50314526_809495946058671_3871654047995920384_n

ক্রো ড় প ত্র–২

 

শব্দের উৎসবে অভিযাত্রী : মহাকাশ অভিযান
সমীর রায়চৌধুরী

বঙ্গীয় চিন্তাচেতনায় ঔপনিবেশিকতাবাদী আধুনিকতার দাপটে পোস্টমডার্ন আর মডার্ন ভাবকল্প দুটোর মধ্যে নানা বিভ্রান্তি রয়েছে। এমনকী, কেউ কেউ মনে করেন যে পোস্টমডার্ন বুঝিবা মডার্নকে বা মডার্নিস্টিকে পিছিয়ে দিতে চায়। এইসব গোলমেলে অবুঝ আগে স্পষ্ট হওয়া দরকার। এ কোনো রেসখেলা নয়। এগিয়ে থাকা পিছিয়ে যাওয়ার মধ্যে সময়ের অনুক্রমের প্রসঙ্গকে ভর করে ধারণাটি গড়ে উঠেছে। ভাবনা এক্ষেত্রে সময় সম্পর্কিত। মডার্ন বা আধুনিকতা সময়/ কাল বিষয়ক ভাবনা। অথচ পোস্টমডার্ন কাল/ সময় বিষয়ক ভাবনা নয়। ঔপনিবেশিকতাবাদী আধুনিকতা উপনিবেশের মানুষজনকে পিছিয়ে থাকা এবং অপেক্ষাকৃত অশিক্ষিত, আধুনিক, অনগ্রসর ইত্যাদি মনে করে সেইভাবেই শাসনকার্য চালিয়েছে বা ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তুলেছেন। সেই কাঠামো অনুযায়ী গড়ে উঠেছে সংস্কৃতি এবং সাংস্কৃতিক যাবতীয় বিচার বিবেচনা।

প্রাগাধুনিক কবি ছিলেন প্রকৃতির মহাপারিবারিক আয়োজনে সংপৃক্ত বা আসঙ্গযুক্ত উপস্থিতি। সংস্কৃতি নামে বা সংস্কৃতিসম্পন্ন আলাদা মাপকাঠি ছিল না। সংস্কৃতির ধারণা এগিয়ে থাকা পিছিয়ে থাকার ধারণাকে প্রশ্রয় দিয়েছে। প্রাগাধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে রচনা ছিল ঈশ্বর নির্দেশিত। এমন কি স্বপ্নাদৃষ্ট।

পোস্টমডার্ন ভাবকল্প সময়ের অনুক্রম মান্য করে রচিত নয়, বরং এই অনুক্রম আগ্রাহ্য করে এবং সারগ্রাহিতা বা একলেকটিক শর্তকে প্রশ্রয় দেয়। দৈশিকতাকে ভর করে এই অভিধা গড়ে উঠেছে। ভাবকল্পটি আষ্টেপৃষ্ঠে স্পেসকেন্দ্রিক। এটি অবলোকন ভঙ্গি, উপস্থাপন ভঙ্গিমা। এগিয়ে থাকা পিছিয়ে পড়ার ধারণাকে মোটেই আমল দেয় না। তাই মডার্ন ভাবকল্পে যাঁরা আস্থা রাখেন তাঁদের এই দিক থেকে বিপন্ন বোধ করার বা বিরূপ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

এবার দেখা যাক এই স্পেসকেন্দ্রিক ব্যাপারটা কী? স্থান, পরিসর, এলাকা, প্রকৃতি, স্তর ইত্যাদি শব্দগুলি প্রসঙ্গক্রমে। বিবেচনার আওতায় আসে। মডার্ন বা ঔপনিবেশিকতার দিক থেকে দেখতে গেলে যে সব এলাকা, পরিসর, স্থানিকতা, বঞ্চিত বা বিপন্ন হয়েছিল সেদিকগুলিতে দৃষ্টি ফেরায়। যেমন, প্রকৃতি নারী, নিম্নবর্গ, আয়োজনের কাঠামো, পরিবেশ ইত্যাদি। ভাষা এমনই এক স্পেস।

এদেশে ভাষা মূলত বহুরৈখিক। পুরনো অভিধান ঘাঁটলে দেখা যাবে একই শব্দের অনেক মানে। অথচ মানেগুলোর মধ্যে সাধর্মসম্পর্ক রয়েছে, যেমন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শব্দকোষ’। আধুনিকতা শব্দের অর্থময়তাকে ঔপনিবেশিক জীবনের আর সব এলাকার মতো একরৈখিক করে তুলেছে। পোস্টমডার্ন ভাবকল্পে কবিতা শব্দের উৎসবে অভিযাত্রী। শব্দ ও শব্দসম্পর্ক তার অর্থময়তার পরিসর স্থানিক আর বহুরৈখিক।

বিষয়টিকে সহজভাবে স্পষ্ট করে তোলার জন্য প্রভাত চৌধুরীর ‘বর্ণপরিচয়’ কাব্যগ্রন্থ থেকে যে কোনো একটি কবিতা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই কাব্যগ্রন্থে এক একটি অক্ষর নিয়ে কবিতা রচিত হয়েছে। অক্ষর ভাষা মানচিত্রের স্পেসের ক্রমসংযোজক। দেখা যাক ‘গ’ অক্ষর নিয়ে কবিতাটি :

গতানুগতিকতা থেকে যাঁরা বেরিয়ে আসতে চাইছেন তাঁদের গন্ধমূষিক সম্পর্কে কিছু না জানলেও চলবে, তবে গন্ধর্বলোক বিষয়ে ২/৪ কথা জেনে রাখা ভালো, কারণ গম্বুজ যেভাবে একা একা দাঁড়িয়ে থাকে কিংবা গম্ভীরার জন্য যাঁরা অপেক্ষা করেন— উভয়ের গমন ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু গরিষ্টের মতামতকে গ্রাহ্য করতেই হয়, গ্রিকপুরাণ থেকে এটা জানানো যেতেই পারে,এই গ্লাসনস্তের সময়ে গ্রীষ্মাবকাশ দেওয়া হচ্ছে না— এটা বলার জন্য গৌরচন্দ্রিকা না করলেও চলবে, একটি গাধাবোটে যাঁরা গাদাগাদি করে গাথা রচনার গড্ডলিকা প্রবাহে ব্যস্ত আছেন, তাঁদের গ-ীর না হলেও চলে যাবে, তবে আমি বাবা এই গণতন্ত্রে নেই, বরং গাড়িবারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে একা একা গতিবিজ্ঞানের কথা ভাবব, এই দৃশ্যে যে একটি গড়াগড়া কিংবা গঙ্গাফড়িং হজির হবে— এতটা অনুমান করা যাচ্ছে না, গণমাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অর্থ কখনোই গরহাজিরা নয়, যে কোনো পদার্থ ব্যবহারের আগে তার গলনাঙ্ক জেনে রাখা বাধ্যাতামূলক হলেই গাছপালা সম্পর্কে আমাদের দায়িত্ব বেড়ে যাবে, সমস্ত গুণীজন যে টিকে থাকার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করেন এই গুরুগম্ভীর তথ্যটির বাস্তবতা গুহাজীবনে থাকতে পারে, এখন নেই, গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য গোষ্ঠলীলায় অংশগ্রহণে যারা আগ্রহী তাদের রান্নায় গোলমরিচ ব্যবহার নিষিদ্ধ, গোলরক্ষার কাজে ব্যস্ত গৃহিণীদের এটিকে গুরুত্ব দিতে হবে, গোধূলিলগ্ন গোপালনে যাঁরা লিপ্ত আছে এইসব গল্পগুজবে তাঁদের ভূমিকাটি কী হবে?

গিরি-গিরিগিটিটি কি আবার বং বদলালো?

গ অক্ষর দিয়ে রচিত কিছু পরিচিত শব্দ নিয়ে এমন এক চমৎকার কবিতা গড়ে উঠেছে যে সেখানে দিশানির্দিষ্টতার সমস্ত সম্ভাবনাকে ভাঙতে ভাঙতে কবিতাটি এমন এক ভাষাদেশে ভ্রমণ উৎসুক করে তোলে যেখানে গ অক্ষরের মানচিত্র সমাপনের আর প্রয়োজন হয় না বরং এক অশেষ মুক্ত পরিসরের জন্ম দেয় যার মানচিত্রটি কখনোই পরিক্রমা শেষ করে তার প্রস্থানবিন্দুতে ফিরে আসবে না। কবিতাটির শেষ পঙ্ক্তিতে যে গিরি-গিরগিটিটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সেটি অবিরাম রং বদলাতে পারে প্রকৃতিলগ্ন এই স্বভাবগুণে তার বর্ণ একমাত্রিক নয়। বর্ণ পরিচয় থেকে এই বর্ণসংকেতে কবিতাটি মুক্তসমাপ্তি ছেড়ে দিয়ে তার সম্প্রসারণ প্রবণতাকে উসকে দেওয়া হয়েছে।

পরিবর্তন অনিবার্য়। প্রকৃতিতেও ঋতু পরিবহণে বদলে যায় ভূ-প্রকৃতি। মানুষের জীবনও পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু পরিবর্তন আর প্রগতি এক নয়। প্রগতির ধারণা এসেছে সংস্কৃতির ধারণা থেকে। ঔপনিবেশিকতার দাপট থেকে। কবিতার ক্ষেত্রে যেমন বলা যায় প্রভাত চৌধুরীর কবিতার টেক্সট অরুণ মিত্র বা অলোক সরকার-এর কবিতা থেকে ভিন্ন, তা বলে অধুনান্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে কখনোই বলা যায় না যে এঁদের মধ্যে কেউ এগিয়ে আছেন বা পিছিয়ে আছেন। তবে বলা যায় কোনো রচনা পোস্টমডার্ন আর কোনোটাই বা মডার্ন।

অনেকে আবার এও বলতে পারেন এটা কী আদৌ কবিতা হয়েছে। এখন প্রশ্নের অন্তরালে প্রশ্নকারীর আস্তিনে একটা গোপন এ্যাজেন্ডা থাকে যা আধুনিকতার ক্ষমতার ধারণা থেকে প্রসূত। অর্থাৎ কবিতা রচনার ক্ষমতা করো করো আছে। এটা যেন ক্ষমতা থাকা না থাকার ব্যাপার। অর্থাৎ টেক্সটের মধ্যে সময় অনুক্রমের অনুপস্থিতির ফলে এই নব আবিষ্কৃত পরিসর গ্রাহ্য করতে প্রশ্নকারীর অসুবিধা হচ্ছে। সময়ের অনুক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুক্তির অনুক্রম। যুক্তি পরপর এক পঙ্ক্তি থেকে পরের পঙ্ক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে, এগোতে এগোতে শেষ লাইনে পৌঁছচ্ছে। তার মানে তলে তলে থেকে যাচ্ছে প্রগতির ধারণা। অনুক্রম লিনিয়ারিটি বা একরৈখিকতার বাহক। উল্লম্বতা বজায় রাখছে। অনুক্রম সময়ের অগ্রসরতার শর্তকে ধরে রাখে।

‘গ’ কবিতাটিতে সময় বা যুক্তির অনুক্রম অনুপস্থিত। ওই ধরনের অনুক্রমের সাহায্যে ‘গ’ কবিতাকে সাজানো হয়নি। বরং সেই আধুনিকতাবাদী অনুক্রমকে আগ্রহ্য করা হয়েছে। মস্করা গড়ে উঠেছে সেই সময়ক্রম ভিক্তিক আর যুক্তিক্রমভিত্তিক অনুক্রমের প্রতি। এখানে রয়েছে পালটা এক অনুক্রম যা ওই আধুনিকতাবাদী অনুক্রমের প্রতি রঙ্গতামাশা। এ যেন স্বরগ্রামের তৃতীয় স্বরের সাদা গিটকারি। গ অক্ষরের ঠুংরি টপ্পা প্রচলিত অনুক্রম ভেঙে অনুক্রমসদৃশ আরেক ধরনের পালটা সংযোগ সৃজন।

প্রাগাধুনিক জীবন ছিল কৃষিনির্ভর। সময়ের হিসেব আর সময়াতিপাত ছিল প্রকৃতিভিত্তিক। অর্থাৎ প্রকৃতির সময় অনুযায়ী জীবন যাপন। কাব্যে, মাহাকাব্যে, পাঁচালি বা গাঁথায় সেই প্রকৃতিলগ্ন সময়বোধের উপস্থিতি। এই সময়বোধ পালটে যায় শিল্প আয়োজনের গুরুত্ব মানুষের জীবনে দেখা দেওয়ার পর। শিল্প-বিপ্লবের পর কলকারখানার স্থাপন, শ্রমিকশ্রেণির উদ্ভব এবং সেইমতো সময়ের তাৎপর্যবদল। প্রকৃতির সময় থেকে সরে গিয়ে নগরজীবনে শ্রমভিত্তিক অনুশাসনের পত্তন থেকে মনুষ্যসৃষ্ট সময়ের গুরুত্ব। সেই সময় অনুযায়ী জীবনের ছন্দবদল। এই সময়াতিপাতে অনুক্রম ক্রমশ কঠোর থেকে কঠোরতর যুক্তির অনুক্রমে গ্রাহ্য। সেই জীবন বা সময়বোধ থেকে উদ্ভূত চিন্তাচেতনা মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পরিধি। আর সেই বোধের ভিত্তিতে রচিত কবিতা, ছোটোগল্প, উপন্যাসের কঠামো। এই পর্বে বিজ্ঞানের দ্বিতীয় তরঙ্গের প্রাধান্য।

বিজ্ঞানের তৃতীয় তরঙ্গ এই চিন্তাচেতনা থেকে সরে এসেছে। ঔপনিবেশিক শাসনের যেমন অবসান হয়েছে সেই একদা শাসিত ভূখ-ে স্বশাসনের সঙ্গে এসেছে স্থানিকতার প্রতি গুরুত্বের বোধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্ব শুরু হল। প্রত্যেক ভূখ- বেরিয়ে আসে ঔপনিবেশিক শাসনের দাপট থেকে। তৃতীয় তরঙ্গজনিত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি জীবনের আয়োজনে এনেছে বিস্তর পরিবর্তন। এই পরিবর্তন ক্রমশ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে আধুনিকতাবাদী দৃষ্টিকোণও বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে শিল্প সাহিত্যের কাঠামো। কবিতার সমগ্র আয়োজন। সময় বা যুক্তির আগের অনুক্রম ছিল বন্ধন। বয়ানের সাজানো বাগান। এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসছে কবিতা। কীভাবে বেরিয়ে আসছে সেই অবস্থানকে তুলে ধরেছে ‘গ’ কবিতা। কবিতাটি ‘আমি’ নামক ব্যক্তি প্রতিস্বের নির্মাণে বা প্রদর্শনে আগ্রহী নয়।

ব্যক্তি প্রতিস্ব নির্মাণের ধারাটিও এসেছিল ঔপনিবেশিকতাবাদী চিন্তাচেতনা থেকে। এই ধারণা খ্রিস্টিয় দর্শনজাত। মহাকাব্য থেকে পাঁচালি অব্দি কাব্যআয়োজনে ব্যক্তি প্রতিস্ব নিমাণের ঝোঁক অনুপস্থিত। ঔপনিবেশিক ব্যক্তি প্রতিস্ব নির্মাণের প্রকল্প বস্তুত মানুষকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘সংস্কৃতি’র আদরায় স্থাপন করেছে। মানুষের ক্ষমতা ও জ্ঞানের প্রকল্পে রচিত এই সংস্কৃতি। প্রকৃতিতে মানুষ প্রকৃতিরই সৃষ্টি। সংস্কৃতির বেলায় সে যেন তার নিজের সৃজিত সত্তা। প্রকৃতিসৃষ্টির বাইরে মানুষের তৈরি ‘সৃষ্টি’ প্রকল্প। যে মাপদ-ে কবিতা একটি ‘সৃষ্টি’। আধুনিক মানুষের একক সত্তাকে জাহির করার উপাদান মাত্র। প্রকৃতির সৃষ্টি থেকে পৃথক। যেন কবিতাটি ব্যক্তি-প্রতিস্ব নির্মাণের সাহায্যে সেই সংস্কৃতিক ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে। প্রকৃতির অন্তর্গত মানুষ নয়। বরং মানুষই যেন প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক। সর্বত্র শাসকের ভূমিকায় চেতনা।

প্রভাত চৌধুরীর ‘গ’ কবিতায়  ‘আমি বাবা’ লক্ষণীয়। তিনি ওই ব্যক্তি-প্রতিস্ব নির্মাণের যোজনাকে নিয়ে মস্করা করেছেন। গাধাবোটের গাদাগাদিতে তিনি নেই। ব্যক্তি-প্রতিস্ব নির্মাণ ছিল আধুনিক কবিতার প্রথম শর্ত। প্রাগাধুনিক কবিতায় ছিল ঈশ্বরের মহিমাকীর্তন। ঔপনিবেশিকতা যে সাম্রাজ্যের পত্তন করেছিল সেক্ষেত্রে শাসকের বা ক্ষমতার প্রতিস্বর নির্মাণ ও প্রদর্শনের অভিপ্রায়ের ঔচিত্য ছিল। ‘গ’ কবিতাটি হদিস দেয় মুক্তির পরিসরের। যা এক পৃথক উৎসবে আমন্ত্রণ জানায়। ভাষাদেশের ভ্রমণসঙ্গী করে তোলে। প্রাগাধুনিক বা প্রাক ঔপনিবেশিক কাব্য ছিল ভূ-প্রকৃতি থেকে উৎসারিত। ঔপনিবেশিক শাসন নিজের মতো সুবিধাজনকভাবে গড়ে নিতে চেয়েছিল শাসিত প্রজাকে। তা বর্জন করেছিল স্থানিকতাকে। যে কারণে ঘটেছিল আত্মবিচ্ছেদ। পরিত্যক্ত হয়েছিল সেই কৌমনির্ভর বয়ান।

ফলে গড়ে উঠেছিল আধুনিকতার লক্ষণ— একরৈখিক আর খ-বাদী কাঠামো বা আঙ্গিক, বিচ্ছিন্নতার উপাদানের উপস্থিতি।

খ-বাদিতার বিরুদ্ধে সুবীর সরকার-এর ‘শোকযাত্রার প্রতিবেদন’ দেখা যাক অথবা ‘সারাদিন কামলালেবু বিক্রি করি’

১.            শোকযাত্রার পতিবেদন

                ‘অথচ কচুগাছ কাটতে কাটতে, আমারা সব ডাকাত হলাম’— আর

                নেত্রছায়ার খুব নিচু দিয়ে সারি সারি পিঁপড়ের শোকযাত্রা

                অথচ ফুঁ সিরিজের পাশে হলুদ দোলনা। হারিয়ে

                যাওয়া তারিখগুলির দিকে হুসহুস দৌড়াতে থাকে

                ধুধু দিগন্তরেখা। অথচ কচুগাছ কাটতে কাটতে

                আমরা পুনরায় আমাদের ডানা খুঁজে পেলাম

২.           সারাদিন কমলালেবু বিক্রি করি

                সারাদিন কমলালেবু বিক্রি করি। সন্ধেবেলায়  খেতে শুরু করি

                একধরনের হালকা খাবার

                মেয়েদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করবার আগে আমাকে

                ঝুলিয়ে রাখতে হয় কয়েক টুকরো দিগন্তরেখা,

                অসংখ্য ধূপকাঠি পুড়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। নতুন করে শিখে নিতে

                হচ্ছে অভিবাদনের কায়দাকানুন।

                সারাদিন কমলালেবু বিক্রি করি। আর

                খাঁচাভরতি বাঁদরের সামনে দাঁড়িয়ে হি হি করে হাসি।

প্রতিস্ব নির্মাণের যাবতীয় কলকাঠি ভেঙে দিচ্ছেন। নেই সময় বা যুক্তির অনুক্রম। প্রতিস্ব নির্মাণের আধুনিক কবিতার কাঠামোকে চুরমার করে নিয়ে যাচ্ছেন ‘ডানা খুঁজে পাওয়ার’ মুক্তিতে। আলগা করে দিতে চাইছেন সেই বুঝ প্রকরণের বাঁধনগুলো লোপাট করে দিয়েছেন লিনিয়ারাইজেশন বা একরৈখিকতা। পর পর যে শব্দসংযোগ এনেছেন তা একটা ক্রমানুক্রমিক যাত্রাকে প্রতিরোধ করে। সাজানো বাগান থেকে সরিয়ে তার পরের স্টপের দিকে উম্মুখ রাখে। কবিতাটি এককেন্দ্রীক নয়। এক ভারকেন্দ্রী নয়। উল্লম্ব বা ভার্টিকাল নয় তার অগ্রসর। বরং আনুভূমিক বা হরাইজন্টাল। ঘাসের ছড়িয়ে পড়ার মতো। ঋজুত্ব বর্জন করেছেন। কোনও অনুশাসনের অধীন নয়। অনুশাসনীকে তোয়াক্কা না করার প্রদর্শনী। আজস্র তার বিস্তার প্রবণতা। কোথাও যুক্তি দিয়ে ইন্টারলকিং করার, অসঙ্গমুক্ত সংস্রব তৈরি করার প্রয়াস করেননি। কবিতাটির কোনো আদি মধ্য আন্তঃক্রমিকতা নেই। শুরু শেষ বললে কিছু রাখার কোনো চেষ্টা নেই। তাকে লোপাট করার খেলা স্পষ্ট। যেখান দিয়ে ইচ্ছে ঢুকে যেখান দিয়ে ইচ্ছে বেরিয়ে যাওয়া যায়। একেই বলা হচ্ছে মুক্তপ্রবেশ আর মুক্তসমাপ্তির আয়োজন। বহুদিশাময় বা বিদিশাময় বিশৃঙ্খলার মহোল্লাস। একটি পঙ্ক্তি সরিয়ে নিলে কবিতাটি ধ্বসে পড়বে না।

পাঠক কবিতা দুটোর কোনো বিষয়কেন্দ্র খুঁজে পাবেন না, অথচ আধুনিক কবিতার টেক্সট পাঠককে ক্রমশ একটি বিষয়কেন্দ্র নিয়ে যাওয়ার জন্য তৎপর থেকেছে। যুক্তিক্রমের অনুপস্থিতির ফলে রচিত হয়েছে যুক্তিফাটল বা লজিক্যাল ক্র্যাক। বয়ানকে জড়ো করার বদলে ছত্রখান করে দিয়েছেন। যা পোস্টমডার্ন কবিতার অন্যতম লক্ষণ। এই যুক্তিফাটল বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে চিহ্নিত করেন বিজ্ঞানী পাওলি। যে বিষয়ে কবি রুদ্র কিংশুক কী বলেছেন শোনা যাক। উলফগাং পাউলিং তৃতীয় তরঙ্গের বিজ্ঞানী যিনি বিশ্বপ্রকৃতিতে এই যুক্তিফাটল বা লজিক্যাল ক্র্যাক শনাক্ত করেন। তার তত্ত্বের দর্শনটিকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে বিষয়টিকে নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায় বলেছেন ডাবল ডায়ালেকটিকস :

                বিজ্ঞানী উলফগ্যাং পাউলিং দেখেছেন একটি পরম সুড়ঙ্গ

                বা ফাটল যার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হলে আপনি খুঁজে পাবেন

                এমন এক দেশ যেখানে আলো অন্ধকার সহজ অবস্থানে

                বিকশিত হয়, মাছ আর পাখি পারস্পারিক স্থান বিনিময়

                করে আর আপনার স্বপ্নগুলো বালিহাঁস হয়ে উড়ে যাচ্ছে

                একটি হ্রদের দিকে, যার চারপারের গভীর গাছে সেসব ফল

                ধরে আছে তাদের মধ্যে থেকে পর্যাপ্ত সৌরভে সঙ্গে সংগীত

                বেরিয়ে আসে, এইসব ফাটলের কথা পাউলিং লিখেছেন

                তাঁর একটি লাল ডায়রির পাতায়, যার খোঁজ একমাত্র সেইসব

                পাখিরা জানে যারা রামধনুর একটি বিশেষ রং-এ তাদের

                বুকের নীচের নরম পালকগুলি একবার ভিজিয়ে নিয়েছে…

বিষয়টিকে চমৎকার এই কবিতায় তুলে ধরেছেন কবি রুদ্র কিংসুক। এই যুক্তিফাটল মানুষ্যসৃস্টি  সাংস্কৃতিক আর ঔপনিবেশিকতাবাদী অনুক্রমসহ যুক্তির বদলে বিশ্বপ্রকৃতির আসঙ্গযুক্ত ইন্টারলকড বুঝের পরিসরে নিয়ে যায়। যেখানে খ-বাদী যুক্তিকে বাতিল করে, গাড়ে ওঠে কোয়ান্টাম ব্রহ্মা-ের সর্বভূতেষু চেতনা। যাকে কবি বারীন ঘোষাল বলেন অতিচেতনা। প্রবাল দাশগুপ্ত বলেছেন, অধুনান্তিক চিন্তাচেতনা। যা আজকের এইসব কবির কবিতার পোস্টমর্ডান বুঝের প্রাণময়তা। কবিতাটি এক পরম সুড়ঙ্গ বা কোয়ান্টাম ফিল্ডের হদিস দেয়। যেখানে আলো অন্ধকার বাইনারি বৈপরীত্যের যুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়। পারস্পরিকতায় আসঙ্গযুক্ত ইন্টারলকড উপস্থিতির সম্প্রসারিত এলাকা।

এই ফাঁকা বা ‘ক্রেফটটুকু’ অনিশ্চিয়তার প্রতীক। যার পরিমাপ দেয় প্ল্যাংকের ধ্রুবক। মোমেন্টাম বা ভরবেগ এবং অবস্থিতি বা পজিশনের দ্বৈরাজ্যের সান্ধান দেয়। এই ছোট্ট কবিতাটি জীবনানন্দের ত্রিবেদীকে পাশ কাটিয়ে চতুর্বেদীর ঠিকানা হাজির করে।

‘জড় ও অজড় ডায়ালেকটিক মিলে আমাদের দু-দিকের কান টানে বলে বেঁচে থাকি — ত্রিবেদীকে বেশি জোরে দিয়েছিল টান’ (জীবনানন্দ)। কিন্তু চতুর্বেদী এই ফাটলের খবর দেয়। ধ্রুপদি বা ক্ল্যাসিক্যাল বিশ্ববিজ্ঞান জানত প্লাস-মাইনাস, ধনাত্মক-ঋণাত্মক বৈপরীত্য। কিন্তু এই বৈপরীত্যের সঙ্গে পরম সুড়ঙ্গে কাটাকুটি খেলা চলে মোমেন্টাম বা ভরবেগ আর অবস্থিতির দ্বৈরাজ্যের ফলে যুগ্ম ডায়ালেকটিকস আমাদের চারমাত্রায় নিয়ে আসে। এখানে যেন হদিস রয়েছে পয়ার বা পদচরণা কেন পারমাত্রা ধরে প্রসারিত হয়ে চেয়েছে। যে চারমাত্রা বিদিশা বা বহুদিশাময়তার এলাকায় বিচরণ করতে চাইলে সেই চার পৌঁছে যায় চারের মহোল্লাসে। গণিতজ্ঞ মিহির চক্রবর্তী যে চার সংখ্যাটিকে ব্রহ্মা- দর্শনের নিমিত্ত করে তুলতে চেয়েছেন। এক আশ্চর্য স্নায়ুভাষার সন্ধান দেয় কিংশুকের এই কবিতাটি।

মানব-মস্তিস্কে যে অগুনতি অতি সূক্ষ্ম ফাঁক সেখানে চলে শক্তির চলাফেরা। যা কোয়ান্টাম জাম্পের সঙ্গে যুক্ত। এই উল্লম্ফনকে সুবীর সরকার ও  প্রভাত চৌধুরীর ইতিমধ্যে বর্ণিত কবিতাগুলোতে পরখ করা যেতে পারে। রুদ্র কিংশুক তাঁর কবিতায় সেই তন্ত্রসূত্র উপস্থাপন করেছেন। শব্দের উপস্থিতি, শব্দসম্পর্কের বিন্যাস, অর্থময়তার প্রসার এই তন্ত্রসূত্রে সম্পর্কিত। যা জটিলতা বা কমপ্লেক্সিটির তন্ত্রসূত্রে আবদ্ধ। কেন আজকের কবিতা কেবলমাত্র খ-বাদিতাকে ভর করতে রাজি নয় কেন এই ডাবল ডায়লেকটিকসের পরিসরে প্রবেশ করতে উম্মুখ তার রহস্য রয়েছে এই তন্ত্রসূত্রে। এই স্নায়ুভাষার দ্বৈরাজ্যের চত্বরে একটা ভাগ নন-রিডাকশনিস্ট এমারজেন্ট, ইউ প্রসেস আর অন্যটি রিডাকশনিস্ট বা ‘আর’ প্রসেস। তত্ত্বের এই বিশ্লেষণ বিজ্ঞানী ডেভিড দয়েচ-এর। এঁরা প্রত্যেকে হু বিদ্যা বিশারদ। বুঝ প্রকরণ নানা জ্ঞানস্রোতের সম্মিলনে।

পেনরোজ বলেছেন, মানুষের মস্তিস্ক জৈব ক্রমাবিকাশের ফলে উপলব্ধ জটিলতাবোধের এক চমৎকার নজির। যেখানে সারাক্ষণ ঘটছে খ-বাদী আর অখন্ডবাদী চেতনার দোলাচল। কবিতার বুঝের স্বদেশ। কিংশুক গড়ে তুলেছেন সেই স্বদেশের বাকচিত্র।

আধুনিক আর উত্তর-আধুনিকের বাকসূত্র কোকিল ও কাক, অর্থাৎ দুটি পাখির উপস্থিতির সাহায্যে তাঁর নীচে উদ্ধৃত কবিতাটিতে তুলে ধরেছেন কবি নিখিলকুমার সরকার। কবিতাটিতে ‘সংস্কৃতিক তুলনাটা’ শব্দবন্ধ লক্ষণীয়। ‘সংস্কৃতি’ নামক আদরার প্রতি অসাধারণ মন্তব্য। ‘সঙ্ঘ নিক্ষিপ্তি বিপুল উচ্ছিষ্ট’।

কাকচরিত্র এবং উত্তর আধুনিকতা

সকাল হলেই কালো এবং কর্কশ— দুটি প্রশস্ত ডানা মেলে

আমার বাড়ির ডাস্টবিনে পোঁছে যায়। প্রতিদিনের মৃত শব্দের ডাঁই, বিস্বাদ উদ্বৃত্ত

ছেঁড়া সম্পর্কের পচনশীল স্মৃতি— ফেলে দেওয়া সব আবর্জনা

খুঁটে খেয়ে যায় একটা কাক। মাঝে মাঝে আমার জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে

ডেকে ওঠে কা কা… কর্কশতা সহ্য করতে পারি না বলেই

লৌকিক ঐতিহ্যমতো জানালায় ভারী পর্দা ঝুলিয়ে দিয়েছি, তবু কাকটা আসে।

ওই একটা কাকই নয়, অন্যান্য কাকেরাও দেখি

দুর্গন্ধে ভারী বাতাস কেটে উড়ে যেতে যেতে মুখোশ-নিঃসৃত

ভাসমান পচাগলা স্বপ্নের আখরগুলি ব্রেকফাস্টের জন্য তুলে নিচ্ছে ঠোঁটে।

দাঙ্গা অথবা উৎসবকেন্দ্রের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পয়ঃপ্রণালী চেটেপুটে

দেখি ঝাঁকে ঝাঁকে কাক ধর্ম কিংবা সঙ্গ নিক্ষিপ্ত বিপুল উচ্ছিষ্টে

একই সঙ্গে সেরে নিচ্ছে লাঞ্চ ও ডিনার— যাতে সংস্পর্শদোষে

আর সব জলস্রোত আবগাহন-অযোগ্য না হয়ে ওঠে।

এরপরেও আইকিউ প্রসঙ্গে কাক এবং কোকিলের সাংস্কৃতিক তুলনাটা ইচ্ছে করেই মনে রাখি। কাক যে জেনেশুনেই কোকিলের ডিমে তা দেয় আমরা কিছুতেই মানতে চাই না— সেই ‘চালাক’ কোকিলের বায়োডাটা নির্ভর গাইডবুকেরই আধুনিকোত্তর সংস্করণ পকেটে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি গেটওয়ের দিকে যদিও বাল্মীক প্রতিভায় ‘বোকা কাক’— এই আধুনিক সিদ্ধান্তটা আজও অনতিক্রম্য রয়ে গেল।

উচ্ছিষ্ট আধুনিকতার নষ্ট পচা শশা। আধুনিকতার সেই বিষপান করে উত্তর আধুনিকের আভেদের সন্ধানে যাত্রা। প্রদূষণ ডাম্পিং, ওজোনস্তরে ফুটো, উচ্ছিষ্টে নানা রূপ আর ত্রাণের দায় এই আধুনিকোত্তর পরিসরের।

একক কণ্ঠস্বর বা কবির একক কণ্ঠস্বর আধুনিক কবিতার নিটোল উপস্থিতি গড়ে তুলেছে। যুক্তিক্রম ও তার্কিক পাদ্ধতিও একক। বহুস্বর আধুনিকোত্তর পরিসরের যৌগিকতাকে ধরে রাখে। কবির চেতনায় জায়গায় ভাষার চেতনা স্পষ্ট করে তোলা। ভাষার চেতনা রৈখিক ও উপসংহারমূলক নয়। তার পাকাপোক্ত সিদ্ধান্তমুখীনতা নেই।

মানুষ স্তন্যপায়ী জীবন। মুখোমুখি যৌন। স্তনাঞ্চল মাতৃত্ব আর কামনার মোক্ষম মহাকাশ। ডাবল ডায়েলেকটিকসের ঝরনামুখ। একক সম্ভাবনাকে মূলতুবি রেখে। পোস্টমডার্ন পাঠবস্তুর সাবজেকটিভিটি ভঙ্গুর, যৌগিক। উপস্থিতি মাত্রেই বার্তাসহ। কবিতা এমনই বহু বার্তার সংকলন। বার্তাগুলি অসঙ্গযুক্ত।

জীবনে এখন আগের চেয়ে ঢের বেশি দ্রুতি। ছবিগুলো একটার পর একটা দ্রুত হাজির হয়। একটা পুরোপুরি গড়ে ওঠার আগে আরো আরো অনেক এসে পড়ে। ছবিগুলো যেভাবে টিভির চ্যানেল ঠাউরে নেওয়ার সময় পর পর হুড়মুড়িয়ে আসে। একটা ফ্লাক্স, প্রবাহ মাত্র। যে হাইপার রিয়ালিটি অতিচেতনার পথে গ্রাহ্য।

পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতার নির্মাণ বাংলা ভাষার চেতনায়। কবির চেতনা অবান্তর। কবিতাটি কবির লিখিত হওয়ার ফলে কবিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভাষার চেতনার প্রবাহের চেতনা তন্ত্রসূত্রে দ্রুতির সাহায্যে ক্রমাগত সম্মিলিত। মুরারি সিংহ-র বৃষ্টির ক্লাসরুম কাব্যগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত ছোট্ট এই কবিতায় ছবিগুলোর বহুত্ব ও দ্রুতি লক্ষ্য করা যেতে পারে :

চিলিচিকেনের অন্তর্গত আলোচ্য কাঁচালঙ্কা খ-টির রং ও

রূপের ব্যাখ্যা করতে গেলে কতখানি জৈব কামড় প্রয়োগ

করতে হবে কতখানিই বা কোনো তামাঘটিত কীটনাশক সেই

অনঙ্গবার্তাটি শালমঞ্জরীর কানে কানে পৌঁছে দেবার জন্য

পোড়া মবিলের পেটুক দাঁত সোৎসাহে তুলে নিতে থাকে ভাঙা

রাস্তার জমে থাকা জলে ভাসমান আকাশের ছবি। তারই

আহ্লাদে খরগোশের ছেঁড়াতারে আটকে যাওয়া রেশমমথের

শব্দ-রঙ্গ তবু তো অট্টহলুদের কিছুটা অংশ চালান করে দিয়ে

যেতে পারে ভোরমাসিত ডালিমবাগানের মধ্যাহ্ন লাগায়।

চিলিচিকেনের ছোট কাঁচালঙ্কার টুকরো থেকে শুরু হয়ে কীটনাশক… শালমঞ্জরী… পোড়া মবিল… রাস্তায় থাকা জল… আকাশের ছবি… খরগোশ… রেশমমথ… ডালিমবাগান… একটি ছবির কাঁপন ফুরোনোর আগেই আরো অনেক ছবির হাজিরা। অনির্ণেয় থেকে যাচ্ছে প্রবেশ মার্গের কাঁচালঙ্কা খ-। আকস্মিকতার জটিল আলপটকা মজা। শব্দ-সংকর অর্থ সম্প্রসারণ। এলোমেলো। সাজানোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকতাহীন। ঘটমান খাপছাড়া। শব্দের এই দ্রুতির থ্রিলটাই আহরণের তহবিল। এই কবিতার পাঠ অভিজ্ঞতা অজস্র প্রতিচ্ছবির। মুহুর্মুহু সৃষ্ট প্রতিচ্ছবির। ফলে একটি শব্দের ক্যাননবিহীন এই ধরতাই। পোস্টমডার্ন কোনো সাহিত্য অনুশাসনের অধীন নয়। ইজমের বা তত্ত্বের আনুগত্যের ফাঁদে পা দিয়ে মারদাঙ্গায় জড়িয়ে পড়তে রাজি নয়। বিশ্বচরাচর এমন কোনো একটিমাত্র রৈখিক তত্ত্বে ব্যাখ্যাযোগ্য নয়। পোস্টজেনেরিক। শিল্প বলে আলাদা সংজ্ঞায়নে এদেশে কোনো ধরতাই ছিল না। তা সে মধুবনির ছবি আঁকা বউদি ঠাকুমা মাসিমারা হোন বা চিত্রকূটের তুলসীদাসজির রামচরিত মানস। যাকে শিল্প বলা হচ্ছে তা ছিল জীবনের ব্যবহারিকতার সঙ্গে মিশে থাকা, দৈনন্দিনের উৎসবের অঙ্গ। আজ আবার কবি বেরিয়ে পড়েছেন শব্দের উৎসবে।

কফিহাউসের চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ আঁতেল নয় এই কবিরা, তারা গ্রামগঞ্জ থেকে উঠে আসছেন। কবিতা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছেন প্রত্যন্ত গ্রামে। আবার শহরের ভিড়ের মধ্যে হাজির হয়েছেন কবিতার পসরা নিয়ে।

আজ জীবনের যে কোনো এলাকা থেকে কবির এই উপস্থিতি শহর বা মহানগরকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রিত সাহিত্য-শিল্পের ধারণার বাইরের, মর্ডান কবিতার অনুশাসনের বহির্ভূত এলাকা থেকে। ক্যাননের বাইরের পরিসর চিহ্নিত করার জন্য পোস্ট শব্দটি শব্দের মুখে জুড়ে দিয়ে সেই শব্দটিকে ভিন্ন এক যাত্রার দিকে শনাক্ত করা হচ্ছে। শব্দগুলি সময়ের অনুক্রমে বদলে দৈশিকতা এবং অনুক্রম বর্জনের পরিসরকে চিহ্নিত করে। যেমন পোস্টওয়েস্ট বা পোস্ট ইকোনমিক্স। আধুনিকতা ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক; কিন্তু আধুনান্তিক চিন্তাচেতনার এমন কোনো কেন্দ্র নেই।

আধুনিক কবি নিজেকে নষ্ট করার প্রদর্শনী দেখাতেন। যেমন দেখেছি শক্তি, তুষার যোগব্রত, আশেপাশের বহু বন্ধুবান্ধবকে। যেন এভাবে আত্মধ্বংশ শিল্পের গুরুত্ব বৃদ্ধি করে। আজকের কবি এমন ডামাডোল ডিসপ্লে করতে রাজি নন। তাঁরা চাইছেন পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশ। ছোটো গোষ্ঠির বদলে সবাইকে আমন্ত্রণের মেজাজ। একে বাদ ওকে বাদ দেওয়ার কলকাঠিতে নেই। গড়ে তুলতে চাইছেন পালটা প্রতিষ্ঠান। রীতিমতো ডিটিপি, বুকসেন্টার, সম্প্রসারিত প্রচার। কবিদের সম্মিলিত উপস্থিতির শক্তি দিয়ে অবস্থান তুলে ধরা। আধুনিক কবির কাছে দায় রয়ে গেছে আমরত্বের। অমরত্বের জন্য ব্যক্তি-প্রতিস্বকে সর্বোপরি করে তোলার।

আধুনান্তিক কবির কাছে বিচার্য হয়ে উঠছে তার টেক্সট। যা কিছু সবই ফ্লাক্স বা প্রবাহের অন্তর্গত— এই বোধ। যেমন শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়-এর কবিতার উচ্চারণে সেই বোধের উম্মোচন : কবিতাটি বয়েছে তাঁর ‘ভ্রমণসূচির পাতা’ বইটিতে। এই কবিতায় এমন এক একটি ঘড়ির কথা বলেছেন যার অনুক্রম সংকেত নেই।

আমি তো আমার

                আয়তক্ষেত্রের ভিতর ঘড়ি আঁকি

                মাকড়সার জালের মতো বিছোনো ছবি

                ঘণ্টর কাঁটা

                সেকেন্ডেরও

                আজস্র যতিচিহ্ন আরো

                দু-হাতের মুঠো ভরে ঘাস উঠে আসে

                কুচোনো ঘাস উড়িয়ে দিই বাতাসে

                ঘণ্টাঘর থেকে প্রবহমান সুরের ধারা নামে

                একটা একটা করে নৌকো ভাসাই

এই ঘড়ি দৈশিকতাবোধক। ঘড়ি আঁকছেন আয়তক্ষেত্রে। সময় এখানে ঘাসের মতো। তার অনুক্রম একরেখ নয়। মাকড়সার জালের মতো বিছানো এই  অয়-বোধকতা। সময়ের যে প্রতিস্ব-নির্মাণের সহায়ক ভূমিকা ছিল সেক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল একরেখ সময়চেতনার। একজন লেখকের ব্যক্তি-প্রতিস্ব নির্মাণের এলাকা তার টেক্সটের বাইরে। তার জীবনের এমন সব খুঁটিনাটি তল্লাসির ও শনাক্তকরণের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ছিল যার সঙ্গে টেক্সটের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। কৌশিক ঘোষ-এর ‘আর্সেনিক প্রকল্প’ কাব্যগ্রন্থের ‘একটি প্রস্তাব— অকথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র’ কবিতায় :

একটি প্রস্তাব—অকথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র নিয়ে

                শরৎবাবু কোন কোম্পানির বিড়ি খেতেন—

                বা কী ধরনের মাদককে তিনি

                গলায় ঢেলে ‘গৃহদাহ’-এর শেষ পর্ব

                লিখেছিলেন— তার চা পান, স্নান

                দুপুরের আহারের মেনু এবং পূজা অর্চনা

                বা বেশ্যাবাড়ি যাতায়াত এগুলোই আমি

                অডিও ভিডিও ক্যাসেটে রেকর্ডিং করে

                জাতীয় গ্রন্থাগারে রাখার প্রস্তাব

                রাখছি— শরৎকমিটির কাছে নয়

                পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণদানকারী কোনো

                সংস্থাকে— যেটা দাতব্য চিকিৎসালয়ে

                বাধ্য অথচ অনিচ্ছুক চিকিৎসারত কিছু

                ডাক্তার যারা বাছুরের দলে শিং ভাঙা

                গোরুদের খোল দ্রবীভূত

                ভাতের মাড়কে শরৎবাবু উচ্ছিষ্ট

                সোমরসের চেয়েও মহাআনন্দে পান করতে চান।

                কোনো উপন্যাস লেখার সময় তার পরনের

                পাঞ্জাবির শুভ্রতা কত ছিল— কোনগুলি তিনি

                লেখেন ব্রহ্মাদেশের সেগুনের কাঠামো দেওয়া

                বেতের চেয়ারে বা বিধবা বিয়ে করে— তিনি

                যে পথের দাবি করেছিলেন সেই পথে তার

                পা টলত কি না— তখন কি দেবদাসের

                যক্ষ্মার ওষুধ একদমই ছিল না— পার্বতী বন্ধ্যা

                ছিল কিনা, এই সার্বিক বিষয়বস্তুর মধ্যে

                আমি তার মহেশ বা অভয়ার পোস্টমর্টেম

                করার দাবি জানাচ্ছি— এই প্রসঙ্গে

                কখনোই উচ্চারিত হবে না ঔপন্যাসিক

                বা‘কথাসাহিত্যিক’ শব্দ দুটি। কারণ

                দুটো বস্তু আমি রেখেছি শরৎবাবুর

                নাগালের বাইরে

                                কলম ও কাগজ।

রচনার চেয়ে রচনাকারের গুরুত্ব, টেক্সটের চেয়ে লেখক-কবির খুঁটিনাটি নিয়ে মাথা ঘামানো, ইত্যাদি ব্যক্তির প্রতিস্বর গড়ে তোলার প্রতি বেশি মনোযোগী থাকতে চেয়েছে ঔপনিবেশিকতাবাদী মডার্ন দৃষ্টিকোণ। এই বিষয়টিকে কৌশিক ঘোষ তাঁর কবিতায় তুলে ধরতে চেয়েছেন। রচনাকার রচনাটির শাসক এবং শাসকের ব্যক্তি-প্রতিস্ব নির্মাণ অনায়াসে শাসকের জন্য প্রয়োজনীয়। গাঁধির মতাদর্শ সম্পর্কে মানতে চাওয়ার চেয়ে রাশি রাশি মানুষ দিল্লির সংরক্ষণালয়ে দেখে এসেছেন গাঁধির লাঠি আর ভাঙা চশমা। ব্যক্তি-প্রতিস্ব নির্মাণে কবির এলোমেলো জীবন, ভ-ামি, লোকদেখানো কায়দাকৌশল, অসুখ বিসুখ, চটিজুতোর ব্র্যান্ড, কোনো কিছুই বিবেচনার বাইরে নয়। যেন তাঁর টেক্সটের বিশ্লেষণে এসব তথ্য জানা জরুরি। কেননা তিনি তাঁর ‘সৃষ্টির’ টাইটেল হোল্ডার। তার মালিক। অথরিটি।

পোস্টমডার্ন চিন্তাচেতনায় যে জন্য বলা হচ্ছে লেখকের মৃত্যু বা ডেথ অব দি অথর। অর্থাৎ টেক্সটই একমাত্র বিচার্য। একজন পাঠকের কাছে লেখকের ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি বা ব্যক্তি-প্রতিস্ব কোনো ইসু নয়। প্রাগাধুনিক ভাবনায় মনে করা হত জপ, তপ, জ্ঞান ও বৈরাগ্য একজন রচয়িতার এই চারটি গুণ থাকা দরকার। রচনাটি শেষ হওয়া-মাত্র তাঁর কর্ম শেষ। অর্থাৎ রচনাটির প্রতি বৈরাগ্যের বোধ থাকবে যাতে তিনি পরবর্তী রচনাটির প্রস্তুতি নেবেন কোনোরূপ পিছুটান বোধ না করে। তাঁর রচনার তিনি টাইটেল হোল্ডার বা মালিক নন। পাঠবস্তুর লক্ষ্য পাঠক।

জটিলতা বা কমপ্লেক্সিটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে পোস্টমডার্ন মতবাদের আওতায়। আধুনিক কবিতা ছিল খ-বাদী আর আত্মমুখিনতা নির্ভর। সবকিছুকে নাগালে আনতে চেয়েছে একশৈলী আদরায়। অথচ আমাদের বিস্ময়ের গভীরে আছে অরৈখিকতা। বিজ্ঞানী ডেভিড বোহমের মতে, ‘দ্য স্টোরি অফ দ্য ইউনিভার্স ইজ ওয়ান অফ আনফোল্ডিং কমপ্লেক্সিটি’। বুঝের অঞ্চলে যে ব্যাকুলতা তা শেয়াবধি হিসাবমূলক বা গণনামূলক নয়। আমরা যখনই তৃপ্ত হই, পরিপূর্ণ বোধ করি, টের পাই বিশ্বসূত্রের অখ-তার ঝিলিক। বিশ্বচরাচর বহুরৈখিক পাস্পরিকতার বুনুনি। অর্থাৎ সরলতা আছে জট পাকানো সুতোর মতো, শিবের জটার মতো। আদি-অন্ত টের পাওয়া নির্ভর করছে সেই জট বিশ্বচরাচরের সমতুল্য কিনা তার উপর। গোলটি যত বড়ো তত দুরূহ। জটিলতার সূত্র বিশেষ স্থিতি প্রবণতা অবস্থা বা ঘটনা অনুধাবন বা পর্যবেক্ষণের হদিস দেয়। এই বিষয়ে আমার ‘টেক্কা বিষয়ক জটিলতা’ কবিতাটি অনুধাবন করা যেতে পারে। বাহান্ন তাসের বা-িল প্রত্যেক কার্ড বা তাস এমনই এক উপস্থিতি। যেমন এই কবিতায় স্রেফ টেক্কার জটিলতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে বাকি একান্ন জটিলতা এবং তাদের পারস্পরিক জটিলতা, চারটে রঙের জটিলতা আর শেষাবধি তবু হাতে থেকে যাবে জোকার। তার ধরতাই অন্তহীন।

প্রথমে পড়ে ফেলা যাক কবিতাটি :

যাঁরা নিয়মিত তাস খেলেন বা তাস খেলার মারপ্যাঁচ দেখে আসছেন

তাঁরা লক্ষ করেছেন ব্রিজ রামি ব্রে তিনতাস

বিন্তি ফিস টোয়েন্টিনাইন তাসের অনেক ভুবন

কখনো টেক্কা বিশ্বজয়ী তুরূপের তাস

কখনো গোলামের চেয়ে খাটো আবার দহরার চেয়ে মানমর্জিত বেশি

কখনো হরতনের টেক্কা চিঁড়িতনের টেক্কার চেয়ে কেউকেটা

কখনো কাগাবগা চুনোপুঁটি

যত খেলা বদল হয় পলটায় টেক্কার কদর আর তার প্রাণপ্রাচুর্য

যে কোনো রউন্ড খেলার শেষে শুরু হয়ে যেতে পারে

রূইতনের টেক্কা নিয়ে ভয়ংকর বিতর্ক

একটা খোপকে সনাক্ত করা যায় হরতনের টেক্কা পাশ করে যাওয়ার অবসর

মনে হতে পারে পিট পাওয়া নিয়ে শুরু হয়ে গেছে

হাইজেনবার্গ আর শ্রোয়েডিংগারের মধ্যে জগৎ বিচারের মৌল মতান্তর

আমরা জেনে গেছি দুরকমের উঠকিস্তি প্রত্যেক রাউন্ডে অসংখ্য সম্ভবনা

কখনো মানুষ উঠবে সিঁড়ি থেকে যাবে স্থির

কখনো সিঁড়ি ক্রমাগত উঠে যাবে মানুষ নড়বে না

তবে ক্রমশ এভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় চারটে টেক্কার

কোনো সুনিশ্চিত হাতযশ নেই

আর তাসখেলা কোনো সরলতা পরখ করার আয়োজন নয়

কেননা শেষাবধি সংশয় থেকে যেতে পারে

চিঁড়িতনের পাঁচ পিটের পর হরতনের টেক্কা বের করা ঠিক ছিল কিনা—

টেক্কার মূল্য নির্দিষ্ট বা ফিক্সড নয়। প্রত্যেক খেলার সঙ্গে তার নির্ধারিত মূল্য বদলায়, আবার খেলা যখন যেমন এগোতে থাকে সেই পিটের ক্রমাবর্তে পাল্টাতে থাকে তার মানমর্জি, আর কদর আর উপস্থিতি। খেপ ক্রমান্বয়, হাতযশ কোনোটাই সুনিশ্চিত নয়। খেলা কেবল জিইয়ে রাখতে চায় অশেষ সংশয়। জটিলতার গর্ভদেশে নিয়ে গিয়ে ওই মহাসংশয়ের দৈশিকতাকে উম্মোচিত রাখে। সামান্য এক তাসখেলা, যা আমাদের অবসর বিনোদনের টোপ, প্রতিদ্বন্দ্বী সাজার ঘোরের মধ্যে সেঁধিয়ে যাওয়ার খেলা, তাকেই মনে হয় জটিলতার এক চমৎকার বোধ পরিসর। একটা খোপ হতো স্রেফ হরতনের টেক্কা পাশ করে যাওয়ার যোগ্য অবসর। অথচ এই খোপগুলোতেই আটকে থাকতে চায় রৈখিকতা; ‘অব’ উপসর্গ প্রয়োগ করার সঙ্গে সঙ্গে অর্থবোধকতায় এসে যাচ্ছে অসাকল্য, ঈষদর্থ খ-বাদিতা, নিম্নগামিতা। বহিত বা অবগতির দিকে প্রস্থানবিন্দু। লঘুকরণের আতিশর্য। ‘আবি’ শব্দের মধ্যে (অ+বি) বয়েছে এই খ-বাদিতাকে অতিক্রমণের সংকেত ও প্ররোচনা। অবিনির্মাণের আহবান। সমগ্র প্যারাডিম দর্শনের বা আভেদের সন্ধানে যাত্রার ব্যাকুলতা। আধুনিকতা যে আদর্শ বা মতাদর্শগুলো তৈরি করেছিল তা এই জটিলতাকে এড়িয়ে গেছে। তার সরলতাই তার বিপন্নতার জমিনটুকু আপসে তৈরি করে দিয়েছে। এই আদর্শ মহাপারিবারিক প্রকৃতিস্থ মহাপরিপূরকতার আসঙ্গযুক্ত পরিসরকে স্রেফ রৈখিকতার সরলতার গরিমায় পাশ কাটিয়ে যেতে চেয়েছে। যা বপন করেছে পারস্পরিক খেয়োখেয়ি আর আত্মধ্বংসের বীজ। অথচ অতিক্রমণের জন্য আজ তার সামনে জোট বাঁধার পারস্পরিক ও সমবাবয়ী চেতনাসম্পন্ন হয়ে ওঠার বাধ্যবাধকতা। জীবন যেখানে আটকে যায় সেখান থেকে বেরোবার পথ খোঁজে। আজ টের পেয়েছে সেই অনিবার্য জটিলতার পরিসরকে। যেজন্য অবিরাম পারম্পরিক সংলাপ বা ডায়লগ উসকে দিতে চায়।

আজকের এই আততায়ী অবস্থানের পরিসরকে আফজল ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর ‘আততায়ী’ কবিতাটিতে। কবিতাটিতে রয়েছে প্রভাত চৌধুরী সম্পাদিত ‘পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতা’ সংকলনের ৭২ পৃষ্ঠায়। ওই একই পৃষ্ঠা থেকে তুলে ধরা যাক তাঁর ‘ভেসলিনের বিজ্ঞাপন’ কবিতাটি।

বিষণœ ছাদটায় যে নরম রোদগুলো শুয়ে আছে ওরাও কানপেতে

মনখারাপের গল্প শুনছে: এইসময় শীতকালীন যেসব ভেসলিন বাজারে

এসেছে সেই প্রসঙ্গে আসা যাক। যেমন এইমাত্র খবর পাওয়া গেল

শ্রীমতী কমলা ভাসানির রক্তঝরা পা এখন অনেকটাই প্রশমিত আর

যারা শীত ভালোবাসে অথচ… তাদের অস্বস্তির পূর্বাভাস, ঝুলে পড়া

বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে দেখে আর ক-জোড়া নতুন কোম্পান গ্যাটচুক্তি

মোতাবেক আসল সম্ভার এসেছে। পরশু রবিবাসরীয় কলমে এই নিয়ে

বেশ একপ্রস্থ আলোচনা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ-মোতাবেক তবু আপদের কি

শেষ আছে—বেচারা প্রোটিন,ভিটামিন ইত্যাদি খাদ্য অসংশ্লেষ—তৃতীয় বিশ্বে

যা হয়। কর্তব্যের খাতিরে ধরেই নিলাম বিজ্ঞাপনও কিছু কিছু সত্য কথা বলে

তবে সবটা না হোক ৮০% তো গ্যারান্টি।

সামান্য একটি ভেসলিন-এর বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে কবিতা অথচ তার ব্যবহারিক দিক তুলে ধরতে গিয়ে গ্যাটচুক্তি থেকে বাণিজ্যিক বয়ান আর শীত আর রোদের দোলাচলে যে বার্তাবিনিময় অথবা ভেসলিনের বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠার বিজ্ঞাপনী দৌড়, অর্থাৎ গোটা জটিল প্যারাডিমকেই আলোড়িত করেছিল তিনি। বৈশিষ্ট্য সংশয় নিরসনের জন্য গ্যারান্টির প্রসঙ্গ রাখে। আর গ্যারান্টি রাখে গ্যারান্টির শর্ত। যে শর্তের আড়ালে ঘাপটে মেরে আছে যুক্তির রৈখিকতার ভাঙন। একটা সম্ভাবনাই ভেসলিনের বৈশিষ্ট্যের আলতোটুকু ধরে রাখে। যেখানে জটিলতার আবেদন তেকে নিস্কৃতি নেই। কবিতার শেষ পঙ্ক্তি আরো চমৎকার। সবটা না হোক অন্তত ৮০% গ্যারান্টি। বৈশিষ্ট্য আর সবটা না হোক দুটি অবধারণা যুক্তিফাটলের গহ্বরে টানে।

আজকের বিশ্বায়নে বাজার সে তো খোলাবাজার, স্বপ্নের বাজার। স্বপ্নটুকুর বাণিজ্য স্বপ্ন নিয়ে বিক্রিবাট্টা। আর সেই স্বপ্নের বাজারের শর্ত হরেকরকমবা। বাজার এখন কনজিউমার ফ্রেন্ডলি। তার স্বপ্নের জুড়ি নেই। ফেভিকলের একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায় যে এক সদ্য বিবাহিত দম্পতির পাশে রাখা ফেভিকলের বাক্স কী অটুট দাম্পত্য বন্ধনের আর একই সাথে সেই সীমা লঙ্ঘনের স্বপ্নের প্ররোচক। ‘স্বপ্নের বাজার’ শিরোনামের গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কবিতাটি স্বপ্ন কেনার শর্তগুলো ব্যাখ্যা করে। তুলে ধরা যাক তাঁর প্রাসঙ্গিক কবিতা :

স্বপ্নে বাজারটা এখন আপনার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে

এবং আপনি চাইলেই এখন যে কোনো ধরনের স্বপ্ন

কিনতে পারেন। এর জন্য দরকার আপনার একটি ক্রেডিট কার্ড

ও প্রতি স্বপ্নের জন্য একটি সঠিক উত্তর।

যেমন আপনি যদি টেবল-টেনিসের সাদা ডিম ডিম

বলের মতো স্বপ্ন কিনতে চান, তাহলে আপনাকে বলতে হবে

ব্যাঙ কোন শ্রেণির প্রাণী। যদি ক্রিকেট বলের মতো

লাল টুকটুকে চান, তাহলে বলতে হবে, বাদুড় রাতে দেখে কেন।

যদি ফুটবলের মতো মাঠভরাট স্বপ্ন চান

তাহলে প্রথম কে কবে চাঁদে পা দিয়েছিল।

আর যদি পোলভল্টের মতো, তাহলে আপনাকে জানতে হবে

পৃথিবী থেকে তিন দশমিক স্থানে ঠিক কটি গ্রহ আছে

এইভাবে স্বপ্ন কিনতে কিনতে দেখবেন

স্বপ্নের বাজরে আপনি একজন দামি খদ্দের হয়ে গেছেন।

স্বপ্নের বাজার এখন নাগালের মধ্যে। রূপ, রং যৌনক্ষমতা, শ্রী, আয়ু, নিরাময় সবই হাতের মুঠোয় যেন। বাজার স্বপ্নের আর তার ক্রেতা স্বপ্ন কিনতে চান যে কোনো শর্তে। তার সম্ভাব্যতা কোনো অন্তরায় নয়।

বাজারে রকমারি স্বপ্নালু মাল ছেড়ে দিয়ে প্রযুক্তি আর বিজ্ঞাপনের সরল সমাধানের মাধ্যমে সবকিছুর হিল্লে হয়ে যাবে। স্বপ্নেক্ষ সুরাহা। স্বপ্নের বাজারের নিত্যনতুন এলাকায় সম্প্রসারণ। কবিতাটির ধরতাই একটি ক্রেডিট কার্ডকে সামনে রেখে। এ যেন ক্রেডিট কার্ড আর ‘কৌন বনেগা করোরপতি’— এ দুটি স্বপ্নপ্রকল্পের চমৎকার মেলবন্ধন। একটা ক্রেডিট কার্ড আর কিছু প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা চাই। তৈরি করেছেন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। উপভোক্তা বা খদ্দের নামক আইডেনটিটি এই বাজারের শেষ কথা। খদ্দের লক্ষ্মী, খদ্দের দামি। বাজার এই স্বপ্নময় খদ্দের তৈরি করে দিতে চায়।

রগড় আরও একধাপ টইটম্বুর করে তুলেছেন গৌরাঙ্গ মিত্র। তাঁর প্রত্যেক কবিতাই এক একটি মজারু বিশেষ। স্বল্প পরিসরে চিচিংফাঁক করে দিতে চায় বাজার আর আদর্শ-এর জটিল চক্রবূহ্য। যেমন তাঁর ‘বাঙালির ব্যবসার তিন পথিকৃৎ’ কবিতাটি:

১.            ডরঃয ইবংঃ পড়সঢ়ষরসবহঃং ভৎড়স-

জীবে প্রেম করে যেইজন সেবিছে ঈশ্বর—বিবেকানন্দ

ঠওঠঊকঅঘঅঘউঅ ঐঅজউডঅজ

ঢ়য. (ড়) ২৩৩৭-৫২০৬ (জ)২৫৪৮-৪৫২৪

                বিবেকানন্দর হার্ডওয়্যার চোখ

                পাকা জহুরির

সাগরের জলে দেখে ছিল মুক্ষম পাথর

                এল টি পাস-এর থার্টি ফাইভ-মিলিমিটার বাবুরা

                বিবেকানান্দ রক নামে চেনে।

২.           শুভ নববর্ষের সাদর সম্ভাষণ গ্রহণ করুন:

                বাবা লোকনাথ বিড়ি

                                                প্রসিদ্ধ নেপালি তামাকে প্রস্তুত

                আমরা পাইকারি ও খুচরা সরবরাহ করিয়া থাকি

                তাহলে, তাহলে তুমিই প্রথম জেনেছিলে

                একটানেতে যেমন তেমন দুই টানেতে—

                গাঁজা চরস চুরুট বিড়ির ধোঁয়াটে মিছিল…

৩.           দাদা, আপনার অফিসে—যদি জল দেওয়ার

                ঘর ঝাঁট দেওয়ার—

                দ্যাখো ভাই, বিশ্বায়ন কম্পিউটার হাইটেক—

                (পেছন মারা-না-যাবার গ্যারান্টি কোনো জনসমাবেশেই দেওয়া হয়নি)

আজ ধরা গলায় বলি : সেনদার পাশে বসে পনের বছরের বেশি—

                এমন মানুষ… সৎ নির্লোভ পরোপকারী—

                সুস্বাস্থ ও দীর্ঘজীবন—। তো কাল থেকে

                চেয়ারটেবিল অমানবিক। তুমি বরং যে কবি আছে

                মাটির কাছাকাছি—

                ‘রামকৃষ্ণ ড্রিমল্যান্ড’। সবাস! ছোটো বড়ো প্লটে আগে এলে

আগে পাবেন ভিত্তিতে— সহজ কিস্তিতে—

দ্যাখো ভাই, রামকৃষ্ণ সংসারজ্ঞানী

…মাটি টাকা… তো প্রথম তিনিই—

বিবেকানন্দ, লোকনাথবাবা আর পরমপুরুষ রামকৃষ্ণ বাঙালি সামাজের তিন পথিকৃৎ। তাঁরা মিশে গেছেন বাঙালি জীবনের প্রত্যেক পরতে। বাণিজ্য সেখানে ব্যতিক্রম নয়। এই তিনজনকে গৌরাঙ্গ নিয়ে এসেছেন কবিতার তিনটি পর্বে। প্রত্যেক এক একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প হিসেবে উপস্থিত। বিবেকানন্দ একটি হার্ডওয়্যারে-এর দোকানের নামকরণ, লোকনাথবাবা একটি বিড়ির ব্র্যান্ড আর রামকৃষ্ণ একটি আবাসন প্রকল্পের নামকরণে। তিনজনকে বাজার ব্যবহার করেছে ব্র্যান্ড প্রমোশনের উপাদান হিসেবে। ফলে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে সরাসরি ব্র্যান্ডের নামকরণে। এক অপূর্ব একাকার। আত্মতাকে আধুনিকতা কোন পর্যায় নিয়ে গেছে স্রেফ মজা করতে করতে গোনাগুনিতে কয়েকটি পঙ্ক্তিতে তা ফাঁস করে দিয়েছেন গৌরাঙ্গ। আমাদের দৈনন্দিন জীবন আর ব্যবহারিক কাজেকর্মের সঙ্গে অনায়াসে জড়িয়ে গেছে এইসব উপস্থিতিগুলি। গৌরাঙ্গ তার অন্তর্নিহিত নিখিলটিকে সহজে উম্মোচন করে দিতে চেয়েছেন। যে জটিলতায় আমাদের অহরহ নিবাস।

টাইটেল হোল্ডার বা মালিকানার বোধ পাকাপোক্ত করার জন্য পাশাপাশি গড়ে তোলা হয়েছে ‘মৌলিক’-এর ধারণা। অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টি মৌলিক। তার আর জুড়ি নেই। যেভাবে হোক একটু আন্যরকম আঙ্গিক গড়ে মৌলিক তকমার যোগ্য হওয়া। মৌলিক হওয়ার হিড়িকে শিল্পসাহিত্য জীবনদর্শনের এলাকা থেকে সরে গিয়ে নানা ধরনের বাহ্যিক বাড়তি গিমিককে প্রাধান্য দিতে বাধ্য হয়েছে। যে মৌলিকত্ব লেখক আলোচক বৃত্তের মধ্যে সীমিত থেকেছে যার কাছে জীবনদর্শনের কোনো নাড়ির টান নেই।

জীবনধারা প্রতিনিয়ত বদলে চলেছে। আজ বিজ্ঞানের তৃতীয় পর্বের দ্রুতির কারণে এই বাঁকবদল অত্যন্ত স্পষ্ট। যাকে বলা হচ্ছে প্যারাডিম শিফট। উত্তর ঐপনিবেশিক পরিস্থিতি ওপনিবেশিক পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন। এই ভিন্নতা দিনকে দিন বাড়ছে।

‘মৌলিকত্ব’ সৃজনের জন্য আজ আর বাড়তি গিমিক বা ভড়ং-এর প্রয়োজন নেই। এই বাঁকবদলের প্রতিফলন স্বাভাবিকভাবেই ঘটছে শিল্পসাহিত্যে। এই ভিন্নতারই অভিধা আধুনান্তিক বা পোস্টমডার্ন। সে কথাই তাঁর একটি কবিতায় তুলে ধরেছেন মলয় রায়চৌধুরী।

পোস্টমডার্ন প্রবন্ধ : আটলাস ও পেরিপ্লাস

এই যে পোস্টমডার্নিজম নিয়ে ক-বছর যাবৎ নানা কথাবার্তা বলছি

তা প্রায় সবই এশিয়া আফ্রিকা লাতিন-আমেরিকার ভাবুকদের

আমি মৌলিক কিছু করছি না, কেবল ব্যাখ্যা করছি

তবে ইংল্যান্ড ফ্রান্স আমেরিকার ভাবুক বা সাহিত্যিকদের বক্তব্য

আমি এড়িয়ে যাই

কেননা পশ্চিমবঙ্গের পোস্টমডার্ন অবস্থায় ওগুলো খাপ খায় না

এটা ঠিক যে ওদের পোস্টমডার্নিজম অতিপ্রযুক্তিবাদের ফল

আমাদের পোস্টমডার্নিজম আধুনিকতার পচনের ফসল

যা পয়দা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গকে নষ্ট করে ফেলার দরুন

আপনি দেখবেন যে পশ্চিমবঙ্গকে ধ্বংশ করেছে যারা

তার পোস্টমডার্নিজমের বিরুদ্ধে চেঁচায়

অমন চ্যাঁচানো ছাড়া ওদের উপায় নেই

ওটা ওদের শান্তি

ওদের দিকে লোক গিজগিজ করে কিন্তু কে যে ওদের পক্ষে বোঝা দায়

এরা বেশির ভাগই গবেট, অন্যের নির্দেশে ওঠে বসে

এদের বাড়ির মধ্যে অন্য দেশ

বাইরে বেরোলেই পশ্চিমবঙ্গ

ওদের বক্তব্য হল যে পশ্চিমবঙ্গ তো দিব্বি বহাল তবিয়তে আছে

পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রের দিকে তাকাতে বলবে ওরা

তার মানে অ্যাটলাস দেখতে বলবে

অ্যাটলাসের মানচিত্র ঔপনিবেশিক মাডার্নিজমের সেরা

কখনও বদলায় না

যেন আপনি অনন্তকাল স্থিরবিন্দুতে ত্রিশঙ্কু

সবসময় সেখানে ঝুলতে-ঝুলতে ম্যাপ আঁকেন

তাই আসল পশ্চিমবঙ্গ যেমনকার তেমন আছে মনে হয় আপনার

পোস্টমডার্ন কবিরা অ্যাটলাসের কথা বলেন না

তাঁরা যে মানচিত্রের কথা বলে তার নাম পেরিপ্লাস

এই মানচিত্র প্রত্যেকের আলাদা হতে বাধ্য

কেননা এই মানচিত্র কবিকে নিজেকে আঁকতে হয়

যাত্রাপথে কবি যেমন-যেমন এগোবেন তৈরি হতে থাকবে মানচিত্র

তিনি আগে থাকতে জানতে পারেন না তাঁর পেরিপ্লাস কেমন হবে

যদি জানতেন তাহলে মডার্ন হতেন

মডার্ন অ্যাটলাস আর পোস্টমডার্ন পেরিপ্লাস

এই ব্যাখ্যাটি আমার নিজের নয়

কথাগুলো অর্জেন্টিনার একজন পোস্টমডার্ন কবির

যিনি তত্ত্বটি একমেরুবিশ্বের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছেন

পশ্চিমবঙ্গকে যাঁরা ধ্বংসের মুখে এনে ফেলেছেন

তাঁরা ওই ত্রিশঙ্কু হয়ে ঝুলে আছেন

এবার দয়া করে নেমে এসে পেরিপ্লাস মানচিত্র আঁকতে বেরিয়ে পড়–ন

ওপনিবেশিকতার প্রত্যেক প্রকল্প ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া একটি স্থির বিন্দুতে ধরে রাখতে চেয়েছে চেতনাকে। উত্তর ঔপনিবেশিক পোস্টমডার্ন অবস্থান সেই স্থিরবিন্দুটিকে পাত্তা দেয় না। মানচিত্র কোনো স্থিরীকৃত রেখাচিত্র নয়। আজকের কবি তার বাকফসল গড়ে তুলে নিজেই বেরিয়ে পড়েছেন দ্রুতিময় সেই রেখাচিত্রের আহরণে। প্রকৃতির আয়োজনের রহস্যগুলি জেনে তার সাহায্যে সূত্র গড়ে তুলে বিজ্ঞান প্রযুক্তির সাহায্যে তার অবিষ্কারগুলি জীবনের ব্যবহারিক কাজে লাগিয়েছে। প্রকৃতির সৃষ্টি থেকে মানুষের ‘সৃষ্টি আলাদা’। প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। মানুষের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি ধারণা গড়ে উঠেছে। শিল্পী এমনই এক স্রষ্টা এবং শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। প্রকৃতি থেকে নিজেকে পৃথক করা এবং শ্রেয়তর মনে করার অবলোকন-ভঙ্গি নানা বিপন্নতা সৃজন করেছে যার খেসারত মানুষকে আজ দিতে হচ্ছে। যেজন্য সে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। আর এই চাওয়াটুকু ক্রমাগত হয়ে উঠছে আজকের কবিতাধারার অভিমুখ।

*********************************************

 

পোস্টমডার্নিজম সম্পর্কিত কিছু ভাবনা
প্রভাত চৌধুরী

সম্প্রতি একটি শার্টের বিজ্ঞাপন নিশ্চয়ই আপনাদের নজর এড়িয়ে যায়নি। বিজ্ঞাপনটি হল : The honest shirt-মনে রাখতে হবে, এই বিজ্ঞাপন যাদের উদ্দেশে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে তারা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপরের দিকের মানুষজন। এখন জানা দরকার, এই বিজ্ঞাপনটি তাঁরা গ্রহণও করছেন। একতলার থেকে একুশতলায় আলো আগে পৌঁছায় এটা বৈজ্ঞানিক সত্য। শার্টের বিজ্ঞাপনে ‘সৎ’ এই শব্দটির প্রয়োগ আধুনিক যুগে সম্ভপর ছিল না, তখন বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল টেকসই এবং সস্তা, যা আধুনিক মানুষকে আকর্ষণ করতো। কোনো কোনো বিজ্ঞাপনে রঙের স্থায়িত্বও ঘোষিত হত। এখন, অর্থাৎ পোস্টমডার্ন যুগে সমাজের ওপরের তলের মানুষদের আর ওসব কথা দিয়ে ভোলানো যাচ্ছে না। বলতে হচ্ছে শার্টের সততার দিকটি।

আধুনিক যুগে একটি লন্ড্রি-র নাম হত ‘মলিন মোচন’, তখনকার মানুষ ওই নামকরণে শুধু একটা অভিনবত্ব দেখতে পেয়েছিলেন নয়, তাঁরা এটিকে প্রতীক রূপেও দেখেছিলেন। এখন দোকানের নামগুলি লক্ষ করুন : The Hot Bread, Suger & Spice, Roofs & Walls, Scoop আমাদের বালকবেলায় যেমন ‘বসন্ত কেবিন’ কিংবা ‘Blue fox’ আমাদের প্রিয় ছিল, আজকের তরুণরা এসব থেকে সরে এসেছেন কিনা বলা যাচ্ছে না, তবে এখনকার মালিকেরা তাঁদের দোকানের ওইসব সিন্বলিক নাম রাখতে ভরসা পাচ্ছে না, এটা জোর দিয়ে বলা যায়। এইসব দৃষ্টান্ত থেকে আমরা কি সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে প্রতীক বা Symbol, ক্রমশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে ব্যবহারিক জীবন থেকে। আর এই সিদ্ধান্তটি যদি সঠিক হয়, তাহলে বলতে বাধা নেই যে কবিতা এবং শিল্প থেকে প্রতীকের ব্যবহারও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। আর আধুনিকতার অন্যতম খিলান ছিল Symbol এটাও আমাদের অজানা নয়। এই ধ্রুবসত্যটি অস্বীকার করার অন্য কোনো সুযোগ পাবেন না আধুনিকরা। এটাও তাঁরা জেনে গেছেন। গেছেন বলেই নিজেদের মধ্যেকার পুরোনো বিভেদগুলিকে ধামাচাপা দিয়ে পোস্টমডার্নিজমের বিরুদ্ধে একাট্টা হচ্ছেন। বা সমবেতভাবে পরম্পর পরস্পরের কফিনে পেরেক পুঁতছেন। যে কোনো নতুনকে গ্রহণ করার ব্যাপারে যাঁরা রক্ষণশীলতাকে আঁকড়ে থাকেন তাঁরা এক ধরনের অন্ধত্বকে প্রশ্রয় দেন, এমনটাই আমার মনে হয়।

ইন্দ্রিয়, সচেতন মানুষ তার পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়ে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন পোস্টমডার্নিজমকে, এজন্য তাঁকে লিখিত কিংবা মৌখিক কোনো উপদেশের কাছে যেতে হবে না।

যিনি শার্টের বিজ্ঞাপনে The Honest Shirt লিখেছিলেন, তিনি কি জানতেন যে এটি একটি পোস্টমডার্ন যুগের বিজ্ঞাপন?

না, তিনি জানতেন না। তাঁর জানার কথাও নয়, তবে তিনি এটি লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই সময়ে তাঁকে দিয়ে এই বিজ্ঞাপন লিখিয়ে নিয়েছিল।

শিল্পবিপ্লবের পর আধুনিকতার সূত্রপাত হয়েছিল, এমনটাই আমার মনে হয়। তবে যাঁরা আধুনিকতাকে সাম্প্রতিকতার প্রতিশব্দ রূপে দ্যাখেন, তাঁদের কথা আলাদা। সভ্যতার ইতিহাসে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার যদি উল্লেখ করতে হয়, তাহলে আমার মনে হয় ‘আগুন আবিষ্কার’ই প্রথম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পরেরটা হল ‘চাকা আবিষ্কার’। তারপর ‘হাওয়া-কল’। এইসব ঘটনাবলী সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আর তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে শিল্পসাহিত্যে। এটি একটি দীর্ঘ প্রবন্ধের বিষয়। আমি বলতে চাইছি শিল্পবিপ্লবের কথা। এই শিল্পবিল্পবকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমটি ‘স্টিম ইঞ্জিন’ এবং শেষটি হল ‘বিদ্যুৎ-শক্তি’।

আমরা জানি শিল্পবিপ্লব সৃষ্টি করেছিল আধুনিক যুগের মহান দর্শন মার্কসবাদ। আমরা জেনেছিলাম সারপ্লাস ভ্যালু-র কথা। প্রডাকশন রিলেশনের কথা। শোষণ এবং বঞ্চনার কথা। এই প্রসঙ্গে একটা কথা জানিয়ে রাখতে চাই, তা হল, বাস্পীয় ইঞ্জিন থেকে যখন বিদ্যুৎ চালিত ইঞ্জিনে সভ্যতা পৌঁছে গেল তখন কিন্তু শ্রমিকশ্রেণীর পোশাকেরও একটা পরিবর্তন দ্যাখা গিয়েছিল, সমাজবিজ্ঞানীরা, বিশেষভাবে মার্কসবাদীরা এটা দেখতে সক্ষম হয় নি। তাঁরা শ্রমিকশ্রেণীকে মহামতি কার্লমার্কস যেভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন ঠিক সেই বৃত্তিই আবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন। সে কারণে তাঁদের কাছে পরিবর্তনটা নজরে আসেনি। এই না আসার খেসারত দিতে হবে বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের মানুষদের। মার্কসবাদ যে একটা বিজ্ঞান, এটা মার্কসবাদীরা মুখে বলেন বটে, তবে বিশ্বাস আনতে পারেন নি। আর এই না আনতে পারার জন্যই মার্কসবাদকে তাঁরা স্থবির করে রেখেছেন। তার ফলে একধরনের অন্ধত্ব গ্রাস করেছে সমগ্র পৃথিবীর মার্কসবাদীদের। এই অন্ধত্বের কারণে তাঁরা দেখতে পেলেন না, ইলেকট্রনিক্স বা কম্পিউটর টেকনোলজিকে।

আগুন জ্বালাতে শেখা, চাকা বানানো এবং শিল্পবিপ্লবের মতোই কম্পিউটর প্রযুক্তিও এই সভ্যতার উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই প্রযুক্তি সারপ্লাস ভ্যালু-র মূল সূত্রটিকে নস্যাৎ করে দিল। যেমন ধরুন, একটি কারখানায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করে পাঁচ কোটি টাকা সারপ্লাস ভ্যালু সৃষ্টি করতো, শ্রমিকরা দাবি করতেন, এই উদ্বৃত্তের অংশ। যার নাম বোনাস প্রডাক্টশন বোনাস। কিন্তু এখন সেই পাঁচ হাজার শ্রমিকের কাজ করে দিচ্ছে পাঁচটি চার ইউনিট যন্ত্র, কম্পিউটারচালিত বা উচ্চ প্রযুক্তির এই যন্ত্র পাঁচটি চালু রাখতে ৫দ্ধ৩+৩=১৮ জন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ হলেই যথেষ্ট। এখন এই ১৮ জন যদি পাঁচ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত মূল্যের অংশ দাবি করে বসেন, তাহলে এর থেকে হাস্যকর আর কিছুই হবে না। এই সহজতম অঙ্কটি যদি মার্কসবাদীরা কয়েকবছর আগে উপলদ্ধি করতে পারতেন, তাহলে এই বিপর্যয়ের মুখে পড়ত হত না সমাজতান্ত্রিক দুনিয়াকে। এই কম্পিউটর প্রযুক্তি-ই আধুনিকতাকে সরিয়ে দিয়ে নিয়ে এসেছে পোস্টমডার্নিজমকে। যেমন শিল্পবিপ্লব এনেছিল মডার্নিজমকে।

এই সময়ে কী কী নতুন উপকরণ আমাদের হাতে উঠে এসেছে, যেগুলি আধুনিক যুগের শিল্প সাহিত্যিকরা পান নি? আধুনিক যুগের মানুষ যেদিন বেতার বা রেডিও পেয়েছিল, তারা যে পরিমাণ আনন্দ পেয়েছিল, আমরা যেদিন টেলিভিশন পেলাম তার থেকে কম ছিল না। টেলিভিশনের সঙ্গে সঙ্গে পেলাম রিমোট কন্ট্রোল কী-বোর্ড। পেলাম ঝঞউ, ওঝউ এবং ঋধী কিংবা ওহঃবৎহবঃ, ব-সধরষ — এই সব উপকরণই কম্পিউটার প্রযুক্তির ফসল।

আধুনিক যুগের একজন মানুষকে বর্তমানে ফোনে কথা বলতে গেলে টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সহযোগিতা চাইতে হত বা ট্রাঙ্ককল করতে হত। এখন হিউজটনে বসবাসকারী আমার শ্যালিকার সঙ্গে মুহূর্তেই কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি আমি। এটা কী কম সৌভাগ্যের? জার্মানিতে বসে কবি অলোকরঞ্জন তাঁর নির্দেশ আমার কাছে মুহূর্তেই পৌঁছে দিচ্ছেন ঋধী এর মাধ্যমে। আমি আলোকদা-র হস্তাক্ষরে নির্দেশ গ্রহণ করছি। আধুনিকযুগে কমপক্ষে ১০/১৫ দিন লেগে যেত এই কাজের জন্য। আমেরিকার অরণ্যে যেদিন আগুন লাগলো বা ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটে গেল সেই দিনই ইইঈ এবং ঈঘঘ আমার কাছে পৌঁছে দিল অডিওভিস্যুয়াল ছবি। আর রাত জেগে বিশ্বকাপ দ্যাখার সুযোগতো আধুনিক যুগে সম্ভবপর ছিল না। তারপর খাটে শুয়ে একটি চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে পৌঁছে যাচ্ছি কী-বোর্ড স্পর্শ করে। সময় নির্দিষ্ট করে দিলে নিজে নিজেই চালু হয়ে যাচ্ছে ঞঠ, বন্ধও হয়ে যাচ্ছে।

এতসব আমরা অর্জন করেছি। আর এই অর্জন বিফলে যাবে, সেটা কেন হবে ভাই? কিছু অর্জন করলে, কিছু প্রতিদান দিতেই হয়। এর প্রতিদান হ’ল আজকের লেখালেখি।

এই প্রতিদানের মাত্র কয়েকটি নমুনা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি :

১.            একটি বুদবুদের গঠনতন্ত্রে রয়েছে একটি জলবিন্দুর প্রতিবাদ। (সমীর রায়চৌধুরী)

২.           লজ্জায় অধোবদন হাতে-টানা মেঘে চেপে অবকাশ কাটাতে বেরিয়ে পড়েছিল ভাসমান ডিজেলের তেলছবি। (মলয় রায়চৌধুরী)

৩.           তৎসম শব্দের মতো ঝরে পড়ছে বৃষ্টি। (নাসের হোসেন)

৪.           আজকাল যেন ফেল করা মার্কসিটের ওপর শুয়ে থাকতে খুব ভালো লাগে। (জহর সেনমজুমদার)

৫.           লাল থকথকে কাদায় আটকে পড়া ঘোড়াটি সারাদিন সহ্য করেছে পাগলাটে অস্বাভাবিক সব চোখ, আর এক অদ্ভুত গোল মাংসমাখা ভাষায় কথা বলা হয়েছে তার বিষয়ে যে ভাষায় ‘আলো’ শব্দটি নেই, এবং কোনো বিস্ময়চিহ্ন নেই। (অমিতাভ মৈত্র)

৬.           খুব সর্তক মোড়কে আমরা ঝুঁকে পড়েছি আয়নার দিকে। ছবি গণিত কিংবা আলু বিষয়ে টাঙিয়ে দিচ্ছি বিজ্ঞাপন। (প্রশান্ত গুহমজুমদার)

৭.           একেকটি দিন তুলে দিচ্ছি ভ্রমণপ্রিয় নির্জনতার কাছে পরিবর্তে তুলাদ-ে ওজন করে সে আমাকে দিচ্ছে নতুন নতুন রুমাল। (রজতশুভ্র গুপ্ত)

৮.           একেকটা শব্দে একেকটা ত্রিমাত্রিক ছবি বয়ে আসে ঘরের ভেতর।  (শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

৯.           কাক আসলে যা দেখে তা সবই ঐ ক্যালাইডোস্কোপের মধ্যে দিয়ে যার মধ্যে কয়েকটি রাজস্থানি চুড়ির ভাঙা কাচ লুকানো রয়েছে।

                (রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়)

১০.         তালপাতার পাখায় গত জন্মের কিছু আলো ঝিকিমিকি করে। (মুরারি সিংহ)

১১.         রাজপথে পা ঠুকে ঠুকে যখন নাকাল বাদামি ঘোড়া, আমি তার খুরের ঘর্ষণ থেকে সন্তর্পণে এক এক করে তুলে নিলাম অনর্গল জলপ্রপাত, অকাল বর্ষণ আর বিষণœ সূর্যমূখী। (শুভাশিস গঙ্গোপাধ্যায়)

১২.         মৃত্যুর রুপোলি কেরিকেচার থেকে ঠিক উড়ে এসে জুড়ে বসে অনেক গুলি হলদে পাখি।  (বিভা বসু)

১৩.         ‘নীল’ একটি মেয়ের নাম দেওয়া যেতে পরে, তাহলে ছেলেটির নাম হয় ‘কমলা’।  (অংশুমান কর)

১৪.         মানুষের মুখ মানে নানারকম আয়নার তৈরি কোনো কুয়াশা। (বাপন চক্রবর্তী)

১৫.        ক্ষীণ গোধূলির মাথা একখানা ফুলস্কেপ কাগজ দিয়েই ঢেকে দেওয়া যায়। (অনিন্দ্য রায়)

১৬.        অন্ধকার রাত্তির খোলা রাস্তায় নামিয়ে সাঁতার কাটতে বলে হাত ধরিয়ে দেওয়া হল জুতোর বিজ্ঞাপন মন্ত্র বড় বড় অক্ষরে লেখা জাস্ট ডু ইট।  (কৌশিক চক্রবর্তী)

১৭.         সাদা বরফের কথা আর লিখবো না। বরং ২টি পায়রার পাশাপাশি অবস্থানের কথা লিখবো । (সুবীর সরকার)

১৮.         জঙ্গল গানের পর একটা আন্তর্জাতিক কারখানায় কিছু শব্দ সংকেত পাঠায়। (মানসকুমার চিনি)

১৯.         আমাদের সম্পর্কও বহুব্রীহি সমাসের মতো। (বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়)

২০.        জেগে থাকা এবং ইন্টারনেট খেলার মধ্যে একটি পঞ্চবটী অভ্যাস ছিল তার  (রবীন্দ্র বিশ্বাস)

প্রতিদানের ২০তম নমুনাটি রবীন্দ্র বিশ্বাসের। কবিতাটির নাম ‘বিনুনি’। উৎসাহী পাঠক ‘হাওয়া ৪৯’-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় কবিতাটি পাবেন। হাওয়া-র এই সংখ্যাটির বিষয় ছিল ‘জটিলতা’, সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। আমার প্রদর্শিত ২০টি নমুনা-ই পোস্টমডার্ন যুগের একমাত্র উদাহরণ তা ভাববেন না। এর বাইরে আরো ১০০ জন আছেন যাঁদের কবিতায় এইসব বৈশিষ্ট্যগুলি দ্যাখা যাবে।

সমীর রায়চৌধুরী, আমাদের দেশের পোস্টমডার্ন চিন্তাচেতনার প্রধানতম ব্যক্তি, দেখতে পেয়েছেন একটি বুদবুদের গঠনতন্ত্র, যে গঠনতন্ত্রে একটি জলবিন্দুর প্রতিবাদ আছে। জলবিন্দুর সঙ্গে বুদবুদের সম্পর্কের কথা আধুনিক কবিদের অজানা ছিল, এমটা ভাবাও দ-নীয় অপরাধ। কিন্তু আধুনিক কবিরা যে বুদবুদের গঠনতন্ত্রের প্রতি মনোযোগী ছিলেন না, এটা জোর দিয়ে বলা যায়। নাসের হোসেনের কাছে বৃষ্টিপতনের শব্দ হয়ে যায় তৎসম শব্দের মতো, আবার বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তাদের সম্পর্কও বহুব্রীহি সমাসের মতো।

এই দুটো নমুনা থেকে আমি যদি বলি পোস্টমডার্ন কবিরা শুধুমাত্র শব্দ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন না, ব্যাকরণও তাঁদের কাছে বিষয় হয়ে উঠেছে। জহর সেন মজুমদারের ভালো লাগে ফেল-করা মার্কশিটের ওপর শুয়ে থাকতে, আর অনিন্দ্য রায় জানে যে, একখানা ফুলস্কেপ কাগজ দিয়েই ক্ষীণ গোধূলির মাথা ঢেকে দেওয়া যায়। রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায় আবিষ্কার করেছে কাকেরা যা দেখে তা সবই ক্যালইডোস্কোপের মধ্যে দিয়ে, আবার ঐ ক্যালাইডোস্কোপটির মধ্যে লুকিয়ে আছে রাজস্থানি চুড়ির ভাঙা কাঁচ।

শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবিষ্কার হলো একেকটা শব্দে একেকটা ত্রিমাত্রিক ছবি বয়ে আসে। শান্তুনুর কাছে ছবিটি একমাত্রিক হতে পারে না। কারণ শান্তনু পোস্টমডার্ন যুগের আলোকিত বিজ্ঞাপনের যে হোর্ডিং দেখেছে সেগুলি ত্রিমাত্রিক।

৫নং নমুনাটি অমিতাভ মৈত্র-র ‘টোটেম ভোজ’ পর্বের। এই সিরিজে অমিতাভ বাইবেল তথা প্রভু যিশুকে বিনির্মাণ করেছেন, বিনির্মাণ করার কাজটি পোস্টমডার্নযুগের কবিদের প্রধান একটি কাজ।

প্রশান্ত গুহমজুমদার বলেছে আমরা খুব সতর্ক মোড়কে আয়নার দিকে ঝুঁকে পড়েছি। শুধু এটুকু বলেই থেমে থাকেনি প্রশান্ত, সে বলেছে, ছবি গণিত কিংবা আলু বিষয়ে বিজ্ঞাপন টাঙানোর ঘোষণা বা স্বীকৃতিপত্র। পাঠক লক্ষ করুন ছবি গণিত ‘কিংবা আলু’ ‘এবং আলু’ নয়। অর্থাৎ প্রশান্ত-র কাছে ছবি গণিত এবং আলু প্রায় সমার্থক শব্দাবলী। আধুনিকযুগে এইসব উচ্চারণ সম্ভপর ছিল না।

মুরারি সিংহ-র গতজন্মের কিছু আলো ঝিকিমিকি করে তালপাতার পাখায়। এই তালপাতার পাখাটিকে কি মুরারি গতজন্ম থেকে বহন করে বেরাচ্ছে। সুবীর ২টি পায়রার পাাশাপাশি অবস্থানের কথা লিখতে চায়। আসলে সুবীর সাদা বরফের কথাও লিখে ফেলেছে, এটা তো আমরা জেনেই গেছি। তবু একটা সংশয় তৈরি হয়ে যায় ২টি পায়রার পাশাপাশি অবস্থানের কথাও কি সে লিখবে? নাকি শুধুই প্রতিশ্রুতি তথা ঘোষণা। এই সব জানতে এবং বুঝতে আপনাকে আরো যতœবান হতে হবে, সংগ্রহ করতে হবে কাব্যগ্রন্থ, এবং কিছু কিছু কবিতা পত্রিকা, সেখানে পোস্টমডার্ন কবিতা ছাপা হয়।

তবে এ সম্পর্কে খুবই সচেতন হতে হবে পাঠককে, কেননা পোস্টমডার্নিজমও এখন ব্যবসা দেয়, দেয় বলে একে ভাঙিয়ে কেউ কেউ পত্রিকা বিক্রি করতে চায়, পোস্টমডার্ন সম্পর্কিত অধ্যাপকদের নোট ছাপে। কিন্তু এরা পোস্টমডার্ন কবিতা ছাপতে ভয় পায়, কারণ এরা মডার্নিজমকে ধরে রাখতে চায়। কারণ মডার্নিজমেই এদের শিকড় গেঁথে আছে। এদের পোস্টমডার্ন প্রীতি নেহাৎ ‘করে খাবার মন্ত্র’।

ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী জাক দেরিদা, জাঁ-ফ্রাঁসোয়া লিওতার, মিশেল ফুকো, জাক লাকাঁ কিংবা রলাঁ বার্থ প্রমুখ যেভাবে পোস্টমডার্নিজমকে ব্যাখ্যা করেছেন, আমাদের দেশে ঠিক সেভাবে আমরা পোস্টমডার্নিজমকে দেখছি না। তা দ্যাখা সম্ভবও নয়। মনে রাখতে হবে আমরা পোস্টকলোনির বাসিন্দা। অর্থাৎ ‘উপনিবেশ’ হল আমাদের জন্মসূত্র। আর ইউরোপীয়রা হলেন যাঁরা কলোনি বানিয়েছিলেন তাঁদের বংশধর। কজেই এই পার্থক্যটা তো থেকেই যাচ্ছে।

আরো একটা কথা, আমাদের ‘আলোকপ্রাপ্তি’ হয়েছিল ঔপনিবেশিক প্রভু ইংরেজদের হাত ধরে বা পা চেটে। সেটা যে দোষের ছিল এমনটাও আমার মনে হয় না। সে সময় প্রয়োজন ছিল ট্রেনলাইন এবং বিশ্ববিদ্যালয়, তদোপরি বিজ্ঞানচর্চা। ইংরেজ প্রভাব ভিন্ন সে সময় এইসব সম্ভপর হত এমনটা আমার মনে হয় না।

আর আমাদের যে নিজস্ব বর্ষকাল আছে তা আমাদেরই, প্যারিসের বর্ষাকালের থেকে তা ভিন্ন। আবার আমাদের সূর্যাস্তের রঙ কিংবা বিবাহগান আমাদের নিজস্ব। আমাদের ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা প্রকাশও আমাদের। কাজেই আমাদের যে পোস্টমডার্নিজম তা আমাদেরই। এর সঙ্গে অনুগ্রহ করে কেউ দেরিদা ফুকো-কে টেনে আনবেন না। আমাদের চিন্তাচেতনাকে আমদের আবহাওয়ায় বেড়ে উঠতে দিন। এবং বিচার বিশ্লেষণ করুন। ১০০ বছর পর সমগ্র বিশ্বকে একসঙ্গে রেখে তার ক্রটিবিচ্যুতি বা ব্যালান্স শিট কষা যাবে। কারণ আরো ১০০ বছর তো এই পোস্টমডার্ন যুগের অস্তিত্ব বজায় থাকবে।

কয়েকটি পোস্টমডার্ন চিহ্ন যেগুলি এখনই কেউ কেউ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, সেগুলি হলো :

১.            দৃশ্যের ভিতরে যে অসংখ্য দৃশ্য আছে, সেই দৃশ্যগুলিকে তুলে আনতে হবে, এবং সেই দৃশ্যগুলিকে কবিতার মতো করে সাজিয়ে দিতে হবে।

২.           ‘প্রতীক’ একটি আধুনিক ধারণা, প্রতীক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। এর ফলে কোনো প্রতীক ফবপড়ফব করতে করতে পাঠককে কবিতায় পৌছাতে হয় না। আমরা চাই ভাষাকে তার আদি লক্ষণে, অর্থাৎ শুধুমাত্র তার ‘চিহ্ন’ বা ংরমহ াধষঁব থেকে ব্যবহার করতে। এক শব্দ যে অর্থ বহন করে, আভিধানিকভাবে তার থেকে বেশি কিছু শব্দের প্রত্যশা করি না। বাস্তবতা নিজেই একটা ংুসনড়ষরপ পড়হংঃৎঁপঃরড়হ যখন, তখন সেই প্রতীকী গঠনকে ধরার জন্য ‘শব্দ’—কে প্রতীকী করে তোলা নিষ্প্রয়োজন, এমনকি বাহুল্যও। শব্দের বাস্তবতা দিয়েই বাস্তবতার প্রতীকী গঠনকে ধরা সম্ভব এমনটাই আমাদের মনে হয়।

৩.           আধুনিক শিল্পসাহিত্য ছিল একরৈখিক, এখন তা বহুরৈখিক।

৪.           চিত্রকল্প-র পরিবর্তে চলচ্চিত্রকল্প।

৫.           আমাদের হাতে আছে রিমোট কন্ট্রোল কী বোর্ড, এটা আমারা জানি; আর জানি বলেই মুহূর্তেই এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে চলে যেতে পারে। যে কোনো উৎসাহী পাঠক আমরা যে কোনো সাম্প্রতিক কবিতা দেখে নিলেই এর অসংখ্য উদাহরণ পেয়ে যাবেন।

৬.           আধুনিকরা সীমাবদ্ধ ছিলেন, যুক্তির পৃথিবীতে। কারণ তাঁরা মূলত যুক্তিবাদী বা যুক্তির ক্রীতদাস ছিলেন। তাঁরা জানতেন না যুক্তির বাইরেও একটা বিরাট পৃথিবী আছে— সেই পৃথিবীর পিক্গুলি ভার্জিন। আমরা দেখতে পেয়েছি যুক্তির বাইরের পৃথিবীর অনাবিষ্কৃৃত সৌন্দর্যকে। এই প্রসঙ্গে একটা কথা জানিয়ে রাখি, যুক্তির পৃথিবীর আয়তনের থেকে যুক্তির বাইরের পৃথিবীর আয়তন বহুগুণ বড়। আর বড় বলেই এখানে বিচরণের ঝুঁকি কম। আধুনিক কবিদের এখন যে সমস্যা দাঁড়িয়েছে, তা হল, অনুকরণের সমস্যা, এমনকি একজন আধুনিক কবি নিজেই নিজের লেখার অনুকরণ করে যাচ্ছেন। বা করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ তাঁরা যুক্তির সীমাবদ্ধতা থেকে বেরুতে চাইছেন না। কাজেই লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁরা নিজেদের অরনুকরণকেই শ্রেয় মনে করছেন, অনেকে আবার পূর্বসূরীদের অনুকরণ করছেন— তাঁদের লেখালেখি ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

পোস্টমডার্নিজম সম্পর্কে বহুরকম চিন্তা চলছে অবিরত। সেইসব চিন্তার সামগ্রিক একটা চেহারা ধরা পড়বে আরো কিছুদিন পর। আপাতত পাঠকেরা লক্ষ রাখুন। বিচার করুন। আধুনিক লেখালেখির পাশে পোস্টমডার্ন লেখালেখিকে বসিয়ে দেখুন। এই অনুরোধ ভিন্ন আর কী-ই বা করতে পারি?

*********************************************

উত্তর-আধুনিকতা ও তৃতীয় বিশ্ব
পবিত্র সরকার

১. প্রথম দু-একটা কথা১

আমরা এখন থেকেই কথাটা শুরু করব যে, উত্তর-আধুনিকতা (পোস্ট মডার্নিজম) বলে কোনো সংহত, সুনির্দিষ্ট, সীমাপ্রগাঢ়, স্থাপত্যঘন তত্ত্ব নেই। এ সম্বন্ধে মোটামুটি সকলেই একমত। এর কোনো স্থিতসংবদ্ধ গোষ্ঠিও নেই— যার সদস্যরা অন্তত বুক বাজিয়ে বলতে থাকবে, ‘আমরা বিশুদ্ধ ও নির্ভেজাল উত্তর-আধুনিক; বাকিরা হয় পরিষ্কার না উত্তর-আধুনিক— সম্পূর্ণ ভিন্ন দল, নিছক ‘অপর’; না-হয় আমাদের মতো খাঁটি উত্তর-আধুনিক নয়। ওদের কথায় কেউ কান দিয়ো না।’ এ থেকেই বোঝা যাবে যে, উত্তর-আধুনিকতা একটা সময়ে উঠে আসা নানা ভবনা ও বিশ্বাসের একটা জোড়াতালি দেওয়া তত্ত্ব। কিন্তু খুব শক্তিশালী তত্ত্ব, কারণ সাহিত্য রচনা থেকে শুরু করে স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি, বৈদ্যুতিন মাধ্যম ও বিনোদন, দর্শন—সমস্ত কিছুতেই তার লক্ষণ ছড়িয়ে গেছে, সমস্ত কিছুতেই নাকি এই ভাবনার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

এই বহুমুখী ও বহুস্তরীয় ভাবপুঞ্জের কোনো বড়ো একক দার্শনিকও নেই, যার দর্শনকে এই তত্ত্বগুচ্ছের একমাত্র ভিত্তি বা উৎস বলা যায়। সাম্যবাদী-সমাজতান্ত্রিক দর্শনের উদ্গাতা যেমন ছিলেন কার্ল মাকর্স ও ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস, কিংবা ধনবাদী দর্শনকে সংহত রূপ যেমন দিয়েছিলেন জন মেনার্ড কিনস। উত্তর-আধুনিকতার দার্শনিক হিসেবে যাঁদের নাম করা হয়, যেমন নিটশে বা হাইডেগার বা জঁ ফ্রাঁসোয়া লিয়োতার (Lyotard) বা জঁ বোদরিয়ার (Baudrillard)— তাঁরা উত্তর-আধুনিকতার উদ্গাতা নন, এর কোনো কোনো লক্ষণের ব্যাখ্যাতা মাত্র। জাক্ দেরিদাও আবির্ভূত হয়েছেন উত্তর অবয়ববাদী (পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট) হিসেবে, তিনিও উত্তর-আধুনিকদের কেউ নন। কখনো কখনো মিশেল ফুকো (Foucault) বা জাক্ লাকাঁ (Lacan)-র নামও উচ্চরিত হয় উত্তর-আধুনিকতার সূত্রে, কিন্তু তাঁরাও নিছক উত্তর-আধুনিক নন। অবশ্য সকলেই উত্তর-আধুনিকতার অসংবদ্ধ ঘটনাকে কোনো-না কোনোভাবে প্রভাবিত করেছেন, যেমন অন্য কালের বা অন্য দেশের আরো কেউ কেউ করেছেন।

২. শব্দার্থ-সন্ধান

‘পোস্ট মডার্নিজম’ নামটির বয়স আজ একশো ত্রিশ বছরের মতো হল। উত্তর-আধুনিক স্থাপত্য ও শিল্প-বিশেষজ্ঞ চার্লস জেংকস (Jencks) খবরের কাগজে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন যে, ১৮৭০-এ তিনি কথাটির সবচেয়ে পুরোনো উল্লেখ লক্ষ করেছেন। সে সময়কার এক ইংরেজ শিল্পী জন উইলকিন্স চ্যাপম্যান ফরাসি নব্য-ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পী ক্লোদ মনে আর ওগুস্ত্ রেনোয়ার-এর ছবি দেখে এই উপসর্গবদ্ধ শব্দটি প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি যেন বোঝাতে চেয়েছিলেন যে এরা ইম্প্রেশনিজমকে উত্তীর্ণ হয়ে আরো এগিয়ে গেছে।

এ থেকেই বোঝা যায় যে, আজ পোস্ট মডার্নিজম কথাটার যে অর্থ প্রথম প্রয়োগে তার সে অর্থ ছিল না। প্রথম কেন, পরবর্তী আরো বহু প্রয়োগে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করা হয়েছে (ডধৎফ ২০০৩, ৭-৯) । ওয়ার্ড ১৯১৭, ১৯৪৭, ১৯৫৭, ১৯৬৪, ও ১৯৬৮-তে এর আরো সব প্রয়োগ লক্ষ করেন, এবং সব প্রয়োগই ভিন্ন অর্থে। ১৯১৭-তে জার্মান লেখক রুডলফ পেনভিট্স এ কথা প্রয়োগ করেন ইয়োরোপীয় ‘আধুনিকতা’-তে বন্ধনমুক্ত মানুষ সম্বন্ধে : ১৯৪৭-এ আর্নল্ড টয়েনবির প্রয়োগের অর্থ ছিল ‘শিল্পবিপ্লব ও বৃহৎ শিল্পায়নের পরবর্তী যুগ’। মার্কিন সংস্কৃতিতাত্ত্বিক বার্নার্ড রোজেনবার্গ ১৯৫৭-তে বলেন প্রযুক্তির আধিপত্যে সার্বিক সমতা-চাপানো এক জীবনযাপনের কথা, যার আংশিক প্রতিধ্বনি হয়ত শুনতে পাওয়া যায় হার্বার্ট মার্কিউজ-এর একমাত্রিক মানুষ্য বা One dimensional man কথাটির মধ্যে। ১৯৬৪-তে লেসলি ফিডলার উচ্চকোটির মূল্যবোধ প্রত্যাখ্যানের মধ্যে পোস্ট মডার্নের অর্থ খোঁজেন; তার মনে নিশ্চয়ই ছিল তৎকালীন হিপি, ফ্লাওয়ার চিলড্রেন ও কালো মানুষদের প্রতিবাদী নতুন আচরণবিধি ও নান্দনতত্ত্বের কথা— যা  WASP White Anglo Saxon Portestant-দের২ আচরণবিধি ও নন্দনতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৬৮-তে লিয়ো স্টাইনবার্গের অর্থ শিল্পতত্ত্বের সঙ্গে জড়িত। মার্কিনদেশে  পপ (পপুলার) ও অন্যান্য নতুন শিল্প পোস্ট মডার্ন, কারণ তা আগেকার এলিট শিল্পতত্ত্বকে বাতিল করতে চায়।

অবশ্যই এ সব প্রয়োগ বিত্তবৈভবশক্তিধর ‘উন্নত’ পাশ্চাত্য দেশগুলির সামাজিক-বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক-সামরিক-প্রাযুক্তিক-নান্দনিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। তৃতীয় বিশ্বের এখানে এক অর্থে কোনো ভূমিকা নেই, কিন্তু অন্য নানা গভীরতর অর্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। যে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার সদ্যতন পর্যায়ে এই তত্ত্বের উদ্ভব বলে ফ্রেডরিক জেমসন জানিয়েছেন, সেই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৃতীয় বিশ্বকে শোষণ করেই বেঁচে আছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ব্যবস্থার সাম্রাজ্যে আমরা অধীনস্থ প্রজা, তাই এ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা করতেই হয়। পৃথিবীর এখন এমন এক অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, আমেরিকা-ইয়োরোপের সর্দি লাগলে আমরাই আগে বেদম হাঁচতে শুরু করি। পোস্টমডার্নিজম এই নব্য ধন-ব্যবস্থার প্রতিচ্ছায়া, কাজেই এই উত্তর-আধুনিকতাকে বুঝতে নতুন ধন-ব্যবস্থাকেও আমরা আরো বুঝতে পারব— এও একটা যুক্তি। এ ব্যবস্থা আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশ ও সমাজের আষ্টেপৃষ্ঠে বিশ্বায়নের বজ্র আঁটুনিতে জড়িয়ে ধরছে, তারই দর্শন ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটছে পোস্টমডার্নিজমে।

বঙ্গভাষী অঞ্চলে আর একটা কথাও হয়ত বলে নেওয়া দরকার। গত শতকের আশির বছরগুলিতে পশ্চিম বাংলায়— কলকাতায় বলাই ভালো— অঞ্জন সেন সম্পাদিত ‘গাঙ্গেয় পত্র’ এবং আরো দু-একটি পত্রিকায় উত্তর-আধুনিকতা বলে একটি মূলত কবিতার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ‘সাম্প্রত’ ও অন্যান্য পত্রিকার একাধিক সংখ্যাতেও এ নিয়ে আলোচনা দেখেছি। তার সঙ্গেও পশ্চিমি উত্তর-আধুনিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। এই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় ভাষা সংস্থানের (CIIL Central Instiute of Indian Langusges) অধ্যক্ষ এবং মৈথিল ভাষার প্রখ্যাত কবি উদয়নারায়ণ সিংহ কবি অমিতাভ গুপ্ত প্রভৃতি। ভারতের সাহিত্য অকাদেমীর তখনকার সচিব ইন্দ্রনাথ চৌধুরী এঁদের নিয়ে ‘ওহফরধহ খরঃবৎধঃঁৎব’ পত্রিকাতেও লিখেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমি উত্তর-আধুনিকতার আঁচ এসে পৌঁছোনোর পর এঁরা খুব সযতেœ তা থেকে নিজেদের অবস্থানকে পৃথক করতে থাকেন। এঁরা বলেন এঁদের উত্তর-আধুনিকতা মূলত দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার আকাক্সক্ষা, ঐতিহ্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়। এঁরা কবিতার শৈলী ও রূপ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছেন, কিন্তু আগেকার স্মৃতিলোককে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান এঁদের পরিকল্পনায় ছিল না।

তৃতীয় আর একটা কথাও মনে হয় প্রথমেই বলে রাখা দরকার— সেটা খুব গোড়ার কথা। আমাদের সহিত্য ও শিল্পতত্ত্বে বহুবিধ ‘ইজম’ বা ‘বাদ’-এর প্রচার ও আস্ফালনের ইতিহাস আমরা পড়তে বাধ্য হই। ক্লাসিক, রোমান্টিক, নিও ক্লাসিক্যাল, ‘আধুনিক’ ইত্যাদি ছাপার আড়ালে সাহিত্য ও কাব্যবিচারের মূল এই প্রশ্নটা ঢাকা পড়ে যায় যে, একটা ‘নাম’ একটি রচনার উৎকর্ষের সঙ্গে কী যোগ করে? আদৌ কি তার উপভোগ্যতা বাড়ায়? নাকি একটা লেবেল ওই রচনার উৎকর্ষের সঙ্গে কী যোগ করে? আদৌ কি তার উপভোগ্যতা বাড়ায়? নাকি একটা লেবেল ওই রচনাটির সময় ও সৃষ্টি-পটভূমিকাকেই শুধু চিহ্নিত করে দেয়, আর কিছু নয়? ‘বাদ’ সম্বন্ধে অনিভিজ্ঞ পাঠক কি রচনাটি থেকে কিছু প্রত্যাশা করবেন, না করবেন না?

এগুলি খুব সরলচিত্ত প্রশ্ন, কারণ তাত্ত্বিকভাবে এ প্রশ্নগুলির বিরুদ্ধতা করে বলাই যায় যে, ভালো-লাগা মন্দ-লাগার কোনো নিরপেক্ষ নির্বিশেষ নেই। এটা যেমন এক দিকের কথা, তেমনই আর এক দিকে কথা হল যে, অনেক শিল্পতত্ত্ব শুধু ভালো লাগাতেও চায় না, চায় একটা কোনো প্ররোচনা দিতে বা কোনো কাজে উদ্দীপনা জাগাতে। শিল্পসৃষ্টি একটা লক্ষ্য, তা-ই আমাদের গন্তব্য— নাকি তা অন্য কোনো গন্তব্য পৌঁছাবার একটা রাস্তা, একটা উপায়— এই দুটো মতে নন্দনতত্ত্ব বিভক্ত হয়ে গেছে। সেখানে পাঠকের-দর্শকের/শ্রোতার ভালো-লাগা, মন্দ-লাগার বিষয়টি যেন তাত্ত্বিক প্রাবল্য হারিয়ে ফেলে। তবে যতই দুর্বল হোক প্রশ্লগুলি,তা তুলে রাখতে দোষ নেই; কারণ এ প্রশ্ন মাত্র দু-চারজনের নয়।

৩. কখন শুরু, কখন শেষ?

উত্তর-আধুনিকতা অবশ্যই এখনো চলছে পাশ্চাত্যে, অর্থাৎ তাকে বাতিল করে এখনো কোনো নতুন সাংস্কৃতিক তত্ত্ব দর্শন ও আন্দোলন শুরু হয়নি। এ থেকে বোঝা যায়, একটির পর একটি আন্দোলনের উদ্ভব ও বিলয়ের মধ্যে একটি দ্বান্দ্বিকতা বা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক আছে। বেশির ভাগ তত্ত্ব বা আন্দোলনই শুরু হয় সমসাময়িক বা অব্যবহিত পূর্ববর্তী অন্যতত্ত্ব বা আন্দোলনের প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া থেকে। সেই কারণে কোনো আন্দোলনের আরম্ভ ও শেষের একটা মোটামুটি সময় নির্দেশ করা যায়। মোটামুটিই সেটা সম্ভব, কারণ তার আরম্ভ ও শেষের প্রান্ত পূর্বপর বিচ্ছিন্ন ও সুনির্দিষ্ট থাকে না। আবার তার কেন্দ্রীয় প্রাধান্যের সময়েই হয়ত তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার একটা ক্ষীণ স্রোতের জন্ম হয়, পরে যা শক্তিশালী হয়ে তাকে সরিয়ে দিতে এগোয়। অর্থাৎ যে-কোনো সময়ে সংস্কৃতি বা ইতিহাসের একাধিক ছোটো বড়ো স্রোত পাশাপাশি চলে, তার মধ্যে একটি প্রধান হয়ে ওঠে। ফ্রেডরিক জেমসনের (ঔধসবংড়হ, ১৯৯১:১৫৮-৫৯ ও অন্যত্র) ঈঁষঃঁৎধষ ফড়সরহধহঃ কথাটি থেকে এই বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত আমরা বুঝতে পারি।৩

জেমসন এক নব্য মার্কসবাদী, মার্কিনদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মার্কসবাদের চর্চার একটা সাম্ভ্রান্ত জায়গা মূলত তাঁর এবং তাঁর সহযোগীদের চেষ্টায় গড়ে উঠেছে। জেমসনের এই কথাটির পেছনে মার্কসের ইতি নেতি সমম্বয় বা থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিনথেসিস তত্ত্ব যে কাজ করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হেগেলের উদ্ভাবিত ইতিহাসব্যাখ্যানের এই সূত্রকে মার্কস তার ভাববাদী ভিত্তি থেকে ছিনিয়ে এনে বস্তুবাদের উপর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই তত্ত্ব আমাদের বলে যে, প্রতিটি সমাজে প্রচলিত প্রধান ব্যবস্থা আগের ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে নিজের প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এক সময় তারও বিপরীত প্রতিক্রিয়া (ধহঃরঃযবংরং) তৈরি হয়। শেষে দুয়ের সংঘাতে তৃতীয় একটি ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। এভাবে ইতিহাসের অগ্রগতি হয়। অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বিপ্লব হয়ত অল্প সময়েই ঘটে, কিন্তু তারই ফলে অতীতের সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও ব্যবস্থাগুলির সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে রাতারাতি নতুন সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে না। ছেদ মূলত ঘটে উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন-সম্পর্কের—অর্থাৎ উৎপাদনের পুঁজি, প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠান, ও ব্যবস্থাপনার মালিক কোন শ্রেণী, তারা কীভাবে কাদের শ্রম কেনে, যাদের শ্রম কেনে তাদের উপরের উৎপাদনগুলিতে অধিকার কতটা, সৃষ্টি ও বিনোদনের অবসর কাদের কতটা ইত্যাদি নানা বিষয়ের উপর। মার্কসবাদ অনুসারে ভিত্তি (নধংব) ও অধিগঠনের (ংঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব) সম্পর্কটি ধ্রুব, কিন্তু খুব প্রত্যক্ষ নয়, সরলও নয়। তাই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘটলেও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে রাতারাতি কোনো পরিবর্তন ঘটা সহজ নয়। এই কারণেই বিপ্লবের পর নতুন করে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দরকার নয়।

যাই হোক এই পঁষঃঁৎধষ ফড়সরহধহঃ-এর সূত্রটি ধরেই উত্তর-আধুনিকতার উদ্ভব ও বিকাশকে আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। এবং দেখতে হবে, কোন ভিত্তি বা নধংব থেকে, অর্থাৎ কোন অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার আশ্রয়ে এই উত্তর-আধুনিকতার জন্ম হয়েছে।

এখানেও জেমসনের নির্দেশই সবচেয়ে কার্যকর। জেসমন অনুসরণ করেছেন জার্মান দার্শনিক মান্ডেলকে, যিনি তাঁর খধঃব ঈড়ঢ়রঃধষরংস (১৯৮৬) বইয়ে ইয়োরোপের উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন-সম্পর্কের নানা পর্যায়ের এই রকম বিভাগ করেছেন : শিল্পবিপ্লবের ফলে বাজার নির্ভর ধনতন্ত্র বা মার্কেট ক্যাপিটালিজম হল প্রথম পর্যায়। দ্বিতীয় পর্যায় হল সাম্রাজ্যবাদ ও/ অথবা একচেটিয়া উৎপাদনের ধনতন্ত্র। আর তৃতীয় ও বর্তমান পর্যায় হল বহুজাতিকের ধনতন্ত্র। এটাকেই ভুল করে পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যাপিটালিজমও বলা হয় (দ্র. ঐড়সবৎ, ১৯৮৮:১০৭)। এ সকলেরই শিকারক্ষেত্র যে তৃতীয় বিশ্ব, তা আমাদের মনে রাখা দরকার। মান্ডেলের মতে বাজারভিত্তিক ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদের কাল শিল্প-বিপ্লবের পর  ১৯৪৭ পর্যন্ত। তারপর ১৮৪৭ থেকে ১৮৯০-এর সময়খ-ে, তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত— সব মিলিয়ে যে মোট চারটি পর্ব পাই, তাতে ইয়োরোপ আমেরিকার শিল্প-বাণিজ্যে প্রযুক্তিগত নানা বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে। তার ফলে ঘটেছে মানুষের সামাজিক-শারীরিক অস্তিত্ব ও জীবন যাপনে আমূল বিপ্লব। প্রথমটিতে কারখানায় শ্রমিকদের হাতে তৈরি বা ব্যক্তিগত চেষ্টায় নির্মিত বাষ্পচালিত যন্ত্রের আধিপত্য, দ্বিতীয় পর্বে নানা উৎপাদন; প্রক্রিয়ায় যন্ত্রনির্মিত বাষ্পীয় যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার। এই দ্বিতীয় পর্বের ঘটনাটিই মান্ডেলের মতে প্রথম প্রযুক্তিগত বিপ্লব। এর পরে এল তৃতীয় পর্ব এবং দ্বিতীয় প্রযুক্তি-বিপ্লবের মুহূর্ত। এই কালখ-ে মোটর ইঞ্জিনের, অর্থাৎ পেট্রোল ডিজেল ইত্যাদির দহনে শক্তি সঞ্চারিত স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জিনের সার্বিক ব্যবহার দেখা গেল। ১৯৪৫ সাল থেকে শুরু হয়েছে তৃতীয় প্রযুক্তি বিপ্লব— এ সময়ে ঘটেছে কম্পিউটার; প্রযুক্তির বৈশ্বিক ও সবাঙ্গীণ ব্যবহার।৪

জেমসন মান্ডেলের শেষ তিনটি পর্বের তিন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তি থেকে তিনটি পৃথক সাংস্কৃতিক অধিগঠনের সম্পর্ক এইভাবে নির্ণয় করেন :

প্রথম প্রযুক্তি বিপ্লব— বাস্তববাদ (রিয়্যালিজম)

   দ্বিতীয় প্রযুক্তি বিপ্লব— আধুনিকবাদ (মডার্নিজম)

তৃতীয় প্রযুক্তি বিল্পব— উত্তর-আধুনিকতা (পোস্টমডার্নিজম)

তৃতীয় প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটেছে ১৯৪৫-এর পারে, এখান থেকেই সদ্যতন বা খধঃব পধঢ়রঃধষরংস-এর সূত্রপাত। এখানে লক্ষণীয় যে, জেমসন তাঁর বইয়েরই নাম দিয়েছেন Postmoderisim : or The cultural Logic of Late capitalism (Jameson, 1991)|5

ডেভিট হার্ভে (দ্র : ঐধৎাবু, ১৯৮৯) উত্তর-আধুনিক পটভূমি বা পোস্টমডার্ন কন্ডিশন সম্বন্ধে আর একটু ব্যাখ্যা করে লিখেছেন যে, এই সদ্যতন ধনতন্ত্রবাদে বাজার যেমন নানা জায়গায় বহুলভাবে ছড়িয়ে গেছে বহুজাতিক সংখ্যার কল্যাণে তেমনি উৎপাদন-উৎসও আর এক কেন্দ্রে বা একটিমাত্র দেশে সীমাবদ্ধ নেই। বহিরুৎপাদন বা আউটসোর্সিং এর কল্যাণে একটি পণ্যের মূল নকশা যেখানে তৈরি হচ্ছে, তা তার চূড়ান্তরূপে (উৎপাদিত পণ্যে) পৌঁছাবার আগে নানা দেশের নানা কারখানায় খ- খ-ভাবে অঙ্গ নির্মাণের পর অন্য কোথাও এক সঙ্গে জোড়া হচ্ছে। আগেকার ফোর্ড-পদ্ধতি বা ফোর্ডিজমের এককেন্দ্রিক উৎপাদন-ব্যবস্থাকে বাতিল করেই সদ্যতন ধনতন্ত্রের উৎপাদন ব্যবস্থা এসেছে। অবশ্য ফোর্ডিজমও সম্ভবত এখন এসব কালোচিত পরিবর্তন স্বীকার করে নিয়েছে।

৪. আধুনিকতাকে প্রত্যাখানের নানা রূপ ও উত্তর-আধুনিকতা

পোস্টমডার্নিজম নিয়ে হই-হট্টগোল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রথম শুরু হয়েছে, একথা বললে অত্যুক্তি হবে না। তবে তা সবসময় হলের উত্তর-আধুনিকতার চেহারা পায়নি। বার্টেনসের বইয়ের (ইবৎঃবহং, ১৯৯৫ : ২০-৩৬) দ্বিতীয় অধ্যায়ে নানা ধরনের আধুনিকতা-বিরোধের মধ্যে তার উদ্ভব ও বির্বতনের একটা ছবি পাওয়া যায়। বার্টেনস লক্ষ করেন, ১৯৫০ এর দশকে মার্কিন সাহিত্য-সমালোচক চার্লস অলসন সমকালীন মার্কিন কবিতায় আধুনিকতা-বিরোধী প্রবণতার কথা বলেছেন এবং তাঁর লেখা ও বক্তৃতায় পোস্টমডার্ন কথাটা ঘন ঘন ব্যবহার করেছেন। ১৯৫১-তে অলসনের পড়ানোর জায়গা ব্ল্যাক মাউন্টেন কলেজে এক অদ্ভুত অভিকরণের৬ ব্যবস্থা হয়েছিল। তাতে চিত্রকর রশেনবার্গ (জধহংপযবহনবৎম) নৃত্যশিল্পী মার্সি কানিংহাম (ঈঁহহরমযধস) এঁর নাচ আমরা কলকাতায় দেখেছি এবং স্বল্পতর খ্যাত আরো কিছু  শিল্পী ‘যে যেমন খুশি করো’ সৃষ্টি ও প্রদর্শনের খেলায় মেতেছিলেন— কেউ জানতেন না অন্যরা পর মুহূর্তে কে কী করবেন। বার্টেনসের বিবরণে এটিই প্রথম দিককার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ আধুনিকতা-বিরোধী সাংস্কৃতিক বিদ্রোহের ঘটনা। শিল্পগুলি নিজস্ব সীমানা ভেঙে পরস্পরের সঙ্গে আদান প্রদানের খেলায় যোগ দেওয়ারও এটি একটি বড়ো ঘটনা।

তার আগে থেকেই সমালোচানার তত্ত্ব ও নন্দনতত্ত্বে অলসন নতুন এক বিকল্প অভিজ্ঞতার কথা বলে এসেছেন। ১৯৫১-তেই মার্কিন ইন্ডিয়ানদের অঞ্চল ইয়ুকাতান-এ কিছু দিন বাস করেন। তার পরে তাঁর ‘হিউম্যান ইয়ুনিভার্স’ বলে প্রবন্ধে পাশ্চাত্যের গ্রিক ইহুদি খ্রিষ্টিয়৭ যুক্তিপরম্পরা ও ভাববিন্যাসের সুশৃঙ্খল ভাবপটভূমি বিসর্জন দিয়ে শিল্পে এক নতুন অভিজ্ঞতা প্রকাশের কথা বলেন, যাতে উঠে আসবে স্বাভাবিক ‘প্রাকৃতিক’ অভিজ্ঞতা, নিজে কোনো আরোপিত ভাষা বা সংগঠন তার শরীরে থাকবে না।

এতে উত্তর-আধুনিকের দুটো চিন্তা উঠে আসছে দেখতে পাই। একদিকে একটা বৃহৎ ও প্রভুত্বপ্রতাপী কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে সধৎমরহ বা  প্রান্তিকতায় নির্বাসিত যে সব অভিজ্ঞতা ছিল, ইয়োরো-কেন্দ্রিক বা পাশ্চাত্য বিশ্বভাবনা-বৃত্তের বাইরে যে জগৎ পড়ে ছিল, তাকে গ্রহণ করার একটা ইচ্ছা। আর একটা হল, শিল্পীর বা স্রষ্টারও প্রভুত্ব বা ধঁঃযড়ৎরঃু বিলোপ। পরে আমরা দেখব যে, দুটোই পোস্টমডার্নের নানা সূত্রের মধ্যে এ দুটিও খুব মূল্যবান সূত্র।

সেই সঙ্গে অলসন ইয়োরোপের উদারনৈতিক মানবতাবাদের যুক্তি-শৃঙ্খলাকে এবং উয়োরোপীয় প্রজ্ঞাযুগ বা এনলাইটেনমেন্টের আত্মতৃপ্ত প্রগতি ও উন্নতির ধারণাকেও বর্জন করতে চান। তাঁর যুক্তি সম্ভবত এই যে— অন্তত তৃতীয় বিশ্ব থেকে তাই আমাদের ভাবতে ইচ্ছে হয়— এই ধারণাগুলি এদের সাম্রাজ্যলিপ্সা এবং তার অনুষঙ্গী নানা লুণ্ঠন হত্যা ও নির্লজ্জ শোষণ থেকে খুব দূরবর্তী ছিল না। অলসন হাইডেগার ও দেরিদার দার্শনিক মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত বলে জানা যায়। তাঁর নিজস্ব পোস্টমডার্নিজমের নাম তাই হয়েছে অস্তিত্ববাদী বা ‘এগজিস্টেনশিয়ালিস্ট’ পোস্টমডার্নিজম। বার্টেনস আলসনের সঙ্গে মার্কিন সমালোচক আরভিং হাউ (ঐড়বি)-এর মতামতের উল্লেখ করেন। ১৯৫৯-এ হাউয়ের প্রবন্ধ ‘Mass society and post-moderm fiction’ বেরোয়, যাতে সল বেলো নর্মমাল মেলার, জি ডি স্যালিঞ্জার ও বার্নার্ড মেলামডকে তিনি উত্তর আধুনিক কথাসাহিত্যিক বলে উল্লেখ করেন। পরে ১৯৮০ দশকে জেমসন ও বোদরিয়ার-এর মতামতের কিছুটা পূর্বাভাস হাউয়ে পাওয়া যাবে। এঁরা সকলেই বিশেষত জেমসন, যেন ‘উন্মত্ততা ও স্বেচ্ছাচারের’ বিরুদ্ধে শেষ লড়াই করেছেন বলে বার্টেনসের মনে হয়েছে। কিন্তু সংস্কৃতির চরিত্র ও মেজাজ বদলের লক্ষণগুলি তাঁরা চিহ্নিত করতে ভুল করেননি।

১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭-র মধ্যে উত্তর-আধুনিকতা ‘ৎবধষষু ঃড়ড়শ ড়ভভ’ বলে বার্টেনসের মনে হয়েছে। যেসব তাত্ত্বিক ও সমালোচক এই নব্য-সংস্কৃতির অভ্যর্থনা করেন তাঁরা হলেন লেনার্ড বি মেয়ার, ইহাব (মার্কিন উচ্চারণে ইয়্বা) হাসান, সুজান সনট্যাগ, লিসলি ফিডলার প্রভৃতি। বিশেষ করে রবার্ট ভেনচুরির A justification for a pop architechture’ প্রবন্ধে নগরস্থাপত্যে উত্তর আধুনিকতার তত্ত্বে দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিসর বা ংঢ়ধপব-এর কথা বিশেষভাবে উঠে আসে। কথাসাহিত্যের আখ্যানতত্ত্ব (হধৎৎধঃড়ষড়মু) বা কাহিনীকৌশল মূলত কাল বা ‘টাইম’-এর সঙ্গে যুক্ত, তার কাজ সময়ক্রম নিয়ে। সময়ক্রমে সাজানো ঘটনার নানা পরীক্ষানিরীক্ষা আখ্যানকলার নতুন প্রয়াসের অঙ্গ, কিন্তু চিত্রকলা ও স্থাপত্য-ভাস্কর্যে আসে স্থান বা পরিসরের কথা। ভেনচুরি এই দিকটিতেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আমরা এঁদের কিছু প্রবন্ধের নাম পাশাপাশি সাজিয়ে দিচ্ছি— এই সব নাম থেকেই এঁদের আশ্বাস, বিশ্বাস, আশঙ্কা, সংশয় ইত্যাদির বিমিশ্র চরিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে, হয়ত বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে না; ইহাব হাসান—‘The dismembement of Orpheus : reflections on modern culture, Language and Literature’ myRvb mbgU¨vMÑ ‘Agaunst interpretation’ GwiK Kvjvi (Kahler)-Gi eB The disintegration of form in the  arts| wdWjvi GKUz Drmvn wb‡qB DËi AvaywbKZv cÖm‡½ ‘apoclayptic, anti-rational bltantly romantic and sentimental, anti-artistic’, Ôanti-serious ইত্যাদি আখ্যা ব্যবহার করেছেন।

এ কথাগুলি উদ্ধৃত করে হয়ত আমরা আগে থেকেই একটা পক্ষপাতী ঝোঁক দেখিয়ে ফেললাম। যাই হোক, পোস্টমডার্নিজমের বামপন্থী দুধরনের সমালোচনা বা সমর্থনই মার্কিন দেশে লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে দুই ফরাসি দার্শনিক লিয়োতার ও বোদরিয়ারাও তার নানারকম ভাষ্য ব্যাখ্যা দেন। গত শতকের আশির বছরগুলিতে জেমসন একটু সংশয় নিয়ে ‘দেখি না ব্যাপারটিতে কী আছে’ ভেবে এগিয়ে এলেন। তখন থেকে উত্তর আধুনিকতা বিষয়ে আলোচনায় অনেকটা গভীরতা এসেছে বলে মনে হয়।

৫. লক্ষণগুলি কী কী : প্রাগ-উত্তর আধুনিক

যে কোনো প্রাথমিক পরিচয়-পুস্তকে উত্তর-আধুনিকতার লক্ষণগুলিকে সাজিয়ে দেওয়া হয়, সেগুলি আমরা একটু পরে দেখব। কিন্তু এ সম্বন্ধে একটা সাধারণ কথা যেন এই যে, (বা এটা বোঝানোর চেষ্টা কারা হয় যে,) উত্তর-আধুনিকতা যেন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পশ্চিমে গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা। অর্থাৎ এখানে ব্যক্তির সৃষ্টি ও সম্ভোগের অধিকারে কোনো আটক রাখা হয়নি। পৃথিবী শেষ হয়ে আসছে, কাজেই আর কোনো ব্যাটার পরোয়া করি না— এই রকম একটা মনোভাব যেন এর পেছনে তাড়া করছে।

অবশ্যই ‘আধুনিকতা’-র সঙ্গে তুলনায় গিয়ে এই উত্তর-আধুনিকতাকে বোঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে। আধুনিকতার কালক্রম পর্যন্ত পৃথিবীর নিরবচ্ছিন্ন আগ্রগতিতে পাশ্চত্যের একটা বিশ্বাস ছিল। তবে তৃতীয় বিশ্বের হয়ে আমরা বুঝতে পারি— এই ‘অগ্রগতি’ ও উন্নতির ধারণাকে পাশ্চাত্য নিজের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেই অনেকটা বুঝতে চেয়েছে, তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভুত্বের শর্তেই, তার বাইরে গিয়ে নয়। কিন্তু বিশ শতকের নানা দর্শন তাদের এই আত্মতৃপ্ত বিশ্বাসে কিছুটা চিড় তৈরি করে। এর মধ্যে নিটশে (১৮৪৪-১৯০০), হাইডেগার (১৮৮৯-১৯৭৬) ও অন্যান্য নানা বর্ণের অস্তিত্ববাদীদের চিন্তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। যেটাকে ব্যক্তি-স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রকাশ বলে দেখানোর চেষ্টা করা হয় তার অপর পিঠ হল একটা দৃঢ় কেন্দ্র বা একটা বিশ্বাসের বন্ধনের৮ অভাব— যার ফলে ব্যক্তিরা বিষ্ফোরণে ভেঙে যাওয়া নক্ষত্রের টুকরোর মতো চূর্ণ চূর্ণ নক্ষত্রখ- হয়ে নিজের নিজের কক্ষে থিতু হয়ে নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে থাকে। বিশ্বাসের জায়গায় পড়ে থাকে একটা কালো গহ্বর। আগেই সোরেন কিয়ের্কগার্ড (১৮১৩-১৮৫৫) ঈশ্বর, সত্য সব কিছুর অস্তিত্ব সম্বন্ধেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরে নিটশের দাস স্পোক জরথুস্ট্র বইয়ে ‘ঈশ্বর মৃত’— এই ঘোষণা থেকেই পশ্চিমি দুনিয়ার সংশয় ও অনিশ্চয়ের সময় শুরু হয়েছিল, জীবনের ঃবৎৎড়ৎ ধহফ যড়ৎৎড়ৎ-কে বাস্তব ধরে নিয়েছিলেন এই দার্শনিক। তারপর প্রথম মহাযুদ্ধ এসে পশ্চিমের আরো অনেক বিশ্বাস ধ্বংশ করে, এলিয়টীয় ‘পোড়ো জমি’র রূপে যে শূন্যতার ছবি ফুটে ওঠে তা ওই অনিশ্চয়েরই রূপকল্প। তার পরে আমেরিকার অর্থনৈতিক ধস, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ— ইত্যাদির মধ্য দিয়ে উত্তর-আধুনিকদের ‘পূর্বাবস্থা না-মানবার’ বহুবিধ শর্ত তৈরি হয়। বিশ শতকের সত্তরের বছরগুলিতে জাক দেরিদার (১৯৩০-২০০৫) উত্তর আবয়ববাদ বা পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের তত্ত্ব, বিশেষ করে শব্দ ও অর্থের সম্বন্ধকে গুলিয়ে দিয়ে ‘ভাষার মানে কিছুই দাঁড়ায় না’-র তত্ত্ব আধুনিকতার কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয় বলা চলে। আধুনিকতার সঙ্গী যেসব শিল্প সমাজ ও ইতিহাসের তত্ত্ব, পুঁজিবাদ, মার্কসবাদ, ফ্রয়ডীয় মানোবিকলনের নানা শাখা, আচরণবাদ, বাস্তববাদ, সাহিত্যে পাঠভিত্তিক নব্য-সমালোচনা (ঘবি পৎরঃরপরংস), অবয়বাদ (স্ট্রাকচারালিজম) কিংবা তার পূর্বসূরি আঙ্গিকবাদ (ফর্ম্যালিজম)— সকলেরই মূলে যেন এই বিশ্বাসগুলি বর্তমান ছিল :

১. শিল্প চারপাশের বাস্তবের প্রতিফলন ঘটাতে পারে, অর্থাৎ বাস্তব বা সত্য বলে একটা কিছু আছে। জ্ঞানে তা মানুষ জানতে পারে— অন্তত এতদিনকার জ্ঞানতত্ত্ব (এপিস্টেমোলজি) মানুষকে সেই আশ্বাস দিয়ে এসেছে, মাঝে মধ্যে সংশয়বাদীদের প্রশ্ন তোলা সত্বেও। আবার মানুষ এও বিশ্বাস করে এসেছে যে, মানুষের সাহিত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ইত্যাদি সেই বাস্তবের ছবি মোটামুটি বিশ্বাস্যভাবে তুলে ধরতে পারে। অর্থাৎ রচনা কল্পিত হলেও তা থেকে (দেখে বা পড়ে বা শুনে) মানুষ ভাবতেই পারে যে, ‘হ্যাঁ, এরকমই তো আছে, এরকমই তো ঘটে।’ মনস্তত্ত্ববিজ্ঞানও মানুষের মনের সত্য ছবি প্রকাশ করতে পারে, মনোজগতের বাস্তবও মানুষের আয়ত্তে এসেছে। অব্যশই কোনো কোনো শিল্পতত্ত্ব এই প্রথাগত বাস্তবের ভাংচুর করেছে— উন্মত্ততা, মানোবিকার, স্বপ্ন ইত্যাদির বিনষ্ট বিকৃত বাস্তবকে আশ্রয় করে— যেমন কিউবিজম, সুররিয়ালিজম, দাদাবাদ ইত্যাদি— কিন্তু নন্দনতত্ত্বের বাস্তবনির্ভরতা পুরোপুরি অস্বীকৃত হয়নি, যেমন দর্শনের সত্য নিয়ে বড়ো প্রশ্ন ওঠেনি।

২. ভাষাতে বাক্যে ব্যবহৃত শব্দ আর বাক্যে শব্দগুলির অর্থও যে পৃথিবীতে উপস্থিত শারীরিক অনুভবগত বা কল্পিত বাস্তবকে নির্দেশ করে— তাও মোটামুটি ধরে নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ শব্দ ও অর্থের সম্বন্ধ মোটামুটি নিত্য ও ধ্রুব। আমরা কথা বলে পরস্পরকে বুঝতে ও বোঝাতে পারি। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, দার্শনিক আইরিস মারডক ভাষাকে ঘোলা কাচের সঙ্গে তুলনা করেছেন গত শতাব্দীতে। ১৯৫০-এর পর থেকে পাশ্চাত্য অ্যাবসার্ড বা কিম্ভূত নাটকে দেখনোই হয়েছে যে মানুষের ভাষা ক্রমশ তার সংগত অর্থ প্রকাশের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। (দ্র: সরকার, ২০০১)। তা সত্ত্বেও অন্য নাট্যকাররা বাস্তবকে প্রকাশের জন্য নাটক লিখতে দ্বিধা করেননি।

৩. আধুনিক সময় পর্যন্ত এই বিশ্বাস পোষণ করা হয়েছে যে, সমাজে অর্থনীতি-রাজনীতির উপর নির্ভর করে সভ্যতা মোটামুটি একমুখী আগ্রগতি ধরে চলে। অর্থাৎ তার একটা ‘টেলিয়োলজিক্যাল অভিমুখিতা আছে। এ পর্যন্ত উন্নতি, অগ্রগতি, ‘ক্রমমুক্তি’— ইত্যাদি সম্বন্ধে বিশ্বাস একেবারে লুপ্ত হয়নি। অবশ্যই ধনতন্ত্রের উন্নতি ও আগ্রগতির ধারণা (মূলত আরো বড়ো বাজার, আরো বেশি লাভ, ফলে আরো বেশি উৎপাদন এবং তা থেকে আরো লাভ), আর সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ বা মার্কসবাদের উন্নতির ধারণা এক ছিল না। দ্বিতীয়টি প্রশ্ন করে কার উন্নতি, কিসের উন্নতি, এবং বঞ্চিত শ্রেণির দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নতি অগ্রগতির হিসেব করে, কিন্তু তারও প্রত্যাশা আছে যে, ‘মানুষের ক্রমমুক্তি’ ঘটবে।

৪. এও ধরে নেওয়া হয়েছে যে, শিল্পে উচ্চ-নিচের ভেদ আছে। বহু চর্চা ও পরিশীলনের ফলে গড়ে ওঠা বা সৃষ্ট যে শিল্প যার পিছনে দীর্ঘ দিনের নন্দনতত্ত্ব আর সক্ষম প্রযুক্তির সমর্থন আছে— তার সঙ্গে পার্কের পাঁচিলে টাঙানো বা রাস্তার ধারে সাজিয়ে বসা ছুটির দিনে সাধারণ লোকের কাছে বিক্রির ‘শিল্পের তুলনা হয় না’ যেমন তুলনা হয় না রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি-র সঙ্গে হাটের ছড়া-কিসসার।

শিল্প উচ্চাঙ্গের, তা ঠিক করে দেয় কে? ঠিক করে দেয় নন্দনতত্ত্ব এবং নন্দনতত্ত্বের ধ্বজাধারী শিল্প সামলোচকের দল। একমাত্র তাদেরই সুপারিশে যেন স্থির হয়ে যায় যে, এই ছবিটা বা ভাস্কর্য বা লেখা সুন্দর ও মূল্যবান। দর্শক উপভোক্তাদের বিচার গণ্য করবার মতোই হয়। হার্বাট রিড এ প্রসঙ্গে বলেন এক হধঃঁৎধষ ঃধংঃব-এর কথা (জবধফ, ১৯৬৩ : ৯৩) যে হধঃঁৎধষ ঃধংঃব-ই নাকি ঠিক করে দেয় শিল্পকর্মের কোনটা ভালো, কোনটা তত ভালো নয় এবং  কোনটা অত্যন্ত খারাপ।

অবশ্য হধঃঁৎধষ ঃধংঃব বলতে কিছু নেই। রিড তাঁর মতো শিক্ষিত শিল্পবোদ্ধাদের ঃধংঃব-কে স্বাভাবিক রুচি বলে দেখাতে চাইলেও সংস্কৃতিতত্ত্বে তা গৃহীত হতে পারে না— অর্থাৎ যে সংস্কৃতিতত্ত্ব হধঃঁৎধষ ও পঁষঃঁৎব-কে বিরোধী অবস্থানে দাঁড় করায় তাতে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নন্দনতত্ত্বের একটা প্রভুত্ব আছে, তা উপরে থেকে ‘সর্বসাধারণের’ জন্য ঠিক করে দেয় কোনটা ভালো কোনটা মন্দ। মাঝে-মধ্যে এমন সন্দেহও আবশ্য ওঠে যে, আড়ালে থাকা ছবি মূর্তি ইত্যাদির ব্যবসায়ী ও দালালরা অনেক সময় এই নন্দনতত্ত্বকে প্রভাবিত করে— শিল্প যেহেতু এখন বাজারের পণ্যও বটে। গল্প-উপন্যাসের ক্ষেত্রে যেমন বড়ো পত্রিকার ঢাক-পেটানো বিজ্ঞাপন। সেটাও আর একটা প্রভুত্বের জায়গা তো বটেই।

৫. শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বহুবিধ শিল্পরূপ তৈরি করেছে— সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যকলা, চিত্রকলা ইত্যাদি। আরিস্তোতলই সর্বপ্রথম স্পষ্ট করে এই সব শিল্পের মিল ও সাদৃশ্য দেখান। কিন্তু তার মূল কথা হল, প্রত্যেকটা শিল্প আঙ্গিক, উপকরণে ও করণকৌশলে পৃথক হবে, পৃথক হবে বিষয়বস্তু ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। বলা বাহুল্য আরিস্তোতলের করা চারুশিল্পের প্রাথমিক বিভাগের পরে আরো অনেক বিস্তার এবং সংশোধনও ঘটেছে। কিন্তু মৌলিক নীতিটি এখনো একই আছে যে, শিল্পগুলি আলাদা আলাদা, সাহিত্য, সংগীত বা ভাস্কর্যের মধ্যে কোনো মৌলিক যোগ নেই। এবং প্রত্যেকটি থেকে মানুষের পাওয়া রসেরও তফাৎ ঘটে। এই ভাগ আধুনিকতায় এসে একটু দুর্বল হলেও আধুনিকতা এই সীমাগুলিকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়ার কোনো চেষ্টা করেনি।

৬. একই সঙ্গে আধুনিক সময় পর্যন্ত এ বিষয়টাও স্বীকার করা হয়েছে যে, কোনো বিশেষ শিল্পের মধ্যেও একাধিক সংরূপ বা জাঁর (মবহৎব) তৈরি হয়ে যায়। সাহিত্যে যেমন উপন্যাস, গীতিকবিতা, মহাকাব্য, ছোটগল্প, উপন্যাস ইত্যাদি। এদের মাঝখানে যে দেয়াল তোলা হয়েছিল তাও আধুনকিতা পর্যন্ত মোটামুটি অটুট ছিল, যদিও দেয়াল ভাঙার কিছু কিছু চেষ্টা অবশ্যই হয়েছে। উত্তর-আধুনিকতা নানা শিল্পের দেয়াল যেমন ভাঙছে তেমনি জাঁর বা রংরূপের সীমানাও মানছে না। কীভাবে তা আমরা পরে দেখব।

৭. শিল্পে নন্দনতত্ত্ব যেমন একটা প্রভুত্বের পরিসর তৈরি করে তেমনি চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত, সংগীত, কবিতা, গল্প ইত্যাদির উপর তার স্রষ্টারও একটা প্রভুত্ব থাকে। সে যেহেতু স্রষ্টা— তার সৃষ্টি তার ব্যক্তিত্বের ঐকান্তিক চিহ্ন বহন করে— সেটাই তার ব্যান্ড। পিকাসোর ছবি পিকাসোরই শাগালের ছবি তাঁরই। মৌলিকতা বা ড়ৎরমরহধষরঃু-র  প্রশ্নটি এখানে বিবেচ্য। এই ‘ব্র্যান্ড’ মূল্য— অর্থাৎ কে সৃষ্টি বা রচনা করেছে তার উপরেও তার বাজারের দাম তৈরি হয়ে যায়।

৮. শিল্পে, বিশেষত চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য ইত্যাদি দৃশ্যকলায় প্রতিটি সৃষ্টি একক (ঁহরয়রব) ও দোসরহীন। এই অনন্যত্বও শিল্পসৃষ্টির মূল্যবত্তা ও মহার্ঘতার সঙ্গে যুক্ত হয়। এর ফলে বিত্তবান সংগ্রাহকেরা প্রচুর দাম দিয়ে শিল্পবস্তু নিজেরা কিনে ঘর সাজায়, নিছক মূল্যবান সংগ্রহের অহংকার দেখায়, এবং নিলামের দর চড়ায়। সাধারণ মানুষের কাছে এসব শিল্পবস্তু অনায়ত্তই থেকে যায়। বিত্তের এই একচেটিয়া প্রভুত্ব দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যামিনী রায় একভাবে ভেঙেছিলেন, অসংখ্য যিশুখ্রিষ্ট বা গণেশের ছবি এঁকে নানাজনের কাছে বিক্রি করেছেন। পরে আমরা দেখব, উত্তর-আধুনিকরা অন্যভাবে একক শিল্পসৃষ্টির উপর এই একচেটিয়া দখলদারি ভাঙবার চেষ্টা করে।

৯. শিল্পতত্ত্ব ও নন্দনতত্ত্বের আগ্রগতি ঘটেছে মূলত আগেকার এসব তত্ত্বকে প্রত্যখ্যান ও সংশোধন করে। অবশ্যই রাতারাতি আমূল পরিবর্তন হয়নি। এক্ষেত্রেও হেগেল মার্কসের ইতি-নেতির সমন্বয়ের সূত্র কার্যকর থেকেছে। কিন্তু কূন (শঁযহ, ১৯৬৩) যাকে বলেছেন আদর্শ-বিক্ষেপ (প্যারাডাইম শিফট) তার দৃষ্টান্তে অধিগঠন বা সুপার স্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছে, তেমনি ভিত্তি বা বেস-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছে। বাস্পীয় থেকে মোটর ইঞ্জিন, এবং তা থেকে কম্পিউটার-প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিন যন্ত্রে এসে যাওয়া এইরকম ভিত্তির আদর্শ-বিক্ষেপের উদাহরণ। এখানেও জেমসনের ‘কালচারাল ডমিন্যান্টের’ বিষয়টি দেখা দেয়নি তা নয়।

অবশ্য হার্বার্ট রিড৯ এবং আঙ্গিকবাদীদের অনেকে সাহিত্যের ইতিহাসে একমুখী অগ্রগামিতার চেয়ে এক ধরনের পুনরাবৃত্তি লক্ষ করেন ( দ্র : ডবষষবশ ্ ডধৎৎবহ, ১৯৬৩ : ২৫২-৭১) রিড যেমন বলেন ইংরেজি কবিতার ইতিহাসে ক্লাসিক্যাল ও রোম্যান্টিকের পর্যায়ক্রমিক আবর্তনের কথা। অবশ্য রিড ও ওয়েলেকদের পুনরাবর্তনের ধারণা এক নয়। রিড ইংরেজি কবিতার ইতিহাসের পর্যালোচনায় বলেন সুনির্দিষ্ট কাব্যতত্ত্বের (ক্লাসিক্যাল ও রোম্যান্টিক) পুনরাবর্তনের কথা; আর ওয়েলেকরা বলেন পুরোনো আদল (হড়ৎস) বা প্রথা (পড়হাবহঃরড়হ) ভেঙে নতুন আদলের জন্মের কথা।১০

যাই হোক, আগের নন্দনতত্ত্বকে বাতিল বর্জন করে নতুন নন্দনতত্ত্বের উদ্ভব— এই একমুখী অগ্রগতির ছকটাও উত্তর-আধুনিকতা ভাঙে। তার শিল্পতত্ত্ব অতীতের প্রতি ‘নস্টালজিক’— অর্থাৎ প্রায়ই কাল উল্লম্ফন করে অতীতের শৈলীকে গ্রহণ করে, কিংবা নানা দেশের শৈলীর বিষয়ভঙ্গিকে মিলিয়ে দেয়। বিশেষ করে স্থাপত্য— যে শিল্পকে জেমসন পোস্টমডার্নিজমের ‘ঢ়ৎরারষবমবফ ধৎঃ’ বলেন তাতে অতীতের বা দূর দেশের সব শৈলীর কিন্তু মিশ্রণ ঘটতে পারে। কিন্তু আধুনিকতা চিহ্নিত স্থাপত্য ছিল ছিমছাম, বিশাল ও কার্যকর। অল্প জায়গা ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি সুবিধে আদায়ই ছিল তার লক্ষ্য। পায়রার খোপের মতো বহুতল বাড়ি তার চিহ্ন। অবশ্যই ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট বা লে কর্বুশিয়ের তার মধ্যে কিছুটা সৌন্দর্য এনিছিলেন, কিন্তু তাতে বাহুল্য ছিল না।

এবার আমরা এই প্রাগ-উত্তর-আধুনিক পর্বের চিহ্নগুলিকে ভিত্তি করে উত্তর-আধুনিকের চরিত্র নির্ধারণ করবার চেষ্টা করব।

৬. উত্তর আধুনিক : চিহ্ন ও চরিত্র

উপরের আমরা ন-টি ক্ষেত্র নির্দেশ করেছি, সেগুলি দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। কতকগুলি ক্ষেত্র এই সদ্যতন ধনতস্ত্রের অধীন সমস্ত নাগরিককেই প্রভাবিত করে, আর কতকগুলি ক্ষেত্র বিশেষভাবে শিল্পস্রষ্টাদের সৃষ্টির আধিকার, স্বাধীনতা ও ব্যাপ্তির সঙ্গে জড়িত। দুয়ের যোগও ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের বাস্তবের চেহারাটা ঠিক কী (বিশ্বাস ১)— এটা সাধারণ নাগরিকের প্রশ্ন যেমন, তেমনি যে শিল্পী বা টেলিভিশনের সংবাদদাতা, তার কাছে বাস্তবের কোনো-না-কোনো চেহারা সাজিয়ে দেন— এটা তাঁরও প্রশ্ন। উপরে তালিকাবদ্ধ বিশ্বাসের মধ্যে ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ সাধারণ মানুষের সামাজিক জীবন, শিল্পের অনন্যতা, উপভোগ, বাজার ও মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ১ মূলত শিল্পস্রষ্টার সমস্যা, ৯-ও অংশত তাই। ৯ আবার বিশেষজ্ঞের বা শিল্প-ইতিহাসকারের সমস্যা— সাধারণ মানুষ, এমনকি শিল্পীরাও তাতে প্রতিদিন লিপ্ত হবে এমন সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ সূত্রগুলি মূলত সামাজিক ভোক্তা মানুষ এবং বিশেষজ্ঞ বা স্রষ্টা মানুষের মধ্যে বিভাজিত। যদিও উপরেই আমরা দেখেছি যে কোথাও কোথাও তা উভয়েরই সমস্যা। কিন্তু দু’পক্ষের সমস্যার চরিত্র পৃথক— এও আমরা দেখব।

৬.১ প্রথম গ-গোল— বাস্তব কী ?

বাস্তবকে জানার আমাদের দুটো উপায় আছে, একটা প্রত্যক্ষ— নিজের ইন্দ্রিয়ের সূত্রে একেবারে সামনে দেখছি শুনছি গন্ধ নিচ্ছি, স্পর্শ করছি ইত্যাদি। এখানে আমরা বলতেই পারি যে, ‘হ্যাঁ এ আমার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা।’

আর একটা উপায় হল মধ্যস্থতা। তার একটা হল ভাষার মধ্যস্থতা। তারও আবার দুটি চেহারা— একটি মৌখিক আর একটি লিখিত বা মুদ্রিত। মৌখিক কথা কারো মুখ থেকে আসতে পারে, আবার তা মুদ্রিত কণ্ঠস্বর হিসেবে ক্যাসেট, সিডি, রেডিয়ো ইত্যাদির অধিকিন্ত এক মধ্যস্থতাসূত্রে আমার কানে পৌঁছোতে পারে। আর লিখিত/মুদ্রিত মধ্যস্থতা সাজিয়ে রাখা হয় বইয়ে, খবরের কাগজে সাময়িক পত্রে।

ইদানীংকালে বাস্তবকে জানার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থ বা উপায় হয়ে উঠেছে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র, অর্থাৎ গতিশীল ও সমন্তব্য বৈদ্যুতিন উপায়ে প্রক্ষেপ করা দৃশ্যাবলি। এর আগে মুদ্রিত ছবিও দেখেছি আমরা, তা দেখে বাস্তব বা ঘটনা সম্বন্ধে ধারণা করার চেষ্টা করেছি। এখনো ভ্রমণের বা ইতিহাসের রঙিন ছবিওয়ালা বইয়ের পাতা উলটে আমরা তাতে পরিবেশিত বাস্তব সম্বন্ধে ধারণা করার চেষ্টা করি। বৈদ্যুতিন দৃশ্যাবলি মৌখিক ভাষাকেও ব্যবহার করে, ফলে তা অনেক জীবন্ত। তবে দৃশ্যাবলি সচল হোক বা অচল হোক, সাধারণভাবে আমরা এই বিশ্বাস নিয়ে থাকি যে, যা এগুলিতে দেখছি সেসব ঘটনা বা দৃশ্য ওখানে ঘটছে বা আছে। অর্থাৎ এগুলিই বাস্তব। মধ্যস্থতার সূত্রে এলেও বাস্তব।

উত্তর-আধুনিকতায় পা রেখে দার্শনিক বোদরিয়ার (ইধহফৎরষষধৎফ, ১৯৮৩) এখানেই প্রশ্নটা তোলেন। বিশেষ করে টেলিভিশনে দেখা সংবাদ সন্বন্ধে। এতে দর্শকদেরও যেন একটা দায়িত্ব এসে যায়। প্রথমত, পোস্টমডার্ন দর্শকেরা কী কী আছে বা কী ঘটেছে— সে সব নিয়ে কি খুব একটা জানতে বুঝতে আগ্রহী? এই যে ঞঠ-র সামনে বসে, অজস্র চ্যানেলের বিকল্পের সুযোগ নিয়ে তারা রিমোটের সাহয্যে হাতে ‘জ্যাপ’ (ুধঢ়) করে একটা চ্যানেল থেকে আর একটা চ্যানেলে লাফিয়ে যায়— তাতে কি এটা প্রমাণ হয় যে, দর্শকেরা কী আছে কী ঘটেছে সে মন্বন্ধে খুব জানতে চায়? দর্শকদের যদি দায়ী নাও করি, তবু বলতে পারি যে, উত্তর-আধুনিক ব্যবস্থা তাদের এমন একটা জায়গায় বেঁধে ফেলেছে যে, তারা এখন বাস্তব-বিমুখ। বাস্তবে একটানা মনোনিবেশ কারার ধৈর্য তাদের নেই। এতে উপভোগ-বিলাসী ও উপভোগ-বিক্রেতা ধনতন্ত্রেরই সুবিধে, কারণ তারা টিভির দর্শকদের অবিরাম ও একাগ্রভাবে বিনোদন-সন্ধানী করে তুলেছে। উত্তেজনার অনন্ত সরবরাহ তাদের চাই। উত্তর-আধুনিক বিনোদন ব্যবস্থা তাই নিয়ে নিরন্তর খেটে চলেছে।

বোদ্রিয়ার বলেন একটা কিম্ভূত কথা। তিনি বলেন, টেলিভিশনে, বিশেষত পাশ্চাত্যের টেলিভিশনে যা দেখানো হয়, সবই বানানো ছবি বা ংবসঁষপৎধ (ংবসঁষপৎঁস-এর বহুবজন) বা ংরসঁষধঃরড়হং। তাঁর মতে নব্বুইয়ের বছরগুলির গোড়ায় ইরাকের যুদ্ধ আদৌ ঘটেনি, বাগদাদে স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র আদৌ নিক্ষেপ হয়নি, লোকজন মারা যায়নি,  ঘরবাড়ি ধ্বংশ হয়নি, প্রচীন সভ্যতার নিদর্শন লুট হয়নি—সবই নাকি বৈদুতিন মাধ্যমের বানানো। কম্পিউটারে এখন যে কোনো ছবি তৈরি করা যায়, স্টার ওয়ারস জাতীয় ছবি মূলত কম্পিউটার সিমিউলেশন করেই তৈরি হয়।

বোদ্রিয়ারের কথার মধ্যে বাড়াবাড়ি আছে, এমনকি ইরাক যুদ্ধ সম্বন্ধে তাঁর কথাবার্তা একটু নিষ্ঠুর ও অবিবেচকের মতো বলেই মনে হয়। কিন্তু তাঁর মূল কথা হল যে, টেলিভিশনের পর্দায় হাজার হাজার ছবির মিছিল দ্রুত দৌড়ে যায়, ফলে দর্শকের বোধ কিছুই ধরে রাখতে পারে না। তারই ফলে ছবির আড়ালে যে ঘটনা অর্থাৎ মধ্যস্থতাকারী দৃশ্যের ৎবভবৎবহপব ঢ়ড়রহঃ—তার যোগাযোগ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। বোদরিয়ার (১৯৮৮ : ১৭০)) ‘ধহ বভভবপঃ ড়ভ ভৎধহঃরপ ংবষভ-ৎবভবৎবহঃরধষরঃু’ বলতে এটাই বুঝিয়েছেন; অর্থাৎ টেলিভিশনের দৃশ্যাবলি নিজেরাই নিজেতে বন্ধ— তারা বাইরের কোনো দৃশ্য বা ঘটনার প্রতিফলন নয়।১১

অর্থাৎ সোজা বা সরলীকৃত কথায় আমরা বাস্তব সন্বন্ধে আগ্রহী যেমন নই, তেমনি বাস্তবের সত্য ছবি পাবার রাস্তাও আমদের জানা নেই। আমরাও নিজেরা একটা যুঢ়বৎৎবধষ বা অধি বাস্তব জগতে বদ্ধ বা বন্দি, এবং তার দেয়াল ভেঙে বৃহৎ বাস্তব পৃথিবীর সুখ-দুঃখের সত্যে ঢুকে পড়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।

উপরের ১০ নম্বর সূত্রে যে সবঃধহধৎৎধঃরড়হ বা মৎধহফ হধৎধঃরাব (মূলত ড.ঋ. খুড়ঃধৎফ-এর শব্দাবলি)-এর কথা আছে, টেলিভিশন মায়াপৃথিবীর নাগরিকদের অস্তিত্ব যে কোনো বৃহৎ প্রত্যয় যে তাকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে সাহায্য করে, এই আত্মবদ্ধ দর্শক যে কোনো বৃহৎ প্রত্যয় বা আদর্শ বা সংগঠনের অধীন হতে চায় না (আসল কথাটা সত্য নয়)— এ দুটো পরস্পর সম্পর্কিত। পরে এ সম্বন্ধে আমরা আরো বলব।

৬.২ শব্দ আর অর্থ

এই জায়গাটায় একটা বড়ো ধাক্কা দিলেন উত্তর অবয়ববাদী (পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট) জাক দেরিদা। তিনি বললেন, ভাষার শব্দ তোমাকে যে অর্থ দেয় সেটা নিছক আপাত অর্থ, খাঁটি অর্থ নয়। খাঁটি অর্থ পাবার জন্য শব্দের ইতিহাস-ভূগোল-বুৎপত্তি বিভঞ্জন (ফবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ) করে তোমাকে অর্থ খুঁজতে হবে (দ্র. উবৎৎরফধ, ১৯৭৬) তা করলেও দেখবে কোনো সাফল্য নেই, কারণ পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়তে শেষ পর্যন্ত পেঁয়াজের ‘অন্তর্দেশ’ বলে কিছু থাকে না।

গত শতাব্দীর গোড়ায় ফের্দিনাঁ দ সোস্যুরের উচ্চারণ খরহমঁরংঃরপ ংুসনড়ষং ধৎব ধৎনরঃৎধৎু অর্থাৎ ভাষার প্রতীকের সঙ্গে তা যা প্রতীক (ভাষার ধ্বনিগঠিত শব্দ অর্থের প্রতীক, লিখিত শব্দ উচ্চারিত শব্দের প্রতীক) তার কোনো নিত্য, ধ্রুব ও অপরিহার্য সন্বন্ধ নেই। তা প্রথার দ্বারা আরোপিত সন্বন্ধ মাত্র (ইধংশরহ, ১৯৫৬) সেই সূত্রের উপর ভিত্তি করে দেরিদা তিলকে তাল করেছেন বলা যায়। তিনি এই সমাধানে পৌঁছেছেন যে, শব্দ (উচ্চারিত হোক, লিখিত হোক) আর অর্থের সন্বন্ধে ভয়ংকর গোলমেলে, ফলে সত্যকে জনবার ভাষাগত কোনো উপায় আর নেই। দেরিদার সমালোচকেরা বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে বলেন, তা যদি হয়, তাহলে দেরিদার বইয়ের ভাষায় যে ‘সত্য’ আছে, যা তিনি ‘সত্য’ বলে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তা আমরা জানব কী করে? তার অর্থও (অর্থাৎ সত্যও) তো আমাদের আয়ত্তে আসবে না সহজে, তার  সরংৎবধফরহম-এর সম্ভাবনা তো থেকেই যাচ্ছে। মার্কিন দেশে দেরিদা-অনুগামী খ্রিস্টোফার নরিসও শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, না এই বিষয়টাতে পবষবনৎধহঃং ড়ভ ফবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ একটু বেকায়দায় আছে, এটা তারা ‘যধাব হড়ঃ নববহ ংঁভভরপরবহঃষু রিষষরহম ঃড় ধফফৎবংং’ ঘড়ৎৎরং. ১৯৮৫ : ২১৯।

বিভঞ্জন বা ফবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ তত্ত্বের হয়ত একটা খুব বড়ো দার্শনিক গুরুত্ব আছে। দার্শনিকদের প্রথা ও প্রচলিত বিশ্বাসের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয় এবং প্রচলিত বিশ্বাসকে ধরে প্রবল ঝাঁকানি মাঝে মাঝেই দিতে হয়। দেরিদা তাই দিয়েছেন। তাঁর আবয়ববাদের বিরুদ্ধে আপত্তির প্রধান কারণ এবং লেভি স্ত্রোস্ প্রভৃতির সঙ্গে তর্কের মূলও এইখানে যে, আবয়ববাদীরা মনে করেন পৃথিবীতে এখনো ‘সত্য’-কে উদ্ধার করা যায়, তা উচ্চারিত ভাষা বা লিখিত ভাষা থেকেই হোক, কিংবা তার কোনো একটা নির্মিত অবয়ব থেকেই হোক।

উত্তর-আধুনকিতার বাস্তব ও সত্যের যে ধরণা— তা আমাদের আয়ত্তের বইরে, কিংবা তা আমাদের আয়ত্ত করতে দেওয়া হয় না। দেরিদার তত্ত্ব তাকে পুষ্ট করেছে। আমাদের মতে দেরিদার তত্ত্বের দার্শনিক গুরুত্ব যতই থাক, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও প্রয়োজনের পক্ষে তা অপ্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বহীন। আমদের কোনো একটা বিশ্বাসের সন্ধান করতেই হয়, একটা সত্যকে আঁকড়ে ধরতেই হয়। সে সত্যকে আমরা মূলত ভাষার মধ্য দিয়েই পাই।

৬.৩ মনস্তত্ত্বের বাস্তব

মনস্তত্ত্বের বাস্তব আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ নয়। মনস্তত্ত্বের রোগী ডাক্তারের শোয়ানো চেয়ারে বসে মূলত ভাষায় বলে তার স্বপ্ন, অনুভব ইত্যাদির কথা। ভাষার সত্য প্রকাশের ক্ষমতা যদি আমরা অস্বীকার করি, তাহলে বহির্জগতের বাস্তব যেমন, তেমনি মনোজগতের বাস্তবকেও জানবার সম্ভাবনাকে আমাদের অস্বীকার করতে হয়।

৬.৪ সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতি বা অভিমুখীনতা

উত্তর-আধুনিকতার সামলোচকেরা প্রায়ই এই সাংস্কৃতিক তত্ত্ব সন্বন্ধে ধঢ়ধপধষুঢ়ঃরপধষ কথাটি ব্যবহার করেন, অর্থাৎ সভ্যতা-সংস্কৃতির শেষ লগ্নের, বলা যায় চূড়ান্ত ধ্বংসকালীন সময়ের তত্ত্ব। আবার একে বলা হয়েছে ‘কল্পলোকাশ্রিত’ ‘ঁঃড়ঢ়রধহ’। দুটোতেই ইতিহাসের ভূমিকা অস্বীকৃত। প্রথমটায় ইতিহাসের সমাপ্তি ঘোষণা, ফুকুয়ামা যেমন সোল্লাসে করেছেন; দ্বিতীয়টাতে ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। অ্যালান ওয়াইল্ডের (রিষফ, ১৯৮১ : ১৩১) মতে উত্তর-আধুনিকেরা এমন এক পৃথিবীর কথা বলে, যে পৃথিবী ‘নবুড়হফ ৎবঢ়ধরৎ’। আধুনিকতা কিন্তু বলে সেই পৃথিবীর কথা, যা হল ‘ধ ড়িৎষফ রহ হববফ ড়ভ সবহফরহম’ অর্থাৎ মানুষের সভ্যতার প্রগতি বা অগ্রগতি সন্বন্ধে মাথা ঘামানোর দায় বা বাধ্যবাধকতা এ তত্ত্বের নেই, এ তত্ত্ব নিজের চমকপ্রদ সাক্ষাৎকারে মুগ্ধ। জেমসন (১৯৯১:৩৬৮) এর ভধহঃধংঃরপ যরংঃড়ৎরড়মৎধঢ়যু-র কথা বলেন। অন্যদিকে উত্তর-আধুনিকারা যত বলে অতীতের নানা নন্দনতত্ত্বে ‘ৎবঃঁৎহ’-এর কথা, কখনো তত বলেন না, এখান থেকে কোথায় যাবেন। না ইতিহাস, না নন্দনতত্ত্ব, না শিল্পের মহত্ত্ব ও প্রভুত্ব, না বৃহৎ আদর্শের বন্ধন ও বিশ্বাস— এই একগাদা ‘না’-এর উপর দাঁড়িয়ে থাকেন তারা, তৈরি করে তোলেন এক বৃহৎ আত্মবদ্ধ, বিচ্ছিন্ন ও সংকীর্ণ বৃত্তের ‘হ্যাঁ’। অবশ্যই উত্তর-আধুনিককালের কিছু কিছু ইতিবাচক অভিক্ষেপও ঘটেছে, তার একটি হল প্রান্তিকায়িত গোষ্ঠিগুলির স্বীকৃতি ও সম্ভাষণ— যেমন কালো মানুষদের কথা, রেড ইন্ডিয়ান ও অন্যান্য আদিবাসী মানুষদের কথা, বিশেষভাবে নারীদের কথা। পরে আমরা লিয়োতারের সবঃধহধৎৎধঃরাব (মৎধহফ হধৎৎধঃরাব, সধংঃবৎ হধৎৎধঃরাব) প্রত্যাখ্যানের আলোচনায় এসব কথা বলব।

৬.৫ শিল্পতত্ত্ব সংক্রান্ত অবস্থান : উচ্চাঙ্গের শিল্প, জনপ্রিয় শিল্প

ইয়োরোপে কান্ট তাঁর ঈৎরঃরয়ঁব ঔঁফমবসবহঃ বইয়ে যে নতুন নন্দনতত্ত্ব গড়ে তুলেছিলেন তাতে শিল্পের একটা মহদ্বোধ ংঁনষরসব-বা এর ধারণা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। নিটশে এসে তাকে অস্বীকার করেন। তা সত্ত্বেও ইয়োরোপের নন্দনতত্ত্বে উচ্চঙ্গের শিল্প আর শস্তা শিল্পের একটা তফাত বরাবরই স্বীকার করা হয়েছে। আবার হার্বার্ট রিডের কথা আমরা উদ্ধার করি— ওই  Taste is formed by a continuous assessment of quality such as all graftsmen instinctivly direct towards each other work. In society as a whole a critical attitude of this kind prodices a porgessive awareness of the formal beauty of human artifacts, and this is the true meaning of ‘taste’ -এর রূপক ব্যবহার করেন।

উত্তর-আধুনিকতা শিল্পের এই উচ্চতা-নিচতার ভেদ স্বীকার করে না। এমনকি কোনটা শিল্প আর কোনটা না-শিল্প—তার তফাৎও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। উত্তর-আধুনিকতা সম্বন্ধে আর একটি প্রারম্ভিক বইয়ে (অঢ়ঢ়রমহধহবংর ধহফ এধৎৎধঃঃ, ১৯৯৫ : ৫১-৫৫) অন্যভাবে সাজানো না-শিল্পের এই শিল্প হিসেবে ন্যায্যতা বা খবমরঃরসধঃরড়হ-এর দৃষ্টান্ত হিসেবে মার্সেল দুশাঁ (গধৎপবষ উঁপযধহঢ়) নামে নব্য দাদাবাদী এক শিল্পীর কথা বলা হয়েছে যিনি নাকি ১৯৯৪ নাগাদ একটি প্রস্রাব-পাত্রকে সাজিয়ে রহংঃধষষধঃরড়হ ধৎঃ হিসেবে জাহির করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন ‘ঝরনা’ বা ঋড়ঁহঃধরহ। অবশ্য এ কথা বলা যেতেই পারে যে, স্নান ঘরে প্রস্রাব-পাত্রের যে স্থান ও ভূমিকা, যে-জায়গায় সে প্রস্রাব-পাত্রই। কিন্তু প্রদর্শনীকক্ষে ভিত্তির উপরে তাকে বসিয়ে দিলে এবং দর্শকের দৃষ্টির সামনে তাকে স্থাপন করলে তা প্রত্যাশিত পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন হল, তার ভূমিকাও বদলে গেল। ফলে তা আর নিছক প্রস্রাব-পাত্র রইল না। অবশ্য তার মধ্যে শিল্পীর মৌলিক ‘সৃষ্টি’-অংশ কতটা, অভিনব কল্পনার অংশ কতটা, সৃষ্টি সে কল্পনাকে সমৃদ্ধ করছে না কল্পনা সৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করছে— এ সব নিয়ে তর্ক চলতেই থাকবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, আধুনিকোত্তর শিল্পের সঙ্গে ‘না-শিল্পের’ আদান প্রদানের পথটি খুব সংকীর্ণ নয়। জেমসন এ বিষয়টি বোঝানোর জন্য ভ্যান গখের চাষির একজোড়া বুটজুতোর ছবি আর নব্য মার্কিন শিল্পী অ্যান্ডি ওয়ারহল-এর ডায়মন্ড ডাস্টি শুজ ছবির তুলনা করেন। প্রথম ছবিতে জেমসন (পূর্বোক্ত, ৭-৮)  the whole object of agricultural misery, of stark rural poverty, and the whole pudimentary human world of backbreaking peasant toil, a world reduce to its most brutal and menaced, pimitive and marginalized state.’ লক্ষ করেন, সেখানে ওয়ারহলের ছবি সম্পর্কে বলেন—it does not really speak to us at all! অন্যদিকে ওয়ারহলের ছবির বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের চরিত, ফটো-নেগেটিভের ছাঁদ যেন এর অন্তর্নিহিত অর্থকে একটা  flatness or depthlessness, a new kind of superficiality এনে দেয়।

না-শিল্পের সঙ্গে শিল্পের পার্থক্যকে যেমন উত্তর আধুনিকতা আচ্ছন্ন করতে চায়, তেমনি যে চায় উচ্চ শিল্পের সঙ্গে বাজারি শিল্পের বা সস্তা সাধারণ রুচির শিল্পের তফাত নষ্ট করতে। শুধু তাই নয়, ঢ়ড়ঢ় ধৎঃ বা সধংং ধৎঃ কে তার সংস্কৃতির উপযুক্ত শিল্প-শস্য বলে প্রমাণ করতে। পরে আমরা এ বিষয়ে আর একটু বলব। তার  আগে অনুষঙ্গিক আরো দু-একটি কথা সেরে নিই।

উচ্চ বা উন্নত শিল্পসৃষ্টি সন্বন্ধে উত্তর-আধুনিকরা প্রথম যে-প্রশ্নটা করে তা এই; এটা যে উঁচুদরের শিল্প তা কে ঠিক করল? যদি কেউ উত্তর দেয় যে, তা ঠিক করেছে শিল্পতাত্ত্বিকরা, শিল্পসমালোচকরা— তারা বলবে, ‘ফুঃ! আমরা ওসব ধঁঃযড়ৎরঃু বা প্রভুত্ব মানি না।’ ক্লাইভ বেল শিল্পকে ড়ৎমধহরুবফ ভৎড়স বলুন আর রিড (পূর্বোক্ত, পৃ. ৪) উন্নত শিল্পকে something beyond self expression, … which might be called life– expression’ বলুন না কেন, উত্তর-আধুনিক বলবে লাইফ-ই-বা কী, আর ংবষভ- ই বা কী— দুয়ের অস্তিত্ব কী তাই তো জানি না।

দ্বিতীয় চিত্রশিল্পে এক একটি ছবি যে একটি অনন্য, স্বতন্ত্র শিল্পসৃষ্টি, এবং টাকা দিয়ে কেউ ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে সেটি দখলে রাখতে পারে, তারও বিরুদ্ধে দাঁড়ায় উত্তর-আধুনিকরা। একদিকে যেমন স্রষ্টা শিল্পীর একক ড়ৎরমরহধষরঃু ধহঃযড়ৎরঃু বা প্রভুত্ব এঁদের আপত্তি, তেমনি এঁরাই আবার সে-শিল্প যে একটি মাত্র ধনী ক্রেতার একমাত্র অধিকারে থাকবে তাতেও আপত্তি জানায়। এতে মনে হতে পারে যে ধনীর সঞ্চয় ও সম্পত্তি সমাবেশ, একক মালিকানায় এঁদের আপত্তি। তা কিন্তু নয়। এঁরাই যখন কোটি কোটি টাকা খরচ করে বেহিসেবি ও অনর্থক অপ্রয়োজনীয় অলংকরণের উত্তর-আধুনিক স্থাপত্যের জন্য উচ্ছ্বাস করে তখন এঁদের স্ববিরোধ প্রকট হয়। কারণ অতুল বৈভব ও অলজ্জ অপচয় ছাড়া ও ধরনের স্থাপত্য আদৌ সম্ভব হত না, সে প্রসঙ্গ তারা মনেই রাখে না।

যাই হোক ছবির শিল্পীর নামচিহ্নিত অনন্যতা, সমালোচক-নির্দিষ্ট দামের প্রতিবাদে উত্তর-আধুনিকরা হাজার হাজার ছবির নকল সস্তাদামে বাজারে বিক্রি করার পক্ষপাতী। ১৯৭৯-এ হবালটার বেনইয়ামিন বলেন এই পরিপ্রেক্ষিতে ফোটোগ্রাফির বিশেষ গুরুত্বের কথা (ইবহলধসরহ, ১৯৭৯) বলেন তা নন্দনতত্ত্বের গোড়া ধরে নাড়া দেবে।

সাহিত্যে ডিটেকটিভ উপন্যাস, প্যারোডি এসব জনপ্রিয় রচনা বা করঃংপয হয়ে ওঠে এসময়ের প্রতিনিধিত্বমূলক শিল্পকর্ম। কারণ এ সংস্কৃতিকাল সত্যে অবিশ্বাসী, অবিশ্বাসী সুন্দরেও। নন্দনতত্ত্ব নামক শাস্ত্রের ন্যায্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে এরা। পিয়ের বুর্দো (ইড়ঁৎফরব,ি ১৯৯৩) বিশেষ করে উচ্চ ও জনপ্রিয় শিল্পের তফাত ভাঙার কথা বলেন।

৬.৬ শিল্পতত্ত্বের দ্বিতীয় আখ্যান : শিল্পে শিল্পে দেয়াল— শিল্পের সীমারেখো; অন্যদিকে একটা শিল্পের মধ্যে নানা সংরূপ বা মবহৎব-এর খোপ খোপ ভাগ সন্বন্ধ সিদ্ধান্ত :

হ্যাঁ, এই দুটো বেড়াই ভাঙতে চাইছেন উত্তর-আধুনিকরা। প্রথমত, শিল্পে শিল্পে মাঝখানে যে দেয়াল থাকে, সাহিত্যে আর চিত্রকলা, চিত্রকলা ও সংগীত, চিত্রকলা ও স্থাপত্য বা ভাস্কর্য— এই কলাবিদ্যার দেয়াল ভাঙা আধুনিকতার যুগেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু উত্তর-আধুনিকতা এটাকেই কাম্য বলে মনে করে। মিক্সড মিডিয়া বলে যে কথাটা আমরা ইদনীং হরহামেশা শুনি, তা যেন চারুশিল্পে উত্তর-আধুনিকতার বিশেষ আবলম্বন। এবং ভিডিয়ো বা সিডিতে দৃষ্টি ও শ্রুতি দুয়েরই উপজীব্য থাকে বলে ভিডিয়োতে সাহিত্য চিত্রকলা, সংগীত, নাটক সবই মিশে যেতে পারে। সেই করণেই জেমসনরা ভিডিয়োকে বিশেষভাবে উত্তর-আধুনিক প্রযুক্তির অন্তর্গত করে দেখান। পরে দেখা যাবে লিয়োতারের বয়ান— বিজ্ঞানের শাখাগুলিরও দেয়াল ভাঙছে। আমরা প্রবন্ধের প্রথম দিকে আলসনের ব্ল্যাক মাউন্টেন কলেজে কবি চিত্রকর নৃত্যশিল্পী প্রভৃতি সকলে মিলে যে অদ্ভুত অভিকরণের কথা বলেছিলাম— তাই যেন উত্তর আধুনিকের উচ্চরণ— ‘দ্যাখো আমরা শিল্প বলতে কী বুঝি।’

আবার একটি শিল্পের মধ্যেও উপন্যাস-কবিতা-নাটক গোছের সংরূপ বা মবহৎব-এর খোপ খোপ ভাগ উত্তর-আধুনিকরা ভেঙে দিতে চান। এ কাজ তাঁরা শুরু করেননি, কিন্তু তাঁরা শেষ করতে ইচ্ছুক। (জেমসন পূর্বোল্লোখ, ৩৭৩) চমৎকারভাবে এই মবহৎব যড়ঢ়ঢ়রহম-কে দর্শকের টিভির এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে পর পর লাফিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর কথায়— Thus the movment form one generic clssification to another is radically discontinious, like switching channels on a cable television set. and indeed it seems appropriate to characterize  the strings of items and the compartments of genres of their typologization as so many channels into which the new reality is organized..’ এর অনেক আগেই জেমসন উত্তর-আধুনিক পৃথিবীতে the language of from or genres-এর সন্ধান বৃথা হবে বলে রায় দিয়েছে (ঢ়. ৬৭)।

সুতরাং শিল্প-সৃষ্টি ও শিল্পতত্ত্বের ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিকতা বেশ জোর গলায় এই দাবি হাজির করেছে— উচ্চকোটির নন্দনতত্ত্বের মহিমা ভেঙে উচ্চ শিল্প ও জনপ্রিয় শিল্পের তফাত স্বীকার করা যাবে না, শিল্পে বিশেষত চিত্রশিল্পে শিল্পীর নাম ও স্বাক্ষরের জুলুম, অন্যদিকে তারই জোরে ধনীর সেই চিত্রে একচ্ছত্র মালিকানা স্বীকার করা যাবে না। এ ছাড়া, শিল্পে শিল্পে তাত্ত্বিক পাঁচিল ভাঙতে হবে এবং একই শিল্পে, যথা সাহিত্যে সংরূপ বা মবহৎব-এর কক্ষভাগ চলবে না।

সাহিত্যে, বিশেষত কথাসাহিত্যে, আখ্যানকাল বা হধৎৎধঃরড়হ-এর ভঙ্গি যে এই পর্বে একেবারেই অন্যরকম তাও বলে রাখা দরকার। চিত্রকলা তো আধুনিক পর্বে এসেই বিমূর্ততার আশ্রয় নিয়ে গল্প বলা ছেড়ে দিয়েছে, তা হয়েছে আত্মনির্দেশক বা ংবষভ-ৎবভবৎবহঃরধষ। অর্থাৎ সে বলছে, খানিকটা কথাহীন উচ্চাঙ্গ সংগীতের মতো করেই— শুধু আমাকেই দ্যাখো, আমার বাইরে আর কিছু নেই।’ উত্তর-আধুনিকতা এটাকেই শিল্পের একমাত্র কাজ বলে মনে করে, এই আত্মনির্দেশনাকে। গল্প-উপন্যাসে গল্প বলার একটা দায় আধুনিক পৃথিবী মুদ্রণ যুগে এসে তুলে নিয়েছিল, তারও আগে ছিল মৌখিক গল্প, কাব্যের সম্ভার। কিন্তু উত্তর-আধুনিক গল্প বলায় আখ্যান-বর্ণনার প্রচীন ঢং সম্পূর্ণ বর্জন করেছে, ফলে সময় অনুসারে ঘটনাক্রম, বাস্তবতা বা বিশ্বাস্যতার মাত্রা রক্ষা, যুক্তি ও ঔচিত্যের লক্ষণ বজায় রাখা— কিছুই আর অস্বীকার করতে রাজি না। কাপলানের সম্পাদিত সংকলনে ফ্রেড ফাইল (ঢ়ভবরষ, ১৯৮৮) দুটি উপন্যাসের আলোচনা করেছেন, যে দুটি তাঁর কাছে উত্তর-আধুনিকতা সার্থক প্রতিনিধি বলে মনে হয়েছে। টমাস ডিশ (উরংপয)-এর ঞযব ইঁংহবংংসধহ : অ ঞধষব ড়ভ ঞবিিড়ৎ আর ডেনিস জনসনের ঋরংশধফড়ৎড়। প্রথম বইটিতে স্ত্রীকে স্বামী খুন করে পালাচ্ছে, কবর থেকে উঠে স্ত্রীর ভূত স্বামীকে ধরতে ছুটছে— এই রকম বহু জটিল এক আখ্যান, কার্যকারণহীন, কিন্তু মজাদার এক পরম্পরা তৈরি করেছে। এবং তার বিচিত্র, যার একটু নমুনা বঙ্গানুবাদে দেখা যেতে পারে :

আপনার বউকে খুন করা কঠিন কাজ এমন মনে নাও হতে পারে, আর বব গ্ল্যান্ডিয়ারের ক্ষেত্রে এটা জলের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল। কর্মসূচী : দুজনে মিলে লাস ভেগাসে উড়ে যাও, কেডি লাক মোটর লজে ঢোকো, বউয়ের গলা টিপে শেষ করো, তারপর মিনোসোটার প্লেন ধরো আর সেখানে উঁচু তলার এগজিকিউটিভ হয়ে জীবন আবার শুরু করো। পরে যা দাঁড়াল তা অবশ্য এত সহজ নয়।

সমালোচকদের মতে টেলিভিশন ফিল্মে ভূত প্রেত দত্যি দানো বীভৎস ও কিম্ভূত রসের আখ্যানগুলি মূলত উত্তর-আধুনিক পর্বেরই প্রার্থনার ফল। এর মধ্যে একটা লঘু ক্রীড়াচাপল্যের ব্যাপার আছে, রলাঁ বার্তে (ইধৎঃযবং) যাকে বলেন লড়ঁরংংধহপব। এই লঘু চাপল্য উত্তর-আধুনিকতার নিজস্ব মেজাজ।

স্থাপত্যের ব্যাপারে আবার একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটে। এই বিষয়টার উপর স্থাপতি ও স্থাপত্য-সমালোচক চার্লস জেংকস সবচেয়ে বেশি করে বলেছেন। উত্তর-আধুনিক স্থাপত্যে প্রচুর জায়গা নিয়ে অদ্ভুত ও বিচিত্র দর্শন গঠন ও নির্মাণে কোনো বাধা নেই। শিল্পকে তারা সস্তা করে নকল করে বা কপি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পক্ষপাতী, কিন্তু স্থাপত্যে তারা বাহুল্যপ্রেমী ও অপচয়ী বলে মনে হয়। জেমসন তাঁর বইয়ে সান্টা মনিকার ফ্রাংক গেরি হাউসের (পৃ. ১০ আর ১১-র মধ্যবর্তী সপ্তম ছবি, এবং ১১০-১১২ পৃষ্ঠায় তার অন্যান্য দিক ও নকশা দিয়েছেন, ১১৪ পৃষ্ঠাতে রান্নাঘরের ছাদের ছবিও) কথা বলেন, লস এঞ্জেলেসের ‘বোলাভেঞ্চার’ হোটেলের বিশাল বাড়িটির কথা। আম্মানের রাজপ্রাসাদের কথাও আসে। নিউইয়র্কের এটিটি বিল্ডিং আটলান্টা জর্জিয়ার পিচট্রি সেন্টার ইত্যাদি অনেক বাড়ির কথা আসে। লাস ভেগাসের নানা রকমের সাইকা ডেলিক আলোকসজ্জিত কিম্ভূতদর্শন বাড়িগুলির কথাও আসে, যাতে পাশ্চাত্যের সঙ্গে আরবের শৈলীও মিশে যায়, চলে আসে মধ্য ইয়োরোপের দূর্গ-স্থাপত্য। মাইক ডেভিস (পূর্বোক্ত, পৃ. ৮৬) লস এঞ্জেলেসের নাগরিক প্রতিবেশে বোনাভেঞ্চার হোটেলের আরোপকে ংধহধমবৎু বলে বর্ণনা করেছে। শুধু ংধহধমবৎু নয়, তাতে স্পর্ধা, বেপরোয়া ভাব, ছেলেখেলা, দেখনদারি বা আদেখলেপনা— সবই আছে। আছে শরঃংধষ বা প্যারোডির প্রবণতা। পাওলো পোরটোগেসি বলে আর-এক স্থাপত্য বিশারদ এই কারণে এ স্থাপত্যকে ‘ঢ়ধৎধফড়ীরপধষ ধহফ ধসনরমঁড়ঁং নঁঃ ারঃধষ’ বলে বর্ণনা করেছেন (ঢ়ড়ৎঃড়মযবংর, ১৯৮৩ : ১০-১১)।

৬.৭ বৃহদাখ্যানের বিচূর্ণন

দার্শনিক লিয়োতার (খুড়ঃধফ, ১৯৮৪) এর যে অংশটি সাইডম্যান (ঝবরফসধহ, ১৯৯৪) ছেপেছেন তার প্রথম বাক্যই হল ‘I define postmodern as an inerdulity toward metanarratives (p.27)) মেটান্যারোটিভ বা বৃহদাখ্যান কী? বৃহদাখ্যান হল সেই সব আদর্শ বা ইডিয়োলজি, যা বিশ্বের বহু মানুষকে কোনো একটা বড়ো বিশ্বাসে বাঁধে, কোনো সামূহিক লক্ষ্য নির্দেশ করে এবং সেই লক্ষ্যে এগানোর জন্য কর্তব্য-অকর্তব্য নির্দেশ করে, উজ্জীবিত করে। ধর্ম একটি বৃহদাখ্যান; ফ্যাসিবাদ, মার্কসবাদ (সমাজতন্ত্রবাদ, সাম্যবাদ)— সবই এক একটি বৃহদাখ্যান। কোনোটি মানুষের মুক্তির জন্য, কোনোটি মানুষের বশ্যতা আদায়ের জন্য। এক বৃহদাখ্যান হল বিজ্ঞান। আবার দর্শনগুলিও এক ধরনের বৃহদাখ্যান।

দর্শনের তত্ত্বের অংশ এত সংগঠিত ও সুবিন্যস্ত হয়নি। তার প্রয়োগকলা বা ঢ়ৎধীরং অংশও এই সুবিস্তারিত চরিত্র লাভ করেনি। যাই হোক, মার্কসবাদের এবং অন্যান্য বৃহদাখ্যানের প্রতিপক্ষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে লিয়োতার সব কিছুর চূর্ণন লক্ষ করেন, এবং বলেন Consensus has become an outmoded and suspect value (p.37)| এ বিষয়ে মতানৈক্য-পন্থী হাবেরমাসের সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য নেই।

বৃহদাখ্যান ভেঙে ছোটো ছোটো আখ্যান বা খ-াখ্যান (ঢ়বঃরঃ ৎবপরঃ) তৈরি হচ্ছে। এই ভাষার ঘটনাটা যতটা সত্য না হোক, পাশে বা আড়ালে পড়ে থাকা প্রান্তিক জীবন উঠে আসছে সামনে। মেয়েদের কথা, আদিবাসী-উপজাতিদের কথা, সমকামী বা নপুংসকদের কথা— এই রকম আরো অনেক অন্তেবাসী জীবন ও তাদের বঞ্চনা মধ্যবিত্ত পৃথিবীর চোখ ও চেতনাতে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। মুদ্রণ ও বৈদ্যুতিন মাধ্যমের যে বিস্ফোরণ ঘটেছে তাতে এমন হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। ইয়োরোকেন্দ্রিক বা পাশ্চাত্য-কেন্দ্রিক পৃথিবীর দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, বিদেশী অভিবাসীদের মতো তার মধ্যে আড়ালে থাকা অস্তিত্বগুলিও এসে ভিড় করছে।

অবশ্যই পোস্টমডার্নিজম ব্যাখ্যানে আরো অনেক কথা আসে। আপাতত এইটুকু পেশ করা গেল। এই তত্ত্ব, যে সম্বন্ধে লিন্ডা হাচন (ঐঁঃপযবড়হ, ১৯৮৮ :২৩) খুব জোর দিয়ে বলেন postmodernism is a fundamentally contradictory enterprise : its art froms (and its theory) at once use and abuse, install and then destabilize convention in parodic ways, self-conscionsly pointing both their own inherent paradoxes and provisionslity, and, of course, to their critical or ironic re-reading of the art of the past . কিন্তু এই সচেতনভাবে স্ববিরোধী এবং আত্মগো-গোলে উল্লাসিত তত্ত্ব দক্ষিণ এশিয়া বা তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষের জন্য কোনো বড়ো আশ্বাস বহন করে না। জেমসন যেভাবে তাদের সদ্যতন শিল্প ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছেন— সে শিল্প-ব্যবস্থা তৃতীয় বিশ্বে কী ভূমিকা নিচ্ছে সে বিষয়ে তারা অবহিত কি না জানি না।

তথ্যনির্দেশ ও টিকা

১.            এই লেখক দেশি বিদেশী কোনো উত্তর-আধুনিকতার নাগরিক বা সদস্য নয়, এ ধরনের কোনো আন্দোলনে সে অংশ নেয়নি। ফলে তার উত্তর-আধুনিকতা সম্বন্ধে জ্ঞান কেবল পুথিগত, যদিও উত্তর-আধুনিক স্থাপত্য, চিত্রকলা, রচনা ইত্যাদির নমুনা অল্পস্বল্প সে দেখেছে। এ সম্বন্ধে পড়াশোনা করতে গিয়ে প্রাথমিক, অগ্রসর সব ধরনের বই (হাতের কাছে যা সে পেয়েছে) সে পড়েছে। তা থেকে যতটুকু বুঝেছে তারই সাক্ষ্য এই নিবন্ধ। এ বিষয়ে যাঁরা প্রাজ্ঞতর তাঁরা এতে ক্রটি বা অসম্পূর্ণতা পেতেও পারেন, সে জন্য ক্ষমা চেয়ে রাখছি। এসব ক্রটি বা অসম্পূর্ণ কথা তাঁরা যদি এ লেখককে জানান, সে প্রভূত কৃতজ্ঞ বোধ করবে।

২.           শাদা অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্যাথোলিক বা প্রেসবিটারিয়ান বা মেথডিস্টদের আচরণ বিধি কী অর্থে প্রোটেস্টানদের চেয়ে ভালো, তা অবশ্য আমরা জানি না।

৩.           পঁষঃঁৎধষ ফড়সরহধহঃ-এর ধারণাটিকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাইক ডেভিস (গরশব উধারং, ১৯৮৮ : ৮০-১) তাঁর টৎনধহ জবহধংরংংধহপব ধহফ ংঢ়রৎরঃ ড়ভ ঢ়ড়ংঃসড়ফবৎহরংস প্রবন্ধে (দ্র. অহহ শধঢ়ষধহ, ১৯৮৮) বলেছেন, অন্তত মার্কিন স্থাপত্যের প্রবণতা দেখে এ ধারণাটিকে খুব সংগত বলে মনে হয় না। তাঁর মতে এটি (ৎবফঁপঃরড়হরংস) বা সরলীকরণের উদাহরণ। এখানে সে তর্কে যাবার সাধ বা সাধ্য আমাদের নেই।

৪.           আমাদের এটাও খেয়াল রাখা দরকার যে, তথ্য প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের এই ব্যাপক ও ঘনিষ্ঠ ব্যবহার মূলত পাশ্চাত্যের সমাজকে যেভাবে আচ্ছন্ন করেছে এবং তাদের চৈতন্যে প্রভাব ফেলেছে সেটা পৃথিবীর সব দেশের সব সমাজের সম্বন্ধে এখনো সত্য নয়। আবার  এই প্রাচ্যে জাপান যতটা সত্য, সেখানে চিনে ভারতে বা বাংলাদেশে সবক্ষেত্রে ততটা সত্য নয়। আমাদের এসব অঞ্চলকে খধঃব ঈধঢ়রঃধষরংস এখনি গ্রাস করেছে এমন কথা বলা যাবে না। প্রাচ্যে অনেক জায়গায় আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ক এখনো টিকে অছে, উত্তর-আধুনিকতার ধাক্কা বাঁচিয়ে।

৫.           মার্কিউস-এর ঙহব উরসবহংরড়হধষ গধহ (১৯৬৪)-এর নামপত্রে তিনি অফাধহপবফ ঈধঢ়রঃধষরংস কথাটা ব্যবহার করেছেন। আমার মনে হয় ঢ়ড়ংঃ-রহফঁংঃৎরধষ ংড়পরবঃু বা খধঃব পধঢ়রঃধষরংস প্রয়োগ দুটির চেয়ে সেটি সার্থকতর নাম।

৬.           দ্র. ঙরংড়হ, ঈযধৎষবং, ১৯৬৭

৭.           অবশ্যই এই ঐতিহ্যের সবটাই ৎধঃরড়হধষ বা প্রখরভাবে যুক্তিভিত্তিক ছিল তা বলা যাবে না। গ্রিকদের দিয়োনিসস্ বন্দনা ও উৎসব নানা ধরনের উন্মত্ততায়, ইহুদি মারণ উচাটন বশীকরণ ডাইনিতন্ত্রের খবরও আমরা রাখি। এখানে জেমসনের ঈঁষঃঁৎধষ ফড়সরহধহঃ-এর তত্ত্ব ধরেই হয়ত আমাদের বলতে হবে এক ধরনের যুক্তি ও বিশ্বাসের ভারসাম্য এ পরম্পরার প্রধান লক্ষণ।

৮.           পরে আমরা দেখব যে দার্শনিক লিয়োতার এই ব্যাপক তত্ত্ব ও দর্শনগুলিকে ব্যাপকতর মানবজীবনকে একটি সার্বিক বিশ্বাস ও সংকল্পের আওতায় এনে তাদের জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত পরিবর্তিত কারার সূত্রগুলিকে সবঃধ-হধৎৎধঃরাবং বা মৎধহফ হধৎৎধঃরাবং বলেছেন। এই বৃহদাখ্যানকে বাতিল করে বহু ক্ষুদ্র আখ্যানের প্রতিষ্ঠাই লিয়োতারের মতে উত্তর-আধুনিকতার একটা লক্ষণ।

৯.           দ্র. রিডের চযধংবং ড়ভ ঊহমষরংয ঢ়ড়বঃৎু.

১০.         ফলত ওয়েলেকবদের প্রস্তাবের তাত্ত্বিক গভীরতা অনেক বেশি, এবং তাকে পুনরাবৃত্তির ধারণা থেকে সহজেই বিচ্ছিন্ন করা যায়। ওয়েলেকদের ধারণার পিছনে সম্ভবত কাজ করেছে রুশ আঙ্গিকবাদীদের (ধঁঃড়সধঃরুধঃরড়হ) ও প্রমুখন (ধশঃঁধষরংধপব বা ভড়ৎবমৎড়ঁহফরহম)-এর সূত্র, যার উল্লেখ তাঁরা নিজেরাও করেছেন। এর মানে হল, ইতিহাসের একটা পর্যায়ে সাহিত্যের আদর্শগুলি যান্ত্রিক প্রথানুসরণে পর্যবসিত হয়, তাতে আর কোনো নবত্ব বা উজ্জ্বলতা অবশিষ্ট থাকে না। তখন নতুন ¯্রষ্টারা সেসব আদল ভেঙে আবার নতুন রূপ ও ভঙ্গি এসে সাহিত্যকে পাঠকের প্রবল মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।

১১.         বোদরিয়ার এটা ভাবেননি, কিন্তু টিভি সংবাদের বানানো চরিত্র আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেও খানিকটা বেরিয়ে আসে। স্কুলের পুরস্কার বিতরণ হয়ে গেলে, তার অনেকক্ষণ পরে টিভির দল এসে পৌঁছল। তাদের অনুরোধ আবার ভি-আই-পিকে সেই  পুরস্কার বিতরণের অভিনয় করতে হল। জানি না, বোদরিয়ার একেই যুঢ়বৎৎবধষরঃু বলবেন কি না!

সহায়ক রচনাবলী

Ann kaplan, E (ed), 1988, postmodernism and its Discontents, London & New York, Verso.

Appignanesi, Rechard & Chris Garret, 1995 postmodernism, for Beginners, Thumpington, Cambridge, Icon Books

Bartens, Hans, 1995, The Idea of postmodernism, London & New York, Routledge Baudrillard, Jean, 1983, Simulations, New York, Semicontext , 1988, selected Writings, Cambridge, polity press

Baurdieu, pierre, 1979, Distinction: A social Critique of the Judgenebt of Taste (English Translation, 1984), London & New York, Routledge & kegan paul Benjamin, walter, 1978, Reflections, New York Harcourt Brace Jovanovich

Cuncliffe, Marcus (ed), 1975, American Literature since 1900, London, Sphere Books

Davis, Mike, 1988, Urban renaissance and the spirt of postmodernism, in Ann kaplan (ed) 1988, pp. 79-87.

Derrida, Jaquss, 1976, of Grammatology, Baltimore ,Ms, John Hopkins University press.

Fiedler, Leslie, 1965, The new mutants, partisan Review, 32 : 505-25— 1975, cross the border- close thst gap : postmodernism in Cuncliff, 1975, pp. 344-66

Harvey Bavid, 1989,the Condition of postmodernity : an Enquiry into the Origins of Cultural Change, Oxford & Cambridge, polity press

Homer, sean, 1998, Fredic Jameson, Cambridge, Plity Press

hutcheon, Linda, 1988, A Poetics of Postmodernism, New York & London, Routledge

Jameseon, Fredric, 1991, Postmodernism or the Cultural Logic of Late Captialism, London & New York, Verso

Kahler, Eric, 1968, The Disintegration of Form in the Arts, New York, Braziller

Khhn, T., 1963, The Structure of Scientific Revolution, Chicago, University of Chicago Press.

Lyotard, Jean-Francios, 1994, `The postmodern condition’ in Seidman (ed.) 1994, pp. 27-38

Mercuse, Herbert, 1964, One-Dimensional Man, London & New York, Routledge

Norris, Christopher, 1985, The Contest of Faculties, London & New York, Methuen

Olson, Charles, 1967, Human Uviverse and other Essays, Ed. Donald Allen, New York, Grove Press

Pfeil , Fred, 1988, `Potholders and subcision : on The Businessman Fiscadoro and postmodern paradise’ in Ann Kaplan, 1988, pp, 59-78

Portoghesi, Paolo, 1983, Postmodernism: The Architecture of posindustrial Society, New York, Rizzoli

Read, Herbert, 1963, To Hell with Culture, New York, Schocken Books

Seidman, Steven (ed.) The Postmodern Turn, Cambridge University Press

Ward, Glenn, 2003, Postmodernism, Teach Yourself Series

Wellek, Rene & Austin Warren, 1949, Theory of Literature, Middlisex, Penguin Books

Wide, Alan, 1981, Horizons of Ascent : Postmodernism and the Ironic Imagination, Baltimore, Md., John Hopkins University Press

**********************************************

 

উত্তর-আধুনিক উপন্যাস ও বর্ণনাকারীর ঐতিহ্য
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

উপন্যাসে বর্ণনাকারীর ভূমিকাটি অবধারিতভাবে কেন্দ্রীয়। এই বর্ণনাকারী সর্বজ্ঞ এবং অন্তর্যামী হতে পারে, উত্তমপুরুষ হতে পারে; কিন্তু কাহিনির চলিষ্ণুতা নিশ্চিত করে তার আখ্যান। ঔপন্যাসিক নিজে অধিকার করে নিতে পারেন অন্তর্যামীর স্থানটি; অথবা সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর যেটুকু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অর্থাৎ আখ্যানের ঘটনাবহির্ভূত ৎবভষবপঃরাব অংশটুকু, ঔপন্যাসিক নিজের কর্তৃত্বে রেখে দিতে পারেন। তবে হয়তো এমন চোরাগোপ্তা উপায়ে যে, পাঠক সন্দেহ করবে না ঔপন্যাসিক সশরীরে কোথাও আছেন বরং আখ্যানের বৈচিত্র্যে এবং ব্যাপ্তিতে তার এমন ধারণা হতে পারে যেন ঘটনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত কিছু অতিরিক্ত বিষয় ওই ঘটনার প্রয়োজনেই তাকে দেখতে হচ্ছে, অনুভব করতে হচ্ছে, অনুধাবন করতে হচ্ছে। বাস্তববাদী উপন্যাসে, যা আঠারো শতকে ইংরেজি উপন্যাসের সূচনালগ্নেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নেয়, সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীকে একদিকে কাহিনির ধারাবর্ণনা দিতে দেখা যায়, অন্যদিকে লেখকের নানা ভাবনাচিন্তা, এমনকি মতবাদকেও নিজের আখ্যানে স্থান দিয়ে একটি জমজমাট গল্পের অবতারণা করতে দেখা যায়। বর্ণনাকারী বাস্তবের মাপজোক, তার মাত্রা ও অনুপাত কোনো বৈকল্য ছাড়াই তুলে আনেন : সামাজিক সত্যগুলোকে নিরাভরণ প্রকাশ করেন এবং চরিত্রগুলোকে জীবনঘনিষ্ঠ ও বাস্তবানুগ করে উপস্থাপন করেন। তাতে পাঠকের এই আশ^াস জন্মে যে, যে কাহিনি তার সামনে উন্মোচিত হচ্ছে, তা সত্য না হলেও সত্যের অনুরূপ হয়ে উঠছে এবং যে চরিত্রদের সে দেখতে পাচ্ছে, তারা অপরিচিত নয় এবং যে সত্য তার সামনে ধরা দিচ্ছে, তা অভিজ্ঞতার অতিরিক্ত কিছু নয়। সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী তার ফিকশনকে বৈধতা দেন পাঠকের সামনে একটি বিকল্প কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, অর্থাৎ পাঠক যা অনুভব করে, যাকে সত্য অথবা সম্ভাব্য বলে ভাবে— অথচ যা কোনো একক ব্যক্তি একত্রে অথবা সামূহিকভাবে নিজের অভিজ্ঞতায় ধারণ করতে অপরাগ, অর্থাৎ যা বহু মানুষের অভিজ্ঞতায় স্থাপিত, তা যখন একজন বর্ণনাকারীর আখ্যানে কেন্দ্রিকতা পায়, সেই কেন্দ্রীয় উপস্থিতিকে সে তখন বৈধ কর্তৃত্ব বলে মেনে নেয়। উপন্যাসের শুরুতে এই যে সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর উত্থান, তার সঙ্গে কাহিনি বা গল্প কাঠামোর প্রয়োজন ছাড়াও আরো দুটো বিষয় জড়িত। প্রথমত, সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী ওই কর্তৃত্বের আভাস দেন, যা জীবনে মানুষ কামনা করে অথচ যার দেখা পাওয়া যায় না, মিশেল ফুকো যাকে বলেছেন সাধারণের ক্ষমতা-মুগ্ধতা। সেই মুগ্ধতার একটি প্রকাশ এখানে দেখা যায়, যা ভিন্ন ভিন্ন অথবা খ-িত জিনিসগুলোকে একত্র করবে, একটা আকৃতি দিয়ে একটা কেন্দ্রিকতা দেবে। সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর বয়ানে সেই কর্তৃত্বের প্রকাশ দেখা যায় যা ঈশ^রতুল্য : এবং কে না জানে মানুষ অন্তর্যামীর উৎপ্রেক্ষাকে কতটা গুরুত্বপূর্ণভাবে জীবনে— এতটা যে, অন্তর্যামীকে কখনো মানুষকে খুঁজে নিতে হয় না, মানুষই তাকে বরাবর খুঁজে নিয়েছে। ফ্রয়েড বলেন, মানুষের সকল গোপন কামনা ও কামনার পেছনে থাকে একটি উদগ্র আকাক্সক্ষা— কেউ যাতে তা দেখতে পায়, তার আকাক্সক্ষা। অন্তর্যামীর চোখের জন্য তোলা থাকে মানুষের কামনা-বাসনার অন্তঃপুর। দ্বিতীয়ত, সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী একটি বাস্তবসম্মত চিত্র দিতে পারে মানুষের ঘটনাবহুল জীবনের। কোনটা রাখা হবে, কোনটা ফেলা যাবে : বস্তুত ডিমেনশন, তার অনুপাত এসব প্রশ্নাতীতভাবে নিষ্পন্ন করতে পারেন ওই বর্ণনাকারী। আমরা লক্ষ করি, একটি অবাস্তব পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরে বাস্তবাদী উপন্যাস অগ্রসর হয়েছে। সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী আসলেই যে অবাস্তব একটি প্রতিপাদ্য, তার ঈশ^রসদৃশ ক্ষমতা যে নিতান্ত আরোপিত/কল্পিত, এটি বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অথচ, ওই অবাস্তব উপায়টির মধ্যদিয়েই বাস্তববাদী উপন্যাস সৃষ্টি করেছে অভিজ্ঞতা-স্বীকৃত ঘটনা, চরিত্র, বিষয়-আশয়।

উত্তমপুরুষ বর্ণনা সে তুলনায় একটু সীমিত— উত্তমপুরুষের চারণক্ষেত্র ব্যক্তির নিজস্ব গ-িতে। উত্তমপুরুষের পক্ষে দ্বিতীয় কোনো চরিত্রের মনোজগতে প্রবেশ সম্ভব নয়, অথচ একক কোনো চরিত্রের একান্ত জগতে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখলে শুধু ওই চরিত্রই পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়, বৈধতা পায়, কিন্তু অন্য কোনো চরিত্র সেরকম নানাবিধ মাত্রায় বিকশিত হতে পারে না, অর্থাৎ হওয়ার সম্ভাবনাটি সামান্য। কিন্তু কার্যত দেখা যায় উত্তমপুরুষ বর্ণনাতেও ভিন্ন চরিত্রের উপস্থাপনা একটি হেত্বাভাসকে ভিত্তি করে হতে থাকে। হেত্বাভাসটি, সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী উপন্যাসের হেত্বাভাসের মতোই, জটিল। যদি বর্ণনাকারী উত্তমপুরুষ হয় তবে তার আখ্যান শুধু তার নিজের মনোজগতের নানা অলিগলির সন্ধান দিতে পারে, অন্যের মানসে তার প্রবেশাধিকার থাকার কথা নয়। অথচ এরকম উপন্যাসের একটি অতিব্যবহৃত পদ্ধতি হচ্ছে অন্য চরিত্রের মনোলোকে নানা উপায়ে প্রবেশ করে, তার রূপটি উন্মোচিত করা। হয়তো দ্বিতীয় চরিত্রটি, কিছু সময়ের জন্য, উত্তমপুরুষে পরিণত হয়, হয়তো উত্তমপুরুষ অনুমানভিত্তিক বর্ণনা দিতে যাবে দ্বিতীয় চরিত্রের : কিন্তু প্রায়শ দেখা যায়, উত্তমপুরুষ বর্ণনাকারী, নিজের অজান্তে, দ্বিতীয় চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে; এবং শুধু অনুমানভিত্তিক নয়, একেবারে প্রকৃত বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে তার একান্ত চিন্তাভাবনার। এই হেত্বাভাসকে বলা হয় ঊীঃবহংরড়হ ঋধষষধপু অর্থাৎ প্রথমজন দ্বিতীয়জনের ভেতরে প্রলম্বিত হচ্ছে, প্রবিষ্ট হচ্ছে, যদিও এটি ঘটলে প্রথমজনের অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের সন্দেহ হয়, মনে হয়, হয়তো সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীরই কোনো খ-িত রূপ সে। সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী অবশ্য অনেক সময় অনেকগুলো চরিত্রকে আলাদা আলাদা উত্তমপুরুষের বর্ণনায় নিয়ে আসতে পারেন। অথবা এ কাজটি সরাসরি ঔপন্যাসিক করতে পারেন। যেভাবেই হোক, শুদ্ধ উত্তমপুরুষের বর্ণনা বিরল। উত্তমপুরুষের সঙ্গে মিশে গেলে ঔপন্যাসিক এক অশুদ্ধতার অর্থাৎ উপর্যুক্ত হেত্বাভাসের শিকার হন। সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর রেওয়াজটি সে জন্য কাটিয়ে ওঠা মুশকিল, যদিও এ পদ্ধতিটি তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক।

যেভাবেই কাহিনি বর্ণিত হোক উপন্যাসে-ছোটগল্পে, অনেকগুলো অসংগতি/ হেত্বাভাস/ বিরোধ তাতে উৎপাদিত হয় অনিবার্যভাবে। মোটা দাগে, তাদের আমরা শনাক্ত করতে পারি নিচের শ্রেণিবিভাগে :

ক. প্রধান অসংগতিটি আসে সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী থেকে। কে ওই বর্ণনাকারী? তিনি কি ঈশ^র? যদি প্রতিটি চরিত্রের মনের খবর তার জানা থাকে, তাহলে তার বর্ণনারই বা কী প্রয়োজন— পরিণতি তো তার জানা।

খ. যদি লেখক হন সেই বর্ণনাকারী— কারণ লেখক এক্ষেত্রে ¯্রষ্টা, এবং অন্তর্যামী— তাহলে একটি নিতান্ত সংকীর্ণ অনুবিশে^ই উপন্যাসটি স্থাপিত হয়, কারণ সেখানে অন্তর্যামী একজন সামাজিক মানুষ। যদি তাই হয়, তাহলে উপন্যাসটি বাস্তবানুগ হয় কীভাবে? মানুষ কি অন্তর্যামীর স্থান নিতে পারে?

গ. উত্তমপুরুষ বর্ণনায় এই বিরোধটির কোনো সুরাহা হয় না। যদি আখ্যান একজন মানুষেরই হবে সেখানে ভিন্ন মানুষের একান্ত চিন্তাভাবনাগুলো কীভাবে দেখানো যায়? যদি ভিন্ন মানুষের অন্তর্লোক উদ্ভাসিতই হয়, তাহলে উত্তমপুরুষ বর্ণনাকারী তো পরিণত হন নিম-সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীতে। আর যদি ভিন্ন মানুষের প্রসঙ্গ শুধু ৎবভবৎবহঃ হিসেবে আসে তাহলে কাহিনি শিগগিরই থমকে দাঁড়ায়, যদি না প্রচ- তীব্রতা নিয়ে ওই কাহিনিকে বর্ণনা করতে পারেন ঔপন্যাসিক তার নির্বাচিত ‘আমি’র বয়ানে।

ঘ. যেহেতু উপন্যাসের কাহিনির বর্ণনায় গ্রহণ-বর্জনের একটি ব্যাপার আছে, বিন্যাসের একটি প্রয়োজন আছে, সেহেতু কোনো উপন্যাসই আসলে বাস্তবানুগ বা বাস্তববাদী বলে নিজেকে দাবি করতে পারে না। উপন্যাসে বড়জোর বাস্তবের একটি বিভ্রম সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু সেটি অতিশয় নিয়ন্ত্রিত বাস্তব।

ঙ. উপন্যাসে ওই বিষয়টি অবহেলা করা হয়েছে, অন্তত বাস্তববাদী উপন্যাসে, এবং চেতনাপ্রবাহের উপন্যাসের উদ্ভবের আগে, যে, মানুষের অন্তর্লোকে সময়ের অনুভবটি কিছুতেই ঘড়ির কাঁটাকে নির্ভর করে হয় না : সেখানে সময় নিতান্তই আপেক্ষিক, স্থিতিস্থাপক। সেখানে এরকম একটি মৌলিক বিষয়ে অবহেলা পরিলক্ষিত হয়, সেখানে বাস্তবানুগ কথাটি বিশ^স্ততা হারায়।

চ. সর্বোপরি, উপন্যাসের ভাষা যদি নিজস্ব সাংকেতিক সম্ভাবনা— যাকে উমবার্তো ইকো বলেন ংবসধহঃরপ ঢ়ড়ংংরনরষরঃরবং — তৈরি করতে চায়, যা প্রতিটি উপন্যাসে একটি অঘোষিত উদ্দেশ্যরূপে থেকে যায়, তাহলে বর্ণনাকারীর সীমাবদ্ধ ফ্রেমে ভাষাকে আটকে দিলে তার সম্ভাবনা অনেকটাই তিরোহিত হয়। বর্ণনাকারীর নির্দিষ্ট আখ্যানটি যে সংকেত সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে, তাতে একটি গন্তব্যেই তাকে ধাবিত করা যাবে : একাধিক কণ্ঠস্বর প্রয়োজন। অথচ উপন্যাসকে এই সীমাবদ্ধতা মনে নিয়েই সংকেত-বিশ^ নির্মাণের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়েছে।

চেতনাপ্রবাহের উপন্যাস ছিল এইসব অসংগতি বিরোধের বিপরীতে কিছু নতুন সম্ভাবনা নির্মাণের প্রচেষ্টা। এই ধারার উপন্যাস, যার সফল প্রবর্তক হিসেবে আমরা তিনজন ঔপন্যাসিকের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে চাই— জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ ও ডরোথি চিরচার্ডসন, বর্ণনাকারীর খুব একটা উনিশ-বিশ করতে পারেনি। সর্বজ্ঞ ও উত্তমপুরুষ বর্ণনাকারীরাই রয়ে গেছে আখ্যান বর্ণনার দায়িত্বে, যদিও যে নির্দিষ্ট ছকে বাস্তববাদী উপন্যাস তাদের হাজির করত, তাতে ব্যাপক অদল-বদল হয়েছে। সবজান্তা/সর্বদর্শীর একটি আত্মবিশ^াস থাকে, যা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটি কাহিনিকে একটি ছকে ফেলে উপস্থাপিত করতে তাকে অনুপ্রাণিত করে। ছকটি এই প্রকার : শুরুতেই শেষ দেখা যাচ্ছে বলে ধারণা করে নিলে বর্ণনাকারীর একটি ক্ষমতা জন্মায় অথবা ওই ক্ষমতাটি নিয়েই সে আবির্ভুত হয়, কাজেই মানুষের ঘটনাগুলোকে ওই শেষের লক্ষ্যে পরিচালিত করার জন্য শুরু-মধ্য-শেষের সরলরেখায় কাহিনি বিন্যস্ত হয়; কাহিনির ভেতরের বিভিন্ন উপদানের আন্তঃসম্পর্ক, সময়ক্রম, উপেক্ষিক গুরুত্ব এবং অনুপাত সুনির্দিষ্ট থাকে। এই ছকটি অগ্রসরমানতাকে নিশ্চিত করে, কিন্তু তা জীবনের প্রধান একটি উপকরণ— আগে থেকে অনুমান করতে না পারাটা অর্থাৎ টহঢ়ৎবফরপঃধনরষরঃু-কে অস্বীকার করে, তা স্থিতিস্থাপক করা হয়েছে। চেতনাপ্রবাহের উপন্যাস বর্ণনার ধারাবাহিকতাকে অবহেলা করেছে, সু-সংযুক্ত ঘটনাসমষ্টিকে খ-িত করে ইচ্ছেমতো সাজিয়েছে, এবং বর্ণনাকারী থেকে চরিত্রকে অনেকটা স্বাধীনতা দিয়েছে (এর কারণটি একটু পরেই ব্যাখ্যা করা হবে এবং আখ্যান বর্ণনা ও আখ্যান, এমনকি প্রতি-আখ্যান নির্মাণের মধ্যকার প্রভেদটির এভাবে নিষ্পত্তি হবে)। কিন্তু চেতনাপ্রবাহের উপন্যাসের বড় অবস্থানটি ছিল কাহিনিকে সরলরৈখিক বিস্তার থেকে মুক্তি দেওয়াতে। আমরা যদি সময়কে সরলরৈখিক অর্থাৎ ক্রমানুগ বলে মনে করি তাহলে ঘড়ির সময়কেই আমরা প্রধান বলে বিবেচনা করব; মানুষের মনের ভেতর সময়ের যে একটি ভিন্ন অনুভব, ভিন্ন প্রকাশ আছে, তাকেই অস্বীকার করব। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক সময়কে অস্বীকার করবে কে? দেখা যাচ্ছে প্রচলিত উপন্যাসের সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী একদিকে অন্তর্যামীর দায়িত্ব পালন করছেন, অর্থাৎ মনের আনাচে-কানাচে আলো ফেলে বের করে নিয়ে আসছেন চরিত্রের লুকোনো চিন্তা, গোপন বাসনা এবং নির্জন অনুভবের খতিয়ান, অথচ তার ভেতরে সময় যে ভিন্ন মাত্রায় উন্মোচিত সে খবর পুরোপুরি চেপে যাচ্ছেন। এই বিরোধ থেকে উপন্যাসকে মুক্তি দিলেন জয়েস ও তার সহযাত্রীরা। তারা মনকে দেখলেন একটি চলমান নদীর মতো, যার জলে— যেমন হেরাক্লিটাস বলেছিলেন— কেউ দুবার পা ফেলে নো। ওই নদী যেমন চলমান, তেমনি ঁহঢ়ৎবফরপঃধনষব একটি মুহূর্ত, মানুষের ওই নদীসদৃশ চেতনালোকে এক মুহূর্ত ব্যাপ্তি পায় এক যুগের, একটি যুগ সংকুচিত হয়ে এসে দাঁড়ায় একটি মুহূর্তে। এভাবে সময়কে একটি পুরোপুরি ‘স্বাধীন অনিবার্যতা’ দিলেন ওইসব ঔপন্যাসিক, দিলেন স্থিতিস্থাপকতা, অনেকগুলো মাত্রা এবং এভাবেই তারা চরিত্রকে কিছুটা নিষ্কৃতি দিলেন বর্ণনাকারীর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ থেকে। কারণ, দেখা গেল, মনস্তাত্ত্বিক সময়ের অনির্দিষ্ট প্রবাহে চরিত্র যখন ভেসে যায়, সে নিজেই জানে না তার ভেতর পরমুহূর্তে জন্ম নেবে কীভাবে, কী অনুভূতি। তার চিন্তার সূত্রটি এতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ঘড়ির সময়ের বন্ধন থেকে, যে তার দিনকালের খ-মুহূর্তের কোনো হিসাব তার দেওয়ার থাকে না, কোনো আপেক্ষিক গুরুত্ব থাকে না ঘটনাগুলোর; কোনো আন্তঃসম্পর্কও কাজ করে না দুটি ঘটনার বা ব্যক্তির মধ্যে। দেখা যায়, এক সম্পূর্ণ নতুন বিন্যাসে ফেলছি আমরা ঘটনাকে, চরিত্রকে, চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, চিন্তাচেতনাকে।

চেতনাপ্রবাহের উপন্যাসের সফল প্রয়োগ যাঁরা করেছেন— বাংলা উপন্যাসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে আমি ওই দলে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই— তাঁরা আখ্যান বর্ণনা ও আখ্যান নির্মাণের মধ্যে একটি প্রভেদও নির্ণয় করে গেছেন। সুনির্মিত, প্রচলিত উপন্যাসে আখ্যান বর্ণনাটি ছিল প্রধান কাজ। আখ্যান বা হধৎৎধঃরড়হ ছিল বর্ণনাকারীকেন্দ্রিক : প্রায়শই যে ঔপন্যাসিকের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করত। সেখানে স্থান পেত সমাজচিন্তা, বৈশি^ক ভাবনা, দর্শন এবং ইতিহাস, ব্যক্তির নানা সমস্যা, তার বিচ্ছিন্নতা, তার প্রেম অথবা বেদনা। কিন্তু আখ্যানটি বর্ণিত হতো, বর্ণনাকে সাহায্য করত ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিভঙ্গি। তার একটি প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ, বাস্তবতার অন্যান্য অনুষঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, নির্মাণ করত একটি ক্রমানুগ আখ্যান, যা বিশ^াসযোগ্য। কিন্তু ওই আখ্যানটি চরিত্রের নিজস্ব কোনো ভিন্ন আখ্যানে সংস্থাপিত হতে পারত না। অর্থাৎ প্রধান আখ্যানটি ছিল নির্দিষ্ট, পর্যাপ্ত। কিন্তু চেতনাপ্রবাহের উপন্যাসের দেখা গেল ব্যক্তির যত গভীরে— তার অবচেতনের সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলটিতেও— যখন প্রবেশ করার চেষ্টা হচ্ছে তত অনিবার্য হয়ে উঠেছে ব্যক্তির নিজস্ব আখ্যানটি। কথাটি একটু বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন। ধরা যাক, একটি উপন্যাসে, যেমন কাঁদো নদী কাঁদোতে একটি নদীর গল্প, অথবা একটি জনজীবনের কিছু খ- ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে একটি আখ্যান তৈরি হচ্ছে মানুষের জীবনের। নদীকে যদি জীবনের উৎপ্রেক্ষা রূপে দেখি, তাহলে সেখানে প্রধান আখ্যানটি, যেটি বর্ণিত হচ্ছে, সেটি ওই জীবনের, ওই জনপদের কিছু সংঘাতের, বিপদের এমনকি পরাবাস্তব অভিঘাতের। কিন্তু সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী যত চরিত্রদের ভেতরে দৃষ্টি দিতে থাকেন, আমরা দেখি অনেকগুলো অতিরিক্ত আখ্যান (অবশ্য একসময় এরা অতিরিক্ত থাকে না, মূল আখ্যানের সম্পূরক/পরিপূরক রূপে আত্মপ্রকাশ করে) জন্ম নিচ্ছে। মোস্তফার গল্পটি যেন নিজস্ব একটি অনিবার্যতায় বড় হতে থাকে। আমরা আবিষ্কার করি, তার নাম যে মোস্তফা, তার মায়ের নাম যে আমিনা— এ যোগাযোগটি কাকতালীয় নয়; কোথাও একটি সংযোগ যেন আছে (এবং এ সংযোগ সূত্রটি আরো দীর্ঘ হয়) যা ভিন্ন একটি মাত্রায় কাহিনিকে বিন্যস্ত করে। ওয়ালীউল্লাহ কি লিখছিলেন কোনো আখ্যান যাতে ধর্মীয় ঐতিহ্য উঁকি দেয়, অথবা কোনো সংবেদী বা ৎবষরমরড়ঁং ধষষবমড়ৎু? তাঁর মোস্তফা প্রকৃতপক্ষে কে? এসব প্রশ্নের উত্তর প্রধান আখ্যানটি দেয় না; সেটি এসব বিষয়ে নীরব থাকে। কিন্তু আমরা জানি, এদের গূঢ় অর্থ আছে। একসময় ওই অর্থের সন্নিকটবর্তী হতে থাকি আমরা। কিন্তু কীভাবে? ওই বিকল্প/অতিরিক্ত/সম্পূরক আখ্যান বর্ণনার মধ্যদিয়ে। কিন্তু যেহেতু ওই আখ্যানটি বর্ণিত হয় না প্রধান আখ্যানটির মতো, বরং নির্মিত হয় তার রূপক বা প্রতীক/উৎপ্রেক্ষা অথবা সংকেতময়তার মধ্যদিয়ে, বলা যায়, বিকল্প আখ্যানটি তৈরি হয় প্রধান আখ্যানের বিপরীতে।

ওই আখ্যান নির্মাণের বিষয় থেকে আসে প্রতি-আখ্যান নির্মাণের সম্ভাবনাটি। উত্তর-উপনিবেশী সাহিত্যতত্ত্বে ওই প্রতি-আখ্যান বা পড়ঁহঃবৎ-ফরংপড়ঁৎংব কথাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রতি-আখ্যানের অর্থ হচ্ছে প্রধান আখ্যানের মূল উপজীব্য বা তার বিরুদ্ধে একটি বিপরীত আখ্যান নির্মাণ করা। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সুলতানার স্বপ্ন নামে যে ইংরেজি উপন্যাসিকাটি আছে, তাতে একটি কাল্পনিক দেশে একজন ভারতীয় নারীর মুক্তির স্বাদ গ্রহণ, তার স্বপ্নের মধ্যদিয়ে, হচ্ছে প্রধান বিষয়বস্তু। এটিই মুখ্য— অর্থাৎ ‘নারীভূমি’তে সুলতানার ভ্রমণের বর্ণনা। কিন্তু ওই প্রধান আখ্যান বর্ণনার বিপরীতে অন্তত একটি প্রতি-আখ্যান তৈরি হয়, সেটি হচ্ছে পরাধীনতার বিরুদ্ধে সার্বিক একটি প্রতিবাদ এবং সেখানে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের স্বাধীনতাসংগ্রামের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রতি-আখ্যান প্রধানত তৈরি হয় ওই প্রতিবাদের মধ্যদিয়ে। অবশ্য প্রতিবাদ সামাজিক না হয়ে অন্যরকমও হতে পারে। আলবেয়ার ক্যামুর দি আউটসাইডার উপন্যাসে প্রতি-আখ্যানটি অনস্তিত্বের বিরুদ্ধে অস্তিত্বের ঘোষণার মধ্যদিয়ে নির্মিত হয়, অথচ ওই প্রতিবাদটি নিতান্ত নমিতভাবে অস্তিত্ববাদী বিভ্রম এবং পরাবাস্তবী কুহকের মধ্যদিয়ে নিমগ্নতার স্পর্শে মুকুলিত হয়। তবে বর্ণনাকারীর সবচেয়ে বেশি রূপান্তর ঘটেছে উত্তর-আধুনিক উপন্যাসে, মেটাফিকশনে। উত্তর-আধুনিক উপন্যাস যে কোনো ভঙ্গি গ্রহণকেই সন্দেহ করে, যে কোনো আরোপিত গাম্ভীর্য, ঝবৎরড়ঁংহবংং-কেউ তাচ্ছিল্য করে। বর্ণনাকারীর ভঙ্গিটি যেহেতু একটি ‘গৃহীত’ ভঙ্গি— এটি বর্ণনার বা গল্প কাঠামোর প্রয়োজনেই গৃহীত হয়ে থাকে, তাকে পূতপবিত্র বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে উত্তর-আধুনিক উপন্যাস। কিন্তু উপন্যাসের আদি সীমাবদ্ধতা— বলা যায় এর একটি প্রধান উৎপাদন শর্ত হচ্ছে বর্ণনাকারীর ব্যবহার। কাজেই একে কীভাবে অবহেলা করা যায়? উত্তর-আধুনিক উপন্যাস বর্ণনাকারীকে গ্রহণ করল বটে, কিন্তু তার একটি প্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করে তাকে নতুন মাত্রা দিল। প্রিয় পদ্ধতিটির নাম ংঁনাবৎংরড়হ বা অন্তর্ঘাত। উত্তর-আধুনিক উপন্যাস শেষ পর্যন্ত আমাদের এরকম একটি ধারণা দেয় যে সবই আপেক্ষিক : সবই নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর, সূত্রবদ্ধ নয় কিছুই এবং গৃহীত কোনো ভঙ্গি, আরোপিত কোনো চিন্তা বিপক্ষে যায় ব্যক্তির মৌল স্বাধীনতার। এই বিশ্বাসগুলো যেখানে অর্জিত হতে দেওয়া হয় না, অথবা অর্জনের পথে থাকে প্রচুর বাধা, যেমন প্রচলিত আখ্যান চিন্তায়, সেখানে অন্তর্ঘাত হচ্ছে মোক্ষম অস্ত্র এবং অন্তর্ঘাত উত্তর-আধুনিক উপন্যাসে আত্মতৃপ্তি, আত্মদর এবং আত্মকেন্দ্রিকতার একটি প্রকাশ, এর কৌতুকপ্রিয়তার ও লঘুতা অন্বেষণের একটি নিমিত্ত। উত্তর-আধুনিক উপন্যাসে সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারী থাকেন বটে, কিন্তু তাকে প্রায়শই অনেকের মধ্যে ব্যাপ্ত করে দেওয়া হয়। একের জায়গায় আসে অনেক, অনেকের কণ্ঠ। দেখা যায়, একজন বর্ণনাকারীকে সরিয়ে দিয়ে বহুবাচনিক একটি উপস্থিতি অধিকার করে নিল আখ্যান : অথবা তৃতীয় কোনো পুরুষের জন্য তুলে দেওয়া হলো আখ্যান। তার ওপর, ক্রমাগত বর্ণনাকারীকে অনিশ্চয়তা এবং অস্থিরতার মধ্যে ফেলে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করা হলো, যাতে বর্ণনাকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা, তার ফুকো বর্ণিত ‘ক্ষমতা’, তার অন্তর্যামিতা, তার ঈশ্বরসৃদশ কেন্দ্রিকতা তিরোহিত হলো। ওইভাবে যখন আখ্যানের কেন্দ্রিকতা বিনষ্ট হয়, কেন্দ্রিক কক্ষপথ থেকে আখ্যানচ্যুত হয় তার বর্ণনাকারী, আমাদের প্রত্যেকের এক একটি নিজস্ব আখ্যান নির্মাণের তাগিদ দেখা দেয়। টলেমির বৈশ্বিক দর্শন থেকে যেরকম পৃথক এবং বিরুদ্ধ ছিল কোপার্নিকাস ও গ্যালিলিওর বৈশ্বিক চিন্তা, তথা কেন্দ্রিকতার তত্ত্ব, উত্তর-আধুনিক উপন্যাসের আখ্যান বর্ণনাও ততটা বৈপ্লবিক, ততটা পৃথক।

বর্ণনাকারীর আরোপিত অবস্থানটি যখন টলে যায়, তাকে উঠে দাঁড়াতে হয়, আর দশজনের সঙ্গে মিশে যেতে হয়, তখন তার আখ্যানটিকে গ্রহণ করতে আমাদের বাধা থাকে না। কারণ সে আখ্যান আমাদের নিজেদের আখ্যানে পরিণত হয়। উত্তর-আধুনিক উপন্যাস আত্মবিশ্লেষী এবং আত্মসমালোচক বলে ‘গৃহীত’ ও ‘অর্পিত’ বিষয়গুলো এভাবেই অন্তর্ঘাতে সম্পন্ন হয়।

উত্তর-আধুনিক উপন্যাস-ছোটগল্প বর্ণনাকারীর ভূমিকাকে আরো স্থিতিস্থাপক, আরো জটিল করেছে বিভিন্ন সাহিত্য শ্রেণি বা মবহৎব-এর একটি সংশ্লেষণ তৈরি করে। বাস্তববাদী সাহিত্য মবহৎব-ভিত্তিক। সেখানে একটি বিরোগান্তক কাহিনি হাস্যরসকে জায়গা দেবে না, ইতিহাস-গল্পে ঢোকানো যাবে না পরাবাস্তবকে, রোমান্স রচনায় গোয়েন্দা উপখ্যান পাওয়া যাবে না। কিন্তু উত্তরাধুনিক উপন্যাসে এই বিভাজন নেই। মার্কিন ঔপন্যাসিক টমাস পিঞ্চনের দ্য ক্রাইং অফ লট  ৪৯-এ মবহবৎব আছে কম হলেও পাঁচটি (অ্যাডভেঞ্চার গল্প, কুরিয়ার সার্ভিসের ইতিহাস, শিল্পায়নের সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি)। টান টান গল্প— অথবা গল্পসকল, কিন্তু বর্ণনাকারীর রূপ ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। বদলায়, কারণ একেক গল্পে তার একেক চেহারা, সে চেহারা কখনো দৃশ্যমান, কখনো অদৃশ্য। তাছাড়া, উত্তরাধুনিক সাহিত্যে কৌতুক, আত্মবীক্ষণ, জোড়াতালির প্রতি দুর্বলতা, বহুবাচনিকতা— এসব থাকায় বর্ণনাকারীও হয়ে দাঁড়ান অনুমান-অসম্ভব, ঁহঢ়ৎবফরপঃধনষব. এজন্য এই সময়ে এসে ফিকশন লেখাটা যেমন হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়, যাতে অবশ্য উপভোগ করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়, সেই ফিকশন পড়াটাও।

**********************************************

 

উত্তরাধুনিকতা বা আধুনিকতার উত্তর-দক্ষিণ
তপোধীর ভট্টাচার্য

‘উত্তরাধুনিকতা’ শব্দটা প্রথম ব্যবহার করা হয় মোটামুটিভাবে ১৯৮৫-৮৬ সালে এবং এটা করেন কলকাতার কবি অমিতাভ গুপ্ত, যিনি বেশ কিছু বইপত্রও লিখেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি আমাদের সত্তর দশকের একজন অত্যন্ত অগ্রণীয় কবি। আলো তার প্রথম কবিতার বই। তারপর আরো অজ¯্র কবিতার বই বেরিয়েছে। কিন্তু আপাতত আমি ওদিকে যাচ্ছি না। তাঁর মনে হয়েছিল তখন— প্রাথমিকভাবে আমি অমিতাভ গুপ্তের কথাই বলছি, যে আমরা মডার্নিটি বলতে যেটা বুঝি, সেটা পশ্চিমি আধুনিকতা। পশ্চিমি আধুনিকতা এই জন্যই বাঙালির রপ্ত করে নিয়েছে। কারণ, আমরা তো দীর্ঘদিন ব্রিটিশের উপনিবেশের অধীন ছিলাম। আমি কিন্তু মনে রাখছি বাংলাদেশ কিংবা কোন এক কালের পূর্ব পাকিস্তান নয়। আমি কিন্তু সমগ্র বঙ্গভূমির বাঙালি জীবনের বাঙালি সংস্কৃতির, বাঙালি ঐতিহ্যের কথাই মাথায় রাখছি। তো, আমাদের কাছে যেটা ১৮০১ সালে কিংবা ১৮০২ সালে— একদম ১৮০০ থেকেই অর্থাৎ যেটা আসলে ১৮০০ থেকে শেষ বছর এবং ১৮০১ অর্থাৎ উনিশ শতকের প্রথম বছর, সেই সময় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হচ্ছে এবং যে ইংরেজ আমাদের তো দেশকে শাসন করতেই এসেছিল এবং শাসন করতে গেলে একটা কথা আছে যে, আগে আমার তৈরি করে নিতে হবে যারা আমার শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করবে— আমি যথাসম্ভব ইংরেজি শব্দ না-ব্যবহার করাই পছন্দ করছি বাংলা প্রতিবেদনে। তবুও একটু মাঝে মাঝে করতেই হবে, এটাকে বলে রুলিং বাই কনসেন্ট। অর্থাৎ যাদের আমি শাসন করব, যেভাবেই হোক ছলে-বলে-কৌশলে তার সম্মতিটা আদায় করে নেব। ইংরেজ সেটা করার জন্য বুঝেছে যে, আগে সাংস্কৃতিকভাবে আমাদের জয় করে নিতে হবে এবং দীর্ঘস্থায়ী এক শাসনের মধ্যে তারা ঢুকিয়ে নিতে চায় তাহলে আমাদের কিছু কিছু সুবিধা দিতেই হবে। শিক্ষাবিস্তার— শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষা তো আনে চেতনা— চেতনার মধ্যে সংস্কৃতির বীজধান হয়। সুতরাং এই বিষয়টা হয়ে গিয়েছিল। ঐ সময়ে আঠারো শতক শেষ হয়ে গিয়ে উনিশ শতক যখন সবে আসতে শুরু করেছে, সেই সময়টাতে আমাদের দেশে (আমি কিন্তু সেই অবিভক্ত বাংলার প্রতি বলছি) হেনরী লুই ডিভিয়ান ডিরোজিও বলে এক অসামান্য শিক্ষকের আর্বিভাব ঘটেছিল হিন্দু স্কুলকে কেন্দ্র করে। এবং তিনি তখনকার একদল তরুণ, (এখানে কোনো মেয়ে ছিল না, আর মেয়ের প্রসঙ্গ কল্পনারও অতীত ছিল সেই সময়টাতে) তাদের তিনি একটা নতুন চেতনা দিতে চাইছিলেন। কিন্তু তিনি দীর্ঘজীবী হননি! ডিরোজিও কিন্তু ইংরেজ নন কিন্তু তাঁরা ইউরোপের সংস্পর্শে এই প্রথম এলো। এসে তারা নিজেদের দেশের ঐতিহ্যকে পরম্পরাকে ঘৃণা করতে শিখল, বিদ্বিষ্ট হতে শিখল। আমরা আজকে যেটাকে আধুনিকতাবাদ বলতে বুঝি, সেটা কিন্তু তখনও আসেনি এবং এই প্রসঙ্গে আরেকটি জরুরি কথা বলে নিতে চাইছি যে, ‘আধুনিক’, ‘আধুনিকতা’ আর ‘আধুনিকতাবাদ’ অর্থাৎ মডার্ন, মডার্নিটি, মডার্নিজম— যেটা খুব কাছাকাছি শব্দ, সংলগ্ন শব্দ, কিন্তু এক শব্দ নয়; এক অর্থ বা এক দ্যোতনাবাহী শব্দ নয় তারা। এটা অনেক সময় আমরা মাথায় রাখি না, ফলে অনেক তাত্ত্বিক সমস্যা তৈরি হয়। কিন্তু সে সমস্যার কথা আমি এখন বলতে চাইছি না। তো ঐ সময়ে যারা এসেছিলেন এবং তারা চারিদিকে শুধু কুসংস্কারের এক অন্ধপ্রবাহ দেখলেন। এবং তার বিরুদ্ধে লড়ার মত মানসিকতা, লড়াই করার মত মানসিকতা তাদের মধ্যে দেখা দিল। আমাদের যে আধুনিকতা তার গোড়াপত্তন ঐভাবেই হলো; কিন্তু সূচনালগ্নেই ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতায় একই মনের মধ্যে দু-ধরনের মানসিকতার বীজপত্তন হয়ে গেল ভারি চমৎকারভাবে। বিনয় ঘোষের বাংলার বিদ্বৎসমাজ এবং বাংলার নবজাগৃতি বইতে এবং আরো অন্য দুই-তিনটে বইয়ে এ সম্পর্কিত বিষয় আছে, কিন্তু সেগুলোতে আমি এখন যাচ্ছি না, গেলে এইরাত্রে শেষ হবে না আমাদের আলোচনা। তিনি কয়েকটি কথা বলেছিলেন যে, আমাদের তথাকথিত যারা বুদ্ধিজীবী, তাদের জন্মই হলো মূলত ব্রিটিশ উপনিবেশের সঙ্গে তাদের শ্রেণিস্বার্থ এবং তাদের চেতনার গ্রন্থিবন্ধন তৈরির ফলে; একই সঙ্গে তারা ইংরেজের কাছ থেকে নিলেন আবার ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিবাদ করারও একটা মানসিকতা তাদের মধ্যে তৈরি হলো। কিন্তু তাদের অজান্তেই তাদের মধ্যে একই সঙ্গে বীজবপন হয়ে গেল আত্মবিরোধিতার (ঢ়ধৎধফড়ীরপধষ)। এটার জন্য তারা দায়ি না, দায়ি মূলত ইতিহাস! ‘কূটাভাস’ এটাকে বলি আমি, ‘প্যারাডকস’ বলি আমি এটাকে। আমার আধুনিকতা পর্ব থেকে পূর্বান্তর বলে একটা বই কলকাতা থেকে বহু বছর আগে বেরিয়েছে, দ্বিতীয় সংস্করণও হয়ে গেছে। এ বইয়ের মধ্যে আমি এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছি। আধুনিকতার ইতিহাস আমাদের বাংলা ভাষায় যত লেখা হয়, আধুনিকতার তত্ত্বাশ্রয়ী-আলোচনা তাতে কিন্তু সেই ভাবে হয় না! আমি একটা ক্ষুদ্র চেষ্টা করেছি ঐ বইটাতে— সেটুকু বলতে পারি। এই কথাগুলো কেন বলছি? কারণ, যে রাজা রামমোহন রায়কে আমরা প্রণাম জানাই, আমরা নমস্কার করি, সালাম জানাই তাঁর মধ্যেও কিন্তু ‘আত্মবিরোধিতা’ ছিল। তিনি ব্রাহ্ম-আন্দোলনের প্রথম প্রবর্তক, সবই ঠিক কথা; তিনি নানা ধরনের প্রতিবাদের আয়োজন করেছিলেন, এটাও ঠিক কথা। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ছিলেন ব্রিটিশব্যবস্থার সমর্থক। অর্থাৎ অত্যন্ত বড় মাপের, উঁচু মাপের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও উপনিবেশবাদের তাৎপর্য রাজা রামমোহন রায়ের কাছেও সম্ভবত স্পষ্ট ছিল না। হয়তো ইতিহাসই তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আমি একটি তাত্ত্বিক কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি। জ্যাঁক দেরিদা বলে এক বিখ্যাত ফরাসী তাত্ত্বিক যিনি বির্নিমাণবাদের প্রবর্তক; (তাঁর সম্পর্কেও আমার একটা বই আছে) তিনি আমাদের একটা তত্ত্ব দিয়েছেন। সেটা অবশ্য পরে আরো অনেকে ব্যবহার করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে ‘এপোরিয়া’। এপোরিয়ার বাংলা আমি করেছি, আমার বইতে পাবে— ‘অন্ধবিন্দু’। অর্থাৎ আমরা যখন ব্যক্তিগত জীবনে কিংবা সামাজিক জীবনে, আমাদের সমষ্টিগত জীবনে, আমাদের বৌদ্ধিক জীবনে আমরা নিজেদের অজান্তেই আলোর সঙ্গে অন্ধকারকে কাঁথা সেলাইয়ের মত বয়ান করে নিই। ফলে আমাদের মনে একই সঙ্গে দুটি মানুষ বাস করে— একই সঙ্গে রক্ষণশীল এবং একই সঙ্গে প্রগতিশীল। এবং এ ২০১৭ সালেও সম্ভবত তার ব্যতিক্রম হয়নি! ইতিহাসের ধারা বেয়ে ঐ যে আধুনিক-চেতনা এক সময়ে এসে একটা ‘নিজস্বচিন্তা প্রস্থান’ গড়ে ওঠার দিকে এগিয়ে গেল। এটা ইতিহাসের বাধ্য-বাধকতাতেই হয়েছে এবং এটাকেই আমরা সংক্ষেপে ‘আধুনিকতাবাদ’ বলতে পারি। কিন্তু বুঝাই যাচ্ছে যে, জন্মসূত্রে সে চরিত্রে আদ্যন্ত ছিল, আদি থেকে অন্ত্য পর্যন্ত ছিল ‘উপনিবেশিক’ (কলোনিয়াল মডার্নিটি)। এমন কোন মডার্নিটি আমাদের পূর্বজেরা গ্রহণ করেননি বা আত্মস্থ করেননি, যেটা চরিত্রে উপনিবেশিক ছিল না। ফলে আমাদের বিদ্বৎসমাজে দেখো, অন্ধবিন্দুটা কি রকম! তারাই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন অথচ সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সময় (লেলিনের একটা বিখ্যাত কথা মাথায় রেখে বলছি) এক কদম এগিয়ে দু-কদম পিছিয়ে যাওয়া— এটা কিন্তু তখনই সূচনা হয়ে গেছে। এটাই উনিশ শতকের বাংলার বাঙালির দুর্ভাগ্যজনক ইতিহাস! ফলে ইতিহাস থেকে বিচ্যূত করে, তুমি— তোমার প্রকৃত শ্রেণিশত্রু কারা, তোমার প্রকৃত জাতিগত শত্রু কারা, তোমার ভালো-মন্দের বৈষয়িক কিংবা অবৈষয়িক বুদ্ধির শত্রু কারা নির্ধারণ করতে পারবে না। যার ফল বাঙালিকে খুব গভীর মূল্য দিয়ে বুঝতে হয়েছে। উনিশ শতকের একটা বিশেষ সময়ে মধ্যযুগের যে সম্প্রীতির ধারা ছিল, সেটা নষ্ট হয়ে গেল। ব্রিটিশ তার নিজস্ব স্বার্থে বাঙালি হিন্দুদের মূল্য দিয়েছে বেশি করে; সেই পরিমাণে বাঙালি মুসলমানদের স্কোপ দেয়নি। মাথায় রাখতে হবে, হিন্দু এবং মুসলমান দুটোই মূলত ধর্মতন্ত্র দ্বারা শাসিত সমাজ। ইসলামের সম্পর্কে যতটুকু জানি, ততটুকু পড়াশুনার মধ্যে দিয়েই জানি, আমার তো অন্যভাবে জানা সম্ভব না এবং যতটুকু আমার আন্ডারস্টান্ডিং— মে বি ইট ইজ রং। ঐহ্যিক এবং পারলৌকিক দুটি ব্যাপারেই ‘মোল্লাতন্ত্র’ বলতে পারি। শুনতে খুব ভাল লাগে না শব্দটা। এদের কাছে পৌরসমাজ এবং রাজনৈতিক সমাজ (যেটা পরে আসবে)— এক সঙ্গে ডেভলাপ্ট করে না; অন্তত উপনিবেশে করে না। তবে আধা-খেচড়া বৌদ্ধিক সমাজটায় করে। পশ্চিম থেকে পাওয়া কনসেপ্ট ‘এনলাইটেনমেন্ট’, যেটাকে আমি বাংলা করি ‘দীপায়ন’, সেটা মানছি। আমাদের পড়াশুনার দিক দিয়ে স্ত্রীশিক্ষার জন্য, বুদ্ধির-মুক্তি আন্দোলনের জন্য, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জন্য যে একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, যে একটা তাগিদ তৈরি হয়েছিল, যেটা বাঙালি হিন্দুরা সম্পূর্ণ গ্রহণ করেছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের বাঙালি মুসলমান বন্ধুরা কিন্তু সেটা গ্রহণ করতে পারে নি। ফলে প্রথম যে গ্যাপটা ছিল সামান্য, সেটা ধীরে ধীরে ওয়াইডেন হয়ে গেল। মনে রাখতে হবে, এটা যাতে আরো ব্যাপক হয়, এটা যাতে বাড়ে এবং এটার জন্যে কারা চেষ্টা… … সেটা আমাদের আধুনিকতার ইতিহাস। তা হলো এক ধরনের অনন্বয়ের ইতিহাস, অসামঞ্জস্যের ইতিহাস এবং অসামঞ্জস্য কিসের? বুদ্ধির সঙ্গে হৃদয়ের, শিক্ষার সঙ্গে চেতনার? আমাদের যাবতীয় সর্বনাশের এবং বাঙালি জাতির সর্বনাশের বীজটা কিন্তু ঐখানেই রোপণ হয়ে গেছে। তোমার যে মূল প্রশ্নটা ছিল, এটাকে বুঝতে গেলে একটা ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বুঝতে হবে বলে আমার ধারণা। এ জন্যই এই কথাগুলো একটু বিস্তারিতভাবে বললাম।

এবার আমি অনেকটা সময় জাম্প দিয়ে চলে আসছি ১৯৮৫-৮৬ সালে। কিন্তু তার আগে রবীন্দ্রনাথের কথা বলতে হবে। রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতা সম্পর্কে যে নানা কিছু বলেছেন, সে তাত্ত্বিক আলোচনায় আমি-যাচ্ছি না। আমার বইটাতে আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি, আধুনিকতা : পর্ব থেকে পূর্বান্তরেও করেছি, পরবর্তীর আরো কিছু বইতেও আলোচনা আছে। রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতার মধ্যে যে অসামঞ্জস্যতা আছে এবং বাঙালি জাতির ইতিহাসের সঙ্গে যে তা মানানসই না, এগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তখন যারা অনুজ ছিলেন, তারা ঢোক গিলে-টিলে বলেছেন, ‘বুড়ো হয়েছেন উনি আর অত কি বোঝেন?’ ইত্যাদি। তিনি কত যে সত্যি কথা বলেছিলেন, আজ আমরা ২০১৭ সালে কিংবা আরো আগেই বুঝেছি বা এসময় বুঝলাম। একটা জিনিস ঘটল যে, মডার্নিটিটা একসময় মডার্নিজমে রূপান্তরিত হলো। এইটার মানে কি? কি বলতে চাইছি আমি? বলছি— আধুনিক চেতনা থেকে আধুনিকতাবাদ হলো অর্থাৎ এক ধরনের ফ্রাস্টালাইজেশন তথাকথিতভাবে ঘটছে। ‘কেলাসিতকরণ’, বাংলায় খুব বাজে শব্দ। অথচ বাংলাতে তো সেটাই ব্যবহার করলাম এবং তার পরে সেটারও পরবর্তী স্তর হচ্ছে।  যখন সেটা বিযুক্ত হয়ে যায় চলমান জীবন থেকে, তখন সে একটা মতবাদের আশ্রয় নেয় এবং আধুনিকতাবাদও ঐ ভাবেই তৈরি হয়েছিল। এবং সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের শিকড়ের দিকে না তাকিয়ে এবং তখন আরেকটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, কলোনিয়াল এলিটের কতকগুলো বিশেষ পার্সপেকটিভ থাকে, বিশেষ প্রবণতা থাকে এবং সে প্রবণতা হচ্ছে, যাদের আমি মনেপ্রাণে জানি, আমার থেকে অনেক শ্রেষ্ঠ তাদের অনুকরণ করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাঙালির এলিট শ্রেণির মানুষ যারা, তাদের মধ্যে লেখক, কবি এবং অন্যান্যরা আছেন, চিন্তাবিদরা আছেন, তারা এ কাজটাই করলেন। আমাদের সাহিত্য তাই ‘ফেনায়েবর্তী’ হয়ে গেল।

এবার আমি আরেকটি কথা বলছি, আমরা জানি আমাদের গদ্যসাহিত্যের জন্ম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরে বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে এবং এটা তাঁর অসামান্য অবদান, সন্দেহ নেই। আমরা যে উপন্যাসটাকে গ্রহণ করলাম, যে নভেলটকে গ্রহণ করলাম, এর সঙ্গে বাঙালির হৃৎস্পন্দনের কোন সম্পর্ক ছিল না। আমরা যেটাকে প্রাগাধুনিক বলে বাতিলযোগ্য ভেবেছিলাম, সেই সময়টায় আমাদের একটা নিজস্ব কথকতা ছিল, আমাদের একটা ন্যারেটিভ ঐতিহ্য ছিল। যে ঐতিহ্যে সবকিছুর মূলে কমউনিকেশনই আসল। শিল্প বল, সাহিত্য বল, সেই সংযোগের দিক দিয়ে কোন সমস্যা ছিলনা। কথক বা ন্যারেটার  ছিল ‘কেন্দ্রবিন্দু’। অথোরের সঙ্গে— কথক তার শ্রোতাদের দেখতে পেত। আমার ধারণা যেটা কৃত্তিবাসের মধ্যে বুঝা যায়; আর অনেকের মধ্যেই বুঝা যায় যে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি মুড অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিতে পারতেন তার ন্যারেটিভকে। অর্থাৎ পরোক্ষভাবে হলেও সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত শ্রোতৃসমাজ। কিন্তু আমাদের তো এখন অসংযোগের সমস্যা! এই অসংযোগের সমস্যা কিন্তু আধুনিকতাবাদ এনে দিয়েছে এবং উপায় নেই কিছু! কারণ, পুঁথি-পত্রের যুগ থেকে আমরা মুদ্রণের যুগে প্রবেশ করে গেছি। ১৮০০ থেকে শেষ দিকে শ্রীরামপুরে যখন প্রেস প্রথম শুরু হলো এবং তার পরে ইউরোপ থেকে পাওয়া নভেলার আইডিয়া আমাদের নিজস্ব-ঐতিহ্য ছিল সেটাকে সম্পূর্ণ বিস্মরণ ঘটিয়ে দিল। একজনমাত্র একটু ফিরে তাকানোর চেষ্টা করেছিলেন, তাকে আমরা কেউ পাত্তা দেইনি। ১৮৯২ সালে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কঙ্কাবতী বলে তাঁর প্রথম উপন্যাসটা লিখেছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ (তাঁকে আমার প্রণাম জানিয়েই বলছি) সেটাকে বুঝতে পারেন নি। তার তাৎপর্যটা সুকুমার সেন (তাঁকেও আমার প্রণাম জানাচ্ছি) তাঁর বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস-এও কিন্তু কঙ্কাবতীর প্রতি একদম সুবিচার করেননি! বুঝতেই পারেন নি এর তাৎপর্যটা কোন জায়গায়! এটা কিন্তু আধুনিকতার বিরুদ্ধে প্রথম অস্ফুট প্রতিবাদ ছিল। কিন্তু সেটাকে ওইভাবে দেখানো আমাদের কেউ শেখায়নি। আমরা চিন্তা করিনি। আমাদের চিন্তটাও তো ‘স্ট্রাকচারড’ (‘আকরণ’গত বলি আমি)। সে যাই হোক, এইভাবে অনেকদিন কেটে গেল। ব্রিটিশ আমাদের থেকে বিদায় নিল, যেভাবেই হোক আমাদের ডিভাইড করে দিয়ে, বাঙালি জাতির চির-সর্বনাশ করে দিয়ে, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে তাদের ডিভাইড করে দিয়ে। এরপর যারা এলেন লিখলেন তারা কিন্তু আধুনিকতাবাদকেই কেবল কর্ষণ করতে লাগলেন অবিরত। এবং একটা সময় এটার বিরুদ্ধে কিছু প্রশ্ন জেগেছিল। সেই প্রশ্নটা জীবনানন্দ দাশ। এই মানুষটাকে কেউ লক্ষ করেনি। বড় কবি হিসাবে আমরা তাকে সেলাম দিই উপযুক্তভাবেই। কিন্তু তাঁর উপন্যাসগুলো সেদিন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি! আমার ধারণা, যদি সময়মতো আবিষ্কৃত হত এবং আমরা যদি ঠিকমত তাকে লক্ষ করতাম— তাঁর উপন্যাসগুলোকে উপন্যাস বলবো না আমি, ‘আখ্যান’ বলবো। যে কথাটা ইদানিং সর্বত্রই বেশি প্রচলিত উপন্যাসের চেয়ে উপন্যাস কথাটা যেমন ঠাকুরমার কাঁথার মতন পুরনো হয়ে গেছে। তো এর জায়গায় আখ্যান শব্দটা ব্যবহার করাকে আমি অনেক সমীচীন মনে করি। ঐ আখ্যানের একটা ধরন কিন্তু তিনি আমাদের দিয়েছিলেন। আমরা তা লক্ষ করলাম না, কারণ আমাদের তো চোখে চশমা পরা!

’৮৫-৮৬ সালে সেটা সম্পর্কে সেই অমিতাভ গুপ্তের কথায় ফিরে আসছি। কিছু প্রশ্ন সে তুলে ধরলো, কবিতায় মধ্য দিয়ে। মূল কথাগুলো কি উত্তরাধুনিকতার? আমরা যে আধুনিকতাবাদ নামক সোনার হরিণের পেছনে ছুটেছি, সেটা আমাদেরকে খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে এগিয়ে নিয়েছে। এবার আমি একটু আমার আলোচনাকে এখানে আপাতত থামিয়ে দুটো কথা বলতে চাইছি। মিখাইল বাখতিনকে স্মরণ করছি। সাহিত্যতাত্ত্বিক। সম্ভবত শ্রেষ্ঠসাহিত্য তাত্ত্বিকই বলব। কারণ, এত নতুন চিন্তাদর্শনবীজ এবং সামাজিকচেতনাসম্পন্ন চিন্তাবীজ আর কখনও কেউ উপহার দেননি। তিনি আমাদের বলেছেন। দেখ বাপু দু-ধরনের প্রতিবেদন সবসময় তৈরি হয় আমাদের সমাজে, সংস্কৃতিতে। একটা হচ্ছে ‘অফিশিয়াল ডির্সকোর্স’— সেটাকে আমরা বলতে পারি সরকারি বয়ান, সরকারি প্রতিবেদন। আর আরেকটা হচ্ছে ‘চিরপ্রতিবাদী’— একেবারে মাটি থেকে উঠে আসা ‘প্রকৃতিপুঞ্জ’। কথাটা পুরনো, সংস্কৃত। তো প্রকৃতিপুঞ্জ মানে হচ্ছে, জনসাধারণের মধ্যে থেকে উঠে আসা আন-অফিশিয়াল ডিসকোর্স। কেন আন-অফিশিয়াল? কারণ প্রতাপের জায়গায়, পাওয়ারের জায়গায় কেননা তারা কোনদিনই যেতে পরেনি। তোমরা কিছুদিন আগে ফুকোর কথা শুনেছো। তিনি বলেছেন, ‘পাওয়ার ইজ এভরি হয়ার’। প্রতাপ সর্বত্র রয়েছে। তো এই প্রতাপ থেকে তারা অনেক দূরে থাকে এবং তারা একেবারে উল্টোদিক থেকে গোটা পৃথিবীটাকে দেখে। যেটা সমাজের হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেটা তাদের নিজস্ব। এ সমস্ত হৃৎস্পন্দনজাত ডিসকোর্স তারা তৈরি করে। এটাকেই আমরা বলতে চাইছি ‘আন-অফিশিয়াল ডিসকোর্স’ বা বেসরকারি প্রতিবেদন। এই বেসরকারি প্রতিবেদন কী হতে পারে, অমিতাভ গুপ্ত সেদিকেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তাঁর উত্তর আধুনিক চেতনার ভূমিকা বলে একটা বইতে। এছাড়াও আরো অন্য বইতেও এ সম্পর্কিত বিষয় আছে। ঐ সময়ে কেউ কেউ, উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কলকাতার অঞ্জন সেনের কথা। তিনি এ ব্যপারে কবিতা লিখতেন। অত ভালো কবি হয়তো তিনি নন কিন্তু উত্তম প্রাবন্ধিক নিশ্চয়ই। নানাবিষয়ে চিন্তা করেন তিনি, ছবি সম্পর্কে তার ভাবনা আছে। এই কথা ধরে আর একটু আমি পেছনে ফিরে যেতে চাই। ত্রিশের দশকে কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য নামে একজন অসাধারণ দার্শনিক ছিলেন। তিনি মাত্র তিন পৃষ্ঠার একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এখন এটা ‘মননে স্বরাজ’ নামে বহু জায়গায় অনুবাদ হয়। তিনি এটা তখন লিখেছিলেন, যখন সম্পূর্ণভাবে আমাদের মন, আমাদের মগজ ধোলাই হয়ে গেছে, কন্টিনিউয়াসলি হচ্ছে— আর এখন উপগ্রহ, আকাশ-সংস্কৃতি সেটা করছে। সে যাই হোক, তিনি মননে স্বরাজ অর্জনের কথা বলেছিলেন। ঐ কথাটাই অমিতাভ গুপ্তরা ফিরিয়ে আনলেন। আর বাংলাদেশের চট্টগ্রামে তখন ‘লিরিক’ বলে একটা পত্রিকা বের হতো। তার সম্পাদক এজাজ ইউসুফী আমার অনুজপ্রতিম বন্ধু। তিনি এবং কবি জিল্লুর রহমান কিছু কিছু প্রবন্ধও লিখে এ সমস্ত বিষয় নিয়ে বেশ কিছু কথা বলতে শুরু করলেন। আর ঢাকায় আরেকজন খোন্দকার আশরাফ হোসেন, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, ‘একবিংশ’ পত্রিকার সম্পাদক এবং আশির দশকের অন্যতম কবি। তিনিও তাঁর পত্রিকায় এসম্পর্কিত অনেকগুলো লেখা লেখেন। আমি এই অধমও এর মধ্যে জুড়ে গিয়েছিলাম। যারা বিশ্বাস করে যে, আধুনিকতাবাদের বিরুদ্ধে একটা সর্বাত্মক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ আমাদের প্রয়োজন, এছাড়া আমাদের প্রাতিষ্ঠানিকতার গহ্বর থেকে— এটাকে আমি বলি ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর, এখান থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। সব আলো এটা শুষে নেয়, তাই ব্ল্যাকহোল আমাদের মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। এটার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ হিসাবে হয়েছিল। একটা সময় ছিল নব্বইয়ের দশকের একেবারে গোড়া পর্যন্ত, খুব বেশিদিন সেটা স্থায়ী হয়নি। বেশ কিছু তরুণ কবি— এখন আমি যতই তত্ত্বকথা বলি, কবিতায় যদি সেটা না-আসে, তাহলে তো হবে না। তো এ সময়ের পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও কিন্তু— ঐযে বললাম ‘কোন চোখে দেখব’, এটাই আমরা স্থির করে উঠতে পারলাম না আজ পর্যন্ত। সত্তরের দশকে পশ্চিমবাংলায় নানা ধরনের ঘটনা ঘটেছিল রাজনৈতিক প্রবাহ ঘটেছিল। তার কাছ থেকে কিন্নর রায় এসেছেন। ইনি জেলখাটা মানুষ, এটা জানো কিনা জানি না। তাঁর মৃত্যুকুসুম বলে উপন্যাসটি পড়ো, বেশ বড় উপন্যাস, অনেক কিছু জানতে পারবে। উনি নক্শাল আন্দোলনে অংশগ্রহণে জন্যে দীর্ঘদিন কারার প্রচীরে বন্দি ছিলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি লিখতে শুরু করেন। তাঁর একটা স্ট্রং, রাজনৈতিক কনটেন্ট আছে। যেমন কিন্নরের কথাই যদি বলি, তা সত্বেও আমি একটু ওভার-অল যদি দেখি, তাঁর মধ্যে বেসরকারি ডির্সকোর্স তৈরি করার একটা ইচ্ছে, একটা আকাক্সক্ষা এবং সামর্থ দেখেছিলাম। কেবল আকাক্সক্ষা থাকলেই হয় না, সামর্থও দরকার হয়।  সেটা তার আছে এবং তার থেকে বয়সে একটু বড়, এরা আমার বয়সের কাছাকাছি, কেউ একটু বড়, কেউ একটু ছোট, কেউ সমবয়সী। সাধন চট্টোপাধ্যায়, অভিজিৎ সেন, ভগীরথ মিশ্র এবং কিন্নর রায়ের কথা তো বললামই; অনিল ঘরাই— এরা অবশ্য বয়সে ছোট, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওর দুইটা কিডনিই শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে। এইরকম ছয়-সাতজন আমাদের সাথে ছিল। কয়েকজন এলেন গল্পে এবং উপন্যাসে। তাঁদের যে ধারা একটু আগে বলছিলাম নাগরিকতা, ভালো করে বললে কলকাতা মহানগরীর কথা, কলকাতার যে মহানাগরিক জীবন, তার যে একটা নিজস্ব বয়ান, সেই বয়ানই উঠে এসেছে।

আমার বিনয় ঘোষের কথা মনে হচ্ছে। তিনি বাংলার নবজাগৃতিতে একটা ফ্যান্টাসটিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘বলছো যে বাপু, আমাদের নবজাগরণ হলো— জাগল কারা?’ কলকাতা থেকে একটু দূরে এখনো তো মধ্যযুগের অন্ধকার, কুসংস্কার ধর্মতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ, ভীরুতা মেরুদ-হীনতা, তাহলে জাগলো কারা? জাগার লক্ষণটা কি? কলকাতার কিছু বাবু শ্রেণির, কিছু এলিট শ্রেণির, কিছু হিন্দুবাঙালি, তাও আবার উচ্চবিত্ত, এদের জাগরণই জাগরণ? এরা কারা? এরা সমাজকে… অথচ তারাই ওপিনিয়ন মুভারস। সমাজ তারাই তৈরি করে। আধুনিকতা কি, আধুনিকাতাবাদটাই যে সর্বশ্রেষ্ঠ, এটাসহ যাবতীয় এবং ঔপনিবেশিক শাসন গিয়ে, যখন নয়া ঔপনেবেশিক শাসন এলো, যেটাকে আমরা বলি নিও-কলোনিয়ালিজম, সেটা তোমার ঘাড়ের উপর বসে বা বুকের উপর বসে এখন রক্তপান করে না। তা নানা রকম পদ্ধতি আছে, সেটা দিয়ে করে। সেটা আমরা দেখেছি নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এবং তার পরে আমরা তো এখন সরাসরি পোস্টমডার্ন-এ এসে গেছি। এইবার আমি একটি কথা, যা আমি বারবার বলে ক্লান্ত বোধ করি আজকাল, বলতেও চাই না, সেটা হচ্ছে যে, ‘অনেক কিছুর মধ্যে রাজনীতি আছে’। ‘সাংস্কৃতিক-রাজনীতি’ কথাটা ফেডরিক জেনসন মশাই চমৎকারভাবে শুরু করেছিলেন তার পোস্ট মডার্নিটি দ্যা কালচারাল লজিক অব লেট ক্যাপিটালিজম বইতে। বইটা অনেক মোটা, কিন্তু খুব ভালো। ফেডরিক জেনসন এর আগে কালচারাল পলিটিকস বলে একটা ছোট বই লিখেছিলেন। সে বইটাও ভয়ানক ভাল বই। ‘ভয়ানক’ শব্দটা ভালো হলো না! খুব কাজের বই। এই ‘সাংস্কৃতিক-রাজনীতি’ ছাড়া কোনো শাসক তোমার মগজ ধোলাই করতে পারে না। আমরা এখনও সাংস্কৃতিক-রাজনীতি দ্বারা শাসিত। আমরা শতকরা নিরানব্বই ভাগই তা বুঝি না! তো যাগগে আমরা আগের কথায় ফিরে আসছি। ঐ রাজনৈতিক-সংস্কৃতির অঙ্গ হচ্ছে, যেটাকে বলে ‘পলিটিকস অব ভকাবুলারি’, শব্দবন্ধ কেড়ে নেওয়া। যে উত্তরাধুনিকতা শব্দটা উত্তরণের অর্থে ট্রান্সসেন্ডেন্সের অর্থে ব্যবহার করেছিলেন অমিতাভ গুপ্ত, অঞ্জন সেন কিংবা তপোধীর ভট্টাচার্যের মত কেউ একজন এবং খন্দকার আশরাফ হোসেন, জিল্লুর রহমান এবং এজাজ ইউসুফী, আরো আছেন মাসুদুল হক, এরকম আরো কয়েকজন আছেন। আরো অনেকজনের নাম হয়তো চট করে মনে পড়ছে না। সবাই মিলে একটা যৌথ কথা বলেছিলাম। মডার্নিজম বা আধুনিকতাবাদ সে কিন্তু ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাকে ব্যক্তিসর্বস্বতার নরকে রূপান্তরিত করে এবং সেই নরকে দীর্ঘস্থায়ী প্রবাস তারা তৈরি করে দেয়। এই জায়গাতেও একটা বড় প্রতিবাদ নিয়ে এসেছিল উত্তরাধুনিকতা। একদিকে যেখানে তথাকথিত মডার্নিজম, যেটা এতদিন ধরে চলছে, সেটা যখন আমাদের— যেটা বিষ্ণু দে বলেছিলেন অন্য প্রসঙ্গে, ‘ব্যক্তির হৃদয়ারণ্য থেকে নিস্ক্রমণ করা, বেরিয়ে আসা’— তার বদলে আমরা কেবল ব্যক্তিগত ব্যক্তিসর্বস্বতার নরক তৈরি করলাম! তার জায়গায় একটা সমষ্টি-চেতনাকে উদ্দীপিত করতে চায় উত্তরাধুনিকতা। এটিই নয় শুধু, তুমি যেটাকে বলছিলে ‘বিয়ন্ড’ অর্থাৎ আধুনিকতা, যেখানে গিয়ে শেষ হলো, শেষ আবার কি আধুনিকতা নিজেই তো অসমাপ্ত প্রকল্প। ইউরেগন হাবেরমাচ নামে একজন ভদ্রলোক এখনও জীবিত, তিনি বেশ কিছু বইপত্র লিখেছেন। উনি সমাজ বিজ্ঞানী, ঠিক সাহিত্য-তাত্ত্বিক নন। কাকে বাদ দিয়ে কাকে ধরি। সুতরাং তাঁর কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে। আমাদের মডার্নিটি এখন পর্যন্ত তোমার কমপ্লিট হলোনা হে, মডার্নিজম তো বাদ দাও। আরে তুমি এই যে আমাদের একদিকে মডার্নিটির দোহাই দেই কিন্তু আমাদের আঙ্গুলে কতগুলো আংটিতে, বিশেষ করে হিন্দুদের— আমরা একদিকে ফিজিক্সের ডি.এস.সি. — পদার্থবিদ্যার সূক্ষ্মতম বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করি, অথচ আমরা হাতে চার-পাচঁটা আংটি রাখি। হোয়াট ইজ দিস ননসেন্স গোয়িং অন! অন্য তত্ত্বকথা সব বাদ দাও বাপু। একেবারে ব্যক্তিগত জীবনাচারণের মধ্যে দেখো। ঐ যে, যেটা বলেছিলাম রাজা রামমোহন রায়ের সময় শুরু হয়েছিল। যে ‘এক মগজে দুটি প্রবণতা’র মালিক, যে তথাকথিত বাঙালি বুদ্ধিজীবী, যেটার সূচনা এইভাবে হয়েছিল প্যারাডক্স থেকে— এই প্যারাডক্স! তো আজও জ্বলছে! আরো অনেক সিরিয়াস ইস্যুতে চলে আসি।

এই বিয়ন্ড-মডার্নিজম মানে কি? মডার্নিজম আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে আমাদের সমস্ত শান্তি, স্বস্তি এবং ভাবাদর্শ। ভাবাদর্শকে শুধু কেড়ে নেয়নি, তারা কৌশলে কাউন্টার ইডিয়োলজি দিয়ে, প্রভাবাদর্শ দিয়ে আমাদেরকে ক্রমাগত আঘাত করেছে, বিচলিত করেছে! আমাদের আজ কোন কেন্দ্রই নেই! এই কাউন্টার ইডিয়োলজির যে আঘাত সেটাকেও মোকাবেলা করা কিন্তু উত্তরাধুনিকতা। কিন্তু করে যদি সুযোগ পাও, চট্টগ্রাম তো বেশি দূরে না, ‘লিরিক’র পুরনো কাগজ কোথাও না কোথাও পাবেই। সেগুলো পড়ে দেখো, বেশ কয়েকটা সংখ্যা ওরা করেছিল, ‘একবিংশ’ সংখ্যা— পুরনো সংখ্যা পড়ে দেখো, এটার মধ্যে অনেক কিছুর হদিস পেয়ে যাবে। আর আমি আমার ঐ আধুনিকতা : পর্ব থেকে পর্বান্তর বইটাতে তো লিখেছিই। এখন কথা হচ্ছে, একটা প্রতিবাদ কিন্তু ছিল। বিয়ন্ডনেস মানে হচ্ছে একটা প্রোটেস্টান্ট, একটা স্টান্ট। একটা প্রতিবাদী অবস্থান গ্রহণ করা, এই প্রতিবাদী অবস্থান গ্রহণ করাটা ছাড়া কোন সত্যিকারের অর্থে, ভাবে সাম্প্রতিক কেউ হতে পারে না। আধুনিকতা আর সাম্প্রতিকতা কিন্তু এক কথা নয়। ইংরেজি করে বললে মডার্নিটি আর কনটেম্পরারিটি এক কথা নয়, ঠিক সেই রকম। আমাদের আলোচনাকে আবার আমরা ফিরিয়ে আনি। তো তাহলে তার লক্ষণগুলো কি? ‘প্রাকৃতায়ন’। ফিরে যেতে হবে প্রকৃতিপুঞ্জের কাছে। ফিরে যেতে হবে মানুষের স্বভাবের কাছে, যে স্বভাবটা আচ্ছন্ন হয়ে গেছে নানা কারণে, যাকে আচ্ছন্ন করে দেয়া হয়েছে; আচ্ছন্ন করেছে প্রতাপ। প্রতাপের কত ধরনের তার স্ট্রাটেজি আছে, কৃতকৌশল আছে, চতুরতা আছে এগুলো আমরা বুঝতেই পারি না। এবং এজন্যে যেহেতু ‘রুলিং বাই কনসেন্ট’ হয় সেহেতু পোস্ট মডার্নিজম আমাদের এটাই শিখিয়েছে। যে পোস্ট মডার্নিজম আমাদের ক্রমাগত একটা আলোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ওটা যে ‘আলেয়া’, ওটা আমরা বুঝতেই পারছি না! এর চেয়েও বড় কথা হয়তো— তত তত্ত্বকথা নয়, কিন্তু ভেতরে তত্ত্ব আছে। আমরা বাঙালির জীবনে, তুমি এইখান থেকে সিলেটে যাও হে, সিলেট শহরের মধ্যে প্রচুর দুই-নম্বর তিন-নম্বর টাকা ওড়ে। সিলেটি হয়েই বলছি আমি কথাটা কিন্তু সিলেটের গ্রামাঞ্চলেও তো আমি গেছি, সেখানে তো এখনও মধ্যযুগের অন্ধকার! সিলেট বাদ দাও, আমি যেখানে থাকি আসামের দক্ষিণ প্রান্তের বাঙালি অধ্যুষিত বরাক নদীর ধার বয়ে গেছে যা সুরমা কুশিয়ারা হয়ে আবার মেঘনা হয়ে গেছে। সেখানে বরাকের অববাহিকা অঞ্চলে আমি থাকি সেখানে শিলচর একটা শহর কিন্তু শহরের মধ্যে এমনসব মানুষজন থাকে, তাদের মধ্যে নাগরিকতার যেন কোনো আলো আনে নি, আলেয়ার প্রভাবটার বলয় তৈরি করা ছাড়া! এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, আমরা কিন্তু এইভাবে ‘এক অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’— এগুলো আমার কথা নয়, এগুলো বিখ্যাত কবির লাইন আমি তোমাদের বললাম। আমাদের এটাই হচ্ছে আজকের সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গা, যেখানে ক্রমাগত আমাদের আত্মতার সঙ্গে— বিচ্ছেদ ঘটে যাচ্ছে! আর শুধু তাই না, যেটা আমাদের সেলফুড হতে পারত, আমাদের আত্মতা হতে পারত, তার সঙ্গে গোটা জগতের— যে জগতের সঙ্গে তোমার কনস্টান্ট মিথষ্ক্রিয়া ইন্টারেকশন হচ্ছে, তাকে তোমার থেকে ‘অপর’ করে দিয়েছে, ‘আদার’ করে দিয়েছে, অপর— আদার করে দিয়েছে, বহিষ্কৃত অপর এক্সক্লুডেড আদার এবং এটা থেকে আর সেতু তৈরি করার কোনো পথ আমরা খুঁজে পাচ্ছি না! অন্তত এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমরা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। এবং আজকের বাংলাসাহিত্যে মনে হলো পোস্ট মডার্নিজম না হলে, বিশেষ করে মনে রাখতে হবে যে, বিলম্বিত পুঁজিবাদ যখন আজকে পুরো বাণিজ্য-পুঁজিতে রূপান্তরিত হলো এবং সবকিছুই যখন নিয়ন্ত্রণ; সোভিয়েত রাশিয়া ধ্বংস হওয়ার পরে এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পরে, পূর্ব ইউরোপ জুড়ে এবং অনত্র যখন কাউন্টার ইডিয়োলজির সন্ত্রাস তৈরি হলো, তখন আমরা বিশ্বাসকে আর বিশ্বাস করতে পারলাম না! আমাদের জীবন থেকে বিশ্বাসটাই উড়ে গেল, কর্পূরের মত উবে গেল! এটা আমরা কিছুতেই বিশ্বাস করি না, আমরা নিজেদেরই বিশ্বাস করি না, আমি আমার ছায়াকেও বিশ্বাস করি না! এ রকম একটা পরিস্থিতে আমরা এসে গেছি। ফলে একটা উৎকেন্দ্রিক করে দেওয়ার জন্য— বিশেষ করে তরুণ সমাজকে, বিশেষ করে বৌদ্ধিক সমাজকে, বিশেষ করে লেখক সমাজকে, বিশেষ করে শিল্পী সমাজকে অনবরত আয়োজন চলছে। কারণ, অনবরত হাতছানি আছে যে, ‘দিয়োতাং বুহ্যতাং’ বলে সংস্কৃতিতে যে, দাও ভোগ কর— যে দাও ভোগ কর— এক সম্ভূকসর্বস্ব পণ্যায়নের দুনিয়া! মনে রাখতে হবে, আজকে তোমার ঔপনিবেশিক মডার্নিটি মডার্নিজমে রূপান্তরিত হয়ে, তারপর নিও-কলোনিয়ালিজম হয়ে যে জায়গায় এসেছে…  … পোস্ট-কলোনিয়োলিজম আবার কিন্তু একটা সদর্থক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এইখানে একটা অসম্ভব জটিল জিনিস তৈরি হয়েছে। কারণ, বিদেশের কোনো কোনো তাত্ত্বিক ইচ্ছে করেই এসব করে। তারা বলে, পোস্ট মডার্র্নিটি আর পোস্ট- কলোনিয়ালিজম এক সঙ্গে চলে। এটা কি করে হতে পারে যে, খাদ্য এবং খাদক একই সঙ্গে চলবে! এটা একটা খুব জটিল জায়গা। এখন আমাদের কতকগুলো কথা মাথায় রাখতে হবে যে, পোস্ট-কলোনিয়ালিজম বলতে আমরা এক্জাক্টলি কি বুঝি? এটার জন্যে বইতো পড়তেই হবে, তার চেয়ে বেশি কথা হচ্ছে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। তাত্ত্বিক কথা তো আছে, তত্ত্বকে কি করে প্রয়োগের মাধ্যমে রূপান্তরিত করতে হয়, কি করে টেস্ট করে নিতে হয়? প্রতিদিনে, বাস্তবে এটা কিন্তু একটা বড় কাজ এবং এটার জন্যে হোমি ভাবার দ্যা লোকেশন অব ক্যালচার আমাদের পড়া দরকার। কারণ, কালচারের তো একটা লোকেশন আছে। ডিসলোকেডেড ক্যালচার বলতে কিছু হয় না। সবকিছু স্পেসেফিক লোকালিটি দিয়ে এবং আরো অনেক কিছু দিয়ে। আমি একটু বিশেষ অর্থে ব্যবহার করলাম। এছাড়া আরো অনেক বই আছে, এখন এটা নিয়েও আমি আরো বিস্তারিত বহু কথা বলতে পারতাম আমার যেটা মনে হয় তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন আর সময় দেয়া যাচ্ছে না। এটা তোলা রইল।

[বোধিচিত্ত : ‘আলাপ’ ॥ ঢাকা]

***************************************************

 

মৌলবাদ, পোস্টমডার্নিজম ও উত্তর আধুনিকতা : বিভ্রান্তির প্রতি-উত্তর
এজাজ ইউসুফী

ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঔপনিবেশিক আধুনিকতার আত্মকেন্দ্রিকতা ও উচ্চমন্যতা থেকে মুক্ত করে দেশ, কাল ও বাঙালি সংস্কৃতি এবং কৃষ্টির নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সঙ্গে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-দর্শনচর্চাকে সম্পৃক্ত করার সৃষ্টিশীল মানসে বাংলাদেশে প্রথম যখন ছোটকাগজ লিরিক-এর মাধ্যমে উত্তর আধুনিকতার কনসেপ্টটিকে ভিত্তি দেয়ার কাজ শুরু হয়, তখন থেকেই রাজধানীকেন্দ্রিক কিছু কবি, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী এর প্রতি নিন্দা ও অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তারা একটি দার্শনিক প্রত্যয় অšে¦ষণের প্রচেষ্টাকে হাস্যকরভাবে উড়িয়ে দেয়ার মনোভাব পোষণ করতেন। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, উত্তর আধুনিকতার অন্তর্নিহিত শক্তির উন্মেষ তত বেশি করে প্রতিভাত হতে শুরু করে আমাদের চিন্তার জগতে এবং সৃজনশীল মাধ্যমগুলোতে। দিন যেতেই অবজ্ঞা ও নিন্দার বিপদ সম্পর্কে শঙ্কিত হয়ে নিজেদের ‘শিল্প সাহিত্যের গুরু’ ভেবে বসা এসব বুদ্ধিজীবী ও কবিবৃন্দ (ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে) রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলে উত্তর আধুনিকতার তত্ত্বটিকে পুঁজি করে এবং তাকে নানা নামে (পোস্টমডার্নিজম, প্রলম্বিত আধুনিক, দেশজ আধুনিক, অধুনান্তিক, অব্যাহত আধুনিক) আখ্যায়িত করে পরের ধনে পোদ্দারি করতে শুরু করেন। ইতোমধ্যেই অনেক অধ্যাপক, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এ দেশীয় চামু-া, অচল কবি, বয়সের ভারে ন্যুব্জ বুদ্ধিজীবী, কিছু পাঁড় মৌলবাদী তাদের স্ব স্ব প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে, তরুণদের মধ্যে থেকে কিছু স্তাবক জুটিয়ে, লিটলম্যাগ প্রকাশ করে, নিজেদের উত্তর আধুনিকতার পথিকৃৎ হিসেবে তুলে ধরার এক কিম্ভূত প্রতিযোগিতায় মেতেছেন। ঢাকা নামক ‘কিষ্কিন্ধা’য় বসবাসকারী এসব কিন্নর পুরুষদের (কিছু নমস্য ব্যক্তি ছাড়া) ঘেঁটু হয়ে জুটেছে মৌলবাদের ণড়ঁহম ডরহম। এরা উত্তর আধুনিকতার আধ্যাত্মিকতার সূক্ষ্ম ও তার বিশাল পরিপ্রেক্ষিত চেতনাকে বুঝতে না পেরে (অবশ্য বুঝবার কথাও নয়, আল্লাহ্ এদের চোখে ঠুলি পরিয়ে দিয়েছেন) উন্মাদগ্রস্ততায় তাকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যাওয়ার বাজখাঁই ফতোয়া দিয়ে চলেছেন। এরা যেমন নিরুদ্বিগণ সমর্থন পাচ্ছেন, ভ- প্রগতিবাদীদের কাছ থেকে, তেমনি নানা ইসলামী ফাউন্ডেশন। এবং ‘এনকেলাব’ জাতীয় পত্রিকাগুলোও দিয়ে যাচ্ছে সমান পৃষ্ঠপোষকতা। তাই উত্তর আধুনিকতা বিতর্ক এবং আমাদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এর গৌরবময় চর্চা ও লালনের মাধ্যমে আমরা যতটুকু ঋদ্ধ হবো ভেবেছিলাম এখন সেখানে জমা হয়েছে পারত্রিক মেঘ। বৈলক্ষণ্যে এখন উপলদ্ধি হচ্ছে, আমরা কি তাহলে বাংলা কবিতার কান ধরে মৌলবাদের খোঁয়াড়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে স্বেচ্ছায়? নাকি আমাদেরসহ বিশ্বের তাবৎ শিল্প সাহিত্য মৌলবাদের কাছে আত্মকেন্দ্রিক হতে বসেছে? এর উত্তর জানা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।

আজ এর সহজ উত্তর হচ্ছে : মৌলবাদ ও ধর্মীয় উগ্রতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা বিশ্বব্যাপী তার এক নতুন চেহারা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। সোভিয়েত মার্কসবাদের অবনমনে এবং ইউরোপ-আমেরিকার হাইটেক সংস্কৃতির যাঁতাকলে পিষ্ট মানবকুল চড়ংঃসড়ফবৎহরংস-এর মাধ্যমে তার হারানো ধর্মীয় চেতনা ও পারিবারিক সহানুভূতির বোধ ও সম্পর্কগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে চাইছে। কিন্তু বাংলাদেশের আঁতেলরা চড়ংঃসড়ফবৎহরংস আমাদনি করতে গিয়ে মৌলবাদের রসদ যোগানোর কাজটি সেরেছেন সবার অলক্ষ্যে। তারই সূত্র ধরে বাংলাদেশে এতদিনকার পরাজিত ও অবনমিত শক্তি প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদ হালে পানি পেয়ে ব্যতিক্রম এক চেহারায় উপস্থিত হওয়ার আঞ্জাম শুরু করেছে আঁটঘাট বেঁধেই। এদের সঙ্গে নেপথ্য গুরুর বেশে এক সময়কার র‌্যাডিকেল মার্কসিস্টরাও জুটে আল্লাহ’র আরশ কাঁপিয়ে তোলার জিগির ধরেছেন। ফলে ধনবাদ, উপনিবেশবাদ ও তাদের অবক্ষয়ী প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে নিজেদের ভূমিজ ও মানুষকেন্দ্রিক, বৈষম্যহীন, প্রগতিপন্থী এবং নয়া সমাজ-বিনির্মাণের রক্ষাকবচ উত্তর আধুনিকতা সম্পর্কে ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিভ্রান্তির উত্তর ইতোপূর্বে আমরা আমাদের প্রতিটি একক ও সম্মিলিত লেখায় দেয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু যেহেতু আমরা লিটলম্যাগকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র শক্তি তাই সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠানিকতার কাছে বার বার কোরবানি হয়েছি এবং হচ্ছি। তবে, আমরা যখন মানবমুক্তির দ্বন্দ্ব সংগ্রামে শরিক হয়েছি তখন মৃত্যুই কেবল ফেরাতে পারে। তাই মৌলবাদ বিষয়ক বিভ্রান্তির প্রত্যুত্তরে ব্যতিক্রম ও প্রাসঙ্গিকভাবেই এ লেখায় চলে এসেছে কিছু খিস্তি-খেউড়, অশ্লীল শব্দাবলী এবং সে ভাষার প্রয়োগই নিচে কিছু ভাবনা সন্নিবেশিত হলো।

পোস্টমডার্ন-মিডিয়া ও মৌলবাদ

বর্তমান সময়ে মার্শাল ম্যাকলুহানকথিত বৈশ্বিক গ্রাম এর ধারণায় পোস্টমডার্ন অডিও-ভিজুয়্যাল মিডিয়া খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মিডিয়ার কবল থেকে কোনো কিছুই মুক্ত নয়। আসলে এ আগ্রাসী মিডিয়াই পুরো বিশ্বকে একটি গ্রামের চেহারার আদল দিয়েছে। অবাধ তথ্য প্রবাহ বিশ্বের মানুষকে খুব কাছাকাছি নিয়ে এলেও এর ভয়াল থাবার নিচে পড়ে যে কোনো ভালো জিনিসও যেমন কুৎসিত রূপ ধারণ করতে পারে, তেমনি কোনো অপাঙ্ক্তেয় বস্তুও মানুষের সহানুভূতি লাভে সমর্থ হচ্ছে। তাই পূর্ব-পশ্চিম, হিন্দু-মুসলিম বা বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র একে কোনোভাবেই বিভক্ত করতে অক্ষম। এ কারণে ম্যাকুলুহান একে পশ্চাৎপদ কিংবা মৌলিক সংস্কৃতি ইধপশধিৎফ ড়ৎ ঙৎধষ ঈঁষঃঁৎব বলে আখ্যায়িত করেছেন। আজকের দিনে ক্ষমতা ও আধিপত্যকে বোঝার জন্য মিডিয়ার প্রকৃতি ও প্রভাব কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। পোস্টমডার্নিজম বর্তমান মিডিয়া যুগের সঙ্গে যুগপৎ সহাবস্থানের তৈরি করেছে। যেহেতু মিডিয়া মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে অনুমোদন করেই ক্ষান্ত হন না সঙ্গে সঙ্গে পুনরুত্থানবাদী প্রবণতাকেও প্রচার করে।

আজকে ভারতে দ্রুত হিন্দু পুনরুজ্জীবনের পেছনে ভারতীয় স্যাটালাইট মিডিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচারের ভূমিকা নিয়েছে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ছদ্মাবরণে উগ্র দেশপ্রেম এবং নানা ধরনের চলচ্চিত্র ও অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে হিন্দু পুনরুজ্জীবনের প্রবণতা লক্ষণীয়। যেমন এ. আর. রহমানের সুরে ও গাওয়া ‘মা তুঝে সালাম, বন্দে মাতারাম’ গানটির কথা ভাবা যেতে পারে। দু’টো সাম্প্রদায়িক স্লোগানের ভিত্তিতেই ভারত বিভক্তি হয়ে গিয়েছিল। আর একটি হল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, অপরটি ‘বন্দেমাতরম’। আসলে এভাবেই স্যাটালাইট মিডিয়ায় অনেকটা বিনোদন এবং আপাতানির্দোষ উপস্থাপনার পেছনে কাজ করে সূক্ষ্ম মৌলবাদী প্রবণতা। এ মিডিয়ার কল্যাণেই ভারতীয়দের নব্য দেশপ্রেম এমন এক স্তরে পৌছেছে যে : উগ্র মৌলবাদী কিংবা র‌্যাডিক্যাল প্রগতিশীল উভয়েই ‘ওহফরধহরংস’-এর প্রবল সমর্থকরূপে আবির্ভূত হয়েছে। এটি আবার শেষ পর্যন্ত ঐরহফঁরংস-এ পর্যবসিত হয়।

মূলত মিডিয়ার দোর্দ- প্রতাপের ফলেই মৌলবাদ আজ আর কোনো অঞ্চলে কিংবা বিশেষ সীমানায় আবদ্ধ নয়, তা আজ বৈশ্বিক চরিত্র অর্জন করেছে। এর আগে দেখা গেছে হয়ত বিশেষ কোনো অঞ্চলে উগ্র ধর্মীয় উত্থানের ফলে মৌলবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে। কিন্তু পরাক্রান্ত মিডিয়া আজ তাকে বৃহত্তর পরিধিতে স্থাপন করেছে। তাই এটি আত্ম-উপলদ্ধি এবং আত্ম-পরিচয়ের ক্ষেত্রে অগ্নিকু-ে জ্বালানির ভূমিকা নিয়েছে বলা যায়। আজকে পোস্টমডার্ন মিডিয়ার যুগে আত্ম-পরিচয় অনুসন্ধানের নামে প্রতিক্রিয়াশীলতা— রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, রাজনীতি এমনকি শিল্প সাহিত্যেও অনুপ্রবেশ করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর স্বাধীনতা প্রদানকালে ১৯৯১ সালে বিশেষ করে বাল্টিক দেশগুলোর স্বাধীনতা প্রসঙ্গে গর্বাচেভ ধর্মীয় পুনরুত্থানের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে : এই ধর্মীয় উন্মাদনা সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোকে গ্রাস করেত পারে। আজকের ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, যুগোস্লভিয়া, বাসনিয়াসহ এতদঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর দিকে তাকালেই গর্বাচেভের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য বলে প্রমাণিত হয়। পুনরুজ্জীবনবাদী প্রবণতা বৃহৎ আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা, সেটি পুঁজিবাদী হোক কিংবা সমাজতান্ত্রিক পুনজ্জীবন, তা কোনো ক্রমেই বহুত্ববাদ (চষঁৎধষরংস)-কে সহ্য করতে পারছে না। অন্যদিকে নয়া বহুত্ববাদের নামে আসলে ঘৃণাকেই পুঁজি করা হয়েছে। তাই পুনজ্জীবনবাদ আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন দেশে ও অঞ্চলের মধ্যেও সংঘাত তৈরি করেছে। শক্তিশালী পশ্চিমা মিডিয়া ঘৃণার বশবর্তী হয়ে ইসলামকে কুৎসিত, অসহিষ্ণু এবং হিংস্র ধর্মীয় মৌলবাদী উন্মাদনার সাথে জড়িয়ে ফেলায় সারা বিশ্বের পশ্চৎপদ, দরিদ্র, মধ্যপন্থী মুসলিমদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপন্থী মুসলমানদের স্থলে উগ্র মুসলমানদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটেছে দ্রুত।

তাছাড়া মিডিয়ার কল্যাণেই আবার সে খবর গোটা বিশ্বে পৌঁছে যাচ্ছে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। অশনধৎ ঝ. অযসবফ তার চড়ংঃসড়ফবৎহরংস ধহফ ওংষধস, চৎবফরপধসবহঃ ধহফ চৎড়সরংব গ্রন্থে মিডিয়ার এ চরিত্রটি তুলে ধরতে গিয়ে নিজেই অন্য এক গোঁড়ামির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। আকবর পশ্চিমা মিডিয়াকে ধমীয় পুনরুজ্জীবনবাদী প্রবণতার জন্য দায়ী করলেও নানা দেশে উগ্র ইসলামী মৌলবাদী উত্থান তাঁর চোখে তো পড়েইনি; উপরন্ত তিনি মৌলবাদকেই বর্তমান অস্থিরতার মহৌষধ মনে করেন। অন্য এক ধরনের ধর্মীয় জিগির থেকে পশ্চিমা মিডিয়াকে আক্রমণ করেছেন এভাবে :

The Word fundamentalism has come to mean ungly, intolerant and violent religious fanaticism in the western media; it is also a code, sometime subliminal, sometime explicit, for Islam.

কিন্তু তিনি এটা দেখতে ব্যর্থ হন যে, আলজিরিয়ার কোনো মৌলবাদীর মৃত্যু কিংবা ওসামা বিন লাদেনের সন্ত্রাসী কোনো কর্মকা-ের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের যে কোনো ব্যবস্থায় কোনোরূপ সুস্থ বিবেচনা ব্যতিরেকেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের উগ্র মুসলিমদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং মিছিল মিটিং কিংবা কুশপুত্তলিকা দাহ করার ঘটনা ঘটে। তবে আকবর একটি জিনিস স্বীকার করেছেন : ধর্মীয় ছাড়াও যে কোনো মতবাদ শেষতক মৌলবাদী চরিত্র অর্জন করতে পারে। মার্কসবাদ, লেলিনবাদ কিংবা মাওবাদও মৌলবাদী গোঁড়ামির শেকল পরতে পারে। আর যেমন পারে পুঁজিবাদী বিশ্বের বাজার ব্যবস্থার উপর সর্বাত্মক বিশ্বাস মৌলবাদী চরিত্র নিতে। যেমন আধুনিক মতবাদে বিশ্বাসীরা আধুনিকতাকেই শাশ্বত ও ধ্রুব হিসেবে বিবেচনা করে সেই পশ্চাৎপদ মৌলবাদী মানসিকতার বশবর্তী হয়েই। তাই এ মানসিকতাকে ধারণ করেই গড়ফবৎহরংস পুঁজিবাদকে সঙ্গী করে র‌্যাডিকেল চরিত্র বর্জন করছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীরাও অনেকটা না বুঝেই এই মৌলবাদী প্রবণতার কাছে আত্মসমর্পণ করে বসেছে এই বলে যে, ‘আধুনিকতা’ সর্বকালীন। কিন্তু খোদ পাশ্চাত্যে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই চড়ংঃসড়ফবৎহরংস-এর জন্ম হয়েছে।

কিন্তু মৌলবাদীরা চড়ংঃসড়ফবৎহরংস-কে রেহাই দিতে প্রস্তুত নয়। তারা ইতোমধ্যেই একে নিয়ে নির্বাপণ ক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। পোস্টমডার্নিজমকে মৌলবাদ চরিত্র দিতে বিভিন্ন দেশের মৌলবাদীরা যেমন তৎপর, তেমনি এদেশীয় কিছু র‌্যাডিকেল মার্কসিস্টও তাকে সেদিকে ঠেলে দিতে বদ্ধপরিকর। অথচ পোস্টমডার্নিজম সব পুরনোকে প্রশ্ন করে এবং প্রথাবদ্ধতাকে নাকচ করে দিয়েই তার যাত্রা শুরু করে। যেমন র‌্যাডিকেল মার্কসবাদীরা মনে করেন যে, মার্কসবাদ অনড় এবং অপরিবর্তনীয়। কিন্তু পোস্টমডার্নিজম সেখানেই প্রশ্ন তুলে বলছে, কোনো কিছুই আর অনড় কিংবা জড় নয়, সবকিছুই নিয়ত পরিবর্তনশীল এবং মার্কসকথিত দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ কাজটি সুসম্পন্ন হয়। কিন্তু পোস্টমডার্নিজমের এই বৈপ্লবিক ধারণাকে পাশ কাটিয়ে আকবর এস, আহমেদের মতো কিছু তথাকথিত পোস্টমডার্নিস্ট সরাসরি মৌলবাদের পক্ষে ওকালতি শুরু করেছেন। তারা বলেছেন যে, মৌলবাদ পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে পোস্টমডার্নিজমের একটা যোগাযোগ ও সূত্রাবদ্ধতা আছে। ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে পোস্টমডার্নিজমের কারণ ও প্রতিক্রিয়ার বিশেষ যোগ রয়েছে। Akbar S. Ahmed Zuvi Postmodernism and Islam, Predicament and Promise গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে বলেছেন :

The connection between post modernism and ethno-religious revivalism or fundamentalism need to be explored by social and political scientists. Post modernists, it would appear, are better philosopher than they are anthropologists. While nothing the fragmentation of social and political ideas and shifts in thought. Postmodernists fail to link this process with the rivival of ethnicity and religious fundamentalism. Where nothing is sacred. Every belief becomes revisable. Thus fundamentalism is the attempt to resolve how to live in a world or radical doubt. It is a dialoges with the times  a response to it. The unsettling contradictions and tension we note in the major world religionse are a result of the transnational moves towards unity; the questions of the multiple interpretation of religions is thus also raised. In fact an agrument can be made by the ethno-religious revivalism in both cause and effect of postmodrnism.

তিনি সরাসরি মৌলবাদের সমর্থক এবং মৌলবাদী উত্থানের সঙ্গে পোস্টমডার্নিজমকে সম্পৃক্ত করতে চাইছেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীও এটিকে ধর্ম সংলগ্ন করতে তৎপর। এরা হচ্ছেন আল মাহমুদ, ফরহাদ মজহার, সালাউদ্দিন আইয়ুব, ইশারফ হোসেন প্রমুখ। তারা একই সঙ্গে চেষ্টা করেছেন ঢ়ড়ংঃসড়ফৎহরংস ও বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের সেক্যুলার উত্তর আধুনিকতার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে একটি ইসলামী এবং ধর্মীয় মৌলবাদী পুনরুজ্জীবনের। আগেই বলেছিলাম, রাজধানীকেন্দ্রিক সুবিধাভোগী তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এরকম এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে চলেছেন।

উত্তর আধুনিকতা বা আধুনিকতা-কে কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় আঁটা যাবে না। এর তাত্ত্বিকেরা একে কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় বাঁধার চেষ্টা করেননি। সাহিত্য পত্রিকা ‘হাওয়া ৪৯’-এ (দ্বাদশ সংখ্যা ১৯৯৭) কলিম খান তার বিশুদ্ধিবাদ ও পোস্টমডার্নিজম প্রবন্ধ লিখেছেন : ‘আধুনিকতাকে অর্থাৎ ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে মৌলবাদ গ্রাস করে নিয়েছে— এ কথা বিশুদ্ধবাদ নিশ্চিতরূপে জানলেও, এ কথা মস্তিষ্ক দিয়ে বোঝার উপায় তথাকথিত উত্তরাধুনিকতার হাতে নেই। কারণ সে উপায় ভারতের ইতিহাসে ‘সংগোপিত’ যা একমাত্র বিশুদ্ধিবাদই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু কে যেন আধুনিকতাকে গ্রাস করে ফেলেছে, সে আর শুভসুন্দর নেই, এ কথা উত্তরাধুনিকতা  হৃদয় দিয়ে বুঝে ফেলে— তাই সে আধুনিকতা বিরোধী! বিরোধ দুভাবেই— একদিকে আধুনিকতা থেকে পেছন পানে যাওয়ার একটা নেতিবাচক ঝোঁক, আর একদিকে আধুনিকতাকে ছাপিয়ে যাওয়ার একটা ইতিবাচক প্রবণতা।’ অথচ আধুনিকতার ভিত্তিমূলে ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যেগুলোর সত্য ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু কালক্রমে মূল জায়গাতেই চিড় ধরে, এবং শেষ পর্যন্ত মৌলবাদী চরিত্র অর্জন করে ও কায়েমী স্বার্থ বলে সে একই রকম অনুবর্তনে বিশ্বাসী। কারণ পরিবর্তনের সুযোগ তার আর নেই। ক্রটিপূর্ণ এক ক্লেদাক্ত চেহারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপই উত্তর আধুনিকতার উদ্ভব ও বিকাশ। মানব সভ্যতাকে বার বার মুক্তি মহাআখ্যানে বিশ্বাস করানো হয়েছে। কখনো তা ধর্মের বাতাবরণে, কখনো আধুনিক সমাজবিজ্ঞানরূপে সমগ্র মানুষ মুক্তির প্রচারক হিসেবে।

কাল মার্কস হচ্ছেন গণমানুষের সর্বশেষ ত্রাতা। কিন্তু মৌলবাদ শেষতক তাঁকেও গ্রাস করেছে। তাই আজকের বিশ্বে সংকীর্ণ ও তত্ত্বান্ধ মার্কসবাদীদের উৎপাত, খোদ সর্বহারার রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। যে মতবাদ ‘ভাঙবার’ জন্য ছিল উন্মুখ, আজ সেটিই স্থিতাবস্থার মূল প্রচারক। সমাজতন্ত্র পুনরাবৃত্তিমূলক মৌলবাদী জীবননীতি গ্রহণ করে বিপ্লব ভুলতে বসেছে। আমাদের এ নিয়ে তেমন কোনো ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। কারণ আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও বণিক মন এতদূর পর্যন্ত শেকড় ছড়িয়েছে যে, পশ্চিমারা ভালো বললে আমরা তার ধুয়ো ধরি, এবং খারাপ বললে এক বাক্যে তার নাকচ করে দিই। অথচ যে পশ্চিম মৌলবাদী উত্থানের প্রধান হোতা, তারই বিশ্বের প্রান্তিক বর্গের লোকদের দোষারোপ করে এই বলে যে, এরা ধর্মীয় উন্মাদনায় মৌলবাদকে ডেকে আনছে। মার্কিন পুঁজিবাদের অভিভাবক আধুনিকতার লোভী ও আগ্রাসী হাত থেকে মুক্তি কিংবা সমাজতান্ত্রিকদের জ্ঞানতাত্ত্বিক অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য আমরা তেমনভাবে লড়তে জানি না। যারা মুক্তি ও জ্ঞান দিয়ে লড়তে পারতেন সেইসব প্রগতিবাদী নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করেন যে, একমাত্র মার্কসবাদ (ক্রটিপূর্ণ)-ই নাকি সর্বমানবের মুক্তির স্মারক। অর্থাৎ প্রান্তিক মানুষেরা প্রতিবারই এই ঐতিহাসিক লড়াই-এ পশ্চিমাদের হাতে মার খেয়ে যায়। কখনো পুঁজি তাকে নিয়ন্ত্রণ করে বশে রাখে, কখনো পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্ব তাদের সামনে মুক্তির গ্র্যান্ড মিথ হিসেবে হাজির হয়ে জিতে নেয় সবকিছু। আমরা মিশেল ফুকোর সূত্র জ্ঞান ও ক্ষমতা তথা ক্ষমতার রাজনীতি যে বিযুক্ত নয়, তাকে ভুলে বসে এক একটি পশ্চিমা মতবাদের সামনেই সাষ্টাঙ্গে প্রণত হই, সিজদায় আনত হই। কিন্তু আলবেয়ার কামুর বিদ্রোহে সঙ্গে একমত হতে ভয় পাই। অথচ কামু তাঁর ঞযব জবনবষ বই-এ বলেছেন, ‘মার্কসীয় তত্ত্ব অর্থনীতি দ্বারা নির্ধারিত, তাই এটি কেবলমাত্র উৎপাদনের বিগত ইাতহাস বর্ণনা করতে পারে, কিন্তু সম্ভাবনার পরিধিতে বিরাজ করা ভবিষ্যৎকে নয়।’ শেষ পর্যন্ত দেখা যায় যে, কালের কোনো পরিধিতেই আমাদের নিজস্ব কোনো বক্তব্য নেই। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমাদের অসহায়তার কথাও বর্ণনা করেন পশ্চিমের উদার ও সংস্কারপন্থী জ্ঞান-বৃক্ষরা। তাদের প্রসাদ পেলে পর আমাদের ব্যাঙের লম্ফঝম্ফ শুরু হয়ে যায়। এসব জ্ঞান-বৃক্ষরা আমাদের হয়ে তাদের স্বজাতি এবং স্বধর্মীয়দের বিরুদ্ধে লড়েন। তাঁদের এ ধরনের মহৎ প্রচেষ্টার বিবরণ আছে ঊফধিৎফ ড. ঝধরফ-এর ঈঁষঃঁৎব ধহফ ওসঢ়বৎরধষরংস গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে। এই গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন :

Most important, the grand narratives of emancipation and enlightenment mobilized people in the colonial world to rise up and throw off imperial subjection; in the process, many Euoropeans and Americans were also stirred by these stories and their protagonists, and they too fought for new narrative of equality and human community.

আমরা কখনো বুঝতে চাইনি পশ্চিমের এক একটি মতবাদ আমাদের জন্য কত ধরনের ক্ষতি বহন করে এনেছে। আধুনিকতার ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা পুঁজিবাদ কিংবা সমাজবাদ উভয়েই মনে করে তারা মানব সভ্যতার অগ্রগতি করে চলেছে। তাই তারা গড়ে তোলে সার্বজনীন প্রগতির ‘মিথ’। শেষ পর্যন্ত মানুষের চেয়ে মানবমুক্তির তত্ত্বই প্রগতীবাদীদের কাজে জরুরি হয়ে পড়ে। তাই পশ্চিমা জ্ঞান-বৃক্ষ লিওতারকেই বলতে হয় :

উদারতন্ত্র এবং মার্কসবাদ, দুটি শতাব্দী জুড়ে, মানুষের বিরুদ্ধে জঘন্য আপরাধ করে গেছে, মানব মুক্তির নামে।’ কিন্তু আমাদের মৌলবাদী মন আধুনিকতাকে ধ্রুব সত্য বলে জেনেছে। তাই অন্য সব কিছুর প্রতি চোখ কান বন্ধ রেখে আধুনিকতাকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস রাখতে ব্যস্ত। অথচ লিওতার-এর মতানুযায়ী— ‘আধুনান্তিক হলো সমসাময়িক পাশ্চাত্য সভ্যতার চলতি অবস্থা। আধুনান্তিÍকে পৌঁছে মেটা-ন্যারেটিভ বা পেল্লাই গপ্পো বা মহাআখ্যান মানে ইতিহাসের দর্শন, যেমন একটু আগেই আমরা দেখলুম ইউরোপের আলোকপ্রাপ্তির আখ্যান, যার মাধ্যমে যুক্তি ও স্বাধীনতার একনাগাড় প্রগতির গল্প বলা হয়েছে, কিংবা হেগেল-এর সত্তার ডায়ালেকটিক, কিংবা মার্কস-এর শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে পাওয়া সর্বহারার বিপ্লবের শেষে মানব সমাজের উৎপাদিকা শক্তির এগিয়ে চলা। বৈধতার সমস্যা সুরাহা করার আধুনিক উপায় বাতলায় মহাআখ্যানগুলো, যেন তারা সবজান্তা।

[পোস্টমডার্নিজম : আধুনান্তিকতা, মলয় রায়চৌধুরী, হাওয়া ৪৯]

কিন্তু আমরা দর্শনের  ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়েছি বলেই দুর্ভোগ কাটনো সম্ভব হচ্ছে না। দর্শনচর্চার মাধ্যমে সত্যানুসন্ধান আমরা করতে পরিনি বলেই পশ্চিমা দর্শন ও সংস্কৃতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চলেছি। স্ববিরোধিতার এক মহান জালে আটকা পড়েছি আমরা। কবে এর থেকে মুক্তি? তা অবশ্যই জানি না একথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। ফলে এসব তত্ত্বে আমাদের প্রশ্নহীন আনুগত্য এক ধরনের ফান্ডামেন্টালিজম কিংবা মৌলবাদ সৃষ্টি করছে। আমাদের নিজেদের কোনো দার্শনিক কিংবা চিন্তার ভিত্তি না থাকায় আমাদের মধ্যে পশ্চিমা বিভিন্ন তত্ত্বকেই আঁকড়ে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এ অন্ধ বিশ্বাসই আমাদের মধ্যে মৌলবাদী ধারণাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। তাই নতুনতর বিকশিত চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সে-সব পশ্চিমী মতবাদকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারিনি।

মৌলবাদ, কায়েমী স্বার্থ ও বাঙালির চরিত্রলক্ষণ

দুরকম মৌলবাদ হতে পারে। একটি ধর্মীয় মৌলবাদ এবং অন্যটি তাত্ত্বিক মৌলবাদ। তবে কথা হচ্ছে, মৌলবাদ এ কথাটি বাংলা ভাষায় চালু হয়েছে তা খুব বেশি দিনের কথা নয়। অন্যদিকে, ইংরেজিতে ঋঁহফধসবহঃধষরংস কথাটি বহু পুরনো। মূলত এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা মৌলবাদ কথাটি চালু করেছি। তাছাড়া মৌলবাদের বহুমুখী চরিত্রের কথা ভুলে গিয়ে আমরা একে শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার সাথে সম্পৃক্ত করেছি। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে এই মৌলবাদ বা ঋঁহফধসবহঃধষরংসকেও আমারা সেই পশ্চিমা থেকে চয়ন করেছি। খ্রিস্টধর্মে, একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠী বিগত শতাব্দীতে আমেরিকায় এ মতবাদের জন্ম দিয়েছিল। এরা বাইবেলকে অপরিবর্তনীয় ও বিতর্কতিতভাবে গ্রহণের মাধ্যমে জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বর্জন করে এবং বাইবেলের সমালোচনাকারীদের তীব্রভাবে ঘৃণা করতো। তারা গড়ফবৎহরংসর মতাদর্শিক যুক্তিবাদ এবং বিশেষত বিবর্তনবাদকে অস্বীকারের মাধ্যমেই তাদের মূলানুগত্য বা ঋঁহফধসবহঃধষরংস-কে গড়ে তোলে। পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে বৈজ্ঞনিক চিন্তা-চেতনার ক্রমবিকাশ, প্রযুক্তিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ধর্মের অস্তিত্ব যখন হুমকির মুখে পড়ে তখন এরা প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে চরম প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী মতাদর্শের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এই ভিত্তির মূলে ছিল যিশুর পুনরুত্থান (জবংঁৎৎবপঃরড়হ)। কুমারী মায়ের গর্ভে তাঁর জন্ম সম্পর্কে বিশ্বাস এবং যিশু খ্রিস্ট খুব শীঘ্রই দ্বিতীয়বার মুক্তির ত্রাতা হিসেবে মর্তে আগমন করছেন এর উপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন। এরই পথ ধরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ক্রমবর্ধমান উদারনীতিবাদের উত্থানের ব্যাপারে সন্ত্রস্ত হয়েই ১৯১৯ সালে নিউইয়র্কে ‘ওয়ার্ল্ডস্ ক্রিশ্চিয়ান ফান্ডামেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের’ মহা সম্মেলনের মাধ্যমে এর ভিত্তি ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমেরিকায় এখনো সেই ঋঁহফধসবহঃধষরংঃ-রা বহাল তবিয়তেই রয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকায় মানুষের প্রগতি-বিরোধী, বিবর্তন বিরোধী যে মৌলবাদের সৃষ্টি হয়েছিল তার অনুকরণে ভারতবর্ষেও ফান্ডামেন্টালিজমের বিকাশ ঘটে। মূলত ধর্মরক্ষার জন্য এর বিকাশ হলেও এখনকার আধুনিক মৌলবাদীরা ঘৃণা, বিদ্বেষ এবং জঙ্গি কর্মকা-ের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের আকাক্সক্ষাকে রপ্ত করেছে। সুতরাং মৌলবাদের আন্তর্জাতিকীকরণ ও সাধারণীকরণ ঘটেছে বলা যায়। এর মৌলিক চরিত্র লক্ষণগুলো হচ্ছে, পেছনে ফিরে যাওয়ার আকাক্সক্ষা বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। ধর্মীয় সংর্কীণতা, ধর্মান্ধতা এবং যুক্তিবোধ ও বিজ্ঞান মনস্কতাকে সম্পূর্ণভাবেই বিনষ্ট করে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ভিত্তিকে মজবুত করা। আমেরিকার ফান্ডামেন্টালিজম নামের এই সংগঠিত ধর্মীয় আন্দোলনকে আমরা ধর্ম রক্ষাসহ ধর্মবিরোধী বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এবং সংখ্যালঘু শ্রেণির উপর শোষণ ও কর্তৃত্বের জন্য গ্রহণ করেছি এবং একে (১) ধর্মীয় মৌলবাদ ও (২) রাজনৈতিক মৌলবাদের রূপ দিয়েছি। আমেরিকান ঋঁহফধসবহঃধষরংঃ-রা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উস্কানি দিয়ে হাজার হাজার লোকের প্রাণহানিতে প্রত্যক্ষ মদত না যোগালেও কিন্তু আমরা আমাদের জঙ্গি ও হিংস্র মৌলবাদের মাধ্যমে তাই ঘটাচ্ছি অহরহ। মৌলবাদ ধর্মের মূল ভিত্তিগুলোকে টিকিয়ে রাখার তাগিদে সৃষ্টি হলেও এখানকার মৌলবাদ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ধর্মীয় মৌলবাদ মূলত হতাশা ও নেতিবাচক অবস্থার ফসল। ধর্মীয় বাণীকে শাশ্বত সত্য করে আঁকড়ে ধরে মানুষের বিকাশকে অস্বীকার করা এবং ধর্মকে ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহারই ধর্মীয় মৌলবাদের মূল ভিত্তি। এছাড়া সাম্প্রদায়িকতা এবং নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বজ্ঞান থেকেও ধর্মীয় মৌলবাদ রসদ সংগ্রহ করে থকে। ধর্মীয় মৌলবাদীরা সবসময়ই শাসক শ্রেণির একটি অংশও তীব্রভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে। সে মানুষের সভ্যতার অগ্রগমন ও মানুষের সব শুভ চেতনার বিরোধী। ধর্ম ছাড়া ধর্মীয় মৌলবাদের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। মূলত ধর্মের রীতিনীতি, অনুশাসন, বাণী, নির্দেশগুলোকে লালিত-পালিত করার জন্যই এর সৃষ্টি। ধর্মীয় মৌলবাদ ধর্মান্ধতাকেই পুঁজি করে বেঁচে থাকে। ধর্মীয় মৌলবাদীরা সমাজের অপরাপর মানুষের কাছ থেকে ধর্ম সম্পর্কে ‘দ্বিধাহীন বিশ্বাস ও প্রশ্নহীন আনুগত্য তথা চূড়ান্ত কর্তৃত্ববাদ’ আশা করে। সে ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিহার করে ও ধর্মবিরোধী যুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বিরুদ্ধে জেহাদে রত হয়। এরা ধর্মকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িকতার উস্কানি দেয়। অন্য ধর্মের লোকের উপর জবরদস্তি করতেও দ্বিধা করে না।

অন্যদিকে এর চেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে মৌলবাদের রাজনীতিকীকরণ। আমেরিকার ঋঁহফধসবহঃধষরংঃ-দের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের তেমন কোনো প্রচেষ্টা ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশসহ ভারতের মৌলবাদীদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে একটি মৌলবাদ রাষ্ট্র কায়েম করা। আমাদের  দেশের মৌলবাদী ও তীব্র সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতা বিরোধী দল জামায়েত ইসলামী চায় বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে। মুক্তিযুদ্ধের এই পরাজিত শক্র আমাদের আধা-বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিহীনতার সুযোগে যুদ্ধের মাত্র ২৮ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হলেও জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে বার বার। বিগত ’৯৬ এর সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে নির্বাচন করলেও ’৯০ এ (বিএনপি সঙ্গে) নির্বাচনের চেয়েও তারা কম আসন পেয়েছে। অর্থাৎ দেশের বৃহৎ গণতাতন্ত্রিক দল বলে পরিচিত ও মুক্তিযুদ্ধে সপক্ষে শক্তি হিসেবে চিহ্নিত আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত সত্ত্বেও তারা জনগণের কাছে মার খেয়েছে। যাই হোক, জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য হচ্ছে, ইসলাম ধর্মের মূল মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা নয়, বরং ইসলামের নামে দলীয় স্বার্থ হাসিল করে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল তথা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। এ কারণেই জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি জঙ্গি ও স্বার্থসিদ্ধির সংকীর্ণতায় আবদ্ধ এবং মরিয়া।

মৌলবাদ তথা ঋঁহফধসবহঃধষরংস-র আরো একটি প্রগতিশীল রূপ বর্তমানে বিশ্বকে বেশ নাড়া দিচ্ছে। তা হলো রাজনৈতিক মৌলবাদ। ধর্মকে সরিয়ে দিয়ে বিশ্বে যে আধুনিকতা ও তার যুক্তিবাদের প্রসার ঘটেছিল তা কালক্রমে আজ তার প্রগতিশীল চরিত্র হারিয়ে মৌলবাদী প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। অবক্ষয়ী পুঁজিবাদের দোসর হিসেবে আধুনিক মতবাদ বা গড়ফবৎহরংস আজ নিজের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার স্বার্থে মৌলবাদী মানসিকতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে পুঁজিবাদী শোষণ মুক্তির জন্য যে মার্কসবাদের উদ্ভব ঘটেছিল তাও শেষতক  মৌলবাদী পরিম-লে নিজেকে সীমিত করে ফেলেছে। কারণ, মৌলবাদ সবসময় ধর্ম ও ঈশ্বর বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত নয়, তা রাজনৈতিক মতাদর্শের ক্ষেত্রেও প্রবেশ ঘটেছে। যার ফলে ধর্ম ও  ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তাকে চূড়ান্তভাবে খারিজ করে দিয়ে এবং দ্বন্দ্বমূলক ঐতিহাসিক বস্তুবাদী তত্ত্বকে সঙ্গী করে যে মার্কসবাদের উদ্ভব তাকেও সামনে রেখ আজ মৌলবাদী আচরণের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। মৌলবাদের উৎস সন্ধানে গ্রন্থে ড. ভবানী প্রসাদ সাহু ধর্মীয় মৌলবাদ ও রাজনৈতিক মৌলবাদকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :

ধর্মীয় মৌলবাদীদের থেকে রাজনৈতিক মৌলবাদীদের একটি বড় তফাৎ এখানে যে, রাজনৈতিক মৌলবাদীরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী না-ও হতে পারে, এমনকি ঈশ্বরে অবিশ্বাসী বা তথাকথিত ‘নাস্তিক’ (অন্তত বাহ্যিকভাবে) হতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষ কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা মার্কসবাদের নাম করে কিছু কিছু রাজনৈতিক দল বা তথাকথিত কম্যুনিস্ট পার্টির মধ্যে এই লক্ষণ যখন দেখা যায়, তখন ধর্মীয় মৌলবাদীদের থেকে তাদের এই  পার্থক্যের দিকটি পরিষ্কার হয়। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তারাও ঈশ্বরের পরিবর্তে তাদের পিতৃসুলভ তত্ত্বটিকে একই ভঙ্গিমায় একই আসনে বসায়। ‘মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ ইহা সত্য’ — এই ধরনের পোস্টারও প্রচার এখন বেশ দেখা যাচ্ছে। তথাকথিত মার্কসবাদী বা কম্যুনিস্টদের মধ্যে অন্যত্রও এই মানসিকাতার রকমফের দুর্লভ নয়। (যথাসম্ভব বিশ্বের নানা স্থানে মার্কসবাদ বা কম্যুনিজম ও সমাজন্ত্রের তথাকথিত বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আপন তত্ত্বের মাহাত্ম্য পুনঃপতিষ্ঠার তাড়নায় তা করা হয়েছে)। মার্কসবাদকে এইভাবে বিচ্ছিন্নভাবে ‘সর্বশক্তিমান’ হিসেবে ব্যাপক প্রচার করার বালখিল্যসুলভ (কিংবা অমার্কসীয়) প্রচেষ্টার মধ্যে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরে ভক্তির দিকটিই ভিন্নভাবে পরিস্ফুট হয়। মার্কস নিজেও কখনো তাঁর নিজের তত্ত্বকে সর্বশক্তিমান হিসেবে দাবি বা প্রচার করেছেন বলে জানা নেই। বরং যে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন তার ভিত্তি, ওই অনুযায়ী মার্কসের তত্ত্বের যুগোপযোগী পরিবর্তন, বৈজ্ঞানিক পরিমার্জন ও গোঁড়ামিমুক্ত সমালোচনার ধারাই তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

বাংলাদেশেও মার্কসবাদকে নিয়ে এমন ধরনের মৌলবাদী মানসিকতার বিকাশ ঘটেছে। এসব ভ- ও অক্ষম এবং হতাশাগ্রস্থ মার্কসবাদী এখনো মনে করেন যে, প্রযুক্তির এই বিকাশের যুগেও একমাত্র এবং একমাত্র মর্কসবাদই রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্ব কায়েম করে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি ঘটাতে পারে। এখানেই তারা মার্কসের বস্তুবাদী তত্ত্বটিকে গোঁড়ামির শেকল পরিয়ে দেয়। তারা বিশ্বাস করে যে, মার্কসের তত্ত্ব সার্বিকভাবে নির্ভুল, অপরিবর্তনীয়, পরিমার্জনারহিত এবং সর্বশক্তিমান, এক ও অদ্বিতীয়। কিন্তু বিজ্ঞানের শিক্ষা একথা বলে না। কারণ আজকে যা বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য আগামীতে তার রূপ পরিবর্তন হতে পারে। আর বিগত দিন যা সত্য ছিল আজ তা নয়। মানব-মানবীর যৌন সর্ম্পক ছাড়া কোনো সন্তান উৎপাদন সম্ভব নয়, এককালে এটাই ছিল বৈজ্ঞানিক সত্য। কিন্তু আজ ক্লোনিং ও জিন প্রযুক্তির যুগে বৈজ্ঞানিক সত্য পরিবর্তন হয়েছে নতুনতর বৈজ্ঞানিক সত্যে। কিন্তু মৌলবাদী মার্কসবাদীরা বিজ্ঞানের এ সত্যকে মানতে নারাজ। তারা মার্কসবাদকে সর্বশক্তিমান জেনেছেন, কারণ লেলিন বলেছেন তাই। লেলিন ঞযৎবব ংড়ঁৎপবং ধহফ ঃযৎবব পড়সঢ়ড়হবহঃ ঢ়ধৎঃং ড়ভ গধৎীংরস গ্রন্থে বলেছেন : ‘ঞযব গধৎীরংস ফড়পঃৎরহব রং ঙসহরঢ়ড়ঃবহঃ নবপধঁংব রঃ রং ঃৎঁব.’। এই উক্তির উপর ভিত্তি করেই মার্কসবাদের উপর তথাকথিত কম্যুনিস্টদের বিশ্বাস প্রশ্নহীন এবং দ্বিধাহীন। এরূপ আনুগত্য একজন কস্টম্যুনিস্টকে শেষ পর্যন্ত মৌলবাদের কাছেই সমর্পণ করে। আর তাই যারাই মার্কসবাদের সমালোচানা করে তাকেই প্রতিক্রিয়াশীল, শ্রেণিশত্রু এবং চক্রান্তকারী হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এভাবেই বস্তুবাদী মার্কসবাদ গোঁড়ামির শেকল পরে নেয়। এ কারণে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গে তাদের ভিত্তিগত তেমন তফাৎ নেই বলেই সিপিবি-র পোস্টারে লেখা হয়, ‘ধর্ম-কর্ম-জমি-কাজ কম্যুনিস্ট পার্টির দাবি আজ’। এসব মার্কসিস্টদের দেখা যায় মৌলবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল নেতাদের সঙ্গে হাত মেলাতে এবং আধা সামন্তবাদী, আধা বুর্জোয়া দলগুলোর লেজুড় হিসেবে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য লড়াই করতে। বস্তুবাদী মার্কসবাদকে সঠিকভাবে না বোঝা, স্বার্থপর, ক্ষমতালিপ্সু ও অশিক্ষিত মার্কসবাদীদের খপ্পরে পড়েই বর্তমানে মার্কসবাদের এরকম দুরাবস্থা। এরাই মার্কসবাদী মৌলবাদের জন্ম দিয়ে চলেছে। তারা মার্কসের দার্শনিক এর আদলটি খসিয়ে সেখানে মহামানব তথা নবীর আদল বসিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে ড. ভবানী প্রসাদ সাহু বলেন : ‘ধর্মীয় মৌলবাদীরা রাম বা কৃষ্ণের মত এক একটি চরিত্রকে বেছে নিয়ে অন্ধভাবে তার মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠায় নামে, রাজনৈতিক মৌলবাদীরাও মার্কস-এঙ্গেলস-লেলিন-স্টালিন-মাও সে তুং (শিবদাস ঘোষ-মহাত্মা গান্ধী-(ইন্দিরা গান্ধী-রাজীব গান্ধী) দের প্রতি অন্ধ ব্যক্তিপূজা শুরু করে। এঁদের কোনো ধরনের সমালোচনাকেই প্রতিক্রিয়াশীল বা সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর অন্তর্ভুক্ত বলে ছাপ মেরে দেয়া হয়।’

বাংলাদেশেও এই ব্যক্তিপূজা চলছে কখনো গণতন্ত্রের লেবাসধারী দলের ছত্রছায়ায়, কখনো মৌলবাদী শক্তির পদতলে। তবে ভারতের মতো বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ কিংবা রাজনীতিক মৌলবাদ ততটা জোরালো নয়। এখানে শিক্ষিতের হার তেমন ব্যাপক নয়, সাংস্কৃতিক মানও খুব গভীর তা বলা যায় না। এ কারণে ধর্মের আচার ও তত্ত্বের প্রতি তাদের তেমন কোনো জোরালো সমর্থনও নেই। সত্যি বলতে কি বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ মানুষ ধর্মে বিশ্বাস করলেও কিন্তু ধর্মীয় অনুশীলন তেমনভাবে তাদের মধ্যে উপস্থিত নয়। পশ্চাৎপদতার কারণে ধর্ম সর্ম্পকে তাদের জ্ঞান সীমিত শুধুমাত্র বিশ্বাস ব্যতীত। ধর্মের তাত্ত্বিকতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের মানুষকে মৌলবাদের পথে পরিচালিত করা সহজ নয়। বরং ধর্মের অজস্র ভুল ব্যাখ্যাসহ ক্ষেত্র বিশেষে হাস্যকর ধরনের (অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মোল্লা শ্রেণির) ফতোয়া ছাড়া ধর্মীয় দর্শনের ভিত্তিতে তাকে পরিচালিত করার (যেমন ইরান, নাইজেরিয়া, বসনিয়া) প্রেক্ষাপট বাংলাদেশে বিদ্যমান নয়। কিন্তু ধর্মের রাজনীতিকীকরণে ব্যাপকভাবে হয়েছে। ধর্মকে রাজনীতিক স্বার্থে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলের জন্য একদা মুসলিম লীগ, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পরাজিত শক্তি জামায়াতে ইসলামী, এবং নানা সময়ে গণতন্ত্রিক লেবাসধারী (আওয়ামী লীগ, বিএনপি) দলগুলোও প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার প্রভাব বলয় টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই বিভিন্ন সময়ে এসব দলগুলোকে মদত ও শক্তি যুগিয়েছে। মুুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ও প্রগতিশীল চেতনার ধারক বলে স্বীকৃত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও শেষতক ধর্মের সঙ্গে আপসরফা করেই ক্ষমতায় বসতে পেরেছে। এবং সে জন্য তাকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও জোট বাঁধতে হয়। আওয়ামী লীগ তার প্রগতিশীল চরিত্র খসিয়েই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সিঁড়িতে পা দিয়েছে। অবশ্য তা না করলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সমর্থন পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হতো না। তা না হলে তার ক্ষমতায় যাওয়ার পথও হতো রুদ্ধ। আর বিএনপি তো ধর্মকে ব্রহ্মাস্ত্রের মতো ব্যবহার করে চলেছে।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার প্রাণভোমরা পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই ধর্মকে আশ্রয় করে টিকে থাকতে চায়। সে কারণেই এক সময় এই শক্তি বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের জুজু তৈরি করে তার বিরুদ্ধে লড়াই-এ নেমেছিল এবং শেষতক টিকে যেতে সমর্থ হয়। সে লড়াইয়ে সে সমাজতান্ত্রিক উত্থানের বিরুদ্ধে ধর্মকেই মহান ও মানব-সহিষ্ণুতার প্রতীক করে তুলেছিল। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের অবনমনের পর পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তাকে ইসলামী পুনরুত্থানের জুজু তৈরি করতে হয়েছে বর্তমানে। বিশ্বব্যাপী বহুধাবিভক্ত অর্থনীতিক, রাজনীতিক, দার্শনিক ও শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা দরিদ্র-প্রায় মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে সংগঠিত করার কাজে নেমেছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অগ্রসর করার পরিবর্তে তাদের ঠেলে দিচ্ছে হীনম্মন্যতা ও মৌলবাদের কোলে। তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এ কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। এই শক্তি আলজেরিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করে সেখানে মৌলবাদের উত্থান ঘটায় এবং আফগানিস্তানে সমাজবাদী সরকারকে হটানোর লক্ষ্যে জঙ্গি মুসলিম মৌলবাদের জন্ম দেয়। ফলে তারই ঔরসে জন্ম নিয়েছিল লাদেনের মতো উগ্র মৌলবাদী। মোদ্দা কথা, পৃথিবীব্যাপী পশ্চাৎপদ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এই পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইঁদুর-বেড়াল খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই শক্তি পাকিস্তানি সামরিক ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তি দোসর হিসেবে কাজ করেছিল। আজকে যখন বাঙালি জাতি এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম করছে, তখনো তারা মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটিয়ে সেই অগ্রযাত্রাকে রুখে দিতে বদ্ধপরিকর।

ধর্ম ও মৌলবাদের মধ্যে একটা দূর-অন্বয় থাকলেও উভয়ের মধ্যে ব্যাপক স্বাতন্ত্র্যও আছে। ধার্মিক ব্যক্তিরা প্রধানত জাগতিক দুঃখ ভোগ থেকে পরিত্রাণ কিংবা মৃত্যুর অবসকিউরিটির কারণে ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়। তারা নিজের আত্মিক মুক্তির জন্যই ধর্মনিষ্ঠ হয়ে থাকেন। ‘কোথা থেকে এলাম’ ‘কোথায় যাব’ দর্শনের এই সমস্যা একজন সাধারণ মানুষকেও আলোড়িত করে এবং সে এর কোনো সঠিক উত্তর না পেয়ে ধর্মীয় বিশ্বাসে নিজেকে সমর্পিত করে। তাছাড়া প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তি মনে করেন যে, ধর্মনিষ্ঠার পুরস্কার তিনি পরকালে পাবেন। বর্তমানের মুনাফা কিংবা ক্ষমতালাভ তার কাছে কাম্য নয়। কারণ, সে তো পরলোকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে। কিন্তু মৌলবাদ নগদ মুনাফা চায়, ক্ষমাতায় ভাগ বসাতে চায়। অবশ্য তারা এক্ষেত্রে এক ধরনের চাতুরীর আশ্রয় নেয়। তারা বলে যে, ধর্মরাষ্ট্র কায়েম না হলে প্রকৃত ধর্মাচরণ সেখানে সম্ভব নয়। তাই তাকে জিহাদ কিংবা ক্রুসেড অধবা ধর্মযুদ্ধে জয়ী হতে হবে। ফলে দেখা যায় ঐহিক স্বার্থেই মৌলবাদ ধর্মীয় আচার-আচারণকে পুঁজি করে তার কাজ হাসিল করতে চায়। সুতরাং মৌলবাদী হওয়ার জন্য ধর্মে সম্পূর্ণ সমর্পিত হওয়া কিংবা পরকালে পুরস্কৃত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মকে পরকালে চাবিকাঠি মনে করেন। ফলে তারা পরকালেন সুখভোগের জন্যই ধর্মে সমর্পিত হন। তারা জাগতিক দুঃখকে আল্লাহর মর্জি বলে মেনে নেয় এবং তা পরিবর্তনের তেমন চেষ্টা করেন না। কিন্তু মৌলবাদীরা যেহেতু ইহজাগতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করে সেজন্য তান নগদপ্রাপ্তির প্রয়োজন পড়ে। মৌলবাদ সেজন্য ভয়ঙ্কর। তবে ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি ক্রমাগতভাবে ধর্মচর্চার মাধ্যমে মৌলবাদীতে পরিণত হতে পরে। কারণ ধর্মচর্চার সঙ্গে মৌলবাদের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। কিন্তু বাংলাদেশে তেমন ধরনের মৌলবাদের প্রসার ঘটেছে বলা যাবে না। আমার জানি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পুঁজিবাদ তথা ধনতন্ত্রের বিকাশ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান এবং জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের বিকাশের পর্যায়ে মানুষ ধর্মানুগত্যের প্রতি শৈথিল্য প্রদর্শন করেছে বলেই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের উন্মেষ ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা সমাজ জীবনেও প্রভাব বিস্তার করে এবং জনগণকে ধর্মনিরপেক্ষ হতে সাহায্য করে। কিন্তু ভারতবর্ষে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। এই উপমহাদেশে বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটলেও তাতে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ছিল :

ঔপনিবেশিক শাসনের পূর্বে ভারতবর্ষে বা মধ্যেপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করুন। ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটালো বৃটিশ শাসন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের শাসনভারও চলে এলো ফরাসী বা ইংরেজি উপনিবেশবাদীদের হাতে। ফলে হারানো ক্ষমতা উদ্ধারের যে বৃহদাকারের সংগ্রাম জন্ম নিল, সেগুলো যুক্তিসঙ্গতভাবেই অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ পেল ধর্মীয় আচ্ছাদনে। এভাবে ধর্ম সম্পৃক্ত হলো এবং একটি প্রতিবাদী ধারা হিসেবে আবির্ভূত হলো জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বহুমুখী স্রোতধারায়।

[তৃতীয় বিশ্ব, ধর্ম ও সমাজ বিপ্লব, বদরুল আলম খান, ১১১ পৃষ্ঠা]

এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মাত্র বাংলাদেশে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার চেতনা থেকে এবং মুষ্টিমেয় স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া এতে দেশের সংখ্যাগোরিষ্ঠ মানুষের ব্যাপক সমর্থন ছিল। যদি অধিকাংশ মানুষের সমর্থন না থাকতো তবে একই ধর্মাবলম্বী ঔপনিবেশিক ঘাতক পাকিস্তানিদের হটানো সম্ভব ছিল না। অথচ এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্ম-বিশ্বাসী, কিন্তু আচরণের দিক থেকে সর্বধর্মমতের প্রতি সহিষ্ণু এবং ক্ষেত্র বিশেষে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের। তবে তাকে বানচাল কারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে এদেশের মুষ্টিমেয় মৌলবাদী। তারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল বিশেষের মদতপুষ্ট হয়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচী নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে। ইদানিং তার কিছুটা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মৌলবাদীরা তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনীতিক স্বার্থেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার স্তরটি বিনষ্ট করতে তৎপর। তাছাড়া এরা সমর্থন পাচ্ছে, স্বার্থান্বেষী নব্য পুঁজিপতিদের কাছ থকে। কারণ ধর্মীয় উত্থান হলে তাদের শোষণের চাকাটি বেশ সুচারূই হয়। মূলত শ্রেণিস্বার্থে পুঁজিপতিরা মৌলবাদীদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছে এবং একসঙ্গে পথ হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। তারা বাংলাদেশের ব্যক্তি-মানুষের ধর্ম উপলব্ধিকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী মৌলবাদী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে চায়। আর বাংলাদেশের এমন এক ক্রান্তিলগ্নেই আমরা উত্তর আধুনিকতার চর্চা শুরু করেছি এবং বলছি যে, এর সঙ্গে মৌলবাদ তো দূরে থাকুক প্রতিষ্ঠানিক ধর্মেরও কোনো দূরসম্পর্ক নেই। আছে লৌকিক ধর্ম কিংবা মিথের প্রতি সক্রিয় গমন।

লৌকিক ধর্ম, উত্তর আধুনিকতা ও সম্মিলিত ঐতিহ্য স্থাপন

লৌকিক ধর্ম যদিও বিজ্ঞান চিন্তা ও যুক্তিবাদের বিপরীতে তবুও এর একটি উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে লৌকিক ধর্মকে ভ্রান্ত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তার একটি সার্বজনীন আবেদন রয়েছে। লৌকিক ধর্ম অন্ধ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও তা কখনোই মৌলবাদের মতো মানবতা বিরোধী তত্ত্বে পর্যবসিত হতে পারে না। আবেগের স্বতঃস্ফূর্ততায় তা সকল ধর্মের মানুষকে পারস্পরিক সৌহার্দ্যে স্থাপন করে। তাই লোকধর্ম প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের উগ্রবাদী কিংবা মৌলবাদীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। কট্টর ধর্মীয় ব্যক্তিদের কাছে সূফী বাউল, বৈষ্ণবরা গ্রাহ্য হয় না। এছাড়া মৌলবাদের অন্যতম চরিত্র লক্ষ হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা, সেখানে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের আরাধ্য লোকধর্ম তাদের কাছে প্রবলভাবে পরিত্যক্ত। লোকধর্মে শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা নেই, আছে সম্মিলনের উদারনীতিক জমিন। অন্যদিকে প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের যুক্তি হচ্ছে, নিজ ধর্মই শ্রেষ্ঠ। তাই মৌলবাদীরা সূফী, বাউল কিংবা বৈষ্ণবদের আধ্যাত্মিকতাবাদকে প্রচ- রকম ঘৃণা করে, সকল রকম সংকীর্ণতা দিয়ে তার পথ রুদ্ধ করতে চায়। মৌলবাদ চায় ধর্মের প্রথা ও শৃঙ্খলাকে ফিরিয়ে আনতে। সে জন্য তাকে হতে হয় অতীতমুখীন। অন্যদিকে, লোকধর্ম বিশ্বাস-নির্ভর হয়েও মানুষকে সকল শৃঙ্খল মুক্ত করতে চায়। মুক্তি দিতে চায় মন পাখিকে। সে ইহ-জগতের সকল দুঃখভোগ ও তুচ্ছতা থেকে ঈশ্বর তথা পরমাত্মা তথা মহান মুক্তির সন্ধান করে। এ পথ ভুল হলেও এ পথে বিধর্মী-নিধন কিংবা মানবতাকে লাঞ্ছিত করার প্রবণতা নেই লোকধর্ম সাম্প্রদায়িকতার বদলে সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতপাতভেদে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলে। আর সে কারণেই তা মৌলবাদ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতিস্পর্ধী শক্তিকে অসাধারণ ব্যাপ্তিতে ধারণ করে। তাই বিজ্ঞাপন পর্ব অক্টোবর ’৯০ সংখ্যায় ইরাবান বসুরায় লিখেছেন :

সূফি বা বাউলের ধর্মমত মৌলবাদের কাছে গ্রাহ্য হতে পারে না। এই মতগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মমতের বাইরের নিজেদের স্বতন্ত্র এক অভিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে— কোনো কোনো সময়ে তারও প্রয়োজন হয়নি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় দেখা যায়, এরকম কোনো উদারনীতিক ধর্মমতের আওতায় না গিয়েও, তারা যে যার নিজস্ব ধর্মকে বজায় রেখেও মিলতে পেরেছে কোনো সার্বজনীন ধর্মস্থানে, পীরের দরগায় বা অন্য কোনোখানে ভিন্নধর্মের পালাপর্বণে যোগ দিতে পেরেছে শুধু দর্শক হিসেবে নয়, আংশগ্রহণকারী হিসেবেই। সাম্প্রদায়িকতার বিষ যখন বেশি উগ্র হয়ে উঠেছে, তখন হয়ত বাধা এসেছে — কিন্তু তা সাময়িক। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিদ্বেষ অন্য সম্প্রদায়কে নিজের ধর্মের পরিধিতে থামতে বাধা দেয়, অর্থাৎ তার আক্রমণ অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে, আর মৌলবাদ তার নিজের ধর্মের মানুষকে আটকায় অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে মেলামেশায়, ভাব বিনিময়ে— অর্থাৎ সে পীড়ন চালায় নিজের ধর্মের মধ্যেই, আক্রমণ করে তার নিজে লোকজনকেই।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী। কিন্তু মৌলবাদী তারা নয়, তবে ভাববাদী তো অবশ্যই। তবে তার ভাবের যোগ লোকধর্মের সঙ্গে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও মৌলবাদী উত্থান রোধ করতে এবং মানুষের মানবতা ও সুকুমার বোধকে বাঁচিয়ে রাখতেই আজকের উত্তর আধুনিকতার দার্শনিক প্রত্যয় খোঁজা হচ্ছে। এদেশে অশিক্ষা, দারিদ্র, সংস্কার বিশ্বাসসহ মানুষের অতীন্দ্রিয় কিংবা আধ্যাত্মিক চেতনার শেকড় এত গভীরে প্রোথিত যে, তাকে শুধুমাত্র সমাজবাদী তত্ত্বের কপচানিতেই উপড়ে ফেলা অসম্ভব। এ কারণে উত্তর আধুনিকতা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাসের পরিবর্তে মানুষের লোকধর্মে বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেয় এবং চেতনার স্তর একটা উন্নত পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত তাকে সমর্থন দিয়ে যায়। তাই উত্তর আধুনিকতা মৌলবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিরুদ্ধে আমাদের হাজার বছরের লোকধর্মকে রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করে। আজকের শিল্পে, কবিতায়, গল্পে মানুষের লোকবিশ্বাসের অনুষঙ্গগুলো উঠে আসছে। কারণ, ‘মৌলবাদ আজ এক ঐতিহাসিক সংকট সৃষ্টি করেছে এ কথা মানতেই হয়। পুঁজিবাদের বিকৃত চেহারা, সমাতন্ত্রের নাম করে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন পার্টি আমলাতন্ত্র, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার যাবতীয় সুফলকে বিনষ্ট করা, উপনিবেশের অর্থনীতির সংকট, এ সবই সাময়িকভাবে হতাশ করে তোলে মানুষকে তখন সান্ত¡না খোঁজে ধর্মের আশ্রয়ে। তাই ধর্মের বা মৌলবাদের পুনরুত্থানের একটা দায়িত্ব নিতেই হয় প্রগতিবাদীদের। এ কথা ঠিক, যতদিন না তৈরি হচ্ছে শোষণমুক্ত মানব সমাজ, যতদিন না ধর্ম ও ঈশ্বরকে মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় করে তোলা হচ্ছে, ততদিন মৌলবাদ ফিরে আসবেই নানারূপে, তার বিরুদ্ধে লড়াই তাই জারি রাখতেই হয়। সে লড়াই লড়বে কোনো সরকার বা রাষ্ট্র নয়, জনগণ’। (ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ এবং… ইরাবান বসুরায়, বিজ্ঞাপন পর্ব ’৯০)

উত্তর আধুনিকতা সেই জনগণকেই বিবেচনা করে সর্বাগ্রে। তাই সে জনগণ যাতে করে তার চেতনা বৃদ্ধি কিংবা শোষণমুক্ত সমাজে উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গোঁড়ামিতে আটকে না পড়ে তার জন্য লোকধর্মের প্রসারকে উত্তর আধুনিকতা অনুমোদন দেয়। কারণ লোকধর্মই মধ্যবর্তী সময়ে তাকে মৌলবাদী খপ্পর থেকে রক্ষা করতে সক্ষম এবং তার সে ক্ষমতা আছে। এরপর সামাজিক অগ্রগতির ফলে জনগণ যখন চেতনার উন্নত স্তরে উত্তীর্ণ হতে তখন আপনা থেকেই যে বুঝতে সক্ষম হবে যে, ঈশ্বর কিংবা যে কোনো ধর্মেরই অসারতা এবং নিজের নায্য পাওনার হিসেব তখন সে কড়ায়-গ-ায় বুঝে নেবে। তখন সে জনগণ লড়াই করবে শ্রেণি-বৈষম্যমুক্ত মানব সমাজ গঠনের লক্ষ্যে। আজ উন্নতচেতনার প্রগতিশীলদের সমানে সময় এসেছে কিছু নিচে নেমে এসে জনগণের সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করার।

উত্তর আধুনিকতা : বিভ্রান্তি ও দায়বদ্ধতার উত্থান

উত্তর আধুনিকতায় লোকধর্মসহ মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনাকে যতটুকু আনুষ্ঠানিক মূল্য দেয়া হয়; তা কেবলমাত্র অনগ্রসর জনগণের কথা বিবেচনা করেই। কিন্তু এ নিয়ে নিরুদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন সুযোগ নেই বলেই আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখাতে চেষ্টা করেছি যে, উত্তর আধুনিকতার দার্শনিক প্রত্যয়টির কোথাও কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাত নেই। তবে আমরা ভারতববের্ষর সব ধর্ম-মতের ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করার অন্ধ মানসিকতা দেখাই নি। তাই এ সময়ের উত্তর আধুনিক কবিতায় মুসলিম পীর, মুর্শিদ, দরগা, কিংবদন্তী কিংবা বিশ্বাসকে যেমন ধরতে চাওয়া হয়েছে, তেমনি পুঁথি, পাঁচালি, হিন্দু-ধর্মের নানা লোক দেব-দেবীকে নিয়েও সচেতনভাবে কাজ হচ্ছে। তবে এসব কবিতা বিশ্লেষণ করতে দেখা যাবে আমাদের ঐতিহ্যের হীরকখ-গুলো সাম্প্রতিক শিল্পী-কবিদের হাতে কীভাবে নবরূপ লাভ করছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে পুরনো জিনিসগুলোই কতটা আন্তরিকতা ও সতর্কতার সাথে বিনির্মিত হচ্ছে। উত্তর আধুনিকরা এভাবেই আমাদের অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে ভবিষ্যৎ স্বপ্নে পুরোভূমি তৈরি করছেন। তারা এক্ষেত্রে একেকজন পুরোহিতের ভূমিকা পালন করছেন বলা যায়। রক্ষণশীল সমাজ ও ব্যক্তিমানস কখনোই নতুন ও প্রাগ্রসর বাণী তথা দর্শনকে গ্রহণ করতে পারেনি। নতুন কোনো মন্ত্রের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গেই সামাজের স্থিতাবস্থার পন্থীরা তাদের গলা টিপে ধরেছে। এরূপ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই নতুন চেতনাকে হত্যা করার ক্ষেত্রে সমাজে বিরাজমান নানা মতবাদের লোক নায়ে উঠে বসে। আপাত শত্রুতা ভুলে তারা নতুন ভাবনার অভ্যুত্থান ঠেকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। উত্তর আধুনিক চিন্তা-বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতেও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ধর্মীয় মৌলবাদীগোষ্ঠী যেমন একে আত্মসাৎ কিংবা মসিলিপ্ত করার কাজে নেমেছে; তেমনি সমাজের তথাকথিত প্রগতিবাদীরাও এর বিরুদ্ধাচরণে নেমেছে প্রকাশ্যেই। উভয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এখানে এক অভিন্ন। কারণ, উভয়ে স্থিতাবস্থার পক্ষে। উভয়েই নতুন চেতনার ব্যাপারে ভীত-সংকুল। এর উত্তর হতে পারে এরকম যে, এরা মতবাদের দিক থেকে পরস্পরের তীব্র বিরোধী হলেও তৃতীয় চিন্তার বিকাশ রুদ্ধ করতে কিন্তু পরস্পরের সহযোগী। উভয়েই চলমান সমাজে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে এবং শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের কোনোরূপ অবস্থান্তর ঘটানোর সৎ আকাক্সক্ষা ব্যতিরেকেই রাষ্ট্রের অত্যন্ত সুবিধাভোগী শ্রেণি হিসেবেই বিরাজমান। তাই তারা যে কোনো নতুন চিন্তার উন্মেষের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠবেই এ তো সত্য।

উত্তর আধুনিকতা কোনো সাহিত্য আন্দোলন নয়। কেউ এর ম্যানিফেস্টোও রচনা করেনি। অথচ রাজধানী-কেন্দ্রিক উপর্যুক্ত উভয় পক্ষের শক্তি একে নানাভাবে বিকৃতি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তথাকথিত প্রগতিপন্থী বুদ্ধিজীবীরা একে পোস্ট মর্ডানিজম, আধুনান্তিক, সংযুক্ত আধুনিক, সমন্বয়ের আধুনিকতা, মধ্যবর্তী আধুনিকতা, অব্যাহত আধুনিকতা, প্রলম্বিত আধুনিকতা এভাবে হাজারো সংজ্ঞায় বাঁধতে যেমন চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে মৌলবাদী চত্রু একে ধর্মের মৃত-ভূতের পুনরুজ্জীবনের কাজে লাগাতে সর্বোত সচেষ্ট। তারা ডাকাতের মতো উত্তর আধুনিকতার মহান তত্ত্বকে নিজের পকেটে পুরতে ব্যস্ত। তাই একসময়ের বাংলা কবিতার সবচেয়ে ধীমান কবি এবং আজকের কলঙ্কিত, আত্মবিক্রিত ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের কাছে মাথা নোয়ানো কবি আল মাহমুদ দৈনিক ইনকিলাবের পাতায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জোচ্চুরির-জোব্বা গায়ে দিয়ে নিজেকে ‘প্রথম উত্তর আধুনিক কবি’ হিসেবে ঘোষণা দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। এজন্য একসময়ের সাম্যের তুখোড় দাওয়াতপন্থী আল মাহমুদের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে না। কারণ আল মাহমুদের প্রকৃত চরিত্র ছিল প্রতিক্রিয়াশীল। যুগের হাওয়ার কারণে তাঁকে আর সকলের মতো মার্কসবাদী হতে হয়েছিল এবং মার্কসবাদের ভবিষ্যৎ তেমন সুখকর নয় ভেবেই নিজের আসল চরিত্রটিই উম্মোচন করে জনগণের লাভই করেছেন শেষতক। এই একজন আল মাহমুদের মধ্য দিয়েই আসল আমাদের ভ- প্রগতিবাদীদের চরিত্র উম্মোচিত হয়েছে। আজো এসব ভ- প্রগতিবাদীরা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ও দরিদ্র দেশটির মুক্তির সনদ মার্কসবাদ তথা বাম রাজনীতিকে বন্দি করে রেখেছে এক রূপকথার অলৌকিক কৌটায়। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এতক্ষণে নিশ্চয় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, উভয় শিবির এই একটি বিষয়কে ভিন্ন অবস্থান থেকে কীভাবে মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর কাজ করে যাচ্ছে সমানে। সমাজতন্ত্রের আকস্মিক বিপর্যয়ে বিশ্বব্যাপী ফাসিস্ট মৌলবাদী জালেম গোষ্ঠির পুনরুত্থান এবং মানুষের বেঁচে থাকার নতুন বোধকে আত্মসাৎ করে সংস্কৃতির ঘাড়ে চেপে থাকা এসব ঘাতক একই সঙ্গে জোট বেঁধেছে পরোক্ষে। এই ছদ্ম প্রগতিশীলের বাচ্চারা দুনিয়ার সব সুস্থ ও প্রকৃত শিল্প-সংস্কৃতিকে নিজের তালুকে নিয়ে তাকে বানাতে চায় সমকামের নরক। মাছের যেমন মাথায় পচন ধরে তেমনি এ দেশের রাজধানীকেন্দ্রিক সুবিধাভোগী প্রগতিশীলদের  পচন শুরু হয়েছে মাথায় —জাতির জন্য খুবই দুঃসংবাদ। অথচ যেখানে উত্তর আধুনিকতার নন্দনতত্ত্বের ভিত্তি ধরা হচ্ছে নিও মার্কসবাদ সেখানে উভয় শিবির একে জাহেলিয়ার দর্শনের দিকে চালিত করতে বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে উত্তর আধুনিকতা যখন বাংলা কবিতার চেহারা দিল পাল্টে, সে সময় এরা নিতে চায় স্রষ্টার সাজ। ঘড়ির কাঁটাকে এভাবে উল্টে দিয়ে এরা বাংলাদেশের উত্তর আধুনিকতা চর্চার সূত্রমুখ দাবি করতেও পিছপা নন।

আসলে ঘৃণার বিরুদ্ধে ঘৃণার ভাষা ব্যবহারের কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। সমাজে যতদিন পচন থাকবে, শোষণ থাকবে, বৈষম্য থাকবে, জোচ্চুরি থাকবে, মুক্ত শিল্প সংস্কৃতিকে যতদিন গিলে খেতে চাইবে জুলুমবাজ প্রতিষ্ঠান, প্রতি-প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ততদিন তাদের বিরুদ্ধে ব্রাত্য, নগ্নপদ মানুষের ঘৃণার খোৎবা উচ্চারিতই হবেই। উত্তর আধুনিকতা নিয়ে যে সব ধান্ধাবাজ আজ মাঠ গরম করতে নেমেছে তাদের প্রতি আমাদের ঘৃণা ও অভিসম্পাত ছাড়া দেয়ার আর কিইবা আছে। উত্তর আধুনিকতা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির এসব কর্মযজ্ঞে বিষফোঁড়ার মতো যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠান, আধা প্রতিষ্ঠানের চাকুরে, ভ- অধ্যাপক ও নিভে যাওয়া কিছু বয়স্ক বালকের দল। দেশের আনাচে কানাচে মুক্তোর মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যে সব তরুণ নিজের শ্রম-ঘাম-মেধা দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মূল স্রোতাকে জোরালো করার নিমিত্তে প্রাণপাত করছে এঁদের পরিশীলিত কণ্ঠে এসব তরুণের কথা একবারও উচ্চারিত হয় না। তার উপর ‘জাতীয়’ ধ্বজাধারী কিছু প্রতিষ্ঠান মূল স্রোতে শামিল কিছু তরুণকে কিনে নেয়ার কাজটি শুরু করেছে ইতোমধ্যে। এসব প্রতিষ্ঠান সাময়িক চাকরি, গ্রন্থ প্রকাশ, নগদ অর্থ ইত্যাদির মাধ্যমে প্রলোভিত করছে বহু লিটল ম্যাগজিন কর্মীকে। মৌলবাদের তকমা আঁটা তরুণেরাও এই আশ্রয়-প্রশ্রয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না। কৃপাপ্রাপ্ত স্তবকের দল তাই দলবালে প্রাতিষ্ঠানিকতাকে করছে ভারী।

বাঙালি দাসত্বকামী দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম জনগোষ্ঠির মধ্যেই প্রবল। এদের চিন্তা-চেতনা জ্ঞানের স্বচ্ছতায় নিবিষ্ট নয়। পাঠ সীমিত হওয়ায় এদের মেধা ও মননে গড়ে ওঠে না কোনো নিজস্ব ভাববিশ্ব কিংবা সাংস্কৃতিক অন্বয়। তাই এ জাতি অপরকে ঠকাতে এবং শেষতক নিজে ঠকতে ভালোবাসে। দাসত্ব ঢুকে গেছে মগজের নিউরণে আর রক্তকণিকায়। ফলে অসমন্বয়ের সংকটে পড়ে পাশ্চাত্যের অশুভ শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবেলায় আমরা দ্বিধান্বিত। প্রাচ্যবোধ গড়ে তোলা কিংবা নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তৈরি হয় কন্টকময় অনুভূতি। সংস্কৃতির লড়াইকে ভিন্নখাতে পরিচালিত করতে তৎপর হয়ে ওঠে প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সঙ্গে তথাকথিত প্রগতির ধারকেরা। নিজেকে আজ খুব নাফরমান মনে হয় এ কারণে যে, যাকে বলতে চাই জ্যামিতিক ক্লিশে বিষয়-আশয় থেকে আত্মিক মুক্তির আধ্যাত্মিকতা, যা আমাদের লোকমানসের প্রতীকাত্মক পরিপ্রেক্ষিত, তাকে আজ ভুলভাবে গ্রহণের পালা চলছে। এগুলো ভুলভাবে গ্রহণের মধ্যে যে পুনঃপ্রত্যাবর্তনের বিপদ আছে তা নাছোড়বান্দাদের বোঝাবে কে? তাই উত্তর আধুনিকতার আধ্যাত্মিক লোক-চেতনার মহান বাণী মৌলবাদী আগ্রাসনে ভূলুণ্ঠিত হওয়ার উপক্রম। এর সুযোগ নিয়ে কেউ ‘বয়েত’ লিখছে, কেউ আল্লাহ, রাসূলের আরশ ছেদা করছে অচল পদ্যে। নিজেকে উত্তর আধুনিক দাবি করা বিশৃঙ্খল সত্তা ইশারফ হোসেন লিখেছেন :

                আল্লাহ্ হক মওলা

                আল্লাহ্ আল্লাহ্, আল্লাহ্, আল্লাহ্,

আল্লাহ্ আল্লাহ্, আল্লাহ্, আল্লাহ্,

                (ফিকিরী বৈঠক-১)

এত নিম্নমানের ভাষা-প্রয়োগের মাধ্যমেই এরা জাহেলিয়াতের অন্ধকারে ডুব দিতে চায় স্বেচ্ছায়। আমরা উত্তর আধুনিকতার মধ্য দিয়ে উপনিবেশবাদ বিরোধী এবং আমাদের বৃহত্তর মানুষ সংলগ্ন ও লোক-জীবনের মানবিকতার সৌন্দর্য উদ্বোধনের যে প্রয়াস করছি, এসব রাজধানীকেন্দ্রিক মৌলবাদী গোষ্ঠী তাকে বিভ্রান্তির অতলে তলিয়ে দিয়ে নতুন সূচনার সূত্রমুখকে সাংগঠনিকভাবে ব্যর্থ করে দিতে চায়। এই চক্রের ইশারফ হোসেন যখন সমকালীন উত্তর আধুনিকতার চিন্তাদর্শটিকে নিয়ে বৈরী খেলায় মেতে ওঠে তখনও তার সহযোগী হন ঢাকার এনলাইটেন্ট বুদ্ধিজীবীবৃন্দ। সংস্কৃতির এই বদ রাজনীতির কারণে এসব বুদ্ধিজীবী স্বঘোষিত মৌলবাদী ইশারফের তথাকথিত উত্তর আধুনিকতা বিষয়ক সেমিনারে যোগ দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। ইশারফ গং ‘উত্তর আধুনিকতা’ এই নামে উত্তর আধুনিক সাহিত্য আন্দোলনের বুলেটিন বের করেছে মোহাম্মদ আজমের সম্পাদনায়। এর ঠিকানা আজিজ মার্কেটের টরেন্ট চত্বর। ১৯৯৬ সালে এটি প্রকাশিত হয়েছে। এদের কাজ দেখে বোঝা যায় বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনেও সর্পিল গতির সন্ত্রাস জায়গা করে নিয়েছে। এই লুণ্ঠন মানসিকতা আমাদের শিল্প-সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে এত বড় রকমের বিপর্যয় সাধন করে চলেছে। আমরা উত্তর আধুনিকতাকে যেখানে সদর্থে বৈশ্বিক চেতনাজাত দার্শনিক প্রত্যয় কিংবা ভাবাদর্শ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি, সেখানে এসব ভ- মৌলবাদীর দল একে উপজীব্য করে আন্দোলনে নামতে চায়। অসুস্থ মানসিকতাজাত এ কাজ মহান প্রাচ্য বোধের গায়ে কলংকের তিলকচিহ্ন এঁকে দিতে খানিকটা হলেও সমর্থ হয়েছে এটা স্বীকার করছি।

আবারো বলছি, উত্তর আধুনিকতা কোনো সহিত্য আন্দোলন নয়। বিশেষত মৌলবাদীদের এতে কোনোরূপ আধিকারতো নেইই। কারণ, যেখানে মৌলবাদ ধর্মের ধৃত বাণীকেই সর্বকালের জন্য গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে সেখানে আমাদের দেশ কাল ঐতিহ্যচর্চার ভেতর দিয়ে বৈশ্বিক হয়ে ওঠার সচেতন প্রয়াস এদের কাছে কি করে চর্চার বিষয় হতে পারে তা বোঝার জন্য খুব একটা শিক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। এরা শুধুমাত্র এই মহান অর্জনকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চায়, তা তাদের ইতোমধ্যেকার কাজের মাধ্যমেই পরিষ্কার করে তুলেছে। এসব উদভ্রান্ত ও দিশেহারাদের এ মুহূর্তে প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে স্মরণ নিচ্ছি উদয় নারায়ণ সিংহের একটি উক্তি :

উত্তর আধুনিকতা কোনো জাতি দেশ সমাজ শিল্প বা সাহিত্যের ইতিহাসে মাত্র আধুনিকতার উত্তরপর্ব নয়। বরং উত্তর আধুনিকতা কবিতায় গল্পে গাথায় সর্বত্র একটি সৃজ্যমান লক্ষ্য বিশেষ যেখানে পৌঁছানো সাধনা ও গৌরবের বিষয়। বরং উত্তর আধুনিকতাকে যৌবন ও প্রজ্ঞানের সমন্বয়ে জাত একটা আন্দোলন বলা যায় যা স্মৃতিশীল সভ্যতা মিথ শ্রুতি ও প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকারে গাঁথা এবং এসবেরই মূল্যায়ন ও মূল্যমান নিরূপণ নির্ভর। চটক, চমক ও আকস্মিকতার আমোঘ আকর্ষণের চেয়েও বেশি জরুরি এখানে বুদ্ধি, বোধি এবং অনুভূতিহর সূক্ষ্মতা, যেমন দ্রোহ কাম্য হলে তার আদর্শ লক্ষ্য ও ব্যাপ্তী কী? কে? কতদূরে? শৃঙ্খলমোচন যদি কাম্য হয় তো মুক্তির প্রার্থনার আগে জেনে নিতে হবে শ্রমে ঘামে নেহামেধায় যেসব প্রতিষ্ঠান (ওহংঃরঃঁঃরড়হ) আমরা গড়ে তুলেছি সেগুলো ভেঙে কি আমরা শ্রেয় যোগ্যতার ও শ্রেয়তর প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রয়াস করছি নাকি শুধুই বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে ইতিহাসের চাকা দিচ্ছি পিছন দিকে ঘুরিয়ে?

[বাংলা কবিতার প্রাকৃতায়ন : উত্তর আধুনিক কবিতা]

আজকে এই প্রশ্ন আমাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে। তাহলে কি উত্তর আধুনিকতার সম্ভবনা দূরপনেয় অন্ধকারেই তলিয়ে যাবে? যেভাবে এর অপব্যাখ্যা এবং মৌলবাদ পক্ষ বিস্তার করছে সে ক্ষেত্রে উত্তর আধুনিকতাকে শষতক সম্বন্ধ করা যাবে কী না তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ শয়তানের শক্তি অপরিসীম। তাবৎ বিশ্ব তাদের শয়তানীর মৌরুসিপাট্টা। এসব শয়তান এটা বুঝতে অপারগ যে, যে ঐতিহাসিক পরিস্থিতি জাত হয়ে এবং পশ্চিমা নানা সংকটের হাত ধরে আধুনিকতার আত্মজিজ্ঞাসার ও তার ব্যর্থতার প্রকট গহ্বর থেকে জন্ম নিয়েছে যে পোস্টমডার্নিজম তত্ত্ব, তার সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা এবং পরিপ্রেক্ষিতের অন্তঃস্তল থেকে উত্তর আধুনিক চেতনার সূত্রপাত। একে আধুনিকতার উন্মুল ভাবনার বিপরীতে সচেতন প্রতিবাদও বলা যেতে পারে। পশ্চিমা তত্ত্বজ্ঞানকে অস্বীকার করে নয়, এই সংকটকে বিবেচনায় রেখেই আত্মপক্ষই সমর্থনের সুযোগ সৃষ্টিই উত্তর আধুনিকতার মূলমন্ত্র। তাই একে পশ্চিমা পোস্টমডার্নিজমের সমমাত্রিক ও বিপরীত অভিঘাত বলা যেতে পারে। কিন্তু বিশ্ব সংস্কৃতির এই রূপ পরিবর্তনকে বুঝাতে না পেরেই এদেশের মৌলবাদের প্রত্যক্ষ সমর্থনপুষ্ট (পরোক্ষ তথাকথিত প্রগতিশীলদের সমর্থনসহ) হয়ে অর্ধশিক্ষিত মূর্খের দল উত্তর আধুনিকতার মধ্যে ধর্মীয় অন্ধকার বীজ বপন করতে চায়। আমাদের জন্য সত্যিই এ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা।

আধুনিকতা ব্যক্তি ‘আমি’-কে করে তুলেছে মিথ্যে ও নকল এবং অবক্ষয়ী। এই অভিশপ্ত বোধজাত ক্লান্তি ও হতাশা যে অনতিক্রম্য দূরত্ব তৈরি করেছে তাকে উন্মোচনের দায়িত্ব পড়েছে উত্তর আধুনিকতার ঘাড়ে। যে আত্মপরিচয় মিথ্যের পোশাক আচ্ছাদিত তাকে অতিক্রমণের অনুসন্ধানই হচ্ছে উত্তর আধুনিকতার জপমন্ত্র। ফলে আধুনিকতার অবক্ষয়ী ‘আমি’ উত্তর আধুনিক চেতনায় সিক্ত ‘আমরা’ হয়ে উঠতে চায়। এবং অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এর সংঘাতময় ও নিরন্তর দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আত্মস্থ করতে চায় বৈশ্বিক অগ্রগতিকে। তাই তাকে খুঁজতে গিয়ে উত্তর আধুনিকদের ভূমিকেন্দ্রিক এবং বিলক্ষণ গণমানুষমুখী হতে হয়েছে। উত্তর আধুনিক কবিতার সমগ্রতাপন্থী এই দার্শনিক চলনকে হৃদয়ঙ্গম করতে না পেরেই বিপথগামী হচ্ছে কিছু তরুণ। তাদের কৃতিগুলো হয়ে উঠেছে আর্বাচীন তাৎপর্যহীন এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিক্রিয়াশীলতার পন্থী।

আমরা বলছি যে, পৃথিবীর জ্ঞান ও বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তি বা জগতের এমন কিছু নেই যা আমরা গ্রহণ করব না। কারণ সর্বক্ষেত্রেই আমরা পশ্চিমা থেকে বেশ পিছিয়ে আছি। এই বাস্তবতাকে আতিক্রম করে আমরা নিজভূমে দাঁড়াতে চাই। এ অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা নয়। আমরা আমাদের অবহেলিত দীর্ঘকার্লে সংস্কৃতি, কৃষ্টি সভ্যতা ও লৌকিকতাকে বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে তাকে নতুন অবয়ব দিতে প্রয়াসী। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সাম্প্রতি শিল্প-সাহিত্য ও দার্শনিক প্রত্যয়কেও বিবেচনায় রাখতে চাই। তা আগের মতো অন্ধ অনুকরণ নয়, আত্তীকরণের মাধ্যমে হওয়া জরুরি। যাকে আমরা ‘আন্তঃসাংস্কৃতিক বয়ান’ বলছি। আধুনিকতার একচক্ষু হারিণীকে বধ করে আমরা মানুষের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক বয়ান (ঞবীঃ) তৈরির পক্ষপাতী। সেই সঙ্গে বৈশ্বিকতাকে গ্রহণ করতে চাই অলজ্জ সারল্যে।

প্রত্যেক জাতির সাহিত্যিকবর্গ তার ভিত্তিমূল থেকে বেড়ে ওঠে। আর এই ভিত্তিমূলের দিকে তাকালে গোটা বিশ্বের লোককথার আবরণে বিশাল সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ বিশ্বের মানুষ সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সবসময়ই দেওয়া নেওয়া করেছে। এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘটে। কিন্তু উপনিবেশিক শক্তি গায়ের জোরে, অর্থের জোরে এবং ক্ষমতার জোরে তার সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার পন্থী। তাই আমরা পশ্চিমা মূল স্রোতের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে নয়, তার উপনিবেশিক সাহিত্য-সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করতে চাই। আমরা চাই বাংলাভাষীর নিজস্ব সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক বর্গগুলো ক্রমশই বিশ্বজনীন হয়ে উঠুক।

আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক চিহ্নগুলোর উত্থানের মাধ্যমে পশ্চিমা আগ্রসী ভাবনাকে খানিকটা ভোঁতা করে দিতেও আমাদের মন যায়। আন্তর্জাতিকতার নামে পশ্চিম আমাদের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং দর্শনের যে জোয়াল চাপিয়ে দিয়েছে— তার বিরুদ্ধে উৎসারিত চেতনার নামই হচ্ছে উত্তর আধুনিকতা। তাই বলে বিশ্বের যে কোনো নতুন ভাবনাকে গ্রহণ করতেও আমাদের দ্বিধা নেই। তবে তাও কিন্তু সংশ্লেষণ ও আত্তীকরণের মাধ্যমে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

পশ্চিবঙ্গের পাশাপাশি বাংলাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রামে এই বোধ জোরালো হয়ে উঠেছে এবং এই বোধের প্রসারের ফলে ইতোমধ্যেই বাংলা কবিতার ব্যাপক স্বরায়ণ ঘটেছে। তাই মানুষের নিয়ত জীবন সংগ্রাম তথা তার অস্তিত্বের দুর্মর চেতনালোকের অনিরুদ্ধ প্রকাশ আমাদের উত্তর আধুনিকতা। লোৎমানের ভাষায় যাকে বলা যায় : ‘নিজের বিচিত্র বহুভাষিকতার দিকে সংস্কৃতির প্রবণতা’, তাকে ঘিরেই উত্তর আধুনিকতার মধুৎসব। কিন্তু লোক কথন ভঙ্গির অপব্যবহার করে কিছু কিছু তরুণ পুঁথি, পাঁচালী এবং পদাবলীর ঢঙকে অক্ষমভাবে অনুকরণ করছে। একে কেউ শেকড় সন্ধানী বলবে না। মূল বিষয় অনুধাবন না করেই তাকে নিয়ে লেগে যাওয়া এই হচ্ছে বাঙালির জন্মগত উন্মাদনা। বাঙালি তার এই কিম্ভূত মুখোশ পরেছে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে। তাই যে কোনো সংগঠিত চেতনার প্রতি সে অন্যায্যভাবে বিশৃঙ্খল আচরণ করে। ফলত আমাদের উত্তর আধুনিকতার দেশজ চেতনার ক্ষেত্রটিও একটি স্থুল ও সঙ্কুচিত অস্থিরতার মধ্যে পতিত হচ্ছে। একে নিয়ে নিরর্থক বিতর্ক তুলছে মৌলবাদী ও ছদ্ম প্রগতিবাদীরা। কারণ, নতুন চেতনার উদ্বোধনে উভয়ে গোপন সখ্য গড়ে তুলেছে ইতোমধ্যে। এই বিশৃঙ্খল চৈতন্য, রাজনৈতিকে যেমন সংক্রামিক করেছে তেমনি সাম্প্রতিকালে সাহিত্যিক বিচ্ছিন্নতাও তৈরি করেছে বলা যায়। অথচ উত্তর আধুনিকতা লোকাভিমুখী হয়েও সর্বজনীন উদারতার বৈশ্বিক পাখা মেলতে চায়। কিন্তু এতসব কিছু বোঝার এবং বোঝানোর লোক এ সমাজে কোথায়?

লিরিক, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯

****************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা