গোপন প্রাণে একলা মানুষ

গোপন প্রাণে একলা মানুষ

অন্ধকার ভয় পাই আমি। আলো জ্বালিয়ে শুতে যাই। সহজে ঘুম আসে না। শুয়ে শুয়ে আকাশপাতাল ভাবি। বিআরবির ফ্যানটি নিঃশব্দে ঘোরে। বাতাসে ঠাণ্ডা লেগে যায়। খুকখুক করে কাশি। কাশতে কাশতে একটি পুরনো ফিনিক্স সাইকেলের কথা মনে পড়ে। চঞ্চল নদীটি, নদীর ওপর ভেঙে পড়া প্রাচীন ব্রিজের কথা মনে পড়ে। সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে নদীপাড়ে গিয়ে বসে থাকার প্রশান্ত বিকেল, বৃদ্ধ আমগাছটির ডাল থেকে পুকুরে লাফিয়ে পড়া দুপুর এসব প্রাগৈতিহাসিক প্রতিটি মুহূর্ত হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ে মাথার মধ্যে। ফ্যানটা বন্ধ করে দিই। জানালার পর্দা ফাঁক করে কাচ সরিয়ে দিলে ঘরে প্রাকৃতিক বাতাস ঢোকে। এই বাতাসে আরাম পাই। আরামে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। এবার হয়তো ঘুমোতে পারব। না ঘুম আসে না। চঞ্চল নদীটির জলে ডুবে ডুবে চোখ লাল হয়ে যেত—সে কথা মনে পড়ে। লাল চোখ, ভেজা চুলে বাড়ি ফিরে গা মুছি মায়ের শাড়িতে। তখন স্কুলে ড্রেস ছিল না। একটা সাদা শার্ট আর জিন্স ইংলিশ প্যান্ট পরে বাবার সাইকেলের ব্যাক-ক্যারিয়ারে চেপে স্কুলে যাই। স্কুলের কথা এলেই কার্তিক স্যার উঁকিঝুঁকি মারেন। একটা মোটা বেত লাঠির মত ঘোরে লম্বা মানুষটির হাতে। এদিক-ওদিক গেলে আমাদেরকে তাড়া করেন। ভয় পেয়ে স্কুলঘরের ৩ নম্বর রুমে ঢুকে বই খুলে পড়ি–অ-তে অজগর, অজগরটি আসছে তেড়ে; আ-তে আম, আমটি আমি খাব পেড়ে। যেদিন বাবা নিতে আসে না, স্কুল ছুটি হলে কার্তিক স্যার আমাকে সাইকেলে তুলে নেন। আমাদের বাড়ির বার-উঠোনে দাঁড়িয়ে সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে ডাক দেন—রানু, রানু। রানু আমার বড় বোন। কতকাল আগে মারা গেছে! কোত্থেকে রানু আসবে! প্রায় সবাই, তবু মাকে ডাকতে রানুকে ডাকে। কেন যে! দরজা খুলে বেরিয়ে আসে আমার মা। রানুর নাম শুনে হয়তো তার বুক কেঁপে কেঁপে ওঠে। আহা আমার মা! একদিনও মাকে না দেখে থাকতে পারতাম না। অথচ এখন কোথায়—কোন গ্রামে মা পড়ে আছে! দরজা খুলে মা বেরিয়ে এলে কার্তিক স্যার বলেন—এই নেন বৌদি আপনার ছেলে। খুব লক্ষ্মী ছেলে আপনার। দেখবেন একদিন অনেক বড় হবে ও। স্যারের কথা শুনে মা শব্দ করে হাসে—বড় না ছাই হবে। খুব জ্বালায় আমাকে। কিচ্ছু খেতে চায় না। দেখেন না কেমন কাঠির মতন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। স্যারের সাইকেল থেকে মা আমাকে কোলে নিয়ে চুমু খায়—আমার দুষ্টু ছেলেটা! কোথায় সেই মা! ভাবতে ভাবতে ঘুম কেটে যায়। বারান্দায় এসে দাঁড়াই। চারদিক ফর্সা হতে শুরু করে। দূরে—রেডিও কলোনির মাঠের ওপারে যোজক প্রজেক্টের বিশাল বিল্ডিং স্পষ্ট দেখা যায়। তখন বিষাদ তীব্র হয়ে আসে। বিষাদ কেন হয়, জানি নে। এমনিতেই বুকের মধ্যে কেমন একটা হাহাকার লাগে। মনে হয় কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি। বা হারিয়ে ফেলে খুঁজি নি। খোঁজার অনাগ্রহের জন্য অনুতাপ হয় বা। একটু পরেই রাস্তায় মানুষ বেরুবে। বিদিশাদের বাসার কুকুরগুলো তারস্বরে ডেকে ওঠে। কুকুর ডাকতে শুরু করলে থামে না। একটা ডাকলে আশপাশেরগুলোও ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। বারান্দায় স্মৃতি কিছু টব এনে রেখেছে— ক্যাকটাস, কয়েকটা বনসাই, আরও কী সব ফুল—আমি সবগুলোর নামও জানি না। বাথরুমের ট্যাপ থেকে পানি এনে অচেনা ফুলের টবে দিই। এভাবে সময় কাটে। শমসের মোল্লা রোডে মানুষজনের আনাগোনা শুরু হয়। আর একটু পরে স্মৃতি কলেজে যাবে, পড়াতে। ও চলে গেলে তখন আমার একটু ঘুম হয়। ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি। যেন একটা রাজবাড়িতে বেড়াতে গেছি দুজন। আমি আর স্মৃতি। বিশাল রাজবাড়ির চারদিকে দিঘি। দিঘিতে জল টলমল করে। বড় বড় প্রাচীনকালের কারুকার্য করা দালান। সিঁড়িগুলো অন্ধকার। আমরা সিঁড়ি বেয়ে ঊঠতে থাকি। ছাদে উঠলে চারপাশটা পরিষ্কার দেখা যায়। চারদিকে বেষ্টনি দেয়া দিঘি একটা আয়তাকার রেখার মত লাগে। আচমকা ঝুমঝুম করে বৃষ্টি আসে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির মধ্যে ছাদে দাঁড়িয়ে আমরা ভিজি। ভিজতে ভিজতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। কখন কারেন্ট চলে গেছে। ঘামে সকালের স্নান সারা।
বাইরে বেরোই। মানুষের ভিড় ঠেলে পৌঁছই যেখানে যাবার। টুকটাক কাজটাজ করি। পিওনকে চা দিতে বলি। ছেলেটি একটু পরে চা আর এক গ্লাস পানি এনে টেবিলের ওপর রাখে। তখন অনেকদিন পরে রোকন এসে দরজায় উঁকি দেয়—চা খাচ্ছো নাকি! আরে দোস্ত তুমি! আসো। ভেতরে আসো। পিওন ছেলেটিকে আরও এক কাপ চা দিতে দিতে বলি—দোস্ত এদ্দিনে আইলা? রোকন আমার বন্ধু। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা একসঙ্গে পড়েছি। এখন ডাচ বাংলা ব্যাংকের ফাস্ট ট্র্যাকে চাকরি করে। কখনো আমি ওর কাছে যাছে যাই। কখনো ও আসে। আমিই যাই বেশি। ও কম আসে। দুপুরবেলা আমার কাজ শেষ হলে ফাস্ট ট্র্যাকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে গিয়ে গল্পগুজব করি। ওর শিফ্ট শেষ হলে আমরা একসঙ্গে বেরোই। কাজলায় কায়েস টি-স্টলে বসে এক কাপ চা খাই। রোকেনের সঙ্গ মন্দ লাগে না আমার। প্রগলভ সরল বন্ধুটি আমার! চা খেতে খেতে ওর স্ত্রীর গল্প করে। খুনসুটির গল্প। প্রেম করে বিয়ে করেছিল। মা-বাবা প্রথমে মেনেই নেয় নি। এখন ওরা ভাল আছে। রোকন সেই গল্প করে। আমি শুনি। এত সুখের গল্পেও মন হারিয়ে যায়। মন যেন একটা পাখি। খালি উড়ে যেতে চায়। আনন্দ-উদযাপন শেষ না হতেই ঔদাসীন্য পেয়ে বসে। যেমন জীবনে একটা পর্ব শেষ হতে না হতে আরেকটা পর্ব এসে আগেরটাকে ভুলিয়ে দেয়। যেন একটা লোকাল বাস। এক স্টপে একজন নেমে যায়। অন্য স্টপে গিয়ে সেই সিটে আরেকজন এসে বসে। মন পাখি উড়াল দেয়—কোথায় আমাদের পুকুরপাড়ে আমরুপালির চারাগাছটি বড় হচ্ছে, য়্যুক্যালিপ্টাসটি হেলে পড়েছে কি না দেখতে দেখতে যেখানে আমার মা দাঁড়িয়ে পড়ে হয়তো তখন আমার কথাই ভাবে। রোকন বউয়ের গল্প করতে করতে গলা ফাটিয়ে হাসে। সিগারেট ধরানোর জন্য আমার কাছে আগুন চায়। ড্রয়ার থেকে দেশলাই বাক্সটি এগিয়ে দিই। গল্প-কথায় ধোঁয়া ওড়ে। আমরা পুড়ি না। আমাদের পোড়াবে এমন আগুন কই?
অথচ এমন হবার কথা নয়। আমি তো কাঁদতে পারতাম! স্কুলে প্রতিদিন ক্লাস শুরুর আগে অ্যাসেম্বলিতে দেখতাম পতাকা উড়ছে। লাল সবুজের পতাকা। আমি জানতাম এই সবুজ বাংলাদেশের প্রকৃতি। এই লাল শহিদের রক্তে রাঙা। পতাকাকে সামনে রেখে আমরা গাইতাম—আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি। গাইতে গাইতে জলে ভরে আসত চোখ। আবার যেদিন ইতি আমার চোখের দিয়ে সিঁড়ির ধাপে ধাপে পা ফেলে অচেনা এক পরির মত বিবাহ-বাসরে চলে গেল। পেরেছিলাম কি কান্না আটকাতে? পারি নি। ইতিদের তিনতলা বাড়ির ছাদে সেদিন দুপুরবেলার বৃষ্টি আমাকে বাঁচিয়ে দেয়। বৃষ্টি সেদিন নরম ছোঁয়ায় ধুয়ে দেয় আমার চোখের জল। ছাদ থেকে মহানন্দা নদীটি দেখা যায়। শুকিয়ে যাওয়া নদী। বড় বড় চর। চরে সবুজ কাশবন। কাশবন বৃষ্টিতে ভেজে। আমি ভিজি যৌথজলে। সেই আমাকে আজ কোন আগুন পোড়াতে পারে না। কোন বৃষ্টি আমাকে ভেজাতে ব্যর্থ হয়। আমি কি তাহলে শুকিয়ে যাওয়া কাঠ! অনুভূতিহীন পাথর! যে মানুষ পাথর হয়ে যায় তার কোন গল্প থাকে না। একদিন আমার গল্প ছিল। এখন নেই। যে আমি বর্ষার প্রথম জলে স্নান করতে গিয়ে সাপের কামড়ে ব্যথা পেয়েছিলাম সে আমিও নেই। এভাবে সবাই বদলে যায়। সাপের মত খোলস পাল্টে একেকজন অন্য আমি হয়ে যাই।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা