Chinno_35 Cover

গ ল্প

এক কাঠি দেশলাই চিৎকার
শেখ নাহিদ হাছান

উফ!…

আর কত এভাবে!

একেবারে ডুবে যাচ্ছি আমি। বাল!

এইভাবে সময় নষ্ট!

সারাদিন…

কী করি?…

কী করবো?

এর থেকে কি বের হতে পারবো না আমি? কীভাবে? এ তো পায়ে লাগানো লোহার বেড়ি নয় যে আগুনে ধরবো, আমার হাতে ধরা জানালার কেতাবি আলো নয় যে দুই হাতে চেপে রাখবো। এ এক মহাজাগতিক অন্ধকার; নেশা; শরীরের ভেতর শরীরের নেশা, বুঁদ হয়ে আঁকড়ে ধরে,পড়ে থাকে  অনন্তকাল। কী দিয়ে ঠেকাই একে?

সারাদিন এত চিৎকার, গলাবাজি ; নিখুঁত আদর্শ, পরিপূর্ণ দর্শন। আর দিন শেষে? আমিই জীর্ণ, জর্জরিত, সবচেয়ে! মনে হয় এ সবই লোক দেখানো।

একটি দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে বেখেয়ালে।

যাই হোক। উঠা দরকার। ক্লাসে যেতে হবে।

এখন আবার চিরুনিটা খুঁজে পাবো না। বাল! চুল আঁচড়াই কী দিয়ে?

বেঁধে রাখতে হবে! অভাব! অভাব আমাদের বেঁধে রাখতে শেখায়; এখন শৃঙ্খলে বাঁধ চুল, অনটনে ক্লিষ্ট হয়ে শৃঙ্খলিত কর মন। বাহ! দারুণ তো…

এই মুহূর্তে একটি মুখ ভেসে ওঠে ‘কবীর’!

ধাক্কা খাবে?

নাহ…

গভীর চিন্তামগ্ন…

না না, এরকম না। আমরা উশৃঙ্খল হতে পারছি না বলেই যে শৃঙ্খলিত হচ্ছি তা নয়, শৃঙ্খলাকে সঠিক, প্রয়োজনীয় আর উচ্চ আসনের জানি বলেই…

উচ্চ আসন! শৃঙ্খলের যে কী জ্বালা, সে আর এরা কী বুঝবে! অবশ্য শৃঙ্খল আর শৃঙ্খলা এক নয়।

একটি দীর্ঘশ্বাস অতঃপর…

আচ্ছা, এই লোকটা বিয়ের পর কেমন হবে? সারাক্ষণ খালি আদর্শ আর দর্শনের কচকচি নাকি প্রতিদিন কাব্যময় ছন্দমধুর?

হা, হা, হা…

‘জীবন গদ্যময়’…

ক্লাসে যেতে হবে।

দেখা কি হবে? ক্লাসে এসেছে কিনা কে জানে! কেমন জানি একটা! আজব…

কবীর সাহেব দূরালাপনে ব্যস্ত। এতক্ষণ ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কার সাথে কথা বলছে! কী বলে এত! সেই মেয়েটা নাকি? ‘কী কথা তাহার সাথে? তাঁর সাথে!’

একটা দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে।

আচ্ছা ঐ দিন মেয়েটার গলায় কবীরের সুর চলে এসেছিলো? একই রকম শব্দ ব্যবহার, একই ধাঁচের কথা! তার মানে কী? মাত্র কয়েকটা শব্দ; এক মুহূর্ত। কেউ হয়ত খেয়ালই করে নি। কিন্তু কীভাবে?  কেন হলো? তাহলে কী!

যাই হোক তাতে কী? যার যা কিছু হবার হয়ে যাক। কী আসে যায় তাতে?

আসে যায় বহু কিছু?

অসহ্য লাগে, আর জেগে ওঠে গোয়েন্দা মন! ঘটনার পর ঘটনা ধরে গল্প সাজায়। কী বুদ্ধিদীপ্ত অনুমান, অব্যর্থ যৌক্তিক পরম্পরা! শুধু পরম্পরা ভুলে যায় নিয়মসিদ্ধ সাংখ্যপথ, আনুক্রমিক সময়ের সরলাঙ্ক! তবুও কোথাও নিজেকে বুদ্ধিদীপ্ত ভাবাতে ভালো লাগে; গল্পে তবু সময়ের কড়িকাঠ পেরিয়ে যেতে কী সাধ জাগে!…

ঐ বি..ভো…

মাইশা ডাকছে।

ঐ তোর ফোন বন্ধ ক্যারে? আমি আজ সকালে দুই বার কল দিছি!

যাবো নাকি ঐখানে? কী করবো গিয়ে? বসে আছে কতগুলি অপাঙ্তেয়, অকারণ!

বিভা:  হ্যাঁ, মাইশা বল।

১ম: ওই দ্যাখ বিভারে কিন্তু আজকে ছাত্রী ছাত্রী লাগতেছে…

বিভা: (গম্ভীরভাবে) হুম…

২য়: অবশ্য খানিকটা পাত্রী পাত্রীও লাগছে।

বিভা: এতদিনে পাত্রী পাত্রী লাগছে? ওইটা তো অনেক আগেই হয়ে গেছি রে!

২য়: দেখলি, এক্কেরে পামে ফুইল্যা গেছে! আমি যে হ্যারে হুদাই পাম দিলাম হেইডে কিন্তু রেহ বুঝলো না!

হা হা হা… সবার কী অট্টহাসি! দেখি…

এদের সঙ্গ এতটা অস্বস্তিকর!

বিভা: সবকিছু সব সময় বুঝতে হয় না রেÑ

সময়ে নিশ্চুপ বিষণ্নতা চলে আসে তারপর। আর কী বলা যায়? কী বলা যেতে পারে?

মাইশা: তুই খেতে যাবি?

বিভা: হ যামু। তুই যাইতে থাক আমি আইতাছি।

এদের সামনে নিজেকে এমন হীন আর অপ্রস্তুত মনে হয়! সমস্যাটা কি আসলে আমার? কী করতে পারি আমি? কী করার আছে?

আসলে আমার স্থানই এটা না। আমার পৃথিবী জুড়ে শুধু জড়তা আর বন্দিত্ব। শুধু শিল্পেই মুক্তি। শিল্পেই একমাত্র স্বতঃস্ফূর্ত হবার স্থান।

আপা, ভালো আছেন?

সেই মেয়েটা?

এই তো! কী অবস্থা তোমার?

এই তো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এতজন যেচে কথা বলতে আসে! কেন আসে? অবশ্য খারাপ লাগে না। যায় কোথায়? কবীরের সাথে কি এর সত্যি কিছু আছে? আছেই তো। এখন মনে হয় সমস্যা চলছে। আমি কি এদের সাথে কথা বলবো এই বিষয়ে? না না, কী বলবো? আমি বলার কে? কী বলার আছে? কিচ্ছু নেই। আমি কিছুই পারি না ঐখানে!…

ঐ কী খাবি?

ও মাইশা? চলে আসছিস!

আর কইস না বাল। হুদাই সব আজাইরা। বোস। এই সোহাগ? সোহাগ… এই দিকে…

খাবার অর্ডার দেয়ার পর…

মাইশা: তারপর কী অবস্থা তোর?

বিভা: এই তো! তোর?

মাইশা: ভালোই।

বিভা: শ্বশুর সাহেব ফোন দিয়েছিলো কাল। রিসিভ করি নাই। কয়েক দিন ধরেই ফোন দিতেছে।

মাইশা: তো রিসিভ করতি। তুই কি আর যাবি না? যাইতে তো হবেই।

বিভা: গেলে কী হবে? শোন, ঐখানে গেলে কী হবে সেটা আমি লিখে দিতে পারি। ওইসব নাটক তো আর একবার দুইবার হয় নাই! আর এই প্রথমবারই যে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে তাও তো না!

মাইশা: দেখ তুই যা মনে করিস সেটাই কর। কিন্তু তুই তো ওদের ফিল করিস… আর তোর শ্বশুর-শাশুড়িও তো ভালোই… তোর সাথে যে এরকম ঝগড়া হল কেন! আর তোর জামাই?… আমার মনে হয় তুই আর একটু ভেবে দেখ…

বিভা: হুম।

মাইশা: দেখ, তোর যে এত চগিবগি! ভার্সিটিতে পড়তে পারতাছস কিন্তু ওদের জন্যেই?

বিভা চুপ করে আছে। মাইশা আবার বললÑ

মাইশা: কিরে চুপ করে আছিস কেন? কিছু একটা বল!

বিভা: কী বলবো?

মাইশা: এইভাবে আর কয়দিন থাকবি? তোর ভাইয়া কী বলে এই ব্যাপারে?

বিভা: কিছু না। ভাইয়া আমার স্বাধীনতায় কোন ইয়ে করবে না। আমি যা মনে করি…

মাইশা: তোর টাকা পয়সা তো ভাইয়াই দিচ্ছে; তাই না?

বিভা: হুম।

মাইশা: দেখ, তাইলে ভাইয়ার সাথেও একটু পরামর্শ কর। কী করা যায়? কিন্তু তুই তো এইভাবে থাকতে পারবি না। কারোর না কারোর কাছে তো যাইতেই হবে। ঐ শিল্প শিল্প করে তুমি যতই লাফাওÑ বাল সব তাল গাছের উপ্রেই থাকে! কিচ্ছু করতে পারবি না তুই।

বিভা চুপ করে আছে। এখন তো অঘ্রাণ মাস? ক্যাফেতে এত কোলাহলের ভেতরেও শোনা যাচ্ছে বাইরে কী একটা পাখির ডাক।

মাইশা: তোর বাপের বাড়িতে যা। তোর মায়ের সাথে অন্তত দেখা করে আয়। দেখ মেয়ে মানুষের এত জেদ ভালো না। এইখানে তুই একলা একটা মেয়ে কী করবি? কী করতে পারবি? আর রাগ করে মানুষ কয়দিন থাকতে পারে?

রাগ?

চোখ-মুখ শক্ত হয়ে যাচ্ছে বিভার। এক অসম্ভব দৃঢ়তা চোখেমুখে চলে আসছে। ঢেকে রাখা অসম্ভব। রাখতে চায়ও না।

কিন্তু একে আর কিছু বলা যাবে না। কী বলার আছে আর? সব কথাই তো বলেছি একে। ভুলে গেছে? শুধু মনে আছে আমি মেয়ে মানুষ! মেয়ে মানুষের অত চঙ্গি ভালো না। পাতে যে উচ্ছিষ্টটুকু পেয়েছো তাই নিয়ে শান্তির ঢেকুর তোল। তোমার সাত জন্মের ভাগ্যি! বাড়িতে একটা কুকুর পোষলে মানুষ কী তার গায়ে হাত তোলে না! আর সামান্য কী হয়েছে আর না হয়েছে তার জন্য… এইসব ‘মাইয়া মাইনষের’ ঢং… উছলে পড়া ক্ষণিকের আবেগ। রাগ?

আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছে! সে কি আমার জন্য? এসব শুধু খাঁচার উপরে রঙের চকচকি! এই অসভ্য পোস্টমর্ডান খাঁচাগুলোকেও চকচকে রঙ্গিন হতে হয়। তাতে ঘুণ ধরে না আবার কী দারুণ শিল্পও হয়! আহা কী ভাগ্য, অমন সোনার খাঁচাটি পেয়েছ! বাইরে থেকেই শুধু ঐ সুখ দেখা যায়! কিন্তু ভেতরে যে প্রাণটা সুদ্ধ হাঁসফাঁস করে? তখন যদি বলি আমি তোমার পোষা কুত্তাটা না, চাবি দেয়া পুতুল না…

সব বাংলা সিনেমা!

এই নোবেল সিনেমাই যত নষ্টের গোড়া! অ্যাঁ! আবার কবিতা চুদাইছে! যা বাইর অ বাড়িত তনে। ফহিন্নির বাচ্চা! তর কুন বাপের কাছে যাবি দেহা যাবো…

মেয়ে মানুষ আর যাবে কোথায়? সারা দুনিয়ায় আর কোথায় স্থান আছে? এই আজন্ম দলিত মেয়ে জীবনটা শরীর থেকে একেবারে বের করে দিতে পারতাম যদি!

মাঝে মাঝে খুব আকাশ দেখতে ইচ্ছা করে। খোলা একটা আকাশ…

চোখে প্রায় পানি এসে যাচ্ছিলো!

খালি কি আমারই এত সমস্যা? এও তো মেয়ে। ওর কী কিছু হয় না? হলেও কিছু যায় আসে না। চোখ বুজে এরা পুণ্যের ঢেকুর তোলে। আহা কী সুখ অন্ধত্বে! সাত জন্মে একবার একটু সোনার জরি দেখতে পেল এই তো ভাগ্যি! আর কী চাই? কিন্তু আমি চাই। সব চাই। সব চাই আমার। ঐ তোমাদের খাঁচাতে হোক আর যেভাবেই হোক দেখে দেখে রঙ চিনে ফেলেছি। লোক দেখাতেও যদি শেকলটা সূক্ষ্ম করে থাকÑ ভুল করেছ। ছিঁড়ে ফেলবো। বেরিয়ে যাবো। অন্তত এখনি বেরোবার সময়।

মাইশা : কিরে কী অইলো তর?

বিভা : না, কিছু না।

মাইশা : তোর ফোন আসছে, রিসিভ কর।

বিভা : হ্যাঁ। আচ্ছা, তুই থাক। আম্মা কল দিয়েছে। আর আমি রুমে যাবো এখন।

মাইশা : ঠিক আছে।

হ্যালো আম্মা

হ মাও, কী রহম আছ?

এই তো আছি। ভালোই আছি। তুমি?

আমি আছি। শরীর অতো ভালো না। হারাদিনই খালি মাথা ঘুরায়। সুজা অয়ে খারোবার পাই ন্যা।

তাইলে ডাক্তরের উনু যাও।

দেহি যামু। তুমি খাইছ?

হ।

বাড়িত তনে যায়ে আর কোন সমস্যা অয় নাই ত?

না।

আম্মা?

কী?

অ্যাডা কতা কবার চাই। রাগ যেন না কর… রাগ করবা?

কী?  কও…

বিভার কণ্ঠ শক্ত হয়ে গেছে। কিছুটা রাগের আভাস দেখা যাচ্ছে। মায়ের কণ্ঠ কাঁপছে! কষ্ট, ভালোবাসা কিংবা দ্বিধায়?

আম্মা! তুমি আর বাড়িত আইবা না?

বিভা চুপ করে আছে।

এল্লা বাড়িত আহ। তুমার আব্বা বাড়িত আইবের কয়। আমারে পোত্তিদিনি কয়, বাড়িত আইবের কস না, বাড়িত আইবের কস না? কান্দে… দ্যাহ, এহন কী করবা? বাপ অয়, গাইল পারছে। উইল্লে মুন রাইহো না। তুমার শ্বশুর ফোন দিছিলো। তুমারে নিয়ে যাবার চায়। কী আর করবা? মুনের মদ্যে রাগ পুইষে রাইহো না। বিয়ের পর মেয়েদের  শ্বশুর-শাশুড়িই আসল ঠিকানা। হাদিসে আছে ‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত’।

আমি বাইরে আছি। পরে কথা বলব। রাখলাম তাইলে।

বিভার চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেছে।

কেউ কী নেই? যে অন্তত এইটুকু বুঝতে পারে? আমার নিজের মা! অবশ্য শোষণের শুঁড় যখন ঘাড়ে দাঁত বসায়  প্রতিবর্তে তখন  নির্বোধের বাঁধন আলগা হয় কীভাবে। কাজেই বুদ্ধির রাজপথ ছেড়ে পঁচা গলির বাসিন্দা হয়েছেন তিনি বহু আগেই!

আর মাইশা? আমার সব কথা তো ওকেই বলেছিলাম! বললেই কী! বন্ধুত্বের সেই স্থানে আর কে পৌঁছাতে পারে! মনুষ্য তীর্থের পথে আলাদা মাত্রা, স্বকীয়তার সংগ্রামে সহধর্মী কিংবা চলমান সময়ের সঙ্গী নিজস্ব অনুভূতিগুলোর ভাগিদার না হোক অন্তত কথা বলার একটা স্থান তো দরকার হয়। কেউ কি হতে পারে? আসলে কেউ পারে না। তবু যদি হত! কোন মুখ কি মনে পড়ে? না, পড়ে না। কেউ নেই । কেউ নেই।

আমি শিল্পী। হ্যাঁ শুধু শিল্পই আমার একমাত্র স্থান। শিল্পেই মুক্তি।

বিভার চোখ মুখ শক্ত হয়ে ওঠে আবার।

যদি কেউ না থাকে তাতেই কী এসে যায়? শিল্পী কখনো একা হতে পারে না। শিল্পী একার নয়, সমগ্রের? দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, সংগ্রাম সবই তো শিল্পীর শস্যবীজ। হৃদয়ের ঊর্বর পলিতে জন্মানো তার ফল সবার!

এইসব ভারী ভারী কথার পাশেও কোথায় যেন শূন্য মনে হয় শুধু শূন্য মনে হয়!

ছিঃ! কী বিভৎস! না এভাবে মেনে নেয়া যায় না। বহুকাল চুপ থেকেছি। জানোয়ার! তবু এগিয়ে যেতে শরীর সরে না। পরিণাম ভয়াবহ যে! তাতে কী? গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। ওই একদম চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলছে বিভা। সব ভয়াবহ চোখ তার দিকে চলে এসেছে। এখন? কী? পালাবে? পালাবার জায়গা কোথায়? পালিয়ে যেতে লজ্জা লাগে!

শুয়রের বাচ্চা। এত বড় সাহস! এই ধর! সবাই তাঁকে বেঁধে ফেলছে। এটা কি তার শ্বশুর বাড়ি? তাই তো। না তার নিজের বাড়ি? না  না। এই তো তার বাবা ওর পা দুটো বেঁধে ফেলছে। ভাঙ, ঠ্যাং দুইড্যা দে ভাইঙ্গে। সাহস কী! দেহাইতাছি তর সাহস। জমিদারের বাচ্চা…

কী করবে এখন বিভা? কী করবে? পালাবে? কোথায় পালাবে? কাকে ডাকবে? কে? কই কেউ তো নেই, কেউ নেই? প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। ভাইয়া? ও ভাইয়া গো? কে যেন তার পাটা ভেঙ্গে দিলো। দুঃখ কষ্ট কিছুই লাগছে না। ভয়াবহ অসহায় বোধ হচ্ছে খালি। ও ভাইয়া গো, ও ভাইয়া গো… গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। কেমন যেন লজ্জা লাগছে ভাইয়াকে ডাকতে…

হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় বিভার!

কোথায় ভাইয়া? সব অন্ধকার! ও ভাইয়া গো… অস্ফুট আওয়াজ গলা দিয়ে বের হয়। কান্না আসছে শুধু! বহুক্ষণ… কেমন যেন একটা স্বস্তি, একটা সুখ কাজ করে তবু। একটু হাল্কা হয়ে আসে বুক।

এই প্রথম ঘুমের ভেতর জ্বলে ওঠা। প্রাত্যহিক দুঃস্বপ্নগুলো পলায়ানপরতার ইতিহাস ধরে আনে প্রতিনিয়ত। তবু কী চমৎকার সামঞ্জস্য! স্বপ্নে, দুঃস্বপ্নে…

ধরে নিয়ে যাবে। চলে এসেছে। লাল টকটকে চোখ, থমথমে মুখ…

কে এসেছে? পালাও বিভা। পালাও…

পালাবো কোথায়? দাঁড়াবার শক্তি নেই তো। কোথায় দাঁড়াবো?

ওই তো একটা মাঠ। মাঠের ভেতর লুকানোর জায়গা কোথায়? দৌড়! দৌড়! কই দৌড়! ধরে ফেলবে! পথ সরে না তো… ঐ তো দেখে ফেলেছে। কী ভয় লাগে! কী ভয় লাগে!

আরে এটা তো ফাঁকা মাঠ নয়Ñ স্টেডিয়াম; চারপাশ বাঁধা!

কোথায় যাব? কোথায় যাব!…

কয়েকদিন ধরে বিভা নিয়মিত স্টাডি করছে। আসলে হঠাৎ করে দুয়েক দিনে কোন কিছুই ভালো মত করে ফেলা যায় না। নিবিড় অধ্যয়ন দরকার। তারপরেও কিছু বুদবুদ মাঝে মাঝে ঢেকুর তোলে; অসহ্য! তারপর আবার দেখা হয়ে যায় তাঁর সাথেÑ ‘কবীর’। আর বিভার মন আবার গোয়েন্দা হয়ে ওঠে। এসব কী রুটিন হয়ে গেল নাকি! এতদিন এত কিছুর পরও বার বার সেই একই রকম হবে? কেন?

প্রথম অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে। বিয়ের পর কী এক নেশা, নেশার মত ঘোরÑ রাতদিন! চিন্তার সমস্তটা আঁকড়ে ধরে শুধু জ্বলতে থাকে। উঠতে বসতে কাজে-কর্মে যেন কিছুতেই আর শরীর জুড়ায় না। ভেতরে ভেতরে সেই প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার শুধু জ্বলে…

তবে স্মৃতির ঐ দিকটাতে এখন সেঁতা পড়া শেওলার স্পষ্ট আবরণ। বুকের ভেতর তবু কেমন জানি একটা দাগ। শক্ত গাছের উপর ছেলেখেলার মত ধারালো ছুরির লম্বা একটা দাগ।

কিচ্ছু করতে ইচ্ছা করে না। কী করবো? ভাল্লাগে না। বাল! কোন ইচ্ছা নেই, ভালো লাগা নেই, কিচ্ছু নেই! কী এক তৃষ্ণা জাগে শুধু…

আমি তারে পারি না এড়াতে/ মরার খুলির মতো ধ’রে/আছাড় মারিতে চাই,/ জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে/ তবু সে মাথার চারিপাশে/ তবু সে চোখের চারিপাশে,/ তবু সে বুকের চারিপাশে।

সেদিন বিকেলে আবার দেখা হয়ে গেল গ্রুপ থেকে আসার সময়। বসে আছে মাঠের ভেতরÑ ওরা দুজন, কবীর আর সেই মেয়েটা! সারাদিন এদের কথা খুব একটা মনে হয় নি। তারপরেও এই অবস্থায় দেখাটা ক্ষুদ্র ঝাঁকি? আমি কি ওদের কাছ দিয়ে যাবো?

না না, কিছুতেই না। ওইখান দিয়ে যাওয়া চলবে না।

শরীরের ভেতর অদম্য শক্তি এসে যাচ্ছে। ছোট্ট একটা ইটের সাথে হোঁচট লেগে গেলো। ওরা কি আমার দিকে তাকিয়েছে? তাকাক। পেছন ফিরে আর চাইবো না। দৃপ্ত পায়ের এ হাঁটা তবু চলতেই থাকবে অনন্ত পর্যন্ত। হেঁটে যাও পান্থ, হেঁটে যাও, শুধু দূরে… ঐখানে নাহি অবকাশ!

হাঁটায় গতি কমে আসে আবার। কেমন জানি একটা দুঃখবোধ কাজ করে!

প্রচ- মাথা ধরেছে। একটু ঘুমানো দরকার। ঘুম কি আসবে? এই গ্রুপ করা কি শুধুই বৃথা সময় নষ্ট? আজ দুজন এসেছে মাত্র। বাকি যারাÑ শুধু আসে আসে। শিল্প দর্শন যেন আসমানি বাণী। কী করবো? কী করার আছে? মানুষকে তৈরি করার তো কিছু নেই। জাগানোরই বা কী আছে? মানুষ কি গরু ছাগল নাকি যে পেছন থেকে হুঁট বললাম আর সব জেগে উঠে পাল ধরে ভোঁ দৌড়। অবশ্য দুপেয়ে গরু ছাগল আছে। কিন্তু কেউ কেউ তো মানুষ। অনেকেই তো জেগেই আছেন। একটা ছোট্ট দেশলাই কাঠির মত মুখে যাদের উসখুস করছে বারুদ… বুকে জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস, প্রয়োজন শুধু সবাই এক বাক্সে একসাথে জ্বলে উঠা। কিন্তু কোথায় খুঁজে পাবো তাদের? কী এমন ডাক দিয়ে জড়ো করে ফেলতে পারি সবাইকে?

অবশ্য হাজার বছর যে বারুদে জং ধরেছে, সেই অন্ধকার পলিতে স্ফুলিঙ্গের বীজ বপন করবার আছে। ঐখানে জাগিয়ে তুলতে হবে এক একটা বারুদের চারাগাছ।

ঘুম কি এসেছিলো? এতক্ষণ ধরে শুধু ভাবছিলামই। এইসব গাছটাছ লাগাবার আমি কে? আর গাছ লাগানো আমার কাজও নয়। আসলে কী চাই আমি? পৃথিবীর কাছে? কী চাইবার আছে? যদি সবকিছু মসৃণ হয়ে যায় কখনো? কী চাইবো তখন? তখনো বেঁচে থাকতে চাইবো। বাঁচার মত বাঁচতে চাইবো। স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাইবো। মানুষের মত মানুষ হয়ে বাঁচতে চাইবো।

মাঝে মাঝে শুধু একটা চিৎকার দিতে ইচ্ছে করে!

হে মহামানব, একবার এসো ফিরে/ শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে…

উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে গিয়ে বিভার চোখে জল এসে যায়!

আম্মা কল করেছেন। রিসিভ করতে হবে।

হ্যালো আম্মা…

হ্যালো… হ, আম্মা কিবা আছ?

বালাই আছি, তুমি কিবা আছ?

বালাই আছি।

এল্লা ফোনও তো দেও না? ফোন দিলেই খালি সুইচ অফ দেহায়। আমি ফাফুরে বাচি ন্যা।

আম্মার কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ…

কাইল রাইতে ফোন দিলাম ফোন বন্ধ! কী করতাছ? খাইছ?

ঘ, খাইছি।

এই একটা প্রশ্ন আম্মা করবেনই। তার আদরের তুলে খাওয়ানো মেয়ে উপোস থাকবে এটা কি তিনি মেনে নিতে পারেন? মেয়ে মানুষের একটু আশ্রয় আর ঠিকমত খাওয়া দাওয়া এই তো। আর কী চাই? মা! শুধু এইটুকু হলেই সব হয় না; শুধু শরীর ছাড়া কি আর কিছু নেই? শরীর! মেয়ে মানুষের শরীর ঠিক রাখতে হয়!

হ্যালো…

হ্যালোÑ

হ, আম্মা?

কী, কও!

তাইলে… আমরা আহি?

কই আইবা?

তুমারে নিবের? তুমার আব্বারে নিয়ে আহি? আম্মা? মুনে রাগ রাইহো না। রাগ মাটি কর।

বিভা ফোনটা কেটে দিলো। তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেছে। না। এভাবে পালিয়ে বাঁচা যায় না। আমাকে পরিস্থিতির সামনে দাঁড়াতেই হবে। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলা যাবে না।

ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা বন্ধ করে বিভা আবার কল করলো।

হ্যালো, আম্মা?

হ, এই যে ফোন কাইটে গেছিলো গা?

কুঠাঁই তুমি?

আমি বাড়িতি; ঘরতি…

আব্বা কুঠাঁই?

ইস্কুলো… তুমার আব্বারে যুদিল আমি নিয়ে যাই? আইবা?

ক্যা? নিয়াইবা কী জন্যে?

তুমি আর বাড়িত আইবা না? তুমার আব্বা আইবের কয়। আমারে কয় পোত্তিদিনি আইবের কস না; আইবের কস না! আমি আর কিছুই কমু না! এল্লা আইবের ক…

আম্মার কণ্ঠে কান্নার আভাস!

কী কবো?

ওই যে গাইল পারছে না? আর বালা-মুন্দ কিছুই কবো না!

এই ভালো মন্দ কিছুই না বলা আর এক শাস্তি প্রক্রিয়া।

না, মানে আর কিছু কবো না মানে কী? আরো বহু কিছু কবার আছে, আরো বহু কিছু করার আছে; তাই না? তো হেল্লেই আগে ইয়ে করবের কোয়োÑ যে আরো কী কী করার আছে, আরো কী কী করবের বাকি রাখছে?

আ মাও?

হুঁ।

উইল্লে মুন কর ক্যা। অই যে গাইল পারছে না…

ঐল্লে মুন করতাছি ন্যা। ঐল্লে মুন করতাছি ন্যা, এহন হুন তুমিÑ তুমার এহন কিছুই মুন অয়তাছে না। হ্যাঁ? কী মুন অয়তাছে তুমার? ঐ এল্লাহানি এল্লা খালি কিছু কইছে আর না কইছে আর হের জন্যে আমি গোসা কইরে আয়ে পরছি। না? ঐল্লে মাইয়া মাইনষের ছল! কী অইছে আর না অইছে ফুইল্লে আয়ে পড়ছে। ধইর‌্যা পুটকিত ঠিকমুত বাড়ি দিলেই সুজা অয়ে যাবো গা। তাই ন্যা?

হেইদিন মামা ফোন দিছিলো, কয়তাছে তুমি নাহি গোসা কইর‌্যা বাড়িত তনেগেছ গা? আমি কয়লাম যে,গোসা কইর‌্যা আয়ে পরছি কয়দিন পরে হুনবেন মারামারি কইর‌্যা আইছি। আমার হাতে দুনিয়ের মর্দাগরে টু পারাপারি আছে। আরো কতকিছু হুনবেন। হ্যাঁ? আমি বাড়িত থাইহে গোসা কইর‌্যা আইছি; না? নতুন নতুন কিস্তে হাজাইতাছে! এহন আবার নতুন আর এক খেল হাজাইছে!

না গো, উইল্লে তুমার আব্বা কিছুই কয় নাই। কান্দে…

ঐ তুমারো ওই রহমই মুন অয়তাছে! যে কিছুই অয় নাই বাড়িত, এল্লাহানি কিছু কইছে আর না কইছে তার জন্যে আমি বাড়িত তনে আয়ে পরছি। শ্বশুর বাড়িতেও ওই রহম। নইলে এত ভালো সংসার, তাও আমি করবের পাইতাছি ন্যা। তাই ন্যা?

না… অইডে মুন অয়তাছে? গাইল ত পারছেই। গাইল পারন দরলে তহন আর কিছু মুন থাহে তোমার আব্বার? উইল্লে ত জানই! হিডে কই ন্যা…

ওই তো খালি এল্লাহানি এল্লা গাইল পারছে তার জন্যে আমি বাড়িত তনে আয়ে পরলাম। তাই ন্যা? ওই এর চাইতে আরো বেশি কিছু কী, এর চাইতে বেশি, ধর, আমি যদি ঐ বাড়িত মইরেও যাই ন্যাÑ তারপরেও তুমার মুনো অবো আল্লার মাল আল্লায়ে নিয়ে গেছে গা, এই ত! আর আমার বাপ বাড়িত গেলে আমারে পরিচয় দিবের পাবো নাহি? আমার মত মেয়ে লাগবো না কি আমার বাপের? দরকার আছে?

উইল্লে মুনো কর ক্যা? উইল্লে মুন রাইহো না।

আম্মার কণ্ঠে কান্না বুঝা যাচ্ছে এখন!

বাপ অয়! গাইল পারছে, কী করবা? আমি যে থকপের পাই ন্যা?

থাকতে পার না বলেই তো যেখানে আমার একটা কুত্তার সম্মানও নাই সেখানে পাঠিয়ে দাও জোর করে?… কী আর করমু? কিছুই যেদিন না করবের পামু, এইডে বুঝমু যিদিন ঐ দিন মারা যামু। বাইচে থাকমু না। কী অবো বাইচ্যা থাইকে?

উইল্লে মুন রাইহো না…

আম্মা কাঁদছেন। আর কী করবেন তিনি? এ শুধু অসহায়ের কান্না। আর কিছু যে নেই তাঁর। বুকটা তবু ভেঙ্গে যায়যে…

দুনিয়াতে কত হাজার হাজার মানুষ আছে। বাইচ্যা থাকার এত মানুষের কী দরকার? হেগোরে মুন অয় এহন নতুন আর এক খেইল মাথায় আইছে। হেডে ত আর খেলবের পায়তাছে না। এহন খেলের গুটি আর এত সহজেই হাতছাড়া করবো? ঐ তুমারে এহন যিবেই যিম্মুহি নিয়ে যাবার চায় হেবেই হিম্মুহি নিয়ে যাবার পায়। বাইত যামু, আবার ধরবো… এর আগের বারও না বড়িত থাইকে খেদায়ে দিছিলো? পরে আবার বাড়িত গেলেই আমারে কী বুঝাইছে আমার বাপ? তাঁর  মান-সম্মান সব ডুবাইয়ে ফালাইলাম আমি! শ্বশুরবাড়ি থাইহে পলাইয়ে তার বাড়িত গেছি। আমারে নাকি চড় মারছে এই জন্যে আমি বাড়িত থাইহে গেছি গ্যা!  কই এইবারও যিদিন বাড়িত থাইহে বাইর কইরে দিল হেইদিনও না কইলো কী কইলো মুন আছে তুমার?

এহনো ঘুইর‌্যা ঘুইর‌্যা বাইত্তি আহে বাইগ্যা বাইগ্যা আর ভাব দেহান চুদায় আমার হাতে।

আমি ভাব দেহাই; না? এহনো বাইত্তি আহি ঘুইরে ঘুইরে? আবার এহনই নিয়ে যাবার চায়তাছে! নিয়ে যায়ে বাইত যায়ে কী করবো? ধইরে বাইন্ধে বাইরেবো! তারপরে আবার… তারপরেও তুমার কিছুই মুনো অবো না? কবা, না কিছুই ন্যা, ইল্লে এহজাল্লা করলেই কি সইহ্য করন যাব না! তো আর কী?

ঐ এতদিন তো সামনাসামনি কোনকিছু বলিও নাই করিও নাই। করি নাই কারণ খুব সম্ভবত আমি তোমারো বেটি এই জন্যে। ঐ খেল তো আমি একেবারে জন্মের পরেতনেই দেইহ্যা আইতাছি। ব্যাক্কাইল্যা আমারে কয়; না? এইরহম ব্যাক্কাইল্যা আর জগতে নাই! আমার বাপের সমান ব্যাক্কাইল্যা আমি এহনও হই নাই। যদি হই তাইলে এহাবারে খুব ভালো কইর‌্যা বুঝায় দিয়ে আইলামনি ব্যাক্কাইল্যা কী জিনিস? হই নাই কারণ আমি তোমারো মেয়ে, খালি আমার বাপের একলার না! আমার বাপ এক কথায় কবার পায় আমি তার বেটি না! আমার পরিচয় দিবের পায় না। কয়লা না কী করবা? কী আর করমু? কিছুই যেদিন না করবের পামু, এডে বুঝমু যে আমার দ্বারা কিছুই সম্ভব না, ঐ দিন মইরে যামু গা।

মাও গো, রাগ কইরো না, রাগ কইরো না, রাগ মাটি কর। বাপ মায়ের হাতে রাগ কইর‌্যা কতই থাহন যাবো। অইন্য মানুষ অইন্য মানুষের সাথে রাগ কইরে আপোষ হয় না?

তো রাগ করলে, আমার এতদিন পরে রাগ করন নাগে ক্যা?

আমি ত তুমারে ঐ আদর্শে বড় করি নেই যে মুহে মুহে কথা কবা…

আমার বাপেরে আমি দেখছি আমার দাদার সামনে দাঁড়ায়ে কথা কইছে। আর তুমার জামাই; বাপের হাতে না মারামারিও করলো?… কই একটা কথার জবাবও ত দেই নাই, অই জন্যে মুনো অইছে কিছুই করে নাই। কিছুই অয় নাই। কী অইছে!

আমি না হয় কারো কথা মানি নাই হেই জন্যে আমার সাথে এতকিছু! কই তুমি ত তুমার সারা জীবন দিয়ে ফেলছÑ কোন কথাই ত অমান্য করলা না। তুমার এত মুনো অয় ক্যা বাইচ্যা থাহার চাইতে মইর‌্যা যাওয়াই ভালা। তুমার কী জন্যে মুনো অয় একটা কাজের লোকের নাখলা, বাড়ির কুত্তার সমান পাওনাও কোনদিন তুমি পাও নাই। কোন বিশ্বাসডা আছে আমার বাপের উপরে? তোমারে থুয়ে না ঠিকই গেছিলো গা আর এক মেয়ে মানুষের পিছে পিছে? ঐ সময় আমার বয়স এহাবারে কম না। কিছুই যে বুঝি নাই তা ত না। আমি ওই সবও জানি। আবার বিরাট সৎ মানুষ দেহায়! আমরা সব মর্দাগরে সাথে নষ্টি কইর‌্যা ঘুইর‌্যা বেড়াই না? সব কাম-কাইজ বাদ দিয়ে? সারাডা দিন তুমার উপরে যে অত্যাচার করে তারপরেও ঠাউর পায় না? কয় তুই আমার সংসারে আয়ে কী ক্ষতি কইর‌্যা দিয়ে থুয়ে গেলি! তাই ন্যা? এই আমারেও ঐ রহমি মুনো অয়তাছে। বাড়িত তনে আয়ে পড়ছি এহন ত আর অত্যাচার করা যায়তাছে না। যিবেই ইচ্ছে হেবেই ব্যবহার করবো, যিবেই ইচ্ছে হিবেই লাত্থি দিয়ে বাড়িত তনে বাইর কইর‌্যা দিবো, যহন যা ইচ্ছে তহন তা করবোÑ আঙ্গরে আর কী করার আছে? আমরা সইহ্য করমু। এই যদি না অইলাম তাইলে আর আঙ্গর নাখলা বেটি দিয়ে কী অবো? আমরা আবার মানুষ অয়লাম নাহি? আমরা কী মানুষ?

এই মুহূর্তে ফোন কেটে গেল। টাকা শেষ!

হ্যালোÑ

হ্যাঁ, হ্যালো। কাইটে গেলো গা। ট্যাহা শেষ?

হ; তুলছি। ঐ যহন ইচ্চে ধইর‌্যা ধইর‌্যা আঙ্গরে নিয়ে খেল খেলাবোÑ এই কইরেই তারা মজা পায়! যহন যিবেই ইচ্ছে ব্যবহার করবেরই যুদি না পাইলো তাইলে আর আঙ্গরে দিয়ে কী দরকার! নেও, ফালায়ে দেও! বাড়িত তনে বাইর কইর‌্যা দেও? আরে আমগোরে বাড়িত এডা কুইত্তে; এডা কুইত্তে এই পর্যন্ত টিকে থাকপের পাইছে কিনা দেহাইয়োছেন! আইজকে বিশ পঁচিশ বছর যাবৎ তো দেখতাছি একটা দুইটা কুত্তা তো আর পালার চেষ্টা করা হয় নাই। এডা কুত্তা আঙ্গর বাড়িত টিকে থাকপের পায় নাই! আর আমি ত মানুষ?

যেইদিন বাড়িত থাইহে আয়ে পড়লাম ওইদিন এই কথা গুইল্লে তুমারে কবার চাইছিলাম না, ভাবছিলাম যে তুমার খারাপ লাগবো। কিন্তু আইজ কওন নাগতাছে।

আমার ফোনে এডা রেকর্ড আছে। আব্বার মোবাইল থাইহ্যা আমার ফোনে ছবি নিবের যায়ে আয়ে পরছিলো। ওই রেকর্ড হুইনে আমি চিক্কির দিয়ে ঘর তনে বাইরোয়ে পরছিলাম। হ্যাঁ…

রুমারে ধইর‌্যা মারতাছে আর কয়তাছে কান্দই, কান্দই… ও চিক্কির পারতাছে আর আম্মা আম্মা করতাছে! আর এই জিনিস নিজে মোবাইল দিয়ে রেকর্ড করছে! তাইলে কী? একদম প্ল্যান কইর‌্যা অরে ধইরে মারছে! মাইর‌্যা কান্দায়ে আবার রেকর্ড করছে! কী পরিমাণ পিশাচ অইলে একজন মানুষ এই রহম কাম করবের পায়?

অইডে মাইরে না, অইডে এমনেই মজা কইর‌্যা…

হ্যাঁ, ঠিকই আছে, মজাইতো! ঐ যে শামসুল ডাক্তর আয়ে যহন আমার বাপেরে কইছিলো, দেহ তুমার বউ খালি হাসেই! কান্দে না? এট্টু কান্দাওছেন দেহি… তহন যে তুমারে ধইরে লাঠি দিয়ে পিটায়ে কান্দাইছিলো ঐডেও ত মজাই ছিলো। তাই ন্যা? এক জনের উপরে অত্যাচার করা ত বিরাট মজার! যার সাথে করা হয় তারও ত বিরাট মজা লাগে; তাই ন্যা? আর ঐ জিনিস যে খালি রুমার হাতে অইছে তা ত না, আমার হাতেও অইছে। রুমার সাথে যুদি দশ বার কইরে থাহে, আমার সাথে এক হাজার বার অইছে! ঐডে যে কী মজা লাগছে তুমি ঠাউর পাও না? তুমার হাতে ত হারাদিন রাইতই এক কাম করে! ঘটনা অইছে তুমার হাতে এই রহম হইতে হইতে তুমার আর কুনো অনুভূতিই নাই। তুমারে যেই দিকে ইচ্ছে ঐ দিকে নিয়ে যাবার পায়তাছে। যা বুঝাবার চাইতাছে তাই বুঝাইতাছে! এই তো, আর কী?

এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা। ফোনের ঐ পাশে কান্নার শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। কী যেন একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। তারপর আবার…

ঐ সারাদিন একটানা কাজ করার পরে রাতে আবার ঘুমাবার দেয় না। তাও না কয়, যে তুই কী করলি সংসারে আয়ে? সব নষ্ট কইর‌্যা দিয়ে গেলি! বাড়িত যায়ে এই সব দেইহ্যা খালি শরীর ছিঁড়্যা ছিঁড়্যা ফালাইয়ে দিবের মুনে ধরছে আমার। খালি মুনো অইছে যে আমি বোধ হয় আমার ঐ ব্যাক্কাইল্যে বাপের চাইতে আরো বেশি কিছু? আমার শরীরে আরো কিছু আছে! খালি যদি ঐ ব্যাক্কাইল্যার বেটি আমি অয়লাম্নি তাইলে এতদিন আমি বাইচ্যা থাকলামনি ন্যা! আমার শরীর তনে ছিঁড়্যা মাংস-টাংস সব ফালাইয়ে দিয়ে থুইয়ে আইলামনি। যেইদিন দেখমু ওর চাইতে আমার ভেতরে নাই আর কিছু বেশি, ওর চাইতে আমি মানুষ আর কিছু

বেশী নাÑ ঐ দিন আমি আর বাইচে থাকমু না। হেইদিন আমার লাশ কোন জায়গায় খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করবা না।…

এহন আবার কান্দে, ঐ এক নাটক, সিনেমা, ঢং…

ঐ বাড়িত গেলে কাইলকেই আবার কান্দন হাতে লাঠি আইবো। বুঝো নাই? আমি দেখছি, বাড়িতে এর আগে কুত্তা ছিলো না? সেই কুত্তারে ধইর‌্যা পিটেইতে পিটেইতে পিটেইতে এক সময় কুত্তা ল্যাং ছাইড়ে দিছে। যতই পিটেয় কোন শব্দ করে না। এর পরে আমরা হইরে আইলে কুত্তা পলাইলো। এরপর ডাইহে আনার জন্যে কত রহমের কৌশল! তাও আব্বার ডাকে আহে না কুত্তা! শেষ পর্যন্ত আমারে দিয়ে ডাহাইছে! আব্বার ডাকে কুইত্তে আহে না, পরে আমার ডাকে আবার আইছে। হেই সময় আবার ধইর‌্যা পিটেইছে অবলা কুইত্তেরে, আমার সামনেই! আমার হাতেও ঐ একই কাম করবো, ঐ একই কাম!

ওদের ফোনের নম্বর ত আমি ব্লক কইরে‌্য রাখছি এই জন্যে তুমারে দিয়ে বলাইতাছে। এই খেইল ত একবার দুইবার অইলো না। আইজক্যা পইল্যাবার অইলোনি! তুমি এহন সুজাভাবে গপ্প বানাবারি পারবা, যে এট্টুহানি বাপে গাইল পারছে আর না পারছে তার জন্যে বাড়িত তনে আয়ে পড়ছে! কিন্তু এই ঘটনা আমার বাড়িত কত হাজার বার অইছে একবার মুনে করার চেষ্টা কর? শ্বশুর বাড়ির কথা না হয় বাদই দিলাম! আর এইসব বইলেই আর তুমারে কী অবো! খানিক পরে ওরা যহন আর এডা কবো তহন তুমার আর এডা মুন অবো, আমগোরে কথা মুনে থাকপো না। আমার কথা তুমরা বিশ্বাস করতে পার না আর কুঠাঁইকের কুন পরের বেটা আয়ে কী বুঝাইলো আর হেডে বুইঝে আমারে তুমরা দুজখের আগুনের মধ্যে ফালাইয়ে দিলা! কই যামু আমি? যাবার কুন জায়গাডা আছে আমার?

খালি আমি তুমার শরীরের ভেতর থাইহ্যা অইছিলাম, আমি তুমার বেটি এই জন্যে কই জানি এডা কষ্ট অয়! কই জানি খারাপ লাগে। আমি তো তুমার বেটি। তাই ন্যে? ঐডে আমি জানি আর কেউ জানে না! যদি জানলোনি তাইলে কবার পাইলোনি ন্যা তুই আমার বেটি ন্যা! সামান্য একটা কারণে পরিচয় দিতে শরম করলোনি ন্যা! তুমার কুনোদিন শরম করছে?

মা কাঁদছেন। এবার চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন।

আমি কই যামু কওছেন? তুমরা ত যার যার মত যাবা গা। আমি?

কতদিন মুনো অইছে ঐ রহম একটা খাঁচা থাইকে তুমারে আমরা বাইর কইর‌্যা নিয়ে আইমু, খালি আমার শইল্লে এই রকম কোন শক্তি আছিলো না যে বাইর কইর‌্যা নিয়ে আহি! কুনোদিন যদি শক্তি অয় তাইলে তুমার সামনে যায়ে খারোমু। আমার শক্তি অইছেÑ এই রহম এডা খাঁচার মধ্যে থাইহে তুমারে বাইর করমু! আর নইলে কুনোদিন সামনে খারামু না।

প্রচ- কান্নায় গলা ভেঙ্গে আসে, কন্ঠ বুঁজে যেতে চায়, কাঁপে আগুনের জ্বলন্ত শিখার মতই! তারপর গলে গলে পড়ে চোখের জল! আগুন? না। কেবল কান্না, বুক ভাঙ্গা কান্না, অথচ কান্নায় কী শান্তি? জ্বালার উপর দিয়ে যেন ঠা-া জল বয়ে যায়। মুছে ফেলো চোখ, মুছে ফেলো। আগুন চাই আমার, আগুন চাই শুধু…

তুমি কোত্থাও যাবা না আম্মা। তুমি থাকবা। আমি আসমু, যদি কোনদিন শরীরে শক্তি অয়। ঐ দিন আসুক, এর আগে না…

আমি তুমার মুখ না দেইহে কিবেই থাকমু… আমার সোনার মুখ কিবেই দেখমু আমি…

মা কাঁদছেন। কাঁদছেন… একটানা… মায়েরা এরকম কেঁদেই থাকেন! দেশজুড়ে এখনো তাঁরা শুধু টলমলে অশ্রু বিন্দু!

তুই আমাকে একটুও পছন্দ করিস না। পছন্দও করিস না, সম্মান তো করিসই না…

আমি এত কষ্ট তাহলে কার জন্য করি? তোর জন্যই তো!

তুই একটা আস্ত শয়তান…

কবীরের হাতের উপর মেয়েটার হাত। একটা ঝোপের পাশে বসে আছে। প্রথমে অন্যের কথা শুনে ফেলতে কেমন বাঁধছিলো তবু কৌতূহল? তবু প্রতিদিন এক বিরক্তিকর চিন্তামুগুর বাজানোর চেয়ে শেষ হয়ে যাক সব একেবারে। শেষ হলো তবে। মাথার ভেতর এখন ঝিমঝিম করছে। পা কাঁপছে। আর কী শোনার আছে! এই রকমই তো মনে করেছিলাম। কী কী ঘটনা থেকে এমন নির্ভুল সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছে সে হিসাবের গল্প বুনছে নিউরন। এত নির্ভুল হিসাব, অব্যর্থ অনুমানই যদি থাকবে তো এই ঝোপের পাশে গোপনে অন্যের কথা শুনে ফেলার কী দরকার ছিলো! আসলে এই অনৈতিক জেনে ফেলাকে কোন মতে অস্বীকার করতে অন্তত একটা বৈধতা দিতে পারলে স্বস্তি পাওয়া যেত? কেউ অবশ্য দেখে ফেলে নি এখনো! সরে পড়তে হবে। এখনি?

খুব স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে যাচ্ছে বিভা।

চোখ মুখ স্বাভাবিক আছে তো? অবশ্যই আছে। কী হয়েছে! কিছুই হয় নি। শরীরের প্রতিটি কোষ এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। স্থির; যেন প্রচ- ঝড়ের মুখেও নির্দ্বিধায় অবিচলিত থাকবে। অদম্য গতি এসে যাচ্ছে হাঁটায়। আমাকে থামলে চলবে না/ আমার সামনে কোটি কোটি মানুষের গগণবিদারী চিৎকার/ আমার সামনে বিধস্তৃত দিগন্তের/ নিচে অনাবিল সবুজ ধানের ক্ষেত/ আমার সামনে পাকা ধানের মতো জীবনের/ অবিরত সম্ভাবনার সোনালী ভাঁড়ার… কিন্তু যাবো কোথায় এখন? কোথায় যাবো? লাইব্রেরি? লাইব্রেরি, লাইব্রেরি…

অসহ্য! দুনিয়াতে একটা বইও নেই যে পড়ি! সব কেমন অর্থহীন! বিশ্রী! প্রচ- শব্দে বিসর্জনের ঢোল শুনতে পারলে ভালো লাগত এই শব্দটার ভেতর

কেমন একটা বিদ্রোহভাব আছে। বিসর্জনে কি বিদ্রোহ থাকে?

ভালো লাগে না। কী করব? সব কেমন লক্ষ্যহীন হয়ে যাচ্ছে। শিল্প, আদর্শ, জীবন? কী দরকার! কেন সব? সুখ! তাছাড়া আর কী অর্থ আছে? আছে! আছে। অবশ্যই আছে! ‘ও যধাব ঢ়ৎড়সরংবং ঃড় শববঢ়, /অহফ সরষবং ঃড় মড় নবভড়ৎব ও ংষববঢ়’ এইসব বাজে চিন্তায় আর এক মুহূর্তও নষ্ট করা যাবে না। এখনি কাজ শুরু করতে হবে। রুমে যাবো।

একটু ময়মনসিংহ যাওয়া দরকার। মোবাইলের চার্জার কিনতে হবে। যদি টাকা থাকে একটা হারমনিকা কিনবো। ভাইয়া কাপড় কিনতে বলেছে। কী হবে কাপড় কিনে?  অহেতুক বাহুল্যে আর আনন্দ কোথায়? প্রয়োজনবোধ করছি না তো!

লাইব্রেরি থেকে বের হবার পর আবার হাঁটায় গতি চলে আসে। তারপরই আবার কেমন যেন ক্লান্তি আর অবসাদে নিস্তেজ হয়ে আসে শরীর। সব অসহ্য মনে হয়। অথচ পরক্ষণেই আবার হাল্কা বাতাস বয়ে যায়! মনে হয় পৃথিবীর প্রতিটি বৃক্ষও কী মায়াবী! পৃথিবীর সবকিছুই ভালো লাগে; ভালো লাগে; আহা কী ভালো লাগে! সব স্বাভাবিক। আবার তখনি মনে হয় বেদনায় প্রতিটি বৃক্ষও স্তব্ধ এখন! তাতে ভাষা, প্রকাশ, শব্দÑ যেন কিছুই নেই! শুধু চেতনাকে অসাড় করে দেয়া ব্যথা বাজতে থাকে একটানা। তারপরই আবার একটা বুলেট দিয়ে মাথার ভেতর সব ছিন্ন-ভিন্ন করে দিতে ইচ্ছা হয়। কী করবো?

এত অভিজ্ঞতা এত দিন এত কিছুর পরেও কেন এমন লাগছে? এইভাবে কি সারা জীবন একই কষ্ট পেতে হবে বারবার? আবার একই ভাবে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করতে হবে?

আসলে বাধ্য হয়ে কিংবা নিজের ইচ্ছায় আগে যত রকম সম্পর্কই হয়ে থাক সম্পূর্ণভাবে এই একজনকেই ভালো লেগেছিলো আমার! তাঁকে মনে হত ‘ঞযব ষধংঃ ফৎড়ঢ় ড়ভ ফুরহম ষরমযঃ’ শুধু এর সাথে কথা বলেই কখনো বিরক্তি লাগে নি। প্রতিটা সময়ে যেন মুর্ছনা বয়ে যেতÑ সম্মিলিত চিন্তাকে মনে হত ‘হারমনি’। তবুও ‘ঞযব ঢ়ধঢ়বৎ-নড়ধঃ ংধহশ ধভঃবৎ ভরমযঃরহম ধ ভবি সরহঁঃবং’ কেন এমন হলো? কেন? কেন? স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। আর কোন…

শহরে যাওয়ার পর চার্জারের দোকানে ঢোকার আগ মুহূর্তে ফোন এলো অপরিচিত নম্বর থেকে।

হ্যালোÑ

হ্যাঁ, বিভা? কেমন আছো?

ও আন্টি! কেমন আছেন?

ভালো। কোথায় তুমি?

আমি তো ময়মনসিংহ শহরে এসেছি।

ও… তোমার আব্বার সাথে কথা হয়েছে আজ?

না!

ফোন দাও। রাগ নাকি করে আছো? বাবা-মার সাথে কেউ রাগ করে? তোমার শ্বশুরবাড়ি যাও না কী জন্যে?  এগুলো কোন কথা?

না এইগুলো কোন কথা না। যেটা কথা সেটা যদি বলি আপনি শুনতে পারবেন তো? সেটা শোনার শক্তি নেই আপনার। কণ্ঠ শক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন কিছু বলা যাবে না, উটকো ঝামেলাÑ এড়িয়ে যেতে হবে।

এই তো। আপনার কী অবস্থা? মুন্নি এইবার কোথায় ভর্তি হচ্ছে?

ও তো পরীক্ষা দিলো অনেক জায়গায়, কিন্তু চান্স পায় নি কোথাও! তো তোমার আব্বারে কল দাও। ময়মনসিংহ গেছে তোমার আব্বা। কল দাও।

আব্বা ময়মনসিংহ আসছে?

হ্যাঁ। যাওয়ার তো কথা। ফোন দিয়ে দেখ তো এখন কোথায় আছে!

কী জন্যে আসছে?

তা তো বলতে পারব না।

ঠিক আছে রাখি তাহলে?

আচ্ছা। আর কল দাও তোমার আব্বারে…

ময়মনসিংহ চলে এসেছে? কেন এসেছে? পত্রিকার বিজ্ঞাপন নাকি শিক্ষা অফিস? কোন দিক দিয়ে আসছে? এখন তো আবার নতুন নাটক শুরু হয়ে যাবে। কী করা যায়? এখন সামনে পড়া যাবে না কিছুতেই। কিন্তু এইখানে সিঁড়ির উপর তো বেশিক্ষণ দাঁড়িয়েও থাকা যাবে না।

ভাইয়া কল দিচ্ছে? যাক আর একটু সময় পাওয়া গেল।

হ্যালো বিভা?

হ্যাঁ, ভাইয়া?

হ্যাঁ, কী অবস্থা?

এই তো।

কোথায় তুমি?

আমি তো ময়মনসিংহ আসছিলাম একটু…

কী, কোন কাজেÑ নাকি?

হ্যাঁ, একটা মোবাইলের চার্জার কিনবো।

ও আচ্ছা। আম্মা কল দিছিলো আজকে তোমারে?

কই, না তো! দুপুরে আমি কল দিছিলাম আম্মারে। কেন?

ও… কিছু বলছে?

না! কী বিষয়ে?

ওই আব্বা নাকি আজ তোমার কাছে যাবো! অলরেডি নাকি ময়মনসিংহ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সাথে তোমার শ্বশুরও আছে।

ও…

আচ্ছা শোন, ওরা যেহেতু গেছেই তো দেখা করো? আর যদি কিছু বলতে চায় শুনবা। রাগারাগি করার দরকার নাই। সাথে যদি না আসতে চাও তাহলে বইলো পরে যাবা?

আচ্ছা…

ঠিক আছে, তাহলে থাক?

আচ্ছা!

সাবধানে থাইকো?

চলে এসেছে। চলে এসেছে। এখন সামনে পড়লে তো সর্বনাশ! কোন নাটক যে শুরু হয়! সিঁড়ি দিয়ে কে যেন আসছে। আর তো দাঁড়িয়ে থাকা যায় না এখানে। সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার? একটু সময় পাঁচটা মিনিট যদি ভাবতে পারতাম!

সিঁড়ি বেয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে বিভা। যেন এক ভয়াবহ আলো লেপ্টে ধরল। আলো নাÑ স্বপ্নে দেখা সেই টকটকে লাল চোখ! বিঁধে যাচ্ছে গায়ের উপর? মনে হচ্ছে যেন একটা ঘিনঘিনে জিভ পেঁচিয়ে ধরবে তার স্বাধীনতার সারা শরীর!

পাশেই একটা দোতলা বইয়ের দোকান আছে। ভেতরে গিয়ে অন্তত একটু ভাবার সময় পাওয়া যাবে। দোকান পর্যন্ত যেতে পারলে হয়! মনে হচ্ছে এখনি একটা মোটর সাইকেল চলে আসবে সামনে। দাঁড়িয়ে পড়বে থমথমে কিংবা মেলোড্রামাটিক ভয়! যদি  মিশে যেতে পারতাম এই আলোর ভেতর!

ঘোমটার ফাঁক দিয়ে একটুখানি আঁড় চোখে দুই পাশে দেখে নিচ্ছে বিভা।

পেছন থেকে যদি কেউ আসে? হাঁটার ভঙ্গি পালটে ফেলবো নাকি? কেউ কী খেয়াল করছে তাঁকে? না না। এখন অস্বাভাবিক হওয়া যাবে না কিছুতেই। হঠাৎ করে পেছন থেকে একটা মোটর সাইকেলের হর্ণ বেজে উঠলো। ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে গেছে। এসে গেলো তবে সেই মুহূর্ত। দেখ এবার সম্মুখ নাটক…

নাহ। অপরিচিত কেউ। যাক!… কানে গরম বাতাস বইছে। গা ঘেমে গেছে হঠাৎ। কী যে ভয় লাগছে!

দোকানে ঢোকার পর একটু স্বস্তি লাগছে। বাইরের আলোটা এখানে নেই। খানিক সময় পাওয়া গেল। এখন সিদ্ধান্তে আসতে হবে। কী করবো?

বই এর দিকে তাকিয়ে বিভা ভাবতে শুরু করলো।

প্রথমত এখন কিছুতেই ওদের সাথে দেখা করা যাবে না। ভাইয়া বললেও না। খোলা চোখে যেটুকু না দেখা যায় ভাইয়া হয়ত সেটা অনুমান করতে পাচ্ছে না। কিন্তু সমস্যা তো আমার। কাজেই আমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আচ্ছা, তাহলে এবার আসা যাক, সমস্যাটা কী আমার? সমস্যা নয় ভয়! কী ভীষণ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে এই ভয়ের তৈরি হয়? সেই পরিস্থিতি যদি বাদ দেই তবে আমার এই অবস্থা অর্থহীন, সাদা, নির্ঝঞ্ঝাট। আমি কি এই প্রসঙ্গ বাদ দিতে পারি? পারবো না। এবং ঐ অবস্থার ভেতর আমি আর কোনদিন, আমি কেন আমার মরা হাড়ও কোনদিন পড়তে চাইবে না। কিন্তু ভয়ের মুখোমুখি তো দাঁড়ানো উচিৎ? উচিৎ, তবে এখনো সময় আসে নি!

তাহলে যাবো কোথায় এখন? ক্যাম্পাসে? অসম্ভব। ভুলেও না। কারো বাসায়? ঐশী, মাইশা, শুভ, নিয়াজ…

নাহ। কারো বাসায়ও যাওয়া যাবে না।

বাইরে থেকে মোটর সাইকেলের শব্দ এসে মনে হয় গায়ের উপর বাড়ি খাচ্ছে! নড়ে যাচ্ছে হৃদয়পি-? কোন একটা রাস্তায় যেতে পারলে! যেখানে কোন মোটর সাইকেল ঢুকতে পারবে না। কোন রাস্তা? গলি? না। রেললাইন! হ্যাঁ, পেয়ে গেছিÑ রেলস্টেশন! রেলস্টেশনে যেতে হবে এখন। যেখানে হাজারো মানুষ গতিময় অথচ পরিচয় সবারই একÑ ক্ষণিকের সহযাত্রী! কাজেই পালাবার সবচেয়ে ভালো স্থান এখন রেলস্টেশন!

মাত্র দুই বগির একটা ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। উঠে পড়বো নাকি?

ভাই এটা কোন ট্রেন?

কই যাবেন আপনি?

যাবো? এটা কোথায় যাবে?

এটা তো যাবে না। আপনে যাবেন কই?

এই তো…

পাশের লাইনে একটা ট্রেন; আন্তঃনগর? উঠে পড়বো নাকি? দ্বিধা লাগছে!

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। লাফ দিয়ে উঠে পড়লো বিভা। এইবার তাকে ধরবে কে? হাসি পেলো।

কিন্তু এটা কোন ট্রেন? টিকেট তো কাটা হয় নি। টিটির কাছ থেকে না হয় টিকেট নেয়া যাবে কিন্তু নামবো কোথায়? পাশের কাউকে কি জিজ্ঞেস করবো? বলবো ভুলে এই ট্রেনে উঠে পড়েছি? যদি…

অসহায় লাগছে। জেগে উঠছে সেই পুরোনো অসহায়ত্ব!

দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমাকে বিয়ে দেয়া হলো। এতে নাকি আমার সম্পূর্ণ পছন্দ এবং মত ছিলো। হুঁ হুঁ… কী হাস্যকর! সবাই সমস্ত সিদ্ধান্ত নেয়া শেষে এসে জিজ্ঞেস করলো ‘তোর কী মত?’ আমার কী মত! তোমাদের মতের বাইরে যে আরো মত আছে এই কথা বলার সুযোগ কী ছিলো সেদিন? আর বলার পরে যে অত্যাচার শুরু হত, যে নিরাপত্তাহীনতার আবহ তৈরি করা হয়েছিলো তার থেকে বের হয়ে আসার, নিজের দায়ভার নিজে নেবার শক্তি কী ছিলো? ছিলো না। বরং সে শক্তি যেন কোনদিন না হয় তার সব রকম চেষ্টাই তো করা হয়েছে। তাই এখনো উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করা হয় ‘তোমার কী মত?’ দুনিয়াসুদ্ধ লোকে বলে ‘আহা কী স্বাধীনতা!’ আর পায়ে থাকে শিল্পসম্মত চকচকে বেড়ি। কাজেই জোরের পাল্লা যেদিকে হালে, মত এখনো সেদিকেই যায়। মত!

মত তোর শ্যাটার মইদ্দে থুয়ে দে গা!

পুঁথির কথা পাতাতেই মানায়।

প-িতের বেটি সাহিত্য নিয়াইছে রে! আমার হাতে সাহিত্য মারাবি ন্যা কয়লাম। তোর কোন ভাতার গরে…

শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে ওঠে। জেগে ওঠে ক্রোধ?

বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় পালাতে হল! বাপের মান-সম্মান নাকি সব ডুবে গেল।

এই রকম ঢঙ্গী মাইয়া কেমনে হইলো! এত ভালো সংসার। শ্যাটায় তো টান পরে না কুনো সময়!…

আহা কী নিদারুণ!

প্রথমবারের মত ট্রেনে উঠে গেল বিভা! কোথায় যাবে জানা নেই! সে কী অভিজ্ঞতা! আবার সেই ট্রেনেই ফিরে আসতে হলো? পৃথিবীতে আর যাবার জায়গা কোথায়!

আপা, আপনে বসেন।

এই সিট কি খালি?

জি, আমার সাথে একজন ছিলোÑ সে আসে নাই।

ও। আপনি কোথায় যাবেন?

আমি তো যাবো মেলান্দহ পর্যন্ত।

আচ্ছা।

মেলান্দহ। মানে এটা জামালপুর হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব পর্যন্ত যাবে?

অপরিচিত নম্বর থেকে বেশ কিছু কল এসেছে। এটা তো মনে হচ্ছে শ্বশুরের নম্বর? এসএমএসও দিয়েছে! এই লোক তো জ্বালিয়ে ফেলল দেখি! সব ম্যাঁম্যাঁ মার্কা এসএমএস। আর ফোন ধরলেই শুরু করবে ম্যালোড্রামা? আগের নম্বর ব্লক করে দিয়েছি। এখন নতুন নম্বর নিয়েছে?

শালা সব পুরুষ মানুষই কী একই রকম নাকি? ব্যাক্কল? সামনে খানিক কলা ধইরে ফ্যাচফ্যাচ করলো আর বান্দরের মত লাফানো শুরু করে দিলাম! তাই ভাবে? ছ্যাবলা কোথাকার! এরা বয়সকালে করেছে কী? সব মাইয়া মানুষের পেছন পেছন ঘুরেও তো মনে হয় পাত্তা পায় নাই। ম্যালোড্রামা কোথাকার! এদের একটু পাত্তা দিলেও ঝামেলা। বাজারের পুতুল ভেবে বসে। অবশ্য আবার শোধও তুলে। শালা কুত্তার জাত!

আন্টি ফোন দিয়েছে আবার? এই তো ফোন অফ করে রাখতে হবে! বাল!

সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। চারপাশে অন্ধকার। বিভা একটা স্টেশনে নেমেছে। আশেপাশে কোন ভালো হোটেল বা থাকার জায়গা থাকলে থেকে যেত। এই এলাকায় পরিচিত কেউ কি আছে? না। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। রাতেরবেলা তো স্টেশনে থাকা যাবে না। দৌড় দিয়ে বিভা ট্রেনে উঠলো।

এটা তো একটা ইঞ্জিন রুম! কেউ নেই? কী অন্ধকার! ঝিঝি শব্দ হচ্ছে ইঞ্জিনের ভেতর থেকে। এখানে তো একটা চিৎকার দিলেও কেউ শুনবে না। এই রকম পরিস্থিতিতে একটা মেয়ে হিসেবে মনে হয় ভয় লাগার কথা; যদিও একটুও ভয় লাগছে না আমার! খানিকটা বোধ হয় রোমাঞ্চই লাগছে!

একটা লোক ভেতরে এসে গেল। হাতে মোবাইল ফোনের লাইট। বিভা এগিয়ে যাচ্ছে তাঁর দিকে। বিভার গায়ের উপর লাইট ধরেছে।

বিরাট অভদ্র দেখি এই লোক!

বিভা এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটা লাইট না সরিয়েই কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করলোÑ এই কী?

সামনের বগিতে কোন দিক দিয়ে যাবো?

এইখানে কী জন্যে উঠছেন? যান এই দিক দিয়ে যান!

প্রচ- খটখটে আর অভদ্র কণ্ঠে জবাব দিল লোকটা। মনে হয় ট্রেনেরই কর্মচারি। বিভা কাছে আসতেই লাইট অফ করে দিয়ে পাশের একটা ছোট্ট কামরার ভেতর ঢুকে পড়লো।

অন্ধকারে হাঁতড়ে স্পষ্ট আলোয় চলে এলো বিভা। সূক্ষ্ম একটা আনন্দবোধ কাজ করছে। সামনের দিকে এগিয়ে যাবার সময় কয়েকজন যাত্রী সসম্ভ্রমে সরে গিয়ে তাঁর জন্য জায়গা করে দিলো। কেন এরা এই সম্মান করে? শুধুই মেয়ে বলে? নাকি সুন্দরী বলে?

সেই একই ট্রেনে ফেরত এসেছে বিভা। এখন বাজে রাত এগারটা। ফোন চালু করতেই ভাইয়া কল দিলো। কয়েকবার! মনে হয় পৃথিবীর ভেতর আর একটি পৃথিবী ছিলো ট্রেনের ভেতর! অন্য বাস্তবতা, ভিন্ন গতি! এখন আবার সেই ভয়ের ভেতর চলে এসেছি? স্টেশনের আলো পড়ছে গায়ের উপর। ভয় লাগছে! কেউ যদি দেখে ফেলে!…

প্ল্যাটফর্মের একটা অন্ধকার জায়গায় বসে পড়লো বিভা।

এখন তো  ভাইয়া দিবে ঝাড়ি। দেখা করতে বলেছে আব্বার সাথে। দেখা করি নি। তাঁর আদেশ অমান্য করেছি? এর শোধ কি নিবে না ভাইয়া? কী উত্তর দিবো আমি? কিন্তু ওদের সাথে দেখা করা যে আমার পক্ষে সম্ভব না! এটা বুঝাই কীভাবে! ভাইয়া বুঝবে না। কেউই বুঝবে না।

নিজের ভালো নিজে না বুঝলে… সবাই তো আমার ভালোই চায়! সবই তো আমার ভালোরই জন্যে! এই ভালো চাইতে চাইতে… ওগো দয়া করে আর দয়া করো না…

কিন্তু ভাইয়ার সাথে তো আমাকে কথা বলতেই হবে। মুক্তি নেই তো! কী আর করা। সব আমার ভালোর জন্যই। এইবার বুঝি আর ভালো টিকে না। ভাইয়া ফেলে দেবে আমাকে? দিলে আর কী হবে? দিক। না, দেবে না। এতই সহজে? এইবার হয়ত ভাইয়ার অত্যাচার শুরু হবে। এখন কলের পর দেবে ঝাড়ি। এই তো শুরু… এও আমার ভালোরই জন্যে। তবে কী আর মুক্তি নেই?

ফোনের রিং বাজছে। বুকের ভেতর করছে ঢিপঢিপ।

হ্যালো ভাইয়া?

হ্যাঁ, বিভা? কই তুমি?

স্টেশনে।

এত রাত হয়ে গেছে! তোমার ফোন কী বন্ধ ছিলো?

হ…

ও… তো ইয়ে কর, বাসায় যাও। চার্জার কিনছ?

না…

তাইলে এত রাত হয়ে গেছে! বাসায় যাইতে পারবা এখন? গাড়ি পাওয়া যাবে?

যাবে। সমস্যা নাই। যাইতে পারমু।

যাও তাহলে। আর বসে থেকো না। এত রাত হয়ে গেছে! যাও। আর রুমে পৌঁছে জানিও।

বিভার চোখে পানি এসে গেছে। প্রবল আঘাতের সময়েও যদি কান্না না এসে থাকে তবু এবার আর চোখের পানি আটকে রাখা গেলো না!

ও ভাইয়া গো…

চিৎকার করে কান্না আসছে।

আমার কেউ নেই আর!

কেউ নেই!…

আরে, বিভা আপা! কেমন আছেন?

কে, সুমন নাকি?

হ্যাঁ, সেই রকমই ত মনে হইতেছে। তো ছোট ভাইটাই আছেÑ একটু খোঁজ-খবর নেন না! আপনেরেও ফোন দিলে বন্ধ পাওয়া যায়!…

এই তো, কী অবস্থা তোর?

জ্বি, ভালোই। ময়মনসিংহ আসছিলেন নাকি?

হ্যাঁ

ফোন দিছিলাম আপনেরে। আজকে বিকেল দিকে আপনের ফোন কি বন্ধ ছিলো?

হ্যাঁ, ছিলো।

এখন শুনেন, একটা খবর আছে! আপনের বাবা আসছিলো!

আচ্ছা! পরে?

এসে হলের সামনে দাঁড়িয়েছিলো! আমি তো চিনিই। দেখে পরে সামনে গিয়ে কথা বললাম।

আহারে! হলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলো! কী আশা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো? এতদিন পরে হয়ত একটু দেখা হয়েও যাবে মেয়ের সাথে?

পরে?

পরে আপনের ফোন মনে হয় বন্ধ ছিলো! উনারে অনেক জোর করলাম রুমে আসার জন্য। বলল : না, আমি চলে যাবো এখনি। আর আধা ঘণ্টার মত থাকবো। বিভার যদি কোন খোঁজ পাও তাহলে জানিও। সাথে আর একটা লোকও ছিলো।

ও…

অসুস্থ শরীর নিয়ে এত দূর থেকে এসেছিলো মোটর সাইকেল চালিয়ে, শুধু আমার জন্যে? কতটা কষ্ট পেয়ে চলে গেছে! বুকের ভেতর একটা আর্তনাথের মত বেজে উঠে!

ওরে তুই আমার বেটি ন্যা! আমি তোর বাপ না?

আমাকে মাপ করে দিও আব্বা।

মনে পড়ছে প্রথমবার শহরে আসার কথা। আব্বা হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে, দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে রাস্তায় হাঁটতে হয়, কীভাবে খুঁজে পেতে হয় পথ!

আব্বাই তো ছিলো আমার প্রথম আদর্শ! তারপর সব কেমন পাল্টে গেল!

বাৎসল্যের থেকে বীভৎসের দিকে যেতে থাকে স্মৃতি এবং জেগে ওঠে ভয়াবহ ক্রোধ!

পরের দিন।

ভয় স্বপ্নদৃশ্য ছেড়ে এখন চলে এসেছে বাস্তবে? চেতনার সবগুলো পথে হাঁটতে গেলেও যেন হৃৎপি-ের দেয়ালে এসে হঠাৎ বাড়ি খায় ভয়! জানালা খুলতে ভয় লাগে! আলোর ভেতর মিশে আছে সেই টকটকে চোখ? ঘিনঘিনে জিভ? অন্ধকারে আর কিছু না থাক অন্তত পালিয়ে বাঁচার একটু আশ্রয় আছে! মুক্তির স্বাদ আছে?

বিছানার এক কোণে বসে আছে বিভা। ফোনে একটা এসএমএস এসেছে।

সাধের প্রদ্বীপ জ্বালাতে গিয়ে নিজেই জ্বলে গেলাম। মনে করেছিলাম মা মরে নাই। ১৫ জানুয়ারী ২০১৭ থেকে সেই ধারণার পরিবর্তন হইতেছে। মা হারানোর ব্যাথা সেই বুঝে যার মা নাই। আর বিরক্ত করবো না। যেটুকু করলাম ক্ষমা করিও। আমার শেষ দিনে আসিও…

প্রথম লাইনটা দেখেই হাসি পেল। বাঃ বিরাট কবিত্ব করেছে তো! তারপরই সংশয় জাগে। ভেতরে না জানি কী লিখেছে! অনেকক্ষণ ধরে শক্তি সঞ্চয় করে সম্পূর্ণ এসএমএসটা পড়লো বিভা।

আর বিরক্ত করবে না। তাহলে তো ভালোই হয়। বিরক্ত করবে না, কী মহান! এখন সমস্ত দোষ আমার! তাঁরা মহৎ কাজ করতে এসেছিলো আর আমি বিরক্ত হয়েছি। এত বড় অন্যায় দেখে তাঁরা উচ্চ হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছেন! ক্ষমা করে দিও? জীবনভর তো আমার মা, খালা, দাদি আর নানীরা কত উচ্চ হৃদয়, ক্ষমাশীলতা আর ন্যায়ের পতাকাবহী হয়ে তার পুরস্কার পোহাচ্ছে। আমি না হয় একটু পাপের শাস্তি উদযাপন করলাম। এতে যদি কিছুটা শোধ হয়।

যদি দেখা করতাম কালÑ কী করত? অতি নাটিক শুরু করে দিত না? আর মাঝখানে, মাঝখানে থাকত কলিজা ছিঁড়া ঝাঁঝ? দুনিয়ার মানুষ বুঝত আবেগ! আসলে ভেতরে ভেতরে চলত ছুরি। বিরক্ত! বিরক্ত আবার কী? অন্যের গায়ের উপর আগুন দিয়ে আপনি ‘সাধের প্রদ্বীপ’ জ্বালাবেন আর গা বাঁচাতে আমরা পালাতেও পারবো না!

‘মা হারানোর ব্যাথা!’ এ আর এক চালবাজি! যখন দিনের পর দিন সব মায়েদের চরম অসহায় অবস্থার মধ্যে ফেলে অত্যাচার শুরু করে দেন, তখন আর ব্যথা লাগে না। কেবল আমরা প্রতিবাদ করতে গেলেই ম্যাঁম্যাঁ শুরু হয়ে যায়? টিকটিকি কোথাকার!

তবুও সংশয় জাগে, ভয় লাগে, বুকের ভেতরে ঢিপ ঢিপ করে!

নারী বলেই কি করে?

***********************************************

 

ইলিশের ঘ্রাণ
হামিদ কায়সার

উটকো একটা গন্ধ এসে নাকে ধাক্কা দেয়। এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। কেননা বুড়িগঙ্গা মানে আমার কাছে শৈশবের অমল দিন, নানাবাড়ি কেরানিগঞ্জের রাজাবাড়ি নামের অনিন্দ্যসুন্দর এক গ্রামে যাওয়ার পথের অনেক অনেক কোমলগান্ধার স্মৃতি। সেই বুড়িগঙ্গা যে আজ ধুঁকতে ধুঁকতে এমন মরণাপন্ন অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, কে জানতো! মনে হচ্ছে যেন, প্যারালাইসড রোগী বিছানায় বছরের পর বছর শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠের নিচে কোমরের মাজায় ঘিনঘিনে গা বাঁধিয়ে বসে আছে! ঢাকা শহরের সব বর্জ্য আর মল যুগের পর যুগ যে নিজের অতলগর্ভে ধারণ করছে, তার অবস্থা তো এমন-ই হবার কথা! আমরা, সেই ভোর ছয়টা থেকে পচনাক্রান্ত দুর্বিষহ দুর্গন্ধের ভেতর বাদামতলীর জাহাজঘাটলার জেটির সামনের গেটমুখে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছি— জহর ঘোষ তার দলবল নিয়ে কখন আসবেন!

আমরা মানে আমি রিদওয়ান হাসান শুভ্র আর আমার ভবঘুরে বন্ধু মাহমুদুল হাসান সেলিম! সেলিম একটা ছোটখাটো ট্যুরিজম কোম্পানি দাঁড় করাবার চেষ্টা করছে! গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই কল দিয়ে আমাকে জানাল, ‘কাল আপনার অফিস নাই। আমার সঙ্গে চাঁদপুর যেতে হবে! হোল ডে রিভার ট্রাভেল!’ এমন ছুটিছাটা ও মাঝে মধ্যেই আমাকে দিয়ে দেয় আর আমিও তা লুফে নেই। আমার পরিচয়ও বোধ করি একটু দেওয়া দরকার। আমি একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় জব করি, ক্রিয়েটিভ লেখালেখি। আমার এটা দোষ কী গুণ বলতে পারব না; বেড়ানোর কোন আমন্ত্রণ পেলেই হলো— নাভিশ্বাস দৌড়াই, চাকরি থাকবে কী থাকবে না তার পরোয়া করি না। আমার স্ত্রী আর এক কন্যাসন্তানকে ঘিরে আমার সংসার কীভাবে চলবে, ভবিষ্যতে কী হবে কোন ভাবনাই আমাকে কাবু করতে পারে না। বাঁচোয়া যে, আমার অফিসও আমার এই বাড়াবাড়ি রকমের বেড়ানোর স্বভাবটাকে ভালোভাবেই মেনে নিয়েছে। এ-নিয়ে আমাকে ঘাটায় না, দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। তাই, সেলিমের ডাক পাওয়ামাত্রই আজও আমি সব পিছুটান উপেক্ষা করে ছুটে এসেছি বুড়িগঙ্গার তীরে! তার মধ্যে যখন শুনলাম লঞ্চ জার্নিটার ব্যবস্থা করা হয়েছে কলকাতার এক নামী-দামী অ্যাডফার্মের মালিকের জন্য, স্বভাবতই আমার উৎসাহ দ্বিগুণ বাড়লো। কারণ, আমরা যে একই গোয়ালের গরু! অ্যাড ফার্মের মালিক জহর ঘোষের নাকি বহুদিনের শখ, সিটি অফ ইলশা চাঁদপুরে বসে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাবেন!

শীতের দিনের ছয়টা মানে কাকভোর— এখনও আলো আবছায়া। আমরা হালকা কুয়াশা মোড়ানো এই কাকভোরেই পল্টুনে চক্কর দিয়ে আগেই নিশ্চিত হয়ে নিয়েছি বিআইডব্লিউটিসি-র ৮ নম্বর ওয়াটার বাসটা ঠিকঠাক মতো রয়েছে কীনা! জাহাজের মাস্টার ইন-চার্জ হাসমতসহ অন্যান্য কর্মীরাও মোটামুটি প্রস্তুত! ওয়াটার বাসটা একদম তৈরি হয়েই দাঁড়িয়ে আছে জেটির গেটমুখে। সময় যেন কিছুতেই আর কাটতে চাইছে না। আমরা কিছুক্ষণ পল্টুনে, জেটিতে, পথে পায়চারি করি, হাঁটি। পথের পাশের চায়ের দোকানে বসে চা খাই এবং এই চা পান করতে করতেই হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায়, তাড়াহুড়ো করে চলে আসায় নোটবুকটা সঙ্গে আনিনি, এমনকি কলমও ফেলে এসেছি! এ দুটো জিনিস ছাড়া আমি হয়তো চলতে পারি, তবে কিছুতেই স্বচ্ছন্দ্য বোধ করি না। চা পান শেষ হতেই দাঁড়াতে দাঁড়াতে সেলিমকে বললাম, ‘দেখি কাগজ কলম কেনা যায় কীনা!’

সেলিম সোজা নিরুৎসাহিত করলো, ‘পাবেন না। এত সকালে কেউ দোকান খুলে?’

ও-দুটো জিনিসের প্রতি আমার টান এতোই প্রবল, সেলিমের সংশয় উপেক্ষা করেই বাদামতলীর ফলের আড়তটা এই সাতসকালেই যেখানে জমে উঠেছে, সে পথের দিকে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলাম। ট্রাকে ট্রাকে কমলাসহ নানান পদের ফল আসছে, আবার ছোট ছোট মালগাড়ি যেমন দেড় টনি ট্রাক, সিএনজি বেবি ট্যাক্সি, রিক্সা ভ্যান দিয়ে খুচরো বিক্রেতারা সেসব ফল পাইট পাইট নিয়েও যাচ্ছে। ফলের আড়তের কেনাবেচার ভিড় ঠেলে আমি একটা সরু গলি-পথের মধ্যে প্রবেশ করলাম। ঘিঞ্জি ঠাসা সারিবাঁধা পুরনো সব বাড়িগুলোর নিচ তলায় তলায় দোকান আছে ঠিকই, কোনটাই খুলেনি। এত সকালে কার দায় ঠেকেছে যে আমার কাছে একটা নোটবুক আর কলম বিক্রির জন্য দোকান সাজিয়ে বসে থাকবে! তবু আমি হাল ছাড়ি না। নিরব-নির্জন পথ দিয়ে কেবল এগোতেই থাকি! একটা নোটবুক সঙ্গে না থাকলে যেন আজকের এই ভ্রমণ পুরো ব্যর্থ হয়ে যাবে! আমাদের মস্তিষ্কে একেক সময় একেকটা জিনিস এমনভাবে চেপে বসে যে, তা মাথা থেকে নামানো মুশকিল হয়ে পড়ে। আমাকে কে বোঝায়— দোকান খোলা পেলেও হয়তো পেতে পারো, কিন্তু সে দোকানে যে তোমার পছন্দসই নোটবুক মিলবে, তার কোন গ্যারান্টি আছে? কেউ কেউ হয়তো বিরক্ত হয়ে ভাবছেন, এনড্রয়েড মোবাইলের যুগে আমি কেনো এখনো একটা নোটবুকের পেছনে ছুটছি, তার উত্তরে বলছি, মোবাইল একটা আমার কাছে আছে বটে— তবে এনড্রয়েড নয়, আর সেটা থাকলেও বোধ করি লাভ হতো না, ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যসামগ্রীতে আমি এখনো অভ্যস্ত হতে পারিনি ততটা।

আরো কিছুটা পথ হাঁটার পর অবশেষে দোকান একটা ঠিকই খোলা পাই! একজন বুড়ো দোকানদার, যার মুখে খোঁচা-খোঁচা পাকা দাঁড়ি, পরনে কালো সোয়েটার আর লুঙি, দোকানের অর্ধেক শাটার খুলে ভেতরটা ঝাড়– দেওয়া শেষ করে কেবল বাইরে এসে ময়লা ফেলছিলেন এবং দোকানের সম্মুখদিকটাও ঝাড়– দিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠলেন। আমি সেই অবস্থাতেও যেন অনেকটা দাবীর সুরেই চেয়ে বসলাম, ‘আংকেল আমার একটা নোটবুক আর কলম দরকার।’

আংকেল নিস্পৃহ গলায় বললেন, ‘নোটবুকটুক দিতে পারুম না, কলম আছে।’

‘আলগা কাগজও নাই?’ আমি যেন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইলাম। তিনি দোকানে ঢুকে আমার হাতে একটা পাঁচটাকা দামের বলপেন ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘না।’ তারপর আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, কী খুঁজছেন কী বের করছেন, সাজাচ্ছেন, আমার প্রতি সামান্যও মনোযোগ নেই। পাঁচটাকা দিয়ে আহত পাখির মতো দাবড়াতে দাবড়াতে চলে আসবো, এমন সময় তার পেছন ডাকে থমকাতে হলো। তিনি এগিয়ে এসে আমার হাতে একটা মুঠো সাইজের নোটবুক ধরিয়ে দিলেন। আরে এটাই তো পারফেক্ট সাইজ। যে কোন পকেটে ঢুকিয়ে রাখা যাবে! ওপরে লেখা রাফি নোটবুক। ভেতরটায় নিউজপ্রিন্ট! তা হোক, জিনিসটাতো আমার জন্য খুবই সুইটেবল! আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে জানতে চাইলাম, ‘আংকেল! কত দিতে হবে?’

                আংকেল আমাকে অবাক করে বললেন, ‘দাম দিতে হইব না।’

                ‘না না, কেনো আংকেল! দাম নেবেন না কেনো!’

‘এইটা আমি এমনেই পাইছি। কোম্পানিরা দিয়া যায়। হিসাবটিসাব লিখতে সুবিধা হয়। আমার আরো আছে। এইটা আপনে নিয়া যান।’

আমি মানুষটার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকি। টাকা যে উনি নেবেন না, তার জন্য একটা অনমনীয় দৃঢ় ভঙ্গি তার চেহারা এবং দেহের ভাষাভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে। আমারও আর জোরাজুরি করতে ইচ্ছে হয় না। মনে ভালো লাগার রেশ নিয়ে আমি দ্রুত জেটির উদ্দেশে হাঁটতে থাকি। এতক্ষণে যদি চলে আসেন জহর ঘোষ এবং তার দলবল!

তাড়াহুড়ো সত্ত্বেও রাস্তার মোড়ে এসে কমলার পর কমলার স্তূপ দেখে আপসেই দাঁড়িয়ে যাই। আমার আর সেলিমের জন্য দুটো কমলা নিলে কেমন হয়! ওয়াটার বাসে বসে খাওয়া যাবে! পানিও তো লাগবে এক বোতল। স্বার্থপরের মতো কমলা নিতে গিয়ে কেবল নিজেদের দুজনের কথাই মনে পড়লো। রসে টসটসা টাটকা সব কমলা ফল-বিক্রেতারা দোকানে দোকানে বিক্রির জন্য বক্স বোঝাই করে করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি দুটো কমলা চাইতেই দু’দুজন মহাজন মুখের ওপর ঠাস করে বলে দিল, ‘খুচরা কমলা বেচি না! নিলে পাইট ধরে নিতে হবে!’ মুখের ওপর যতই বলুক বেচবে না, তবু নাছোড়ের মতো আবদার করতে থাকি, ‘দুটো কমলা বেচলে কী হবে ভাই?’

এবার কাজ হয়। কমলার বস্তা নিয়ে দাঁড়ানো শ্রমিক মতো একজন বলে উঠলো, ‘নিতে পারেন, দুইটা পঞ্চাশ টাকা!’ সঙ্গে সঙ্গেই রাজী হয়ে যাই। যত না প্রয়োজন, তারচেয়ে কমলা খেতে হবে এই তৃষ্ণা আমাকে প্ররোচিত করলো! ওই যে কথায় আছে না, শখের দাম লাখ টাকা! শ্রমিকটি বস্তা থেকে দুটো কমলা নিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে, টাকা নেওয়ার জন্য হাত পাতলো। আমার পকেটে এক দঙ্গল খুচরো টাকা। ভেঙে ভেঙে যখন টাকা দিচ্ছিলাম, চল্লিশ টাকা দেওয়া হতেই, শ্রমিক লোকটি প্রায় হই হই করে উঠলো, ‘থাক থাক। লাগবো না, আপনার বেশি ঠকা হইয়া যাইব।’ আমি লোকটির কথায় পাত্তা দিই না, আমার মন এখন ভালো, ‘আরে আপনার সঙ্গে কমিটমেন্ট করছি, নিবেন না কেনো!’ আরো দশ টাকা জোর করে দিতে যাই। তখনই আরো একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটে। বোধহয় আমাদের সমস্ত ঘটনাই সে লক্ষ্য করছিল। আমার হাত থেকে কমলা দুটো ছোঁ মেরে নিয়ে মানুষটি বেছে বেছে ভালো দুটো কমলা বের করলো, তারপর আমার হাতে সে-দুটো ধরিয়ে দিয়ে বললো, ‘দুইটা কমলাই তো! টাকা দিতে হবে না। আপনি যান।’

এই মানুষটি শ্রমিকটির হাত থেকে সব টাকা নিয়ে জোর করে আমার হাতে ধরিয়ে দিতে চায়। আমি চরম বিব্রত বোধ করি। আমাদের মধ্যে টাকা নিয়ে জোরাজুরি হয়— কে কার হাতে ফেরত দিতে পারবো! পাশ থেকে এক মৌলভী টাইপের মানুষ, মুখে ভারি দাঁড়ি, মাথায় টুপি, আর পাঞ্জাবি পরনে, চেহারায় নুরানির আভাস, আমার উদ্দেশে মিষ্টি করে ধমকে উঠলো, ‘আপনাকে ইজ্জত করছে, আপনি নিবেন না কেনো। সব মানুষ কি ইজ্জত পায়? আপনি পাইছেন!’

এরপর আর কেনো যেন টাকাটা আমি অফার করি না। মানুষটার সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়ে দ্রুত জায়গাটা ছেড়ে চলে আসি। নতুন করে টের পাই, মানুষ শুধু অপমানজনক কথা থেকেই পালাতে চায় না, প্রশংসা বাক্যও এড়াতে চায় দুর্বহ লজ্জা থেকে পরিত্রাণের জন্য। আমি জেটির দিকে এগোতে এগোতে পরম বিস্ময় বোধ করি, একই দিনে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে প্রাপ্তির এমন সুন্দর দু’ দুটো ঘটনা কীভাবে ঘটলো! কাকতালীয় তো বটেই, দুর্লভও। কারণ মানুষ এখন শুধু নিতেই শিখেছে, দিতে ভুলে গেছে একেবারে। যে কোন বাহানা বা ছল করে কারোর কাছ থেকে কিছু নিতে পারাটাকেই বিবেচনা করে জয় হিসেবে। সত্যিকার অর্থেই মানুষের প্রতি বিশ্বাস আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল এই সেলফি-উন্মাদনা যুগে মানুষ নিজের স্বার্থ-ছাড়া অন্য আর কোন কিছু চিন্তা করতে পারে না, নিজেকে ছাড়া অন্যের দিকে তাকাবার প্রবণতাটুকুও হারিয়েছে। এ ধরনের একটা অন্তর্লীন ভাবনায় আচ্ছন্ন থাকতে থাকতে আমি নিজেও এক ধরনের বিকারগ্রস্ত মানুষে পরিণত হচ্ছিলাম। কিন্তু আজ সকালের এ দু’ দুটো ঘটনা, তা যতই ক্ষুদ্র হোক, আমার অনুভূতিকে এক পরম আনন্দে ভরিয়ে তুললো। আমি বেশ বিহ্বল হয়ে থাকি। সত্যিকার অর্থেই অনেক অনেকদিন পর জীবনের প্রতি ভালোবাসা ফিরে আসে আমার, এই বিশ্বাস লাভ করি যে, মানুষ তার মনুষ্যত্বের সবটুকু এখনো হারায়নি। ছোট্ট একটি নোটবুক আর দুটো কমলার মূল্য হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু এভাবে উপহার পাওয়া সম্ভার দুটো আমার কাছে কোটি টাকার চেয়েও বেশি মূল্যবান মনে হচ্ছে।

জানি না আমার বন্ধু সেলিমকে ঘটনা দুটো সেভাবে প্রভাবিত করলো কীনা, ও শুধু আমার বর্ণনা শুনে মৃদু হাসলো, আসলে ও এখন জার্নিটা নিয়ে এতটাই চিন্তিত যে, আর কোনোদিকে মনোনিবেশ করার অবস্থা ওর নেই। ওয়াটার বাসের মাস্টার ইন-চার্জ হাসমত বারবার ওকে মোবাইলে তাড়া দিচ্ছিল, তাড়াতাড়ি যাত্রা শুরু করতে, কেননা আমাদেরকে যেতে হবে যেমন জোয়ারের বিপরীতে, আসতেও হবে তাই, তাছাড়া সরকারি নিয়মকানুন বলে একটা ব্যাপার আছে। সন্ধ্যে ৬ টার মধ্যে ওয়াটার বাসকে ঢাকায় ফেরার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া আছে। এই ওয়াটার বাসটি সরকারি কাজে ব্যবহার হয়, কোনভাবেই পাবলিককে ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেওয়া হয় না, সেলিম যে কীভাবে ম্যানেজ করেছে, সেটা এক রকম বিস্ময়করই। অবশ্য জহর ঘোষ মানুষটার জন্যও সম্ভব হয়েছে, টাকা দিতে তিনি কার্পণ্য করেননি, যখনই সেলিম টাকা চেয়েছে, বিশেষ ব্যবস্থায় পাঠাতে দেরি করেননি, শখ বলে কথা। ভদ্রলোক নাকি অনেকদিন ধরেই চাঁদপুরে গিয়ে ওখানকার তরতাজা ইলিশ খাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন।

জেটির গেটের মুখে অপেক্ষা করতে করতে যখন আমরা কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছি, যেখানে সাড়ে ছয়টায় রওনা দেওয়ার কথা ছিল, তার ঠিক দেড় ঘণ্টা পর, জহর ঘোষদের নিয়ে মাইক্রোটা এসে আমাদের ঠিক সামনে দাঁড়ায়। আমরা ড্রাইভারের পাশে যিনি বসেছিলেন, স্বভাবতই তাকে জহর ঘোষ ভাবি, কিন্তু লোকটির মধ্যে অতিশয় গাম্ভীর্য দেখে সে-বিষয়ে সন্দিহান হলাম, কারণ, সেলিমের কাছে শুনেছি জহর ঘোষ মানুষটা নাকি সবসময় হাসিখুশি থাকেন।

একে একে মাইক্রোর দু’পাশের গেট দিয়ে ৭ জন মানুষ নেমে আসেন, কিন্তু এদের কাউকেই আমাদের জহর ঘোষ বলে মনে হলো না। তবে ভেতরে যে কেউ একজন এখনো আছেন, তা না দেখলেও বেশ টের পাচ্ছিলাম। এরপর যা দেখি, তার জন্য আমি বা সেলিম দুজনের কেউই ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না। জহর ঘোষের পরিবর্তে একটা হুইল চেয়ার এনে নামানো হলো। এরপর একজন আভিজাত্যে ভরা উজ্জ্বল চেহারার দীর্ঘদেহী মানুষকে চারজন মিলে মাইক্রোবাস থেকে নামিয়ে এনে বসিয়ে দিল সেই হুইল চেয়ারে। বোঝাই যাচ্ছে এতে তারা অভ্যস্ত— যেন এটা কোন ব্যাপারই না। আমি ততক্ষণে বাকরুদ্ধ, সেলিমও। আমরা ঠিক এই জহর ঘোষের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা ভেবেছিলাম, জহর ঘোষ মানুষটা হবেন শেষ বয়সের ছবি বিশ্বাস টাইপের কেউ। তেমনই বয়স— ৮০ থেকে ৮২-এর মধ্যে, উঁচু লম্বা। আভিজাত্যের দ্যুতির সঙ্গে থাকবে উপযুক্ত গাম্ভীর্যের ছাপ। হ্যাঁ, বয়স এবং উচ্চতায় সে রকমই আছেন বটে, আভিজাত্যেরও কমতি নেই— তবে তিনি অসাড়, কথা বলতে পারেন না, হাঁটতে-ফিরতেও না। কোমরের নিচ থেকে শরীরের পুরো অংশ অবশ। এমন একজন জহর ঘোষকে দেখার প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে, এবং কিছুটা বিস্মিত ভাব নিয়ে আমি আর সেলিম— আমরা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করি। কারণ, জহর ঘোষকে মাইক্রো থেকে ভালোয় ভালোয় নামানো হয়েছে ঠিকই, এখন তাকে জেটি, পল্টুন পেরিয়ে উঠাতে হবে ওয়াটার বাসে। সেটা যে কী ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার, আমরা প্রত্যেকেই ভেতরে ভেতরে অনুভব করলাম। কারণ, জেটির সিঁড়িটা খাড়া ঢালু হয়ে নেমে গেছে নিচের দিকে পল্টুন পর্যন্ত। হুইল চেয়ারটা যদি জহর ঘোষসমেত গড়িয়ে যায়, বিপদ হবে।

দুজন মানুষ সহজেই জহর ঘোষসমেত হুইল চেয়ারটাকে ঠেলতে ঠেলতে সড়ক থেকে জেটিতে নিয়ে এলো। এরপর সামনে আরো যোগ দিল দুজন, যেহেতু জেটিটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে নিচের দিকে, তাই সামনে থেকেও গতি আটকাতে হবে। তারপর চারজন মানুষ একসঙ্গে হুইল চেয়ারটিকে ভালোভাবেই পল্টুনের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। আমি আর সেলিম চুপচাপ তাদেরকে অনুসরণ করি। আমাদের দুজনেরই মনের বিস্ময় কিছুতেই আর ফুরাচ্ছে না। জহর ঘোষের যে বয়স, আশি ছাড়িয়ে গেছে— শুধুমাত্র এ কারণেই কেউ ইলিশ মাছ খাওয়ার জন্য সেই সুদূর ভারত থেকে ট্রেনে ঢাকা, তারপর ঢাকা থেকে আবার লঞ্চযোগে চাঁদপুর যাওয়ার কথা কল্পনাও করবে না, আর তিনি এসেছেন এ-রকম অসাড় শরীরে! এটা শুধু বিস্ময়করই নয়, অভাবনীয়ও। এমন প্রাণচাঞ্চল্যময় জীবনীশক্তির মানুষ খুঁজে পাওয়াটা সত্যি কঠিন। কেন এবং কীভাবে এটা সম্ভবপর হলো— মনের সব কৌতূহল আর প্রশ্নকে আপাতত ধামাচাপা দিয়ে আমরা দুজনও ওদের সবার মতো জহর ঘোষকে ওয়াটার বাসে নিয়ে যেতে ব্যস্ত হয়ে উঠি।

জেটি থেকে পল্টুনে হুইল চেয়ারসহই তাকে উঠিয়ে নেওয়া হলো। পল্টুনটা বেশ বড় এবং লম্বা। একেবারে দক্ষিণের শেষ প্রান্তে ওয়াটার বাসটা নোঙর করা আছে। জহর ঘোষকে হুইল চেয়ারে ঠেলেঠুলে সেদিকে নিয়ে যেতে কষ্ট হলো না বটে, একজনই তার জন্য যথেষ্ঠ, কিন্তু সমস্যাটা হলো বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধের প্রবল ধাক্কা। ভারত থেকে আসা প্রতিটি অতিথিই একবার নাক ধরে তো, আবার থুতু ফেলে। এদের মধ্যে একজন গৌরাঙ্গ, অ্যাড ফার্মের প্রোডাকশন ম্যানেজার বার বারই আওড়াতে থাকে, ‘এরা তো বুড়িগঙ্গাকে দেখছি শেষ করে দিয়েছে। সে তুলনায় আমাদের গঙ্গার অবস্থা অনেক ভালো!’ লোকটির আক্ষেপ ফুরাতেই চায় না, ‘শহরের ভেতর এমন সুন্দর একটা নদী, অথচ গন্ধে টেকা যাচ্ছে না।’

হঠাৎ হুইল চেয়ারটা ইশারায় থামাতে বললেন জহর ঘোষ। তার এক নাম্বার অ্যাসিসটেন্টকে কী একটা ইঙ্গিত করতেই লোকটা ক্লিপে কাগজ সাঁটানো একটা বোর্ড আর কলম এগিয়ে দিল তার দিকে। জহর ঘোষ খস খস করে লিখলেন, ‘বুড়িগঙ্গা এবং বাংলাদেশ নিয়ে কোনো নেগেটিভ কথা বলবে না।’ লিখেই বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধ নিয়ে যিনি অনর্গল কথা বলেই চলছিলেন তার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি মানুষটাকে অবাক হয়ে দেখি। বয়স, অসুস্থতা কোনকিছুই যেন তার জীবন পথের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কত সূক্ষè অনুভূতি কত দিকে খেয়াল! তার সামনে বুড়িগঙ্গারও বদনাম করা যাবে না। কিন্তু অবাক হচ্ছিলাম, বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধটা আমার নাকে আর তেমনভাবে লাগছে না বলে। সেটা কি ওই দু’ দুটো উপহার পেয়ে মন অসম্ভব ভালো থাকার কারণে নাকি ততক্ষণে আমার ঘ্রাণশক্তি সব দুর্বহ সয়ে নেওয়ার শক্তি অর্জন করে নিয়েছে— সেজন্য, আমার পক্ষে তার সঠিক ব্যাখ্যা করাটা দুরূহ-ই!

ওয়াটার বাস যেখানে নোঙর করা আছে, তার সামনে গিয়ে হুইল চেয়ারটা আক্ষরিক অর্থেই থমকে দাঁড়াল। সবাই যেন একটা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়ল বলা যায়! ওয়াটার বাসটার পাটাতন বেশ নিচে। তাছাড়া কী কারণে ঠিকমতো ভেড়ানোও হয়নি, যাকে বলে গায়ের সঙ্গে একেবারে লাগোয়া তো নয়ই, মাঝখানে সামান্য দূরত্বও রয়েছে। নিচে তাকালেই বুড়িগঙ্গার কালো জল সাপের মতো ফোঁস করে উঠে! তার মধ্যে আবার ওয়াটার বাসটার পাটাতনের যেখানে হুইল চেয়ারটা রাখা হবে, সে জায়গাটা সরু এবং চাপা। কিন্তু কেউই যেন কোনো বাধাকে কোনভাবেই মেনে নিতে রাজি নয়। খুব সাবধানে দুজন বলশালী মানুষ ওয়াটারবাস থেকে আর এ পাশের পল্টুন থেকে আরো দুজন মানুষ জহর ঘোষসমেত হুইল চেয়ারটাকে উঠিয়ে ওয়াটার বাসের পাটাতনে ঠিকঠাক মতোই নামিয়ে রাখল।

এবার বেশ স্বস্তির আবহ। এরপর পাটাতন থেকে সিঁড়ি দিয়ে ওয়াটার বাসের চারদিকে কাঁচঘেরা কেবিনে নামাতে কোন অসুবিধাই হলো না। মাঝখানে পরিসর পথ আর দু’পাশে সারিবাঁধা চেয়ার পাতা। চল্লিশ পঞ্চাশজন মানুষ অনায়াসেই বসা যাবে এখানে। সেখানে আমরা কেবল দশ বারোজন। তার ওপর ছাদ তো রয়েছেই। জহর ঘোষকে সামনের দিকে ভালো মতো একটা জায়গায় বসিয়ে দেওয়ার পর প্রায় সবাই যে যার জায়গা বেছে নেয়। অধিকাংশরাই বসলো জানালার পাশে। আমিও একেবারে পেছনের দিকের একটা জানালার সাইট বেছে নিলাম জুতমতো।

সবাই বসতে না বসতেই ওয়াটার বাসের ইঞ্জিন গর্জে উঠলো। বিপুল হুইশেল বাজিয়ে ওটা বাবুবাজার ব্রিজ ছাড়িয়ে পোস্তগোলামুখী ব্রিজের দিকে ছুটে চললো। তিন তিনটি বুড়িগঙ্গা ব্রিজ হওয়ার পরও জলযানের ভিড় কমেনি। অবশ্য এদিকটায় ছোট ছোট নৌকার আধিপত্য কম। ছোট বড় নানা আকৃতির জাহাজ, লঞ্চ, মালবাহী কার্গোই বেশি চোখে পড়ছে। আমি বাইরের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে জহর ঘোষকে দেখি। সেলিমকে পাশে বসিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রশাসনিক মানচিত্রটি খুলে বসেছেন। সম্ভবত আমরা কোথায় কোন পথ দিয়ে যাচ্ছি সেসবই বোঝার চেষ্টা করছেন। কৌতূহলের তাড়নাতেই কিনা সিট থেকে ওঠে ওদের দুজনের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। এতক্ষণে খেয়াল করি জহর ঘোষের মুখটাও সামান্য বাঁকা। এবং কিছুক্ষণ পর পর মুখ থেকে লালা বেরিয়ে আসছে। আর তিনি খুব দ্রুতই একটা রুমালে মুছে নিচ্ছেন। জহর ঘোষ নিজের প্রশ্নগুলো হোল্ডারের ক্লিপে সাঁটানো কাগজে লিখে দিচ্ছেন কখনো ইংরেজিতে কখনো বাংলায়, সেলিম মুখে মুখে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। আমাকে দেখেই সেলিম পরিচয় করিয়ে দিল। তিনি কাগজে লিখে জানতে চাইলেন, ‘আপনার নামের স্পেলিং?’ আমি সঙ্গে সঙ্গেই কাগজের একপাশে আমার নাম লিখলাম। জহর ঘোষ কাঁপা হাতে লিখে চললেন, ডিয়ার রিদওয়ান হাসান। সো গ্রেটফুল টু ইয়ো। অল ফর অ্যারেনজিং দিজ মেমোরেবল ট্রিপ ফর আস। গড ব্লিসিং।’

তার সৌজন্য বোধে মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। হাতে হাত মেলালাম। শীতল হাতেও টের পেলাম উষ্ণতা। তিনি সেলিমকেও আলাদাভাবে লিখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। তারপর ওকে স্পাইরাল করা নিজের দুটি ভ্রমণ বৃত্তান্ত দিলেন। সেই কবে কোন যৌবনের প্রথমবেলায় বউ বাচ্চা নিয়ে দার্জিলিংয়ে প্রথম ভ্রমণে গিয়েছিলেন সে কাহিনি, দার্জিলিং-গ্যাংটক— তারিখ দিয়ে দিয়ে সেই ভ্রমণের বর্ণনা ও ছবি সংযুক্ত করে রেখেছেন। আরেকটি বাঁধানো ফাইলে কেরালা ভ্রমণের বর্ণনা ও ছবি— সেও সুস্থ জীবনের। বোধ হয় তখন তার বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে।

আমি কেরালা ভ্রমণের বাঁধানো খাতাটা হাতে নিয়ে এবার যে সারিতে বসেছিলাম, তারই উল্টোদিকে কোট পরিহিত ছোটখাটো মানুষটার পাশে গিয়ে বসি। জানালার পাশে যিনি একটি বইয়ে মন বসানোর চেষ্টা করছিলেন ঠিকই, কিন্তু কোনভাবেই পারছিলেন না, তার সঙ্গে গল্প জমানোর চেষ্টা করি, ‘দাদা সত্যি আমি উনাকে দেখে অবাক হয়েছি! শরীরের এই অবস্থা নিয়ে কলকাতা থেকে কীভাবে চাঁদপুর যেতে চলে এসেছেন!’

‘মনের জোর, বুঝলেন দাদা, মনের জোর! আমরাও তো ভাবতে পারি নাই উনি সত্যি সত্যিই আসবেন! সেই চৌদ্দ বছর ধরেই তো বলে চলেছেন চাঁদপুরে একবার যেতে চান। অবশেষে আসা হলো আর কী!’

‘চৌদ্দ বছর ধরে বলছেন মানে?’

‘চৌদ্দ বছর আগেই তো স্ট্রোক করেছেন! বেঁচে থাকারই কথা না। সিরিয়াস স্ট্রোক। তাও কী একবার? দু’ দু’বার স্ট্রোক করেছেন! চলতে পারেন না, বলতে পারেন না, শুধু মনের জোরে বেঁচে আছেন।  ব্রেনটা পুরোই শার্প আছে! আমাদের ফার্মটা তো এখনো তার মেধাতেই চলছে!’

‘হ্যাঁ। আপনাদের মতো এতো ভালো স্টাফ পেয়েছেন! চলবেই তো!’ আমিও জোর দিয়ে বলি।

‘স্টাফদের প্রতিও যথেষ্ট ভালোবাসা আছে! এই যে এখানে এসেছেন, তিনচারজন নিয়েই আসতে পারতেন— তাই না?’

‘হুমম!’

‘যখন ভালো ছিলেন, তখনও তাই করতেন। যেখানেই যেতেন দলবল নিয়ে। পুরো ভারতবর্ষই চষে বেড়িয়েছেন! ওই যে ভীমকে দেখছেন— ভীম, ভুবন, রাকেশ! গৌরাঙ্গদা! ওরা পার্মানেন্ট! বসের দেখাশোনা করেন। আমরা ঘুরেফিরে আসি আর কী! আমি বসের সাথে অনেক জায়গায় গিয়েছি! কেরালা, ভাইজ্যাগ, কাশ্মির! সব জায়গায় যাওয়া হয়নি। সেখানে আবার অন্যরা গেছেন!’

আলাপে আলাপে দাদা জানান উনার নাম অশোক কুমার রাউত। তিনি কনটাড ভুবনেশ্বর-এর ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার! আমি অশোক দার কাছ থেকে আরো জানতে পারি, কনটাড কলকাতার একটা বড় অ্যাড ফার্ম। তবে এর অনেক জায়গায় শাখা রয়েছে, ভুবনেশ্বর তো বটেই, দিল্লী, মুম্বাইয়ের মতো জায়গাতেও। জহর ঘোষ যখন সুস্থ ছিলেন ভালোই পসার বানিয়েছেন, ঘোরার নেশাটা তখনো ছিল, তবে দু’ দু’বার স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার পর যখন মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন, চলবার শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে, মানুষটার ভ্রমণের নেশাটাও নাকি মরে গেছে। শরীরের এ-অবস্থা নিয়ে তো ঘর থেকে বের হওয়া যায় না। তবে চাঁদপুরে আসার ব্যাকুলতা নাকি দিন দিনই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। এবার তাই সেই অসাধ্য সাধন হলো। শরীরের সব ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে অনেকটা বেপরোয়া হয়েই চলে এসেছেন চাঁদপুরের ইলিশ খেতে।

অশোক কুমার রাউতের কাছ থেকে জহর ঘোষ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি বটে, সল্ট লেকে বাড়ি, সেলফ মেইড মানুষ, এত বড় অ্যাড ফার্মটা নিজে খেঁটেখুটে দাঁড় করিয়েছেন! ভদ্রলোক বিপতœীক, ছেলেমেয়ে দুটোই অস্ট্রেলিয়ায় থাকে— এত কিছু জানার পরও কৌতূহল কিছুটা রয়েই যায়। চাঁদপুরে আসার পিছনে কি অন্য কোন গল্প আছে? শুধু ইলিশ মাছ খাওয়ার জন্য কেউ এখানে আসতে পারে এই অথর্ব অসাড় শরীর নিয়ে? নাকি পুরনো কোন স্মৃতির আঁচড় রয়েছে বা জন্মটান! কৌতূহল কিছুতেই দমিয়ে রাখতে পারলাম না, ‘চাঁদপুরে কি উনার শেকড়ের কোনো টান আছে?’

‘মে বি, থাকতে পারে! আমি অতো ডিটেইলস জানি না। ভীম বলতে পারবে।’ অশোক কুমার রাউত কথা বলতে বলতেই আরেক ভদ্রলোকের হাত থেকে নাস্তার প্যাকেটটা বুঝে নেয়। সেই ভদ্রলোক আমার হাতেও তুলে দিল আরেকটা প্যাকেট। ওটা হাতে নিতে নিতেই টের পাই, পোস্তগোলার ব্রিজ পার হয়ে যাচ্ছি আমরা। কথা হয়তো আরো জমে উঠতো, নাস্তা আসায় ছেদ পড়ল। হোটেল থেকেই প্যাকেট করে আনা হয়েছে। তারা উঠেছেন পল্টনের হোটেল একাত্তরে। নাস্তার আইটেম বেশ স্বাস্থ্যকর। দুটি আগুনে সেকানো পাউরুটির পিস, জেল আর বাটার, সঙ্গে একটা সিদ্ধ ডিম, আলাদাভাবে কলা দেওয়া আছে। সবাই জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে নাস্তা খাওয়ায় মনোনিবেশ করল। বাইরের দৃশ্যের মধ্যে এখনও বৈচিত্র্যের দেখা তেমন মেলেনি। শুধু জাহাজ আর জাহাজের সারি, দু’পাশ জুড়েই।

নাস্তা খাওয়ার পর সবাই যখন একটু নতুন করে চাঙ্গা হলো, আমি ঝটপট কিছু ছবি তুলে নিলাম। গতকালের কল্পনার নয়, আজ সকালের বাস্তব এই জহর ঘোষকে দেখার পর থেকেই আমার এটাকে শুধু নিছক একটা ভ্রমণ মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে যেন বিপর্যয় অতিক্রম করে কীভাবে নিজের আকাংখাকে জয় করতে উদ্যমী হয়ে উঠতে হয়, তারই একটি জলন্ত চলচ্ছবি দেখছি! আমি সেই স্মৃতি কানায় কানায় ধরে রাখতে চাই। ছবি তোলার উৎসাহেই কীনা, কেবিনের ভেতর থাকতে আর ভালো লাগে না। আবদ্ধ রুম। কাচের জানালাগুলো সব বন্ধ। যতটুকু না শীতের জন্য, তারচেয়ে বুড়িগঙ্গার দুর্বিষহ দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পেতে! আমি অনেকক্ষণ ধরেই ভেতরে ভেতরে ছাদে যাওয়ার জন্য ব্যগ্র হয়েছিলাম, ছবি তোলার হুজুগে এবার সিঁড়ি পেরিয়ে পাটাতনে উঠতে লাগলাম। পাটাতনের একেবারে সামনে মাস্টার ইন-চার্জ হাসমত যেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওয়াটার বাস চালায়, তার পাশ দিয়েই চিকন সরু উপরে উঠার সামান্য ব্যবস্থা রয়েছে— এ প্রান্তে ও প্রান্তে খাঁজে খাঁজে পা ফেলে। বড়ই বিপজ্জনক এই ব্যবস্থা। একটু পা হড়কালেই বা ঠিকমতো খাঁজে পা না বাজলে পড়ে যেতে হবে পানির গভীরে।

ভারি ডিএসএলআর ক্যামেরাটা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে আর জুতোর তলার সঙ্গে খাঁজগুলোর মধ্যে উত্তম সংযোগ স্থাপন করে বেশ কসরতের সঙ্গেই ছাদে উঠে আসি। অমনি অসীম আকাশ। সীমাহীন দিগন্তের আমন্ত্রণ! সত্যি কথা বলতে কী বুড়িগঙ্গার গন্ধটা আমি সত্যি সত্যিই আর পাচ্ছি না। কেন পাচ্ছি না, কী এর ব্যাখ্যা সেটাও আমার জানা নেই— শুধুই মনে হচ্ছে দু’দুটো উপহার পাওয়ার পর আমার মন থেকে যে ভালো লাগার সৌরভ উত্থিত হচ্ছে, তাতেই ভেসে গিয়েছে বাইরের যত দুর্গন্ধ! আমরা সম্ভবত পাগলা পেরিয়ে যাচ্ছি। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই ব্রিকফিল্ডের আধিক্য ছিল দু’পাড় জুড়ে, তা এখন কমতে শুরু করেছে। এতসব ব্রিকফিল্ড চললে তো সে জায়গায় মাটি পুড়ে তামা হয়ে যাওয়ার কথা। কালো ধোয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে আকাশ। জলেস্থলে পরিবেশ দূষণের এমন জ্বলন্ত উদাহরণ দেখে মন বিষণœই হয়ে উঠলো।

পাগলার পর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাও পার হয়ে যায় ওয়াটার বাস। এখন যেন একটু একটু করে প্রকৃতি তার আপন স্বভাব ফিরে পেতে শুরু করেছে। ঘরবাড়িহীন গাছপালায় ভরা নদীর পার চোখে পড়ছে। তবু যেন কোথায় প্রাণের অভাব, কিসের ভাটা! আচ্ছা আমি কী সবার থেকে আলাদা, ভিন্ন চরিত্রের— নাকি আমার মধ্যে কোন অস্বাভাবিকত্ব রয়েছে? নইলে আমিই শুধু একা ছাদে কেনো? আর একজনকেও যে দেখছি না?

নারায়ণগঞ্জের প্রান্ত ছাড়িয়ে ওয়াটার বাসটা যখন মুন্সিগঞ্জ এলাকায় প্রবেশ করলো, সম্ভবত গজারিয়া হবে— এক অপার্থিব ঘটনা ঘটে যায়। হঠাৎ নদী— নদীর দু’পাশ ঘিরে কুয়াশার ভারি আবর্তন দেখা দেয়, এতো কুয়াশা যে সামনে কিছুই চোখে পড়ছে না। মনে হচ্ছে যেন আমরা অন্য একটা জগতে ঢুকে যাচ্ছি, কোনো সুড়ঙ্গ পথে। ওয়াটার বাসের গতিও অনেক কমে এসেছে। বুঝলাম কুয়াশার কারণে সাবধানে চালাতে হচ্ছে। পরিবর্তনটা এত হঠাৎ করেই হলো যে, কেমন অস্বাভাবিক লাগছিল। শুধু যে কুয়াশার স্তরে ঢুকেছি তাই নয়, শরীরে বেশ ঠা-াও অনুভব করছিলাম। এরপর ওয়াটার বাস যতই এগোয় কুয়াশার স্তর একটু একটু করে কমতে থাকে, ধীরে ধীরে আবার স্বচ্ছ হয়ে উঠে নদীপথ। এতক্ষণে রোদও বেশ চাগাড় দিয়ে উঠেছে। বেশ ঝলমলে একটা অনুভব।

সামনের মাস্টার ইন-চার্জের রুম থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে সেলিম জানতে চায়, ‘শুভ্র ভাই, দেখলেন ব্যাপারটা?’ বলতে বলতে ও নানা কসরৎ করে পাটাতন থেকে ছাদে উঠে এলো। আমি নিজের আশ্চর্য হওয়া লুকাতে পারলাম না, ‘হ্যাঁ, অবাক ব্যাপার, এ যেন রূপকথার সেই গল্পের মতো, হঠাৎ করে সুড়ঙ্গ পথে অজানা রাজ্যে প্রবেশ।’

সেলিম একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দিতে দিতে বিজ্ঞের গলায় জানাল, ‘আমি তো পুরা ব্যাপারটাই কাছ থেকে দেখলাম। আসল ঘটনাটা কী জানেন, আপনি অজানা রাজ্যে প্রবেশ করেননি, এইটাই ভাই আসল জগত, এতক্ষণই বরঞ্চ আপনে একটা নষ্ট জগতে ছিলেন!’

‘কী রকম?’ সেলিম আমাকে জোরে জোরে শ্বাস নিতে বললো, বললো যে, ‘বুড়িগঙ্গার সেই পচা গন্ধটা এখন আর পাচ্ছেন? তার রেশও নাই, বাতাস পুরা টাটকা!’ সেলিম জানায়, ‘আমরা ঢাকার কার্বন-ডাই অক্সাইডপূর্ণ নষ্ট আবহাওয়া থেকে এখন বিশুদ্ধ এক পরিবেশে প্রবেশ করেছি, এখন শীতকে শীতের মতোই লাগছে। ঢাকায় কেন শীত কম, এবার বুঝতে পারছেন?’

সেলিমের কথাটা যে কতোটা ঠিক, নিজেকে দিয়েই অনুভব করছিলাম। হাওয়ার শরীরে এখন প্রাণের স্পন্দন, যার ছোঁয়ায় মন আপসেই ভালো হয়ে যায়। রোদ পাচ্ছি, শীতলতাও বেড়েছে। সেই ভালো লাগার উত্তেজনাতেই কীনা সেলিম আমার দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দেয়। আমি স্মোকার নই। কিন্তু এই খোলামেলা হাওয়ায়, যেখানে আকীর্ণ বিস্তীর্ণ নদী, সিগারেটে টান দিতে সুখই লাগে। হঠাৎ জানতে চাই, ‘কী ব্যাপার! কেউ ছাদে আসছে না যে!’ সেলিম বললো, ‘হয়তো জহর ঘোষকে রেখে কেউ ছাদে আসতে চাইছে না!’ এতক্ষণে আমার সব কৌতূহল এবং জহর ঘোষকে ঘিরে জল্পনা-কল্পনা আবার নতুন করে পাখনা মেলে! ‘আশ্চর্য এক মানুষ! কথা বলতে পারে না। শরীরের অর্ধেক অবশ! হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে হয়! অথচ এই অবস্থা নিয়েই চলে এসেছে চাঁদপুর, শুধুমাত্র ইলিশ মাছ খেতে!’ ‘টাকাও তো খরচ করেন দু’হাত দিয়ে! শুধু ওয়াটার বাসটা ভাড়া করতে কত লেগেছে, জানেন?’ ‘কত?’ ‘পঞ্চাশ হাজার! বুঝতে পেরেছেন?’ ‘হুমম! বিশাল!’ ‘ইচ্ছে করলে সাধারণ লঞ্চেই তো যেতে পারতেন, তাই না? বলেন, পারতেন না?’ ‘হুমম। পারতেনই তো!’ ‘কেনো যায় নাই জানেন?’ ‘কেনো?’ ‘অন্যের অসুবিধা করতে চান না। ফিজিকেলি ডিজাবল! দেখলেন না কীভাবে লঞ্চে উঠলেন!’

হুমম। জহর ঘোষ যে একজন অসাধারণ মানুষ এবং ব্যতিক্রমী, সন্দেহ নেই। আমাদের কথা বলায় ছেদ পড়লো। একসঙ্গে কোলকাতার  লোকজন প্রায় সবাই উঠে আসলেন ছাদে। বিশালদেহী ভীমদা আইপ্যাড নিয়ে চারদিকের ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কেউ সিগারেট ধরিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজবে মেতে ওঠলেন। অশোক কুমার রাউত গেড়ে বসলেন চেয়ারে— হাতে বই ধরা, কিন্তু চোখ মেঘনার অতলান্তে হারিয়ে গেছে। ছাদের যেমন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, বাইরের দৃশ্যপটও এখন অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। মেঘনার জল শুধু গভীরই নয়, এক পার দৃশ্যমান তো আরেক পার দেখা যায় না। জোয়ারের টানে বিপরীত দিক থেকে আসছে বড় বড় জাহাজ, মালবাহী কার্গো, ট্রলার। কখনো একটা দুটো, কখনো আবার সারি সারি। যেন কার আগে কে যাবে নীরবে চলছে প্রতিযোগিতা। জলহাওয়ার রোদ্দুরে মিলেমিশে ছায়ান্ধকারাচ্ছন্ন সেইসব জাহাজ পরিবেশটাকে কেমন অচেনা আর আদিধৈব করে তোলেছে। আইপ্যাড দিয়ে ভীমদার ছবি তোলার সিরিয়াসনেস দেখে সেলিম ঠাট্টা করে উঠলো, ‘ভীমদা! মনে হচ্ছে বসের জন্য অ্যাসাইন্টমেন্ট করছেন!’ ভীমদা ছবি তোলা রেখে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন, ‘কী করে বুঝলেন বলুন তো।’ ‘যেভাবে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন!’ ‘আর বলবেন না দাদা। বস ছাদে আসতে চাইছিলেন। সেটা কি সম্ভব, বলুন, উনাকে তো এখানে টেনে তোলা সম্ভব নয়, শেষে আমাকেই পাঠিয়ে দিলেন যে নদীর ছবি তুলে আনো।’

ভীমদার পাশাপাশি তাদের টিমের আরো অনেকের সঙ্গেই কথা বলায় মেতে উঠি আমি আর সেলিম। কথার মাঝে মধ্যে চকলেট আসে, কমলা আসে, কলা আসে, বিস্কিট আসে। ঠা-া হাওয়া আর নদীর সমুদ্রপনায় মন ফূর্তিতে ছলছলায়। আমরা আর নতুন করে কমলা নেই না। সকালে পাওয়া সেই দুটো কমলা এবার সুযোগ মতো গ্রাসাচ্ছদন করি। পল্টুনে বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধ নিয়ে যিনি বেশ সরব ছিলেন, সেই গৌরাঙ্গ বাবু হঠাৎ উষ্মা প্রকাশ করে উঠলেন, ‘পাখিটাখি দেখছি না কেনো?’ ওয়াটার বাসের মাস্টার ইন-চার্জ হাসমতও এসে দাঁড়িয়েছিলেন ছাদে, সহকারীকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে, জবাব তিনিই দিলেন, ‘অনেক পাখি আছে। বিকেলে ফেরার সময় দেখবেন। এখনও আছে, পারে পারে।’

কনটাড-এর ভুবনেশ্বর শাখার ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার অশোক কুমার রাউতের সঙ্গে ওয়াটার বাসের কামরাতেই আমার আলাপ বেশ জমে উঠেছিল, তিনি পাখি-প্রসঙ্গের সূত্র ধরে আমাকে নিমন্ত্রণ জানালেন, ‘আমি ভুবনেশ্বর থাকতে থাকতে একবার আসুন। আপনাকে চিল্কায় নিয়ে যাব। দেখবেন পাখির কেমন মেলা বসে! সাইবেরিয়া থেকে যে পাখিগুলো আসে, ওরা ফেরত যেতে চায় না চিল্কা থেকে। ওখানেই রেসিডেন্স হয়ে যায়। সেফ ফিল করে। একটা পাখি কেউ মেরে দেখুক না, সোজা ৮ বছরের জেল খাঁটতে হবে। কোন মাফটাফ নেই। আর  পাখি মেরে কেউ লুকিয়ে ফিরবে, ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট তার কোন সুযোগ রাখেনি। জায়গায় জায়গায় চর সেট করে রেখেছে। ধরুন, মাঝিদের মধ্যেই একজন আছে, জেলেদের মধ্যেই একজন আছে, গাইডদের মধ্যেই একজন আছে! কেউ পাখি শিকার করলো বা ধরলো তো সঙ্গে সঙ্গেই জায়গামত খবর পৌঁছে যাবে! গভর্নমেন্ট এতো অ্যালার্ট!’

আমি অশোক কুমার রাউতের কথা শুনি আর চোখে ভেসে ওঠে আমাদের খোদ রাজধানী ঢাকাতেই সেইসব পাখিবাজ মানুষদের তৎপরতা, যারা পাখি হাতে হাতে নিয়ে ফেরি করে বেঁচছে আমলার কাছে, বিচারপতির কাছে, বুদ্ধিজীবীর কাছে, পুলিশ অফিসারের কাছে, রাজনীতিবিদের কাছে, কবির কাছে, পরিবেশবিদের কাছে… আমি সেই কুৎসিত দৃশ্যপট ভুলে থাকতে বিশাল ব্যাপ্তিময় পারহীন মেঘনার বুকে বিপরীত দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আসা বড় বড় জাহাজগুলোর দিকে মনোনিবেশ করি! মেঘনার বিশালত্ব যে এতটা অপার জানা ছিল না। মাঝে মধ্যেই পারের কোনো আভাস পর্যন্ত মেলে না। জলের সীমানার আদিগন্ত বিস্তারে জাহাজের পর জাহাজের সারি চেনা পৃথিবী ছাড়িয়ে পুরো দৃশ্যপটকে রৌদ্র ঝলসানো কোন এক আবহমানতা দান করে করে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি যেন ভাসছি চিরকালের সেই রথের খেয়ায়।

চাঁদপুর পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের দেরি হয়ে যায়। একটার মধ্যে যেখানে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেখানে বেজে যায় দুটোরও বেশি। মাস্টার ইন-চার্জ হাসমত সবাইকে তাড়া দিয়ে উঠে, ‘আমরা ভাটায় এসেছি, ফিরতেও হবে ভাটায়। আধাঘণ্টার মধ্যে লাঞ্চ সারতে হবে! নইলে ঢাকায় ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।’ মাস্টার ইনচার্জের যেমন তাড়া রয়েছে তাড়াতাড়ি ঢাকায় ফেরার, জহর ঘোষের দলটারও কম তাড়া নেই। কাল সকালের প্লেনেই তাদের কলকাতা রওনা দেওয়ার কথা, ঢাকায় ফিরে অনেকেরই টুকটাক কেনাকাটার প্ল্যান ছিল। সাতটার মধ্যে ঢাকায় ফিরতে না পারলে সব ভেস্তে যাবে।

জহর ঘোষ এবং তার দুই সেবককে লঞ্চে রেখে, লঞ্চ টার্মিনালে নেমেই আমরা হুড়োহুড়ি করে দুটো অটোরিক্সায় শহরের কালিবাড়ি এলাকায় ছুটে যাই। ছোট শহর চাঁদপুরের এই কালিবাড়িতেই রয়েছে শহরের সবচেয়ে বড় রেস্টুরেন্ট তাজ। পথে যেতে যেতে জহর ঘোষের টিমের মানুষগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করি অন্য এক উত্তেজনা। সুদূর কলকাতা থেকে চাঁদপুর এসেছেন ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেতে। কারো কাছে মনে হতে পারে এ বুঝি বিলাসিতা। অশোক কুমার রাউতও আমার সঙ্গে একমত হয়েছেন, এর পেছনে বস জহর ঘোষের জীবনের কোনো অমূল্য স্মৃতি থাকলেও থাকতে পারে! কিন্তু তার স্বরূপটা কী বলতে পারলেন না, এও তিনি বলতে পারলেন না, জহর ঘোষের পূর্ব পুরুষরা ঠিক কোথাকার মানুষ— পূর্ব বঙ্গের না পশ্চিমের! কথা হলো আমরা দুজনই ফেরার পথে একসঙ্গে ভীমদার কাছ থেকে আসল সত্যটুকু জেনে নেব।

তাজ-এ ঢুকে ভালোই লাগলো। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তো বটেই, আপ্যায়নেও যতœবান। খাতির করে আমাদেরকে তিন টেবিল এক করে একসঙ্গে বসাল। কিন্তু অর্ডার নিতে গিয়েই সবার মাথায় পড়লো বজ্রপাত। যে কথা শোনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলাম না, মেসিয়ার শোনাল সে-কথাই, ‘ইলিশ মাছ নেই। ছিল। শেষ হয়ে গেছে।’

কলকাতার সব মানুষগুলোর মুখ কালো হয়ে গেল! জহর ঘোষ এতদূর থেকে এত কষ্ট করে চাঁদপুরে এসেছেন তো ইলিশ মাছ খেতেই। সেই ইলিশই যদি না খাওয়া গেল, তাহলে এসে লাভটা হলো কী? সেলিমের মুখ দেখে মনে হলো ও বুঝি চুরিডাকাতি কিছু একটা করে ধরা পড়েছে। বার বার বলতে লাগলো, ‘সরি বস। আমি ভাবতেই পারি নাই সিটি অফ ইলশার সবচেয়ে বড় হোটেলে ইলিশ মাছ থাকবে না।’ মেসিয়ারের বার বার জবাবদিহি, ‘ছিল তো ভাই। শেষ হয়ে গেছে!’ অশোক কুমার রাউত গভীর আর্তস্বরে বললেন, ‘দাদা, দেখুন তো আশেপাশের কোনো হোটেলে ইলিশ মাছ আছে কীনা! অন্তত তিনটা পিস হলেও চলবে। বসকে খাওয়াতে পারলেই আমাদের শান্তি!’

যাক! আমাদের মনে খানিকটা স্বস্তি ফিরে আসে যে, অন্য কোন হোটেল থেকে যদি অন্তত তিন পিস ইলিশ মাছও নেওয়া যায়— জহর ঘোষকে খাওয়ানো যাবে। রেস্তোরাঁর এক কর্মীকে পাঠিয়ে দেওয়ার পর মেসিয়ার জানতে চায়, ‘আপনারা কি খাবেন!’ কেউ কেউ মৃদু সুরে আপত্তি তোলে যে, আমরাও না হয় অন্য হোটেলে খেতাম। অন্যরা প্রতিবাদ করে দেরি হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত আমরা এ হোটেলেই খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। জহর ঘোষের জন্য তো আমরা ব্যবস্থা করেছিই!

তাজ হোটেলকেও খুব বেশি দোষ দেওয়া যাবে না। একে তো এটা ইলিশের মৌসুম নয়, ইলিশ যা পাওয়া যায়— ছোট, স্বাদও নেই তেমন। তাই কম কমই রান্না করে। বেশিক্ষণ থাকে না।  ইলিশ না থাকলে কী হবে— আইড়, বাইন, বোয়াল, খাসিসহ অনেক মজার মজার পদই রয়েছে। প্রায় সব পদই আনা হলো এবং আমরা বেশ তৃপ্তি সহকারেই খেতে থাকি ভাত। আর এই খাওয়ার মুহূর্তেই আরেকবার বজ্রপাত! মেসিয়ার এসে আমাদেরকে জানায়, ‘ইলিশ স্যার কোনো জায়গাতেই নাই!’

বলে কি! আমার আর খেতে ইচ্ছে করে না। একজন আশি বছর ঊর্ধ্ব মানুষ, যিনি প্যারালাইজড, কথা বলতে পারেন না, চলৎশক্তিহীন, তবু এসেছেন চাঁদপুরে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেতে, তিনি সেটা না খেয়েই চলে যাবেন? এরচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে! আমি হাত দিয়ে ভাত মাখি বটে মুখে তোলা হয় না। আবার ভাবি, তোমার কি করার আছে! তুমি সেলিমের অতিথি হয়ে বেড়াতে এসেছো, খেয়েদেয়ে মজা করে চলে যাবে! তোমার এত টেনশন নেওয়ার কী দরকার!

তোমার কি কিছুই করার নেই! চমকে উঠি, সকাল বেলা যে খোঁচা খোঁচা পাকা দাঁড়ির বুড়ো মুদি দোকানদার আমাকে একটা ছোট নোট বুক দিয়েছিলেন, এ-যেন তার কন্ঠস্বর, যে পৌঢ় ফলের মহাজন আমাকে দুটি কমলা উপহার দিয়েছিলেন, তার কণ্ঠস্বরও যেন সে কণ্ঠের সঙ্গে মিলেমিশে প্রতিধ্বনি তোলে মনের মধ্যে প্রবল ঘূর্ণনদোলা তৈরি করলো, তোমার কি কিছুই করার নেই। আহা! ছোট দুটি উপহার আমার মনের মধ্যে যে কত বড় আনন্দের সৃষ্টি করেছিল, যার জন্য আমি বুড়িগঙ্গার দুর্গন্ধ পর্যন্ত পাইনি, সেই আনন্দটুকু কি আমিও জহর ঘোষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারি না?

খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। বেসিনে কোনমত হাত ধুয়ে অটোরিক্সায় ছুটে যাই লঞ্চ টার্মিনালে। লঞ্চ থেকে নামার সময় এক ঝলক চোখে পড়েছিল, একটা নৌকায় নানান পদের মাছ— ইলিশ, বড় আইড়, গলদা চিংড়ি। আমি মরীয়া হয়ে সেই মাছের নৌকাটাকে খুঁজি। যেখানে রেখে গিয়েছিলাম, সেখানে নেই। ছুটে ছুটে বিক্রি করছে মাছ। একটা নতুন আসা লঞ্চের কাছে ঠিকই পেয়ে গেলাম। এখন ইলিশের মৌসুম নয়, তাই খুব বেশি বড় ইলিশ পাওয়া গেল না। তবে পদ্মার ইলিশই পেলাম, মাঝারি সাইজের— দাম নিল পাঁচশো টাকা। ঢাকার থেকে খুব বেশি পার্থক্য নেই দামের।

ইলিশটা নিয়ে টার্মিনাল থেকে সামান্য দূরের ছোটখাটো একটা হোটেলে কেবলমাত্র ঢুকেছি, তখনই সেলিমের প্রথম ফোনটা আসে, ‘শুভ্র ভাই, আপনে কই?’ ‘এইতো ভাই আসতেছি।’ ‘আসেন আসেন। আমরা সবাই লঞ্চে উঠছি!’

বলে কি! আমি অস্থিরভাবে হোটেলের মালিককে অনুরোধ করি, ‘ভাই, ইলিশটা কেটে পিসগুলো একটু ভেজে দেবেন প্লিজ!’ লোকটা গা গো করে। ‘আমার বেশি স্টাফ নাই।’ আমি তাকে সকাতরে অনুরোধ জানাই, ‘ভাই আপনাকে এরজন্য টাকা দেব। খুবই প্রয়োজন ভাই। প্লিজ না করবেন না। আপনাকে পুষিয়ে দেব ভাই।’ অনেক অনেক বোঝানোর পর লোকটাকে যখন জহর ঘোষের কথা বলি, বলি যে, শুধুমাত্র চাঁদপুরের ইলিশ খেতেই তিনি কলকাতা থেকে এসেছেন— তখনই তিনি রাজী হন। মেসিয়ারকে দিয়ে ইলিশটা পাঠিয়ে দেন সোজা রান্নাঘরে। আমি যেতে চাইলে আমাকেও যাবার অনুমতি দেন।

রান্নাঘরের বাবুর্চি সবেমাত্র বটিতে ইলিশটাকে কাটতে যাবে, তখনই সেলিমের মোবাইলটা আবারও বেজে উঠলো, ‘আপনি কই রে ভাই। আসেন। ঢাকা পৌঁছাতে তো দেরি হয়ে যাবে! সবাই যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে।’ আমি ওকে বোঝাই, ‘এই তো ভাই, হয়ে গেছে। আসতেছি!’ বলেই মোবাইলটা কেটে দেই।

তারপর বাবুর্চিকে তাড়া দেই, ‘ভাই একটু তাড়াতাড়ি!’ ‘ভাই লঞ্চ ছেড়ে দিচ্ছে।’ ‘ভাই জলদি করেন!’ ‘ভাই ভাই! দেরি হয়ে গেল!’ মানুষটা আমার কথার উত্তর দেয় না। নিজের মতো মাছটাকে কেটেকুটে টুকরো করলো। তারপর পেছনের দিকে নিয়ে গিয়ে ভালোমতো ধুয়ে নিল। আবারও সেলিমের ফোন। এবার বেশ অসহিষ্ণুতা এবং ঝাঁঝ কণ্ঠস্বর, ‘ধুর মিয়া! আপনে একটা মানুষ! কোথায় আছেন! কি করতেছেন? আসেন না কেনো?’ ‘এই তো ঘাটের কাছেই। আসতেছি।’ ‘তো আসেন না কেনো? এতগুলো মানুষকে বসিয়ে রেখেছেন। আমার তো মানইজ্জত কিছু রাখলেন না!’

বাবুর্চি এবার ইলিশের টুকরোগুলোতে মশলা মেশাতে থাকে। হলুদ দেয় মরিচ দেয় ধনে দেয়। তারপর বড় তাওয়ার গরম তেলের মধ্যে একটার পর একটা ইলিশের টুকরো ছেড়ে দিতে থাকে। সেলিমের ফোনও থেমে থাকে না। একটার পর একটা কল আসতেই থাকে। আমি ধরি না। কারণ, আমি তো কোন সদুত্তর দিতে পারব না ওকে। উলটো আমাদের দুজনের মাঝে তিক্ততা বাড়বে। দশ বছরের গাঢ় বন্ধুত্ব আমাদের। এ বন্ধুত্ব ভ্রমণের, ভ্রমণের কারণেই ওর সঙ্গে গড়ে উঠেছিল সব হৃদ্যতা— আমি তা কিছুতেই হারাতে চাই না।

একটা স্বচ্ছ পাতলা পলিথিনে ইলিশ ভাজা নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে সিঁড়ি বেয়ে লঞ্চে উঠতেই সেলিম গালি দেবে কী, আমার হাতের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে জানতে চায়, ‘কি!’

                ‘ইলিশ। ভেজে আনলাম। জহর ঘোষের জন্য!’

‘খুব ভালো করেছেন, শুভ্র ভাই। খুব খুশি হইলাম ভাই!’ সেলিম রাগের বদলে আমাকে জড়িয়ে ধরে। অশোক কুমার রাউতসহ ওদের দলের অন্যান্যরাও এগিয়ে এসে আমাকে বাহবা দিতে থাকে। একটা প্লেট এনে জহর ঘোষের সামনে ইলিশ ভাজার টুকরোগুলো থরে থরে সাজিয়ে রাখা হলো। পাশেই বাটিতে ভাত। তিনি ইলিশের একটি পেটি হাতে নেন, ঘ্রাণ শুঁকেন, কামড়ও বসান। আবারো ঘ্রাণ নিতে থাকেন নাকের কাছে ধরে। তারপর কাগজ সাঁটা বোর্ডটা টেনে গড় গড় করে কী লিখে সেলিমের দিকে বাড়িয়ে দেন।

সেলিমের ঘাড়ের ওপর দিয়ে আমিও পড়ি জহর ঘোষের লেখাটা, ক্যান ইউ অ্যারেঞ্জড প্লিজ, গ্রামের বাড়ি বাড়ি ইলিশ ভাজা হচ্ছে। আর আমি সেই ইলিশ ভাজার স্মেল পাচ্ছি! ইজ ইট পসিবল মিস্টার সেলিম?’

লেখাটা পড়ে সেলিম বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে, আমিও। আমরা কী জবাব দেব ভেবে পাই না। ইলিশ ভাজার স্মেলের কথা শুনে আমিও আমার শৈশবে ফিরে যাই। সোমবার ছিল আমাদের হাটের দিন। দুপুরের পর থেকে পুরো গ্রামের দৃশ্যপটই যেত পাল্টে, যে-ই ফিরতো হাট থেকে সবার হাতে হাতে থাকত ইলিশ মাছ, কারো হাতে একটা, কারো হাতে দু’টা, কারো হাতে বা দুই হালি। বিকেলে আকাশবাতাস ভরে যেত ইলিশ ভাজার ঘ্রাণে! এমন আমোদ বাজত প্রাণে, আমি বুঁদ হয়ে থাকতাম তার আবেশে! জহর ঘোষেরও কি তাই হতো? এখানে হাট বসতো কি বারে?

***********************************************

 


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা