ঢাকাচন্দ্রিকা ॥ ঢাকার কাগজ ॥ ৩য় খণ্ড [বিশেষ ক্রোড়পত্র]

ঢাকাচন্দ্রিকা
ঢাকার কাগজ ॥ ৩য় খণ্ড
……………………………………………………………………………..

॥ বাংলা দেশ, পূর্ব-বাংলা ও স্বাধীন বাংলাদেশ ভূখণ্ডটির পরিক্রমণ ॥
সত্তর-আশি-নব্বুই দশকে রাজধানী ঢাকার অপ্রাতিষ্ঠানিক কাগজের কর্মশীলন ও চর্চার গলিঘুঁপচি (ইঁদুর আর বিড়ালের ভয়কাতর অস্তিত্ব)

যুদ্ধের বছর—তখন রাস্তাঘাট নাই। পুলসাঁকো ভাঙা। উত্তরের জনপদ পঞ্চগড় মহকুমায় লোকবসতি কম। পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা কোনো লোকবসতি চোখে পড়ে না। খুব ঠাণ্ডা-ফর্সা শীতলপ্রবণ আবহাওয়া। কূলুকূলু বয়ে যায় শান্ত মহানন্দা। অনেকদূর থেকে কৃষাণের পদশব্দ কখনো কানে আসে। কখনোও নিথর নিস্তব্ধতা মাড়িয়ে কেউ হঠাৎ কেউ পঞ্চগড়ের বাংলোয় আসেন, কেউবা তেঁতুলিয়া রেস্ট হাউজে যান— হাই অফিসিয়াল হিসেবে, বেড়াতে, আনন্দ করতে— প্রকৃতি দেখতে। সে যাওয়াও খুব কষ্টের বিবরণীতে ঠাসা। সেখানে রাতবসতি ভয় আর আতঙ্ক দিয়ে আটকানো। তখন— ওখান থেকে ঢাকায় আসতে চার/পাঁচদিন লাগে। থেমে থেমে, রেস্ট নিয়ে, চিকন রাস্তায় ক্রমশ এগিয়ে, ধুলো মাড়িয়ে আর শারীরিক হেনস্থা-ধকল অস্বীকার করে। আর ওইকালে কেনইবা মানুষ ঢাকায় আসবে! ঢাকার প্রতি আগ্রহ থাকার কারণ তেমন ছিল না। হ্যাঁ, নগরবসতি যে লোভের, সেখানে গড়গড়াইয়া গাড়ি চলে, লাল-নীল বাত্তি জ্বলে— এসব খবর ছিল। গাঁ-গ্রামের মানুষজন জানতো— ওসব তাদের নয়, বড় বড় বণিক ব্যবসায়ী আর উচ্চপদস্থদের। তবে তারা বেতার শোনেন। নানা সময়ে খবর নেন। আকাশবাংলা-বিবিসির সূচনাসঙ্গীত, নির্দিষ্ট সময়ে কানে আসে; এইটুকুই আগ্রহ। এর বাইরে খাওয়াপরা বা বৈঠকি আড্ডা ছাড়া আর কী! কেবল তখন দ্যাশ স্বাধীন হলো, মানুষ বলে— ‘স্বাধীনের বছর’। যোগাযোগহীনতার ভেতরে ঢাকায় কারা লেখালেখি করছে, কী তাদের অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড, কীভাবে ষাটের স্রোতধারা বহাল আছে— সে সবের খবর কে রাখে? তবে কেউ কেউ যে করছেন সেটি অমান্য করা যায় না। আরও বলা চলে, অপ্রাতিষ্ঠানিকতার চর্চায় আমাদের মন ও মানস তৈরির প্রসঙ্গটি কিংবা কর্মসূত্রে ঢাকায় আসা জন¯্রােতের পালে তখনও যে হাওয়া না লাগার ফলে কাজ হচ্ছে, যোগাযোগ হচ্ছে, বসছে মুদ্রণযন্ত্র, লেটারপ্রিন্ট চলছে, নিউজপ্রিন্টে কাগজ বেরুচ্ছে। কণ্ঠস্বর থামেনি, সমকালও না। ষাটের ওঁরা সজাগ ও সম্বিৎ— এই ঢাকাকেই। ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে’র কালে চলছে ধুন্ধুমার সিনেমা, চিত্রালী, দেশ, বেগম, উত্তরাধিকার; প্রবল স্বপ্ন নিয়ে চলা, বিশাল জীবনের ভার কাঁধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কার্জন হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, বুয়েট, মেডিক্যাল কলেজ ঘিরে পুরান ঢাকার পুরনো প্রেস বা নতুন প্রেস বসানোর ভাবনাচিন্তায় চিকন রাস্তায়, চিকন মগজের কারো যাতায়াত ও যোগাযোগ। চলার যান অল্প, পায়ে হেঁটে বা টমটম কিংবা কিছু বেসামাল ভারসাম্যহীন রিক্সায়। এই পরিবেশে ষাটের ধারাবাহিকতায় যুদ্ধে ফেরা সন্তানরা সত্তুরে কিছু কাজ ঘটাতে শুরু করে। কী পাবে সামনে?
সত্তরের দশক যুদ্ধপ্রজন্মের কাল। যুদ্ধফেরত সন্তানরা যে ভূখণ্ডের ভেতরে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো, তখন গোটা বিশ্ব স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপে আক্রান্ত, ক্রুশ্চেভ কাল শেষ হয়ে ব্রেজনেভের কাল শুরু হয়েছে, সমাজতন্ত্রের দর্শন খোদ রাশিয়ায় প্রহেলিকাময় হলেও এর উত্তাপ ভারতে, বাংলাদেশে প্রবলভাবে আক্রান্ত। কিশোর বালকদের হাতে মার্কসবাদের অআকখ কিংবা অস্ত্রোভস্কির ইস্পাতময় বিপ্লবী জীবন বিচিত্ররূপে ছেয়ে যাচ্ছে বিস্তর ভূপ্রান্তরে। এর মধ্যেই দেশ স্বাধীন হয়ে আরও নতুন আলো এসে পড়েছে তারুণ্যের ভেতরে, কীভাবে এই দেশের রক্তলাল ছাওয়া ছাঁদকে এগিয়ে নেওয়া যাবে! ষাটের কণ্ঠস্বর বা সমকাল আবার বের হলো এসবের ভেতর হওয়া পেটাচ্ছে অমল ধবল দিন। সামরিক শাসনের গেঁড়াকলে, দুর্নীতির চাপে আর বেশুমার উচ্ছিষ্টভোগীদের দাপটে ঘরের মধ্যে ইঁদুর আর বিড়ালের ইলিশ আর দুধবাটি দখল হয়ে যায়। প্লেবয় মার্কা রাজনীতি চালু হয়, ‘কমপ্লিট’ প্রশাসক জমিয়ে তোলেন আসর, কারা যেন হৈহৈ রবে ছুটে আসে, পাল্লা দিয়ে বঙ্গভবনের ভেতরে উঁকি মারে। হুহু করে অবক্ষয় আর অপদস্ত জীবনের স্বর চারদিক জমিয়ে তোলে। কবিরা ভাষ্য হারায়। উপন্যাসে মেলেটারি পোশাকের চরিত্ররা ছড়ি ঘোরায়। দম্ভ আর চালাকিমারা ফেউ কেউ ফুচকি মারে; দরোজায়, প্রাসাদে লোবানের টকগন্ধ চতুর্দিকে ছড়ায়। তখন কাগজ করা বা কাগজের স্বভাব ধরা মুশকিল হয়ে যায়। কী যেন বাইরের বা ভেতরের— তবে তার মধ্যেই বিপ্লবী হওয়া, ড্যাম ভাবা, নারীদের এলোমেলো বসনে হুজুগ তোলা, বোম্বে নায়িকাদের স্তন আর পাছা দেখে হস্তমৈথুন করা— তারপর কী যে চরমসুখে বৃথা ঘুমাবার চেষ্টা করা। কিছুক্ষণ পর আবার কানের উপরে টাক-টাক আওয়াজ আর মাথা ধরে যাওয়ার ভারী শব্দ, তখন মনে হয় আবারও একই কাজে নিয়োজিত হই। এইসব খরা ক্রান্তিকাল ঘনিয়ে এলে, আশিতে ‘গাণ্ডীব’, ‘একবিংশ’ বের হয়— তুমুল উন্মাদনা নিয়ে। ওঁর কথা বলছি, এই কারণে ওটা ঝড়ো হাওয়াই বইয়ে দেয়, তুমুল ও প্রশান্ত বেগে, বইয়ে আনে অনেক কাজের উদ্যাপন। আজও এ উদ্যাপন উপভোগ করা যায়, বহরে চিকন কিন্তু মেজাজেও বড্ড চিকন, মেধাতেও আরও খুব চিক্কন কারবারি। সবটুকু এক তারে বাধা। কবিতার কাগজ বা অন্য রকমফেরের সব কাগজের নাম ধরে নাইবা বলি। কাজটি হয় নানা প্রকারেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুব আওয়াজ ওঠে। বারুদে আর গ্যাসে ঠাসা, কখনও জীবনের জন্য হুল্লোড়, কেউবা ট্রাকের নীচে কেউবা গুলির মুখে একএকটি ভোর আসে জয়নাল দীপালী সাহা আর বসুনিয়ারা স্তম্ভে আটকে যায়। ঘরে ঘরে সেসব সংবাদে ভয় আর আতঙ্ক থোকা থোকা হয়ে ওঠে। সে সব থোকার ভেতরে মনে পড়ে যায় পঁচিশে মার্চের জগন্নাথ হল আর মধুর ক্যান্টিনের দমকা প্রলোভিত হাওয়ার কথা। কিন্তু এই মরণজয়ী সময়ের ভেতরেই কাগজ আর কালির বাঁশরি জেগে থাকে। কেউবা অধ্যাপক হয়ে, কেউবা ছাত্র হয়ে, কেউবা কবি হয়ে করেন সুন্দরম্, নদী, ঊষালোকে, প্রান্ত, প্রসূন প্রভৃতি কাগজ। কিছুই এনভার্টেড দিয়ে মোড়ানো নয়, কাজে খুব চৌকস, প্রাণে রুশ তারুণ্য, সবকিছু ভেঙে সম্মুখের দিকে তরী বাওয়া, পথটুকু আবিষ্কার করা, উজ্জ্বলতর উদ্ধারে অনিমেষ বাতায়ন রচনা করা। এর মাঝেই নূর হোসেনরা এক সূর্যে বিদায় নিয়ে চলে যান, নতুন জীবন নিয়ে শুরু হয় এই ঢাকার আরেকটি অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী সৃষ্টির কাজ। গণতন্ত্র বলে কিছু রয় না কিন্তু গণতন্ত্র কাঠামোতে, শোরুমে ঝোলে আর নাচুনি নাচে। পরিবর্তনের প্রশাখাসমূহ দুলে ওঠে। যোগাযোগ বাড়ে। স্বপ্নের সোভিয়েত থাকে না। ফরহাদরা তার আগেই সিগ্রেটের আগুনে পুড়ে মৃত্যুমুখে বিনাশ। সবটুকু মুখ থুবড়ে পড়ে। কিন্তু ফিনিক্স পাখি উড়ে আসে। তড়তড়িয়ে ওঠে। এভাবে একদল গড়ে ওঠে আগুন হাতে। সবটাই পত্রিকার জন্য, প্রচুর অনুবাদে, নতুন ভাষায় রঙে আর রূপে। কী যেন এক নতুন বান নেমে এসেছে, হুহু করে পানি ঢোকার মতো লিটলম্যাগও আসে অনেক, এদের হাতে নানারকম শরম আর বেশরমের কর্মকাণ্ড। এই সূত্রটি ঢাকার, ঢাকার কাজের প্রস্তাবনা। তাকে ঘিরেই নি¤েœর লেখাটুকু পুনর্মুদ্রণে আদিষ্ট হয়ে উঠি। সেখানে সবটুকুর তথ্য-উপাত্ত মিলবে না কিন্তু গড়ে উঠতে পারে এই ভূমিকার কারণের পরিপ্রেক্ষিতটুকু :
১৯৬৭ হতে ২০০৭ অবধি এই চার দশক ধরে এদেশের সাহিত্য অঙ্গনে লিটল ম্যাগাজিনের প্রায় সার্বিক ধর্ম বহন করে এমন নিঃশব্দে, প্রায় অপ্রচারিত, প্রকাশকুন্ঠ ও মৌন থেকে বিপ্রতীক তার প্রকাশনা যেভাবে অক্ষুণœ রেখেছে- এর নজির বোধ করি আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে আর নেই। ষাটের দশকের শেষের দিকে আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আবদুস সেলিম সম্পাদিত শিল্পকলা প্রবন্ধ পত্রিকারূপে প্রকাশিত হয়। সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, চলচ্চিত্রসহ শিল্পের বিভিন্ন ধারার স্বতন্ত্র দ্বারা শিল্পকলা নবীনদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়।
সত্তরের দশকে প্রকাশিত যে ছোট পত্রিকাগুলো নতুন সাহিত্যরীতির ঐতিহ্যগত ব্যবধান ধরে রাখার ক্ষেত্রে তৎপর ছিল, সেসবের মধ্যে পূর্বপত্র, কালপুরুষ, সময়, থিয়েটার, গণসাহিত্য, সংস্কৃতি, কাল¯্রােত, জনান্তিক, কিংশুক, শতবর্ষী, এলবাম, আড্ডা, অনুবাদ, অনড়, সূচিপত্র, কবিতা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
লিটল ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রে কালান্তরে এসে যুক্ত হয় বহুস্বর প্রতিযোগী। কিছুটা স্বেচ্ছাচারিতার ভেতর, কিছুটা সৃজনশীলতার শব্দব্যূহের ভেতর কার্যকর থাকে নতুন সাহিত্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে আত্মনির্বাচনের আদর্শ ও তাগিদ। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, পারস্পারিক যোগসূত্রহীনতার কারণে, যৌথ উদ্যোগের তেমন কোনো তাৎপর্য গড়ে উঠতে পারে না।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে এসে আগের খুদে পাতার পাঠ্যকে পিছনে ফেলে এসে উপস্থিত হয় নতুন কালের ভাবী কর্মীদল। লিখন ও পঠনের প্রচলিত গণ্ডি পেরুনোর চুম্বকক্ষেত্রের আকর্ষণে প্রকাশিত হতে শুরু করে নতুন নতুন ছোট পত্রিকা। সবার মধ্যেই প্রেরণা, পৌঁছুতে হবে নিজেদের সমকালে। সাম্প্রতিক কালের এ সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির নাম করা যেতে পারে। প্রকাশনার সন তারিখ অনুযায়ী ধারাবাহিকতার চেক লিস্ট সঠিক নাও হতে পারে। বস্তুতঃ এ সমস্ত পত্রিকার গোষ্ঠীগত সৃষ্টিশীল তাৎপর্য যেন অলক্ষে থেকে না যায়, সেজন্যেই নাতিদীর্ঘ এই তালিকাটি দিতে চাই। আাশি ও নব্বইয়ের দশকে যেকটি পত্রিকা নতুন রুচি ও অর্ন্তদৃষ্টি মেলে ধরার ক্ষেত্রে উদ্যোগী হয়, তাদের মধ্যে অধুনা, একবিংশ, নিরন্তর, গাণ্ডীব, সংবর্ত, সংবেদ, নিসর্গ, প্রতিশিল্প, লিরিক, দ্রষ্টব্য, রোদ্দুর, নদী, রিভাইব, অনিন্দ্য, দ্বিতীয় চিন্তা, চালচিত্র, মৃৎ, প্রান্ত, উত্তরসূরী, প্রাকৃত, গ্রন্থী, বিকাশ, দ্রোণাচার্য, ঘণ্টা, শব্দপাঠ, জেব্রাক্রসিং, ভিন্নপত্র, প্রসূন, হৃদি, ঘাস, চোখ, দ, প্যারাডাইম, নির্বেদ, শুদ্ধস্বর, ছাপাখানা, নোয়াজার্ক, ধাবমান, সুদর্শনচক্র, নার্সিসাস, সে, একা, আনন্দপত্র, ফ্রী স্ট্রীট স্কুল, ১৪০০, মঙ্গলসন্ধ্যা, স্বাতন্ত্র্য, জীবনানন্দ, প্রাতিস্বিক, উটপাখি প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। এসব পত্রিকার কোনটি আগেই অধুনালুপ্ত, কোনটি অনিয়মিত প্রকাশনার মাঝে যান্ত্রিক ও ক্লিশে, কোনটি বিপুল কলেবরে বিচিত্র ও আকর্ষণীয় হয়ে নিজের নিয়মে প্রকাশনাকে অব্যাহত রেখেছে। হালফিলের এ সব পত্রিকার কোনটির জন্মলগ্নে আমরা কবিতাকেন্দ্রিক সমগ্রবাদী ‘ইশতেহার’ প্রচারিত হতে দেখি। কোনটাতে দেখি ‘কাব্যপ্রেমী’ বহুধ্বনিময় স্বীকারোক্তি, কোনটিতে উত্তরাধুনিক ঐতিহ্যের তত্ত্ব ও শৈলী, কোনটিতে যাদুবাস্তবতার সমকালীন প্রেক্ষাপট, কোনটিতে পোস্টমডার্ন অবিনির্মাণের সারাৎসার, কোনটিতে কল্পবিজ্ঞান, কোনটিতে আধার ও আধেয়র বিশ্লেষণাত্মক সাহিত্যিক ডিসকোর্স।
উত্তরকালে ৮০ থেকে ৯০-এর দশকে কিছু কিছু ‘লিটল ম্যাগাজিন’ প্রকাশনার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র অবস্থান ও অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করেছে। আগের যুগ থেকে তাদের মুখটি ঘোরানো ছিল ভবিষ্যতের প্রায়ান্ধকার অনুসন্ধানের দিকে। বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে মনে হবে হয়তো এসব অনচ্ছ ও স্ফীত অহং। কিন্তু সমকালীন নবজাতক উত্তরপাঠ্যকে সৃষ্টিশীল রাখতে হলে যে দুর্বিনীত, ব্যাপৃত ও তন্বিষ্ঠ প্রয়োজন, বিচ্ছিন্ন ও অগভীর হলেও সেই সচেতন বিরুদ্ধতা যে দৃশ্যত অর্ন্তহিত হয় নি, এসব ‘লিটল ম্যাগাজিন’ সেই স্বরূপটিকে প্রকাশ করে।
উত্তরকালের একটি লিটল ম্যাগাজিন ‘গাণ্ডীব’। তপন বড়–য়া সম্পাদিত এ পাত্রকাটিতে নতুন কবিতা আন্দোলনের ‘সমগ্রবাদী ইশতেহার’ ঘোষিত হয়েছে:
১. প্রচলিত পল্ক¯্রােত থেকে মুক্তি দিতে হবে কবিতাকে।
২. কবিতার শব্দ হবে এমন, যা পাঠকের চেতনায় আছড়ে পড়বে হাতুড়ির মতো; গুড়ো গুড়ো করে দেবে চৈতন্যের ইট।
৩. আমরা এবং একমাত্র আমরাই নির্মাণ করবো শব্দের অতিব্যক্তিক সংযুক্ত চরিত্র।
৪. পাঠকের জন্য কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা হবে মৃত্যুযন্ত্রণার মতো। কবিতা শাণিত কৃপানের মতো ঢুকে যাবে পাঠকের মনোরাজ্যে; আর পাঠক আর্ত ঘোড়ার মতো ছুটতে ছুটতে দেশকাল পেরিয়ে পৌঁছে যাবে এক তীব্র বোধের চূর্ণিত জগতে।
৫. থুতু ছুঁড়ি তথাকথিত সুন্দর ও কুৎসিতের স্থুল কাব্যবন্দনাময়। কেবল আমাদেরই অভিজ্ঞানে রয়েছে রহস্যময় সংবেদনের আবর্ত।
৬…৮. ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাকরণ অগ্রাহ্য করে কবিতায় প্রয়োগ করতে হবে বিন্দুবাদী প্রক্রিয়া।
‘গাণ্ডীব’ কাব্যান্দোলনের জিজ্ঞাসু তাৎপর্যসমূহকে প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রধান্য দিলেও, গল্প ও প্রবন্ধও তাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘গাণ্ডীব’-এ সাহিত্যের নতুন বস্তুবিবেক ও তন্বিষ্ঠা, মতাদর্শগত স্বতন্ত্র ঝোঁক সোচ্চার ছিল। বেশ ক’টি সংখ্যা ধরে সক্রিয় থেকে ‘গাণ্ডীব’ এখন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
শোয়েব শাদাব, সাজ্জাদ শরিফ, শান্তনু চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজ, তারেক শাহরিয়ার, সেলিম মোর্শেদ, মোহাম্মদ কামাল প্রমুখ নতুন প্রজন্মেও লেখকগণ ‘গাণ্ডীব’-এর চেতনাপ্রত্যয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন।
‘একবিংশ’ কবিতাবিষয়ক পাঠক্রিয়া-সাপেক্ষ হয়ে প্রথম প্রকাশিত হয়। খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত ‘একবিংশ’ কবিতাপত্র হিসেবে এখানে প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। কখনো ‘একবিংশ’র মলাটে ‘বর্তমান সময়ের কবিতার কাগজ’ এই বাক্যটি উৎকীর্ণ হতে দেখি। ‘একবিংশে’ নতুন ও পুরাতন সকলেই সংশ্লিষ্ট থাকেন। লিটল ম্যাগাজিনের সাথে যুক্ত তরুণ কবিকুলই ‘একবিংশে’ প্রাধ্যান্য পান। কবিতা, কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ, কবিতাবিষয়ক নতুন ভাবনা, মূল্যায়ন, অনুবাদ কবিতা ‘একবিংশে’র অন্তর্গত বিষয়আশয়। ‘একবিংশে’র সম্পাদকীয়তে লিটল ম্যাগাজিনের সপক্ষে অন্তর্জ্বালার উপস্থাপন লক্ষ করি : ‘বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার আগেই বি¯্রস্ত হয়ে যাচ্ছে- এ ঘটনা দুঃখজনক, কিন্তু সত্য। গত কয়েক বৎসরে প্রচুর সম্ভাবনাময় সাহিত্যপত্র আত্মপ্রকাশ করেছে: এ সময় মনে হয়েছিল, এবার একটি রেনেসাঁ আগত প্রায়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যে সম্ভাবনা সুদূরপরাহত! মুষ্টিমেয় কাগজ নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে প্রবলভাবে লড়াই করছে…।…লিটল ম্যাগাজিনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এর পাঠককুল। পাঠকদেও প্রতি অনুরোধ। আপনারা আপনাদের এলাকার / শহরে লিটল ম্যাগাজিন পাঠচক্র গড়ে তুলুন। সেই সঙ্গে প্রকাশ করুন নিজেদের সাধ্যমতো অসংখ্য ছোটকাগজ। গড়ে উঠুক প্যারালাল সাহিত্যের দেশব্যাপী আন্দোলন।
পারভেজ হোসেন ও শহিদুল আলম-এ যৌথ সম্পাদনায় ‘সংবেদ’ অনিয়মিতভাবে প্রকাশনা শুরু করে। গদ্য ও পদ্য বিষয়ক রচনা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, ‘সংবেদ’-এ নতুন কাব্যান্দোলনের উচ্চারণ ও পরিচর্যা প্রাধান্য পায়। চার/পাঁচটি সংকলনের মধ্যে ক্রিয়াশীল থেকে ‘সংবেদ’-এর সৃজনশীল ওঙ্কার বিলুপ্তির আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
‘সংবেদ’-এ কবিতার সাম্প্রতিক ভাবনা প্রসঙ্গে সাজ্জাদ শরিফ-এর একটি পর্যালোচনা থেকে উদ্ধৃতি দিতে চাই,…প্রচলিত ব্যাখ্যাকারী কবিতার খুলিতে দণ্ড পুঁতে সম্প্রতি নতুন কবিতার নিশান ওড়ানো হয়েছে। কবিতার কথা নয়, বক্তব্য নয়- কবিতার কাছে অর্থ প্রার্থনা করা বালখিল্যতা। …বর্ণনা ব্যাখ্যা কবিতাকে নিয়ে যায় গদ্যের দিকে, রহস্যবিন্যাসের দিকে। আমরা চাই প্রতি দুই শব্দের মাধ্যখানে, প্রতি দুই পঙক্তির মধ্যখানে গুপ্তধনের গোপন দরজা স্থাপন করতে। সুতরাং ব্যাকরণকে দলিত করে বিভিন্ন শব্দ পরপর বসে যেতে পারে; বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে দুটি শব্দের মধ্যবর্তী সংযোগ সেতু; দুটি পঙক্তির মধ্যে আসতে পাওে দূরতিক্রম্য ব্যবধান; অভ্যস্ত বিশেষণ অপাংক্তেয় হয়ে যেতে পারে। বর্তমান ধাবমান সময়ে আমরা বিসংগত, উদ্ভট, আত্মঘœ ও বমিউদ্রেককারী সংবেদনার ছেঁড়া টুকরো, একত্রচাপ অনুভব করছি। ‘সংবেদ’-এর লেখচর্যার পরীক্ষা নিরীক্ষাতে যুক্ত ছিলেন সাজ্জাদ শরীফ, শান্তনু চৌধুরী, শোয়েব সাদাব, মারুফ রায়হান, সেলিম মোরশেদ, শহিদুল আলম, সৈয়দ রিয়াজুল রশীদ, মাখরাজ খান, তারেক শাহরিয়ার প্রমুখ লেখক।
কবীর হুমায়ুন সম্পাদিত ‘প্রিজম’ নতুন কাব্যান্দোলনের বলয়িত বোধ নিয়ে প্রকাশিত হয়। ২/১টি সংখ্যার মাঝে তাদের কাব্যবোধ, নির্দেশনা, ইচ্ছা ও আক্রান্ত উল্লাস বিলোড়িত হয়। ‘প্রিজম’ অধুনালুপ্ত। ‘প্রিজম’-এর কাব্যচেতনাসংক্রান্তি উচ্চারণ ছিল : ‘সময়ের প্রতিঘাত আমাকে লুব্ধ করে- সময় : লাল, কালো, পরিবেশ, গলন, বিচ্ছিন্নতা, মানুষ, আমি, প্রতিটি রহস্যময় ঘর্ষণ।
…কবিতা এই সূত্রধ্বনির ভেতর নিমজ্জিত হয়ে তার অর্থাৎ সূত্রের অন্তর্গত সূক্ষ্ম ভাঙন নিয়ে উঠে আসে- ভাঙনের বিচিত্র বিন্যাস : কবিতা। এই বিন্যাস দর্শনগ্রাহ্যতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে, দর্শনের খণ্ডিত রূপ নিয়ে… যেন বা শিল্পী নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘূর্ণমান ইলেকট্রন।’ [কবিতা : নিজস্ব রসায়ন/আহমেদ নকীব]
আহমেদ নকীব, সৈয়দ তারিক, কবীর হুমায়ুন প্রমুখ লেখক ছিলেন ‘প্রিজম’-এর কুশীলব।
এ দশকের কাব্যান্দোলনের নতুন চেতনাকে অভ্যর্থনা জানাতে লিটল ম্যাগাজিন ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য’ ৯০-এ প্রকাশিত হয়। অধুনালুপ্ত পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন শাহেদ শাফায়েত। সাজ্জাদ শরিফ, রিফাত চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজ, মাসুদ খান, আহমেদ নকীব, ব্রাত্য রাইসু, আহমেদ মুজিব, আদিত্য কবির, বদরুল হায়দার ছিলেন এ সংকলনের অন্তর্গত লেখক।
‘পূর্ণদৈর্ঘ্য’র সম্পাদকীয়তে কাব্যান্দোলনের যে মূল্যবোধ উচ্চারিত হয়েছিল, ‘এই ক‘বছরে বিশেষ চরিত্র ও লক্ষ্যনিহিত লিটল ম্যাগাজিন না বেরোলেও সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার বর্ধিত মেজাজটি ধারণ করেছে মূলত লিটল ম্যাগাজিনের কবিরাই।এদের মাঝ থেকে প্রতিশ্র“তিপ্রবণ কয়েকজনের… যা থেকে বাংলা কবিতার বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রবাহের একটি নমুনা মিলবে।’
৯০-এর সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ ও মাসুদ আলী খান-এর যৌথ সম্পাদনায় ‘প্রসূন’ সাময়িক পত্রটি প্রকাশিত হয়। ‘প্রসূন’ পরবর্তীকালে বেশকিছু সংখ্যা যাবৎ সৃষ্টিশীল নতুন লেখকদের রচনার তাৎপর্যকে পাঠকের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আন্তরিকভাবে ব্যাপৃত ছিল। ‘প্রসূন’-এ সময়ে অন্যান্য পত্রিকার মতো কাব্যানুরাগী বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। কবিতায় স্বতন্ত্র নিরীক্ষাধর্মী দুরূহ সংস্কার বিষয়ে ‘প্রসূন’-এর সম্পাদকীয়তে উল্লেখ ছিল : ‘লিটল ম্যাগাজিন একটি হয়ে উঠবার জিনিস। তাই এই ভ্রুণ-সংস্কার-মুহুর্তেই ‘প্রসূন’কে আমরা লিটল ম্যাগাজিন বলে প্রচার করবো না, তাতে ভবিষ্যতে কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হবার সম্ভাবনা! আপাতত এ ঘোষণাই নিরাপদ যে, সেই ভবিষ্যৎ লিটল ম্যাগাজিনের স্বপ্ন আমাদের বর্তমান মাঘ শর্বরীর সুবিশ্বস্ত কাঁথা। …ছোট-বড় সবার জন্যেই আমাদের দুয়ার খোলা। তবে ছোটদেরই এখানে ঢোকার একটু বিশেষ সুবিধা। কারণ আমরা ছোট, আমাদের দুয়ারও তাই। কাজেই বড়দের এখানে ঢুকতে হলে একটু নুয়ে, বেঁকেচেকে ঢুকতে হতে পারে তবে আমাদের ধারণা ‘নতুন কিছু করাই’ যদি সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা হয়, তাতে অধিকাংশ সময় সাহিত্য সৃষ্টি যেমন হয় না, তেমনি খুব নতুন কিছুও হয় না। আবার পুরোনো ঐতিহ্যকে গায়ের জোরে আগলে রাখলেও একই আমের আঁটি বছরের পর বছর চোষার মতো ব্যাপার হয়। প্রকৃতপক্ষে ধ্রুব সাহিত্য হয়তো তা-ই যা সর্বকালে নতুন এবং সর্বকালে পুরাতন।’
৯০-এর দশকের প্রাকসূচনাকালে প্রকাশিত কবিতাপত্র ‘নদী’ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অধুনালুপ্ত এ পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন তাজুল ইসলাম। ‘নদী’র গ্রন্থ প্রকাশনার ক্ষেত্রে স্বকীয়তার নান্দনিক রুচিঋদ্ধতা প্রকাশ পায়। নবীন ও প্রবীণদের সমন্বয়ে ‘নদী’র বেশ ক’টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ‘নদী’র সম্পাদকীয় নিবেদন ছিল, ‘নিকট বর্তমানে বাংলাদেশে এবং তার মূর্খ মোড়ল শহর ঢাকায় যে পদ্যচর্চা চলছে, এর শ্বাসরোধী দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ কাব্যভক্ত।… আমাদের সাম্প্রতিক অধিকাংশ অগ্রজদের মধ্যম এবং নিম্নমধ্যমমানের কাব্যচর্চার পর অধিকাংশ তরুণেরা এসে সেখানে যোগ করে অপরিশ্রম, আলস্য, অবহেলা, অসততা ও মেধাহীনতা।… এ শতকের শেষভাগে অথবা আগামী শতকের প্রারম্ভে সেই তিরিশের মতো আরেক বর্ণচ্ছটা প্রত্যক্ষ করবো।’
মিনার মনসুর সম্পাদিত ‘এপিটাফ’ ছিল কবিতা বিষয়ক গদ্য ও পদ্যের সংকলন। প্রায় এক দশক ধরে ‘এপিটাফ’ কাব্যধর্মী নতুন সৃষ্টির নানা উৎস বিন্যাস্ত রেখেছিল খুদে পত্রিকাটির পত্রপুঞ্জে। এদেশের পত্রপত্রিকার অভ্যুদয় ও বিলয়ের নানা ঘটনারাশির মধ্যে ‘এপিটাফ’ আজ আামাদের কাছে অমনি এক টোটেম হয়ে আছে।
‘এপিটাফ’-এর প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৮-এর ১৫ আগস্ট। সম্পাদকীয়তে ‘এপিটাফে’র নিবেদন ছিল, ‘এপিটাফ’ কবিতার, কেবল কবিতার মুক্তির ও শুশ্রƒষার কাজেই নিবেদিত থাকবে। এবং যারা ইতোমধ্যে সেই কাজে নিয়োজিত এবং যারা নিয়োজিত হতে বদ্ধপরিকর, তাদের সকলের জন্য ‘এপিটাফ’র বক্ষ ক্রমেই সম্প্রসারিত হবে। কবিতার প্রতি প্রেম ও সমর্পণের সকল অহংকার ও স্পার্ধার কাছে ‘এপিটাফ’ সবিনয়ে আপন মস্তক পেতে দেবে। তবে কোনো আস্ফালনকে, তা যতো বলদর্পীই হোক না কেন, পদস্পর্শ করার অনুমতি সে দেবে না।… বাংলা ভাষাভাষী সকল প্রান্তের, সকল বয়সের কবিদের জন্যে এই প্রকাশনা, তবে সকলের জন্য আবশ্যই নয়।’
সমকালীন সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পতত্ত্ব বিষয়ক এ সময়ের অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য ছোট পত্রিকা হচ্ছে মঈন চৌধুরী সম্পাদিত ‘প্রান্ত’। বিশ শতকের সাহিত্যতত্ত্ব ও দর্শন ‘প্রান্ত’র প্রিয় আলোচ্য বিষয়। আপেক্ষিক সমকালীন চেতনার বেশ ক‘টি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ‘প্রান্ত’ প্রাজ্ঞ পাঠকের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। ‘প্রান্ত’র সম্পাদকীয়তে যে আন্তরপ্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়, ‘আমাদের প্রজন্মেও কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সমালোচকেরা নিজেদের কর্মকাণ্ড, সৃষ্টি সম্পর্কে যেমন সচেতন, বিপরীতে একইভাবে অজ্ঞান। সজ্ঞান ও অজ্ঞান চেতনার দ্বৈরথে তাঁরা জড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন সুস্থ ও অসুস্থ কর্মকাণ্ডে। আমরা অসুস্থতার বিপক্ষে। আর তাই আপেক্ষিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ঝড়কে সামনে রেখে সুস্থ ও সজ্ঞান চিন্তাজাত, সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পতত্ত্ব সম্পর্কীয় কিছু লেখা পত্রস্থ করলাম…। কোনো সমুদ্রমুখী ¯্রােতই পেছনের দিকে প্রবাহিত হয় না- এ ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার অঙ্গীকার নিয়েই উপস্থিত হয়েছি আমরা, যদিও হঠাৎ জোয়ারের ক্ষণস্থায়ী প্লাবন সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ সচেতন।’
‘নৃ’ নব্বই-এর অন্যতম এক উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন। মাত্র দুটি সংখ্যার নান্দনিক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিয়ে দেয়- একালের সৃষ্টি প্রক্রিয়া, এ-কালের শিল্পকরা ভিন্নধর্মী। নতুন উপলব্ধির নিরীক্ষাপ্রক্রিয়া ‘নৃ’তে লক্ষ্যণীয়। নূরুল আলম আতিক সম্পাদিত ‘নৃ’র দ্বিতীয় সংখ্যাটি ছিল মিথ সম্পর্কিত গভীর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি ব্যতিক্রমী সংকলন। শুধুমাত্র ‘মিথ’-এর আলোচনা পর্যালোচনা নিয়ে এর আগে একক এমন কোনো সংকলন প্রকাশিত হওয়ার বোধ করি আর নজির নেই। ভারি সুন্দর শোভন ও দুর্লভ সংখ্যা ছিল এটি। ‘নৃ’র মিথবিষয়ক প্রকাশনার স্বীকারোক্তি ছিল : ‘মিথ এই শব্দ অভিধাটি আমরা হরহামেশাই ব্যবহার করে থাকি; নিতান্ত কথাচ্ছলে— আবার ঋদ্ধ কোনো শিল্পালোচনায়। মিথ কী? …মিথ শুধুই গালগল্প? মিথ কেন? আধুনিক সভ্যতার এই যন্ত্রযুগের বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের নিকট মিথের এই পৌনঃপুনিক আকর্ষণের কারণই বা কী? এইসব মৌল প্রশ্নই মিথ সংখ্যার প্রণোদনা।
… সরল আবেগের তরল প্রকাশের জোয়ার যেখানে প্রকট, বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিন সেখানে সাহিত্য শিল্পের মৌল প্রবাহটিকে ধারণ করে আছে। না, ‘নৃ’ লিটল ম্যাগাজিনের পর্যায়ে পড়ে না। তবু অসুস্থ পরিপার্শে¦ লিটল ম্যাগাজিনগুলোর দিকেই আমাদের দৃষ্টি।’ ‘নৃ’ পরবর্তী সংখ্যার বিষয় ছিল বিশ্বের অন্যতম এক প্রতিশ্রুতিশীল চলচ্চিত্রকার ‘তারাকোভস্কি’ প্রসঙ্গ নিয়ে। শুনেছিলাম ‘নৃ’র পরবর্তী কাজ চৌদ্দ আনাই সম্পাদিত হয়েছিল। কিন্তু আজো ‘নৃ’ প্রকাশনার অপেক্ষায়, ‘তারাকোভস্কি সংখ্যা’ উন্মোচনের অপেক্ষায় রহস্যময় এক মিথ হয়ে আছে।
উত্তরপ্রজন্মের উল্লেখযোগ্য দিকচিহ্ন নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘অনিন্দ্য’। প্রথম প্রকাশ ১৯৮৮। এক দশক ধরে ‘অনিন্দ্য’ তার প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছিল। হাবিব ওয়াহিদ সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে প্রকাশিত এই সাড়া জাগানো ছোটপত্রিকাটি ১৪টি সংখ্যার বিক্রিয়ার ভেতর তার অস্তিত্বের প্রজ্জ্বলন ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছিল।

[ভূমিকা লিখেছেন ও নিসর্গ লিটলম্যাগ সংখ্যা থেকে সম্পাদনা করেছেন চিহ্নসম্পাদক]
অনিরুদ্ধ কাহালি
ত্রৈমাসিক সুন্দরম্ পত্রিকার স্বভাবচিহ্ন ও জাতিসত্তা নিরূপণ

বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রৈমাসিক পত্রিকা সুন্দরম্। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। ১৩৯৩ বঙ্গাব্দে (১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে) প্রথম প্রকাশিত সংখ্যাটি ছিল শরৎ সংখ্যা। এটি প্রকাশিত হয় ভাদ্র-কার্তিক/ আগস্ট-অক্টোবর মাসে। প্রতিবৎসর প্রকাশিত চারটি সংখ্যাকে যথাক্রমে শরৎ সংখ্যা, শীত সংখ্যা, বসন্ত সংখ্যা ও গ্রীষ্ম সংখ্যা নামে চিহ্নিত করা হত। ১৩৯৩ বা ১৯৮৬ থেকে একাদিক্রমে ১৪০৮ বঙ্গাব্দ বা ২০০১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৫৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। শুধু শেষ সংখ্যাটি ছিল অনিয়মিত। দীর্ঘ এই ষোল বৎসরের যাত্রায় প্রতিটি সংখ্যারই সম্পাদক ছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। পত্রিকার প্রচ্ছদ-পরিকল্পনা করেছিলেন কালাম মাহমুদ এবং রেখাঙ্কন করেছিলেন স্বনামখ্যাত চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান। সম্পাদকের মতো প্রথম সংখ্যা থেকে শেষ সংখ্যা পর্যন্ত প্রচ্ছদও ছিল অপরিবর্তিত; শুধু রঙের পরিবর্তন করা হত। পত্রিকাটির পরিচিতি হিসেবে নামলিপির ডান পাশে একটু ওপরে উল্লিখিত হত ‘শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য বিষয়ক ত্রৈমাসিক সাময়িকী’ এবং থাকত সংখ্যা-পরিচিতি। ষোল বৎসরের এই পথ পরিক্রমায় আমাদের জাতীয় চরিত্রের অনেক বিবর্তন ঘটলেও সুন্দরম্ কখনোই তার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। লক্ষ্যে একাগ্র থেকে আমাদের জাতীয় চেতনার অনুসন্ধান, প্রকাশ ও বিস্তারে পত্রিকাটি থেকেছে অবিচল। একক প্রণোদনায় এই দীর্ঘ অভিযাত্রা সত্যি সম্পাদকের জন্য শ্লাঘার ব্যাপার। আমাদের শিল্প-সাহিত্য ও সাময়িক পত্রিকার ক্ষেত্রে এ-এক বিস্ময়কর ঘটনা। সাময়িকীটি বাংলা একাডেমী প্রেস, ঢাকা-২-এ মুদ্রিত হয়ে সম্পাদক কর্তৃক আকাশ প্রদীপ, ৫২/৩ ইন্দিরা রোড, ঢাকা-১৫ থেকে প্রকাশিত হত।
সুন্দরম্এ প্রকাশিত প্রবন্ধ
সুন্দরম্রে প্রতিটি সংখ্যায়ই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য বিষয়ক বিচিত্র প্রবন্ধ প্রকাশিত হত। এগুলোর সঙ্গে সব সংখ্যাতেই আরো চারটি নির্ধারিত প্রসঙ্গে প্রবন্ধ থাকত। সেগুলো হচ্ছে ‘আপন কথা’, ‘প্রাসঙ্গিক ভাবনা’, ‘ললিতকলা : অনুষ্ঠানমালা’ ও ‘গ্রন্থভুবন’। পত্রিকায় মূল প্রবন্ধের সংখ্যা সাধারণত ৫টি থেকে ৯টির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রবন্ধগুলো ছিল প্রধানত সাহিত্য-সম্পর্কিত। সংখ্যা বিশেষে এর তারতম্য ঘটেছে, তবে তা খুবই কম। সাহিত্যের বিচিত্র দিকের পাশাপাশি শিল্প ও শিল্পের নন্দনভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করেছিল পত্রিকাটিতে। সঙ্গীত, নাটক-থিয়েটার, সামাজিক আন্দোলন, কখনো কখনো আংশিকভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনও প্রবন্ধের বিষয়ভুক্ত হয়েছে। তবে এগুলোকে অতিক্রম করে সাময়িকীর প্রথম সংখ্যা থেকে শেষ সংখ্যা পর্যন্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান-সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধসমূহ। একটি জাতিসত্তার সংগঠন ও বিকাশ নির্ভর করে বিচিত্র ও বহুমাত্রিক বিষয়ের ওপর। জাতিসত্তা প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধগুলোও ছিল তাই বিচিত্র মত, বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা-নির্ভর ও তথ্যনিষ্ঠ। পত্রিকাটির অধিকাংশ প্রাবন্ধিক ছিলেন প্রাজ্ঞ এবং তাঁরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে ছিলেন যশস্বী, সে-সঙ্গে সত্য ও ন্যায় প্রকাশে অবিচল। ফলে জাতিসত্তা প্রসঙ্গে সুন্দরম্ সবসময়ই বাঙালির বিভ্রান্তিমুক্ত আত্মপরিচয়ের সন্ধানে থেকেছে ব্যাপৃত। বর্তমান প্রবন্ধে ‘আপন কথা’, ‘প্রাসঙ্গিক ভাবনা’, ‘ললিতকলা : অনুষ্ঠানমালা’ ও ‘গ্রন্থভুবন’কে বাদ রেখে মূলত প্রধান প্রবন্ধগুলোকেই বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এ-ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে, মূল প্রবন্ধ থেকে বাছাইকরা জাতিসত্তা সম্পর্কিত প্রবন্ধসমূহ আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সুন্দরম্ েজাতিসত্তা-নির্ণয়-প্রয়াসের কারণ
জাতিসত্তার সঙ্গে একটি জাতির হয়ে ওঠার পেছনে ক্রিয়াশীল যে-কোনো বিষয়ই সংশ্লিষ্ট। আসলে অস্তিত্ব বা অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত যা-কিছু নিত্য বিদ্যমান তাই সত্তা। যে-সব প্রপঞ্চ ব্যক্তি বা জাতি বা রাষ্ট্রের স্বাতন্ত্র্য, শ্রেষ্ঠতা বা উৎকর্ষকে ধারণ করে তার প্রকৃতি ও প্রবণতাকে চিহ্নিত করে সেগুলোই সত্তাকে গঠন করে। জাতির সমাজ-রাজনীতি, ভাষা-আচার-অনুষ্ঠান, নৃ-তাত্ত্বিক-জাতিগত পরিপ্রেক্ষিত, মানসিক-দার্শনিক জগৎ, ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয়-ঐতিহ্যিক-ঐতিহাসিক প্রভাব— ইত্যকার সব কিছু মিলিয়ে গড়ে ওঠে জাতিসত্তা। এই জাতিসত্তা গড়ে ওঠা খুব স্বল্প সময়ের ব্যাপার নয়, শত-শত বৎসরের ধারাবাহিকতায় জাতিসত্তা পূর্ণতা লাভ করে। বাঙালি সংকর জাতি, যে কারণে বহু মানুষের বহু জাতির রক্তের ও সংস্কৃতির বহু সময়ের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে তার জাতিসত্তা। ফলে বাঙালির জাতিসত্তার স্বরূপ-নির্ণয়-প্রয়াস তুলনামূলকভাবে জটিল ও গবেষণা-নির্ভর বিষয়। জাতিসত্তা সংগঠন-প্রক্রিয়া অনেকাংশেই আলো-বাতাসের মত সহজ-স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত। যদি-না রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি এর স্বাভাবিক প্রবাহের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। তবে একথা উল্লেখযোগ্য যে, মূল প্রবাহ এতই ধীর, দৃঢ় ও অন্তর্গত যে বহিরাশ্রয়ী যে-কোনো বিষয় সাময়িক তরঙ্গ সৃষ্টি করা ছাড়া তাতে কোনো অনপনেয় প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। এ শুধু সময়ের ব্যাপার, যে-কোনো মুহূর্তে সত্য তার স্বাভাবিক দৃঢ়তা নিয়ে প্রকাশ পায়ই। প্রথম সংখ্যা থেকে শেষ সংখ্যা অবধি সুন্দরম্ েপ্রকাশিত প্রবন্ধসমূহে বাঙালির জতিগত পরিচয় অনুসন্ধানের প্রয়াস সুস্পষ্ট এবং এ-কথা অনুল্লেখযোগ্য যে, এই প্রয়াস প্রধানত সম্পাদকের, দ্বিতীয়ত প্রাবন্ধিকবৃন্দের সচেতন মনোযোগের ফসল। একটি প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে, কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিষয়ের কেন সচেতন অনুসন্ধানের প্রয়োজন পরে? এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে সুন্দরম্রে জন্ম-সময়ের মধ্যে। পূর্বেই একটি কথা উল্লেখ করেছি যে, কখনো কখনো রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার আমাদের জাতিগত সামগ্রিক বিষয়াবলিকে সাময়িকভাবে দ্বিধান্বিত করে দিতে পারে। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বহু জাতি-গোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের ফলে তাদের রক্ত ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই অঞ্চলের স্থায়ী অধিবাসীদের রক্ত ও সংস্কৃতির গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাঙালি সংস্কৃতি একটি বড় ধাক্কা খায় ইংরেজ রাজত্বে, যা তীব্রতা পায় পশ্চিম পাকিস্তানী শাসনামলে। ধর্মও কখনো কখনো জাতিগত সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। ইংরেজ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার সময়ে অত্যন্ত সচেতনভাবে শাসক গোষ্ঠী ভারতীয় জনগণের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করে দিতে সক্ষম হয়। এই বিভেদের পরিণতি হচ্ছে ধর্ম-কেন্দ্রিক রাষ্ট্র-বিভাজন। সাম্প্রদায়িকতার এই বীজ বিস্তৃতি পায় পকিস্তানি শাসনের ২৩-২৪ বৎসরে। ভাষা-সংস্কৃতি-স্বাধিকারের উপর শাসক যন্ত্রের নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণেই বাঙালি জাতি তীব্রভাবে জাতিগত স্বাতন্ত্র্যের প্রসঙ্গে সোচ্চার হতে বাধ্য হয়। স্বাধিকার ও স্বাজাত্যবোধের তীব্রতারই পরিণতি ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। যুদ্ধোত্তর সময়ে সচেতন সকলের ধারণাগত বিশ্বাস ছিল আমাদের সংহতি রক্ষিত হবে জাতীয় চেতনা ও জাতীয় সত্তার অলোকে এবং সেই বিবেচনা থেকেই আমাদের সংবিধানও প্রণীত হয়। ৭২ সালের সংবিধানই ছিল জাতিসত্তার স্মারক। কিন্তু এই প্রয়াস দীর্ঘ সময় রক্ষিত হয়নি। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল মুক্তির পর একটি দেশ যখন তাঁর নিজস্ব ভূখণ্ড ও গণতন্ত্রকামী মানুষকে নিয়ে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে তার স্বাধীনতার লক্ষ্যের আলোকে নির্মিত সংবিধানকে অবলম্বন করে সুদূর-প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে গড়ে উঠছিল তখনই হত্যা করা হয় সেই জাতির জনককে। একটি জাতি কখনো কোনো তাৎক্ষণিক ব্যাপার নয়, তার অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য, ইতিহাস, বিশ্বাস ও বহু জাতির রক্তের নির্যাসে নির্মিত জাতিসত্তার সামগ্রিক প্রপঞ্চ। জাতির জনক হত্যার পর বেশ কয়েক বার পরিবর্তন করা হয় স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার মৌল প্রবণতা সম্বলিত সংবিধানকে। এক দিকে দীর্ঘ দিন উপনিবেশের দৃষ্টিতে এই জাতির সংগঠন প্রক্রিয়া অবলোকন, অন্যদিকে সংবিধান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুতির অপপ্রয়াস, ফলে নতুন করে প্রয়োজন পরে জাতিসত্তার স্বরূপ-সন্ধান করার। এমনই সময়ে ১৩৯৩ সালের ভাদ্র-কার্তিকে (আগস্ট-অক্টোবর ১৯৮৬) অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ত্রৈমাসিক সুন্দরম্। পত্রিকাটিতে প্রকাশিত প্রবন্ধের বিষয়-নির্বাচনের প্রতি লক্ষ করলেই এই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য প্রসঙ্গে যে প্রবন্ধই প্রকাশিত হোক না কেন তার অলক্ষ্যে কাজ করে হাজার বছরের বাঙালির জাতিগত বৈশিষ্ট্যের অনুসন্ধান।
সুন্দরম্ েপ্রকাশিত প্রবন্ধসমূহের শ্রেণিকরণ
সুন্দরম্ েপ্রকাশিত প্রবন্ধসমূহকে শ্রেণিকরণের আগে একটি বিবেচনা আমাদের করতে হবে তা হচ্ছে যে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য সংশ্লিষ্ট যে-কোনো আলোচনাই আসলে জাতিসত্তা-প্রসঙ্গেরই অঙ্গীভূত। কিন্তু তারপরেও সাহিত্য ও শিল্পকলার বিশ্লেষণাত্মক আলোচনাসমূহের তুলনায় আমরা বাঙালির জাতিতাত্ত্বিক বা ভাষাতাত্ত্বিক অথবা নৃবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কিংবা বাঙালির চেতনা বিকাশে কার্যকরি রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনাবলিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ দ্বিতীয় ধারার প্রবন্ধসমূহ একটি জাতির স্বরূপ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। সামগ্রিক বিবেচনা থেকে সুন্দরম্ েপ্রকাশিত প্রবন্ধসমূহকে মোটা দাগে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে :
ক. জাতীয় সত্তা চিহ্নিত করণে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ
খ. বাঙালি চেতনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব-সঞ্চারী জাতীয় ঘটনা-নির্ভর প্রবন্ধ
গ. বাঙালির ধর্ম-দর্শন, ইতিহাস ও অর্থনীতি সম্পর্কিত প্রবন্ধ
ঘ. সাহিত্য-শিল্প-সঙ্গীত-বিষয়ক প্রবন্ধ
ঙ. বিজ্ঞান ও বহির্বিশ্ব প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ
চ. সমসাময়িক কিংবা অব্যবহিতপূর্ব বিষয়-আশ্রয়ী প্রবন্ধ
ছ. অন্যান্য প্রবন্ধ।
আমাদের আলোচনা প্রধানত প্রথম দুই ধারা নির্ভর হলেও গবেষণার প্রয়োজনে কখনো কখনো অন্যান্য ধারার বিশেষ করে তৃতীয় ধারার কিছু প্রবন্ধেরও সাহায্য নিতে হয়েছে। ‘আপন কথা’, ‘প্রাসঙ্গিক ভাবনা’, ‘ললিতকলা : অনুষ্ঠানমালা’, ‘গ্রন্থভুবন’ ব্যতীত ৫৮ সংখ্যায় মোট প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল ৩৮৯টি এবং তার মধ্যে জাতিসত্তা সম্পর্কিত প্রবন্ধ ছিল ৮৫টি।
সুন্দরম্ েপ্রকাশিত জাতিসত্তা সম্পর্কিত প্রবন্ধসমূহের পর্যালোচনা
শরৎ সংখ্যা ১৩৯৩
ক. বাঙালি জাতির নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষিত হয়েছে প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যাতেই অজয় রায় লিখিত গবেষণামূলক প্রবন্ধ ‘বাঙালীর জন্ম : একটি নৃবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে’। বাংলাদেশে বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যাঁরা নিজেদের দীর্ঘ সময় গবেষণায় নিয়োজিত রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে অজয় রায় অন্যতম। তাঁর এই আলোচনা বিস্তার লাভ করেছে প্রধানত ভারত উপমহাদেশের জনগণের উপর বিভিন্ন মূল নৃগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র জাতি বা গোষ্ঠীর প্রভাব বা উপাদান চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে প্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নৃপরিমাপবিদ্যা প্রয়োগকারী স্যার হার্বাট রিজলির সিদ্ধান্তকে নির্ভর করে। রিজলির সিদ্ধান্তের সঙ্গে জে. এইচ. হাটন, বিরজাশঙ্কর গুহ, এ. এন. চ্যাটার্জী, রমাপ্রসাদ চন্দ, টি. সি. রায়চৌধুরী, নীহাররঞ্জন রায় প্রদত্ত বিভিন্ন মতবাদ সমন্বয় করে অজয় রায় বাঙালিজনের মধ্যে নৃগোষ্ঠিক জাতিরূপের তিনটি মৌল উপাদানকে শনাক্ত করেছেন : ক. আদি-অস্ট্রেলয়েড্ বা ‘ভেড্ডিড’ বা ‘নব্যনিষাদ’ খ. দ্রাবিড় বা মেলানাইড গ. ইউরেশিয়; এর মধ্যে ১. ‘মধ্যম-বিস্তৃত শিরস্ক ইন্দো-ভূমধ্য নৃজাতিরূপ’ বা ‘হোমো-আলপিনাস’ বা ‘প্রতীচ্য বিস্তৃত শিরস্ক’ বা ‘ব্রাকিড্’ ২. ‘দীর্ঘ-শিরস্ক ইন্দো-ভূমধ্য’ বা ‘যথার্থ ও উত্তর ইন্ডিড্’ বা ‘ইন্দো-আর্য’। এদের সঙ্গে রক্ত, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাদৃশ্য ও স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে গবেষণার নিয়ম-নীতি মেনে দেশি-বিদেশি গবেষকদের গবেষণা-লব্ধ সিদ্ধান্তসমূহ পর্যালোচনা করে প্রাপ্ত নতুন তথ্য ও বিভিন্ন রসদের বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে অজয় রায় সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন যে, “আধুনিক বাঙালী জাতি একটি সমরূপী সমসত্ত্ব জন হিসেবে গড়ে উঠেছে ইতিহাস ও সময়ের পথ ধরে। এই অভিযাত্রা হয়তো শুরু হয়েছিল পুরা-প্রস্তর যুগে; হয়তো জন গঠন প্রক্রিয়া আজও চলছে অব্যাহত, ধীর গতি হলেও। এই জন গঠনে মূল উপাদান এসেছে—দীর্ঘ থেকে বিস্তৃত শিরাকারের সুন্দর দীর্ঘ নাসিকার অধিকারী দক্ষিণ ইউরোপীয় বা ইন্দো-ভূমধ্য নৃগোষ্ঠীর অসংখ্য নৃজাতিরূপের কোম ও জনগোষ্ঠী থেকে, অবদান এসেছে ভূমধ্য বা মেলানাইড অর্থাৎ দ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠী থেকে, আরও অবদান রেখেছে প্রোটো-অস্ট্রেলয়েড্ জনগোষ্ঠী ও নানা কোম, আর ঐতিহাসিককালে অবদান রেখেছে মুসলিম শাসনের সাথে আসা নব্য ইসলাম ধর্মাবলম্বী মধ্য এশিয়ার নানা দুর্ধর্ষ জনগোষ্ঠী। সুদীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ও বিচিত্র জনস্রোত এসে মিশেছে বঙ্গজনসমুদ্রে। আত্মীকৃত হয়েছে বাংলার শ্যামল মাটিতে। আর বাংলার স্বকীয় প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মেজাজের সাথে সঙ্গতি রেখে এই সব জনগোষ্ঠী আমাদের জাতিত্বে, সংস্কৃতিতে, শিল্পে, ধ্যান-ধারণায়, চেতনা-চিন্তনে, ভাষায়, আমাদের ধর্মবোধ ও বিশ্বাসে দ্যুতিময় বর্ণাঢ্য অবদান রেখেছে, গড়ে তুলেছে ‘বাঙালী জন’—একটি নতুন জাতিসত্তা।”১
খ. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদের ‘উনিশ শতকের বাংলাদেশ : মুসলিম মানসে রেনেসাঁ-ভাবনা’ প্রবন্ধে লেখক উনিশ শতকে পাশ্চাত্য রেনেসাঁর মত সংকীর্ণ অর্থে ভারতবর্ষে বিশেষ করে কলকাতা-কেন্দ্রিক বাংলায় যে পুনর্জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল সেক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের অবস্থান অনুসন্ধান করেছেন। এই কাজটি করতে গিয়ে প্রাবন্ধিক এই অঞ্চলের মুসলিমদের শিক্ষা, দর্শন, ধর্ম, চিন্তা, সংস্কার ইত্যাদির খুবই সংক্ষিপ্ত চিত্র উপস্থাপন করে তাদের কূপমণ্ডূকতার কারণসমূহ চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। এ ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের মুসলিমদের তিনি প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন এক. উর্দুভাষী শহুরে মুসলিম; দুই. বাংলাভাষী গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী প্রধানত কৃষিজীবী মুসলিম। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্রেণিগত বৈষম্যও ছিল স্পষ্ট। উনিশ শতকে ইউরোপীয় প্রভাবে নবজাগরণের সূচনা হলেও হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের মধ্যেও যে এর প্রভাব সঞ্চারিত হয় তা ক্ষীণস্রোতা হলেও লেখক গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। কারণ তাঁর বিবেচনায় মুসলিমদের অগ্রগামিতায় সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও “উনিশ শতকের বাংলায় আবদুর রহীম ও রামমোহন থেকে শুরু করে দেলওয়ার হোসেন ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন কালক্রমে তা বাঙালীর আত্মসচেতনতাকে জাগ্রত করতে এবং বাঙালীকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে অনেকটা সহায়তা করেছিল। […] এইভাবে উনিশ শতকের বাংলায় মুসলিম সমাজে সংস্কারমুক্ত যে ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর শ্র“ত হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি যেন সাহিত্য সমাজের ক্রিয়া-কাণ্ডে এবং ‘শিখা’ পত্রিকার প্রকাশনায়।”২
গ. একটি তথ্যপূর্ণ ও যুক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধ ‘পূর্ববঙ্গে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন (১৯০৫-১৮)’। মুনতাসীর মামুন আলোচ্য প্রবন্ধে পূর্ববঙ্গে সন্ত্রাসবাদী অন্দোলন বা বিপ্লবী অন্দোলনের তুলনামূলকভাবে বেশি বিস্তারের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি এই আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণসমূহও চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করেছেন। ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই অন্দোলন বাঙালির স্বাধিকার চেতনাকে প্রণোদিত করার ক্ষেত্রে যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল তাকে যথার্থভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। মূল আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে প্রাবন্ধিক সন্ত্রাসবাদ বা বিপ্লববাদের তাত্ত্বিক আলোচনা সংশ্লিষ্ট করায় প্রবন্ধটি ঋদ্ধ হয়েছে।
শীত সংখ্যা ১৩৯৩
ক. একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রবন্ধ সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের ‘উনিশ শতকে বাঙালীর ইতিহাস-চেতনা’। উনিশ শতকের আগে বাঙালির মধ্যে ইতিহাস-বোধ বা ইতিহাস-চেতনা সেই অর্থে কার্যকরি ছিল না, ছিল না লিখিত কোনো ইতিহাস বা ইতিহাস রচনার কোনো আগ্রহ। উনিশ শতকেই এই প্রয়াস প্রথম পরিলক্ষিত হয়। জাতিগত ইতিহাস সম্পর্কে অসচেতনতার কারণেই ঔপনিবেশিক শক্তি বিশেষ করে ইংরেজদের পক্ষে ভারত শাসন করা সহজতর হয়েছিল, এই কারণে এই শতকের শিক্ষিত মধ্যশ্রেণি, যারা এক অর্থে ইংরেজ তোষক তাঁদের হাতেই ইতিহাস রচনা শুরু হয়। বাঙালির ইতিহাস-চেতনার উন্মেষের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে লেখক জানিয়েছেন, “এক, ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাতে আহত স্বাজাত্যবোধ। দুই, পাশ্চাত্য জ্ঞানের সঙ্গে পরিচয়। বলা যেতে পারে উনিশ শতকে বাঙালীর ইতিহাস-চেতনা তার বিকাশমান জাতীয়তাবোধের সামন্তরিক।”৩ এ-কথা সত্য যে, স্বাজাত্যবোধের প্রেরণায় যেমন বাঙালির আত্ম-ইতিহাস-অšে¦ষা শুরু হয় তেমনি এই নিজের ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ বাঙালির জাতিসত্তার বিকাশ ও স্বাধিকার-চেতনাকে শাণিত ও প্রাণিত করেছিল। গবেষক রামরাম বসু থেকে শুরু করে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত এই শতকে যাঁরা সজ্ঞানে বা নিজের অজ্ঞাতে ইতিহাস-চর্চা করেছেন বা ইতিহাস-চর্চার প্রয়োজনীয়তা সর্ম্পকে লিখেছেন তাঁদের র্কীতিকে স্মরণ করেছেন। সে-সঙ্গে তাঁদের প্রয়াসের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনাকেও চিহ্নিত করেছেন।
বসন্ত সংখ্যা ১৩৯৩
ক. বহু জনপদ একত্রিত হয়ে এবং অনেক জাতি-গোষ্ঠীর রক্ত ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে ‘‘প্রাক্-মোগল যুগেই যে, বর্তমান কালের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে একটি লোকগোষ্ঠীর ও একটি ভাষাভূগোলভিত্তিক সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছিল,”৪ এই সঙ্গে “বহু দ্বিধাদ্বন্দ্ব সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার কিছু সংখ্যক শিক্ষিত মুসলমান বাংলা ভাষাকে তাঁদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক রূপে চিহ্নিত করছিলেন”৫ অর্থাৎ দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক ইতিহাস অতিক্রম করে এবং অনেক দ্বিধা-সংশয় অঙ্গীভূত করেই শেষ পর্যন্ত প্রধানত ভাষা-ভিত্তিক বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছিল— যা মমতাজুর রহমান তরফদার তাঁর ‘প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙালী সংস্কৃতি : আত্মপরিচয়ের সন্ধানে’ প্রবন্ধে এই সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেছেন। দ্বান্দ্বিক কারণেই “মধ্যযুগের কয়েকজন মুসলমান কবির বাংলাভাষাকেন্দ্রিক আত্মজিজ্ঞাসা পরবর্তীকালের সাম্প্রদায়িক ও প্যান-ইসলামিক আন্দোলনের মাঝখানে পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। ভাষা-ভিত্তিক আঞ্চলিক জাতীয়তা ও ধর্মাশ্রয়ী বহির্মুখী প্রবণতার টানাপড়েনের মাঝে বাঙালি মুসলমান এক দ্বিধাগ্রস্ত সত্তা। ১৯৪৭ সালে একটি সাম্প্রদায়িকতা-আশ্রয়ী, ধর্মীয় ইউনিটির রাষ্ট্রের উদ্ভব এবং ১৯৭১-এ সেই রাষ্ট্রের ধ্বংসস্তূপের উপর একটি ভাষাভিত্তিক, জাতীয়তাবাদী প্রতিশ্র“তি সম্পন্ন, আঞ্চলিক রাষ্ট্র গঠন এ-কথার প্রমাণ দেয়। এ-রাষ্ট্রে এখন ধর্মাশ্রয়ী বহির্মুখিতা ও সাম্প্রদায়িকতা কতকগুলি শক্তিশালী প্রবণতা। চৌদ্দ শতকে যে বাঙালী লোকগোষ্ঠীর সম্ভাবনাময় বিকাশ ঘটেছিল তার জাতীয়-চেতনা সুশৃঙ্খল হয়নি-পূর্ণতা পায়নি। তার আত্মপরিচয়ের বিষয়টি আজো বিতর্কিত।”৬ এই আত্মপরিচয়ের সন্ধানই সুন্দরম্ পত্রিকার অন্বিষ্ট।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৩৯৪
ক. ‘বাঙালীর জন্ম : একটি প্রাগৈতিহাসিক অনুসন্ধান’ প্রবন্ধে সৃষ্টির আদিতে চার্লস ডারউইন তত্ত্বের নৃবানর থেকে ঐতিহাসিক পর্বান্তর প্রক্রিয়ায় বর্তমান মানব প্রজাতি ‘হোমো স্যাপিয়ানসে’র বিকাশ পর্যন্ত দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে বাঙালির জাতির উৎস সন্ধান করেছেন অজয় রায়। মানবের এই বিকাশের সঙ্গে যৌক্তিক পারম্পর্যে লেখক মানব জাতির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সভ্যতার তুলনা করেছেন। বলাই বাহুল্য সর্বত্র লেখকের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ভারতবর্ষ তথা বৃহৎ বঙ্গ অঞ্চলের দিকে। এই সঙ্গে নৃগোষ্ঠীগত উপাদান-প্রভাবের সঙ্গে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যিক উপকরণের তুলনার মাধ্যমে অজয় রায় চেয়েছেন নৃগোষ্ঠী ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সমন্বয় সাধন করতে। যা বাঙালির জাতিসত্তার বিকাশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরো বেশি বিশ্বাস্য ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে।
খ. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ১৯৪৭ পর্যন্ত অর্থাৎ বিভাগপূর্ব কালে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস-চেতনার প্রকৃতি ও স্বরূপ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন ‘বাঙালী মুসলমানের ইতিহাস চেতনা’ প্রবন্ধে। আলোচনায় মুখ্য অবলম্বন ছিল মুসলিম রচিত সাহিত্যকর্ম এবং সে ক্ষেত্রে তিনি সাহিত্যকর্মগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন ১. মিশ্র ভাষারীতির কাব্য ২. আধুনিক বাংলা সাহিত্য। মিশ্র ভাষারীতি কাব্য আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি শুরু করেছেন ফকির গরীবুল্লাহ্কে দিয়ে এবং আধুনিক সাহিত্যের আলোচনা শুরু হয়েছে মীর মশাররফ হোসেনকে অবলম্বন করে; শেষ করেছেন এস. ওয়াজেদ আলীর সাহিত্য পর্যালোচনা মাধ্যমে। গবেষক প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন যে, এঁদের মধ্যে প্রশিক্ষিত ঐতিহাসিক ছিলেন সৈয়দ আমীর আলী এবং তিনি ছাড়া সকলেই ছিলেন মুসলমানদের অতীত ঐতিহ্যের মোহে মুগ্ধ। যে কারণে তৎকালের কোনো বিশেষ প্রসঙ্গ, এমনকি সিপাহী বিদ্রোহের মত জাতিসত্তা আন্দোলিত করার মত ঘটনাও তাঁদেরকে নাড়া দিতে পারেনি। অর্থাৎ যথার্থ ইতিহাসবোধ তাঁদের গড়ে ওঠেনি এবং ইতিহাসচর্চা ছিল ধর্মস্বাজাত্যবোধ তাড়িত। যা বাঙালি জাতিসত্তার স্বরূপ অনুধাবনে এক অর্থে ছিল প্রতিবন্ধক।
গ. পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জাগরণের একটি রূপরেখা উপস্থাপিত হয়েছে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ : একটি নতুন কণ্ঠস্বর’ প্রবন্ধে। উনিশ শতকের তথাকথিত নবজাগরণে বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যেভাবে সাড়া দিতে পেরেছিল মুসলিগণের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। ধর্মীয় সংস্কারবদ্ধ মানসিকতা তাঁদের জাগরণ ও অগ্রগতির পক্ষে ছিল বড় অন্তরায়। সেই বিবেচনায় ‘‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ই সর্বপ্রথম নব্য শিক্ষিত বাঙালী মুসলমান সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তির ঋজুপথে আমন্ত্রণ জানিয়ে আত্ম-জিজ্ঞাসায় প্রদীপ্ত করে তোলেন।’’৭ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও এর বার্ষিক মুখপত্র ‘শিখা’ নিঃসন্দেহে ছিল উদার, মানবিক, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় স্নাত। ফলে মুসলমানদের পশ্চাদ্পদতার কারণসমূহ উপলব্ধি করতে পেরেছিল বলেই সকল প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে ওঠে “মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ দ্বিধামুক্ত হয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন যে, বাংলাই বাঙালী মুসলমানের একমাত্র মাতৃভাষা এবং এ-ভাষাতেই বাঙালী মুসলমানকে সাহিত্যের সাধনা করতে হবে। তাঁরা এ কথা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, উর্দু-আরবী-বাংলার বিতর্কের ফলে বাঙালী মুসলমান সমাজ নির্দ্বিধায় বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা করতে পারে নি, ফলে তাদের মধ্যে চিন্তাশক্তির প্রসারও ঘটেনি।”৮ খোন্দকার সিরাজুল হক এই প্রবন্ধে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র স্বরূপ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
শরৎ সংখ্যা ১৩৯৪
ক. ঐতরেয় আরণ্যকে উল্লেখিত বঙ্গ জন ও জনপদ এবং মহাভারতে উদ্ধৃত ‘অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র, সুহ্ম’ থেকে রাজনৈতিক-সমাজিক-সাংস্কৃতিক শত পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমগ্র বঙ্গভাষী অঞ্চল নিয়ে কীভাবে একক সত্তা হিসেবে গৌড়কে অতিক্রম করে বঙ্গ প্রতিষ্ঠা পেল তারই গবেষণা-সমৃদ্ধ বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে অজয় রায়ের ‘বাঙালীর জন্ম : একটি পুরাবৃত্তিক অনুসন্ধান’ প্রবন্ধে। তাঁর গবেষণা-লব্ধ সিদ্ধান্ত এই যে,‘[…] পৌন্ড্র-বরেন্দ্র, গৌড়-কর্ণসুবর্ণ, রাঢ়-সুহ্ম-তাম্রলিপ্তি, বঙ্গ-সমতট হরিকেল—এই জনপদ সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল অতীতের বঙ্গভূমি।’৯ তিনি মনে করেন যে, এই সমগ্র বাংলাদেশকে প্রথম ‘বাঙ্গালা’ নামে অভিহিত করার যে কৃতিত্ব সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহীকে প্রদান করা হয় তা যথার্থ।
শীত সংখ্যা ১৩৯৪
ক. প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের অধিবাসী বাংলাদেশি, বাঙালি না মুসলমান অথবা কোনটা আগে এই বিতর্কই বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্বরূপ নির্ধারণে সংকটের তৈরি করছে। কবীর চৌধুরী তাঁর ‘বাঙালীর আত্মপরিচয়ের সঙ্কট : কৃত্রিম সমস্যা (?)’ প্রবন্ধে এই সংকটের প্রকৃতি নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, এই সমস্যা আসলে আরোপিত এবং সুবিধাভোগী শাসক গোষ্ঠী তাদের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে এই অনাকাক্সিক্ষত বিষয়ের সৃষ্টি করে তা থেকে ফায়দা অর্জনের চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রীয় পরিচয়, ভাষিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ধর্মীয় পরিচয় যে আলাদা এই বিষয়টি অনেকের কাছে বোধগম্য নয়। ধর্মীয় ভাবে ভিন্নতা থাকলেও সাংস্কৃতিক ঐক্যে যে আমরা সবাই এক এই সত্যই তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
খ. আবদুল করিম প্রণীত বাংলার ইতিহাস : সুলতানী আমল গ্রন্থের আলোচনা করতে গিয়ে আসহাবুর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন, আর তা হচ্ছে ইতিহাস-চর্চার ক্ষেত্রে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে গুরুত্ব না দেওয়া। আমাদের ইতিহাস-চর্চার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় দুর্বলতা। ঔপনিবেশিক শক্তির তোষণ এবং তাদের পদ্ধতি অবলম্বন করায় ইতিহাসচর্চায় আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার ক্রমবিকাশ আধুনিক কালের আগে যথার্থভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। লেখক ‘জাতীয়তাবাদ ও ইতিহাসচর্চা’ প্রবন্ধে আবদুল করিম সাহেবের উপর্যুক্ত গ্রন্থকে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বসন্ত সংখ্যা ১৩৯৪
ক. একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিপ্রশ্ন : বাংলাদেশ’ লেখক আসহাবুর রহমান। প্রবন্ধের বিষয়কে লেখক আন্তর্জাতিক মাত্রা দিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি মূলত ভারতবর্ষে বাংলাভাষাভাষী মানুষের বিভিন্ন সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে গড়ে উঠে একটি জাতিরাষ্ট্র গঠনের যেসব সুযোগ তৈরি হয়েছে তার একটি খতিয়ান উপস্থাপন করেছেন এবং রাষ্ট্র গঠনের ব্যর্থতার কারণ এবং এই দায় কার তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি দেশ-বিদেশের অনেক জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া উপস্থাপন করেছেন। ‘জাতিপ্রশ্ন’ বিষয়টির সঙ্গে সাধারণ পাঠকের তত পরিচিতি না থাকায় লেখক প্রথমে এর তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করেছেন। এই প্রসঙ্গটি যে একটি মার্কসবাদী বিবেচনা তা লেখক প্রথমেই জানিয়েছেন। লেখকের শেষ বিবেচনায় ‘‘শাহ্-ই-বাঙ্গালা’ ও ‘শাহ্-ই-বাঙ্গালীয়ান’ এই উপাধি ধারণ করে কেন্দ্রীভূত বাংলা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্ (১৩৪২-১৩৫৮) বাংলার উল্লিখিত অঞ্চলে আজকের বাঙালী জাতিসত্তা গঠনের বাস্তব পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন।’১০ কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তি আমাদের জাতিগত প্রকৃত ইতিহাসও সঠিকভাবে জানতে দেয়নি এমনকি শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরাও যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। আলোচনার প্রান্তে এসে লেখক প্রশ্ন করেছেন প্রত্যেক জাতির প্রাতিস্বিক ভূমিকা প্রবহমান মানবসভ্যতার বিশাল ইতিহাসে অমর ও অক্ষয় পদচিহ্ন রেখে যায়, সেই বিবেচনায় বাঙালি জনগোষ্ঠী এই ঐতিহাসিক যাত্রায় কোনো স্মরণীয় ভূমিকা রাখতে পেরেছে কী? এ প্রসঙ্গে লেখকের উত্তর ‘বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাঙালী নিজেকে সেই পর্যায়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, এ সত্য স্বীকার না করে উপায় নেই।’১১ প্রাবন্ধিক মনে করেন ‘…দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যশ্রেণীর নীচের অংশ’ই পারবে প্রত্যাশিত সাফল্য প্রদর্শন করতে।
খ. গত সাতশ বছর ব্যাপী এই অঞ্চলে মুসলিমদের বসবাস হলেও মানসিকতার দিক থেকে তাদের পরিবর্তন হয়েছে কতটুকু? ‘বাংলাদেশে ইসলাম : কয়েকটি প্রবণতা কিছু মন্তব্য’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক আবুল কাশেম ফজলুল হকের সেই আক্ষেপই ধ্বনিত হয়েছে। লেখকের বিবেচনায় যে মানসিকতা নিয়ে এই অঞ্চলের মুসলমান ওহাবি আন্দোলন করেছিল, সেই মানসিকতা থেকে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন সত্ত্বেও তারা এখনও পুরোপুরি ফিরে আসতে পারেনি। তাঁর মতে, স্বচ্ছ, উদারনৈতিক, যুক্তিবাদী, পরমতসহিষ্ণু, প্রগতিবাদি মানসিকতাকে আত্মস্থ করতে পারলে আমাদের জাতীয় অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা রোধ করা সম্ভব হত।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৩৯৫
ক. বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে একনিষ্ঠ গবেষক অজয় রায়। তিনি তাঁর ‘বাঙালীর জন্ম : একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান’ প্রবন্ধে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থান-বিহারে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্ন-উপকরণ ও মুদ্র ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য, জীবন-যাপন-প্রক্রিয়া, কৃষি-ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির স্বরূপ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি মূলত মহাস্থানগড়, বাসুবিহার, চরকাই-বিরামপুর প্রত্নস্থল, পাহাড়পুর, ময়নামতি-লালমাই অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী বিশ্লেষণ করে প্রাচীন কালে বাঙালির গৃহ ও দুর্গ নির্মাণ-কৌশল, নগর-পরিকল্পনা, রাস্তাঘাটের অবস্থা, অলঙ্কার-মৃৎশিল্প-পশুর হাড়-নির্মিত সুদৃশ্য অস্ত্র প্রভৃতির যে নিয়মতান্ত্রিক ও সাংগঠনিক রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন তার থেকে লেখক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, “প্রত্নপ্রস্তর যুগ থেকেই প্রাচীন বঙ্গের অধিবাসীরা অব্যাহত ধারায় নিজেদের সংস্কৃতি, স্থাপত্য, শিল্পকলা, ভাস্কর্য, পোড়ামাটির চিত্রশিল্প এবং কারিগরী কৃৎকৌশল দক্ষতায় এক ঋদ্ধ সমাজ, একটি বলিষ্ঠ সভ্যতা গড়ে তুলেছিল অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে। আর নব্য বাঙালীর জন্ম সেই সুপ্রাচীন, গৌরবময় ঐতিহ্যের পটভূমিতেই।”১২
খ. বাঙালি মুসলমানের আত্মস্বরূপ উন্মোচনের প্রয়াস পেয়েছেন সালাহউদ্দীন আহ্মদ তাঁর ‘বাঙালী মুসলমানের আত্মজিজ্ঞাসা’ প্রবন্ধে। বাঙালি মুসলমানের বহু পুরনো সমস্যা ‘আশরাফ’ ‘আতরাফ’ সমস্যাকে কেন্দ্র করে বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতি-জাতিগত সমস্যার ইতিহাস বিশ্লেষিত হয়েছে এই প্রবন্ধে। একই সঙ্গে এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে মাঝে-মধ্যে বাংলাদেশকে ইসলামীকরণের যে প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয় তার সমালোচনা করা হয়েছে। প্রাবন্ধিকের মতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ কথিত ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালী’ এই প্রত্যয়েই তিনি শেষ পর্যন্ত আস্থা রেখেছেন।
শরৎ সংখ্যা ১৩৯৫
ক. আবদুল মমিন চৌধুরীর ‘হাজার বছরের পুরাতন বাঙালী : প্রাচীন বাংলার ‘ব্যক্তিত্ব” প্রবন্ধটি বাঙালির জাতিসত্তা ও বাঙালির ইতিহাসের একটি নতুন দিগন্তের প্রতি আলোকপাত করেছে। প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় প্রসঙ্গে লেখক জানিয়েছেন যে, “[…] আমরা এই প্রবন্ধে বাংলার প্রাক্-মুসলিম যুগের সমাজ-সংস্কৃতির বিকাশে ঐ যুগের অনেক বৈশিষ্ট্যই বাংলার বা বাঙালীর ‘ব্যক্তিত্ব’ গঠনে সাহায্য করেছে—যে ব্যক্তিত্বের একটা শাশ্বত রূপ রয়েছে। এই ‘ব্যক্তিত্বে’র কয়েকটি মৌল ধারাকে চিহ্নিত করার প্রয়োজন রয়েছে এবং এই সনাক্তকরণ বর্তমানের আত্মোপলব্ধি সৃষ্টিতে সাহায্য করবে।”১৩ বাঙালির এই শাশ্বত ব্যক্তিত্বের উপর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক-সামাজিক-ধর্মীয় অনেক কারণেই বিচিত্র প্রভাব পড়েছে তারপরও বাঙালি যে তার ব্যক্তিত্বের মৌল প্রবণতা থেকে বিচ্যুত হয়নি এই কথাটি গবেষক দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।
শীত সংখ্যা ১৩৯৫
ক. ‘বাঙালীর ইতিহাস একটি জাতিতাত্ত্বিক অনুসন্ধান’ প্রবন্ধে অজয় রায় বাঙালি জন ও জাতি সৃষ্টিতে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী ও জনের প্রভাব প্রসঙ্গে আলোকপাত করেছেন। এই ধরনের গবেষণার একটি অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে লেখক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রবন্ধটি শেষ করেছেন। তাঁর বিবেচনায় “[…] হোমো-আলপিনাস জন প্রাচীন কালে অসুর জাতি নামে ভারতীয় উপমহাদেশের জনতত্ত্বের ইতিহাসে, এই উপমহাদেশের সংস্কৃতি-ধর্ম-দর্শন-বিনির্মাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল, আর ভবিষ্যৎ বাঙালী জন ও জাতি সৃষ্টিতে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, যে ইতিহাস আজও অনুদ্ঘাটিত।১৪
খ. ইতিহাস কী? ইতিহাসচর্চার কারণ কী- তার প্রকৃতি কেমন? যথার্থ ইতিহাসচর্চা আত্মস্বরূপ উন্মোচনে কতটুকু ভূমিকা রাখে? ইত্যাকার প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর ‘ইতিহাসচেতনা : অতীতের মোহ ও ভবিষ্যতের কল্পস্বর্গ প্রবন্ধে’। এই পরিক্রমায়ই তিনি আবিষ্কার করেছেন যে, বাঙালি আসলে প্রকৃত ইতিহাসচর্চা করে উঠতে পারেনি, যে ইতিহাস জাতিগতভাবে বাঙালিকে প্রণোদিত করতে পারে।
বসন্ত সংখ্যা ১৩৯৫
ক. সমসাময়িক কালে বাংলাদেশে ইসলামি মৌলবাদের উত্থান ও তার আগ্রাসী-প্রবণতার প্রেক্ষাপটে ১৯৮৯ সালের প্রথমার্ধে আসহাবুর রহমান লেখেন ‘ইসলামি মৌলবাদের বুদ্ধিবাদী উৎস’ প্রবন্ধ। ইসলাম ধর্মের শুরু থেকে এবং মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রসমূহে কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে কেন ইসলামী মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে তার ঐতিহাসিক পটভূমি উপস্থাপন করেছেন এখানে। দীর্ঘ এই প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন পরিস্থিতির কারণে বুদ্ধিবাদী প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশে-দেশে, সমাজে মৌলবাদের উদ্ভব ঘটে। যা বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিবাদ, প্রগতিপন্থা ও সকল ধরনের সৃজনশীলতার পরিপন্থি।
খ. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ লিখেছেন ‘উনিশ শতকে বাংলার মুসলমান : শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা’। উনিশ শতকে ভারতবর্ষের মুসলমানদের যে দ্বান্দ্বিক সত্তা তার স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয়েছে এই প্রবন্ধে। প্রবন্ধটিতে দেখান হয়েছে, শিক্ষা ও সমাজভাবনাগত পশ্চাদ্পদতার সঙ্গে ভাষা বাংলা না আরবি-ফার্সি; মুসলমানরা তুর্কি, আফগান, হাবশি, মুঘল, ইরানিদের বংশধর নাকি এই অঞ্চলের নিম্নবর্গের হিন্দু-বৌদ্ধদের উত্তরাধিকার এই সব দ্বন্দ্ব এবং শহরের ও গ্রামের মুসলিমদের দ্বন্দ্বে উনিশ শতকের মুসলিম মানসের যথার্থ বিকাশ ঘটেনি। ব্যক্তি উদ্যোগ কখনোবা কিছু ছোট ছোট সংগঠনের উদ্যোগ ক্ষীণ স্রোতের মত প্রবাহিত হয়েছে কিন্তু তা মূল প্রবাহে তেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ‘…উনিশ শতকের বাংলার মুসলিম জন-জীবন ও সমাজ-চিন্তায় দেখা যাবে বৈচিত্র্যের সমারোহ। একদিকে যেমন ছিল পশ্চাদমুখী রক্ষণশীলতা, অন্যদিকে তেমনি ছিল প্রগতিশীল সংস্কারবাদ এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বিচ্ছিন্নতাবাদী সাম্প্রদায়িক চেতনার সমান্তরাল ছিল ক্ষেত্র বিশেষে সমন্বয়ধর্মী ভাবনা। বস্তুত উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের মানসভুবনকে কোনো এক নির্দিষ্ট পরিচিতিতে চিহ্নিত করা যায় না। সেই ভুবন কখনো স্থবির, কখনোবা সেকালের সেই জনজীবন নানামুখী ভাবতরঙ্গে আলোড়িত।’১৫
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৩৯৬
ক. বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে গভীরতর ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় যতীন সরকার লিখিত ‘আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ নামক প্রবন্ধে। এই প্রবন্ধ লেখার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে প্রাবন্ধিক জানিয়েছেন যে, তাঁর ধারণা ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে যে বিতর্ক ছিল তা স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে নির্মূল হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো, পুরোনো বিতর্কই বরং নতুন পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে আমাদের সংস্কৃতির স্বরূপ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ধর্মের পরিচয়ে জাতি ও সংস্কৃতিকে পরিচিত করার প্রয়াস রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে যা খুবই শঙ্কার বিষয়। তাই সংস্কৃতি সম্পর্কে সৃষ্ট নতুন ধূম্রজাল ছিন্ন করার প্রয়োজনেই সংস্কৃতি-বিষয়ক এই আলোচনার অবতারণা।১৬ গবেষকের এই উক্তি আমাদের জাতীয় রাজনীতির বিশেষ দিককে চিহ্নিত করে। প্রাবন্ধিক দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির সামগ্রিক রূপ পরিস্ফুটনে সক্ষম হয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে বাঙালি সংস্কৃতির উপর যে আগ্রাসন চলেছে তার স্বরূপও উন্মোচন করেছেন তিনি। এই প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সংস্কৃতির তাত্ত্বিক আলোচনা। এই আলোচনার মাধ্যমে লেখক সংস্কৃতির উপকরণ চিহ্নায়নে সাধারণ ধারণা পরিবর্তনে সচেষ্ট হয়েছেন।
খ. ‘প্রত্নসম্পদে বাংলার মুখ’ প্রবন্ধে লেখক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রতœবস্তুর আলোকে বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধানে ব্যাপৃত হয়েছেন।
শরৎ সংখ্যা ১৩৯৬
ক. প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন ‘বাঙালীর আত্মপরিচয়’ প্রবন্ধ। তিনি বাঙালির আত্মপরিচয়কে দু’ভাগে ভাগ করেছেন : (ক) নৃতাত্ত্বিক দিক (খ) জাতিগত দিক।১৭ ইতিহাসের পরিক্রমা অক্ষুণœ রেখে লেখক দেখিয়েছেন যে, এই অঞ্চলের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের একটিই পরিচয় তারা বাঙালি। শুরু থেকেই এই বাঙালি জাতি ও বাঙালি সংস্কৃতির উপর বহিঃশক্তি বা কখনো কখনো সুবিধাবাদী অভ্যন্তরীণ শক্তি বারবার বাঙালির জাতিগত বা সংস্কৃতিগত ঐক্যে ভাঙন ধরানর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তা ছিল সাময়িক শেষ পর্যন্ত বাঙালি স্বরূপেই বলীয়ান থেকেছে। আবু জাফর শামসুদ্দীনের বিবেচনায় বাঙালির জাতিগত ও সংস্কৃতিগত ঐক্যের চূড়ান্ত রূপ পরিলক্ষিত হয়েছে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সময়, যে ঐক্যে এই অঞ্চলের আদিবাসীরাও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এরপরও পাকিস্তানী শক্তির জুনিয়র পার্টনার হিসেবে দেশীয় কায়েমি স্বার্থ এবং সামরিক শক্তি সাংস্কৃতিক বিভেদ তৈরি করে দেশকে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারপরও লেখক আশাবাদী, তিনি মনে করেন, দেশের দশ ভাগ মানুষ শোষক-নিপীড়ক ও স্বার্থবাদী তারাই দেশকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেয় কিন্তু আশি-নব্বই ভাগ শোষিত-নিপীড়িত দেশবাসীর জয় অবশ্যম্ভাবী। তাঁর বিশ্বাস ‘বাঙালীর আত্মপরিচয়, তারা একটি সমন্বিত জাতি—এই সত্য সেই বিজয়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠালাভ করবে।’১৮
শীত সংখ্যা ১৩৯৬
ক. তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণা প্রবন্ধ মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমানের ‘বাঙালী মুসলমানের আত্ম-অšে¦ষার স্বরূপ : ১৮৮২-১৯২২’। ধর্ম-নির্ভর মুসলিম জাতীয়তাবাদী ধারণার বিপরীতে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ও এই দুই এর দ্বন্দ্ব এবং পাশাপাশি ক্ষীণ হলেও হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের উদ্ভবের কারণ ও বিস্তারের চেষ্টা ইত্যাদি প্রবন্ধের পটভূমি নির্মাণ করেছে। গবেষকের বিবেচনায় ‘১৮৮২ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যবর্তী সময়কে প্যান-ইসলামী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার পাশাপাশি ধর্ম নিরপেক্ষ এবং বাঙালী মুসলমানের স্বীয় স্বাধীন জীবন-এষণার উপ্ত পটভূমি বলা যায়।’১৯ প্রধানত সাহিত্য ও সমাজকর্মের বিশ্লেষণ এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন মুসলমান আত্মোন্মোচনের মাধ্যমে উদার নিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
বসন্ত সংখ্যা ১৩৯৬
ক. অজয় রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘বাঙালীর জন্ম : একটি ভাষাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান’। এখানে গবেষক প্রচলিত তত্ত্বসমূহকেই নতুনভাবে বিচার করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত রয়েছে চার শ্রেণির ভাষা: ‘১. ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের অন্তর্গত নব্য-ভারতীয় আর্য-ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন ভাষা, ২. দ্রাবিড় ভাষা-পরিবারের বিভিন্ন সদস্য, ৩. অস্ট্রিক ভাষা-পরিবারভুক্ত অস্ট্রো-এশিয়াটিক গোষ্ঠীর অন্তর্গত বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা, ৪. তিব্বতী-চৈনিক পরিবারের তিব্বতী-বর্মী শাখার অন্তর্ভুক্ত-তিব্বতী হিমালয়ান উপশাখাভুক্ত এবং আসাম-বর্মী উপশাখাভুক্ত বিভিন্ন ভাষা ও উপভাষা।’২০ এর মধ্যে বাংলা ভাষা নব্য-ভারতীয় আর্য-ভাষা গোষ্ঠীর বহির্মণ্ডলীয় ভাষার সদস্য এবং অন্যান্য তিনশ্রেণির ভাষাও কীভাবে বাংলা ভাষাকে ঋদ্ধ করেছে তার ব্যাখ্যা তিনি উপস্থাপন করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে যে আদিবাসীরা বসবাস করে তাদের ভাষারও উৎস সন্ধান করেছেন তিনি।
খ. ‘বাঙালীর আত্ম-অন্বেষণ সমস্যা’ প্রবন্ধে মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী দেশীয় ও অন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত বিচার বিশ্লেষণ করে বাঙালি জাতিসত্তার স্বরূপ উন্মোচনে প্রয়াসী হয়েছেন এবং তিনি দেখেয়েছেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের যে সংকট তা নতুন নয়, অনেক আগে থেকেই তা শুরু হয়েছিল কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে তার মীমাংসা হয়ে যাওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর মতে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণের মধ্য দিয়ে বাঙালিকে নতুন করে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করার চেষ্টা হয়েছে দেশি ও বিদেশি কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর প্ররোচনায়।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৩৯৭
ক. অসীম রায় ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের ক্ষেত্রে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংগঠন ও দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন করেছেন ‘দেশবিভাগের প্রশ্নে লীগ ও কংগ্রেস : ইতিহাসের পুনর্বিচার’ প্রবন্ধে। এই মূল্যায়নে তিনি বিশেষকরে জিন্নাহর ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এবং প্রাসঙ্গিক ইতিহাসকে নতুনভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করেছেন।
শরৎ সংখ্যা ১৩৯৭
ক. বাঙালি মুসলমানের দুর্ভাগ্য যে, কালের পরিক্রমায় বহুবার তারা বিভ্রান্ত হয়েছে, যার পরিণতিতে বিশেষকরে হিন্দুদের তুলনায় তারা পিছিয়ে গেছে অনেক। জাতিসত্তার প্রশ্নে, ভাষার প্রশ্নে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে যথার্থ পথ খুঁজে নিতে সময় গেছে অনেক। ইতিহাসের এই অমোঘ সত্যের কারণে ভারতবর্ষের মুসলিমরা বারবার হয়েছে দ্বিধান্বিত। যার সর্ব শেষ প্রমাণ ছিল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। যে-কারণে মাত্র দুই বছরের মধ্যে মুসলিমদেরই সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হতে হয়েছে। ‘বাঙালী মুসলমান : পর্যাবৃত্তের ইতিবৃত্ত’ প্রবন্ধে এসব বিষয়েরই অবতারণা করেছেন মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান।
খ. মাহবুবুর রহমানের লেখা ‘জাতীয় ঐক্যমত্যের সমস্যা—প্রসঙ্গ বাংলাদেশ’ বলা চলে বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যের দলিল। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক অগ্রসরতার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় আমাদের জাতীয় ঐক্যমত্যের অভাব। প্রবন্ধটিতে কোন কোন ক্ষেত্রে সাধারণত আমরা ঐক্যমত্যে পৌঁছতে পারি না; সেই ক্ষেত্রগুলোকে সূত্রবদ্ধ করা হয়েছে, সূত্রবদ্ধ করার আগে না পৌঁছার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ত্রুটিকে এবং এর প্রতিকারের পথও অনুসন্ধান করা হয়েছে। ঐক্যমত্যে পৌঁছতে না পারার ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে : ১. জাতীয়তার স্বরূপ নির্ধারণ, ২. সরকার পদ্ধতি ও প্রশাসনের মৌল কাঠামো, ৩. উন্নয়ন কৌশল, ৪. রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মের ভূমিকা, ৫. জাতীয় জীবনে সামাজিক শক্তিসমূহের অবস্থান ও ভূমিকা, ৬. জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক সম্পর্ক। এই বিরোধ প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক দলমত ও শিক্ষিত ও সচেতন অংশের মধ্যে ক্রিয়াশীল। সাধারণ ব্যাপক জনগণ আসলে এর অংশ নয়। তাই জাতীয় জীবনের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য সাধারণ মানুষের উপর বিরোধপূর্ণ কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠা করা উচিৎ।
শীত সংখ্যা ১৩৯৭
ক. বাংলার রেনেসাঁকে আপাত বিপরীতমুখি দুই ধরনের বক্তব্যের আলোকে পুনর্মূল্যায়ন করতে প্রয়াসী হয়েছে শহিদুল ইসলাম তাঁর ‘উনিশ শতকে বাংলায় রেনেসাঁ’ প্রবন্ধে। এই রেনেসাঁর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যে মতগুলোকে পাওয়া যায় সেগুলোকে প্রাবন্ধিক সূত্রবদ্ধ করেছেন : এক. রেনেসাঁর কোনো সীমাবদ্ধতা দেখতে না পাওয়া; দুই. রেনেসাঁর মধ্যে কেবলই কালো রঙ্ চোখে পড়া; তিন. রেনেসাঁকে হিন্দু পুনরুজ্জীবনী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা; চার. রেনেসাঁকে ইংরেজ প্রাচ্যবাদীদের সভ্যতার আলোক বিতরণকারী ভূমিকার ফসল হিসেবে দেখা। তথ্যমূলক আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যেক মতের সত্যতা ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করে শেষ পর্যন্ত তিনি সুশোভন সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন, “আমাদের উনিশ শতকের নবজাগরণ ছিল একটি সামাজিক বাস্তবতা; যা দেশের উপর একটি প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছিল এবং আধুনিক সংস্কৃতি নির্মাণে সত্যিকার অর্থেই অবদান রেখেছিল।”২১
খ. আমাদের সংস্কৃতির সংকটের স্বরূপ, সাংস্কৃতিক সংকট সৃষ্টির কারণ ও উত্তরণের উপায় অন্বেষণ করেছেন ফাহিমুল কাদির ‘সংস্কৃতির সংকট : সাম্প্রতিক প্রেক্ষিতে’ প্রবন্ধে। বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে আমাদের সংস্কৃতির উপর ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির আগ্রাসনের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে লেখক যথেষ্ট শঙ্কিত হয়েছেন।
বসন্ত সংখ্যা ১৩৯৭
ক. বাঙালির আত্মাভিমানের চূড়ান্ত প্রকাশ ভাষা-আন্দোলন। ‘ভাষা আন্দোলন : পটভূমির স্বরূপ’ প্রবন্ধে আতিউর রহমান বাঙালির জাতীয় ঐক্যের অন্যতম উপকরণ ভাষার উপর আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালির চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া প্রকাশের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক পটভূমি ও পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করেছেন। এই আন্দোলনের সঙ্গে তিনি অনেকটাই মিল খুঁজে পেয়েছেন নব্বই-এর গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে। গবেষকের বিবেচনায় সফল এই দুই আন্দোলনের নায়ক কোনো ব্যক্তি বা দল নয় এর নায়ক ছাত্র-জনতা-সাধারণ মানুষ। প্রকৃতপক্ষে জাতিসত্তার ওপর আক্রমণ আসলে বাঙালি জাতি যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায় এবং সর্বশক্তি দিয়ে যে তা প্রতিহত করে এই সত্য প্রাবন্ধিক প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
খ. ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি মুসলমানের সামাজিক জীবনের প্রকৃত অবস্থা বিধৃত হয়েছে মুহম্মদ নূরুল কাইয়ুম রচিত ‘উনিশ শতকে বাংলার মুসলমান সমাজ’ প্রবন্ধে। শিক্ষা-শিল্পে পশ্চাদ্পদতা, ধর্মীয়-সামাজিক কুসংস্কার-গোঁড়ামী-অন্ধবিশ্বাস, রাজনৈতিক বৈরিতার স্বীকার হয়ে তারা যে কূপমণ্ডূক জাতিতে পরিণত হচ্ছিল এবং প্রগতিবাদী ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত অল্প কিছু মানুষের আন্তরিক প্রয়াসে উনিশ শতকের শেষে বিশেষ করে বিংশ শতকের প্রথম দিকে তাঁদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জন্মাতে থাকে। ঐ শতাব্দীতে মুসলিমদের তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পরা এবং পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে আধুনিক জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার বিত্তান্ত এই প্রবন্ধ।
গ. ১৯২৬ সালে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষা-দীক্ষার খতিয়ান ‘বাঙালী মুসলমানের শিক্ষা ভাবনা’। খোন্দকার সিরাজুল হক যথেষ্ট শ্রম ও মেধা ব্যয় করে তথ্য পরিসংখ্যান-নির্ভর প্রবন্ধটিতে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম মনীষীদের মুসলমানদের শিক্ষা নিয়ে ভাবনা ও কার্যকরি উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা বিস্তারের প্রয়াস-সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। এই অঞ্চলের মুসলিমদের শিক্ষার ক্রমাগ্রগতির একটি প্রায়-পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখানে পাওয়া যাবে।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ৯৮
ক. শামসুল আলম সাঈদ রচিত ‘জাতীয়তাবোধে সিরাজদ্দৌলা কাল্ট ও পলাশির যুদ্ধ’ একটি ভিন্ন মাত্রার প্রবন্ধ। বিস্মরণ-প্রবণ বাঙালির কাছে এখন প্রায় বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যাওয়া একটি সাহিত্যকর্মের নাম নবীনচন্দ্র সেনের ‘পলাশির যুদ্ধ’। কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই কাব্যটি যে কত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল সে সত্যই আবিস্কৃত হয়েছে এই প্রবন্ধে। […] ‘পলাশির যুদ্ধ’ লিখে তিনি ‘জাতির অবরুদ্ধ ধারণা’র একটা রূপ দিতে প্রয়াস পেয়েছিলেন। নিশ্চিতভাবে এ ধারণা একটা জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি করেছিল এবং ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত তা প্রবাহিত হয়েছে।’২২ ঔপনিবেশিক ও অবরুদ্ধ সময়ে তাঁর এই প্রয়াস বাঙালিকে জাতীয়তাবাদী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং ফল স্বরূপ গিরিশ ঘোষ ও শচীন সেনগুপ্ত রচনা করেছিলেন ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটক। যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। প্রকৃতপক্ষে সিরাজদ্দৌলা জাতীয়তাবাদী ও স্বাধিকার-চেতনার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। এই কৃতিত্ব প্রধানত নবীনচন্দ্র সেনের।
খ. বাঙালির জন্ম, তার সংস্কৃতির স্বরূপ অন্বেষায় অজয় রায়ের নিরন্তর প্রয়াসের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ ‘বাঙালীর জন্ম : একটি বর্ণতাত্ত্বিক আলোচনা’। বাঙালি হিন্দুদের অন্তর্গত বিরোধের একটি বড় কারণ তাদের বর্ণভেদ-চার বর্ণ। নিঃসন্দেহে এই প্রথা জাতীয় ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাঁধা। অজয় রায় এই বর্ণভেদের আদি উৎস অনুসন্ধান করেছেন এবং দেখিয়েছেন এই বর্ণপ্রথা বাঙালি জাতিসত্তা গঠনে কোনো ভূমিকা রাখেনি। একই ভাবে হিন্দুদের অনুসরণে বাঙালি মুসলমানের মধ্যেও বর্ণপ্রথা প্রচলিত হয়েছিল। তিনি সেখানেও একই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন : ‘সুতরাং আমরা বিনা দ্বিধায় বলতে পারি, বাঙালী হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক—চণ্ডালই হোক আর ব্রাহ্মণই হোক—এরা একটি সমরূপী বাঙালী জন রূপে গড়ে উঠেছে—সকল বাঙালী গড়ে তুলেছে বাঙালী জনতা, বাঙালী জন, বাঙালী জাতি।’২৩
শরৎ সংখ্যা ৯৮
ক. মুসলমান সমাজের অনগ্রসরমানতার কারণ এবং বাংলার নবজাগরণে শামিল হতে ব্যর্থ হওয়া প্রসঙ্গে লেখা গ্রন্থ, প্রবন্ধ বা প্রচলিত মতবাদের একটি সারাংশ পর্যালোচনাসহ উপস্থাপন করেছেন শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘রেনেসাঁস ও বাংলার মুসলমান সমাজ’ আলোচনায়। সার্বিক দিক বিশ্লেষণ করে মুসলমানদের জাগরণ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যকে মোট নয়টি সূত্রে আবদ্ধ করেছেন। তাঁর বিবেচনায় বাঙালি মুসলমানদের জাগরণ হয়েছিল একটু বিলম্বিত এবং যার চূড়ান্ত রূপ পরিলক্ষিত হয়েছে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে।
শীত সংখ্যা ৯৮
ক. দেশভাগোত্তর পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের তথ্য-নির্ভর উপস্থাপনা মিনার মনসুরের ‘বাংলাদেশ (১৯৪৭-’৮২) : সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি’। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রাপ্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল প্রকৃতপক্ষে ঔপনিবেশিক শক্তির পরিবর্তন, যা অল্প কিছু দিনের মধ্যেই বাঙালি বুঝতে পারে। ফলে শুরু হয় নতুন করে আন্দোলন-সংগ্রাম, ভাষা-আন্দোলন যার উৎস। এই ধারাবাহিকতায়ই স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং তারপর আবার সামরিক সরকার বিরোধী আন্দোলন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত আমাদের ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনগুলোকে মিনার মনসুর এই প্রবন্ধে যথার্থভাবে চিহ্নিত করেছেন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তা শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই আবদ্ধ ছিল না, তা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে গিয়েছিল। যা আমাদের জাতীয় চেতনাকে শানিত ও প্রাণিত করেছে।
খ. অতি সংক্ষেপে প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাঙালির দর্শনচর্চার রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন আমিনুল ইসলাম তার ‘বাঙালীর দর্শন-ভাবনা [প্রাচীন ও মধ্যযুগ]’ নামক প্রবন্ধে। তিনি দেখিয়েছেন আমাদের এই দর্শনচর্চা প্রধানত ছিল সাহিত্য-নির্ভর। তিনি মনে করেন প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যের আন্তরিক অধ্যয়ন ও পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ঐ সময়ের বাঙালির দর্শন-ভাবনা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে।
বসন্ত সংখ্যা ৯৮
ক. পিছিয়ে পরা বাঙালি মুসলমানদের মানস-জগতের উন্নতিকল্পে তুলনামূলকভাবে একটু দেরিতে হলেও-যে-সব মুসলিম মনীষী অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তাঁদের সেই আন্তরিক প্রয়াসের সংক্ষিপ্ত রূপ প্রতিফলিত হয়েছে ইমরান হোসেনের ‘উনিশ শতকের বাংলার মুসলিম এলিটের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে। তাৎক্ষণিক কোনো তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে না পারলেও তাঁরা বাঙালি মুসলমান সমাজে ভাষা, জাতীয়তাবাদ ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে যে বিতর্ক ছিল সেখানে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পেরেছিল।
খ. সর্বস্তরের মানুষের ঐকান্তিক প্রয়াসে, বিশাল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা এবং ১৯৭২ সালে ধর্ম-নিরপেক্ষ সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে ইসলাম ধর্মকে রাজনৈতিক ব্যবহারের যে অপপ্রয়াস শুরু হয়েছিল তা অব্যাহত রয়েছে এখনও। সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ‘বাংলাদেশে ধর্মের রাজনীতি’ নামক প্রবন্ধে এই প্রবণতার কারণ ও দুই দশকের ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক জটিলতার সূচনা হয়েছে শাসকের অবৈধতা থেকে। শাসকের উদ্দেশ্যমূলক নীতি ও পদক্ষেপের ছত্রছায়ায় ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করেছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো। […] কিন্তু অপর দিকে রাজনীতিতে এই মোড় পরিবর্তন ভবিষ্যতের অশুভ ইঙ্গিতবাহী।’২৪
গ্রীষ্ম সংখ্যা ৯৯
ক. ফেরদৌস হাসান ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ : একটি আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ’ প্রবন্ধে বাংলাদেশে যথার্থ গণতন্ত্রের চর্চার সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে আলোকপাত করেছেন। তিনি এক অর্থে হতাশাই প্রকাশ করেছেন এবং বিকল্প ব্যবস্থার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। ‘বাংলাদেশে একদিকে যেমন বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সংকট প্রকটতর, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের সম্ভাবনাও সুদূরপরাহত। এই পরিস্থিতিতে জনগণের সামনে একমাত্র আপাত বিকল্প হল শ্রমিক-কৃষক ও প্রগতিশীল মধ্যবিত্তের একটি ব্যাপক রাজনৈতিক কোয়ালিশন এই কোয়ালিশন সর্বোচ্চ ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বিকল্প রাজনীতি-সংস্কৃতির পথ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হলে এবং তার সথে সঙ্গতিপূর্ণ সাংগঠনিক ভিত্তি সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম হলে মুৎসুদ্দী পুঁজির হাত থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবে।’২৫
শরৎ সংখ্যা ৯৯
ক. অবিভক্ত বাংলায় ১৯৩৭ সাল থেকে শুরু করে পরবতী দীর্ঘ সময়ে মুসলিম লীগের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ও কৃষক প্রজা সমিতির নেতা ফজলুল হকের মধ্যে বাংলার রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে যে টানাপড়েন ও জিন্নাহ্র রাজনীতি প্রসঙ্গে দীর্ঘ বিশ্লেষণ লিপিবদ্ধ হয়েছে এনায়েতুর রহিমের ‘বাংলার রাজনীতিতে নেতৃত্বের সংকট ফজলুল হক বনাম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্’ আলোচনায়। শেষ বিচারে লেখক দেখিয়েছেন বাঙালির ভাষাপ্রীতি দুর্দান্ত। তাই অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হওয়ায় জিন্নাহ্ কোনো দিনই বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত নেতা হতে পারেননি। অন্যদিকে গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রাণের প্রকৃত যোগ থাকার কারণে অনেক ষড়যন্ত্রের পরও ফজলুল হক বাঙালি মুসলমানের অন্তরে শ্রদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত হননি।
শীত সংখ্যা ৯৯
সেলিনা হোসেন ‘সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষ’ প্রবন্ধে সংস্কৃতির একীভূত রূপকে গুরুত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ আলোচনার মধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছেন সংস্কৃতির স্তর বা পর্যায় থাকতে পারে কিন্তু কোনো ধরনের বিভাজন নেই। সংস্কৃতি-বিষয়ক আলোচনার অনেক ক্ষেত্রই ‘গণসংস্কৃতি’ নামে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিকে আলাদা করার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়, বিশেষকরে এখানেই সেলিনা হোসেনের আপত্তি। তিনি বহু মনীষীর বিচিত্রমুখি সংজ্ঞার্থ ও শিল্প-সাহিত্য, দেশ-বিদেশের অনেক উদাহরণ বিচার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, ‘[…] জীবনকে টুকরো ক’রে দেখা যায় না, সে-জীবন থেকে উদ্ভূত সংস্কৃতিকেও নয়। সংস্কৃতি তাই কোনো বিশেষ একদল মানুষের হয় না, তা সবার। সংস্কৃতিই গণসংস্কৃতি, সবার আবেগ, সবার বিষয়, সবার জীবন। কোন বিশেষ গোষ্ঠীর সংস্কৃতি অর্থে কোন গণসংস্কৃতি নেই।’২৬
বসন্ত সংখ্যা ৯৯
ক. অজয় রায় ‘বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস’ শিরোনামে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক বিচার বিশ্লেষণ করে ভূপ্রকৃতির গঠন-বিবেচনায় বাংলাদেশকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেছেন : ‘প্লিস্টোসিন উচ্চভূমি যথা বরেন্দ্রভূমি, মধুপুর লালমাই, ময়নামতি এলাকা; ক্ষুদ্র পাহাড়ী এলাকা— সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা, মৃতপ্রায় বদ্বীপ অঞ্চল—সমগ্র মধ্য বঙ্গ; পরিপক্ক বদ্বীপ অঞ্চল—ফরিদপুর এলাকা; সক্রিয় বদ্বীপ এলাকা—সমগ্র নিম্নবঙ্গ, সুন্দরবন খুলনার নিম্নাংশ, বরিশাল, নোয়াখালী অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগর উপকূল এলাকা।’২৭ প্রসঙ্গক্রমে প্রবন্ধের শেষ অংশে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ নামে এই বৃহৎ বদ্বীপ গঠনের ইতিহাস।
খ. বাংলা ভাষার উৎপত্তি-বিকাশ, ব্যবহার, তার সংগঠন ও বাঙালির সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ও আন্তরিক উপস্থাপনা মনসুর মুসার ‘ভাষা বহমান : বাংলা ভাষার কথা’ নিবন্ধ। এখানে প্রাবন্ধিক ভাষা বিশেষজ্ঞদের অভিমত এবং প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য বিশ্লেষণ করে বাংলা ভাষা সংগঠনের বৈচিত্র্য ও বহমানতা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তিনি তাত্ত্বিক আলোচনার সঙ্গে বাংলা ভাষা যে বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার প্রধান অবলম্বন তা যথার্থভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে।
গ. পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান এয়ার মার্শল আসগর খানের সম্পাদনায় ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় ‘ইসলাম, পলিটিক্স এন্ড দা স্টেট : দা পাকিস্তান এক্সপেরিএন্স’। পাকিস্তানের রাজনীতি ও ধর্মের পারস্পারিকতা নিয়ে বইটি লেখা হলেও গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধগুলোর মৌলবক্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই সার্বজনীনতা লাভ করেছে। এই গ্রন্থের ৬টি প্রবন্ধের বাংলা অনুবাদ কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের সম্পাদনায় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির আলোচনা ‘ইসলাম, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র—পাকিস্তান প্রসঙ্গে’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধ, লিখেছেন আসহাবুর রহমান। পাকিস্তানের রাজনীতির বর্তমান অবস্থার কথা বিবেচনা করে লেখক বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের সংশ্লেষের গভীরতাকে যথেষ্ট ভীতির কারণ বলে মনে করেছেন আলোচক।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪০০
ক. ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভয়াবহতা রূপায়িত হয়েছে কাজী তামান্নার ‘সাম্প্রদায়িকতা একটি অমানবিক ব্যাধি’ প্রবন্ধে’। প্রসঙ্গিকভাবেই ভারতবর্ষের আদি অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসঙ্গ অবতারণা করে তিনি সেই সময়ের ভারতবর্ষের অবস্থা উপস্থাপন করেছেন; পরবর্তী সময়ে তিনি বাবরি মসজিদের পূর্ব ইতিহাস ও উগ্রসাম্প্রদায়িকদের অবস্থা বিশ্লেষণের করে বাংলাদেশে এই ব্যাধি কীভাবে ছড়াচ্ছে তার প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন বিশেষ করে সংবিধান কর্তনকে অবলম্বন করে।
খ. দীর্ঘ আলোচনা, বিভিন্ন প্রত্নবস্তুর বিশ্লেষণ, অনেক তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ মনীষীদের মন্তব্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মমতাজুর রহমান তরফদার ‘মধ্যযুগের বাংলায় প্রযুক্তির ব্যবহার ও আর্থ-সামাজিক বির্বতনে’ দেখিয়েছেন যে, মধ্যযুগে বাংলায় যন্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার খুব বেশি ছিল না এবং নগরায়ণ ও আমাদের আর্থ-সামাজিক বিবর্তনে এগুলোর ব্যবহার তেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারেনি।
শরৎ সংখ্যা ১৪০০
ক বাংলাদেশের মুসলমানদের সামাজিক-মানসিক ও শিক্ষা-দীক্ষাগত উন্নতির ক্ষেত্রে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন মুসলিম সভা-সমিতির অবদান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ওয়াকিল আহমদ মুসলিমদের জাগরণের ক্ষেত্রে এই সব সভা-সমিতির গুরুত্ব ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর ‘ঢাকায় মুসলিম সভা-সমিতি’ লেখায়। তিনি ১৮৭৯ সালে গঠিত ‘সমাজ সম্মিলনী সভা’ থেকে শুরু করে ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ পর্যন্ত এ ধরনের ৯টি সংগঠনের ইতিহাস ও ভূমিকা উপস্থাপন করেছেন।
খ. একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রবন্ধ ‘সোনার বাংলা : উপকথা ও বাস্তব’। লেখক আকবর আলি খান আমাদের মধ্যে বহু পূর্ব থেকে প্রচলিত ‘বাংলাদেশ এক সময় সোনার বাংলা ছিল’ এই ধারণার সত্যাসত্য যাচাই করেছেন, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সহযোগে বিচার-বিশ্লেষণ করে। সব কিছু বিচার-বিবেচনা প্রাবন্ধিক মনে করেন এই ‘সোনার বাংলা তত্ত্ব’ মেনে নেওয়া কঠিন এমনকি বহুল কথিত শায়েস্তাখানের আমলসহ। কিংবদন্তীর সুলভ মূল্যের বিষেয়ে তাঁর বক্তব্য “…সুলভ মূল্য পণ্যের অতিরিক্ত সরবরাহ থেকে হয় নি, হয়েছে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার অভাবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে প্রাক্-বৃটিশ বাংলায় সুলভ মূল্য সমৃদ্ধি নয় দুর্দশার নিদর্শন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ‘সোনার বাংলা’ অনাপেক্ষিক অর্থে ‘সোনালী’ ছিল না। প্রাক্-শিল্প-বিপ্লব সমাজের সকল দুর্বলতাই প্রাক-বৃটিশ বাংলাতে উপস্থিত ছিল।”২৮
শীত সংখ্যা ১৪০০
ক. বিশ্ব পরিস্থিতি সাপেক্ষে আসহাবুর রহমান ইসলাম ধর্ম সৃষ্টির পর ধীরে ধীরে কখন কীভাবে তাঁর মধ্যে মৌলবাদ বাসা বাঁধল এবং তার অবস্থান দৃঢ় হল সেই তথ্য অনুসন্ধান করেছেন ‘ইসলামি মৌলবাদ ঐতিহাসিক পটভূমি’ এই আলোচনায়।
বসন্ত সংখ্যা ১৪০০
ক. বশীর আল্হেলাল ‘ভাষা-আন্দোলনের চরিত্রবিচার’ নামক আলোচনায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন জাতির ভাষাপ্রীতি, মাতৃভাষা সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষীর মন্তব্য এবং দেশভাগ, ভাষাআন্দোলন, আন্দোলনের রাজনৈতিক চারিত্র ও ঘটনাক্রম পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন ভাষা-আন্দোলন আসলে গণমানুষের আন্দোলন ছিল এবং তিনি বিশ্বাস করেন বিশ্ব ইতিহাসের বড় বড় গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোর মধ্যে ভাষা-আন্দোলন অন্যতম।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪০১
ক. সব বাঁধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে মনস্বী সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব, যাঁরা বাংলা ভাষার বিকাশ ও শ্রীবৃদ্ধি সাধনে নিজেদের সৃষ্টিকর্মকে নিবেদন করেছিলেন, যেমন : রামমোহন রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ সাধনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর ‘বাংলা ভাষার প্রতিবাদী চরিত্র’ প্রবন্ধে। বিভিন্ন ভাষার আগ্রাসন ও ঔপনিবেশিক শক্তির ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করে এই মহান ও কীর্তিমান পুরুষদের অবদানের কারণেই বাংলা ভাষা এখনও আলোক বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে।
খ. আবু জাফরের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব’ প্রবন্ধে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের প্রতিক্রিয়া বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশের ইতিবৃত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে।
শরৎ সংখ্যা ১৪০১
ক. বিজ্ঞান কী, বিজ্ঞান-চেতনা কী, বিজ্ঞানমনস্কতা কী? ইত্যাদি তাত্ত্বিক বিষয়ের আলোচনার মধ্য দিয়ে অজয় রায় ‘বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজনির্মাণ’ শিরোনামে প্রবেশ করেছেন আমাদের সমাজে-শিক্ষায় বিজ্ঞানের অবস্থা পর্যালোচনায়। তিনি দেখিয়েছেন বিজ্ঞানের জন্য যে যুক্তিবাদী সমাজ ও মুক্তচিন্তার মানুষ দরকার তার কত অভাব। বিজ্ঞানকে অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যে পরিণত করার প্রয়াস চলছে এখানে। স্কুলপাঠ্য বিজ্ঞান গ্রন্থে কত অসম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞানশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। সমাজের সর্বত্রই যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবের তীব্রতা প্রখর এই প্রবন্ধে তাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
খ. সন্তোষ গুপ্ত বিশ্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান ও বিকাশের পরিপ্রেক্ষিত উপস্থাপন করেছেন ‘ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধে। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা কীভাবে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে ব্যাধির মত ক্ষতি করছে তা চিহ্নিত করে সেখান থেকে মুক্তির পথ অনুসন্ধান করেছেন লেখক। তিনি মনে করেন, মৌলবাদের উত্থানের প্রধান কারণ ‘আমাদের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক চরিত্র ও অবস্থান।’ ‘আমাদের ইতিহাস বিচার-বিশ্লেষণের সনাতন পদ্ধতি—জনশ্রুতি ও বিশ্বাস নির্ভর ধারার পরিবর্তনের মধ্যে’ এই অবস্থা থেকে মুক্তি সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন মানুষকে আধুনিক ও মুক্তচিন্তার বাহন যে শিক্ষা সেই শিক্ষায় শিক্ষিত করে মনুষ্যত্বের বিকাশের অন্তরায় যে কোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের সোচ্চার করে তোলা।’২৯
শীত সংখ্যা ১৪০১
ক. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ‘আধুনিকতাবোধ ও বাংলাদেশ’ নামক প্রবন্ধে ‘আধুনিকতা’র তাত্ত্বিক দিক সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ‘আধুনিকতা ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের গণ্ডী টেনে দিয়েছে এবং ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে জনমনে : এ যেন একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ, একটি ঘটনার নজির, এর মধ্যে একটি জনসমষ্টি তার সমাজ-সম্পর্ক নির্ধারণ করেছে। নির্মাণ কিংবা নির্ধারণ, নির্মাণ এবং নির্ধারণ দুই-ই তৈরি হয় আধুনিকতার প্রক্রিয়া থেকে, যে প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঔপনিবেশিকতা থেকে এবং পশ্চাদ্পদতা ব্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে।’
বসন্ত সংখ্যা ১৪০১—’০২
ক. ইতিহাস বিশেষ করে উনিশ শতকের নবজাগরণের পরিপ্রেক্ষিতে সুরাইয়া বেগম রোকেয়ার অন্তর্গত আধুনিকতা বা প্রাগ্রসরতার নির্যাসকে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন ‘উনিশ শতক এবং রোকেয়ার সমাজ ও ধর্মচিন্তা’ শিরোনামে। বর্তমান সময়েও লেখক রোকেয়ার চিন্তা-চেষ্টার প্রতিফলন দেখতে না পেয়ে আক্ষেপ করেছেন।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪০২
ক. ‘বাংলাদেশ এবং আধুনিকতা’ প্রবন্ধে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর মনে করেন ‘বাংলাদেশের সমাজগঠনে, বর্তমান মুহূর্তে, আধুনিকতার তিনটি বোধ কাজ করছে : প্রথমটি হচ্ছে পশ্চিম উদ্ভূত সর্বগ্রাসী সভ্যতা ও সংস্কৃতি অনুসরণের বোধ। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকতা উদ্ভূত জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধের বোধ। তৃতীয়টি হচ্ছে ধর্ম উদ্ভূত মৌলবাদী নির্বাচিত প্রত্যাখ্যানের বোধ। প্রথম বোধের ভিত্তি বৈশ্বিক ধনতন্ত্র। দ্বিতীয় বোধের ভিত্তি জাতীয়তাবাদী ধনতন্ত্র। তৃতীয় বোধের ভিত্তি ইসলামী ধনতন্ত্র।’৩০ তিনি এই তিন বোধের সামগ্রিক আলোচনার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, এই তিন বোধের পারস্পারিকতার মাধ্যমে আমাদের সমাজ-সংগঠন সম্পন্ন হয়। তাই তাঁর বক্তব্য ‘বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির মধ্যে সমরূপতা, বিভিন্নতা এবং নৈর্ব্যক্তিকতার উপাদানগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’৩১ তিনি আধুনিকতা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে উত্তরাধুনিকতার সঙ্গে এর পারস্পারিকতা নিয়েও আলোকপাত করেছেন।
শরৎ সংখ্যা ১৪০২
ক. আমাদের জ্ঞানকাণ্ডগুলোর মধ্যে একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইতিহাস পঠন-পাঠন। ইতিহাস যেমন একটি জাতিসত্তার প্রকৃত বিকাশ সম্পর্কে অবহিত করে তেমনি ভবিষৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত ইতিহাসকে তত গুরুত্বপূর্ণভাবে পাঠ্যসূচিভুক্ত করা হচ্ছে না; একই সঙ্গে যথার্থভাবে পড়ান বা জানান হচ্ছে না। ‘শিশুর মানস গঠনে ইতিহাস : প্রাক্-স্কুল পর্যায়’, ‘ইতিহাসবোধ : প্রাথমিক স্কুল-পর্যায়’, ‘কিশোর মানস বিকাশে ইতিহাস : মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইতিহাস শিক্ষা’, ‘কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পঠন-পাঠন : ইতিহাস শিক্ষার দুইধারা—ইতিহাস বনাম ইসলামের ইতিহাস’, ‘মাদ্রাসায় ইতিহাস পঠনপাঠন : শুরু ও শেষ একই বৃত্তে’ এই পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত করে মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশে ইতিহাস পঠনপাঠনে’র চিত্র তুলে ধরেছেন।
শীত সংখ্যা ১৪০২
ক. অজয় রায় কৃত ‘ভূখণ্ড বাংলাদেশ জন-জাতি ও সভ্যতা-সংস্কৃতি’ সুন্দরম্ পত্রিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। অজয় রায় বাঙালির জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধানে বাংলাদেশে যে কয়জন মেধাবী মানুষ নিবেদিত তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বাঙালির জন-জাতি-সভ্যতা-ভূখণ্ড-ভাষা-সংস্কৃতি-নামকরণ-ঐতিহ্য সৃষ্টির সার্বিক চিত্র অন্বেষণে সর্বদাই থেকেছেন নিবেদিত। তাঁর এই দীর্ঘ প্রয়াসের সারাৎসার এই প্রবন্ধটি। ‘নামের উৎস সন্ধানে’, ‘জন্মের উৎস সন্ধানে’, ‘নদীর কেন এই চঞ্চলতা’, ‘জন ও জাতির সন্ধানে’, ‘সাংস্কৃতিক ভিতের সন্ধানে’ ইত্যাদি উপশিরোনামে অজয় রায় বাঙালির উৎস অনুসন্ধান করেছেন এই প্রবন্ধে। শেষ বিবেচনায় তিনি বলেছেন, ‘…আবহমান কাল থেকে পূর্বদেশীয় ঐ সমন্বয়ধর্মী জন-সংস্কৃতির একত্ব এবং পুরাকাল থেকে ভাষার একত্ব বাঙালী জন ও জাতি সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে এতে সন্দেহ নেই।’৩২
খ. ১৯৪৭ থেকে ’৭১ পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাহিত্য-সম্মেলনের খতিয়ান উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিপ্লবী এই সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে ওঠার পেছনে এই সব সংগঠন ও সভা-সমাবেশের ভূমিকা পর্যালোচনা করেছেন ইসরাইল খান ‘সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাহিত্য-সম্মেলন’ শিরোনামে।
বসন্ত সংখ্যা ১৪০২
ক. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেতনা : স্বাধীন বাংলাদেশে’ প্রবন্ধটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা নিয়ে যে রাজনৈতিক অপপ্রয়াস চেলেছে তারই তথ্যপূর্ণ উপস্থাপনা। বাঙালি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বিতর্ক এই আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। গবেষক দেখিয়েছেন কীভাবে একজন রাষ্ট্রনায়ক এই বিতর্কের প্রধান অংশীদারে পরিণত হয়েছিলেন।
খ. শহিদুল ইসলাম পরাধীন ভারতবর্ষে সিপাহী বিদ্রোহ, বঙ্গভঙ্গ এবং বঙ্গভঙ্গ রদ, সুমলিম লীগ, কংগ্রেস গঠন ও বাংলদেশ সৃষ্টির পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থা এবং স্যার সৈয়দ আহমদ ও লর্ড কার্জনের ব্যক্তিগত ভূমিকা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভারতবর্ষে সম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান-বিকাশ এবং পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও এই রাজনীতি বিস্তারের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছেন ‘রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা—ইতিবৃত্তের সন্ধানে’ আলোচনায়।
শরৎ সংখ্যা ১৪০৩
ক. উনিশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সমাজিক, বিপ্লবী ঘটনাবলি এবং তাৎপর্যপূর্ণ সাহিত্য-সৃষ্টি ও কিছু ব্যক্তির ঐকান্তিক প্রয়াস সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমানের মানসিক ও সামাজিক জীবনের সেই অর্থে উল্লেখযোগ্য বিকাশ ও উন্নতি কেন ঘটেনি তারই কারণ অনুসন্ধান করেছেন মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান ‘উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের সামাজিক ভুবন’ নামক প্রবন্ধে। বিশ শতকের প্রথম দশকেই প্রত্যাশিত সেই পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
শীত সংখ্যা ১৪০৩
ক. আনিসুজ্জামান শেকড় সন্ধানী আলোচনার মধ্যদিয়ে উনিশ শতকের প্রারম্ভ থেকে ভারতবর্ষে ধর্ম, ধর্মের সংস্কার, ধীরে ধীরে রাজনীতিতে ধর্মের সংশ্লেষ ও ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি-সমাজ-ব্যক্তিজীবনে সাম্প্রদায়িকতার উদ্বোধন এবং তার ভিত্তিতে দেশভাগের ইতিহাস উপস্থাপনা করেছেন ‘বাংলাদেশে ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্র’ প্রবন্ধে। দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িকতা-মুক্ত, সম্মিলিত উদার জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তিতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও ১৯৭৫ সালের পর থেকে এদেশে রাজনৈতিক কূটচালে রাষ্ট্র-দেশ-জাতীয়তাকে ধর্মাশ্রয়ী করে তোলার যে তৎপরতা শুরু হয়েছে তার কারণ ও প্রতিফল প্রসঙ্গে আলোকপাত করেছেন প্রাবন্ধিক। এই প্রয়াসের ফলে দেশে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পর্যন্ত সংঘটিত হয়। বহু ধর্মের লোক বসবাসকারী ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এমন দেশে রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা ও রাজনীতিতে ধর্মের সংযুক্তি বিবেকবান বাঙালি মাত্রকেই ভয়াবহ কিছু প্রশ্নের সম্মুখিন করে তুলেছে।
খ. বাঙালির জাতিসত্তার বিকাশ, জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ, এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্পৃহা নির্মাণে কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রভাব-প্রণোদনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ স্থান পেয়েছে বি. এম. রেজাউল করিম রচিত ‘জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও উত্তরণ : নজরুল ইসলামের অবস্থান’।
বসন্ত সংখ্যা ১৪০৩
ক. বশীর আলহেলাল তাঁর ‘ভাষা-আন্দোলনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট’ প্রবন্ধে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, বাঙালির দীর্ঘ সময়ের শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাসই বাঙালির ভাষা-আন্দোলনকে অনিবার্য করে তুলেছিল। যে কারণে ভাষা-আন্দোলন কখনোই কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়— এই আন্দোলন দেশবিভাগের আগে থেকে শুরু হয়ে অন্তত ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে উর্দুর সঙ্গে বাংলা যখন অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় তখন পর্যন্ত কিদ্যমান ছিল।
খ. গভীর নিষ্ঠা, যথেষ্ট তথ্য ও যৌক্তিক বিচার বিশ্লেষণের ফসল ওয়াকিল আহমদের ‘বাংলার মুসলিম এলিট : উনিশ শতকের প্রথমার্ধ’। বাঙালির জাতীয় উন্নতির ইতিহাসে একটি বড় দুর্ভাগ্য জনক অধ্যায় উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা-সংস্কৃতি-চাকুরিতে পিছিয়ে থাকা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আধুনিক জীবনচেতনার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত না করা। ওয়াকিল আহমদ উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কিছু শিক্ষিত মানুষ ও কিছু অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান মুসলিমদের জাগরণ নিয়ে ভেবেছেন। প্রাবন্ধিক হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিমদের এই সব সাময়িক ও সংক্ষিপ্ত উদ্যোগের পর্যালোচনার মাধ্যমে দেখিয়েছে সামান্য কিছু চেষ্টা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা মুসলিম-জাগরণে কোন ভূমিকা রাখেনি।
শরৎ সংখ্যা ১৪০৪
ক. আবেগ ও যুক্তি একই সঙ্গে ক্রিয়াশীল সেলিনা হোসেনের ‘সংস্কৃতি ও নারী’ প্রবন্ধে। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশে নারীর অবস্থান পর্যালোচনা করেছেন সেলিনা হোসেন। কথাসাহিত্যিকের অসাধারণ স্বাদু গদ্যে সেলিনা হোসেন আমাদের পুরুষ-শাসিত সংস্কৃতিতে নারী কীভাবে নিগৃহীত হয়-হচ্ছে এবং দেখিয়েছেন কীভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা এক অর্থে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়ই চলে নারীর উপর নির্যাতন। বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামালের আদর্শের কথা উল্লেখ করে সেলিনা হোসেন আমাদের প্রধান মন্ত্রী ও বিরোধী দল-প্রধান এই দুই নারী নেত্রীর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন এই অবস্থা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা গ্রহণের। অর্থনৈতিক, সামাজিক, শারীরিক এমনকি কর্মক্ষেত্র ও সংসার সর্বত্রই নারীরা অবহেলিত হচ্ছে। এই ব্যর্থতা আমাদের সংস্কৃতির ব্যর্থতা, বহু আগে থেকেই সংস্কৃতি নারীকে তার সম্মানজনক অবস্থান দেয়নি।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪০৫
ক. আমাদের চেতনার সঙ্গে ভাষা তথা ভাষা আন্দোলনের গভীর সম্পর্কের ইতিবৃত্ত উপস্থাপিত হয়েছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’ প্রবন্ধে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশভাগের যে উদ্যোগ নেয় হয়েছিল তা বাঙালিকে একত্র করেছিল এবং অনিবার্য করে তুলেছিল ’৪৭ এর দেশভাগ। কিন্তু আমরা বুঝতে পেরেছিলাম ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের অসাড়তা। ফলে ভাষার প্রশ্নে সব বিভেদ নিমূর্ল হয়ে গিয়েছিল। ধর্ম ও শ্রেণির বিভেদ ভুলে বাঙালি এক হয়ে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে ছিল এবং ’৫২ থেকে ’৭১ পর্যন্ত আমাদের সেই চেতনা বিভিন্ন মাত্রায় গভীরতা লাভ করে জাতিসত্তার শেকড়কে স্পর্শ করেছিল। ধর্ম নয় এই সময়ে ভাষাকে কেন্দ্র করে আমাদের চৈতন্যে জাতি সম্পর্কে যে সব মৌল প্রত্যাশার জন্ম হয়েছিল তারই প্রতিফলন ঘটেছিল আমাদের সংবিধানের চার মূল নীতির মধ্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্য জনক হলেও সত্য অল্প কিছু দিনের মধ্যে আমরা সেই নীতিকে কর্তন করেছি এবং আমাদের অগ্রগতির মুখটাকে আবারও ’৪৭ এর দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছি। কষ্টার্জিত সর্দ্থক চেতনার এই পরিণতির জন্য সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কণ্ঠে আক্ষেপ ধ্বনিত হয়েছে।
শরৎ সংখ্যা ১৪০৫
ক. আনিসুজ্জামান মূলত বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে সংস্কৃতির যে ভিন্নতা তার উপর আলোকপাত করেছেন ‘সাংস্কৃতিক বহুত্ব’ আলোচনায়। সংস্কৃতির তাত্ত্বিক দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও গ্রহণ বর্জনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি এগিয়ে যায়। এক সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির মিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিলন যদি যথার্থ হয় তবে তা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে আর তা না হলে বিরোধ তৈরি করে। বাংলাদেশে বাঙালির প্রকৃত সংস্কৃতি থেকে সরে গিয়ে, ধর্ম-কেন্দ্রিক যে সংস্কৃতি চালুর চেষ্টা হয়েছে বা হয়ে থাকে তারই সমলোচনা করেছেন লেখক।
শীত সংখ্যা ১৪০৫
ক. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ দেশে-সমাজে নারীর বর্তমান অবস্থা চিত্রিত করতে গিয়ে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত থেকে তা বিচার করার চেষ্টা করেছেন ‘বাংলাদেশে নারীমুক্তি আন্দোলন : ইতিহাসের প্রেক্ষিতে’ আলোচনায়। সমাজ-ধর্ম-রাষ্ট্র নারীকে ঐতিহাসিক কাল থেকে দমিত করে রেখেছে। একটি জাতি কতটুকু উন্নত অথবা জাতির অগ্রগতির মাত্রা কেমন হবে তা নির্ভর করে সেই সমাজে নারীর অবস্থান কেমন এবং কর্মক্ষেত্রে তার অংশগ্রহণ কতটুকু। সামাজিক-রাষ্ট্রিক আধিপত্য ও শারীরিক বল এই সব কারণে পুরুষরা সর্বকালেই নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪০৬
ক. বাঙালি মুসলমান কারা? তাদের ধর্মীয় পরিচয় কী? জাতিগত পরিচয় কী? ‘বঙ্গীয় মোসলমানে’র ভাষা কী? বঙ্গীয় মোসলমান থেকে বাঙালি মুসলমানে উত্তরণ কীভাবে? উনিশ শতকের নবজাগরণে মুসলমানদের অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি কেন? ইত্যাদি প্রশ্নের অবতারণা ও উত্তর অনুসন্ধান করা হয়েছে মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ‘বাঙালী মুসলমানের ‘ভাষা-ভাবনা’ এবং প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাসা’ নামক প্রবন্ধে। ‘বঙ্গীয় মোসলমান’—যাদের মাতৃভাষা কী এই নিয়ে প্রশ্ন শুরু হয়ে ছিল অনেক আগে থেকেই, সেই মুসলমানের পরিচয় যে এখন শুধুই বাঙালি এই সত্যে পৌঁছানর পরিক্রমাই বিবৃত হয়েছে এই আলোচনায়।
শরৎ সংখ্যা ১৪০৬
ক. বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক, উদার, বিশ্বজনীন ও সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ সৃজনে রণেশ দাশগুপ্তের ভূমিকা সর্বজন স্বীকৃত। তিনি যেমন ছিলেন একজন কর্মী তেমনি ছিলেন একজন অসাধারণ সংগঠক। পূর্ববাংলায় ঢাকা-কেন্দ্রিক প্রগতিশীল একদল তরুণকর্মী নির্মাণ এবং দেশেবিদেশে ফ্যাসিবাদী যে-কোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার সমাজ তৈরির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত। তাঁর এ ধরনের জাতীয়-চেতনা সঞ্চারী প্রথম দিকের একটি পদক্ষেপ ছিল ঢাকায় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠা। বিশ্বজিৎ ঘোষ ‘ঢাকায় প্রগতি লেখক-আন্দোলন ও রণেশ দাশগুপ্ত’ শীর্ষক আলোচনায় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলাদেশে যে তরুণরা প্রগতি আন্দোলনে ছিলেন একনিষ্ঠ, কীভাবে তাঁদের নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়েছিলেন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব রণেশ দাশগুপ্ত তার ইতিবৃত্ত উপস্থাপন করেছেন। মূল আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে প্রাবন্ধিক বিভিন্ন দেশে ফ্যসিবাদ বিরোধী শিল্পী-সাহিত্যিকদের সংগঠন গড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিত সংশ্লিষ্ট করেছেন, যা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
বসন্ত সংখ্যা ১৪০৬
ক. সেলিনা হোসেন আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে একুশে ফেব্র“য়ারির প্রভাব অলোচনা করেছেন ‘সংস্কৃতি ও অমর একুশ’ প্রবন্ধে। আমাদের মহৎ যে-কোনো অর্জনের ক্ষেত্রে তার চেতনার অন্তর্গত সত্তায় ক্রিয়াশীল থেকেছে অমর একুশের প্রেরণা। ভাষার প্রতি আমাদের ভালবাসা অনেক, কখনো বহির্শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলেও আমরা একুশের চেতনাতেই বলীয়ান হয়ে দেশকে রক্ষা করব। কিন্তু আমরা আমাদের ভাষার মর্যাদা কতটুকু রক্ষা করছি? বাংলা একাডেমি সরকারের আজ্ঞাবহে পরিণত হয়েছে। তিনি বাংলা একাডেমির স্বায়ত্তশাসন চান না, স্বাধীনভাবে কাজকরার জন্য চান একাডেমির স্ব-নিয়ন্ত্রণ।
খ. চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা-দীক্ষা প্রভৃতিতে মুসলিমদের পিছিয়ে থাকার কারণ অনুসন্ধান এবং তাদের আত্মোত্তরণ-প্রয়াসের শেষ নিদর্শন মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠনের ইতিবৃত্ত উপস্থাপন করেছেন হাবিব রহমান। তিনি ‘ঢাকার বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন : সাফল্য-অসাফল্যের খতিয়ান’ প্রবন্ধে এই সংগঠনের কার্যক্রমের পাশাপাশি এর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা এবং এর প্রধান প্রধান সদস্যদের পরিণতি সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।
গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪০৭
ক. মুহম্মদ ইদ্রিস আলী ‘বাঙালী বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে মধ্যযুগে বাংলা সংস্কৃতির তিনটি ধারাকে চিহ্নিত করেছেন : “এক. লৌকিক সংস্কৃতিসহ মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধের যৌথ সংস্কৃতি। […] দুই. মুসলিম সংস্কৃতি তিন. হিন্দু সংস্কৃতি।”৩৩ তাঁর বিবেচনায় প্রথম ধারার সংস্কৃতিই আমাদের সংস্কৃতি। তিনি মধ্যযুগ থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত এই ধারার প্রবণতাসমূহ চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।
খ. কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্যক্তিগত ও রাজনীতির স্বার্থে ও দেশ পরিচালনাকে সহজতর করতে অবিভক্ত ভারতে ও পূর্ববাংলায় যেসব উদ্ভট পরিকল্পনা এবং রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে যেসব নতুন ধ্যান-ধারণা প্রবর্তনের চেষ্টা করেছেন তাকে মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জিন্নাহ-সৃষ্ট কালচার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার এই ব্যবস্থা আমাদের অগ্রগতির জন্য কীভাবে সমস্যার সৃষ্টি করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে ‘জিন্নাহ-সৃষ্ট কালচার ও বাঙালীর বন্ধুর পথ’ প্রবন্ধে।
গ. বিশ শতকের প্রারম্ভে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে বাঙালি বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজের যেসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সভা-সমিতি কিংবা পত্রিকা বাঙালির জাগরণ, আত্মিক উন্নয়ন, ইহলৌকিক সুস্থ-চেতনার বিকাশ ও রাজনৈতিক-সামাজিক জীবনের সার্বিক কল্যাণার্থে সর্দ্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তাদের ভূমিকা বিশ্লেষিত হয়েছে স্বরোচিষ সরকারের ‘বিশ শতকের মুক্তবুদ্ধি চর্চা’য়।
শরৎ সংখ্যা ১৪০৭
ক. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ‘বাংলাদেশ, বাঙালী—স্বরূপের সন্ধান’ প্রবন্ধে হাজার-লক্ষ বছর আগে থেকে এই অঞ্চল ও অঞ্চলের অধিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত, ভূতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক সর্ববিধ বিষয়াদি পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন নিয়তিসিদ্ধভাবেই এই অঞ্চলের মানুষ বাঙালি। তিনি সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন যে, ‘এতাবৎকালে ছিল চারিপার্শ্বে বিভাজন-সীমানা বেষ্টিত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অধিবাসী সাধারণ, নামপরিচিতিতে তারা বাঙালী। এবং অবশ্য হাজার বছরের ঐতিহ্য-বহমানতায়, নানা বংশরক্তের সংমিশ্রণ-ধারাবাহিকতায় আর ভাষা-সংস্কৃতির সংকর উত্তরাধিকারে ঋদ্ধ বিশেষ সেই বাঙালীজনগোষ্ঠী। অতঃপর ’৭১ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় থেকে আহৃত, সংযোজিত হলো রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্বের পরিচিতি অভিধা ‘বাঙালী’।’৩৪ (পৃ. ৯)
খ. রাজনৈতিক ইতিহাসের পর্বে পর্বে গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলার সংস্কৃতির অব্যাহত অগ্রযাত্রার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে আবদুল মমিন চৌধুরীর ‘ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বাংলার সংস্কৃতি’ আলোচনায়। তিনি সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, ‘এই আবর্তন-বিবর্তনের মধ্যে, আত্মীকরণ-সাঙ্গীকরণের মধ্যে ঐক্য থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু অনৈক্য যে ছিল তারই ইঙ্গিত আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াসে। সামগ্রিক ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা থাকলেও সাংস্কৃতিক অনৈক্যকে ইতিহাস অস্বীকার করতে পারে না।’৩৫
গ. কবীর চৌধুরী ‘মৌলবাদ : তার ইতিহাস ও প্রকৃতি’ প্রবন্ধে মৌলবাদ কী? দেশে দেশে মৌলবাদের বিস্তার ও প্রকৃতি বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের বিস্তার সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন। স্বাধীনতার এক দশক পার হওয়ার আগেই মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী পাকিস্তানী মৌলবাদ সুযোগমত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কেমন করে বাংলাদেশে তার থাবা বিস্তার করেছে এবং আমাদের সব শুভ চেতনাকে বিনষ্ট করছে তার ইতিবৃত্ত এই প্রবন্ধ।
বসন্ত ১৪০৭—গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪০৮ [প্রকাশকাল : অক্টোবর ২০০১]
ক. আমাদের বিবেচনার শেষ প্রবন্ধ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ‘চাওয়া-পাওয়া ও না-পাওয়ার হিসেব’। চাওয়া পাওয়ার হিসেব সব সময় মেলে না, না মেলাটাই হয়ত নিয়ম, ব্যক্তি জীবনে কি জাতীয় জীবনে। বিশ শতক জুড়ে নানা অত্যাচার নিপীড়ন, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন-সংগ্রাম, রক্ত-জীবন ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজকের এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। প্রতিটি ঘটনা, ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন-স্বার্বভৌম রাষ্ট্র যেমন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল তেমনি প্রতি ক্ষেত্রেই স্বাধীন দেশের কাছে আমাদের প্রত্যাশার পরিধিও বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিংশ শতাব্দী শেষ করে এসে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসেব মেলাতে বসেছেন। কিন্তু স্বাধীন দেশে সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা, জীবনের নিরাপত্তাহীনতা, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা, দেশে খুন ও ধর্ষণের পরিসংখ্যান দেখে তিনি হিসেব মেলাতে পারেননি। তিনি বেদনার্ত হয়েছেন, তারপরও আশা ছাড়েননি। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের দৃঢ় বিশ্বাস প্রগতিবাদী শক্তির সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে।
উপসংহার
সুন্দরম্ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জাতিসত্তা প্রসঙ্গ-সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধগুলো পর্যালোচনার পর আমরা নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমূহে উপনীত হতে পারি :
ক. সুন্দরম্এ প্রকাশিত মূলপ্রবন্ধসমূহের ২১.৮৫% ভাগ বাঙালি জাতিসত্তা-কেন্দ্রিক। যা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সাহিত্য ও শিল্প-বিষয়ক অনেক প্রবন্ধের মৌল চেতনা আমাদের জাতিসত্তা-সংশ্লিষ্ট। কিন্তু এই সব প্রবন্ধগুলোকে আমরা জাতিসত্তার সঙ্গে পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট বিবেচনা করেছি।
খ. সেনা-পরিচালিত শাসন-ব্যবস্থায় যখন স্বাধীন মত প্রকাশ ছিল নিয়ন্ত্রিত সেই অবস্থায় ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়েও সুন্দরম্ ত্রৈমাসিক আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি-চর্চায় এবং জাতীয় চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়েছে।
গ. ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে দ্বিখণ্ডিত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয় তা বাঙালি জাতির ঐক্য-চেতনাকে দ্বিধান্বিত করে রাখে দীর্ঘকাল এবং এরই পরিণতি ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ। কিন্তু ঔপনিবেশিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ বাঙালি জাতি ১৯৪৮ থেকে ১৯৭০ এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একতাবদ্ধভাবে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে জয় লাভ করে, ফলে আমাদের ওপর আরোপিত জাতীয়তাবাদের সংকটের সাময়িক সমাধান হয়। সংবিধানের মূলনীতিসহ প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন আমাদের জাতীয়-চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে, যা আমাদের জাতিসত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আর এখানেই সুন্দরম্রে জাতিসত্তা-বিষয়ক ভাবনা প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ঘ. সুন্দরম্রে বিভিন্ন প্রবন্ধের মাধ্যমে আমাদের জাতিসত্তার বিকাশ পরিণতির সামগ্রিক দিক বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধগুলোর মধ্যে জাতিসত্তার স্বরূপ সন্ধানের প্রয়াস অনুধাবন করা যায়।
চ. কিছু প্রবন্ধে আজকের বাংলাদেশ নামক এই বৃহৎ ব-দ্বীপ সৃষ্টি ও এর নামকরণ ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিশ্লেষিত হয়েছে।
ছ. বাংলাদেশ মূলত মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল, ফলে তাদের মানস পরিক্রমার সঙ্গে এই অঞ্চলের সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই বিবেচনা থেকেই সুন্দরম্-এ জাতিসত্তা-বিষয়ক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মুসলিম-প্রসঙ্গ, যা সমসাময়িক চিন্তন-প্রক্রিয়ার বিবেচনায় স্বাভাবিক। বিশেষকরে উনিশ শতকে মুসলিম মানসের পশ্চাদ্পদতার কারণ, নবজাগরণের প্রবাহে একাত্ম হতে না পারা। এর পরিণতিতে বাঙালি মুসলমান তথা এই অঞ্চলের বাঙালির পিছিয়ে পরার ইতিহাস এসব প্রবন্ধে উন্মোচিত হয়েছে। বিবৃত হয়েছে বঙ্গীয় মুসলমান থেকে বাঙালি মুসলমানে পরিণত হওয়ার ধারাক্রম।
জ. বহু তথ্য ও যুক্তি-নির্ভর আলোচনার ও বিভিন্ন পর্যটক ও দেশি-বিদেশি ইতিহাস-বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিরাজমান বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুসলিম লেখকদের রচনায় স্বদেশ ও মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগের পরিচয় লিপিবদ্ধ হয়েছে।
ঝ. ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্লাবী চেতনা আমাদের জাতীয় ঐক্যকে সংহত ও দৃঢ় রূপ দান করেছে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়ী প্রবণতাকে কীভাবে শানিত ও প্রাণিত করেছে— বিভিন্ন প্রবন্ধে তা পরিস্ফুট হয়েছে।
ঞ. ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির উপর যে-কোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিরন্তর প্রেরণার উৎস। এই সত্য প্রবন্ধগুলোর মধ্যে দৃঢ়ভাবে অভিব্যক্ত।
ঞ. ভাষা আন্দোলনের পর থেকে আমাদের সংস্কৃতি-বিরোধী, স্বাধীনতা-বিরোধী ও জাতীয় স্বার্থ-বিরোধী যে-কোনো কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিসত্তা থেকেছে ঐক্যবদ্ধ। এই ঐক্যপ্রয়াসের ভিত্তি হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য।
ট. বাঙালি মুসলমান তথা এই বঙ্গের বাঙালি মুসলমানের আত্মজাগরণে মুসলিম সাহিত্য সমাজ বা শিখা গোষ্ঠীর ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে।
ঠ. এই ভূখণ্ডের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে সুন্দরম্রে কোনো প্রবন্ধে আলোকপাত করা হয়নি।
বাঙালি জাতিসত্তার স্বরূপ-নির্ণয় প্রয়াসে সুন্দরম্ সর্বদাই ছিল একনিষ্ঠ, নির্ভীক ও নিরলস। আমাদের জাতীয় একতা ও অগ্রগতির স্বার্থে এবং সময়ের প্রয়োজনে যা ছিল একান্ত প্রয়োজন। তাই আমাদের সকল ধরনের জাতীয় ভ্রষ্টাচারের অপচেষ্টার মুহূর্তে ত্রৈমাসিক সুন্দরম্ বাঙালি জাতির বাতিঘর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তথ্যসূত্র
১. অজয় রায়, ‘বাঙালির জন্ম—একটি নৃবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শরৎ সংখ্যা ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৩, আগস্ট-অক্টোবর ’৮৬, ঢাকা, পৃ. ৬১
২. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ, ‘উনিশ শতকের বাংলাদেশ : মুসলিম মানসে রেনেসাঁ-ভাবনা’, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭১
৩. ‘সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, উনিশ শতকে বাঙালীর ইতিহাস-চেতনা’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শীত সংখ্যা ১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৩ নভেম্বর ’৮৬ জানুআরি ’৮৭, ঢাকা, পৃ. ৪৭
৪. মমতাজুর রহমান তরফদার, ‘প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙালী সংস্কৃতি : আত্মপরিচয়ের সন্ধানে’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম,বসন্ত সংখ্যা ১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ’৯৩ -বৈশাখ ’৯৪, ফেব্র“য়ারি-এপ্রিল ’৮৭, ঢাকা, পৃ. ৮
৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮
৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮-৯
৭. খোন্দকার সিরাজুল হক ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ : একটি নতুন কণ্ঠস্বর’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, গ্রীষ্ম সংখ্যা ১ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৪ মে-জুলাই ’৮৭, পৃ. ২৭
৮. প্রাগুক্ত. পৃ. ৩৩
৯. অজয় রায়, ‘বাঙালির জন্ম : একটি পুরাবৃত্তিক অনুসন্ধান’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শরৎ সংখ্যা ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৪ আগস্ট-অক্টোবর ’৮৭, ঢাকা, পৃ. ১৯
১০. আসহাবুর রহমান, ‘দক্ষিণ এশিয়ার জাতিপ্রশ্ন : বাংলাদেশ’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, বসন্ত সংখ্যা ২য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ’৯৪ -বৈশাখ ’১৩৯৫ ফেব্র“য়ারি-এপ্রিল ’৮৮, ঢাকা, পৃ. ১৬
১১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬
১২. অজয় রায়, ‘বাঙালির জন্ম : একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, গ্রীষ্ম সংখ্যা ২য় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৫ মে-জুলাই ’৮৮, ঢাকা, পৃ. ১৪
১৩. আবদুল মমিন চৌধুরী, ‘হাজার বছরের পুরাতন বাঙালী : প্রাচীন বাংলার ‘ব্যক্তিত্ব’’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শরৎ সংখ্যা ৩য় বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৫ আগস্ট-অক্টোবর ’৮৮, ঢাকা, পৃ. ১
১৪. অজয় রায় ‘বাঙালীর জন্ম : একটি জাতিতাত্ত্বিক অনুসন্ধান’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শীত সংখ্যা ৩য় বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৫ নভেম্বর ’৮৮ জানুআরি ’৮৯, ঢাকা, পৃ. ১২
১৫. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ, ‘উনিশ শতকে বাংলার মুসলমান : শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, বসন্ত সংখ্যা ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ’৯৫ -বৈশাখ ’৯৬ ফেব্র“য়ারি-এপ্রিল ’৮৯, ঢাকা, পৃ. ৩৬
১৬. যতীন সরকার, ‘আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, গ্রীষ্ম সংখ্যা ৩য় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৬ মে-জুলাই ’৮৯, ঢাকা, পৃ. ১
১৭. আবু জাফর শামসুদ্দীন, ‘বাঙালীর আত্মপরিচয়’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শরৎ সংখ্যা ৪র্থ বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৬ আগস্ট-অক্টোবর ’৮৯, ঢাকা, পৃ. ১
১৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪
১৯. মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান, ‘বাঙালী মুসলমানের আত্মঅšে¦ষার স্বরূপ’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শীত সংখ্যা ৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৬ নভেম্বর ’৮৯ জানুআরি ’৯০, ঢাকা, পৃ. ৩৪
২০. অজয় রায়, ‘বাঙালীর জন্ম : একটি ভাষাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, বসন্ত সংখ্যা ৪র্থ বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ’৯৬-বৈশাখ ’৯৭; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ’৯০, ঢাকা, পৃ. ১
২১. শহিদুল ইসলাম ‘উনিশ শতকের বাংলায় রেনেসাঁ’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শীত সংখ্যা ৫ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৭ নভেম্বর ’৯১ জানুয়ারি ’৯১, ঢাকা, পৃ. ৯
২২. শামসুল আলম সাঈদ ‘জাতীয়তাবোধে সিরাজদ্দৌলা কাল্ট ও ‘পলাশির যুদ্ধ’’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, গ্রীষ্ম সংখ্যা ৫ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৮; মে-জুলাই ১৯৯১, ঢাকা, পৃ. ২৭
২৩. অজয় রায়, ‘বাঙালীর জন্ম : একটি বর্ণতাত্ত্বিক আলোচনা’, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৬
২৪. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ‘বাংলাদেশে ধর্মের রাজনীতি’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, বসন্ত সংখ্যা ৬ষ্ঠ বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ’৯৮-বৈশাখ ৯৯; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ’৯২, ঢাকা, পৃ. ১৮
২৫. ফেরদৌস হাসান, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ : একটি আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, গ্রীষ্ম সংখ্যা ৬ষ্ঠ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৯; মে-জুলাই ১৯৯২, ঢাকা, পৃ. ৬৯
২৬. সেলিনা হোসেন ‘সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষ’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শীত সংখ্যা ৭ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৯; নভেম্বর ’৯২ জানুয়ারি ’৯৩, ঢাকা, পৃ. ১৪
২৭. অজয় রায়, ‘বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, বসন্ত সংখ্যা ৭ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন’৯৯-বৈশাখ’১৪০০; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ’৯৩, ঢাকা, পৃ. ৬
২৮. আকবর আলি খান, ‘সোনার বাংলা : উপকথা ও বাস্তব’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শরৎ সংখ্যা ৮ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০০; আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯৩, পৃ. ৮৪
২৯. সন্তোষ গুপ্ত, ‘ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শরৎ সংখ্যা ৯ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০১; আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯৪, ঢাকা, পৃ. ৭২
৩০. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, ‘বাংলাদেশ এবং আধুনিকতা’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, গ্রীষ্ম সংখ্যা ৯ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৪০২; মে-জুলাই ’৯৫, ঢাকা, পৃ. ৩৬
৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬
৩২. অজয় রায়, ‘ভূখণ্ড বাংলাদেশ জন-জাতি ও সভ্যতা-সংস্কৃতি’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শীত সংখ্যা ১০ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ১৪০২; নভেম্বর ’৯৫—জানুয়ারী ’৯৬, ঢাকা, পৃ. ১৪
৩৩. মুহম্মদ ইদ্রিস আলী, ‘বাঙালী বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪শ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৪০৭/ মে-জুলাই ২০০০, ঢাকা, পৃ. ৫
৩৪. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, ‘বাংলাদেশ, বাঙালী—স্বরূপের সন্ধান’, সুন্দরম্ সম্পাদক : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, শরৎ সংখ্যা ১৪শ বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০৭ / আগস্ট-অক্টোবর ২০০০, ঢাকা, পৃ. ৯
৩৫. আবদুল মমিন চৌধুরী, ‘ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বাংলার সংস্কৃতি’, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬

পরিশিষ্ট
সুন্দরম্ পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত মোট প্রবন্ধ এবং জাতিসত্তা সম্পর্কিত প্রবন্ধের
শিরোনাম, সংখ্যা ও লেখক-নামের তালিকা
সুন্দরম্রে
সংখ্যা মোট প্রবন্ধ জাতিসত্তা-সম্পর্কিত প্রবন্ধের সংখ্যা জাতিসত্তা-সম্পর্কিত প্রবন্ধের
লেখক-নাম ও শিরোনাম
১. শরৎ সংখ্যা ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৩ আগস্ট-অক্টোবর ’৮৬ ৭ ৩ ক. অজয় রায় : বাঙালির জন্ম—একটি নৃবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান
খ. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ : উনিশ শতকের বাংলাদেশ : মুসলিম মানসে রেনেসাঁ-ভাবনা
গ. মুনতাসীর মামুন : পূর্ববঙ্গে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন
২. শীত সংখ্যা ১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৩ নভেম্বর ’৮৬ জানুআরি ’৮৭ ৮ ১ ক. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : উনিশ শতকে বাঙালীর ইতিহাস- চেতনা

৩. বসন্ত সংখ্যা ১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ’৯৩ -বৈশাখ ’৯৪ ফেব্র“য়ারি-এপ্রিল ’৮৭ ৯ ১ ক. মমতাজুর রহমান তরফদার : প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙালী সংস্কৃতি : আত্মপরিচয়ের সন্ধানে
৪. গ্রীষ্ম সংখ্যা ১ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৪ মে-জুলাই ’৮৭ ৯ ৩ ক. অজয় রায় : বাঙালির জন্ম : একটি প্রাগৈতিহাসিক অনুসন্ধান
খ. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : বাঙালী মুসলমানের ইতিহাস চেতনা
গ. খোন্দকার সিরাজুল হক : মুসলিম সাহিত্য সমাজ : একটি নতুন কণ্ঠস্বর
৫. শরৎ সংখ্যা ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৪ আগস্ট-অক্টোবর ’৮৭ ৭ ১ ক. অজয় রায় : বাঙালির জন্ম : একটি পুরাবৃত্তিক অনুসন্ধান
৬. শীত সংখ্যা ২য় বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৪ নভেম্বর ’৮৭ জানুআরি ’৮৮ ৭ ২ ক. কবীর চৌধুরী : বাঙালীর আত্মপরিচয়ের সংকট : কৃত্রিম সমস্যা(?)
খ. আসহাবুর রহমান : জাতীয়তাবাদ ও ইতিহাসচর্চা
৭. বসন্ত সংখ্যা ২য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ’৯৪-বৈশাখ ’১৩৯৫ফেব্র“য়ারি-এপ্রিল’৮৮ ৮ ২ ক. আসহাবুর রহমান : দক্ষিণ এশিয়ার জাতিপ্রশ্ন : বাংলাদেশ
খ. আবুল কাসেম ফজলুল হক : বাংলাদেশে ইসলাম : কয়েকটি প্রবণতা কিছু মন্তব্য
৮. গ্রীষ্ম সংখ্যা ২য় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৫ মে-জুলাই ’৮৮ ৭ ২ ক. অজয় রায় : বাঙালির জন্ম : একটি প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান
খ. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ : বাঙালী মুসলমানের আত্মজিজ্ঞাসা
৯. শরৎ সংখ্যা ৩য় বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৫ আগস্ট-অক্টোবর ’৮৮ ৭ ১ ক. আবদুল মমিন চৌধুরী : হাজার বছরের পুরাতন বাঙালী : প্রাচীন বাংলার ‘ব্যক্তিত্ব’
১০. শীত সংখ্যা ৩য় বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৫ নভেম্বর ’৮৮ জানুআরি ’৮৯ ৬ ২ ক. অজয় রায় : বাঙালীর জন্ম : একটি জাতিতাত্ত্বিক অনুসন্ধান
খ. আবুল কাসেম ফজলুল হক : ইতিহাসচেতনা : অতীতের মোহ ও ভবিষ্যতের কল্পস্বর্গ
১১. বসন্ত সংখ্যা ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ’৯৫ -বৈশাখ ’৯৬ ফেব্র“য়ারি-এপ্রিল ’৮৯ ৮ ২ ক. আসহাবুর রহমান : ইসলামী মৌলবাদের বুদ্ধিবাদী উৎস
খ. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ : উনিশ শতকে বাংলার মুসলমান : শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা
১২. গ্রীষ্ম সংখ্যা ৩য় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৬ মে-জুলাই ’৮৯ ৫ ২ ক. যতীন সরকার : আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
খ. আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া : প্রত্ন সম্পদে বাংলার মুখ
১৩. শরৎ সংখ্যা ৪র্থ বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৬ আগস্ট-অক্টোবর ’৮৯ ৬ ১ ক. আবু জাফর শামসুদ্দীন : বাঙালীর আত্মপরিচয়
১৪. শীত সংখ্যা ৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৬ নভেম্বর ’৮৯ জানুআরি ’৯০ ৫ ১ ক. মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান : বাঙালী মুসলমানের আত্মঅšে¦ষার স্বরূপ
১৫. বসন্ত সংখ্যা ৪র্থ বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন’৯৬-বৈশাখ’৯৭; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ’৯০ ৬ ২ ক. অজয় রায় : বাঙালীর জন্ম : একটি ভাষাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান
খ. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : বাঙালীর আত্ম-অšে¦ষণ সমস্যা
১৬. গ্রীষ্ম সংখ্যা ৪র্থ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৩৯৭ মে-জুলাই ১৯৯০ ৫ ১ ক. অসীম রায় : দেশবিভাগের প্রশ্নে লীগ ও কংগ্রেস : ইতিহাসের পুনর্বিচার
১৭. শরৎ সংখ্যা ৫ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৩৯৭; আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯০ ৬ ২ ক. মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান : বাঙালী মুসলমান : পর্যবৃত্তের ইতিবৃত্ত
খ. মাহবুবুর রহমান : জাতীয় ঐক্যমত্যের সমস্যা—প্রসঙ্গ বাংলাদেশ
১৮. শীত সংখ্যা ৫ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৭ নভেম্বর’৯১ জানুয়ারি’৯১ ৮ ২ ক. শহিদুল ইসলাম : উনিশ শতকের বাংলায় রেনেসাঁ
খ. ফাহিমুল কাদির : সংস্কৃতির সঙ্কট : সাম্প্রতিক প্রেক্ষিতে
১৯. বসন্ত সংখ্যা ৫ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন’৯৭-বৈশাখ’৯৮; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ’৯১ ৭ ৩ ক. আতিউর রহমান : ভাষা আন্দোলন : পটভূমির স্বরূপ
খ. মুহম্মদ নূরুল কাইয়ুম : উনিশ শতকে বাংলার মুসলমান সমাজ
গ. খোন্দকার সিরাজুল হক : বাঙালী মুসলমানের শিক্ষা ভাবনা
২০. গ্রীষ্ম সংখ্যা ৫ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৮; মে-জুলাই ১৯৯১ ৭ ২ ক. শামসুল আলম সাঈদ : জাতীয়তাবোধে সিরাজদ্দৌলা কাল্ট ও ‘পলাশির যুদ্ধ’
খ. অজয় রায় : বাঙালীর জন্ম : একটি বর্ণতাত্ত্বিক আলোচনা
২১. শরৎ সংখ্যা ৬ষ্ঠ বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৮; আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯১ ৬ ১ ক. শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায় : রেনেসাঁস ও বাংলার মুসলমান সমাজ
২২. শীত সংখ্যা ৬ষ্ঠ বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৮; নভেম্বর ’৯১ জানুয়ারি ’৯২ ৬ ২ ক. মিনার মনসুর : বাংলাদেশ (১৯৪৭-’৮২) : সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি
খ. আমিনুল ইসলাম : বাঙালীর দর্শন-ভাবনা [প্রাচীন ও মধ্যযুগ]
২৩. বসন্ত সংখ্যা ৬ষ্ঠ বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন’৯৮-বৈশাখ’৯৯; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ’৯২ ৭ ২ ক. ইমরান হোসেন : উনিশ শতকের বাংলার মুসলিম এলিটের ভূমিকা
খ. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : বাংলাদেশে ধর্মের রাজনীতি
২৪. গ্রীষ্ম সংখ্যা ৬ষ্ঠ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’৯৯; মে-জুলাই ১৯৯২ ৭ ১ ক. ফেরদৌস হাসান : বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ : একটি আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ
২৫. শরৎ সংখ্যা ৭ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ’৯৯; আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯২ ৬ ১ ক. এনায়েতুর রহিম : বাংলার রাজনীতিতে নেতৃত্বের সংকট
২৬. শীত সংখ্যা ৭ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ’৯৯; নভেম্বর ’৯২ জানুয়ারি ’৯৩ ৭ ১ ক. সেলিনা হোসেন : সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষ
২৭. বসন্ত সংখ্যা ৭ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন’৯৯-বৈশাখ’১৪০০; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ’৯৩ ৭ ৩ ক. অজয় রায় : বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস
খ. মনসুর মুসা : ভাষা বহমান : বাংলা ভাষার কথা
গ. আসহাবুর রহমান : ইসলাম, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র—পাকিস্তান প্রসঙ্গ
২৮. গ্রীষ্ম সংখ্যা ৭ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’১৪০০; মে-জুলাই ৯৩ ৬ ২ ক. কাজী তামান্না : সাম্প্রদায়িকতা একটি অমানবিক ব্যাধি
খ. মমতাজুর রহমান : মধ্যযুগের বাংলায় প্রযুক্তির ব্যবহার ও আর্থ-সামাজিক বির্বতন
২৯. শরৎ সংখ্যা ৮ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০০; আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯৩ ৬ ২ ক. ওয়াকিল আহমদ : ঢাকার মুসলিম সভা-সমিতি
খ. আকবর আলি খান : সোনার বাংলা : উপকথা ও বাস্তব
৩০. শীত সংখ্যা ৮ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ১৪০০; নভেম্বর ’৯৩ জানুয়ারি ’৯৪ ৬ ১ ক. আসহাবুর রহমান : ইসলামি মৌলবাদ ঐতিহাসিক পটভূমি
৩১. বসন্ত সংখ্যা ৮ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন’ ১৪০০-জ্যৈষ্ঠ ১৪০১; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ’৯৪ ৮ ১ ক. বশীর আলহ্লোল : ভাষা-আন্দোলনের চরিত্রবিচার
৩২. গ্রীষ্ম সংখ্যা ৮ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ’১৪০১; মে-জুলাই ’৯৪ ৭ ২ ক. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : বাংলাভাষার প্রতিবাদী চরিত্র
খ. আবু জাফর : চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব
৩৩. শরৎ সংখ্যা ৯ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০১; আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯৪ ৭ ২ ক. অজয় রায় : বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজনির্মাণ
খ. সন্তোষ গুপ্ত : ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা
৩৪. শীত সংখ্যা ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ১৪০১; নভেম্বর ’৯৪—জানুয়ারি ’৯৫ ৭ ১ ক. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর : আধুনিকতাবোধ ও বাংলাদেশ
৩৫. বসন্ত সংখ্যা ৯ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ১৪০১-বৈশাখ ১৪০২; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ’৯৫ ৭ ১ ক. সুরাইয়া বেগম : উনিশ শতক এবং রোকেয়ার সমাজ ও ধর্মচিন্তা
৩৬. গ্রীষ্ম সংখ্যা ৯ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৪০২; মে-জুলাই ’৯৫ ৮ ১ ক. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর : বাংলাদেশ এবং আধুনিকতা
৩৭. শরৎ সংখ্যা ১০ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০২; আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯৫ ৬ ১ ক. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : বাংলাদেশে ইতিহাস পঠনপাঠন
৩৮. শীত সংখ্যা ১০ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ১৪০২; নভেম্বর ’৯৫—জানুয়ারী ’৯৬ ৮ ২ ক. অজয় রায় : ভূখণ্ড বাংলাদেশ জন-জাতি ও সভ্যতা-সংস্কৃতি
খ. ইসরাইল খান : সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাহিত্য-সম্মেলন
৩৯. বসন্ত সংখ্যা ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ১৪০২-বৈশাখ ’০৩; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ১৯৯৬ ৯ ২ ক. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেতনা : স্বাধীন বাংলাদেশে
খ. শহিদুল ইসলাম : রাজনীতিতে
সাম্প্রদায়িকতা—ইতিবৃত্তের সন্ধানে
৪০. গ্রীষ্ম সংখ্যা ১০ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৪০৩; মে-জুলাই ১৯৯৬ ৭ ০
৪১. শরৎ সংখ্যা ১১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০৩; আগস্ট-অক্টোবর’৯৬ ৭ ১ ক. মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান : উনিশ শতকে বাঙালী মুসলমানের সামাজিক ভুবন
৪২. শীত সংখ্যা ১১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ১৪০৩; নভেম্বর ১৯৯৬—জানুয়ারী ’৯৭ ৭ ২ ক. আনিসুজ্জামান : বাংলাদেশে ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্র
খ. বি. এম. রেজাউল করিম : জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও উত্তরণ : নজরুল ইসলামের অবস্থান
৪৩. বসন্ত সংখ্যা ১১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন’ ১৪০৩-বৈশাখ ’০৪; ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ১৯৯৭ ৭ ২ ক. বশীর আলহেলাল : ভাষা-আন্দোলনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
খ. ওয়াকিল আহমদ : বাংলার মুসলিম এলিট : উনিশ শতকের প্রথমার্ধ
৪৪. গ্রীষ্ম সংখ্যা ১১ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৪০৪/ মে-জুলাই ১৯৯৭ ৫ ০
৪৫. শরৎ সংখ্যা ১২শ বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০৪/ আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯৭ ৮ ১ ক. সেলিনা হোসেন : সংস্কৃতি ও নারী
৪৬. শীত সংখ্যা ১২শ বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ১৪০৪/ নভেম্বর ১৯৯৭—জানুয়ারী ১৯৯৮ ৫ ০
৪৭. বসন্ত সংখ্যা ১২শ বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ১৪০৪-বৈশাখ ১৪০৫/ফেব্র“য়ারি—এপ্রিল’৯৮ ৬ ০
৪৮. গ্রীষ্ম সংখ্যা ১২শ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৪০৫/ মে-জুলাই ১৯৯৮ ৬ ১ ক. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
৪৯. শরৎ সংখ্যা ১৩শ বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০৫/ আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯৮ ৭ ১ ক. আনিসুজ্জামান : সাংস্কৃতিক বহুত্ব
৫০. শীত সংখ্যা ১৩শ বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ১৪০৫/ নভেম্বর ১৯৯৮—জানুয়ারী ১৯৯৯ ৬ ১ ক. সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ : বাংলাদেশে নারীমুক্তি আন্দোলন : ইতিহাসের প্রেক্ষিতে
৫১. বসন্ত সংখ্যা ১৩শ বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ১৪০৫-বৈশাখ ১৪০৬/ফেব্র“য়ারি—এপ্রিল ১৯৯৯ ৬ ০
৫২. গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৩শ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৪০৬/ মে-জুলাই ১৯৯৯ ৭ ১ ক. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম : বাঙালী মুসলমানের ‘ভাষা-ভাবনা’ এবং প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাসা
৫৩. শরৎ সংখ্যা ১৪শ বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০৬ / আগস্ট-অক্টোবর ১৯৯৯ ৭ ১ ক. বিশ্বজিৎ ঘোষ : ঢাকায় প্রগতি লেখক-আন্দোলন ও রণেশ দাশগুপ্ত
৫৪. শীত সংখ্যা ১৪শ বর্ষ ২য় সংখ্যা অগ্রহায়ণ-মাঘ ১৪০৬ / নভেম্বর ১৯৯৯—জানুয়ারী ২০০০ ৬ ০
৫৫. বসন্ত সংখ্যা ১৪শ বর্ষ ৩য় সংখ্যা ফাল্গুন ১৪০৬-বৈশাখ ১৪০৭ / ফেব্র“য়ারী—এপ্রিল ২০০০ ৫ ২ ক. সেলিনা হোসেন : সংস্কৃতি ও অমর একুশে
খ. হাবিব রহমান : ঢাকার বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন : সাফল্য-অসাফল্যের খতিয়ান
৫৬. গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪শ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ-শ্রাবণ ১৪০৭/ মে-জুলাই ২০০০ ৭ ৩ ক. মুহম্মদ ইদ্রিস আলী : বাঙালী বাংলাদেশের সংস্কৃতি
খ. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম : জিন্নাহ-সৃষ্ট কালচার ও বাঙালীর বন্ধুর পথ
গ. স্বরোচিষ সরকার : বিশ শতকের মুক্তবুদ্ধি চর্চা
৫৭. শরৎ সংখ্যা ১৪শ বর্ষ ১ম সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৪০৭ / আগস্ট-অক্টোবর ২০০০ ৫ ৩ ক. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম : বাংলাদেশ, বাঙালী—স্বরূপের সন্ধান
খ. আবদুল মমিন চৌধুরী : ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বাংলার সংস্কৃতি
গ. কবীর চৌধুরী : মৌলবাদ : তার ইতিহাস ও প্রকৃতি
৫৮. বসন্ত ১৪০৭—গ্রীষ্ম সংখ্যা ১৪০৮ ১৫শ বর্ষ ২য়—৪র্থ সংখ্যা অগ্রহায়ণ ১৪০৭—শ্রাবণ ১৪০৮/ নভেম্বর ২০০০—জুলাই ২০০১ প্রকাশকাল : অক্টোবর ২০০১ ৬ ১ ক. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : চাওয়া-পাওয়া ও না-পাওয়ার হিসেব


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা