50314526_809495946058671_3871654047995920384_n

গ ল্প

একটি পোস্টমর্ডান গল্প

প্রাকার পরিখা আধুনান্তিক আঙ্গিকের কাহিনি
মলয় রায়চৌধুরী

যৌনি কাকে বলে জানিস?

জানি-জনি, বললো অমিত, রোজ একঘেয়ে লেকচার শুনে শুনে ওসব আংরেজি তাকিয়া-কালাম মুখস্থ হয়ে গেছে, ইসকুলে যদি রোজ কেউ অমন লেকচার দিতো তাহলে দেখতে, সব সাবজেক্টে চৌয়া ছক্কা পেটাতুম।

বল তাহলে কাকে যৌনি বলে?

ওফ অনেক আংরেজি ঝালরবাজি, মানে-ফানে জানি না, সব ক্রান্তিকারি ঘসিটারাম, বলছি শোন, অ্যালিয়েনশান, অ্যান্টাগনিজম,  অ্যারিসট্রোক্র্যাসি, বারটার, বুর্জোয়াজি, বুরোক্র্যাসি, ক্যাপিটাল, ক্যাপিটালিজম, ক্লাস, কমোডিফিক্যাশন, কমোডিটি, কমোডেটি ফেটিশ, কনজাম্পশন, প্রোডাকশন, কনট্রাডিকশান, ক্রেডিট, ডেমোক্র্যাসি, ডায়ালেকটিকাল, মেটেরিয়ালিজম, ডায়ালেকটিস,  ডিভিজন অফ লেবার, ইকুইভ্যালেন্ট ফর্ম, এমপিরিসিজম, এক্সচেঞ্জ ভ্যালু, ইউজ ভ্যালু, ফল্স কনশাসনেস, ফিউডাল সোসাইটি, গোলাবালাইজেশন, হেজিমনি, ইনটারেস্ট, আইডিওলজি, লেবার পাওয়ার, লুম্পেন প্রলেতারিয়েত, ল্যান্ড, মারকেট, মেটেরিয়ালিজম, মিনস অব প্রডাকশান, মিডল ক্লাস,  মোড অব প্রোডাকশান, মানি, নেশান স্টেট, পিজ্যানট্রি, পেটি বুর্জোয়া, পলেটিক্যাল ইকোনমি, প্রলেতারিয়েত, প্রপারটি, প্রফিট, রেন্ট, র‌্যাডিক্যাল, ডেমোক্র্যাসি, সোশালিজম, স্টেট, সাবলেশান, সুপাস্ট্রাকচার, সারপ্লাস ভ্যালু, সিনথেসিস, প্র্যাকসিস, ট্রেড ইউনিয়ান, ট্রাইবাল, সোসাইটি, ইউজুরি, ইউটিলিটেরিয়ানিজম, ইউটিলিটি, ইউটোপিয়া, ওয়েজ লেবার।

এক নাগাড়ে বলে দম ফুটিয়ে গিয়েছিল অমিতের, কাতলা মাছের মতন জলের ওপরে ওঠার ঢঙে শ্বাস নিয়ে বলল, কী, ঠিক বলিনি? আরে সব তাকিয়ে কালামের মনে ওই একই, যাহাঁ সঠিয়া তাহাঁ ঘটিয়া, যোনি বলো আর আলুকাবলির ঘুগনি বলো।

কিস্যু জানিস না তাহলে, অবশ্য শব্দ না জানলেও চলে, কাজটা জানলেই হলো, বললে কমরেড ডিবি বা ডাক্তার বর্মণ বা ডাক্তার ঘোষ।

ধুলো-পড়া কালো পলিথিন-তেরপল দিয়ে তৈরি, ঘনসবুজ জংলি বাঁশঝোপের ঝিরিঝিরি আড়ালে ঘেরা, মাথায় বিকেলের রোদমাখা শাল খয়ের গাছের মাঝখানে সামান্য ফাঁকা জায়গায় তাঁর ভ্রাম্যমান ডাক্তারখানায় ওষুধ আর আঘাতের রক্তের  ফেলে দেওয়া ভিনিভিনি গন্ধে, জঙ্গলের বুনো প্রকৃতিকে অস্বীকার করার প্রয়াসের মাঝে, আসন্ন গোধূলীর ঝিঁঝিপুরুষের ডাকে উতরোল প্রায়ান্ধকার তাঁর সামনের ফ্লোডিং চেয়ারে তাঁর স্ত্রী গর্ভজাত ছেলেকে বসিয়ে, প্রশ্নটা করলেন ডাক্তার ঘোষ, যাঁকে সকলে ডাক্তার বর্মণ বা কমরেড ডিবি বলে ডাকে, কেননা ওঁর স্ত্রীর নাম মানসী বর্মন বা কমরেড জ্যোতি।

প্রশ্নটা করার জন্য বেশ কিছুকাল যাবৎ নিজেকে তৈরি করেছে কমরেড ডিবি, মানে ডাক্তার, নিজের সঙ্গে তর্কাতর্কি করে নির্ণয়টা নিয়েছে, আর এখন আজকেই সুযোগ, মনে হল, কেননা ওর স্ত্রীর গর্ভের ছেলের তাঁবু গার্জেন, যে কিনা ছেলেটার বাবা হিসেবে ক্রান্তিকারিদের মধ্যে প্রচারিত, মানে কমরেড দীপক, প্রকৃত নাম অতনু চক্রবর্তী, পাশের তাঁবুতে যাঁর ক্রান্তিকারি দপ্তর, অতনু আর তার প্রেমিকা কমরেড জ্যোতি, মানে ডাক্তারের স্ত্রী মানসী বর্মণ, দুজনেই কাছাকাছি বিধাবৌড়িয়া গ্রামে সিআরপিএফ-এর গুলিতে আহত তরুণ-তরুণীদের জমায়েতে গিয়েছে, কিছুক্ষণেই হয়তো এসে পড়বে।

নিজেকে স্তোক দেয় ডাক্তার, মানে, কমরেড ডিবি : সকলেই জীবনে অন্তত একটা মিথ্যাকে আশ্রয় করে বাঁচে, অনেকে একাধিক মিথ্যাকে আঁকড়ে থাকে জীবনভর, আমি না হয় একটাই।

দোহারা, ফর্সা, সামান্য টাক, বাইফোকাল চশমা, অলিভ মুফতি বোতামখোলা শার্ট, গেঞ্জি নেই, ডাক্তার পরে আছেন লুঙ্গি, যার রঙ বাগবাজার ক্লাবের দেয়ালে গত বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়ে আঁকা ব্রাজিলের পরাজিত জার্সির মতন, কালবৈশাখির ফ্রি-কিক ভলি খেয়ে ফ্যাকাশে। নিজেকে নিজে নিঃশব্দে শুনিয়ে বলল, এখানে আর থাকা যাবে না, এ আমার স্বপ্নের ক্রান্তিকারি রাস্তা নয়, কেউই কোথাও পৌঁছোচ্ছে না। অবিচারের মধ্যে দিয়ে অবিচারের বিরুদ্ধে লড়া যায় না।

ব্যাস ওইটুকুই জানিস। ওটুকু তো যোনির রস রে, ক্রান্তির ঝর্ণা। তুই আসল অরগ্যাজমের কথা বললি না? শেখায়নি তোর সোকলড মা-বাপ? অরগ্যাজম জানিস তো, নাকি? রিয়াল ক্রান্তি? শরীর আর মনের সুনামি, জিগ্যেস করলে ডাক্তার।

না, জানি না, সুনামি শুনেছি কোথাও, এখন যা আংরেজি বললুম, তা কনকদুর্গা শিখিয়েছে, বলেছে মুখস্থ করে রাখ, পরে বুঝতে পারলে আওড়াস। অ্যালুমিনিয়ামের নড়বড়ে চেয়ারে নড়াচড়ার মাধ্যমে অপ্রস্তুতভাবে লুকোবার চেষ্টা করে, ডান হাতের মধ্যমার নখ খেতে-খেতে বলল অমিত বমর্ণ যে, ওর বোন মানে প্রেমিকা ইতুকে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে, নারায়ণপুর যাবার নৌকরওয়ালা বাসে তুলে দিয়ে, সেখানেই একটা আয়নাভাঙা সস্তা সেলুনে ন্যাড়া হয়ে গিয়েছিল; চুলদাড়ি আর রাখবো না ঠিক করেছে।

ইতু পাছা অবদি দীর্ঘ কোঁকড়াটেচুল ববছাঁট করিয়ে নিলে, বাড়ি ছেড়ে উধাও হবার সময়ে নিজের খাটে চুলের কাটা অংশ দুজনের একসঙ্গে বাড়ি থেকে কেটে পড়ার গর্বোদ্ধত ইঙ্গিত হিসাবে ফেলে রেখে। ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাসের তাপ দিয়ে, অমিতই কেটে দিয়েছিল ইতুর চুল, কেননা ইতু বলেছিল, যা আমার গর্বের, তা কেটে বাদ দিয়ে দে, যতটা পারা যায় গর্বহীন করে তুলি বেঁচে থাকাকে।

জানিস না কি রে! জোয়ান ছেলে, সমাজে ক্রান্তি আনার জন্য রোজ কতো পাঁয়তাড়া ভাঁজছিস, আর অরগ্যাজম কাকে বলে জানিস না? ডাক্তার ঘোষ ওরফে ডাক্তার বমর্ণ, যে প্রায় প্রাগৈতিহাসিক আড়ম্বরহীনতায় বসবাস করে, বসে আছে অ্যালুমিনিয়ামের ফোল্ডিং চেয়ারে, জেনেশুনে যে কমরেড জ্যোতি লুঙ্গি পরা বরদাস্ত করতে পারে না; সামনে এক ফুট চওড়া দু ফিট লম্বা হালকা অ্যালুমিনিয়াম টেবিল, সেটাও ফোল্ডিং, ফোল্ডিং খাটে টাঙানো মশারি চব্বিশঘণ্টা পাতা, খাটে একটা চাঁদর, বালিশ নেই।

কিছুক্ষণের নোটিসেই পুরো পাত্তাড়ি গুটিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে তেরপল খাটাবার সুব্যবস্থা হিসেবে সব কিছুই ফোল্ডিং আর অস্থায়ী, ডাক্তার নিজেও নিজেকে পাটে পাট ভাঁজ করা মানুষ বলে মনে করে, অস্থায়ী। প্রতিদিন উঠে পড়ে ঘষাকাচ ভোরে, তবু তখনই মশারি থেকে বেরোয় না। তাঁবুতে সৌরলণ্ঠন আর ব্যাটারিলণ্ঠন দুইই আছে, পোকাদের অনাহুত উড়াল আর ডানাসঙ্গীতের ভয়ে জ্বালে না সচরাচর।

বাংলা কথনি? না সংস্কৃত? হিন্দিতে কী? নখ খাওয়া মুলতুবি রেখে জানতে চাইল অমিত।

হিন্দি আর সংস্কৃততে ইয়োনি আর বাংলায় যোনি, সেই যোনি যখন মুগ্ধ হয় তখন তাকে বলে অরগ্যাজম, আসল ক্রান্তি, ডিকটিটরশিপ আর দি রেজিং ফ্লেশ, বুঝলি, বললে ডাক্তার, ও ছাড়া বাদবাকি ক্রান্তি ফালতু, বুকনির বাতাসা, আরগ্যাজমের বাংলা নেই, হয়তো বাৎসায়নে সংস্কৃততে আছে, ঠিক জানি না।

নাঃ, কোনো ক্লাসের বইতে কথনিটা ছিল না; ক্লাসমেটরও কখনও বলাবলি করেনি; কী করেই বা জানবে! তাছাড়া আমাকে তো সবচে রদ্দি স্কুলে পাঠানো হয়েছিল : গাঁঠরিচোর টিচাররা ঘুষ দিয়ে চাকরিতে ঢুকেছে, নিজের ভাই হলেও ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, নিজেরাই কিছু জানে না, সব রগড়ঘস, টিউশানির চকরলস কেটে বেড়ায়। কোনো টিচারের মুখেও শুনিনি কথাটা। বাংলা তো আর পড়ানো হয় না কোনো স্কুলে; সংস্কৃতের টিচার নেই। হিন্দি টিচার আছে, সেও কখনো ইয়োনি কথাটা ব্যবহার করেনি।

টিচাররা অমন শব্দ বলে না, বুঝলি, টিচাররা কি ছাত্রদের ক্রান্তির কথা শেখায় কখনো, গোরু হতে শেখায়, চাকরি-বাকরি করে লিটার লিটার দুধ দেবে, জেইই, আইআইটি, আইআইএম, রাজস্থানি কোচিং ধাঁআআআ, নিউইয়র্ক। যোনি, অরগ্যাজম যে ধরণের ক্রান্তিকারি বুলি, যাকে তুই কথনি বলছিস, দশ-বারো বছর বয়স থেকে বন্ধুবান্ধবরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে। টেবিলের উপর বাইফোকাল চশমা খুলে রাখতে রাখতে বলল ডাক্তার ঘোষ, মানে কমরেড ডিবি, কণ্ঠস্বরে স্বনিত হল এক ভিন্ন সুর, নিজেকে বললে, চশমাটা বদলানো দরকার, কিন্তু কী-ই বা হবে বদলে, বদলাতে হলে চোখ দেখাতে হবে, হয়তো না ভাঁড়িয়ে, দূরের কোনো রাজ্যে গিয়ে, সে অনেক হ্যাঙ্গাম, যা পোশায় না। প্লাসটিক লেন্সের চশমা, স্ক্র্যাচ পড়ে লেন্সদুটো নিজেরাই মায়োপিয়ার আক্রান্ত।

ডাক্তার, কমরেড ডিবি, এখন হাত দিয়ে তাকায়, চোখের প্রয়োজন হয় না, হাত দিয়ে নাড়ি পরখ, হাত দিয়ে ওষুধের বড়ি বের করা, হাত দিয়ে ঘায়েল শরীর থেকে বুলেট বের করা, হাত দিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা। হাত যে নারীকে আদরও করতে পারে তা ভুলে গেছে হাতেরা। হাতদুটো ওর মতনই হয়ে গেছে, রুটিনবাঁধা। নতুন ওষুধের জন্য মেডিকাল ম্যাগাজিন পড়া জরুরি বলে কমরেডদের আদেশ দিয়ে ভারতীয় মেডিকাল জার্নাল আনায়, ইংরাজি জানে এমন কাউকে পড়তে বলে আর শুনে শুনে মনে রাখে, কিংবা নিজেই পড়ে নেয়, এখানে তো মেডিকাল রিপ্রেজেনটেজিভ এসে ওষুধের বাখান করে ডাক্তারকে এটা সেটা ঘুষ দিয়ে যাবে না, জার্নাল পড়া হয়ে গেলে ওষুধের জেনেরিক নামগুলো স্মৃতির আলমারিতে তুলে রাখে, তারপর ম্যাগাজিনগুলো সমবায়িক রান্নার উনোনে পোড়াতে পাঠিয়ে দেয়; ওষুধের কেবল স্ট্রিপ আনায়, বাক্সে প্যাক করা নয়, কাগজে মোড়া।

টেবিলের ওপর পড়ে আছে আগের বছরের মেডগেট টুডে আর ইনডিয়ান জার্নাল অফ মেডিকাল সায়েন্সের সংখ্যা, অতিব্যবহারে ময়লা, পাতাগুলো নিজেরাই কোনাগুলো ভাঁজ করে আরাম করছে। সকাল থেকে দুপুরের  খাওয়ার রুটিন বাদে বেশির ভাগ সময় মশারিতে ঢুকে শুয়ে থাকে, ম্যাগাজিন পড়ে, রোগীরা এলে বা কোনো বেয়ারফুট কমরেড কিছু জানতে এলে মশারির ভেতর থেকেই নির্দেশ দেয়, কেবল ঘায়েল কমরেড এলে ওর দৌড়ঝাঁপ হয় দেখার মতন, বিশেষ করে সে যদি বুলেটফোঁড় হয়, যে ওর কাছে পাঠাবার জন্যই আধামিলিট্রি জওয়ানরা রাইফেল চালিয়েছিল।

মানুষকে বাঁচিয়ে আবার জীবনের লাথি খেতে পাঠানোর চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি আর নেই, মনে করে কমরেড ডিবি, যাকে কমরেড বললে মনে মনে চটে যায় বটে, কিন্তু মৃদু শ্লেষহাসিতে মনের অন্ধকার দমিয়ে রাখে লোকটা।

বন্ধু বলতে যা বোঝায় তা আমি কোনো ক্লাসেই পাইনি, পাড়াতেও কেউ বন্ধু করতে চায়নি; নিজের বাড়িতেই বোলতিবন্ধ ফেকলু, ওরা তো দেখতেই পেতো, বন্ধু করবে কেন, ভাই ভিতরঘুন্না হয়ে বড়ো হয়েছি। বন্ধু বলতে শুধু ইতু। চেয়ারে দুই পা তুলে হাঁটু মুড়ে বসতে বসতে বলল অমিত।

নামিয়ে রাখলে আমিতের পা নাচাতে ইচ্ছা করে। সামনে যে বসে আছে সে মনে করে ওর পায়ে ব্যথা, ইতুও তাই মনে করে বলত, এই ডাফার, পা নাচাসনি, পা ব্যথা করছে তো পা তুলে বোস। পা নাচানোটা ওর অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠার উপায়। পা নাচাতে নাচাতে জিন্সের ঘসটানি খেয়ে বসন্তকালের হাওয়ায় ওর লিঙ্গ দাঁড়াতে আরম্ভ করেছিল বলে থামিয়ে চেপে বসল। বলে উঠলো দাঁড়াও দাঁড়াও মনে পড়েছে, একটা কাগজে লিখে নিয়ে মুখস্থ করেছিলুম, এক্ষুনি মনে পড়ে গেল। বলব?

ডাক্তার হাই তুলতে তুলতে বললেন, বল দেখি অরগ্যাজম বলতে কী বোঝায়, জানিস কিনা?

অমিত যতক্ষণ নিজের মগজে মুখস্থ করছিল, ডাক্তার একটা বাংলা লিফলেট টেবিল থেকে তুলে নাকের সঙ্গে সাঁটিয়ে পড়া আরম্ভ করল, বোধহয় ওষুধের মোড়কে এসেছিল, চোখ কুচকে, টাকে হাত বোলাতে বোলাতে, পড়তে বেশ ভালেই লাগছিল, সরেস লিখেছে, লাথি খাচ্ছে আর লিখে যাচ্ছে ব্যাটা বাঙালির দল, লেখা ছাড়া আর তো কিছু করার নেই ‘সম্প্রতি রাজ্যে রামনবমীতে তরোয়াল নিয়ে শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অস্ত্র নিয়ে মিছিল বাঙালি সংস্কৃতি নয়। অস্ত্র হাতে যুদ্ধংদেহী মেজাজে নগরের মিছিল শাসক থেকে আমজনতাকে বিস্মিতই করেনি, পালটা কিছু করতে শাসক দলকে প্ররোচিতও করেছে। রাজ্যের শাসক দল রামনবমীর পাল্টা হনুমান জয়ন্তী পালন করছে। এলাকায় এলাকায় হনুমানের প্রতিকৃতি নিয়ে শোভাযাত্রাও করেছে। মিছিল ও পাল্টা মিছিলে ভক্তিরসের তুলনায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিদ্বেষের বীজ বপন করা হয়েছে। এই সংস্কৃতি কোনো কালেই ধর্মগুরুদের সংস্কৃতি নয়, এমনকি বাঙালিদেরও সংস্কৃতি নয়। কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর ‘শ্রীরাম পাঁচালী’তে বিষ্ণুর আবতার হলেও সেখানে বীররসের প্রাধান্য ছিল না। ছিল ভক্তিরসের প্রাধান্য। কৃত্তিবাসের কাব্যের মূল সুরের সঙ্গে বৈশাখের গরমে টিনের প্যাঙপ্যাঙে তরোয়াল হাতে ছেলে মেয়ে বুড়ো বুড়িদের মিছিল খাপ খায় না। কৃত্তিবাস ওঝার যাঁরা অনুগামী তাঁদের সংস্কৃতির সঙ্গেও এই সংস্কৃতি মেলে না। অথচ কলকাতা মহানগরীতে রামনবমী উপলক্ষে অস্ত্র মিছিলে কাতারে কাতারে মানুষজন নগর দাপিয়ে বেড়ালো। কপালে লাল তেলক কেটে, কাঁধে চাদর, হাতে চিৎপুর অপেরার তলোয়ার, আর মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে রোদ্দুরের ভিড়কে মাতালো। বিদগ্ধজন থেকে সচেতন আমজনতা বলছেন, এটি বাংলার সংস্কৃতি নয়, এই সংস্কৃতি উত্তর ভারতের সংস্কৃতি; বিদগ্ধজন মানে যারা অ-কোষ চুলকায় আর টিভির তর্কাতর্কিতে জ্ঞান দেয়। মিছিলে বাঙালিদের সংখ্যাধিক্য ছিল না। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিল অবাঙালি। মিছিলে ওড়ানো ঝা-াগুলোতেও বাংলা হরফে কিছু লেখা ছিল না, যা লেখা ছিল তা কেবল নাগরি হরফে। সেগুলো সংস্কৃত না হিন্দিতে লেখা ছিল তা বোঝার উপায় ছিল না। প্রশ্ন উঠেছে, এই ব্যাপক জনসমাগম কীভাবে ঘটল? এঁরা নিশ্চয়ই পাশের রাজ্য উড়িষ্যা বা অন্ধপ্রদেশ-তেলেঙ্গানা বা উত্তরপ্রদেশ থেকে আসেনি। এঁরা সকলেই এই পশ্চিমবঙ্গের। এঁরা বাঙালি হোন বা না হোন, পশ্চিমবঙ্গেরই নাগরিক। আমাদের এই রাজ্যে বাঙালি সংস্কৃতির ঘোর সংকট; বাঙালি বলতে যে কী বোঝায় তা বাঙালি নিজেই ভুলে গেছে। বিশেষ করে আমাদের রাজধানী যে কলকাতা, সারা রাজ্যের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের কর্মস্থল, খোদ সেখানেই বাঙালিরা এখন সংখ্যালঘু। উনিশ শতকের মতন মনীষীরা আর জন্মান না এই শহরে, শুধু মাস্তান গু-া আর দলদাসরা জন্মায়। কেউ কেউ হয়তো ‘আমরা বাঙালি’ প্রাদেশিকতাবোধে উষ্মা প্রকাশ করতেই পারেন। কিন্তু বর্তমান সংস্কৃতি সুকুমার রায়ের ভাষায় ‘হাঁসজারু’ সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। কলকাতার চারিদিক ধরলে মধ্য কলকাতা বরাবরই জারজ সংস্কৃতির কেন্দ্র। এর মধ্যে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান প্রভাব কিছুটা আছে। উত্তর কলকাতা বা পূর্ব কলকাতা, বিশেষ করে সল্টলেক, এখন হিন্দিভাষী অবাঙালিদের প্রাধান্য, যা ঘটেছে বাঙালি মধ্যবিত্তের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। বিধান রায় বাঙালিদের জন্য সল্টলেক কলোনি তৈরি করেছিলেন; বাঙালিরা সেখানে জমি কিনে বাড়ি তুলেছিল; তারপর সেই লোভী বাঙালিরা একে একে মাড়োয়াড়িদের বিক্রি করে শহরতলির দিকে পিছিয়ে গেছে। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ বামপন্থীদের প্ররোচনায় বাঙালি উদ্বাস্তুরা দখল করে বইয়ের আর নানা জিনিসের দোকান দিয়েছিল; তারা সেসব দোকান আবাঙালিদের বিক্রি করে একইভাবে শহরতলিতে পেছিয়ে গেছে। বাকি রইলো দক্ষিণ কলকাতা, যেখানে উচ্ছিন্ন হিন্দু বাঙালির জীবন সংগ্রামের মূল জায়গা। এককালে মুসলমানরা এই অঞ্চলে চাষবাস করতো, তাদের সরিয়ে দাঙ্গায় মেরে ফেলে, অজ¯্র উদ্বাস্তু কলোনি গড়া হলো, সেসব নিয়ে প্রচুর কাঁদো-কাঁদো বেস্টসেলার লেখা হয়েছে। এক সময়ে দক্ষিণ কলকাতার উপনিবেশগুলো থেকে সংসদীয় বামপন্থীরা তাঁদের আন্দোলনের রসদ পেয়েছিলেন, তাঁরা জোর খাটিয়ে আর ভয় দেখিয়ে এই উদ্বাস্তুদের আন্দামানে যেতে দেননি, নয়তো আন্দামান আজ বাঙালিদের উপনিবেশ হয়ে উঠতো। সেই সমস্ত সংগ্রামের জায়গাও মুছে ফেলে প্রাক্তন উদ্বাস্তুরা জমিবাড়ি অবাঙালিদের বেচে শহরতলিতে পেছিয়ে যাচ্ছেন। বৃহত্তর কলকাতা শহরে এখনও বাঙালিদের প্রাধান্য থাকলেও, দুই প্রজন্ম জুড়ে বাঙালির পোলারা এখন বাংরেজি ও বাংদি — বাংলা হিন্দি মেশানো — সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, হিন্দি ফিল্ম দেখার জন্য হুড়োহুড়ি করে মরে, বেরিয়ে এসে সালমান শাহরুখ আমির খানের সংলাপ ভাঁজে, আনোয়ার শা রোড আর মেটিয়াবুরুজ তো নবাবদের হারেমের বংশধরদের গু-ামিতে থরহরি, তাদের ধারণা তাদের রক্তে বইছে, টিপু সুলতান আর ওয়াজেদ আলি শাহের রক্ত। মহরমের সময় পাকিস্তানি ধরনের পতাকা উড়িয়ে তাজিয়া বের করে ঝাঁপাই ঝোড়ে। বড়বাজারে বরাবরই মারোয়াড়ি আর গুজরাটিদের রবরবা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় থেকে। হাওড়া শহর দখল করে নিয়েছে বিহারি আর উত্তরপ্রদেশের মাফিয়া, তাদের বিরোধিতা করলেই মুঙ্গরের দিশি পিস্তলের গুলি। সুতরাং বাংলা সংস্কৃতির অবশিষ্টাংশ সত্যিই কি পারবে এই ‘হাঁসজারু’ সংস্কৃতি রুখতে? দেড়শো বছর আগে কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখে গিয়েছিলেন, ‘হুতোম পেঁচার নকশা’। রামনবমী বা রামলীলা সম্পর্কে যা বিতর্ক থাকুক না কেন, তা যে বাঙালি সংস্কৃতি নয়, তা তিনিও জানিয়েছেন। রামলীলা সম্পর্কে সেই কবে তিনি বলে গিয়েছেন, এ সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতি নয়। বাঙালি সংস্কৃতি জানতে হলে আজও ‘হুতোম পেঁচার নকশা’ পড়া দরকার’।

পড়া শেষ হলে, যে শব্দটা নিজের মনে নিজেকে শোনাবে ভেবেছিল ডাক্তার, তা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে মুখ দিয়ে বেশ জোরেই উচ্চারিত হলো, ‘মাদারচোদ, গা-ু কা জনা’।

অমিত চমকে বলে উঠলো, আরে, আমাকে গালাগাল দিচ্ছ নাকি গো? মায়ের সঙ্গে ওইসব করছিলে বলে আমাকেই নোংরা করে দিচ্ছ।

ডাক্তার বললে, না রে, তোকে বলিনি, ওই চুতিয়াগুলোকে বলছি, যাদের পোঁদে সোভিয়েত দেশ এককালে রুবল গুঁজে দিতো, তারপর চীন কিছুদিন লাখ লাখ রেমনিমবি ইয়ান গুঁজেছে ওদের পোঁদে, তারপর মার্কিন কোম্পানির মারোয়াড়ি এজেন্টরা গুঁজেছে, গুঁজেই চলেছে, চটকলগুলোর লালবাতি জ্বেলে,  বাঞ্চোৎরা পোঁদ ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ডুবিয়ে দিল পশ্চিমবাংলাকে, ময়দানে র‌্যালির‌্যালা করে ভাড়াটে পাবলিক এনে, আর লাউডস্পিকার লাগিয়ে নিজের নুনু নিজের পোঁদে; আর কিচ্ছু হবে না, তোর মা বাপের ক্রান্তিও পাঁক থেকে তুলে আনতে পারবে না। যাকগে, তোর মনে পড়েছে কি অরগ্যাজম কাকে বলে?

হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়ে গেছে, কনকদুর্গা আংরেজি মুখস্থ করতে শিখিয়েছে, ওই যে কমরেড কুনকি, অমিত বলা আরম্ভ করলো, ডিকটেটারশিপ অফ দি প্রলেটারিয়েট, ইনটারপেলেশান, মেটাবলিক রি, পারমানেন্ট রিভিউলিশান, প্রিমিটিভ কমিউনিজম, রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশান, রেনটিয়ার ক্যাপিটালিজম, রিভলিউশানারি সিচুয়েশান, আল্ট্রা ইমপিরিয়ালিজম, বলশেভিক, বোনাপার্টিজম, ক্যাডার, শভিনিজম, ডুয়াল পাওয়ার, ইকোনমিজম, মেনশেভিক, ফ্যাসিজম, মেটাফিজিক্স, নিও লিবারলিজম, অপরচুনিজম, প্ল্যান্ড ইকোনমি, পলিটিকাল স্ট্রাইক, রিঅ্যাকশানারি। বলা শেষ করে গলা ছেড়ে হাসতে লাগল অমিত, তারপর বললো, বুঝলে আংরেজি ঝাড়তে পারলে এই জঙ্গলেও কদর বাড়ে। অরগ্যাজমও তো আংরেজি, ঝেড়ে দিলেই হলো সময় বুঝে, লেকচারবাজি আমি পারি না, ওরা কতো শেখাচ্ছে, আমার ভালোই লাগে না, কেন যে এলুম এখানে, ধুৎ শালা, ইসকি মাকা, বুড়মে পেল দেঙ্গে রামরতিয়া চুতিয়াপা।

কমরেড ডাক্তার বললে, অমিতের দিকে তাকিয়ে নয়, আস্তানার বাইরে প্রায়ান্ধকারের দিকে চোখ মেলে, আসল বয়সের আনন্দটাই পাসনি দেখছি। কথা বলাবলিরও আনন্দ আছে, নিজেদের মধ্যে সমবয়সি মেয়েদের নিয়ে ফিসফিস করার, নোংরা হাসাহাসি করার বুক টিপটিপ আনন্দটাই মিস করেছিস। মেয়েদের নিয়ে ফিসফিস করে কথাবার্তা হতো না? নাইন টেন টুয়েলভে? টাচিফিলি খেলাখেলি? অমিতের দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে বললো ডাক্তার ঘোষ, যে পিঠে, ব্যাকপ্যাকে দাতব্য ওষুধ, যা নিজে কখনো খায় না যতই জ্বরজারি হোক, তাতে নিজের সিনথেটিক মশারি ঢুকিয়ে, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ক্যাডারদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটে, তাকালো অমিতের দিকে, পেশার গাম্ভীর্যের সঙ্গে কথা বলার শৈলী মিশিয়ে; বছরের কতদিন হতে চলল এই একটা ছেঁড়া রঙ ওঠা জিনস পরেই চালিয়ে দিচ্ছে ছেলেটা, ক্যাডারদের মতন মুফতি পরতে ওর ভালো লাগে না, তা জানে ডাক্তার।

ছেলেটা ওর মানে, ডাক্তার কমরেড ডিবির ছেলে, না অতনু চক্রবর্তীর ছেলে তা মানসী বর্মণ, যে অমিতের মা, সেও নিশ্চিত নয়, ওর বউয়ের ছেলে, তবু ছেলেটা ওর মতই হয়ে চলেছে, যেমন চলছে তেমনই চলুক টাইপের। লোকে বলবে বাপ ছেলে যেন যমজ ভাই।

এই জীবন নিজে বেছে নিয়েছে ডাক্তার, ¯্রফে মানসী বর্মণের খাতিরে। মানসী যেদিন আধামিলিট্রির গুলিতে মরবে সেদিন ওর ছুটি। ডাক্তার নিজেও উড়িয়ে দিতে পারে মানসী বর্মণ আর ওর বিয়ে-না করা বর অতনুকে, নাইন এম এম একটা লোডেড থাকেই ওর কাছে, সাইলেন্সার লাগানো, যাতে আধামিলিট্রির কাছে আত্মসমর্পণ করতে না হয়। কিন্তু মানসী মরে গেলে বেঁচে থাকার কোনো উদ্দেশ্য থাকবে না, মানসী তা জানে, তাই অস্তিত্ব দিয়ে আটক করে রেখেছে ডাক্তারকে।

অমিতকে ডাক্তার বললে কী হলো? কী জিগ্যেস করেছিল, সেটা মনে করার চেষ্টায় বললে, কী হলো।

নাঃ, জানি না, হতো হয়তো, আমার সঙ্গে হয়নি। যাকগে যাক, তুমিই বলো না যোনি আর অরগ্যাজম ব্যাপারগুলো আসলে কী, আর কেনই বা জিগ্যেস করছ, আমাকে এই ক্যাম্পে বাবা-মা আর ক্যাডাররা যা শিখিয়েছে, তা তো এতক্ষণ বললুম, তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি বিশ্বাস করোনি। জানতে চাইল অমিত, চেয়ারে বসে হাঁটু নাচাতে নাচাতে, লিঙ্গকে কাবু করে পোষ মানিয়ে নিয়েছিল।

সেক্স করেছিস কোনো মেয়ের সঙ্গে? আই মিন কোনো ছেলের সঙ্গে করিসনি বলেই মনে হয়, বিহারে অবশ্য লালটুশ ছাত্ররা হোমো টিচারদের পাল্লায় পড়ে। ডিজিটাল সেক্স হোক বা রিয়াল পেনিট্রেটিভ সেক্স, করেছিস কোনো মেয়ের সঙ্গে? কথাগুলো বলতে বলতে নিজের কাছে হাসলো, কমরেডরা ওকে সাধুসন্ত মনে করে, সংসারত্যাগী সংসারী-ক্রান্তিকারি। অন্তর্লীন হাসি, যা মুখে ফোটে না সচরাচর। কেবল তখনই মুখে মৃদু হাসি খেয়ে যায় যখন কোনো উপজাতি তরুণ বেয়ারফুট ডাক্তার হবার জন্য ডাক্তারের কাছে প্রথমদিন শিখতে আসে। হবু শিক্ষার্থীকে প্রথম প্রশ্ন, ‘ইমপিরিয়ালাইস্টস, কমপ্রাডার বুর্জোয়াজি আর ফিউডাল লর্ডস কাকে বলে জানিস’ আর সে, বলা কথাই যে শোনেনি, ঘাড় নাড়ে, ডাক্তার ঘোষ তাকে মাথায় হাত রেখে আদর করে বলে, ‘ভালো ডাক্তার হবি তুই’।

ডিজিটাল? সেটা কী? থুতনি ওপরে তুলে প্রশ্ন করল অমিত।

গণিত নয় ইলেকট্রনিক্স নয়, আঙুল আঙুল, তর্জনী, এই দ্যাখ, এই আঙুলটা ঢুকিয়ে। রাশভারি কণ্ঠস্বর ডাক্তারের।

ওসব জানতে চাইছ কেন? ওর সঙ্গে তোমাদের ক্রান্তির সম্পর্ক আছে নাকি? জিগ্যেস করল অমিত, ডান হাতের কড়ে আঙুলের নখ খেতে খেতে। নখের টুকরোটা থুঃ করে ফেলে বলল, যোনি নিয়ে আমার হবেটাই বা কি, আমি তো ক্রান্তি করতে আসিনি! সুযোগ বুঝলেই কেটে পড়ব, তোমার পিস্তলটা গেঁড়িয়ে।

তোমাদের মানে? তোর বাপ-মা তো তোকে রাইফেল আর পিস্তল চালাতে শিখতে পাঠায় মাঝে মধ্যে। তুইও তো একজন ক্রান্তিকারি। আমি তো ক্রান্তিকারি নই; আমি ওদের, হো-মু-া-সাঁওতাল, বিরহোর, -কোরওয়া-মাহলি আর মাড়িয়া- গো–লোহরা চিকবারিকদের ডাক্তার।

বাপ মা? ওনারা? তোমার বউ আমার মা, আর তোমাকে আমার মা বিয়ে করেছিল তা-ই তো জানি।

কিন্তু তোর মা যার সঙ্গে সেক্স করে তোর জন্ম দিয়েছিল সে তো কমরেড দীপক, আই মিন অতনু চক্রবর্তী, আমি নই। তোর মার সঙ্গে সেক্স করে আমি যে বাচ্চাটার বাবা হতাম সে তো জন্মাবার আগেই মারা গিয়েছিল বলে শুনেছি।

অমিত ছেলেটা তারও হতে পারে, অতনুরও হতে পারে, কিন্তু অমিতের জন্মের কাহিনি যেভাবে চাউর করা হয়েছে, সে গল্পকে অমিতের মনে চারিয়ে আপাতত সন্দেহ ভারাক্রান্ত হতে দিলো না ডাক্তার।

তোমাকে বিয়ে করলেন আর প্রেমে পড়লেন ওই লোকটার! সেক্স করার ছিল তো সেক্স করলেই হতো, আমাকে জন্ম দেবার কি দরকার ছিল? টোপি পরে নিলেই হতো, ইতু বলেছিল টোপি পরে করলে বাচ্চা-ফাচ্চার জুঠঝামেলা হয় না।

তোকে জন্ম দেবার জন্যই সেক্স করেছিল, বুঝলি, তুই হলি ওদের ভালোবাসার ফসল, ভলোবাসার প্রতীক, রাশিয়া, চীন কিউবা ভিয়েতনামে এই ধরণের অনেক প্রেমের গল্প আছে, বললো ডাক্তার, যে আজও বুঝে উঠতে পারেনি, কেন দুজনের সঙ্গে ইচ্ছানুযায়ী সেক্স করতো ওর স্ত্রী, অথচ ওকে ডিভোর্সও দিতে চায়নি, কেননা মানসী বর্মণ বা কমরেড জ্যোতি বলেছিলো, আমার দুজনকেই চাই, আমি তোমাদের দুজনকেই ভালোবাসি, শুধু একজনকে নিয়ে আর থাকতে পারবো না, দুজনের কেউ একজন যদি আমাকে ছেড়ে যাও তাহলে আত্মহত্যা করে নেবো, সে অনেককাল হলো।

ফিল্মি তক্কো দিও না। এদিকে ক্রান্তি করছি আবার ভালোবাসাবাসিও করছি, হ্যাক থুঃ। হ্যাক থুঃ করলেও, থুতু ফেলল না অমিত, গলা শুকিয়ে এসেছে বলে জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে নিল। টেবিলের ওপর থেকে দুশো এমএল জলের বোতল এগিয়ে দিলো ডাক্তার ঘোষ। এক ঢোঁক খেল অমিত, জেনে গেছে যে জল এখানে, জঙ্গলের ভেতরে, মহার্ঘ।

ক্রান্তির সঙ্গে ভালোবাসার কোনো বিরোধ আছে নাকি রে? ভালোবাসাবাসি কোনো ইজম নয়। ওটার জন্যেই মানুষরা জন্তু-জানোয়ার বা কীটপতঙ্গ হয়নি, মানুষ হয়েছে। এখন তোর বয়স কম, তাই জেনে রাখ, ভালোবাসা হল মানবজীবনের মিথ্যেগুলোর প্রধানতম।

আবার জ্ঞান দিচ্ছ, ভঁয়সালোটন টিচারদের মতন। টিচাররা যা বলে নিজেরা তা মানে না, ক্লাস ফোর থেকে দেখেছি। বলে এক করে আরেক। ওই তোমার বউ আর তোমার বন্ধুর মতন।

তা তুই সেক্স করেছিস কিনা বললি না তো।

তুমিও তো বললে না যোনি কাকে বলে।

আগে বল সেক্স করেছিস কি না।

করেছি।

রেডলাইট এরিয়ায় যাসনি তো? গিয়ে থাকলে ব্লাড টেস্ট করিয়েছিস? আমার কাছে যে ব্লাড টেস্ট কিট আছে তা দিয়ে যৌনরোগ ধরা পড়ে না। একটু থেমে বললো, নাঃ, কী করেই বা যাবি, সেখানে তো টাকা ছাড়তে হবে, আর তুই বলছিস তুই ছিলি ইতুদের বাড়ির চাকরের মতন।

ফিরকি নিও না; কি আবোল তাবোল বকছ। যারা আমাকে ভালোবেসেছে আর আমি যাদের ভালোবেসেছি তাদের সঙ্গে সেক্স করেছি।

তাদের ফেলে পালিয়ে এলি এই জঙ্গলে?

না, তাদের প্রথম জনকে তোমরা ছত্তিসগড়ের অবুঝমাড় জঙ্গলে পাঠিয়ে দিয়েছ, ডাক্তারি করার জন্য, ক্রান্তিকারিদের রোগ জখমের চিকিৎসা করার জন্য।

ইতু? ইতু ঘোষ তোর প্রেমিকা? সে তোর বোন হয়, তার সঙ্গে সেক্স করলি।

বোন আবার কোথায়। তবে ইতু বলেছিল যে ও যদি আমার নিজের বোন হতো তাহলেও আমাকে ভালোবাসতো, আমার সঙ্গে সেক্স করতো। আমি কিছুই করতে চাইনি। ইতুই যাবার আগে আমাকের ওর ভার্জিনিটি উপহার দিয়ে গেল, ও-ই বলেছিল যাবার আগে আমাকে আমার প্রাপ্য দিয়ে যাচ্ছে। ও কিন্তু প্রিকশান নিয়েছিল। ভার্জিনিটি, উপহার প্রাপ্য, প্রিকশান এইসব কথা ইতুর, আমি জানতুমই না এগুলো কী ব্যাপার! আরেকজন এখানেই আছে, কনকদুর্গা, কমরেড কুনকি, ছবিলি নম্বর ওয়ান।

এবার বুঝেছি। শুনলে কেমন যেন কাব্যি-কাব্যি মনে হয়।

কী বুঝেছ?

ইতুকে তোকে দিয়ে ফুসলিয়ে কেন অবুঝমাড়ের জঙ্গলে পাঠিয়ে দেয়া হল। কনকদুর্গা কি করে তোর প্রেমে পড়ল রে? আগে ইতুর গল্প করি, তারপর কনকদুর্গার করব, কী বল?

কেন? ইতু তো মানুষের সেবার জন্যে নিজেই গেল। ফোসলাবো কেন? আর কনকদুর্গাকেও আমি ফোসলাইনি, ও একদিন আমাকে ম্যাস্টারবেট করতে দেখে ফেলেছিল, তারপর হাত ধরে জঙ্গলের ভেতর নিয়ে গিয়ে আমার গালে দুই চড় কষিয়ে মাটিতে ফেলে আমার উপর শুয়ে পড়েছিল, ওর গতর দেখেছো, তো ইয়া সলিড মাল, জড়িয়ে ধরলে ছাড়ানো যায় না, ভাঙা ভাঙা বাংলা মিশিয়ে তেলেগু আর আংরেজি ভাষায় কি-কি সব বলতে থাকে সেক্স করার সময়ে, সারা গায়ে থুতু মাখিয়ে দেয়, ওর কাছে থেকেই তো ছিলিম টানতে শিখেছি। বলে ছিলিম টেনে সেক্স অনেকক্ষণ করা যায়, সত্যিই তাই, মাটির ছিলিম গরম হয়ে গেলে নিজের সেক্সের জায়গায় ঢুকিয়ে ঠেলাঠেলি করে বলে, নে এবার টান, ঠা-া করে দিয়েছি।

ম্যাস্টারবেট কারা খারাপ নয়, যদি না করিস তাহলে আপনা থেকে মরা ধাতুরস রাতের বেলা বেরিয়ে যাবে, কম বয়সে সব ছেলেরাই তাই নয়। তুই একবারে লবড়ধোধো থেকে গেলি, পড়লিও তো কনকদুর্গার পাল্লায়, ও তো বাচ্চা হাতি, তবে দয়ামায়া নেই, ঘায়েল কমরেডদের হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে আসে। ওই যে তুই বললি ছিলিমটা ঠেলাঠেলি করে কনকদুর্গা, ওই ঠেলাঠেলিটা ওর আনন্দের জন্যে জরুরি, ও নিজের অরগ্যাজমের জন্য সেটা করে, এখানকার উত্তেজনার চাপ থেকে ছাড়ান পায়।

আমায় আবার কি বলছ, নিজেও তো খাড়–স থেকে গেছো, গুরুঘণ্টাল। মরা না জ্যান্ত ধাতু অতোশত জানি না, মাস্টারবেট করতে ভাল্লাগে বলে করি, তবে এখানে জলের অভাবে ধোয়াধুয়ির ঝামেলা, কনকদুর্গা বলেছে ও যতোদিন এখানে আছে মাস্টারবেট করার দরকার নেই। আসলে দলমের কেউই ওকে দেখে টান পায় না। ও আমাকে চুসকিও শিখিয়েছে। চুসকি জানো তো? অন্ধকারে টের পাই না কোথায় মুখ দিয়ে চুসকি মারছি, এমন কালো রঙের আঙুর।

ফাজলামি রাখ, যা করার করিস, আমাকে হিসেব দেবার দরকার নেই। ইতুকে তো তোর সঙ্গে এখানেই রাখতে পারতো, যেমন তোর বাপ-মা রয়েছে। তোদের দুজনকে আলাদা করে দেবার প্যাঁচ মেরে ইতুকে ওই ফিল্ডে, আর তোকে এই ফিল্ডে রাখা হল।

ওই লোকটাকে আমার বাপ বানিও না। ওটা একটা স্কাউন্ড্রেল, চুতিয়া, মাদারচোদ কোথাকার। ও তো এক নম্বরের লুচ্চা-লোফার, বন্দুকবাজ লাফাঙ্গা কাঁহিকা, জানো তুমি। যেদিন আমাকে আর ইতুকে বাড়ির লোকেরা বকুনি দিচ্ছিল, সেদিন ওরা অতনু চক্রবর্তী সম্পর্কে যা-যা বলেছিল, শুনলে তোমার কান লাল হয়ে ঝলসে শিক কাবাব হয়ে যেতো, বুঝলে।

অমিত বলল, ওদের, মানে অতনুদের, একটু গ্যাং ছিল যাকে ওদের অফিসের লোকেরা বলত নারী-নারকো গ্যাং, যতো তিলেখচ্চরা ছিল ওই দলে, এরিক পেজ, মাহমুদ জোহের, মলয় রায়চেীধুরী, অসীম পোদ্দার, দেবেন্দ্রবাবু, অভিজিৎবাবু, দাশগুপ্ত সায়েব, মুদালিয়ার সায়েব, বাঙালি বিহারি পাঞ্জাবি ওড়িয়া মিলে সে নাকি লম্পটদের বিরাট কিচাইন। ওরা সবাই অফিস ছুটির পর পেছনের গলির ঝোপড়িতে বসে ভাঙ, কানট্রি লিকার, তাড়ি, চরস, স্ম্যাক, নিতো। মাহমুদ জোহেরের ছিল জানালায় পর্দা টানা ম্যাটাডোর ভ্যান, পেছনের দুদিকের সিট টানলে বিছানা হয়ে যেতো, আর ছুটিছাটায় ওদের পিকনিক হতো, লটারি করে যে জিততো সে ভাড়াকরা মাগিকে ওই বিছানার ওপর শুইয়ে এপিঠ ওপিঠ যা ইচ্ছে তাই করত।

যতই যাই হোক, হি ইজ ইওর বায়োলজিকাল ড্যাড। বললো ডাক্তার, যে কথায় ওর নিজেরই সন্দেহ আছে।

দুই

এই ঘটনাগুলো যে ঘটেছে, তা ওই তোর বাপের বন্ধু মলয় রায়চৌধুরী ঘটাচ্ছে, ঘটিয়ে চলেছে লোকটা, লিখেও রেখেছে। তুই যদি মলয় রায়চৌধুরীর লেখা ঘটনাগুলো একের পর এক পড়িস তাহলে অতনু চক্রবর্তী আর ওর বন্ধুদের কেলোর কিত্তি জানতে পারবি। এর আগে মলয় রায়চেীধুরী চারটে পার্ট লিখে ফেলেছে, ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, জলাঞ্জলি, নামগন্ধ আর ঔরস। কলকাতায় গেলে খতিয়ানগুলো পাওয়া যাবে, ডাক্তার এক নাগাড়ে বলে থামলো, তারপর বললো, আমার কাছে মলয় রায়চৌধুরীর ওই সব ঘটনার হাতে লেখা পা-ুলিপি আছে, এখন তো লোকটা বুড়ো হয়ে গেছে, আঙুলে আরথ্রাইটিসের কারণে কমপিউটারে এক আঙুলে টাইপ করে লেখে, এই যে এখনকার ঘটনাগুলো, আঙুলে টাইপ করতে করতেই লেখে, লিখতে বসে ভাবে যে, এক্ষুণি যদি মরে যায় হার্টফেল করে, কিংবা হার্নিয়া বার্স্ট করে কিংবা হাঁপানির টানে, তাহলে এই শেষ পার্টটা কমপিউটারেই থেকে যাবে, আমরা সবাই মলয় রায়চৌধুরীর কমপিউটারে থেকে যাবো, কেউ আর জানতে পারবে না, তোর, আমার, তোর মা-বাপের, ইতুর, কনকদুর্গার শেষ পর্যন্ত কী হলো। আমরা সবাই সমুদ্রের ডুবজলে লাশ হয়ে মাংসখোর মাছেদের খোরাক হয়ে যাবো।

চলো না দুজনে মিলে পাটনায় পালাই, বলল অমিত, ওখানে ভিড়ের ভেতরে ঢুকে গেলে কেউ তোমাকে খুঁজে পাবে না, আর আমাকে তো কেউই তেমন চেনে না। আমি কিন্তু পাটনার গরিব বস্তিগুলো চিনি। যাবার সময় কলকাত্তা হয়ে যাবো; কলকাত্তা ঘুরে দেখার খুব শখ আমার, এখানে একদিন আধামিলিট্রির হাতে মরার চেয়ে কলকাত্তায় গিয়ে গাড়িতে চাপা পড়ে মরা ভালো। তোমার পিস্তলটা গেঁড়িয়ে কমরেড দীপক আর কমরেড জ্যোতিকে খাল্লাস করে চুপচাপ কেটে পড়ব, একদিন রাত্তিরে। আমি আর কনকদুর্গা এসে দেখে গেছি, নাক ডেকে ঘুমোও।

গেঁড়াতে হবে না; যেদিন কাজটা করবি, চেয়ে নিস।

মনে থাকে যেন, সেদিন আবার টাঁয় টাঁয় ফিস কোরো না।

কলকাতার পুলিশ মলয় রায়চৌধুরীকে ওদের ভ্যানে বসিয়ে কলকাতার অন্ধকার জগত দেখাতে নিয়ে যেতো রে। ওরা পুরোনো কলকাতার পরিবার, সেকালের ঘাঁত ঘোঁত জানে। আর জন্মেছিল পাটনায়, তোকে ঠিক খুঁজে বের করবে, আর কী কী করলি তা লিখে রাখবে।

তিন

অতুন চক্রবর্তী তোর বায়োলজিকাল ড্যাড, বুঝলি?

তার কোনো প্রমাণ নেই, ওটা বানানো গল্প, আমি যা জানি, আমি তোমার ছেলে, আমাকে দেখতে তোমার মতন। কী করে যে ওই লোকটা ক্রান্তিকারি কমরেড দীপক হয়ে গেল তা-ই ভাবি।

মানসী বর্মণের প্রেমে পড়ে। ওরা একে আরেকজনকে ভালোবাসে। তোর মা তো ভালো চাকরি করতো, আমিও ওকে ক্রান্তি দিয়ে সমাজবদলের স্বপ্ন দেখিয়ে এই রাস্তায় এনেছিলুম, এখন বুঝতে পারছি কতো ভুল করেছিলুম সেসময়। সমাজটা বদলায় না, মানুষগুলো বদলে যায়।

প্রেম না ঘেঁচু, যত্তো সব ঢাকোসলা। কেমন করে যে একজন লোক আরেকজন লোকের বউকে ফাঁসায়, বুঝতে পারিনা শালা। যখন এখানে প্রথমবার এসেছিলুম, তখন মনে হয়েছিল অতনু চত্রবর্তী লোকটা আমাকে মায়ের চেয়ে বেশি পছন্দ করে, এত দিন বুঝে ফেলেছি যে ও ভালো নৌটঙ্কি করতে পারে, ড্রামাবাজ শালা চাপলুস চুকন্দর।

বাবার সম্পর্কে এরকম কথা বলিসনি। এইসব গল্প কক্ষনো কাউকে বলিসনি। তোর বাবাকে ক্রান্তিকারিরা শ্রদ্ধা করে।

তুমিই আমার বাবা। ইতুই তো আমাকে বলল যে তুই তোর বাবা-মার কাছে চলে যা, বাবা-মাকে যদি বাবা-মা না মনে করিস, তাহলে মনে করিসনি, কিন্তু ওনাদের সঙ্গেই থাকগে যা। আমি চলে এলুম কারণ তুমি, আমার বাবা, এখানে রয়েছে, আমার মাও এখানে রয়েছে। জানি না ওদের বাবা-মা বলে মনে করি কি না, এখনো তো আপনি থেকে তুমিতে যেতে পারছি না। তোমাকে তো প্রথম থেকেই তুমি বলছি, তুমি আমার সঙ্গে তুই তোকারি করছ, অথচ ওরা আমার সঙ্গে তুই তোকারি করে না, তুমি তুমি করে, নিজেদের ছেলে বলে মনে করে না, আমার এখানে আসাটাও ওরা ভালো চোখে নেয়নি, বুঝতে পারি, অথচ ওদের ফোসলানোতেই এলুম, ইতুটাও চলে গেল অবুঝমাড়ের জঙ্গলে।

আমি তোর লিগাল বাবা, তোর বায়োলজিকাল বাবা হল অতনু চক্রবর্তী মানে কমরেড দীপক। তোর নাম অতিম বর্মণ কেন? কারণ তোর মায়ের পদবি বর্মণ। তোর মাও আমায় বিয়ে করে বর্মণ পদবি ছাড়েনি, ওটা ওর বাপের পদবি, আমার পদবি ও কোনো কালেই নিজের নামের সঙ্গে জোড়েনি।

ভালোই করেছে, আমি অন্তত ওর পদবিটা পেয়েছি, আর তো কিছু পাইনি। তোমার পদবি যদি পেতুম তাহলে অমিত ঘোষ হয়ে যেতুম আর লোকে ভাবত যে অমিত ঘোষ আর ইতু ঘোষ সত্যি সত্যি ভাই-বোন। এমনিতেই ওদের বাড়িতে আর পাড়ায় ভাই-বোন ভাই-বোন বলে বলে ঘিনিয়ে দিয়েছিল আমাদের, যত্তো শালা আনপড় ঘড়িয়াল কুত্তা। আমি সেই জন্যেই আরও পালিয়ে এসেছিলুম ওই বাড়ি থেকে। ইতুও তাই অবুঝমাড়ের অজান জঙ্গলে যেতে রাজি হয়ে গেল। মায়ের সঙ্গে তোমার সর্ম্পকটা কী?

ডিভোর্স তো করিনি আমরা, সেপারেটও হইনি। ওদের মা-বাবা বলার অভ্যাসটা এবার ছাড়। অতনু চক্রবর্তী হল কমরেড দীপক, আর মানসী বর্মণ হল কমরেড জ্যোতি। তোর উচিত সবায়ের মতন ওই ভাবেই ওদের নাম উচ্চারণ কর। যা সত্য আর বাস্তব তাকে ওদের অবিশ্বাস সত্ত্বেও ওরা তো আফটার অল ক্রান্তিকারি, হ্যাঁ কি না বল? আর আমাকে বাবা বলবিনা, কমরেডও বলবিনা. ডকটর  বা ডাগডার সাহাব বলবি, সবাই যেমন বলে।

ধুসসসসস, ছাড়ো, বাবা বলে ডাকিই না লোকটাকে, তোমাকেও তো ডাকি না বাবা বলে, মনে মনে বলি। যাকগে যাক। হওনি কেন? তুমি হওনি না ও হয়নি? আজব বর বউ তোমরা। পাশাপাশি রয়েছে, কথাবার্তাও বলছ নিজেদের মধ্যে, ওই অতনু চক্রবর্তী লোকটাও রয়েছে এখানে। তোমাদের কাউকেই আমি বুঝতে পারছি না, আজ চার বছরের বেশি হয়ে গেল, তোমরা অ্যালজেব্রা না ট্রিগনোমেট্রি, ফেল মারার সাবজেক্ট?

ও তুই বুঝবি না, এখন বুঝবি না, পরে, আরেকটু বয়স হলে, কপালে বলিরেখা পড়া আরম্ভ হলে, লিঙ্গ অভিজ্ঞ হয়ে উঠলে, বুঝতে পারবি, হয়তো বুঝতে পারবি। তোর আর ইতুর মাঝে হঠাৎ কেউ এসে যদি শুয়ে পড়ে তখন টের পাবি কোথা থেকে কী ঘটে যায় মানুষের জীবনে।

হুঃ। যোনি কি বললে না তো? আমরা আর পাশাপাশি শোবো না, সুযোগ হবে বলে মনে হয় না, ওই জঙ্গলে পুলিশ এত বেশি হানা দেয় যে ইতু কত দিন ওখানে বেঁচে থাকবে কে জানে, বেঁচে আছে কিনা তাও জানি না। যোনি কী তা-ই বলো।

ওকে রাইফেলধারী দেহরক্ষী দেবার কথা, বেঁচে আছে বলেই মনে হয়। শোন, যেখান দিয়ে তুই সেক্স করেছিস আর যেখান দিয়ে তুই জন্মেছিস, তাকে বলে যোনি।

যোনি বলে? ওকে তো কোক বলে, গালাগাল দেবার সময়ে বুড় বলে, জানতুম। কতো ডায়লোগ শুনেছি, মেরে কোক সে যো পয়দা হুয়া, মা কি কোক কি কসম, হিন্দি ফিলিমে, হিন্দি টিভিতে। স্কুলে গালাগালি দেবার সময়ে যোনি বলত না কেউ, বলতো বুড়, রে-িদের বলতো বুড় মারাউনি। তো হঠাৎ এই সন্ধেবেলা যোনির লেকচার মারছো কেন? পুরোনো দিনের কথা চোখে ভাসছে বুঝি? চোখের সামনে যোয়ান বয়সের গোলাপি যোনি, ফরফরাতি বুড় কি চাকাচৌঁধ আঁধি ভেসে উঠছে?

বাপের বয়সী লোকের সঙ্গে ফাজলামি করছিস? প্রশ্রয়ের চিলতে হাসি ঠোঁটে খেলিয়ে বললো ডাক্তার।

ওসব ছাড়ো, যোনির কথা বলো, জানি ভাসছে তোমার চেখের সামনে, কেন যোনির কথাটা হঠাৎ পাড়লে সেটাই বলো, কার যোনি, বুড়কো ভমচৌলা ঢাকোসলা?

একটা বাচ্চা যার যোনি থেকে জন্মায়, সেই মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শিশুটার মানুষের মতন মানুষ হয়ে ওঠার জন্য খুবই জরুরি,  তাই প্রসঙ্গটা তুলেছি। তুই যে একটুতেই ভয় পাস, ডেড বডি দেখলে কেঁদে ফেলিস, কোনো ক্রান্তিকারি সামান্য জখম হলে তার দিকে তাকাতে পারিস না, চোখ ছলছল করে, একবার রক্তক্ষয় দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলিস, অনবরত নখ খাস, পা নাচাতে থাকিস, তা সেই কারণেই। তুই তোর মায়ের বুকের দুধ খাবার সুযোগ পাসনি, বোতলের দুধ খেয়ে, কিংবা দুধ না খেয়েই বড়ো হয়েছিস।

অমিত বলল, তোমাকে একটা মনের কথা বলব? যবে থেকে মানসী বর্মণকে দেখেছি, ওনার ফর্সা মাইতে চুসকি দেবার ইচ্ছে ধরে রাখতে পারিনি, স্বপ্নেও দেখেছি, ওনার গোলাপি মাইতে চুসকি দিচ্ছি, আর প্যান্ট ভিজে গেল। তোমার তো বউ ছিল এককালে, নিশ্চয়ই অনেক চুসকি দিয়েছিলে? কনকদুর্গা আমার চুসকি খুব পছন্দ করে, চুসকি দিতে দিতে দম বন্ধ হয়ে যায়।

তক্ষুণি কোনো উত্তর দিলো না ডাক্তার। একটু পরে বলল, ক্রান্তি হলো তার সামনে একজন উলঙ্গ সুন্দরী, তোর ইচ্ছে করবে গিয়ে জড়িয়ে ধরি, চুমু খাই, কিন্তু আমরা ক্রান্তি করছি না, নিজেদের মতন করে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করছি, যদিও ক্রান্তিকারিরা জানে না যে রাষ্ট্রটা কোথায়, এই জঙ্গলে নিশ্চয়ই নয়।

অমিত বললো, যাদের বাড়িতে কোলের শিশুকে মানসী-অতনু ফেলে দিয়ে এসেছিল, তাদের বাড়িরও কারোর বুকের দুধ খাবার সুযোগ পাইনি, রাঙাবাবা আর রাঙামা আমাকে নিজেদের ছেলে হিসেবে নিয়েছিল বলে শুনিছি, রাঙামার তো বাচ্চাই হয়নি, কতবার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে আইভি এফ করিয়েও হয়নি, বুকে দুধ আসবে কোত্থেকে? দুধ খাওয়াবার মাসিও রাখেনি যে তার বুকের দুধ খাবো। তাদের বাড়িতে যে চাকরের মতন ছিলুম; সেকারণেই তো গর্দানিবাগের ঘোষবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলুম, তারপর কতো চাপ খেয়ে এখানে এসে জুটেছি। শালা, ইঁদুরকল যেন। ইতু বলত, ফাকিং একান্নবর্তী পরিবার।

না, যার যোনি থেকে জন্মেছিস, তারই বুকের দুধ জরুরি, চরিত্র গড়ার জন্য জরুরি। আমি কথাটা ডাক্তার হিসেবে বলছি। মায়ের দুধ করটিজল থাকে, তার কাজ প্রায় ফেরোমোনের মতন। ফেরোমোনের মাধ্যমে একজন মানুষ আরেকজনকে সংকেত পাঠায়। ঠিক সেভাবেই করটিজলের মাধ্যমে মা শিশুকে আর শিশু মাকে সংকেত পাঠায়। করটিজল হল স্ট্রেস হরমন। শরীরের ভেতর দিয়ে যখন করটিজল যাতায়াত করে তখন তা মানুষের মগজে ভয়, আতঙ্ক, ক্ষোভ, অপমানবোধ, গ্লানি, পরাজয়বোধ, ক্রোধ এই ধরণের প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবার জন্য তাকে আগেভাগে তৈরি করে দেয়; মগজের গ্লুকোজ কনজাম্পশান কমিয়ে পচনশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মাসি-পিসির দুধ খেলে হবে না, কৌটোর দুধ খেলে হবে না, শৈশবে নিজের মায়ের দুধ খেতে হবে। প্রাণীর শরীরের সবরকমের লিকুইডের মাধ্যমে বার্তা গড়ে ওঠে।

কী যে মাথামু-ু বোঝাতে চাইছ কিছুই বুঝতে পারছি না, খোলোসা করে বলো, খাড়–সকে খাড়–সই রয়ে গেছো।

সেক্স করার সময় কী করলি? তুই তোর আর ইতু কিংবা তুই আর কনকদুর্গা যে যার নিজের লিক্ইুড ব্যবহার করলি, পরস্পরকে খবর পাঠালি যে একজন আরেকজনের দেহকে ভালোবাসছিস।

শুধু দেহকে ভালোবাসিনি আমরা, নিজেদের পুরোটা দিয়ে ভালোবেসেছি। ইতু বলত, কারনিভোরের মতন রক্তমাংস দিয়ে ভালোবাসা।

পুরুষ-মানুষের শরীরের ষাট ভাগ লিকুইড, বুঝলি। মেয়েদের অবশ্য একটু কম, পঞ্চান্ন ভাগ। আমাদের মগজ আর হৃদয়ে আছে তার সত্তরভাগ; হাড়কে মনে হয় শুকনো খটখটে, তাতেও লিকুইড আছে একত্রিশ ভাগ। আমার তো মা ছিল না, দুধ খাইনি, অতএব তুলিনি, নাল ফেলতুম কি না জানি না।

তাহলে তোকে বলি, মানুষ নানারকম মিথ্যেকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে, একটু আগেই তো বললুম, তার মধ্যে প্রধান হল প্রেম। এই মিথ্যেটা বেঁচে থাকার প্রাণশক্তি। সব রকমের প্রেমই কোনো না কোনো মিথ্যাকে আঁকড়ে নিজের সততা প্রমাণের চেষ্টা করে, দেশপ্রেম, সংসারপ্রেম, মানবপ্রেম, সমাজপ্রেম, ধর্মপ্রেম, ঈশ্বরপ্রেম এটসেটরা। দেখছিস না এখানে যেমন ক্রান্তিকারিরা, তেমনি বর্ডারে জওয়ানরা মারা যাচ্ছে, আর আরামে ঠা-াঘরে মজা নিয়ে চলেছে নেতারা। মুসলমানদের দেশে এখন জোর লড়াই চলেছে স্বর্গে যাবার, শয়ে-শয়ে মানুষ বোমাবুমি করে মারা যাচ্ছে বা আত্মহত্যা করছে রোজ রোজ। বুঝিয়েও কিছু হবে না; মিথ্যাই সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে।

মারো গোলি; যে যার লুঙ্গি তুলে পুঙ্গি বাজাক, আমার তাতে কি!

চুমু খাবার সময়ে লিকুইড আদান-প্রদান করিছিলিস, খবর পৌঁছে দেবার জন্য, মুখে থুতু না থাকলে কথা বলতে পারবি না, আমি তোমায় ভালোবাসি বলতে হলেও মুখের ভেতরটা ভিজে থাকা দরকার, জড়িয়ে ধরার সময়ে ঘাম দিয়ে ফেরোমোনের দেয়া-নেয়া করেছিলিস। লোকে কাঁদে, তাতে চোখের জল কেন বেরোয়? জানাবার জন্য যে মনের অবস্থা তখন কেমন।

ডাক্তার ঘোষ পেশার মর্যাদা আর স্ত্রীর ছেলের প্রতি পিতৃত্বসুলভ আদরের মাঝে মনে মনে দোল খেতে লাগলো। অমিতের ওপর দখল প্রসারিত করার খেলায় ছেলেটাকে জ্ঞানের জাল দিয়ে আটকে নেবার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে যে এসে অব্দি।

তুমি এখানে পড়ে আছো কেন? এই জঙ্গলে? জ্ঞান তো মাঠে মারা গেল। বিপ্লবের ব- নিয়েও তোমার একরত্তি আগ্রহ নেই, তা এতদিনে বুঝে গেছি, ঝাঁটের বাল তোমার কাছে এই ক্রান্তিকারি খুনোখুনি। ক্রান্তি-ফান্তিতে তুমি বিশ্বাসই করো না, তবু এখানে পড়ে আছো! শহরে থাকলে মারোয়াড়ি হাসপাতালে ডাক্তারি করে পেল্লাই বাড়ি করে ফেলতে পারতে, গাড়ি হাঁকাতে, এখানে ফালতু জীবন নষ্ট করে ফেললে।

ক্রান্তি? নিজেকে চুপি চুপি প্রশ্ন করলো ডাক্তার, ক্রান্তির হাতছানি তো আমিই দেখিয়েছিলুম মানসীকে, সেই হাতছানির ডাকে যে আরেকজন এসে ক্রান্তির স্বপ্নটাকে হাতিয়ে নেবে, মানসীকে হাতিয়ে নেবে, তা তো তখন ভাবিনি। এখন আর সামাজবদলে বিশ্বাস করি না, জানি সমাজ কোনো দিনই বদলাবে না, বইতে সমাজ বদলের যতো গপ্পো আজ পর্যন্ত লেখা হয়েছে, সব গা-ুগর্দি। সোভিয়েত রাশিয়ার মতন শেষ পর্যন্ত মাফিয়ারা হাতিয়ে নেয়, চীনের মতন পুঁজিপতিরা হাতিয়ে নেয়।

তুই যা জানতে চাইছিস তার উত্তর তুই জানিস। আমি এও জানি যে তুই সেই একই মহিলার জন্য এখান থেকে যেতে পারছিস না, যে মহিলার জন্যে আমি নিজের তৈরি করা ফাঁদে আটক পড়ে গেছি।

কে? কমরেড জ্যোতি? কমরেড দীপকের জ্যোতি? ওই মহিলা তো তোমাকে ভালোবাসে না। আমাকেও পছন্দ করে কিনা তাও নিশ্চিত নই। তবে বদলা একদিন নেবোই নেবো, ইসপার ইয়া উসপার।

না বাসলেই বা, আমি তো… যাকগে, তুই জেনে কীই বা করবি।

হুঁঃ, ছুঁতে পর্যন্ত পাও না, শেষ বোধহয় পঁচিশ বছর আগে ছুঁয়েছো।

তেইশ বছর তিন মাস আট দিন। তারপর কমরেড দীপক একবস্তা টাকা নিয়ে এসে শুয়ে পড়ল আমদের মাঝে। আর তুই পয়দা হয়ে সব ল-ভ- করে দিলি।

হুঁঃ, এই জঙ্গলে ক্যালেন্ডার-ট্যালেন্ডার না থাকা সত্ত্বেও এত হিসেব রেখে চলেছ। দেবদাস সেজে  থাকো, চুল আঁচড়াও না, রেগুলারলি দাড়ি কামাও না, লুঙ্গিটা বোধ হয় একসপ্তাহ হয়ে গেল ছাড়েনি, বুশশার্টে সবকটা বোতাম নেই। নিজেই নিজেকে ল-ভ- করে রেখেছ, এসে থেকে দেখছি। শুধু দিনের বেলা খাও, রাতে কখনও খেতে দেখিনি তোমাকে।

ভালোবাসার জন্য ছুঁতো হয় নাকি।

আমি তো ভালোবাসি না। আমি ওই মহিলাকে আর ওনার সঙ্গীকে ঘেন্না করি বলে এখানে আছি। একটা দুহাজার টাকার প্যাকেট তো আমিও এনে দিয়েছিলুম কমরেড জ্যোতিকে, সুশান্তজেঠু দিয়েছিলেন, কীই বা করব অত টাকা, তাই দিয়ে দিলুম, একটা অবশ্য নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছি, বলা তো যায় না, যেদিন পালাবো সেদিন কাজে দেবে। কমরেড জ্যোতি কি বলেছিলো জানো? বলেছিলো যে যাক, কয়েকটা হ্যান্ড উইপন কেনা যাবে। ওইসব ফালতু জিনিস কেনার প্ল্যানের কথা আমি যদি আগে জানতুম, তাহলে এক পয়সাও দিতুম না। ওই বিধাবৌড়িয়া গ্রামে একটা টিউকল বসালে বরং ভালো হতো, জল আনার জন্য কত দূর যেতে হয় বউগুলোকে, মেয়েগুলোকে; ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে যায় ওদের শাড়ি, কুড়ি হাত দূর থেেেকও সেই মেয়েলি ঘামের গন্ধ পাওয়া যায় জানো তুমি?

একটা গ্রামে বসলে অন্য গ্রামগুলোর মানুষ মনে করবে তাদের অবহেলা করা হচ্ছে; সরকার অমন অবহেলা করলে গ্রামবাসীরা তেমনকিছু মনে করে না, কিন্তু ক্রান্তিকারিরা যদি করে তা সন্দেহ করবে। ছেলে-মায়ের সম্পর্কটা ভালোবাসাবাসির নয়, ওটা জৈবিক, দুজনে একে আরেকজনের প্রতি চৌম্বকক্ষেত্র গড়ে তোলে; সে সম্পর্কটা কিন্তু মিথ্যা নয়। কথা বলতে বলতে ডাক্তার নিজের মনে বলতে থাকলো, এ নিউজপেপার ইজ নট ওনলি এ কালেকটিভ প্রোপাগানস্টি অ্যান্ড এ কালেকটিভ এজিটেটর, ইট ইজ অলসো এ সোশ্যাল অরগ্যাজম।

অমিতের জানা আছে, কথা বলতে বলতে মগজের অনেকটা ঘরে সেঁদিয়ে যায় ডাক্তার, মগজ যেন হাজারখানেক পাকানো কেঁচো দিয়ে তৈরি। সে দিকে খেয়াল না দিয়ে বলল, হবেও বা, আমার কোনো চুম্বকটান আছে কি না জানি না। যাকগে যাক, এমন কোথাও টিউকল বা কুয়ো বসালেই তো হলো যেখানে কয়েকটা গ্রামের বউরা জল তুলতে আসতে পারবে। আমি নিজের চোখে দেখেছি ঘামে মুখ একেবারে থমথমে হয়ে থাকে মেয়েগুলোর।

দ্যাখ, একটু কথা বলতে গিয়েও তুই কাঁদো কাঁদো হয়ে যাচ্ছিস। দেখছিস কখনও যে তোর মায়ের ঘামের ফোঁটা কেমন জোনাকির মতন জ্বলজ্বল করে, অন্ধকারে উড়তে থাকে, তাঁবুর ভেতর আলো হয়ে থাকে?

হ্যাঁ, দেখেছি, এখন আমি ওর তেরপলে শুই, অতনু চক্রবর্তীর তেরপলে শুই না। বলেছিলুম যে আমাকে ক্রান্তিকারিদের কোনো একটা তাঁবুতে শুতে দেয়া হোক, দুজনে রাজি হল না কেন কে জানে, কনকদুর্গাও ওদের বলেছিল যে অমিতের বয়স তো কম, মেয়েদের তেরপলে শুতে পারে। ওরা রাজি হয়নি, বোধ হয় কনকদুর্গার হামলেপড়ার ব্যাপার ওরা জানে, দলে এতো ছিপকিলি পুষে রেখেছে।

বলার পর, অমিতের মনে হল, মায়ের সঙ্গেই বা কেন শোবে না! মায়ের পাশে শোবার জন্মগত অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত হবো, মায়ের বুকের দুধ খাবার অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত হবো, একদিন না একদিন মায়ের বুকের দুধ আমি নির্ঘাৎ খাবো, দুধ থাকুক বা না থাকুক। গোঁফের রেখা দেখা দেয়া শুরু হয়েছে তো কি হয়েছে, আমিই তো মায়ের একমাত্র সন্তান। নিজের ফোল্ডিং খাটকে মায়ের খাটের পাশে নিয়ে গিয়ে শোবো। কোনটা বাবা তো গোলমেলে হলেও মা তো মানসী বর্মণ, এতো সুন্দরী মা, আমার পুরো ছোটবেলা নষ্ট করে অতনু চক্রবর্তীর পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ওরা একাধজন মেয়ে ক্রান্তিকারিকে সন্দেহ করে। বিশেষ করে কনকদুর্গাকে।

সন্দেহ করার তো দরকার ছিল না; ওরা জানে আমি ইতুকে ভালোবাসি। যদিও জানে না যে কনকদুর্গাকেও ভালোবাসি। দুজনকে কি একসঙ্গে ভালোবাসা যায় না? আমাকে বললে আমি দুজনকেই বিয়ে করে কিংবা না করেও ঘর করতে পারি। কমরেড মানসী বর্মণ তো তোমাকে আর অতনু চক্রবর্তীকে একই সঙ্গে ভালোবাসে।

কনকদুর্গা, মানে কমরেড কুনকি একজন ইমপরট্যান্ট ক্রান্তিকারি, বুঝলি। ভীষণ ডেনজারাস মেয়ে, মনে রাখিস, ওকে দল ছাড়বে না, তোকেও জোর করে ওর কাছ থেকে ছাড়াতে পারবে না। তবে কী জানিস? ডেনজারাস মেয়েরাই ভালোবাসার জন্য জি-জান লড়িয়ে দ্যায়।

জানি, ঝাড়খ- থেকে পালিয়ে কলকাতায় ফিরে সারে-ার করবে ভেবেছিল, তাইতো নাকি দুজন ক্যাডারকে দিয়ে ওকে বড়ি-প্যাঁদানি দেয়া হয়েছিল, সেই দুজনকে আধামিলিট্রি মেরেছিল না কনকদুর্গা, তা জানা যায়নি। আমি তবুও ওকে ভালোবাসি, ও আমার কান্নার ওষুধ। বললে না তো, দুজনকে একসঙ্গে নিয়ে ঘর করা যায় কিনা।

জানিনা যায় কিনা, ওটাই আমার জীবনে প্রধান প্রশ্ন হয়ে আছে আজও। অন্য কাউকে ভালোবাসলেও যদি কোনো তরুণী তোকে রাতের বেলায় আঁকড়ে ধরে, বুঝলি তুই ছাড়াতে পারবি না নিজেকে, দেখবি তোর শরীরে আপনা থেকে সাড়া জেগে উঠছে, কনকদুর্গা ঠিক তাই করেছে তোর সঙ্গে, তার ওপর গাঁজা ফোঁকার নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। ক্রান্তিকারিদের কি আর দেহ মন নেই? তোর পাশে যদি কোনো মেয়ে শোয়, তাহলে তার মাথায় সেসময়ে ক্রান্তির কথা থাকার কথা নয়, তোকে দেখতে শুনতে যথেষ্ট ভালো, তোর বাবার হাইট চোখ-মুখ নাক আর তোর মায়ের গায়ের রঙ পেয়েছিস। মাঝরাতে তোর শ্বাস যদি কোনো যুবতীর মুখের ওপরে অনবরত পড়তে থাকে, ফেরোমোনের ঝাপটায় তার পক্ষে নিজেকে কনট্রোল করা কঠিন হতে পারে। ক্রান্তিকারিদের তাঁবুতে হয়, এমনকি ক্রান্তিকারিরা যখন অপারেশান করতে যায়, তখনও ক্লান্তি আর টেনশান কাটাবার জন্যে লিঙ্গ-যোনির স্মৃতিতে জড়িয়ে পড়ে, জানাজানি হলে তাদের আলাদা করার জন্য বিভিন্ন ফিল্ড-এরিয়ায় পাঠনো হয়, যেমন তোকে আর ইতুকে পাঠানো হয়েছে। তোর লিঙ্গের স্মৃতি তোর নিজের নয় রে, তা যুগ যুগ ধরে স্মৃতি ধরে রেখেছে, ডায়নোসরদের সময় থেকে। তুই না চাইলেও তোর লিঙ্গের স্মৃতি তোকে বিগড়াবার রাস্তায় নিয়ে যাবে, ইউ মে কল ইট ভালোবাসা কিংবা সেক্স বা ভালোবাসা উইথ সেক্স। কনকদুর্গার সঙ্গেও সেক্স করেছিস, আই মিন কুনকি তোর সঙ্গে সেক্স করেছে, ওতো ভীষণ ডিমান্ডিং? কপালে নাইন এমএম ঠেকিয়ে তোকে দিয়ে কাজ আদায় করে নেবে।

হ্যাঁ, প্রথমবার মুখ দিয়ে, ও-ই শিখিয়েছে, এখানে প্রিকশান নেবার কোনোও ওষুধ ছিল না, তাই আমরা সেক্স দিয়ে সেক্স করতে পারিনি, ও বলে ওটা ব্লোজব, মজা একই, বরং বেশি মজা। তুমি ওকে প্রিকশানের ট্যাবলেট দাও না কেন? ওর মান্থলি ব্লিডিঙের সময়ে আমরা রোজই সেক্স করেছি, ঘাসের ওপর, বুঝলে, জোনাকি উড়তে থাকে, ঝিঁঝি ডাকতে থাকে, জঙ্গলের গন্ধর সঙ্গে ওর বুনো গন্ধ মিশে যায়, যাকগে যাক, যে কথা হচ্ছিল, কমরেড দীপক তোমার চেয়ে বেঁটে আর তুমি কমরেড জ্যোতির চেয়ে ফর্সা, অমন যুক্তি অনুযায়ী তাহলে আমি তো তোমার ছেলে, কী, কেমন দিলুম, বেশি পাঙ্গা নিও না। কিন্তু কান্না এসেই যায়, আসলে আমি একজন ইডিয়েট বাফুন, কতবার কনট্রোল করার চেষ্টা করেছি, পারি না। ইতু বকুনি দিত, কনকদুর্গা ডরপোকি কমজোর মরদ বলে চড় মেরেছিল। কনকদুর্গাকে বলে দিয়েছি যে আমি জন্মাতে ভয় পেয়েছিলুম, জন্মেও ভয় পেয়েছিলুম, সবেতেই আমি ভয় পাই।

আমিতের মনে পড়ল, প্রথমবার ও ছাদে বসে একা একা কেঁদেছিল, পাড়ার গু-া রফিক মাসুম একটা ষ-া মার্কা লোককে দশ হাজার টাকার সুপারি দিয়ে বলছিল ক্উাকে সাফায়া করে দিতে, ভয়ে গলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অমিতের, কথাটা ইতুর সঙ্গেও শেয়ার করতে পারেনি, যা সাহসী ইতু, গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত রফিক মাসুমের ওপর, আর ওরা ওকে মুখ বেঁধে তুলে নিয়ে গিয়ে কী করত তা তো আর ইতু জানে না, মনে হয়েছিল অমিতের।

একদিন রাতের বেলায় আওয়াজ শুনে জানালা দিয়ে দেখছিল অমিত, পাড়ার ফুটপাতের ওপর যে গাছগুলো ছিল তাতে ছেঁদা করে কিছু করছিল ষ-াটা তার সাকরেদরা। অমন কেন করছে তখন বুঝতে পারেনি অমিত। সপ্তাহখানেক পরে দেখল সবকটা গাছ মরে গেছে, একেবারে শুকনো, তার কিছুদিন পরেই কর্পোরেশানের লোকদের সঙ্গে এনে গাছগুলোকে কেটে কয়েকটা লরিতে চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিল রফিক মাসুম। ইতুকে বলতে, ও বলেছিল, ইডিয়েট, তখনই বলতে হত, পাড়ায় যাদের গাড়ি আছে তারা রফিক মাসুমকে দিয়ে কাজটা করিয়েছে; গাছের ডালে বসে পায়রা আর অন্য পাখি গাড়িগুলোর ওপর হাগত, গাড়ি খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, সুপারি দিয়ে গাছগুলো কাটিয়ে নিলে রফিক মাসুম, দুদিক থেকেই টাকা খেলো ব্যাটা। শুনে অব্দি কেঁদেছিল অমিত, লুকিয়ে লুকিয়ে।

দ্বিতীয়বার কেঁদেছিলুম ব্যানার্জি দিদা মারা যেতে। ব্যানার্জি দিদা বলতেন ওনার ছেলেরা দিল্লি মুম্বাই আর লখনউতে থাকে। নাতিদের স্কুলের আর কলেজের ফলাফল ভালো হলে মিষ্টির বাক্স এনে বাড়ির সবাইকে খাওয়াতেন; অমিতকে বলতেন, আমার নাতিদের মতন লেখাপড়া করে বড়ো হ, কতদিন এভাবে চালাবি। কয়েকদিন ধরে পাড়ায় কুকুর মরে পড়ে থাকার মতন পচা গন্ধ আসতে জানা গেল যে ব্যানার্জি দিদার বাড়ি থেকে আসছে। সদর দরোজায় ধাক্কাধাক্কি করা সত্ত্বেও ব্যানার্জি দিদা যখন দরোজা খুললেন না, তখন পুলিশ এসে দরজা ভেঙে কয়েকদিন আগে মরে পড়ে থাকা ব্যানার্জি দিদার লাশ পেয়েছিল, চেয়ারে বসে বসে পচে গেছেন। কতদিন যাবত টয়লেটে যেতে পারেননি, ঘরে কার্পেটের ওপর হেগেমুতে রেখেছেন, শেষে নড়তে না পেরে রকিং চেয়ারে বসে বসে কখন যেন মরে গেছেন, কোলে হাত রেখে। সারা ঘর আগোছালো, নোংরা। পুলিশ পরে জানিয়েছিল যে ওনার স্বামী বাংলাদেশ স্বাধীন করার যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন। ওনার কেউই নেই। নাতিদের গল্প সব বানানো। শুনে অনেক কেঁদেছিল অমিত। অকারণে কান্না পায় ওর।

অমিত বলল, কোনো মানে হয়, ভেবে দেখো, বাংলাদেশ স্বাধীন করতে গিয়ে কী পেলেন ব্যানার্জিদাদু? নেড়েগুলো তো দিনকেদিন হেফাজতে ইসলামি না কী যেন হয়ে যাচ্ছে, হিন্দুদের আর থাকতে দেবে না ওদের দেশে, কতো লোক পালিয়ে আসছে, আর ফিরছে না, মন্দির টন্দির দুর্গা কালীর মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। ওসব গল্প শুনি আর আমার কান্না পেয়ে যায়।

ওটা তোর পারসোনালিটি ট্রেট হয়ে গেছে, আর তার কারণ হল তুই তোর মায়ের দুধ খাসনি, মায়ের আদর খাসনি, মায়ের গায়ের গন্ধ জানিস না।

আমাকে ওরা ডাস্টবিনে ফেলে দিলেই পারত। যে বাড়িতে ফেলে দিয়ে এসেছিল, সেখানে আমি ডাস্টবিনেই থাকতুম, নয়তো আর কি। আমার তিনটে বাবা, ডাক্তার বাবা, কমরেড বাবা, রাঙা বাবা আর দুজন মা, কমরেড মা আর রাঙা মা, কিন্তু আপন বলতে আমার কেউই নেই। বলে, অমিতও ডাক্তার ঘোষের আদলে ষেঁড়োহাসি হাসল, তারপর বলল, আমি যদি তিনজন বাপের আর দুজন মায়ের কমবাইন্ড লিকুইড দিয়ে জন্মাতুম তাহলে বোধহয় আই ইডি বানাতে পারতুম, মাইন পুঁততে পারতুম, ক্রান্তি করার জন্যে গুলি ছুঁড়তে পারতুম, বলে, অমিত চোখ মুছল দুহাতের চেটো দিয়ে।

চোখে জল আনিসনি, ট্রাই টু কন্ট্রোল ইওরসেল্ফ। ডাস্টবিনে কেন ফেলবে? বোকা নাকি? তোকে নিজের প্রিয় বন্ধুর বাড়িতে রেখে এসেছিল, যাতে তারা নিজের পরিবারের সদস্যদের মতন গড়ে তোলে তোকে, শিক্ষিত করে তোলে। ওদের বাড়িতে পর পর তে দুর্ঘটনা ঘটে গেল যে ওরা দিশেহারা হয়ে পড়ল। ডাক্তার নিজেকে শুনিয়ে বললে, ওরা অতনুর বন্ধু, আমার বন্ধু তো নয়; মা বেঁচে থাকলে মানসীর বাচ্চাটাকে মায়ের কাছেই দিয়েই আসতুম, কত বাচ্চা তো ঠাকুমার কোলে মানুষ হয়।

সবই জানো দেখছি, এই জঙ্গলে বসেও সব খবর রাখো। কিন্তু বন্ধু সুশান্তজেঠুই তো কিডন্যাপড হয়ে চলে গিয়েছিলেন, একজন বিহারি মেয়েকে বিয়ে করে সেখানেই থেকে গেছেন সুশান্তজেঠু। আমি আর ইতু বাড়ি থেকে পালিয়ে ওনার আস্তানাতেই প্রথমে ডেরা ডেলেছিলুম। টাকার বান্ডিল সুশান্তজেঠুর বিহারি বউ দিয়েছিল আমাদের।

কানে আসে। আরও অনেককিছু জানি, যা তুই চলে আসার পর ঘটেছে, সুশান্তজেঠু আত্মহত্যা করে নিয়েছে, আর ওনার ছেলে অপু খুনোখুনি করে ফেরার হয়ে গেছে।

ওফ, আর বলতে হবে না।

এখন যোনির প্রসঙ্গটা জরুরি। তুই একটুতেই ভেঙে পড়িস।

তা নয় মানসী বর্মণের ছেলেটার জন্য অতনু চক্রবর্তীর চেয়ে তোমার টান বেশি। হতে পারে। এখন যা, তোর মা-বাপ দুশ্চিন্তা করবে, ভাববে আমি তোকে রিঅ্যাকশানারি বক্তৃতা দিচ্ছি। আমার ডাক্তারিটা ওদের দরকার, আমাকে তো ওদের দরকার নেই। আমি বেয়ার ফুট ডাক্তার তৈরি করে চলেছি, যারা শিখে পড়ে মেডিকাল স্কোয়াডের কাজ করছে। তোকেও করতে চেষ্টা করেছিলুম, কিন্তু তুই বন্দুক-পিস্তল চালিয়ে ক্রান্তিকারিগিরিতে অংশ নিতে চাস, অথচ ভিতুর ডিপো। শেখ শেখ। শিখে নে বন্দুক-টন্দুক চালানো। তোকে কিন্তু যেতে দেবে না, দেখে নিস, তোকে প্রোটেক্ট করে রাখবে।

ক্রান্তিকারিগিরিতে যেতে তো আমাকে হবেই। নয়তো আমি এরকম কাওয়ার্ড ইডিয়ার্ড থেকে যাবো। আমি ভেবে রেখেছি। তরে ওই মুফতি পরা ক্রান্তিগিরিতে নয়, কাউকে অযথা খুন করতে পারব না। মরার জন্য কারণ থাকা দরকার। কনকদুর্গার কারণ আছে, ও পৃথিবীর সব পুরুষ মানুষের ওপরও চটা, সবাইকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে খুন করতে পারে; বলেছিল গুলি চালিয়ে দনাদ্দন ওড়াতে ওর বেশ মজা লাগে।

জানি, তুই কী ভেবে রেখেছিস।

জানো? হুঃ

জানি। তুই মনে মনে ভাবছিস আমি তা বহুকাল যাবত ভেবেছি।

তার মানে তুমিও আমার মতনই কাওয়ার্ড বলো?

না, আমি আহাম্মক।

আহাম্মক মানে?

বাংলা ভাষাটাও জানিস না? আহাম্মক মানে এক্সট্রিমলি ফুলিশ,

ল্যাকিং ইন কমন সেন্স।

তা ঠিক। নয়তো এখানে জঙ্গলে দেবদাস হয়ে পড়ে থাকতে না।

দেবদাস? শরৎচন্দ্র পড়েছিস দেখছি?

না, পোড়বো কোত্থেকে। শাহরুখ খানের ফিল্ম দেখেছি। অইশরিয়া রায় আর মাধুরী দিকছিত ছিল। ইতু ওর ল্যাপটপে পেনড্রাইভে ফিল্ম আনতো মাঝে মাঝে।

আমি দিলীপ কুমারেরটা দেখেছিলুম। সূচিত্রা সেন আর বৈজয়ন্তীমালা ছিল।

যে-ই থাকুক, রেজাল্ট একই। এক্সট্রিমলি ফুলিশ, ওই যে তুমি বললে। ল্যাকিং ইন কমন সেন্স।

অন্ধকার হয়ে যাবে। আলো তো জ্বলবে না কারোরই তেরপলে। তোর মায়ের আস্তানায় যাবি কি করে?

কথা ঘোরাচ্ছো কেন? আমি কয়েকজন ক্রান্তিকারির সাঙ্গে কথা বলে দেখেছি। ওরা বিশ্বাস করে যে তুমিই মানসী বর্মণের আসলি বর; কমরেড দীপকটা নকলি স্বামী। এতদিন রয়েছ পাশাপাশি। রেপ করার মতনই সাহস যোগাতে পারোনি, আর আমাকে বলছ কাওয়ার্ড। তুমি তো তোমার মায়ের দুধ খেয়েছিলে, নাকি?

কি আজেবাজে কথা বলছিস নিজের মায়ের সম্পর্কে। মানসী বর্মণ বাইরে ক্রান্তিকারি, ভেতরে ঠুনকো। আমি ওকে জড়িয়ে ধরলে ও ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।

একদিন মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোবো নিশ্চয়ই, দেখে নিও। শ্বাস ফেলবো ওনার মুখের ওপর, শুঁকবো ওনার ঘামের গন্ধ, বুকের দুধের হারিয়ে যাওয়া গন্ধ, জবাবদিহি চাইব যে ক্রান্তিকরাটা আমার চেয়ে কেন জরুরি, মায়ের দায়িত্ব আগে সন্তান না ক্রান্তি, কেন আমাকে দুধের বয়সেই ফেলে চলে এসেছিলো তারপর কেন খোঁজ নেয়নি, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে করে পাগল করে দেবো।

ঘুমোস। ওই যে কমরেড কনকদুর্গা তোকে ডাকতে এসেছে; তোর খাবার সময় হয়ে গেল।

কনকদুর্গা মেয়েটা বাঙালি নয়, কিন্তু মহা ধাকড়নি। ওর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি না, তেলেগুতে, হিন্দিতে, বাংলায়, ইংরিজিতে, সব ভাষায় কথা বলতে পারে। আমি কোনো ভাষাতেই ঠিকমতন কথা বলতে পারি না। ওকে এখনে কেন এনে ফেলল বলোতো? বোধহয় কমরেডদের চুল কাটার জন্য আনিয়েছে এখানে।

অমিতের উক্তি শুনে বেশ কিছুক্ষণ যাবত অট্টহাসি হাসলো ডাক্তার ঘোষ, যা ওর চরিত্রে বিরল। অমিত বলল, হ্যাঁ, হাসো তোমার ষেঁড়ো হাসি, কতোদিন যে হাসোনি, স্টক খালি করো।

অনেকে চুল ও-ই কাটে বটে, আমার চুল আমি নিজেই কাটি, জঙ্গলে আবার চুলের কোনো দরকার আছে নাকি। যা, খেয়ে নিবি যা।

তোমাদের এইসব ফালতু ক্রান্তিকারি খাবার দাবারের চেয়ে কিন্তু ইতুদের বাড়িতে ভালো খাবার পেতুম, চাকরের জীবনের ভালো পেটপুজো।

তুই-ই তো বোকার মতন চলে এলি।

চলে আসিনি; ওরা তাড়িয়ে দিলে।

মোটেই তাড়ায়নি ওরা। তুই আর ইতু চাদের অন্ধকারে জাড়াজড়ি করে কিছু একটা করছিলি বলে শুনেছি, মারিহুয়ানাও ফুঁকছিলি। জানি তোরা ভাইবোন নোস; কিন্তু ওনাদের বাড়িতে ছোটোবেলা থেকে যেভাবে দুজনে বড়ো হয়েছিস, ওনাদের চোখে ভাইবোন হয়েই ছিলিস। আত্মমগ্নতার বিরতি মিশিয়ে মিশিয়ে কথাগুলো বললে ডাক্তার ঘোষ।

এসব খবর এসে গেছে তোমাদের কাছে? তোমাদের ছিপকিলি জাসুস ওই বাড়িতেও আছে?

আমাদের খোচর সর্বত্র আছে; পুলিশে, প্রশাসনে, গ্রামে, হাটে, সব জায়গায়। যাকগে এখন যা, কনকদুর্গা অপেক্ষা করছে। ওর আসল নামটা জিগ্যেস করে নিস।

যাবো যাবো তাড়া কিসের? কমরেড জ্যোতিকে ভয় পাও।

পেলে তো ভালোই হতো রে। তা তুই সেক্স-টেক্স করলে নিজেকে ক্লিন কিরিস তো? ক্লিন করবি, আনহাইজেনিক থাকলে যার সঙ্গে সেক্স করবি তার ইনফেকশান হয়ে যাবে, পেনিসে লিন্ট মা ম্যাগমা জমে, এক ধরণের মোম। কি উল্টোসিধা পাঠ পড়াচ্ছ, ফালতু। ইহুদিরা আর মুসলমানরা সুন্নত করে কেন? যাতে ক্লিন থাকে। আমার ক্লিনই থাকে। প্রায়দিনই তো মিষ্টিবিষ্টি করি, কনকদুর্গাই বলেছে, পরিস্কার রাখতে নয়তো ওর মুখে ঘা হয়ে যাবে তো! পুরোনো পোশাক সঙ্গে রাখে ও, তাই দিয়ে নিজেই পুঁছে দেয়।

হোয়াট ইজ দ্যাট? শুনিনি তো, মিষ্টিবিষ্টি।

ইতুদের কোর্ড ওয়ার্ড, ওর বন্ধুর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলছিল, তখন শুনেছিলুম। ওরা ম্যাস্টারবেশনকে বলে মিষ্টিবিষ্টি।

আই সি। হ্যাঁ, এই বয়সে ওটা করা জরুরি, বাৎসায়নও বাতলে গেছেন কী ভাবে মিষ্টিবিষ্টি করতে হবে। দ্যাখ, ওই কাজের মাধ্যমে তুই পৃথিবীকে জানাচ্ছিস যে তোর একজন নারীর দরকার, মাটিতে বার্তা ফেলছিস, মাটি তো প্রতিদান দেবে। যাকগে, কনকদুর্গা দাঁড়িয়ে রয়েছে তোর জন্য।

ওকেও যোনি ফোনি এইসব বুঝিও না যেন।

আবার তুই বাপের বয়সী লোকের সঙ্গে ফাজলামি করছিস।

পরে আসবো, আরও কি খবর জানো খোলোশা করে বলো।

ডাক্তার নিজেকে নিজের মনের ভেতর বললে, হয়তো এ আমারই ছেলে। এ যদি জেনে যায় যে এ নিশ্চিত আমার ছেলে, তাহলে এর সঙ্গে এমন খোলাখুলি কথা বলা যেতোনাকো; এই বরং ভালো, কমরেড দীপকের চেয়ে কাছে টেনে আনতে পারছি।

টাঙানো তেরপলের বাইরে, ক্রেয়নে বাচ্চাদের বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় জেতা গোধূলির খাপচা কমলা হলুদ রঙ নেমে আসছে ঘন সবুজ গাছগুলোর ওপরে।

অমিতের হাত ধরে ওর কোমর বাঁহাতে জড়িয়ে, আলো অন্ধকারের ভেতর সেঁদিয়ে কমরেড কনকদুর্গা বলল অমিতকে, চল ডাক্তারকেও কনফিউজ করি, উনি এখনও দেখতে পাচ্ছেন আমাদের, বলে আমিতের দিকে ফিরে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল।

তাহলে তুই মুখ খোল, জিভ ঢোকাই।

কী করছিস কি? উত্তেজিত করে দিচ্ছিস।

চল, ওই বাঁশঝাঁড়ের পেছনে যাই।

চল, ডাক্তার এগিয়ে এসে উঁকি মেরে দেখছেন, পরের বার নিশ্চয়ই অন্য লেকচার শোনাবেন, সারাদিন নিজের মনে ইংরেজিতে বিড়বিড় করতে থাকেন, পাগল হয়ে যাবেন বুড়ো বয়সে।

বিড়বিড় নয়, মার্কস লেনিন মাও ওনার মুখস্থ; ঠিকই, বুড়ো হয়ে গেলে কমিউনিস্টরা পাগল হয়ে যেতে থাকে, স্বপ্ন ধ্বসে পড়ার বিষে ক্ষয়ে যান ওনারা। উনি কমিউনিজমে বিশ্বাস করেন না, বোধহয় মানুষের সমাজকেই বিশ্বাস করেন না।

অমিত বলল, আমিও করি না।

ডাক্তার ঘোষ তাকিয়ে রইলো কনকদুর্গার চুল-চিকচিকে খোপার দিকে, নিজেকে শুনিয়ে ফিসফিসিয়ে বললে, ‘প্রোট্র্যাড আর্মাডে স্ট্রাগল টু আনডারমাইন অ্যান্ড টু সিজ পাওয়ার ফ্রম দি স্টেট, স্বপ্ন দেখে যাও দেখে যাও দেখে যাও, যতদিন না ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝিমার হয়’।

কনকদুর্গা বলল, তোকে একটা ভয়ের খবর দেবো।

অমিত : আমি  তো চিরকাল ভিতু। কী খবর?

কনকদুর্গা : আমি প্রেগনেন্ট হয়ে গেছি, তিন মাস হয়ে গেল। ওরা জানতে পারলে রাখবে না। বলবে সারে-ার করতে।

অমিত জড়িয়ে ধরলো কনকদুর্গাকে, যাক, রোজকার ধস্তাধস্তির ফল ফলল তাহলে। এবার এখান থেকে পালাবার পথ তুই তৈরি করে দিলি কনকদুর্গা, দুজনে পালাবো। পালাবার আগে ওই দুটোকে ওড়াতে হবে।

কনকদুর্গা : আমি ভেবেছিলুম শুনে তোর মুখ শুকিয়ে যাবে।

আমিত : আরে নাহ, এখন নিজেকে আসলি ষাঁড় মনে  হচ্ছে।

কনকদুর্গা অমিতের কোমর ধরে তুলে নিয়ে জঙ্গলের ভেতর ঘাসের ওপর নিয়ে গিয়ে ফেলল, বলল, এবার থেকে সাবধানে, নয়তো বাচ্চা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, পাশাপাশি শুতে হবে।

মশারির ভেতরে  শুয়ে ডাক্তার ঘোষের মনে পড়ল, মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে তার শারীরিক অবস্থা বোঝার ক্ষমতা মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলো, আর শিক্ষানবীশ বেয়ারফুট ডাক্তারদের সেই ক্ষমতাটি দেবার প্রয়াস করে, যাতে উপজাতি রোগীকে নানা প্রশ্নের মুখে পদ্ধোড় বিমূঢ়াবস্থায় না পড়তে হয়। মেয়ে শিক্ষানবীশরা তা দ্রুত শিখে ফেলতে পারে, কেননা তারা জানে যে রোগীরা কোথায় হাগতে যায়, জঙ্গলে না ঘাসের ওপর না নদীর বালিতে।

মশারির ভেতরে ঢুকলেই মায়ের ঘুমপাড়ানি গানের সুর ভেসে আসে ডাক্তার ঘোষের কানে, একের পর এক যার সাহায্যে জখম বা বুলেটফোঁড় ক্রান্তিকারিদের কান্না-কাতরানির অসহ্য স্মৃতিকে সামলায়, কিন্তু গানের কথাগুলো ইংরেজিতে, সেই একই, অ্যানিহিলেশান অফ ক্লাস এনিমিজ অ্যান্ড এক্সট্রিম ভায়োলেন্স অ্যাজ এ মিন্স টু সিকিয়র অরগানাইজেশানাল গোলস, মায়ের মুখ ভেসে ওঠে।

ইংল্যান্ডে ডাক্তারি পড়তে গিয়েছিলো, রেডিওলজি। যাবার আগে মায়ের কথা  মেনে, কচি বয়সেই উচ্চমাধ্যমিকের পর বিয়ে করে নিয়েছিলো উচ্চমাধ্যমিকেরই মানসী বর্মণকে, যাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। মেয়েটি দৃষ্টিকটুভাবে সুশ্রী, আকর্ষণীয়ভাবে উন্নাসিক, ফুলোফুলো আঙুল, ঢাউস বর্তুল বুক, গভীর কালো চোখ, পাতলা কোমর আর হ্যাঁ, বেশ ফর্সা।

ফুলশয্যার রাতে, ফোম লেদারের একটা ব্যাগের জিপ খুলে বিছানার ওপর অজ¯্র চিঠি, তার অধিকাংশ খাম আর ইনল্যান্ড, খোলা হয়নি, ছড়িয়ে মানসী বর্মণ বলেছিল, এই নাও কোনোও যৌতুক চাই না বলেছিলে, এগুলো ক্লাস এইট থেকে আমাকে লেখা ঘাড়ে  পড়া প্রেমিকদের প্রেমপত্র; আমি কাউকে পাত্তা দেইনি। আজ রাতে তুমি যাচাই করে দেখে নাও যে আমি ভার্জিন, নয়তো পরে তোমার মনে হবে এর তো প্রেমিকদের লাইন ছিল, নিশ্চয়ই কারোর সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে তার সঙ্গে শুয়ে থাকবে। শুইনি কারোর সঙ্গে। শুতে হলে ডিজায়ারেবল হওয়া অতি আবশ্যক, তোমাকে ডিজায়রেবল মনে না হলে বিয়ে করতুম না। তুমি শোওনি তো কোনো মেয়ের সঙ্গে, খোলাখুলি বলো, আমি সবকিছু স্পষ্ট বলি, কোনো হাইড অ্যান্ড সিক নেই।

এই বয়সেই বিয়ে করতে রাজি হলাম ওই কারণেই, কৌমার্যটা তোমাকে সঁপে বিদেশে যাই। তাছাড়া তোমাদের বাড়ির লোকেরা খোঁজ নিয়ে জেনে গেছেন যে আমার বেশিরভাগ সময় কাটত ছাত্র রাজনীতি করে, দেয়ালে পোস্টার মেরে; ভালো রেজাল্ট করতে পারিনি ক্রান্তিকারি রাজনীতির স্বপ্নে, নয়তো ভারতে কোনো মেডিকাল কলেজে সিট পেয়ে যেতাম। এখন কথা বন্ধ করে কাজে নেমে পড়া যাক, ফুলশয্যাকে বক্তৃতার মঞ্চ করে ফেলছ।

চার

মলয় রায়চৌধুরীই অতনুকে শেষ পর্যন্ত ঠেলে দিয়েছিল চৌমাথার দিকে, যাতে ব্যাটা সেখানে পৌঁছে ভ্যাবাচেকা খেয়ে মরে, এবারে কোন দিকে যাবে, কোন রাস্তা বেছে নেবে, বন্ধু তো, দিয়েছে ঠেলে শুকনো কুয়োর ভেতরে। অসীম পোদ্দারের দেয়া পোর্টম্যান্টো ব্যাগের ভেতরে যে গাদা গাদা টাকা ঠাসা আছে, অফিস থেকে গেঁড়িয়ে জমিয়ে রেখেছিল আর সেই টাকায় রে-িবাজি করে বেড়াতো, পুলিসের রেইড পড়তেই মানসী বর্মণের হাতে ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে নিজে নৌকা থেকে ঝাঁপ মেরে পটল তুলেছিল বাঞ্চোৎ। মানসী বর্মণ চাকরি ছেড়ে চলে যাবার আগে সেটা ধরিয়ে দিলে অতনু চক্রবর্তীকে। সহকর্মী বন্ধুদের একের পর জেরার শেষে অতনুর বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো প্রমাণ পেলো না, তখন সেই দিনই, সন্দেহ হওয়াতে অতনু বাড়ি ফিরে ব্যাগটা খুলে দ্যাখে টাকায় ঠাসা, হাজার হাজার টাকা। ব্যাস বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়েছিল, কোথায় যাবে ভেবে পাচ্ছিল না। মলয় রায়চৌধুরী ওকে পাঠিয়ে দিল মানসী বর্মণের কাছে, ক্রান্তির মাংসল ঘূর্ণিতে।

মলয় রায়চৌধুরী এবার অমিতের জীবনকে জড়িয়ে দিল কনকদুর্গার সঙ্গে, যে অমিতের চেয়ে পনেরো বছরের বড়ো। ওরা দুজনে পাটনায় পালাবে তা মলয় রায়চৌধুরী জানে, এখন দেখার যে কাদের খুন করে ওরা পালাবে।

পাঁচ

ডাক্তার মশারির ভেতরে ঢুকে পড়লো, পায়ের ওপর পা চাপিয়ে, মাথার তলায় দুহাত রেখে মলয় রায়চৌধুরীর বই চারটে সম্পর্কে ভারতে লাগলো।

ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস, জলাঞ্জলী, নামগন্ধ ঔরস, চারটে বইতে কোথাও মলয় রায়চৌধুরী এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়নি কেন?

১. মাও সে তুঙ আর হেনরি কিসিঞ্জার এই দুজনের দাঁত বের করা হাসি দেখার জন্যেই কি সাংস্কৃতিক বিপ্লবে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল? কিসিঞ্জার তো ওই ফটো তোলাবার সময়েও ভিয়েতনামে নাপাম বোমা আর কমলাবিষের ধোঁয়ায় মানুষকে পুড়িয়ে মারছিল, মনে নেই?

২. মাও সে তুঙ আর হেনরি কিসিঞ্জার দুজনেই বুঝেছিল দু দেশের বাজারের মালপত্তরের বেচাকেনা দুই দেশের জন্যেই জরুরি। বাজার যতো বাড়বে, ততো জিনিস বিক্রি হবে, ততো চাকরি বাড়বে, ততো দেশ উন্নতি করবে। তাহলে লেলিন কেন আগ বাড়িয়ে বলেছিল, ফ্রিডাম ইন ক্যাপিটালিস্ট সোসাইটি অলওয়েজ রেমাইনস অ্যাবাউট দি সেম অ্যাজ ইট ওয়াজ ইন অ্যানসিয়েন্ট গ্রিক রিপাবলিকস? ছ্যাঃ।

৩. ভারতে নকশাল আন্দোলন ঘটছে জেনে তাকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ বলার সময়ে চীন কেন পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কায় অমন ক্রান্তি ঘটাবার চেষ্টা করেনি?

৪. বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়ের মূর্তির মাথা কেটে কোন ক্রান্তি ঘটাবার চেষ্টা হয়েছিল? ভারতবর্ষ মানে কি শুধু কলকাতা, শুধু পশ্চিমবাংলা? বিদ্যাসাগরের গড়ে দেয়া ভাষায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, রেড বুক, অনুবাদ করার সময়ে মনে ছিল না? সোভিয়েত দেশে বসে রুবল আর ভোদকা খেতে খেতে রুশভাষার বইগুলো বাংলায় অনুবাদ করার সময়ে কেন মনে পড়েনি, ভাষাটা কারা তৈরি করে দিয়ে গেছেন! চটকলের গেটে আর গড়ের মাঠে ভাষণ দেবার সময়ে মনে ছিল না ভাষাটা কারা গড়ে দিয়ে গেছেন?

৫. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে চীন কেন পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল, নিক্সনের চামচাগিরি ছাড়া আর কীই বা বলা যায় একে? এদিকে তো গায়ে পড়ে সবাইকে মানবমুক্তির লেকচার দিতো মাও সে তুং। চৌ এন লাই কি ইয়াহিয়া খানের গণহত্যা আর গণধর্ষণের প্রশংসা করে প্রেমপত্র লেখেনি? তাহলে?

৬. ১৯৭১ সালে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারতে পালিয়ে এসে ভিখিরির মতন রাস্তার দুধারে জীবন কাটিয়েছিল, কতো মেয়ে ধর্ষিত হয়েছিল, তার হিসেব নেই। মাও সে তুঙ আর মাওবাদীরা এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি কেন? চীনের সংবাদপত্রে বাংলাদেশে গণহত্যা আর গণধর্ষণের খবর চেপে যাওয়া হয়েছিল কেন?

৭. আমাকে এই জঙ্গলে মাওবাদীদের ডাক্তার বানিয়েছে মলয় বায়চৌধুরী। এতে আদিবাসীদের কোন উপকারে লাগছি আমি? ইতু গেছে অবুঝমাড়ের জঙ্গলে, সেখানে গিয়ে কোন কাজে লাগছে? তার চেয়ে অমিতের সঙ্গে ঘর বাঁধতে পারতো, সুখী হতো।

৮. ১৯৭০ সালে শীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কেন খুন করা হয়েছিল? মতাদর্শ যে বুদ্ধিকে ভ্রষ্ট করে তা টের পেতে প্রজন্মকে নস্যাৎ করে ফেলতে হয়েছিল কেন?

৯. চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চরিত্র পালটে যাচ্ছে তা বুঝতে এতো দেরি হয়েছিল কেন?

কই মলয় রায়চৌধুরী, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই ভাকপা, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামে, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, অইফব, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, বিসপামা, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই,ভাকপামালে নিই ডেমোক্র্যাসি, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে অরগ্যানাইজিং কমিটি, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে শান্তি পাল, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে নিউ প্রলেতারিয়ান, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে সত্যেন্দ্র সিংহ, সন্তোষ রানা, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে নকশালবাড়ি রউফ, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে জনশক্তি কুরা রঞ্জনা, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে জনশক্তি রণধীর, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে চন্দপুলা রেড্ডি, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে মাধব মুখার্জি, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে কেন্দ্রিয় টিম, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে জনসংবাদ, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে ভাইজি, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে প্রজাশক্তি, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে প্রজাপতিঘটনা, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপামালে প্রতি ঘটনা, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ইউনিটি সেন্টার মালে ডিবি রাও, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই,  সেন্টার মালে আজমের গ্রুপ, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, কপাভারত রঞ্জন চক্রবর্তী, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, লাল ঝা-া দল, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই,  সুসিক, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই,  রিকপাই, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, সিএমপি অরবিন্দাকশন, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ইউনাইটেড ভাকপা মোহিত সেন, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, কামাপা সিপি জন, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, গসপা সৈইফুদ্দিন চৌধুরী, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ওড়িশা কপা অজয় রাউত, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, কপাবিমা দার্জিলিং, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, সিআরএল আই অসীম চ্যাটার্জি, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ত্রিপুরা গণমঞ্চ অজয় বিশ্বাস, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, লাল নিশান দল লেলিনবাদী, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, মার্কসবাদী মঞ্চ আসাম, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, পিআরপিআই সুমন্ত হীরা, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, ভাকপা মাওবাদী মুপ্পলা লক্ষ্মী রাও, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, কলিভামালে রামনাথ, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, কলিভামালে প্রতোকল্পনা, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, কলিভামালে রিভিশানিস্ট, জবাব দাও, জবাব চাই।

কই, মলয় রায়চৌধুরী, জবাব দাও, জবাব চাই।

ছয়

মশারির ভেতরে শুয়ে ডাক্তার স্পষ্ট শুনেতে পাচ্ছিলো ঝিঁঝি-পুরুষরা ডানা কাঁপিয়ে বলে চলেছে, জবাব নাই ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ জবাব নাই ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ জবাব নাই ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ জবাব নাই ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ জবাব নাই ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ জবাব নাই ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ জবাব নাই ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ জবাব নাই ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ জবাব নাই ঝিঁঝিঁঝিঁঝিঁ জবাব নাই…

১৭৮৯ সাল থেকেই তো যুবকেরা যখন মানুষ যুবক থাকে, সেই বয়সে প্রতিষ্ঠানকে বদলাবার জন্যে মতাদর্শের আশ্রয় নিয়ে খুনোখুনি করবেই, তুমি কোন বদলকারীর দলে তাতে কিচ্ছু এসে যায় না। তুমিও তোমার শত্রুর আদলে গড়ে উঠবে। তোমার প্রজন্ম চলে যাবে, তারপর আরেক প্রজন্ম এসে বদলাবার চেষ্টা করবে। অথচ দুই পক্ষই জানে যে পৃথিবীর একটা বালও তুমি ওপড়াতে পারবে না।

বিপ্লব হলো একধরণের বৃত্ত, সুতো দিয়ে তৈরি।

বিপ্লব হলো শাঁখের করাত, দুদিকেই কাটে।

চিন্তার কুয়াশায়, ডাক্তার ঘুমিয়ে পড়লো বুকে দুই হাত রেখে যেমনটা লেলিনের দেহকে মলম মাখিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে, যাতে রুশ দেশের মানুষ, তাঁর পেল্লাই মূর্তিগুলো উপড়ে ফেলে দিলেও, তাঁকে না ভুলে যায়।

মানসী ঈশ্বরে বিশ্বাস করে; বন্দুকের নলের ক্ষমতায় বিশ্বাস করে; একই সঙ্গে দুজন পুরুষকে ভালোবাসায় আর বিশ্বাস করে, এককালে দুজনের সঙ্গে একই দিনে সেক্স করায় বিশ্বাস করতো।

সাত

ফুলশয্যার বিছানায়, ডাক্তারের ডাক, ওকে, শুরু করা যাক।

কাজ হয়ে গেলে স্বামী পাশ ফিরে শোবার তোড়জোড় করছে দেখে মানসী বলল, দাঁড়াও এক্ষুনি ঘুমোতে চললে কেন। পিড়িঁতে বসে তো অনেক সংস্কৃত মন্ত্র আউড়ে ছিলে পুরুতের কথামতো; তারপর আমার শরীরের পিড়িঁতে বসে দেহের মন্তর ভাঁজলে। এবার আমার মন্তর ভাঁজার পালা, তোমার দেহের পিড়িঁতে বসে। তোমার হয়ে গেলেই হলো? আমারও তো হওয়া দরকার, নাকি?

ঠিক আছে, বোসো, বলো কী মন্তর বলতে চাও।

বসি আগে; একি ফসকে যাচ্ছে কেন? মন ভরে গেল আর ব্যাস, তোমার মন অন্য দিকে চলে গেল।

আমি ফসকাচ্ছি নাকি? পিড়িঁতে তো তুমি বসে আছো।

দাঁড়াও, যুত করে বসি, হ্যাঁ, এইবার আমার চোখে চোখ রেখে দ্যাখো।

সক্রিয় হও, নয়তো ফসকাবে।

এখানে যে ফিসফিসিনি গুজগুজুনি ছাত্র রাজনীতি করো, তা বিদেশে গিয়ে করা চলবে না, ফিরে এসে যে দলের ঝা-া চাও দেশে এসে ওড়াবে, ওদেশে নয়।

ফসকে যাচ্ছে, বক্তৃতা দিতে গিয়ে ভুলে যাচ্ছ, এখন সক্রিয় হও, পরে না হয় বক্তৃতা দিও। মনে করো দিকিনি যে তুমি ঘোড়ায় চেপে বেড়াতে যাচ্ছ আর ঘোড়াটা দুলকি চালে হাঁটছে।

ইশশ… দুলকি চাল চাই ওনার, এই নাও রাজধানী এক্সপ্রেসের চাল। কী? হল তো?

কই হয়নি। ওপর থেকে নামো, আমি ট্রাই করি।

না, ওপরে বসে কথাগুলো বললে, তোমার মনে থাকবে নয়তো বিদেশে গিয়ে ভুলে মেরে দেবে কী কী বলেছি, ওদেশে মেমগুলো আদেখলা।

বলো, হেল্প করবো?

না, আমার গায়ে যথেষ্ট জোর আছে, তুমি পিড়িঁ হয়ে চুপ করে থাকো। টগবগ টগবগ, টগবগ, টগবগ, টগবগ, টগবগ, টগবগ, টগবগ, কী? এখন কেমন। এবার ঘোড়াকে ছোটাচ্ছি কিন্তু রেডি স্টেডি গো। আমার সঙ্গে ইয়ার্কি, না? স্থির থাকো, নট নড়ন-চড়ন।

রইলাম।

মারো জোয়ান হেঁইও, জোরসে মারো হেঁইও, সাবাশ জোয়ান হেঁইও, মানসী জড়িয়ে ধরে ডাক্তারকে।

ডাক্তার বলে ওঠে, কী হলো, ও মাঝি তোর হাল শক্ত করে ধর।

ঠিক আছে, আবার মর্নিং শো।

অ্যাজ ইউ প্লিজ।

বিদেশে ঠিক মতন পড়াশুনা কোরো, রাজনীতি করার লোভে কোনো মেয়ের পাল্লায় পোড়ো না যেন, শেষে রোগবালাই হবে, আমি সামলাতে পারব না। রাজনীতি করতে হয় তো কার্ল মার্কসের কবরে গিয়ে প্রার্থনা কোরো যে মেডিকাল পরীক্ষায় যেন ভালো রেজাল্ট হয়, দেশে বউটা একা পড়ে আছে, দেশে ফিরে প্রয়োজন হলে ফিসফাস-রাজনীতি বা দলীয় রাজনীতি যা হয় করব।

যাই তো আগে; সত্যি ওখানে গিয়ে ফলাফল ভালো করতেই হবে, নয়তো বাবার রেখে যাওয়া টাকা নয়ছয় করা হবে, মা তা সহ্য করতে পারবেন না।

প্রেমপত্র লিখো না; প্রেমপত্র পেয়ে পেয়ে ঘেন্না ধরে গেছে। সাদামাটা কথা লিখবে, ফোন করবে।

পিড়িঁর কাজ সমাধা করে ফেলেছ? কাঁপছো দেখছি! আর কিছু বলার আছে?

যাওয়া না পর্যন্ত প্রতিরাতে একবার আমি পিড়িঁ হব, একবার তুমি পিড়িঁ হবে।

একবার কেন?

একবার হল কথার কথা।

ভার্জিনিটি যাচাই করে, একে আরেকের কৌমার্যের সিল ভেঙে, হবু ডাক্তার চলে গেলো লন্ডনের রয়াল কলেজ অফ রেডিওজিতে ডাক্তরি পড়তে।

কোর্স পুরো করে ফেরার আগেই লন্ডনে বসে শুনলো, স্ত্রী মানসী একাকীত্ব কাটাবার, আর শাশুড়ির উঠতে বসতে উপদেশ এড়াবার জন্য চাকরি নিয়ে চলে গেছে পাটনা। শুনে, ডাক্তারের মনে হল, মানসীর কথা না শুনে একাটা বাচ্চা পয়দা করে বা বউকে প্রেগনেন্ট করে বিদেশে গেলে, বউয়ের একাকীত্বের নিদান দিয়ে যেতে পারা যেত। বউ একা কী করে প্রেগনেনসি সামলাবে, ওর অবর্তমানে বাচ্চা হলে, কোলের শিশুকে কে সামলাবে, মাকে কে দেখবে, কচি বয়সের দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে মানসীর কথামতো বাচ্চা মুলতুবি রাখার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়েছিলো।

শাশুড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ হবারই ছিল, দুজনেই বড্ড বেশি কথা কইয়ে।

ডাক্তার কলকাতায় ফিরলো, মানসী কলকাতায় ফিরলো না, করকরে মাইনের এমন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, বলেছিলো মানসী, তুমিই এসো যখন মন কেমন করবে, শরীর ছোঁকছোঁক করবে। দেড় বছরের মাথায় মা মারা গেলেন তবুও মানসীর ফেরার ইচ্ছা হল না, বললো, এই তো বেশ চলছে তুমি তো সপ্তাহে একদিন আসছ, আমিও বড়ো ছুটি পড়লে যাচ্ছি, কারোর তো অসুবিধে হচ্ছে না। মানসীকে ডাক্তার বলে ফেলেছিলো যে সপ্তাহে এসে মন ভরে না, রোজ দুবেলা সেক্স করার ইচ্ছে হয়।

মানসী বলেছিলো, ডাক্তারের থুতনি ধরে, যে ওরও অমন ইচ্ছে হয়; কিন্তু কি আর করা যাবে, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে এমন মাইনের চাকরি পাওয়া যায় না, অফিস কোয়ার্টার দিয়েছে, চাইলে নানা রকম লোন দ্যায়, কতো সুবিধা। ডাক্তার যে রাতটা থাকতো, যতবার পারতো সেক্স করতো দুজনে। সপ্তাহ-শেষে, প্লেনে সন্ধ্যায় পৌঁছে পরের রাতে ট্রেনে যাতায়াত, ক্লান্ত দেহে আনন্দ নেবার মতন আহ্লাদ ভরপুর থাকত না।

একটা রাত আর দিনের জন্য ঢুঁ মারতো, লুকিয়ে, যাতে কেউ না ওকে দেখে ফ্যালে। ইনটারভিউ দেবার সময়ে টেবিলের ওদিকে বসে থাকা তিন মাঝবয়সী সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর মুখ দেখেই মানসী আঁচ করে ফেলেছিল যে এরা যেভাবে তাকাচ্ছে, টেবিলের তলা দিয়ে নিজেদের বিরাট বিরাট অ্যানাকো-া সাপকে ওর দিকে পাঠিয়ে সাপটে জড়িয়ে ধরার জন্য লড়ে মরছে। চাকরিটা পেতে হলে বিয়ে হয়ে গেছে বলা চলবে না, চাকরির দরখাস্তের জায়গাটায় তাই টিক দেননি, এর আগের ইন্টারভিউয়ের অভিজ্ঞতা থেকে। অ্যানাকো-া তিনটে ওর গলা জড়িয়ে ধরে দমবন্ধ করে বলিয়ে নিল যে, বিয়ে করিনি এখনও। অফিসের সকলে জানে মানসী বর্মণ অবিবাহিত। বর লুকিয়ে এসে জমানো ফোঁটাগুলো ফেলে লুকিয়ে চলে যায়, তা কেউ জানে না।

মানসী যখন প্রেগন্যান্ট হলো, তখন অফিসের ননীগোপাল বসু আর তাঁর মুসলমান স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে রটিয়ে দিতে হল যে ননীবাবুর স্ত্রীর জরায়ুর সমস্যার কারণে মানসী ওদের বাচ্চার সারোগেট মা হতে রাজি হয়েছে। প্রেগন্যান্ট হয়েছে শুনে আনন্দে আটখানা আর কাজে অন্যমনস্ক ডক্টর ঘোষ তার হাসপাতালে এক বিপর্যয় ঘটিয়ে বসলো, আর মানসীর নির্দেশমতো কলকাতার বাড়িতে তারা ঝুলিয়ে, মানসী অফিসের রাজনৈতিক কর্মী রসিক পাসোয়ানের সঙ্গে পাটনা স্টেশনে যোগাযোগ করে ডাক্তার পালালো ওয়ারিস আলি গঞ্জের দাতব্য চিকিৎসালয়ে। রসিক পাসোয়ান লোকটা মানসীর অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী, গরমকালেও মাথায় সর্ষের তেল চুপচুপে, অফিসের দেয়া পোশাকেও কলার তেলে চিটচিটে, মুখময় পানিবসন্তের শ্রীছাঁদ, ডান হাতের তর্জনী অর্ধেক কাটা। পরে জেনেছিলো ডাক্তার ঘোষ, আঙুল সে নিজেই অফিসের মেশিনে কাটিয়ে ফেলেছিল, অফিসের কাছ থেকে বীমার টাকা পাবার জন্য, যা ও ক্রান্তির কাজে লাগিয়েছিল।

আট

রায়পুর থেকে নারায়ণপুর যাবার বাসে ইতুকে তুলে দিয়ে অমিত বলে দিয়েছিল, বাস থেকে নেমে সোজা গিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের গেটের কাছাছাছি দাঁড়িয়ে থাকবি; সুশান্ত জেঠুর দেয়া তার মোবাইল থেকে, একটা ছেলেকে ফোন করে দিয়েছি। তুই মিশনের গেটের কাছে পৌঁছে এই নম্বরে একটা মিস কল দিবি। নারায়ণপুরে নেটওয়ার্ক ততো ভালো কাজ করে না। ছেলেটা রেসপন্সড করে বলবে, ওর নাম বীরবল মাড়িয়া। হিরো হন্ডার কালো রঙের স্পেলন্ডার  মোটর সাইকেলে আসবে। ও তোকে নমস্তে ইতুদিদি বললে, কোনো কথা  না বলে পিলিয়নে বসে পড়িস। ও তোকে যেখানে পৌঁছে দেবে, সেখানে তোর সঙ্গে আমার পরিচিতদের দেখা হবে, হয়তো তোর পরিচিতও থাকতে পারে কেউ। চিন্তা করিসনি, মনে রাখিস, সেখানে ঢুকতে যাচ্ছিস সেটাকে প্রশাসনের লোকেরা বলে জংলি পাকিন্তান।

বাস ডিপোয় ইতুর কান্না পায়নি, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। কেঁদে ফেলেছিল অমিত, রুমাল দিয়ে চোখ পুঁছে নিচ্ছিল যাত্রীদের এড়িয়ে। বলেছিল, আর দেখা হবে না জানি, তোকে শেষবার দেখে নিচ্ছি। উত্তরে ইতু বলেছিল, আমি আমার অতীতকে কলকাতা বিমানবন্দরে প্লেনে ওঠার সময়ে কাট অফ করে দিয়েছি, তুইও তাই করে ফ্যাল। সবাইকে ভুলে গিয়ে যা করবার কর, বাবা মায়ের সঙ্গে থাক, থেকেও তাদের ভুলে থাক। গেট রিড অফ অল মেমরিজ।

ডেনিমের ট্রাইজার আর ঢিলোঢালো টপ পরেছিল ইতু, পায়ে জগিং করার কেডস, কাঁধে ওর রাকস্যাক। রায়পুরে দুবোতল মিনারেল ওয়াটার আর বিস্কিটের প্যাকেট নিয়ে নিয়েছে।

যে বাসটায় চেপেছিল, সেটার নাম, ইতুর অবাক লাগল শুনে, নৌকরওয়ালা বাস। কন্টাক্টর টিকিট দিল না কাউকে, স্কুলের অ্যাটেন্ডেসন্স রেজিস্টার হতে প্রত্যেক যাত্রীর কাছে গিয়ে তাদের নামের সামনে ছককাটা ঘরে সই নিয়ে নিলো। মাসের শেষে টাকা নেবে, উপস্থিতি অনুযায়ী।  প্যাসেনজারদের পোস্টিং হয়েছে নতুন জেলা সদর নারায়ণপুরে; তাদের পরিবারকে নিয়ে যায়নি, নারায়ণপুরে ভালো স্কুল কলেজ, সিনেমা হল, মালটিপ্লেক্স কিছুই গড়ে ওঠেনি এখনও। ইতুকে কন্ডাক্টর বলল, দিতে হবে না।

বাস থেকে নেমে হাতে টানা রিকশোয় চেপে নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে বীরবল মাড়িয়াকে মিসড কল দিয়ে অর্জুন গাছের তলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল ইতু।

নমস্তে ইতু দিদি, শুনে কালো মোটর সাইকেলের পিলিয়নে বসে, ইতুর নাকে ছেলেটির যৌবনগ্রন্থির ঝাপটের উগ্র গন্ধ এসে লাগতে প্রায় বমি পেয়ে গেল; উফ ফেরোমন। মুখে কাঁধের থলেটা চাপা দিয়ে সামলালো। কিছুটা যাবার পর বুঝতে পারলো যে এক হাতে ছেলেটির পেট ধরে থাকতে হবে, আর এক হাতে মোটর সাইকেলের হ্যান্ডেল, নয়তো সড়কের যা অবস্থা, নির্ঘাত ছিটকে পড়বে কোনো পাথরে চাকা পড়লেই। ঘামে ভেজা পেটে হাত রেখে ধরতে, ছেলেটি বলল, হ্যাঁ ঠিক করে বসুন, রাস্তা ভালো নয়, এই তো সবে দুটো ব্লক নিয়ে নারায়ণপুর জেলা তৈরি হয়েছে। ইতুর মনে পড়ল, অমিত এই ভাবেই ওর স্কুটারে পেট ধরে বসেছিল, আর নাভিতে আঙুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিয়েছিল।

যুবকটির পেট, বর্ষার ভেড়ার লোমের মতন, বেশ ভিজে, উনিশ-কুড়ি বছর বয়স হবে, গায়ে রঙ মুখের গড়ন দেখে আদিবাসি বলেই মনে হয়। ইতু জিগ্যেস করল, দান্তেশ্বরীর মন্দির পড়বে কি রাস্তায়।

—না দিদি, দান্তেশ্বরী হলো বস্তারের দেবী। নারায়ণপুরে অবুঝমাড়িয়াদের দেবী হলো কাকসার। বৈগারা রাসনাভাকে পুজো করে, আর গোঁড়ারা পুজো করে মেঘনাদকে।

মেঘনাদ! মাইকেলের’ ইতু নিজেকে নিঃশব্দে বলল।

যুবকটি বলল, জানেন, এখানে কেউ আসে না, বেশ দূরে দূরে প্রায় দুশো তিরিশটা গ্রাম আছে, চার কিলোমিটার জঙ্গলে ছড়িয়ে, তিরিশ হাজারের বেশি মানুষ, বেশির ভাগই মাড়িয়া আর গোঁড়, যাদের খোঁজখবর সরকার নেয় না। কেন বলুন তো? হোল ইনডিয়ায় শুধু এইটুকু এলাকার কোনো সার্ভে আজ পর্যন্ত হয়নি। নারায়ণপুর, বিজাপুর আর বস্তার, এই তিন জেলার জঙ্গল এলাকা হলো অবুঝমাড়।

ও আচ্ছা, শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে বলল ইতু।

জানেন, অবুঝমাড়কে ঘিরে রেখেছে কেন্দ্রিয় রিজার্ভ পুলিশ দল আর ক্রান্তিকারিরা। ইতু নিজেকে প্রশ্ন করল, এখানে কেন আসতে চাইলুম? বাড়িতে কি ভাল ছিলুম না? আমি তো অলটারনেটিভ মেডিসিন পড়েছি, অমিতের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে কোথাও সংসার পাততে পারতুম, বস্তিতেই থাকতুম না হয়, অমিত কিছু কাজ তো করত, অন্তত আমার ডিসপেন্সারিতে হেলপার হয়ে? যাকগে, এবার নিজের জন্যে কিছু করব, ক্রান্তিকারিদের চিকিৎসা তো করতে পারব, জঙ্গলে এতো পরিচিত গাছগাছড়া রয়েছে।

বীরবল মাড়িয়া বলল, কিছুক্ষণ থেকে, শ্বাস নিয়ে, অবুঝমাড় এমন ভুতাহা জায়গা যে ক্রান্তিকারিদের শরীরকেও অদৃশ্য ডাইনরা আক্রমণ করে, যতই বন্দুক কামান থাক, কিছুদিনের মধ্যে রোগে ভুগে হাড্ডির চামগাদড় হয়ে যায়। আপানি দেখুন কতোদিন এখানে টিকতে পারেন। জল তো নোংরা, টিকতে হলে সালফি খেয়ে চালাতে হবে।

সালফি?

হ্যাঁ, সালফি হল তাড়ির মতন দেখতে একরকমের মদ। তালগাছ বা খেজুর গাছের মতন দেখতে হয় গাছগুলো, যেমন করে চেঁচে নিয়ে তালের বা খেজুরের রস বের করে, তেমনি করে সালফি বের করতে হয়।

ছায়ায় আধঘণ্টা জিরিয়ে কয়েক ঢোঁক জল খাবার পর, মোটর সাইকেলটা চালাঘরের কাছে রেখে, বীরবল বলল, চলুন আরেকটু এগিয়ে দিই।

মিনিট পনেরো হাঁটার পর, দুটো নীচু চালাঘরের মতন একটা জায়গায় পৌঁছালো ইতু আর বীরবল। উলঙ্গ কিশোর-কিশোরীরা খেলা করছে, রুক্ষ চুল, দেখেই বোঝা যায় বহুদিন, বা হয়তো কখনো ¯œান করেনি। শহরে এই বয়সের মেয়েবা কুঁচকি আর বুক ঢাকা পোশাক পরে; এদের কুঁচকির চুলও দেখা দেয়া আরম্ভ হয়েছে, বুকও উঠে এসেছে, এই বয়সে ইতু বডিস আর জাঙিয়া পরা আরম্ভ করেছিল।

কয়েকজন শিড়েঙ্গে শিথিল-দাবনা পুরুষ বসে আছে, তারাও প্রায় উলঙ্গ, কৌপিনগোছের ন্যাকড়ায় লিঙ্গ ঢাকা। বীরবল বলল, ওরা এগ্রামের নয়, কুরসুনার গিয়ে সালফি খেয়ে এখানে মৌতাত নিচ্ছে। এই অবস্থায় ওরা ভেতরে গেলে ক্রান্তিকারিরা ধরে ফেললে ফাইন করবে।

মানুষ যদি এরকমই থাকতে চায়, তাহলে তাতে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি ছিল না, নিজের সঙ্গে কথা বলছিল ইতু। এই লোকগুলো এখনও বিস্মিত হবার ক্ষমতা রাখে, জীবনকে যথেচ্ছ উপভোগ করতে চায়, পোশাকের পরোয়া নেই, এখনও এরা কলাকৌশলের জাঁতিকলে আটকে পড়েনি; এখনও ভড়ংশূন্য, সরল, স্বাভাবিক; প্রযুক্তির প্রগতিতে এসে যায় না কিছু। সভ্যতা যতো বুড়ো হয়েছে ততো বিমূর্ত আর অবাস্তব হয়ে গেছে শহরের মানুষ, শিকড় থকে ওপড়ানো, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন, যেমন আমি নিজে। মেট্রপুলিশের মানুষ আর জৈবিক হৃদয়ের প্রাণী রইলো না, তার আবেগের স্বাভাবিকতা আর আন্তরিকতা উবে গেছে। বোধহয় এটাই মানুষের নৃবৈজ্ঞানিক ভবিতব্য। সভ্যতা যতো সভ্যতর হয়ে চলেছে ততোই আমরা হয়ে চলেছি জটিল, খারাপ, অনৈতিক, ভয়াবহ।

এই লোকগুলো আনন্দের পরিভাষা তো এরাই তৈরি করবে, নাকি আমি বা ক্রান্তিকারিরা বাইরে থেকে এসে তাকে বোঝাবো কীসে তাদের আনন্দ। সভ্যতা মানুষের যৌবনকে ক্ষইয়ে দিচ্ছে, মানুষ আসলে ভঙ্গুর, ঠুনকো, নশ্বর, তার শরীর অসুস্থ হবেই, ঋতুদের প্রকোপ সামলে চলতে হবে তাকে, সভ্য থাকার কাঁচামাল ফুরিয়ে যাচ্ছে, না খেয়ে, আধপেটা খেয়ে থাকতে হচ্ছে, তার ওপর আবার সন্ত্রাসের আতঙ্ক। কে জানে, আমার কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। দেখি, কী হয়। অন্যদের সুখে আনন্দে সুস্থতায় যদি জীবন কাজে লাগাতে পারি তাহলেই যথেষ্ট, তাহলে অমিতকে ভুলে যেতে পারবো।

গ্রামটার পর পথ ক্রমে ওপর দিকে ওঠা আরম্ভ হলো। দুপাশে চেনা-অচেনা নানা রকমের গাছ, ছায়ায় হাঁটতে ভালো লাগছিল ইতুর। তখনই বীরবল বলল, দিদি আমাকে এখান থেকে ফিরে যেতে হবে, সন্ধ্যা হয়ে এলো। আপনি প্রথমে যে গ্রাম পাবেন, সেখানে অপেক্ষা করবেন, কেউ আপনাকে নিতে আসবে। কিংবা এই সরু পাহাড়ি বনপথ ধরে যদি এগিয়ে যান, একটা বড়ো গ্রাম পাবেন, সেখানে অপেক্ষা করবেন। অন্ধকার হয়ে গেলে কোনো গাছে হাত দেবেন না; সন্ধ্যার পর গাছ আর গাছের ডালপালারা সাপ হয়ে যায়, সবুজ, কালো, হলদে, মোটা রোগা, চিত্তিদার, নানারকম। আপনাকে সাবধানে হাঁটতে হবে। টর্চ এনে থাকলে জ্বালাবেন না, সাপেরা আলোয় বিরক্ত হয়।

—সে কী, তুমি যাবে না? ইতু বুঝতে পারলো যে ও এই ছেলেটির ওপর নির্ভর করেছিল এতক্ষণ, ওর কল্পকাহিনি খাচ্ছিল। এবার থেকে ও একা। কারোর ঘাড়ে চাপার জন্যে তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েনি।

— না, আমি ফিরে যাই, এখানে কেউ আপনার কোনো ক্ষতি করবে না। মাড়িয়া গোঁড়রা জানেই না কাকে ক্ষতি করা বলে। জঙ্গলের ভেতরে শহরের মানুষ পাবেন না; যদি পান তো নিজেকে দূরে দূরে রাখবেন।

ইতু হাত তুলে, ফির মিলুঙ্গি জানিয়ে, এগোলো বনের পথে। বীরবল চলে গেলে, জুতো আর জিনস খুলে, প্যান্টিটা ফেলে দিয়ে, পেচ্ছাপ করে নিলো। ওহ কতক্ষণ চেপে রেখেছিলুম, বলল হলুদ ফুলের চুমকি বসানো ঘন সবুজ ঝোপকে, যে ঝোপটা হয়তো কোনো ভবঘুরে পাখির গু থেকে বৃষ্টির ছাটে দুহাত মেলে জন্মেছিল। টপ খুলে বডিসও ফেলে দিল। সেই ক্লাস এইট থেকে অভ্যাস, বাইরে থেকে বাড়িতে নিজের ঘরে ঢুকে আগে এই দুটো খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া।

বাঁদিকের বুকটা তুলে দেখলো, দ্বিতীয়বার উত্তেজিত হয়ে দাঁত বসিয়ে দিয়েছিল অমিত, তাই ঘামের দারুণ জ্বালা করছিল। একটা ঘৃতকুমারী পাতা ভেঙ্গে, তার শাঁস কুঁচকিতে আর বুকে, গোলাপি জায়গায় লাগিয়ে নিলো।

বনের ভেতরে সম্পূর্ণ উলঙ্গ দাঁড়িয়ে অবর্ণনীয় ভালোলাগা পেয়ে বসল ইতুকে। দুহাত ওপরে তুলে চেঁচিয়ে উঠল, আমি ইতুউউউউউ, আমি ইতান, পৃথিবীর মাটিতে সম্পূর্ণ স্বাধীন। দুদিকে দুহাত মেলে আবার চেঁচালো, আমি ইতুউউউউউউ্… আমি আদি মানবিইইইইই….. আমি ইতু…..আমি ইতু….. আমি ইতুউউউউ..। টের পাওয়া গেল আজকেরটা রিহার্সাল নয়, আসল। বাইরে বেরোবার আর ঢোকবার শাটার গেট দরোজা সব বন্ধ হয়ে গেল দ্রুত, তাক করে বসে গেল বন্দুকধারীরা পুরো বিল্ডিঙের বিভিন্ন ফ্লোরে, সুট-টাই পরা কর্তাদের হন হন গট গট, চেয়ার থেকে মু-ুবার করে হাফ কেরানি আর কেরানিদের কচাল। ঘণ্টাখানেক পরে অলক্লিয়ার ঘন্টি বাজলে জানা যায় ব্যাপারটা। একজন অফিসার, যিনি জোড়াতালি দেয়া নোট পাস করেন এক এক করে, তিনি বাজিয়েছিলেন।

ছেঁড়া জোড়াতালি নোটের কেরানিদের খাঁচার পেছনে ওই অফিসারের কেবিন, যিনি অ্যালার্ম বেল বাজিয়েছিলেন। পাবলিক আর নোটের দালালরা ছেঁড়াপচা নোটের লট দ্যায় কাউন্টারের কেরানিকে, সে নিজের খাতায় কমপিউটারে এনট্রি করে অফিসারকে দেয়। তক্ষুনি বদলযোগ্য হলে অফিসার নোটের ওপর সই তারিখ দিয়ে পাঠায় হাফ-কেরানির কাউন্টারে। সেখানে টোকেন দেখিয়ে নতুন নোট নিয়ে যায় পাবলিক বা নোটের দালালরা।

আপন মনে জোড়াতালি নোট পাস করছিলেন অফিসার। আচমকা একটা নোট হাতে নিয়ে তিনি স্তম্ভিত। নোটটা তিনি নিজেই বছরখানেক আপে ছাপ তারিখ সই দিয়ে পাস করেছিলেন। এটা তো শ্রেডারে শ্রেড হয়ে কাগজের ম- হয়ে যাবার কথা। বাজারে গেল কী ভাবে। তার মানে নিয়ম মেনে নষ্ট করার প্রক্রিয়া অনুসরণ কার হয়নি, মাঝ পথেই মেরে দিয়েছে কেউ; কিন্তু প্রক্রিয়াটা তো এমন যে, কোনো একজনের পক্ষে একাজ করা সম্ভব নয়; নিশ্চয়ই একটা দল কাজ করছে, বাতিল নোট পাঠিয়ে দিচ্ছে বাইরে সার্কুলেশন। কবে থেকে চলেছে কত নোট বাজারে বেরিয়ে গেছে, সার্কুলেশানে। যে লোকটা নোটটা দিয়েছে, ধরতে হবে তাকেই। ভয়ে গলা শুকিয়ে যায় অফিসারের, কপালে বিনবিনিয়ে ঘাম। পেপারওয়েট তুলে সজোরে কাচঢাকা অ্যালার্মবেলের কোটরে মেরে বাজিয়ে দিলেন পাগলা ঘন্টি। খদ্দেরটা নজর রেখেছিল, অফিসার নোটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আলোয় পরখ করছেন দেখেই সে ব্যাটা হাওয়া।

পুলিশে খরব দেয়া হল। ওই নোটটা যে কর্মীশেকলের মাঝ দিয়ে একের পর এক গেছে, তাদের নামঠিকানা যোগাড় করে ঢুঁ মারতে লাগল পুলিশ। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হল। অতনু নিজেকে বলল, মানসী বর্মণ নিশ্চয়ই এই র‌্যাকেটের অংশ নয়, কিন্তু একটা ঢাউস ব্যাগ হুট করে দিয়ে উধাও হয়ে গেলো  কেন!

বাড়ি পৌঁছে খাটের তলা থেকে মানসী বর্মনের দেয়া ব্যাগটা টেনে ধুলো ঝেড়ে, জিপ খুলতেই অতনু অবাক, থ। ঠিক যা অনুমান করেছিল। আগোছালো নোটে ঠাসা, ছোঁড়াফাটা নোটের সঙ্গে বদলে নেয়া হয়েছে বা পিলফারেজ করা হয়েছে। ভেতরে অসীম পোদ্দারের ডায়রি, পাতার পর পাতা মানসী বর্মণকে লেখা প্রেমপত্র, যৌনরোগ বা যৌনস্বেচ্ছারিতা থেকে পাওয়া রোগ আর সারবে না জানিয়েছে শেষ প্রেমপত্রে। ভাগ্যিস মানসী বর্মণ চলে গেছে, নয়তো এই নোটগুলো ওর বাড়িতে যদি পুলিশ পেতো কী কেলেঙ্কারি হতো।

ভোরবেলা, বাড়িতে দরোজায় তালা ঝুলিয়ে ওয়ারিস আলিগঞ্জ যাবার বাস ধরার জন্য বেরিয়ে পড়ে অতনু, এক হাতে টাকাঠাসা ঢাউস ব্যাগ, কাঁধে ঝোলানো থলেতে এক সেট জামা কাপড়।

ওয়ারিস আলিগঞ্জে বাস স্ট্যান্ডে বাঙ্গালি ডাক্টার গরিবোঁকা মাস্টারনি কোথায় থাকেন জিগ্যেস করতে একটা রিকশাঅলা জানায় চলুন বাবু, আমি পৌছে দিচ্ছি, ওনারা তো দেওয়ি দেওতা।

রিকশা থেকে অতনু নামলে রিকশাঅলাটা বলল, ওই যে ডাগডরবাবু রোগী দেখছেন।

এত রোগী? এতা ছোটোখাটো জনসভার মতন, সবাই মাটিতে বসে ওনার কথা শুনছে, বলে ফেলে অতনু।

জি হাঁ, দূর দূর থেকে আসে, ওষুধ দেন, টাকা পয়সা নেন না।

অতনু ঘরের ভেতরে ঢুকতেই ডাক্তার ওর হাতের ব্যাগ আর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, নিশ্চয়ই অতনু চক্রবর্তী, যিনি আমার দুধের বাটি থেকে চুমুক মেরে আমার স্ত্রীর গেলে রাখা দুধ খেয়েছিলেন?

মানসী আক্রান্ত হয়েছিল অরগ্যাজমে, মন্দিরের ভেতরেই ওর শরীরে আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল ঢেউ, অতনুর পাশে দাঁড়িয়ে ঘটে গেল কেঁপে কেঁপে। অতনু নির্ঘাত ভাবছে কালী প্রতিমা ফুল নিলেন না বলে মানসীর অমন প্রতিক্রিয়া; অতনুর সঙ্গে থাকলেই কেন এমন ঘটছে, দুশ্চিন্তায় মানসী, মন্দিরের মতন জায়গাতেও ঘটে গেল। গায়নাক দেখাবে, নাকি স্বামীকে বলবে? কী করেই বা স্বামীকে বলবে যে একজন পরপুরুষের চৌম্বকক্ষেত্র মানসীকে পরপর যৌন আকর্ষণে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে!

অতনু টের পায়নি মানসীর কাঁপুনির উৎস, ও বোধ করছিল এক গোপন আনন্দ, কালী প্রতিমাকে পরাজিত করার আনন্দ, মানসীর দৈববিশ্বাস টলিয়ে দেবার আহ্লাদ। ওর আনন্দ দেখে ছুটন্ত ট্রাকগুলোর চক্ষুস্থির। মানসী অমনভাবে না কাঁপলে, কী এক অচেনা থরথর, বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়ে আসার প্রস্তাব দিত অতনু।

মোটর সাইকেলের পিলিয়ানে বসে অফিসের সহকর্মী অরিন্দম মুখোপাধ্যায়, যে হিউমেন রিসোর্সে কাজ করে, অতনুর সঙ্গে অফিস ফেরতা ওর বাড়িতে এসেছিল দিনকতক  পরে, দুচার ফুঁক চরস খাবার গোপন সদিচ্ছা নিয়ে। পাকানো সিগারেট তামাকে মিশেল দিয়ে টেনে ঘণ্টা দুয়েক এমন একনাগাড় হেসেছিল অরিন্দম যে, অতনুর মনে হচ্ছিল, আগে একবার অপ্রকৃতিস্থ অরিন্দমের আবার বুঝি ঘটল মগজের বেগড়বাঁই, ফের ফিরে যাবে মানসিক চিকিৎসালয়ে।

পাশবালিশ টেনে, আয়েস করে ফুঁক মেরে অরিন্দম বলল, জানেন তো মানসী বর্মণ রিজাইন করে চলে গেছে ওরসলিগঞ্জের গান্ধি আশ্রমে কাজ করার জন্যে?

চলে গেছে? কবে? জানি না তো!

আপনি তো এমন বলছেন যেন আপনার অনুমতি নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল।

হ্যাঁ, খবরটা শুনে ভেতরে  ভেতরে খারাপ লাগল। কবে গেছে?

গত মাসের পনেরো তারিখে; উনি বলেছিলেন, জানাজানি না করতে।

ওয়ারিস আলিগঞ্জ তো মারাত্মক জায়গা। মুসহররা থাকে। বিনোদ মিশ্রর নকশালদের গড়। একজন সুন্দরী আধুনিকা থাকবেন কী করে সেখানে গিয়ে? ওরকম একটা জায়গায় গান্ধি আশ্রম করেটাই বা কী?

আশ্রম পরিচালক ওনার স্বামী।

স্বামী? মানসী তো ডিভোর্সি?

সব বানানো গল্প। লোক দেখানো। ওনার স্বামী এম বি বি এস ডাক্তার। ডাক্তারি করেন আর নিচু জাতের লোকেদের মধ্যে বিপ্লবের প্রচার। বাচ্চাটাও ওনারই। আর গান্ধি আশ্রম বলে কিছুই নেই ওখানে। আছে ডাক্তারখানা। শুনেছি যে মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টারের ক্রান্তিকারি কিষাণ সমিতির অফিস ওটা।

আপনি কী করে এতসব জানলেন?

উনি চলে যাবার পর জানতে পারলুম রসিক পাসওয়ানকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে।

অতনুর মন খারাপ হয়ে গেল শুনে।

মানসী বর্মণের জন্য মন কেমন করে অতনুর; অন্যের স্ত্রীর জন্য মন কেমন। জানা তো ছিল না; যে অন্যের স্ত্রী, কেন জানায়নি মানসী, কেন বুকের দুধ দেখিয়েছিল, কেন তালশাঁসের গন্ধ শুঁকিয়েছিল, কেন কালী মন্দিরে নিয়ে গিয়েছিল রিকশায় পাশে বসিয়ে, কেন তাহলে ব্যাগটা রাখতে দিয়েছিল, ওটা নিয়ে আমি কী করব, মনের গভীরে ফুঁপিয়ে ওঠে ও, অতনু।

অফিসের কর্মীদের মাঝে খবর নেয়াদেয়া হয়, মুসহর ছেলেমেয়েদের অক্ষরজ্ঞান দিতে দেখা গেছে মানসী বর্মণকে, গয়া নওয়াদা আওরঙ্গাবাদ জেহানাবাদের গ্রামে, বন্দুকধারী যুবকেরা থাকে ওর পাহারায়।

বছরখানেক পরে অফিসে একদিন কি হ্যাঙ্গাম, পাগলা ঘন্টি। বিপদ আপদ ডাকাতি সামলাবার জন্য অফিসে নানা জায়গায় অ্যালার্ম ঘন্টির বোতাম লুকানো আছে। কাচের ঢাকনি ভেঙে বোতাম টিপলে সারা অট্টালিকা জুড়ে বাজতে থাকে পাগলা ঘন্টি। ন-মাসে ছ-মাসে একবার করে মহড়া হয়। বহুক্ষণ বাজছিল বলে হ্যাঁ। দ্বারভাঙা কালী বাড়ি যাচ্ছি, তুমি যাবে?

চলুন। ব্যাগটা তুলে নিল অতনু। ভাগ্যিস মোটর সাইকেল আনেনি। মোটর সাইকেলে মানসী কি বসতে চাইতো পেছনে। চাইতো না বোধহয়। মেয়েরা জানে যে ব্রেক কষলেই যে মহিলা পিলিয়ানে বসে তার বুক চালকের পিঠে ধাক্কা খাবে।

রিকশায় ঠেসাঠেসি, দুধের গন্ধ পায় অতনু। রাস্তার এত গর্ত যে ছিটকে পড়তে হবে শক্ত করে ধরে না থাকলে। রাজেন্দ্রনগর, মেছুয়াটুলি, মাখারিয়াকুঁয়া হয়ে অশোক রাজপথে পড়ে। বাঁদিকে গলিতে ঢুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙ্গা বিলডিং, এর ভেতরে গঙ্গার তীরে মন্দির। দ্বারভাঙ্গা বিলডিঙে ঢোকার মুখে পথের দুপাশে চর্মরোগ যৌনরোগের হাসপাতাল-বিভাগ। খুঁটিতে বাঁধা গোরু মোষ।

ছাত্র ইউনিয়ানের সময়ে যে পাম গাছটায় বেঁধে অরবিন্দ অবস্থির মাথায় লোমনাশক লাগানো হয়েছিল, অতনু দেখল, গাছটা এখনও তেমনি ঠায় একা দাঁড়িয়ে, অরবিন্দ অবস্থির স্মৃতি নিয়ে।

অন্ধকারে প্রাচীন মন্দির কালচে ধরেছে দেয়ালে, পায়রা চামচিকে অবাধ, ফুল পচা বেলপাতা শুকনো রেড়ির তেলের গন্ধ। মন্দিরে ঢোকার মুখে অতিগরিব ভিখিরি আর গরিব জুতোরক্ষক। জলভেজা পাথরের ঠা-া মেঝে। সিঁদুরমাখা হাড়িকাঠ, কখনও ছাগবলি হতো। পাকাদাড়ি আদুলগা বুড়োদের প্রায়ান্ধকার জটলা। ঝোঁপতোলা ঘোমটায় বউ।

‘খুব জাগ্রত এই মন্দিরের ঘণ্টা। আপনা থেকে বাজে। রাত্তির আটটায়’, জানায় মানসী। অতনু উত্তর দেয় না। ও তখন দেখছিল, নিরন্তর পরিপূর্ণতায় উপচে পড়া নর্দমা, কুলুঙ্গির মধ্যে শ্যাওলাপোশাক দেবতাদের দুর্বল ভঙ্গি, নিরীহমুখ দেবী-দেবতা, দালানে শুয়ে নিজের কুঁই কুঁই উপলব্ধিকে প্রকাশে মশগুল কুকুর। ‘খুব জাগ্রত, মাথায় জবাফুল রাখার পর যদি পড়ে না যায়, তাহলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়’, মানসী বোঝাল।

আপনার ফুল পড়ে যায়, না থাকে? জিগ্যেস করল অতনু।

পড়ে যাবে কেন! থাকে। একবারও পড়েনি আজ অব্দি।

নিজেকে নিজে অতনু বলছিল, বাচ্চাটার স্বাস্থ্যের জন্য কি মানত করেছিল মানসী বর্মণ? কে জানে। জিগ্যেস করা ঠিক হবে না।

অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, একদা দ্বারভাঙ্গা মহারাজের, এখন করোরই নয়, কালী প্রতিমা। বোধহয় দুধে চিনিতে চান করানো হয় তাই মাথার ওপরে আটকে থাকে ফুল। দর্শনার্থীরা একের পর এক ফুল চাপিয়ে, পুরুতকে টাকা দিয়ে, মনস্কামনা পুরো করার আগাম মিটিয়ে চলে যাচ্ছে। মানসী ব্লাউজ থেকে টাকা বের করে পুরুতকে দিল, হাত জোড় করে দেখে নিল প্রতিমার মাথার ওপর ফুল রয়েছে, পড়েনি, তার মানে ওনার বর ডাক্তার ঘোষ বহাল তবিয়তে আছেন, পুলিশ পেছু নেয়নি।

তুমি চাও না কিছু। দেখ না। হয়তো ঝট করে বড়ো অফিসার হয়ে যাবে।

একটা করকরে নতুন নোট দিল অতনু, পুরুত ফুল চাপালো হাসি মুখে, তক্ষুণি পড়ে গেল ফুলটা। মানসী গম্ভীর, পুরুত গম্ভীর। অতনু আবার একটা করকরে নতুন নোট দিল, পুরুত ঠিক মতন জায়গা বেছে ফুল রাখল যাতে না পড়ে, বেশ কিছুক্ষণ প্রতিমার মাথায় চিনিমাখানো মুকুটে ফুল রেখে সরিয়ে নিল হাত, পড়ে গেল ফুলটা। দর্শকদের গুঞ্জন আরম্ভ হয়ে গেছে অতনুকে ঘিরে। তিনবার চড়ানো যায় জানালো এক ভক্তিমতি বউ। অতনু আবার দিলো নতুন নোট প্যাকেট থেকে বের করে। পুরুতের হাত থরথর। ফুল পড়ে গেল। ভিড় জমতে থাকে অতনুকে ঘিরে। মানসীর কাঁপতে থাকা হাত ধরে বাইরে আসে অতনু, জুতো পরে যে যার, হাঁটে গলিপথ ধরে দু-জনে চুপচাপ।

প্রাঞ্জল রাজপথে পোঁছে যে যার বাড়ি যাওয়াই, কোনও কথা না বলে, উচিত মনে করে। নভেলটি বুক ডিপোর বহুতল বাড়িটার কাছে রিকশায় তুলে দিল মানসীকে। রিকশায় চাপার আগে অব্দি, অতনুর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল মানসী, নিয়ন্ত্রণহীন, এমনকি হ্যালোজেন আলোয় আবছা বেজে উঠছিল পায়ের মল।

দু-বেলা। দাঁড়াও চা বসাই। আগেরবার না খেয়েই চলে গেছিলে। টোস্ট খাবে? চানাচুর? মানসী রান্নাঘরে ঢুকতেই, অতনু টুক করে খেয়ে ফেলল বাটির দুধ। ঠা-া কিন্তু মিষ্টি। সোঁদা আচ্ছন্ন করা গন্ধ, সারা শরীর জুড়ে শিহরণ খেলে যায়।

অনভিপ্রেত আকস্মিকতায় থ, ও মানসী, ‘পাগল, না মাথা খারাপ, ওঃ সত্যি, ওফ, কোন জগতের জীব তুমি? ভেতরের ঘরে চলে যায় মানসী, আর বুঝতে পারে যে সেই অনুভূতিটা আবার ছড়িয়ে পড়ছে দেহে, কেঁপে কেঁপে অরগ্যাজম হয়ে গেল। বিছানায় শুয়ে পড়ল মানসী, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে নাকি নিজের ওপর, কিংবা অন্য ধরণের প্রেমে পড়ে চলেছে স্বামী তো রয়েছেই, তার সঙ্গে সময় সুযোগ পেলেই সঙ্গম করে নিয়েছে, এই যুবক এসে কি ঘটিয়ে চলেছে। গায়নাককে কি জিগ্যেস করবে? নাঃ গায়নাক কী ভাববে! যেমন চলছে চলুক, পরে আবার ঘটলে দেখা যাবে।

অসীম পোদ্দার অতনুদের লম্পট পিকনিকে নৌকো থেকে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করার আগে একটা  ঢাউস ব্যাগ রেখে গেছে মানসীর কাছে, বলেছিল, এটা প্লিজ আপনার কাছে রাখুন, আমি বাইরে যাবো কিছুদিনের জন্য, বন্ধুদের তো জানেনই কাউকে বিশ্বাস করা যায় না।

ব্যাগে তালা দেয়া ছিল না, বলে কৌতুহল মেটাতে মানসী একদিন জিপ খুলে দেখেছিল, একটা ডাইরিতে পেছনের দিকে পাতার পর পাতা মানসী বর্মণকে প্রেমপত্র লিখে গেছে অসীম পোদ্দার, আর সামনে  দিকে লাল কালিতে পাতার পর পাতা লিখে রেখেছে ওঁ রামকৃষ্ণায় নমোঃ, পোর্টম্যান্টো ব্যাগের ভেতরে ডায়েরির সঙ্গে ঠেসে ঠেসে ভরা দোমড়ানো মোচড়ানো অজ¯্র টাকা। নিশ্চয়ই অফিস থেকে চুরি করে রেখেছিল, সুযোগ পেয়ে গছিয়ে গেছে মানসীকে, আত্মহত্যা করার আগে। ব্যাগটা আপাতত অতনুর হাতে ধরিয়ে দেয়া যাক, ওর তো কেউ নেই বাড়িতে, মা মারা গিয়ে অব্দি ঝাড়া হাত পা। মানসী নিজেকে বোঝালো যে অপ্রত্যাশিত অরগ্যাজমের আনন্দ দেবার জন্য অতনুকে তার দাম হিসেবে দিচ্ছি ব্যাগটা; তারপর তো চুপচাপ বরের কাছে চলে যাব, যা করার করবে অতনু, খরচ করুক বা বিলি করুক।

অতনুকে বসিয়ে রেখে, সেজে নেয় মানসী, লাল পাড় গারদ, কপালে বিশাল লাল টিপ, হাতে টাকা ঠাসা আর অসীম পোদ্দারের ডায়েরি রাখা ব্যাগটা এনে রাখে অতনুর পায়ের কাছে, ‘তালশাঁসের গন্ধ পাচ্ছ না’ জানতে চায়।

না. চারিদিকে কেমন দুধ, দুধ গন্ধ। বাচ্চাটা নষ্ট হল আপনার মনখারাপ হয়নি?

এখন জানি আমার পেটে বাচ্চা হতে পারে। তোমার কথা বল। অনেক কানাঘুষো শুনি।

যা শোনেন সবই সত্যি।

সত্যি?

বোঝা গেল অমন সারাসরি সত্যি কথা আশা করেনি মানসী, তাই অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়, ‘আমার এই ব্যাগটা তোমার কাছে রেখে দিও, অ্যাঁ, কিছু দরকারি কাগজপত্র আছে। আমি কিছুদিনের জন্য ওয়ারিসগঞ্জ যাচ্ছি।

ওয়ারিস আলিগঞ্জ? ও তো মারাত্মক জায়গা, মুসহররা থাকে, সৎযুগ মানঝি ঝাড়ুদার, কেয়ারটেকার রাঘবের পেছন পেছন চাবি নিয়ে ঘুরত, ও তো ওখানকার। ইঁদুর পুড়িয়ে খায়।

ইঁদুর পুড়িয়ে তো অনেক দেশেই খয়, চীনে আল থাইল্যান্ডের ভালো রেসিপি আছে ইঁদুর রান্নার, লোকে থাই ফুড বলতে অজ্ঞান, দেখেছো তো। ওতে আবার খারাপ কিসের? আসলে ওরা একেবারে একঘরে হয়ে গেছে উঁচু জাতের লোকগুলোর চাপে। কুচ্ছিত অবস্থা।

ওরা তো বিয়ে করে আর ছাড়ে। করেই না অনেক সময়ে, এমনিই থাকে। সৎযুগ মানঝির কতগুলো ছেলেমেয়ে ও নিজেই জানে না। কিন্তু আপনি অমন একটা জায়গায় যাচ্ছেনই বা কেন?

আমার নিকটাত্মীয় ওখানকার গান্ধি আশ্রমে মুসহরদের উন্নতির জন্য কাজ করেন।

তাই বুঝি?

মানসী : (বিস্ময় আর শ্রদ্ধা) কত কথা বলতে পারো, সত্যি।

অতনু : (উঠে দাঁড়ায়। দরোজার দিকে এগোয়) কথায় আর কাজে মিল ঘটে গেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না।

মানসী (উঠে দাঁড়ায়। অতনুর হাত নিজের দুহাতে নিয়ে) আবার এসো, অ্যাঁ, আসবে তো? চা কফি কিচ্ছু খাওয়ালুম না তোমায়।

অতনু : (ম্লান হাসে। মাস ছয়েক আগে হলে মানসীর স্পর্শে বজ্রপাত ঘটে যেত তার ¯œায়ূকেন্দ্রে)।

অতনু চক্রবর্তী চলে যাবার পর তার দেহের গন্ধ ঘরের ভেতর উড়ে বেড়াচ্ছিল। মানসী বর্মণ টের পেলো তার অরগ্যাজমের অনুভূতি আরম্ভ হয়েছে। দৌড়ে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো, চোখ বুজে স্বামীর মুখ মনে আনার চেষ্টা করা সত্ত্বেও অতনুর মুখ ভেসে উঠতে লাগল। দেহ কেঁপে উঠল কয়েকবার, সত্যি অরগ্যাজম ঘটে গেল, জীবনে প্রথমবার, কেবল একজন পুরুষের দেহের গন্ধের প্রতিক্রিয়ায়, তা কি এই জন্য যে লোকটা দুশ্চরিত্র বলে প্রচারিত, আর মানসী তার লাম্পট্যের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণে আক্রান্ত হলো। প্রেগনেন্ট তো ছিলই, অতনুকে শোবার ঘরে ডাক দিয়ে তার সঙ্গে একবার শুয়ে দেখা যেতো হয়তো। শুলে ফিসফিসিয়ে জীবনের প্রকৃত অবস্থা বলা যেত ওকে, বিশ্বাস করতে অসুবিধা হতো না বলেই মনে হয়, তরল চরিত্রের যুবকদের কাছে বিশ্বাস জিনিসটা তেমন গুরুত্ব রাখে না। অফিসের শ্যামলী কর্মকার বলে, যৌনতা বাদ দিলে লম্পটদের চরিত্র আদারওয়াইজ ভালো হয়।

ভ্রুণটা নির্দিষ্ট সময়ের আগে ভূমিষ্ঠ হলে, আর নষ্ট বলে প্রচারিত হবার পর, মানসী ডেকে পাঠালো অতনু চক্রবর্তীকে।

সন্ধ্যাবেলা মানসী বর্মণের ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজিয়ে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে অপেক্ষার পর ফিরে যাবে কিনা ভাবছিল অতনু, দরোজা খুলতেই ধুপকাঠির গন্ধ আর মানসী, রোগাটে, চুলে ববছাঁট, ফ্রিলদেয়া হলুদ ব্লাউজ, তাঁতের ফিকে হলুদ শাড়ি। কই, দুঃখকষ্টের ছাপ, অফিসের বন্ধুরা বলেছিল, পেল না অতনু, চেহারায়, ঘরের আসবাবে।

আরে, অতনু

আমি ভাবলুম, এখনও ওপরতলার আগরওয়ালের নেকনজর এড়াতে খুলতে চাইছেন না।

ও ব্যাটা বিদেয় হয়েছে এই বিলডিং থেকে। পুজো করছিলুম, তাই দেরি হল।

পুজো? আপনি পুজো করেন বুঝি? জানতুম না।

কেন? ঠাকুর দেবতা মানো না? বোসো না, দাঁড়িয়ে রইলে কেন?

মা মারা যারার পর ঠাকুর দেবতাদের তোরঙ্গে বন্দি করে রেখেছি। একদিন গিয়ে গঙ্গা ব্রিজ থেকে বিসর্জন দেবো।

ছিঃ অমন বলে না। কত বিপজ্জনক চাকরি, কখন কী হয় তার ঠিক আছে। ভগবানে বিশ্বাস রাখতে হয়।

এসব কী এখানে?

মানসীর ড্রইংরুমে সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ছিল তুলো সাইকেল রিকশার ভেঁপুর মতন লাগানো রবারের হর্ন কাচের গোল বালবে, স্টেনলেস স্টিলের বাটিতে কয়েক চামচ দুধ, গোলাপি হাতলের ডিম্বাকার আয়না। মানসী বর্মণের দপ করে রং পালটানো মুখশ্রী দেখে  অতনু টের পেল প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি। শাড়ির আঁচল সরায় মানসী। দুই বৃন্তকে ঘিরে ব্লাউজে ছড়িয়ে পড়া দুধের ভিজে ছোপ দেখে অতনু নির্বাক। দেখিয়ে, মানসীর মনে হল, এর আগে অতনু এসে গন্ধের টোপ ফেলে চলে গিয়েছিল, তার পাল্টা টোপ ভিজে বুকের গন্ধ।

কী করি, ডাক্তার বলেছে পাম্প করে বের করে দিতে, নইলে ক্যানসার হতে পারে, বলল মানসী। নিজেকে নিঃশব্দে বলল, আমার বর যদি এখন আসতো তাহলে তাকেই বলতুম মুখ দিয়ে টেনে বের করে দাও।

রোজ পাম্প করতে হয়?

মানসী :(সোফায় বসতে বসতে) আসুন না, ওখানটায় বসুন, জানলা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া আসে। ধ্যাৎ, আপনি আপনি বলতে পারছি না। তোমাকে তুমিই বলছি। তুমি তো বেশ ছোটো আমার চেয়ে, তাই না? (ঘাম না থাকা সত্ত্বেও আঁচল দিয়ে কপাল পুঁছে) তুমি তো কোথাও যাও না, কারোর সঙ্গে মেশো না বলে বদনাম। উন্নাসিক, না। কৌতূহল হল বুঝি। ইউনিয়ন এমন পাকিয়ে ফেলেছে ব্যাপারটা…।

অতনু : (মানসীর পাশে ধপ করে বসে, পকেট থেকে পারফিউম বের করে এগিয়ে দ্যায়: মানসী হাতে নিয়ে দ্যাখে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে) পুরো ঘটনাটা কেমন অবিশ্বাস্য। ননীদার বিয়ে তো রূপকথার গল্প, তারপর আপনার এই দুঃসাহসী কাজ।

মানসী : (মৃদু হাসি ঠোঁটে খেলিয়ে, মাথা নাড়িয়ে আলগা খোঁপার ঢল পড়ে যেতে দ্যায় কাঁধে-পিঠে) ও বাবা, বেশ গুছিয়ে কথা বলতে জানো। (পারফিউমের ঢাকনি খুলে বাতাসে ¯েপ্র করে) আর কী হবে এসবে। আমার গা থেকেই এখন মৃগনাভির গন্ধ বেরোয় (ডান হাতের তর্জনী রাখে বুকের ওপর)।

অতনু : (ঝুঁকে পড়ে প্রায় বুকের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে  শোঁকে) হ্যাঁ, সত্যি তালশাঁসের মতন গন্ধ।

মানসী : (অতনু কাছাকাছি চলে এলো আমায় বুক ঢিপঢিপ লুকোতে, অতনুর চুলে আঙুল বুলিয়ে) দূর বোকা। তালশাঁসে কি মুগনাভির গন্ধ হয়। মাস্ক পারফিউমের নাম শোনোনি?

অতনু : (আচমকা উদাসীন) কে জানে, গন্ধটা পেলে টের পাবো। কিন্তু আপনি এত বড়ো ঝুঁকি নিলেন যে? কিছু যদি হয়? যদি কমপ্লিকেশন হয়।

মানসী : (খর¯্রােতা ভঙ্গীতে) কীইইই বা হবে। বরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি না হলে আমার ছেলেমেয়ে ক্লাস ফোর ফাইভে পড়ত এখন (চিন্তিত ভ্রুযুগল)।

অতনু : (মুখ ফসকে অথচ মানসীর দৃষ্টির গভীর তাকিয়ে) ছাড়লেন কেন? সবাই বলে আপনিই তালাক দিয়েছেন।

মানসী : (গম্ভীর) হ্যাঁ আমিই ছেড়েছিলুম (ক্ষুব্ধ) হিজড়ে ছিল লোকাটা।

অতনু : (বিস্মিত) হিজড়ে? হিজড়েরা বিয়ে করে  নাকি?

মানসী : (পরাজিত হাসি) সে  হিজড়ে হতে যাবে কেন? ছোটোবেলায় অসুখ বিসুখ হয়েছিল কিছু, তাইতো অ্যালিগোম্পারমিয়া হয়। ডাক্তার দেখায়নি। অ্যাজোম্পারমিয়া হয়ে গিয়েছি। (উষ্মা ফুটে ওঠে) অমন বর থাকাও যা, না থাকাও তা। পোকাই নেই তো ডিম ফোটাবে কী করে?

অতনু : তাতে কী হয়েছে? এখন যেমন করলেন তখনও চুপিচুপি কারোর স্পার্ম নিয়ে নিতেন।

মানসী (অবাক) কী বলছ কি তুমি। এখন ব্যাপারটা আলাদা। বর থাকতে ওসব করে কখনও কোনো বউ? ঢি ঢি পড়ে যেত। কেলেংকারির একশেষ। বরও মেনে নেবে কেন? এখন যা করছি তাতে কত গর্ব বলো ইউনিয়ানের। টাইম অফ ইনডিয়াতে বাংলা অ্যাকাডেমির জীবনময় দত্ত আমাকে নিয়ে ফিচার লিখেছেন, তা জানো?

অতনু : ছাড়াছাড়ির পর আবার বিয়ে করতে পারতেন।

মানসী : কুমারী মেয়েরাই বসে রয়েছে, বিয়ে হয় না, ডিভোর্সিকে কে বিয়ে করবে?

অতনু : কেন? আমি।

মানসী : (অতনুর চোখে চোখ রেখে কিছুক্ষণ হতবাক) তুমি? পাগল নাকি? ভেবেচিন্তে বলছ? আগে বলোনি তো কখনও! ভালো করে কথাই বলতে না। বেশি পড়াশুনা করছ বলে একটা ভয়-ভয় ভাবে ছিল। তোমার মা কেন মেনে নেবেন?

অতনু : ভেবেচিন্তে বলছি না। আবেগেও বলছি না। মাও মেনে নেবে না জানি। কিছুকাল আগে হলে আমিও মেনে নিতুম না। কীই বা এসে যায় তাতেও! কিছুই মানামানির দরকার হয় না মানুষের মতন থাকতে গেলে। জানেন প্রেম মায়া মমতা ভালোবাসা শ্রদ্ধা লোভ সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। মুহূর্তটা ধরুন, ফুরিয়ে গেলে ছেড়ে দিন।

নয়

হাসপাতালে এম আর আই স্ক্যান করার জন্য একজন বয়স্ক  রোগীকে শুইয়ে টেকনিশয়ানকে নির্দেশ দিচ্ছিলো ডক্টর ঘোষ, তখনই বুড়ো ওয়ার্ডবয় গোপাল নস্কর পাশের ঘরে নিয়ে যাবার বদলে একটা খালি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ঢোকে, আর এম আর আই মেশিনের ম্যাগনেটিক ফিল্ডের প্রচ- আকষর্ণে সিলিন্ডারসুদ্ধু ওয়ার্ড বয়টা রোগীকে নিয়ে বাজপাখির ছোঁ-মারার মতন করে সেঁদিয়ে গেলো মিশিনের ভেতরে, রোগী তক্ষুনি মারা যায়। ভ্যাবাচাকা খেয়ে টেকনিশিয়ানটা পালালো।

মেশিনের কোয়েঞ্চিং সুইচ অফ করে ম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিঅ্যাকটিভেট করার বদলে রোগী আর ওয়ার্ড বয়কে বের করার চেষ্টা করে ডক্টর ঘোষ, কিন্তু পারে না, সুইচও নেভাতে পারে না। অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু ঘটানোর জন্য গ্রেপ্তার হয়ে একদিন হাজতে থাকার পর, পাটনায়  পালিয়ে গিয়ে মানসীর  পরামর্শে, রসিক পাসোয়ানের সাহায্যে গা ঢাকা দেয় ওয়ারিস আলিগঞ্জে। এককালে ছাত্র রাজনীতি করিয়ে ডাক্তার উন্নীত হয়ে গেল ক্রান্তিকারির রাজনীতিতে, যে রাস্তায় যাবার গোপন ইচ্ছে ছিল অনেককাল ধরেই ছিল।

না পালালেই তো হতো। পরে মনে হয়েছে ডাক্তরের, হয়তো অতিবুদ্ধিমতী সুন্দরী মানসী ওইভাবেই তাকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিলো। টেকনিশিয়ান প্রশান্ত সরখেল গ্রেপ্তার হয়েছিল, পুলিশ হাজতে ছিল চোদ্দো দিন, মিশিনটা ডিফেকটিভ ছিল বলে হাসপাতালের কর্মী ইউনিয়ন দাবি করে পালটা মামলা করার ফলে কেস ঝুলে আছে সেই থেকে। ডাক্তারও না হয় ঝুলেই রইতো, মানসীকে বাধ্য করতো কলকাতায় ট্রান্সফার নিয়ে সঙ্গে থাকতে। ভয় ছিল যে পুলিশ শেষে বাড়িতে ঢুঁ মারলে বিপ্লবের বইপত্র দেখে অন্য মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে পারত, হয়তো আগে থেকেই নজর রেখে থাকবে, তার চেয়ে কাগজপত্র জ্বালিয়ে গা ঢাকা দেওয়াই উচিত, ভেবেছিল ডাক্তার।

মানসীর বাচ্চাটা নির্দিষ্ট দিনের আগেই, জটিলতার কারণে হাসপাতালে মারা গেল, জানিয়েছিল মানসী, যা আজও বিশ্বাস করে না ডাক্তার, হয়তো কোথাও কারোর জিম্মায় দিয়ে রেখেছে, যাতে বাচ্চার ঝক্কি পোয়াতে না হয়।

অফিসের কর্মীরা সুযোগ খুঁজছিল ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সংঘর্ষের, মানসীকে মেটাররিটি লিভ না দেয়ায়, যেহেতু অফিসের রেকর্ডে মানসীর বিয়ে হয়নি, অফিসের অনুমতি না নিয়ে সারোগেট মাদার  হতে রাজি হয়েছে, আর যেহেতু বাচ্চাটা তার নয়, হরতাল চলল বেশ কয়েকদিন।

হরতালের সুযোগ বিয়ে নারী নারকটিক গ্যাঙের সদস্যরা নানা জায়গায় ম্যাটাডর ভ্যান হাকলো কিসিম কিসিম কচি আধপাকা-পাকা যুবতীদের দেহরঙ্গের খেলা খেলতে, কখনও বা গঙ্গার বুকে পালতোলা নৌকার ছইয়ের পুল্লকুসুমিত জোছনায়।

অতনু চক্রবর্তীকে যে কিনা অফিসে মানসীর পরের ব্যাচের, সে যখন অফিসের কাজে ট্যুরে মিজোরাম যাচ্ছিল, তাকে একটা পছন্দের পারফিউম আনতে বলেছিল মানসী বর্মণ। হরতালের তাঁবুতে মানসীর বাড়ি যাবার পথনির্দেশ যোগাড় করে, পৌঁছে অতনু কলিং বেল টিপতে, কয়েক সেকেন্ডে ফাঁক হয় চেনবাঁধা দরোজা। টাঙাইল শাড়িতে মানসী বর্মণ, উদাসীন বহিরাবয়ব, সর্বতোমুখী পরিব্রাজক চাউনি, নিঃশব্দ উলুধ্বনির বলয়ে ঘেরা উচ্চারণ উম্মুখ শরীর। দরোজা খুলে মানসী, ‘আরে আপনি; চিনতে পারিনি প্রথমটা, অনেকদিন দেখিনি তো, আসুন না ভেতরে আসুন না, বারমহল আর খাসমহল আমার এই দুঘরের ফ্ল্যাট। ওপরের ফ্ল্যাটে আগরওয়াল সায়েব থাকেন, বড় ছ্যাঁচড়া, তাই চেন লাগিয়ে রাখি।’

অতনু আঁচ করেছিল অনেক লোকজন থাকবে মানসী বর্মণের বাসায়, তার সমর্থনে হরতাল হচ্ছে যখন, থাকবে ধর্মঘটের রেশ, একাধজন নেতা সাঙ্গপাঙ্গ সুদ্ধু। পুরো ঘরটা আসবাব কার্পেট কিউরিওতে ঠাসা, সামলে চলাফেরার পরিসর। কোনোও অজানা প্রতিপক্ষের দুঃখ ছেয়ে আছে যেন।

শুকনো পাতার ওপর থেকে পোশাক তুলতে গিয়ে ইতু দেখলো, একটা কাঠবেড়ালি নতজানু হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ইতু, নগ্ন, শুকনো পাতার ওপরে উবু হয়ে বসে কাঠবিড়ালিটাকে বলল, সেতু বাঁধতে এসে থাকলে ভুল করছিস, সব সেতু ভেঙ্গে চলে এসেছি। কাঠবিড়ালিটা পালিয়ে গেল, পোশাক আর জুতো পরে নিলো, কাঁধে ঝোলা এগোলো বনপথে।

ঘন্টাাখানেক চলার পর, সন্ধ্যা নেমে আসায়, অজানা এক গাছের গুঁড়ির কাছে, ছায়ায়, জুতো খুলে, বসে পড়েছিল ইতু, বুকের ভেতরে বাজতে থাকা ভীতির দামামা দূর থেকে কানের ভেতরে ঢুকে আসছিল। ওপর থেকে কয়েকটা ফুল ঝরঝর করে ঝরে পড়তে চমকে উঠেছিল; তারপর টের পেলো যে এটা মহুয়ার গাছ; তাইতো অমন গন্ধ বেরুচ্ছিল। মহুয়া ফুলের গন্ধে যদি ভাল্লুক আসে, তাহলে? কোথায় যেতে হবে সুস্পষ্ট বলে দেয়নি অমিত, ওকে ওর ক্রান্তিকারি মা-বাপ যেমনটা বুঝিয়েছিল, ও সেটাই বলেছে, বলেছিল হাঁটতে থেকো যতোটা পারো, পরিচিত কাউকে ঠিকই পেয়ে যাবে। তন্দ্রা এসে গিয়েছিল ইতুর, গাছে ঠেসান দিয়ে ঢুলতে লাগল। সারাদিনের রোদের আমেজে বুঁদ গাছের পাতাগুলো আবসাদে ঝিমিয়ে।

ঘুম ভাঙতে, দেখল অন্ধকার, আজকে বোধহয় চাঁদ ওঠার রাত নয়। জুতো পরে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে অন্ধকারে গাছ ডান হাত ঠেকাতেই মনে হলো সাপের গায়ে হাত দিয়ে ফেলেছে, নরম মাংসল, যেন ভিজে ভিজে তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিলো। কী করবে? গাছগুলো রাতে সাপের আকার নিয়ে নিচ্ছে! বিশ্বাস করি না, অথচ বিশ্বাস করে ফেলেছি, ভয়ে। এককালে অমিতকে ভিতু বলে কতো ডাঁট ফটকার দিয়েছি। কেউ এলে তাকে দেখতেও তো পাবে না জঙ্গলের অন্ধকারে। হয়তো বিভ্রম, মনে করে, বাঁ হাত বাড়িয়ে গাছ অনুমান করে হাত বাড়াতে, ঠা-া সাপের গায়ে হাত ঠেকল, নরম। সাপের ভয়ে ইতুর বুকের ভেতরের ইঁদুরগুলো দাপাদাপি আরম্ভ করে দিয়েছিল। ইতু বুঝতে পারছিল ওর অস্তিত্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, সাপের আকার পাওয়া গাছগাছালির আতঙ্ক।

হঠাৎ ইতুর চোখের ওপর সরু নিয়নের আলোর মতন রশ্মি পড়তে, চোখ ধাঁধিয়ে গেল, বুকের দামামা আরও জোরে বাজা আরম্ভ হলো। কোনো ময়ালের চোখ নয়তো? আরও তিনটে টর্চ জ্বলতে, ইতু আবছা দেখলো, ওর চারপাশে জলপাই রঙের উর্দিতে চারজন যুবক ও একজন যুবতী। সকলের কাঁধে বন্দুক বা রাইফেল, কে জানে কী, দেখেনি তো কখনও। আমাকেও ঝোলাতে হবে নাকি! এই উদ্দেশ্যে তো আসিনি, আদিবাসীদের চিকিৎসা করতে এসেছি।

—ডক্টর ঘোষ? ওয়েলকাম। একজন যুবক বলল।

ইতুর মুখ দিয়ে বেরোলো, থ্যাঙ্কস, ম্যায় বহুত ডরি হুই থি।

যুবতী বলল, জানতি হুঁ, আপ সো গয়ে থে দেখকর আপকো নিন্দ সে নহিঁ জগায়া। আপ জব আপনা নাম লেকর চিল্লায়েঁ, তভি সে হমলোগ আপকে সাথ হ্যাঁয়।

ওর উলঙ্গ চিৎকার এরা দেখেছে তাহলে! দেখুকগে, কীই বা এসে যায়।

যুবতী বলল, ওর নাম সোনারি, বলল, আপ হম লোগোঁকে বিচ মেঁ রহিয়ে, ইতুকে ঘিরে ওরা হাঁটা আরম্ভ করল, অন্ধকারে টর্চ না জ্বেলে। বনপথের সহযাত্রীদের ঘেরাটোপে বোধহয় আরও ঘণ্টা দেড়েক হেঁটেছিল ইতু।

তখনই অন্ধকারকে হুশিয়ারি দিয়ে কয়েকবার হুইসিল বেজে থেমে গেল।

আচমকা গুলি চলার শব্দ আরম্ভ হতে, ইতুকে টেনে শুকনো পাতার উপর নামিয়ে, ওরা ইতুর দেহ ঘিরে শুয়ে পড়ল। ইতু অনুমান করল দুদিন থেকে গুলি চলছে, অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। ওর মুখ মাটির দিকে, জিভেতে ভয়ার্ত আহ্লাদের স্বাদ। শুকনো পাতার ছোঁয়াচে গন্ধে, বাড়ি থেকে পালাবার পর, প্রথম যখন অমিত ওর ক্লিনিকে এসেছিলা, ঠিক ওর শরীরের সম্মোহক গন্ধ।

অসংখ্য গুলি ওদের দিকে এসে ঝাঁঝরা করে দিল সবাইকে, ইতুকেও। কু-লী পাকানো ময়াল সাপের মতন পড়ে রইলো ইতুর আর ওর ক্রান্তিকারি রক্ষীদের মৃতদেহ গুলো।

আপ্যায়নে স্তম্ভিত অতনু, কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল। কেমন স্ত্রী? এই কথাগুলোও নিজের স্বামীকে বলেছে। শহুরে মানুষ দেখে একজন রোগী ভেতর থেকে একটা মোড়া এনে দিতে অতনু দেখল, ডাক্তারও মোড়ায় বসে আছে, টাক পাড়া আরম্ভ হয়েছে, ফর্সা দোহারা চেহারা, টেবিলের ওপর নানা ওষুধের স্ট্রিপ।

অতনু মোড়ায় বসার পর ডাক্তারের বলা পরের কথায় হতবাক হয়ে গেল, ডাক্তার বলল, মানসী চলে এলো দুটো কারণে, প্রথমত বুকের বইতে থাকা দুধ, আর দ্বিতীয়ত আপনার উপস্থিতিতে ওর তিনবার অটোম্যাটিক অরগ্যাজম হয়ে গিয়েছিল; বুক থেকে দুধ গালতে গালতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল, এখানে আসার পর আমিই আমার স্ত্রীর দুধ পান করার সুযোগ পেলুম, রাইট ফ্রম সোর্স। আপনি এসে ভালো করলেন, আমরা তো অনুমান করেছিলাম যে আপনি আরও আগেই আসবেন।

ডাক্তার বলা বজায় রাখলো, মানসী বলেছে যে আপনি ওর নতুন প্রেমিক আর ও ও আপনার উপস্থিতির প্রতি এমনই আকর্ষিত হয়ে পড়েছিল যে চলে আসতে বাধ্য হল। মানসী রোঁদে বেরিয়েছে, ঘণ্টা দুয়েক এসে পড়বে। আপনি ততক্ষণ ভেতরে গিয়ে ¯œানটান করে নিন, লুঙ্গি- পায়জামা কিছু এনছেন, না এনে থাকলে আমারই একটা পরে নিন, ভেতরে বারান্দায় তারে ঝুলছে। ওইটা টাকার ব্যাগ তো? ভালোই করেছেন এনে, বেশ কয়েকজন রোগীর দামি ওষুধ দরকার, অন্য কাজেও লাগবে। অসীম পোদ্দারের প্রেমিকের ডায়েরিটাও ওতে আছে? থাকুক কখনও সময় হলে পড়ব। মানসী তো ফুলশয্যার রাতে ক্লাস এইট থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত যে তিনশো প্রেমপত্র পেয়েছিল সেগুলো পড়ার সুযোগ হয়নি আমার। অনেক কথা বলে ফেললাম। বাংলা বলার সুযোগ পেয়ে ছাড়তে চাইছিলাম না। যান যান, আপনি ভেতরে যান।

দশ

মলয় রায়চৌধুরী ডাক্তার ঘোষকে প্রথমে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জঙ্গলমহলে আদিবাসীদের কুঁড়হা পরবের দিন, গা ঢাকা দেবার আর আদিবাসী রোগীদের সেবার করার জন্য, সেখানে মাওবাদীদের জমায়েতে ভিড়ে গিয়ে তাদের নির্দেশ মতো যাতে কাজ করতে পারে। সেখান থেকে চলে যেতে হলো ওয়ারিস আলিগঞ্জে, গান্ধি আশ্রমের নাম করে পার্টির কাজ করার জন্য রোগীদের মধ্যে বিপ্লবের কথা প্রচারের জন্যে। মানসী বর্মণ আর ডাক্তার দুজনে ভালোই ছিল ওয়ারিস গঞ্জ, কিন্তু মলয় রায়চৌধুরী সেখানে পাটিয়ে দিল অতনু চক্রবর্তীকে, আর ডাক্তারের জীবন ওলোট-পালোট হয়ে গেল। চৈত্রসংক্রান্তির দিন জঙ্গলমহলের আদিবাসীরা মুড়ি বা ছোলার ছাতু আর আম দিয়ে কুঁড়হা উৎসব করে। আগে এই্  পরব কুরমি আর আদিবাসীরা করতো, ক্রমশ ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, উত্তর দিনাজপুর, ঝাড়খ- রাজ্য, বিহার, উড়িষ্যা রাজ্যের জনজাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। কুরমি সম্প্রদায়ের মানুষরা সেই দিন সকালে গোবর গুলে ঘরের সব ঘরগুলোয় আর উঠোনে ন্যাতা দেন যাতে বাড়ি শুদ্ধ হয়ে ওঠে। মহিলারা বাড়ির দোরগোড়ায়, উঠোনে তুলসীমঞ্চে হরিমঞ্চে আলপনা দেন। বাড়ির কর্তা বা বড়ো বউ যিনি উপোসি থাকেন, তিনি চান করে কচি শালপাতার থালাতে আম, মুড়ি বা ছোলার ছাতু আর মহুয়া রেখে পূর্বপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে তুলসীমঞ্চে প্রার্থনা করেন। পুজোর আগে যাবতীয় সমিধ বাড়িতে জড়ো করে রাখতে হয়। পয়লা মাঘ হলো আখান যাত্রা। অনেকে মানত করে পাঁঠা কিংবা মোরগ বলি দেন। পুজোর মাংস গ্রামের সবাইকে ভাগ করে দেয়া হয়। কুরমিরা মহুয়াকে নারী আর আমাকে পুরুষ হিসেবে অনন্তকাল থেকে মান্যতা দিয়ে এসেছে। তারা বলে ‘আম ডাকে বান’ আর ‘মহুয়া ডাকে খরা’। যে বছর আম বেশি হয় সে বছর প্রচুর বৃষ্টি পড়ার কথা। যে বছর মহুয়া বেশি হয় সে বছর বৃষ্টি কম হবার কথা। এখন আমও বেশি হয় না, মহুয়াও বেশি হয় না। বৃষ্টি আর খরা নিজের ইচ্ছেমতন আসে।

ডাক্তার কুরমিদের কুঁড়হা উৎসব মনে রেখেছে, মহুয়া মদ প্রথমবার খেয়ে বাঁধনছেঁড়া মাতলামো করেছিলো।

ডাক্তারের মনে আছে পালামৌয়ের নরসিংহপুর পাথরা গ্রামের কথা, সেখানে গিয়েছিলো মলয় রায়চৌধুরীর প্ররোচনায়, দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত গ্রামে, খরা, প্রচ- গরম, জল নেই, খাবার নেই, মানুষেরা যে গাছের পাতা আর আমের আঁটি খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করে তা কলকাতায় ছাত্র রাজনীতি করার সময়ে ভাবতেও পারিনি। সরকার খিচুড়ি বিলি করতো, যার জন্য ছেলে বুড়ো বউ সবাই হাতের তলায় হাত পেতে খিচুড়ি নিয়ে খেতো, ব্যাস এক হাতা, তার চেয়ে বেশি খিচুড়ি যোগাড় করতে পারত না। সরকার। গ্রামের ডিসপেনসারিতে কোনো ওষুধ ছিল না। সেখানেই শুতো ডাক্তার। অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষেপে গেলো ডাক্তার। মানসীকেও নিজের বিশ্বাসে চুবিয়ে ফেলতে সময় লাগলো না।

তারপর থেকে ডাক্তার কেবল একবেলা খায়, রাতে খায় না কিচ্ছু।

১৯২৯ সালে লেখা মহেন্দ্রনাথ দত্তের কলিকাতার পুরাতন কাহিনী’ বইয়ের কথাগুলো মনে পড়ে গেল ডাক্তার ঘোষের। উনি লিখেছিলেন, ‘তখনকার দিনে অধিকাংশ লোক ভাত খাইত। শহরের লোকেরা দিনে আড়াই পোয়া চালের ভাত, রাত্রে আধসের চাল ও তদোপযুক্ত তরকারি। অনেক লোকের বাড়িতে গোরু ছিল এইজন্য দুধও পাওয়া যাইত। না হইলে গয়লাদের বাড়ি হইতে দুধ আসিত, সেও সস্তা। কলকাতার দক্ষিণদেশ বা বর্ধমান হইতে আমাদের বাটীতে যখন লোকজন আসিত, তাহারা অধিক পরিমাণে আহার করিত। দুপুরবেলা তিন পোয়া হইতে এক সের চালের ভাত খাইত এবং রাত্রে কিছু কম।

আজ, কেন ওনার মনে হচ্ছে যে অবিচারের বিরোধিতা করতে গিয়ে অবিচারের আশ্রয় নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না। আজ কেন মনে হচ্ছে মানসীকে ভুল পথে এনে মানসীকে ছাড়তে না পেরে নিজের ভেতরে নিজেই হারিয়ে গেছেন।

মনে পড়ে যাচ্ছে, মেক্সিকো অলিম্পিকে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিযোগীদের ব্ল্যাক পাওয়ার স্যালিউট।

মনে পড়ে যাচ্ছে ভিয়েৎনামে ন্যাশনাল লিবারেশান ফ্রন্টের টেট আক্রমণ প্রণালী।

মনে পড়ে যাচ্ছে চেকোসলোভাকিয়ার প্রাগ বসন্তকাল।

মনে পড়ে যাচ্ছে প্যারিসের পথে পথে ১৯৬৮ সালের মে মাসে ছাত্রদের উত্থান।

মনে পড়ে যাচ্ছে ১৯৬৪ সালে কলকাতায় হাংরি আন্দোলনকারীদের হাতে হাতকড়া কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় হাঁটানো।

মনে পড়ে যাচ্ছে ১৯৭১ সালের আগস্টে বরানগরে শয়ে শয়ে যুবহত্যা ঠেলায় গাদাগাদি চাপিয়ে গঙ্গায়।

মনে পড়ে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, প্যালেস্টাইন ভিয়েৎনাম।

মনে পড়ে যাচ্ছে ঈশ্বরের মৃত্যু।

মানসী এখনও ঈশ্বরে বিশ্বাস ছাড়তে পারেনি, জানে অতনু ওর মায়ের দেবী-দেবতাকে থলেতে ভরে গঙ্গার জলে ফেলে দিয়েছিল।

এগারো

কী করছ কী? নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আঃ ছাড়ো

মনে করুন আপনি আমাকে জন্ম দিচ্ছেন, তাই কষ্ট হচ্ছে, মনে করুন, মনে করুন, সেই সময়ের যন্ত্রণা, আপনি কি মনে করেন আমার জন্মাবার কোনো যন্ত্রণা হয়নি, কষ্ট হয়নি?

আর ইউ ম্যাড? কী করছ কী, নামো নামো, আমি তোমার মা, কী করছ কী, অমিত, এত জোরে জড়িয়ে ধোরো না, ছাড়ো ছাড়ো, মুখ সরাও, দাঁতও মাজো না কখনও, নোংরা জানোয়ার কোথাকার।

জানি আপনি আমার মা, কিন্তু জানি না আমার বাবা কে, অতনু না ডাক্তার ঘোষ? দুজনের সঙ্গেই তো শুতেন এক সময়, তাই না? এখন না হয় আমার সঙ্গেই শুলেন।

ছাড়ো, ওফ, ছাড়ো, লুম্পেন একটা।

কেন ছাড়বো, ওনাদের দুজনকে তো আপনার দুধ খাইয়ে ছিলেন, যা আমার প্রাপ্য ছিল।

কী করছ কী?

আপনার দুধ খেতে চেষ্টা করছি।

দুধ থাকে নাকি এই বয়সে, ইউ ইডিয়ট, নেমে পড়ো, ছাড়ো, ছাড়ো, কখন আমার বিছানায় চলে এসেছো। আরে কী করছ কী!

দুধ নেই জানি, তার বদলে আপনার ঘামই খাচ্ছি, গন্ধ খাচ্ছি, আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্ককে গড়ে তুলতে চাইছি। মিষ্টি দুধের বদলে নোনতা ঘাম, আপনার শরীরের জোনাকিদের মুখে পুরে নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে নিতে চাইছি।

পাগল নাকি? বন্ধ করো, ওফ, নাম, নাম আমার ওপর থেকে, নাম, তোকে এখানে আনাই উচিত হয়নি। মুখের ওপর থেকে মুখ সরা।

মারুন চড়। যাক তুইতোকারিতে তো এলেন, এতদিন ছিলাম আপনার সঙ্গে, যেই নিশ্বাস বন্ধ হতে লেগেছে তখন বুঝতে পারলেন যে তুইতোকারি করতে হবে।

অমিত, তুমি জানোয়ারের কাজ বন্ধ করো, ছাড়ো আমায়, ছাড়ো।

ছাড়বো না।

কী করছ, ইউ স্কাউন্ড্রেল, কী করার চেষ্টা করছ?

আপনার তৃতীয় প্রেমিক হবার চেষ্টা করছি। মুখ বন্ধ রাখুন। নিন প্রেম, নিন প্রেম, ক্রান্তি, ক্রান্তি, ক্রান্তি…।

কষ্ট হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে, ব্যথা করছে। বয়স হয়ে গেছে, এই বয়সে হয় না ওসব, গেট ডাউন, ইউ স্কাউন্ড্রেল কী চাই তোমার?

আপনাকে চাই। জানতে চাই, আমার বাবা কে?

তুমি অতনুর ছেলে নও, তুমি ডাক্তারের ছেলে।

হ্যাঁ, কাঁদুন, আমি চাই কষ্ট হোক, নিজের কাছে অপমানিত বোধ করুন, নিজের সম্পর্কে আপনার ঘেন্না ধরে যাক, যেমন আমার নিজের জীবনে ঘেন্না ধরে গেছে। যা চাই তা-ই তো নেবার জন্য আপনার বুকের ওপর চেপেছিলুম। বালিশের তলায় কী খুঁজছেন? সায়লেন্সার- লাগানো রিভলভার? আমার দেয়া টাকায় কিনেছিলেন, এখন আমায় মারার জন্য চালাতে চান, তাই না? সেটা আমি আগেই সরিয়ে রেখেছি, জানি আপনার কাছে আপনি ছাড়া আর কারোর কোনো দাম নেই। ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, শুনেছি, ডাক্তার ঘোষ বলেছেন আমায়, দেখুন ঈশ্বর এখন আপনাকে বাঁচাতে আসছে না। বন্দুকও আপনাকে বাঁচাতে আসছে না। চুলায় যাক আপনার ক্রান্তি, এটা আমার বদলা নেবার ক্রান্তি। আপনি চেঁচাতেও পারবেন না, জানি, আপনার ক্রান্তিকারিরা জড়ো হলে লজ্জায় বেঁচে থাকতে পারবেন না।

কী করলে কী তুমি, ছি ছি ছি ছি।

ওই ছি ছি নিয়ে আমি এতকাল বেঁচে ছিলুম, এবার আপনি আমার সারা জীবনে জড়ো কারা ছিছিক্কার নিয়ে বাঁচুন। খাট থেকে উঠবেন না, চুপ করে শুয়ে থাকুন, নয়তো মরবেন, এই দেখুন সায়লেন্সার লাগানো আপনার ক্রান্তির যন্তর। আমারই দেয়া টাকায় কেনা।

মানসী বর্মণের তেরপলের বাইরে বেরিয়ে অমিত দেখল দূরে অন্ধকারে কনকদুর্গা দাঁড়িয়ে; যন্তরটা মানসী বর্মণের তেরপলের কাছে ফেলে দিলো।

বারো

কনকদুর্গা বললো, অ্যাই অ্যাম প্রেগন্যান্ট উইথ ইওর চাইল্ড, বাট আই ডোন্ট ওয়ান্ট হিম টো গ্রো আপ এ কিলার লাইক মি, উই আর গোইং টু পাটনা, টু গেট লস্ট ইন দি ক্রাউড।

অমিত বলল, ঠিক আছে, ইংরিজি ঝাড়িস নি, ভাল্লাগে না শুনতে, মুখস্থ করতে করতে জান হালকান হয়ে গেছে এই ক্রান্তিকারি ঢকোসলাবাজিতে, টাকার বান্ডিলটা রেখে নিয়েছি; অতনু চক্রবর্তীকে মাথায় নল ঠেকিয়ে উড়িয়ে দিয়েছি। মানসী বর্মণ বেঁচে থাকুক ক্রান্তি করার জন্য, সারা জীবন ভুগুক ছেলেকে অন্যের বাড়িতে ফেলে আসার পাপে, এবার ঘেন্নায় মরে যাবে কেঁদে-কেঁদে, পাগল হয়ে গেলে ভালো হয়। জানাজানি হবার আগে অনেক দূরে চলে যেতে হবে, পাটনায় চলে যাবো, ওখানকার গরিবদের বস্তিগুলো সব আমার জানা।

হ্যাঁ, ঝিয়ের কাজ করে চালাবো যতোদিন পারি, তুইও পারলে সাইকেল রিকশা চালিয়ে রোজগার করিস। আমি তোর চেয়ে পনেরো বছরের বড়ো; পনেরো বছর বয়সে বিয়ে হলে তোর বয়সের ছেলে হতো। কোথাও কেউ জিগ্যাস করলে আমি বলবো তুই আমার ছেলে। তুই তাদের সামনে মা বলে ডাকবি।

কতোবার যে জীবনে নকল মায়ের পাল্লায় পড়তে হবে কে জানে।

চল, পালাবার শর্টকাট আমি জানি।

*************************************************

থিয়েটার, পাঠ-পুনর্পাঠ
সুবন্ত যায়েদ

 

অসুখ-বিসুখের দিন

দীর্ঘমেয়াদী এক অসুখের পর যেদিন আমি প্রথম বাইরে এলাম, দিনটা তখন বিকেলের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিলো। আমি হাঁটছিলাম আমাদের শহরে, প্রশস্ত এক সড়কে। আমি হাঁটছিলাম সূর্যের বিপরীতে, আমার প্রলম্বিত ছায়ার চলাচল দেখতে দেখতে। আমার মনে পড়লো, দিনে দিনে কীভাবে আমি মৃত্যুর মতো গভীরে ডুবে যাচ্ছিলাম। মনের ভেতরে চিরন্তন হয়ে থাকে যে দৃশ্য, আমি তেমন সব দৃশ্য ভুলে যাচ্ছিলাম, আমি ডুবে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাকে কিসে যে ভাসিয়ে দিলো, আমার মনে দৃশ্য ফিরে এলো। তখন আমার মনে হলো, এই দৃশ্যের জন্যই শুধুমাত্র বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু আমি যদি অন্ধ হতাম! আহা, সে আর ভাবতে পারলাম না।

আমার ছায়া ক্রমেই সড়কের কালো পিচে মিলিয়ে যাচ্ছিলো। এভাবে যখন দ্রুতই মিলিয়ে গেলো আর সড়কের কালো নিরন্তর হয়ে উঠলো, তখন ছায়াকে হারিয়ে বড্ড একা লাগলো। সড়ক ও ছায়ার সমান্তরাল আমার দৃষ্টি তখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে গেলে বহুদিন পর চমকাতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু আমি জনবহুল সড়কের এমন জনহীন চেহারা দেখেও চমকালাম না। কিন্তু খুব গোছালো ভাবনা এলো। ভাবনা এলো এই রকম যে, এই বিকেলে আমার ছায়া মিলিয়ে যেতেই সড়ক এমন জনহীন হয়ে গেলো কী করে! নাকি আমার সেই অসুখের দিনগুলোর মতো আমি পুনরায় ডুবে যাচ্ছি করুণ এক নিক্রপলিসে! যে সময়ে আমার চোখে ব্যাকগ্রাউন্ড কোনো দৃশ্য ধরা পড়তো না। অথচ আমি খুব চাইতাম এক গোছা সবুজ পাতার আড়ালে চনমনে এক হরিণের মুখ জেগে উঠুক। কিংবা মধ্যরাতে ঘুমভাঙা শহুরে বালকের মুখের উপরে গুচ্ছ জোনাকি উড়–ক। কিন্তু সেসব কখনো আসে নাই করুণার মতো কিছু দৃশ্য ছাড়া। আর যে অসুখ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে ভেবে শহুরে রাস্তায় দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার চলাচল শুরু হলো, সে চলাচল কি তবে পুরনো সেই অসুখই!

হাহ্, বুকের ভেতর থেকে পুরনো আর নষ্ট হাওয়াটুকু বুঝি আর বেরোয় না। সেই হতাশে কিংবা ঘনায়মান অন্ধকারের সূত্র ধরে, আইল্যান্ডের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণ আর ধূসর দেবদারুর ফাঁক গলিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম অক্টোবরের আকাশে হৈমন্তী রোদ মায়ার মতো আর বয়ে আসছে না এই কারণে যে, সেখানে ঘনকালো মেঘ জমে গেছে। এই সময়ে অমন মেঘ দেখে আমি একটু বিচলিত হলাম। কিংবা মনের ভেতরে ছোট্ট একটা ভয়ের কাঁটার অস্তিত্ব টের পেলাম। সেই কাঁটা কুটকাট করে বিঁধতে শুরু হলে মনে হলো মৃত নগরে আমি এক পৌরাণিক চরিত্র, পুরনো ও জীর্ণ পুঁথির ভেতরে যে নিঃষ্প্রাণ হেঁটে বেড়াচ্ছে।

তখন বিকট শব্দে মেঘে মেঘে গর্জন করে উঠলে আমি সড়ক ছেড়ে নতুন আর ঝকঝকে সব এ্যাপার্টমেন্টের দিকে এগোলাম। এই মুহূর্তে আমার আসলে একটু আশ্রয় চাই। নয়তো মনে হলো, যে বৃষ্টি নামার তাল ধরেছে সেই বৃষ্টিতে আমি ভেসে যাবো হাজার বছরের জীর্ণ পুঁথি থেকে। আমি তাই হন্যে হয়ে একটা এ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুঁজে গেলাম। কিন্তু আমার জন্য কোনো দরজাই সহজ হয়ে এলো না আর আমার কোনো আশ্রয়ও মিললো না। তখন পুনরায় বিকট শব্দে আলো ঝল্কে বৃষ্টি নামলো। আমি দারুণ ভয়ে একটা দরজার ভেতরে যেনো সেঁধিয়ে যেতে থাকলাম। তারপর নিদারুণ এক পতনের শব্দ শুনলাম। মনে হলো গভীর কোনো গুহায় পড়ে গেছি আমি, চারিদিকে নিস্তরঙ্গ অন্ধকার ছাড়া যেখানে আর কোনো দৃশ্য ছিলো না।

পায়ে জোড়ালো ব্যথা টের পেলাম। তখন উঠবো না বলে আরাম করে বসে ব্যাথায় হাত বোলাতে থাকলাম। ততোক্ষণে বোধ হয় মনের কোলাহল কমতে শুরু করেছে আর চোখের আঁধার সয়ে এসেছে। আমি তখন কিছু শব্দ শুনলাম আর দেখলাম বিচিত্র কোনো আলো ঝলকালো। হা, এখানে তবে কিছু প্রাণের উপস্থিতি আছে, ভেবে আমি তুমুল খুশি হয়ে দাঁড়ালাম। তারপর ডানে তাকাতে তাকাতে খানিকটা পেছন দিকে ফিরলাম। দেখলাম অনেক দূরে আর বেশ খানিকটা নিচে একটা মঞ্চে দুই প্রকারের আলো প্রতিফলিত হয়েছে। যেখানে হলুদ আলো প্রতিফলিত হয়েছে সেখানে ধ্যানমগ্ন এক বৃদ্ধ, (দূর থেকে তাই মনে হলো) অপর দিকে নীল আলোর নিচে একদল তরুণ কিংবা তরুণী ভারি পোশাক পরে নৃত্যের মতো দেহভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি বোধ হয় শহরের সবচে বড়ো থিয়েটারে ঢুকে পড়েছি। আর গভীর এক আঁধার ঘনিয়ে আসা বিকেলে যেখানে দ্বিতীয় কোনো দর্শকও জমতে পারে নাই। আহ্ কী আনন্দ! আমার তুমুল করতালি দিতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু সংযত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকলাম। আমি বহুদিন পর কাছ থেকে থিয়েটার দেখবো। আমি দেখবো যে, ছোটো ছোটো মানুষগুলো কিভাবে মিথ্যেমিথ্যি হাতির চরিত্রে অভিনয় করে। আরো দেখবো যে, খেতে পায় না সেও দুশো টাকার চুক্তিতে থিয়েটারে নাম লিখিয়ে প্রতাপশালী রাজার সিন করে। তারপর হঠাৎ চক্রান্তে রাজত্ব হারিয়ে ফের সত্যাসত্য জারেজার হয়ে কাঁদে।

থিয়েটার চলছিলো

তবলা বেজে উঠলো। তরুণ-তরুণীরা হাত ধরাধরি করে ঢেউয়ের মতো কয়েকবার দুলে উঠে আবারো স্থির হয়ে গেলো। তখন করুণ এক বাঁশি সুর করে উঠলে ধ্যানমগ্ন লোকটি অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়ালো আর বললো, আমি ঠিক জানি না যে, আমি আসলেই কখন প্রথম অন্ধ হতে চেয়েছিলাম।

তার কণ্ঠে যেনো কান্না ঝরে পড়লো। তারপর স্থির হয়ে বসলে কালো পর্দা এসে তাকে আড়াল করে দিলো। তখন অন্যপাশে কয়েকটি আলো প্রতিফলিত হলে সেখানকার তরুণ তরুণীরা পুনরায় ঢেউয়ের মতো দুলে উঠলো। তারপর তারা করুণ এক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে বেদনার মতো নৃত্য করে চললো। তখন এপাশে পর্দা উঠে গেলে নতুন দৃশ্য এলো এইরকম…

একদল লোক হুল্লোড় করতে করতে ছুটে এলো। ডাইনে তাকালো বাঁয়ে তাকালো আর চিৎকার দিলো…

আপনি কোথায় হে মহান, আমাদের অন্ধত্বের তালিম দিন। আমরাও অন্ধ হবো।

কয়েক মুহূর্তের নীরবতা নামলো।

তোমরা কেনো অন্ধ হতে চাও?

ঈষৎ অন্ধকার থেকে কথা ভেসে এলে তারা সেদিকে ছুটলো।

আমরা আসলে অন্ধ হতে চাই এই জন্য যে, অন্ধের চোখে সব দৃশ্যই এ্যাব্সট্রাক্ট, আমাদের সরল দৃশ্য আর ভালো লাগে না।

হা, এখনকার বাস্তবতার কাছাকাছি সব দৃশ্যগুলোও ঘিনঘিনে, অস্বস্তিকর।

আবারো খানিকটা নীরবতা নামলো। মঞ্চজুড়ে তখন একক আলো প্রতিফলিত হলো।

অন্ধ লোকটি যাকে তারা মহান বলে ডাকছিলো সে অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, তোমরা অন্ধ হতে পারো, কিন্তু তোমরা কি পেছনের সব দৃশ্য ভুলতে পারো? যদি না পারো, তবে অন্ধত্বের তালিম নিতে এসো না। আর সত্য হলো এটাই যে, পেছনের দৃশ্য ভোলা যায় না।

তবে, আপনিও কি ভোলেন নাই পেছনের সব দৃশ্য?

হা আমি ভুলি নাই, আমার এই অন্ধত্বে কোনো মাহাত্ম্য নাই।

তবু আপনি কেনো অন্ধ হয়ে থাকেন? যদিও আমরা আপনার অন্ধত্বের গল্প জানি না। আমরা শুধু জানি যে, দৃষ্টিমান আপনি হঠাৎ অন্ধত্বের খেতাব পেয়ে গেছেন। এও জানি যে, অন্ধত্বের জন্য আপনার এক সাধনা আছে। তখন আপনার কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একদিন আমাদের মনে হলো, এই সব দৃশ্য তো আর ভালো লাগে না। সরল আর একঘেয়ে। সুতরাং অন্ধত্বই উত্তম, কারণ অন্ধের চোখে সব দৃশ্যই এ্যাব্সট্রাক্ট।

কিন্তু হে বালকেরা (তার বলার ভঙ্গি এমন, যেনো সে অবতার) আমার অন্ধত্বের পেছনে একক অনেক গল্প আছে। যদিও মিছেমিছি, তবু এই অন্ধত্বের পেছনে সেই গল্পরা জেগে আছে, আমাকে সেসব ভুলতে দেয় না।

গল্প পরম্পরা

মঞ্চের পাশে ডিজিটাল পর্দাটা জ্বলে উঠলো। অন্ধ লোকটি আগতদের সে পর্দার দিকে নির্দেশ করলো। পর্দায় দেখা গেলো কিছু দৃশ্য জেগে উঠতে, আর একটা কণ্ঠ, যে কণ্ঠ সেসব গল্পের বর্ণনা দিচ্ছিলো।

তখন আসলে আমার এমনি উন্মাদনার সময় ছিলো, যে সময়ে বিষাক্ত দাঁতের ছোবল খেতে ভালো লাগতো। তারপর এমন একদিন এলো যে, ছোটো ছোটো রোদের ফালি আমার ঘরে ভোর হয়ে ঢুকে গেলো। আর রোদের ফালি আমার জন্য বয়ে আনলো একটি চিঠি। হলুদ খাম কিন্তু কোত্থাও কিছু লেখা নাই বলে খুব অবাক হলাম আর বুঝলাম, এ চিঠি ডাকে আসা নয়।

তারপর চিঠি খুলে দেখলাম একটি মাত্র শব্দ, প্রিয়জন। এসবের কিছুই আমি বুঝলাম না কিন্তু এর মাজেজা বুঝতে চেষ্টা করে গেলাম। তখন আমি ভাবতে ভাবতে চিঠিটা নাকের কাছে ঘনিষ্ট করে ধরলাম, এবং ধরলাম হয়তো এ কারণে যে, চিঠিটা ডাকে আসা নয়। আর ডাকে আসা নয় মানে চিঠিটা প্রেরকের হাতের ছোঁয়ায় ও সান্যিধ্যে ছিলো শেষ অবদি। সুতরাং তার সান্যিধ্যের গন্ধ পেতেই হয়তো নাকের কাছে চিঠিটা ধরলাম। পরিচিত কিংবা অপরিচিত অথবা মেয়েলি একটা গন্ধের প্রতাশা হয়তো করেছিলাম, আদতে পেলাম সাধারণ কাগজের বিশ্রী এক গন্ধ। এই গন্ধের সূত্র ধরে আমার মনে দৃশ্য এলো লোমশ কুৎসিত একটা হাতের, সে হাতে আসলে মানবিক অনুভূতির কোনো টার্ম নাই। তাই আমার ও চিঠি নিয়ে তখন আর ভাবতে ইচ্ছে হলো না।

কিন্তু এভাবে দ্বিতীয় দিন করে তৃতীয় দিন চলে যাবার পরে, ঠিক আগের মতোই ভোরের মতো এক পথ ধরে আমার ঘরে বয়ে এলো দ্বিতীয় চিঠিখানা। এবার আর চিঠিটার গন্ধ না নিয়ে শুধু উল্টে পাল্টে একটু দেখে এই জন্য যে, উপরে প্রেরকের কোনো নাম ঠিকানা আছে কিনা, তারপর আমি চিঠি খুলে ফেললাম। এবার লেখা দেখলাম, ‘তুমি এসো, ভীষণ অন্ধকার দুপুরে, কিংবা বৃষ্টি¯œাত সন্ধ্যায় আমার আকুল মন তোমাকে জড়িয়ে কাঁদবে।’ এবং কী অদ্ভুত, সেদিন ভোর বেলার রোদে বসে এই চিঠিখানার দুটো লাইন পড়ে পড়ে আমি আকুল হয়ে কাঁদলাম। হায় রে মানব মন, কোত্থেকে যে এমন জোয়ার আস্যা ভাসায়া নিবার চায়, আমি নিঃসংকোচ কাঁদলাম। তারপর সেদিনেই আমি গোটা পাঁচেক চিঠি লিখলাম এবং তার পরের দিন হয়তো আরো পাঁচটা চিঠি লিখলাম। কিন্তু চিঠি পাঠাবো আমার কাছে তো তেমন কোনো ঠিকানা নাই, তাই চিঠি লিখলাম আর পাঠ করে নিজেকে শোনালাম। কিন্তু এতে আমার সাময়িক শান্তি হলো মাত্র, ভেতরের অস্থিরতা আর দহন পীড়ন তো কমলো না। বরং জোয়ারের বেলার মতো বেড়ে গেলো জলের মতো তরল আর বুক উপচে পড়তে থাকলো সেসব।

এভাবে আমি রাস্তায় বের হয়ে এলাম আর এলোমেলো এ গলি ও গলিতে হেঁটে বেড়ালাম। আমি হয়তো কিছু খুঁজতে বের হতাম, হয়তো একটি ঠিকানা, যে ঠিকানায় একজন মানুষ থাকে কিংবা অতিমানবীয় কিছু, সে বুঝি আমি আর জানতে পারি না। আমি শুধু জানতে পারি যে, কতো সহজ নিয়মে বেনামি মালিকানার কাছে দখল হয়ে গেলাম। এভাবে আমি শেষ চিঠিটা পেলাম এবং সেদিনও ভোর। মাঝ থেকে সেবার পার হয়েছে আরো দুটো দিন বেশি। কিন্তু সে চিঠিতে দেখি কোনো কালি নাই কিন্তু ব্যবহারে ব্যবহারে সে কাগজ মলিন। এই দেখে আরেকটু অনুসন্ধান চালাবো বলেই হয়তো চিঠিটা আমি চোখে মুখে চেপে ধরে ঘ্রাণ নিলাম। এবার আর পুরনো সেই কুৎসিত গাগুজে গন্ধটা লাগলো না, বরং কোমল এক গন্ধ পেলাম এবং বুঝলাম যে, এই গন্ধ কোনো কালেই আমার চেনা ছিলো না। তখন মলিন কাগজ দেখে মনে হলো, এই কাগজ বোধ হয় খুব দীর্ঘ সময় আগে এমন শুকনো ছিলো না, কারণ ভেজা থেকে সদ্য শুকিয়ে ওঠার চিহ্ন বোঝা যাচ্ছিলো। তখন আমার হঠাৎ মনে হলো সে কথাটা কিন্তু কেনো যে মনে হলো, হয়তো মনে হবার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে ছিলো। আমি তাই জিহ্বা দিয়ে সে কাগজের স্বাদ নিলাম এবং চমকে ওঠার কথা ছিলো আমার, কিন্তু চমকে উঠলাম না। তেমন গাঢ় নয় আর একেবারে কোমলও নয়, এমনি নোন্তা স্বাদ সে চিঠির। তখন আমার মনে হলো যে, তার সাথে আমার অন্তত একটা সুযোগ হলো মিলিত হবার। এই ভেবে আমি আনন্দিত হলাম কিন্তু ভেতরে তো আদতে যাতনা ও দুঃখ, তাই উথলে উঠে কান্না এলো, আর কপোল বেয়ে যাবতীয় নোনা জল চিঠির দিকে গড়িয়ে গেলো। এভাবে তার কান্নার সাথে আমার কান্না মিলিত হলে মনের ভেতরে প্রশান্তির ছায়া বিস্তার করলো। এটা আসলে সামান্য সময়ের জন্যই মনে হলো। আদতে প্রশান্তি বলে কিছুই লাগে নাই আর তাই, মুখে ও মনে নোনতা স্বাদ নিয়ে ভীষণ করুণ রোদের সে সকালে আমি বের হয়ে গেলাম। সেদিন নিজেকে মনে হচ্ছিলো উড়ন্ত এক কীট, সে কীট হয়তো ফড়িংয়ের মতো কিংবা পাখা ছড়ানো উঁইয়ের মতো, আমি সমস্ত সকাল ও বিকেল ধরে রোদে রোদে উড়ে, হয়তো সন্ধ্যা হলে বা রাত নামলে ঘরে এলাম। তারপর মুখগুঁজে পড়ে থাকলাম এ জন্য যে, সারাদিন উড়ে উড়ে পাতলা পাখার ক্ষয় রোগে ধরে ফেলেছে, এবং আগামী সকালের রোদে ডানা মেলবার আগেই হয়তো ঝরে যাবে।

সেদিন আমার সকল চেতনার রাজ্যে ঘুম নেমে এলে, বোধ হয় দ্বিগুণ চেতনা নিয়ে জেগে উঠলাম ঘুমের ভেতরে।  সেই বোধ হয় প্রথম কিনা, আমার যাপন আমার স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে গেলো দিনের মতো আলো হয়ে। আমি দেখলাম যে, নতুন আরেকটি ভোর নেমে এসেছে আমার ঘরে, কিন্তু টুকরো টুকরো হয়ে রোদের ফালি আসে নাই। আসলে সেদিন বোধ হয় লাল আলো হয়ে আকাশে সূর্যই ওঠে নাই। আমার চোখে পড়লো শুধু জটলা পাকানো আন্ধার। কিন্তু যাবতীয় দৃশ্য দেখা যাচ্ছিলো বলে, তিনটা চিঠি পাবার পরে চতুর্থ চিঠিখানা পেলাম আমি স্বপনে। এবারের চিঠিতে কোনো হলুদ খাম নাই, আর তাই হাতে নিয়েই হন্যে হয়ে একটা বার্তা খুঁজে গেলাম। কিন্তু কোথায় আর বার্তা, আমার মন খারাপ হলো। অথচ বার্তা ছিলো, যখন দ্বিতীয়বার চোখ গেলো সেদিকে, দেখলাম ‘অন্ধ কি আর চিঠির মর্ম বোঝে’, তারপর ‘বিদায়’ লেখা উঠে আছে।

হায় হায়, কেমন অবাক করার বিষয় একটা যে, আমাকে অন্ধ বলা হলো। কিন্তু সেটাতে আমার কিচ্ছু মনে হলো না। বরং বিদায় শব্দে, নিদারুণ এক বেদনা আমার চেতনার অবচেতনার সমস্ত জগত ছেয়ে ফেললে আমি ভাবলাম যে, আক্ষরিক অর্থে মিলন না হতেই যে বিদায় এলো, সে বিদায়েও তবে এতোটা দহন থাকতে পারে! এসব ভাবতে ভাবতে কিংবা আদতে সেসব আমি ভাবি নাই, বলা যায় যে নিদারুণ এক যাতনা পেতে পেতে জটলা পাকানো অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকলাম।

তারপর সত্যিই একটা ভোর নামলে আমার ঘরে, টুকরো টুকরো রোদের ফালি দেখতে দেখতে জেগে উঠলাম। আর জেগে উঠেই শুনলাম আমাদের পাড়ার পূরবী মারা গেছে স্বেচ্ছায়, যে পূরবীর সাথে একদিন মাত্র আমার চোখে চোখে যোগাযোগ হয়েছিলো বাস স্টান্ডে, উত্তরপাড়ার রাস্তায়। তখন তার সেই চোখজোড়া আমার মনে পড়লো, যে চোখ দিয়ে সে দীর্ঘক্ষণ আমার দিকে তাকায়ে ছিলো, সে এমন এক সকালে যেদিন বিশাল এক আকাশ ভরে নিঃশব্দে বর্ষার মেঘ জমে এসেছিলো। তবু কেনো যে আমার সেদিন মনে পড়ে নাই, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়।’ কিন্তু তার সে চোখের ভেতরে নিশ্চয় ফুটে উঠেছিলো ঐচ্ছিক সে বিষাদ, যে বিষাদের ভাষায় লেখা থাকে ‘এমন দিনে তারে বলা যায়’। আর তারই সূত্র ধরে, তার মনে কি স্থায়ী মেঘ জমে গিয়েছিলো আর সেই চোখ দিয়েই কি তবে দীর্ঘ রাতের কান্না মিশিয়ে আমার জানালা বরাবর চিঠিগুলো এসেছিলো!

হায় হায়, পূরবী তো পৃথিবীর বাস্তবতা থেকে অতীত হয়ে গেছে আর তার যাবতীয় বেদনা অকরুণভাবে আমাকে দিয়ে গেছে। পূরবী আসলে আমাকে দিয়ে গেছে বেদনার এক সূত্র, সেই সূত্রের নাম ‘অন্ধ’। তাকে নিয়ে যতোবার আমার বেদনাবোধ জেগে ওঠে ততোবার নিজেকে আমার অন্ধ মনে হয়। হায় আফসোস, কেনো যে সত্যিকারের অন্ধ আমি নই!

ডিজিটাল ডিসপ্লেতে আলো নিভে গেলো। অন্ধকার মঞ্চে আলো জ্বলে উঠলো। তখন দেখা গেলো ব্যাকগ্রাউন্ড নৃত্য করছিলো যারা তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে পুরো মঞ্চে। তাদের চোখ ডিসপ্লেতে। আহা, এইসব গল্পের সাথে মৃদু আলোয় ব্যাকগ্রাউন্ড নৃত্য হলে বোধ হয় মন্দ হতো না।

তখন পুনরায় আলো নিভে গেলে ডিজিটাল পর্দাটা জ্বলে উঠলো।

এই রকম গল্প আসলে আমার জীবন থেকে ফুরোবে না। এর পর থেকে যতোবার আমি বেদনার মতো দৃশ্য দেখেছি কিংবা বেদনায় ডুবতে থেকেছি। ততোবার আমি অন্ধ হয়ে যেতে চেয়েছি। এমন হলো একবার যে, আমি জনবহুল পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। ইলশেগুঁড়ি মেজাজে বৃষ্টি হচ্ছিলো, আমি ভিজে যাচ্ছি। কিন্তু আমার ভালো অনুভূতি হচ্ছিলো না। স্যাঁতসেতে পাকা রাস্তায় মানুষের কি নোংরা পদচ্ছাপ, বিশ্রী লাগছিলো। তারপর মোড় ঘুরে সামনে এগোতেই দেখি বিশাল এক জমায়েত। সবার চোখ সেঁটে আছে স্ট্রিট টিভির পর্দায়। আমিও দাঁড়ালাম দশ আঙ্গুলে চুল ঝেড়ে নিয়ে। দেখলাম একজন তরুণ চকচকে ছুরি হাতে লাইভে এসেছে আর সেটা কোনো টিভি টুকে নিয়ে সম্প্রচার করছে। এভাবেই তবে মানুষের রক্তে বিকার ঢুকে গেছে, ভাবতে ভাবতে দেখলাম ছেলেটাকে চিৎকার করতে। সে আসলে বলছে, যারা বোকা তারাই বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে, বেঁচে থাকে। বেঁচে থেকে আসলে কিচ্ছু হয় না। বেঁচে থাকায় কোনো বাহাদুরি নাই। আমি নিজ ইচ্ছায় মারা যাবো এটা আমার জীবনের অন্যতম এক স্বপ্ন।

ছেলেটা এই রকমে কয়েকবার চিৎকার করে, চোখদুটো খোলা রেখে ছুরিটা বেগে গলার ভেতরে বসিয়ে নিলো। হাহ্! আমি চোখদুটো বন্ধ করে ফেললাম, আসলে ওটা দেখার মতো চোখ নাই আমার। কিন্তু ভেতরের দৃশ্য তো আর মোছা যায় না। আর তাই মনের ভেতরে ভীষণ দ্বন্দ তৈরি হয়ে গেলে দীর্ঘ সময় আমি আর চোখ খুলতে পারলাম না। তখন আমার এটা কল্পনা করতে ভালো লাগলো যে, আমি দৃষ্টিহীন, আমি অন্ধ।

আলো নিভে গেলো। কাঁচের ফ্লোরে ঝনঝন করে অনেক পিন পতনের শব্দ হলো। তারপর করুণ এক মিউজিক বেজে উঠলে আমি একটু আত্মমনযোগী হলাম। আমি দেখলাম তাপানুকুল থিয়েটারেও বেশ ঘেমে উঠছি। আসল কথা হলো থিয়েটার জমে উঠেছে। কিন্তু কখনো মনে হচ্ছিলো, আমি এখনো আমার অসুখ বিসুখের দিনেই জেগে উঠছি না তো! কিন্তু এই অসুখের ভেতরে জেগে ওঠাও স্বস্তির, সুখের। যদিও জানি না যে, একাকী রাস্তার পরে আমি এখন এই থিয়েটারে, তারপরে কোথায় আমি জেগে উঠবো!

এইভাবে, আমার জীবনে অনেক গল্পেরা এলো। আর সেইসব গল্প অন্ধত্বের সাথে যোগ হয়ে গেলো। শেষবার এতোটাই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হয়ে গেলাম যে, সে ঘটনা ঘটে যাবার পরে আমি ছুটে বের হয়ে এলাম। হন্যে হয়ে বিভিন্ন দিকে ছুটে গেলোম এই জন্য যে, আমার অন্ধত্বের স্বীকৃতি দরকার। আমি দেশের নামি অপট্যামঅ্যাজিস্টের কাছে গেলাম। তারা আমার অন্ধ করে দিলো না অথবা অন্ধত্বের স্বীকৃতিটুকুও না। তখন আমি দারুণ হতাশায় নুয়ে পড়তে পড়তে একটা দুর্বল উপায় খুঁজে বের করলাম। আমি বিপনীবিতান থেকে অন্ধের চলাচলের লাঠি আর এমন কালো এক চশমা জোগাড় করলাম, যাকে দৃষ্টি ভেদ করে যেতে পারে না। তারপর আমি অন্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে এলাম। আর এগিয়ে গেলাম সেই কন্যার দিকে, যে কন্যাকে আমি অন্ধ হবো বলে কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে জানলাম, সে কন্যা কয়েকদিন হলো ঠিকানায় থাকে না। তখন এগিয়ে এলো এক লোক।

তাকে কি এতোই দরকার? অথচ সে তুচ্ছ মানুষ, আজন্ম অন্ধ।

তাকে তুচ্ছ বলবেন না। আপনি ভাবতে পারবেন না সে আমার কাছে কিসের সমান।

সে এতো দামী হলো কী করে?

সেখানে এক গল্প আছে। সেদিন আমি আসলে এক আড্ডানুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানকার আয়োজন ছিলো দারুণ আর অভিনব। আয়োজকেরা অনুষ্ঠানের মুভমেন্টের দিকে লক্ষ রেখে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবস্থা করেছিলো। আমরা সে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দেখলাম, ঝলমলে এক কন্যা ছোট এক মঞ্চে বসে সারেঙ্গা বাজাচ্ছে। এই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আমাদের এতোই ভলো লেগে গেলো যে, আমরা আর আড্ডায় মন দিতে পারলাম না। অনুষ্ঠানজুড়ে আমরা তন্ময় হয়ে শুধু মিউজিক শুনে গেলাম। তারপর আমরা বলাবলি করলাম, এই রকম আনন্দানুষ্ঠানের আয়োজন আমরা আর দেখি নাই।

কিন্তু ঝড় উঠলো আমার ভেতরে। আমার মনে হলো, জীবনে এই রকম মুহূর্ত আমার আরো দরকার, সীমাহীনভাবে দরকার। আমি তাই সে কন্যার দিকে এগিয়ে গেলাম। তারে বললাম, তোমাকে আমি চাই, আমি দারুণভাবে সমর্পিত হয়ে গেছি।

সে আমার দিকে দৃষ্টিহীনভাবে তাকালো। আলোহীন ঘোলাটে চোখ তার তিরতিরিয়ে কেঁপে কেঁপে গেলো। বললো, যদি ইচ্ছে করো এক পথে হাঁটবো, তবে অন্ধ হয়ে এসো।

বলছেন সত্যই?

হা মিছে নয়, আমি আজ অন্ধ হয়েই এসেছি।

আপনার জন্য দুঃখ ও করুণা, সেই মেয়েটা আর অন্ধচোখে ফিরবে না।

এটা বলছেন আপনি?

হা। তার চোখে দৃষ্টি স্থাপন হবে বলে মেডিকেলে ডাক্টাররা বিশেষ বোর্ড বসিয়েছে। অচিরেই সে দৃষ্টি পেতে যাচ্ছে।

পোস্টমর্টেম চললো

থিয়েটারে পূর্বাবস্থা ফিরে এলো। ব্যাকগ্রাউন্ড নৃত্যের জন্য তরুণ-তরুণীরা তাদের নির্ধারিত জায়গায় চলে গেলো। আলো প্রতিফলিত হলো অন্ধজনের উপর।

আপনার এইসব অন্ধত্বপ্রদায়ক গল্পের জন্য আমাদের মনে বেদনা জেগেছে।

কিন্তু ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির সমৃদ্ধির এই যুগে পূরবী কেনো আপনাকে চিঠি দিলো?

হা, এখন তো আর চিঠি আসে না কিংবা যায় না!

আপনার এই অন্ধত্বও তো ফেইক। আপনি কেনো এমন মিছেমিছি চলছেন?

অথচ আপনি পেছনের সব দৃশ্য ভোলার কথা বলছেন। আদতে আপনিই সেসব ভুলতে পারেন নাই।

আপনার আসল চাওয়াটা কি। আমাদের আসলে কিছুই সহজ ঠেকছে না।

উত্তর দিন।

তখন অন্ধ লোকটি আসন ছেড়ে এসে বেদনার মতো পায়ে মঞ্চে হেঁটে বেড়ালো। একবার ডাইনে তাকালো আরেকবার বাঁয়ে, তারপর আকাশ বরাবর তাকালো। ওদিকে নৃত্য চললো আর করুণ এক মিউজিক।

প্রথম কথা হলো, পূরবী আমার শৈশব ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। আমাদের শৈশবে চিঠি আসতো।

আর আমি আসলেই অন্ধ হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অন্ধত্ব আমার কাছে আসে নাই কিংবা আমি পৌঁছাতে পারি নাই অন্ধত্ব পর্যন্ত। আমার অতো সাহসও নাই সে যুবকের মতো যে যুবক গলার ভেতরে নির্ভয়ে ছুরি বসিয়ে নিয়েছিলো। আমি তাই নিদারুণ এক ফাঁকির ভেতরে ঢুকে পড়েছি। সত্যিকারের কথাটা হলো, আমি এমন এক সাধনার কথা ভাবছি, যে সাধনা আমার সকল দৃশ্য মুছে দেবে আর জাগিয়ে রাখবে শুধু শৈশবের স্মৃতিটুকু। আমার জীবনে শুধু এই শৈশবটাই সত্যের মতো জেগে আছে। আর মানুষের বেঁচে থাকার জন্য একটুখানি স্মৃতিই যথেষ্ট।

তখন মেঘের গর্জনে চারিদিক কেঁপে উঠলো। কোন ফাঁকে মেঘ করে এলো আকাশে, এমন এক ভঙ্গিমায় থিয়েটারের সকলে আকাশের (উপরে) দিকে তাকালো। তারপর মেঘ এসেছে মেঘ’ বলে চতুর্দিকে নাচুনে ভঙ্গিতে ছোটাছুটি শুরু হলো। তখন থিয়েটারজুড়ে লাল নীল হলুদ কাগজের বৃষ্টি নামলো অঝোরে। তাই দেখে মুখ উজ্জ্বল করে সবার সামনে চলে এলো অন্ধ লোকটি।

চিৎকার করে বললো, শতবর্ষের বৃষ্টি নেমেছে আজ। সুতরাং স্মরণ করো তোমার শৈশবকে আর অন্ধচোখে পরাণ ডুবিয়ে ভিজতে থাকো। বাকিসব দৃশ্য ভুলে যাবার এটা এক কৌশল।

পাঠ-পুনর্পাঠ

ওরা ভিজছিলো তুমুল উৎসবে। আমি উঠে এলাম আহত পায়ে। বাইরে এসে দেখলাম শহরে ইলেকট্রিসিটি নাই। মাতৃজঠরের মতো সে আঁধারে তখনোবৃষ্টি হয়ে চলেছে অঝোরে। আমার আর মিছেমিছি অন্ধ হতে হলো না। আমার সমস্ত অসুখ-বিসুখ নিয়ে তুমুল অন্ধকারে বৃষ্টিতে নেমে পড়লাম।

*************************************************

ব্রহ্মপুত্রের খিদে
আযাদ কালাম

গোরুছাগলহাঁসমুরগি নয়, মনুষ্য। শিশু। দশএগার। হাতপাচোখকাননাকমুখ মনুষ্যতুল্য । কিন্তু ঐযে, কেতাবি মৌলিক অধিকার-না কি যেন বলে— অন্নবস্ত্রবাসস্থানচিকিৎসাস্বাস্থ্যশিক্ষা ধরণের ডেকোরেটেড বুলি দাঁতমুখ খিঁচিয়ে কপচান তথাকথিতরা। শিশুটি ওসব বেদবাক্যের বাইরে।

শিশুটি মানে মেয়েটি। কদিন পর কিশোরি। তারপর তরুণি। যুবতি। অবশ্য তার ক্ষেত্রে এরকম মসৃণ শব্দের প্রয়োগ কখনোই হবে না। বলা হবে— ছুঁড়ি, সিয়ানা, মাগি, মাল। তথাকথিতদের ভোগ্যপণ্য। মালে-গণিমাত। বাপবেটাচাচাভাতিজাচেয়ারম্যানমেম্বারদালালচাটুকার সবার।

বয়স কিংবা অপুষ্টির কারণে শরীরী বৃদ্ধি না ঘটার ফলে সে এখনো বুঝতে শেখে নি বস্ত্রের প্রয়োজন। বাসস্থান কিভাবে দরকার হয়— এরকম উচ্চমার্গীয় চিন্তাশক্তির জন্ম হয় নি এখনো। অনুর্বর মগজে এহেন মহান চিন্তাবৃক্ষের জন্ম কেমনে সম্ভব সে এক প্রশ্ন বৈকি? ওকে তো যখনযেখানেযার প্রয়োজন সেখানেই থাকতে হবে। ঠা-াগরমভেজাশুকনা অনুভূতি তার একাকার। অসুখবিসুখচিকিৎসাও তথৈবচ। অসুখ বলতে সে বোঝে জ্বর আর নদীফিরা। নদীফিরা মানে ঘন ঘন নদীর খালে গিয়ে নদী বা পুকুরের পানির মতো ঘোলাজল মলদ্বার দিয়ে ত্যাগ করে চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে ফেরা। জ্বর কিংবা নদীফিরার জন্যে ওষুধপথ্যের কালচারে অভ্যস্ত নয় ওর পরম্পরা। বড়জোর তেলপড়াপানিপড়া। তার বেশি মানে জঙ্গল থেকে আনা লতাপাতাশেকড়বাকড়ের নির্যাস। শিক্ষা? যার দরকার সে বুঝুক। ভদ্রসভ্যজনদের মুখোশ আঁটানো সার্টিফিকেটফেরিওয়ালাদের মতো তার কোনোদিন দরকার হবে না— এটা সে না বুঝলেও মতবাদ বিক্রেতারা বুঝুক। শিক্ষাচিকিৎসাসেনিটেশনপুনর্বাসনের ঠোঙ্গায় পুড়ে যাদের বৈদেশিক চাঁদি ভিক্ষে করতে হবে এটা তাদের বিষয়।

তার জগৎজীবনজুড়ে একমাত্র সক্রিয় অনুভূতি খিদে। সর্বগ্রাসি। খাদ্য ছাড়া জগতে অন্যকিছু চেনে না সে। যে খাদ্য অখাদ্যে পরিণত হয়েছে— তাতেও আপত্তি নেই। গলধকরণ করা যাচ্ছে কিনা এটুকুই বিবেচ্য। টাট্কাবাসিসেদ্ধভাজিপঁচাগন্ধ বাঁধা নয়। খেতে দিলেই খায়। যে-কোনো সময়। যে-কোনো খাবার। যতবার দেয়া হয় বা পায়। ভাত হলে ভাত। রুটি হলে রুটি। সাথে তরকারি থাকলে থাকলো। না থাকলে কিছু এসে যায় না। জিগ্গ্যাসার জবাব দেয়া ছাড়া নিজের প্রয়োজনে কথাও বলতে জানে না সে। সারাদিন উপোসেও খিদের কথা বলে না। তবে হ্যাঁ, হাতের কাছে পেলেই হাত না ধুয়ে শুরু করে দেয়। হতে পারে সেটা পাতিল কিংবা গামলা থেকে। সারসরি। লক্ষ্যযোগ্য যে, এই সরাসরি গলধকরণ কর্মটি সে খিদে পেলেও করে, না পেলেও করে। সম্ভবত খিদে পাওয়ানাপাওয়ার বিষয়টি সে বোঝে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের পরপরই তাকে এ কর্মটি আবার করতে বারবার দেখা গেছে।

অনিবার্য প্রয়োজনে মেয়েটির পরিচয় আবশ্যক। নাজলি। পিতা আজিমুদ্দি। প্রপিতা কলিমুদ্দি। প্র-প্রপিতা ধজমুদ্দি। এভাবে অনেক মুদ্দিউদ্দি পর্যন্ত উল্টোভ্রমণের সুযোগে বহুদূর পেছনে হাঁটা যাবে। আদি নিবাস রংপুর। বর্তমান কুড়িগ্রাম। উপজেলা চিলমারি। পেশা কাজের মেয়ে। বর্তমান নিবাস দিনাজপুরের বিরল…

দুই

নাজলির হাড়িপাতিল থেকে তুলে খাবার দৃশ্যটা অধ্যাপক জালালউদ্দিন কিছুতেই হজম করতে পারছেন না। বিষয়টা স্ত্রীকে বলতেও পারছেন না। অধ্যাপকের স্ত্রী সেমি সাইকিয়াটিক। কাজের মেয়ের এ্যাঁটোঝুটা স্বামীসন্তানসহ খেয়ে চলেছেন জানার পর মহিলার অগ্নিমূর্তি কী ভয়ানক রূপ ধারণ করতে পারে অধ্যাপক মহাশয় সে দৃশ্য কল্পনা করে বার বার চুপসে যাচ্ছেন। অধ্যাপকের বাড়িতে নাজলির শুভাগমনের বয়স মাত্র দুসপ্তাহ। এনজিওসংস্কৃতির যুগে কাজের মেয়ে যোগার করা যে চাকরি যোগার করার চাইতে সহজ নয় এটা অধ্যাপক টের পেয়েছেন। তার ওপর চাকরি করা বউয়ের কী ঝাঁঝ সে অভিজ্ঞতা ফাঁকিহীনভাবে অর্জন করে চলেছেন। আস্তেধীরে ঠিক করে ফেলার আশায় জালাল নাজলিকে সাময়িকভাবে ক্ষমা করার কথা ভাবতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু ঠিক করার আগেই যদি স্ত্রীমহাশয়া হাতেনাতে ধরে ফেলেন, তখন?

জালালদম্পতির পাঁচ বছরের শিশুটি চর্মরোগে ভুগছে। বহু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাবার পর অবশেষে অর্জিত জ্ঞান, শিশুটি ত্বকশুষ্কতায় আক্রান্ত। ত্বকশুষ্কতা থেকে নিষ্কৃতি পেলেই চর্মসমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব— ডাক্তারের সর্বশেষ অভিমতকে শিরোধার্য করেছে জালালদম্পতি। চিকিৎসকের দৈববাণির সুবাদে শিশুটির ভাগ্যে এখন নির্ধারিত হয়েছে রুটিনমাফিক তৈলমর্দন।

একদিন শীতের সকালে বারান্দার রোদে মাদুর বিছিয়ে অধ্যাপক সাহেব শিশুর গায়ে তৈলমর্দনে মশগুল। স্ত্রীমহোদয়া রান্নাঘরে। নির্দিষ্ট সময়ে রান্না শেষে বাচ্চার গোসলখাওয়া, নিজের প্রস্তুতি এবং বাচ্চার সারাদিনের থাকাখাওয়ার বন্দোবস্ত নাজলির হাতে গুছিয়ে দিয়ে ঠিক সময়ে অফিসে উপস্থিত হওয়া। তারপর কয়েক মিনিট পরপর ল্যান্ডফোনে নাজলিকে গাইড করা। কিছুক্ষণ পরপর বাসায় ফেরার জন্যে অধ্যাপককে মোবাইলফোনে তাড়া। এতসব ভাবনার জটিল আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে মানসিক অস্থিরতার চরমে উঠে শারীরিক স্থবিরতায় আক্রান্ত হচ্ছেন মহিলা রান্নাঘরে। নাজলি টিউবওয়েলপারে বাসন মাজছে।

জালাল কখন অন্যমনস্ক হয়েছে বুঝতে পারে নি। স্ত্রীর কণ্ঠের ঝাঁঝাঁলো আওয়াজে সম্বিত ফিরলে দেখলেন, মহিলা নাজলির হাতের বাহু সাঁড়াসির মতো খাঁমচে ধরে সামনে মূর্তিমান। দড় দড় করে ঘামতে ঘামতে হাপাচ্ছেন, একে তুমি কোথায় পেলে?

                ‘কেন, আমাদের গ্রামে?’

                ‘তোমাদের গ্রামে এরকম রেয়ার ভ্যারাইটি কিভাবে সৃষ্টি হলো?’

                ‘তোমার কথার মানে ধরতে পারছি না।’

                ‘দয়া করে এ রাক্ষসকে আর লোকালয়ে ফেরৎ দিও না, একে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আস।

জালাল ভয়ে ভয়ে মৃদুকণ্ঠে জানতে চান, কেন, কি হয়েছে?’

‘বলো, কী হয় নি! রাক্ষস আমার হাড়িপাতিল সব খেয়ে ফেললো। এক গামলা বাসি ভাততরকারি ঘুম থেকে উঠেই খেয়েছে। এখন টিউবওয়েলপাড়ে বাসনমাজা বাদ দিয়ে হাড়িপাতিল চাটছে। ছি! ঐ বাসনে খাচ্ছি। এর ভয়ে কোথাও খাবার রাখতে পারি না, ময়লা হাতে সব তুলে খাচ্ছে। ভয়ভীতি কিচ্ছু নাই, আমার সামনেই খাচ্ছে। অবাক কা-, বাসিপঁচা সব খাচ্ছে। দিয়ে তাল পাচ্ছি না। এটুকু বাচ্চার পক্ষে এতো খাবার কিভাবে খাওয়া সম্ভব? অসম্ভব, মানুষের পক্ষে এ অসম্ভব! দোহাই তোমার, এ রাক্ষসের হাত থেকে আমাকে রক্ষা কর…’

জালাল মিনমিনে গলায় স্ত্রীকে বলার চেষ্টা করেন, ‘এরা বংশ পরম্পরায় গরিব। বুভুক্ষু। পানি ঢালতে থাকলে একসময় মরুভূমিও ভিজে ওঠে। খেতে খেতে একসময় স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তখন খাবে না…’

তিন

কেউ লিখেছে ‘সাহিত্য খেলা’ কেউ ‘সাহিত্যের খেলা’— ক্ষীণকায় একটি বিভক্তির পরিবর্তনে অর্থপ্রভেদ অধ্যাপক মহাশয়েরা কতটুকু বুঝতে এবং বোঝাতে সক্ষম তা প্রশ্নসাপেক্ষ বৈকি। চৈত্রদুপুরের সকালে দিনাজপুরি রোদে মাদুরপাতা বারান্দায় বসে বোর্ড পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন জালাল। ছুটিরদিন বলে পাশে বসে মেয়েকে ওলিভওয়েল ম্যাসেজ করছেন জালালের স্ত্রী। সামনে উঠোন পেরিয়ে আবার টিউবওয়েলপাড়ে নাজলি।

পরীক্ষার খাতায় এ মামুলি ভুলগুলো ছেলেমেয়েরা কেনো করে নিজের অজান্তে জালাল কারণ অনুসন্ধানে নেমে পড়ে। টেক্সট-এর ধার কেউ ধারে না। ক্লাশেও আসে না। নোটগাইড আর কোচিংটিউশনির আগাছা গ্রাসে গেছে সব। মূল ফসল আগাছামুক্ত করতে না পারলে এ-ই তো হবে। অবশ্য ফসল যদি চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয় কিংবা বেড়া যদি ফসল খায় তাহলে এটাই হবার কথা। বেকার উৎপাদনকারি শিক্ষাব্যবস্থায় ভিটেমাটি বেচেও যেখানে অন্নসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই সেখানে এ মায়াকান্নারও প্রয়োজন নেই।

অধ্যাপক সাহেবের শিক্ষাবিষয়ক পেশাদারি ভাবনাটা মুহূর্তে উবে গেল নাজলিকে দেখে নয়, স্ত্রীকে নাজলির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে। নাজলি তরকারির কড়াই হাতদিয়ে মুছে হাত চাটছে। তাহলে কি বুদ্ধি গজাতে শুরু করেছে? আগে তো সরাসরি মুখ লাগিয়ে দিতো। পরক্ষণে অধ্যাপকের হুশ ফিরলো, এক্ষণি স্বস্তি বোধ করা যাবে না। জালাল রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে থাকলেন স্ত্রীর প্রতিক্রিয়ার জন্যে। তিনি ঠাওর করতে পারছেন না বাড়ির ওয়েদার শীতগ্রীষ্ম কোন ঋতুতে উত্তীর্ণ হবে এক্ষুণি।

বাবামায়ের হতবিহ্বল দশা পাঁচ বছরি শিশুর অনুধাবন ক্ষমতার বাইরে হলেও বাবামায়ের মনোযোগ শতভাগ নাজলির দিকে— এটা চাইল্ড সাইকোলোজিতে ঠিকই ধরা পড়েছে। এবং শিশুটির জানার কথা নয়, সে ভষ্মে পানি ঢালছে নাকি ঘি। ঠিক এ মুহূর্তে সে বাবার কছে অভিযোগ করলো, ‘বাবা, নাজলি পায়খানা করে সাবান দিয়ে হাত ধোয় না।’

অধ্যাপকের স্ত্রী এবার ফুলানো বেলুনে আলপিনের খোঁচা খাওয়ার মতো ব্লাস্ট। তড়াৎ করে উঠে মাত্র তিন কদমে উঠোন টপকে নাজলির ওপর হামলে পড়লেন মহিলা। তারপর চুলের মুঠি ধরে হেচকা টানে উঠোনে এনে বেদম শুরু। ‘…বাপরে… মারে… মরি গেনুরে… মোক ছাড়িদে নানি, আর কুনো দিন খাম নি… নানা মোক বাঁচা… মোক বাড়িৎ দি আইসো, মুই আর থকিবানাউ… ওবা… ওমা…’ নাজলির বিলাপআহাজারিতে বাড়ি মাথায়। অধ্যাপকের স্ত্রী চিল্লাচিল্লি থামাতে হিমশিম খেয়ে দুহাতে ওর মুখ চেপে ধরলেন। সমূহ বিপদ প্রত্যক্ষ করে অধ্যাপক দৌড়ে গিয়ে স্ত্রীর হাত থেকে নাজলিকে উদ্ধার করে এবার নিজেই তোপের মুখে।

মহিলা পাগলের মতো বলে যাচ্ছেন, ‘…এ রাক্ষসকে এক মুহূর্ত দেখতে চাই না। এক্ষণি বিদায় করো। নাহলে আমি তোমার সংসার করবো না। ইচ্ছা করে তুমি এই আবর্জনা আমার ঘাঁড়ে এনে চাপাচ্ছ। আজ পর্যন্ত একটা ভালো কাজের মেয়ে যোগাড় করতে পারলে না। সামান্য একটা কাজের মেয়ে যে লোক যোগাড় করতে পারে না সে বিয়ে করে কোন আক্কেলে। সে আবার সন্তান জন্ম দেয়… খুব বীরপুরুষ…’

চার

নাজলির গায়ে থলথলে মাংস হতে বেশিদিন প্রয়োজন হয় নি। চিপচোয়াল বসা বুড়িয়ে যাওয়া ভাবটাও কেটে গেছে। জ্বলে যাওয়া কটাশূদ্র লাল চুলগুলো নাপিতের কাছে কামিয়ে এনেছিলেন জালাল নিজে। এখন বৈশাখের বৃষ্টিতে ঘাসের নোতুন চারা গজাবার মতো কালোচুল উঁকি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে কেনা হয়েছে নোতুন জামাকাপড়। তেলচক্চকে জেল্লা এখন চোখমুখে। কিন্তু খাদ্যাভাসের পরিবর্তন হচ্ছে না। বরং অধ্যাপকের স্ত্রীর পজিটিভ পরিবর্তন লক্ষণীয়। নাজলি আসার আগে নিয়মিতই বাসি খাবার ফেলে দিতে হতো। খাবার ফেলতে মহিলার গায়ে লাগতো খুব। এখন ফেলতে হয় না। কি খেতে দেবে এ নিয়েও ভাবতে হয় না। নিজেরা যা খেলো না, সব ছেড়ে দেয়— খা যতো খুশি। ওর হাত থেকে খাবার রক্ষা করতে বাড়িতে তালার ব্যবহার বেড়েছে— এটুকুই বাড়তি কাজ। আশার কথা, নাজলি কাজ শিখতে শুরু করেছে। কাজে ফাঁকি দেয়ার বুদ্ধিই ওর নেই। বুদ্ধিহীনতার এহেন সুবিধে আবিষ্কার করে মহিলা এখন  আত্মতুষ্টিতে।

নাজলিকে আনার পর থেকেই জালাল জন্মগ্রামের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত। প্রথম অবস্থায় নাজলির প্রাথমিক বিড়ম্বনাগুলো বেশি বিড়ম্বিত করায় গ্রামের স্মৃতি সেভাবে কাবু করতে পারে নি। নাজলির টিকে যাওয়ার সাথে যোগ হয়েছে গায়েগতরের চেকনাই। জালাল মুগ্ধ তাকিয়ে থাকেন। মেয়েটি যখন চোখের সামনে কাজকামে এটাসেটা নিয়ে ছুটোছুটি করে জালাল স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। সহসাই ফিরে যান শৈশবের গ্রামে। নাজলির বাপ আজিমুদ্দি তখন জালালদের বাড়িতে বছরমারি কামেল। সে-ই ছোটোবেলা থেকেই জালাল দেখে এসেছে— তাদের বাড়ির কোনো বছরমারি কামেল বছরচুক্তি শেষে চলে যায় না। ছোটো শিশুটি বছরের পর বছর চুক্তি নবায়ন করতে করতে শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে যুবক, কেউ কেউ লোক হয়ে যায় তবু চুক্তি নবায়নের নেশা কাটে না। জালালের বাপ তখন লোকটির বিয়ে দিয়ে সংসারি করে চাষাবাদ করে খাবার জন্যে জমি আধি দিয়ে কামেল থেকে কৃষক বানিয়ে ফেলে।

আজিমুদ্দি জালালের বয়সি। জালাল তখন সদ্য দাড়িগোঁফ গজাতে শুরু করা কলেজগামি। মস্তিষ্কে রঙ্গিন দুনিয়া। নিজেই মুগ্ধ হয় নিজকে দেখে। মেয়েবন্ধুর পেছনে পুরো জীবন খরচ করে ফেলবে— এ রকম আকর্ষণ মেয়েদের প্রতি।

আজিমুদ্দি সে বছর ভাদরমাসে ভাদইধানের কাটামাড়ায় ব্যস্ত জালালের বাপের সাথে। ভরা মৌসুমি ভাদরে ভাদইধানের কাজে দম ফেলার সময় নেই কারো। প্রতিদিন দশবারোজন পাইটের তুমুল তদারকিতে ব্যস্ত জালালের বাপ। বিশেষ সহযোগী আজিমুদ্দি। বলা আবশ্যক, ঠিক নাজলির মতোই আজিমুদ্দির মাথায় মগজের বদলে গোরুর বিষ্ঠা ছাড়া আর কিছুর নমুনা দেখে নি জালাল। গলধকরণ করা এবং সেসব মলমূত্র আকারে ত্যাগ করার বাইরে জগতে অন্যকিছুর ধার ধারে না সে।

প্রচ- কাজের চাপে নিদমপাটাশ সময়ের একদিন হঠাৎই আজিমুদ্দি উধাও। কাজ আর কাজের লোক সামাল দিতে যখন জালালের বাপের ধইনসইন অবস্থা, সে সময় গোরুখোঁজা খুঁজতে হচ্ছে আজিমুদ্দিকে। ব্যাপারটা যেনো গোরুখোঁজা নয়, গোরুকে খোঁজা। আজিমুদ্দির সঙ্গে গোরুর তফাৎটা হলো গোরু গাছে উঠতে পারে না। আজিমুদ্দি আবিষ্কৃত হলো জঙ্গলের ভেতর জংলি একটা পেয়ারা গাছের মগডালে। আরাম কেদারার মতো গাছের ডালে হেলান দিয়ে বসে ছিলো সে সম্পূর্ণ একা। ডাক দেয়ামাত্র বাধ্য ছেলের মতো নেমে এলো। জালালের বাপ পরম যতেœ হাত ধরে এনে ভাদই ধানের মাড়ায় জুড়ে দিলো গোরুর পেছনে। ভূতে পাওয়া মানুষের মতো গোরুর পেছন পেছন ঘুরতে থাকলো সারাদিন কথাবার্তাহীন। অসমাপ্ত ধানের মাড়া মূলতবি হলো সন্ধেনাগাদ। রাতেরবেলা গোরুর মতো গোগ্রাসে গামলা উজার করে ভাত খেয়ে মোষের মতো গলনালির ভয়ঙ্কর আওয়াজ তুলে ঘুমোতে লাগলো আজিমুদ্দি।

পরদিন ভোরবেলা আজিমুদ্দি আবার উধাও। বনজঙ্গলের মগডালে, পুকুরডোবানদীর জলে কোথাও আর পাওয়া যাচ্ছে না। লোকমুখে খবর এলো ভাদরমাসের কুকুরসঙ্গমের একনিষ্ট দর্শক হয়েছে আজিমুদ্দি। কুকুরের পিছে পিছে সে নাকি কুকুরদলের অনুগামি। জালালের বাপ ওকে ফেরাতে ব্যর্থ হলো।

গ্রামবাসি ছোটোবেলা থেকেই আজিমুদ্দিকে আজিমুদ্দি পাগলা বলে সম্বোধন করে। পাগলা এবার নামের সার্থকতা প্রমাণ করতে শুরু করেছে। পাগলার মুখে বোল, ‘মুই নাই কাম করিম, মোক বেহা দেও।’

জালালের বাপের মাথায় আকাশ ভাঙ্গার দশা। শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্র এলেও শ্রাবণের ধারা থামে নি আকাশে। ভাদইধান বেজায় কুড়িয়া। ভিজা ধান ঢিপে রাখলে একদিনে ঘুলিয়ে যায়। দুইদিনে ফুটে চুন। এখন কাটমাড়ার ভরা বতরে ধানফেলে পাগলের বেহা কে দিবে? নিরেট গোরুটাকে কে দিবে বেটি? বেচ্ছুয়াক খিলাবে কি? বাপ তো মরি বাঁচিছে, মা তো একপাল হেড়–য়াটেপুয়া ছুয়া নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঢেসকুলাপারি বেড়াছে। পাগলকে নিয়ে মহাবিপদে জালালের বৃদ্ধ পিতা।

ওদিকে দিনদিন বেড়েই চললো পাগলার বেয়াড়া পাগলামি। ঝোপঝাড়ে, কখনো গাছে চড়ে নিজ হাতে লিঙ্গ চেপে ধরে বসে থাকে একা। খাওয়াদাওয়ানিনস্বপন বাদ। পরনের লুঙ্গি মাড়মাড়চাপচাপ কড়কড়ে ভেজাভেজা। গায়ের গন্ধে কাছে যাওয়া যায় না আজকাল।

পাগলা এখন যাত্রাগানের প্যান্ডেলে হাজির হয়। মুতেভিজাখেড়ের বিছানায় বসে নাচনেওয়ালির অশ্লীল দেহকসরত দেখতে দেখতে নিজের লিঙ্গ চেপে ধরে কেঁপে ওঠে। পাগলা এবার বিয়েপাগলা।

কিভাবে কি হলো— তারচেয়ে বড়কথা ভোরবেলা আজিমুদ্দি পাগলার বাড়িৎ একজন দুজন করতে করতে মহিলাদের ভিড় বাড়তে থাকলো। বিনাপ্রচারে রাষ্ট্র হলো— বেহা কইছে আজিমদ্দিপাগলা। দর্শনার্থীদের চোখ কপালে। মুখচাওয়াচাওয়ি করে মহিলাদের কানাঘুষা ছড়াতে থাকলো দশদিগন্তে— বহের বয়স আজিমদ্দির মায়ের সমান।

আগুনে পানি পড়ার মতো পাগলা এবার ঠা-া।

মাসে মাসে সম্ভব নয় বলে বছর বছর অজস্র সন্তানের পিতা হতে থাকলো আজিমুদ্দি।

পাঁচ

নাজলিকে দেখলেই জালালের ভাবনার ভাবান্তর ঘটতে থাকে। জালালস্মৃতির টাইম মেশিন উল্টোদিকে চলতে থাকে। একদম শিশুকাল হলেও পষ্ট মনে আছে। জালাল তখন এমন ছোটো যে মা কোলে নিতে না পারলেও বাবার বুকেপিঠে দিব্যি সওয়ার হওয়া যায়। অঘ্রাণপৌষের দিনাজপুরি ঠা-ায় কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়েছে দুপুরের সূর্য। রিগ্যান কিংবা নিক্সন মার্কেটে দক্ষিণার কাপড় এ তল্লাটে তখনো নাগালের বাইরে। একবিন্দু রোদের আশায় সুকান্তের কবিতার মতো প্রহর গোনে বস্ত্রহীন শিশু। প্রতি সকালে খড়ের আগুনের চারপাশ ঘিরে থোকা থোকা পিঁপড়ের মতো জমাটবেঁধে গতর সেঁকে মানুষ। জালালকে ফ্লানিল কাপড়ের জামা কিনে দিলেও গিলাফ কিনে দেয়ার আব্দার উপেক্ষিত হয় নি বাবার কাছে। জালালবয়সিরা দুয়েকজন ছাড়া সবাই বাবার লুঙ্গি কিংবা মায়ের শাড়ি গলা পর্যন্ত পেঁচিয়ে আগুন পোহাচ্ছে। হিরো হিরো ভঙ্গিতে জালাল বিরাজ করছে কখনো বাবার কাছে কখনো বন্ধুদের মাঝে বীরদর্পে।

শিশুরা শিশুর মতো থাকলেও শীতের সকালে প্রতিদিন আগুনের পোঢ় ঘিরে তুমুল আড্ডা জমে। আড্ডার আলোচ্যে ঠিকঠিকানা থাকে না। রাজনীতিধর্মকৃষিজমিজমা নয়তো কোনো স্থূল বিষয়— কী নয় আলোচ্য। সকালে আগুনের আড্ডায় শরীক না হলে কি যেন নেই কি যেন নেই অতৃপ্তিতে শুরু হয় দিন।

গোরুর মাড়াঘুরিয়ে যে ভাদই ধান মাড়া হয় সে খেড় সংরক্ষণের একটা আদি পদ্ধতি আছে। একটা বাঁশ লম্বা আকারে মাটিতে পুতে বাঁশের পাশদিয়ে বৃত্তাকারে পাঁচছয়ফুট পরিধিতে খেড়গুলি বিছাতে বিছাতে বাঁশের ডগা পর্যন্ত উঁচু হয়ে যায় সে খেড়ের ঢিপি। যাকে বলে ভাদই ধানের খেড়ের পুঞ্জ। তথাকথিত শিল্পিজন যাকে বলে খড়ের গম্বুজ। শুকনা কিংবা আধা শুকনা এই খেড়গুলিতে দুয়েকদিন পরই গরম ধরতে শুরু করে। খেড় বেশি ভেজা থাকলে গরমের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে একদম আগুনের মতো ধোঁয়া ওঠে পুঞ্জের মাথায়। ভেতরে খেড়গুলো রান্না হবার মতো মজে নরোম হয়ে নিজস্ব একটা খয়েরি রং ধারণ করে। গোরু এ খেড় খেতে পছন্দ করে। সকালের আড্ডায় আগুনের পোঢ় সাজাতে এ খেড়ের জুড়ি নেই। এই খেড় দিয়ে সাজানো আগুনের পোঢ়ের মাথায় গোরুর গোবরের ঘঁষি দিলে সে আগুন দীর্ঘসময় ধরে জ্বলে। ধোঁয়াটা হয় গাঢ় এবং ঘোলাটে শাদা। দীর্ঘস্থায়ী এ পোঢ় ঘিরে বাসিমুখে বিড়ি খেতে খেতে যে আড্ডা বসে তার মহিমা যে কী হৃদয়গ্রাহি তার বর্ণনা ধারণ করার শক্তি বাংলা ভাষার থাকলেও সে ভাষা প্রয়োগের শক্তি এখনো আমার জন্মে নি।

আগুনের পোঢ় ঘিরে এরকম গাঢ় একটা আড্ডা একদিন ফিকে হয়ে গেল অতি মামুলি একটা খবরে। মেম্বারের বৈঠকঘরের চালিৎ কারা যেনো এসেছে। আগুনের আসর ছেড়ে সবাই ছুটলো মেম্বারের বৈঠকঘরের দিকে। আগুনের পোঢ় জ্বলতে থাকলো নিঃসঙ্গ দহনে।

দুজন বয়স্ক পুরুষ, দুজন মহিলা, তাদের ঘিরে জনাছয়েক মানবশিশু। পুরুষ দুজনের পরনে শতছিন্ন ময়লা লুঙ্গি, গায়ে জড়ানো একই মানের লুঙ্গি। তবে তাদের ব্যবহার্য পরিধানকে কাপড় কিংবা লুঙ্গি না বলে ত্যানা বলাই সঙ্গত। পরিধেয় বস্ত্রের রং কি ছিলো তা উদ্ধার করার সমস্ত নমুনা ইতোমধ্যে লুপ্ত। চোখমুখের হতশ্রীদশা দেখে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে পুরো শরীরের কঙ্কাল ঢেকে রাখা জীর্ণশীর্ণ খোসপাছড়া খাওয়া একখানা চামড়া ছাড়া মাংসের কোনো অস্তিত্ব নেই। দীর্ঘদিন না কামানো গালে আর কপালে নদীর চরের বালুতে মরাশুষ্ক কাশুয়ার নিচে থরে থরে সাজানো বলিরেখা। চোখ ঢুকেছে যেনো কাঁকড়ার গর্তে। জবুথবু হয়ে খালিপায়ে বসে কাঁপছে একফোঁটা রোদের আশায়। মহিলা দুজনের অবস্থা তথাস্তু। তেলচিটচিটে কালো ক্যাথা জড়িয়েছে গায়ে। ভেতরে পরিধেয় কি আছে কে জানে? শিশুগুলির অবস্থা বললে বাড়াবাড়ি মনে হবে। অভূক্ত থাকতে থাকতে শিশুগুলি শিশু নেই। মাথায় চুল নেই। ঠোঁট দিয়ে দাঁত ঢাকতে পারছে না। ছোটো আকৃতির এক একজন বামনবৃদ্ধ মানুষ। মেম্বারের বৈঠকঘরের বারান্দায় বসে আছে সবাই সারাশব্দহীন। মাটির দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষগুলো ভাষাহীন।

একজন দর্শক জিগ্গ্যেস করে বসলো, ‘বাড়ি কুণ্ঠে বাহে তোমহার?’

                ‘অম্পুর বাবা।’

                ‘অংপুর কুন জাগাৎ?’

                ‘চিলমারি।’

                ‘চলি আসিলেন কেনে? কি অসুবিদা?’

                ‘নদী বেবাক খায়া ফেলেইছে বাবা।’

শেষ সংলাপটার ভাঙ্গাচোরা আওয়াজ মরানদীর বিস্তীর্ণ বালুচরে বাতাসের ঘুর্ণি সৃষ্টি করলো মুহূর্তে।

ছয়

মানুষের কিছু স্মৃতি থাকে যা পুরনো হয় না। অনেক সময় এমন হয়, ফেলে আসা সেইসবদিন যতো পুরনো হয় ততো উজ্জ্বল হতে থাকে। সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো প্রাণবন্ত। সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার বেলায় এটা হয়ে থাকে। বন্যা নয়, নদী ভাঙ্গনের শুষ্ক বালির ঝাপটায় খরকুটোর মতো গড়াতে গড়াতে সুদুর চিলমারি থেকে দিনাজপুরের বিরলে এসে কিনার লাগা দুটি পরিবারকে দেখার ঘটনা আজ এতবছর পর স্মৃতিতে এতো জীবন্ত হয়ে থাকার গুরুত্ব কিংবা ঐতিহাসিকতা জালাল কিছুতেই উদ্ধার করতে পারে না। পষ্ট মনে পড়ছে— না, মনে পড়ছে বললে কম হবে, দেখতে পাচ্ছে, সেদিন স্কুলে তার জীবনে প্রথম পরীক্ষার ফল বেরিয়েছিলো। প্রথম শ্রেণি পেরিয়ে সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠলো। পরীক্ষায় তার ফলাফলটা কি হয়েছিলো মনে নেই। কিন্তু সেদিন স্কুলের সমস্ত ছাত্রশিক্ষক মিছিল করতে করতে সদরে গিয়েছিলো। মিছিলের শ্লোগান ছিলো— ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মামেঘনাযমুনা।’ মিছিলের সাথে যেতে যেতে মিছিল যখন বাড়ির পাশদিয়ে যাচ্ছিলো জালাল তখন মিছিল থেকে বেরিয়ে মেম্বারের বৈঠকঘরের বারান্দায় চিরিয়াখানার জন্তু দেখার মতো সকালবেলা দেখতে থাকা মানুষগুলোকে আবার দেখার জন্যে দৌড়ে গিয়েছিলো। তখন না জানলেও জালাল এখন জানে, মিছিলের শ্লোগানে যমুনা ঠিকানা হলেও ঐ যমুনা কিংবা ব্রহ্মপুত্র মানুষগুলিকে ঠিকানাহীন করেছিলো।

জালাল বৈঠকখানার বারান্দায় ওদের পায় নি। এদিক সেদিক খুঁজে সে আবিষ্কার করলো একজন মহিলা মেম্বারের বাড়িতে চাল ঝাড়ছে। তখন মহিলার গায়ে কাঁথা নেই। শাড়ি। ছোটো শিশুটি মাতৃদুগ্ধ চাটছে, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই মহিলার। গায়ে ব্লাউজ নেই। জালাল অবাক হয়ে দেখলো, শিশুটি যে দুধ খাচ্ছে তার সাথে নিজের মায়ের স্তনের কোনো সাদৃশ্য নেই। জালাল কোনো স্তন দেখতে পেলো না, পচ্কটে যাওয়া চামড়ার থলি ঝুলছে।

কয়েক দিনের মধ্যে নদীভাঙ্গনে কপাল ভাঙ্গা পরিবার দুটির একটি জায়গা পেলো মেম্বারের গোয়ালঘরের কুচকির ফাঁকে। ওপর পরিবারটির ঠাঁই হয়েছিলো জালালদের বাড়ির সেরকমই সঙ্কীর্ণ এক গলির চিপায়। নিজ বাড়িতে একটি পরিবার আশ্রিত হওয়ায় জালালের গর্ব হয়েছিলো এই ভেবে যে, তার বাবাও মেম্বারের মতো মানি লোক। নিজ বাড়িতে আশ্রিত সেই লোকটিই আজিমুদ্দির বাপ। আজকের নাজলি সে পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম।

খয়রাতি বাঁশখেড় দিয়ে বস্তির মতো ছাপড়া তুলে কলাপাতার আড়াল দিয়ে আজিমুদ্দির বাপরা শুরু করেছিলো নূতন সংসার। ফসলের মাঠে ধানগমআলুডাল কুড়িয়ে, বাড়ি বাড়ি ভাতের মাঢ় ভিক্ষে করে, নানারকম দয়াঅনুগ্রহে বেঁচে উঠতে উঠতে তারা হয়ে উঠলো নিকট প্রতিবেশি। শুধু সন্তান জন্ম দিয়ে নয়, তাদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করলো নূতন নূতন পরিবারের আগমনে। দুয়েকটি নয়, নদীভাঙ্গা চিলমারি, নাগেশ্বরি, রৌমারি, কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল থেকে আসতে থাকলো শতশত পরিবার। বিরল উপজেলার গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠলো রংপুরিয়া পাড়া। স্থানীয় গৃহস্থবাড়িতে এক একটি রংপুরিয়া পরিবারকে আশ্রিত করা ইজ্জত আর ঐতিহ্যের মাপকাঠিতে পরিণত হলো।

স্মৃতির তাড়না জালালকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলো ব্রহ্মপুত্রের চরে। চিলমারিরৌমারিনাগেশ্বরির জনজীবন জালালের চোখে অবাস্তব বাস্তবতা। ওখানকার মানুষগুলির জীবনে সূর্যআগুনকেরোসিন ছাড়া আর কোনো আলোর সন্ধান মেলে নি। ব্রহ্মপুত্রের বেসুমার গ্রাস দয়াহীন। নদীর এপ্রান্তওপ্রান্ত দেখা যায় না। শস্যহীন, বৃক্ষহীন, সবুজহীন ধু ধু কাশবন দিগন্তবিস্তৃত জলশূন্য মায়াহীন প্রান্তর। বিরামহীন খেয়ে চলেছে নদী তার নিজস্ব দুধার। নিয়ন্ত্রণহীন বেড়ে চলেছে নদীর পুষ্টিহীন শরীর। শাঁস শুষে নিয়ে ছোবড়া ফেলে দেয়ার মতো উৎপাদন করে চলেছে অদ্ভুত প্রজাতির এক বুভুক্ষু মানবগোষ্ঠি। মানুষগুলোর অস্থিমজ্জায় প্রোথিত ব্রহ্মপুত্রের সর্বগ্রাসি খিদে। শেকড়বিহীন এ মানবপ্রজাতি খরকুটোর মতো পথের ধুলোয় গড়াতে গড়াতে ছড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সর্বত্র। চিলমারির নদী দেখে জালালের মনে হয়েছে, নদীর জীবন থাকলে বুঝতে পারতো কিভাবে খেয়ে চলেছে সে তার নিজের শরীর। নদী মানে তো শুধু প্রবাহিত জলরাশি নয়। নিচের তলদেশ, দুতীরের স্থলভূমি সেও তো নদীরই অংশ। হায় রে সর্বগ্রাসি, নিজের শরীর খেতে খেতে বুঝতে পারলো না নিজেকেই সে অস্তিত্বহীন করে ফেলেছে। জলশূন্য হয়ে বুকজুড়ে সৃষ্টি করে চলছে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। উৎপাদন করে চলেছে জন্মমৃত্যুর পরিধি বিস্তৃত জন্মজন্মান্তরের মঙ্গা।

জালাল অনুকূল আবহাওয়ার মানুষ। দিনাজপুরের মানুষকে বৈরি প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় না। শ্যামল প্রকৃতির সরল জীবন। দিনাজপুর-রংপুর কতো কাছাকাছি তবু বিপরীত মেরুর বৈপরীত্য।

নাজলিকে দেখলে জালাল দেখতে পায় চোখের সামনে হেঁটে যাচ্ছে একফোঁটা ব্রহ্মপুত্রের সর্বগ্রাসি প্রেত।

সাত

জালাল ভূগছে দ্বৈতনাগরিকত্বে। স্ত্রীর চাকুরি, সন্তানের পড়াশুনো, চিকিৎসা, যোগাযোগ— আরো কিছু নাগরিক সুবিধার লোভে শহরে বসবাস তার। চোদ্দগুষ্ঠির অস্তিত্বে মিশে আছে গ্রাম। গ্রামে গেলে জালাল বাড়ি ফেরার আনন্দে দোল খায়। মায়ের কোলে ফেরার প্রশান্তি। গ্রামে এখন রাস্তার বাঁকে বাঁকে কিংবা স্কুলকলেজমাদ্রাসার মোড়ে চাপানপাউরুটি সমৃদ্ধ চরিত্রহারা মুদি দোকান। দোকান ঘিরে সকালবিকেলদুপুর কিংবা ক্ষণে ক্ষণে কাজের ফাঁকে মানুষের জটলা। জমে ওঠে যেনো জালালের সেই শৈশবের আড্ডা। আড্ডায় অকৃত্রিম আনন্দ উপভোগ করতে করতে কাটিয়ে দেয় সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শহুরে জীবনে হাজার সুবিধে হলেও জালাল একাত্ম বোধ করে না। তরকারিশাকমাছ ইত্যকার নৈমিত্তিক বাজারের জন্যে তাকে অপেক্ষা করতে হয় হাটবার অব্দি। জালালের ভাগ্য বলতে হয়, তার শহরে এখনো সাপ্তাহিক হাট বসে। ছোটোবেলায় যেভাবে বাবার সাথে হাটে যেতো এখন ঠিক সেভাবে নাজলিকে নিয়ে হাটে যায় জালাল। নাজলি সাথে থাকলে ব্যাগ ধরতে সুবিধে হয় বটে কিন্তু তার থেকেও বড়ো সুখ সঙ্গে কেউ থাকলে বাজার করে শৈশবের শান্তি পাওয়া যায়।

ছোটো শহরটিতে কান ফেটে যাচ্ছে শব্দদুষণে। আকাশবাতাস প্রকম্পিত মাইকিং— …মন্ত্রীর আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম। … দলে দলে যোগদান করে বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলুন … … বিরাট ঐতিহাসিক …। ব্যানারপোস্টারে সাজ সাজ। মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন বলে কথা। আগমনী রাস্তায় থরে থরে শোভা পাচ্ছে বিশাল বিশাল গেইট।

জালাল রওনা দিয়েছে নাজলিকে নিয়ে হাটের উদ্দেশ্যে। নাজলিকে নিয়ে হেঁটে হেঁটেই হাটে যায় সে। হাটবারের বিকেলে ভীড় বেশি। হাঁটার শুরুতেই জালাল অনুভব করলো অন্য হাটবারের চেয়েও আজ ভীড় বেশি। মনে মনে বিরক্ত হলো সে। বর্ষার ভরা নদীতে যেমন খরকুটোফেনাআবর্জনা দুলতে দুলতে ভেসে যায় পানির ওপর ঠিক সেভাবে রাস্তার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মানুষের স্রোত। মাঝেমধ্যে রিক্শাভ্যানবাসট্রাকভটভটি। বিরক্তিকর স্রোতে বিলীন হতে হতে জালাল ভাবতে চাইলো, মহোদয়ের আগমন কি আজই? জালাল তখন একটা মন্ত্রীর গেইট অতিক্রম করছে। মহামান্যের আগমন তারিখ নিশ্চিত হবার জন্যে গেইটের মাথায় টাঙানো শুভেচ্ছাস্বাগতম আঁকা বাহারি কাপড়খানার দিকে চোখ তুললো জালাল। মুহূর্তে বিদ্যুতের শক্খাওয়ার মতো ঝাঁকি খেলো দৃষ্টি। বাহারি স্বাগতম কই! পুরোটা কাপড়জুড়ে মন্ত্রীর মুখাবয়ব। স্বাভাবিক মুখচ্ছবি নয়, কামরুল হাসানের ‘এইসব জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ আকৃতির ছবি।

দ্বিতীয়বার তাকাবার আগে জনস্রোত জালালকে গেইট পার করে নিয়ে গেছে। সে পেছন ফিরে না দেখেই অনুভব করলো নাজলি তাকে অনুসরণ করে হাঁটছে। ধাতস্থ হবার চেষ্টা করে জালাল ভাবতে চাইলো, ভুল দেখেছি। ইতোমধ্যে চৌরাস্তার মোহনায় পৌঁছেছে ওরা। ওখানে আরও বিশাল গেইট। এবার মস্তিষ্কে সক্রিয় হতে শুরু করলো ভয়। গেইট থেকে ওরা এখনো খানিকটা দূরে। গেইটের ব্যানারে সরাসরি তাকাতে ভয় হচ্ছে। এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লো জালাল। চোখকে সার্চলাইট করে বি¯েফারিত করলো গেইটে। এবার দ্বিধাহীন। না, দৃষ্টিভ্রম নয়, পষ্ট দেখতে পাচ্ছে পুরোটা গেইট জুড়ে মন্ত্রীর মুখগহ্বর। নদীর স্রোত ঘুর্ণির পাক দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে গহ্বরে। পিঁপড়ের মতো বয়ে যাওয়া মানুষের প্রবাহ, রিকশাভ্যানবাসট্রাক বেজায় তুচ্ছ মন্ত্রীর গহ্বরে। ক্ষুধার্ত সিংহের সামনে ইঁদুরছানার মতো কাঁপতে কাঁপতে ইচ্ছের বিরুদ্ধে এগিয়ে যাচ্ছে জালাল। স্রোতের দোলনায় দুলতে দুলতে ব্রহ্মপুত্রের খিদে ধারণকরা নাজলিকে নিয়ে আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জালাল হারিয়ে যাবে গহ্বরে।

*************************************************

দুয়ার বন্ধ …
পাভেল চৌধুরী

আকাশে আকাশে আলো আঁধারির খেলা

নিয়নের আলোয় পার্টি অফিসের বাইরেটা যত ঝলমলই মনে হোক না কেন ভেতরের চিত্রটা কিন্তু অন্যরকম। বড় কোনো নেতা না আসলে, নিদেনপক্ষে জেলা কমিটির সভাপতি বা সম্পাদক, বা তেমন কোনো প্রোগ্রাম না থাকলে, পার্টি অফিস ফাঁকাই থেকে যায়।

নীচের বড় হল ঘরে কটা ‘চ্যাংড়া’, সন্ধ্যেয় যাদের যাওয়ার তেমন কোনো জায়গা বা কাজ থাকে না, পার্টির ক্যাডার হিসেবে যাদের পরিচিতি, দোকানে বরাদ্দ ফ্রি লাল চা খায় আর পকেটের পয়সায় ভাগাভাগি করে সিগরেট ফোঁকে। রাজনীতির আলোচনা তেমন একটা হয় না, আলোচনায় কি হয়? তারা বোঝে এ্যাকশান, কাজ। নেতার নির্দেশ। নির্দেশ পেলে দ্বিধাহীনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে মুহূর্তকাল দেরী করে না। উপরে সভাপতি আর সম্পাদকের ঘর অধিকাংশ সময় ফাঁকাই থাকে। সেখানে অবশ্য মাঝে মধ্যে এসে বসে জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ জাকারিয়া। তিনি যে দলীয় কাজে আসেন এমন না, আবার বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা জমাতে আসেন তাও না। তিনি আসেন, চুপচাপ বসে থাকেন, দু-এক কাপ চা খান আর চেয়ারে হেলান দিয়ে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে সিগরেট টানেন। মোঃ জাকারিয়াকে যারা জানে তারা তাঁকে একটু ভিন্ন চোখে দেখে, কিছু বাড়তি সম্ভ্রমও তিনি পেয়ে থাকেন।

মোঃ জাকারিয়ার বয়স ত্রিশের কোঠায়। ক’বছর হলো তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাট চুকিয়েছেন। চেহারা স্বাস্থ্য সুদর্শন, সুপুরুষ। বিশ্ববিদ্যালয় চত্ব¡রে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে ছিলেন খুবই সফল। তাঁর দীপ্ত পদচারণা ছাত্র-শিক্ষক সকলের দৃষ্টি কেড়েছিল। কিন্তু বিপর্যয় ঘটলো তারপরেই। ফলিত রসায়নে মাস্টার্স শেষ করার পর নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে কাজে লাগাতে যেয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির সাথে মেহনতি মানুষের উন্নতিকে এক করে ফেললেন। এ হচ্ছে নতুন ভাবে রাজনীতিকে দেখা। বুর্জোয়া রাজনীতির মধ্যে থেকেই মেহনতি মানুষের রজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দুম্ করে তিনি পাওয়ার পার্টিতে যোগ দিয়ে ফেললেন এবং ছিনিয়ে নিলেন সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ। বড় দল, দাম তাঁর বেশি, প্রথম প্রথম ভালোই লাগছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই বুঝলেন বিধি বাম। যথাসাধ্য চেষ্টা করেও পছন্দ মত এমপি ক্যানডিটেট বানানো গেল না। ঢাকা থেকে নমিনেশন পেপার পকেটে করে প্লেন থেকে নামলেন এক দুঁদে ব্যবসায়ী, তাঁর গলায় মালা পরাবার পাল্লায় জাকারিয়া পিছিয়ে পড়লো। কিন্তু ভদ্রলোক বুদ্ধিমান, জাকারিয়ার ঘাড়ে থাবা বসিয়ে বললেন, —ইয়ংম্যান, আমি পলিটিক্স বুঝিনে, তোমাদের মত শিক্ষিতও না, পলিটিক্স তোমরা করবা, আমি ইনসেনটিভ জোগাবো; টাকা দেব।

নির্বাচনে টাকা তিনি যথেষ্ট দিলেন তারপর জিতে যেয়েই বুঝিয়ে দিলেন পলিটিক্সও তিনি কম বোঝেন না।

দলের নতুন কমিটিতে সভাপতি হলো এলাকার বিখ্যাত চোরাকারবারি চোরাকামাল, আর সম্পাদক ল্যাংড়া রশিদ। ল্যাংড়া রশিদ সন্ত্রাসী। বেশ কিছুদিন আগে পার্শ্ববর্তী গ্রামে গরু চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়লে এলাকার মানুষ গণপিটুনিতে তার পা ভেঙেছে, সেই থেকে নামের এই উপাধি। এই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো: জাকারিয়া স্বপদেই বহাল থাকলেন। এমপি মহোদয় তাঁকে বিশেষ ¯েœহ করেন। সান্ত¦না দেন এই বলে, ইয়াংম্যান, তোমার মধ্যে ইমোশন বেশী, আরও ম্যাচিওরড হতে হবে।

জাকরিয়া তাতে সান্ত¦না পায় না বরং মনের প্রত্যয়টাই যেন ঝংকার দিয়ে ওঠে,—  দেখা যাক্।

এমপি’র সাথে সভা সমিতিতে জাকারিয়া বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়। সে বলে ভালো, মানুষ অভিভূত হয়ে শোনে, এমপি মহোদয় ভাল বলতে পারেন না। গলায় তাঁর টান নেই, সুর নেই। গলা একটু উঁচুতে তুললেই শব্দ চোক্ করে যায়, সে কারণেও এমপি’র কাছে জাকারিয়ার কদর বেশি। এলাকার মানুষ এমপিকে চেনে কিন্তু তারা নেতা মানে জাকারিয়াকে।

জাকারিয়া জানে তার কতটুকু ক্ষমতা। আসলে সবক্ষমতাই এমপি’র। তারপরেই আছে জেলা কমিটির সভাপতি চোরাকামাল আর সম্পাদক ল্যাংড়া রশিদ।

তারপরও ভাই ভাই করে এমপি মহোদয়ের পা’য় পা’য় ঘোরার মধ্যেই যে তাঁর বর্তমান অবস্থান, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, এটুকু জাকারিয়া বোঝে এবং নিজের সর্বশক্তি দিয়ে এই কাজেই সে আত্মনিয়োগ করে। তাতেই কি সে এমপি’র মনের নাগাল পায়? চোরাকামাল আর ল্যাংড়া রশিদই যেন সেখানকার সবটুকু দখল করে রাখে।

একদিন ঘনিষ্ট মুহূর্তে এমপি মহোদয় তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,— তুমি ভার্সিটিতে এত ভাল বিষয়ে লেখাপড়া করে এই রাজনীতিতে কেন এলে?— সে উত্তর দিতে পারেনি।

সে কেন এল? এখন ভাবে, শুধু কি নিজের আখের গোছাতে? আসলে তাঁর মনে হয়েছিল আইডিয়া যদি থাকে পাওয়ার পর্টির মধ্যে থেকেও সমাজের জন্য ভাল কিছু করা যাবে না, তা কেন হবে? চাইকি মেহনতি মানুষের রাজনীতিতেও কী পরোক্ষ সহযোগিতা করা যায় না?

হাতের মুঠোয় নিবিড় অন্ধকার

সিজার পটকা শিমুল মদন আরও দু’জন নাম না জানা ছেলে তখন পার্টি অফিসের নীচের তলায় আড্ডা জমিয়েছে। প্রতিদিন এ সময় তাদের আড্ডা বেশ জমাট হয়ে ওঠে। পার্টি অফিস ফাঁকা, তেমন কারো আসারও সম্ভাবনা থাকে না, কাজেই নিবিড় আড্ডা হতে অসুবিধে নেই। সিজার দলের ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি। কোনো এক সময়ে কোনো এক কলেজে সে ¯œাতক শ্রেণির ছাত্র ছিল। ছাত্রত্বের পরিচয় তার সেইটুকু; তাতে অবশ্য যে কোনো কলেজের সিনিয়র ছাত্রদের ভাই হয়ে উঠতে তার সমস্যা হয় না। দলের নেতাদের ও খুব বাধ্য; গুছিয়ে কথা বলতে পারে এবং সাহসী। ওদের সবারই বয়স ২০/২৫ এর কোঠায়। যৌবনের জ্যোতি সর্বাঙ্গেই প্রজ্জ্বলিত। পটকা একটু ঢ্যাঙ্গা ধরনের। পরণের পাঞ্জাবী কাঁধ বরাবর সটান ঝুলে আছে। তার দুই পাশ পকেটে যে ভারী কিছু আছে দেখে বোঝা যায়।  সে দাঁড়িয়ে আছে। সারা মুখে হালকা হাসি ছাড়িয়ে উৎসুক চোখে সে তাকিয়ে আছে সিজারের দিকে।

সিজার বসে আছে হাতওয়ালা চেয়ারে, টেবিলের এক পাশে। সামনে টেবিল ঘিরে বসেছে বাকী সবাই।

 কি রে, হা করে দাঁড়িয়ে আছিস? সিজার বললো।

না, পার্টি আফিস তো! ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলে পড়লো পটকার।

পার্টি আফিস তো কি? সিজার অধৈর্য্য হয়। পার্টির নেতাদের আমরা চিনিনে? ধোয়া তুলসির পাতা? সব শালাকে চিনি, নে বের কর। আমরা হচ্ছি ফ্রাসট্রেটেড জেনারেশন, বুঝলি? অতো বাছবিচার নেই।

পটকা তবু দ্বিধা করে। তখন সিজার চোখ বড় করে তাকায়।

পটকা ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে গা’য় নীল রঙের কাগজ মোড়া ১টা, ২টা,  ৩টা বোতল বের করে।

৩টে মোটে?—মদন অবাক হয়।

না, আরো আছে।

কিনলি?

মদনের এই প্রশ্নে পটকা হাসে। আমি কেনবো? কামার পাড়া রেইড করে পুলিশ ১৩৬ বোতল ধরেছে, সেখান থেকে ২০ বোতল মেরে দিইছি।

সিজার হঠাৎ টেবিলে একটা থাবা দিয়ে চিৎকার করে ওঠে, সাবাস শালা পটকা, এই না হলে ক্যাডার? সরকার তুমি এগিয়ে চল আমরা আছি তোমার সাথে। বলে হি হি করে হেসে ওঠে, সাথে অন্যরাও হাসে।

পটকার পাঞ্জাবীর বাম পকেট যে ঝুলেই থাকে তার কারণ সেখানে রয়েছে তার প্রিয় জিনিস। একটা কামারে পিস্তল। নানা ধরনের ঝুঁকি আর হুমকি থাকা সত্ত্বেও এই পিস্তল সে কিছুতেই হাত ছাড়া করেনি। এটা থাকলে তার সাহস বাড়ে, মনে বল পায়।

কদিন আগে গুরগোল্লার মোড়ে রাস্তার ধারে টোঙের ভেতর বজলু এসআইকে চা খেতে দেখে পটকা এগিয়ে গিয়েছিল। রাত তখন সাড়ে ১১টা, ১২টা হবে।

স্যার এখেনে? পটকা জিজ্ঞেস করেছিল।

 আমাদের কি আর এখেনে সেখেনে আছে রে, ক্রিমিনাল দাবড়াচ্ছি।

কে, ভ্যান খালেক? —বজলু এসআই মাথা নাড়লে পটকা উত্তেজিত হয়ে ওঠে।  ধরেন তো, ধরে আচ্ছা মত ঠ্যাঙানি দেন, শালা খানকির ছেলে আমাদের এমপি চাচার বিরুদ্ধে এত বাজে কথা বলে বেড়াচ্ছে!

বজলু এসআই অকস্মাৎ পটকার পাঞ্জাবীর পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়, কিরে এখনও এই মাল নিয়ে ঘুরছিস?

পটকা হেসে ফেলে। বোঝেন তো স্যার, কত ঝামেলা ঝক্কি থাকে, এটা থাকলে মনে বল পাই।

কিসের বল! বজলু এসআই অবাক হয়; এই সব কামারে মালের কোনো ভরসা আছে? সোজা মারবি তো ডানে যাবে, না হয় বামে যাবে, টার্গেট মিস, তার থেকে বিদেশী মাল রাখ।

রেখেছিলাম স্যার, তাৎক্ষণিক জবাব দেয় পটকা। তা খুব ঝামেলা, এ চায় সে চায়, ভাবলাম আমার দেশী মালই ভাল। কেউ চায়-টায় না। আর টার্গেট মিস হবে কি, হিট হয় তো বডিতে ঠেকিয়ে, ডানে বায়ে কদ্দুর সরবে?

বজলু এসআই হা হা করে হেসে ওঠে। পটকার ঘাড়ে একটা আদুরে থাবা বসিয়ে বলে, হারামজাদা, যা সিগরেট নিয়ে আয়।

সে দৌড়িয়ে এক প্যাকেট বেনসন সিগরেট এনে দিলে বজলু ১টা সিগারেট ধরায়।

এই ফাঁকে পটকা বলে,  এখন তো খুব আদর দেখাচ্ছেন, সরকার পাল্টি খালি তো ছাইগুষ্টি সব ধরে প্যাদানি দেবেনেন।

বজলু এসআই এর ঠোঁটে ধরা জ্বলন্ত সিগরেটটা একটু দুলে ওঠে। তারপর সে দার্শনিকের মতো উক্তি করে,—বুঝিসনে, সরকারি চাকরি করি তো, তা তোদের সমস্যা কি? সরকার পাল্টাবে, তুরাও পাল্টাবি!

টেবিল ঘিরে বসা সিজার, পটকা মদন শিমুল আরও নাম না জানা দু’জনের সামনে ৩ বোতল ফেনসিডিল পর পর সাজান। ধ্যানমগ্নের মত তারা তাকিয়ে আছে সেদিকে। ফেনসিডিল তারা যে খায় না এমন না, তবে পার্টি আফিসে বসে ফেনসিডিল খাওয়ার ব্যাপারটা তাদের কাছে নতুন এবং রোমাঞ্চের।

গুরু,  মদন বললো,  তুমি তো আমাদের লিডার, তুমিই শুরু করো।

হ্যাঁ, আমিই শুরু করবো, সিজার বললো, আমি কারো ভয় পাইনে বুঝলি? সব শালাকে চিনি।

এ পর্যন্ত বলে সে ছোঁ মেরে একটা বোতল তুলে নেয় তারপর দু’হাতের তালুর মধ্যে চেপে ধরে মুটকিতে এমন জোরে মোচড় দেয় যে সেখান থেকে আর্তনাদের মতো শব্দ ছুটে আসে।

নিষেধের বাঁধ খেয়ালী-কপোত ডানা

মো. জাকারিয়ার রাজনৈতিক জীবনে বলা যায় আজকে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল।

দুপুরের পর থেকে তাঁর মনটা এত খারাপ যে দুপুরের খাবার খেতেও সামান্য আগ্রহ হলো না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্যে। সে চলে এল সোজা পর্টি অফিসে। সম্পাদকের ঘরটা এখন নির্জন। নিরিবিলি একা, আজকের সারাদিনের ঘটনাগুলো নিয়ে সে ভাববে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁর নিতে হতে পারে। সে যখন উপরে উঠে আসে তখন নীচের হল ঘরে সন্ধ্যের আলো জ্বলেছে। আলোটা পর্যাপ্ত না, সে খেয়াল করেছে কিন্তু ঘরে কারা ছিল এটা তাঁর চোখে পড়েনি। দরজার কাছে তাঁর দেখা হলো এ অঞ্চলের সবার চেনা সাদা-কালো রঙের স্বাস্থ্যবান বেওয়ারিশ কুকুরটার সাথে। ভয়ংকর চেহারা কুকুরটার কিন্তু আসলে নিরীহ। সুযোগ পেলে সে পার্টি অফিসে ঢোকে, কারো খেয়ে ফেলা ভাঙা বিস্কুট কেক্ বা মাটিতে ছড়িয়ে পড়া চ্যানাচুর খোঁজ করে। কুকুরটা পার্টি অফিস থেকে বের হচ্ছিল। মো: জাকারিয়ার দিকে সে চোখ কুঁচকে তাকায়, চোখাচোখি হয়, আর তখন কুকুরটা যেন মুখে মৃদু শব্দ করে জাকারিয়ার গা’য়ে লেজটা ঘষে দেয়।

জাকারিয়া দ্রুত উপরে উঠে আসে।

আজ সকালে যে ঘটনার সম্মুখিন সে হয়েছিলো সেটা তাঁর জীবনে শুধু অপ্রত্যাশিত ছিল না, ছিল চরম অকল্পনীয়। বাড়ীর বসার ঘরে যখন সে সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে নানা শলাপরামর্শে ব্যস্ত তখন যাকে সে ঘরে ঢুকতে দেখলো তাঁকে দেখে মন্ত্রমুগ্ধের মত উঠে দাঁড়ানো ছাড়া তাঁর উপায় ছিল না।

স্যার আপনি!

হাতে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসাইট প্রফেসর এক সময়ের প্রগতিশীল শিক্ষক গোষ্ঠির অবিসংবাদিত নেতা প্রফেসর ড: এ কে জোয়ার্দ্দার ঘরে ঢুকলেন। তারপর হাতের মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলের উপর রেখে বসে পড়লেন।

জাকারিয়া মিষ্টির প্যাকেটের দিকে তাকালো এবং তাঁর স্যারের দিকে। কি বিশাল ব্যক্তিত্ব আর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন এই স্যার। সুঠাম ঋজু শরীর,স্পষ্ট কথাবার্তা। তাঁর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে পারলেই যেন স্বস্তি পেত ছাত্ররা। অথচ তিনি ছিলেন ছাত্র-বান্ধব, আন্তরিক। এ ক’বছরে তাঁর চেহারা পাল্টিয়েছে। চুলগুলো সব সাদা, মুখে স্পষ্ট বলিরেখা। মনে হচ্ছে যেন বার্ধক্য চেপে বসেছে তাঁর সমস্ত শরীরে।

স্যারের হাতে মিষ্টির প্যাকেট দেখে নিজের কাছেই নিজেকে কেমন ছোট মনে হলো জাকারিয়ার। তাঁকে খবর দিলেই কি সে ছুটে যেতে পারতো না?

বড়ো বিপদে পড়েই তোমার কাছে এলাম, স্যারের গলা বিপর্যস্ত, ভঙ্গুর,  শুনেছি তুমি রুলিং পার্টির ভাল পজিশন হোল্ড করছো, তা আমাকে একটু না দেখলে তো হয় না।

সমস্যাটা জাকারিয়া মনযোগ দিয়ে শুনলো। এই শহরের রায়পাড়ায় কোনো এক সময়ে তিনি এক টুকরো জমি কিনেছিলেন। কিছুদিন আগে খবর পেয়েছেন সেই জমিতে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনে কারা যেন ঘর তুলছে। তিনি তাদের সাথে দেখা করেছেন, তারা বুঝিয়েছে যেহেতু তারা কাঁচা ঘর তুলছে সেহেতু এটা দখল না, জায়গাটা তারা কাজে লাগাচ্ছে মাত্র। এর মধ্যে তাদের কেউ একজন স্যারের সাথে যোগাযোগ করে শর্ত দিয়েছে যে যদি তাদেরকে ৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় তবে তারা দখল ছেড়ে দেবে। স্যার থানায় গিয়েছিলেন; থানা পরামর্শ দিয়েছে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটা মিটিয়ে ফেলতে।

স্যারের কাছে এই বৃত্তান্ত শুনে জাকারিয়া আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়লো। তাৎক্ষনিক স্যারকে সাথে নিয়ে সোজা চলে গেল ডিসি অফিসে। সৌভাগ্যক্রমে ডিসি সাহেব অফিসে ছিলেন। ল্যাংড়া রশিদ আর দু’জন ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে খোলা মনে গল্প করছিলেন।

জাকারিয়াকে দেখে ডিসি সাহেব সহাস্য সম্ভাষণ করলেন,—এই যে ইয়ংস্টার আসুন, এই বারই তো আসর জমবে।

কিন্তু জাকারিয়া ডিসি সাহেবের সাথে স্যার প্রফেসর ড. একে জোয়ার্দ্দারকে পরিচয় করিয়ে দিলে আসর আর জমলো না। বিস্তারিত ঘটনা ডিসি সাহেবকে বললো জাকারিয়া। তিনিও মনযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর চা’র কথা বলি,-এই কথা বলে চা’র অর্ডার দিয়ে একটু ভেবে স্যারকে উদ্দেশ্য করে বললেন,-আইনের দৃষ্টিতে কথাটা তারা যে খুব ভুল বলেছে তা কিন্তু না। দখল বলতে আসলে পাকা স্থাপনা অর্থাৎ ব্রিক ওয়ার্কসকে বোঝায়, তা আপনার সমস্যা কি? এখন তো আর কিছু করছেন না, যখন করবেন আমার বিশ্বাস ওরা নিশ্চই উঠে যাবে।

এটা কোনো কথা হলো?  জাকারিয়া একটু উত্তেজিত হয়ে গেল।

কথাই তো হলো, আমি তো বেসিক কথাটাই বললাম। ডিসি সাহেব মৃদু হাসলেন।

জাকরিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেল। কিছু সময় তাঁর মুখ দিয়ে কথা সরলো না। তারপরও নিজেকে যথেষ্ট সংযত রেখে সে বললো, না, ওটা বেসিক কথা না, বেসিক কথা হলো আপনাকে ঐ জমিটা দখল মুক্ত করে দিতে হবে।

হাস্যোজ্জ্বল ডিসি সাহেবের মুখটা কেমন নিথর হয়ে গেল।

 হ্যাঁ দেব, তবে এমপি সাহেবকে দিয়ে আপনাকে ফোন করাতে হবে।

এমপি সাহেব! জাকারিয়ার গলা চড়ে গেল, এমপি সাহেব কেন, আপনি আমাকে চেনেন না?

না চিনি না, – নির্লিপ্ত ভাবে ডিসি সাহেব বললেন, আপনি কে?

ঠিক আছে আমি কেউ না, দেশের নাগরিক তো? জাকারিয়ার গলা কাঁপছে, সমস্ত শরীর জুড়ে যেন উত্তেজনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। দেশে আইন-কানুন বিচার-বিবেচনা কিছুই কি নেই?- আর্তনাদের মতো শোনালো জাকারিয়ার গলা।

দেশে আইন-কানুন বিচার-বিবেচনা কোথায় কতটুকু আছে আমার থেকে আপনি কি কম বোঝেন জাকারিয়া সাহেব? আগের মতই নির্লিপ্ত ভাবে ডিসি সাহেব বললেন, —যান, এখানে সিনক্রিয়েট না করে স্যারকে নিয়ে এমপি সাহেবকে যেয়ে ধরেন, তাঁর যদি দয়া হয় আমাকে ফোন করে বললে আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।

জাকারিয়া আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলো না। উত্তেজনার চরমে উঠে স্প্রিংয়ের মত লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললো, সব শূয়োরের বাচ্চাকে আমি দেখে নেব, ঠগ, বাটপার।

ল্যাংড়া রশিদও মার মুখো হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, হুংকার দিয়ে বললো, জাকারিয়া, বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।

মুহূর্তকাল দেরি না করে ঝড়ের গতিতে জাকারিয়া বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। পেছনে প্রফেসর ড. এ কে জোয়ার্দ্দার। জাকারিয়ার নাগাল ধরতে তিনিও দ্রুত পা চালালেন আর ডাকতে লাগলেন,—জাকারিয়া, ও জাকারিয়া। একসময় জাকরিয়া ঘুরে দাঁড়ালো। দু’হাত জোড় করে মিনতি করে বললো, প্লিজ স্যার, প্লিজ। বলেই দ্রুত পা চালিয়ে ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

এদিকে ডিসি অফিসের পরিবেশটা তখন ভারী হয়ে উঠেছে।

থমথমে মুখে ডিসি সাহেব তাকালেন ল্যাংড়া রশিদের দিকে, —দেখলেন তো সিচুয়েশনটা?

ও একটা শয়তান স্যার, বানচোৎ, আমি আজকেই এমপি সাহেবকে পুরো ঘটনাটা বলবো।

প্লিজ, ডিসি সাহেব যেন অনুনয়ের সুরে বললেন, আপনাকে কাউকে কিছু বলতে হবে না, আর শুনুন,কিছু মনে করবেন না, আপনাদের এমপি সাহেব হচ্ছে একটা নাম্বার ওয়ান ইডিয়েট বুঝলেন?

ল্যাংড়া রশিদের চোখ ঘোলা হয়ে গেল। মাছের মতো পলকহীন সে তাকিয়ে থাকলো ডিসি সাহেবের দিকে।

বন্ধ দুয়ার রুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস

পূর্বাপর ঘটনাটা মো. জাকারিয়া যাচাই করলো। না, তাঁর কিছুই করার ছিল না।  সে যে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল তার কারণটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঘটনার জের এখনও আছে, সেটা টের পাচ্ছে। মাথার মধ্যে থেকে থেকে যেন বিদ্যুতের চিড়িক দিচ্ছে।

আবার কি সে উত্তেজিত হয়ে উঠছে? সে, মো. জাকারিয়া, ফলিত রাসায়নে অনার্স, মাস্টার্স, সব ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে এসেছে শুধু নিজের জন্য না, দেশের জন্য, মানুষের জন্য। বিনা কারণে তাঁকে অপমান করলে, অপদস্ত করলে, সে  মেনে নেবে? তাই হয়!

টেবিলের উপর সজোরে একটা কিল বসালো সে, তারপর একটা সিগরেট ধরালো।

শরীরটা একেবারে নির্ভার করে দিয়ে সিগরেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো যে, না আর না, হয় তাঁকে এই অবস্থান থেকে একেবারে সরে আসতে হবে, অথবা যে ঘটনায় আজ সে নিজেকে বেশামাল করে ফেললো, এ জাতীয় অথবা এর থেকে আরও নিকৃষ্ট পরিস্থিতি রপ্ত করার মতো যথেষ্ট বিবেকহীন হয়ে উঠতে হবে তাঁকে।

তাঁর পথ কোনটা?

হাত ঘুরিয়ে ঘড়ি দেখলো জাকারিয়া। রাত বেশ হয়েছে। খোলা জানলা দিয়ে সারাসরি চোখ যেয়ে ঠেকলো বাইরের এক টুকরো রূপালী আকাশে। নিপাট জ্যোৎ¯œায় ধুয়ে যাচ্ছে আকাশ, এরকম সে কি দেখেছে কোনোদিন? অভিভূতের মতো কতক্ষণ সে চেয়ে থাকলো সেদিকে।

জানলা সে বন্ধ করলো না, এমনকি ঘরের বাতিটাও নিভালো না, দ্রুত সে নেমে গেল নীচে।

নীচের ঘরে টেবিল ঘিরে তখন অনঢ় মূর্তীর মতো বসে আছে সিজার পটকা শিমুল মদন, আরও নাম না জানা দু’জন।

কি ব্যাপার এত রাতে তোমরা? —অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো জাকারিয়া।

ইয়েস বস্,—সিজার ওদের নেতা, নির্দ্বিধায় সে বললো, —আমরা মাল খাচ্ছি।

সিজার, —ধমক দিয়ে উঠলো জাকারিয়া।

ইয়েস বস্,—সিজার উঠে দাঁড়ালো, —আমরা মাল খাচ্ছি আর ফুর্তি করছি।

সিজারের চোখ দু’টো কেমন অস্বাভাবিক লাগলো। মুখজুড়ে যেন সাপের নাচন। জাকারিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেল।

 আপনিও বস্, আমাদের সাথে ফুর্তি করবেন। সিজারের ঠোঁটের কোনায় এক টুকরো নির্মম জেদ ঝুলে পড়লো।

 এসব কি বলছো তোমরা?

 আমাদের গুরু ঠিকই বলেছে বস্, আমরা মাল খাবো, ফুর্তি করবো, আপনি লস্ট জেনারেশন বলে বক্তৃতা করে বেড়াবেন, তাতো হবে না বস্। এই কথা বলার জন্য মদন যেন প্রস্তুত হয়েই ছিল।

সিজার কিছু একটা ইশারা করলে ওরা উঠে ঘিরে ধরলো জাকারিয়াকে; দরজায় যেয়ে দাঁড়ালো দু’জন।

তাদের সবারই চোখ ভারী আর লাল, মুখে ভয়ংকর খেলায় মেতে ওঠার উল্লাস।

সিজার একটা ফেনসিডিলের বোতল জাকারিয়ার মুখের কাছে তুলে ধরে বললো, -প্লিজ বস্, মাত্র দু’ঢোক, —বলেই সে খিক করে হেসে উঠলো।

জাকারিয়া হাত দিয়ে ধাক্কা দিলে ফেনসিডিলের বোতলটা ছিটকে পড়লো।

মনে হলো না এই ঘটনায় কারো কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে সবাই মেনে নিল ঘটনাটা, শুধু তারা আরও একটু ঘনিষ্ট হয়ে এল।

টেবিলের তলা থেকে আর একটা ফেনসিডিলের বোতল বের করে খুব মনোযোগ দিয়ে মুটকির প্যাঁচে মোচড় দিয়ে সিজার বললো,  বস্, এতগুলো ক্যাডার আমরা আপনাকে রিকোয়েস্ট করছি, আপনি শুনবেন না? আমরা তো শুনি, উইথআউট এনি কোশ্চেন আমরা তো ঝাপিয়ে পড়ি আপনাদের অর্ডারে।

 সিজার মদন প্লিজ, আমার কথা শোন প্লিজ, তোমাদের মতো আমিও, আমিও- জাকারিয়ার শরীর কাঁপে, গলা কাঁপে, বিশ্বাস করো, বিশ্বাস করো, দু’হাত জড়ো করে সে অনুনয়ে সিক্ত হতে থাকে।

অচমকা পিঠের কাছে কিসের স্পর্শে সে সচকিত হয়। আর পেছন ফিরে তাকাতেই পটকা আকর্ণ বিস্তৃত হাসি ছড়িয়ে দিলো।

জাকারিয়া ঠা-া হয়ে যায়।

পিঠের ঠিক মাঝখানে পিস্তল ধরেছে পটকা।

বডি টাচে টার্গেট মিস হবে না বস্, ডানে বামে কতদূর সরবে, পটকা বললো।

জাকারিয়ার নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ঘরের ভেতরের আলো ক্রমশ নিস্প্রভ হয়। বুভুক্ষার মতো চারিদিকে তাকায় সে। জানলা সব বন্ধ, দরজায় দু’জন দাঁড়িয়ে। খোলা বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস কি সে নিতে পারবে না?

সিজারের হাতে মুখ খোলা ফেনসিডিলের বোতল জাকারিয়ার মুখের কাছে উঠে আসে আর কটা আত্মবিনাশী কৌতুক-চোখ তাঁকে ঘিরে নাচে।

শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে শ্বাস কাজটা চালায় জাকারিয়া। হঠাৎ জোৎ¯œা প্লাবিত এক টুকরো রুপালী-আকাশের প্রত্যাশায় তাঁর চোখ দু’টো কোটর থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায় আর বন্ধ দরজা জানলাগুলোর উপর তীব্র বেগে আছড়ে পড়তে থাকে। তখন ভেঙেচুরে চুরমার হওয়া ছাড়া তাঁর আসলে আর কোনো উপায় থাকে না।

ঘরের ভেতর উম্মত্ত হাসির ঘূর্ণি ওঠে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ জাকারিয়াকে ঘিরে কতগুলো আদিম প্রাণী মহা-মচ্ছবে মাতে।

*************************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা