[ট্রিলজি]–সমস্ত ধূসর পিয়

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

মাখনুন বিশাল কাঁঠালতলার ছোট্ট কোণার সময়গুলা ছাড়িয়া একদিন সেই কাঁঠালগাছের ছোট্টমুচিধোয়া ফোঁটা পানির গড়ানো অংশে হাত রাখে। কাঁঠালমুচির অংকুরোদ্গম দেখে। ফলবান বৃক্ষের আত্মদান অভ্যাসে নয়, চিরায়ত আনন্দে— তা দেখে নেয়। এ গাছটা কবে কোন হিন্দু স্বর্ণকার রোপণ করিয়াছিলেন, কে জানে? শোনা যায় তার নাম বসন্ত বৈরাগী। কতো বড় সেই গাছ, এর শাখা-প্রশাখা মসৃণ কোমল, বড় খালার থাইয়ের মতোন। অনেক উঁচুতে উঠে বসে থাকতে খুব মজা লাগে। এক রকমের উষ্ণতাও আছে তাতে। যেন খালার বুকের ময়লা নরোম কাপড়ের ওমে মুখ গুজানো বাসনা। ওতেই কী ডিম পাড়ে ডেকি মুরগীটা! গোল থাইয়ের ওপর মচমচা গরম আমেজ আর দুলুনির কোছায় মগ্ন তামান শরীর। খালি লুকাতে চায়। আর ভেতর থেকে গুগলি ওঠে। তাতে রক্তবীজের ধারায় মর্ত্যে নাইমা আসে শিশু। সে নতুন উষ্ণতার সন্ধান করে। আলোয় আলোয় আকাশ দেখে। আকাশের ওপারে তাকিয়া কয় অন্ধকার থেকে কই আইসা পড়লাম। তাতে উষ্ণতা ভর করলে হঠাৎ বন্দ চোখ খুইলা তাকাইয়া দেখে এ তো কাঁঠালগাছের মোটা ডাল। তয় এইটাই কী বড় খালার থাইয়ের মতোন লাগছে? কী ধরনের আরামকোণা আছে এই থাই-ডালগুলায়, তাতে পাখি বসে, কাক ওঠে, ঘুঘু আসে, শালিক ঠ্যাং তুইলা পাখা ঝাপটায়। ফুড়–ৎ কইরা এপাতা ওপাতার নাচনের সঙ্গে যেন বায়না আনে। সে বায়নায় তুরতুরা ঠোঁটে পশম খুঁটে, ঝপঝপ ডানা ঝাপটায় আর কুচকুচ পশমহানা বাকুম তোলে। এতে গাছের মগডালের সঙ্গে রোদছায়ার উল্কিতে বোল ওঠে। তির্যক কমলা রঙের রোদ তাতে নকশা আঁকে। শিরশির আনন্দের ভেতরে তৃপ্ত ঠাণ্ডা বাতাস ছুঁইয়া দেয়। কাঁপে, দোলে, আর ভর দিয়া বোঁটার সাথে গড়ে তোলে চিক্কন মোনালি সংযোগ। অপার মুখে সে ভালোবাসা মানুষের বুকে ওরাল তোলে, গুরুগম্ভীর প্রার্থনা বইয়া আনে। মাখনুন তখন শতকিয়া আর মানসঙ্কে ঘর মেলায়। কঠিন মাষ্টারের মুখের দাড়ি নড়ে, হাত দিয়া টানে, একটু কাঁপেও। স্কুলের উত্তর দিকের দরোজা দিয়া তখন হু-হু করা হাওয়া তীক্ষè হয়া ঢোকে। তিন বেঞ্চের শেষটার কোণায় মাখনুন শীতে কাঁপে। আজ তার গায়ে হাফ হাতা মলিন শার্ট। বুকপকেট কোচকানো। সবুজ হাফ প্যান্টের তিনবোতামের একটা অন্যসুতায় আটকানো। এ কাঁপুনি আরও বেশি বোধ হয়, কারণ আজ সালোক সংশ্লেষণ বিষয়ক পড়া। তখন একপ্রকার নিজেকে নেতিয়ে নেয় সে, আরামের ভাপে তার মাইয়া বন্ধু জুঁইয়ের কথা মনে হয়। ফুলতোলা সাদা কামিজের তলে মোটা রানে আনন্দ ওঠে। পরিষ্কার লোমছাড়া থাইয়ে নীচে নামানো পায়ে তার হাইট মাপা যায়। উপচানো আলাপে ওই ধানভানা মেশিনপাড়ের ঢকঢক কলের পানিপড়া আওয়াজে কয়, ‘খুব ভালো ছেলে’। পাশের আলাদা লাইনে সেও তখন পড়া নিয়া ব্যস্ত। কিন্তু আরাম হয়। তীব্রতর স্বর ওঠে। ভেতরে টকমিষ্টি আওয়াজ ঘনায়া আসে। হঠাৎ স্কুলঘরটা দুইলা ওঠে। এ কি ভূকম্পন! একবার দুবার অনেকবার। তখন কঠিন মাস্টার ভয়ে দোয়া পড়ে। বলে এই তোরা সানা পড়। ওইটা ছোট দোয়া। এর মধ্যে হেডমাস্টার বাইরে এসে বলে, সকলকে স্কুল মাঠে আইতে কন। ভূমিকম্প আসচে। হেডস্যার নোয়াখালির মানুষ বলে পরিচিত। আড়ালে সবাই তাকে নোয়া স্যার বলে ডাকে। মাখনুন ভূকম্পনে ভয়ের চেয়ে স্বস্তিই পায়। এসব সালোক সংশ্লেষণ পড়া সে বোঝে না। বাইরে যাওয়ার অর্ডার আসলে মনটা ভরে ওঠে। সে পেছনের ভাঙা দরোজা দিয়ে বাইরের প্রান্তরে তাকায়। নুয়ে পড়া আকাশে ভোরের কণারাশির আলাপে মুগ্ধ হয়। আকাশজোড়া এতো আলো সে কখনো দেখেনি। আলোর মাঝে বিপুল বিকিরণে তীরমাথা যুক্ত হয়। ওতে কী লাল দেখা যায়! নাকি কমলা লাল। বড় বড় ইলেকট্রিক পোলে ছাওয়া, দুলন্ত তারের চিক্কনরেখা মনে করিয়া দেয় তার প্রাচীন সুখদ প্রলয়মাখা দিনকে। তা কি অনেককালের কোনো কথা? তখন তারা নিজ গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিল এখানে। বিরাট স্কুলবাড়ির এই পেছনটায়। এসব ভাবলে রিফুজি মনে হয় এখন। ধীরে ধীরে হাঁটা পথে বাঁকা রাস্তা ঘুরে ঘুরে আঙরার বিলের ওপর দিয়া এখানে আসে। এই মাঠেই তখন সার্কাস চলে, মোগলে আযম আর পুতুল নাচের খেলা। আসতে আসতেই তা শুরু হয়ে যায়। তখন কেমন যেন এক মামা তিনি বলেন, এখন আর নয়, পরের শোতে। শো আবার কী! এখন এই আকাশ দেখে তার শোর কথা মনে হয়। শো, আহা সেই শো। তারপর ভোরের আলোরেখা সবকিছু ছেদ করিয়া ছিনিয়া নেয় অন্ধকারকে। রক্তমাংসের তুমুল আক্রমণ ছিল তাতে। গড়ানো বালুকণা আর কিম্ভূত এক দরগার ভয়মাখানো আওয়াজ। অনেকদিন পর এই প্রান্তরে এইসব মনে পড়ার সুযোগ হলো। এই সুযোগ আর কোনোদিন সে পাইবে না। নোয়া স্যার যে ব্যবস্থা কইরে দিলেন, মনে মনে তারে সে শ্রদ্ধা জানায়। বইয়ের পাতা সেদিন আর ফিরে আসে নাই। উড়ন্ত আলোয় কালো অক্ষরকে আর কোনো স্যার সেদিন তারে পায় নাই। ভূকম্পনটাই তাকে সবরকম ভালোবাসা দিয়া গেল। এ যেন জুঁইয়ের চাইয়াও তখন অনেক বেশি আপন।

এই জুঁই তাকে মায়া করে, একটু একটু ভালোও মনে করে। কিছুতেই বিরোধ নাই, যা কওয়া যায় তাই শোনে। সমর্পিত মানুষকে যেমন সবাই ভালোবাসে তেমন। সাহস নাই, খালি মনের ভেতরে কুৎকুৎ করে। মনের কথা বাইরে ঘোষণা না করলেই সবাই ভালো কয়, ভদ্র কয়। এই গাছের পাতাটাও সেরকমই ঠেকে, সে বাতাসে বাতাসে হেলে— মাখনুনের মতো। পরে জুঁই তাকে কইছিলো, যুথি ফুল চিনিস। আমাদের বাড়িত আব্বা লাগাইছিল। ভারি মজার বাসনা। তোর গালগুলাও জুঁইফুলের মতোন। এসব নিয়া কাঁঠালপাতা আর বসন্ত বৈরাগীর গাড়া এ গাছ সম্পর্কে নিজেকে সে সুন্দর কইরা তোলে। বাঁশী হাতে নরেশ কৃষ্ণের সুকুমার মুখ তার মনে বাসা বাঁধে। বিশুদের বাড়িতে এক বিরাট ছবি দেখে একপ্রকার ভয় আর পাপবোধ মনে জাগে। এইসব মানুষকে জীবন দেবে কে? কেন ওদের মূর্তি হয়। আসলে এসব কাজে সকলের যোগমায়া রচিত হয়। যেমনটা গাছে বসা পাখিটাতেও আছে। এই পাখির ডানার ছাঁটে কী চমৎকার রঙ নিয়া ওড়ে কিন্তু পাখির আনন্দ কেন মানুষের আনন্দ হয় না! মাখনুন প্রায়ই এই গাছে ওঠে, প্রাচীরে পা দিয়া, ডাল কাটা গর্তে পা রেখে আস্তে আস্তে উপরে ওঠে। ওখানে পছনের জোড়া ডালে বসে নীচে-উপরে তাকায় আর স্বপ্ন বোনে। সারাটা জেবন এই ডালেই গাছবসতি করলে কেমন হয়, মোজাম্মেল স্যার বলেন পাখি আর মানুষের মন এক, গাছ সেটা টের পায়। কখনো গাছ কাটিস না। এসব শুনলে মাখনুনের কান্না আসে, তাহলে বড়রাস্তায় জামগাছটা কাটল কেডা! এখানে বসেই একদিন সে পাখির স্বপ্ন দেখিয়াছিল, নীল আকাশের সাদা ভেলায় পাখি-বিমান উড়িলে তখন সে ঘুমিয়া পড়ে, নানীর ডাক পিছলে পা ফসকে সে গাছ থেকে পইড়া যায়, বুকে আছাড় খায়, তারপর ঘোর আসে। নিইভা যায় চান্দের বাতি। ফর্সা বাতিটা চিমনীর আলোয় রঙ ধরে, বেত দিয়া মাস্টার পেটায়, তড়পাতে থাকলে রহমান পিওন দড়ি আনে, ক্যারে তুই গাছোত ক্যা! তারপর হুমহুম করি মেলেটারি যায় পচ্চিমে আঙরার বিল ভাঙে, মেলেটারি ছোল কাড়ি নেয়, আর দেয় না, এই-ওই করে আর কয়, মাও তুমি চইলে যাও। এই নাদুসনুদুস ছাওয়াল আর দেওয়া হবি না, আমরা নেমো। দেয় না, দোলায় দুলে দুলে চলে, মেলেটারি আসে যায়, আবার আসে যায়, দুরুদুরু কান্নায় তপ্ত ভাপে বেলা ওঠে, গড়ায়, পেছায়, হঠাৎ কমান্ডার আইলে, ছোলের ঝামেলা বা শখ মিটা যায়, মা ফেরত যায়। কী ইচ্চা মানষের, যদি গুলি করে তয় কিচ্ছু করবার নাই, হুট হুট করে মওদুদ বিএসসির সাদা পাঞ্জাবী নাকি চান্নির আলো নাকি রইচের দোকানের ফর্সা ঘোলা বাল্ব– কুত্তা এত্তেলা দিয়া তড়পায়, কোপান দিলে, বিস্কুটের ঠোঙা ছাড়ি দৌড়ায়, সেও দৌড়ায় পচ্চিমে-পূবে ওড়াল ওঠে, মিছিল বারায়, ভোট ভোটার ১৫ নং ১৩নং ভালো খবর, জিতিবে। হোসেন জিতিবে, বিষ খাইবে না, আছে নবীজীর দোয়া। দুলদুল আর দরুদ-বারুদ সবই। তড়পায় বিরাট কালা পিঁপড়ার কামড়ে সচেতন হলে দেখে সে কাঁঠালের ডালের খোপেই বইসে আছে। এখানে মাখনুন বাঁইচ্যা আছে। সে ঘুমে-কষ্টে-আনন্দে স্বপ্ন দেখে, এই গাছতলার নীচের কোটার ঘরে। রূপদিয়ার মোকাম এটা। অনেকেই বলে এই গাছটিই সীমানা। এখান থেকে দেড় ক্রোশ সোজা হাঁটা দিলে ডুবাপুকুরের আইল শুরু। এ রাস্তায় কখনো চাঁদ ওঠে ভরা জোয়ার নিয়া, কখনো কালিগোলা আন্ধার। ছাতা দুলিয়া, পাঞ্জাবীর হাত গুটায়া পান মুখে নিয়া রাস্তা হাঁটেন মওদুদ বিএসসি। সক্কলেই কয়, মাষ্টারের মুখের সামনোত কেটা দাঁড়াবি, বুকের পাটা কয়টা। মাখনুনের বাড়ির কাঁঠালছায়া আর মওদুদ বিএসসি অন্তরমন এক তুলনা হয়। একরূপ আবেগে গাছটা যেন ছায়া দোলায়, পুনর্বার ঝড় উঠলে গর্জন তোলে। একসময় সে গর্ভবতী হয়, প্রচুর ফলে আমজনতার আহার রক্ষা করে, মিষ্টি সে আহারে গন্ধঢালা মনে পাড়া জুড়ানো মানুষের আনন্দে রোল ওঠে। চিক্কুর ওঠে কার বাড়ির কাটোল রে বা? ওর ছোলের বেটা হবি, দোয়া করি। তখন কানাবুড়ি আশীর্বাদ দেয়, রাঙার মা বর দেয় বাড়ির ছেলের জন্যে। এ গাছবাড়ির দরোজা জানালা চেয়ার টেবিল সবকিছু গরিব এবং মহৎ বিদ্যুতময়। ওখানে কাষ্ঠাসন করেন বড় অফিসার, কাজী সাহেব, থানার দারোগা বড়বাবু। বেড়া আটকানো এই খাঙ্গায় অনেক সিদ্ধান্ত হয়, শালিস বসে, মীমাংসা নিয়া চলে যান দর্শনার কুতুব মৌলবী কিংবা হাজেরা বিবি। তাদের সমস্যার সমাধান এই চেয়ারে বইসাই নিষ্পন্ন হয়। এই আজও সকালে দূরের মৌলবী আসিয়াছেন কীসের যেন এন্তেজাম নিয়া। তার আলোচনা করে বহুক্ষণ। মাখনুন হাবিলদারের ব্যাটার মতো চালাক নয়, কিন্তু সে একরোখাগোছের। যে কোণার ঘরটা আছে সেটা সে নিজের বলে অধিকার নিতে চায়। কিন্তু হয় না। একঘরে বাপমাভাইবোন গোলাগুলি থাকতে ঘেন্না করে। রাত হলে বাজার খরচের আর হারিকেনের ত্যাল পুড়ি খালি বিষাদসিন্ধু শোনা। বিষাদসিন্ধুর কথা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। খালি কষ্ট আর কান্নাকাটি। ছবির লাকান ভাইসা ওঠে পাগড়ি পড়া মাসহাব কাক্কা। সম্মুখ সমরে জয় ওঠে। ভীড় কাটাইয়া দর্শকের শব্দে আকাশ কাঁপে। ফোরাত কূল চাক্ষুষ হইয়া ওঠে। সশস্ত্র এসব অভিযানের ভরকেন্দ্র জুইড়ে গড়ে ওঠে মাখনুনের স্পর্শধায়ী মগোজ। চলতে থাকে যুদ্ধ আর ক্রন্দনের তপ্ত মেশামেশি। বাপের গদি বিছানায়, মায়ের থুতনিতে বাপের জামাফেলা হাঁটু আর শ্রবণে আক্রান্ত মগোজ ভীষণ আক্রমণে আটকানো সেই যুদ্ধের তরবারি। এ যুদ্ধে ভয় আর জয়ের সাহস গড়িয়া ওঠে। বিষাদসিন্ধুর গদ্যের তরবারিতে ভৈরবীরাগ প্রস্তুত হয়।

তবে ফোরাতকূল আর দুলদুল ঘোড়ার আওয়াজ মাখনুনের কান বিড়বিড় করলে ঝমঝম করে কাঁঠাল গাছের শাখা-প্রশাখা বেয়ে সরসর বৃষ্টির পানি গড়ে পড়ে। অন্ধকারের ভেতরে কুমকুম করে ত্যাল কমে আসা হারিকেন। টিনের চালে পটপট দমকা বাতাসে বৃষ্টির ফোঁটা নামে। হারকেনের ত্যাল না থাকলে চিক্কন ফিতাডার মাথায় কানি বের হয়। তা একপ্রকার লম্বাও হয়। সে লম্বা শীশে চিমনির এক অংশে কালো কালি জমে। ঘোলা হয়া আসে হারিকেন। বিষাদসিন্ধুর পাতা লালচে হয়। কালো অক্ষরগুলা রঙ পাল্টায়। কাছে এসে দুলদুল ঘোড়ার কাহিনি আবেগের কম্পন আওড়ালে মাখনুন কান্দে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলা চোখোত পড়ে। সে চোখে আন্ধারের ভেতর অল্প ক্রম-আলোতে বালিশটা ভিজিলে কখন যেন চোখ বন্ধ হয়। ভীষণ পানির তোড় তাকে তাড়া দেয়। মাখনুন ঝাঁপ দেয়। বিলের বাতা কিংবা করতোয়া নদীর ওপর পুল থেকে উল্টালাফের ফলে পংগোরের তির্যক কাঁপুনি গোটা শরীরকে ভিইজা দেয়। পানির ওপর হাঁটা, তার স্বরের ওপর ঘুষি মারা আর পংগোরে পংগোরে নিমতলা পার হয়া একাকি অনেকদূর চইলে যাওয়ার খুব সুখ লাগে। মওদুদ বিএসসি কয়, পানি আর আলো মানুষের জীবনের সঙ্গে রিলেটেড। জল জল আর জল এছাড়া মানুষের চলে না। আবার একে ভয়ও করে মানুষ। জলের ছায়া কিংবা জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা বলা, লেক-পাহাড় নিয়া মানুষের উৎসব কাতরতা সবকিছুই মানুষের আগ্রহের বিন্দু। আলোও তাই। পতঙ্গের মতো মানুষও আলো ভালোবাসে। আর পরিবেশের সঙ্গে সবকিছু জড়িত। পূর্ণিমার আলো, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা আর মানুষের আবেগ-অনুরাগের শরীর এক বেণীতে আটকানো। মওদুদ বিএসসি হরোস্কোপের ব্যাপারে আগ্রহী নন কিন্তু প্রসঙ্গ তোলেন। পরে আবার শোরগোল তোলে বিনষ্ট মনের ফেরারি মানুষকে দায়ি করেন সবকিছুর জন্য। মানুষের আয়রনি হচ্ছে, সভ্যতার খাতিরে পরিবেশ সে বিনষ্ট করবে এবং সেই আবার পরিবেশ ফিরিয়েও আনবে। মাখনুন এসব ভাবলেও জলের ইশারা খুঁজে পায় না। অনেক জোড়াতালির পালতোলা নৌকায় সে একবার কাঁদতে বসে, এঞ্জিন নষ্ট হলে খালি চারআঙ্গুল বাদ দিয়া নৌকা কাঁপা শুরু করে মাঝ যমুনায়। হায়রে পানির বলকানি। মাঝি কয়, নড়েন না, চুব হয়্যা থাকেন। অনেকক্ষণ পর স্যালো চালু হলে বড়খালের ফাঁকা তীরে নামি দিয়া কয়, আজ আর নৌকা চালাবানাও ত্বরা কোটে যামেন যাও। সেই ভয় আর মওদুদ মাস্টারের কথাকে মেলালে মাখনুন আগুন আর পানির শব্দ শুনতে পায়। হারকেনের আগুন আর পানির আওয়াজ মেল্যা দূর পৌঁছায়। বড়খালে তখন মানুষ ঘুমায় আর কুত্তার রোল ওঠা কান্না গাঢ়তর হয়। খালি তখন শিরশিরা হাওয়া কুসারের ক্ষেত আর শর্ষের আল দিয়া বাতাস বোলা মায়ায় ভাসে, দৌড়ায়। মাখনুন তখন উষ্ঠা খায়, আর দিশেহারা হয়া কয়, ‘এরামে বাঁচি থাকা যায়, বড়ফুপুর নাকান মরিলে কীসের দায়’— লক্ষ্য যে অনেকদূর! অনিঃশেষ কাশবিছানো মাঠ ধরে হাঁটে, কী গভীর মগ্ন আকাশ, পাখির ডানা আর যমুনার পাড়কাঁপানো সুর। এ এলাকার সংস্কৃতিটা বেশ আলাদা ঠেকে। মাটি থকথকে, জলের ছোঁয়ায় তার সিক্ত পরিণতি জুড়ে দিয়েছে হাওয়াই মন। মনের উত্তাপে বাইরের রূপ শক্ত ভেতরে কাদা। সবকিছুর ভেতরে রহস্য, রহস্যের তালে সামনে দিয়া অগোছালো ঘর, বাড়ির বউ, আর কষ্ট-যন্ত্রণার চিৎকার। উদামপীঠে চাক্কুর মায়ের সংসার। কবে গত হইছে তার স্বামী, চাক্কুই এখন সংসার চালায়। উদাম বাড়িতে মাখনুন ঢুকলে খাবার জন্য তেষ্টা ওঠে, যদিও আজ ভরা পূর্ণিমা। এ পূর্ণিমায় দিনেরবেলা খাদ্য আহার বারণ, সমুদ্রে জোয়ার দিছে, শরীর এর শালীন থাকার কথা কয়– কবে কইছিলো জেঠুবাবা, শালা কম খা, খাওনের জন্য খালি বাসনার পিছে পিছে হাঁটিস। তারপর সেসব মিথ্যাদিনে জেঠুর চোখ ছাড়িয়া এই বড়খালের তুচ্ছ জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়লে দূর থেকে সে এলেকশানের আওয়াজ শুনতে পায়। স্বাধীনের পরে খুব কম সময়ে হারানো বড় ফোর্সের নায়ক মশাররফ মরিয়া গেছেÑ ভারতের দালাল বলিয়া, কেউবা প্রতিশোধে তার নিজের আগার মিটাইছে। স্বাধীনের সুবাতাস নাই, কেন এ দেশের মাটির মানুষ সুখ সুখ করিয়া ভার হইয়া আছে– তাহার খোঁজ কে রাখে। কিন্তু ক্ষমতাও কী ভাগ হইছে। মাখনুন চাক্কুর মায়ের হাতের ডালভাত খাইয়া মোড়ের দিকে ভাষণ শুনতে যায়। কাল পরীক্ষার জন্য উৎসব পড়িয়া গিয়াছে। সে পরীক্ষায় কতো মানুষ এলাকায় আসিবে! কার ভালো কে চায় সেটি বোঝা কষ্টকর। সাইকেলে সাইকেলে মাখনুনদের আশেপাশের চিরচলাফেরার এলাকা ভরিয়া যাইবে। রওশনপুর, কুতুবপুর পার হইয়া অনেক দূরদেশের ডিস্ট্রিক্টের লোক আসিবে। তাহারা ফেসিলিটি চায়, সাপ্লাইয়ের বন্দোবস্ত খোঁজে। বড় লম্বা মানুষ, বিদেশি স্যুট আর টি-শার্ট গয়ে লইয়া মাখনুনরে কয়, ‘তোমাদের এখানে ভালো দপ্তরী কে? উনার সঙ্গে দেখা করানোর ব্যবস্থা আছে কী?’ এই ভোটঘর, ধানেরশীস-তালা-মই-আনারস মার্কার লারেলাপ্পাটা এখানে ভালোই। কাছে আসেন লাভলু দা। লাভলু দা এই এলাকার হলেও মাখনুনের জাতবন্ধু। কয়েকদিন ও ওকে নিয়া বিড়ি খাওয়া আর পরে পাড়ের ঢালে ভেতরে পুরানা সিনেমা হলে সুচরিতার ছবি দেখতে নিয়া গেছে। তখন শুনছিল ভোরে এক বিরাট জীবনের সংবাদ। নাচুনি বুড়ির ভেতরে মেলা ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষের প্রলয় নৃত্য। তখন বিরাট শোরগোল শোনা যায়। এক অন্ধ আলো ঘিরে ফেলে প্রবল ছায়াগুলো, সে তখন আকাশের গুচ্ছ তারার দিকে চোখ মেলিয়া ডাকে, আয় আয় আয়! মাখনুনের ডাক পাড়া কণ্ঠ আর নাচুনি বুড়ির প্রলয় নৃত্য হাওয়ায় ভাসে না, মনের বারান্দায় হুমড়ি খাইয়া মৃত মানুষের কথা শোনায়। না মৃত নয়, মোহাম্মদ আবুল নামে একজন, যে অন্যায় ভাবে খুনের দায়ে এক চিক্কন বারুদ পান করিয়াছিল। কেউ কিচ্ছু বলে নাই। সবাই বিশ্বাস করে সে বারুদে বিষ নাই, ধ্বক নাই, গন্ধ নাই। কেউ তার চিহ্নমাত্র পাইবে না। সেটার কোনো মালিকানা রইবে না। হজমের ভেতরে তার তেজ ফুরাইয়া যাইবে। সেই কাম ঠিক ঠাকই চলে। কিন্তু বিধির বিধান কাটবে ক্যামনে। তা ফিইরা আসে। জানান দেয় খুনীর খুনের শার্লোক পরিক্রমা। রব ওঠে। প্রিয়তমার চোখের জল প্রবল বর্ষণ আনে। সেই বৃষ্টির ফাঁদে সমস্ত হাহাকার সকলকে সঙ্গী করে। কোলের কাঁখের হ্রেষা দূরন্ত হইয়া কয় : আয়, আয়, আয়। সত্যিই আইসা গেল, সব গুপোন কতা বাইর হইয়া পড়লো। কী নির্মম আর কতো তুচ্ছ মৃত্যু। সেখানে প্রবল অত্যাচার, নিরুপম হাহাকার, আর তীব্র কষ্ট খরা রোদের ফড়িং চীৎকার, চিরকালের হারানো জাফরান বেদনার ভার চুইয়া ওঠে কন্যা আর প্রিয়তমার স্বর। কেউ তা দেখে নাই, হায়রে অভাগা জীবন। কুৎকুঁতে স্বার্থে সব ভুইলা যায়, দ্যাশ বেচেÑ জীবন বেচে। কী স্বার্থ আছিল তাতে। পাপ কী বাঁচে? পাপের সমুদ্র কেউ কী দ্যাখছে। নিদারুণ তার আর্তনাদ। সমুদ্রের কোলাহলও তাতে পরাস্ত। মাখনুন সমুদ্র দেখে নাই, ছবি দেখছে। পাগলী বুড়ি ওই ছবিতে নামে, নীল সাগরে পঙ্গর দেয় আর আবুল বাবার ইশারায় ডাক পাড়ে। তখন খুব দ্রুত ঐশী বাণী চিক্কুর দিয়া ধমকের সাথে কয়, চেনোস বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনরে চেনোস। শিইখ্যা রাখ ভরা জীবনের লাইগ্যা : ‘যারা আক্রান্ত হয়নি, যতক্ষণ না তারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের মতো ফুঁইসা উঠছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হইবো না’, হয়নি তা কোনোদিনও। নুনের সামনে ভেসে ওঠে আবাস সেই ফটিকছড়ি। মাঘনিশীথের রাতে ডাক ওঠে। পেছনে পিস্তল ঠেকাইয়া মারিছে। বউ কান্দে, কষ্টে হুপ হুপ কইরা কান্দে কোলের শিশু। টুপ কইরা নেওর পড়ে, কানের গোড়া দিয়া। দূরে তিনটা কুত্তা একসঙ্গে গা মোচড়ায়। সড়াক কইরা উইড়া যায় বাজপাখি। শান্ত সমান সবুজ জমিনে নির্জনতা আরও গাঢ়তর হয়ে আসে। জোনাক পোকার আলোও ক্লান্ত হয়ে কমে আসে। তখন কি সব মানুষ ঘুমায়! বুড়ির নৃত্য তো বহুদূর তখন। যাত্রার ফ্লুট বাজানোর মতোন মিইয়া থাকে। মিহিটা আরও গভীর। এতো নিথরতার ভেতর ‘টাস’ আওয়াজ হয়। ফ্যাটকা টাস। তাতেই আবুল মইরা যায়। কলঙ্ক লিপিত হয়। কাহার নির্দেশে ঘুচায় আলো। অন্ধকার প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে। ঘিরিয়া ধরে। অধর্মের অপরাধে দুর্যোধনের ন্যায় সকলের মদ্যেই খালি গোয়ালাকে দেখে। পানিতে দেখে, দ্রোণাচার্যকে দেখে, ভীষ্মকে দেখে, বিদূরকে দেখে। গোয়ালার প্রভাবে সে নিজেকেও ভুল দেখে। সে কী ভুলিয়া গেল নিজেকে? পানিতে মুখ দেখিতে গেলে এ তো গোয়ালা! কীসের এতো প্রতাপ তাহার, আমি মানি না। এই গোয়ালাই তো আবুল। তাহারে সরাইয়া দেছে। আর কোনো শত্রু নাই। কেউ আর পেছনের দরোজা দিয়া আসিলে ভয় নাই। আবুলরে নিয়া আছিল মহা বিপদ। সে খালি ন্যায়ের কথা কয়। ট্যাকা চেনে না— বোকার কোনেকার। এভাবে জীবন নিয়া কতো মক্কোর মানুষেরÑ এ্যাঁ। থুবড়ে পড়ে গোটা শরীর। রক্ত নাই। খালি ঠ্যাং উঁচু করা একটা কালো পাখি লম্বা সুরে ধুম ডাক পাড়ে। ডাকের ভেতরে হাহাকার। চিনচিনা ব্যথা। ঘিরে থাকে কুসন্নী ডাক। পুরানা মসজিদের ভেতর থাকি জ্বীন বহির হইয়া আসে। ইঁদুর পাশ দিয়া মুখ শুঁকে হাঁটাহাঁটি করে। জন্তুকুল নিজের মতোন ডাকে। বিরাট হয়া ওঠে লাশ। কতোক্ষণ আগেই সে বাঁচার জন্য আল্লাকে ডাকিছে। পশুপাখির কাছে মাফ চাইছে। এখন সব থেকে সে অবসিত। নিশ্চিত তার মিনতি ছিল অনেক। কতো মায়া, দয়া, আকাক্সক্ষা সব বরবাদ। কীসের জন্য এতো সুন্দর সবকিছু! যেখানে মানুষ নাই, জেবনের দাম নাই, আবুল মইরা গেলে কিচ্ছু হয় না। কারণ ছাড়াই সিংহ নিরীহ শাবকের ওপর চড়াও। রক্তশোষকের মতো ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলে। মহাসিন্ধুর ডাক সে চেনে না। সার্কিট হাউজের কোণায় তখন টেনশানে হাঁটে মাখনুন। লাভলুও থাকে। কয়, ফাঁকোত চুব কবি থাকিস। মেলেটারি আসিছে। কাকো বাঁচাবি না। বিড়াল চকচকে চোখে তাকায়। মাখনুন বাঘের বাচ্চাই মনে করে ওকে। শালা ভয়ঙ্কর।

পাঁচ.

মুকুলভাইয়ের মুখে মাখনুন দূরপাল্লা-মাঝারীপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়া গল্প শোনে, কিন্তু সে গল্পের মুকুলভাই কবেই মইরা গেছেন, ক্যামনে মরেন কান্দোন আসে বৃষ্টিতে ভাইস্যা কান্দন চিকচিক করে, পাতা চুইয়া বৃষ্টি নামে, আমড়া গাছ চুইয়া ঝরা পানি পড়ে, চোখ ডলে বৃষ্টি নামে হঠাৎ মরেন একসময় স্মৃতিভরা শেখসাহেব— ‘ত্বরা কারা, ক্যান আইচস’ তহনও টিকটিকি লাফায় ফুচকি মারে, এক ইশারায় রাইফেলের নটে চাপ দিয়া লুটাইয়া দেন তারে সিঁড়িঘরের রানায়। বাইরে তখন কালো কুচকুচা আন্ধার, গুড়–ম বিজলীরেখায় ক্লান্ত গোমরা আকাশ, কুত্তছানা এনিতেই বেশি চিক্কুর দিতে থাকে। সোনার দ্যাশ শ্যাষ হইয়া গেছে তার নির্মম বয়ান পাড়ে ওই কালোকিষ্টি নধরকান্তি সেক্সী কুত্তার থুলথুলা শরীর। দ্যাশটারও দশা এই কুত্তাডার ভীরু চিক্কুরের লাকান। মাখনুনের এসব মনে নাই। মাঝে মাঝে ঝড়পোড়া বাউরা আসি ঠেসি ধরে তাকে। তার ভেতর আউলা-বাউলা এসব কানোত পড়ে, কখনো শির শির করি ঠ্যাং কাঁপে। মুকুল ভাইয়ের সাথে আবার শেখসাহেব ক্যা। তাই তো সগ্গোল সময় শেখসায়েবের গুষ্টি উদ্ধার করিছে। ঢাকাত থাকি বাড়িত আসলে খালি উল্টা-পাল্টা কথা কয় শেখসায়েবোক নিয়া। ভার্সিটির শহীদুল্ল্যা হলোত এখন খালি বড় বড় নেতা আর রেবলবারের গপ্পো— মুকুল ভাই নিজেই নাকি সেগলা হাতে নিয়া চলেন। সবাই তাক ডাকে আর সন্মান করে। পুকুর পাড়োত বসি খালি মন্ত্রী আর হলের নেতাদের সম্পর্ক নিয়া কীসব কথাবার্তা কন। তখন ভার্সিটি ভ্যাকান্ট হলে প্রকাশ খলিপ্যার দোকানোত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সে সব শৌর্য-বীর্যের কাহিনি বলিয়া চলেন। মাখনুন এক কানে তা শোনে। খালি শোরগোল। ঘুমালেই এসব শোরগোল তাকে ঘিরিয়া ধরে। জিয়ার মৃত্যুর দিন থাকি কেমন একটা শোরগোল তখন চারিদিকে। কান্না আসচিলো সেইদিন। শহরের সব দালানকোঠা, গাড়ি-বাড়ি, রেলওয়ে-স্টীমার মরহুম জিয়াকে আলোচ্য কইরে তোলে। পরে এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ওই পদে বসিলে তার জন্য গণভোট হয়। থমথম হওয়া পরিবেশ অনেককাল টাইনে চলে। মাখনুন সে ভোটের পোস্টার নিয়া সাইকেলের পেছনে অনেকদূর হাঁটি আসার পর বিরাট সামিয়ানার পাশে প্রাইমারী স্কুলের বারান্দার সিঁড়িত বসে খোর্মা আর একপিচ গুড়ের জিলিপি খাইচিলো। পরে ময়লা হাত চেটে গুড়ের স্বাদ নিলে আরেকটা জিলিপির জন্য খুব লোভ হয়। এ বয়সী কয়েকটা ছেলেকে পাশ কাটিয়া ভীড় ঠেইলে অনেক বড় জিলিপির বস্তার দিকে তাকায়া থাকে। হঠাৎ লম্বা স্যুট পরা মখলেছ মামা স্টেজের পাশে দাঁড়াইলে সাদা দাঁত বার কইরা কয় : ‘ক্যারে আরও জিলিপি নিবু? চিক্কুর দিয়া ৫খ্যান জিলিপি ধরি দিয়া কয় যা, বাড়িত যা। ফকিরের ডৌল আর ঘুরিস না।’ মখলেছ মামা প্যাটোয়ার বান্দা ঢোলা প্যান্ট আর সাদা শার্ট পরে বেশ ঝাঁকি দিয়ে উঁচা মঞ্চের ওপর ওঠেন। কান্নাবিজড়িত আবেগে বলেন : এইবার ভোটে সাবেক বিচারপতিকে ভোট দিয়া মানুষ জেনারেল জিয়াহত্যার প্রতিশোধ নিবি। ভাইসব চট্টগ্রামের লৌহমানব সাবেক মন্ত্রী এখন আপনাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য নিয়া আসবেন। এসব কথায় মখলেছ মামার খুব নাম হয়, মাখনুন জিলিপি হাতে নিয়া বাইরে আসে। একা একা নিরানন্দ মনে হয়। পাশের শিরিসের তলে বসে সে সবকটা জিলিপি খাইতে পারে নাই, তখন দুমদুম আওয়াজ তোলা ধানভানা মেশিনের পাশ দিয়া একটা ক্ষীণ শোঁসানো শব্দ তার কানে আসে। দুটা হেরিংবোন রাস্তার স্পর্শবিন্দুর পাশে প্রাইমারী স্কুল মাঠ। সেখানে নিজ নিজ কাজে যখন ব্যস্ত সবাই, তখন এক খারাপ জিনিস তার চোখে পড়েছিল। সেটি খারাপই তো, চালমেশিনের পাশে ছোট্ট ফাঁকা দিনের অন্ধকারে কীসব খারাপ কাজ সেখানে চলছিল। সে মানুষটার নাম মাখনুনের মনে নাই। কিন্তু সে চেনে তাকে। এরকম আরও কয়েকটা লোক একসঙ্গে হয়ে মাঝে মাঝে এখানে বসে বিড়ি ফুঁকায় আর কী কী সব বলে। মাখনুন, বিশু, হাবলু এসব অনেক কাজের সাক্ষী। কিন্তু হাবিলদারের বেটা এসব বললে বিশ্বাস করে না বা চেপে যায়। কারণ কী! কারণ এর মধ্যে সেও আছে। কেন একদিন তো সে স্বীকারই করেছিল, গর্ব করে বিবরণও দিয়েছিল সে খারাপ কর্ম্মের। কিন্তু সাক্ষাৎ এ ঘটনাটি বেশ কিছুদিন তাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। একি জীবনেরই কোনো স্বরূপ! বা পুরুষ পোকা স্ত্রী পোকা, পুং মৌমাছি স্ত্রী মৌমাছি মাটি ও জলে সাপের প্যাঁচানো শরীর আলিঙ্গনের কাম্য রূপটি কীভাবে তাহা এ নিষেধের তটে খারাপ বলিয়া প্রতিভাত হইলো!

একটা বড় মুড়ির টিনের মতো গাড়ি আসিয়া থামিল। এ গাড়িটা বেশ বুড়া। সময়টাও বুড়া। কারণ মানুষগুলা চলতে ফিরতে সময় লাগে অনেক। এর প্যাটে অনেক মানুষ ধরে। সময় নিয়া থামি থামি সে জিলা শহরের দিকে চলে। সেমেন্টে বাঁধা চিকন রাস্তা, রাস্তায় কেউ থাকলেই তাকে তুলে নেয়। মাখনুনের পুরানা মাটির একটিয়ে বাড়ির সামনের রাস্তায় এ গাড়ির নিত্যদিনের যাতায়াত। সে রোদে বসিয়া ‘মহৎ প্রাণ’ গল্প পড়ছিল। এক সৎ মানষের কাহিনি। কিন্তু এ গাড়ি আসলে উঠতে চায়। দূরেদেশে যাইবে সে। যেভাবে মওদুদ বিএসসির ছেলে চলিয়া গিয়াছে। সে তো বিদেশ কিন্তু মন আড়ষ্ট হইয়া, ভয়ে কুঁকড়ে যায়। বিরান পাথার অবমুক্ত হয়। কেউ নাই সেখানে। অনেককালের মাটি হাতে ছানিয়া বিএসসি কয় মাখনুন এই দ্যাশে আর থাকোন যাইবো না। ত্বর বাইজানের নাহান চইলা যাইবো। আবার বুঝি যুদ্ধ লাগবে। কেমন একটা গরম গরম ভাব। খালি চোরাগুপ্তা খুন আর ফাঁসানো মৃত্যুর দড়ি ভালো ভালো মুক্তিযোদ্ধা মেলেটারির গলায় পড়ছে। খালেদ, হায়দার, তাহের সবাই বিচারের নামে, ক্ষমতার নামে, গদি দখলের নামে খুন হচ্ছে। যারা খুন করছে তারাও একসময় হয়তো খুন হবে। এই দ্যাশ কী খুনীদের হাতে চলে গেল! মাখনুন এতোক্ষণ মুখোমুখি থাকলেও এসব জ্ঞান কুলিয়ে উঠতে পারে না– সইরে আসি কয়, হামার কী হইবে! মুকুল ভাইয়ের নাহান আবোল তাবোল বকলেও কাম আছিল। বড়ো গাড়ির সামনে আসলে এসব নানা চিন্তা মাথায় আসে। বিএসসি এখন বাড়ির বাইরে যান না। খাঙ্গা ঘরেই তার সময় কাটে। আর এসব আশঙ্কা নিয়া বলিরেখার বলয়ে বসবাস করেন। সেদিন কী কারণে বিড়বিড় করে আরও কী কী সব বললেন। মাখনুন বোঝে না, হাতড়ায়, সে স্বাধীন নবাব সিরাজদৌলার পাগড়িতে আর শায়েস্তাখানের আটমন চালের গন্ধ নিয়া ওখানে দাঁড়াইয়া থাকে। (চলবে)


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা