ff

গপিলা

আবার আমি গল্প লিখতে বসেছি!

খানিক আগেই এডমিটেড হয়েছি হাসপাতালে। ভর্তি হতে ভালো লাগছে না। স্ট্যাটাসটা কেমন পড়পড় লাগছে! তাই এডমিটেড হলাম। যা ঠা-া ঠা-া কুল কুল স্তব্ধ আবহ। হুঁশিয়ার হয়ে হেঁটে আসছিলাম। ঘিয়ে সাদা টাইলস্ মোড়া মেঝে, সাবান জলে পলিশ করা পিছল পিছল ভাব। আমার স্যান্ডেলের তলায় আবার দাঁত নাই একটাও। পাশ দিয়ে খটখট হেঁটে যায় সিস্টারগণ, বয়-ব্রাদার— কী অকপট! কেবল আমিই মন্থর পিছলে পড়ার আতঙ্কে! আরও সতর্ক সমন্বয়ে মরিয়া।

এখানের বিছানাটা আমার মনে ধরেছে খুব। রেক্সিন কাপড়ে মোড়া ফোমের ওপর নীল-সাদা চাদর— মাঝ বরাবর একটি সেলাই আছে। বালিশের খোলও একইরকম। পা থেকে মাল উঠা স্যান্ডেল জোড়া খুলে বিছানার ওপর হয়েছি চিৎপটাং। আর লম্বা দম নিচ্ছি, বড় করছি পিটপিটানো চোখ দুটি।

ব্রাদার (ব্রা) : স্যার, আপনের মাথার দিকে বেডটা তুইলে দিমু— আরাম পাবেন!

আমি ব্রাদারের গাট্টাগোট্টা হাতের কব্জি, থাবা, ঘি-রঙ সাদা শার্ট, বাম বুকে আবছা নীল মনোগ্রাম, হাসপাতালের— এইসব দেখছি। বুঝতে চাচ্ছি মাথার দিক তুলে দিলে কী আরাম পামু, কীভাবে তুলে দিবে? ব্রাদারের হাতে কিন্তু সময় বড় কম। কাজের সাথে তাঁকে চরকির মত ঘুরতে হয়। আমার মতামতের জন্য সুতরাং অপেক্ষা করলে চলে না। তাই হবে! নইলে আমি মুখ খোলার আগেই, ব্রাদার আমার পায়ের দিকে কী একটা হ্যান্ডেল মত ঘোরাতে লাগল।

কেন?

আজিব! আমারও মাথার দিকটা ধী…রে ধী…রে…উঠে এলো। এবং মাথার ওপর ছাদটা, মেঝের মতই টাইলস্ মোড়া, থেমে গেল জাস্ট আড়াই ফুট উচ্চতায়!

ব্রা. : স্যার, আর একটা বালিশ দেই?… আর একটা বালিশ দেই, পায়ের নিচে দিয়ে থুবেন ভাল লাগবো।

আমি ভাবছি, মাথার এত কাছে ছাদ! মনোযোগ ঠিক রেখে কী করা যাবে? ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি। আশ্চর্য হচ্ছি বড়! ছাদ আর মেঝের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নাই। একই রঙ, ঘি-সাদা। বর্গাকৃতির চাক, একই রকম। তিন চাক অন্তর ঘোলা চোখ দেখাচ্ছে নীল-সাদা প্যাঁচানো বাল্ব। তাও একই বর্গাকৃতির শেপে শোভা পাচ্ছে। হাঁপিয়ে যাচ্ছি দেখতে দেখতে। কত মনোটোনাস!

নাহ, ছাদ থেকে নেমে আসা যাক তবে দেয়াল বেয়ে। দেয়ালগুলো মসৃণ, ঘি-সাদা!

উহ্! সেই একই রঙ, আবার?

ত্রিভুজাকৃতির এই ঘরে দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে থাকা বেডগুলোতে কোন মানুষ নাই। দেখতে পাচ্ছি না রোগীও। আমার ঠিক সামনে, যদিও মুখোমুুখি নয়, আমার বিছানা বরাবর একই রেখায় অর্ধবৃত্তাকার ডেস্কের পিছনে তিনজন নার্স ঠোঁট নাড়ে, ফাইল পত্র ঘাটে। কথা বলছে না কেন? কোন ভূতুড়ে হাসপাতাল ওয়ার্ডে ঢুকে গেলামরে বাবা! অকস্মাৎ আমার বোধ হলো, নৈঃশব্দের তোড়ে খান খান হয়ে যাব। আমাকে আঁটো করতে শুরু করেছে চাক চাক আতঙ্ক, ঘি-সাদা বিষণœতা। চোখের কোণে চেগে ওঠা আহ্লাদ হারিয়ে গেল চোখের ক্লান্তিতেই!

ঘরের ভিতর বন্দী করা হয়েছে ফিক্সড টেম্পারেচার। বাইশ-টাইশ হবে হয়তো। হতে পারে তেইশ-চব্বিশ ডিগ্রিও। আমি যখন অতল নৈঃশব্দে ডুবে যাচ্ছি, ঘি-সাদা আলো আতঙ্ক আমাকে গিলে খাচ্ছে তখন শরীরটা শিরশিরিয়ে ওঠে। শিরশিরানির কারণ হতে পারে বহুবিধ।

এক. গ্রাস হয়ে যাবার আতঙ্কে!

দুই. গোপন সুরসুরি দিচ্ছে বিশ-বাইশ কি তেইশ-চব্বিশ ফিক্সড টেম্পারেচার! আমার শরমিন্দা ত্বক এখনো যতন করে আগলে রেখেছে সুরসুরি অনুভব। শিহরণের পুলকে বাক্ বাকুম খেল আরম্ভ করতে চায় অল্প আস্কারা পেলেই। অবশ্য এখানে যা স্তব্ধতা! বাক্-বাকুম খেল— ছ্যাড়াবেড়া হয়ে যাবে একদম। কইতর ঠোঁট থেকে সরিয়ে নিই আঙুলের ডগা। অমোঘ নিয়তি যেন, অজান্তে কখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে পায়রার ফুলে ওঠা গলা। মুক্ত করে দিই। এমন সদ্য আগত দুপুরবেলা! থাক বাবা, মালিমাঠার আঠায় হাত মাখামাখি করার কোন মানে হয় না। কড়কড়ে বেড কাভার টানটান বিছানো দেখেও নিরস্ত হতে হয়। এখানে কিছুতেই লুকানো যাবে না ভেজা ফুলের গোল শেপ।

আমাদের কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সকালের কথা আলাদা।

আদিগন্ত রোদের মাঠ। সরু মেঠোপথের ধারে ছাল ওঠা হিজল গাছের কিঞ্চিৎ ছায়া টলোমলো করে। টলোমলো ছায়ায় পা ছড়িয়ে বসে আছি গাছে পিঠ ঠেকিয়ে। বাম পা মাটিতে সটান রাখা; হাঁটুমোড়া ডান পা বুকের কাছাকাছি গুটানো। এভাবে বসলে তলপেটের নিচে লুঙ্গির আড়ালে হাত সঞ্চালনে সুবিধা হয়। মাঠে মাঠে ওৎ পেতে থাকা রস টইটম্বুর সবুজ ঘাস কা-ের বুক চিবুচ্ছে আমাদের বকনা গাই বাছুরগুলো। আমরা দেখছি রোদের মাঠে তীব্র ঝাঁঝ। ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে আছি। সাদা আলোর কণাগুলো গুড়–গুড়– হয়ে লাল হলো। মাঠজুড়ে নৃত্য করে লাল কন্যা। লাল কন্যার নৃত্যমাতম দেখ আর…

ছ্যাঁ, এখানে কিচছু নাই। সমুখে ফ্যাঁসফ্যাঁস করছে তিন মডেল কইন্যা। জ্যান্ত কইন্যা! এদের দেখে তবু জমবে না বাবা। সবুর করে থাকো, নিশীথ গভীর হলে পর দেখা যাবে।

শিহরণের কারণ নম্বর তিন. এটা আমার অসুখ বা অসুখের উপসর্গ। আমি হাসপাতালে এডমিটেড হয়েছি, কেন? কী আমার অসুখ! আমার দেহে শিরশিরানির ঢেউ ওঠে অকস্মাৎ। কোন কথা নাই বার্তা নাই মনে হয় একটি লেজ বিড়বিড় করে কোমরের জোড়ায় মানে মেরুদ-ের হাড় শেষ হয়ে গেল যেখানে, ঠিক সেখানটায়। সাপের লেজ ঠা-া, অমসৃণ— বিছানা ঝাড় দেওয়া নারকেল ডাটা ঝাড়–র মত সরু ও শক্ত। স্পর্শ দেয় কিন্তু দখিনা হাওয়ায় হঠাৎ উড়ে আসা পাখির পালকের মত। প্রথমবার পরশে অতর্কিতে কেঁপে ওঠে বুকের খুব গভীরে। বাঁ পাঁজরের নিচে শব্দ হয় তিনবার দ্রিম দ্রিম দ্রিম। সেখানে একখান ভারি বিশাল ঢোলের পর্দা আছে। শব্দকম্পন থামার আগেই দ্বিতীয়বার সুরসুরি দেয় সর্পলেজ। প্রতিক্রিয়া হয় এবার সারা শরীরে। পশমগুলো হয় সজারুর লোম। সাপ আর অতিরিক্ত সময় খরচা করে না। ঢুকে যেতে থাকে আমার দেহে। অথবা নতুন করে ঢুকে-ঠুকে না। স্মরণাতীতকাল থেকেই সে বাসা বেঁধে আছে মেরুদ-ের শেষভাগে, কোমরের জোড়ায়। এখন শরীর টানটান করছে শুধু; এই যা। মাঝে মাঝেই করছে, প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে। শিরদাঁড়া হাড় বেয়ে উপরে ঘাড়ের দিকে উঠতে থাকে সাপের লেজ বা মাথা। লেজ না, মাথাই হবে। কারণ ঘাড়ের কাছে উঠে আসার পর আগুন তাপে বিষ নিঃশ্বাস ছাড়ে। লেজ দিয়ে বিষ নিঃসরণ করা যায় কি! কানের লতির পিছনে ঝাঁঝাঁ করছে। চোখের তারা ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আর ঝাপসা হয়ে যায় কেবল সামনের দৃশ্যাবলি। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় এখন সামনে কীসের চেহারা মুবারক দেখছ? আমি বলব, সত্যি করেই বলব কিছুই দেখছি না। চোখের সামনে লেপ্টালেপ্টি হয়ে গলে পড়ছে কতিপয় ধূসর ধুলোর গুড়ো। এই দেখছি!

দেহের কাঁপন এই মুহূর্তে খুব তীব্র তাই ঝিম ঝিম লাগছে। শিউরে উঠছি না বার বার। এবার নতুন ক্রিয়া করবে শরীর। ঘাড়ের ঠিক উপরে মাথার খুলির পিছন দিকটায় জমা হয়েছে সর্পবিষ। দেহের নতুন ক্রীড়া শুরু হবে যদিও তলপেট থেকে। নিকষ কালো রাতের আকাশে নিঃশব্দ বজ্ররেখা যেমন মিহি চিড়ল পথ আঁকে তেমনি তলপেটে চিড়বিড় করে কতিপয় ব্যথার রেখা। এবং ঝিলিকে ঝিলিকে বুক ছেয়ে যায় ব্যথা। তীক্ষè বিজলী ঝলকের পর চোখের সমুখটা অধিক আঁধারময়। পাক দিয়ে ওঠে মাথা। তারপর নাভিমূল ছিঁড়ে নাড়িভুঁড়িসুদ্ধ গলাপথ দিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য ত্রাস চালায়। আমি বিন্দুমাত্র বাঁধা দেবার চেষ্টা করি না কোথাও। অভ্যন্তরে তা-বে ত্রাসে তছনছ করে তবু। আছাড়ি-পিছাড়ি করি আমি। বেরিয়ে যা, বমি হয়ে বেরিয়ে যা সব— আমি মুক্ত হই, আমি আরাম পাই! উহ! উহ! আহ্! নাহ্, উগলে উঠে না একফোঁটা পানিও। সুতরাং নিষ্ফল আছাড়ি-পিছাড়ির পর, টেঁটা বেঁধা অতিকায় মৎসের মত অগভীর জল উথাল-পাথালের পর নিস্তেজ হয়ে যাই।

বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে রোমকূপে। মুহূর্তবাদে ঘামের প্লাবন ছুটবে। চার হাত-পা ছড়িয়ে হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। আহত মাছটাকে টেনে হিঁচড়ে তোলা হয়েছে ডাঙায়। কানকো ফুলিয়ে ঠোঁট ফুঁপিয়ে বাতাস খাচ্ছে। বাছাধন, এমন বিষময় বাতাস খেয়ে বাঁচতে পারবে তো! মুখের ভিতর ছড়িয়ে থাকে তেঁতো বিস্বাদ!

প্রথম প্রথম যখন মাথা ঘোরায়, উটকি ওঠে, বমিবমি ভাবের দমকে পেশি, শিরা-উপশিরা নিস্তেজ হয়ে যায়, তখন ভাবতাম পোকার বাতাস লেগেছে।

প্যাঁচপ্যাঁচা বৃষ্টিতে বাড়ির চারদিক ভিজে এ্যাকসা। বানের জলে ভিটের চারপাশটা টইটুম্বুর। ঢলের সাথে পাহাড় বেয়ে নেমে এসেছে অতিকায় সাপ, বিষাক্ত কীট। গৃহের গোপন কোণে এখন তাদের বাস। সন্ধ্যায় আর ভোরে পুবেলা বাতাসে নির্মল হয় বাড়ি। বাড়ির বাসিন্দারা উদাসী বিশ্বাসে বুক ভরে বাতাস নেয় আরামে। কিন্তু সর্পকীট নির্মল বায়ুতে ভরে রেখেছে বিষ। বিষবায়ুতে নীল হয় বুকের ভিতরটা। তখন মাথা ঘোরে। মুখে কিছু খাওয়া যায় না। খেলেই দমকে দমকে বমি। কালচে হয়ে ফুলে থাকে কপালের শিরা। গর্তে বসে যায় চোখ। আমরা বুঝি, পোকার বাতাস লেগেছে। তাই আম্মা-নানী-ফুফু-দাদী লবণ পড়া দেন ভোরের সূর্য উঠার আগেই। লবণ পড়া খেতে হয় পশুর অবাঞ্ছিত লোম বেছে বেছে। উদিত সূর্যের দিকে মুখ করে বসে থাকি। লালমুখো সূর্য থেকে আলোর তীর এসে চোখে বেঁধে। আর কপাল ভিজে ঠা-া কোমল সবুজ রসে। আম্মা, বিষকাটালি পাতায় লবণ মিশিয়ে শিল-পাটায় ছেঁচে তাজা রসসুদ্ধ কোমল পেস্ট কপালে লেপ্টে দিচ্ছেন। চিড়বিড়িয়ে রোদ ওঠে এবং পোকার বিষমুক্ত হয়ে উঠি আমরা।

বিষ নামে নি তবু! ভাবনা নাই। কালসন্ধ্যায় উত্তরমুখো হয়ে বসতে হবে। রান্নাঘরের চালের পাতায় গুঁজে রাখা বোয়ালের দাঁত খুলে আনেন আম্মা। এটি চালের পাতায় শুকোচ্ছে গত বর্ষার আগে থেকে। নানা বলেন, বড় বোয়াল মাছ আর পাওয়া যায় না আগের মত। গত বর্ষার আগে টাহিবাড়ি খালে নেমে আসা প্রথম ঢলে পৌনে দুইহাতি এই বোয়ালটা নানার টেঁটায় গাঁথা পরে অনেক কয় বছর পর। বোয়ালের চোয়াল কেটে চালের বাতায় যতœ করে গেঁথে রেখেছিলেন আম্মা। এবার শুকনো বোয়াল দাঁতে আমাকে আছড় করা পোকার বিষ হরণ হবে।

অবশ্য ইট-পাথর-কংক্রিটের শহরে আম্মার ভালোবাসার দাওয়ায়ে আস্থা রাখা যাচ্ছে না। আমার কোমরে প্রকাশ্যে ঘর বেঁধেছে সাপেরা। মেরুদ-ের মজ্জা চিবিয়ে ওদের বাড়। মাথার খুলির ভিতর ছড়াচ্ছে বিষম বিষ। হাদিস শরিফে বর্ণিত নরকের শাস্তি বুঝিবা নেমে এসেছে আমার বুকে! সুতরাং খোদাতালার অশেষ রহমত ছাড়া এই নরক যন্ত্রণা থেকে নাযাত মিলবে না! তাছাড়া আম্মাদের ভালোবাসার কথা উচ্চারণের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা আছে। বুকের ভিতর যতই উথাল-পাথাল করুক আম্মার জন্য— সে ছটফটানি বাইরে যত কম আনা যায় ততই মঙ্গল। আম্মার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ্য হলো তো সংসারে অশান্তি। কে হায়! হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

ব্রাদার পায়ের কাছে ছুঁড়ে দেয় আরেকটা বালিশ। এক্সট্রা একটা চাদর হলেও মন্দ হয় না। শরীরে শিরশিরানি যদি ঠা-াজনিত কারণে হয় তবে চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে থাকা যায়। তারপর পায়ের ওপর ফেলে রাখা যায় শীত শীত না লাগলেও। পায়ের পর চাদর ফেলে রাখার মধ্যে এক প্রকার রাবিন্দ্রীক আভিজাত্য আছে। মেপে দেখি নি তাতে আরাম-ব্যারাম কতটুকু। যদিও আমার প্রায় অভ্যেসমত হয়ে গেছে পা থেকে কোমর অব্দি চাদর ফেলে রাখা। কিছুই না, খাটে কিংবা খাটের সাথের দেয়ালে হেলনা দিয়ে বই পড়ছি— পাশ থেকে চাদর কি কাঁথা তুলে নিয়ে জড়িয়ে দিলাম। কেউ এসেছে আড্ডা-গল্প করতে— কাঁথা কি চাদরের তলে পায়ের ওপর পা নাচিয়ে গপ্ কর। মুড এসে যায় বেশ। এবং শরীর খারাপ করলে, ক্লান্তিতে দুর্বলতায় দেহ যখন বিছানায় নেতিয়ে পড়ে তখন কেউ পাতলা নরোম চাদর আদরের মত বুক পর্যন্ত টেনে দিলে কী যে ভালো লাগে!

ব্রাদার চলে যাচ্ছে। এক্সট্রা চাদরের নিবেদন করব কি করব না বুঝতে পাচ্ছি না। বালিশের মত অতিরিক্ত চাদরের যোগান কি হাসপাতালের নিয়মভুক্ত? চাইলে যদি না দেয়, ভালো লাগবে না। ভালোমুখো ব্রাদার আবদার শুনে যদি দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ওঠে? থাক্। দরকার নাই চাদরে।

ব্রাদার নিষ্ক্রান্ত হলো। আমার আর অতিরিক্ত চাদর চেয়ে নেওয়া হলো না। শেষের রাত্রি গল্পে ভালোবাসার কাঁথা জড়িয়ে দেয় মাসী। রোগীর মন অথচ বউয়ের সোহাগ স্পর্শের জন্য কী যে আকুলি-বিকুলি করে। মাসী ভালোবাসার ছলনে ভোলায় রোগীকে। আমার পাশে মাসী নাই, আম্মা নাই, আদরের ছলনে জড়ানো যায় যে চাদর তাও নাই।

আকস্মিক প্রশ্নে আমার ঘোর কাটে।

: রোগী কে?

আমার ওয়ার্ড গ্রাস হয়েছিল নৈঃশব্দের আক্রমণে। আমি হয়েছিলাম আতঙ্কিত। এবার গায়েবী আওয়াজ হলো! কারো হাত থেকে মেঝেয় পড়ল স্টেইনলেস স্টিলের প্লেট। কিনকিন শব্দে কান তালা লেগে যায়। শব্দের উৎস খুঁজতে আমি আমার সামনে নাইন্টি নাইন ডিগ্রি বরাবর সোজাসুজি তাকাই। নির্বিকার সিস্টারগণের ছবি ভেসে ওঠে। তারপর ধূসর মেঘ আবছায়া হয়ে ঢেকে দেয় ছবিগুলো। আমি আর কিছু দেখছি না। ওয়ার্ডে প্রবেশ করে একবার চোখ বুলিয়েছিলাম। চোখে পড়ে নি কোন রোগী কি রোগীর সাথের লোক। অথচ শোনা গেল স্পষ্ট মনুষ্যকণ্ঠের প্রশ্ন : রোগী কে? এবং আওয়াজ উঠেছে ওয়ার্ডের ভেতরেই। সুতরাং ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম আমার ডানদিকে ফোরাটি ফাইভ ডিগ্রি বরাবর। বাম পাশে দেয়াল তাই তাকালে সামনে অথবা ডানেই তাকাতে হয়। আশ্চর্য! আমার দৃষ্টিজুড়ে তিরতির কাঁপছে ঘি-রঙ সাদা পর্দা। তার ওপর ধূসর মেঘের আবছায়ার লুকোচুরি। আমি এইসব দেখছি, প্রশ্নকর্তাকে দেখছি না। তবু চোখ মেলে তাকিয়ে থাকি।

ফল ফলল! আবছায়া মিলে গেল, ঘি-রঙ সাদা পর্দা স্থির হলো। পর্দায় ভেসে উঠে ছায়াছবি। আমার সামনের ডানদিকটায় চারটা বেড আছে। ১ম ও ২য় বেড খালি। খাটিয়ার ওপর শূন্য পরে আছে পীতাভ রেক্সিন মোড়া ফোমের গদি। কড়কড়ে সাদা কাভার দিয়ে ঢাকা নয়, রোগী নাই, বালিশও নাই। বেডের যেখানে নিতম্ভের ভর ও চাপ পড়ে সেখানে বিচিত্রভাবে ফেটে গেছে রেক্সিন। প্রতিটা বেডের মাথার ওপর দেয়ালে সাঁটা আছে নম্বর। ১ম খালি বেডটার ওপর নম্বর সাঁটা ৮, পরেরটায় ৭। চোখ উল্টে দেখে নিলাম আমার নম্বর ৪। ৭ নম্বর আর ৬ নম্বরের মাঝে দেড় হাত ফাঁকা। ফাঁকায় পাতা জায়নামাযে বসে আছে কালো স্কার্ফে মাথা মুড়ানো মাঝবয়েসী নাক ভাঙ্গা পুতুল। সদ্য মোনাজাত শেষ করা পুতুল মুখে ঢুলুঢুলু করছে আধ্যাত্মিকতা। মাঝবয়েসী, বসে যাওয়া নাকের আধ্যাত্মিক পুতুল মুখ জায়নামায গুটিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আবার প্রশ্ন করে।

মাঝ বয়েসী মহিলা পুতুল (মা.ম.পু.): রোগী কে, আপনেই!

নিজেকে রোগী ভাবতে বা রোগী হিসেবে পরিচয় দিতে কেমন বাধোবাধো ঠেকছে। আমিই রোগী কথাটি বলতে ইচ্ছে করছে না। অস্বস্তির আড়ষ্টতায় মিঁইয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত। আমাকে অসুখী দেখাচ্ছে না, বরং আলাদাভাবে জানানোর প্রয়োজন পড়ছে, আমার অসুখ! এটা আবার আহ্লাদ আমদানি করছে আমার ভেতর। বুঝতে পাচ্ছি গদগদ ভাব উপচে পড়বে কথা বললেই।

অযথা!

তো আমি আর কথা বলি না। কথা না বলে নিঃশব্দে আমার দাঁত কেলিয়ে ধরি আধ্যাত্মিকতায় ঢুলুঢুলু মা.ম.পু-র চোখে। তৎপর থাকি যেন থুতনি বেয়ে আমার সাধের হাসিহাসি দাঁত কেলানো গড়িয়ে না যায়। কথোপকথনের পিছলতায় যেন খসে না পড়ে, অবিকল ঝুলে থাকুক ঠোঁটে, সতর্ক থাকি। তুমি বাবা আমার দাঁত কেলানো নিঃশব্দ হাসি দেখে যা বুঝার বুঝে নাও। ঠিক বুঝ কি বেঠিক বুঝ আমার কিচ্ছুটি আসে যায় না।

আজকাল এই কর্ম করি আমি কারণে-অকারণে।

যেমন : আমার প্রিন্সিপাল (পি.) স্টাফ কাউন্সিলের ভরা বৈঠকে বক্তিমা করছেন—

পি. : আমি এই কলেজে কিছু স্বপ্ন নিয়ে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেছি। আমার স্বপ্নের ভেতর দিয়েই এখন আমরা স্বপ্ন দেখি কলেজটাকে সারাদেশের মধ্যে একটি অনন্য কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবার। তার জন্য কিছু পদক্ষেপ আমরা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন করেছি। আমার রুমটাকে টাইলসে মুড়ে এসি লাগিয়েছি, চমৎকার কালার লাগিয়েছি দেয়ালে, জানালায়-দরোজায় পর্দা লাগিয়ে রুমটাকে একদম আধুনিক ঝকঝকে তকতকে করে ফেলেছি। আপনারা দেখেছেন। মাঝে-মধ্যে গিয়ে এসির ঠা-া বাতাস খেয়ে আসছেন নানা উছিলায়। অধ্যক্ষের ব্যবহারের জন্য কলেজের নিজস্ব একটি গাড়ি কেনার অনুমোদন মন্ত্রণালয় থেকে আমরা পেয়ে গেছি। সরকারি কলেজের একজন অধ্যক্ষের গাড়ি নাই— ভাবা যায়! খুব শিগ্গির টেন্ডার দিয়ে গাড়ি ক্রয় করা হবে। আমার কলেজের একটা ছাত্র যখন দেখবে তার প্রিন্সিপাল গাড়ি করে কলেজে আসছে, সুসজ্জিত আধুনিক রুমে বসে কলেজ পরিচালনা করছে— আমি মনে করি এর ভেতর দিয়েই ছাত্রটির মন বড় হয়ে উঠবে এর ভেতর দিয়েই সে গর্ববোধ করতে শিখবে তার কলেজকে নিয়ে তার প্রিন্সিপালকে নিয়ে…

আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করেই তো এইসব বক্তিমা ঝারছেন না প্রিন্সিপাল। তবু নিঃশব্দে দাঁত কেলিয়ে কী সব অমৃতসুধাবচন পান করি তাঁর মুখের ওপর মুগ্ধ নয়ন মেলে!

মিটিং শেষ। হেঁটে আসছি কলেজ প্রাঙ্গনের বকুলতলা দিয়ে। আলতোভাবে হাত স্পর্শ করেন আমার এক সিনিয়র, সহকারী অধ্যাপক (সি.স.অ.)। তারপর ইদিক-ওদিক তাকান তিনি। আমিও অনুসরণ করি তাকে। না, কোন বিপজ্জনক মনুষ্য উপস্থিতি নাই আশেপাশে। তিনি, আমার সিনিয়র, সহকারী অধ্যাপক কথা শুরু করেন উচ্চকণ্ঠে। নিম্নকণ্ঠে কথা বলা তাঁর অভ্যাসের অন্তর্গত নয়।

সি.স.অ. : মিটিং শুনলেন স্যার! যাই বলেন, শালা বক্তব্য রাখে খুব সুন্দর! আমি ওরে এই একটা কারণেই পছন্দ করি। কিন্তু শালার এইরকম বাঞ্চোৎ মার্কা প্রিন্সিপাল আমি আমার জীবনে দেখি নাই। এর ভেতর দিয়েই… শালা তোমারেও যদি এর ভেতর দিয়েই… বদমাইশ একটা…

তিনি, আমার সিনিয়র, সহকারী অধ্যাপক এমন আঁকাবাঁকা করেন শরীর! মনে হয় এর ভেতর দিয়েই প্রিন্সিপালের ইসের ভেতর ঢুকে পড়ছে অতি পিছল সাপ। আর আমি? আসলে আমার কোমরের কাছে শিরশির করে উঠেছে। পায়ের তলায় মাটি দ্রিম করে কেঁপে ওঠে একবার। মাটি স্থির হয় তখনি। যদিও আমার দেহে ছড়িয়ে যায় কম্পন। বকুল চত্ত্বর থেকে খুব দূর নয় প্রিন্সিপালের কামরা। মিলায় না কোন কথা বাতাসে। যিনি এই বয়ান দিচ্ছেন তিনি নিজেও ঘুরঘুর করেন সারাক্ষণ প্রিন্সিপালের পিছে। কী মতলবে না জানি এইসব কথা আমার কাছে তুলছে! কোমরে দলা পেকে থাকা রাবারের মজ্জা মেরুদ- বেয়ে মাথা পর্যন্ত টানটান হলো যেন হিমসর্প বিষ ছড়াবে খুলির ভিতর! আমার চোখে তার পূর্বছায়া? অথচ আমি নিঃশব্দে দাঁত কেলিয়ে রেখেছি আমার সিনিয়রের মুখের ওপর! সোজাসুজি তাঁর চোখে তাকিয়ে নই যদিও। কি জানি, কিসের ছায়া পড়ছে চোখে! এমন একট ভঙ ধরার চেষ্টা করছি, হাসিতে-খুশিতে যেন চোখে পানি আসার দশা হয়েছে আমার!

অথবা আমার ডেস্কের পেছনে চেয়ারে চুপটি করে বসে আছি একাকী। বেয়াদব টাইপের কতিপয় ছাত্র (বে.ছা.) এলো। আন্তাজেই। অযুহাত নাই কিছুই।

বে.ছা. : স্যার, একটা কথা বলি? রাগ করবেন!

আমি বেয়াদব টাইপের ছাত্রের ঠোঁটের ওপর চোখ রাখি যথারীতি! কি অদ্ভুত! চোখ রাখতে পাচ্ছি না ছাত্র বাহাদুরের চোখেও।

বে.ছা. : স্যার, আপনেরে খুব ভাল লাগে! কিন্তু স্যার আপনে এইরম আনিস্মার্ট অয়ে কলেজে আহেন ক্যা? অইন্য স্যারেরা কত সুন্দর ইস্মার্ট অয়ে আহে। কত সুন্দর লাগে! আপনের সব ভাল লাগে, খালি এই আনিস্মার্ট ভাব বাদে।

আমি এখনো খসে পড়তে দেই নি হাসিতে-খুশিতে গদগদ অভিব্যক্তি। নিঃশব্দে ঝুলিয়ে রেখেছি একইরকম। তবু কী সন্দেহ হলো বেয়াদব টাইপের ছাত্র বাহাদুরের?

বে.ছা. : স্যার, রাগ করলেন!

আমি আর ঝুঁকি নিই না। ভাবের উচ্ছ্বাসে উপচে যাই আর কি! মাথা ঝুঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে আকছাড় প্রমাণ করে ছাড়ি, আমার থুতনির ওপর লেগে থাকা ভাব কতটা অকপট!

কিন্তু হয় কি, বেশ খানিকটা মাথা ঝাঁকানোর প্রতিক্রিয়াতেই হবে বা— তলপেটে মোচড় দিয়ে ওঠে। মোচড়ের তীব্রতায় ইচ্ছে করে নাভিমূলে আঙুল ঢুকিয়ে নাড়ি ছিঁড়ে ফেলি। ঝিম ঝিম করে মাথার ভিতর। আমাশয় হলো নাকি, ভাবি। চেয়ার ছেড়ে ত্রটস্থ ঢুকে পরি টয়লেটে। কমোটে বসে থাকি এক মিনিট, তিন মিনিট, পাঁচ মিনিট… হাগা হয় না তবু! তলপেটে চাপ দেই, কুঁৎ পারি! হাগা তো দূরস্থান পাদ পর্যন্ত বের হয় না! উল্টো তলপেটের ব্যথা উজান ঠেলে বুকের ভিতর দলা পাকায়। এক বাটি বমি থিতু হয় যেন বুকের ভিতর। কমোটের ওপর দুই পায়ে ভর দিয়ে বসে থাকতে পা ঝিম ধরে যায়। অবশেষে উঠে এসে বেসিনের কাছে দাঁড়াই। হাগা না হোক অল্প বমি হলেও আরাম লাগবে হয়তো। এমন হাঁসফাঁস লাগছে। বুকের মধ্যে আটকা পড়া এক বাটি শক্ত বমি নিয়ে বেসিনের ওপর উবু হয়ে থাকি।

অনেকক্ষণ…!

অথচ উটকি আসে না, বমি হয় না, আমার হাঁসফাঁস দূর হয় না। বুকের ভিতর জমা হচ্ছে বাটি বাটি বমি আর শক্ত হয়ে উঠছে ক্রমাগত…

এখন এইপ্রকার সর্বত্র প্রশ্নহীন দাঁত কেলানো ভাবের মুদ্রাদোষে আমি বেশ ধাতস্থ হয়ে উঠলেও আমার অসুখ করেছে। আমি হাসপাতালে এডমিটেড হয়েছি।

আধ্যাতিœকতায় ঢুলুঢুলু কালো স্কার্ফ মুড়ানো মা.ম.পু. আমার কেলানো দেখে কি দেখে না, বুঝা গেল না। ঠোঁটে যা লম্বা হিস্টরি আমি ঝুলিয়েছি। কার অত সময় আছে, ধৈর্য আছে— পড়ে দেখবে! সে যুঁৎমত বসে ৬ নম্বর বেডে। বসেই তৎপর হয়ে ওঠে গলায় আটকানো কালো স্কার্ফের ফাঁস খুলতে। বোধ হয় মরা গিঁট পড়েছে। গিঁট খুলতে বড় কসরৎ করতে হচ্ছে মা.ম.পু.-কে। হাতের টানে এদিক-ওদিক, ডানে-বাঁয়ে হেলাদুলা করছে তাঁর মুখম-ল। তাঁর নাকে তারকার মত সোনার ফুল। বৃহৎ সোনার ফুল থেকে কতিপয় আলোর ছুরি ছিটকে গিয়ে আঘাত করছে একবার হাসপাতাল ওয়ার্ডের এ দেয়ালে আরেকবার ও দেয়ালে আবার আমার চোখে। মুশকিল হলো গাই গরুর মত মা.ম.পু.-র থ্যাবড়ানো নাকের শিরা কপালের যেখানে গিয়ে শেষ হলো তার দুইপাশটায় চোখের মত গর্ত দুটোয় তাকাতে পাচ্ছি না আমি। ফলে নিশ্চিত বলতে পাচ্ছি না, কোথা থেকে আসছে আলোর আঘাত।

ইদানিং টের পাচ্ছি আমার ভেতর এই লক্ষণ। কোন মানুষ এসে আমার সামনে বসে কথা বলে গেল দিব্যি, আমি তাঁকে ঠাহর করতে পারি না তবু। আমাকে যদি জিঙ্গেস কর : যে এসেছিল সে কী? আমি হয়তো বলতে পারব তাঁর পায়ের সাইজ কেমন। কিংবা নখ দিয়ে নোঙরা ঘেটে এসেছে কিনা মুরগির মত। কিংবা কত বার উঠানামা করেছে তাঁর বুক। কিংবা কেমন নাড়ায় ঠোঁট। দাঁতের ফাঁকে খাদ্যকণা জমেছে কী কুৎসিত!

তদ্রুপ বর্তমান দৃশ্যপটের কিছু ক্লোজআপ :

মা.ম.পু.-র কোমর বরাবর ক্রস চিহ্নের মত পড়ে আছে সাদা চাদর মোড়ানো কেউ। এই রে, এক্সট্রা চাদর তো হাসপাতাল থেকে দেওয়াই হয়। ধূর, আমি আরও চাইলাম না। ব্রাদার আবার এলে চেয়ে নিতে হবে। ক্রসের মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে বুকের ওপর দুহাত বাঁকিয়ে ধরে আছে বই। বইয়ের প্রচ্ছদপটে একটি মানুষের কালো ছায়া। ছায়ার উপরে রোমান হরফের লাল আষ্ফালন। ডিটেকটিভ কাহিনীর বই বলে আন্দাজ হচ্ছে। ইচ্ছে করলে বইয়ের নামটা পড়ে শোনাতে পারি কিন্তু রোমান হরফ দেখে চোখে ক্লান্তি অনুভব হচ্ছে। বইয়ের নাম পড়ি না। ক্রসের ডান হাতে ঘি রঙ সাদা মাস্কিং টেপে চাপা দেওয়া প্রজাপতি। ভুল করে বোধ হয় হাসপাতালের ওয়ার্ডে ঢুকে কোন সবুজ প্রজাপতি। সেই অপরাধে মৃত্যুদ- হয় তার। তারপর তার পাখা থেকে, ছোট্ট দেহ থেকে, ব্লেড দিয়ে চাছা হয় সবুজ। এবং বাননো হয় জলের মত স্বচ্ছ প্রজাপতির প্লাস্টিক ফসিল। ফসিলের জলে এখনো সবুজের আভা টলোমলো। অদ্ভুত! ঘি-রঙ সাদা মাস্কিং টেপে হাতে সাঁটা থাকলে প্রজাপতির প্লাস্টিক ফসিল, রোগী চেনা যায়। মুখ দেখার দরকার পড়ে না। আমিও ক্রসের মুখ দেখতে পাচ্ছি না বুঝতে পাচ্ছি অথচ সে রোগী। ঐ প্রজাপতির প্লাস্টিক ফসিল প্রতীক দেখেই!

ক্রসের উত্তোলিত হাত আর পুতুল মাথা ত্রিভুজের নিম্নস্থ দুই বিন্দুতে স্থাপন করে দৃষ্টিকে সামনে প্রসারিত করলে ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দু পাওয়া যায়। পিরামিডের শীর্ষে ডেস্কের ওপর স্থাপিত ২/৩ ভাগ ভর্তি পানির বোতল প্লাস্টিকের। বোতলটি মাজা হয় নি অন্তত সাত দিন। তাই দাঁত না মাজলে এনামেলের ওপর যেমন হলুদ আস্তরণ পড়ে তেমন আস্তর দেখা যাচ্ছে বোতলের গায়ে। বোতলের পাশে খাড়া আছে গোলাপী টিস্যু। আরও আছে ঘি-রঙ সাদা মেলামাইন প্লেটে চাপা দেওয়া কিছু। আমি আঁতিপাতি খুঁজি একখ- হলুদ নেবু। রোগশয্যার পাশে একখ- ছিবড়ানো নেবুর খোলস জীবনানন্দীয় ভাবে, রসে, হতাশায়, করুণ ও সজীব রাখে আবহ। আজকাল মনে হয় নেবুর করুণা নিয়ে হাজির হয় না কেউ রোগশয্যার পাশে। দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝরে যায় আমার আঁতিপাতি।

চোখটাকে ডানে ১৫ ডিগ্রি বরাবর প্যান করলে ৫ নম্বর বেড উদ্ভাসিত হয়। এই বেডের ওপর মনুষ্য রোগীর মতই ফেলে রাখা হয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ছাল ওঠা একাশিয়া গাছের কা-! কড়া সিজনিঙের ফলে রস-কষ শুকিয়ে খটখটে! ভিতরে সার-মাল কিচ্ছু নাই। ফ্যাঁসফ্যাঁস করছে। করাতে চিড়াই করলে পোষাবে না। তার চেয়ে বরং দায়ের কোপে ফালিফালি লাকড়ি বানানো চলে। বুকের কাছে পাঁজরার হাড্ডির মত এখনো কিছু শুকনো বাকল সেঁটে আছে। জোর খাটানোর দরকার নাই। ফাঁক দিয়ে আঙুল ঢোকাও আর অল্প টান দাও। ব্যাস, পরিষ্কার হয়ে যাবে। পেটের মধ্যে নাড়ি-ভুঁড়ির মত লতাপাতা শুকিয়ে কালো, পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বেড পার হয়ে ঐ পাড়ে দেখি, ফাঁকা স্পেসে একটি বৃদ্ধার মুখ ৫ নম্বর বেডের নিচে বারবার আপ-ডাউন করছে।

এইসব ক্লোজআপ দেখতে পাচ্ছি বেশ!

কিন্তু চোখের?

পারব না। পূর্ণাঙ্গ মানুষের বিবরণ আমি কিছুতেই ঠাহর করে বলতে পারব না।

মহৎ সাহিত্যের কথা এক মনে পড়ছে। মহৎ সাহিত্য মানে বিদেশী সাহিত্য! দেশীয় সাহিত্য, বাঙলা ভাষায় রচিত সাহিত্য মহৎ হয় কি! হলেও সেইসব নজির উপস্থাপনে প্রকাশ পায় না কোন পা-িত্য। আমার নরোম তালু চুলবুল করছে এখন প-িতি জাহির করবার জন্য। তাছাড়া সামনে ছ নম্বর বেডের ক্রস রোমান হরফে লিখিত বই এখনো বাঁকিয়ে ধরে আছে না!

মহৎ সাহিত্যের কিশোরকে তাঁর দাদামশাই উপদেশ দিচ্ছেন : মানুষের সাথে যখন কথা বলবি, সোজাসুজি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলবি, বুঝলি?

বুঝলাম! আর এক বুলেট করোটির ভিতর নরোম মগজে গিয়ে বিঁধল। তবুও তো আমি মানুষের চোখের ভেতর দেখতে পারি না। চোখের দিকে দেখব ভাবলেই তলপেটে অনুভূত হয় চিকন ব্যথা। তছনছ হতে থাকি কী যে আতঙ্কে আর দ্বিধায়! অথচ করোটির ভেতর নরোম মগজে বেঁধা বুলেটের কারসাজিতে তখন চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয় কেবল। ওয়াইড এঙ্গেল লেন্সে ধরা মাস্টার কম্পোজিশন, যেখানে প্রতিটি বস্তু স্পষ্ট ফোকাস পায়, তেমন ছবি আর আমার দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। টোটাল কম্পোজিশন এইভাবে ক্রমাগত ডি ফোকাসে চলে যায়। একই রাস্তায় প্রতিদিন যাই, আসি, চোখের সামনেই ঘটে যায় কত ঘটনা, একই মানুষকে বার বার দেখছি কত বার, কত বস্তুরাশি চোখের ওপর আছড়ে পড়ছে— কিছুই স্পষ্ট নয়?

সব ডি ফোকাস!

একদিন কী মনে এলো, আমাদের টাউনের গলিপথ ধরে হাঁটছি। এই গলির দুপাশে সারসার ঘড়ি চশমার দোকান। কাঁচঘেরা এক দোকানের কাচে চোখ আটকে গেল। “এখানে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে ডিজিটাল মেশিনে চোখ পরীক্ষা করে চশমা দেওয়া হয়।” কাচে সাঁটা বিজ্ঞাপনে সেঁটে গেলাম আমিও। ‘ডিজিটাল’ শব্দের ওপর প্রশ্নহীন এক নিদারুণ আনুগত্য আমাদের। ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটালি অনুগত না হয়ে উপায়ও নেই! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি চশমায় স্বচ্ছতা ফিরে পাবে আমার ঝাপসা দৃষ্টি। মোটা ফ্রেমের মুজিবীয় চশমা চোখে— দারুণ উত্তেজনাকর ব্যাপার। তাছাড়া আমাদের বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশের নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট ঘটনায় লেগে থাকে মুজিবীয় জোশ। বাকি এক পার্সেন্টে থাকে মিসগাইডেড তরুণদের জিহাদী জোশ! সুতরাং মুজিবীয় চশমায় মুজিবী জোশের ডিজিটাল বাংলাদেশের ফেনোমেনাসমূহ উপভোগ্য হবে ক্রিস্টাল স্বচ্ছতায়?

এবং মুজিবীয় চশমায় আবৃত চোখে তেজোদ্দীপ্ত বুদ্ধি আর দরদ আর সাহসের যে ভাব ফুটে, সে আর কিসে প্রকাশিত!

কাচের দরোজা ঠেলে ঢুকে পড়ি দোকানে। দোকানের ভেতর দুইজন। একজনের বয়স সাতচল্লিশ-আটচল্লিশ হতে পারে। মাথায় কিস্তি টুপি। গালে চাপদাড়ি লম্বা নয়, ছোট করে ছাঁটা লাল রঙে রঞ্জিত। গায়ে পাঞ্জাবি। আরেকজন টগবগে তরুণ (ট.ত.)। তাঁর মুখেও অনুরূপ দাড়ির আভাস। তবে গতরে শার্ট। মাথা খালি। ছোট করে চুল ছাঁটা! আমি তাঁদের মুখোমুখি হই। আমাদের মাঝে কোমর সমান উচ্চতায় কাচের তাকের দূরত্ব। আমি কাচের ভিতর ঘড়ি ও চশমার ফ্রেম দেখি আর আলাপ পারি।

আ. : ভাই চশমা নিতাম।

ট.ত. : চোখ পরীক্ষে করছেন; কত পাওয়ার?

আ. : আপনেগরে ইন্তিই ত পরীক্ষে অয় দেখলাম। পরীক্ষে করি নাই।

ট.ত. : তাইলে কি এবাই নিবেন না পরীক্ষে কইরে নিবেন? পরীক্ষেডা করায়েই নেন ভালো অবো। আমরা ডিজিটাল মেশিনে চোখ পরীক্ষে কইরে চশমা দেই।

আ. : পরীক্ষে কত কইরে করান?

ট.ত. : আপনে যুদিল বাইরে ডাক্তার দেহাইয়ে করান, তাইলে ডাক্তারের ভিজিট নিব পাঁচশ’, আর পরীক্ষের জন্যে পাঁচশ’। টোটাল এক হাজার ট্যাহা খরচ পরব। আমরা ঐ একই পরীক্ষে তিনশ’, ট্যাহায় কইরে চশমা দিয়ে দেই। ফ্রেমের খরচ ছাড়া আপনের তিনশ’, ট্যাহা নাগব।

আমি চোখ তুলে ট.ত.-র মুখে তাকাই নি। আমাদের মাঝখানে যে কাঁচঘেরা তাক, চোখ ফেলে রেখেছি তার উপরেই। তবু তরুণের গতিবিধি আমি পাই টের। কাচের বাক্সের ভিতর এক চশমায় ফুটেছে ট.ত.-র অভিব্যক্তি। সে খালি চোখেই আমার চোখ পরীক্ষা করতে তৎপর হয়েছে। অত সোজা! আমি মুখ তুলে তোমার চোখে রাখলে তো চোখ। আর কিছু বলছে না সাতচল্লিশ। বুঝতে পাচ্ছি যদিও আমার উত্তরের অপেক্ষায় টানটান অবস্থায় আছে সেও।

ট.ত. : কী, করাবেন?

আমি সম্মতি দিলে ট.ত. আমাকে নিয়ে ঢোকে পাঁচ ফুট বাই তিন ফুট সাইজের এক খোপে। দৈর্ঘ্য বরাবর এক প্রান্তের টুলে বসিয়ে দেয় আমাকে। এবং নিভিয়ে দেয় আলো। মুহূর্তের মধ্যে ঘরের ভিতর ঝাঁপিয়ে পড়ে কবরের আঁধার। কবরের ভিতর চুপটি করে বসে আছি। তিন বার খুঁটখুঁট আওয়াজ হয় কবরের মধ্যে। তারপর আমার সামনে, কবরের অপর প্রান্তে বিজলী চমকের আবহে কাঁপতে থাকে আঁধার। বিজলী চমক থামে ও একটি আয়তাকার সাদা বাক্স আলোকিত হয়। কবরের আঁধার আর কাঁপে না তবে জড়ো হয়ে আসে আমার দিকে। দেয়ালের সাথে লম্বালম্বি সাঁটা আয়তাকার সাদা বাক্স। বাক্সের দেহে নানা রঙের, নানা আকৃতির বসন্তের দাগ। ট.ত. এখন কবরে নাই। অশরীরী ছায়া হয়েছে সে। তাঁর হাতে ছিপছিপে কঞ্চি দেড়হাতি। আমার বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে সে কঞ্চির নির্দেশে বাক্সের সব উপরের সারির বড় দাগগুলো পড়তে বলে।

আমি পড়ি : অ ই ঈ উ

তারপর মাঝামাঝি কঞ্চি নির্দেশ করে।

আমি পড়ি : ঢ় য় ৎ

তারপর ট.ত. নিচের দিকের এক সারি নির্দিষ্ট করে।

আমি পড়ি : ঙ চ ঊ ঋ

ট.ত. : আপনের চোখ ত ঠিকই আছে মুন অয়! কোন চোখে সমস্যা দেখেন?

আ. : জানি না! মুন ত অয় দুই চোখেই ঝাপসা লাগে!

ট.ত. আর কিছু না বলে এগিয়ে আসে আমার দিকে। নাকের ওপর আটকে দেয় চশমার মত লোহার ফ্রেম। কানের ওপর ঠা-া স্পর্শে সারা শরীর শিরশির করে উঠে। কালো চাকতি যোগে ঢেকে দেয় বাম চোখ। এবং আগের অবস্থানে ফিরে ট.ত.সরাসরি পড়তে বলে সবচেয়ে ছোট দাগগুলো।

আমি পড়ি : ঢ় য় ৎ ং

অশরীরী ট.ত. এবার পূর্ববত প্রক্রিয়ায় আন্ধা করে আমার ডান চোখ। এবং পূর্বোল্লিখিত দাগ পড়তে বলে।

আমি পড়ি : ঢ় য় ৎ ং

ট.ত. আমার চোখ থেকে খুলে নেয় লোহার কাঠামো।

ট.ত. : আপনের চোখে কোন সমস্যা নাই। সব নরমাল আছে!

আ. : ডিজিটাল মেশিনে পরীক্ষে করবেন না?

ট.ত. : এতক্ষণ তাইলে কী করলাম! সামনে পেপার ধইরে আপনের চোখ রগড়ে পরীক্ষে করলাম নাকি?

বুঝলাম না! অসহিষ্ণুতার কী কারণ ঘটল ট.ত-র! অসহিষ্ণুতার আভাস স্পষ্ট ট.ত.-র কণ্ঠে।

আলো ফিরিয়ে আনে ট.ত.। নিষ্প্রভ হলুদ আলো! আমার এখন ভাসতে ইচ্ছে করছে উজ্জ্বল কমলা রঙের আলোয়। চোখ ভালো আছে জানলাম তবুও শরীরে শিরশিরানি প্রবাহমান যে! হলুদ আলোয় উবে গেছে ট.ত.-র অশরীরী ছায়া। এখনো তাঁর কণ্ঠে অধিক শীতল স্বর!

ট.ত. : আপনের চোখের সামনেই ডিজিটাল লেহা উঠল না সুইচ টেপার সাথে সাথেই?

সে নিভিয়ে দেয় আয়তাকার সাদা বাক্সের আলো।

আ. : তাইলে ভাই, বাক্সের উপরে বাঙলা অক্ষর উঠায়ে আর একবার পরীক্ষে কইরে দেখপেন? ইংরেজি দেহাইলেন দেইহে বুধয় কিছু ধরা পড়ল না!

ট.ত. : কয়দিন পরে আবার আয়েন। আপনের জন্যে বাঙলা মেশিনের অর্ডার দিমুনি কোম্পানিত! মিয়া দেখছেন কুনোদিন, বাঙলাতে ডিজিটাল জিনিস অয়? চশমার শখ অইছে নিয়ে যান একটা নরমাল পাওয়ারের চশমা!

কবর থেকে নিষ্ক্রান্ত হলাম আমি। এখন সাতচল্লিশের মুখোমুখি। আমার দেহে অবশ করা ঝিমঝিমানি। সামনে রিভলবিঙ গদিতে বসা সাতচল্লিশ, দেয়ালে কাঁচ ঢাকা তাকের সারিতে বিচিত্র সানগ্লাস, ঝাপসা লাগছে সব। যদিও চক্ষু পরীক্ষার ফলাফল পেলাম এইমাত্র— সব নরমাল!

নাহ! নরমাল হলেও চশমা নিতে হবে। দেয়ালে সানগ্লাসের সজ্জায় তাকিয়ে থেকেই কথা বলছি।

আ. : আপনেগরে কাছে কালো, মোটা ফ্রেমের গোল চশমাগুলো নাই? শেখ মুজিব যেইরম চশমা পরত!

সাতচল্লিশ : আমার দোকানে ষাট সত্তর মডেলের কোন বাতিল মাল পাবেন না। যা আছে সব লেটেস্ট। ঐসব পুরানা মাল, বাতিল মাল বেচি না আমি।

আ. : কী বলেন! বাতিল হবে কেন? আজকালকার পোলাপানরা ফ্যাশন হিসেবে পরছে না!

সাতচল্লিশ পাত্তা দেয় না আর আমাকে। ট.ত.-র উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ে।

সা. : হের বিল কত অইছে?

ট.ত. : তিনশ’।

আমার আইডি কার্ডের ভাঁজে লুকানো এক হাজার টাকার কড়কড়ে এক বেগুনি নোট মেলে ধরি সাতচল্লিশের সামনে।

সা. : ভাঙতি দেন।

অনর্থক ঘাটাঘাটি করি আইডি কার্ড।

আ. : ভাঙতি নাই!

সা. : ভাঙতি কইরে আইনে দেন।

আ. : পরীক্ষে করলাম আপনের ইন্তি। আমারে ভাঙতি ক্যারা দিব!

প্রসারিত এক হাজার টাকার বেগুনি নোটে চোখ রেখে মিনমিন করি। ক জ সিরিজ নম্বরের উপরে বসে আছেন শেখ মুজিব। মুজিবের এই ছবিতে ফুটে নি তেজোদীপ্ত প্রজ্ঞা আর দরদের ভাব। তাই মুজিবের অবয়ব চেনা গেলেও তাঁর অমিত তেজ ব্যক্তিত্বের মধুময় সম্মোহন এখানে অনুপস্থিত। ডিজাইনার, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনকারী বোর্ড/কর্তা, কেউই মনে হয় খেয়াল করে নি এই সৌন্দর্যের বিষয়টি। মুজিবসহ এক হাজার টাকার নোটটি ছিনিয়ে নিল সাতচল্লিশ। মুজিবের চশমা ঢাকা চোখের ওপর কী আক্রোশে সাতচল্লিশ মর্দন করে দুই আঙুল? নোটের খাটিত্ব যাচাই করে? তারপর ক্যাশবাক্স খুলে খুবই অপ্রসন্নভাবে ছুঁড়ে দেয় আমাকে একটি পাঁচশ’ ও দুটি একশ’ টাকার নোট। আমি নোটত্রয় যাচাই না করেই কাচের দরোজা খুলতে এগিয়ে যাই। এত ভারি আর অবশ হয়েছে পা! কাচের দরোজা ঠেলে এক পা বাইরে দিয়েছি তখন শুনছি—

সা, অথবা ট.ত. : শালা মালাউনের বাচ্চা… কোত্থেকে যে শালারা আয়ে হাজির অয় বালডার উপরে…

দ্বিতীয় পা ছেঁচড়ে এনে ততক্ষণে দাঁড়িয়েছি বাইরে। পিছে বন্ধ হয় দরোজা। এখন আষাঢ়ের পড়ন্ত দুপুর। রোদের তেজ দেখ অথচ? আকাশে কোথাও মেঘের কোন চিনবিন নাই। ভ্যাপসা ভাপ উঠছে ইট বিছানো গলিপথ থেকে।

অসহ্য!

পিছন ফিরে কাঁচঘেরা ঘরে তাকালাম একবার। আবছা দেখা যাচ্ছে, সাতচল্লিশ ও ট.ত. দাঁতমুখ খিঁচছে। আমাকে কেটে কুচিকুচি করার মতলব করছে নাকি!

পা টেনে টেনে হাঁটতে শুরু করি পশ্চিমমুখো। মাথার ওপর ঈষৎ হেলানো সূর্য। নাভিমূলে শুরু হয়েছে অথচ বজ্রাঘাতপূর্ব চিনচিন! শালা আকাশের মেঘগুলো কালো জখম হয়ে ঢুকে গেল বুঝি তলপেটে। এবার খামচাখামচি করবে। না, এইসব মেঘজখম ব্যথার দানবকে প্রশ্রয় দেবার কিছু নাই। ট.ত.-কে জানিয়ে এলে পারি বরং…

আ. : তুই কি বুঝবি চুতমারানির পো! রোমান হরফ মানে একটা অক্ষর। আমার কাছে ওটার কোন ভাব নাই, রূপ নাই, রস নাই, আবহ নাই। আমার চোখের সামনে ঐ বাল ছিঁড়ে ছিঁড়ে ধরলে আমি পষ্ট দেখমু না তে কী দশ ট্যাহার নোট দেখমু! আমার সামনে ধরবি বাঙলা। বাঙলা অইলো, ব্যাটা আমার কাছে বাঙলা অক্ষর অইলো একটা ছবি, বহু ঘটনা নিয়ে এক ছবি, বিচিত্র ভাবের আবহে রস টইটম্বুর করুণামাখা, সুখমাখা এক ছবি! এহন ঐ ছবি যুদিল আমি পষ্টাপষ্টি দেখতে পারি, চিনতে পারি, বুঝতে পারি, শালা বাঞ্চোতের বাচ্চা বাঞ্চোত, তাইলে না বুঝা গেল আমার চোখ নরমাল, দৃষ্টি ঠিক আছে! শালা হারামির বাচ্চা, চোখ পরীক্ষে কর, না?…

আমাকে থমকে দাঁড়াতে হয় এক ধ্বংসস্তূপের সামনে। আগে সিনেমা হল ছিল এখানে। এখন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সিনেমা হলের স্মৃতি বুকে এখনো স্তূপ হয়ে আছে কিছু নোনা ধরা ভাঙা ইট। দোকানি ও পথচারী মানুষেরা ইটের স্তূপে মুত খালাস করে। তলপেটের ব্যথায় অস্থির হচ্ছি আমি। খুব ভালো হত এই ধ্বংসস্তূপে হাগার জন্য প্যান্ট খুলে বসে যেতে পারলে। জানি, আমার এ ব্যথা আমাশয়জনিত নয়; তবু। আমাকে মালাউনের বাচ্চা বলে গাল দিয়েছে বাঞ্চোৎ সাতচল্লিশ ও ট.ত.। হাগা না হোক মুতের উছিলায় অন্তত লিঙ্গ নেড়েচেড়ে পরখ করা যায় মুসলমানির দাগ অবিকল আছে কিনা! কিন্তু মুসলমানিত্ব পরখ করার ফুরসৎ পাই না। বমির দমক আসে এত তীব্র! তলপেট মুচড়ে ধরে বসে পড়ি ধ্বংসস্তূপের ওপর। আর বমির দমকে ওয়াক ওয়াক করি।

নিষ্ফল!

এক ফোঁটা বমিও হয় না। তলপেট ছেড়ে মাথা চেপে ধরি দুহাতে। এত ক্লান্তি লাগছে আর এত যন্ত্রণা! মাথাটা টিল্ট আপ করি হাতের ফাঁকে। সামনে তাকাই। পুরো ডি ফোকাস আমার দুনিয়া! কিছুতেই ফোকাস পাচ্ছে না। নাকে ধাক্কা দিচ্ছে তীব্র ঝাঁঝালো বিষগন্ধ। আমি জানি না, কিসের এ বিষ-গন্ধ। রোদ ও তাপে প্র¯্রাব থেকে উঠে আসছে নাকি আমার করোটির ভিতরই ছড়িয়ে আছে!

ডিজিটাল বাংলাদেশের কোন এক সিনেমা হলের ধ্বংসস্তূপে বসে বসে আমি নিদারুণ এক বিবমিষায় খাবি খেতে থাকি।

মুতগন্ধে ভরপুর ধ্বংস্তূপের ওপর বিবমিষায় খাবি খেতে থাকা আমাকে ছিঁড়ে এনে হাসপাতালে বসায় আবার মা.ম.পু.-র প্রশ্ন।

মা.ম.পু. : বিয়ে-সাদি করেন নাই— সাথে কে আসছে?

তছনছ হয়ে যায় ইটের ফাঁক দিয়ে ভেজা মাটি থেকে উঠে আসা ভ্যাপসা ভাপে ধোঁয়াময় আবহ। আমি ঠা-া ঠা-া কুল কুল আবহে মা.ম.পু.-কে দেখছি। মা.ম.পু. গলার ফাঁস খুলে স্কার্ফমুক্ত করেছে মাথা। ফলে খসে পড়েছে তাঁর পুতুল মুখোশ। আধ্যাত্মিকতা হাওয়া। আর ঢুলুঢুলু ভাবটাও নাই। মাঝবয়েসটাই শুধু ত্যাগ করে নি তাঁকে! মাথার চুলে গালের পেশিতে, গলার ভাঁজে, ঘাড়ের কুঁজে লেপ্টে রয়েছে একদম। আমার কেলানো গুটিয়ে মা.ম.পু.-র প্রশ্নের সশব্দ এনসার দিতে হয়ে উঠে উৎসাহী। অবশ্য প্রথম প্রশ্নের শুধু। দ্বিতীয়টার উত্তর তো দৃশ্যমান। সাথে কেউ নাই।

আ. : আমার একটি মেয়ে ও একটি ছেলে আছে।

আগেও খেয়াল করেছি ব্যাপারটা, এই কথা কয়টা বলতে কোন সময়ই আমার উৎসাহের অভাব হয় না। ক্লান্তি আসে না। আজকাল সাধারণত কথা বলতে ক্লান্তি বোধ হয় ভীষণ। ফুসফুসে মনে হয় ফুটো হয়েছে একাধিক। হাঁ করা মাত্র বাতাস বেরিয়ে যায় এদিক-সেদিক দিয়ে। চুপসানো ফ্যাপড়া দিয়ে উচ্চারণ করা সম্ভব হয় না কাজের শব্দটি। বুকের ভিতর ভুঁসভুঁস আওয়াজ শুনি মাত্র। অথচ যখনই উচ্চারণ করি : আমার একটি মেয়ে আছে… কী যে প্রশান্তির হাওয়ায় ভরে উঠে বুক! কানের ভিতর দিয়ে মরমে ঢুকে মধুর ধ্বনি— বাবা…

দৃষ্টির সামনে ভাসে সিনেমার পর্দা। পর্দায় দেখছি নীল-সাদা মেঘের স্বপ্ন থেকে স্লো মোশানে উড়ে আসছে আমার সে ছোট মেয়ে। কচি কচি ডানা মেলে। দেখ দেখি ঐটুকুন মেয়ের কা-খানা! হাওয়ায় ভর করে আমার বুক বরাবর কী সাংঘাতিক ড্রাইভখান দিল অত উঁচু থেকে! এখন কী হবে? হঠাৎ যদি ফসকে যায় আমার হাত পিছলে। যদি আমি ধরতে না পারি! মেরুদ- বেয়ে হিসহিস শব্দে মগজে উঠতে শুরু করেছে আতঙ্কের সাপ।

আমার সে ছোট মেয়ে আমার বুকে পৌঁছার আগেই পর্দার ডানে ঢুকে যায় মা.ম.পু.। ৬ নম্বর রোগশয্যায় শায়িত রোগীর সাথে খ্যাচর খ্যাচর করে।

মা.ম.পু. : বাবা, কাল রাতেও কিন্তু ভয়ে ঘুমাতে পার নি। আবার এইসব পড়ছ! রাতদিন খালি ইংরেজি ডিটেকটিভ বই পড়া; না? আলো জ্বালাও নি কেন? এইসব করে করে চোখটা খেলে।… লাঞ্চ করতে হবে, ওঠ। ডাক্তার আঙ্কেল মানা করেছে না অল্প আলোতে পড়তে?

মা.ম.পু.-র খ্যাচর খ্যাচর তাঁর বাবার উদ্দেশ্যে দেওয়া মৃদু ধমক নয়তো ৪ নম্বর বেডে এডমিটেড নতুন রোগীর কাছে ছেলের ডিটেকটিভ বিষয়ে পা-িত্যের খবর ঘোষণা? ঠিক বুঝা গেল না, কোনটা! ৬ নম্বরে শায়িত রোগীর মত পূর্বের ক্রস বুকের ওপর শুইয়ে দিয়েছে দুহাতে ধরা বাঁকানো ইংরেজি ডিটেকটিভ বই। মুখ তার তাই দৃশ্যমান। বাবার বয়স তের-চৌদ্দ, কইন্যার যদিও মাঝবয়েস। বাবার নাকে আটক চিকন ফ্রেমের গোল চশমা। লাল রঙের ফ্রেম। হাবলা-গুবলা ভাব ফুটেছে তাই বেশ। সে কইন্যাকে বলছে : ভেরি এক্সাইটেড একটা সিনে আছি আম্মু, এখন ডিস্টার্ব করো না প্লি.ই.জ— আমার লাঞ্চ করতে ইচ্ছে করছে না।

ওলে বাবা, তুমি অমন বাংলা টেলিভিশন নাটকের নায়িকাদের মত ন্যাকান্যাকা ডায়ালগ ঝারছ যে!

এই ভাব অভিনয় দেখলে আমার হালকা অস্বস্তি হয়। টেলিভিশন পর্দায় হিরোইন অমন ভঙ্গি শুরু করলেই মনে হয় চুতমারানি তুমি যাও তো; এমন ঢঙের ইশারায় সুরসুরি দিলে আমার মাল বেরুবে না সারা রাতেও। আমি বরং ঢঢঢ লাগাই আর হাত মারি। মনটা তবু বিষণœতার ঘোরে প্রফুল্ল থাকবে সাময়িক। এখন উসখুস করছি বাবার ঢঙ দেখে। আর আম্মু ততক্ষণে ঘি-রঙ সাদা মেলামাইন প্লেটে হলুদ ঝুলে ভেজানো এক খাবলা ভাত তুলে নিয়েছেন। এবার নিলেন এক টুকরো মোরগ কি মুরগির গোশ্। হলুদ ঝোলে সিক্ত মোরগ কি মুরগির গোশ্ ফ্যাঁসফ্যাঁসা দেখাচ্ছে। আর নিলেন এক টুকরো হলুদ আলুর ফালি। এইসব করতে করতে তাঁর হাতে, বাসন-কোসনে ঝঙ্কার তোলেন আভিজাত্যের অথবা অপ্রসন্নতার।

ন্যাকান্যাকা বাবা : আম্মু, খাব না!

মা.ম.পু. : জ্বালাতন করবে না বলতেছি!… আলু চটকে মাখোমাখো ঝোলে মুরগির গোশ্ দিয়ে নলা কইরে দিতেছি, খাও।

ন্যা.ন্যা.বা. : তুমি খাওয়ায় দিবা?

ওদিকে ৫ নম্বর বেডের নিচে যে বৃদ্ধা আপ-ডাউন করাচ্ছিলেন মাথা, তিনি এখন দাঁড়িয়ে গেছেন প্র¯্রাব ভর্তি প্লাস্টিক ব্যাগ নিয়ে। ব্যাগের কান ধরে চোখ বরাবর তোলেন আর নিবিড় মমতায় ব্যাগের পেট টিপে কী যেন পরখ করেন। কিন্তু ঐরকম পেট টিপলে উপচে মুত বেরিয়ে যাবে না! বৃদ্ধা মুতভর্তি ব্যাগের পেট টেপা বন্ধ করে। অথচ কোন এক ধন্দে পড়ে হয়ে যায় এলোমেলো। এগিয়ে আসেন মা.ম.পু.-র দিকে। মা.ম.পু.-র নাক বরাবর ঝুলিয়ে ধরেন মুতভর্তি ব্যাগ।

বৃদ্ধা : অ মা, আমি ত চোহে ঠাহর করবের পাইতাছি ন্যা, মুতে কি এহনো অক্ত যাইতাছে, অঙডা এল্লা গোলাগোলা অইতাছে না— দেহেনছেন গো!

মা.ম.পু. : উঁহ হুঁ! সরান সরান। দেখতিছেন লাঞ্চ নিয়ে বসছি। মুতের ব্যাগ এই ভাবে কেউ নাকের উপরে ধরে!

এলোমেলো বৃদ্ধা ছড়িয়ে পড়েন জানালার আলোয়। দখিনা জানালার আলোয় ব্যাগ উঁচু করে প্র¯্রাবের রঙ পরীক্ষা করেন। আমিও দেখছি ব্যাগভর্তি সোনালী মুত। রক্তের আভা আছে কি নাই ঠাহর করতে পারি না আমিও। সোনালী আভা এত স্বচ্ছ— ঝকঝকে কাচের সাকিতে ভরে দিলে অবলীলায় কেউ পান করে নিবে নিদারুণ স্বাদের পানীয়। প্লাস্টিকের ব্যাগে মুত নয়, অবিকল সোনালী পানীয়; দখিনা জানালা দিয়ে আগত রোদের ঝলকে বিচ্ছুরণে আমাকে বাধতে চায় মায়ায়। কিন্তু অমন পানীয়ের নেশায় আমি মজি নি কোনদিন। আমার এখন ইচ্ছে হচ্ছে অথচ সাত রাস্তার কেন্দ্রে সোডিয়াম বাতির তলে বসে কারো তৃষ্ণা মেটাই ঐ পানীয় যোগে।

ভাবছি, এত মধুর আপ্যায়নে সিক্ত করা যায় কাকে? কী জানি, হাসপাতালে বসে ভাবছি বলেই কি না আর অসহায় রোগীর রক্ত ও শরীর নিঃসৃত জলে সৃষ্ট পানীয় বলেই হবে হয়তো— একজন কনসালটেন্ট (অর্থোপেডিকস) এর চেহারা মুবারক ভেসে উঠল চটজলদি সবার আগে! এবং তাঁর বুযুর্গ চেহারার তলে বাকি সম্ভাবনাগুলো চাপা পড়ল।

সুতরাং আমরা, আমি ও বুযুর্গ ডাক্তার, কনসালটেন্ট (অর্থোপেডিকস), মুখোমুখি বসেছি। কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ থেকে সন্তর্পণে বের করেছি ঝকঝকে কাচের গ্লাস। আমাদের মাঝে ২ ফুট বাই ১ ফুট কালো কাচের টেবিলে রেখেছি শূন্য গ্লাস। শূন্য কাচের গ্লাসে টেবিলে ঠোকাঠুকিতে আওয়াজ ওঠে টুং। ভরা পেয়ালায় ওঠা মধুর জলতরঙ্গ ধ্বনি এ নয়। বিরক্ত হন কনসালট্যান্ট (অর্থপেডিকস)? বুঝেছি, জাফরান গন্ধে ডুবানো এক টুকরো বরফকুচি না দিলে তাঁর সুন্নাত আদায় হবে না। তিনি যেহেতু বুযুর্গ লোক! নবীজির আদেশের বাইরে যান কী করে?

আমার ডানপাশে সটান পড়ে আছেন ছোটমামু। আজ গোধূলিবেলায় রোড এক্সিডেন্টে তিনি আহত। কোথায় কোথায় কতগুলো ফ্র্যাকচার হয়েছে কে জানে? আমি শুধু দেখতে পাচ্ছি ছোটমামুর পায়ের পাতায় পুরু করে বাঁধা সাদা ব্যান্ডেজ রক্তে ডুবে যাচ্ছে। পায়ের গোঁড়ালি চুঁয়ে বৃষ্টির মত রক্তের ফোঁটা পড়ছে ধূসর সিমেন্ট লেপা মেঝেতে। বিমর্ষে, আতঙ্কে কান পেতে আছি আমি— রক্তফোঁটার আঘাতে ওঠে কী ধ্বনি?

কনসালটেন্ট (অর্থোপেডিকস) ওষুধ কোম্পানি থেকে উপহার পাওয়া কলম দিয়ে আঘাত করেন গ্লাসের কানায়। ক্রন্দন করে গ্লাস! আর মামুও করে উঠেছেন আর্তনাথ!

আহত মামু : বাবারে জিবেই পাও আমারে বাঁচাও। ও মাওগো…

মামু চিৎকার করছেন। বুযুর্গ ডাক্তারের সামনে শূন্য পেয়ালা ভরে দেব, আমার কাছে তেমন কিছু নাই। কী যে অসহায় পরিস্থিতি! বৃদ্ধার হাত থেকে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিলে হয়।

মামুকে টিপে টিপে পরীক্ষা করছেন ডাক্তার। মামুর শরীর জাস্ট একটা হাড়ের কাঠামো। মাংস-চর্বির লেশমাত্র নাই। মাংস-চর্বিহীন ঠনঠনে হাড় চুষতে কি কনসালটেন্ট (অর্থোপেডিকস) এর ভালো লাগবে! আবার দেখ, গাড়ি ও রাস্তার মাঝে পড়ে নিজেকে থ্যাঁতলে নোঙরায় মাখামাখি হয়ে এসেছে।

বিস্ময়! হাড়ের মজ্জাতেও এত রক্ত থাকে!

বুযুর্গ ডাক্তার এক ফোঁটা রক্ত ধরেন তর্জনীর ডগায়। আহা! মনে হয় দারুণ রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন কিশোরী আকাশ ফেটে বেরুনো এক ফোঁটা সুখ আঙুলে ছুঁল! তারপর ডাক্তার জিভের ডগায় ঘষেন রক্তমাখা তর্জনী। চুকচুক শব্দে মুখর হন। রাঁধুনী তরকারি তেলে দেবার পূর্বে যেমন পরখ করে নেয় স্বাদ।

ছোটমামু বড় বেশি চিৎকার চেঁচামেচি করছেন। কে জানে, ডাক্তারের কড়াইয়ে টগবগ করা গরম তেলে ছ্যাঁকা খাবার ভয়ে মামু কাঁদেন নাকি ফ্র্যাকচার হয়ে যাওয়া হাড়ের শোকে!

ডাক্তারের মুখ যদিও প্রষণœ হয়ে ওঠে। মামুর রক্তে প্রাচীন হয়ে যাওয়া আভিজাত্যের স্বাদ এখনো অটুট!

ততক্ষণে হাত সাফাইয়ের কারসাজিতে বৃদ্ধার হাতে ধরা মুতভর্তি থলে খালি করে দিয়েছি। আমার ও বুযুর্গের মাঝে ২ ফুট বাই ১ ফুট কাঁচের টেবিলের ওপর শূন্য কাচের সাকি ভরে উঠেছে সেই প্র¯্রাবে। অর্থাৎ এখন তাহা মুত নয় সোনালি মদ! বুযুর্গ (অর্থোপেডিকস) আমার সামনে বসেছেন আবার। তাঁর ডান ঠোঁটের কোণ থেকে একগোছা সাদা দাড়ি নেমে গেছে বুক বরাবর। বাকি দাড়িগুলো প্রায় সবই কাঁচা। আমি দাড়ির ওপর ফেলে রেখেছি চোখ। খানিক আগেই তিনি চেখে দেখেছেন রক্ত! সেই রক্তের ছিট দাড়িতে লেগেছে কি, বিড়ালের যেমন থাকে— আমি পরখ করছি তাই।

জীবনে একবার মাত্র বিড়ালের রক্ত পান দেখেছি লাইভ! বৃষ্টি মেদুর এক দুপুরবেলায় চেয়ার পেতে বসে আছি, সামনে দরোজা খোলা। তারপর অল্প পরিসর বারান্দা, বারান্দা পেরুলেই সবুজ ঘাসের উঠোন। উঠোনে ঘাসের বুকে নামছে অবিরল বৃষ্টিধারা। অচঞ্চল। ঘাসের চারপাশে জমেছে রূপালি বৃষ্টির জল। সেই রূপালি জলের কিছু আনন্দ আলো ছিটকে এসে লেগেছে আমার চোখে। ছড়িয়েছে অপরিসর বারান্দায়। আমার মন মজে আছে বৃষ্টি-আলো-আনন্দে।

তখন খোলা দরোজার সামনে বারান্দায় এলো মৃতপ্রায় এক ইদুর। পিছনে শিকারি বিড়াল। মৃতপ্রায় ইদুর তবু চেষ্টা করে না পালাবার। বিড়ালের ভাবভঙ্গিতে থমথমে নিস্পৃহতা। ডান থাবা দিয়ে বিড়াল ইদুরের পিঠ ছুঁল। ইদুর মাংসে তার অরুচি ধরেছে! তাই যেন সোহাগ করে বলছে : বাবা তুমি চলে যাও, আমার এখন তোমার রক্ত মাংস চিবুতে ভালো লাগছে না। অথচ ইদুরের কি ঢঙ মড়ার মত পড়েই থাকে। দৌড়ে পালায় না। তো বিড়াল আর কি করে— ইদুরের ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে দেয়। রক্তের একটি মাত্র ধারা বেরিয়ে আসে ফিনকি দিয়ে। বিড়ালের দাড়ি রঞ্জিত হয়ে যায়। মুরগীর ছোট বাচ্চার মত তিনবার মাত্র চেঁও শব্দ করে ইদুর। প্রথমবার স্পষ্ট শব্দ হয়। তারপর ফেড আউট হয় শব্দ। দ্বিতীয়বার মৃদু শোনা যায়, তৃতীয়বারের পর সব স্তব্ধ।

অবশ্য ঝুম বৃষ্টির আবহ হারায় না। রক্তের ছাঁট দাড়িতে লাগায় অথবা ইদুরটি অসভ্যের মত চেঁও চেঁও করে উঠায় বিব্রত হয় যেন বিড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিক তাকায়। রঞ্জিত ঠোঁটে দাড়িতে পুঁতুপুঁতু হাসি ঝকঝক করে। আমি শিউরে উঠি। তারপর সে বৃষ্টির আবহ দেখে উদাস। এবং নিশ্চুপ ইঁদুর মুখে করে আমার খোলা দরোজা পার হয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।

আফসোস! ইত্যবসরে দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যায় বুযুর্গ ডাক্তার, কনসালটেন্ট (অর্থপেডিকস)। ইস, তাঁর সাথে রয়ে গেছে আমার কতদিনের অমীমাংসিত বোঝাপড়া। আজও সুরাহা হবার আগেই ডুবে গেল দৃশ্যপট।

ফিল্ম ডিজলভ মুডে বুযুর্গ ডাক্তার, কনসালটেন্ট (অর্থোপেডিকস)-কে ডুবিয়ে দিয়ে আমার মুখোমুখি এখন অন্য ডাক্তার। ইনি মহিলা, বয়সেও নবীণা। কব্জিসুদ্ধ হাত দেখতে পাচ্ছি। বেশ নরোম আর মসৃণ বোধ হচ্ছে। এক চোখের ওপর আছড়ে পড়ছে তার তলপেট। কামিজ ও এপ্রোনের তল থেকে হাঁসের ডিমের এক প্রান্তের মত ফুটে উঠেছে। হাতের দূরবীণ আর সূর্যের আলোয় পরখ করলে মন্দ হতো না, ডিমে বাচ্চা এসেছে না এখনো কুমারী আছে? গুলতি ঝুলিয়ে রাখা ঘাড় ও গলার ভাঁজ দেখা যাচ্ছে মাখন মাখন। কথায় অবশ্য গলে যাওয়া মাখনের লেশ মাত্র পাচ্ছি না। প্রথমেই তাঁর অবাক করা প্রশ্ন!

মহিলা ডাক্তার (ম.ডা.) : রোগী কে? আপনেই!

আজিব! হাসপাতালের বেডে শুয়ে ডাক্তারের মুখেও এমত প্রশ্ন শুনতে হয়! আমার এখন মুখ খোলা উচিত। শুধু দাঁত কেলিয়ে উদ্ধার পাওয়া যাবে না আর। কিন্তু রোগী কে— প্রশ্ন শুনেই ভেতরটায় খামচে ধরে আড়ষ্টতা! হাসপাতালে এডমিটেড হয়েছি মিনিট চল্লিশেক তো হবেই, রোগশয্যায় পড়ে আছি; অথচ ডাক্তার স্বয়ং জনতে চায় রোগীর কাছে— রোগী কে? আমার বোধ হয় কোন রোগ হয় নি তবে। নাকাল হচ্ছি শুধু শুধু।

কী মুশকিল! আমি মহিলার চোখে দাঁত কেলিয়ে ধরেছি আড়ষ্টতায় কুঁকড়ে থাকা সত্ত্বেও।

আ. : জ্বি।

ম.ডা. : কী হয়েছে আপনার?

আধশোয়া থেকে সোজা হয়ে বসার জন্য নড়েছি মাত্র—

ম.ডা. : ঠিক আছে উঠবার দরকার নাই। কতদিন যাবৎ সমস্যা?

আমি সোজা হয়ে বসবার উদযোগ বন্ধ করি, স্থির হই।

ম.ডা. : আপনার জিভটা দেখি। হা করেন, বড় করে হা করে জিভটা দেখান।

আছি তো কেলিয়েই। কেলানো আরেকটু বাড়িয়ে শুধু দাঁতের ফাঁক দিয়ে বের করে দিলাম জিভ। জিভের ডগায় জল টলোমলো করছে, তাড়া খাওয়া কুত্তার যেমন করে। আমার মনে অবশ্য অন্য ঝোঁক।

ম.ডা. তোমার এ কেমনতর ঢঙ জিভ পরখ করার। জিভের ধার ঠিক আছে কি নাই দেখতে চাইলে আমাকে একটু আড়াল আর আশ্রয় দাও। তোমার ঘাড়, গলা, গলার নিচটা থেকে যে মাখন গলে, পড়ে নষ্ট হচ্ছে, আমার জিভ যদি সেই মাখন চেটেপুটে খরখরে করতে পারে তবে না বুঝবে জিহ্বা ঠিক আছে। তা না, আগেই রায় ঘোষণা করলে—

ম.ডা. : জিহ্বা তো স্বাভাবিক! চোখের নিচে এত কালি কেন? রাতে ঘুম হয় না! পানি খাবেন বেশি বেশি।

আমার চোখের পাপড়ি টেনে ওপর দিকে টেনে ধরল সে বাম হাতের বুড়ো আঙুলে। ডান হাতের বুড়ো আঙুলে নিচের দিকে টানে গাল।

মনে মনে বলি আমি, রাতে আমার ঘুম হয় আবার হয় না। যেদিন রাতে সঙ্গমের তীব্র তৃষা জাগে অথচ সঙ্গমসাথী কাছে নাই; মৈথুনে মন সাড়া দেয় না তবু মৈথুনে লিপ্ত হলে দীর্ঘ সময় খরচা হয়ে যায় ঘোরের ভেতর; ক্লান্তি আসে, বিষণœতায় ময় হয়ে যায় বেডরুম; ঘুম আসে না; যদিবা তন্দ্রা নামে দুঃস্বপ্ন হানা দেয়; তারপর মনোলগে মনোলগে রাত কাবার। ঘুম হয় কখন?

ম.ডা. : মুখে রুচি কেমন?

আ. : জ্বি, ভালো!

আমার চোখ পড়েছে ম.ডা.-র ঠোঁটে। অমন টসটসে কমলা রঙের ঠোঁট। খেতে দিলে কার অরুচি হবে?

ম.ডা. ঘাড় থেকে গুলতির মত স্টেথিস্কোপ নামিয়ে কানে ঢুকালেন। আর এক ভক্কা আমার বুকে চেপে ধরতে লাগলেন।

ম.ডা. : লম্বা শ্বাস, হুঁ লম্বা শ্বাস নেন…

ভক্কা দিয়ে আমরা কোনদিন এই খেলা খেলি নি। ভক্কার ভিতর ধুলো অথবা ঝুরঝুরে বেলে দোআঁশ মাটি ঠেসে ঠেসে ভরেছি। এবার ত্বরিৎ কোন শক্ত মাটির ওপর বসিয়ে দেই দক্ষ হাতে। যেন এলোমেলো ছিটিয়ে না যায় মাটি। এবং পোড়া মাটির ভক্কা তুলে নেই সন্তর্পণে। তারপর বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠিক মাঝ বরাবর গর্ত ভর্তি করি প্র¯্রাব দিয়ে। প্র¯্রাব শুকিয়ে এলে ঐ ভক্কা তুলে অপ্রিয় অথবা প্রিয় কারো দিকে ছুঁড়ে মারি!

কেমন শায়েস্তা হলে?

অথবা রাস্তার মাঝ বরাবর মার্বেল খেলার মাঠ প্রস্তুত করতে হবে। বড়রা হাডুডু খেলে ধুলো তুলে নষ্ট করে দিয়েছে মাঠ। আমরা, খেলার সাথীরা ধুলো জড়ো করি, স্তূপাকারে সাজাই। স্তূপের মাঝে গর্ত করে প্র¯্রাব ভরে রাখি। মার্বেল খেলা সাঙ্গ হলো। ধুলোস্তূপের গর্তে শুকিয়ে গেছে মুত। এবার গর্তের চারপাশ থেকে ধুলো সরিয়ে নিই। শুরু হয় আমাদের নতুন খেলা। মুতের ভক্কা হাডুডুর মাঠময় ভেঙে খানখান করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আমরা ছ্টু!

ম.ডা. আমার বুকেপিঠে ভক্কা চেপে চেপে কী মজা নেয় কানের ভেতর! আমার ভালো লাগছে না।

ম.ডা. : পেটে কোন সমস্যা আছে? প্র¯্রাব-পায়খানা ঠিকমত হয়?

আ. : জ্বি?

আমি কোন কথা বলি তাঁকে? প্র¯্রাব-পায়খানার প্রতি এক প্রকার সম্মোহন আছে আমার। স্বাভাবিক দিনগুলোয় টয়লেটে ঢুকে আমি ঐসব সারি দীর্ঘ সময় নিয়ে। কাজ শেষ হয়ে যায় তবু দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে পায়খানা দেখি। কী যে মুগ্ধতায় পেয়ে বসে কেমনে বুঝাব! আমার উঠতে ইচ্ছে করে না। আকাশ-কুসুম ভাবনায় উড়ে উড়ে যাই! তখন আমি অবন ঠাকুরের রিদয়! একেক দিন একেক গন্ধ বুক ভরে দেয়— কোনদিন গন্ধহীনতায়। শুধু ফ্যাকাসে হলুদ কিংবা কালচে কিংবা শাকের পেস্টের মত রঙে মুগ্ধ রাখে। কীভাবে বলি, প্র¯্রাবের সাদা ফেনা কিংবা পায়খানার রঙ-গন্ধে আমি যতটা মুগ্ধ নয়ন মেলি তার সিকি ভাগ মুগ্ধতা নিয়ে যদি এইসব ম.ডা. অথবা অপরাপর ঘটনা, মানুষ প্রভৃতিকে দেখতে পারতাম! আর যেদিন আমার দিন ভালো যায় না, অসুস্থতা বোধ করি, সেদিন তো পায়খানার বেগ আসে, তলপেট মোচড়ায়, তীব্র ব্যথার অনুভব হয়, পায়খানা হয় না! পেটের ভিতর একটা শিল গড়াগড়ি খায় কিছুক্ষণ তারপর উপরে উঠে বুকের ভিতর আটকে যায়। ইদানিং টের পাই প্রায়শ, শিলটা বড় হচ্ছে। ইহা আছে বুঝি সারাক্ষণ, যদিও উপস্থিতির তীব্রতা জানায় কখনো-সখনো।

ম.ডা. এবার আমার পেট মর্দন করে বাম হাতে। উহ! আমি শিউরে উঠি। কাঁপন থামে অবশ্য মুহূর্তেই।

ম.ডা. : স্মোক করেন? অন্যকোন বদ অভ্যাস? স্মোক করবেন না। দুধ বা দুদ্ধজাত খাবার খাবেন না। কারো কারো পেটে দুধ সহ্য হয় না একদম।

এটা কী বললেন ম.ডা.। অন্য কোন খাবারের প্রতি আমার খাঙড়াপনা নাই। একমাত্র দুধ। যখন পাই দুধ আমি সব ভাবে খেয়ে স্বাদ নিতে চেষ্টা করি। এই যেমন : বিড়ালের মত চেটে, বাছুরের মত চুষে, হরিণের মত দাঁতে কেটে, বাঘের মত থাবায় পিষে। আর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন কিনা সেই দুধের ওপর!

ম.ডা. এখন পড়েছেন পাশে দাঁড়ানো সিস্টারকে নিয়ে।

ম.ডা. : উনাকে এই টেস্টগুলো করানোর ব্যবস্থা করেন। রিপোর্টগুলো ফাইলে রেডি রাখবেন। স্যার এসে যেন দেখতে পারে সব।

সিস্টার : ম্যাডাম, উনাকে ক্যানোলা দেব?

ম.ডা. : না, উনার মনে হয় না ইঞ্জেকশন, স্যালাইন এইসবের দরকার পড়বে। আপাতত এভাবেই থাক। স্যার এসে যা বলেন।

আবার আঘাত দিলেন ম.ডা.! হাতে ক্যানোলার মত প্রজাপতি কি শুধু ইঞ্জেকশান ও স্যালাইনের জন্য? সে তো রোগীর আইডেন্টিটি। হাসপাতালের নীল-সাদা শয্যায় শুয়ে শুয়ে আমাকে এনসার দিতে হয়— রোগী কে?

নাহ্, ম.ডা. আপনার ট্রিটমেন্ট ভালো হচ্ছে না!

ম.ডা. আবার আমাকে নিয়ে পড়লেন।

ম.ডা. : স্যার মনে হয় আজকে আর আসবেন না। আপাতত আমার অবজারভেশনে থাকবেন। কাল স্যার আসলে আপনার সমস্যার ডিটেল্স বলবেন। শুধু জ্বি আর তাকিয়ে থাকায় হবে না।

আ. : জ্বি!

ম.ডা. চলে যাচ্ছেন। কিন্তু স্যার আসবেন আমার সমস্যার ডিটেলস জানতে। এদের যা ব্যস্ততা! আর প্রশ্নের যে তুফান ছুটে একের পর এক। অল্প কথায় ডিটেলস প্রকাশ করতে হবে। জয়নুল কিংবা শাহাবুদ্দিন যেমন গভীর বেদনা কি শক্তির ডিটেলস তুলে আনেন খুবই সহজ দুএকটি রেখার টানে। আচ্ছা ডাক্তারের ডিটেলস কী?

মনে এক মস্ত ধন্দ উপস্থিত।

গতরাত থেকে আমার মেয়ের জ্বর। আজ আমার ছেলে আসবে পৃথিবীতে। মেয়ের মা তাই সকালবেলা ভর্তি হয়েছে মা ও শিশু হাসপাতালে। আমার মেয়ে অনেক কান্নাকাটি করছে ওর মায়ের সাথে থাকার জন্যে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশ কোন শিশুকে মায়ের সাথে রাখা যাবে না এবং কোন পুরুষ এটেন্ডেন্স। আমার মেয়ে সদ্য চার বছরের। সেই থেকে মেয়েকে আমার ঝাপ্টে রেখেছি বুকের সাথে।

আচমকা মেয়েটার শরীরে এত তীব্র জ্বর ওঠে— আমারই গা পুড়ে যাবার দশা।

দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের সামনে হিজিবিজি গাড়ির গলিপথে আমি মেয়েকে নিয়ে হাঁটছি। মেয়ে আমার ক্লান্তিতে, হতাশায় ও জ্বরের আচ্ছন্নতায় ঘাড়ে মাথা রেখে নেতিয়ে আছে। আমি গাড়ির গলিপথে হাঁটছি আর মেয়ের ছোট হয়ে আসা মুখ দেখছি গাড়ির কালো কাচে। মেয়ের নির্জীবতায় ভাবছি ঘুমিয়ে পড়েছে বোধ হয়। কিন্তু না, চোখ খোলা মেয়ের। কালো গ্লাসে প্রস্ফুটিত মেয়ের চোখ কত ম্লান। মেয়ে আমার রাত থেকে এখন পর্যন্ত কিছু খায় নি।

আ. : আম্মা, কী খাবে? কিছু খাও— আম্মা গো!

মেয়ে : বাবা, আমি কিছু খাব না; আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।

আ. : আম্মা, না খেলে শরীর খারাপ করবে যে আরো। তখন তো তোমার আম্মুর মত তোমাকেও হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে!

মেয়ে আমার চুপ! যেমন ছিল তেমনি নেতিয়ে আছে ঘাড়ের ওপর। আমি হাসপাতালের সদর গেটে নিভু নিভু এক কাঁঠাল ছায়ায় দাঁড়িয়ে। একটু বসতে পারলে ভালো হত। কোমরে যন্ত্রণা হচ্ছে সাংঘাতিক! সেই সকাল থেকে দাঁড়ানোর ওপর তো!

আ. : আম্মা কী খেতে চাও বল!

আমি সদর গেটের সামনে দিয়ে বহে যাওয়া রাস্তায় দেখছি অতিকায় টিনের বাক্স বাসের মত তীর বেগে ভেসে যাচ্ছে। ঘোমটা পরা লাজুক বউয়ের মত রিক্সাগুলো অনবরত খাবি খাচ্ছে। কিন্তু মেয়ে আমার সাড়া দিচ্ছে না। নেতিয়ে আছে ঘাড়ের ওপর। একইরকম। মধ্য গ্রীষ্মের দুপুরবেলার রোদ আর ঘামে ভেজা পিচঢালা পথ চকচক করছে। মেয়ের গায়ে আঁচ লাগে কি রোদের। ঘাড় থেকে মাথা উঠায় আস্তে আস্তে। বুঝাই যাচ্ছে, নিদারুণ কষ্ট হচ্ছে ওঁর। মালার মত গলায় জড়ানো হাত দুটো আরও নিবিড় করে।

মেয়ে : বাবা! আম্মু আর আমি নিউমার্কেটে যায়ে একটা দোকানে বসে পিৎজা খাই না! চল আমরা ঐ দোকান থেকে পিৎজা খায়ে আসি।

কিন্তু এই রোদে জ্বরতপ্ত মেয়েটাকে নিয়ে নিউমার্কেট যাই কীভাবে! তার ওপর যা জ্যাম পড়বে! রোদ, জ্যাম, বিকট শব্দ হর্ণের, গরম, এইসবের ধকল সইতে পারবে না জ্বরে পোড়া মেয়ে আমার। আমি মেয়েকে এইসব বুঝাই। এবং বিকল্প প্রস্তাব খাড়া করি।

আ. : আম্মা, দেখছ না বাইরে কত রোদ! এত রোদে রিকশা করে নিউমার্কেটে গেলে তোমার জ্বর আরো বেশি হয়ে যাবে যে! চল আমরা তোমার প্রিয় চিকেন পোলাও নিয়ে বাসায় যাই। বাসা থেকে খেয়েদেয়ে তোমার আম্মুকে দেখতে আসব আবার!

মেয়ে আবার ঘাড়ে মাথা রেখে নীরব থাকে।

লাল মিয়া বিরিয়ানি ঘর থেকে চিকেন পোলাও এর একটা লাল প্যাকেট নিয়ে বাসায় ফিরেছি। মেয়েকে বিছানায় বসিয়ে দুইবারে দুই চিমটি ভাত তুলে দিয়েছি ওর মুখে। মেয়ে এক ঢোক খাবারও গিলে নি। চিবিয়ে চিবিয়ে গালে জমা করেছে।

মেয়ে : বাবা পানি!

আমি মেয়ের প্রিয় লাল মগে পানি ঢেলে ওর সামনে ধরি ত্বরিৎ। দুই ঢোক পানি ও খায়। পানি গলা বেয়ে বুক অতিক্রম করে নি। বমি হয়ে ফিরে আসে। ভাসিয়ে দেয় বিছানা, খাবার প্লেট। বিব্রত হয় মেয়ে আমার।

মেয়ে : বললাম না বাবা, আমার খেতে ইচ্ছে করছে না, গিলতে পাচ্ছি না!

কাঁদতে শুরু করে মেয়ে।

আ. : আর খেতে হবে না আম্মা। কিছু হয় নি… আম্মা কেঁদো না! চলো আমরা একটু শুয়ে থাকি তাহলেই ভালো লাগবে।

বমিময় প্লেট, বিছানার চাদর, এইসব গুটিয়ে মেয়ে আর আমি শুয়েছি।

আ. : আম্মা, চোখ বন্ধ করে থাকো; ভালো লাগবে!

আমার বুকে ঝাপ্টে রেখেছি মেয়েকে। জ্বর বাড়ছে ওর। ইস্ এত তাপ উঠছে… জ্বরের ঘোরে, ক্লান্তিতে মেয়ে আমার ঘুমিয়ে গেল। ইস্ ! গা পুড়ে যাচ্ছে একদম! মেয়ে আমার কুলাবে কেমনে! ঘুম থেকে উঠলেই ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।

সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে আছি মা ও শিশু হাসপাতালের ইমারজেন্সি দরোজায়। দরোজায় স্টিকার সাঁটা ‘প্রবেশ নিষেধ’। এখানে আলাদা কোন কাউন্টার নাই। বন্ধ দরোজাটা কাঠের, অথচ হাসপাতালের টিকেট এখান থেকেই নিতে হবে।

কীভাবে!

এই হাসপাতালেরই তিন তলা থেকে নেমে এসেছেন আমার শ্বাশুড়ি। সেখানে আমার বউ ভর্তি আছে। এখনো প্রসব ব্যথা ওঠে নি। সন্তান প্রসবের জন্য ডাক্তারি প্রক্রিয়া চলছে। জানালেন আমার শ্বাশুড়ি।

ইমারজেন্সি দরোজায় অপেক্ষা করছি ঝারা দশ মিনিট। বার কয়েক টোকা মেরেছি বন্ধ দরোজায়। লোকজন কই?

অগত্যা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করি। ভেজানো দরোজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়ি আমরা। হাসপাতালের একজন মহিলা কর্মচারী (ম.ক.) আয়ার সাথে জম্পেশ আড্ডা বসিয়েছে। আমাদের দেখে ম.ক.-র চোখ কপালে উঠে। দুই ভ্রুর মাঝে ভাঁজ পড়ে।

ম.ক. : কী ব্যাপার আপনেরা এখানে ঢুকছেন কেন?

আ. : ডাক্তার দেখানোর টিকেট এখান থেকেই দেওয়া হয় না?

ম.ক. : সকালে আসেন না কেন, সকালে কী করেন? ইমার্জেন্সি টাইমে আসেন!

আমি দাঁড়িয়েই থাকি মেয়েকে ঘাড়ে ফেলে নিরুত্তর।

ম.ক-র অপ্রসন্নতা চাপা থাকছে না, মুখের ওপর উদ্ভাসিত হচ্ছে, কিন্তু দূর হচ্ছে না, আমার ওপর কি শাস্তি আরোপ করা যায় তাও খুঁজে পাচ্ছে না বোধ হয়! সে তাই আয়ার দিকে ফিরে। শাস্তি ঘোষণা করে আয়া। আমার দিকে আঙুল তোলে।

আয়া : আপনে বাইরে যান।

আমি মেয়েকে ওর নানীর কোলে দিয়ে প্রস্থান করি বাকহীন।

দরোজার সামনে বোধ-বুদ্ধিশূন্য অচল মাথা নিয়ে সাত মিনিট অপেক্ষার পর নাতি কোলে ও টিকেট হাতে বেরিয়ে আসেন আমার শ্বাশুড়ি। চার তলায় যেতে হবে।

আমি শ^াশুড়ির কাছ থেকে প্রথমে মেয়েকে নিই পরে টিকেট দেখতে চাই। টিকেট হাতে নিয়ে প্রসন্ন হলো মন। ডিজিটাল বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালে ডিজিটাল টিকেট। প্রিন্টেড কপি বাংলায় লিখিত নয়। প্রতিটি বর্ণ রোমান। এমনকি হাসপাতালের নামও লেখা গঅ ঙ ঝঐওঝঐট ঐঙঝচওঞঅখ। খুব ভালো! কিন্তু খারাপ হলো আমার মেয়ের নাম, মেয়ের বাবার নাম ভুলভাবে লেখা। বাঙলা শব্দে নাম তো; প্রশিক্ষিত ম.ক. রোমানে খাপ খাওয়াতে পারে নি। সুমিষ্ট শরবতে দুই দানা বালির মত দাঁতের তলে খিচখিচ করছে চঅঞওঊঘঞ’ঝ ঘঅগঊ, ঋঅঞঐঊজ’ঝ ঘঅগঊ.

চারতলায় উঠে গেছি। হাসপাতালের এই ওয়ার্ডের পাশে একটি কাঁচঘেরা ঘরে ডাক্তার আর নার্স বসেন। ইমার্জেন্সি রোগী দেখেন। এই মুহূর্তে অবশ্য কাঁচঘরে কেউ নাই। মুখোমুখি পড়ে আছে দুটি টেবিল, চারটি চেয়ার। টেবিলের ওপর ঘামের আঠায় ধুলো বসে যাওয়া শ্যাওলা রঙের ফাইল স্তূপাকারে সাজানো। স্টেইনলেস স্টিলের সসপেনে রক্তপুঁজ লাগা তুলো ভাসছে। একটি খোলা রেজিঃ খাতা চিৎ করা। তার ওপর খাপ খোলা হলুদ রঙের বলপেন। কাঁচঘরে ঠাসাঠাসি এইসব বিবিধ আসবাব ফ্যাকাশে আলোয় মিটিমিটি করছে। কিন্তু কোন মনুষ্যির দেখা নাই। রোগী দেখবে কে?

আমার আবার কাঁচঘরে প্রবেশ নিষেধ। শ্বাশুড়ির কোলে মেয়েকে দিয়ে কাচের দেয়ালের যেখানটায় কাউন্টার মত কাটা সেখানে থুঁতনি রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম বাইরে। শ্বাশুড়ি মেয়েকে নিয়ে অপ্রস্তুতভাবে ভিতরে যান। কক্ষের ভিতরে পশ্চিম দিকের কোণায় খোলা দরোজা এক দেখা যায়। দরোজা দিয়ে ভেসে আসছে উজ্জ¦ল সোনালি আলো। এবার উড়ে এলো হাসির হল্লা। আমি শ^াশুড়িকে ইশারায় দরোজার দিকে এগিয়ে যেতে বললাম। তিনি ভারি পায়ে দরোজার সামনে পৌঁছুতেই বেওয়ারিশ মাদি কুত্তার (বে.মা.কু.) মত কেউ খ্যাঁক খ্যাঁক করে ওঠে।

বে.মা.কু. : এই কী অইলো! ভিতরে আসতেছেন ক্যা! যান, যান বাইরে দাঁড়ান।

আমার শ^াশুড়ি মেয়ে কোলে দাঁড়িয়ে যান স্তব্ধ। স্তব্ধতার ভঙ্গি দেখে অনুমান করি বে.মা.কু.-র দাঁতমুখ ভেঙচানোর বীভৎসতা। পিছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে কাচের এপারে অস্পষ্ট আমাকে বিমর্ষ দেখে নেন শ^াশুড়ি। কোন ভরসা খোঁজেন আমার ওপর অথবা কী নিদারুণ অপ্রস্তুত অবস্থায় পতিত হয়েছেন তারই আভাস জানান আমাকে। তিনি দরোজার সামনে দাঁড়িয়েই থাকেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

খানিক বাদে কাফনের কাপড়ে বানানো খাঁচায় মস্তক আটকানো এক মুখ দরোজা দিয়ে আমাদের দিকে উঁকি দেয় এবং অদৃশ্য হয় পূর্ববৎ। আমরা যেমন, তেমনি থাকি। বারান্দায় পদধ্বনি শুনি মানুষের আসা-যাওয়ার। কখনো খটখট, কখনো ছ্যাঁচড়ানো খিচখিচে আওয়াজ, কখনো খুব ভারি দ্রিম দ্রিম। শুনতে পাই নিচু শব্দের ভাসমান সংলাপ টুকরো টুকরো।

কাচের দেয়ালে সাঁটা পোস্টারে এবার রাখি চোখ। বিশ^মাতৃদুগ্ধ দিবসের পোস্টার, শিশুস্বাস্থ্য সংরক্ষণে বিশেষ প্রশিক্ষণের বিজ্ঞাপন। পোস্টারের রঙ-রেখা বাণী কিছুই মগজে কোন আকার পাচ্ছে না। তাকিয়ে থাকার জন্য তাকিয়ে থাকা!

ওয়ার্ডে পরিবেশন হচ্ছে রাতের খাবার। খাবার ট্রলির চাকার শব্দ এত কর্কশ কেন? থাল-বাসনের ঠোকাঠুকি— এই যা, কারও হাত থেকে বুঝি কাচের গ্লাস পড়ে খান খান হলো।

বাম পায়ে ভর রেখে হেলনা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ… ঝিম ধরে যাচ্ছে পা, গোঁড়ালিতে ব্যথা ব্যথা করছে। পায়ের ওপর ভর পাল্টানো দরকার। বাম পা থেকে ডান পায়ে ভর স্থানান্তর করছি আর দেখছি উজ্জ্বল সোনালি আলোর কামরা থেকে খটখট শব্দে বেরিয়ে আসছেন আপাদমস্তক কাফনের কাপড়ে মোড়া মোটা সাইজের এক সিস্টার (মো.সা.সি.)। তিনি এসে বসলেন উত্তর দিকের টেবিলের সামনে দক্ষিণমুখো চেয়ারে। বসেই কাঁচভাঙ্গা শব্দে হাঁক ছাড়েন আমার শ্বাশুড়ির প্রতি।

মো.সা.সি. : কই, টিকেট কই— টিকেট দেন।

আমার শ^াশুড়ি মেয়েকে ঘাড়ে ফেলে দোল খাওয়াচ্ছেন। এইরে, আমি তো তাঁর হাতে টিকেট দিতে ভুলে গেছি। টিকেট রয়ে গেছে আমার হাতেই। আমি তাড়াহুড়া করে কাউন্টারের খোপে ঢুকিয়ে দিয়েছি টিকেটসুদ্ধ হাত। বিনয়ে বিগলিত আমি মো.সা.সি-কে টিকেট নিতে অনুরোধ জানাই।

আ. : আপা, এই যে টিকেট। ধরেন একটু…

মো.সা.সি আমাকে পাত্তা দিলেন না। চকিতে আমার উপরে শ্যোনদৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। তারপর চিৎ করা রেজিঃ খাতায় শুয়ানো হলুদ বলপেন আঙ্গুলের চিমটায় গাঁথলেন। বলপেন ধরা হাত নিজ গালে দিলেন ঠেকা। আমার হাত থেকে টিকেট নিলেন না। বাম হাত তার সম্পূর্ণ প্রসারিত না করেও আমার হাত থেকে টিকেট নিতে পারতেন। কিন্তু নিলেন না। আমাকে ভস্ম করা দৃষ্টি পড়ল এবার শ^াশুড়ির ওপর। আর দাঁতমুখ খিঁচে আদেশ করলেন—

মো.সা.সি. : টিকেট ছাড়াই ভিতরে আইসা খাড়ায় রইছেন ক্যা? যান টিকেট নিয়ে আসেন।

একবার ইচ্ছে হলো বলি, এই যে মো.সা.সি. বেওয়ারিশ মাদী কুত্তার মত অমন খ্যাঁক খ্যাঁক করছেন ক্যা? আমার হাত থেকে টিকেট নিতে কী সমস্যা! দুধে টান লাগে?

এমনই অবস্থা, অথচ আমার শরীর ঝিম ঝিম করছে। রাগে কি বিষের ভারে জিভটা নাড়াতে পাচ্ছি না! ঠোঁটদুটি কাঁপলো কি কাঁপলো না বুঝতে পারলাম না। চোখের ওপর ঘন কালো মেঘ চেপে বসল। কোমরে লাগল স্পর্শ শীতল কিছুর। শিহরিত হলো শরীর। এই শিহরণ গা করতে ইচ্ছে হলো না। তবু পরক্ষণেই মনে হলো—

থাক, কী হবে এইসবের সাথে ঝগড়াঝাটি করে। তাছাড়া আমার মেয়েটার অসুখ। ওর জন্য ডাক্তারি পরমর্শ প্রয়োজন। এখন ঝামেলা পাকিয়ে কাজ নাই। আমি স্বভাবতই চুপ থাকলাম। আমার শ^াশুড়ি উত্তরদিকের দরোজা পেরিয়ে বারান্দা হেঁটে আমার হাত থেকে টিকেট নিয়ে আবার বারান্দা হেঁটে উত্তরদিকের দরোজা পেরিয়ে মো.সা.সি.-র টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে ওর দিকে টিকেট বাড়িয়ে ধরেন।

তাচ্ছিল্যভরে টিকেট নিলেন মো.সা.সি। রেজিঃ খাতায় কলম ঘোরালেন। এবং রেজিঃ খাতা ও টিকেটসহ হেলেদুলে উপস্থিত হলেন উজ্জ্বল সোনালী কক্ষের দরোজার সামনে।

মো.সা.সি. : ম্যাডাম, একটা রোগী— বিদেয় কইরে দেন। নইলে আবার ঘর ভইরে যাব রোগীর পালে, কাজ করা যাইব না।

দক্ষিণদিককার টেবিলে মো.সা.সি. রেজিঃ খাতা ও টিকেট ছুঁড়ে দিয়ে ফিরে এলেন তিনি তার উত্তর দিককার টেবিলের সামনের চেয়ারে।

আবার অপেক্ষার পালা আমাদের। রোগীর পালের সদস্য আমরা। আমাদের একটু-আধটু অপেক্ষা করা নিয়তি। কপাল মেনে চুপটি করে অপেক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা। মেয়ে আমার বোধ হয় নানীর ঘাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কোন সাড়া-শব্দ করছে না কেন! নাকি জ¦রটা আরো তীব্র হলো! আমার শ^াশুড়ি পূর্ববৎ পায়ে পায়ে মেয়েকে দোল খাওয়াচ্ছেন।

কী ভাগ্য আমাদের! এবার বেশি অপেক্ষা করতে হলো না। অপেক্ষার প্রস্তুতি শেষ হতে না হতেই ডাক্তার ম্যাডাম (ডাম্যা.) কক্ষে প্রবেশ করেন এবং দক্ষিণদিককার টেবিলের সামনে উত্তরমুখো চেয়ারে বসেন। আমার শ^াশুড়ি পায়ে পায়ে ডাম্যা-র দিকে এগিয়ে যান। দাঁড়ান তার টেবিলের পাশে। কী আশ্চর্য! তিনিই যে ডাম্যা আমাদের কাউকে চেনাতে হলো না। অদ্ভুত ঢঙে, আবহে আমরা টের পেয়ে গেলাম— তিনি ডাম্যা! খাপখোলা সাদা কলম ও টিকেট হাতে ডাম্যা শ^াশুড়ির দিকে চোখ ফেরান। ইশারায় বসতে বলেন। তাঁর টেবিলের পাশে প্লাস্টিকের টুল আছে একটি। টুলের ওপর বসেন আমার শ^াশুড়ি।

ডাম্যা : কী হয়েছে?

শ্বাশুড়ি : জ¦র…

ডাম্যা : কখন থেকে?

শ^াশুড়ি : আইজকেই, সকাল তনে…

রীতিমত আঁৎকে উঠি আমি। ভুল তথ্য দিলেন আমার শ^াশুড়ি। জ¦র তো সকাল থেকে নয়, গত রাতের প্রথম প্রহর থেকে মেয়ে আমার জ¦রাক্রান্ত!

ডাম্যা : কয়বার জ¦র উঠেছে?

শ^াশুড়ি : দুই তিন বার…

উদ্বিগ্নতায় আমি এত আচ্ছন্ন হলাম! মনে হলো মেয়ের আদ্যোপান্ত রোগ বর্ণনা নিখুঁতভাবে দিতে না পারলে সমূহ সর্বনাশ হয়ে যাবে। আর যথাযথ ব্যবস্থাপত্রের জন্য পুরো কেস স্টাডিটাই জানানো দরকার না! আর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জানি আমি। কারণ গত দুই দিন মেয়েকে আমি বুকে ঝাপ্টে রাখছি অষ্টপ্রহর। আমি ডাম্যা-র দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সচেষ্ট হই।

আ. : ম্যাডাম, আমি একটু বলব?

ডাম্যা আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। এটি প্রশ্রয়ের নয়, আঘাতের। যেন স্তব্ধ হয়ে যাই। কিন্তু আমি স্তব্ধ হই না। আসলে দৃষ্টির ভাষা পড়ার অবস্থায় নই আমি তখন। ডাম্যা-র দুই ভ্রু কুঞ্চিত হলো কেন— তারও মর্মোদ্ধার করতে যাই না আমি! রোগ বর্ণনা শুরু করেছি—

আ. : গতকাল আগারাতে ওর প্রথম জ¦র আসে। ঘণ্টা দুই পরে জ¦র নেমে যায়। তারপর শেষ রাতের দিকে আবার জ¦র আসে, ভোরের দিকে ছেড়ে যায়। আজকে আবার সকাল দশটা সাড়ে দশটা নাগাদ প্রথম জ¦র আসে একটা নাগাদ ছেড়ে যায়। দুপুরে খাওয়াতে গেলে পানি মুখে দেওয়া মাত্র বমি করে ফেলে। গতরাত থেকে এখন পর্যন্ত কিছু খায় নি। বমি অবশ্য একবারই করেছে। বিকেল থেকে আবার একটানা জ¦র। আর যখন জ¦র আসে মনে হয় গা পুড়ে যাচ্ছে, কোলে রাখা যায় না এত তীব্র হয় তাপ। বুকের মধ্যে কফ আছে। ঘড়ঘড় আওয়াজ পাওয়া যায়। ঠা-ায় সর্দিতে নাক বন্ধ হয়ে আছে। ঠিকমত নিঃশ^াস নিতে পারে না, মুখ দিয়ে নিঃশ^াস নেয়। দেখি ওর চোখ দিয়েও কেমন পানি পানি মত আসে। চোখমুখ টোপাটোপা লাগে…

আমি এক নিঃশ^াসে রোগ বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছি। ডাম্যা তাঁর মত ওষুধের নাম লিখলেন। লেখা শেষে আমার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টি, তেমনি কুঞ্চিত ভ্রু!

ডাম্যা : নতুন কী বললেন?

আচমকা তার প্রশ্নবাণে থ’ হয়ে গেলাম। তাঁর দৃষ্টিতে, কুঞ্চিত ভ্রুতে এমন কিছু তাচ্ছিল্য আঁকা ছিল, আর বলায় এমন শীতলতা— বরফ হওয়া ছাড়া আমার আর গত্যন্তর কী!

ডাম্যা আমার শ^াশুড়ির দিকে টিকেট বাড়িয়ে দিলেন।

ডাম্যা : ওষুধগুলো খাওয়াবেন। জ¦র না ছাড়লে তিন দিন পর নিয়ে আসবেন। সকালে এসে নিচে দেখাবেন! ইমার্জেন্সিতে আসবেন না।

ডাম্যা-র তাচ্ছিল্য, শীতলতা স্তব্ধ করে আমার শ^াশুড়িকেও। ব্যবস্থাপত্র হাতে পাবার পরও ঠাহর করতে পাচ্ছেন না কী করবেন! বরফচাপা মৃতমৎস্যের মত তাকিয়ে থাকেন ডাম্যা-র মুখের দিকে। আমার কোমরে অবস্থিত সেই বরফ শরীর টানটান হয়ে মেরুদ- বেয়ে উঠে গেছে মগজের খোলে। কানের কাছে ঝাঁঝাঁ করছে। শিহরণে শিহরণে ঝিম ধরেছে শরীর। ঝিমঝিমানির ভিতর থেকে কিছু কথার বাতাস ভুরভুরি কাটে।

ডাম্যা, আমি ডাক্তার নই— মেয়ের বাবা! জ¦র উঠানামার প্রবণতা, অন্যান্য উপসর্গ প্রভৃতির বর্ণনার মধ্যে নতুনত্ব আছে কি নাই, কতটুকু দরকার, কতটুকু অপ্রয়োজনীয় এটা তো আমি জানি না। আমি শুধু জানি মেয়েটা আমার কীভাবে অসুস্থতায় কষ্ট পাচ্ছে। বাবার ইমোশনকে আপনে এইভাবে অপমান করতে পারেন না! আপনের এরকম বেয়াদবের মত আচরণ করার কোন অধিকার নাই…

আরও কঠিন কঠিন ডায়লগ ভুরভুরিও কাটতে পারল না, অতলেই মিলে গেল!

আমার মেয়েটা এখনো ওর হাতের মধ্যে। বউটা এই হাসপাতালেই প্রসব ব্যথা নিয়ে ভর্তি। সেখানে দুই দুটি জীবন এদের মুঠোয়। না বাবা, কোন সংঘর্ষে কাজ নাই।

চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। কাচের ভিতর দিয়ে দেখছি অস্বচ্ছভাবে আমার শ^াশুড়ি ডাম্যা-কে কি যেন বললেন আর ডাম্যা দাঁত-মুখ ভেঙচালেন। কিছুটা ত্রস্থভাবেই সেই কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন আমার শ্বাশুড়ি। আমি মেয়েকে কোলে নিতে নিতে জানতে চাইলাম : কী কইলো ডাক্তার?

শ্বাশুড়ি : আমি কইলাম মেয়েটার মা, বাচ্চা হবার জন্য এই হাসপাতালে ভর্তি। শুইনে অইরকম করল, কইলো— আমি কী করমু!

ব্যথায় আমার তলপেট ছিঁড়ে যাচ্ছে। বুঝতে পাচ্ছি এখনই আমি বিবমিষায় খাবি খেতে থাকব। আমার শ^াশুড়িকে তাঁর মেয়ের কাছে ফিরে যেতে বললাম। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালের গেট পেরিয়ে কংক্রিট দালান বেষ্টিত আকাশের তলে ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে পড়ি। মনে মনে ডাম্যা-কে কী প্রকার বাৎচিতে ঘায়েল করা যায় তাই ভাবছি। বিব্মিষার দাপট ভাবনায় ছুরি চালাচ্ছে। তবু আমি ভাবনায় তলিয়ে যেতে নিবিষ্ট থাকি।

অবশ্য এখন কোন প্রকার ভাবনার অতলে তলিয়ে যাবার আগেই একজন ত্রাতা আমাকে তোলে আনেন। মাঝ বয়েসী মহিলা পুতুল।

মা.ম.পু : আপনের ওয়াইফ আসবে না?

প্রশ্নটা যে আমাকে উদ্দেশ্য করেই বুঝতে যেন একটু দেরী হলো। বুঝে ভাবনার অতল থেকে ভেসে ওঠে তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেই।

আ. : না, চাকরি করে— আবার বাসায় ছেলেমেয়ে দুটো ছোট…

মা.ম.পু : তাই বলে, হাজব্যান্ড হাসপাতালে— আসবে না!

আ. : আমিই মানা করেছি…

এভাবে আমি মা.ম.পু-র কাছে কৈফিয়ত দেই। কিন্তু তিনি তুষ্ট হন না। আমাকে হাসপাতালের ঝক্কি, আরেকজন সাথীর প্রয়োজনীয়তা এইসব বিষয় ওয়াকিবহাল করতে থাকেন।

মা.ম.পু : রোগী মানুষ হাসপাতালে একা একা থাকা যায়! কত কী-র দরকার পড়ে। এখানে কাউকে দিয়ে কিছু আনাবেন না, পাঁচ টাকারটা দশ টাকা লাগব। ওষুধপত্রও নিচ থেকে আনাবেন, কমিশন পাবেন— এদের এইখানে কমিশন ত দেয়ই না দামও বেশি ধরে, সার্ভিস চার্জ আছে…

আমি মুখে হাসি ঝুলিয়ে অভিভূত ভাবে তাঁর পরামর্শ গিলতে থাকি।

কতক্ষণ?

ক্লান্তি লাগছে! থামানো দরকার তাঁকে।

আ. : রাতে আমার বন্ধু আসবে। ও সব ঠিক করে দিয়ে যাবে।

মা.ম.পু. : পানি-টানি কিছু লাগলে বলিয়েন। আমার একদম বাসা থেকে আনা পিউর ইটের পানি। দুপুরের খানা-টানার কী ব্যবস্থা? হাসপাতাল থাইকে ত খাবার দিবো রাত্রিবেলা।

আ. : জি¦! সমস্যা নাই।

এবার সত্যি সত্যি আমি বিনয়ে গলে যাই। এটা তো সত্যি আমি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি ঠিক, কিন্তু সাথে কিছুই আনি নি। অবশ্য কাঁধের ঝোলা ছাড়া।

আচ্ছা, আমার এখন কী কাজ?

যাহ্ শালা, হাসপাতালের নীল রঙ সাদা বিছানায় আধশোয়া হয়ে পড়ে থাকা ছাড়া এখন দেখি কোন কাজই নাই আমার! কাঁধের ঝোলা হাতড়ে দেখি একটি কলম আর কিছু কাগজপত্র ছাড়া কিছুই নাই! অন্যসময় ঝোলার ভিতর এক আধটা বইপত্র থাকে। আজ নাই! থাকলে শুয়ে শুয়ে পড়া যেত। কী করি?

ঝোলার ভেতর থেকে কাগজগুলো বিছানায় ঢাললাম। একটি ভাঁজ করা সাদা কাগজ পেলাম। তখনই মনে এলো বহুদিন কিছু লিখি না! এখন এই হাসপাতালের বিছানায় অখ- নীরবতা ও অবসরের মধ্যদুপুরে আমি কিছু লিখে সময়টা অতিবাহিত করতে পারি।

বাকি কাগজগুলো ঝোলায় ঢুকিয়ে ভাঁজ করা সাদা কাগজ আর কলম নিয়ে আধশোয়া হলাম। ভাবছি একটা গল্প শুরু করা যাক। কিন্তু কী গল্প! কীভাবে শুরু করি?

চকিতে মনের মধ্যে এলো এই বাক্যবন্ধ “আবার আমি গল্প লিখতে বসেছি!”

লিখলাম।…

তারপর?

দ্বিতীয় বাক্যটি আর কার্যকারণ সূত্রে কোনভাবেই মনঃপুত হচ্ছে না। তবে এমন একটি বাক্য আমি কেন লিখতে গেলাম! কে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিল?

মনে পড়ে সৈয়দ হকের একটি কবিতা শুরু হয়েছে এইভাবে, হুবহু মনে পড়ছে না, তবু এই রকমই বোধ হয় পংক্তিটি— কতদিন লিখি না আমি কোন কবিতা…

আমি বরং হাসপাতালের টুকরো টুকরো সংলাপ, আপাত বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিছু মুখের স্কেচ চিত্রনাট্যের মত লিপিবদ্ধ করি।

আমার লিখিত বাক্যবন্ধটির ওপর কলমের হিজিবিজি কাটতে লাগলাম। দেখতে দেখতে হিজিবিজি কালির তলে চাপা পড়ে গেল বাক্যটি।

ওয়ার্ডটা আবার নৈঃশব্দে ডুবে গেছে। তাকিয়ে দেখছি মাঝবয়েসী মহিলা পুতুল তাঁর ন্যাকা-ন্যাকা বাবার পাশে দিবানিদ্রায় গেছেন। ন্যাকা-ন্যাকা বাবাও ঘুমে। আর বৃদ্ধা পুব দিকের দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝের ওপর পা গুটিয়ে বসে আছেন। দখিনা জানালা দিয়ে একফালি রোদ তাঁর বাম গালে পড়েছে। ডান গালে তাঁর ডান হাত। দৃষ্টি সমুখে স্থির। তাঁর ছবিতে যে হাহাকার তা বেশিক্ষণ সহ্য করা যায় না। কোন ভাষায় ব্যক্ত করা যাবে বলেও মনে হয় না। গতানুগতিক কিছু কথা হয়তো লেখা যায়!

যেমন : বৃদ্ধার মুখে হাজারে হাজারে বলিরেখা। প্রতিটি বলিরেখায় বহু শতাব্দীর প্রাচীন অন্ধকার!…

ধ্যাত! গল্প লেখা আমার কম্ম নয়। ও সৃষ্টিকর্তার সর্বশেষ নেশা!

দুইজন নার্স এলো আমার কাছে। একজন ঘি-রঙ সাদা বাক্সের মত একটি মেশিন ট্রলিতে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে এলো। অন্যজন পকেট থেকে বের করে তিনটি সিরিঞ্জ প্যাকেট। সিরিঞ্জ দিয়ে আমার হাত থেকে তিন সিরিঞ্জ রক্ত তুলে নেন তিনি। বাকিজন বিছানার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে সমান করে বিছানা। এবং আমাকে শুইয়ে ই.সি.জি করেন।

নার্সরা চলে গেল। আমারো ক্লান্তিবোধ হচ্ছে ভীষণ। গল্প লেখার ভাবনাশ্রম সহ্য হচ্ছে না।

শামিম ভাইকে ফোন করে আসতে বলতে হবে।

আ. : হ্যাঁ, শামিম ভাই, ব্যস্ত?

ফোনের ও পাড়ে শামিম ভাই (শা.ভা.) : না, বল।

আ. : আমি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি, ডাক্তার বলল তাই ভর্তি হয়ে গেলাম। আপনে অফিস থেকে বের হবেন কয়টায়?

শা.ভা. : এই পাঁচটায়। কেন— কী করতে হবে বল।

আ. : আপনে অফিস থেকে বের হয়ে আমার বাসায় যান আর আপনের বাসায় যান— বাসা থেকে এক বোতল পানি, লুঙ্গি-গামছা আর এক আধটা বই সাথে নিয়ে হাসপাতালে চলে আসবেন। রাতে আমার সাথে সম্ভব হলে থেকে যাবেন।

শা.ভা : আচ্ছা আসব। কোন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিস?

আমি তাঁকে হাসপাতালের ঠিকানা, ওয়ার্ড নম্বর, বেড নম্বর জানিয়ে ফোন রাখলাম।

পাশ ফিরে শুয়েছি। ফাফুর লাগছে। চোখের ওপর ঘি-রঙ সাদা দেয়াল আছড়ে পড়েছে। মনের ভিতর নিঃসঙ্গতার উথাল-পাথাল হাহাকার। কত কী মনে পড়ছে! আমার স্মৃতি খুব দুর্বল। কত ঘটনা, মানুষ, পাঠ ভুলে যাই! তবু এখন কতিপয় বাক্যবন্ধ মনের মধ্যে অবিকল আকার পেয়ে উদাস করে দিচ্ছে সময়!

বাজল দুপুরের ঘণ্টা। মালীরা গেল চলে। সমস্ত বাগানটা নির্জন।…

আমি নীরজা নই! তবু নীরজা হয়ে যাই?

… নীরজা দূরের দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে দুরাশার মরীচিকাও আভাস দেয় না, যেখানে ছায়াহীন রৌদ্রে শূন্যতার পরে শূন্যতার অনুবৃত্তি।

আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি।…

শামিম ভাই ডেকে তুলল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ।

মাশাল্লাহ। হাসপাতালের বিছানায় কী ঘুমটাই না ঘুমিয়েছি দিনের বেলাতেই।

শা.ভা. : উঠ! রাতের খাবার দিয়ে গেছে হাসপাতাল থেকে। দুপুরে তো বোধ হয় খাস-টাস নাই কিছু। যা ফ্রেশ হয়ে এসে খেয়ে নে।

দুপুরে খাওয়া হয় নি। খিদে তো লেগেছেই। তবে পানি পিপাসাটাই বেশি তীব্র বোধ হচ্ছে।

আ. : পানি আনছেন? পানি খাব আগে।

আমার বেডের পাশে ফাইল ক্যাবিনেট মত টেবিল থেকে শামিম ভাই পানির বোতল আমার হাতে দিল। আমি বসে দুই ঢোক পানি গিললাম। বোতল রাখতে গিয়ে দেখছি টেবিলের ওপর উদোম ভাতের প্লেট।

আ. : প্লেটটা ঢেকে রাখেন নি!

শা.ভা. : আমাকে তো এক্সট্রা প্লেট আনতে কস নাই। এখানে একটা প্লেটে করেই খাবার দেয়। কেবলি দিয়ে গেল, হাত-মুখ ধুয়ে এসে খেয়ে নে, যা ওঠ।

বাথরুম কাম টয়লেটে ঢুকে মন খারাপ হয়ে গেল। সবই ঠিক আছে শুধু টয়লেটটা হাই কমোটের। গা ঘিন ঘিন করে আমার এইরকম গণ টয়লেটে হাই কমোট দেখলে। যে কয়দিন হাসপাতালে থাকব ভুগতে হবে, বুঝেছি।

হাই কমোটে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুতছি। দেখতে দেখতে কমোটের জমানো পানি লাল হয়ে গেল। ভাতের মাড়গন্ধ নাকে ঝাপ্টা দেয়। ফ্লাশ ছেড়ে দিয়ে বেসিনে আসি। চোখে অনেকবার পানির ঝাপ্টা দেই। গলা-ঘাড়-চুল পানির ঝাপ্টায় ভিজিয়ে ফেলি। আয়নায় নিজের চেহারা মুবারক দেখি। দেখার কিছু নাই, তবু অভ্যাস! দেখতে নেশার মত ভালো লাগে তাই দেখি!

বেডে ফিরে এসে ভাতের প্লেট নিয়ে বসি। সাদা ভাতের ওপর একটি মাছের টুকরো, ঝোল আর অল্প একটু লাল শাক ভাজি। এই হলো রাতের খাবার। কোন অমৃতের মত লাগবে খেতে কে জানে!

আ. : শামিম ভাই, আপনেও একটু খান?

শা.ভা. : তুই খা, নিচে হাসপাতালেরই ক্যান্টিন আছে। আমি পরে খেয়ে নেব।

শামিম ভাই আমার মুখোমুখি বসে আছে। তাঁর ঠোঁটের ওপর এতক্ষণে আমার চোখ পড়ল। নিচের ঠোঁটের বাম পাশটায় থ্যাঁতলে গেছে একদম। ঠোঁটের ঐ অংশটা দেখতে এখন টকটকে চেরি ফলের মত আগুন মনে হচ্ছে। যদিও তা ব্যথার দাগ, তাজা।

আ. : আপনের ঠোঁটে কী হয়েছে?

শা.ভা. : কিছু না এমনি।

আ. : এ্যাকসিডেন্ট করেছিলেন, নাকি—

শা.ভা. : তুই খা আগে।

লাল ঝোলে সাদা ভাত মেখে লাল করেছি। এক লোকমা ভাত মুখে পুরি। না, একেবারে মন্দ নয় খাবার। খাওয়া যাবে। একটু মাছ ভেঙে মুখে দেই। ঠিক আছে— চলবে।

শামিম ভাই খুব নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠে : মারামারি করেছি আসার সময়।

ওর কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে যাই।

আ. : কোথায়?

শা.ভা. : বাসের মধ্যে; হেল্পারের সাথে। ভাড়া দেওয়া নিয়ে ক্যাচাল লাগছিল…

আমি আবার ভাত নাড়াচাড়া করতে শুরু করি। শামিম ভাই বলে যাচ্ছে আমি শোনার চেষ্টা করছি। যদিও ধোঁয়া বের হচ্ছে কান দিয়ে!

শা.ভা. : আমি ফোনে কথা বলছিলাম। হেল্পার এসে ভাড়া চাইল, আমি ইশারায় বললাম— পরে। ও পিছনের দিকে ভাড়া কাটতে চলে গেল। আমি ফোনে কথা বলছিই। ও পিছন দিক থেকে এসে আবারো আমার কাছে ভাড়া চাইল। আমি তখন কথা বলতে বলতেই পকেট থেকে টাকা বের করে ওর হাতে বিশ টাকার একটা নোট দিলাম। ও নিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে বাস একটা স্টপেজ পার হলে হেল্পার ভাড়া কাটতে কাটতে আবার আমার কাছে এসে ভাড়া চায়। আমি তখনো ফোনে কথা বলছি। এবার তাঁকে ইশারায় বলি— ভাড়া হয়েছে। সে পিছন দিকে চলে যায়। আমি ফোনে কথা শেষ করি। তখন সে এসে আবার ভাড়া চায়। আমি বলি : ভাড়া দিয়েছি তো। সে বলে : আপনে তো ফোনে কতা কইতেছিলেন, ভাড়া কখন দিলেন। তারপর আমি বলি ভাড়া দিছি সে বলে দেই নাই। এই নিয়েই কথা কাটাকাটি। এক পর্যায়ে হেল্পার আমার মুখে ঘুষি মেরে বসে। আর লেগে গেল মারামারি।

আ. : বাসের অন্য যাত্রীরা …

শা.ভা. : আমার পাশের সিটের যাত্রী তো দেখেছেই আমি ভাড়া দিয়েছি। কিন্তু তিনি কোন কথাই বললেন না!

আ. : আবার দিয়ে দিতেন ভাড়া। বিশ টাকাই তো! কী এমন ক্ষতি হতো? বাসের মধ্যে এমন মারমারি বাধানোর কোন মানে হয়!

শা.ভা. : বিশ টাকা কথা না। আমি তো তাকে ভাড়া দিয়েছি। দ্বিতীয়বার আবার ভাড়া দেওয়ার মানে হলো আমি প্রথমে মিথ্যে বলেছি। কিন্তু আমি তো মিথ্যে বলি নি। মিথ্যে না বলেও বাসের মধ্যে এতগুলো মানুষের সামনে নিজেকে মিথ্যেবাদী প্রমাণ করার কোন মানে হয় নাকি!

শামিম ভাইয়ের মনে ক্রোধের ঝাঁঝ এখনো আছেই, বুঝতে পাচ্ছি। তাই আর কোন কথা বলি না। ওর মুখের দিকেও তাকাতে পারি না। আমি ভাত গেলায় নিবিষ্ট থাকি। ভাত অথচ তেঁতো হয়ে গেছে। এত বিস্বাদ ভাত গলা বেয়ে নামছে না। খুব জোর করে আরও কয় লোকমা ভাত পানি দিয়ে দিয়ে গিলি। বাকি ভাতসুদ্ধ প্লেট বিছানার তলে রেখে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে আসি।

ঢক ঢক করে আধ বোতল পানি সাবাড় করি।

আ. : কী বই নিয়ে আসছেন, দেখি।

রবিসমগ্রের একটি খ- আমার হাতে ধরিয়ে দেয় শামিম ভাই। আমি বিছানার সাথে লাগানো দেয়ালে হেলান দিয়ে বসি। কোলের ওপর বইটি নিয়ে এলোমেলো পাতা উল্টাই। প্রথমে আসে গল্পসল্পের পাতা, তারপর দেখি লিপিকার ক্ষুদ্রাকৃতির গল্পসমূহ।

আমার এখন পড়তে ইচ্ছে করছে না। বইয়ের পাতা উল্টাতেও ভালো লাগছে না। বই বন্ধ করে কোলের ওপর ফেলে রাখি। শামিম ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাই না। খুব দূরে তাকিয়ে থাকি। গল্পও শুরু করি খুব দূর থেকে।

আ. : আপনের সাথে মনে হয় শেয়ার করি নি। একবার বাড়ি থেকে বাসে করে ঢাকায় আসছিলাম। আমি তো সাধারণত বাসে ঢাকা আসি না। ট্রেনেই যাতায়াত করি। আমাদের এলাকার বাসগুলোর যাচ্ছেতাই অবস্থা। সময়ও লাগায় প্রচুর। সাথে মেজুফুফু ছিল। ফুফুর আবার বাসে এলে সুবিধা হয়। সাভারের ঐদিকে ফুফুর বাসা। আমি বাস স্টেশনের এক দোকানে গেছি ছোট ফুফাতো বোনটার জন্য চিপসটিপস কিছু কিনতে। বাসের মধ্যে যেন খেতে পায়। ফুফু আবার করছে কি এর মধ্যেই বাসে উইঠে পড়ছে।

আমি ফুফুরে জিগাইলাম : ভাড়া ফুরায়ে উঠছেন?

আমি জানি আমাদের ঐ এলাকার বাসে ফুরায়ে না উঠলে পরে ভাড়া নিয়ে খুব ঝামেলা করে।

ফুফু বলল, বাইপাইল পর্যন্ত একশ’ বিশ টাকা কইরে ফুরায় উঠছে।

বাস ছাড়ার পরে সুপারভাইজার ভাড়া নিতে গেলে আমি পাঁচশ’ টাকার একটা নোট দিয়ে দুইশ’ ষাট টাকা ফেরত চাই।

সুপারভাইজার জিগায় : কই নামবেন?

আমি বলি, বাইপাইল নামব। একশ’ বিশ টাকা কইরে ফুরায়ে উঠছি।

তারপরও সে আমারে একশ’ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলে বাইপাইল দুইশ’ ট্যাহা কইরে দুইজন চারশ’— কার কাছে ফুরায়ে উঠছেন?

এই ভাবে নানান তালবাহানা করতে করতে টাঙ্গাইলে এসে সে আমাকে দেড়শ’ টাকা দিয়ে বলে ভাই, মুন করেন বাকি ট্যাহা আমি খায়ে ফালাইছি। আর কোন ক্যাচাল কইরেন না ত, এইডা রাইহে দেন।

পরে আমি চুপ করে গেলাম। রাগ হলো প্রচুর। অপমানিতও বোধ করলাম। আর এত অসহায় লাগল নিজেকে। একটা বাসের ক-াক্টর এসে বলে কিনা আপনের ট্যাহা আমি খায়ে ফালাইছি। আমি তখন তার সাথে কী করতে পারতাম! সে আমাকে মিথ্যেবাদী করল, আমার টাকা মেরে দিল। তাই বলে কি আমি তার সাথে বাসের মধ্যে মারামারি করতে যাব! এইসব মারামারিতে তার হয়তো কিছুই যায় আসবে না; কিন্তু তার প্রেস্টিজবোধ আর আমার প্রেস্টিজবোধ কি এক সমান? কি হবে! নব্বই টাকা বেশি নিছে— নিছে! এই জন্যে বলি, আপনের ত মাথা গরম— সব জায়গায় নিজের প্রেস্টিজ প্রতিষ্ঠা করতে যান— কী দরকার! চারদিকে এখন যা অবস্থা আত্মসম্মান বজায় রেখে পথ চলা বহুত কঠিন। কিছুটা ওভারলুক করে যতটা পারা যায়…

শা.ভা. : ছিঃ, আমি নেহাত ভালো মানুষ।

আমার বক্তৃতার মাঝে শামিম ভাই দুম করে এমনভাবে কথা কয়টা উচ্চারণ করে। আমি চমকে তার মুখের দিকে তাকাই। দেখি ব্যথার দাগে টকটকে হয়ে ওঠা চেরি ফলের মত আগুন ঠোঁটে শামিম ভাই একটা দাঁত চেপে কুঁতকুঁত করে হাসছে। যারা শামিম ভাইকে চেনেন তাঁরা জানেন এটা তাঁর, শামিম ভাইয়ের বিখ্যাত দুষ্টুমির আবার কখনোবা বিদ্রুপের ভঙ্গি।

আমি তাঁর মুখের দিকে থ’ মেরে তাকিয়ে অপেক্ষা করছি। বুঝতে চাচ্ছি এটা বিদ্রুপ না দুষ্টুমি। এবং আরো কিছু বলেন কিনা! সে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করছে না। বরং ওর হাসির বেগ বুঝি বাড়ে আমার চেহারা দেখে। আমার কিন্তু শরীর ঝিম ধরে যাচ্ছে। হাসপাতালে এসে পর্যন্ত এই অনুভব হয় নি। তবে কি…

আমি হাতের বই একদিকে ঠেলে বিছানায় শুয়ে পড়ি।

শামিম ভাইকে বলি : দেখেন ত একটা চাদরের ব্যবস্থা করতে পারেন কিনা! শরীরে তো শিরশির করছে।

শা.ভা. : সিস্টারের কাছে চাইব?

মুহূর্তের মধ্যেই আমার দৃষ্টি এত ঝাপসা হয়ে গেল। ইস্ পেটের মধ্যে নাড়িভুঁিড় কিছুই বুঝি আজ আর থাকবে না। এভাবে গুলিয়ে উঠছে কেন!

আমি শামিম ভাইকে কিছু বলতেই পারলাম না। তার আগেই আমার সমস্ত শরীর আন্দোলিত হয়ে, বিশাল ভবন কাঁপিয়ে, হাসপাতাল ওয়ার্ডের নৈঃশব্দতা কুচিকুচি করে বিকটভাবে বমির আওয়াজ করে উঠি। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে শামিম ভাইকে ঝাপ্টে ধরি। আমার প্রতিটা ওয়াক শব্দ কংক্রিটের দেয়ালে বারি খেয়ে হাজার শব্দে খানখান হচ্ছে। যদিও আমার বমি হচ্ছে না। বমি তো কখনো হয়ই না। খানিক আগে যে অতখানি পানি খেলাম সেই জলটুকু পর্যন্ত উগলাতে পাচ্ছি না! কষ্ট অথচ বমি হবার চাইতে দ্বিগুণ হয়।

আমি শামিম ভাইকে শক্ত করে ধরে আছি।…

বিব্মিষার দাপট কমে এলে শামিম ভাই বললেন : চল্ বেসিনে নিয়ে যাই। চোখেমুখে পানির ঝাপ্টা দিলে ভালো লাগবে।

হ্যাঁ, বেসিনে যেতে হবে। বমি হলো না ঠিক কিন্তু তবু ঘামের বান ছুটবে!

শামিম ভাইয়ের কাঁধে ভর রেখে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়েছি।

অবাক কা-! আমি সামনে, শামিম ভাই অল্প পিছনে দাঁড়ানো। অথচ বেসিনের আয়না জুড়ে শুধু শামিম ভাইয়ের কুঁতুকুঁতু হাসিমুখের প্রতিবিম্ব!

আমি কই?


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা