গল্প

পাখিটা
তানিয়া গুহমজুমদার

হেমন্তও কি ফুরিয়ে এল? সামনে ছড়িয়ে থাকা সবুজ, ডান দিকে সামান্য এক টুকরো জলা আর এই প্রাচীন কাঠের বেঞ্চে বাবাকে নিয়ে আজ সকালে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে এল প্রশ্নটা। হেমন্তও কি ফুরিয়ে এল!
ফ্ল্যাটের খুব কাছেই এই পার্ক। সময় পেলেই রুমা বাবাকে নিয়ে এখানে এসে বসে। বাবার ছিয়াত্তর আর ওর বিয়াল্লিশের কাছাকাছি। ওদের আর কেউ আছে বলে রুমার মনে পড়ে না। এ নিয়ে কোন প্রশ্ন বাবাকেত ও করে না। আর বাবা সারাদিনই ক’টাই বা কথা বলেন! বোধ হয় একুশটা। নেহাৎ প্রয়োজনে। কথা বলানোর খুব একটা চেষ্টা রুমাও করে না। যেহেতু অফিসে ওকে কিছু কথা বলতেই হয়, অনিচ্ছাতেই। আর মন শরীর ইত্যাদি রুমার নিছক সাদা এখন। সাদা শরীরে কথা কম আসে, রুমা মেনে নিয়েছে এ তথ্য।
এখন ওর হাতে অফিসের একটা বার্ষিক ফিনান্সিয়াল রিপোর্ট। সোমবার মিটিঙ আছে। মাঝামাঝি চেয়ারে বসায় কিছু কথা বলার দায় সেখানে ওর আছে। যেটুকু করতে হয়, সেটা ঠিকঠাকভাবে করতে রুমা পছন্দ করে। এখন খেয়াল করে, রিপোর্টে কিছু ত্র“টি আছে।
এক ঝলক বাবার দিকে তাকালো। হাঁটুর উপর হাত, প্রায় ছ’ফুটের মানুষটা সামান্য কুঁজো, সামনে তাকিয়ে চুপচাপ। কী ভাবছেন এখন উনি! রুমা হাতের কাগজগুলোর দিকে আবার চোখ টেনে নিয়ে আসে।
ওটা কী?
বাবার আঙুল যেদিকে, সেখানে একা একটা দোয়েল।
ও তো দোয়েল।
টুপটাপ পাতা ঝরছে সামনের গোটা =কয়েক আকাশমণি থেকে। আর কোন শব্দ নেই। সামান্য দূরে তিনটে কিশোরী সাইকেল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বোধ হয় টিউশন শেষে। সৌমেনকে একটু বকতে হবে। এই ত্রিশ পাতার প্রিন্টে এত ভুল হবে কেন?
ওটা কী?
বাবার গলা খুকব শান্ত।
রুমা দেখে, দোয়েলটা নেমে এসেছে কাছের ডালে। লেজ নাচাচ্ছে। ও একা।
ও দোয়েল।
সাম্যা বাতাস। কোন তাড়া নেই। কোথাও যাওয়ার। রুমার কি আছে? সেই অনি যখন স্টেটস-এ চলে গেল, আর ফিরে এল না, তারপর থেকেই নেই। তাও তা প্রায় বাইশ বছর হল। অপেক্ষা শব্দটা অর্থহীন!
ওটা কী?
কেন জানে না, সকাল থেকেই আজ রুমার মনটা ভাল নেই। যেন কী একটা হারিয়েছে তার। মুখের ত্বক তার এখনো  টানটান, শুধু ভ্রুদুটো আজ স্বাভাবিক হচ্ছে না।
রুমা চোখ তুলে দেখে, দোয়েলটা নেমে এসেছে মাটিতে। প্রায় বাবার কাছাকাছি। যেন এ মানুষটাকে আর ভয় পেতে নেই।
বলছি তো ওটা সেই দোয়েল! একটু চুপচাপ বসে থাকতে পারো না কেন বল তো! দেখছো, আমি একটা লেখা পড়ছি। তারমধ্যে  সেই এক কথা। আজকাল কি তুমি চোখে কম দেখছ!
এত ঝাঁঝ থাকবে শব্দগুলোয়, রুমা নিজেও ভাবে নি। বাবা অবাক চোখে দেখল রুমাকে। উঠে দাঁড়ালো। হাঁটতে শুরু করলো ঘরের দিকে। কাছেই ফ্ল্যাট। তবু রুমা অবাক হল।
কোথায় যাচ্ছো! একা যাবে না তুমি।
তবু রুমাকে অবাক করে বাবা চলে গেল।
রুমাকেও উঠতে হবে তাহলে। মেজাজটা আরো তিতো হয়ে গেল। অফিসের কাজটা আর হবে না এখন। চোখ তুললেঅ। পাখিটাকে এখনো ভষৈ থাকতে দেখল। লেঝ নেড়েই যাচ্ছে। ও কি নাচছে!
হঠাৎ দেখে বাবা ফিরে এসেছে। হাতে একটা পুরনো ডায়রি।
পাশে বসে নিঃশব্দে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল। একটা পাতার মাঝখানে আঙুল। রুমার কৌত’হল হল।
কেগুনি কালিতে লেখাÑ‘অফিসে খুব ঝামেলা চলছে। এর মধ্যেই আমার রুমা মায়ের তিনবছর হল।ুর মা থাকলে নিশ্চয়ই বাড়িতে খুব উৎসব হত। এখন আর কে ওকে পায়েস করে দেবে! রাত্রে ওকে আইসক্রিম খাওয়াবো। একটু আগে ওকে নিয়ে সামনের পার্কটায় বসেছিলাম। ওর সব ব্যাপারে কীযে এত প্রশ্ন! একটা দোয়েলকে দেখেছিল। ওর মতই ছোট্ট। তাকে দেখে কীযে আনন্দ ওর! বারবার একই প্রশ্ন, ও তা কি? পাখিটাও যেন খুব মজা পেয়েছিল। ওর পায়ের কাছেই ঘুরঘুর করল। আর ওর সেই এক কথা, ও তা কি? আমি কিন্তু একটুও বিরক্ত হই নি। আমি তো জানি, এভাবেই ও  কথা বলতে শিখবৈ, জানবে পৃথিবীটাকে! আর আমার হাত ছাড়া আর কার হাত ধরবে ও! খিলখিল হাসি আর একটু পরপরই সেই এক কতঅ। আমিও যেন ওর সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম। সকাল থেকেই মনটা ভাল ছিল না। এখন কেন যেন আর অত খারাপ লাগছে না। এই বোধ হয় জীবন!…
রুমা শেষদিকে আর পড়তে পারছিল না। বাবাকে জড়িয়ে কাঁধে মুখ গুঁজে দিল। ভেসে যাচ্ছে অনাবিল অশ্রুতে। বিয়াল্লিশের রুমা এই মুহূর্তে সেই সকালে, যখন ওর তিন বছর পূর্ণ হয়েছে।
দোয়েল তখন উড়ে গিয়েছে আর একটা বেঞ্চের দিকে। ওখানেও কেউ আসবেন বোধ হয়।

রোদের দাগ
শিমন রায়হান

ঠিক আমার মতনই ছোট্ট টিনের বাকশোটি । হাতল ধরে হাঁটার সময় অদ্ভুত একটা আওয়াজ হয়। ভেতরে সীতানাথ বসাকের আদর্শলিপি আর ম্যাজিকস্লেট। ম্যাজিকস্লে¬টের নামকরণের নেপথ্যে ছিল খড়িমাটি স্বরূপ প্লাস্টিকের কাঠি  আর ওর ওপরে দেওয়া দাগগুলোর নিমেষেই উবে যাওয়ার স্বভাব । ইতস্তত দাগ, বর্ণমালা, পাখি, মেঘ-পর্দাটা টেনে দিলেই অদৃশ্য উড়ে যায় । সত্যিই তো ম্যাজিক! বাবার কোর্তা কেটে বানানো ফতুয়া, পাজামা আর টুপি নিয়ে মক্তব যাই । মক্তব মানেই বাড়ি থেকে বহুদূর । সব থেকে দূর । দূরের প্রথম ধারণা । দীঘিটির পিছল ধার দিয়ে ভাঁটফুলের গন্ধ নিয়ে, বড় গাছগুলোর নিচের আবছায়ায় শুকনো পাতা মাড়িয়ে, রাগী কালো কুকুরটির ভয় জয় করে বাড়ি ফিরে আসি মায়ের উদ্বিগ্নতা আর শঙ্কার শেল চোখে নিয়ে। মাঝেমধ্যে মা এগিয়ে আসে । আমি হাত-পা ধূলোয় ছড়িয়ে কাঁদি একাই  ফিরতে পারি এই বীরত্ব জাহিরের মওকা বিফলে যাওয়ায়। ঈদের দিন সকালে হঠাৎ নতুন জামা আসে । বাবা বলেন পাখিতে দিয়ে গেছে । আর ঐ জামাটির নাম হয়ে যায় পাখির জামা । আনকোরা জামাটির গন্ধ শুকে পাখিটির মায়াবী চোখ দেখতে পাই ওর করুণ ওড়াউড়ি ।
প্রথম ভয় আর অপছন্দের ধারণা হয়ে মায়ের হাতের জুনিয়র গেলাসটি রাজ্যের তেতো ওষুধ খাইয়ে দেয়। মাঝেমধ্যেই ঠোঁট কেটে যায় । নিস্তার নেই। নিস্তার করে দেয় ডানপিটে দুপুর, কচিকাঁচা ব্রিগেড। অপ্রতিরোধ্য রোদের ডাক কে সামলায়। কাঠাল পাতার টাকায় ধুন্ধুমার সওদা চলে । পাশেই কাঠচেরাই কল, দিনমান শো ..শো করাতের ক্যালিওগ্রাফিক গ্রীবায় হিম উৎকন্ঠা। চুপচাপ হাতের তালু ঘেমে যায় । ছুতোর বাড়ি। কাঠের গুড়ো, গুড়ির আঠা। চলে আসে ফড়িঙ ধরার দিন। ফড়িঙ ধরতে মন সায় দেয় না। ওদের খেলা শেষে আমি কুড়িয়ে আনি নিহতদের ডানা। তুলে রাখি সযতেœ আমার জাদুঘরে। চকমকে রোদচশমা চোখে অচেনা মোটরবাইকের পিছে ছুটে যাই পোড়া পেট্রোলের নেশায়। দূর কালভাটের বাক থেকে ফিরে আসি বিবিধ কৌতূহলের উস্কানি ফেলে। ফিরে আসতে মন সায় দেয় না। বোধহয় গ্রামগুলোর ওপারেই নেমে গেছে আকাশ, এগোলেই ধরা যেত মাশরুম মেঘ ।
টেপরেকর্ডারে হেমন্ত বেজে চলেছে, গাছতলায় বিজয় সরকার। চামড়া বাঁধানো বাবার আইনের বইগুলোতে ধুলো জমে যাচ্ছে। দেয়ালঘড়ির পাঠ ফুরোচ্ছে না আমার। সবগুলো কাটা’ই নাকি ঘুরছে, অথচ আমার চোখে পড়ছে না! নির্মেদ কাগজফুলের গোলাপি ডাক আমায় খুঁজে পাচ্ছে ধীরে ধীরে।

বাহারী উলের ওম পেচিয়ে হেঁটে যাচ্ছি ক্রিমের মতন কোমল রোদ মাথায় নিয়ে। হাতের টিফিনক্যারিতে বাবার জন্যে রুটি আর গুড়। কোমরে গোজা টকটকে লাল মাউথঅরগ্যান, বিবিধ আওয়াজের রঙিন শহর। আমাদের বাড়ি বদল হচ্ছে। আরো অন্য দূরেরা কাছে চলে এলো কিংবা আমরা দূরের কাছে। বাকশোবন্দী কাপড়ের নির্জন গন্ধ নিই, নেশা হয় । দূরসময়ের নেশা। নামতা পড়ার মুশকিল আর কদ্দিন, এক সমুদ্দুর ভোকাবুলারি শেখার! আমার নাকি খরগোশের মত কান, এই নিয়ে মা-ও মজা করে ।
একদিন সকালে দাদী আর উঠলেন না। অনেক লোক এলো। মৃত্যুর প্রথম ধারণা, একটা মন খারাপের উৎসব! বহুরঙা কাঠপেন্সিলে একে যাই প্যাঙ্গমা-প্যাঙ্গমীর দুঃখ, রূপকথার লালকমল-নীলকমল। ঝিনুককন্যার জন্যে আমার মন পোড়ে। ব্যক্তিগত জাদুঘরে বিস্তর জমে গেল ডাকটিকিটেরা। অথচ মধ্যগ্রীষ্মে আমার চিঠিগুলো কান ধরে দাঁড়িয়ে। চিঠি পাঠানো হয় না। প্রাপকের ঠিকানা থাকেনা কিংবা প্রাপকই। পুজোর পিস্তল তো নয় যেন অনেক অনেক সাহস কিনবো। কিন্তু আমার কাছে ষোলো টাকা নেই। খুলনা বেতারে নামছে লোককাহিনির প্রতœরাত। স্কুলে যাচ্ছি। বন্ধু জমছে। আরো আরো কথা জমছে। স্কুলের পাশেই নদী। ভোরের সাঁকো পেরুলেই গাঙশালিকের গর্ত , শিশির চোয়ানো ঊর্ণাজাল। পিঠাগাছ খুঁজে বেড়াই। এই নদী দিয়েই নানাবাড়ী যাওয়া। নানাবাড়ী মানেই সেই মস্তবড় দেবদারুটা, ইঞ্জিনের নৌকো। নৌকোর জানালা দিয়ে নদীর জল ছুঁই। একদিন দেবদারু জয়ের অভিযানে বেরোই। ফসল কেটে কামিয়ে ফেলা মাঠ, ধোঁয়াশা। এইতো ভুতের লাঠি, গোরস্থানের মোড়। পথ ভুলে যাচ্ছি। কাগুজে নৌকোয় কয়েকটি পিপড়ে ভাসিয়ে দেই…

রোজনামচা লিখি, অবিন্যস্ত অভিমান। আমার প্রাত্যহিক আর কিশোর সংঘ থিয়েটার ,ব্র্যাকেটে অগন্তি আগমন-প্রস্থান। সবার উপরে নাটক সত্য! মধ্যবিত্তের আহ্লাদ বেয়ে উঠে পড়ছে রোদ আবার। এবঙ অনবরত  ফিরে আসছে পূর্ণদৈর্ঘ বিকেল। আর ক্রিকেট বল হারিয়ে বাড়ি ফিরছি আমি। লোডশেডিংয়ের রাতে জলছে বিষণœ হারিকেন কাঁচ। ইংরিজি গ্র্যামারের প্রচ্ছদে ছোট্ট দুটি ছেলেমেয়ে জানালা দিয়ে জোৎস্না দেখছে। আপা বলে ওরা নাকি -আমরা! মাথা ধরে আসে হলুদ আলোয়। সত্যি করেই অতিরঞ্জিত চাঁদ ওঠে, বিষক্ষয়ী জ্যোৎস্না। অনুভব করি রুপোলি ধুলোর মিহিন নিরবতা। জ্যোৎস্নাকে চাঁদরোদ ডাকি।
ক্লাসের পড়ায় মন নেই। আপার বাংলা টেক্সট্ আর সহপাঠ লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ি। ‘রাজা’ নামের গল্পটি আমাকে কাঁদায়। মাধবসেনের দোকান থেকে লেখক রাজার জন্যে নুপূর কিনে আনেন। খাটাশে ধরে নিয়ে যায় রাজাকে, নুপূর পরানো হয়না। রাজা তার পোষা পায়রার নাম। রবিঠাকুর। জানালায় অসুস্থ অমল, বাইরে দইওয়ালা হাঁক দিয়ে যায়। হিরোশিমার নারকীয়তা। এমনকি শেক্সপিয়ার। বৃদ্ধ-উন্মাদ কিঙ্ লিয়ার। প্রেত পিতার প্রতি রাজপুত্র হ্যামলেটের আর্তনাদ।  রোমিও এন্ড জুলিয়েট। শরৎ,সুকান্ত সমগ্র। পড়ি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, আবদুল¬াহ্ আল-মুতী আর বিক্রির জন্যে রাখা পরিত্যক্ত কাগজের স্তূপ থেকে বের হওয়া ‘ভারতবিচিত্রা’।
‘আমি কী মেলানকোলিয়া পেশেন্ট!’

বিপদ বুঝেই উড়ে যাই। সাথে পোষা বেড়ালটিও। কে যেন আঁকড়ে ধরে আমার প্রাণপণ দৌড়! বাবার মৃত্যুস্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায়। হারানো কাঁচপাথরের দুঃখে জ্বর আসে। সেগুনের ডালে গুলিবিদ্ধ পাখিটি কাতর কান্নায় থম থাকে সারারাত। মা আমায় জলপট্টি দেয়। ঘুমোতে পারি না। এই রিপু দরিয়া থেকে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দাও মা!
বর্ষাকাল ফুরিয়ে এলো টিনের চালে। অকারণ পার হচ্ছি ডুবন্ত রাস্তা-ঘাট।  পাতাবাহারটি বেড়ে উঠছে ওর নিরীহ বর্ণিল আভায় । হঠাৎ সুপ্রিয়ার ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার খবর! জানি, ও যেতে চায় নি। বিবিসি, জার্মান বেতার তরঙ্গ শুনে বাবাকে শুধু হতাশ হতেই দেখি। আঁতুর ঘর থেকেই বাবা আমার সর্বশেষ বিন্দু, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর -সমস্ত রোদের ছায়া। একটা ব¬্যাক এন্ড হোয়াইট ফ্রেমে তরুণ বাবা নিজেকে চিরদিনের জন্যে জারী রেখেছেন যেন আমার পথের দিকেই আমার বিষাদ মিশলো আকাশ-জলে আর বিকেলটার নাম  হলো মেলানকলিক। ওরা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, আমি খালপাড়ে বসে থাকছি  বেকা। ধূসর আকন্দের বৃত্তে তবু ভেসে আসে ছাতিম পথের মেদুরতা। জোনাকির ছায়াপথে পথ খুজে নিচ্ছি…

আমার বামহাতের মধ্যমার গোড়ায় একটি পোড়া দাগ আছে। উঠোনে রাখা জলন্ত কয়লায় হাত রেখেছিলাম ছেলেবেলায়। কিছু কিছু ভুল ক্যামন সনাক্তকরণ চিহ্নের মত আপন হয়ে যায়! আমার সাথে পোড়া দাগটিও বুড়ো হচ্ছে। পরম প্রেমে ওকে দেখি, আদর করি। অনেক স্মৃতি-বিস্মৃতির দূর্গের দরোজা হয়ে ও ইশারা করে। কিছু ভুল অমোঘ অবলম্বন হয়ে ওঠে । প্রেমে, অপ্রেমে…

অনিঃশেষ সত্যিই এক মাতাল শব্দ। ফুরোনোর পরেও দাগ থেকে যাওয়াটা কোমল সান্ত্বনা। রোদের দাগের সমান্তরালে শুয়ে থাকে বিবর্ণ বৃত্তান্ত, ভৌতিক হাসি নিয়ে কথা না রাখা চিরকালের কঠোর অতীত। আকরিক সময়বেলুনের ক্রমশ চুপসে ওঠা জাদুর ফাকে এইসব দাগ এক অশরীরি স্যুভেনির। তবুও সেইসব রোদেলা বৃত্তান্ত হয়ে ওঠে পথের পাঁচালী। ইদানীং আমার কাঁধে অনুভব করিÑ‘সিনেমা প্যারাদিসো’র আলফ্রেদোর হাত। আর আমি সালভাতর হয়ে যাই। অস্ফুট শুনতে পাই  ‘সালভাতরেরা খুব বেশি নেই।’ কী বিষ তুলে নিচ্ছি হররোজ! জানো কী আলফ্রেদো?

কোরকের গভীরে স্ফুলিঙ্গের ঘোর ভাঙতে খুব বেশি দেরী নেই।

দুই আঙুলি নুরুল
মতিউর রহমান সাগর

মাধাইল খালের উত্তরে, যেটা সহজেই পূর্বে হতে পারতো; আর হলে সড়কটির নাম সংগতকারণেই কাজী সড়ক না হয়ে মৃধা সড়ক হতো এবং যদি হতো তবে হয়তো দুই আংগুলি নুরুলকে আমাদের চেনার আদৌ প্রয়োজন হতো না। অর্থাৎ, একটি ঘটনার সাথে আপাত অসংলগ্ন পারিপার্শ্বিক অন্য ঘটনার যে সম্বন্ধ তাকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে জোবেদ টি স্টল’টি হতে পারতো খালের উল্টো দিকে আর তাতে চেরাগ মুন্সি যে সংবাদটি জোবেদ নামক আরেকজন মানুষকে দিতে যাচ্ছে তাতে হয়তো সংবাদটির নায়ক অন্য কেউ হতো। জোবেদ টি স্টলের ভেতরের দিকে সর্ব পূর্বের বেঞ্চি হতে এই গল্পটিকে আমরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেখব। জোবেদ টি স্টলের সর্ব পূর্ব বেঞ্চিতে বসার একটা উত্তেজনা আছে। দোকানের ওপাশটি ভাঙা আর তা যে কোন মুহূর্তে বেঞ্চিটিসহ মাধাইল খালে পড়ে যাবে এই সম্ভাব্য ভবিতব্য অনেকটা জুয়ার উত্তেজনা এনে দেয় কেরোসিন চা সিগারেট দুই টাকা দামের মোটা টোস্ট বিস্কুট প্যারাসিটামল এবং যাদের যাদের লাগে তাদের জন্য কাগজে মুড়ে দিয়ে একটুখানি ইতর দোকানদার জোবেদ আলী ওরফে জইব্যা‘র চোখ টিপে রাজা কনডমের (যেগুলো বয়স্করা সন্ধ্যের পর আর পোলাপাইন ফোটকা ফুলানোর জন্য সকাল বেলায় কিনে) খুচরো μেতাদের মনে। মঙ্গলবারের হাটফিরতি ছিন্ন বিচ্ছিন্ন জনদংগলের এক টুকরো অংশে হাঁটুর কাপড় গুটিয়ে সেই বেঞ্চিতে বেশ আয়েশ করে বসতে বসতে চেরাগ মুন্সি খানিক ফিসফিস খানিক তোষামুদি কণ্ঠে বলে, জইব্যা ভাই, হুইনছনি, আমিনের হোলা নুরুলের চিঁডি ধরা হইড়ছে। চেরাগ মুন্সির ফিস্ফিসানো স্টাইলে জোবেদ আজকাল সাবধান। বাকী খাওয়ার ধান্দা সে তার দোকান থেকে উঠিয়ে দিয়েছে। বড় বড় অক্ষরে ক্যাশবাক্সের পাশে লেখা স্টিকার – বাকীর নাম ফাঁকি, আজ নগদ কাল বাকী। গঞ্জের দোকান থেকে সে কিনে এনেছে এ সাবধান বাণী। বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না-টা কেনার ইচ্ছে ছিলো। দোকান থেকে ওটা ফুরিয়ে গেছে। ফিস্ফিসানো কথার সে খ্যাতা পোড়ে। চায়ের কাপে লিকার ঢালতে ঢালতে মুখে কোন আগ্রহের চিহ্ন না ফুটিয়ে বলে, হাচানি? জোবেদের অমন অনাগ্রহে চেরাগ মুন্সি দমে না, ক্যাপস্টানের পাছায় কষে টান দিয়ে বলে, তাইলে আর কি কই। আশরাফ মাস্টরে নিজ মুখে কইছে আমারে।  জোবেদ আস্তে করে বলে, বইঅ। কাস্টমার বিদাই করি লই।

তাহলে এখন আমরা উপরে উঠতে থাকি। ঈগলের উচ্চতায় উঠে বসি। সাত আসমানে উঠে বসি। পা মুড়ে বসি ঈশ্বরের বিছানায় এবং নিচে এই অগ্রহায়ণের শেষাশেষি শীত আসি আসি সন্ধ্যায় মাধাইল খালের পারে জোবেদ টি স্টলে জোবেদ এবং চেরাগ মুন্সির সংলাপের অপেক্ষায় থাকতে পারি যতক্ষণ না সব কাস্টমার বিদায় হয় এবং আমিনের হোলা নুরুলের চিঁডি ধরা পড়ার সংবাদের পরের গল্পটুকু শোনা যায়। ঈশ্বরের বিছানায় পা মুড়ে বসার সুবিধা আছে অনেক। হাতের কাছে নাটাই আছে। ঘটনা নেড়ে দেবার কাঠিটি একেবারে নাকের কাছে ঝুলানো। শক্ত লাঠিটিতে হাতের আঙুলের অজ¯্র দাগ দেখে বোঝা যায় প্রায়শ ব্যবহৃত। আমরা এক কাজ করি। জোবেদের দোকানে আশরাফ মাস্টারকে ঢুকিয়ে দিই এখন। আশরাফ মাস্টার কুঁজো হয়ে হাঁটে খানিক। তার হাতে পলিথিনের কাঁধ ছুঁয়ে লাউ শাকের ডগা উঁকি দিচ্ছে, নিচের দিকে কুঁচো চিংড়ির পানি চুঁইয়ে নামছে। আশরাফ মাস্টার স্টলে ঢুকেই হাঁক দেন, জোবেদ, চা দেও তো। হালার একটা রিকশাও রাজি হইল না আইতে। কয়, ম্যালা দরূ । যাইতান ন। চেরাগ মুন্সি মাস্টারকে দেখে সালাম দেয়। পাশের খালি জায়গা মুছতে মুছতে বলে, আরে ম্যালা দিন বাইঁচবেন গো চ্যার। হবে আঁর কতা কইতে চিলাম জইব্যা ভাইরে। জইব্যা ভাই, হাচা নি? আশরাফ মাস্টার তার দেখিয়ে দেয়া জায়গায় বসতে বসতে বলে, দূর মিয়া। ম্যালা দিন বাঁচি লাব আচে নি কোন কও চাই? কুঁচা ইচা কিন্চি নি জীবনে? মূলামূলি কইরতাম গেছি, বদমাইশে কয়, চ্যার, মাচ কিননের কি দরকার। হোলাহাইন হড়া না হাইরলে নদীত্ নামাই দ্যান। ধরি দিব। লগে বেত থাইকলে দিছিলাম দুই বাড়ি। জোবেদ বলে, কতা কিন্তু খারাপ কয় ন মাস্টর। খালি খালি হোলাহাইনরে মারি লাব আচে নি। এ্যা তোন বালা নো মারি কাম কাইজ করাই লওয়া।
ইতিমধ্যে দোকানের ভিড় পাতলা হতে শুরু করেছে। ক্যাশবাক্সের কোণায় বসানো প্রদ ীপের আলো আরেকট ু উস্কে দিয়ে সে পেছনের তাক হতে স্পেশাল কাপ বের করে মাস্টারের জন্য।  চেরাগ মুন্সির দিকে তির্যক তাকিয়ে আলগাভাবে বলে, মুন্সি, চা খাইবা নি? চেরাগ মুন্সি আড়মোড়া কাটে, থাকলে দ্ না কদ্দুর। আঁর লাই আলাদা করি বানানের দরকার নাই। খাড়াও চোড কাপখান আঁই ধুই লই। তোঁর ধোয়া লাগতো ন। তুঁই মাস্টররে চা দাও। বাবুরে, আইজগা লা যেন বেশি শীত, ক্যান? চেরাগ মুন্সির এ কাঁচুমাঁচু ভাব জোবেদের ভালো লাগে। সে মাস্টারের হাতে চা দিতে দিতে বলে, মাস্টর, আপ্নে আঁর কতা বিশ্বাস করেন্ ন। অন বলে ঘটনা ধরা হইড়ছে? মাস্টারের মুখ কুঁচকে যায় রাগে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে মাধাইল খালে থুঃ করে থুথু ফেলে বলে, তোঁর আর মুন্সির কতাই ঠিক অইছে। হোলা ইগা মুক্তার হিচে লাইগছে। সাক্ষী দিতা হার্ইবা নি? চেরাগ মুন্সির ততক্ষণে চা নেয়া হয়ে গেছে। চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, এইটার আবার সাক্ষী কি? আম্নে না কইলেন আম্নের আতে ধরা হইড়চে। মাস্টারের মুখ আরো কুঁচকে যায়। আরেক দলা থুথু মাধাইল খালে ফেলে গলা নামিয়ে বলে, আরে ধুর, আংগো হেড স্যার একটা আবাল। আঁরে কয়, হোলাহাইন মানুষ। কেম্নে বুঝাই সুঝাই ঠিক করন যায় করেন। আঁই কইছি, স্যার হোলা ইগা আগেও এই কাম কইরচে, ইগারে দিষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওন দরকার। অঁন তুঁই যদি তোঁর ব্যাপারটাও হেড স্যাররে বুজাই কইতে হারো, তাইলে আঁই শাস্তির ব্যবস্থা কইরতাম হারি আঁর মত। জোবেদ চায়ের কাপ ধুচ্ছিল। ধোয়া বন্ধ করে জিজ্ঞেস করে, চিঁডি বোলে আম্নের আতেই ধরা হইড়ছে, কেম্নে ধইরছেন? মাধাইল খালের পানি স্বচ্ছ। খালে কচুরিপানা দাঁড়াতে পারে না ¯্রােতের টানে। আশরাফ মাস্টার যেখানে থুথু ফেলেছে, সেখানে এক ঝটকায় আমরা চোখ ঘুরিয়ে যদি খালের পানিতে দৃষ্টি দিই এবং দেখার আলোকে বয়ে যেতে দিই এই সাত আসমান হতে, তা হলে জল নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে বইতে বইতে মিনিট খানেক পরে বাড়ি খাবে এসে যে কয়েক থান ইটের টুকরোয়, তা মাধাইল হাইস্কুলের অসমাপ্ত বাউন্ডারির দুষ্টু পোলাপাইনে ব্যাঙ টক্কা খেলার জন্য খুলে নেয়া সুড়কি হতে খসে যাওয়া। আমরা তখন দেখব অর্ধেক ইটের কংকাল দাঁড়িয়ে আছে ডান পাশে, তাকে কোলের মধ্যে রেখে মাধাইল খাল কিছুটা সরু হয়ে গেছে এই জায়গায়, তারপর আবার নদীর টানে ছুটে গেছে পেছনে। বাম পাশে সর্বাংগে ঢেউটিনের বল্কল পরা লম্বা পুরনো স্কুল ঘর। এর দশম শ্রেণী গ শাখা লেখা টিনের পাত আমাদের চোখে পড়ার জন্য আমরা সপ্তর্ষি মণ্ডলকে আরেকটু উজ্জ্বল হতে বলতে পারি কিংবা সাঁই করে নিচে নেমে গিয়ে দেখে আসতে পারি। তবে সর্ব দক্ষিণের ঠিক আগের কক্ষটার কথা আমরা বলছি যেটাতে আজ দুপুরের ঘটে যাওয়া আশরাফ স্যারের কা¬সের সিনের সারাংশ আমাদের এখন জানা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আশরাফ মাস্টার এখন সে ঘটনাটাই বলবে জোবেদের টি স্টলে ঘন লাল দুধে স্পেশাল কাপে ডাবল পাত্তির চা খেতে খেতে। আমরা এখন ঈশ্বরের খাটে পা নাচাচ্ছি। আমাদের প্রয়োজন পড়বে একটা স্ক্রু ড্রাইভার। মাধাইল হাই স্কুেলর দশম শেণ্রী গ শাখার ল¤া^াটে রোগাটে ফর্সা এবং এরোপ্লেনের মতো কাট দেওয়া লম্বা চুলের ছাত্র নুরুল ইসলামের লেখা প্রেমপত্র ধরা পড়ার আশরাফ মাস্টারের ঘটনা বর্ণনা হতে যদি রূপক উপমা বাহাদুরি নাটকীয়তা গালাগালি ইত্যকার নাট বল্টুগুলো খুলে শুনে ফেলি তবে অর্ধপ্যারায় বিষয়টা দাঁড়াবে: ইংরেজি রচনা মুখস্থ পড়া ধরার জন্য আশরাফ মাস্টার যখন নুরুলের কাছে গিয়ে দাঁড়ান তখন তার বই-খাতার গুচ্ছ হতে ঘাড় বের করে রাখা ছোট্ট সাদা ডাক্তারী প্যাডের মলাটে মুক্তা শব্দটি জরিরং দিয়ে লেখা তিনি দেখতে পান। নুরুল পড়া বলতে গিয়ে দাঁড়ায় এবং সন্ত্রস্ত হয়ে প্যাডটি ভেতরে ঢুকাতে গিয়ে তার উপরকার স্তুপীকৃত বই খাতা মেঝেতে ঝরে পড়ে এবং আশরাফ মাস্টার প্যাডটি ঝট্ করে তুলে নিতে না নিতে তার ভেতর থেকে নৌকা ব্লেড এবং প্রজাপতি‘র অরিগ্যামী করা তিনটি কাগজ তিনদিকে উড়ে যায়। নুরুল ঝাঁপিয়ে পড়ে কাগজ তিনটি ধরতে যায় কিন্তু তার আগে তার সহপাঠী তিনজনের কাছে তা গিয়ে পৌঁছে এবং আশরাফ মাস্টারের বজ্রকণ্ঠের হুকুমে তারা সে সব তাঁর হাতে দেয়। সারা ক্লাসে একটা হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। তা থামাতে আশরাফ মাস্টার হাতের তিনটি বেতকে সাঁই করে বাতাসে ঘুরান। এবং ক্লাসে কবরের নির্জনতা নেমে আসে।
আমরা এবার বুকশেলফ হতে মাধাইল গ্রামের জনগণ সংμান্ত চিত্রগুপ্তের গোটাগোটা হাতে লেখা খাতাটি তলব করব ¯্রফে রেফারেন্সের জন্য। তাতে আ বর্ণμমে গেলে দেখা যাবে, আশরাফ মাস্টারের নামের সেকশানে লেখা আছে, ইনি ছেলে ছোকরাদের প্রেম সংμান্ত বিষয়ে শায়েস্তা করার জন্য মাধাইল স্কুলে খ্যাতি অর্জন করেছেন। প্রেমে পড়ে চিঠি লিখে ফেলার মত গর্হিত কাজের জন্য তার বদান্যতায় অন্তত দুজন স্কুল ছাড়া হয়েছে এবং অন্তত শ’পাঁেচক তাদের বাল্যপ্রেমকে কাগজ কলমে ফুটিয়ে তোলবার আগেই কবর চাপা দিয়ে দিয়েছে। পোলাপান কা¬স টেনেই মজন ুলাইলি ইটিশ পিটিশ লারে লাপ্পা হাম তুম অইবার চায়, মাগে গা মা, কেয়ামত হুরাই পাকি টস্ টস্ কইরতেছে, ঝাঁপাই পইড়বো দুইনরবার উপরে। , আর দেরী নাই। পুরো ঘটনা শুনতে শুনতে চা টোস্ট বিস্কুট জর্দা দেওয়া পান ফাইভ ফাইভ ফাইভ সিগারেট শেষ হলে চেরাগ মুন্সি বলে, মাস্টর, চুল বাতাসে হাকে ন। বিষ্টির মধ্যে দূর তোন দেখলেও আঁই হেতার চুলের ডিজাইনে চিনি গেছি। আঁরে দেই দিছে দৌড়। বিষ্টি কমলে যাই দেই, লেখচে, এন প্লাস এম। আম্নেরা তো কইছি, আনে ড়ব কন আন্দাজে ধরি লাভ নাই। জোবেদ পুরো কাহিনি শুনতে শুনতে কাপ প্লেট ধুয়ে ফেলেছে। বিস্কুট মোমবাতি চানাচুর রাখবার তাকের নিচের দিকের ড্রয়ার টেনে খুলে বের করে আনে ভাঙা বাঁশের এক টুকরো। আশরাফ মাস্টারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ধরেন। মুন্সি হাঁপা তন ভাঙি আনি আঁরি দিছিল। মাস্টর, জিনিস‘টারে আমনে কেম্নে টেকেল দিবেন দেন, কিন্তু আম্নে তো বেক খবর জানেন। মাইয়ার বাপের লগে কতা কওনের লাই আঁই সব বেবস্থা করি হালাইছি, অন এইসব কতা উডলে আঁর কেরুম লাগে। আশরাফ মাস্টার বাঁশের টুকরাটি হাতে নেয়। দেখতে দেখতে বলে, হেটাই তো তোঁরে আই কইলাম হেডস্যাররে বুজাই কইতে। তার বাদে আঁই দেক্কুম কি কইরতে অয়। কাইলগাই আইয়ো স্কুলে। তোংগো সামনেই অইব বিচার। তো এই হল ব্যাপার। মাধাইল খালের উত্তরে সড়কটি হলে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে মুক্তা নামক মেয়েটিকে জোবেদের টি স্টল পার হয়ে স্কুলে যেতে হতো না আর তা হলে জোবেদ, যে বহুদিন ধরে পাত্রী খুঁজছে, তারও মুক্তাকে চোখে পড়ত না হয়ত, আমিনের হোলা নুরুলকেও বৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে বাঁশের সাঁকোতে নামের আদ্যক্ষর সংμান্ত সমীকরণটি মুদ্রিত করতে হত না কিংবা সাঁেকা পার হতে গিয়ে মাস কয়েক আগে বাশঁ হড়কে প্রায় পড়ে যাওয়া মুক্তাকে সাহায্য করতে না হলে সে হয়তো বুঝতো পারতো না মুক্তা নাম্নী আশ্চর্য সুন্দর বনহংসী ছাড়া তার জ্যামিতি অর্থনীতি ভূগোল ঐকিক নিয়ম ইসলাম শিক্ষা পপি গাইড পড়ে পড়ে সকাল সন্ধ্যা কাটতে চায় না আর জীবনে। আমরা এখন কিছুক্ষণ বৃষ্টি দেখতে পারি বা সরোদ শুনতে পারি কিংবা পরনের লুঙ্গিতে এক ঠোঙা বাতাসা ঢুকিয়ে চিবুতে চিবুতে অপেক্ষা করতে পারি পরের দিন মাধাইল হাই স্কুেলর নুরুলের চিঠি ধরা পড়া সংμান্ত কাজের ফলাফল স্বরূপ আশরাফ স্যারের শাস্তিদান পর্বের জন্য। কেননা, আমাদের মনে আছে, জোবেদের স্পেশাল চা টোস্ট বিস্কুট জর্দা দেওয়া পান ফাইভ ফাইভ ফাইভ সিগারেটের দাম জোবেদ নেয় নি কাল রাতে এবং জোবেদ আসলে আশরাফ মাস্টারের বাল্যবন্ধু যে দোকান হতে বিদায়ের সময় বলে এসেছে, দেইখো, হোলাটারে কে শাস্তি আঁই দি দেইখো। মুক্তারে এরপর থেইকা মা কইয়া ডাকবো। তোঁর সম্মান আঁরও সম্মান। জোবেদ শুধু বলেছে, আম্নে কিল্লাই কদুশাক কিনতে গেচেন? আঁর কদু গাচের হাতা বেগ্গুন বাতি অই যায়ের, আঁর কদু হাতা কে খায়? চেরাগ মুন্সি পানের রস ফেলতে ফেলতে মজা করে, আর কয়দিন। তার হরে মুক্তা  ভাবি খাইব। হা হা হা এবং হি হি হি এবং হো হো হো। নুরুলের হাতের লেখা ভাল। সে সুন্দর ছবি আঁকে । নুরুল সুন্দর করে বাংলা এবং হিন্দি সিনেমার গান গাইতে পারে। আরবিতে সুর করে হামদ এবং নাত এবং কোরান তেলাওয়াত করে সে পুরস্কার পায় প্রতি বছর স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃিতক অনষ্ঠুানে। কিন্তু নুরুলর প্রেমপত্র লিখে। তার প্রেমপত্রে একা একা লাগে জানগো ভালোবাসি কষ্ট প্রভৃতি ইত্যাকার বখে যাওয়া পোলাপাইনের বদ কথা আছে এবং চিঠির সর্বশেষে বি: দ্র: তে লেখা আছে: হে মেরে হাম সফর, একি জারা ইন্তেজার। নুরুলের বাবার চোখে লজ্জার গড়ানি, মুক্তার বাবার চোখে মান সম্মান চলে যাবার ভয় মেশানো গনগনে রাগ।
জোবেদের প্রায় ভাবী বৌকে প্রেমপত্র লিখেছে যে জোবেদ আশরাফ স্যারের বাকিতে ফ্রিতে এবং স্পেশাল আদর পাওয়া টি স্টলের প্রোপাইটার অশিক্ষিত বাল্য বন্ধু। অতএব নুক্ষুলকে একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতেই হয় যা দেখে আর কোন ছেলে যেন এরকম পাকামী না করে। বকাবকি গালাগালি ঠাট্টা গর্জন তর্জন উপদেশ আদেশ শেষ হলে তিনটি বেত ঝরে ভেঙে গেলে নুরুলের এরোপ্লেন স্টাইলের চুলের গোছা ধরে আশরাফ স্যার তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘোষণা দেন, আগামী সাতদিন ডানহাতের যে তিনটি আঙুল ব্যবহার করে নুরুল চিঠিটি লিখেছে সে তিনটি আঙুল একসঙ্গে করে একটি কাঠিতে বেঁধে দেয়া থাকবে। কাঠিটিও তিনি বের করেন পকেট থেকে। একটি বাঁশের ভাঙা টুকরো যাতে বল পয়েন্ট ব্যবহার করে ঘসে ঘসে খোদাই করে লিখা: এন যোগ এম। কিছুক্ষণ আমরা এবার মাধাইল খালের পারে দাঁড়াতে পারি। সারি সারি ছেলেমেয়ের মাঝখান দিয়ে আমিন মিয়ার পিছু পিছু নুরুল এখন বাড়ি যাবে। নুরুলের সহপাঠীরা এবং সহপাঠীনীরা তাকে দেখবে হাসবে ভীত হবে টিপ্পনী কাটবে ঠাট্টা করবে সহানুভূতিপ্রবণ হয়ে নিজেদের মুখ লুকাবে, সে সব আমরা কিছক্ষণ দাঁিড়য়ে দেখতে পারি। নুরুলের ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি তজর্নী মধ্যমার সরল সমীকরণটিতে আমরা মনে মনে যোগ চিহ্ন মুছে বিয়োগ চিহ্ন বসিয়ে দিতে পারি, আমরা নুরুলের নাকের জল চোখের জল ঝরা দেখতে পারি, তার মাথা হেঁট করে ত্রস্ত পায়ে বাবার পেছন পেছন হাঁটাটি অনুসরণ করে এগুতে পারি, কিন্তু আমাদের সাহস হবে না নুরুল নামক একটি পনের বয়সী রক্ত-মাংস-হৃৎপিণ্ডের হৃদয়ে ঢুকে যেতে, বয়সের আগেই যে পেকে গেছে, ঝুম বর্ষায় যে অঙ্ক কষার জন্য সাঁকোতে গেছে যদি আসা যাওয়ার পথে আরেকটি রক্ত-মাংস-হৃৎপিণ্ড তা দেখতে পায়। আমরা জানতে পারি না সে হৃৎপিণ্ডটির কী ভূমিকা ছিল এ সমীকরণ রচনার পেছনে, আশরাফ স্যার আমাদের বলেন নি, জোবেদ আমাদের বলেন নি, চেরাগ মুন্সি আমাদের বলেন নি। নুরুলের দীর্ঘ তিন ঘণ্টার বিচারকার্যে কেবল মার খাওয়ার ফোঁপানো ছাড়া আমরা তার কাছ থেকে শুনি নি একটিও সংলাপ এবং গত শতাব্দীর প্রেমের সিনেমার মত এই বিচারকার্যের কোন এক পর্যায়ে দৌড়ে আসে নি মুক্তা নাম্নী সেই বনহংসী যার জন্য নুরুলের হে মেরে হাম সফর। অর্থাৎ কিনা আমরা একটা হাত তালি বাজানো হতে বঞ্চিত হয়ে থাকলাম কেননা এমন একটা চমৎকার অন্তর্মিলন পর কোন পাষাণ হাত থাকত বাজনা বিহীন! নুরুলের পরবর্তী সাত দিন যাপনের একটি বিস্তৃত বিবরণ জানার জন্য আমাদের মন আকুলি বিকুলি করবে, অদ্ভুত এই শাস্তিকে আমরা অবিশ্বাস্য মনে করব মাথা নাড়ব আর বলব, দূর এটা কেমন করে হয়। আর হৃদয়হীন এই বিচারকার্যের জন্য আমরা আশরাফ মাস্টারকে ঘৃণা করতে শুরুও করতে পারি বিশেষত শাস্তির পরদিন থেকে যিনি নুরুলকে তিনআঙুলি নুরুল বলে ডাকতে শুরু করেছেন এবং নুরুলের সহপাঠীদেরকেও তাই ডাকতে উৎসাহ দিচ্ছেন। কিন্তু এত কিছুর মধ্যমণি যে নুরুল ( যার হৃদয়ে আমরা উঁকি দিতে সাহস পাচ্ছি না), তাকে দেখব তিনটি আঙুল কাঠিতে বেঁধে ভাত খাচ্ছে, গোসল করছে, বই পড়ছে, (হাতের লেখা তাঁকে লিখতে হবে না আগামী সাতদিন) এবং মাঝে মাঝে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে আঙুল তিনটি দেখছে। এর মাঝে আমাদের কানে টুকরো টুকরো সংলাপ ঢুকে পড়ছে এদিক ওদিক হতে আর আমরা তিনআঙুল বাঁধা নুরুল দেখছি, দেখেই যাচ্ছি, কি দেখে নুরুল তার কাঠি বাঁধা বৃদ্ধাঙ্গুলি তর্জনি আর মধ্যমার বন্ধনে অমন করে! -হোলাহাইন বেশি সেয়ানা অন বালো না, অন ঠেলা বোজ। -আশরাফ মাস্টরের বুদ্ধি আছে যাই কও তোমরা। কোন অসুখের কোন ওষুধ হেই বালা জানে। -এক্কেরে বালা বিচার অইছে। জীবনেও মাইয়ার নাম মুখে আইনতো নো। -বাবুরে, হোলার বাল গজায় ন ঠিকমত অনই শুরু কইছে মাইয়া টোগানি। -ইগারে দেই বাকি হোলাহাইন সব সোজা অই যাইব দেইখ্খ আঁই কইলাম। -তুই আঁর মুকে জোতার কালি মাখাইচচ। মাইনষে কইব কি হোলা হেডে ধইরছ এরুম বেদ্দপ। মাইনষের মাইয়ার হিছে গুরে! আর খালি বুঝি আঁর হোলার দোষ? মাইয়া ইগার বুঝি কোন দোষ নাই? এরুম অপমান করনের আগে আল্লা আঁরে উডাই নেন ন কিল্লাই। -ইগার বাঁধ কেউ খুলবা না আঁই কইলাম, তাইলে আঁই কুনুগারে ঘরে জায়গা দিতাম ন। আঁর মান ইজ্জত সব নিছে হারামজাদায়। তো ইত্যকার এসব এবং নুরুলের মা এবং বাবার শেষোক্ত অভিমানী রাগী সংলাপ শোনার মধ্য দিয়ে নুরুলের এক দিন যায়, নুরুল এখন তিনআঙুলি নুরুল। নুরুলের দুই দিন যায়, নুরুল এখন আরো বেশি তিনআঙুলি নুরুল। নুরুলের তিন দিন যায়, নুরুল এখন আরো আরো বেশি তিনআঙুলি নুরুল। নুরুলের চারদিন যায়, নুরুল এখন আরো আরো আরো বেশি তিনআঙুলি নুরুল। একটা দৃশ্যমান পরিবতর্ন আমরা দেখি নুরুলের চেহারায় এবং বুঝতে পারি কাল রাতে এবং কিংবা পরশু রাতে এবং কিংবা তার আগেরদিন রাতে এবং কিংবা গত এক যুগ এক শতাব্দী ঘুমায় নি নুরুল, শুনতে পারি সারাক্ষণ তার কানের ভিতর একটি দু‘লাইনের অর্থহীন ছড়া ঘুরে ঘুরে বাজে, বাজতে থাকে যা তাকে দেখেই সুর করে গাইতে শুক্ষু করে গ্রামের পিচ্চি জোবেদেরা, পিচ্চি চেরাগেরা এবং পিচ্চি আশরাফ মাস্টরেরা তিন আঙুলি নুরুইল্যা, খাদে হান্দা বদইল্যা। তিন আঙুলি নুরুইল্যা, খাদে হান্দা বদইল্যা। এই চতুর্থ র্দিন, নুরুল যখন আরো আরো আরো বেশি তিনআঙুিল নুরুল, তখন মধ্যরাত। উ উ উ একধরনের শব্দ শুনতে পেয়ে আমরা ঢুকে পড়েছি নুরুলের ঘরে। দেখি নুরুল বসে আছে তার টেবিলে। ছড়ানো ছিটানো অঙ্কের বই, সামাজিক বিজ্ঞানের বই, ভূগোলের বই। নুরুল তাকিয়ে আছে তার হাতের দিকে। তার চোখ টকটকে লাল। উ উ উ শব্দ আসছে তার গলা থেকেই। তার শরীর অল্প অল্প কাঁপছে প্রচণ্ড জ্বরে। নুরুল কি হাঁটছে? নুরুলের মনে হয় সে হাঁটছে। না, না, হাঁটছে না। দৌড়াচ্ছে। দৌড়াচ্ছে? তা হলে হাতের আঙুলে মেঘ লেগে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে কিভাবে? তবে সে উড়ছে। বাহ! উড়ছে। উড়ছে পায়ের তলায় একটা সরোবর নিয়ে। সরোবরে ফুটে আছে একটা নদী। চোখে হাত বাড়ায় নুরুল। এত চোখ? এত চোখ তার কখনো ছিলো না। ছিলো না তো। নুরুলের মনে হয় সে একটা মাছি। মাছি না কি ঘুড়ি। মেঘে দুটো ময়ূর। ময়ূরেরা বুঝি মেঘ খায়? মেঘে চরে চরে চরে ময়ূর হয়ে যায়। নুরুলের চুলে বরফ কুঁচি জমে। উড়তে উড়তে নুরুলের শীত লাগে। উহ! কি প্রচণ্ড শীত। শীতের মধ্যে তার ইচ্ছে করে মুখ ডুবিয়ে দ্যায়। পা ডুবিয়ে দ্যায়। শীতের মধ্যে লিখে রাখে এন যোগ এম। কে এম? এন মানে কি নুরুল? কোথায় দেখেছে এ সমীকরণ সে? পাটিগণিত বইয়ে? বীজগণিতে? একটা লম্বা দুবেণী তার চোখে ঝাপটা মারে। বেণীটিকে তার ভাল লাগে। বেণীটিকে সে ভালবাসতে চায়। ভালবাসতে চাইলে বুঝি খুব খারাপ হয়? বখে যায়? তবে সে বখে গেছে? বখে নষ্ট হয়ে গেছে? ভ্রষ্ট হয়ে গেছে? সুর করে গুনগুন করে গায় নুরুল, তিনআঙুলি নুরুইল্যা, খাদে হান্দা বদইল্যা। সে কি ঢুকে যাবে কোন খাদে? হান্দায়ে যাবে তিনআঙুল নিয়ে? উত্তর জানালার উপরের ঘুলঘুলি হতে শিষ দিতে দিতে তিনটি শালিক এসে নামে নুরুলের টেবিলে। প্রথম শালিক এসে চুমু খায় বৃদ্ধাঙ্গুলিতে। দ্বিতীয় শালিক এসে চুমু খায় তর্জনীতে। তৃতীয় শালিক এসে চুমু খায় মধ্যমাতে। চিঠি লিখতে তবে এই তিনটি আঙুল লাগে। তার হঠাৎ একটা চিঠি লিখতে ইচ্ছে করে। একট মিষ্টি চিঠি। লুকিয়ে লিখে লুকিয়ে লুকিয়ে না হয় পড়বে। কিন্তু যদি ধরা পড়ে। তখন? তখন তো আশরাফ স্যার আবার আঙুল বেঁধে দিবে। তাহলে কি সে আঙুলগুলো লুকিয়ে ফেলবে? লুকিয়ে রেখে দিবে যাতে আর কেউ দেখতে না পায়। লুকিয়ে সে আঙুলগুলো রেখে আসবে শালিখের ঘরে। শালিখের ঘরে গিয়ে লিখবে চিঠি আর শালিখের ঘরে গিয়ে পড়ে আসবে? শালিখেরা ভাল। তারা চিঠি লিখলে বকা দেয় না বরং শিষ দিতে দিতে এসে চুমু খেয়ে দেয় আঙুলে। যাঁতিটি নুরুল প্রায় প্রতিদিনই ব্যবহার করে। দাদির কাছে সে শিখেছে সুন্দর করে সুপারি কাটা। তার টেবিলেই থাকে। সেই চিকন চিকন করে সুপারি কেটে দেয় বাড়ির সবাইকে। এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি আর তর্জনীর মাঝখানে যাঁতির দু‘পাকে শক্ত হাতে ধরে অন্য হাতে সুপারিটা মাঝখানে দিয়ে ঝপ্ করে চাপ দিলেই হয়। ব্যাস। নুরুলের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি আর তর্জনীর মাঝখানে এসে বসে তিনটি শালিক। প্রথম শালিক ঠুকরে খুলে নিতে থাকে তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল, মট্ করে কট্ করে বাজনা বাজে। দ্বিতীয় শালিক ঠুকরে খুলে নিতে থাকে তার ডান হাতের তর্জনী, মট্ করে কট্ করে বাজনা বাজে। তৃতীয় শালিক ঠুকরে খুলে নিতে থাকে তার ডান হাতের মধ্যমা, মট করে কট্ করে বাজনা বাজে।

নুরুল হাতে মিনারের মত দাঁড়িয়ে থাকা অনামিকা এবং কনিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে হাসে। বাহ্। বেশ। থাকলো তবে চিঠি লিখতে লাগা তিনটি আঙুল লুকানো শালিকের ঘরে। কেউ ডাকবে  না আর তাকে তিনআঙুলি নুরুইল্যা বলে। তার তো এখন আছে দু‘আঙুল শুধু। নুরুল পাতা ঝরার মত চেয়ার থেকে মেঝেতে ঝরে পড়ে। খাদের মধ্যে পড়ে নুরুল। অতল খাদের দিকে ভাসতে ভাসতে ভাসতে তার বুকের কাছে সে টের পায় যাঁতির মুখে ভেঙে দু‘টুকরো হয়ে যাওয়া এম যোগ এন। ঘুম আসে নুরুলের। সমীকরণটিকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে নুরুল।

আহা! কতদিন নুরুল ঘুমায় নি!

জ্যোৎস্নাজাগা রাত
শফিক লিটন

০০
রাতের আকাশ। জ্যোৎস্নারাত। জমানো সুখানুভূতি ঝরণার কাচস্বচ্ছ্ব জলের মতো দিগন্তব্যাপী ছড়ানো-ছিটানো। দিনের আলোয় যারা ২৫, ৫০, ১০০, ২০০ কি ৫০০ পয়সার কয়েন হারিয়ে মনোবেদনায় নির্ঘুম ঘুমে বারংবার বিছানার ওম ভাঙছে, জ্যোৎস্নাঢাকা এই রাতে খুঁজলে তারা হারিয়ে ফেলা কয়েন ফিরে পাবে সন্দেহ নেই। জ্যোৎস্নাখেকো পেঁচা ভরাচোখে ভাদরের তালপাকা গন্ধ গায়ে জড়িয়ে কারেন্টের তার আর জানালাঘেঁষা নারিকেল গাছের ডাল আর রাস্তার ধারঘেঁষা তেঁতুল গাছের শাখা আর তমালের তাল কী পাতায় নেচে নেচে চাঁদের বুড়ির ফোঁকলা দাঁতের ফাঁক গলে বেরিয়ে পড়া পৃথিবীপ্লাবিত আলোয় রাতের অন্যরকম নির্জনতা ভোগ করতে থাকে। এই ভোগের ভাগ কী বদহজমের সম্ভাবনায় স্বজাতিদের উদ্দেশ্যে ‘কি আঁচ, কি আঁচ, কিচ্ কিচ্’ রবে রাতের নির্জনতার বুকে শূল চড়িয়ে দেয়।

০১
একটা মেয়ে, যে কিনা কখনো জ্যোৎস্না দেখে নি; অথচ পাড়াগাঁয়ে বনেদি বংশ বলে সুদীর্ঘকাল পরিচিতি পেয়ে এসেছেÑ তার এহেন মন্তব্যে অন্যেরা হাসে, শুধু হাসেই না সাথে আরো আরো অনেক কিছু যোগ করে। এই যোগ-বিয়োগের হিসেব-নিকেশ তাকে আহত বা আহ্লাদিত কিছুই করে না, যদি না অসম্ভব স্বপ্নবাজ সহপাঠী তার পাশে এসে না দাঁড়াত। ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই/ মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?’ এই তথ্য ফাঁস হলে স্বপ্নবাজ ছেলেটি এও জেনে যায়, শুধু জ্যোৎস্না নয়, জ্যোৎস্নারাতে কলপাড় অবধি বিস্তৃত হয়ে থাকা বাঁশঝাড়ের দিকেও তাকায় না সে। কেন এমন হয়? তবে কী বাল্যকালের মামদো ভূত বালিকার অন্তরাত্মায় এক বিশ্বাসের বীজ বুনেছে? তাহলে কেমন আকাশ ভাল লাগে তার; নাকি আদৌ ভাল লাগা কী ভাল না লাগার সুখ বা যন্ত্রণায় তাকে পুড়তে হয় না? স্বপ্নবাজ ছেলেটি যখন জানেÑ আকাশের কালোমেঘ, অবিরাম ছিঁচকাঁদুনে অথবা মাঝারি কী ভারী বৃষ্টি তার ভাল লাগে; তখন তাকে একাকী মধ্যরাতে জ্যোৎস্না দেখার মিনতি জানায়।

০২
পাখিপেঁচার ডাক উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু মানুষপেঁচার ডাক উপেক্ষা করার মানসিকতা বিমলিন করে দেয় মেয়েটিকে। তাই পেঁচাজাগা আর জ্যোৎস্নাজাগা এই রাতে জানালার খিল খুলে সে নির্মল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মধ্যরাতের মায়াকাড়া কুহেলিকা মেয়েটিকে স্বস্তি দেয় না, আশ্চর্য সুন্দর জ্যোৎস্নালোকিত প্রকৃতি বাহুডোর উন্মুক্ত করে আহ্বান জানায় তাকে। দীর্ঘদিনের ছায়া মেয়েটির মনের ওপর প্রলেপ দিতে দিতে যে ঘনকালো পর্দার আবরণ সৃষ্টি করেছিল, আজকের জ্যোৎস্না, পেঁচা কী স্বপ্নবাজ ছেলেটির আকুতি বারংবার তার মনের পর্দায় ফ্ল্যাসলাইটের মতো আলো ফেলতে থাকে। সুদূর আকাশে মিলিয়ে যাওয়া চোখ দুটি হৃদয়ানুভূতির প্রবল প্রতাপে তাকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে, ঠিক শুধু ঘর ছাড়াই নাÑ উঠোন পেরিয়ে তাকে কলপাড় অবধি ঠেলে পাঠিয়ে দেয়। কলপাড় থেকে বাঁশবাগানের মাথার ওপর নেমে আসা জ্যোৎস্নার দিকে তাকাতেই তার সুখ সুখ লাগে, আহা! এত সুখ কোথায় লুকানো ছিল এতদিন? কত কিছুর সংজ্ঞাই তো ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে জীবনের সাথে, তবে কি সুখেরও সংজ্ঞা হয়? আচ্ছা, সুখের সংজ্ঞা হয় কিনা স্বপ্নবাজ ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? ভাল, না মন্দ, না ভাল, না না মন্দ, ভাল, মন্দ, ভাল …। তা যাই মনে করুক সেÑ কাল জিজ্ঞেস করলে কী ক্ষতি; তাই সই। সহসা বাঁশবাগানের ঘাড় মটকে জ্যোৎস্না কি জন্তু এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার শরীরের ওপর। যে জন্তুর জ্বালাতন এড়িয়ে চলতে রাস্তা আর কালেজ আর মার্কেট সর্বত্রই যত সাবধানতা মেয়েটির; অথচ আজকের এই জ্যোৎস্না দেখার সাধে সব পণ্ড! একটি, দুটি, তিনটি … অকেকগুলো পেঁচা সমস্বরে ‘ কি আঁচ, কি আঁচ, কিচ্ কিচ্’ অবিরাম ডেকে রাতের বিশুদ্ধ জ্যোৎস্নার বুক ফালা ফালা  করে ফেলে।

০…
‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই/ মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?’ যে-ফুল একদিন প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল, বছর তিনেক অন্তেÍ আজকের এই জ্যোৎস্নাজাগা রাতে নদীর পানিতে শরীর ধুতে ধুতে খদ্দেরের গুঁজে দেওয়া ফুল খোপাখুলে ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে মেলে ধরে মেয়েটি ভাবে, স্বপ্নবাজ ছেলেটির জীবনে এখনো কী জ্যোৎস্নাজাগা রাত আসে? জ্যোৎস্নাছড়ানো বুড়ির বদলে আকাশে কালোমেঘ, ছিঁচকাঁদুনে অথবা মাঝারি কী ভারী বৃষ্টি যার ভাল লাগেÑ তার ছবি কী এখনও সে দু চোখ মেলে দেখতে পায়? দেখুক চাই না দেখুক, এমন জ্যোৎস্না যেন জীবনে বার বার আসে…

ছেঁড়া ঘুড়ি
তানজিন তামান্না

পলেস্তারা খসা বাড়িটা লাল ইটের দাঁত বের করে হা হয়ে আছে। তেলাকুচির লতা আঁকড়ে ধরেছে মরিচা ধরা লোহার রড । পশ্চিমের আকাশে একটু হেলে সূর্যটা তীর্যক রোদ ফেলছে বাড়িটার মুখে । ভেতরে অদ্ভুত ঘোরলাগা ঠাণ্ডা আর ঘুনধরা কড়িকাঠের গন্ধ । জায়গায় জায়গায় মেঝে ক্ষয়ে গ্যাছে । টুসু হোঁচট খেল ।
একজোড়া পা তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল । খোয়ার সরু রাস্তা দিয়ে সে যত সামনে এগোচ্ছিল রোদ তত পেছনে সরছিল । তফের দোকানের সামনে গিয়ে সে থেমে গেল । রোদ তখন শ্যাওলা পড়া পানির ট্যাঙ্কির গায় উত্তাপ ছড়াচ্ছে । ভীত দু’হাত টুসুকে বুকে জড়িয়ে ধরল । ‘কোথায় যাচ্ছিলে তুমি !’ ‘মায়ের কাছে’ খুব আস্তে উত্তর দিল সে ।
‘চা দেব ভাইজান?’ শান্ত ও কৌতূহলী চোখে দোকানি ছেলেটা তাকিয়ে থাকে তার দিকে । ‘একটা লাল চা দাও। ’এই জায়গায় পাশাপাশি অনেক দোকান ছিল । মাঝেমাঝে দু’টাকা নিয়ে চারআনার বিস্কুট কিনতে আসত তফের দোকানে । তফে কাকা খুব ভালবাসত তাকে । কখনও কখনও টাকা নিত না তার কাছে । এই দোকানে পানি টানত এক বৃদ্ধ পাগল । তার মাথায় চুল ছিল না আর মুখে দুটো দাঁত ছিল । তাকে দেখলেই টুসুরা খেপাত ‘সফদার ডাক্তার,মাথা ভরা টাক তার । পানি পেলে পানি খায় চিবিয়ে চিবিয়ে । ’পাগলটা একটুও রাগত না বরং ফোকলা দাঁতে হাসত ।
সেদিন তফের দোকানের সামনে থেকে টুসুকে নিয়ে বাড়ি ফিরল মনি খালা। বাড়ির সবাই তখন দুঃচিন্তায় অস্থির হয়ে আছে। বারান্দায় পায়চারি করছিল নানা। মনি খালাকে দেখে বকা শুরু করল ‘কই থাকস সারাদিন ,একটা বাচ্চা সামলাইতে পারস না ! ’আর একটুর জন্য মেরুন টয়োটার নিচে চাপা  পড়ে নি টুসু ।
প্রতিদিন দুপুরে মনি খালার কড়া নির্দেশ ‘রোদ কমলে খেলতে যাবে কনক!’ কনক নামটা মায়ের রাখা । বাড়ির সকলে আদর করে টুসু ডাকত । মনি খালার নির্দেশে বাধ্য হয়ে গোলাপি স্প্রিং দেয়া গাড়ি নিয়ে খেলতে বসত আর কান খাড়া করে মনি খালার নাক ডাকের অপেক্ষা করত । বাড়ির সবাই যখন ভাতঘুমে বেহুঁশ তখন পা টিপে টিপে চেয়ার নিয়ে যেত দরজার কাছে । চেয়ারে দাঁড়িয়ে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বাড়ির ভেতরটা দেখে নিত । তারপর খুব আস্তে ছিটকিনি খুলে দৌড় দিত খেলার মাঠে । তখন প্রায় সবাই চলে আসত । গোল্লাছুট, চি-বুড়ি,ছোঁয়াছুয়ি, লুকোচুরি, গাদন, ওপেনটি বায়োস্কোপ,কপাল টুক্কা,আলাপাতা-এইসব খেলায় ব্যস্ত হয়ে যেত তারা আর তাদের পায়ে পায়ে বিকাল শুরুর রোদ । কোন কোন দিন খেলা  হত না। সেদিন তারা দল বেঁধে দু’হাত পাখির ডানার মত প্রসারিত করে ধানখেতের আল ধরে দৌড়ে বেড়াত । অথবা কাশবনের কাশফুল ছিঁড়ে সেটা কে কত সময় হাতের তালুতে রাখতে পারে তার প্রতিযোগিতা করত । এই খেলায় সুতপাই সবসময় প্রথম হত । সুতপা অবশ্য সব খেলাতেই দক্ষ ছিল । আর সব দুষ্টুমিতে ছিল টুসুর সার্বক্ষণিক সঙ্গী । সে টুসুর তিন বছরের বড় ছিল আর সবচেয়ে প্রিয় দিদি ছিল তার । যেদিন খেলতে খেলতে সন্ধ্যা হয়ে যেত সেদিন একা একা বাড়ি ফিরতে ভয় করত টুসুর । তার মনে হত স্বপ্নের আলখেল্লা পড়া সাদা দাড়িঅলা বুড়ো ভূতটা সিঁড়িঘরে ঘাপটি মেরে বসে আছে । তাই সন্ধ্যা হয়ে গেলে সুতপাই তাকে বাড়ি পৌঁছে দিত । শুধু তার একটা দুষ্টুমির কথা জানত না সুতপা ।

লম্বা বারান্দার কার্নিশে মাঝেমাঝে হেঁটে বেড়াত টুসু। কখনও কখনও দু’হাত কার্নিশে রেখে পা ঝুলিয়ে একটু পেছনে হেলে বসে থাকত কার্নিশের উপর । রাস্তার ওপাশে যেখানে আকাশটা নেমে হারিয়ে গিয়েছিল কাশবনের আড়ালে সেদিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকত । শরতের রোদ তখন ইচ্ছামত বিলি কাটত তার কোঁকড়া চুলে । আর সুতপার বেগুনি ফ্রকটা কাপড় আটকানো ক্লিপের বাঁধা ভেঙে প্রজাপতির মত উড়তে চেষ্টা করত ।
একবার শ্রাবণের একটানা বৃষ্টিতে একটা সরপুঁটি পুকুর থেকে উঠে এসে লাফাতে লাগল কদম গাছের গুঁড়িতে । সেটা দেখে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলল সুতপা ‘তাড়াতাড়ি আয় টুসু দেখে যা কি কাণ্ড ! পরে এলে দেখতে পাবি না কিন্তু ।’
যে বছর মনি খালার বিয়ে হল সে বছর টুসুর টাইফয়েড ও ম্যালেরিয়া একসাথে হয়েছিল । মনি খালার বিয়ের পর টুসুর নিজের ঘর,নিজের বিছানা, পড়ার টেবিল আর বাঁশের একটা বুকশেলফ হল যার অর্ধেকটাই তিন গোয়েন্দার দখলে ছিল । মাঝেমাঝে বাপ্পি মাসুদ রানার বই দিয়ে যেত পড়তে । জেসাকুইন খেয়ে আর গল্পের বই পড়ে কাটছিল তার জ্বরের দিনগুলো । একদিন সুতপা শৈবালকে নিয়ে দেখতে এসেছিল তাকে । সুতপা যখন কপালে হাত রেখে জ্বর দেখছিল তখন অদ্ভূদ একটা অনুভূতি তার বুক থেকে তলপেট সোজাসুজি নেমে গেল । সুতপা তখন ফ্রক ছেড়ে কামিজ ধরেছে । আগের চেয়ে একটু লম্বা ও রোগা হওয়া সুতপাকে হঠাৎ খুব বড় মনে হল টুসুর । অবশ্য সুতপা অনেক আগেই অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল । একদিনের পর থেকে খেলতে আসাও বন্ধ করে দিয়েছিল ।
প্রতিদিনের মত সেদিনও দুপুরে সে ও সুতপা উঠানের বকুল গাছতলায় পাটি পেতে লুডু খেলছিল । সাপলুডু খেলতে ভয় করত টুসুর । মনে হত আঁকানো ছোট-বড় সাপগুলো লুডুর বোর্ড থেকে এক্ষুণি ফণা তুলে ছোবল দেবে তাকে । হঠাৎ কোথা থেকে বাপ্পি দৌড়ে এলো হাঁপাতে হাঁপাতে; বললÑ‘ছোটন মামা সবাইকে ডাকে, পিকনিক নিয়ে কথা বলবে।’ ছোটন করিম নানার ছোট ছেলে । প্রতিদিন বিকালে বারান্দার গৃলে তার ছাগলা দাড়ি ভর্তি থুতনি ঠেকিয়ে টুসুদের খেলা দেখত । পিকনিকে অতি উৎসাহী সুতপা ও টুসু বাপ্পির সাথে ছোটনদের বাড়ি গিয়েছিল । বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে সরু একফালি রোদ বিছানা থেকে নিচে নেমে বিপরীত দিকের দেয়ালে বেঁকে গিয়েছিল । সেই আলোতে তারা ছোটন ও তার বন্ধু মঞ্জুকে দেখতে পেল । ছোটন বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসেছিল আর মঞ্জু  বালিশে হেলান দিয়ে বসে সিগারেট টানছিল । বাড়িতে আর কোনো মানুষ ছিল না। সিগারেটের উৎকট গন্ধে বমি পাচ্ছিল টুসুর আর কিছুক্ষণের ভেতর মাথার একপাশে চিনচিনে ব্যথা শুরু হল ।
প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় ঘুম ভেঙে গেল তার । একটা বাজে স্বপ্ন দেখছিল। একটা বাসে করে সে, সুতপা আর ছোটন কোথাও যাচ্ছিল । বাসটা রাস্তার মাঝখানে নষ্ট হয়ে যায় । সে ও ছোটন সেটাকে পেছন থেকে ধাক্কাচ্ছিল কিন্তু বাসটা কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছিল না । কিছুক্ষণ পর সে ছোটনের জায়গায় শৈবালকে দেখতে পেল । এক সময় বাসটা চলতে শুরু করল এবং যেখান থেকে তারা বাসে উঠেছিল সেখানেই ফিরে এলো । নামার পর দেখল পাশে আর একটা বাস একসিডেন্ট করেছে আর মনি খালা মারা গ্যাছে । ’ঘুম ভেঙে খুব পানি তৃষ্ণা পেল টুসুর । বাইরে বৃষ্টি পড়ছে । পানি খেয়ে কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে চেষ্টা করল  সে।
ভোরে ওঠার অভ্যাস নেই টুসুর । কিন্তু আজ ভোরে ঘুম ভেঙে গেল । অনেক সময় বিছানায় শুয়ে থাকল টুসুূ। একটু সকাল হতে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়ল । গতরাতে যে বৃষ্টি হয়েছে সকালে তা বোঝার উপায় নেই। রাস্তাঘাট,গাছের পাতা সব শুকনো । এদিকে আবাসিক এলাকা হওয়ায় ভীড় নেই তেমন । লাইব্রেরির সামনে দিয়ে স্কয়াররোড হয়ে বড় বৃজটার উপড় দাঁড়াল সে। এপাশ থেকে ওপাশের ছোট বৃজটা দেখা যায় । বৃজটার রেলিং কিছুটা ভাঙা । দু’টো বৃজের নিচে শহরের আবর্জনা ও কচুরিপানায় ঠাসা ইছামতি চিৎ হয়ে কোঁকাচ্ছে । টুসু ঠিক করল আজ রিক্সায় করে সারা শহর ঘুরবে । ট্রাফিক মোড় ঘুরে এ.আর.কর্ণার ক্রস করল রিক্সা। ইন্দিরার মোড়ে যানজটে আটকা পড়ে ক্রমাগত বেল বাজিয়ে চলল । তার মনে হল পুরানো এই জেলাটা ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে ।

আঁতুর ঘর
ইবাইস আমান

দোলুজের দিকটাতে গেলে অন্যরকম অনুভব। বাঘ অলা বাড়ির আর দশজন থেকে খোকা বাবুর ভাবনাগুলো আলাদা। দোলুজের বুনো কবুতরগুলো সাথে খোকা বাবুর কথা হয়। ইচ্ছে হলেই কবুতর উড়ে যায় বলাডাঙ্গার মাঠে। হৃষ্টপুষ্ট বড় মর্দা কবুতরের বাকবাকুম ডাকের মোহে নতুন নতুন কবুতরে দোলুজের ঝাড়ন ভরে যায়। সংসার ছেড়ে রঙ বেরঙের কবুতর ভালোবাসার টানে বুনো; চাড়াল কবুতরের সাথে দোলুজের নিরাপদ আশ্রয়ে নতুন সংসার পাতার আয়োজনে গান করে। দোলুজের দেয়ালে মেঝেতে ইদুরে ইদুরের গর্ত। গর্ত জুড়ে বড় বড় গোখরা সাপের খোলশ। সাপগুলো নিশ্চিন্তে থাকে। মনসা দেবীর আশির্বাদে এক একটা সুপরী গাছের মত মুটিয়ে গেছে। ইদুর খেয়ে দেহে চর্বি জমেছে। নড়তে চায়না। মানুষের আশেপাশে থাকতে চায় ওরা। কিন্তু মানুষ ওদেরকে মেরে কেটে পুড়িয়ে ছাড়ে। মানুষের কেবল আজগুবি চিন্তা ! ভাদলি থেকে আসার পর ষাট বছর কেটে গেছে  অথচ সাপে কামড়ায়নি কোনদিন। ওরা নিরীহ শান্ত শিষ্ট থাকতে চায়। মানুষ ওদের তাতিয়ে তোলে। প্রাণ বাঁচাতে ছোবল মারে কেবল। মানুষের অহেতুক ভয়। যদি কামড় দেয়। মানুষ মরতে চায় না। খাদ্য খাবারের পাহাড় মজুদ করে। মজুদ খাদ্যে ভাগ নেয় ইদুর। সাপে ইদুর খায়, জীবন চক্রে- এ এক খেলা ! নিদারুন খেলা। খাদ্য খাবার জীবন মরণের খেলা।
কে কখন কার খাদ্য হবে কে জানে। কত আশা করে মনুর মনুষ্য; কৃষ্ণের কাঙাল হয়েছে-বিত্ত, বৈভব বিলিয়ে,-তা আঁচ করা যায় পূঁজোর ঘরের কারুকর্মে। চিরুনীর দাঁতের মত সিঁড়ি, থাম্ব, দেয়ালের গায়ের নানান বর্ণের নকশাগুলো করেছে অঢেল অর্থ ও পরিশ্রমের পরোয়া না করে।
অনেক মায়া মমতায় গড়া ঘর-দালালগুলোতে ওরা থাকতে পারেনি। পাক মুসলমানের রাজ্যে-নাপাক হিন্দুদের জায়গা কোথায় ! যে যার মত পালিয়ে বেঁচেছে হিন্দুস্থানে।
হিন্দুস্থান থেকে পাক পবিত্র পাকিস্থানে মুসলমানি মাদকতায় গদগদ আদম সন্তানদের শুদ্ধি অভিযান চলছে।
খোকার মনে শুদ্ধ অশুদ্ধ বলে কিছু নেই। ভেড়ি পাড়ার গৌতমের বাড়ির স্বাদ, মফিদের খেজুর গাছের রস, আরেকটিবার পাওয়া গেলে বাষট্টি বছরের বুড়ো বারো বছরের বালক হতে চাইত। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর বিকাশে বালক বেলার বাউলা বাতাসে ইচ্ছে ঘুড়ি উড়তে উড়তে রাজবাড়ি, বলাডাঙার আকাশ ছুতো।
ঘুড়ি উড়ছে-খোকা উড়ছে। ঘুড়ি গাইছে-খোকা গাইছে। ঘুড়ির সুতা কাটছে খোকার পা কাটছে। খোকা ছুটছে-মুফতিপাড়া দিয়ে রাজবাড়ি-কাটাকুমুরের মাঠে। ঘুড়িটার সুতো হাসিমপুরের বাদুরঝোলা তেতুলগাছে আটকে যায়। খোকা সুতো ধরে টান দেয়। শ্মশান ঘাটের শয়তান শয়তানি করে। মুসলমানি মাল ভাংড়া খালে ঢাল।
খোকা আশায় থাকে। কাকডাকা কার্ত্তিকের কুয়াশায় বাবা মার চোখ ফাঁকি দিয়ে গাম্বুলের ডালের ফাঁদে জ্যান্ত চ্যাং মাছ গেথে খোকা মল্লার ধান ক্ষেতে পেতে-অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে। অপেক্ষার শেষ হয় না। কত কালিদাস মেঘদূত পাঠালো। কাব্য কথায় কালি কলম উজাড় হলো তার খবর জানিয়ে দেবে কুজ বক ধরার পর। কত কাল অপেক্ষার পর কুজ বক ফাঁদে পড়বে খোকা জানে না। এক একটা ভোরের অপেক্ষা। অপেক্ষার আকাশে অযুত, নিযুত বকপাখি ! একটা যদি ফাঁদে পড়ে যায়, আকাশ জয়ের আমোদে বক হাতে বিজয় বাজনা বাজাবে।
অপেক্ষা করার আনন্দে খোকার শরীর উড়ে। ন’ মল্লার মেলেটারি আমগাছে থাকা হামেদার কমলা লেবু দেয়া পরি খোকার সাথে কথা বলে। মিলিটারি আমগাছরা কখন যে পারিজাত হয়ে গেল ! খোকা আর খোকা থাকে না। পৌরাণিক পরী থেকে পুষ্প পুরাণের পরীর সাথে খোকার কত ভাব ! হামেদাকে শুধু কমলা দিয়েছে। খোকাকে রাজ্য দিতে চায় ! খোকা যেতে চেয়ে যায় না। খোকা মল্লার ধান খেতে পাতা ফাঁদে কুজ বক পড়তে চায়। আহা তারা ফাঁদে পড়ে খোকার কাছে থাকতে চায়। খোকাকে ভয় না পেলেও দু’পেয়ে মনুষ্য প্রাণিদের বড্ড ভয় পশুপাখিদের। বকগুলো খুব চালাক। ফাঁদের আশে পাশে ঘুরে চিৎপুঁটি খায়, ফাঁদের মাছ খায় না।
খোকা অপেক্ষা করে। খোকার বয়সী দু’টো পরী খোকাকে আদর করে। কাছে এসে সুবাস ছড়ায়। খোকার মন আনচান করে। মাকে ছেড়ে পরিরাজ্যে পারাপার কেমন করে হবে।
রিফ্যুজি-জোলায় দেখতে দেখতে গ্রামটি ভরে গেল। জোলারা বাশদহ, ভাদলি, হাজিপুর আর রিফ্যুজিরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গোবরডাঙ্গা, পাঁচপোতা থেকে বখতিয়ারের ঘোড়ার মত ছুটে এসে লক্ষণ সেনদের হিন্দু রাষ্ট্রে চালান করে দিল। বড় বড় বাড়ি। শান বাঁধানো পুকুরগুলো দেখে মনে হয় লক্ষণ সেনদের কলিজা ছিড়ে গেছে আতুর ঘরের মায়া ত্যাগ করে হিন্দু রাষ্ট্রে যেতে।
কী এমন লাভ হলো- হিন্দু মুসলমানের আলাদা রাষ্ট্রে। জোলারা রিফ্যুজিদের গালি দেয় রিফ্যুজি বলে। রিফ্যুজিরা-জোলা বলে।
মালপাড়ার মালোরা সুজাত নানার মালকাচায় কতকাল যে নাচবে-তা কী জানে সতিনাথের বাশতলার কৈ মাছ গুলো।
জোলারা কাপড় বুনে না। তা’হলে ওদেরকে জোলা বলে গালি দেয়া কেন ? রিফ্যুজিরাই বা কী দোষ করল। ধর্মপুত্ররা ধর্ম রক্ষা করবে মানুষের রক্তে পবিত্র হয়ে। যা শালা ম্লেচ্ছ, যবনের দল পাকিস্থানে। মালাউনরাই বা থাকবে কোন সাহসে পাকিস্তানে।
বসতভিটাগুলোয় সেই থেকে কোন শান্তি নেই। জোলারা কাপড় বুনা ছেড়ে ব্যবসা বাণিজ্যে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, পাবনা জয় করে মেলিটারি আম গাছের বড় আমটি খেতে পারে নি।
রিফ্যুজিদের কিছু লোক কাচতে হাতে মালাউন, জোলাদের জমিতে যায় কাক ডাকা ভোরে। কত সাতচল্লিশ, বাষট্টি যে গেল তার খবর রাখে কাঠ মোল্লারা। দালালদের দলাদলিতে মেম্বরের পোয়া বারো। পান্তাভাতে ভোট।
হানাফি-আহলেহাদিসদের জলসায় পিয়াজু-পাপড়ের পসার। মৌলুবীদের মেদে কলুপাড়ার তেল। ঘানিতে জুড়ে দিলে কিছুটা লাঘব হতো। কেচ্ছা কাহিনীর আরবী ঘোড়ার পা বাংলার পলিমাটিতে আটকে যায়। মরুভূমির লু’ হাওয়ার সাথে কাল বৈশাখীর মেলে না। এক হাজার এক রাত্রির ঘটনা এক রাতের এক প্রহরে বয়ান করে ওরা পার পেয়ে গেলেও হাতেম খেপলে মুক্তিপাড়া কাঁপে। নয় মাসের নয় গুণিত ত্রিশ অর্থাৎ দুশ সত্তর রাতের কাহিনী কথায় ছলেমানের মাথা গরম হয়; কত কিছু করার আশায় কিছু না করার উন্মাদনায়।
অনেক ঘটনা ঘটে গেল খানের আমলে। ছিয়ানব্বই গ্রামের মালাউনদের রক্তে ঝাউডাঙার ম্লেচ্ছ রাজাকাররা গোসল সারে ভাঙড়া খালে। ওদের শরীরের দূর্গন্ধ যায় না যমযমের পানিতে। নররক্ত, মাংশের গন্ধ থেকে যায় জন্ম-জন্মান্তরে। ছিয়ানব্বই গ্রামের বুড়িটার কান্নায় মোজু রাজাকারের জিহবায় জল। শরীরে বল। ঝাউডাঙার বারবণিতাদের পোয়াবার। মোজু রাজাকার খেলবে এবার বেবুস্যে মাঠে। গোবিন্দকাটির মায়ের কোল খালি হয়।  পাথরঘাটার পরহেজগারের জানাজায়।
সাফা মারওয়ার শয়তানগুলো বাগিয়ে শত্রু সম্পত্তির মৌজায় মৌজায় বসিয়ে রেখেছে। মালাউনদের ‘জমি’ গণিমতে মাল। আলের গায়েই তো ধান। আল কেটে জমি বাড়ায় বোম্বাই হাজী। খোকা মল্লার জমি দানবে খায়। মালাউনদের মাংশে বড্ড সাদ; গণিমতের মাল। পাকিস্তান-হিন্দুস্থান নর মাংশ ভোজের মহাস্থান।
বড় মল্লার কবরে জোলা মনসুরের কবিরাজি ওষুধের বোতল। কাজ হলো নারে, কোন কাজ হলো না। সাড়ে তিন হাত ছাড়া মানুষের কি থাকে, থাকে মানুষ হবার সাধনা। শব‘ইবরাতের রাতে গো-মাংশের ঢেঁকুরে রয়েলবেঙ্গলের লালা। ওরা সব খাবে। বরাতের রাতে বড়াই করে বলতে হবে না, আমরা হানাফি। হাদীস অলারা বলবে জাহান্নামী। সবাই নামী-দামী বেহেশ্তবাসী কি না। ইসরাইল মাস্টারের নির্ভিকতায় বুকের মধ্যে গোলা-বারুদের ক্ষত। শালা বাদরের বাংলাদেশ। মহররম দেয়ার বল দেয়ার। রিফ্যুজিরা মাঠে যায়- জোলারা জমিজমায়।
গোবিন্দ চন্দ্র বিদ্যালয়ে সুধির বাবুদের সুদের হিসাব। সাংঘাতিক সাংবাতিকতা আর কারে বলে! এক একটা সংবাদে জোলা-রিফ্যুজি রাত জাগে। মুক্তিপাড়া, আমতলাপাড়া, কলুপাড়ায় শিয়াল ডাকে। কার ঘরে কে যাবে? কার মুরগি কে খাবে? ভোটের আগে সব দেবে। ভোট ফুরালে সব নেবে। সুদের অংক চায়। সুদ-কষায় ফুল মার্ক, নইলে মুরদাবাদ।  মাছি মারা কেরানিদের মুখে বেদ বাক্য। বক্তৃতার বখ্তিয়ার খিল্জি ঘোড়া ছুটায় রাজবাড়ীর বলাডাঙার মাঠে। শূন্য মাঠে কেরানির কদর হেড পন্ডিতের ওপরে। কেরানির কেরামতি কোমলমতি বালিকার কপাল পোড়ায়। দুধের সরের মত সতীত্ব শুকরে চটকায়।  বিদ্যা বিনয়ের বাজারে বেবুস্যে ব্যবসা।  বাণিজ্যের বিদ্যা, বিদ্যার বাণিজ্য। বিদ্যা বাণিজ্যং দদাতি। মানবতা খাদ্যং হযাতি।
মালাউন ম্লেচ্ছ দেশে মাৎস্যন্যায়ে মাছ মারে মেকুর মানুষ। মেদ মজ্জা হাড়পাঁজর খেয়ে মনিবের কলজে ছেড়ে। আরে পাইছি আর পাবো। খেয়ে দেয়ে দেউড়িতে বসে গালি দেবো। আমরাতো বাবার বাবা। রাজনীতি ব্যবসায় খানদানি মাল। আরবী রাজতন্ত্র আজমী বঙ্গে। সাধ্যি আছে তো দেখাক না শালা, কার কত ক্ষতি করার শক্তি সামর্থ। গ্রাম সরকার। পুলিশিং কমিটিতে শালা চুতমারানির মূর্খের দল। শিক্ষিত লোকেরা শালিস করে না। কপি ক্ষেতে শুকুর তাড়ায়। কার ঘরে কে সাজাল দেয়। খাকনা এডিস মশা; ডেঙ্গু জ্বরে মরবে। আমার তাতে কি? নিজেরটা ঠিকঠাক থাকলে হয়। ছোট সংসার ছোট চিন্তায় বাড়তি ঝক্কি ঝামেলা। হোক না মেম্বর-চেয়ারম্যান; চোর-শোর, দালাল-বাটপার।
কিন্তু আগুন লাগলে দেবালয় রক্ষা পায় না। চালাক মানুষ ! তোমার ছোট্টঘরের ছোট্ট আঙিনায় আগুন লাগলে ঘর দোর পুড়বে। দহনে কলজে জ্বলবে। কী জানি কিসে কী হয় বাপু। আমারটা বজায় থাকলে বেঁচে যাই। রক্ষে নেই গোলাম হোসেন। রক্ষে নেই। বঙ্গদেশের বেবুশ্যে বাঙাল বড্ড হুজুগে। গড্ডল প্রবাহে তিন লক্ষ থেকে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ দেবে। রাজাকার মুক্তিফৌজ মিলে জলসা করবে। ক্ষমতা দেখাতে হবে আর কী !
মিলিটারি আম গাছের উপরে। মনির বাসপাতা কাগজের ঘুড়ি উড়ছে। বলাডাঙার সরদার পাড়ার ঘুুড়ির চোখে ঘুম নেই, গান গেয়ে গালি দেয়- তোমাদের ঘরে শান্তি নেই। রামায়ণের রাজ্যে বিষাদসিন্ধু। দজলা ফুরাত ফুরিয়ে গঙ্গা ভাগিরথিয় ভাগ বসাও। রাজতন্ত্রের রাজন।  মসজিদের মুনিষ খাটতে চাওনা। পেট্রো ডলারে পরের পয়সায় পোদ্দারি।  খোকার সব চাই। খানের আমলের খান খান করা মাঠে স্বাধীন বাংলার জন্মান্তরে। বালক বেলার বল্গা বিশ্বাসে বিরতি নেই। বিভূতির দেবযানে চড়ে সতিনাথের বাঁশতলা দিয়ে ঢুকে মালপাড়া হয়ে-আমতলা পাড়ায় আতা মল্লার ভিটায় আম কুড়াবে। প্রাণভরে আম কুড়ায়। কেউ বাধা দেয় না। চার-চারটা কলপি আমগাছে আমগুলো নুয়ে পড়েছে। মতিয়ার দালালের কাঁচামিঠে আমে কাটা। মেদ-দাদির গালি খেয়ে কত জাহাঙ্গীর পালালো। খায়ের মিয়ার ভূতের বাগানের ভূতগুলো একরামুলের তাড়া খেয়ে পালায়। হাফিজুল মতি বুড়োর তরমুজ নিয়ে বাঘ অলা বাড়ির দোলুজে ছোটে। আরবীদের রাজ্যে আজমী বাঙাল, পাইছে আর পাবে !
মুফ্তিপাড়ার মুফ্তিরা কাতারে কাতারে বাই-সাইকেল মেরামতের মধ্যযুগ পার করে। ডিজিটাল ডিশে পেট্রোডলার দেখায়। সব কিনে নেবে। দ্বিগুন দশগুন দামে বাঁধা নেই। মুলুক মালিকানার দলিলে ছেয়ে দেবে রাজতন্ত্রের রাজ ব্যবসা।
তারের বেড়ের ওই লেজ লম্বা পাখিটা কোথায় গেল।
দুধে আলতা মেশানো রঙে পাখায় সাদা হলুদের হিরন্ময় দ্যুতি। খোকা দেখছে পাখিটাকে। বড় মল্লার বাঁশঝাড়ে বসে পাখিটা লেজ নাড়ে। খোকার বিস্ময়ের বিশ্ব নড়ে। পাখিটা ওড়ে খোকা ওড়ে। বড় পুকুরের সান বাধানো ঘাট। মালাউনদের বাড়ী, পূজোর ঘর, ম্লেচ্ছ মুসলমানের। জাত সাপের জাত যায় না। মালাউনদের কী রুচী ! বাড়ীগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়। ওদের সব ভালো। দোষের মধ্যে দোষ ওরা নুনু কাটে না। ম্লেচ্ছদের ভাষায় অভিশপ্ত। দেখতে দেখতে ওই লেজ লম্বা পাখিটার মত মানুষগুলো চলে গেল। বাঘওলা বাড়ীর বাঘ মক্কা মদীনার চিড়িয়াখানায়। খোকা পাখি ধরবে কী বাঘ ধরবে জানে না।
পাখির মায়া বাঘের কায়ায় খোকার ইচ্ছে ঘুড়ি ঘোরে। ভেড়ি পাড়া, ঘোষ পাড়া, মাল পাড়া, আমতলা পাড়ায়। রিফ্যুজি পাড়ার ময়জার খোলায় জোলাপাড়ার জল। মুফ্তি পাড়ায় পেট্রো ডলার। জোলা পাড়ার জাত সাপগুলো বড্ড খারাপ। সুযোগ বুঝে রিফ্যুজি পাড়ায় ঢুকে ডিম মুরগী সব উজাড় করে।
খোকার ইচ্ছে ঘুড়ি উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে কথা বলে- সাড়ে তিন হাত জাগায় এত সব রাখবে কোথায়? খাও যা খেতে চাও খেয়ে নাও। খেতে পারছো না তাই না? পেটের মধ্যে সাড়ে তিনশ বিঘা জমি জাগর তোলে। কসাইদের কাছে কলিজার কাঁটা ছেঁড়া। মানুষের কাছে মানুষের যাওয়া আসা, ফিরে আসা। যেতে যেতে ফিরে আসা।
এক মা এক মাটি জলের চারাগুলো দুই মা-তে ভাগ হয়ে যাবার পর কেমন যেন হয়ে গেল ! অন্নকে ভাত, ভাতকে অন্ন বলতে বলতে-জলকে পানি, পানিকে জল করে ফারাক্কার ফাপরে মরে ডুবে অথবা শুকিয়ে। শ্মশানের কাঠগুলো শুকিয়ে আগুন । কবর গুলো জল পানি। টিপাইমুখের বাঁধে মমতার মুখ আঁটকায় না। দুই সতিনের চুলোচুলিতে কৃষ্ণ মহম্মদের উকুনগুলো ছটফট করে। মাথায় মগজে কুট কুট কামড়ের কাল শেষ হয়ে যায়। কোথায় যাবে কী খাবে ভেবে হামলে বেড়ায়। ধম্মরাজ্য রক্ষায় রক্ত ঝরানোর উৎসব চলে ১২ মাসে ১৩ বার। রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতে রক্তপাত। হালাকু, চেঙ্গিস, রাজপুতানিদের উত্তর পুরুষের রক্তের নেশা কী আর মেটে ! নুনু কাটার দল আর নুনু ঢাকার দলে ফারাক না থাকলে কেরামতির কারবার চলে না। নুনু কাটার দলগুলোর হরেক কেসম। কারো ইমাম লাগে আবার কারো লাগে না। কেউ দোয়া করে, কেউ দোয়া করতে নিষেধ করে। এসব দেখে নুনু ঢাকা দলের লোকগুলো মুচকি হাসে। দেখি না যবনরা কি করে। মগডালে চড়িয়ে মজা দেখায়।
ধম্ম নিরপেক্ষ উড়াল দেওয়া গণতন্ত্রের মডেল কন্যা মাজা দোলায়। এক দল মজা দেখে অন্য দল মরে-মসজিদে মন্দিরে। বেহেশত-দোজখ ! স্বর্গ-নরক !
কাটা তারের এপার ওপার। একপারের ম্লেচ্ছ অন্য পারে মালাউন। মালাউন ম্লেচ্ছদের আশে পাশে যারা আছে এপারে ওপারে তাদের কারো নুনু কাটা আবার কারো নুনু ঢাকা ! বড্ড মুশকিল !
মেলায় মালাউন ম্লেচ্ছদের মেলা হয় অথবা স্বর্গ যাওয়ার কালে। মালাউন ম্লেচ্ছদের সংকরায়ণের সন্তানরা হয় মানুষ না খোজা। খোজাকে খুঁজতে সময় লাগে। মানুষকে চেনা যায় পুরুষ অথবা নারী রূপে। মানুষ হলে মত প্রকাশ করে। মত প্রকাশের অধিকারে অনড় থাকে। স্বাধীনতাকে স্বাধীন রাখে। পরাধীনতা পায়ে মাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। খোজারা পালিয়ে থাকে। নারী পুরুষের পাছায় লাগে না ; পাছে সব বেরিয়ে পড়ে। বজ্র আটুনি ফস্কা গেরোয় খোজারা ঢেকে রাখে নপুঙ্শতা। যদি দেখে ফেলে কেউ, যতেœ জমানো সম্পদ সোনা কেড়ে নেবে নারী, পুরুষ, মানুষ।
কার খাদ্য কে কাড়ে। কত সাতচল্লিশ গেল। বায়ান্নতে মায়ের কোল খালি হয়ে কলজে পুড়ে জুড়ে গেল। খোকা ছোটে বিজিপি-বিএসএফের চোখে ধুলা দিয়ে সোনাই নদী, কাটা তার পেরিয়ে। আছিয়া খাতুনের বালিকাবেলায় ইটেন্ডা বাদুড়িয়ায়। আব্দুস সোবহানের সোনা রুপার বাজারে। রহিমা খাতুনের আতুর ঘরে।
খোকার আতুর ঘরে কাটা তারের এপার ওপারে ফেলানীদের লাশের রাজনীতি নেই। ইচ্ছে মত উড়া যায় মালাউন ম্লেচ্ছ দেশে।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা