Chinno_35 Cover

ক বি তা

জুলফিকার মতিনের কবিতা
চার নারী

১.  দলনী বেগম
কুসুম-কোমলে মেশা সে নারী কি আজও আছে তারাদের ভীড়ে?
সরমা অরুন্ধতী — এদের সবার মাঝে আজও তাকে খুঁজে ফেরা
নক্ষত্র খচিত রাতে সীমাশূন্য আকাশের দিকে চোখ মেলে,
বিস্মরণের নদী কেবলই তো বয়ে চলে দুকুল প্লাবিত করে দিয়ে,
কেন না  মানুষ সব কিছু ভুলে যায় — সব কিছু ভুলে যেতে চায়,
স্মৃতিভারে জর্জরিত জীবনের ভার তাকে ক্লান্ত করে শুধুই কেবলই।
ক্ষয়—ক্ষতি-পরাজয় — তবুও তা থেকে যায় প্রত্যহের অমোঘ সঞ্চয়ে,
ভুল করে ভুলে যাওয়া মধুপ গুঞ্জন ধ্বনি শোনা যায় কখনও কখনও।
তেমনই করেই বুঝি দূর কোন অতীতের মুগ্ধ সুবাস
ঝঞ্ঝা-ক্ষুব্ধ জগতের প্রান্তে ফের এসে এসে মাদল বাজায়।
বিস্মৃতির বিবরে থাকা সে নারীর কথকতা খুলে দেয় রুদ্ধ দুয়ার,
মোহিনী মূর্তি তার অদৃশ্যলোক থেকে ভেসে ওঠে মানস মন্দিরে।
সে নারী বালিকাবৎ — বেতস লতার মতো মৃদু-মন্দ সমীরণে নুয়ে নুয়ে পড়ে,
বিশাল পুরীতে তার বড় হয়ে ওঠা ছিল ভাগ্যেরই তীব্র ভ্রুকুটি,    রেশমী ঝালরে মোড়া ঐশ্বর্য মথিত ঠাঁট সে কি নিতে পেরেছিল আপনার করে?
বৈভবে মোড়ানো দিন কম্পিত তার বুকে কি বা জ্যোতিঃ জ্বেলে দিয়েছিল?
তার পর এক দিন লাজন¤্র বধু হয়ে — স্বামী সোহাগিনী হয়ে
ভেবেছিল জীবনের সব পাওয়া হয়ে গেছে শেষ।
কিছুই হয় না শেষ — অস্থির সময় তার মেলে ধরে উদ্যত থাবা,
লোভী বণিকেরা এসে থানা পাতে মৃত্তিকার জবর দখলে।
মুর্শিদাবাদের দিন পিছে ফেলে চলে আসা মুঙ্গেরের নতুন ভবনে —
স্বপ্নের বিচ্ছুরণ উদয়নালাতে যেন পুনর্জন্ম পায়।
যুদ্ধের দামামা
ঈশান-বিষাণ কোণ ছিন্নভিন্ন করে।
সেই নারী — চিত্রপট পুতুলের — যোদ্ধাসাজ তুলে দেয় স্বামীর শরীরে,
যে আর কখনও ফিরে আসেনিকো বক্সারের রণক্ষেত্র থেকে।
বিহাস ॥ ১৬। ০৭। ২০১৮

***********************************************

২.  সংযুক্তা

মরুভূর পথ বেয়ে ঘোড়ার পিঠেতে
রাজার কুমারী কোন ছুটেছিল প্রেমিকের পৃষ্ঠদেশ চেপে ধরে বুকে।
যোজন যোজন পথ পার হয়ে গিয়েছিল দুরন্ত গতির নেশায়,
অনিশ্চিত ভাগ্যকে মেনে নিয়ে দেখেছিল জীবনের নব অভ্যূদয়।
কি তার হৃদয়ে ছিল? নৈঋতে উঠেছিল প্রেমের তুফান
বৈরী পিতার ক্রোধ বাঁধা হয়ে পারেনি দাঁড়াতে
অনায়াস আলিঙ্গনে দয়িতের কণ্ঠে তাই বরমাল্য দিয়েছিল তুলে।
উৎসব মুখরতা সে দিন তো ভাসিয়েছিল রাজার প্রাসাদ
স্বয়ম্বর সভাতে এসে ভীড় করেছিল সব নৃপতির দল।
কোথায় মালব আর কোথায় উজ্জ্বয়িনী, কোথায়ই বা দূর দেশ কন্যাকুমারিকা?
রূপের খ্যাতি যে তার পরিব্যপ্ত দিকে দিকে মর্মরিত বাতাসের সুরেলা ডানায়।
বসন-ভূষণে মোড়া রাজপুরুষেরা যত উষ্ণীষে রেখেছে বেঁধে
হীরা-মুক্তা-মাণিক্যের কণা,
দর্শনীয় বস্তু হতে চেষ্টার ত্রুটি কারও ছিল না মোটেই,
তাদের সমুখে
ছন্দায়িত পদ ফেলে রাজার কুমারী এসে দাঁড়াল নীরবে,
মানবী না অপ্সরী — তাই ভেবে বাক্যহারা সমাগতজন।
মুখে তার লোধ্ররেণু — কর্ণে দোলে ঝুমকোদুল — গলায় জড়ানো আছে সাতনরী হার
অঙ্গে অঙ্গে অলঙ্কার— তা থেকে বিচ্ছুরিত সৌন্দর্য অপার।
শুরু হয় প্রদক্ষিণ —বরমাল্য হাতে নিয়ে রাজার কুমারী
প্রত্যেকেরই সমুখ দিয়ে মরাল গতিতে
কেবল এগোতে থাকে এবং কেবলই….
মালা তো ওঠে না আর কারোরই গলায়।
অবশেষে দ্বার প্রান্তে দৌবারিক ছিল এক জন
রাজার কুমারী গিয়ে তার কাছে দাঁড়াল যখন
সে তার ছদ্মবেশ মুহূর্ত-মধ্যে খুলে ক্ষিপ্রগতিতে
উন্মুক্ত কৃপাণ হাতে পাহারা এড়িয়ে
রাজকন্যাকে নিয়ে চড়ল ঘোড়ায়।
এ তো চলা নয় — স্বপ্নকে সাথে নিয়ে চলা
হৃদয়ের অধিকার — তাও তো চিরন্তন বিশ্বনিয়মের
তারই বুঝি শিলালিপি লেখা হল অশ্বের দৃপ্ত কদমে।

বিহাস ॥ ১৬। ০৭। ২০১৮

***********************************************

৩.  উত্তরা

নিদয়া বিধির ক্রোধ জন্মদাগ হয়ে বুঝি লেগে রয়েছিল,
অভিশপ্ত বিনুনীতে ভাগ্যের করাল গ্রাস লেখা ছিল নৃত্যের পদ-ভঙ্গিমায়,
সে সব তো ছিল নাকো তোমার জানার
অস্পষ্ট কররেখা পাঠ করে কেউ কভূ শোনাতে পারেনি কোন
অমঙ্গল বার্তা জীবনের।
অথচ শৈশব ছিল মুখর হুল্লোড়ে ভরা প্রস্ফুটিত রঙ্গনের মতো
সুগন্ধি সুরভি মাখা গোলাপের পাঁপড়িতে লেগে থাকা অমেয় মূর্ততা,
আকাশের চাঁদ এসে রজনীগন্ধার রাতে খেলা করে যেত
মত্ত মাদলে এসে দোলা দিত বিদ্যুতের চকিত বিলাস।
বিরাট রাজার সেই প্রাসাদ ভবন ছিল উচ্ছ্বলিত মর্তের নন্দন কানন
বিত্ত আর বৈভবের সমারোহে দিন ছিল প্রাচুর্যময়
উন্মুক্ত কৃপাণ হাতে বিনিদ্র পাহারায় সৈন্যরা ছিল সচকিত
সকাল-সন্ধ্যা জুড়ে বন্দীরা গেয়ে যেত মঙ্গল গান।
যৌবনের চিঠি নিয়ে এক দিন বসন্ত বাতাস
নীরবেই এসেছিল — সঙ্গে করে এনেছিল বিনম্র বকুলের সমাহিত মগ্ন হৃদয়
অজ্ঞাতবাসের দিনে অর্জুনই বৃহন্নলা — তোমাকে শিখিয়েছিল নৃত্য ও গীত,
তার পুত্রবধু হয়ে, ভেবেছিল, এত বড় ভাগ্য, বুঝি, হয় নাকো আর।
সুখ তো ক্ষণস্থায়ী — তারও চেয়ে ক্ষণস্থায়ী রাজসিংহাসন
তাই নিয়ে সংঘাত — সারা ভারতের
মৃত্তিকা থর থর — যুদ্ধের বিষাণ
বিষাক্ত করে তোলে ভোরের বাতাস।
যুদ্ধ শুরু কুরুক্ষেত্রে — চক্রব্যুহ ভেদ করে অর্জুনের ছেলে।
জানা তো ছিল না তার মন্ত্র ফের ফিরে আসবার,
তাই ফেরা হল না তো আর।
নিয়তির সে ছিল এক অমোঘ বিধান :
তোমাকে পরিয়ে দিল বৈধব্যের টীকা।

বিহাস ॥ ১৭।০৭।২০১৮

***********************************************

৪.  ঊর্মিলা

কি করে কেটেছে দিন সুরম্য নগরীতে — অযোধ্যার রাজার প্রাসাদে?    প্রমোদ মাধুরী দিয়ে যার খ্যাতি পরিব্যাপ্ত ছিল দিকে দিকে,
উদ্যানে ভরা ছিল চিত্তহরা পুষ্পরাজি
প্রাঙ্গনে শিরীষ শাখা দোল খেত মর্মরিত মধুপ গুঞ্জনে।
আশ্বিন আকাশে চাঁদ জ্যোৎ¯œাময়ী রজনীর মায়াবী যাদুতে
আধো আলো অন্ধকারে স্বপ্নের বীজ দিত বুনে।
নূপুরের ঝঙ্কারে নর্তকীর দল
মেনকা রম্ভা হয়ে অপার্থিব ভুবনের মায়ায় জড়াতো।
তবু কি কখনও কোন চৈত্র সন্ধ্যায়
উদাস বাতাস এলে আনমনা হয়ে যেত মন?
প্রিয় সন্নিধান থেকে বিরহ বোধের এক মর্মরিত হাহাকার
সত্য হয়ে উঠত নীরবে।
সংক্ষিপ্ত মানব-জন্ম — তা থেকে চৌদ্দ বছর এমন তো কম কিছু নয়,
বস্তু জগতের সুখ — তা কি ভরে দিতে পারে শূন্য হৃদয়?
এক দিন এক সাথে তুিমও তো এসেছিলে দশরথ-পুত্রবধু হয়ে,
কঠিন নির্বাসন — তারও চেয়ে সুকঠিন স্বামীসঙ্গ বিসর্জন দেয়া,
সীতার ভাগ্য তাই পল্লবিত হতে থাকে বেত্রবতী তীরে,
রামানুজও চলে গেল ভ্রাতৃত্ববোধের চির ছবি এঁকে দিতে,
একচক্ষু বাল্মিকী তোমাকে তো দেখল না চেয়ে।
রমণী হৃদয়ে প্রেম কতটা গভীর হয় — তার বুঝি নেই কোন দাম,
এ ভাবেই ফিকে হল কাব্যের সত্যতা — কবির সততা।
আরেক কবির কাছে এ বেদনা মূর্ত হয়ে ধরা পড়েছিল,
কাব্যে উপেক্ষিতা হয়েও তুমি তো তাই হলে স্মরণীয়।

বিহাস ॥ ১৭।০৭।২০১৮

***********************************************

বায়তুল্লাহ্ কাদেরীর কবিতা

সাজঘর

সেই যে আমার জল-সফেদ সাঁতার
সুডৌল বাহুর আমার হাঙ্গর
আর কি নাচবে না? আর কি ডালায় ভরে
নামাবে না শাড়ির প্রান্তের মতো সিঁড়িবৃষ্টি?
অস্থিরতা ঘড়ির মতন ত্রিমুখিচৌমুখি হাতে-পায়ে
জল ঘোলা করে। অথচ ঘড়িই এক উদাম লাটিম আমার ফ্ল্যাটের মধ্যে খুব ভবঘুরে
অবিন্যস্ত শাড়ি-শেমিজের মতো নিঃসঙ্গতার আলোয়
শেলফের বইয়ে বিগতার স্মৃতি গুনগুনায়।
এখন সবুজকাল। থ্রিডি মুভির ব্যায়ামে আমার স্ত্রী আর আমি নিচে নেমে ফের সিঁড়ি ছাড়া উঠে যাই।
এরকম ওঠানামা ডোনাল ট্রাম্পের আর পুতিনের টুইটারে ঢুঁ মারার মতন মনে হবে একজন বঙ্গদেশীয়ের।
‘রোহিঙ্গারা আর যাবে না’— এমন চিন্তাও হঠাৎ কোনো নারী ব্যাংকসহকর্মীর মনে জেগে ওঠে—
যখন রাত ন’টায় তার তামা বের হয়ে শিসা হতে শুরু করে।
আবার সকাল, আবার পরদিন। চুল স্ট্রেইট করা বাকি। থ্রিপিসটা খটখটে,
লাঞ্চবক্সে অর্ধেক তাকিয়ে আছে কবেকার পেড়ে যাওয়া মুরগির অর্ধসেদ্ধ ডিম
মুরগিটি এখন কোন কবরস্থানে আছে— সেটি একটি শিশুর জিজ্ঞাস্য হতে পারে,
কিন্তু এরকম চিন্তায় প্রায়শই আমি আর আমার স্ত্রী ডুবে যাই যখন দুজনে হরর মুভির ভাম্পায়রকে দেখি
আসলে এই তো যাত্রার ধ্বনি! এক উদোম বেঢপ লাটিমের উদর-নিতম্ব নৃত্য,
সারাঘরে শুধু সাজঘর আর সাজঘর— আয়না আর আয়না— কই শুরুতে তো
আমাদের ঘরে সাজবার এমন আয়না ছিল না?

***********************************************

বুড়ো বসন্ত

বাড়িবিলাসের স্বপ্নকে ছুঁয়ে বসন্ত তুমি
আমার হয়েছো  আমার হয়েছো

                                                আংটি পরেছো

                                                                বাসরে উঠেছো
বুড়ো বসন্ত।
সন্তান-বভা হয়তো হবেও।
ঝড় কি এসেছে? বায়ু কি আয়ুধ
গুনেছে নিজের?
বাড়িবিলাসের স্বপ্ন ছুয়েই জাগ্রত আমি
চুলের ভিতর ত্বকের ভিতর চোখের ভিতর
ভিতর ভিতর ঠিক যেরকম চুলের ভিতর
বসন্ত তুমি
শাড়িতে সেজেছো!

***********************************************

প্যাসাজ

আমি তোমাকে আলো দেবো
আমি দেবো গৌরীচুলের
হাট
দেবো আমি ভিতরবাড়ির
যাত্রাশুরুর প্যাসাজ
জরতির রত্তি ঘাম
আমি তোমাকে শিস দেবো
নৌকো দেবো উদোম চুলোয়
আমি তোমাকে চুমুও দেবো
গরম তোমার শিমূলতুলোয়
সত্যি বলছি এই যে আমার দেবার-দেবার কথা
দেহের মাঝেই ফিরিয়ে দেবো তোমায়
আগুন নৃত্যরতা।

***********************************************

উজানবৃষ্টি

এক মহাকালের উজানবৃষ্টি শুরু হয়েছে
শুরু হয়েছে গহ্বর আর সমুদ্রফেনার প্রলোভনময় উচ্ছ্বাস
মাঝির চিন্তার চেয়েও প্রাগ্রসর ডুবো জাহাজের
ন্যূব্জ হৃদপি-
এখন ঝড়ের সংকেতে প্রায় নিভছে
আগুন আমার কথা শোন, জ্বলো আর জ্বলো
আগুন আমার লোম পোড়াতে পারছো?
আগুন পারছো তুমি আমার দৃষ্টির সুতোটিকে
একটু মুচড়ে দিতে? আমি তো উত্তরে; হয়তো বৃষ্টিতে মিশে যেতে বাকি
আগুন পারছো কি আমার জাত নিয়ে যেতে?
আহ্মেদ নীলের কবিতা

***********************************************

পাগলা লিরিক্স ১

রাইতের আন্ধারে কু-ল পাকায়া বসে থাহে সাপ খাটের উপুর
তারে যদি চুমা খাইবার চাও- যাও-খাও- খাইয়েলও জম্মের ছোঁবল!
জলের মহড়া বুঝি বুঝবার পারে কহে না নালার যাতনা!
কীটপতঙ্গ কী কহনো বুঝবার পারে অনলের ধাঁ-ধাঁ?
কেবল লাফ দিয়া পড়ে-মরে-পোড়ে আঁচের কারিশমায়
হেই দিকে সাপের কাম সাপ সারে, আলো দেইখা পলায়
মানুষ হুদাই না বুইজ্জা ওঝারে ডাকে মিছেমিছি বিষ ঝাড়বার চায়
ফের রাইত হইলে সাপ কু-ল পাকায়, আন্ধার ঘনাইলে মদ্দেরা সাপের গোরত যায়।

***********************************************

পাগলা লিরিক্স ২

দেইখো এই ঝঞ্ঝাট থাক’ব না আর, বুকভরা অভিমান লইয়ে চইলা যামু গা
যেদিকে দু’চক্ষু যায়-
নাগালের বাইরে হুট কইরা ফুইট্টা যামু ট্যারও পাইবে না
সোনার দরিয়া যে পিলে না জানা বহর ডিঙায়- রঙ্গিল ময়ূরাক্ষী ¯্রােতে
জলের সেতার ভাঙে যে পিলে সহস্র ঘোলাটে ঢ্যাউয়ের মণিকুঠে
যে পিলে পিরিতের নামে দিছো কঠিন ছেঁচান, দিছো মগজে আঘাত ইটের
যে পিলে আদর দিবার চায়া দেও নাই, হক মারছো এতিম ঠুটের!
দেইখো সেই পিলে কাউরে কিছু না-কয়া লাপাত্তা হমুগা
দেইখো এই বান্দারে আর খুঁজে পাইবে না
বুক ভরা অভিমান লইয়ে চইলা যামুগা
কেরোসিন-কাতান শইলে শলাই, ঠুকে দিমুগা
পুড়ে ছাই হইয়া দাঁড়ামু পাগলা বাতাসের সামনোত

***********************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা