ক বি তা

ময়ুখ চৌধুরীর তিনটি কবিতা
আর্কিমিডিসের মগজ

প্রেসার-কুকারে রান্না হচ্ছে মগজ। তার গন্ধে পাশের বাড়ির জানলায় ফুটছে নয়নতারা।
সেরিব্রামের পরিবর্তে গোশালার পচে-যাওয়া খড় সেরিবেলামের পরিবর্তে গবাদি পশুর দড়িদড়া।
গোসলে ঢোকার আগেই আমরা সাজিয়ে রেখেছিলাম ডাইনিং টেবিল—
শসার স্বচ্ছতা, লেটুসপাতার সজীবতা, গাজরের রক্তপাতহীন মাংস,
কাঁটাচামচের ক্ষুধার্ত নখ, আরও কিছু

একসময়, কুকার চিৎকার করে উঠতেই
আমরা ছিটকে বেরিয়ে এলাম ¯স্নানঘড় থেকে, তখন
রাস্তার সেই পাগলটার চিৎকার শোনা গেল—
‘পাইছি, পাইছি’।

পাকস্থলীপরায়ণ আমরা ডাইনিং টেবিলের চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম
তারপর আর একটু ছোট হয়ে গেলাম,
থুতনিটা বুকের কাছে নেমে এলো,
নারকেলের মালার মত খুলি, ভেতরে ছোবড়া।

আমরা আর্কিমিডিস পড়ি এবং পড়াই

———————————————

 

ঘরদোর
(সন্জীব সেনগুপ্ত বাল্যবন্ধুবরেষু)

একটি বোতাম ঠিক ঠিক ঘরে লাগছে না বলে
তোকে প্রায় দেখা যেত বলরাম দর্জির দোকানে।

বোতামেরও  ঘর থাকে, তোর
ঘরদোর হলো না কিছুই।
অবসরপ্রাপ্ত ঘড়িটাকে
লাটাই-সুতোয় বেঁধে সারাদিন ওড়াস ঘোরাস
সন্ধ্যা হলে ছায়াটাকে গাছের তলায় রেখে এসে
একা একা ফিরিস ডেরায়,
তোর জন্যে পথ চেয়ে থাকে
বিছানাবালিশ, কাঁথা, আধখাওয়া জলের গেলাস।

বোতামেরও ঘর থাকে, তোর
ঘরদোর হলো না কিছুই।
তবে কি দেখিস তুই অন্য চোখে ভিন্ন কিছু আর!
টিপবোতামের মতো প্রথাগত মানুষের ঘর
ছিঁড়ে যাচ্ছে অর্থহীন ঘোরের ভিতর!

——————————————————

 

পিরামিড সংসার
দায়ভার বলে

বন্ধুকে কান্তার কথা বলেই ফেলেছি।
দায়ভার বলে
শিশুকে উদ্ধার করে বেঁধে দিই মায়ের আঁচলে।
দায়ভার বলে
নদীকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছি মোহনার কাছে।

চারিদিকে কোলাহল,
শুনি।
বারুদের গন্ধে ফুল ফোটে,
দেখি।
তাঁবুকে দোফাল্লা করে শরণার্থী শিশুর ক্রন্দন,
লিখে রাখি।

মনুষ্যজন্মের স্মৃতি আছে বলে মানুষের সঙ্গে দেখা করি,
কবিদের দেখাদেখি আঁধারকে বলেছি শর্বরী।

সমস্ত দিনের শেষে জামাকাপড়ের ভাঁজ থেকে
নিজেকে আলগা করে দেখি
খুব একা।

পাথরে শ্যাওলার মতো পড়ে আছে মন
পিরামিড সংসারে বেঁচে আছি মমীর মতন।

—————————————-

 

তারেক রেজার দুটি কবিতা
আঙুলের ভাঁজগুলো

কার কাঁধে হাত রেখে হেঁটে গেছি প্রলয়ের পথে
ঝড়ের আঁচল পারে ভেঙে দিতে হৃদয়ের খিল
ঘাটের আদর বুঝি ভেসে যায় বিপরীত ¯্রােতে
কার চোখ ফাঁকি দিয়ে উড়ে আসে সুদূরের চিল
কতোটা আড়াল হলে বিষাদের ছায়া ঢেকে যায়
কাছের মানুষ ভালো নাকি যাবো মানুষের কাছে
এসব কথার ফাঁকে আজো দুটো প্রজাপতি নাচে
আঙুলের ভাঁজগুলো জল নয় ঢেউ হতে চায়
যেতে পারি কেন যাবো— বেঁজে ওঠে শঙ্খের বাণী
ফুলের সাহসে আজ ভর দিয়ে দাঁড়াবো বাগানে
পাঠ করি কাঁটা-কীট-পরাজিত জীবনের গ্লানি
এ-যুগের কাস্তে নাকি চাঁদকেও চুমু খেতে জানে
তুমি আর আমি আজো মুখোমুখি পাশাপাশি বাড়ি
দোতলার ছাদ থেকে মাঝরাতে হাত ছুঁতে পারি

হাত বদলের অর্থনীতি
কতো রকম অসুখ বিসুখ বুক পকেটে আগলে রাখি
শরীর থেকে মনের দিকে ওরা কেবল গড়িয়ে চলে
জানি আমার ঠাঁই হবে না ঢেউ খেলানো গভীর জলে
এখনো কি কেউ তোমাকে ডেকে বলে পরানপাখি
শিশুর হাতের বলের মতো হাত বদলের অর্থনীতি
বুঝতে পারি যেমন করে সাদা-কালোর ফাঁরাক বুঝি
ব্যবহারে বেড়েই চলে এমন তোমার মোহন পুঁজি
আমি কেবল গেঁয়ো রাখাল বাঁশির সুরে পল্লীগীতি
শঙ্খিনী মন দেহের ভাঁজে অন্যরকম আগুন পোষে
পিপীলিকার পাখায় তবু অস্থিরতার প্রলয় জাগে
দেহের অধিক দীর্ঘ কোনো নদীতে খুব ক্লান্ত লাগে
তোমার চোখের ইশারা কি এক ঘাটে জল বাঘে-মোষে
তোমার পায়ের শব্দ শুনি : থমকে দাঁড়ায় সবুজ ছাতা
তুমিই আমার জলের সাথে ঘর করা এক পদ্মপাতা

————————————

শামীম নওরোজ-এর তিনটি কবিতা
পাখিবন্ধু

বিলাসী বিকেলগুলো আত্মমগ্ন জলের সাম্পান
তুমি না এলে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে ফেরে না আর
জনহীন মাঠগুলো একদিন শাদা তুলোর মতো
উড়ে যাবে কালো-কালো বৈশাখে
রঙিন মাছের দিন ফুরালে
স্বাভাবিক নিয়মে
কেউ-কেউ পাখি হয়ে যাবে
পাখিবন্ধু গাছে-গাছে আলোর সাম্পান হয়ে
জ্বলে উঠবে
নিভে যাবে

 

অসুখের বাড়ি

পাতা ছেঁড়ার শব্দে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৃষ্টি ও রোদ্দুর
পুরনো কাসুন্দি ঘেটে দু’জনের মুখ দু’দিকে পর হয়ে গেছে
গৃহিনী পাখি এসে একটি বাড়ি বানিয়ে দেয়
বাড়ির ভেতর বিল-ঝিল
মহিষের গাড়ি

 

স্বর্গ

জলন্ত আকাশ
ঝুলন্ত মেঘের মতো বাড়ি
শ্মশানে ঘুমিয়ে আছে ব্রতচারী মানুষের মুখ
অনেকেই দেখে যাচ্ছে সার্কাস
স্বর্গীয় তাড়ি গিলছে ঠাকুর
মধুকুঞ্জে উৎসব
স্বর্গীয় সুখ

————————————-

বায়তুল্লাহ্ কাদেরী
আমি পক্ষিগোত্র

আমি কি বলতে পারি না ঘোড়াটি কাহার লেজে
নেচেছিল লেজের ওপর?
ডিম্বাণুর ঘোড়া মেঘের ভেতরে মুখ
ডোবায়-ভাসায়
আবার ঘুরতে থাকে… উপত্যকা বেয়ে
গিরিখন্দে কিংবা অদ্ভুত পাতালে
জলডুবি কলসির ভিতরের গতিপথে
ঐ আসিতেছে পূর্ণবতী আসিতেছে
আর্যতের মগধের মটকাতে
পুরনো ¯স্নানের কীর্তি আমি যার ভাগ্যের উদোম
সৌন্দর্যের সঙ্গে
কিছু আড়িয়াল, কিছু পৈখগাছা, কিছু গঙ্গাফুঁর
কিছু বা কালিন্দী আমি যার চালকুমড়ো—
ধবধবে স্তন, যত অন্ধকার… সিন্ধু বা মহেঞ্জদারো
উদারা হরপ্পা আমি ঠিক নেমে কোনদিকে? বলছি শুধুই
ওঁ ওঁ ওঁ… বাবারা ওলান কোনদিকে… বলো দিকি… ধবলা কোনদিকে
ওলান ঝুলিয়ে দিয়েছে? বাস্তবিক
পালের হামানদিস্তা… গুপ্তকাল… সেনের সুন্দরতমায় একটি কি দুটি সকালের পর
কী করতে পারতাম আর আমি? যেহেতু
আমার ঘোড়া প্রতিবেশীর ছাদের ওপর উঠে যায় যখন-তখন…
যদিও বঙ্গেরা আমি, যদিও আমি পক্ষিগোত্র তবুও,
পাঠক, তবুও… দেখুন দিকি, ‘টিকিটা কোথায় গেল রে বাবা’ বলে
পাড়ার ছেলেরা আমাকে খেপিয়ে তুলে, দেখুন দিকি, বামুন মানুষ…
এইভাবে দিন যায়… এইভাবে শীতকাল… গ্রীষ্মকাল… বর্ষাকাল…
একদিন ঘরের দোরে সেই এলোমেলো মুখের ঘোড়া
ভাষার ভিতরে ভীষণ যবন… একদিন দুপুরবেলায়…
একদিন আমি পৈতে নিয়ে দারুণ চিন্তিত… দেখুন দিকিন…
এইভাবে পক্ষীগুলো ফের উল্টে যায়? গাছেই ওড়াল পারে
আরেক উড়ালে? স্বর্ণ-কলসির মতো রাজপুতানির অগ্নিঝাঁপ
আর যাত্রাপালা— মহাযাত্রা ভঙ্গ করে মিশে যায় মাটির পরতে
আরেক রক্তাক্ত মাটি, মিশে যায় স্রোতধারার তেজস্বী স্রোত
হয়তো ওলান ধবলার আরো বেগবতী…
যবন-বামুন-রাজপুত মিলে মহাসংসারের আয়োজন
কোনদিকে ওলান তাহলে কোনদিকে ঝুলিয়ে দিয়েছে ধবলায়
অতঃপর? ঘুরি, তুঘলক মোগলের গাট্টি-বোচকা, পাগড়ি-পিরহান
বলুন দিকিন… আমি বামুন মানুষ কী বা করতে পারি?
হেরেমে হেরেমে জ্যোৎ¯œা-মেঘ-রৌদ্র-ছায়া-চাকু-অসূয়া-বিষ-মধুচক্র
শুধু মধুচক্র ঘোর জীবনব্যাপ্তির এরকম ঘোর আয়োজন-তৃষ্ণা
এই উপত্যকায় গিরিখন্দে কখনোই নাবে নাই!
আমিও অতীতচারী হ্যাঁ… কখনোই নাবে নাই, আচমকাই দেখি সেই উন্মাতাল
ঘোড়াই পৌঁছে যায় তার মানবীর জঙ্ঘার তরলে… শোরগোল আর ষড়যন্ত্রে
ক্ষুর তার ছিন্নভিন্ন… ঠগের বিস্তার বর্গির উৎপাত… এদিকে-ওদিকে ভুঁইয়াগিরি
চলছেই চলছেই, দেখুন দিকিন তবুও হেরেম-জ্যোৎস্না আমি বামুন মানুষ
কী বা করতে পারি যবনে-ইংরাজে টানাটানি… একটি ঘোড়াও নাই
আ¤্রতল ফাঁকা!… আমি পক্ষিগোত্র… দেকুন দিকি, আবারো ওড়াল
একই গাছে… পুচ্ছ তুলে… পায়ু দেখিয়ে আবারো ওড়াল… আর কতো সহ্যি হয়
খানের জামানা শুরু হল বলে দলবেধে পেন্নাম পেন্নাম… সেলাম সেলাম… আদাব আদাব
গুডমর্নিং… বেডমর্নিং… পশ্চিম সাগরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে উদোম
ঘোড়ার পাল নৃত্যরঙে আমি কী বা করতে পারতাম… আখক্ষেতে ফাঁস লাগিয়ে?
ও মৃত্যু আমার নয়… যার মৃত্যু হল সে তো বাপু ঐ পৈ… তে…
আমার পৈতে।

 


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা