ক্ল্যাসিক পোয়েট এন্ড ক্ল্যাসিক পোয়েম কবি ও কবিতার প্রাথমিক চিকিৎসা

কথা

কবিতা কী? কবিতা তো একটি সেক্সি গেম। খেলার একেকটি লেভেল ক্রস করার পর মোবাইল স্ক্রিনে একটি অতীব শৃঙ্খল নারী একে একে তার দৈহিক সৌন্দর্য প্রদর্শন করে। প্রথম লেভেলটা একটু সহজ, সাবলীল, খেলতেও স্বস্তিদায়ক। খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায়। প্রথম লেভেল ক্রস করার পর সেই রমণ নারীর উন্নত বুক দেখা যায়। যে বুকে সামান্য পর্দা। মনে হয় চোখের সামনেই দুটি জীবন্ত পাহাড়। পাহাড় দুটো সমান। একটুও বড়-ছোট নয়। এবারই পেয়ে যায় আসল মজা, মজা নয় লোভ। সেই লোভের কারণ দ্বিতীয় লেভেল। খেলার লোভ নয় বরং দেখার লোভ। দ্বিতীয় লেভেল ক্রস করলেই আবার সে নারী স্ক্রিনে ভেসে ওঠে। এবার ডান স্তনটি দেখিয়ে বিদেয় আমন্ত্রণ করে পরের লেভেলে। উত্তেজনা বেড়ে যায়, বাড়তে থাকে। উত্তেজনা কেনো? লেভেল ক্রস করার জন্য? নাকি ঐ নারীর অপর স্তনটি দেখার জন্য? আপাত দৃষ্টিতে সবার তাই মনে হতে পারে অপর স্তনটি দেখার জন্য কিন্তু তার আগেও একটি শর্ত সেটি হলো লেভেলটি ক্রস করলে ঐ নারীকে দেখা যাবে, তাছাড়া নয়। সুতরাং আগে খেলা তারপর দেখা। এভাবে খেলতে খেলতে একটা পর্যায়ে গিয়ে মনে হয় খেলাটি কঠিন হয়ে গেছে। আগের মতো আর সহজ নেই। একটু কষ্টে সৃষ্টে এই লেভেলও সম্পন্ন হয়। এরপর দেখা যায় পাহাড় দুটো উলঙ্গ অবস্থায় লম্ফ করছে। পাহাড় দুটোকে আর পাহাড় বলতে ইচ্ছে করে না। পাহাড়ের বদলে একটি শব্দটি আপনাআপনি ভেতর থেকে উচ্চারিত হয় ‘পর্বত’। আমার, আমাদের প্রথম প্রাপ্তিÍ প্রথম তৃপ্তি…

’যেকোনো একজন থাকবে

হয় সূর্য নয়তো তুমি

পৃথিবীতে একসাথে এতো তাপের দরকার নেই।’

তারপর খেলা চলে, নেশা চলে। এভাবেই চলে…

একসময় খেলার চূড়ান্ত পর্যায়ের লেভেল চলে আসে। সবশেষে যে লেভেলটি থাকে সেটি অতিক্রম করতে পারলেই সফলতা, সাধনার অবসান। খেলোয়াড় পাকা হলে এই লেভেলটিও অতিক্রম করে। তারপর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন। ঐ নারী পুরো নগ্ন হয়। অন্তর্বাস পর্যন্ত দেখায়। সার্কাসের চতুর যাদুকরের মতোন দেখে নিতে হয় খুবই সন্তর্পণে…

’আমি অন্ধ হলেও শাড়ির ভাঁজ সরাতে পটু

সদ্য হাতের আঙুলগুলো যদিও নির্জীব,

কীভাবে স্থানের কটিদেশ খুবলে খুবলে বাৎসায়নের

চতুর সীমানা অতিক্রম করতে হয়

তা আমার চাইতে ভালো আর ক’জনই বা জানে …’

যাকে তাকে কবিতা অন্তর্বাস দেখায় না। লোক জেনে লোক বুঝে দেখায়। প্রকৃত অর্থে সে রমণী। সে ভালো করেই জানে তার যেমন যত্ন দরকার তেমন সঙ্গমও। সন্তান উৎপাদনে সব পুরুষ সক্ষম হয় না।

এই সঙ্গম দেহের সাথে দেহের নয়। দেহের সাথে দেহ মিলে যে সন্তান হয় সে ঔরসজাত। কবিতা তো ঔরসজাত নয় বরং হৃদয়জাত। হৃদয়ের বীর্য অতীব গাঢ় লাল। লাল লাল পলল দিয়ে হৃদয়ের রোমকূপ গঠিত। সেখানেও লিঙ্গের হিত-বিপরীত আছে। মিলন হয়, ইচ্ছেমত উৎপাদন হয়, হৃদয়ও গর্ভবতী হয়। অনেক সন্তান জন্ম দেয়। সব তো আর সুস্থ নাদুস নুদুস হয় না! কিছু কিছু বিকলাঙ্গ অথবা কিছু কিছু সুস্থ হয়। কিন্তু সন্তান, সন্তান-ই। সুস্থ, বিকলঙ্গ অনেক পরের হিসাব। সবচেয়ে বড়ো কথা আমি সন্তান জন্ম দিতে পারি। বিপরীতধর্মী দুটি লিঙ্গ ও হৃদয় নিয়েই কবির বসবাস।

কবি কী? কে?

’কবিতো কয়লার উপসংহার

সমস্ত ব্যর্থের নীল পাঁজরে গুছিয়ে আগল মেলে দেয় গর্ভপাতের

কবি হলেও বাঁচো

কষ্টেসৃষ্টে নষ্ট খানিক হয়

বুকের নির্লীপিত অহংকারে দুঃখের গৌরব থাকলেও বাঁচো

বাঁচো

বাঁচতে হয় বলে, বাঁচতে হবে বলে

তুমি পারলে আমি পারবো, আমরা পারলে মানুষও পারবে।’

একদিন যাকে নববধূরূপে গ্রহণ করেছিলাম সেও তো শব্দ; এমনকি যার সাথে আমার প্রথম সঙ্গমও। মনে পড়ে, ফুলসজ্জার রাত। বিছানায় আঁটোসাটো বারো-তেরো বছরের অপরিপক্ক এক কিশোরী। মুখে ঘোমটা টানা। আমি বিছানায় বসতেই সে একটু তটস্থ হলো। আলতো করে ঘোমটাটি সরিয়ে নিতেই দেখলাম; কী নিষ্পাপ মুখ-ঠোঁট! ঠোঁটের সামান্য অংশে লিপিস্টিক থেবড়ে গেছে। তা ঠিক করে দিলাম। নাভী স্পষ্ট। উপর থেকে কাপড় সরে গেছে। হয়তো শাড়ির ভাঁজ ঠিকমত হয় নি। কাপড় টেনে দিলাম। নতুন বধূ তার উপর বয়স কম। চূর্ণ চুল; কপাল-কপোল দুয়েরই সৌন্দর্য দখল করে অপার সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। বুঝলাম, বধূ আমার কালো হলেও সৃষ্টিতে নিপুণ। সব এলোপাথাড়ি ঠিক করে যেই তার সাথে সঙ্গম হলো অমনি সে কুঁকড়ে গিয়ে আমার নিরাপরাধ কাঁধে কামড় বসিয়ে দেয়। কাঁধের দাগ তো শুকিয়ে গেছে কিন্তু মনের যে দাগ! আজও উজ্জ্বল। তার দাগ আমাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে, জানি। যারা কবি তাদের এমন দাগ থাকে। কাঁধে নয়, মনে। কবিতাই সে দাগের জন্ম দেয়।

অপরিপক্ব কিশোরী যে কি’না সঙ্গমে অপারদর্শী, কথা বলতে গেলেই কথা জড়িয়ে যেতো, যার সাথে আমার প্রথম যৌবন কেঁটেছে, এমনকি প্রথম সঙ্গম সে শব্দ। আর, যাদের ভুরিভুরি উৎপাদন করেছি তারাও শব্দ। কবি স্ত্রী সন্তান বোঝে না, যেকোনো সময় যেকারোর সাথে বিছানায় যায়। তা হোক সে স্ত্রী হোক সে সন্তান শব্দ তো?

বনজঙ্গলের গাছ আর বাড়ির মাটিতে লাগানো গাছের মাঝে বিস্তর পার্থক্য থাকে। বাড়িতে যে গাছটি বেড়ে ওঠে তার বীজটি দেখেশুনে লাগানো হয়। সুস্থবীজ তার প্রথম শর্ত। তারপর বীজ অঙ্কুরোদ্গম হয়। আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে। চারা গাছটির সর্বদা যত্ন-আত্তি করতে হয়। গোড়ায় মাটি না থাকলে মাটি দিতে হয়। পানি ধারণ করে রাখার জন্য চারার গোড়ায় মাটি দিয়ে মসৃণ করে বেঁধে রাখতে হয়। দিনদিন পরিচর্যার সুফলে চারাটি বাড়তে থাকে। ফলে তার শাখা-প্রশাখা, কঁচিকাণ্ড-পাতা বের হয়। একদিন দেখা গেলো ছাগল এসে গাছটির পাতা খেতে শুরু করেছে; ছাগলকে তাড়িয়ে চারার চর্তুষ্পার্শ্বে বেড়া দেওয়া যাতে পরবর্তী সময়ে কোনো ছাগল বা অন্য কোনো পাতাখোর জীব তাকে নষ্ট না করে। কিছুদিন বাদে চারার পাতায়, কাণ্ডে, নতুন বাকলে পোকা আক্রমণ করলে কীটনাশক দেওয়া। একসময় চারাটি একটি নির্দিষ্ট বয়সে যায় যৌবনে। ফুল আসে ফল হয় ফল পাকে। কবিও পাকে। পরিচর্যার পর পরিচর্যা, পুনঃপুন পরিচর্যা কবির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন। যাঁরা এই পরিচর্যার মাধ্যমে বড়ো হয়ে ওঠেন তাঁদের লেখার ছাপ, বিন্যাস, উপমা, নির্ধারিত ছন্দের বিশেষ প্রয়োগ প্রভৃতি বিচারেই বোঝা যায়। এঁদের মাঝে একধরনের অহং আর চালাকি কাজ করে। এঁরা যখন ইচ্ছা তখন শব্দ গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। প্ল্যান না থাকলেও প্ল্যানের ঘোর বসবাস করে এদের মাথায়। কবিতা বানায়। কবির স্বভাব-সাধনা, কবিতা বানানোর টেকনিক!

অপরদিকে, যে বীজ জঙ্গলে অঙ্কুরিত হয় সেই বীজ? বনেজঙ্গলে এমন কিছু গাছ থাকে দেখলেই প্রাণটা ভরে যায়। আমরা বলে উঠি, ‘আহ্, কী সুন্দর’! সুন্দর তো হবেই, হতে বাধ্য। এই অদ্ভূত সুন্দরের মাঝে কতো যে জ্বালা, যন্ত্রণা তা জানার আবশ্যিকতা আমরা ক’জন মনে করি? এই চারার যত্ন কেউ করে না। গোড়া থেকে মাটি সরে গেলেও বহুবার, কেউ এক মুঠো মাটিও দেয়নি। কখন জলের কখন আলোর কখন কীটনাশকের প্রয়োজন, এই পরিচর্যাগুলো জোটে নি। কখন যে ছাগল এসে কাণ্ড, পাতা খেয়ে যায়! ভাঙা কাণ্ড, ছেড়া পাতা থেকে অনবরত কষ বের হতে থাকে। যখন শুকিয়ে যায় যাক, আপত্তি নেই। একসময় শুকিয়ে যায়। হায় রে ঘাঁ! বাহিরের ঘাঁ! বাহিরের ঘাঁ’র স্বভাব শুকিয়ে যাওয়া কিন্তু অন্তরের ঘাঁ? তাতে আজন্ম কষ ঝরে। অবহেলায় অযত্নে ঝরতে থাকে। ঝড়বাদলে নুয়ে পড়ে, আবার ওঠে, আবার পড়ে, মরে; কিন্তু বাঁচে। পৃথিবী জুড়ে বাঁচে। কবি বাঁচে কবিতা বাঁচে। তাই আমরা তাকে সুন্দর বলি। এঁরা যখন তখন লেখে, কখনও দীর্ঘ বিরতি। সে বিরতি থেকে কেউ ফেরে কেউ ফেরে না। তাই কেউ যেতে যেতেই বলে,

’শব্দ তো আর পতিতা নয়

যখন ইচ্ছে হবে তখনই

আমি তার কাছে যেতে পারবো।’

এ কবিরা অতো চাতুরি বোঝে না, বুঝলেও মানে না। এদের আঙুলের ইশারায় আগুন বরফে বরফ জলে আর জল আগুনে পরিণত হয়।

’…আমার অকাল বয়সে যখন পিতা ছেড়ে গেছে

দিয়ে গেছে ব্যর্থতার বিষাদ বারুদ উৎসব

আমার-ই জলভরা নয়নের চতুর সীমানায়

বিপদগ্রস্থ বরফগুলো তখন জলের বদলে

সনিয়মে তিনভাগ আগুন হয়ে গেছে!’

একজন কবির জন্য, তার কবিতার জন্য প্রথম যে জিনিসটি দরকার তা হলো ‘ইমোশন’। কবির আদি ও অনাদি বলে যদি কিছু থাকে তাহলে সেটা ইমোশন। তা কখনো সুখের হয়কখনো কষ্টেরও। যার ইমোশন নেই, সে ইমোশন তৈরি করে। হয়তো তার পরপরই চলে আসে ইমেজ, ভাব, শব্দ আরো অনেক কিছু। ইমেজকে কবিতার মূল প্লাটফর্ম হিসেবে অনেকেই মনে করে থাকেন; আপত্তি নেই। কবিতার সাথে যাদের দীর্ঘ বসবাস এবং যারা ‘ডাক্তার’ তারা প্রকৃতপক্ষে রোগীর চীকিৎসার উপযুক্ত ওষুধ হিসাবে ইমোশনকে না ইমেজকে প্রাধান্য দেবেন, সেটা ঐডাক্তারই ভালো বুঝবেন। ইমোশন তৈরি করে কবিতা লেখা এক জিনিস আবার ইমোশন নিয়ে (মৌলিক) লেখা আরেক জিনিস। দুটো’র বিস্তর তফাৎ। খাঁটি ইমোশন যুক্ত কবির ক্ষেত্রে এমনও হয় যে, শব্দের খাতিরে শব্দ চলে আসা মাত্রই কলম চালাতে হয়; নইলে পরবর্তী সময়ে ইমোশনও থাকে না শব্দ তো থাকেইনা! হারিয়ে যায় একদম অতলে। এধরনের কবিদের বুঝতে যে চায় তার ক্ষেত্রেও ইমোশন অর্থাৎ কবির প্রতি আলাদা দরদ থাকা আবশ্যক। প্রকৃত অর্থে কবিতা যারা লেখেন, তারা কবিতা হলো কি হলো না, পাঠক কতোখানি অথবা বুঝলো না এসবের ধার ধারেন না। বরং আর যারা কবিতা বোঝেন তারা কবিতা বিশ্লেষণ করেন।

কবিদের এখন অনেক কাতার। উমুক গৌণ তমুক মুখ্য ইত্যাদি। গৌণ-মুখ্য বুঝিনে; যে কবিতার আচরণে, চলায় বলায় অনেকটা বোঝা যায়। খানিকটা বোঝা যায় লেখায় একান্ত কারিশমায়। বস্তুত কাক ও ময়ূরের গলা এক হয় না; ভিন্ন হয়। কারণ দুটোর আলাদা জাত আছে। ময়ূর পুচ্ছ লাগালেই কাক যেমন ময়ূর হয় না তেমনি শব্দপুচ্ছ বা চৌর্যভাবগুচ্ছ লেখায় প্রয়োগ করলেই কবি হওয়া যায় না, আসলে, ভেতরে একেবারেই কিছু না থাকলে হয় না। আমের আঁটি দিয়ে ভেপু বাজানো ছাড়া অন্য কোনো কাজ হয় না। একারণেই আমরা কেউ গৌণ কেউমুখ্য। প্রকৃত কবিদের কাতার নেই তবে স্বভাব-সাধনা আছে। তাঁরা কবিতার সমস্ত ধারণ করেন, ধরে রাখেন, তাঁরা ক্ল্যাসিক, ক্ল্যাসিক পোয়েট। ক্ল্যাসিক পোয়েট’রা যা লেখেন তাই হয়ে যায় ক্ল্যাসিক পোয়েম।

কবিও কবিতাকে বোঝা খুব জরুরী। জরুরী কী? এগুলো ক্রিটিকদের কাজ। তাতে কবির কী? কবিতার কী? আসে যায় না কিছুই। কবিতো আর প্ল্যান প্রোগ্রাম করে কবিতা লিখতে বসে না। প্ল্যান প্রোগ্রাম করে আর যাই হোক কবিতা হয় না।

কবিতা

স্বার্থহীন শত্রু

সবার সব কিছু হয় না

তবে কারো কারো হয়

প্রেম হয়, সুবর্ণ সংসার হয়

কেউ কেউ এমন হয় সংসারে বিপুল বিরাগী, বড্ডো উদাসীন

না পায় ঘর, পেলেও; থাকে না ঘরে ঘরের ঘরণী

তবে কারো কারো ঘর থাকে স্বচ্ছল ঘরামি থাকে

ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধি সবার থাকে না।

কেউ কেউ এমন সুখে সুখী হয়ে যায়

সুখ তার সাথে আজীবন সতীনের ন্যায় আচরণ করে

আভিজাত্য-অহংকার তো আর মামুলি বিষয় নয়!

সবাই সব কিছু পায় না

তবে অনেকেই পায়

কেউ প্রেমিকা পায় কেউ প্রতিমা পায়

আর কেউ উভয়ই হারায়।

কেউ কেউ এমন দুঃখে দুঃখী হয়ে যায়

পাথর তাকে স্বার্থহীন শত্রুর মতো ভালোবাসে— পাশাপাশি বসে বসবাস করে,

তারপর ভালোবেসে থেকে যায় আজন্ম নির্দ্বিধায়!


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা