67089695_1205629756286621_1569702463835996160_o

ক বি তা

 

বায়তুল্লাহ্ কাদেরী’র কবিতা

অক্ষরকে ফিরে পেতে পারি

গোধূলিবাড়িটি ছেড়ে আম্মা যেদিন গেলেন চলে
তাঁর নাইয়রের দিকে, রূপসীর গমনাগমনে
বড়ো ভিড়নিদ্রা! আমি খুব ‘যাবেন না, যাবেন না’ বলে
শটক থামাতে চাহি মিনতির রাতুল চরণে;
কিন্তু, মাতা যে আমার শুভ্র হংসিনীর মতো জলে
ভেসে ভেসে দূরে… সন্তানসন্ততি যতো স্মৃতিবনে
ফেলে একদার সোহাগিনী নাইয়র-যাত্রার তলে
ঘোমটা লুকালেন, হায়, মানিনীর মুখের ধরনে।

কোন ঘরে পৌঁছালেন গো মা? কোন সেই মিয়াবাড়ি?
বেগমসাম্নির সেই ঘর চিনি না যে আমি? হায়,
এমনি আমার দিনরাত! নীল জীবনের আড়ি!
কীভাবে খুঁজবো আমি আপনাকে? যেহেতু সওয়ারি
হয়েছি গো বহুস্রোতের তুফানে; … মানবভাষায়
আমি কি কখনো আর অক্ষরকে ফিরে পেতে পারি?


মহাকালের পদবি
আমিরাবাদ মিয়াবাড়িতে এখন কিভাবে যাবো
যেখানে আমার মাতা হায়, রফিকুন্নেসা চৌধুরী
যাবেন না কোনোদিন! তদুপরি ফেরার স্বভাবও
প্রায় হারিয়েছি। সে-মাতুলালয়ে শাশুড়ি-বহুড়ি-
মাতৃস্থানীয়ার ভিড়ে একদার বাড়ির ঢেকুর
লিখেছিল মহাকালের পদবি। আজ নানা-সাব
বড়মামা কেউ নেই। আছে কিছু সামন্ত ধুলোর
ভগ্ন দালানের ইট : খাজাঞ্চির স্মৃতির হিসাব।

এইতো গো মায়েরবাড়ি। গভীর মাতুলালয়, ফিরে
গেলে কেমন বেদনা নামে— মায়ের বাড়িতে আর
মা নেই। পুতুল আছে তার। শৈশবের যে খেলার
অপূর্ণ পুতুল তার সব আয়োজন কৌটো ঘিরে
চমকিত আছে, পুতুল বিয়ের দিনে একদিন
তিনিও গেছেন চলে— পুতুল যেনো বা অন্তহীন।

************************************************

আহমেদ নীল’র কবিতা

প্ল্যাকার্ড
ভুল সময়ে ভুলের গলিতে ঢুকে
ভুলেই গেছি ভুলের কোলাহলে
নিত্যনতুন দাবি-দাওয়া নিত্য সংঘাতে

ভুল সময়ে ভুল শ্লোগানে মেতে
ভুলেই গেছি ভুলের দোলাচলে
মিছিল ভেস্তে সটকে গেছি শনির আখড়াতে

ভাঙা ব্রীজ ভাঙা রাস্তা ভাঙা রাজপথে
উন্নয়নের ছোঁয়াচ শুধু নাচে মনস্তাপে
তা ধিন তা, তা ধিন তা গাইছে তোপের মুখে

ভুল সময়ে ভুলের প্লাকার্ড নিয়ে
দাঁড়িয়ে ছিলাম তোমার অপেক্ষাতে
তুমি এলেই জমতো দাবি তোমার বদৌলতে

নিরাপদে এলেই যদি এসেই নেমে গেলে
তোমায় দেখে তেড়ে এলো খাকি সুকৌশলে
তা ধিন তা, তা ধিন তা পিষছে যাঁতাকলে

রাষ্ট্রতন্ত্র গভীর ঘুমে তোমার দাবি শুনে
মন্ত্রীবর্গ হেসেই খুন এমন মুদ্রাদোষে
তা ধিন তা, তা ধিন তা উঠছে আগুন ফুঁসে
উন্নয়নের ছোঁয়াচ শুধু নাচে মনস্তাপে
ভুল সময়ে ভুলের প্ল্যাকার্ড নিয়ে
দাড়িয়ে আছি তোমার অপেক্ষাতে।

গণতান্ত্রিক চক্ষু
হাওয়াকে বলি তোমার কথা
নষ্ট হাওয়া আমায় শাসায়
চোখের উপর আঙুল তুলে
গণতান্ত্রিক চক্ষু দেখায়

মোড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা
বেওয়ারিশ পাগল নাচায়
যাকেই বলি তোমার কথা
ছাত্র কিংবা থই জনতায়

ভুল বুঝে সব লুকিয়ে পড়ে
লাঠির ভয়ে দৌড়ে পালায়
ভাঁড়ের পুলিশ গলির ন্যাংটো
গণতান্ত্রিক চক্ষু দেখায়

তোমার কথা যাকেই বলি
প্রচার কিংবা প্রচারণায়
নকল এজেন্ট সিল মারে সব
কেন্দ্রে কেন্দ্র বুলেট গোলায়

তোমার কথা যাকেই বলি
ভারাক্রান্তে ভোট গণনায়
ছদ্মবেশে হরিলুটে, মন-
ভেঙে যায়; মন ভেঙে দ্যায়

খুনের রক্তে উন্নয়নে উন্নয়নে
শহর ঘাট রাস্তা ডোবায়
তোমার কথা যাকেই বলি
গণতান্ত্রিক চক্ষু দেখায়।

************************************************

মাসুদার রহমান’র কবিতা

মা
ভোরবেলা। কুয়াশার ভেতর এক রাজহংসি
উড়ে যাচ্ছে

সাদা

সাদা রাজহংসি তুমি আমাদের
মা

বাবা চলে গেছে
অল্প বয়সে আমরা পিতৃহারা দুইভাইবোন

কুয়াশারমাঠে উড়ে উড়ে
তুমি আমাদের জন্য রোদ সংগ্রহ করছ

খেলা
চাঁদ নিয়ে খেলতাম। আর কোন খেলনা ছিল না
আমাদের

লাল বেলুনের মতো আকাশে উঠতো চাঁদ

উঠোনে মাদুর পেতে বসতাম

মা এক থালা জল সামনে রেখে
বলতেন
– নে, এই থালা ভরা চাঁদ

সারারাত আমার সঙ্গে খেলে এক থালা চাঁদ

************************************************

আহমেদ স্বপন মাহমুদ’র কবিতা

১.
তোমারে চাই রৌদ্রতপ্ত খরায়
তোমারে চাই বৃষ্টি অঝোর ধারায়।
যেমন ধানের ক্ষেতে সবুজ ফসল তিড়বিড়ায়া নড়ে
তেমন করে চাই তোমারে, না চাই তোমায়
ফসল যখন অনাচারে পোড়ে,
পড়ে রাষ্ট্রীয় খপ্পরে।
হোক প্রতিবাদ গ্রাম-নগরে সকলে কাঁধ মিলে
কৃষি আমার বাপদাদারই, রাষ্ট্র কেন খাইবে তারে গিলে!
দাঁড়াও তুমি সম্মিলনে মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে
কে বাঁধ সাধে মুক্তপ্রকাশ,
সব অনাচার নিভে যাবে— যুক্তজবান, প্রতিবাদ একসাথে।
এইতো আমার প্রেমপরিণয় ফসল আমার মা
দেশটারে কেউ খাবে গিলে, আর হবে না, না।
তোমারে চাই সবুজ ফসল দিনে
তোমারে চাই ভালোবাসায়
সবুজের উত্থানে।
ধানের মাচায় খড়ের গাদায়
অনেক আশার ভালোবাসার টানে।

২.
অমন খরায় তোমারে জড়িয়ে ধরায়
বাতাসের চোখ দেখছিল ইর্ষায়
দেয়ালজুড়ে যত পলেস্তঁরা ঘিরে
যেন জড়িয়ে ধরে রাখছিল গভীরে
কোন অবিমৃশ্যতায়!
ঠোঁটের মিলিত উত্তাপের চেয়ে
কোনো দহন নাই
নাই কোনো প্রশান্ত উন্মাদনা
বাতাসজুড়ে ছিল কত কানাঘুঁষা
আমাদের মিলিত বুকের উচ্ছ্বাসা,
জানে হৃদয়ের উচ্চতাই।
এমন নিমগন প্রেমে ডুবে গেলে
কে কাহারে টানে, কোন দূরাশার চঞ্চলে
বাঁেধ অস্থিও মায়া ও বিষাদের কল্লোলে
আমাদের সকল গান পেড়ে পরস্পর অনলে।
আছে এর গভীর কোনো মানে!
বলেছি, চুম্বনের প্রাক্কালে বাতাসের কানে কানে।
সে-ও বয়ে গেছে তোমার ভিতর দিয়ে
নিয়ে গেছে সব আমার, নিঃস্ব করে
তোমারে দেবার পরিচয়ে।

************************************************

সৈয়দ তৌফিক জুহরী’র কবিতা

ফরমালিন
সুতীক্ষন বেদনাকে এখন আনন্দ বলা হয়!

শহরের দেয়ালগুলো রঙ করা শেষ হলে চৌবাচ্চার জল
মাপতে বসবে লোকটি। পাতার মুকুটে আস্তে একটা গিঁট
এঁটে সে নেমে এলো সিঁড়ি বেয়ে। লোকটা মাটি ভালোবাসে
তাই তার চোখ ভর্তি মাটি, মুঠোভর্তি মাটি— আঙুল খসে-খসে
ঝরে পড়ছে মাটি। পরিচিত কেউ দেখে ফেললে এগিয়ে দেয়
বিড়ি, আধখাওয়া কলা আর লাফিয়ে ওঠা হাতের পেশীতে
বাদামি আঙুল। সেই হাতে ধরে রাখে শহরের দাঁড়, পাল
তোলে বেরসিক হাওয়া এড়িয়ে এবং পথ খুঁজে নেয়।

লোকটা সবুজ গাছের মতো বিষদাঁত এঁটে নেয় বুকে, পেরেক
ঠুকে কি-সব এঁকে রেখে যায় হকারের দল।

তারপর . . . তাতে  লেখা হয় মানুষের বিলুপ্তির ইতিহাস।


ফিনাইল
প্রক্রিয়া দেখাতে গিয়ে
প্রতিক্রিয়া করে সবাই

বুকের ওপর বসে ছুরি গেঁথে দেয়
হৃদয় কুসুমে

সকল বস্তু থেকে ঝাঁঝাঁলো অভিজ্ঞতার গন্ধ আসে
সাথে ফিনাইলের বাসি বাতাস

ফুটপাতে কুকুর ঘুমায়
সাথে থাকে তাহাদের ব্যাভিচার-অভিজ্ঞতা

তবুও তা মানুষের চেয়েও উত্তম উপায়!

************************************************

জুয়েল মুস্তাফিজ’র কবিতা

কিসিং মিসিং টেস্টি রেইন…
তোমরা কি ধান কাটলে নাকি কৃষকের গলা? তোমরা কি ফুল ছিঁড়লে নাকি জঠর থেকে প্রেমটাকে করলে আলাদা… ছিঁড়তে ছিঁড়তে ছিঁড়ে ফেলেছ জীবনের দলিল… ভূমি অফিস এখন আর মাটি চেনে না…
বাল ছিঁড়া ছাল ওঠা কালের গাছটা… আঁশ ছিঁড়া বাল ওঠা বোয়াল মাছটা… আমরা তোমাদের বাড়িতে দাওয়াতি খুনি… ভাতের থালায় রক্তের ঝোল মেখে বেঁচে আছি খুব…
আমরা তোমাদের মাঝরাতে ছদ্মবেশি অন্ধকার… মেঘের সাথে চুক্তি করে চালায় কান্নাকাটি… বুকের সাথে চুক্তি করে ভাঙতে থাকি বারো হাজার তালা…
আমাদের শিশুটা কি দারুণ! ওর বুকের শিরায় রক্ত জমার আগে ওর ডাক নাম হয়ে যায় জবাই… আমাদের ভোর কি দারুণ! লাইনে দাঁড়ানো হাসপাতাল…
কোকিল বসন্ত থেকে বহিষ্কার… মানুষ তার জীবন থেকে বহিষ্কার… তোমার আমার জোড়া জমজ চোখ আয়না থেকে বহিষ্কার… ঘোড়ার পিঠে চাবুক তাড়া বিকেলটা বহিষ্কার! …
আমরা থোকা থোকা কবরের ভেতর লাশের বিচি… তবু চুষে খাই; তবু পিশে যাই কালের চাকা …

************************************************

অর্বাক আদিত্য’র কবিতা

এই উত্তর
বসতের খুব কাছে, একটা কাক ডেকেছিল
তার ডাকাজুড়ে অনন্ত বেদনা, কর্পুর
তার ডাকজুড়ে বিস্তৃত দুঃসংবাদ, অন্যরকম সুর!
কেন পাখি ডেকেছিল? কেন বসেছিল কাছে?
এই উত্তর, কারো কাছে কি আছে?

বিমর্ষসুরে পাখি যদি কাঁদে, বৃক্ষ কি ঝাপটায় না ডানা?
চোখ ফেটে কি ঝরায় না হলুদপাতা?
বাকল খুলে খুলে কি দেখায় না বেদনা?

কেন কাক ডেকেছিল বসতের কাছে?
এই উত্তর, তোমার আমার কারো কাছে কি আছে?

************************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা