ঢাকাচন্দ্রিকা ॥ ঢাকার কাগজ ॥ ১ম খণ্ড [বিশেষ ক্রোড়পত্র]

ঢাকাচন্দ্রিকা
ঢাকার কাগজ ॥ ১ম খণ্ড
…………………………………………………………………………………
[বাঙালি ও মুসলমান অবিভাজ্য, এমন ধারণা পাকিস্তান সৃষ্টির সময় ছিল না। উপনিবেশকালে মুসলমানদের লেখাপড়া ও সংস্কৃতিচর্চা ছিল জাতীয়তাবাদী শৌর্য ও অহমিকা প্রকাশের জন্য, হিন্দু প্রতিরোধী বা হিন্দুত্বের বিপরীত শক্তি প্রদর্শনের নিমিত্ত। মেধাবী মুসলিম সন্তানরা জ্ঞানকে যখন জীবন-জীবিকা করলেন, তখন মুসলমানিত্বই হলো প্রধান চিন্তাশক্তি। মোহাম্মদীসহ প্রভৃতি পত্রিকা তারই বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন আসে, বাঙালি জাতিত্ব বিষয়টি তখন কীভাবে দেখেছেন, বিশেষ করে ধর্মের ঊর্ধ্বে থেকে! না, ধর্মের ঊর্ধ্বে ওঠাটা তাদের হয়ে ওঠেনি, পশ্চাৎপদ বন্ধ্যাত্বপূর্ণ শিক্ষার কারণে। সেটি প্রকাশ্য ও স্পষ্ট হয় সাতচল্লিশের পরে, পাকিস্তান রাষ্ট্রে শ্রেণিদ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে, যেটি আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের উত্তাপে প্রবলতর হয়ে ওঠে, জাতিত্বই প্রধান শক্তিÑ যেখানে ধর্ম-পরিচয় আর মুখ্য থাকেনি। ফলে, উদারতা-প্রগতিমুখিতাও গড়ে উঠল। ‘ঢাকাচন্দ্রিকা’র প্রথম পর্বের প্রতিনিধিস্থানীয় পত্রিকাসমূহ তার স্বভাব-চারিত্র্যে এই লক্ষণগুলোই ধরা পড়ে। কিন্তু ইতিহাসে এর গুরুত্ব কম নয়। কারণ, বাঙালি এখন একটি স্বতন্ত্র দেশ ও রাষ্ট্রের পরিচয়বাহি হয়ে বিশ্ব-মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। এই সাংস্কৃতিক পরিচয়টুকুর গোড়ার সংবাদ পাওয়া যায় নি¤েœাক্ত পত্রিকায়Ñ যা ষাট-সত্তর ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সুলুকসূত্র বা অনুসন্ধান-পর্ব বললে ভুল হয় না। [চিহ্নসম্পাদক]

মাসিক মোহাম্মদী
মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮) প্রতিষ্ঠিত মাসিক মোহাম্মদী ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে (কার্তিক, ১৩৩৪) কলকাতা থেকে নবপর্যায়ে প্রকাশিত হতে আরম্ভ করে। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ‘মোহাম্মদী’ মোহাম্মদ আকরাম খাঁর সম্পাদনায় কিছুদিন মাসিক আকারে প্রকাশ হয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। ১৯২৭ সনে পুনঃপ্রকাশের পর যুদ্ধ দুর্ভিক্ষকালে কাগজ-সংকটের কবলে অনিয়মিত এবং মনক্ষুণœ অবস্থায় হলেও মোটামুটি নিয়মিতভাবেই ২০বর্ষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিলো। ২১বর্ষ, ১ম সংখ্যা প্রকাশিত হয় সাতচল্লিশের পাকিস্তান সৃষ্টির পরে নভেম্বর (১৯৪৭) মাসে। এটিও কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। তবে বলা হয় পরবর্তী সংখ্যা (২১বর্ষ, ২সংখ্যা) ঢাকা থেকে প্রকাশিত হবে। কিন্তু দুই বছর বন্ধ থেকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় মোহাম্মদীর ২১বর্ষ, ২ সংখ্যা, অগ্রাহায়ণ ১৩৫৬ সনে ডিসেম্বর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে। সম্পাদনা বিভাগে বিভিন্ন সময় প্রতিথযশা সাহিত্যিক-সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বিভাগ পরবর্তীকালের মোহাম¥দীর কয়েক বর্ষ সম্পাদনা করেছিলেন ( ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ বর্ষ) মুজীবুর রহমান খাঁ (১৯১০-৮৪)। তখন মোহাম্মদীর প্রচ্ছদে আকরম খাঁর নাম ছাপা হতো। ৩১ বর্ষ থেকে আবার আকরম খাঁর নামে ছাপা হতো। তাঁর মৃত্যুর পর কয়েক সংখ্যায় বদরুল আনাম খাঁর নাম সম্পাদক হিসাবে ছাপা হয়েছিলো। আবদুল গাফফার চৌধুরী, আখতার-উল আলম, শহীদ আ. ন. ম গোলাম মোস্তফা প্রমুখ তখনকার তরুনের মোহাম্মদীর সম্পাদনা-সহযোগী হিসাবে বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন। মোহাম্মদী পাকিস্তানী আন্দোলনের সপক্ষে সবচেয়ে জোরদার শক্তির সাহিত্য পত্রিকা ছিল। পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করলে মোহাম্মদীর ভূমিকা ও পাকিস্তানীবাদীদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। এঁরা বাঙালির স্বাতন্ত্র্য কম না না করে টিকে থাকতে চেয়েছিলো মুসলামান হিসাবেএবং অখণ্ড পাকিস্তানের নাগরিক হিসাবে। যে সমস্ত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ সুগম করেছেন, তারা সেগুলোকে সুনজরে দেখতে পারেনি ন। অনেক ক্ষেত্রেই বিরোধীতা বিবেচিত হবে, যদি দেখা যায় এইভাবে যে বাঙালির চিন্তাধারাতে তাঁর জনসমাজে প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং বাঙালিরা জাতীয় চিন্তাধারার গতি-প্রকৃতি জানতে পেরেছিলেন মোহাম্মদীর মারফতে এবং স্বাধীন চিন্তার দায়িত্ব তো মুক্তবুদ্ধির পাঠকদের সংরক্ষিতই ছিল। তাছাড়া দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও অনেক সময় মোহাম্মদীতে বাঙালির প্রতিফলিত হয়েছে যথার্থভাবে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রকাশিত মোহাম্মদীর ২১বর্ষ, ১ম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে কলকাতা থেকে বলা হয়েছিল :
আজ হইতে ২৫ বৎসর পূর্বে মোছলেম-বাঙলার জ্ঞান-বিশ্বাস, সংস্কার-ঐতিহ্য এবং তাহার সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আরম্ভ করিয়া দেওয়া হয় একটা গরুতর রকমের সাংস্কৃতির অভিযান। সুযোগ ও সুসময় মনে করিয়া মোছলেম সমাজের পঞ্চম বাহিনীও এই অভিযানের সহায়তা করার জন্য পূর্ণ উদ্যম কর্মক্ষেত্র অবতীর্ণ হইয়া পড়েন। ২০ বৎসর পূর্বে মাসিক মোহাম্মদীর আবির্ভাব হইয়াছিল, প্রধানত এই অভিযানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাইবার জন্য। …যতটা পারিয়াছি, করিয়া আসিয়াছি। …আজ আবার ডাক আসিয়াছেÑমুক্ত ভারতে মুক্ত ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার একটা অভূতপূর্ব সুযোগ ও সম্ভাবনা আজ আমাদিগের সম্মুখে উজ্জ¦ল হইয়া উঠিয়াছে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে হইবে। পাকিস্তানের বহু প্রকার ভিত্তি সম্বন্ধে সংবাদ পত্রে বহু জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ প্রকাশিত হইয়াছে। হওয়ার দরকারও আছে খুবই। কিন্তু দুঃখের সহিত ইহাও বলিতে হইতেছে, এগুলো আনুষঙ্গিক উপকরণ হইলেও, পাকিস্তানের মৌলিক ভিত্তি কোনটিই নয়। আমার জ্ঞান-বিশ্বাস মতে পাকিস্তানের মূলভিত্তি হইতেছে মনস্তাত্বিক। মুসলমানদের মন ও মস্তিষ্কে, এমন একটা পুলক, এমন একটা প্রেরণা এবং এমন একটা ভাবাবেগ জাগাইয়া তুলিতে হইবে, যাহার অপরিহার্য নির্দেশে বাঙলার মুসলমান আদর্শ সাধনার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে প্রস্তুত হইয়া যাইবেÑ মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি বলিতে মোটামুটিভাবে এই জিনিসটাকে বুঝাইতে চাহিয়াছি।
বস্তুত পাকিস্তানের ভিত্তি মজবুত করার সাধনায় মোহাম্মদী নিরলসভাবে ১৯৭০ সন পর্যন্ত নিয়মিত পাঠক সাধারণের খেদমতে নিয়োজিত ছিল। এতে অসংখ্য লেখক বিচিত্র রচনা নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন।

মাহে নও
‘মাহে নও’ উর্দু কথা। অর্থ নতুন চাঁদ। ব্যঞ্জনার্থ ‘নবযুগ’ কিন্তু উদ্যোক্তাদের মাথায় সেটা ছিলো না বলা যায় না। নতুন চাঁদ তাঁরা ইসলামি তাৎপর্যেই গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়। এর প্রথম সংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয় আবদুর রশিদের সম্পাদনায় ১৩৫৫ বঙ্গাব্দর চৈত্র মাসে। পত্রিকায় এপ্রিল ১৯৪৯ তারিখও লেখা হয়েছিল। ‘ভোলানাথ বসাক কর্তৃক শ্রীকান্ত প্রেস, ৫ নয়া বাজার, ঢাকা থেকে মুদ্রিত এবং এম. আরশাদ হোসেন কর্তৃক পাকিস্তান পাবলিকেশনস্-এর পক্ষে করাচী থেকে প্রকাশিত’ কথাটাও প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যায় বলা হয়েছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুদ্রণ, আর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রকাশন, বেশিদিন সম্ভবপর হয়নি। ১ম বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হয়। ঢাকায় আগমন সম্পর্কে ১ম সংখ্যা ৬ষ্ঠ সংখ্যায় (ভাদ্র ১৩৫৬) বলা হয় :
আপাতত ঢাকাতে ‘মাহে-নও’র নিজস্ব দফতর কায়েম হয়েছে। পরিচালনার নতুনতর এনতেজামও করা হয়েছে। মাহে-নাও’কে সর্বোঙ্গসুন্দর মাসিক পত্রিকায় পরিণত করা মোনতাজেমগণের আন্তরিক আকাক্সক্ষা। ‘মাহে-নও’র ক্রমোন্নতির কোশেশ আমাদের কাম্য। ফলাফল আল্লাহর রহমত এবং লেখক-লেখিকাও পাঠক-পাঠিকাগণের সাহায্য-সহানুভূতি ও সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। আমরা কামনা করি সকলের নেক নজর হামদদী ও মেহেরবাণী।
‘মাহে নও’র আসল মক্সাদ সম্পর্কে বলা হয় :
মাহে নওর আসল মকসাদ নিয়ে কাহারো মনে খটকা রয়েছে বলে মলুম হয়। সাহিত্যের মাধ্যম আত্মচেতনা ও আত্মপরিচিতির পরিবেশে পাকিসÍানের খেদমত মাহে নওর আসল উদ্দেশ্য। পাকিস্তান আমাদের জাতীয় রাষ্ট্র। পাকিস্তানের সোবেহ-উম্মিদে শুরু হয়েছে আমাদের নতুনতর জীবনের জয়যাত্রা। আমাদের জাতীয় জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ ও সফলতার জন্য দরকার সাহিত্যক্ষেত্রে নতুনতর অনুপ্রেরণা সঞ্চারÑনতুনতর পরিবেশ ও পরিবেষ্টনীর সৃষ্টি। ‘মাহে নও’ কোশেশ করছে এবং করবে পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশের বাসিন্দাগণের মধ্যে আত্মীয়তা এবং পারষ্পরিক পরিচিতি সোনালী বন্ধন সৃষ্টি করতে। ‘মাহে নও’ এসতেকবাল করে সহযোগিতা করবে সকল সাময়িক পত্রিকার সহিত নিজস্ব রীতির দায়েরাতে। নিজেদের ভাবধারা প্রকাশের জন্য ‘মাহে নও’ কাহারো উপর কোনও ফরমান দিবার অধিকার রাখে না। ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা। কে কেমন ভাবে নিজের কথা প্রকাশ করবেন, তা লেখক-লেখিকার নিজস্ব অধিকার এবং দায়িত্ব। কোন লেখা কার কতটুকু বোধগম্য, সে বিচারের দায়িত্ব কেউ নিতে পারে না। অতীতের বাঙলা ভাষা নানা মোড় ঘুরেছে। বর্তমানে শুরু হয়েছে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের নতুন যুগ। নতুন যুগের সাথে তাল ঠুকে চলবার কোশেশ করবে ‘মাহে নও’। বিষয়টি নেহায়েৎ গুরুত্বপূর্ণ। যথাসময়ে আমরা আরো বিশদভাবে আলোচনা করবো নতুনতর আবহাওয়া সম্বন্ধে। আজকে বিসমিল্লাহ মাত্র। (সূত্র : মাহে নও, ১ম বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ভাদ্র ১৩৫৬)
‘মাহে নও’ এর ঘোষণার একে ‘সচিত্র মাসিক পত্রিকা’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয় এবং কায়েদে আযমের চিত্র শোভিত হয়ে এর যাত্রারম্ভ হয়। নিয়মাবলীতে জানিয়ে দেয়া হয় ইংরেজি মাসের পয়লা ও প্রতি বাংলা মাসের তৃতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত হবে এবং এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত বর্ষ গণনা করা হবে। বার্ষিক মূল্য ডাক মাশুলসহ পাঁচ টাকা আট আনা, প্রতি সংখ্যার নগদ মূল্য আট আনা। সাইজে সাড়ে নয় ইঞ্চি বাই সাড়ে সাত ইঞ্চি। প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যা থেকে দ্বিতীয় বর্ষের অষ্টম সংখ্যা পর্যš এর সম্পাদক ছিলেন মীজানুর রহমান। চতুর্থ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা থেকে অষ্টম সংখ্যা পর্যন্ত সম্পাদনা করেন মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন। চতুর্থ বর্ষের নবম সংখ্যা থেকে ষোড়শ বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা পর্যন্ত সম্পাদক ছিলেন আবদুল কাদির। ষোড়শ বর্ষ, নবম সংখ্যা থেকে পত্রিকাটির দায়িত্ব পালন করেন তালিম হোসেন। মাহে-নও এর সঙ্গে আবদুল কাদিরের সময়কালে সহকারী হিসাবে কাজ করেছিলেন মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ।
‘মাহে-নও’ এর প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যার চৈত্র ১৩৫৫) সম্পাদকীয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। এটি করাচীতে বসে লেখা হয়েছিল :
খোদাতালার মেহেরবাণীতে ‘মাহে-নও’ প্রথম সংখ্যা আত্মপ্রকাশ করিল। কিছুদিন আগেও এইকথা ভাবিতে পারি নাই যে, করাচীতে বসিয়া একটা বাঙলা মাসিক পত্রিকার সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করিতে হইবে। …একটা প্রথম শ্রেণীর বাঙলা মাসিক পত্রিকার আবশ্যকতা বহুদিন হইতে বিশেষভাবে অনুভূত হইতেছিল, পূর্ব-পাকিস্তানে আজ দেড় বৎসর যাবৎ সময় ও কালোপযোগী বই-পুস্তক, খবরের কাগজ ও সাময়িক-পত্রিকার অভাব অনেকটা দুর্ভিক্ষের আকার ধারণ করিয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। নবলব্ধ আজাদীর সঙ্গে সঙ্গে যে নূতন ভাবধারার সৃষ্টি হইয়াছে তাহা সুন্দর, সুষ্ঠু ও নিয়মিতভাবে জনসাধারণের সামনে পেশ করিবার উদ্দেশ্য নিয়েই ‘মাহে-নও’র জন্ম।
‘মাহে-নও’-এর সম্পাদকীয় থেকে দেশ বিভাগের পর সাময়িক পত্রিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায় :
অবিভক্ত বাঙলা, কলিকাতা হইতে প্রকাশিত নামকরা বাঙলা মাসিক পত্রিকার উপর নির্ভরশীল ছিল। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করায় মাশরেকী পাকিস্তানবাদী সেই সুবিধা হইতে বঞ্চিত হইল। তাছাড়া, পাকিস্তান এখন আলাদা রাষ্ট্র। হিন্দুস্তানের কলিকাতা নগরী হইতে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকাসমূহে পাকিস্তানী তার নিজের আদর্শের তাহজীবের ও তমুদ্দুনের, কোনো কিছুরই সাক্ষাৎ পায় না। অন্যদিকে আমাদের যেই এক আধখানা মাসিক পত্রিকা ছিল সেইগুলো রোজ-বরোজ ক্ষীণ কলেবরে পরিণত হইয়া বিলীন হইল। তাই তীক্ষœভাবে অনুভূত হইল একখানা মাসিক পত্রিকার আবশ্যকতা। দেখা দিল সমস্যা। তারপর আল্লাহর রহমতে সমস্যার ফয়সালা করিয়াই আজ বাঙলার সাহিত্যিক ও পাঠকদের সামনে ‘মাহে-নও’ লইয়া হাজির হইলাম। প্রচার বা কোনোকিছুর মামুলী প্রোপাগাণ্ডা ইহার উদ্দেশ্য নহে। ইহার আদর্শ পাকিস্তানের তহজিব ও তমদ্দুন। ইহার উদ্দেশ্য দেশের প্রধান সাহিত্যিকদিগকে কদর দেওয়া ও নয়া আজাদীর আবহাওয়ায় পরিপুষ্ট নবীন লেখক লেখিকা সৃষ্টি করা। বিগত যুগের সাহিত্যিকদের আদর্শ আজাদীর রঙ ফলাইয়া অনাগত যুগের সাহিত্যিক জন্ম নিলেই আমরা আমাদের চেষ্টা সার্থক হইয়াছে বলিয়া মনে করিব। এই জন্যই ইস্তেকবাল জানাইতেছি প্রবীণ ও নবীন লেখক-লেখিকাদের সমভাবে তারপর মাশরেকী ও মাগরেবী পাকিস্তানের মধ্যে বিরাট ব্যবধান দূরত্বের মাপকাঠিতে। আদর্শ ও ভাবরাজ্যে কোনো ব্যবধান আছে বলিয়া আজ আর মনে করা যায় না। তাই একাংশের চিন্তাধারা অপর অংশে পরিবেশন করিতে হইবে। ‘মাহে-নও’এর মারফতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলকে দেখিবে, বুজিবে, আর খোদ বাঙলা ‘মাহে-নও’ পশ্চিমাঞ্চলের ক্রোড় বসিয়া নিজের সত্তা বুঝাইয়া দিবে। কতাটা আরও একটু খোলাশা করিয়া বলি। আমাদের বাঙলা ‘মাহে-নও’-এ প্রকাশিত মূল্যবান প্রবন্ধগুলি ইংরেজি ‘পাকিস্তান’ ও উর্দু ‘মাহে-নও’তে তর্জমা করিয়া প্রবেশ করিবার ব্যবস্থাও হইবে। …জনগণের সন্তুষ্টিই আমাদের কাম্য ও লেখক লেখিকাদের সহানুভূতিই আমাদের সম্পদ।
প্রথম সংখ্যায় কবি জসীমউদদীন ‘পাকিস্তান’ ও মাহে-নও’ শীর্ষক দুটি কবিতা লিখেছিলেন :
মাহে-নও
আবার আমরা গরিব কুতব ইট, কাঠ দিয়ে নয়,
জীবনদানের কার্তি যে হেথা অনন্ত অক্ষয়।
গড়িব হাফেজ রুমি খৈয়াম গালিব আলোয়াল,
যাঁদের কীর্তি পাহারায় রবে অনন্ত মহাকাল।
* * *
আমাদের এই পাকিস্তানের যারা হবে কাণ্ডারী
বৃশ্চিক জ্বালা ভরা যেন হয় তাহাদের বিভাবরী।
* * *
মোদের কবির কণ্ঠে যেন গো জনগণ রূপ পায়,
তাহাদের তরবারি যেন সেথা খরধারে চমকায়।
* * *
‘পাকিস্তান’ শীর্ষক কবিতাটি নি¤œরূপ :
মোদের পাকিস্তান
লহু দিয়ে গড়া, জান দিয়ে গড়া, প্রাণ দিয়ে গড়া মন
এইখানে এসে বুক পান করে আমরা দাঁড়াতে পারি
উচ্চে ফুকারি হাঁক দেই যবে, আধেক দুনিয়া নাড়ি
ইরান, তুরাণ, মিশর আজম পশারিত হয়ে বুক
তবু ভারে নারে অতৃপ্ত ¯েœহ, বিন্দু যে ধরাটুক।
* * *
দুনিয়ার বুকে রোপিয়াছি মোরা এই নব ছায়াতরু
এইখানে এসে জুড়াইবে প্রাণ যতো পথচারী মরু।
* * *
মানুষেরে দিয়া গড়িবে ধরায় আবার সে নব তাজ
আবার আসিবে ওমর ফারুক আর আবু বকর।
‘মাহে-নও’ এপ্রিল থেকে ১৯৭১ সনের নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এতে লেভেননি এমন বাঙালি লেখক হাতে গোনা যাবে। এর রচনা-বৈচিত্র্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

দিলরুবা
ঢাকা সেন্ট্রাল ল কলেজের প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, মরহুম এ.এইচ.এ. আবদুল কাদের (১৯১১-৯৪) তাঁর অকালে প্রয়াত স্ত্রী ‘দিলরুবা’র নামে এই পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন দিলরুবারই সম্পদে, সমাজের কল্যাণের লক্ষ্যে। প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সনের এপ্রিল অর্থাৎ বৈশাখ ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে। সম্পাদক-প্রকাশক হিসাবে যখন যাঁর নামই ছাপা হোক না কেন এ.এইচ.এম আবদুল কাদেরই ছিলেন ‘দিলরুবা’র প্রধান কাণ্ডারি। লাভ-ক্ষতিও তাকেই বহন করতে হতো। নিউজপ্রিণ্টের ভালো পদের কাগজে, আটের-এক সাইজ, ৫৪ পৃষ্টায় মুদ্রিত দিলরুবার প্রথম বর্ষ ‘আবুল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক ২১ বি.কে রায় লেন, বংশী বাজার, ঢাকা হইতে প্রকাশিত হয়ে ও তৎকর্তৃক দি সিটি প্রেস, ১৬/৩ কোর্ট হাউস স্ট্রিট হইতে মুদ্রিত ছিল। পরিচালক সমিতি ঘোষণা (গঠিত) করা হয়েছিল : চেয়ারম্যান বেগম রওশন আখতার খনম; কোষাধ্যক্ষ বেগম সাঈদা করিম; সদস্য বেগম সৈয়দা সকিনা ইসলাম খাঁ; বেগম আসিয়া রহমান; মি. মজবুল আল হোসায়েন, ফরিদ আহম্মদ, মি. আবুল হোসেন, চৌধুরী এবং সম্পাদক দিলরুবা। ম্যানেজার ও পরিচালক সমিতির সেক্রেটারি ছিলেন বেগম রাবেয়া এম. হোসেন, সহ সেক্রেটারি এ. এন.এম শামসুদ্দীন, এসিস্টেন্ট ম্যানেজার সৈয়দ মঞ্জুর আলী, রেজা হোসেন খাঁ প্রমুখ। বিভিন্ন জেলা প্রতিনিধিও নিয়োগ করা হয়। পত্রিকায় তাঁদের নাম-ঠিকানা ছাপানো হয়েছিলো। উদ্যোগটি মোটামুটি শক্ত ভিত্তির উপর স্থাপিত ছিল। ‘দিলরুবা’ ইংরেজি ও উর্দুতে কিছুদিন নিয়মিত মানসম্মতভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। কাজী মোতাহার হোসেন, বেগম সুফিয়া কামাল, দৌলতুন্নেছা খাতুন, ফয়েজ আহমদ, মুহম্মদ সফিয়্যুল্লাহ, মুহম্মদ যকীয়ুল্লাহ, রাবেয়া চৌধুরী প্রমুখ এর সম্পাদক, সম্পাদনা সহযোগী বা সদস্যরূপে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। দিলরুবা ডাকের মারফত দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাক্তিবর্গের হাতে নিয়মিত পৌছুতো। এটির নাম মোহাম্মদী, সওগত, মাহে-নও প্রভৃতির সমান মর্যাদায় উচ্চারিত হয়েছে। বেসরকারি পত্রিকাসমূহের ইতিহাসে ‘দিলরুবা’ নিঃসন্দেহে দীর্ঘতম সময় ধরে প্রকাশিত উচ্চমান পত্রিকা হিসাবে খ্যাতি লাভ করে চলবে। দিলরুবার নিজস্ব ছাপাখানা এবং একটি প্রকাশনা সংস্থাও গড়ে ওঠেছিল। বক্তব্য যৌক্তিক, ধার ও ভাবসম্পন্ন ছিল। যদিও তাঁদের সৃষ্টিও মাহে-নও-মোহাম্মদীর মতো পাকিস্তানের কল্যাণের প্রতিই নিবদ্ধ ছিল। তথাপি বক্তব্য ও সমালোচনা সাম্প্রদায়িক, প্যান-ইসলামি চেতনাঋদ্ধ হয়ে উগ্রভাবে প্রকাশ পায় নি বলে স্বতন্ত্র হিসাবে চিহ্নিত হবার দাবি রাখে। প্রথম সংখ্যায় ঘোষণা করা হয় :
এ পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য ত্রিবিধ। প্রথম উদ্দেশ্য বাঙলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্যের দৈন্য দূর করবার চেষ্টা করা। বাঙলা ভাষার এ দৈন্যর কৈফিয়ত তুলে অনেকেই আজকাল মাদেরী জবান চেষ্টা ছেড়ে অন্য ভাষার দিকে নজর দিচ্ছেন। এ দৈন্য যে সত্যিই আছে তা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেটার কারণ হচ্ছে এতকাল এত অধিকাংশ মুসলিম অশিক্ষিত ছিলেন আর তার ফলে মাতৃভাষার চর্চা তাদের মধ্যে বিকাশ লাভ করে নি। আজ আমাদের কাছে এটাই স্বাভাবিক সহজ বলে মনে হয় যে, আমরা এ ভাষার পরিপুষ্ট সাধনে তৎপর হব। এতে এতে মুসলিম জাতীয় জীবনের চিত্রন চাই, ইসলামের দর্শন, সমাজনীতি প্রভৃতির আলোচনা চাই, এ কাব্যচর্চার পেছনে নতুন জীবন-দর্শন প্রয়োজন। তবেই এ ভাষা দীনহীন থাকবে না। আমাদের জাতীয় ভাবের সত্যকার বাহন হবে।
আমাদের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য পূর্ব পাকিস্তানে বাঙলা সাহিত্যের গতিপথ নির্দেশের চেষ্টা করা। পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গে চিরকালই একটা ভাবগত বৈষম্য ছিল। আজাদী লাভের পর সেটাই স্পষ্ট হয়ে চোখে ধরা দিচ্ছে। এদেশের অধিকাংশ অধিবাসীর যোগ মাটির সঙ্গে, নদীর সঙ্গে, এদের চালচালতি সবই মুসলমানী কায়দায় গড়ে ওঠেছে। কারণ সংখ্যায় মুসলমানেরা অত্যাধিক। আমাদের সাহিত্যে এরূপ প্রকাশিত হতে বাধ্য। তবে আমাদের পত্রিকায় যে এখনই সেরূপ ধরা দিয়েছে তা বলতে সাহস করিনে, কারণ এখনও আমাদের উপর পশ্চিম বাঙলার সাহিত্যিক প্রভাব খুবই প্রবল। এ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে কিছু সময় লাগবে। লাগুক, ক্ষতি নেই, কিন্তু কাটিয়ে ওঠাই দরকার।
আমাদের তৃতীয় উদ্দেশ্য পত্রিকার দ্বারা ভবিষ্যতে কোনো সমাজ-সেবার কাজ করা যায় কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখা। এ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে বেগম দিলরুবা কাদেরের স্মৃতিকে স্মরণ করে। তিনি অল্প বয়সেই কলিকাতার লেডী প্রেসিডেন্সী ম্যাজিস্ট্রেটের পদ পেয়েছিলেন কিন্তু বেশিদিন জীবিত ছিলেন না; প্রসব-সংকটে ১৯৪৬ ইং সনের ৩ সেপ্টেম্বর তারিখে ইন্তেকাল করেন। তিনি বিদ্যোৎসাহী, তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্না বহু গুণান্বিতা ছিলেন। নারী শিক্ষার দিকে তাঁর বিশেষ লক্ষ্য ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে বিশেষ কিছু তিনি করে যেতে পারেন নি। তাঁরই সম্পদ ও আদর্শ কেন্দ্র করে তাঁরই আত্মার প্রেরণায় ‘দিলরুবা’ প্রকাশিত হল।… ভবিষ্যতে… লভ্যাংশ দ্বারা সমাজের কল্যাণ সাধনা বিশেষত নারীশিক্ষা ও দুঃস্থ মানবতার সেবা আমাদের অন্যতম লক্ষ্যÑ তাছাড়া আজ তাঁর মৃত্যুর পর শুধুমাত্র তাঁর নাম স্মরণ করে পত্রিকা প্রকাশ অর্থহীন।
আমাদের এসব উদ্দেশ্যের সফলতা নির্ভর করে কতকটা আমাদের চেষ্টার উপর আর কতেকটা নবীন লেখক ও পাঠকদের উপর। যারা নয়া লিখছেন তাদের উচিত পশ্চিম বাঙলার বর্ধিত সাহিত্যকে আদর্শ না করে নতুন একটা আদর্শ গড়ে তোলা। ঢাকা শহরের ইট কাঠ পাটকেলের মধ্যে যেন তাঁদের সাহিত্য সীমাবদ্ধ না হয়Ñ তাঁরা যেন বিশাল দেশকে চেনেনÑ।
নানা বিভাগে দেশ এখন বহুধা বিচ্ছিন্ন। সব চাইতে বড় বিভেদ আধুনিক শিক্ষিত সমাজ আর গ্রাম্য চাষী সমাজের মধ্যে। প্রাচীন কালে আমাদের দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল তা এ বিভেদ কখনও সৃষ্টি করতেন না; আবার শিক্ষা লাভ করার উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের জ্ঞান অর্জন, বর্তমান কালের মতো চাকুরী অন্বেষণ ছিলো না। আমরা আজকাল যে শিক্ষা লাভ করি থাকি, সে শিক্ষার সঙ্গে আমাদের দেশের, আমাদের জাতির প্রাণের যোগ নেই। আমাদের জাতির মূলভিত্তি ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ শিক্ষার সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই। তার জন্যই যারা এ শিক্ষালাভ করেন তাঁদের সঙ্গে দেশের অধিকাংশ লোকের যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে আসে। দ্বিতীয়ত: এ শিক্ষা বিজাতীয় শিক্ষা। পাশ্চাত্য বস্তুগত ঐ শিক্ষার পাশ্চাত্য কাজ করছে। ফলে এ শিক্ষার সংস্পর্শে যাঁরাই আসছেন তাঁরাই কিছু না কিছু সেই বস্তুতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। সেই বস্তুতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের ধর্মের, আমাদের দেশের মনোভাবের চিরকাল বিরোধ। তাই সেই বস্তুতন্ত্র আমাদের দেশের অধিকাংশের থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। এ ছাড়াও আছে চাকুরির উদ্দেশ্যে শিক্ষা লাভ। করা… আমাদের এ দূরবস্থা দূর করতে পারি কি হলে? প্রথম কথাই হচ্ছে আমাদের উচ্চশিক্ষিত সমাজকে নিয়ে। তাঁদের মনে রাখা উচিত যে ন্যূনতমভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা দরকার। কিন্তু সে পরিকল্পনার পূর্বে চিন্তা করতে হবে আমাদের সমাজের কথা, আমাদের জাতির কথা এবং আমাদের ধর্মের কথা।… কোরআন শরীফে সেই জীবনাদর্শ প্রচারিত হয়েছেÑ রসূলের জীবনে ও কার্যাবলীতে তার রূপায়ণ… কিন্তু এই জীবনাদর্শের সঙ্গে আমাদের কর্ম পদ্ধতির যোগসূত্র হারিয়ে গেছে। আমাদের চিন্তা অন্যমুখী। যে চিন্তাশক্তির সাহয্যে ইসলামী সভ্যতার প্রারম্ভে মুসলমানেরা তাঁদের জীবনের সঙ্গে আদর্শের যোগ খুঁজে পেতেন আজ আমাদের মধ্যে সেই চিন্তাশক্তির অভাব ঘটেছে। …পাশ্চাত্য বস্তুতান্ত্রিকতার শ্রেষ্ঠ বিকাশ যে কমিউনিজম… সেই কমিউনিজম ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী। …আমাদের সমাজনীতি; অর্থনীতি সমস্ত পাঠ্য বই-ই পাশ্চাত্য ধরনের হয়ে থাকে। পাকিস্তানে নূতন ইসলামিক স্কুল অব ইকোনমিক্স-এর উদ্ভব সম্বন্ধে আমাদের চিন্তা করা দরকার এবং সে পথে গবেষণা চালানোর জন্য নবীন ছাত্রদের উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।
দিলরুবা ১৬ বর্ষ পর্যন্ত বের হয়েছিল। তবে শেষের দিকে এর সাহিত্যিক সামাজিক গুরুত্ব হ্রাস পায়। পত্রিকার মানও পড়ে যায়। দিলরুবার শেষ বর্ষের কয়েকটি সংখ্যা অনুসন্ধানে পাওয়া যায় নি।

নওবাহার
‘নওবাহার’-এর সম্পাদক ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪)-র পতœী মাহফুজা খাতুন। বস্তুতপক্ষে গোলাম মোস্তফাই মূল ব্যক্তি ছিলেন নওবাহারের। এটির প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ভাদ্র ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে। প্রথমে সচিত্র মাসিকপত্র কথাটা উল্লেখ করা হতো। বলা হতো পরিচালনায় : কবি গোলাম মোস্তফা। ভাদ্র মাস হতে বর্ষ শুরু হয়ে আশ্বিনে শেষ হতো। ঘোষণায় বলা হয়েছিলো প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাহির হয়। বার্ষিক মূল্য ডাক মাসুলসহ ছয় টাকা বারো আনা। ঠিকানা ম্যানেজার, নওবাহার, ৯৬ ইসলামপুর, ঢাকা। মুসলিম বেঙ্গল প্রেস, ৪৬ জিন্দাবাহার ফাস্ট লেন থেকে এম. আবদুর রশিদ দ্বারা মুদ্রিত এবং ৯৫ ইসলামপুর থেকে মহীউদ্দীন আহমদ কর্তৃক প্রকাশিত। চৈত্র ১৩৫৬ সন থেকে মুদ্রিত পরিবর্তন হন, মোহাম্মদ ইসরাইল হোসেন কর্তৃক কখন ছাপানো হতো প্রকাশকও মহীউদ্দীন ছিলেন। তবে দ্বিতীয় বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা থেকে প্রকাশকও পরিবর্তিত হনÑ মুজিবুল হক দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এরপর কিছু পরিবর্তন হয়। তৃতীয় বর্ষ, ষষ্ঠ-সপ্তম সংখ্যায় মুদ্রক ও প্রকাশক হিসাবে নাম ছাপা হয় ইসরাইল হোসেন এর। নওবাহার-এর প্রাপ্ত শেষ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয় : নওবাহারের প্রকাশ… আমাদের জীবনে আনে কল্যাণ। …এক হাতে সে ভাঙে, আর এক হাতে গড়ে। এই ভাঙাগড়ার মধ্যেই তো জীবন। নওবাহার আসে তরুণের বেশে। প্রাণের প্রাচুর্যে সে শক্তিমান। পুরাতনকে সে ভয় করে না। কারো সাথেই তার দ্বন্দ্ব নেই। সে সর্বজয়ী… তার মনে কোনও… কারও প্রতিই বিরাগ তাকে না। পুরাতনকে কেন সে স্বতন্ত্র মনে করিবে? পুরাতন ও নতুনের মধ্যে সে তাই কোনো সীমারেখা টানে না। যে তরুণ বৃদ্ধকেও তার যাদুস্পর্শে তরুণ করিয়া না লইতে পারে, সে আবার কিসের তরুণ? পত্রিকার আদর্শ ও লক্ষ্য সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ বলেন : নওবাহারের পাশ্চাতে আছে একটা বিশেষ লক্ষ্য ও আদর্শের প্রেরণা। আমরা দিতে চাই একটা ঈঁষঃঁৎব উৎরাব, গড়িতে চাই একটা আদর্শ তমুদ্দনিক পাকিস্তান। আমাদের কাব্যে ও সাহিত্যে যদি পাকিস্তান না আসে তবে বৃথাই হইবেই বাহিরের আয়োজন।… আমরা চাই এমন এক দল কবি সাহিত্যিকদের যাঁরা এই বন্ধুর পথ দিয়া অগ্রসর হইবেন। সাহিত্য ও সাহিত্যিক দুই-ই আমরা গড়িতে চাই। নওবাহারের ইহাই প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু নিতান্ত দুঃখের সঙ্গে বলিতে হইতেছে : আমাদের কবি সাহিত্যিকদের একটি অংশ এখনও বিভ্রান্ত হইয়া বিপথে ঘুরিতেছেন।
[ঋণ : পূর্ববাঙলার সাময়িকপত্র (১৯৪৭-১৯৭১), ইসরাইল খান সংকলিত ও সম্পাদিত, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৯]


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা