67089695_1205629756286621_1569702463835996160_o

গ ল্প

বিরামহীন গন্তব্য

অনিন্দ্য প্রভাত

নিকষ অন্ধকার পেরোনো ভোরের ঘনাবৃত কুয়াশা তামাপুকুর গ্রামে। ঢোলের ধমক ধমক, করতালের মৃদু টুন টুন আওয়াজে শেষ ভোর রাতের কীর্তন শোনা গেল। হুলুধ্বনি হল। ব্রাহ্মমুহূর্তের সঙ্গীত লহরী নয়। তবুও শীতের আগমন বার্তায়, শিশিরসিক্ত ঠা-ামাটিতে ওদের আধো জাগরণের নিমিলীত চোখগুলো শিহরিত হয়। কারো চোখের কোণ কালো হয়। ঈষৎ নীলাভ দেখায়। তাদের কারো কারো কণ্ঠস্বর শ্লেষ্মা জড়ানো। তবুও একনাম বন্ধ হবার নয়। কেউ কেউ দূর্বা ভেজানো সিক্ত মাটি জড়ানো পায়ে শীতলার বেদীতলে পঞ্চাঙ্গে প্রণাম করল। মঙ্গল-অমঙ্গলের মধ্যে বিরূপাক্ষকে স্মরণ করল। কেউ কেউ দু¹া দু¹া স্মরণে মঙ্গল কীর্তন গাইল। কার্তিকের শেষ শীতটা জেঁকে আসেনি। তবুও মৃদু শিরশিরে বাতাসের ঘূর্ণায়মান কুয়াশার শিহরণে শিশিরকণা জট পাকানো। বৃষ্টির কর্দমাক্ততা নয়, তবুও কাঁচাসড়কের দুপাশ ভেজা ভেজা ঠেকে। নিস্তব্ধতার নিস্তরঙ্গ পুকুরজলে জিগা কিংবা বাঁশপাতার টপটপ শব্দ হলে, কারো কারো মাছের কথা মনে হয়। তখন কারো কারো একনাম কীর্তন উচ্ছ্বসিত ভাবাবেগের মতো জিহ্বায় আলগা আলগা ঠেকে। কারো মনে পড়ে শূন্য আঙিনার কথা, গরু-ছাগলের অসহায় দৃষ্টির কথা, মনে পড়ে বাসি তেল চিটচিটে কালোকালির শূন্য হাঁড়ির কথা। সকালে নিবিড় সূর্য-আলোর বর্ণচ্ছটায় ভাঁটপাতা, ঢেকিপাতা ঈষৎ শিশিরের গন্ধে আরক্তিম সূর্যস্নাত। মৃত্তিকাস্পর্শী দূর্বাদল নিঃসঙ্গতার নৈঃশব্দে একে অপরের গা বেয়ে বিন্দু বিন্দু শিশির জলে চিক্ চিক্ করে। মেহগনি, নারিকেল, আম, জাম, কাঁঠালের ফাঁকে নিম, ঘোড়ানিম, লিচু, জলপাই পাতার ঘনাবৃত ছায়ায় মৃদু দোলায়িত শিহরণ উঁকিঝুকি করে। হয়তো ঘুমহীন নয়তো একপাশে বালিশ উপুড় হয়ে; নিস্তব্ধ নির্জনতার নৈঃশব্দগুলো নীরদের চোখে-মুখে। একজোড়া ঘু ঘু পায়চারি করল। দুএকটা দোয়েল লোহার গ্রিল করা জানালার ফাঁকে উঁকি দিল। উজ্জ্বল নীলরঙের মাছরাঙা কয়েকটি বক বাঁশঝাড়ে ছপ ছপ শব্দে আকাশে তাকাল। প্রাতঃকাল-স্পর্শি সূর্য মধ্য-আকাশে বিস্তারমগ্ন। আকাশের দেবতা এই বিদীর্ণতায় মৌন, শান্ত ও সমাহিত। স্বর্ণালী হৈমন্তিক ফসল কারো কারো উঠানে জড়ো হয়। ঘর-দরজা উঠানময় ধুলোর আস্তরণ হয়। তবুও প্রতিদিনের কর্মক্লান্তির নিরাবয়ব অবসরের কাকের কা-কা ডাক নিঃসীম শূন্য দিগন্তে মিলিয়ে যায়। আজো নীরদ ভোরের কীর্তনে এলো না। তাঁর সন্তানও নয়। মায়ের শারীরিক দুর্বলতা ও অক্ষমতার রবগুলো কানে কাঁটা ফোঁটার মতো বিঁধছে। ‘বংশ নির্Ÿংশ হবে। কোথায় গেল ছেলেটা। চুলোয় যাক তোর ভিটে।’ এইসব মৃদু বিড়বিড় আওয়াজে নীরদ ভাবে তার মা কবে গঙ্গা  পাবে। তবে হয়তো শান্তি। এবার এ গ্রামে শীতলা পূজা হবার নয়। নীরদের চোখে মুখে নিশাক্রান্ত বিষাদের ছাপ। কথায় উত্তাপ নেই। আজকাল কারো নিকটে যায় না। শুধু চায়ের দোকান আর নিজের ভিটেটুকুর ওপর বাড়ী। নকুর বৈরাগী চাল পায় না। পাবেই বা কোথা থেকে। অধীর পুরোহিত গত বছর থেকে নিরুদ্দেশ। নিজের ত্রিশ বছরের সাজানো যজমান নেই। পুত্র অশ্বিনীকে দিলেও সে যেন অসহায়। নিজের ছোট সংসার চালাতে যে হিমসিম। এখন কেউ এগিয়ে আসে না। আসবেই বা কী করে। আউষের পর জল হলেও সারা বর্ষায় বৃষ্টি কম। আশ্বিনের প্রবল ঝড়টা ধানগাছ পাতাগুলোকে জটপাকিয়ে কর্দমাক্ত করে দেয়। শত বছরের দাঁড়ানো বটগাছের দুটো বড় ডাল নেই। ক’জোড়া কপোত-কপোতী অসহায় জড়সড় মরে পড়ে ছিল। কয়েকটা পানগাছসমেত সুপারী গাছ উপড়ে পড়লে কারো বুক ধুক্ ধুক্ করে। কতক ঘরে গাছের ডাল হেলানো বাঁশের মতো ঠেকে। নড়াচড়া করলে অন্ধকারে ঝুলন্ত দেহছায়া বলে মনে হয়। ঘর থেকে বের হতে পারে নি বলে, নধরের বাছুরটি মারা গেল। কারো কারো গোয়ালে গরুগুলি ছটফটাল। সারারাত বেড়া বেয়ে বৃষ্টি জল চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ল। গরুগুলি নির্বোধ ও অসহায় দৃষ্টিতে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকল। মানুষগুলো ঝড়ে বিপর্যস্ত ও অসহায়। কেউ কেউ হরি হরি বলে জোর আওয়াজ তোলে। প্রবল বাতাসের শোঁ শোঁ শোনা যায়। রাতে ব্যাঙগুলো শীতনিদ্রার পরিবর্তে ঘোঁৎ ঘোঁৎ একটানা ডেকে ওঠে। মেঘের এক একটি গর্জনের বিকট শব্দে কেউ কেউ ঈশ্বরহীন অন্ধকার হাতড়ায়; বেড়া হাতড়িয়ে ঘরে যায়। দুমড়ানো মোচড়ানো শব্দ হয় টিনের বেড়াগুলোতে। তামাপুকুর গ্রামের মানুষ সারারাত ভয়ে জড়োসড় হয়ে থাকলো। পরের দিন বজ্রনির্ঘোষ শব্দ শেষে আধো আধো সূর্য উঠলে কয়েকজন ঘর থেকে বেরোয়। একে অপরের খোঁজ নেয়। জটলা পাকিয়ে বসে। শঙ্কা ও অসহায়তা ওদের চোখে মুখে। সমস্ত তামাপুকুর ঝড়ে আক্রান্ত। শীত না হলেও সকালে ঠা-া জেঁকে ধরে। টিপ টিপ বৃষ্টি। কখনোওবা জোরে। সজোরে বৃষ্টি হওয়ায় ঘরের আঙিনায়, গ্রামের মাঝে রাস্তার মাটি ধসানোর মতো দেখায়। কারো কণ্ঠে জোর গলায় কথা বের হয় না। আচমকা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। কয়েকজন ভয়ার্ত দৃষ্টিতে এর ওর দিকে তাকায়। আকাশে তবু মেঘ। মেঘের পর মেঘ। উত্তর-দক্ষিণ দিকের শূন্য দিগন্তে যতদূর চোখ যায়— এক নিঃসীম শুনশান নিবিড় অন্ধকার এগিয়ে আসে। হালকা অন্ধকার গাঢ় হয়। অজানা আশঙ্কায় তাদের মুখ পাংশু শুষ্ক বর্ণ হয়ে এল, বিদ্যুৎবৎ তীব্র স্ফুলিঙ্গ আর সশব্দ মেঘের গর্জনে নির্বাক হয়। তবুও কয়েকজন বিড়ি টানে। ধোঁয়া উড়ায়। ঘোরানো ধোঁয়ার  ভীষণ করালমূর্তির মেঘ কারো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

এ গ্রামেরই নীরদ। ফর্সা হলেও চেহারায় কালসে তামাটে রং। বুকের দুএক খানা হাড় দেখা যায়। গত ক’মাস ধরে এক নৈঃসঙ্গের বৈরাগ্যতা। মাথার চুলগুলো প্রায় সাদা ধবধবে। পায়ে সবসময় স্যান্ডেল। আঙুল উঁচিয়ে প্রায় আকাশে তাকায়। কখনো উজ্জ্বল নীলাভ নয়তো শেষ সূর্যাস্তের আরক্তিম আভায়। ক’বছর ধরে যে রুদ্রবীণার ঝংকৃত সুরধ্বনির মূর্ছনায় পাগুলো সচল ছিল হঠাৎ-ই অধীর বাবুর নিরুদ্দেশ কিংবা অতীত হয়ে ওপারে যাওয়ার বিষণœতায় মন ভারাক্রান্ত। যে আর এখন ভোরবেলায় কীর্তনে যায় না। যায় না সংঘে নয়তো নামযজ্ঞে। এক গভীর বিষাদের উদ্বিগ্নতা চোখে-মুখে। যে কালস্রোত বইছে অপরিণামহীন দিকনির্দেশে সেই প্রবাহ বইছে গোটা তামাপুকুর গ্রামে। সমস্ত দায় তাঁর একার। নীরদের চারপাশ টিনের ঘেরা বাড়িটার ভেতর ডালকাটার খট্ খট্ শব্দ। বড় জলপাই গাছের ডাল একেবারে আঙিনায় দুই ঘরের মাঝ বরাবর পড়েছিল। কী অসুবিধা। পাতাগুলো দিয়ে বাড়ি ঢোকার পথটাও বন্ধ। ভেতরে যাওয়া আসা করতে কাপড় হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত ওঠাতে হয়। ঝড়ের তা-বে সারারাত নীরদের মা’র সে কী বিলাপ! একমাত্র পুত্র যে তার ধর্মের পি-দাতা সে অবশ্য ঘুমে। সকালে ভাঙা ডাল দেখে আচমকা ভয় পায়। আজ ডাল সরানোর কোন লোক নেই। কাউকে ডাকলে জবাবও নেই। যে কয়জন এর ওর দিকে তাকিয়ে বিড়ি টানছিল তারাও নিশ্চুপ। সারারাত এক একটা গাছ মাথা হেলিয়ে নুয়ে, মাটির সাথে ঘেঁষেছিল। সারারাত ডালপাতা নিয়ে ঝড়ের সাথে লড়তে হয়। আশ্বিনের শুরুর এ ঝড়টা কারো নিকট ভালো ঠেকেনি। নুতন করে না হলেও পূজা তারপর হৈমন্তিক ফসল তোলার সময়। সকলে ভালো থাকবে, এক নিরুদ্বিগ্ন ও নিশ্চিত আশা ছিল। কেউ কেউ ষাটোর্ধ্ব পেরোনো নারীদের ডাক শোনে তবুও শাখা-সিঁদুরবিহীন সাদা কাপড় জড়ানো ছোট ছোট ছাটানো মাথার চুল নিয়ে নীরদের মা কী সব যেন বিড়বিড় বলে। ঝড়টা যেন তার মাথার উপর দিয়ে গেছে। প্রায় অর্ধরাত জাগরণ। চোখের কোণে কালি। দুজনকে বলতে শোনা যায় এইবার য্যানো ক্যামন। আমার জন্মে দেখি নাই। পাপ, পাপ! আবার বলে ‘দুর্গা এবার ঘোটকে আসবে’। নীরদের মার দুচোখ বিস্ফারিত হয়। বলে, কেরে তুই! নবীন না! চারটি টিনের ঘর, নুয়ে পাড়া তুলসী গাছ, দুটি পেঁপে গাছ, চারকোণায় চারটি মরিচ গাছের দিকে চেয়ে কারো কথা মুখে আসে না। গত দুমাসে মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ। বৃষ্টির জন্য হাহাকার, আহাজারি। কর্মক্লান্তির শরীরগুলোর ঘাম শুকিয়ে ঠা-া হয়ে এলে; পুকুরের জল ঘোলা দেখায়। কেউ কেউ ঘোলা জলে স্নান করতে পারে না।

গ্রামের সধবা-বিধবা হুদুমের আয়োজন করে। লণ্ঠনের আলোয় ঘুটঘুটে অন্ধকারে জোনাকির ঝিঁ ঝিঁ শব্দে গভীর রাত অবধি চলে নৃত্য। এক একজন হাঁটু অবধি কাপড় তুলে একপা পুকুর জলে, অন্য পা উপরে। ততদিনে ধানগাছগুলো বিবর্ণ হয়। মাটিতে চীর চীরে ফাটল দেখা যায়। সবুজ শস্যহীন প্রান্তরের শীর্ষবিন্দু শুকনো পোড়াটে দেখায়। তবুও স্বর্ণালী ফসল ঘরে উঠবে। শরতের কুয়াশা ভেদ করে চিক্চিকে বিন্দু বিন্দু শিশিরকণা শস্যক্ষেতে প্রাতঃস্পর্শ শেষে দুলে উঠবে। এই প্রত্যাশা। তবুও মেঘের দেবতা সমস্ত আকাশে রুদ্রনৃত্যের মতো দুললেন। কারো কারো তখন পাপের কথা মনে হয়। মনে হতে থাকে কোন এক লোকালয়হীন তামাপুকুর গ্রামে কোন এক মানুষের আসা। নিজ হাতে দা, বটি, কাচি, কুড়াল নিয়ে একটু একটু জঞ্জাল কাটা, পরিষ্কার করা। বড় বড় আম, জলপাই, কাঁঠাল গাছে জড়ানো পরগাছাগুলোকে কেটে দেয়া। একপাশে নারিকেল অন্যপাশে বেল, জামগাছ লাগানো। অনেক বছরের পরিত্যক্ত জায়গাটাকে বাসযোগ্য করার কথা। দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে কোন এক ভরা মাঘের মেঘের অন্ধকারে জমাট কুয়াশায় শূন্য হাতে অন্তর্ধান হওয়া। কারো কারো মনে হয় অভিশপ্ত এ গ্রাম। অভিশপ্ত এ গ্রামের মানুষ। ঈশ্বরের বন্ধন এখানে আলগা, অসহায়। তুমুল সংগ্রামেও বিপর্যস্ত। যাঁদের বাঁচবার অধিকার তাঁরাও গন্তব্যহীন। শেষ ভিটেটুকু আগলে রাখতে যিনি পথ দেখিয়েছেন, তিনিও অতীত নিরুদ্দেশ।

একদিকে গহীন অরণ্যের মতো সবুজ বনভূমি। মাঝে কাঁচা সড়ক এঁকেবেঁকে শহরের রাস্তায় মিশেছে। পাঁচ-সাত মাইল পেরোলে উঁচু জমিদার বাড়ী। তারপাশে অর্ধমাইল বিস্তৃত খাল। বর্ষায় খাল ভরলে যেন ফুঁসে ওঠে। দুপাড় ছাপিয়ে ছলার ধানক্ষেত তলিয়ে যায়। গোলাকার বৃত্তীয় ঘূর্ণায়মান পাকগুলো, ব্রিজের নিচ দিয়ে সমান্তরাল নালায় মেশে। একদিকে ধূ-ধূ শূন্যপ্রান্ত, বর্ষায় ভরা নদীর মতো চকচক করে। শীত এসে দিগন্তব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে নিঃসীম শূন্যতা। শূন্য প্রান্তর পেরোলে বিস্তৃত মাঠ। তারপর উঁচুভূমি। অতঃপর মায়ের মন্দির। এক প্রান্তে শীতলার বেদী, অন্য প্রান্তে চ-ীদেবীর বেদী। আরো কিছুদূর পার হলে ভৈরব—ভৈরবীর মহা-শ্মশান। আর অর্ধমাইল পূর্ব-পশ্চিমকোণ বরাবর বড় মসজিদ। গোধূলি শেষে সন্ধ্যায় শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টাধ্বনি, হুলুধ্বনি, কাঁসিরধ্বনি আর আযানের ধ্বনি ছড়ায় অরণ্যময় অর্ধশতাব্দী পুরনো বট, অশ্বত্থ, কড়ই, তাল, ঘোড়া নিমের সারিতে। সোঁদা মাটির মিষ্টি ঘ্রাণ, শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি, অসীম আকাশ, অতলম্পর্শী মাটি আর সবুজ ঘ্রাণের স্পর্শ জড়িয়ে তামাপুকুর গ্রাম। তার উত্তর পূর্বে নীরদের বাড়ী। আজ নীরদের মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। কিছুক্ষণ বৃদ্ধা মায়ের দিকে  চায়। তের বছরের ছেলেটি চীৎকার করে। কই! বাড়ীর ডাল সরল। আবারো আকাশটা গর্জন করে। পুবের আকাশ ফকফকে হয়ে এলে, আবারো ঘন মেঘ জড়ো হয়। একজন ডালের পাতা ঝোড়ে। অন্যজন ডালটির মাঝে বরাবর কুড়োল বসায়। ঠক্ ঠক্ খটাস্ খটাস্ শব্দ হলে একজন নীলদকে বলে—দাদা জলপাই গাছ এত শক্ত নয়। মাঝে মাঝে কুড়োল পিছলে যায় বলে, ভিজা। বাড়ীর চারদিক ঘেরা থাকলেও একটু শিরশিরে ঠা-া বাতাসে তাদের বুকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। পরনের লুঙ্গি তারা আরো ভালো করে কোমরে গুঁজে। উরু অব্দি কালো লোমগুলো ভিজা ভিজা দেখায়। পেঁজাতুলোর বৃষ্টি লোমগুলোকে চামড়ার সাথে ল্যাপ্টে দিলে ত্যাকত্যাকে দেখায়। কয়েকবার কুড়াল দিয়ে কাটলে বুকটা হাপরের মতো ওঠে-নামে। বলে— দে একটা বিড়ি! সকালে একটু নাস্তাও নাই। কই রে পানগুয়া আন। বলেই লুঙ্গিটা হাঁটুর নিচে নামিয়ে বাড়ীর বাইরে যায়। আজ তামাপুকুর নিস্তেজ নিস্তব্ধ। তবু নীরদের বাড়িতে সশব্দে ডাল কাটার শব্দ। পশ্চিমে কতকগুলো গরু হাম্বা হাম্বা রব করে। খড়ের গাদাগুলো ভিজা। টপটপ জল ঝরছে। শুকনো খড়গুলো ভিজে গেছে বলে এরা এদিকে ওদিকে তাকায়। ঝড় তার ওপর বৃষ্টি। অনেক আশায় অনেকে পুকুরে রেনু পোনাগুলো ছাড়ে কিন্তু বৃষ্টির তোড়ে মাছ উছলে যায়। কেউ কেউ অকাল বন্যার কথা বলে। শ্যামচরণ চান্দুর আজ খুব দীর্ঘদেহী না হলেও কালো চুলের অধীর পুরোহিতের কথা মনে পড়ে। কথা বলতেন দাঁতের ফাঁকে, হাসলে যেন দুপাটি উজ্জ্বল সাদা দাঁত দেখা যায়। মাথার পেছনে শিখা বন্ধন করতেন। পা ফেলতেন ধীরে ধীরে এক হাত দুহাত পরপর। তিনি বলতেন— মাছ বানে গেলে কী! না গেলেই কী! চারিদিকে যে চোর। দেখিস আমার পুকুরে কেউ ঢিল ছুঁড়িস না। কষ্টের মাছ। পোনা বড় হলে, জাল আনতেন, দেখতেন, কাউকে কাউকে দিতেন। নিজের জন্য রাখতেন বড় পোনা, শিঙ, কৈ। অবসন্ন ও নিথর সকাল। কেউ কেউ রাস্তার মোড়ে মাথায় হাত বোলায়। মাটিতে কী যেন আঁকে আবার কাটে। জন্মান্তরের বোধ এখানে পূঁজা পার্বণ সংঘ, কীর্তনের উচ্ছ্বসিত জোয়ারের প্রাবল্যে সমুদ্রে সমর্পিত কখনো বা নিরাসক্ত বৈরাগ্যের সুুউচ্চ বেদীতে। সেখানে অজানা সম্ভাবনা। অনেকে খড় ছাওয়া ঘর থেকে বের হয় না। এ সবই পাপ, ভগবানের কর্ম, আমি মানুষ উপলক্ষ, পাপের ফল নরক, প্রায়শ্চিত্তে সমাপ্ত— এই চিরকালীন বিশ্বাসের দিনযাপন। তবুও কোন গ্রীষ্মের গোধূলির অবসানে পূর্ণিমার আল্পনা জড়ানো জ্যোৎস্নার নতুবা ঘোর অন্ধকারের মধ্যে আলো জ্বালিয়ে দাতা কর্ণপালা, মহীরাবন বধ, কখনো কখনো দূরন্ত স্বপ্নবোনা মানুষগুলো ভাওয়াল সন্ন্যাস। গুনাইবিবির জন্মকালো আয়োয়, নিজেদের কর্মক্লান্তির অবসর কাটাতে। আর সেই সব রাতগুলো মনে হত এক নব উচ্ছলের দুরন্ত বাতায়ন। কোন কোন দিন নীরদ নিঝুম রাতের অন্ধকারে ছেলেকে ডাকতেন। চুপি চুপি বলতেন— যাবি! মধ্যরাতের অন্ধকারে তারা ভিজামাটি মাড়িয়ে ছুটতেন আলোকোজ্জ্বল মঞ্চের দিকে। শেষ ভোররাতের ঘন কুয়াশার অন্ধকারে কেউ কেউ মৃদুস্বরে বলতেন— ‘কী পালাটা! মহীরাবণের মৃত্যু। কেউ থাকল রাবণের। গুষ্টী নিপাত।’ নীরদ কোন কোন দিন তুলসীতলায় সান্ধ্যপ্রদীপ, সকালে নয়তো সন্ধ্যায় আঙ্গিক, দৈবকর্ম করত, আঙুল টিপে ডোঙা বানাত। ঘট বসাত। ভুল হলে পুরোহিত দাঁতে দাঁত চেপে বিড় বিড় কথা বলত। নীরদ হাসত। কখনো কখনো ছেলে নিয়ে কাঁচা সড়ক পেরিয়ে বড় রাস্তা হাঁটলে ছেলে বলত— বাবা আর কদ্দুর। বাজার করত। মধ্যদুপুর পেরোনো সোনালী হলদেটে রোদের আভা বিস্তৃত হলে; তাদের চোখ মিলিয়ে যেত শূন্য দিগন্তে। অতঃপর মায়ের সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বললে মৃদু আলোয় ঘরের আঙিনায় পা রাখতো। নীরদের সংসার বড় নয়। বিধবা মা, আর অনেক দুঃস্বপ্নের পথ মাড়িয়ে —এই একমাত্র ছেলে। সংসার চলত কয়েকহাজার টাকায়। পৈত্রিক জমি ভিটা আর অন্তিম বিশ্বাসটুকুর জোরে বেঁচে থাকা।

সাদাসিধে জীবন হলেও মাছ খেত। আশ্বিনের মাঝামাঝি নয়তো কার্তিকের প্রচ- বর্ষণ আর বাধ-উছলানা বানভাসা জলে দিগন্তব্যাপী একাকার হলে তারা মাছ ধরে। দিনে নয় রাত্রে টর্চের আলোয়। আর কয়েকদিন পর জলে নামলে রোপিত আমন ধান গাছের ফাঁকে ফাঁকে মিলত পুঁটি, টাকি, নয়তো শিঙের ছোট পোনা। নীরদ নিরীহ অলস সময়গুলোকে পাশ কাটিয়ে পৈত্রিক জমিতে কাজ করে। স্কুলে যায় না বলে একমাত্র ছেলের প্রতি অবিশ্বাসের তীরটা বেশি করে গাঁথা। ক্লাস ফোর পর্যন্ত গেলে বলে অসুখ। একদিন ছেলে বলে— বাবা স্কুলে যাব না। ভালো লাগে না। বেতের মার দিছে। কানে লাগছে। দেখ দেখ বলে কান এগিয়ে দেয়। নীরদ অবাক হয়। নীরদের পড়ালেখা তেমন নয় বলে, কোনদিন রৌদ্রে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, কর্দমাক্ত নগ্নপায়ে একাই হাল দিয়েছে, সার ছিটিয়েছে, জমিতে বীজতলার চারা রোপণ করেছে। হাফশার্ট পরিহিত ত্যাকত্যাকে শরীরের দিকে চেয়ে কেউ বলে — নীরদ ভাই এত কাজ কার জন্যে? মাত্র তো তিনটে মানুষ। নীরদ উত্তর দেয় না। হয়তো কারো কথা ভালো লাগে না। তবুও এই মাটি, মাটির সোঁদা ঘ্রাণ, সবুজ ধান গাছ নয়তো স্বর্ণালী গমক্ষেত, তার কাঁদার প্যাকপ্যাক শব্দ, নয়তো ধূলি, ব্যাঙের ঘোঁৎ ঘোঁৎ এ সবই তার চিরচেনা। কতগুলো দুর্বা, জংলি ঘাস, চাপা ঘাস উপড়ায়। কখনো ছেলের চোখের কোণে কালি দেখে, তাঁর মাথা হাতড়ায়। রাতে ঘুমুতে ঘুমুতে গল্প করে। কোনোদিন ছেলে ঘুমালে দরজা ভেজিয়ে সন্তর্পনে বাড়ীর চারিদিক দেখে ঘোরে। একটু গলায় কাঁসে। শুক্লপক্ষের দশমী নয়তো কৃষ্ণপক্ষের তৃতীয় তিথিতে বড় বাঁশঝাড়ের মাথায় চাঁদ উঠলে তাকায়। কখনো প্যাঁচা নয়তো রাতজাগা পাখির ডানা ঝাপটানির শব্দে চমকে ওঠে। আবার ঘরে যায়। পিতৃবিয়োগ স্ত্রীর বিয়োগান্তের পর এক সরল অনাড়ম্বর জীবন যাপনে সে অভ্যস্ত। আজ তার ভরসার জায়গা নেই। এক পুরোহিত যাকে কখনো খুড়াঠাকুর কখনো কাকা বলে ডাকত, তিনিও কতগুলো বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সত্য-মিথ্যার দোহাই আর বঞ্চনার কথা বলে নিরুপায়ভাবে চলে গেলেন। আর আসবেন কী না সেগুলো তর্কাতীত। পুরোহিতের মুখ চেয়ে হয়তো তার বার বছরের ছেলেটা নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রবে আরো দুচার বছর শান্তিতে ঘুমাতে পারত। কিন্তু হয়তো অদৃশ্য নয়তো কতগুলো ঘটনার অনিবার্যতাকে তার ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সেও এক অবিশ্রান্ত গন্তব্যহীন পথে পা ফেলেছে। মাঝ রাতে ঘুমের ঘরে এইবারের দুর্গাপূজার শেষে বিচলিত হয়। নীরদের শখ ছিল যাত্রা দেখার। পূজার সময় তামাপুকুর গ্রামে চলত যাত্রা। ছেলেকে বিধবা মায়ের কাছে রেখে নীরদ কোন কোন গহীন রাতে একাই যেত। তার ভালো লাগত নায়কের অভিনয়, বিবেকের গান। কোনদিন রাত্রি শেষে সকালে আরক্তিম রোদের গাছের ছায়ায় গুনগুনিয়ে রেওয়াজ করে গান। কোথায় যেন অপূর্ণতা, নীরদ বুঝতে পারে না। কখনো বুকের বাঁ দিকে নয়তো মাঝ বারাবর কী যেন চিন্চিন্ ধাক্কা দেয়। কী যেন পিঁপড়ার মতো সরসর ওঠে-নামে। অবিশ্রান্ত কয়েকমিনিট চললে বলে — ‘মা, মাগো!’ তারপর একদিন পূঁজায় যাত্রাও বন্ধ হল। যাত্রার প্যান্ডেলে মারামারি।

কারা যেন কাদা ইটের টুকরো দিয়ে ঢিল ছুঁড়ে। তবুও উদোম দেহের মাংস দোলানো নৃত্য চলে। বিড়ির ধোঁয়ায় চলে জুয়া। জুয়ায় কারো টাকা যায়, আঙুলের আংটি যায়, কারো বা জমি যায়। না পেরে কেউ পালিয়ে নিরাশ্রয়ী হয়। সেই মারামারির রাত পেরোতে না পেরোতে তার খোঁজ হয় ম-পে। অধীর পুরোহিত মহাষ্টমীর দিন আখিলকে খবর দেয়, নীরদকে আনার জন্যে। সে আরো বলে— তার শরীর ভালো নয়। মাঝে মাঝে হাত পা শরীর কাঁপছে। সে আরো বলে দেয় ক’টা ডোঙা, নৈবেদ্যের থালা, প্রদীপ, হোমেরকাষ্ঠ লাগবে। নীরদ খবর পায়। সে আশ্চর্য হয় সপ্তমীতে এত কাজ তবুও মহাষ্টমীতে কেন ডাকাডাকি। মারামারি দৌড়াদৌড়ি অতপর রাত জাগরণ সে ঘাবড়ে যায়। বিধবা মা মৃদুমৃদু বলে— রাতে খবরটা দিলে হতো না! সকালে পূজায় যাওয়া। রাতেও কিছু খায়নি। খালি পেট। যদি কিছু হয়। আমিই না ঘুরে আসি। দশজনের পূজা ও আজ না গেলে নয়! হালকা কুয়াশার জ্যোৎস্নালোকিত শুভ্রতার ভোর পেরোতেই নীরদের যেতে ইচ্ছে না হলেও যায়। যদিও সপ্তমীর দিন তার মা-ই গিয়েছিল। ঘটস্থাপন হোমের কাষ্ঠ, বালু যোগাড় সবই করেছে। কিন্তু আজ পুরোহিত অসুস্থ। নীরদের চোখ লাল। মাথার চুলটুকুও আঁচড়ায়নি। চোখে মুখে এখনো রঙিন আলোর জৌলুস ঝলকানি। ক’টা চুরুট টেনেছে। মুখ ফ্যাকাসে। নীরদের পরনে একখানা ধুতি। গায়ে রাধা-কৃষ্ণ নামাঙ্কিত নামাবলী। পুরনো বলে কোথাও কোথাও অস্পষ্ট। সে অধীর পুরোহিতের সামনে দাঁড়ায়। খালি গায়ে, কাঁধে গামছা, অধীর পুরোহিত বসে। নীরদ অষ্টাঙ্গে প্রণাম করে। করজোড়ে বলে— ‘খুড়া ঠাকুর, কী জন্যে ডেকেছেন।’ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। নীরদের চোখে ঔদাসীন্য দৃষ্টি। পুরোহিত ধীরে ধীরে বলে — আসতে দেরি কেন? একটু  পা চালায় সিক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে বলে— ক’টা ডোঙা বানাও মানপাতায় নৈবেদ্য সাজাও। বহুদিন ধরে নীরদ এই দেবী পূজার সাথে। দশজনের ম-প তবু নীরদ ছাড়া অচল। আজ বিশ বছর ধরে এই মন্দির তার নবজন্মভূমি। পাড়া ঘুরে লোক ডাকা, স্বাক্ষর নেয়া, চাল সংগ্রহ সবই তার নিজ হাতে। দুচারবার তবুও ব্রাহ্মণের বদল হয়, কিন্তু নীরদ আগের মতোই, যদিও সে দুবছর আসেনি। তবুও তাঁর নিরাসক্ত আর ঔদাসীন্য ঘোচার নয়। অধীর পুরোহিতের কাছে এলে সে যেন ভুলে যায় সবকিছু। কতদিন ভেবেছে এ সংসার ছেড়ে চলে যাবে। কী হবে জমি-জমা পুত্র। এক বিধবা মা। মাথার চুল সাদা ধবধবে। মাঝে মাঝে চা বানায়। সকাল সকাল না উঠলে ডাকে। মাথায় তেল মালিস করত। নিমপাতার রস করত। একটু করে নাতিকে নীরদ খাওয়ায়। বলে— রক্ত পরিষ্কার হয়। চ-ীপাঠ শেষে পূজা শেষ হতো। পুরোহিত কিছুই খেত না। প্রায়ই খুঁতখুঁতে কথা কাটাকাটি হত। বলতো— একটা কলা দাও। নয়তো একটু জল চেয়ে নিতো। কী এক অনাড়ম্বর আটপৌঢ়ের জীবন। চোখে মুখে কী এক বিষণœতা। সন্ধ্যার হ্যাজাক লাইটের আলোয় সান্ধ্য আরতীর সময় কিছুক্ষণ কাটাত।

প্রতি বছর মহাষ্টমীতে প্রণাম নেয়ার সময় বলতো— এ প্রণামী রাখব কোথায়। বাবা মা নেই। আমাকেই নিতে হবে। তারপর গদগদস্বর শেষে রুঢ় গলায় বলতো — পূজা তো শেষ। আমার টাকা চাউল দিয়ে দাও। নীরদ নিজ হাতে টাকা সংগ্রহ করে, এনে দিত। এই সেই নীরদ সংকল্পকারী। উপযুক্ত সময়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারে নি। তবুও সংস্কার অসম্পূর্ণ হয় বলে। হঠাৎ-ই বিয়ে। নেই একখানা ভালো ধুতি, বিয়ের সাতদিন পূর্বে নীরদের বাবা বলেছিল— নীরদ তোর বিয়ে। এক রকম পাকা কথা। নগদ টাকা কম দিবে। সাজ-গয়না ওরা যা পাবে। নীরদ মাথার চুলে হাত বোলায়। নীরদের বয়স কম নয় তবুও যেন অসহায়। বাবার ঔদাসীন্য ভাব-গম্ভীরতায় সে একবারে নিশ্চুপ। সে সময় না ছিল টাকা, না ছিল কর্মক্লান্তির অবসন্নতা। হৈমন্তিক শেষ বিকেলের রোদ ক্রমে পৌষের এগোনো রোদে জর্জর। উত্তুরে মেঘ— রোদের সূর্যদেব মধ্যাহ্ন পেরিয়ে পশ্চিমাকাশে। মাঠগুলো ক্রমে ক্রমে খাঁ-খাঁ। যতদূর চোখ ধোঁয়াশার শূন্যতা। অনাপত্তি ওঠেনি তাঁর কথায়। এই  পুরোহিত-ই বলে— সম্পর্ক ভালো, ভালো বংশ, বিয়ে কর। মাথায় শলার মুকুট, পায়ে এক জোড়া স্যান্ডেল, গায়ে শাল জড়িয়ে বাবা-মায়ের আশীর্বাদপ্রাপ্ত নীরদ ক’জন বরযাত্রী সমেত রিকসায় যায়। মাঘ মাসের দুর্ভেদ্য কুয়াশায় তার মাথায় উটকো চিন্তা ভীড় করে। বাবাকে বলতে গিয়েছিল হোক না বিয়েটা ক’দিন পর। অন্তত আষাঢ় নয়তো শ্রাবণে। কিন্তু কিছু সঙ্গোপিত বিশ্বাস, কিছু ব্যবধান, অস্বাভাবিক ভাবনা, দুর্নিবার অমোঘ নিয়তি জমাট মেঘ হয়ে জমল। গোধূলির অন্ধকার রাতে মিলল। বৃন্তহীন পত্র বিথী পথচারীদের পায়ে নিস্পিষ্ট হয়ে মর্মরিত হল। ঘন, ঠান্ডা, শান্ত পুকুরজলে তবু দুএকটি শব্দ হল, মন্ত্র উচ্চারিত হল। প্রজ্জ্বলিত হল হোমাগ্নি; ততক্ষণ ভোরের পূর্বাকাশে কতক মেঘ সরল। ঘোলা লাল ডবডবে সূর্য ঘন মেঘের ফাঁক গলে বের হল। আলতা রাঙানো এক জোড়া পা সপ্তপাক প্রদক্ষিণ করল। সকাল হতেই আকাশ ফটফটে হয়ে এল। নিরাশ্রয়ী গৃহে কন্যা আসতে চায়নি। তবুও গোটা কতক নারীর চোখের জল, ধান দুর্বার শান্তি শেষে, কিছু অভিমান ক্ষোভ নিয়ে বরবধূ রওনা হল। বিদায়ের অন্তিম মুহূর্তে কন্যার পিতা নীরদের হাত দুটি শক্ত করে ধরে। কন্যার মাতা হাউমাউ কেঁদে বলে— একটু দেখিও বাবা। মেয়েটির মুখটায় কী মায়া। সাদাসিধে চেহারা। মাথার ঘোমটা ঠিকমত টানতে পারেনি, বারবার মাথার পিছনে পড়ে যায়, তখনও নীরদের ঔদাসীন্য চোখগুলো নিমীলিত। সারারাত ঘুম হয়নি বলে চোখের কোণ ঈষৎ রক্তিম। জীবনের স্বপ্ন, ব্যর্থতা, হতাশা যা একদিন ঈশ্বরে সমর্পিত করেছিল তা যেন উবে যায়। তারা তামাপুকুরে ফেরে। দীর্ঘ গভীর নিশীথের কুয়াশা দুর্ভেদ্য ঠেকে। রাতজুড়ে আয়োজন চলে বউ ভাতের। তবু কতগুলো অজানা আশঙ্কা নীরদের বুকে ধুক ধুক করে। নীরদ বাবার কাছে বলতে চায় বিয়ে হয়েছে কিন্তু! কথা আটকে যায়। বাবা বলে— কিন্তু কী রে! তোর মুখ চেয়ে এই বিয়ে। ও তোর পর না। বাবা দীর্ঘশ্বাস নেয়। অর্ধরাত অব্দি পায়চারি করে। সমস্ত স্পষ্ট অস্পষ্টতার তাল-লয়ের নিগুঢ় রহস্যে সে ভরা মেঘের জমাট কুয়াশার ঘন অন্ধকারে হারিয়ে যেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর বারান্দার চেয়ারটায় বসে। উপরে তাকায়। কথাগুলো বিশ্রি বিদঘুটে ইঁদুরের কুটুস কুটুস শব্দ হল। বাঁশবাগানের বাঁশে কড়কড় ঠকাস ঠকাস শব্দ হল। রাতজাগা পাখি শনশন উড়ে গেল। অতঃপর রাত কাটল। বড় আশ্বাস পেয়েছিল বাবার নিকট থেকে। কিন্তু বিবাহিত জীবনে বারবার ছেদ পড়ল। সব যেন ভেঙে গেল। গরুগুলো খড়ের স্তূপে চেয়ে থাকল। ওদের চোখে অসহায় দৃষ্টি। বাড়ীর পুকুর জল শুকিয়ে এল। কটা মাছ অসহ্য ঠা-ায় চুপচাপ মাঝ পুকুরে জড়ো হল। ক’টা বাঁশের লম্বা ডগা শিরশিরে দুলে উঠল। হাঁসগুলো পুকুরপাড়ে ঘুমঘুম চোখে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকল। বাবা আর বেশিক্ষণ নয়। আকাশে কালিমার অন্ধকার ঘনিয়ে এল। দুটো গরু আর ভিটেটুকু রেখে বাবা চিননিদ্রায় শায়িত হলেন। তারপর মায়ের সিঁথির সিঁদূর মুছল। শাঁখা ভাঙল। আরো কিছুদিন পর শাদা শাড়ী। মাথায় ছোট ছোট চুল। আরো কয়েক বছর পর গলায় তুলসীর মালা। কপালে মাটির তিলক। নীরদের বউ নীরদের বাবা মারা যাওয়ার পর প্রায়ই যেত। প্রায়ই ঝগড়া হতো শাশুড়ীর সঙ্গে। নীরদের পূজা, যাত্রাদেখা, সংঘ, কীর্তন নীরদের বউয়ের ভালো লাগত না। সে জানত এভাবে সংসার অসম্ভব। তবুও এগুলোর প্রতি নীরদের কী এক অমোঘ আকর্ষণ। এক পিতৃহীন ঔদাসীন্য বৈরাগ্য। নীরদের বউ বলেছে বাপের বাড়ী চল। না হলে আর একটা বিয়ে কর। বলেই হাঁসফাঁস করতো। বুকটা হাপোরের মতো উঠত নামত। তবু সে যায় নি। জানত বউ অসুস্থ। ভালো হবার নয়। খামাখা জমি বন্ধক রাখে। ডাক্তার দেখায়। ওষুধ খাওয়ায়। এক একদিন বউ শাশুড়ীর ঝগড়ায় গ্রামের লোক জড়ো হত। একদিন বউ শাশুড়ীকে বটিসমেত কোপাতে গিয়েছিল। বলে নষ্টা মহিলা। তুই বের হ। মাঝে একদিন বের হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাশের নান্দুর বাড়ীতে খোঁজ মেলে। নীরদের চেষ্টার অন্ত ছিল না। লুকিয়ে লুকিয়ে ঝাল-মুড়ি, নারিকেল তেল, কোন কোন দিন আঙ্গুর, কমলা, কলা আনতো। নীরদের পড়ালেখা বড়গ-ি না পেরোলেও গীতা পাঠ করত। প্রায়ই আওড়াতো  শ্লোক। বাবার মৃত্যুর পর পুরোহিতের কাছে মাঝে মাঝে যেত। নীরদ গৃহস্থধর্ম যথাযথ পালন না করলেও মাঝে মাঝে সাত্ত্বিক জীবন যাপন করত। সন্ধ্যায় একাই হাতে তালি দিয়ে নাম সংকীর্তন করত।  নীরদ বুঝিয়েছে এ বাড়ীর গূঢ় সম্বন্ধ সূর্য, আকাশ, মাটি আর বৃষ্টির সাথে। বউয়ের কতবার চোখের জল ঝরেছে। নীরদের বাবা বলত— বউ মা, পড়ালেখা ইসকুল—কলেজ পাস সকলের কর্ম নয়। সংসার কর। গৃহধর্ম বড় শান্তির জায়গা। দুচার জনের মোটা চালের ভাতের অভাব হবার নয়। বিয়ের পর কিংবা পিতৃদেব স্বর্গবাসী হলেও পুরোহিত আসতো। এটা  ওটা করতে বলতো। বলতো অসুখের কথা। শহরে ডাক্তার দেখানোর কথা। কিছু খাওয়ার কথা বললে বলতো— তোমরা দীক্ষিত নও। কি আর খাওয়াবে? এক কাপ চা দাও চিনি ছাড়া। চেয়ারে হেলান দিয় বলতো —ব্লাড সুগার বেড়ে যাচ্ছে। চোখেও ভালো দেখি না।

প্রায়ই এ বাড়িতে এলে বলতো বউমা ভালা ডাক্তার দেখাও। কিন্তু ডাক্তার দেখাতে চায়নি। দেখালেও ওষুধ-পথ্য ঠিকমত নিত না। এরপর যা হবার তাই হল— বউয়ের গায়ের রং হলদেটে হল। বুকের হাঁসফাঁস দীর্ঘতর হল। নীরদ দু সের বন্ধকী জমি বিক্রি করল। তবুও কিছু খাওয়ান গেল না। এক দুধের বাচ্চা রেখে ঘন অন্ধকার রাতে চিতা জ্বলল। তখন নীরদের এক বছরের পুত্র ঘুমন্ত। আজ ঝড়ের রাত পেরোনো সেই ছেলে শাসানোর ভঙ্গিতে। তখন জলপাই গাছের ডালকাটা প্রায় শেষ। পাতাগুলো সারা উঠানে ছড়িয়ে। বাঁ হাত কোমরে রেখে নীরদের বিধবা মা সুপারি পাতার বারুন দিয়ে ঝাড়– দেয়, পাতা জড়ো করে। সেগুলো দক্ষিণ কোণে লাগানো মরিচ গাছটার গোড়ায় দেয়। নীরদ ভাবতেই থাকে বছরের পর বছরগুলো সে আর তার বিধবা মা নির্মোহ নিরাসক্ততায় কাটিয়েছে। বিধবা মা বলেছে বিয়ে কর একটা। পুরোহিত গোপনে বিয়েও ঠিক করে। কিন্তু একটু বেটে আর পেটটা বেঢপ উঁচু বলে কন্যা অন্যত্র পালিয়ে যায়। অবশ্য নীরদও রাজী ছিল না। সে বিয়ের পূর্বে বলেছে — আমার জন্যে নয় ছেলের জন্যে আসো। মেয়ে ভড়কে যায়। সেই থেকে সে আরো নি¯প্রভ, কথা কম বলে। বিয়ে করতে না পারা দোষ যেন তার। বিধাতার এই দৈব নিষেধ তো তার। মাঝে সে স্বপ্ন দেখে বাবা যেন দেখায়। ঝিঁ-ঝিঁ জোনাক পোকার আলোয় ঘুম ভাঙে। উঠে দেখে কে যেন আঙিনায় হাঁটছে। নীরদের মা নয়তো। মা বলে ডাকতে গিয়ে দেখে ঝুলন্ত বাঁদুড় জলপাই গাছে। বউয়ের মৃত্যুর পর কোন দিন লাইট হাতে শ্মশানে চলে যেত। কোন দিন বা রাতে আকাশে বিদ্যুৎবৎ ঘোর বর্ষণে, শীতের রৌদ্রের অবসানে অবসন্ন বিকেল পেরিয়ে ভয়ার্ত ধোঁয়াশার গভীর নৈঃশব্দের রাতে, গ্রীষ্মের প্রচ- রৌদ্রে ঘাম জর্জরিত ভেজা শরীর থ্যাকথ্যাকে হয়ে এলে, দুহাতে অঞ্জলিপুটে ভগবানকে ডাকে। পিতৃদেব যেন স্বর্গে অধিষ্ঠিত। কোনদিন বুকের ভেতর ধরফর করে। কে যেন তাকে টানছে। বিছানা ছেড়ে বাইরের দরজা পেরোতে দেখে তার মা। মা বলে—  এ কী তুই! নীরদের সম্বিৎ ফেরে, কথা বলে না। সে রাতে আবার ঘুমায়। তবুও পুরোহিত না এসে থাকতে পারেনি। নীরদ কতদিন পুরোহিতকে বলেছে— কাকা এরকম কেন হয়? সব আছে আবার শূন্য। এ গৃহও নিরাশ্রয়ী।

ও দ্বিতীয় বিয়েটা করলেও পারত। শুনছ দেশের অবস্থা ভালো নয়। কোনেদিন ছেলে আসে নি। পাশের বাড়ীতে বেড়াতে এলে নতুবা পূজা-পার্বণ হলে। একটি বই রাখতো। প্রায়ই বলত টিকবে না টিকবে না। আরো দুটো গরু কিনেছিল। প্রণাম করলে হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কনিষ্ঠামূলে রেখে বলত— কল্যাণ, কল্যাণ। একদিন হঠাৎ নীরদের ছেলের খোঁজ নিতে আসে। ছেলেটি এদিক-ওদিক তাকায়। ঘোরে। নীরদ পুরোহিতকে দেখিয়ে বলে— প্রণাম কর, গুরুজন বাবা। পুরোহিত বলে টিকবে না টিকবে না। এদের দ্বারা হবে না। নীরদের মাও মৃদু মৃদু স্বরে বলে— ছেলেটা এখানে থাকে না। আজ মামা, কাল মামী, এ করে মানুষ হয়। অধীর পুরোহিত অনেকক্ষণ পর এক গ্লাস জল চেয়ে নিতেন, ঢকঢক পান করত। তারপর ধীর পায়ে চলতে চলতে বলতো— আমিও পারি না। ছেলেটি খেয়ালি। আজকাল বিড়ি, চুরুটও টানে। মহাষ্টমীর মহা¯œানের হাঁড়ির দিকে চেয়ে পুরোহিতের মন্ত্রমুগ্ধতায় মনটা ভরে ওঠে। সে পেত না টাকা, দশসের কিংবা আধমণ চাউল, দুচারটে নারকেল, প্রণামীর পয়সা, উৎসর্গের দান।

কখনো পুরোহিত ধুতি, ময়লা গামছা। মাঝে মাঝে শঙ্খধ্বনি দিত। আরতী করত। হঠাৎ আখিল আসত। নীরদকে বলত পুরোহিতের সাথে কম বলবি। যখন যেটা লাগে দিবি। আশ্বিনের নয়তো কার্তিকের মেঘ রৌদ্র উজ্জ্বলতায় ঘাম ঝরে। শরীরের শিহরিত রক্ত প্রবাহের ছোঁয়ায় উৎসবের বার্তায় প্রাঙ্গণ ভরে যায়। গুমোট ভ্যাঁপসা গন্ধ ছড়ায়। কারো কারো শরীরে ক’খান পাঁজর তবু নামাবলী জড়ানো। কতগুলো শিশু মারামারি করে, ঢাকে হাত দেয়। দৌড়াদৌড়ি করে। আহ্লাদে নিবিষ্ট মনে দেবীকে দেখে। অধীর পুরোহিতের কাছে এই পূজা বহুদিনের। বহুকালের পরিচিত এই প্রাঙ্গণে। সেই ফুল, নেই দূর্বা কিংবা আতপ চাউল। নেই ভোজ্য দক্ষিণা, নেই একখানা পায়েল ধুতি। শুধু জল দিয়ে পূজা সারতেন। তবুও বলতেন মা কল্যাণ কর। শান্তি দাও। আশীর্বাদ কর। সে সত্যাসত্যের মূল্যে সবকিছু ছেড়ে পুরোহিত আশ্রয় নিয়েছিল পৌরহিত্যে। অভিতেতার স্পন্দনে তারও আজকাল মনে হয়— এই বৃহৎ যজমান, শ্রাদ্ধ, পূজা থেকে কী লাভ! কী লাভ চ-ীপাঠ করে, নয়তো ধর্ম ধর্ম করে। পুরোহিত বলে— বুঝলি নীরদ আর এখানে নয়? কেউ কেউ শুনে বলে— ক্যান ঠাকুরদা এমন কথা বলেন। হাসতে হাসতে বলে— এ ব্রাহ্মণের বেটা ভালো নয়। কারো কারো মুখে সাময়িক অনিশ্চয়তা আর উদ্বিগ্নতায় ঘনমেঘের গর্জন ঘনিয়ে আসে। কেউ কেউ মুচকি হাসিতে বলে— কাকা ঠাকুর। আপনি থাকবেন না কেন? ছেলেটাকে যজমান দিয়েছেন। শুনি পূজা করে। পুরোহিত বলে— আসলে টাকার দরকার। ছেলে এগুলো করতে চায় না। সে বলে চাকরি করব। টাকা লাগবে। অনেক টাকা। কী হবে এই টাকায়।

বৎসর বৎসর এই একটি উৎসব। কোনোদিন এই সব নিয়ে বলেন নি। নিজ হাতে গড়ানো পূর্ব পুরুষের পেশা। কত কষ্ট যন্ত্রণা রৌদ্র, বিদ্যুৎবৎ বৃষ্টি হাড় কাঁপানো শীত, কর্দমাক্ত মাটি কখনো বা হাঁটু অব্দি জল পেরিয়ে যজমান চালিয়েছে; কিন্তু টাকার কথা বলে নাই। কেউ কেউ বলে— খুড়ো ঠাকুর এত টাকা টাকা কেন। কেউ কেউ ভাবে তবে কী জীবন সায়াহ্নের কোন বার্তা দিলেন। যে সূর্যসম তেজদীপ্ত অমৃত মন্থিত বাণী, তার বিন্যাস অস্ত হতে চলেছে। এই মন্দিরে মহাভারত পাঠ, নিজ গৃহে কোনদিন ভাগবত পাঠ কোনদিন গীতা পাঠ। কোন কোনদিন গ্রামের উপেন, চান্দু নয়তো মৃগেনের খোঁজ নেয়া — তার কি সত্য অস্ত হতে চলেছে। নীরদ ভাবে তামাপুকুর গ্রাম পেরিয়ে সুখান পুকুরের মহাশ্মশান, মেকুরটারীর ভৈরব মন্দির পেরিয়ে সূর্যদয়ের পর কোন কোন দিন বহুদূর চলে যেত। তবুও বছর বছর শীতের বার্তার ঈষৎ ঠা-া জড়ানো শিরশিরে বাতাসে রাধা-কৃষ্ণ নামাঙ্কিত নামাবলী গায়ে জড়িয়ে মুখরিত করত এই প্রাঙ্গণ। তার ভরাট কণ্ঠে উচ্চারিত হত মন্ত্র, স্তোত্র। আজ প্রত্যহের মতো নয়। একটু আগে বিসর্জনের ঘণ্টা বাদ্য হল। দুর্গা এখনো পাটে। জ্বলজ্বল চোখে যেন তাকিয়ে দেখছে। একটা কলাপাতায় দুটো কলা, সামান্য ভেজা আতপ চাউল, দু টুকরো কাটা আপেল, একটু দুধ, এক মুঠ চিনি। আজ আকাশ ছমছমে। হালকা কুয়াশার মতো বৃষ্টি, বৃষ্টিতে ভ্যাপসা গন্ধ বাড়ে। অধীর পুরোহিত এইমাত্র অচ্ছিদ্রাব ধারণ ও বৈত্তণ্য শেষে দাঁড়ালেন। প্রণাম করল। বিসর্জনের পূর্বে দাঁড়িয়ে বলল— এখন বিসর্জন হবে। বহুবছর পুরোহিতের কণ্ঠ ভেজা ভেজা। চোখ থেকে এক ফোঁটা জল পড়ল। বলতে থাকে— আর হয়তো আমি পারব না। সকলে ভালো থাকো। শেষে শান্তি ছিল। এরপর ক’দিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে কেউ কেউ পুরোহিতকে প্রণাম করল। অপরাজিতা লতাবন্ধনীর প্রণামী পুরোহিতের হাতে দিল। নীরদ দেখে। ঘাড়ের ময়লা গামছায় দু চোখ মোছে। কোমর থেকে দুটো পাঁচশো টাকার নোট পুরোহিতের হাতে দেয়। পুরোহিতের পায়ে প্রণাম করে। আরো একবার পুরোহিত নীরদকে বুকে জড়িয়ে ধরে। বলে— তোরা কিছু মনে করিস না। হয়তো আমি আর …। এই তো নীরদের পৃথিবীর স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃস্বপ্নের ভগ্ন বেড়াজাল। তাঁর বুকে নিস্তেজ নদীস্রোত প্রবাহের গুমড়ানো ঘোলাটে বালুজল খচ খচাল। সে দুটা নারিকেল নেয়। আরো কয়েকদিন পর খবরটা বাতাসে ভাসছিল। নিশ্চিত নয়। মধ্যকার সূর্যতাপ শেষে বিকেলের রৌদ্র ক্রমশ নিস্তেজ। বাতাসে ছোট ছোট ধূলিকণা। স্বর্ণালী ধানক্ষেতে ছড়িয়ে হলদেটে রোদ। বাতাস অসহ্য ভারী হয়ে ওঠে। নীরদ শোনে পুরোহিত নাই। তবু সে এক জোড়া সেন্ডেল পায়ে ধীরে ধীরে এগোয়। পুরোহিতের বাড়ীর ভেতর ঢোকে। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে আসে। কয়েকটি তারা পুব আকাশে। ভেতরটা শুনশান। অন্ধকারের মতো নিশ্চুপ নীরবতা ঘন হয়। দেখে— পুরোহিত চৌকির ওপর। বামপায়ের ওপর ডান পা রেখে পৈতায় গ্রন্থি দেয়। সে নীরদকে আধো অন্ধাকারের অস্পষ্ট আলোয় দেখে বলে— তোমাদের ওগুলি ছেলেটা দেখবে। মুখ ভর্তি সাদা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। প্রশস্ত কপালে দুএকটি ভাঁজ। হো হো হো হাসল। তামাটে বর্ণের খোরানো চেহারায় তাকায়। গলায় ঘড়ঘড়ে হাঁসফাঁস শব্দে নিঃশ্বাস টানতে টানতে বলে— আজ মেয়েটা নেই। থাকলে জামাইকে নিয়ে এ সংসার চালাত। ক্রমশ বাড়ীটার ভেতর অন্ধকার আরো জমাট ও ঘন  হয়ে আসে। অন্ধকারে একটি লণ্ঠন জ্বালিয়ে গৌরবর্ণের একটি হাত এগিয়ে আসে। হাতটি যেন কার। নীরদ কোথায় যেন দেখেছে, বুঝতে পারে পুরোহিতের স্ত্রীর। আবার ঘরের ভিতর মিলিয়ে যায়। লণ্ঠণের মৃদু আলোয় দুজনের মুখ হলদেটে দেখায়। কপালের ভ্রূ কুঁচকে, পুরোহিতের হাত ধরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে— কিন্তু কাকাঠাকুর। একটু চোখের জল দুগ-দেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। দুহাঁটুর উপর হাত রেখে মুখ ঢাকে। পুরোহিত পৈতাটা হাতে নিয়ে ঘরের দরজার দিকে দিয়ে বলে— ধর। পুরোহিত বলতেই থাকে— ও নীরদ আমি নাও ফিরতে পারি। ছেলেটারে একটু দেখিস। ঘরের ভিতর কতগুলো শব্দ হল। চুড়ির টুং টাং। একটা গুমড়ানো কান্নার আওয়াজে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। অস্পষ্ট গলায় শব্দ হয়— আমি যাব না। পুরোহিত চৌকি থেকে উঠে দাঁড়ায়— ওষুধ পথ্য নিও। সিরাপটাও নিও। নীরদ কথা বলে না। কী যেন অনিবার্য অনিশ্চিত আতঙ্ক তাঁর চোখেমুখে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের গুমোট অন্ধকারে বাড়ীটা ঘন অন্ধকারে মিশছিল। ঝিঁ-ঝিঁ জোনাক পোকার শব্দ হল। কয়েকটা ব্যাঙ ঘে্যাঁৎ ঘ্যোঁৎ ডাকল। নীরদ সজোরে পা চালায়।  তাঁর সমস্ত শরীর ভেঙে পড়ছিল হাঁটুর শিরাগুলো শিথিল হচ্ছিল। হাত দুটি ঠকঠক কাঁপছিল। সে দ্রুত পা চালায়। শুনতে পায়— কী করি নি তোদের জন্য। তবুও ছেলেটার জন্যে পঞ্চাশ হাজার টাকা হল না। কই তাড়াতাড়ি কর।

তারপর আরো কমাস কাটল। নিস্তরঙ্গ পুকুরজলে জালের ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দ হল। মৃদু তরঙ্গায়িত ঢেউগুলো পাড়ে ঠেকল। বিল্টুর জালে বড় কাতলা, নয়তো রুই, কালবাউস ধরা পড়ল। তামাপুকুর গ্রামে কটা গাভী গর্ভিনী হল। হাঁড় কাঁপানো ঠা-ায় সবুজের বাচ্চাটা মরল। দশ বছরের মমতায় জড়ানো ইট কাঠের দেয়াল ঘেরা মন্দির কমিটি ভাঙল। দু দুটো দল হল। আর কোন দিন সংস্কারের নানান বেড়াজাল নিয়ে আর কোনোদিন এই পুকুর গাভী বহুরাস্তার সমম্বিত পথ পেরোনো তামাপুকুর গ্রামে আসবে না। ঘটা করে সংঘ, মহাভারত নয়তো রামায়ণের তাৎপর্য, নানান মতের তাৎপর্য হবে না। অনেক অনেকে দিন কেউ আর শোনে না— ছেলেটা ভালো তো! মেয়েটা পড়েত! মেয়েটার কোথায় যেন বিয়ে হল?

নীরদ আর যায় না। কেমন যেন কুঁকড়ে গেছে। নীরদের মায়ের হাঁপানির টান বাড়ে। কোন কোনদিন নীরদ নিজেই তুলসীতলায় সান্ধ্য-প্রদীপ জ্বালায়। ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে গলায় এক নামকীর্তন গায়। তারপর রাতে শোয়। কতগুলো বিদঘুটে স্বপ্ন ভিড় করে। কতগুলো দূরাগত পদধ্বনির আওয়াজ তার দিকে আসছে। দেখে একটি শ্মশান সেখানে বাবার সাদা কাপড়। বউয়ের লাল পেড়ে শাড়ী। বুকটা ভারী ঠেকে। দেখে কালসিটে ধোঁয়া সেই রক্তিম অগ্নিময় লেলিহান জিহ্বার ধোঁয়া যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে। তারপর আগুন যত উপরে উঠতে থাকে ধোঁয়া গাঢ় অন্ধকার হয়। হঠাৎ ঘুম ভাঙে। সে শোনে গোটা কতক পাখির ডানা ঝাপটানি। সে নিজেকে শক্ত বিছানায় আবিষ্কার করে। দেখে জানালার ফাঁকে জোছনার আলো। পুরোহিত যাওয়ার পর ছেলেটা স্কুলে যায় না। একটা চায়ের দোকান দেয়। সারাদিন দেখা নেই। কোনদিন হঠাৎ চায়ের দোকান বন্ধ করে কোথায় যেন যায়। রাতে দুএকটা কথা বলে। জল নাড়তে নাড়তে ছেলেটার হাতের তালুর চামড়া ভেজা ভেজা ফ্যাকাসে দেখায়। চোখের কোণে কালি। মাঝে মাঝে বলে— বাবা ভালো লাগে না। কারা যেন এমনি এমনি খায়। টাকা দিতে চায় না। কোন কোন দিন জানতে চাইলে বলে— আজ ষাইট, নয়তো নব্বই, নয়তো একশ দশ টাকা রোজগারের। নীরদ ভাবে— অধীর পুরোহিতের এ কোন অন্তর্ধান। কোথায় গেলেন। না মেয়ের বাড়ী, ওপারে। শেষ জীবনে শুধু টাকা টাকা করল। কেউ কেউ দুচার হাজার দিলেও হতো। ভাবতে ভাবতে ভালো লাগে প্রণামীর ক’টা পয়সা চুপ করে নিজের কোমরে গুঁজবার কথা।

বছর শেষে আবার দুর্গাপূজা আসে। এবার অধীর বাহ্মণ নেই। তার ছেলে অশ্বিনী তন্ত্র ধারক। নীরদের ডাক পড়ে। সে যায়। অনেকক্ষণ চেয়ে থাকে। ঢাকের বাদ্য বাজছে। ভয়ার্ত হাতে ঘণ্টাধ্বনির টুং টাং শব্দ হচ্ছে। অস্পষ্ট মীনমীনে স্বরে মন্ত্রগুলো মন্দিরের ইঁটের দেয়ালে আটকে যাচ্ছে। নীরদ দেখে সেই একই মূর্তি দুর্গার। এবার প্রতিমার মুখটা ফ্যাকাসে। মহাদেবীর আসনে মহিষের মাথা, সাথে মহিষের শরীর। সে অনেকক্ষণ রাধা-গোবিন্দের বারান্দায় বসে। বুকটা কেমন যেন খচখচ করে। শূন্য মনে হয়। মন্দিরের এদিকে নীরব। বেলগাছের দিকে তাকায়। নীরদকে কেউ আর ডোঙা বানানোর কথা বলে না। রাধা-গোবিন্দর দরজাও বন্ধ। তার অবতারের কথা মনে হয়। কখনো শুক্লপক্ষের মহাপ্লাবনের মৎসরূপী অবতারের কথা মনে হয়। মনে পড়ে হিরণ্যাক্ষ বধের কাহিনী। মনে পড়ে  রামচন্দ্রের অকাল বোধনের কথা। কী অসম্ভব প্রগাঢ় বিশ্বাসের দিনযাপন।

ততক্ষণে জলপাই গাছটার ডালকাটা শেষ। একটা আমগাছের ডাল ঝুঁকে বাড়ীর পশ্চিমঘরের চালে পড়ছিল। ইতোমধ্যে ডালটাও কাটা হল। নীরদের মা পান সুপারী বাটল। কয়েকটি কাটা কাঠের টুকরো এদিক সেদিক পড়েছিল। অনেকক্ষণ পর নীরদ দুহাতে পাতাগুলো জড়াল। বাইরে একটা  পাতার স্তুপ হল। নীরদের ছেলে বলে ডালগুলো একেবারে খড়ি করলেই ভালো হত। ওগুলো উনুনে ভালো জ্বলে। নীরদের মা থমকে যায়। কাঁদো কাঁদো স্বরে কাঠুরের ঘর্মাক্ত হাত দুটি ধরে বলে— ওর কী হল। শুধু চা আর দোকান। এছাড়া কী কিছুই নাই। কাঠুরের মাথায় চুলগুলো ভিজা ভিজা। ঘাম ঝরছিল। লুঙ্গিটা উরু পর্যন্ত গুটানো। কালো কসকসে দাঁত বের করে একটু হাসে— ক্ষিদা লাগছে। এইতো সেই আশ্বিনের ঝড় কাটল। তারপর আরো কয়েকদিন কাটল। সকলেই ক্ষয়ক্ষতি একটু একটু করে কাটাল। নীরদ ধান, চাল এখনও সংগ্রহ করে। নতুন কিছু পায় না। সবই যেন নিঃশেষ। তবুও তার দায়িত্ব।

বৈষ্ণব নকুল কতবার টনটনে চামড়ার শির ফোলানো পায়ে হেঁটে ভিক্ষা চেয়েছে। কেউ কেউ তখন একুশ টাকা আর সোয়াসের চাউল সঙ্গে দুটি আলু দেয়। নীরদের মাঝে মাঝে ডানপাঁজর থেকে তলপেট ব্যথা করে। ব্যথাটা তীব্র হলে তামাক পাতায় চুন মাখিয়ে মুখে দেয়। কার্তিকের কাছাকাছি পড়ন্ত বিকেলে বুকে কফ জমে। আজকাল তামাকপাতা বেশি মুখে দেয়। খক খক কাস বৃদ্ধি পেলে, ছেলেটাকে জল আনতে বলে। গ্রামে ঘুরতে, পাড়ায় বেড়াতে গেলে বুকের কফটা গলায় হ্যাসফ্যাস করে। এক সময় বলে— পারি না। কাকা ঠাকুর যদ্দিন ছিলেন, তদ্দিন ছিলাম। এখন সপ্তাহে কিংবা মাসে একবারের জন্যেও মন্দিরে যায় না। সে বরং ছেলেটার চায়ের দোকানে বসে। প্রায়-ই সেখানে ঝগড়া হয়। দোকানের পাশে মারামারি হয়। কোন কোন দিন নীরদ সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসে। জেনারেটরের টিমটিম  আলোয় ঝুঁকে বসে। এবার শীতের শুরুতে সংক্রান্তির দিন আকাশে মেঘ ঘন ও জমাট হয়। দুর্ভেদ্য কুয়াশার অন্ধকার ঘনিয়ে এল, ঘন মেঘের আস্তরণ ভেদে গাছের পাতায় শিশির জমে। রাস্তা ভিজে কর্দমাক্ত হয়। স্যান্ডেল পায়ে হাঁটলে প্যাঁকপ্যাঁক কাদা লেপ্টে যায়। সেদিন মাঘীপূর্ণিমা। উত্তুরে বাতাস সন্ধ্যাকালে শিরশিরে বয়। অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি তামাপুকুর গ্রামের শেষপ্রান্তে নামযপের আয়োজন। সেখানে সাধু, ভক্ত, বৈষ্ণব, বৈষ্ণবীর উচ্ছ্বসিত ধ্বনির জোয়ারের প্রাবল্যে ভরে যায়। আজ ছেলেটার চায়ের দোকান সেখানে। অন্ধকারে নিবীড় হয়ে আসে নাম সংকীর্তনের সুর। নীরদ বাড়ীতে। নীরদের আজ খুব মনে  পড়ে, যাত্রার কথা, নিধুবাবুর শ্রাদ্ধে একটা গীতা পাওয়ার কথা। সে মাইকের আওয়াজে গান শোনে। তামাক পাতা হাতের তালুতে ডলতে ডলতে ঘরের বাইরে যায়। হঠাৎ মাইকের কীর্তন বন্ধ। শুনতে পায় না। পূর্ণিমার আলোয় নীরদের চোখ দুটো মিটমিটে জ্বলে। এই মধ্যরাত্রে কে যেন বইরের দরজাটা ঠেলে। জানালায় সজোরে ধাক্কা দেয়। তারপর স্তব্ধ, শুনশান নীরবতা। নীরদ আতঙ্কিত হয়। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চোখমুখ শুষ্ক হয়ে আসে। এখন এই পৃথিবীটা তার কাছে অপরিচিত, অসহ্য, অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য। এই নিস্তব্ধতা নির্মম যন্ত্রণাময়। বাইরে কারা ডাকে— কাকা! দরজা খোল। নীরদ শুনতে পায় কে যেন বিড়বিড় বলে— না বাড়ীতে যাব না। সারারাত চা বেচব। তার ছেলের কণ্ঠ নয়তো। নীরদের মা জোরে জোরে ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে গলায় বলে— কে এত রাতে ডাকে? নীরদ লণ্ঠনের আলোটা বাড়িয়ে দেয়। বাইরের দরজাটা ঠেলে সে পা চালায়। দেখে কয়েকটা পায়ের ছাপ। জুতার ছাপ। কারা যেন বাইরে দাঁড়িয়ে। একজনের পরনে জিন্সের প্যান্ট, অন্যজনের পরনে লুঙ্গি, চাঁদর জড়ানো। মাফলার দিয়ে মুখ বাঁধা। বলে চেনা যাচ্ছে না। একজন ওদের ঘাড়ে মাথা হেলান দিয়ে। নীরদ জোরে বলে— কে? ও কে? গোঙানির ধ্বনি পায়। পা চালায়, দেখে তার ছেলে। মাথায় ব্যান্ডেজ। নীরদকে দেখে তারা দ্রুত দৌড়ায়। ওকে দীর্ঘপথ ঘাড়ে নিয়ে আসা হচ্ছিল। রক্তে ঘাড় ভিজে গেছে। ছেলেটা ফ্যাকাসে তাকায়, কথা বলে না। বাবার ঘাড়ে হেলে পড়ে। বিড়বিড় বলে— বাবা ক’টা টাকার জন্যে! ওরা….। দুএকটা আলো জ্বলে। কয়েকটি কুকুর অমঙ্গলের ডাক ডাকে। দুচারজন শব্দ খুঁজতে বের হয়। ততক্ষণে পূর্ণিমার ঘোলা চাঁদ অনুজ্জ্বল মেঘের আড়ালে। নীরদের বুকটা হু হু কেঁদে ওঠে। বৃষ্টির বড় বড় শীতল ফোঁটা টিনের চালে অবিশ্রান্ত শব্দ হয়। নীরদ একটু চাঁদটার দিকে তাকায়। চাঁদটা মেঘের আড়ালে। সে বরং ছেলেকে নিয়ে একপা একপা করে বাড়ীর ভেতর দিকে এগোয়…।

************************************************

ভিখারিদের শহর

কবীর রানা

আমরা এতো গরীব হয়ে যাই যে ভিক্ষা করা জরুরী হয়ে ওঠে। ভিক্ষা আমাদের সকল রকম জীবিকার উপায় হলে আমরা হই ভিক্ষাজীবী। ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের সবার পেশা হয়। ভিক্ষালব্ধ জিনিসে আমরা আনন্দ পেলে ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের জীবনে, আমাদের শহরে স্থায়ী পেশা হিসাবে দাঁড়িয়ে যায়। তখন কিছুদিন পর আমরা একে বলি ভিক্ষা সংস্কৃতি। ভিক্ষা সংস্কৃতিকে বলি আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতি। আমাদের সকল পূর্বপুরুষ, সকল পূর্বনারীর ভেতর আমরা আবিষ্কার করি ভিক্ষা সংস্কৃতির নানান উপাদান। আমরা এ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত চর্চা করি এ সংস্কৃতি- ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিক জীবনে, সমাজ জীবনে, রাষ্ট্রীয় জীবনে।

আমদের শিশুদের শ্বাসকষ্ট হলে তাদের শ্বাসের জন্য বের হই শ্বাস ভিক্ষায়। এই কথা খুবই দুঃখের যে আমাদের শহরের শিশুদের হয় শ্বাসকষ্ট। তারা তো এখনো ভাষা শেখেনি, তারা তো এখনো ভিক্ষা সংস্কৃতি শেখেনি, তারা তো এখনো ভিক্ষার ঝুলি পায়নি উত্তরাধিকার সূত্রে। তবে তার জন্য আমরা আনি ভিক্ষার ঝুলি। যে ঝুলির ভেতর হাতড়ে হাতড়ে সে আবিষ্কার করবে আমাদের বিপুল সংস্কৃতি, বিপুল গৌরব, বিপুল প্রাচীন মাটি।

শিশুরা নিঃশ্বাস পেলে পড়াশোনায় খুব মনোযোগী, পড়াশোনা করে নাম্বার পেতে খুব মনোযোগী। পড়াশোনায় অধিক নাম্বার পাবার জন্য তারা নেমে পড়ে সৃজনশীল ভিক্ষায়। তাদের ভিক্ষা পদ্ধতিতে আমরা এতো খুশি যে তাদের ভিক্ষা পদ্ধতির স্বীকৃতি হিসাবে দেই নানা রকম ভিক্ষা সনদ। রাজনীতি অস্ত যাবার সময় রাজনীতি ভিখারীরা অস্ত্র হাতে ভিক্ষায় নামে। তখন কোথাও রক্তপাত, কোথাও মৃত্যুপাত, কোথাও গর্জনপাত, কোথাও গর্ভপাত, কোথাও নারীপাত, পুরুষপাত, শিশুপাত, সত্যপাত, মিথ্যাপাত। প্রেম অস্ত যেতে থাকলে, প্রেমের ভিখারীরা টিভিতে, সিনেমায়, নাটকে প্রেম ভিক্ষা করতে থাকে। বিবাহ যদি অস্ত যায়, তবে বিবাহ ভিখারীরা বিবাহ বাঁচাও, পরিবার বাঁচাও আন্দোলনে যায়। মা অস্ত যেতে থাকলে, বাবা অস্ত যেতে থাকলে মা বাচাঁও, বাবা বাচাঁও আন্দোলনে যাই। আমাদের শহরের সব কিছু অস্তায়মান কিংবা অস্তমিত হলে সূর্যকে বলি আরো একটু আলো আকাশে রাখো, দেখবো আয়নায় মুখ। বলবো আরো কিছু ভিক্ষার কথা।

গাছ যদি খাবি খায় –  তবে গাছ বাঁচানোর জন্য গাছ হাতে ভিক্ষা (সূর্য,তার নিকটে দাবী আরো একটু পরে সে অস্ত যাক)। গাছ ভিখারীরা গাছ ভিক্ষা বিষয়ে ভিক্ষা পাবার জন্য পত্রিকায় প্যারাগ্রাফ লেখে, প্যারাগ্রাফের বই লেখে, প্যারাগ্রাফের বই বের করে বিশেষ মাসে। পশু যদি খাবি খায়-তবে পশু বাঁচাবার জন্য পশু নিয়ে ভিক্ষা। পশু ভিখারীরা ভিক্ষা পাবার জন্য কখনো পশুর পিঠে চড়ে, পশু হাতে নিয়ে, পত্রিকায় পশু বিষয়ক প্যারাগ্রাফ লিখে, প্যারাগ্রাফের বই লিখে ভিক্ষায় যায়। তারা জানায় পশুই জীবন। পশু বাঁচলে আমরা বাঁচবো। কবি ভিখারীরা জানায় কবিতা কখনো অস্ত যায় না। কবিতার সা¤্রাজ্য এতো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত যে সূর্য যতো দূরেই অস্ত যাক কবিতাকে সে ডোবাতে পারবেনা। তবুও কবিতা বাচাঁবার জন্য কবিতার পত্রিকা বের করে, কবিতার উপর প্যারাগ্রাফ বের করে ভিক্ষায় যায়। কোনো কবি পুরষ্কার পেলে তাকে নিয়ে বিশেষ ভিক্ষা সংখ্যা হয়।

রাস্তায় এখন জ্যাম। ভিক্ষা জ্যাম। কতো রকম ভিক্ষাজ্যাম তার ইয়ত্তা নাই। হাজার হাজার ভিখারী ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বের হয়েছে। ভিক্ষা উৎসব। ভিক্ষা সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভীষণ ভিক্ষা সংগ্রাম। আজ আমার এই ভিক্ষা সংগ্রাম থেকে ছুটি। এই কথা এখানে বলি। সপ্তাহে একদিন আমার ভিক্ষা থেকে ছুটি। এদিন আমি নিজে ভিক্ষা না করে অন্যের ভিক্ষা দেখি। এই দিন আমি আমার দিকে তাকাই। (সূর্য আরো একটু ভালো করে আলোটুকু ধরো, আমার শরীরে। আমি আমার হাত দেখবো-কতো পুরাতন সে; অস্ত যাও। আমি আমার মুখটুকু দেখবো-কতো পুরাতন সে, অস্ত যাও। আমি আমার শরীরটুকু দেখবো-কতো পুরাতন সে; অস্ত যাও। কী ভীষণ পুরাতন আমি, ভিক্ষার ঝুলির মতো।)

আমি যাচ্ছি আমার ছেলের কাছে। এতোটুকু ছেলে আমার শিক্ষা নিতে নিতে এতো দূরে গেছে যে তার কাছে পৌঁছুতে আমাকে পাড়ি দিতে হয় এ শহরের সবগুলো জ্যামের নদী, সবগুলো জ্যামের সাগর। তারপর বলেছি একটু আগে, এখন জ্যাম, ভিক্ষা জ্যাম। এই জ্যাম শুরুর দিকে ভালো লেগেছিলো। জ্যামের ভেতর একজন হারিয়ে গেলে তার ভালো লাগে এই ভেবে যে চলার প্রতিযোগিতা, হাঁটার প্রতিযোগিতা, দৌড়াবার প্রতিযোগিতা স্থগিত।

আমাকে তো যেতে হবে ছেলের সংগে দেখা করতে। ছেলের কাছে পৌঁছানো প্রতিযোগিতার বিষয় কি-না তা আমি বুঝিনা। হতে পারে এটা একটা প্রতিযোগিতা। কারণ আমি দেখেছি ছেলের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেকে ভিক্ষাবৃত্তিকে বাদ দিতেও চেয়েছে।

হাতি হাতি বলে কেউ একজন, কিংবা তারপর অনেকজন চিৎকার করে। তবে হাতি জ্যাম সৃষ্টি করেছে। হাতি জ্যাম। জ্যামের মাথায় গিয়ে দেখি হাতি। কালো হাতি। হাতির পিঠে একজন হাতি ভিক্ষুক। হাতির পিঠে যে সিংহাসন তার উপর বসে আছে সে। হাতির পিঠে সিংহাসনে বসে ভিক্ষা করছে। হাতির পিঠে ভিক্ষা করা সবচেয়ে গৌরবের। হাতিকে ভিক্ষা না দিয়ে কেউ এই জ্যাম পার হতে পারে না। হাতির পিঠের ভিখারীর মনোহর পোশাক, মনোহর ভাষা। এ ভিখারী কতো রকম পোশাক যে পরতে পারে, কতো রকম কথা, কতো রকম ভাষা যে বলতে পারে, তা নির্ণয় করবে কে। আজ প্রথমবারের মতো খেয়াল করি হাতির দু’দিকে দু’জন হাতির সংগী ভিখারী বিউগল বাজাচ্ছে। বিউগলের ধ্বনি আমার শরীরের লুকানো সকল গুহায় পৌঁছে যাচ্ছে। আমার সাধ্য নাই আমার শরীরের কোনো ভয়ের গুহাকে লুকিয়ে রাখি। আমি আমার কতো কতো ভয়কে লুকিয়ে রেখেছিলাম আমার কতো কতো গোপন গুহায় তার কথা কে জানে। আমার স্ত্রী-যার সংগে অজ¯্র সঙ্গম আমার, সেও জানেনি আমার ভয়ের গুহার সন্ধান। আমার একমাত্র ছেলে, যাকে বলতে চাই আমার প্রাচীন কাল থেকে সূর্যাস্তকাল, সেও জানেনি সে সকল ভয়ের গুহার সন্ধান। অথচ হাতির বিউগল আমার সকল গোপন গুহার ভেতর প্রবেশ করে  তার দানবিক শক্তি নিয়ে। আমার সকল ভয় লুণ্ঠন হয়ে গেলে আমি কোথায়। আমার পোশাক কোথায়, আমার খাবার কোথায়, আমার সন্তানের দিকে যাত্রা কোথায়। আমি আমার এ সকল কিছু ফেরত পাবার জন্য সমর্পণের ভঙ্গিতে হাতি পার হতে যাই। হাতির শুঁড়ের নীচ দিয়ে যাবার সময় আমি আমার জমানো সকল ভিক্ষা তাকে দেই।

আমি যেতে থাকি। যেতে যেতে আবারো মনে হয় আমার ছেলের কাছে পৌঁছুতে আমাকে পার হতে হবে সকল প্রকার ভিক্ষা ও ভিক্ষা-জ্যাম। ভিক্ষা থেকে ছুটি নেবার পর মনে হচ্ছে ভিক্ষা-ছুটির দিনে সূর্যকে ছাতার মতো মনে হয়। আমি কি ধরনের ভিখারি তা এখানে বলে নিলে ভালো হয় এই জন্য যে এখানে এখন কিছুক্ষণের জন্য জ্যাম কম। কয়েকজন বস্তির ছেলে একটা ছেঁড়া ফুটবল নিয়ে ম্যারাডোনা-ম্যারাডোনা, পেলে-পেলে খেলছে। জ্যাম আসতে দেরি হচ্ছে বলে তারা খেলে খেলে জ্যাম তৈরি করার চেষ্টা করছে। ছেলেগুলোর কয়েকজনের শরীরে ব্রাজিলের ছেঁড়া জার্সি, কয়েকজনের শরীরে আর্জেন্টিনার ছেঁড়া জার্সি। আমি খেলা ভিখারী। খেলার নানা বিষয়ে ভিক্ষা করা আমার দায়িত্ব। এই সকল ছেলেরা রাস্তায় খেললে আমার ছুটির কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যায়। যেনো ছুটি ভেঙ্গে গেলো। কি কি জিনিস ভাঙ্গে। ঝনাৎ শব্দ হয়। ভাঙ্গন দেখা যায় না। শুধু তার শব্দ শোনা যায়। ছেলেগুলোকে জিজ্ঞেস করি তাদের বাড়ি কোথায়, বাবা কোথায়, মা কোথায়, খাবার কোথায়, পোশাক কোথায়। তারা বলে আমি ব্রাজিল, আমি আর্জেন্টিনা। এদের একজনকে তখন মনে হয় আমার ছেলে, যার কাছে এখন যাচ্ছি। আমার ছেলেকে আমি কি প্রশ্ন করবো-বাড়ি কোথায়, বাবা কোথায়, মা কোথায়, খাবার কোথায়, পোশাক কোথায়। আমার ছেলে কি বলবে-ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা; আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল।

যেতে যেতে রাস্তা পেরুতে পেরুতে আবার জ্যাম। আমি ভিখারীদের ফাঁক ফোকর দিয়ে, তাদের ছেঁড়া পোশাকের ফাঁক ফোকর দিয়ে সূর্যের আলোর মতো কিংবা মোমবাতির আলোর মতো এগিয়ে যাই। বাঘ। বাঘ নিয়ে, বাঘ দিয়ে ভিক্ষা করছে একজন। খাচাঁর ভেতর বাঘ। বাঘ খাঁচার ভেতর-এই দৃশ্য চমৎকার। বাঘ ভিখারীকে তখন আমার বন মনে হয়। বনের ভিতর বাঘ, লোকটার ভেতরে বাঘ। বাঘটা লৌহার খাঁচায় বন্দী। তার পায়ের তলায় কতো যে টাকা। এ টাকা গুনবে কে। আমাদের শহরে কতো যে ব্যাংক। সে সকল ব্যাংকে টাকা গোনার কতো যে টাকা ভিখারী। বাঘটার গর্জন শুনতে ইচ্ছে হলো আমার। বাঘটার গর্জন শোনার জন্য আমি আমার সকল পোশাক তাকে দেবার প্রতিজ্ঞা করি মনে মনে। তারপর বাঘের গর্জন শোনার ইচ্ছা থেকে নিজেকে সংযত করি। কোথাও তো শুনেছিলাম বাঘের গর্জনে জননেন্দ্রিয় খসে পড়ে। আমি আমার জননেন্দ্রিয় হারাতে বা খসাতে না চাইলে প্রার্থনা করি যেনো সে বাঘ গর্জন না করে। কিন্তু কি যে দুর্ঘটনা। সে সময় একবার গর্জন। কার গর্জন-বাঘটার কিংবা বাঘের সাহায্যে যে ভিক্ষা করছে তার। কেউ একজন ভিক্ষা না দিয়ে বাঘের খাঁচা অতিক্রম করছিলো। তাকে ধরা হলো। অপরাধী সে। ভঙ্গ করেছে সে ভিক্ষার নিয়ম। তার পোশাক ও পোশাকের অভ্যন্তরে যা কিছু ছিলো সবই বাতিল করা হলো। ভিক্ষার যে আইন, ভিক্ষার যে বিধি তার বাইরে পালাবে কোথায় সে। শত শত বছরের পাথরে লিখিত প্রাচীন ভিক্ষার আইন ভাঙবে কি করে সে। তারপর ছাড়া পেয়ে নগ্ন হয় দৌড়ে গেলো। কাছাকাছি কোনো একটা গোরস্থানের দিকে, যেখানে গতকাল তার স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা বাস ভিখারীদের চাকার তলায় চাপা পড়ে এই গোরস্থানে পালিয়ে আছে। তার পালানোর দৃশ্যটা দেখে আমার ভীষণ মজা লাগে। গোরস্থানটাকে আকাশ মনে হয়। যে আকাশে না যাবার জন্য মানুষ কতো রকম পালানো শেখে। গোরস্থানের প্রতি আমার ভীতিটা দূর হয় যখন তাকে মনে করি আকাশ। গোরস্থানকে ভয় পেয়ে পেয়ে আমার কতো যে কাজ ভেঙ্গে গেছে।

আমি গোরস্থান পার হতে গিয়ে আকাশপন্থী এক ভিখারীর জ্যামে আটকা পড়ে যায়। তার হাতে আকাশ। যদিও আমি দেখতে পাইনা তার হাতের আকাশ। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি আকাশ কি? সে কোনো উত্তর না দিলে আমি তাকে বলি আকাশ কি পালিয়ে যাবার রাস্তা। আকাশ কি আমার শরীর, যে শরীর আমি কখনো আয়ত্ব করতে পারবোনা। কিংবা আকাশ বন্ধুর বেশে আমার শত্রু, যাকে ভয় পাবো চিরকাল। আকাশপন্থী-ভিখারীটা হাসে। আমার তখন আকাশকে মনে হয় নির্বোধ শূন্যতা। যে শূন্যতা আমি নির্মাণ করতে পারি আমার দুই করতলে। তবে তার হাসির ভেতর বিদ্রুপ থাকে, অবজ্ঞা থাকে, অহংকার থাকে। সে বলে আকাশ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অতো সহজ নয়। আমি তার পোশাকের দিকে তাকাই। তার পোশাকে পাখির ইঙ্গিত। কিন্তুু ভিক্ষা করতে করতে তার পেট এতো মোটা হয়েছে যে তার কখনো পাখি হওয়া হবেনা। আকাশে যাওয়া হবেনা। শুধু আকাশ বিষয়ে সবাইকে বিভ্রান্ত করা হবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, তার সাধনা কি পাখি হবার। সে আমার কথা শুনতে পায় না। কারন গোরস্থান তাকে আহবান করছে। তার তো তখন পেটে ক্ষুধার দরুন গর্জন। সে আমার নিকট থেকে প্রায় জোর করে টাকা নিয়ে চলে যায় মাটির সেখানে, যেখানে খাদ্য উৎপাদন হয় আকাশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। আর আমি এগিয়ে যাই আমার ছেলের বিদ্যালয়ের দিকে।

আমি হাঁটতে থাকি। আমার ছেলের কাছে আমি না যেতে পারলে আমার আজকের ছুটিটা বাতিল হয়ে যাবে। আমার চিরকালের ছুটিটা বাতিল হয়ে যাবে। আমি তো তখন বাবা নই। শুধুই ভিখারী। ছুটি না থাকা ভিখারী। আমার আবারো মনে হয় আমার ছেলে কেনো যে এতো দূরের বিদ্যালয়ে পড়ে। হয়তো ছেলেদের বিদ্যালয় সব সময় বাবাদের থেকে মায়েদের থেকে দূরেই থাকে। আমি যে বিদ্যালয়ে পড়তাম সে বিদ্যালয় আমার বাবা-মা থেকে এতো দূরে ছিলো যে আমার বাবা-মা কখনো আমার বিদ্যালয়ে যেতে পারেনি। একবার যেতে যেতে পথ হারিয়ে ফেলেছিলো এবং আমি পড়াশোনা শেষ করে ফেললে আমার বাবা-বা বুঝতে পারেনি আমি কি বিদ্যা অর্জন করেছি কিংবা কি বিদ্যার গর্জন শিখেছি সে বিদ্যালয় থেকে। গর্জন শেখা পড়ার সংগে মনে এলো, মনে আসে কতো সব বনের গর্জনের কথা। বাবা বলতো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পড়াশোনা কতো বদলে যায়। এক খ- মেঘ যতো দ্রুত আকাশ বদলায় পড়াশোনা তার চেয়ে দ্রুত বদলে যায়। তাই আমার পড়াশোনা বাবা-মা কখনো বুঝতো না। বাবা-মা’র এই চিন্তার ভেতর টের পাই একটা পাতিলের ভেতর কতোটা শূন্যতা থাকে। বাবা-মা তাদের মাঠে যাচ্ছে-ফসল খুঁজে পাচ্ছেনা। বাবা-মা তাদের বৃক্ষের নীচে যাচ্ছে- ছায়া খুঁজে পাচ্ছে না। রাত গভীর হলে – যখন বাবা-মা চোখের জল জমা রাখার স্থান পায় ; ঠিক তখন তারা বলে অন্ধকারকে-বিদ্যালয়গুলো ছেলে ধরা, মেয়ে ধরা। তারা কোথায় যে ছেলে-মেয়েগুলোকে ধরে নিয়ে যায়।

হাঁটতে থাকি। হাঁটাকে আর হাঁটা বলতে ইচ্ছে হয় না। হাঁটাকে ভালো লাগেনা। হাঁটাকে এতো পুরাতন মনে হয় যে ফেলে দেই এই সকল হাঁটাকে।  কিন্তুু হাঁটাকে কোথাও ফেলা না গেলে হাঁটতেই থাকি। হাঁটার ভেতর একজন বাঁশি ভিখারী তৈরি করেছে বাঁশি জ্যাম। হাতে তার কালো বাঁশি। হতে পারি তা বাঁশের, হতে পারে তা ধাতুর। বাঁশির সাহায্যে সে ভিক্ষা করছে। বাঁশিওয়ালা বলছে বাঁশির ইতিহাস, ভিক্ষার ইতিহাস। যুগে যুগে কিভাবে বাঁশি নিয়ে বাঁশি দিয়ে ভিক্ষা করা হয়েছে। তা জানায় সে। সে জানায় পৃথিবীর সবচেয়ে কম রক্তপাতহীন ভিক্ষা করার মাধ্যমে বাঁশি। বাঁশির কথা বলতে বলতে সে বিমূর্ত কথা বলতে থাকে। সে বলে বাঁশি বিমূর্ত সৌন্দর্য সৃষ্টি করে আমাদেরকে আমোদিত করে। বাঁশি মানুষের আত্মা থেকে ভিক্ষা আনয়ন করতে পারে। বনের পশু, পাখি, গাছ বাঁশিকে ভিক্ষা দেয়। এই বাক্য খুব হাস্যকর। তবুও এটা বলার পর আমার মনে হলো কোথাও পাখির ডাক শোনা গেলো, পশুর ডাক শোনা গেলো, গাছের পাতা পতনের আওয়াজ শোনা গেলো। বাঁশি ভিখারীর গল্পটা ভালো লাগে। তার গল্প মিথ্যা। কিন্তুু মিথ্যার চেয়ে মধুর আর কী-ই বা হতে পারে। তাকে ভিক্ষা দেই। আমার কী-ই-বা পকেট। আর সে পকেটে কী-ই-বা থাকে। আমার ছেলের জন্য নিয়ে যাচ্ছি কয়েকটা চকলেট। সেখান থেকে একটা চকলেট তাকে দেই। সে হাসে। সে বলে এই বয়সে ভিক্ষা হিসাবে চকলেট গ্রহণ করে কি করবে সে। তার তো চকলেট ভিক্ষা নেবার বয়স নেই। তাছাড়া তার বাড়ির কারুরই চকলেট চোষার জিভ নাই।

হঠাৎ খেয়াল করি পথের মাঝখানে একজন মেয়ে। প্রথমে সমস্যা এই যে কি রকম ভিক্ষা পদ্ধতি এটা। এই মেয়েটাকে আমি প্রথমে ভিখারী হিসাবে বুঝিনি। কিন্তুু তার চারপাশে এতো দানকারী দাঁড়িয়ে যে আমার ভ্রম কেটে যায়। মেয়েটি হাসি খুলছে। হাসি বন্ধ করছে। মেয়েটি পোশাক খুলছে। পোশাক বন্ধ করছে। কি বিষ্ময় যে মেয়েটা হাসি দিয়ে, পোশাক খোলা ও বন্ধ করা পদ্ধতিতে ভিক্ষা করে এতো আয় করেছে যে টাকা উড়ছে এদিকে-ওদিকে। আমি ভুলে যেতে থাকি কোথায় যাচ্ছি, কেনো যাচ্ছি। মেয়েটি আমার উদ্দেশ্য ভুলিয়ে দিলে আমি তবে পিতা নই, আমি তবে গন্তব্যহীন। আমার এ সময় যেতে ইচ্ছে করে পোশাকের বাইরে। পোশাকের বাইরে যেতে যেতে একটা বাগান। সে বাগান আমার বাবার, তার বাবার; তারপর পেছনে যেতে যেতে যদি আর না যাওয়া হয়, পড়ে যেতে হয়, তবে ফিরে আসি পোশাকের ভেতর, রাস্তার ভেতর।

হাঁটতে হাঁটতে রাস্তাটাকেই এক সময় ভিখারী মনে হয়। এ শহরে এমন কোনো রাস্তা নাই যেখানে ভিখারী নাই। পায়ের তলার রাস্তার ধুলা, ধুলার ভেতরে সবার পায়ের ছাপ, সবাই ভিখারী, এই ভিখারী রাস্তা, এই ভিখারী রাস্তার ধুলা আমাকে ভিখারীর নিকট ছাড়া কোথাও নিয়ে যেতে পারবে না। এখন এরকম চিন্তা-এ শহরের আমি যে পৃষ্ঠায় যাবো সে পৃষ্ঠায় ভিখারী। যখন আমি লিখছি এ শহরের ভিক্ষা ও ভিক্ষুকের ইতিহাস।

অতঃপর ধুলায় ধুলায়, ধুলা পার হয়ে আমি আরেক ভিখারীর নিকট আসি। আমি বুঝে যাই আমার সন্তান যে বিদ্যালয়ে পড়ে সেখানে যেতে হলে পাড়ি দিতে হবে এ শহরের সকল ভিখারী, সকল ভিখারী পথ।

ছবি নিয়ে ভিক্ষা করা এক বিশাল ভিক্ষুক দলের সংগে আমার দেখা হয়। এতো দেরী করে কেনো তাদের সংগে দেখা হলো তা বুঝিনা। তারা তো শহরের সবচেয়ে প্রশস্ত পথ, প্রশস্ত পত্রিকা, প্রশস্ত বই, প্রশস্ত বিদ্যালয়, প্রশস্ত মহাবিদ্যালয়, প্রশস্ত বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশস্ত ক্ষমতা, প্রশস্ত ধর্ম, প্রশস্ত নদী, প্রশস্ত সমুদ্র দখল করে ভিক্ষা করছে। তাদের হাতে কতো রকম যে ছবি। সে সকল ছবি আমাকে বলে, ম্যান ইজ ইমমর্টাল। মানুষও অমর অলিম্পাস পর্বতের অধিবাসীদের মতো। তারপর মনে আসে পাহাড়ও ভিক্ষা করে, মৃত্যুর পর। সমুদ্রও ভিক্ষা করে, মৃত্যুর পর। সকল বিরাট পুরুষও ভিক্ষা করে মৃত্যুর পর। এ সকল ছবি কতো প্রাচীন, যখন পাথর অস্ত্র হয়েছে। রক্ত,রক্ত,রক্ত। এ সকল ছবি কতো প্রাচীন, যখন আগুন জ্বলছে গুহার ভেতর। ভস্ম,ভস্ম, ভস্ম। আমি ভিক্ষা দেই অস্ত্রকে, রক্তকে। আমি ভিক্ষা দেই আগুনকে, ভস্মকে। আমি ভিক্ষা হিসাবে দেই আমার অবনত মস্তককে। আমি ভিক্ষা হিসাবে দেই আমার বেঁচে থাকাকে। ছবি থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে আমি আমাকে খুঁজে পাইনা। এতো ভিক্ষা দিলে আমি কোথায়। আমি তবে ভিক্ষা হয়ে ভিক্ষার পাত্রে।

একটা গাছ। প্রাচীন পাহাড়ের মতো উঁচু। আমাদের শহরের ভেতর  কোথা থেকে এলো। আমি তার দয়ার নিকটে গিয়ে বলি, আমাকে খুঁজে দাও। গাছ উত্তর দিলো, কিংবা ছায়া উত্তর দিলো কিংবা কিছুই দিলো না উত্তর। আমার তো শরীর ফেরত পেতে হবে। নতুবা কিভাবে যাবো আমি আমার ছেলে কাছে। আমি তো এখন ভীষণ ক্রন্দন । আমি কিভাবে একটা মানুষ থেকে ভিখারী মানুষ, ভিখারী মানুষ থেকে ক্রন্দন হয়ে যাই জানিনা। তবে কি আমার ভিক্ষা দেবার সকল কিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে। ভিক্ষা দেবার ক্ষমতা না থাকলে কি একজন ব্যক্তি শরীর হারিয়ে রূপান্তরিত হয় একবিন্দু অশ্রুতে, এক বিন্দু ক্রন্দনে। আমাকে অশ্রু থেকে, ক্রন্দন থেকে ফিরে আসতেই হবে। আমার তো ছেলে আছে; তার জন্য তার সংগে দেখা করার জন্য আমার শরীরকে ফিরে পেতে হবে। আমার ছেলেতো চেয়েছে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়, তার বাবা পৃষ্ঠা থেকে বই থেকে একবার, অন্তত একবার শরীর হোক।

পাতা নড়ে, ছায়া নড়ে। পাতা পড়ে, ছায়া পড়ে। আমার অশ্রুর ওপর, আমার ক্রন্দনের ওপর। আমি হয়তো শরীর ফিরে পাই। আমার সমস্ত অশ্রু, সমস্ত ক্রন্দন গাছটিকে দিয়ে শরীর নিয়ে বেরিয়ে আসি পুনরায় শহরের ভিখারী রাস্তায়। আমার শরীরে এ সময় সামান্য পোশাক, যা কেবল আমার জননেন্দ্রিয়কে আবৃত করে রেখেছে। এবার মগ হাতে এক ভিখারীর সংগে দেখা হয়। তাকে দেখে মনে হয় যেনো সে কাকের ঠোকর খাওয়া এক শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার শরীরের দিকে তাকায়। জিজ্ঞেস করে কোনো কাকের আক্রমনের শিকার কী-না  আমি। তারপর সে আমাকে চায় তার সংগী হিসাবে। এই চাওয়াতে আমি আমার শরীর ফিরে পাই আরো নিশ্চিতভাবে। ভিখারীর এই চাওয়ার ভেতর অনুভব করি আমার শরীর আমার জলে সাঁতার কাটছে। আমি দৌড় দেই। হতে পারে সাঁতার দেই। দৌড়াতে দৌড়াতে, সাঁতরাতে সাঁতরাতে আমি পার হই আমার বিবাহ। কিংবা কি-যে পার হই আমি আমার শহর, আমি আমার ছেলে।

আমি এখন আমার ছেলের বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে। বিদ্যালয় ফাঁকা ফাঁকা লাগে। গেটম্যানকে জিজ্ঞেস করে জানা হয় আজ এ বিদ্যালয়ের সবাই গেছে শিক্ষা ভ্রমণে। সে জানায় হাতি নিয়ে, বাঘ নিয়ে, ছবি নিয়ে তারা এখন শহরের রাস্তায় রাস্তায় জ্যাম সৃষ্টি করছে, ভিক্ষা সৃষ্টি করছে।

************************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা