গৌতম গোস্বামী’র প্রবন্ধ

ছোটকাগজের ছোট কথা

জন্মের পর স্বাধীনতার চেয়ে পরাধীনতাকেই আমরা অনেক বেশি আপন করে নিই। তাই বিষদাঁত ভাঙ্গা সাপের মত শুধু ফোঁস ফোঁস করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না। এই বাঁধন থেকে বের হওয়ার সত্যিকারের প্রচেষ্টা প্রায় অসম্ভব। তাই প্রচেষ্টাতে আজকাল আমরা নার্ভাস feel করি। মেরুদণ্ডের এই ক্ষয় কোনো ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটে খাবার নয়। যা প্রয়োজন তা হল সৎ সাহস ও আত্মপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। কারণ সত্যের অঙ্গীকার গরলেও অমৃত সেবন করায়। নীল কণ্ঠের এই নীলে এক রাশি অধঃপতনের অপমৃত্যু হয়। পৃথিবী আবার হয় বসবাসযোগ্য। একখণ্ড মাটি যেমন প্রয়োজনার্থে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে ঠিক তেমনি শিল্পবোধ এর ধরন পরিবর্তিত হয় সময়ের প্রয়োজনে। ক্ষতি নেই; যদি তার উদ্দেশ্য হয় সৃষ্টির আত্মমর্যাদা লাভ। তবে মর্যাদার মানবিকতা থাকা অপরিহার্য। সাহিত্যের ক্ষেত্রে মর্যাদাবোধ সম্পন্ন সবচেয়ে ছোট অথচ জটিলতার মধ্যে জটিলতার নিরসনের একমাত্র মাধ্যম ছোটকাগজ বা little magazine সধমধুরহব। প্রসঙ্গ পুরাতন কিন্তু ভাবাচ্ছে নতুন করে। তাই এই প্রচেষ্টা ও নতুন কিছুর প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা থেকেই little magazineকে আরো একবার সামনে আনা, তার পেছনের দিকগুলোকে আরেকবার ফিরে দেখা। ছোট কাগজ বা লিটল ম্যাগাজিনের সাথে পরিচয় আছে তাদেরই যারা সাহিত্যের গভীরতায় নিমজ্জিত। একটা সময় ছিল যখন ছোট কাগজ বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত ভাবনার মোড় পরিবর্তন করেছিল। তারপর থেকে আজ অবধি সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ছোটকাগজের ভূমিকা ইতিবাচক ও ফল প্রদায়ক। আমরা অনেকেই বিশ্বের চিরায়ত গ্রন্থগুলোর নাম এক নিঃশ্বাসে বলে শেষ করতে পারব। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যে প্রথম ছোটকাগজ, কোনটি? জিজ্ঞেস করা হলে নিঃশ্বাস বিলম্বিত হওয়াটা অবাক হবার মত কিছু নয়।

ছোট কাগজের সংজ্ঞা সংজ্ঞায়িত নয়
এক সময় মানুষ হাতে লিখত। মাধ্যম ছিল পাথর, ধাতব, গাছের পাতা, বাকল এবং সর্বশেষে অনেক সাধনার ফসল কাগজ। মূলত হাতে লেখার যুগে কোনো সাজানো গোছানো বই আকারের কিছু ছিল না এক কথায় লিটল বা বড় বা মাঝারি কোন কাগজই ছিল না। যে কোনো বই তখন ছিল প্রায় স্বর্গীয় দৈব বাণীর মত। ছাপাখানা আবিষ্কার ও তার সুসম্প্রসারণের ফল মুদ্রণ ও পুস্তক প্রকাশে অভাবনীয় সাফল্য আসে। তবে ছাপাখানার প্রাথমিক যুগে হাতে লেখা পত্রিকা বা Magazine প্রকাশিত হয়েছে প্রচুর। সত্যিকথা বলতে গেলে little magazine-এর উদ্ভব হয়েছে এক প্রকার অহং, পরম আন্তরিকতা ও দ্রোহ জাত ভাবনা হতে। যার গর্ভাশয় শিল্পের প্রতি প্রগাঢ় মমত্ববোধ হতে উৎকলিত। এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যারা ব্যবসায়িকভাবে প্রবল সবল পত্রিকাগুলোর পাশাপাশি আরেকটি প্রকাশনার চেষ্টা করেন মমতার আঁধার দিয়ে। আর এখান থেকে যে আন্তরিক স্পর্ধা জন্মায় তার মলাটবদ্ধ সংকলনই little magazine। তবে একে আরেকটু বিশেষায়িত করা যায় little magazine-এর শব্দার্থতত্ত্বের ব্যাখ্যায়।
Magazine শব্দটি আমরা অনেকেই শুনে থাকব। আর যারা বাদ ছিলাম তারাও আমেরিকার আগ্রাসনের বদৌলতে সমরাস্ত্রের বিভিন্ন অংশের নাম সম্পর্কে অবগত। গধমধুরহব শব্দের আভিধানিক অর্থ বন্দুকের গুলি রাখার খাপবিশেষ কিংবা ক্যামেরা অথবা প্রজেক্টারে ফিল্ম রাখার স্থান এবং সাময়িকী। জানা যায় সাময়িকী অর্থে (জেন্টলম্যানস) ম্যগাজিন (লন্ডন ১৭৩১) এর বরেণ্য সম্পাদক এডওয়ার্ড কেভ প্রথম ম্যাগাজিন শব্দটি ব্যবহার করেন। কিন্তু এর উৎসার্থ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। কেউ কেউ বলেন, নামটি এসেছে লিটল থিয়েটার থেকে আবার কেউ বলেন মার্গারেট এন্ডারসন সম্পাদিত লিটল রিভিউ (শিকাগো, ১৯৪১) থেকে।
ওয়েবস্টার থার্ড নিউ ইন্টারন্যাশনাল ডিকশনারী (১৯৭১)-এ লিটল ম্যাগাজিনের সংজ্ঞা রয়েছে এভাবে–
‘A literary use non-commercial magazine typically small in format that esp. Feautures experimental writing or other lither literay expression appealing to a relatively limited number of reders’

লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ সুবিমল মিশ্র বলেন–লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে সাহিত্যের বিশেষ একটি দৃষ্টিভঙ্গি, বেপরোয়া, রবীন্দ্র পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে যা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, হয়ে উঠেছে। এক কথায় আর্থ-সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক সমস্ত রকম স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে তার অবস্থান।
সন্দীপ দত্তের মত একটু আলাদা রকম। তাঁর মতে লিটল ম্যাগাজিন বিশেষ উদ্দেশ্যবাহী, সৎ সাহিত্য ভাবনায় পরিচালিত এস্ট্যাব্লিশমেন্ট বিরোধী, সমাজ সচেতন, স্বল্পবিত্ত, রুচিশীল, তরুণদের সৃজন সাহিত্যপত্র।
আর এতে করেই বোঝা যায়, লিটল ম্যাগাজিনের পথ পরিক্রমা খুব সহজ কিছু নয়। তার বাধা, বিপত্তি অগণিত। তবে যেহেতু little magazine একটি শিল্প প্রক্রিয়া তাই শিল্পের খাতিরেই এর সদর্থক অনুভবে আমরা অনুরণিত। শিল্পের চিরন্তনতা, সার্বজনীনতা, শাশ্বত মহিমাকে লিটল ম্যাগাজিন দিয়েছে চিরন্তন স্থায়িত্ব। অতএব লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে প্রকাশনার মাধ্যমে শিল্পের নির্মাণ যা আন্দোলনে বিশ্বাসী, যাতে প্রচুর গতি, সম্ভাবনা ও চেতনার নিদর্শন বিদ্যমান। যার লক্ষ্য পৃথিবীতে সত্যের অহংকার, যার প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষা একটি পূর্ণাঙ্গ স্বপ্নকে ঘিরে এবং যার দর্শন মনে প্রাণে আমৃত্যু প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা।
লিটল ম্যাগাজিনের কথা মনে আসতেই সুকান্ত’র একটি কবিতা বারবার মনে পড়ে–
“আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য হয় চোখেও পড়ে না
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস।”
[দেশলাই কাঠি]
লিটল ম্যাগাজিন এই জ্বলে ওঠার বিষয়টি তাকে একটা আলাদা মর্যাদা দান করেছে। তাকে দিয়েছে অন্যন্য বৈশিষ্ট্য যে বৈশিষ্ট্যে তার দ্যুতি আলোহীনকে আলো দেয়। প্রকাশভঙ্গিতার প্রচণ্ডতা আর তীব্র গতি নিউটনের গতিসূত্রগুলোকে হার মানায়। আমাদের প্রত্যাশা হয় ভিন্ন রকম। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নতুন উপায় বাতলানোর অগ্নিস্ফূলিঙ্গ বিশেষ little magazine। বুদ্ধদেব বসু ‘সাহিত্য পত্রে’ উল্লেখ করেছেন “লিটল কেন? আকারে ছোট বলে? প্রচারে ক্ষুদ্র বলে? নাকি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সব কটাই সত্য, কিন্তু এগুলোই সব কথা নয়। ওই ছোট বিশেষণটাতে আরো অনেকখানি অর্থ আছে। কথাটা একটা প্রতিবাদ বহুলতর প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেল যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনো ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড় বাজারে বিকোবে না, কিন্তু হয়ত কোনো একদিন এর একটি পুরনো সংখ্যার জন্য গুণী-সমাজে ঔৎসুক্য জেগে উঠবে।” সত্যি বলতে লিটল ম্যাগাজিন একটি আত্মা। আর আত্মা হচ্ছে শক্তি। শক্তির ক্ষয় বা বিনাশ নেই তাকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর করা যায় মাত্র। লিটল ম্যাগাজিনের শক্তিতেও তাই ধ্বংসের প্রতাপ কখনো আঁচ দিতে পারে নি।
ছোটকাগজ কথাটি আক্ষরিক অর্থে ছোট হলেও ভাবার্থে নয়। কারণ এই ছোটকাগজের ছোট পরিসরেই বড় লেখকের ভিত সৃষ্টি হয়েছে। আজ যাঁরা সমাজ বরেণ্য, দেশ বরেণ্য, বিশ্ব বরেণ্য তাদের অনেকের লেখক জীবন শুরু হয়েছিল ছোটকাগজের পাতায়। তবে ছোটকাগজের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানোর প্রবণতা তাদের অনেকেরই নেই বললেই চলে। তাঁরা ছোটকাগজকে ব্যবহার করেছেন উপরের সিঁড়ি হিসাবে। আর শতকরা ৯৯.৯৯ ভাগ সাধারণ এবং অসাধারণ মানুষই উপরে উঠলে নীচে তাকান না। সবচেয়ে বড় দুঃখের ব্যাপার যেটি সেটি হচ্ছে, যে ছোটকাগজের সাতে প্রাতিষ্ঠানিকতা ও বাণিজ্যিকতা একটা সংঘাত সব সময় চলেছে এই লেখকরা সরাসরি সেই বাণিজ্যিকতার দাসত্ব করেছেন। আবার অনেকে লোকের চোখে ধূলো দিয়ে বা দেবার চেষ্টা করে ফিরে আসতে চেয়েছেন ছোট কাগজে। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত ছোটকাগজ কখনো কারো সাথে কোনো অবস্থাতেই আপস করে না। আর এই আদর্শ নিয়ে ১৮৮০ সালে ‘দি ডায়াল’ নামে প্রথম একটি ছোটকাগজ বা লিটল ম্যাগাজিন আত্মপ্রকাশ করেছিলো। যার সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন ‘র‌্যালফ ওয়ান্ডো ইমারসন’ ও ‘মার্গারেট ফুলার’। প্রকৃতার্থে লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটকাগজের চর্চা ও প্রসারতা শুরু হয় ১৮৮০ সালের পর ফ্রান্সে। এ সময় ফ্রান্সে প্রতীকবাদী সাহিত্যের জয়জয়কার ছিল। একই সময় যুক্তরাজ্যে ও যুক্তরাষ্ট্রে রূপবাদী সাহিত্যের মুখপত্র রূপে লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভাব হয়। মোটামুটিভাবে এ সময়টাই লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভাবের কাল। ১৯২০ সালে জার্মানীতে প্রবলভাবে শুরু হয় এর চর্চা। এ সময়ে উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে হ্যারিয়েই মনরোর ‘পোয়েট্রি’ (১৯১২), মার্গারেট ওন্ডারসনের ‘লিটলরিভিউ’ (১৯১৪-২৯), ‘ইগোইস্ট’ (১৯১৪-১৯), ‘ব্লাস্ট’ (১৯১৪-১৫), ‘ট্রানজিশান’ (১৯২৭-৩৮)।
লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে এ পত্রিকাগুলো প্রতিষ্ঠা করেছে লিটল ম্যাগাজিনের প্রাথমিক ভিত্তি। আর এগুলোকে ঘিরে রয়েছে বিশ্ব বরেণ্যদের অনেকের নাম, এজরাপাউন্ড, টি এস এলিয়ট, জেমস জয়েস, হেমিংওয়ে এই কাগজগুলোতেই তাদের প্রাথমিক সময় পার করেছেন। আবার কেউ কেউ প্রচণ্ড আন্তরিক হয়ে নিয়েছেন সম্পাদনার কঠিন দায়িত্ব। জয়েসের চৈতন্যপ্রবাহ রীতির প্রথম উপন্যাস ‘ইউলিসিস’ এর প্রথম এগারো অধ্যায় ছাপা হয় ‘লিটল রিভিউ’র পাতায়। এলিয়টের বিশ্ব নন্দিত ‘ওয়েস্টল্যাণ্ড’ ছাপা হয় ‘ডায়ালে’র পাতায়। ত্রিশের দশক বিশ্ব রাজনীতি ও সংস্কৃতি একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। দুনিয়াব্যাপী শ্রেণিহীন মানুষের অধিকার ও সম্পদের সুষম বন্টনের বাণী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মার্কসবাদী চেতনা। এ সময়ের সাহিত্য জারিত হয়েছে মার্কসবাদী চেতনায়। আমেরিকায় ‘পার্টিজান’ এবং ইংল্যান্ডে ‘লেফট রিভিউ’ এই চেতনাকে বহন করে। অতিক্রান্ত সময়ের প্রবাহ ও কালের চেতনাকে পরবর্তীতে সমৃদ্ধ করেছে সমালোচনা প্রধান লিটল ম্যাগাজিন। যার ভেতর উল্লেখযোগ্য ‘ক্যানিয়ন রিভিউ’ (১৯৩৯), ‘স্ক্রুটিনি’ (১৯৩২-৫৩), ‘সাউদার্ন রিভিউ’ (১৯৩৫-৪২), ‘একসেন্ট’ (১৯৪০-৬০)। পঞ্চাশের দশকের পূর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তৎপরতায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে সাহিত্যের সুকুমার বৃত্তি। পঞ্চাশ দশক এবং পরবর্তী সময়ে সমৃদ্ধ হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা। এ সময়ের প্রধানতম কাগজগুলো হচ্ছে ‘এন্টিয়ক রিভিউ’, ‘এলিজাবেথ’, ‘প্যারিস রিভিউ’ ইত্যাদি। ষাটের দশকে বিট আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করেছে ‘বিটিচিউড’, ‘হউগন’ ও ‘বিগটেবস’। তবে এখানেই শেষ নয়। এর পরবর্তী সময়েও লিটল ম্যাগের চর্চা ধারাবাহিকভাবে হয়েছে। এবং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী লিটল ম্যাগের সাথে পাল্লা দিচ্ছে সাহিত্য সাময়িকী এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাগজ।
দুই.
বঙ্কিমের হাতে জন্ম নেয় প্রথম সার্থক ছোটকাগজ ‘বঙ্গদর্শন’ (১৮৭২)। এর পূর্বে অবশ্য জন ক্লার্ক মার্শম্যানের নেতৃত্বে সৃষ্টি হয়েছিল ‘দিগদর্শন’ (১৮১৮)। এরপরের ইতিহাস তৈরি হয়েছে ঠাকুরবাড়িতে। ‘ভারতী’ (১৮৭৭) এবং তার পর পরই ‘হিতৈষী’ (১৮১৮), ‘সাহিত্য’ (১৮৯০), ‘হিতবাদী (১৮৯১), ‘প্রবাসী’ (১৯০১), ‘ভারতবর্ষ’ (১৯১৩)। কিন্তু এ পত্রিকাগুলো ঠিক লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্র বহন করে না। তবে লিটল ম্যাগাজিন গড়ে তোলার প্রাথমিক ভিত্তি এ পত্রিকাগুলো তৈরি করে দিয়েছিল। বাংলা সাহিত্যে সত্যিকারের লিটল ম্যাগাজিন তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯১৪ সালে ‘সবুজ পত্র’ পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। লিটল ম্যাগাজিনের চিরায়ত ঐতিহ্য প্রকাশিত হয়েছে সবুজ পত্র পত্রিকার চরিত্রের মধ্য দিয়ে। সবুজের চিহ্ন সব সময় সামনের দিকে নির্দেশ করে। সবুজ তারুণ্যকে নির্দেশ করে। ঠিক এভাবেই সবুজ পত্র প্রথা বিরোধিতা ও মননশীলতার পরিচয় দিয়ে সবুজের অর্থকে সমুন্নত রেখেছিল। এরপর প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয় বাংলা সাহিত্যে। রবীন্দ্র বিরোধিতা এবং আকাশের রবি কিরণকে একটা প্রবল অথচ সৃষ্টিশীল ধাক্কা দেয়। মার্কসইজম ও মর্ডানিজম-এর যৌথ প্রযোজনা তখন বাংলা সাহিত্যের ভেতর বাহির। আধুনিকতা, আধুনিক কবিতা, আধুনিক গল্প তথা রঙ বদলের চিত্র। দিন বদলের ভাষা এবং পৃথিবীর অন্ধকার, জারত্ব নিয়ে সাহিত্যের নতুন ইমারত সৃষ্টি হয়। তৈরি হয় আধুনিকতা জারিত রবীন্দ্রদ্রোহী ‘কল্লোল’ (১৯২৩), ‘কালিকলম’ (১৯২৬), ‘প্রগতি’ (১৯২৭), ‘ধূপছায়া’ (১৯২৭), ‘পরিচয়’ (১৯৩১), ‘পূর্বাশা’ (১৯৩২), ‘কবিতা’ (১৯৩৫), ‘চতুরঙ্গ’ (১৯৩৮), ‘নিরুক্ত’ (১৯৪০), ‘একক’ (১৯৪১)। এদের ভেতর ‘প্রগতি’ ও ‘পূর্বাশা’ বাদে বাকী সবগুলো কাগজ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হত। এর সবগুলো পত্রিকা লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রকে বহন করেছিল।
’৪৭-এর পরও লিটল ম্যাগাজিন কলকাতার বলয় ছেড়ে বের হতে পারে নি। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলো হল‘শতভিষা’ (১৯৫১), ‘কৃত্তিবাস’ (১৯৫৩), ‘ময়ূখ’ (১৯৫৩), ‘অনুক্ত’ (১৯৫৬) ইত্যাদি। এরপর ৬০ ও ৭০-এর দশকে আসে আন্দোলন ও সমাজ পরিবর্তনের নতুন ইঙ্গিত। সাহিত্য সমাজের বাইরের কিছু নয়। তাই সমাজ পরিবর্তনের ইঙ্গিতে সাহিত্যেও আসে নতুন মাত্রা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এ সময় শুরু হয় হাংরি জেনারেশনসহ একাধিক সাহিত্য আন্দোলন। এরই ফলশ্র“তিতে জন্ম নেয় ‘উচ্চারণ’ (১৯৬০), ‘নন্দীমুখ’ (১৯৬০), ‘এক্ষণ’ (১৯৬১), ‘শ্র“তি’ (১৯৬১), ‘কবিকণ্ঠ’ (১৯৬৩), ‘অনীক’ (১৯৬৪), ‘অনুষ্টুপ’ (১৯৬৬), ‘সাম্প্রতিক’ (১৯৬৭), ‘সারস্বত’ (১৯৬৮), ‘গঙ্গোত্রী’ (১৯৬৯)। এতো গেল ৬০-এর দশক। ৭০ তখনও জন্ম নেবার অপেক্ষায়। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগগুলোর নাম হচ্ছে ‘নক্ষত্র’ (১৯৭০), ‘সত্তর দশক’ (১৯৭১), ‘বিজ্ঞাপন’ (১৯৭৪), ‘গাঙ্গেয়পত্র’ (১৯৭৪), ‘অমৃতলোক’ (১৯৭৭) ইত্যাদি। ঠিক এ সময় থেকে লিটল ম্যাগাজিনের আত্মপ্রকাশ কলকাতার সীমারেখাকে অতিক্রম করতে থাকে। লিটল ম্যাগাজিনের পৌরষদীপ্ততায় আলোকিত হয় ছোট ছোট শহরগুলো। তার আরো অনেক পরে গ্রামাঞ্চল। মুর্শিদাবাদ, ত্রিপুরা, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর প্রভৃতি অঞ্চল ভাষাকে নতুনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। ভাষার আধুনিকায়ন ও ভাষাতত্ত্বের জটিল বিষয়গুলো সামনে আসতে থাকে। শব্দার্থতত্ত্ব ও বাক্যগঠনের ক্ষেত্রে নতুন কৌশল দেখা যায়। লিটল ম্যাগাজিন ও সংগঠন থেকে একটি নতুন ধারা জন্ম নেয়। আমরা তখন মর্ডানিজম হতে পোস্টমডর্নিজমের দিকে ধাবিত। লিটল ম্যাগাজিন ততদিনে তার আত্মপরিচয় সাহিত্যে সমাজে নতুন পৃথিবীর দ্বার খুলেছে। যাতে সমাজের তথা বিশ্বের সকল অসঙ্গতিকে নির্দিষ্ট করে উত্তরণের পথ দেখানো হচ্ছে।
বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস অনেক পরে। এখানকার লেখকরা তখন কলকাতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠার কাজটুকু শেষ করেছেন। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিনের তেমন কোনো ইতিহাস ছিল না। ১৯২৭-এ বুদ্ধদেব বসু কর্তৃক প্রকাশিত ‘প্রগতি’ (বুদ্ধদেব বসুর সহকারী রূপে ছিলেন অজিত দত্ত)। ১৯৩২ সালে কুমিল্লা থেকে সঞ্জয় ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় ‘পূর্বাশা, এই ছিলো ’৪৭ পূর্ব বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস। ভাষাআন্দোলন পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে এসে এদেশে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা শুরু হয়। এ সময় ফজলে শাহাবুদ্দিন বের করেন ‘কবিকণ্ঠ’ এবং সিকান্দার আবু জাফর বের করেন ‘সমকাল’ (সেপ্টেম্বর ১৯৫৭)। তবে সমকালের খ্যাতি লিটল ম্যাগাজিন রূপে নয় বরং সাহিত্যপত্রিকা রূপে অনেক বেশি ছিল। ‘অগত্যা’ বের হত ফজলে লোহানীর সম্পাদনায় ৬০-এর দশকে অবশ্য ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার আসরে বিরাট রদ-বদল দেখা দেয়। এক ঝাঁক তরুণ মুখ সাহিত্য রচনার শক্ত দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তাদেরকে ঘিরে জন্ম হয় ‘স্বাক্ষর’ (১৯৬৩) পত্রিকার। অবশ্য এর পূর্বে ১৯৬২ সালে ‘বক্তব্য’ নামের আরেকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। ’৬৪ সালে আসে বাংলাদেশের সাহিত্য ক্ষেত্রে অন্যতম পুরোধা ও সাহিত্য বিস্তারের অগ্রপথিক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নেতৃত্বে সৃষ্টি হয় এ বাংলার অন্যতম আকর্ষণীয় লিটল ম্যাগাজিন ‘কণ্ঠস্বর’ ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ‘কণ্ঠস্বর’ বাংলা সাহিত্যে একটা নতুন গদ্যরীতির প্রবর্তন করেছিল। ষাট-এর দশকে ঢাকাকেন্দ্রিক আরো কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিনের জন্ম হয়। তাদের মধ্যে‘উত্তরণ’, ‘অধো রেখ’, ‘না’, ‘বহুবচন’, ‘আরিচা’, ‘কিছ্ধ্বুনি’, ‘রূপম’ অন্যতম।
ষাটের দশকে ঢাকার বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া, ময়মনসিংহসহ আরো কয়েকটি জায়গায় লিটল ম্যাগাজিন চর্চা ছিল। এর মধ্যে রাজশাহীর ‘পূর্বমেঘ’ এবং বগুড়ার ‘বিপ্রতীপ’ উল্লেখযোগ্য। ১৯৭০-এ আব্দুল মান্নান সৈয়দ ও আবদুস সেলিম বের করেন ‘শিল্পকলা’, আহমদ আউয়াল বের করেন ‘কালস্রোত’ এবং সৈয়দ আবুল মকসুদ বের করেন ‘সময়’। আবদুল মান্নান সৈয়দ এবং আবদুস সেলিম ‘চরিত্র’ নামের আরো একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছিলেন। ৮০-এর দশকে শেকড় সন্ধানী লেখক ধারায় ফের তরুণ সমাজ এবং এ সময় জাদু বাস্তবতা (যার প্রবর্তক গার্সিয়া মারকেজ), কাঠামোবাদ, বিনির্মাণবাদ প্রভৃতি নতুন দর্শনের সূত্রপাত হয়। এই সূত্রে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। সে প্রবণতা হতে সৃষ্টি ‘একবিংশ’ ‘প্রান্ত’, ‘সূচক,’ ‘লিরিক’, ‘নিগর্স, ‘অনুশীলন’, ‘প্রাকৃত’ ‘শব্দ শিল্প’, ‘শিকড়’, ‘বিবর’, ‘গাণ্ডীব’, ‘ছাপাখানা’ ‘বালুচর’, ‘বজ্রকন্ঠ’, ‘চিহ্ন’, ‘প্রতিশিল্প’ প্রভৃতি। বর্তমানে সে অর্থে লিটল ম্যাগাজিন নেই বললেই চলে। কারণ যে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ও বাণিজ্যিক প্রচারণা থেকে লিটল ম্যাগাজিন মুক্ত ছিল তা এখন আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ এবং তা লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রকে হনন করতে উদ্যত। বরাবরই লিটল ম্যাগাজিন ছিল প্রথা বিরোধী এবং আপসকামিতার প্রভাব মুক্ত। কিন্তু অন্যায্য কর্তৃত্ব ও উন্নত দেশসমূহের আগ্রাসী মনোভাব সাহিত্যের সাহিত্যগুণকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে চায়। ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংস আন্দোলন, সন্ত্রাস বন্ধের নামে সন্ত্রাসের রুদ্রমূর্তি ধারণ, ভালোবাসার অপব্যবহার, মোহের অসাড়তা, বিবেকের সিকি দরে বিক্রি এবং আত্মশুদ্ধির অভাবে সব আজ বাণিজ্যিকিকরণ হয়ে গেছে। এই প্রণালিবদ্ধ মারীচ মায়ায় লিটল ম্যাগাজিন কোথায় দাঁড়াবে সেটাই বড় প্রশ্ন।

সহায়ক গ্রন্থ
১. বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত–ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, পুনর্মুদ্রিত নতুন সংস্করণ, ২০০২।
২. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (আধুনিক যুগ)–আজহার ইসলাম। অন্যন্যা প্রকাশনী, প্রথম অনন্যা প্রকাশ ও তৃতীয় সংস্করণ–আগস্ট, ২০০১।
৩. প্রসঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন–সন্দীপ দত্ত, ১৯৯৩।
৪. উত্তর প্রজন্ম–আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ১৯৯২।
৫. নিসর্গ– লিটল ম্যাগাজিন সংখ্যা পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ। সম্পাদক: সরকার আশরাফ, প্রকাশ–ফেব্র“য়ারী ২০০৭।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা