ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস

চিহ্নের শেষ পৃষ্ঠার আহ্বান ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’। এ আহ্বানে সাড়া দিতে নিপতিত মননের ঝড়ে। ঝড়ে কেঁপে উঠে আত্মজৈবনিকতার বাউল বাতাস গায়ে লাগে। জেগে ওঠে মনন, অবগাহনে নেমে পড়ি। আলোটা নেভালে নন্দিতা চারপাশে গরিলা অন্ধকার। কারফিউ কবলিত কাজল কালো রাত কাঁদে পৃষ্ট চিৎকারে। সুইচের বোতাম টিপলেই আলো নিভে অন্ধকার নামে। চিরন্তন এ সত্য শাশ্বত বিজ্ঞানের আবিষ্কার বিশ্বাসে অমলিন। এ কথা স্বীকার করি বলেই যৌতিক উচ্চ কণ্ঠে বলি; সত্যমঃ শিবমঃ সুদরমঃ। এই সত্য বিশ্বাস বোধে প্রতিষ্ঠিত। আলোহীন জীবন কারফিউ কবলিত স্বভাব বিরুদ্ধ দুঃশাসনে নিয়ন্ত্রিত। তাই কবি এখানে নিমজ্জিত অন্ধকারে প্রশ্নের সম্মুখিন। উদ্ধৃতিতাংশের ব্যাখ্যা বিশেষণ এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য নয়। সেজন্যই এ প্রসেঙ্গর ইতি টানছি তিন তালাক দিয়ে।

কোনো কিছু লেখা তো লেখকের স্বাধীন সুকুমার বৃত্তির অনুশীলন। নিবিষ্ট চিত্তের একনিষ্ঠ সাধনা। খোদা ভক্তদের মতে যা কি-না পবিত্র এবাদতের সামিল। লেখক তার লেখনির ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ সার্বভৌম। স্বাধীন সত্বায় সৃষ্টিতে ক্রিয়াশীল। একান্তই লেখকের নিজেস্ব সে জগতে কারো অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ। চিন্তার মলিকিউল ভাঙছে মগজের কারফিউ। মলিকিউল ভেঙ্গে ভেঙ্গে সৃষ্ট পরমাণু। যার রূপান্তর পারমানবিক বা আনবিক শক্তি। আনবিক শক্তি বলে পৃথিবী নামক ভু-খণ্ডে গ্রহবাসী জনগণ শাসিত ও শোষিত। শাসকের নির্যাতনে নীপিড়নের শিকার নিরীহ এক প্রাণি গিনিপিক। অনুরূপ মগজ শাষিত নিয়ন্ত্রণাধীনে মানবের দৈহিক সচলতা অনস্বীকার্য। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাছে হাঁটুভাঙ্গা অচল যুক্তি দর্শন অবান্তর।

ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস প্রাকৃতিক তত্ত্বে প্রসঙ্গ প্রতিপাদ্য এক মহাদুর্যোগ। নিপতিত দুর্যোগ ভাঙ্গছে মগজের কারফিউ। স্বাভাবিকতার বিরুদ্ধে খড়গ উদ্যত। খণ্ড বিখণ্ড অস্তিত্ব আমার বেসামাল নিপতিত দুর্যোগে। জীবন চলার পথ পরিক্রমায় আমি ঝড়ের প্রতিকূলে। অতিক্রান্ত তারুণ্যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সামরিক শাসনের নিগড়ে আবদ্ধ। চারিদিকে তখন গেরিলা অন্ধকার। কারফিউ কবলিত কাজল কালো রাত ডুকরে কাঁদে পৃষ্ট চিৎকারে।

সবে শৈশব উত্তীর্ণ। কৈশোরাম্ভে গ্রীষ্মের ছুটির একদিন। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে কোকিলের কুহুতানে মাতাল প্রকৃতি। বসন্তের বাউল বাতাসে উতাল চারদিক। ‘ফুল ফুটুক আর না ফুকুট আজ বসন্ত।’ উদাসী হাওয়ায় দোলা লাগে উচাটন মনে। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামদেশে গ্রীষ্মের ছুটিতে একদিন। গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় ঘেরা উদাসী বনের বায়ে বাড়ির আম বনে ছেলে মেয়ের একসঙ্গে তুমুল আড্ডা। সূর্য আসেনি তখনো মাথার উপর। খেলার সঙ্গিনী এক আত্মীয়া বালিকার বাসনা।

কাঁচা আমের টক টক গন্ধে বুঝি তার জিভে এসেছিল জল। তার বায়না মেটাতে উঠেছি আম গাছে। আম ডালে ঝাঁকি দিতেই একটা আম সজোরে পড়লো তার পিঠে। লেগেছিল বুঝি, কাঁদলো হাউ মাউ করে। ঝড় এসে আঘাত হানলো আমার উপর। আমি নন্দ ঘোষ আমার শত দোষ। দোষী সাব্যস্তপনায় আমি নন্দ অভিযুক্ত। বাবা কর্মজীবনে ছিলেন জমিদারের নায়েব। জমিদারের মত সহায় সম্পদ আমার বাবার নেই। তবে বাবার ছিল জমিদারি মেজাজ। তাঁর কড়া সামরিক শাসনে সারাক্ষণ টতস্থ থেকেছি আমরা। পান থেকে চুন খসলেই বাবার রক্ত চক্ষু শাসন থেকে রেহায় পাওয়া ছিল দুষ্কর। মা বাবার প্রথম সন্তান হওয়া সত্বেও অপরাধের শাস্তি পাওয়া থেকে নিস্তার পাইনি কখনো। আত্মীয় বালিকার কান্নার অভিযোগে শাস্তি এতোদিন পরেও মনে দাগ কেটে আছে। শাস্তি পেয়ে জেদ চাপলো। সে আমার মনের মনি কোঠায় জায়গা দখল করলো। ঠিক যেন ইংরেজ শাসক লর্ড উইলিয়াম মাউন্টব্যাটন এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার সামিল। এ আমার ভালোবাসা। আমার প্রথম প্রেমে পরিণত হলো চুপ কথার অন্তরালে নীরবে। মনের মনি কোঠায় ভালোবাসার রাজ্যপাটে অধিষ্ঠিত দেবী সম্রাজ্ঞীর আগমনে ঝড় উঠেছে। বাউল বাতাস খেলছে লুকোচুরি দীর্ঘদিবস দীর্ঘরজনী। মহুয়া নেশায় মাতাল। ঝড়ের সে তাণ্ডব তোলপাড় করেছে হৃদয়ের খনি।

ঘড়ির কাঁটার সাথে সময়ের পাল্লা দৌড়ে এগুতে এগুতে শিক্ষা জীবনে রাজনীতি সংগঠন আর এলো কবিতার ঝড়। দ্বৈত ঝড়ে সমান্তারাল গতিতে চলেছি। একাত্তরে সারাদেশ উত্তাল। মাতৃভূমির স্বাধীনতা উদ্ধারে হানাদার বর্বরের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালিরা। তখন রাজপথে গণগণ মিছিল। অগ্রভাগের সৈনিক আমিও। শরিক হয়েছি উনসত্তর থেকে একাত্তর। উন্মত্ত সেই মহাদুর্যোগে আমি অপরাজিত। আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়েছি মাত্র। সার্বিক মুক্তি আসেনি। স্বাধীনতার পর লেখাপড়া শেষে কর্মের সংস্থান। চাকুরিতে স্বদেশে শুরু হয় প্রবাসী জীবন যাপন। সে সময় কলকাতা, বহরমপুর (ভারত), ঝিনাইদহ, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, বাগেরহাটে বান্ধবীদের সাথে পত্রমিতালী। স্থানীয় উদীচী-তরুণীর প্রেমঝড়ে আমি স্বপ্নের রাজকুমার। সবাই তারা ছ্যাঁকা পেয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে গেছে। মনে দাগা পেয়ে ভাটির টান পড়লেও কবিতা সুন্দরীর লোভের জোয়ার উজানে টেনেছে বরাবর।

উজানের ¯্রােতধারায় মিলেছি দেশ বিদেশের অনেক কুলে ও মোহনায়। দেশের ও বিদেশের বিশেষ করে ভারত ত্রিপুরা, আসাম কবি লেখকের সাথে পত্রযোগে সাক্ষাতে ঘটেছে পরিচয়। যোগাযোগের মাধ্যমে আমার সাহিত্য চর্চার দিগন্ত হয়েছে প্রসারিত সম্প্রসারিত। সেই আলোকে বেড়েছে পড়াশুনা, সঞ্চিত হয়েছে অভিজ্ঞতা। তাগিদ অনুভব করেছি লেখা প্রকাশের। সাহিত্য চর্চার জন্য সাহিত্যের সংগঠন পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্র ছাড়াও রাজনীতি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে জড়িয়ে নিজের খেয়ে ব্যয় করে বনের মোষ তাড়িয়েছি। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যখানে ঝড় উঠেছে। বাউল বাতাস লেগেছে দেহ মনে। উতাল বাতাসে উত্তোলিত আলোড়িত আন্দোলনের বিরুদ্ধ গতিতে সামিল হয়েছি। কলেজে পড়ার সময় এক স্যার (প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাপ্ত ইতিহাসবিদ পরবর্তীতে জাতীয় যাদু ঘরের কিউরেটর) বলেছিলেন সাহিত্যের পথ বড় কণ্ঠকাকীর্ণ। এ পথে এসো না। তার কথা হাড়ে হাড়ে টের পাই। এখানে নোংরামী সততার অভাব তোষামদ চাটুকার সিন্ডিকেট ক্ষমতার অপব্যবহার প্রভাব বিস্তার পুরস্কার কেনা বেচা বৌ দখল দালালী তাবেদারি আমলাবাজি প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে কোন অপকর্ম হয় না? পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় বৈধ অপেক্ষা অবৈধ জারজের উৎপাদন সংখ্যাতীত। ফলে এখানে প্রকৃত মেধাবীরা মূলহীন অপাংক্তেয়। ব্যতিক্রম ছাড়া মূলত: সাহিত্য রাজধানী কেন্দ্রিক। সেখানে ছুরি কাঁচি হাতে অনেক নাপিত কামানোর জন্য বসে থাকেন। অনেকে মিডিয়া এজেন্সি নিয়ে বসে আছেন। তাদের সনদপত্র নিয়ে কবি লেখকরা অনেকেই জাতে ওঠেন। প্রবাদ আছে— প্রচারে প্রসার। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই কবিতা স্বরণযোগ্য। ‘বিজ্ঞাপনে ঢেকেছে মুখ।’ আমাদের দেশে অনেকেই আছেন, যাদের বয়সের সমান বা দ্বিগুণ তিনগুণ বই প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু এর উল্টোও আছে। কবি হেলাল হাফিজের মাত্র একটি কবিতার বই। আবুল হাসানের তিনটি। আলোর জন্য এক ঘরে একাধিক মোমবাতি অপ্রয়োজনীয়। বাংলা একাডেমীর পুরস্কার যাদের হাতে সেটা বাগাতে (পুরস্কার প্রত্যাশীরা) তাদেরকে আবার পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রকৃতার্থে কি আছে আমাদের সাহিত্য ভাণ্ডারে। রাজনীতি সমাজ ও দেশ নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনীতিকরা দেশ চালায়। এদেশের গণতন্ত্র কাগজে কলমে আর ভাষণে। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। গণতন্ত্রের নামে দূর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি। লাগামহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতা দখলের রাজনীতি এদেশে। সাহিত্যাঙ্গনও সে দূষণমুক্ত নয়।

কাঁচা শরীরে ঝড়ের সময় চুম্বনে অভিসিক্ত করার মতো আমার পক্ষে ওকালতির কেউ ছিল না। দাদাকে নানাকে দেখি নি। দাদী মরার সময় বয়স ছিল ৬/৭ বছর। নানী ভারতের নাগরিক। তাকে শুধু চোখেই দেখেছি। তার মধুমাখা যাদুকরি স্নেহ মায়া ও আমার জন্য ‘এ্যকনা কণ্যা’ সঙ্গিনীর পক্ষে তার মুখে ঝড় ওঠেনি। ‘এ্যকনা কণ্যা’ লাগতো যখন সে ঝড় উঠেছে বাউল বাতাসে ছুটে গেছে মন কবিতার ছন্দে। সে দোলায় থামেনি কবিতার প্রকম্পন। বইছে আজো নিরন্তর। একই সময়ে রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িয়ে থাকা নিয়ামক শক্তি আমাকে প্রবল দেশাত্ববোধে উদ্দীপ্ত করে। সে প্রণোদনায় দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়ি। তাই শারীরিক ঝড়ে বাউল বাতাসে পরাজিত হইনি। আমার রাজনীতির দর্শন আমাকে আত্মমর্যাদাশীল একজন সৎ মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার প্রণোদনা যুগিয়েছে। দেশ মাটি ও মানুষের ঘনিষ্ঠতায় শিকড়ে প্রবেশের প্রয়াস পেয়েছি।

আপাত রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেও স্বাধীনতার সুফল বঞ্চিত ভাগ্যহীন বাঙালি জাতি। এখনো মৌলিক অধিকার হননের শিকার। স্বাধীনতার সুফল ছিনতাইকারী সামরিক জান্তার যাতাকলে পিষ্ট বাঙালি। বিকৃত ইতিহাসে পরিচিত বাঙালি নামের আড়ালে বাংলাদেশী। ষড়যন্ত্র অভূত্থান যেন নিয়তির লিখন এ জাতির। তা এখনো থামেনি। মুক্তির লড়াই চলছে। এ লড়াই চলবে। অপপ্রচারের গোয়েবলীয় মিথ্যাচারের মারণাস্ত্র এনেছে বিভ্রান্তি বিভাজন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ তরুণেরা ঐক্যবদ্ধ। এ সাহস হোক আমাদের পাথেয়।

আমার সফলতার বিফলতার মূল্যায়ন হয়তো হবে কিম্বা হবে না তা সময় সাপেক্ষ। তবু দেশোদ্ধারে স্বপ্নের স্বাধীনতার সম্মুখ লড়াইয়ে অদম্য কলম সৈনিক আপ্রাণ লড়ছি। প্রতীজ্ঞা প্রত্যয়ে দৃঢ় বিশ্বাসে আজীবন সংগ্রামী। ভোগের উজ্জ্বল শিখা ত্যাগের ফুৎকার স্বমহিমায় দ্রোহের বাতি ঘরে স্বপ্নের সাতমহলায় ক্ষুব্ধতায় বোনে আনন্দ অক্ষর মালা। জীবনের যাত্রা পথে খুঁজে ফিরি অপার আনন্দ।

ঝড় উঠেছে, বাউল বাতাস গায়ে লাগে পৃথীবির আবাসস্থলের বাসিন্দা বলে। সমাজ বিচ্যুত প্রাণি নই। একলা আমার জগতে হতাশা নামক সংক্রামক ব্যাধির ছোঁয়া গ্লোবস পরা দুহাতে আবর্জনা সরিয়ে ফেলি। দুর্দমনীয় প্রচেষ্টায় কানে আসে শৈশবের শোনা অচেনা গায়কের কণ্ঠে গাওয়া চেনা সে গানের সুর। ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস আজকে হলো সাথি, সাতমহলার স্বপ্নপুরের নিভলো হাজার বাতি’ আলো নেভালো নন্দিতা। চারপাশে নেমেছে গরিলা অন্ধকার। চলেছি অন্ধকারের পথে একাকী যাত্রী। আঁধারের গর্ভজাত আলোর ওপারের পৃথিবী আলোময়। অন্ধেরাও দৃষ্টিতে আলো দেখে। সে আলো দেখার মানস চক্ষু চাই। বেশি দূরে নয় সে আলো। সে আলো খুঁজে দেখি প্রত্যেকেই অন্তরের পর্দায়। নিজের ভেতরে সে প্রদীপ জ্বলুক চিহ্ন মনলোকে। পথের দিশারি হোক পথ পরিক্রমায়।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা