ff

ক বি তা

 

ময়ুখ চৌধুরীর কবিতা
বৃষ্টিবন্দী

বিছানার একপাশে কবিতার বই হাতে তুমি

তোমার পিঠের পিছে ভেঙে পড়া বৃষ্টির আকাশ

অনেক চোখের দানা জানালায় উঁকি মেরে দেখতে চেয়েছে

বৃষ্টিবন্দী দুইজন কী করে কী করে

কবিতা রয়েছে পড়ে আঙুলের নম্র কারাগারে

চৌকাঠের ফ্রেমে স্থির ভাস্কর্যের মতো এক কবি

বৃৃষ্টির প্রেরণাপুঞ্জ অভিমানে আছড়ে পড়ে পাথরের বুকে

এ রকম নিঃসঙ্গতা দরোজাজানালা আর কখনো দ্যাখেনি

****************************************

 

 

পর পুরুষের ছায়া

প্রখর রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছ একা, দূরে,

একটু সরে এলে তুমি ছায়াটুকু পেতে

হয়তো পছন্দ নয় অন্য কোনো গাছ, যার নিচে

ছায়া আর আমি।

ছায়াদের জাতপাত নেই— কবিদেরও।

আকুল শাখায় ভরা পরগাছাটাকে তবু তুমি

পরপুরুষের মতো ভয় পেয়েছিলে।

****************************************

 

অপরাজিতার ভাঁজে

অপরাজিতার ভাঁজে রচনা করিনি কোনো দ্বিধা,

বেগুনি রঙের দ্বন্দ্বে তবু কেন বরফ ছুঁয়েছ?

এখন ভীষণ যুদ্ধে নিজের বিরুদ্ধে তুমি একা,

তাই চেয়েছিলে তুমি আমি যেন তোমাকেই ভাবি;

ভাঙা টুকরো জোড়া দিয়ে আমি যেন প্রতিমা বানাই

এবং এভাবে যেন তোমাকেও একটু করে ছুঁই।

****************************************

 

সহজে হারিয়ে ফেলি

মানুষ বেড়াতে যায় এখানে ওখানে। আঁধার-অধিকরণের টানে

অরণ্যের সোঁদাগন্ধ, পাহাড়ের জটিল জ্যামিতি, মাঝখানে

লবণাক্ত হাওয়া যদি হাতছানি দেয় তবে হা¯œুহানা গলি।—

সহজে যাই না আমি, সহজে হারাই নিজেকে আমার,

এখনো নিজেকে খুঁজি বুক-পকেটের কাছে পুরোনো জামার।

****************************************

 

সায়ীদ আবুবকরের তিনটি সনেট
মহাকালের কান্না

মহাকাল সমুদ্রের তরঙ্গধ্বনির সাথে কান্না শুনি কার;

শুনি কোন্ ভিটেছাড়া নৃগোষ্ঠির আর্তনাদ বিপন্ন বাতাসে;

ইনকাস এজটেকস মেসোপটেমিয়া আর মায়া সভ্যতার

ধ্বংসস্তূপ থেকে ফের মানুষের পরাজয় ফিরে ফিরে আসে।

পালাচ্ছে মানুষ আজও নেকড়ের তাড়া খাওয়া হরিণের মতো;

নারী ও শিশুর লাশে ভরে যাচ্ছে আজও রোজ ঘৃণার ভাগাড়;

পারবে কি মুছতে কেউ সভ্যতার বুক থেকে জিঘাংসার ক্ষত,

নাকি শুধু দেখে যাওয়া এইভাবে ব্যবচ্ছিন্ন মানুষের হাড়?

হয়েছি নির্বাক শুধু, যখন পশুর মতো মানুষের ’পর

হামলে পড়েছে লোকে— কখনো ধর্মের নামে, কখনো রাষ্ট্রের;

নানা মতাদর্শ এসে কেবলি গড়েছে বোবা কান্নার কবর

মানুষের পৃথিবীতে, হয়েছে অমানুষেরা উল্লসিত ঢের।

কতবার জিতে যাবে ঘাতকেরা, মানুষেরা হবে পরাজিত?

তবু তারা জেনে যাক—মানুষ রয়েছে বেঁচে, খুনীরাই মৃত।

****************************************

 

সভ্যতার গান

সভ্যতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ওত পেতে রয়েছে ঘাতক,

মানুষে মানুষে শুধু সুপ্রাচীন সাম্প্রদায়িকতা;

শুচিশুদ্ধ মনে করে কেবলি নিজেকে সব লোক,—

কমেছে কি কোনো কালে মানুষের আদিম মূর্খতা?

মধ্যযুগের চেয়েও ভয়াবহ আধুনিক যুগ:

গণতন্ত্র ধর্মান্ধতা আর উগ্র জাতীয়তাবাদ

হিংস্র হাঙরের মতো ফেলছে গিলে তাবৎ মুলুক;

মানুষের মধ্যে শুধু মানুষকে মারবার সাধ।

কার কাছে যাবে নারী, কার কাছে শিশুদের ঠাঁই?

নিরন্ন নির্গৃহগণ থাকবে কোন্ আকাশের তলে?

ঘৃণার আগুনে পুড়ে আরাকান হয়ে গেছে ছাই,

আণবিক বোমা পড়ে ব্যবিলনের জলে ও স্থলে।

ছেড়েছে সকল সীমা বর্বরতা মেকি সভ্যতার;

চোখে যত আলো লাগে, তার চেয়ে বেশি অন্ধকার।

****************************************

 

তবুও মানুষ সত্য

তবুও মানুষ সত্য; মানুষেরই কাছে

ফিরে আসি বারবার। সভ্যতার নীল

পাপ-পঙ্কিলতা আসি ফেলে রেখে পাছে;

ছুটে যাই, মানুষের যেখানে মিছিল।

অরণ্য আমার নয়, নির্জনতা নয়,

উন্মাতাল কোলাহলই আমার আরাধ্য;

যে-হৃদয় যাচে শুধু অন্ধ আত্ম-জয়,

সে-হৃদয় ঘৃণ্য লাশ শকুনের খাদ্য।

মানুষকে মর্ত্যে ফেলে যাবে যারা চাঁদে;

চায় যারা নীলচক্ষু স্বর্গের অপ্সরী;

মানুষের পরাজয়, দুঃসংবাদে

নিয়ত নির্লিপ্ত যারা; এ কামনা করি,

ভিন্নলোকে যেন তারা স্বর্ণনীড় বাঁধে

আর আমি মানুষেরই সাথে বাঁচি-মরি।

****************************************

 

বেনজামিন রিয়াজীর কবিতা
লাল চাঁদ— ফুটন্ত কড়াই

আবার এসেছে ঐ লাল চাঁদ ছাড়ের উপরে

পুরোনো দালান ভাঙ্গা বাগানের ঐ পাশে বিপন্ন আকাশে

যেখানে তুলেছে মাথা শিকে গাঁথা পাথুরে কলাম …

দেয়ালের অন্ধকারে মরে যাওয়া পরিত্যক্ত কাকের বাসায়

কিছু আলো পড়ে থাকে মৃত নীল ডিমের খোসায়—

যাদের শীতল চোখে অস্থিরতা ডুবে থাকা ইনসোমনিয়া

চেয়ে দেখে আলোছায়া অলিগলি, ডাকিনীর মতো

ছড়িয়ে দিয়েছে চুল জটা তারে বিজলীর বাতির খাম্বায়।

জানালার গ্রিলে যেন ঝুলে থাকা লাল চাঁদ ফুটন্ত কড়াই

ভরে তোলে ডাকিনীরা ঐ সব নিদ্রাহীন মগজের যতো

মরা পেঁচা বাদুড়ের বাঁকা হাড় চামচিকে শেয়ালের কালো কলিজায় …

লোকগুলো কেঁপে ওঠে চোখগুলো ঘোলা রক্তচাপে

খুঁজে চলে বেটালক অ্যাঞ্জিলক ঘোর লাগা দেরাজের ফাঁকে

শুয়ে পড়ে বিছানায় শূন্য যেন পড়ে থাকে খালি হওয়া অষুধের খোসা

তবুও আসেনা ঘুম স্বপ্ন তাকে ঘুমোতে দেবে না

ঘুমোতে দেবে না চাঁদ অফুরন্ত কামনার ফুটন্ত কড়াই …

ঝুলন্ত বুড়ির মতো জরাগ্রস্ত মৃত্যুহীন কাঁথার নক্সায়

বুনে যাবে স্বপ্নজাল আজ আর আগামীর রাতে।

****************************************

 

 

সমুদ্র-ধূসর সীমানায়

কী এই জীবন আর জীবনের অনুভব

আজ রাতের বৃষ্টিতে ধুয়ে যেতে পারে সব—

ধুুয়ে যেতে পারে আকাশ

সবুজের প্রান্তরের ঘাস

চোখ থেকে অরণ্যের হেম

নিস্ফল হৃদয়ের প্রেম।

 

যদি ভেসে যায় আজ এই অন্ধকার বর্ষায়

স্মৃতির অতল জাল ছিঁড়ে

স্রোতাবর্তে বিহ্বল মাছেরা

দিকভ্রান্ত পুষ্পদীঘি বিহঙ্গের বিলে

মেঘ আর ছায়ার নদীরা—

সব গান ঢেকে দিয়ে

বাদলের মাদর মন্দিরা

ডেকে যদি  নিয়ে যায় সাথে

তোমার সঘন নীল রাতে

হয়তো দূরের মোহনায়

তোমার হৃদয় ভাঙ্গা স্রোত

ভেসে চলা নীড়ে খড়ে

মৃৃত হিম একাকী কপোত

সমুদ্র-ধূসর সীমানায়

****************************************

 

মামুন মুস্তাফার কবিতা
কফিনকাব্য

১.

জুতা সেলাইয়ের ভেতরে জেগে থাকে অনুকাব্য। প্রতিটি ফোড়নে বেরিয়ে

আসে ‘জুতা আবিষ্কার’। মুচির আত্মার মতো বরুণ ভালবাসা নিয়ে জুতা

হেঁটে যায়। মুচি ফিরে চলে মেঘের ভেতরে। যেখানে স্বপ্নেরা ¯স্নান সারে।

উৎকণ্ঠ বিশ্বাস নিয়ে মুচি পেরেক ঠোঁকে কফিনের কাঠে। সারাবেলা বসে

থেকে কফিনকাঠ মেলে ধরে ঝিনুক-উত্তর। তোমারও সঙ্গী কেবল

প্রতারণাটুকু! মুচির চোখের গোলকে ভেসে ওঠে পঞ্চম পেরেকে ঝলসে ওঠা

কফিনকাঠ— জুতাপালিশের মতো বর্ণময় কবরের মাটি…

 

২.

ভিখিরির ঝুলি ভরেছিল বায়ুহীন বাঁশি। কাঁচা, ভাঙা ঘরে ভ্রমর ওড়ার শব্দ—

আর কিছু অনৈতিক তন্দ্রা এনেছিল রাবীন্দ্রিক সন্ধ্যা। ভিখিরি সেধেছিল

বায়ুহীন বাঁশি আর মন্ত্রগাঢ় ধ্যান দিয়ে গাওয়া কোনো গান। ভিখিরি রাত

চেয়েছিল খুব করে। দিনের লজ্জা যেন চুরি হয় আরেক রাতের যামে।

ভিখিরির থলে তবু ভরে থাকে সারাটা দুপুর। খুঁদকুটো, কাঁড়াআকাঁড়া—

হিশেব কষে ভিখিরি আড়াল তোলে এই এক ইহজীবন! তখন কাঁসাইয়ের

দূরাগত শ্বাস এসে লাগে কফিনকাঠে। ভিখিরি চেয়ে দেখে জ্যোৎ¯œাপ্লাবিত

চাঁদ তুলোর মতো উড়ে উড়ে পড়ে কবরের মাঠে, জেগে ওঠে ওখানেই

গোরস্থানের প্লট…

****************************************

 

মাহী ফ্লোরার কবিতা
ঈশ্বর

জ্যোতিময় এক আলোর নাম। সমস্ত কঠিন রাতের পর

জরায়ুতে ঢেলে দিলে এক মানব শিশুর বীজ! নেশায়

কেটে গেলো দিনের নাম। একেকটি পাখির পাখায়

নিয়তি লেখা যেভাবে। ধুকপুক নরম বুকে রুধিরাক্ত

গোপন বসবাস। ঈশ্বর-বুক চেপে থাকা সন্তানের

বিশ্বাস। জন্মের পর কচি হাতে তুলে দেয়া সিফারার

কালি। অচেনা আগন্তুকের মত একেকটি সূূরা! দুলে

দুলে আমের ছায়ার তলে আমপারা পাঠ! ঈশ্বরকে

বাঁচিয়ে রাখে অবুঝ অন্তর। শেকলের চেরাগি পাহাড়

ধুলো দেয় চোখে। ধানের কবিতার আর বিশ্বাসে টিকে

গেল নতুন পৃথিবী। ঈশ্বর সাধারণ মানুষের চেয়ে

লোভী। টিকে থাকার লোভ। বিশ্বাসে মিলে থাকার

লোভ। নত মস্তকের ভীরুদের পছন্দ করে সকল

ক্ষমতাবান। ক্ষমতা যাকে অত্যাচারী করে সেই ঈশ্বর!

ঈশ্বর বলেছিলো প্রতিদিন এ জ্যোতিময় আলো তিনি!

নদীর দেশে সাদা কবুতরে গতির প্রতীক বলে তাকে

চিনি! কেউ তবু জানে ঈশ্বর— কুতুব তারার মত স্থির!

 

 

একটা ভোরের পরেই যদি নিভিয়ে দেবে আলো,

ভালোবাসায় শিশু তুমি— খাতাকলম সরিয়ে যে দাগ

যত্রতত্র টানো! একটা ভোরের পরে যদি ইচ্ছে তোমার

শেষ; ভালোবাসায় শিশু তুমি- তোমার হয়তো

মানচিত্রের সীমায় সীমায় একটা কোনো দেশ… আমার

কিন্তু দেশ বলতে মানুষ, আমার কিন্তু আকাশ আছে,

নদীর পরেই বিজন বনভূমি! চলো যাবেই যদি তোমায়

নিয়ে যাই। ভালোবাসায় শিশু তুমি- হাঁটতে হাঁটতে

হারতে হারতে হারিয়ে যেতে পারো, ধরো এই বনোদী

হাত কড়ে আঙুল ধরো, আধরোষ্ট গোপন কিছু নয়;

ভালোবাসায় টিকতে গেলে হবে, ভালোবাসায় একটা

ও কার বেশি, ভালোবাসায় নতুন কেনা খাঁচা— এবং

আরো অনেক কিছু হয়।

****************************************

 

 

শামীম নওরোজের কবিতা
সোনালি ছিনার

গোপনে আকাশ দেখে ফিরে গেছে

সোনালি ছিনার

তার চোখে দোষের বাতাস খেলা করে

সারাটা সময়

দেখায় এমন ভাব যেন সে ছিনার নয়

অথচ তার দেহ ছুঁয়ে আছে অসভ্য পুরুষ

আমি আছি আগের মতোই

প্রকাশ্য রোদ্দুরে উজ্জ্বল হয় হিংসার ধুলো

এই বুঝি দ্বিচারিণী কাতর করবে খুব

আমাকে পারে না বলে

অন্যের শরীরে ঢাকে নিজের শরীর

ছিনারের হাসি দেখে

মুখ দেখে

বুক দেখে

খুলে ফেলে চরের পোশাক

অতঃপর ধুলো মেখে ফিরে আসে আমার আবাসে

 

আমি আছি আগের মতোই

তার থেকে কিছুটা দূরত্বে

নিজের গুহায়

****************************************

 

 

রক্তাক্ত, মৃত্যুমুখি…

জটিল একটি গিঁট খুলতে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না…মৃত্যু আবশ্যক জেনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিলো জটিলতর গিঁটের পাশে…এরকম মাঝে মাঝে হয়…অন্ধকার তেড়ে এসে ভেঙে ফেলে বুকের কাঠামো…ইদানিং সহজ যাপন খুব বেশি কঠিন কুটিল হয়ে গেছে…মৃত্যুভয় সঙ্গে নিয়ে মানুষেরা বহুদূরে যায়…মৃত্যুভয় সঙ্গে নিয়ে মানুষেরা ঘরে ফিরে আসে…রক্তাক্ত, মৃত্যুমুখি

মানচিত্রের বুকের ভেতর ভাঙা কাচের টুকরো… আত্মঘাতী পাখি…পাখিগুলো পালক উঁচিয়ে উড়ে যাচ্ছে জটিল জটিলতর গিঁটের ভেতর…

****************************************

 

রিঙকু অনিমিখের কবিতা
বনানী ৭

ফুল— সে কোনওদিন নিজেকে দেখে নাই

তাই, চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে

ফুলের নিজস্ব কোনও আয়না নেই

আয়না অর্থ দর্পণ, দর্পণ মানে দৃষ্টিভঙ্গি

ফলে, সে আজন্ম পূজার অর্ঘ্য হয়ে রইলো

আকাশের ছিল বৃষ্টিভঙ্গি ভাল— ফুলকে সে

চাইলো দিতে স্বচ্ছ জলের ধারা— এই লক্ষ্যে—

সিক্ত হবে সজীব হবে— জল-প্রলেপে আয়না হবে পাতা

কিন্তু, তাতেও অসম্মতি— বাধ সাধলো ছাতা

এই মর্মে— একটি ভ্রমর

গুঞ্জরণের ভজনসংগীতে

হৃদয়াধিক কাব্যকুসুম করলো সমর্পণ

বললো সে ইঙ্গিতে, ‘দেবী, ফুল শুধু নও— তুমিই পূজনীয়’

একটু ঝুঁকে চোখের ভেতর আয়না পেতে দিলো

কিন্তু যে হায়— কার ভাল আর কে ভাল চায়!

নিজের ভুলে নিজেই ফুল মুখ ফিরিয়ে নিলো

****************************************

 

 


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা