চিহ্নপত্রিকা-২৫

মূর্তালা রামাত
জীবন, মৃত্যু অথবা অন্য কোন নাচ

ক.
টেবিলের ওপর বুক উঁচিয়ে থাকা টাকার বান্ডিলের দিকে চেয়ে প্রথমে আফসোস হয় মাহবুবের, ইস! কতগুলো টাকা। তারপর হতাশার কালো বাদুড় ঝুপ করে ওর চেহারায় লম্বা ডানা গুটায়, ভাগ্যটা আজা এতো খারাপ কেন! ডানার গুমোট অন্ধকার থেকে ভয়ের একটা পিচ্ছিল শিহরণ সাপের শিরশির নিয়ে ওর তলপেট বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে, ব্যাংকের এই টাকা ও ফেরত দেবে কীভাবে? ওর সাদা কাগজ হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে যেন দয়া হয় শরাফত আলীর, কী মাহবুব ভাই, আরেকটা দান হবে না-কি?
ডুবন্ত মানুষ সামান্য খড়কুটো পেলে যেমন খুশি হয় তেমন আনন্দে মাহবুবের চোখ জোড়া সাত ব্যাটারির টর্চের আলো দেয়, ওস্তাদের মাইর হবে শেষ রাতে। সাগ্রহে ও সামনের দিকে ঝুঁকে বলে, ধার দিলে খেলাতো যায়ই।
শরাফত আলী শিভাস রিগালের গ্লাসে বরফকুচিগুলোকে কাঁচের সাথে ছন্দ তুলে বাড়ি খাওয়াতে খাওয়াতে বলে, ধার দেয়া কোন ব্যাপার হলো! ছোট্ট চুমুকে এক ঢোক হুইস্কি গিলে সে স্মার্টলি হাসে, সমস্যা হলো আগের লোনগুলোই আপনি এখনো শোধ করতে পারেন নি!
আজ পারবো। সুদে আসলে সব শোধ করে দেবো, উত্তেজনার বশে নিজের ভরা গ্লাসটা এক চুমুকে খালি করে ফেলে মাহবুব, শেষ দানটা আমি জিতবোই জিতবো।
আপনি শিওর? শরাফত আলীর বাম চোখের কোনাটা খানিক উপরে উঠে গেলে তার চেহারার ক্যানভাসে ধূর্ত একটা ভাব অস্পষ্ট তুলিরেখা হয়ে ফুটে ওঠে।
হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর, উত্তেজনায় টেবিলে দুম করে একটা ঘুসি বসিয়ে দেয় মাহবুব,  একবার খেলেই দেখেন না?
শবের গন্ধে শকুন যেভাবে গলা বাড়িয়ে দেয়, শরাফত আলী সেভাবে দুই হাতের উপর ভর দিয়ে মুখটা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে আসে, তাহলে একটা অন্য বাজি ধরেন।
আবহাওয়ায় হঠাৎ পরিবর্তনের পূর্বাভাসে মাহবুবের চোখের মনিদুটো স্থির হয়ে যায়, কণ্ঠটা স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে ও জিজ্ঞেস করে, কী বাজি?
শরাফত আলী মাকড়সার জাল বিছিয়ে হাসে, আপনার আপনজন-
মানে?
মানে বুঝে নেন মহবুব ভাই, শরাফত আলী দেতো হাসির ইঙ্গিত দিয়ে সোফার নরম কুশনে পিঠটা রগড়ে নেয়।
ফারিয়া!
শার্প ব্রেন আপনার। ঠিকই বুঝেছেন। ভাবির কথাই বলছি।
তা কী করে হয়? মাহবুবের টের পায় স্পাইনাল কর্ড বেয়ে রক্তের সুনামী ওর মাথায় আছড়ে পড়তে শুরু করেছে।
না হওয়ার কী আছে? ইব্রাহীম নবী তার ছেলেকে কোরবানী দিতে রাজি ছিলেন আর আপনি ভাবিকে বাজি ধরতে পারবেন না! এতো ছোট কলিজা আপনার! চাইলে বউ আরো তিনটা ঘরে আনতে পারবেন ভাই, শরাফত আলী টাকার খোলা শরীরে আদুরে হাত বোলায়, কিন্তু মাত্র তিনটা তাস বাড়ি মেরে ঘরের টাকা ঘরে ফেরানোর সুযোগ কি বারবার আসে, আপনিই বলেন?
শরাফত আলীর হাত অনুসরণ করে মাহবুব চকচকে নোটগুলো দেখে, গা এলিয়ে উদাস ভঙ্গিতে পড়ে আছে যেন মাহবুবকে চেনেই না! অথচ খানিক আগে ওগুলো ওরই ছিল। এখন কতো দূরে! খুব কি বেশি দূরে? ও নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করে। ইঞ্চি চারেকও হবে না, শরাফত আলীর লোমশ হাতের ছাতায় উদোম গায়ে রোদ পোহানো সুন্দরীদের হাতছানি নিয়ে টাকাগুলো পড়ে আছে। দূরত্বের মাঝখানে কেবল ফারিয়া।

খ.
মাহবুব অফিসে যাবার পর রোজকার মত পেপারে খনিকটা চোখ বোলায় ফারিয়া। চোখের ব্যায়াম শেষে ঘরদোর গোছগাছে নেমে পড়ে ও। ছোট বাসা, কাজ কম, ঘরের কাজের জন্য আলাদা লোক রাখতে রাজি নয় মাহবুব। একা একা থাকো, সময় কাটানোর জন্যতো কিছু করা চাই, মাহবুবের যুক্তি, নইলে শরীর বেড়ে বাংলা সিনেমার নায়িকা হয়ে যাবা।
মাহবুবকে বোঝায় সাধ্যি কার! বলতে গেলেই ঝগড়া ঝাটি। তার চেয়ে চুপচাপ কাজ করে যাওয়াই ভাল। অভ্যস্ত হাতে আধোয়া জামাকাপড়গুলো প্রথমেই ওয়াশিং মেশিনে ঠেসে দেয় ফারিয়া, তারপর ফ্রিজে কদিনের বাসি হয়ে যাওয়া খাবারদাবার ময়লার ব্যাগে ফেলে, বাসন কোসন ধোয়, জানালার পর্দাগুলো পাল্টায়, আলমারির কাপড় গোছায়, ফুলের টবে পানি ছিটায়, কার্পেটের ময়লা ঝাড়ে, টুকটাক আরো কিছু করার পর চুলায় রান্না চাপায়। কাচকি মাছ ভাজি, মুরগীর ঝাল ফ্রাই, বেগুনের চাটনী, ঘন ডাল- বেছে বেছে মাহবুবের পছন্দের খাবারগুলো এক এক করে রান্না করে ও। বাইরে বৃষ্টির আবহাওয়া দেখে আজি ঝরো ঝরো বাদরও মুখর দিনে গানটা শোনে বারকয়েক। গান ছেড়ে দিয়েই আচ্ছা করে ঠাণ্ডা পানিতে চুবিয়ে গোসল সারে। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে ভেজা চুল শুকানোর সময়ও গান চলতে থাকে। গানের রেশ নিয়ে একা একা খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে শুয়ে শুয়ে টিভির পর্দায় পাখির নীড়ের মতো শান্ত চোখ রাখে ও। অন্যদিকে নিজের অজান্তেই ইদানীংকার মাহবুবকে নিয়ে ভাবতে বসে ওর অশান্ত মন।
মাহবুব আজকাল ওর প্রতি কেমন যেন বিরূপ, উদাসীন! সারাদিন সে তার অফিস, পার্ট টাইম ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ততা দেখায়। ফারিয়ার শরীরটা কদিন ধরে খারাপ, সে নিয়ে তার কোন মাথাব্যথাই নেই! এসব কিছুতে ও একটু অনুযোগ করতে গেলেই সে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। আগে অল্পক্ষণেই ওর রাগ পড়ে যেত। কিন্তু গেলো কদিন ধরে কী যে হয়েছে, রেগে গেলে মাহবুবকে থামানো দায়। অশ্রাব্য খিস্তি খেউড় করে সে ফারিয়ার চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করে ফেলে। বিয়ের এতগুলো বছর ধরে নিঃসন্তান থাকাটাই কী এর কারণ! ফারিয়া ভাবে, না হলে, তোমাকে বিয়ে করে কোন কচুর মাথাটা পেলাম, ও এমন কথা বললো কেন? মাহবুবের অতীত বর্তমান ভাবতে ভাবতে একসময় ওর চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। ও চোখ বোজে, বুজতেই সিনেমার রিল টেনে সকালটাকে কেউ ওর সামনে জ্যান্ত করে দেয়। সকালের প্রতিটা সংলাপ, প্রতিটা দৃশ্যে ওর ভেতরকার কান্নার নদী হু হু করে ফুলে ফেঁপে ওঠে, এমন হিং¯্র ব্যবহার মাহবুব করতে পারলো!

গ.
ফারিয়ার কথা ভাবতেই মাহবুবের সকালের কথা মনে পড়ে। চায়ে চিনি কম দেয়া নিয়ে অভিযোগের শুরু। তারপর একের পর এক বিষাক্ত কথার বাঁকানো ছুরিতে ফারিয়াকে ও ফালা ফালা করেছে। জবাবে ফারিয়া একটা কথাও বলেনি। ওর মৌনতা মাহবুবকে আরো তাতিয়ে দেয়। আগ্নেয়গিরি যেমন তার গনগনে লাভা আটকাতে পারে না, রাগ সামলাতে না পেরে মাহবুবও তেমন আচমকা চড়টা মেরেই বসে। মাত্র একটা চড়, তাতেই ফারিয়া ওর দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিল  যেন ও টাইম মেশিনে চড়ে ভিনগ্রহ থেকে আজব চিড়িয়ার বেশে দুনিয়া ভিজিটে এসেছে! চোখ দুটোকে গেলে আসলে ভালো হত, অফিসে আসার পরও ফারিয়ার ওই দৃষ্টি বুকে-পিঠে লেপ্টে থাকায় ও রাগে গজগজ করছিলো। সময় পার হওয়ার সাথে সাথে মাথা খানিকটা ঠা-া হলে চড়টা মারার জন্য ওর খারাপ লাগতে থাকে। ওর মনে হয় কাজটা ভালো কিছু হয়নি। ফারিয়া ওর জীবনে প্রথম নারী, ওকে ও পছন্দ করে, ভালোবাসে।
মাহবুব পেছন দিকে তাকায়, হাটি হাটি পা পা করে ওদের সংসারের বয়স এখন তিন বছর। সাজানো গোছানো স্বচ্ছল। ও নয় বরং ফারিয়াই এর কারিগর। ওর জীবনে ফারিয়া একটা লাকি টোকেন। ফারিয়ার সাথে বিয়ে হবার পরপরই ওর প্রমোশন হয়। আচমকা ট্রান্সফার হয়ে ও মফস্বল থেকে চলে আসে বড় শহরে। আস্তে আস্তে গাড়ি হলো, ফ্লাট হলো, লটারিতে প্লটও পাওয়া গেলো একটা, শেয়ার ব্যবসাটাও জমে উঠলো, ব্যাংকে জমতে থাকলো অলস টাকা। এই যে ক্লাবে বসে ও এখন বিদেশী মদ খায়, দামী সিগারেটের ধোয়া ওড়ায়, লাখ লাখ টাকা বাজি খেলে ফূর্তি করে সবই ফারিয়া ওর জীবনে আসার পর সম্ভব হয়েছে। তার আগে ওর কি বলার মতো কোন পরিচয় ছিল? ব্যাংকের সামান্য একজন মাহবুব সরকার, সকালে ঘাড় গুজে অফিসে যায়, বিকেলে মাটির সাথে নুয়ে পড়ে বাসায় ফেরে, মোড়ের দোকানে বাকি খায়, মাস শেষে বেতনের অপেক্ষা করেজ্জসেই জীবনের দিকে তাকিয়ে মাহবুবের আবারও মনে হয় ওর নিজের উচ্চাকাক্সক্ষা আর কঠোর পরিশ্রমের মনোভাবকে পেছনে ফেলে ফারিয়াই ওর জীবনের লাফঝাঁপের টার্নিং পয়েন্ট।
কথাটা মনে হতেই ফারিয়ার জন্য ওর ভালোবাসা উথলে ওঠে। না জানি, সকালে ওর ব্যবহারে কতো কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা! ফারিয়ার গায়ে ও কখনোই হাত তুলতে চায় না। আজ তুলেছে, এর কারণ রাতে জুয়ায় হেরে মেজাজটা এমনিতেই খারাপ ছিল, তার উপর পেটে মাল একটু বেশি পড়ায় ওর ভেতর জেগে উঠেছিল অন্য মাহবুব।
আজকাল অন্য মাহবুবটা বড় বেশি জ্বালাচ্ছে। শালাকে আচ্ছামত ধোলাই দিতে হবে, মাহবুব ভাবে। শালা বলে কীনা, এতো বছর বাচ্চাকাচ্চা হলো না, ফারিয়াকে রেখে কী লাভ! ফুলো গালের হাসিখুশি একটা বাচ্চার কথা মনে হতেই মাহবুুবের বুকে দীর্ঘশ্বাসে কাশবন দুলে ওঠে। সত্যিইতো, তিন বছরে ফারিয়া এতোকিছু দিলো আসল জিনিসইতো দিতে পারলো না। বংশধর ছাড়া এই বাড়ি গাড়ি সম্পদ প্রাচুর্যের কোন মূল্য আছে। কে খাবে এসব?
আচ্ছা আরেকটা বিয়ে করলে কেমন হয়? চকিতে একটা চিন্তা ওর মাথায় উঁকি দিয়ে যায়। বাচ্চা হলেতো প্রমাণ হয়েই গেলো ফারিয়ার ওপর ওর যে মেজাজ খারাপ হয় তা এমনি এমনি না। আর না হলে? না হলে দুটো বউই থাকলো, অন্য মাহবুব ওর প্রশ্নের উত্তর সাজিয়ে দেয়। কিন্তু ফারিয়া যদি তখন ওর সাথে থাকতে রাজি না হয়? না থাকলে না থাকবে, ফারিয়ার বদলে যে আসবে সেই নতুন বসন্তে ভরিয়ে দেবে ওর জীবন। আচ্ছা সে কি ফারিয়ার মতোই ওর জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে অথবা ফারিয়া না থাকলে ওর ভাগ্যের সমস্ত ভরা নদী শুকিয়ে ছবি হয়ে যাবে অথবা ফারিয়া কি আসলেই ওর লাকি কয়েন? পরখ করে দেখার এইতো সেরা সুযোগ, আচমকা মাহবুবের ভেতরটা ইউরেকা বলে লাফিয়ে ওঠে।
শরাফত আলীর হাতের আদর খাওয়া টাকাগুলোর দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে মাহবুব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। ওকে বাজিতে জিতিয়েই ফারিয়াকে প্রমাণ করতে হবে যে সে আসলেই ওর সৌভাগ্যের পরশপাথর। কেবল তারপরেই, তারপরেই এতোদিন নিষ্ফলা থাকার পরও সে ফারিয়াকে নিঃশর্ত ক্ষমা করবে, ভালোবাসবে আগের থেকে আরো আরো গভিরভাবে ভালোবাসবে। ভাবতেই চোখ ঘোলা হয়ে আসে ওর। হুইস্কির গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করে ও শরাফত আলীর চোখে চোখ রেখে বলে, ডান। আপনার কথাই মেনে নিলাম। এই দানে আপনার ভাবিকেই বাজি ধরলাম।

ঘ.
অচিন বেশভূষার দুজন লোক মুখোমুখি বসে আছে। তাদের ভেতর অশীতিপর লোকটার হাতে রঙ্গীন একটা সুতোয় ও ঝুলছে। লোকটা সুতো টেনে টেনে নানা কসরতে ওকে নাচিয়ে চলেছে। অন্য লোকটা মুগ্ধ হয়ে দেখছে। হঠাৎ সুতো আলগা হয়ে গেলো। খাবি খেয়ে গাঢ় অন্ধকারে ডুবতে ডুবতে আর্তচিৎকার দিয়ে জেগে উঠলো ফারিয়া। বুকের ভেতর কেমন ধক ধক করছে। কারেন্ট নেই। আইপিএস চলার কথা। খুব সম্ভবত ব্যাটারি শেষ। চার্জ হয়নি। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ড্রয়ার খুলে মোমবাতি, দেশলাই বের করে ও, জ্বালায়। মোমবাতির কাঁপা কাঁপা আলোয় ঘরের আসবাবপত্রগুলো দেয়ালে ছায়া ফেলে জীবন্ত হয়ে ওঠে। সেদিকে তাকিয়ে ওর গা-টা কেমন ছম ছম করে। কে যেন ওর কানের কাছে ফিসফিস করে ওঠে, আজ না তোমার আত্মহত্যা করার কথা!

ঙ.
মাহবুব ডান বলার সাথে সাথেই শরাফত আলীর শরীরে ঝিম ঝিম একটা ভাব হয়। আজ তার তাসের কপাল খুবই ভাল। না জেতার কোন কারণ নেই। আর এই দানটা জিতলেই সে পেয়ে যাবে স্বপ্নের মেয়েটাকে। পার্টিতে প্রথমবার দেখার পরপরই ফারিয়াকে তার মনে ধরেছিল। মেয়াটার চোখেমুখে মিষ্টি জলের স্নিগ্ধতা। দুটো কথা বলেই প্রাণটা জুড়িয়ে গিয়েছিলো বটে পিপাসা মেটেনি। আকণ্ঠ তৃষ্ণা নিয়ে সেই কবে থেকে শরাফত আলী অপেক্ষা করেছে। এবার সেই অপেক্ষার পালা শেষ। একটা মাত্র দান, তারপরই ফারিয়া তার। হুইস্কিতে মেশানো কড়া ড্রাগটা ভালোই কাজে দিয়েছে! শরাফত আলী নিজের বুদ্ধির তারিফ করে, মাহবুবের ব্রেন সাজানো দাবার ছকে পড়ে এলোমেলো হয়ে গেছে। না হলে কোন ভদ্রলোক জেনে শুনে নিজের সুন্দরী বউকে বাজি ধরতে রাজি হয়! চেষ্টা করেও শরাফত আলী মনের আনন্দ লুকিয়ে রাখতে পারে না। অভ্যস্ত হাতে তাস বাটতে গিয়ে গোপন শিহরণে বারবার তার হাত কেঁপে ওঠে, আঙ্গুলের ডগা ছুঁয়ে পেলব মসৃণ স্তনের মতো পিছলে যায় নরম তাসের শরীর। ফারিয়াকে নিজের ভেতর পিষে ফেলার কল্পনায় তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসে। বায়ান্নো তাসের ভেতর থেকে মাত্র তিনিটি তাসের দূরত্বে ফারিয়া তার সামনে ক্রমশ রক্তমাংসের অবয়ব হয়ে ওঠে।

চ.
আত্মহত্যার কথা মনে হতেই ফারিয়ার চোখের সামনে সকালের সমস্ত ঘটনার হাড়গোড় আবারও রক্তমাংসের মানুষ হয়ে উঠে দাঁড়ায়। মাহবুবের চড় খেয়ে ও অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল কতোক্ষণ। ওর মনে হচ্ছিল নিজের জীবনের পার করে আসা সমস্ত সময় আর অনাগত ভবিষ্যতের অবশিষ্ট সময়টুকুর মাঝখানে ও অনন্তকালের জন্য আটকে গেছে। মাহবুবকে ওর সেই মাকড়সার মতো মনে হচ্ছিল যে ভালোবাসার মিহিন সুতোয় একটা প্রজাপতিকে আচ্ছামতো পেচিয়ে তারপর গিলে খেতে আসছে। এই মাহবুব ওর অচেনা। তিন বছর ধরে যে মানুষটাকে ও উজোড় করে ভালোবেসেছিলো, যে মানুষটার ভালোবাসার সুতোয় ও একটু একটু করে স্বেচ্ছায় দমবন্ধ হয়েছিলো, সকালের ওই মানুুষটা সে নয়। সত্যটাকে উপলব্ধি করে ওর ভেতরের দুনিয়াটা ভেঙ্গেচুরে মুখ থুবড়ে পড়ছিলো।
নতুন কষ্ট পুরোনো কষ্টের ক্ষতকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। ওর মনে পড়ে যায়, ওর মতামতের এক পয়সা দাম না দিয়ে বাবা যেদিন বললেন তিনি ওর বিয়ে ঠিক করেছেন- ছেলে ব্যাংকার, শিক্ষিত, দেখতে শুনতে ভাল সেদিন ও ছুটে গিয়েছিল সজলের কাছে। নিজেকে পানপাত্র বানিয়ে তুলে ধরেছিলো সজলের ঠোঁটে, আমাকে নাও, গ্রহণ করো। এখন বিয়ে করলে ক্যারিয়ার নিয়ে টানাটানিতে পড়ে যাব বলে নিত্যদিনের পানপাত্র ঠেলে সরিয়ে দিলে সজলের দিকে ও এভাবেই অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। চিরপরিচিত একটি পুরুষ এক মুহূর্তের ভেতরই এমন করে সেদিন অন্য পৃথিবীর কেউ হয়ে গিয়েছিল। পুরুষগুলো এমন হয় কেন? সবকিছু ভেঙ্গে পড়ার অনুভূতি থেকে ফারিয়া নিজেই নিজের কাছে উত্তর খোঁজে। কোন জবাব মেলে না বরং ও টের পায়, ওর বুকের ভেতর পরিত্যাক্ত একটা কল থেকে আবার রক্তমাখা জল গড়াচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে হৃদয়ের নকশীকাথার জনপদ।
ভাঙ্গাচোরা দুনিয়ায় ক্ষতবিক্ষত হতে হতে ওর মনে পড়ে, বাবার ইচ্ছায় মাহবুবকে বিয়ে করার পর, প্রত্যেক ছেলের ভেতরেই অন্য এক বিশ্বাসঘাতক পুরুষ বাস করে, এই ভয় ওকে দোমড়ানো কাগজ বানিয়ে রাখতো। গত তিন বছরে ধের্য ধরে একটু একটু করে ভালোবেসে মাহবুব সেই কাগজটার প্রতিটা ভাঁজ সমান করেছে, ওকে আবার জীবনের রোদেলা জগতে ফিরিয়ে এনেছে। পুরুষ মানেই বিশ্বাসঘাতক নয়জ্জএই আস্থার কেন্দ্রে ও যখন সবে দাঁড়াতে শিখেছে তখনই মাহবুব বুলডোজার চালিয়ে ভেঙ্গে দিলো সমস্ত স্থাপনা, নগর, বন্দর, লোকালয়। এ যেন মজার একটা খেলা! কেন?
ভেতরে বাইরে উপলব্ধির দৃষ্টি দিয়ে উঁকি মেরে হঠাৎ করেই ও বুঝতে পারে এতোগুলো বছর মাহবুব আসলে দুমড়ে থাকা একটা কাগজের দলাকে কীভাবে আবার আগের অবস্থায় নেয়া যায় মনযোগ দিয়ে সেটাই চেষ্টা করেছে। এর উপর নির্ভর করছিল ওর পুরুষোচিত জয় পরাজয়। এ কারণেই মাহবুব ওকে পোষা কুকুর বেড়ালের মতোই স্নেহ করেছে, পুতুলের মতো সাজিয়ে গুছিয়ে আমোদ নিয়েছে, অবলা জীব ভেবে করুণা করেছে, বাড়ির দামী আসবাবের মতোই যতœ নিয়েছেজ্জভালোবাসেনি।
ও চোখ বন্ধ করে হিসেব মেলাতে থাকে, ঘরের ডিজাইন করা হয়েছে মাহবুবের আইডিয়া অনুযায়ী, ফার্নিচারগুলো মাহবুবের পছন্দে কেনা, টিভি-ফ্রিজ-এসি সব কিছুর ব্রান্ডই মাহবুবের পছন্দ করা, পত্রিকাটাও মাহবুবের পছন্দের, মাহবুব যা খেতে পছন্দ করে ওকে সেটাই রান্না করতে হয়, টিভিতে একসাথে মাহবুবের পছন্দের অনুষ্ঠানই দেখতে হয়, মাহবুব ডান কাতে শোয় বলে তার মুখোমুখি থাকতে বিয়ের রাত থেকেই ওকে বাম ফিরে শুতে হয়, বেড়াতে যাবার ভেন্যু মাহবুবই ঠিক করে, ওর সাজগোজও বলে দেয় মাহবুব, কোন বইটা ওর পড়া উচিত কোনটা উচিত নয় সেটাও মাহবুব জানে, এমনকি মাহবুব চায়নি বলে স্কুলের চাকরিটাও ওকে ছাড়তে হয়েছে। আসলে মাহবুবের কাছে ও একটা শখের গাড়ি যার ড্রাইভিং সিটে শুধু সেই রাজত্ব করতে চায়। শুধু মাহবুব কেন! বাবা হোক, সজল হোক, আসলে প্রতিটা পুরুষই একইরকম, পুতুলনাচের খামখেয়ালি কারিগর বনতে চায়।
নিজেকে সুতোয় ঝোলা একটা পুতুল ভাবতেই অসহ্য লাগে ওর। রক্তজলে ক্রমশ লাল হয়ে যাওয় নকশী কাথাটা ওর সামনে ষাঁড় ক্ষেপানো লাল পর্দার দোল হয়ে দোলে। ওর কানের কাছে কে যেন আবারও ফিসফিস করে, ঘুমের ওষুধগুলো খেয়ে নাও, একেবারে ঘুরিয়ে পড়ো, মুক্তি নাও। মাহবুবকে দেখিয়ে দাও তুমি তার দম দেয়া কলের পুতুল নও। তুমি নিজেই নিজের নিয়ন্তা। সকাল থেকে মনে মনে যা ভেবে রেখেছ তা করতে দেরী করো না। মাহবুব ফিরেই যেন একটা উচিত শিক্ষা পায় সে ব্যবস্থা কর। তুমি উড়াল দাও। নিজের অজান্তেই ফারিয়া বালিশের নিচে রাখা ঘুমের ওষুধগুলোর দিকে হাত বাড়ায়।

ঝ.
কার্ডগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে মাহবুব। শরাফত আলীর নির্ভার আঙ্গুলে ভর দিয়ে ওগুলো যেন নিয়ে আসছে ঐশ্বরিক কোন বাণী। স্টিমার ঘাটে ভেড়ার সময় যেভাবে তার সার্চলাইটের আলো তীব্র হয়ে ওঠে, শরাফত আলী মুখে তেমন একটা হাসি। ও নিজের হাতের দিকে তাকায়। ফারিয়ার উজ্জ্বল মুখের মতো তিনটা কার্ড। ওর কি হাসা উচিত? নিজের বুকের ভেতর ধুপধুপ শব্দে কে যেন হাঁটে। ওর কপাল ফেরানো ফারিয়া কি শরাফত আলীর দিকে হাঁটা দিলো! ওর সহ্য হয় না। ফারিয়াকে ধরে রাখার আকুলতা নিয়ে ও নিজের কার্ডগুলো ছুঁড়ে ফেলে। বাতাসে ভাসতে ভাসতে টেবিলে নামতে থাকে ফারিয়ার থাকা না থাকা।

ঞ.
ঘুমের বড়িগুলো মুখে পুরতে গিয়েও থমকে যায় ফারিয়া। অচ্ছা আত্মহত্যা কি মুক্তি না এক ধরনের পরাজয়? এটা কি ইচ্ছে করে হার স্বীকার করে নেয়া নয়? একজন পৃথিবীর সমস্ত রং রূপ গন্ধ নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে উপভোগ করে যাবে আর ও হাবুডুবু খেতে খেতে অবিরাম সাঁতার কাটবে অন্ধকার কোন সমুদ্রে! এর মানে কি এই দাঁড়ালো না যে, ও জেনেশুনে বঞ্চিত হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? আমি কেন বঞ্চিত হবো, আমি কেন মৃত্যুর সাথে হাত মেলাবো? আমার জীবনকে আমি আমার মতো করে উপভোগ করতে চাই, ফারিয়ার কথায় দেয়ালের প্রেতাত্মারা নড়েচড়ে ওঠে। ওর কানের কাছে কে যেন আবার ফিসফিস করে, মৃত্যু ফারিয়া, মৃত্যুই মেয়েদের একমাত্র উপভোগ্য পৃথিবী। মৃত্যু দিয়ে তোমার পুরুষটার কাঁধে অনুশোচনার বোঝা চাপিয়ে দাও। জীবনভর লোকটা তা টানতে থাকুক। টানতে টানতে দুনিয়াটা ওর কাছে হয়ে উঠুক স্বাক্ষাৎ দোযখ। জীবিত থেকেও ও মৃত্যুর আগুনে পুড়ে ছাই হোক। তুমি ধরাছোঁয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে সেই ছাইয়ে নুপূর পরে নাচো। ফারিয়া, মৃতদের জগতে আসো, চরম প্রতিশোধ নাও লোকটার উপর, ওকে অশান্তিতে তারিয়ে তারিয়ে মারো। নিজের চোখেমুখে নিরীহ ঘুমের বড়িগুলোর উত্তপ্ত নিঃশ্বাস টের পায় ফারিয়া।

ট.
শরাফত আলী নিজের চোখে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার সাহেব বিবি গোলাম ছাপিয়ে আলোকিত হয়ে উঠেছে মাহবুবের তিন কুইন। শেষ দানটা জিতে গেছে মাহবুব। প্রমাণ হয়ে গেছে ফারিয়াই ওর সমস্ত সৌভাগ্য। ওকে ও কিছুতেই হারাতে দেবে না। বাড়ি ফিরে প্রয়োজনে ও ফারিয়ার পা ধরে মাফ চাবে, হারতে হারতে জিতে নেয়া সমস্ত টাকা ফায়িারর ওপর উপুড় করে ঢেলে দেবে ও। ফারিয়া! মাহবুব টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়।

ঠ.
বহু আলোকবর্ষ দূরে। দু’জন লোক এতোক্ষণ টানটান উত্তেজনা নিয়ে খেলা দেখছিলো। মাহবুব জিতে যেতেই দ্বিতীয়জন প্রথমজনের দিকে তাকিয়ে উল্লাসধক্ষনি দিয়ে ওঠে, বলেছিলাম না শেষ দানে মাহবুবই জিতবে। টাকা, বউ সবই ওর থাকবে। আপনি হেরে গেছেন প্রভু!
অল্প বয়সীর হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে কৌতুকভরে হাসলেন অশীতিপর বৃদ্ধ, তাই! তাঁর হাতের আঙ্গুল থেকে অদৃশ্যভাবে পিছলে খানিকটা খসে পড়লো রঙ্গীন একটা সুতো।

ড.
হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে গেলো ফারিয়ার। খোলা জানালা দিয়ে আসা দমকা বাতাস মুহূর্তেই ঝড়ের কেন্দ্রে নাচাতে লাগলো ওকে, ওর মুখের কাছে দপদপ করা মৃত্যুকে আর নাচিয়ে চললো ওর ভেতরের নতুন জীবন।

[জানুয়ারি-জুন ২০১৩/ সিডনী, অস্ট্রেলিয়া]

গুঞ্জন রহমান
শিশু যাদুকর

আঠারো বছরের চেনা জায়গাও ষোল বছরের না দেখায় অচেনা লাগে। তার উপর রাত পৌনে এগারোটায় ট্রেন থেকে নামলে তো আরোই। ট্রেনটা পৌঁছুনোর কথা ছিল সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে, তবে নামার পরে জানতে পারলাম এমন নাকি প্রতি রাতেই ‘নেট’ হয়। আমি প্লাটফর্ম পার হয়ে স্টেশন চত্ত্বর থেকে বেরিয়েই হকচকিয়ে গেলাম। সর্বসাকুল্যে তিনটে রিকশা দাঁড়িয়ে। এমন হবার কথা নয়। আঠারো বছর থেকেছি আমি মহিমাগঞ্জে, এখানকার চিনিকলে আমার বাবা চাকরি করতেন, আমি সেই চিনিকলের স্কুলে এগারো বছর পড়েছি, চিনিকলের কলোনীতে বাস করেছি আঠারো বছর। কত শত কিংবা হাজারবার এভাবে রাতের ট্রেনে এসে নেমেছি এই স্টেশনে, তার হিসেব নেই। কোনোদিন এমন রিকশা-শূন্য স্টেশন চত্ত্বর দেখিনি। শীতটাও পড়েছে অনেক বেশি, সেজন্যেই কি? আমি যখন থাকতাম এখানে, তখন কোনো আন্তনগর ট্রেন থামতো না এই স্টেশনে। এখন থামে। আমি আন্তনগর থেকেই নামলাম। আসলে আন্তনগরের স্টপেজ হয়েছে বলেই বাসে না এসে ট্রেনে আসার সিদ্ধান্ত, কিন্তু’ তারপরও রাত হয়ে গেল। ইউনিয়ন পর্যায়ের একটা ছোট্ট মফস্বল শহরে পৌনে এগারোটা অনেক রাত, তাও আবার শীতকালে। আমি তিনটে রিকশার একটার দিকে এগুতেই আমার পেছন থেকে কেউ একজন হনহন করে হেঁটে গিয়ে সেই রিকশায় উঠে গেল। অগত্যা অন্য একটির চালককে মাস্টারপাড়া যাবে কিনা শুধাতেই সে গম্ভীর গলায় উত্তর দিলো, ‘বিশ ট্যাকা লাগবি’।
আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। স্টেশন থেকে মাস্টারপাড়ার দূরত্ব বড়জোর আধা কিলোমিটার হবে। সে আমলে দুই টাকা চাইতেও সংকোচ করতো রিকশাওয়ালারা, এখন এক ধাক্কায় বিশ টাকা? দর কষাকষি করলেই বা কত বলা যায়… এমন সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কেউ একজন, ‘এ আক্কাস, চ’ যাই’ বলে সেটিও দখল করে ফেললো। সবেধন নীলমণি একটা মাত্র রিকশা পড়ে রইলো। সেটির দিকে তাকাতেই দূর থেকে রিকশাওয়ালা গলা চড়িয়ে হাঁকলো, ‘মাস্টারপাড়ার ভাড়া কিন্তুক লিগেলে বারো ট্যাকা, ট্রেনেত থাকি নামলে তো বিশ ট্যাকা চাওয়ারই পারে, কিন্তুক পুরানা লোকঝনের জন্যি অবশ্য এখনও দুই-তিন ট্যাকায় যাওয়া যায়’!
আমার বিষ্ময়ের সীমা রইলো না। রিকশাওয়ালা নিশ্চিতভাবেই আমার চেনা কেউ, যে কিনা এই ষোল বছর পরও আলো-আঁধারিতে আমার আকার আকৃতি দেখে কিংবা নেহায়েত গলার আওয়াজ শুনেই চিনে ফেলেছে! আমি এগিয়ে গেলাম, ‘কে ভাই, গলাটা তো চেনা চেনা লাগে…’
‘ওইংক্যা ভাব মারা লাগবি না, হামাক তুই একনাও চিনব্যার পারিসনি। পাইল্লে আগোতই এটি আইসলু হয়’
এবার সত্যি সত্যিই চিনতে পারলাম। কিন্তু মানতে পারলাম না। ইউসুফ। আমার সহপাঠী ইউসুফ। পুরো দশ বছর একসাথে, এই ক্লাশে পড়াশোনা করা ইউসুফ। রিকশা চালাচ্ছে! স্থাানীয় ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ও ধারাবাহিক ছাত্র ছিল ইউসুফ। ফার্স্ট সেকেন্ড হওয়া ছাত্র না হলেও কোনো দিন কোনো পেপারে ফেল করেনি। ছোট পোস্টে হলেও আমার বাবার মতো তার বাবাও চিনিকলে চাকরি করতেন। সেই ইউসুফ রিকশা চালাচ্ছে কেন? আমার বিষ্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই ইউসুফ রিকশার চালকের আসন থেকে নেমে এসে আমার হাত থেকে ব্যাগটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে পা-দানিতে রাখে। আমি অপ্রস্তুতের মতো রিকশায় উঠে বসি, রিকশা চলতে শুরু করে। যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে ইউসুফ গল্প করতে করতে রিকশা টানতে থাকে, আমি তার সাথে টুকটাক হুঁ-হ্যাঁ দিতে থাকি।
‘কদ্দিন পর আ’লু, দোস্ত?’
‘হ্যাঁ রে, আসাই হয় না’
‘তারপর, কোঁটে কি করিচ্চু?’
‘এই আরকি… চলছি, কোন রকম…’
‘মাস্টারপাড়া কোঁটে যাবু রে?’
‘আছে একজন, গণেশ মিত্র নাম। একটা অফিশিয়াল কাজে আরকি…’
‘গণেশ… গণেশ… নাহ, গণেশ নামে তো কাকো চিনব্যার পারিচ্চি না!’
‘তোর চেনার কথা নয়’।
‘তাঁই কী করে? তোর সাথ চেনা পরিচয় ক্যাম্বা করি?’
‘ওই আরকি, ব্যবসার কাজে…’
এই এক ঝামেলা। আমার কাজটাই এমন যে, নিজের স্ত্রীকেও মন খুলে সব কথা বলা যায় না। ইউসুফ আমার বাল্য বন্ধু, সময়ের কষাঘাতে দুজনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান আলাদা হয়ে গেছে, কিন্তু তাই বলে তো আর বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বদলে যায় নি। তার পরও উপায় নেই, যত ভালো বন্ধুই হোক, পেশাগত গোপনীয়তা তো আর সবার কাছে ভাঙ্গা যায় না। কিন্তু ইউসুফ নাছোড়বান্দা, গাইবান্ধা জেলার মানুষগুলোই এমন। এত আন্তরিক আর অকপট মানুষ আমি দেশের আর কোথাও কখনো দেখিনি। এরা ঘোরপ্যাঁচ বোঝে না, যাকে ভালোবাসে, বুক দিয়ে ভালোবাসে। তার সাথে যেমন কোনো প্রকার শঠতা করে না, তেমনি গোপনীয়তারও ধার ধারে না। ইউসুফ চিন্তিত গলায় বললো, ‘মহিমাগঞ্জেত ব্যবোসা করে গণেশ নাম, আর হামি তাক চিনমো না, এড্যা অ্যাডা কতা ক’লু দোস্তো! হামাক খুলে ক’ তো, কিসের ব্যবোসা তার সাথ তোর?’
আমি কথা ঘুরানোর জন্য বললাম, ‘বাদ দে তো, তোর এই অবস্থা কেন? শালা তুই আর কাজকাম পাস নাই, রিকশা টানিচ্ছু কেন?’
ইউসুফ একটু হতাশ গলায় বললো, ‘কী করমো ক’? তোরা যাবার মনে কর দুই বছর পর মিল তো বন্ধ হয়্যা গেল। আব্বা মারা গেছিল তার আগোতেই। আব্বার বদলে চাকরিত ঢুকছিল ইউনুছ ভাই। জানিস তো, হামাগেরে এটি চাকরিত থাকলে বাপ ম’লে তার বদলেত ব্যাটার চাকরি হয়? … কিন্তুক অঁয় তো আর লেখাপড়া বেশি করে নাই, সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি পাছিল আরকি। মিল বন্ধ হয়্যা সেড্যাও গেল… হামার আর পড়াশুনা হয় বারে? খামো কী সেই চিন্তাত বাঁচি না, এর মধ্যে আবার পড়ালেখা!’
‘কেন, তোদের তো মনে হয় জমি-জির‌্যাত ছিল কিছু…’
‘অক কি আর থুয়া যায়? চাকরি এখান পায়েই না বিয়্যা করলো ভাই!’
‘তো? তার সাথ জমি না থাকার স¤পর্ক কী?’
‘সগলি ধর যে বিয়্যা কর‌্যা ডিমেন্ড নেয়, হামার ভাই ডিম্যান্ড তো কিছু পায় নাই, উল্টা বউ বাচ্চা সাত করি ওই জমি বেচ্যা পলাছিল শ্বশুরবাড়ি। ওত্তি যায়্যা দোকান করছিল। শ্বশুরের দ্যাশেত কি আর ব্যবোসা করা যায়? তামান তহবিল খায়ে দায়ে আবার হামাগেরে এটিই ফিরত আইসলো! এখন বড় ভাই, মা জীবিত থাকতে তাক ফেলি কেম্বা করি? তার মইধ্যে আবার দুড্যা বাচ্চা, বউ!’
‘তোর রিকশা চালানোর রোজগারে এই এতগুলা পেট চলে?’
‘সিডাও নয়। দিন তো আর কম যায় নাই। এখন ধর ভাইয়েরও অবস্থা ফিরছে। বউটা বদ আছিল, কিন্তুক এখন বুদ্ধি আক্কেল হছে। নিজেগেরে মতোন আছে আরকি। হামার উপরে আর নাই।’
‘আর খালাম্মা… মানে তোর মা?’
‘আম্মা হামারঠেই ছিল, বছর তিনেক হয়্যা গেল ইন্তেকাল হইছেন’
‘ইন্নালিল্লাহ… সরি দোস্তো…’
‘না ঠিক আছে… তোর মাস্টারপাড়ার মধ্যে কত্ক্ষণ ধর‌্যা ঘুরিচ্চি খিয়াল আছে?’
‘এড্যাই মাস্টারপাড়া নাকি? কাম সারছে রে… এর তো সবই বদলায়ে গেছে গা!’
‘হবি না? দিন কি আর থ্যামে আছে নাকি? … তোর লোকের ঠিকানা কী? কোঁটে নামবু?’
‘কলেজটা কি আগের জা’গাতই আছে? নাকি বিল্ডিং টিল্ডিং উঠে গেছে?’
‘বিল্ডিং উঠছে, কিন্তু ওই জাগাতই। ওই তো সামনেতই।’
একটু পরই কলেজের চির-চেনা পুরাতন বিল্ডিংটা ঘোলাটে স্ট্রিট লাইটের আলোয় কুয়াশার চাদর ভেদ করে দৃশ্যমান হয়। আমি কলেজের কাছে রিকশা থেকে নামি। পকেটে হাত দিতে যেতেই ইউসুফ চোখ পাকিয়ে তাকায়। আমি জোর করি, হাজার হলেও এটা তার প্রফেশন, মজুরী কেন নেবে না সে? ইউসুফ সে কথা হেসে উড়িয়ে দেয়, বলে- “যা, আগোত দেখি আয়, তোর গণেশবাবু আছে নাকি নাই। হামি এঠে খাড়া থাকলাম।’ আমি তাকে বিদায় করে দিতে চাচ্ছিলাম, আবার মন সায় দিচ্ছিল না এতদিন পর পুরনো বন্ধুকে পেয়ে এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে যেতে। যাহোক, ব্যাগ হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলাম।
ঠিকানা আর লোকেশন মিলিয়ে নির্দিষ্ট দরজায় গিয়ে দেখা গেল তালা ঝুলছে। শুধু যে তালা ঝুলছে তা’ই নয়, মোবাইলের টর্চের আলোয় সেই তালা লাগানোর কড়াসহ পুরো দরজায় মাকড়শার ঝুল আর ধুলার স্তর ¯পষ্ট বোঝা গেল। এই দরজা কম করে হলেও এক মাস খোলা হয়নি। এর মানে কী? আজ দুপুরে যখন রংপুর থেকে ট্রেনে উঠছি, তখনো তো ফোনে কথা হয়েছিল গণেশবাবুর সাথে। তিনি বাসাতেই আছেন, থাকবেন বলে কথা হয়েছিল। এই মিথ্যাচারের মানে কী? মোবাইলে নম্বর লাগিয়ে প্রত্যাশিতভাবেই ‘সুইচড অফ’ পেলাম। কিছু একটা ঘাপলা আছে কোথাও।
ঘাপলাটা কী? এইসব ভাবতে ভাবতে ফিরে আসতেই ইউসুফ খুব স্বাভাবিকভাবে আমার ব্যাগটা আবার হাত থেকে নিয়ে পা-দানিতে রেখে বললো ‘ওঠ!’ আমি অন্যমনষ্কভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে হোটেল আছে রে কোনো?’
‘খাওয়ার হোটেল, না থাকার হোটেল? খাওয়ার হোটেল তাও পাবু দু-একটা, থাকার হোটেল কোঁটে!’
‘অ্যাদ্দিনেও হোটেল হয়নি রে?’
‘ক্যামনে হবি, তুই তো আর খবর দিয়্যা আসিসনি! এক-আধ মাস আগে খবর দিলে হয়তো তোর জন্যে হোটেল অ্যাডা বানায়ে ফেলাও য্যাতো…’
বলার কায়দাটাই এমন মজার যে আমি হেসে ফেললাম। কিন্তু এই শীতের রাতে থাকবো কোথায়? ইউসুফ নিশ্চিন্তে রিকশা চালাচ্ছে, যেন আমি তাকে জানিয়ে দিয়েছি আমি কোথায় যাবো।
‘ক্যা রে তুই যাস কোঁটে?’
‘বাড়িত যাই, আর কোঁটে? গোটাল আইতখান কি আস্তাত ঘুরি ঘুরি গণেশপূজা করমো নাকি!’
‘তুই তো যাবু তোর বাড়িত, ঠিকই আছে। হামি তা’লে কোঁটে যাই?’
‘হামার বাচ্চা ক’লে দুড্যাই বড় হয়্যা গেছে, দুই তিন বচ্ছর হইল কোনোডাই আর বিছনাত মোতে না!’
আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। ইউসুফের রসবোধ ঠিক আগের মতোই আছে। সে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে, সেটা জানানোর এর চেয়ে সহজ পদ্ধতি আর কী হতে পারে!
টুকটাক গল্প করতে করতে আমরা এসে পৌঁছুলাম বাজারে। রাত প্রায় বারোটা বাজে, বাজার পুরোপুরি বন্ধ। দু-একটা দোকানের ভেতর থেকে আলোর আভাস, কিন্তু ঝাঁপ বন্ধ। ইউসুফ ময়না বাবুর হোটেল পার হয়ে একটা বেড়া-ঘেরা গোডাউন জাতীয় কিছুর সামনে দাঁড়ালো। ‘এ মন্টু-উ’ বলে হাঁক দিতেই একটু পর কে একজন টিনের গেট খুলে দিলো, ভিতরে সারি সারি রিকশা রাখা। এটা তাহলে রিকশার আড়ত। আমি নেমে গেলাম, ইউসুফ রিকশা জমা দিয়ে ফিরে এলো। ‘দোস্তো, স্যরি, ইবারকা একনা হাঁটা নাগবি। মহিমাগঞ্জত হামার রিশকাই হচ্চে শেষ পেডেল।’
আমরা গল্প করতে করতে ইউসুফের বাড়ি পৌঁছুলাম। একটু সংকোচই লাগছিল, এত দিন পর বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি, একদম খালি হাতে। তার বউ-বাচ্চারাই বা কী ভাববে? যাহোক, কাল একটা কিছু কিনে দিলেই হবে। ইউসুফ হঠাৎ প্রায় অনুনয় করে বললো, ‘দোস্তো, এডা রিকোয়েস্ট। হামার এই ব্যাপারটা জানি তোর ভাবী না জানে’
‘কোন ব্যাপারটা?’
‘এই যে রিশকা চালানের ব্যাপারটা’
‘তার মানে? তুই রিকশা চালাস, এটা তোর বউ জানে না?’
‘না জানে না। জানলে খুব কষ্ট পাবি’
‘তা’লে তুই করিস কী? মানে তোর পেশা কী?’
‘দোকান করি। বন্দরে দোকান আছে। কিন্তুক ধর যে নয়টা-দশটা বাজতেই বাজার ফাঁকা হয়্যা যায়, বেচা-বিক্রী নাই। তাই … এই… রিশকা নিয়্যা বারাই। দিনেত দোকান করি, দশটার পর থাকি রিশকা। তুই যেই ট্রেনত অ্যা’লু, সিড্যা ধর সারা বচ্ছর লেট থাকে। ওই ট্রেনের পেসেঞ্জার ধরি, আবার কিছু আইতের কাস্টমার আছে, হাটবারে বন্দরের ব্যাপারীরা আসে, তাগেরে নিয়্যা যাই, পশ্চিমপাড়ার জুয়ার ঠেক থাকি জুয়াড়ি গোরেক নিয়্যা যাই… সপ্তায় ধর দুই-আড়াইশো ট্যাকা থাকে। গড়পড়তা মাসে হাজার খানিক হলেই তো মনে কর বাচ্চা দু’ড্যার পড়ার খরচটা আসে। … তোর ভাবীক কইসনা ভাই, ওঁই কষ্ট পায়্যা মর‌্যা যাবি!’
দরজা খুললো ইউসুফের বউ। আমার তখনো ইউসুফের কথার ঘোর কাটেনি। মাথা নিচু করে ছিলাম, ইউসুফের বউয়ের গলা পেয়ে আবার চমকে গেলাম।
‘এড্যা কা’ক আনছো তুমি? জাহেদ না? আগোতে কওনি তো!’
মোছলেমা! আমার আরেক সহপাঠী! কী আশ্চর্য, ইউসুফ এতক্ষণে একবারও বলেনি, সে সংসার পেতেছে মোছলেমার সাথে। আজ এই এতটুকু সময়ের মধ্যে কতবারই না সারপ্রাইজ্ড হলাম! এই মোছলেমাকে সিক্স কি সেভেনে পড়ার সময় আমি চিঠি লিখেছিলাম! জীবনের প্রথম প্রেমপত্র! আমার হাতের লেখা এমনিতেই বাজে, ছোট ক্লাসে পড়ার সময় আরো বাজে ছিল, নার্ভাসনেসের কারণেই সম্ভবত, সেই চিঠির হাতের লেখা এতই হিজিবিজি হয়েছিল যে, মোছলেমা বাধ্য হয়ে বড় ক্লাসে পড়া তার বড় বোনকে দিয়ে পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করেছিল, আর তা থেকে আমার বড় বোন, বড় ভাই এবং মুহূর্তে পুরো স্কুল জেনে গেল!
সময় কী ভয়ঙ্কর নির্দয়! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমার প্রথম প্রেমপত্রের প্রাপক, আমারই বন্ধুর স্ত্রী, দুই সন্তানের জননী মোছলেমা!
ইউসুফ কোন ফাঁকে মোবাইলে জানিয়ে দিয়েছিল, মধ্যরাতে এমন আতিথেয়তা পাবো স্বপ্নেও ভাবিনি। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সাথে বেগুন ভাজা, টাকি মাছের ভর্তা, ছোট মাছের চচ্চরি আর ঘণ করে রাঁধা মশুরির ডাল! অমৃত! বাচ্চারা ভোর ভোর উঠে স্কুলে যায়, তাই আগেভাগে ঘুমিয়ে গেছে। নির্বিঘেœ খাওয়া শেষ করে শরীর ভেঙ্গে ক্লান্তি এলো। শহুরে সৌজন্যের খাতিরে সে কথা বলতেও পারছি না, তাছাড়া কৈশোরের প্রেমিকা ও বর্তমানে বন্ধুর স্ত্রীর সাথে কী এমন কথাবার্তা বলবো সে সব ভেবেও কোনো দিশা পাচ্ছিলাম না। ইউসুফই আমাকে বাঁচিয়ে দিল। হাত মোছার জন্য গামছা হাতে দিয়েই বললো, ‘বন্ধু, তোমার বিছনা রেডি, নিশ্চয়ই অনেক টায়ার্ড, ঘুমায়ে যাও। সকালে বাকি কথা হবি’।
‘আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু তুই ঘুম থেকে উঠিস কখন? আমি তো কাল সকাল সকালই চলে যাবো’
‘ক্যান? দুই-একটা দিন থাকলে কী হয়? কত বচ্ছর পর অ্যা’লু… হামিদুল, মোনারুল, জাহাঙ্গির, বাবুল, কামু সবাই আছে… কাল দেখা হবি।’
‘না রে, আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। দেখলিই তো কী ঝামেলা বেধে আছে।’
‘আচ্ছা, ইবারকা কী ঝামেলা সেড্যাই খুল্যা ক’ তো হামাক, দেখি তোর কোনো কামেত লাগবার পারি কিনা…’
‘ঝামেলাটা যে কী তা আমিই বুঝতে পারছি না। একটা লোকের সাথে প্রতিদিন মোবাইলে কথা হচ্ছে, লোকটা বলছে সে মহিমাগঞ্জে থাকে, মাস্টারপাড়ায় বাসা। আজ দুপুরে ট্রেনে ওঠার সময়ও কথা হয়েছে, সে বাসায় আছে, অথচ নিজের চোখেই দেখে আসলাম, সেই ঠিকানায় কেউ থাকে না! লোকটা মাস খানেক ধরে একনাগাড়ে মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছে। মোবাইলে তার উপস্থিতি আছে, বাস্তবে কোনো ঠিকানা নাই!’
‘তা’ক তোর দরকার কী?’
‘দরকার তো আছেই, সে আমার ডিপার্টমেন্টের এ¤প্লয়ী। এখানে তার পোস্টিং’
‘তোর ডিপারমেন্টটা কী?’
‘এইটা বন্ধু বলতে পারবো না যে! প্রফেশনাল সিক্রেট বলে একটা টার্ম আছে, জানিস তো?’
‘বুঝছি! ঠিক আছে, এড্যা যদিল খুব জরুলী কিছু হয়্যা থাকে, তো হামি তোক আটকামো না। কিন্তুক সকাল সকাল একনা বাজারেত আসিস। হামার দোকানের উপর দিয়্যাই তো ইস্টিশন যাওয়া লাগবি, তাই না?’
‘সে না হয় গেলাম, কিন্তু তুই আর কাউকে জানাস না যে আমি এসছি এখানে। তাহলে আবার আঁটকে যাবো’
‘সিড্যা তো হামাক কওয়া লাগবি না। দোকানেত গেলিই টের পাবু। হামার দোকানই সবার কন্টাক পয়েন্ট না?’
‘সারছে! তাইলে ভাই মাফ কর, পরের বার দেখা যাবে!’
‘আচ্ছা, সকাল হোক তো, দেখা যাবি। তুই বাতি নিব্যা দিয়্যা ঘুমা’
বিছানায় শুয়ে গণেশ বাবুর পুরো ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই চোখ লেগে আসলো।
সকালে ঘুম ভাঙতেই মোবাইলের ঘড়িতে দেখি সাড়ে সাতটা! এত বেলা পর্যন্ত বিছানায় থাকা খুবই রেয়ার ঘটনা আমার জন্য। তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নামতে যেতেই মোছলেমা ঘরে ঢুকলো চায়ের কাপ নিয়ে। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, ‘কেবল ঘুম ভাঙলো, স্যরি! এত বেলা করে উঠি না কখনো’
‘ঢাকা শহরের লোক নাকি বেলা করেই উঠে? মুনতাহা বু’র দেওর থাকে ঢাকায়, ওদের কাছে শুনছি’
‘গ্রাম শহরের বিষয় না, মানুষের অভ্যাসের বিষয়। যাই হোক, ইউসুফ কই?’
‘বাজারে। সে তো রোজ বারায়ে যায় ছয়টার মধ্যে। ভোর ভোর নাকি তার বেচাবিক্রি সব থাকি ভালো হয়।’
‘তাই নাকি? … আচ্ছা, কলেজ ট্রেন কি এখনো আছে?’
‘থাকবি না ক্যান? কলেজও বন্ধ হয় নাই, ছেলেমেয়েদের কলেজে পড়াও বন্ধ হয় নাই। তা’লে কলেজ যাবার ট্রেন বন্ধ হবি কেন ?’
‘তাও তো কথা। ক’টায় যেন আসে ট্রেনটা?’
‘আটটার সময় মনে হয় রাইট টাইম। কেন, তুমি কি যাবার প্ল্যান করিচ্চো নাকি?’
‘যাওয়া লাগবে না?’
‘যাবা, এখনই কেন? এক-আধ দিন থাকলে কী হয়?’
‘আরে না, কাজ আছে না?’ আমি তাড়াহুড়ো করে ব্যাগের পকেট হাঁতড়াতে লাগলাম টুথব্রাশের জন্য। মোছলেমা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,
‘আমার ছেলেমেয়েদেরকে তো দেখলা না’
‘কেন, দেখলাম তো, কাল রাতে দেখলাম না?’
‘ওইটা আবার দেখা হইল নাকি? অ’রা তো ঘুমের মধ্যে। ভোরবেলা অ’রা যখন উঠলো, তুমি তখন ঘুমে। তুমি অ’দের জাহেদ মামা নাকি জাহেদ চাচা – তাই নিয়ে দুই ভাইবোনে কাইজ্যা করতে করতে ইস্কুল গেছে। আস্যা যদি দেখে তুমি নাই, কান্দি এক্কেরে বাড়ি মাথাত তুলবি।’
‘আমি আবার আসবো। এবার তো কাজ নিয়ে এসেছিলাম, এর পর তোমাদের জন্যই আসবো। প্রমিজ, আসবো!’
‘থাক, অইল্যা উল্টাপাল্টা প্রমিস আর করা লাগবি না। প্রমিস তো আগোতেও একবার করছিল্যা, সিব্যারও তো রাখবার পারো নি!’
আমি থতমত খেয়ে মাথা নিচু করলাম। আমার বিব্রত অবস্থা চোখ এড়ালো না মোছলেমার, প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্যেই হয়তো প্রশ্ন করলো, ‘আচ্ছা, ইমো’র বাবার সাথ তোমার দেখা হ’ছিল কোনটে কাইল? ইমো তোমার ভাগ্নীর, মানে হামার মেয়ের নাম।’
আমি আবারও বিব্রত হলাম। কোনো রকমে বললাম, ‘ওই আরকি, বাজারের দিকে।’
মোছলেমা কিছু সন্দেহ করলো কিনা বোঝা গেল না, কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বললো, “যাবার চা’লে যাবার পারো, আটকাবো না। কোনোদিন আটকাইনি, সেড্যা তুমি ভালোই জানো। বাচ্চাগুলার কান্দাকাটিও ব্যাপার না, অ’রা তো এমনিতেই ভাইবোনে মারামারি কর‌্যা এই কান্দে, এই হাসে। কিন্তুক, অভাবের সংসারে এত রাতে খাতিরদারী তেমন একটা করব্যার পারল্যাম না, এড্যা লিয়্যা তোমার বন্ধুরও মন খারাপ, হামারও। ওই দেখো, কত্ত কত্ত বাজার প্যাঠে দিছে। হামাগেরে গরীবের সংসারে একসাথ এত ট্যাকার বাজার কুনোদিন হয় নাই আগেত। ফিরিজও নাই যে রাখ্যা দেমো। তুমি যদিল না খাও তো হামাগেরে খরচটাও বেকার, কষ্টটাও বেকার। মনটাও হবি খারাপ। একটা রাতের জন্যি আস্যা মায়া ব্যাড়ে দিয়ে যাবার চা’লে যাও, আটকামো না। তোমার বন্ধু বাজার র্যেকম কর‌্যা দিছে, র্সেকম আবার কয়্যাও দিছে, হামি জানি তোমাক জোর কর‌্যা আটকায় না রাখি। তুমি তো আর হামাগেরে মতোন যেন-তেন মানুষ না, তোমার কাম-কাজেরও দাম আছে, সুময়েরও দাম আছে…’
‘দেখ মোছলেমা, আমি যে কাজে এসেছি, সেটা যদি হয়ে যেত ঠিকঠাক মতো, তাহলে কাল রাতেই আমি এখান থেকে চলে যেতাম। যে-কোনো উপায়ে যেতাম। সেটা হয়নি বলেই থেকে যাওয়া। যদি আজকের দিনটা থাকলে কাজটা হতো, থেকে যেতাম। আর থেকে যাওয়ার যদি বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকতো, তোমাদের এত বার করে বলতে হতো না। এই জায়গাটা আমারও তো নিজেরই জায়গা। এই গ্রামের, এই মফঃস্বলের আলো-হাওয়াতেই তো বড় হয়েছি আমি। আমারও তো কত কত বন্ধু আছে এখানে, দশ-এগারো বছরের স্কুল জীবনের সহপাঠীরা, আরো কত পরিচিত বন্ধুবান্ধব!… কিন্তু কর্তব্য বড় কঠিন জিনিস। তবে হ্যাঁ, তোমাকে দেয়া কথা রাখতে না হলেও, কর্তব্যের কারণেই যে আবার আসতে হবে, তা আমি বেশ বুঝতে পারছি। আমার ভাগ্নে-ভাগ্নীদের মন খারাপ করতে মানা ক’রো, দেখা হবেই!’
বাসা থেকে বেরুনোর সময় মোছলেমা আবার একবার স্মরণ করিয়ে দিলো, ‘কলেজ ট্রেন আগেও যেমন, এখনো কিন্তু রাইট টাইমে চলে। ট্রেন ফেল করলে তো বাসেই যাওয়া লাগবে, বাসার উপর দিয়েই য্যায়ো না হয়…’
‘ট্রেন ফেল করার বদ-দোয়া দিলে নাকি?’
‘ছি! তোমাক কোনো দিন বদ-দোয়া দিব্যার পারি? জীবনে একখান মাত্র প্রেমপত্র পাছিলাম, সিড্যাই কিনা তোমার লেখা… হি হি হি’
এবার আমিও না হেসে পারলাম না।
মোছলেমার কথাই ঠিক হলো, ট্রেন পাওয়া গেল না। অগত্যা বাজারে ঢুকতে হলো। ইউসুফের দোকান খুঁজে পেতে অসুবিধা হলো না, সেখানেই দেখা হয়ে গেল পুরনো বন্ধুদের প্রায় সবার সাথে। জাহাঙ্গির ইউসুফের প্রতিবেশী, পাশের দোকানদার। কামুরও দোকান বাজারেই, একটু তফাতে। বাকিদেরকে মোবাইল করতেই এসে হাজির। জ¤েপশ আড্ডা হলো সবাই মিলে। ঘন্টা দু’য়েক আড্ডা দিয়ে ইউসুফের পরামর্শ মতো রওনা দিলাম ওর বাসায়। এর মধ্যে আড্ডার চোটে ইউসুফ ভুলে গেছিল মোছলেমাকে জানাতে যে আমার ট্রেন মিস হয়েছে। আমিও আর বলতে দিলাম না, যাতে বাচ্চাদেরকে সারপ্রাইজ দেয়া যায়। ওদের জন্য চকলেট আর রংপেন্সিল কিনে নিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছুলাম, তখন বেলা প্রায় সাড়ে বারোটা। বাচ্চাদুটো ধুলোকাদায় গড়াগড়ি করে উঠোনে খেলছে। দেখে মন ভরে গেল। আমাকে দেখেই মেয়েটা ‘জাহেদ মামা’ আর ছেলেটা ‘জাহেদ চাচা’ বলে এমনভাবে ছুটে আসলো, যেন আমি তাদের কত দিনের চেনা। ধুলোমাখা শরীরের বাচ্চাদুটোকে বুকে তুলে নিতে আমার এতটুকুও সঙ্কোচ হলো না, যেমনটা কখনো হয়না আমার আপন ভাগ্নে-ভাগ্নীদের নিতে। চকলেট আর রংপেন্সিল পেয়ে তারা যখন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার খুশিতে লাফালাফি করছে, তখন আমি খেয়াল করলাম, বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছেনা। ইমো-কে বললাম, ‘মা-মণি, তোমার মা কোথায়?’ ইমো কিছু বলার আগেই তার ছোট ভাই মিমো বললো, ‘ওপিকুলদের বাড়িত।’ ইমো সংশোধন করে দিয়ে বললো, ‘রফিকুল চাচাদের বাড়ি।’ তারপর আমার বলার অপেক্ষা না করেই দুজনে ছুট দিলো, সম্ভবত তাদের “ওপিকুল” কিংবা ‘রফিকুল চাচা”র বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমি এই সুযোগে কলতলায় চলে গেলাম হাতে-পায়ে, কাপড়ে লেগে যাওয়া ধুলো-কাদা পরিষ্কার করতে।
কলতলাতে থাকতেই শুনতে পেলাম মোছলেমা ছুটে আসতে আসতে উদ্বিগ্ন গলায় বলে চলেছে, ‘দেখতো দেখি তোর বাপের কাণ্ড, ট্রেন ফেল হছে, এড্যা আগোতে কবি না? কত্খানি বেল হছে, কখন কী আন্দিমো, কখন খাবার দেমো! আল্লা গো, এই মানুষটাক তুমি যদি চার‌্যানাও বুদ্দি-আক্কেল দিত্যা গো!’
কিছু বুঝে ওঠার আগেই মোছলেমা এসে ঢুকলো বেড়া-ঘেরা কলতলায়। আমাকে কলতলায় দেখে ভূত দেখার মতোন চমকে গেল। চমকে উঠলাম আমিও, কারণ মোছলেমা কলতলায় এসেছিল হাত ধুতে। সম্ভবত সে মশলা বাঁটতে বাঁটতে তাড়াহুড়ো করে উঠে চলে এসেছে, তার হাতে শুকনো মরিচ বাঁটার লালচে দাগ!
চোখাচোখি হতেই মোছলেমা চোখ নামিয়ে নিলো, আমিও বিনা বাক্য ব্যয়ে বেরিয়ে আসলাম কলতলা থেকে।
ঘরে এসে বিছানায় বসতেই পেছন থেকে মোছলেমার গলার আওয়াজ পেলাম, ‘যা দেখছো তা তো বুঝিছোই, তোমাক অনুরোধ লাগে, তোমার বন্ধু যেন্ না জানে ব্যাপারটা!’
আমি চমকে তাকালাম, বারো ঘন্টার ব্যবধানে স্বামী স্ত্রী উভয়েই একই অনুরোধ করলো আমাকে। আমার দৃষ্টির কৌতুহল পড়তে পেরে, কিংবা নিজে থেকেই মোছলেমা বলে চললো, ‘কত ভালো ছাত্র আছিল, বাপটা মরার জন্যে পড়াশুনা হইল না। ভাইটার বোকামীত জমিজমাও শ্যাষ! ভাইয়োকই টানে না মা’ওকই টানে! তার মধ্যে হামি গেলাম জুটে! না জুটলে উপায় কী? বাপ তো হামারও গেল। ডিম্যান্ড ছাড়া বিয়্যা করবি আর কেডা হামাক? হামিও যা, ইউসুফও তা। দুজনে গেলাম জুটে এক সাথ। এত বড় সংসার চালাবার য্যায়্যা দোকানদারী করতে করতে লোকটা তো শ্যাষ হয়্যা গেল। আন্ধার থাকতে উঠে দোকান খোলে। তামান দুনিয়া বন্ধ হয়্যা যায়, অর জানি কতই বড় ব্যাবোসা, বাড়িত ঢুকার নাম নাই! … এইসব দেখ্যাই … আত্মীয়-গুষ্টির মইদ্যেই টুকটাক কাজে কামে সাহায্য করি। হামার তো বাচ্চাকাচ্চা ছোট, এখনো এই সব বোঝে না, এই সুযোগে যত্টুক আগায় রাখা যায় আরকি। পাঁচশো ট্যাকা মতোন দেয়, বেটাবেটির নামে সিড্যা ব্যাংকেত ডিপিএস কর‌্যা থুই। রফিক ভাই ইমোর এক রকম মামা হয়, ওর দ্বারাই ট্যাকা রাখি ব্যাংকেত । হামাগেরে যা হয়নি, হামার বেটাবেটির যেন তা হয়, অদের পড়ালেখা জানি মাঝা-ঘাটাত বন্দ হই না যায়…’ কথা বলতে বলতে কণ্ঠ ধরে আসলো মোছলেমার, আমিও বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেলাম না, মুখ ফিরিয়ে রাখলাম অন্য দিকে।
কী বলবো? আমার সকল তুচ্ছতাকে নিয়ে আমি কী করে তাকাবো এই অসামান্য মানুষগুলোর দিকে? জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি উঠানে নিজের মনে হুটোপুটি খাচ্ছে ইমো আর মিমো। ‘পার হয়ে কত নদী কত না সাগর/ এই পারে এলি তুই শিশু যাদুকর!’ যাদুকরই বটে। কী অসম্ভব মায়ার যাদুতে অতি সাধারণ দুই ভাগ্য-বিড়ম্বিত তরুণ-তরুণীকে তোরা অসামান্য মানব-মানবীতে বদলে দিলি! তোদের মতোন শিশু যাদুকরেরা আছে বলেই ‘মাটির পৃথিবী তাই এত ভালো লাগে’! স্যালুট তোদের… স্যালুট!


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা