ff

ক্রো ড় প ত্র

আলাপচারিতা

‘মহাভারতে দেবত্ব মহত্ব বলে কিছু নেই’
হাসান আজিজুল হক

হাসান আজিজুল হক গল্পের মানুষ। অন্যরকম গল্প বলেন তিনি। রাজশাহীতে অবস্থানসূত্রে চিহ্ন-ঘরানার সঙ্গে তাঁর সংযুক্তি— প্রায় দুইদশক। চিহ্নের ক্রোড়পত্ররূপে মহাভারত নির্বাচিত হলে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অভিভাবকরূপে তাঁর নিকট এ বিষয়ক কিছু কথাবার্তা জমে যায়। গত ২১ আগস্ট ২০১৭ হাসান আজিজুল হকের ‘উজানী’র বাসায় আমরা পরস্পরের মুখোমুখি হই। প্রশ্ন-উত্তরের কথোপকথনের চেয়ে মহাভারত সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিকোণটি আমরা অন্বেষণের চেষ্টা করি। তারই চৌম্বক-অংশ এখানে পত্রস্থ হলো। (সম্পা.)

চিহ্ন : আপনি লেখক হিসেবে অনেকদিন আমাদের লেখালেখির মধ্যে আছেন, চলছে। আমরা যতটুকু জানি যে, রবীন্দ্রনাথ আপনার খুব আগ্রহ এবং আকর্ষণের জায়গা। সেটা হয়তো ভক্তি থেকে যতটা তার চেয়ে বিচার-বুদ্ধি, যুক্তি, দার্শনিক ইঙ্গিত কিংবা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া যে চলে না— এমন একটা কা-জ্ঞানের ধারণার ভেতর দিয়ে। এই জায়গা থেকে রবীন্দ্রনাথ আপনার পাথেয় কিংবা রবীন্দ্রনাথ আপনার সঙ্গে থাকেন এবং রবীন্দ্রচর্চাও আপনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে করেছেন— করে চলছেন, আজও। আমাদের যেটা বিষয় সেটা হচ্ছে যে, রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই, রবীন্দ্রনাথ যখন লেখালেখি করেছেন তখন ভারতীয় দর্শন, যেমন— বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত— এগুলো সম্পর্কেও তাঁর একটা বিস্তারিত স্বচ্ছ ধারণাও যেমন ছিল এবং সেটাকে তাঁর জীবনের নানা পর্বে প্রয়োগও ঘটিয়েছেন তিনি এবং লেখালেখিতেও তার প্রভাব আছে। স্পষ্টরূপেই আছে। তো আপনার লেখালেখির ক্ষেত্রে মহাভারত কতটা আপনাকে আন্দোলিত কিংবা আলোড়িত করে? মহাভারতের চরিত্র, কাহিনি, ঘটনা, কিংবা মহাভারতের যে শিক্ষা সেটা আপনার মত করে আপনি কীভাবে চিন্তা করেন?

হা. আ. হ. : মহাভারত আমার কাছে খুব প্রিয় বই। যখন খুশি আমি মহাভারত পড়া শুরু করতে পারি এবং তার মধ্যে ডুবে যেতে পারি। এটা সম্ভব। আমার যদি মনে হয়, আচ্ছা ঠিক আছে মহাভারত একটুখানি খুলি তো! খোলার পর যে কোন একটা জায়গায় চোখ পড়ে গেল। হয়তো আধঘণ্টা পড়লাম। আর এমনিতেই মহাভারত বিভিন্ন সংস্করণের, বিভিন্ন ধরনের পড়েছি। ছোটবেলায় পড়েছি ছেলেদের মহাভারত। এটা দেব সাহিত্যকুটির থেকে বের হতো, এর লেখক ছিল সুবোধচন্দ্র মজুমদার। এটা আমার প্রথম মহাভারত পড়া। তারপর পড়লাম কালীপ্রসন্ন সিংহের দুই খ-ের মহাভারত। তবে এটা আমি তেমন পড়তে পারি না! কেননা, একে তো মহাভারত, তারপর এত বিস্তৃত! মূল মহাভারত পড়া সম্ভব না। বিরক্তি ধরে যাবে! কারণ, তার ডালপালা এত ছড়াচ্ছে এবং তখন এটাকে আর একটা গাছ বলে মনে হয় না। মনে হয় হাজারটা গাছ। হাজারটা গাছে আবার হাজারটা ডালপালা রয়েছে। সেগুলো অনেকে বাদ দেয়। রাজশেখর বসু এসব ডালপালা খানিকটা বাদ দিয়ে দিয়েছেন এবং সারানুবাদটাই গ্রহণ করেছেন। সেজন্য আমি রাজশেখর বসুরটাই পড়ি আর কি। আমার কাছে যেটা আছে সেটাও রাজশেখর বসুরই মহাভারত।

চিহ্ন : এটা সুন্দর কিন্তু—

হা. আ. হ. : এটা খুবই সুন্দর! গদ্যটাও যত সুন্দর, তেমনি সুপাঠ্যও। মহাভারত আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় একটা বই। এর যে কৃষ্ণ চরিত্র, কিংবা পা-বদের যে চরিত্র, কিংবা শকুনি বলে যে একজন চরিত্র আছে, দুর্যোধন বলে যে চরিত্র আছে, কিংবা ধৃতরাষ্ট্র চরিত্র— এ রকম অসংখ্য চরিত্র আছে। তবে প্রত্যেক চরিত্রকেই আলাদা করা যায়। খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায় যে, এটা এই চরিত্র, ওটা ওই চরিত্র, এমনকি পা-বদের পাঁচ ভাইও আলাদা আলাদা। যুধিষ্ঠির একরকম, ভীম আরেক রকম, অর্জুন আরেক রকম, নকুল আরেক রকম, সহদেবও তার মত। এজন্য মহাভারত আমার কাছে খুবই প্রিয় গ্রন্থ এবং আমার মনে হয়, প্রাচীন ভারতে যে সভ্যতা ছিল— ধরো খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর সময়কার সভ্যতার পরিচয় ধরে রেখেছে মহাভারত। তাছাড়া মহাভারতের গল্প তো অনেক আগে থেকেই নানান আকারে চলতো। এর কাহিনি, উপকাহিনি, পৌরাণিক গল্প অনেক আগে থেকেই চলে। তবে মহাভারত রচিত হয়েছে, সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব তিনশো বছর আগে। আর এটা অন্যের লেখা, নকল। অনেকে অনেক সময় এরকম নকল করে না! যেটাকে বলে কুম্ভীলকবৃত্তি, কিন্তু মহাভারতের ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টোটা। অনেকে মহাভারতের মধ্যে লিখেছে, কিন্তু তাঁদের নাম দেয় নি; বরং এর মধ্যে গুঁজে দিয়েছে। এটা তরকারিতে ফোড়ন দেওয়ার মত আর কি। তুমি একটু দিলে, আমি একটু দিলাম। যার ফলে যেটা খাঁটি মহাভারত, যেটা বেদব্যাসকৃত, সেটা আমি অন্তত সঠিকভাবে বলতে পারবো না, কি ছিল! অনেকে এ কাজটা করেছে বলে মহাভারত সম্পর্কে এরকম বলা হয় যে, ‘যাহা নাই ভারতে, তাহা নাই মহাভারত-এ’। অর্থাৎ যা মহাভারত-এ নাই, তা ভারতবর্ষেও নাই। নানান জায়গার নানান জিনিস মহাভারতের মধ্যে ঢুকেছে। তবে তাতে অনেকে কুম্ভীলকবৃত্তির উল্টোটা করেছে। তারা মহাভারতের মধ্যে নিজেদের নাম না রেখে মহাভারতের অংশ রচনা করেছে। সেসব জিনিস বাছাবাছি হয়েছে অনেক। বালগঙ্গাধর তিলকসহ অনেকে মহাভারতের আধুনিক ভার্সন করেছে। চেষ্টা করেছে, যেটা মূল মহাভারতের অংশ নয়, সেটাকে বাদ দিয়ে দিতে। যাই হোক, আমি এসব বিষয়ে অত ভাবিনি। তবে আমি ছেলেদের মহাভারত, পরবর্তীতে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছোটদের মহাভারত, এবং রাজশেখর বসুর সারানুবাদই মূলত পড়েছি। আর কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদটি পড়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারি নি! মানে, অত ডিটেল্স পড়া যায় না!

চিহ্ন : আপনি বললেন, মহাভারত আপনার খুব আকর্ষণীয় গ্রন্থ। একজন সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আপনার কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা, এসময়ে মহাভারতের কোনো প্রয়োজন আছে কি? অর্থাৎ এখনকার যে সমাজ ব্যবস্থা, কিংবা এখনকার যে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর মধ্যে আমরা বাস করছি— বলা যায় একটা প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ ব্যবস্থা এখন চলছে, কিংবা এখন আমাদের দিনযাপনের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। এই যে, এখন সারা দেশে বন্যা চলছে, কিছু অনাহারী লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তা দিয়ে, রিলিফ, এটা-সেটা। একজন লেখক হিসেবে আপনিও এটার সাথে অর্থাৎ মানবিক সহানুভূতির জায়গা, এটা-সেটা। এগুলোর সাথে মহাভারত-রামায়ণকে আমরা এখনকার সময়ে কিভাবে দেখব? এগুলোর কি পুনর্পাঠের প্রয়োজন আছে?

হা. আ. হ. : রামায়ণের থেকে আমি মহাভারতের কথাই বেশি বলবো। রামায়ণ আমাকে অতোটা টানেনি! কিন্তু মহাভারত আমাকে ভীষণ টেনেছে। কারণ, মানুষের যে মূল প্রবৃত্তিগুলো, সেগুলো মহাভারতে আছে, সেটা এখনও আছে। যেমন— রাজ্যলোভ, ধনলোভ— এই যে, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদেনী’— আমরা রাতদিন করছি এটা, একচুল ছাড়ব না, পাশা খেলে পাঠিয়ে দেওয়া, বড় বড় ব্যাংকের টাকা মেরে দেওয়া— এই সমস্ত জিনিসই তো রূপান্তরের মাধ্যমে আমাদের বর্তমান সময়ে এসেছে। তার মানে, মানুষের মূল প্রবৃত্তিগুলো স্পর্শ করেছে বলে মহাভারত সর্বকালেই পাঠ্য বলে আমার কাছে মনে হয়। আর এর গল্পগুলো এমন ভালো লাগে, তোমার পড়তেই ইচ্ছে করবে। পরশুরাম যেমন বর্ণনা দিয়েছেন আর কি। বাহ! আমার তো যখন তখন বিভিন্ন জায়গা মনে পড়ে যায়। যেমন— যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে বললো যে, যুদ্ধটা যাতে এড়ানো যায় তুমি তার চেষ্টা করো। ভীম তো দাদা আর গদা ছাড়া কিছু জানে না। কিন্তু দ্রৌপদী কৃষ্ণকে বললো, ‘সখা, যুদ্ধ যাতে হয় তুমি সেই চেষ্টা করো। যে অপমান তারা আমাকে করেছে, আমি কিছুতেই মার্জনা করবো না’। তাছাড়া বাকীরা বলেছে যুদ্ধ যাতে না হয় তুমি সেই চেষ্টাই করো। শ্রীকৃষ্ণ কৌরব রাজসভায় গিয়ে দাঁড়িয়ে দুর্যোধনকে বলছে, তারা বহু নিগ্রহ ভোগ করেছে, তারা বনবাসে গেছে, তারা অজ্ঞাতবাসে গেছে, জতুগৃহে তাদেরকে ঢুকিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, তারা অনেক অত্যাচার ভোগ করেছে; এখন ওদের জন্য আর কিছু দরকার নেই, পাঁচটি গ্রাম তাদেরকে দাও। তখন দুর্যোধন বলছে, পাঁচটি গ্রাম কেনো, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদেনী’। এমন পরিস্থিতিতে কৃষ্ণ বলেছে, আমি তাহলে এ যুদ্ধ আর থামাতে পারলাম না। যুদ্ধের প্রস্তুতিই গ্রহণ করো। ধৃতরাষ্ট্রকে ডেকে বললো, মহারাজ আমাকে বিদায় দিন। আমার এ দ্যূতকর্ম ব্যর্থ হলো। একথা শুনে দুর্যোধন বলেছে, এখন আর কৃষ্ণকে ছেড়ে দেওয়া হবে না— ওকে বাঁধ। এসময় শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু মুখ ফসকেও বাজে কথা বলে নি, বরং খুব শক্ত কথাই বলেছে, ‘তোমার তো দুর্মতি হয়েছে’। আচ্ছা বাঁধ, তবে মনে রেখো, আমি কিন্তু যুদ্ধটা এখনই শেষ করে দিতে পারি। তোমাদের কয়জনকে বেঁধে এইখান থেকে নিয়ে গিয়ে যুধিষ্ঠিরের কাছে সমর্পণ করতে পারি। তোমরা আমাকে বাঁধবে, বাঁধ। বাঁধতে যখন গেলো তখন দেখা গেলো যে, আকাশ-পৃথিবী-সূর্য জুড়ে বিরাট একটা মূর্তি! এই মূর্তিতে শত শত জগত নির্বিচার হচ্ছে, শত শত জগত ধ্বসে পড়ছে, মানুষ মরছে! ভীষণ ভয়াবহতা! তাই দেখে দুর্যোধনরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেল। কৃষ্ণ তখন মুহূর্তের মধ্যেই স্বাভাবিক মানুষের চেহারায় ফিরে আসলো। আসলে শরীরে বদ রক্ত জমলে যেমন সেটা বের করে ফেলতে হয় তেমনি সভ্যতা যখন ক্লিষ্ট হয়ে যায় তখন সেই সভ্যতার স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে তার সমস্ত বদ রক্ত বের করে ফেলতে হয়। এটা সেরকমই আর কি। এই অর্থে মহাভারতের যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ। এ যুদ্ধটা হয়েছিল অধর্ম আর ধর্মের মধ্যে। অর্থাৎ, মানবিকতার কারণে অমানবিকতার বিরুদ্ধে লড়াই। এটাকে আধুনিক অর্থে ধরলে এর একটা ভিন্ন অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময়  শ্রীকৃষ্ণ আরেকবার নিজ মূর্তি ধারণ করেছিল। যুদ্ধের সময় অর্জুনের মন ভীষণভাবে পীড়িত হলো। সে কিছুতেই যুদ্ধ করবে না। তাঁর হাত কাঁপছে। কারণ, আত্মীয়-স্বজনসহ নিকট ব্যক্তিদের মারতে হবে। অর্জুন বলছে, এ হতে পারে না মাধব! তখন কৃষ্ণ বলছে, তুমি কাকে মারবে, তুমি মারছোও না, জন্মও দিচ্ছ না! এই দেখ বলে— কৃষ্ণ আবার নিজ মূর্তি ধারণ করল। অর্জুন তখন দেখল, শত শত অর্জুন মরছে, বাঁচছে। এটাকে যদি প্রতীকী অর্থে গ্রহণ করা হয়, তাহলে এটারও একটা অসাধারণ ব্যাপার দেখা যাবে। এই সমগ্র ভূম-ল— এর তো শেষ আছে, এরও তো শুরু হয়েছিল; কতো কা- ঘটলো, কতো সভ্যতা উঠল-নামল, পড়লো— ক্ষয়েই তো যাচ্ছে; কি বেশি হচ্ছে, কি কম হচ্ছে, কে কার হিসেব রাখে! অর্থাৎ জীবন-মৃত্যু অত্যন্ত স্বাভাবিক, এটাকে গ্রহণ করা, বর্জন করা— কোনোটারই কোনো দরকার নেই। জীবনের জন্য যা কিছু দরকার করো। আবার যখন চলে যাবে, চলে যাবে। মহাভারত এই বিষয়টিকেই ধারণ করতে চেয়েছিল। মহাপ্রস্থানিকপর্বে তো সেটাই বোঝা গেলো। প্রতিটা মানুষেরই একটা দুর্বলতা থাকে, সেই দুর্বলতাই শেষ পর্যন্ত তার জন্য মৃত্যু ডেকে আনে। সর্বপ্রথমেই কিন্তু দ্রৌপদীর পতন হয়েছিল। কেন পতন হয়েছিল? কারণ, তাঁর একটা দোষ ছিল। সে পঞ্চস্বামীকে সমানভাবে ভালো না বেসে অর্জুনকে একটু বেশিই ভালোবাসত। এটা অধর্ম! একজনের পাঁচটা স্বামী হওয়াটাই যে অসম্ভব ব্যাপার, এবং বোঝা যায় যে, ভারতবর্ষে এ প্রথাও চালু ছিল। নিয়োগ প্রথা থেকে শুরু করে, অন্য লোককে নিয়ে এসে সন্তান উৎপাদন করানো, ঋষিকে দিয়ে সন্তান উৎপাদন করানো— এসব তো প্রাচীন সমাজের চিত্র। এখানে তো দেবত্ব-মহত্বের কিছু নেই। আমি মহাভারত-এ তো দেবত্ব-মহত্ব দেখি না। আমি একদম মনে করি এটা একটা সভ্যতার চিত্র। এই রকমই ছিল সে সময়ের সভ্যতা। এখনও পর্যন্ত হিমালয়ের ওখানে কিন্নর-টিন্নর বলে যে ছোট ছোট দল আছে, তাদের কিন্তু একাধিক স্বামী। এক পুরুষের বহু স্ত্রী— এটা তো প্রচলিত। কিন্তু এক স্ত্রীর বহু স্বামী— এটা তেমন দেখা যায় না। অথচ পঞ্চসতীর নাম করতে গেলে দ্রৌপদীর নাম করতে হয়, কুন্তীর নাম করতে হয়, সাবিত্রীর নাম করতে হয়, সীতার নাম করতে হয়। হিন্দুশাস্ত্রে এই হলো পঞ্চসতী। দ্রৌপদী পঞ্চসতীর একজন হওয়ার কারণ হলো— পঞ্চস্বামীর প্রতি তাঁর একনিষ্ঠতা। শুধু একজনের প্রতি তার একটু অন্য রকম টান ছিল, এছাড়া সে কখনোই সতীত্ব বর্জন করে নি। সে সৈরিন্ধ্রী হিসেবে যখন বিরাট রাজার বাড়িতে কাজ করতো তখন কীচক তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, বলেছে, তুমি তো দাসী; আমার সঙ্গে মিলিত হতে তোমার আপত্তি কি? এটাকে সে চরম অপমান হিসেবে গ্রহণ করে কাঁদতে কাঁদতে ভীমকে বিষয়টি বলেছে। ভীম বললো যে, তুমি তাকে নাট্যশালায় আমন্ত্রণ করো। তারপর ভীম তাকে হত্যা করে। যাই হোক মহাভারতের কাহিনি কিন্তু দারুণ!

চিহ্ন : স্যার! ধৃতরাষ্ট্রও কিন্তু ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। ওরে বাপরে বাপ! হ্যাঁ, এটাও ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার! ভীষণ!

চিহ্ন : আর গান্ধারী, চোখ বন্ধ; সেও কিন্তু কম ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার না?

হা. আ. হ. : সে অন্য রকম মহিলা। সে একবারও বলেনি যে, আমার ছেলের জয় হোক। দুর্যোধন যতবারই আশীর্বাদ নিতে গেছে ততবারই সে বলেছে, ‘যথা ধর্ম তথা জয়’। পঞ্চপা-ব মিলে তাঁর একশ ছেলেকে মেরে ফেলেছে। উনি কিন্তু তাও কিছু বলেন নি! শুধুমাত্র ভীমকে বলেছিল, অন্তত একটা ছেলেকে তো বাঁচিয়ে রাখতে পারতে! তবে একথা সত্য যে, শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া মহাভারতের যুদ্ধ অচল। শ্রীকৃষ্ণ বলেছিল, আমি কিন্তু কোনো অস্ত্র-টস্ত্র ধারণ করবো না। করেও নি। তবে ভীষ্ম একদিন এমন যুদ্ধ করেছিল, মনে হয়েছিল যে, আজকেই মনে হয় যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। তখন কৃষ্ণ শঙ্খ, চক্র, গদা নিয়ে নেমেছিল। ভীষ্ম দেখল যে স্বয়ং ভগবান নেমেছে, তখন সে বললো, এসো মাধব, আমি অস্ত্র পরিত্যাগ করলাম; তোমার হাতেই আমার মৃত্যু হোক। তখন অর্জুন বললো, খবরদার খবরদার পিতাকে মারা যাবে না, মাধব, তুমি মারবে না কক্ষনো, তুমি কিছুতেই এটা করতে পারো না। এরপর সে কৃষ্ণকে টেনে সরিয়ে নিয়ে আসলো। এই রকমই কৃষ্ণ! এই রকম চরিত্র কিভাবে তৈরি করা যায়!

চিহ্ন : আর ভীষ্মের শরশয্যা?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, শরশয্যা! তার মৃত্যু নিয়ে আর কি। মানুষের অমরত্ব থাকতে পারে, কিন্তু কণ্টকশয্যায় মৃত্যু আসবেই, যেভাবে হোক না কেনো। সূর্য যখন উত্তর থেকে দক্ষিণে যাবে, অর্থাৎ যখন দক্ষিণায়ণ হবে তখনই তার মৃত্যু হবে। সে যে শরশয্যায় শাস্তি পেয়েছিল, তার কারণ হচ্ছে— অষ্টবসু বশিষ্ঠের কামধেনু নন্দিনীকে হরণ করে। ফলে বশিষ্ঠের শাপে তাদের প্রত্যেকেই মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। মানুষ হয়ে জন্মানো খারাপ কি? দেবতাদের জন্য তো বটেই। কারণ, মনুষ্যজন্মে সুখ-শান্তি, কষ্ট-দুঃখ সবই তো আছে। তাহলে মানুষ হয়ে জন্মানো খারাপ কি? অষ্টবসু সে সময় বলেছিল, আমাদেরকে এমন একজনের গর্ভে জন্ম দাও সে যাতে জন্মের সাথে সাথে আমাদেরকে উদ্ধার করতে পারে। তখন গঙ্গাদেবীকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। শান্তনু গঙ্গার অপূর্ব রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন গঙ্গা বলে যে, হ্যাঁ আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারি, তবে আমাকে আমার কোনো কাজে বাধা দেওয়া যাবে না। যেদিনই বাধা দেবে, সেদিনই আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। এ শর্ত মেনে নিয়েই শান্তনু তাঁকে বিয়ে করল। বিয়ের পর সাত সাতটা সন্তান হলো। কিন্ত সন্তান হওয়ার পর গঙ্গাদেবী প্রত্যেক সন্তানকেই পানিতে ডুবিয়ে মেরে ফেললো, মানে উদ্ধার করলো। এরপর আট নম্বর সন্তান যখন জন্মালো, তখন শান্তনু তাকে বাধা দিলো। গঙ্গা বললো, ঠিক আছে, এই নাও তুমি তোমার সন্তান; আমি চললাম। এই সন্তানই ভীষ্ম। সে অষ্টবসুর একজন। অষ্টবসুর অন্য সাত জনের দোষ একটু কম ছিল বলেই তারা মানবজন্ম নিয়েই ফিরে গেল, আর ভীষ্মের দোষ একটু বেশি ছিল বলে তাঁকে অনেক দিন পৃথিবীতে থাকতে হলো।

চিহ্ন : তাহলে কি যার দোষ বেশি থাকে, সে কি পৃথিবীতে বেশি দিন থাকে?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, থাকবে। এই দর্শনটাও মহাভারত-এ পাওয়া যাচ্ছে। জীবনের প্রতি নিস্পৃহ নয়, আবার জীবনটা এমন কোনো জিনিস নয়, চাহিবার জিনিস নয়, ভোগান্তিই বটে। যতদিন পৃথিবীতে থাকবে ভোগান্তিই হবে। এসব দিক থেকে মহাভারত একটা আশ্চর্য গ্রন্থ।

চিহ্ন : কবিরা যেমনটা বলেন, ‘দীর্ঘ জীবন দীর্ঘ অভিশাপ’।

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। দীর্ঘ জীবন, দীর্ঘ অভিশাপ!

চিহ্ন : তাহলে মহাভারত-এ এরকম বিষয় আছে?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। সেজন্যেই তো বলছি, ভারতবর্ষের সভ্যতার নির্যাস, অর্থাৎ সভ্যতার ভিতর যা যা ছিল— মহত্ব, নীচুতা, কুটিলতা— সবকিছুই মহাভারতের মধ্যেই আছে আর কি। কেউ কেউ বলে, শ্রীকৃষ্ণ তো ইমপিয়ারালিস্ট ছিল, ওর কাজ ছিল সমস্ত গৃহযুদ্ধ বন্ধ করে দিয়ে, ভারতবর্ষকে একসঙ্গে করে স¤্রাট হবে। হয়তো যুধিষ্ঠিরই হবে। আর যুধিষ্ঠির হওয়া মানেই তো তারই হওয়া। যাই হোক, তবে তার পরিকল্পনাটা তাই ছিল। তার পরিকল্পনা ছিল কোনো বিরোধী দল থাকবে না। কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক নৃসিংহ ভাদুড়ি এসব ব্যাখ্যাগুলো করেছেন।

চিহ্ন : রবীন্দ্রনাথের অনেক কাহিনি কবিতায়, যেমন : কর্ণ-কুন্তী সংবাদ, গান্ধারীর আবেদন-এ মহাভারতের কাহিনির রিকনস্ট্রাকশন হয়েছে।

হা. আ. হ. : একদম ঐ গল্পগুলোকে নিয়েই রাবীন্দ্রিক করেছেন আর কি। এর ভিতরে যারা আছে, তারা একালের মানুষ প্রায়, আবার সর্বকালেরও বটে। আর রবীন্দ্রনাথ লোকটাও তো আমাদের জন্য বিরাট এক আশ্চর্য! মহাভারত যেমন আশ্চর্য, রবীন্দ্রনাথও আশ্চর্য। একি মানুষ আমি বুঝি না! যেমন তাঁর একটা কবিতায় আছে, তপবনে গৌতম ঋষি পড়াচ্ছে, একজন জাবালিকে জিজ্ঞাসা করছে, তোমার পরিচয়টা কি? তখন সে বলেছে, আমি তো আমার পরিচয়টা জানি না, মাকে জিজ্ঞাসা করে আসি। তখন সে তার মা জাবালার কাছে গিয়ে নিজের পরিচয়টা জানতে চেয়েছে। মা তখন সহজ উত্তর দিয়েছে। বলেছে, এত টানাটানি ছিল, এত দারিদ্র্য ছিল, শেষ পর্যন্ত গণিকাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়েছি। সেই গণিকাবৃত্তির সময় কত পুরুষ যে আমার কাছে এসেছে, ফলে তুমি কার সন্তান আমি ঠিক বলতে পারবো না! কি কথা!— ‘যৌবনে বহু পরিচর্যা করে পেয়েছিনু তোরে/ জন্মেছিস ভতৃহীনা জাবালার ঘরে/ পিতা তব নাহি জানি তা তো!’ জাবালি ঠিক এ কথাটাই গৌতমকে গিয়ে বলেছে। গৌতম কথাটা শুনে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছে, ‘তুমি শুধু ব্রাহ্মণ নও, দ্বিজ নহ, তুমি দ্বিজত্ব’। কি দারুণ কথা! কর্ণ অতো বড় বংশের ছেলে, অথচ সে হয়ে গেল রথচালক অধিরথের ছেলে! এবং সারাজীবন সে ঐ অপমানটাই সহ্য করেছে। ‘যা যা যা যা, রথের রশি টানগে যা’— ভীম একথাও বলেছে! এখানে আত্মসমর্পণেরও একটা ব্যাপার আছে।

চিহ্ন : সে কিন্তু এক ধরনের ধর্মও পালন করেছে?

হা. আ. হ. : ওরে বাবা! তার মতো ধার্মিক লোক তো ছিল না! তার মা কুন্তী যখন তাকে মাতৃ¯েœহে সা¤্রাজ্যে ফিরে যেতে বলছে, তখন কিন্তু সে ফিরে যায় নি। কারণ, সে দুর্যোধনকে কথা দিয়েছে, তার পক্ষে যুদ্ধ করার। সে তার মাকে বলে দিয়েছে, একজন যাবে, পাঁচজন থাকবে। কে থাকবে আমি জানি না। শুধুমাত্র স্বধর্ম রক্ষার জন্য, নিজের কথা রক্ষার জন্য, নিজের ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তার মৃত্যুর পর কুন্তী যখন বলেছে, কর্ণ তোমাদের বড় ভাই ছিল, তখন পা-বরা হা হা করে উঠেছে! বলেছে, উনি তো আমাদের দাদা, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আগে জানলে এ যুদ্ধ করার কোনোই দরকার হতো না! মা তুমি কথাটা গোপন করেছ কেন? যুধিষ্ঠির তখন বলল যে, মা আমি এই অভিশাপ দিচ্ছি— মেয়েদের পেটে কোনো কথা গোপন থাকবে না! এই সমস্ত কাহিনি কি মহাভারতে কম নাকি। এছাড়া উপকাহিনিও কি কম! যেমন বৃহস্পতির ছেলে কচ সঞ্জীবনীবিদ্যা শেখার জন্য শুক্রাচার্যের কাছে এসেছিল। কচ সহ¯্র বছরের জন্য শুক্রাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করল। গুরু ও গুরুকন্যার সেবারত কচ পূর্ণ ব্রহ্মচার্য পালন করতে লাগল। কিন্তু ঘটনাক্রমে দেবযানী রূপবান কচের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল— ইত্যাদি। এই পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ রচনা করলেন ‘স্বর্গ হতে বিদায়’। কি দারুণ কবিতা! এই কবিতার কথা আমি এখনো ভুলতে পারি না! ভারতবর্ষে এই রকম ব্যাপক প্রতিভা রয়েছে, তাই না? কালিদাস কি কম? কালিদাস, কি আশ্চর্য! পৃথিবীতে এরকম কবি কজনইবা আছে!

চিহ্ন : আপনি বাল্যকাল থেকে প্রচুর বই-পুস্তক পড়ছেন, বইয়ের মোটামুটি একটা লাইব্রেরিও দেখতে পাচ্ছি— এগুলো সখের বসেই। এই জার্নির ভেতর মহাভারতও ছিল। তো মহাভারতের এই সমস্ত প্রবৃত্তিগত বিষয়, যেমন— লোভ-লালসা, রাজ্যক্ষয়, ভ্রাতৃত্ব দ্বন্দ্ব, পরিবার, সংসার, রাজ্য, রাজত্ব— এসব কিছু আপনার লেখার মধ্যে নিশ্চয়ই ইন্সপায়ার তৈরি করেছে। হয়তো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। তো সেই ইন্সপায়ারের জায়গাগুলো নিশ্চয়ই একটা সাহিত্যসত্তাও তৈরি করেছে?

হা. আ. হ. : নিশ্চয়ই করেছে। ধরো আগুনপাখির কথা। এটা ভারতবর্ষ বিভাজন সম্পর্কে লেখা। মহাভারতই আমাকে পুরোপুরিভাবে ইন্সপায়ার করেছে। মহাভারত না পড়লে তো আগুনপাখি লেখা যেত না। পারতাম না। কুন্তীর মতো চরিত্র আমার সামনে না থাকলে আগুনপাখির চরিত্র তৈরি করা কঠিন হতো। আসলে কোথা থেকে কোন বিষয় যে মানুষকে ইনস্পেয়ার করে, মানুষ নিজেও তা জানে না। কবি-লেখকরা জানেও না যে, সে কার কথা বলছে! ‘ওরা কার কথা কয়রে ওরে কিশলয়’ কিংবা ‘সহসা ডাল-পালা তোর সচকিত ও করবী’— আছে না, কি যেন একটা?

চিহ্ন : তো এগুলো আপনার একটা ইন্সপিরেশনের জায়গা অবশ্যই?

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। এটা এলোপ্যাথিক ডাক্তারের টনিক ওষুধ তৈরির মতো। খুব তেতো হলো একটু সিরাপ দাও, আরেকটু দাও হ্যাঁ— এটা ওই রকমই। আনন্দ দেবে, দুঃখ দেবে, ব্যথা দেবে, ভীষণ কষ্ট দেবে। আমি তো মনে করি সাহিত্যের একটা ট্রিমেন্ডাস ক্ষমতা আছে। কিন্তু শরতের মেঘ দেখার মতো হালকা কোনো কিছু সাহিত্য হয় না। সাদা মেঘ ঘুরঘুর করে উড়ে বেড়াচ্ছে, অন্যমনস্ক হয়ে একটু তাকিয়ে থাকলাম। এভাবে করলে সাহিত্য হয় না। টলস্টয় যখন পড়বে তখন দেখবে, এটা খুঁড়তে খুঁড়তে তোমাকে যে কতো দূর নিয়ে যাবে, কিচ্ছু টের পাবে না! যে কোনো বড় লেখকের ব্যাপারই এরকম। হোমার পড়লে ওরকম পাগল হয়ে যেতে হয়। ওডিসি পড়লেও তাই। তবে আমি ভার্জিল আর দান্তে তেমন পড়িনি।

চিহ্ন : এখন যারা লেখক আছেন— জেনারেশন আফটার জেনারেশনে একটা পরিবর্তন আসে এবং এক জেনারেশন থেকে অরেকটা জেনারেশনের মধ্যে একটা তৈরি হওয়ার ব্যাপারও ভেতরে ভেতরে থাকে। সেখানকার অভিজ্ঞতা থেকে, মহাভারত এতো বড়! সেটা কি পড়া যায়, কিংবা এইগুলো সব পুরোনো-প্রাচীন কথা। আর সব থেকে বড় কথা, লেখক হতে গেলে যে পড়াশুনা, কিংবা যে সমস্ত ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ আছে, সে গ্রন্থের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় যে, সে বিষয়গুলো এখন কিন্তু তেমন তৈরি হচ্ছে না! যেমন— ছেলেদের মহাভারত, কিংবা ছোটদের মহাভারত— এই জিনিসগুলো আজকাল তো নেই। সবকিছুই নেটকেন্দ্রিক বা ই-লাইব্রেরি, এটা-সেটা বলা হচ্ছে। ফলে আমাদের মনে হয় যে, লেখকসত্তা তৈরি হওয়া কিংবা সাহিত্যবোধ তৈরি হওয়ার বৃত্তিগুলো এখন মনে হয় তেমন একটা নেই! আপনি একটু আগে বললেন, সাহিত্য শরতের আকাশের উড়ুউড়ু মেঘের মতো— এটা হয় না। এই কথাটার সত্যতাও এখানে পাওয়া যাচ্ছে। ঠিক উড়ুউড়ু মেঘের মতো অনেকেই অনেক কিছু বলে যাচ্ছে, ছুঁয়ে যাচ্ছে, কেউ বর্ণনা করছে। কিন্তু, কেউ ভেতরে যাচ্ছে না, কিংবা কেউ একটা স্ট্যান্ড বেছে নিচ্ছে। আসলে তাদের স্টোরির টেলিংটার ভিত্তিটা কম। আমরা পাঠকেরা যে জায়গাগুলো থেকে স্ট্যান্ডটা নেবো, সে জায়গাগুলোতে দেখতি পাচ্ছি, এক ধরনের খামতি থাকছে! ফলে আমরা যদি বলি, বর্তমান সময়ের কে ভালো লেখক, কিংবা কার লেখা একটা মান স্পর্শ করেছে? মান কথাটা আপেক্ষিক। তবে কিছু কিছু লেখা মান স্পর্শও করেছে। আমরা চাচ্ছি যে, এখনকার সময়ে যারা লিখছে, তাদের মধ্যে এই ক্লাসিক্যাল গ্রন্থগুলো একটু থাক। যেমন— শিবরাম, মহাভারত, ইলিয়াড, টলস্টয়, দস্তভস্কি, কিংবা আমাদের সাহিত্যের মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্কর— এই রেটিং-এর রাইটার যদি পেতে চাই, কিংবা এ ধরনের সাহিত্য যদি পেতে চাই, তাহলে এই ক্লাসিক্যাল সাহিত্যগুলোর পঠন-পাঠনের ব্যাপরটা তো জরুরি?

হা. আ. হ : অবশ্যই জরুরি। তবে জরুরি শুধু তার জন্য নয় যে, অমিত প্রতিভাবান। যেমন— অদ্বৈত মল্লবর্মণ। এই মানুষটি খুব যে পড়াশুনা করা মানুষ, তা কিন্তু মনে হয় না। কিন্তু উপন্যাস লিখতে গেলে প্রথম দিকে তাঁর তিতাস একটি নদীর নাম পাঠ্য। তাছাড়া উপন্যাসের ভ্যারাইটিস দেখতে গেলে মনে হয়, আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নাই! হবে কিনা তাতেও সন্দেহ! তাহলে এখন কি করবো বলো? তাহলে কি এই ধরবো যে, মানুষের আয়তন ক্রমেই খাটো হয়ে যাচ্ছে, বামণের জন্ম হচ্ছে বেশি! জানি না। কিছু বুঝতে পারি না। বলতে তো পারিই না।

চিহ্ন : আপনার কথাটা অবশ্যই সুন্দর। তবে আজকালকার ছেলেমেয়েরা চায় যে, আমি মিলিটারি অফিসার হবো; কেউ বলছে, আমি ডাক্তার হবো; কেউ বলছে, আমি ইঞ্জিনিয়ার হবো; কেউ বলছে, আমি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হবো ইত্যাদি। কিন্তু লেখক হবো— এমন স্বপ্ন কেউ দেখছে না! তবুও যারা লেখক হতে চায়, বা লেখক হতে গেলে যা কিছু লাগে, যে বুদ্ধি-বিবেচনা দরকার, যে বোধ-শক্তির দরকার, কিংবা লেখক হওয়ার জন্য যে প্যাশন দরকার, সেটা কিন্তু এখন তেমন নেই! এটা মনে হয় পারিবারিক মূল্যবোধ থেকেই হোক, সামাজিক মূল্যবোধ থেকেই হোক, এই জিনিসটাকে এনকারেজ করা হচ্ছে না, কিংবা সে রকম লাইব্রেরিতে যাওয়া, বই-পুস্তক থাকা, কিংবা এই বইটা পড়ো— সেটা নেই এখন। এখন একটা প্রতিযোগিতামূলক ফলাফল প্রত্যাশী লেখাপড়া শুরু হয়েছে। সে কারণে লেখক হতে চাওয়ার স্বপ্নটাও দূরাহত!

হা. আ. হ. : নেই! নেই! নেই!

চিহ্ন : আপনার এখানে বিচিত্র বই-পুস্তকের যে জগত রয়েছে, সেটা আমরা দেখছি এবং অনুপ্রাণিতও হচ্ছি। আপনি আপনার রুচির জায়গা থেকে বলেছেন যে, রামায়ণ আপনাকে কম টানে, মহাভারত খুবই আকর্ষণীয় বিষয় এবং এটার বহু বিচিত্র উপকাহিনিও রয়েছে। এ বিষয়গুলো আপনার আগুনপাখির মধ্যেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া আপনার মধ্যে যেহেতু কালিদাস আছে, মহাভারত আছে, সে কারণে অলক্ষ্যে-অগোচরে তা শকুনের মধ্যেও আছে, কিংবা আমৃত্যু-আজীবনের মধ্যেও আছে, কিংবা মা-মেয়ের সংসারের মধ্যেও এ বিষয়গুলো থাকতে পারে। রিসার্চ করলে হয়তো পাওয়া যাবে কিছু। যারা রিসার্চ করছে, তারা সেটা বের করবে। কিন্তু এখনকার যারা গল্পকার, যেমন— সত্তরের দশক, আশির দশক, আমরা এখনকার কথা বাদ দিচ্ছি, শূন্য-দশকের কথা বাদ দিচ্ছি। তাছাড়া সত্তর-আশির দশকের লেখকরা, তাঁদের বয়স এখন ৪৫-৫০ বছর হয়েও গেছে; তাঁদের মধ্যে মত্র পাঁচ-সাতজন কথক বা ফিকশনিস্ট পাচ্ছি। আমরা স্বাধীকার আন্দোলন করলাম, ভাষাভিত্তিক একটা আন্দোলন করলাম— দেশ স্বাধীন হলো। আমাদের দেশ স্বাধীনের পর আমরা তো অনেক কিছু চেয়েছি। যেমন— আমাদের ভালো সাহিত্য হবে, স্বাধীন দেশে কবি থাকবে, লেখক থাকবে এবং তাঁরা ভারতীয় ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকারী হবে। কিন্তু, সেটা হলো না কেন? আমি কাউকে দোষারোপ করছি না কিংবা অন্যভাবে দেখার কোনো বিয়ষও না। কিন্তু, একটা অবজারভেশন তো থাকা দরকার। আপনারা স্যার ষাটের মানুষ, ষাটের লেখক। আপনাদের পরের জেনারেশন, এখন আমি যদি কিছু নামও বলি, যেমন সুশান্ত মজুমদার, হরিপদ দত্ত— যেমন মঞ্জু সরকার, যেমন আরেকটু পরে নব্বয়ের দিকে ইমতিয়ার শামীম, আহমাদ মোস্তফা কামাল, কিংবা ওয়াসী, প্রশান্ত মৃধা, জাকির তালুকদার, আরেকটু আগের দিকে নাসরিন জাহান, শাহীন আখতার— এ ধরনের কিছু লোক আমরা পাচ্ছি। কিন্তু স্পর্শ করার মতো, সর্বজনমান্য গ্রন্থ, যেমন চিলেকোঠার সেপাই, যেমন চাঁদের অমাবস্যা— এ রকম গ্রন্থ কেনো আমরা পাচ্ছি না? তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার পরে যে স্বপ্নটা ছিল, সেই স্বপ্নটা এভাবে কেনো মিলিয়ে গেলো?

হা. আ. হ. : এর উত্তর তো আমিও খুঁজি! এভাবে কেনো মিলিয়ে গেল, কেনো! দোষ আমাদের। তাছাড়া কার দোষ দেবো বলো!

চিহ্ন : এখানে আমাদের যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা— আমরা একটু আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার দিকে যাই— আমাদের বাঙালি মুসলমানদের যে ব্যাপারটা, সেখানে আসলে রামায়ণ, মহাভারত কিংবা ভারতীয় যে ট্রাডিশন সেখানে যে দীর্ঘ ঐতিহ্যের ব্যাপার— আমাদের যে সমন্বয়, আমাদের যে লোকায়ত ধর্ম, যে লোকায়ত ঐতিহ্য— যেমন লালনের মধ্যে বা শ্রীচৈতন্যদেবের মধ্যে যেটাই বলি, তাদের এক ধরনের লোকজ ভাবনা, লোকজ জীবন-ব্যবস্থা, লোকজ ধ্যান-ধারণার একটা ব্যাপার আছে। সেই জিনিসগুলোর একটা সমন্বয়ী প্রয়াস কি দাঁড়ায় নি আমাদের ভেতর?

হা. আ. হ. : না। দাঁড়ায় নি!

চিহ্ন : আমরা কি হিন্দু-মুসলমান থেকেই গেছি?

হা. আ. হ. : অনেকটা। হিন্দুদেরও পতন হয়েছে।

চিহ্ন : হ্যাঁ, হয়েছে। একইভাবে হয়েছে। বরঞ্চ আমার মনে হয়, বাঙালি মুসলমানরাই বেশি কমপারেটেব্লি লিবারাল।

হা. আ. হ. : হিন্দুদের এদেশে তো হয়েছেই। কি করবে তারা! পশ্চিম বাংলাতেও তাই। এমন কোনো বিরাট ব্যাপার কিছু হয় নি। মুসলমানদের কথা ছেড়ে দিলাম। সাম্প্রতিক খবর আমি জানি না। তবে মনে হয় না যে এ চিত্রটার খুব একটা বদল হয়েছে। আমাদের ছোটবেলায় আমরা যেমন দেখেছি, পশ্চিম বাংলা যেমন ছিল, এখনও তার চেয়ে এগিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এটা হয়েছে। অদ্ভুত কা-! কিন্তু, কেন যে এরকম হলো?

চিহ্ন : মুসলমানদের নিয়ে বিষাদ-সিন্ধু তো লিখেছেন মীর মশাররফ হোসেন। পরে আমাদের মধ্যে মুসলমানমঙ্গল একজন লিখলেন। ঠিক আছে। ট্রাডিশনটা যদি ঐভাবেই আসে তবে সেই জিনিসটা হজম হচ্ছে না কেন?

হা. আ. হ. : বিষাদ-সিন্ধু তো হজম হয়েছে। অসাধারণ ব্যাপার। এখানে হিন্দু-মুসলমান কোনো ব্যাপারই না। ঐ যুদ্ধটার জায়গায় অন্য যে কোনো যুদ্ধ, যেমন সোহারাব-রুস্তমের যুদ্ধটা লাগিয়ে দিলেও অসুবিধা নেই।

চিহ্ন : একটা মহান রচনাই স্যার…

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, মহান রচনাই। তবে এজিদ রাজা, কিন্তু বেশ যোগ্য রাজা ছিল। খুব ভালো রাজা ছিল। মীর মশাররফ তার ফিকশনের কারণে ঐ রকম পুঁথির মতো করে নিয়েছে। সেখানে এই বইটাই দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু, এখনকার সময় কোথায় যে খাদগুলো হচ্ছে! ভিতর থেকে যেটা আসা, সেটা কি হচ্ছে না! যা লিখব আমি সেটা উপরে উপরে লিখে গেলাম। ভিতর থেকে আসছে না জিনিসটা! অনুভবগুলো কি ঘটছে না! এই যে চোখের সামনে বাংলাদেশ দেখছি, মানুষের সাথে মানুষের ব্যবহার দেখছি, এক শ্রেণির সাথে আরেক শ্রেণির ব্যবহার দেখছি— সব মিলিয়ে। কিংবা ধরো বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধাই ধাই করে নীচে নামছে। এগুলো কেন হচ্ছে? উল্টো হওয়ার তো কোনো কারণ নেই, বরং উল্টোটাই হওয়া উচিত। স্বাধীন দেশ হয়েছে, সার্বভৌম দেশ হয়েছে, এখন উল্টো হওয়াই উচিত আমাদের। তা তো হচ্ছে না! আমি কোনো উত্তর খুঁজে পাই না! একটা জিনিস আমার মনে হয়— সমাজের সংগঠনকে কুক্ষিগত করে রাখা আর কি।

চিহ্ন : এই যে আধুনিক হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আসলে আমরা বিন্দুমাত্রও আধুনিক হইনি কিন্তু!

হা. আ. হ. : বিন্দুমাত্রও না!

চিহ্ন : বরং এখনো আমাদের মধ্যে রক্ষণশীল প্রবণতা রয়েছে। গোটা পৃথিবী জুড়েই হাজার বছর ধরে প্রগতিশীল আর রক্ষণশীল ব্যাপার দুটো আছেই। প্রগতিশীলরাই মানব সভ্যতার উন্নয়নকেই সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। সেটাই আসলে মানুষের পরিচয়। সেটাই তো মনুষ্যত্বেরও পরিচয়। তো সেটা যদি আস্তে আস্তে কমে যায়। কমে গিয়ে তার উল্টো দিকটারই যদি প্রকাশ ঘটে, তাহলে আমাদের আধুনিকতার জায়গাটা কোথায়?

হা. আ. হ. : বটেই। আমরা তো এখনও আধুনিক হইনি। সত্যি সত্যি আধুনিক হইনি!

চিহ্ন : এখন আমরা দেখছি রাজা আছে, রাজ্য আছে, মন্ত্রী-পরিষদ আছে, দশটা ল্যাপটপ আছে, এয়ারকুলার আছে, কালার টেলিভিশন চলছে, যেখানে আমি যা খুশি তাই করতে পাচ্ছি, যেটা ইচ্ছা সেটা দেখতে পাচ্ছি। তো আগে মোঘল রাজারাও তো স্যার তাই করতো! মোঘল রাজারাও ঐরকম বল্লম নিয়ে বসে থাকতো, চাকরেরা চামর দোলাতো। তারাও সুখ-আরাম-আয়েশ-ভোগবাদকেই লালন করতো। সে ভোগবাদটাই এখনো আছে। তাহলে আমরা এগুলামটা কোথায়?

হা. আ. হ. : না। এগোয় নাই!

চিহ্ন : মহাভারতের যে জিনিসগুলো, সেগুলো তো একেবারেই স্পষ্ট। এই রাজ্যে, সমাজে সর্বত্রই ওরকমই তা-ব চলছে। সেখানে লেখকের যে জায়গাগুলো— যাঁরা পঞ্চাশের দশকের লেখক, ধরলাম ইমদাদুল হক মিলন, সাবের— ধরলাম মঞ্জু সরকার, ধরলাম সুশান্ত মজুমদার, কিংবা তার একটু পরে আকিমুন, নাসরিন কিংবা শাহীন আখতার— নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বললাম। এঁরা লিখেছেন। এঁদের যে ডিউটি, লেখক হিসেবে তাঁদের যে কলমিশক্তি সেটা একটু রেনোভেট করে— হিস্ট্রি, ট্রাডিশন, মর্ডানিটি— সেটাকে বিচিত্রভাবে এক ধরনের মন্থন করা, এবং মন্থন করে সেটাকে একটা আধুনিক রূপ দেওয়া ইত্যাদি। সেগুলোও তো আমরা পেতে চাই। কিংবা আমরা যখন বাইরের সাহিত্যগুলো দেখছি, আমরা যখন অ্যাচিবি পড়ছি, আমরা যখন থিংগ্স ফল এ্যাপার্ট পড়ছি, কিংবা আমরা আবার যখন হেমিংওয়েতে ফিরে আসছি, তখনো মনে হচ্ছে। তাহলে এই জিনিসগুলোকেই পরিবার, সমাজ থেকেই এক ধরনের দুর্বলতা, একটা খ-িত, একটা বিচূর্ণিত ব্যাপার কি?

হা. আ. হ. : আমারও সেটা মনে হয়। আমাদের রাষ্ট্রের ধারাটা দেখো। উপনিবেশ, ফের উপনিবেশ, সাধারণ মানুষের লড়াই, তারপরে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে পা রেখে উঠে বসা। তবে ব্রিটিশ আমলে অনেকগুলো পজেটিভ দিক ছিল। যেমন, তখন শাস্তি হতো, বিচার ব্যবস্থা ঠিক ছিল, আইনগুলো ঠিক ছিল, এক কথায় সমাজের একটা বাঁধন ছিল। কিন্তু বর্তমান অবস্থা এলিয়ে পড়ার মতো। সে দিক থেকে আমাদের সুভাগ্যই বটে। আমরা যদি নবাব সিরাজদ্দৌলার পর পরেই স্বাধীন হতাম। তাহলে কি যে করতাম! উইলিয়াম কেরি যদি না আসতো, তাহলে গদ্যটার যে কি হতো! বঙ্কিমচন্দ্র তো আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, বিদ্যাসাগরও তাই। বিদ্যাসাগর তো যথেষ্ট ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত। এঁরা না আসলে বাংলা গদ্যের যে কি হতো! আমার মাঝে মাঝে এমন মনে হয়। উপনিবেশ হয়ে কি তাহলে ভালোই হয়েছে?  অন্তত উড়ে এসেছে অনেক  বাইরের জিনিস! এটা ঠিক কথা। শিমুল পেকে ফেটে গেলে সে বিস্তারিতই হয়। কতো দূরে চলে যায়, গিয়ে এক জায়গায় পড়ে। সেখানে আবার একটা বিশাল গাছ তৈরি হয়। ইংরেজ আসার ফলে আমাদের ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। কারণ, আমাদের তো কাজ-কর্ম করে দিতে হবে। যারা কাজ করতো তারা তো দু-চার ঘণ্টা সময় পেতোই। আর সে সময় তারা ডিকেন্স পড়বে, হার্ডি পড়বে। আটকাতে পারবে কেউ? পড়বেই তো সে। আর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃথা যাবে না সেটা। টমাস হার্ডি পড়লে সেটা বৃথা যাবে? যাবে না। শেক্সপীয়র পড়লে বৃথা যাবে? কখনো তা যায় না। আমাদের ভাগ্য ভালো যে, আমরা ইংরেজ উপনিবেশ হয়েছি। আমরা যদি ফরাসি উপনিবেশ হতাম, তাহলে কি হতো আমি জানি না। যদি পর্তুগীজ উপনিবেশ হতাম, যদি জার্মান উপনিবেশ হতাম, তাহলে কি হতো? পর্তুগীজরা তো এদেশে এসেছিল। সর্বপ্রথমে তারাই এসেছিল। তারাই যদি থেকে যেত। কারণ, এরাই কিন্তু প্রথম দিকে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল আমেরিকাতে। আমেরিকাতে কিন্তু কোনো জাত হয় নাই। বরং সবকিছু মিলিযে একটা ম- পাকিয়ে গেছে! ফলে আমেরিকাতে কোনো চরিত্র দাঁড়ায় নি। এখনো সেই কারণেই হয়তো বোস্টন দেখলেই মনে হবে, আরে এটা তো আইরিশ শহর। ক্যালিফোর্নিয়ায় গেলে তোমার কি মনে হবে আল্লাই জানে! তারপর হার্সা নদীর পারে গেলে মনে হবে পর্তুিগজ, আমস্টারডাম ইত্যাদি। নিউ আমস্টারডামটা ওরাই স্থাপন করেছিল কিন্তু। আফ্রিকার বোয়ার যুদ্ধের সময় পর্তুগিজদের সঙ্গে ইংরেজদের খুব লেগেছিল। সেই যুদ্ধটারও কিন্তু মারাত্মক ফল ছিল। তার কিছুদিন পরই বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এসব যুদ্ধ-টুদ্ধ সব খেয়োখেয়ি। কিন্তু এগুলো হলে সমাজে পরিবর্তন এসেই যায়, কোনো উপায় থাকে না ঠেকাবার। খেলাফত যদি ভালো হয় তো ভালো কথা। কিন্তু খলিফাকে খেদিয়ে দিয়ে আতার্তুক আসার পরে তুরস্ক যে আধুনিক হয়েছে, এটা তো আমরা সকলেই স্বীকার করি। সেজন্যই আমি বলি যে, ১৯০ বছরের যে উপনিবেশ, সে উপনিবেশে আমাদের কালচার, আমাদের সাহিত্য— সবকিছুর গায়েই কিন্তু আলাদা একটা বসন্তের বাতাস বয়ে গেছে। আমার মনে হয়, পৃথিবীর সব সম্প্রদায়ই তাই। সবকিছু মিলিয়েই একটা নতুন কিছু হয়। ইংরেজরা বলে আমরা এ্যাংলো-স্যাক্সন, জুট— আলাদা আলাদা চলে আর কি। স্কটরা বলে আমরা অন্যরকম। তাই না? একজন স্কট ডুবে যাচ্ছে তখন একজন বলছে যে, গিভ ইয়োর হ্যান্ড, গিভ ইয়োর হ্যান্ড, কিন্তু সে কিছুতেই দিলো না। অথচ সে ডুবে মরছে, কিন্তু হাতটা ধরছে না! তারপর সে বলছে, ইউ টেক মাই হ্যান্ড। তখন সে হাতটা খপ করে ধরেছে। মানে তার গিভের বেলায় নেই, টেকের বেলায় আছে। স্কটদের খুব নিন্দা করা হচ্ছে তাই না? তবে এই দুর্নামটা স্কটদের জন্য ঠিকই। কারণ, তুমি যদি একজন ইংরেজকে দাওয়াত করো তাহলে সে একটা মদের বোতল নিয়ে তোমার বাড়িতে আসবে। আর যদি একজন স্কটকে দাওয়াত করো তাহলে সে তার ছোট ভাইকে নিয়ে হাজির হবে। তারা ডুবে মরবে, কিন্তু গিভ করবে না! এই সমস্ত জিনিস একেকটা জাতি সম্পর্কে বলা হয়েছে। তবে তুমি যাই বলো, মানুষের সভ্যতা কিন্তু সব মিলিয়েই। আমি সেন্ট ম্যারিস ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিলাম। অসাধারণ দেখতে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকিনি আমি। রাত্রিবেলায় গিয়েছিলাম। সমুদ্রের পাড়ে বিশ্ববিদ্যালয়। আমার আবার ঐসব ব্যাপারগুলো খুবই টানে। প্রকৃতি, প্রকৃতি দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হওয়া; রুক্ষ্ম প্রকৃতি, পৃথিবীর যে কোনো প্রকৃতিই হোক না কেন— আমাকে ভীষণ টানে।

চিহ্ন : আপনার লেখার মধ্যেও কিন্তু সেটাই আছে। প্রকৃতি সম্বন্ধে আপনার একটা ইন্দ্রিয়ঘন ব্যাপার আছে।

হা. আ. হ. : আছে না?

চিহ্ন : হ্যাঁ।

হা. আ. হ. : মানে একদম শুকনো নয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো প্রকৃতির বর্ণনা দেন নি। আর বিভূতিভূষণের লেখায় প্রকৃতির বর্ণনায় ভরপুর, তারাশঙ্কর রুক্ষ্মভাবে প্রকৃতির বর্ণনা দিয়েছেন। একেকজনের ধরণ একেক রকম। আমার মধ্যে— তোমরাই তো বলো, অতো নরম দৃষ্টিভঙ্গি আমার না। মানুষকে, মানুষের স্বভাবটাকে আমি দেখি, সেখানে রোমান্টিকতার কোনো রকম প্রকাশ থাকে না। দিই না। কিন্তু আমার লেখায় যখন প্রকৃতি ঢুকিয়ে দিই তখন কি ওরকম খটখটে জিনিস কি রোমান্টিক হয়ে যায়?

চিহ্ন : না না।

হা. আ. হ. :  সাবিত্রী উপাখ্যান-এ আমি এক জায়গায় ওরকম একটা ব্যাপার মনে করেছিলাম।

চিহ্ন : না। আপনার পুরো জিনিসটাই সিরিয়াস। কিন্তু সিরিয়াস জিনিসটার মধ্যে যখন প্রকৃতির বর্ণনাগুলো আসে, তখন সিরিয়াসটা একটা আলাদা মর্যাদা পায়, আলাদা একটা প্রকাশ পায় এবং সে প্রকাশটাই বলে দেয়, প্রকৃতির যে বৈচিত্র্য এবং তার ভেতরের ফ্লেভারটা আপনার লেখায় ভিন্ন একটা অর্থ নিয়ে আসে। যেমন আপনার আত্মজা ও একটি করবী গাছ-এ আছে, ‘কলা গাছটি বুক-পিঠ দেখায়’। এটা কিন্তু ইন্দ্রিয়ঘন না হলে সম্ভব না। আপনি যখন লেখেন, একটা অন্ধকার নেমে আসছে, তখন বোঝা যায় যে, কুসংস্কার  চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরেছে। তবে, তাতে কিন্তু অন্ধকারেরও একটা আলাদা রূপ ধরা পড়ে।

হা. আ. হ. : হ্যাঁ, আছে। সাবিত্রী উপাখ্যান-এ বার বার রেপ আছে। ‘হল্ট’ মানে ছোট একটা স্টেশন, সেখানে ট্রেন দাঁড়ালেও দাঁড়াতে পারে, আবার না দাঁড়ালেও না দাঁড়াতে পারে। একটা ঘর, স্টেশন মাস্টার নেই। এই স্টেশনের চারিপাশে জঙ্গল-টঙ্গল রয়েছে। সেখানে একটা রেপ দৃশ্য আছে।

চিহ্ন : আমরা তো স্যার সাবিত্রী উপাখ্যান পড়লাম। দেখলাম ঐ রেপের জায়গাগুলো এখানে রয়েছে, এবং একটা রেপিস্ট নারীর বর্ণনাগুলোও সেখানে রয়েছে। তবে কোনো অর্থেই তা ন্যুড নয়। এখানেও দেখা যাচ্ছে, প্রকৃতির সাথে অঙ্গীভূত করে তার প্রত্যেকটা জিনিসকে আপনি অর্থারোপ করার চেষ্টা করছেন।

হা. আ. হ. : হয়তোবা। ওই যে, এখান থেকে ওখানে যাচ্ছে— দুই পাশে যে ধানের ক্ষেত। সেইখানে চলে যাচ্ছে।

চিহ্ন : প্রচুর উপমার ব্যবহারও কিন্তু আছে, এবং সে উপমাগুলোর ভেতর দিয়ে সাবিত্রীর একটা সামাজিক পরিণতি, তার যে একটা মর্যাদাহীনতা, মানুষ হিসেবে সমাজে সে ক্ষুদ্র, অতিশয় ক্ষুদ্র, এবং সে যে আস্তে আস্তে গোবরে পোকায় পরিণত হচ্ছে। মানুষ তাকে শকুনের মতো ঘিরে ধরছে। যেখানেই যাচ্ছে, সেখানেই ধরছে। এই জিনিসগুলো যেভাবে এসেছে, এটা শুধু প্রকৃতি তো বটেই— আমি খেয়াল করেছি যে, ধানের ক্ষেত, আইল, চতুর্দিকের বর্ণনা, এবং সেখানে মেয়েটার একাকিত্ব, তার নির্যাতন-নিপীড়ন! এটা কিন্তু প্রকৃতির মধ্য দিয়েও তৈরি হচ্ছে, এবং এ কারণেই কিন্তু আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি, মহাভারতের যে বিস্তৃত পটভূমি, সেই পটভূমির মধ্যেও কিন্তু এই জিনিসগুলো আছে, নানা রকম করে আছে। সুতরাং এটার পাঠ-অভিজ্ঞতা, এটার আদি পাঠ আপনার আছে, চলছে, ভেতরে আছে, এবং নানাভাবে তার রূপায়ণ ঘটছে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে। এই রূপায়ণগুলোকেই কিন্তু একটা জিনিসকে মজবুত করে। একটা ক্লাসিক্যাল মর্যাদা দেয় আর কি। সাবিত্রী উপাখ্যান-এ নিছক যে সাবিত্রী রয়েছে, এখনকার বাংলাদেশের সমাজে সে সাবিত্রী হাজার হাজার। সেই জায়গা থেকে আমার জিজ্ঞাসা, এই রকম জিনিস এখন আসলে হচ্ছে না— এর কারণ কি পড়াশুনার ব্যাপারগুলো বা ঐ চেতনাটা, ঐ ধারণাটা, ঐ বিষয়বস্তুটা? এতো সমস্যা সমাজে, এতো জটিল সমস্যা, এতো ক্রুয়েল একটা জীবন চলছে, অথচ কেউ তার প্রকাশ সেভাবে করছে না, বা হচ্ছে না। এটা আসলে লেখকদের যে জ্ঞানচর্চার ভিত্তি, চিন্তা-চেতনার ভিত্তি, বোধ-বিচারের যে একটা ঐতিহ্য, ধারাবাহিকতা— সেটা বোধ হয় আমাদের এই প্রজন্মের মধ্যে একটা হাওয়া, মানে পালে বাতাস লাগছে না?

হা. আ. হ. : না না না! লাগছে না। বললে কি হবে লাগছে না! আমি বললে হয়তো বলবে, আপনি আগেকার লেখক, কিন্তু সমাধান কি হবে! আমি তো বুঝতে পারি, ওদের লেখা আমি পড়ি তো, একেবারে পড়ি না তাতো নয়।

চিহ্ন : তাহলে সর্বসাকুল্যে মহাভারত-এ দেবত্ব-মহত্ব বলে কিছু নেই?

হা. আ. হ. : না না না। ওসব কিছু নেই। দেবত্ব-মহত্ব বলে কিছু নেই। ওগুলো তুমি জাস্ট ঝেড়ে দিতে পারো। মহাভারত-এ কৃষ্ণের যে বিশ^রূপ দেখানোর কথা বলা হচ্ছে, এ করছে, তা করছে— এসব অলৌকিক বিষয় তুমি বাদ দিতে পারো; বরং গীতার এই শ্লোকটা তুমি পড়ে দেখতে পারো :

ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥

বেদাবিনাশিং নিত্যং য এনমজমব্যয়ম্।

কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়তি হস্তি কম্ ॥

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি

গৃহ্নাতি নরোহপরাণি।

তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি

সংযাতি নবানি দেহী ॥

অর্থাৎ ‘দেহ হত হলে আত্মা হত হয় না। আত্মা সর্বদাই এক প্রকার, এর জন্ম-বৃদ্ধি, ক্ষয়-হীন। হে পার্থ! যে এভাবে আত্মাকে জানে সে কাকেই বা বধ করে বা করায়? মানব যেমন পুরাতন বস্ত্র ছেড়ে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, তেমনি আত্মাও পুরাতন দেহ ছেড়ে নতুন দেহ ধারণ করে।’ দেখ কিভাবে কথাটা বলছে! আরেক জায়গায় বলা হচ্ছে : ‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন। / মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত¡কর্মণি ॥’— অর্থাৎ ‘কর্মেই তোমার অধিকার; কর্মফলে তোমার কখনও অধিকার নেই। তুমি ফলের আশা ছাড়, কিন্তু কর্ম ত্যাগ করো না।’ তুমি ত্যাগ করো, এবং ত্যাগের মাধ্যমেই ভোগ করো। এগুলো সম্পর্কে তুমি তো বলতে পারো না যে, এসব সংস্কৃত, পুরোনো জিনিস, কি সব আজেবাজে কথা বলছে! তুমি খেয়াল করে দেখো, এগুলো তো গভীর জ্ঞানের কথা। ‘মা ফলেষু কদাচন!’— তুমি একটা কাজ করলে, তার জন্যে ফল পেলে; কিন্তু তুমি ভোগ করতে পারবে না। তুমি ত্যাগ করো, এবং ত্যাগের মাধ্যমেই ভোগ করো। এসব কথা দারুণ লাগে! একজন প্রকৃত শিক্ষক কি করে? সে কিন্তু সবকিছু তার শিক্ষার্থীদের দেয়, এবং দেওয়াতেই তার সার্থকতা। সত্যিকার অর্থে একজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী যখন সামনাসামনি বসে তখন দুজনেই ভীষণ আনন্দিত হয়। কেনো বলতো? কারণ, শিক্ষকের আছে, তাই সে দিতে পারছে। যত দিচ্ছে ততই ওর মন ভরে উঠছে। আর শিক্ষার্থী আজলা পেতে নিচ্ছে। কাজেই এই জিনিসগুলো মহাবাক্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে এগুলো অর্থহীন হয়ে গেছে! এখন এমন একটা ব্যাপার শুরু হয়েছে যে, আমার যা ভাগ আমি তার চেয়েও বেশি নেবো!

চিহ্ন : ভালো লাগলো।

*************************************

 

প্রতিভা বসু
………………..
প্রাক্কথন

প্রথমেই সবিনয়ে পাঠকের নিকট নিবেদন করা প্রয়োজন, আমি প-িতও নই, বিদ্যাও সীমিত। তথাপি মহাভারত বিষয়ে আমার নিজস্ব মতামত প্রকাশে যে সাহসী হলাম তার প্রধান কারণ, এই মহাগ্রন্থ বিষয়ে চিন্তা করবার, আলোচনা-সমালোচনা করবার অধিকার, বিদ্বান-প-িতদেরও যতোটা আছে, সাধারণ পাঠকেরও ততোটাই।

মহাভারত এক সহ¯্রকোণ বৈদূর্যমণি। তার বিচ্ছুরণ নানাদিকে প্রতিভাত। কোন অংশের দ্যুতিটি কার সৃষ্ট তা-ও যেমন আমরা জানি না, কোন দ্যুতি কাকে স্পৃষ্ট করবে, তা-ও তেমন অজানা। শুধু স্থির সত্য যে বহু আপাতবিরোধ, বহু অসংগতি, বহু রূপকথা-আখ্যান-উপখ্যানে ভরা এই চিরন্তন মহাগ্রন্থ পাঠান্তে সৎ পাঠকের মনে নানাবিধ প্রক্রিয়া হতে বাধ্য। এমন কি নেহাৎ শিশুও মহাভারতের গল্প শুনে বিচলিত হয়।

পাঠকের সেই একান্ত নিজস্ব অধিকারেই মহাভারত পাঠান্তে আমি অনেক ভেবেছি, বিভ্রান্ত বোধ করেছি, ফিরে পড়েছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার নিজস্ব দৃষ্টিকোণকে অস্বীকার করার উপায় দেখিনি। সে কারণেই জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে আমার মতামত তা নিতন্ত প্রচলিত জেনেও, প্রকাশ করার তাগিদ অনুভব করলাম। বলাবাহুল্য, একজন লেখক হিশেবে আমি সাধারণ পাঠককে মতামত ব্যক্ত করার চরম অধিকারী মনে করি। এই আলোচনাগ্রন্থও একজন সাধারণ পাঠকের ব্যক্তিগত অধিকার-প্রসূত। এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, বিবাদ নয়।

আমি সংস্কৃত জানি না। অতএব মূল গ্রন্থ পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তদ্ব্যতীত, তুলনামূলক ব্যাখ্যার জন্য অন্য কোনো পৌরাণিক পুঁথি বা আধুনিক নথিও আমি ঘাঁটিনি। আমার নির্ভর শুধুমাত্র কালীপ্রসন্ন সিংহের বাংলায় অনূদিত মহাভারত। তাঁর অনুবাদই আমি প্রামাণ্য বলে মেনেছি, কারণ সেই বিশাল মনীষীর পা-িত্যে সংশয় করবার মতো স্পর্ধা আমার নেই। রাজশেখর বসুর সারানুবাদে এবং ভূমিকায় তাঁর নিজস্ব পক্ষপাত প্রতিফলিত দেখেছি। অনেক ক্ষেত্রে কালীপ্রসন্ন এবং রাজশেখর বসুর ভাষা-শব্দ ব্যবহার করেছি উদ্ধৃতির মধ্যে, কিন্তু তাঁদের ভাষার সঙ্গে আমার নিজের ভাষা এবং ভঙ্গি বহুক্ষেত্রেই মিলেমিশে গেছে। এই অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলাম না।

পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব বসুর অসামান্য গ্রন্থ মহাভারতের কথা এবং তার ভূমিকা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। যদিও আমার মতামত তাঁর একেবারে বিপরীত, এমন বই ক্ষণজন্মা ব্যক্তিদের লেখনী থেকে দুর্লভক্ষণেই জন্মায়।

প-িত মনীষীদের বিপরীত মতামত পোষণ করা শক্ত না হলেও তা ব্যক্ত করা সহজ নয়। আর তাঁদের সমস্তরে পৌঁছানো তো আরো কঠিন। আমিও কখনও তাঁদের সঙ্গে সমস্তরে দাঁড়াবার দাবি রাখি না। আমার বক্তব্য নেহাৎ সরল, একজন সৎ পাঠকের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া মাত্র, যা আমি পঞ্চাশ বছরেরও অধিক কাল ধরে বহন করে চলেছি।

মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে গল্প-উপন্যাস পড়বার নেশায় আমি কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত পড়ে উঠেছিলাম— চার খ-ে সম্পূর্ণ বসুমতী সাহিত্য মন্দিরের মহৎ অবদান। বলা বাহুল্য, ধর্মগ্রন্থ জ্ঞানের এই বই এমন অল্প বয়সে পড়তে বসিনি। সেই সময়ে প্রতি বিকেলেই অল্প অল্প জ¦র আমাকে আক্রান্ত করতো। লক্ষণ দেখে ডাক্তার সন্দেহ করলেন টি.বি.। এলেন পারিবারিক বন্ধু বিধান রায়ের সমগোত্রীয়, চিরকুমার, ধন্বন্তরী ডাক্তার রাম অধিকারী, যিনি তখন অচিকিৎস্য, দূরারোগ্য যক্ষ্মারোগের প্রধান বিশেষজ্ঞ। রাম অধিকারী খুব ভালোভাবে আমাকে পরীক্ষা করার পর জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে বললেন, ‘খাওয়াদাওয়ার বোধ হয় খুব অনিয়ম করা হয়?’ চিরকুমার ছিলেন বলেই বোধহয় মহিলাদের দিকে তিনি সরাসরি তাকাতেন না, ভাববাচ্যে কথা বলতেন। অতঃপর, একটা খাবার চার্ট করে দিলেন, এবং বুদ্ধদেবকে বললেন, ‘যক্ষ্মার সঙ্গে আপনার স্ত্রী-র কোনো সম্পর্ক নেই, ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়াও দরকার।’

সেই বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নেবার সময়ই বুদ্ধদেব নতুন প্রকাশিত চার খ- মহাভারত এনে আমার কাছে রেখে বললেন, ‘পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখতে পারো, বোধহয় ভালোই লাগবে।’ আমিও বাধ্য ছাত্রীর মতো পৃষ্ঠা ওল্টালাম, এবং শুধু ভালোই লাগলো তা নয়, রীতিমতো মোহাচ্ছন্ন হলাম।

ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া বিশ্রাম করে ভালো হতে সত্যি আমার সময় লাগেনি, কিন্তু চার খ- মহাভারত পড়ে উঠতে আমার সময় লেগেছিল। শেষ হয়ে যাবার পরে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, দ্বৈপায়নকৃত এই সংগ্রহ গ্রন্থটি আমি কেন এমন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম! আমাদের দেশে মহাভারত-রামায়ণ বৃদ্ধের পাঠ্য, কেননা এই গ্রন্থ পাঠে (বা শ্রবণে) পুণ্য হয়। বলা বাহুল্য, আমি পুণ্যাভিলাষী হয়ে পড়িনি, পড়ার নেশা ছাড়তে পারিনি বলেই পড়েছি। পড়া শেষ করে নানা ভাবনায় আক্রান্ত হলাম। মহাভারতের “মরাল” কী সেটা ভেবেও বিচলিত হলাম। কেবল এটাই মনে হতে লাগলো, এই গ্রন্থ যেন আমাকে এই শিক্ষাই দিলো যে যেমন ভালো বলে কিছু নেই, তেমনই মন্দ বলেও কিছু নেই। সত্য বলেও কিছু নেই, মিথ্যে বলেও কিছু নেই। ধর্ম বলেও কিছু নেই, অধর্ম বলেও কিছু নেই। যা আছে তা কেবল সুবিধাবাদীর সুবিধাভোগ। এবং ন্যায়-অন্যায় বলে যা কিছু আমরা শিখেছিলাম, মহাভারতের মহারণ্যে সে দুটি ধারণার জন্মই হয়নি।

তারপরে নদীতে অনেক জল গড়িয়ে গেলো। ঊনত্রিশ বছর আশিতে পৌঁছেও যখন মহাভারত বিষয়ে একই বিভ্রান্তিতে পীড়িত হতে লাগলো, তখন নিজের মতটুকু লিপিবদ্ধ করাই সংগত মনে করলাম। আমি গল্পলেখক, ঔপন্যাসিক। জীবন থেকে সংগৃহীত রসদ কিভাবে লেখকের কল্পনা এবং পক্ষপাত দ্বারা বিবর্তিত হয়, তার একটা ধারণা আমার আছে। মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনা, উপাখ্যান, দাবি এবং বর্ণনার মধ্যেও আমি বিভিন্ন রচয়িতার নিজস্ব মনোভাবের প্রতিবিম্ব দেখেছি। নিজের লেখক-সত্তা দিয়ে অনেক বিবরণের নিহিত অর্থ অনুভব করেছি, অনেক চরিত্রের ও সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক, এবং ঘটনাবলীর সমাজতাত্ত্বিক, ব্যাখ্যা খুঁজে পেয়েছি।

মহাভারতের যে সর্বজনস্বীকৃত মূল গল্পের কাঠামো, তার ভিত্তিতেই আমার প্রতিটি মতামত প্রোথিত। কিন্তু আমি তার অলৌকিক ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে বাস্তবানুগ ব্যাখ্যা খুঁজেছি। সর্বদিক থেকেই যা সাধারণ মনুষ্যলোকের কাহিনী, প্রতিটি চরিত্রই যেখানে দোষেগুণে মানুষ, প্রতিটি ঘটনাই যেখানে অতিপরিচিত রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়, লোভ-কাম-ক্রোধ-হিংসা-প্রতিহিংসা-শঠতা-চক্রান্তে ভরা, সেখানে সময় সুযোগমতো অতিপ্রাকৃতের ব্যবহারকে বিনা প্রশ্নে মেনে নেবার আমি কোনো যুক্তি দেখিনি। বরং প্রতিটি অ-বাস্তব,অলৌকিক ঘটনারই সহজ একটি বাস্তবধর্মী ব্যাখ্যা আছে বলে আমার মনে হয়েছে। সেটা শকুন্তলা-সত্যবতী-দ্রৌপদীর জন্মরহস্যের ক্ষেত্রে যতোটা সত্যি, কুন্তী-গান্ধারীর সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ততোটা। যুধিষ্ঠিরকে ধর্মপুত্র এবং বিদুরকে ধর্ম বলার মধ্যেও যে বাস্তব নিহিত আছে, কৃষ্ণকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী স্বয়ং ঈশ^রের মনুষ্যরূপ বলার মধ্যেও তা-ই। যুধিষ্ঠির-বিদুরের মতো ধার্মিকেরা এবং ঈশ^রের প্রতিভূ ভেল্কিদক্ষ কৃষ্ণেরা আজও বহুসংখ্যায় আমাদের চারপাশে বিরাজমান। তবে বিদুর যে যুধিষ্ঠিরের প্রকৃত পিতা এবং কুন্তী-বিদুরের সম্পর্ক যে অতি গভীর ছিলো, এটা আমার দৃঢ় বিশ^াস। এই প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু মহারাষ্ট্রীয় লেখিকা ইরাবতী কার্ভের যুক্তিগুলি অগ্রাহ্য বলে মনে করলেও, আমি ইরাবতীর যুক্তিগুলির মধ্যে আমার নিজস্ব চিন্তার সমর্থন পাই।

পাঠকের অবগতির জন্য আমি বুদ্ধদেব বসু-র উদ্ধৃতিতে (মহাভারতের কথা পৃষ্ঠা ৭৬-৭৭) ইরাবতীর যুক্তিগুলি উপস্থিত করছি। “প্রথম, বিদুর কুন্তীর দেবর, অতএব নিয়োগের পক্ষে বিশেষভাবে উপযোগী; দ্বিতীয়, অণীমা-ব্য মুনির শাপে ধর্মরাজ (যম?) শূদ্রযোনিতে বিদুররূপে জন্মগ্রহণ করেন (আদি : ১০৮); তৃতীয়, মৃত্যুর পূর্বে বিদুর তাঁর সমস্ত প্রাণশক্তি ও আত্মাকে যুধিষ্ঠিরের দেহে সঞ্চলিত করে দেন (আশ্রমবাসিক : ২৬)— আর এটা হলো (শ্রীমতী কার্ভে আমাদের জানিয়েছেন) মুমূর্ষু পিতার পক্ষে পুত্রের প্রতি আচরণীয় একটি উপনিষদুক্ত সংস্কার; এবং চতুর্থ— আর এটাই লেখিকার সপক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি— বিদুরের তিরোধানের অব্যবহিত পরে ব্যাসদেব এসে ধৃতরাষ্ট্রকে বলেন যে— বিদুর  ধর্ম নামে ‘কবিদের দ্বারা কথিত, এবং ঐ শম-দমাদি গুণসম্পন্ন মহাত্মাই যোগবলে’ যুধিষ্ঠিরকে উৎপাদন করেছিলেন।”

আমার বক্তব্য, মহাভারতে বিবৃত ঘটনাবলী থেকে বিদুর-যুধিষ্ঠিরের সম্পর্ক বাস্তবপক্ষে কী ছিলো তা প্রমাণ করা যাক বা না যাক, বাস্তববাদী মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে মানবীয় ব্যবহারের কার্যকারণ খুঁজলে, বিদুর-যুধিষ্ঠিরের রহস্যাবৃত সম্পর্ক পিতাপুত্র ব্যতীত অন্য কিছু মনে হয় না। সত্যি বলতে, বিদুরের পিতৃত্ব অস্বীকার করলে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিদুরের একচক্ষু ব্যবহার সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। যুধিষ্ঠির বিদুরের পুত্র মেনে না নিলে মহাভারতের মূল ঘটনাসমূহের কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা পাওয়া অসম্ভব।

এই ব্যাখ্যার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মহাভারত নামত ভরতবংশের ইতিহাস হলেও, প্রকৃতপক্ষে সত্যবতী-দ্বৈপায়নের বংশের ইতিহাস। হয়তো সেইজন্যেই দ্বৈপায়ন লোকগাথায় বেঁধে সেই মূল আখ্যানটিকে অমরত্ব দিতে চেয়েছিলেন।

সত্যবতী তাঁর অবৈধ অনার্য পুত্রটিকে বংশরক্ষার দায়িত্ব দেবার পর দেখা গেলো পুত্র উৎপাদনে দ্বৈপায়ন অতি দক্ষ। ধৃতরাষ্ট্র এবং পা-ু দ্বৈপায়নের ঔরসজাত পুত্র হলেও তাঁদের মাতারা শুদ্ধ ক্ষত্রিয়। কিন্তু অন্য পুত্র, বিদুর, যাঁর মাতা এক নি¤œবর্ণা দাসী, যাঁর সঙ্গে ভরতবংশের কোনোভাবেই কোনো যোগ নেই, দাসরাজার পুত্রী সত্যবতীর কৃপায় কী জানি কেন তিনি এক মহৎ স্থান জুড়ে বসলেন। আমরা জানলাম তিনি নাকি সাক্ষাৎ ধর্ম; কিন্তু দেখলাম, কার্যক্ষেত্রে তিনি অতি প্রকটভাবে, এবং অযৌক্তিকভাবে, কৌরবপক্ষ বিরোধী (বিশেষত দুর্যোধনের), এবং ততোধিক অযৌক্তিক ও নির্লজ্জভাবে, আপত অচেনা, অকস্মাৎ আবির্ভূত, পাঁচমেশালী পঞ্চপা-বভ্রাতার (বিশেষত যুধিষ্ঠিরের) পক্ষপাতী। এতৎসত্ত্বেও তিনি অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মহামন্ত্রীর পদে বসে আজীবন আধিপত্য করেছেন। দুর্যোধনের যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হবার সময় আগত হওয়ামাত্রই জ্যেষ্ঠভ্রাতা হিশেবে যুধিষ্ঠিরকে পা-ুর ‘ক্ষেত্রজ’ রূপে উপস্থিত করা, এবং তার সপক্ষে ক্রমাগত লড়াই করার কোনো যুক্তিই বিদুরের নেই, যদি না এর মধ্যে অন্য কোনো রহস্য নিহিত থাকে। ‘ধর্মাচরণ’-ই এ দু’জনের মধ্যে সংযোগসূত্র’ বুদ্ধদেব বসু-র এই উক্তি মানা আমার পক্ষে ভীষণ কষ্টকর হয় যখন দেখি শুধুমাত্র সা¤্রাজ্য দখলের উদ্দেশ্যে কতো চক্রান্তের সাহায্যেই বিদুর যুধিষ্ঠিরকে পরিচালনা করেছেন, এবং সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে জন্মমুহূর্ত থেকেই নিরাপদ শিশু দুর্যোধনের বিরুদ্ধে ক্লান্তিহীন অপপ্রচার চালিয়ে তাঁকে একটি নির্ভেজাল শয়তান হিশেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিদুর-যুধিষ্ঠিরের সম্পর্কের ভিত্তি ধর্মে নয়, শান্তনুর সা¤্রাজ্য দখলের উদ্দেশ্যমূলক চক্রান্তে। যে কোনো সাধারণ সাংসারিক ক্ষেত্রে এইভাবে সহসা কেউ ভ্রাতা সেজে সম্পত্তির অধিকার চেয়ে দরজায় দাঁড়ালে (বিশেষত যদি তার পিতা মৃত হয়) স্বীকার করে নেবার প্রশ্ন উঠবে না; রাজত্বদখলের ক্ষেত্রে তো এ এক অকল্পনীয় পরিস্থিতি। সেদিক দিয়ে বিচার করলে ধৃতরাষ্ট্র-দুর্যোধনের ভদ্রতা এবং উদারতা উদাহরণযোগ্য, যদিও বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে মূল নির্দেশ অভ্যন্তরের অন্তরাল থেকে সত্যবতীই দিয়েছিলেন। ব্যাসদেবের সূত্রে তিনি সম্ভবত পূর্ণসত্যই জানতেন।

এই বিশ্লেষণ অনুসরণ করলে যে ব্যাপারটা প্রকট হয়ে ওঠে তা হলো, মহাভারতের বিশাল প্রেক্ষাপটে বিধৃত এক অনস্বীকার্য কালো-সাদার দ্বন্দ্ব। সংঘাত বৈধ-অবৈধের, আর্য-অনার্যের। লক্ষণীয়, যে ভারতবর্ষে আজও জাতিভেদ প্রবল, উচ্চবর্ণ-নি¤œবর্ণের বিভেদ গাত্রবর্ণে প্রতিফলিত, সেখানে ক্ষত্রিয়-কুলের এই কাহিনীতে কৃষ্ণবর্ণের আধিপত্য সর্বত্র, অবৈধ অনার্য এবং মিশ্ররক্তের জয়জয়কার, শেষ পর্যন্ত শুদ্ধ শোণিতের চূড়ান্ত পতন ও বিলুপ্তি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ— যার নাম ‘ধর্মযুদ্ধ’— তা যে কতো দূর অধর্মের যূপকাষ্ঠে বলি হতে পারে, কতো মিথ্যা প্রবঞ্চনা নিষ্ঠুরতা ছলনা বর্বরতা হীনতা এবং কাপুরুষতার নিদর্শনে ভরা, তা ভাবলেও স্তম্ভিত হতে হয়। আর যখন দেখি প্রতিটি অধার্মিক আচরণ, অন্যায় আঘাত, মিথ্যাচার এবং শঠতা এসেছে পা-বপক্ষ থেকে, প্রধানত স্বয়ং কৃষ্ণের কপটতায় আসক্তিহেতু, তখন বোঝা যায় না কী ধর্মে আমাদের উদ্দীপ্ত করা মহাভারতের উদ্দেশ্য। কেন দুর্যোধন মন্দ যুধিষ্ঠির ভালো বলে কথিত, কেন দ্বৈপায়ন স্বীকৃত অথচ কর্ণ প্রত্যাখ্যাত, কেন বিদুর ধর্ম, কেন কুন্তী সতী, আর কেনই বা চতুর কৃষ্ণের উপর ঈশ^রত্ব আরোপিত হলো? সে কি কৃষ্ণ কৃষ্ণাঙ্গ বলেই? বিদুর এবং যুধিষ্ঠির অবৈধ বলেই? কুন্তী বহুগামী বলেই? রটনা দিয়ে ঘটনাকে বদলানো যায় সেটা আমারা সাম্প্রতিক রাজনীতিতেও দেখতে পাই। কিন্তু মহাভারতে ধর্মের বর্ম পরিয়ে যে-ভাবে কৃষ্ণাঙ্গ এবং অবৈধদের প্রতি প্রকট পক্ষপাত প্রদর্শন করা হচ্ছে, শুধুমাত্র অক্লান্ত রটনার সাহায্যে সাদাকে কালো এবং কালোকে সাদা করা হচ্ছে, এবং দ্বৈপায়নের পক্ষপাত অনুযায়ী কিছু মানুষকে অতিমানবের চেহারা-চরিত্র দিয়ে জিতিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার তুলনা ইতিহাসে বিরল।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিচার করলে মনে হয়, মহাভারতের গল্প বহিরাগত আর্যশাসকের বিরুদ্ধে অনার্য, কৃষ্ণবর্ণ, বর্ণসংকর, জাতিবৈষম্য বিলম্বিত দেশবাসীর অন্তিম প্রতিশোধ। শুদ্ধ শোণিতের গরিমালুপ্তির ইতিহাস। হিন্দুধর্মে যতোই জাতবিচারের প্রচলন থাক, ভারতবর্ষের মাটি থেকে যে রক্তের শুদ্ধতা বহুযুগ পূর্বেই ধুয়ে মুছে গেছে, ভরতবংশের এই মহিমান্বিত কাহিনী তার দলিল। মুনিঋষিই হোন, আর ক্ষত্রিয় রাজা-মাহারাজারাই হোন, এমন কি তথাকথিত দেবতারা পর্যন্ত, সত্যবতী দ্রৌপদীর মতো কৃষ্ণাঙ্গী, রূপযৌবনবতী, অনার্যা রমণীদের চরণে নিজেদের উৎসর্গিত করেছেন। এবং মাতৃশাসিত সমাজের সেই সব প্রবল ব্যক্তিত্বশালিনী নারীদের সম্মোহনের কাছে আর্যপুত্ররা, তপস্বী ব্রাহ্মণেরা জাতের শুদ্ধতার বিসর্জন দিতে মুহূর্তমাত্র দ্বিধা করেননি। জাতের দোহাই দিয়ে একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে নেওয়া অথবা কর্ণের দ্রৌপদীর প্রত্যাখান, নেহাৎ-ই অর্জুনের স্বার্থে উদ্দেশ্য-প্রণোদিত ঘটনা। বহিরাগতদের সঙ্গে আদিনিবাসীদের মিশ্রণ অতি নিবিড় এবং গভীর ছিলো বলেই পেশাভিত্তিক জাতবিচারের প্রয়োজন হয়েছিলো, শোণিতের শুদ্ধতার প্রশ্ন সেখানে অবাস্তর।

দ্বৈপায়নের গল্প তাঁর পুত্র-পৌত্রদের নিয়ে, কিন্তু অতীব পক্ষপাতদুষ্ট। পরবর্তীকালে বহু ধর্ম, তত্ত্ব, দর্শন, আলোচনার সংযোজনে এই আখ্যান যখন ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের রূপ নিলো, তখনও মূল গল্পের ধারাটি অক্ষুণœই রইলো। তথাপি, কোনো কোনো রচয়িতা অন্ধভাবে পা-বপক্ষ সমর্থন  করতে পারেননি বলেই হয়তো আমার কাছে এই গল্পের অন্য একটা দিক প্রতিভাত হতে পেরেছে। মহাভারত পঠনে আমার প্রতিক্রিয়া কোনো বিরল ঘটনা নয় বলেই আমার বিশ্বাস, তা প্রকাশ্যে উচ্চারিত হোক বা না হোক।

উৎস : মহাভারতের মহারণ্যে

********************************

 

বিবেক দেবরায়
………………..
কৃষ্ণ ও কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংঘটনে কৃষ্ণের ভূমিকা নিয়ে ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন উপস্থাপনা বা ‘হাইপথেসিস’ আছে।

বঙ্কিমচন্দ্র ঐ যুদ্ধের পিছনে কৃষ্ণের দায়িত্ব স্বীকার করেন নি; এমন কি, পা-বদের প্রতি কৃষ্ণের পক্ষপাতিত্ব ছিল একথাও মেনে নিতে পারেন নি।১ বুদ্ধদেব বসু এতে বিস্মিত হয়ে লিখেছেন, কৃষ্ণের নিরপেক্ষতা ছিল ভাণ, এবং যুদ্ধ আরম্ভ হলে ঐ ভাণটুকুও কৃষ্ণের আর থাকে নি, তিনি তর্কাতীতভাবে কৌরবদের ঘাতক এবং পা-বদের, বিশেষ করে অর্জুনের, সহায়ক হয়ে উঠেছিলেন।২ অশোক রুদ্র কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ সংঘটনে কৃষ্ণের দায়িত্ব এবং পা-বদের প্রতি কৃষ্ণের পক্ষপাতিত্ব সপ্রমাণ করেছেন এবং ঐ দুটি কার্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে বলেছেন, সবই দ্রৌপদীর জন্য।৩ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারণে পা-বদের দ্বারা কৃষ্ণের কৌরবদের বিনাশসাধনকে অরুণ ষোষ পর্যালোচনা করেছেন প্রতœতত্ত্বের আলোকে।৪

কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ সংঘটনে কৃষ্ণের যে একটি অত্যন্ত (এমন কি সর্বাধিক) প্রধান ভূমিকা ছিল, এই প্রস্তাবটির ভিত্তিতেই আমরা আমাদের উপস্থাপনটি গড়ে তুলব। অর্থাৎ আমাদের উদ্দেশ্য হবে, কেন কৃষ্ণ ঐ ভূমিকা নিয়েছিলেন তার কারণ পুনরানুসন্ধান করা। এতে আমরা ব্যবহার করব মহাভারত, এবং মহাভারতের ‘খিলভাগ’ হরিবংশ। মহাভারতে কৃষ্ণের যে রহস্যময় চিত্র, তা হরিবংশের সাক্ষ্য বিবেচনা করলে কিয়দংশে সম্পূর্ণতর হয়ে ফুটে ওঠে। হরিবংশ সত্যিই মহাভারতের ‘খিলভাগ’ কি না এবং মহাভারত ও হরিবংশ পাশাপাশি জুড়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত কি না, তা অবশ্য পৃথক প্রশ্ন।

মহাভারতে এবং হরিবংশে আছে যে তখনকার যে-সব প্রতিষ্ঠিত রাজশক্তি, তারা প্রায় সকলেই একজোটে যাদবদের বিপক্ষে ছিল। যাদবদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল পুরনো শত্রুতার, যাদবদের সম্বন্ধে তাদের মনোভাব ছিল কিছুটা উন্নাসিক। কৃষ্ণ কংসকে নিধন করেছেন শুনে জরাসন্ধ কংসপুত্রকে শূরসেন দেশের রাজা করেন, মহৎ সৈন্য উত্থাপন করে কৃষ্ণকে পরাস্ত করে নিজ দৌহিত্রকে সেখানে রাজ্যাভিষিক্ত করেন, এবং সেখানে উগ্রসেন ও বৃষ্ণিবংশোদ্ভবদের কষ্টদান করেন; কারণ, কৃষ্ণ ও জরাসন্ধের মধ্যে শত্রুতা।৫ একই ঘটনার কথায় হরিবংশে আছে যে কংসবধের সংবাদ পেয়েই জরাসন্ধ মথুরা আক্রমণ করেন; তখন সসৈন্যে বহু রাজা জরাসন্ধের অনুগমন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে দুর্যোধন পৃথকভাবে উল্লিখিত।৬ বলা যেতে পারে যে পঞ্চপা-ব তখনও কৌরবপক্ষের অন্তর্ভুক্ত বলে পৃথক উল্লেখ পান নি, যদিও দুর্যোধনাদির সঙ্গেই যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু হরিবংশেরই অন্যত্র৭ স্পষ্ট পাওয়া যায় যে দুর্যোধনাদি যুদ্ধ করেছেন যাদবদের বিপক্ষে এবং পঞ্চপা-ব যাদবদের সপক্ষে। নিকুম্ভ ও শিশুপালের নেতৃত্বে যাদবগণের বিরুদ্ধে যাঁরা যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন দুর্যোধনাদি শত ভ্রাতা, শল্য, শকুনি, ভগদত্ত, জরাসন্ধ, ত্রিগর্ত্তরাজ সুশর্ম্মা, দ্রপদ এবং উত্তরসহ রাজা বিরাট। ব্রহ্মদত্তের যজ্ঞে এই যুদ্ধে কর্ণ, দুর্যোধন, বিরাট, দ্রুপদ, শকুনি, শল্য, নীল, ভীষ্ম, বিন্দ ও অনুবিন্দ, জরাসন্ধ, সুশর্ম্মা, মালব এবং বাসন্ত্যগণ কৃষ্ণপুত্র প্রদ্যু¤েœর মায়ায় গুহাবন্দী হয়েছিলেন, এবং ঐ যুদ্ধে অর্জুন ব্রহ্মদত্তকে রক্ষা করছিলেন; যেসব দৈত্যরা যজ্ঞম-পের দিকে যাচ্ছিল, পঞ্চপা-ব তাদের বধ করার ভূমিকা নিয়েছিলেন। হরিবংশের আর এক জায়গায়৮ পাই, দুর্যোধনকন্যা লক্ষ্মণাকে অপহরণ করায় কৃষ্ণপুত্র সাম্ব হস্তিনাপুরে বন্দী হচ্ছেন, এবং বলরাম শান্তিপূর্ণভাবে মুক্তিদানের কথা বললেও সাম্ব মুক্তি পাচ্ছেন না। ‘যে বৃষ্ণিকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং অন্যায় আচরণ দ্বারা মহাত্মা জরাসন্ধের প্রাণসংহার করিয়াছে’৯ তাকে অর্ঘ্য দেওয়াতে শিশুপাল আপত্তি করেছিলেন। বংশ ও কুলের বিচারে যাদবরা যে হীন বিবেচিত হতেন তার সাক্ষ্য ভূরিশ্রবার উক্তিতেও : ‘হে অর্জুন। বৃষ্ণি ও অন্ধকবংশীয়গণ ব্রাত্য ক্ষত্রিয় এবং স্বভাবতই নিন্দনীয়; তাহারা ক্রোধান্ধ হইয়া কার্য্যানুষ্ঠান করে।১০

কৃষ্ণের কার্যধারা দেখলে মনে হয়, একজন যাদবপ্রধান হিসেবে তিনি বিপক্ষ শক্তির জোটটাকে ভাঙতে চেয়েছিলেন এবং সুপরিকল্পিতভাবে সেই ভাঙন ধরাতে শুরু করেছিলেন— প্রথমে পা-ব সাহায্য ছাড়াই।

কংস ও নরকাসুর গেলেন; বলরাম রু´ীকে মারলেন, কৃষ্ণ নিকুম্ভদ্বয়কে। জরাসন্ধের দুই প্রধান সহায়, হংস ও ডিম্ভক, যাদব সাহায্য করছিলেন দৈত্য বিচক্র ও রাক্ষসরাজ হিড়িম্ব, জরাসন্ধের নীতিপরায়ণতার সুযোগে অপসারিত হলেন।১১

কিন্তু জরাসন্ধের বেলায় কৃষ্ণের বহিশক্তির সাহায্য প্রয়োজন হয়েছিল। হরিবংশে আছে যে জরাসন্ধ যাদবদের আঠারোবার যুদ্ধের সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও কোন যুদ্ধেই যাদবরা জরাসন্ধকে বধ করতে পারেন নি।১২ মহাভারতে আছে যে কৃষ্ণ জানতেন তিনশো বছর (অর্থাৎ বহুকাল) মহাস্ত্র-যুদ্ধ করেও যাদবরা জরাসন্ধের সৈন্য নিঃশেষিত করতে পারবেন না, জরাসন্ধের উপদ্রব ভয়ে তাঁরা পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন; জরাসন্ধকে যাদবদের অবধ্য জেনে, ব্রহ্মার আদেশানুসারে, বলরাম স্বয়ং জরাসন্ধকে মারতে চেষ্টা করছিলেন না।১৩

যাদব-বহির্ভূত কোন শক্তির এই যে সাহায্য প্রয়োজন হয়েছিল, তা কোথা থেকে নেবেন এ ব্যাপরে কৃষ্ণের খুব একটা বাছাবাছি করার অবকাশ কি ছিল? জরাসন্ধ ও কৌরবরা যেক্ষেত্রে এক জোট, সেক্ষেত্রে জরাসন্ধের সাহায্যের জন্য কৌরবদের প্রত্যাশা না করে পা-বদের দিকে তাকানোই তো স্বাভাবিক।

ততদিনে পা-বদের মনে কৌরবদের প্রতি ভীমকে বিষপ্রয়োগ, জতুগৃহদাহ ইত্যাদি কারণে বেশ কিছু অভিযোগ জমা হয়ে গেছে। তাঁরা কুরুকুলের হলেও, কৌরবদের যে-জোটে তার বিরুদ্ধে তাঁদের অস্ত্র ধরা তখন আর অসম্ভব নয়। তাছাড়া যাদবী কুন্তীর সূত্রে তাঁরা ততদিনে একসূত্রে গ্রথিত হয়ে গেছেন।

যদিও তাঁদের বাল্যে ও কৈশোরে কোন ‘প্রণয়’ বা ‘সখ্যে’র ঘটনা লিপিবদ্ধ নেই, তবু দ্রৌপদীর সূত্রটি নিঃসন্দেহে পা-বদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে কৃষ্ণকে সাহায্য করেছিল। কৃষ্ণের সঙ্গে সখ্য ও প্রণয়ের উল্লেখ, সহজ খোলামেলা ব্যবহার, কৃষ্ণ গাত্রবর্ণ, পঞ্চপা-বকে স্তিমিত-না-হতে-দেওয়া, কৃষ্ণকেও সময়বিশেষে যুদ্ধে-উদ্দীপিত করা ইত্যাদি যে সব দিকের প্রতি অশোক রুদ্র তাঁর প্রবন্ধে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, তা কৃষ্ণের ভূমিকা বুঝতে দ্রৌপদীর প্রাসঙ্গিকতা সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

আর একভাবেও যাদব-বিপক্ষ জোটটা ভাঙতে দ্রৌপদী সাহায্য করে থাকতে পারেন। কৌরব রাজপুত্র (যাদের মধ্যে তখন পঞ্চপা-বও ছিলেন) সমভিব্যহারে দ্রোণের পাঞ্চাল-আক্রমণে দ্রুপদ (যাঁকে এর অগে কৌরবদের সপক্ষে যুধ্যমান দেখা গেছে) কৌরব-বিরোধিতার সূচনা অনুভব করেছিলেন। কৌরবলাঞ্ছিত পঞ্চজামাতার সূত্রে সেটি দৃঢ় হয়ে থাকতে পারে। আর কৌরবহস্তে দ্রৌপদীর ব্যক্তিগত নিগ্রহ সেটি দৃঢ়তর করে থাকতে পারে, কারণ দ্রৌপদীর মুখে শোনা গেছে যে ভীমার্জুন যদি সন্ধি চান তো তাঁর বৃদ্ধ পিতা নিজে কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন।১৪

কিন্তু একই সঙ্গে আরও দুটি কথা স্মর্তব্য।

প্রথম, ‘চিরসখী’র মাধ্যমে পা-বদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে কৃষ্ণ কিন্তু থেমে থাকেন নি, ভগিনীর সঙ্গে অর্জুনের বিবাহ ঘটিয়েছেন যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে। সুভদ্রাহরণের বুদ্ধিটা তাঁর এবং তিনি বলাতেই যাদবরা সেটা মেনে নেয়। কৃষ্ণার মনের দিকে কৃষ্ণ তখন তাকিয়েছিল কি? পরে মেনে নিলেও কৃষ্ণা কিন্তু প্রথমটায় এতে আহতই হয়েছিলেন।১৫ সুভদ্রার মাধ্যমে পা-বদের সঙ্গে কৃষ্ণের যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, পরে তা আবার আলোচিত হবে।

দ্বিতীয়, কপটদ্যুতক্রীড়াসূত্রে পা-বদের রাজ্যহরণ এবং দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ঘটাবার আগেই কিন্তু দেখা যায় যাদব-বিপক্ষ জোটটি ভাঙার কাজে কৃষ্ণ নিজেকে নিয়োগ করছেন, এবার পা-বদের সহায়তায়। দ্যুতক্রীড়ার আগেই অনুষ্ঠিত হয় রাজসূয় যজ্ঞ, এবং বিপক্ষ জোটটি ভাঙায় রাজসূয় যজ্ঞের ভূমিকা ছিল যথেষ্ট। রাজসূয় যজ্ঞের সম্বন্ধে যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের মত জানতে চাওয়া মাত্রই কৃষ্ণ ইন্দ্রপ্রস্থে এসে যুধিষ্ঠিরকে উৎসাহ দেন, এবং সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে রাখেন যে জরাসন্ধকে বধ না করতে পারলে যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞপালন করতে পারবে না। জরাসন্ধবধে কৃষ্ণ যে ভীমকে বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করেছিলেন তা মহাভারতে প্রকট এবং হরিবংশে নিজমুখে স্বীকৃত।১৬ পৌ-্র বাসুদেব, যিনি জরাসন্ধের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন বলে কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছিলেন, তাঁকে ভীম ঐ রাজসূয় উপলক্ষ্যে পরাস্ত করেন; শিশুপাল, যিনি সহাস্যে ভীমকে কুশলপ্রশ্ন করে উদ্দেশ্য জেনে তৎক্ষণাৎ কর দিয়েছিলেন এবং তেরো দিন আতিথ্য করেছিলেন, তিনিও ঐ রাজসূয় উপলক্ষ্যেই কৃষ্ণকর্তৃক নিহত হন।১৭ পাদ্য অর্ঘের ব্যাপারে তাঁর প্রতিক্রিয়া তাঁর যাদব-বিরোধিতার পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ প্রত্যাশিত। হয় তো সেটাই কৃষ্ণ চাইছিলেন; শিশুপালকে দিয়ে একশো-এক-তম অপরাধ করানোর হয়ত তিনি একটা সুযোগ খুঁজছিলেন। ভীষ্মের উক্তিটি এখানে লক্ষণীয়। ‘ভীষ্ম কহিলেন, শিশুপাল যে বুদ্ধিতে বাসুদেবকে আহ্বান করিতেছে উহা নিজের বুদ্ধি নহে, বাসুদেবেরই এইরূপ অভিসন্ধি, সন্দেহ নাই।১৮ জরাসন্ধ বধ, রাজসূয় যজ্ঞ উপলক্ষ্যে পা-বদের দিগি¦জয় এবং শিশুপালবধে বিপক্ষ-জোটটি অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ে। উপরন্তু রাজসূয়ের অতিথি হিসেবে ইন্দ্রপ্রস্থে এসে দুর্যোধনের পা-ব-ঈর্ষা পুনরুদ্দীপিত হয়ে ওঠে। এটি শুধু তাঁর পরশ্রীকাতরতা নয়, কৃষ্ণেরই কথায় নির্মিত প্রাসাদ তাঁকে পদেপদে বিড়ম্বিত করেছিল এবং ভীমার্জুন শুধু নয়, ভৃত্যরাও তাতে হাস্য করেছিল। পাল্টা জবাব (যা দুর্যোধন দিয়েছিলেন দ্যুতক্রীড়াদির মাধ্যমে) চেয়েই কি ঐসব করা হয়েছিল? হরিবংশে১৯ জন্মজয়ের একটি উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক : ‘আমার ধারণা পা-বগণের অনুষ্ঠিত রাজসূয় যজ্ঞই কৌরবগণের বিনাশের হেতু। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে অজেয় রাজন্যবর্গের যে প্রকারে বিনাশ হইয়াছে তাহাতে মনে হয় রাজসূয় যজ্ঞ যুদ্ধের নিমিত্তই কল্পিত হইয়াছে।’

সুতরাং মনে হওয়া অযৌক্তিক না যে বিপক্ষ-জোট ধ্বংস করার দীর্ঘমেয়াদী এক পরিকল্পনা কৃষ্ণের ছিল। রাজসূয় যজ্ঞ তার একটি প্রকল্প ছিল। তারই আর-একটি প্রকল্প ছিল কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ। দ্রুপদ কৌরব-বিমুখ হতে, এবং জরাসন্ধ-শিশুপাল ইত্যাদি বিঘœ অপসারিত হতে, কৌরবকুলে ভগদত্ত ইত্যাদিরাই বাকি থাকেন। সেই ভাঙন-ধরা বিপক্ষ-জোটটিকে সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দিতেই হয়ত কুরুক্ষেত্রের কা-টা হয়েছিল। রাজ্যচ্যুত পা-বদের রাজ্য পাইয়ে দেওয়া বা দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিকার করা হয়ত কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের মূল কারণ না।

গান্ধারী বলেছিলেন যে কৃষ্ণ পারস্পরিক সংগ্রামে কুরুকুলকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেও তা স্বেচ্ছায় উপেক্ষা করেছিলেন, জেনেশেুনে ঐ বংশকে বিনষ্ট হয়ে যেতে দিয়েছিলেন।২০ উতঙ্ক মুনিও বলেছিলেন যে বলপূর্বক কৌরবদের নিবারণে ও পরিত্রাণে সমর্থ হয়েও কৃষ্ণ তাতে বিমুখ হয়েছিলেন, কুরুকুলের বিনাশ শুরু হলে তা উপেক্ষা করেছিলেন, তাঁর কপটতাপ্রভাবেই কুরুকুলের ধ্বংস হয়েছিল।২১ শুধু কুরুকুল না, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যাদব-বিপক্ষ (বা একদা যাদব-বিপক্ষ) বহু প্রতিষ্ঠিত রাজন্যকুল। বিপক্ষ-জোট, বিশেষ করে কুরুকুল নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে নষ্ট হয়ে যাক্, এ-ও কি ছিল কৃষ্ণের পরিকল্পনার মধ্যে? আর ঐ পরিকল্পনারই কি অঙ্গ ছিল কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে কৃষ্ণের নিরস্ত্র থাকা?

মহাভারতে২২ কৃষ্ণ নিজেই বলেছিলেন যে কৌরবদের সকলকে নিগৃহীত করে পা-বদের হাতে দিতে ও অনায়াসেই পা-বদের কার্যসিদ্ধি করে দিতে তিনি পারতেন। হরিবংশে অর্জুন ও সাত্যকির পাশেই কৃষ্ণ ‘মহাবীর’ আখ্যা পেয়েছেন; সমস্ত অস্ত্রবিদ্যায় প্রাধান্য পেয়ে ধনুর্ধরশ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। তাছাড়া বিদ্যাস্ত্রের উপর অধিকার (যা তখন অস্ত্র-কুশলতার একটা প্রধান পরিমাপ ছিল) তাঁর ছিল প্রভূত। খা-বদাহন সূত্রে তিনি পেয়েছিলেন সুদর্শন চক্র ও কৌমুদকী গদা। সুদর্শন চক্রে তিনি অপ্রস্তুত শিশুপালকে শুধু না, শৃগাল-নিকুম্ভ-পৌ-্রককেও মারেন, ভীষ্মের দিকে ধাবিত হন। ব্রহ্মশির-বৈষ্ণব-আগ্নেয়, মহাভারতের এই তিনটি অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্রের ব্যবহারই তাঁকে হরিবংশে২৩ করতে দেখা যায় হংসডিম্বক ও বিচক্রের বিরুদ্ধে। তাছাড়া সশস্ত্র কৃষ্ণ সমীহ করার মত কিছু না হলে নিরস্ত্র কৃষ্ণ মহাভারতে এত বারংবার উল্লেখ পেতেন কি?

নিরস্ত্র কৃষ্ণের সহযোগিতাতেই আঠরো দিনের মাথায় কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের সমাধান হয়ে যায়। তিনি সরাসরি অস্ত্র ধরে যুদ্ধে নামলে কি ঐ সমাধান অনেক কম সময়ে অনেক কম খরচে হয়ে যেত?

কৃষ্ণ হয়ত তা চান নি। তাই হয়ত তিনি দুর্যোধনকে নারায়ণী সেনা দিয়ে যুদ্ধটা জমিয়ে তুলেছিলেন। অর্জুনকে প্রতিপদে উৎসাহ এবং পরামর্শ দিয়ে ধ্বংসলীলা উদ্দীপিত করে তুলেছিলেন। লক্ষণীয় যে তাঁর পুরনো শত্রুদের নিধনে কৃষ্ণ যথেষ্ট সহায়তা করেছেন। যথা, চর্মের বন্ধনী ছিন্ন করে শিথিল চর্মের বগদত্তের দৃষ্টি রুদ্ধ করে তাঁকে অসুবিধায় ফেলতে কৃষ্ণই অর্জুনকে পরামর্শ দিয়েছেন। শাল্যবধে যুধিষ্ঠিরকে উৎসাহ দিয়েছেন। স্মর্তব্য, ব্রহ্মদত্তের যজ্ঞে বাগদত্ত-শাল্যের মত যে বিরাট ও দ্রুপদ যাদবদের বিরুদ্ধে ছিলেন, সেই বিরাট ও দ্রুপদকেও কুরুক্ষেত্রের সপুত্র নিহত হতে হয়েছে।২৪ তাঁরা ততদিনে পা-বপক্ষে এসে গেলেও আসলে ছিলেন যাদবদের বিপক্ষের লোক। এদের সবার ধ্বংসে বিপক্ষ- জোটটির মাথা তুলে দাঁড়াবার সম্ভাবনা ছিল না।

কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের ফলে বিপক্ষ-জোটটির ধ্বংস ছাড়া আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার ঘটেছিল : কুরুসিংহাসনের  সঙ্গে যাদবরা এক অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়ে গিয়েছিল।

মথুরা-দ্বারকার প্রতিবেশী অথচ তার চেয়ে অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত কুরুরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হবার একটা বাসনা যাদবদের মধ্যে থেকে থাকা অস্বাভাবিক না। যাদবদের মধ্যে মাতৃসূত্রে রাজ্যপ্রাপ্তি অভূতপূর্ব ছিল না। যাদবরা যে রাজ্য ভোগ করতেন তা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পিতৃরাজ্য ছিল না। পুত্র লবণ বেঁচে থাকতেই দানবরাজ মধু জামাতা হর্য্যাশ^কে নিজ রাজ্য প্রদান করে যেখানে বসবাস করতে বলেছিলেন।২৫ মাতৃসূত্রে পাওয়া সেই রাজ্যই যাদবরা ভোগ করতেন। যাদবরা যে কতকটা মাতৃতান্ত্রিক ছিলেন সে কথা অরুণ ঘোষও তাঁর প্রবন্ধে বলেছেন। তাই যাদবকন্যাদের মাধ্যমে কুরুসিংহাসনের কাছাকাছি আসার একটা পরিকল্পনা যাদবদের থেকে থাকতেই পারে। হয়তো সেইজন্যই পা-ুবর্ণ হলেও পা-বকেই স্বয়ংবরে বরণ করেছিলেন যাদবকন্যা কুন্তী; ভীমার্জুন যখন শান্তি চেয়েছিলেন তখনও কুন্তী যুদ্ধই চেয়েছিলেন। অর্জুনের সঙ্গে সুভদ্রার বিবাহ ঘটানোতে কৃষ্ণের আগ্রহ আগেই উল্লেখিত হয়েছে। সহদেবের সঙ্গেও ভানু নামক যাদবের কন্যা ভানুমতীর বিবাহ হয়েছিল।২৬

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে গেলে দেখা যায় কৌরবরাজ্যে ছত্রিশ বছর রাজত্ব করছেন যাদবীতনয় যুধিষ্ঠির; আর তিনি মহাপ্রস্থানে গেলে কৌরবরাজ্যে অভিষিক্ত হচ্ছেন পরীক্ষিৎ যিনি যাদবদের এবং বিশেষ করে কৃষ্ণের অতি নিকট সম্পর্কীয়া।

পরীক্ষিতের পিতামহী (সুভদ্রা) যাদবী এবং প্রপিতামহী (কুন্তী) যাদবী, পিতা (অভিমন্যু) এবং পিতামহ (অর্জুন) যাদবসম্পর্কিত। উপরন্তু, সুভদ্রা ছিলেন কৃষ্ণের ভগিনী, বসুদের-তনয়া। আর অর্জুন ছিলেন কৃষ্ণের সঙ্গে নরনারায়ণ সম্পর্কে সম্পর্কিত; মহাভারতে কৃষ্ণ স্বয়ং বলে গেছেন যে তাঁরা একই; উভয়েই দ্বারকায় মৃত যদুবংশীয়দের ঔর্দ্ধদেহিক ক্রিয়ার অধিকারী।২৭ এই অর্জুন-সুভদ্রার পুত্র  অভিমন্যু, যিনি একাধারে কৃষ্ণের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং ভাগিনেয়, তাঁর প্রতি কৃষ্ণের বিশেষ মনোযোগ ছিল। তিনি ‘জন্মিয়া অবধি কৃষ্ণের সাতিশয় প্রিয়পাত্র ছিলেন। … তাঁহার জাতকার্য প্রভৃতি সমুদায় শুভকর্ম বাসুদেব স্বয়ং সম্পন্ন করেন।’ অর্জুন বিরাটের কাছে অভিমন্যুর পরিচয় দিতে গিয়ে তাকে ‘বাসুদেবের প্রিয়তম ভাগিনেয়’ বলেছিলেন, এবং অভিমন্যু-উত্তরার বিবাহ ‘জনার্দ্দনকে পুরস্কৃত্য করতঃ’ হয়েছিল। অভিমন্যুকে রাজ্যের উত্তরাধিকারী বলেই হয়ত যাদবরা দেখতেন, কারণ মহাভারতে পাওয়া যায় যে সাত্যকি বলছেন যুধিষ্ঠির প্রতিজ্ঞা-উত্তীর্ণ না-হওয়া অবধি অভিমন্যু পৃথিবী শাসন করুক।২৮ হঠাৎ অভিমন্যুর নাম প্রস্তাব বিস্ময়কর। পঞ্চপা-বদের মধ্যে অর্জুনকে তো কোথাও রাজ্যাধিকারী ভাবা হয় নি। যুধিষ্ঠিরই বরাবর রাজ্যাধিকারী বিবেচিত হয়েছেন এবং যুধিষ্ঠিরের প্রতিবিন্ধ্য নামে দ্রৌপদীগর্ভজাত পুত্র ছিল২৯ যার উল্লেখমাত্র সাত্যকি করেন নি। অবশ্য এমন হয়ে থাকতে পারে যে অভিমন্যু প্রতিবিন্ধ্যের জ্যেষ্ঠ; মহাভারতে সুভদ্রার পুত্রপ্রসব দ্রৌপদীর পুত্রপ্রসবের আগে উল্লিখিত। সেক্ষেত্রে অভিমন্যুর দাবী প্রতিবিন্ধ্যের চেয়ে বেশী, কারণ, জেষ্ঠের পুত্রত্ব নয়, পুত্রদের জ্যেষ্ঠত্বই কুরুসিংহাসনের উত্তরাধিকার নির্ণয় করে; ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধন জন্মাবার সঙ্গে-সঙ্গেই একথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাহলে ঘটোৎকচের দাবী অভিমন্যুর থেকে অধিক বিবেচিত হবার কথা। ঘটোৎকচের জন্ম দ্রৌপদীর স্বয়ংবর বা সুভদ্রাহরণ হবার অনেক আগে, ভীম তাঁর রাক্ষসী জননীর ‘পাণিগ্রহণ’ করেছিলেন, এবং তিনি ‘পা-ুবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন’ বলেই মহাভারতে উল্লিখিত। সাত্যকি কিন্তু ঘটোৎকচের নামও করেন নি। এ থেকে মনে হয় যাদবদের দৃষ্টি বিশেষভাবে অভিমন্যুর উপরই নিবন্ধ ছিল। কিন্তু কুরুক্ষেত্রে অভিমন্যুর মৃত্যু হয়। এক প্রকল্প ভেঙে যেতে তখন হয়ত কৃষ্ণ অন্য কোন প্রকল্প নেন: অভিমন্যু না হোক, অভিমন্যুর সন্তানকে কুরুসিংহাসনে বসানো  হবে। কৃষ্ণকে তারপর দেখা যায় ঘটোৎকচকে কর্ণের অমোঘ ইন্দ্রদত্ত শক্তির সামনে এগিয়ে দিতে, ঘটোৎকচের মৃত্যুতে উৎকটভাবে আহ্লাদিত হতে।৩০ অর্জুনের জন্য সংরক্ষিত ইন্দ্রদত্ত শক্তি ব্যয়িত হয়ে যাওয়াই এর একমাত্র কারণ হতে পারে না কারণ অনতিবিলম্বে কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন যে ঐ শক্তিতে ঘটোৎকচের বধ করতে হত, কারণ ঘটোৎকচ ‘ব্রাহ্মণাদ্ধেষী, যজ্ঞনাশক, ধর্মলোপ্তা ও পাপাত্মা’। ঘটোৎকচের চরিত্র সম্বন্ধে অন্য সূত্র থেকে ঐ সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। তবে কি কৃষ্ণ খুশী হয়েছিলেন কুরুসিংহাসনের একটি সম্ভাব্য ভাগীদার কমল বলে? ইন্দ্রদত্ত শক্তিরূপে কণ্টকে কৃষ্ণ-মনোনীত উত্তরাধিকারীর কণ্টক উদ্ধার হল বলে? এই কারণে কি দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্রের মৃত্যু আসন্ন জেনেও,৩২ কোন ‘সখ্য’, বা ‘প্রণয়ে’র খাতিরেও তা রোধ করার চেষ্টা করেন নি? এবং পা-বনারীদের গর্ভে অশ^ত্থামা তাঁর ব্রহ্মশির নিক্ষেপ করলে প্রায় পিতৃসুলভ দর্প নিয়ে বলেছেন : ‘কিন্তু সেই গর্ভস্থ বালক মৃত ও পুনরায় জীবিত হইয়া সুদীর্ঘকাল বসুন্ধরা অধিকার করিবে। … আর পা-বকুলতিলক  পরীক্ষিত ক্রমশঃ পরিবর্ধিত হইয়া বেদাধ্যায়ন ও কৃপাচার্য্য হইতে অস্ত্রশাস্ত্র সমুদায় শিক্ষা করিয়া ক্ষত্রিয়ধর্মানুসারে ষষ্টি বৎসর পৃথিবী পালন করিবে। … এক্ষণে তুমি তাহাকে অস্ত্রানলে দগ্ধ করিলেও আমি পুনরায় তাহার জীবন প্রদান করিব।’৩৩ এবং কার্যত তাই হয়। পরীক্ষিতের মৃতজাত দেহে ‘জীবন’ দেন কৃষ্ণ। অর্থাৎ পরীক্ষিৎ কৃষ্ণের সঙ্গে জীবনের সূত্রে সূচিত হয়ে যায়, স্থাপিত হয়ে যায় দুজনের মধ্যে এক অত্যন্ত বিশেষ সম্পর্ক। পরীক্ষিৎ সিংহাসনে অভিষিক্ত হবার সময় কৃষ্ণ আর ছিলেন না, কিন্তু ঐ অভিষেকের মাধ্যমে তাঁর একটি প্রকল্প রূপায়িত হর বলে ভাবা হয়ত অযৌক্তিক না।

লক্ষণীয় যে একই সঙ্গে ইন্দ্রপ্রস্থে অভিষিক্ত হয়েছিলেন যাদবগণের একমাত্র বংশধর বজ্র৩৪; এবং যাদবী সুভদ্রা অর্জুনের সঙ্গে মহাপ্রস্থানে যান নি। তিনি ভার পেয়েছিলেন পরীক্ষিৎ ও বজ্রকে রক্ষা করার এবং অধর্ম যাতে না হয় তা দেখার। অর্থাৎ যদুবংশ কুরুসিংহাসনের সঙ্গে সুদৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত হয়ে যায়।

কৃষ্ণের কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ সংঘটন আমাদের উপস্থাপনা তাহলে এই : যাদব-বিপক্ষ জোটটাকে ভাঙার, এবং ঐ বিপক্ষ জোটের একটি প্রধান শক্তির আসনে যাদব-সম্পর্কিতদের প্রতিষ্ঠিত করার, একটি পরিকল্পনা কৃষ্ণের মধ্যে কাজ করে থাকতে পারে। প্রসঙ্গত নিজে রাজ্যাভিষেক না করলেও যাদববংশীদের জন্য রাজ্যাংশের ব্যবস্থা কৃষ্ণ অন্যত্রও করেছেন। হরিবংশে আছে যে নিকুম্ভকে বধ করে ইন্দ্র ও কৃষ্ণ নিকুম্ভের রাজত্বে নিকুম্ভের কোন বংশধরকে না প্রতিষ্ঠিত করে করে রাজ্যের একচতুর্থাংশ জয়ন্তপুত্র বিজয়কে, একচতুর্থাংশ প্রদ্যু¤েœর পুত্রকে, একচতুর্থাংশ সাম্বের পুত্রকে, এবং বাকী চতুর্থাংশ গদের পুত্র চন্দ্রপ্রভাকে দিয়েছিলেন।৩৬ আধুনিক ভারতও হয়ত এমন কাউকে কাউকে দেখেছে যাঁরা পুত্র, পুত্রী বা পুত্রপ্রতিম শিষ্যদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গেছেন কিন্তু নিজেরা সেই ক্ষমতায় আসীন হন নি।

উল্লেখপঞ্জী

১। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; ‘কৃষ্ণচরিত্র’, চতুর্থ খ-ের প্রথম পরিচ্ছেদ এবং পঞ্চম খ-ের প্রথম পরিচ্ছেদ। ২। বুদ্ধদেব বসু; ‘বৃদ্ধ কা-ারী’ মহাভারতের কথা। ৩। অশোক রুদ্র; ‘কৃষ্ণ রহস্য’, জিজ্ঞাসা, মাঘ ১৩৮৭। ৪। অরুণ ঘোষ; ‘আর্য্য বিজয়, কুরু-পা-ব ও কৃষ্ণ’, জিজ্ঞাসা, মাঘ-চৈত্র ১৩৮৮। ৫। মহাভারত, সভাপর্ব, অধ্যায় ১৩; মহাভারতের উল্লেখ কালীপ্রসন্ন সিংহ অনূদিত মহাভারত থেকে। ৬। হরিবংশ, বিষ্ণু পর্ব, অধ্যায় ৩৪; হরিবংশের উল্লেখ সর্বত্রই আর্য্যশাস্ত্রীয় সংস্করণের। ৭। হরিবংশ, বিষ্ণু : ৮৪। ৮। হরিবংশ, বিষ্ণু : ৬২। ৯। মহাভারত, সভা : ৩৬। ১০। মহাভারত, দ্রোণ : ১৪২। ১১। হরিবংশ, ভবিষ্য : ১১২, ভবিষ্য : ১২১। ১২। হরিবংশ, বিষ্ণু : ৩৬। ১৩। মহাভারত, সভা : ১৩; ২১। ১৪। মহাভারত, উদ্যোগ : ৭৪। ১৫। মহাভারত, আদি : ২২১। ১৬। মহাভারত, সভা :২২; হরিবংশ, ভবিষ্য : ৭৪। ১৭।  মহাভারত, সভা : ১৩; ২৮; ২৯; ৪৪। ১৮। মহাভারত, সভা : ৪৩। ১৯। হরিবংশ, ভবিষ্য : ২। ২০।  মহাভারত, স্ত্রী : ২৫। ২১। মহাভারত, আশ^মেধিক : ৫৩। ২২। মহাভারত, উদ্যোগ : ১২৯। ২৩। হরিবংশ, ভবিষ্য : ১২৩; ভবিষ্য : ১২৭। ২৪। বিরাটপুত্র উত্তর, শে^ত ও শঙ্খ মহাভারতের  ভীষ্মপর্বে মারা যান, দ্রুপদ ও বিরাট দ্রোনপর্বে, র্ধষ্টদ্যু¤œ সৌপ্তক পর্বে। ২৫। হরিবংশ, বিষ্ণু : ৩৭। ২৬। হরিবংশ, বিষ্ণু : ৯০। ২৭। মহাভারত, মৌষল : ৬। ২৮। মহাভারত, বন : ১২১। ২৯। মহাভারত, আদি : ২২১; বিষ্ণুপুরাণে (আর্য্যশাস্ত্রীয় সংস্করণ; চতুর্থাংশ, অধ্যায় ২০) দ্রৌপদী গর্ভজাত প্রতিবিন্ধ্য ও যৌধেয়ী-গর্ভজাত দেবক নামক পুত্রের কথা আছে। ৩০। মহাভারত, দ্রৌণ : ১৮১। ৩১। মহাভারত, দ্রৌণ : ১৮২। ৩২। মহাভারত, শল্য : ৬৪। ৩৩। মহাভারত, সৌপ্তিক : ১৬। ৩৪। হরিবংশ (বিষ্ণু : ১০৩), বজ্র কৃষ্ণের প্রপৌত্র, অনিরুদ্ধতনয় সানুর পুত্র। বিষ্ণুপুরাণে (চতুর্থাংশ : ১৫), কৃষ্ণের পৌত্র, অনিরুদ্ধের পুত্র। মহাভারতে (মহাপ্রস্থানিক : ১১), পৌত্র। ৩৫। মহাভারত, মহাপ্রস্থানিক : ১। ৩৬। হরিবংশ, বিষ্ণু : ৯৭।

[উৎস : জিজ্ঞাসা, শিবনারায়ণ রায় সম্পা. বৈশাখ- আষাঢ় ১৩৯৩; ৭ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, কলকাতা]

********************************

সনৎকুমার সাহা
………………..
মহাভারতের দিন-কাল

মহাভারতের কাল নিয়ে নানা মুনির নানা মত। এ নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কৃষ্ণচরিত্রতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে খ্রিষ্টপূর্ব দেড় হাজার বছরের আগে টেনে নিয়ে যাওয়া মুশকিল। কারণ খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় তিন হাজার বছর থেকে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১৭০০ বছর পর্যন্ত পাঞ্জাবের হরপ্পা ও সিন্ধু অঞ্চলে মহেন-জো-দারোতে যে অবিচ্ছিন্ন সভ্যতার নিদর্শন মেলে তা আর্যদের ভারতে আসার আগের অবস্থা নির্দেশ করে। ইন্দো-ইউরোপীয় আর্যদের উত্থান ঘটে কাস্পিয়ান সাগরের পাড় ও দক্ষিণ রাশিয়ার স্টেপ-ভূমি থেকে। পরে তারা নানা দলে ভাগ হয়ে গ্রিস-এশিয়া-মাইনর, পারস্য ও ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। তারা কৃষিকাজ জানতো না। গবাদিপশু পালন ও বন্যপ্রাণী শিকারই ছিলো তাদের প্রধান জীবিকা। সিন্ধু সভ্যতা তুলনায় ছিলো অনেক উন্নত, অনেক সুবিন্যস্ত, নাগরিক ও কৃষি উদ্বৃত্তনির্ভর। আর্যদের সাথে হরপ্পা ও মহেন-জো-দারোবাসীর সরাসরি সংঘাত ঘটেছিলো কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে আর্যদের যখন আগমন ঘটে, তখন হরপ্পা ও মহেন-জো-দারোকে স্থবিরতায় পেয়ে বসে। ওই সময়েই প্রবল বন্যায় তাদের নগর সভ্যতা বিধ্বস্ত হয়। অবশ্য ইদানীং প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণায় অনুরূপ সভ্যতার আরো নিদর্শন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে—ছিটিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তাতে এদের ভেতরে যে পারস্পরিক যোগাযোগ ছিলো, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো উত্তর-পশ্চিমে বাইরের জগতের সঙ্গে, এমনটিও আন্দাজ করা অসংগত নয়।

তবে আর্যদের আগমন ঘটে স্থায়ী আবাসভূমি খোঁজার চেষ্টায়। তারা তুলনায় দীর্ঘকায় ও শক্ত-সমর্থ। যদিও কৃৎ-কৌশলে অনুন্নত। তবু নবীনতার প্রেরণা ও বিশ্বপ্রকৃতির আনন্দময় আকর্ষণ তাদের সামনের দিকে ঠেলে। ক্রমশ তারা গাঙ্গেয় অঞ্চলেও বসতি গড়ে। মহেন-জো-দারো, হরপ্পা সভ্যতার ঋণও হয়তো তাদের রক্তে মেশে। কারণ পশুপালনের সঙ্গে কৃষিও তাদের জীবিকার অংশ হয়ে যায়। এভাবে প্রায় দু’শো বছর যায় তাদের থিতু হতে। ওটাই সম্ভবত ঋগ্বেদের কাল। পরপর অন্য তিন বেদও। বেদান্ত বা উপনিষদের আবির্ভাব তার পরে। খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচশো বছর থেকে দু’শো বছরের ভেতরে মহাভারত সংহতি পায়। মনে হয়, এরকম সময়েই। তবে তার সূত্রপাত আরো আগে। যদি ধরে নিই, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কাল্পনিক নয় এবং মূল মহাভারতকার তার সাক্ষী, তবে তেমন ঘটনা দেড় হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের আশপাশে অনুমান করলে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে একটা তালমিল খুঁজে পাওয়া যায়। বঙ্কিমও মোটামুটি সে রকমই দাবি করেছেন। তবে তিনি পুরাণের উদ্ধৃতি থেকে সন-তারিখ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন। পেছনে অবশ্য নিশ্চিত বিশ্বাস কাজ করেছে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কোনো কবির কল্পনা নয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনার যতদূর সম্ভব যথাযথ অনুসরণই তাঁর দায়িত্ব।

এ-ও তিনি বলেন, মহাভারত সংহিতা গ্রন্থ। সংহিতা বলতে বোঝায় একত্রীকরণ। কাহিনি বা বিধি-বিধান অথবা ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা, কিংবা এদের সবগুলোর সমন্বয়, এই হলো সংহিতা। সময়ের দিক থেকে তা অনেকখানি আলগা। এক সময়ের ধ্যান-ধারণার পেছনে অতীতের অভিজ্ঞতার বা অভিজ্ঞতার স্মৃতি থেকে ধারাবাহিক ঘটনার কিংবা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস-নিয়ম-অনিয়মের ঐতিহ্যলালিত ক্রিয়াশীলতার দিকনির্দেশনার কাজ করে। দিকনির্দেশনাও হতে পারে বহুমুখী। ‘যাদৃশী ভাবনা যস্য’, সেই অনুযায়ী সে অর্থ নির্ণয় করতে পারে; পথও বেছে নিতে পারে। অথবা আপন অভিপ্রায়ের পেছনে সমর্থন খুঁজতে পারে। যুগপরম্পরার সঞ্চয়। ফলে অসংলগ্নতা, পরস্পরবিরোধিতা বা স্বার্থবাহী তরঙ্গমালার প্রবহমানতাও এতে বহুবিচিত্র উদ্দ্যেশ্যের হাত ধরে জায়গা করে নেয়। সব বাণী এর অভ্রান্ত, সব বর্ণনা যথাযথ, এমন দাবি এর সংজ্ঞার্থেই খারিজ হয়ে যায়। এদিক থেকে মহাভারতও কোনো ব্যতিক্রম নয়। যদিও আমরা জানি, তাকেই অবলম্বন করে এই উপমহাদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে তাদের নৈতিক মূল্যবোধের চলমান, পরিবর্তমান, পরিবর্ধমান প্রতিমা, দৈহিক গড়ন অবিকল রেখেই, খাড়া করে চলেছে। তাদের মহাভারত পাঠ ভিন্ন ভিন্নকালে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ওই মহাগ্রন্থকেও ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রতিফলিত করে এখনো সচল রয়েছে।

তবে আরো একটা ব্যাপার এই সঙ্গে হিসাবে নিতে হয়। মূল মহাভারত যদি রচনা হয়ে থাকে কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের অবসানের পরপরই— এবং তা পৌরাণিক হলেও বাস্তব— তবে তাতে ক্রমাগত প্রক্ষেপণ চলছে শত শত বছর ধরে। কোনো প্রক্ষেপকই নিজেকে জাহির করেন নি। সবাই মূল প্রণেতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের নামের আড়ালে অদৃশ্য থেকে— এবং ব্যক্তিগত যশ বা দায়মুক্তও— নিজের নিজের অভিরুচি অনুযায়ী মহাভারতের বিষয়-আশয় বাড়িয়ে চলেছেন। স্ববিরোধ যদি ঘটে তবুও। ভারসাম্যহীনতা যদি তার লাবণ্য হরণ করে, যদি তার স্বরূপে বিকৃতি ঘটায়, তাও। একটা কারণ বোধহয় এই, বঙ্কিমও এর উল্লেখ করেছেন, মহাভারতকে বলা হয় পঞ্চমবেদ। সমাজপতিদের নির্দেশ, শূদ্র ও স্ত্রী জাতির অধিকার নেই বেদ-পাঠে (বঙ্কিম এর প্রতিবাদ করেন নি)। সে ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থায় তাদের রসতৃপ্তির সঙ্গে বেদের সারাৎসার হৃদয়ঙ্গম করার সুযোগ দেওয়ার জন্যেই বেদ-বিভাগ-কর্তা দ্বৈপায়ন ব্যাস মহাভারত প্রণয়ন করেন। এই ‘মহৎ’ উদ্দেশ্য সামনে রেখে পরবর্তী অনামা ‘মহাকবি’-রাও পদের পর পদ রচনা করে সেসব ওই মূল মহাভারতেই অঞ্জলি দেন। এই প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে সম্ভবত খ্রিষ্ট জন্মের সময় পার হয়ে যায়। সমাজে বর্ণবিভাজন আরো সূত্রবদ্ধ ও আচরণসিদ্ধ হয়। রসভোক্তার তাৎক্ষণিক উত্তেজনা প্রাধান্য পায়। ফলে বহু কাহিনির ডালপালা গজায়। নতুন কাহিনি যোগ হয়। সব মিলিয়ে মহর্ষি দ্বৈপায়ন ব্যাস-কৃত মহাভারত বলে যা আজ প্রচলিত তার শ্লোকসংখ্যা লক্ষাধিক। ভাব- কল্পনার ও বিষয়চিন্তার প্রেক্ষাপট অন্তত পাঁচশো বছরের। এখান থেকে কোনটা বা কতটা মৌলিক, তা ছেঁকে তোলা প্রায় অসাধ্য।

কিন্তু এই কাজটির আপন প্রতিভার প্রবল দাপটে সম্পন্ন করতে নেমেছেন বঙ্কিম। কবিত্ব প্রতিভার তারতম্যের বিবেচনায় ও মূল বিষয় থেকে সরে গিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিত নানা তত্ত্বকথা অথবা পক্ষপাতমূলক মনগড়া তথ্য জুড়ে দেওয়ার চেষ্টাতে তিনি প্রক্ষেপণ শনাক্ত করেন। অনেক জায়গার কথা এতই কাঁচা বা উদ্ভট যে, তাকে বাজে কথা বলে উড়িয়ে দিতে অসুবিধা হয় না। যা অনৈসর্গিক ও জাগতিক বিধি-বিধানের পরিপন্থী, তাকেও তিনি অসার কল্পনা বলে খারিজ করেন। সত্যানৃতে মিশ্রিত বিপুল পাঠ থেকে এভাবে সারবস্তু বাছাই করা দুরূহ। রাজশেখর বসু তাঁর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারত সারানুবাদ গ্রন্থের ভূমিকায় জানাচ্ছেন— বঙ্কিমচন্দ্র উত্ত্যক্ত হয়ে কৃষ্ণচরিত গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এ ছাইভস্ম মাথামু-ের সমালোচনা বিড়ম্বনা মাত্র। তবে এ হতভাগ্য দেশের লোকের বিশ্বাস যে যাহা কিছু পুঁথির ভিতরে পাওয়া যায় তাহাই ঋষিবাক্য, অভ্রান্ত, শিরোধার্য। কাজেই এ বিড়ম্বনা আমাকে স্বীকার করিতে হইয়াছে।’

১৮৯২ সালে কৃষ্ণচরিত্র সম্পূর্ণ আকারে প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক অসাধারণ আলোচনায় সশ্রদ্ধ মন্তব্য করেন, ‘… এই কৃষ্ণচরিত্র গ্রন্থে প্রতিভার একটি প্রবল স্বাধীন বল অনুভব করা যায়।… তিনি শাস্ত্রকে ঐতিহাসিক বুদ্ধির দ্বারা তন্নতন্ন রূপে পরীক্ষা করিয়াছেন এবং চিরপ্রচলিত বিশ্বাসগুলিকেও বিচারের অধীনে আনয়নপূর্বক অপমানিত বুদ্ধিবৃত্তিকে পুনশ্চ তাহার গৌরবের রাজপদে অভিষিক্ত করিয়া দিয়াছেন। আমাদের মতে কৃষ্ণচরিত্র গ্রন্থের নায়ক কৃষ্ণ নহেন, তাহার প্রধান অধিনায়ক, স্বাধীন বুদ্ধি, সচেষ্ট চিত্তবৃদ্ধি। প্রথমত বঙ্কিম বুঝাইয়াছেন, জড়ভাবে শাস্ত্রের অথবা লোকাচারের অনুবর্তী হইয়া আমরা পূজা করিব না। সতর্কতার সহিত আমাদের মনের উচ্চতম আদর্শের অনুবর্তী হইয়া পূজা করিব। তাহার পরে দেখাইয়াছেন যাহা শাস্ত্র তাহাই বিশ্বাস্য নহে, যাহা বিশ্বাস্য তাহাই শাস্ত্র। এই মূল ভাবটিই কৃষ্ণচরিত্র গ্রন্থের ভিতরকার অধ্যাত্মশক্তি, ইহাই সমস্ত গ্রন্থটিকে মহিমান্বিত করিয়া রাখিয়াছে।’ (১৩০১ বঙ্গাব্দ)

আমরা জানি, বঙ্কিম য়োরোপীয় জ্ঞানকান্ডে প্রত্যক্ষবাদী দর্শনের অনুরাগী ছিলেন। এখানেও কৃষ্ণচরিত্রের পুননির্মাণে বিপুল বিক্রমে তিনি তাঁর বিরল ধীশক্তিকে সেই পথে পরিচালিত করেন। বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ ও শ্রীমদ্ভাগবতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রাসঙ্গিক বিষয়ের প্রয়োজনে কিছু থাকলেও তাঁর দৃষ্টি প্রবলভাবে পড়ে মহাভারতের ওপরে। কারণ এখানেই কৃষ্ণ পরিপূর্ণ মানুষ; এবং ঈশ্বর যদি থাকেন (আছেন বলেই তাঁর বিশ্বাস), তবে তাঁর পূর্ণাবতার। (অপরীক্ষণীয় কিছু ‘আছেন’ বলে ধরে নিয়ে অগ্রসর হয়ে প্রত্যক্ষবাদ কি গোড়াতেই স্ব-বিরোধের মুখে পড়ে না?)

রবীন্দ্রনাথ নিজে কিন্তু মহাভারতকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। ‘ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা’— রচনায় তিনি লিখেছেন, ‘আর্যসমাজে যতকিছু জনশ্রুতি ছড়াইয়া পড়িয়াছিল তাহাদিগকে তিনি (ব্যাস) এক করিলেন। জনশ্রুতি নহে, আর্যসমাজে প্রচলিত সমস্ত বিশ্বাস, তর্কবিতর্ক ও চরিত্র নীতিকেও তিনি একসঙ্গে এক করিয়া একটি জাতির সমগ্রতার এক বিরাট মূর্তি এক জায়গায় খাড়া করিলেন। ইহার নাম দিলেন মহাভারত।… ইহা কোনও ব্যক্তিবিশেষের রচিত ইতিহাস নহে, ইহা একটি জাতির স্বরচিত স্বাভাবিক ইতিহাস।’

লক্ষ করবার, রবীন্দ্রনাথও কিন্তু মহাভারতকে ইতিহাসের পর্যায়েই দেখেছেন। তবে সে দেখা বঙ্কিমের মতো নয়। বঙ্কিম যেখানে ঘটনার সত্যাসত্য নির্ণয়ে নৈর্ব্যক্তিক সাধনায় কৃত-সংকল্প, রবীন্দ্রনাথ সেখানে ভারতে আর্যসমাজের এক পর্বে তার প্রবহমান ধারায় ভালো-মন্দ সব কিছুকে এক করে গভীর নিরাসক্তিকে তুলে ধরার ওপরে জোর দেন। ব্যাস তাদের একত্র করেন। কিন্তু গোটা জাতি তার রচনাকার। ন্যায়-অন্যায় বোধেও তাই বহুস্বর।

তার পরেও ইতিহাসের দাবি ছাপিয়ে মহাভারতের অমরত্ব নিশ্চিত হয় জীবন ও সাহিত্যের ধারায়। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট থাক বা কল্পিত হোক, অথবা তিলকে তাল করা হোক, তা খন্ডিত ও প্রায় অনুল্লেখ্য, কিন্তু তার সাহিত্যিক প্রেরণা অফুরন্ত। মানবভাগ্যের গৌরব ও অসহায়তার অকুন্ঠ প্রকাশে এখনো তা তুলনাহীন। এবং তা ব্যষ্টি ও সমষ্টি উভয়কে মিলিয়েই। এবার এই দিকটাতেই কিঞ্চিৎ আলোকপাতের চেষ্টা করি। যদিও ইতিহাসের ভিত্তিভূমিকে বাদ দিয়ে নয়। যে-কোনো মহৎ সাহিত্যই স্থান ও কালের অক্ষ ও দ্রাঘিমাংশে দাঁড়ায়। কিন্তু মাথা তোলে আকাশে। মহাভারতও সেইরকম।

উপমহাদেশের মানচিত্রে প্রায় মাঝামাঝি বিন্ধ্যাচল পর্বতমালার ওপরের অংশটিকে বলা হয় আর্যাবর্ত। এ অঞ্চলেই আর্যরা বেশিরভাগ বসতি গড়ে। তার মানে এই নয় যে আর কেউ ছিলো না। কিন্তু আর্যদের দখলই প্রবলতর হতে থাকে। সভ্যতর জনগোষ্ঠীর বিধি-বিধানও তারা চালু করতে থাকে। সংস্কৃতির বিকাশও ঘটে চলে। তবে সবটাই নির্দ্বান্দ্বিক থাকে না, আবার মিত্রতা ও মিশ্রণও এড়ানো যায় না।

জীবন অনিত্য। প্রকৃতির প্রকাশ বহুবিচিত্র; কখনো কখনো ভয়ংকর। তার তুষ্টির জন্যে যাগ-যজ্ঞের বিধান। এবং মেধা ও বুদ্ধির চর্চায় অগ্রণী হয়ে যারা বিধানকর্তা তারা ব্রাহ্মণ। কিন্তু শুধু ব্রাহ্মণের মন্ত্রপাঠেই সবরকম বিপদ থেকে উদ্ধার মেলে না। আত্মরক্ষা অথবা অধিকার বিস্তারের জন্যে চাই ক্ষাত্রতেজ— চাই সেনাদল। আর বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান। সেগুলোর জোগান দেবে আর সবাই— অর্থাৎ একেকটি যূথবদ্ধ সমাজে বাকি যারা, তারা। এভাবে দেখা দেয় কৃষক, নিষাদ, তাঁতি, কামার, কুমোর— এরা। চাক বাঁধে, চাক ভাঙে, চাক বাড়ে— সবকিছু সামলাতে প্রয়োজন হয় দলপতির, গুরুত্ব পান পুরোহিতেরা, গড়ে তুলতে হয় সেনাদল, থাকেন তার সেনাপতি। আর কৃষক, শ্রমিক, সওদাগর সবাই নিজ নিজ কাজ নির্বিবাদে করে চলতে পারলেই নিশ্চিন্ত। কিন্তু সমীকরণ বেশিদিন সরল থাকে না। বিস্তারে মিশ্রণে নতুন নতুন জটিলতা ছড়ায়। প্রয়োজন হয় রাজ্যের এবং তার শাসক, কোনো রাজার; অথবা তা রূপ নেয় গণশাসনের, যেখানে তারাই ঠিক করে, কে হবে তাদের গণপতি। ঝোঁকটা অবশ্য বেশি থাকে রাজা ও রাজ্যের দিকে। সব মিলে এক নয়। সাধারণত আলাদা আলাদা। যদিও আর্যদের ভেতর থেকেই। তবে কোথাও কোথাও রাজা হতে চান মহারাজ। সফল হলে তাঁর দ্বিগি¦জয় পৌরাণিক কাহিনিতে ঠাঁই পায়। মহাভারতের কালে অবস্থাটা ছিলো এরকম। পরে গৌতম বুদ্ধের কালে, অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ষোড়শ মহাজনপদ আকার পেয়েছে। যেমন— কুরু, পাঞ্চাল, মগধ, কোশল, কাশী, অবন্তী ইত্যাদি। উত্তরে গান্ধার ও কম্বোজও ছিলো। এদের অনেকটাই এখন উপমহাদেশের বাইরে বলে গণ্য। এটুকু অন্তত বোঝা যায়, উৎসভূমির সঙ্গে এখানকার আর্যদের যোগাযোগ তখনো একেবারে ছিন্ন হয় নি। আবার আর্যাবর্ত মানে সেখানে শুধুই আর্যদের বাস, এটাও বোঝায় না। বিভিন্ন জাতি-উপজাতি, ভেতর থেকে, বাইরে থেকেও নানা পথে এসে জড়ো হয়। ঘর বাঁধে। মারামারিও করে। তবে আর্য অধিকার, আর্য সংস্কৃতি, মুখের ভাষায় তার মিশ্রণ, আর্য জীবনধারায় অনার্য বিশ্বাস-ভাবনা, রীতিনীতির আত্তীকরণ— এগুলোই প্রাধান্য পায়।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যদি ঘটে থাকে, তবে তা এই কাল থেকে আনুমানিক এক সহ¯্রাব্দ আগে। অবস্থাটা ছিলো নিশ্চয় তুলনায় অনেক বেশি তরল। তবে আগে যা বলেছি, রাজা-মহারাজার আবির্ভাব ঘটে গেছে তখনই। কারো কারো কীর্তিকথা লোকগানে ছড়ায়। ঝোঁক থাকে অবশ্য বাড়িয়ে বলার দিকে। যাদবদের বেলায় কংস বধের পর অবস্থাটা বোধ হয় ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। গণরাষ্ট্র হিসেবে তা বজায় থাকে। কৃষ্ণ নিজে কোনো রাজা ছিলেন না। না যাদবদের, না অন্য কোথাও। অবশ্য মহাভারতের অন্তিম লগ্নে যাদব রাষ্ট্রও বিধ্বস্ত হয়। কিছুটা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে, কিছুটা বা বাইরের আক্রমণে। মহাভারত বলে, মহাপ্রস্থানের আগে পা-বেরা অবশিষ্ট যাদবদের ইন্দ্রপ্রস্থে পুনর্বাসিত করেন। কৃষ্ণের একমাত্র জীবিত পৌত্র বজ্রকে তাঁরা তাদের অধিপতি হিসেবে অভিষিক্ত করে যান।

তবে ওই যুদ্ধ মূলত কুরু-পা-বের, না, কুরু-পাঞ্চালের— এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। পরে দেখেছি, কুরু ও পাঞ্চাল ছিলো পাশাপাশি রাজ্যে। অবিভক্ত পাঞ্জাবের পূর্ব দিকে কুরু, আর তার পরেই গাঙ্গেয় অববাহিকায় পাঞ্চাল। এখনকার উত্তরাখন্ড ও হিমাচলও ছিলো তার ভেতরে। বহুভর্তৃক বিবাহরীতির খোঁজ এই শতাব্দীতেও মেলে সেখানে। তাই দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামী বিষয়টি এ অঞ্চলের কোনো কবির কল্পনাপ্রসূত কি না, এমন প্রশ্নও তোলেন অনেকে। যা-ই হোক, যুদ্ধটা যে ছিলো কুরু ও পাঞ্চালের ভেতর, তার ইঙ্গিত কেউ কেউ পান এখান থেকে যে কুরুবিরোধী পক্ষের সেনাপতি ছিলেন পাঞ্চাল-রাজ দ্রুপদের পুত্র ধৃষ্টদ্যু¤œ। তাঁর বোন দ্রৌপদী। তাঁর স্বয়ংবর সভায় অর্জুন লক্ষ্য ভেদ করে তাঁকে জয় করেছিলেন। হতে পারে পাঞ্চাল-পা-ব মিত্রবাহিনী এক হয়ে কৌরবদের বিপক্ষে লড়েছিলো। যুদ্ধে জয় কিন্তু কোনো পা-ব-রাজবংশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করে না। কুরু-রাজ্যই ইতিহাসে টিকে থাকে। তবে শক্তিক্ষয় হয় উভয়েরই। ইতিহাসের কালে যখন আমরা পা রাখি, তখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু সরে এসেছে পূর্ব দিকে — মগধে।

কুরু-পাঞ্চাল, বা কুরু পা-ব, যাই হোক না কেন, এই যুদ্ধকাহিনি কিন্তু মন হরণ করে ভারতবর্ষের সব প্রান্তের সব মানুষের। তাদের আত্মপরিচয়ের এক অবিনাশী প্রতীকে পরিণত হয় মহাভারত। পাপ-পুণ্য, ধর্ম-অধর্ম, ন্যায়-অন্যায়, কর্তব্য-অকর্তব্য, প্রেম-বৈরাগ্য, সবকিছুর দৃষ্টান্ত এবং মানদ- এক বিশ্বাসযোগ্য সমগ্রতায় খাড়া করে তোলে এই মহাকাব্য। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, পরিপূর্ণ সমাধান মেলে খুব কমই। সুখ-সমাপ্তি বলে কিছু নেই। তবু মানুষ সম্মোহিত হয়। বাস্তবের প্রেক্ষাপট বদলে যায়। জীবনের রং অবিরাম পাল্টায়। শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ যেমনই হোক না কেন, সবাই নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রেরণা খোঁজে এইখানে। যদিও এর ভিত্তিভূমি প্রাচীন— এতটাই প্রাচীন যে তাকে ধরা যায় না চেতনার কোনো পূর্বনির্ধারিত সীমায় বাঁধা খোপে— তবু আজকের মানুষও আপন প্রতিবিম্ব ভেসে উঠতে দেখে এর অসংখ্য কাহিনির কোনো কোনোটায়। শুধু নিজের নয়, অন্যেরও। যদিও আবার বলি, কেউ এখানে তর্কাতীত নয়। অস্বাভাবিকও নয়।

তবে কিছু মহাকাব্যিক ছাড় এখানেও দিতে হয়। গ্রিক পুরাণে হেলেন যেমন অনন্ত যৌবনা, মহাভারতে উর্বশীও তাই (বনপর্ব, ১১)। মহাভারতকার যদিও তাকে পার্থিব সম্পর্ক-সম্বন্ধের বাধা-নিষেধের ওপরে তোলেন না। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস সত্যবতীর কন্যাকালীন অবস্থায় পরাশমুনির ঔরসজাত পুত্র। বেদের বিভাগকর্তা ও মহাভারতের রচনাকাল বলে তাঁর খ্যাতি। সত্যবতী-শান্তনুর ছেলে বিচিত্রবীর্যের হয়ে তিনি আবার জন্ম দেন ধৃতরাষ্ট্র ও পা-ুর; এবং দাসীপুত্র বিদুরের। ধৃতরাষ্ট্র ও পা-ুর ছেলেরা কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করলেন। যুদ্ধ শেষে পা-বেরা রাজত্ব করলেন; তারপর অর্জুনপুত্র অভিমন্যুর ও উত্তরার সন্তান পরীক্ষিৎ সিংহাসনে বসলেন। সর্পদংশনে পরীক্ষিতের মৃত্যু হলে তাঁর ছেলে জনমেজয় রাজা হন। বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তিনি সর্পযজ্ঞ করেন। তাঁর সবিশেষ অনুরোধে ব্যাসদেব ওই যজ্ঞানুষ্ঠানে উপস্থিত হন, এবং শিষ্য বৈশম্পায়নকে উপস্থিত সবার আগ্রহে মহাভারত পাঠের আদেশ দেন। এখন প্রশ্ন হলো, ব্যাসদেব তো চিরজীবী নন। এতো প্রজন্ম পার করে তিনি বেঁচে থাকেন, এটা ভাবা যায় না। যদি এমন হয়, ব্যাস একটি সাম্মানিক উপাধি, যুগের পর যুগ যাঁরা শ্রেষ্ঠ বেদজ্ঞ ও মহাভারত উপস্থাপনে দক্ষ তাঁরাই পরপর এর অধিকারী, তবে তা সম্ভব মনে করা যায়। কিন্তু একই সঙ্গে মূল পাঠ থেকে সরে আসার বিপদও এতে ঢুকে পড়ে। পা-বদের দ্যূতক্রীড়ায় পরপর দু-বার রাজি হওয়া বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। বঙ্কিমও এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। আর কথায় কথায় দীর্ঘকালীন বনবাস, এতে দুর্ভোগের ছবি প্রকট হয় ঠিকই, কিন্তু কাহিনির বিশ্বাসযোগ্যতা মার খায়। প্রাচীন সাহিত্য, যে দেশেরই হোক, যত উন্নতই হোক, এ-রকম অতিরেক এড়াতে পারে না। তবে এসব নিয়েই মহাভারত আমাদের মনের ওপর একটা গভীর স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। কোনো কোনো অংশ গণচেতনায় মেশে— শিক্ষিত-অশিক্ষিত ভেদাভেদ থাকে না। আর আশ্চর্য, বাস্তব বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটি সেখানে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। তবে কাহিনির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ন্যায়নীতির কচকচি কোথাও কোথাও বিরক্তি বাড়ায়। স্ববিরোধও তাতে অজ¯্র। বোঝা যায়, বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থ তাদের মতলব হাসিল করার উপায় হিসেবে একে ব্যবহার করেছে। এতে ব্রাহ্মণদের অগ্রগণ্যতা বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়াটাই দৃষ্টিকটু ঠেকে। তবে তার কারণ আন্দাজ করা বোধ হয় কঠিন নয়। মূল মহাভারতের ওপর প্রক্ষেপণ চলেছে বহুশত বছর ধরে। বিশেষ করে গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবের পর ব্রাহ্মণদের প্রাধিকার বেশ বড় রকমের হুমকির মুখে পড়ে। নিছক আত্মরক্ষার তাগিদেই তাদের মুখপাত্ররা যেখানে যেমন পান, নিজেদের অধিকারের, এমনকি ক্ষুদ্র স্বার্থের কথাটাও এর-ওর মুখ দিয়ে বলিয়ে নেন। মহাভারতেও তার অনুপ্রবেশ ঘটে। তবে আশার কথা, মূল পাঠে তারা তেমন প্রভাব ফেলে না। সব মানুষই মহাভারত পড়ে নির্মল আনন্দ পেতে পারেন। এইখানেই রবীন্দ্রনাথের উক্তি, ‘ইহা একটি জাতির স্বরচিত স্বাভাবিক ইতিহাস’, প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তা যে-কোনো কায়েমি স্বার্থের নাক গলানোতে বিন্দুমাত্র বাধা দেয় না। যদিও তাকে তৃণজ্ঞান করে নিজের বিশাল প্রবাহে মিশিয়ে দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে চলে। আজ মহাভারত শুধু সে সময়ের আর্য ভাবধারার প্রতিনিধি নয়, গোটা উপমহাদেশের সব মানুষের চেতনায় তার অনুরণন বাজে। সে মানুষ যে প্রান্তের, যে সাংস্কৃতিক পরিম-লেরই হোক। মহাভারতের পরিণামে শত্রু-মিত্রের ভেদাভেদ আর থাকে না। মহাভারত পাঠেও আজ তা কে পড়ছেন, কোন অঞ্চলের, কোন জাত বা গোষ্ঠীর, এ প্রশ্নগুলো উবে যায়। পিটার ব্রুকস তাঁর মহাভারত প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের ‘অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে’— এই গানটিকে এক বেদগানের সঙ্গে (শৃন্বন্তÍ বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ), তার শীর্ষ সংগীত করেছিলেন। তাঁর অভিপ্রায় এ-কথাটিই আমাদের জানিয়ে যায়।

এ-ও চোখে পড়ে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র— এই রকম বর্ণবিভাজনের উচ্চারণে মহাভারত বেশ কঠোর। কিন্তু তাদের প্রয়োগিক প্রকাশে কোনো সংগতি বা সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মনে হয়, সমাজ তখনো সূত্রবদ্ধ কোনো আকারে এসে পৌঁছে নি। তাই নিয়ম বাঁধবার চেষ্টা থাকলেও মানবপ্রকৃতি প্রায়ই তার ফাঁক গলিয়ে ফসকে যায়। আবার প্রাক-আর্য সভ্যতার নিদর্শন যেটুকু মেলে, তাতে পুরোহিত তন্ত্রের দাপট যে প্রবল ছিলো, এটুকু অনুমান করা অযথার্থ মনে হয় না। আরো তাতে ছিলো মৌমাছির চাকের মতো শ্রমিক ও কর্মী দল। মহাভারতের সমাজ বিন্যাসে কি তার প্রভাব কাজ করেছে? এমন ভাবার আরো একটি কারণ, ভারতে আসার আগে আর্যদের জীবন প্রণালিতে তেমন জটিলতার ইঙ্গিত খুব একটা মেলে না। মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব য়োরোপের বিস্তীর্ণ পশু চারণক্ষেত্র থেকে তাদের আগমন। পশুপালন করে, দুধ, ফলমূল ও মাছ-মাংস খেয়ে তাদের জীবনধারণ। ঘোড়া তাদের সহায়। দূর-দূরাঞ্চলে তা তাদের ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। এই গোষ্ঠী জীবনে শ্রেণিবিভাজন হিতকারী নয়। জোট বেঁধে নানা দিকে অভিযানে বেরোনোটাই অগ্রাধিকার পায়। মহাভারতের কালে এই উপমহাদেশের উত্তরাবর্তে নানা জায়গায় তারা থিতু হয়েছে এবং আরো থিতু হওয়ার দিকে মন দিয়েছে। কৃষিকাজও শিখেছে। প্রাক-আর্য সভ্যতার স্তরবিন্যাস কি তাতে ঢুকে পড়ার সুযোগ পায় না? উদ্বৃত্ত উৎপাদনে ভাগ বসাতে ব্রাহ্মণ নামে যাঁরা চিহ্নিত, তাঁরা কি একটু বেশি তৎপর হয়ে ওঠেন না?

তবে মনে হয় না, ওই কালে তাঁরা সবটুকু সফল হয়েছেন। মানব-জীবনের প্রাকৃত আবেগ পুরোপুরি বাগ মানে নি। ব্রাহ্মণরাও বারবার লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করেছেন; অথবা ব্রাহ্মণ-পরিচয় নিজেই তখনো পুরো হয় নি। যদিও সমাজের বর্ণবিভাজনে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের প্রাধান্য স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। গ্রামবাসী-নগরবাসী জনসমুদয় আপন আপন বৃত্তির দিকে ঝুঁকেছে। নারীর অবস্থানেও থেকে গেছে সামাজিক দোলাচল। কাহিনি বেশিরভাগ সময়ে সমাজের নির্মাণকলায় স্বার্থবাহী কুলপতিদের পৌনঃপুনিক নির্দেশ অমান্য করে। অথবা এমনও হতে পারে, কাহিনিই আগে। যাতে তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্যেই মাঝে মাঝে বিধি-বিধানের নির্দেশ। কাহিনির বিপুল ¯্রােত কিন্তু তাকে থোড়াই কেয়ার করে এগোয়। ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ’— এই আকুতিই যেনো সব মিলে থেকে যায়।

মহাভারতের মূল কাহিনির সূত্রপাত বলে যা মনে করা যায়, সেই সত্যবতী-উপাখ্যানেই আমরা তার পরস্পরবিরোধী বহুমুখী বাস্তবতার ইঙ্গিত যেনো পাই। পুরু বংশের রাজা উপরিচর বসুর নাম টেনে আনা যেনো একটা ছল। মাছের পেটে সত্যবতীর জন্ম এবং সে উপরিচর বসুর কন্যা, এ বর্ণনায় এটুকু ইঙ্গিত পাই, সে কোনো জেলেনির সন্তান, যে জেলেনি তাকে জন্ম দিয়েই মারা যায়। পুরু বংশের রাজার সঙ্গে জড়িয়ে তাকে কিছুটা মর্যাদার আসনে বসানো হয়। ‘কিছুটা’ কারণ, সে বড় হয় জেলেদের মধ্যেই। এবং পালক পিতার কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় সে-ই যমুনায় নৌকা বেয়ে করে যাত্রী-পারাপারের কাজ। মাছধরা ছাড়া এই বাড়তি কাজে তাদের ঘর-সংসার চলে। একদিন মুনিশ্রেষ্ঠ পরাশর সত্যবতীর নৌকায় নদী পার হওয়ার সময় তার রূপলাবণ্যে আকৃষ্ট হয়ে তাকে কামনা করলেন; এবং সত্যবতীও সাড়া দিলো। সে তখনো কুমারী। এই মিলনের ফলেই জন্ম নিলেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। তিনি পিতৃগৃহে বড় হলেন, সত্যবতী কিন্তু ধীবরকন্যাই থেকে গেলো। তবে কাহিনিসূত্র অনুসরণ করলে মনে হয় ব্যাসের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিন্ন হয় নি। এবং এই যোগসূত্র ধরেই গড়ে উঠেছে গোটা মহাভারতের কথা।

এরপর কুরুবংশের রাজা শান্তনু একই রকম সত্যবতীকে দেখে মুগ্ধ হন, ও তাকে বিয়ে করতে চান। তাঁর প্রথমা স্ত্রী গঙ্গা তাঁকে ছেড়ে গেছেন, কিন্তু তাঁদের একমাত্র জীবিত পুত্র দেবব্রত মার কাছে থেকে বড় হলে বাবা তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। এরপর শান্তনুর সত্যবতীকে দেখে আকৃষ্ট হওয়া এবং ধীবর রাজের কাছে গিয়ে ওই কন্যার পাণিভিক্ষা করা। ধীবর রাজ তাঁর অবস্থা দেখে এই চাল চাললেন, যদি রাজা কথা দেন, সত্যবতী তাঁর ধর্মপতœী হবেন, এবং তাঁর গর্ভজাত পুত্রই পরবর্তী রাজা হবে, তবেই এই বিয়েতে তিনি রাজি হতে পারেন। বিফল মনোরথ হয়ে শান্তনু ফিরে আসেন। কিন্তু তাঁর বিষন্ন বদন ও চলাফেরা দেখে দেবব্রত পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ধীবর রাজের কাছে গিয়ে এই প্রতিজ্ঞা জানালো, সে নিজে কোনোদিন রাজা হবে না। তার সন্তান রাজসিংহাসন দাবি করতে পারে, এই সম্ভাবনার কথা ওঠায়, সে আরো প্রতিজ্ঞা করে, কোনোদিন সে বিয়েও করবে না। এমন ভীষণ প্রতিজ্ঞা করেছিলো বলে সেদিন থেকে তার নাম হলো ভীষ্ম। ধীবররাজ খুশি হয়ে শান্তনুকে কন্যা সম্প্রদান করলেন।

শান্তনু ও সত্যবতীর দুই ছেলে হলো চিত্রাঙ্গদা ও বিচিত্রবীর্য। শান্তনুর পর চিত্রাঙ্গদা রাজা হয়েই বিরাট যোদ্ধা বলে নাম কিনলেন; কিন্তু গন্ধর্বরাজ, তাঁর নামও চিত্রাঙ্গদা— তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন। ভীষ্ম বিচিত্রবীর্যকে রাজার আসনে বসালেন এবং কিছু পরে, তাঁর বিয়ের জন্য কাশীরাজের তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকাকে জয় করে আনলেন। কিন্তু জানলেন, অম্বা অন্যাসক্তা, তাই তাঁকে ছেড়ে দিয়ে অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে বিচিত্রবীর্যের বিয়ে দিলেন। দুই বউ নিয়ে বিচিত্রবীর্যের কামাসক্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না। তিনি ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হলেন এবং মারা গেলেন।

সত্যবতী দেখলেন, তাঁর দুই পুত্রবধূ নিঃসন্তান। ভীষ্ম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এ অবস্থায় রাজা শান্তনুর বংশ রক্ষায় এবং রাজ্যরক্ষার একমাত্র উপায় ক্ষেত্রজ পুত্র দিয়ে অম্বিকা ও অম্বালিকাকে সন্তানবতী করা। ভীষ্মকে তিনি প্রথমে অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি প্রতিজ্ঞা ভাঙতে রাজি হন না। তখন সত্যবতী নিজেই ভীষ্মের কাছে তাঁর কুমারী অবস্থায় ব্যাসদেবের জন্মকথা বর্ণনা করে তাঁকে দিয়ে এই কার্যসাধন করার কথা তুললেন। ভীষ্মও তা সমর্থন করলেন।

পরাশর ছিলেন কৃষ্ণবর্ণ। দ্বৈপায়ন ব্যাসও তাই। সে সঙ্গে তাঁর বেশভূষা নোংরা ও দুর্গন্ধ। শাশুড়ির নির্দেশে অম্বিকা ও অম্বালিকাকে পরপর তাঁর জন্যই প্রস্তুত থাকতে হলো। অম্বিকা বিকট দৈত্যাকার ব্যাসদেবকে দেখে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেন। তাই তাঁর পুত্র ধৃতরাষ্ট্র হলেন জন্মান্ধ। অম্বালিকাও শয়নশয্যায় ব্যাসের কদাকার মূর্তি দেখে ভয়ে পা-ুবর্ণ হয়ে গেলেন। ফলে তাঁর পুত্র পা-ুও হলেন পা-ুবর্ণ। সত্যবতী অম্বিকাকে আরেকবার ব্যাসের কাছে যেতে বলেন। কিন্তু তিনি কৌশলে নিজে না গিয়ে এক সুন্দরী দাসীকে তাঁর বদলে পাঠান। এই দাসীর গর্ভে ব্যাস যে পুত্র উৎপাদন করেন, তিনি বিদুর। মহাভারতের মহাযুদ্ধের পটভূমি রচিত হয় এঁদের দিয়ে। উৎসে অবশ্যই সত্যবতী।

ঘটনা হিসেবে এরা চমকপ্রদ। যে জাল এরা ছড়ায়, তার রহস্য এখনো আমাদের ভাবায়। মানব ভাগ্যের অন্তহীন সম্ভাবনার দিকে তারা ছোটে। আমরা তাদের তল পাই না। কিন্তু আপাতত বিষয়টিকে অন্য এক সীমিত পরিসরে দেখার চেষ্টা করি। তা কেবল ওই কালের বাস্তবতা আন্দাজ করার জন্য। এতেও যে অস্পষ্টতা থাকবে না, তা বলতে পারি না।

জেলে মায়ের কন্যা এবং জেলেদের ভেতরে বেড়ে ওঠা সত্যবতী যে কুরুরাজ শান্তনুর রানী হন, এতে ক্ষত্রিয় ও অক্ষত্রিয়র ভেতরে ভেদরেখাটা যে কোথায় তা বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়ে। এই অনুমান প্রবল হয়, তিনি ছিলেন তাঁর মায়ের অবৈধ, এমনকি, হতে পারে বহুভজনার সন্তান। উপরিচর বসুর উল্লেখে তাতে আভিজাত্যের আলগা মহিমা একটুখানি জুড়ে দেয়ার চেষ্টা। এই সত্যবতী হলেন রাজরানী। কিন্তু তার আগে কন্যাবস্থাতেই ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ পরাশর মুনির সাধ মিটিয়ে তিনি মা হয়েছেন। সন্তান কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস শুধু মহর্ষিই নন, তিনি বেদ-বিভাগ কর্তা ও মহাভারতের মূল রচয়িতা। পরাশর ও ব্যাসের আকৃতিতে এটা বোঝানো মুশকিল যে, তাঁরা আর্য ছিলেন। মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ য়োরোপ থেকে যে আর্য জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটে তাঁরা ছিলেন গৌরবর্ণ ও উন্নত নাসা। বিপরীতে পরাশর ও ব্যাস, দুজনই ছিলেন কৃষ্ণবর্ণ; ব্যাস তো কুৎসিত কদাকার। ব্রাহ্মণ্য গৌরবও তাহলে বিশুদ্ধ বলে দাবি করা যায় না। এবং আমরা জানি, কুরু-পা-ব (প্রকৃতপক্ষে উভয়েই কুরু-বংশ) দুয়ের ভেতরেই প্রবহমান ছিলো পরাশর-সত্যবতী-ব্যাসের রক্ত। বর্ণবিভাজন বাস্তবে তখন যথাযথ ও বংশানুক্রমিক থেকেছে, তা দাবি করা বাতুলতা বলেই মনে হয়।

আরো একটা বিষয় খেয়াল করি। দ্বৈপায়ন ব্যাস সত্যবতীর কন্যাকালীন সন্তান। এ নিয়ে তাঁর মনে কোনো গ্লানি নেই। বরং কিঞ্চিৎ গৌরববোধই বোধ হয় আছে। ভীষ্মের কাছে ব্যাসের জন্মকথা বলার সময়, ঈষৎ লজ্জার সঙ্গে হলেও, তিনি জানান, ‘কন্যাবস্থায় আমার যে পুত্র হয়েছিলো তাঁর নাম দ্বৈপায়ন, তিনি মহাযোগী মহর্ষি, চতুর্বেদ বিভক্ত করে ব্যাস উপাধি পেয়েছেন, তিনি কৃষ্ণবর্ণ সেজন্য তাঁর অন্য নাম কৃষ্ণ।’ (সারানুবাদ : রাজশেখর বসু) এ-ও দেখি, পুত্রবধূদ্বয় বিধবা হলে তিনি বংশরক্ষার তাগিদে তাদের এক রকম জোর করেই ব্যাসের সঙ্গে মিলিত হতে পাঠাচ্ছেন। এটা আমাদের বিস্ময় জাগায়।

একটু পরেই কিন্তু পড়ি কর্ণের জন্মকথা। সত্যবতীর পুত্রবধূ কুন্তীর সেও কন্যাকালীন সন্তান। অপবাদের ভয়ে কুন্তী তাকে জলে ভাসিয়ে দেন। এ থেকে জন্ম নেয় বিয়োগান্ত সম্ভাবনারাশি। আমরা সেসব এড়িয়ে গিয়ে শুধু কুন্তীর বিপন্ন সত্তার দিকে এক পলক তাকাই। প্রথম— পার্থকে তিনি স্বীকার করতে পারেন না; কিন্তু ভুলতেও পারেন না। দ্রোনাচার্যের কাছে প্রশিক্ষিত হয়ে ধৃতরাষ্ট্রের ও পা-ুর পুত্ররা যখন ক্রীড়াঙ্গনে নিজ নিজ কৌশল প্রদর্শন করার পর অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রায় স্বীকার করে নিয়েছেন, তখনই সেখানে কর্ণের আবির্ভাব। অর্জুন যা যা করেছেন, তিনিও সেসব করে দেখালেন এবং অর্জুনকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন। রাজশেখর বসুর সারানুবাদে পড়ছি, ‘কর্ণকে চিনতে পেরে কুন্তী মূর্ছিত হলেন… দুই পুত্রকে সশস্ত্র দেখে (তিনি) বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। এই সময়ে কৃপাচার্য কর্ণকে বললেন, এই অর্জুন কুরুবংশজাত, পা-ু ও কুন্তীর পুত্র, ইনি তোমার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করবেন। মহাবাহু কর্ণ, তুমি তোমার মাতা-পিতার কুল বল, কোন রাজবংশের তুমি ভূষণ? তোমার পরিচয় পেলে অর্জুন যুদ্ধ করা বা না করা স্থির করবেন, রাজপুত্ররা তুচ্ছকুলশীল প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে যুদ্ধ করেন না। কৃপের কথায় কর্ণ বর্ষাজলসিক্ত পদ্মের ন্যায় লজ্জায় মস্তক নত করলেন। দুর্যোধন বললেন, আচার্য, অর্জুন যদি রাজা ভিন্ন অন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে না চান তবে আমি কর্ণকে অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত করছি।… এই সময় সূর্যাস্ত হ’ল।… কর্ণ অঙ্গরাজ্য পেলেন দেখে কুন্তী আনন্দিত হলেন।…’

কিন্তু কুরু-পা-ব বিরোধ এড়ানো যায় না। এড়ানো যে যায় না, তার পেছনে একটা বড় ইন্ধন জোগায় কর্ণের তীব্র পা-ববিদ্বেষ। পরিণামে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, এবং তাতে অর্জুনের হাতে কর্ণ বধ। ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে এখানে যাচ্ছি না। আদৌ তা ভাগ করা যায় কি না, মহাভারত সত্যি সত্যিই তেমন করেছে কি না, এরও কোনো সদুত্তর নেই। কিন্তু যুদ্ধের সর্বনাশা সমাপ্তির পর আমরা দেখি মৃত যোদ্ধাদের তর্পণের কালে কুন্তী নিজেকে আর সামলে রাখতে পারেন না। সবার সামনে এতোদিন পর তিনি কর্ণের জন্মরহস্য উন্মোচন করেন। বলেন ‘সূর্যের ঔরসে কন্যাবস্থাতেই আমার গর্ভে কবচকু-লধারী হয়ে তাঁর জন্ম।’ পা-বদের তাঁদের এই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার তর্পণ করতে তিনি বললেন। পা-বরাও বিষাদমগ্ন হলেন।

মহাভারতের প্রায় অন্তিমলগ্নে আরেকবার আমরা কুন্তীর কাতরতা দেখি। তা অবশ্য এবার সান্ত¦নার সাময়িক স্পর্শ পায়। ‘পুত্রদর্শনপর্বাধ্যায়ে’ ব্যাসের কথামতো জীবিত আত্মীয়জনরা গঙ্গাতীরে সমবেত হয়ে যুদ্ধে নিহত তাঁদের প্রিয়জনদের দেখতে পান। ব্যাসের কাছে কুন্তীও তার আগে লজ্জিতভাবে আবেদন জানিয়ে রেখেছিলেন, ‘ভগবান, আপনি আমার শ্বশুর, দেবতার দেবতা… আমি মূঢ়তার বশে সজ্ঞানে সেই পুত্রকে (কর্ণ) উপেক্ষা করেছি, তার ফলে আমার হৃদয় দগ্ধ হচ্ছে। আমার কর্ম পাপজনক বা পাপশূণ্য যা-ই হোক আপনাকে জানালাম। সেই পুত্রকে আমি দেখতে ইচ্ছা করি; মুনিশ্রেষ্ঠ, আমার হৃদয়ের কামনা আজ পূর্ণ করুন।’ (রাজশেখর বসুর পূর্বোক্ত সারানুবাদ)

গঙ্গা থেকে যুদ্ধে বীরগতি পাওয়া আর সবার সঙ্গে কর্ণও উত্থিত হলেন। কুন্তীর মাতৃহৃদয় সান্ত¦না পেল। আমরা দেখি একই রকম পরিস্থিতির সামনে সত্যবতী ও কুন্তীর দু-রকম আচরণ। একি সামাজিক মূল্যমানে কোনো ওঠা-পড়ার ইঙ্গিত? নাকি বিভিন্নজনের বিভিন্ন রকম হয়ে ওঠার কথা বলা? মহাভারতে অজ¯্র মানব-মানবী আসে যায়। সুখ-দুঃখ দেয়। কেউই মানবিক বিচ্যুতির উর্ধ্বে নয়। কিন্তু কোনো দু’জন একরকম নয়। তবু পেছনে বয়ে কালের ¯্রােত। সচেতনভাবে হোক, আর ওই ¯্রােতের টানেই হোক, মহাভারত নিজেও তার সঙ্গে সঙ্গে চলে। কাহিনি-ধারায় মানব-মানবীরা তাতে যোগ দেয়। তবে প্রত্যেকের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে। এভাবেই আসেন সত্যবতী। আসেন কুন্তী। তবে দুজনই আপন আপন বিশিষ্টতা নিয়ে। তা নিয়তি নির্দিষ্ট। মৌলিকভাবে তাকে বদলানো যায় না।

মহাভারতে ধর্মাধর্ম, ন্যায়-অন্যায় নিয়ে কথা আছে প্রচুর। কিন্তু তাতে কি কোনো সমাধান মেলে? বঙ্কিমের মতো নৈয়ায়িক শুদ্ধতার খড়গ হাতে অগ্রসর হলেও কোনো সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে কি আমরা আসি? বঙ্কিমের প্রত্যয়েও ঐতিহ্যের আনুগত্য থেকে যায়। তার সঙ্গে মানব সভ্যতার বিকাশ একসঙ্গে যায় না। তিনিও চার যুগ— সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি— এটা মেনে বিচারে আসেন। তাতে মহত্ত্বকে চিহ্নিত করা যায় তার প্রাচীনত্বের প্রেক্ষাপটে। ডারউইনের প্রাণিজগতে ক্রমবিকাশের তত্ত্ব অবশ্য অখন-নীয় গ্রাহ্যতা পেয়ে গেছে ততদিনে। এতে বঙ্কিম-বিচার কিছুটা ফিকে হয়ে যায় বৈ কি! সেইসঙ্গে প্রশ্নগুলো নতুনভাবে ভিড় করে আসে। ভালো-মন্দের পূর্বনির্ধারিত অবস্থান মেনে নেওয়া আর বাধ্যতামূলক থাকে না। আমাদের মহাভারত পাঠ তাতে অন্য মাত্রা পায়; এবং আগে যে বলেছি, ন্যায়-অন্যায় বিভাজন মহাভারত সত্যিই করেছে কি না, তার সদুত্তর না পেলেও আমরা তার মুখোমুখি হই। ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’ রবীন্দ্রনাথের কল্যাণে আমাদের অনেকেরই পড়া। মহাভারত তার ভিন্ন রকম কিছু লেখে নি। এতে কর্ণই মহত্তর আলোকে উদ্ভাসিত হন। যদিও তিনি বরাবর থেকে যান দুর্যোধনের পাশে। বল-ভরসাও জোগান তাকে। এমনকি বিবিধ দুষ্কর্মেও। ইন্দ্র যে ছল করে কর্ণের মহানুভবতার সুযোগ নিয়ে তাঁর কবচকু-ল হস্তগত করেন এবং বিনিময়ে দেন শক্তি অস্ত্র, যার মারণক্ষমতা কৃষ্ণের চাতুরীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ঘটোৎকচ বধেই শেষ হয়, ফলে অর্জুনের জীবনসংশয় হ্রাস পায়— এতেও কর্ণের মহিমাই উজ্জ্বলতর হয়। আমরা বিচিত্র, এমনকি পরস্পর-বিরুদ্ধ মানুষী সম্ভাবনার প্রকাশ একেকজনের ভেতরে দেখি। তা অবিশ্বাস্য ঠেকে না। বরং মানুষী বাস্তবতায় ও তার অসহায়তায় ওই সময়ের প্রেক্ষাপটেই পূর্ণতা দেয়। এখনো আমরা বারবার সেদিকে তাকাই।

একটা ধারণা আমাদের জনগনের মানসলোকে প্রবল যে, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা পা-বদের অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করেছিলেন। সে কারণেই কুরুক্ষেত্রের মহাসমর। বিষয়টি খোলা চোখে দেখতে গেলে কিছু সংশয়ের মুখোমুখি হতে আমরা বাধ্য হই। তাদের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার আগে এ প্রশ্ন অবান্তর মনে হয় না, ওই সংঘর্ষে মহাযুদ্ধের উপাদান কতটুকু ছিলো? মূলত এটা একই রাজবংশের ভেতরে শরিকি লড়াই। এবং তাতে দুর্যোধনদের প্রথমেই দুর্জন হিসেবে ধরে না নিলে তাঁদের অন্যায় দখলদার বলে কি নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায়? ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হওয়াতেই সমস্যার উৎপত্তি। তা নইলে রাজা হওয়ার অখ- অধিকার ছিলো তারই। পা-ুও রাজা হয়ে রাজ্যশাসন করতে পারেন নি। ব্রহ্মশাপে রাজকার্য ছেড়ে দুই স্ত্রী কুন্তী ও মাদ্রীকে নিয়ে তিনি বনবাসী হন। কীভাবে পঞ্চপা-বের জন্ম, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে বনবাসে পা-ুর মৃত্যু হলে এবং মাদ্রী সহমরণে গেলে কুন্তী পাঁচ ছেলে নিয়ে একদিন কুরু-রাজ্যের রাজধানী হস্তিনাপুরে ফিরে আসেন। এতোদিন অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের হয়ে ভীষ্ম রাজকার্য সামলেছেন। ছেলেরাও প্রায় সাবালক। এমন সময় কথা নেই, বার্তা নেই কুন্তী পাঁচ ছেলে নিয়ে হাজির। তাদের জন্ম রহস্যে ঢাকা। একটা গুঞ্জন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। দুর্যোধনের বাড়া ভাতে ছাই পড়ছে ভেবে বিরূপ হওয়াটাও মনুষ্যস্বভাবের অঙ্গ।

বয়সের জ্যেষ্ঠতায় যুধিষ্ঠির যুবরাজ হন। প্রজাদের সমাদর পান। ধৃতরাষ্ট্রেরও ঈর্ষা জাগে। শকুনি ও কর্ণের সঙ্গে ফন্দি এঁটে কুন্তীসমেত পা-বদের বারণাবতে জতুগৃহ বানিয়ে সেখানে তাঁদের পুড়িয়ে মারার চক্রান্ত করে দুর্যোধন এতে তাঁর অনুমোদন চান। তিনি আর ‘না’ করেন না। বিদুরের কাছ থেকে সতর্ক থাকার বার্তা পেয়ে পা-বেরা জতুগৃহে নিজেরাই আগুন লাগিয়ে দিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে পারেন। পরে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে বনে বনে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একদিন খবর পেয়ে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় হাজির হন। এখানে লক্ষ্যভেদ করে অর্জুন দ্রৌপদীকে লাভ করেন। তবে কুন্তীর অজ্ঞানপ্রসূত এক কথায় পঞ্চপা-ব একত্রে দ্রৌপদীকে বিয়ে করেন, এই কথাটিই প্রসিদ্ধি পায়। মহাভারত একে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে নিয়ে আবর্তিত হয়ে চলে। তবে প্রাথমিক অবস্থায় বিষয়টি এমন ছিলো কি না এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। তাঁদের সংশয় কিঞ্চিৎ ভিত্তি পায় অর্জুন যখন রূপসী সুভদ্রাকে গায়ের জোরে রথে তুলে নিয়ে রাক্ষসপ্রথায় বিয়ে করে ঘরে আনেন, তখন অন্তত দ্রৌপদীর এই খেদে : ‘কৌন্তেয়, তুমি সুভদ্রার কাছেই যাও, পুনর্বার বন্ধন করলে পূর্বের বন্ধন শিথিল হয়ে যায়।’ আমরা আরো পড়ি, ‘অর্জুন বারবার ক্ষমা চেয়ে দ্রৌপদীকে সান্ত¦না দিলেন এবং… সুভদ্রা দ্রেীপদীকে প্রণাম করে বললেন, তোমার স্বামীর যেন শত্রু না থাকে।’

দ্রৌপদীর অভিমান তখনই সাজে, যখন কেবল অর্জুনই তাঁর ভালোবাসার একমাত্র অবলম্বন। পঞ্চস্বামীর পক্ষে এটা একটু বিসদৃশই মনে হয়। আবার সুভদ্রা যখন বলেন. ‘আমি আপনার দাসী’ তখন তা দ্রৌপদীর এতোদিনের একচ্ছত্র অধিকারেরই ইঙ্গিত দেয়। অবশ্য তার আগে অর্জুন উলুপী ও চিত্রাঙ্গদাকেও বিয়ে করেছেন। কিন্তু তাঁরা দূরেই থেকে গেছেন। জীবনসায়াহ্নে তাঁদের আবার দেখা পাই। পুরুষের বহুবিবাহ নিয়ে কোথাও কোনো কথা ওঠে নি। পঞ্চ পা-বদের প্রত্যেকেরই একাধিক পতœী ছিলো। তবে শেষ পর্যন্ত কুরু-রাজ্যে অর্জুনের ধারাই বহমান থাকে। সুভদ্রা-তনয়া অভিমন্যু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে প্রাণ দিয়ে অমরত্বে ঠাঁই করে নেন। তাঁর ও উত্তরার ছেলে পরীক্ষিৎ যুধিষ্ঠিরের পর রাজা হন। দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র বধ কি মহাভারতকারের অনিবার্য জাগতিকর উত্তরাধিকার সমস্যা এড়াবার ছল?

এর আগে অনেক মন্ত্রণার পর ধৃতরাষ্ট্র দ্রৌপদীসহ পা-বদের পাঞ্চালরাজের প্রাসাদে থেকে ফিরিয়ে এনে তাঁদের অর্ধেক রাজ্য দিয়ে একটা রফা করেছেন। খা-বপ্রস্থ পড়ে পা-বদের ভাগে। অর্জুন ও কৃষ্ণের নেতৃত্বে খা-ব দাহন সেখানে এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এতে বোঝা যায়, বনজঙ্গল পরিষ্কার করে বসতভূমি তৈরির কাজ তখনো শৈশাবস্থায়। ভূমি বাসযোগ্য হলে পা-বরা সেখানে ইন্দ্রপ্রস্থ নগর গড়ে তুলে সেখানে তাঁদের রাজধানী স্থাপন করেন। এবং বহু জাঁকজমকের সঙ্গে রাজসূয় যজ্ঞ করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেন। রাজসূয় যজ্ঞ ও অশ্বমেধ যজ্ঞ— এই দুটো ছিলো রাজাদের স্বীকৃতি লাভের প্রথানুগ উপায়। রাজসূয় যজ্ঞ চলতো এক বছর ধরে। তাতে যতো আড়ম্বর, যতো সমমানের রাজন্যবর্গের আগমন, তত তার সফলতা। যুধিষ্ঠিরকে রাজা করে পা-বদের রাজসূয় যজ্ঞ সফল হয়। অবশ্য তা নির্বিঘœ হয় না। চেদিরাজ শিশুপাল কৃষ্ণের সম্মাননার বিরোধিতা করে তাঁকে যুদ্ধে আহ্বান করলে কৃষ্ণ তাঁকে বধ করেন।

রাজসূয় যজ্ঞের অনুরূপ আরেকটি প্রথা ছিলো অশ্বমেধ যজ্ঞ। যজ্ঞের ঘোড়া যতদূর ঘুরে আসে ততদূর রাজার আধিপত্যের স্বীকৃতি। ঘটনাটায় রাজ্য বিস্তারের চেয়ে প্রথার অনুশাসনই বেশি ছিলো বলে মনে হয়। ঘোড়া যতটা পথ ঘুরে আসে তার আওতায় কোনো রাজাই রাজ্য হারাতেন বলে মনে হয় না। অশ্বমেধ যজ্ঞের যিনি হোতা, তিনি মান্যতা পান, ব্যাপারটা বোধ হয় বাস্তবে এরকমই ছিলো। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর সমগ্র কুরুরাজ্য পেয়ে পা-বেরাই অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। তাতে উলুপী, চিত্রাঙ্গদা ও তাঁর ছেলে — তখন মণিপুর-রাজ বভ্রুবাহন, এঁরাও এসে জড়ো হয়েছিলেন।

অশ্বমেধ যজ্ঞ এক আদিমতর আর্য বিশ্বাসের দিকেও বোধহয় ইঙ্গিত দেয়। মধ্য এশিয়ায় মানব বসতির শুরু থেকে শত শত বছর ধরে ঘোড়াই ছিলো শক্তির উৎস। অন্যান্য উর্বরা-বর্ধক প্রথার মতো এখানেও তাই অশ্বমেধ আরো অশ্বশক্তির প্রার্থনা দিয়ে শুরু বলে মনে হয়। তবে যতো যাগযজ্ঞ, তত ব্রাহ্মণ-পুরোহিতদের পোয়াবারো। এসব যজ্ঞানুষ্ঠানের বর্ণনায়, এবং সুযোগ পেলে অন্যত্রও, দেবদ্বিজে ভত্তি যে বাঞ্ছাপূরণের উপায়, এবং তাদের অবহেলা যে শত বিপর্যয়ের কারণ, এ কথাগুলো বারবার উচ্চারিত হয়। সন্দেহ বোধহয় অমূলক নয়, এদের বেশিরভাগই প্রক্ষিপ্ত। বৌদ্ধভাবনার উত্থান ও অন্যান্য দ্রাবিড় অনার্য ধ্যান-ধারণা অব্যাহত থাকার মুখে ব্রাহ্মণ্যস্বার্থ পরবর্তী নানা পর্যায়ে যখন যেমন পারে, ঢুকে পড়েছে। মহাকাব্যের মাহাত্ম্য এতে কিন্তু ক্ষুণœ হয়। যদিও, যেমন বলেছি, কে ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়, আর, কে তা না, এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর আমরা পাই না। পাই না বলেই কিন্তু এর পাঠ আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিছু কিছু মজাও পাই। যেমন, এই রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের আগে ইন্দ্রপ্রস্থে ময়দানবের তৈরি সভাগৃহে প্রবেশের কালে আমরা পড়ি, ‘যুধিষ্ঠির ঘৃত ও মধুমিশ্রিত পায়স, ফলমূল, বরাহ ও হরিণের মাংস, তিলমিশ্রিত অন্ন প্রভৃতি বিবিধ ভোজ্য দিয়ে দশ হাজার ব্রাহ্মণ ভোজন করালেন এবং তাঁদের উত্তম বসন, মাল্য ও বহু সহ¯্র গাভী দান করলেন।’ (রাজশেখর বসুর পূর্বোক্ত সারানুবাদ)। খেয়াল করি, ব্রাহ্মণরা মাংসাশী; এবং আদৌ নির্লোভ বা নির্লিপ্ত নন। মহার্ঘ দান গ্রহণের প্রাথমিক অধিকার তাঁদেরই। এবং তার প্রচারে সুযোগ পেলেই তাঁরা উচ্চকন্ঠ। এ কোনো শ্রদ্ধার উদ্রেক করে না। বরং মনে পরিহাস মিশ্রিত করুণার জন্ম দেয়।

ইন্দ্রপ্রস্থে রাজসূয় যজ্ঞের ঘটাই কিন্তু পা-বদের বিপাকে ফেলে। মন্যুময় দুর্যোধন ঈর্ষায় ফেটে পড়েন। ধৃতরাষ্ট্রের সম্মতি নিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠতম উপদেষ্টা শকুনি ও কর্ণের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি যুধিষ্ঠিরকে বাজি ধরে পাশা খেলায় আহ্বান করেন। পরবর্তী ঘটনা যাঁরা মহাভারতে উৎসাহী তাঁদের সবারই জানা। পাশা খেলায় দক্ষ শকুনি দুর্যোধনের পক্ষে খেলতে বসেন। যুধিষ্ঠির সর্বস্ব হারান। বাজির শর্ত অনুযায়ী পা-বদের বারো বছর বনবাস ও এক বছর অজ্ঞাতবাসে যেতে হয়। দুঃশাসনের হাতে দ্রৌপদী লাঞ্ছিত হন। তবে বঙ্কিম এ ঘটনার অনুপ্রবেশকে প্রক্ষিপ্ত বলে রায় দেন। যা-ই হোক, পা-বদের বনবাস পর্ব নির্বিঘেœ কাটে না। অজ্ঞাতবাসের এক বছর তাঁরা মৎস্য দেশে বিরাট-রাজার আশ্রয়ে ছদ্মবেশ পার করেন, যদিও তার ভেতরেও নানা রোমাঞ্চকর কা- ঘটে। এই মৎস্য দেশ কুরুপাঞ্চালের অনেকটা দক্ষিণে — এখনকার রাজস্থান মধ্যপ্রদেশ এলাকায়। অজ্ঞাতবাসের মেয়াদ শেষ হলে অর্জুন-সুভদ্রা পুত্র অভিমন্যুর সঙ্গে বিরাটকন্যা উত্তরার বিয়ে হয়।

একটা বিষয় এখানে চোখে পড়ে। বড় বড় রাজারাও গোধন লুণ্ঠনকে মহাবীরত্বের কাজ বলে মনে করতেন। অনুমান বোধ হয় অযৌক্তিক হবে না, তখনো পশুপালনের আপেক্ষিক গুরুত্ব কৃষি বা অন্য কোনো সম্পদ সৃষ্টির কাজের চেয়ে তুলনায় বেশি। বহিরাগত আর্যদের বেলায় অবশ্যই। বিরাট রাজার গরুর পাল লুঠ করতে এসে গোটা কৌরব বাহিনীর অর্জুন ও উত্তরের হাতে নাকাল হওয়ার বর্ণনায় মজা পাই ঠিকই, কিন্তু সমাজে জীবনযাত্রার এই দিকটি তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অজ্ঞাতবাস পর্ব শেষে পা-বরা ফিরে এসে আবার অর্ধেক রাজত্ব দাবি করেন। দুর্যোধনেরা এবার সূচ্যগ্র মেদিনীও দিতে প্রস্তুত নন। যুদ্ধই অনিবার্য পরিণাম। শরিকি গোলমাল লাঠালাঠিতে গড়ায়, এমন এখনো ঘটে। কিন্তু তাই নিয়ে মহাযুদ্ধ, যাতে ধর্ম ও অধর্মে স্পষ্ট ভেদরেখা টেনে দিয়ে গণমানুষের চেতনায় তাকে স্থায়ী রূপ দেওয়া, এটাই শুরুতে মহাভারতের মূল লক্ষ্য ছিলো কি না, এ নিয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে। অন্তত এমন সাদা-কালো বিভাজন এখানে স্পষ্ট নয়। পরিণতিও কোনো সুখ আনে না। কারো জন্যেই না।

শুরুতে কুন্তীকে নিয়ে পা-বদের হস্তিনাপুরে আগমন এমন রহস্যজালে ঢাকা যে, তাদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক মনে হয় না। দুর্যোধনদের দাবি এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হলে মহাভারত তার মানুষী রূপ থেকে কখনো বিচলিত হয় নি। অন্তত যতটা খাঁটি বলে বিবেচনা করা যায়, তাতে এখানে কেউই সর্বশুক্ল বা সর্বশুক্লা নয়। কৃষ্ণও না। পরিণামের প্রশান্তি যে বিষাদে মোড়ানো এতেই মহাভারতকারের দৃষ্টির সমগ্রতা ধরা পড়ে। ধর্মের বা ন্যায়ের রাজ্য প্রতিষ্ঠাই যদি এর বার্তা হয়, তবে তার দেখা মেলে কই? কৃষ্ণের মৃত্যুতে কোনো গৌরব ছিলো না। যাদবদের পানশক্তি তাদের সর্বনাশের দিকে ঠেলে। দুর্যোধন প্রজাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিলেন না। পা-বদের রাজত্বে কুরুরাজ্য কোনো সৌভাগ্যের স্বর্ণশিখরে ওঠে নি। ইতিহাসে যখন ষোড়শ মহাজনপদের কাহিনি উচ্চারিত হয় এবং তা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে, তখন সে অন্যতম থাকে, অনন্য হয়ে ওঠে না। ক্রমে ক্ষমতার ও সৃষ্টিশীল মানবিক ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু সরে আসে পুবে — মগধের রাজগৃহে, পাটলিপুত্রে, বুদ্ধদেবের আবির্ভাবকালে সারনাথে।

তারপরও মানুষ মহাভারত পড়ে। মহাভারত শোনে। এখনো। এ কারণে নয় যে, তাতে পা-বদের বিজয়গাথা রচিত হয়েছে। বরং এ কারণে যে, মর্ত্য মানুষের আর্তি ও শান্তি, দুই-ই সে নিরাসক্তভাবে দেখিয়েছে।

সহায়ক গ্রন্থাবলি

১.            আন্তানোভা, বোনগার্দ-লেভিন, কতোভ্স্কি, ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮২

২.           বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘কৃষ্ণচরিত্র’, বঙ্কিম রচনাবলী, সাহিত্যসমগ্র, তুলি-কলম, কলকাতা, ১৩৯৩ (বঙ্গাব্দ), পৃ. ৪০৭-৫৮৩

৩.           বুদ্ধদেব বসু, মহাভারতের কথা, কলকাতা, ১৯৭৪

৪.           রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র, বিশ্বভারতী গ্রন্থ বিভাগ, কলকাতা, ১৯৭৭

৫.           রাজশেখর বসু, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস-কৃত মহাভারত, সারানুবাদ, কলকাতা, ১৩৭৮ (বঙ্গাব্দ)

৬.           রাজ্যেশ্বর মিত্র, মহাভারত চিন্তা, কলকাতা, ১৩৯২ (বঙ্গাব্দ)

৭.           সুরেন্দ্র মোহন ভৌমিক, মহাভারত কথামৃত, কলকাতা, ১৯৫৬

৮.           জড়সরষধ ঞযধঢ়ধৎ, অ ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ওহফরধ- ১, চবহমঁরহ ইড়ড়শং, ঊহমষধহফ, ১৯৮৬

*******************************

 

অসীমকৃষ্ণ দত্ত
………………..
উৎস মহাভারত : বাংলা সাহিত্য

ব্যাসদেব রচিত মহাভারত গুণী-জ্ঞানীজনের দৃষ্টিতে নানারূপে প্রতিভাত— মহাকাব্য, পুরাণ, ধর্মশাস্ত্র, স্মৃতিশাস্ত্র ইতিহাস ইত্যাদি। অনেক শতাব্দীর অনেক রচয়িতার রচনা এতে জুড়ে রয়েছে। আদিতে ‘জয়’ বা ‘ভারতসংহিতা’য় যা শোনা গেছে বৈশম্পায়নের মুখে, শ্লোক সংখ্যা ছিলো ২৪ হাজার। তাই পরে সৌতির মুখে শোনা গেলো ৮৪ হাজার শ্লোকে আর তারও পরে কথা কাহিনি জুড়ে দাঁড়িয়ে গেল ১ লক্ষ শ্লোকের এক অখ- মহাভারত। ভিন্নমতও আছে। বহুজনের বহুচিন্তার ফসল নিয়ে এ এক বিরাট ভা-ার। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ইহা কোনো ব্যক্তিবিশেষের রচিত ইতিহাস নহে, ইহ একটি জাতির স্বরচিত স্বাভাবিক ইতিহাস’। স্বয়ং ব্যাসদেবই আদিপর্বের অনুক্রমণিকায় সৌতির মুখে তাঁর ভবিষ্যতবাণী ঘোষণা করে গেছেন— ‘এই বিশাল মহীতলে কত শত মহাত্মার ঐ ইতিহাস কহিয়া গিয়াছেন, অনেকেই কহিতেছেন এবং ভবিষ্যতকালেও কহিবেন।’ (কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদ)

মনীষী রাজশেখর বসুও মহাভারতের সারানুবাদে এ কথাই বলেছেন— ‘কয়েকজন কবি এই ইতিহাস পূর্বে বলে গেছেন, এখন অপর কবিরা বলেছেন আবার ভবিষ্যতে অন্য কবিরাও বলবেন।’ ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ব্যাসদেবে এ কথার আক্ষরিক সত্যতাই এ নিবন্ধের প্রতিপাদ্য।

বাঙালির কাছে মূলত পাঁচটি মহাভারত রয়েছে— ব্যাসদেবের মূল সংস্কৃত মহাভারত, কালীপ্রসন্ন সিংহ কর্তৃক বাংলা ভাষায় অনূদিত মহাভারত, রাজশেখর বসুর মূল মহাভারতের বাংলা সারানুবাদ, প-িত হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশকৃত ৪৩ খ-ের মহাভারতের বাংলা অনুবাদ আর কাশীরাম দাসের বাংলার অনুবাদে আপামর বাঙালির প্রিয় ‘কাশীদাসী মহাভারত’। অবশ্যই এই প্রশ্নগুলির রসভোক্তা পাঠকের মধ্যে শ্রেণীভেদ আছে। একমাত্র কাশীদাসী মহাভারতই মূলত কাঠামো বজায় রেখেও অনেকটা সরে এসেছে— গ্রহণ-বর্জন-পরিমার্জন-পরিবর্ধন-অতিরঞ্জন-সংযোজন। ব্যাসদেবের ভবিষ্যতবাণী যে কতোটা সফল কাশীদাসী মহাভারতই তার সাক্ষ্য। এও এক রচনা নয়, একাধিকের।

মহাভারত গ্রন্থ নয়, এক অফুরান মধুচক্র। শুধু বাংলাতেই, অন্য ভারতীয় বা অ-ভারতীয় ভাষা ছেড়েই দিলাম, আজ পর্যন্ত কত যে অনুবাদ-কাব্য-নাটক-প্রবন্ধ-আলোচনা-গল্প-উপন্যাস-কাহিনি রচিত হয়েছে, হয়ে চলেছে (এবং ভবিষ্যতে হবে আশা করা যায়) তার ইয়ত্তা নেই। নিতান্তই কৌতূহল থেকে এ জাতীয় একটা রচনা তালিকা তৈরীতে হাত দিয়েছিলাম। কিছুদূর এগিয়েই বুঝতে পেরেছি কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সমগ্র তথ্য সংগ্রহ করা প্রায় এক অসম্ভব কাজ। আর অসম্ভব জেনেই সাহস ও ভরসা পেয়েছি, আমার অক্ষমতাজনিত অসম্পূর্ণতার ত্রুটি পাঠকের কাছে ক্ষমার্হ হবে।

নীচে যে গ্রন্থ-তথ্য সংকলিত হয়েছে তা মূলে বর্ণিত (জন্ম, ভারতসংহিতা, মহাভারত, খিল-হরিবংশসহ) আখ্যান উপাখ্যান এবং কাশীদাসী মহাভারতের সংযোজিত কাহিনী থেকে গৃহীত। শ্রীমদ্ভগবতে শ্রীকৃষ্ণপ্রসঙ্গে অনেক কাহিনী আছে, যা মহাভারতে— সংস্কৃতে বা বাংলায় নেই।… তাই সংকলিত গ্রন্থের নাম, রচয়িতার নাম, রচনাকাল, প্রকাশকাল ইত্যাকার প-িত-গবেষকের সমস্তরকম বিতর্ক এড়িয়ে শুধুমাত্র নাম-তালিকা রচনা করা হয়েছে। এ কোনো সৃজনধর্মী সাহিত্যিক প্রয়াস নয়। বঙ্কিমচন্দ্রের কথায় নিতান্তই সাহিত্যের কুলির কাজ। তবে অতি সাধারণ এই প্রয়াস যদি পাঠকের মনে সামান্যতম কৌতূহল সৃষ্টি করে, এর অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণতাদানে প্রণোদিত করে তাহলেই নিজেকে কৃতার্থ মনে করব। প্রসঙ্গত সুধী পাঠকবর্গ এ সংকলনে সংকলকের অজ্ঞানতা বা অনবধানজনিত অনেক হয়তো খুঁজে পাবেন। সেজন্য অগ্রিম ক্ষমাপ্রার্থী।

পাঠকের সুবিধার জন্য তালিকাভুক্ত গ্রন্থগুলি বিষয়ভেদে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

ষোড়শ শতাব্দীতে অনেক ঐতিহাসিক বাংলা সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতির নবজাগরণকাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বস্তুত এ সময়েই বাংলা সাহিত্য ঐতিহ্যের সদর্থক অনুশীলন লক্ষ করা যায়। সংস্কৃত রামায়ণ, মহাভারত, ভগবত, ভগবতের অনুবাদ বাঙালির কবিগণ তৎপর হয়ে ওঠেন। নবজাগরণের এ এক বিশেষ লক্ষণ। নিচের পঞ্জীটি মহাভারতের ব্যাপক অনুবাদকর্মের একটি তালিকা প্রণয়নের প্রয়াসমাত্র।

মহাভারতের বাংলা অনুবাদ—সগ্রে/অংশ

১৬-১৮ শতক

কবীন্দ্র পরমেশ্বর—আদি থেকে অশ্বমেধপর্ব অনুবাদ। পুঁথির শেষের দিকে ‘সঞ্জয়’ ভনিতা পাওয়া যায়। শ্রীকর নন্দী, দ্বিজ অভিরাম, অনন্ত মিত্র, দ্বিজ রামচন্দ্র খান, দ্বিজ রঘুনাথ প্রমুখের ‘অশ্বমেধ পর্বে’র অনুবাদ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও অনুবাদ করেন— ভারতপয়ার—অনিরুদ্ধ, বৈদ্য পঞ্চানন— কর্ণ পর্ব, দ্বিজ বলরাম-বনপর্ব, কবি সারণ (সারল সারলা দাস) আদি পর্ব, সভা পর্ব, বিরাট পর্ব, দ্বিজ কবিচন্দ্র— মহাভারত রুদ্রদেব— আদিপর্ব, রাজেন্দ্র দাস—, আদি পর্ব বামনন্দন— শল্যা পর্ব, দ্বিজ বৈদ্যনাথ— শান্তিপর্ব, গঙ্গাধর সেন- আদিপর্ব অশ্বমেধ পর্ব, ষষ্টীমেধ সেন— স্বর্গারোহন পর্ব, গোপীনাথ দত্ত— দ্রোণ পর্ব, রামেশ্বর নন্দী— মহাভারত আজ পর্যন্ত বাঙালির ঘরে ঘরে যে মহাভারতের অনুবাদ সবচেয়ে বেশি আদৃত ও প্রচলিত তার অনুবাদক কাশীরাম দাস। কবি মধুসুদন যাকে বন্দনা করেছেন— ‘হে কাশী কবীশ দলে তুমি পূণ্যবান।’ কাশীরাম দাস সম্পূর্ণ মহাভারত অনুবাদ করেননি। তাঁর মহাভারতে যুক্ত হয়েছে নন্দরাম দাসের কিছু অনুবাদ। নন্দরামের অনুবাদের তালিকায় পাওয়া যায় ভীষ্মপর্ব, দ্রোণপর্ব ও কর্ণপর্ব। কাশীরাম দাসের মহাভারত চলিত কথায় কাশীদাসী মহাভারত নামে প্রচলিত। এটি মূলানুগ অনুবাদ নয়। আদতে ব্যাসদেবের কাহিনির যথাযথ অনুবাদ হয়নি। অনেক অংশ বর্জিত হয়েছে আবার অনেক অংশ সংযোজিত হয়েছে। চরিত্র চিত্রনের দিক থেকেও কাশীদাসী মহাভারত একান্তভাবেই বাঙলি মানষিকতার পরিচয় বহন করে।

মহাভারতের অনুবাদে যুক্ত হয়েছেন গদাধর দাস, দ্বিজ হরিদাস, ঘনশ্যাম দাস। এরা প্রত্যেকেই অশ্বমেধ পর্বটি অনুবাদ করেন। নিত্যানন্দ ঘোষ অনুবাদ করেন— আদিপর্ব, সভাপর্ব, ভীষ্মপর্ব, দ্রোণপর্ব, শল্যপর্ব, স্ত্রীপর্ব ও শান্তিপর্ব। রামনারায়ণ দত্ত— দ্রোণপর্ব, কৃষ্ণানন্দ বসু— শান্তিপর্ব ও স্বর্গারোহণ পর্ব ও শান্তিপর্ব, বিজয় প-িত— মহাভারত, অনন্ত মিশ্র— জৈমিনীভারত, দ্বিজনন্দরাম, গঙ্গাদাস সেন— আদিপর্ব ও অশ্বমেধপর্ব, রামকৃষ্ণ প-িত, ত্রিলোচন চক্রবর্তী, নিমাই প-িত ও বল্লভদেবের মহাভারতের আংশিক অনুবাদ পাওয়া যায়। মধুসূদন নাপিত— নলোপাখ্যান, ভৃগুরাম দাস— মহাভারত, চরতপ-িত— অশ্বমেধপর্ব অনুবাদ করেন। মুকুন্দানন্দ, রামনারায়ণ ঘোষ, শ্রীনাথ ব্রাহ্মণ বা দ্বিজ কবিরাজ অনুবাদ করেন দ্রোণপর্ব। কবিশেখর— কিরাতপর্ব, ও লোকনাথ দত্ত নৈষধ অনুবাদ করেন। দ্বিজ কংসারি অনুবাদ করেন— পরীক্ষিত সংবাদ, রাজারাম দত্ত দ-পীর, গোবিন্দ কবিশেখর— কিরাতপর্ব, কৌশারি, দ্বিজবলরাম, বৈদ্যনাথ, পরমানন্দ, মহীনাথ প্রমুখেরা অশ্বমেধ পর্বের অনুবাদ করেছেন। রামবল্লভ দাস করেন বনপর্ব; লক্ষ্মীরাম— কর্ণ পর্ব, কোচবিহার রাজ হরেন্দ্রনারায়ণ— ঐষিদ পর্ব, দ্বিজকীর্তিচন্দ্র— আশ্রমিক পর্ব, মাধবচন্দ্র— প্রস্থানিক পর্ব, দুর্লভসিংহ— ভারত পাঁচালি অনুবাদ করেন। গোপীনাথ পাঠকের অনুবাদ পাওয়া যায় সভাপর্ব, সুবুদ্ধিরাম— অশ্বমেধপর্ব, দ্বিজ রামলোচন— স্ত্রীপর্ব, দ্বৈপায়ন দাস— ভারত পাঁচালি, পুরুষোত্তম দাস— পা-ব পাঁচালি, পোপীনাথ দত্ত (নন্দী)— সভাপর্ব, গোপীনাথ পাঠক— সভাপর্ব, তাম্বষ্ঠবল্লভ— মহাভারত পুঁথি; দ্বিজরামলোচন— স্ত্রী পর্ব, দ্বিজ গোবর্ধন— গদা পর্ব, শ্রীকৃষ্ণপ্রসাদ ঘোষ— ভীষ্মপর্ব, জ্যোতিষ ব্রাহ্মণ বাসুদেব— স্বর্গারোহণ পর্ব অনুবাদ করেন। অকিঞ্চন দাস অনুবাদ করেন সৌপ্তিকপর্ব, নিমাই (দৈবকী নন্দন ভনিতায়)— কর্ণপর্ব, রাজীব সেন— উদ্যোগ পর্ব, দ্বিজ ঘনশ্যাম, দ্বিজ কৃষ্ণরাম ও দ্বিজ প্রেমানন্দ— অশ্বমেধ পর্ব, লোকনাথ দত্ত ও রামনারায়ণ ঘোষ— বনপর্ব, পাকুড়রাজ পৃথ্বীচন্দ্র ত্রিবেদী গৌরিমঙ্গলের অবন্তীখ-ের মহাভারত— কাহিনিবিশেষ অনুবাদ করেন, শঙ্কর রবিচন্দ্রের মহাভারত কাহিনির অনেকগুলি অনুবাদের পুঁথি পাওয়া যায়— অর্জুনের দর্পচূর্ণ, অর্জুনের বাঁধ-বাঁধা তালা, কন্বমুনির পারণ, কুম্ভির শিবপূজা, দাতাকর্ণ, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর, পরীক্ষিতের ব্রহ্মশাপ, প্রহ্লাদচরিত্র, ভারত উপাখ্যান, মহাভারত বনপর্ব, উদ্যোগপর (খ-িত), অজামিলের উপাখ্যান ইত্যাদি।

১৯ শতক

১৯ শতকের সূচনাতেই বাংলা আধুনিক সাহিত্যের শুরু, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, হিন্দু কলেজ, স্কুলবুক সোসাইটি ইত্যাদি প্রতাষ্ঠান, ইংরেজ কমিশনারদের নানান ইংরেজিগণ, রাজা রামমোহন, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, রাধাকান্ত দেব বাহাদুর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ মনীষীর আবির্ভাবে বাঙালি চেতনায় নবযুগের লক্ষণ প্রকট। সে সময়েও প্রাচীন মহাভারত বাঙালি মানসকে পুষ্টির রসদ যুগিয়ে গেছে।

কালীপ্রসন্ন সিংহ সরল গদ্যে অনুবাদ করেন ব্যাসদেবের সংস্কৃত মহাভারত। উনিশ শতকের মহাভারত বিষয়ক অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি এটি। এর অনুবাদকাল ১৮৬০-৬৬। অবশ্য এই অনুবাদ শুরুর আগেই বিদ্যাসাগর মহাশয় এর অনুবাদে হাত দেন। তবে মহাভারতের উপক্রমণিকা অংশটুকু অনুবাদ করেই তিনি ক্ষান্ত হন। এর কারণ কালীপ্রসন্ন তাঁর অষ্টাদশ পর্বের উপসংহারে জানিয়েছেন ‘আমার অদ্বিতীয় সহায় পরম শ্রদ্ধাস্পদ শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং মহাভারতের অনুবাদে উদ্যত হইয়াছেন শুনিয়া, তিনি কৃপাপরবশ হইয়া সরল হৃদয়ে মহাভারত অনুবাদে ক্ষান্ত হইয়াছেন। বাস্তবিক বিদ্যাসাগর মহাশয় অনুবাদে ক্ষান্ত না  হইলে আমার অনুবাদ হইয়া উঠিত না।’ এই উক্তিতে উভয়েরই মহৎ হৃদয়ের প্রকাশ পায়। যা হোক বাঙালির মূল সংস্কৃত মহাভারত কাহিনি আদ্যন্ত পাঠের প্রথম সুযোগ পেলো- কালীকপ্রসন্নের অনুবাদে। এর কিছু আগে বর্ধমান রাজসভা থেকে মহাভারত অনুবাদের কাজ শুরু হয় এবং কিছু প্রকাশিত হয়।

এ শতকে বিভিন্ন ব্যক্তির অনুবাদের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। যেমন— রোহিনী নন্দন সরকার— জৈমিনি ভারত, অশ্বমেধপর্ব, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য— ভাগবৎ গীতা (১৮২০), গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য ভগবৎ গীতা (১৮৫২), জয়গোপাল তর্কালঙ্কার সংস্কার করেন কাশীরাম দাসের মহাভারত (১৮৩৬) এটি এখন সুপ্রচলিত। রাজকৃষ্ণ রায় সম্পূর্ণ মহাভারতের অনুবাদ করেন ১৮৫৫ তে। আনন্দ চন্দ্র বেদান্তবাগীশ অনুবাদ করেন শকুন্তলা উপাখ্যান (১৮৫৯ হেমচন্দ্র বিদ্যারতœ— কিরাতার্জুনীয় (১৮৭৬)। লং সাহেবের তালিকায় বেশ কিছু অনুবাদ পুঁথির উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও অভিরামমুখোটি, প্রতাপচন্দ্ররায় প্রমুখেরা মহাভারতের আংশিক অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। ২০ শতকে একটি শ্রেষ্ঠ মহাভারতীয় কর্ম প-িতপ্রবর হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের মহাভারতের অনুবাদ ও টীকা রচনা। ১৫৯ খ-ে বাংলা অক্ষরে মূলসহ গদ্যে অনুবাদ এটি। একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীলকণ্ঠের টীকার অনুবাদ ও নিজস্ব টীকা। এর ফলে সাধারণ বাঙালি পাঠকের পক্ষে মহাভারত আলোচনার পথ সুগম হয়।

রাজশেখর বসুর মূল মহাভারতের গদ্যের সারানুবাদ (১৯৪৯) সাধারণ বাঙালি পাঠকের কাছে বিশেষ আদৃত। এতে মাঝে মাঝেই মূল সংস্কৃত শ্লোক উদ্ধৃত হয়েছে। এর অনুবাদ অত্যন্ত প্রাঞ্জল। বৃহদায়তন সংস্কৃত মহাভারত সাধারণ পাঠকের পক্ষে গুরুভার ছিলো। এই সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ থেকে বাঙালি পাঠক সহজেই মূলের স্বাদ গ্রহণ করতে পারে। ড. ধ্যানেশ নারায়ণ চক্রবর্তী সম্পাদিত ও সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ অনূদিত মহাভারতের প্রথম সংস্কারটি ১৯৮৯ এ প্রকাশিত হয় তপোধন প্রকাশনী থেকে।

এ শতকে নতুন করে অনুবাদ কর্মে লিপ্ত হতে বড়ো একটা দেখা যায় না। তার পূর্বে প্রকাশিত কালীপ্রসন্ন সিংহ ও কাশীরাম দাসের গ্রন্থের সম্পাদনা ও নতুন সংস্করণ প্রকাশে বিশেষ উদ্যেগ লক্ষ করা যায়।

কালীপ্রসন্নের মহাভারত (১ম ২য় ৩য় খ-) নতুন সংস্করণ বের করে মডার্ন বুক এজেন্সি ১৯৯০-৯১ ও ৯৩ এ। এর সম্পাদনা করেছেন ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। উক্ত গ্রন্থের চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশ করেছেন পি এম বাগচী। ১৯৯৪ এ। ১৯৮৭ তে পাওয়া যায় এরই দুটি সংস্করণ তুলিকলম ও বসুমতি প্রকাশনী সংস্থা থেকে। ১৯৯০ এ এম সি সরকার প্রকাশনা সংস্থা থেকে। নতুন সংস্করণ বেরিয়েছে রাজশেখর বসুর মহাভারতের সারানুবাদ। বর্ধমান রাজসভা থেকে প্রকাশিত মহাভারতের দশখ- প্রকাশ করেছে ভারবি, ১৯৭৬-৮৪ এর মধ্যে। বিশ্ববাণী প্রকাশ করে হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের মহাভারতের ১ থেকে ৪৩ খ- ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৪ র মধ্যে গোপাল হালদারের সম্পাদনায় কালীপ্রসন্নের মহাভারতের অনুবাদ প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গ নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি পাঁচখ-ে ১৯৭৩-১৯৭৬ এ।

কমলেশ চক্রবর্তীর সম্পাদনায় কাশীরাম দাসের মহাভারতের অযোধ্যাকা- প্রকাশিত হয়। প-িত জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের মহাভারতের অনুবাদের সবচেয়ে ভালো গ্রন্থ (প-িত সুকুমার সেনের মতে) বটতলা সংস্করণ ও দে ব্রাদার্সের সংস্করণ। নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য়ের সম্পাদনায় সচিত্র মহাভারত প্রকাশিত হয় ১৯২৮ এ। এর ৩৩তম সংস্কার প্রকাশিত করে বসুমতি সহিত্য মন্দির ১৯৮৬ তে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় কাশীদাস মহাভারতের আদিপর্ব প্রকাশ করে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ১৯২৮ এ। ছুটি খানের মহাভারতের অশ্বমেধপর্বের সম্পাদনা করেন দীনেশচন্দ্র সেন ১৯০৫ এ। উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির ও দে’জ বুক থেকে এর দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় কাশীদাসী মহাভারত দুখ-ে প্রকাশিত হয়। তুলিকলম থেকে প্রকাশিত হয় তীর্থপতি দত্তের সম্পাদনায় কাশীদাসী মহাভারত। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র ও নিরোদবরণ হাজরার সম্পাদনায় ম-ল এন্ড সন্স থেকে সংস্করণ বের হয় ১৯৮৬ তে। তারাচাঁদ দাস এন্ড সন্স থেকে ১৯৭১ এ প্রকাশিত হয় কাশীদাসী মহাভারত, যেটা সম্পাদনা করেন মতিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও ধীরানন্দ ঠাকুর। ১৯৯২ এ দেবসাহিত্য কুটীর থেকে সুবোধচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত কাশীদাসী মহাভারতের ৩৩তম সংস্করণটি প্রকাশিত হয়।

প্রবন্ধ/আলোচনা

মহাভারতের অনুবাদ শুরু হয়েছে ষোড়শ শতাব্দী থেকেই। সে ধারা বিশ শতকে এসে প্রায় থেমে গেছে। তবে সে জায়গায় আমরা পেয়েছি মহাভারত সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রবন্ধ ও আলোচনা। এটাই স্বাভাবিক। সুপ্রাচীন এই সাহিত্যসৃষ্টিকে আধুনিক যুগ তার নতুন দৃষ্টিতে বিচার বিশ্লেষণ করছে, নতুন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। যে অমূল্যরতন পারিপার্শ্বিকতার কারণে (নানা বিক্ষিপ্ত কাহিনিমালার সংযোজনে) কিছুটা নিষ্প্রভ হয়েছিলো আধুনিক মনীষা তা উদ্ধার করে মননে ও যুক্তিবাদে শোধন করে নতুন যুগের সামনে এক উজ্জ্বল ঐতিহ্য তুলে ধরেছে। উনিশ শতকে বাঙালি মানসে যে বিপ্লব ঘটে গেছে, যাকে অনেকে নবজাগরণ বলছেন তারই প্রকাশ এই জাতির রচনায় আমরা পেয়েছি। নবজাগরণের একটা লক্ষণই হলো— নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতনতা, নিজের অতীতকে পুঙ্খানুপুঙ্খ জেনে নতুন করে রচনা করে।

১৯ শতক

বাংলা সাহিত্যে এ ঘটনার সূচনা উনিশ শতকে। রাজা রামমোহন রায়ের কয়েকটি নিবন্ধে— গোস্বামীর সহিত বিচার, কবিতাকারের সহিত বিচার, ভট্টাচর্যের সহিত বিচার, উৎসবানন্দ বিদ্যাবাগীশের সহিত বিচার (সংস্কৃতে) মাঝে মাঝেই বেদব্যাস গীতা ভগবতের প্রাসঙ্গিক উল্লেখ রয়েছে। প্রাচ্য সাহিত্য অনুরাগী জেমস লঙ্-এর গ্রন্থতালিকায় এ ধরনের কয়েকটি পুঁথি ও গ্রন্থের সংবাদ পাওয়া গেছে। যেমন— জনৈক কে ব্যানার্জি ‘ভারতবর্ষীয় ইতিহাস গ্রন্থ’ এ মহাভারতের আলোচনা করেন। অন্যান্য বিষয়ের আলোচনাও সেখানে আছে। এই নিবন্ধে তিনি মার্সম্যানের মত খ-ন করেছেন। অপরগ্রন্থ ‘বিবিধপাঠে’ পা-ববৃন্দ গান্ধারীর বিলাপ, সাগর, পা-বপতন বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। তাঁর ‘জীবন বৃত্তান্ত’ গ্রন্থে রয়েছে যুধিষ্ঠির সম্পর্কিত আলোচনা। গ্রন্থগুলি ১৮৪৬-৪৮ এর মধ্যে রচিত বলে অনুমান করা হয়েছে। রজ এ- কোং এর প্রকাশক। প্রায় সমকালে জনৈক ইংরেজ এর গদ্য রচনাবলীতে নলবৃত্তান্ত পাওয়া যায়। নীলমনি বসাকের ‘নবনারী’  প্রকাশিত ১৮৫২ সালে। এতে তিনি আলোচনা করেছেন দ্রৌপদী-শকুন্তলা, সাবিত্রী-দময়ন্তীর চরিত্র। এ বছরেই পাওয়া যায় মহেন্দ্র রায় রচিত ‘কুসুমাবলী’। এতে ব্যাসমুনি ও অন্যান্যের কথা আলোচিত হয়েছে। বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ (১৮৪৮) গ্রন্থে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে মহাভারত কাহিনির আলোচনা পাওয়া যায়। প-িত নবীন মারাবলী রচনা করেন ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৮৪৬)। এতে মহাভারত কাহিনি নিয়ে আলোচনা অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্যের ‘নীতিরতেœ’ মহাভারতের আলোচনা পাওয়া যায়।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এ পর্যায়ের কিছু গ্রন্থের সন্ধান মেলে। যেমন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ‘সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাবে’ পাওয়া যায়। শিশুপাল বধনৈষধ চরিত্র— কিরাতার্জুনীয়মের আলোচনা। ‘শ্রীকৃষ্ণ বাসুদেব’ সম্পর্কিত একটি আলোচনা প্ওায়া যায় প-িত গোপীনাথ কবিরাজের। প্যারীচাঁদ মিত্র রচনা করেন— যুধিষ্টিরের চরিত্র (১৮৪৭), কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘বিদ্যাকল্পদ্রুম’ পাঁচখ-ে মহাভারতের কিছু বিষয় আলোচিত হয়েছে। এছাড়্ওা আমরা পেয়েছি কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য রচিত বিচিত্রবীর্য (১৮৬২); চন্দ্রনাথ বসু— শকুন্তলাতত্ত্ব (১৮৮১), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়— কৃষ্ণচরিত্র (১৮৮৬), শ্রীমদ্ভগবতগীতা (১৯০২), বিবিধ প্রবন্ধে কয়েকটি আলোচনা, ‘দৈবতত্ত্ব ্ও হিন্দুধর্মে’ মহাভারত প্রসঙ্গ আলোচনা— দ্রৌপদী, শকুন্তলা, শকুন্তলা-মিরন্দা-দেসদিমনা চরিত্র বিশ্লেষণ ও মহাভারত প্রসঙ্গে ‘প্রাচীন ভারতীয় রাজনীতি ও চিত্তশুদ্ধি’ সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন।

রজনীকান্ত গুপ্ত রচনা করেন ভীষ্মচরিত (১৮৯১); রামগতি ন্যায়রতœ— দয়মন্ত হরিমোহন মুখোপাধ্যায়— কাশীরাম দাস; ঈশান বন্দ্যোপাধ্যায়— কুরুক্ষেত্র বিষয়ে বিশ্লেষণ করেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর প্রবন্ধ— উর্বশী বিদায়-দুর্বাসার কথা— শকুন্তলার মা-দুষ্মন্তের ভাঁড়, শকুন্তলার হিঁদুয়ানী, শ্রীকৃষ্ণ প্রভৃতি। এতে নানা বিষয়ে  তত্ত্বমূলক আলোচনা করেছেন। উমেশচন্দ্র বটবাল্যের ‘হুসেনশাহী মহাভারতের’ (১৮৯৫) বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। শ্রীরামকথিত শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত কথোপকথন প্রসঙ্গে মহাভারতীয় কাহিনীর নানান আখ্যান-উপাখ্যান ঘটনায় সরস তত্ত্ব আলোচনা করেছেন স্বয়ং রামকৃষ্ণদেব। রমেশচন্দ্র দত্তের আলোচনায় পাওয়া যায়— দ্রৌপদী চরিত্র, হিন্দু আর্যদিগের প্রাচীন ইতিহাসে মহাভারতীয় যুগ এবং মহাভারত সম্পর্কিত বীরেশ্বর পাঁড়ের ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর মহাভারত’ প্রবন্ধে নবীনচন্দ্র সেনের ত্রয়ীকাব্যের সমালোচনা করেন।

২০ শতক

বিশশতকের সূচনাতেই আমরা পাই সখারাম গনেশ দেউস্করের কয়েকটি বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ— ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত যুধিষ্টিরের আবির্ভাব কাল (১৯০৬), প্রতিভা পত্রিকায় প্রকাশিত জয়দ্রথ বধ (১৯০৫), উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির প্রকাশিত বেনীমাধব শীলের প্রভাস খ-, দেবেন্দ্রনাথ বসুর ‘শকুন্তলায় নাট্যকলা’ ও ‘শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ক আলোচনা’, তারাচাঁদ দাস প্রকাশিত ঈশ্বরচন্দ্র সরকারের প্রভাস খ-, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যয়ের পঞ্চকন্যার অংশবিশেষে দৌপদী ও কুন্তীবিষয়ক আলোচনা।

বিশশতকের শেষ পর্যন্ত প্রবন্ধ ও আলোচনার এই ধারা অব্যাহত। যেমন বুদ্ধদেব বসুর ‘মহাভারতের কথা’র চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯০-এ। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মহাভারতের উপর এ এক নতুন আলোকপাত। এছাড়াও রয়েছে প্রতিভা বসুর ‘মহাভারতের মহারণ্যে’, পাঁচুগোপাল ভট্টাচার্য— মহাভারতের কৃষ্ণ (১৯৭০); সুকুমার সেন— ভারকথার গ্রন্থিমোচন (১৯৮২); স্বামী জুনেশ্বররানন্দ— ভারত কথামৃত (১৯৯১); বীরেন্দ্র মিত্র— মহাভারতের স্বর্গদেবতা (১৯৮৮); হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গ মহাভারত (১৯৮৯)। উল্লিখিত বর্ষগুলি শেষসংস্করণের। এছাড়াও রয়েছে নরেশ্বর জানা— শকুন্তলা ও সীতার বনবাস, ড. সত্যজীবন দাস— চন্দ্রভাগা দ্রৌপদী, গৌরবচন্দ্র সাহা— শ্রীকৃষ্ণ (১-৪ খ-), রবীন্দ্রনাথ দাস— শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গত শ্রীমনমহামানব্রত ব্রহ্মচারী— শ্রীকৃষ্ণের শেষ উপদেশ বিষয়ক তত্ত্বমূলক বিশ্লেষণ।

আশা দাস আলোচনা করেন— রামায়ণ-মহাভারত ও জাতক, চিত্তরঞ্জন ঘোষাল— ভারতসংবাদ; বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী— মহাভারত গাইড, অতুল সুর— মহাভারত ও সিন্ধু সভ্যতা; রাজেশ্বর মিত্র— মহাভারত চিন্তা, দুর্গাপদ চট্টোপাধ্যায়— মহাভারতের কুমারীমাতা, ধীরেন্দ্রলাল ধর— মহাভারতের উপাখ্যান বিষয়ক আলোচনা; কালিপদ সরকার— কৃষ্ণকথা চিরন্তনী, দিলীপ কুমার রায়— কৃষ্ণকথা কাহিনী; ধ্রুবকুমার মুখোপাধ্যায়— নরনারায়ণ, বীরেন্দ্র সিংহ— যদুবংশ, বিষ্ণুপদ দত্ত— শিশুপালবধ কাব্য সমীক্ষা, স্বপন বসু— সতী বিষয়ক নিবন্ধ, অমলেশ ভট্টাচার্য— মহাভারতের কথা (দ্বিতীয় খ-); প্রভাতরঞ্জন সরকার— মহাভারতের কথা, জনার্দন চক্রবর্তী— মহাভারতের বিদুর সম্পর্কিত মননশীল বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা।

সুকুমারী ভট্টাচার্য রচিত— ‘রামায়ণ ও মহাভারত, আনুপাতিক জনপ্রিয়তা’ একটি বিশেষ তুলনাত্মক বিশ্লেষণ। কল্যাণ কুমার গঙ্গোপাধ্যায় আলোচনা করেন— ‘ভারত সংস্কৃতিতে ভগবান কৃষ্ণ’, ধীরেন্দ্র মিত্র— কুরুক্ষেত্রে দেব শিবির, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী— অর্জুন-দ্রৌপদী-কৃষ্ণ-কুন্তী ও কৌন্তেয়, মহাভারতের ভারত যুদ্ধ ও কৃষ্ণ, ভুপেন চৌধুরী—কুরুক্ষেত্রে গান্ধারী; বারিদবরণ ঘোষ— কুরুক্ষেত্রের শেষ দশ মহাবীর, মহাভারতের অন্দরমহল; হীরেন্দ্রনাথ দত্ত— উনিশশতকের মহাভারত; ধীরেন্দ্র দত্ত— ‘সংস্কৃত মহাভারতের পরিপ্রেক্ষিতে কবি কাশীরাম দাসের কাব্য বিচার’, নিরঞ্জন সাহা— ‘রামায়ণ মহাভারতের দেব গন্ধর্বেরা কি ভিন্ন গ্রহবাসী’, শঙ্কু মহারাজ— দ্বারকা ও প্রভাস বিষয়ক আলোচনা, শিপ্রা ‘চরিত্রে রামায়ণ মহাভারত’ বিষয়ক আলোচনা

স্বামী বেদানন্দ প্রশ্নোত্তরে আলোচনা করেন— ‘গুরুমুখী মহাভারত’, স্বামী তথাগতানন্দ ‘মহাভারত কথা, দিলীপ কুমার ভারতী— সহিংস যুধিষ্ঠির, মনোনীত সেন— রামায়ণ ও মহাভারত: নব সমীক্ষা, ড. বলরাম চক্রবর্তী— মহাভারত ও পুরাণ থেকে উত্তর পূর্বাঞ্চলের আধিবাসীদের সনাক্তকারী গ্রন্থ, শুভঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের— কৃষ্ণচরিত, সুখরঞ্জন রায়— মহাকাব্যের চলচিত্র ও চলচিত্রে মহাকাব্য প্রভৃতি আলোচনা। অর্ধেন্দু শেখর ভট্টাচার্য রচনা করেন ‘গীতায় শ্রীকৃষ্ণ’, ‘কুরুক্ষেত্রের অধর্ম-যুদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ’, দ্রৌপদীর সেকাল ও একাল এবং মহাভারতের নারী, অশ্রুকুমার সিকদারের আলোচনা— নবীন যাদুর বংশ, ধীরেন্দ্রকুমার রায়— মহাভারতের চরিত্র, সুখময় ভট্টাচার্য— মহাভারতের চরিত্রাবলী, শিশির কুমার সেন— মহাভারতের মূলকাহিনী ও বিবিধ প্রসঙ্গ, নরেশ গুহ— ‘একালের জন্য মহাভারতের পাঠের ভূমিকা’। কিছুদিন আগে দুহাজার সালে হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নুতন দৃষ্টিতে মহাভারতের পর্যালোচনা করেন তাঁর ‘কৃষ্ণকাহিনী মহাভারত’ গ্রন্থে। গ্রন্থটি ১৬টি অংশে বিভক্ত। সম্ভবত এটি এ পর্যায়ের শেষ বৃহৎগ্রন্থ।

নাটক/ কাব্যনাট্য/ গীতিনাট্য

১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের সূচনায় বাংলা নাটকের উদ্ভব। মহাভারত কাহিনী অবলম্বন করেই নাটকের যাত্রা শুরু। কিছুদিনের মধ্যেই এ বিষয়টি বাঙালি দর্শককে এমনভাবে আকৃষ্ট করে যে সৃষ্টিশীল সাহিত্য রচয়িতারা মহাভারতের অনুবাদ এবং তার বিচার-বিশ্লেষণাত্মক রচনাই ছিল সাহিত্যকারদের উপজীব্য। এ পর্যায়ে এসে শুরু হল সৃষ্টিশীল সাহিত্যের। বাঙালী মানুষ নতুন রসে অভিষিক্ত হল। দর্শকদের চাহিদা মেটাতে গড়ে উঠল একের পর এক সাধারণ রঙ্গমঞ্চ। দর্শক মনোরঞ্জনের পথ ধরেই সেদিন পরোক্ষে বাঙালী মানসের আকাক্সক্ষাপূরণ ও তার পরিপুষ্টির কাজটি করে গেছেন নাট্যকারেরা। তাঁদের সৃষ্টির পরিমাণ, শুধুমাত্র মহাভারত অবলম্বনেই, আমাদের বিস্মিত করে।

১৯ শতক

প্রথম বাংলা নাটক ‘ভদ্রার্জুন’— রচয়িতা তারাচরণ সিকদার, রচনাকাল ১৮৫২। নাটক বিচারে এটা কতটা উত্তীর্ণ সে বিষয়ে নয়, প্রথম বাংলা নাটক হিসেবেই এর ঐতিহাসিক মর্যদা। এ বছরই লঙ সাহেবের তালিকা অনুসারে জনৈক মিল্যমান রচনা করেন— নলদময়ন্তী পালা। রচনাটি ফার্সী, রুশি, জার্মান, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। নন্দকুমাররায়ের শকুন্তলা নাটকের প্রথম অভিনয় ১৮৫৫ সালে। মহাভারত কাহিনী অবলম্বনে রামনারায়ণ তর্করতেœর একাধিক নাটক পাওয়া যায়— বেণীসংহার (১৮৫৬), অভিজ্ঞান শকুন্তলা (১৮৬৭), রু´িনী হরণ (১৮৭১), কংসবধ (১৮৭৫), হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান নিয়ে ধর্মবিজয় নাটক (১৮৭৫)। কালিপ্রসন্ন সিংহ রচনা করেন বিক্রমোবর্শী (১৮৫৭), সাবিত্রী সত্যবান (১৮৫৮)। বাংলা নাটকের ইতিহাসে নতুন যুগের পত্তন করেন কবি মধুসূদন দত্ত তাঁর শর্মিষ্ঠা নাটকে (১৮৫৮)। একই বছরে পাওয়া যায় হরচন্দ্র ঘোষ— কৌরববিয়োগ (১৮৫৮), সৌরিন্দ্রমোহন ঠাকুর— মালবিকাগ্নিমিত্র (১৮৫৮), উমাচরণ দে— নলদময়ন্তী নাটক এবং অভয়ানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নলদময়ন্তী (১৮৫৯)

ষাটের দশকের শুরুতেই পাওয়া যায় যাদবচন্দ্র বিদ্যারতœ— কীচকবধ নাটক (১৮৬১), মনিমোহন সরকার— উষা অনিরুদ্ধ (১৮৬২), ধ্রুব চরিত্র (১৮৭৩), দুর্গাদাস কর—স্বর্ণশৃঙ্খল নাটক (দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ বিষয়ক, ১৮৬৩), হরিশ্চন্দ্র মিত্র— জয়দ্রথ বধ (১৮৬৪), কীচকবধ (১৮৬৬), প্রহ্লাদ নাটক (১৮৭২), কালীদাস সান্যাল— নলদময়ন্তী (১৮৬৪), অন্নদাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়— শকুন্তলা গীতাভিনয় (১৮৬৫), উষাহরণ (১৮৭৪), হরিমোহন কর্মকার— শ্রীবৎসচিন্তা (১৮৬৬), বিদ্বজতনয়া— উর্বশী নাটক (১৮৬৬), পুর্ণচন্দ্র শর্মা— শ্রীবৎস রাজার উপাখ্যান নাটক (১৮৬৬), গনেন্দ্রনাথ ঠাকুর— বিক্রমোর্বশী (১৮৬৮)।

সত্তরের দশকের শুরুতেই পাওয়া যায় কোদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্রৌপদী বিলাপ নাটক (১৮৭০), সাবিত্রী সত্যবান (১৮৭৭), দুর্যোধনের দর্পচূর্ণ (১৮৭৭), জরাসন্ধ বধ (১৮৭৮), অভিমন্যুবধ যাত্রা (১৮৭৮) এবং দুর্যোধন উরুভঙ্গ (১৮৭৮)

কামিনী সুন্দরী দেবী রচনা করেন— ঊষা নাটক (১৮৭১), নফরচন্দ্র দত্ত— অভিমন্যু বধ যাত্রা (১৮৭১), হরিশ্চন্দ্র যাত্রা (১৮৭১), দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ (১৮৭৯), হরচন্দ্র দেব— যদুবংশ ধ্বংস (১৮৭১), হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়— পাঞ্চালীবরণ (১৮৭২), নিমাইচাঁদ শীল— ধ্রুবচরিত্র (১৮৭২), রাজকৃষ্ণ দত্ত— দ্রৌপদীহরণ নাটক (১৮৭২), তিনকড়ি ঘোষাল— সাবিত্রী সত্যবান গীতাভিনয় (১৮৭২), হরিমোহন রায় (কর্মকার)— শ্রীবৎসচিন্তা (১৮৭২), রামনারায়ণ তর্করতœ— রু´িনীহরণ (১৮৭২), কংসবধ (১৮৭৫), মনমোহন বসু— সতী নাটক (১৮৭৩), হরিশ্চন্দ্র নাটক (১৮৭৫), পার্থপরাজয় নাটক ও যদুবংশ ধ্বংস (১৮৭৫), পার্বতীচরণ তর্করতœ— হরিশ্চন্দ্র নাটক (১৮৭৩), বেণীমাধব ঘোষ— ঋষিচরিত্র (১৮৭৩), হরলাল রায়— মাত্রাসংহার নাটক, বৃহন্নলা নাটক (১৮৭৪)।

দ্বারকানাথ রায়— সৈরিন্ধ্রী নাটক (১৮৭৫), রাজকৃষ্ণ রায়— পতিব্রতা (সাবিত্রী সত্যবানের কাহিনী অবলম্বনে, ১৮৭৫), প্রহ্লাদ চরিত্র (১৮৮৪), দুর্বাসার পারণ (১৮৮৫), পারণ (১৮৮৫), যদুবংশ ধ্বংস (১৮৮৫), প্রেমদ্বরা (১৮৭৯), ভোলা মুখোপাধ্যায়— নলদময়ন্তী (১৮৭৫), ধ্রুবযোগাপাখ্যান (১৮৭৫), পা-বের অজ্ঞাতবাস (১৮৭৭), হরিনাথ মজুমদার— সাবিত্রী নাটিকা (১৮৭৫), যদুগোপাল বসু— সুভদ্রাহরণ (১৮৭৬), রাধামাধব হালদার শৈব্যাসুন্দরী (১৮৭৬),  নাগযজ্ঞ (১৮৮৬), তিনকড়ি বিশ্বাস— দক্ষযজ্ঞ (১৮৭৮), অর্জুনের লক্ষ্যভেদ (১৮৭৮), অভিমন্যু বধ (১৮৮০), বভ্রুবাহনের যুদ্ধ (১৮৮০), দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ (১৮৮১), বজ্রমোহন রায়— অভিমন্যুবধ (১৮৭৮), হিড়িম্বাবধ (১৮৭৮), জয়দ্রথবধ (১৮৮০), নলদময়ন্তী (১৮৮০), অক্ষয়কুমার দেব— অভিমন্যুবধ যাত্রা (১৮৭৮), কানাইলাল সেন— অভিমন্যুবধ (১৮৭৯), রাসবিহারী শীল— উত্তরবিলাপ (১৮৭৯), গিরীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়— অর্জুনবধ (১৮৭৯), নন্দলাল রায়— অর্জুনবধ (১৮৭৯), ধ্রুবচরিত্র (দ্বিতীয় সং ১৮৮৬), প্রমথনাথ মিত্র— বীরকলঙ্কনাটক (অসমাপ্ত), অভিমন্যু পালা (১৮৭৯), এবং শুভসংহার (১৮৮০), মহেশচন্দ্র দাস দে— প্রন্নদচরিত্র (১৮৮০), দক্ষযক্ষ নাটক (১৮৮২), কৃষ্ণধন চট্টোপাধ্যায়— দ্রৌপদী বস্ত্রহরণ (১৮৮০), হরিশ্চন্দ্র নাটক (১৮৮২), বিনোদবিহারী মল্লিক— যুধিষ্ঠির রাজ্যাভিষেক (১৮৮০), রাধানাথ মিত্র— ঊষাহরণ (১৮৮০), শ্রীবৎসচিন্তা (১৮৮৫)।

১৮৮১— তে গিরীশচন্দ্র ঘোষ করেন পা-বগৌরব ও অভিমন্যুবধ নাটক, পা-বদের অজ্ঞাতবাস (১৮৮২), দক্ষযজ্ঞ, ধ্রুবচরিত্র ও নলদময়ন্তী (১৮৮৩), বৃষকেতু দৃশ্যকাব্য, শ্রীবৎসচিন্তা ও প্রন্নদচরিত্র নাটক (১৮৮৫), জনা (১৮৯৩), বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায় রচনা করেন কয়েকটি নাটক— অহল্যাহরণ (১৮৮১), দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর, দুর্যোধন বধ (১৮৮৪), ভীষ্মমহিমা (১৮৮৫), সুভদ্রাহরণ (১৮৮৬), রু´িনী রঙ্গ ও পা-ব নির্বাসন (১৮৮৭), নবীক্ষিতের ব্রাহ্মশাপ (১৮৮৯), বাণযুদ্ধ (১৮৯১) এবং ধ্রুব (১৮৯৬), মতিলাল রায় রচনা করেন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ (১৮৮১), যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধযজ্ঞ (১৮৯৪), যুধিষ্ঠিরের রাজ্যাভিষেক (১৯০০), পা-বনির্বাসন (১৯০৫), কর্ণবধ (১৯১২), এবং ভীষ্মের শরশয্যা চতুর্থ সং (১৯২১), শ্যামচরণ দাস— কুরুক্ষেত্রের উপাখ্যান (১৮৮১), ব্রহ্মব্রত সমাধ্যায়ী ভট্টাচার্য— গন্ধর্ববর্নিতবা বা কীচকবধ এবং দ্রৌপদীর চিতারোহণ বা দুর্যোধন বধ (১৮৮১), রাইচরণ ঘোষ— আশামুকুরভঙ্গ নাটক— দুর্যোধনের উরুভঙ্গ ও অশ্বথামার পা-বপুত্র নিধন বিষয়ক (১৮৮২), হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়— পাঞ্চালীবরণ (১৮৮৩), যোগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়— অজ্ঞাতবাস নাটক (১৮৮৩), প্রফুল্ল কুমার মুখোপাধ্যায়— অন্ধবিলাপ (১৮৮৩) এবং পঞ্চম বেদ বা মহাভারত নাট্যকাব্য (১৮৮৯), অতুলকৃষ্ণ মিত্র— আদর্শ সতী সাবিত্রী সত্যবান কাহিনী (১৮৮৪), ভীষ্মের শরশয্যা (১৮৮৫), নন্দবিদায় (১৮৮৬), কুঞ্জবিহারী বসু— শ্রীবৎসচিন্তা (১৮৮৪) এবং শকুন্তলা নাট্যগীতিকা (১৮৮৯), ভুবন কৃষ্ণ মিত্র— ধর্মপরীক্ষা নাটক (১৮৮৪), সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়— জয়দ্রথবধ নাটক (১৮৮৪), অঘোর নাথ ঘোষ— কীচকবধ নাটক দ্বিতীয় সং (১৮৮৪), উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়— সমুদ্রমন্থন (১৮৮৪), কেদারনাথ চৌধুরী ছত্রভঙ্গ— কৌরবের পরাজয় কাহিনী (১৮৮৫) এবং উলুপী (১৯০৬), দ্বিজেন্দ্রলাল রায়— ধ্রুবচরিত্র (১৮৮৭), গুরুবন্ধু ভট্টাচার্য— পঞ্চরাত্র (১৮৮৭), যোগেন্দ্র তর্কচূড়ামনি— মহাপ্রস্থান নাটক (১৮৮৭), তারাপদ ভট্টাচার্য— হরিশ্চন্দ্র নাটক (১৮৮৭)।

নব্বই এর দশকে আমরা পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রাঙ্গদা নাট্যকাব্য (১৮৯২), গান্ধারীর আবেদন নাট্যকাব্য (১৮৯৭), নরকবাস নাট্যকাব্য (১৮৯৭), কর্ণকুন্তী সংবাদ (১৯০০) এবং বিদায় অভিশাপ— কচ ও দেবযানী (১৯১১), অমরেন্দ্র দত্ত রচনা করেন শ্রীকৃষ্ণ (১৮৯৯), জ্যেতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কয়েকটি নাটক— অভিজ্ঞান শকুন্তলা (১৯০০), বেণীসংহার, বিক্রমোবর্শী, মালবিকাগ্নিমিত্র (১৯০২) এবং ধনঞ্জন বিজয় (১৯০৩), অমৃতলাল বসু— হরিশ্চন্দ্র (১৯০০) ও মাজ্ঞসেনী (১৯২৮), ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ রচিত কয়েকটি নাটক— সাবিত্রী (১৯০২), উলুপী (১৯০৬), ভীষ্ম (১৯১৩), নরনারায়ণ (১৯২৬), অহিভূষণ ভট্টাচার্য— উত্তরবিলাপ (১৯০২), শশাঙ্কমোহন সেন— সাবিত্রী (১৯০৪), দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ভীষ্ম নাটকটি তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। কামিনী রায় রচনা করেন একটি কাব্যনাট্য— অম্বা (১৯১৫), অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কয়েকটি নাটক— কর্ণার্জুন (১৯২৩), শ্রীকৃষ্ণ (১৯২৬) ও শকুন্তলা (১৯৩০)। শেষের নাটক কয়েকটি ২০ শতকে রচিত হলেও এগুলিতে পুরোনো ধারা অব্যাহত।

২০ শতক

বিশ শতকের নাট্যকারেরা মহাভারতের কাহিনী অবলম্বন করে নাটক রচনা করেছেন। তবে তা ভক্তিভাববশত নয় মূলত পুরাণের নতুন ব্যাখ্যা তুলে ধরার জন্য। এর সূচনায় পাওয়া যায় নাট্যকার মন্মথ রায় রচিত ‘কারাগার’ নাটক। এতে কংসবধের কাহিনী এতোটাই রূপকাশ্রিত হয়ে উঠেছিল যে শাসক ব্রিটিশ সরকার নাটকটির প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। রবীন্দ্রনাথের কথা আগেই বলা হয়েছে। তাঁর এ পর্যায়ে নাট্যকাব্যগুলি সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে উপস্থিত। নতুনভাবে আমাদের ভাবিয়েছে বুদ্ধদেব বসুর কয়েকটি নাটক— প্রথম পার্থ, অনা¤œী অঙ্গনা, সংক্রান্তি ও কালসন্ধ্যা; সুনীল গঙ্গোপধ্যায়ের ‘নন্দনকাননে দুর্যোধন’ বেতার নাটকটিতে এ যুগের চিন্তাই প্রতিফলিত। বীরেন্দ্র কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অমৃতমন্থন’ কাব্যনাট্য সঙ্কলনে বিশ শতকীয় দৃষ্টিভঙ্গিজাত প্রখর যুক্তিবাদ উপস্থিত। মহাভারতীয় বিভিন্ন নারী চরিত্র অবলম্বনে রচিত মায়া চট্টোপাধ্যায়ের একক সংলাপী কাব্যনাট্যগুলিতে এ যুগের নারীভাবনা উচ্চারিত। এ সময় আরো কিছু বিশিষ্ট নাটক আমরা পেয়েছি— ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের মহাভারতের যুদ্ধ ও অন্যান্য একাঙ্ক; মনোজমিত্রের অশ্বথামা ও তিন প্রকাঙ্ক এ কালের বিশিষ্ট রচনা। সুনীল দত্তের কংসবধ পালা; শীলভদ্রের— কচ ও দেবযানী, সুধাংশু সেন রচিত কাব্যনাট্য— ‘অলৌকিক চন্দ্র’ বিশিষ্টতার দাবি রাখে। শাঁওলী মিত্রের ‘নাথবতী অনাথবৎ’ বা ‘কথা-অমৃত সমান’ রচনা দুটি প্রয়োজনীয় ও অভিনয়ে মহাভারতীয় কাহিনীকে নতুনমাত্রা দিয়েছে। ‘বোধে’র বর্তমান সংখ্যাতেও মহাভারত অবলম্বনে একটি নাটক পরিবেশিত হয়েছে— উরুভঙ্গ, লেখেন নাট্যকার মোহিত চট্টোপাধ্যায়।

মহাভারতের কাহিনী অবলম্বন করে ১৯ শতক থেকেই মঞ্চনাটকের পাশাপাশি যাত্রাপালা রচনা শুরু হয়েছে। প্রচলিত ধারার নাটকে মহেন্দ্র গুপ্তের উত্তরা, চক্রধারী, গয়াতীর্থ, উৎপলেন্দু সেনের পার্থসারথি; সুধিবেন্দ্র রাহার বভ্রুবাহন, ভোলানাথ রায়ের জরাসন্ধ ইত্যাদি বেশ কিছু মঞ্চ সফল নাটক পাওয়া যায়।

মহাভারতীয় কাহিনী নিয়ে অসংখ্য যাত্রাপালা রচিত হয়েছে। পালাকারদের মধ্যে ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদ, রাজেন্দ্র কুমার দে, প্রসাদকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, সত্যপ্রকাশ দত্ত, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, আনন্দময় বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দগোপাল রায়চৌধুরী, অঘোরচন্দ্র কাব্যতীর্থ, ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ পালাকারেরা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। ১৯ শতকের শেষ ত্রিশ বছর এবং পুরো বিশ শতক ধরে যে যাত্রাপালা রচিত হয়েছে তার সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন। তবে মহাভারতীয় কাহিনী নিয়ে যে সমস্ত পালার নাম সবসময় শোনা যায় তার মধ্যে বিশিষ্ট কয়েকটি— গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম, মহাসতী দ্রৌপদী, মহারাজা পরীক্ষিৎ, পা-বের অজ্ঞাতবাস, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, শকুনির পাশা, দানবীর কর্ণ, মহামতী বিদুর, অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র, দাতা কর্ণ, পার্থ পরাজয়, পুরুষোত্তম কৃষ্ণ, পা-বগৌরব ইত্যাদি।

আখ্যান/ উপাখ্যান/ কাহিনী/ শিশুকিশোর পাঠ্য

১৯ শতক

১৯ শতকে মহাভারত কাহিনী থেকে নানান আখ্যান—উপাখ্যান নিয়ে বাংলা সাহিত্যের ভা-ার সমৃদ্ধ হয়েছে। লঙ্ সাহেবের পুঁথি তালিকায় পাওয়া যায় মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনী অবলম্বনে রচিত অভিলাষ ও রসসিন্ধু (১৮৪৯)। এতে মহাভারত ছাড়াও অন্যান্য কাহিনী সংকলিত আর সি বসু রচিত দূতী-বিলাস (১৮৪৭)। দ্বারকানাথ কু-ু-পরশুরামের দর্পচূর্ণ (১৮৫৪); রাজা সত্যচরণ ঘোষাল সম্পাদিত পা-বগণের জন্ম ও পরশুরাম অশ্বমেধপর্ব, বনপর্ব, ভীমপর্ব, গদাপর্ব, নলদময়ন্তী, ভদ্রার্জুন ইত্যাদি (১৮৫৪); নীলাদ্রি লোহারি রচিত দ্রৌপদী-কুন্তী-গান্ধারী, কর্ণের মৃত্যু রচনাগুলির উল্লেখ আছে। মধুসূদন নাপিত রচনা করেন নলদময়ন্তী কাহিনী।

জনৈক লিন্ডেলে মারে রচনা করেন দাতাকর্ণ, গুরুদক্ষিণা, প্রহ্লাদ চরিত্র শীর্ষক আখ্যান, হরিশ্চন্দ্র মিত্রের কবি কলাপে মহাভারতের নানান আখ্যান পাওয়া যায়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কয়েকটি আখ্যান রচনা করেন— বাসুদেব চরিত, শকুন্তলা, মালবিকাগ্নিমিত্র, বেণীসংহার এবং ঋজুপাঠের প্রথম ও তৃতীয় খ-ে মহাভারতের কয়েকটি উপাখ্যান। হরিনাথ মজুমদার— ‘একলব্যের অধ্যাবসায়’ শীর্ষক একটি কাহিনী রচনা করেন। স্বামী বিবেকানন্দ কাহিনীমূলক কিছু রচনা না করলেও বিভিন্ন সময়ের আলোচনাসূত্রে মহাভারতের নানা আখ্যানের বর্ণনা পাওয়া যায়

২০ শতক

বিশ শতকে রচিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কুরুপা-ব, দীনেশচন্দ্র সেন— সতী, জড়ভারত, ধারাদ্রোণ ও কুশধ্বজ এবং পৌরাণিকী সংকলন; অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর— শকুন্তলা; যোগীন্দ্রনাথ সরকার— মহাভারত; শশীভূষণ দাসগুপ্ত— ছোটদের ব্যাসরচিত মহাভারত; পার্থসারথি দাশগুপ্ত— মহাভারতের ভীমসেন, স্বামী রাঘবেশানন্দ— মহাভারতের গল্প শোনা। শঙ্করীপ্রসাদ বসু— কৃষ্ণ রমেন ভট্টাচার্য— শকুন্তলা; বিষ্ণুপদ রায়— শ্রীচৈতন্য ও কুরুক্ষেত্র; অনন্তকুমার দত্ত— পুরাণের গল্প, শ্যামল চক্রবর্তী— পরমাণু মহাভারত; রূপক সাহা পঞ্চপা-ব ও একাদশ সূর্যোদয় ইত্যাদি।

উপরের অধিকাংশ রচনাই শিশুকিশোরদের উপযোগী। এছাড়া এই শ্রেণীর প্রচুর রচনার বিভিন্ন সংস্করণ এখনও প্রকাশ পাচ্ছে। নিচের তালিকাটি থেকে এই কাহিনীগুলোর জনপ্রিয়তা অনুধাবন করা যায়। ছোটদের মহাভারত শীর্ষক গ্রন্থের সম্পাদনা করেছেন খগেন্দ্রনাথ মিত্র (রঞ্জন পাবলিশার্স), যোগীন্দ্রনাথ সরকার (সংসদ), ফুলবালা রায় (বি.চাঁদ এন্ড সন্স), পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী (ওরিয়েন্ট লঙ্ম্যান), যোগীন্দ্রনাথ সরকার (পাত্রজ), যোগীন্দ্রনাথ সরকার (আনন্দয়), সুবোধচন্দ্র মজুমদার (আনন্দম ২২ সং), অলোকনাথ চক্রবর্তী (ভারতী), সুবোধকুমার চক্রবর্তী  (দেবসাহিত্য কুঠীর) এবং অমিতাভ চৌধুরী (নিউ বেঙ্গল পাবলিশার্স)।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছেলেদের মহাভারত প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে। পাত্রজ, অন্নপূর্ণা, সাহিত্যম্, কেম্বিজ বুক থেকে তাঁর মহাভারত প্রকাশিত হয়েছে বিদ্যামন্দির থেকে। মহাভারতের নানা গল্প গ্রন্থ নিলয় থেকে এবং মহাভারতের গল্প অন্নপূর্ণা সাহিত্য মন্দির থেকে।

এছাড়াও মহাভারতের গল্প লিখেছেন বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় (এ কে সরকার); লীলা মজুমদার (সংসদ); এবং সন্ধ্যা বারিক। শিশু মহাভারত লিখেছেন গজেন্দ্রকুমার মিত্র (মিত্র ঘোষ) এবং নীলিমা ঘোষ (প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরী), শিশুদের মহাভারত লিখেছেন স্বামী বেদানন্দ (ভারত সেবাশ্রম), পূর্ণেন্দু পত্রী— দুষ্টুর মহাভারত (আজকাল), বারিদবরণ ঘোষ— পা-বদের ছেলেবেলা (নবপত্র), দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়— ভারতগল্পকথা (পত্র ভারতী), গজেন্দ্রকুমার মিত্র— মহাভারতের নীতিগল্প, উৎপল সেনগুপ্ত— মহাকাব্যের ঝুলি, ননীগোপাল চক্রবর্তী ছোটদের মহাভারত।

শিশু মনোরঞ্জনের জন্য মহাভারত কাহিনীর সঙ্গে ছবিও প্রকাশ করেছেন অনেক প্রকাশন সংস্থা। যেমন— উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সচিত্র মহাভারত  গোল্ডেন বুকস), যোগীন্দ্রনাথ সরকার— ছবিতে ছোটদের মহাভারত (নির্মল বুক এজেন্সি), ছবি ও কথায় মহাভারত (নির্মল বুক এজেন্সি), ছোটদের ছবিতে মহাভারত (শৈব্যা), পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী ছবিতে মহাভারত (শিশু সাহিত্য সংসদ), অমিতাভ চৌধুরী ছবি ও ছড়ায় মহাভারত (নিউ বেঙ্গল প্রেস); স্বামী নির্মলানন্দ— সচিত্র মহাভারতের গল্পগুচ্ছ।

এখানে শিশুপাঠ্য গ্রন্থের যে তালিকা দেওয়া হল তা নিতান্তই অসম্পূর্ণ। একই লেখকের একই গ্রন্থ বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করে চলেছে। শিশুপাঠ্য প্রকাশনার এই অসম্পূর্ণ তালিকাটিও বিস্মিত করে। প্রকাশকেরা গ্রন্থপ্রিয় কিন্তু তারা গ্রন্থব্যবসায়ীও। এ— জাতীয় বইয়ের চাহিদা বুঝেই তারা এখনও শিশু মনোরঞ্জনকারী এই গ্রন্থগুলির প্রকাশ করে চলেছেন। বাঙালি শিশুমানসে মহাভারত কাহিনীর প্রভাব এ থেকেই বিশেষভাবে অনুধাবন করা যেতে পারে।

************************************

 

শামসুদ্দিন চৌধুরী
………………..
বুদ্ধদেব বসুর ভারত-কথা

বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪) কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক হিসেবে খ্যাতকীর্তি যখন, প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় এসে যুক্ত হলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে; ১৯৬৩ সালে এই সূত্রেই মার্কিন দেশে ব্লুমিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ব্রুকলীন কলেজে, কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে, ওয়েসলিয়ান কলেজে ১৯৬৪ সাল জুড়ে, হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টারে ১৯৬৫ সালে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত থাকলেন।১ তাঁর পড়াবার বিষয় ছিল ‘পূর্ব ও পশ্চিমি সংস্কৃতির সম্পর্ক বিচার’, যার একটা অংশ২ তুলনামূলক ইন্দো-ইউরোপীয় এপিক— একদিকে ইলিয়াড, অদিসি, ঈনীড, অন্যদিকে মহাভারত ও রামায়ণ’। প্রায় একযুগ পরে মহাভারতের কথা (১৯৭৪)-র মুখবন্ধে জানান ‘মহাভারত বিষয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছে সেই সময়েই আমার মনে অঙ্কুরিত হয়েছিল—আমেরিকার আরো কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে অনুশীলনের আরো সুযোগও পেয়েছিলাম।’৩ উল্লেখ্য এই যাত্রায় বুদ্ধদেব আমন্ত্রিত ছিলেন৪ নিউইয়র্কের ফেডারেশন অব মর্ডান ল্যাঙ্গুয়েজেস্ এন্ড লিটেরাচার্সের নবম অধিবেশনে ভারতীয় সাহিত্যের কোন একটি দিক নিয়ে বক্তৃতা দিতে। তুলনামূলক সাহিত্যের জন্যই এই অধিবেশনের অনুষ্ঠান। বুদ্ধদেবকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল ভারতবর্ষের তুলনামূলক সাহিত্যচর্চার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়িক কেন্দ্রের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে।৫ এই উপলক্ষ মহাভারতের কথা নামক অসাধারণ গ্রন্থের পরিকল্পনা ও রচনার প্রণোদনা হলেও আমাদের অনুমান বুদ্ধদেবের ভারতবিদ্যার চর্চা ততটাই আকস্মিক নয়। এর পূর্ব-প্রস্তুতি ছড়িয়ে আছে তাঁর  কাব্যে, নাটকে, কথাসাহিত্যে— বুদ্ধদেব বসুর রচনায় ভারত-প্রসঙ্গ এ প্রবন্ধের আলোচ্য।

বুদ্ধদেব বসুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয়েছিল একটু বেশি বয়সে; অন্তত ১৫ বছর বয়সে কলেজিয়েট স্কুলে এসে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হবার মাধ্যমে, ১৯২৩ সালে৬; শৈশবে মাতৃবিয়োগের কারণে মাতামহ-মাতামহীর গৃহে প্রতিপালিত হওয়ার সূত্রে মাতামহ ভুবনচন্দ্র সিংহ হয়ে ওঠেন তাঁর জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু ও প্রথম ক্রীড়াসঙ্গী। কলেজিয়েট স্কুলের পরীক্ষায় তিনি যে কৃতিত্ব দেখান ও ম্যাট্রিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান লাভ করেন তা সম্ভব হয় মাতামহের প্রযতেœ শিক্ষারই কারণে। বুদ্ধদেব বসু তাঁর দেয়া ইংরেজি শিক্ষার প্রসঙ্গ কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করেন আমার ছেলেবেলা গ্রন্থে।৭ ব্যাকরণ-বর্জিত ইংরেজি, সংস্কৃতের ধাতুরূপ-শব্দরূপ পাড়ি দিয়ে চাণক্য শ্লোক-হিতোপদেশ ‘চর্বণ’ করার উল্লেখ৮ পাই। এই শিক্ষায় ইংরেজি-মনস্কতার প্রাবল্য ছিল, যদিও কৌতূহলকর এক উল্লেখ৯ মেলে, সদ্য বিধবাকে শোনানোর জন্য গীতা পাঠের সময় পূজারি ব্রাহ্মণের কণ্ঠে মহাভারতের ভগবদগীতার শ্লোকে কবিতার ধ্বনিকল্লোল তাঁকে আলোড়িত করে। আরও অধিক ঘনিষ্ঠ মহাভারত অধ্যয়নের সাক্ষ্য মেলে তপস্বী ও তরঙ্গিণী রচনা প্রসঙ্গে পশ্চাৎপট বর্ণনায় :

সেটা আমি লিখেছিলাম আটান্ন বছর বয়সে, কিন্তু প্রথম যখন ভেবেছিলাম তখন আমি সবেমাত্র উত্তরতিরিশ। সেই প্রথম আমি নিচ্ছি কালীপ্রসন্নর মহাভারতের আস্বাদ; সব বিস্তার ও অনুপুঙ্খসমেত ঋষ্যশৃঙ্গের উপাখ্যান পড়ে চমকে উঠেছি।১০

তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন ঋষ্যশৃঙ্গ উপাখ্যানকে পরিণতি দিতে তিনি সমর্থ হন অন্তত তিরিশ বছর ধরে ‘নানাদেশে ঘুরে বেড়াবার ও ক্লাশে পড়াবার সময়, পড়াবার জন্য অনেক সময় বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে আর বিশ্ব পুরাণে (আমার) বিবর্ধমান কৌতূহলবশত।’১১ এই ধারাবাহিকতা পূর্ণতা লাভ করে মহাভারতের কথা রচনার মধ্য দিয়ে। এর অবসরে একাধিক কাব্যগ্রন্থে, কাব্যনাটকে মহাভারত প্রসঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অমলেন্দু বসুর একটি মন্তব্যকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়— ‘বুদ্ধদেব বসুর সম্পূর্ণ সৃজনী কর্মে প্রথম থেকে প্রবাহিতা একটি অনতিপ্রশস্ত তরঙ্গিণী যেন ক্রমেই প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর মহানদীতে পরিণত হয়েছে।’১২ উল্লেখ্য মহাভারতের কথার দ্বিতীয় খ-ের পরিকল্পনা করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু, সেটি সম্ভব হলে এই স্রোতস্বিনীর পরিপূর্ণ প্রসার লক্ষ করা যেত। এই কথার সমর্থনও পাওয়া যাবে মহাভারতের কথা-র মুখবন্ধে ‘এমন নয় যে অন্তর্বর্তী সময়ের মধ্যে মহাভারতের সঙ্গে আমার কখনো বিচ্ছেদ ঘটেছিলো বরং আমি যে ক্রমশ জড়িয়ে পড়েছিলাম, আমার সাম্প্রতিক অনেক নাটকে ও কবিতায় তার নিদর্শন আছে।’১৩ সমালোচকেরা এই প্রমাণ দেখতে পান বুদ্ধদেব বসুর আদি রচনাতেও। বিশেষত মহাভারতের বা ভারতীয় মিথলজির উপাদান ব্যবহারের অন্যতম উপহার হচ্ছে রচনার মধ্যে মিথ-পুরাণের নতুন তাৎপর্য সন্ধান। কমলেশ চট্টোপাধ্যায় বিস্তারিত উল্লেখ করেন :

বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্রোত্তর যুগে মিথ-পুরাণ সন্ধানী কবিদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসুর একটি বিশিষ্ট ভূমিকা আছে। তাঁকে আমি পুরাণের পুনর্জন্মদাতা কবি এবং কাব্য নাটকের ¯্রষ্টা না বলে মিথ-পুরাণের সন্ধানী কবি বলছি—লিখিত পুরাণ কাহিনী বা পুরাণেরও পূর্বযুগের পুরাণের বীজস্বরূপ লোকশ্রুতি নির্ভর গল্প কাহিনীগুলোকে য়ুরোপীয় প-িতেরা মিথ বলেছেন। যাঁরা পুরাণের পুনর্জন্মদাতা কবি ও নাট্যকার তাঁরা কিংবা পুরাণের ব্যবহারকারী অন্যান্য শিল্পীগণ লিখিত পুরাণকেই নবযুগের পটে পুনর্লিখিতভাবে প্রকাশ করেন। সেক্ষেত্রেও পুরাণের পুনর্জন্ম ঘটিয়ে তাঁরা শিল্পসৌন্দর্য ও চিরন্তন মানবরস একযোগে সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। কিন্তু কোন কোন রচনায় শিল্পী পুরাণ কাহিনীর অন্তরালে আদিম পুরাণের সত্য বা মিথিক কাহিনীর আবিষ্কার করতে চান। আপন রচনাকে চান সেই পুরাতন সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলতে। এই ধরনের মিথ-পুরাণের উপাদান বা অনুষঙ্গ ব্যবহারকে বিশেষভাবে মনস্তাত্ত্বিক রচনাক্রিয়া বলা যায়।১৪

এই প্রয়োগ হয়ে থাকে প্রতীক স্বভাবের আধুনিক শিল্পী তাঁর বক্তব্যকে প্রকাশিত দেখেন আদিম মিথ-পুরাণে। তিনি বাস্তব জীবন-জগৎকে যেভাবে দেখতে চান, বাস্তবে সে কল্পনা প্রতিফলিত হয় না বলে মিথের কল্পবিশ্বে অনুপ্রবেশ করিয়ে দেখতে চান। ফলে পুনর্জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বনিয়তির প্রেক্ষাপট পেয়ে রচনাটি বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে।

বুদ্ধদেব বসুর রচনায় এই নির্দশনগুলো কালানুক্রমিকভাবে অনুসরণ করলে প্রথমেই পাই পুরাণের নবজন্ম বিষয়ক ভাবনা, অনতিবিংশতি বর্ষ বয়সে, “পুরাণের পুনর্জন্ম” নামে এক গল্পের ভূমিকায় : ‘কিছুদিন ধরে জল্পনা করি, রাম-সীতা প্রভৃতি প্রাতঃস্মরণীয়াদেরকেও ধুতি-শাড়ি পরিয়ে বিংশ শতাব্দীর কলকাতায় টেনে আনা যায় কিনা। আমাদের প্ল্যান হলো বিংশ শতাব্দীর পৌরাণিক চরিত্রের পুনরাবির্ভাব ও পৌরাণিক ঘটনার পুনরভিনয় করানো;’১৫ শ্রাবণ, ১৩৩৪ প্রকাশিত এ গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল লক্ষ্মণের স্ত্রী উর্মিলা, রচয়িতার ছদ্মনাম ছিল বিপ্রদাস মিত্র।

এই পুনর্জন্ম ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল ‘বিরাট ংধঃরৎব রচনা করা’। যদিও এ পরিকল্পনার অন্য অংশ যেখানে রাম, সীতা, কর্ণ, অর্জুন, দ্রৌপদী—সকলের শরীর থেকে ‘কবিত্ব ও দেবত্বের বস্ত্র হরণ’ করার অভিলাষ ছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি। যদিও উর্মিলা বিষয়ে বুদ্ধদেবের দৃষ্টিভঙ্গি সাতচল্লিশ বছর পরেও অপরিবর্তনীয়রূপে সনাক্ত করেছেন সুবীর রায় চৌধুরী১৬— ‘মহাভারতের কথা’র পাঠ্য অংশে।

এ সংক্রান্ত পরবর্তী রচনার নাটক রাবণ (১৯৩১); নাট্য নিকেতনে অভিনয়ের জন্য গৃহীত হয়েও কয়েকবার মহড়ার পর পরিত্যক্ত হয়। তাঁর ঢাকা-জীবনের সর্বশেষ রচনা, এমনকি কলকাতা এসে এর দ্বারা দারিদ্র্যমোচনের উপায়ও ভেবেছিলেন। পৌরাণিক রাবণকে নিজের মানস কল্পনায় সৃষ্টি করেছেন :

সরমা আছেন সীতা দেবীর সান্ত¦নাদাত্রী, রাবণের সমালোচক আছেন বিভীষণ, অশোকবনে ও রাবণের সভায় মঞ্চসজ্জার অবকাশ আছে। সবই বলা যায় গতানুগতিক—আমার নতুনত্ব শুধু এটুকুতে যে আমার রাবণ পুরোপুরি একটি দুরাত্মা নন, সীতাকে হরণ করে এনে এখন চান হৃদয় দিয়ে তাঁকে জয় করতে—তাঁর মনের একটি অংশে তিনি ভাবপ্রবণ। এই প্রথাচ্যুত রোমান্টিক রাবণকে গ্রহণ করলেন হারান ঠাকুরতা।১৭

সাত দৃশ্যের এই নাটকটি খ-িত অবস্থায় ৫ম ও ৬ষ্ঠ দৃশ্য বাদে উদ্ধার করা গেছে। দ-কারণ্য, রাবণের রাজসভা, অশোকবনে পূর্ণিমা, অশোকবনে সীতা-সরমা এবং সপ্তম দৃশ্যে রাবণের রাজসভায় মেঘনাদের মৃত্যু সংবাদে রাবণ যুদ্ধসাজে সজ্জিত হচ্ছে। বুদ্ধদেব বসু রাবণকে ‘প্রেমিক, ভোগী ও বীররূপে’ আঁকতে চেয়েছেন। এই রচনা পূর্বোক্ত পুরাণের নবজন্ম বিষয়ক অনুরণন, যার উদ্বোধন ঘটেছিল ঔড়যহ ঊৎংশরহব এর ঝরৎ এধষধযধফ পাঠের সূত্রে।

বুদ্ধদেব বসুর পুরাণ সম্পর্কিত চিন্তার আবারও প্রকাশ দেখি বিখ্যাত ‘রামায়ণ’ (১৯৪৭) প্রবন্ধে।১৮ যেখানে রামায়ণ, রাম চরিত্রের প্রাসঙ্গিকতা যথাবিহিত সমালোচকের দৃষ্টিতে আলোচনা করেছেন। এর আগে দময়ন্তী (১৯৪৩) কাব্যের নাম কবিতাটিতে মহাভারতের নল-দময়ন্তী কাহিনীর প্রতীকে কন্যার প্রতি নলরাজার স্মৃতি কথনে কবি-পিতার ভূমিকা গ্রহণ করেন। সেই সঙ্গে পুরাণ কাহিনীর নির্মোক সরিয়ে নাটকীয় স্বগতোক্তি ব্যবহার করে আদিম পুরাণ চেতনায় প্রসারিত করেছেন। ‘ঐ কাহিনীগুলোতে যথা মিশরীয় আইসিসঅসাইবিস কাহিনীতে কিংবা ভারতীয় আদি পুরুষের যৌন  মিলনের যজ্ঞভূমি দেখতে পাই। ঐ কাম ইন্দ্রিয় বিলাস নয়—তা হল আদিশক্তি। মৃত্যু সেক্ষেত্রে ফসলের সাময়িক অন্তর্ধানের মতোই ঘটনা। তা হল পুনর্জন্মের ভূমিকা।১৯ এই পথ ধরেই উত্তর জীবনে তপস্বী ও তরঙ্গিণীতে নিষ্ক্রমণপথ রচিত হবে।

“দ্রৌপদীর শাড়ি” (১৯৪৮) কবিতাতেও এই প্রতিরূপক প্রয়োগ লক্ষ করা যাবে। ‘দ্রৌপদীর প্রতিরূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বিশ্ব প্রকৃতি এবং দুঃশাসনের প্রতিরূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে আধুনিক বিশ্বের বিজ্ঞান ও বিশ্লেষণী-বুদ্ধি। দর্পিত বুদ্ধির হাতুড়ি বিশ্ব প্রকৃতির অন্তহীন রহস্যজালকে উন্মোচন করতে চায়, কিন্তু তা দ্রৌপদীর শাড়ির মতোই অন্তহীন।’২০ বুদ্ধদেব বসু একে আখ্যা দিয়েছেন ‘অসম্ভব দ্রৌপদীর অন্তহীন শাড়ি’ বলে, যে রহস্যের উন্মোচন অসম্ভব।

আরো উল্লেখ পাওয়া যাবে পরাশর-সত্যবতী প্রসঙ্গ যে আঁধার আলোর অধিক, (১৯৫৮) কাব্যের ‘আটচল্লিশের শীতের জন্য :’ শীর্ষক কবিতায়, অভিমন্যুর প্রতি-তুলনা এসেছে শীতের প্রার্থনায় : বসন্তের উত্তর (১৯৫৫), কাব্যের ‘রাধামাধব উপাধ্যায়ের শেষ উক্তি’ কবিতায়; অর্জুন এসেছে একাধিক কবিতায়—অসম্ভবের গান (শীতের প্রার্থনা : বসন্তের উত্তর), বহুমুখী প্রতিভা, শিল্পীর উত্তর প্রভৃতি কবিতা (যে আঁধার আলোর অধিক) এবং রোদন রূপসী মরচেপড়া পেরেকের গান (১৯৬৬) কবিতায় দ্রৌপদীর জন্ম বিষয়ক মিথকে নবজন্ম দেন। কবিতায় এই পুরাণ প্রসঙ্গ আরও গভীরতর প্রয়োগে উপস্থাপিত হয় বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাটকগুলোতে তপস্বী ও তরঙ্গিণী (১৯৬৬), কালসন্ধ্যা (১৯৬৯), অনা¤œী অঙ্গনা (১৯৭০), প্রথম পার্থ (১৯৭০) ও সংক্রান্তি (১৯৭৯)। এসবের বিষয় ছিল যথাক্রমে ঋষ্যশৃঙ্গ মিথ, যাদবকুলের ধ্বংস, বিদুরের জন্ম, কর্ণ ও দুর্যোধনের মৃত্যু। কবিতায় অবলম্বিত মহাভারতের প্রসঙ্গসমূহকে স্মরণে রাখলে, কাব্যনাট্যের বিষয়সমূহ এবং মহাভারতের কথায় বুদ্ধদেবের উক্তি২১ ‘যুধিষ্ঠিরই মহাভারতের নায়ক’ ও সেই সুবাদে কৃষ্ণ-অর্জুন প্রভৃতির আলোচনা মহাভারতের শীর্ষ চরিত্রগুলোর প্রতি মনোযোগকে তুলে ধরে। আর কাব্য ও কাব্যনাট্য রচনা যদি হয় তার প্রস্তুতিপর্ব যার উল্লেখ মহাভারতের কথার ভূমিকায় রয়েছে, তবে এই দীর্ঘ প্রস্তুতির ফসল উক্ত গদ্যগ্রন্থটি। তবে এ গ্রন্থে প্রকাশিত মতামতের অনুরণন পূর্বের রচনায় শোনা বিচিত্র নয়।

যদিও মহাভারতের কথা রচনার দৃষ্টিভঙ্গি—‘আমি দেখতে চেয়েছি যে মহাভারতের কোনো সুদূরবর্তী ধূসর স্থবির উপাখ্যান নয়, আবহমান মানবজীবনের মধ্যে প্রবহমান’২২—বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাট্যগুলোর রচনায় সময়ও ক্রিয়াশীল ছিল বলা যায়। তপস্বী ও তরঙ্গিণী প্রসঙ্গে অনেক লেখকই জানান : ‘আমার কল্পিত ঋষ্যশৃঙ্গ ও তরঙ্গিণী পুরাকালের অধিবাসী হয়েও মনস্তত্ত্বে আমাদেরই সমকালীন।’২৩ আর সমকালীনতার দ্যোতনা খুঁজেছেন এই অর্থে—‘লোকেরা যাকে ‘কাম’ নাম দিয়ে নিন্দে করে থাকে, তারই প্রভাবে দু’জন মানুষ পুণ্যের পথে নিষ্ক্রান্ত হলো নাটকটির মূল বিষয় হলো এই।’২৪ মহাভারতের বনপর্বের ১১০-১১৩ অধ্যায়ে আলোচিত কাহিনীটির চেয়ে বুদ্ধদেবের বর্ণনায় ঋষ্যশৃঙ্গের জীবনবৃত্তান্ত যেমন স্বতন্ত্র, তিনি বিভাধক পুত্র এবং বারবধূ তরঙ্গিণী নামে উপস্থাপিত, যে রোমান্টিক প্রেমে দীপিত হয়ে গিয়ে পরিণতিতে বীতকাম সন্ন্যাসীর সাক্ষাতে শূন্যতার অভিমুখে যাত্রা করে। সারল্য হারিয়ে ঋষ্যশৃঙ্গ নতুন সাধনার কথা ভাবে। দুজনেই তারা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে শূন্যতা ও বিষাদকে অবলম্বন করে এগিয়ে যায়। বুদ্ধদেব বসু কালসন্ধ্যার ভূমিকায় মন্তব্য করেন : ‘দ্বারকাপুরী ও যদু বংশের ধ্বংস পেরিয়ে এই কাহিনীর ইঙ্গিত আরো বহুদূরে প্রসারিত; এর মর্মে মানব ইতিহাসের একটি আদি সত্য বিরাজমান।’২৫ কেবল মৌষলপর্ব নয় মানব ইতিহাসের উত্থান পতনের আলেখ্য কালসন্ধ্যা। এক মহা ভবিষ্যৎকে মেনে নিতেই আহ্বান করেন বুদ্ধদেব বসু। ষাটের দশকের পশ্চিমবঙ্গ এ বুদ্ধদেবকে কালসন্ধ্যার সমকালীনতায় উদ্বুদ্ধ করে থাকতে পারে। কৃষ্ণ কালচক্র সম্পর্কে অবহিত, তাই তিনি উদ্যোগী নন, অর্জুনও এ জ্ঞান লাভ করে ব্যাসদেবের নিকটে। কালপরিণতি সম্পর্কে কুশীলবদের অজ্ঞানতা নাটকের পরিণতিকে গভীরতা দিয়েছে।

অনা¤œী অঙ্গনাতে নিয়োগ প্রথার সূত্রে বিচিত্রবীর্যের পতœী অম্বিকার নামহীনা দাসীকে ব্যাসদেবের শয্যায় কৌমার্য বিসর্জন দিতে হয়েছিল। মহাভারতের এই কাহিনীতে বিদুরের জন্ম হয়। বুদ্ধদেব বসু বিদুরমাতার অন্তরায় পুত্রের সঙ্গে প্রণয়কে অপেক্ষমান রেখে এই অনিচ্ছুক মাতৃত্বের অভিঘাতে জীবন পরিবর্তিত হওয়াকে তুলে ধরেছেন। তার মাতৃত্ব পূর্বেকার বহমান জীবনকে থামিয়ে দিলেও আপন মুক্তি ও আত্মজ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে। এমন কি যে রাণী অম্বিকার ভূমিকায় সে শয্যায় গিয়েছিল, সুস্থ পুত্রের জননী হয়ে তারও ঈর্ষার কারণ হয়েছে সে। কৌমার্য প্রত্যর্পণ তুচ্ছ হয়ে যায় অঙ্গনার মাতৃত্বের নিকট।

অনা¤œী অঙ্গনা-র মতো প্রথম পার্থ-র কর্ণ স্বতন্ত্র মানুষ। নিজের জন্মপরিচয়ের হীনতায় অভিমানহত, ক্ষুদ্ধ নন, বরং স্বীয় প্রজ্ঞায় জানেন জীবনের অর্থ কী। শ্রেয় ও প্রেয় মিলিয়ে বেঁচে থাকার প্রলোভনকে উপেক্ষা করে মৃত্যুকে বরণ করেন তিনি। সময়োচিত, অনিবার্যকে মেনে নিতে সদা প্রস্তুত তিনি। কুন্তীর কানীন পুত্রটিকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে ফিরিয়ে নিতে এসেছেন শৈশবের হারিয়ে যাওয়া মা এবং স্বয়ম্বরসভায় প্রকাশ্যে অপমানকারিণী পা-ববধূ কৃষ্ণা আর পা-বসখা কৃষ্ণ। কুন্তীর ¯েœহ, কৃষ্ণার বন্ধুত্বের আহ্বান, কৃষ্ণের ¯েœহ—সবকিছু সত্ত্বেও কর্ণ মৃত্যুকেই নির্বাচন করলেন। কর্ণের প্রত্যাখ্যান তাঁর ব্যক্তিত্বেরই সূচক।

সংক্রান্তি-তে মৃত্যু আরও ঘনীভূত হয়েছে। দুর্যোধনের পরাহতদশা ও মৃত্যুতে যথার্থ সংক্রান্তি ঘোষিত। সত্তর দশকের বাংলাদেশের কালবেলায় অজ¯্র যৌবনের নিহত হবার প্রতিফলক হয়েছে ‘সংক্রান্তি’, এমনও মনে করেন কোন কোন সমালোচক।২৬ জীবিত ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী, তাদের শত পুত্রের মৃত্যুর শোক সহ্য করেই। কর্তব্যপরায়ণতার মধ্যে ¯েœহময়তার উদ্বোধন ঘটেছে গান্ধারী চরিত্রে। পাপাচারী জীবিত দুর্যোধন পরিত্যাজ্য কিন্তু মৃত, স্থবির ও নির্জনে শায়িত দুর্যোধন গান্ধারীর আকুলতা সৃষ্টি করেছেন। মৃত্যু যেহেতু আকাক্সক্ষা, উৎকণ্ঠা, ক্রন্দন, আন্দোলন থেকে মুক্তি দিয়ে যায় তাই দুর্যোধনের মৃত্যুরূপী সংক্রান্তির মহিমাই এখানে কীর্তিত। গান্ধারী স্বামীকে কর্তব্যপরায়ণতার জন্য গঞ্জনা দিয়েছেন, আবার মৃত পুত্রের জন্য ¯েœহে উদ্বেলও হয়েছেন। তাঁর সম্বল একমাত্র অফুরন্ত বিষাদ। ১৯৭১-৭২ সালে ১৮ কিস্তিতে প্রকাশিত হয় মহাভারতের কথা; আপাতভাবে লক্ষ করা যাবে এর রচনাকৌশল তুলনামূলক, প্রাচীন মহাকাব্যের আধুনিক ব্যাখ্যা, মহাকাব্যটির প্রধান থীম ও বিষয়কে আলোচনা করে এবং এর নায়ক চরিত্রকে বিভিন্ন তুলনা-প্রতিতুলনায় উপস্থাপন করেছেন। আর গ্রন্থের এপিগ্রাফে উল্লেখ করেছেন মহাভারতেরই পঙ্ক্তি—‘কোনো কোনো কবি এই ইতিহাস পৃথিবীতে পূর্বে বলেছিলেন। কেউ কেউ সম্প্রতি বলছেন, ভবিষ্যতে অন্য কবিরাও বলবেন।২৭ শাশ্বত বিষয়ের এই মতামত বুদ্ধদেব বসুর নিজস্ব এবং তিনি অন্যান্য মতের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন। গ্রন্থের অভিপ্রায় ও পরিধি সম্পর্কে জানিয়েছেন :

প্রথম কথা, আমার আলোচনার ধারা সাহিত্যিক, অথবা—যেহেতু ‘সাহিত্য’ কথাটা বড়ো বেশি ব্যাপক—তাই বলা যাক কবিতা ও কবিতার মতো মিথলজির উপর নির্ভরশীল।

দ্বিতীয় কথা, আমার প্রধান আলোচ্য মহাভারত হলেও তুলনা ও প্রতিতুলনার টানে রামায়ণ ও অন্যান্য পুরাণের প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবেই গ্রথিত হয়ে গেছে : পশ্চিম দেশীয় প্রাচীন ও অর্বাচীন সাহিত্য এবং স্বদেশজাত আরো কিছু দৃষ্টান্ত, সেই একই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলো।২৮

তাঁর প্রতিপাদ্য ছিল আবহমান মানবজীবনে মহাভারতের প্রবহমানতা প্রমাণ করা। অথচ তিনি সর্তক করে দেন এ আলোচনা পা-িত্যপূর্ণ হবে না, কারণ ‘এ আলোচনা এক রসভোক্তার আনন্দের নিঃসরণ।’২৯ সুবীর রায়চৌধুরী বুদ্ধদেব বসুর পদ্ধতিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে :

মহাকাব্য পাঠের উদ্দেশ্য তাঁর কাছে পুণ্যসঞ্চয়ও নয়, তথ্য সংগ্রহও নয়। তিনি তাঁর নিজস্ব জীবন-দর্শন এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মহাকাব্যের কয়েকটি চরিত্রকে মানবিক মাত্রার মধ্যে ধরতে চেয়েছেন, আধুনিক মানুষের মূল্যবোধের প্রেক্ষিতে কয়েকটি থীম বা বিষয়ের (যেমন, প্রেম, স্বধর্ম, অহিংসা, পাপ-পুণ্য) প্রতিসাম্য খুঁজেছেন দেশী বিদেশী সাহিত্যে। অথচ তার ধরন পুরাণ কথকেরও নয়। মহাভারতের পাঠের আসরে কথক যেমন পুণ্যার্থী শ্রোতাদের সামনে ব্যাখ্যা করেন মহাকাব্য কথা, সেরকম কাহিনী কথন তাঁর পরিধির বাইরে। তাছাড়া তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয় নয়, সাহিত্যিক।৩০

কিন্তু এই সাহিত্যিক অভিপ্রায় যে বুদ্ধদেব বসু ত্যাগ করতে বাধ্য হন ‘গোত্রবিচার’ প্রসঙ্গে এসে, সুবীর রায়চৌধুরী৩১ তার উল্লেখ করেন বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্যে৩২ :

বস্তুত এই সংহিতাটিকে একটি শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচনা করাই বাতুলতা। না, কোনো শিল্পকর্ম নয়, শিল্পকর্মের অনিঃশেষ উপাদান ভা-ার… এই জন্যে আমি মহাভারতের অসংখ্য ত্রুটি লক্ষ করেও সে বিষয়ে অসহিষ্ণু হতে পারি না। সম্প্রতি আমি প্রবলভাবে অনুভব করছি যে মহাভারত কোনো নান্দনিক সূত্রে বিচার্য নয় : তা থেকে নিজেদের মনোমতো অংশগুলোকে ছেঁকে নিযে শুধু সেটুকুর মধ্যেই আবদ্ধ থাকার অধিকার আমাদের কারোরই নেই আর তা থাকতে গেলে আখেরে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

বুদ্ধদেব বসুর মৌখিক মহাকাব্যের লিখিতরূপকে বিচারে প্রবৃত্ত হলেও মৌখিক ঐতিহ্যের প্রবহমানতাকে বিস্মৃত হন নি। ‘তাই এখানে প্রক্ষিপ্ত-বিক্ষিপ্ত বলে কিছু নেই—পুরুষানুক্রমে মুখে-মুখে ছড়ানো মহাকাব্যে সংযোজন পরিবর্তন স্বাভাবিক ঘটনা। যে অর্থে লিখিত কোনো সাহিত্যকর্মে, যেখানে উপন্যাস-নাটকে আমরা সামগ্রিকভাবে সংহতি প্রত্যাশা করি, এখানে তা পাওয়া যাবে না।’৩৩

আধুনিক সময়ে প্রাচীন যে কোন সাহিত্যকৃতির রচনাকৌশল বা প্রকৃতি নির্ণয়ে গোত্রসংক্রান্ত এবং অনুপ্রবেশ কাহিনীর তুলনায় লিখিত পাঠের নির্দিষ্টতা অধিক। মহাভারতের পটভূমি ভারতবর্ষ, অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় কাহিনী বিস্তৃত, মূল কাহিনীকে ধরে এগোলে এর কালসীমাও অল্প নয়; এর চরিত্রশালার অনেকেই নায়কোচিত গুণাগুণ ও যোগ্যতা ধারণ করেন। অথচ বুদ্ধদেব যখন আদি অবিকৃত ভাবে মহাভারতকে গ্রহণের পক্ষপাতী এবং পরপরই এর মূলকাহিনী ও নায়ক সন্ধান করেন তখন পাঠক বিমূঢ় বোধ করতে পারেন। এই কূটের মীমাংসা জানিয়েছেন সুবীর রায়চৌধুরী :

আসলে ‘মহাভারতের কথা’ বিচার্য সামগ্রিকভাবে বুদ্ধদেব বসুর রচনাবলীর প্রেক্ষিতে এবং তখনই আমাদের কাছে পরিষ্কার হবে যে, এই বইটি তাঁর রচনাসংগ্রহের পরিপূরক গ্রন্থ, তাঁর জীবনদর্শন। এখানে একদিকে তিনি মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনা ও চরিত্রের প্রতিসাম্য খুঁজেছেন দেশী বিদেশী সাহিত্যে, অন্যদিকে চেয়েছেন এই মহাকাব্যকে কেন্দ্র করে তাঁর ভাবনা চিন্তার বোঝাপড়া করতে।৩৪

মহাভারতের চরিত্রদের কর্মতৎপরতা, প্রবল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, বীরত্ব, সাহসিকতা—সব কিছুকে এড়িয়ে বুদ্ধদেব বসু নায়ক নির্বাচন করলেন এমন একজনকে যিনি ছায়াবৃত, অস্পষ্ট, দ্বিধাকম্পিত, চিন্তামগ্ন ও ভ্রাম্যমাণ। যদিও বুদ্ধদেব লেখেন৩৫ আমেরিকায় এপিক সংক্রান্ত কোর্স পড়াতে গিয়ে যুধিষ্ঠিরের নায়কত্বের কথা তাঁর মনে আসে, সমালোচকরা এ বিষয়ে প্রায় একমত যে, বুদ্ধদেবের সৃষ্ট মিথলজিক্যাল চরিত্রের সারিতে ঋষ্যশৃঙ্গ, কৃষ্ণ, কর্ণ, বিদুর, ধৃতরাষ্ট্রে পর যুধিষ্ঠির উপযুক্ত সংযোজন। অমিয় দেব এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন :

ঊাবহ ঃযবংব নধৎবংঃ ড়ঁঃষরহবং ধৎব বারফবহপব ধং ঃড় যিধঃ ইঁফফযধফবাধ’ং রহঃবহঃরড়হ ধিং রহ ঃযবংব ধফধঢ়ঃধঃরড়হং ড়ভ ধহপরবহঃ সুঃযং, ঃড় ফবঢ়রপঃ ংঢ়রৎরঃঁধষরঃু যিরপয রং ঃযব ঃৎঁব যঁসধহ বংংবহপব ধহফ ঃযব নবংঃ ংুসনড়ষ ড়ভ যিরপয ভড়ৎস ওহফরধহ সুঃযড়ষড়মু রং ণঁফযরংঃযরৎধ.৩৬

বুদ্ধদেব বসু যুধিষ্ঠিরকে মহাভারতের ঐক্যসাধনের অবলম্বন মনে করেছেন যাকে কেন্দ্র করে এর ‘জটিল বন্ধুর বৃহদরণ্যে, লতাগুল্ম কণ্টকবনের ফাঁকে ফাঁকে, গাত্রলগ্ন তৃণপল্লব পতঙ্গের বোঝা সঙ্গে টেনে নিয়ে অপ্রতিহত, আত্মবিস্মৃতিহীন— অত্বর গতিতে এগিয়ে যায় এই কাহিনী বা পরিকল্পনা, এক বিরাট বিঘœবহুল দূরত্ব পেরিয়ে তার অমোঘ ও অবিস্মরণীয় পরিণামের দিকে, এক ম-লাকার সম্পূর্ণতা নিয়ে সমাপ্ত হয়।৩৭ এই যুধিষ্ঠির স্বভাবে ‘ধীর মৃদু লজ্জাশীল অস্থিরমতি মানুষ’ মাত্র। ক্ষত্রিয় রাজপুত্র, যদিও শাস্ত্রবিদ্যায় তত দক্ষ নন, মনস্তত্ত্বেও ক্ষত্রিয়ের চেয়ে ব্রাহ্মণ অধিক তিনি। বিবাদ, বিসংবাদ এড়িয়ে শান্তির সন্ধান করেছেন যেকোন মূল্যে; জয়লিপ্সা, লোভ, হিং¯্রতা কোনটাই তাঁর নেই। নিজের সঙ্গেই নিজের অবিরত বোঝাপড়া, কেবল অরণ্যে মুনি-সংসর্গে শাস্ত্র ও জ্ঞানের আলোচনা তাঁকে বিরাম দিতে পারে, অধ্যয়ন-আলোচনায় তিনি মনের খোরাক পেতেন। অরণ্যে প্রাজ্ঞ ঋষিদের কাছে পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান মেধাবী শিক্ষার্থীর মত শিখে গেছেন। যুধিষ্ঠিরের ভিত্তি সারা জীবনই ধর্ম; যে ধর্ম ঐশী নয়, কোন দীক্ষিতের দ্রুত-আচার বা গোষ্ঠীগত বিশ্বাসও নয় তার স্বধর্ম, স্বভাবধর্ম ও স্বভাব যা যুগপৎ মানবিক ও চিরন্তন স্বভাব। মনননির্ভর মানুষ তিনি, শাস্ত্র, বচন বা মহাজনোক্তি কোন কিছুই নিজের মনে বিচার না করে গ্রহণ করেন না। ভাবনাকুল, সংশয়ী। নিজের কাক্সিক্ষত বিষয় সম্পর্কেও স্থির নন আবার ঘটমান বাস্তবেও তাঁর সমর্থন নেই। এই ধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসবেন স্বীয় সামর্থ্যইে; কারো সুহৃদ নন, অথচ সকলের অভিভাবক, দায়িত্বপরায়ণ, দূরদর্শী। আবার নিজের স্বভাব দোষে নিস্তরঙ্গ দৈনন্দিনে প্রলয় সম্ভব। আত্মজ্ঞান তাঁর নেই, তাই চিন্তাকুল সদাই। আর আত্মীয় পরিজন কেউই তাঁকে উপলব্ধি করতে পারে না; যুক্তিবাদী, বিচারশীল হওয়া সত্ত্বেও তিনি অসুখী, বেদনার্ত। স্খলনে-পতনে তাঁর প্রবণতা সাধারণ মানুষেরই ন্যায়। নিজের অন্তরের মধ্যেই তিনি পথ চলেন, একাকী, সংসারের মায়াপাশকে ছিন্ন করে, এভাবেই আত্মচৈতন্য লাভ করেন। অনন্তযাত্রায় ভাই, স্ত্রী সকলের মৃত্যুও তাঁর নির্লিপ্তি ছিন্ন করতে পারে না। তিনি তখন দয়াবান, স্বেচ্ছাবন্দী, জন্তুর প্রতি করুণাশীল, স্বর্গের চেয়েও পৃথিবী তাঁর কাছে মনোহারী। তিনি গীতার সারাৎসার আত্মবলে অনুভব করে ফলবান করেন। মহাকালের যাত্রায় নিঃসঙ্গ, পথিক, মানবতায় উত্তীর্ণ হন তিনি। যুধিষ্ঠির আগাগোড়া বড় বেশি সাধারণ, সাধারণত্বের জোরেই তিনি শাশ্বত মহিমা অর্জন করেন। বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্যে :

যুধিষ্ঠির কোন মহাপুরুষ নন, আমাদের অনেক ভাগ্যে তিনি মানুষ, শুধুমাত্র মানুষ…। সেই সঙ্গে একথাটিও এখন যোগ করা দরকার যে তিনি কোন দেবতার দ্বারা বিশ্রুতভাবে বরপ্রাপ্ত বা অভিশপ্ত হন নি (যেমন হয়েছিলেন অর্জুন ও কর্ণ); তাঁর সব বর এবং অভিশাপ তাঁর নিজেরই মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিলো—সেগুলোকে তিনি কেমন করে স্বীয় চেষ্টায় সমন্বিত ও বিকশিত করে তুলেছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন সর্বলক্ষণসম্পন্ন এক মর্ত্য মানুষ, তারই ইতিহাসের নাম মহাভারত।৩৮

এই যুধিষ্ঠিরকে আবিষ্কারের কৃতিত্ব বুদ্ধদেব বসুর, এর সঙ্গে আত্মীয়বোধ করেছেন। রোমান্টিকতার যে ধর্ম—‘আপন সৃষ্টির থেকে তারা কখনোই দূরে থাকতে পারেন না—সব চরিত্রের মুখেই তাদের নিজের আভা একটু না একটু এসে পড়েই’৩৯—বুদ্ধদেবও গ্রন্থের এক স্থানে৪০ স্বীকার করেছেন নিজেকে রোমান্টিকদের পঙ্ক্তিভুক্ত বলে, সেই সূত্রে কেউ কেউ৪১ এ গ্রন্থটিকে আখ্যা দিতে চান : উপশিরোনামে ঞযব ষরভব ড়ভ ইঁফফযধফবাধ ইড়ংব নু ণঁফযরংঃযরৎধ. সুবীর রায়চৌধুরী৪২—রবের আঁতোয়ানের অবিকল না হলেও—যুধিষ্ঠিরকে বুদ্ধদেব যে এপিকবৃত্তের বাইরে ঔপন্যাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তা লক্ষ করেন এবং বুদ্ধেদেবের রচনায় যুধিষ্ঠিরকল্প নায়কদের সারণীও খুঁজে পান :

যদি সামান্যীকরণ করা যায়, তা হলে ‘পাড়া’ থেকে ‘প্রেমপত্র’ পর্যন্ত তাঁর অধিকাংশ গল্প উপন্যাসের নায়কও এই রকম : ‘ধীর মৃদু লজ্জাশীল অস্থিরমতি’ অথবা ‘অভিলাষ ও অবস্থার মধ্যে দ্বিখ-িত, নিজের প্রতি ও অন্যদের প্রতি বিপরীত দায়িত্বে সংকটাপন্ন।’ তারা নিঃসন্দেহে সাধারণের ব্যতিক্রম, কিন্তু মহাপুরুষ নয়—তারা জিজ্ঞাসু, কৌতূহলী, প্রেমিক অথচ যুধিষ্ঠিরের দ্যুতাসক্তির মতোই নিজেদের শিল্পকর্ম বিষয়ে আত্মকেন্দ্রিক, জীবনবিমুখ নয়, কিন্তু নিঃসঙ্গ। … সাগর, পার্থপ্রতিম, সত্যেন, মৌলিনাথ, সোমেন প্রমুখ চরিত্রেরা অসাধারণ তাদের কীর্তিতে নয় তাদের স্বধর্মনিষ্ঠায়।৪৩

বুদ্ধদেবের নায়কদের স্বধর্মচ্যুতি পারিপার্শ্বিক বা ব্যক্তিগত কারণে ঘটে যায়, তারা বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, নিঃসঙ্গতায় ভোগে। এই বিষণœতা পরাক্রম সাফল্য ও ব্যর্থতাকে অতিক্রম করেও অব্যাহত থাকে। এর মধ্য দিয়েই তাদের ব্যক্তিত্বের উন্মোচন ঘটে। সুবীর রায়চৌধুরী এই গুণাবলী কর্ণের থাকলেও তাকে বুদ্ধদেব অনেক বেশি সুদূর হিসেবে দেখেছেন বলে মনে করেন।৪৪

অতএব বুদ্ধদেব বসু তাঁর সাহিত্যসাধনায় ভারত-কথাকে আগাগোড়াই ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে; সমালোচকের এই মন্তব্য যথার্থ যে৪৫ তাঁর জীবনকালে রচিত শেষ গ্রন্থ মহাভারতের কথায় যে জীবন জিজ্ঞাসার পরিচয় পাই, তা বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে আছে অর্ধশতাব্দী জুড়ে তাঁর সমগ্র রচনাবলির মধ্যে। আধুনিককালের একজন লেখকের রচনার প্রবেশক হিসেবে ভারত-কথার এই প্রাসঙ্গিকতা এর চিরন্তনতাকেই তুলে ধরে।

তথ্যসূত্র

১.            সমীর সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসুর জীবন, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ. ৩৩০

২.           বুদ্ধদেব বসু, মহাভারতের কথা, কলকাতা, ১৯৪৭, পৃ. ৫

৩.           প্রাগুক্ত, পৃ. ৫

৪.           সমীর সেনগুপ্ত, প্রাগুক্ত পৃ. ৩২০

৫.           প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২০

৬.           ভূঁইয়া ইকবাল, বুদ্ধদেব বসু, ঢাকা, ১৯৯২, পৃ. ১০

৭.           বুদ্ধদেব বসু, আমার ছেলেবেলা, কলকাতা, ১৯৭৩, পৃ. ২২

৮.           প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২

৯.           প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮

১০.         বুদ্ধদেব বসু, কবিতার শত্রু ও মিত্র, কলকাতা, ১৯৬০, পৃ. ৩৬

১১.         প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬

১২.         অমলেন্দু বসু, ‘পরিচিত’—জগন্নাথ বসু, নাট্যশিল্পী বুদ্ধদেব বসু, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ. ৪

১৩.         বুদ্ধদেব বসু, মহাভারতের কথা, কলকাতা, ১৯৭৪, পৃ. ৫

১৪.         তরুণ মুখোপাধ্যায় (সম্পা.), বুদ্ধদেব বসু : মননে অন্বেষণে, কলকাতা, ১৯৮৮, পৃ. ৮২-৮৩ থেকে উদ্ধৃত

১৫.        বুদ্ধদেব বসু, বুদ্ধদেব বসুর রচনা সংগ্রহ, প্রথম খ-, সুবীর রায়চৌধুরী ও অমিয় দেব সম্পাদিত, কলকাতা, ১৯৭৫, পৃ. ২৯১

১৬.        সুবীর রায়চৌধুরী, ক্যোলিওপে’-র সীমানা ছাড়িয়ে : মহাভারতের কথা, ঔঔঈখ, ঠড়ষ ১৩, নরেশ গুহ (সম্পাদিত) ১৯৭৫, পৃ. ১৫১-১৫২

১৭.         বুদ্ধদেব বসু, আমার যৌবন, কলকাতা, ১৯৭৬

১৮.         বুদ্ধদেব বসু, সাহিত্যচর্চা, কলকাতা, ১৯৫৩, পৃ. ৬২

১৯.         কমলেশ চট্টোপাধ্যায়, তরুণ মুখোপাধ্যায় (সম্পা.), প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৬ থেকে উদ্ধৃত

২০.        মাহবুব সাদিক, বুদ্ধদেব বসুর কবিতা : বিষয় ও প্রকরণ, ঢাকা, ১৯৯১, পৃ. ৪০২-৪০৩

২১.         সমীর সেনগুপ্ত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৪ থেকে উদ্ধৃত

২২.        বুদ্ধদেব বসু, মহাভারতের কথা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮

২৩.        বুদ্ধদেব বসু, তপস্বী ও তরঙ্গিণী, কলকাতা, ১৯৬৬, পৃ. ৩

২৪.        প্রাগুক্ত, পৃ. ৪

২৫.        বুদ্ধদেব বসু, কালসন্ধ্যা, কলকাতা, ১৯৬৯, পৃ. ২

২৬.       তরুণ মুখোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১০

২৭.        বুদ্ধদেব বসু, মহাভারতের কথা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫

২৮.        প্রাগুক্ত, পৃ. ৭-৮

২৯.        প্রাগুক্ত, পৃ. ১১

৩০.        সুবীর রায়চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৯-৫১

৩১.        প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫০

৩২.        বুদ্ধদেব বসু, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩০

৩৩.       সুবীর রায়চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৯

৩৪.        প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫০

৩৫.       সমীর সেনগুপ্ত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৪

৩৬.       অসরুধ উবা, অহপরবহঃ গুঃয ধং ঝুসনড়ষ, নরেশ গুহ সম্পাদিত, ঔঔঈখ, ঠড়ষ ১৩, ১৯৭৫, পৃ. ১৪৮

৩৭.        বুদ্ধদেব বসু, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০

৩৮.       প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭৬

৩৯.        শকুন্তলা দেবী, তরুণ মুখোপাধ্যায় (সম্পা.) প্রাগুক্ত, পৃ. ২০০

৪০.        ‘আমরা যারা রোমান্টিকতায় তীব্র সুরা পান করেছি’ বুদ্ধদেব বসু, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৬

৪১.         জড়নবৎঃ অহঃরড়হব, ঞরৎব গরংংরহম ঝঁনঃরঃষব নরেশ গুহ (সম্পাদিত) ঔঔঈখ, ঠড়ষ ১৩. ১৯৭৫, ঢ়. ১৩৯

৪২.        সুবীর রায়চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩

৪৩.        প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৩-৫৪

৪৪.        প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৪

৪৫.        প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬

***********************************

 

খোরশেদ আলম
………………..
মহাভারতের অভিশপ্ত কৃষ্ণপুত্র : ঔপন্যাসিক রূপান্তর

 

উপন্যাস আধুনিক জীবনের শিল্পিত বয়ান। তার মধ্যে অতিবাস্তব উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ যে-কোনো আধিদৈবিক ঘটনাকে অবিশ্বাস করে। পক্ষান্তরে সে নির্মাণ করতে চায় এক বাস্তব বিশ্ব। অন্যদিকে পৌরাণিকতা স্বয়ংসিদ্ধ এক প্রতœরূপ। মহাকাব্যের যে-কোনো চরিত্রই অতিপল্লবিত কাহিনি-আক্রান্ত। মানুষ এই আধিদৈবিক পৌরাণিকতার মধ্যেই খুঁজতে চেয়েছে জীবনের রূপ। বিশ্বাসী মানুষের চোখে পুরাণ অখ-। কিন্তু আধুনিক মানুষের চোখে পৌরাণিক ঘটনা সবসময় বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবুও পুরাণ যুগে যুগে সৃষ্টিশীল মানুষকে দর্শনের খোরাক এনে দিয়েছে। মহাভারতের প্রত্যেকটি চরিত্রই কোনো না কোনোভাবে আধিদৈবিকতা-সিক্ত। তবুও এর অসংখ্য চরিত্রের ভিড়ে কতকগুলো চরিত্র নতুন বোধ ও জীবন-অনুভূতিকে নাড়া না দিয়ে পারে না। পা-ব ও কুরুপক্ষীয় বহু চরিত্রের ভিড়ে অনায়াসেই চেনা যায়―ধৃতরাষ্ট্র, পা-ু, গান্ধারী, কুন্তী, পঞ্চপা-ব, দ্রৌপদী, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, দুর্যোধন কিংবা অভিমন্যু, অশ্বত্থামা, বিদুর এঁদের সবাইকে। বেদব্যাস কাহিনিকার। তিনিও এই মহাকাব্যের মধ্যে মধ্যে স্বয়ং উপস্থিত। আত্মীয় পক্ষ-প্রতিপক্ষই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কুশীলব। স্বয়ং কৃষ্ণ তাকে ঘোষণা করছেন ধর্মযুদ্ধ বলে। কুরু-পা-ব উভয়পক্ষের নীতি-দুর্নীতি ন্যায়-অন্যায় শক্তি সামর্থ্যরে বহু ফিরিস্তি দান করেছেন বেদব্যাস। যদিও তিনি ধর্মত কৃষ্ণের মানসজাত মহিমাকে উচ্চে তুলে ধরেছেন। পা-বরাও সেখানে নীতির ধ্বজাধারী অমিতবীর যোদ্ধা। আর্য-অনার্য ভাবমিশ্রিত সন্তান ব্যাসের হৃদয়ে তবু লুকিয়ে থাকে কৌরবপক্ষীয় কোনো কোনো চরিত্রকে দীপ্তি দানের প্রচেষ্টা। ভীষ্ম, গান্ধারী, বিদুর, কর্ণ যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। অন্যদিকে মহাভারতে কুরুপা-বের যুদ্ধ-সমাপ্তি এবং পা-ব পক্ষের সিংহাসনারোহন ঘটে।

বাসুদেব নন্দন কৃষ্ণ যাদবশ্রেষ্ঠ। তিনি কেবল নরপতি নন, কালান্তরে ভগবান কৃষ্ণ। যদুবংশে তিনি কখনোই রাজসিংহাসনের অধিকারী ছিলেন না। কিন্তু রাজা না হয়েও তিনি রাজ-অধিক ক্ষমতাধারী। তিনিই পা-বদের প্রতিষ্ঠা ও মন্ত্রণাদাতা ঈশ্বর স্বয়ং বিষ্ণুর বরপ্রাপ্ত। অন্য অর্থে তিনিই যুগে যুগে সম্ভবামি সত্য হয়ে ফিরে ফিরে আসেন। কিন্তু এই ঈশ্বর মহিমার কৃষ্ণও খোদ বেদব্যাসের হাতেই যেন বাস্তব হয়ে ওঠেন। কারণ যুগের অনিবার্য প্রবহমানতা আর কালের সত্যই নির্ধারণ করে দেয় তাঁর ভবিতব্য। আত্মীয় হত্যার বিরাট যজ্ঞ কুরুক্ষেত্রেই অভিশপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। কেননা জ্ঞাতিক্ষয়কর যুদ্ধ নিবারণে সমর্থ হয়েও কৃষ্ণ তা করেননি। গান্ধারী তাঁকে অভিশাপ দেন অপঘাতে মৃত্যুর ভবিষ্যতবাণী দিয়ে। এই ভবিষ্যতবাণী আধিদৈবিক হলেও স্বয়ং কৃষ্ণর বাস্তব মৃত্যু যা খুব স্বাভাবিক, একান্তভাবে তা-ই সমস্ত পৌরাণিক বিশ্বাস খ-নে যথেষ্ট। পরিশ্রান্ত কৃষ্ণের পদতলে একজন ব্যাধের তীর এসে আঘাত করলে তিনি নিহত হন। যিনি মহাবীর অর্জুনের সারথী, যুদ্ধ না করেও বিরাট কৌশলী, সময় সময় ঐশ্বরিক শক্তি ভর করে পা-বদের জেতানোর যাবতীয় পরিকল্পনাকারী―তার এহেন মৃত্যু, গান্ধারীর অভিশাপ তাঁকে সাধারণ মানুষের স্তরে নামিয়ে আনে। যদুবংশ ধ্বংসের ইঙ্গিতসহ অসংখ্য মৃত্যুর জন্য দায়ী কৃষ্ণ। অভিশাপ-গঞ্জনার এ-আরেক নমুনা নয়কি!

এই যদুবংশ ধ্বংসের নায়কই মহাভারতের ‘মৌষল পর্বে’র শ্রীকৃষ্ণপুত্র শাম্ব। পৌরাণিক অভিধানে উল্লেখ :

একবার বিশ্বামিত্র, কণ¦ ও নারদ মুনি দ্বারকায় গেলে যাদবগণ কুবুদ্ধিবশত: কৃষ্ণপুত্র শাম্বকে পেটে কাপড় বেঁধে গর্ভিনী-বেশে সজ্জিত করে ঋষিদের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন যে, ইনি বভ্রুর স্ত্রী, এঁঁর কি সন্তান হবে? মুনিরা প্রতারণা ধরতে পেরে ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন যে শাম্ব এক লৌহমুষল প্রসব করবে, যদ্দারা যদুবংশ ধ্বংস হবে। পরদিন শাম্ব এক লৌহমুষল প্রসব করেন এবং যাদবগণ সেই মুষলচূর্ণ করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন।১ (পৌরাণিক অভিধান ১৪১২ : ১২৪, ৫০৩)

যাদব বংশ একসময় অন্যায় ও পাপে ছেয়ে যায়। এরই ফলস্বরূপ তারা ক্রমশ ধ্বংসমুখি হয়। সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত পুরাণ কথিত মুষলচূর্ণ থেকে উৎপন্ন এক রকম তৃণের আঘাতেই যদুবংশ ধ্বংস হয়। শ্রীকৃষ্ণ ও জাম্ববতী পুত্র শাম্বের এই পরিণতি তার প্রতি ভয়ংকর অভিশম্পাতেরই ফল। কিন্তু এই শাম্বকেই শাম্ব পুরাণে ব্যক্ত করা হয়েছে ‘বিবস্মান’ বা সূর্য বলে। সে রূপময়, দারুণ সুপুরুষ, দিবসে উদিত উজ্জ্বল আলোকধারা। পুরাণের নানা পল্লবিত কাহিনিতে শাম্ব নানা ভাবেই চিত্রিত। মহাভারতের যুদ্ধে তার পিতা কৃষ্ণ ছিলেন দুর্যোধনের ভিন্ন পক্ষে। কিন্তু শাম্বই পরবর্তীকালে দুর্যোধন কন্যা লক্ষ্মণাকে স্বয়ংবর সভা থেকে হরণ করে। এ-কাজের পর কৌরবরা তাকে বন্দি করে। কিন্তু পিতার বড়ভাই বলরামের খুবই প্রিয়পাত্র ছিল শাম্ব। তিনিই শাম্বকে এদের হাত থেকে মুক্ত করেন। তবে শাম্ব সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ঘটনা―মুষলপ্রসব ও যদুবংশ ধ্বংস। কিন্তু এই যদুবংশ ধ্বংসের জন্য দায়ী ব্যক্তিটিকেই কালকূট ভিন্নভাবে রূপায়িত করেন। সেই কাহিনিতে শাম্বের লক্ষ্মণাহরণ বা মুষলপ্রসব নয় বরং প্রাধান্য পায় পাপ ও শাপমুক্তির আখ্যান। পুরাণ-ভাঙা সেই নবকাহিনির নায়ক শাম্বও অভিশপ্ত। কিন্তু পরিণামে পাপ-আত্মোপলব্ধি ও মুক্তিতে অনন্য চরিত্ররূপে প্রতিষ্ঠিত।

কালকূট ঔপন্যাসিক সত্তার আড়ালে গল্পকথনের এক স্বতন্ত্র কৌশল অবলম্বন করেন। মানুষ, সমাজ, বাস্তবতা, রাজনৈতিক প্রসঙ্গ সেখানে প্রতীকের অন্তরালবর্তী। কালকূট-সাহিত্য মহাভারত ও অন্যান্য ভারত-পুরাণের আলোকে ইতিহাস-দর্শন পরিশ্রুত হয়ে মানব মনের নৈকট্য এবং এর সার্বজনীনতা অন্বেষণকামী হয়ে ওঠে। তাঁর রচনার বিচিত্র চরিত্রে আত্মাহুতি, ভালোবাসা, স্নেহ ও আত্মচেতনাকে তিনি ফুটিয়ে তোলেন। বস্তুত আধুনিক নিঃসঙ্গ মানুষকে তার বিদ্রোহ ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তিনি শাপমুক্ত করেন। অন্তর্দ্বন্দ্ব ও দায়িত্ববোধ এখানে চরিত্রের অন্যতম চালিকা শক্তি। বস্তুত তিনি পুরাণ-মোড়কে মানবতাকেই আশ্রয় দেন। পুরাণকথিত ঐতিহাসিক পথ, কিংবদন্তীর অন্বেষণে বিচিত্র আঙ্গিকে মানুষকে জানার ও ধরার চেষ্টা করেন তিনি। তেমনি করেন ঐতিহ্য-অনুসন্ধান এবং পুরাণের নবনির্মিতি।

পৌরাণিক কাহিনি, ইতিহাস ও দর্শনের নানা পথ বেয়ে কালকূট পেতে চান নিগূঢ় জীবনসত্যের সন্ধান। কালকূটের এই পথ-পরিক্রমা গভীরতর দার্শনিক সংকেত-সমৃদ্ধ। ধর্মীয় ব্যাখ্যা থাকলেও গূঢ় ঐতিহাসিক সত্য-সন্ধানে তাঁর অন্বিষ্ট বিষয় আসলে মানুষ এবং মানুষের সমাজ। পুরাণনির্ভর শাম্ব, প্রাচেতস্, যুদ্ধের শেষ সেনাপতি, পৃথা ও অন্তিম প্রণয় এই পাঁচটি উপন্যাসেই বিধৃত হয়েছে পুরাণ-চেতনা, পুরাণের নতুন ব্যাখ্যা। আবার তার মধ্য দিয়েই তিনি করেন স্বদেশ ও সমাজের সংগ্রামী চরিত্রের স্বরূপ-অন্বেষণ। কালকূট মহাভারতের রচনা থেকে উদ্ধার করেন, ‘ইতিহাসবিদং চক্রে পূণ্যং সত্যবতীসুতঃ’ (কালকূট ১৯৯৬ : ১০১৫)।―একথায় বোঝা যায়, মহাভারত একটি ইতিহাস গ্রন্থও। কিন্তু ইতিবৃত্তের অলৌকিকতা থেকে সত্য-সন্ধানই লেখকের উদ্দেশ্য। কালকূট পুরাণকারের সংকেতাচ্ছন্ন ইতিহাসকে এভাবেই দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে: ‘ভারতকাহিনী ভারতেরই বৈদিক অথবা প্রাক-বৈদিক যুগের ভারতীয় ইতিহাস।’ (কালকূট ১৯৯৬ : ১০১৫)। পুরাণের নির্মোক খসিয়ে কালকূট যে-সত্যের কাছাকাছি পৌঁছান তাতেই তিনি অনন্য শিল্পস্রষ্টা হয়ে ওঠেন।

মহাভারতকে কালকূট আধুনিক বৈজ্ঞানিক মন নিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছেন। ফলে অতীত গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয় আধুনিকতাবোধ। শাম্ব উপন্যাসে শ্রীকৃষ্ণ পুত্র শাম্বের পাপ, অভিশাপ ও প্রায়শ্চিত্তে মানব-মুক্তির আকাক্সক্ষাই পরিস্ফুট। শাম্ব উপন্যাসে ধর্ম ও ইতিহাসের প্রসিদ্ধ মানব কৃষ্ণপুত্র শাম্ব। অভিধানে উল্লিখিত, সে ‘শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী জাম্ববতীর গর্ভজাত অন্যতম পুত্র।’২ (পৌরাণিক অভিধান ১৪১২ : ৫০৩)। শাম্ব চরিত্র-নির্মিতির মাধ্যমে কালকূট আবিষ্কার করেন প্রাচীন কালের একজন প্রভূত প্রভাবশালী ও ত্যাগী এবং মানবতায় উচ্চকিত সংগ্রামশীল ব্যক্তিকে। সূর্যসাধনার কঠোর নিয়মতান্ত্রিকতার সংযম অনুশীলন করে শাম্ব চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সবলতা অর্জন করে। শাম্বই হল ভারতপুরাণে প্রথম সূর্যসাধক। শাস্ত্রীয় পূজার নিয়মকানুন সে পালন করেনি, বরং রোগগ্রস্ত দেহের আরোগ্য লাভের জন্য সূর্যসাধনা করেছে। শাম্বপুরাণ-এ সৌরসাধক শাম্ব সম্পর্কে জানা যায়। সূর্য বংশের কুলগুরু বশিষ্টমুনি সূর্যবংশীয় রাজা বৃহদ্বলকে বলেছেন :

কৃষ্ণপুত্র শাম্ব রোগমুক্তির জন্য সূর্যের সহস্র নামের সাধনা করতে করতে কৃষ্ণও দুর্বল হয়ে পড়েছেন। সূর্যদেব তখন শাম্বকে স্বপ্নাদর্শন করিয়ে বলেন, কষ্টসাধ্য সহস্র নামের পরিবর্তে শাম্ব তার একুশটি গোপনীয় পবিত্র ও মঙ্গলদায়ক নামগুলিরই আরাধনা করুক। পরবর্তীকালে সেই একুশ নামই সূর্যস্তবরূপে চিহ্নিত হবে। যেমন―বিকর্তন, বিশ্বায়ন, মার্ত-, ভাস্কর, রবি, লোক প্রশাসক, শ্রীমান, লোকচক্ষু, গ্রহেশ্বর, সপ্তাশ্ববহন, গভস্তি হস্ত, ব্রহ্মা, লোকসাক্ষী, তিলোকেশ, কর্তা, হর্তা, তমিস্রহা, তপন, তাপন, শুচি, সর্বদেব। শাম্ব এই একুশ নাম জপ করেই রোগ নিরাময় করেছে। (চক্রবর্তী ১৯৯৫ : ৯৪-৯৫)

এই হল সাম্ব পুরাণ কথিত সৌর সাধনার ইতিহাস। সাম্ব পুরাণ থেকে গৃহীত এই ‘শাম্ব কাহিনি’ মূলত ঘটনা ও সংকেত দ্বারা সংগৃহীত। উপন্যাস-শিল্প সৃষ্টির মানসে লেখক আসলে কল্পনা-সূত্রে গেঁথে পুরাণকাহিনির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁর কাছে শিল্পের ভূমিকাই প্রবল। তিনি প্রত্যক্ষ করেন―সৌর-সাধনার কঠোর অনুশীলনের ভেতর পার্থিব সংগ্রাম-চিত্র। সাহিত্যিক-ঐতিহাসিক অদ্বৈতচর্চার মাধ্যমে কালকূট পাঠককে ইতিহাস ও সাহিত্যের গোধূলি-সন্ধিতে নিয়ে যেতে চান। সেখানে সাহিত্য ও ইতিহাস উভয়েই নির্দিষ্ট সীমারেখায় একে অপরের সঙ্গে যুক্তবেণীবদ্ধ। এ-উদ্দেশ্য নিয়েই মানুষের চিরন্তন রূপ-উদ্ঘাটন করেন তিনি। পুরাণের পাতায় পাতায় ভারত-দর্শন ও ঐতিহাসিকতা অন্বেষণ করেন তিনি মানুষের চরিত্র পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই।

পুরুবংশীয় কৌরবদেব মধ্যে নারদমুনির কথা জানা যায়। পরিভ্রমণের মধ্য দিয়ে যাবতীয় পার্থিব সংবাদ গ্রহণ করে তিনি অশেষ জ্ঞানের অধিকারী হয়েছিলেন। সে-সঙ্গে তাঁর চরিত্রে প্রচ-তা ও কুটিলতাও লক্ষণীয়। এই নারদমুনির কোপানলই শাম্ব জটিলতার মূল কারণ। দ্বারকাপুরীতে নারদমুনির আবির্ভাবে শাম্ব কাহিনির সূত্রপাত। কৃষ্ণসহ বৃষ্ণিগণ যখন মহর্ষির সাদর অভ্যর্থনায় রত তখন পুষ্পবনে সহচরিদের নিয়ে ব্যস্ত ছিল রূপবান শাম্ব। মহর্ষির দিকে সে একবারের বেশি তাকাবার অবকাশ পায়নি। মহর্ষি এতেই রুষ্ট হয়ে শাম্বের সকল অহংকার চূর্ণ করার মনোবাসনা করেন। ষড়যন্ত্র করে পিতা কৃষ্ণকে পুত্রের বিরুদ্ধে দাঁড় করান নারদ। শাম্বর আপন রূপই তার জন্য শত্রু হয়ে ওঠে। গোপবালাদের সঙ্গে শাম্ব পাপকর্মে লিপ্ত বলে কৃষ্ণের কাছে অভিযোগ আনেন নারদ। রৈবতক পর্বত সন্নিকটে ভিন্নপুরুষ প্রবেশ-নিষিদ্ধ প্রমোদ-কাননে ষোলশত গোপীসহ জলক্রীড়ায় মগ্ন কৃষ্ণের কাছে নারদের কূটকৌশলেই শাম্বকে উপস্থিত করা হয়। মুহূর্তেই স্খলিত বসনা রমণীরা রূপবান শাম্বের প্রতি কামনাবিহ্বল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। জাম্ববতী, সত্যভামা ও রু´িণী ছাড়া আর সব নারীই শাম্বের প্রতি কামাসক্ত; এটি প্রত্যক্ষ করে কৃষ্ণ অস্থির ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি মহর্ষির ষড়যন্ত্রের কূটচক্রে ফাঁদে ধরা দেন। নির্দোষ পুত্রের প্রতি তাঁর চরম রোষ উপস্থিত হয়। রোষ ও ঈর্ষায় প্রজ্জ্বলিত কৃষ্ণ অভিশাপ বর্ষণ করেন―‘তোমার এই রমণীমোহন রূপ নিপাত যাক। কুষ্ঠরোগের কুশ্রীতা তোমাকে গ্রাস করুক।’ (কালকূট ১৪২২ : ৪৪)। এমনকি তিনি শাম্বের প্রতি মোহগ্রস্ত ও কামবিহ্বলদৃষ্টির রমণীদের প্রতিও কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, ধিক্কারের সুরে উচ্চারণ করেন―‘তোমরা আমার রক্ষিত হয়েও অতি নিকৃষ্ট আচরণ করেছ। অতিপ্রমত্তা হয়ে তোমরা যেমন পণ্যাঙ্গনাদের ন্যায় ব্যবহার করেছ, আমার মৃত্যুর পরে, তোমরা তস্করদের দ্বারা লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত হবে।’ (কালকূট ১৪২২ : ৪৪)

শাম্ব আসলে ভাগ্যচক্র-পীড়িত মানবাত্মার প্রতীক। সূর্যতপস্বী শাম্ব তপস্যা ও আত্ম-অন্বেষণে মহামানব হতে চেয়েছিল। কিন্তু নিয়তির অভিশাপকে অতিক্রম করতে পারেনি। ‘মিথ অব সিসিফাসে’র প্রসঙ্গ এখানে অনিবার্য। তবু মানবজীবনের প্রকৃত সংগ্রাম বিপুল দুঃখ ও অভিশাপেরই বিরুদ্ধে। মর্ত্যে অমরাবতী কখনোই সৃষ্টি করা সম্ভব নয়, তবু এই অসম্ভব প্রয়াসের মধ্যেই মানুষের শ্রেয়বোধ জাগ্রত হয়। শাম্ব উপন্যাস তাই শাম্বেরই আত্মোপলব্ধির ইতিহাস। এখানে কালকূট পুরাণ ও চলমান সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন। তিনি দেখান, শাম্ব বিনা দোষেই মহর্ষির দ্বারা শাপগ্রস্ত। সে স্বেচ্ছায় ঋষিকে অপমান করেনি। কিন্তু নেমেসিসের নির্মম অভিশাপ নেমে আসে তার জীবনে। মহর্ষিকে একবার দেখতে পেয়েও তার প্রতি কী আচরণ করা উচিত সে বুঝে উঠতে পারে না। কারণ তখন প্রণয়লীলায় সে মগ্ন।

তবে পুরাণ-বর্ণিত নারদের প্রতি শাম্বের অবজ্ঞাকে কালকূট প্রাধান্য দেননি। বরং মানবিক দুর্বলতার বিষয়টিকেই প্রধান করে তুলেছেন। শাম্ব ‘সবসময় মহাত্মা নারদের অবজ্ঞা করতেন’ মূলের এ-বাক্যটিকে সচেতন প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত করতে তিনি সংযোজন করেন : ‘শাম্ব আচরণবিধি জানেন না, এমন না, তবু ভুলে গেলেন।’ (কালকূট ১৯৯৬ : ৯৮১)

শাম্বের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, গৃহত্যাগ করে মিত্রবন-গমনপথে তার সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তির (পুজারিণী ধীবর মাঝি ঋষিতুল্য ব্যক্তি) সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ ঔপন্যাসিক কল্পনা। কিন্তু পুরাণ-কাহিনির অলৌকিকতা পরিপূর্ণরূপে বর্জন করা এ-ধরনের উপন্যাসে সবসময় সম্ভব নয়। যেমন: মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধুতেও তা সম্ভব হয়নি। চরিত্রসমূহের নাম এবং কারবালা যুদ্ধের নানা তথ্য লেখককে অবিকৃত রাখতে হয়েছিল। এজিদ-হৃদয়ের রক্তক্ষরণজনিত যন্ত্রণাটুকুর আশ্রয় নিয়েই ঔপন্যাসিক সেখানে কল্পনার রঙ চড়িয়েছেন। এখানেই তিনি সার্থক। নিয়তির নায়ক শাম্ব পিতা কৃষ্ণকর্তৃক যে ব্যাধিগ্রস্ত হওয়ার অভিশাপ পান সেটি পূর্বঘোষিত। কৃষ্ণ তাকে জানান জন্মলগ্ন থেকেই কুষ্ঠরোগের মতো কুৎসিত ব্যাধি শাম্বের ভাগ্যলিপি। নিয়তির এই চরম নির্দেশনাকে অমোঘ মেনেই দুর্ভাগ্য থেকে উত্তরণের পথ-সন্ধান করতে হয়েছে তাকে। দুর্ভাগ্যের জন্য নিয়তি নির্দেশিত অভিশাপের কথা জেনেও শাম্ব অগ্রসর হয় মুক্তি-অন্বেষণে; এখানেই সে সংগ্রামশীল অথচ ‘মিথ অব সিসিফাসে’ আক্রান্ত মানবসত্তা। শাম্বের মুখে উচ্চারিত হয় :

আমার ভাগ্যের এই অমোঘ অনিবার্য পরিণতি জেনেও আমি নিশ্চেষ্ট থাকবো না। প্রয়োজন হলে মুক্তির জন্য আমি এই সসাগরা পৃথিবী, দেবলোকে, অন্তরীক্ষে সর্বত্র যাবো। (কালকূট ১৯৯৬ : ৯৯৩)

নারদ প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণের অভিশাপ দ-ে দ-িত হলেও শাম্ব ভেঙে পড়েনি। সে বিশ্বাস হারায়নি আত্মশক্তিতে বরং নারদের কাছে মেনে নিয়েছে তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা। ব্যাধি-আক্রান্ত শাম্ব মিত্রবনের উদ্দেশ্যে গমন করে। নারদ নির্দেশেই সে রোগমুক্তির যন্ত্রণা-জর্জর ক্লেশময় পথ-পরিক্রমায় অংশ নেয়। চন্দ্রভাগা নদী তীরে উপস্থিত হয়ে শাম্ব দেখে জীবনের প্রতি বিশ্বাসহীন কুষ্ঠরোগীর দলকে। সমাজ-সংসার বহিষ্কৃত এ-সমস্ত মানুষ যদৃচ্ছ জীবন কাটায়। অবাধ যৌনাচারের মধ্য দিয়ে এরা সন্তান উৎপাদনও করে। একদিন আরোগ্যের আশা নিয়েই এরা মিত্রবনে এসেছিল। কিন্তু ব্যাধিতে ভুগে তাদের জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। এজন্যই শাম্ব-র মনে হয় :

এদের কোন আশা নেই, অতএব, কোনো বিশ্বাসও নেই। অথচ এরা অবিশ্বাসী ছিল না, তাহলে এখানে আসতো না। (কালকূট ১৯৯৬ : ১০০০)

শাম্ব এই হতাশ ব্যাধিগ্রস্তদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে চান। তিনি কঠিন সাধনার পথে আরোগ্য লাভের অনুসন্ধান তাদেরকে দিতে চান। অথচ স্বীয় অভিশাপের অমোঘতা সম্পর্কে তার দ্বিধা নেই―‘অভিশাপ জিজ্ঞাসার অতীত। এ অমোঘ এবং অনিবার্য। এ ভাগ্যের পরিহাস না, নির্দেশ।’ (কালকূট ১৯৯৬ : ৯৯৩)। এ-নির্দেশে অঙ্গীভূত হয়েই শাম্ব অতিক্রম করে বহু দুর্গম পথ, সহ্য করে তথাকথিত সুস্থ মানুষের অকারণ কটূভাষ অথবা কারুণ্য, জয় করে আধিভৌতিক তথা আধিদৈবিক বিপদের ভয়। ‘শাপমোচনেই তোমার জীবনের মোক্ষলাভ। … আমার কেন এমন দুর্ভাগ্য হল, অপরের কেন হল না, এইরূপ প্রশ্ন বাতুলতা মাত্র।… কেননা জরা আছে, ব্যাধি আছে, মৃত্যু ঘটে এইসব নিয়ে মানুষ বিলাপ করে, শোকাকুল হয়। অথচ এসব আক্রমণের থেকে কারুরই রেহাই নেই।…ব্যক্তির দুর্ভাগ্যের জন্য তাকে একাকী সংগ্রাম করতে হয়।’ (কালকূট : ৯৯৮)। শাম্ব স্বীয় চেষ্টায় মুক্তি লাভের পথ অনুসন্ধান করেছে। ঋষির মুখে শুনেছে সূর্যদেবের আরাধনার কথা। সে সূর্যালোকের দ্বাদশ স্থান পরিভ্রমণ করে কেবল একার নয়, সকলের রোগমুক্তি চায়। মিত্রবনের রোগজীর্ণ বিশ্বাসহীন সমাজকে দেখে শাম্বের মনে হয়―‘এদের মুক্তির কি কোনো উপায় নেই? তাঁর নিজের মুক্তিরই বা কি উপায়।’ (কালকূট ১৯৯৬ : ১০০১)

শাম্বের সংগ্রাম একক দুর্ভাগ্যের জন্য নয়। এখানে ব্যক্তির পাপ মূলত সমাজেরই পাপ। তাই ব্যক্তির দুর্ভাগ্যের দায় নিতে হয় সমাজের সকলকেই। আত্মানুসন্ধানে প্রবৃত্ত মানুষ যখনই তার ব্যক্তিসত্তার গভীরে যেতে চায়, অন্বেষণ করে মুক্তির, তখনই সে ব্যক্তিসত্তাকে সমাজের ব্যাপক অংশে বিধৃত দেখতে পায়। তাই যে-কোনো সৎ-সাধনার পশ্চাতে থাকে যথার্থ সমাজবোধ। লক্ষণীয় যে, ‘শাম্ব পুরাণে’ শাম্ব সূর্যকে প্রসন্ন করে মুক্তি পেয়েছিল ব্যাধি থেকে এককভাবে। কিন্তু এ-উপন্যাসে সচেতনভাবে কালকূট শাম্বের সাধনাকে একাকিত্বের সাধনায় অভিষিক্ত না করে সমাজবোধের সঙ্গে যুক্ত করেন। পুরাণে শাম্বের সাধনা আত্মকেন্দ্রিক, কালকূটের সাধনা আত্মবোধের সঙ্গে জড়িত হয়েও সমাজবোধে উৎসারিত। কিন্তু অবিশ্বাসী হতাশাগ্রস্ত কুষ্ঠ রোগীর দল শাম্বের কথায় আস্থাশীল হয়নি। একজন বিদ্রƒপ করে ওঠে :

কিন্তু ও যে কী সব বিশ্বাস-ফিশ্বাসের কথা বলছে। ওসবতো মিথ্যা, ছলনা। শাম্ব তখন বলে, যার বিশ্বাস হারায় তার সবই হারিয়ে যায়। (কালকূট ১৯৯৬ : ১০০৭)

তারা মনে করে তাদের সবই হারিয়ে গেছে। তাদের আর কোনো কিছুতেই বিশ্বাস নেই। শাম্ব উত্তরে বলে :

আমার সঙ্গে তোমাদের এই প্রভেদের কথাই বলছিলাম। আমি বিশ্বাস করি, আমার পাপই আমাকে বিনাশ করতে উদ্যত হয়েছে, আর একমাত্র মুক্তির উপায় দুষ্কর প্রায়শ্চিত্ত। এই আমার বিশ্বাস। (কালকূট ১৯৯৬ : ১০০৭)

শাম্ব উপলব্ধি করে তার অতীত জীবন এখন আর স্মৃতি ছাড়া কিছুই নয়। জীবনের সুখ ও বিলাস তাকে স্পর্শক্ষম নয়। আর এজন্যই প্রতিশ্রুতিশীল লক্ষ্য ছাড়া কোনো কিছুই তাকে বিচলিত করে না। তবে সকলের দুর্ভাগ্যকে এক করে নিয়েও তাঁর পথ স্বতন্ত্র। ঋষিবাক্য অনুসরণ করে সে পৃথক অন্ন ও আশ্রয় গ্রহণ করে, অবাধ শৃঙ্গারে উন্মত্ত হয় না। এটা আত্মাকে অন্যভাবে আবিষ্কার করারই একটা উপায়। তার সত্তাকে সে সমাজের বৃহৎ অংশে ছড়িয়ে থাকতে দেখে। ঐ-সব হতভাগ্য কুষ্ঠরোগীরা তো তারই সত্তাকে বহন করে চলে। আত্মোপলব্ধির পথ তো এই। শাম্ব চরিত্রের এ-হেন পরিবর্তনে আমরা আরও একবার বুঝতে পারি পুরাণ-চর্চার উদ্দেশ্য কালকূটের নেই বরং পুরাণের মুকুরে আত্মদর্শনই তাঁর অন্বিষ্ট।

কুষ্ঠরোগী জীবনের প্রতি চরম অবিশ্বাসী মানুষদের যদৃচ্ছ যৌনবাসনাকে অস্বীকার করেই শাম্ব তার প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হয়েছিল। তার কর্মপথে সূর্যমন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থের প্রয়োজন পড়লে সে দ্বারকায় যায়। পতœী লক্ষণা কান্নায় ভেঙে পড়ে শাম্বকে পূর্বের মতোই স্বামীরূপে পেতে চায়। কিন্তু সেই রাজপুত্রের বেশ ও বিলাসবহুল জীবন তখন তার নয়। তাই সে বলে :

নিতান্ত অর্থের প্রয়োজনেই আমি এখানে এসেছিলাম। আমার অতীত জীবন আর কখনোই ফিরে আসবে না। তোমার যদি ইচ্ছা হয়, তবে যে-কোনো সময়ে পঞ্চনদীর দেশে, চন্দ্রভাগার তীরে মিত্রবনে ফিরে এসো। সেখানেই তোমার যদি বাস করতে ইচ্ছে হয়, বাস করো। আরও শোনো লক্ষণা, জীবন কখনো এক স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে না। তা সতত সঞ্চরমান, পরিবর্তনশীল। তুমি তপোবনে গেলে, রৈবতকের এই হর্ম্যতলের বিলাসকক্ষের জীবন পাবে না। তোমার স্বামীকেও পূর্বের ন্যায় পাবে না। (কালকূট ১৯৯৬ : ১০১১)

শাম্ব চরিত্রে বিশ্বাসের এই পরিবর্তন মূলত আধুনিক মানুষেরই বোধ।

নীলাক্ষী শাম্বের জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। জীবনের সুন্দর রূপে অনাস্থা ও ভোগ-উন্মত্ত নীলাক্ষী শাম্ব-স্পর্শে মানস-পরিবর্তন করে। ভোগ-সম্ভোগের জীবন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। মানবতার জন্য ত্যাগের মহিমায় অভিষিক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সে হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। মিত্রবনে উপস্থিত হয়ে প্রথমাবস্থায় শাম্বকে খাদ্য দানের পেছনে ছিল তার যৌন সম্ভোগকামনা। তার কামনার পেছনে নিজের প্রতি দুঃখবোধও ছিল। কিন্তু তার জন্য শাম্ব সমব্যথী হলেও মুক্তি-পথে যথেচ্ছা যৌনাচারকে বাধা প্রদান করে। তার প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়ায় নীলাক্ষীর রোষ ও অভিশাপ বর্ষিত হয়। কিন্তু পরিবর্তনশীলতার ছোঁয়ায় সে নতুন মানুষি-সত্তায় জেগে ওঠে। পরে নীলাক্ষীর সাহায্যেই সত্তর জন কুষ্ঠরোগীকে নিয়ে আরোগ্য লাভের মুক্তিপথে শুরু হয় শাম্বের যাত্রা। ‘দ্বাদশ স্থানে ও নদ নদীতে ¯œান করে, দ্বাদশ মাস পরে তিনি যখন আবার চন্দ্রভাগাকূলে অস্তাচলমান স্থানে ফিরে এলেন তখন তাঁকে বাদ দিয়ে চৌদ্দজন মাত্র জীবিত।’(কালকূট ১৯৯৬ : ১০০৯)। এই চৌদ্দ জন আজ নিজেদের যথার্থ অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। কালকূট দেখান মৃত্যুময় অসারতা অতিক্রম করে কুষ্ঠরোগীরা অনিবার্য মৃত্যুকে পেছনে ফেলে চলমান জীবনের প্রতি লড়াই অব্যাহত রেখেছে। লক্ষ্যে পৌঁছান সবার পক্ষে সম্ভব হয়ত নয় কিন্তু জীবন-প্রবাহকে তারা অস্বীকার করে না। নীলাক্ষীও শাম্বের জীবনে জড়িত হয়ে নিজস্ব লক্ষ্য নির্বাচন করেছে। বিবর্তনের পথ ধরে কামতাড়িতা এক নারীই অবশেষে প্রেমময়ী সত্তায় উত্তীর্ণ হয়। দ্বাদশ বর্ষশেষে ‘মূলস্থান মিত্রবন’, ‘কালপ্রিয় কালনাথ ক্ষেত্র’ ও উদয়াচলের সমুদ্রতীরের ‘কোন বল্লভ ক্ষেত্রে’ তিনটি মন্দির নির্মিত হয়। দীর্ঘদিনের সাধনায় অস্তাচলমান স্থানে পর্যায়ক্রমে অবস্থান করে শাম্ব কুষ্ঠরোগ মুক্ত হয়ে পূর্বরূপ ফিরে পায়। নীলাক্ষীও পরিণত হয় মন্দির গাত্রে অঙ্কিত অপ্সরারূপী নারীসত্তায়। কুৎসিত কামতাড়িতা অবিশ্বাসী এক নারী নীলাক্ষীর দৃষ্টিতে তখন নেমে আসে প্রেমমুগ্ধ দৈব দৃষ্টি। শাম্বের রূপে মুগ্ধ হয়ে সে তাকে ‘বিবস্বান’ অর্থাৎ সূর্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে চায়। তথাপি লেখক নীলাক্ষীকে দেবী বলতে নারাজ। মানবীসত্তায় উত্তীর্ণ হয়ে নীলাক্ষী বলে :

আমি এই সমুদ্র ও চন্দ্রভাগা তীরের মধ্যবর্তী স্থলেই থাকতে চাই। বৃষ্ণিরতœ, আমি আজীবন কোণাদিত্যের পূজা করবো, কিন্তু আমি নিতান্ত প্রস্তরের অপ্সরা মূর্তি নই। আমি মানুষ, তুমি আমার মহামৈত্র। তোমার দর্শনের আশায় আমার প্রাণ ব্যাকুলিত হবে। বৎসরান্তে একবার দেখা দেবে তো? (কালকূট ১৯৯৬ : ১০১২)

এই নীলাক্ষী প্রথম দিন মিত্রবনে শাম্ব-দর্শনে ছিল শরীরী কামনায় বিহ্বল। কুষ্ঠ-আক্রান্ত জরাগ্রস্ততায় দৈহিক কামনায় সুখ পেতে ব্যাগ্র সে। কারণ তখনও পর্যন্ত শুধু শরীর নয়, মনও তার মৃত।

এখন শুধু শরীরের ভেতরেই সময় আছে। যেমন জিভ দিয়ে খাবারের স্বাদ পাই। হয়তো মরার আগ পর্যন্ত এই সাড়ই থাকবে। এই সুখটুকু তুমি আমাকে কেন দেবে না? (কালকূট ১৯৯৬ : ১০০২)

ভোগবাসনার সে-ই নীলাক্ষী পরিবর্তিত হয়। জীবনের নতুন দার্শনিক উপলব্ধিতে হয় সমাসীন। নীলাক্ষীর মধ্যে সাধনা শেষে আসে ত্যাগের মহিমা, সত্যিকারের প্রেমাচ্ছন্নতা। যে-‘কোণাদিত্য ক্ষেত্রে’ নীলাক্ষী অবস্থান করেছে তার নাম দেওয়া হল মৈত্রেয় বন। কারণ শাম্ব উপলব্ধি করেছে নীলাক্ষীর মতো প্রকৃত বন্ধুর সাহায্যে মুক্তিপথ-অন্বেষণ সম্ভব। শাম্ব মিত্রবনে মগ ব্রাহ্মণদের প্রতিষ্ঠা করেছে। ব্যাধিগ্রস্তদের চিকিৎসা-ব্যবস্থা করেছে। শাকদ্বীপের ব্রাহ্মণদের সে এখানে এনেছে। অভিশাপ কী, ব্যাধি কী তা সে উপলব্ধি করেছে; ঐশ্বর্যপূর্ণ দ্বারকায় আর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে তার নেই। মহর্ষি নারদের শেষ আশীর্বাদ :

হে সর্বদেবমান্য, সর্বভূতমান্য, সর্বশ্রুতিমান্য হে শাম্বাদিত্য! আপনি সন্তুষ্ট হোন, আমার পূজা গ্রহণ করুন। … হ্যাঁ আজ থেকে এই বিগ্রহের আর এক নাম শাম্বাদিত্য। এই নামেই তিনি এখানে পূজিত হবেন। (কালকূট ১৯৯৬ : ১০১৩)

শাম্ব মানবিক সংগ্রামে উত্তীর্ণ হয়ে এভাবেই উপন্যাসে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আসলে শাম্ব উপন্যাসে প্রতীকী উপস্থাপনার মাধ্যমে কুষ্ঠরোগের অসারতাকে লেখক বর্তমান সমাজ-ব্যবস্থা ব্যাখ্যায় ব্যবহার করেন। কুৃষ্ঠরোগ দেহকে অসাড় করে দেয়। এই অসাড়তা তো এ-যুগেরই অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আত্মোপলব্ধি ও বিশ্বাসের অভাবে, যুগ-মানুষকে কালকূট দেখেছেন পঙ্গু হয়ে যেতে, অসাড় অস্তিÍত্ব বহন করতে। কুষ্ঠরোগ কেবল মানুষের দেহে নয়, মনে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আজ জীবনের মূল্যবোধ হারিয়ে নীতিভ্রষ্টতায় পতিত। সুখ-সম্ভোগ, বিলাস-ব্যসন আর আত্মবিস্মৃতির মধ্যে কোথাও তাদের জীবনের তাৎপর্য নেই। এই চরিত্রহীন মানুষের সামগ্রিক উত্থান ও সমষ্টিগত উন্নয়নের কথাই কালকূট বলেছেন। এখানেই পুরাণের সঙ্গে যুক্ত হয় আধুনিক বোধ। শাম্ব যখন নীলাক্ষীকে প্রশ্ন করে, ‘নীলাক্ষী তোমার চোখের এই মুগ্ধতা কীসের?’ উত্তরে নীলাক্ষী বলেছে―‘মানুষের’। কালকূটও এখানে মানুষ ও তার জীবন-সংগ্রামকে তুলে ধরেন। সমাজ ও মানুষ দর্শনে সামষ্টিক এ-চেতনা শাম্ব চরিত্রে পূর্ণতা এনে দিয়েছে। নতুন জীবনের সূচনা শুধু তাই শাম্বের অবদান নয়, এ-তার কৃত্যও। ইনডিভিজুয়্যালিজম ও কালেকটিভিজম-এর অপরূপ মেলবন্ধনের কল্পকাহিনি ভারত-পুরাণের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। কালকূটই তার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে আমাদের দৃষ্টি ফেরালেন। (ভট্টাচার্য ২০০৮ : ৬৯)। তাই দ্বারকাবতীর ভোগবাসনা তুচ্ছ করে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হয় শাম্ব। মহর্ষি নারদ সূর্যদেবকে পূজাঞ্জলি দিয়ে তাকে ‘শাম্বাদিত্য’ নামে সম্বোধন করলে―‘শাম্বের সারা শরীর শিহরিত হল।’ (কালকূট ১৯৯৬ : ১০১৩)। এখানে সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি―মনুষ্যত্বের সাধনায় আজ দেবতাও গৌরবান্বিত। শাম্বের নামে চিহ্নিত হয়ে সূর্য বা ‘আদিত্য’ই তার ধ্যান হল তখন। ফলে মানুষ কালকূটের কাছে দেবতার চেয়েও হয়ে উঠল মহীয়ান। কারণ কেবল মানুষেরই আছে অবিরাম জীবনপ্রবাহ, সংগ্রামশীলতা ও আত্মদর্শনের মহিমা।

শাম্ব উপন্যাসে লেখক মহাভারত-কাহিনির অংশ বিশেষে শাম্বের মতো একজন সংগ্রামী নেতার অন্বেষণ করেন। তাঁর প্রাচেতস্ (১৯৮৪) নামক একটি উপন্যাসের নায়ক প্রাচেতস্ও একইভাবে ব্যক্তিচরিত্রের পরিবর্তনের মাধ্যমে মনুষ্যত্ব-স্ফুরণকে প্রাধান্য দেয়। অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি, কুষ্ঠরোগ থেকে আরোগ্য প্রাপ্তি শাম্ব উপন্যাসে আধুনিক ব্যাধিগ্রস্ত জীবন থেকে রক্ষার পাওয়ার প্রতীক; এ-প্রতীকের আড়াল ভেঙে প্রাতেচস্ সরাসরি জীবনজিজ্ঞাসা-পূর্ণ :

আমার ভেতরে এখনও তুষারহিম অন্ধকারের স্তব্ধতা, অথচ তা কাঁপছে, এবং এর মধ্যে আমি একটি আনন্দধ্বনির তাল শুনতে পাচ্ছি। কি ঘটতে চলেছে আমি তা জানিনা। কেবল যে দুঃখ আমাকে বিকৃত ও মরণের ফাঁদে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, সেই দুঃখকে আমি অমৃতের স্বাদ পেতে চাই। আমি শুনেছি, দুঃখই মানুষকে মহৎ করে অথচ মহৎ আমি হতে চাইনি। পূর্ণ মানবতা আমার সাধনা। মহৎ হওয়ার থেকে মানবের পূর্ণতাই কঠিন, যা দুঃখকে গ্লানির অন্ধকার থেকে বের করে নিয়ে আসে, তাকে অমৃতের স্বাদে ভরিয়ে নিতে চায়। (কালকূট ১৯৯৬ : ১২৯৭)

পাপ-গ্লানি ও আত্মোপলব্ধির আখ্যান শাম্বের সঙ্গে তুলনা করা যায় প্রাচেতস্-এর। প্রাচেতস্ মহাকাব্যের ইতিবৃত্তীয় আঙ্গিকে তমসা তীরের রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকির অন্বেষণ। কালকূট আধুনিক কালের প্রেক্ষিতে পৌরাণিকতার সংযোজন করেননি; বরং পৌরাণিকতার ঐতিহ্যিক দর্পণেই তিনি আধুনিক মানুষের যন্ত্রণা, চিরকালীন মানুষ, তাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উত্তরাধিকারকে অন্বেষণ করেছেন। ইতিহাসের আঙ্গিনায় প্রাচেতসের অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি তার আত্মোপলব্ধির পথকে প্রশস্ত করে। রামচন্দ্রের কালে তাঁরই সমবয়সী রামায়ণ রচয়িতা প্রাচেতস্কে লেখক চরিত্র ও ঘটনার নিরিখে আধুনিক জীবন-অন্বিষ্ট করে তোলেন। কালকূটের বড় কৃতিত্ব এই যে, তিনি হিন্দু পুরাণের এক অতি প্রচলিত কাহিনির নায়কের আত্ম-উদ্বোধনকে আধুনিক মননের অস্তিত্বের আর্তির সঙ্গে একাত্ম করতে পেরেছেন। হত্যা-লুণ্ঠন-কামচরিতার্থতা-পাপ ও অন্যায়ের পর প্রাচেতসের যন্ত্রণা ব্যক্তিমানুষের একাকিত্বের যন্ত্রণা। আর্ত এক অস্তিত্বের আকাক্সক্ষাই তার মনকে রাজার আজ্ঞাবহ সৈনাপত্য গ্রহণে বাধা প্রদান করে। এ-বিশাল বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী, কর্ম ও ফলভোগও তাই তার একার; এ-অনুভব তাকে ভীষণভাবে তাড়িত করে। সংসারের নগ্ন বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করে তার অন্তরে শূন্যতার অনুভূতি জাগে :

তাহলে সারা জীবন ধরে আমি কি করে আসছি? কোন অন্ধকারে আমি আছি? সংসারের সব সুখের স্বপ্ন আমার ভেঙ্গে গিয়েছে।…আমি যে একা, একা।…পাপের এই একলা জীবনটা নিয়ে আমি কি করবো? কেমন করে এর থেকে মুক্তি পাবো। (কালকূট ১৯৯৬ : ১২৯০)

জীবনের মুক্তি-আকাক্সক্ষায় নব পথোন্মেষণে প্রাচেতস্ কোনো সরল সমীকরণ চায় না। কিম্পুরুষবর্ষ নারদ মুনির কাছে ‘উপবাসী ক্লান্ত রক্তাক্ত’ পায়ে ছুটেও তাই তার সমাধান আসে না। সঙ্গীরাও এক সময়ের হননমত্ত প্রাচেতসের উপলব্ধি ও দুঃখের স্রোতধারা আবিষ্কারে ব্যর্থ হয়। বুদ্ধের মতই সে মানবতার আর্ত-চিৎকার শুনতে পায়। সে-কান্না এখন গগনবিস্তারী; প্রকৃতিতেও তা পরিব্যাপ্ত :

এই প্রকৃতি কি কাঁদছে? দূর থেকে যে ঝর্ণার শব্দ আসছে―ঐ শুনতে পাচ্ছো, কুলকুল শব্দ সে শব্দেও কান্নার আভাস। (কালকূট ১৯৯৬ : ১২৮৪)

পৌরাণিক প্রাচেতস্কে কালকূট কিছুটা নিজের মতো করে তৈরি করেন। পুরাণে যে-অস্তিত্বের যন্ত্রণা নেই তিনি তা যুক্ত করে মনুষ্যত্ব ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষায় প্রাচেতসের অন্তর্জগতকে শতধাদীর্ণ করেন। আর তাই নারদ মুনি তার জীবনে নিমিত্ত মাত্র হয়ে উপস্থিত; কর্ম-পরিধি প্রাচেতসের স্বকীয়। নারদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় :

আমি নিমিত্ত মাত্র। তোমার মধ্যে শক্তি না থাকলে তোমার এ জগৎ আলোকিত হত না। একাই তুমি আলোকিত করেছো, কারণ তোমার মধ্যে সত্যের বোধ জাগ্রত হয়েছে। (কালকূট ১৯৯৬ : ১২৯২)

অজস্র নারকীয় শোণিতপাতের পর তীব্র দুঃখ-দহনে আত্মসমীক্ষার এক মহালোকে উপনীত হয়েছে প্রাচেতস্। এরই নাম আত্ম-উদ্বোধন, ঋষিরা তাকেই ‘তপোবন’ বলে। সংসারে মানুষের প্রত্যাখ্যান, প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রবঞ্চনা, পাপবোধের পুনর্জাগরণ তার জীবনে এনে দেয় ‘মহতী দুঃখে’র স্বাদ। আত্ম-উন্মোচনের পথে প্রাচেতস্ একাকী অন্তরে প্রকৃত-সত্তার তাৎপর্য খুঁজে ফিরেছে। একেই অস্তিত্ববাদীদের অঁঃযবহঃরপ বীরংঃবহপব৩ বলে। জীবনের প্রতি অসীম বিশ্বাস আর সীমাহীন প্রতীক্ষায়ও তাই তাকে মুষড়ে পড়তে দেখা যায় না। বিশ্ব প্রকৃতির তাৎপর্য অনুধাবন করতে করতেই সে অব্যাহত যাত্রাপথিকে রূপান্তরিত হয়। দুঃখের অন্ধকারে জীবনের আলোকতীর্থ খুঁজে ফেরাই এখন তার সাধনা। শাম্ব চরিত্রের সঙ্গে এই প্রাচেতস্ সঙ্গত কারণেই প্রাসঙ্গিক।

কালকূট পৌরাণিক-ঐতিহাসিক চরিত্রকে শরীরী প্রত্যক্ষতায় ধরতে গিয়ে তাদের বহিরাবরণ থেকে বের করে আনেন শাশ্বত মানবের ছবি। এসব চরিত্র-নির্মাণে লেখক-কল্পনার চেয়ে বাস্তবের যোগ বেশি। উপন্যাস-কলাকৌশলেও সেসব রচনা বাস্তবতা-অধ্যুষিত রস-জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। লেখকের আপন উপলব্ধিতে, তাঁরই সৃষ্ট চরিত্রের অন্তর্দেশে যে-অতৃপ্তি, অশান্তি, দিশাহীনতা ও কষ্টের সংবাদ পাই―তাতে আছে নিরন্তর আত্ম-আবিষ্কার। ব্যক্তির অস্তিত্বকে সার্থকতায় দেখতে চাওয়ার এই যে ক্লান্তিহীন প্রয়াস তা লেখকের আত্মোপলব্ধিরই আর্তি। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, তাদের জীবনবোধ, জীবন সংগ্রাম, দ্রোহ এবং যন্ত্রণায় ক্লিন্ন-ক্লিষ্ট মানুষের চিত্রাঙ্কন তাঁর অনন্য শিল্পিত ভাষ্য। শাম্ব উপন্যাসের কৃষ্ণপুত্র সামষ্টিক মানবের স্বতঃস্ফূর্ত গতির সঙ্গে মিশে যায়। কালকূটের সযতœচর্চা ও শিল্পিতায় শাম্ব চরিত্র পৌরাণিকতার খোলস ভেঙে পরিপূর্ণ আধুনিক মানুষের রূপান্তর।

                (মহাভারত―মৌষল, বিষ্ণুপুরাণ) সুধীরচন্দ্র সরকার (সংকলক), পৌরাণিক অভিধান, কলকাতা, নবম সংস্করণ-১৪১২।

২             (মহাভারত―মৌষল, বিষ্ণুপুরাণ) সুধীরচন্দ্র সরকার (সংকলক), পৌরাণিক অভিধান, কলকাতা, নবম সংস্করণ-১৪১২।

৩      “Existentialism” philosophy emphasizes on the ‘existence’ of individual human. After projecting the drawbacks of ‘artificial’ way of life, this philosophy then tries to give guidance as to how humans can live an æauthentic way of life” and so can make their existence ‘authentic’. This ‘guidance’ is something like that a person should reject every sort of objective values and standards. Truth relating to different aspects of life is to be found in pure personal experience of individual, which is subjective.

তথ্যসূত্র

কালকূট (১৯৯৬), প্রাচেতস্, কালকূট রচনা সমগ্র (ড. নিতাই বসু সম্পাদিত), তৃতীয় খ-, মৌসুমী প্রকাশনী, কলকাতা।

কালকূট (১৯৯৬), শাম্ব, কালকূট রচনা সমগ্র, পূর্বোক্ত।

         (১৪২২), শাম্ব, আনন্দ, কলকাতা।

চক্রবর্তী, শম্ভুনাথ (১৯৯৫), জাতীয় ইতিবৃত্ত ও কালকূট, সাহিত্যায়ন, কলকাতা।

ভট্টাচার্য, ¯েœহাশিস (২০০৮), ‘মন চল যাই ভ্রমণে’, কালকূট : অন্তহীন অন্বেষণ, পত্রলেখা, কলকাতা।

সরকার, সুধীরচন্দ্র (১৪১২), ‘মহাভারত―মৌষল, বিষ্ণুপুরাণ’ পৌরাণিক অভিধান (সঙ্কলক : সুধীরচন্দ্র সরকার), নবম সংস্করণ, কলকাতা।

Existentialism’s ‘Authentic Existence’ and ‘Moral Individualism’: http:// www.sikhphilosophy.net/ interfaith-dialogues/14483-existentialisms-authentic-existence

*****************************

 

জফির সেতু
………………..
মহাভারতের গুরু-শিষ্য 

দ্রোণাচার্য ও অর্জুন-মহাভারতের দুই চরিত্র। একজন ব্রাহ্মণ, আরেকজন ক্ষত্রিয়। একজন পরান্নভোজী, আরেকজন রাজকুমার। সর্বোপরি একজন গুরু, আরেকজন শিষ্য। এই দুই চরিত্রের ভেতরে আরও কত বৈপরীত্যমূলক বৈশিষ্ট্য আছে; আছে বৈসাদৃশ্য নানান ভাবে, নানান রূপে। একজন আশ্রিত, আরেকজন আশ্রয়দাতাদলের। এমনকী বয়েসের দিক থেকেও পার্থক্য বিপুল। ন্যায়ধর্ম ও শ্রেয়ধর্মেও তফাৎ আছে দুজনের। কিন্তু এরা সম্পর্কিতও পরস্পরের মধ্যে গুরু ও শিষ্য হিসেবে। সারা মহাভারতজুড়ে এ-সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত ছাপিয়ে উঠেছে-স্পর্শ করেছে ভক্ত ও পাঠকের হৃদয়। যেহেতু মহাভারত রচিত হয়েছে বহু যুগ ধরে, আর রচনাকারীও বহুজন, সেহেতু আমার মনে হয় ভারততীর্থের গুরুশিষ্য সম্পর্ক এখানে কীর্তিত হয়েছে গভীর অনুরাগ ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে। কুরুপা-বের যুদ্ধে দুই বিপরীত অবস্থানে থেকেও দ্রোণাচার্য ও অর্জুন  ভোলেননি মানবসভ্যতার সবচেয়ে কড়ি-কোমল এই সম্পর্কটির বন্ধন ও মাধুর্য। পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ সম্পর্ক বোধ হয় ওই একটিই; গুরুশিষ্য। বন্ধুত্বের মধ্যেও একটা গোপন চাওয়া ও দায় থাকে; এটিতে তাও কিন্তু নেই। আছে শুধু নম্র মধুরতা ও প্রেমের এক চিরাগত পরম্পরা। এই গুরুশিষ্য পরিচয়ই দ্রোণ ও অর্জুনকে মহাভারতের ইতিহাসে এক স্বর্গীয় দ্যুতি দান করেছে; আলোক-অলোক ছড়িয়েছে গোটা মানবসভ্যতায়ও।

দ্রোণাচার্য জন্মেছেন গরিব এক ব্রাহ্মণের ঘরে, জন্মের ইতিহাস যে খুব ভালো তাও কিন্তু নয়। মহর্ষি ভরদ্বাজ একদা গঙ্গাস্নানকালে আর্দ্রবক্ষ প্রায়নগ্ন অপ্সরা ঘৃতাচীকে দেখে কামার্ত হন, এতে ভরদ্বাজের শুক্রপাত হয়। মহর্ষি তার শুক্র নষ্ট করতে দিলেন না, রাখলেন একটি যজ্ঞীয় পাত্রে, যাকে বৈদিক ভাষায় বলে ‘দ্রোণ’। সেই দ্রোণ থেকেই জন্মকালে পুত্রের নামকরণও করেন-দ্রোণ। স্বাভাবিকভাবেই দ্রোণ বড়ো হলেন পিতার কাছেই, একা; মায়ের স্নেহবঞ্চিত হয়েই। সঙ্গে দারিদ্র্য নিশ্চয়, নতুবা দ্রোণ পিতার পেশাকে অবজ্ঞা করে অর্থাৎ ব্রাহ্মণত্ব ছেড়ে ক্ষত্রিয় হতে যাবেন কেন? আবার যাগযজ্ঞ পিতার পেশা হলেও ভরদ্বাজ পুত্রকে অস্ত্রবিদ্যাও শেখালেন, এমনকি বালক দ্রোণকে বেদ-বেদাঙ্গের পাঠসমাপণ করে শিষ্য অগ্নিবেশ্যর কাছে পাঠালেন সশস্ত্রবিদ্যা অর্জনের জন্য। গুরুগৃহে অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হিসেবে লাভ করলেন ‘ব্রহ্মশীর’ নামক চরমঅস্ত্রটিও। এখানে একটা কথা বলার আছে; আমার মনে হয় তখন পেশা হিসেবে ব্রাহ্মণ্য বেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল, এবং সভ্যতার বিবর্তনে, শানশওকতে ক্ষত্রিয়বৃত্তি ওপরের স্তরে চলে যাচ্ছিল; অথবা ব্রাহ্মণরা ক্ষত্রিয়দের কাছে সর্বত্র সম্মান পাচ্ছিলেন না। যদিও মহাভারতে স্থান বিশেষে ব্রাহ্মণদের যথেষ্ট সম্মানের কথা বলা হয়েছে, আবার ব্রাহ্মণ নিন্দার উদাহরণও আছে পরতে পরতে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দ্রোণাচার্যের প্রতি দুর্যোধন কিংবা ভীমের বিদ্রুপ ও শ্লেষ উদাহরণ হিসেবে আনা যেতে পারে। সেই সংকট যুগেই হয়ত, দ্রোণের জন্ম। পিতা ভরদ্বাজও বাস্তবজীবনে পেশা বা ক্ষুণিœবৃত্তিতে ছেলেকে বিপদে ফেলতে চাননি। যদি ব্রাহ্মণত্বে না টিকতে পারে, তাহলে ক্ষত্রিয় হয়েও উদোর ও সম্মান দ-ুই বাঁচাতে পারবে। ওই যুগ ব্রাহ্মণত্ব পেশা হিসেবে ঝুঁকির ছিল, তার আরেকটা নমুনা হয়ত পাই আমরা দ্রোণের বিবাহ ও পুত্রজন্মের পর কঠিন দারিদ্র্য দেখে। দ্রোণ অনিন্দ্যসুন্দর ছিলেন; জ্ঞানী ব্রাহ্মণ ও অস্ত্রবিদ হিসেবে খ্যাত হওয়ার পর বিয়ে করেছিলেন দেখতে সুন্দর নন, এমন এক নারী কৃপীকে। দরিদ্র বলে গরিব ঘরের কদাকার মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন এটা যেমন হতে পারে, আবার ব্রাহ্মণত্ব পেশা ছেড়ে ক্ষত্রিয় পেশায় ধাবিত হয়ে সমাজে ‘পতিত’ হিসেবেও দুর্ভাগ্য নেমে আসতে পারে তার জীবনে। পুত্র অশ্বত্থামাকে দুধ খাওয়াতে পারেননি দ্রোণাচার্য, এমনকি সারারাজ্য চষেও একটা দুধেল গাভী সংগ্রহ করতে পানেননি তিনি ব্রাহ্মণ্য পেশা দিয়ে। আমার মনে হয় পিতার দরিদ্র জীবনের দুস্থ অবস্থার সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের বাস্তবতা দ্রোণকে ব্রাহ্মণত্ব থেকে ক্রমশ ক্ষত্রিয়ত্বে ধাবিত করেছিল। মহামতি পরশুরাম এ-সময় ঘোষণা করলেন, তার সকল ধনরতœ ব্রাহ্মণদের বিলিয়ে দিয়ে বনবাসী হবেন। পরশুরামকে দেখার ইচ্ছে বহুদিনের দ্রোণের, সেই সঙ্গে যোগ হলো ধনসম্পদদানের খবর। দ্রোণ পৌঁছালেন পারশুরামে কাছে, এবং ভণিতা না-করেই উদ্দেশ্য নিবেদন করলেন। আমি আপনার কাছে ধন চাইতে এসেছি! ততক্ষণে পরশুরামের ভা-ার খালি অপর ব্রাহ্মণদের থলিতে। তিনি দ্রোণের পরিচয় জেনে বললেন, আমার বয়োবৃদ্ধ শরীর ও কিছু দৈবঅস্ত্র ছাড়া তো আর আমার বিশেষ কিছু নাই? দ্রোণ পরশুরামের কাছে ক্ষত্রিয়ত্বের অস্ত্রশস্ত্রই চাইলেন। এতে দ্রোণের সামরিক শক্তি বাড়ল, সঙ্গে মনোবলও।

দ্রোণের মনস্তত্বে অনেক সংকট ছিল। ছিল দুই বৈপরীত্বগুণও চরিত্রজুড়ে। উচ্চম্মন্য ও হীনম্মন্যতা। একটি ক্ষয়িত্রয়ত্ব, আরেকটি ব্রাহ্মণত্ব। চরিত্র ছিল দ্বন্দ্ববহুলও। পরশুরামের কাছে দান গ্রহণ করতে গেছেন ব্রাহ্মণ হিসেবে, আবার ধন না-পেয়ে নিয়ে এসেছেন ক্ষয়িত্রের সম্বল অস্ত্র। আবার সেই অস্ত্রে বলিয়ান হয়ে ব্রাহ্মণত্ব ভোলে ছুটে এসেছেন পাঞ্চাল রাজা দ্রুপদের দরবারে। দ্রুপদ তার সতীর্থ ও বন্ধু; যখন অগ্নিবেশ্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করতে যান তখন তাদের পরিচয় ও প্রণয় হয়েছিল। শিক্ষাসমাপণশেষে দু-বন্ধু বিদায়ের কালে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, দ্রুপদ কথা দেন পিতা পৃষত থেকে রাজ্য লাভ করলে অর্ধেকটা দ্রোণকে দেবেন। সেই কথামতো দরিদ্র ব্রাহ্মণ হাজির হন সদ্য রাজ্যলাভপ্রাপ্ত দ্রুপদের কাছে। দ্রুপদ কিন্তু অবজ্ঞা করলেন দ্রোণকে, এমনকি প্রথমে না-চেনার ভানও করলেন-এটা দ্রোণ মেনে নিতে পারেননি। এমনকি বন্ধুকে পূর্বের প্রতিজ্ঞা স্মরণ করিয়ে দিলে দ্রুপদ বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে; বউবাচ্চাসহ তোমার একরাতের খাবার দিতে পারি, তা নিয়েই বিদেয় হও। ব্রাহ্মণের আঁতে লেগেছিল কথাটি। দ্রুপদ আসলে এই কথা দেননি কখনো, তিনি আবেগে কিংবা বন্ধুতায় ঘোষণা করেছিলেন, আমি যদি রাজ্য লাভ করি, তাহলে তুমিও রাজভোগ পাবে আমার মতো। এর অর্থ এই নয় যে, অর্ধেক রাজ্য দিয়ে দেবেন দ্রুপদ, যা এসে চেয়ে বসলেন দ্রোণ। দ্রুপদের অটলতা, আর দ্রোণের চাওয়া কাল হলো পরে উভয়েরই জীবনে। একটা আক্রোশ নিয়ে রাজদরবার থেকে বেরুলেন দ্রোণ, সিদ্ধান্ত নিলেন দ্রুতই। তিনি চললেন পাঞ্চাল রাজ্যের পাশ্ববর্তী হস্তিনাপুর-কুরুরাজ্যে। কুরু-পাঞ্চালরা চিরবৈরী, এবং এদের একজনকে মিত্র করে আরেকজনকে কঠিন প্রতিশোধে দৃঢ়কল্প দ্রোণ উঠে এলেন খোদ কুরুদরবারে; শ্যালক কৃপাচার্যের রাজপরিবারের গুরুগিরির সূত্র ধরে। এখানে তিনি হয়ে উঠলেন নবীন কুরু-পা-বদের অস্ত্র ও দীক্ষাগুরু, আর শিষ্য হিসেবে পেলেন কর্ণসহ পঞ্চপা-ব; পঞ্চপা-ব-শ্রেষ্ঠ ঘনচুলের তীক্ষèধী দৃষ্টি বালক চিরশিষ্য অর্জুনকে। শিক্ষাদান, রাজনীতি, মন্ত্রণা প্রভৃতি নিয়ে দ্রোণ নিজেও হয়ে উঠলেন এক পরমপিতা ও আচার্য-দ্রোণাচার্য। আর এর সবই প্রকাশ অর্জুনের প্রতি অপত্য স্নেহ ও অনুরাগকে ঘিরে। এই দুই মানব সন্তান একজনের ভেতরে ছবি দেখেছিলেন অপরজন। অর্জুনের জনমভর নায়ক ছিলেন দ্রোনাচার্য, সারাজীবন তিনি দ্রোণাচার্যই হতে চেয়েছেন। আর অচরিতার্থ দ্রোণাচার্য নিজের মূর্তি দেখেছেন আমৃত্যু অর্জুনের শরীর ও শৌর্যের মধ্যে। এই শ্বাশত সম্পর্কের জন্য দুজনই শুনেছেন নানা কথা দুর্মুখদের কাছে; পুত্র অশ্বত্থামার চেয়ে অর্জুনকে বেশি ভালোবাসেন দ্রোণাচার্য এটা তো সর্বত্রই জ্ঞাত। আবার অর্জুন অন্ধভাবে গুরুভক্ত বলে বিরুদ্ধদলের সেনাপতি সত্ত্বেও তাকে বাণবিদ্ধ করবেন না অর্জুন; এ-নিয়ে কানাঘুষা শুধু নয়, প্রকাশ্য কথাও হয়েছে। এমনকি কৌবরদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধরত দ্রোণাচার্য পা-বদের ক্ষতি চাননি কখনও, এই বলে দুর্যোধনের যে-খেদোক্তি, তা মিথ্যেও নয়। দ্রোণাচার্য নিজের জীবন বলি দিয়ে চেয়েছেন শিষ্যের জয়; শিষ্যের কাছে পরাজিত হয়ে তিনি চিরজয়ী হতে চেয়েছেন কুরুক্ষেত্রে।

যথার্থ গুরুই ছিলেন দ্রোণাচার্য। তার ব্যক্তিগত নীতি, আক্রোশ, উচ্চলিপ্সা যাই থাকুক-না কেন গুরু হিসেবে তিনি চিরমান্য। নিজের সন্তানকে পেশায় ব্রাহ্মণ করতে চাননি বলে জন্মের পর থেকেই অশ্বত্থামাকে অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে যথার্থ ক্ষত্রিয় করে তুলতে চেয়েছেন। তুলেছেনও। অবশ্যই তিনি পিতা হিসেবে চাইবেন পুত্র অশ্বত্থামা অদ্বিতীয় বীর হোন। পিতামহ ভীষ্মের ইচ্ছায় অর্জুনাদির অস্ত্রগুরু হয়ে রাজপ্রাসাদে সমস্ত আর্থিক সুবিধা পেয়ে শিক্ষাদান শুরু করলেন দ্রোণ। ভীষ্মের কাছে তিনি পেলেন নিরাপত্তা, প্রাচুর্য ও সম্মান; কিন্তু তার বুকের ভেতরে অপমানের আগুন। তিনি শিষ্যসহ নতুন করে দীক্ষা নিলেন শস্ত্রবিদ্যায়। নিজে যেমন নিত্যনতুন কৌশল আয়ত্ত করেন, শেখানও শিষ্যদের তেমন। তিনি এদের সবাইকে, নিজপুত্রসহ নিজের মতোই গড়ে তুলতে চাইলেন। যেন এরা প্রত্যেকেই হয় সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় বীর, চির অপরাজেয়। আর এর ভেতরে ক্রীয়মান অপমানের জ্বালা আর প্রতিশোধের স্পৃহা। এক সকালে কৌরবকুমারদের উদ্দেশ্যে দ্রোণ প্রসঙ্গ টানলেন, ‘আমার মনের গভীরে এক গোপন ইচ্ছে আছে। আমি তোমাদের অস্ত্রশিক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বীহীন করে তুলব; কিন্তু তোমাদের একটা কথা দিতে হবে। যোগ্য হয়ে উঠলে তোমরা আমার বাসনা পূর্ণ করবে!’ কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন আবেগে কাপছিলেন আচার্য। কিন্তু তার সংবেদনকে কেউই স্পর্শ করতে পারছিল না। এমনকি তার পুত্র অশ্বত্থামাও। একশ ভ্রাতা কৌরব আর পা-বকুল সবাই নীরব, বাক্হীন। নীরবতা ভাঙলেন তখন একজন পা-ব, অর্জুন! আমি আপনার ইচ্ছা পূর্ণ করব গুরু! এটা ছিল একটা স্বয়ংক্রিয় প্রত্যুত্তর। গুরু চেয়েছেন বলে করতেই হবে; অথচ কী করতে হবে, শিষ্য তা জানে না। অর্জুনের কণ্ঠস্বরে ছিল দৃঢ়তাও। মুগ্ধ হলেন দ্রোণাচার্য। জড়িয়ে ধরেন আবেগে, স্নেহে। কেঁদেও ফেললেন। পুত্র অশ্বত্থামার হাত অর্জুনের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, পুত্র! আজ থেকে এই অর্জুন তোমার সখা! অর্থাৎ অর্জুনকে পুত্রস্নেহে দেখলেন, পক্ষপাতগ্রস্ত হলেন! এই পক্ষপাত ছিল একান্তই মানবিক।

অন্যদিকে নবীন কৌরবদের মধ্যে একজনের অস্ত্রশিক্ষার প্রতি আগ্রহ, অনুশীলন, মনোযোগ, কসরত ইত্যাদি দেখে দ্রোণাচার্য খুশি হবার পরিবর্তে শঙ্কিত হলেন। তার মনে হলো এ-শিক্ষার্থী অশ্বত্থামাকেও ছাড়িয়ে যাবে। তরুণটি আর কেউ নয়, অর্জুন। যদিও এরই মধ্যে আচার্য হিসেবে দ্রোণের নাম ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্য থেকে রাজ্যে এবং বিভিন্ন রাজ্যের কুমাররাও আসছেন তার কাছে শস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হতে। এ-সকল সতীর্থের মধ্যে নিশ্চয়ই অর্জুন ছিলেন প্রধান আর্কষণ। অর্জুন এগিয়েও যাচ্ছেন সকলকে টপকে। এমনকি অশ্বত্থামাকেও। কিন্তু পিতা দ্রোণ এটা মানতে পারছিলেন না। তিনি একটা কৌশল অবলম্বন করলেন; কীভাবে অশ্বত্থামাকে এগিয়ে রাখা যায়। শিষ্য সকলের চেয়ে অশ্বত্থামাকে বেশি সময় দিতে চাইলেন। প্রতি সকালবেলা সকল শিষ্যকে একটা কাজ দিলেন।  সন্ধ্যাআহ্নিকের জলসংগ্রহের জন্য প্রত্যককে একটা করে কম-লু দিলেন, আর অশ্বত্থামাকে একটা কলস। কম-লুর মুখ সরু, কলসের বড়ো। তাই কলসে পানি ভরতে কম সময় লাগে। তাই সবার আগে জল নিয়ে পৌঁছায় অশ্বত্থামা, এইটুকু বাড়তি সময়ে দ্রোণাচার্য পুত্রকে অতিরিক্ত বিদ্যা শেখান। কিন্তু সব বুঝতে পারলেন অর্জুন কদিন যেতে না-যেতেই। এবং অস্ত্রের সাহায্যে কম-লুতে জল ভরে অশ্বত্থামার সঙ্গেই ফিরতে লাগলেন আচার্যের কাছে। বেচারা দ্রোণাচার্য অশ্বত্থামার সমানবিদ্যা শেখাতে লাগলেন অর্জুনকেও; আর ধ্যান, চিন্তা ও জ্ঞানের প্রতি অসামান্য নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে পক্ষপাত বেড়েই চলল অর্জুনের প্রতি। শেষপর্যন্ত দেখা যাবে সর্বশস্ত্রবিদ্যায় অর্জুনই তার ধ্যানজ্ঞান ও শিষ্যপুত্রতে রূপান্তরিত হয়ে গেছেন। দ্রোণাচার্য চেয়েছেন অশ্বত্থামা নয়, অর্জুনই হবেন পৃথিবীর অদ্বিতীয় বীর ও রাজন্য। এই পক্ষপাত গুরু হিসেবেই, নিঃস্বার্থভাবে।

সবাই জানেন মহাবীর কর্ণও দ্রোণাচার্যের শিষ্য ছিলেন; কিন্তু একসময় কর্ণকে বিদ্যাশ্রম থেকে বহিষ্কার করে দিলেন। কুন্তীর এই পুত্রের অপরাধ ছিলে কর্ণ অব্রাহ্মণ-সুতপুত্র। ব্রহ্মাস্ত্রবিদ্যা ব্রাহ্মণ ও সৎ ক্ষত্রিয়েরই একমাত্র অধিকার। সুতরাং একজন সুতপুত্রকে আচার্য ব্রহ্মাস্ত্রশিক্ষা দিতে পারেন না। আসল বিষয় এটা ছিল না, দ্রোণাচার্য কর্ণের নিষ্ঠা ও দক্ষতা দেখে আশঙ্কা করেছিলেন তিনিই অর্জুনের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন। তা-ই নয়, শুরু থেকেই কর্ণ অর্জুনের প্রতি প্রতিযোগী মনোভাবের ছিলেন। কর্ণ অর্জুনকে কারণে-অকারণে অবজ্ঞা করতেন, তাচ্ছিল্য করতেন। চালাক ও ধূর্ত তো ছিলেনই। অস্ত্রশিক্ষার একপর্যায়ে কর্ণ দ্রোণাচার্যকে বললেন, গুরু আমাকে ‘ব্রহ্মাস্ত্রবিদ্যা’ শেখাও; আমি যাতে অর্জুনের সমকক্ষ হতে পারি! দ্রোণ ভাবলেন একে ব্রহ্মাস্ত্রশিক্ষা দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ অর্জুনের প্রতি পক্ষপাত ও  অর্জুনকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলার মানসেই গুরু দ্রোণাচার্য কর্ণকে প্রত্যাখ্যান করলেন। অপরদিকে, যদি সূতপুত্র বলে কর্ণকে প্রত্যাখ্যান করবেনই, তাহলে তাকে বিদ্যাশ্রমে কখনও নিতেনইনা দ্রোণাচার্য। সুতরাং এটা ছিল একটা হঠকারিতামাত্র। হঠকারিতা দ্রোণাচার্যের চরিত্রের মধ্যেও ছিল সর্বতো। যদিও তিনি উজাড় করে সববিদ্যা অর্জুনকে দিতে চেয়েছেন, আবার অর্জুনের মেধা ও অনুশীলন তাকে ভীতিগ্রস্তও করে যে; তাকে না-আবার অর্জুন ছাড়িয়ে যায়। এধরনের হীনম্মন্যতা খুবই মানবিক, দ্রোণাচার্য তো দেবতা নন। আবার পুত্র অশ্বত্থামা তো আছেই। দ্রোণ চাননি অর্জুন ধনুর্বিদ্যার শেষ ধাপ ‘শব্দভেদ’ শিখুন। অর্জুনকে কিন্তু গুরু তা কিছুতেই পথ বাতলে দিচ্ছেন না। কিন্তু একরাতে ভোজনরত অবস্থায় বাতি নিভে গেলে অন্ধকারে গ্রাসাচ্ছদন করতে করতে অর্জুনের বোধোদয় হলো যে, অভ্যাসের মাধ্যমেই শুধু শব্দ শুনেই লক্ষ্যভেদ করা সম্ভব। যেই ভাবনা সেই কাজ; আশ্রমের সবাই ঘুমিয়ে গেলে অর্জুন একাকী অন্ধকারে রাত্রিকালীন শব্দ শুনে কল্পিত লক্ষ্যবস্তুর প্রতি বাণনিক্ষেপের কৌশল আয়ত্ত করতে লাগলেন। আর অর্জুনের এই প্রচেষ্টা টের পেলেন খোদ দ্রোণাচার্য। তিনি আসলেন অর্জুনের আছে, অন্ধকারেই।  আলিঙ্গন করে বললেন, বাছা! আমি দুঃখিত। তোমাকে আমার অদেয় কিছু নেই। আজ থেকে আমি পণ করলাম তোমাকে আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীরে পরিণত করব। কোনো কার্পণ্য ছাড়াই। অর্জুনের আগ্রহ ও অধ্যবসায়ই দ্রোণাচার্যকে অকৃপণ ও মহৎ গুরুতে পরিণত করেছে। পরে আমরা দেখতে পাই দ্রোণাচার্য যে-কোনো মূল্যেই অর্জুনকে শ্রেষ্ঠ বীরের আসনে রাখতে চেয়েছেন, তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাখেননি কোথাও। পথের কাঁটা সরিয়ে দিয়েছেন, হঠকারিতার সঙ্গে কিংবা ছলনায়। এতে ন্যায়-অন্যায় মানেননি তিনি। তিনি যে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা গুরুর।

স্মরণ করা যেতে পারে একলব্যের প্রতি দ্রোণাচার্যের অমানবিক আচরণ। দ্রোণাচার্যের বিদ্যাশ্রমে নিষাদ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্যও এসেছিলেন। নিষাদজাতীয় বলে অস্ত্রশিক্ষা দিতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আচার্য দ্রোণ। তখন দুঃখিত মনে একলব্য অরণ্যে গিয়ে দ্রোণের মৃন্ময় মূর্তি বানিয়ে এবং তাকেই গুরুরূপে কল্পনা করে যোগবলে ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী হন। একবার কুরুপা-ব মৃগয়ায় গেলে তাদের সঙ্গী কুকুর একলব্যের ভয়ালরূপ দর্শনে চিৎকার করলে একলব্য আশ্চর্য কৌশলে কুকুরের মুখে সাত-সাতটি শর বিদ্ধ করে স্বরসংরোধ করেন। শরবিদ্ধ রুদ্ধমুখ কুকুরকে দেখে কুরুপা-বরা বিস্মিত হন শরকৌশল দেখে। এরা সকলে একলব্যের কাছে আসেন এবং একলব্য দাবি করেন তিনি দ্রোণাচার্যেরই শিষ্য। অর্জুন এতে ঈর্ষান্বিত হন। আশ্রমে গিয়ে দ্রোণাচার্যকে বিষয়টা জ্ঞাত করে বলেন, আচার্য আপনি একবার প্রীত হয়ে বলেছিলেন যে, জগতে আপনার কোনো শিষ্য আমার সমতুল্য হবে না; বা ছাড়িয়ে যাবে না। কিন্তু একলব্য আপনার শিষ্য হয়েও আমাকে ছাড়িয়ে গেল! কিন্তু দ্রোণাচার্য জানেন এই নিষাদপুত্রকে তিনি অস্ত্রশিক্ষা দেননি। অর্জুনাদির সঙ্গে তিনি বনে একলব্যের কাছে গেলেন, গুরুকে দেখে একলব্য ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে কৃতাঞ্জলিপুটে দাঁড়ালেন। এবার দ্রোণাচার্য স্বমূর্তি ধারণ করে বললেন, তুমি যদি সত্যি আমার শিষ্য হয়ে থাকো, তাহলে গুরুদক্ষিণা দাও! একলব্য সহাস্যে জবাব দিলেন, গুরুকে অদেয় কিছু নেই! তখন আচার্য দ্রোণ গুরুদক্ষিণা হিসেবে চাইলেন, একলব্যের ডান হাতের বৃদ্ধাঙুল। একলব্য প্রফুল্ল মনে, এই দিচ্ছি! বলে, অঙুল কেটে, গুরুকে দক্ষিণা দিলেন। এই ঘটনার ব্যাখ্যা অনেকেই দেন যে, দ্রোণাচার্যের ব্যক্তিস্বার্থ ও আর্যজাতির শ্রেষ্ঠত্বের আদর্শ অক্ষুণœ রাখার জন্য দ্রোণ এটা করেছেন। কিন্তু তারচেয়ে বড়ো হচ্ছে, একলব্যের বৃদ্ধাঙুল কেটে নিয়ে শরনিক্ষেপের দক্ষতা নষ্ট করে ধনুর্বিদ্যায় অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষাই এই প্রার্থনার উদ্দেশ্য ছিল। ব্যক্তিগত যে-স্বার্থের কথা বলা হলো, তা হচ্ছে কুরুপা-বদের বিদ্যার্জন শেষে অর্জুনের প্রতিজ্ঞা মোতাবেক চাইবেন এককালের বন্ধু ও পরে তার দ্বারা অপমানিত পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে যেন শিষ্যরা পরাজিত করে দ্রোণাচার্যের কাছে নিয়ে আসেন। হ্যাঁ, কুরুপা-রা, বিশেষত অর্জুনের দক্ষতায় দ্রুপদকে পরাজিত করে দ্রোণাচার্যের কাছে এনেছিলেনও। দ্রোণও চরম প্রতিশোধ নিয়ে অর্ধেক রাজ্য নিজে নিয়ে বাকি অর্ধেক দ্রুপদকে দান করে মহানুভবতার পরিচয়ও দিয়েছিলেন। সেটা অন্য কথা।

অর্জুনকে জিতিয়ে দিতে দ্রোণাচার্য নিষাদ একলব্যের সারাজীবনের স্বপ্নকে ধুলিস্যাৎ করতেও পিছপাও হননি। অর্জুনের একাগ্রতা ও মেধা দ্রোণাচার্যের পক্ষপাতিত্বর মূল কারণ ছিল। সেটার আরেকটা পরিচয় পাই কৌরবদের অস্ত্রবিদ্যা সমাপণ হয়ে আসছিল, আর তখনকার প্রথা অনুযায়ী রাজকুলের প্রধানদের কাছে শিক্ষাপ্রদর্শনের কালও উপস্থিত হচ্ছিল। দ্রোণাচার্য চাইলেন, আগে নিজেই একটা পরীক্ষা নেবেন, পরে কৌরবকুলপতিদের কাছে উপস্থাপন করবেন। তিনি বাজার থেকে একটা পাখি বানিয়ে আনলেন মাটি দিয়ে; এবং সেটিকে রাখলেন উচ্চ একন বৃক্ষের ডালে। দ্রোণ নবীন কুমারদের এবার আদেশ করলেন লক্ষ্যভেদের জন্য প্রস্তুত হতে। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম পা-ব যুধিষ্ঠিরের পালা, শরক্ষেপণের পূর্বে দ্রোণাচার্য পরীক্ষাস্বরূপ জিজ্ঞেস করলেন, যুধিষ্ঠির! তুমি কি পাখিটি দেখতে পাচ্ছ? যুধিষ্ঠির বললেন, হ্যাঁ আচার্য! আবার জিজ্ঞাসা, তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ? উত্তর, হ্যাঁ। জিজ্ঞাসা; গাছ, গাছের ডাল, গাছের পাতা দেখতে পাচ্ছ? উত্তর এলো, হ্যাঁ। সব দেখতে পাচ্ছি, আমার ভাইদেরও দেখতে পাচ্ছি। দ্রোণাচার্য বললেন, তোমার লক্ষ্যভেদের দরকার নাই ধর্মপুত্র! এভাবে, আরেকজন। আরেকজন। যখন অর্জুনের পালা এলো; অর্জুন দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, আচার্য! এই গাছের পাতা, ডাল, গাছ, আমার ভাই, এমনকি আপনাকেও আমি দেখতে পাচ্ছি না! আমি দেখতে পাচ্ছি একটা পাখি; শুধু একটা পাখি, ঠিক পাখিও নয়-পাখির একটা মাথা, যেটা আমাকে ছেদন করে মাটিতে ফেলে দিতে হবে! মাথাই তো! দ্রোণাচার্য এতে আনন্দ পেলেন। আনন্দে তার চোখ জলে ভরে উঠল। আর তখনি অর্জুন শরাঘাতে শরনিক্ষেপ করলেন, মুহূর্তেই পাখিটির মাথা মাটিতে পড়ে গেল। আর প্রথম যে-কথাটি দ্রোণাচার্যের মনে পড়ল তা এই; অহংকারী দ্রুপদের এইমাত্র পতন হলো! আর সার্থক হলো দ্রোণাচার্যের সকল তপস্যা। এরপর; কুমারদের অস্ত্রপ্রদর্শনী হবে, সবাই খুশি হবেন, রাজারা-রাজমহিষীরা ও অন্য রাজন্যবর্গও। এবং শেষমেষ চাইবেন দ্রোণাচার্য তার গুরুদক্ষিণা, দ্রুপদকে জীবিত ধরে আনো! কিন্তু গুরু হিসেবে দ্রোণাচার্যের এই মূল্যায়নপদ্ধতিটাও প্রাসঙ্গিক। তিনি সকল শিষ্যেরই পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। যুধিষ্ঠিরের জবাব অনুজরা উচ্চারণ করে যাচ্ছিল, আর কেউই লক্ষ্যভেদে উত্তীর্ণ হচ্ছিল না, অর্জুন হয়েছিলেন। পরে তিনি এই বলে তিরস্কারও করেছিলেন যে, তোমাদের দ্বারা কিচ্ছুটি হবে না। তোমরা অন্যকে অনুসরণ করছ। অগ্রজ যুধিষ্ঠিরকে। কিন্তু অর্জুনকে দেখো, সে তা করেনি। মনে রেখো, অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে অন্যকে অনুসরণ করলে চলে না। স্বতন্ত্রতা লাগে। যেটা তোমাদের নেই, অর্জুনের আছে। অর্জুন যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞাবহ সত্ত্বেও, তার উত্তর ছিল স্বাধীন। এই স্বাধীনতা বীরের স্বাধীনতা। এটাকে অর্জন করতে হয়। যুধিষ্ঠিরের এই বক্তব্যের সঙ্গে, নিজের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর মন্ত্রের ইঙ্গিতও আছে।

রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষাপ্রদর্শনী ব্যবস্থা করেছিলেন খোদ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র। অস্ত্রপ্রদর্শনীতে আনন্দে ফেটে পড়ছিল রাজপরিবার, তাদের ধারণা ছিল রাজপুত্ররা বুঝি বখে যাবে। বিশেষত পিতামহ ভীষ্ম এসব নিয়ে ভাবতেন বেশি। তিনিও খুশি হলেন। সবশেষে দ্রোণাচার্য অর্জুনকে রণাঙ্গনে নামালেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এই বীরকে দেখুন; এ আমার পুত্র অপেক্ষা প্রিয়। ভগবান বিষ্ণুর মতোই পরাক্রমশালী, সকল অস্ত্রে কুশলী! যদিও এই ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল দ্রোণগৃহ প্রত্যাখ্যাত অর্জুনের চিরপ্রতিযোগী কর্ণ; এবং এই ঘটনায় ওরা দুজনই চিরশত্রুতে পরিণত হয়েছিল। যদিও দুজনই সতীর্থ। কিন্তু অর্জুন দ্রোণের পুত্র অপেক্ষা প্রিয়, এটা মিথ্যে ছিল না; কিংবা ছিল না কথার কথা। তার প্রমাণ,  দ্রোণাচার্য অর্জুনকে ব্রহ্মাস্ত্র দান করেছিলেন। দান করেছিলেন আরও একজনকে, তিনি অশ্বত্থামা। মনে রাখতে হবে দ্রোণ শুধু আচার্য নন, একজন পিতাও। গুরু প্রদত্ত ব্রহ্মশির দান করে শর্ত আরোপ করেছিলেন দ্রোণাচার্য, বাছা! এই অস্ত্র শ্রেষ্ঠ, আর অপ্রতিরোধ্য। তুমি কোনোভাবেই তা মানুষের ওপর প্রয়োগ করবে না। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো অসামান্য শক্তি যদি তোমাকে আক্রমণ করে তবেই প্রয়োগ করবে। দ্রোণাচার্যের কথা রেখেছিলেন অর্জুন শেষপর্যন্ত, রাখতে পারেননি স্বীয় পুত্র অশ্বত্থামা। অর্জুনের শিষ্যত্বের জয় এখানেই। গুরুবাক্য তার কাছে সবসময়ই বেদবাক্য ছিল; তিনি সব লঙ্ঘন করেছেন, শুধু গুরুবাক্য ছাড়া।

যাই হোক শিষ্য অর্জুনের কল্যাণে দ্রোণাচার্য রাজা হলেন, কিন্তু রাজ্য নিলেন না; সেও পা-বদের প্রতি দয়াপরবশত-অর্জুনের জন্য তো বটেই। দেখা যাবে সকল ক্ষেত্রেই তিনি অর্জুনকে চোখে চোখে রেখেছেন; দুষ্ট নন এমন শিষ্যদেরও। এমনকি আচার্য হয়ে এসে জড়িয়ে পড়লেন গোটা হস্তিনাপুরের আন্তর রাজনীতিতে। অবশ্য সে সবের সঙ্গে তার অস্তিত্বের একটা সম্পর্কও ছিল। কেননা ইতোমধ্যে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের যজ্ঞবেদি থেকে জন্ম নিয়েছেন ধৃষ্টদ্যুম্ন-যার জন্মই হয়েছে দ্রোণাচার্যকে হত্যা করার জন্য। আর দ্রোণাচার্যকে কেন্দ্র করে শত্রুতাও তৈরি হলো কুরু-পাঞ্চালদের, নতুনভাবে। দ্রুপদ-কন্যা কৃষ্ণাকে বিয়ে করে পা-ব আর পাঞ্চালদের মধ্যে গড়ে উঠেছে সখ্য; রাজনীতির নতুন মেরুকরণ। আর কুরু-অন্নভোজী দ্রোণাচার্যও হয়ে উঠলেন ধৃতরাষ্ট্রের মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ণ একজন; তাদের আপদ কালে তিনি তো আর পা-বদের দলে যোগ দিতে পারেন না! কেননা কৌরবকুলপিতা ভীষ্ম তাকে সম্মান করে আচার্যের চাকরি দিয়ে জীবনের নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। ভীষ্ম এখন বৃদ্ধ, তিনি দ্রোণাচার্যের সাহায্যপ্রার্থী। কৌরব মন্ত্রী সভায় থেকে বরং দ্রোণাচার্য চান একটা মীমাংসা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান; কৌরব-পা-বদের। এরা সকলেই তার শিষ্য। অন্যদিকে দ্রোণাচার্য মনে করেন পা-বরা ন্যায়সঙ্গভাবেই রাজ্যের ভাগী; তাদের উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়াই উচিৎ। কিন্তু অসূয়াপ্রবণ কর্ণ ও স্বার্থান্ধ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দ্রোণাচার্যের মত মেলে না। তারা বরং দ্রোণাচার্য কেন, পিতামহ ভীষ্মকেও অবজ্ঞা করে। এদিকে দ্রোপদীকে অপমান, পা-বদের রাজ্যহারা হওয়া; ১২ বছরের বনবাসসহ ১ বছরের অজ্ঞাতবাস পরে কুরুপা-বের যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল এবং এই যুদ্ধের একপক্ষে দ্রোণাচার্য, অপর পক্ষে অর্জুন। এটা গুরুশিষ্য উভয়ের জন্য এক মারণখেলা; কঠিন পরীক্ষাও বটে।

যুদ্ধের আগেও যুদ্ধ আছে। যদিও দ্রোণাচার্য চাচ্ছিলেন কৌবরদের সঙ্গে পা-বদের শান্তি ও মৈত্রী। কিন্তু নয়া এক যুদ্ধ বাঁধালেন খোদ কৌরবরা, বিরাটরাজার সঙ্গে। এটাও  ছিল একটা অন্যায় যুদ্ধ। ন্যায়নিষ্ঠ দ্রোণাচার্য এ-যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না। তবু যুদ্ধযাত্রা করলেন অন্য কুরুবৃদ্ধদের সঙ্গে। তিনি গেলেন অন্নঋণের জন্য মাত্র। ভীষ্ম ও কৃপাচার্যও সঙ্গে ছিলেন। যুদ্ধে এরা জয়ও পেতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই গোল বাঁধে। ততক্ষণে পা-বদের অজ্ঞাতবাসের কাল শেষ হয়েছে, অন্য পা-বরা চাচ্ছিলেনও কুরুরাজ্য আক্রমণ করবেন; মানছিলেন না কিছুতেই যুধিষ্ঠির ও অর্জুন। দুজনই সত্যরক্ষায় শ্রদ্ধাশীল। এখন সুযোগ এলো বিরাটরাজকে অন্যায় আক্রমণের প্রেক্ষিতে, অন্যায়ের প্রতিবাদস্বরূপ পা-বকুল বিরাটের পক্ষ নিলেন। সুতরাং কুমার উত্তরকে নিয়ে বৃহণœলারূপী অর্জুন গা-ীব হাতে নিলেন, যুদ্ধের গোষণা দিলেন। অর্জুন গা-ীবে টঙ্কার উঠলে কুরুরা সচকিত হলো। দ্রোণাচার্য আনন্দিত হলেন, যা বুঝার তিনি বুঝে ফেলেছেন। এ-তো অর্জুনের টঙ্কার, হা প্রিয় শিষ্য! এত বছর বাদে! কিন্তু প্রতিযুদ্ধের জন্য প্রস্তত না-হয়ে বরং খুশিতে লাফাতে লাগলেন, উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করলেন, শোনো বাছারা! রাথের আওয়াজ ও ধনুকের টঙ্কার যেমন শুনছি, কারণ ঝড় আসছে আকাশে; মেঘ গর্জন করছে; পৃথিবীও কাঁপছে দেখো। আমার তো মনে হচ্ছে সব্যসাচী অর্জুন ভিন্ন এ-কেউ নয়!… মনে হচ্ছে আমাদের অস্ত্রশস্ত্র সব ভোঁতা হয়ে গেল, ঘোড়াগুলোও বুঝি পালাচ্ছে! এদিকে কৌরবরা সকলেই মিইয়ে আসছিল অর্জুনের ঝড়ো আক্রমণে। তবুও কর্ণ তিরস্কার করলেন দ্রোণাচার্যকে, অর্জুনের অশ্বের হ্রেষাধ্বনি শুনেই দ্রোণাচার্য যেখানে উতলা হয়ে যাচ্ছে, সেখানে কৌরবসেনাদের কি করার আছে? কর্ণ সুযোগ পেলেন দ্রোণাচার্যকে অপমান করার। তীব্র বাক্যবাণে করলেনও। একপর্যায়ে দুর্যোধনের উদ্দেশ্যে বললেন, এই পরগুণগর্বিত বামুনপ-িতকে পেছনে রেখেই আমাদের যুদ্ধ করা উচিত! এত অপমানের পরও ভীষ্মের মুখ চেয়ে অস্ত্র ধরলেন দ্রোণাচার্য। যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখিও হলেন গুরু ও শিষ্য। আহ! প্রিয় শিষ্য অর্জুন! দ্রোণাচার্যের মনে পড়ল সব। কী অধ্যবসায়, কী অনন্যতায় আর কী প্রতিভায় তাকে অর্জুন হতে হয়েছে। কত মমতায় একে গড়েছেন বৃদ্ধ এই আচার্য, পুত্র অশ্বত্থামার চেয়েও মহাযতনে। কিন্তু অর্জুন? জীবনের যেকোনো যুদ্ধে, ধনুকে টঙ্কার তুললেই মনে পড়ে যায় বৃদ্ধ অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যকে। চোখে ভাসে মুখ আর উজ্জ্বল চোখদুটি। কত স্বপ্নে, কত আনন্দে, কত যতেœ এই প্রবীণ সখা তাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন, করেছেন সব্যসাচী, মহাবীর। এ-যে ভোলার নয়। দ্রোণাচার্যের কথা ভাবলেই পিতৃহারা এই কুমারের চোখ সজল হয়ে ওঠে। অর্জুনকে দেখেই কর্ণের তিরস্কার ভোলে আবারও সোৎসাহে বলে উঠলেন, আহ এযে অর্জুনের রথ! কী সুন্দর। আর ওই তো অর্জুন, রথের সমানভাগেই! এমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে না-করতেই দুটি তীক্ষè বাণ দ্রোণের পায়ের কাছের মাটিতেই বিদ্ধ হলো! আরও দুটি কানের পাশ দিয়ে উড়ে গেল! সবাই ভাবল অর্জুন দ্রোণাচার্যকে শরাঘাত করেছেন। কিন্তু আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন দ্রোণাচার্য! বলে উঠলেন, এ যে আমার প্রতি অর্জুনের অভিবাদন! আমার প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রণয় সম্ভাষণ! আমার পায়ের কাছে গেঁথে আছে যে-তীর তা অর্জুনের গুরুপ্রণাম; আর কানের পাশ দিয়ে যেদুটি উড়ে গেল, ওই দুটি অর্জুনের কুশল সংবাদ। মুখে বললেন, অর্জুন বলতে চাইছে; বনবাসে তাদের অনেক কষ্ট হয়েছে, আর বনবাসের কালও সমাপ্ত হয়ে গেছে। তারপর দ্রোণাচার্য আরও উল্লসিত হলেন, আহা বাছা অর্জুন! কতকাল পরে তোমাকে দেখতে পেলাম। আর ও কত ভালোবাসে আমাকে, আমাদের! এমন উচ্ছ্বাস ছিল অর্জুনের মনেও। সারথী বিরাটপুত্র উত্তরকে কৌবরদের পরিচয় করিয়ে দেবার সময় সম্ভ্রমের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন দ্রোণের নাম। বলেছেন, ওই যে রথ দেথতে পাচ্ছ কুমার, ওই যে রথের চূড়ায় কম-লু বসানো ইনি হচ্ছেন সেই আচার্য, আমার গুরু! শোনো উত্তর, তোমার কাজ হবে আমার গুরুর রথকে প্রদক্ষিণ করা সসম্মানে। জানো তো, পৃথিবীর সমস্ত অস্ত্রবীরদের মাঝে ইনি হলেন আমার সবচেয়ে মান্য!

কিন্তু যুদ্ধ তো শুরু হতে হবে গুরুশিষ্যের মধ্যে, যেহেতু তা অনিবার্য। যদিও পরস্পরের জয়ই পরস্পর চান; বুকের ভেতরে পরস্পরের হিতকামনা। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় এখানে অর্জুন কেন গুরু দ্রোণাচার্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন? সত্যি তো। শস্ত্রবিদ্যা সমাপণান্তে অর্জুন আচার্য দ্রোণকে গুরুদক্ষিণা দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অন্য অনেকের কাছে বহুবিচিত্র গুরুদক্ষিণা নিলেও অর্জুনের কাছ থেকে নেননি কিছু। এখানেও অর্জুনের প্রতি তার বিশেষ সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়। বরং দ্রোণাচার্য হেসে অর্জুনকে বলেছিলেন, আমি যদি কখনও তোমার সঙ্গে যুদ্ধে রত হই; তখন তুমিও আমার সঙ্গে প্রতিযুদ্ধে লিপ্ত হবে। গুরুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে কোনো রূপ সংকোচ প্রকাশ করবে না। অর্জুন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই প্রতিশ্রুতিই দ্রোণের প্রতি তার গুরুদক্ষিণা। আসলে এই প্রতিশ্রুতির জন্যই বিরাটের পক্ষে ও কৌরবদের বিপক্ষে, যেখানে সৈন্যাপৈত্যে খোদ দ্রোণাচার্য,  আজ অর্জুন অস্ত্র ধরলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হবে কীভাবে? বিশেষত যুদ্ধ যদি হয় গুরুশিষ্যের মধ্যে? প্রাচীন ভারতে একটা রীতি ছিল, অমন যুদ্ধের। শিষ্য কখনও প্রথম অস্ত্র নিক্ষেপ করবেন না। প্রথম আঘাতটা করবেন গুরুই, প্রতিপক্ষ হিসেবে। অর্জুন এটা মানলেন, নিজে বললেন কুমার উত্তরকে, দ্রোণ যদি আমার শরীরে প্রথম আঘাত হানেন, পরে আমি যদি প্রত্যাঘাত করি তাহলে তিনি কষ্ট পাবেন না। অন্যায়ও হবে না। এবার সত্যিই দ্রোণ আর অর্জুন সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। রক্তাশ্ববাহন দ্রোণের মুখোমুখি হলো শ্বেতাশ্ববাহন অর্জুনের রথ। অর্জুন মাথা নত করে দ্রোণের সমীপে বললেন, বনবাসে অনক দখল গেছে, আচার্য! এবার প্রতিশোধ নেবার পালা। আপনি আমাকে সুযোগ দিন। এই দুষ্টদের আমি দমন করতে চাই। আমাকে ভুল বুঝবেন না আচার্য। তবে, হ্যাঁ, আপনিই প্রথম অস্ত্রাঘাত করবেন আমাকে। তারপর আমি। কথাও এমন ছিল! দ্রোণাচার্য তাই করলেন। শুরু হলো ভীষণ যুদ্ধ, দ্রোণাচার্যের সমূহ বাণ মুহূর্তেই কেটে ফেললেন অর্জুন। একের পর এক ভয়ানক ও বিচিত্র আক্রমণ ও পালটা আক্রমণ। কর্ণ-কৃপও যুদ্ধে যোগ দিলেন, আবার পশ্চাদবরণও করলেন। কিন্তু গুরুশিষ্যের যুদ্ধ চলল। আর অর্জুনের রণকৌশল দেখে এই প্রতিযুদ্ধের মধ্যেও দ্রোণাচার্য আনন্দে বিহ্বল হচ্ছিলেন। এই আমার শিষ্য, অর্জুন; আমার প্রাণাধিক পুত্র! একে তো আমিই শিক্ষা দিয়েছি! আমি যদি এ-সমরে হারিও আমার পরাজয় নেই; এ-জয় আমার জয়। আমি আজীবন অর্জুনকেই তো অদ্বিতীয় বীর ভেবে এসেছি। চেয়েওছি। আজ আমার আনন্দের দিন। এরই মধ্যে অর্জুনের শররাশি দ্রোণাচার্যের রথকে ঘিরে ফেলে। সৈন্যরাও পেরে উঠতে পারছে না। দ্রোণাচার্যকে বুঝি এবার রক্ষা করা গেল না। চারদিকে হাহাকার উঠল। পিতার করুণ অবস্থা দেখে এগিয়ে এলেন পুত্র অশ্বত্থামা। দ্রোণের সামনে দাঁড়িয়ে অর্জুনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন, আর এই ফাঁকে দ্রোণাচার্য পালালেন, সম্মানের সঙ্গে। কিংবা সুযোগ দিলেন খোদ অর্জুনও। হ্যাঁ, অর্জুন শিষ্যের কাছে পরাজিত হয়ে পালালেন ঠিকই; পরাজয়ের গ্লানিতে তার মতো অস্ত্রগুরুর মন যেখানে ভারাক্রান্ত হবার কথা, সেখানে দেখা গেল তিনি বেজায় খুশি। তার মন ভরে গেছে শিষ্যের বীরত্বে ও কুশলবিদ্যায়। ইনি এটাই চেয়েছিলেন, বুঝেছিলেন কৌরবরা হারবেই। তাই কৃতজ্ঞতাবশত চেয়েছেন যুদ্ধহীন সুরাহা করতে। কিন্তু কর্ণ ও দুর্যোধনরা ভেবেছেন দ্রোণাচার্য পা-বদের হিতাকাক্সক্ষী; তাই অযথাই অর্জুনের প্রশংসা করেন; তাহলে আজ বুঝুক তারা, নিয়ে এমনি এমনি অর্জুনের প্রশংসা করেননি। যোগ্য বলেই অর্জুন প্রশংসার দাবিদার। যেটা দ্রোণাচার্য সঞ্জয়ের কাছেও করেছেন। সঞ্জয়ের কাছে অর্জুনের ভীতিপ্রদর্শন তার ফাঁকা আওয়াজ ছিল না; দৃঢ়বিশ্বাস থেকেই তিনি বলেছিলেন সব। এমনকি ধৃতরাষ্ট্রকে সোজা বলে দিয়েছেনও, অর্জুনের মতো বীর জগতে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না।

কৌরবকুলের গৃহবিবাদ তখন চরমে ওঠে; দ্রোণাচার্য বুঝে নেন এ-বিবাদ থেকে তারও মুক্তি নেই। কৌরবপতি ভীষ্ম তার অন্নদাতা; আজ তারা পা-বদের করাল গ্রাসে নিপতিত। এই দুঃসময়ে ন্যায়ত তিনি কৌরবদের পাশেই থাকবেন; যদিও অপর দুষ্ট দুই শিষ্য কর্ণ ও দুর্যোধন তাকে অপমান করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু এতেও তার দুঃখ নেই। কারণ দুষ্ট দুষ্টই; তাদের কথায় কল্যাণ বা শ্রেয়বোধ থেকে সরে আসা যায় না। যে-জায়গায় দুঃখ সেটা পা-বদের প্রতি যে-অবিচার চলছে তার সমাধান চান তিনি; জানেন তিনি এই সমাধানে একমাত্র পথ ভয়াবহ যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধে তার প্রিয় অর্জুনের প্রতিপক্ষ যোদ্ধা হয়ে অবতীর্ণ হবেন তিনি। এটা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু উপায়ও তো নেই। অসহায়তা ছেয়ে বসে দ্রোণাচার্যকে। তিনি শেষ চেষ্টা চালালেন। কথা পাড়লেন দুর্যোধনকে। যুদ্ধ নয়, শান্তি প্রস্তাব করো। যার যার অধিকার ফিরিয়ে দাও। নইলে অমঙ্গল তোমাদেরই হবে। কুরুবাড়িতে বসে এটুকু বলতে তার গলা একটুও কাঁপল না। আরও যুক্ত করলেন, কৌরব-পা-ব উভয়েরই অস্ত্রগুরু তিনি; গুরু হিসেবে তিনি শিষ্যদের শরশয্যা কামনা করতে পারে না। আর যুদ্ধ যদি করতেই হয়, তাহলে তার পক্ষপাত থাকবে পা-বদের প্রতি, যেখানে বিশেষত অর্জুন আছেন। তিনি বুঝিয়েও দিলেন ইঙ্গিতে। বললেন, শোনো দুর্যোধন, একটা কথা বলি! অশ্বত্থামা আমার কাছে যেমন, অর্জুনও তেমনি। এরপরে আর কথা থাকে না। বুঝিয়ে দিলে দ্রোণ কুরুদের জয় তিনি চান না। ইঙ্গিতসূচক বাক্যে বললেন, প্রলাপ বকে লাভ নেই। ধর্ম যেখানে জয়ও সেখানে! দ্রোণাচার্য না-বুঝাতে পারলেন দুর্যোধনকে, না-কর্ণ বা কৃষ্ণকে। যুদ্ধই হয়ে উঠল সকলের নিয়তি। যুদ্ধও বেঁধে গেল, আর ভাইদের পক্ষ থেকে শিষ্য যুধিষ্ঠির যখন অনুমতি নিয়ে আসলেন গুরুর কাছে, তখন সহৃয় অনুমতি সহকারে বললেন, এখন আমি আনন্দচিত্তে অনুমতি দিচ্ছি তোমাদের। তোমরা যুদ্ধ করো এবং জয়ী হও! যদিও এই যুদ্ধে দ্রোণ সেনাপতি হবেন পরে। অনুমতি দিয়ে তিনি অনুতাপে পুড়ছিলেন বারবার, অভিসম্পাত দিচ্ছিলেন নিজের ভাগ্যকে। শুধু অর্থের জন্যই প্রিয় শিষ্যের বিরুদ্ধে আজ অবতীর্ণ হয়েছেন তিনি। অনৈতিক যুদ্ধ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর দ্রোণ নিজে কিছু করতে পারছে না। সবচেয়ে ভয়ংকার ব্যাপার হলো যুদ্ধে অর্জুনকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের মৃত্যুর উপায়ও বলে দিলেন অকাতরে। দ্রোণ চির অপরাজেয় ছিলেন। ভীষ্ম একবার বলেছিলেন, অনেক সেনাপতির সম্মিলিত অস্ত্রক্ষমতার চেয়ে দ্রোণাচার্যের শক্তি অনেকগুণ বেশি! দ্রোণ নিজে তা জানতেন, বলে, যুধিষ্ঠিরকে বললেন, শোনো বাছা! আমার হাতে যতক্ষণ অস্ত্র আছে, ততক্ষণ আমাকে মারা সম্ভব হবে না। এমন বীর জন্মায়নি, রথে দাঁড়িয়ে আমাকে হত্যা করবে। তবে, আমি যদি অস্ত্রত্যাগ করি, তবেই আমাকে মারা সম্ভব। আর আমি অস্ত্র ত্যাগ করব তখনই, যখন কোনো ভয়ংকর অবিশ্বাস্য সংবাদ আমি পাবো। এমন লোক যদি দুঃসংবাদটা আনে, যাকে বিশ্বাস করা যায়। তবেই আমি অস্ত্র ত্যাগ করতে পারি। পরে দেখা যাবে, দ্রোণাচার্যকে বধ করতে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরই মিথ্যে একটি দুঃসংবাদ বয়ে এনেছিলেন। যুধিষ্ঠির দ্রোণ বধের কারণ হন। যদিও তিনি দ্রোণের আরেক শিষ্য, অবশ্য নন তিনি মহাবলী অর্জুন।

কুরুক্ষেত্রের ভয়াবহ যুদ্ধ হলো অষ্টাদশ দিবস। এই যুদ্ধের কুরুপক্ষের প্রথম দশদিনের সেনাপতি ছিলেন মহাবলী ভীষ্ম। তিনি দশম দিবসে শরশয্যা গ্রহণ করলেন। আর একাদশ দিবসে সেনাপতি বরে বরণ করা হলো আচার্য দ্রোণকেই। আশ্চর্য এখানে, চিরটাকাল ধরে যে-কর্ণ দ্রোণকে কৃতঘœ হিসেবেই তাচ্ছিল্য করেছেন, তিনিই দুর্যোধনকে আচার্যের নাম প্রস্তাব করেন। এমনকি কৌরবদের বিপন্নকালে শুনতে পেলেন কর্ণাদির মুখে তার সুনাম। দ্রোণ কথা দিলেন যুদ্ধ তিনি মনপ্রাণ দিয়েই করবেন, তবে দ্রুপদপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নকে বধ করতে পারবেন না কিছুতেই। যেহেতু তার জন্মই হয়েছে দ্রোণাচার্যকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু এর আড়ালে ছিল আরও কিছু। দ্রোণাচার্য যুদ্ধ করবেন মরণপণই, তবে জিতিয়ে দিতে চান অর্জুনকে। ধৃষ্টদ্যুম্নকে যদি বধই করবেন, তাহলে অর্জুন জয় করবেন কীভাবে? ধৃষ্টদ্যুম্ন-কর্তৃক দ্রোণবধের মাধ্যমেই তো পা-বদের জয় সুনিশ্চিত হবে। দুর্যোধন অতোটা বুঝেননি তখন। তবে শর্ত দিলেন যুধিষ্ঠিরকে জীবন্ত ধরে এনে দিতে হবে! না-বুঝেই দ্রোণ বললেন, আচ্ছা! পরে যখন দুর্যোধনের বদ মতলব বুঝলেন যে, জীবিত যুধিষ্ঠিরকে দিয়ে পাশা খেলিয়ে সমস্ত পা-ুদেরই আবার দেশছাড়া করতে চান দুর্যোধন তখন, একটা চালাকি করে বসেন। যোগ করলেন দ্রোণ, তবে এটা সম্ভব হবে তখনই, যদি যুদ্ধকালে অর্জুন যুধিষ্ঠিরের পাশে না-থাকেন! তা-ই নয় শুধু, যুধিষ্ঠির যেন খবরটা পান, এই উদ্দেশ্যে সেনাদের কাছে দ্রোণাচার্য কথাটা রটিয়েও দিলেন। আসলে তিনি অর্জুনাদির জয় চান। কথাটা কানে যায় যুধিষ্ঠিরের। অর্জুনের সঙ্গে শলাপরামর্শও হয়, অর্জুন বলেন, শোনেন ভ্রাতা! আমি কখনোই আচার্য দ্রোণকে বধ করতে পারি না, এটা যেমন সত্য; তেমনি আরেক সত্য জেনে রাখো, তোমাকে একা ফেলে আমি যাব না কোথাও! অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে শেষরক্ষা করেওছিলেন। যুধিষ্ঠির পালিয়ে বাঁচলেন; পালাতে সাহায্য করলেন যেমন অর্জুন, তেমনি দ্রোণাচার্যও। বিষয়টা ধরতে পেরেছিলেন দুর্যোধন। এজন্য একহাতও নিয়েছিলেন দ্রোণের ওপর। জবাবে, দ্রোণাচার্য প্রতিজ্ঞা করলেন, এইবার আমি পা-বপক্ষের এক মহারথকে দেখে নেব। তবে, তোমরা অর্জুনকে কায়দা করে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে! দ্রোণাচার্য তার চক্রব্যূহ রচনা করে, অর্জুনপুত্র অভিমন্যুকে ধরাশায়ী করলেন; অভিমন্যুর অজ্ঞতাবশত। যদিও দুর্যোধন বিশ্বাসই করতে পারেনি, দ্রোণ অভিমন্যুকে এমনটা করতে পারেন। কেননা অভিমন্যু শিষ্য অর্জুনের প্রিয়পুত্র; সুতরাং দ্রোণেরও! আসলে অভিমন্যুকে বধ করেছিলেন মহাবীর জয়দ্রথ। আর ব্যূহ রচনা করেছিলেন দ্রোণ নিজে।

পুত্রের মৃত্যুর পর কৌবরবাহিনীর ওপর চড়াও হন অর্জুন; শপথ নিলেন সন্ধ্যার আগেই বধ করবেন জয়দ্রথকে। কিন্তু চক্রব্যূহের মুখেই দাঁড়িয়েছিলেন দ্রোণাচার্য। সামনে আসেন এবার অর্জুন, ক্রোধান্ধ তিনি, চেহারা আলুথালু। কিন্তু অর্জুন সসম্মানে বললেন, গুরু! আপনার আশীর্বাদ নিয়েই সেনাব্যূহের ভেতরে যেতে চাই আমি। আপনি আমার পিতার সমান; সম্মানেও আমার কাছে কৃষ্ণ বা যুধিষ্ঠিরের সমান। পুত্র অশ্বত্থামাকে যেমন রক্ষা করেন সর্বদা, তেমনি আমিও আপনার রক্ষণীয়! দ্রোণ অবাক হলেন পুত্রশোকে কাতর ও ক্রোধান্ধ হলেও অর্জুন গুরুর মর্যাদা ভোলেনি। কিন্তু ন্যায়সঙ্গত বাধা দিলেন অর্জুনকে। ভয়ংকর যুদ্ধ চলল পরস্পরের মধ্যে। কিন্তু গুরুর জন্য অর্জুন বাগে আনতে পারছেন না কিছুই। এদিকে কৌশল বদলালেন, অস্ত্রমোক্ষণ থামিয়ে দ্রোণাচার্যকে প্রদক্ষিণ করে সম্মান দেখিয়ে এড়িয়ে গেলেন। দ্রোণ অবাক হলেন, এটা হবার কথা নয় আজকের যুদ্ধে অন্তত। তাই সশব্দে বললেন, আরে কী করছ অর্জুন! শত্রুকে জয় না-করেই কোথায় যাচ্ছ? উত্তর দিলেন সহসা অর্জুন, আচার্য! আপনি আমার গুরু। শত্রু তো ছিলেন না কখনো? এছাড়া এই পৃথিবীতে এমন কে আছে, আপনার সঙ্গে যুদ্ধে জিতবে? এই সেই অর্জুন, তিনি সর্বদাই মহামতি। বিস্ময়ে গাঢ় হলো দ্রোণাচার্যের চোখ। হয়ত চোখে জলও এলো। যুদ্ধের নীতি ভঙ্গ করে অর্জুন জয়দ্রথকে বধ করলেন, সন্ধ্যা নামার পরেও। কিন্তু পুত্রশোকে কাতর অর্জুনকে যে জয়দ্রথ হত্যায় মৌন সমর্থন দেননি দ্রোণ, এটাও বলা যাবে না। নয় তো তিনি অজুনের পশ্চাদানুসরণ করতেন। আটকে দিতেন গতিপথ, কার্যত দেননি।

জয়দ্রথ হত্যার পর দুর্যোধন আরও অপমান করলেন দ্রোণাচার্যকে। জয়দ্রথ ছিলেন দুর্যোধনের ভগ্নীপতি। দ্রোণ স্বীকার করলেন এবার, এই বৃদ্ধ বয়েসে তিনি কেমন করে বীর অর্জুনের সঙ্গে পেরে উঠবেন? যুক্তি দিলেন আরও, যুধিষ্ঠিরকে ধরার জন্যই তিনি নড়েননি। শুনিয়ে দিলেন জয়দ্রথের রক্ত শুকাবার আগেই যুধিষ্ঠিরকে, তুমি যে এত বড়ো বড়ো কথা বলছ, তুমিও তো রাজপুত্র; যাও না একবার অর্জুনের সঙ্গে পাল্লা দিতে? মুখেই যত কথা তোমার! এবার দুর্যোধনের মুখ বন্ধ হলো। তবু জয়দ্রথের মৃত্যুর জন্য দায়ী হলেন এককভাবে দ্রোণাচার্য। যদিও প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধই করে গেছেন সারাদিন। সন্ধ্যার আলোচনাসভায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করলে তিনি চটে যান; বলেন, শোনো দুর্যোধন-দুঃশাসন, তোমরা সবাই আমাকে দায়ী করছ এখন। কিন্তু আমি বলি কি, তোমরাও তো যুদ্ধে লিপ্ত ছিলে? কী করেছ তাহলে সারাদিন? জয়দ্রথ যেখানে মারা গেছে, সেখানে তোমরা সবাই অর্জুনকে ঘিরেই তো ছিলে! তাহলে জয়দ্রথ মরল কেন? অধিকন্তÍু শুনিয়েছেন নিজের অনুতাপ বাণী, বললেন শুনছ সবে? এসবই অন্যায়ের ফল। যারা আমার পুত্রের মতো, এই যে অর্জুনাদি, সারাজীবন এরা সত্যপথে চলেছে; আজ তাদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করে যাচ্ছি! সেনাপতি দ্রোণাচার্য রাতেও যুদ্ধঘোষণা করলেন। তবু মন পাওয়া গেলনা দুর্যোধনাদিন। বন্ধু কর্ণকে উদ্দেশ্য করে দুর্যোধন বললেন, শুধু অর্জুনই আমার সব রসাতলে দিল, এবং তা দ্রোণের জন্যই। অর্জুনকে তিনি অধিক ভালোবাসেন বলেই যুদ্ধ না-করে ব্যূহের দ্বার মুক্ত করে দিয়েছিলেন অর্জুনের প্রতি। জয় নিশ্চিত করেছেন দ্রোণ নিজেই। এমনকি শেষরাত পর্যন্ত যুদ্ধ করে ভীমপুত্র ঘটোৎকচকে হত্যার পর, অর্জুনের সঙ্গে তিনিও সিদ্ধান্ত দেন যুদ্ধ বন্ধ করতে। সেটাও একটা ষড়যন্ত্র বলে দ্রোণের ওপর চাপিয়ে দিলেন দুর্যোধন। আসলে সমস্ত সৈন্য একটু বিশ্রাম চাচ্ছিল, তাই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দ্রোণ। অগ্নিশর্মা দুর্যোধন বললেন, বুঝেছি! আপনি বারবার পা-বদের জিতিয়ে দিতে চান; আর এটা এজন্য যে আপনার প্রিয় শিষ্যের প্রতি প্রবল স্নেহের কারণেই। কত কত দিব্যাস্ত্র আপনার আছে, আপনি চাইলেই তা শত্রুর ওপর প্রয়োগ করে জয় ছিনিয়ে আনতে পারেন! কিন্তু এতসবে অস্বীকৃতি জানালেন দ্রোণাচার্য। বললেন, একজন অস্ত্রবিদ হয়ে সাধারণ মানুষের ওপরে এ-অস্ত্র আমি প্রয়োগ করতে পারি না। সঙ্গে সঙ্গে অভিভূত হলেন অর্জুনের পরম স্থৈর্যে, একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত হয়েও অর্জুন তার দেওয়া ব্রহ্মাস্ত্র দুর্যোধনাদির ওপর প্রয়োগ করছে না। এ-অর্জুনকে ভালো না-বেসে কাকেই-বা ভালোবাসবেন তিনি? ভ-, প্রতারক, আত্ম প্রবঞ্চক, এই দুর্যোধন-দুঃশাসন আর হীন কর্ণকে? সেনাপতি সবার সামনেই আবার অর্জুনের প্রশংসা করলেন; আর এরা সবাই ক্ষেপে গেল; অর্জুনের জন্য আপনাকে ভাবতে হবেনা মশাই! আমরা আছি; তাকে এক শেষ দেখে নেব আমরা, বলে দিলাম। এই বুঝি অক্ষমের দম্ভ। প্রবল অট্টহাস্যে ফেটে পড়লেন দ্রোণাচার্য। বরং বলে দিলেন, বাপুরা শোনো বলি, যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের প্রতিপক্ষ হয়ে তোমাদের ঘরে ফেরার জোগাড় তো দেখি না। কেন মিছে লাফাচ্ছ? শান্ত হও। দুর্যোধনকে একচোট নিয়ে বললেন, দুর্যোধন, যাও না তুমি আজ অর্জুনের সামনে? তোমার বেঁচে থাকার জন্যই তো অর্জুনকে বধ করা দরকার, তাই না? অন্য বা আমার প্রতি এত অনুযোগ কেন তোমার? তুমি বরং মুখোমুখি হও; তুমি না ক্ষত্রিয় বীর? আজকে তোমার সুযোগ এসেছে, অর্জুনকে হত্যা করে যশ আর রাজ্য অধিকার করো? বিদ্রুপের একশেষ দেখালেন দ্রোণাচার্য।

কিন্তু দ্রোণাচার্য শেষপর্যন্ত পা-বদের কোনো ক্ষতি করেনি; ক্ষতি সহ্যও করেনি। এর মূলে ওই অর্জুন, অর্জুনের শৌর্য ও  নীতিনম্রতাই। দুর্যোধনের প্ররোচনায় পা-ববিরোধী যুদ্ধের সেনাপতি হয়েও পা-বদের হত্যা না-করে শেষরাতে কঠিন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, পাঞ্চালদের শায়েস্তা না-করে আমি যুদ্ধবর্ম খুলব না। কিন্তু যুদ্ধ তো পাঞ্চালদের সঙ্গে নয়; পাঞ্চালরা মিত্রশক্তি মাত্র। এ-বিষয়টাকে অর্জুনসূত্র ছাড়াও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করাও সম্ভব; তবে, এ-প্রসঙ্গে সে প্রশ্ন আসছে না। রাত্রিশেষে দ্রোণ একে একে বধ করলেন মহারাজ বিরাট ও দ্রুপদকে। আরও নিধনযজ্ঞে চড়াও হলেন পাঞ্চালবাহিনীর ওপর; ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন পার্থসারথি কৃষ্ণ। এবার দ্রোণাচার্যকে দমন না-করলে শেষ নিস্তার হবে না; পা-ব-পাঞ্চালের অস্তিত্ব থাকবে না পৃথিবীতে। কৃষ্ণ ষড়যন্ত্রের জাল বুনলেন। দ্রোণাচার্যকে হত্যা করতে হবে, অনৈতিকভাবেই। যুধিষ্ঠিরকে দেওয়া মন্ত্রণানুযায়ী। না-হলে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী পা-বকুলের। কিন্তু অর্জুন তাতে রাজি হবেন কেন? রাজি তিনি হলেন না। কৃষ্ণ বুঝানোর চেষ্টা করলেন, শোনা পার্থ! যুদ্ধজয়েই এই আয়োজন। ধর্ম বা ন্যায়বিধিতে তা আর সম্ভব নয়; অন্যায় একটা করতেই হবে। নতুবা দ্রোণ সবাইকে মাটিতে মিশিয়ে দেবেন! কিন্তু অর্জুন এই অন্যায় পরামর্শ মেনে নিতে পারলেন না, আমতা আমতা করে যুধিষ্ঠির মেনে নিলেও।

ভীম অশ্বত্থামা নামে একটা হাতি বধ করে ঘোষণা দিলেন, অশ্বত্থামা আর নেই। দ্রোণের কানে সেটা পৌঁছালও। কিছুক্ষণ তিনি স্তব্ধ হলেন, কিন্তু অস্ত্র ছাড়লেন না। পুত্র অশ্বত্থামা এমন সাধারণ বীর নন যে তাকে চাইলেই হত্যা করা যাবে; তার ওপর তার কাছে আছে ব্রহ্মাস্ত্র। তিনি সংশয়াচ্ছন্ন হলেন। ভাবলেন, খবরটা মিথ্যা। কিন্তু পিতার প্রাণ কেঁপে উঠছিল বারবার। অশ্বত্থামা বেঁচে আছে তো? হ্যাঁ, যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞেস করা যায়, তিনি তো কখনও মিথ্যে বলেন না! কিন্তু আগেই যুধিষ্ঠিরকে বুঝিয়ে ফেলেছেন কৃষ্ণ, বিপদমুক্ত হবার জন্য একআধটা মিথ্যে বলাই যায়! যুধিষ্ঠির ঠিক মিথ্যেও বললেন না; কপটতার আশ্রয় নিলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, অশ্বত্থামা মারা গেছেন, তবে হাতি কিন্তু! দ্বিতীয় ব্যাক্যাংশ বললেন আস্তে করে; যা শুনলেনই না আবেগী দ্রোণাচার্য! একমাত্র বীরপুত্রের মৃত্যুসংবাদে পঁচাশি বছরের বৃদ্ধ মুষড়ে পড়লেন নিমিষেই; কী আছে জীবনে আর? অশ্বত্থামা নেই, হা পুত্র! ভেঙে পড়লেন দ্রোণ, আর হাত থেকে খসে পড়ল অস্ত্র।

এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন; কিছুকাল পূর্বে এরই হাতে হত হয়েছেন পিতা দ্রুপদ; রাজ্য হারিয়ে অপমানিত হয়েছিলেন একদা দ্রোণের কারণেই। আজ প্রতিশোধ নিতে হবে। অস্ত্রহীন বৃদ্ধের ওপর পড়তে লাগল শরের বৃষ্টি; বিহ্বল আর শোকার্ত দ্রোণও থেমে থাকলেন না। অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করলেন, একসময় ধৃষ্টদ্যুম্নর ধনুক ফেলেও দিলেন। তখনই ভীম দ্রোণের কাছে আসেন, আর কথার বাণে অসম্মান করতে থাকেন যে, যারা ব্রাহ্মণ হয়েও ব্রাহ্মণের মতো আচরণ করেন না; ব্রাহ্মণের ধ্বজাধারী, এরা অন্তত যুদ্ধ না-করে যদি ঘরে বসে থাকত তাহলে এরকম ক্ষত্রিয় নিধন হতো না। দ্রোণাচার্যের এটা একটা অভিমান ছিল; ব্রাহ্মণত্ব ছেড়ে ক্ষত্রিয়ের বৃত্তি নিলেও ব্রাহ্মণত্বকেই আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন সারাজীবন। এটাই তার জ্ঞাতিপরিচয়, আর কেউ না-বুঝলেও এই অভিমান বুঝতেন দুজনমাত্র ব্যক্তি; এক, কৌরবপতি ভীষ্ম; আর দুই, প্রিয় শিষ্য অর্জুন। এজন্য ভীষ্মের প্রতি সর্বদাই তার একটা সমীহ যেমন ছিল; অর্জুনের প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাতও। সেই ব্রাহ্মণত্বে খোঁচা দিয়েছেন তৃতীয় পা-ব ভীম। অসম্মান করেছেন মৃত্যুমুহূর্তেও, তাও আবার নিজের এক শিষ্য। এদিকে তিন তিন বার উচ্চারিত হয়েছে ‘অশ্বত্থামা নেই’। যে-অশ্বত্থামার মুখে পিটুলিঘোলার পরিবর্তে দুধ তুলে দেওয়ার জন্য ব্রাহ্মণের বৃত্তি ছেড়েছিলেন দ্রোণাচার্য; কিন্তু ভেতরে চিরআরাধ্য ছিল ওই পরিচয়টুকু; সে-অশ্বত্থামা নেই! যার জন্য বেঁচে আছেন, অথচ সে আজ আর নেই! দ্রোণাচার্য দেরি না-করে রথের ওপর রাখলেন অস্ত্রশস্ত্রের ভার; ত্যাগ করলেন সৈনাপৈত্য পদ। কিন্তু দায়িত্বহীনের মতো কাজটি করলেন না মোটেই, কর্ণ আর দুর্যোধনকে ডেকে বললেন, বাছা দুর্যোধন! এই আমি অস্ত্রত্যাগ করে সেনাপতির পদ ত্যাগ করলাম; তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাও! আর পা-বদের মধ্যে অর্জুনের মুখ মনে এনে আশীর্বাদ করলেন, মঙ্গল হোক তোমাদের, অস্ত্রত্যাগ করলাম আমি! ইনি আচার্য দ্রোণ। তারপর মুখ থেকে হাহাকার ধ্বনি বেরিয়ে এলো, ‘অশ্বত্থামা, অশ্বত্থামা আমার!’ ততক্ষণে খড়্গ হাতে লাফিয়ে এলেন, ক্রূর ধৃষ্টদ্যুম্ন। দূর থেকে চিৎকার করে উঠলেন অর্জুন, মেরো না, ধৃষ্টদুম্নœ! মেরো না! জীবন্ত যদি ধরে আনতে পারো আনো, কিন্তু আচার্যকে মেরো না! কিন্তু এই মর্যাদার মূল্য কী করে বুঝবেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

দ্রোণহত্যার পর পুত্র অশ্বত্থামা প্রবল ক্রোধে ধাবিত হলেন পা-বদের দিকে। ধৃষ্টদ্যুম্ন হত্যার প্রতিজ্ঞা নিয়ে আসছেন এই বীর। ভয় পেলেন যুধিষ্ঠির। সংবাদ দিতে গেলেন অর্জুনকে। নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখালেন অর্জুন। যুধিষ্ঠিরকে বললেন, আসুক অশ্বত্থামা! আমার গুরুর চুলের মুঠি ধরে যে অপমান করেছে; তাকে ক্ষমা করবে কেন অশ্বত্থামা? বরং তিনি বকাঝকা করতে লাগলেন যুধিষ্ঠিরকে, যার প্রতি কখনও চোখ তুলেননি অর্জুন। কেন আপনি মিথ্যাচার করেছেন? আপনি-না সত্যবাদী? তাহলে বলতে পারলেন ‘অশ্বত্থামা নেই’? ধৃষ্টদ্যুম্নের ব্যাপারে আমার করার কিছু নেই, বলে দিলাম। আমি তো ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিষেধও করেছিলাম। ক্ষোভে আর রাগে অর্জুনের চোখে জল এসে গেল। বড়োই স্মৃতিকাতর হয়ে উঠলেন অর্জুন। সেই শৈশবে কুয়োর ধারে খেলতে গিয়ে গুরুর উজ্জ্বল-কান্তি শালপ্রাংশু দেহ দেখেছিলেন তিনি; এখনো স্পষ্ট মনে আছে; হাতে তুলে দিয়েছিলেন তীব্র তীরধনু। মিত্রপক্ষ ধৃষ্টদ্যুম্ন হত্যাকরল তাকে নৃশংসভাবে! অর্জুন উচ্চারণ করলেন যুধিষ্ঠিরাধির সম্মুখে, শিষ্য ছিলাম আমি ঠিক; তবে আমাকে আচার্য ভালোবাসতেন পিতার মতোই। পিতাকে হারিয়েছি শৈশবে; ধর্মত তিনিই তো ছিলেন আমার পিতা। সামান্য রাজ্যের লোভে পিতাকে সবাই মিলে হত্যা করেছি আমরা। এটা অন্যায়।…আমার কথা যদি বলি; বলতে হবে, পুত্র আর শিষ্যদের মধ্যে তিনিই আমাকে ভালোবাসতেন বেশি। এমন গুরুকে আমরা হত্যা করেছি, আমাদের জীবনের আর কোনো মানে হয় না!

কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের কান্নার রোল ওঠে; গুরু দ্রোণের মৃত্যুতে শিষ্য অর্জুনের কান্নার আহাজারি মহৎপ্রাণ ছাড়া অন্য কারও কানে প্রবেশ করে না। তাই আশেপাশে একমাত্র প্রাজ্ঞ যুধিষ্ঠিরকেই নীরব থাকতে দেখি। অর্জুনের একটা কথারও জবাব দিতে পারেননি তিনি; দাঁড়িয়েছিলেন নিশ্চল পাথরের মতোই। আর অর্জুনের এই যে কান্নার আর্তি ও শোক তা একজন গুরুর প্রতি একজন শিষ্যের। একজন পিতার প্রতি এক পুত্রের। এরা দুই মিলে আসলে একজন। অন্যদিকে পিতা পিতা শুধু; গুরু আবার পিতা ও গুরু। তাই পিতা রূপান্তর মাত্র, গুরু নিত্য।  মহাভারতের কবি যেমনটা বলেন, আসলে পিতাতে-পুত্রতে যে-অভিন্নতা; গুরুতেশিষ্যতেও ওইরূপ। পিতা দেখেন পুত্রের মুখে নিজের ছবি, শিষ্য দেখেন গুরুর চোখে জীবনের স্বপ্ন। এমন ছবিনির্মাণ আর স্বপ্নসৃষ্টিতে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসই একমাত্র শিল্পী ও ভাষ্যকার হতে পারেন, আর কেউ না। অন্তত আমি দেখি না।

*******************************

 

ফখরুল ইসলাম
………………..
বুদ্ধদেব-প্রতিভা’র মহাভারত পরিক্রমা

বুদ্ধদেব বসু, (১৯০৮-১৯৭৪ খ্রি.) তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ ব্যয় করেছিলেন পুরাণচর্চায়। আমাদের স্মরণে আসে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থের— ‘অভিনয়, অভিনয় নয় ও অন্যান্য গল্প’ (১৯৩০)— কথা। গ্রন্থর্ভুত শেষ গল্পটি ‘পুরাণের পুনর্জন্ম’, যেখানে তিনি রামায়ণে’র দুই চরিত্র, ঊর্মিলা-লক্ষ্মণ দম্পতির দাম্পত্য জীবন ও প্রেমকে চিত্রায়িত করেছেন। তবে তাদেরকে তিনি রূপায়িত করেছেন বর্তমানের মানুষ হিসেবে, সমকালীন বাস্তবতায়। পুরাণের উপেক্ষিতজনদের প্রতি তাঁর দরদ এরপরেও আমাদের নজরে আসবে। আমাদের মনে হয়, সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাথই ঊর্মিলার সংক্ষিপ্ত-সংকীর্ণ দাম্পত্য জীবনের জন্য বেদনাতুর হয়েছিলেন (দ্র. ‘কাব্যের উপেক্ষিতা’, জ্যৈষ্ঠ-১৩০৭, প্রাচীন সাহিত্য)। পৌরাণিক চরিত্রে বিশ শতকের আধুনিক মানুষের মানসতা সঞ্চার এরপরেও বুদ্ধদেব করেছেন ‘তপস্বী ও তরঙ্গিণী’ (১৯৬৬) নাটকে। মহাভারতের ‘বনপর্ব’ থেকে এ-নাটকের কাহিনিবীজ আহৃত। তাঁর প্রথম নাটকের বিষয়ও রামায়ণ থেকে চয়িত। একে একে আমাদের মনে পড়তে থাকে ‘দময়ন্তী’, ‘দ্রৌপদীর অন্তহীন শাড়ি’, ‘কালসন্ধ্যা’, বিদুরের জন্মকথা নিয়ে লেখা ‘অনা¤œী অঙ্গনা’, ‘প্রথম পার্থ’, ‘সংক্রান্তি’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘ইক্কাকু সেন্নিন’ প্রভৃতির কথা। জীবনের শেষ চার বছরে তিনি রচনা করলেন— তাঁর সুদীর্ঘ, পূর্ব-প্রস্তুতির, পরিকল্পনার ফসল ‘মহাভারতের কথা’; তাঁর মহাভারত পর্যটন বৃত্তান্ত। বৃত্তান্তটির প্রথম খ-টি পেলেও তাঁর পরিকল্পনার দ্বিতীয় খ-টি পাওয়ার সম্ভাবনা লেখকের জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে তিরোহিত হয়েছে।

মহাভারত বিষয়ে তাঁর আরো কিছু পরিকল্পনা ছিলো। তাঁর সৃষ্টির দরোজায় হানা দিয়েছিলো বিদুর-কুন্তীর রহস্য ঘেরা প্রেম-সম্ভাবনা; ‘মহাপ্রস্থানিক পর্বে’র যুধিষ্ঠিরাদির সঙ্গী হওয়া কুকুরটি; কিন্তু সময় হয় নি তাঁর, সেসবকে রূপায়িত করার। ‘মহাভারতের কথা’য় ভীষ্ম, কর্ণ যথোচিত মনোযোগ পান নি বলে অনেকেই অনুযোগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর পরিকল্পিত দ্বিতীয় খ-ে হয়তো তিনি তাদের যথোচিত আসন বরাদ্দ করতেন— এমনটি অনুমান করা যায় তাঁর সাহিত্যকর্মের দিকে তাকিয়ে।

‘মহাভারতের কথা’য় বুদ্ধদেব বসু মহাভারতের কাঠামো নিয়ে খুব বেশি ভাবিত ছিলেন না। তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে ছিলো এর চরিত্রায়ণ। তবু এ-বিষয়ে তাঁর কিছু মতামত ও সিদ্ধান্ত রয়েছে। ‘আদিপর্বে’ মহাভারতকে— ইতিহাস, কাব্য, পুরাণ এই তিন নামে অভিহিত করা হয়েছে। তাঁর মতে— ‘এই ‘পঞ্চম বেদ’টির স্বরূপ বুঝতে হলে একে খ-িত ভাবে দেখা চলবে না’। কাঠামোর মধ্যে ‘গীতা’র অবস্থান বিচার করে তিনি এর অপরিহার্যতা স্বীকার করেন। অনেকেই ‘গীতা’কে ‘মহাভারতে’র প্রক্ষিপ্ত অংশ বলে বিবেচনা করে থাকেন। তাদের মতামতের সঙ্গে বুদ্ধদেব বসু একমত নন। তাঁর মতে ‘গীতা’ স্বাধীন কোনো গ্রন্থ হতে পারে না, তা ‘মহাভারতে’র অঙ্গীভূত। নিশ্চেষ্ট, যুদ্ধকুণ্ঠ (সদ্ধর্ম ত্যাগে ধাবিত), প্রেরণাহীন অর্জুনকে ঐ মুহূর্তে কৃষ্ণের বাণী দ্বারা উজ্জীবিতকরণ ছাড়া উপায় ছিলো কি? ‘গীতা’কে এ-দিক থেকে বুদ্ধদেব বসু দেখেছেন ‘এক তীব্র নাটক’ হিসেবে। মহাভরতের কাহিনিমধ্যে অসঙ্গতি ও অসংলগ্নতা রয়েছে এ-বিষয়ে তিনিও একমত। এটা স্থানে স্থানে তিনি চিহ্নিতও করেছেন। তারপরেও তিনি বলেছেন, ‘… যদি চাই এক বিশাল তরঙ্গোচ্ছল পুরাণ ¯্রােতে অবগাহন করতে, আর সেই জলের তলা থেকে মাঝে মাঝে যে-সব সুন্দর, ভীষণ, অদ্ভুত ও মনোমুগ্ধকর ভাবমূর্তি মুহূর্তের জন্য উত্থিত হ’য়ে মিলিয়ে যাচ্ছে, তাদের দূরপ্রসারী তাৎপর্য কিয়দংশও যদি উপলব্ধি করতে চাই, তাহ’লে, যা-কিছু আমাদের হিসেবে বিসদৃশ বা অসংগত বা বিভ্রান্তিজনক, সেই সবই আমাদের যথাযথ বলে মেনে নিতে হবে।’ কাহিনি বিন্যাস সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্তটি: ‘আমার কাছে এ-কথা অতি স্পষ্ট যে ‘মহাভারতে’র মূলকাহিনী তার প্রতিটি পর্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত—অচ্ছেদ্যভাবে, যুক্তিসিদ্ধভাবে।’

বুদ্ধদেব বসু ‘মহাভারত’ পর্যটন করেছেন একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে— যার রয়েছে নমনীয়, মুগ্ধ কবিপ্রাণ। এই মহোত্তম কাব্যটিকে কেন্দ্র করে তাঁর ভাবনা-চিন্তা, বোঝাপড়ার প্রকাশই ছিলো ‘মহাভারতের কথা’ গ্রন্থ রচনার কারণ। এর প্রধান চরিত্রগুলোর ‘মানবিক মাত্রা’ নির্ণয় করাই ছিলো তাঁর উদ্দেশ্য। গ্রন্থের প্রথম পরিচ্ছেদে—‘বনবাসের শেষ দিন’— তিনি দুটো ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এক, একটি তৃণভূক হরিণকে পঞ্চভ্রাতা তাড়া করে পরাস্ত করতে পারলেন না। ব্রাহ্মণের অরণিকাষ্ঠটির পুনরুদ্ধারও সম্ভব হলো না পঞ্চপা-বদের দ্বারা। ক্লান্তি, অবসাদ, গ্লানি সব একসঙ্গে গ্রাস করলো তাদের। ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর হলেন তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি লিখছেন, ‘মনে হয় এই দেবপুত্র ভ্রাতৃপঞ্চক তাঁদের বলবীর্য অসামান্যতা হারিয়ে জীবনের প্রাকৃত স্তরে অধঃপতিত হলেন।’ এ-প্রসঙ্গেই দ্বিতীয়ত যেটি তিনি আমাদের স্মরণ করিয়েছেন তা হলো: বনচর এক কিরাতের বিক্রম সহ্য করতে না পেরে অর্জুন একদা মূর্ছিত হয়েছিলেন এবং বলবান ভীমকে ‘এক মহান অজগর’ বশীভূত করেছিলো। এ-সবের উল্লেখ করে তিনি দেবদুলাল চরিত্রদের ‘মানবিক মাত্রটিকে’ চিহ্নিত করেছেন।

‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ বিচারের ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সবাইকে ‘একটি অখ-, সার্বিক ও সামঞ্জস্যমূলক দৃষ্টি নিয়ে’ প্রবৃত্ত হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু কার্যত বঙ্কিম কথিত দৃষ্টি নিয়েই ‘মহাভারতে’র দিকে তাকিয়েছিলেন কিন্তু তদ্সত্ত্বেও বিচারের ক্ষেত্রে পার্থক্য সূচিত হয়েছে। ‘মহাভারতে’র উচ্চ প্রশংসিত পুরুষ কৃষ্ণ। বঙ্কিমচন্দ্র ‘কৃষ্ণচরিত্রে’ কৃষ্ণকে ‘সম্পূর্ণ পক্ষপাতশূন্য’ বলে রায় দিয়েছেন। অপরপক্ষে বুদ্ধদেব বসু উদাহরণ সহযোগে কৃষ্ণের পক্ষপাতদুষ্টতার পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন। তারপরেও বুদ্ধদেবের মনে হয়েছে কৃষ্ণই মহাভারত কা-ের ‘পরিচালক ও অধিনায়ক’। ‘মহাভারতে’ কৃষ্ণের ঈশ্বরত্বকে বুদ্ধদেব স্বীকার করেন নি। বঙ্কিমচন্দ্র প্রমাণ করতে চেয়েছেন— যে কৃষ্ণ ঈশ্বর নন, এক আদর্শ মানুষ। তার বিপরীতে বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্য—‘বঙ্কিম কথিত আদর্শ মানুষ দূরে থাক, এক চতুর ,কপট, নিগূঢ়ভাবুক, রাজনীতিদক্ষ লোকনায়ক, যাঁর তুল্য দ্বিমুখী ও সুকৌশলী কূটকর্মী মহাভরতে  আর একটিও নেই।’ (দ্র.:১৯: ‘কোন বীর, কোন দেবতা…’)। বুদ্ধদেব বসু কৃষ্ণ সম্পৃক্ত অনেকগুলো প্রসঙ্গই বিভিন্ন স্থানে উপস্থাপিত করেছেন, যেখানে কৃষ্ণ সম্বন্ধে তাঁর উপর্যুক্ত মন্তব্যের সত্যতা প্রতিপাদিত হয়। কৃষ্ণ নিজে যে তাঁর ঈশ্বরত্ব সম্পর্কে মাঝে মাঝে ভুলে যান, তা আমরা দেখি যুদ্ধ আরম্ভ হবার সঙ্গে সঙ্গেই। এরই প্রেক্ষিতে বুদ্ধদেব লিখেছেন, ‘… কিন্তু অনুগীতা— অধ্যায়ে এসে দেখলাম, শুধু যে অর্জুন সব ভুলে গিয়েছেন তা নয়, কৃষ্ণও আর মনে করতে পারছেন না ‘ভীষ্ম পর্বে’ অর্জুনকে তিনি কী বলেছিলেন। এতেও আমাদের মন সম্মতি জানায়, কেননা, আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে মানুষের জীবনে এই রকমই ঘটে থাকে, এবং কৃষ্ণ এখন আমাদের চোখে একজন মানুষমাত্র— অসাধারণ মানুষ তা সত্য, কিন্তু ইতিহাসশ্রুত অনেক অসাধারণের মতোই স্খলনপ্রবণ— অন্তত পুণ্যপ্রভ বা শুদ্ধশীল তাঁকে বলা যায় না— কেননা যুদ্ধকালীন নিকৃষ্টতম কর্মগুলি তাঁর দ্বারা সাধিত বা প্ররোচিত হয়েছিলো।’ (দ্র.: ‘কোন বীর, কোন দেবতা…’)। এ নিরিখেই স্বীকার্য ‘কৃষ্ণ সর্বাঙ্গীনভাবে মানুষ’।

বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘মহাভারতে আমি একজন নায়কেরর উপস্থিতি অনুভব করি… তিনি যুধিষ্ঠির’। এর পূর্বে রাজশেখর বসু ‘মহাভারতের’ সারানুবাদের ভূমিকায় যুধিষ্ঠিরকেই নায়ক চরিত্র বলে নির্দেশ করেছিলেন। বুদ্ধদেব বসু সে সত্যকে বিস্তৃত করেছেন। মহারাষ্ট্রীয় লেখিকা ইরাবতী কার্ভের অনুমান, যুধিষ্ঠির শূদ্রগর্ভজাত বিদুরের পুত্র, বুদ্ধদেব বসু তা মানতে নারাজ। তাঁর মতে: ‘তাহলে মহাভারতের একটি ভিত্তিপ্রস্তর সরিয়ে নেয়া হয়’ এবং ‘তাহলে মহাভারতকে হ’তে হ’তো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গ্রন্থ।’ তবে এমনটি কল্পনা করে সাহিত্য রচনার অবকাশ রয়েছে, বলে তিনি মনে করেন। যুধিষ্ঠিরের ভূমিকা বিশ্লেষণের পূর্বে একটি বিষয়ে লেখক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন— সেটা হলো যুধিষ্ঠিরের সৌন্দর্যবোধ। তার প্রমাণ তিনি রেখেছেন পাশা খেলায় দ্রৌপদীকে পণ রাখার পূর্বমুহূর্তে, যখন তিনি সাতটি শ্লোকে দ্রৌপদীর রূপ-গুণ বর্ণনা করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে বুদ্ধদেব তাকে ‘সৌন্দর্যরসিক বিদগ্ধ পুরুষ’ বলে অভিহিত করেন।

চতুর্বর্গের শেষটি—তথা মোক্ষকে বাদ দিয়ে বেদব্যাস ধর্ম-অর্থ-কামের উল্লেখ করলেন মহাভারতের মাহাত্ম্য বোঝাতে। গার্হস্থ্যকে বলা হলো শ্রেষ্ঠ আশ্রম? কেন? বুদ্ধদেব বসু মনে করেন— এই প্রশ্নের জবাব যুধিষ্ঠিরের জীবনে মূর্ত হয়ে আছে এবং ‘এর মাধ্যমে যেন বলে দেয়া হচ্ছে যুধিষ্ঠিরই মহাভারতের প্রতিভূ পুরুষ’। আমরা জানি যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র হয়েও কাম ও অর্থ, তাঁর নিকট অবজ্ঞাত ছিলো না। তিনি গৃহস্থ, তবে বলা যায় গৃহস্থ হিসেবে তিনি আদর্শ নন। কোনো কিছুতে আদর্শস্থানীয় হবার ইচ্ছ বোধ হয় তাঁর ছিলো না। যা-হোক, গৃহধর্মী বলেই কিন্তু যুধিষ্ঠির ধর্মবকের একটি প্রশ্নের (কে সুখী?) উত্তরে বলতে পেরেছিলেন: ‘অঋণী ও অপ্রবাসী হয়ে স্বগৃহে যে শাকান্ন ভোজন করে, সে-ই সুখী’।

আখ্যানভাগে যুধিষ্ঠিরের ভূমিকা কেবল পা-বপক্ষেই এমনটি বিবেচনা করেন নি বুদ্ধদেব। যুধিষ্ঠিরের ভূমিকাটিকে তিনি মহাকালিক ও মহাজাগতিক ক্ষেত্রে বিস্তৃত করে দেখেছেন। এ-কারণে তিনি বলেছেন—‘কুরুক্ষেত্রের পরেও প্রয়োজন ছিলো প্রায়শ্চিত্তের, সেটা বিশ্বপ্রকৃতির দাবি, তা না-হলে পৃথিবী স্বাস্থ্য ফিরে পাবে না;— আর সেই প্রায়শ্চিত্ত, মানবিক পাদপীঠে দাঁড়িয়ে, ভুক্তভোগীদের মধ্যে যুধিষ্ঠির ছাড়া আর কে করতে পারতেন? এই যে তিনি অন্যদের কৃত অপরাধও নিজের বলে স্বীকার করে নিলেন, যেন দুর্যোধন- শকুনির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেলেন মনে-মনে। সব পাপাত্মার মুখপাত্র হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন আনতশিরে গান্ধারীর কাছে ও জগতের কাছে— এটাই উত্তরপুরুষের জন্যে উপঢৌকন তাঁর— এবং কোনো রাজত্ব-পরিচালনার চাইতে এটাকে কোনোমতেই ন্যূন বলা যায় না, কেননা এতেই আছে চিত্তশুদ্ধির উপাদান, আছে যুদ্ধপরবর্তী মনোবৈকল্য থেকে সর্বজনের পরিত্রাণের উপায়।’ (১৮, নীলচক্ষু নকুল)।

মহাভারতের নায়ক হিসেবে অর্জুনের দাবিটিকেও পরীক্ষা করে দেখেছেন বুদ্ধদেব। এ-বিষয়ে তাঁর অভিমত— অর্জুন কর্তা নন, কর্ম মাত্র। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা দেখে এসেছি কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের প্রতিটি যুদ্ধের  সম্পাদক ছিলেন কৃষ্ণ: কোন সময় কাকে আক্রমণ বা রক্ষা করতে হবে, কখন কোন অস্ত্রের ব্যবহার সমীচীন, কখন প্রতিদ্বন্দ্বীকে অন্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজের সরে পড়া ভালো, কী-উপায়ে মহাযোদ্ধারা বধ্য হতে পারেন— এই সব, প্রতিটি অনুপুঙ্খ, কৃষ্ণ বলে দিয়েছেন, অর্জুন শুধু আজ্ঞাপালন করেছেন ভৃত্যের মতো।’ (২১: ঐশ্বর্যের দারিদ্র্য: দারিদ্রের ঐশ্বর্য )।

অর্জুন, সবরকমের ক্ষাত্রগুণে ভূষিত, ‘কীর্তিকিরীটধারী মনোমুগ্ধকর’ পুরুষ হলেও শেষপর্যন্ত তিনি কৃষ্ণের ক্রীড়নকমাত্র। তার যা শ্রেষ্ঠ অর্জন তা তিনি নিজে অর্জন করেন নি, এগুলো অপর কর্তৃক উপহৃত। অর্জুনের ব্যক্তিত্ব প্রসঙ্গে অন্যান্য বীর চরিত্রের সঙ্গে তুলিত করে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ ভীম দুর্যোধনেরা তাঁদের সব ভালো-মন্দ নিয়ে তাঁদেরই স্বপ্রকাশ ব্যক্তিত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। বিষয়টিকে আরো একটু অনুধাবন করলে আমরা এই অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি এসে দাঁড়াই যে বীর অর্জুনই সবচেয়ে কম স্বাবলম্বী এবং সবচেয়ে বেশি পরমুখাপেক্ষী; তাঁর তুলনায় ‘ভীরু দুর্বল’ যুধিষ্ঠিরকেই স্বনির্ভর বলে আমাদের মনে হচ্ছে এখন— কেননা ‘মহাপ্রস্থানিক পর্বে’, ভীষ্ম বিদুর কৃষ্ণ যখন অন্তর্হিত, চঞ্চলরসনা হিতৈষিণী পাঞ্চালীও নির্বাক; তখন যুধিষ্ঠির একাই তাঁর সংকটের সমাধান করতে পারলেন, কোথাও কোনো সাহায্যকারী নেই বলে উদ্বিগ্ন হলেন না। কিন্তু— এই কথাটা এতক্ষণে বলবার সময় হলো— এ-রকম কোনো বিশুদ্ধ স্বকীয় কর্ম অর্জুনের জীবনে একটিও নেই; সবই তাঁর জন্য করে দেয়া হয়েছিলো, তাঁর বিঘœহীন পথ বহু যতেœ রচনা করে দিয়েছিলেন অন্যেরা, তিনি শুধু পথের বাঁকে বাঁকে জয়মাল্যগুলি গ্রহণ করেছিলেন।’ (২১: ঐশ্বর্যের দারিদ্র্য: দারিদ্র্যের ঐশ্বর্য)। কৃষ্ণের মৃত্যুর পর অর্জুনের যে অনস্তিত্বের অনুভূতি হয়েছিলো তার প্রতি লক্ষ্য রেখেই বুদ্ধদেব যুধিষ্ঠির ও অর্জুনের নিজস্বতা নিয়ে উপর্যুক্ত অভিমত দিয়েছেন।

বুদ্ধদেব বসুর মতে মহাভারতের কেন্দ্রীয় চরিত্র যুধিষ্ঠির, নানা দিক থেকেই তাঁকে তিনি মূল্যায়ন করেছেন এবং তাঁর মূল্যায়নের সারাৎসার উল্লেখ করেই এ বিষয়ের সমাপ্তি টানছি— ‘ভারতবর্ষীয় প্রতিভার এই এক অদ্ভুত ও অতুলনীয় সৃষ্টি, যুধিষ্ঠির: কর্মকারী কিন্তু কর্মবীর নন, ধর্মাচারী কিন্তু ধর্মবীর নন, অফুরন্তভাবে জ্ঞান অন্বেষী হয়েও জ্ঞানগুরু হতে পারলেন না, স্বাভাবিক আধ্যাত্মিকতা নিয়েও তপস্যারত হলেন না কখনো— আমাদের অনেক ভাগ্যে কোনো অর্থেই তাঁকে মহাপুরুষ বলা যায় না— তিনি মানুষ, শুধুমাত্র মানুষ, প্রায় এক ‘সাধারণ’ গৃহস্থ, যাঁর মুখচ্ছবিতে মানবজীবনের সব দাযিত্ব ও দায়িত্বজনিত বেদনার রেখা অঙ্কিত হয়ে আছে, এবং সেইজন্যেই যিনি চিরস্মরণীয়।’(১৫: রামের উদাহরণ)।

বুদ্ধদেব বসু মহাভারত বিষয়ে প্রচল অনেক মত মেনে নিয়েছেন, আবার অনেক মতের সঙ্গে একমত হতে পারেন নি। তবে এমন এক স্থান থেকে তিনি তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন যেটা ছিল একটা নতুন পথের শুরু। দেবতা বা দেবতাতুল্যদের মানুষ হিসেবে আবিষ্কার নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিকই ছিলো। তিনি যে পথের সূচনা করেছিলেন সে পথেরই আরেক অভিযাত্রী তাঁরই সহধর্মিনী, প্রতিভা বসু (১৯১৫-২০০৬) জীবনের উপান্তে এসে, বিরাশি বছর বয়সে, দীর্ঘ চারযুগের ‘মহাভারত’ পাঠের অভিজ্ঞতায় লিখলেন ‘মহাভারতের মহারণ্যে’ (১৯৯৭)। দম্পতি বলে নয়, ‘মহাভারত’ সম্পর্কে তাদের মতের ভিন্নতার— যা মূলত তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিগত ভিন্নতাজাত— কারণে আমরা একসঙ্গে তাঁদের মতামতগুলিকে পর্যবেক্ষণ করছি।

বুদ্ধদেব বসু যেখানে আগাগোড়া যুধিষ্ঠিরকে কেন্দ্র করে ‘মহাভারত’-কা- সংঘটিত দেখছেন , প্রতিভা বসু সেখানে দেখছেন সমস্তটাতেই সত্যবতীর ইচ্ছাকে ফলবতী হতে। যুধিষ্ঠির যে ধর্মপুত্র এটা মানতে বুদ্ধদেবের অস্বস্তি হয়নি কিন্তু প্রতিভা বসু মনে করেন—বিদুরই যুষ্ঠিরের পিতা। প্রতিভা বসুর বিবেচনায় ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ নয় ‘মহাভারত’ কার্যত অনার্য কালো মেয়েদের জয়ী হবার কাব্য। দ্রৌপদীর প্রকৃত জন্মকথা ব্যাসদেব আমাদের জানতে দিতে চান না, গল্প ফাঁদেন, যজ্ঞবেদী থেকে দ্রৌপদী উত্থিত হন। প্রতিভা বসু মনে করেন, মহাভারত আখ্যায়িকার প্রকৃত নায়িকা সত্যবতী। সত্যবতী, শান্তুনুকে যে শর্তে বিয়ে করতে সম্মত হন, তা হলো: তার গর্ভের সন্তানই রাজা হবেন এবং পূর্বপক্ষের সন্তান ভীষ্ম কিংবা তার সন্তানরা রাজত্ব লাভ করবেন না। শান্তনু এ-শর্তে সম্মত হন নি। পুত্র ভীষ্মই সত্যবতীর শর্ত মেনে নিয়ে পিতার মনের ইচ্ছা পূরণ করেন। সত্যবতী ধীবর কন্যা হয়েও চেয়েছিলেন, তার পুত্র-পৌত্রাদি হস্তিনাপুরের রাজা হবে। এ-কারণে তিনি নিজপুত্র ব্যাসদেবকে দিয়ে অপরপুত্র বিচিত্রবীর্যের দুই পতœী অম্বা-অম্বিকার গর্ভসঞ্চার ঘটান। এবং শেষ পর্যন্ত তারই বংশধর যুধিষ্ঠির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।

বিশ্বামিত্র ও মেনকার কন্যা, কন্ব মুনির আশ্রমপালিতা শকুন্তলা। শকুন্তলা, রাজা দুষ্মন্তকে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন, ‘আপনার ঔরসে আমার গর্ভে যে পুত্র জন্মাবে, আপনি বিদ্যমানে সে যুবরাজ হবে, এবং আপনার অবিদ্যমানে সে রাজা হবে।’ শকুন্তলা ও দুষ্মন্তের সে পুত্রই ভরত। মহাভারত সেই ভরতবংশেরই কাহিনি।

মহাভারতকে পঞ্চম বেদ বলা হয়। কিন্তু এমনটি বলার পেছনে কী মহত্ব লুক্কায়িত তার সন্ধান পাননি প্রতিভা বসু। ধর্ম রক্ষার্থে যুদ্ধ বলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে যে মহিমান্বিত করা হয়, তাকেও তিনি অযথার্থ বলে মনে করেন। কেননা অর্জুন প্রতিটি যুদ্ধে অন্যায্য আচরণ ও  রীতি-প্রথা লঙ্ঘন করেছেন। প্রতিভা বসু লিখেছেন, ‘মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বলার তুল্য মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না… যখন প্রতিটি অধার্মিক আচরণ, অন্যায় আঘাত, মিথ্যাচার এবং শঠতা এসেছে পা-ব পক্ষ থেকে, প্রধানত কৃষ্ণের কপটতা হেতু, বোঝা যায় না, কী ধর্ম মহাভারতের উদ্দেশ্য।’

প্রতিভা বসু মনে করেন, মহাভারতের অনেক স্থলই অসংগতি দোষে দুষ্ট। উদাহরণত তিনি উল্লেখ করছেন, নিষাদ বালক একলব্যের কথা। একলব্য নিষাদ বলে দ্রোণাচার্য তাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেন না, অথচ রাজ্যের যিনি প্রভু, শান্তনু, তিনি বিবাহ করলেন একজন ধীবর কন্যাকে। ধীবররাওতো নিষাদ। মহাভারতের আখ্যানেও অনেক স্থানে ফাঁক ও ফাঁকি রয়েছে বলে প্রতিভা বসুর নিকট প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি সেসবের কিছু কিছু উল্লেখও করেছেন। তিনি দেখেছেন কিছু স্থানে ব্যাসদেব রূপকথা সহযোগে সেসব ফাঁক পূরণে সচেষ্ট হয়েছেন। যেমন, দ্রৌপদীর জন্ম, দুর্যোধন ও দুঃশাসনের জন্মরহস্য, কুন্তীর — যে দেবতাকে স্মরণ করবেন তিনিই এসে তার সম্ভোগ ইচ্ছা পূরণ করবেন—বরলাভ, দেবতাদের হর-হামেশা মর্ত্য আগমন, কলসীকে জরায়ু বানানো, মাছের পেটে মানুষের জন্ম, দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী গ্রহণকে বৈধতাদানের নিমিত্ত পুরাকালের গল্প বানানো। এরকম অপ্রাকৃত ঘটনার সন্নিবেশ ব্যাসদেব তখনই করেছেন যখন সত্য প্রকাশ করা বিপজ্জনক।

প্রতিভা বসুর চোখে ‘মহাভারতের শ্রেষ্ঠ আর্য যুবক’ ভীষ্ম। শপথ রক্ষা, ত্যাগ ও ঔদার্য তাঁর অন্যতম চারিত্রিক গুণ। সত্যবতীর শর্ত পূরণ কল্পে চিরকুমার থাকলেন। চিত্রাঙ্গদা ও বিচিত্রবীর্য নামত রাজা থাকলেও, সত্যবতীর নির্দেশে পেছন থেকে তিনিই রাজত্ব পালন করেছেন। বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রীর গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্যে সত্যবতী তাঁকে অনুরোধ করলে, তাঁকে তিনি পূর্বশর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

পা-ুর ক্ষেত্রজ যুধিষ্ঠির। আসল সত্যটি দ্বৈপায়ন জানতেন, বিদুরের ঔরসে কুন্তীর গর্ভের অবৈধ পুত্র যুধিষ্ঠির। এ-কারণে মহাভারত রচয়িতা দ্বৈপায়ন পা-ুপুত্রদের প্রতি অকুণ্ঠ ¯েœহ-আসক্তি ও পক্ষপাত প্রদর্শন করেছেন। প্রতিভা বসু উল্লেখ করেন, ‘তাঁর বিধানে কর্ণ অপাঙক্তেয়। তিনি কর্ণকে জন্মকলঙ্কের লজ্জা থেকে মুক্ত করেন নি। ভীষ্মকেও তিনি যথোচিত মর্যাদা দেন নি; কেবল রাজকর্মচারীরূপে এঁকেছেন। ভীষ্ম পিতার ইচ্ছাপূরণ করলেন, সত্যবতীর শর্ত পালন করলেন কিন্তু তাঁর মহত্ব নিরূপণ করলেন না দ্বৈপায়ন।’ ভীষ্ম ও কর্ণ বিশুদ্ধ আর্য। সম্ভবত সেজন্যেই তাঁরা দ্বৈপায়ন কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েছেন মর্মে মত দেন প্রতিভা বসু। ভীষ্মের অন্যান্য গুণপনার কথা প্রতিভা বসু স্বীকার করলেও একস্থানে তাঁর ন্যায়চ্যূত হবার জন্য তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড়ও করিয়েছেন। তাঁর মতে, ভীষ্ম সত্য পরিত্যাগ করতে পারেন না বলে নিজে অহংকার করেন আবার সেই তিনি বিচিত্রবীর্যের জন্যে কাশীরাজের দুই কন্যাকে ছিনিয়ে আনেন কেমন করে?

ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ বলে, জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বাদ দিয়ে পা-ুই প্রথম রাজত্বে অভিষিক্ত হন। কিন্তু কিছুদিন পরে নিজেকে ‘নিষ্ফল জ্ঞানে মনের দুঃখে’ রাজ্যের ভার বড়ভাই ধৃতরাষ্ট্রের হাতে সমর্পণ করে দুই স্ত্রী কুন্তী ও মাদ্রীকে নিয়ে হিমালয়ে চলে যান। বিদুর মাঝে মাঝে তাঁদের খোঁজ-খবর নিতে হিমালয়ে যেতেন, প্রতিভা বসুর ধরণা—বিদুর মূলত কুন্তীর টানেই সেখানে যেতেন। অনেক পরে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রের জন্ম হলো- নাম তাঁর দুর্যোধন। প্রতিভা বসুর প্রশ্ন হলো, কেউ কি তার নিজ সন্তানের নাম এমন নেতিবাচক (দুর্যোধন, দুঃশাসন) রাখতে পরেন? বিশেষ করে যারা দীর্ঘ প্রতীক্ষিত-আকাক্সিক্ষত এবং ভবিষ্যৎ যুবরাজ। জন্মমাত্রইবা কীভাবে তাদের ভবিষ্যৎ সুকর্ম বা দুষ্কর্ম সম্পর্কে অনুমান করে তেমনটি নাম রাখা সম্ভব? তিনি অনুমান করেন, ‘খুব সম্ভব হয়তো দুর্যোধনের প্রকৃত নাম ছিলো সূর্যধন’। দুর্যোধনের যখন জন্ম হচ্ছে, ঠিক একই সময়ে হিমালয়নিবাসী কুন্তীও গর্ভবতী হলেন। ব্যাপারটাকে প্রতিভা বসু ষড়যন্ত্রমূলক বলেই মনে করেন। বিদুরের বংশধরকে রাজা বনানোর পরিকল্পনার ফসল এটি। প্রতিভা বসুর সিদ্ধান্তই বলা যায়— বিদুর এবং কুন্তীর ছেলে যুধিষ্ঠির। ধৃতরাষ্ট্র শতপুত্রের জনক হলেও প্রথম দুটিই কুরুকুলের প্রধান চরিত্র— দুর্যোধন ও দুঃশাসন। দুর্যোধনের যখন রাজ্যাভিষেক হবে ঠিক তখনই, হঠাৎ, কুন্তী পা-ুর ক্ষেত্রজ! পাঁচপুত্র নিয়ে হস্তিনাপুরে হাজির। তিনটি কুন্তীর এবং দুটি মাদ্রীর যমজ। কুন্তী জানালেন জ্যেষ্ঠটি ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির, বয়স ষোল; মধ্যমটি পবনপুত্র পনেরো বছরের ভীম, এবং কনিষ্ঠটি ইন্দ্রপুত্র অর্জুন আর নকুল, সহদেব অশ্বিনীকুমারের পুত্র। এর আগে কুন্তী সূর্যের ঔরসে জন্ম দিয়েছিলেন কর্ণকে। কুন্তী ষড়যন্ত্র করেই যুধিষ্ঠিরের বয়স ষোল বলেছেন, কেননা দুর্যোধনের তখন বয়স পনেরো। ষোল না হলে যুধিষ্ঠির রাজত্ব লাভের যোগ্য হয় না। পঞ্চপা-বের জন্ম নিয়ে সন্দেহ ও পাঁচ কথা হয়েছিলো প্রজাদের মধ্যে কিন্তু সত্যবতীর ইঙ্গিতে ভীষ্মই তাতে পানি ঢেলে দেন। দুর্যোধন এ-ব্যাপারে সকলের স্বীকৃতিকে অপছন্দ করলেন। প্রতিভা বসুও সন্দেহ করেছেন। পা-ু হিমালয়ে বাস করলেও গৃহ নিঃসম্পর্ক ছিলেন না। কুন্তী, মাদ্রী গর্ভবতী হলে এমন খবর পূর্বেই হস্তিনাপুর পৌঁছানোও অসম্ভব ছিলো না, বলে মনে করেন তিনি যৌক্তিকভাবেই। এসবের পেছনে বিদুরের প্রযোজনা ও সত্যবতীর কলকাঠি নাড়ার ব্যাপারটি তাই গোপন থাকে না। তাই তিনি প্রশ্ন  উত্থাপন করেন, ক্ষেত্রজ নামধারী যুধিষ্ঠির কেন রাজা হবেন? স্বাভাবিকভাবে ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধনই রাজা হবার যোগ্য। ধৃতরাষ্ট্রকে আমরা নির্বোধের মতো বিদুরের বুদ্ধি অনুসারে পরিচালিত হতে দেখি, এ-বিষয়ে দুর্যোধনের মতো প্রতিভা বসুও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। দুর্যোধন প্রতিভা বসুর হৃদয় কেড়েছিলেন- এটা বোঝা যায়। বিদুরের ষড়যন্ত্রে ও দ্বৈপায়নের কৃপায় দুর্যোধন সম্পর্কে ভিন্নরূপ প্রচারের মাহাত্ম্যে বাঙালি পাঠক দুর্যোধনকে সঠিকভাবে আবিষ্কার করতে অসমর্থ হয়েছেন বলে মনে করেন  তিনি। এ-প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন—‘যদি বলি দুর্যোধন স্বভাবতই কিছুটা সংযত ও সহিষ্ণু চরিত্রের মানুষ, তাহলে শতকরা একশো জনই হয়তো অট্টহাস্য করে উঠবেন, কেন না, কেবল শুনে শুনে, প্রচারের মহিমায়, তার উল্টো কথাই সবাই বিশ্বাস করে এসেছেন সহ¯্র বছর যাবৎ।’

প্রতিভা বসুর অভিমত, কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস ও তার পুত্র বিদুর দুর্যোধনাদির বিরুদ্ধে একতরফা অপপ্রচার চালিয়েছেন। দুর্যোধনের জন্মমাত্রই বিদুর ধৃতরাষ্ট্র সমীপে দুর্যোধনকে পাপাত্মা বলেছেন। হত্যা করতে বলেছেন দুর্যোধনকে। ধৃতরাষ্ট্র বিদুরের সকল কথা শুনতেন, মানতেন। কেবল এই একটি কথা তিনি মানেন নি। দুর্যোধনের প্রতি বিদুরের বিদিষ্ট মনোভাব অন্যত্রও গোপন থাকে নি। এর একমাত্র কারণ, দাসীপুত্র বলে তিনি রাজত্ব লাভ করতে ব্যর্থ হন, বলে চিরটাকাল ঈর্ষার অগুনে দাহিত হয়েছেন। কিন্তু তার দীর্ঘদিনের সাধ; তার পুত্র যুধিষ্ঠির যেন হস্তিনাপুরের রাজা হয়। এই উদ্দেশ্যেই তার কর্মপ্রবাহ চালিত হযেছে। প্রতিভা বসুর দৃঢ় বিশ্বাস, যুধিষ্ঠিরকে রাজত্বে অধিষ্ঠিত করতে বিদুর এবং কুন্তী ষঢ়যন্ত্র করে পা-ু ও মাদ্রীকে হত্যা করেছে। যাতে পা-ুর ক্ষেত্রজ বলে যুধিষ্ঠিরাদির পরিচয় দিতে কোন বাধা না থাকে। তাঁর মতে, পা-ুর মৃত্যু রহস্যজনক। কেননা, মাদ্রীর হঠাৎ আর্তনাদ শুনেই কুন্তী সেখানে কাঁদতে কাঁদতে গেলেন; যেন কুন্তী আগেই জানতেন এই আর্তনাদের কারণ পা-ুর মৃত্যু। প্রতিভার অনুমান, মনে হয় কুন্তী এজন্য অপেক্ষারত ছিলেন। মাদ্রী সম্ভবত জেনে গিয়েছিলেন পা-ুর হত্যাকারী কে বা কারা? তাই তাকেও সঙ্গে সঙ্গে মরতে হলো। প্রতিভার সন্দেহের তীর সরাসরি বিদুর ও কুন্তীর দিকে। হিমালয় থেকে শব বহন করে আনা লোকজন হস্তিনাপুরের কারো সঙ্গে কোনো কথা বলেন নি। পঞ্চপা-বদের পা-ুর মৃত্যুস্থানে যেতে দেয়া হয়নি। যেইমাত্র ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র হলো তখনই কেন পা-ুর ক্ষেত্রজ নিতে হলো? পঞ্চপা-বের কথা গোপন রাখা হলো যতক্ষণ না পা-ু ও মাদ্রী মৃত্যুবরণ না করেন। বিদুরের ষড়যন্ত্র ও কলাকৌশল দৃষ্টে প্রতিভা বসু তাকে বলেছেন,‘এক শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, ক্ষমতালোভী চতুর মন্ত্রী’। অন্যদিকে দ্বৈপায়ন সম্পর্কে বলা হয়—‘মহৎ, নিষ্কাম, নিরপেক্ষ, ব্রহ্মচারী’। এসবের সঙ্গে একমত হতে পারেন নি প্রতিভা বসু। তিনি প্রশ্ন তুলেন দ্বৈপায়ন কেমন ব্রহ্মচারী? ‘যে ব্রহ্মচর্যের মস্তকে পদাঘাত করে, যে-কোনো নারীর শয্যায় শায়িত হতে এক মুহূর্ত চিন্তা করেন না’।

ক্রীড়াচ্ছলে ভীম দুর্যোধনকে নানাভাবে পীড়িত করতেন। তার প্রতিক্রিয়ায় একদিন দুর্যোধন ভীমের খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেন। তারপর তার হাত-পা বেঁেধ জলাশয়ের ধারে রাখেন। বিদুর অপপ্রচার চালাবার মোক্ষম অস্ত্র হাতে পান। দুর্যোধন যে পা-বদের সহ্য করতে পারেন না, তাদের হত্যা করতে চান এমন আরো অনেক কথা বলে প্রজাদের নিকট দুর্যোধনের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজত্ব ব্যাপারে দুর্যোধনের প্রতিদ্বন্দ্বী যেখানে যুধিষ্ঠির সেখানে কেন দুর্যোধন ভীমকে হত্যা করতে যাবেন? এ স্বাভাবিক প্রশ্ন কেন কেউ উত্থাপন করলেন না তা ভেবে বিস্মিত হয়েছেন প্রতিভা।

কুন্তী স্বভাব স্বৈরিণী বলে মত দিয়েছেন প্রতিভা। তাঁর অনুমান সূর্যের ঔরসে কুমারী অবস্থায় কুন্তী কর্ণের জন্ম দেন এবং ভূমিষ্ঠ হবার পর তাকে অশ্বনদীতে নিক্ষেপ করেন। তার স্বৈরিণী স্বভাব ঢাকতেই জনৈক মুনির বরদানের গল্পটি তৈরি করেন দ্বৈপায়ন। মুনির বরে কুন্তী যে দেবতাকে স্মরণ করবেন তিনিই আবির্ভূত এবং কুন্তীর সম্ভোগ ইচ্ছা পূর্ণ করবেন। কুমারীকালের পুত্র কর্ণ জীবিত আছেন এবং কোথায় কাদের নিকট প্রতিপালিত হচ্ছে তা কুন্তী জানতেন কিন্তু কখনো পা-ুর নিকট প্রকাশ করেন নি। কারণ তা করলে বিদুরের রাজপিতা হবার সাধটি পূরণ হয় না।

জতুগৃহ ষড়যন্ত্রকে প্রতিভা বসু বিদুরের রচনা বলেই সাব্যস্ত করেছেন। ধৃতরাষ্ট্র পঞ্চপা-বদের প্রমোদভ্রমণে বারাণাবতের মেলায় পাঠিয়েছিলেন মাত্র দিনকয়েকের জন্যে কিন্তু তারা সেখানে একবছর থাকলেন জতুগৃহের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরি হবার অপেক্ষায়। বিদুরই খননকারী নিযুক্ত করেছিলেন। প্রতিভা বসু যথার্থ প্রশ্নই তুলেছেন, পঞ্চপা-বদের ধার্তরাষ্ট্ররা যদি পুড়িয়েই মারবেন তবে এতোটা সময় নিশ্চেষ্ট থাকবেন কেন? লক্ষণীয় পুরোচনের ঘরটি আলাদা ছিলো। যুধিষ্ঠিরের নির্দেশে ভীমই আগুন লাগালেন জতুগৃহে। একজন ক্ষুধার্ত নিষাদ মাতাকে পাঁচপুত্রসহ অধিক পরিমাণে ভোজন করান পা-বগণ। অত্যধিক আহারের প্রভাবে যখন তারা জতুগৃহে মৃতবৎ পড়েছিলেন তখন আগুন দিয়ে তাদের পুড়িয়ে মারলেন পা-বরা। নির্দোষ নিষাদেরা বেঘোরে প্রাণ দিলো। কী নির্মম পৈশাচিকতা!

দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভার আয়োজনকে প্রতিভা বসু ব্যাসদেবের সাজানো নাটক হিসেবেই গণ্য করেন। রাজা দ্রুপদ ঘোষণা করলেন, যে বীর ‘শয্যাশরাসনে’ শরসন্ধানপূর্বক যন্ত্র অতিক্রম করে লক্ষ্যবিদ্ধ করতে পারবেন দ্রৌপদী তারই গলায় বরমাল্য দিবেন। লক্ষণীয়, দ্রুপদ কিন্তু কোন জাত-পরিচয়ের কথা বলেন নি, বলেছেন কেবল বীরত্বের কথা। কিন্তু যখন কর্ণ ধনুকে শর পরাতে উদ্যত হলেন, তখনই দ্রৌপদী চিৎকার করে উঠলেন— কোনো সূতপুত্রকে তিনি স্বামী হিসেবে মেনে নিবেন না। দ্রুপদ কিংবা তার ভাই ধৃষ্টদ্যু¤œ কেউই দ্রৌপদীর কথার প্রতিবাদ করলেন না। প্রতিভা বসু প্রশ্ন রাখেন, দ্রৌপদী কেমন করে জানলেন কর্ণ সূতপুত্র? তাছাড়া তো কর্ণ অঙ্গ দেশের রাজা হিসেবেই স্বয়ংবর সভায় এসেছিলেন। ব্যাসদেবের পরামর্শ মোতাবেক পঞ্চপা-বরা ব্রাহ্মণের বেশ ধরে স্বয়ংবর সভায় এসেছিলেন। অর্জুন ধনুকে শর পরালেন এবং লক্ষ্যবিদ্ধ করতে সক্ষম হলেন। দ্রৌপদী অর্জুনকে মাল্যভূষিত করলেন। অনার্য রীতিতেই বিয়ে হলো। কুন্তীর নিকট গিয়ে তারা বললেন, এক ‘রমণীয় পদার্থ’ নিয়ে এসেছেন। কুন্তীও না দেখে বলে ফেললেন সকলে (পাঁচ ভাই) মিলে ভোগ করো। প্রতিভা বসু বলেন, না জেনে বলা কুন্তীর ঐ কথাটি কেন পালন করতে হবে? এর কি কোন আবশ্যক রয়েছে? আর নারীকে ‘উৎকৃষ্ট বস্তু’, ‘রমণীয় পদার্থই বা বলার হেতু পরিষ্কার নয়। জীবিত মানুষকে কেমন করে বস্তু বলা যায়? সবচেয়ে যেটাকে বিস্ময়কর বলে প্রতিভা বসুর মনে হয়েছে তা হলো— কেউ বলে দেবার আগেই, দ্রৌপদীকে প্রথম দেখেই কুন্তী কেমন করে বললেন— যে ইনি দ্রুপদনন্দিনী? কার্যত অর্জুনের সঙ্গে বিয়ে হলেও অর্জুনের জ্যেষ্ঠভ্রাতা যুধিষ্ঠিরও যে স্বামীত্বের দাবী নিয়ে তাঁর শয্যায় এসে উপস্থিত হবেন— এ-কথা কি দ্রৌপদী পূর্বে কখনো স্বপ্নেও ভাবতে সক্ষম হয়েছিলেন? প্রশ্ন রাখেন প্রতিভা বসু। দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী গ্রহণ ‘নারীত্বের অবমাননা’ ছাড়া অন্য কিছু নয়— বলে মনে করেন লেখিকা। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণকে সমর্থন করেন না লেখিকা, কিন্তু তিনি মনে করেন এটা পা-বদের হিংসার বদলে কৌরবদের প্রতিহিংসার প্রকাশ। তিনি মনে করেন, দ্রৌপদী বলির পাঁঠা হয়েছেন—রাজনীতির যূপকাষ্ঠে বলি হয়েছেন।

রাজসূয় যজ্ঞের সময় পা-বদের আমন্ত্রণে দুর্যোধন গিয়েছিলেন। সেখানে ময়দানব নির্মিত জৌলুসপূর্ণ সভাগৃহ দেখিয়ে পা-বগণ চেয়েছিলেন দুর্যোধনের মনে ঈর্ষা জাগাতে। শুধু তাই নয় জল-স্থলের বিভ্রমে যখন বারবার দুর্যোধন নাকাল হচ্ছিলেন দ্রৌপদীসহ পা-বগণ বিদ্রƒপ, উপহাস করেছিলেন দুর্যোধনকে। দুর্যোধন সে অপমানের প্রতিশোধ নিতেই পরবর্তীতে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ও পা-বদের নিঃস্ব করেছেন। এটা মূলত অপমানের, অহংকারের জবাব দিয়েছেন দুর্যোধন। কিন্তু পাশাখেলায় কোনোরূপ শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি তারা। বলরাম বলেছেন, শকুনি কপট পাশায় যুধিষ্ঠিরকে হারান নি। নিজ দক্ষতা ও বুদ্ধিবলেই শকুনি পাশায় জিতেছেন। কিন্তু বিদুর মিথ্যাটাই প্রচার করেছেন এবং সবাই সেটাই অধিক বিশ্বাস করেছে। কৃষ্ণও বিদুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে এই অন্যায্য ও অসত্য বলেছেন যে, শঠতাপূর্ণ খেলায় দুর্যোধনেরা যুধিষ্ঠিরের পৈতৃকরাজ্য অপহরণ করে নিয়েছেন। অক্ষক্রীড়ায় শকুনি সবচেয়ে পটু এটা যুধিষ্ঠির জানতেন তবু তিনি তার সঙ্গেই খেলার ইচ্ছা নিজ থেকেই প্রকাশ করেছিলেন।

পুরো মহাভারত জুড়েই প্রতিভা বসু লক্ষ করেছেন, শঠতা, অন্যায়, লজ্জাহীন পক্ষপাত, ধূর্ততা আর ষড়যন্ত্রের ছড়াছড়ি। প্রতিভা বসু লিখেছেন : ‘মহারাজা শান্তুনুর মৃত্যুর পরে বিমাতার প্রতি দ্রেবব্রতের কাযর্কারণহীন আনুগত্য, দ্বৈপায়নের দ্বারা দাসীর গর্ভে বিদুরের জন্ম, দুর্যোধন জন্মানোমাত্রই বিদুরের তাকে হত্যা করাবার প্রয়াস, স্বীয় অবৈধ পুত্র যুধিষ্ঠিরকে পা-ুর ক্ষেত্রজ প্রমাণ করবার জন্য কুন্তীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে পা-ু ও মাদ্রীকে নিহত করা, পুত্রদের অজ্ঞাতবাসে পাঠিয়ে কোনো ক্ষমতাশালী নির্দিষ্ট রাজার সঙ্গে সম্পর্ক পাতাবার চেষ্টা, বারণাবতে নিজেরা আগুন লাগিয়ে অতোগুলো মানুষকে পুড়িয়ে ধৃতরাষ্ট্র আর তাঁর পুত্র দুর্যোধনের নামে চালাবার মিথ্যাচার, একজন কৃতবিদ্য প্রযুক্তিবিদ পাঠিয়ে বিদুরের পাতাল পথ রচনা, সেই পথে হেঁটে দূরবর্তী অন্য এক লোকালয়ে গিয়ে উঠে মাতাসহ পঞ্চপা-বের আকাশের তলায় দাঁড়ানো এবং অপেক্ষমাণ পথপ্রদর্শককে সঙ্গে নিয়ে বিদুরের পাঠানো যন্ত্রযুক্ত নৌকায় আরোহন, অপর তীরে অবরোহন করে আবার নির্দিষ্টভাবে দক্ষিণদিকে গমন, চলতে চলতে নির্দিষ্ট স্থানে ব্যাসদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ, ব্যাসদেবের নির্দেশে প্রথম একমাস একচক্রা নগরে অবস্থান, তারপরে পুনরায় একমাস পরে ব্যাসদেবের আগমন এবং পাঞ্চাল নগরে ব্রাহ্মণের বেশে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় গিয়ে অর্জুনের বীরত্বে দ্রৌপদী লাভ, কুন্তীর চালাকিতে যুধিষ্ঠিরাদির সঙ্গে দ্রৌপদীর বিবাহ দেবার ধূর্ততা— ষড়যন্ত্র এবং হঠকারিতার নিদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়’।

যুধিষ্ঠির চরম সৌভাগ্যবান। ভ্রাতাদের প্রসাদেই তিনি সবকিছুর অধিকর্তা। বিদুরের বুদ্ধি, ব্যাসদেবের সহায়তা, অর্জুনের বীরত্ব, ভীমের বলে তিনি সবকিছু পেয়েছেন। ধৃতরাষ্ট্র অর্ধেক রাজত্ব পা-বদের দিয়ে খা-বপ্রস্থে পাঠালেন। রাজ্যলিপ্সু যুধিষ্ঠির রাজা থেকে স¤্রাট হতে চাইলেন। রাজসূয় যজ্ঞ করলেন।  কৃষ্ণ ভয় পেতেন দুজনকে: এক, জরাসন্ধ; দুই, শিশুপাল। কারণ এই দুই রাজা কৃষ্ণের বুজরুকিতে বিশ্বাস করতেন না। যজ্ঞে কৃষ্ণ কর্তৃক ভীষ্মের সম্মাননাদান আরেকটি চক্রান্ত ছিলো, যার উদ্দেশ্যই ছিলো কৃষ্ণের শত্রু নিধন। জরাসন্ধকে বধ করতে হবে— কৃষ্ণ বললেন যুধিষ্ঠিরকে। অসততা ও ক্ষাত্রধর্মের অবলোপ করে কৃষ্ণের কথায় যুধিষ্ঠির উল্লসিত হলেন। মগধরাজ জরাসন্ধের সামনে কৃষ্ণ মিথ্যা বলেন। কপট যুদ্ধে, চতুর্দশ দিবসে ধুর্ত কৃষ্ণ ‘ক্লান্ত, অব্যবস্থিত, উপবাসী, অসতর্ক’ জরাসন্ধকে হত্যা করেন। শত্রুগৃহে গোপনে প্রবেশ করে অপ্রস্তুত গৃহস্থকে হত্যা করা ক্ষাত্রধর্ম বিরুদ্ধ। যুধিষ্ঠির সম্পর্কে প্রতিভা বসু আরো লিখেছেন, ‘আর যিনি ধর্মাত্মা, মহাত্মা, সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, তিনি নিজে অক্ষম হয়েও, অপরের পারঙ্গমতার সাহয্যে তাঁর নিজের লোভ চরিতার্থের জন্যে যে কোনো পাপকর্মে অন্যদের লিপ্ত হতে দিতে মুহূর্তমাত্র দ্বিধা করেন নি’। দ্যুতাসক্তি তার চরিত্রের আরেক দুর্বল দিক। যে ব্যক্তি জুয়ার নেশায় স্ত্রীকে পর্যন্ত বিক্রয় করেন তাকে প্রতিভা বসু কোনোভাবেই সম্মানিত ব্যক্তি বলে মেনে নিতে রাজি নন। জরাসন্ধ ও শিশুপালবধে তার কপটতা স্পষ্ট। দ্রোণাচার্যবধের সময় গুরুকে মিথ্যা বলেছেন। উচ্চৈঃস্বরে বলেছেন— ‘অশ্বত্থামা হত’ নিচু স্বরে বলেছেন—‘ইতি কুঞ্জর’। কাজেই তার সত্যবাদিতা মিথ্যা প্রচারণামাত্র। তার মিথ্যাবচন শুনেই গুরু দ্রোণাচার্য অস্ত্র পরিত্যাগ করেন এবং চেতনা হারান। অচৈতন্য অবস্থায় ধৃষ্টদ্যু¤œ দ্রোণাচার্যকে হত্যা করে। গুরু দ্রোণাচার্যের ছিন্ন মস্তক নিয়ে ভীম, যুধিষ্ঠির নৃত্য করেছেন। তাদের অভব্য, অশ্লীল আচরণের অসংখ্য নজির মহাভারতে ছড়িয়ে রয়েছে। যুদ্ধ সেদিনের মতো স্থগিত হয়ে যাবার পর জয়দ্রথ যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তখন শপথ ভেঙ্গে অর্জুন জয়দ্রথের শিরো—েদ করেন। একইরকমভাবে ভূরিশ্রবা যখন সাত্যকির সঙ্গে যুদ্ধরত তখন অর্জুন রীতি লঙ্ঘন করে ভূরিশ্রবার ডানহাত কর্তন করেন। এছাড়া, শিখ-ীকে সামনে রেখে ভীষ্মকে হত্যার প্রসঙ্গটিও স্মর্তব্য, যদিও প্রকৃতার্থে পা-বদের জয়ের জন্যে ভীষ্ম একরকম স্বেচ্ছামৃত্যুই তো বরণ করেছেন। অর্জুন, যুধিষ্ঠিরদের মতো অসততা, নীচতা, শঠতার আশ্রয় নেয়া মহাবীর কর্ণ কিংবা দুর্যোধনের পক্ষে কখনো সম্ভব হয়নি। কর্ন যুদ্ধে ভীম ও যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করেছিলেন কিন্তু হত্যা করেন নি, উপহাস করেছেনমাত্র। কেন না তিনি মা কুন্তীকে কথা দিয়েছিলেন, কেবল অর্জুনের সঙ্গেই তার যুদ্ধ হবে। হয় অর্জুন নয় তিনি মরবেন যুদ্ধে। যাতে তার মায়ের শেষ পর্যন্ত পাঁচপুত্রই জীবিত থাকে। কর্ণ মহাবীর, শত প্রলোভনে কেউ তাকে টলাতে পানে নি। বাস্তবত, কৌরব পক্ষে অসৎ রণনীতি অনুসরণের দৃষ্টান্ত বিরল বলে মত দিয়েছেন প্রতিভা বসু। অপরদিকে পা-বপক্ষে, শঠতা, কপটতা, গুপ্ত হত্যার দায় অমোচ্য। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘ছলনা ছাড়া অর্জুনরা কোন মহাবীরকে হত করেছেন? অথবা যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন?’ মহাভারতে অর্জুনকেই বীরশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়— যুদ্ধের সময প্রকৃতপক্ষে কোনো বড় যোদ্ধার সঙ্গে শঠতা না করে অর্জুন বীরত্বের পরিচয় দিতে সক্ষম হন নি।

প্রতিভা বসু শেষ বিচারে জানাচ্ছেন, ‘মহাভারতে ধর্মের কোন জয় নেই, ন্যায়ের কোন স্থান নেই, সত্যের কোন দাম নেই’।

বুদ্ধদেব বসু যেখানে যুধিষ্ঠিরকে মহাভারতের নায়ক হিসেবে দেখেছেন  প্রতিভা বসু সে স্থানে দেখতে পেয়েছেন সত্যবতীকে। অর্জুন ও কৃষ্ণ সম্পর্কে তাঁদের উভয়ের মতামত সমধর্মী। ভীষ্ম, দুর্যোধন, কর্ণ প্রমুখ বুদ্ধদেবের মনোযোগ অকর্ষণে ব্যর্থ হলেও প্রতিভা বসু তাঁদেরকে যথার্থভাবেই মূল্যায়ন করেছেন। দ্বৈপায়ন ও বিদুরের ষড়যন্ত্রের বিষয়টিকে উন্মোচনের কৃতিত্ব প্রতিভা বসুর। প্রতিভার নারী চরিত্রের প্রতি সহানুভূতিপূর্ণ দৃষ্টির বিষয়টি অনুধাবন করা যায়, তবে সেটি কেবল তাদের প্রতিই ক্রিয়াশীল ছিলো যারা অপেক্ষাকৃত শুদ্ধচিত্ত, অন্যায্যভাবে পীড়িত। হিংসা, ষড়যন্ত্র, কপটতা যেসব নারী চরিত্রে তিনি দেখেছেন তাঁদের প্রতি তিনি সহানুভূতিশূন্য। বুদ্ধদেব বসুর মতো তিনিও চরিত্রদের ‘মানবিক মাত্রা’র বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন কিন্তু বুদ্ধদেব বসু যেসব স্থানে কিছুটা কুণ্ঠা বোধ করেছেন যথার্থ সত্যটি স্বীকারে, প্রতিভা বসু সাহসের সঙ্গে সেই কুণ্ঠাকে জয় করেছেন। সর্বোপরি বলা যায়, তাঁদের দুজনের ‘মহাভারত’ পর্যটনে অনেক অনুদ্ঘাটিত স্থানে মানুষের প্রথম পদপাত ঘটেছে।

**********************************

 

ইমানুল হক
………………..
মহাভারতের রাজনীতি— রাজনীতির মহাভারত

রাজনীতি— নীতির রাজা না রাজার নীতি? তর্ক চলতে থাকবে। রাজা নেই রাজতন্ত্র নেই। কিন্তু রয়ে গেছে সেই মানসিকতা। রামায়ণে আছে রাজা যেমন প্রজা তেমন। মহাভারতে উল্টো। বিদুর বলেছেন, প্রজা যেমন রাজা তেমন।

প্রজারা যেমন তেমন রাজাই তো পায়। আবার মার্কস বলেছেন, যে কোন যুগের সংস্কৃতি সেই যুগের শাসকের সংস্কৃতি। মজার কথা হচ্ছে, ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি আজও মহাভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বহন করে চলছে।

‘রাজনীতি’র ইংরেজি প্রতিশব্দ— পলিটিক্স। শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘পলিটিকা’ থেকে। যার অর্থ নগরের কার্যাবলী। কার্যত রাজনীতি মানে হচ্ছে ক্ষমতা, জনগণ, রাষ্ট্র, অর্থ, ধর্ম, জাতি, জাতিগোষ্ঠী, সংস্কার, পরিবেশ এমনকি পরিবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে রাজনীতি। মহাভারতেও আমরা দেখতে পাবো, সম্পত্তি, নারী ও ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বই প্রধান।

‘মিথ’ ও ‘মিথ্যা’— এই শব্দ দুটি কাছাকাছি। মহাভারতে ঘিরে বহু মিথ বা ‘অতিকথন’ আছে। মহাভারতকার লিখেছেন :

যথা সমুদ্রো ভগবান তথা হিহিমবান গিরিঃ।

খ্যাতাবুভৌ রতœনিধী তথা ভারতমুচ্যতে

(আদিপর্ব ৫/৬৬)

অনন্তরতœপ্রভাব হিমালয়ের ন্যায় মহাভারতও অতি তুচ্ছ এবং বিরাট, আবার রতœাকর সুগম্ভীর সমুদ্রের ন্যায় ইহা অতলস্পর্শী এবং অসংখ্য রতেœর আকর। (অনুবাদ : সুখময় ভট্টাচার্য) মহাভারতকে পঞ্চম বেদও বলা হয়। মহাভারত একাধারে ধর্মশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র, কামশাস্ত্র, মোক্ষশাস্ত্র, পুরাণ, ইতিহাস ও কাব্য। কথা চালু আছে— যা নাই ভারতে তা নাই ভারতে। কিন্তু সত্যই কি সমগ্র ভারত ও ভারতীয় সত্তা ধরা পড়ে মহাভারতে? নাকি এটা বিজয়ীর আখ্যান, বিজিতের নয়? নিষ্পদ একলব্য, ব্যাধ জরা, যৌন্দ্ররাজ বসুদেব, জয়দ্রথ, অঙ্গরাজ কর্ণ— এরা কি উপেক্ষিত মহাভারতে? অনার্য স্ত্রীজাত ঘটোৎকচ, উলুপী পুত্র— এরা কি কেবল ব্যবহারের বিষয়? সম্মান ও সম্মানিতের ন্যায়! নাকি শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে চতুর কৌশলে— তথাকথিত আর্যদের সেবা করাই অনার্যদের কাজ, কর্তব্য ও নিয়তি?

রাজশেখর বসু লিখেছেন :

মহাভারত পত্তনে প্রাচীন সমাজ ও জীবনযাত্রার একটা মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়াদি সকলেই প্রচুর মাংসাহার করতেন। গোমাংস ভোজন ও গোমেধ যজ্ঞের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু গ্রন্থ রচনাকালে তা গাইত গণ্য হতো। অস্পৃশ্যতা কম ছিল, দাস-দাসীরাও অন্ন পরিবেশন করত।

এছাড়াও ছিল :

ক্স            মহাভারতে সর্বত্র যুবতী বিবাহ দেখা যায়

ক্স            বহুবর্ণ সংকর বিবাহ ছিল

ক্স            অনেক বিধবা সহমৃতা হতেন। অনেকে হননি। যেমন কুন্তী, অভিমণ্যুপতœী উত্তরা, অর্জুনপতœী সুভদ্রা

ক্স            নারীর মর্যাদা ছিল কিন্তু তা পুরুষের ইচ্ছাধীন। তাদের দান বিক্রয় করা যেত। জুয়াখেলায় পণ রাখা যেত। দ্রৌপদীসহ সব দাসদাসী পণ রাখেন যুধিষ্ঠির

ক্স            জমি ধনরতœ বস্ত্র, যানবাহনের সঙ্গে যুবতী দাসী দান করা হতো। শর্মিষ্ঠাকে যেমন দান করা হয়েছিল কচ প্রণয়িনী দেবযানীর বিবাহের সময়।

ক্স            দেব প্রতিমার পূজা প্রচলিত ছিল। তবে দুর্গা, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী অন্নপূর্ণা নয়।

ক্স            ব্রাহ্মণদের সম্মান করা হতো। কিন্তু সভায় বসে তর্ক করতেন বলে লোকে উপহাসও করতো

ক্স            রাজাকে দেবতা মনে করা হতো। কিন্তু রাজহত্যার বিধানও দেওয়া হয়েছে

ক্স            অশ্বমেধ যজ্ঞের নামে বহু পশু হত্যা হতো

ক্স            নরবলির প্রচলিত ছিল। জরাসন্ধ তার আয়োজন করেন।

(সূত্র : মহাভারত ॥ রাজশেখর বসু ॥ ভূমিকা, পৃ. ১)

ক্স            মহাভারতে দুর্ভিক্ষ আছে। আছে অনাহার ও তীব্র দারিদ্র্যের কথা। বিশ্বামিত্র ক্ষুধায় কুকুরের মাংস ভক্ষণ করেছেন

ক্স            যুদ্ধে নিয়ম মানা ও না মানা দুইই ছিল।

ক্স            ছলনা ছিল। সূর্য অস্ত গেছে বলে, আবার সূর্যের উদয় দেখিয়ে হত্যার আয়োজন চলতো

ক্স            যুদ্ধের সময় একালের মতো স্লেজিং বা বাকযুদ্ধ ও অশালীন আক্রমণ চলতো

ক্স            এছাড়া সমাজে দারিদ্র্য ছিল। ছিল বেশ্যাবৃত্তি। যুদ্ধের সময় বেশ্যাদেরও নিয়ে যাওয়া হতো সৈন্যদের মনোঞ্জনের জন্য

ক্স            হিংসা, প্রতিহিংসা, লোলুপতা, ক্ষমতালিপ্সা, অসূর্যা ছিল তীব্রভাবে

আর আজো যা রাজনীতির অঙ্গ

মহাভারতের রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে পাঁচটি মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ :

ক. ধৃতরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে মহামন্ত্রী কনিকের মন্তব্য

খ. ভীষ্মের

গ. অর্জুনের

ঘ. কৃষ্ণের

ঙ. যুধিষ্ঠিরের

ধৃতরাষ্ট্রের মন্তব্য আজও খুবই প্রাসঙ্গিক। প্লেটো, অ্যারিস্টটল, চাণক্য, মেকিয়াভিলিরাও ফেল মেরে যাবেন তা শুনলে। আজকাল বহু রাজনীতিকই ধৃতরাষ্ট্রের বহুদর্শী মন্ত্রী কনিকের উপযুক্ত শিষ্য।

ধৃৃতরাষ্ট্রের পা-বদের প্রতি প্রবল অসূয়া নিবারণের উপায় হিসেবে মন্ত্রিশ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞ কনিকের উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন : মহারাজ, উপযুক্ত কাল না আসা পর্যন্ত অমিত্রকে কলসের ন্যায় কাঁধে বইবেন, তারপর সুযোগ এলেই তাকে পাথরের ওপর আছড়ে ফেলবেন। পা-বদের প্রতি সেই আচরণই করেছেন ধৃতরাষ্ট্র।

অর্জুন সখেদে মন্তব্য করেছিলেন দ্রোণবধের পর। সেটাও যে কোন রাজনীতিকের সারকথা। বড়ভাই যুধিষ্ঠিরের প্রতি অর্জুনের মন্তব্য :

যিনি ¯েœহের জন্য একধর্মত পিতার তুল্য ছিলেন, অল্পকাল রাজ্যভোগের লোভে তাকে আমরা হত্যা করিয়েছি দ্রোণকে যুধিষ্ঠির অশ্বত্থামা হত ইতিগজ বলে অর্ধসত্য ভাষণ করে শুধু হত্যা করিয়েছেন এমন নয়, দ্রোণের ছিন্নমুন্ডের ক্লেশকর্ষণ করে অপমান করা হয়েছে।

অর্জুনের এই মন্তব্যে ন্যায়বোধের প্রতিফলন আছে। কিন্তু অর্জুনও সবসময় ন্যায় করেননি। কর্ণের প্রতি ঈর্ষায় দগ্ধ হয়েছেন। একলব্যের বুড়ো আঙুল ছেদন করিয়ে দ্রোণ কার্যত অর্জুনের ইগো বা অহমিকাকেই সন্তুষ্ট করেছেন। হত্যা করেছেন ভীষ্মকে। জয়দ্রথকে। রথহীন কর্ণকে হত্যা করেছেন কৃষ্ণের প্ররোচনায়। যা নীতিহীনতার শামিল।

কৃষ্ণ তো মহাভারতের বহু অন্যায়ের দ্রষ্টা ও ¯্রষ্টাও। কর্ণকে বধের সময় তার মন্তব্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক। অর্জুন ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বে, যুদ্ধে লিপ্ত হতে অনীহা প্রকাশ করলে তাঁকে উত্তেজিত করেছেন। তাঁর কথা পরে আরো সংযুক্ত হয়ে ‘গীতা’ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। সেখানে আছে, ‘স্বধর্ম্ম নিধনং শ্রেয়, পরধর্ম ভয়াবহ’ যুুধিষ্ঠির সাধারণত ন্যায়পরায়ণ বলে পরিচিত। কিন্তু আমার তাকে অত্যন্ত ক্ষমতালোভী, হীন বলে মনে হয়েছে। অর্জুনের প্রতি দ্রৌপদী বেশি আযুক্ত জেনে অর্জুনকে বারো বছরের জন্য বাইরে পাঠাবার কথা ভেবে তিনি দ্রৌপদীর সঙ্গে মিলনের জন্য দিনেরবেলায় শয্যাগৃহে না গিয়ে অস্ত্রশালায় গেছেন। সেখানে অস্ত্র নিতে এসে অর্জুন শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত যুধিষ্টিরকে দেখায় তার তৈরী নিয়মানুযায়ী অর্জুনকে বারো বছর বনবাসে যেতে হয়েছে। সেই বনবাসের ফল, মনিপুর কন্যা চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বিবাহ। নাগকন্যা উলুপীর সঙ্গে দেখা এবং বিয়ে। দুই সন্তানের জন্মদান। চিত্রাঙ্গদার পুত্র বভ্রুবাহন ও উলুপী পুত্র ইরাবান। ক্ষত্রিয়ের বীর্যে অনার্য নারীর সন্তানের জন্ম দাও। কিন্তু রাজরাণী হওয়ার বা রাজপুত্র হওয়ার স্বপ্ন দেখো না। ঘটোৎকচ, বভ্রুবাহন এবং ইরাবানের জীবন দিয়ে তাই প্রমাণ।

কিন্তু ব্রাহ্মণ বা দেবতার বীর্যে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন কুন্তী এবং মাদ্রী। গোটা মহাভারতে এ রকম আখ্যান অজস্র। কুন্তী পা-ুকে বলেছেন দেবতার বীর্যে সন্তান দ্রুত জন্মায়, ব্রাহ্মণের বীর্যে দেরিতে। অতএব পা-ুর অনুরোধে একের পর এক ক্ষেত্রজ বা জারজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন কুন্তী। ধর্মের সঙ্গে মিলনে যুধিষ্ঠির, পবনের সঙ্গে মিলনে ভীম, ইন্দ্রের সঙ্গে মিলনে অর্জুন। মাদ্রী অশ্বিনী কুমারদ্বয়ের সঙ্গমে জন্ম দিচ্ছেন নকুল ও  সহদেবের।

এবং মহাভারত আমাদের শেখাল— রক্ত সম্পর্ক কোন বিষয় নয়— ক্ষমতা সম্পত্তিই প্রধান বিষয়। সতীত্ব বা একগামিতাও বিষয় নয়। প্রধান লক্ষ্য ক্ষমতা। বীর্যবান পুত্র দরকার। যারা ক্ষমতার জন্য লড়াই করতে পারবে। এজন্য পা-ু তার রাজত্ব ধরে রাখতে কুন্তীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে সঙ্গমে অনুরোধ করেছেন। নিজে পিতা নন, কিন্তু সামাজিক পিতা। তাঁর পুত্ররা পা-ব বলেই পরিচিত হচ্ছে। ক্ষমতার এমনই মহিমা।

আবার কুন্তীর সূর্যের মতো সন্তান জন্মেছে শুনে ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গমে গর্ভবতী গান্ধারী তার গর্ভে আঘাত করে লৌহপি-ের মতো কঠিন একটি মাংসপেশী প্রসব করলেন। ফেলে দিতে গেলেন। ব্যাসদেব এসে উপস্থিত। ব্যাসদেবের পরামর্শে ঘৃতপূর্ণ একশত কু-ে রেখে শীতল জলে বিধৌত করে ১০০ পুত্র ও এক কন্যা লাভ করেন।

গান্ধারীর মধ্যে কাজ করেছিল রাজমাতা হওয়ার বাসনা। যাঁর সন্তান আগে জন্মাবে তিনিই হবেন রাজমাতা। গান্ধারীর জ্যেষ্ঠপুত্র রাজা হলেন। যুধিষ্ঠির রাজা হলেন ইন্দ্রপ্রস্তের। অসূয়া— ঈর্ষাই ডেকে আনল দ্বন্দ্ব। বিচিত্রবীর্যের দুই সন্তানের বংশধরের বংশপরিচয়ের বড় হল সম্পত্তি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। কর্ণ বলেছেন :

আমরা পা-বদের সঙ্গে শঠতা করেছি, বিষ দিয়েছি, জতুগৃহে অগ্নি দিয়েছি, দ্যূতে পরাজিত করেছি, রাজনীতি অনুসারে বনবাসে পাঠিয়েছি, কিন্তু দৈবের প্রভাবে সবই নিষ্ফল হয়েছে।

রাজনীতি সমাজ জীবন— সবার উপরে দৈবের স্থান দেওয়া মহাভারতের সবচেয়ে বড় রাজনীতি। কর্ণের মুখ দিয়ে মহাভারতকার বলিয়েছেন :

তুমি ও (দুর্যোধন) পা-বরা মরণপণ করে যুদ্ধ কর, দৈব তার নিজ মার্গে চলবে। সৎ বা অসৎ সকল কার্যের পরিণামে দৈবই প্রবল, মানুষ নিদ্রিত থাকলেও অনন্য কর্মা দৈব জেগে থাকে।

আমরা জানি না, এটি প্রক্ষিপ্ত বা পরবর্তীকালের সংযোজন কিনা? কিন্তু গীতা যে পরবর্তীকালের সংযোজন সে বিষয়ে আমাদের নিশ্চিত করেছেন মহাপ-িত সুকুমারী ভট্টাচার্য। পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেওয়া অন্যায় হবে না— এই সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখা হুবহু টুকে নিয়ে তছলিমা নাসরিন ‘নির্বাচিত কলাম’ লিখে আনন্দ পুরস্কার পেয়ে ভারতে বিখ্যাত হন। সুকুমারী ভট্টাচার্য সংস্কৃত সাহিত্যে সুপ-িত। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ : ‘গীতা কেন?’ ‘গীতা কেন?’য় তিনি লিখেছেন যে, ‘কুষাণ যুগের আর্যাবর্তে গীতা রচনা’। তাঁর স্পষ্ট ভাষণ:

প্রতিষ্ঠিত প-িতমহলে প্রায় সকলেই স্বীকার করেন যে, গীতা কুষাণযুগে রচিত। (কুষাণযুগ খ্রিস্টাব্দ ৪০ থেকে ২৩০ খ্রিস্টাব্দ)

মহাভারত রচনাকাল সম্পূর্ণ হয়েছে খ্রিষ্টাব্দ চতুর্থ শতকে। [রামশরণ শর্মা, ভারতের প্রাচীন অতীত, ওরিয়েন্ট ব্লাক স্যোশাল, ২০১১, পৃ. ১৩৫] আর কল্পনা করা হয় মহাভারতের যুদ্ধ খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ এ। মহাভারত তো একদিনে, এমনকী একহাতের রচিত নয়। রাজশেখর বসু চমৎকার লিখেছেন :

মহাভারতে যে ঘটনাগত অসংগতি দেখা যায় তার কারণ বিভিন্ন কিংবদন্তির যোজনা। চরিত্রগত অসংগতির কারণ বিভিন্ন রচয়িতার (লক্ষ্যণীয় বহু রচয়িতা) হস্তক্ষেপ, অন্য কারণ— প্রাচীন ও আধুনিক আদর্শের পার্থক্য। [রাজশেখর বসু, মহাভারত, ভূমিকা]

এখন মহাভারতের রচনাকাল কী?

ইউরোপিয় প-িতগণের মতে আদিগ্রন্থের রচনাকাল খ্রি.পূ. চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দির মধ্যে, খ্রিষ্টের জন্মের পরের তাতে অনেক অংশ যোজিত হয়েছে। অধিকাংশ প-িতগণের মতে খ্রি.পূ. ১৪০০ এ। [রাজশেখর বসু, মহাভারত, ভূমিকা]

গীতার রচনাকাল তাহলে ৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। মহাভারতের রাজনীতি তাহলে কি গীতার রাজনীতি? নাকি মহাভারতের একটি নিজস্ব ভাষ্য ছিল? তাকে বদলে ফেলা হল, এক ব্যক্তি পুরুষোত্তম, দৈব-নির্ভর পুরুষোত্তম এবং তার সেবা ও নির্দেশ দ্বারা চালিত হওয়াই প্রধান লক্ষ্য যেন হয়ে দাঁড়ায় মহাভারতবাদীর তাই নির্মাণ করা হল কৃষ্ণকে। যার মূল কথা : মা ফলেতু কদাচন। ফলের আশা করো না। কর্ম করে যাও। কর্ম করবে দাস। ফল ভোগ করবে ধনিক শ্রেণি। উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণ ও তার কর্মকর্তা ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়। জন্মপরিচয় বড় হল কর্ম পরিচয় থেকে। আমরা ‘গীতা কেন?’- বই থেকে সুকুমারী ভট্টাচার্যের একটু দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেখে নিতে পারি :

প্রতিষ্ঠিত প-িতমহলে প্রায় সকলেই স্বীকার করেন যে, গীতা কুষাণ যুগে রচিত। এই যুগে মধ্যপ্রাচ্য ও চীন থেকে বহু জাতির বণিক, সৈন্য ও সাধারণ মানুষ, কোনো বিজয়কামী সেনাপতির সঙ্গে দলে দলে ভারতে আসে। সঙ্গে আনে সেইসব গোষ্ঠীর নানা বিচিত্র ধর্মবিশ্বাস, দর্শনপ্রস্থান, সংস্কার ও আচার-আচরণ। ভারতবর্ষের উত্তরার্ধে তখন নানা মতের প্রবল সংঘর্ষ চলছে; কোনো একটি মত প্রধান বা সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেনি। সম্ভবত ভগবদ্গীতায় এইসব মতের সমন্বয়ের চেষ্টা হয়েছে।

গীতা নানা কারণে জনপ্রিয় গ্রন্থ খ্রীস্টধর্মে যেমন বাইবেল, ইসলামে যেমন কোরান, হিন্দুধর্মে তেমনি গীতা প্রধান ধর্মগ্রন্থ। এর একটা প্রমাণ অতীতে ও বর্তমানে— এবং হয়তো ভবিষ্যতেও— ভারতবর্ষে অসংখ্য মেয়ের নাম গীতা। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে গীতা ছিল ধর্মগ্রন্থ। তাঁরা গীতা নিয়ে যেতেন ফাঁসির মঞ্চের কাছে; শেষ উপহার পাঠাতেন মা-বাবার কাছে। এদেশে মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আগে পর্যন্ত একখ- গীতা মৃতদেহের বুকে রাখা থাকে। বিচরালয়ে বাদী-প্রতিবাদীকে সত্য কথা বলার জন্য শপথ করতে হয় গীতা স্পর্শ করে। শ্রাদ্ধের সময় গীতা পাঠ করতে হত। অন্য শুভকার্যের অঙ্গ হিসেবেও গীতাপাঠ আবশ্যিক ছিল। গীতা আকারে ছোট হলেও গুরুত্বে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

কুষাণযুগে সমাজে বহু দার্শনিক, ধর্মীয় ও সামাজিক তোলপাড় চলছিল,যার মধ্য দিয়ে সমাজ হয়তো একটা পথনির্দেশ খুঁজছিল। সেটা পায়নি, কিন্তু পাবার জন্য একটা প্রায় সার্বিক আকুতি, একটা আপ্রাণ চেষ্টা চলছিল, যার নানা চিহ্ন গীতার মধ্যেই নিহিত। গীতা জনপ্রিয় হলেও কোসম্বী বলেন, ‘গীতা যতটা সম্মানিত হয়, ততটা পঠিত বা বুদ্ধিদ্বারা আত্মসাৎ করা হয় না এবং যতবার আবৃত্তি করা হয় ততটা বুদ্ধিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে না।’১

দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী মশায় বলেছেন, ‘গীতার অনেক আগেই ভারতবর্ষে একটি সুবৃহৎ পরিমাণ দর্শনচিন্তার সমাহার ছিল, যেটিকে বিভিন্ন প্রস্থানে বিভক্ত করার চেষ্টাই তখনো শুরুই হয়নি।’২

এটা সত্য যে গীতার বহুভাষ্য রচিত হয়েছে, কিন্তু রু´িনী বলেন যে, ‘সব ভাষ্যকারই গীতাকে নিজের মতের অনুকূলে ও সমর্থনে ব্যাখ্যা করেছেন, তাই এ গ্রন্থটির স্পষ্ট উদ্দেশ্য হল বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক মতবাদকে একটি ছত্র তলে নিয়ে আসা।’৩ সে চেষ্টা বহুলাংশে সার্থকও হয়েছিল। নবাগত ও পূর্বেকার সমাজের বহু অন্তর্নিহিত সমস্যার সমাধান হয়েছিল; ফলে একধরনের একটা সংহতি সৃষ্টি হয়েছিল।

সে আলোড়ন বুঝবার জন্য সে সময়কার সমস্যাগুলো খানিক বোঝা প্রয়োজন কুষাণ যুগে বৈদিক যাগযজ্ঞ কিছুকিছু অনুষ্ঠিত হলেও মোটামুটি তার উপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস বেশ কমে গিয়েছিল। এর একটা কারণ হল যে, যে সামাজিক সংহতির মধ্যে যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হত তা বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের প্রভাবে শিথিল হয়ে এসেছিল অথচ নতুন কোন সর্বজনগ্রাহ্য বিকল্প নির্মিত হয়নি। মহাভারতের পঞ্চম অধ্যায়ে উদ্যোগপর্বে গীতাকে পাই। সেখানে কৌবর ও পা-বপক্ষ যুদ্ধের জন্য তাদের অসংখ্য সহচর সঙ্গে নিয়ে দুদিকে যুদ্ধের নিয়মে সজ্জিত— কেবল যুদ্ধসূচনার শঙ্খধ্বনিটি হলেই যুদ্ধ শুরু হবে। অর্থাৎ কয়েক মুহূর্তের প্রতিক্ষা মাত্র। এমন সময়ে, অষ্টাদশ অধ্যায়ে রচিত প্রায় স্বতন্ত্র একটি বৃহদায়তন প্রক্ষেপ সংযোজিত হলে তার নাম গীতা। এর মূল প্রতিপাদ্য কৃষ্ণের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা এবং একটা সামাজিক বিন্যাসের প্রবর্তন— তাও দার্শনিক ও আপাত দার্শনিক যুক্তিতর্কের এক প্রলম্বিত পরিচ্ছেদে। এই বাগবিনিময়ের সময়ে দুদিকে সজ্জিত সৈন্যদল কী করেছিলেন? কৃষ্ণ ও অর্জুনের বিত-ায় তাঁদের কী উৎসাহ থাকতে পারে? যুদ্ধ অনিচ্ছুক অর্জুনকে কৃষ্ণ স্বমতে আনবার জন্য যুক্তি, অযুক্তি, কুযুক্তি প্রয়োগ করেই চলেছেন। তিনিই মুখ্য বক্তা; অর্জুন শ্রোতা মাত্র। মাঝেমাঝে কেবল অর্জুন অল্প কিছু প্রতিবাদ বা প্রশ্ন করেছেন এবং কোনো বিষয় বিশদভাবে জানতে চেয়েছেন। কিন্তু ক্রমেই অর্জুনের স্বর যেন ক্ষীণতর হচ্ছে এবং বক্তা হিসেবে কৃষ্ণের প্রাধান্য বাড়ছে। তাঁর বক্তব্য অর্জুনের স্বীকৃতি অর্জন করতে না পারলেও দৈর্ঘ্যে এবং আপাতভাবে বর্ধিত হয়ে ক্রমে প্রধান হয়ে উঠেছে।

সে যাই হোক, এমন কোনো যুদ্ধ কল্পনা করা যায় না যাতে যোদ্ধারা এমন আশ্চর্য ধৈর্যশীল এবং সুদীর্ঘ প্রতিক্ষায় সম্মত। মহাভারতের যুদ্ধটা এক অর্থে গ্রন্থের মূল অংশ, অতএব সেটার প্রাধান্য স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু তাকে বিলম্বিত করার প্রক্রিয়ার গীতা যখন দেখা দিল পুরো আঠারো অধ্যায় নিয়ে, তখন মহাকাব্যের গতি ব্যাহত করার দায় গীতার। এ বস্তু কোনো সুস্থ বুদ্ধিমান রচয়িতা হতে দেবেন তা কল্পনা করা যায় না। অতএব একমাত্র সিদ্ধান্ত হল মহাভারতে গীতা হচ্ছে প্রক্ষিপ্ত। এর প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায় মূলগ্রন্থের ভূমিকারূপে থাকলেও থাকতে পারত, কিন্তু তার বেশি কখনোই নয়। যে সব দর্শন প্রস্থানের ওপর ভিত্তি করে কৃষ্ণ তাঁর বক্তব্য উপস্থাপিত করেছেন সেগুলি তৎকালীন ভারতবর্ষের মানসে সঞ্চরমান ছিল দীর্ঘকাল ধরেই, এবং গীতায় কৃষ্ণ কখনোই সেগুলিকে যুক্তি সূত্রের বন্ধন বেঁধে একটি সার্বভৌম যুক্তিতে পরিণত করতে পারেন নি, চেষ্টাও করেন নি।

ইরফান হবীব বলেন, ‘উত্তর ও উত্তরপশ্চিম ভারতে যে জনপ্রিয় একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল তা শ্রমিক সমাজের সঞ্চরণশীলতা গ্রামে ও নগরে ব্যাপ্ত করে তুলছিল, যেমন গ্রামাঞ্চলে জাঠদেরও এতে তাদের কতকটা সম্মান বাড়িয়েছিল।’

এমন পরিস্থিতিতেই উচ্চবংশীয় বিত্তবান মুখপাত্র হয়ে কৃষ্ণ বলেন, ‘কর্মেই তোমাদের অধিকার, কখনোই ফলে নয়।’ কারণ এরা সকলেই কর্মী বা কোনো নির্দিষ্ট শ্রমের শ্রমিক— উচ্চ বিত্তশালীরাই ফলের অধিকারী। এ কথা আপনিই আসে যে, যে বহু মত ও পথ উত্তরাখ-ের ও বহিরাগতদের, তার একটা সমন্বয়ের চেষ্টা হয়তো আদি গীতাতে প্রচ্ছন্ন ছিল। গীতা কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসন্ধানের রীতিতে এ সমন্বয় সন্ধানে প্রবৃত্ত হয়নি। বিভিন্ন দর্শন প্রস্থানের আলোচনাও এতে নেই। কিছু কিছু প্রসঙ্গে-এর বিবরণ আছে মাত্র। কোনো কোনো দর্শনের উল্লেখ ও তার মূল বক্তব্য সংক্ষেপে গীতার প্রসঙ্গে কোনো স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া উল্লিখিত হয়েছে। এতে গীতার বক্তব্য কোনো বিধিবদ্ধ আকৃতি পায়নি, এবং যুক্তি পরম্পরার দ্বারা যে সুগ্রথিত দার্শনিক তত্ত্ব উপস্থাপিত হতে পারত তাও হয়নি।

তাহলে গীতার মূল বক্তব্য কী? গ্রন্থের শুরুতেই কৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর বর্ণধর্মে প্রবৃত্ত করবার চেষ্টা করেন। উত্তরে অর্জুন বলেন, ‘যাঁদের জন্য মানুষ যুদ্ধজয় করে তাঁরাই শত্রু হিসেবে আমার সম্মুখে উপস্থিত। এঁদের হত্যা করে আমি বৈকুণ্ঠেও যেতে চাই না। বিপন্নকে, আত্মীয়কে, নারী ও শিশুকে রক্ষা করাই ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য, অতএব এ যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ নয়। এতে আমার সায় নেই।’ অর্থাৎ অর্জুন যা বলেছেন তার মর্মার্থ হল, বর্ণধর্ম অর্থাৎ ক্ষত্রিয়ের কর্তব্যের ওপরেও একটি ধর্ম আছে— তা মানবধর্ম, যেখানে মানবিক মূল্যবোধেরই প্রাধান্য। সেই মূল্যবোধে প্রণোদিত অর্জুনের পক্ষে হীনতর বর্ণধর্মের নির্দেশ মেনে আত্মহনন করা সম্ভব নয়, উচিতও নয়। পরবর্তী বহু অধ্যায় জুড়ে কৃষ্ণ অর্জুনের আপত্তি খ-ন করবার চেষ্টা করলেন, প্রায় সকল দর্শনপ্রস্থান ও নীতিবাক্য দিয়ে। বলা বাহুল্য, অর্জুন যে মহানীয় মানবিকতার নীতির ছত্রতলে অধিষ্ঠান করেছিলেন তার থেকে তাঁকে সরানো সম্ভব হল না। শেষ পর্যন্ত নিরূপায় কৃষ্ণ জাদুবিদ্যার আশ্রয় নিয়ে অর্জুনকে দেখালেন যে, সমগ্র চরাচর তাঁর মধ্যেই বিধৃত; তিনিই পরাৎপর ব্রহ্ম, তাঁর ওপরে আর কেউ নেই। তখন অর্জুন নতশিরে নিজেকে কৃষ্ণের আজ্ঞাবহ দাস বলে স্বীকার করলেন : সমস্ত বিরোধিতার অবসান ঘটল। দুই মখা এখন প্রভু ও অনুচরে, সারথি ও আরোহীতে পরিণত হলেন। কৃষ্ণের ইষ্ট সিদ্ধ হল, অর্জুনের ব্যক্তিমর্যাদা কৃষ্ণের পায়ে ভূলুণ্ঠিত হল। গীতা যা চেয়েছিল তাই হল।

আফ্রিকান একটি প্রবাদ আছে, ‘একজন মানুষকে একবার নয়, বহুবার দেখে বহুবার বহুভাবে চিনতে হয়।’ যে কোনো মহাগ্রন্থ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। যতবার পড়বেন ততবার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থিত হবে আপনার সামনে। সাহিত্য, জীবন, মন— সবই পেঁয়াজের খোসার মত। পরতে পরতে তার আবিষ্করণ। মহাভারত শুধু আকারের, বিন্যাসে, পরিমাপ ও পরিমাণে নয়— চিন্তা, দর্শন, মনন, বিশ্লেষণ; ভাবন-চিন্তনের জগতের এক মহাগ্রন্থ। প্রচলিত কাহিনির সঙ্গে মূল মহাভারতের মিল যেমন আছে— অমিলও কম নয়।

১০

রাজনীতি শেখার জন্য প্লেটো, অ্যারিস্টটল, মেকিয়াভেলি, রুশো, হেগেল, মার্কস, এঙ্গেলস, লেলিন, স্তালিন, মাওয়ের স্মরণ নিই আমরা। ভারতে খুব ওঠে চাণক্যের নাম। মহাভারত— আমার মতে, রাজনীতি ও কূটনীতি শিক্ষার এক মহা আকর গ্রন্থ। সামন্ততান্ত্রিক শাসন ও শোষণ চেনার আকর গ্রন্থ।

ভারতীয় সংবিধানের অন্যতমপ্রণেতা দলিত আন্দোলনের নেতা ভীমরাও আম্বেদকর বলেছিলেন, গীতা বর্ণবাদী মনুস্মৃতির সংক্ষিপ্ত রূপ। সেই গীতার বাণী বিধৃত হয়েছে কৃষ্ণের মুখে। বলা হয়ে থাকে, ভারতে প্রথম ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের শুরু, বৌদ্ধরাজা বৃহদ্রথের প্রকাশ্য হত্যার মধ্য দিয়ে। ১৮৫ খ্রিস্টাব্দে। সেই সময়েই প্রচলিত কাহিনি রামায়ণ সংকলিত হয় বাল্মীকির নামে। রামকে করা হয় পুরুষোত্তম। বৃহদ্রথের হত্যাকারী সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাঁর আদেশেই রামায়ণ সংকলন। সেখানেই প্রথম রাজাসূর যজ্ঞ। পুষ্যমিত্র শুঙ্গকেই কার্যত রাম বানান হয় বলে দলিত আন্দোলনের ইতিহাসকারদের মত। মহামতি রাজা অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের দিন ছিল বিজয়ী দশমী। তাকে অনার্য রাজা রাবণ হত্যার দিন হিসেবে চিহ্নিত করে দশহরা তথা বিজয়া দশমী উদযাপনের সূচনা হয়। মহাভারত রামায়ণের পরবর্তীকালের রচনা। রচয়িতা অনার্য রমনী ‘মৎস্য তথা জেলেকন্যা সত্যবতীর গর্ভে জন্মান কালো, কুৎসিত কৃষ্ণদ্বৈপায়ণব্যাস। তাঁর সঙ্গে সঙ্গমে জন্ম ধৃতরাষ্ট্র ও পা-ুর। ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে গান্ধারীর সঙ্গমে জন্ম নেয় দুর্যোধনসহ একশত ভাই। এক কন্যা দুঃশলা। এদের সবার অনার্যরক্ত কিন্তু পা-ু কোনও সন্তানের জন্ম দেননি। কুন্তী ও তাঁর আরেক পতœী মাদ্রীর গর্ভে জন্মানো পাঁচ সন্তান— কার্যত আর্য দেবতার সন্তান।

মহাভারতের মধ্যে বহু ভাষ্য আছে। একদিকে গীতা প্রভাবিত অংশ। অন্যদিকে সমান্তরালে আছে অনার্যদের প্রতি বঞ্চনা, নিপীড়ন, শোষণ, আবিষ্কার মজার বিষয়। আজকের বিচারে যারা দলিত, ও বিসি তাঁরা প্রায় সবাই মহাভারতে দুর্যোধনের পক্ষে। মহাভারতে তাঁর আরেক নাম ছিল সুযোধন।

পক্ষপাতিত্বে সে নাম হারিয়ে গেছে। দুর্যোধনের পক্ষে ছিলেন দ্রোণ, ভীষ্ম, কৃপাচার্য, অশত্থামা ইত্যাদি বেতনভুক্ত বা আত্মীয় সম্পর্কে থাকা ছাড়াও অঙ্গ, বঙ্গ, সিন্ধু রাজারা। কিরাত, যবন, পারদ, শক, দরদ, কম্বোজ, রাক্ষস, পর্বতবাসীরা (দ্রোণাচার্য ॥ জয়দ্রথ পর্বাধ্যায়)

অপরদিকে পা-ব পক্ষে ছিলেন তাঁরাই যাঁরা বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ। সে বিরাট রাজা বা দ্রুপদ বা ঘটোৎকচ। মনে রাখতে হবে ঘটোৎকচের মৃত্যুতে তীব্র উল্লাস প্রকাশ করেছেন কৃষ্ণ। এই কৃষ্ণ যুদ্ধের আগেই বধ করেছেন কিরাত রাজা একলব্য, জরাসন্ধ, পৌ-রাজ বসুদেব আর শিশুপালকে। এবং প্রায় সবগুলোই অন্যায়ভাবে অন্যায় কারণে। কারণ এরা পাল্টে দিতে পারতেন ভারতযুদ্ধের ভবিষ্যৎ। মহাভারতের যুদ্ধ তাই আর্য-অনার্যদের যুদ্ধ, আর্য-বিজয়ের কাহিনি। দুর্যোধন ছিলেন অনার্যদেবতা মহাদেবের আর্শিবাদ ধন্য। দানব তথা অসুররাও ছিলেন তাঁর পক্ষে। চিত্রসেনের হাতে নিপৃহীত হওয়ার পর দুর্যোধন প্রায়ো পরশনে প্রাণ ত্যাগ করতে গেলে দানব তথা অসুররা তাঁকে পাতালে নিয়ে সেবা করেন ও তাঁকে উজ্জীবিত করেন। এই কাহিনি অনুচ্চারিত থাকে। রাজশেখর বসু এবং সুখময় ভট্টাচার্য মহাভারতের দুই প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাদাতাই বলেছেন :

দুর্যোধন ছিলেন প্রজারঞ্জক। (মহাভারতের চরিত্রাবলী ॥ সুখময় ভট্টাচার্য, আনন্দ,

পৃ. ৮৭ ॥ এবং রাজশেখর বসু, মহাভারত, ভূমিকা)।

সুখময় ভট্টাচার্য লিখেছেন :

দুর্যোধন রাজশাসনে বিশেষ পটু ছিলেন। প্রজারঞ্জক বলিয়াও তাঁহার খ্যাতি ছিল। প্রজাসাধারণ অনুগত না থাকিলে এদের ভারতের অনেককে নৃপতি তাঁহার বন্ধুভাবাপন্ন না হইলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তিনি একাদশ অক্ষোহিনী সৈন্য সংগ্রহ করতে পারতেন না। ভারতের অধিকাংশ বীরই তাঁহার পক্ষে যোগ দিয়ে ছিলেন। বাঙ্গালী বীরগণও দুর্যোধনের পক্ষেই যোগ দিয়েছিলেন। বলরামের শ্রেষ্ট শিষ্য দুর্যোধন গদাযুদ্ধে ভীম হইতে নিপুণ ছিলেন। মিত্রসংগ্রহ এবং মিত্রতা রক্ষায় তিনি বিলক্ষণ অজ্ঞাত ছিলেন।

এটুকু বলেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না… ড. সুখময় ভট্টাচার্য লিখেছেন :

যদি পা-ব সম্পর্কে তাহার মনে কোনপ্রকার নীচতা না থাকিত, তবে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের চরিত্র অপেক্ষাও তাঁহার চরিত্রকে আমরা সমধিক সম্মান করিতাম। *লক্ষ্যণীয় সমধিক সম্মান শব্দটি ‘বন্ধার্থ’

মহাদেব তথা আর্য দেবতা শিব শুধু দুর্যোধন নয় তার পক্ষীয় অশ্বত্থামারও পক্ষে ছিলেন। অশ্বত্থামা পিতা দ্রোণকে অন্যায়ভাবে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নিদ্রিত পা-ব শিবিরে প্রবেশ করে একজন ছাড়া সবাইকে হত্যা করেছেন। সেই হত্যার অস্ত্র হচ্ছে খড়গ। এই খড়গ কে দিয়েছেন?  মহাদেব। ‘দদৌ চাস্মৌ বিমলং খড়গমুত্তমম’ [মহাভারত। ৭/৬৫]। একলব্য বীর। তিনি আর্যও। নিষাদরাজপুত্র। দ্রোণ তাঁকে শিষ্যত্ব দিতে রাজি হননি। স্বশিক্ষিত একলব্যের ধনুর্বিদ্যায় আশ্চার্য ক্ষমতা দেখে অর্জুন বিস্মিত, ক্ষুব্ধ ও রুষ্ট হয়েছেন। তাঁকে প্রশান্তি করতে ধনুর্বিদ্যায় অতিপ্রয়োজনীয় বুড়ো আঙুল কেটে উপহার দিতে বলেছেন দ্রোণ। এই হীনতা— মহাভারতে বারে বারে দেখিয়েছেন পা-বপক্ষ। শুধু একা দুর্যোধনকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দুর্যোধনের দোষ একটাই— অসূয়া। পা-বদের তিনি কুরুবংশীয় মনে করেন না। এবং তাদের সহ্য করতে পারেন না।

কিন্তু পা-বপক্ষ অন্যায়ভাবে হত্যা করেছেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ এমনকী দুর্যোধনকেও। দুর্যোধনের দোষ অভিমণ্যু হত্যায়। কিন্তু অভিমণ্যু ব্যূহ প্রবেশের মন্ত্র কেবল জানতেন, ব্যূহ ভেদে পারদর্শী ছিলেন না জেনেও তাকে পাঠানো কি ন্যায় হয়েছে?

*এক রমনী ও তার পাঁচ পুত্র বারনাবর্তে পা-বদের অনুষ্ঠানে যেতে এসেছিল। শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাঁদের নিজেদের স্বার্থে পুড়িয়ে মারেন পা-বরা।

আসলে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হল— ক্ষমতা, ক্ষমতা এবং ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যেই— ভারতভূমির অধিপতি অনার্যরা দাসে রূপান্তরিত হয়েছে। আর্যরা শাসক। যদিও দাস শব্দটির মূল অর্থ দাতা। এবং আর্য শব্দের মূল অর্থ যারা নগর, স্থাপত্যবিদ্যায় নিপুণ, অনার্য পরাজিত হয়েছে কূটকৌশলের কাছে।

মহাভারত আসলে ভরত নামক জনজাতির উপাখ্যান। যে উপাখ্যানে আসল ‘ভরত’বংশীয় কৌরবপক্ষ। আর কে না জানে, সমস্ত আখ্যান ইতিহাস বিজয়ীকেই মহিমান্বিত করে। রামায়ণ ও মহাভারত— তারই সাক্ষ্য দেয়। সেই রাজনীতিরও।

পুনশ্চ

ভারত উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে বিভাজন বিদ্বেষ বদনাম এবং পরিবারতন্ত্র সহজেই চলে। এই রাজনৈতিক প্রবণতার মূলে আছে ‘মহাভারতী’য় জিন। বংশ ও গোষ্ঠীগত বিবাদকে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ ভাবার প্রবণতা মহাভারতীয় প্রবণতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ককটেল প্রণোদনা… মিথ্যা অহং এবং অর্ধসত্য— সাম্প্রদায়িক ইতিহাস নির্মাণের মেকলে-মিল মিশেল। শ্রেণিচেতনা খ-িত। মনে মনে বড়লোকিপনার বিপুল ব্র্যান্ডেড আহ্লাদ ও মুখে উল্টো কথা। অতিলৌকিকতা, মূর্তি নির্ভরতাও এক ভয়ঙ্কর বিপদ। একটি মূর্তি খাড়া করতে পারলেই সাত হাজার খুন শতবার্ষিক মাপ। দুটি পক্ষে ভাগ হওয়া। নিজের সমর্থকদের পক্ষের কোন দোষ না দেখার বিধ্বংসী প্রবণতা মহাভারতীয় প্রণোদনা। এই প্রণোদনা ও আত্মিক প্ররোচনা থেকে মুক্তি না পেলে খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের মুক্তি নেই। মহাভারত উচ্চবর্গের মানসিকতা সঞ্চারিত করে মেহনতি মানুষের মননেও। তাঁর নিজের এজেন্ডা গুরুত্বহীন হয়ে যায়, এমনকি নিজের কাছেও। ক্ষুধা-দারিদ্র্য মুক্তির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে উচ্চবর্গের সম্মান তথা ক্ষমতা দখলের লড়াই। যে লড়াইয়ে গর্বিতভাবে নিজেদের স্বেচ্ছা বলি দেয় আজকের একলব্য— ঘটোৎকচরা। কোনো বভ্রƒবাহন চোখে পড়ে না। কারণ বভ্রবাহনদের মহিমান্বিত করা হয়নি। করা হয়েছে একলব্য ঘটোৎকচদের জীবন বিসর্জনকে। আজকের সাংস্কৃতিক সামাজিক লড়াই হোক মহাভারতীয় জিন ও জীবন প্রবণতার বিরুদ্ধে। এইটাই এই কালের কলমের দাবি।

****************************

 

নিখিল রঞ্জন বিশ্বাস
………………..
বাংলা সাহিত্যে মহাভারতের প্রভাব

রামায়ণ ও মহাভারত ভারতবর্ষের দুটি প্রাচীন মহাকাব্য। ইংরেজি সাহিত্যে যেমন ইলিয়ড ও ওডিসি তেমনি সংস্কৃত তথা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে রামায়ণ ও মহাভারতের প্রভাব সর্বজনবিদিত। রামায়ণের রচয়িতা মহর্ষি বাল্মীকি এবং মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। কাব্য দুটি সংস্কৃত ভাষায় লেখা। পরবর্তীকালে এ দুটি কাব্য বাংলাসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষায় রচিত অনূদিত হয়েছে এবং তার কাহিনি-চিত্রকে অবলম্বন করে বহু কাব্য, নাটক, কবিতা, যাত্রা, পালা রচিত হয়েছে।

রামায়ণ ও মহাভারত উভয়ই মহাকাব্য। সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রে মহাকাব্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে :

সর্গবন্ধো মহাকাব্যং তত্রৈকো নায়কঃ সুরঃ ॥

সদ্বংশ ক্ষত্রিয়ো বাপি ধীরোদাত্তগুণান্বিতঃ।

একবংশভবা ভূপাঃ কুলজা বহবোহপি বা ॥

শৃঙ্গার-বীর-শান্তানামেকোহঙ্গী রস ইষ্যতে।

অঙ্গানি সর্বেহপি রসাঃ সর্বে নাটকসম্বন্ধয়ঃ ॥

ইতিহাসোদ্ভবং বৃত্তমন্যদ্বা সজ্জনাশ্রয়ম্।

চত্বারস্তস্য বর্গাঃ স্যুস্তেষে¡কং চ ফলং ভবেৎ ॥

আদৌ নমস্ক্রিয়াশীর্বাদ বস্তুনির্দেশ এব বা।

ক্বচিন্নিন্দা খলাদীনাং সতাং চ গুণকীর্ত্তনম্ ॥

একবৃত্তময়ৈঃ পদ্যৈরবসানেহন্যবৃত্তকৈঃ।

নাতিস্বল্পা নাতিদীর্ঘাঃ সর্গা অষ্টাধিকা ইহ ॥

নামাস্য স্বর্গোপাদেয়কথয়া সর্গনাম তু।

নানাবৃত্তময় ক্বাপি সর্গঃ কশ্চন দৃশ্যতে ॥

সর্গান্তে ভাবিবৃত্তস্য কথায়াঃ সূচনা ভবেৎ।

সন্ধ্যা সূর্যেন্দুরজনী প্রদোষ ধ্বান্ত বাসরাঃ ॥

(বিশ্বনাথ কাবরাজ, সাহিত্যদর্পণ)

অর্থাৎ মহাকাব্য হবে সর্গযুক্ত। এর নায়ক হবেন ধীরোদাত্তগুণসম্পন্ন কোনও দেবতা বা সদ্বংশজাত কোন ক্ষত্রিয় অথবা একই বংশে জাত বহু রাজা। মহাকাব্যের প্রধান রস হবে মাত্র একটি— শৃঙ্গার, বীর অথবা শান্ত; বাকি সমস্ত রস হবে অঙ্গরস (গৌণরস)। এর বিষয়বস্তু হবে ঐতিহাসিক বা কোন সজ্জন ব্যক্তিকে আশ্রয় করে রচিত কাহিনি। এতে চারটি বর্গের (ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ) কথাই থাকবে, তবে একটি বর্গই মুখ্য ফলরূপে বর্ণিত হবে। কাব্যের শুরুতে আশীর্বাদ, নমস্কার বা বস্তু নির্দেশ থাকবে। প্রতিটি সর্গে একই রকম ছন্দ থাকবে, কেবল সর্গের শেষে অন্য প্রকার ছন্দের পদ্য হবে। এতে আটের অধিক সর্গ থাকবে। সর্গগুলো আকারে খুব ছোট অথবা বড় হবে না। প্রত্যেক সর্গের শেষে পরবর্তী সর্গের বিষয়বস্তুর সূচনা থাকবে। মহাকাব্যে সন্ধ্যা, সূর্য, চন্দ্র, রাত্রি প্রভৃতির বর্ণনা যথাসম্ভব করতে হবে। কবি, কাব্যের বিষয়বস্তু, নায়ক অথবা অন্য কারো নামানুসারে মহাকাব্যের নামকরণ হবে।

পাশ্চাত্য আলংকারিকেরা মহাকাব্যের দুটি ভাগ নির্দেশ করেছেন— ঊঢ়রপ ড়ভ এৎড়ঃিয এবং ঊঢ়রপ ড়ভ অৎঃ. রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ঊঢ়রপ ড়ভ এৎড়ঃিয ‘বৃহৎ সম্প্রদায়ের কথা’ এবং  ঊঢ়রপ ড়ভ অৎঃ  ‘একলা কবির কথা’। ওষরধফ, ঙফুংংবু প্রথম ভাগের মহাকাব্য। আর চধৎধফরংব খড়ংঃ, উরারহধ ঈড়সবফরধ প্রভৃতি দ্বিতীয় ভাগের মহাকাব্য। সংস্কৃত আলংকারিকেরা প্রথম ভাগের মহাকাব্যকে বলেছেন আর্য মহাকাব্য আর দ্বিতীয় প্রকারের মহাকাব্যকে বলেছেন কলাত্মক মহাকাব্য। প্রথম ভাগের মহাকাব্য ঋষিদের দ্বারা রচিত বলে তাকে আর্য মহাকাব্যও বলা হয়।

মহাভারত নামটির মধ্যেই তার বিশালত্ব বিদ্যমান। ভারতবর্ষের নামানুসারে কাব্যটির নামকরণ। ঐতিহাসিকদের মতে রাজা ভরতের নামানুসারে ভারতবর্ষের নাম। কেউ কেউ মনে করেন, ভরত নামক প্রাচীন জনগোষ্ঠীর নামানুসারে ভারতবর্ষের নামকরণ। আর ভারত নামক পুণ্যভূমির নামানুসারে মহাভারতের নাম। মহাভারত ভারতবর্ষের জাতীয় মহাকাব্য। মহাভারতে নেই এমন কিছু ভারতবর্ষে নেই। তাই বলা হয়, ‘যা নেই ভারতে তা নেই ভারতে (মহাভারতে)’। ভরতবংশীয়দের (কৌরব ও পা-বদের) মধ্যকার যুদ্ধের কাহিনীর কাব্যরূপ হলো মহাভারত। রামায়ণের মতো মহাভারতও হিন্দুদের কাছে একাধারে ধর্মগ্রন্থ ও জাতীয় মহাকাব্য। কৌরব ও পা-বদের মধ্যে অন্তঃকলহ ও যুদ্ধ মহাভারতের মূল কাহিনি। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেবকে মহাভারতের রচয়িতা বলা হয়। কিন্তু এ কাব্য কোনো একজনের দ্বারা, একটি বিশেষ সময়ে রচিত হয়নি। কালের যাত্রাপথে বিভিন্ন জনের রচনার মধ্য দিয়ে কাব্যটি তার পূর্ণ রূপ লাভ করেছে। কালে কালে অসংখ্য কাহিনি ও উপাখ্যান, শত শত উপদেশ ও অনুশাসন যুক্ত হয়েছে তার ছত্রছায়ায়। বিশালায়তন এই মহাকাব্যটিতে ভারতবর্ষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও অধ্যাত্মচেতনার পূর্ণ বিকাশ লাভ করেছে। ডরহঃবৎহরঃু মহাভারতকে ‘একটি সমগ্র সাহিত্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ওঃ রং ড়হষু রহ ধ াবৎু ৎবংঃৎরপঃবফ ংবহংব ঃযধঃ বি সধু ংঢ়বধশ ড়ভ ঃযব গধযধনযধৎধঃধ রং হড়ঃ ড়হব ঢ়ড়বঃরপ ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ ধঃ ধষষ, নঁঃ ৎধঃযবৎ ধ যিড়ষব ষরঃবৎধঃঁৎব.’ মহাভারতের আরেক নাম ‘ভারত-সংহিতা’। ভারতে প্রচলিত সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, পুরাণ, তত্ত্বকথা, নীতিকথা, লোকবিদ্যা, জীবনের নানা সংঘাত ও তার সমাধান, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষের তত্ত্বদর্শন প্রভৃতি স্থান পেয়েছে এতে। তাছাড়া ধর্মনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিও স্থান লাভ করেছে এ গ্রন্থে। মহর্ষি বৈশাম্পায়ন তাই বলেছেন :

ধর্মে চার্থে চ কামে চ মোক্ষে চ ভরতর্ষভ।

যদিহাস্তি তদন্যত্র যন্নেহাস্তি ন তৎ ক্বচিৎ ॥

সুবিখ্যাত দার্শনিক গ্রন্থ ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ মহাভারতের ‘ভীষ্ম পবর্’ থেকে সংকলিত। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির এক অপূর্ব সঙ্গমতীর্থ। এ গ্রন্থখানা কেবলমাত্র ভারতীয় দর্শনে নয়, জগতের সকল দর্শনশাস্ত্রের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। তাই অহহরব ইবংধহঃ বলেন, ‘ঞযব গধযধনযধৎধঃধ রং ঃযব মৎবধঃবংঃ ঢ়ড়বস রহ ঃযব যিড়ষব ড়িৎষফ. ঞযবৎব রং হড় ড়ঃযবৎ ঢ়ড়বস ংড় ংঢ়ষবহফরফ ধং ঃযরং, ংড় ভঁষষ ড়ভ যিধঃ বি ধিহঃ ঃড় শহড়,ি ধহফ যিধঃ রঃ রং মড়ড়ফ ভড়ৎ ঁং ঃড় ংঃঁফু.’ মহাভারত মহাসমুদ্রের মতো বিশাল ও অনন্ত জ্ঞানরতেœর অমূল্য ভা-ার। তাই বলা হয়েছে :

যথা সমুদ্রো ভগবান্ যথা মেরুমহাগিরিঃ।

উভৌ খ্যাতৌ মহানিধি তথা ভারতমুচ্যতে ॥

ভারতীয় সমাজ, সাহিত্য, দর্শন ও ধর্মে মহাভারতের প্রভাব অপরিসীম। লৌকিক সংস্কৃত সাহিত্যে তো বটেই, ভারতীয় সমাজ, দর্শন, ধর্ম ও সাহিত্যে মহাভারতের প্রভাব অপরিসীম। লৌকিক সাহিত্যে তো বটেই, ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্যেও মহাভারতের প্রভাব ব্যাপক। খ্রি. পূ. প্রথম বা দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই মহাভারত থেকে উপজীব্য নিয়ে সংস্কৃত ভাষায় বহু কাব্য-নাটক রচিত হয়েছে। ভাসের পাঁচটি নাটকই মহাভারতের কাহিনি-আশ্রিত। মহাকবি কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটকটির মূল কাহিনি মহাভারত থেকে গৃহীত। ভট্টনারায়ণের বেণীসংহার রাজশেখরের বালভারত নাটক মহাভারত-আশ্রিত। খ্রি. দশম থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত অসংখ্য নাটক মহাভারতের কাহিনি নিয়ে রচিত। সংস্কৃত সাহিত্যের অনেক মহাকাব্য মহাভারত-আশ্রিত। ভারবির কিরাতার্জুনীয় মাঘের শিশুপালবধ শ্রীহর্ষের নৈষধীয়চরিত ক্ষেমেন্দ্রের মহাভারত-মঞ্জুরী প্রভৃতি এ ধরনের কাব্য।

রামায়ণ ও মহাভারত দুটি কাব্যই ভারতীয় সমাজ, সাহিত্য, দর্শন ও ধর্মের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অন্যান্য ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষা-সাহিত্যের মতো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও মহাভারতের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বিদুরের খুদ, শকুনি মামা, কংস মামা, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির, ভীষ্ম-প্রতিজ্ঞা, কুরুক্ষেত্র, অশ্বত্থামা হত ইতি গজঃ, যাহা নাই ভারতে তাহা নাই ভারতে (মহাভারতে), মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা, নরানাং মাতুলক্রমঃ, ঠুঁটো জগন্নাথ, শিখ-ী, বিড়াল তপস্বী প্রভৃতি প্রবাদ-প্রবচন এসেছে মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনি থেকে। ভারতীয় গার্হস্থ্যজীবনে মহাভারতের তুলনায় রামায়ণের প্রভাব অনেক বেশি দৃঢ় হয়েছিল। তাই বাংলা ভাষায় মহাভারতের অনুবাদ কিছুটা ধীর গতিতে হয়েছে। মহাভারতের প্রথম দুটি অনুবাদই সম্পন্ন হয়েছে দুইজন ভিন্নধর্মী রাজপুরুষের আগ্রহে। গৌড়বঙ্গের সুলতান হোসেন শাহের সেনাপতি চট্টগ্রাম-বিজয়ী পরাগল খানের ইচ্ছায় কবীন্দ্র পরমেশ্বর প্রথম মহাভারতের বাংলা অনুবাদ রচনা করেন। গ্রন্থটি বিজয়পা-বকথা বা ভারত-পাঁচালী নামে অভিহিত। সাধারণভাবে এটি পরাগলী মহাভারত রূপে পরিচিত। পরাগল খানের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র ছুটি খান জৈমিনী মহাভারতের ‘অশ্বমেধ’ পর্বের বঙ্গানুবাদ শুনতে চাইলে শ্রীকর নন্দী তার অনুবাদ করেন। মহাভারতের অন্যান্য বাংলা অনুবাদকের মধ্যে রয়েছেন রামচন্দ্র খান, অনুরুদ্ধ রাম সরস্বতী, দ্বিজ রঘুনাথ, কাশীরাম দাস, নিত্যানন্দ ঘোষ, হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ, কবিচন্দ্র শঙ্কর চক্রবর্তী, ষষ্ঠীধর সেন, কালীপ্রসন্ন সিংহ, রাজশেখর বসু প্রভৃতি। কাশীরাম দাসের বাংলা মহাভারত কৃত্তিবাস ওঝার বাংলা রামায়ণের মতো বাঙালির ঘরে ঘরে পঠিত হয়ে থাকে। গ্রন্থটি পদ্যে অনূদিত। মহাভারতের বিভিন্ন উপাখ্যানে এত বৈচিত্র্য ও নাটকীয়তা রয়েছে যে, আধুনিক কালের অনেক কবি-সাহিত্যিক ও নাট্যকারগণ তাঁদের কাব্য-নাটকে মহাভারতের সেইসব কাহিনি-চিত্রই রূপায়িত করেছেন। একলব্যের কাহিনি, কর্ণ ও অর্জুনের বীরত্ব, ভীমের পরাক্রম, অভিমন্যুবধ, পা-বদের বনবাস, চিত্রাঙ্গদা-কাহিনি, ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা, যদুবংশ ধ্বংস, দুষ্মন্ত-শকুন্তলা উপাখ্যান, যযাতি-কাহিনি, নল-দময়ন্তী উপাখ্যান, সাবিত্রী-সত্যবান উপাখ্যান, দেবাসুর যুদ্ধ, সমুদ্রমন্থন প্রভৃতি মহাভারতীয় বিষয়কে অবলম্বন করে বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য কাব্য, নাটক, কবিতা রচিত হয়েছে। গিরিশচন্দ্র ঘোষের অভিমন্যুবধ, পা-বগৌরব, জনা ও পা-বদের অজ্ঞাতবাস; ক্ষীরোদপ্রসাদের ভীষ্ম, নরনারায়ণ; তারাচরণ সিকদারের ভদ্রার্জুন প্রভৃতি নাটক মহাভারতীয় কাহিনি অবলম্বনে রচিত। এরূপ আরও অনেক নাটকের উপজীব্য মহাভারতের বিভিন্ন চিত্তাকর্ষক কাহিনি ও উপাখ্যান থেকে গৃহীত হয়েছে।

আধুনিক যুগের প্রথম কবি মধুসূদন দত্ত তাঁর বীরঙ্গনা পত্রকাব্যের অন্তত ছয়টি রচনা করেছেন মহাভারতীয় কাহিনিকে অবলম্বন করে। পত্রগুলো হলো— (১) দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা (২) শান্তনুর প্রতি জাহ্নবী (৩) অর্জুনের প্রতি দ্রৌপদী (৪) দুর্যোধনের প্রতি ভানুমতী (৫) জয়দ্রথের প্রতি দুঃশলা এবং (৬) নীলধ্বজের প্রতি জনা। এছাড়া কবির চতুর্দশ পদাবলীর বেশ কিছু সনেট রচিত হয়েছে মহাভারতীয় চরিত্র ও অনুষঙ্গকে অবলম্বন করে।

কবি নবীনচন্দ্র সেনের রৈবতক-কুরুক্ষেত্র-প্রভাস কাব্যত্রয়ী মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে রচিত। কাব্য তিনটিতে কবির আধুনিককালের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাই এই কাব্য তিনটি ‘উনিশ শতকের মহাভারত’ নামে পরিচিত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কর্ণকুন্তীসংবাদ, বিদায় অভিশাপ, গান্ধারীর আবেদন, চিত্রাঙ্গদা, নরকবাস; বুদ্ধদেব বসুর প্রথম পার্থ প্রভৃতি কাব্যনাট্য মহাভারতের অনুষঙ্গে রচিত। এছাড়া অনেক বাংলা যাত্রা-পালাও রচিত হয়েছে মহাভারতের কাহিনিকে ভিত্তি করে। যেমন : সারথি, কর্ণার্জুন, কুরুক্ষেত্রের কৃষ্ণ, দ্রৌপদী, শকুনি, শকুনির পাশা, দানবীর কর্ণ প্রভৃতি। এসব যাত্রা-পালা বাঙালির হৃদয়কে জয় করেছে। তাছাড়া বিষয় বর্ণনায়, প্রকৃতির রূপচিত্র কল্পনায়, চরিত্রচিত্রণে এবং রস-পরিবেশনের ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্য বহুলাংশে মহাভারতের কাছে ঋণী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধশেষে স্বজন-হারানো শ্মশান-প্রান্তরে দাঁড়িয়ে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মনে যে বৈরাগ্যর ব্যাকুলতা দেখা দিয়েছিল সে কথা স্মরণ করেই কবিগুরু তাঁর সোনার তরী কাব্যের ‘পুরস্কার’ কবিতায় লিখেছেন :

বিজয়ের শেষে সে মহাপ্রয়াণ,

সকল আশার বিষাদ মহান,

উদাস শান্তি করিতেছে দান

চিরমানবের প্রাণে।

************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা