পত্রিকা-আলোচনা

[স্পর্ধা সবসময়ে ॥ হাবীব ইমন সম্পাদিত ॥ প্রচ্ছদ ॥ রফিক উল্যাহ ॥ বর্ষ ০৯ ॥ সংখ্যা ০১ ॥ বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২০ ॥ ঢাকা] 
বাছাইকৃত ফুলের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে স্পর্ধা সবসময়ের পসরা। প্রতিটি ফুলের সৌন্দর্য ও সৌরভে মোহিত হতে হয়। বাংলা ভাষা, লোকসাহিত্য, বর্তমান প্রেক্ষাপট, কথোপকথন, কিছু কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ছড়া, গল্প, অভিজ্ঞতা ও সমাজ বাস্তবতার কিছু চিত্র ফুটে উঠেছে দ্রোহকালের এই সাহিত্য কাগজে।
বিপ্লবী বিনোদবিহারীর উক্তি পত্রিকাটিতে প্রাণচাঞ্চল্য এনেছে। ধর্মের কল যে বাতাসে নড়ে না কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় তা ফুটে উঠেছে। বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনপূর্বক হাসান আজিজুল হক বলেছেন যে বাংলা ভাষা টিকবে। অর্থাৎ এ ভাষা লুপ্ত হবার কোন সম্ভাবনা নাই। যদিও আলেকজেন্ডারের রোসোডিনিয়া, যিশুর আরমাইক ভাষা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাছাড়াও কিছু ভাষা যে বিশ্ব দরবারে অধিক সমাদৃত তাও এই প্রবন্ধে তিনি আলোকপাত করেছেন। যেমন বর্তমান বিশ্বে চীনা ও ইংরেজি ভাষার কদর অনেক বেশি। আত্মকথনে হেলাল হাফিজ ‘ঘরছাড়া’ শিরোনামায় তিনি তাঁর কবি হওয়ার কথা, কষ্টে নিঃসঙ্গতা তাকে কিভাবে কবি করে তোলে তার বর্ণনা দিয়েছেন। নষ্ট নগ্ন গেলে তুমিই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে/ সুকঠিন কংক্রিটে জীবনের বাকি পথ হেঁটে যেতে যেতে/ বারবার থেমে যাবে জানি/ “আমি” ভেবে একে তাকে দেখে। হেলাল হাফিজ যে কষ্টের প্রেম পড়ে কবি হয়েছেন তা এখানে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। স্বকৃত নোমান তার শোনা পৌত্র, আমিও গণজাগরণে জেগে উঠেছিলাম যা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তা মূলত যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার ন্যায়বিচারের পক্ষের কিছু কথা। যা আমাদের মাতৃভূমির প্রতি প্রেম, ভালোবাসাকে এবং মাতৃভূমির বিপদ তথা সংকটকালে প্রাণ সঞ্চারণে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ‘সাধু বাংলা ও চলিত বাংলা’য় সলিমুল্লাহ খান দেখাতে চেয়েছেন যে বাঙালির মধ্যে সাধু ভাষার বাংলা ও চলিত ভাষার বাংলার আগমন কিভাবে ঘটলো। এক্ষেত্রে তিনি শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, প্রমথনাথ বিশী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি তুলে ধরে এ ভাষার আগমন নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন। মূলত ভাষারীতির ব্যবহার আমরা কিভাবে করতে শিখলাম তাই প্রকাশ পেয়েছে এ প্রবন্ধে। লোকসাহিত্য অংশে কাজী মোঃ মনছুরুল হক খসরু ‘চৌধুরীর লড়াই নোয়াখালীর প্রাচীনতম লোকসাহিত্য’ শিরোনামে নোয়াখালী অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী একটি লোকশিল্পের বর্ণনা দিয়েছেন যা আমাদের লোকসাহিত্য সম্পর্কে প্রগাঢ় জ্ঞান অর্জনে আকৃষ্ট করে। ফকির ইলিয়াস কথোপকথন করেছেন প্রবাসে বসবাসকারী পঞ্চশ দশকের কবি শহীদ কাদরীর সাথে। তিনি অবাক হয়েছেন তাঁর বাঙালির প্রতি বাঙালির ভালোবাসায়। প্রেম যে চিরন্তন কোন বিষয় নয় তা তিনি মনে করেন। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট, প্রেম ভালোবাসা, রাজনৈতিক পরিবেশ, কল্পিত চিঠি, মুক্ত পদ্য, অনুবাদ কবিতা নিয়ে সাজানো হয়েছে কবিতার অংশটি। হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘বাঘ দিবস’ গোলাম কিবরিয়া পিনুর ‘মর্মবেদনার অধ্যায়’ আনিসুল হকের ‘গন্দমের কথা’, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘উলুবনে বনলতা’, কাজল চক্রবর্তীর ‘নিজের মত’, কাবেরী গায়েনের ‘রক্ত আমাদের আল্পনার ছন্দ’, আখতারুজ্জামান আজাদের ‘ইতিহাস’, রহমান হেনরীর ‘লিবিয়ান বন্ধুদের উদ্দেশ্যে একটি রচনা রূপকল্প: ২০২১’, মজনু শাহর ‘আমার কাদের বক্স’ মুক্তি ম-লের ‘নিজস্ব কফিনের ছায়া’, মিতুল দত্তের ‘টাইম মেশিন’, সুমন সুপান্থর ‘বৃত্তান্ত’ আলোড়ন খীসার ‘কোচপনো’, প্রণব আচার্য্যর ‘আমরা অভিনয় শিখিনি মেঘ ধূসর বিপ্রতীপ’, মোয়াজ্জেম হোসেন আরমানের ‘পরান মাঝি হাঁক দিয়েছে’, নির্ঝর নৈঃশব্দের মুক্ত পদ্য, ক্রিস্টোফার ওয়াকিবোর কবিতা অনুবাদ করেছেন চারু হক, মোতাকিম রাহী অনুবাদ করেছেন দুর্গপ্রসাদ মালার কবিতা। ঝুলে আছি সামান্য বোটায়/ঝড়ে বা বাতাসে ঝরবনা/ তুমি যদি বলো তবে বোটা থেকে নেমে আসব/ধরার ধূলিতে কথক জানাচ্ছি সব, আমি হলাম চাষার ছেলে/জানাচ্ছি সব, মায়ের নাম আগুর বালা/ জানাচ্ছি সব এক একে বইখাতা সব ফেলে/ জানাচ্ছি সব কত পালিয়ে যাত্রাপালা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যে দুই যুগের আন্দোলনের ফসল তাতে বামপন্থি রাজনীতি সে কতোটা ভূমিকা পালন করেছে তা নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ কেবল নয় মাসের ছিল না’ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তাঁর লেখনীতে কমরেডদের আত্মত্যাগের কথা আলোকপাত করেছেন। ‘রুঝটের ঝোল’ নামক গল্পে শামীম আজাদ বর্তমান নগর গড়ে ওঠার কথা আলোকপাত করেছেন। সমাজ ব্যবস্থা কীভাবে গুড়িয়ে যায় তা বর্ণনার পাশাপাশি তিনি এই নগরের সৌন্দর্য ধরে রাখার কথা আলোকপাত করেছেন। মিলটন রহমান তাঁর ‘মুরালী’ নামক গল্পে মুরালী নামক বাদ্যযন্ত্রকে রূপক অর্থে ব্যবহার করে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করার প্রয়াস পেয়েছেন। জানি আমি (অমিত্রার চিঠি) তে হুমায়রা হারুন স্মৃতিচারণ করেছেন অতি সন্নিকটের অতীতকে। যা আসলে এখনো অনুভূতিতে বর্তমান। পেনফ্রেন্ডের সাথে দেখা হলো কথা হলো, ভবিষ্যতে অনুভব করার মতো স্মৃতি হলো তারপর অকালপ্রয়াণের মাধ্যমে চিরদিন বেঁচে থাকলো অমিত্রার অনুভবের সেই মানুষটি। ওয়াসি আহমেদের ‘উদ্ধার-পুনরুদ্ধার’ গল্পটি তহুরা নামক এক মেয়ের স্বপ্নভঙ্গের কথা উঠেছে। যে কিনা ছোট বোনকে খুশি করতে জামা-স্যালোয়ারের সাথে জর্জেট শাড়ি কিনেছে, মায়ের চিকিৎসার জন্য ওভারটাইমের টাকা এনেছে। আর তার যাবতীয় স্বপ্ন ভেঙে ফেলে পৈশাচিক মানুষেরা। যাদের উদ্ধারকারী মনে হলেও তারা প্রত্যেকেই অনিষ্টকারী, জানোয়ার, মানবিকতাবোধ বর্জিত ধর্ষক। রুমানা বৈশাখী তার ‘জনৈকা সুরাইয়া হিজরা এবং একটি সরল সম্বোধন নামক গল্পে স্বপ্ন বিস্তরে হিজরাদের জীবন কাহিনী, তাদের কষ্টের কথা, বঞ্চিত হবার কথা বিস্তরভাবে তুলেছেন। হিজরা হলেও যে তাদের মাঝে মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব থাকে তারাও যে সমাজের অংশ সে কথাটা রুমানা বৈশাখীর লেখাতে স্পষ্ট। শরীফ নিঝামের ‘সাবিতারা যদি ফিরে আসে’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধকালীন হিন্দুদের নির্যাতন ও তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাবার কথা উঠে এসেছে। তারা কি প্রাণের বাংলাদেশকে ভুলতে পেরেছে? পার্ল এস বাক-এর গল্প অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ আজিজুল হক, ‘রিফিউজি’ নাম দিয়ে গল্পটিতে এক বৃদ্ধের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কথা উঠে এসেছে। তার শেষ সম্বল নাতিকে নিয়ে সে কিভাবে পথ চলবে তারই ভাবনা চিন্তায় প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কথা উপস্থাপিত হয়েছে গল্পটিতে। কাজী নাসির মামুন তার ‘বাংলাদেশের কবিতার প্রান্তজন এবং ঐতিহ্যের প্রেরণা’ নামক প্রবন্ধে উর্বর এই বাংলাদেশের কবিতার সমৃদ্ধি ও তার কারণ দেখিয়েছেন। চর্যাপদ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের কবিতা কত সমৃদ্ধ ও বিচিত্র তার প্রমাণ মেলে এই প্রবন্ধে। ‘যখন জমবে ধুলা তানপুরাটার তারগুলায়’ হাবীব ইমন শ্রদ্ধাঞ্জলিতে কবি ফারুক মোজাম্মেল হককে স্মরণ করেছেন। অফুরন্ত যৌবনের মাঝে তিনি বেঁচেছিলেন আর শক্তিমান পুরুষ হিসেবেই তিনি চলে গেছেন তাঁর কীর্তি রেখে। দেশের নানা পরিস্থিতির কোন বিশেষ সময়ের চিত্র রঙতুলিতে ফুটিয়ে তোলাই শিল্পীর কাজ। এমনই শিল্পীগণের কার্যের ইতিহাস নিয়ে সাজানো ফারহানা মান্নানের ‘চল্লিশ থেকে শাহবাগ : দ্রোহের শিল্পকলা’। ছড়া অংশের অ্যালেক্স আলীম, লুৎফর রহমান রিটন, হাসান আল আব্দুল্লাহ, রনজু রাইম ছন্দবদ্ধতায় বিনোদবিহারীকে স্মরণ, পোশাক শ্রমিকের অধিকার, রাজনৈতিক চালবাজি, রাজনীতি করতে নিজের বিবেক বিসর্জনের কথা বলেছেন। ফজলুল হক সৈকত, ‘সৈয়দ শামসুল হকের উত্তরবংশ বিজয়ভাবনার নতুন অধ্যায়’ কাব্যনাট্যের আলোচনায় সৈয়দ শামসুল হকের ‘উত্তরবংশ’ নাটকের মঞ্চায়ন ও নাটকের কাহিনির বর্ণনা দিয়েছেন। এ নাটকটির মধ্য দিয়ে রাজনীতিবিদ, তার কন্যা আর রাজনীতিক বন্ধুর কথা উঠে এসেছে। বাউল ঋতু তার হৃদকথন ‘চিহ্নমেলায়…’ এর স্মৃতি নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে সেই মিলন মেলায় উপস্থিত হওয়া কবি, সম্পাদক, পাঠকের সাথে কথোপকথন, মেলার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে, ভালোলাগার বিষয় এবং অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে ফেরার কথা বলেছেন।
স্পর্ধা সবসময়ের শুধু একমুখী রাজনীতির বিষয়গুলো এখানে কী হিজিবিজি সখ্য গড়ে তুলেছে? বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে সম্পাদকের পরিশ্রমের সাক্ষ্য আছে। এক দশকে পা রাখতে যাওয়া পত্রিকাটি হয়ে উঠুক বর্ষীয়ান। [দীপ্ত উদাস]

[অতঃপর শব্দায়ন ॥ যোবায়ের শাওন সম্পাদিত ॥ প্রচ্ছদ ॥ রাশিদুল আমিন ॥ প্রথম সংখ্যা ॥ প্রকাশকাল ॥ মার্চ ২০১৩ ॥ রাজশাহী]
যোবায়ের শাওন সম্পাদিত কাগজ অতঃপর শব্দায়ন-এর মধ্যকার নতুন মগজের নতুন চিন্তা ধারার নতুন কলমধারিদের যে কবিতাগুচ্ছ প্রকাশ করেছেন তা ব্যস্তময় জীবনে পথচলার মুহূর্তে সেদিন থমকে দাঁড়িয়ে একটুখানি পাঠ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমিতো বিস্ময়ে আপ্লুত হওয়ার উপক্রম হয়ে গেলাম। মনে পড়ে গেল সমালোচক দেবেন্দ্র বিজয়ের কথা যে, ‘সাধারণে যা দেখতে পাওয়া যায় না, যাদের শক্তি বলে কেবল কবির জ্ঞান চক্ষে প্রকাশ পায় তা সাধারণ কে দেখাতে হয়, তার যথার্থ মর্মার্থ বুঝাতে হয়। যা লোকে দেখিয়াও দেখেনা বুঝিয়াও বোঝেনা, কবি তা বুঝিয়ে দেয় ধ্যানে জ্ঞানে ভাবনার আলোকে’। যার প্রচেষ্টা নতুন সময়ের উঠতি বয়সের মোমের বাতিরা অতঃপর শব্দায়ন ছোটকাগজে দেখাতে চেষ্টা করেছেন। যা ভাবিয়ে তোলে, ভাবনা করার মতো। তারপরও কিছু কথা থেকেই যায় যা প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে, বাস্তবে, বিশ্বাসে, দর্শনে যার সাথে কিছু কিছু কথা বা বিষয়ের দ্বন্দ্ব বেধে যায়। একসময় অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন : ‘যথার্থ সমালোচনা বন্ধন নয়, মুক্তি’। ম্যাথু আর্নল্ড বলেছেন : ‘ওহঃবষষবপঃঁধষ ফবষরাবৎধহপব’ সার্থক সমালোচনা তাই যা মুক্তির সহায়ক। সে ক্ষেত্রে আমি মোটেই পারদর্শী নই। অসংখ্য গুণী গুরুজনের জ্ঞানের সাগরে ক্ষুদ্র কীট বা একরকম হয়ত বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে বজ্র আঁটুনির ফসকা গেরোর মতোই অতঃপর শব্দায়ন নিয়ে তার ভিতর বাহিরের কথা কেমন, কিরূপ তা লিখতে বসেছি। সম্পাদকের কথাগুলো পড়েছি, মনে হয়েছে নতুন কোন এক দাবি আদায়ের মানসে পুনরায় স্বাধীনতার আন্দোলনে বুঝি পা রাখলাম। ধৈর্যের বাধ মানছিল না এর শেষ কি হয় দেখার জন্য। তাই হাতের লক্ষ্মী পায়ে না ঠেলে তাড়াতাড়ি কবিতার মালঞ্চবনে প্রবেশ করলাম। সম্পাদকের কথা, বিষয়বস্তু নির্ধারণ, রঙতুলিতে কাগজের প্রচ্ছদ অংকন, কিছু কিছু কবির কবিতা, ধ্যান-ধারণা সম্ভাবনার আলো দেখিয়েছে। যদিও সম্পাদকের বানানভুলের মধ্য দিয়েই কবিতায় প্রবেশ করার লগ্নে হোঁচট খেলেও আবার দাঁড়িয়ে ভিতরে কি হয়, কি হয়, ভাবতে ভাবতে কবিতার সপ্তমে চড়ে বসলাম। পাঠ করলাম নতুন কবিদের নিরানব্বুয়ের ধাক্কাগুলো। যা হোক, এখানে কিছু কবিতায় মাত্রাবৃত্ত ছন্দের তাল, লয় ঠিক করতে গিয়ে মাত্রা সংখ্যা বেমালুম ভুলে গেছে, হয়তবা কবির এটা নিজস্ব ঢং, সম্পাদকের বাহাত্তরে ধারা অথবা বচনবাগীশতার ফলে ‘অতঃপর শব্দায়ন’ কবিতা পা-ুলিপির মধ্যকার অনেক কবিতা ভাষাবাহুল্যে দোষদুষ্ট। মনে হয়েছে তা যেন ধান ভানতে শিবের গীত। কবি তাঁর কবিতায় পটের বিবি করতে গিয়ে ‘দ্রোহ এবং অন্যান্য, তুমি যেদিক থেকেই আসো সামনে শাহবাগ, আব্বু ঘরে আসো, মুহূর্তের কারাগার থেকে বলছি’ কবিতাগুলিতে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির অপব্যবহার,   বাস্তবতার নিরীক্ষণ এলোমেলো, শব্দচয়নের অসাবধানতা, রং-ঢং একরকম ধর্মের ষাঁড়ের মতো ব্যবহার হয়েছে। বহু কবিতায় ব্যাপকতর বানান ভুল লক্ষ করা যায়। ণ-ত্ব বিধান ষ-ত্ব বিধান, শ, স, ই কার, ঈ-কার ও র, ড় এর বানানবিধির অপব্যবহার ও ভুল পরিলক্ষিত। এ কথা সকলের জানা যে, অনুভূতি সেই তীব্রতা ও বিশুদ্ধি যা কবিতার সমস্ত অপ্রীতিকর উপাদানও মাধুর্যপূর্ণ করে, সেখানে অশুদ্ধ শব্দ একটি কবিতাকে রস আস্বাদনের পথ থেকে শুধু বিরতই করেনা বরং কবিতার যোগ্যতাকেও হারিয়ে ফেলে। কীটসের মতে : ‘ওহঃবহংরঃু ড়ভ ঢ়বৎপবঢ়ঃরড়হ রহ যিরপয ধষষ ফরংধমৎববধনষব বাধঢ়ড়ৎধঃব’. প্রমথ চৌধুরীর ভাষায় : ‘কবিতার মূল বিষয়, ভাব ও ভাষা। ভাবের অনুরূপ ভাষা প্রয়োগেই যথার্থ কবিত্বশক্তির পরিচয়’Ñ ‘অতঃপর শব্দায়ন’-এ খুব বেশি লক্ষ করা যায় না। তবে একথা অস্বীকার করবার সুযোগ নেই যে, ‘অতঃপর শব্দায়ন’-এর নতুন কবিমুখরা তাঁদের লেখায় যে চেতনার প্রয়াস ঘটিয়েছেন তা একবিংশ শতাব্দীর প্রকৃত আলোর পথ। ৪১ বছর ধরে সাধারণ মানুষের মনের যে আকুতি, যে বাসনা, শাহবাগের আন্দোলন, দাবির কথা যে ভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা করেছে তা প্রশংসনীয়। বিষয়বস্তু ভাল। বাংলাদেশের প্রত্যেক রাজাকার বিচারপ্রার্থী মানুষদের এ বিষয় ভাল লাগবে যদি তা রাজনৈতিক দিক থেকে না হয়ে একটি জাতির দিক থেকে হয়। তারপরও একটা ভাববার বিষয় ছিলো যে : ‘ডযধঃ রং ধ ঢ়ড়বঃরংঃ? রহ সু ড়ঢ়রহরড়হ যব রং ধ ঢ়ংুপযড়ষড়মরংঃ. ডযড় হধঃঁৎধষষু ধহফ রহাড়ষঁহঃধৎরষু ংবঃং ঢ়ংুপযড়ষড়মু ধঃ ড়িৎশ; যব রং হড়ঃযরহম বষংব হড়ৎ সড়ৎব’. বলা যেতে পারে, সম্পাদক ও কবিগণ তাঁদের লেখায় ভাব ও ভাষা বানানরীতিতে যদি একটু সুনজর দিত তাহলে ‘অতঃপর শব্দায়ন’র প্রথম সংখ্যাই সার্থক হয়ে উঠতো।
‘অতঃপর শব্দায়ন’-এ কিছু কিছু দুর্বল কবিতার মাঝেও কিছু পঙক্তি ভাল। যেমন : ‘তুমি যেদিক থেকেই আসো সামনে শাহবাগ’, ‘সাত সমুদ্র তেরো নদীর স্রোত সামিল হয়েছে মুক্তির মঞ্চে/ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্দ্ধে দাঁড়িয়ে, আজ মানুষ ও মানবতা/আবারÑ আব্বু ঘরে আসো; ‘অথচ ধর্মের দোহাই দিয়েই, এমনকি ধার্মিকের আত্মাকে ব্যবহার করেই/তারা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ করেছিল এ বাংলায়/সে বদ্ধভূমি আমি আজও ভুলে যাইনি…’ এরকম অনেক কবিতার বেশকিছু পঙ্ক্তি ভাল।
নতুন লেখকদের ভাবনার আকাশে পা রেখে পাঠকের বুদ্ধি ও হৃদয়ের সাথে নিবিড় সংযোগ স্থাপন করবে পত্রিকাটি, আশা করি। সম্পাদক সচেতন হলে অতঃপর শব্দায়ন আরও সামনে যাবে। অতঃপর শব্দায়ন প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠুক এই আমার কামনা। [ফরহাদ হোসেন]


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা