67089695_1205629756286621_1569702463835996160_o

চি হ্ন মে লা চি রা য় ত বা ঙ লা ২ ০ ১ ৯

চিহ্নমেলা  ২০১৯ : সতত ডানার সিম্ফনি

২০১১ থেকে ২০১৯ চারবার শান্তির পায়রাগুলো উড়ে গেছে, মেলার আকাশে; তারা সংবাদ নিয়ে গেছে, আবার আসিব ফিরে বলে। তখন একটা শ্বাসভরা উদ্বোধনের বাতাসে বেলুনগুলো কোন অজানায় অনিঃশেষ নাই হয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা ‘শূন্য’ আর ‘ইনফিনিটি’ নিয়ে অনেক ভাবেন। আমরা মেলা প্রাঙ্গণে ওরকম কিছু ভাবি নাই কিন্তু হাবাগঙ্গারামের মতো ঊধ্বাকাশে তাকিয়ে কীসব স্বপ্ন বুনে চলেছি। একজন দুজন করে অনেক অনেকানেকÑ যুবক, তরুণÑ আর সব বাচ্চা নারীদের। লিটলম্যাগ কী কেন সেসব নিয়ে বিস্তর গপ্পো আছে। আমাদেরও গপ্পো কম হয় নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে চলাফেরাÑ তাই গুণীদের নিয়ে ওসব আড্ডাবাজী বেশ হয়েছে। কাগজের লেখালেখি নিয়ে ধাপ্পাও কী কম হয়েছে? ভেতরে ভেতরে বেলা তখন বেড়েছে। যুগবর্ষযাপন থেকে, এপার বাঙলা ওপার বাঙলা, অতঃপর বিশ্ববাঙলা হয়ে চিরায়তবাঙলা। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলা ধরে পদচারণা ছড়িয়ে গেছে কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে পশ্চিমবাংলায়। ২০১৯এ মেদিনীপুর থেকে জলপাইগুড়ি সব্বাই নিজেদের মতো ভালোবাসা ছড়িয়ে এক হয়ে আসেন। কলকাতা বইমেলায় লিটলম্যাগ মেলার চত্বরের উৎসবটা বেশ আকর্ষক, এর কোনো সংজ্ঞা হয় না। সেখান থেকে মানাসই শ্লোগান ধরে নিয়ে, ছোটপ্রকাশনার কাজ যুক্ত করে, বড় এক উৎসব গড়ে ওঠে এবার চিহ্নমেলায়। এ উৎসবের অনুঘটক হন, ‘কলকাতা কথকতার’ জাদরেল শিক্ষিত প্রদর্শকবৃন্দ। খুব দারুণ ওঁরা। সেশনগুলোও হয় খুব জমজমাট। সাহিত্যে বিজ্ঞান, গল্পের হালচাল, কবিতার প্যাথোস, প্রকাশনানুষ্ঠান প্রভৃতি রকমের। মেলায় তো মেলা মানুষ, কে কার কথা শোনে? কেউ শোনেন বা শোনেন না। এসব নিয়ে পশ্চাৎকর্মপরিকল্পনায় ভেবেছেন, মঞ্চ সাজিয়েছেন, কাজ করেছেন অন্তত দেড়শজন চিহ্নকর্মী; তার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে এগারজন সেক্টর কমান্ডার আলাদা চিহ্ন নিয়ে ভেবেছেন। ঝড়-বৃষ্টি-গুরুগুরু দেয়া সব বাতিল করেÑ যা চাই তাই করেছেন। এরাও লেখক। ভালো কবি ও গল্পকার। ভুলে যান না কিছু। প্রযুক্তির প্রসারে সবকিছু ডিজিটালি করলে কেমন হয়? সে চেষ্টায় আনো সেরকম মানুষ। ভিডিও, ¯œ্যাপ, অডিও, টুকরো টুকরো কতোকিছুর খেয়ালÑ কিন্তু কোনো জরিমানা নেই। হায়! কী যে উৎসব। দুইদিন যেন কয়েক সেকেন্ড মাত্র! মেলা শেষ হওয়ার পর এখন একদম কাউকে ভাল্লাগে না। তাই আগামীবার মেলা বসবে তিনদিনের। নাম দিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘চিহ্নমেলা মুক্তবাঙলা’। সেই অপেক্ষা ২০২২ পর্যন্ত। এবার আরও অভিজ্ঞ, এক্সপেরিমেন্ট, আড্ডবাজদের ভীড়ে সতত ডানায় আকাশ হবে ভরপুর। আরও গুটিকয় বেলুনের সমাহার আর যোগাড় এবার। এভাবেই বুঝি- ‘This is the way the world ends/ Not with a bang but a whimper’ চলুন একসাথে, একরথে, মাভৈঃ!!

************************************************

পুরস্কার ও সম্মাননা

যুগবর্ষযাপন ও চিহ্নসম্মাননা  ২০১১

সৃজনশীল            : জাকির তালুকদার (মুসলমানমঙ্গল)

মননশীল             : মামুন মুস্তাফা (এই বদ্বীপের কবিতাকৃতি)

বাংলাদেশ (লিটলম্যাগ সম্মাননা)

সমুজ্জ্বল সুবাতাস            : চৌধুরী বাবুল বড়–য়া, বান্দরবান

আরণ্যক              : তুহিন দাস, বরিশাল

পড়শি   : সাফিয়ার রহমান, যশোর

ধূলিচিত্র : পাপড়ি রহমান, ঢাকা

ভাস্কর    : পুলিন রায়, সিলেট

দোআঁশ : ইসলাম রফিক, বগুড়া

শব্দ        : সরোজ দেব, গাইবান্ধা

চিহ্নমেলা : এপারবাঙলা ওপারবাঙলা ২০১৩

মননশীল             : ইউছুফ মুহাম্মদ

সৃজনশীল            : মাসুদুল হক

চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলা ২০১৬

সৃজনশীল            : মোস্তাক আহমাদ দীন

মননশীল             : শরীফ আতিক উজ জামান

বাংলাদেশ (লিটলম্যাগ সম্মাননা)

চৈতন্য  : রাজিব চৌধুরী, সিলেট

প্রয়াসী  : জলিল আহমেদ, দিনাজপুর

পুষ্পকরথ            : হাফিজ রশীদ খান, চট্টগ্রাম

দূর্বা         : গাজী লতিফ, গোপালগঞ্জ

কবিকুঞ্জ               : রুহুল আমিন প্রামানিক, রাজশাহী

ভারত (লিটলম্যাগ সম্মাননা)

কোরক : তাপস ভৌমিক, কলকাতা

মল্লার    : শুভময় সরকার, শিলিগুড়ি

তিতির   : সঞ্জয় সাহা, কোচবিহার

চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা ২০১৯

সৃজনশীল            : সরকার মাসুদ

মননশীল             : হোসেনউদ্দীন হোসেন

বাংলাদেশ (লিটলম্যাগ সম্মাননা)

বুনন      : খালেদ উদ-দীন, সিলেট

খড়িমাটি              : মনিরুল মনির, চট্টগ্রাম

অ্যলবাম              : মনজু রহমান, রাজশাহী

অমিত্রাক্ষর         : আমিনুর রহমান সুলতান, ঢাকা

বেগবতী               : সুমন শিকদার, ঝিনাইদহ

ভারত (লিটলম্যাগ সম্মাননা)

কবিতা ক্যাম্পাস : অলোক বিশ্বাস, কলকাতা

এখন বাংলা কবিতার কাগজ : অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়, জলপাইগুড়ি

এবং সায়ক : সূর্য নন্দী, মেদিনীপুর

************************************************

লেখকদের সঙ্গে আলাপচারিতা

ইমানুল হকের মুখোমুখি
লেখক ও অধ্যাপক

চিহ্ন : সেশনটায় কি সমস্যা হয়েছিল উপস্থাপকের কারণে?

ইমানুল হক : না ওটা হয়ে গেল কি, পরিসরটা যেটা ফালতু বিষয়, ওটা সবাই জানে ওটার কী উত্তর হবে। বিষয়টা ছিল, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে কেমন সাহিত্য রচিত হচ্ছে।’ এসময়ে ভালোমন্দ কী হচ্ছে সেটা তো এল না আলোচনায়। শুধু আলোচনায় এলো, ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ বনাম সাহিত্য। খারাপ হলো না, কিন্তু এর ব্যপ্তিটা এইটুকু হয়ে গেল, যেটা ছিল এতবড় সেটা ছোট হয়ে গেল। সঞ্চালক যদি বিষয়টা ছেড়ে দিত আমাদের হাতে তাহলে আলাদা ব্যাপার। কিন্তু ও প্রশ্ন করে দিচ্ছে। এটা সমস্যা। ও যদি বলতো আপনার মত বলুন, এই বিষয়ের ওপর মত বলুন, তাহলে বিস্তারিত কথা আসতো। ও একটা প্রশ্ন করেছে, তখন আলোচনা ওই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা যা ভেবে এসেছিলাম তার ধারেকাছেও যাওয়া গেল না।

চিহ্ন : পুরোটা সময় কী মঞ্চের দিকেই ছিলেন আজকে?

ইমানুল হক : হ্যাঁ। আমরা এখানে মঞ্চের বা দিকটায় বসে শুনছিলাম।

চিহ্ন : উত্তর-আধুনিক সময়ে বা ডিজিটাল সময়ে ছোটগল্প সম্পর্কে এই আড্ডা থেকে কী উঠে আসলো?

ইমানুল হক : প্রথমত উত্তর-আধুনিকতা হচ্ছে বিপণন। একটা মতাদর্শগত বিপণন। মার্কসবাদকে নস্যাৎ করার জন্য বহু চেষ্টা হয়েছে, পুঁজিবাদী আক্রমন হয়েছে। পরে পুঁজিবাদীরা বোঝে পুঁজিবাদ দিয়ে, বাইরে থেকে আক্রমণ করে মার্কসবাদের কোনো ক্ষতি করা যাবে না। তাদের মার্কসবাদ আরও শক্তিশালী হবে এতে। এবার নতুন প্রক্রিয়া শুরু হলো- ভেতর থেকে আক্রমণ করা। ভেতর থেকে আক্রমণের বড় সুযোগটা চলে এলো ফ্রান্সে। ফ্রান্সে একদল যুবক যারা আদর্শবাদী ছিলেন, কেউ প্রসকাইড এবং কেউ বামপন্থী, কেউ কেউ স্তালিনবাদীও ছিলেন, তারা মনে করে ছিলেন যে সর্ববিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন থেকে শুরু হয়েছিল, যে ছাত্র আন্দোলন ছিল মেয়েদের হোস্টেলে যাওয়ার অধিকার ছেলেরা চায়। এইখান থেকে আন্দোলন শুরু হয়। এই অধিকার থেকে তারা পিকেটিং বা অবরোধ শুরু করে। এখানে ৩০ দিন অবরোধ চলে। অবরোধ চলার পর যেটা হয় যে আস্তে আস্তে একটা একটা শ্রমিক ফ্রন্টে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লো। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা পাশে এসে দাঁড়াতে লাগলেন। এবং এমন একটা অবস্থা হলো যে ফ্রান্সের সরকার প্রধানকে চলে যেতে হলো দেশের বাইরে। পালিয়ে ন্যাটোর একটা সামরিক ঘাঁটিতে আশ্রয় নিতে হলো। এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেল। সেই সময় ছাত্ররা চাইলেন যে কমিউনিস্ট পার্টি বিপ্লবের ডাক দিক। এবং সোভিয়েত রাশিয়ার ট্যাংক ঢুকুক এ দেশে। তাদের এ দেশে, সামরিক অভ্যুত্থান হোক, তারা এ অভ্যুত্থানে সহয়তা করুক। তারা যখন এটা চাইলেন, তখন রাশিয়া রাজি হয়নি। বা কমিউনিস্ট পার্টিও বিপ্লবের ডাক দিতে রাজি হয়নি। এতে সব অচিরেই মারা যেত। এটা সফল হতোও না। ফলে সারা পৃথিবীতে সোভিয়েত রাশিয়ার ভাবমূর্তিরও সমস্যা হতো। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন নেই, রাশিয়া হয়ে গেছে। স্তালিন নেই এবং এরা যারা বেড়িয়ে এলেন তারা প্রথমে আক্রমণ করলেন ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টিতে। যে এরা হচ্ছে ডরপুক। ভীতু। কাপুরুষ। এদের দ্বারা হবে না। এটা করতে করতে ওরা এরপর আক্রমণ করলেন সোভিয়েত ইউনিয়নকে। তার থেকে ওরা আক্রমণ করলেন স্তালিনকে। যে স্তালিনকে সোভিয়েত রাশিয়ার শাসক শ্রেণী ইতোমধ্যে পরিত্যাগ করেছে। এবং সেখান থেকে তারা পৌঁছালেন মার্কসে। এবং খুঁজতে লাগলেন কোথায় কোথায় মার্কসের অসম্পূর্ণতা আছে।

                একটা সময় যে কথা বলেছিলেন গ্রামশি, গ্রামশির কথায় কোথাও কোথাও সারবত্তা ছিল। মার্কস হয়তো সেসব ভাবতে পারেননি সুশীল সমাজের কথা। যেসময় লিখছেন, সেসময় হয়তো ভাবেননি। তিনি এটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে পুঁজিবাদের ভেতর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ আছে। তারা পরস্পর স্ত্রীদের বিনিময় করে, তেমনি আবার তাদের অভ্যন্তরে দ্বন্দ দেখা যায়। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ অনিবার্য। উপায়হীন তারা। এবং তিনি কতটা ভাগ করেছিলেন যা গ্রামশিরও বুঝতে অসুবিধা হয়েছিল। তিনি কিন্তু শুধু এ কথা বলেননি। বুর্জুয়া আর পুলেটারি একথা বলেননি। সরল রেখায় ভাগ করেননি। তিনি একটা পেটি বুর্জুয়ার কথা বলেছিলেন। যেটা আমরা যারা পাতি মধ্যবিত্ত, পাতি বুর্জুয়া, যারা একদিকে দালালি, হয় বিপ্লবের পক্ষে থাকে, আবার যখন পারে না তখন শোষক শ্রেণীর দালালে রূপান্তরিত হয়ে যায়। যেটা সুবোধ ঘোষের গোত্রান্তর গল্পে চমৎকার আছে। যে ছিল শ্রমিকদের পক্ষে, সে চলে গেল শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। এবং এই যে পন্যায়ন ঘটছে সম্পর্কের, যে সে দেখছে একটা গল্পতে, সুবোধ ঘোষের গল্পের মতো এত চমৎকারভাবে বামপন্থার চিন্তা খুব কম লেখকের গল্পে এসেছে। সে গল্পে দেখা যায়, সঞ্জয় দেখেছে, তার ভাইপো সেদিন বেশি ভালোবাসে যেদিন সে চকলেট বেশি এনে দেয়। অর্থাৎ দেয়া- নেয়ার মধ্যে যে সম্পর্কের জায়গাগুলো এটা মার্কস বুঝেছিলেন, তিনি পাতি বুর্জুয়াদের কথা বলেছেন। তিনি লুম্পেন পুলেটারির কথা বলেছিলেন। তো এটা, সবটা যে খুব স্পষ্ট করে বলে দেবেন একজন মানুষ, তাতো না। কারণ তিনি তো লেখেন, তাইলে মার্কসবাদকেই অস্বীকার করতে হয়। যে মার্কসবাদ… উনি বলেছেন যে, ভাগ্যিস আমি মার্কসবাদি নই। আমি অন্তত মার্কসবাদি নই। কারণ যে মার্কসবাদ মানে হচ্ছে সমাজের কাঠামোর মধ্য থেকে, পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্য থেকে উঠে আসার তত্ত্ব। সেটার মতো। তো এরা তার অতিমাত্রিক একটা ধরণ করলেন, মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান অনেকে ভেবে বলেছেন। তা হতে পারে না! তাহলে মার্কসবাদকে অস্বীকার করা হয়। মার্কসবাদ হলো একটা বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের নিয়ম হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে তার নীতির মধ্য দিয়ে চলা। না না করতে করতে সে, বাতিল করতে করতে সে একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মার্কসবাদের যে, কমিউনিস্টদের মূল কথাটা, সে কথাটা তো বাতিল হয়ে যায়নি। আজ পর্যন্ত বিদ্যমান পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। এবং শ্রেণীসংগ্রাম চলবে। পৃথিবী যতদিন থাকবে সংগ্রাম চলবে। তো এই উত্তর-আধুনিকতাটা তারা যেটা করলেন ভয়ঙ্করভাবে মার্কসবাদকে আক্রমণ করলেন, ব্যক্তি সাপেক্ষে অন্তর্নিহিত দ্বন্দই সব। এই জায়গাটাকে তারা নিয়ে গেলেন, অণু পরমাণু বলতে বলতে, ব্যক্তি স্বাধীনতা বলে ইগো অহমিকা, আত্ম সর্বস্বতাকে তারা বড় করলেন। মুহূর্তে বাঁচো। খ-কালীন বাঁচা, এই গুলোকে তারা খুব বড় করলেন। আসলে তারা হলেন ভোগবাদ। এই যে আজকে আমরা কনজিউমারের যে বিপুল বিস্ফোরণ দেখছি, এর তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করে কিন্তু উত্তর-আধুনিকতা। এবং বৈদ্যুতিন সময়ে প্রযুক্তির পরিবর্তন যুগে যুগে হয়েছে। পৃথিবী যতদিন, প্রযুক্তি ততদিন। প্রযুক্তিহীন তো পৃথিবী ছিল না। যে লোকটা বুমেরাং আবিষ্কার করছে, যে পাথরের অস্ত্র আবিষ্কার করছে তার কাছে ওইটাই প্রযুক্তি। যে আগুন আবিষ্কার করছে, যে চাকা আবিষ্কার করছে, আগুন আবিষ্কারের থেকে বড় আবিষ্কার পৃথিবীতে খুব কম হয়েছে। তার হয়েছে মাত্রাগত বিস্ফোরণ। আর বৈদ্যুতিন যুগে হয়েছে প্রবল বিস্ফোরণ। প্রবলতর বিস্ফোরণ। প্রবলতম আমি বলতে চাইছি না, কেননা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো আমরা জানি না। সেইজন্য বৈদ্যুতিন যুগে আমার যেটা ভয় হচ্ছে সেটা হলো, যে সামাজিক মাধ্যম অনেকগুলো উপকার করেছে যে আমরা অনেক জায়গায় যেতে পারছি। যে লেখাগুলো আগে পেতাম না সেগুলো পাচ্ছি। তেমনি দিচ্ছে যেমন অনেক, কেড়েও নিচ্ছে। পাশাপাশি বসে থাকছে দু’জন ছেলেমেয়ে, ট্রেনে আগে দেখতাম গল্প করতো দু’জনে। এখন মোবাইল খুলে বসে আছে। আবার এটাও তো দেখলাম, এখানে হিজাব পরে একটা মেয়ে সে অন্যদের ডাকছে নাচার জন্য। সে নাচায় কিন্তু লাস্য নেই, কিন্তু তার মধ্যে প্রাণের প্রণোদনা আছে। নাচের তো একটা ধর্ম থাকে লাস্য, কিন্তু এখানে আছে প্রণোদনা, মানে নিজেকে প্রকাশের, যে আপনা হতে বাহির হয়ে বাহিরে দাঁড়ায়। এই বাহিরে দাঁড়ানোর যে একটা প্রবণতা, এবং এই যে এতগুলো ছেলেমেয়ে যে গান শুনতে এলো, লোকগান শুনছে, লোকগানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যে, এরা কিন্তু চাইছে, ওরা কিন্তু এসময় ফেসবুক করেনি। বরং আমরা বৃদ্ধরা অনেক সময় ফেসবুকে গিয়ে লাইভ করেছি। আমার দেশের যারা আসেনি তারা দেখলো। এই একটা দিক। এখন আগুন দিয়ে আমি লোকের ঘর জ্বালাতে পারি, আবার আগুন দিয়ে ভাত রান্না করতে পারি। আগুন দিয়ে নেশাদ্রব্য বানাতে পারি, আবার একজন শীতগ্রস্থকে উষ্ণতা দিতে পারি। আবার আগুন দিয়ে আমি ইস্পাতও তৈরি করতে পারি। সোনা গলিয়ে নতুন কিছু তৈরি করতে পারি। কিভাবে আমি ব্যবহার করছি এটা হলো বিষয়। আজকের যুগে আমার যেটা মনে হচ্ছে যে আমরা প্রযুক্তির তৈরি, আমরা তৈরি হইনি। আমরা খানিকটা যেন মুহূর্তের আলগা চটক, একটু চমক এর দিকে ঝুঁকেছি। যে আমরা এখনো আমার মাঝেমাঝে মনে হয় যে, রবীন্দ্রনাথের গল্পের ধারা তো দূরে থাক, বঙ্কিমের ছায়া থেকেও বেরোতে পারছি না। এই যে ত্রিকোণ সম্পর্ক, নারী, তার স্তন, তার যৌনতা, নারী একটা অবশ্যই রহস্যময় প্রাণী। মানুষই রহস্যময় প্রাণী। কিন্তু নারী হচ্ছে সবথেকে সুন্দর, পুরুষের কাছে তো বটেই। কিন্তু সে তো শুধু একতাল মাংসপি- না। শুধু একটা গহ্বর না। শুধু একটা আরণ্য মহিমা না। সে তো একটা স্বত্তা, সে তো একটা মানবিক স্বত্তা। সেইটাকে যদি আবিষ্কার না করলাম, তাহলে কিসের আমার উত্তর-আধুনিকতার কথা বলছি। কিসের আমি বৈদ্যুতিন সময়ের কথা বলছি। সে তো সেই পুরানো আদিম যুগেও নারীকে ওভাবেই ভোগ্য পণ্য হিসেবে দেখা হতো।

চিহ্ন : তাহলে কি এটা বলা যায় না যে, সময়ে মিশে থাকে সবকিছু?

ইমানুল হক : সময়ে সবকিছুর মধ্যে মিশে থাকে। এবার আমরা আদিমতাকে আধুনিকতা বলে ভুল করছি। সমস্যা হচ্ছে এখানেই যে আদিমতা আধুনিকতা বলে ভুল করছি। আধুনিকতা হচ্ছে চিন্তার মুক্তি। সেই চিন্তার মুক্তি ঘটাতে সাহায্য করছি কিনা। চিন্তার বিস্ফোরণ ঘটছে কিনা। বিস্ফোরণের জড়ুল চিহ্নগুলো আমাদের লেখায় দেখা যাচ্ছে কিনা।

চিহ্ন : তাহলে উত্তর-আধুনিকতা মূলত চিন্তার জায়গাটা?

ইমানুল হক : চিন্তার জায়গাটা, কিন্তু ভোগবাদকে প্রবলভাবে বিস্তার লাভে সাহায্য করেছে। নিজের জন্য বাঁচো। ঘরের মধ্যে একাধিক টেলিভিশন। একাধিক ফোন। একেকজনের একাধিক মোবাইল। এবং এইটাই হচ্ছে ভোগবাদের লক্ষণ। আগে ছিল আপরুচি খানা, পররুচি পরনা। এখন হলো পররুচি খানা, আপরুচি পরনা। আমরা যে খাচ্ছি, পাসতা খাচ্ছি, পিৎজা খাচ্ছি, আমার দেশীয় খাবারগুলো খাচ্ছি না। বিদেশি খাবারের দিকে আমাদের ঝোঁক বেড়ে যাচ্ছে। পোষাকের ক্ষেত্রেও বিদেশি পোষাক। আমি কী পরছি, আগে রেডিমেড পোষাক পরতো গরিবেরা। বড়লোকেরা পরতো পোষাক বানিয়ে। আগে ছেঁড়া পোষাক পরা ছিল লজ্জার, এখন ছেঁড়া পোষাক হয়ে গেছে ফ্যাশন। সেটা আমি রাজশাহীতে তেমন দেখলাম না, তবে ওখানে দেখছি। আগে মানুষ পোষাক পরতো মানুষ লজ্জাস্থান ঢাকা বা নিজেকে সৌন্দর্যম-িত করে তোলার জন্য। এখন মানুষ যতটা উন্মুক্ত করছে, সেটা ততটা মডেল। মডেল বলতে আমরা প্রীতিলতা ওয়াদ্দারকে বুঝি, যে বুকে বোম নিয়ে সুইসাইড করেছিলেন। জানি না এই কাশ্মীরের যুবকের মতো, নাকি যে লোকটা ইরাকে লড়ছে, যে আফগানিস্তানে লড়ছে, তাদের বুকেও এরকম স্বপ্ন আছে কিনা জানি না। তাদের আমরা সন্ত্রাসবাদী বলে দিচ্ছি, তাদের আমরা জঙ্গী বলে দিচ্ছি। বা চাকমাদের মতো, আমরা যাদের জঙ্গী বলে দিচ্ছি, তারা হয়তো স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে। তারা হয়তো জাতিগত নিপীড়নের বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চাইছে। তারা আধিপত্যবাদের বিরূদ্ধে তাদের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরতে চাইছে। তারা প্রীতিলতা ওয়াদ্দারের মতো, মাতঙ্গিনী হাজেরার মতো, কিংবা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যে মহিলারা ধর্ষিত হয়েছেন, প্রাণ দিয়েছিলেন, অবমাননার মুখে পড়েছিলেন, তারা তো একটা বিশ্বাসের জন্য করেছিলেন, একটা ভাবাবেগের জন্য করেছিলেন। আমার রাষ্ট্র, আমার ভাষা, আমার সম্পদ আমি লুট হতে দেব না। আমি পরাধীন থাকবো না। এটা কাশ্মীরেও হয়তো স্বপ্ন দেখছে। এই স্বপ্ন ইরাক দেখছে, এই স্বপ্ন আফগানিস্তান দেখছে, এই স্বপ্ন দেখছে আমার ভূখ-ের কোনো না কোনো মানুষ, বা বালুচিস্তানের মানুষ।

                ছোটগল্প সেটাকে ধরতে পারছে কিনা আমার খুব সন্দেহ হচ্ছে। ছোটগল্প আমাদের সময়টাকে ধরতে পারছে না। অন্তত আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দু’ একজনের লেখা ছাড়া, তারাও ষাট পেরোনো, অল্প বয়সীদের লেখার মধ্যে আমি এখনো পর্যন্ত নতুন কিছু দেখতে পাচ্ছি না। এবং আমার অনেক সময় মনে হয় কী, হচ্ছে না। প্রচুর দিস্তা দিস্তা লিখছি আমরা, প্রচুর কবিতা লিখছি, নতুন প্রকরণ গড়ে ওঠেনি। জয় গোস্বামী একটা লিখেছিলেন, এখনো ওপার বাংলায় যিনি শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখেন তার নাম সঙ্খ ঘোষ। যার কবিতা এখনো নাড়া দেয়। বাকিদের খানিকটা চালবাজি আছে, খানিকটা ছলকে ওঠা আছে, খানিকটা শব্দের চাপল্য আছে, তারল্য আছে, কখনো তারুণ্যও আছে কিন্তু কোনো কাব্যভাষা তৈরি হয়নি।

চিহ্ন : তাহলে এটা তৈরি হয় নি কেন, হচ্ছে না কেন?

ইমানুল হক : ডিসকাস নেই, কোনো আদর্শবাদ নেই। শুধু যশের জন্য লিখলে এটা হবে না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন আল মাহমুদরা তৈরি করেছিল। আকাশ থেকে আল মাহমুদরা আসেন না।

চিহ্ন : তাহলে কি কোনো সংগ্রাম আদর্শকে তৈরি করে দেয়? আদর্শ তৈরি করার জন্য সংগ্রাম দরকার?

ইমানুল হক : মার্কস বলেছেন পুঁজিতে। যত কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে তাদেরকে যেতে হয়, যত বিরুদ্ধতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তত সৃষ্টিশীল হয়। অনুকূল অবস্থা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, মধ্যবিত্ত করে দেয়। তার চিন্তা মধ্যবিত্তে ঘোরাফেরা করে। চিন্তার মধ্যবিত্ততা এবং মধ্যবিত্তীয় চিন্তা, দুটো মিলে সেটা কিছু হয় না।

চিহ্ন : এখানে যে দায়ের কথা আসছে, আমরা সাহিত্য করছি, গল্প লিখছি তার দায়। আসলে কি সাহিত্যে কোনো দায় থাকতে পারে? অনেকে বলছেন যে, লেখার চিন্তা নিয়ে লেখকের টেবিল পর্যন্ত যাওয়াই হলো লেখকের দায়। যেহেতু বাকিটা রচিত হবে টেবিলেই।

ইমানুল হক : দেবেশ রায় সারাজীবনের বিশ্বাসের বিপরীতে একটা কথা বললেন, যে, লেখকের কোনো দায় নেই। দায়বদ্ধতা নেই। তার কোনো জীবন দর্শন থাকতে পারে না। এটা তো ভুল কথা। আমি প্রতিবাদ করলাম। জীবন দর্শন ছাড়া কোনো লেখা হতে পারে না। জীবন দর্শন ছাড়া একটা মানুষও বাঁচে না। কুকুরেরও একটা জীবন দর্শন আছে। ওর বেঁচে থাকার জন্য একটা জীবন দর্শন আছে। যে আমাকে খাবার দেয় তার কেনা গোলাম হয়ে থাকবো, তার প্রতি ভক্তি দেখাবো। মশারও একটা জীবন আছে। আমাকে বাঁচতে হবে। মশা একা বাঁচে না, সংঘের মাধ্যমে বাঁচে। উইপোকাও সংঘের মাধ্যমে বাঁচে। পৃথিবীর ইতিহাস হচ্ছে সংঘবদ্ধতার ইতিহাস, দায়বদ্ধতার ইতিহাস। ডায়নোসররা নিজেদের অতিকায় ভেবেছিল, একই সঙ্গে এসেছিল পিঁপড়া আর ডায়নোসর। আজ ডায়নোসর ধ্বংস হয়ে গেছে। পিঁপড়ারা ধ্বংস হয় নি।

চিহ্ন : তাহলে আল মাহমুদকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছেন?

ইমানুল হক : একজনের ব্যক্তিগত জীবন এবং সাহিত্যকে মেলানো অনেকে উচিৎ বলবেন, এক্ষেত্রে আমার একটা কথা আছে- অনেক সময় তার ব্যক্তিগত কারণে, পারিবারিক কারণে, অর্থের কারণে, সংসার পালনের জন্য অনেককে আপোষ করতে হয়। কিন্তু তার কবিতা আপোষ করছে কিনা। এ লোকটা যদি মৌলবাদী হতো তবে জলবেশ্যা প্রত্যাহার করে নিত।

চিহ্ন : এই আল মাহমুদ যে গড়ে উঠলেন, এটা কি তার দায় থেকে?

ইমানুল হক : অবশ্যই। একদিকে বামপন্থী আন্দোলনের সাথে তার যুক্ততা, পরে হচ্ছে ভাষা আন্দোলন। গোটা পূর্ববাংলার কৃষকের আন্দোলন, লড়াইগুলো, ভাসানীর আন্দোলন, আওয়ামীলীগের আন্দোলন, কমিউনিস্টদের আন্দোলন, জাসদের আন্দোলন এই সমস্ত আন্দোলন শামসুর রাহমানদের তৈরি করেছে। তাদের মধ্যে ছিল প্রতিভা, কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত প্রতিভা দিয়ে এটা হয়নি। নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহারা আকাশ থেকে আসেন নি। এই সমাজ পরিবেশের মধ্যদিয়ে সৃষ্টি হয়েছেন। ব্যক্তিগত প্রতিভা অবশ্যই লাগে, তবে ব্যক্তিগত প্রতিভা দিয়েই হয় না। এবং সমাজ যে তাদের প্রচার করেছে, সমাজ যে তাদের কথা পৌঁছে দিয়েছে, তারা কয়টা বই ছেপেছে? তিনশ কপি? পাঁচশ কপি? কিন্তু এই বই হাজারে হাজারে মানুষের কণ্ঠে বেজেছে। এটা তো দায়বদ্ধতা ছাড়া তারা হতে পারতেন না। শামসুর রাহমান শামসুর রাহমান হতে পারতেন না।

চিহ্ন : তাহলে ইচ্ছে করলেই হয়ে ওঠা যায় না?

ইমানুল হক : ইচ্ছে করলেই হয়ে ওঠা যায় না। মনে করতে পারেন যে আমি একা পারি। একা পারা যায় না। সবাই রবীন্দ্রনাথ বা তলস্তয় হয় না। এবং রবীন্দ্রনাথও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও বলেছেন, সাহিত্য শুধু লেখকের জন্য নহে। যাহাদের জন্য রচিব তাহাদের পরিচয়ও বহন করে। রবীন্দ্রনাথ একসময় বলেছিলেন সাহিত্য দৈববাণী। পরে তা প্রত্যাহার করেছিলেন। পরে উনি লিখেছেন, আমার আগের লেখাগুলো কোনো লেখা হয় নি। আগের লেখাগুলো তিনি বাতিল করতে চেয়েছিলেন, এবং বলেছিলেন- বুর্জোয়া লেখকের সংসর্গ দোষে, একদিন গল্পগুচ্ছ বাতিল বলে, অস্পৃশ্য বলে গণ্য হবে। এবং ১৯৩০ এর পর তার লেখাগুলো, মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরে আসার পর তার লেখাগুলো, সেই লেখাগুলো মনে হবে যেন স্লোগান। শিশুঘাতি, নারীঘাতি, ইত্যাদি কথাগুলো যে উচ্চারণ করছেন এই কথাগুলো তো প্রায় স্লোগান! এই ধিক্কার হানার কথা ভাবছেন তিনি, এগুলো স্লোগান পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যদি সোবিয়েত রাশিয়া না হতো তবে রক্তকরবী হতো নাকি! তিনি যদি না জানতেন বুদ্ধের জীবন, বুদ্ধ তো বাড়ি ছেড়েছিলেন কোনো জরা জয় করবার জন্য না। এগুলো হচ্ছে বানানো ভোগবাদি এবং ভাববাদি দর্শন।

                [আলাপচারিতা : সুবন্ত যায়েদ, জাকির হোসেন, নাফিস অলি]

************************************************

রাখাল রাহার মুখোমুখি
লেখক ও অ্যকটিভিস্ট

চিহ্ন : আপনাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় থাকতে দেখি। আবার আপনার লেখা একটি গল্পও চিহ্নের একটি সংখ্যায় পাঠ করেছিলাম। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে সাহিত্যের বোঝাপড়াটা কেমন আসলে? রাখাল: বর্তমানে সাহিত্যের যে হাহাকার সেটা আসলে রাজনীতি থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্নকরণের হাহাকার। এই হাহাকার আসলে ভন্ডামির নামান্তর। তারা ষাটের দশক নিয়ে গর্ব করে। ষাটের দশকের গর্বের যে উৎস সেটা হলো রাজনীতিকে সরাসরি ফেইস করার একটা শক্তি। তারা ষাটের দশককে গ্লোরিফাই করে। একই সাথে তারা তলিয়ে দেখে না যে সেটা গৌরবান্বিত হয়ে উঠল কেন। রাজনীতিকে মুখোমুখি নিয়ে আমরা সাহিত্য করেছি। এখন তারা এক ধরণের আপসের রাজনীতির ছত্রছায়ায় সাহিত্য করবে এবং একই সাথে সাহিত্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে বলবে যে সাহিত্য হচ্ছে না, সাহিত্য নিষ্প্রাণ ইত্যাদি। এরা আসলে ভন্ড। তারা জানে কেন সাহিত্য হচ্ছে না। তারা জানে কোনটা বলা যাবে। কিন্তু তারা বলছে না। এই ধরণের ভন্ডামির জন্যেই এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

চিহ্ন : তারা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যাচ্ছে সবসময়।

রাখাল রাহা : প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যাওয়াটা ভন্ডামি নয়। আপনার এখানে একটা প্রতিষ্ঠান আছে। এই সাউন্ড সিস্টেমে ক্লাসরুমে বিঘœ ঘটছে কিনা। এখন যদি কেউ বলে যে ক্লাস হোক বা না হোক আমি এটা ব্লক করব। এমন তো না আসলে। বিষয়টা হলো সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনের জায়গাটা অ্যাড্রেস করে আমি যার যার জায়গায় আঘাত করছি কি-না বা বিকাশ ঘটাচ্ছি কি-না কিংবা আয়োজনটা করছি কি-না। সেটাই মূল বিষয়।

চিহ্ন : মানে আমাদের টিকে থাকার জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হয় এবং সেগুলোকে রক্ষাও করা লাগে। এখানে মন্দের কিছু নেই।

রাখাল রাহা : অবশ্যই। পরিবার একটা প্রতিষ্ঠান। পরিবার ভেঙে ফেললে কি সব পরিবারের খুব বেশি লাভ হবে? এর একজন কর্তা আছে। তার একটা নিজস্ব সিস্টেম আছে। পরিবার হলো সবচেয়ে ক্ষুদ্র এবং পাওয়ারফুল প্রতিষ্ঠান।

চিহ্ন : তারপরও তো পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। পরিবারের আয়তন কমছে।

রাখাল রাহা : পরিবার তারপরও ভেঙে যায় আসলে।

চিহ্ন : প্রতিষ্ঠানের কি কোন ভাল-মন্দ নেই তাহলে? যেমন আপনি নিজেই রাষ্ট্রের সংস্কার চান। রাষ্ট্রও তো একটা প্রতিষ্ঠান।

রাখাল রাহা : প্রতিষ্ঠানের ভাল-মন্দ নির্ভর করে রাষ্ট্রের ভাল-মন্দের উপর। প্রতিষ্ঠান স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাল-মন্দ হতে পারে না। আজকে রাজশাহী ইউনিভার্সিটি এমন ছিল না। তখন রাষ্ট্র ছিল পাকিস্তান। প্রতিষ্ঠান মানেই হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র যেভাবে নির্মাণ হয় তার প্রতিষ্ঠানও সেভাবেই নির্মাণ হয়। খুব বিচ্ছিন্ন দুয়েকটা প্রতিষ্ঠান ছাড়া।

চিহ্ন : অর্থাৎ রাষ্ট্রের সাথে সবকিছুই জড়িত। সাহিত্য, শিল্প, দর্শন…

রাখাল রাহা : রাষ্ট্র উল্টোপথে গেলে সাহিত্য যে সবসময় উল্টোপথে যায় তা নয়। বরং সাহিত্য মাঝে মাঝে রাষ্ট্রকে ফেইস করে। রাষ্ট্রের সাথে সরাসরি একটা মোকাবিলার জায়গায় যায়। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে সেটা হলো রাষ্ট্র যেদিকে যাচ্ছে সাহিত্য শিল্পের একটা বিশাল পরিমন্ডল তার দিকে যেতে চাইছে। এটাকে একটা খারাপ সময় বলা যায়। সময়টা অল্প বা দীর্ঘ কাল ব্যাপী স্থায়ী হতে পারে। তবে সেটা খারাপ সময়। সেটা ভেঙে পড়ে। ভেঙে যখন পড়ে তখন একটা আওয়াজ হয়। সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তা সবসময় সুখকর হয় না। এটা মানুষের জন্য খারাপ। মানুষের জন্য সেটাই হওয়া উচিত যা মসৃণ। খামোখা আপনি যখন রাষ্ট্রের অনৈতিক এবং অন্যায় কর্মকান্ডের পক্ষে আপনার ক্রিয়েটিভ জায়গা থেকে অবস্থান নেন তখন একে তো আপনি আপনার ক্রিয়েটিভিটির প্রতি অসততা করছেন, আবার গোটা সেই জনমন্ডলের সাথে বিরোধাত্মক জায়গায় সাহিত্যকে প্রতিস্থাপন করছেন। এটা খুবই ভয়াবহ। এসমস্ত সাহিত্যের পরিণতি কি হয়? পাকিস্তানের পক্ষে যে সমস্ত সাহিত্য ছিল সেগুলোর পরিণতি কি? তাদের অনেকের অনেক বড় সক্ষমতা ছিল।

চিহ্ন : বাংলাদেশের বড় একটা বুদ্ধিজীবী অংশের বিষয়টা কেমন? তারা কি সেদিকেই যাচ্ছেন?

রাখাল রাহা : তারা তো তারই প্রতিনিধি।

চিহ্ন : পাকিস্তান যুগে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গিয়েছিলো। এই পরিবর্তনটা কীভাবে হলো?

রাখাল রাহা : সেটা সামাজিক গবেষণার বিষয়। কেমন করে সাহিত্যিকরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধের জায়গা থেকে সমর্পণ-নতজানু হওয়ার জায়গায় পৌঁছাল। তবে যা ঘটেছে তার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিপীড়ক-নির্যাতক হয়ে উঠতে বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। রাষ্ট্র মূলত টিকিয়ে রাখে কারা? আর্মি মনে করে রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখে আর্মি। ব্যুরোক্রেটরা মনে করে রাষ্ট্র তারাই টিকিয়ে রাখে। শাসকেরা জানে আসলে রাষ্ট্র কারা টিকিয়ে রাখে। রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখে সচেতন বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। তারা শাসকের সমস্ত অন্যায় কর্মকা-কে একধরণের বৈধতা দেয় কিংবা উপেক্ষা করে। জনগণের মধ্যে এসমস্ত মৃত্যু হত্যাগুলোকে সহনীয় করে ফেলে। যেখানে চিৎকার করার দরকার সেখানে চুপ থাকে। যেখানে চিৎকারের প্রয়োজন নাই সেখানে মাইক বাজায়। যারা কিনা এখন পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে তাদের মুখেই ষাটের দশক নিয়ে ফেনা ওঠে। ষাটের দশকের যে শক্তির জায়গা, প্রতিবাদ প্রতিরোধ, রাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়া, সেই জায়গায় রাষ্ট্র তো এখন আরো বড় দানব, নিপীড়ক, নির্যাতক। এখন তো কথা বলার জায়গা আরো বেশি। কিন্তু আপনি কথা বলবেন না। বললেই একটা পক্ষ নির্ধারণ করে দেবে। আপনি অন্যায়কে অন্যায় বলতে পারবেন না। চোখে যেটা দেখছেন সেটাকেও বিশ্বাস করতে বলবেন না। এরকম একটা দুঃসময় আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে কখনোই ছিল না। দুঃসময় এজন্যে যে আমরা আমাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের জায়গাটাকে হারিয়ে ফেলেছি। দুঃসময় এজন্যে না যে আমি এখন ভাত খেতে পারছি না। দুঃসময় তখন হয় যখন মানুষ নিজের অস্তিত্বকে বিনাশ হতে দেখে। তার মত প্রকাশ, তার ব্যক্তি স্বাধীনতা, তার অধিকার, তার মানবতাবোধের জায়গাগুলোকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে দেখে। আমি সুন্দর গাড়িতে চড়ি, সুন্দর রাস্তায় চলি এটা খুব সুসময় নয়।

চিহ্ন : অনেকে আর্ট ফর আর্টস সেকের কথা বলে…

রাখাল রাহা : তারা আসলে আর্ট ফর পাওয়ারস সেক। আর্ট ফর আর্টস সেক হলে তো সমস্যা নেই। একজন মানুষ চুপচাপ সারাজীবন তারা দেখুক না। অসুবিধা নাই। আপনার সামনে একটা হত্যাকান্ড হলো। আপনি আপনার আর্ট করেন অসুবিধা নাই। কিন্তু আপনি তো বলতে পারেন না যে হত্যাকান্ড হয় নি। সেটা বললে তো আপনি আর্ট ফর আর্টস সেক নন। আর্ট ফর কালপ্রিটস সেক, আর্ট ফর পাওয়ারর্স সেক, আর্ট ফর করাপশানস সেক… অ্যানিথিং।

                আলাপচারিতায় : সুবন্ত যায়েদ, জাকির হোসেন, নাফিস অলি]

************************************************

রহমান কারিগর
চিহ্নর নিয়মিত পাঠক

চিহ্ন : আমরা জানি যে, যেকোন কাজে একটা প্রতিবন্ধকতার জায়গা থাকে। প্রতিবন্ধকতার এই জায়গা বিভিন্নভাবেই থাকে। আপনার সম্পর্কে জানা হলো যে, আপনি পুলিশের চাকুরী করেন। কিন্তু আপনি শিল্প-সাহিত্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সাহিত্য চর্চা করেন, আপনার মূল প্রতিবন্ধকতা কোথায়?

রহমান কারিগর : সময় আর পরিবেশ আমার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। যেমন, রাতে আমি ঘুমোইনি, সকালে সামান্য ঘুমিয়েছি। কাজ করেছি। তারপর অনেক কাজ বাকি রেখে দুপুরের আগেই আপনাদের মেলায় এসে পৌঁছেছি। এই যে এখানে এসেছি, সেটা কৌশলে সময় বের করে। এটুকুই আমার জন্য কঠিন। আর এই চাকরি করেও এইসব চর্চার পরিবেশ করা আরো কঠিন।

চিহ্ন : এই যে এত সংগ্রাম করে চিহ্নমেলায় এসে কেমন অনুভব করছেন?

রহমান কারিগর : এটা তো আমার জন্য, এই আয়োজন। আমার খুব ভালো লাগছে। ভালো যে লাগছে এটা বলবার কথা নয়।

চিহ্ন : এটা তো এক সম্মিলন, লেখক-পাঠক—সম্পাদক বৈশ্বিক সম্মিলন। অথচ আপনাকে দেখে মনে হচ্ছিলো আপনি এতো বড় একটা আয়োজনে থেকেও একা।  দীর্ঘ সময় আপনাকে দেখছি, কারো সাথে দেখিনি। কেন? মানিয়ে নিতে কোথাও ঘাটতি মনে হচ্ছে?

রহমান কারিগর : আসলে, আমার ভেতর থেকে যেটা আসে, সেটা হলো, আমি নিজেকে তুচ্ছ ও ছোট জ্ঞান করে চলি। হতে পারে এটা হীনন্মন্যতা। আমার মনে হয়, সকলেই কত জানে, কত বোঝে, পড়াশোনা করে, যে তুলনায় নিজেকে মুর্খই মনে হয়। যে জায়গা থেকে একরকম আমি সঙ্গ এড়িয়ে চলি। যতটুকু নিজের মত বুঝে নিয়ে চলা যায়, চলি।

চিহ্ন : আপনার নামের একটা অংশও কিন্তু কারিগর। শব্দটা আমাদের দেশের একটা পেশা ও বংশের পরিচায়ক। যে বংশ ও পেশাকে একটা শ্রেণী তুচ্ছ করে দেখে।

রহমান কারিগর : এটা মানুষের চূড়ান্ত অশিক্ষা। এবং এটাও একপ্রকার সাম্প্রদায়ীকতা। আমাদের রক্তে এসব সাম্প্রদায়ীকতা আবহমানকাল ধরেই আছে। মানুষে মানুষে এতো বিভক্তি!

চিহ্ন : এইসব দেখে, ক্ষোভে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করে না কখনো?

রহমান কারিগর : ফেটে পড়তে তো শিখিনি আসলে। আমি একা ফেটে পড়ে তো চেইন ভাঙ্গতে পারব না। এই জন্য, সয়ে যেতে শিখেছি। তাই সয়ে যাই ফেটে পড়ার বদলে।

চিহ্ন : এই যে, আপনি এতোটা সংগ্রাম করে সাহিত্য চর্চা ধরে রেখেছেন, কেন?

রহমান কারিগর : আমি অনেককেই দেখেছি, এসব চর্চা তাদেরও ছিলো। কিন্তু রাখতে পারেনি। আমার সাথে তেমনটা ঘটেনি। এর পেছনে হয়ত কিছু কারণ আছে। শেষ পর্যন্ত এইসব চর্চা আমার জীবনের বড় একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই হয়ত।

চিহ্ন : আপনি বহুদিন রাজশাহী আছেন; এখানে চাকরি করছেন। আপনি বলছিলেন, আপনি চিহ্নের পুরনো পাঠক।

রহমান কারিগর : হ্যাঁ, অনেক আগে থেকে। এ শহরে এসে থিতু হবার পর থেকে, দেখা যাচ্ছে, বই কিনতে, বইয়ের দোকান ঘুরে দেখতে বের হয়ে যেতাম। একবার উত্তরাধিকারের পুরনো একটা সংখ্যা খোঁজ করতে গিয়ে চিহ্নের সন্ধান পেলাম বুক পয়েন্টে। উল্টে-পাল্টে দেখে আমার খুব ভালো লেগে গেলো। সেই থেকে চিহ্ন নিয়মিত পড়ছি আমি। সেই সংখ্যাটা কততম সংখ্য ছিলো, সেটা অবশ্য মনে নেই। তবে, ওখানে তখন আরো কিছু লিটলম্যাগ পেতাম। এখন তেমনটা পাই না। চিহ্নটাই বরাবর নিয়মিত পেয়েছি।

চিহ্ন : সার্বিকভাবে চিহ্নকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রহমান কারিগর : কীভাবে যে বলব। তবে এটা বলতে পারি যে, একটি সংখ্যা পড়ার পর পরের সংখ্যার জন্য অপেক্ষা থাকে আমার। এটা সবসময়ই হয়েছে। চিহ্নর লেখা আমি খুঁটে খুঁটে পড়ি। এবং পরিশ্রম করে পড়ি। এটা যে উচ্চমানের সাহিত্যের কাগজ শুরুতেই সেটা বুঝেছিলাম। এই বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়েছে একের পর এক সংখ্যা পড়ে।

চিহ্ন : চিহ্নর কিন্তু এসব এমনি এমনিই হয় না। চিহ্নর সুর্দীঘ এক প্ল্যান আছে। যাকে আমরা মাস্টারপ্ল্যান বলে থাকি আরকি।

রহমান কারিগর : হ্যাঁ, চিহ্নর পাতা ওল্টালেই কিন্তু এটা বোঝা যায়। মাস্টারপ্ল্যানটা বোঝা যায়।

************************************************

সম্পাদকদের সঙ্গে আলাপচারিতা

সুস্মিতা বসু সিং
সম্পাদক : ঋতবাক
কলকাতা

চিহ্ন        :               ঋতবাকের ‘এই সময় সাহিত্য সমৃদ্ধি’ এই শ্লোগানের কারণটা কী?

সুস্মিতা :               আমরা এই সময়েই থাকতে চাইছি তবে সমৃদ্ধি আর সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে নয়। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলা। প্রগতির সঙ্গে থাকব তবে  সেখানে সমৃদ্ধির কোন জায়গায় যাতে কমতি না পড়ে, সাহিত্যবোধ যেন কোথাও না কমে। সাহিত্যের সমৃদ্ধি এবং সেটা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। অর্থাৎ শিল্পে সময়কে ধরা, ঠিক যে সময়টাতে আমরা বসবাস করছি। কিন্তু এই সময় মানে এই এসব মুহূর্ত নয়। কিংবা একটা প্রজন্ম যে সময়টা ধরে, সে সময় নয়। আমরা যা দেখে এসেছি, যা দেখছি, দেখতে চলেছি, কয়েকটা প্রজন্ম, যারা আমরা এক সাথে বসবাস করছি, এভাবে টোটাল যে সময় দাঁড়ায়, কিংবা যে সময় আমাদের মুখোমুখি দাঁড়ায়, সে সময়।

চিহ্ন        :               ঋতবাকের সকল লেখকই কি প্রতিষ্ঠিত লেখক? নাকি সেখানে নতুন কেউ আছেন?

সুস্মিতা :               নতুন লেখক আর প্রতিষ্ঠিত লেখক মেশানো রয়েছে। নতুন লেখকদের জন্য তো একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে আস্তে আস্তে। প্ল্যাটফর্মটা  তৈরি করতে গেলে আপনার মতোই সবাই জিজ্ঞাসা করবে প্রথিতযশা লেখক কে কে আছেন। তখন আমি সেটা দেখাব। যখন আপনি সেটা প্রথিতযশাদের বলে নিয়ে যাবেন তখন কিন্তু নতুন লেখকেরা একটা প্ল্যাটফর্ম পেয়ে গেল। আপনি পড়তে পড়তে দেখলেন বাহ এই ছেলে বা মেয়েটাতো বেশ ভাল লিখছে! সুযোগটা তো এভাবেই হচ্ছে, হয়।

চিহ্ন        :               মানে এটা একটা কৌশলও বলা যায়। তাদেরকে জায়গাও দেয়া হচ্ছে আবার বাজারেও চলছে।

সুস্মিতা :               না হলে আমি মানুষের কাছে পৌঁছাব কিভাবে? শুধু নতুন লেখক নিয়ে এলে অনেক মানুষই নেবেন না। বলা যায় এটা কোনো কৌশল নয় শুধু, এটা একটা নীতি। যার উপর নির্ভর করে আমি একটা কাজ নিয়ে চলি। যে নীতিতে আমি সামনে এগোতে পারি। আর যেহেতু ‘এই সময়’ আমার স্লোগান, তাই এই সময়ের যারা, তাদের সবাইকে স্থান দিতে হবে।

চিহ্ন        :               এখানে লিটলম্যাগ সম্পর্কে বিভিন্ন কথা প্রচলিত আছে। যেমন লিটলম্যাগ হবে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী…

সুস্মিতা :               আমি প্রতিষ্ঠান কনসেপ্টটাতেই যেতে চাই না। প্রতিষ্ঠান কনসেপ্টটাই একটা ফেইক কনসেপ্ট। আমি যে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী একটা সমাজ তৈরি করতে চাচ্ছি সেটাও তো একটা প্রতিষ্ঠান। আমি বলছি আমি, তুমি আর সেও প্রতিষ্ঠান-বিরোধী, আর ইনি হচ্ছেন প্রতিষ্ঠান। তাহলে আমরা তিনজন মিলে তো একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করছি। প্রতিষ্ঠানের মানেটাকে বিকৃত করে লাভ নেই। আমি কোন জিনিসটাকে কিভাবে ব্যবহার করছি তার উপরে সেটার ভালমন্দ নির্ভর করছে। আজকে যদি নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়িকে প্রতিষ্ঠান বলা হয়, তাহলে আমি নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়িকে ব্যবহার করছি আমার ছোট ভাইবোনদের প্রতিষ্ঠা দেবার জন্য। রবীন্দ্রনাথ এখন একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে তাকে কি আমরা বাদ দিতে পেরেছি? আপনি একটা গীতবিতান খুলে বসলে মনে হবে আপনার অনুভূতির প্রত্যেকটা মুহূর্ত যেন তিনি লিখে গেছেন একেকটা গানে। বেশিদূর যেতে হবে না। হাজার হাজারে যেতে হবে না।

চিহ্ন        :               নতুন লেখকদের থেকে প্রায়ই এমন অভিযোগ আসে যে তারা লেখালেখির পরেও পরিচিত মুখ হয়ে উঠতে পারছে না। কেউ কেউ হয়তো ভাল লিখছেন। তাদের অনেকেই মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারছেন না।

সুস্মিতা :               এটাই হলো কথা। আমি যখন একটা মাংস রান্না করছি, আমি পরিমাণটা বুঝব যে আমি মসলার পরিমাণটা প্রচুর দেব নাকি সাদা সাদাই রান্না করব। মসলা কিন্তু দিতেই হবে। তাহলে আমরা সমস্ত কিছুকে প্রেজেন্ট করতে হলে, লোকের কাছে পৌঁছে দিতে হলে কিছু বেসিক নিয়ম থাকে। এর বাইরে আমি যেতে পারব না। যদি যাই তাহলে আমাকে আরেকটা বিরোধী প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী কথাটা আমি মানতে পারি না।

চিহ্ন        :               তবে উত্তরাধুনিক চিন্তা যারা করে তারা ব্যক্তিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। যার ফলে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আর থাকে না। তো সেখানে ধারণাটা একটু পরিবর্তন হয়ে যায়। যেমন যে কোন যায়গায় যে কোন জিনিস আলাদাভাবে গর্জে উঠতে পারে …

সুস্মিতা :               লাভ নেই। গর্জে ওঠা মানে পরিবর্তনের প্রচেষ্টা তো! বহতা নদীর ¯্রােতের মতো গড্ডালিকা প্রবাহে বয়ে যাওয়ার বিপরীতে আমি যখন তার বিরোধীতা করতে যাচ্ছি তার মানে আমি সেটাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি। আবারও সেই প্রতিষ্ঠান।

চিহ্ন        :               সৃষ্টিশীলেরা তো তাই করবেন। আপনি আরেকটাকে বাতিল করে নতুন কিছু সৃষ্টি করবেন। এটাই তো নিয়ম। তাহলে আমি একটা পুরোনো কিছুকে ধরে রাখব কেন?

সুস্মিতা :               আপনি এবং আমি যখন এই আম গাছটা নিয়ে লিখছি তখন আপনি হয়তো লিখছেন গাছটা কতোটা ছায়া দিচ্ছে। আমি লিখছি গাছটা কতো ফল দিচ্ছে। তাহলে দুটো আলাদা হয়ে গেল।

চিহ্ন        :               অর্থাৎ পুরোনোটাকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রাখতে হবে এমন তো কোন কথা নেই।

সুস্মিতা :               আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে— এটা আমার অনেক বছর ধরে মানুষ হয়ে হয়ে আমার জিনের ভেতরে ঢুকে গেছে। আমাকে তা নতুন করে শিখতে হয় না। একটা নিতান্ত শিশু কিন্তু হাত দিয়ে ফেলে। তাহলে তাকে আমার শিখিয়ে দিতে হবে। পুরোনোরা অভিভাবক। আমাকে তাদের মত মেনে চলতে হবে তা নয়। কারণ আমি একজন স্বতন্ত্র মানুষ। আমি যখন পরিণত বয়স্ক হয়ে যাব, আমার মস্তিস্ক আমাকে পরিণতি দিচ্ছে। তার মতের সাথে আমার মিল নাও হতে পারে। এখানে দায়িত্বটা পারস্পরিক। তার এটা বললে চলবে না যে আমি যা বলছি সেটাই শেষ কথা। তুমি যা বলছ তা ভুল। তাকেও উন্মুক্ত থাকতে হবে। দরজাটা কে খুলে রাখতে হবে। স্বাগত করতে হবে নতুন জিনিসকে। আবার আমাদের খেয়াল রাখতে হবে বিগতকে বিসর্জন দিয়েও কিন্তু এগোনো যায় না। তাদেরকে আমাদের বোধে আমাদের মতো করে সম্পৃক্ত করে নিতে হয়। তাদেরটুকু থেকে যেটুকু নির্যাস নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগোব। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে কেউ মোবাইল ফোনের কথা ভাবতে পারত না। আজকে আমি একটা লেখা লিখছি। তাৎক্ষণিক তা বন্ধুদের কাছে পৌঁছে দেয়ার রাস্তা রয়েছে। তারা সেটা পারতেন না। তারা সেটা পারতেন না এবং আমরা সেটা পারছি বলে তারা যদি বলেন যে এটা খারাপ, তাহলে অসুবিধে।

চিহ্ন        :               তাদের ভেতরে একটা সংস্কারের মতো থাকে যে এর বাইরে যাওয়া যাবে না বা এই ফর্মের বাইরে যাওয়া যাবে না…

সুস্মিতা :               এইখানে হচ্ছে তাদের সীমাবদ্ধতা। তাদের সীমাবদ্ধতায় আমাদের নিজেদেরকে যে আটকে ফেলতে হবে এমন কথা তো নেই।

চিহ্ন        :               যেমন আমি জানতে পারি যে জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথকে তার কবিতা পাঠিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সে কবিতা নাকচ করে দেন।

সুস্মিতা :               এগুলো হবে না আসলে। প্রতিষ্ঠানবিরোধীতা বলে কোন কথা হয় না প্রথমত। কোন কিছুকেই আঁকড়ে থাকা শেষ কথা নয়। আজকে আমার চল্লিশ বছর বয়স ধরা যাক। এই বয়সে আমি কুড়ি বছর বয়সের কারো থেকে কিছু শিখতে পারি না এমন মানসিকতা রাখা তো ভুল। আজকে আমি এখানে এসে এটা থেকে নেট কানেক্ট করতে পারছি না। আমি একটা বাচ্চা মানুষকে বললাম একটু করে দেন ভাই। তাহলে তো তার কাছে থেকেও আমি শিখলাম। সেও শিখবে আমার কাছ থেকে। আসলে লেনদেনটা ক্রমশ না চললে বেণীবন্ধনটা হয় না। সব জায়গাতেই নিজেকে একটু উন্মুক্ত রাখতে হয়। কিছু নেব কিছু দেব। আদান-প্রদানটা রাখতেই হবে। আমি প্রতিষ্ঠান’ বলে আমার অগ্রজদের অস্বীকার করতে পারি না। তাদের অনেক ত্রুটি আছে। আমাদের ত্রুটি নেই? যদি থাকে তাহলে তাদের সমালোচনাটাকেও নিতে হবে। একইসাথে তাদের ত্রুটির যেগুলো রেক্টিফাই করার দায়িত্ব আমরা নিয়েছি সেগুলোও তাদের মেনে নিতে হবে।

চিহ্ন        :               বোঝাপড়াটা কি হয় শেষ পর্যন্ত?

সুস্মিতা :               বোঝাপড়াটা হওয়াতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইগোর জন্য সেটা হয় না।

চিহ্ন        :               সেটাকেই তো বলা যায় প্রতিষ্ঠান!

সুস্মিতা :               ইগোটাই আসলে প্রতিষ্ঠান। ঠিক কথা। সেটাকেই যদি বাদ দেয়া যায় জীবন যে কত সহজ হতে পারে! সেটা আমার উত্তরসূরীদের শেখাতে পারি, পূর্বসূরীদের নয়। কারণ তারা তো তৈরি হয়ে রয়েছে। তাদের মননশীলতার ভিত পোক্ত হয়ে গিয়েছে। সে ভিতে আঘাত করতে পারি বড়জোর। বদলানো কিন্তু ভয়ানক শক্ত। তাদের নিয়েও চলতে হবে। আমার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছেন ষাটোর্দ্ধ অনেক মানুষ। আমি তাদের আমার মতো করে নিয়ে চলি। তারা অনেক কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের বোঝাতে হবে মুখে বলে নয়, ফলাফল দিয়ে।

************************************************

প্রণব চক্রবর্তী
সম্পাদক : ইনটার‌্যাক্শন্
নবগ্রাম ॥ নদীয়া

চিহ্ন        :               আপনি এবার চিহ্নমেলায় প্রথম এলেন?

প্রণব      :               হ্যাঁ, প্রথম তো বটেই। বাংলাদেশেও প্রথম এলাম।

চিহ্ন        :               আচ্ছা, তাহলে তো রাজশাহীই আপনার কাছে বাংলাদেশ এখন। রাজশাহীই বাংলাদেশকে প্রেজেন্ট করছে আপনার কাছে। আপনার ওপারে গিয়ে নিশ্চয় বলবেন না, রাজশাহী গিয়েছিলাম। আপনি বলবেন, বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। তো বলুন, বাংলাদেশ কেমন দেখছেন?

প্রণব      :               হ্যাঁ— সে তো নিশ্চয়! আমি যখন বাংলাদেশে ঢুকলাম, তারপর থেকে যতকিছুর মুখোমুখি হয়েছি, আমি ভৌগলিক কোন পার্থক্য দেখিনি। মানে, মানুষের জীবনযাপন, জীবনধারণ পদ্ধতি, সবই তো একই। আমার কাছে আলাদা কিছু মনে হয়নি।

চিহ্ন        :               তাহলে এসমস্ত জায়গায় তো বিভেদ সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু কাঁটাতার স্থাপনের পর আমাদের ভেতরে মূলত কোন জায়গায় বিভেদ এসেছে?

প্রণব      :               বিভেদের যে বড় জায়গাটা, আমাদের কাছে সেটা বড় এক সংকটের জায়গাও। বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র, সেখানকার রাষ্ট্রভাষা হলো বাংলাভাষা। আমরা বাংলা ভাষাভাষি বলে এটা আমাদের কাছে দারুণ গর্বের। কিন্তু আমাদের ওখানে বাংলা ভাষাটা হচ্ছে অন্য অনেক ভাষার ভেতরে একটি ভাষা মাত্র। সুতরাং আমাদের ওখানে এমন একটি ভাষা স্বভাবতই চাপে থাকে। আর আমাদের ওখানে এমন একটি ভাষা নিয়ে যে চর্চাটা হয়, সবটাই ব্যক্তি উদ্যোগে। এই যে এটা আমি করছি, পত্রিকাটা, সবটাই ব্যক্তি উদ্যোগে। একটা বিজ্ঞাপন নেই। এভাবেই দেখবেন, দারুণ সব কাজ কিন্তু সবটাই ব্যক্তি উদ্যোগে। এবং কতটুকু কমিটেড থাকলে এসব কাজ করা যায়!

চিহ্ন        :               আমাদের মৌলিক ঐক্যের জায়গাটাই তো ভাষা ও সংস্কৃতি।

প্রণব      :               কিন্তু আমাদের ভেতরে বিভাজ্যতা তৈরী করা হলো ধর্ম দিয়ে। অথচ ধর্ম খুবই ব্যক্তিগত বিষয়। মনে ধারণ করার বিষয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ এটা মনে ধারণ করে থাকে। এটা একটা আশ্রয়। সাধারণত চূড়ান্ত অসহায়ত্বের একটা আশ্রয়। এই ব্যাপারে অনেক স্টাডি করেছি জানো? একবার আমাদের শহরে, কিছু মানুষ, রাত্রি ১টা দেড়টার দিকে হবে, খোলা জায়গায় বসে, কালো কুচকুচে, লেংটি পরা, যাদের খাবার পরার থাকার কোন ঠিক নেই, তখনো তারা কী বলছে জানো? ভগবান যা ভালো মনে হয় করবে। তারা এইটুকু আশ্রয় নিয়ে একটি রাত্রি স্বচ্ছন্দে কাটানোর চেষ্টা করছে। এই যে চূড়ান্ত আশ্রয়হীনতার ভেতরে এইটুকু মানসিক আশ্রয়, ব্যক্তিগত আশ্রয়। কথা হলো, মানুষের আশ্রয় থাকতেই পারে। সাধারণ মানুষ তো ধর্মকে আকড়েই থাকে। কিন্তু ধর্মে যদি চাপিয়ে দেবার মত ঘটনা ঘটে, তখন সংঘাত বাঁধে। এই যে দেশভাগ হলো, এটা তো দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় হয়েছে। ধর্মটাকে তারা পুরোপুরি ব্যবহার করেছে।

চিহ্ন        :               এই যে ধর্মের কথা বারবার উঠে আসে কেন? আমরা এর শিকার। বারবার এর দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছি। ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি। এই যে আমাদের সকল ঐক্য থাকার পরেও আপনি বাংলাদেশে প্রথম এলেন। অথচ এই বাংলাদেশ আপনার পূর্বপুরুষদের জন্মস্থান। বাংলাদেশ এখন বিদেশ। এই যে আপনি ওখান থেকে এসেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন প্রতিনিধি হিসেবে। আপনারাও এসেছেন চিহ্নের কাছে, যে চিহ্ন আপনাদের মতই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করে…

প্রণব      :               হ্যাঁ, এটা যে কী যন্ত্রণার! একজন গুণী মানুষ তার জীবন শেষ করে দিলেন এই যন্ত্রণার উপর। ঋত্বিক ঘটক। ভাবতে পারো কতোটা যন্ত্রণার জায়গা?

চিহ্ন        :               এবার ওখানকার লিটলম্যাগের কথা বলুন। মিডিয়ার ছড়াছড়ি, লেখকদের এখন প্রচুর প্ল্যাটফর্ম, প্রচুর কাজ করার জায়গা। এসবের ভেতরে লিটল ম্যাগাজিন তার গুরুত্ব হারাচ্ছে কি?

প্রণব      :               আমার সেটা মনে হয় না যে, গুরুত্ব হারাচ্ছে। বরং দেখছি যে তীব্র হচ্ছে এবং অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে যুক্ত হচ্ছে। এমন আছে যে লিটল ম্যাগাজিন না বুঝে না জেনে লিটল ম্যাগের সাথে জড়িত আছে। সবখানেই তো স্তর আছে বিভিন্ন রকমে। তো যাই হোক, লিটলম্যাগের গুরুত্ব কমছে কই? আমাদের ওখানে আনন্দবাজারের শারদীয় সংখ্যা বন্ধ করে দিচ্ছে। মানুষ লিটলম্যাগের দিকেই ঝুঁকছে। এখন তো লিটলম্যাগ এতো বিক্রি হচ্ছে যে আমাকে প্রেস যতগুলি কপি দিয়েছিলো, তার একটা কপিও আমি বাড়িতে রাখতে পারিনি। এই যে এতোগুলো কপি বিক্রি হচ্ছে এগুলো তো আর ছাগলে এসে নিয়ে যাচ্ছে না। যারা জায়গাটা বোঝে, তারা বুঝবেই। যতই মিডিয়া আসুক, সোস্যাল মিডিয়া আসুক, লিটলম্যাগের জায়গা থাকবেই। যার যার জায়গায় তার তার মত করে থাকবে। এটা নিয়ে কোন সমস্যা নেই। সোস্যাল নেটওয়ার্ক, ওয়েবম্যাগ, এগুলো তো বেশির ভাগই ভংয়ের উপরে চলে। অসাম, নাইস, দারুণ হয়েছে, ফাটিয়ে দিয়েছো, কিছু লাইক, দুচারটা কমেন্টস, এসবের উপরেই তো চলে। এসব দেখা আছে।

************************************************

শান্তনু সরকার
সম্পাদক : শুভশ্রী
কলকাতা

চিহ্ন        :               কলকাতার লিটলম্যাগাজিন নিয়ে কথা উঠলে এটার নাম শুনতে পাই, মানে শুভশ্রীর কথা। ওইদিক থেকে আরো কয়েকজনের সাথে কথা বলে এসেছি, তারাও আপনার এই ম্যাগাজিনটার নাম বললেন।

শান্তনু    :               আচ্ছা, এটা শুনে ভাল লাগছে। আসলে এদিকেও শুভশ্রীর পাঠক আছে। আপনি হয়তো নাম শুনবেন, রাহেল রাজিব।

চিহ্ন        :               হ্যাঁ, রাহেল রাজিব।

শান্তনু    :               হ্যাঁ; উনার সাথে আমি ম্যাসেঞ্জার-এ কথা বলছিলাম। আমি বললাম, আপনি হয়ত শুভশ্রীকে দেখেননি। তিনি আমায় অবাক করে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে শুভশ্রীর পাঁচটিছবি তুলে পাঠিয়ে দিলেন। মানে আমি লজ্জায় পড়ে গেছি। তারপর বললেন, আমি দুটোর আলোচনা করেছিলাম। একটি ‘ভ্রমণের কথাও কাহিনী’। এটা মনে হয় আমাদের সবচেয়ে সেরা প্রোডাকশন। ওপরে ছবি এঁকেছেন হিরন মিত্র। কভার থেকে ভেতর পর্যন্ত পুরো ভ্রমণের এবং ভ্রমণ সাহিত্যের ওপরে পুরো অন্যরকম সংখ্যাটা করা হয়েছিল। তো তিনি বললেন, ঐ-সংখ্যাটাতো  বংলাদেশের সবাই খুব আগ্রহের সঙ্গে পড়েছে। ভলোলাগে। উনি তো কোনো স্বীকৃতির জন্যই কাজটা করেছেন, কোনো ম্যাটেরিয়াল লাভের ভাবনা নেই। কাজটা করে আমার ভাল লাগল কিনা আর পাঠকের ভাল লাগলেই সেটাই পাওয়া আর কি। আজকে একজন জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘আপনি কি করেন? কেন করেন?’ আমি বললাম যে আন্যের কি হয় জানিনা, আমি সমৃদ্ধ হই নিজে।

চিহ্ন        :               এটাই সবচেয়ে বড়কথা।

শান্তনু    :               এটাই সবচেয়ে বড় কথা। এই যে বাংলাদেশের গল্প, বলতে লজ্জা নেই, আমার ধারণা একদমই ছিলনা। কাজটা করতে গিয়ে আমি ভাবলাম এতটাই এনরিচ এবং আমি এটা সম্পাদকীয়তে লিখেওছি। এতটাই সমৃদ্ধ সাহিত্য। আল-মাহমুদ যেমন আমি কবিতাটুকুই পড়েছি, কবিতাটুকুই জানতাম আমার সীমিত জ্ঞানে, গল্প পড়তে গিয়ে রীতিমত স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

চিহ্ন        :               তার মানে এখানকার গল্প-কবিতাগুলো পড়ছেন।

শান্তনু    :               হ্যাঁ, এইবার নতুন করে শুরু করেছি।

চিহ্ন        :               কী মনে হচ্ছে? কাজ হচ্ছে?

শান্তনু    :               হ্যাঁ, নিশ্চয়। আমি তো আগেই বললাম। নিজে সমৃদ্ধ হলাম, হচ্ছি, এত ভাল লেগেছে।

চিহ্ন        :               আচ্ছা।

শান্তনু    :               আমাদের সম্বন্ধে তথ্য পান কোথা থেকে আপনারা?

চিহ্ন        :               কোথা থেকে পাই? আসলে আমরা যারা লিটলম্যাগাজিন নিয়ে খোঁজ খবরগুলো নিই, সেখান থেকেই বিভিন্ন তথ্য পেয়ে যাই আমরা। বিভিন্নভাবে খোঁজ নিই বা জানতে চাই। আজকেই তিনজনকে জিজ্ঞাসা করেছি কলকাতা থেকে ভাল ৫টা বা ৪টা লিটল ম্যাগাজিনের নাম বলুন।

শান্তনু    :               এখন তো ফেসবুকের অনেক মারপ্যাচ, যোগাযোগ সহজ হয়েছে।

চিহ্ন        :               এই যে রাহেল রাজিবের কথা যেভাবে বললেন এভাবেই তো আমাদের এখানে কিছু এসেছে, কিছু পাঠ হচ্ছে,  চিহ্নের মাধ্যমে এখানে এগুলো এসেছে। এখান থেকে কিছু সংখ্যা যাচ্ছে বা চিহ্নে আসছে। এভাবেই তো কিছু পাঠ হচ্ছে, এভাবেই হয়ে যাচ্ছে। যেভাবে আপনারা চিহ্নকে জেনেছেন ওপারে। প্রসেস তো একটাই। আর বাকি যেটুকু তা ফেসবুক বা অন্যান্য মাধ্যমে এভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

শান্তনু    :               হ্যাঁ, এখন ফেসবুক হওয়াতে এদের অনেকটা উপকারও হয়েছে।

চিহ্ন        :               চর্চার জায়গাটা ছড়িয়ে গেছে বিভিন্নভাবে।

শান্তনু    :               হ্যাঁ। আনেকটা সহজে জানা যায় এখন। আগে একটা জায়গায় লিটিল ম্যাগাজিনটা বদ্ধ ছিল, কিছু সংখ্যক লোক জানত। এখন বহুজন জানছে, পরিধিটাও বেড়ে গেছে। তবে আমরা যে যে সংখ্যাগুলো করেছি এখন তার আর্ধেকই পাওয়া যায় না।

চিহ্ন        :               নতুন সংখ্যাগুলোও?

শান্তনু    :               না, না,আমাদের পুরোন সংখ্যাগুলো। এই সংখ্যাগুলো বিষয়ের দিক দিয়ে খুব ইউনিক ছিল।

চিহ্ন        :               শুনেছি, তিন প্রজন্ম মিলে এই ম্যাগাজিনটা চলছে। তাহলে আপনি কি থার্ড জেনারেশন? কয়টা সংখ্যা বেরিয়েছে তাহলে?

শান্তনু    :               ৫৬ টা।

চিহ্ন        :               এই যে দীর্ঘ জার্নি, অক্লান্ত জার্নি চলে এসেছে, কখনও মনে হয়নি এটা বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে বা বন্ধ করে দিই।

শান্তনু    :               হয়নি বললে ভুল হবে। কিন্তু তার পরেও প্রত্যেক বইমেলাতে বের করি। এর জন্য যুদ্ধ চলে, রাত্রি দুটো-আড়াইটা অব্দি খাটছি। ভাবতে পারবেনা যে কি খাটুনি। একটা সংখ্যা বেরোনোর পরেই আরেকটা সংখ্যার কাজ আরম্ভ করতে হয়।

চিহ্ন        :               এটা করতে গিয়ে তো আপনাকে পরিবারের দিকে আনেকটা দৃষ্টিহীন হয়ে থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে পরিবার তো অভিযোগ করে আপনাকে?

শান্তনু    :               না, না, পরিবার বরং অনেক ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ করে, কোনো অভিযোগ নয়।

চিহ্ন        :               অভিযোগ ওইঅর্থে না, আমি বোঝতে চাচ্ছি, যেটা অন্য অর্থে অনুযোগ বলা হয়। যাই হোক, এটা কি কোনো পুরস্কার বা সম্মাননা পেয়েছে?

শান্তনু    :               না।

চিহ্ন        :               এটা একটা বড় ব্যাপার যে পুরস্কার পাননি। কারণ, সাধারণত কেউ কিছু একটা করে দৌঁড়ায় কোথায় কি সম্মাননা বা পুরস্কার পাওয়া যায় তার জন্য।

শান্তনু    :               ওটা আমি খুব একটা পেয়ে উঠি না। এখানে আমন্ত্রণ পেয়ে আমি আবাক হয়ে গেছি। মানে, চট করে আমন্ত্রণ পেতে অভ্যস্ত নই।

চিহ্ন        :               আপনি আগেও কি চিহ্নে এসেছেন?

শান্তনু    :               না, না। এই প্রথম রাজশাহীতে।

চিহ্ন        :               শহীদ ইকবাল স্যার বলছিলেন যে, কয়েকজন এসেছেন যারা কখনও বাংলাদেশেই আসেন নি। এদেরকে ভালভাবে দেখতে। যেহেতু রাজশাহীতে আসা মানে শুধু রাজশাহীকে নয়, পুরো বাংলাদেশকে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সে জায়গা থেকে তো সেভাবেই দেখতে হবে, বিশেষ করে যারা কলকাতা থেকে এসেছেন। তো সব মিলিয়ে এই অভিজ্ঞতা কেমন লাগছে?

শান্তনু    :               অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আমি বলছিলাম, আগে একজন ভদ্রলোক এসেছিলেন, ভাইকে আমি বললাম, ‘মুগ্ধ, এই পরিবেশটা দেখে আমি মুগ্ধ।’ আর আমি শুনেছি আনেকের কাছে যারা নিয়মিত বাংলাদেশে আসেন, তাদের দারুণ উচ্ছ্বাস বাংলাদেশের ব্যাপারে। এসে খুবই ভাল লাগছে। প্রথমে কিন্তু আসতে না না করছিলাম যেহেতু আগে কখনও আসিনি। আর আমার শরীর খারাপ থাকে বলে ওরা আমাকে একা ছাড়তে চায় না।

চিহ্ন        :               আপনারা তো শুধু ম্যাগাজিনটাই করছেন?

শান্তনু    :               প্রকাশনা করতে চাই না।

চিহ্ন        :               অনেকেই তো দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট প্রকাশনা করছে।

শান্তনু    :               ওটা ব্যবসা ব্যবসা মনে হয়।

চিহ্ন        :               কলকাতার কি হয় বলতে পারব না। আমাদের বাংলাদেশে যেটা হয়, ম্যাগাজিনের পাশাপাশি যে ছোট ছোট প্রকাশনাগুলো গড়ে ওঠে এমনটা একধরণের শখের থেকেই হয়। ব্যবসার উদ্দেশ্যটা সেভাবে থাকে না আমি যেটা দেখেছি বা চিহ্নও করে। কিন্তু বইটই করার পেছনে চিহ্নের এখানে কোনো ব্যাবসায়ীক উদ্দেশ্য বা পলেসি নেই।

শান্তনু    :               আমি ওখানে যেটা দেখি, বিষয়টা ব্যবসার দিকেই চলে যায় আস্তে আস্তে, মানে পত্রিকাটাই আস্তে আস্তে অবহেলিত হয়ে যাচ্ছে।

চিহ্ন        :               হুম, এটাই দুঃখজনক। এদিকে অনেকে অভিযোগ তুলছে, অনেকভাবে লিটলম্যাগাজিনটা অবহেলিত হয়ে যাচ্ছে সময়ের কারণে। কারণ একটা সময় ছিল যখন লেখার স্পেসটা শুধু লিটল ম্যাগাজিনেই ছিল। যারা লিখতে আসত বা বুড়ো হয়ে গেলেও, কিন্তু এখন তো বিভিন্ন উপায় সহজলভ্য হয়ে গেছে।

শান্তনু    :               আপনাকে একটা কথা যদি দেখাই। এটাই ধরুন, এটার মধ্যে একটি সংখ্যা আছে। এই অর্থে প্রথম ৪০ বছরের থেকে বাছাই করা একটি সংখ্যা। এখানে যারা লিখেছেন সেই সময়ে যেমন ধরুন— নিমাই, প্রতাপ এই ধরনের মানুষ যারা লিখেছেন তাদের লেখা প্রবন্ধগুলো কেউ কিনতে চায় না যেখান থেকে মূলত বিক্রি হয়। বিক্রিটা একটা কথা, আর পাঠকের কাছে পৌঁছানো আরো বড় কথা। যদি পাঠকের কাছেই না পৌঁছায় তাহলে আর লাভটা কি। সেজন্য এই বিশেষ সংখ্যার পেছনে ছুটতে হচ্ছে। এটা কিন্তু ভাবাচ্ছে মাঝে মাঝে। আমি বলি অনেকটা সেই কলকাতার থিম পূঁজোর মতোন আর কি। প্রত্যেকটা দুর্গাপূজোর নতুন নতুন থিম করতে হয়। আমরাও সেই লড়ে যাচ্ছি আর কি, নতুন বিষয় ভাবতেই হবে। সেটা বোধ হয় আর একদিকে কোথাও ক্ষতি করে দিচ্ছে। যেটা বললেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গাটা। এজন্যই আমি ভেবেছি ডিসক্লোজ করতে পারব না। মানে, সাহিত্য করতে করতে একটু চেইঞ্জ করা দরকার মনে হচ্ছে, একটু অন্য স্বাদে। কারণ, আমি যখন আমাদের ঐ সংখ্যাটা যেমন করেছিলাম ‘নদী ও বাংলা কথাসাহিত্য’। ২০০১ সালের সংখ্যা, কলকাতা বইমেলায় এমন কোনো বছর যায়নি যে কেউ এসে জিজ্ঞেস করেনি সংখ্যাটা পাওয়া যাবে কিনা। ওটা আমাদের আইকনিক সংখ্যা হয়ে গেছে আর কি। ওই নদী বা নষ্ট দাম্পত্য বা প্রথম একটা নারী চরিত্র এই সংখ্যাটা যেমন।

চিহ্ন        :               আপনার প্রতিটি সংখ্যাতেই ক্রোড়পত্র থাকে? কোন একটা সুনির্দিষ্ট বিষয় থাকে?

শান্তনু    :               না, আমাদের পুুরো বিষয়টাই বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা। যে বিষয়টা ধরা হয় সেটাই।

চিহ্ন        :               নিয়মিত বিভাগ বলে কিছু নেই?

শান্তনু    :               না, আমাদের একদম সিরিয়াস-ই প্রবন্ধ।

চিহ্ন        :               যেমন আমাদের চিহ্নে যেটা করা হয় নিয়মিত বিভাগের পাশাপাশি একটা ক্রোড়পত্র করা হয়।

শান্তনু    :               সন্দীপ বাবু বলছিলেন আমায়, ‘তুমি একটা কথা ভবতে পার যে, যদি অন্য ধরণের একটু গল্প কবিতার একটা সংখ্যা পড়াযায় তাহলে কেমন হয়?’ তিনি ভাল কথাই বলেছেন। তো আমরা এখন যেটা করছি একেবারে সিরিয়াস, একান্ত প্রবন্ধই। এই যে সংখ্যাটা, এই সংখ্যাটা হচ্ছে সেই নারীদের নিয়ে যাদের জীবনে স্ট্রাগল আছে। এখানে এমন একজনের লেখা আছে, একজনের ওপরে আলোচনা আছে, তিনি হচ্ছেন সম্পূর্ণা। নাম শুনবেন মনে হয়। তার দিদির নাম বললে চিনবেন— আশাপূর্ণা দেবীর বোন। সম্পূর্ণা দেবী এবং আশাপূর্ণা দেবীর বড় হয়ে ওঠাটা একই রকম গুরুত্ব দিয়ে, একই রকম যন্ত নিয়ে বড় হয়েছেন। উনার বিয়ে হল কালিদাস গুপ্তের সঙ্গে। তিনি সবসময় আশাপূর্ণা দেবীকে সাহায্য করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু আশাপূর্ণা আশাপূর্ণা হতে পারলেন, সম্পূর্ণা ক্রমাগত স্বামীর বিরোধিতা, সন্তানদের বিরোধিতা করতে করতে শেষ পর্যন্ত সুইসাইড করলেন। তার মানে, তিনিও লিখেছেন। এই যে তাকে তুলে আনা। যদিও মলা দেবী আপনাদের বাংলাদেশেরই মানুষ, চট্টোগ্রামেরই মানুষ, বুদ্ধিস্টদের মধ্যে প্রথম গ্রাজুয়েট, বিলেতফেরত। বিলেত দেশেটা মাটির বলে বই লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ তার প্রশংসা করেছেন। শেষ জীবন কালীগঞ্জের চেসুহার গ্রামে ভিক্ষা করে কেটেছে, তার ওপরে লেখা। এভাবে তুলে আনা। আমাদের যে প্রান্তিক নি¤œবর্গের ওপরে একটা সংখ্যা ছিল সেটাও দ্রুতই শেষ হয়ে গেছে। নি¤œবর্গের মানুষ, এই সংখ্যাটা খুব ক্ষীণকায় একটি সংখ্যা। এই সংখ্যাটা করে আমি খুব আনন্দ পেয়েছি। মানে যাদের কথা রয়েছে সত্যিই জানতাম না। এই ঘাটাঘাটি করতে করতে হঠাৎই মলা দেবীর কথাটা পেলাম আর কি।

চিহ্ন        :               বংলাদেশে এসে অভিজ্ঞতা কেমন?

শান্তনু    :               হুম। খুবই ভাল লাগছে। একটু ঘোরার চিন্তা করছি। আপনাদের ইউনিভারসিটিটা না মনে হয়েছে অনেকটা শান্তিনিকেতনের মতো।

চিহ্ন        :               এটা অনেকেই বলেছেন। ইমানুল হক, তিনিও বলেছেন এ কথা।

শান্তনু    :               শান্তিনিকেতনের সাথে পরিসরের মিল রয়েছে। পরিসরটা ঠিক এবাবেই সাজানো। এসেই খুব ভাল লাগছে।

চিহ্ন        :               খুব বেশি কি পার্থক্য মনে হচ্ছে এপার ওপার?

শান্তনু    :               না, না, আসল পার্থক্যটা তো ভাষার হয়, সেটাই তো নেই। নিজের ভাষায় প্রাণ খুলে কথা বলতে পারছি। নিজের ভাষায় কথা বলতে পারলে কোনো পার্থক্য থাকে না। শুধু একটা বর্ডার দিয়ে আমাদের ভাগ করেছে একটা কাঁটাতারের বেড়া। সব কিছু শেষ করে দিয়েছে।

চিহ্ন        :               এই জেনারেশন বা পরের জেনারেশন বলে যে কি দুর্দশা অপেক্ষা করছে? একবার বলছিলেন যে, বাংলা ভাষা টিকে থাকবে নি¤œশ্রেণির ভিতর, উচ্চশ্রেণির ভিতরে ঐ অর্থে থাকবে না।

শান্তনু    :               সেই অর্থে আমরা ওখানে বলে থাকি বাংলাদেশে বাংলা ভাষা টিকে থাকবে। কলকাতায় আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটা করি- বাংলা ভাষার কথা বলি। সপিং মলগুলোতে নয় হিন্দি, নয় বাংলায় কথা। এখানে যেমন বাংলাটাই প্রধান ভাষা। আমাদের ওখানে তো ইংলিশ নয়, হিন্দি। বিরক্ত লাগবে সপিং মলগুলোতে প্রায় হিন্দিতে বলবে। আমি তো সচেতনভাবে বাংলা বলি। কিন্তু দেখছি পুরো বাঙালিরাই কিন্তু হিন্দি বলে। একজনকে আমি বলেছি কেন আমায় হিন্দিতে বলছেন? না, আমি হিন্দুস্থানই বলব। প্রথমত ভাববে ওরা হিন্দুস্থানী, বাংলা বলবেই না।

আলাপচারিতায় : সুবন্ত যায়েদ, জাকির হোসেন, নাফিস অলি

************************************************

একটি অধিবেশনে
একজন বক্তার অভিব্যক্তি

দেখতে দেখতে ষান্মাসিক চিহ্ন-পত্রিকা ১৯ বছরে পদার্পণ করল। প্রফেসর শহীদ ইকবাল এর নিরলস প্রচেষ্টার ফসল। তাঁর প্রতিভার সঙ্কেত বহন করে। আমি ভাষা ও সাহিত্যে একেবারে মূর্খ। আমি ভয়ে অনেক সমাবেশে যাই না। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে করে কম্মে খাচ্ছি। নিউটনের মত এক যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলে গেছেন, ‘আমি অজানা জ্ঞান সমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়াচ্ছি’। মনে পড়ল ছোটবেলায় পড়া, কবি গোলাম মোস্তফার কবিতার এক পঙক্তি, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে’। সাহস জাগল। অন্তরকে জাগ্রত করতে হবে। আমাকে মাফ করবেন, ভুল কিছু বললে। তবে আমন্ত্রণ করার জন্য চিহ্নপ্রধান প্রফেসর শহীদ ইকবালকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

আজকের আলোচনার বিষয়, ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞান : দোঁহে অভেদ’। এর সাথে থাকতে পারে ধর্মও। সবই তো দর্শনজাত অন্তরের উপলব্ধিপ্রসূত জ্ঞানের প্রভাব। সবই স্থানীয় জনগণের ভাষায় প্রকাশিত। তিনটিই  গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে সাহিত্যের মাধ্যমে অর্থাৎ মর্মস্পর্শী বা হৃদয়গ্রাহী হলে। সব কালজয়ী ধর্মের মূল লক্ষ্য এক। সেটা, পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি চ-ীদাসের (১৪০৮ খৃ.) উক্তিতে বলা যায়, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। কালজয়ী সাহিত্য ও বিজ্ঞান দুটোই সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত।

সত্যের পূজারী নোবেল বিজয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ রথযাত্রা কবিতায় লিখেছেন, ‘পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি, মুর্ত্তি ভাবে আমি দেব, হাসেন অন্তর্যামী’। এর দুটি অর্থ হতে পারে তিনি সত্যকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন : (১) যে যেভাবে ¯্রষ্টাকে গ্রহণ করে শান্তি পায়, তাই করুক না এবং (২) ¯্রষ্টা সর্বত্র বিরাজমান। শুদ্ধ মন নিয়ে তিনি মানুষের মঙ্গলার্থে নিজ পুত্র রথীন্দ্রনাথকে উন্নত কৃষিবিজ্ঞানে দীক্ষিত করেছিলেন, সমবায় কৃষিব্যবস্থা ও সমবায় ব্যাংকিং চালু করেছিলেন এবং তাঁর সমুদয় সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছিলেন। সাহিত্যের প্রকোষ্ঠে থেকেও রবীন্দ্রনাথ গণিত ছাড়াই আধুনিক বিজ্ঞানের নিগূঢ় অর্থ, বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গীকৃত, ‘বিশ্ব-পরিচয়’ গ্রন্থে বাংলাভাষায় প্রকাশ করে গেছেন। সহজ বাংলা ভাষাতে কোয়ান্টাম তত্ত্বের ধারণাসহ আধুনিক বিজ্ঞানকে প্রকাশ করেছেন। এ সবই কবিগুরুর সেকুলার শক্তির প্রকাশ। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এটা পড়লে বুঝতে পারবে কি করে বিজ্ঞানকে অনুভূতিতে আনতে হয়। ১৯৩০ সালে বার্লিনে কোয়ান্টাম যুগের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী, নোবেল বিজয়ী ড. আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫)ও সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ‘পরম সত্য’ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘অতি-মানবীয় পরম সত্য ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এর কিছুটা আশা করা যায়। এর ব্যাখ্যা মিলে না, এটা মনের বিশ্বাস।’ কবিগুরু বলেছিলেন, ‘বিশ্বব্রহ্মা-ের সকল পদার্থ বিজ্ঞানের বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বলের উদ্ভূত পরিস্থিতি। এর মূল ‘পরম সত্য’ অনন্ত শক্তি (রহভরহরঃু), এটাই আমাদের ভারতীয় দর্শনের ‘ব্রহ্মা’, বিজ্ঞান ও দর্শনের মিলনমালা। ‘মন’ তো  কালপ্রবাহে গতিশীল ছন্দের প্রকাশ’। আইনস্টাইন তখন বলেছিলেন, ‘দেখছি, আমি তোমার চেয়ে বেশী ধর্মবিশ্বাসী’। কবিগুরুর ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘ব্রহ্মা’ জ্যের্তিবিজ্ঞানের বহুল পরিচিত ‘মহাবিস্ফারণ’ তত্ত্বে শক্তির ‘অনন্যতা’ (ংরহমঁষধৎরঃু)-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

সাহিত্য-কর্ম ও বিজ্ঞান-আবিষ্কারের প্রসার ও প্রকাশনা ভাষা নির্ভর। উভয় ক্ষেত্রেই অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু ভাষাবন্দী নয়। ভাষান্তরেও বিষয়বস্তু অক্ষুণœ থাকে। কিন্তু সমাজ ও সংস্কৃতি নির্ভর। সাফল্যজনক সাহিত্য অজানা সমাজের চিত্র মানসপটে ছবির মত তুলে ধরে। কবিগুরু আকাশের সৌন্দর্য বর্ণনা করে লিখেছেন, ‘তুমি কি কেবলই ছবি, ওই যে সূদুর নীহারিকা, যারা করে আছে ভীড়, আকাশের নীড়’। বিজ্ঞানী সাফল্যজনক তত্ত্বের মাধ্যমে নীহারিকার প্রকৃতি ও উৎস উন্মোচন করে এর সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা দেন। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘ৃষধহমঁধমব ড়ভ এড়ফ পধহ নব ঁহফবৎংঃড়ড়ফ ঃযৎড়ঁময ঁহভড়ষফরহম যরং পৎবধঃরড়হ’ অর্থাৎ ‘সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বই ঈশ্বরের ভাষা’।

শক্তিশালী ভাষার সাহিত্য বেশী হৃদয়গ্রাহী, সামাজিক চিত্রকে নিখুঁতভাবে ছবির মত করে তুলে ধরে। সাহিত্যের বিষয়বস্তু চেতনাকে জাগায়, মানুষের অনুভূতিকে নাড়া দেয়। বিজ্ঞান প্রবন্ধেও  প্রকাশিত ফলাফলের নিগূঢ়তা পাঠকের গ্রহণযোগ্যতা পায় ভাষার ব্যবহার শৈলীতে। সাহিত্য বলি আর বিজ্ঞান বলি, সংশ্লিষ্ট সুধা পরিবেশনায় দরকার শক্তিশালী ভাষার উপর দখল।

মাতৃভাষা আবেগের ভাষা। কবিগুরু বলেছেন, ‘শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ’। মাতৃভাষা সবরকম শিক্ষার হাতেখড়ি। এই আবেগের কারণে অমর একুশের শহীদরা যেভাবে মাতৃভাষার জন্য জীবনদান করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্যদেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। মাতৃভাষার আবেগ এতই প্রবল যে ১৯৫২ সালের বাংলাভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতার সংকেত রেখেছিল। চিহ্ন, আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে, আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির শিকড়কে চিহ্নিত করে চলেছে।

মাতৃভাষার অনুশীলনের মাধ্যমে আবেগকে জাগ্রত করতে পারলে, বিভিন্ন ভাষা ও বিভিন্ন বিষয়ের মর্মার্থ উপলব্ধি করা সহজ হয়ে আসে। মহান ব্যক্তিবর্গ অনেক ভাষা শিখেছেন, অন্যভাষাতে লিখিত সাহিত্য রসে নিজেদেরকে সিঞ্চিত করেছেন। আমাদের বাংলা সাহিত্যের অগ্রপথিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবিগুরু (জন্ম ১৮৬১ সালে)-এর প্রায় চার দশক আগে (১৮২৪ সালে) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি পাশ্চাত্যের ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ (ইষধহশ ঠবৎংব)’ ও ‘চতুর্দশপদী ছন্দ (ঝড়হহবঃ)’-রসে সিঞ্চিত করে বাংলাসাহিত্যে  ‘নতুন যুগ’-এর সূচনা করে গেছেন। এ সম্পর্কিত তাঁর কয়েকটি রচনার মধ্যে সবচেয়ে সাফল্যজনক সৃষ্টি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত মেঘনাদবধ মহাকাব্য। নতুন ছন্দের প্রয়োজনে তিনি মাতৃভাষার অনুভূতি দিয়ে নতুন নতুন শব্দ, ‘বারুনী’, ‘বাহিরিল’ প্রভৃতি চয়ন করেছেন। সুকুমার বন্দ্যোপধ্যায়ের উক্তিতে, ‘মাতৃভাষা বাঙলার অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করে মাইকেল অমরত্ব লাভ করেছেন’।

আমাদের উপমহাদেশের পথিকৃৎ বহুদর্শী বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, বিশ্বখ্যাত রসায়নবিদ ও প্রযুক্তিবিদ স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায়, তাঁদের ছাত্র বিশ্বনন্দিত পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত মহলানবিশ, পদার্থবিজ্ঞানী সতেন্দ্রনাথ বসু ও জ্যেতির্বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা  বহুভাষা জানতেন। স্যার জগদীশচন্দ্র বসু পদার্থবিজ্ঞানী হয়েও জীববিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁর আবিষ্কৃত মাইক্রোওয়েভ সেল ফোনসহ সব রকম যোগাযোগের মাধ্যম। তাঁর আবিষ্কৃত ‘ক্রেসকোগ্রাফ’ যন্ত্র উদ্ভিদ বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী অবদান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাঁর বিশ্বকাঁপানো আবিষ্কারসমূহ আমাদের উপমহাদেশের মর্যাদা প্রথম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছিল। সত্যেন্দ্রনাথ বসু গণিতবিদ হয়েও বিশ্ববরেণ্য পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাত হয়েছিলেন এবং আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক মাত্রা এনে দিয়েছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানী প্রশান্ত মহলানবিস পরিসংখ্যানের কোন ডিগ্রি ছাড়াই এই উপমহাদেশে তথা আমাদেশে পরিসংখ্যানের জনক। গণিতবিদ মেঘনাদ সাহা জ্যোতির্বিজ্ঞানে যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। আমাদের মাটির মানুষ। আমাদের দেশের মানুষ স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায় ব্রিটিশ আমলে একজন স্বদেশ-প্রেমিক হিসেবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে উন্নতিতে বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন।

অক্ষয়কুমার দত্ত বিজ্ঞান বই প্রথম বাংলাতে প্রণয়ন করেন। স্যার জগদীশচন্দ্র বসু প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ বাংলাতে লিখেছিলেন। স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায় ডিগ্রি ও মস্টার্স ক্লাশে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাতে পড়াতেন শিক্ষার্থীদের বিষয়গত স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার জন্য। তিনিই বরেণ্য রসায়নবিদ ড. কুদরত-ই-খুদাকে পঠন-পাঠনে  উৎসাহ  দিয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু বিজ্ঞানে বাঙালির সুশিক্ষার জন্য বাংলাকে প্রমোট করতেন। এতে অনেকের আপত্তির কারণে তিনি বলেছিলেন, ‘যাঁরা বলেন বাংলাতে বিজ্ঞান পুস্তক বা প্রবন্ধ লেখা সম্ভব নয়, তাঁরা হয় বিজ্ঞান বুঝেন না, না হয় বাংলা জানেন না’। দুঃখের বিষয়, বর্তমানে বাঙালি শিক্ষার্থীরা সাধারণভাবে বাংলাতেও বিজ্ঞান বুঝে না। আমাদের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ইংরেজি মুখস্থ করত, এখন বেশীর ভাগ শিক্ষার্থীরা বাংলাও না বুঝে মুখস্থ করে। শিক্ষার্থীরা বাংলার শব্দ, খুব প্রচলিত না হলে, বুঝে না। সবই ভাবে ইংরেজি। একবার পড়ানোর সময় আমি ছবি অঙ্কন সহ বহুভুজ বা চড়ষুমড়হ ব্যবহার করেছিলাম। তবু শিক্ষার্থীর অনেকে বাংলার প্রতিশব্দ চাচ্ছিল। আমি তখন একটা শব্দে নয়, বাক্যে বহুভুজ বুঝিয়েছিলাম। ১৯৬৯ সালে এক রিক্সাওয়ালাকে বিশ্ববিদ্যালয় যেতে বললাম। রিক্সাওয়ালা জানাল, সে চিনে না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে ক’বছর রাজশাহীতে রিক্সা চালাচ্ছে। উত্তরে বলল, দশ বছর বলাতে, আমি বললাম ইউনিভার্সিটি চেন না? সে বলল, ‘সেটা চিনি’। বললাম, ইউনিভার্সিটি আর বিশ্ববিদ্যালয় একই। রিক্সাওয়ালা বলল, ‘আমরা মুখ্যু মানুষ ইংরেজি বুঝি না’। পরিচিত শব্দ সবই বাংলা হয়ে যায়।

প্রত্যেক ভাষাতে নিজস্ব শক্তি থাকে। যেমন, বাংলা ভাষার ‘অভিমান’ এর প্রতিশব্দ ইংরেজিতে আমি পাই নি। তেমনই ইংরেজির  ট্রাজেডি ও কমেডির সার্বিক অর্থ বহনকারী একটি প্রতিশব্দ বাংলাতে আছে কী? প্রত্যেক ভাষা গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। এভাবেই ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। অন্যন্য ভাষার শব্দ স্থান করে নিয়েছে। সঠিক শব্দ প্রয়োগ, জ্ঞানচর্চাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন যেকোন পঠন-পাঠনে জনগণের কাছে পরিচিত শব্দ ব্যবহারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। ১৯৭৬ সালে ইংল্যান্ড থেকে ৪ বছর পর দেশে ফিরে, বাসে বসে শুনতে পেলাম, পড়হফঁপঃড়ৎ সাহেব ফৎরাবৎ সাহেবকে বলছে ‘হালকা হালকা’। আমার কাছে ‘হালকার মানে’ এখানে ‘ধীরে’, আগে জানা ছিল না। ক’দিন পরে আরও নতুন শব্দ শুনতে পেলাম। একজন বললেন, আহ্ খাবারটা ‘জটিল ছিল, খুব ভাল খেলাম!’ বুঝলাম, এখানে ‘জটিল’ এর অর্থ ‘সুস্বাদু।

আধুনিক গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ বহু-বিষয়ক, বিধায় আমাদের আর একটু তলিয়ে দেখা দরকার। আমি কবিগুরুর একটা উক্তি স্মরণ করছি, ‘গণিতের ছন্দসমগ্র প্রকৃতির মধ্যে নিহিত আছে’। ছন্দের বিভিন্ন স্বরূপ : সঙ্গীতে ছন্দ, গণিত ও ভৌতবিজ্ঞানে প্রতিসাম্যআইন ও ধর্মে শৃঙ্খলা, সাহিত্যে হৃদয়গ্রাহীতা এবং জীববিজ্ঞানে প্রজাতি, সবই সমার্থক। সঙ্গীতের ছন্দ একঘেয়েমির অবসান করে নতুন উদ্দীপনা জাগায়। একঘেয়েমিজাত ক্লান্তি দূর করার জন্যই আমাদের বিভিন্ন ছন্দে চলাফেরা করা দরকার। অন্যদিকে বিশ্ববরেণ্য পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিস বলেছেন, ‘সঙ্গীতের তাল প্রকৃতিতে ‘মিল’-এর সন্ধান দেয়’। স্যার জগদীশ বসুর ছাত্র পদার্থবিজ্ঞানী মহলানবিস লন্ডনে গিয়ে ‘বাইয়োমেট্রিকা’ জার্নাল পড়ে পরিসংখ্যানের আকাশচুম্বী প্রয়োগ-শক্তি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। পরিসংখ্যানে তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কার ‘মহলানবিস ডিস্ট্যান্স’ নৃবিজ্ঞানে, রোগনিদানে, আবহাওয়া-পূর্বাভাষে, অর্থনৈতিক সূচক-নির্ণয়ে, কৃষি-উৎপাদনে, শিল্প-সূচক নিরূপণে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। ‘তাল’ এক ব্যক্তির মধ্যে বহুবিধ প্রতিভার জন্ম দেয়। এর জলন্ত উদাহরণ হলেন বহুদর্শী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। লিওনার্দো অবিশ্বাস্যভাবে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। এর মধ্যে  ড্রয়িং (তাঁর হ্যালিকপ্টার ডিজাইন, বিশ্বে প্রথম), পেইন্টিং (মোনালিসা সবার কাছে পরিচিত), ভাস্কর্য, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, সঙ্গীত, গণিত, প্রকৌশল (মানুষ সদৃশ প্রথম রোবট), সাহিত্য, শরীরবিদ্যা (মস্তিষ্ক, হার্ট, মাতৃগর্ভের ত্রিমাত্রিক চিত্র তাঁরই প্রথম), ভূতত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, ইতিহাস,মানচিত্র-অঙ্কন ও জীবাশ্মবিজ্ঞান উল্লেখযোগ্য।

মহান ব্যক্তিরা বিভিন্ন ছন্দে চলাফেরা করেন। এতে ক্লান্তি দূর হয়। অন্য ছন্দে কিছুক্ষণ অবদান রেখে আবার  পূর্বের ছন্দে ফিরে নতুন উদ্দীপনায় কাজ করতে পারেন। বর্তমানে বিশ্বে  নতুন নতুন আবিষ্কারের সাথে সব রকম বিষয় দ্রুত এগোচ্ছে। এর সঙ্গে তাল রাখতে আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে আলোকিত হতে হবে। বিভিন্ন অনুষদের বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। সবার জন্য ওঈঞর প্রয়োগ জানতে হবে, এতে ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধার সদ্ব্যবহার সম্ভব হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নতুন নতুন বাংলা শব্দ ব্যবহার করে প্রশিক্ষণকে উপভোগ্য করলে পঠন-পাঠন গতিশীল হবে।

চিহ্নের পদচারণা আরও বৃদ্ধি পাক, কামনা করি। এতে আন্তঃবিষয়ক জ্ঞান পরিবেশনা উন্নততর হবে এবং সেসঙ্গে সকল বিষয়ের পঠন-পাঠন সমৃদ্ধ হবে। এতে আমাদের দেশের উন্নয়নের গতি বাড়বে। আমাদের সন্তনেরা কোয়ালিটি শিক্ষায় দীক্ষিত হতে পারবে।

[১২ মার্চ ২০১৯, পদার্থবিদ্যার এমিরেটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক]

************************************************

শেষ পাতার আহ্বান

ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য…

একটা সময়ে বাংলা-কবিতার কণ্ঠ ছিল ফুল-পাখি আর বনভূমির গান। এখন তো আর সেই সময় নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য আর প্রযুক্তি ফুল-পাখির গানের চিরন্তন বৈশিষ্ট্যকে পাল্টে দিয়েছে। এ প্রজন্মের কাছে ‘ফুল’-‘পাখি’ এখন অন্য নাম। বুঝি ফুল নিয়ে আবেগ ঝরাবার সময়ও তেমন আর নেই। কেন নেই? তবে কি ফুল-পাখির গানের সৌন্দর্য মানুষ বাতিল করে দেবেÑ বনভূমি নাকি শূন্য আগুনে পুড়বে? নাকি তাদের অন্য নামে ডাকা হবে? লিখুন আগামী সংখ্যায়…

পরবর্তী সংখ্যায়

ই-যোগাযোগ : shiqbal70@gmail.com অথবা chinnolittlemag@gmail.com

ফোন : ০১৭৩৭-৩৫৪৬৮৪, ০১৭৬৬-৬১৯৫৪৬

এ বিষয়ে লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯

************************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা