ঝিদও খানিকটা আছেন। গত মহাযুদ্ধের  সময় ঝাঁ-পল সার্ত্র উপন্যাসে ধরাবাঁধা তথাকথিত বাস্তবতার বিরুদ্ধে প্রবল আঘাতহানেন। তাদের সকলের হাতেই বরাবরকার উপন্যাসরীতির অদল-বদল হয়। আসলে বাস্তবতার ধারণা সম্পর্কেই যত বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ। …এর আগে এবং কতকটা এর পাশাপাশি নুই ফেরদিনাঁ সেলিন, ঝর্ঝ বাতাই, ঝাঁ ফলআ, আঁরি, মিশো, ফ্রাঁন্সি, ও পঝঁ, রেমঁ ক্যনো প্রভৃতি কবি ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিকেরা ভাষা বস্তুটাকে মানুষ ও পৃথিবীর সঙ্গে  সম্পর্কিত করে অনুসন্ধান চালান।

এই ধারাবাহিকতায় প্রচলিত ছাঁচ ভেঙ্গে এগোতে চান রোরিস ভিয়াঁ (১৯২০-৫৯) ঝুলিয়্যা গ্রাক (১৯১০), আঁদ্রে পিয়ের দ্য মাদিয়ারগ্, ঝাঁ কেরল (১৯১০) প্রমুখ। রোসিস ভিয়াঁর গ্রন্থগুলো হচ্ছে : L’Ecume des Jours (1947, L’ Automne a’ Pekin (1947), L’ Herbe rouge (1950) I L’ Arrache Coeur এগুলোর বিশিষ্টতা হচ্ছে : প্রথমেই আশ্চর্য করে দেয় শব্দের ভোজভাজি ও দৃশ্যপরিকল্পনার অভিনবত্ব। … তিনি এমন এক জগতে আমাদের নিয়ে যান যেখানে বস্তু ও জীবজন্তুরা অদ্ভুতভাবে থাকে, কথা বলে ব্যবহার করে, যেখানে নিষ্ঠুরতা ও অপরূপতার বসবাস একসঙ্গে। গ্রামও উপন্যাসের প্রথাগত কাহিনি গঠন ও চরিত্র নির্মাণ প্রত্যাখান করেন। তার রচনায় ‘যে স্থান ও আবহাওয়ার অবতারণা করেন তা কাহিনি বিবৃতি করার পটভূমি হিসেবে আসে না, তা যেন কাহিনি সৃষ্টি করে। কোনো ঘটনার লক্ষণ সেখানে দেখা যে, যা মনেহতে পারে অন্তিম পর্ব অথবা এক পুনরাম্ভ।’ তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হচ্ছে Au chateau d’ Arrgol (1938), Un Beau Tenebreux (1945), Le Rivage des Syrtes (1951); guw`qviM Gi iPbvq Le Musee noir (1966), Soleil des lopus (1951), Feu de Braise (1959) এরকই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে রক্তমাংসের স্পর্শ জুটেছে। ঝাঁ কেরল নিজের রচনা পদ্ধতি নিজেই বিশ্লেষণ করেছেন।

লাজারী উপন্যাসে গল্প বা আচরণের কোনো উৎস থাকে না। এরকম উপন্যাসের নায়ক সর্বদা অবিশ্রান্ত খাড়া থাকে, কোনো এক প্যাশনের উৎসারে তার বাঁচার ক্রিয়া, কিন্তু সে প্যাশনের অগ্রগতি ছন্দ সে অনুসরণ করে না, তার ভাবনা-পরিকল্পনা নেই, ধাক্কা খেয়ে গিয়ে পড়ে সে বিবিধ কা-ের মধ্যে, বাস্তবের একরকম বিকৃতির মধ্যে। নায়ক চায় না কেউ তার কথার উত্তর দিক, প্রশ্নই তার পক্ষে যথেষ্ট, তার জিজ্ঞাসাকে সে ত্রিশঙ্কু রাখতে ইচ্ছুক।

তিনি দেহে ও মনে পঙ্গু মানুষ ল্যাজারাসের কথায় বর্ণনা করেন Je vivrai L’ amour des autres (1947) Le vent de Memorie (1952) L’ Escapaee d’une Nuit (1954). প্রভৃতি উপন্যাসে।

এসব ঔপন্যাসিকেরা সচেতনভাবেই এ-বদল আনতে চেয়েছেন। তবে তারা যে ছাঁচকে ভাঙতে চেয়েছেন তাকে অধ্যাপক ঝাক ল্যাকরম্ এভাবে বর্ণনা করেছেন।

১.            ভাষা ও বাক্যার্থ বুঝতে অসুবিধা হবে না অর্থাৎ দর্শন ও বিজ্ঞান পড়তে গেলে যেমন মাথা ঘামাতে হয় সেরকম মাথা ঘামাতে হবে, সহজভাবে পড়ে নেওয়া যাবে;

২.           একটা ক্রমাগ্রসর কাহিনি থাকবে, ঘটনার ঘনঘটা যদি নাও থাকে ঘটনাচক্র কিছু থাকবে।

৩.           কিছু চরিত্র থাকবে যাদের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় হবে এবং যাদের আচরণ ও কথাবার্তার মধ্য দিয়ে মনের যে চেহারা ফুটে উঠবে তার সঙ্গে পাঠকের কোনো না কোনো আবেগের সংযোগ হবে অর্থাৎ বিস্ময়, শ্রদ্ধা, ঘৃণা, সহানুভূতি, বিরুদ্ধতা, আত্মীয়তাবোধ ইত্যাদি সৃষ্টি হবে।

৪.           কাহিনির মধ্যে যদি কখনও লেখক মুখ বাড়ান, তাহলে তা কাহিনিকে বানচাল না করে বরং আরো জোরদার করবে।

বহু শতাব্দীর প্রাচীন উপন্যাসের ধারায় বৈচিত্র্যের মধ্যেও এসব সাধারণ লক্ষণ নতুন ধারা ঔপন্যাসিকদের কাছে ‘প্রথাগত’ বলে চিহ্নিত হয়েছে। অরুণ মিত্র নুভো রোমাঁ বা নব উপন্যাসের পূর্বগামীদের মধ্যে এমন লক্ষণ সনাক্ত করেছেন। ‘কাহিনি, চরিত্র ও কালপর্বকে এই যে অনির্দিষ্ট করে দেওয়া, নায়কের সঙ্গে লেখকের মিশে যাওয়া, স্বতোক্তির জোঁক, কথকের অপর পক্ষ হিসেবে পাঠককে দাঁড় করানো, এক একটা ঘটনাকে বহু ভাষ্যের কেন্দ্রে স্থাপন করা’ -যা আসন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তার পর্যবেক্ষণ এর কারণ।

দুনিয়া সম্পর্কে দৃষ্টিবদল। এইসব নব্য ঔপ্যাসিকদের কাছে ধারবাহিক কাহিনির ঘটনা পরস্পরায় বা চরিত্রে ক্রমান্বয় বিবর্তনে বাস্তবের সত্য মূর্তি গড়ে ওঠে না। বাস্তব আরো গভীর ও সর্বগ্রাসী। সেখানে লেখকের মন, পাঠকের মন, ঘটনা এবং চরিত্রের অসম্পূর্ণতা ও অধিক্রমণ, বস্তুর অস্তিত্বে ও অবস্থান, এমন কি লিখনক্রিয়া এসবেরই ভূমিকা আছে।

বস্তুত আঙ্গিকে, বক্তব্য নতুন ও সমকালীন হতে চাওয়া এসব ঔপন্যাসিকদের ভাবগত প্রেরণার দুটি উৎসক নির্দেশ করেছেন লোকনাথ ভট্টাচার্য। একটি দিয়োজেন, দোএ নো আন্দা (উরড়মবহব ফদ ড়বহড় ধহফধ)- অধিকাংশ লোকই অসুস্থ, যেন মহামারীতে আক্রান্ত, এবং সে অসুখটা তাদের কি? জগত সমন্ধে তাদের যত মিথ্যা ভুল ধারণা ও বিশ্বাস’। অপর উক্তিটি ভের্ণের হাইজেন বার্গ (বিৎহবৎ যবরংহি নবৎম) এর।

দেখা যাচ্ছে আদি ভৌতিক অনুপরমাণুর বাস্তব নিরপেক্ষ সত্য স্কন্ধে যে ধারণা, তা কেবলই আশ্চার্যভাবে অদৃশ্য হচ্ছে, ধুমাচ্ছন্ন ভুল বোঝা সত্যের কোনো নতুন ধারণায় কুয়াশার মধ্যে নয়, তা অদৃশ্য হচ্ছে সেই গাণিতিক স্বচ্ছ তরল প্রাঞ্জলতার আদিভৌতিক কণার অস্তিত্বের সত্যাসত্য সমন্ধে আগ্রহহীন, কিন্তু সেই কনার অস্তিত্বের যে জ্ঞানে আমরা সমৃদ্ধ, উক্ত প্রাঞ্জলতাটির বাসস্থান সেখানেই।

নব ঔপন্যাসিকদের কষ্টে, শ্রমে সাধ্য, গবেষণালব্ধ তথ্যে সমৃদ্ধ এই বিদগ্ধ, অনধ্যাত ভাষায় রচিত এ উপন্যাস যা বহু পাঠে কেবল আয়ত্ত করা সম্ভব, তার অতি অবশ্যই একটা সুচারু পরিকল্পনার ছক রয়েছে। যদিও নব ঔপন্যাসিকগণ সম্মিলিতভাবে কোনো আন্দোলন করেন নি, কাছাকাছি সময়ে একই চরিত্রের রচনা ও বক্তব্য উপহার দিয়েছেন এবং বলছেন, তাদের রচনাগুলো ‘প্রতি উপন্যাস (ধহঃর হড়াবষ) নয়’। বরং যে যুগের যা অর্থাৎ তাদের সৃষ্টি এ যুগের জীবনের এক বিশ^স্ত ও অর্থপূর্ণ প্রতিচ্ছবি এবং এতে উপন্যাস বৈশিষ্ট্যের ঊণতা ঘটে নি; উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ টিকে একমেবাদ্বিতীয়ম্ না ধরে নিয়ে যুগে যুগে নতুন ও সমকালীন করে তোলার দায়িত্ব ঔপন্যাসিকেরই।

নব ঔপন্যাসিকদের সৃষ্টির সবচেয়ে চিৎকৃত প্রকাশকাল ১৯৫৩-৫৮, যদিও পরেও এই শৈলীর অনুসরণ লক্ষ্য করা গেছে। এদের অন্যতম হচ্ছে রব-গ্রীয়ের খবং Les Gommes (1953), Ala Jalousie (1957), Dans La Labyrinthe (1959), La Maison de rendezyous (1965), Projet pour une revoullution a New York (1970); bvZvwj mv‡ivr Gi- Tropismes (1957), Portrait d’un inconnu (1957), Le plane’ tarium (1959), Les fruit d’or (1963), Entre de la vie et la mort (1968), Vous les entendez (1972); wg‡kj ey¨ri-Gi L’emploi du terms (1956), Degre (1960), La Modification (1957; Mobile (1962), ou’ (1971), Intervelle (1973); †K¬v` wmgui Historie (1967), Le Vent (1957), La route des Flandres (1960), Le palace (1962), Orion avengle (1970), Les corps Conducteurs (1971); এদের প্রত্যেকে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে দেদীপ্যমান-রব-গ্রীয়েরের রচনায় ‘ব্যক্তিমানুষ মূলত রূপকল্প, শব্দ ও অনুমেয় প্রতিক্রিয়ার সমাহার’, সারোৎ এর রচনায় তুচ্ছাতিতুচ্ছ, ব্যক্তি ও বস্তুর মধ্যে অনিদের্শ্যতা, চরিত্র ও গ্রন্থকারের মনোভাব একাকার, ব্যুৎর এর রচনা চিহ্নিত এর ‘খ-তা’র বৈশিষ্ট্য এবং ক্লোদ সিমঁ পুরোনো ফিল্মের কাঁচি জোড়াতালি চিহ্নিত বিচ্ছিন্নতা ম-িত।

নব ঔপন্যাসিকদের ‘স্ব আকাশ বিহারী’ স্বাতন্ত্রের মধ্যেও সাধারণ চারটি মানসিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন লোকনাথ ভট্টচার্য। তার অনুসরণে এসব চারিত্র বর্ণনা করা চলে :

১.            তার নায়ক ও অন্যান্য চরিত্ররা নামহীন, আসলে তাদের চরিত্রগত অস্তিত্বই নেই-যেন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তাদের ফুটে ওঠার সমস্ত সম্ভাবনাকে সজাগ লেখক দৃঢ়হস্তে রবার দিয়ে মুছে চলেছেন। তারা তাদের আশেপাশের বস্তুরই সামিল। …আবার নামহীন বলেই চরিত্রেরা সর্ব বিশেষণহীন। বিশেষণ যদিও বা থাকে তা যেন কিছুতেই কোনো কিছুতেই কোনো কিছুর উপরে লেখক বা চরিত্রের মতামত আরোপ না করে।

২.           তাঁদের চরিত্রদের  অবিচ্ছিন্ন গতিভঙ্গি, কখনো বা স্বতঃপ্রণোদিত কখনো আত্মবিস্মৃত হয়ে তারা কেবলই ঘুরে মরছে, বারবার এই রাস্তায়, একই বৃত্তের মধ্যে ফিরে ফিরে আসছে একই পার্কে বা স্কোয়ারে-যেন একটা নিরন্তর আত্মজিজ্ঞাসার পরিক্রমণে। লেখকের বক্তব্য, ঐ গতিটাই বা ভঙ্গীটাই হাত পা নাড়াটাই সব, তাই মানুষকে পৃথক করছে বস্তু থেকে, তার বাইরে মন বলে আর কিছু নেই।

৩.           রহস্যোপন্যাস বা ডিটেকটিভ কাহিনির সঙ্গে এ ধরনের রচনার মিল। একটা খুন বা একটা তদন্ত বা একটা বলাৎকার, এই নিয়েই অধিকাংশ ঘটনা। এরা বলেন রহস্য এদের কাছে একটা সহজ ও সরল মাধ্যম আত্মজিজ্ঞাসার ও বস্তুজগতে আত্মোপলব্ধির।

৪.           লেখককে কেবলি একটা আয়নার সম্মুখীন করা-লেখকের মনটা হওয়া উচিত ঠিক একটা স্বচ্ছ আয়নার, এই বক্তব্য। …আয়নার কাজ, তাতে প্রতিফলিত জিনিসের হুবহু প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা কিন্তু সে প্রতিচ্ছবি ঠিক সে একই জিনিস নয় যার প্রতিফলন সেটা। …আমি ও বাইরের জগত, এই দুয়ের সংস্পর্শে  যে অবিরাম সংঘাত, তাইতেই রুপ নেয় জীবন।  মানুষ ও বস্তুর মধ্যে পার্থক্য হল মানুষ ভঙ্গীর দ্বারা চিহ্নিত করে নিজের অস্তিত্ব, বস্তুকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নাড়ায়। অন্যদিকে বস্তুকে যেমন সে প্রভাবিত করছে, বস্তুর প্রভাবও তার উপর পড়ছে ক্রমাগতই। বস্তুর সংস্পর্শলব্ধ যে জ্ঞান  তাই  মানুষের অস্তিত্বের একমাত্র সত্য।

অ্যালা রবগ্রীয়ে (১৯২২) এদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। ১৯৫৫-৬৩ সময়সীমার মধ্যে উপন্যাস বিষয়ক একগুচ্ছ প্রবন্ধ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে, যা তাকে তার রচনাসহ অন্যান্য সমধর্মী রচয়িতাদেরকে বিতর্কের মধ্যে এনে ফেলে। এই বিতর্কে ঝড় থেকে যায় যতদিন না মার্কিন অধ্যাপক ব্রুস মরিসেৎ ১৯৬৩ সালে তার উপন্যাস বিষয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করেন। পেশাগতভাবে কৃষিবিজ্ঞানী এই ঔপন্যাসিক লেখকজীবনের আরম্ভেই চৎরহপবংং ড়ভ ঈষবাবং বা অফড়ষঢ়যব-এর মত উপন্যাস না লেখার বিষয়ে স্থিরপ্রতিজ্ঞ হয়ে নেন, কারণ এগুলোর রচয়িতাদের চোখ এড়িয়ে গেছে প্রুস্ত, লেলিন, ফ্লব্রের ফরাসি উপন্যাসের ক্ষেত্রে এবং জায়েস, কাফকা ও ফকনার বিশ^ উপন্যাসের মানচিত্রে কী পরিবর্তন সাধন করেছেন; এমনকি পূর্ববর্তী প্রজন্মের সার্ত্রে-কাম্যু কী অভিঘাত রেখেছেন লক্ষ করেন নি। পর্যায়ক্রমে বলা যায়, প্রুস্থ আমূল বদলে দেন উপন্যাসে মনস্তত্ত্বের ভূমিকা ও প্রকৃতি; আর সেলিন, জয়েস ও কাফকা স্বতন্ত্রভাবে কাহিনি ও ন্যারেটিভ প্লটে’র ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। ফকনার ঘড়ির কাটার সময়কে অনুসরণ না করে মানবকল্পনা পুষ্ট সময়কে অনুসরণ করেন। এদের দৃষ্টান্ত থেকে রবগ্রীয়ে মনে করেন, অপরের অনুকরণ বা পাঁচমিশেলি জোড়াতালিতে রচিত উপন্যাস বা বালজাকের ধরনে মনোবিশ্লেষণে সার্থকতা নেই।

আর সময়ের ধারণাও-ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনে পর দিন জুড়ে দিয়ে-এভাবে সজ্জিত নেই; কখনও সঙ্কুচিত বা প্রসারিত হয়, যেমন স্মৃতি সময়ের পরম্পরায় ক্রম অনুসরণ করে চলে না। অতএব উপন্যাসেও সঙ্কোচন, প্রসারণ, পুনর্বিন্যাস বা পুনরাবৃত্ত করে সময়ের উপস্থাপন প্রয়োজন হতে পারে। ততদিনে ফরাসিদেশে প্রপঞ্চবাদের বিকাশের ফলে বর্হিবিশে^র বস্তুর গুরুত্ব নতুন করে মূল্যায়িত হল। জগতের যা কিছু বর্ণিত বা ব্যাখ্যাত হয় তা মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেই হয়। সকল শিল্প, দর্শন সবই অপরিহার্যভাবে ‘মানবকেন্দ্রিক’ হয়ে আছে।

নব উপন্যাসের অপর লক্ষ্যযোগ্য চরিত্রটি হচ্ছে পাঠকের প্রতি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে লেখকের পাশে পাশে পাঠকের কল্পনায় গড়ে উঠবে এক বিশ^, পাঠককে কোনোভাবেই তৈরি, পূর্ণায়ত বা বদ্ধ বিশ^ হাতে তুলে দেওয়া হবে না। পাঠককে সৃজনধর্মী ভূমিকায় গ্রহণ করা হয়, লেখকের সমান কল্পনাশক্তি ও প্রজ্ঞায়; এমন এক সময়ে তা সম্ভব হবে যখন উপন্যাসে স্বতঃসিদ্ধ বলতে সামান্যই থাকবে, প্রথাগত চরিত্রপ্রদান রচনা অতীতের বিষয় হয়ে যাবে ও প্রতিনিধিত্ব করবে এমন অতীতের, যখন ব্যক্তিকে চূড়ান্ত তাৎপর্যম-িত করে দেখা হত। নব ঔপন্যাসিকরা তাদের যুগকে বলেন সংখ্যার যুগ, নামের নয়। যখন কোনো চরিত্রের প্রণোদনা বা ক্রিয়া সম্পর্কে লেখকের বর্ণনাকে অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে দেখা হয়। তবে তারা অতীতকে প্রত্যাখান না করে তাদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। তাদের কথায় সকল যুগের উপন্যাসের জন্য এমন কোনো স্থির করা আদর্শ নেই, যার সঙ্গে সকল রচনা তুলনীয় হতে পারে। অন্য সকল কিছুর ন্যায় উপন্যাসেরও বিবর্তন ঘটবে; এ সময়ের কোনো ঔপন্যাসিকই বালজাকের ধরনে লিখবেন না বা কোনো কম্পোজার মোৎসার্টের অনুরূপ অথবা কোনো চিত্রকর রাফায়েলের মতো অবিকল আঁকবেন না। অতএব অন্য শিল্পের ন্যায় উপন্যাসের বদলও অবশ্যম্ভীয়। উল্লেখ্য নতুন উপন্যাসের পাঠক সৃজনক্রিয়া অংশগ্রহণ করে তীক্ষèতার আনন্দ লাভ করবে, তার স্বাধীনতা থাকবে আর পূর্বের ন্যায় শিল্পীর সৃষ্ট কল্পিত জগত গ্রহণে সে বাধ্য থাকবে না।

রবগ্রীয়ের উপন্যাস থেকে এসব তত্ত্ব ও তথ্যেরই প্রমাণ মিলবে। তার ক্ষেত্রে, প্রথমেই উল্লেখ প্রয়োজন, আঙ্গিক বিষয়বস্তুর পূর্বসূরী; তারই কথায় :No true creator starts off with an idea of his meaning; The writers project is always a project of form. A novel must be something, before it can begin to mean anything.’ তার পক্ষ থেকে কোনো বার্তা নেই, কিন্তু তিনি লিখে থাকেন এ সত্য জানতে, তিনি কী সঞ্চালন করতে চান আর কেই বা তা চান। যদিও তার প্রথম উপন্যাস খবং এড়সসবং (রবার) এক পুরোনো ছক, অয়দিপৌঁস কাহিনি, ধরেই রচিত। পাঁচ অধ্যায়ে গৌরচন্দ্রিকা ও উপসংহারসহ সোফেক্লেসের কাহিনির সমান্তরাল হয়ে উপস্থিত। কোনো এক ভালাস দ্যুপ নামের একজনের খুনের তদন্তে এসে আবিষ্কার করেন সে জীবিত ও ঘটনার অনিবার্য পাকে পড়ে ভালাসই তাকে অবশেষে খুন করতে সে বাধ্য হয়। অচেনা শহরে একই পথে, এই লোকের সাক্ষাতে ভালাস পুনরাবৃত্তভাবে ঘুরতে থাকে। একরকম মায়ায় পড়ে সে, প্রাণপণে অন্বেষণ করে সে নিজেকে, তার অবস্থান কী, তাৎপর্য প্রভৃতি। খুনের তদন্তে এসে ভালাস নিজে খুনী হয়ে যায়। আমিত্বকে মুছতে সে অকারণে একটার পর একটা রবার কিনে চলে শহরের দোকান থেকে; একই দোকানে এসে প্রশ্ন করে চলে, সন্দেহ এড়াতে প্রতিবার একটা করে রবার কিনতে থাকে। ঘটনা উন্মোচিত হলে নিহত লোকটি তার বাস্তব পিতা হিসাবে প্রকাশ পায় এবং যে রমণীকে সে কামনা করে সে তার মা হতে পারে এমন একজন; সমালোচক গ্রন্থটির তাৎপর্য লক্ষ্য করেন। ‘The originality of the novel lies…..in the fact that it contains object which have little or no signifacance in themselves: they act as focuses for feelings which are alien to them but which they attract like an electric charge’.

এ উপন্যাসের পর রবগ্রীয়ে বহুকৌণিক বর্ণনা বর্জন করেন এবং একক পর্যবেক্ষণের দিকে ঝোকেন, যিনি একাধারে কথকও যদি তা তৃতীয় পুরুষে কখনও হয়। দ্বিতীয় উপন্যাস খব ঠড়ুঁবঁৎং (দর্শক) এ ‘দৃষ্ট’ বস্তুজগতের সর্বস্বতা যেন আরও প্রকটভাবে প্রতিফলিত, অন্যদিকে আমিও বাইরের বস্তুজগতের সঙ্গে সে আমার সম্বন্ধ নিয়ে যে প্রশ্ন, তাও আরও জোরের সঙ্গে উত্থিত। এক চটপটে বালিকার ধর্ষণ সংক্রান্ত তীব্র যৌনতাময় ফ্যান্টাসীর এক কাহিনি। কর্মকর্তাটির নাম মাতিয়াস, যে নিজেই ধর্ষক, যদিও মিথ্যাচার করছে ধর্ষণ ও হননের বিষয়ে, উপন্যাসের কোথাও স্পষ্টাক্ষরে লিখিত না থাকলেও বস্তুপুঞ্জের সাক্ষ্য থেকে অবধারিত এ সত্য সচেতন মনে ফুটে ওঠে। নামকরণের দর্শকটি এক বালক যে যাবতীয় ভয়ঙ্কর চিত্রকল্পরাজি নিজের বীক্ষণে অমোচনীয়ভাবে ধারণ করে আছে, যে একাই কেবল মাতিয়াসের অনৃতভাষণকে উন্মোচন করে দিতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তিগত কারণে নীরব থাকে, খুনীকে শনাক্তহীন  অবস্থায় শাস্তি এড়িয়ে যেতে দেয়। স্বল্প অধিবাসী সম্বলিত এমন এক দ্বীপে ব্যবসায়ী পর্যটক মাতিয়াস এসে ধর্ষণপূর্ব অবস্থায় যা কিছু ভাবছে এবং ধর্ষণের পরের ঘটনা উপন্যাসটির দুটি অংশ। মাঝখানে একটি পাতা অক্ষরহীন, যেখানে সম্ভাব্য ধর্ষণটি সংঘটিত হয়েছে তার বিবরণে রবগ্রীয়ে বিরত থাকেন; দড়ির নকশা, চলচ্চিত্রের কাহিনি, পিষ্ট ব্যাঙের চিত্রকল্প ইঙ্গিত দেয় আসন্ন দুষ্ক্রিয়ার। পরের অংশে স্বেচ্ছাপরিভ্রমণ ঘটে পুনরাবৃত্তভাবে, ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে, শেষে পালিয়ে যায়।

তৃতীয় উপন্যাস খধ ঔধষড়ঁংরব (ঈর্ষা) অধিকতর পরিচিত মানসিক বৈকল্যের কাহিনি। যেখানে প্রেম ও ব্যভিচারে লিপ্ত তিনজন : অ. তার স্ত্রী ও ফ্রাঙ্ক, যাকে প্রেমিক মনে করা হয়, কোনো একটা কিছু করে, হয়ত নির্দোষভাবেই; যা থেকে কথক এক যাত্রায় তাদের প্রস্থান দেখান যেখানে ব্যাভিচার সংঘটিত হতে পারে। কিন্তু গাড়ি গাছে ধাক্কা খেয়ে অগ্নিস্তুপে পরিণত হয়। অতএব তাদের প্রস্থানও কল্পনা হওয়া সম্ভব। এ কাহিনিতে বিভ্রম নেই, আবার কথক তিলকে তাল করছে না এমনও বলা যাবে না; পাঠক বা লেখক কেউই নিশ্চিত হতে পারে না : an essential theme of this novel is that Jealousy is an illness that corrupts the data which gave rise to it in the first place. যদিও গ্রন্থনাম ছাড়া কোথাও ঈর্ষার উল্লেখ নেই, কেবল কথকের মনে ঘটনাচক্রে এ কথাটি উদয় হয়। এর রচনারীতি অপেক্ষাকৃত অসরল :

The whole book is constructed on neutral times of what looks at first sight like impassive description. but is soon becomes apparent that this objectivity is obsessional, returning again and again to the same scenes of A brushing her hair or of Frank crushing a centipede on the wall. both of these having ready. obvious sexual over tours. As a natural result of this, the object that in this novel serves as the focus of the narrators seek feeling is the stain on the wall left by the squashed in net.

কল্পনার আরও গভীরে নেমে যান রবগ্রীয়ে পরবর্তী উপন্যাস উধহং ষধ খধনুৎরহঃযব এ; যেখানে এক সামরিক ধ্বংসযজ্ঞের পর এক পুরোনো রীতির দৃশ্যসজ্জায় কথকের কক্ষ, যার মধ্যে সে গোলকধাঁধাঁর ন্যায় প্রবেশ করে এবং কেবল তখনই মুক্তি পায় যখন এ কাহিনি শেষ হয়, যা সে গড়ে তুলেছিল একটা আলোকচিত্র থেকে। এই আলোকচিত্র ঘিরেই আবেগের উৎসারণ; আর কাহিনি হল বরফ ঢাকা এক শহরের গোলকধাঁধাঁময় সড়কে জনৈক সৈনিকের পরিভ্রমণ। উল্লেখ্য রবগ্রীয়ে নিজে আলোকচিত্রী ছিলেন, আলোকচিত্রকে অধিকতর বস্তুনিষ্ঠ বলে মনে করতেন। এই গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি পাঠককে অনুরোধ করেন একে রূপক হিসেবে না পড়তে, অর্থাৎ গ্রন্থটির সরল অর্থ গ্রহণে তিনি পাঠককে প্ররোচিত করেছেন। বরগ্রীয়ে সকল রকম ব্যাখ্যা বর্জনের পক্ষাপাতী, পাঠককে তার গ্রন্থে এর বস্তু, ক্রিয়া, শব্দ ও ঘটনা দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানান এবং এদেরকে বাস্তব জীবনের চেয়ে ভিন্ন কোনো তাৎপর্য না দিতে অনুরোধ করেন।

প্রসঙ্গক্রমে আসে চলচ্চিত্রের কৌশলের কথা; রবগ্রীয়ের দুটি সিনে নভেল L’annee derniere a Marianbad I L’Immortelle-এর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ^খ্যাতি অর্জন এবং অন্যান্য উপন্যাসেও এসব পদ্ধতি প্রয়োগের বিষয়ে আলোকপাতের দাবী রাখে। যেমন খধ সধরংড়হ ফব ৎবহফবুাড়ঁং-তে চলচ্চিত্রে যেভাবে  কলাকুশলীদের নাম শুরুতে পর্দায় ভেসে আসে এখানেও আগাম কয়েকটি দৃশ্য বর্ণিত হয় এবং দৃশ্যসজ্জার দ্রুত পরিবর্তন কেবল সেই পাঠকের বোধগম্য হবে যিনি চলচ্চিত্রের ফেড হয়ে যাওয়া’র কৌশলের সঙ্গে পরিচিত।

উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট হংকং এ সমাজের উঁচু শ্রেণির একটি পতিতালয়, যেখানে রুচিসম্মত ক্যাবারে, ককটেল বারসহ অন্যান্য আয়োজন রয়েছে। গ্রন্থের পরিকল্পনার সারাৎসার লেখকই দিয়েছেন কোনো এক জনসন, যিনি স্যার র‌্যালফ্ বা অন্য নামেও পরিচিত, এদুয়ার্দ মানেরের সঙ্গে গোপন ব্যবসায় জড়িত; সে খুন  হলে জনসন তার মাকাও ঘাটিতে ফিরে আসে। নিজের পর্তুগীজ পাসপোর্ট নিয়ে এক ব্রিটিশ চীনা অঞ্চল থেকে চলে যেতে চায়, তবে সঙ্গে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক লেডি আভার গৃহের মক্ষী লরেনকে, যে কিনা সাধারণ বারাঙ্গনা নয়। এই মক্ষীরানী কেবল স্বেচ্ছায় এই জীবন বেছে নিয়েছে তাই নয়, সে স্থিরপ্রতিজ্ঞ তার মূল্য হবে অত্যাধিক চড়া। জনসন মানেরেকে (যে তখনও মৃত্যু নয়) বলে বিপুল অঙ্কের ঐ অর্থ ধার দিতে এবং রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হলে তাকে হত্যা করে। অতএব সত্ত্বর তাকে হংকং ত্যাগ করতে হবে। এক বোকামির মুহূর্তে সে লেডি আভার গৃহে আসে লরেনকে বুঝিয়ে নিয়ে যেতে, যদিও তার যথেষ্ট মূল্য যে পরিশোধ করতে পারেনি। হিচককসুলভ সমাপ্তি ঘটে উপন্যাসটির হুড়মুড়িয়ে কক্ষে প্রবেশ করতেই সে মুখোমুখি হয় এক পুলিশকর্তার যে তাকে ইতোমধ্যে জেরা করেছে; ফিরে দেখা দরজা জানলায় প্রহরারত সশস্ত্র সৈন্যরা তাকে ঘিরে ফেলেছে এবং লরেন বিছানায় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। সমালোচক জন ফ্লেচার এই উপন্যাসের পটভূমি কল্পনার বাস্তবকে এভাবে উদ্ধৃত করেন :La Maison de rendezvous is set in Hong Kong, a city that everyone knows with its harbor, its junks and Sampans, the tall buildings of Kowloon, and the tight dress with hobble skirt, slit upside to the thigh and by long and slender Eurasian girls; তিনি উল্লেখ করেন ঔপন্যাসিকের দেয়া একাধিক ভূমিকা থেকে সৃষ্ট এই হংকং মূলত মিথ ও ফ্যান্টাসির সৃষ্টি, যা উপনিবেশটি সম্পর্কে মানুষের ধারণা থেকে জাত; আর যে ধারণা আবার ট্যুরিস্টদের শোনা গল্পগাথা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় রঞ্জিত। সমালোচকের কথায় রবগ্রীয়ে সুলভ এই পটভূমি যেখানে ঃযব রহপৎবফরনষব পধহ পৎবফরনষু যধঢ়ঢ়বহ তিনি এর প্লটের কাঠামোয় বহু বৈপরীত্য সনাক্ত করেন; যেমন মানেরেকে বার চারেক মরে যেতে হয় এবং মানেরে ব্যতীত উপন্যাসের আর সবই দ্রুত বদলে যায়। এছাড়াও এর সময় জট পাকিয়ে যায়, ঘটনার পূর্বাপর নির্ণয়ের জো থাকে না। তেমনি বর্ণনার দৃষ্টিকোণ কখনও গোপন ভঙ্গিতে, কখনও প্রথম পুরুষে বর্ণনা বা কখনও তৃতীয় পুরুষে বর্ণিত হতে থাকে। অধিকাংশ দৃশ্য তাৎপর্যময় পরিবর্তনসহ পুনরাবৃত্ত, অন্তত একাধিক বারতো বটেই, হয়। প্রয়োগ কৌশল কোথাও থ্রিলার এর, অন্যত্র চলচ্চিত্রের কাট ও ফেড রীতির। এ গ্রন্থে একক কোনো কথক নেই। এর অধিক উৎপাদনশীল চারিত্র দৃশ্যগুলির তুলনায় কল্পনার বহর বাড়িয়েছে। আর তা সমষ্টিগত কল্পনা : রমণীরা একঘেয়ে স্টিরিওটাইপ যেন পর্ণোগ্রাফির চিত্রমালা, পুরুষেরা যেমন থ্রিলার থেকে বেরিয়ে আসা চালিয়াৎ বা গুপ্তচর। এ উপন্যাসে কাহিনি একাধিক ও পরস্পর দ্বন্দ্বকুল; আর কোনো সরল সমাধানে এগিয়ে যায় না। বরং কল্পনাকে স্বাধীনতা দেবার উপযুক্ত এক নির্মাণ সম্পন্ন করে। এর বৈচিত্র্যেও লক্ষণীয় উত্তেজক, আলোড়নকর ও কোথাও বা ট্র্যাজিক। রবগ্রীয়ে এক সাক্ষাৎকারে যেমন বলেন : ঃthe life of imagination is the true life of  man who differs from the beasts in that he is continually imagining his own life.’ Rb †d¬Pvi h_v_©B gšÍe¨ K‡ib; The myths by which we live and move and propagate the species are the substance of Robbe-grillets fiction: and that undoubtedly, is what gives its strength.

রবগ্রীয়ে উপন্যাসের বিষয়বস্তুর প্রসঙ্গে উপন্যাসের সমাজতত্ত্ববিদ লুসিয়েঁ গোল্ডম্যান মন্তব্য করেন। ১৯৪৫ উত্তর সময়ে পুঁজিবাদী সমাজে যে পরিবর্তন হয়েছেন সেখানে বস্তুবিশে^র ভিড়ে মানবসত্তা স্বতন্ত্র ব্যক্তি বা সম্প্রদায় হিসেবে তার নিত্যপ্রয়োজনীয় বাস্তবতা হারিয়ে ফেলেছে, একধরনের যান্ত্রিক স্বয়ংক্রিয়তা মানুষের আত্মপ্রকাশকেও ব্যহত করেছে বা দুরূহ করে তুলেছে। তিনি রবগ্রীয়ের রচনায় লক্ষ করেন স্বয়ংক্রিয় বস্তুবিশে^র উপস্থিতি  যা নিজস্ব সংগঠন ও আইনসহ বিদ্যমান এবং এর মধ্য দিয়েও মানবসম্ভব বাস্তবতা একপর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম। তিনি একে আখ্যায়িত করেন autonomous reality : the reified world of objects বলে। এই বাস্তবতার পরিচয় দেন এইভাবে :

There is in the human domain no immutable reality, given once and for all, that is simply there to be explored with increasing subtlety. One generation of waiters and artists to another. The essence of human reality is itself dynamic and changes through history; moreover this change it to an unequal degree of course the work of all men and although writers play their part, it is neither an exclusive, nor a preponderant one.

এমন প্রেক্ষাপটে বস্তুবিশে^র নিরেট স্বয়ংক্রিয়তায় রবগ্রীয়ে মানসিক বাস্তবতা সন্ধান করেন খবং এড়সসবং এ অয়দিপৌস কমপ্লেক্স, খব ঠড়ুবঁৎ এ অবসেশন, খধ ঔধষড়ঁংরব-তে ঈর্ষা এবং খ’ধহহব’ব ফবৎহরব’ৎব ধ গধৎরধহনধফ এ মনোবিশ্লেষণিক চিকিৎসা যেমন। গোল্ডম্যান এসব মনোভাবের মধ্যে লক্ষ করেন : Supposing them to have been effective have managed to become incorporated in the work only to the extent that they could became linked to an otherwise essential analysis of overall structures of social reality.

প্রথাগত ছক মান্য করেই রবগ্রীয়ে খবং এড়সসবং এ নতুন ধরনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আরোপ করেন এই উপলব্ধির জন্য যে এটি নিছক গোয়েন্দা কাহিনি নয় বা গ্রিক মিথের পুনঃকখনও নয়। যেহেতু দ্যুপঁ তার নিজের সন্তানের হাতে নিহত হয় নি, অন্তত গ্রন্থমধ্যে এর প্রমাণ নেই। ঈশ^রের ইচ্ছা ও মানবের উদ্যোগের মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান তার তাৎপর্য প্রকাশ পেয়েছে : with the mechanical and inevitable process that enfolds within a world in which individuals and search of liberty have lost all reality and importance’. . এই প্রকাশ আসলে আত্মনিয়ন্ত্রণহীন এক যান্ত্রিক ব্যবস্থার, যেখানে এই সরকারবিরোধী সংগঠন এক লোককে হত্যার মানসে দানিয়েল দ্যুপঁকে ভ্রমবশত ঘিরে ফেলে। হিসেবের ভুলে দ্যুপঁ খানিক পূর্বেই অফিসের বাতি নেভায়, বিষ্মিত গুপ্তঘাতক লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, সে বাহুতে আঘাত পায়। নিজেকে হন্তারকের লক্ষ জেনে আহত দ্যুপঁ প্রভাব খাটিয়ে এমনভাবে আত্মগোপন করে যে প্রকৃতই নিহত হয়েছে। এক গোয়েন্দা আসে, বাস্তবে  না ঘটা, অপরাধের তদন্ত করতে; তাৎক্ষণিকভাবে মনে হতে পারে প্রক্রিয়াগত বিচ্যুতি ঘটেছে, বাস্তবে যদিও তা বিভ্রমমাত্রা। সাধারণ ঘটনা বিন্যাসে সব ঠিকই থাকে, কারো অনিচ্ছায় বা অজ্ঞাতসারেই গোয়েন্দাটির হাতে তথাকথিত ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি নিহত হয় ও প্রকৃত হত্যাকা-ের তদন্ত শুরু হয়। ইতোমধ্যে ঘাতকদল নিজেদের ভুল সম্বন্ধে যেন কাজ চালিয়ে যায় এবং পরের দিন আর একজনকে হত্যা করে, আলবার দ্যুপঁ যার নাম। গ্রন্থনামের সূত্রে বলা যায় আত্মনিয়ন্ত্রণ যেমন ব্যর্থতাকে মুছে দেয় তেমনি সমাজের যান্ত্রিক কৌশল বিদ্যমান যে কোনো অনিয়ম ও বাস্তবতাকে ব্যক্তির নিকট হতে অবলুপ্ত করে দেয়।

একই সমস্যা অন্য স্তরে গভীরভাবে উপজীব্য হয়েছে খব ঠড়ুবঁৎ; দর্শক কে? অবশ্যই মাতিয়াস, যিনি বাণিজ্যিক ভ্রমণকারী এবং যে বস্তগত অর্থে খুন করে, যে ঘটনাটিকে ঘিরে উপন্যাস রচিত। এর ক্ষেত্রে একজন মেয়ের নিহত হওয়া উপন্যাসটির তুচ্ছতম উল্লেখ। বরং দ্বীপটিতে চব্বিশ দিনের বসবাসকালে  মাতিয়াসে কর্তৃক ঘটে যাওয়া হত্যাকা-ের পুনঃবর্ণনার চেষ্টা, খুনের স্মৃতিতে ও গ্রেফতারের ভয়ে, এর উল্লেখযোগ্য অংশ। এর দুটি চারিত্র-এক, খুনের কোনো উল্লেখ যাতে না থাকে এবং আবিষ্কৃত ও গ্রেফতার ভীতি যা অবচেতনে প্রকাশ পেয়েছে  হাতকড়ি বা অন্যতর প্রসঙ্গের স্মৃতিতে; এই ভয় বারবার তাড়িত করেছে মেয়েটির খুনের ঘটনার বর্ণনায় বা মাতিয়াসের শৈশবের কোনো অভিজ্ঞতা যার সম্পর্ক রয়েছে হত্যার সঙ্গে তার বর্ণনায় এবং মনস্তত্ত্বিক তাৎপর্য পেয়েছে। এ পর্বে মাতিয়াসের বড় আবিষ্কার এই যে, তার উদ্যম বা ভয় সবই অকার্যকর এই অর্থে ‘‘he is using a entirely false representation of social reality’’ হত্যাকা-টি যে দুজন সাক্ষী বা দর্শক রয়ে গেছেন এই দ্বীপে তারা অটল থাকবেন মাতিয়াসের বয়ানের অসত্য অংশকে শুদ্ধ করার জন্য। এই পর্যবেক্ষণ তার মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দেয়, যদিও তা সাময়িক, কারণ তারা একাজ করবেন নিছক সত্যের মুখ চেয়ে এবং তাকে ধরিয়ে দেবার কোনো অভিলাষ তাদের নেই। ‘ঞযব ধৎব ংরসঢ়ষু াড়ুবঁৎং’ মাতিয়াস লক্ষ করে দ্বীপের অধিবাসীদের বিশে^র যত ক্ষুদ্র অংশ হোক, তারা একটা পূর্ণাঙ্গ পৃথিবী এবং তাদের কোনো অতিরিক্ত আগ্রহ নেই ছোট মারেক বা মারিয়ার চেয়ে।

Basically, this murder, like the one in Les Gommes, has become part of the order of things and, in so far as the murdered girl was not like theother inhabitants of the island and element of spontaneity and disorder, her disappearence even comes as a source of relief to them.

এভাবে পৃথিবী নিষ্ক্রিয় দর্শকে পূর্ণ যারা সমাজ জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনতে বা মানবিক করে তুলতে ইচ্ছা বা আগ্রহ পোষে না। কেবল যে ব্যক্তিটি এক শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে করতে পারে, যে এ অপরাধ তাকে সমাজ জীবন থেকে উপড়ে ফেলতে সক্ষম; সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে পলায়নের সকল পথ প্রত্যাখান করে ও পরদিন সকালে নৌকো ধরা পর্যন্ত অপেক্ষা করে যা তাকে মূল ভূমিতে নিয়ে যাবে। গোল্ডম্যান মনে করেন এই দুই উপন্যাসে৩৫ the ‘self reguations of society’ I ‘the increasin passivity’ cwijwÿZ n‡q‡Q, hv‡K mgvRZ‡Ë¡i fvlvq AvL¨vwqZ Kiv hv‡e36 Ôdepoliticization, desacralization, dehumanization, reification’’ বলে।

তৃতীয় উপন্যাসটিও এক ঈর্ষাকাতর দর্শকের কাহিনি, যে স্বামীটি ভেনিশিয়ান ব্লাউন্ড দিয়ে দেখাতে থাকে। এই রচনাতেও অনুভূতিকে অল্প ক্ষেত্রেই বস্তু থেকে পৃথক করা যায় সমগ্র রচনাতেই বস্তুর ক্রমবর্ধমান স্বয়ংক্রিয়তারই পরিচয় যা পূর্ণাঙ্গ নিরেট বাস্তবতা এবং যার বাইরে মানব বাস্তবতা ও অনুভূতির স্বতন্ত্র স্বয়ংক্রিয় অস্তিত্ব নেই, এমনকি ঈর্ষাকাতর লোকটিকেও বোঝানো হয় তৃতীয় গ্লাশ বা তৃতীয় চেয়ার-এর উল্লেখ করে; এর গড়নে বস্তুপুঞ্জস্বায়ত্তশাসন লাভ করে এবং মানুষ বস্তুর উপর প্রভুত্ব করার বদলে তাদের সঙ্গে সমীকৃত হয়ে যায়। উধহং ষধ ষুনুৎরহঃযব-এর বিষয়বস্তু হল উদ্বেগের অনুভূতি, যা তার চলচ্চিত্র ‘মারিয়ানবাদে’ ব্যবহৃত হয়েছে।

অতএব রব গ্রীয়ের রচনার এসব লক্ষণ বাস্তবতার নতুন অর্থসংস্থান দ্বারা এমন এক বিশ্বের সৃজন সম্পন্ন করে যা রচনাকার্যের পারিপার্শ্বের বিশ্বের সদৃশ। নব ঔপন্যাসিকদের অগ্রগণ্য হিসেবে রব গ্রীয়ের উপন্যাস ও উপন্যাস বিষয়ক সন্দর্ভ ‘নব উপন্যাসের পক্ষে’ নুভো রোঁমার প্রসারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নুভো রোমাঁর বিশ্ব উপন্যাসের অগ্রযাত্রার অন্যতম বাঁকবদল বলে পরিগণিত আর সে যাত্রায় অ্যালা রব গ্রীয়ে অগ্রপথিক।

তথ্যসূত্র

১.

brian mchale, postmordernist fiction, london, 1987, p.13

২.           সমীর রায় চৌধুরী সম্পা. পোস্টমর্ডানিজম : অধুনান্তিকতা, কলকাতা, ১৯৯৭, পৃ.২

৩            অরুণ মিত্র, ‘বর্তমান ফরাসী উপন্যাস : পটভূমি ও প্রবণতা’, প্রমা, সুরজিত ঘোষ সম্পা. অক্টোবর ১৯৭৮, পৃ. ৫১-৫২

৪.           অরুণ মিত্র, প্রাগুক্ত, পৃ.৫৪

৫.           প্রাগুক্ত, পৃ.৫৪

৬.           প্রাগুক্ত, পৃ.৫৬

৭.           প্রাগুক্ত, পৃ.৫১

৮.           প্রাগুক্ত, পৃ.৫৭

৯.           প্রাগুক্ত, পৃ.৫৭

১০.         লোকনাথ ভট্টাচার্য, ‘বস্তুপ্রেমিক ফরাসী ‘নব’ উপন্যাস’, এক্ষণ, নির্মাল্য আচার্য সম্পা. শারদীয়, ১৯৭৩, পৃ. ১৪৩

১১.         লোকনাথ ভট্টাচায, প্রাগুক্ত, পৃ.১৪৩

১২.         প্রাগুক্ত, পৃ.১৪৪-১৪৫

১৩.

Bruee Morrissette, les romans des robbe grillet. paris 1963

  1. John Fletcher, new directions in literature, London, 1968, p. 106
  2. allain robbe- grillet, les gommes, parism 1953
  3. John Fletcher, new directions in literature, London, 1968, p. 106
  4. John Fletcher, new directions in literature, London, 1968, p. 106
  5. Allian robbe-grillet, la jaloustie, paris, 1957
  6. John Fletcher, ibid.p. 108
  7. Ibid. p. 108
  8. Bruee Morrissette, les romans des robbe grillet. paris 1963
  9. Bruee Morrissette, les romans des robbe grillet. paris 1963
  10. John Fletcher, ibid.p. 108
  11. Cited from john Fletcher, Ibid. p. 115
  12. John Fletcher, ibid.p. 115
  13. lucien goldman, towards a sociology of the novel london, 1975, p. 132
  14. Ibid. p. 133
  15. Ibid. p. 133
  16. Ibid. p. 141
  17. Ibid. p. 141
  18. Ibid. p. 141
  19. Ibid. p. 144
  20. Ibid. p. 145
  21. Ibid. p. 145
  22. Ibid. p. 146
  23. Ibid. p. 146

[উৎস : নব উপন্যাসের পক্ষে, অ্যালা রবগ্রীয়ে, ভাষান্তর ও ভাষ্য : শামসুদ্দিন চৌধুরী ॥ বৃত্তায়ন, ঢাকা, জুলাই ২০১১]

*******************************************

উপন্যাসের সংকট
দেবেশ রায়

উপন্যাস কাকে বলে ও কোন বিশেষ ধরনের সমাজে উপন্যাস তৈরি হতে পারে এই দুটি প্রশ্ন নিয়ে একটা সর্বসম্মত ভুল সিদ্ধান্ত সাহিত্যের ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এমন সর্বসম্মত ও অন্তর্ভুক্তির কারণ একটা প্রশ্ন দুটি প্রশ্ন বিশেষে যতটা গ্রাহ্য, এর উত্তরটা ততই অমীমাংসিত হতে বাধ্য। যে প্রশ্নের শুধু একটি মাত্র উত্তর হয় না, হওয়া সম্ভব নয়, সে প্রশ্নের যে কোনো একটা উত্তরে একমত হয়ে যাওয়াটা হাতের নাগালের কাজ চালানোর পক্ষে নেহাৎ দরকারি। মানুষের সামাজিক বিকাশ ও অর্থনৈতিক জীবনের পক্ষে সা¤্রাজ্যবাদী বা আধিপত্যশীল প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির পর্ব, যাকে আমরা সা¤্রাজ্যবাদী বা উপনিবেশিক পর্বই বলতে পারি, মাত্র দু-তিনশ বছরের পুরনো, আর-একটু বাড়িয়ে না হয় চার-পাঁচশ বছরই ভাবা যায় বড় জোর, তার বেশি তো নয়। অথচ যেহেতু সেই পর্বে পৃথিবীর সব দেশ পরস্পরের কাছাকাছি হয়েছে অনেক বেশি, তাই শিল্পসাহিত্যগত প্রশ্নের ওপরও এই আধিপত্যবাদী চিন্তার জবরদখল চালুই থেকে যায়, এ নিয়ে প্রতিবাদ বড় একটা হয় না।

গল্প-উপন্যাস কাকে বলে ও কোন বিশেষ ধরনের সমাজে উপন্যাস তৈরি হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে যে সর্বসম্মতি আমাদের অভ্যস্ত হয়ে গেছে তার কারণটা একটু বিদঘুটে। এই প্রশ্নের উত্তরে ধনতন্ত্রে বিশ্বাসী সাহিত্যতত্ত্ববিদরা ও মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী সাহিত্যতত্ত্ববিদরা একমত হয়ে গেছেন অনেক দিন, প্রায় মার্ক্স-এর সময় থেকেই। সেই মতৈক্যটা হচ্ছে এই উপন্যাস তৈরি হয় সেই সমাজে, যে-সমাজে ব্যক্তি প্রধান হয়ে ওঠে। একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের কাহিনীই উপন্যাস। সেই বিকাশোন্মুখ ব্যক্তির আকাক্সক্ষার বিষয় হতে পারে বেশ বড়সড় এক জমিদারির মালিক হওয়া, সেই কারণে সে তেমন জমিদারির জন্য অপরিহার্য ক্রীতদাস সংগ্রহ করলে করতে পারে।

কিন্তু তার ক্যাশের জোর না থাকায় সে ঘুরে-ঘুরে বড়-বড় জমিদারদের কাছ থেকে তাদের মরা-ক্রীতদাসদের নামগুলো কিনে বেড়ায়। তাতে অনেক জমিদার নামগুলো দেয় বটে কিন্তু দাম নিতে তাদের ইজ্জতে লাগে। এই লোকটির সস্তায় জমিদার হওয়ার ব্যক্তিগত বাসনা প্রায় যেন পূর্ণ হয়। গোগোল-এর ‘ডেডসোলস’ বা, একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের অনুকূল সেই সমাজে কোনো একটি মেয়ে বার বছর বেশ্যাবৃত্তি করতে পারে, পাঁচবার বিয়ে করতে পারে একবার নিজের ভাইকে, বারো বছর ধরে চুরি করে যেতে পারে, চৌর্যবৃত্তিই তার পেশা, আট বছর অপরাধী হিসেবে নির্বাসন ভোগ করতে পারে, শেষে বড়লোক হতে পারে, ভালো মানুষ হতে পারে ও মৃত্যুর আগে অনুতপ্তও হতে পারে। ডেনিয়েল ডিফো-র ‘মল ফ্লান্ডার্স’ (১৭২২)। বা, তেমন ব্যক্তিত্ব নির্মাণক্ষম কোনো সমাজে এক বড় অমাত্যের বৌ ট্রেনে দেখা হয়ে-যাওয়া এক ছোকরার প্রেমে এমন পড়ে যেতে পারে যে ঘর-সংসার ছেড়ে তাকে বিয়ে করে তার ছেলের মাও হতে পারে ও শেষে এক ট্রেনের চাকার তলায় ঝাঁপ দিতে পারে। তলস্তয়-এর ‘আনা কারেনিনা’। কিংবা আর-একটি মেয়ে, কাপালিকের তন্ত্রসীমার সঙ্গিনীদশার বন্দিত্ব থেকে এক আচমকা দেখা পুরুষের সঙ্গে জনপদে আসে বটে কিন্তু সেই পুরুষটির সব প্রশ্নের মানে বুঝতে না পেরে গঙ্গায় ভেসে যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপালকু-লা’। বা, এক ভাগ্যান্বেষী মানুষ কোত্থেকে একটা গাধার চামড়া পেয়ে যায় এই শর্তে যে তার সব উচ্চাকাক্সক্ষাই মিটবে বটে কিন্তু চামড়াটা ছোট হতে-হতে সে শেষ পর্যন্ত মরে যাবে। বালজাক-এর ‘মরা গাধার চামড়া’ বা, সিপাহি বিদ্রোহের সময় এক পথে পড়ে থাকা শিশু গোঁড়া বামুন হয়ে বড় হয়ে ওঠে ও জীবনের এক সংকটে নিজের সেই আদি পরিচয়ের মুখোমুখি হয়ে যায়, সে তো ভারতীয়ই নয়, বামুন তো দূরের কথা। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’। বা, সুইজারল্যান্ডের এক স্যানাটোরিয়ামে যক্ষ্মারোগাক্রান্ত কিছু মানুষ শুধু তর্ক করে যায় ঘনায়মান ফ্যাসিবাদ নিয়ে। কথা, কথা আর কথা ব্যক্তিগুলোকে ছেয়ে ফেলে। টমাস মান-এর ‘ম্যাজিক মাউন্টেন’। বা, মৃগীরোগের চিকিৎসায় নিজের যৌবনকালের অনেকটা ইয়োরোপে কাটিয়ে রাশিয়ার ফিরে-আসা এক কপর্দকহীন ছোকরা, যে নাকি একই সঙ্গে একজন প্রিন্সও বটে ও একজন ইডিয়টও বটে হয়ে ওঠে এক প্রগাঢ় দার্শনিক, তার পায়ের তলায় পড়ে থাকে টাকা আর সম্পদ আর নারী। দস্তয়েভ্স্কির ‘ইডিয়ট’। বা, আফ্রিকা থেকে জাহাজের খোলে ভরে যাদের নিয়ে আসা হয়েছিল উত্তর আমেরিকায় শিল্পশ্রমিক হিসেবে তাদেরই বংশধর এখন এই বিশ-একুশ শতকে প্রশ্ন তুলছে তার দেশপরিচয় ও বংশ পরিচয় নিয়ে। টনি মরিসন-এর ‘বিলাভেড’। অসউইৎস-এ যে বন্দী ছিল তখন এক লেখক বেঁচে ফের প্রশ্ন তুলছে সে কি জীবনে ফিরল। কার্টেজ-এর ‘রিকুইম ফর অ্যান আনবোর্ন চাইল্ড’। বাংলা পশ্চিম আর পুবে ভাগ হয়ে যাওয়ার পর এক ব্যক্তি তার পশ্চিম থেকে পুবে চলে যাওয়ার পথ বাইছে। পথের দুটি স্তর। স্বচ্ছ বরফের ওপর দিয়ে দেখা যায় তলার কাল পথ। শুধু পথবাহন। একই পদ-থেকে দুটো পথ। মাহমুদুল হক-এর ‘কালো বরফ’। এক বুড়ো মাঝি ফিরছে সমুদ্রে তার ডিঙিতে হাঙরের সঙ্গে যুদ্ধ সেরে। হাঙর, রক্ত, মৃত্যু ও মুক্তি। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দি ওল্ড ম্যান এ্যান্ড দি সি’।

এই সবই কি ব্যক্তির গল্প? ব্যক্তির আত্মসন্ধানের বা আত্মধ্বংসের? সব উপন্যাসের গল্পই কি ব্যক্তির উত্থানের সোপান বা ব্যক্তির ধ্বংসের এক ধ্বস্ত প্রাকার? সেই কথাই কি বলছেন পাশ্চত্যে বুর্জোয়া উত্থানের মহত্তম দার্শনিক হেগেল ও হেগেল থেকে মার্ক্সবাদে উত্তীর্ণ গেয়র্গ লুকাচ?

দুই

উপন্যাসের এই লিস্টটাতে যেন একটু তাৎক্ষণিকতা আছে, লিখতে লিখতে যেমন মনে আসছে উপন্যাসগুলোর উল্লেখ করে যাচ্ছি। কথাটা অর্ধেক ঠিক। আমি কোনো লিস্ট তৈরি করে নিজেকে বাঁধতে চাই নি। তেমনি আবার একটা বিশৃঙ্খল লিস্টি তৈরি করে নিজেকে সেই লিস্টিতেও বাঁধতে চাই নি এই সূত্রটা পরীক্ষা করতে যে সমাজে ব্যক্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারণে ও নভেল সেই কার্যকারণের শিল্পরূপ। মানুষের জীবনযাপনের উপাদানগুলিই তার ভাবজীবনের ভিত্তি এই সত্যটি এতই জটিল যে সত্যটিকে বুঝে নেয়ার বা তথ্যগুলিকে সত্যের অনুকূলে সাজানোর তড়িঘড়ি দরকারে মানুষের ভাবজীবন ও জীবনযাপনের ভিতরকার পারস্পরিক নির্ভরতাকে একটা চৌকো খোপের ওপর আর-একট চৌকো খোপ বসিয়ে দেয়ার মত ছেলেমানুষি খেলা, বা একটা ত্রিভুজাকৃতি তৈরি করার মত জ্যামিতিক খেলায়, মেতে ওঠাটাকেই একটা তত্ত্বজিজ্ঞাসা মনে করা হয়।

এই লিস্টটাতে ১৭২২ সালে লেখা ‘মল ফ্লান্ডার্স’ আছে। তখন উপন্যাস সবে মাত্র তৈরি হচ্ছে। যাঁরা এটা লিখছেন তারাও জানেন না যে একটা নতুন শিল্পরূপের জন্ম দিচ্ছেন তারা। ‘মল ফ্ল্যান্ডার্স’ সত্যিকারের অনেকগুলি মেয়ের একটি ঔপন্যাসিক চরিত্র, বানানো ও বানানো নয়। সে ব্রিটেন ও তার নতুন কলোনিগুলির ভিতর একটি সেতু বা সম্বন্ধ হয়ে উঠেছে। সে নিশ্চয়ই ব্রিটেনের তখনকার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে নিজেকে পকেটমার, চোর ও বেশ্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল ও তার মত মানুষজনের জীবনযাপন ব্রিটেনের নতুন সামাজিক জীবনের পক্ষে কলঙ্ক হয়ে উঠতে পারে ভেবেই তাকে ব্রিটেনের নতুন কলোনি আমেরিকাতে নির্বাসনে পাঠানো হল। কলোনির অপরাধ-প্রধান মুক্ত পরিবেশে ‘মল ফ্ল্যান্ডার্স’ বেশ প্রতিষ্ঠিত হতে পারল। শেষ পর্যন্ত সে এতটাই ভদ্রলোক হয়ে উঠল যে খ্রিস্টধর্মের রীতি অনুযায়ী অনুতাপ পর্যন্ত করে ফেলল। ‘মল ফ্ল্যান্ডার্স’-এর ব্যক্তিত্ব বিকশিত হয়ে উঠল কি সেই তখনই, যখন সে তার একান্ত ব্যক্তিত্বশীল পেশা ও পেশান্তরের জোরে আহৃত কিছুটা টাকাপয়সা ও কিছুটা আইন মোতাবেক শাস্তিসহ পুরনো স্বীকৃত খ্রিস্টান ভদ্রলোক সমাজের যোগ্য হয়ে উঠল?

গোগোলের ‘ডেড সোল্স’-এর চিচিকভ, বালজাকের ‘গাধার চামড়ার’ নায়ক, বাংলার ‘আলালের ঘরের দুলাল’-এর ঠকচাচা কিন্তু একই রকম মানুষ। এই তিনজন, মল ফ্ল্যান্ডার্সসহ নভেলের অনিবার্য চরিত্র হয়ে উঠেছে। এরা কেউই নিশ্চয়ই নতুন শিল্পরূপ নভেলের সেই প্রতিনিধি-পুরুষ বা নায়ক নয়, এবং এরা তো সামাজিকভাবে পরিত্যক্ত পুরুষ।

তেমনি এর বিপরীতে এই লিস্টে শিল্পরূপ হিসেবে নভেলের কিছু প্রবল চরিত্রের উল্লেখও আছে। দস্তয়েভ্স্কি-র প্রিন্স, তলস্তয়-এর ‘আনা কারেনিনা’, রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের প্রবল ব্যক্তি। এমন চরিত্রগুলিই নভেলকে করে তুলেছে ব্যক্তির জীবনী, জীবনের মূল্যেও ব্যক্তিত্বের প্রতিষ্ঠার কাহিনী।

কিন্তু একই সঙ্গে আছে টনি মরিসন, কার্টেজার, মাহমুদুল হকের উপন্যাসের চরিত্রগুলির কথা। সে চরিত্রগুলি একেবারেই একা একা এমন জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে, যে-জীবন একান্তভাবে তারই জীবন। সে-জীবনের কোনো শরিক হয় না। পশ্চিমবঙ্গের একজন মুসলমান, আফ্রিকার এক নারী ও হিটলারের বৃহত্তর জার্মানির এক কিশোরের পক্ষেই মাত্র সে-জীবনগুলি সত্য হতে পারে। মরিসন, মাহমুদুল হক ও কার্টেজার যখন উপন্যাস লিখছেন তখন তাঁরা সেই চরিত্রগুলির ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাচ্ছেন না। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের সমানুভূতি তৈরি করে সহৃদয়হৃদয়সংবেদী হওয়া ঐ উপন্যাসগুলির ঔপন্যাসিক প্রকল্পই নয়। এই পরিস্থিতি এখন উপন্যাস-সম্পর্কিত তত্ত্বচিন্তার অনিবার্য বিষয় হয়ে ওঠা প্রয়োজন। ধনতন্ত্র যে সা¤্রাজ্যতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়ে শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের আকার নিল, ও ক্ষমতাবিস্তারের জন্য এমন সব পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াকে রাষ্ট্রায়ত্ত করে ফেলল, ও কোনো এক স্তর পর্যন্ত সেই পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াকে গণতন্ত্রেরও সমার্থক করে তুলল, সা¤্রাজ্যবিস্তারের সেই দু-তিনশ বছরের ইতিহাসে উপনিবেশের মানুষজনকে অধস্তন স্তরের জীব হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই কয়েক বছর আগেও দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের কোনো মানবিক অধিকার ছিল না, নাগরিক অধিকার তো দূরস্থান। ঢাকার তাঁতিদের বুড়ো আঙুল কেটে দেয়া বা পশ্চিম আফ্রিকার দাসদের হাতের তেলো ফুটো করে জাহাজের খোলে ভরে আমেরিকার শিল্পশ্রমিক করে নিয়ে আসা অমানবিকতায় নাৎসিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের চাইতে কম কোনো অপরাধ নয়।

টনি মরিসন যখন অ্যাফ্রো-আমেরিকান অতীত নিয়ে বা কার্টেজার যখন অস্উইথস্-এর কনসেনট্রেশন ক্যাম্প নিয়ে বা বাংলাদেশের অনেক ঔপন্যাসিক যখন পাকিস্তান-সেনাবাহিনীর ন-মাসের বর্বরতা নিয়ে উপন্যাস লেখেন, তখন সেগুলি ব্যক্তির কাহিনী হয় না, ব্যক্তির বিকাশের বা ধ্বংসের কাহিনী থাকে না, তখন সেগুলি হয়ে ওঠে ব্যক্তিত্ববিনাশী এক সিস্টেমের সশস্ত্র আক্রমণের কাহিনী। ও সিস্টেমের বিজয়গাথা।

তখন ধনতন্ত্র ও উপন্যাসের বিকাশ নিয়ে বুর্জোয়া তাত্ত্বিক ও মার্ক্সবাদীদের এমন অনুমান আর মেনে নেয়া যায় না যে

These hypotheses concern, on the one hand, the homology between the structure of the classical novel and the structure of exchange in the liberal economy, and on the other hand certain parallels in their later evolutions.

তিন

গেয়র্গ লুকাচ, লুসিয়েঁ গোল্ডমান, এঁরা, খুবই শ্রদ্ধেয় মার্ক্সবাদী তত্ত্ববিদ- তাঁরা উপন্যাসের সমাজতত্ত্ব ও শিল্পতত্ত্ব নিয়ে আমাদের ধ্যানধারণার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁদের উপন্যাস সংক্রান্ত সমস্ত তাত্ত্বিক ধারণাই তৈরি হয়েছে ইয়োরোপীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। উপন্যাস সম্পর্কে ইয়োরোপেই সবচেয়ে বেশি তত্ত্ব তৈরি হয়েছে, সে-সব কোনো তত্ত্বচিন্তাকেই এমন কী উত্তর আমেরিকার উপন্যাসগুলিকেও তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয় না, কখনো-সখনো ব্যতিক্রম হিসেবে ফকনারকে বুুড়িছোঁয়া করে রাখা হয় মাত্র। উত্তর আমেরিকারই যদি এই হাল, তাহলে বিরাট পৃথিবীর বাকি সব মহাদেশের অন্তর্গত অজ¯্র দেশের অজ¯্র ভাষায় যে-লক্ষ লক্ষ উপন্যাস লেখা হয়েছে ও হচ্ছে সে-সব উপন্যাস ইয়োরোপীয় নভেলতত্ত্বের আওতার মধ্যে, আসেই না। অথচ পৃথিবীর উপন্যাস-সাহিত্যবিচারের একমাত্র নিরিখ ইয়োরোপীয় নভেলতত্ত্ব। সে-নভেলতত্ত্বে আবার বুর্জোয়া বিকাশের তত্ত্ববিদ আর মার্ক্সবাদী তত্ত্ববিদরা একমত। ইয়োরোপের বিভিন্ন ভাষায় কলোনিবিস্তারী ধনতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবন যেমন উপন্যাসের বিষয় হয়ে ওঠে, তেমনি উপনিবেশের বৃহত্তর পৃথিবীর নানা ভাষার নানা স্তরের উপনিবেশিত সমাজ, ও নানা বিচিত্র পদ্ধতিতে শোষিত মানুষজনও উপন্যাসের বিষয় হতে পারে। ইয়োরোপীয় নভেলতত্ত্ব অনুযায়ী তারা দুজনই হিরো বা নায়ক। এই দুজনের একজন যে প্রভু ও আরেকজন যে তার প্রভুত্বের শিকার এই বৈপরীত্যের কোনো স্বীকৃতি ইয়োরোপীয় নভেলতত্ত্বে নেই। ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি, যার আর-এক নাম উদার-অর্থনীতি, তার বিকাশের নানা স্তরের সঙ্গে নভেলের বিকাশের নানা ধরনের যে মিল লুসিয়েঁ গোল্ডমান অনুমানের আকারে উপস্থিত করেছেন, সেটা প্রত্যাখ্যানের সময় পেরিয়ে গেছে।

উপন্যাসের শিল্পতত্ত্বও তো নন্দনতত্ত্বেরই অন্তর্গত। উপন্যাসের শিল্পতত্ত্বের এই পশ্চিম ইয়োরোপীয় আধিপত্যবাদ তৈরি হয়েছে বুর্জোয়া বিপ্লবের মহত্তম দার্শনিক হেগেল-এর নেতৃত্বে।

হেগেল-এর মৃত্যুর পর প্রকাশিত তাঁর ‘লেকচার্স অন এসথেটিক্স’ (১৮১৮)-এ তিনি গ্রাহ্য শিল্পপ্রকরণগুলির একটি তালিকা দিয়েছিলেন। হেগেল এই বক্তৃতাগুলিতে বিষয় ও আঙ্গিকের ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেছিলেন এই ঐক্য কখনো ভাঙতে পারে না, সৌন্দর্যের একটা কুৎসিত ধারণাই সৌন্দর্যের একটা কুৎসিত আকার তৈরি করতে পারে। হেগেল বলেছিলেন, ‘বিষয়টিই আকার।’ আরো বলেছিলেন, ‘বিষয়ের দোষ থেকেই আকারের দোষ ঘটে।’ এই খারাপ বিষয় ও খারাপ আকারের উদাহরণ দিতে গিয়ে হেগেল বলেছিলেন, ‘চিনের লোকরা, ভারতীয়রা, ইজিপ্টের লোকজন কখনো যথাযথ সৌন্দর্য আঁকতে পারেনি। তারা আমাদের দেবদেবীর যে-সব ছবি ও মূর্তি তৈরি করেছে, সেগুলো হয় আকারহীন অথবা আকারের এক মিথ্যা ও ভয়ঙ্কর চেহারা।’

হেগেল যখন এই তত্ত্ব তৈরি করেছিলেন, তখন কলকাতার ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’র বয়স ৫০ পেরিয়ে গেছে ও যে-সব সাহেবপ-িতদের আমরা পরবর্তী কালে ‘অরিয়েন্টালিস্ট’ বলব, তাঁরা ইয়োরোপে ভারতীয় ও ইজিপ্টীয় স্থাপত্য, দেয়ালচিত্র, ভাস্কর্য, চিনের বস্ত্রশিল্প, ইজিপ্টের সমাধিশিল্প এই সব কিছুর নিদর্শন দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন।

হেগেল-এর নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক বক্তৃতাগুলি থেকে বোঝা যায় তিনি সে-সব খবরই জানতেন না। নাই জানতে পারেন। কিন্তু তথ্য সম্পর্কে তাঁর স্পর্শকতারতার যে-সব গল্পকথা আমরা শুনেছি পরে, সে-সব আজগুবি ঠেকে ও তাঁর তত্ত্ব অর্থনির্ভর নয় এটাই প্রমাণিত হয়।

১৮১৮-তে প্রকাশিত তাঁর ‘নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক বক্তৃতা’য় হেগেল শিল্পপ্রকরণের যে-তালিকা দিয়েছিলেন, তাতে নভেল ছিল না। অথচ ততদিনে সারভেন্তেস-এর ‘ডন কুইকজোট’ বই-আকারেই ২১৩ বছরের পুরনো, র‌্যাবলে-র ‘গারগানটুয়া’-রও একশ বছর পার হচ্ছে। লেরমনতোভ’এর নায়ক ককেশাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুশকিন-এর ফেরার মাস্তানরা মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবুর্গ-এর বড়লোকদের বৈঠকখানায় ঢুকে পড়েছে, গোগোলের মরা দাসরা নভেলের লোক হয়ে যাচ্ছে ও মধ্যরাতে শহরের কালভার্ট পেরচ্ছে যারা তাদের কাঁধ থেকে কেরানির ভূতগুলো শুধুই ওভারকোটগুলো খুলে নিচ্ছে।

ইয়োরোপেই যে গল্প-উপন্যাস লেখা হচ্ছে হেগেল তারও খরব রাখতেন না। নাই রাখতে পারেন। কিন্তু তিনি তো বুঝতেই পারেননি ‘নভেল’ বা ‘গল্প’ বলে একটা সম্পূর্ণ নতুন শিল্পপ্রকরণ তৈরি হয়ে উঠছে। যাকে তিনি কুৎসিত বিষয় বলেছেন সেই চুরি, জোচ্চুরি, মেয়েবাজি, কেরানিগিরি, মাস্তানি শিল্পের বিষয় হয়ে উঠছে। বুর্জোয়া বিপ্লবের তাত্ত্বিক গুরু নতুন সমাজের ওপর এক গ্রিস-সমতুল্য এরোস-এথোস-এর নিরিখ আরোপ করছিলেন। তত দিনে সেই সব গ্রিক আদর্শ তো লোপাট হয়ে গেছে। আধুনিক শিল্পপ্রকরণ তৈরি হয়ে উঠেছে ও উঠবে নভেল, খবরের কাগজ, সিনেমা, স্টেডিয়ামে খেলা ও নাটক, ইলেকট্রিক আলো, ধীরে-ধীরে নতুন সব শিল্পপ্রকরণের জন্ম দিচ্ছে। বার্লিন অলিম্পিকেই প্রথম হিটলার মাটি থেকে উৎক্ষিপ্ত সার্চলাইটের কলায় সাজিয়ে দুনিয়াকে ভড়কে দিয়েছিলেন। শিল্পের নিভৃত ব্যক্তিচর্চা বদলে যাচ্ছে পরিবর্তিত টেকনোলজির সঙ্গে-সঙ্গে। ছাপাখানায় বই ছাপা হচ্ছে হাজার হাজার কপি। নভেলই হচ্ছে সেই আধুনিক শিল্পের প্রথম নিদর্শন। ইয়োরোপীয় নন্দনতত্ত্ব নভেলের হদিশ করতে পারে নি।

চার

কথাটা আচমকা শুনতে একটু ধাক্কা লাগতে পারে। আমাদের সাহিত্যের ইতিহাস প্রধানত ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের কাঠামোতেই যে-ভাবে তৈরি হয়েছে, যাতে এমন ধারণা তো আমাদের ভিতর বদ্ধমূল, যে ইংরেজদের কাছ থেকেই আমরা নভেল লেখা শিখেছি ও সাহেবদের লেখাপত্র পড়ে-পড়েই আমরা চিরকাল জেনে আসছি নতুন ব্যক্তিপ্রধান সমাজের শিল্পপ্রকরণ হয়েই নভেল তৈরি হয়েছে, বাংলা নভেলও।

বাংলা নভেল লেখা শুরু হওয়ার প্রক্রিয়াটা আমরা পরে আলোচনা করব কিন্তু আপাতত আমাদের আরো কিছু সাক্ষ্য হাজির করতে হবে এই প্রাথমিক প্রতিপাদ্যের পক্ষে যে ইয়োরোপ উপন্যাস যখন লেখা হচ্ছিল তখন ইয়োরোপ উপন্যাসের শিল্পপ্রকরণ বুঝে উঠতে পারে নি।

হেগেল-এর পর গেয়র্গ লুকাচ-এর একটা দৃষ্টান্ত নেয়া যাক কারণ লুকাচ আমাদের উপন্যাস সম্পর্কিত অনেক ধ্যান-ধ্যারণার আদিপুরুষ।

১৯২০-এ লুকাচের ‘দি থিয়রি অভ দি নভেল’ বইটি বেরোয়। তার আগে ১৯১৪ ও ১৯১৬-তে লেখাটি পত্র-পত্রিকায় বেরিয়েছে। ১৯৬২-র জুলাইয়ে বইটির নতুন সংস্করণের ভূমিকায় গেয়র্গ লুকাচ বইটি লেখার ইতিহাস, তৎকালীন মার্ক্সবাদী ও কিছু অমার্ক্সবাদীর ওপর এই বইটির প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ও বইটির পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। সেই ভূমিকার দুই-একটি জায়গা এখনো প্রাসঙ্গিক। যেমন, লুকাচ বলছেন, ‘দি থিয়রি অব দি নভেল’ বইটির সাধারণ পদ্ধতিগত আদর্শ হেগেল। নান্দনিক ও দার্শনিক দিক থেকে হেগেল-এর সঙ্গে বইটির কোনো বিরোধিতা নেই। যেটুকু বিরোধিতা তা শুধুই সামাজিক। আর-এক জায়গায় লুকাচ বলছেন, ‘আমি যদ্দুর বুঝি তাতে বলতে পারি, দি থিয়রি প্রথম জার্মান বই যেখানে সামগ্রিক বিপ্লবমুখী বামপন্থী নীতি ও ন্যায়ের সঙ্গে বাস্তবের ঐতিহ্যসম্মত ও প্রচলিত ভাষ্য মেলানো হয়েছে।’

লুকাচের এই ধারণাটি যথার্থ। এই বইয়ের তাই দুটি ভাগ। প্রথম ভাগ ‘তৎকালীন সভ্যতা সঙ্গতিপূর্ণ না সংকটপূর্ণ সেই প্রশ্নের মীমাংসায় মহান এপিক সাহিত্যের বিভিন্ন প্রকার।’ দ্বিতীয় ভাগ ‘নভেলের প্রকরণের চরিত্র সন্ধান।’ প্রথম ভাগে গ্রিস, খ্রিস্টান ধর্ম, বিভিন্ন সাহিত্যপ্রকারের সমস্যা, এপিক ও নভেল, নভেলের ভিতরের গঠন, নভেলের ঐতিহাসিক-দার্শনিক আবহ, এই পাঁচটি পরিচ্ছেদ। দ্বিতীয় ভাগে, বিমূর্ত আদর্শবাদ, রোম্যান্টিসিজমের স্বপ্নভঙ্গ, গ্যেটের উইলহেলম মেইস্টারস-এর শিক্ষানবিশিপর্ব, তলস্তয় ও সমাজসংগঠনের বহির্মুখ— এই চারটি পরিচ্ছেদ। পৃষ্ঠার দিক থেকে প্রথম ভাগটি দ্বিতীয় ভাগের দেড়া। তাতে বোঝা যায়, নভেলের সঙ্গে প্রাচীন সাহিত্যের, প্রধানত এপিকের সংযোগসূত্র তৈরি করতে লুকাচ প্রাচীন সাহিত্যের পুনর্পাঠে বা পুনর্গঠনে যত্মশীল, আর সেই অভিজ্ঞতাতেই দ্বিতীয় ভাগে ডন কুইকজোট, বালজাক, গোলচারভ, ফ্লবেয়ার, গ্যেটে, তলস্তয়, দস্তয়েভ্স্কিকে সংযুত করেছেন।

লুকাচ-এর এই চেষ্টা সাহিত্যের ইতিহাসের ইতিহাসে পথিকৃতের কাজ। এই বইটির প্রায় পনের-বিশ বছর পর মিখাইল বাখতিন প্রধানত দস্তয়েভ্স্কি প্রসঙ্গে উপন্যাসের নতুন দায়িত্বকে মিনান্মিয়ান ট্র্যাজেডির মত প্রাচীন সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। যদিও বাখতিন-এর সে-সব লেখা পুনরুদ্ধার করতে অন্তত আরো বছর তিরিশ কেটে গিয়েছিল।

লুকাচ তাঁর এই কাজের যে-বৈশিষ্ট্য ৪২-বছর পরের সংস্করণে উল্লেখ করেছিলেন, সামগ্রিক বিপ্লবমুখী বামপন্থী নীতি ও ন্যায়ের সঙ্গে বাস্তবের ঐতিহ্যসম্মত ও প্রচলিত ভাষ্য-এর ভিতর সংযোগ তৈরি আর বাখতিন স্তালিনের আদর্শবাদী স্বৈরাচারের এক বিপরীত ভাষ্য যে-খুঁজছিলেন র‌্যাবলে ও দস্তয়েভ্স্কির রচনায় এই দুইয়ের ভিতরও মিল যথেষ্ট। মিল হয়তো আরো একটু বেশি। ১৯২৩-এ লুকাচ, কারো-কারো মতে তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ, ‘হিস্টরি অ্যান্ড ক্লাসকনসাসনেস’ বের করেন। বেরবার পরপরই এল রুদাস, ও এ. ডেরোরিন বইটির একটি মারাত্মক সমালোচনা করেন। লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিন তখন পার্টির ওপর তাঁর সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছেন কিন্তু তখনো সেই আধিপত্য সর্বস্বীকৃত হয় নি। ১৯২৫-২৬ নাগাদ লুকাচ ঐ স্তালিনীয় সমালোচনার উত্তরে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সে প্রবন্ধ কোথাও ছাপা হয় না ও লুকাচ তাঁর অসংখ্য মুখোমুখি কথাবার্তায় কখনো একবারের জন্যও এই লেখাটির উল্লেখ করেন নি। পেরেস্ত্রোইকা-র পর সোভিয়েত ইউনিয়নের অভিলেখ্যাগারের নথিপত্র সারা দুনিয়ার সামনে খুলে দেয়া হলে এই লেখাটি পাওয়া যায়। ২০০২ সালে লেখাটির ইংরেজি অনুবাদ ‘ভের্সো’ কর্তৃক প্রকাশিত হয়।

মার্ক্সবাদী চিন্তা, মননবিশ্বের দ্বান্দিক সংঘাত ও সৃষ্টিশীল সাহিত্যের বিশেষ রকম ব্যাখ্যা এই সব কিছুই যে একটি সূত্রে গেঁথে ফেলার চেষ্টা চলছিল বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পরের দশকেও, তার এক ও একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সমাজতন্ত্রে উত্তরণের অবধারিত পথ সম্পর্কে নিশ্চয়তায় পৌঁছুনো।

সেই কারণেই লুকাচ ও বাখতিনের মত মনীষীদের এমন প্রয়াস পৃথিবীর প্রাচীন সাহিত্যকে তার আধুনিক রূপান্তরের সঙ্গে গ্রথিত করে দেয়া। আমরা যখন বিশেষ করে সময়টার কথা মনে রাখি, মোটামুটি বিশ শতকের প্রথম তিনটি দশক, তখন তো বিস্মিত না-হয়ে কোনো পথ থাকে না যে লুকাচ ও বাখতিন, তাদের মত প-িত সূত্রকাররা প্রাচীন সাহিত্যের সঙ্গে আধুনিক উপন্যাসের সম্বন্ধ বিচারে একবারের জন্যও এমন প্রাচীন এপিকে পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ ভারতের রামায়ণ-মহাভারত পুরানসাহিত্য-জাতককাহিনীর নামোল্লেখ পর্যন্ত করেন না। পশ্চিম এশিয়ার ইসলাম অধ্যুষিত দেশগুলিতে ইসলামি ও প্রাগিসলামি ঐহিক সাহিত্য, আরব্য উপন্যাস, সিন্দাবাদের কাহিনী ইত্যাদি দ্বারা ইয়োরোপের উপন্যাস সাহিত্যের প্রভাবিত হওয়ার বিষয়টিও তোলেন না। ও এই ১৯২০ বা ১৯৪০ নাগাদ ভারত-উপনিবেশে উপন্যাস-সাহিত্যের যে নতুন বিস্ময়কর অভ্যুদয় ঘটেছে, তাকে বিশ্ব-সংস্কৃতির ইতিহাসের দ্বান্দ্বিকতার এক সম্পূর্ণ নতুন উদাহরণ হিসেবেও পাঠ করেন না। অথচ ১৯২০-নাগাদ তো লেনিন প্রাচ্যদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনকে বিশ্ববিপ্লবের অন্তরঙ্গ উপাদান হিসেবে স্পষ্ট চিহ্নিত করেন। আজ যখন ‘তুলনামূলক সাহিত্য’ একটা বিশিষ্ট বিষয় হিসেবে সারা পৃথিবীর বিদ্যাচর্চাতেই স্বীকৃত, তখন তো চোখের সামনে দেখতে পাই ১৯১০ সালে ১৯৪০-এর মধ্যে ভারতের বিভিন্ন ভাষায়, বিশেষ করে ছোটগল্প ও উপন্যাস, এমন লেখা হচ্ছে যে-তৎকালীন বিশ্বের যে-কোনো দেশের তুলনায় সেগুলি বিশ্বসাহিত্যের অংশ ও উপন্যাসের কোনো-কোনো গড়ন ইয়োরোপের কোনো ভাষার আগে ভারতের কোনো ভাষায়, বিশেষ করে বাংলায়, তৈরি হয়ে উঠেছে। ছোটগল্পের আকার রুশ ও ফরাসি ভাষার সঙ্গে-সঙ্গে বাংলাতেই প্রথম স্থিরীকৃত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের হাতে উনিশ শতকের শেষ দশকে।

এই একপেশে বিচারের একটা উদাহরণ দিলে হয়তো স্পষ্ট হবে, কোন্ কথাটার ওপর জোর দিতে চাই।

লুকাচ রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসটির একটা খুব ছোট, খুবই ছোট, আলোচনা করেছিলেন। লুকাচ বলেছিলেন, এটা রবীন্দ্রনাথের ‘এ গান্ধী নভেল।’ লুকাচ উপন্যাসটির গল্পটিও বুঝতে পারেন নি, একজন সাধারণ পাঠকও গল্পের ঘটনা যেমন পরপর পড়ে যান, তেমন ওপর-ওপরও উপন্যাসটি পড়েন নি তিনি। সেটা ধরা পড়ে যায় তিনি গল্পটির টুকরো টুকরো যে-বিবরণ দিয়েছেন তা থেকে।

‘ঘরে বাইরে’ লেখা হয়েছে প্রথম মহাযুদ্ধর বছরগুলিতে প্রথমে কাগজে ধারাবাহিক বেরোয়, পরে বই হয়ে (১৯১৬)। ১৯১৯ নাগাদই এর ইংরেজি অনুবাদ ঐড়সব ধহফ অনৎড়ধফ বেরিয়ে যায়।

‘ঘরে বাইরে’র রচনাকালে গান্ধীজি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এসেছেন বটে কিন্তু ভারতে রাজনীতিতে তখনো গান্ধীযুগ শুরু হয়নি। গান্ধীজি ছোটখাটো দু-চারটে আন্দোলনে তাঁর আন্দোলন ও সত্যাগ্রহ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন বটে কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক তত্ত্ব ও আদর্শ তখনো প্রতিষ্ঠিত হয় নি। ‘ঘরে বাইরে’-তে যে বিদেশী দ্রব্য বয়কটের কথা বলা হয়েছে সেটা ১৯০৫ থেকে ১৯০৮-এর স্বদেশী যুগের ঘটনা। অথচ লুকাচ এটাকে গান্ধীজির বিদেশী পণ্যবর্জনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন।

গুলিয়ে না-হয় ফেললেন কিন্তু সেটাই হয়ে দাঁড়াল বইটির সাহিত্যমূল্য নির্ধারণের প্রধান নিরিখ। লুকাচ এতদূর পর্যন্ত গেলেন যে ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনে ব্রিটিশ-পুলিশের স্তাবকতা করেছেন রবীন্দ্রনাথ এমন কথাও লিখলেন।

আমি জানি লুকাচ সম্পর্কে আমরা এতটাই সশ্রদ্ধ যে তাঁর সম্পর্কে এই কথাগুলি ঠিক কী না, অনেকে এমন সন্দেহ করতে পারেন। সেই কারণে, এই নিবন্ধের সঙ্গে লুকাচের মূল লেখার ইংরেজি অনুবাদের কপিটি সংযোজন হিসেবে জুড়ে দিলাম।

ইয়োরোপে ফ্যাসিবাদের প্রাথমিক সূত্রপাত থেকে সেখানকার যে-সমস্ত উপন্যাসে গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ নিয়ে আলোচনা ঘটেছে, লুকাচ তাঁর উপন্যাস সম্পর্কিত রচনাগুলিতে সেই উপন্যাসগুলির বিশেষ উল্লেখ করেছেন ও এই বিচারেই টমাস মান-এর মাহাত্ম্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন, অথচ ‘ঘরে বাইরে’ জুড়ে জাতীয় মুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে যে তর্কবিতর্ক, তা তিনি পড়লেনই না।

পাঁচ

ঐ প্রবন্ধে অপর প্রতিপাদ্য ছিল, উপন্যাসের শিল্পকর্ম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে ইয়োরোপের, তাত্ত্বিক চিন্তা অসম্পূর্ণ ও উপন্যাস শিল্পের পৃথিবীব্যাপী অনুশীলনের যথাযোগ্য তত্ত্ব নয়। আমি এও বলেছি, উপন্যাসকে বুর্জোয়াপর্বের বা ধনতন্ত্রিক যুগের শিল্পরূপ বলে বর্ণনা করাও অনৈতিহাসিক। আমার যুক্তিবিন্যাসে এমন কথারও আভাস আছে যে, উপন্যাস ব্যক্তির বিকাশের বা বিকাশের সংকটের কাহিনী নয়, অনেক সময়ই সামাজিক বিকাশ ও সংকটের কাহিনী, অনেক সময়ই সিস্টেমের সংকটকথা।

এগুলো সবই এতকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত উপন্যাস সম্পর্কিত ধারণার বিপরীত নেতিবাচক কথা। উপন্যাসের সংজ্ঞা ও স্বভাব সম্পর্কে আমার ধারণা কী, এর প্রমাণ দেয়ার দায়-দায়িত্ব যদিও আমার ওপর বর্তায় না, তবু সে বিষয়ে আমার কিছু অনুমান না থাকলে পাশ্চাত্যের উপন্যাসতত্ত্ব অস্বীকারের কথা আমার মাথায় আসত না।

এই সিদ্ধান্তগুলিতে আমি পৌঁছেছি আমার কাজের মধ্য দিয়ে ও কাজের প্রগতির প্রয়োজনে। প্রায় ষাট বছর ধরে গল্প-উপন্যাস লিখছি। সেই অব্যাহত চর্চার মধ্যে দিয়ে এমন অনুভবে পৌঁছেছি বারবার যে বাংলা উপন্যাসের সৃষ্টি বাংলা লেখকের নিজস্ব তাড়নায়, ও শিল্প-আকাক্সক্ষায়। কোনো ক্রমেই ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষায় লেখা কাহিনীর অনুকরণ থেকে নয়।

এমন কি কখনো-কখনো কোনো ইয়োরোপীয় ঔপন্যাসিক বা ইয়োরোপীয় কোনো উপন্যাস যদি কোনো বাংলা লেখককে প্রভাবিত করেও থাকে তবে সেই বিশেষ রচনার মধ্যেই তিনি সেই প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছেন তাঁর স্বাধীন ও স্বয়ম্ভর সৃষ্টিশক্তি ও বাংলা সাহিত্যের অন্তর্নিহিত প্রবল গতিময়তার জোরে। ১৮৫৮ ও ১৮৬১-১৮৬২-তে যথাক্রমে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ ও ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ থেকে এই আমাদের এখনকার সময় পর্যন্ত কিঞ্চিদধিক দেড়শ বছর ধরে বাংলা উপন্যাস লেখা হয়ে আসছে স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সাহিত্য হিসেবে। কী সূচনাপর্বে, কী আধুনিকপর্বে বাংলা উপন্যাস নিজের এমন ইতিহাস তৈরি করে তুলেছে যা পৃথিবীর যে-কোনো ভাষার সাহিত্যের ইতিহাসের উপন্যাসকীর্তির সমতুল্য। বিশেষ করে এখন, যখন এই কথাগুলি ভাবছি, বাংলাদেশের গত তিরিশ-পঁয়তিরিশ বছরে লেখা কিছু উপন্যাসে-উপন্যাসশিল্পে বাংলা লেখকদের অভীপ্সা ও সামর্থ্যের এমন প্রমাণ আমরা পেয়েছি, যাতে এ-কথা দায়িত্ব নিয়ে ভাবাও যায়, বলাও যায়, ভাবা উচিত ও বলা উচিত যে বাংলাদেশের লেখকরাই এখন দুনিয়ার সেরা উপন্যাসগুলি লিখছেন। এ-কথা আমি অন্যত্র সবিস্তার বলেছি। এখানে লেখক ধরে-ধরে ও বই ধরে-ধরে সে-আলোচনায় যাচ্ছি না, প্রধানত তাত্ত্বিক এই প্রবন্ধের গতি তাতে ব্যাহত হতে পারে। তবু প্রবন্ধের শুরুতেই উপন্যাসের সংজ্ঞা কত বিচিত্র হতে পারে তার যে একটা লিস্টি তৈরি করা হয়েছিল, তাতে কিছু বাংলা উপন্যাসের উল্লেখ অকারণ ছিল না ও আরো অনেক বাংলা উপন্যাস অনুল্লেখিত ছিল, বলাই বাহুল্য।

কিন্তু সাহিত্য বা অন্য যে-কোনো শিল্পের প্রসঙ্গে মৌলিক তত্ত্বভাবনা ছাড়া কোনো মৌলিক শিল্প তৈরি হতে পারে না। শিল্পতত্ত্ব নিশ্চয়ই তাত্ত্বিকদেরই ক্ষেত্র নয়। কোনো শিল্পীই তাঁর রচনার তত্ত্বভিত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত না-হয়ে শিল্পসৃষ্টি করতে পারেন না। এমন হতেই পারে যে শিল্পী বা লেখক যুক্তিবিকাশের পদ্ধতি অনুযায়ী তাঁর তত্ত্ব তৈরি করে তুলতে চান না। এমনও হতে পারে যুক্তিবিন্যাসের অতিনির্দিষ্টতায় লেখার বা শিল্পের আড় বা রহস্য ভেঙে এড়িয়ে যান হয়তো। আবার, এও তো সত্য যে যত বড় দার্শনিক ও তাত্ত্বিকই হন, তিনি যখন শিল্পতত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন তখন তাঁর হাতে থাকে কতগুলি নির্দিষ্ট শিল্প, লেখা বা ছবি বা ভাস্কর্য বা সংগীত, আর তাঁর তত্ত্ব আমাদের নিয়ে আসে বারবার সেই তত্ত্বের অব্যবহিত শিল্পেরই কাছে।

ইয়োরোপীয় ভাষায় বাইরে শিল্পতত্বের এই চর্চা খুব একটা ঘটে নি, এমন কি আমেরিকাতেও নয়। ইয়োরো-আমেরিকার বাইরের দেশে তো প্রায় কিছুই ঘটে নি বলা যায়। ফলে সাহস করে একটু ঠাট্টা মিশিয়ে এমন কথা বলে ফেলা যায় যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে ইয়োরোপ একজিসটেনসিয়ালিজম, অ্যাবসার্ড, ডিকোডিফিকেশন, ডিকনস্ট্রাকশন, টেক্সচুয়ালিটি, পোস্ট-মডার্নিটি, ডেথ অব দি অথর, ম্যাজিক রিয়ালইজম ইত্যাদি ইত্যাদি নানা তত্ত্ব আবিষ্কার করে যাচ্ছে, আর তাতে আমাদের বোঝাবুঝির যে একটু-আধটু সুবিধে হচ্ছে না তাও নয়, কিন্তু ইয়োরোপ উপন্যাস ভাবতেও পারছে না, লিখতেও পারছে না। উপন্যাসের প্রধান কর্মশালার স্থানান্তর ঘটে গেছে লাতিন আমেরিকার কোনো-কোনো দেশে, পশ্চিম আফ্রিকায়, আরব দুনিয়ার, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে ও বাংলাদেশে।

ইয়োরোপ তত্ত্ব করে, আমরা লিখি, এমন আত্মসন্তুষ্টিতে নেশাগ্রস্ত হয়ে থাকলে উপন্যাসের ওপর এই কর্তৃত্ব এই সব দেশেরও থাকবে না। এটাই উপন্যাসের বর্তমান সংকট।

কথাটা এখানেই শেষ করে দেয়া যেত, যে-দেশগুলি আগে ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশের উপনিবেশ বা কলোনি ছিল, সেই দেশগুলিকে তাঁদের উপন্যাসের জন্য নতুন তত্ত্ব রচনা করতে হবে।

সেই নতুন তত্ত্ব ভাবা ও তৈরি করে তোলাও একটা নিরবধি লড়াই। সেই কথাটায় না-পৌঁছে আমার এই কথাটা শেষ করা যায় না।

১৯৬১ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দি রেচেড অব দি আর্থ’ বইটিতে ফ্রানজ ফ্যানন প্রথম বলেছিলেন, কলোনিগুলি থেকে পাশ্চাত্য মননজাত ও সৃষ্টিজাত সম্পদ লুট করেছে। কলোনিগুলি রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেও সেই লুটের সম্পত্তি বহাল আছে। ফ্যানন বলেছিলেন, কলোনিযুগ শেষ হয়ে গেলেও পাশ্চাত্য বা ইয়োরোপ কলোনিগুলির মনন ও সৃষ্টির ওপর দখল ঢিলে করে নি। কিন্তু তাঁর এই কথাগুলি বলতে গিয়ে ফ্যানন ‘উপনিবেশোত্তর’ বা পোস্ট-কলোনিয়্যাল পদটি ব্যবহার করেন নি।

এডোয়ার্ড সয়িদ-এর ‘অরিয়েন্টালিস্ট’ বইটি বেরয় ১৯৭৮-এ। তার পর থেকে তিনি যে-টুকরো লেখাগুলি লিখছিলেন ও লিখিত যে-বক্তৃতাগুলি লিখছিলেন সেগুলোর একটি সংকলন বেরয় ১৯৯৬-এ। বইটির নাম ‘কালচার অ্যান্ড ইমপিরিয়্যালইজম।’ আমি লক্ষ করেছি, সয়িদ তাঁর এই লেখাগুলিতে কোথাও ‘পোস্ট-কলোনিয়্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করেন নি।

কিন্তু তাঁদের মধ্যে ২০ বছর সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও ফ্যানন ও সয়িদ উপনিবেশের মানুষের ধন ও সংস্কৃতি নিয়ে নতুন চিন্তা উসকে দিলেন। এই নতুন চিন্তা কিন্তু ইতিহাস নিয়ে ফুকো-র, পাঠ্য নিয়ে দেরিদা-র ও ভাবতত্ত্ব নিয়ে দেল্যুজ-এর নতুন চিন্তার সমান্তরাল ছিল।

গত শতকের ৯০-এর দশকে কয়েকজন প-িত মানুষ, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভ্যাক, অমিভাবা, জ্ঞানপ্রকাশ প্রমুখ, কলোনি পরে লেখা সাহেবদের বইপত্র নতুন করে পড়ে বললেন কোনো সা¤্রাজ্যের কোনো লেখাই কলোনিগুলির প্রভু ও প্রজা কাঠামোর বাইরে যায় না।

এই প্রমাণের পর সাহেবদের হাস্যশোভন মিষ্টি দাঁত খেঁচিয়ে উঠল ও ওঁদের তৈরি পোস্ট-কলোনিয়ালিজম-এর ধারণা আক্রান্ত হল।

যাঁদের নাম উল্লেখ করলাম, তাঁরা ইংল্যান্ড-আমেরিকাতেই স্থায়ীভাবে থাকেন ও তাঁদের বিদ্যাচর্চার কাজ করেন। কিন্তু তাঁরা যখন পোস্ট-কলোনিয়্যাল বা উত্তর-উপনিবেশ ধারণাটা তৈরি করলেন ও ব্যবহার করলেন তখন আমেরিকার বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের আক্রমণ করে এমনও বললেন যে, তাঁরা এই সব নতুন কথা বলে তাঁদের চাকরি-বাকরির সুবিধে করতে চাইছেন। ‘প্রফেশন্যাল অ্যাকোমোডেশন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল। ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড কোয়াটারলি’র ১৭ খ-ের ২য় সংখ্যায় ১৯৯৬-এ জেসপার গস সবচেয়ে নোংরা আক্রমণ করেছিলেন। ১৯৯৪-এ শীতের ২০-তম সংখ্যার ‘ক্রিটিক্যাল এনকোয়্যারি’তে ‘পোস্ট-কলোনিয়্যাল অরা’ শিরোনামে আরিখ ডিরলিক একটি যুক্তিপূর্ণ প্রবন্ধ লেখেন।

এই সব বিপরীত আলোচনায়, প্রশ্নগুলি কী ছিল?

১.            উত্তর উপরিবেশ কোন সা¤্রাজ্যের অন্তর্ঘাত ঘটাচ্ছে?

২. এমন কোনো বাস্তব পরিস্থিতি কি নির্দিষ্ট করা যায় যেগুলিকে উত্তর-উপনিবেশের লক্ষণ বলে চিনে নেয়া যায়?

৩.           উত্তর-উপনিবেশ বলতে কি নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতি বোঝায় না কী সম্পূর্ণ আলাদা ও পৃথক কোনো অবস্থা বোঝায়?

৪.           উত্তর-উপনিবেশ বলতে বোঝায়টা কী? কলোনি পেরিয়ে? কলোনির ভিতরে? কলোনি থেকে আলাদা?

৫.           পোস্ট-কলোনিয়্যাল পদটির জোরটা কোন অংশের ওপর ‘পোস্ট’-এর ওপর না ‘কলোনিয়্যালিজম’-এর ওপর?

একে বলে সাহেব! আমেরিকার ইতিহাস সিলেবাসে ‘থার্ড প্যাসেজ’ পড়ানো হয় না। কারণ, ‘থার্ড প্যাসেজ’-এর অর্থ সমুদ্রপথে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে জাহাজের খোল ভর্তি করে দাস আমদানি। আমেরিকা এটা ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চায়।

সাহেবরা এখন ‘কলোনি’র মানে বোঝে না। অথচ ব্রিটিশ সরকারের লন্ডনে একটা মন্ত্রকই ছিল, তার নাম কলোনিয়্যাল অ্যাফেয়ার্স।

কলোনি বলতে বোঝায় জমি। সেই জমি যে দখল করে সে কলোনাইজার। সেই জমির তো অধিকারী আছে, মালিক আছে যাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। উত্তর-উপনিবেশ বলতে বোঝায় সেই মুহূর্ত যখন থেকে মাটি-জমির মালিক যে ছিল সে জানে সে বসবাস করলেও সে ঐ জমির মালিক নয়। তখন তার এটা ভৌতিক পরজীবন শুরু হয়, মারা না গিয়েও পরলোকের জীবন। সেই জীবনযাপনই উত্তর-ঔপনিবেশিক জীবন। কলোনি প্রতিষ্ঠার পরের মুহূর্ত থেকে এই জীবন। কলোনি মুক্ত হয়ে যাবার পরের জীবন নয়। সেই জীবনের গল্পই লিখেছেন, কলোনির গল্পকার ঔপন্যাসিকরা। কলোনিতে এমন কোনো লেখক থাকতেই পারেন না যিনি কলোনির সেই জীবনের কাহিনী ছাড়া অন্য কোনো কাহিনী লেখেন। সেই কাহিনীই নতুন তত্ত্বের ভিত্তিতে পুনরুদ্ধার করা গল্প-উপন্যাসের লেখকদের কাজ। গল্প-উপন্যাস কোনো বিমূর্ত শিল্প নয়। যেমন বলেছিলেন এডোয়ার্ড সয়িদ,

Narrative is crucial to my argument here, my basic point being that stories are at the heart of what explores and novelists say about strange regions of the world, they also become the method colonized people use to assert their own identity and existence of their own history.

এর সঙ্গে আমি যোগ করতে চাই, সেই গল্পের তত্ত্ব উদ্ঘাটন করার দায় এই আমাদের প্রাক্তন উপনিবেশের গল্পকার-ঔপন্যাসিকদের। সে-দায়িত্ব কোনো ঐতিহাসিক বা সমাজবিজ্ঞানীও নিতে পারেন। কিন্তু গল্পকার, ঔপন্যাসিকদের পক্ষে সেই দায়িত্ব অনিবার্য। সেই স্বাদেশিক ও স্বভাষিক তত্ত্বভূমি ছাড়া স্বাদেশিক ও স্বভাষিক উপন্যাসের ভূমিকা তৈরি হবে না। উপন্যাসকে তার পাঁচশ বছরের জালি সর্বজনীনতা থেকে বের করে আনবেন প্রাক্তন কলোনির গল্পকার-ঔপন্যাসিকরা, নতুন করে পাঠোদ্ধার করবেন পুরনো লেখকদের ও সাহিত্যের। পৃথিবীর উপন্যাস তার সংকট মোচনের জন্য আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।

[১৪ জুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে পঠিত কবি-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্মারক বক্তৃতা-২০১৫। বানানরীতি লেখকের নিজস্ব।]

*******************************************

মার্কোয়েজের অনন্য উপন্যাস
‘একশ বছরের নিঃসঙ্গতা’ নিয়ে কিছু প্রশ্ন
রণেশ দাশগুপ্ত

বিশ্ব-উপন্যাসের বয়স হয়েছে পাঁচশ’ বছর। বাংলা উপন্যাসই শতাব্দী ছাড়িয়েছে। উপন্যাসের বিন্যাস কিন্তু খুব বেশি বদলায় নি যদিও অসংখ্য নরনারী-জীবনের ধারা দেশ-দেশান্তর থেকে এসে এতে মিশেছে। এই জন্যেই এর মূল কিংবা অনুবাদের ভাষা জানা থাকলে কাহিনির মধ্যে ব্যাপকতম পাঠক-পাঠিকা সরাসরি প্রবেশ করতে পারেন। যে দেশ যত রহস্য কিংবা বাধা দিয়েই ঘেরাও হয়ে থাক না কেন, এর হৃদয়কে জানতে কষ্ট হয় না। দ্বীপমালা দিয়ে গাঁথা মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার তথা লাতিন আমেরিকার ভিতরটা আমাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের গ-ি থেকে দূরে। কিন্তু এর উপন্যাস হাতে এলে এই অঞ্চলের বিশাল বিশাল নদী, পর্বতমালা, উপত্যকা আর আগ্নেয়গিরি ও অরণ্যের আদি ও নব বাসিন্দাদের কোটি কোটি নরনারীকে যেন আমাদের ঘরের পাশে কথাবার্তা বলতে শুনতে পাই। এমনি একটি উপন্যাস মার্কোয়েজের একশ বছরের নিঃসঙ্গতা। লাতিন আমেরিকার চিলির কবি পাবলো নেরুদা আমাদের একান্ত চেনা মানুষ। তিনি জন্মেছিলেন বিশ শতকের শুরুতে। বিশ শতকের শেষার্ধে এসেছেন কলোম্বিয়ার মার্কোয়েজ। ঔপন্যাসিক। কিছু প্রশ্নের মধ্য দিয়ে উপন্যাস ও তার লেখককে হাজির করা হলো এখানে। বইটি স্প্যানিশ ভাষায় লেখা। ইংরেজি ভাষায় অনুদিত এই উপন্যাসটির নাম ‘ঙহব ঐঁহফৎবফ ণবধৎং ড়ভ ঝড়ষরঃঁফব’।

দক্ষিণ আমেরিকার কলোম্বিয়া প্রজাতন্ত্রের অতিসাম্প্রতিক লেখক গার্সিয়া গ্যাব্রিয়েল মার্কোয়েজের উপন্যাস একশ বছরের নিঃসঙ্গতা ১৯৮২ সালে নোবেল পুরস্কার পাবার আগেই বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। নোবেল পুরস্কারের পরে স্বাভাবিকভাবেই এর পরিচিতির পরিধি বেড়েছে। শুরু থেকেই সাধারণভাবে বামপন্থী ও বিশেষভাবে মার্কসবাদী মহলের যে আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছিল, তা একটা দায়িত্বেরও রূপ নিয়েছে। বইটিকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের শিল্পরূপের মূল প্রশ্নগুলি নিয়ে যে ব্যাপক আলোচনার ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়েছে, তাতে সাধারণভাবে বামপন্থী ও বিশেষ মার্কসবাদী বক্তব্যকে যে কোনো বিতর্কের মোকাবেলা করতে হবে।

কয়েকটি প্রশ্ন বইটি পড়েছেন এমন অনেকের মনেই জেগে থাকতে পারে। এই প্রশ্নগুলি একটি মূল প্রশ্নকে ঘিরে রয়েছে। সেটি এই যে, মার্কোয়েজের উপন্যাসটির বিপুল ধ্রুপদী ও আধুনিকতম লৌকিক মানসিকতা ও ঘটনা-বিন্যাসের মধ্যে যে অলৌকিক ঘটনার উল্লেখগুলি রয়েছে, সেগুলি কি রসগ্রাহ্য হলেও চিন্তা ও চেতনার আধুনিকমনা পাঠক-পাঠিকাদের কাছে যুক্তিগ্রাহ্য? সাধারণভাবে উপন্যাসের চারশ’ বছরের পরিণত শিল্পরূপের বিচারেই বা এই অলৌকিকতার উপাদানের জায়গা কোথায়? ইতিপূর্বে মানুষের বহিঃপ্রকৃতির ঘটনার চেয়েও অন্তঃপ্রকৃতির ঘটনাকে বড় করে তুলে ধরে শেষ পর্যন্ত নরনারী-চরিত্রকে ভেঙে চুরে কতগুলি সাধারণ জৈব-মানসিক আচরণের ঘোলাটে প্রবাহে পরিণত করার যে রীতি গড়ে উঠেছিল, মার্কোয়েজ কি তাঁর উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তেমন তালগোল পাকাতে চেয়েছেন? প্রশ্নটিকে সর্বোপরি আরেকভাবেও উপস্থিত করা যেতে পারে। মার্কসীয় রূপবিচারে এই বইটিকে কিভাবে দেখবো? উপন্যাসের অলৌকিকতার উপাদানকে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি কোনো রীতিতে দেখে?

উপর্যুক্ত প্রশ্নগুলির জবাবের সূত্রেই আমাদের এই আলোচনা।

গোড়াতেই বইটির সারমর্ম উপস্থিত করছি। এতে লৌকিকের মধ্যে অলৌকিকের উপস্থাপন সম্বন্ধে একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে। সারমর্মটি নি¤œরূপ :

উনিশ শতকের শুরু থেকে বিশ শতকের দুই দশক পর্যন্ত এক শতাব্দীকালে দক্ষিণ আমেরিকার কলোম্বিয়ার একটি অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় একটি গৃহ এবং তাকে ঘিরে একটি জনপদ গড়ে ওঠার পটভূমিতে মধ্যযুগীয় জীবনযাপন থেকে আধুনিকতম নাগরিক জীবনধারায় লালিত ও বর্ধিত একটি পরিবারের চার প্রজন্মের কথা নিয়ে রচিত হয়েছে একশ বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাস। এই পরিবার ও তার গৃহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জনপদে ইউরোপীয় মধ্যযুগের শেষের দিকের শিল্প ও বিজ্ঞান-বিপ্লবের তৈজসপত্র যেমন আমদানী হয়েছে, তেমনি এরোপ্লেনের যুগ পর্যন্ত ব্যবহারিক বিজ্ঞানের শতাব্দীব্যাপী সম্ভার একের পর এক এসে পরিবারটিকে এবং সেইসঙ্গে জনপদটিতে পশ্চিমী ধনতান্ত্রিক সভ্যতার চরম ও পরম ভোগ এবং তাড়নার সৃষ্টি করেছে। এই জনপদ ও তার কেন্দ্রীয় পরিবারটি দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা তথা ল্যাতিন আমেরিকার  রাজনৈতিক মুক্তিসংগ্রামের দ্বন্দ্বাত্মক উত্থানপতনের শরিক হয়েছে। গোঁড়া ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী পুরোহিত শাসিত স্প্যানিশ উপনিবেশস্থাপনকারী জনপদটি এবং তার কেন্দ্রীয় পরিবারটি হচ্ছে ঘটনাবলীর মূলধারা। আদিম জীবনযাপনে অভ্যস্ত আদিবাসীরা তাদের চিন্তাচেতনার এটা বাতাবরণ দিয়ে জনপদটিকে ঘিরে রেখেছে। কিন্তু যেন কোনো সুড়ঙ্গপথে ইটালির বাদক থেকে শুরু করে আরবের সওদাগর পর্যন্ত এসে এখানে আস্তানা গেড়েছে। এসেছে নানারকমের যান্ত্রিক সরঞ্জাম। এসেছে রেললাইন। এসেছে মার্কিন ধনকুবের এবং তার খামার। এককথায় আধুনিক লৌকিক জীবনের একসময়ের শান্ত সরলধারা সময়ান্তরে প্রচ- অস্থির ও জটিল হয়ে উঠেছে।

এই সঙ্গেই পাল্লা দিয়েছে পরিবারটির এবং জনপদেরও চার প্রজন্মের চরিত্রাবলী। এই সমস্ত চরিত্রই একান্তভাবে মানবিক প্রচ- আবেক ও সূক্ষ্ম অনুভূতি ক্রমান্বয়ে একেকটি চরিত্রকে বিশেষত্ব দিয়েছে। এদের চরিত্রের প্রত্যেকের স্বকীয়তা যতটা সময়ে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারার, ততটা আয়ু এরা পেয়েছে। দীর্ঘায়ুদের সংখ্যা অনেক। কয়েকজন শতায়ু। ধ্রুপদী ও ঐতিহাসিক ধরনের উপন্যাসে এরা সবাই বাস্তব চরিত্র। এদের একেক জনের একেক রকম ঝোঁক পেয়েছে প্রচুর পরিসর। পরিবারগুলি লৌকিক। তৈজসপত্রের বর্ণনায় মনে হয় মিউজিয়ামে বসে সবকিছু দেখছি।

একটি অদ্ভুত চরিত্রের শতায়ু লোক অবশ্য এই উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রয়েছে। জনপদটির সূচনার সময়ে মহাদেশে দেশে ভ্রাম্যমাণ এক বেদিয়া দলের সঙ্গে সে এসে কেন্দ্রীয় পরিবারটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। সে ছিল এক ধরনের মধ্যযুগীয় খ্যাপাটে বিজ্ঞানী। নানরকমের আকারা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দিয়ে জাদুর খেলা দেখাতো। সে পরিবারটির কর্তার নিদের্শে একটা ঠিকুজি তৈরি করেছিল পরিবারের উত্থানপতনের। ঠিকুজিটি রচিত হয়েছিল সান্ধ্য ভাষায়। ভাষাটা আসলে সংস্কৃত। কিন্তু ল্যাতিন আমেরিকায় তখন কে পড়বে এর লেখন? রহস্যময় লোকটি পরিবারের শেষ বংশধরকে তার মৃত্যুর মূলে এই ঠিকুজির মর্মন্তুদ ব্যাখ্যা শুনিয়ে নিজেও মরে গেল। পরিবারটির শেষ হলো, পদটিও ধ্বংস হয়ে গেল। মনে হতে পারে এই ব্যাপারটা বুঝি বা অলৌকিক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই ঠিকুজিটা মানব প্রকৃতি-বিজ্ঞান। রহস্যময় লোকটি আসলে প্রকৃতিবিজ্ঞানী।

সমস্ত কাহিনিটি বুঝিয়ে দেয় যে, লৌকিক কার্যকারণ সম্পর্কের ধারা বেয়ে উপন্যাসের চরিত্রসমূহ তাদের পরিণতির দিকে ধেয়ে চলেছে। এর মধ্যে যেমন সূক্ষ্ম বাস্তব রয়েছে, তেমনি কার্যকারণের স্থ’ল ও বৃহৎ পটভূমিও রয়েছে। পরিণতিগুলি চরিত্রাবলির প্রত্যেকের এবং পরস্পরের সৃষ্টি। বিশেষ করে নরনারীর প্রেম ও আকর্ষণবিকর্ষণের রক্তমাংসের ব্যাপারটা অত্যন্ত স্পষ্ট ও প্রচ-ভাবে রূঢ়।

এই লৌকিক বিন্যাসেরই আরেকটি দিকও কিন্তু সমানভাবেই স্পষ্ট সেটা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় পরিবারটি হোক, কিংবা তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিন্দু থেকে সিন্ধুতে পরিণত জনপদটি হোক, এরা একটা নিদারুণ নিঃসঙ্গতা বা একাকীত্ব বা বিচ্ছিন্নতার শিকার। এরা বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়েও যেন একঘরে হয়ে গিয়েছে। কেন্দ্রীয় পরিবারটির চার প্রজন্মের প্রত্যেকটি চরিত্রই বস্তুতপক্ষে নিজ নিজ গ-ির মধ্যে বদ্ধ। জনপদটিরও সমস্ত লৌকিক সম্ভার নিয়ে একটা ঐক্যবদ্ধ সত্তা নিয়ে গড়ে উঠতে পারে নি। পরিবারটির একজন ল্যাতিন আমেরিকার মুক্তিযুদ্ধের নায়ক হলেও নিজ বাসভূমে যেন পরবাসী হয়ে রয়েছে। স্পেনের ঔপনিবেশিক সা¤্রাজ্যকে ভেঙ্গে ফেলে মুক্তিযোদ্ধার প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করলেও জনগণ ক্ষমতার কাঠামোতে জায়গা পায়নি। বিপ্লব থেকে গিয়েছে অসমাপ্ত। এর ফলে যা হবার তাই হয়েছে। জীবন চলেছে গড্ডলিকা প্রবাহে। এর মধ্যেও দুরাকাক্সক্ষীদের অভাব হয়নি। তবে এরা কেউ গিয়েছে প্যারিসে, কেউ রোমে। মাঝে মাঝে গতানুগতিকতার জীবনে যেসব উৎক্ষেপ ঘটেছে,  সেগুলির জন্যে কেউ কেউ  ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছে দূরান্তরে। এইমাত্র। উপন্যাসটির নামকরণের মধ্যে রয়েছে বিচ্ছিন্নতার সমস্যাদি। শব্দানুগ অনুবাদে নামটি হওয়া উচিত ছিল, নিঃসঙ্গতার একশ বছর। অবশ্য এতে নিঃসঙ্গতার তারতম্য ঘটেনি।

লৌকিকতার বিপুল বিন্যাসের মধ্যে এই যে বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতা, এটাও কিন্তু অলৌকিকতার পর্যায়ে পড়ে না। এটা দ্বন্দ্বাত্মক জীবনের নেতিবাচক দিক। ধনতান্ত্রিক সভ্যতা তার সমাজ সম্পদ দিয়ে একে নিবারিত করতে পারে নি। বরং এটা বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্বকে পরিপুষ্ট করেছে। এই নেতিবাচকতাই উপন্যাসের কাহিনিকে মর্মন্তুদ বিয়োগান্তক পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছে। নিশ্চিহ্ন হয়েছে পরিবারটি, ধ্বংস হয়েছে জনপদটি।

এখন প্রশ্ন, তাহলে এই কাহিনির মধ্যে সেই অলৌকিকতাটা কোথায় যেজন্য বইটি নিয়ে একটা মৌলিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে?

এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, কাহিনির শুরু হয়েছিল একটা অলৌকিক কা- ঘটার আশঙ্কা নিয়ে। সেটা হচ্ছে একটা আদিম খ্রিস্টীয় ধর্মীয় অতিপ্রাকৃত সংস্কার। ল্যাতিন আমেরিকার একটি স্প্যানিশ বসতির এক যুবক ও এক যুবতী আত্মীয়তার সূত্রে ভাইবোন হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে করেছিল। অতিপ্রাকৃত সংস্কার কিন্তু তাদের তাড়া করে না। ভাইবোনের বিয়ের সন্তান একটা লেজ নিয়ে জন্মাবে, এই সংস্কার তাদের বসতি ছাড়া করলো। তারা বেরিয়ে পড়লো এক দুর্গম এলাকায় যেখানে কোনো সমাজ নেই। সেখানে একটা ঘর বেঁধে থাকার উদ্দেশ্যে। এরা স্থাপন করলো গৃহ। এল সন্তান-সন্ততি। গড়ে উঠলো জনপদ। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্মে সমস্ত সন্তানই বিচিত্র রকমের চরিত্রের হলেও দৈহিকভাবে স্বাভাবিক রইল। লৌকিক জীবনের ধারায় অতিপ্রাকৃত সংস্কার নিশ্চিত হয়ে গেলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে অলৌকিক ব্যাপারটি ঘটলো বংশের শেষ সন্তানের বেলায়। শেষ প্রজন্মের সম্পর্কিত দুই ভাইবোনের নেতিবাচক আত্মনিবদ্ধ ভোগসর্বস্ব জীবনের লাগামহীন দৈহিক তাড়নার ফল এই অস্বাভাবিক সন্তান। সে মৃত অবস্থাতেই জন্মালো। জননীও সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল। অতিপ্রাকৃত সংস্কারকেই এইভাবে গ্রীক নাটক ইডিপাসের ভয়ঙ্কর পরিণতির মতো একান্ত আধুনিককালের মানুষের জীবনের জয়পতাকা উড়াতে গেলো।

এক শতাব্দী ব্যাপী জীবনের ধারায় ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত একটি অলৌকিক সংস্কারকে এইভাবে পুনর্জাগরিত করার ব্যাপারটাই প্রধানত মার্কোয়েজের উপন্যাসে চাপিয়ে দেয়া বলে মনে হবে। উপন্যাসের লৌকিক বিন্যাসের ফাঁকে ফাঁকে অবশ্য আরও কয়েকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে সেগুলিকে অতিপ্রাকৃত বলা যায়। যেমন পরিবারের সবচেয়ে সুন্দরী ও অভিমানিনী কন্যা যখন শেষের দিকে আঙ্গিনায় ঘুরছিল, তখন কে যেন তাকে আকাশ থেকে টেনে নিয়ে চলে যায়। তাছাড়া পরিবারের এক ছেলে যখন আলাদা বাড়িতে বদ্ধ ঘরে অপঘাতে বন্দুকের গুলিতে মরলো, তখন তার রক্তের ধারা মায়ের বাড়ির দরজা পর্যন্ত গড়িয়ে এসে মৃত্যুর কথাটা জানিয়ে দিলো। এছাড়া আরও অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো কখনো ফুল ঝরছে। ঝাঁকে ঝাঁকে কখনো বা মরা পাখি ঝরে পড়েছে। চার বছর ধরে একটানা বৃষ্টি হয়ে সমগ্র জনপদটাকে তছনছ করে দিয়েছে। এগুলোকে অতিপ্রাকৃত ছাড়া কি বলবো? এইসব ঘটনা মূল লৌকিক ঘটনাবিন্যাসের সঙ্গে কার্যকারণগত যুক্ত হয়ে ঘটেনি অবশ্য। আদিবাসীদের কোনো কোনো ধ্যান-ধারণা মাঝে মাঝে পরিবারটিকে ছায়া ফেলেছে, কিন্তু সেগুলিও স্থায়ী হয়নি। এরা কাহিনির গতিপরিণতির উৎক্ষেপ মাত্র। খ্রিস্টান পুরোহিত খ্রিস্টীয় জমায়েতে বেদীর উপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দেবার সময় দেখা যায় পুরোহিত বেদি থেকে আলগা হয়ে যেন শূন্যে ভর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যেতে পারে। কিন্তু লেজধারী সন্তান জন্মাবার ঘটনাটা শুরু আর শেষকে একটা গতিপরিণতির ধারায় জোর করে হলেও গেঁথে দিয়েছে। এই অলৌকিকতাকেই আমরা উপন্যাসটির সঙ্গতির ব্যাপারে মূল প্রশ্ন হিসেবে দেখবো।

আমরা দুদিক থেকে এই সঙ্গতির প্রশ্নটিকে খতিয়ে দেখবো। প্রথমত, উপন্যাসের শিল্পরূপের দিক থেকে। দ্বিতীয়ত, মার্কসীয় বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। শুরুতেই একথা জানিয়েছি।

এখন প্রথমে উপন্যাসের শিল্পরূপের দিকটাকে বিচার করা যাক।

আমরা জানি, গদ্য মহাকাব্য হিসেবেই উপন্যাসের আবির্ভাব। তবে যুগযুগান্ত ধরে চলে আসা মহাকাব্যের সঙ্গে উপন্যাসের পার্থক্য শুধু গদ্যে সূচিত হয়নি। মহাকাব্য থেকে একটা বড় পার্থক্য নিয়ে উপন্যাসের সৃষ্টি। মহাকাব্যে মানুষের জয়পরাজয়ের ইতিবৃত্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতো অলৌকিকতা। বস্তুতপক্ষে দেবদেবী প্রভৃতি অতিপ্রাকৃত শক্তির অঙ্গুলিহেলনেও মহাকাব্যের বীর ও বীরাঙ্গনারাও চলতে বাধ্য হতো। উপন্যাস এসে এই দেবদেবী প্রভৃতি অতিপ্রাকৃত শক্তি বা অলৌকিকতার নির্দেশে মানুষের অভিযাত্রাকে মুক্ত করে দিল। জন্ম-মৃত্যু মিথুনের জৈব সীমাপরিসীমা মানব প্রকৃতির অঙ্গ হিসেবে বহাল রইল। কিন্তু তাতে অলৌকিকতা রইল না। দেবদেবীরা অন্তর্ধান করলো। নর-নারীর পার্থিব ও সামাজিক জীবন হলো জীবনমৃত্যুর সমস্ত রহস্যের মূলাধার। মানুষের কীর্তি ও অকীর্তি হয়ে উঠলো গদ্যমহাকাব্যের বিষয়সম্পদ। লাগামছাড়া কল্পনাও দৈবকে আশ্রয় করলো না। মানুষের বহির্জগৎ ও অন্তর্জগত নিয়ে দ্বন্দ্ব বাঁধলো। সেখানে মানুষ নিয়ে ভাঙচুর হলো, কিন্তু মানুষই রইল সমস্ত উপন্যাস জুড়ে। বহিঃপ্রকৃতির দিক থেকে বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে তার যোগ, এই জন্যে প্রকৃতি উপন্যাসে বড় জায়গা পেয়েছে। অন্তঃপ্রকৃতির দিকে মানুষের যোগ যুগযুগান্তের চিন্তাভাবনার সঙ্গে। সেইজন্যে চিন্তাভাবনাও উপন্যাসে বড় জায়গা করে নিয়েছে। এছাড়া মানুষ তো কোনোদিনই একক ছিল না। অন্তরে বাহিরে বহুর সঙ্গে জড়িত তার সত্তা। এইসব উপাদান নিয়ে অবিশ্রান্ত পরিবর্তনের ধারায় মানুষের অন্তরঙ্গ কাহিনিকে উপন্যাস অসংখ্য পরিমাপে রূপায়িত করেছে। ধ্রুপদী উপন্যাসই হোক অথবা অতি-আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হোক, একটা ব্যাপার সাধারণ গুণনীয়ক। সবার উপরে মানুষের সত্তা সত্য।

বাংলা উপন্যাসের দৃষ্টান্ত রয়েছে আমাদের কাছে। এর গতিপরিণতির উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য অনুসারেই ঘটেছে। বাংলা উপন্যাস শুরু থেকেই বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য আঙ্গিক থেকে আলাদা। বাংলাকাব্য ও নাটকের অতিপ্রাকৃত শক্তির উপাদান রয়েছে। বিশ শতকেও এটা চলে। কিন্তু উপন্যাসে এই অতিপ্রাকৃত শুরুতেই বর্ণিত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসে পৌরাণিক প্রসঙ্গ থাকলেও সেগুলি নায়ক-নায়িকার জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রিত করেনি। খোঁজাখুঁজি করলে গত একশ বছরের বাংলা উপন্যাসে অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃত উপাদান যে পাওয়া যাবে না তা নয়। তবে এরা কোনো উপন্যাসিকেরই মূল প্রবণতা নয়। বিভূতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃষ্টি প্রদীপ ও দেবযান উপন্যাসে অতিপ্রাকৃত ব্যাপার রয়েছে, কিন্তু আধ্যাত্মবাদীরাও এদের সামনে আনেন নি। তারাশঙ্কর তান্ত্রিকদের নিয়ে লিখলেও তাঁর সমস্ত উপন্যাসে মানুষই বড়, মানুষই নিয়ন্তা। মহাশ্বেতা দেবী যে আদিবাসীদের নিয়ে একাধিক উপন্যাস লিখেছেন, তাতেও তিনি অলৌকিকতাকে আনেন নি। এর কারণ, বাংলা উপন্যাস যেভাবে শতাব্দী জুড়ে গড়ে উঠেছে, তাতে অলৌকিক নিয়ে লেখা কঠিন কাজ।

উপন্যাসের শিল্পরূপের মূলধারার বিচারে এই দৃষ্টান্তই নিশ্চয় যথেষ্ট। আমরা বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না। আমাদের বিবেচ্য একশ বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসের বিপুল লৌকিক বিন্যাসে অলৌকিকতা আরোপের যৌক্তিকতা অথবা অযৌক্তিকতা।

আপাতদৃষ্টিতে আমাদের বাংলা উপন্যাসের পাঠক-পাঠিকাদের কাছেও মনে হবে, মার্কোয়েজ উপন্যাসের মূল ধারাকে ভেঙ্গেছেন এবং কয়েকশ’ বছর পিছিয়ে গিয়েছেন। মার্কোয়েজের তরফ থেকে এ সম্বন্ধে কিছু বলার রয়েছে কি?

সরাসরি মার্কোয়েজ কিছু বলেছেন কিনা জানি না। তবে একটা বক্তব্য সাধারণভাবে লাতিন আমেরিকার তরফ থেকে বলা হয়েছে, যা থেকে মার্কোয়েজের অলৌকিকতার মিশ্রণকেও উপন্যাসে মানুষের জয় জয়কারেরই একটা পদ্ধতি বলে নির্দিষ্ট করা যেতে পারে।

বক্তব্যটা নি¤œরূপ

আঠারো শতকের শেষের দিকে কিংবা উনিশ শতকের শুরুতে যখন স্পেনের উপনিবেশিক সা¤্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা তথা সমগ্র ল্যাতিন আমেরিকার স্প্যানিশ বসতি স্থাপনকারীদের পাশাপাশি আদিবাসী জনগণ কিংবা আফ্রিকা থেকে আনীত দাসদের প্রজাতান্ত্রিক বিদ্রোহ ঘটে, তখন স্পেনের উপনিবেশিক শাসন উৎখাত হয়ে গোটা বিশেক জাতীয় প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হলেও এদের বিকাশ প্রায় এক শতাব্দীকাল অবরুদ্ধ থাকে। বিশ শতকে এসে আরম্ভ হয় এদের দ্বিতীয় দফার জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ এবং এই সঙ্গে বিকাশের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ প্রয়াস। ল্যাতিন আমেরিকার উপন্যাস তাই মূলত বিশ শতকের ঘটনা। এই উপন্যাসে লাতিন আমেরিকায় মানুষের আত্ম-প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটা একটা বিপ্লবাত্মক উপাদানকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে। এই উপাদান হচ্ছে, লাতিন আমেরিকার স্বকীয়তা। যেহেতু মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ ও তার দোসরেরা এই স্বকীয়তাকে ধ্বংস করে তাকে মানসিকভাবেও পরনির্ভর করতে চাইছে, সেজন্য এই স্বকীয়তাকে এর সব কিছু সমেত রক্ষা করা বৈপ্লবিক দায়িত্ব। উপন্যাস তার কাঠামোর দিক দিয়ে মহাকাব্যিক গদ্য হলেও এই স্বকীয়তাকে প্রতিফলিত করতে গিয়ে এবং উপন্যাসকে ব্যাপকভাবে জনগ্রাহ্য করতে গিয়ে লাতিন আমেরিকার জনগণের বহুজাতিক সংস্কৃতিক নানারকম অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসকেও মানুষের জয় জয়কারের ইতিবৃত্তে যুক্ত করতে হয়েছে। বিশ শতকে সাম্প্রতিককালে ল্যাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠ উপন্যাসিকরা একটা বিশেষ বাস্তববাদকে কাজে লাগাচ্ছেন। এর নাম ঐন্দ্রজালিক বাস্তববাদ। এক সময়ে কিউবার আলেজো কার্পেনটিয়ার প্যারিসে পল এলুয়ার ও লুই আরাগঁর সঙ্গে সাহিত্যের কাগজ বার করতেন। তিনি এই ঐন্দ্রজালিক বাস্তববাদের বড় কারিগর। সম্প্রতি প্রয়াত এই ঔপন্যাসিকের লেখায় মুক্তিযুদ্ধের বিষয়বস্তুতেই অলৌকিকতা যুক্ত হয়েছে। মার্কোয়েজ এই কার্পেনটিয়ারের অনুসারী। কার্পেনটিয়ার ছিলেন শিল্পরূপের চিন্তাধারার আধুনিকতম প্রবক্তা। কিন্তু ল্যাতিন আমেরিকার স্বকীয়তার প্রশ্ন তাঁকে ঐন্দ্রজালিক বাস্তববাদে টেনে নিয়েছিল। সচেতনভাবেই তিনি অযৌক্তিকতাকে ব্যবহার করেছিলেন। মার্কোয়েজ সচেতনভাবে তাই করেছেন।

সুতরাং, বাংলা উপন্যাসের চেয়ে অনেক দেরীতে ল্যাতিন আমেরিকার উপন্যাসের প্রসার ঘটলেও সেই বিলম্বই এর মধ্যে অলৌকিকতার উপাদান সংযোজনের কারণ নয়। এই উপন্যাস তার মহাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে রক্ষা করার জন্য অলৌকিকতা প্রয়োগ করছে। এই অলৌকিকতার উপাদান বাদ পড়লে এই মহাদেশের আত্মপরিচয়ের হানি হবে। এখনও এই উপাদান জড়িত আছে মহাদেশের গণজীবনে।

এই ঘটনাটি আফ্রিকার উপন্যাসের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। বিশেষ করে কালো আফ্রিকার দেশগুলির উপন্যাসে রয়েছে অলৌকিকতার ছড়াছড়ি। আদিবাসী প্রধান এইসব দেশ বর্তমানে যে ধর্মেরই অনুসারী হোক না কেন, আদিম আফ্রিকার সংস্কৃতিকে রক্ষা করার মধ্য দিয়েই মুক্তিসংগ্রাম করে আসছে। ঔপন্যাসিকরা  ধ্রুপদী উপন্যাসের শিল্পরূপ সম্বন্ধে অজ্ঞ তো নয়ই, বরং এদের মধ্যে অনেকে রয়েছেন যাঁরা সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের ধারক ও বাহক। তবু, যে কারণে ল্যাতিন আমেরিকার কার্পেনটিয়ার ও মার্কোয়েজের উপন্যাসে অলৌকিকতা এসেছে সে কারণেই আফ্রিকার উপন্যাসেও অতিপ্রাকৃত উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। এই অলৌকিকতার উপাদান নিয়ে লেখা উপন্যাসই যে কোনো চারশ’ বছরের উপন্যাসে দেশেরও আধুনিকতম কাজের সঙ্গে তুলনীয়।

‘একশ বছরের নিঃসঙ্গতা’ উপন্যাসের রচয়িতা মার্কোয়েজও ধ্রুপদী ও আধুনিক উপন্যাসের রীতিনীতিতে দক্ষ, তার পরিচয় ছড়িয়ে রয়েছে সমস্ত বইটিতে, তিনি তড়িঘড়ি করে লেখেননি। তিনি বহুদর্শী। ল্যাতিন আমেরিকার বিশেষ উপন্যাস লিখতে বসে তিনি আঞ্চলিকতা নিয়ে যেমন বাড়াবাড়ি করেছেন, তেমনি সর্বকালের বিশ্ব-ঔপন্যাসিকের একটি বড় নির্দেশও পালন করেছেন। মহাশক্তিধর বিবেকের অধিকারী মানুষও যে চিন্তায় চেতনায় আচরণে কত ভঙ্গুর হয়, সেটা মার্কোয়েজ জানেন এবং সেটা তিনি তাঁর উপন্যাসে জানিয়েছেনও। উপন্যাসের একটা বহু শতাব্দীব্যাপী ধারা এই যে মানুষ তথা নরনারী যেমন মহৎ হতে পারে, তেমনি ক্ষুদ্রও হতেও পারে। ঔপন্যাসিকের শিল্পরীতি হচ্ছে এই বৈপরীত্যকে যথাযথভাবে, গুরুমশায়ের শাসনের চোখে নয় কৌতুকের দৃষ্টিতে দেখা এবং দেখানো। মার্কোয়েজ এ ব্যাপারে স্পেনের সার্ভেন্টিস, ফ্রান্সের রাবেলা (জধনবষধরং) কিংবা রুশিয়ার গোগোলের সমকক্ষতা দেখিয়েছেন বললে অত্যুক্তি হবে না। এই পূর্বসুরীদের মানবতা ও হৃদয়তার মধ্যে যে গভীর কৌতুকরস ছিল, মার্কোয়েজ তাকে আয়ত্ত করেছেন। কোনো কোনো ব্যাপারে নরনারীর আচরণের চিত্রে তাঁর সঙ্গে ‘লেডী চ্যাটার্জির প্রেমিক’ উপন্যাসের লেখক ডি. এইচ. লরেন্সের মিল পাওয়া যায়। সেটা বাইরের মিল। কারণ, লরেন্স কোনোদিন কৌতুকের ধার ধারে না।

মার্কোয়েজ ছোটগল্প ও উপন্যাসের তফাৎ বুঝবার জন্য এদের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতেও এই কৌতুকের মেজাজটি প্রকাশ পেয়েছে। মার্কোয়েজ বলেছেন ছোটগল্প হচ্ছে প্রেম, আর উপন্যাস হচ্ছে বিবাহ।

বিস্তারিতে না গিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত টানতে পারি যে, মার্কোয়েজ তাঁর উপন্যাসে বহিঃপ্রকৃতিকে খাটো করে অন্তঃপ্রকৃতিকে আস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে মানবজীবনে ভুতুড়ে কাহিনির মতো কোনো উপন্যাস লিখতে চেষ্টা করেন নি। তার বই তালগোল পাকায় নি। তিনি মূলত ধ্রুপদী মহাকাব্যিক ঔপন্যাসিক। একশ বছরের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসের একাধিক রহস্যময় পুরুষ রহস্যময়ী নারী রয়েছে ঠিকই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, সবচেয়ে দুর্গম যে মানুষ, তার রহস্যের উদঘাটন এখনও কে করতে পেরেছে। উপন্যাসের কাজই তো হচ্ছে এই রহস্যকে ভেদ করা। রহস্যময় মানুষের অবতারণা না করলে রহস্যভেদের প্রক্রিয়া কি করে এগিয়ে যাবে?

এবার আমরা সর্বশেষ প্রশ্নটিতে যেতে পারি। প্রশ্নটি হচ্ছে, মার্কসীয় দৃষ্টিতে আমরা বইটিকে কিভাবে দেখবো এবং উপন্যাসের অলৌকিক উপাদানকে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি কোন রীতিতে দেখে।

প্রথমে দ্বিতীয় অংশটি নিয়ে আলোচনা করা যায়। অর্থাৎ উপন্যাসে তথা মানুষের জীবনে অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত উপাদান সম্বন্ধে মার্কসবাদের বক্তব্য কি?

এ সম্বন্ধে সাধারণ ধারণা এক কথায় বলবে যে, মার্কসবাদ অলৌকিকতা বা অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস করে না। মার্কসীয় দর্শন হচ্ছে বস্তুবাদী। এর দৃষ্টিতে বস্তু বা প্রকৃতি হচ্ছে প্রাথমিক। বস্তু থেকে ভাবের জন্ম। ওপরে এবং এর আগে কোনো আদ্যাশক্তি নেই, মানুষেই জীবনের মৌল ভিত্তি ও নির্দেশক হচ্ছে প্রকৃতি ও লৌকিকতা। অবশ্য মার্কসবাদ যান্ত্রিক বস্তুবাদী নয়, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী। মানুষের জীবনে ভাবের পরিবর্তন-সাধক সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। তবে এর উৎসও লৌকিক। এর লক্ষ্যও লৌকিক।

এই ধারণা অনুসারে উপন্যাসে অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃত উপাদানের ব্যবহারে বিধেয় হতে পারে না।

এইখানে আমাদের আলোচনার ইতি টেনে দেয়া যেতো এবং মার্কোয়েজের বইটিকে বড়জোর মার্কসবাদ-বহির্ভূত একটি বামপন্থী চিন্তার ফসল হিসেবে মেনে নেয়া যেতো।

কিন্তু মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের কা- থেকে অনেক ডালপালা বেরিয়েছে এবং ফুলে-ফলে মঞ্জরি হয়ে চলেছে। রূপকের ভাষায় বলা যেতে পারে, একটি বৃক্ষ থেকে উৎসারিত ও প্রসারিত হয়ে বেরিয়ে আসছে একটি উদ্যান। বিশ্বব্যাপী মানবমুক্তির সংগ্রামে মার্কসবাদের প্রাকৃতিক ও লৌকিক বৈজ্ঞানিক সত্যতা বাস্তবে ফলিত হচ্ছে। উক্ত দর্শন হিসেবেই মার্কসবাদ এটা করতে সক্ষম হচ্ছে।

মার্কসবাদের ¯্রষ্টা কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গেই প্রসারমান ও বিচিত্র লোকজীবনে এর সারসূত্রের পাশাপাশি এর বৈচিত্র্যকেও উপস্থাপিত করেছিলেন।

মার্কসবাদের প্রবর্তকেরা তত্ত্বকে জীবন থেকেই উদ্ভূত ও জীবনের সহযোগী বলে মনে করতেন। মানবজীবনের রহস্যময়তা ও বৈচিত্র্যকে তাঁরা চূড়ান্ত মূল্য দিতেন। এই ব্যাপারে তাদের মন যে খোলা ছিল, তার একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে এখানে।

দার্শনিক স্পিনোজা ছিলেন প্রকৃতিবাদী। প্রকৃতিই ঈশ্বর, ঈশ্বরই প্রকৃতি এই ছিল তাঁর একটি বক্তব্য। অন্যদিকে দার্শনিক লাইবনিজ ছিলেন অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাসী। প্রকৃতিও ঈশ্বর ছিল তাঁর কাছে ভিন্ন। এদিক থেকে দেখলে স্পিনোজাই বাস্তববাদীদের নিকটতর ছিলেন। কিন্তু মার্কস একটা বিশেষ বিচারে লাইবনিজকে স্পিনোজার উপরে জায়গা দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা তিনি কিছুটা কাব্যিকভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। বলেছিলেন স্পিনোজার জগৎ একরঙা, লাইবনিজের জগৎ রামধনুর জগৎ।

আসল কথা এই যে, মার্কস জীবনের বৈচিত্র্যকে বড় করে দেখেছিলেন।

এই সঙ্গেই ‘মিথ’ বা পৌরাণিক কল্পনা সম্বন্ধে মার্কসের বক্তব্যকে বুঝে নেয়া যেতে পারে। আমাদের আলোচ্য বিষয়ে এই বক্তব্য তো একান্তভাবেই প্রাসঙ্গিক।

বিষয়টিকে বুঝবার জন্য অতি সরলীকরণ করে পটভূমিটাকে তুলে ধরা যেতে পারে।

মানবজাতির ইতিবৃত্ত শুরু হয়েছে আদিম যুগ থেকে। আরণ্যক জীবন, দেশ দেশান্তরে ভ্রাম্যমাণতা ও স্থিতি সভ্যতাÑ তিনটি পর্ব এই ইতিবৃত্তের। গ্রীকরা যখন স্থিতির সভ্যতায় প্রবেশ করেছে, তখনও পৌরাণিক কল্পনার জগৎ তাদের উপর ভর করেছে। এই পৌরাণিক কল্পনার দেবদেবীও অলৌকিকতা ও অতিপ্রাকৃত শক্তি গ্রীকদের কাব্যে ও নাটকে মানুষের জীবনের নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে। এদের বাদ দিলে সমগ্র গ্রীক শিল্পকলার ভিত্তি ধ্বসে যেতো।

মিথ বা পৌরাণিক অতিপ্রাকৃত শক্তির কল্পনা ও ধারণা এইভাবে গ্রীক জীবনে যে স্থিতি নিয়েছিল, তাকে মার্কসও মানুষের ইতিবৃত্তের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছিল। অবশ্যই তিনি গ্রীক নাটক ও কাব্য গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়েছেন এবং সেটা আদ্যোপান্তই পড়তেন।

তদানীন্তন জীবনে এই মিথের ব্যাপারটার একটা বাস্তবতা ছিল। এটাই হবে আমাদের সিদ্ধান্ত। মার্কস কিন্তু এখানেই থামেন নি। তিনি বলেছেন, আজও এই মিথে পরিপূর্ণ নাটক ও কাব্য আমাদের টানে। ব্যাপারটা কি? এই আকর্ষণের কারণ হিসেবে মার্কস তাঁর গ্রুন্ডরিসো গ্রন্থে যে বক্তব্য বলেছেন তার একটি অংশ হচ্ছে নি¤œরূপ : ‘আদিম বা পৌরাণিক যুগের শিল্পকলা, সংগীত ও কাব্য যত উঁচুতেই উঠুক না কেন, তারা অনগ্রসর অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই ফসল। তবু এরা মানবসমাজের শৈশবের ফসল। এই কারণে উত্তরকালে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যতই উন্নত হয়ে থাক না কেন, পূর্বতনের একটা বড় আকর্ষণ ও মূল্য থেকে যাচ্ছে। কারণ, মানুষের কাছে তার শৈশবের সবকিছু একটা আলাদা কদর থাকে।’

উপরের কথাটা বলা বাহুল্য, হুবহু মার্কসের বক্তব্যের আক্ষরিক অনুবাদ নয়। এটি তর্জমা।

একথার অর্থ দাঁড়ালো, শুধু আজ নয়, আগামীকালেও মানুষ তার শৈশবের আজগুবি ধারণাগুলোকে মানসপট থেকে নির্মমভাবে ছেঁটে তো ফেলবে না, বরং ধরেও রাখবে, হয়তো মায়ার ভরে। কিন্তু ধরে রাখবে।

আরও একটা সিদ্ধান্ত আমরা মার্কসের পৌরাণিক প্রভাবিত সাহিত্য শিল্পকলা সম্পর্কিত বক্তব্য থেকে টানতে পারি। সাহিত্যে শিল্পকলায় অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিকতা থাকলে মার্কসীয় দৃষ্টিতে এর জাত যায় না। এ কথা সত্য যে, মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন পূরাণের মধ্যেও এবং পুরাণ-প্রভাবিত সাহিত্যে শিল্পকলায় তো বটেই মানুষের লৌকিক ও প্রাকৃতিক সম্পর্ক ও জীবনধারার সূত্রের অনুসন্ধান করে। এখানে মার্কসীয় দর্শন মানুষের মুক্তিসংগ্রামকে প্রধানত দেখতে পায়। মার্কসবাদ মানুষেরই সন্ধান করে দেবদেবী অধ্যুষিত স্বর্গেও। কিন্তু মার্কসবাদ যদি অলৌকিকতা কিংবা অতিপ্রাকৃত সম্বন্ধে শুচিবায়ুগ্রস্ত হতো, তাহলে নিশ্চয় পুরাণের মধ্যে তার পক্ষে মানুষের সন্ধান করা সম্ভব হতো না।

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির এদিকটাকে দুজন মার্কসবাদী লেখকের লেখায় গভীর অনুসন্ধিৎসা নিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। এঁদের একজন ক্রিস্টোফার কডওয়েল। তাঁর বইটির নাম ‘মায়া ও বাস্তবতা’ (ওষষঁংরড়হ ধহফ জবধষরঃু)। আরেকজন অধ্যাপক ডি. ডি. কোসাম্বী। তাঁর বইটির নাম ‘পুরাণ ও বাস্তবতা’ (গুঃয ধহফ জবধষরঃু)।

কডওয়েল তাঁর গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে পুরাণের অবসানের কথা বলতে গিয়ে গ্রীককাব্যে তার টানাপোড়েনের মমতাময় ছবি এঁকেছেন। অধ্যাপক কোসাম্বী তাঁর গ্রন্থের সমস্ত অধ্যায়ে ভগবদ্গীতা, ঊর্বশী প্রভৃতির মধ্যে মানুষের লৌকিক বস্তুগত জীবনধারার প্রক্রিয়াটিকে অনুসন্ধান করে দেখেছেন। কডওয়েলের মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ববিদিত। অধ্যাপক কোসাম্বী তাঁর গ্রন্থে বলেছেন, মার্কসই তাঁকে পুরাণ ও বাস্তবতার পথের সন্ধান সবচেয়ে বেশি করে দিয়েছেন।

পুরাণের অলৌকিকতা ও অতিপ্রাকৃতের মধ্যে মাক্সিম গোর্কি মেহনতী মানুষের অভিযাত্রার সন্ধান পেয়েছেন। তিনি একটি নিবন্ধে বলেছেন, সাম্য হচ্ছে সমস্ত সংস্কৃতির উৎস। এই নিবন্ধেই তিনি বলেছেন, গ্রীক পুরাণের হারকিউলিস হচ্ছে মেহনতী মানুষের আদর্শ বীর। আদিম মেহনতী মানুষের শ্রম চেতনার অতিপ্রাকৃত শক্তির কল্পনা থেকেই হারকিউলিস চরিত্রের সৃষ্টি।

মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন এইভাবে দেখিয়েছে যে, অলৌকিকতা ও দেবদেবী এবং অন্যান্য অতিপ্রাকৃত ঘটনা আদিম ও অনগ্রসর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যুগের ইচ্ছা ও কামনার কল্পনার সৃষ্টি। অনগ্রসরকালে অনগ্রসর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যখন মানুষ প্রকৃতির উপর আধিপত্য শুরু করেছে, যখন তারা বজ্রের চেয়েও শক্তিশালী বিদ্যুৎ-ভা-ার তৈরি করছে, যখন তারা মহাকাশে যাত্রা করছে, তখন অলৌকিকতা ও অতিপ্রাকৃত শক্তির স্তবস্তুতি সম্বন্ধে সংস্কার পোষণ তারা করতে পারে না। পৃথিবীর চূড়ান্ত বিচ্ছিন্ন ও অনগ্রসর এলাকায় মানুষেরও আজ অন্ততপক্ষে শুনতে বা জানতে বাকি নেই যে, আদিম দেবদেবীদের চেয়ে মানুষ বেশি শক্তিশালী। তবু একথাও কি সত্য নয় যে, অনগ্রসর দেশ ও এলাকাসমূহের লৌকিক সমাজ ও মানসিক কাঠামোর অচলায়তন এখনও ভেঙেও ভাঙ্গছে না। এর মধ্যেই একটা স্বকীয়তারও উপাদান পাওয়া যাচ্ছে। এটা বিপ্লববাদ। তাছাড়া যেসব দেশ ধনতান্ত্রিক অগ্রসর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শীর্ষে রয়েছে, তাদেরও শাসক ও শোষকচক্রগুলি ধনতান্ত্রিক সা¤্রাজ্যবাদী অচলায়তনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আদিম সংস্কারকে নিজেদের উন্নত দেশেও প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই জন্যই অলৌকিকতা ও অতিপ্রাকৃত শক্তির ব্যাপারটা নানাদিক দিয়ে আজও বাস্তব। মার্কসবাদ এই বাস্তবতার মোকাবিলা করতে বাধ্য। একে পাশ কাটিয়ে যাবার উপায় নেই।

উপরোক্ত পটভূমি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখেই মার্কসবাদীরা অন্যান্য বামপন্থী ও স্বাধীনতা ও সমমনাদের সঙ্গে সঙ্গে মার্কোয়েজের উপন্যাসটির মধ্যে ল্যাতিন আমেরিকার দেশ-দেশান্তরের মুক্তিসংগ্রামের ও বিপ্লবের অসমাপ্তির জন্য যে ক্ষোভ ও যন্ত্রণা রয়েছে, তাকে মর্মবস্তু করে একশ বছরের নিঃসঙ্গতাকে উপন্যাসের শিল্পরূপের প্রাণবন্ত ধারার বাহক হিসেবেই নির্দিষ্ট করবে।

লাতিন আমেরিকায় একদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বিশ শতকে দ্বিতীয় মহাজাগরণের পালা চলেছে। উনিশ শতকে সাইমন বলিভার থেকে শুরু করে জোসে মার্তি পর্যন্ত যেসব মুক্তিযোদ্ধার সাধনা শত শত বছরের সামাজিক অচলায়তনের হেরফের কবরস্থ হয়েছিল, তার পুনরুত্থান ঘটেছে। সেজন্যে লাতিন আমেরিকার মানুষ আজ বাস্তবতার গভীরে যেতে চাইছে। উপন্যাস যত গভীরে যেতে পারে, ইতিহাস কিংবা অন্য কোনো খতিয়ান ততটা পারে না। মার্কোয়েজের উপন্যাসটিতে সেই অঙ্গীকার রয়েছে। এই কারণে ধ্বংস ও বিপর্যয় দিয়ে শেষ হলেও বইটি পুনরুত্থানকেই প্রতিফলিত করেছে।

[সূত্র : নিঃসঙ্গতার একশ বছর, ভাষান্তর : জি এইচ হাবীব, নান্দনিক, দ্বি. মু. ২০১১, ঢাকা, ভূমিকাংশ]

*******************************************

মুক্তিযুদ্ধোত্তর নবচৈতন্য ও উপন্যাসের শিল্পরীতি
রফিকউল্লাহ খান

বাঙালির স্বাধীনতাকামী ও সংগ্রামশীল অস্তিত্বের আত্মপ্রকাশ বিগত চার দশকে বিষয় ও শিল্পরূপের দিক থেকে যুগান্তকারী বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। আমরা জানি, বাঙালির সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনে ভাষা আন্দোলন তাৎপর্যবহ ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করেছে। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ১৯৪৮ সাল থেকে সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন হিসাবে অঙ্কুরিত হয়ে, ১৯৫২ একটা গণ-অন্দোলন থেকে ক্রমান্বয়ে গণজাগরণের রূপ নেয় এবং পরিণামে অবরুদ্ধ জাতীয় চৈতন্যের আত্মসন্ধান, সত্তানুসন্ধান ও জাতিসত্তাসন্ধানের রক্তিম প্রতীকে পরিণত হয়। সময়-পরম্পরায় ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রাম, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্বক্ষত আন্দোলন প্রভৃতি ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার সংগ্রামশীল ও রক্তিম চেতনার রূপ ও রূপান্তরের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। স্বাভাবিকভাবেই বাস্তব মানব-মানবীর অন্তর-বাহিরের বহুমুখী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার রূপকল্প উপন্যাস শিল্প ঐ সব ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠেছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের উপন্যাসের উপকরণ ও বিষয়ের পরিধি যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি, তার শিল্পরীতিও অবলম্বিত জীবনের অনিবার্যতায় স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চার দশকে বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতি ও অর্থ-উৎপাদন কাঠামোর রূপ-রূপান্তরের বহুকৌণিক অভিঘাত গ্রাম ও নগরজীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে উদ্ভিন্নমান মধ্যবিত্ত ও সংবেদনশীল চৈতন্য এই সব অভিজ্ঞতায় আন্দোলিত ও আলোড়িত হয়েছে। জিজ্ঞাসায়-বেদনায়-আর্তনাদে, সংকটে-সংগ্রামে-দ্বন্দ্বে দ্বন্দ্বোত্তরণের জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বাঙালির সমাজমানস। আমাদের ঔপন্যাসিকরা সমাজজীবনের এই বহুমুখী সত্যকেই রূপায়িত করেছেন উপন্যাসে। ফলে বিষয়ের বৈচিত্র্য ও জঙ্গমতায় উপন্যাসের শিল্পরূপেও সূচিত হয়েছে নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ঔপন্যাসিকের ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা, রুচি, অধীত অনুশীলনও এ ক্ষেত্রে পালন করেছে কার্যকর ভূমিকা। স্বাধীনতা-উত্তরকালের ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যা ও মানব-অস্তিত্বের নানামুখী সংকট উপন্যাসের বিষয়ের মতো শিল্পরূপকেও প্রভাবিত করেছে। এ পর্যায়ে উপন্যাসের উপকরণ-পরিধি যেমন বিস্তৃততর হয়েছে, তেমনি, সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার বহুলাঙ্গিক প্রকাশ উপন্যাসবিধৃত চেতনাকে করেছে দ্বন্দ্বক্ষত ও জটিলতা-আক্রান্ত। স্বাধীনতা-পরবর্তী সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ ও গতির রূপায়ণে বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকরা সন্ধান করেছেন অনিবার্য শিল্পরীতি, উদ্ভাবন করেছেন নব-আঙ্গিক বা রূপকল্প।

১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর স¦াধীন বাংলাদেশের উপন্যাস যে নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, তা হল আত্মসন্ধান, সত্তাসন্ধান ও জাতিসত্তা-সন্ধানের প্রেরণা। এর ফলে ঔপন্যাসিকগণ লোকপুরাণ, পুরাণ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রূপক-প্রতীকে জীবনের সাম্প্রতিক সংকট ও জিজ্ঞাসাকে রূপায়িত করেছেন। অন্যদিকে, স¦াধীনতা-উত্তর জীবনাকাক্সক্ষার অচরিতার্থতাজনিত শুন্যতার কারণে ঔপন্যাসিকগণ হলেন মগ্নচৈতন্য-আশ্রয়ী, অন্তর্মুখী। তাঁদের শিল্পরীতিও অনিবার্য কারণেই হল মনোকথনধর্মী, অন্তর্সংলাপময় আর উপন্যাসবিন্যাস্ত হল উল্লম্ফনধর্মী। দৃষ্টিকোণ নির্বাচনে প্রাধান্য পেল কেন্দ্রীয় ও প্রান্তিক চরিত্র পরিচর্যারীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল প্রতীকধর্মিতা, চিত্রকল্পময়তা, অভিব্যক্তিবাদ এবং পরাবাস্তববাদ। অন্তর্মুখী ঔপন্যাসিকের কাছে গদ্য-পদ্যের ব্যবধান অপসারিত হয়ে উপন্যাসের গদ্যরীতিও হয়ে উঠল মনোময়, গীতধর্মী, চিত্রকল্পময়।

প্রথাগত শিল্পরীতির অনুসরণ

বর্ণনাধর্মিতা

বাংলাদেশের উপন্যাসে স্বাধীনতা-উত্তরকালেও ঊনিশ শতকীয় আঙ্গিকের অনুসরণ প্রলম্বিত হয়েছে। এর কার্যকারণ ঔপন্যাসিকদের প্রথাগত মানসগড়নের মধ্যেই কেবল নিহিত নয়। কেননা, আমরা জানি, যুদ্ধোত্তরকালে কলোনি-শাসন ও জাতিশোষণ থেকে মুক্ত হলেও বাংলাদেশের সমাজচেতনাপ্রবাহের গুণগত রূপান্তর নানা কারণে বিঘিœত হয়েছে। ফলে, আত্মসন্ধান ও জাতিসত্তাসন্ধানের পূর্বতন ধারার অঙ্গীকার মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর সময়প্রবাহে বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকদের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছে। জাতিসত্তার ইতিহাসক্রম এবং সমষ্টি-অস্তিত্বের বাস্তব জীবনজিজ্ঞাসা রূপায়ণের প্রয়োজনবোধ থেকেও ঔপন্যাসিকরা প্রথাগত গঠনরীতির প্রতি মনোযোগী হয়েছেন। শিল্পরূপের সূক্ষ্মতর বিকাশ ও অগ্রগতির জন্য সমাজসংগঠন ও মধ্যবিত্তের মানসগড়নের যে রূপান্তর প্রত্যাশিত ছিল, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তা আজও দূরধ্বনি মাত্র। ফলে, প্রথাগত সমাজপ্যাটার্ন তার দ্বন্দ্ব ও গতির রূপায়ণে উনিশ শতকীয় রীতি-প্রকরণেই ঔপন্যাসিকরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাঙালির সমাজজীবনের সম্পূর্ণতাকে এপিক শৈলীতে রূপদান করলেন আবু জাফর শামসুদ্দীন তাঁর পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৭৪) উপন্যাসে। ইতিহাসের বিশাল পটকে মহাকাব্যিক আয়তনে রূপ দিতে গিয়ে ঔপন্যাসিক ব্যবহার করেছেন বর্ণনাত্মক গদ্যরীতি। ইতিহাসের বঙ্কিম ঘটনাপ্রবাহ কখনো কখনো নাটকীয় আকস্মিকতায় আন্দোলিত হলেও নাট্যরীতি আবু জাফর শামসুদ্দীনের অন্বিষ্ট ছিল না। বিচিত্র জীবন ও চরিত্রের সমাবেশ সর্বজ্ঞ ঔপন্যাসিকের নির্লিপ্ত নিষ্প্রাণ অবলোকনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে মাত্র। তাঁর সংকর সংকীর্তন এই অভিন্ন ধারারই শিল্পরূপায়ণ। ঘটনাপ্রবাহ, সময়প্রবাহ ও চরিত্রপ্রবাহের ক্রমবিচারে তাঁর ‘ত্রয়ী’র প্রথম খ- ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান, দ্বিতীয় খ- সংকর সংকীর্তণ (১৯৮০) এবং তৃতীয় ও শেষ খ- পদ্মা মেঘনা যমুনা। ঘটনা উপস্থাপন ও চরিত্রায়ণের ক্ষেত্রে মূলত বর্ণনাত্মক রীতি অনুসৃত হলেও ঐতিহাসিক কালের বিশাল আয়তন ও চরিত্রকল্পনার নৈয়ায়িক ক্রম অনেকাংশে রক্ষিত হয়েছে এ ত্রয়ী উপন্যাসে।

শিল্পমানের বিচারে আবু জাফর শামসুদ্দীনের দেয়াল এ ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। ঔপন্যাসিকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ কেন্দ্রীয় চরিত্র আব্দুল্লাহ সাহেবের দৃষ্টিকোণের সঙ্গে সমীকৃত হয়ে এ উপন্যাসে অবিচ্ছিন্ন শিল্পবলয় রচনা করেছে। পরিচর্যার ক্ষেত্রে বর্ণনা, বিশেষণ ও চিত্ররীতির যথাযথ প্রয়োগের সমান্তরালে নাট্যরীতির প্রয়োগ কখনো কখনো অনিবার্যতা পেয়েছে। উপন্যাসের কাহিনি উন্মোচিত হয়েছে ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চের পাক হানাদারবাহিনীকবলিত ঢাকা শহরের আরণ্যক হিং¯্র অন্ধকারে। আজীবন পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের বশংবত আব্দুল্লাহর চৈতন্যে অভাবিত-পূর্ব ঐ অভিজ্ঞতা এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করে। তার আদর্শ, বিশ্বাস, দেশপ্রেম কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়। আবদুল্লাহর আত্মসমীক্ষা ও আত্মপরীক্ষার সূত্র ধরে প্রায় অর্ধশতাব্দীকালের বাঙালি জীবনের ইতিহাস বিপ্রতীপ। বিপ্রতীপতা উদ্ঘাটন (ভষধংয নধপশ) পদ্ধতিতে বিন্যস্ত হয়েছে উপন্যাসে।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে প্রকাশিত এপিক আয়তনের উপন্যাসসমূহে মূলত বর্ণনাত্মক পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে। সমাজ, রাজনীতি ও ইতিহাসচেতনার বিচিত্রমূখী প্রকাশকে অধিকাংশ ঔপন্যাসিকই নিস্তরঙ্গ, একমাত্রিক গদ্যরীতিতে উপস্থাপন করেছেন। সরদার জয়েনউদ্দিনের বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ (১৯৭৫), রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা (১৯৭৮), শামসুদ্দীন আবুল কালামের সমুদ্রবাসর (১৯৮৬), আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ (১৯৮৬), হরিপদ দত্তের অজগর (প্রথম খ- ১৯৮৯, দ্বিতীয় খ- ১৯৯১) এ-ধারার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।

রূপক ও প্রতীকধর্মী উপন্যাস

মহৎ ঔপন্যাসিকরা সহজাতভাবেই তাঁদের শিল্প-উপকরণের মধ্যে প্রতীক ও রূপকের সম্ভাবনা লালন করেন। উপন্যাসের উদ্ভবলগ্ন থেকেই এই শিল্প-অভিপ্রায়ের ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। আর্ট ফর্মসমূহের মধ্যে উপন্যাসের জীবনঘনিষ্ঠতা যেহেতু সর্বাধিক, সেজন্য প্রতিকুল ও বিরুদ্ধ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতিতে ঔপন্যাসিকরা তাঁদের সামাজিক-রাজনৈতিক জিজ্ঞাসা রূপায়ণের একান্তিকতায় রূপক ও প্রতীকের আশ্রয় গ্রহণ করেন। যে কারণে সাম্প্রতিক বিশ্বের জটিল ও দ্বন্দ্বময় মানবপরিস্থিতিতে ঔপন্যাসিকরা রূপক ও প্রতীককে সচেতন শিল্পকৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের  ঔপন্যাসিকদের মধ্যে শওকত ওসমানই প্রথম ঐ রীতিকে সচেতন শিল্পক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করেন। ষাটের দশকের সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুনরুত্থান স্বাধীনতা-উত্তরকালেও শিল্পীর আত্মপ্রকাশকে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করে। ফলে, সঙ্গতকারণেই তাঁর কাছে রূপক ও প্রতীক শৈল্পিক অনিবার্যতা লাভ করেছে। পতঙ্গ পিঞ্জর (১৯৮৩) উপন্যাসে শওকত ওসমান রূপকের আশ্রয়ে নিগূঢ় সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। এ উপন্যাসে দীর্ঘ খরা, বৃষ্টির সম্ভাবনা এবং পতঙ্গকুলের আক্রমণ, সঙ্ঘশক্তির উন্মেষ প্রভৃতি অনুষঙ্গ প্রতীকী তাৎপর্যম-িত। এই সব প্রতীকের আশ্রয়ে সমগ্র উপন্যাসে সচেতন রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্তঃসুর প্রবাহিত। উল্লেখযোগ্য যে, এ পর্যায়ে আহমদ ছফার ওঙ্কার (১৯৭৫) উপন্যাসে এক বোবা মেয়ের সবাক হয়ে ওঠার ঘটনাক্রম ষাটের দশকের বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণের সমতাৎপর্যে ইঙ্গিতময় হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। সংহত, সুগঠিত ঘটনা একটি কেন্দ্রাভিমুখী লক্ষ্যে বিন্যস্ত হয়েছে এ উপন্যাসে। সামরিক শাসনপীড়িত, অবরুদ্ধ জাতীয় অস্তিত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে সুবিধাবাদী, প্রতারক ষড়যন্ত্রপরায়ণ এবং পাকিস্তানি আদর্শের ধ্বজাবাহী আবু নসর মোক্তারের বোবা মেয়ে। প্রান্তিক চরিত্রের দৃষ্টিকোণ (ঢ়বৎরঢ়যবৎধষ পযধৎধপঃবৎং ঢ়ড়রহঃ ড়ভ ারব)ি থেকে  রচিত এই উপন্যাসের কথক কেন্দ্রীয় চরিত্র বোবা মেয়ের স্বামী উপন্যসের সংযতবাক্ ঘটনাপ্রবাহে দেশ-বিভাগোত্তর কালের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের ক্রমরূপান্তর সূক্ষ্ম টানে অঙ্কিত হয়েছে। হাসনাত আবদুল হাই-এর তিমি (১৯৮১) শিল্পস্বভাবের দিক থেকে প্রতীকী বৈশিষ্ট্যযুক্ত উপন্যাস। সামাজিক অপশক্তির প্রতীক নওয়াজেশ আলীর চরিত্র-প্রকৃতির সঙ্গে জলজগতের সর্বগ্রাসী প্রাণী তিমির সাদৃশ্য নিরূপণের চেষ্টা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের উপকরণনির্ভর রশীদ হায়দারের খাঁচায় (১৯৭৫) এবং সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬) উপন্যাসেও প্রতীকের চিরায়তিক পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে। রশীদ হায়দার এশটি খাঁচার প্রতীকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী-কবলিত বাংলাদেশকে এবং পাখির প্রতীকে শৃঙ্খলিত ও মুক্ত বাঙালি জীবনের স্বরূপ অঙ্কন করেছেন।  হাঙর নদী গ্রেনেডর বিষয়কল্পনা, চরিত্রায়ণ এবং পরিচর্যার মধ্যেও প্রতীকের নিগূঢ় তাৎপর্য আরোপিত হয়েছে।

আঞ্চলিক জীবনের রূপায়ণ

বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানবচরিত্র যখন ঔপন্যাসিকের সচেতন শিল্প-অভিপ্রায়ে স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে, তখনই একটি সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের জন্ম সম্ভব হয়। উপন্যাসের উপকরণ-উৎস কোনো অঞ্চলের জীবন হলেই আঞ্চলিক উপন্যাস (ৎবমরড়হধষ হড়াবষ) হয় না। এর জন্যে প্রয়োজন ঔপন্যাসিকের আঞ্চলিক জীবনসম্পর্কিত অভিজ্ঞতা, স্থানিক বর্ণিমা। (ষড়পধষ পড়ষড়ঁৎ) রূপায়ণের শিল্প-দক্ষতা। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই আঞ্চলিক উপন্যাসের শিল্পরীতি এক স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এমিলি ব্রন্টি, টমাস হার্ডি, আর্নল্ড বেনেট প্রমুখের উপন্যাসে আঞ্চলিক জীবনের রূপায়ণ নির্বিশেষ চারিত্র্য অর্জন করেছে। উইলিয়াম ফকনারের কৃষিপ্রধান দক্ষিণ আমেরিকার জীবনভিত্তিক উপন্যাসেও আঞ্চলিক জীবনসমগ্রতার সার্থক বিন্যাস ঘটেছে।

ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই বাংলাদেশের আঞ্চলিক জীবন অবলম্বনে উপন্যাস রচিত হয়েছে প্রচুর। কিন্তু শিল্পরীতির বিচারে সফল উপন্যাসের সংখ্যা কম। গভীরতর জীবনবোধের অভাবে শামসুদ্দীন আবুল কালামের কাশবনের কন্যা (১৯৫৪) এবং আলাউদ্দিন আল আজাদের কর্নফুলি (১৯৬২) পরিণত হয়েছে রোম্যান্টিক আখ্যানে, রোমান্সকর নাটকীয় ঘটনা সন্নিবেশে। এ দিক থেকে শহীদুল্লা কায়সারের সারেং বৌ (১৯৬২) বিষয়বস্ত ও চরিত্রায়ণে অনেকাংশে সফল। ‘বহির্বাস্তবের সংঘর্ষে অন্তর্জীবনের সঞ্জীবনী প্রেরণা ও সাহসের যোগফলে নবীতুন স্থান-কাল-পাত্র ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে মানব-অস্তিত্বের প্রতিনিধি।’ স্বাধীনতা-উত্তরকালে আঞ্চলিক জীবনরূপায়ণের সচেতন শিল্প-অভিপ্রায়ে বেশ কয়েকজন ঔপন্যাসিক বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। রিজিয়া রহমানের উত্তর পুরুষ (১৯৭৭), ধবল জ্যোৎ¯œা (১৯৮১), সূর্য সবুজ রক্ত (১৯৮১) ও একাল চিরকাল (১৯৮৪) এবং সেলিনা হোসেনের পোকামাড়ের ঘরবসতি (১৯৮৬) এ-ধারার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এ সকল উপন্যাসে প্রকৃতি পটভূমি (নধপশমৎড়ঁহফ) মাত্র নয়, মানুষের মতোই স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে বিদ্যমান। কখনো সে মানুষের জীবনায়নের সহচরী শক্তি, আবার কখনো-বা বিরুদ্ধতায় ভয়ঙ্কার।

মহাসমরোত্তর নব্যশিল্পনীতি

আঙ্গিকগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিক থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী উপন্যাসে বিচিত্র মাত্রা যুক্ত হয়েছে। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে উদ্ভূত ঔপন্যাসিকরাও এ-পর্যায়ে যুদ্ধোত্তর বহুভুজ চেতনার সঙ্গে সাধর্ম্যসূত্রে নব-নব রীতি উদ্ভাবন করেছেন। বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালের পাশ্চাত্য ঔপন্যাসিকরা রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার বিশাল সঞ্চয় নিয়ে চেতনা ও আঙ্গিকের ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দিগন্ত উন্মোচন করেন, একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকদের জন্যেও সে-রূপ যুগান্তকারী সম্ভাবনার পথ উন্মক্ত করে দেয়। স্বাধীনতা-পূর্ব উপন্যাসপ্রবাহে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র যে নিঃসঙ্গ শিল্পযাত্রা লক্ষ করি, তার মূলে রয়েছে বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় জীবনাভিজ্ঞতা ও শিল্পধারার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ। দুই বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় মানুষের বহির্জীবনচেতনার ক্ষেত্রে সে খ-ায়ন ঘটতে থাকে, তার ফলে নবজাত শিল্পচৈতন্য প্রথাগত সবকিছুরই ধহঃর বা বিরুদ্ধ হয়ে ওঠে। অস্তিত্ব-ধারণা, ঘটনা, সময়, মানুষ, শিল্প, দর্শন,  নন্দনতত্ত্ব প্রতিটি প্রসঙ্গেই নবতাৎপর্য সন্ধানে মনোযোগী হন ঔপন্যাসিকরা। বহির্বাস্তবতার বিচূর্ণ ভগ্নস্তূপ বাস্তবতার ধারাবাহিকতায় যেন পূর্ণচ্ছেদ স্থাপন করে। মানবীয় মূল্যবোধ ও সম্পর্কই শুধু বিপর্যস্ত হয় না, সমগ্র প্রকৃতিজগৎ থেকেই যেন মানবত্ব অন্তর্হিত হয়। ফলে মানুষের ত্রিমাত্রার জ্যামিতিক অবয়বের পরিবর্তে চতুর্মাত্রা চেতনাই অন্বিষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা-উত্তরকালের ঔপন্যাসিকরা উপন্যাসের ফর্ম সন্ধানের ক্ষেত্রে এই নতুন অভিজ্ঞার জগতে পরিভ্রমণ করেছেন। সময় ও অস্তিবোধের যুগান্তকারী পরিবর্তন উপন্যাসের শিল্পরূপকেও করেছে নবমাত্রিক, স্বাতন্ত্র্যাভিসারী।

অন্তর্বাস্তবতার রূপায়ণ

বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালের বহুভূজ জটিল, দ্বন্দ্বময় ও অন্তর্মুখী চেতনা উন্মোচন-সূত্রে ইনার রিয়েলিটিধর্মী উপন্যাসের উদ্ভব। মানব-অস্তিত্বের নানামুখী টানাপড়েন নবমাত্রিক প্রকরণশৃঙ্খলায় এ-জাতীয় উপন্যাসে বিন্যস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে এ ধারার সূত্রপাত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র হাতে। তাঁর উপন্যাসেই প্রথম রূপায়িত হয়েছে ‘অস্তিত্বজিজ্ঞাসু আতঙ্কিত মনের মুক্তিলাভের জটিলতর অন্তর্বাস্তবতা’। ‘ওয়ালীউল্লাহ্র চরিত্রগুলোকে, লক্ষ করি, অস্তিত্বের চেতনা-অবচেতন গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হতে; শুনি তাদের নিঃশব্দ আর্তনাদ; দেখি তারা দু’হাতে ভেঙে ভেঙে চলেছে অন্ধকার; শোনা যায় তাদের কষ্টচালিত শ্বাস-প্রশ্বাস। এভাবেই ভীতিশিহরিত নিরস্তিত্বের গুহাপথ অতিক্রম করে, আত্মপ্রবঞ্চক ‘কীটপতঙ্গ সদৃশ আরেফ আলীরা হয়ে ওঠে সূর্য-প্রতিম, টান টান প্রতিবাদী।’ স্বাধীনতা-উত্তরকালের জটিল সমাজবাস্তবতা, অস্তিত্ব মুক্তচিন্তা ও রাজনৈতিক মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ধাতব প্রতিবন্ধকতার ক্রম-বিস্তার, যুদ্ধোত্তরকালের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গজনিত মর্মন্তুদ অন্তর্দাহ এবং আত্মসন্ধান, আন্তবিশ্লেষণ ও আত্মস্বীকারোক্তির তীব্র আকাক্সক্ষা ঔপন্যাসিকদেরকে এ-ধারার উপন্যাস রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে। শিল্পরীতি বিচারে এই অন্তর্বাস্তবতাধর্মী উপন্যাস স্বাধীনতা-উত্তরকালের এক সফল প্রবাহ।

সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাসসমূহে এই নবমাত্রিক শিল্পরীতির বহুকৌণিক বিন্যাস ঘটেছে। জীবনাভিজ্ঞতার সঙ্গে শিল্প-অভিজ্ঞতার আন্তরক্রিয়ায় তাঁর প্রতিটি উপন্যাসই ফর্ম-সচেতনতার সাক্ষ্যবাহী। দ্বিতীয় দিনের কাহিনী (১৯৮৪), অন্তর্গত (১৯৮৪) এবং স্তব্ধতার অনুবাদ (১৯৮৬) এ-ক্ষেত্রে শিল্পসাফল্যের শীর্ষ স্পর্শ করেছে। এইসব উপন্যাসে দৃষ্টিকোণ, প্লটবিন্যাস, চরিত্রায়ণ, সময়ের ব্যবহার, ভাষারীতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিল্পসতর্ক নিরীক্ষা প্রযুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় দিনের কাহিনী এবং অন্তর্গত উপন্যাসের  উপকরণ একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার অব্যবহিত-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রকরণের ব্যবহার এ-দুটি উপন্যাস ‘মর্মদাহ ও স্বপ্নস্মৃতিচারণায় অপূর্ণ ব্যক্তিসত্তার একক হয়ে উঠেছে। আঙ্গিকগত পরীক্ষার দিক থেকে ‘স্তব্ধতার অনুবাদ’ অধিকতর পরিণত ও নিপুণ সৃষ্টি। এ-উপন্যাস ‘অন্ধকারে নিমজ্জিত নষ্ট মস্তিষ্কের প্রেক্ষণবিন্দু থেকে বিন্যস্ত অনুভূতির প্রতিচিত্র; যা মূলত হয়ে উঠেছে উল্লস্ফনধর্মী, স্থাপনকাল-বিচ্ছিন্ন ও স্বপ্ন-ব্যাকরণময়। তিমিরবিনাশী হতে গিয়ে, আত্মনিষ্কাশন-আত্মখননের এমন কঠোর শ্রম, মুষ্টিমেয় ঔপন্যাসকই আমাদের দেশে স্বীকার করেছেন।’ লেখক ও চিত্রপরিচালক ফয়সাল হোসেন এবং মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইসমাইলের অভিজ্ঞতালোক, আত্মসন্ধান, সত্তাসন্ধান, আত্মখনন ও আত্মহননসূত্রে যুদ্ধাত্তর  বাঙালিজীবনের এক গভীরতর সত্য উন্মোচিত হয়েছে। ঔপন্যাসিকের  দৃষ্টিকোণ বা প্রেক্ষণবিন্দুর সঙ্গে ফয়সাল হোসেনের দৃষ্টিকোণ সমীকৃত হয়ে এ-উপন্যাসে চেতনাবৃত্ত নির্মাণ করেছে। চেতনাপ্রবাহরীতির উপন্যাসে যে রহহবৎ ৎবধষরুধঃরড়হ ড়ভ ঃৎঁঃয আমরা প্রত্যাশা করি, স্তব্ধতার প্রতীকে সেই ব্যাখ্যাতীত নিগূঢ় জীবনসত্যের উন্মোচন ঘটেছে। ‘মানুষের অভিজ্ঞতা অসীম এবং অপূর্ণতাই তার স্বধর্ম।’ উপন্যাসের শিল্পরূপ বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে উচ্চারিত হেনরি জেমসের এই উক্তি সর্বজনবিদিত। শিল্পীর ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা সংবেদনশীলতা ও বহুমাত্রিকতায় নবতাৎপর্য লাভ করে। রশীদ হায়দারের অন্ধকথামালা (১৯৮২) উপন্যাসের বিষয়ও মুক্তিযুদ্ধ। সময়ের ভগ্নক্রমিক ব্যবহার, স্মৃতি, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমান্তরাল বিন্যাস, এবং স্বপ্নচিত্রের বিচিত্র প্রয়োগ এ-উপন্যাসের প্রকরণকে করেছে বিশিষ্ট। মৃত্যুমুখ বেলাল হোসেনের আত্মকথনসূত্রে কয়েক ঘণ্টার ঘটনাবৃত্তে ঔপন্যাসিকের মুক্তিযুদ্ধ-কেন্দ্রিক শিল্প-অভিপ্রায় রূপায়িত হয়েছে।

শামসুর রাহমানের অক্টোপাশ (১৯৮৩) ব্যক্তির আত্মসন্ধান ও আত্মবিশ্লেষণের নিপুণ শিল্পরূপ। এ-উপন্যাসে বহির্জগতের ঘটনা এবং ক্রিয়াশীলতার ভূমিকা গৌণ। উদ্বেগ, ভীতি ও মনস্তাপে কেন্দ্রীয় চরিত্রের যন্ত্রণাদগ্ধ, আতঙ্কিত ও মীমাংসাহীনতার বৃত্তবন্দি জটিল আত্মস্বরূপ শামসুর রাহমানের অন্তর্ময় অবলোকনে অভিব্যক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তমানসের জটিল থেকে জটিলতর বাস্তবতার দিকে ধাবমানতা এ উপন্যাস থেকে অনুধাবন করা যায়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে অন্তর্বাস্তবতা বা রহহবৎ-ৎধবষরঃু-ধর্মী উপন্যাসচর্চার প্রসার উল্লেখযোগ্য। সমাজদেহের জটিল ক্ষত মধ্যবিত্তের মনোজগৎকে যে রক্তিম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করেছে, বাস্তবতার সরল মাত্রায় তার রূপায়ণ সম্ভব নয়। ফলে জীবনপ্যাটার্নের নবতর অন্তর্ময় বৈশিষ্ট্য উপস্থাপনে অনিবার্য আঙ্গিক সন্ধান করলেন আমাদের ঔপন্যাসিকরা। ‘চেতন থেকে অবচেতনে চরিত্রের যাওয়া-আসা, ছিন্নভিন্ন চরিত্রের স্বীকারোক্তি, আন্তঃ-সংলাপ, চিন্তার উল্লম্ফনধর্মী স্বেচ্ছাচারের ছদ্মবেশে অর্থপূর্ণ আত্মকথন : আত্ম-অনুসন্ধানের আত্মদহন; বোধ ও নিঃসঙ্গতার সঙ্গে নিরন্তর মুখোমুখি হওয়া; মনের অনাবিকৃত গহ্বরে চেতনার হেড-লাইট-জ্বালাÑইত্যাদি ইনাররিয়ালিটি-ধর্মী উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য।’ পূর্বে আলোচিত উপন্যাসমূহে এ ধারার শিল্পরীতির বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেছি। হুমায়ুন আহমেদের নন্দিত নরকে (১৯৭২) ও শঙ্খনীল কারাগার (১৯৭৩), রাহাত খানের এক প্রিয়দর্শিনী (১৯৮৩), ছায়া দম্পতি (১৯৮৪), খেলোয়াড় (১৯৯১), সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের একজন (১৯৭৫) মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন (১৯৭৬) রশীদ করীমের প্রেম একটি লাল গোলাপ (১৯৭৮); বশীর আল হেলালের কালো ইলিশ (১৯৭৯) ও শেষ পানপাত্র (১৯৮৬); সেলিনা হোসেনের মগ্ন চৈতন্যে শিস (১৯৭৯) ও পদশব্দ (১৯৮৩); রাজিয়া খানের চিত্রকাব্য (১৯৮০) ও হে মহাজীবন (১৯৮৩) হাসনাত আবদুল হাই-এর আমার আততায়ী (১৯৮০); মঞ্জু সরকারের তমস (১৯৮৪), নগ্ন আগন্তুক (১৯৮৬), ও প্রতিমা উপাখ্যান (১৯৯০); শামসুর রাহমানের অদ্ভুত আঁধার এক (১৯৮৫), ও নিয়ত মন্তাজ (১৯৮৫), শওকত আলীর অপেক্ষা (১৯৮৫), আল মাহমুদের ডাহুকী (১৯৯২), হুমাযুন আজাদের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল (১৯৯৪) ও সবকিছু ভেঙে পড়ে (১৯৯৫); মঈনুল আহসান সাবেরের পাথর সময়; শহীদুল জহিরের সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫); নাসরীন জাহানের উডুক্কু (১৯৯৩), চন্দ্রর প্রথম কলা (১৯৯৫) এ-ধারার উপন্যাসের বৈচিত্র্যের সাক্ষ্যবাহী। এই শ্রেণীর উপন্যাসে সময় ও ঘটনার সরল বিন্যাস পরিত্যক্ত হয়েছে। চরিত্রের বহির্জগতের পরিবর্তে মূল্য পেয়েছে চেতন-অবচেতনের বিচিত্র গতিবিধি। চেতনাপ্রবাহ-পদ্ধতির সচেতন প্রয়োগ কোনো কোনো উপন্যাসের শিল্পমানকে আন্তর্জাতিক রীতির সমধর্মী করে তুলেছে। এ প্রসঙ্গে স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বিষয়-বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্যের দিক থেকে এ জাতীয় উপন্যাসের সংখ্যা সর্বাধিক। পাঠকের মনোরঞ্জন ও ব্যবসায়িক সাফল্যের কল্যাণে কোনো কোনো লেখক ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করেছেন। কিন্তু সবকালেই উপন্যাসের শিল্পরীতি মননশীল অনুধ্যানের বিষয়। লোকরঞ্জনের আকাক্সক্ষা সাময়িক ও স্থুল; আর শিল্প চিরকালের বিষয়। শিল্পীর লক্ষ্য বর্তমানের পাঠক নয়, চিরকালের পাঠক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুরঙ্গ (১৯১৬), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথা (১৯৩৬), সতীনাথ ভাদুরীর ঢোঁড়াই চরিতমানস (১৯৪৯-১৯৫১), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্’র লালসালু (১৯৪৮) উপন্যাসের কথা এ-প্রসঙ্গে স্মরণীয়। শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮), সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫), মুখের দিকে দেখি (২০০৬) এবং আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু (২০০৯) উপন্যাস বিষয় ও আঙ্গিকভাবনায় এই নবচেতনার সাক্ষ্যবাহী। জাতীয় ইতিহাসের অন্তঃস্রোতের সঙ্গে ব্যক্তি ও সমষ্টির বহুস্তরীভূত চেতনালোক উপন্যাস তিনটিতে অসাধারণ দক্ষতায় রূপায়িত হয়েছে। শহীদুল জহির বাঙালি জীবনের মূল  প্রবাহকে তাঁর গতিশীল সংস্কৃতিভাবনার কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। এ-কারণে তাঁর উপন্যাসের বর্ণনারীতিও প্রচলিত ভড়ৎস ভেঙে ভেঙে অগ্রসর হয়েছে। তাঁর উপন্যাসের পরিচর্যা ও ভাষারীতি ব্যক্তির অবচেতেনের (ঢ়বৎংড়হধষ ঁহপড়হংপরড়ঁং) সমান্তরালে সমষ্টির অবচেতনকে (পড়ষষবপঃরাব ঁহপড়হংপরড়ঁং) ধারণ করেছে। পরাবাস্তব আঙ্গিককে তিনি নতুন সম্ভবনায় নিয়ে গেছেন। মুখের দিকে দেখি উপন্যাসে নিঃশব্দতার ভাষা-ব্যাকরণ বাংলা সাহিত্যে অভিনব। উপন্যাসের বিষয়ভাবনা ও আঙ্গিক নির্মাণে শহীদুল জহির তাঁর কালকে অতিক্রম করে গেছেন। শওকত ওসমানের আর্তনাদ (১৯৮৫) উপন্যাসে যুদ্ধোত্তোর প্রকরণ সাফল্যের সঙ্গে অনুসৃত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের চেতনাবাহী এই উপন্যাসে সমাজের মাত্রা এবং ব্যক্তির মাত্রাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করেছেন ঔপন্যাসিক। কোরাস অংশে যাত্রী বোঝাই চলামান বাসের পটভূমিতে কাহিনির উন্মোচন। ভাষা আন্দোলনে শহীদ সন্তানের পিতার নিঃশব্দতা এবং দীর্ঘশ্বাস অতঃপর তার জিজ্ঞাসা ও ক্রন্দনে সকল যাত্রীর মধ্যে আলোড়ন এ-অংশের উপজীব্য। একাকী অংশে আত্মকথনের ভঙ্গিতে সর্বজ্ঞ ঔপন্যাসিক বাঙালী জাতিসত্তার অন্তরিত হাহাকারকেই যেন রূপায়িত করেছেন। এ-উপন্যাসেও বহির্গামী ঘটনা তাৎপর্যহীন। চেতনার বহুমুখী প্রসারণ ইতিহাসের জটিল ও দ্বন্দ্বক্ষত প্রান্তসমূহ স্পর্শ করেছেন। ক্লাসিক গুণম-িত গদ্যের মধ্যে শওকত ওসমান সঞ্চার করেছেন সাম্প্রতিক চেতনা ও প্রকণের অন্তর্গুণ। উপন্যাসের শেষাংশে জাতীয় ইতিহাসের অস্বাভাবিক, অভূতপূর্ব, রক্তাক্ত, জটিল ও দ্বন্দ্বময় পরিস্থিতি-পরম্পরার গভীর অনুভব জেমস্ জয়েসীয় গদ্যশৈলীতে রূপায়িত হয়েছে। একজন শহীদের আত্মকথন জাতিসত্তার মর্মস্থানের বাণীরূপ হয়ে উঠেছে।

মিথ-ঐতিহ্য, ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন : নব-আঙ্গিক

স্বাধীনতা-উত্তরকালের সমকালীন ব্যক্তিক ও সামূহিক অস্তিত্বের বিমিশ্র বাস্তবতার বিপ্রতীপ শক্তি-উৎস আবিষ্কারের অভিপ্রায় থেকে ঔপন্যাসিকরা মিথ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য-আশ্রয়ী উপন্যাস রচনা করেছেন। জাতিসত্তার গভীরে যে প্রাণময় সত্তা সংগুপ্ত থাকে, যুদ্ধোত্তর ঔপন্যাসিকের কাছে তা-ই হয়ে ওঠে নবমাত্রিক জীবনচেতনার প্রেরণাশক্তি। এ পর্যায়ের প্রকরণসতর্ক ঔপন্যাসিকরা মিথ বা পুরাণকে কেবল উপকরণ বা বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেন নি, তাঁদের সৃষ্টিতে মিথ হয়ে উঠেছে গঠনকৌশলের নিগূঢ় প্রক্রিয়া (ঁংব ড়ভ সুঃয ধং ধ ংঃৎঁপঃঁৎরহম ফবারপব) স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে মিথ-ঐতিহ্য ও ইতিহাস উপন্যাসের  উপকরণ প্রকরণের ক্ষেত্রে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য সঞ্চার করেছে। সময় ও সমাজসংকটের পরিপ্রেক্ষিতে সংবেদনশীল শিল্পেচৈতন্য আত্মসন্ধান ও শক্তি অর্জনের জন্য মিথ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যলোকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এই শিল্পক্রিয়া স্বাভাবিক এবং মনোবিজ্ঞানসম্মত এ ধারার উপন্যাসে ইতিহাসের বহির্ঘটনার পরিবর্তে তার শাশ্বত অন্তর্সত্য গৃহীত হয়েছে। ইতিহাসের বহির্ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্ব নিঃসন্দেহে অপরিসীম। কিন্তু তার অন্তঃশীলা জীবনরহস্য যা বহির্বাস্তাবতার অজ্ঞাত থেকে যায়। নির্মাণ করে ইতিহাসের দর্শন। শিল্পীর চেতন অবচেতনা ইতিহাসের এই অন্তর্ময় প্রবাহের ভূমিকাই সর্বাধিক। সেলিনা হোসেনের নীল ময়ূরের যৌবন (১৯৮৩) ও চাঁদবেনে (১৯৮৪), অজয় ভট্টাচার্যের অরণ্যানী (১৯৮৪), সৈয়দ শামসুল হকের আয়না বিবির পালা (১৯৮৪) এবং মুহম্মদ নূরুল হুদার জন্মজাতি (১৯৯৪) এই নবমাত্রিক জীবনান্বেষার শিল্পরূপ।

নব্যবাস্তবতাবোধ : আঞ্চলিক জীবনের রূপায়ণ

জীবনের বস্তুস্বভাবকে অনিবার্য রূপাঙ্গিকে প্রকাশের অভিপ্রায় উপন্যাসশিল্পের এক আবহমান বৈশিষ্ট্য। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এর সূত্রপাত হলেও সাম্প্রতিককালের ঔপন্যাসিকদের বোধের তীক্ষèতা ও গভীরতা এ ধরায় নবমাত্রা যোগ করেছে। যুদ্ধোত্তরকালে আঞ্চলিক জীবনের সমগ্রতা নির্মাণের প্রয়াসে ঔপন্যাসিকদের বাস্তবদৃষ্টি হয়ে ওঠে বহুমুখী ও অনুপুঙ্খচারী। আবুবকর সিদ্দিকের জলরাক্ষস (১৯৮৫) ও খরাদাহ (১৯৮৭) উপন্যাসে জীবনের যে বস্তুস্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে, শিল্প-অভিজ্ঞতার দিক থেকে তা নিঃসন্দেহে অভূতপূর্ব। এ দুটি উপন্যাসে মৃত্তিকাসংলগ্ন মানুষের জীবনপ্যাটার্ন ও অস্তিত্বসংগ্রামের স্থানিক (ষড়পধষ) রূপ ও রঙ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রূপায়িত হয়েছে। খুলনা-বাগেরহাটের নিম্নাঞ্চলের মানুষেরা প্রতিকূল প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে অভ্যস্ত। কিন্তু এর সঙ্গে যখন ‘ইতর প্রশাসন’-যন্ত্র যুক্ত হয়ে নি¤œবিত্ত-বিত্তহীনের জীবন, জীবিকা ও সম্ভ্রম বিনষ্ট করতে উদ্যত হয়, তখন সর্বস্বহারা মানুষের দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ ক্ষোভ হিংস্রতায় উদ্দাম হয়ে ওঠে। গোনজোরালি ও জরিনের অস্তিত্বরূপ ও তার সংগ্রামকে এই বাস্তবতার আলোকেই উপস্থাপন করেছেন ঔপন্যাসিক। জলরাক্ষস-এ জীবন নির্বাচন ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে যথাস্থিতবাদী (হধঃঁৎধষরংঃরপ) শিল্প-নিরীক্ষা অনেকটা সফল হয়েছে। প্রকৃতি বর্ণ ও বর্ণান্তর, চরিত্রস্বভাবের সঙ্গে প্রকৃতিরূপের সঙ্গতি নির্মোহ নিরাসক্তিতে রূপায়িক হয়েছে এ উপন্যাসে। খরাদাহ উপন্যাসের পটভূমি উত্তর বাংলার খরাপীড়িত ভূ-প্রকৃতি ও তার অন্তর্গত মানব-মানবী। ‘পাথুরে লাল মাটি, লু-হাওয়ার হলকা, দয়ামায়াহীন খরা, পোড়া কালো নরনারী, তাদের গনগনে মেজাজ’ এ উপন্যাসে অধিকতর সংহত সুগঠিত রূপাবয়ব লাভ করেছে। জীবন রূপায়ণের ক্ষেত্রে আবুবকর সিদ্দিক প্রথাগত শিল্পরীতির অনুশাসন সম্পূর্ণ অস্বীকার করে  অগ্রসর হয়েছেন।

এপিক ফর্ম : যুদ্ধোত্তর নন্দনতত্ত্ব

স্বাধীনতা-উত্তর সমাজকাঠামোতে জীবনের যৌথায়নের সম্ভাবনা ক্রমান্বয়ে অন্তর্হিত হয়েছে। জীবনের ছক ভেঙেছে। সেই সঙ্গে সময়ধারণার ক্ষেত্রেও যুগান্তাকরী রূপান্তর সাধিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা, নতুন মানচিত্র ও জীবনধারায় প্রথাগত মূল্যচেতনা, জীবনধারণা অভাবিতপূর্ব সংকটের সম্মুখীন হয়েছে জাতিসত্তার প্রশ্নে অনাকাক্সিক্ষত বিতর্ক ইতিহাস ও সময়সতর্ক শিল্পীর জন্য হয়ে উঠেছে নবতর সৃজনবেদনার কার্যকারণ। অস্তিত্বগত বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ ভূমিকা সত্ত্বেও শিল্পীর সমগ্রতা-অন্বেষী শিল্প-অভিপ্রায় অনিবার্য প্রকরণ সন্ধান করেছে। ব্যক্তির আত্মসন্ধান, সত্তাসন্ধান ও জাতিসত্তা সন্ধানের প্রয়োজনবোধ এ পর্যায়ের রাজনীতিসতর্ক ঔপন্যাসিকদেরকে ঐতিহাসিক ঘটনা, সময় ও চরিত্রপ্রবাহের প্রতি মনোযোগী করেছে। কিন্তু প্রথাগত শিল্পরীতির অনুশাসন ঐ সব উপন্যাসের আবেদনকে সর্বজনগ্রাহ্য করতে পারে নি। শিল্পের বিবর্তন মূলত প্রকরণনির্ভর। অবশ্য প্রকরণের নবত্ব অনেকাংশে বিষয় বা চেতনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মহাকাব্যিক রূপাঙ্গিকে সমাজসত্তার মর্মমূল-উৎসারিত আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন ও যন্ত্রণার রূপায়ণে যুদ্ধোত্তর প্রকরণের প্রতি খুব কম ঔপন্যাসিকই মনোযোগী হয়েছেন। শওকত আলীর ‘ত্রয়ী’ দক্ষিণায়ণের দিন-কুলায় কালস্রোত-পূর্বরাত্রি পূর্বদিন (১৯৮৫-৮৬) এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৬) ও খোয়াবনামা (১৯৯৬) এই নব শিল্পধারার উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। শওকত আলীর ট্রিলজিতে বিশ শতকের ষাটের দশকের কু-লায়িত সময়ের নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবন রূপায়িত হয়েছে। উপন্যাসের ঘটনা, চরিত্র ও সময় ‘কেন্দ্রীয় রস-আবেগে ঘূর্ণিত, দ্রবীভূত ও স্ফটিকায়িত’ হয়ে রূপ লাভ করেছে। ১৯৬৫-১৯৬৯ কালপরিসরের ঘটনা বিধৃত হলেও চরিত্রচেতনার সূত্রে সময়ের বিশাল আয়তন এতে বিধৃত হয়েছে। শওকত আলীর উপস্থাপনভঙ্গি মূলত বর্ণনাতœক হলেও প্লটবিন্যাস ও চরিত্রায়ণের নিগূঢ় পদ্ধতি উপন্যাসের আঙ্গিককে করেছে নবমাত্রিক। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে এপিক ফর্মের চিরায়ত রূপের মধ্যেই আধুনিক জীবনের জটিল সংকটকে রূপ দিয়েছেন ঔপন্যাসিক। সমাজের প্রথাগত অবরুদ্ধ কাঠামোর মধ্যে ষাটের দশকে যে যুগান্তকারী পরিবর্তনের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, মধ্যবিত্তের অস্তিত্বরূপ ও জীবনজিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া ছিল জটিল ও অন্তর্দ্বন্দ্বময়। বাঙালী জাতির অস্তিত্বসংগ্রামের আবহমান চেতনাকে সর্ব-আয়তনিক করে জীবনের চলামান রেখা ও টোনের সঙ্গে মিথ-ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনিবার্য সম্পর্কসূত্র নির্দেশ করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস খোয়াবনামা রচনা করেন। বাঙালিজীবনের বিচিত্র পট, মানব-অস্তিত্বের সংকট ও শ্রেণিসংগ্রামের রক্তিম অন্তঃস্রোত এ উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও শিল্পরূপকে অসাধারণত্ব দান করেছে বিচিত্র ঘটনা, উপ-ঘটনা ও চরিত্রের যে সমাবেশ এ উপান্যাসে লক্ষ করি, তা কেবল জীবনের বহির্বাস্তবতাকেই নয়, সমাজবাস্তবতার অন্তঃস্থ গভীরতর সত্যকেও উন্মোচন করে’। এ ধারার উপন্যাসের সাম্প্রতিক সংযোজন হরিপদ দত্তের জন্ম জন্মান্তর (২০০০)। বাঙালিজীবনের প্রাকৃত স্তর থেকে মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়সীমা পর্যন্ত এ উপন্যাসের ঘটনাংশ প্রসারিত। ব্যক্তির ভেতর-বাইরের সংগ্রামের সঙ্গে জাতীয়-আন্তর্জতিক বিচিত্র ঘটনার অন্তর্বয়ন এর এপিক শৈলিতে নতুনত্ব আরোপ করেছে। মিথ-উৎস, প্রতœ-ইতিহাস, গোষ্ঠী, সমষ্টি ও ব্যক্তির অস্তিত্ব রূপায়ণে ঔপন্যাসিকের শিল্পসতর্কতা বিস্ময়কর। স্বাধীনতার পর স্বতন্ত্র স্বাধীন জাতি হিসেবে তিন দশক কাল আমরা অতিক্রম করেছি। সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ঘাত-প্রতিঘাতে আমাদের জীবন হয়েছে ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত। এইসব অভিজ্ঞতায় ঔপন্যাসিকগণ বাঙালী-অস্তিত্বের নিগূঢ় উদ্বেগ, জটিল জিজ্ঞাসা ও দ্বন্দ্বময় জীবনের বহুকৌণিক সত্য রূপায়ণে মনোযোগী হয়েছেন। সমাজ ও জীবনের রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসের উপকরণ ও বিষয়ের মতো এর শিল্পরীতিরও বিবর্তন ঘটেছে। এভাবেই স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের উপন্যাস বাঙালির জাতীয় চৈতন্যের সমগ্রতার শিল্পরূপে পরিণত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর অস্তরাগ এবং একবিংশ শতাব্দীর আগমনী বিশ্বজীবনে বিচিত্রমুখী আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে এক দশক সময়কাল আমরা অতিক্রম করে এসেছি। জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য-দর্শন, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আজ অতীত কর্মের সমীক্ষা এবং সম্মুখচলার প্রস্তুতি। সাহিত্যের সর্বাপেক্ষা জীবনঘনিষ্ঠ মাধ্যম উপন্যাসের ক্ষেত্রেও নতুন শতাব্দীর উপযোগী বিষয়ভাবনা ও শিল্পমাত্রা সংযোজিত হবে, এটাই প্রত্যাশিত। [পুনর্মুদ্রিত]

*******************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা