গ ল্প–বি ষ য় ক–প্র ব ন্ধ

ইমতিয়ার শামীম
সংকট কোনখানে

বেশ কিছুদিন আগে মোবাইল ফোনে আমার কথা হয় এক তরুণের সঙ্গে। বইপত্র পড়তে ভালবাসে সে, আগ্রহী লেখালেখিতেও। অবশ্য আমার লেখা তেমন একটা পড়া হয়ে ওঠেনি তার। দৈনিক এক সংবাদপত্রের ৭-৮ বছর আগের ঈদসংখ্যায় ছাপা হওয়া একটি উপন্যাস পড়েছিল কোনও এক সময়ে, সেই থেকে আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। দুএকটা গল্পও পড়েছে। আলাপটা এ পর্যন্ত সহজেই চলছিল। কিন্তু কথাবার্তার এক পর্যায়ে শুনি, মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে সে। আমি জানি না, আমার কথায় তার পর ছন্দপতন ঘটে কি না। তবে অন্তত এটুকু বলতে পারি, আমি বিস্মিত হয়েছি। বিস্মিত, এবং সতর্ক। ভীত হইনি, সেটি আমি নিশ্চিত বলতে পারি। তাই বলে আমাকে সাহসী ভাবাও ঠিক হবে না। তা ছাড়া আমার সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ভূমিকা এমন যে এই প্রাণটা কেড়ে নেয়ার আকাক্সক্ষা কাউকে তাড়া করছে— অন্তর থেকেই বলি, আমি তেমনটা মনে করি না। তবে চার পাশে যা ঘটছে তাতে একজন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এখন কোনও লেখক, বুদ্ধিজীবী কিংবা সংস্কৃতিকর্মীর কাছে ফোন করছে, ঘনিষ্ঠ হতে চাইছে— এমন ব্যাপারকে নির্দোষ স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করেন, এরকম মানুষের সংখ্যা ক্রমশই কমছে। স্বভাবতই আমি বিস্মিত হই— অজান্তে সতর্কও হই একটু। জিজ্ঞেস করি, আমার ফোন নাম্বার সে কার কাছ থেকে পেয়েছে। এক কথাসাহিত্যিকের নাম বলে সে— যিনি আমার ঘনিষ্ঠ পরিচিতও। পরে তার সঙ্গেও কথা বলি আমি। তিনি জানান, নাম্বারটা তিনিই দিয়েছেন। কিন্তু দেয়ার পর থেকে তারও মনের মধ্যে খচ খচ করছে। স্পষ্ট বুঝতে পারি, তিনি বিব্রত বোধ করছেন। যদিও তার বিব্রত হওয়ার কারণ নেই— তরুণটি সহজেই আকৃষ্ট হওয়ার মতো, তার জানার আগ্রহ, প্রশ্ন করার সক্ষমতা তো আছেই— নিজের জীবনের যে দু-চার টুকরো ঘটনা জানিয়েছে সে, তাও তার প্রতি আকর্ষণ আর সহানুভূতিই বাড়ায়। সে যে অন্যরকম এ ব্যাপারে আমাদের কোনও সংশয় নেই। কিন্তু তারপরও কী এক অনিশ্চয়তা আর দ্বিধা নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলি আমরা।

এর পরও ওই তরুণের সঙ্গে আরও দু-তিনবার কথা হয়েছে আমার। সে আমার আরও একটি নতুন উপন্যাস পড়েছে, বণিক বার্তার ঈদসংখ্যায়— তা নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে তার। আমার ই-মেইলে সে পর পর দুবার নিজের লেখাও পাঠিয়েছে। একটি লেখায় জীবনের শুরুতেই যে দোটানার মধ্যে দিয়ে তাকে এগুতে হচ্ছে, সেসবের যন্ত্রণা বেশ স্পষ্ট। তার আরেকটি লেখার প্রসঙ্গ সমকামিতা। তার অন্য কোনও ভাই বা বোন মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেনি, কিন্তু তাকে করতেই হচ্ছে; কেননা সে মানতের সন্তান। এই অবস্থাটা আমি বেশ স্পষ্টই বুঝতে পারি, কেননা আমার মাকেও দেখেছিলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ না থাকার পরও আশা করতে, তার কোনও একটি ছেলে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করুক। অবশ্য তা আকাক্সক্ষাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। পীড়াপীড়ি করে আমাদের কোনো ভাইকে অস্থির করে তোলেননি তিনি, আর আমাদের ভাইদেরও কারও ইচ্ছা ছিল না তার আকাক্সক্ষা পূর্ণ করার। এইসব ইচ্ছের কথা এখনও যে তিনি মনে রেখেছেন, সে রকমও মনে হয় না। ছেলেটির কথাবার্তা শুনে, লেখা পড়ে স্মৃতির অতলে দূর কৈশোরের একদমই চাপা পড়ে যাওয়া এই ঘটনা হঠাৎ করেই আমার মনে পড়ে যায়। প্রচ- কৌতূহলও জাগে। তবে সে কৌতূহল দমনও করি। দুঃস্বপ্নের মতো অনেক ঘটনাও ধেয়ে আসে চিন্তার জগতে। পত্রপত্রিকায় চোখ রাখলেই জঙ্গিবিরোধী অভিযানের খবর, আমাদের ভূগোলেই বসবাস করা মানুষজনের এমন পথে পা বাড়ানোর খবর আর শেষ পর্যন্ত আবেদনহীন মৃত্যু এবং আমার মুক্ত বন্ধুপরিজনের নানা উদ্বেগ আমাকে আচ্ছন্ন করে। আমার আর সেই তরুণের সঙ্গে ঠিক যোগাযোগও রাখা হয় না। আবার অপরাধবোধেও ভুগি। একজন মানুষকে খুব কাছ থেকে জানার এমন সুযোগ তো খুব বেশি আসে না, যন্ত্রণাকে আজকাল আমরা নিজেদের মধ্যেই আটকে রাখার কৌশল শিখে নিচ্ছি কিংবা ‘আপনার সমস্যা’ পাতায় বা অনুষ্ঠানে গোপনে জানিয়ে সান্ত¡না খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি। নগরের জীবন, জীবিকার তাগিদ কিংবা দৈনিক সংবাদপত্রের ফিচার পাতায় প্রতিনিয়ত প্রকাশিত জীবনযাপনের সহজ উপায় আমাদের এইসব কৌশল শিখিয়ে দিচ্ছে নিবিড়ভাবে। তাই সামান্য লেখালেখি করার সুবাদে পাওয়া একটি অমূল্য সুযোগ যে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে সেটাও বুঝতে পারি। যদিও অপরাধবোধ ঠিক এই কারণে নয়— অপরাধবোধ জাগে এই কারণে যে, মানুষ হিসেবে একজন মানুষের সঙ্গে যে আচরণ করা দরকার, তাও আর করতে পারছি না।

অভিজ্ঞতা, যা নাকি একজন লেখকের বা কথাসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, তার সংস্পর্শে যাওয়ার বা আসার সুযোগ এরকম কত অলিগলিতে যে হারিয়ে যায়, তার হিসেবনিকেশ করাও এক কঠিন ব্যাপার। সময় আমাদের জন্য এ কাজটিকে কঠিন করে তোলে। কথাসাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাকে সবাই উচ্চে রাখতে চান। কিন্তু সর্বোচ্চ অভিজ্ঞতাও সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম কি না তা নিয়ে অন্তত আমার সংশয় রয়েছে। নিঃসন্দেহে একজন জনপ্রিয় নেতা, আইনজীবী কিংবা ভালো ডাক্তার প্রচুর মানুষের সান্নিধ্যে আসেন, নানা প্রকরণের মানুষকে চেনেন তারা, জানেন তাদের গলিঘুপচি; আবার একজন কৃষক, জনশক্তি নামক শ্রমিক, পরিবেশবিদ আর পর্যটক বিচিত্র প্রকৃতি আর ভূগোলের সান্নিধ্যে আসেন। কিন্তু কথাসাহিত্যিক মানুষ আর প্রকৃতির এত সান্নিধ্যে না এসেও তার চালচিত্র তৈরি করে ফেলতে পারেন। কারণ অভিজ্ঞতাকে, মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে নিজের দেখার পারস্পারিকতাকে তারা দ্রুতই উদ্ঘাটন করতে পারেন, ছেঁকে তুলতে পারেন। কিন্তু এই অমিত ক্ষমতা থাকার পরও তাকে অন্তত মানুষের কাছে যেতে তো হবে, প্রকৃতির কাছে যেতে তো হবে, দুম করে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানের সামনে যেন বা অনন্তকালের জন্য দাঁড়িয়ে তো পড়তে হবে। কিন্তু সময় আমাদের পক্ষে নেই— মানিক জেলেদের মধ্যে গিয়ে থেকেছিলেন, তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেননি। কিন্তু আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রচ- কৌতূহল থাকার পরও হয়তো একজন লেখক মাদ্রাসার তরুণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বা নিয়মিত মাদ্রাসা এলাকায় যেতে নিরুৎসাহিত হবেন; আবার তিনি যদি উৎসাহিতও হন, ভয়কে জয় করতে সক্ষমও হন, আমি নিশ্চিত নই, তার মতাদর্শের স্থানটিকে তারই নিকটজনরা ঠিক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করবেন। হয়তো বিরুদ্ধবাদীদের কোপানলে পড়ার আগেই তিনি স্বগোত্রে নিষিদ্ধ ঘোষিত হবেন।

এ একটি জটিল পরিস্থিতি। হ্যাঁ, আপনি-আমি বলতে পারি, এই যে অন্তঃক্ষরণ, এই যে অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হওয়া, এ-ও তো একটি বিষয়, এর মানুষটিও তো একটি চরিত্র। তাকে নিয়েও লেখা যেতে পারে। কিন্তু এভাবে লিখলে যা হয়, তা হল, আমরা একটি বিকল্প পথে হাঁটি, বাইপাস দিয়ে হাঁটি, ডাইভারশন দিয়ে হাঁটি। সেটিও একটি জগত বটে, কিন্তু যে জগৎ আমাদের হাতছানি দিয়েছিল, যেখান থেকে চিন্তার শুরু হয়েছিল, যে বিষয় বা যে মানুষ আমাদের লেখার স্বপ্ন ছিল, তার কোনোটিকইে হয়তো এ জগতে আর রাখা যায় না। কোনোটিই তাতে থাকে না। এই যন্ত্রণা সব লেখক হয়তো উপলব্ধি করেন না বা করতেও পারেন না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমাকে করে। এটি লেখার গতিকেও শ্লথ করে থাকে। তরুণকালে আমরা ভয়ংকর অভিযোগ করেছি, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা হাসান আজিজুল হকের যতটা লেখার কথা ততটা লিখছেন না বলে। কিন্তু এখন অনুভব করি, কী যন্ত্রণায় তাদের কলম অবশ হয়ে থাকত। ইলিয়াস আর হকের পত্রালাপেই পাই, দুইজন বলাবলি করছেন, চরিত্রগুলো মাঝে মধ্যে বড় বেশি বেয়াড়া হয়ে ওঠে, লেখককে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে চলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, লেখক সেই চরিত্রকে কতটুকু স্বাধীন রাখতে পারেন, স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠতে দিতে পারেন। নির্মম সত্য হলো, লেখককে প্রতিনিয়ত সে চরিত্রকে কাটাছেঁড়া করে নির্দিষ্ট আকৃতির মধ্যে রাখতে হয়। ফলে আমরা আমাদের কল্পনাশক্তির জোরে অনেক কিছুই সংক্ষিপ্ত করি, গোঁজামিল দিয়ে চলি এবং বলতে গেলে গোঁজামিল দেয়ার সক্ষমতা যার যত বেশি, অপরের কল্পনাশক্তিকে লুঠ করে আত্তীকরণ করে ফেলার ক্ষমতা যার যত বেশি, তিনিই হয়তো তত সফল কথাসাহিত্যিক হয়ে উঠতে পারেন। আমার এ কথাকে আমার নিজের কাছেই আপত্তিকর লাগে। কিন্তু আমি নিরুপায়। সফল কথাসাহিত্যগুলো আমাদের এরকম সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে কি না, তা নিয়ে চিন্তা করা করতে গেলে শেষ পর্যন্ত এরকম ভাবতেই উৎসাহী হই আমি। কেননা শেষ পর্যন্ত জীবনযাপনের আর ব্যক্তি অনুভূতির যে প্যাটার্ন লেখক উদ্ঘাটন করতে থাকেন, তা তার স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচনক্ষমতারই প্রকাশ। লেখায় ডিটেইলিং ও সংক্ষেপীকরণের যে দ্বন্দ্ব অবিরাম লেখককে কুঁড়ে খায়, তাতে এ ছাড়া আর কোনও পথ তার সামনে খোলা থাকে না।

লেখালেখি যিনি করছেন, যিনি করবেন কীভাবে তিনি অভিজ্ঞতার দ্বারস্থ হবেন, কীভাবে তা আহরণ করবেন কিংবা ডিটেইলিং বনাম একবাক্যে পুরো আকাশ তুলে ধরার দ্বন্দ্বকে নিরসন করবেন, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যাওয়া কতটুকু অনিবার্য তার কাছে— এইসব নিশ্চয়ই তার যন্ত্রণার কারণ; কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যাপার, এটা তার কাছে আবার বিশাল এক পরিভ্রমণ। ধ্রুপদ বলি আর জনপ্রিয়ই বলি,— আলাদা করে চোখে পড়ার মতো যেসব কথাসাহিত্যিক রয়েছেন, তাদের লেখালেখি সংক্রান্ত স্মৃতিকথা কিংবা কেন লিখি জাতীয় ব্যক্তিগত গদ্য পড়তে গিয়ে মনে হতে পারে, কথাসাহিত্যের সংকটগুলো হয়তো নেহাৎই ব্যক্তিগত পর্যায়ের বা উপলব্ধির, যার সঙ্গে যুদ্ধ করে, যাকে অতিক্রম করার মধ্যে দিয়ে তিনি দশজনের চোখে আটকে যাওয়ার মতো গল্প-উপন্যাসগুলো লিখতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু  শেষ পর্যন্ত এসব সামগ্রিক সংকটের নিতান্তই ক্ষুদ্রাংশ কিংবা হয়তো কোনও সংকটই নয়। কারণ এইসব যত বড় পরিভ্রমণই হোক না কেন, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও অনেক মানুষের পরিভ্রমণ; বলতে গেলে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিভ্রমণও বটে। সফল কিংবা ব্যর্থ মানুষগুলোর পরিভ্রমণ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিভিন্নভাবে। আমরা যখন সকালবেলায় দরজার কাছ থেকে হকারের রেখে যাওয়া খবরের কাগজ কুড়িয়ে নিই, তখন আমাদের প্রত্যাশা থাকে, পজিটিভ বাংলাদেশকে দেখতে পাব, আমাদের সন্তান নাসায় চাকরি করছে, মহাশূন্যযানে ঘোরাফেরা করছে, কিংবা একুশ টাকার পুঁজিতে বেগুনের টাল দিয়ে একুশ শতকের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হতে চলেছে জলেশ্বরী অথবা কোন এক গ্রামের অমুক! আমরা চাই দুই নেত্রী একসঙ্গে বসে বাদামভাজা খাচ্ছেন, সংবাদপত্রে এমন ছবি ছাপা হচ্ছে। চার পাশের রক্তারক্তি, হানাহানি দেখতে আমাদের আর ভালো লাগে না। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তেমন প্রত্যাশা করার মতো লোকের অভাব নেই। আবার বেশির ভাগ পাঠকই এমন এক গোত্রের— যারা সাহিত্যের কাছ থেকে চান কাঁদবার শক্তি। হাসতে হাসতে পড়তে থাকব, তারপর কান্না সংক্রমিত হবে এবং তা আর থামবে না কিছুতেই। কমলকুমার মজুমদার প্রার্থনা করেছিলেন, চোখ চলে গেলেও কান্নার শক্তি যেন না হারান তিনি। এঁরাও তেমন, চোখের জলে ভেসে পরিশুদ্ধ হতে চান তারা। যিনি কাঁদাতে পারেন, হাসাতে পারেন তিনিই সফল সাহিত্যিক; আর যিনি হাসাতে কাঁদাতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত উদ্বেগ ডেকে আনেন, নিস্পৃহতা আনেন, চিন্তিত করে তোলেন— তিনি দুর্বোধ্য কথাসাহিত্যিক। কুকুরকে মারার আগে মিথ্যা অপবাদ দেয়ার মতো একজন সাহিত্যিককেও একঘরে করে ফেলার জন্য প্রথমেই যে অপবাদটি দেয়া হয়, তা হলো উনি তো দুর্বোধ্য লেখেন। শুনেছি একজন সুপরিচিত লেখক নাকি একবার কোনও এক প্রকাশ্য সভায় উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে প্রশংসামিশ্রিত তির্যক বক্তব্য দিতে দিতে লাগসই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, ‘এই যে খোয়াবনামা এত বিখ্যাত বই, এত ভাল বই, কিন্তু কেউ কি পড়ে? আপনারা কেউ পড়েছেন?’ অবশ্য এক বেরসিক শ্রোতা উঠে দাঁড়িয়ে— ‘হ্যাঁ, আমি পড়েছি’ বলে তাকে বেকায়দায় ফেলে দিলেও তিনি তা মুহূর্তে সামলে নিয়েছিলেন।

কথা হলো, কারও লেখা যদি দুর্বোধ্যই হয়ে থাকে, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় না থাকে এবং কম পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার পরও লেখালেখির কারণে তিনি ঈর্ষা জাগাতে থাকেন— তার অর্থ আবার এই যে, নতুন এক সময় এসেছে, যে সময় নতুন ভাষা ও লেখা দাবি করছে— যে সময়কে আবার বেশির ভাগ মানুষ চিহ্নিত করতে পারছেন না। বেশির ভাগ পাঠকও তাদের নিতে পারছেন না— কারণ তারা প্রাত্যহিক জীবনযাপনের মতো প্রাত্যহিক পাঠকর্ম করে যাচ্ছেন। এমনটা সব সময়েই ঘটেছে। জলের মতো সহজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্যও তার সময়ে দুর্বোধ্য ছিল। আর এই দুর্বোধ্যতার অভিযোগ কাজে লাগিয়ে শরৎচন্দ্রের এক পাঠক বাহবা পেতে চেয়েছিলেন তার কাছে রবীন্দ্রনাথের লেখার সমালোচনা করে। শরৎচন্দ্র তার সে পাঠককে পাত্তা না দিয়ে শুধু বলেছিলেন, ‘দেখেন, আমি আপনাদের লেখক, আর তিনি আমাদের লেখক— লেখকদের লেখক।’ আমাদের আধুনিককালের শরৎচন্দ্ররা অত বিনয়ী নন, হয়তো তেমন সুপাঠকও নন, তাই ‘লেখকদের লেখক’ গোত্রীয় কাউকে দরকারও হয় না তাদের। দুর্বোধ্যতার অভিযোগকে তারা বরং নিজেদের জনপ্রিয়তার কাজে ব্যবহার করতে আগ্রহী। যদিও দুর্বোধ্যতা কোনো সংকট নয়। যদিও সংকট রয়েছে কথাসাহিত্যে, প্রবলভাবেই আছে। শওকত ওসমান যেমনটি বলেছিলেন, শুধু সাহিত্য নয়, সব চারুকলার সঙ্গেই সংকটের যোগাযোগ অবশ্যম্ভাবী। কেননা, কোন না কোন টেনশন বা কঠিন টান সেখানে পশ্চাৎভূমি তৈরি করে, তাই সংকটও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। মুশকিল হলো, এই সংকটের প্রেক্ষাপট ও চরিত্র সবার কাছে একভাবে ধরা পড়ে না। যেমন, আমাদের প্রকাশকদের উদ্বিগ্ন মুখের অনুবাদ করলে একটা কথাই বেরিয়ে আসে, একজন হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি হয়েছিল, তাই বইয়ের বাজার তৈরি হয়েছিল; তিনি বিদায় নিয়েছেন, তাই বইয়ের বাজার আবারও সংকটাপণœ। যদিও পরিসংখ্যান ভিন্নতর বিবেচনাও দাবি করে থাকে। কারণ তার মৃত্যুর পরেও বইমেলায় বই বিক্রি কি সংখ্যার তুলনায়, কি টাকার পরিমাণের আগের বছরের তুলনায় ক্রমশই বাড়ছে। হয়তো ব্যক্তি লেখক হিসেবে কারও বইয়ের কপি হুমায়ূনের বিক্রিত সংখ্যার ধারে-কাছেও যাচ্ছে না, কিন্তু বই বিক্রির সামগ্রিক পরিসংখ্যান ক্রমশ ঊর্ধ্বগামী। সোজা কথায়, পাঠকের মনোজগত এখন বিচিত্রগামী, পাঠক চিন্তার দিক থেকে বিভক্ত, পাঠরুচির দিক থেকে বিভক্ত। কোনও একক লেখকের এমন শক্তি নেই যে, তাকে নিজের পিছনে ঐক্যবদ্ধ করবেন। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র যেদিকে এগোচ্ছে, কর্পোরেট কালচার যেভাবে বিকশিত হচ্ছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে এই শক্তিহীনতা আরও বাড়বে।

কথাসাহিত্য যাদের কাছে ‘আনন্দদানের’ বাহন, তাদের কথা মেনে নিলে তাই বলতেই হয়, সত্যিই লেখকদের পক্ষে যথেষ্ট আনন্দ দান করা সম্ভব হচ্ছে না, তাদের দেয়া আনন্দে পড়–য়ারা আকৃষ্ট হচ্ছেন না আর আমাদের সাহিত্যোদ্যোক্তারাও এত ভালো রজনীকান্ত সেন নন যে, ‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড়, মাথায় তুলে নে রে ভাই/ দিনদুঃখিনী মা যে মোদের, এর বেশি আর সাধ্য নাই’ বলেই জাগরণ এনে দেবেন। এখন, কথাসাহিত্য আনন্দ নিশ্চয়ই দেয়, কিন্তু এই আনন্দ নিশ্চয়ই একরৈখিক কিছু নয়, উৎসবের দিনে যেমন তুচ্ছ মানুষও উদার, মহান মানুষ, সাহিত্যের আনন্দেও মানুষ তেমনই গভীর কোনও প্রাপ্তিতে আহ্লাদিত। সুকুমার রায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়রা আমাদের এখনও আনন্দে আপ্লুত করে, তার মানে এই নয় যে আমরা এখনও সরলতার পৃথিবীতে আছি, তার মানে এই যে আমরা এখনও সরলতাকে খুঁজে ফিরি। কিন্তু তীব্রতর সরলতাও কখনও কখনও জটিল কুজ্ঝটিকা তৈরি করে এবং আমরা তার গোলকধাঁধা থেকে আর বেরুতেই পারি না। আর কথাসাহিত্যের প্রথম পাঠের, কিংবা হঠাৎ পাঠের মানুষজনও যে প্রশ্ন তুলে আমাদের আক্রান্ত করে ফেলতে পারে তা হলো, আনন্দ আর ভালোমানুষীর শিক্ষাই যদি দিতে না পারে তা হলে সে কেমন লেখক? কেমন তার সাহিত্য? কাহিনীর মানুষটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে, কিন্তু তার ভালোমানুষীই তাকে সফল করে তুলবে, কেননা আবেগাপ্লুত পাঠক তার পক্ষেই থাকবেন। এমন হিতোপদেশদানকারী কথাসাহিত্যের দাপটকে আধুনিক কথাসাহিত্যিকরা অস্বীকার করার চেষ্টা করলেও সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতাবাদ আমাদের অনেক কথাসাহিত্যিককে এখনও এত আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, পাঠককেও তারা প্রতিনিয়ত এমন পাঠের দিকেই প্ররোচিত করে থাকেন। এই কারণে আমাদের কত ভালো সাহিত্য যে কত তাড়াতাড়ি মরে গেছে, তা গুণে শেষ করা যাবে না। জীবনবোধের সরলতা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে জোর করে আঁকড়ে থাকার প্রবণতায় কথাসাহিত্যের জীবনীশক্তি বা প্রাণশক্তি যে কখন, কোন ফাঁকে মরে যায়, তা তারা নিজেরাও টের পান না। সৃষ্টির নামে, সৃজনের নামে সাহিত্যকে তারা আসলে হত্যা করেন। এদের কাজকর্ম দেখলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কথা মনে পড়ে যায়, ‘লোক যদি সাহিত্য হতে শিক্ষা পেতে চেষ্টা করে তবে পেতেও পারে, কিন্তু সাহিত্য শিক্ষা দেবার জন্য কোন চিন্তাই করে না। কোন দেশে সাহিত্য ইস্কুলমাস্টারির ভার নেয়নি।’ কিন্তু আমাদের অনেকেই আমাদের সাহিত্যকে সেই ভার দিতে আগ্রহী। এভাবেও কথাসাহিত্যের সৃজনশীলতার স্থান সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে আমাদের শিশুসাহিত্য এমন পরিস্থিতির প্রধান শিকার। বিভিন্ন এনজিও সংস্থা শিক্ষা বিস্তারের জন্য যেসব দোকান খুলেছে, শিক্ষা উপকরণ নির্মাণ করছে, তাতে শিশুসাহিত্য ক্রমশই বিপণœ হচ্ছে। যদিও আমাদের লেখক-প্রকাশকদের বেশির ভাগই আবার এই দিকে ঝুঁকে পড়ছেন, বইপত্র ভালো বিকোচ্ছে বলে, বিভিন্ন প্রকল্পেও ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে বলে।

তো এইসবই পড়তে হয় আমাদের— আমাদের পাঠকদের। কিংবা এইসবই পড়ানো হয় নানা ফাঁদ পেতে। আমাদের সবারই কম-বেশি জানা আছে, সাহিত্য বা পাঠ্যবই, লিখিত যা কিছু আছে সেসবের প্রধান পাঠকই মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আসা। কাজেই ‘জনগণের সাহিত্য’ প্রত্যয়ও শেষ পর্যন্ত আমাদের পীড়িতই করে। কারণ ‘জনগণের সাহিত্য’ বলে যা কিছু আমরা উগড়ে দেয়ার চেষ্টা চালাই, তাও মধ্যবিত্তের চোখ দিয়ে দেখে তাদের জন্যেই তৈরি করা বয়ান। অন্তত এখনো, কথাসাহিত্যিক কিংবা কথাসাহিত্য দুটোরই কথিত সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করছে এই পাঠকশ্রেণির ওপর। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির তত্ত্ব-তালাশসাপেক্ষে অনেক হা-হুতাশও হয়েছে, তাদের পাঠরুচি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বার বার উঠেছে। আর পাল্টাপাল্টি তত্ত্বের মধ্যে আমাদেরও টানাহেঁচড়া করা হচ্ছে। একদল মনে করছেন, সাহিত্যে জনগণ নেই, মানুষ নেই— মধ্যবিত্তই যেহেতু পাঠক, লেখকও একই গোত্রের, তারা তাই নিজেদের প্রেম, আদিখ্যেতা, ম্যাড়মেড়ে দুঃখ এইসব হাবিজাবি কেচ্ছা করে যাচ্ছে। আরেকদল মনে করছেন, মধ্যবিত্তরা বাংলাসাহিত্যে প্রায় চিরবঞ্চিত, তাদের নিয়ে লেখাই হচ্ছে না, নগরকে নিয়েও না— এ যাবৎ যা কিছু লেখা হয়েছে তার সবই গ্রামকে নিয়ে, গরিব-সরিবদের নিয়ে, তাদের দুঃখদুর্দশা নিয়ে।

বাংলা সাহিত্যে বা সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যে সাধারণ জনগণের অস্তিত্ব নেই, এই কথা যদি মেনে নিতে হয়, তা হলে আমাদের এটা-ও বলতে হবে, বাংলা সাহিত্যেরই কোনো অস্তিত্ব নেই। বরং বলা ভালো, সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ প্রতিনিয়ত যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যত বিচিত্র ছোট-বড় পেশা ও কর্মযজ্ঞের বিকাশ ঘটছে এবং তার ফলে জীবনযাত্রায়ও নতুন নতুন ছাপ পড়ছে, নতুন নতুন চরাই উৎরাই দেখা দিচ্ছে। এবং এসব তুলে ধরার ক্ষেত্রে আমি বলব, সত্যিই আমাদের কথাসাহিত্যিকরা ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু একটি ক্ষেত্রের কথাই বলি, গার্মেন্টস খাত— হাজার হাজার মেয়ে মুক্ত হওয়ার জন্যে শহরে এলো, প্রথম দিকে আমরা তাদের চলাচলের অসুবিধার আর ধর্ষণের কত শত যে খবর পেতাম, তার ইয়ত্তা নেই। এখনও নিশ্চয়ই এসবের সুরাহা হয়নি, বঞ্চনার প্রতিভূ হয়ে সংগ্রামের প্রতিভূ হয়ে এবং আমাদের নগরবিকাশের ধারায় একমাত্র প্রতিভূ শ্রেণি হয়ে গার্মেন্টসের নারীরা দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা কিন্তু তাদের কোনও চরিত্র এখনও কথাসাহিত্যে দাঁড় করাতেই পারিনি। একজন কথাসাহিত্যিক যে তার এই সমাজকে, তার পারিপার্শ্বিকতাকে দেখতে পারছেন না, ধরতে পারছেন না, এমনকি নিজেকেও মেলে ধরতে পারছেনা, তার কারণ তার নিজেরও আত্মপরিচয়ের সংকট রয়েছে; নিজেকে এবং সমাজকে বোঝাবার ক্ষেত্রে তার বড় বাধা রাষ্ট্রের আইন-কানুন, উপনিবেশিক সমাজের বিবিধ প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার, তার রং-বর্ণ, ধর্ম আর শ্রেষ্ঠত্ব— নিকৃষ্টতার দ্বন্দ্ব।

আর মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও নগর নিয়ে সাহিত্য? সে চেষ্টা তো শুরু থেকেই হয়ে আসছে। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ বলেন, ‘ঘরে-বাইরে’ বলেন আর কাজী ইমদাদুল হকের ‘আবদুল্লাহ’ বলেন, তা এই মধ্যবিত্ত বাঙালিরই আখ্যান। বিভূতিভূষণের অপুরা শেষ পর্যন্ত আর গ্রামের নয়, নি¤œমধ্যবিত্তও নয়। বরং পুরোদস্তর নতুন এক বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি— যে প্রতিনিধির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আরেকটি অংশের প্রতিনিধি, ক্রমশঃই আত্মতুষ্টিতে বিভোর হতে থাকা ভীরু-ভীরু ভাঁজা মাছ উল্টে না খেতে জানা মার্কা নষ্টামীর প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথের অমিত-লাবণ্যরা। মানিক, জনগণের জীবনযাপনের যিনি খুবই কাছের সাহিত্যিক, তার সিংহ ভাগ রচনাই তো নগরের কিংবা নগরগামী বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের গল্প, তাদের মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার প্রাথমিক পর্বের গল্প। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ তো এমন আধুনিক মধ্যবিত্ত মননের গল্প— যা মানিকের লেখা ভাবতেও অনেক সময় কষ্ট লাগে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তরাও কম চেষ্টা করেননি নগরের কথা শোনাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর সদা প্রবহমান সাহিত্য হয়ে ওঠেনি। আশির দশকের দিকে এসে কি সত্তরের, কি আশির যেসব লেখকরা আমাদের নতুন করে মধ্যবিত্ত ও নগরের গল্প শোনাতে শুরু করলেন, সেসব নতুন পাঠক হিসেবে আমাদের কাছে অনাস্বাদিত মনে হলেও বয়স যখন একটু বাড়তে শুরু করেছে আর এখান-ওখান থেকে পুরানো বইপত্র আর পত্রপত্রিকা জোগাড় করে পড়তে শুরু করেছি, তখন চোখের সামনে আবদুল গাফফার চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক কিংবা সাযযাদ কাদিরদের গল্পগুলো উপস্থিত হয়ে বার বার মনে করিয়ে দিয়েছে, মধ্যবিত্তের যে সংকট আর অবক্ষয়ের কথা বর্তমানে সাহিত্যে উপস্থিত হতে চাইছে— তাও আসলে অনেক পুরানো। হয়তো তারা যে সময় এ নিয়ে লিখে গেছেন, তখন পাঠকশ্রেণি একে গ্রহণ করার জন্যে তৈরি ছিলেন না, তাই তাদের সেসব লেখা পড়ে আছে অগোচরে। অথচ নতুন নতুন সংকট নিয়ে এই মধ্যবিত্ত আর নগরকে কত হিমশিমই না খেতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নিয়ে, নগরকে নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টির কথা যখন আমরা বলছি, তখন হয়তো এ ব্যাপারটিও ভুলে থাকছি, গ্রামেও মধ্যবিত্ত শ্রেণি আছে এবং বর্তমান বাংলাদেশের একটি অন্যতম নতুন বাস্তবতা হলো, গ্রাম ও নগরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাপন ও আকাক্সক্ষার দূরত্ব ক্রমশই লয় পাচ্ছে; আমরা ভুলে যাচ্ছি, নগর মানে শুধু মধ্যবিত্ত শ্রেণি— সেখানে অন্য শ্রেণিগুলোও আছে। তাই নগরসাহিত্য কিংবা মধ্যবিত্ত জীবনের সাহিত্যও একই ¯্রােতের নয়, নগরমনন মানেই মধ্যবিত্ত মনন নয়, অন্তত আমাদের এ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে।

সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, গত এক-দেড় দশকের কথা বাদ দিলে এই মধ্যবিত্তকেই তো নানা দোদুল্যমানতা নিয়েই বার বার সংগ্রামে যেতে হয়েছে, আন্দোলনে যেতে হয়েছে। তাকেই মৃদু কণ্ঠে হোক, উচ্চৈঃস্বরে হোক স্বৈরাচারের বিরোধিতা করতে হয়েছে, গণতন্ত্র চাইতে হয়েছে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলতে হয়েছে, আদিবাসীদের  পাশে থাকার প্রত্যয় প্রকাশ করতে হয়েছে। আর এই সংগ্রাম বোধকরি সহজে শেষ হওয়ার মতোও নয়। কিন্তু একেই যখন ছকে বাধা মধ্যবিত্তের জগতে বা ছাঁচে ফেলে একটি ক্যারেক্টার বানাতে চাওয়া হয়, তখন পুরানো সংগ্রামই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কাম্যু কিংবা কাফকায় যে নৈরাশ্য, যে অরাজকতা, যে হতাশা কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তার সব উপাদানই আমাদের মধ্যে বার বার ঘুরপাক খায়— অথচ আমাদের কারও কলম থেকে সত্যিকারের কোনও নিঃসঙ্গ, ভীত, নির্জন মানুষের চরিত্র, হতাশা আর অরাজকতার শিকার চরিত্র এখনও বেরিয়ে এলো না। আমরা যারা কাম্যু কিংবা কাফকাকে সবচেয়ে প্রিয় লেখক ভাবছি, তারাই আবার বাংলা সাহিত্যের দুয়ারে এসে ঘোরতর গাঢ় স্বরে ভালবাসছি সুনীলের লেখাকে— কী বলব একে? পরিহাস নাকি নৈরাজ্য? নাকি জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্তহীনতা?

তাই মধ্যবিত্তের সাহিত্যরুচিকে নিয়ে, অনেক আগে থেকেই যেভাবে প্রশ্ন উঠছে, তাদের পাঠরুচিকে গড়পড়তা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। আবার তা নিয়ে তীব্রভাবে আশাহত হওয়ারও কিছু নেই। কেননা এ-ও একটি বড় প্রশ্ন, কথাসাহিত্যিক নিজের সাহিত্যরুচিই বা কতদূর সম্প্রসারিত। মাঝে মাঝে তারা পত্রপত্রিকায় কী বই পড়ছেন, কী বই প্রিয়, কোন লেখক প্রিয়— এইসব কথা জানিয়ে থাকেন। সেসব থেকে আমরা সহজেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি, পাঠক হিসেবে তিনিও খুব বেশি ব্যতিক্রমী নন। ব্যতিক্রমটা এখানেই এই কথাসাহিত্যিকদের কেউ হয়তো নতুন ভাষায় কথা বলতে চান, নতুন বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান। কিন্তু কয়জনই বা বলতে পারেন!

সাহিত্য থেকে আনন্দ পেতে চাই, সাহিত্য থেকে শিখতে চাই, সাহিত্য থেকে জীবনকে তার অর্ন্তদেশে গিয়ে সৃজনশীলভাবে উপলব্ধি করতে চাই— সবই তাই খ-িত ধারণায় পরিণত হয়; শেষ পর্যন্ত দিনের আলো হয়ে ফুটে উঠতে থাকে এই সত্য যে, সাহিত্য মানে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বা এই শ্রেণির বিভিন্ন অংশ তাদের অবসরে গিয়ে সমাজকে ও এর শ্রেণিসমূহকে কিংবা নিজেকেই কীভাবে দেখতে চান, মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে কী করে মিথস্ক্রিয়ায় জড়াতে চান, এসবের চকিত গাঢ় প্রকাশ। এইসব নিয়ে আমরা কখনও তাৎক্ষণিকভাবে কখনও বা সুদূরপ্রসারীভাবে ঐক্যবদ্ধ কিংবা বিভক্ত হই। তবে তার পরও মোটা দাগে দুই ধরনের বিভাজন থেকেই যায়— এক গোত্রের সাহিত্যিক ও পাঠকরা ব্যক্তিকে নিরিখ করেন, তাদের সংকটের সুলুকসন্ধান করেন ব্যক্তির মানসসংকটের নিরিখে; আরেক গোত্রের সাহিত্যিক ও পাঠকরা হেলে পড়েন ব্যক্তির সামাজিক-আর্থনীতিক-রাজনৈতিক সংকটের দিকে। এই দুটি বিষয়ের মিথস্ক্রিয়া কি সম্ভব নয়? কথাসাহিত্যে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনে হয়, সত্যি কথা বলতে গেলে আমরা এখনও শুরুর বিন্দুতেই দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের উল্লেখযোগ্য সব কথাসাহিত্যিকেরই একাধিক লেখা রয়েছে, যাতে এমন বা দুটি দিকেরই মিথস্ক্রিয়া চোখে পড়ার মতো— বিশেষ করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ও মাহমুদুল হকে তা বেশ উচ্চকিত। কিন্তু তাদের মধ্যেও এ নিয়ে সংকট ছিল মনে হয়। কারণ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ও মাহমুদুল হক দুইজনের উপন্যাসেই এই মিথস্ক্রিয়া প্রবল হলেও, ছোটগল্পে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। আবার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ক্ষেত্রে ছোটগল্পে এই মিথস্ক্রিয়ার ছাপ বেশ স্পষ্ট। কিন্তু উপন্যাসে তিনি প্রধানত ঝুঁকে পড়েছেন ব্যক্তির সামাজিক-আর্থনীতিক-রাজনৈতিক সংকটের দিকে।

ইলিয়াস-মাহমুদুল-সৈয়দ হক-হাসান যুগের পরে, দেখার মতো বিষয়, কর্পোরেট জগত কথাসাহিত্যকে বিশেষ গুরুত্ব স্থান দিতে শুরু করেছে। আর ভবিষ্যতে তা যে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য। গত কয়েক বছরে এ দেশে সাহিত্যে পুরস্কার প্রদানের ব্যাপারে বিভিন্ন মহলের আগ্রহ বেড়েছে— তবে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, পুরস্কার পাচ্ছেন প্রধানত কথাসাহিত্যিক আর প্রাবন্ধিকরা। কবিরা,— যাদের বরাবরই সাহিত্যের পুরোধা হিসেবে আমরা দেখে এসেছি, তারা বলতে গেলে স্বীকৃতি আর পাচ্ছেন না। স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ বলে কথাগুলো আসছে না— আসছে এ কারণে যে, কথাসাহিত্যকে বা গদ্যসাহিত্যকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে কেন? গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে কেন? এর মধ্যে দিয়ে কি আসলেই কোনো তাৎপর্য সৃষ্টি হচ্ছে? না কি শেষ পর্যন্ত তাকে শিল্পপ্রদর্শনীর শিল্প বিকিকিনির মতো করে তোলা হচ্ছে? কবিতার আপেক্ষিকে যদি চিন্তা করি, তা হলে এই প্রশ্নটি আরও সরব হতে পারে। আমরা কি ধরে নেব, দেশে ভালো কবিতা আর লেখাই হচ্ছে না? কবিতা নিশ্চয়ই অনেকদিন হলোই সংকটাপন্ন এক অবস্থার মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে, কিন্তুমৃত কবিতার পাশে শুয়ে কখনোই কি কোনো গদ্য বাঁচতে পারে? পেছনের এই মৃত চর তাকে কি পারে নতুন কোনো ডাঙায় নিয়ে যেতে? আবার লক্ষ্যণীয়, মানুষ ভার্চুয়াল জগতের অধিবাসী হয়ে পড়ছে, যে জগতের প্রবন্ধ-সাহিত্য ব্যক্তির স্ট্যাটাস, যে জগতের প্রধান সাহিত্য কবিতা আর অনুগল্প।

এই চালচিত্রই বলে দিচ্ছে, আগামী দিনগুলোয় কথাসাহিত্যের সংকট আরও বাড়বে। কারণ কেবল ‘মধ্যবিত্ত রুচির’ পাঠকের প্রাচুর্য নয়, কর্পোরেট আকাক্সক্ষা আর সহিংসতাও তাকে গ্রাস করছে। আর তাতে কথাসাহিত্যিকও ক্রমশ সংকটগ্রস্থ হয়ে উঠছেন, নিঃসঙ্গতার দিকে নৈরাজ্যের দিকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার দিকে ফিরে তাকাতে তিনি ভয় পাচ্ছেন। এই ভয় এত মারাত্মক যে তিনি আর অ্যান্ডারসনের মতো রূপক রূপকথাও লিখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

————————————–

হোসেনউদ্দীন হোসেন
গল্পসাহিত্য : ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা ও কল্পনার রূপ

গল্পসাহিত্য সৃষ্টি হয় ব্যক্তির ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা এবং কল্পনার উপর নির্ভর করে। নিজের বিশেষত্বের মধ্যে যা ব্যক্ত হয়, তাই ব্যক্তি। সেই ব্যক্তি— যে উপলব্ধিকে ব্যক্ত করে। সাহিত্যের ব্যক্তি কেবল মানুষ নয়— সাহিত্যের ব্যক্তিজগতের সমুদয় বস্তুসামগ্রী। নিজের ঐকান্তিকতায় সে নিজেই ব্যক্তি হয়ে ওঠে। যে গুণের দ্বারা ব্যক্তি হয়ে উঠলে মানুষের অন্তর স্বীকার করে নেয়— এই দুর্লভ গুণের অধিকারী সে, যে কল্পনাশক্তি ও রচনাশক্তির গুণে গুণান্বিত।

একজন  সৃষ্টিশীল ব্যক্তি নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। কি প্রকাশ করতে চায়? সে প্রকাশ করতে চায় নিজের উপলব্ধিকে। সে যে আছে, এই সত্যটাকে সে সৃষ্টিশক্তির গুণে চিরকালীন রূপে প্রকাশ করতে চায়। ব্যক্তি যখন কোনো কিছু ব্যক্ত করে তখন তার সেই অভিব্যক্তির মধ্যে একটা ঐশ্বর্য থাকে, এই ঐশ্বর্য হচ্ছে নিজস্বভাবনা। তাঁর অন্তরের ভাবনার অলোড়ন দোল দেয় বলে— সে তার ভাবনাকে একটা রূপের মধ্যে দাঁড় করায়। এই রূপটি রচনা ও কল্পনা শক্তির গুণে সাহিত্য মর্যাদা লাভ করে।

মানুষের সামনে বিশাল জগত দৃশ্যমান। মানুষ আছে, জন্তুজানোয়ার আছে, গাছপালা আছে, পাহাড়পর্বত আছে, নদীনালা সমুদ্র আছে। আবার এমনও বস্তু আছে যা বর্তমান অবস্থার বাইরে মানুষের অন্তরে প্রকাশমান নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে এই দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বস্তু মানুষ কীভাবে উপলব্ধি করে? এই প্রশ্নের জবাবে এইটুকু বলা যেতে পারে যে, একদল মানুষ উপলব্ধি করে ভাবের মাধ্যমে, আর একদল মানুষ করে জ্ঞানের মাধ্যমে। জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ জানছে বিষয়কে। যে জানছে সে রয়েছে জানার পশ্চাতে এবং তার জানার বস্তু রয়েছে লক্ষ্য হিসেবে সামনে। এই জ্ঞান বিষয়গত। এই জ্ঞান জাগতে ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন নেই। কারণ এই জ্ঞান সাধনার মাধ্যে ব্যক্তিত্বকে সরিয়ে রাখা হয়।

প্রকৃতপক্ষে মানুষ যদি নিজেকে উপলব্ধি করতে চায়, তবে তাকে ভাবের মধ্যে নিজেকে উপলব্ধি করতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে নিজেকে উপলব্ধি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। নিজেকে উপলব্ধি করার একমাত্র মাধ্যম হলো সাহিত্য। সাহিত্যের মধ্যেই রয়েছে মানুষের সত্যতা ও নিজস্ব উপলব্ধি। এই কারণেই সাহিত্যের জ্ঞান বিষয়গত নয়— এই জ্ঞান ব্যক্তিগত মানুষের উপলব্ধিগত।

ব্যক্তির উপলব্ধি বিচিত্র রকমের কোন যুক্তি ও প্রমাণের মানদ-ে বিচার্য নয়। মানুষের সত্যস্বরূপ প্রকাশমান একমাত্র সাহিত্যে গল্প এবং কবিতার বিষয়ের যাথার্থ্যে নয়। সাহিত্যের প্রকাশ চেষ্টার মুখ্য উদ্দেশ্য নিজের প্রযোজনীয় রূপকে প্রতিষ্ঠিত করা নয় আনন্দরূপকে ব্যক্ত করে তোলা। এই আনন্দবোধের মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধতা এবং এটাই হলো সাহিত্যরস। এমনকি মানুষের প্রয়োজনকে রূপ দেওয়া সাহিত্যের উদ্দেশ্য হতে পারে না সাহিত্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বড় এবং অনেক স্বতন্ত্র। সৃষ্টিশীল গল্প রচয়িতার কাজ হলো প্রয়োজনকে সুষমাম-িত করা নয় তাকে নিঃশেষিত করা নয়— পূর্ণতার একটি আদর্শকে প্রত্যক্ষতা দান এবং রূপলোকে অপরূপকে ব্যক্ত করে তোলা। এটাই হলো সাহিত্যের মূল জিনিস— অর্থাৎ রূপ সৃষ্টি। রূপসৃষ্টি করতে পারলেই তিনি হবেন দক্ষরূপকার। এই রূপসৃষ্টি করতে গিয়ে তিনি বাস্তব অবস্থাকে কল্পনায় আনতে পারেন, আবার অবাস্তব জিনিসও কল্পনার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারেন। এটা নির্ভর করে গল্পলেখকের কল্পনাশক্তির ও রচনাশক্তির উপর। যদি তিনি সমগ্রতাদান করতে পারেন, তাহলে তিনি হবেন সার্থক— তা না হলে নয়।

মাঝে মাঝে সমাজে এমন উত্তেজনা দেখা দেয় যে, সেই উত্তেজনাটা সাহিত্যের আঙিনা দখল করে বসে। সেই সামায়িক উত্তেজনাকর বিষয়টি সাহিত্যের নিত্যবিষয় হয়ে কখনো টিকে থাকেনা— দেখতে দেখতে বিলীন হয়ে যায়। এই জন্যে গল্পলেখকরা যা কিছু করে এবং যা কিছু শিল্পরূপ দেয়, তার জানার মধ্যে এবং কাজের মধ্যে থাকে কোনো না কোনো ঐক্যসূত্র। গল্পলেখকের জানার মধ্যে একান্তভাবে পার্থক্য কিছু নেই। যেখানে দেখার মধ্যে অথবা জানার মধ্যে অস্পষ্টতা, সেখানেও সে জানে, মিলিয়ে জানতে পারেনা বলেই তার কাছে থেকে যায় অস্পষ্টতা। লেখক যখন অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে, তখন তার অন্তরেই ভাবের প্রবল ঢেউ উঠে, সেই উপলব্ধির ঢেউয়ের দ্বারা আনন্দবোধ করে সে এবং বিষয়কে উপলক্ষ্য করে, উপাদানের উপর নির্ভর করে একটি অখ- রূপকে গল্পের মধ্যে ফুটিয়ে তোলে। এই রূপটি পরিপূর্ণ এককে চরম রূপ দিতে যতক্ষণ সে না পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্তরলোকের সঙ্গে বর্হিলোকের মিলন ঘটাতে পারে না। যার অন্তরে রসবোধ নেই, তার পক্ষে চরম এককে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সে দেখে শুধু উপাদানের এবং প্রয়োজনের দিকটি। ফলে সাহিত্যের মূল্য নিরূপণ করা তার পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।

গল্পসাহিত্যের একটা বিশাল ভূমিকা আছে। গল্পে কোন বস্তু সত্য, তা নির্ধারিত হয় গল্পে রসের ভূমিকার উপরেই। তাই গল্পমাত্রই রসসাহিত্য। এই রস রূপটি প্রকৃতির কাছ থেকেই মানুষ পেয়েছে, না মানুষই প্রকৃতিকে দিয়েছে, এটাও একটি প্রশ্ন। গাছপালা নদী কালে কালে মানবমনের সংস্পর্শে বিশেষ রসের রূপায়িত হয়ে উঠেছে মানুষের কল্পনার কারণে। মানবজগতে শুধু প্রাকৃতিক নয়— তা মানবিকও বটে। প্রকৃতি তাকে বিশেষভাবে আনন্দ দেয় যেমন তেমনি মানুষ সমগ্র জগতকে হৃদয়রসের সংযোগে মানবিকতায় আবৃত করেছে, এবং তাকে ভোগও করছে। গল্পলেখকের মন রসের অনুভূতিতে যখন ছাপিয়ে যায়, তখনই সে গল্প লিখে প্রকাশ করে নিত্যকালের ভাষায়, ভাষাকে সে মানুষের অনুভূতির ভাষা করে তোলে। এটা জ্ঞানের ভাষা নয়, হৃদয়ের ভাষা, কল্পনার ভাষা। লেখক যখনই কোন বস্তু বা ঘটনা ভাবের চোখে দেখে— তখনই তার দেখা জাগতিক থাকে না, হয়ে ওঠে অজাগতিক। সে বস্তু তখন আর ক্যামেরায় তোলা ছবির মত থাকে না। দেখার মধ্যে একটা ভিন্নমাত্রা এসে যায় । সেই দৃশ্যটাকে হুবহু বর্ণনা করাও যায় না। বিষয়ের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের সত্যতার কোন সম্পর্ক নেই। তার সত্যতা তার নিজের উপলব্ধির মধ্যে। সেটা উদ্ভূত হতে পারে, অলৌকিকও হতে পারে। তথ্যহীনও হতে পারে। যার উপলব্ধির গভীরতা বেশি তাঁর সাহিত্যকর্মে জীবন আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

এ মানুষের মনে আদিকাল থেকে রয়েছে একটা ক্ষুধা। এই ক্ষুধা নিবারণ করেছে তার মনের কল্পনার জগতের নানা কল্পনা। সে কল্পনা করে নানা রকমের উদ্ভট গল্প তৈরি করেছে— তৈরি করেছে রূপকথার কাহিনি। নিজে যেমন গল্প বানিয়েছে, তেমনি সেই গল্পটি অপরকেও শুনিয়েছে। এই গল্প বলে ও গল্প শুনিয়ে চরম একটা তৃপ্তি পেয়েছে ব্যক্তিমানুষ। তার মন যখন যা চেয়েছে, কল্পনার মধ্যে সেটা পেয়ে তার মন খুশি হয়ে উঠেছে। আকাশের সঙ্গে সে আকাশ হয়েছে, সমুদ্রের সঙ্গে সে সমুদ্র হয়েছে, পাহাড়ের সঙ্গে পাহাড় হয়েছে, চাঁদের সঙ্গে চাঁদ হয়েছে নক্ষত্রের সঙ্গে নক্ষত্র হয়েছে, মন চেয়েছে যার সঙ্গে মিলতে, তার সঙ্গে মনের মিলন হলেই মন হয়েছে খুশি। এইভাবে কল্পনার জগৎ থেকেই নানারকম গল্পের কাহিনি বের করে এনেছে ব্যক্তিমানুষ। মনের ভুবন জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তার নানারঙের লীলা। এই লীলার মধ্যেই পেয়েছে সে রূপ-রসের সৌন্দর্য। সাহিত্যের সৌন্দর্য প্রচলিত সৌন্দর্যের সঙ্গে মেলে না। সাহিত্যের সৌন্দর্য ভিন্ন। মন যার সঙ্গে মিলে যায়, মন যার সঙ্গে মিলে আনন্দ পায়, সেটাই হলো সাহিত্যের সোন্দর্য। এই সৌন্দর্য হলো সাহিত্যের একমাত্র সামগ্রী। অনেকেরই ধারণা যে, সৌন্দর্য হচ্ছে সাহিত্যের প্রাণ। এই ধারণার মধ্যে সত্যতা নেই। সাহিত্যের কিংবা শিল্পের অভিজ্ঞতা কখনো মেলানো যায় না। মূলত আনন্দবোধই হচ্ছে সাহিত্য ও শিল্পের সৌন্দর্য। এই আনন্দবোধ সাহিত্যের সৌন্দর্যবোধকে নিবিড়ভাবে জাগিয়ে তোলে। কেউ যদি এই সৌন্দর্যকে স্বীকার করে না নেয়, তাতে কোনো ক্ষতি নেই। জগতের অনেক অবাঞ্ছিতের মধ্যে মন যাকে স্বীকার করে নিচ্ছে— তাতেই রয়েছে সৌন্দর্য। সাহিত্যের মধ্যেই এই সৌন্দর্যের উপলব্ধি। সাহিত্যের বাইরে নয়। সাহিত্যের এই সৌন্দর্য আাছে বলে মানুষের গল্প শোনার প্রতি রয়েছে বিপুল আগ্রহ। কারণ, মন গল্পের সৌন্দর্যকে টানে। গল্পে দুঃখের কাহিনিও আছে। সুখের কাহিনিও আছে। গল্প মানবমনকে শুধু প্লাবিত করে তোলে না— মানবমনকেও স্পষ্ট করে তোলে। নিজের কাছে নিজেকে নতুন করে ভাবায়। ভিন্নতর এক মানবে তাকে পরিণত করে। এটা নিজের কাছে নিজের অপরূপকে চাওয়া— এই চাওয়াটা নিজেকে সঁপে দেয়া নয়— নিজেকে পরম করে পাওয়া। নিজের চাওয়ার মধ্যে যে ভাবকল্পনা রয়েছে, এই ভাবকল্পনার মধ্যে রয়েছে মানবমনের অবিমিশ্র উপলব্ধি। মানবমন যে বস্তুকে প্রিয় বলে ভাবে, সেই বস্তুকে সে সত্যভাবে পেতে চায়। এই সত্যবোধই তার কাছে পরম সুন্দর।

সৃষ্টিশীল ব্যক্তিমন সাধারণত উপলব্ধির ক্ষেত্রকে প্রশস্ত করে থাকে। তার হৃদয় জগতে মানুষের জীবন-যাপনের বহুতর দ্বন্দ্বের উপলব্ধি। বিচিত্র রকমের ভাবনা আর কল্পনা নিয়েই তার কারবার। ভাবনা  এবং কল্পনা আছে বলেই সে নতুন নতুন সৃষ্টির কথা ভাবে। নিজের ভেতর সে নিজেকে সৃষ্টি করছে অহরহ। এবং নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে নানাভাবে এবং নানারূপে। সে নিজের উপলব্ধি থেকে নিজেকে আস্বাদন করতে চায়। এই আস্বাদন থেকে সৃষ্টি করে সে গল্প। কিন্তু এর মধ্যেও রয়েছে মূল্যের তারতম্য। তার কারণ হলো এই যে, তার সব গল্পের মূল্য এক নয়। রস ও রূপের  নির্বাচনে এবং আনন্দসম্ভোগের বিচারে নির্ভর করছে তার মূল্যের বিষয়টি। শুধু মনস্তত্বের কৌতুহল চরিতার্থ করার জন্যই গল্প নয়, কিংবা বুদ্ধির প্রাখর্য প্রকাশ করার জন্যই গল্প নয়, গল্পের বাছবিচার আনন্দভোগের উপরেই। সাহিত্যের আনন্দভোগের জন্য প্রয়োজন মনের সুস্থতা। কারণ মানুষের মনে নানারকম অরুচি রয়েছে। নানা রকম বিকৃতি রয়েছে। যখন মানুষের মনে অসুস্থতা এসে ভর করে, তখন সে ভালো জিনিসের স্বাদ বোঝে না। খারাপটিই তার কাছে স্বাদে অতুলনীয় বলে হয়। যখন মানুষের মন সুস্থ থাকে, তখন মানুষ ফিরে পায় তার নিজস্ব মানবিক স্বভাব; এটাই তার চিরকালের স্বভাব। চিরকালের স্বভাব ফিরে পেলে মানুষ লাভ করে আনন্দ সম্ভোগের আস্বাদ। সাহিত্যও তখন নানারকম ভঙ্গি ত্যাগ করে চিরন্তন সাহিত্য হয়ে ওঠে। মানুষের জগৎ মানুষের চিত্তের মধ্যে রয়েছে। বাইরে নয়। মন যখন জগতকে নিজের করে নেয়, তখনই তার ভাষায় জীবন্ত হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :

মানবঘটনাকে সুস্পষ্ট করে দেখবার আর একটি ব্যাঘাত আছে। সংসার অধিকাংশ স্থলে ঘটনাগুলি সুসংলগ্ন হয় না, তার সমগ্রতা দেখতে পাইনে। আমাদের কল্পনার দৃষ্টি ঐক্যকে সন্ধান করে এবং ঐক্য স্থাপন করে। পাড়ায় কোন দুঃশাসনের দৌরাত্ম্য হয়ত জেনেছি বা খবরের কাগজে পড়েছি। কিন্তু এই ঘটনা তার পূর্ববর্তী পরবর্তী দূর শাখাপ্রশাখাবর্তী একটা প্রকা- ট্রাজেডিকে অধিকার করে হয়তো রয়েছে— আমাদের সামনে এই ভূমিকাটি নেই— এই ঘটনাটি হয়তো সমস্ত বংশের মধ্যে পিতা-মাতার চরিত্রের ভিতর দিয়ে অতীতের মধ্যেও প্রসারিত, কিন্তু আমাদের কাছে অগোচর। আমরা তাকে দেখি টুকরো টুকরো করে, মাঝখানে বহু অবান্তর বিষয় ও ব্যাপারের দ্বারা সে পরিচ্ছন্ন, সমস্ত ঘটনাটির সম্পূর্ণতার পক্ষে তাদের কোনগুলি সার্থক কোনগুলি নিরর্থক তা আমরা বাছাই করে নিতে পারিনে। এই জন্য তার বৃহৎ তাৎপর্য ধরা পড়ে না। যাকে বলছি বৃহৎ তাৎপর্য তাকে যখন সমগ্রভাবে দেখি তখনই সাহিত্যের দেখা হয়।

আসলে আমরা কোনোকিছুই সমগ্রভাবে দেখি না বলেই আমাদের গল্পও ঠিকমত সাহিত্য হয়ে ওঠে না। আমাদের এই জীবনে কতো কিছুই তো দেখেছি। দেখেছি দেশ বিভাগ, হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা, দেখেছি আইয়ুবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, দেখেছি বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাস, বন্যা-দুর্ভিক্ষ, দেখেছি কৃষকদের খরায় ও অতিবৃষ্টিতে ফসলহানি, শ্রমজীবী মানুষের মানবেতর জীবন-যাপন, গ্রাম ছেড়ে ভূমিহারা দূর্গত মানুষদের শহরের দিকে গমন, দেখেছি মানুষের রাতারাতি ধনী হওয়ার ন্যাক্কারজনক ঘটনা, দেখেছি ব্যবসায়ী রাজনৈতিক নেতাদের ভ-ামী ও মিথ্যা প্রবঞ্চনা। দেখেছি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। কোনটিতেই আমরা সমগ্রভাবে উপলব্ধি করিনি। রাস্ট্রীয় জীবনে হোক, সামাজিক জীবনে হোক, কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে হোক, আমরা প্রতিনিয়তই তো কত ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি; এই খ- খ- ঘটনাগুলিকে যদি কেউ বাছাই করে নিয়ে নিজের কল্পনার পটে সাজিয়ে একটি সমগ্রতার ভূমিকায় এনে গল্প সৃষ্টি করত, তবে সেই গল্প হয়ে উঠতো জীবনের গল্প।

প্রতিদিন আমাদের দেশে যে ঘটনা ঘটছে, তা আমরা সংবাদপত্রের পাতায় পড়ছি। এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে রয়েছে দেশকাল ও সময়ের ইতিহাস। রয়েছে বীর্যবত্তার কাহিনি, রয়েছে সফলতার কাহিনি, রয়েছে ব্যর্থতার কাহিনি, রয়েছে মর্মভেদী শোকের কাহিনি। প্রতিদিন সংবাদপত্রের ছায়ালোকে এই ঘটনাগুলি ছায়া হয়ে আছে। আমাদের সাহিত্যের জ্যোতিষ্কলোকে নেই। কল্পনার শক্তি ও রচনা শক্তির অভাবে নিত্যকালের মানবমনের বিরাটমূর্তি কেউ নির্মাণ করে তুলে ধরতে পারেনি।

লেখকের সামনে বিশাল বস্তুজগৎ আছে। সে প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছে মানবসমাজের নানা রকমের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ছোট-বড় দ্বন্দ্ব-বিরোধ। রয়েছে তার মানসজগৎও। বহুকালের রচনার মতো জমে রয়েছে অভিজ্ঞতার ফসল। যদি কেউ ইচ্ছে করে তবে ঐ অভিজ্ঞতার ভা-ার থেকে মানুষের সম্বন্ধে সে জ্ঞান লাভ করতে পারে। আবার প্রকাশ বৈচিত্র্যবান মানুষ ঐ অভিজ্ঞতাকে গল্পে রূপ দিতে পারে। আমরা নৈকট্য কামনা করতে পারি সেই প্রকাশ বৈচিত্র্যমান মানুষকে। তার কাছে আমাদের একমাত্র চাওয়া— গল্প শোনাও, সেই গল্প, যে গল্পে রয়েছে মানব পরিচয়ের সমগ্র ছবি। রয়েছে জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, রয়েছে রূপের মোহিনী শক্তি। রয়েছে জীবন জয়ের গল্প। রয়েছে প্রেম ভালোবাসা, রয়েছে ঈর্ষা যন্ত্রণা, রয়েছে অন্তরের সঙ্গে অন্তরের মিলন, রয়েছে ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ। রয়েছে সুখের এবং দুঃখের পাঁচালী। গল্পকার কেবল কি গল্প বলে? মূল্যবোধেরও জন্ম দেয়। সে জীবনের বাস্তবতা ও কল্পনা ছেনে গড়ে তোলে জীবনের নতুন মূল্যবোধ। জীবন সম্পর্কে সে যেমন নতুন ধারণা দেয়, তেমনি সে জীবনকেও বদলে দিতে পারে।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। বাস্তব এবং সাহিত্যের বাস্তব এক নয়। সাহিত্যের বাস্তব হলো ভিন্ন। যাকে মানুষ অন্তর থেকে অব্যবহিতভাবে মেনে নেয়, সেটাই হলো সাহিত্যের বাস্তব। এই বাস্তবতা একান্ত উপলব্ধিগত। মন যাকে ‘বোধ’ করছে তাই বাস্তব। অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলি আমরা ‘রিয়েল’, বাঙলায় আমরা তাকে বলি ‘যথার্থ’। অর্থাৎ এই ‘যথার্থ’ শব্দের একটা অর্থব্যঞ্জনা আছে। গল্প সাহিত্যের চরম অন্বিষ্ট ‘যথার্থ’। এ সম্পর্কে ভার্জিনিয়া উল্ফ্ মন্তব্য করেছেন :

To services, each sentence must have, at it’s hear, a little spark of fire, and this. Whatever the risk, the move list must pluck with his own hands from the blaze. His state them is a precarious one. He must expose himself to life; He must risk the danger of being led away and tricked by her deceitfulness; he must seize her treasure from her and let her trust run to waste. But at a certain moment he must leave. The company and withdraw; alone, to that mysterious room where his body is hardened and fashioned into permanence by processes which, if they elude the critic, hold for him so profound fascination.

এই মন্তব্যের মধ্যে আমরা পাবো ‘যথার্থে’র মর্ম এবং অর্থব্যঞ্জনা। যে এগিয়ে যেতে পারবে— সে এগিয়ে যাবে— যে এগিয়ে যেতে পারবে না সে পিছিয়ে থাকবে, এটাই হলো মূলকথা। আর কিছু নয়।

————————————-

পাপড়ি রহমান

নব্বুই দশকের গল্প

আমাদের গল্প-ইতিহাস নিপুণভাবে ধরে ধরে দেখলে আমরা পাই যে ’৪৭ পরবর্তীকালে, দেশভাগের ফলে, ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আর্থসামাজিক পটভূমিতে মধ্যবিত্ত সমাজের নাগরিক বিকাশের সাথে সাথে জীবনের স্বপ্নময়তা যেমন সে পায়, স্বপ্নভঙ্গের হতবিহ্বল অবস্থা দেখে তার চেয়ে বেশি। যা ওই সময়ের লেখকদেরও নানাভাবে প্রভাবিত করতে থাকে। ক্রমে ক্রমে তারা বুঝতে থাকে, দেশ স্বাধীন হয়েছে মূলত ধর্মের নামে এদেশের মানুষকে শোষণ-নিপীড়নের জন্য। তবে তখন নগরমনস্ক ও বুদ্ধিধর্মী সাহিত্যিকরা গভীর বিশ্বস্ততার সাথে বিশ্বের অন্যান্য শিল্প-সাহিত্যের সাথেও পরিচয় ঘটাতে থাকেন, এবং তাঁদের কথাসাহিত্যও বদলে যেতে থাকে। তাঁরা জীবনের নানান বাস্তবতা, ক্ষয়, ক্ষোভ, অনুভূতি, স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে প্রকাশ করতে থাকেন। এ সময়ের গল্পসাহিত্যের ধারায় যাঁরা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন তাঁরা হলেন শওকত ওসমান, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, সৈয়দ ওয়াীউল্লাহ্্, আবু রুশদ, শাহেদ আলী, সরদার জয়েনউদ্দীন, আবুল ফজল, মাহবুবুল আলম প্রমুখ। বুলবুল চৌধুরী ও ফজলুল হক তুলনামূলকভাবে কম লিখেও পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে এঁরা ছোটগল্পচর্চায় উদ্যোগী ছিলেন। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের ফলে আমরা মধ্যবিত্তের নতুন চেহারা দেখি। প্রগতিশীলতার উন্মেষ, তেভাগা আন্দোলন, নৃ-জাতিগোষ্ঠীর লড়াই-সংগ্রাম এই জনপদের মানসপটে প্রভাব রাখতে থাকে। তারা সাংস্কৃতিকভাবে ক্রমশ আরও সচেতন আর আধুনিক হতে থাকেন। দেশের বিরাজমান পরিপ্রেক্ষিত তখন ছিল শোচনীয়। তৎকালীন কথাসাহিত্যিকরা তাঁদের সামনে পেয়েছেন বিশ্বযুদ্ধোত্তর সংকট, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দেশভাগের মতো নিষ্ঠুর অমানবিক ও অন্যায্য ঘটনাসমূহ। এমন প্রতিকূল সামাজিক দুরবস্থার ভেতর একজন সৃজনশীল লেখককে মনোযোগ দিতে হয়েছে রাষ্ট্রীয় ঘটনাসমূহ, সামাজিক অব্যবস্থাপনায় এবং একইসঙ্গে তাঁর সৃজনশীলতার প্রতিও। এই টানাপড়েনের মধ্যেও শওকত ওসমান, আবুল ফজল ছোটগল্পে অসাম্প্রদায়িক মানবিকতা, গ্রামজীবনের অসাম্য-অসঙ্গতি মূর্ত করে তোলেন। কেউ কেউ আবার বিভ্রান্ত হয়ে আধুনিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট ক্রমে ক্রমে চলমান হওয়ার পরও বিভাগোত্তর কথাসাহিত্যকে আধুনিক করে গড়ে তুলতে ছিলেন নারাজ। তাঁদের সাহিত্যও দেশভাগের ভেদ-বুদ্ধিতে ফেলে বিবেচনা করার কারণে ক্ষুণœ হয় বাংলা কথাসাহিত্যেও ধারাবাহিকতা। তাঁরা খারিজ করে দেন কথাসাহিত্যের উত্তরাধিকার। কেউ কেউ আবার শাসকদের সাংস্কৃতিক কৌশলের সঙ্গে সুর মেলান; ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতাকে অধিক গুরুত্ব দিতে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসের জ্বলন্ত প্রেক্ষাপট— দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভূমি-উৎখাত শরনার্থীদের বিদেশ-বিভুঁইয়ে-মানবেতর জীবনযাপন মিলিয়ে সমাজ ও মানুষের অসহায় করুণ গাথা আমাদের সামনের সারির অগ্রজ গল্পকাররা ছোটগল্পে নিয়ে আসতে পারেননি। গ্রামীণ পটভূমির দুর্নীতি, অসাম্য এবং ছিন্নমূল মানুষের দুঃখবোধ ছোটগল্পে যা এসেছে তা এতই কুয়াশাচ্ছন্ন যা সরিয়ে পাঠক সত্যের মুখোমুখি হতে পারেননি। ব্যতিক্রম সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ— বিষয় উপস্থাপনায়, গল্পভাষায় তিনিই আমাদের গল্পসাহিত্যকে আধুনিকতার মর্যাদা দান করেন। তিনি উপন্যাস ও গল্প দুই ক্ষেত্রেই নান্দনিকতামুখর সাহিত্য রচনা করেন। যা এই সময়ের প্রকৃত আধুনকিতাকে বোধসম্পন্ন, প্রখর জীবনঘনিষ্ট সূক্ষ্ম শিল্পচেতনায় উদ্ভাসিত করতে সমর্থ হন।

ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা নিয়ে পঞ্চাশের দশক এমনিতেই ছিল ঘটনাবহুল। মাতৃভাষার দাবিতে সংগ্রাম, বিদ্রোহ, মৃত্যু, প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তিতে গোটা দশক রূঢ়, মানবিক প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ে। ফলে অনেকের লেখাতেই এই গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন স্থান করে নিয়েছিল। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সচেতন মানুষের মধ্যে লড়াই-সংগ্রাম, ছাত্র-জনতার নির্মম মৃত্যু, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অটল পঞ্চাশ নানা কারণেই জাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। এবং এই দশকেই আমরা পেয়েছি ক্ষুরধার লেখনীতে নিজেদের উদ্ভাসিত করে তোলা বেশ কিছু গল্পকার। সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবু ইসহাক, রাজিয়া খান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্, রশীদ করীম, হাসান হাফিজুর রহমান, শহীদ সাবের, আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রমুখ। এই গল্পকাররা আধুনিক জীবন-জিজ্ঞাসার আলোকে ব্যক্তিরূপকে উন্মোচন করতে গিয়ে মানুষের অস্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে ভেতরের সংঘাতকে বিশ্লেষণ করেছিলেন। জীবনের জন্য অপরিহার্য বিষয়রূপে গুরুত্ব দিয়েছেন যৌনতার সংশ্লেষকে। পঞ্চাশের গল্পকাররা প্রচলিত বৃত্তকে ভেঙেচুরে নিজেদের অসাম্প্রদায়িক, উদার, প্রগতিশীল চিন্তাশীলতাকে সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন।

বাংলাদেশের গল্প প্রথমবারের মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য বাঁক পরিবর্তন করে ষাটের দশকে। অস্থিরতার সময় ছিল সেটি— কী আমাদের পরিচয়— এই প্রশ্ন প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিল তখন। ততোদিনে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রতত্ত্বের মোহ কেটে গেছে, ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছে পাকিস্তানের প্রকৃত স্বরূপ, বাঙালি দাঁড়িয়ে আছে তার আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন সামনে নিয়ে, ভাবতে শুরু করেছে স্বাধিকারের কথাও। একদিকে সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সমস্ত মানবতা অন্যদিকে চলছে আন্দোলন-সংগ্রাম-প্রতিরোধ। একদিকে জাতীয়তাবোধ ও স্বাতন্ত্র্যবোধ নির্মাণের প্রবল প্রচুর প্রক্রিয়া, অন্যদিকে বাঙালির বিরুদ্ধে আব্যাহত ষড়যন্ত্র। পূর্ববর্তী অর্থাৎ পঞ্চাশের লেখকরা যেন কিছুটা হতভম্ব ছিলেন নতুন রাষ্ট্র প্রাপ্তিতে আর ষাটের লেখকরা অনেক বেশি স্থির হয়ে উঠেছিলেন আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে। এই অর্থে সময়টি নানাদিক থেকে সংকট ও নির্মাণেরও বটে। সাহিত্যের ভূমিটি তখনো ছিল কিছুটা নরম কর্দমাক্ত। বীজক্ষেত্র কীভাবে নির্মিত হবে, সেটি নির্ভর করছিল লেখকদের ওপরই। এই দ্বন্দ্ব ও সংকটমুখর সময়ে ষাটের সাহিত্যকর্মীরা নিয়ে এসেছিলেন প্রথাভাঙার অঙ্গীকার, নতুন কিছু নির্মাণের আন্তরিক-উদ্যম-উচ্ছল প্রচেষ্টা। এর জন্য যে দীপ্ত-উজ্জ্বল তরুণ গোষ্ঠীর প্রয়োজন, ষাটের তা ছিলও। এই ষাটের দশকে বাংলাদেশের গল্প পৌঁছে যায় এক সম্মানজনক স্তরে। এই প্রেক্ষাপটে যাঁরা নবতর রীতিবৈচিত্র্য, বক্তব্যের বিশ্বস্ততায় ও দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যে প্রসিদ্ধি পেয়েছেন— তাঁদের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, কায়েস আহমদ, রিজিয়া রহমান, মাহমুদুল হক, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, সুব্রত বড়–য়া, রশীদ হায়দার, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রাহাত খান, আল মাহমুদ, বিপ্রদাশ বড়–য়া, হাসনাত আবদুল হাই, বশীর আলহেলাল প্রমুখ। এঁদের সম্মিলিত প্রয়াস, সমাজসজ্ঞানতা, শিল্পবোধ এবং আধুনিক সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে উপলদ্ধি ছোটগল্পের ভাড়ারে জমা করে উজ্জ্বল শস্য। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন সাহিত্যাদর্শের তরঙ্গ এসে পৌঁছায় আমাদের সাহিত্যে। এর প্রভাবে নতুন সময়ের নতুন সাহিত্য আঙ্গিক ও ভাষাভঙ্গি সহযোগে গল্প লেখেন লেখকরা।

সত্তরের দশক বাংলাদেশের জন্য নিয়ে এসেছিল এক অভূতপূর্ব ও অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতা। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তরের প্রলয়ংকারী জলোচ্ছ্বাসের দাগ তখনো শুকোয়নি এই দেশ থেকে— তার মধ্যেই এলো একাত্তর। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সেই সময়ের সাহিত্যভুবনেও পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছিল। তারপরও ষাটের গল্প বৈশিষ্ট্য, আঙ্গিক বা লিপিকৌশল, গদ্যভঙ্গি— এমনকি পরিপ্রেক্ষিত অবলোকনের সঙ্গে সত্তরের গল্প লেখকদের সাযুজ্য অধিক। এঁরা যে শ্রেণী ও অবস্থানের মানুষ তা তাঁরা তীব্র মনোযোগের সঙ্গে গল্পে তুলে এনেছিলেন। সমাজের ভাঙন-নির্মাণ, ক্ষয় ও বিকাশ, ম্লানিমা ও বিক্ষোভ, ঘুম ও আলোড়নের বিষয়কে সত্তরের গল্পকাররা গল্পের বিষয় করেছেন। যে দ্বিধা, পিছুটান, অনাগ্রহ, ভয় বিভাগোত্তর লেখকদের ছিল দুই দশক পরে ষাটের লেখকরা তা খারিজ করে দেন। ষাটের নির্মিত এই গল্পের জমিনের উপর দাঁড়িয়ে সত্তরের লেখকরা গল্পের ফসল আরও সজীব করে তোলেন। কুসংস্কার ও অন্ধধর্মানুভূতির প্রতি অকারণ আনুগত্য সত্তরের লেখকদের নেই। এই দশকের লেখকরা অধিক সাহসী ও সচেতন। সমাজ ও জীবনের বিষয় সত্তরের গল্পে বহুলাংশে প্রত্যক্ষ, সরাসরি ও লক্ষ্যের প্রতি নিক্ষিপ্ত। প্রেরণা ও অভিজ্ঞতা হিসেবে সত্তরের লেখকরা পেয়েছেন এই দশকে সংঘটিত ঘটনাবলি। বাংলাদেশের জন্ম, স্বাধীন সার্বভৌম নিজ দেশের জন্য মরণপণ যুদ্ধ এবং মানুষের মৃত্যু লেখকদের অভিজ্ঞতায় এনে দিয়েছিল গুণগত পরিবর্তন। যুদ্ধ, স্বাধীনতার যুদ্ধ, মুক্তির যুদ্ধ মানুষকে আমূল বদলে দেয়। তখন চারিদিকে বারুদের গন্ধ, হত্যাযজ্ঞের নির্মম ক্ষত, নারীর সম্ভ্রমহানির হাহাকার, চারিদিকের হারানোর বেদনা তখন সংস্কৃতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তবে যুদ্ধের সশস্ত্রতা জাতিগোষ্ঠীর উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। সমাজের সকল দিকেই জোরপূর্বক অর্জনের একটা হুলস্থুল শুরু হয়। রাজনৈতিক এত অস্থিরতা জাতি আর কখনও দেখেনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী মানুষের আশাভঙ্গ, রাজনৈতিক অরাজকতা, বিতর্কিত দুর্ভিক্ষ, ৭৫-এর নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকা-, সামরিক অভ্যুত্থান, সামাজিক মেরুকরণ পাল্টে দেয় লেখক-চৈতন্য। অন্যদিকে, জনপদ ছোঁয়া পেতে থাকে সশস্ত্রতার। ‘বন্দুকের নলই রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস’, ‘তোমার বাড়ি আমার বাড়ি, নক্সালবাড়ি নক্সালবাড়ি’, ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ স্লোগানের ছাপও রাজনীতিকে বিক্ষুদ্ধ করতে থাকে। এসবের প্রভাব পড়েছে সত্তরের গল্পে। সত্তরের প্রায় সব লেখকই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প লিখেছেন। যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতার চাপ লেখকদের দিয়ে গল্প লিখিয়ে নিয়েছে। সত্তরের লেখকের কেউ কেউ জনপ্রিয়তার মোহে লেখার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন চটুল প্রেম, শূন্যগর্ভ জীবনদর্শন আর ফাঁপাবুলির ফানুস। জনযুদ্ধরূপী মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে জনসংস্কৃতির যে বিকাশ ঘটে, মানুষ অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য তৃষ্ণার্ত হতে থাকে, তখনকার অনেকের গল্পে তা সেইভাবে ফুটে ওঠেনি। তবে এই ধারার লেখা ব্যাপক পাঠক সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে। ফলে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য পাঠকদের কাছে পৌঁছেও গেছে দ্রুত। সত্তরের লেখকদের মধ্যে হুমায়ুন আহমেদ, মঈনুল আহসান সাবের, হরিপদ দত্ত, সুশান্ত মজুমদার, মঞ্জু সরকার, মনিরা কায়েস, আহমদ বশীর, আতা সরকার, শাহরিয়ার কবির, বারেক আব্দুল্লাহ, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়, মুস্তফা পান্না, সৈয়দ কামরুল হাসান, ইমদাদুল হক মিলন প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়।

আশির দশকে যাঁরা এলেন, প্রথমেই তাঁদের প্রয়োজন হয়ে পড়ল নষ্ট¯্রােতের বিরুদ্ধে তারুণ্যের দ্রোহ নিয়ে দাঁড়াবার। তাছাড়া ওই সময়টায় দেশে স্বৈরাচার চেপে বসে রাষ্ট্রক্ষমতায়। শাসকগোষ্ঠীর নানারকম উৎপীড়নে সাধারণ মানুষ ছাড়াও শিল্পী সাহিত্যিকদের স্বাধীনতার কলম অনেকটাই ছিল রুদ্ধ। গোটা দশক জুড়েই মানুষের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এক তীব্র ক্ষুদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি করে রেখেছিল। আর লেখকদের অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিরোধে সামিল হয়েছিলেন। এই রকম প্রতিবন্ধক অবস্থাতেও তাঁদের লেখাতে পলায়নী মনোবৃত্তি নেই। আশির দশকের লেখকরা এই নষ্ট ¯্রােতের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন তারুণ্যের দ্রোহ নিয়ে, প্রধানত লিটল ম্যাগাজিনকে কেন্দ্রে করে! দেশের দৈনিক পত্রিকায় সাহিত্য সাময়িকী ও সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ম্যাগাজিনগুলো যখন পাঠক মনোরঞ্জনে ব্যস্ত, জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যকে যাবতীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়-প্রেরণা দেয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন অনেকটা নিঃশব্দেই লিটল ম্যাগাজিনগুলো আশ্রয় হয়েছে এইসব বিক্ষুদ্ধ-তরুণের। যাঁদের লেখায় ছোটগল্পের ছিমছাম তনুখানি অনুপস্থিত। পূর্বসুরীদের জনপ্রিয়তার ধাঁধায় অস্থির হয়ে কোনো গল্পকারই নিজেকে সেই ধারায় বিকশিত করেননি। সম্ভবত এইসব কারণেই ষাটের পর আশিতে এসে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল এবং যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত। আর ওই সময়ের লেখকরাও নিটোল গল্প ঝেড়ে তৈরি করেছেন নানা সংকটের কাঁটায় ক্ষত-বিক্ষত ছোটগল্পের খরখরে শরীর। রিয়ালিজমের মধ্যে নব্য দার্শনিকতার প্রভাব, সুররিয়ালিজমের আমদানী আর অস্তিত্ববাদী চেতনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ফলে নিরীক্ষা প্রবণতা আশির গল্পকারকের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। নতুন কিছু সৃষ্টির নেশায় এসময়ের গল্প-শিল্পীরা নিরীক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। কী বিষয়ে, কী আঙ্গিকে, কী ভাষায় তাঁরা অচিরেই নির্মাণ করেছিলেন স্বতন্ত্র একটি গল্পের ভুবন— পূর্বের গল্পঐতিহ্য থেকে যা বেশ খানিকটা আলাদা। ট্রাডিশনাল গল্পচর্চাও যে হয়নি তা নয়, বরং যা হয়েছে তার সংখ্যা বা শিল্পমূল্যও মনোযোগ দাবি করার যোগ্যতা রাখে। কিন্তু প্রধান সারিতে ছিলেন ওই নিরীক্ষাপ্রবণ গল্পকাররাই।

আশির গল্প হয় দ্রোহমুখর। ছোটকাগজ কী বড়কাগজ, কী সাহিত্য পত্রিকা— তখন দ্রোহই ছিল গল্পের প্রধান স্বর। ওই সময়ের লিটল ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার খুব একটা কাছাকাছি ছিলেন না এমন লেখকের সংখ্যাও কম নয়। এবং এঁদের কেউ কেউ আশির প্রধান লেখকদের সারিতে স্থান করে নিয়েছেন। যেমন : শহীদুল জহির, মামুন হুসাইন, ইমতিয়ার শামীম, নাসরীন জাহান, ওয়াসি আহমেদ, মহীবুল আজিজ, ঝর্না রহমান, হুমায়ুন মালিক, সঞ্জীব চৌধুরী, হামিদ কায়সার প্রমুখ। ছোটকাগজকেন্দ্রিক উল্লেখযোগ্য গল্পকারদের মধ্যে সেলিম মোরশেদ, সামসুল কবীর, কাজল শাহনেওয়াজ, পারভেজ হোসেন, সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ, তারেক শাহরিয়ার, শহিদুল আলম প্রমুখকে আমরা এই দশকেই পেয়েছি। আশির লেখকরা দাঁড়িয়েছিলেন দ্রোহ আর প্রতিবাদ নিয়ে। তাঁদের এই প্রতিবাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে আমাদের সাহিত্যজগতে। কথাক্রমে এও বলে রাখতে হয়, তখনকার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রটি এত ঝঞ্ঝা-বিক্ষুদ্ধ ছিল যে, শিল্প-সংস্কৃতির সমস্ত ক্ষেত্রে অপরাজনীতিকে মোকাবেলা করাটাই ছিল মুখ্য।

আশির দশকের লেখকরা তুমুল সক্রিয় থাকার সময়ই নব্বয়ের লেখকরা লিখতে শুরু করলেন। অগ্রবর্তী লেখকদের ওই তীব্র প্রতাপ নব্বইয়ের নতুন লিখিয়েদের জন্য একই সঙ্গে ছিল স্বস্তির ও অস্বস্তির। এক একটি দশকে নতুন লেখকদের আবির্ভাব সর্বদা প্রথাভাঙা ¯্রােতের দিকে অগ্রসরমান ছিল। ফলে নব্বইয়ের লেখকরাও এদিক থেকে ব্যতিক্রম নয়।

নব্বইয়ের লেখকদের এই স্বকীয়ভাবে উজ্জ্বল হয়ে থাকার অনেক কারণ ছিল। প্রধান কারণ হলো— এই দশকের লেখকরা কথার চেয়ে কাজ বেশি করেছেন। এই সময়ে লিটলম্যাগাজিনে যে চর্চা হয় তাতেও আশির সেই ধারা লক্ষিত হয় না। তার চেয়ে বরং পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রবণতা বাড়তে থাকে। অজ¯্র লিটলম্যাগাজিনের ভিড়ে কথাসাহিত্যকেন্দ্রিক কাগজের দেখা মিলেছে একটি বা দুইটি। নানাবিধ সংকটের কারণে নব্বইয়ের লেখকরা অনেকটা কোণঠাসা হয়েই নির্ভর করতে শুরু করে দৈনিক কাগজের উপর। নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নব্বইয়ের লেখকরা লিখে গেছেন! সক্রিয় থেকেছেন— যা ওই দশক অতিক্রান্ত হওয়ার দীর্ঘদিন পর এখন তা সূর্যের মতোই জাজ্জ্বল্যমান। নব্বইয়ের অনেক গল্প নানাদিক থেকেই প্রচলিত গল্পের সীমানা এমনভাবে পেরিয়ে গেছে যে, পাঠক যদি প্রগতিশীল না হয়, তাহলে এর রসাস্বাদনে ব্যর্থ হতে পারেন।

এতসব কিছুর পরও নব্বই দশক মূলত হতবিহ্বলতারই দশক, সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে, সা¤্রাজ্যবাদের একক আদিপত্য বিস্তৃত হচ্ছে তো হচ্ছেই। উপনিবেশ তার নতুন আদল নিচ্ছে, তথ্যে আধুনিকতার নামে নানান দাপুটে সংস্কৃতির জটিল থাবা বসাতে শুরু করেছে। ব্যক্তিপুঁজির সঙ্গে কর্পোরেট পুঁজি এসে মানুষের সহজাত প্রকৃতিকেও হতচকিত করে দিচ্ছে। এমনই কালে গল্পকারগণ নানান সঙ্কটের ভিতর তাদের গল্পসাধনা করতে থাকেন। নব্বইয়ের গল্পলেখকরা একেকজন একেক স্বরে কথা বলছেন; তার নিজের মতো করে বলছেন। ফলে প্রত্যেক লেখকের বৈশিষ্ট্যকে আলাদা করে চেনা যায়, চিনে নিতে হয়। এদের গতি, প্রকৃতি, ভঙ্গিকে আলাদা করে ধরা যায়। এ দশকের লেখকরা আঞ্চলিক ভাষার উপর ঝুঁকেছেন কম-বেশি সবাই। এবং আঞ্চলিক ভাষাকে সাবলীলভাবে ব্যবহারও করেছেন। নব্বইয়ের লেখকদের অনেক বেশি প্রগতিশীলও বলা যেতে পারে— কারণ এঁরা প্রায় সকলেই ধর্মান্ধতা থেকে মানুষের মুক্তি দেখাতে চেয়েছেন। পূর্ববর্তী দশকের ধারাবাহিকতায় সুররিয়ালিজম বা ম্যাজিকের ব্যবহারও করেছেন কম। বরং নব্বইয়ের লেখকদের লেখায় রাজনীতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো এসেছে একেবারে সমসাময়িক ঘটনাবলি থেকে। ফলে এদের গল্প হয়ে উঠেছে বাস্তবধর্মী— যা চলচ্ছবির মতোই দৃশ্যমান; কোনো কোনো লেখকের লেখায় মিথ বা পুরাণ ব্যবহারের ঝোঁক লক্ষণীয়। কারো লেখায় রয়েছে অভূতপূর্ব ও ব্যতিক্রমী গদ্যভাষা! ছোটগল্পের যে একমুখী প্রবণতা— একটা তুঙ্গ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া— তা আর সকল ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। বিভিন্ন বাঁক প্রতি পদে পদে তাকে ব্যাহত করছে। নব্বইয়ের গল্পকারদের গল্পে ঘুরে-ফিরেই আসছে সমাজব্যবস্থার অসম বিন্যাস, রাজনীতিবিদদের স্বার্থপরতা, জটিল-কুটিল মানসিকতা, বেকারত্ব, অশিক্ষা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, ফতোয়াবাজদের রক্তাক্ত জিহ্বা, খেটে-খাওয়া মানুষের স্বপ্ন নিয়ে এনজিওদের ব্যবসা, সমাজ-রাজনীতি, সাংস্কৃতিক বলয়ে নতুন নতুন ধ্যান-ধারনা, উত্থান-পতন অর্থাৎ সার্বিক অবক্ষয়-হাহাকার গল্পের উপজীব্য হয়ে উঠেছে। যাবতীয় দ্বন্দ্বের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আজ গল্পে দৃষ্ট হচ্ছে, কমে যাচ্ছে প্রেমময়তা ও উল্লাস। চটুল প্রেমের কোনো আবেগী গল্প নব্বইয়ের লেখকরা লিখেননি বললেই চলে। নব্বইয়ের লেখকরা তাঁদের লেখায় ধীর-স্থির— অনেকটা পুরনো পুকুরের মতো গভীর আর নির্জনও বটে। আসলে এই সময়ের লেখকরা পরিবার, ব্যক্তি এবং শুধু তাঁর চারপাশের সমাজের মধ্যে নিজেদের লেখাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন না। এক্ষেত্রে সামাজিক সংকটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংকট মিশ্রিত হয়ে নব্বইয়ের সাহিত্য ভিন্নধারায় প্রবাহিত হওয়ার প্রয়াস পেয়েছে।

জীবন বদলে যাচ্ছে, সমাজ বদলে যাচ্ছে, রাষ্ট্রকে আশ্রয় করে প্রতিষ্ঠানের চেহারা যেন অচেনা হয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানকে ভর করে নানান অপসংস্কৃতির বিস্তারও লক্ষ করা যায়। কর্পোরেট পুঁজির দাপট, এনজিওর প্ল্যানমাফিক জীবনযাত্রা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় গল্প তার চেনাজানা চেহারা বদলে দিচ্ছে। গল্পের চেয়ে আকর্ষণের কায়দা বেড়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতি শুধু নয়, শহর বদলে যাচ্ছে, মানুষের সহজাত সৃষ্টিশীলতা নানান কায়দায় নিজের চেহারা দেখাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে নব্বই-এর চেহারায় প্রাণ আনতে যেন নবতর প্রেরণায় ‘ফিজিক্যাল স্টোরি’র আমদানি প্রয়োজন। গল্পের এই প্রতীকী চেহারা সাংস্কৃতিক অপকৌশলকে মোকাবেলা করার হিম্মত রাখবে!

[পুনর্মুদ্রিত ও সংক্ষেপিত : ভূমিকাংশ, বাংলাদেশের গল্প : নব্বুইয়ের দশক, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯২]

—————————————

নাসরীন জাহান
বাংলাদেশের গল্প : আশির দশক

বিভাগোত্তর কাল থেকেই ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আর্থ-সামাজিক পটভূমিতে মধ্যবিত্ত সমাজের নাগরিক বিকাশের সাথে সাথে জীবনের নানা জটিলতা লেখকদের জীবন সচেতন করে তুলেছিলো। এবং এর প্রভবে আন্তর্জাতিক বোধসম্পন্ন নগরমনস্ক ও বুদ্ধিধর্মী সহিত্যিকরা গভীর বিশ্বস্ততার সাথে এগিয়ে এসেছিলেন। জীবনের অনুভূতি, বাস্তবতা, ক্ষয়, ক্ষোভ, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশাকে প্রকাশ করতে। এই দশকের দুজন উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্যিক হলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ এবং শওকত ওসমান। এছাড়াও গদ্যসাহিত্যের ধারায় যাঁরা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন তাঁদের মধ্যে আবুল ফজল, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, মাহবুবুল আলম, শাহেদ আলী অন্যতম। এই দশকের স্বল্পপ্রজ লেখক হওয়া সত্ত্বেও বুলবুল চৌধুরী এবং ফজলুল হক পাঠকের বেশ মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এই দশকের প্রধান সার্থকতা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র মতো একজন অত্যন্ত আধুনিক বোধসম্পন্ন, প্রখর জীবনঘনিষ্ঠ সূক্ষ¥ শিল্পচিন্তা চেতনায় উদ্ভাসিত শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যের উত্থান।

চল্লিশের দশকের কথাশিল্পীদের লেখা সমাজের বলিষ্ঠ রূপায়ণের মাধ্যমে এগিয়ে গেলেও, শিল্পকলার অনেক দাবি পূরণ করতে সক্ষম হলেও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আর আবেদন রাখতে পারছিলো না। বৈচিত্র্য-সন্ধানী মানসিকতা শিল্পের গতানুগতিকতামুক্ত প্রগতির হাত ধরে এগোয় বলেই হয়তো নতুন প্রজন্মের পাঠকচিত্তের কাছে এদের অনেকের গল্পই অনেকটা আবেদনহীনতায় রূপান্তরিত হয়ে পড়েছিলো।

তাঁদের গল্পে তৎকালীন সমাজ ও জীবনের প্রতিচ্ছবি আছে। লেখক ভেদে সমাজ ও জীবনের রূপায়ণে পাস্পরিক স্বাতন্ত্র্য ও বিভিন্নতাও আছে। তখনকার গল্পকাররা স্বকীয় শিল্পকৌশলে তাঁদের গল্পের বিষয়বস্তু গড়ে নিয়েছিলেন। তথাপি তাঁরা সমসাময়িক মন্বন্তর, দেশবিভাগ সংকট, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যকার অস্থির পরিস্থির দিকে পিঠ ফিরিয়ে, ছিন্নমূল মানুষের মানবেতর জীবন-যাপনের গভীরে প্রবেশ না করে সাহিত্যে তৈরি করেছেন এক ভাসমান জগত, যার শেকড় মাটির গভীরে গিয়ে পৌঁছায় নি।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ এবং শওকত ওসমান মূলত এই ধারা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলেন। এই দশকের গল্পকারদের সামনে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিপ্রেক্ষিত ছিলো বড় টালমাটাল। দুটো বিশ্বযুদ্ধ অতিক্রম করেছে পৃথিবী। বাংলায় শুরু হয়েছে নিষ্ঠুর মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এসবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক স্বার্থপরতা ঘটলো বাঙালি জীবনে নিষ্ঠুরতম বিভাজন; দেশবিভাগ। এইরকম নাজুক পরিস্থিতিতে সাহিত্যরচনা কালের দু-তিনজন গদ্যকার ছাড়া কারও লেখাতেই সমসাময়িক ছাপ তেমনভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে নি। ফলে জীবন উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর বাস্তবতার নিগূঢ় ফাঁকের জন্যই এই দশক পরবর্তী পাঠকের কাছে আবেদন সৃষ্টি করতে অনেকটা ব্যর্থ হয়েছে।

পরবর্তীকালে বাংলা গল্পের ¯্রােত ধরেই পঞ্চাশের গল্পকারদের উত্থান। আধুনিক জীবন জিজ্ঞাসার আলোকে ব্যক্তিরূপকে উন্মোচন করতে গিয়ে মানুষের অস্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তর সংঘাতের বিশ্লেষণ, যৌনতার সংশ্লেষকে জীবনের এক অপরিহার্য বিষয়রূপে গুরুত্ব দান এবং প্রচলিত প্রবাহের বৃত্ত ভেঙ্গে মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, উদার, প্রগতিবাদী চিন্তাশীলতার স্ফুরণে পঞ্চাশ দশকের অনেক গল্পকারই উজ্জ্বল আলোয় নিজেদেরকে উজ্জীবিত করেছেন। পঞ্চাশ দশকের শেকড়ের মধ্যে ছিলো ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা। ভাষা আন্দোলন গোটা দশকের ওপর এক রূঢ়, মানবিক প্রভাব বিস্তার করে। এই দশকের অনেক লেখায় এই গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের আনন্দ এবং বেদনা মূর্ত হয়ে আছে। ২১শে ফেব্রুয়ারির সামগ্রিক চেতনা, একে কেন্দ্র করে সচেতন মানুষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা, ছাত্রদের নির্মম মৃত্যু… এই দশককে জাতির কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে। আধুনিকতার পথ ধরে এই দশকে যাঁদের উত্থাপন তাঁদের মধ্যে অন্যতম বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবু ইসহাক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, রশীদ করীম, হাসান হাফিজুর রহমান, জহির রায়হান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্, সৈয়দ শামসুল হক, রাজিয়া খান প্রমুখ।

বাংলাদেশের ছোটগল্প ষাট দশকে এসে এক নতুন সাহিত্যিক পালাবদল ঘটায়। ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের আলোড়ন মূলত এর প্রাণশক্তির কেন্দ্রবিন্দু। যার ওপর দাঁড়িয়ে গোটা দেশের মানুষ আরও রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠে। ষাটের দশকের লেখদের কৈশোরের শেষ এবং যৌবনের শুরু সামরিক শাসন দিয়ে চাপা। পাকিস্তানে মানুষের অবস্থায় চিড় আইয়ুব খান পরিণত করে ফাটলে। এই ফাটল তৎকালীন সমাজে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা এবং ভাঙনের উস্কানি দেয়। লেখকেরা হতাশ ও অবক্ষয়ের প্রকাশ ঘটাতে প্ররোচিত হন এবং আবার গা ঝাড়া দিয়ে ঐ উস্কানিকে পরিণত করেন অনুপ্রেরণায়। গোটা দেশের মানুষ  এইসব পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেই আরও রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠেন। প্রশ্ন ওঠে সার্বভৌম স্বাধিকারের। শিল্প সমাজে ধীরে ধীরে জেগে উঠতে থাকে নিওরিয়ালিজম মতবাদ। ক্রমান্বয়ে ভেঙ্গে পড়তে থাকে শাদামাটা জীবনের সরল বিবৃতি। রিয়ালিজমের মধ্যে নব্য দার্শনিকতার প্রভাব, সুররিয়ালিজমের আমদানি আর অস্তিত্ববাদী চেতনার পরীক্ষা নিরীক্ষা। ফলে, যতই দিন যেতে থাকে, গল্পের ফর্মও যেতে থাকে পাল্টে। গল্পের ভুবনে ঘটে শৈল্পিক দিগন্তের নয়া উন্মোচন। শুধু ঘর-গেরস্থালির পুরনো কাসুন্দি নয়, রাজনীতির তরতাজা উল্লম্ফন নয়, প্রগাঢ় জীবনবোধ; ভাষা এবং দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সূক্ষ্ম আধুনিকতার সুগভীর প্রচ্ছায়া গল্প করে তোলে অভিজাত, ঋদ্ধ, সার্বিকভাবে সম্পন্ন। নতুন টেকনিকে সমৃদ্ধ হয়ে ভাষার পরিবর্তনের সাথে চলে অভিনব বিষয় বৈচিত্র্য আনার প্রয়াস। এই সময়ের মতবাদ প্রধান গল্পরচনার ধারাটির সূত্রপাত। ষাট দশকের প্রথামার্ধের যে মূলভিত্তি ভাষা আন্দোলন তাকে ছাড়িয়েও সামরিক শাসনের দুঃসহ যাতাকলের কারণে এই দশকের শেষ দিকে আরও ব্যাপক শূন্যতা এবং পরাধীনতাকে কেন্দ্র করে প্রথম দিককার গদ্যের চেয়ে এই দশকের শেষ দিকের গদ্য আরও অধিক সম্পন্ন এবং পূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে যাঁরা নবতর রীতি-বৈচিত্র্য, বক্তব্যের বিশ্বস্ততায় ও দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যে প্রসিদ্ধি পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, রশীদ হায়দার, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রাহাত খান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আল মাহমুদ, সেলিনা হোসেন, কায়েস আহমেদ প্রমুখ।

ষাট দশকের লেখকদের যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি পরবর্তীকালের লেখকদের বিশেষভাবে প্রেরণা দিয়েছে তা হচ্ছে মুক্তচিন্তা এবং সমাজ সচেতনতা। বিদেশী সাহিত্যের প্রবাহকে সংস্করণের মাধ্যমে চিন্তার ক্ষেত্রে এঁরা যেমন হয়ে উঠেছেন আন্তর্জাতিক, তেমনই আধুনিক, অস্থির, যন্ত্রণাকীর্ণ এবং যান্ত্রিক যুগের প্রত্যাশায় বিদ্ধ। এবং যে শ্রেণী ও সমাজের তাঁরা মানুষ সেই শ্রেণী ও অবস্থানকে তীক্ষ¥ দৃষ্টিভঙ্গিজাত গভীর মনোযোগের সাথে গল্পে তুলে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন যা সত্তর এবং আশির দশকের লেখকদের আরও গভীরভাবে মেধা, মনন ও রুচির বিকাশের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোজনে সহায়তা করেছে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মানুষ জেগে উঠেছে, গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে ছাত্র সমাজের ব্যাপক আন্দোলন চাঙ্গা করে তুলেছে গোটা বাঙালি জাতির চৈতন্যে। ছাত্র শ্রমিক কৃষক রাজনীতিবিদ লেখক বুদ্ধিজীবী সর্বস্তরের সকল মানুষ এক জোট হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। ন’মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের গর্বিত পতাকাতলে জেগে উঠেছে নতুন সমাজ। আর সেই সমাজের তাবৎ শিল্পীদের শিল্পকর্মে স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এত বড় একটা ঘটনা, এত বড় একটা ঐতিহাসিক পরিবর্তন কোন লেখাতেই শিল্প সফলতা নিয়ে বিকশিত হয় নি। যদিও সত্তরের লেখকদের সাহস ও সচেতনতার তেমন অভাব নেই, সমাজ ও জীবনের প্রতি লক্ষ্যভেদী দৃষ্টি রেখে এরা কথা বলেন সরাসরি। ফলে ভাষার ক্ষেত্রেও ষাট দশকীয় ভারি কষ্টার্জিত গদ্য ভঙ্গিমায়ও এসেছে একটা ঝরঝরে ভাব, যা বড় মাপের সাহিত্য সৃষ্টির পথকে সুগম না করে বরং মধ্যবিত্তের সস্তাচটুল ছিচকাঁদুনে কেচ্চা বর্ণনে যথেষ্ট সহায়তা দান করেছে। সত্তরের লেখকদের অনেকেই পাঠক ধরার ফাঁদ পেতে অনবরত লেখার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন পুতপুতু প্রেম, শূন্যগর্ভ জীবনদর্শন আর ফাঁপা বুলির ফানুস। আর যারা সত্যিকার জীবনকে শিল্পম-িত করে সাহিত্যে স্থান দিতে চেয়েছেন, জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যের প্রবল ¯্রােতের ধাক্কায় তাদের অনেকের কলম গেছে রুদ্ধ হয়ে। এরপরেও প্রবল সম্ভাবনা সহ সত্তরে দু-একজন আছেন, যারা আবার সাহিত্যকে রাজনীতি এবং সমাজের রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরার অনেকটা সরাসরি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন।

যুদ্ধ পরবর্তীকাল হিসেবে সত্তরের প্রতি পাঠকের প্রত্যাশা ছিলো অনেক। জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যচর্চা, পুস্তককে পণ্যে রূপান্তরিত করা, এইরকম শিল্পের দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে ফাঁপা, অন্তঃসারশূন্য ব্যাপক অবস্থা সৃষ্টি করার প্রক্রিয়া সত্তরের আগে বা পরে আর হয় নি। তবুও একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায় তরল মনোরঞ্জনের অবাঞ্ছিত কর্মে লিপ্ত হলেও এই ধারার সাহিত্যে বেদনা, রোমান্টিকতা ইত্যাকার বিষয় সংযোজিত থাকায় এরা ব্যাপক পাঠক সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশের ব্যাপক পাঠককে কথাসাহিত্যে আগ্রহী করে তোলার ব্যাপারে এঁদের বেশ ভূমিকা রয়েছে। এই ধারার কথাসাহিত্যে মূলত হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন খ্যাত। পরবর্তীকালে মঈনুল আহসান সাবেরও নিজের সাহিত্যকে সেই ধারায় প্রবাহিত করেছেন।

এইসব পরিস্থির মধ্যেও যাঁরা নিজেদেরকে মহৎ সাহিত্যচর্চায় ব্যাপৃত রেখেছেন তাঁদের হাতেই বলতে গেলে উঠে এসেছে যুদ্ধপরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যর্থ শাসন ব্যবস্থা, উপর্যুপরি সামরিক অভ্যুত্থান, মানুষের ক্রমপতন, মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়, হত্যা এবং হানাহানি। শিল্পের বিচারে তাঁরা আমাদের প্রত্যাশাকে কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে সেই বিতর্কে না গেলেও এদের শক্তির দিকটা কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না। এই তালিকার মধ্যে মঞ্জু সরকার, সুশান্ত মজুমদার, বারেক আবদুল্লাহ্, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়, মুস্তাফা পান্না, সৈয়দ কামরুল হাসান ও হরিপদ দত্ত অন্যতম। এর মধ্যে দু-তিনজন ছাড়া বাকিরা অজ্ঞাত কারণে কথাসাহিত্যের পথে নিজেদের কলম থামিয়ে দিয়েছেন।

গোটা আশির দশক জুড়ে দেশে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত ছিলো। নিপীড়ন ও লুণ্ঠন নিয়মে পরিণত হয়। মিলিটারি ও শাসকগোষ্ঠীর নানারকম উৎপীড়নে সাধারণ মানুষ ছাড়াও শিল্পী সাহিত্যিকদের স্বাধীনতার কলম অনেকটাই ছিলো রুদ্ধ হয়ে। গোটা দশক জুড়েই মানুষের প্রতিবাদ,  প্রতিরোধ এক বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করে রেখেছিলো। লেখকদের অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই প্রতিরোধে সামিল হয়েছিলেন। এইরকম প্রতিবন্ধক অবস্থাতেও—তাঁদের লেখাতে পলায়নী মনোবৃত্তি নেই। এই দশকের লেখকেরা অনুধাবন করতে পেরেছেন রাজনীতি এবং সাহিত্য দুটো আলাদা মাধ্যম। রাজনীতির প্রয়োজনে শিল্প নয় বরং শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে সাহিত্যে রাজনীতি আসতে পারে। ফলে মানুষের প্রতিরোধকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তাদের সাহিত্যে শিল্পমান খাটো করার প্রয়োজন হয় নি। সত্তর পরবর্তী কালে, গদ্য সাহিত্যের বিশেষ করে গল্পের সংকটাপন্ন অবস্থাকে কেন্দ্র করে ‘বাংলা গল্পের কি মৃত্যু ঘটছে?’ এই জাতীয় প্রশ্ন উঠেছে। ঠিক সে সময় পোষমানা, পরিচিত, নিরাপদ মায়াময় বৃত্তটিকে ভেঙ্গে ছোটগল্পে নতুন তরঙ্গের অনুভব এনেছে বিশেষ করে লিটল ম্যাগাজিন কেন্দ্রিক তরুণ কিছু গল্পকার। তাঁদের লেখায় ছোটগল্পের ছিমছাম তনুখানি অনুপস্থিত। পূর্বসূরীদের জনপ্রিয়তার ধাঁধায় অস্থির হয়ে আশির কোন গল্পকারই নিজেকে সেই ধারায় বিকশিত করেন নি। তেমন ধারায় নিজেকে প্রবাহিত করার প্রতিভাও (?) সম্ভবত আশিতে অনুপস্থিত। সাম্প্রতিক মানুষকে তুলে ধরার তাগিদে নিটোল গল্প ঝেড়ে তাঁরা তৈরি করেছেন নানা সংকটের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত ছোটগল্পের খরখরে শরীর। নিরীক্ষাপ্রবণতা আশির গল্পকারদের মধ্যেই সবচে বেশি পরিলক্ষিত হয়। যদিও এঁদের একটি ভালো ব্যর্থতা, এঁরা খুব কম লেখেন। অনেকের লেখার মধ্যেই নিরীক্ষা, গভীর জীবনবোধ, সামাজিক অন্তঃসারশূন্যতা ইত্যাদি সূক্ষ্ম শিল্পম-িত শক্তির সাথে উঠে আসে কিন্তু সংখ্যায় তা স্বল্প হওয়ায়, এবং ব্যাপক প্রচার মাধ্যমের সুযোগ অনেকেরই পরিহার করায় আশির গল্পকারদের পরিচিত অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। তবুও বলা যায় ব্যর্থতা মাপার সময় আশির দশকের দশকের গল্পকারদের কেন্দ্র করে আসে নি। সামনের বিস্তৃত পথই এর সার্থকতা বা অসফলতার ভার নেবে।

“শিল্পের সততায়, নিরাবেগ নির্মোহতায় এ দশকের অধিকাংশ লেখক খুব অল্প লিখলেও যে-পথ তাঁরা করেছেন তা ছোটগল্পের মুমূর্ষু শরীরে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করেছে বলা যায়।” এই গ্রন্থের প্রায় প্রত্যেক গল্পেই এই বাক্যের স্বাক্ষর মিলবে আশা করি। ষাটের মতো এই দশকের তরুণরাও আন্তর্জাতিক বোধসম্পন্ন। পৃথিবীর রাজনীতি, সাহিত্য প্রতিদিন কোন পথে ধাবিত হচ্ছে সে সম্পর্কে তাঁরা সজাগ। কোন বড় ধরনের যুুদ্ধ ছাড়াই এ দশকে যে বিশাল পরিবর্তন ঘটে তা মানব ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সোভিয়েত  ইউনিয়নের বিপর্যয়। যদিও তা ঘটেছে আশির একদম শেষ প্রান্তে এসে। এই ব্যাপক পরিবর্তন  লেখক মনে প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও তা সাহিত্যে প্রভাব ফেলার মতো সময়েরই অবকাশ পাওয়া যায় নি। সামনের সময়ের দিকে এ প্রসঙ্গে চেয়ে দেখার অবকাশ আছে বৈকি। এ ছাড়াও পৃথিবীব্যাপী মৌলবাদের উত্থান, ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি প্রভৃতি লেখকদের মধ্যে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বেশ প্রভাব ফেলছে। ফলে লেখকরা পরিবার, ব্যক্তি এবং শুধু তাঁর চারপাশের সমাজের মধ্যে নিজেদের লেখাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন না। এ ক্ষেত্রে সমাজকে সংকটের সাথে আন্তর্জাতিক সংকট মিশ্রিত হয়ে সাহিত্য ভিন্নধারায় প্রবাহিত হওয়ার প্রয়াস পাচ্ছে।

এ দশকের প্রত্যেকেই তরুণ। বৃত্ত ভেঙ্গে বাইরে আসার জন্য উন্মুখ, ফলে অনেকের কাছেই সেই বৃত্ত ভাঙ্গার কৌশলটিকে অপরিণত, অগ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু তারুণ্যের ধর্ম বৃত্ত ভাঙ্গার চেষ্টা। সেই চেষ্টার সফলতার বিচার কালই করবে।

মূলত লিটল ম্যাগাজিনকে কেন্দ্র করেই এই দশকের বিস্তার। সংবেদন, প্রসূণ, গা-ীব, অনিন্দ্য, পেঁচা, লিরিক, ড্যাফোডিল, রূপম…এইসব লিটল ম্যাগাজিন এই দশকে গদ্যের ক্ষেত্রে বেশ শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে। যদিও এসব সাহিত্য পত্রিকার মধ্যে কোনটা লিটল ম্যাগাজিন কোনটা নয়, এ নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। তথাপি এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে এদের অবদানের কথা না স্বীকার করলেই নয়।

যুগে যুগে কোন নতুনই তার কালে গ্রহণযোগ্য হয় নি। সে বিচারে এই দশকের স্বল্প লিখিয়ে, নির্মোহ গদ্যের ধারকদের সম্পর্কে এখন কোন রকম মন্তব্য না করাই উচিত। এরপরও কয়েকজন গল্পকারের গল্পের প্রবণতার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত উল্লেখ না করলে চলছে না। সেলিম মোরশেদ এই দশকের একজন নিরীক্ষাপ্রবণ অন্যতম নির্মোহ গদ্যকার। কর্কশ, রূঢ় বাস্তবতা তাঁর কলমে ভিন্ন কণ্ঠস্বরের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। মামুন হুসাইনের গদ্যে আমরা গ্রাম এবং মানুষকে প্রত্যক্ষ করি শিল্পিত বর্ণনাধর্মী ভঙ্গিতে। পারভেজ হোসেন গদ্য লেখেন অসম্ভব সংযমী কলমে। রিয়ালিস্টিক ধারার সংহত বর্ণনার ব্যাপারে তাঁর দক্ষতা অসাধারণ। শহিদুল আলমের প্রধান সম্পদ তাঁর ভাষা। সুররিয়ালিস্টিক ধারায় তার গদ্য বেশ ভাঁজ খুলে এগোয়। শহীদুল জহিরের মধ্যে আমরা রূপকথাকে আধুনিকাশ্রিত ফর্মে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের প্রবণতা লক্ষ্য করি। কাজল শাহ্নেওয়াজের গদ্যেও আমরা সমসাময়িক বাস্তবতাকে নিরীক্ষার মাধ্যমে তুলে ধরার অন্যরকম প্রয়াস পর্যবেক্ষণ করি।

এ ছাড়াও এই দশকের সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ, তারেক শাহরিয়ার, অশোক কর, মাখরাজ খান, শামসুল কবির, প্রলয় দেব; সঞ্জীব চৌধুরী, দেবাশিস ভট্টাচার্য, ওয়াহিদ রেজা, মহিবুল আজিজ এঁদের মধ্যে গতানুগতিক বৃত্ত ভেঙ্গে গল্পকে নতুন স্থানে দাঁড় করানোর প্রবণতা বেশ লক্ষ্য করা যায়। প্রচলিত ফর্মে, গদ্য নিয়ে কোনরকম জটিলতার মধ্যে  না গিয়েই যাঁরা নিরলস গল্প রচনায় ব্যাপৃত আছেন তাঁরা হলেন ওয়াসি আহমেদ, ইমতিয়ার শামীম, ঝর্ণা রহমান, মনীশ রায়, মোস্তফা হুসাইন, হামিদ কায়সার, হুমায়ূন মালিক। এই গ্রন্থের আরও একজন গল্পকার নাসরীন জাহান, যেহেতু তিনি নিজেই গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন, সেহেতু তার গল্পের বিচারের ভার পাঠকের ওপর রইলো। যদিও এই দশকের লেখকদের প্রধান প্রবণতা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রচলিত বোধ, চিন্তাকে অতিক্রম করে যাওয়া। তথাপি যাঁরা সেই পথে ধাবিত হন নি তাঁরা সরলভাবে জীবনের অন্ধকার দিকগুলোর প্রতি আলোকপাত করেছেন। শিল্পের প্রতি এঁরাও বেশ সৎ। কেউ কেউ আবার অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি গল্প লিখে থেমে গেছেন। এই গ্রন্থে তাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরাবাস্তবতার অপ্রচলিত ফর্মকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করার প্রয়াস আশির দশকের অনেক গল্পকারের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক কিংবা মনঃসংকটকে রূপকাশ্রিত ফর্মে তুলে আনার এঁরা অধিক পক্ষপাতি। এই সাহিত্যের পথ কখনই ব্যাপক পাঠকের নয়। তবে এঁরা এর চর্চা আরও বৃদ্ধি করলে এই কালের সার্বিক সফলতা সম্পর্কে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া যেতো।

[পুনর্মুদ্রিত ও সংক্ষেপিত : ভূমিকাংশ, বাংলাদেশের গল্প : আশির দশক, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৩]

————————————–

সুশান্ত মজুমদার
সত্তর দশকের গল্প : উত্তরাধিকার ও পরিপ্রেক্ষিত

বাংলা একাডেমির উদ্যোগে প্রকাশিত হলো ‘বাংলাদেশের গল্প : সত্তর দশক’ গ্রন্থটি। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকে একদশকের মধ্যে যে সব উল্লেখযোগ্য গল্প লেখকের উত্থান, গ্রন্থটি তাঁদের গল্পের সংকলন। লেখকদের জন্ম স্বাধীনতা-পূর্বে হলেও সক্রিয় সাহিত্যচর্চা সত্তরের দশক থেকে। যুবক চোখ দিয়ে দেশ-সমাজ ও মানুষকে লেখকরা অবলোকন করেছেন এবং স্ব স্ব অভিজ্ঞতার নির্যাস দিয়ে গল্প রচনা করেছেন। সত্তরের গল্পকারদের দৃষ্টিভঙ্গি, মনোযোগ, গল্পের বিষয়, সামগ্রিকভাবে সত্তরের গল্পের শিল্পমূল্য যাচাই করার ব্যাপারে গ্রন্থটি সজ্ঞান পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে আশা করা যায়। গল্পগুলি অবশ্য উল্লিখিত দশকের লেখা নয়। সৃষ্টির শুরুতে পরিণত গল্প লিখে সিদ্ধি ও স্বীকৃতির স্তরে পৌঁছে যাওয়া লেখক সত্তরের দশকে শুধু নয়, স্বাধীনতার পূর্বাপর কোনো দশকেই নেই। পৃথিবীর সব ভাষার সব সাহিত্যে তা বিরল। লেখার শৈশবে সবাই ছিলেন কমবেশি অপরিণত। এটাই স্বাভাবিক—মানুষ ক্রমশ বেড়ে ওঠে এবং নিরলসচর্চার মধ্য দিয়ে পরিণতির দিকে যায়। অগ্রজের মতো সত্তরের অনুজ লেখকেরও প্রথমদিকের গল্প ছিল দুর্বল। আজ লেখক-জীবনের সূচনা পর্বের গল্প পড়ে অনেকেই বিব্রত হন। ওই গল্প-সংকলিত হওয়ার ব্যাপারে তাঁদের সম্মত হওয়ার কথা না। গ্রন্থে তাই লেখকের প্রতিনিধিত্বমূলক গল্পটি মুদ্রিত হয়েছে। বিবেচনা করে কোনো কোনো লেখকের সম্প্রতি লেখা গল্প গ্রন্থের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। সত্তরের দশকে বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকরাও সাহিত্য রচনায় সক্রিয় ছিলেন। অগ্রজদের কেউ কেউ তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্প এই দশকে এসে লিখেছেন। কিন্তু সাহিত্যে তাঁদের আগমন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে হওয়ায় অগ্রজদের গল্প সংকলনভুক্ত হয় নি। ইতোমধ্যে সত্তর-দশকের কোনো কোনো লেখক লেখায় নিস্ক্রিয় হয়ে গেছেন। জীবিতাবস্থায় তাঁরা আর লিখবেন না—এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। লেখক-জীবনে লেখায় সাময়িক বা দীর্ঘ বিরতি আসতে পারে। নতুন সাহিত্যাদর্শ—বিষয় ও আঙ্গিক ভাবনায় ভাবিত হয়ে নিজের সঙ্গে লেখক বোঝাপড়া করে নিতে পারেন। বর্তমানে না লিখলেও একসময় তাঁরা তরুণ গল্পকার হিসেবে যথেষ্ট সম্ভাবনার পরিচয় রেখে পাঠক মনোযোগ দখল করতে পেরেছেন। অনিবার্যভাবে তাঁর গল্পও এই সংকলনে জায়গা করে নিয়েছে।

এখন, দশক-ওয়ারী বিভাজন স্বীকার করে নিয়ে সত্তরের দশকের গল্প আলোচনা করতে হলে আগের দশকসমূহ সেই বিভাগোত্তর কালের গল্পচর্চার দিকে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। অগ্রজদের সাহিত্যের ধারাবাহিকতা এবং অনুজ গল্পকারদের গ্রহণ-বর্জনের ভেতর দিয়ে যে গল্প নির্মাণের প্রয়াস তা সনাক্ত করা দরকার। সত্তরের গল্প সাহিত্যকে তাই নির্দিষ্ট করতে হলে পূর্বের গল্পসাহিত্যকে সামনে রাখা জরুরী। কি উত্তরাধিকার সত্তরের গল্পকাররা প্রাপ্ত হয়েছেন, আর কি বিষয়-সম্পদ গল্পসাহিত্যে তাঁরা বৃদ্ধি করেছেন?

আমাদের গল্পসাহিত্যের পুরনো পৃষ্ঠা উল্টালে দেখি, সামগ্রিকভাবে বিষয়ে, আঙ্গিকে, গদ্যে মূল্যবান ছোটগল্প তেমন লিখিত হয় নি। সরাসরি এ-কথা বললে বিভাগোত্তর লেখকদের প্রতি সুবিচার করা হয় না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তখন খ-িত দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রাক্তন ধ্যান-ধারণার পোষকতা করা হয়েছে। সমাজের ক্রমাগ্রগতি ও মুক্তবিশ্বাস পালনের মতো অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ তখন ছিল না। কিন্তু শ্বাসরুদ্ধ কঠিন বিরুদ্ধ পরিবেশ ও পরিস্থিতির মধ্যেও লেখক সজাগ দায়িত্ব থেকে সরে আসেন না। আমাদের বিভাগোত্তর লেখকরা তৎকালীন তমুদ্দুনী কলরব ও জঙ্গীজোশ কড়া হাতে মোকাবেলা করতে পারেন নি। তবু সাধ্য অনুযায়ী ছোটগল্প লেখার চেষ্টা করেছেন আবুল ফজল, আবু রুশদ, সরদার জয়েনউদ্্দীন, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, শওকত ওসমান, আবু ইসহাক প্রমুখ। এঁরা মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে ছোটগল্পচর্চায় উদ্যোগী ছিলেন। দেশের বিরাজমান পরিপ্রেক্ষিত তখন ছিল শোচনীয়। তৎকালীন কথাসাহিত্যেকরা তাঁদের সামনে পেয়েছেন বিশ্বযুদ্ধোত্তর সংকট, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দেশভাগের মতো নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অন্যায্য ঘটনাসমূহ। এমন প্রতিকূল সামাজিক দুরবস্থার ভেতর একজন সৃজনশীল লেখককে মনোযোগ দিতে হয়েছে রাষ্ট্রীয় ঘটনাসমূহ, সামাজিক অব্যবস্থার প্রতি এবং একই সঙ্গে তাঁর শিল্পের উপর। এই টানাপোড়েনের মধ্যেও আবুল ফজল, শওকত ওসমান ছোটগল্পে অসাম্প্রদায়িক মানবিকতা, গ্রাম-জীবনের অসাম্য অসঙ্গতি মূর্ত করে তোলেন। আরেকদিকে কেউ কেউ বিভ্রান্ত হয়ে আধুনিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য নির্ণীত হওয়ার পরও বিভাগোত্তর কথাসাহিত্যকে আধুনিক করে গড়ে তুলতে ছিলেন নারাজ। তাঁদের সাহিত্যও দেশভাগের ভেদ বুদ্ধি ফেলে বিবেচনা করার কারণে ক্ষুণœ হয় বাংলা কথাসাহিত্যের ধারাবাহিকতা। তাঁরা খারিজ করে দেন কথাসাহিত্যের উত্তরাধিকার। (প্রকৃতপক্ষে, ইতিহাসের জ্বলন্ত প্রেক্ষাপট—দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভূমি-উৎখাত শরণার্থীদের বিদেশ-বিজন-বিভূঁইয়ে মানবেতর জীবন-যাপন মিলিয়ে সমাজ ও মানুষের অসহায় করুণ গাথা আমাদের সামনের সারির অগ্রজ গল্পকাররা ছোটগল্পে নিয়ে আসতে পারেন নি। গ্রামীণ পটভূমির দুর্নীতি, অসাম্য এবং ছিন্নমূল মানুষের যা কিছু দুঃখ ছোটগল্পে এসেছে তা এতোই কুয়াশাচ্ছন্ন যা সরিয়ে পাঠক সত্যের মুখোমুখি হতে পারেন না। ব্যতিক্রম সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্—বিষয় উপস্থাপনায়, গল্পভাষায় তিনিই আমাদের গল্পসাহিত্যকে আধুনিকতার মর্যাদা দান করেন।) তিনি উপন্যাস এবং গল্প দুই-ই পাঠযোগ্য এবং আয়ুষ্মান করে তোলেন। আমাদের আধুনিক ছোটগল্প তাঁকে দিয়ে শুরু। আজো আমাদের কথাসাহিত্যে তিনি শক্তিমান লেখক হিসেবে মর্যাদাবান।

পঞ্চাশ দশকের গল্পেও চল্লিশ দশকের ধারা প্রবহমান ছিল। চল্লিশ দশকের গল্প বৈশিষ্ট্যের দ্বারা প্রধানত শাসিত হয়েছে পরবর্তী দশকের গল্প। এই সময়ে প্রচল প্রবাহ থেকে বেরিয়ে মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক এবং প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনার আলোকে কথাসাহিত্য চর্চায় মনোযোগী ছিলেন তাঁদের মধ্যে আলাউদ্দিন আল আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, রশীদ করীম, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল গাফফার চৌধুরী, রাজিয়া খান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শওকত আলী, শহীদ সাবের, জহির রায়হান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ অন্যতম। এদের অনেকে প্রত্যক্ষ করেন ৫২-র ভাষা আন্দোলন। অনেকে সক্রিয়ভাবে ছিলেন ভাষা-আন্দোলনের এবং পরবর্তী সময়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী। এই ভূখ-ের জনগোষ্ঠীর স্বরূপ সন্ধানের প্রথম এবং যাত্রারম্ভের মাইলফলক—ভাষা আন্দোলন। ৫২-র ভাষা-আন্দোলন তছনছ করে ফেলে সামাজিক জড়তা, চূর্ণ করে মানবিক স্থবিরতা ও দাসত্ব এবং ভেঙ্গে দেয় বাঙালির  উৎসমুখের সমূহ জটিলতা। নতুন বোধ, উৎসাহ এবং চিন্তার আলো পতিত হয় লেখকের মনোভূমিতে এবং তাঁর শিল্পের হৃদপি-ে। আলাউদ্দিন আল আজাদের গল্পের বিষয় সমাজের শ্রেণীদ্বন্দ¦ এবং নিপীড়িত মানুষ। কিন্তু তাঁর লেখার শ্রেণীদ্বন্দ্ব ছিল রোমান্টিসিজম দ্বারা আচ্ছন্ন। পরে মনোবাস্তবতার রূপকার হতে গিয়ে তিনি, নিজের সাহিত্যকে আহত করে ফেলেন। হাসান হাফিজুর রহমানের প্রধান পরিচয় কবি হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী গল্প রচনার কারণে তিনি আমাদের গল্প সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিসজ্ঞাত মানবিক মূল্যবোধ তাঁর গল্পে সংশ্লিষ্ট। সৈয়দ শামসুল হক ও শওকত আলী পঞ্চাশ দশকের লেখক হলেও তাঁরা বিকশিত হয়েছেন মূলত ষাটের দশকে। এদের গল্পের ভেতর দিয়ে ব্যক্তির প্রতিষ্ঠা হয়। ব্যক্তির আমোদ, উল্লাস, প্রাণ শুধু নয়, ব্যক্তির পতন ও মুমূর্ষু জীবনবেদও এদের গল্পে প্রতিফলিত হয়। জহির রায়হান ছোট ছোট বাক্যে কাব্যধর্মী গদ্যে কথাসাহিত্য চর্চা করেছেন। হালকাভাবে হলেও রাজনীতি প্রবেশ করেছে তাঁর গল্পে। সাইয়িদ আতীকুল্লাহ পরাবাস্তবতা গল্পধারায় অগ্রবর্তী লেখক। ষাটের দশকে গল্পের পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে মানুষের অন্তর্জগত, মনোরাজ্যের আলোড়ন, আত্মকথন মিলিয়ে গল্পচর্চায় পরাবাস্তবতা ব্যাপারটা অস্পষ্টভাবে প্রথমে দেখা দেয় জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হুমায়ুন চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং পরে আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখায়। আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রথমদিকের লেখা ছিল পুরোপুরি রোমান্টিক।

ষাটের দশকে বাংলাদেশের গল্প পৌঁছে যায় সম্মানজনক স্তরে। ভাষা-আন্দোলনের প্রভাবে সমাজের উপর কাঠামোতে আসে এক ব্যাপক আলোড়ন। রাজনীতিতে ক্রমশ সচেতন হয়ে ওঠে বাঙালি। অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে উত্থাপিত হতে থাকে বিভিন্ন দাবী। এই দাবীতে সংগঠিত এবং সোচ্চার হয়ে ওঠে মানুষ। একদিকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারা আরেক দিকে সমাজ পরিবর্তনে সশস্ত্র সংগ্রাম ভেঙ্গে দেয় মানুষের মানসিক জাড্য। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ষাটদশকের লেখকরা সমাজবাস্তবতা, তার শরিক মানুষ, তাঁদের জীবন-যাপন এবং রাষ্ট্রীয় আলোড়নসমূহ ছোটগল্পের বিষয় করে তোলেন। ক্ষুধার আগুনে দগ্ধ গ্রাম ও অস্বাভাবিক বিকাশশীল লুটেরা শহরের যাবতীয় পচন, মাটি ও ইট-কাঠের নিচে চাপা পড়া মানুষের আহাজারি ধারণ করে জীবন্ত হয়ে ওঠে ছোটগল্প। জমে যাওয়া নতুন কথার কারণে নতুন আঙ্গিক গ্রহণ করেন এ সময়ের লেখকরা। পঞ্চাশ দশকের লেখক সৈয়দ শামসুল হক, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শওকত আলী এসে মেশেন ষাটের ধারায়। এই দশকের উল্লেখযোগ্য লেখক : হাসান আজিজুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রশীদ হায়দার, সেলিনা হোসেন, কায়েস আহমেদ, বিপ্রদাশ বড়–য়া প্রমুখ। এদের সম্মিলিত প্রয়াস, সমাজসজ্ঞানতা, শিল্পবোধ এবং আধুনিক সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে উপলব্ধি ছোটগল্পের ভাঁড়ারে জমা করে উজ্জল শস্য। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন সাহিত্যাদর্শের তরঙ্গ এসে পৌঁছায় আমাদের সাহিত্যে। এর প্রভাবে নতুন সময়ের নতুন সাহিত্য নতুন আঙ্গিক ও ভাষাভঙ্গি সহযোগে গল্প লেখেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ—এমনকি হায়াৎ মামুদও। কিন্তু টালমাটাল রাজনৈতিক প্রবাহ বুদ্ধি ও পুস্তকপাঠে আহৃত সাহিত্যাদর্শকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা নামের পরাবাস্তবতাধর্মী গল্পের ধারা পরবর্তীকালের লেখকদের আদৌ প্রভাবিত করতে পারে নি। নতুন গল্পধারা থেকে একমাত্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সরে এসে নিজেকে সচল এবং বিকশিত করতে পেরেছেন। অন্যদের গল্প নিরীক্ষা ফলপ্রসূ হতে পারে নি।

ষাটের গল্পবৈশিষ্ট্য, আঙ্গিক বা লিপিকৌশল, গদ্যভঙ্গী, লেখক-চিন্তা এমনকি পরিপ্রেক্ষিত অবলোকনের সঙ্গে সত্তরের গল্প লেখকদের সাযুজ্য অধিক। ষাটের লেখকদের মতো সত্তরের দশকের গল্পকাররাও মুক্তচিন্তার অধিকারী এবং সমাজসচেতন। এঁরা যে শ্রেণী ও অবস্থানের মানুষ তা তাঁরা তীব্র মনোযোগের সঙ্গে গল্পে তুলে এনেছেন। সমাজের ভাঙ্গন-নির্মাণ, ক্ষয় ও বিকাশ, ম্লানিমা ও বিক্ষোভ, ঘুম ও আলোড়নের বিষয়কে সত্তরের গল্পকাররা গল্পের বিষয় করেছেন। যে দ্বিধা, পিছুটান, অনাগ্রহ, ভয় বিভাগোত্তর লেখকদের ছিল দুই দশক পর ষাটের দশকের লেখকরা তা খারিজ করে দেন। ষাটের নির্মিত এই গল্পের জমিনের উপর দাঁড়িয়ে সত্তরের লেখকরা গল্পের ফসল আরো সজীব করে তোলেন। কুসংস্কার ও অন্ধধর্মানুভূতির প্রতি অকারণ আনুগত্য সত্তরের লেখকদের নেই। আগের দশকের লেখকদের থেকে এই দশকের লেখকরা আধিক সাহসী এবং সচেতন। শাসকদল ও তাদের গৃহীত ব্যবস্থা গল্পে সমালোচনা করতে সত্তরের লেখকরা কার্পণ্য করেন নি। সমাজ ও জীবনের বিষয় সত্তরের গল্পে বহুলাংশে প্রত্যক্ষ, সরাসরি, লক্ষ্যের প্রতি নিক্ষিপ্ত। প্রেরণা ও অভিজ্ঞতা হিসেবে সত্তরের লেখকরা পেয়েছেন এই দশকে সংঘটিত ঘটনাবলী। বাংলাদেশের জন্ম—স্বাধীন সার্বভৌম নিজ দেশের জন্য জল-স্থল-অন্তরীক্ষে সর্বাত্মক মরণপণ যুদ্ধ এবং মানুষের মৃত্যু লেখকদের অভিজ্ঞতায় এনে দিয়েছে গুণগত পরিবর্তন। আবার স্বাধীনতা-পরবর্তী মানুষের আশাভঙ্গ শাসকদলের ব্যর্থতা, দুর্ভিক্ষ, সামরিক অভ্যুত্থান, সামাজিক মেরুকরণ পাল্টে দেয় লেখকচৈতন্য। মানুষের বেহিসেবী চরিত্র ও স্খলনে জন্ম নেওয়া সুবিধাভোগী শ্রেণীর হাতে ক্রমাগত লুণ্ঠিত হয়েছে, আজো হচ্ছে জীবন রসদ। সমাজের একজন সংবেদনশীল সৃজনশীল মানুষ হয়ে লেখককে তাই শরিক হতে হয়েছে প্রতিটি ঘটনার। এর উৎসারণ লক্ষ্য করা যায় সত্তর দশকের গল্পে। আবার মেধা-মনন-রুচির দারুণ ক্ষয় হয়েছে সত্তরের দশকে। এরও প্রভাব পড়েছে সত্তরের গল্পে। রুদ্ধ হতে হতে ব্যক্তি হয়ে পড়ে ক্ষতাক্ত, ক্লেদপূর্ণ। এর কারণ এবং পরিণতি না বোঝার কারণে অনেক স্থ’ুল, জলো, অসার কাহিনী গল্পের মোড়ক পরিয়ে পরিবেশন করেছেন সত্তর দশকের লেখকরা। এর আগে কোনো দশকে এতো সস্তা, চটুল, মধ্যবিত্তের সাধারণ কেচ্ছা লিখিত হয়নি। জনপ্রিয়তার টানে লেখার উপযোগিতা, লেখকের দায়িত্ব কোনো কোনো লেখকের কারণে উপেক্ষিত হয়েছে। শাস্ত্রবদ্ধ বুদ্ধি দিয়ে লেখা সমাজ বাস্তবতার গল্প হয়েছে কেবল লেখকের ইচ্ছাপূরণের কাহিনী। পাঠক মনে তাপ ছড়িয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে এসব গল্প—নির্দিষ্ট কোনো আলো পৌঁছে দিতে পারে নি। সমাজে শ্রেণী আছে, শ্রেণীদ্বন্দ্ব আছে কিন্তু তা উল্লম্ফনের মাধ্যমে সংঘাতে নিয়ে এবং কাহিনীতে শোষিতের জয় দেখিয়ে লেখকরা বাহবা পেয়েছেন বটে, কিন্তু গল্পের জন্য লেখক শিল্পশর্ত পূরণ করতে পারেন নি।

সত্তর দশকের প্রায় সব লেখক মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প লিখেছেন। যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতার চাপ লেখকদের দিয়ে গল্প লিখিয়ে নিয়েছে। তবু সত্তর দশকের কোনো গল্পকারের হাতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শিল্পসফল গল্প লিখিত হয় নি। এই গ্রন্থের পাঠক মনোযোগ দিলে বুঝবেন, সত্তরের লেখকদের এই গল্প সংকলনে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ঘটনা নিয়ে একটিও গল্প নেই। অথচ মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে যে দশকে সেই দশকের লেখদের গল্প নিয়ে এই সংকলন। মুক্তিযুদ্ধের গল্প বাদ রেখে সত্তর দশকের গল্প সংকলন প্রকাশ নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন। দুর্বল গল্প স্থান দেওয়ার চেয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প রচনায় সত্তর দশকের লেখকদের দুর্বলতা প্রকাশ ও স্বীকার করা ন্যায়সঙ্গত। এই সংকলনে আহমদ বশীরের ‘প্রতিপক্ষের পক্ষে’ এবং মঈনুল আহসান সাবেরের ‘ভুল বিকাশ’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আছে। কিন্তু গল্পের মূল বিষয় যুদ্ধোত্তর নৈরাজ্য।

তবু সত্তর দশকের গল্প বিকাশের পেছনে ক্রিয়া করেছে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে এই ভূখ-ের মানুষের ক্রম-মুক্তি এবং অগ্রগতি ছিল অসম্ভব। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রয়োজনে নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল অনিবার্য এবং তা অর্জন করেছে এই জাতি। স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন বিপর্যয়, শাসকগোষ্ঠীর ব্যর্থতা, সামাজিক অস্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অক্ষমতা, উপর্যুপরি সামরিক শাসন তছনছ করে দিয়েছে সমাজকাঠামো এবং মানুষের প্রত্যাশা। তাসত্ত্বেও ঘুরছে সমাজের চাকা। মৌলিক কাঠামোতে কোনো গুণগত পরিবর্তন না এলেও উপর কাঠামোতে এসেছে বিবিধ রদবদল ও সংঘটিত হয়েছে নির্মাণ। তারই সংবাদ, চিত্র নির্যাস পাওয়া যায় সত্তর দশকের গল্পে।

এখন প্রশ্ন, গ্রন্থভুক্ত বাইশ জনই কি সত্তরের দশকের উল্লেখযোগ্য গল্পকার! কোন মানদ-ে বাইশ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে? প্রথমে বলে নেওয়া ভালো—কোনো সংকলনই প্রশ্নমুক্ত নয়। সর্বসম্মত সংকলন প্রকাশ করতে হলে তা আর সুনির্বাচিত থাকে না। কলেবরের কথা তো রয়েছে। তা ছাড়া যে বা যাঁরা সংকলন সম্পাদনার দায়িত্বে থাকেন তাঁর বা তাঁদের চিন্তা ও মনোনয়ন লেখা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। সম্পাদকের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সব লেখক ও পাঠকের ঐক্য হওয়া সম্ভব নয়। সত্তর দশকের সমুদয় বৈশিষ্ট্য এবং গতিপ্রকৃতির পরিচয় পাঠক সমীপে দাখিল করা যেতে পারে—এমন লক্ষ্য থেকে বাছাই করে বাইশ জনের গল্পগ্রন্থে নেওয়া হয়েছে। লেখকদের যে গল্প অন্য কোনো সংকলনে মুদ্রিত হয়েছে সেটি এই সংকলনে স্থান পায় নি। সত্তর দশকের কেনো কোনো কবিও ছোটগল্প গ্রন্থে লিখেছেন। সাহিত্যচর্চায় তাঁদের প্রধান পরিচয় কবি। এই-কারণে কবিদের লেখা ছোটগল্প গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

সত্তর দশকের গল্পকার সবাই সমসাময়িক লেখক। আগে-পরের লেখক নির্ণয় করা দুঃসাধ্য কাজ। একের সঙ্গে অন্যেও বয়সে সামান্য পার্থক্য থাকলেও একজনের পাশ থেকে উঠে এসেছেন আরেকজন। বুলবুল চৌধুরী, হুমায়ুন আহমেদ, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়, শাহরিয়ার কবির, তাপস মজুমদার, আফসান চৌধুরী, বারেক আব্দুল্লাহ একই সময়ের লেখক। জাফর তালুকদার, মুস্তাফা পান্না, আতা সরকার, মঞ্জু সরকার এক সময়ের লেখক। এদের কাছাকাছি সময়ে গল্প লিখতে শুরু করেন হরিপদ দত্ত, আবু সাঈদ জুবেরী, সৈয়দ ইকবাল, আহমদ বশীর, ইমদাদুল হক মিলন। এরপরই সুশান্ত মজুমদার, সৈয়দ কামরুল হাসান, মঈনুল আহসান সাবের, সারোয়ার কবীর, ইসহাক খান। নকিব ফিরোজ সত্তর দশকের অনুজ গল্পকার। বয়সের তারতম্য হলেও সক্রিয় সাহিত্যচর্চায় সত্তরের লেককদের আগ-পিছ আছে। সম্পূর্ণ সঠিকভাবে কে কখন, কে কার আগে গল্প লিখতে শুরু করেছেন— এটা নির্দিষ্ট করতে হলে আমাদের আরো দিন অপেক্ষা করতে হবে। দেখা যায়, কনিষ্ঠ লেখক শক্তিমান হলে জ্যেষ্ঠ লেখককে সরিয়ে সামনে চলে যান। তাই সহজ সুবিধা বিবেচনা করে গ্রন্থটির সূচীপত্র লেখকদের নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী ধার্য করা হয়েছে।

গ্রন্থের গল্পগুলি সম্পাদকের নির্বাচিত। গল্পকাররা তাঁদের গল্প সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে সহযোগিতা করেছেন। গ্রন্থের সম্পাদনার দায়িত্ব বাংলা একাডেমীর পক্ষে উপপরিচালক কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন আমার মতো একজন তরুণকে দেওয়ায় তাঁকে ধন্যবাদ। পা-ুলিপি প্রণয়নে পরামর্শ ও মতামত দিয়েছেন দুই অগ্রজ কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান ও শওকত আলী। প্রত্যাশিত একটি গল্প সংগ্রহ করে দিয়েছেন কথাসাহিত্যক কায়েস আহমেদ। গল্পগুলির ফটোকপি করে দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সম্পাদক ও কবি আনওয়ার আহমদ। সত্তরের যে সব লেখকের আজো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি তাঁদের মুদ্রিত গল্প ‘গণসাহিত্য’ ‘রূপম’ ‘বিনিময়’ ‘বিপক্ষে’ সাহিত্য পত্রিকা থেকে নেওয়া হয়েছে।

[পুনর্মুদ্রিত : বাংলাদেশের গল্প : সত্তরের দশক (সুশান্ত মজুমদার সম্পা.), বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯২]

————————————-

আবুজাফর শামসুদ্দীন
আমাদের গল্প সাহিত্য

বাঙ্গালী লেখক ছোটগল্প রচনার প্রেরণা পায় ইয়োরোপ থেকে। তার পূর্বে এ দেশে যে সমস্ত কাহিনী প্রচলিত ছিল সেগুলো প্রায় সবই রূপকথা এবং উপন্যাসধর্মী— ক্যানটারবারী টেলসের বাস্তব জীবন তার মধ্যে নেই। লক্ষণীয় যে ক্যানটারবারী টেলসের প্রত্যেকটি রচনাই গল্প, উপন্যাস-ধর্মীতা বিরল। এ দেশীয় পুরনো গল্পের মধ্যে সম্ভবতঃ একমাত্র গোপাল ভাঁড়েই গল্প পাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলোর স্থ’ূলতা চসারের ক্যানটারবারী টেলসের স্থ’ূলতার চাইতেও পীড়াদায়ক, শৈল্পিক রুচির অভাবে সেগুলো বিদগ্ধ সমাজে অপাংক্তেয়। বাংলা সাহিত্যের গল্প শাখায় মুসলমানের আবির্ভাব আরো হালের। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার ন্যায় এ শাখায়ও সর্বপ্রথম সার্থক রচনা কাজী নজরুল ইসলামের। নজরুল ইসলামের সাহিত্য জীবনের সূত্রপাত এই শতাব্দীর বিশে, অর্থাৎ গল্প সাহিত্যে আমাদের সার্থক প্রচেষ্টা আরম্ভ হয় এখন থেকে মাত্র চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বৎসর পূর্বে। এর অধিক বা অর্ধেকের চাইতেও কিছু বেশী সময় কেটেছে বিভাগ পূর্বকালীন কলকাতায় কিন্তু তাই বলে তাকে কলকাতা কেন্দ্রিক বা কলকাতাধর্মী বলা যায় না। কেননা তৎকালীন মুসলিম লেখকের গল্পের উপকরণ পল্লীর মুসলিম সমাজ। তৎকালীন পরিবেশে রচিত গল্পের সংখ্যাবাচক পরিমাণ খুব বেশী নয়। মুষ্টিমেয় লোক— তন্মাধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম ব্যতিরেকে— আবুল মনসুর আহমদ, নসরু অর্থাৎ এস. এন. কিউ. জুলফিকার আলী, মাহবুবুল আলম, আবুল ফজল, নাজিরুল ইসলাম আবু সুফিয়ান, মোহাম্মদ নাসির আলী বি. কম, একরামুদ্দীন, ইব্রাহিম খান, আকবর উদ্দীন, খালেকদাদ চৌধুরী, আশরাফুজ্জামান খান, মোহাম্মদ মোদাব্বের, মুবিনউদ্দীন আহমদ, মতিন উদ্দীন আহমদ, গোলাম কাসেম, মরহুম মোহাম্মদ কাসেম, জাহেদুল হুসাইন, শোয়েব আহমদ, আকরাম হোসেন, হাবিবুল্লাহ বাহার, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আবু রুশদ মতিনউদ্দীন, সিকানদার আবু জাফর প্রমুখ গল্প লিখতেন। আমার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে। আরো দু’চার ব্যক্তি হয়ত কালেভদ্রে গল্প লিখতেন— সকলের নাম স্মরণ করতে পারছি না। উল্লিখিতদের মধ্যে মোহাম্মদ মোদাব্বের এবং মোহাম্মদ নাসির আলী বি. কম. পরে শিশু সাহিত্যিক রূপে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

তখন মুসলিম গল্প লেখকের রচনা প্রকাশের মাধ্যম ছিল মাত্র তিন চারটি পত্রিকা— সওগাত, মাসিক মোহাম্মদী, ত্রৈমাসিক— পরে মাসিক বুলবুল এবং কিছু দিনের জন্যে সাপ্তাহিক সওগাত। অল্পায়ু জয়তী, ছায়াবীথি, নওরোজ এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত অভিযানেও কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য গল্প প্রকাশিত হয় কিন্তু লেখকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় নি। ১৯৪০ সালের পূর্বে কাজী নজরুল ইসলামের ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, আবুল মনসুর আহমেদের এবং জুলফিকার আলীর মণিদীপ ছাড়া অন্য কোনো মুসলিম লেখকের গল্প গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে বলে মনে হয় না। মণিদীপের সব রচনা গল্প নয়— কিছু রচনা বেলেলেটার জাতীয়। যাই হোক ‘নসরুর’ এ গ্রন্থটি সে-যুগে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল সমালোচকের উচ্চ-প্রশংসা লাভ করেছিল। রচনা বিভাগ পূর্বকালীন হলেও অধিকাংশ গল্পগ্রন্থ বিভাগোত্তর কালে অথবা বিভাগের অব্যবহিত পূর্বে প্রকাশিত। মুসলমান গল্প লেখকের রচনা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতো এবং পত্র-পত্রিকায়ই লুপ্ত হতো। বিভাগ পূর্বকালের শেষের দিকে বিভাগের অব্যবহিত পূর্বে আরো যারা গল্প রচনায় অবতীর্ণ হন তাঁদের মধ্যে সরদার জয়েনউদ্দীন, আবদুল গনী হাজারী, আলাউদ্দীন আল আজাদ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, ওবায়দুল হক, হামেদ আহমেদ প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সুতরাং নিঃসংশয়ে বলা যায় সংখ্যার দিক থেকে আমাদের গল্প সাহিত্য তেমন কিছু ভারী ছিল না— প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ মিলে যা লিখেছিলেন আমাদের সকলের তৎকালীন অবদান সংখ্যায় তার সমপরিমাণ ছিল কিনা সন্দেহ। উল্লেখযোগ্য যে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র প্রথম সার্থক ছোটগল্প ‘একটি তুলসি গাছের কাহিনী’ প্রকাশিত হয় দেশ বিভাগের পর মোহাম্মদ নাসির আলী এবং আমার যুগ্ম সম্পাদনায় সম্পাদিত ‘নয়া সড়ক’ নামক বার্ষিকে। তবু তৎকালীন মুসলিম লেখকদের গল্পের গুণগত উৎকর্ষ স্বীকার করতেই হবে। রোমান্টিক আমেজে পূর্ণ হলেও নজরুল ইসলামের ‘পদ্মগোখরো’, ‘জীনের বাদশা’ প্রভৃতি গল্প বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। তাঁর প্রায় গল্পই রসোত্তীর্ণ প্রথম শ্রেণীর রচনা এবং আবুল মনসুর আহমদের প্রত্যেকটি গল্পে সুতীক্ষè সমাজ-সচেতনতার প্রমাণ পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য যে, সেকালের মুসলিম গল্প লেখকদের মধ্যে যাঁরা খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে একমাত্র কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠ গল্প লেখক রসঘন প্রেমের গল্প রচনা করেন নি। গোলাম কাসেম যিনি থ্রিলার লিখতেন— তাঁকে বাদ দিলে অন্য প্রায় সকলের গল্পই সমাজ চেতনা-মূলক। সুতরাং বিনা দ্বিধায় বলা যায় বিভাগ পূর্বকালীন মুসলিম লেখকদের গল্পের সংখ্যা যা-ই হোক গুণগত দিক থেকে আদৌ উপেক্ষণীয় ছিল না।

সমাজ চেতনারও দুটি দিক বিদ্যমান। বিভাগ পূর্বকালীন অধিকাংশ প্রথম শ্রেণীর মুসলিম গল্প লেখকের রচনার সমাজ-চেতনা সংস্কারধর্মী। আবুল মনসুর আহমদের আয়নার প্রত্যেকটি গল্প শ্লেষাত্মক— একমাত্র ‘আদু-ভাই’ ব্যতিক্রম। এ গল্পটি মানব মনের কোমল অন্তরিন্দ্রিয়ে একটি বর্ণনাতীত আবেদন সৃষ্টি করে। শৈল্পিক কুশলতা এবং সার্বজনীন আবেদনে একটি প্রথম শ্রেণীর গল্প— যে কোন সাহিত্যের গর্বের বস্তু। শ্লেষবিদ্রুপাত্মক সংস্কারধর্মী গল্প কুসংস্কার ও গোড়ামী বিদূরণের সহায়ক হলেও বোধগম্য কারণেই তার আবেদন সীমিত। উল্লেখযোগ্য যে, শরৎচন্দ্রও ছিলেন সংস্কারক লেখক— হিন্দুত্ব সম্পূর্ণ অব্যাহত রেখে তার গোড়ামী ও কুসংস্কার বিদূরণ ছিল তাঁর লক্ষ্য। ভাষা ও বর্ণনার মুন্সীয়ানায় তাঁর ছোট-বড় গল্প তৎকালীন সমাজ-মনে গভীর আবেদন সৃষ্টি করলেও, যুগান্তরে সেগুলো প্রায় মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। কিন্তু টলস্টয়ের, ‘ঐড়ি সঁপয ষধহফ ফড়বং ধ সধহ ৎবয়ঁরৎব’, গর্কির ছাব্বিশজন লোক এবং ‘একটি মেয়ে’, ‘মানুষের জন্ম’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘কাবুলিওয়ালা’র আবেদন জাতিধর্মাতীত সার্বজনীন। বিদ্রুপ ও শ্লেষাত্মক রচনাকে সার্থক ও আবেদনপূর্ণ করতে গেলে যে সহানুভূতিশীল মন ও পক্ষপাতহীন নির্বিকারত্ব প্রয়োজন তা অধিকাংশ মুসলিম গল্প লেখকদের রচনায় প্রায় অনুপস্থিত ছিল। নবাবির্ভূত তরুণ লেখকগণের মধ্যেও এ দোষ কম-বেশী বিদ্যমান— সহানুভূতির স্থানে লেখকদের উষ্মা ও বক্তৃতা অনেক সময় বিকৃতি রূপে প্রকাশ পায়। সুতরাং সাহিত্যকর্মরূপে তৎকালীন মুসলিম গল্প, পাঠকের সাড়া জাগালেও মানব মনের গভীরে প্রবেশ করে কতটুকু স্থায়ী আসন লাভ করেছে তা একটি বিচার্য বিষয়। বিকৃতি হচ্ছে ‘সাডিজমের’ পূর্ব লক্ষণ। সমাজ ধীরে-সুস্থে অগ্রসর হয় এমন কি বিপ্লব সাফল্যম-িত হওয়ার পরেও সমাজে বহু সংস্কার থেকে যায়— উদাহরণ স্বরূপ এ যুগের মার্কসীয় সাম্যবাদী রাষ্ট্রেও জাতীয়তা বোধের বিদ্যমানতা উল্লেখ্য। ইসলাম ধর্ম ভৌগোলিক জাতীয়তা স্বীকার করে না, তবু আজকের দুনিয়ায় ডজনখানেক স্বাধীন সার্বভৌম মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র বিদ্যমান— চৌদ্দ’শ বৎসরেও ভৌগলিক সংস্কার, সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণা বিসর্জন দেওয়া সম্ভব হয়নি। এরূপ ধীরে সুস্থে সঞ্চরণশীল বস্তুর গভীরে প্রবেশ করতে হলে সহানুভূতি ও সংবেদনশীল মন নিয়ে অগ্রসর হতে হয়।

রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র প্রমুখের শৈল্পিক দক্ষতা ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা দু’জন সমাজ সংস্কারক। তৎকালীন মুসলিম গল্প লেখকদের সাথে তাঁদের পার্থক্য এই শৈল্পিক কুশলতার। একারণেই রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র সংস্কারবাদী অর্থাৎ কিনা সংশোধনকামী হয়েও হিন্দু সমাজকে যতখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, মুসলিম গল্প লেখকগণ তা পারেন নি। এখানে স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, আমি কাব্যকে আলোচনা থেকে সযতেœ বাদ রাখছি। বলাই বাহুল্য নজরুল-কাব্য মুসলিম সমাজকে যথেষ্ট এগিয়ে নিয়ে গেছে। মুসলিম গল্প লেখকদের এই তুলনামূলক অসাফল্য বা অপারগতা অস্বাভাবিক নয়, কেননা মুসলমান আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করেছে হিন্দুর অর্ধ শতাব্দীকাল পরে। অবশ্য একই সঙ্গে গভীর আবেদনশীল এবং সংস্কারবাদী গল্প আদৌ লিখিত হয়নি। কাজী নজরুল ইসলামের কয়েকটি গল্প এবং মাহবুবুল আলমের ‘মোমেনের জবানবন্দি’তে যে সমস্ত বিচ্ছিন্ন গল্প পাওয়া যায় সেগুলোর উল্লেখ এ-প্রসঙ্গে করা যায়। সমাজ-চেতনার দ্বিতীয় ধাপ বৈপ্লবিক। সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন— অর্থাৎ প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উচ্ছেদ অন্তর্গূঢ় উদ্দেশ্যরূপে সম্মুখে রেখে সেকালে এবং ইদানীং যাঁরা গল্প লিখতেন এবং এখনও লিখছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে শওকত ওসমানের নাম উল্লেখ করা যায়। তাঁর ‘ফাদার যোহানেস’, ‘দুই  কানা’, ‘গেহু’, ‘নতুন জনম’ প্রভৃতি গল্প স্মরণীয়। ডক্টর হাইড এ- জেকাইলের অনুসরণে লিখিত কবি মহীউদ্দীনের ‘ডাক্তার মরেনো’ গল্পটিও স্মরণীয়। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লিখিত আমার ‘নেতা’ এবং অধুনা লিখিত ‘এক জোড়া প্যান্ট’, ‘মল্লবীর’, ‘রৈখিক’ প্রভৃতি গল্প, সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘বাতাসি’ এবং শাহেদ আলীর ‘জিব্রাইলের ডানা’ প্রভৃতি গল্পেরও উল্লেখ করা যেতে পারে।

অবশ্য সেকালের কিছু সংখ্যক লেখক শুধু গল্প বলার নেশায়ও গল্প লিখতেন— এখনও যে তেমন গল্প লেখা না হচ্ছে এমন নয়। পাঠক বা শ্রোতার কাছে নিছক গল্পেরও মূল্য আছে। সুতরাং সেগুলোও কালের প্রয়োজন মিটিয়েছে। বিভাগোত্তরকালের প্রথম দিকে জাতি গঠনমূলক অন্যান্য দিকের ন্যায় আমাদের সাহিত্য প্রচেষ্টাও নানারূপ জটিল বাধার সম্মুখীন হয়। গল্প প্রকাশের মাধ্যম প্রায় ছিল না। মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বহু পরে এখান থেকে পুনরায় প্রকাশিত হতে থাকে। নতুন দু’একটি মাসিক পত্রিকা শূন্যতা পূর্ণ করার চেষ্টা করেও অর্থাভাব এবং প্রয়োজনীয় মান রক্ষায় অসমর্থ হওয়াতে ব্যর্থকাম হয়। তবু ‘দিলরুবা’ এবং মরহুম কবি গোলাম মোস্তফার স্ত্রী মাহফুজা খাতুন সম্পাদিত ‘নওবাহার’ প্রভৃতির ভূমিকা নিতান্ত উপেক্ষণীয় নয়। বেশ কিছু সংখ্যক ভালো গল্প অধুনালুপ্ত বা অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত এ সমস্ত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। অবশেষে সরকারী পরিচালনাধীনে প্রকাশিত মাসিক ‘মাহেনও’ মাধ্যমের অভাব কতকটা পূরণ করতে চেষ্টা করে, কিন্তু বোধগম্য কারণেই পত্রিকাটিতে সব রকম গল্প প্রকাশিত হওয়া সম্ভব নয়। ‘সমকালের’ আবির্ভাব অনেক পরে। ইদানীং এই প্রথম শ্রেণীর মাসিকটি প্রথমে অনিয়মিত এবং পরে প্রায় ত্রৈমাসিকে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের কুড়ি বৎসর পরেও গল্প প্রকাশের মাধ্যম মাসিক পত্রিকার সংখ্যা বিশেষ বৃদ্ধি পায়নি। সবে ধন চারটি বাংলা দৈনিক, দ’ুটি সরকার পরিচালিত সাপ্তাহিক এবং একটি বেসরকারী সাপ্তাহিকে সপ্তাহে একটি করে ছোট গল্প প্রকাশিত হয় বটে, কিন্তু লেখকের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিমাণ অনুযায়ী এ-সুযোগ অতি সামান্য। প্রসংগত উল্লেখযোগ্য যে, ছোটগল্প মাসিক পত্রিকারই বস্তু— সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকা সাধারণতঃ সম্পূর্ণ গঠিত হওয়ার পূর্বেই জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়ে যায়। অপর দিকে গ্রন্থরূপে গল্পের সংকলন প্রকাশ করার মতো দুঃসাহসী স্বচ্ছল প্রকাশকও পাওয়া সহজ নয়।

এত সব অসুবিধা সত্ত্বেও বিগত কুড়ি বৎসর— বিশেষ করে তার শেষার্ধে আমাদের গল্প এবং গল্পের সংখ্যা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। শওকত ওসমান একাই নাকি এ পর্যন্ত প্রায় তিন’শ গল্প রচনা করেছেন। আমিও প্রায় এক’শ গল্পের লেখক— যদিও আমারা দু’জন বয়সী লেখকদের শ্রেণীভুক্ত। এ সময়ের মধ্যে বহু গল্প লেখক অবতীর্ণ হয়েছেন। বিভাগ পূর্ব কালের শেষের দিকে যারা সবে সাহিত্য রচনা আরম্ভ করেন তাদের মধ্যে অনেকে পরিপক্কতা ও খ্যাতি লাভ করেছেন। এদের মধ্যে বিশেষভাবে সরদার জয়েনউদ্দীন, আলাউদ্দীন আল আজাদ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, শাহেদ আলী, আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী প্রমুখের নাম করা যায়। সরদার জয়েনউদ্দীনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়ানঢুলী’ ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয়। ‘বীরকণ্ঠির বিয়ে’ এবং ‘খরস্রোত’ প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে, তাঁর শেষ গল্প গ্রন্থ ‘বেলা ব্যানার্জির প্রেম’ প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। দরিদ্র গ্রামীন সমাজ জীবনের নানা সমস্যা দর্পণের ন্যায় স্বচ্ছভাবে পাঠকের চোখের সামনে উপস্থিত করার দক্ষতা তার অনস্বীকার্য। প্রেমের গল্পরূপে তাঁর ‘ভাবী’ এবং দারিদ্র পীড়িত চাষীজীবনের আলেখ্যরূপে তাঁর ‘বাতাসি’ পূর্ববঙ্গীয় গল্প সাহিত্যের সম্পদরূপে দীর্ঘকাল স্বীকৃত থাকবে বলেই আমার ধারণা। আলাউদ্দীন আল আজাদের গল্পগ্রন্থাবলীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘জেগে আছি’, ‘ধান কন্যা’, ‘উজান তরঙ্গ’। তাঁর গল্পের মধ্যে ‘কয়লা কুড়ানোর দল’, ‘সৃষ্টি’, ‘রঙ্গিলা’, ‘শিষ ফোটার গান’, ‘সুরমা’ প্রভৃতি বৈপ্লবিক প্রেরণাদায়ক। ‘বৃষ্টি’ ও ‘পরী’ ভাল গল্প হয়েও লেখকের সংযমহীনতার অভাবে প্রথম শ্রেণীর রচনার দাবী করতে পারে বলে মনে হয় না। শাহেদ আলীর প্রথম গল্প পুস্তক ‘জিব্রাইলের ডানা’ প্রথম গল্প। ‘জিব্রাইলের ডানা’ বাংলা সাহিত্যের একটি সম্পদ। কিন্তু এই লেখক মাঝখানে রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে পড়ে সাহিত্যকর্ম থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। সম্প্রতি তিনি পুনরায় সাহিত্যকর্মে মনোযোগ দিয়েছেন? ‘একই সমতলে’ নামে তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে। শামসুদ্্দীন আবুল কালাম রচিত গল্পগ্রন্থ ‘পথ জানা নাই’, ‘ঢেউ’, ‘দুই হৃদয়ের তীর’, ‘শাহের বানু’। তাঁর বিশেষভাবে উল্লেযোগ্য গল্প ‘কেরায়া নায়ের মাঝি’, ‘জাহাজ ঘাটের কুলী’, ‘পথ জানা নাই’, ‘শেষ প্রহর’ ইত্যাদি। তাঁর প্রায় প্রতিটি গল্প বৈপ্লবিক সমাজ-চেতনাপূর্ণ। এই লেখক কয়েক বৎসর যাবৎ বিদেশীবাসী— ইদানীং তাঁর লেখা প্রায় দেখতেই পাওয়া যায় না। উপরোক্ত লেখকদের মধ্যে একমাত্র আলাউদ্দীন আল আজাদ সমাজ-চেতনা বলতে আমরা যা সাধারণতঃ বুঝি সে পথ ত্যাগ করে যৌন সহজতার (চযধষষরংস) পথ ধরেছেন বলে মনে হয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ দীর্ঘকাল যাবৎ বিদেশে বাস করছেন। তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘দুই তীর’ ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখকের অধিকাংশ রচনার মধ্যে বাঙ্গালীর পোশাকের অন্তরালে ইয়োরোপীর মন ও মানসের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি জ্যাঁ পল সার্তর প্রবর্তিত অস্তিত্ববাদ বাঙ্গালী মুসলিম চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। কাফকার নৈরাশ্যও তাঁর লেখায় কিছু কিছু পরিদৃষ্ট হয়। তাঁর অধিকাংশ ছোট-বড় গল্পের মানুষের অন্তরিন্দ্রিয় সন্দর্শন প্রচেষ্টা দেখা যায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র সব চাইতে প্রশংসনীয় দিক হলো তাঁর প্রকাশভঙ্গি এবং শব্দ চয়নের স্বকীয়তা : তাঁর শৈলীর শ্লথ গতি গভীর রাত্রে শ্রুত তানপুরার টুং টাং ধ্বনির মতো হৃদয়তন্ত্রীতে আঘাত করে পাঠককে ঘুম পাড়ায়, কোনক্রমেই উত্তেজিত করে না। সুতরাং চেতনাকে যথাসম্ভব স্তিমিত রেখেই যারা শান্তি পেতে চান তাদের কাছে এই লেখকের রচনা চিত্তগ্রাহী হবে সন্দেহ নেই।

পাকিস্তানোত্তরকালে রচনায় অবতীর্ণ আমাদের গল্প লেখকদের মধ্যে হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান প্রমুখ গল্প রচনায় কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত গল্প গ্রন্থগুলির মধ্যে ‘স¤্রাটের ছবি’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘সুন্দর হে সুন্দর’ উল্লেখযোগ্য। হাসান হাফিজুর রহমানের ‘আরো একটি মৃত্যু’ গল্পটি পূর্ববঙ্গীয় গল্প সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সৈয়দ শামসুল হকের ‘আনন্দের মৃত্যু’, ‘শীত বিকেল’, ‘রক্ত গোলাপ’ প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখায় যে পরিশীলন ও শৈল্পিক চেতনা দৃষ্ট হয় বহু অত্যাধুনিক লেখকের মধ্যে তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। ব্যাখ্যা প্রদান, নিজের বক্তব্য বলা এবং মন্তব্য করা থেকে তরুণ লেখকগণ প্রায়ই বিরত থাকতে পারেন না। এ দোষ পূর্বেও ছিল এবং এখনও অধিকাংশ তরুণ লেখকের মধ্যে এ দোষ প্রচুর পরিমাণে দৃষ্ট হয়। সৈয়দ শামসুল হক অনেকটা ব্যতিক্রম। জহির রায়হান সাহিত্য ছেড়ে ছায়াছবির দিকে অধিকতর মনোযোগ দিয়েছেন। শহীদ সাবের আমাদের আর একটি গল্প লেখক যার মধ্যে প্রতিভার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। দুঃখের বিষয় এই লেখক এখন অসুস্থ।

অপেক্ষাকৃত হালে যারা লিখে গল্প খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা দুই-ই অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর (প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘অবিছিন্ন’— ১৯৬৪); হেমায়েত হোসেন (প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘অনিদ্র পলাশ’ এবং ‘আরক্ত প্রহর’— ১৩৭৩-৭৪), হাসান আজিজুল হক (প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন’, ‘শীতের অরণ্য’— ১৩৭১), আবদুস শাকুর (প্রকাশিত গল্প ‘ক্ষীয়মান’— ১৯৬১), জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত (প্রকাশিত গল্পপুস্তক ‘বহে না সুবাতাস’— ১৯৬৭ এবং ‘দুর্বিনীত কাল’— ১৩৭২), ইসহাক চাখারি (প্রকাশিত গ্রন্থ ‘জানালা’— ১৯৬৭), আশীষ কুমার লোহ (প্রকাশিত গ্রন্থ ‘অনেক তারার আকাশ’— ১৯৬৬), লায়লা সামাদ (প্রকাশিত গ্রন্থ ‘দুঃস্বপ্নের অন্ধকারে’— ১৯৬৩), হুমায়ুন কাদির (প্রকাশিত গ্রন্থ ‘একগুচ্ছ গোলাপ ও কয়েকটি গল্প’— ১৯৬৬), আবু ইসহাক (প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মহাপতঙ্গ’— ১৯৬৩), রশীদ হায়দার (প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘নানকুর বোধি’— ১৯৬৭), আহমদ রফিক (প্রকাশিত গ্রন্থ ‘অনেক রঙ্গের আকাশ’— ১৯৬৪), আতোয়ার রহমান (প্রকাশিত গ্রন্থ ‘অনেক বলয়’— ১৯৬৭), আবদুর রহমান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, হাসনাত আবদুল হাই, শামসুল হক, রাবেয়া খাতুন, নাজিরা খান এবং বুলবন ওসমান প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বহু তরুণ লেখক গল্প লিখছেন। সংখ্যায় অল্প হলেও মুনীর চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, মোস্তফা নূরউল ইসলাম, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্ প্রমুখও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গল্পের লেখক। মুনীর চৌধুরীর ‘খড়ম’ একটি উত্তম সৃষ্টি। খ্যাতনামা কবিদের মধ্যে আহসান হাবীব কিছু রোমান্টিক গল্প লিখেছেন। ফররুখ আহমদের ‘মৃত বসুধা’ একটি ভালো গল্প। যত দিন যাচ্ছে পরিবেশ ও চতুস্পার্শিক সামাজিক অবস্থা ততই পরিবর্তিত হচ্ছে। ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক মন দ্রুত পরিত্যাগ করছে এ দেশের মানুষ; কিন্তু এখনও নতুন মূল্যবোধ তৈরী করতে পারে নি। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজ-জীবন থেকে নবাগত গল্প লেখকগণ নতুন উপকরণ সংগ্রহ করার সুযোগ পাচ্ছেন এবং সে সুযোগের তারা সদ্ব্যবহারও করেছেন। …মৌলিক গল্প রচনা ছাড়াও বিশ্ব-সাহিত্যের বই বাছাই করা গল্প শক্তিশালী গল্প লেখকগণ কর্তৃক নিত্য-নিয়ত অনুবাদিত হচ্ছে। তবু উল্লেখ করা আবশ্যক যে, আমাদের প্রায় সকল লেখকের রচনার উপকরণ গ্রাম-কেন্দ্রিক মুসলিম সমাজ-জীবন থেকে আহৃত। সত্যিকার নগর জীবনের রূপায়ণ বয়সী লেখকদের মধ্যে সম্ভবতঃ একমাত্র আবু রুশ্দ মতীনউদ্দীনের রচনায় পাওয়া যায়। নগর-জীবনকে উপলক্ষ করে লিখিত গল্পের মধ্যেও নায়ক-নায়িকার আচরণের মধ্যে গ্রাম্য চরিত্র বিকাশ লাভ করে। এ-কথা বলার উদ্দেশ্য, গ্রাম-জীবন বা গ্রাম্য আচরণকে হেয় করা হয়। আমার উদ্দেশ্য শুধু বিষয়টা খুলে বলা।

এমন কি সাম্প্রতিক গল্প লেখকদের মধ্যেও নগর-জীবন ভিত্তিক রচনা খুব বেশী পাওয়া যায় না। এর কারণ গবেষণাসাপেক্ষ নয়। বয়সী লেখকদের তো বটেই, তরুণ লেখকদেরও অধিকাংশের বাল্যজীবন গ্রামে কেটেছে অথবা শহরে বাস করলেও পারিবারিক জীবনে গ্রাম সুলভ মূল্যবোধ এবং জীবন-যাপন প্রণালী এবং আচার-আচরণ রয়ে গেছে। বাস্তবিক পক্ষে নগর-জীবন আমি বরং বলব নগরতা বলতে যা বুঝায়, তার সাথে আমাদের নাড়ির যোগ এখনও ঘটে নি, আমরা এখনও নগরতা লাভ করি নি। বিভাগ পূর্ব-কালীন লেখকগণ কলকাতায় প্রবাস জীবন-যাপন করতেন— অধিকাংশ আবার মেসে বোর্ডিং-এ— তাদের মন থাকত পল্লীতে। অপরপক্ষে আজ যা পূর্ববঙ্গ তাতে কোন বৃহৎ সমৃদ্ধ নগরের অস্তিত্ব ছিল না— পুরুষ পুরুষানুক্রমে যারা নগরবাসী, দিনমজুর, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং/অথবা চাকরিজীবী তাদের সাথে লেখকদের পরিচয় ছিল না— তাদের ধ্যান-ধারণা, মূল্যবোধ, জীবনযাত্রা প্রণালী, আদব কায়দা, আদর অভ্যর্থনা, আপ্যায়ন রীতি প্রভৃতি আমাদের লেখকদের অগোচর ছিল— এবং এখনও প্রায় তদবস্থা বিদ্যমান। ঢাকা প্রাচীন নগর হলেও বৃটিশ আমলে এর নগররূপ প্রায় লোপ পায়। এই পুস্তক প্রায় শহরের যারা সত্যিকার নাগরিক সেই দরিদ্র-পীড়িত বস্তিবাসী মুসলিম সমাজ আজ অবধি একজন নাম করার উপযুক্ত সাহিত্য কর্মী জন্ম দেয় নি। সত্যিকার নগরজীবনে বৈদগ্ধের যেমন চরম বিকাশ দৃষ্ট হয় তেমনি বিদগ্ধজন কর্তৃক ঘৃণিত অধঃপতিত সমাজ-জীবনও বিদ্যমান। এই উভয় জীবনের প্রতিনিধিত্ব করার উপযুক্ত নগর এখন পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে অনুপস্থিত— এ দেশের এমন কোন শহরবাসী নেই যারা ধান গাছকে তক্তা তৈরীর উপাদান জ্ঞান করেন। তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, সত্যিকার নগর দ্রুত গড়ার পথে। আমাদের নগরে বাস করে যাঁরা সাহিত্যকর্ম করেন, পূর্বেই উল্লেখ করেছি, তাঁদের পারিবারিক জীবন থেকে এখন পর্যন্ত সামন্ততান্ত্রিক আচার ব্যবহার সম্পূর্ণ দূর হয় নি। স্থাবর সম্পত্তির প্রতি মমতাহীন লোকত বিরল বটেই— এমন কি সাহিত্য-কর্মীগণও স্থাবর সম্পত্তি স্থাপনে অতিমাত্রায় আগ্রহান্বিত। স্থাবর সম্পত্তির প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন প্রলেটারিয়েট শ্রমিকও পূর্ববঙ্গে নেই বললেই চলে। বাড়ী বলতে এখনও আমরা বুঝি পল্লীর আম কাঁঠালবাগান পরিবৃত গ্রামের ভদ্রাসন— শহরের আবাসবাটী নিজের হলেও ‘বাসা’ মাত্র। দু’চার দিনের ছুটিতে কারখানায় নিযুক্ত শ্রমিকরাও দেশের দিকে ছোটে। কেরাণী এবং অফিসারেরাও ছোটে। এ জন্য স্পেশাল রেলগাড়ী ও স্টীমারের ব্যবস্থা করতে হয়। এই হচ্ছে হেতু যে জন্য সত্যিকার নগর-জীবন কেন্দ্রিক উন্নতমানের গল্প আমাদের সাহিত্যে বিরল। মাঝে মাঝে দেখতে পাই সমালোচকেরা রচনাকে গ্রাম্যতা দোষে দুষ্ট বলেছেন। কিন্তু সমালোচকের নিজের মধ্যেও যে গ্রাম্য জীবনের যাবতীয় দোষগুণ এবং মূল্যবোধ বিদ্যমান— এমন কি সমালোচকের ভাষাও যে গ্রাম্যতাপূর্ণ তৎসম্বন্ধে তাঁরা সজাগ নন। উল্লেখযোগ্য যে আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারাদি এবং যন্ত্রপাতি প্রভৃতিও আমাদের গল্পে কদাচিত দৃষ্ট হয়। বিমানপোত— এমন কি সামুদ্রিক জাহাজও আমাদের গল্পের পটভূমি নয়। কিন্তু আমাদের গল্প সাহিত্যর এই গ্রাম-কেন্দ্রিকতাকে নিন্দা করার কোন কারণও আমি খুঁজে পাই না। আয়ত্তাধীন এবং পরিচিত উপকরণ নিয়েইত আমরা লিখব।

 [লেখকের বাননরীতি অপরিবর্তিত রেখে পুনর্মুদ্রিত ও ঈষৎ সংক্ষেপিত : আমাদের সাহিত্য, ১৯৬৯, বাংলা একাডেমী]

———————————————————————————-


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা