ঢাকাচন্দ্রিকা ॥ ঢাকার কাগজ ॥ অবতরণিকা [বিশেষ ক্রোড়পত্র]

ঢাকাচন্দ্রিকা
ঢাকার কাগজ ॥ অবতরণিকা
…………………………………………………………………………………

বুদ্ধদেব বসু
সাহিত্যপত্র

এক রকমের পত্রিকা আছে যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটার জন্য কিনি, আর গন্তব্য স্টেশনে নামার সময় ইচ্ছা করে ফেলে যাই— যদি না কোনো সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত এবং বিব্রত করেন আমাদের। আর এক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাতে কিনতে হলে বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে-চেয়ে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিন-গান্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি—জল, পোকা, আর অপহারকের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য। যেসব পত্রিকা এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত হতে চায়—কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটা নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে, চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে ‘লিটল ম্যাগাজিন’।
লিটল কেন? আকারে ছোটো বলে? প্রচারে ক্ষুদ্র বলে? না কি বেশি দিন বাঁচে না বলে? সব কটাই সত্য, কিন্তু এগুলোই সব কথা নয়। ঐ ছোটো বিশেষণটাতে আরো অনেকখানি অর্থ পোরা আছে। প্রথমত, কথাটা একটা প্রতিবাদ এক জোরা মলাটের মধ্যে সব কিছুর আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বহুলতম প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেলো যে, জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনো ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়োবাজারে বিকোবে না, কোনোদিন, কিন্তু হয়তো কোনো একদিন এর একটি পুরোনো সংখ্যার জন্য গুণীসমাজে উৎসুকতা জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এজন্যই যে, এটি কখনো মন জোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিলো। চেয়েছিলো নতুন সুরে নতুন কথা বলতে। কোনো এক সন্ধিক্ষণে যখন গতানুগতিকতা থেকে অব্যাহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিলো-নিন্দা, নির্যাতন বা ধনক্ষয়ে প্রতিহত না হয়ে। এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা–এটাই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম। আর এটুকু বললেই অন্য সব কথা বলা হয়ে যায়, কেননা সেই ধর্ম পালন করতে গেলে চেষ্টা করেও কাটতি বাড়ানো যাবে না, টিকে থাকা শক্ত হবে, আকারেও মোটাসোটা হবার সম্ভাবনা কম। অবশ্য পরিপুষ্ট লিটল ম্যাগাজিন দেখা গেছে—যদিও সে সময়েও কথাটার উদ্ভব হয়নি—যেমন এলিয়টের ‘ক্রাইটেরিয়ন’ বা ‘আদিকালের পরিচয়’। কিন্তু মনে রাখতে হবে তারা ত্রৈমাসিক ছিলো; সমসাময়িক গণসেব্য মাসিকপত্রের তুলনায় তারা যে ওজনে কত হালকা তা অল্প একটু পাটিগণিতেই ধরা পড়বে। ভালো লেখা বেশি জন্মায় না, সত্যিকার নতুন লেখা আরো বিরল, আর শুধু দুর্লভের সন্ধানী হলে পৃষ্ঠা এবং পাঠক সংখ্যা স্বতঃই কমে আসে। অর্থাৎ আমরা যাকে বলি সাহিত্যপত্র, খাঁটি সাহিত্যের পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন তারই আরো ছিপছিপে এবং ব্যঞ্জনাবহ নতুন নাম।
সাহিত্যের পত্রিকা—তার মানে সৃষ্টিশীল, কল্পনাপ্রবণ সাহিত্যের। যেসব পত্রিকা সাহিত্যবিষয়ক জ্ঞানের পরিবাহক, ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব বা পাঠমূলক গবেষণায় লিপ্ত, দৃশ্যত কিছু মিল থাকলেও সাহিত্যপত্রের সংজ্ঞার মধ্যে তারা পড়ে না। তারা বিশেষজ্ঞের পত্রিকাজ্ঞানের একটি বিশেষ বিভাগে আবদ্ধ, আপন সম্প্রদায়ের বাইরে তাদের আনাগোনার রাস্তা নেই। কিন্তু সাহিত্যপত্রের দরজা খোলা থাকে সকলেরই জন্য, কেননা সাহিত্য যেখানে সৃষ্টি করে সেখানে তার আহ্বান অবারিত, যদিও তা শুনতে পায় কখনো পনেরো জন আর কখনো বা পনেরো লক্ষ মানুষ। আজকের দিনে যাদের কণ্ঠ লোকের কানে পৌঁছাচ্ছে না, যারা পাঠকের পুরোনো অভ্যাসের তলায় প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে, তাদের এগিয়ে আনা, ব্যক্ত করে তোলাই সাহিত্যপত্রের কাজ। এর উল্টো পিঠে আছে যাকে বলে অম্নিবাস ম্যাগাজিন, সর্ববহ পত্রিকা; তাদের আয়তন বিপুল, বিস্তার বিরাট, সব রকম পাঠকের সব রকম চাহিদা মেটানোর জন্য ভূরি পরিমাণ আয়োজন সেখানে মাসে মাসে জমে ওঠে। বাছাই করা পণ্যের সাজানো-গুছানো দোকান নয়, পাঁচমিশেলি গুদামঘর যেনো; সেখানে রসজ্ঞের কাম্যসামগ্রী কিছু হয়তো কোথাও লুকিয়ে আছে, কিন্তু বিজ্ঞাপনের গোলমাল পেরিয়ে বর্জইস অক্ষরের অলিগলি বেয়ে সেই সুখধানে পৌঁছানো অনেক সময়েই সম্ভব হয় না—পাতা ওল্টাতেই শ্রান্ত হয়ে পড়তে হয়। এসব পত্রিকা তাদের জ্ঞানত যারা নির্বিচারে পড়ে, শুধু সময় কাটাবার জন্য পড়েÑআর সংখ্যায় বৃহত্তম তারাই। এরা উৎকৃষ্ট লেখাও পরিবেশন করে তা নয়, কিন্তু দৈবাৎ করে, কিংবা নেহাৎই লেখক ‘নামজাদা’ বলে স্থান দেয়; সেটা প্রকাশ নয়, প্রচার মাত্র; তার পিছনে কোনো সচেতন সাহিত্যিক অভিপ্রায় থাকে না। এসব পত্রিকা শুধু সমাবেশ ঘটায়, সামঞ্জস্য সাধন করে না, যা সংগ্রহ করে তার ভেতর দিয়ে কিছু রচনা করে তোলার চেষ্টা এদের নেই—শুধু কালস্রোতে ভেসে চলা এদের কাজ; কোনো নতুন তরঙ্গোৎক্ষেপ নয়।
যথাস্থানে প্রাপ্তিস্বীকার করতেই হয়; এই সর্ববহ পত্রিকার বর্তমান রূপ যেমনই হোক, বাংলাদেশে তার ইতিহাস অনুজ্জ্বল নয়। এই আদর্শ নিয়েই প্রবাসী দেখা দিয়েছিলো, এবং তারপর বহু বছর ধরে পত্রিকার অন্য কোনো রূপ কারো ধারণার মধ্যেই আসেনি—যদিও ভারতী আর সাহিত্যের সাহিত্যঘটিত বৈশিষ্ট্য আধুনিক লিটল ম্যাগাজিনের পূর্বাভাস ছিলো। কিন্তু প্রবাসী উত্থানের দিনে ভারতী নিস্তেজ হয়ে আসছে, আর সমাজপতির সমালোচনায় ধ্বংসবিলয় অত্যধিক ছিলো বলে সৃষ্টির ক্ষেত্রে তা কাজে লাগেনি। বহু বছর ধরে প্রবাসী ছিলো দেশের মধ্যে পয়লা নম্বর, তার বহুমিশ্র পক্বশস্যে সাহিত্যের সোনার ধানেরও অভাব ছিলো না; আর নতুন লেখকের পরিচয়সাধনও কোনো এককালে তাকে দিয়ে যে সম্ভব হতো, তার প্রমাণ আছেন মণীন্দ্রলাল বসু। তার চরম গৌরবের দিনে প্রবাসী—আর প্রথম কয়েক বছরের বিচিত্রা এ দুটি পত্রিকায় কৌলিন্য না থাকলেও সংগ্রহের বৈদগ্ধ্য ছিলো; কোনো সর্ববহ পত্রিকা কতদূর সুপাঠ্য, পাঠযোগ্য, রক্ষণযোগ্য হতে পারে তার কোনো তুলনীয় উদাহরণ বাংলা ভাষায় তৃতীয়বার ঘটেনি। একদিক থেকে বিচিত্রার কৃতিত্ব আরো বেশি, কেননা প্রবাসীতে অনুচ্চার্য শরৎচন্দ্রকে আর ভারতবর্ষে অনুপস্থিত রবীন্দ্রনাথকে প্রথমবার একসাথে পাওয়া গিয়েছিলো বিচিত্রায়, উপরন্তু প্রমথ চৌধুরী, সবুজপত্র আর ভারতীর ভাঙা দল, এমনকি ‘কল্লোল’র সদ্যোজাত লেখকরা পর্যন্ত, সকলেই সেখানে একত্র হয়েছিলেন। নানা বয়সে নানা ভাবের লেখকদের এরকম উদার সম্মেলন আর কখনো ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।
কিন্তু শুধু রচনা প্রকাশ করাই পত্রিকার কাজ নয়—সে রচনা যতই ভালো, যতই সুনির্বাচিত হোক না। লেখককে প্রকাশ করাও তার কর্তব্য, পরিবর্তনের ধাত্রী এবং আধার হওয়াও তার কাজ। যতদিন পাঠকের সংখ্যা অল্প ছিলো, পাঠ্যবস্তুর চাহিদা পরিমিত, আর শিক্ষিত নামধারী মানুষমাত্রেই সুশিক্ষিত ছিলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে রুচির বৈষম্য যতদিন উগ্র হয়ে ওঠেনি, ততদিন জনপ্রিয়তার সাথে সৃষ্টিশীলতার বিরোধ এমন দুস্তর ছিলো না। ভিক্টরীয় যুগে লন্ডন শহরে যেসব ক্রিসমাসবার্ষিকী বেরোতো, সেগুলো নারীরা সযত্নে তাদের বুদোয়ারে সাজিয়ে রাখতেন, শুনতে অবাক লাগে সেগুলোই ছিলো তখনকার দিনে কাব্য প্রচারের প্রধান বাহন, টেনিসনের, এমনকি ব্রাউনিংয়েরও নতুন কবিতা স্থান পেতো তাতে—হয়তো আমাদের আজকালকার পূজাবার্ষিকীতে জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতোই অসঙ্গতভাবে। কিন্তু এই সময়ের অনতিপরেই স্বাক্ষর মানুষ অসংখ্য হয়ে উঠেলো সাহিত্যে। তখন সৃষ্টি বেগ প্রবাহিত হবার জন্য ভিন্ন পথ খুঁজে নিলে, এমন পত্রিকার প্রয়োজন অনুভূত হলো, যার অনতিস্থায়ী জীবনের মধ্যে সাহিত্যের সদ্যতন বিশেষ সাধনাটি মূর্ত হয়ে উঠবে। দেখা দিলো রসেটির বীজাণু, তারপর নব্বুই যুগের নিশান উড়িয়ে হলুদ পুঁথি। আর তারই সাথে দুই দশকের ব্যবধানে সবুজপত্রের উদগম, বাংলা পত্রিকার অপূর্ব আদর্শের জন্ম।
দুই.
সবুজপত্র বাংলা ভাষার প্রথম লিটল ম্যাগাজিন। কারো কারো মনে হতে পারে, বঙ্গদর্শন বা সাধনা বিষয়েও কথাটা প্রযোজ্য। কিন্তু যখন অন্য কিছুর প্রায় অস্তিত্বই নেই, প্রতিতুলনার যোগ্য কিছু নেই, তখন শ্রেণীবিভাগে সার্থকতা কোথায়? বাংলা পত্রিকার সেই আদিযুগে, যখন পাঠক ছিলো স্বল্প এবং আজকের তুলনায় অনেক বেশি সমভাবাপন্ন, তখন বঙ্কিম আর রবীন্দ্রনাথ ঐ পত্রিকা দুটিকে তাঁদের একান্ত সাহিত্যসাধনার মধ্যেই নিবিষ্ট করে নিতে পেরেছিলেন, প্রতিবাদের প্রয়োজন তখনো প্রবল হয়ে ওঠেনি। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন নামেই যখন প্রতিবাদ, তখন অন্তরেও নিশ্চয়ই তা থাকা চাই—আর সেটা শুধু একজন অধিনায়কেরই নয়, একটি সাহিত্যগোষ্ঠীর। সবুজপত্রে এই লক্ষণ পুরোমাত্রায় বর্তেছিলো। তাতে বিদ্রোহ ছিলো, যুদ্ধঘোষণা ছিলো, ছিলো গোষ্ঠীগত বৈষম্য। তার মানে সাম্প্রদায়িকতা নয়, শুধু দীক্ষিতের মধ্যে আবদ্ধ থাকা নয়। যেখানে সমধর্মীরা পরস্পরের মনের স্পর্শে বিকশিত হয়ে ওঠেন তাকেই বলে গোষ্ঠী, আর সেটা যখন ঘটে তখনই কোনো পত্রিকায় সবুজপত্রের মতো সুরের ঐক্য দেখা দেয়, চরিত্রের অমন অখণ্ডতা, প্রকাশের অমন প্রথামুক্ত নির্ভয় ভঙ্গি। মনে পড়ছে সবুজপত্রের কেনো একটি সংখ্যার ঘরে বাইরের একটি সুদীর্ঘ কিস্তি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। আর এমন সংখ্যা তো অনেক হয়েছে যেটি রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী আর বীরবলের রচনাতেই সমাকীর্ণ। কিন্তু যে সংখ্যায় বহু লেখকও স্থান পেয়েছেন, সেটিও রূপ নিয়েছে সম্পূর্ণ একটি রচনার, অর্থাৎ সেই বহুর মধ্যে দপ্তরির সুতো ছাড়াও আন্তরিক একটি সম্বন্ধ থেকে গেছে। এই অখণ্ডতা গোষ্ঠীসাপেক্ষ, তাই গোষ্ঠী ছাড়া সাহিত্যপত্র হয় না।
সবুজপত্র আমাদের জন্য কী করেছে তার আলোচনা নানা স্থলে করেছি, এখানে তার চুম্বক দিতে চেষ্টা করি। এর প্রথম দান প্রমথ চৌধুরী বা বীরবল, দ্বিতীয় দান চলতি ভাষার প্রতিষ্ঠা, তৃতীয় (এবং হয়তো মহত্তম) দান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রমথ চৌধুরী আর রবীন্দ্রনাথ—এ দুজনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিলো সবুজপত্রে, প্রথম জনের আত্মপ্রকাশের জন্য, দ্বিতীয় জনের নতুন হবার জন্য। প্রচলিত অন্য কোনো পত্রিকায়, অন্য কোনো সম্পাদকের আশ্রয়ে প্রমথ চৌধুরীর স্বকীয়তার বিকাশ হতে পারতো না; তাছাড়া শুধু রচনাতেই নয়, সম্পাদনাতেও তিনি ছিলেন প্রতিভাবান। রবীন্দ্রনাথ—তিনি সবুজপত্রের কাছে পেয়েছিলেন পুরোনো অভ্যেসের বেড়ি ভাঙার সাহস, যৌবনের স্পর্শ, গদ্য ভাষার জন্মান্তর-সাধনের প্রেরণা—বরং যে প্রেরণা তাঁর নিজেরই মনের নেপথ্যে কাজ করছিলো, নিঃসংকোচে মুক্তি দেবার পথ পেয়েছিলেন। যেমন টেনিসন ক্রিসমাস বার্ষিকীতে কবিতা ছাপাতে আপত্তি করেননি, তেমন রবীন্দ্রনাথ তাঁর সর্বোত্তম এবং সর্বাধিক রচনাবলী বহু বছর ধরে প্রবাসীতে প্রকাশ করেই তৃপ্ত ছিলেন। এ ব্যবস্থায় তাঁর কোনো বিক্ষোভ ছিলো না, বরং ছিলো প্রবাসীর উদার আশ্রয়ের জন্য কৃতজ্ঞতা। প্রবাসীর নানা গুণের মধ্যে দোষ ছিলো এই যে, কোনো দোষই ছিলো না, ঐ রেসপেক্টেবিলিটির দুর্গের মধ্যে ঘরে বাইরে উড়ে এসে পড়লে কী রকম অভ্যর্থনা হতো বলা যায় না, কিন্তু সহজ বুদ্ধিতে অনুমান করা যায় যে, ঘরে বাইরের রচনার পিছনে সবুজপত্রের উদ্দীপনা কাজ করেছে। বলাকার সময় থেকে গদ্যে পদ্যে যে নতুন রবীন্দ্রনাথকে আমরা পেয়েছি, তার স্রষ্টা অবশ্য রবীন্দ্রনাথ নিজেই, কিন্তু ধাত্রী সবুজপত্র তাতে সন্দেহ নেই।
তিন.
আমরা যখন বড়ো হয়ে উঠছি তখন পর্যন্ত প্রবাসীতে প্রকাশিত হওয়াই কোনো নতুন লেখকের মোক্ষ বলে গণ্য হতো। প্রায় পাঠক বয়সেই আমার সেই পূণ্যলাভ ঘটেছিলো, তবু প্রথম যখন কল্লোলে আমার লেখা বেরোলো, তখন বিশেষভাবে সার্থক মনে হলো নিজেকে। তার কারণটা কী, বলি।
কল্লোলে যাঁদের লেখা পড়তুম— গোকুলচন্দ্র নাগ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র—নতুন নাম সব, কিন্তু আমার মন যেন তাদের সাথে এক সুরে বাঁধা, তাঁরা যেন আমার আত্মীয়, তাঁদের জন্য আমি রক্তের মধ্যে চঞ্চলতা অনুভব করতাম—অনেকটা রাজহাঁস দেখে হ্যান্স আন্ডেরসেনের কুরূপ হংসশাবকের মতো। সেই কল্লোলে স্থান পাওয়া আমার পক্ষে অনিবার্য ছিলো। কিন্তু তাই বলে পাবার মুহূর্তের উৎসাহ ভোলবার নয়। মনে হলো বাড়ি খুঁজে পেলাম, পথে পথে সরাইখানায় আর ঘুরতে হবে না। প্রবাসীতে যে লেখাটা বেরোলো, সেটা হয়তো বহু মানুষের চোখে পড়লো, কিন্তু ঐ ঠেলাঠেলি ভিড়ের মধ্যে আমি গেছি হারিয়ে। কিন্তু কল্লোল যেন চিনতে পারলো আমাকে, সেই অভিজ্ঞানে আমিও নিজেকে চিনলাম। অর্থাৎ, প্রবাসীতে প্রকাশিত হওয়া মানে বিজ্ঞাপন, আর কল্লোলে প্রকাশিত হওয়া মানে নিজেকে আবিষ্কার করার আনন্দ। লেখকের পক্ষে, বিশেষত কাঁচা বয়সের অস্থির লেখকের পক্ষে এ দুয়ের মধ্যে কোনটা স্মরণীয় তা বলবার কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
আজকালকার যুবকেরা আমাকে মাঝে মাঝে বলে থাকেন, ‘কেন যে কল্লোলের কথা এত বলেন আপনারাÑপড়ে দেখেছি, বাজে লেখায় ভরতি।’ ‘বাজে’—সে কথা মানতে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু ফুলের পক্ষে পল্লব যে রকম বাজে, এও সেই রকম। কল্লোল বেঁধে ফুলের তোরা বাঁধেনি বলে তাকে দোষ দিই না, সে যে আস্ত গাছের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিলো, সেটাই তার প্রাণশক্তির প্রমাণ। তার পরিবেশের মধ্যে বুদ্ধির চর্চা বেশি ছিলো না, কিন্তু প্রাণ ছিলো, আবেগ ছিলো, তার টানে কিছু আবর্জনা তো ভেসে আসবেই। সেটা কিছু না—স্রোতটাই আসল কথা। স্রোত ছিলো কল্লোলে, জোয়ার এসেছিল, রবীন্দ্রনাথের কসুমশয়নে দীর্ঘ সুখতন্দ্রার পর আমরা হঠাৎ নিজের মধ্যে জেগে উঠেছিলাম। ঐ আবেগই আমাদের প্রয়োজন ছিলো তখন, প্রয়োজন ছিলো ভুল করবার স্বাধীনতায়, কেননা আমরা বুদ্ধি দিয়ে অনেক রকম ভুল বুঝলেও সৃষ্টিকালে আমাদের প্রাণ তার আপন কথা ঠিক বলে নেয়Ñযদি প্রাণ জেগে ওঠে। আমরা প্রথম যখন নিজের প্রাণের সাড়া পেয়েছিলাম নিজের কথা বলে উঠতে পেরেছিলাম, সেই সময়কার বহুনিন্দিত ধিকৃত রচনাগুলো— যা কোনো ভদ্রগোছের সম্পাদক দ্বারা স্পৃষ্ট হবার সম্ভাবনা ছিলো না—সেগুলোকে কল্লোল যে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করেছিলো, তার এ প্রশ্রয়ের দ্বারাই সে সার্থক করেছে, সার্থক হয়েছে। বলা বাহুল্য, এটা শুধু আমার বা আমার সমসাময়িকদের ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নয়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের মধ্যেই এই সত্য গাঁথা হয়ে গেছে। জঞ্জাল তলিয়ে গেছে কবে, উদ্বৃত্ত পলিমাটির খবর বাংলাদেশের পাঠক ও তরুণতর লেখকদের অজানা নেই। যেসব অখ্যাত কিংবা কুখ্যাত এবং সন্দেহভাজন যুবক সেই সময়ে বলার জন্য আকুলিবিকুলি করছিলো, যাদের আক্ষরিক অর্থে কণ্ঠরোধ করারও প্রস্তাব উঠেছিলো, তাদের ব্যক্ত হতে দেবার মতো, যাত্রা পথে এগিয়ে দেবার মতো উত্তাপটুকু কল্লোল ছাড়া সারা দেশে আর কোথাও ছিলো না। লেখকরা যেমন পত্রিকা গড়ে তোলেন, তেমন পত্রিকার প্রভাব লেখকদের উপর পড়ে। কোনো এককালে অচিন্ত্যকুমার নীহারিকা দেবী ছদ্মনামে প্রবাসীতে যেসব পদ্য ছাপিয়েছিলেন, আশা করি তাঁর বন্ধুরা সেগুলো মনে রাখেননি। কিন্তু কল্লোলে স্থান পাবার পরেই দেখা দিতে লাগলো তাঁর স্বকীয় রচনাবলী। অবশ্য এমন নয় যে এটা কল্লোলের জন্যই হয়েছিলো—কোনো পত্রিকার বিষয়েই তা বলা চলে না—সাহিত্য তার আপন অন্তরের বেগেই চলতে চলতে নিজের পথ তৈরী করে নেয়, পত্রিকাগুলো শুধু প্রয়োজনীয় যন্ত্রের কাজ করে। কিন্তু ফসল যদি সঞ্চয়যোগ্য হয় তাহলে যন্ত্রটাও শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠে। লেখকরাও কি ঈশ্বরের যন্ত্র নন, তবু কোনো সুন্দর সৃষ্টির জন্য আমরা কি তাঁদের অভিনন্দন জানাই না?
চার.
প্রগতি ও কালি কলমÑকল্লোলের এই শাখা দুটি অত্যল্প কালেই ঝরে পড়লো, আর কল্লোলের সমাপনের জের টেনে তারই ধারা এগিয়ে নেবার উদ্যম দেখা দিলো কুমিল্লা থেকে পূর্বাশায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পৃথিবীর মনের ঋতুতে অলক্ষে যে হাওয়া বদল ঘটে গেছে, যা আমরা আভাসে-ইঙ্গিতে অনুভব করছিলাম, তার স্বাদ প্রথম স্পষ্ট হলো যখন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পরিচয় প্রকাশ করলেন। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রান্তে পৌঁছেছি। আমার শেষ পরীক্ষার প্রথম দিনে পরিচয়ের প্রথম সংখ্যা চোখে দেখেছিলাম। পরীক্ষামণ্ডপে রক্ষী ছিলেন শ্রীযুক্ত সুশোভন সরকার; তিনি নিঃশব্দে পায়চারি করতে করতে যে পত্রিকাটি পড়ছিলেন, তার মলাটে পরিচয় লেখা দেখতে পেয়ে আমি খাতা লিখতে লিখতে ঈর্ষানি¦ত দৃষ্টিপাত করছিলাম মাঝে মাঝে। সেদিনই বিকেলে এই নতুন পত্রিকাটির একটি খণ্ড আমারও হাতে পৌঁছালো; দেখে মানতে হলো নতুন বটে।
পরিচয়ের সাথে সবুজপত্রের তুলনা অপ্রতিরোধ্য, নানা দিক থেকেই এ দুটিতে মিল আছে। সবুজপত্র যেমন প্রমথ চৌধুরীর, তেমনি পরিচয়েও জরুরিতম প্রয়োজন ছিলো সুধীন্দ্রনাথের নিজেরই, তাঁর ব্যক্তিস্বরূপের স্ফূর্তির জন্য। এর আগে পর্যন্ত সুধীন্দ্রনাথের খ্যাতি তাঁর বন্ধুমহলেই আবদ্ধ ছিলো; আমি বাংলা সাহিত্যের অলিগলির খবর রেখেও তার নাম আগে শুনিনি। তবু, তাঁর সাথে আমাদের পরিচয় স্থাপনেই পরিচয়ের দায়িত্ব চোকেনি; সবুজপত্রের মতো, সেও একটি নতুন লেখকগোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলো এবং সেই লেখকরা ছিলেন প্রধানত ব্যাখ্যাতা, বিশ্লেষণপন্থি, শিল্পী ততটা নন যতটা জ্ঞানী, রসের স্রষ্টা ততটা নন যতটা রসজ্ঞ;—এও সবুজপত্রেরই মতো। এবং সম্পাদনাকর্মে সুধীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব প্রমথ চৌধুরীর মতোই স্মরণীয়।
সুধীন্দ্রনাথের পরিচয়ের কথা ভাবলে আজ আমার মনে হয় যে, কল্লোলের তোলপাড়ের পর ঘর গোছাবার কাজ নিয়ে সে এসেছিলো। কল্লোলে যা ছিলো না, তাই ছিলো ষ্ক্রু সম্পদ; বিদ্রোহের উন্মদনা যখন কেটে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে পরিচয় নিয়ে এলো রুচি, বিচারবুদ্ধি, চিন্তার শৃঙ্খলা। ততদিনে ইংরেজি সাহিত্যে টোয়েন্টিজ-এর রঙিন দিন অস্তমান; অল্ডস হাক্সলি ও লিটন স্ট্রেচির ব্যঙ্গ, লরেন্সের সংরাগ, ভর্জিনিয়া উলফের অতি সূক্ষ্ম ভাবনা জালÑএই সবের উপর দিয়ে পোড়ো জমির হিম হাওয়া বইতে শুরু করেছে। পশ্চিমী সাহিত্যের এই নতুন ধারাটিকে পরিচয় আমাদের চোখের সামনে উজ্জ্বল করে তুললো, সমসাময়িক বিশ্বমনের বাণী শোনালো—বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্পকলা, সকল ক্ষেত্রে। অন্তত ত্রৈমাসিক অবস্থায় তার পাতায় বৈদেশিক চিন্তার আলোচনায় যেরকম প্রাচুর্য আর দক্ষতা দেখা গিয়েছিলো, বাংলা ভাষায় তার ভাষ্য, কিন্তু প্রসাধনের পরিচ্ছন্নতায় তার বিশেষ মর্যাদা ছিলো, তাছাড়া একটিও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করে পদার্থতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে যে বাংলা রচনা সম্ভব, এই আদর্শের জন্যও পরিচয় আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন।
বিষ্ণু দে’র সাহিত্যিক জন্ম কল্লোল যুগেই ঘটেছিলো, তাই এ কথা বললে ভুল হয় না যে সৃষ্টিশীল সাহিত্যের ক্ষেত্রে পরিচয়ের অনন্য দান সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। অন্য যাঁরা এই ঘাটে ভিড়েছিলেন, যাঁদের লেখা এখানেই প্রথম আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখানেই শেষ দেখা গেছে, তাঁরা কেউ প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যিক নন। এটা তখন অপবাদরূপে উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ, শৌখিন বলে বক্রোক্তি করেছেন, কিন্তু সাহিত্যে শৌখিনতা বাদ দিতে গেলে সেটা নিতান্তই লেখকদের একটা ঘরোয়া ব্যাপার হয়ে পড়ে। লেখকদের দিয়েই সাহিত্যের সৃষ্টি হয়, কিন্তু শুধু লেখকদের দিয়ে কোনো সাহিত্যসমাজ গঠিত হতে পারে না, তার সার্থক অস্তিত্বের জন্য প্রান্তিক অধিবাসীদের একটি পরিমণ্ডল চাই। চাই রসিক, কলাবিদ, বিদগ্ধজন। চাই আদি অর্থে amateur অর্থাৎ প্রেমিকের দল। যে লোকটা লেখে তার তো লেখাটাই পেশা, আর মৎস্যজীবি মৎস্যগন্ধে ব্যাকুল হবে না তো কে হবে। কিন্তু যে মানুষ নিজে লেখে না অথচ সাহিত্য ভালোবাসে, শুধু ভালোবাসে না, চিন্তাও করে তা নিয়ে, লেখকরা যে পণ্ডশ্রম করেননি সেই মানুষই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আর তাই শৌখিনদের হাতে কখনো কখনো উত্তম রচনা বেরিয়েছে, ইতিহাসে তার নজিরের অভাব নেই। পরিচয়ের যে বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে উল্লেখ্য ছিল, সেই সমালোচনা বিভাগটি নিবিড় হয়েছিল সুধীন্দ্রনাথের অ-সাহিত্যিক বন্ধুদের সমবায় সাধনে। যেসব সমালোচনা নিষ্কাম কর্মের উদাহরণরূপে গণ্য হতে পারে, কেননা তাঁরা বই কিনে বেছে বেছে রিভিউ লিখতেন, প্রকাশকের উপকার করা তাঁদের উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিলো না, সব ক্ষেত্রে গ্রন্থকর্তারও নয়, কেননা গ্রন্থকারটি অনেক সময়ই পৃথিবীর অন্য প্রান্তের অধিবাসী, পরিচয় এবং বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিষয়ে অচেতন। কিন্তু অন্য কারো উপকার হোক বা না হোক, এতে উপকৃত হয়েছিলাম আমরা, বাংলাদেশের সাহিত্যিক সম্প্রদায়। শুধু যে নানা দেশের নতুন সৃষ্টির সাথে পরিচিত হয়েছি তা নয়, রচনার উৎকর্ষেও আমরা বিস্মিত এবং শিক্ষিত হয়েছি। এমন বুদ্ধিদীপ্ত রসোজ্জ্বল সমালোচনা, এমন অজস্র পরিমাণে আমাদের জীবৎকালে বাংলা ভাষায় ইতিপূর্বে আমরা পাইনি। লেখকদের মধ্যে যোগ্যতার তারতম্য নিশ্চয়ই ছিলো; অন্যান্য বিভাগে ভালোর সাথে মাঝারি লেখাও বেরিয়েছে, কিন্তু আশ্চার্য এই, গ্রন্থ সমালোচনার অংশে প্রায় প্রত্যেক রচনাতেই কিছু না কিছু গুণপনা দেখা যেত। অবশ্য এমন লেখাও দেখেছি, যেখানে দুই বা তিন পঙক্তির মধ্যে দশ-বারোটি বিদেশী লেখকের নামাবলী অঙ্কিত হয়ে ব্যাপারটাকে প্রায় অর্থহীন করে তুলেছে, কিন্তু এমনও উদাহরণ জানি যেখানে কোনো লেখক দশ বছর ধরে অবিরাম লিখেও কারো মনে রেখাপাত করতে পারেননি, কিন্তু পরিচয়ে একটি ধারালো রিভিউ লিখে হঠাৎ আমাদের অবাক করে দিয়েছেন। একবার আবহাওয়া জমে উঠলে এই রকমই হয়। যুদ্ধে আবহাওয়া ধ্বংস হলো, সুধীন্দ্রনাথ পরিচয় ত্যাগ করলেন, এবং চতুরঙ্গ যা পরিচয়ের সগোত্ররূপে আশাপ্রদভাবে আরম্ভ হয়েছিলো, তাও তৎকালীন বিশৃঙ্খলার জন্য সংহত হয়ে উঠতে পারলো না।
পাঁচ.
পরিচয়ের কোনো এক বৈঠকে অন্নদাশঙ্কর রায়ের হাতে একটি পত্রিকা দেখেছিলাম। রোগা চেহারা, ইট রঙের মলাটের উপর শেলির ছবি ছাপানো, নাম মনে নেই। ভাষা ইংরেজি, জাতি মার্কিন, ভেতরে ছিলো চওড়া মার্জিনে সুন্দর করে সাজানো কবিতা, শুধু কবিতা আর কবিতারই বিষয়ে কিছু আলোচনা। এই প্রথম আমি কবিতার কোনো পত্রিকা দেখলুম।
এর আগে অনেকদিন ধরে মনে মনে অত্যন্ত পীড়া পেয়েছি আমাদের দেশে কবিতার অপমানের কথা ভেবে। বালক বয়সে প্রথম যখন পাঠকশ্রেণীতে ভর্তি হই, তখন থেকে দেখে আসছি আমাদের সর্ববহ পত্রিকাগুলো কবিতার সাথে কী রকম শ্রদ্ধাহীন ব্যবহার করে থাকেন। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া অন্য যে কোনো লেখকের পদ্যজাতীয় রচনার কাজ হচ্ছে পাদপূরণ, গদ্য ভোজের এঁটো পাতে সসংকোচে তাকে বসতে হয়, তার বাছাইয়ের মাপকাঠি হচ্ছে ইঞ্চি মাপা স্কেল। নামজাদা কবির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম দেখিনি; প্রবাসী কোনো কোনো সংখ্যায় সত্যেন্দ্র দত্তের পাঁচ-ছটি করেও কবিতা পাওয়া গেছে, কিন্তু ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে, ডবল কলামের ঠেলাঠেলির মধ্যে কখনো মনে পড়ে না আস্ত পাতাটা ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। বড়ো জোর আমিষান্নের ফাঁকে ফাঁকে চাটনির মতো পরিবেশন, কিন্তু কবিতাটাই যে একটা ভোগ্য বস্তু এমন ভাব কোথাও নেই। বাংলা মাসিকপত্রের এই অবিচল প্রথার মধ্যে সবুজপত্র বিস্ময় নিয়ে এলো—শুধু চরিত্রে নয়, চেহারাতেও, আর কল্লোল তার পরবর্তী সাহিত্যপত্রিকাগুলোতেও কবিতা ছাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যবস্থার প্রবর্তন হলো। আমি কখনো কখনো এমন পত্রিকার স্বপ্ন দেখতাম যেটা শুধু কবিতারই জন্য। নিছক স্বপ্ন—বন্ধুদের কাছে উচ্চার্য নয়। সেই স্বপ্নের একটা বাস্তব রূপ এই মার্কিনি নমুনাটিতে দেখতে পেয়ে আমি একটা দুঃসাহসিক কথা চিন্তা করে ফেললাম; এরকম একটা বের করা যায় না বাংলায়? তাহলে তো কবিতা—এবং কবিরা—পদপ্রান্তিক অবমাননা থেকে বেঁচে যায়। অ¤িœবাসের বদলে একেবারে রিজার্ভ করা সেলুনপাড়ির ব্যবস্থা—অন্য কারো জায়গাই নেই সেখানে।
ইতিপূর্বে আমাদের দেশে কোনো কবিতাপত্রের জন্ম হয়নি, সে রকম কোনো প্রস্তাবও শুনিনি কখনো। আমার কল্পনাকে সম্ভবপরতার পরাপারে বলেই ধরে নিলাম, অথচ সেটা মন থেকে বিদায় নিতেও নারাজ, মাঝে মাঝে সেটাকে নিয়ে খেলা না করেও পারি না। যখন কবিতা বেরোলো, সেও খেলাচ্ছলেই। কোনো সম্বল ছিলো না, আয়োজন ছিলো না; দেখা যাক না কী হয়—এই গোছের মনের ভাব নিয়ে আরম্ভ হলো। বিষ্ণু দে, আরেকজন অকবি বন্ধু, পাঁচ টাকা করে চাঁদা দিলেন, প্রথম দ্ইু সংখ্যা বিনামূল্যে ছেপে দিলেন সদ্যস্থাপিত পূর্বাশা প্রেস। কোলকাতার সুধীসমাজে যাঁদের মুখ চিনি বা নাম জানি, এই রকম পনেরো-কুড়ি জনের কাছে প্রথম সংখ্যাটি পাঠিয়ে দিলাম—গ্রাহক হবার অনুরোধে। সেই অনুরোধ প্রায় সকলকেই সম্মানিত করলেন। এতটা আমি আশা করিনি। বাহক ফিরে এলো এক মুঠো ছোটো-বড় রৌপ্য মুদ্রা নিয়ে। সমর সেন নিয়ে গেলেন এসপ্লানেডের স্টলে; তারা বললে, এইটুকু কাগজ ছ আনা দিয়ে কে কিনবে, চার পয়সা দাম হলে ঠিক হতো। দুদিন পরে আরো দশ কপি পাঠাতে হলো সেখানেÑএতে স্টলওয়ালা নিশ্চয় অবাক হয়েছিলো—কিন্তু আমি আরো বেশি। কয়েকদিন পরে, একটু ভয়ে ভয়ে, রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে দিলাম, তিনি চিঠি লিখলেন, লেখা পাঠালেন। কী মনে করে এডওয়ার্ড টমসনকেও পাঠালাম; পরিচয়, কবিতা, রবীন্দ্রনাথের সদ্যপ্রকাশিত ‘বীথিকা’ আর মান্দ্রাজের ‘ত্রিবেণী’ অবলম্বন করে তিনি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখলেন টামমিস-এর সাহিত্যক ক্রোড়পত্রে।
চেষ্টা দ্বারা আরো কিছু গ্রাহক করা গেলো, কিন্তু প্রথমে যাঁরা অযাচিতভাবে গ্রাহক হলেন তাঁরা রাজবন্দী। ভয় হতো পাছে অর্থাভাবে বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। সুখের বিষয়, ত্রৈমাসিক—দুটো সংখ্যা বেরোলেই ভাবতে পারতামÑযাক, অর্ধেক চাঁদা কাটানো গেলো। রাজবন্দীদের মুক্তির সময়ে খাতা থেকে একসাথে অনেকগুলো নাম কাটা পড়লো—একটু শঙ্কিত বোধ করলাম। কিন্তু চতুর্থ বছরের মুখে এসে বোঝা গেলো আকস্মিক অপমৃত্যুর অবস্থা পেরিয়েছে।
শ্রদ্ধার সাথে কবিতা ছাপা হবে—নামজাদা বা অনামজাদা যার লেখাই হোক নাÑপ্রসাধনেও বৈশিষ্ট্য থাকে—এই পত্রিকা প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য এটুকুর বেশি আমার ছিলো না। কিন্তু রচনাকালীন উপন্যাসের মতো, কবিতা সেই প্রথমিক পরিকল্পনা অতিক্রম করে নিজে নিজেই বেড়ে উঠলো। আজ পর্যন্ত তার প্রায় দুই দশকের ক্রিয়াকলাপ কেউ কেউ অবগত আছেন। কবিতাÑবিশেষত বাংলা ভাষার আধুনিক কবিতা—এই বিষয়টার একটি একান্ত রঙ্গমঞ্চ গড়ে উঠলো যেন—রচনায়, আলোচনায়, কোনো এক সময়ে সংলগ্ন ‘এক পয়সায় একটি’ গ্রন্থমালায়। সাহিত্যের অন্যান্য অঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু কবিতার উপর এই জোর দেবার প্রয়োজন ছিলো, নয়তো সেই উঁচু জায়গাটি পাওয়া যেতো না, যেখান থেকে উপেক্ষিতা কাব্যকলা লোকচক্ষের গোচর হতে পারে। কবিতা যখন যাত্রা শুরু করেছিলো, সেই সময়কার সাথে আজকের দিনের তুলনা করলে এ কথা মানতেই হয় যে, কবিতা নামক একটা পদার্থের অস্তিত্ব বিষয়ে পাঠকসমাজ অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন, সম্পাদকরাও একটু বেশি অবহিত-এমনকি সে এতদূর জাতে উঠেছে যে কবিতা লিখেও অর্থপ্রাপ্তিও আজকের দিনের কল্পনার অতীত হয়ে নেই।
ছয়.
সমিতি করে, মন্ত্রণাসভা ডেকে, কিংবা লিমিটেড কোম্পানি স্থাপন করে, কখনো সত্যিকার লিটল ম্যাগাজিন সম্ভব হয় না। এর আসল কথা স্বতঃস্ফূর্তি, বাইরে থেকে বানিয়ে তোলা যাবে না একে, ভেতরে থেকে হয়ে ওঠা চাই। এই হয়ে ওঠার প্রেরণারূপে থাকে কখনো কোনো একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের বল, কখনো কোনো লেখকগোষ্ঠীর মিলিত প্রভাব। সবুজপত্র ও পরিচয়ের সাথে প্রমথ চৌধুরী ও সুধীন্দ্রনাথের সম্বন্ধ তাই, যে সম্বন্ধ রেলগাড়ির সাথে ইঞ্জিনের। কিন্তু কল্লোলের সৃষ্টি হয়েছিলো তার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদকের হাতে নয়, তার লেখকদেরই নির্বন্ধরূপেগুণে। দীনেশরঞ্জন দাশ বের করেছিলেন গল্পের পত্রকা, যার সিকি চিত্র বিজ্ঞাপন দেখা যেতো—কিন্তু তার রূপান্তর ঘটলো গোকুলকুমার ও অচিন্ত্যকুমারের সংযোগে, তারপর নবযুবক লেখকরাই কল্লোলকে দখল করে নিলো, দীনেশরঞ্জন স্মিতহাস্যে অভ্যর্থনা জানালেন। সেই অভ্যর্থনার উষ্ণতায় তাঁর কৃতিত্ব, বন্ধুতার প্রতিভায় তার গৌরব। বন্ধুতা এখানে বড়ো কথা; কেননা বন্ধুতাই সেই শক্তি, যার দ্বারা কোনো এক সময়ে সদ্যোত্থিত বিক্ষিপ্ত চঞ্চলতা একটা জায়গায় সংহত ও মূর্ত হতে পারে। অর্থাৎ যাঁরা মিলবেন তাঁদের প্রাণের টানে মেলা চাই, কর্তব্যবোধে বা জীবিকার তাগিদে নয়। তা না হলে মিলন হয় না—যদিও সম্মেলন হতে পারে, গোষ্ঠী হয় না, শুধু ভিড় হয়। বিচিত্র যে সেই সময়কার সকল লেখকদো একত্র করতে পেরেছিলেন তার পিছনে শুধু সুবুদ্ধি ছিলো না, অর্থবলও ছিলো; সেখানকার লেখকদের সমাবেশের মধ্যে কোনো সমন্বয়ের সূত্র ছিলো না। কিন্তু কল্লোল বা পরিচয়ের লেখকরা তারই অন্তর্গত ছিলেন, ছাপার অক্ষরে পরস্পরকে নমস্কার জানিয়েই তাঁরা যে যার বাড়ি ফিরে যেতেন না, সেই প্রকাশের নেপথ্যে পরস্পরের ঝাউবনে তাদের যে অংশ ছিলো, তাতেই সমস্ত পরিবেশ উর্বর হয়ে উঠেছে। বন্ধুতাই এসব পত্রিকার প্রকৃত ক্ষেত্রÑআপিশ নয়, আঁটোসাঁটো সাহিত্যসভা নয়—খোলা হাওয়া, প্রীতি, স্বাচ্ছন্দ্য, যাকে বলে আড্ডা। অবশ্য এরকম যোগাযোগ ঘটলেই যে পত্রিকা সার্থক হবে তাও নয়, মৌলিক প্রতিভাও চাই, সত্যিকার নতুন সুর বেজে ওঠাও চাই—আর সেটা সময়ের বিশেষ বিশেষ লগ্নসাপেক্ষ। কিন্তু সেই বিশেষ লগ্নটি কবে আসবে তা তো আমরা আগে থেকে জানতে পারি না, তাই অবিরাম চেষ্টা করে যাওয়া দরকার। বর্তমান কালের যে কোনো যুগেই এ ধরনের সাহিত্যনিষ্ঠ পত্রিকার অস্তিত্ব থাকা ভালো—তাতে পাঠকদের লাভ এই যে, চলতি কালের রচনাধারার একটি সংবদ্ধরূপ দেখতে পাওয়া যায়, আর লেখকদের লাভ এই যে, তাঁরা উদাসীন বহুর বদলে সমনস্ক স্বল্পসংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেন। আমি যদি তিন মাসের মধ্যে একটি কবিতা লিখে উঠতে পারি তাহলে সেটি কবিতাতেই ছাপাতে ইচ্ছা করবো। তার কারণ লেখাটা আমি বিশেষভাবে যে কজনকে শোনাতে চাই, তাঁরা ঐ পত্রিকার পাঠক। এ কথাটা তরুণ লেখকদের পক্ষে আরো বেশি সত্য; বহু কাটতির পত্রিকার মধ্যে অসংখ্যের দৃষ্টিপাতসুখের বদলে সুনির্বাচিত স্বল্প পাঠকের অভিনিবেশই তাঁদের প্রয়োজন। আর বস্তুত, বাংলা ভাষার উপযুক্ত পত্রিকাগুলোর মধ্যে দিয়েই অধিকাংশ আধুনিক লেখক প্রতিষ্ঠালাভ করেছেন, এ কথাও আজ অনেকেরই অজানা নেই।
লিটল ম্যাগাজিন ব্যবসা হিসেবে অচল, তাকে চালাতে হলে আর্থিক অপব্যযের শক্তি চাই। সে শুধু ধনের শক্তি নয়, মনেরও শক্তি। কিন্তু তবু এই পশু তথ্যটা থেকেই যায় যে, রাজকীয় নামাঙ্কিত কাগজগুচ্ছেরও প্রয়োজন হয়। পশ্চিমী দেশে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক বদান্যতা দ্বারাই এসব অসাধ্য সাধন ঘটে থাকে; ইউলিসিস প্রকাশ করার অপরাধে যে পত্রিকা আদালতে সোপর্দ হয়েছিলো, সেই Transition কারয়িত্রী ছিলেন একজন ধনী নারী। ক্রাইটেরিয়নের একবার প্রায় উঠে যাবার দশা হলো। এলিয়ট দুদিনের জন্য সুইজারল্যান্ডে গেলেন, ফিরে এলেন আশ্বাস নিয়ে—শুধু মৌখিক আশ্বাস নয়। শিকাগোর ঢ়ড়বঃৎু এবং আমেরিকার অন্যান্য সাহিত্যপত্র প্রভূতভাবে দানের উপরেই নির্ভর করে থাকে। স্থানীয় ধনীদের কাছে এরকম সাহিত্যিক আগ্রহ আমরা কল্পনাতেও করি না, আমাদের কোনো রকফেলার বা ফোর্ড ফাউন্ডেশনও নেই, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের পক্ষে আনন্দের কথা এই যে, প্রমথ চৌধুরী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং অন্য কোনো কোনো সাহিত্যিকের দগ্ধ করার মতো অল্পবিস্তর অর্থ ছিলো, আমাদের সাহিত্যপত্রের ধারাটি তাই সম্ভব হতে পেরেছে। কবিতার অর্থবল ছিলো না, কিন্তু বন্ধুবল ছিলো, আর ছিলো সম্পাদকের দুর্মর আসক্তি। মনে হতে পারে আর্থিক কারণেই এসব পত্রিকা দীর্ঘজীবি হতে পারে না, কিন্তু সেটা শুধু আংশিক সত্য। স্বল্পায়ু হওয়াই এদের ধর্ম। বিশেষ কোনো সময়ে, বিশেষ কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর উদ্যমে, বিশেষ কোনো একটি কাজ নিয়ে এরা আসে, সেটুকু সম্পন্ন করে করে বিদায় নেয়। সেটাই শোভন, সেটাই যথোচিত। ইদানিং কবিতা বুঝি সেই শোভনসীমা পেরিয়ে গেলো, এ কথা ভেবে মাঝে মাঝে আমি অস্বস্তি অনুভব করি।

মীজানুর রহমান
ঢাকাচন্দ্রিকা
সূত্র : কথাসাহিত্য; ৩৭তম বর্ষ; দ্বাদশ সংখ্যা; আশ্বিন ১৩৯০; কলকাতা।

‘কথাসাহিত্য’-এর সহ-সম্পাদক সবিতেন্দ্রনাথ রায় মহাশয় নিয়মিত বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের নিয়ে লিখতে বলেছেন। নিয়মিত হবে কিনা জানিনে, তবে চেষ্টা করে যাবো। বাংলাদেশের সাহিত্যকর্ম মোটামুটি বলা চলে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী নির্ভর। রাজধানী ঢাকাতে কোনো কালেই লেখালেখির জগতে সাহিত্য পত্রিকা তেমন ডাঁটো ভূমিকা পালন করে নি। একমাত্র ব্যতিক্রম প্রয়াত কবি সিকান্দার আবু জাফর প্রতিষ্ঠিত ও সম্পাদিত মাসিকপত্র ‘সমকাল’। ষাটের দশকে আবির্ভাব এবং সত্তরের শেষার্ধে নির্বাণ—-প্রায় বিশ বছরের অস্তিত্ব। এই কাগজটি ঘিরে সত্যিকার অর্থে তৎকালীন নবীন ও প্রবীণ সাহিত্যিকদের সাহিত্য প্রচেষ্টা আবর্তিত হতো। এবং বলতে কি অকুতোভয় সম্পাদকের প্রকৃত ভাবমূর্তি নির্মাণে সিকান্দার আবু জাফর সাফল্য লাভ করেছিলেন। ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে শেষ দিকে পত্রিকা অনিয়মিত হয়ে পড়ে এবং তাঁর তিরোধানের ফলে শূণ্য স্থানটি আরেক প্রয়াত কবি হাসান হাফিজুর রহমান বলা চলে বিনে প্রাপ্তিযোগে কিছু কাল চালিয়ে গেলেও কার্যব্যপদেশে মস্কো গমনের দরুন ‘সমকাল’ বন্ধ হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক কালের কথা বলার আগে পটভূমিটা জানিয়ে রাখা ভালোÑপশ্চিম-বঙ্গের পাঠকদের জন্যে যা জরুরী মনে করি।
দেশভাগের পর ভঙ্গপূর্ববঙ্গের ভারি নড়বড়ে দশা। স্বাধীনতার সাঁজো উচ্ছ্বাস থির ধরলো কি সব কিছুতে ঢিমে তাল। সাহিত্যের ছোট্ট কিন্তু বেগবান ধারাতেও ঐ জের। মফস্বল শহর ঢাকার নিজস্ব সম্পদ বলতে সম্পাদিত ‘সোনার বাংলা’ বঙ্কিমচন্দ্র সাহা সম্পাদিত অর্ধ সাপ্তাহিক ‘চাবুক’ ও ‘ঢাকা প্রকাশ’। সবগুলো পত্রিকাই ছিল ট্যাবলয়েড সাইজ ও বর্তমান লুপ্ত। এই ‘সোনার বাংলা’- তেই ১৯৫০ সনে কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। দেশভাগের ফলে কলকাতা থেকে যাঁরা নতুন রাজধানীতে এলেন তাঁদের পরম সহায় হলো এই ‘সোনার বাংলা’। প্রকৃত অর্থেই ছিল সাহিত্য পত্র। উঠতি সব কবি সাহিত্যিককেই জায়গা করে দিল এই সাপ্তাহিকী। কিন্তু সমৃদ্ধ আর্থ দশা বিদ্যমান সত্ত্বেও পত্রিকাটির অকাল মৃত্যু ঘটে।
ওদিকে ‘চাবুক’, সে তো নামে গোয়ালা কাঁজী ভক্ষণ—অর্থাৎ তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে কষে চাবুক হানা দূরে থাকুক, কাঁচি মারা বিদ্যেটুকু রপ্ত করেছিল বেশ। আজও পরিষ্কার মনে পড়ে দুলকি চালে পা দুলিয়ে খবরের কাগজ থেকে পছন্দসই সংবাদটিকে কাঁচি চালিয়ে ভাবলেশহীন বঙ্কিমবাবু কাটিংগুলো পাঠিয়ে দিতেন বেটে বন্ধু নিতাই মারফৎ তালেবের কম্পোজিটর নরেনবাবুর হাতে। তবে বৃটিশ আমলে অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে এম. এ. পড়ায় ক্ষান্ত দেওয়া স্বদেশী লোকটি চাবুক নামের যথার্থ রাখার চেষ্টা একদা করতেন বৈকি। কিন্তু যে কারণে বর্তমান লুপ্ত (১৯৫৩ সনে কলকাতার মির্জাপুর স্ট্রীট থেকে পত্রিকাটির পুনঃপ্রকাশ ঘটেছিলো) চাবুকের নামটি আজও অনেক অশীতিপর প্রাচীনের মুখে মুখে ঘোরে সে তো ঐ ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা। তাহলে তো একটু পেছনপানে ফিরতে হয়।
এ শতাব্দীর প্রথম দশকের কথা। স্থান ঢাকা জেলার ভাওয়ালগড়। গড়ের রাজা রাজেন্দ্রনারায়ন। তাঁর তিন পুত্র। মধ্যমকুমার পীড়িত হলে হাওয়া বদলের জন্যে ১৯০৯ খৃঃ দার্জিলিং যান। সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী বিভাবতী, শ্যালক ও রাজ পরিবারের অন্যান্য সদস্য। কিছুদিন পরে পীড়া বৃদ্ধি পেলে চিকিৎসা চলাকালে মৃত্যু ঘটে। দীর্ঘ ১২ বছর পরে ১৯২১ এক সন্ন্যাসী ভাওয়ালগড়ে এসে নিজেকে মধ্যমকুমার হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু মধ্যমকুমার তো মৃত, অপর দিকে জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ ভ্রাতাও ইত্যবসরে মৃত্যুবরণ করেছেন—এক অদ্ভুত চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি! মধ্যমকুমারের ঠাকুরমা ও পিসিমাগণ তাঁকে গ্রহণ করলেন কিন্তু স্ত্রী বিভাবতী বেঁকে বসলেন।
সন্ন্যাসী মামলা দায়ের করলেন। তাঁর মন্তব্য : মৃতজ্ঞানে তাঁকে শ্মশানে নেয়া হয় বটে কিন্তু প্রবল ঝড়বৃষ্টির দরুণ না পুড়িয়েই লাশবহনকারীরাশ্মশান ত্যাগ করে। জ্ঞান ফিরলে তিনি আর দেশে ফিরে যাননি। সন্ন্যাসী জীবন কাটিয়ে আবার ঘরে ফিরেছেন।
ঘটনাটি তৎকালে সারা বাংলাদেশের বিশেষ করে ঢাকার ভীষণ উত্তেজনার সৃষ্টি করে। মামলা কখনও সন্ন্যাসীর পক্ষে যায় আবার কখনও বিপক্ষে যায়। মহাচাঞ্চল্যকর এই এই মামলার খবরাখবর রসের ভিয়েন দিয়ে পাঠকসমীপে হাজির করতো চাবুক। চাবুকের কাটতি অন্যান্য কাগজগুলোর ঈর্ষার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। মামলা চলে সুদীর্ঘ দু‘বছর আট মাস। জবানবন্দী নেয়া হয়েছিল ১৫ শত সাক্ষীর এবং আলামত পরীক্ষা করা হয়েছিল দু‘হাজারের মতো। অবশেষে ঢাকার অস্থায়ী জেলাজজ শ্রীযুক্ত পান্নালাল বসু মামলার রায় ঘোষণা করলেন সন্ন্যাসীর পক্ষে— এভাবেই ‘ভাওয়ালগড়ের সন্ন্যাসী’র বিখ্যাত মামলার অবসান ঘটেছিল। আর ততোদিনে বঙ্কিমবাবুও গুছিয়ে নিয়েছিলেন বেশ!
‘ঢাকা প্রকাশ’ ছিল মূলতঃ নিলাম ও টেন্ডার বিজ্ঞপ্তির কাগজ। খবরাখবর ছাপা হতো না বলবো না, তবে কি, ঢাকা মফঃস্বল শহর থেকে রাতারাতি রাজধানী হওয়ার কারণে পত্রিকার মর্যাদা রইলো না। আর মহার্ঘ—ক্ষুণ্ন হলো যথেষ্ট, ফলে একদা লুপ্ত হলো প্রায় শতবর্ষায়ু ‘ঢাকা প্রকাশ’।
১৯৪৮-এর দিকে (পৌষ, ১৩৫৫) প্রকাশিত ‘সংকেত’ই বোধ করি একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য মাসিকপত্র। বিভাগ-পূর্বকালের বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘প্রগতি’ ও মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের মুখপত্র ‘শিখা’র কথা মনে রেখেই একথা বলছি, কারণ আমাদের অন্বেষণ সে তো বিভাগোত্তর কালকে নিয়ে। এর সম্পাদনায় ছিলেন- সিরাজুর রহমান। বি. বি. সি.-র বাংলা বিভাগের সবচেয়ে পুরনো সদস্য হিসেবে এই নামটি উভয় বাংলায় তো বটেই বিশ্বের তাবৎ বাঙালীর কাছে অতি পরিচিত নাম।
এরপর ১৯৪৮—এর শেষার্ধে (২৫ শে ডিসেম্বর) আত্মপ্রকাশ করে কিশোর পাক্ষিক ‘মুকুল’ এবং ১৯৪৯-এর প্রথমার্ধে (ফেব্রুয়ারী) বেরোয় কিশোর মাসিক ‘ঝংকার’। ‘মুকুল’ পত্রিকাটি মুকুল ফৌজের (মণিমেলার সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান) অন্তর্দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে কখনও কিশোরদের কল্যাণকর কাজে সুস্থ ভূমিকা রাখতে পারেনি।
‘ঝংকার’ দেড় বৎসরাধিক কাল বেঁচেছিল। প্রকাশনার ও সম্পাদনার দায়িত্বে অগ্রজ মঈদ-উর-রহমান এবং আমি। দুজনেই ছাত্র। বড় ভাই মেডিক্যাল কলেজ, অধম স্কুলে। কলকাতা থেকেই হাতে-লেখা পত্রিকা বের করার একটা বাতিক ছিল। ঐ প্রক্রিয়াটা চলছিল ঢাকাতেও। হঠাৎ ছেপে বের করার বুদ্ধিটা মাথায় চাপলো। হুজুগে বাঙালী। কাজে কাজেই আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে থেকে চাঁদা তুলে ‘ঝংকার’ বের করার উদ্যোগ নেয়া হলো। কিন্তু কাগজ বের করার বড় অন্তরায় হয়ে দেখা দিল ব্লকের সমস্যা নিয়ে। সেকালে ঢাকাতে কোন ব্লক তৈরির প্রতিষ্ঠান ছিল না। অথচ ছোটদের কাগজ বের করার প্রধান শর্ত হলো, তা সচিব ও বর্ণ্যঢ্য হতে হবে। তো একেবারে ছিল না বলবো না, খুঁজেপেতে বের করেছিলাম ইসলামপুরের লায়ন সিনেমা হলের পাশে, চেট্টে-নেট্টে বি. এস. ব্লক কোম্পানী। যিনি মালিক তিনিই কর্মচারী–কুল্লে ঐ একজন। বিজ্ঞানসম্মত প্রায়োগিক প্রথার জিঙ্ক শীটের ওপর ব্লক নয়—গনগনে আগুনে সীসের পাত তৈরী করে বাটালির ঘায়ে উডকাঠের মতো ঠুকে ঠুকে তৈরি করেন ব্লকের ছাঁচÑআধো আলো আধো আঁধারির আধিভৌতিক পলেস্তরা খসে পড়া নোনাধরা ঘরে, ন্যূজদেহে একটা ব্রজভাব। চাঁচুনী ছিটকে ছিটকে পড়ে, চালশে চোখে লাগলো কি লাগলো না। বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশের অন্যতম সেরা শিল্পী কামরুল হাসান যে নামাঙ্কন করে দিয়েছিলেন ঐটে সামনে রেখে কাজ এগুচ্ছে, আমি অধীর আগ্রহে পাশে বসে—চিত্তচকোর যেমন। চম্চমা চোখে দেখি—চিকি পাতের গায়ে বাটালির ঘা পড়ে অক্ষরগুলো কেমন কেমন বেরিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে দু’ভায়েতে পরামর্শ করে সীসে কিনে নিয়ে আসলুম। হবে তো, আমাদের হাতেও হবে। তবে কি, সীসের পাশে নয় মোটে, আমাদের ঘা কাঠের মসৃণ গায়ে। আর তাই তো কাঠের টুকরোও যোগাড় হয়ে যায়—কাঠের চিকি শরীরে ছবি এঁকে ঐ রেখা বরাবর বাটালির ঘা চলে। উডকাট শেষ–অর্থাৎ ব্লকের ছাঁচ। এবার বাকী কেবল গালানো সীসে ঐ ছাঁচে ঢেলে ব্লক করা। বড় ভাই ততক্ষণে কড়াইয়ের সীসে গলিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়। আমার খোদাইয়ের কাজ শেষ কি কড়াইয়ের বাঁট ধরে গলিত সীসে ঢেলে দেন কাঠের ছাঁচে। মুহূর্তে প্রলয়কাণ্ড! স্পর্শগুণে জ্বলে ওঠে আগুন এবং পরক্ষণেই হিরোশিমার উৎক্ষিপ্ত ধু¤্রজাল। চোখের জলে নাকের জলে একশা। হায়! এতো কষ্ট করে এতো সময় নিয়ে যে ছাঁচ তৈরি হলো তা এক লহমায় খাক হয়ে গেল। ও খোদা! ও হরি! এ কি করেছি দুভায়েতে! বুদ্ধিসুদ্ধি শিকেয় উঠলো যে! কাঠের ছাঁচে উত্তপ্ত সীসে—কাঠের দোষে কোথায়, ও তো পুড়বেই। অথচ খেয়াল হয়নি প্রেসে এমনধারা কাঠের ব্লক দেখা সারা। আমার উডকাটটি যে নিজেই ব্লক—এ খেয়াল হলো কোথায়! কি রাম-বোকামি!
তো ঐ নিজের হাতে তৈরি কাঠের ব্লক যেমন চলতো, চলতো বৃটিশ তথ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া প্লাস্টিকের ব্লক, কলকাতা থেকে অর্ডার দিয়ে আনা ব্লক এবং মৌলানা আকরাম খাঁ প্রতিষ্ঠিত দৈনিক আজাদÑর ব্লক। প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে যায় ৪২ সীতারাম ঘোষ স্ট্রীট থেকে প্রকাশিত এবং সুজিতকুমারনাগ সম্পাদিত ভারতের প্রথম কিশোর পরিচালিত মাসিক ‘আগমনী’র কথা। প্রতি সংখ্যার দাম ছিল দু‘আনা। সুজিত ও আমাতে যে রাখীবন্ধন হয়েছিল তা ছিল খুবই পোক্ত। কাগজ বিনিময় তো হতোই, আরো কিছু চলতো। আমি দিতুম ছবি (‘আগামী’র একটি সংখ্যার প্রচ্ছদও ছিল আমার আঁকা), সুজিত ব্লক–জিঙ্ক ছাড়া কাঠের ব্লকও। ‘ঝংকার ও আগামী’র বন্ধনকে তথা পুব ও পশ্চিম বাঙলার সৌহার্দ্য আরো দৃঢ় করার লক্ষ্যে একটি বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলুম ১৯৪৯-এর হিমেল ডিসেম্বর। ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখেনি মুসলিম লীগ সরকার। গোয়েন্দা বিভাগের ফেউ লেগেছিল আমার পিছনে। কিন্তু সে তো আরেক কাহিনী। ঝংকার লুপ্ত, আগমনী সুপ্ত, কাজে কাজেই রাখীবন্ধনের গাঁটছড়াটিও মুক্ত। সুজিত নাথ কোথায় আছেন জানি নে। পত্রিকাসূত্রে আরো পরিচয় ঘটেছিল ৮০ কারবালা ট্রাঙ্ক লেন, কলকাতা ৬ থেকে প্রকাশিত ও সুধাংশুশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশিত ‘নতুন প্রভাত’-র সম্পাদক শীতলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। শীতলবাবু যথার্থ অর্থেই সজ্জন ও ‘ঝংকার’-এর শুভানুধ্যায়ী ছিলেন। কাছে এসেছিলেন তরুণ লেখক দেবকুমার ঘোষ। ওঁর যে ‘মেঘসুন্দর’ গল্পটি ছাপা হয়েছিল ঝংকার—এর ১ম বর্ষ ৭ম সংখ্যা (১৯৪৯)-তে, নরেন্দ্র দে সম্পাদিত ‘ইংগিত’-এর ১৯৫২ সনের পূজো সংখ্যার ফাইলে দেখলুম ঐ একই নামে দেববাবুর কিশোর-কিশোরীদের জন্যে ‘দেশ’ ও ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র প্রশংসাধন্য গল্পগ্রন্থের বিজ্ঞাপন।
তা ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া এই প্রাচীনের একটি সহজাত অভ্যাস; পাঠক নিজগুণে ক্ষমা করবেন।
ঐ যে ‘মুকুল’-এর কথা ওপরে বলেছি ঐটে ছিল গুরুসদয়-শিষ্য শিল্পগুরু কামরুল হাসান প্রতিষ্ঠিত কিশোর-কিশোরীদের প্রতিষ্ঠান মুকুল ফৌজের মুখপত্র। এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন আজকের বিজ্ঞান সাহিত্যচর্চার জন্যে কণিঙ্ক পুরষ্কারপ্রাপ্ত লেখক আব্দুল্লাহ্ আল-মুতী। সম্পাদকমণ্ডলীতে আরো অনেকের সঙ্গে আমিও ছিলুম। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে আনন্দবাজার পত্রিকা পরিচালিত কিশোর সংগঠন মণিমেলার সঙ্গেও বিভাগোত্তর কালে কামরুল হাসান একজন অন্যতম প্রধান কর্মী হিসেবে যুক্ত ছিলেনÑযে কারণে ভারতে তাঁর ভক্তকুলের সংখ্যা নেহাৎ নগণ্য নয়। অনেকেই আজও কার্যোপলক্ষে বাংলাদেশে পা দিলে তাঁদের মেজদার (মণিমালায় এ সম্বোধনেই তিনি পরিচিত ছিলেন) পায়ের ধূলো না ফিরে যায় না। এবং একই কথা খাটে ব্রতচারী কামরুলজীর ক্ষেত্রেও।
এবার ছোটদের কিছু পত্রিকার নাম : হুল্লোর (১৯৫১), মিনার (১৩৫৫), খেলাঘর (১৩৬২—যা আজও টিকে আছে), আলাপনী (১৯৫৪), শাহীন (১৯৫৫), সিতারা (১৯৫৫) ইত্যাদি।
এসব তো গেলো ছোটদের পত্রিকা। এবার বড়দের কাগজ। প্রথমেই ‘সওগাত’, ‘বেগম’ ও ‘মোহাম্মাদী’। কলকাতা থেকে উক্ত পত্রিকাত্রয়ের কর্তৃপক্ষ ঢাকা চলে আসলেও এখান থেকেও প্রকাশনা অব্যাহত থাকে। কিন্তু আধুনিক কালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতি না পেরে প্রথমে সওগাত ও পরে মোহাম্মাদী বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ১৮ বছর বয়স্ক সুঠামদেহী সওগাত সম্পাদক শ্রদ্ধের নাসির-উদ্দীন সাহেবের ও তাঁর সুযোগ্য কন্যা নুরজাহান বেগমের সম্পাদনায় মহিলা পত্রিকা ‘বেগম’ এখনও টিকে আছে। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত এই পত্রিকাটি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সুদীর্ঘ ৪০ বছর ধরে নারীসমাজের বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ঘরণীদের সেবা করে আসছে। কিন্তু পত্রিকাটি যেন বা এক ডোবা—বাইরের কলস্বনা স্রোত—ধারার সঙ্গে যার কোন যোগ নেই। ১৯৪৭ সাল ১৯৮৬তেও কোলাহল করে।
এবার অন্যান্য কিছু উল্লেখ্য পত্রিকার তালিকা—কাফেলা (১৯৪৭ কলকাতা থেকে প্রকাশিত, দেশভাগের পর ঢাকা থেকে), মাহেনও (১৯৪৯-১৯৭১), দিলরুবা (১৯৪৯), সুলতানা (মহিলা সাপ্তাহিক—১৯৪৯) ঢাকা টিভি-র ‘যদি কিছু মনে না করেন’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের জনপ্রিয় উপস্থাপক প্রয়াত ফজলে লোহানী সম্পাদিত অগত্যা (১৩৫৬), নওবাহার (১৩৫৬), ইমরোজ (১৩৫৬), মুক্তি (১৩৫০), স্পন্দন (১৯৫৩), অনন্যা (১৯৫৫Ñমহিলাদের সাহিত্য মাসিক), বিজ্ঞানবিচিত্রা (১৯৫৭—অদ্যবধি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু পত্রিকা), সাহিত্য পত্রিকা (১৩৬৪), পরিক্রম (১৩৬৯), পূবালী (১৩৬৭), পূর্বমেঘ (১৩৬৭) ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলাদেশের উদ্ভবকালের পর আমরা পাচ্ছি বাংলা এ্যাকাডেমি থেকে প্রকাশিত উত্তরাধিকার (১৯৭৩), বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান পত্রিকা, ধানশালিকের দেশ (কিশোর মাসিক),বাংলা একাডেমী গবেষণা পত্রিকা, বাংলা একাডেমী জার্নাল, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা (১৯৮৩), এখন (১৯৮৬), দীপঙ্কর (১৯৮৬, অধুনা (১৯৮৬) ইত্যাদি।
এবার দশকওয়ারী কবি ও সাহিত্যিকদের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেব। ১৯৪৭ সালের পর ১৪ই আগস্ট দেশ ভাগের পর কলকাতা থেকে যাঁরা নতুন রাজধানী ঢাকাতে এলেন তাঁদের মধ্যে শওকত ওসমান, আবুল মনসুর আহমেদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, আবুল হোসেন, আহসান হাবীব, আবদুল গনি হাজারী, বেনজির আহমদ, বন্দেআলী মিঞা, সিকান্দার আবু জাফর, মঈনউদ্দীন, জসীমউদ্দীন, আবদুল কাদির, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, কাজী আনসারউদ্দীন, আবু রুশ্দ, শাহাদৎ হোসেন, হাবীবুর রহমান, আনিস চৌধুরী, ফররুখ আহমদ, মো. নাসির আলী, জিল্লর রহমান সিদ্দিকী প্রমুখ অন্যতম। কথাশিল্পী আলাউদ্দিন আল আজাদ দেশ বিভাগের পূর্ব থেকেই এপারে ছিলেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই আজ প্রয়াত।
পুরো পঞ্চাশের দশক এবং বোধ করি ষাটের প্রথমাংশ বাংলাদেশের সাহিত্যের সোনালী যুগ। এই নামগুলি তারই সাক্ষ্য দেয় : শামসুর রহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, মাহমুদুল হক, রশীদ করীম, শওকৎ আলী, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, ফয়েজ আহমেদ, আবদুল্লাহ আল মুতী, বেলাল চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হায়াৎ মামুদ, মির্জা মুহাম্মদ আবদুল হাই, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, হাসানাত আবদুল হাই, রবিউল হুসাইন, মঈদ-উর-রহমান প্রমুখ।
ষাট দশকের শেষার্ধ থেকে অদ্যবধি যাঁরা প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন : আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, শিহাব সরকার, আবিদআজাদ, করুণাময় গোস্বামী, সুনীল বন্দোপাধ্যায়, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মুহম্মদ নুরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ্ সিরাজী, আবুল হাসানাত, বিপ্রদাশ বড়–য়া, সিকদাা আমিনুল হক, মঞ্জু সরকার, রফিক কায়সার, আবুবকর সিদ্দিক, হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখ।
পটভূমি পর্বের এখানেই ইতি টানছি। হয়তো অনেক কথাসাহিত্যিক ও পত্র-পত্রিকার নাম অনবধানবশত অনুল্লেখ রইল, এর জন্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

জুলফিকার মতিন
‘ভোরের আলো’ : একটি বিলুপ্ত পত্রিকা

কার না ভাল লাগে জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তে?
মনে পড়ে কবে এক তারাভরা রাতের বাতাসে
ধর্মাশোকের ছেলে মহেন্দ্রের সাথে
উতরোল বড়ো সাগরের পথে
অন্তিম আকাক্সক্ষা নিয়ে প্রাণে
সাথে সাথে চোখের তারায় ভেসে ওঠে উজ্জ্বল এক বৌদ্ধ ভিক্ষু মূর্তি, শোক-দুঃখ-সন্তাপ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে পাল তোলা জাহাজে চড়ে যে পাড়ি দিয়ে চলেছে উত্তাল সাগর। ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য’ হয়ে গেছে তার কাছে। আদিগন্ত বিস্তৃত তরঙ্গায়িত জলস্রোতের বাধাবন্ধহীন নৃত্যের ভঙ্গিমার দিকে চেয়ে আছে নক্ষত্র খচিত রাতের সীমাশূন্য সুনীল আকাশ। সে দৃশ্যপটের চিত্র মানসনেত্রে ফুটে উঠলেই এক অপার্থিব রোমাঞ্চ শিহরণ সৃষ্টি করে মনের ভেতর। তারই সাথে, কে কল্যাণব্রতের অন্তিম আকাক্সক্ষা প্রাণে নিয়ে ঘর ছেড়েছে, তাও, থাকে না অনুক্ত। তবে সব ছাপিয়ে ধর্মাশোকের কথাটি আমাদের নিয়ে যায় ইতিহাসের ধূসর জগতে। প্রাচীন ভারতের এক মহামহিমান্বিত সম্রাট। হীরক দ্যুতির মতোই যাঁর গৌরবগাঁথা অতীতকে বর্ণাঢ্য করে আমাদের ঐতিহ্যকে করে তোলে বনেদী। ভাবতে পুলক লাগে, তখনকার সেই স্বর্ণোজ্জ্বল এক গর্বিত উত্তরাধিকার আমরা চলেছি বহন করে। কিন্তু, খুব দূর পেছনের কথা নয়, ১৮৩২ সালে পরলোকগত আধুনিক ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায়ও হতে পারেননি আমাদের এই গৌরব ও গর্বের অংশীদার। কেন না, তত দিনও ইতিহাসের কবর থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়নি সম্রাট অশোককে, যিনি তাঁর নামকে সম্পূর্ণতা দিয়েছিলেন ‘ধর্মাশোকে’ রূপান্তরিত করে। এটাও কিন্তু অবাক হবার মত ব্যাপার, ১৯২০/২২ সালের আগে যারা মারা গেছেন, তারাও জেনে যেতে পারেননি, আর্যরা আসার বহু আগেই এ দেশের সভ্যতা কতটা সমৃদ্ধময় ছিল। কেন না, তারা তো দেখে যেতে পারেননি মহেঞ্জদারো আর হরপ্পার ধবংসাবশেষ। এখনও তো আমাদের এই বাংলাদেশেও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন খুঁজে পাওয়ার। ময়নামতী কিংবা বটেশ্বর-উয়ারীতে ঠিক মতো খনন কার্য হলে, হয়ত, বদলে যেতে পারে আমাদের ইতিহাসটাই।
এ বার একটু শিল্প-সাহিত্য প্রসঙ্গে আসি। মহোমহাপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যদি নেপাল না যেতেন, তা হলে, বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শনের বয়স কোথায় নেমে আসত? গোয়াল ঘরের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল বলে রক্ষা, না হলে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের দশা কি হত? ধরে নিই চর্যাপদ পাওয়া যায়নি, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্ববল্লভও গোশালার মধ্যে ঢোকেননি, তা হলে, বাংলা সাহিত্যের শুরুটা গণনা করতে আরও দেরী হত কত? বলতে পারেন, নিউটন গাছতলায় শুয়ে ছিলেন না, জেমস ওয়াট রান্না করতে বসেননি,Ñ এ ভাবে কথা বলা কি ঠিক? কাকতালীয় ভাবে অনেক কিছু ঘটতে পারে, এগুলোও তেমনই। কিন্তু আমার কথা হল, হঠাৎ হঠাৎ যখন অনেক কিছু হয়, চেষ্টাচরিত্র করলে তো আরও অনেক কিছু হতে পারে। এখন প্রশ্ন হল, সেই চেষ্টাটাও কি হচ্ছে?
এ কথা ঠিক, শিল্প-সাহিত্যের রস গ্রহণ মানুষের জীবন প্রবাহের সামগ্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেই জড়িত। বলতে পারেন, তার সাংস্কৃতিক স্তর ভেদে রস গ্রহণের ক্ষেত্রেও বিভিন্নতা আসে। এটা আসলে শ্রেণীবিভক্ত সমাজ মানসেরই নিয়তি। মানুষের জীবন নির্বাহই বলি, আর অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনই বলি, সম্পদ আহরণ তার একটা বড় বিষয়। ননী-মাখন যেমন একটা সম্পদ, ডাস্টবিন-নর্দমায় ফেলে দেয়া রুটির একটি টুকরোও তেমনই একটি সম্পদ। যে যেটা পারে, সেটা সে জোগাড় করে। এই জোগাড়-প্রক্রিয়ার মাত্রাগত মানদণ্ডেই নির্ণীত হয় তার শ্রেণী-অবস্থান। যারা ননী-মাখনের ব্যবস্থা করতে পারে, তারা ধনী। আর যারা তা না পেরে দ্বিতীয়টি সংগ্রহ করে থাকে, তারা দরিদ্র। খাওয়া-পরার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য রস গ্রহণ করবার ক্ষমতারও নির্ধারণ করে দেয় সীমা। তাই বলে মানুষতো আর নান্দনিকতার চেতনা বিচ্ছিন্ন নয়। মাটির সানকিতে যে ভাত খায়, সেও তার পছন্দের জিনিসটাই, মূল্য যত কমই হোক, তার সামর্থের মধ্যে কিনে নিয়ে আসে। রাজা তো এক জন, বাকী সবাই তো প্রজা। মন্ত্রী-সেনাপতি-অমাত্য-সভাসদ দশ জন হলে পাইক-বরকন্দাজ-ভৃত্য-দৌবারিক একশ জন। অর্থাৎ সংখ্যার হিসাবে এরাই অগুণতি। আর এই অগুনতি মানুষের রস-পরিতৃপ্তির প্রশ্নটাও কি ফেলে দেবার? এ কারণে, শিল্প-সাহিত্যের কথাই বলি, আর নান্দনিকতা বিকাশের কথাই বলি, এ সবের ইতিহাস লিখতে গেলে, কেবল রাজকবিরাই তো তার একক উপাদান হতে পারেন না, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রস পরিতৃপ্তির দায়িত্ব যারা নিয়েছেন, তাদেরকে কি বাদ দিলে চলে? একেবারে এখনকার বিষয়টি যদি বিবেচনার মধ্যে আনা যায়, তা হলেই বা জিনিসটা কি দাঁড়ায়? শিক্ষিত- অশিক্ষিতের ব্যাপারটা তার একটা দিক। আবার অন্য একটা দিক হল, তার প্রাগ্রসরতার। শিল্প-সাহিত্যে নানা রকম পালা বদলের ঘটনা ঘটে, তত্ত্ব ও ভঙ্গীর পরিবর্তনমানতাও হতে থাকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে। শিল্প-সাহিত্যের কত রকম আন্দোলনও বেগবান হয়ে ওঠে মাঝে-মধ্যেই। পাঠকদের ভেতরেও রস গ্রহণের ক্ষেত্রে তারতম্য নিতে হয় স্বীকার করে। এখানেও, রাজকবিরা না থাকলেও, বনস্পতি লেখকেরা হয়ে ওঠেন কিংবদন্তীও। তবে তারা তো সূর্যের মতো সব সময় আলোক বিতরণ করেন না সবাই, হয়ত, আবার সেই আলোতে স্নাত হবার ধারণ করে না সামর্থও। তা হলে, সাধারণ পাঠকের রস পরিতৃপ্তির দায়িত্ব গড় লেখকদেরই অনিবার্য নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। এখন তাদেরকে অস্পৃশ্য জ্ঞান করে শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাসে তাদের ঠাঁই না দিলে, সেই ইতিহাস কি সম্পূর্ণতা পায়?
এখন প্রশ্ন হল, সাহিত্যের ইতিহাসই বলি আর আলোচনা-সমালোচনার কথাই বলি, তাকে সম্পূর্ণতা দেবার কোন প্রয়াস আমাদের পণ্ডিত সমালোচকÑ গবেষকদের ভেতরে দেখা যাচ্ছে কি? আলোচনা-সমালোচনার বিষয়টা, না হয়, ধর্তব্য থেকে বাদ দিলাম। কেন না, ওটা লিটারারী অ্যাপরিসিয়েশন-ক্রিটিসিজমের মধ্যে পড়ে বলে নেহাতই সাবজেকটিভ হয়ে যায়। আমার বউ কবিতা লিখছে, তার প্রশংসা কি আমি করতে পারব না?—এ রকম আর কি! কিন্তু যেটাকে আমরা গবেষণা বলি, অবজেকটিভিটিই হল তার মৌলিক দাবী। সেখানে পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারটা খুব আসে কি? কেবল মাত্র বনস্পতি লেখকদের নিয়েই গবেষণা করতে হবে, তাও ক্ষেত্রটাকে করে তোলে একপেশে।
এখন আমরা কি দেখছি? আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিই এই গবেষণার দায়িত্ব নিয়েছে। এটা অবশ্য তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তবে কি ভাবে এই দায়িত্ব পালিত হচ্ছে, তাও একটু খতিয়ে দেখা দরকার বৈ কি? অন্য বিষয়ের কথা বলতে পারব না, আমার জানাও নেই তেমন, কিন্তু, বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের কাজগুলি যে ভাবে হচ্ছে, তা নিয়ে দুচারটে কথা, বোধ করি, বলা যেতে পারে। কেন না, যে কোন কাজই করা যাক না কেন, তার একটা সুদূরপ্রসারী লক্ষ থাকা প্রয়োজন। বিশ্বের যে সব দেশকে আমরা মডেল বলে বিবেচনা করে থাকি, সেখানে একটা রাস্তা বানাতে যেয়েও, শুনি, না হলেও, দেড়/দুইশ বছরের হিসাব তাদের মাথার মধ্যে থাকে। আর এখানে পিচ ঢালার এক দিন পরেই, হয়ত, আবার শুরু হয় খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে, লোকের সংখ্যাও যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে রাস্তার ওপরে গাড়ী-ঘোড়ার চাপ যে বাড়বে, সেটাও থাকে না মাথার মধ্যে। এটা তো গেল একটি মাত্র উদাহরণ। সন্ধান করে দেখুন, সর্ব ক্ষেত্রেই ঘটনাটা একই রকম। গবেষণার বিষয়টি কি তার আলাদা? আলাদা তো নয়ই, সকলেই, বোধ করি, মানবেন, সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেন না, জাতীয় মেধা বিকাশের বিকল্পহীন পথের এটাও একটা। কিন্তু এখানে যেটা চলছে, সেটাকে অরাজকতা বললেও, মনে হয়, কারও আপত্তি থাকবে না। গবেষণার একটা বড় লক্ষ্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, অন্ততঃ, মানববিদ্যার,ক্ষেত্রে। বৈজ্ঞানিক যেমন গবেষণাগারে নতুন জিনিস বানান, শিল্প-সাহিত্যের বেলায় তো আর তা হয় না। সৃজনশীল মানুষেরাই এটা করেন। তারই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে সমাজ মানসে। আবার সেটাকে ধরেও রাখতে হয়। উদ্ধার করতে হয় বিলুপ্ত জিনিসকেও। সেগুলি পুনর্ব্যাখ্যাত হতে থাকলে নতুন করে তা হতেও থাকে চলমান জীবনের অনুসঙ্গী। অতীতকে পুনরুদ্ধার করে তার যে ভিত্তি নির্মাণ করা হয়, তাই প্রেরণা ও শক্তি হয়ে দাঁড়ায় সামনের দিকে এগিয়ে যাবার। ইউরোপীয় রেনেসাঁর বেলাতেও তা হয়েছে, আমাদের এখানেও তার অন্যথা দেখি না। ্ইংরেজেরা ভারতবর্ষকে কলোনী বানিয়ে শোষণ করেছে, তারাই আবার অতীত চর্চার দিগন্তকেও করে তুলেছে বর্ণিল। যারা শোষণ করেছে, তারা এক ধরনের ইংরেজ আর যারা এই কাজগুলি করেছে তারা অন্য রকমের। একটি দেশের জনসাধারণ একই জাতির হলেও যারা শাসন করে, তাদের চরিত্র আর যারা শাসিত হয় তাদের চরিত্র এক নয়। গভর্ণমেণ্ট অব দি পিপল, বাই দি পিপল, ফর দি পিপল— এটা মনে রেখেই আমি এই কথাগুলি বলছি। ক্ষুব্ধ হবেন না, পাকিস্তানী সামরিক জান্তা আর তার সাধারণ মানুষ কি এক? আমাদের দেশেই বা কি? তাই বলছি, আমাদের জন্য পজিটিভ কাজগুলি যারা করেছে, তাদের কথাটাও মনে রাখা দরকার। এখন কথা হল, জাতীয় জীবনে প্রাণ— চঞ্চলতা আনার জন্য অতীতকে জীবন্ত করে রাখাটাও অত্যাবশ্যকীয়। অত দূর না হয়, নাই গেলাম, কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে যা দাঁড়াচ্ছে, তা হল, নিকট অতীতকেও আমরা যেন বিলুপ্ত করে দিচ্ছি। কিছু লেখককে বনস্পতি,-এই শব্দটা আগেও ব্যবহার করেছি, বানিয়েছি, তাদের প্রতিভার কোন কমতি আছে, আমি তাও বলছি না, কিন্তু দৃষ্টিটা যেন কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে সেখানেই। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি, তার সমকালেই বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় বলে যে একজন লেখক ছিলেন, সে খবরটিও, বোধ করি, জানা নেই অনেক গবেষকের। মানিককে কিংবা এই রকম আরও দুচার জন লেখককে নিয়ে কাজ হতে দেখছি একাধিক, কিন্তু কাজের সংখ্যা যতই বাড়ছে, চর্বিতচর্বণের পরিমানও বেড়ে যাচ্ছে অনেক বেশী। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নতুন কথা বলতে পারছেন না প্রায় কেউই। যেমন মানিকের মধ্যে মার্কস আর ফ্রয়েড ছাড়া খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আর কিছু-ও! অন্য পক্ষে কাজ হওয়া লেখকদের নিয়ে কাজ করার সুবিধাও আছে অনেক। তথ্যাদিÑ সবই পাওয়া যাচ্ছে হাতের কাছে, উদ্ধৃতির কলেবর বাড়িয়ে পেটও মোটা করে দেয়া যাচ্ছে অভিসন্দর্ভের। সুপারভাইজার সাহেবরা দেখছেন, এতে সুবিধা তাদেরও। ছাত্রকে গাইড করার জন্য তারও যে অনেক জিনিস জানার আছে, প্রয়োজন পড়ছে না সে সবেরও। এ জাতীয় গবেষণা কর্মের ডিগ্রীর জন্য চাকুরী ক্ষেত্রে ব্যবস্থা করা আছে প্রায় স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতির। গবেষণা কাজের জন্য সেটাও হয়ে রয়েছে এক হুমকীর বিষয়। যেনতেন প্রকারে সেটি সংগ্রহ করার জন্য তৈল মর্দনের ক্ষেত্রকেও করে রাখা হচ্ছে যথোপযোগী। আবার এ জাতীয় ডিগ্রী থাকলে চাকুরী পাওয়াটাও সহজÑ এ জন্য মেধাহীনেরাও আয়োজনাদি সম্পন্ন করে রাখছে নানা অনৈতিক ব্যাপারের। তা ছাড়া, সুপারভাইজার সাহেবের বন্ধুরাও তো তৈরী হয়েই আছেন এক্সজামিনার হবার জন্য!
নজরুলকে নিয়ে গবেষণার একটা দিকের কথা বলি। প্রায় সব গবেষকদের কাছেই তাঁর জীবনে নারী প্রসঙ্গ সুরসুরি দেবার মতোই একটি বিষয়। তা তারা দিয়েও থাকেন। নজরুল নিজে কেঁদেছেন, অন্যদেরকেও কাঁদিয়েছেন,—এটা যেন তাদের এক মহা মূল্যবান আবিস্কার! তাতেও ক্ষতি নেই। কিন্তু যে সব নারীকে নজরুল-জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয, তাঁদের অনেকে তো, নাম না হয় নাই করলাম, কারণ, তাদের নাম আমরা প্রায় সবাই জানি, এই সে দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। আমার জানতে ইচ্ছে করে, আমাদের নজরুল গবেষকদের কজন, সময় ব্যয় করে- শ্রমের শ্রাদ্ধ করে তাঁদের বাড়ী পর্যন্ত গিয়েছিলেন, বলেছিলেন,—- আর কিছু না হোক, অন্ততঃ ইতিহাসের স্বার্থে আপনাদের সম্পর্ক কি ছিল, সে কথাটা বলুন। এখন প্রকাশ করতে না চান, করবেন না। মওলানা আজাদের মতোই আপনার কথাগুলো আমরা রেখে দেব সময়ের অপেক্ষায়। ভবিষ্যতের মানুষ তো জানতে পারবে এক দিন। নার্গিস আসার খানম, নজরুলের প্রথম স্ত্রী, তিনিও তো গুণী মহিলা ছিলেন, তারও লেখা অনেক বই পুস্তক আছে, আজকে হয়ত দু®প্রাপ্য হয়ে গেছে, তাঁকে নিয়েও গবেষণার কাজ হতে পারে, কিন্তু ঘরে বসে বিবলোগ্রাফী বানিয়ে যদি ডিগ্রী পাওয়া যায়, তবে কি দরকার ওগুলো খুঁজে-পেতে অত পরিশ্রম করার?
আমার এই কথাগুলো খারাপ ভাবে নেবেন না। এগুলো বলার উদ্দেশ্য একটাই, তা হল, অন্য জায়গায় হবার খুব সুযোগ নেই, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা কর্মের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাসটা সম্পূর্ণ করা। এবং এটি একটি প্রবহমান প্রক্রিয়া। থেমে থাকবে না। খাবলা মেরে মেরে এ খানে ও খানে থেকে যা পারি তাই জোগাড় করার প্রবণতা ত্যাগ করে যাতে এই লক্ষ্য পূরণ হয়, তার, প্রয়োজন হলে, দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আর কাকতালীয় ভাবে হলেও, এই কথাগুলো বলার একটা সুযোগ আমারও এসে গেছে।
আমি একটি সাহিত্য পত্রিকা পেয়েছি। এই পত্রিকাটির ‘আবিষ্কার’(!) যে আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে বিপ্লব এনে দেবে কিংবা তা নতুন করে লেখার অনিবার্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে, সে কথা বলার মতো অতটা মূর্খ, বোধ করি, আমি নই। আবার এটির উলে¬খ কোথাও হয়েছে, তাও আমার জানা নেই। ভরসা করি, আর কিছু না হোক, নতুন তথ্য সংযোজনে সাহায্য করবে। আমাদের পত্রপত্রিকার তালিকাতে অংশত একটা সম্পূর্ণতা এনে দিতে সহায়তা করবে। পত্রিকাটির নাম ‘ভোরের আলো’। এটি একটি সাহিত্য মাসিক। দীর্ঘায়ু হয়ত নয়, হলে নামটা তো কোন না কোন ভাবে জানা যেত। আমার কাছে পত্রিকাটির প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পঞ্চমÑ এই চারটা সংখ্যাই আছে। কত দিন এই পত্রিকাটি বেঁচে ছিল, তাও নিশ্চিত করে বলা, অন্ততপক্ষে, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। হতে পারে, মাত্র ঐ পাঁচটা সংখ্যাই তার আয়ু। ক্ষীণায়ু অনেক পত্রিকাও নতুন ধারার সাহিত্য সৃষ্টির উন্মাদনায় ঝড় তোলে, এটির ক্ষেত্রে তেমনটি হয়েছে বলেও মনে হয় না। ‘কল্লোল’ কিংবা ‘কালিকলম’-এর মতো কোন সাহিত্য আন্দোলনের জন্মও সে দিতে পেরেছে, তারও কোন হদিস নেই।
‘ভোরের আলো’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৪৭ সালের পৌষ মাসে অর্থাৎ আজ থেকে পৌনে একশ বছর আগে। অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরুর কালে। তারও দুবছর আগে খ্রিস্টিয় ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে খ্রিস্টিয় ১৯৩৭ সালের নির্বাচন হয়ে গেছে। ধরেই নেয়া যায়, এ. কে. ফজলুল হক তখন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের একটা গণভিত্তি শক্তভাবে তৈরী হয়ে গেছে ততদিনে। মার্কসবাদেরও প্রসার ঘটেছে। শিল্পীÑসাহিত্যিকদের ভেতরে ফ্যাসীবাদ বিরোধী মনোভাবও গড়ে উঠেছে প্রবলভাবে। গণমুখী পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে সাহিত্যের অবয়বে। আমার এ কথাগুলো বলার কারণ, কি ধরনের প্রেক্ষাপটে আবির্ভাব ঘটেছিল পত্রিকাটির? তবে সে প্রেক্ষাপটটি ‘ভোরের কাগজ’ ধারণ করতে পেরেছিল কি না, সে প্রশ্ন তো পরের।
এটা ঠিক যে ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বাংলা ভাষায় পত্রপত্রিকার প্রকাশ শুরু হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যয়ের ‘বঙ্গদর্শনে’র পূর্ব পর্যন্ত এসব পত্রপত্রিকায় সৃজনশীল রচনা, বিশেষ করে কবিতা, পাদটীকা হিসেবেই বিবেচিত হত বোধ করি। কোন মননশীল গদ্য পৃষ্ঠার মাঝামাঝি এসে শেষ হয়ে গেছে, বাকী জায়গাটা থেকে যাচ্ছে ফাঁকা। কি আর করা, ছেপে দাও একটা কবিতা-ব্যাপার অনেকটা এই রকম? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত নিজে কবি ছিলেন, কবিতা ছাপতেন, সাহিত্যের সালতামামীও করতেন, কিন্তু ‘সংবাদ প্রভাকর’ তো আর সাহিত্য পত্রিকা ছিল না। ধীরে ধীরে এই অবস্থারও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। মুদ্রণ শিল্পের সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রন্থ প্রকাশও সুলভ ছিল না। এ কারণে সাহিত্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে পত্রপত্রিকাই গ্রহণ করে মুখ্য স্থান। দেশ বিভক্ত হবার পর পূর্ববঙ্গ, পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে এই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল অন্তত মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত্। কলকাতা থেকে মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিনের ‘মাসিক সওগাত’ ও মওলানা মোহাম্মদ আকরম খানের ‘মাসিক মোহাম্মদী’ স্থানান্তরিত হয় ঢাকায়। একটি সরকারী সাহিত্য পত্রিকাও প্রকাশিত হতে থাকে, ‘মাসিক মাহেনও’। সিকান্দার আবু জাফরের ‘মাসিক সমকাল’ প্রবর্তন করে একটি নতুন ধারার। প্রকাশিত হত মোহাম্মদ ইজাব উদ্দিন সম্পাদিত ‘দিলরুবা’। এ প্রসঙ্গে ‘অগত্যা’ কিংবা ‘পুবালী’র নামও উল্লে¬খ করার মতো। তবে যে কথাটা বলার, তা হল, এখন কিন্তু সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের সংস্কৃতিটা আগের মত নেই। মাসে মাসে সাহিত্য পত্রিকা বেরুচ্ছে, আবুল হাসনাত সম্পাদিত ‘কালি ও কলম’ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’ ছাড়া আর কটার নাম করা যায়? সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ‘নতুন দিগন্ত’ আছে, তিন মাস পর পর পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য। অল্প দিন আগে থেকে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বেরিয়েছে, ‘শব্দঘর’, আয়ু কত দিনের, কে জানে? তবে জয়-জয়কার-যা কিছু, তা এখন লিটল ম্যাগাজিনের। বেরুবে, কখন, ঠিক নেই; কত দিন পর, ঠিক নেই। পত্রিকা প্রকাশ থেমেও নেই।
কাজেই, আগের দিনের মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের যে সংস্কৃতি, তার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই ‘ভোরের আলো’র একটি বিবরণ আপনাদের সামনে নিয়ে আসার একটা আগ্রহ যেমন আমার রয়েছে, তেমনই আরও আগ্রহান্বিত হবার কারণ ঘটেছে এর সঙ্গে বন্দে আলী মিয়ার সম্পৃক্ততা। যে দুজন এই পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন, তার একজন ছিলেন তিনি, আর একজন ছিলেন বলরাম ঘোষ। পিতৃ-মাতৃ প্রদত্ত নাম পালটিয়ে নিজের মতো করে যারা আধুনিক সাহিত্য-রচক হচ্ছেন, হয়ত তাদের অনেকের কাছে বন্দে আলী মিয়া নামটাই নাক সিঁটকানোর মতো। সেটাও হয়ত নয়, কিন্তু এটা তো ঠিক, তার সৃষ্ট সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে একটা উন্নাসিকতা আমাদের তথা- কথিত বোদ্ধা সাহিত্য সমালোচকদের রয়েছে। সাহিত্য জগতেও একটা হায়ারার্কির ব্যাপার আছে। দলভুক্ত হবারও ব্যাপার আছে। এ সবের কোথাও বন্দে আলী মিয়াকে ঠিক ‘ফিট’ করা যায় না। কিন্তু মনে করা যায়, তিনি সাহিত্যের যে পরিসর দখল করে আছেন, তা অকিঞ্চিৎকর নয়। কেবল তো সাহিত্য সৃষ্টি নয়, তিনি আর্ট স্কুলে পড়েছেন-ছবি এঁকেছেন, তাঁর জীবনটা যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এসেছে, তাও কি কম কালারফুল?

দুজন সম্পাদক বন্দে আলী মিয়া ও বলরাম ঘোষ ছাড়াও পরিচালকমণ্ডলীতে যে তিন জনের নাম পাওয়া যায়, তাঁরা হলেন, শ্রীঅমরেন্দ্র নাথ ঘোষ, শ্রীফণিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীহেমন্তকুমার ঘোষ। সম্পাদক ও পরিচালক মণ্ডলীর সদস্যদের নাম ছাড়াও প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে ছিল ‘সডাক বার্ষিক মূল্য—১॥ টাকা’; ‘প্রকাশক— সিঁথি বাণী মন্দির’ ও ‘প্রতি সংখ্যা- /১০। এ ছাড়াও ছিল প্রায় অর্ধেক পৃষ্ঠা জোড়া ‘মণিকার নারায়ণ চন্দ্র মান্না আসল রত্ন বিক্রেতা’র একটি রঙিন বিজ্ঞাপন। কভারে চতুর্থ পৃষ্ঠার শেষে ছিল, ‘৮৮ নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটস্থ ও.কে. প্রিণ্টার্স এণ্ড পাবলিসার্স লিঃ হইতে শ্রীলক্ষ্মীনারায়ণ নাথ কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত’।
পত্রিকাটির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যে প্রেস থেকে ছাপা হত, সেটি ছাড়াও ‘সিটি অফিস’ বা ‘কার্যালয়’রূপে আরও একটি ঠিকানার উল্লে¬খ পাওয়া যায় : ৩৯, ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড, কলিকাতা। পত্রিকার প্রকাশ উপলক্ষে প্রথম সংখ্যাতে ‘পরিচালক মণ্ডলীর নিবেদন’ শীর্ষক বক্তব্যে যা বলা হয়েছে, তার চুম্বক অংশগুলি নিম্নরূপ :
১। প্রায় দুই বৎসর পূর্ব্বে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার বর্ত্তমান সম্পাদক শ্রীযুক্ত ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের সভাপতিত্বে আমাদের সমিতির এক অধিবেশন বসে। এই সভায় শ্রদ্ধেয় নাট্যাচার্য শ্রীযুক্ত শিশিরকুমার ভাদুড়ী মহাশয়, বিখ্যাত কবি বন্দে আলী মিয়া, শ্রীযুক্ত ইন্দুভূষণ মুখোপাধ্যায় এম.এ. শ্রীযুক্ত অজিতকুমার ভক্তিবিদ্যা বাচস্পতি মহাশয় প্রভৃতি বিদ্বজন সাহিত্য সেবায় আমাদের পথনির্দেশ ও উৎসাহদান করিতে উপস্থিত ছিলেন। আমাদের সমিতির নামকরণ হয় ‘সিঁথি বাণীমন্দির’। সমিতির সভ্যেরা শিক্ষা ও সাহিত্যের উন্নতিকল্পে একটি পত্রিকা প্রকাশ করিবার বাসনা করেন। তাই আজ বহুদিনের বাধাবিঘ্নের পর ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদ মস্তকে বহন করিয়া আমাদের ঈপ্সিত পত্রিকাখানি সাগ্রহে বাংলাভাষী জন সাধারণের সমীপে উপস্থাপিত করিলাম।
২। পত্রিকার নামকরণ হইয়াছে ‘ভোরের আলো’। রাত্রির আগমনে পৃথিবী অন্ধকার হইয়া গেলে মানুষ নিদ্রার আবেশে অভিভূত হইয়া পড়ে। তাহার কর্ম্মশক্তি ও চিন্তাশক্তি লুপ্ত হইয়া সে জড় জগতের সমপর্যায়ভুক্ত হইয়া পড়ে। পরে যখন পূর্ব্বাকাশের নবীন ঊষা দুঃস্বপ্ন সম তমোরাশি দূর করিয়া মানুষকে ডাকিয়া বলে, ‘জাগৃহি’, মানুষ ফিরিয়া পায় তার পূর্ব্ব চেতনা। তাহার মোহ-তমসা দূর হইয়া যায়। নবীন উদ্যম, নবীন আশায় হৃষ্টমনে সে বাহির হয় চিরাভ্যস্ত কর্ম্মে।……আমাদের এই ‘ভোরের আলো’ সেইরূপ অজ্ঞান-তমোরাশি দূর করিয়া ও আশার আলোকে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করিয়া আমাদের কর্ম্মপথকে দীপ্তিময় করিবে।
এ ছাড়াও তারা পত্রিকা প্রকাশের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে ব্যক্ত করেন এভাবে :
ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ পায় তার সৃষ্টির মধ্যে। তাঁহার সর্ব্বশেষ সৃষ্টি মনুষ্যজাতি। মানুষকে তিনি নিজের প্রতিকৃতি হিসাবে সৃষ্ট করিয়াছেন। মনুষ্যত্বের পূর্ণ-বিকাশই তাঁহার অভিলাষ।মানবের সুকুমার স্বর্গীয় গুণগুলি যতদিন না বিকাশ লাভ করে ততদিন মানব মানবত্বের উচ্চ সিংহাসনের অধিকারী হয় না। এই স্বর্গীয় সম্পদ সম্পন্ন হইয়া মানুষ জগতের কল্যাণ সাধন করুক ঈশ্বরের এই ইচ্ছা। কিন্তু তিনি মানুষকে পূর্ণতা দান করেন মানুষেরই মধ্য দিয়া। মানুষেরা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করিয়া উন্নতির উচ্চ সোপানে আরোহণ করিতে সমর্থ হয়। উন্নতিকল্পে মনুষ্যজাতির এই পারস্পারিক সাহায্য বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নরূপ ধারণ করে। কর্ম্মে জ্ঞানে ও ধর্ম্মে এই পাস্পারিক সাহায্য সমৃদ্ধ ও সম্ভবপর হয়। কিন্তু সমস্তের মূলে প্রয়োজন সুশিক্ষার ও সংস্কৃতির। শিক্ষাবিস্তারের এই বিভিন্ন প্রচেষ্টার মধ্যে পত্রিকারও একটা বিশিষ্ট স্থান আছে।
এ ছাড়া, প্রথম বর্ষ ৩য় সংখ্যা, ফাল্গুন, ১৩৪৭-এ ‘ভোরের আলো’ পত্রিকার প্রথম বার্ষিক সারস্বত সম্মিলন—এর প্রতিবেদন রয়েছে। ১৯শে মাঘ, ১৩৪৭ সন্ধ্যা ৬টাতে ৩৯নং ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডস্থ সিঁথি বাণী-মন্দির গৃহ-প্রাঙ্গনে এই সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সভানেত্রী ছিলেন প্রভাবতী দেবী সরস্বতী। সেখানে উদ্বোধনী সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশিত হয় কাশীপুর বাণীবিদ্যা-বীথির ছাত্রীদের দ্বারা। আবৃত্তি করেন শ্রীকানাই বসু, শ্রীশিশির পূজারী ও কুমারী মায়া দত্ত। গান করেছিলেন কুমারী প্রতিমা কয়াল, শ্রীঅমরেন্দ্র নাথ ঘোষ, মাস্টার নানু ও মাস্টার নীলু। এই বার্ষিক সম্মিলনে যে সব কথাবার্তা উঠে এসেছে, তা থেকেও পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে। যেমন শ্রীহেমন্ত কুমার বলেছেন :
বর্ত্তমান যুগের আধুনিক রুচিসম্পন্ন রচনা সম্ভারে ‘ভোরের আলো’ পত্রিকার প্রত্যেকটি পৃষ্ঠা রঞ্জিত হয়ে উঠবে তবেই জয়যাত্রা পথের পাথেয় সংগ্রহ হবে পাঠক সম্প্রদায়ের মনের মণিকোঠায় এবং পত্রিকাটি হয়ে উঠবে দিন দিন উন্নতির চরমস্তম্ভ স্বরূপ। যুগের পর যুগের রুচি বিকাশের পর বর্ত্তমান সময়ে মানুষ বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। জ্ঞানের উজ্জ্বল আলোকপাতের মাঝে সে আরও নতুন কিছু আশা করে। আমি সর্ব্বান্তকরণে বিশ্বাস করি ও কামনা করি ‘ভোরের আলোর’ ভেতর দিয়েই তার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হোক।
এ ছাড়া, ‘বন্ধুবর কবি বন্দে আলী মিয়া এর সম্পাদনার ভার গ্রহণ করেছেন’—সে কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। উক্ত সম্মিলনে নির্ম্মল দাস বলেন :
বিশ্বসাহিত্য পর্যালোচনা করলে জানা যায় যখনই কোন দেশ নির্যাতনের অন্ধকারে ঝিমুতে থাকে তখনই সেই দেশে দেখা দেন একদল দুর্ধর্ষ সাহিত্যিক — আর তাদের সমবেত চেষ্টায় সম্ভূত পত্রিকা নিয়ে আসে জনগণের মুক্তি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশে সেরূপ সাহিত্যিক বেশী সংখ্যায় আসেননি এবং যদিচ দু’একজনের হদিস পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ‘ফিলসফি’ আওড়িয়ে ও দেব দেবীর দুটো ভজন গান লিখে সাহিত্যিক জীবনে ইস্তফা দিতে হয়েছে।
তিনি আক্ষেপ করে আরও যা বলেছেন, তা-ও বেশ প্রণিধানযোগ্য :
আমাদের দেশের সাহিত্যের মধ্যে জাগরণী সুর নেই। আমাদের ‘বীণাপাণি’ শ্বেতাম্বর ধারিণী, হাতে তাঁর করুণ সুরের বীণা। আমাদের কবিরা ‘চাঁদ’ ‘ফুল’ ‘প্রজাপতি’ ‘নারী’ নিয়ে মশগুল। অধিকাংশ পত্রিকা অভিনেত্রী নিয়ে ব্যস্ত। দেশে সঞ্জীবনী মন্ত্র ছড়াবে কে?
শ্রী নির্ম্মল দাস বন্দে আলী মিয়া সম্পর্কে যা বলেছেন, তা-ও বিশেষভাবে উল্লে¬খ করার মতো। এ বিষয়ে তার কথাগুলো হল :
তিমিরের অবগুণ্ঠন ঠেলে ‘ভোরের আলো’ এসেছে। তার জীবন পথ কেমন হবে জানিনা— তবে—এ আশা আমরা নিশ্চয়ই ক’রব সারা বাংলার সর্বজন- প্রিয় কবি বন্দে আলী যখন তার দায়িত্ব নিয়েছেন তখন সে সুপথেই চালিত হবে। আর সব চেয়ে বড় কথা বন্দে আলী হিন্দু নন, বন্দে আলী মুসলমান নন —বন্দে আলী বাঙ্গালী। সুতরাং তরুণ বাংলা তাঁর সৃষ্টির দিকে সাগ্রহে প্রতীক্ষা ক’রতে থাকবে অনেক কিছু আশা আকাক্সক্ষা নিয়ে।
শ্রীজগন্নাথ দাঁ বলেন :
পত্রিকার উদ্দেশ্য —সাহিত্যের মধ্য দিয়া দেশ ও দশের সেবা করা। যাহা নীচ, যাহা কলুষিত— সমাজের বুক থেকে তাহা অপসারিত ক’রে উচ্চ ও মহানকে সেখানে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ‘ভোরের আলো’ হবে সেই মহান আদর্শের প্রতীক।
এবার বন্দে আলী মিয়া কি বলেছিলেন, তা শোনা যাক। তিনি বলেন :
সাহিত্য ক্ষেত্র—রসের ক্ষেত্র। রস উপলব্ধির ব্যাপারে বয়স ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নিরর্থক। যিনি যতটুকু অনুভব করেন— প্রাণের আদান প্রদানের পক্ষে ইহাই পর্যাপ্ত। সাহিত্য ব্যতীত মানব মন পঙ্গু—স্থবির— অবচেতন। জাতি ধর্ম্ম নির্বিশেষে সকলের মিলন ক্ষেত্র এই সাহিত্য। ইহারই বেদীমূলে আমাদের মন পরস্পরের সন্নিহিত হয়— পরস্পরকে চিনতে শেখে।
‘ভোরের আলো’র ন্যায় সাহিত্য পত্রিকা এ অঞ্চলে ইতিপূর্ব্বে প্রকাশিত হয়নি। কলিকাতার প্রবল আলোর ধারার পার্শ্ববর্তী এই উপকণ্ঠসমূহ গভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন। প্রচুর প্রচেষ্টা ও ক্লেশ স্বীকারের মাঝে ‘ভোরের আলো’র অভ্যূদয় সম্ভব হয়েছে। ইহার ক্ষীণ জ্যোর্তিলেখা উপকণ্ঠের তমসাকে কতটা পরিমাণে বিদূরিত করতে পেরেছে সে বিচারের ভার রসবেত্তা সুধী সম্প্রদায়ের।
‘ভোরের আলো’ আজ নিতান্ত শিশু। অনাগত ভবিষ্যের সুদূরপ্রসারী পথ তার বিপদাকীর্ণ— শঙ্কাময়। রসপিপাসু সাহিত্যিক মনের স্নেহ এবং সহানুভূতি তার ভরসা এবং কাম্য। ‘তারুণ্য ও প্রেরণার যুগ্ম সম্মিলনই কর্ম্ম। কর্ম্মই সাধনা— কর্ম্মই ইষ্ট। করুণেরা জাতির মেরুদণ্ড এবং ভবিষ্যৎ সমাজ। ইহাদের উৎসাহ —ইহাদের সমবেত প্রচেষ্টায় ‘ভোরের আলো’ উত্তরোত্তর সুপরিস্ফুট হোক ঔজ্জ্বল্য লাভ করুক।’
ঐ সংখ্যাতেই সভানেত্রী প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর যে অভিভাষণ, তার স¤পূর্ণটা ছাপানো হয়নি। পরবর্তী সংখ্যার জন্য বাকীটা ‘ক্রমশ’ করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমি যে সংখ্যাগুলো পেয়েছি, তার ভেতর তা পাওয়া যায়নি। সম্পূর্ণ অভিভাষণটি না পাওয়ার জন্য, এ সম্পর্কে কিছু বলা থেকে বিরত থাকলাম।
‘ভোরের আলোর’ প্রথম সংখ্যাতে নিম্নোক্তভাবে ‘নিয়মাবলী’ মুদ্রিত হয় :
ভোরের আলোর বার্ষিক সডাক মূল্য — ১॥
ষান্মাসিক — বারো আনা
প্রতি সংখ্যা এক আনা
সর্ব্বদা বার্ষিক মূল্য অগ্রিম দেয়। পৌষ মাস হইতে বৎসর আরম্ভ। যে কোন মাস হইতে গ্রাহক হওয়া যায়, তবে প্রথম সংখ্যা হইতে কাগজ লইতে হইবে।
লেখকগণের প্রতি :—
প্রবন্ধাদি কাগজের এক পৃষ্ঠায় পরিস্কার করিয়া লিখিয়া পাঠাইতে হইবে। অমনোনীত রচনা টিকিট দেওয়া না থাকিলে ফেরৎ দেওয়া হয় না। পত্রের উত্তর চাহিলে রিপ্লাই কার্ড পাঠাইতে হইবে।
নমুনা সংখ্যার জন্য দুই আনার ডাক টিকিট পাঠাইতে হয়।
বিজ্ঞাপন দাতাদের প্রতি :—
একপেজ সাধারণ পৃষ্ঠা প্রতি সংখ্যা Ñ ৮ টাকা
অর্দ্ধপেজ ” ” ” —৫ ”
সিকিপেজ ” ” ” ” — ৩ ”
কভার ও বিশেষ পৃষ্ঠার ও স্থানের হার পত্র লিখিয়া জ্ঞাতব্য। পত্রিকাটির সূচীপত্র ছিল নিম্নরূপ :
বিষয় লেখকগণ পৃষ্ঠা
ক) পৌষ— ১৩৪৭
১। ভোরের আলো (কবিতা) শ্রীনরেন্দ্র দেব ১
২। স্বস্তিবাচন কাজী নজরুল ইসলাম ২
৩। মানব জাতির উৎপত্তি (প্রবন্ধ) শ্রীযুগল নারায়ণ ভট্টাচার্য্য ৩
৪। গুণী (কবিতা) বীরেন্দ্র কুমার গুপ্ত ৪
৫। তাই শুধু কর ভগবান (কবিতা) শ্রীপ্রভাবতী দেবী সরস্বতী ৫
৬। বিরহ মিলন কথা (গল্প) শ্রীমনোমোহন ঘোষ ৬
৭। এলো ভোরের আলো (কবিতা) বন্দে আলী মিয়া ৮
৮। অন্ধের মুক্তি (গল্প) শ্রীহেমন্তকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ৯
৯। শিক্ষা (প্রবন্ধ) শ্রীদুর্গা সুন্দরী দেবী ১৪
১০। বিরহ মিলনে (কবিতা) শ্রীইন্দুভূষণ মুখোপাধ্যায় ১৬
১১। ভুলের নেশায় (গল্প) শ্রীবলরাম ঘোষ ১৭
১২। বিভিন্ন দেশের অভিবাদন প্রণালী শ্রী নীরোদ কুমার ভট্টাচার্য্য ২১
১৩। পুস্তক পরিচয় ২২
১৪। পল্লী মা (কবিতা) শ্রীগিরীন চক্রবর্তী ২৩
১৫। পরিচালক মণ্ডলীর নিবেদন ২৪
খ) মাঘ ১৩৮৭
১। বাণী আবাহন (কবিতা) শ্রীহারাধন বিদ্যাবিনোদ ২৫
২। লাঞ্ছিতা তরুণী (গল্প) শ্রীবলরাম ঘোষ ২৬
৩। বর্ত্তমান (কবিতা) সুবিমান রায় ৩০
৪। জীবনের নিত্য স্রোতে (গল্প) কুমারী ঝর্ণা বসু ৩১
৫। মন্দিরা (কবিতা) গোপাল বটব্যাল ৩৩
৬। সাহিত্যের রূপ (প্রবন্ধ) শ্রীহেমন্ত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ৩৪
৭। বিরহ মিলন কথা (গল্প) শ্রীমনোমোহন ঘোষ ৩৬
৮। তোমার রহস্য আজো বুঝিতে না পারি (কবিতা) বন্দে আলী মিয়া ৩৮
৯। সিনেমা পরিচালিকা বাণী দেবী ৩৯
১০। সাময়িক প্রসঙ্গ ৪০
গ) ফাল্গুন ১৩৪৭
১। এসো এসো আরো কাছে (কবিতা) নজরুল ইসলাম ৪১
২। অভিনয় (গল্প) বন্দে আলী মিয়া ৪২
৩। হেÑ১৯৪০? (গল্প) কৃষ্ণদাস মৈত্র ৪৯
৪। ভোরের আলো (কবিতা) নির্ম্মল কুমার দাস ৫১
৫। বিরহ মিলন কথা (গল্প) শ্রীমনোমোহন ঘোষ ৫২
৬। ব্যর্থ স্বপন (কবিতা) নীরদ কুমার ভট্টাচার্য্য ৫৫
৭। প্রাচীন সাহিত্য (প্রবন্ধ) গোপাল বটব্যাল ৫৬
৮। ভোরের আলো পত্রিকার প্রথম বার্ষিক সারস্বত সম্মেলন ৫৮
৯। সভানেত্রী শ্রীযুক্তা প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর অভিভাষণ ৬০
ঘ) বৈশাখ ১৩৪৮
১। মার্চ্চ-পাস (কবিতা) শান্তি পাল ৮১
২। বিবর্ত্তন (গল্প) বলরাম ঘোষ ৮২
৩। শ্রীবলরাম ঘোষের জন্মদিনে—(কবিতা) বন্দে আলী মিয়া ৮৬
৪। বৈশাখ (কবিতা) আভাদেবী ৮৬
৫। লেডি ডাক্তার (গল্প) বন্দে আলী মিয়া ৮৭
৬। নুন খায় যার, নিন্দা তরে তার (গল্প) শ্রীজগন্নাথ দাঁ ৮৯
৭। তাজমহল (কবিতা) শ্রীমতী আশারাণী দেবী ৯২
৮। নব বর্ষ (কবিতা) কুমারী লাবণ্য পলিত ৯২
৯। সাহিত্যের রূপ (প্রবন্ধ) শ্রীইন্দুভূষণ মুখোপাধ্যায় ৯৩
১০। গান মাষ্টার তানু ৯৪
১১। বর্ত্তমান যুগে কাব্যের স্থান (প্রবন্ধ) শিশির কুমার পূজারী ৯৫
১২। ভোরের আলো (কবিতা) শ্রীপ্রসাদ দাস মুখোপাধ্যায় ৯৬
উল্লে¬খ্য যে প্রথম বর্ষ ১ম সংখ্যা, পৌষ ১৩৪৭ ও প্রথম বর্ষ ২য় সংখ্যা, মাঘ ১৩৪৭-এর সূচীপত্র পত্রিকাতে মুদ্রিত অবস্থাতেই পাওয়া গেছে। অন্যগুলি, হতে পারে, মুদ্রিত হয় নাই কিংবা বিনষ্টির শিকার হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ওগুলি আমিই তৈরী করেছি। বৈশাখ ১৩৪৮ সংখ্যার সবগুলি পৃষ্ঠাই পাওয়া গেছে, তাও মনে হচ্ছে না।
‘ভোরের আলো’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা শুরু হয়েছিল শ্রী নরেন্দ্র দেবের কবিতা দিয়ে। কবিতাটির নামও ‘ভোরের আলো’। ধরেই নেয়া যায়, পত্রিকাটির প্রকাশ উপলক্ষ্যেই তিনি এই কবিতাটি লিখেছিলেন। তাঁর আকুল জিজ্ঞাসা :
কবে এ তিমির রাত্রি হবে অবসান
ফুটিবে ভোরের শুভ্র আলো,
শতাব্দীর অন্ধকার কবে হবে দূর?
বিদূরিয়া পুঞ্জীভূত কালো—
হাসিবে আবার বিশ্ব অম্লান গৌরবে;
ধরণী লাগিবে পুনঃ ভালো?
তাই কবিতাটির শেষে তিনি বলেছেন :
এস প্রভাতের দ্যুতি বিচ্ছুরি কিরণ
জীবনী রসের রশ্মি ঢালো;
দেখাও দিবার দীপ্তি দিগন্তে আবার
দিব্য তেজ প্রকাশো ধারালো,
দাও দাও তৃষার্ত্তের প্রাণপাত্র ভরি
জ্যোতির্ম্ময় অমৃত রসালো।
যে চারটি সংখ্যা আমার কাছে রয়েছে, তাতে ‘ভোরের আলো’ প্রকাশ উপলক্ষ্যে আরও কয়েকটি কবিতা দেখতে পাওয়া যায়। প্রথম সংখ্যাতেই বন্দে আলী মিয়া লিখেছেন, ‘এলো ভোরের আলো’। এ ছাড়া, তৃতীয় সংখ্যাতে নির্ম্মল কুমার দাসের ‘ভোরের আলো’ ও পঞ্চম সংখ্যাতে শ্রীপ্রসাদ দাস মুখোপাধ্যায়ের ‘ভোরের আলো’—এ দুটি কবিতাও পাওয়া যায়।
প্রথম সংখ্যাতেই নজরুলের একটি গদ্য রচনা দেখতে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় পৃষ্ঠাতেই তা মুদ্রিত হয়েছে। সূচীপত্রে এর শিরোনাম উল্লে¬খ করা হয়েছে ‘স্বস্তি বাচন’। নাম লেখা আছে ‘কাজী নজরুল ইসলাম’। কিন্তু ছাপার সময়ে দেখা যায় লেখাটির শিরোনাম ‘সুজনের গান’। আর লেখকের নাম শুধু ‘নজরুল ইসলাম’। সঙ্গীতশিল্পী শ্রীগিরিন চক্রবর্তীর স্বরচিত ও সংগৃহীত গ্রন্থ ‘সুজনের গান’ সম্পর্কে নজরুল এ লেখায় তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। লেখাটি বাংলা একাডেমী প্রকাশিত নজরুল রচনাবলীর চতুর্থ খণ্ডে সঙ্কলিত হয়েছে।
তৃতীয় সংখ্যাটি শুরুই হয়েছে নজরুলের ‘এসো এসো আরো কাছে’— এই কবিতাটি দিয়ে। এটিও অবশ্য বাংলা একাডেমী প্রকাশিত নজরুল রচনাবলীর চতুর্থ খণ্ডে আছে। কবিতাটি ছোট ও অপ্রচলিত বিধায় সবটাই তুলে দিচ্ছি :
মোর নিশীথের চাঁদ ঘন মেঘে ঢাকিয়াছে
আজ দূরে থাকিও না এসো এসো আরো কাছে।
ভবন কপোতগুলি উড়িয়া গিয়াছে ভয়ে
কাঁপিছে মাধবীলতা মুকুল বক্ষে লয়ে
(মোর) আশার প্রদীপ শিখা হের ঝড়ে নিভিয়াছে।
আজ দূরে থাকিও না এসো এসো আরো কাছে।
হের ঘনঘটা সব লাজ দিলো ঢেকে
বিজলী তোমারে হেরি চমকায় থেকে থেকে।
বাহিরে আলেয়া ধর হাত ধর মম
আঁধারে দেখাও পথ তুমি ধ্রুবতারা সম
ঐ শোন গো ফটিক জল তৃষ্ণার বারি যাচে।
আজ দূরে থাকিও না এসো এসো আরো কাছে।
প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর প্রধান পরিচয়, তিনি এক জন ঔপন্যাসিক। কিন্তু প্রথম সংখ্যাতে তাঁরও একটি কবিতা রয়েছে, ‘তাই শুধু কর ভগবান’। এ কবিতায় নিগৃহীত বঞ্চিত অত্যাচারিত দুর্বলদের জীবনে সুখ ও শান্তি এনে দেবার জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন। তাঁর কবিতাটির কয়েকটি লাইন এ রকম :
অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ দাঁড়ায়ে রহে দ্বারে,
একমুষ্টি অন্ন চাই— চাই,
একটু করুণা লাগি কারে ডাকে তবু বারে বারে
যদিও জেনেছে কেহ নাই।
.. .. .. .. .. ..
নিগৃহীত, গৃহচ্যূত বক্ষে রাখি কম্পমান কর
নিষ্পলকে রহে চাহি—প্রশ্ন জাগে মনে — তারপর?
তারপর কি যে হবে,— কোনখানে লভিবে আশ্রয়
প্রশ্নের হয়নি সমাধান,
এ উত্তর দাও ভগবান।
ধারাবাহিকভাবে গল্প প্রকাশের প্রবণতা প্রথম থেকেই লক্ষ করা যায়। প্রথম সংখ্যার প্রথম গল্প শ্রীমনোমোহন রায়ের ‘বিরহ মিলন কথা’ দুপৃষ্ঠা ছাপা সম্পূর্ণ না হতেই ব্রাকেটের ভেতর লিখে দেয়া আছে—‘চলবে’। এমন হতে পারে লেখক পত্রিকা প্রেসে যাবার পূর্ব পর্যন্ত ওটুকুই লিখে উঠতে পেরেছিলেন। গল্পটি একেবারে তৃতীয় সংখ্যায় গিয়ে শেষ হয়েছে। পঞ্চম সংখ্যায় বন্দে আলী মিয়ার একটি গল্প— ‘লেডি ডাক্তার’ আবার ‘চলবে’ বলে শুরু হয়েছে। পঞ্চম সংখ্যায় শিশির কুমার পূজারীর প্রবন্ধ ‘বর্ত্তমান যুগে কাব্যের স্থান’ সম্পর্কেও একই ব্যাপার লক্ষ করা যায়। অবশ্য এটা ঠিক যে, বিশেষ করে সাহিত্য মাসিকে ধারাবাহিক রচনা প্রকাশ নতুন কিছু নয়। ‘বঙ্গদর্শনে’ বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস, এমন কি ‘সবুজপত্রে’ রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’— এর কথাটা সহজেই মনে আসে। বাংলা সাহিত্যের আরও আরও অনেক বিখ্যাত উপন্যাসের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা যায়। তবে উপন্যাসগুলির ধারাবাহিক প্রকাশনাই ছিল, বোধ হয়, তার নিয়তি। সে সময় পূজা সংখ্যাগুলির প্রকাশ শুরু হবার পরই সম্পূর্ণ উপন্যাস পাওয়া গেছে। বাংলাদেশেও এখন ঈদ সংখ্যাতে যেভাবে পাওয়া যায়। তবে এটাও ঠিক, ধারাবাহিক রচনা প্রকাশের ক্ষেত্রে কেবল মাত্র স্থানাভাব নয়, পাঠককে ধরে রাখারও একটা ব্যাপার কাজ করত। সম্পাদক বন্দে আলী মিয়ার মাথায় সেটা থাকাও বিচিত্র নয়।
এটা, বোধ করি, বলা যায়, গল্প-কবিতা ‘ভোরের আলো’তে যা ছাপার, তা তো ছাপা হয়েছেই। সূচীপত্র দেখে, তার হিসাবটাও আমাদের কাছে স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে। আর এটাও, বলা যায়, বোধ করি, তখনকার দিনের গড় পাঠকের প্রত্যাশার কাছেও তা ছিল সমীপবর্তী। অর্থাৎ সাধারণভাবে এ ধরনের লেখাই ছিল গ্রহণীয়। এ কথা বলে অবশ্য আমি সাহিত্যে তত্ত্বগত আন্দোলন কিংবা আঙ্গিকগত পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে নিরুৎসাহ করতে চাই না। এগুলো যারা করেন, তারা অগ্রবর্তী পাঠকদের বিষয়টা মাথায় রেখেই করেন। সেটা সামনের দিকে এগিয়ে যাবার একটা পূর্বশর্তও বটে। তবে সেটা করার জন্য যে ক্ষমতা দরকার, তা তো সবার থাকে না। আবার আমরা যেটাকে ‘সিম্পল স্টোরী টেলিং’ বলি, তার জন্যও একটা সহজাত প্রতিভা থাকা দরকার। সহজভাবে গল্প বলাটাও একটা দারুণ ব্যাপার। আর সেটা যাদের থাকে না, এটাকে প্রিটেনশনও বলতে পারেন, আবার বর্ম বানানোও বলতে পারেন, এটা করে তারা ‘বাঙালকে হাই কোর্ট’ই দেখিয়ে থাকেন। বিরাট কিছু করে ফেলেছি, তোমরা অবোধ শিশু, বোঝার সাধ্য কি আর তোমাদের আছে? গল্প-কবিতার তুলনায় মননশীল লেখা অর্থাৎ প্রবন্ধ, তার সংখ্যা কম। তবে বিচার বিশ্লেষণ যেমনই হোক সাহিত্য নিয়ে লেখা প্রবন্ধই বেশী। তার মধ্যে দুটি সংখ্যায় ‘সাহিত্যের রূপ’ অর্থাৎ একই নামে দুজন ভিন্ন লেখকের প্রবন্ধ আছে দুটি। প্রাচীন সাহিত্য আর কবিতা নিয়ে দুটি। শিক্ষা আর মানব জাতির উৎপত্তি বিষয়ক প্রবন্ধ আছে একটি করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাদন প্রণালী কি, তাও জানতে পারা যায় একটি লেখা থেকে।
গিরীন চক্রবর্তীর ‘সুজনের গান’ নিয়ে নজরুলের লেখাটির কথা তো আগেই বলেছি। এ ছাড়া, প্রথম সংখ্যাতেই ‘পুস্তক পরিচয়’ নামে একটি বিভাগ ছিল। সেখানে সেখানে শ্রীফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় প্রণীত ‘তুঁহু মম জীবন’ ও শ্রী কেদার সরকারের ‘প্রিয়া’ নামক একটি গ্রন্থের অতি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। একথা বলা চলে যে বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় ধারার উপন্যাসের অন্যতম প্রবর্তক ছিলেন ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়। এখনও রেলস্টেশানগুলির বুক স্টলে কিংবা ট্রেনে-বাসে-ফেরীতে ফেরী করে যারা বই বিক্রী করে, তাদের আর কোন বই না পাওয়া গেলেও তাঁর বই পাওয়া যাবেই যাবে। আমি নিজেও বয়ঃসন্ধিকালে ‘তুঁহু মম জীবন’ পড়ে অনেক কান্নাকাটি করেছি। এ থেকে গ্রন্থখানির চাহিদা কেমন, তার একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। ‘পুস্তক পরিচয়ে’ এ বই সম্পর্কে বলা হয়েছে :
বর্ত্তমান বাংলা সাহিত্যের একখানি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। আখ্যান বস্তু, বর্ণনাভঙ্গী ও চরিত্র-চিত্রণ সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। পাঠ শেষ করিয়া স্তব্ধ হইয়া ভাবিতে হইবে লেখকের কৃতিত্বের সঙ্গে অসামান্য মৌলিকতার কথা। ঘরে ঘরে পুস্তকখানির সমাদর হওয়া উচিত’। পাশাপাশি শ্রীকেদার চক্রবর্তী প্রণীত ‘প্রিয়া’ সম্পর্কে বলা হয়েছে।
‘একখানি কাব্যগ্রন্থ। লেখক নবীন। সুতরাং দোষত্রুটি যথেষ্টই আছে। সাধনা থাকিলে সিদ্ধিলাভ না হইতে পারে এমন বলা যায় না’। তবে এই পুস্তক পরিচয়গুলি কে লিখেছেন, তার নাম নেই। ধরে নেয়া যেতে পারে, এটি পত্রিকারই বক্তব্য। আবার যে সংখ্যাগুলি হাতে আছে, তাতে এ জাতীয় পুস্তক পরিচয় আর নেই।
দ্বিতীয় সংখ্যায় এসে দুটি নতুন বিভাগের সূচনা লক্ষ করা যায়। তার একটি ‘সিনেমা’, অন্যটি ‘সাময়িক প্রসঙ্গ’। ‘সিনেমা’ বিভাগের পরিচালিকা হিসেবে নাম দেয়া আছে, বাণী দেবী। এখানে অবশ্য কোন সিনেমা হলে কোন বই প্রদর্শিত হচ্ছে, নির্দেশ করা হয়েছে তা। সঙ্গে কারা অভিনয় করেছেন, পরিচালক কে, সঙ্গীতকার কিংবা কাহিনী কোন উপন্যাস থেকে নেয়া হয়েছে, প্রাসঙ্গিকভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে তাও। আমার মনে হয়, এখানে এই তথ্যগুলি কিছুটা জেনে নেয়া যেতে পারে:
১। নিমাই সন্ন্যাস—সিনেমা হল ‘উত্তরা’।
মতিমহল থিয়েটার্সের ভক্তিমূলক চিত্র। পরিচালনা—ফণী বর্ম্মা। কাহিনী ও সঙ্গীত- অজয় ভট্টাচার্য্য। অভিনয়Ñছবি, মণিকা, প্রমোদ, রবি, নিভাননী, সন্তোষ প্রমুখ। এই বই সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তাও বেশ ইন্টারেস্টিং : বর্ত্তমান যুগে এ ধরনের বই কেন যে ফিল্ম কর্ত্তৃপক্ষরা তোলেন তা বুঝতে পারি না, কারণ বিংশ শতাব্দীতে এ ধরনের বই চলা কঠিন, বিশেষতঃ ছাত্ররাই সিনেমা হলগুলিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সুতরাং তাদের রুচি অনুসারে বই করাই শ্রেয়।
২। অভিনেত্রী—সিনেমা হল রূপবাণী
এটি সম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য নেই, শুধু বলা হয়েছে, ‘বইখানি মন্দ নয়’।
৩। নর্ত্তকী—সিনেমাহল চিত্রা
নিউ থিয়েটার্সের চিত্র। পরিচালনা— দেবকী বসু। সঙ্গীতÑ পঙ্কজ মলি¬ক। অভিনয়— লীলা, ভানু, উৎপল, ইন্দু, নরেশ প্রমুখ। কাহিনী সম্পর্কে শুধু বলা হয়েছে এটুকুই,— ‘হঠাৎ একটি নর্ত্তকীর জীবনে আবির্ভাব হয় একটি সুদর্শন ব্রহ্মচারী যুবক, তারপর তাদের চলে প্রণয়ের অভিনয়’।
৪। মায়ামৃগ ও ভালবাসা—সিনেমা হল ছবিঘর
পরমা পিকচার্সের বই। মায়ামৃগ চারু বন্দ্যোধ্যায়ের ‘যমুনা পুলিনের ভিখারিণী’ শীর্ষক উপন্যাস অবলম্বনে চিত্রায়িত। আর ভালবাসা কৌতুক চিত্র। পরিচালক—তুলসী লাহিড়ী
৫। রাজকুমারের নির্ব্বাসন—সিনেমা হল শ্রী
কমলা টকিজের চিত্র। কাহিনী—শ্রীকান্ত সেন। পরিচালনা—সুকুমার গুপ্ত। এই বই সম্পর্কে মস্তব্য হল, গল্পের প্লটটি মন্দ নয়, তবে পরিচালক সুকুমার গুপ্ত মহাশয়ের দোষে কয়েকস্থানে অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পেয়েছ।
৬। পি-ডব্লিউ-ডি—সিনেমা হল নাট্যভারতী। কাহিনীÑশ্রীজলধর চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়—দুর্গাদাস, নির্ম্মলেন্দু, রতীন, রাণীবালা প্রমুখ।
৭। গৌরসী প্রণীত ‘ঘূর্ণি’ ও প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রত্নদীপ। সিনেমা হল—রঙমহল।
স্পষ্টই দেখা যায়, এতদসংক্রান্ত তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে কোন ইউনিফর্মিটি রক্ষা করা হয়নি। পরিচালক, সঙ্গীতকার, কাহিনীকার কিংবা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নাম কোথাও দেয়া হয়েছে, আবার কোথাও দেয়া হয়নি। কোনটাতে মন্তব্য আছে, কোনটাতে নেই। আর প্রসঙ্গত বলতে হচ্ছে, তা হল, বার্ষিক সম্মিলনে নির্ম্মল দাস অভিনেত্রী বিষয়ে একটি তির্যক মন্তব্য করেছিলেন, ‘ভোরের আলো’ পত্রিকা পথে যাবে না, এমন একটি আশাও হয়ত তার মনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু তৃতীয় সংখ্যাতে দেখা যাচ্ছে, একাধিক অভিনেত্রী ও সিনেমার দৃশ্য বেশ যত্ন সহকারেই ছাপা হয়েছে। ‘সাময়িক প্রসঙ্গ’ও পাওয়া যাচ্ছে ঐ দ্বিতীয় সংখ্যাতেই। প্রথমটি হল, বলধা জমিদার পুত্র খুনের মামলা’। ঘটনাটি হল, পড়ে যেটুকু বোঝা যায়, তা হল, ত্রিভুজ প্রেমের পরিণতিতে খুন হয়েছে বলধা জমিদার পুত্র। আর নারীর কারণেই এ প্রণয়-যুদ্ধ। কিন্তু এ প্রসঙ্গে যে মতামত উঠে এসেছে, তার ভেতর দিয়ে পাওয়া যায় পত্রিকাটির নারী প্রগতি সম্পর্কে ধারণা। সেখানে বলা হয়েছে :
এটা নাকি নারী প্রগতির যুগ, নারীরা নাকি এতদিন পরে জেগেছে; কিন্তু আমরা বলি এটা নারী প্রগতির যুগ নয়, নারী অধঃপতনের যুগ; নারী দেশের জন্য জাগেনি, নারী জেগেছে বিলাসে, রোমান্সে। নারী শিক্ষিত হয়নি, নারী হয়েছে উচ্ছ্বঙ্খল— বহির্মুখী। যেদিন হতে নারী পাশ্চাত্যকে অনুসরণ করতে শিখেছে সেদিন হ’তে নারী তার নারীত্বকে, তার সত্ত্বাকে হারিয়ে ফেলেছে। ইউনিভারসিটির কতকগুলি ডিগ্রী লাভ করলেই শিক্ষিতা হওয়া যায় না।
দ্বিতীয়টি হল, ‘হেঁয়ালী’ শীর্ষক একটি পত্রিকার চতুর্থ বার্ষিক উৎসব ‘সুসম্পন্ন’ হবার খবর। আরিয়াদহ কালাচাঁদ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে সভাপতিত্ব করেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। উদ্বোধন করেন ভারতবর্ষ সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।
সর্বশেষ যে প্রসঙ্গটি রয়েছে, তা, বলা যায়, আন্তর্জাতিক। হিটলার ও মুসোলিনী কোন এক গোপন অভিসন্ধিতে নিরুদ্দেশ হয়ে রয়েছেন, তা নিয়ে বিশ্ববাসী চিন্তিত। প্রসঙ্গটির শিরোণাম হর, ‘মামা ভাগ্নের নিরুদ্দেশ যাত্রা’।
পত্রিকাটি বেশ ক্ষীণকায়। পৃষ্ঠা নম্বর দেখানোর বেলাতে এক সংখ্যা থেকে প্রথম তিনটি সংখ্যার পৃষ্ঠার পরিমাণ ন্যূনধিক ২০ করে মোট ৬০ যে চতুর্থ সংখ্যাটি পাওয়া যায়নি, তার পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ২০। কারণ পঞ্চম সংখ্যাটি শুরু হয়েছে ৮১ থেকে। সেখান থেকে ৯৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অনেকটা চর্যাপদের খণ্ডিত পুঁথির মতো অবস্থা। মনে হয়, আর ৪/৬ পৃষ্ঠা থাকলেও থাকতে পারে। যে সময়ের কথা বলছি, তখন প্রথম সংখ্যা থেকে দ্বাদশ সংখ্যা পর্যন্ত মোট পৃষ্ঠার একটা কনটিনিউয়িটি রাখা হত। দ্বাদশ সংখ্যাতে সারা বছরে কোন লেখকের কত লেখা ছাপানো হয়েছে, তারও একটি তালিকা দেয়া হত। তাতে করে এক নজরে পত্রিকায় প্রকাশিত সমস্ত লেখার বিষয় জানাটাও ছিল সুবিধাজনক। ‘ভোরের আলো’র পৃষ্ঠা সংখ্যা নির্দেশের ক্ষেত্রে তখনকার এই রীতিটাই করা হয়েছে অনুসরণ।
আরও দুএকটি বিষয় নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। যেমন, কি কি বইপত্র কিংবা পত্রপত্রিকার বিজ্ঞাপন এসেছে ‘ভোরের কাগজে’। প্রথম সংখ্যার দ্বিতীয় কভারেই আছে ‘বন্দে আলী মিয়ার লেখা’ বেশ কয়েকটি বইয়ের নাম ও মূল্য তালিকা :
‘ময়নামতীর চর’— ১ টাকা
কলমী লতা (পল্লী কাব্য)— ১ টাকা
অনুরাগÑ ১ টাকা
পরিহাস (উপন্যাস)— ১॥ টাকা
অস্তাচল (উপন্যাস)— বারো আনা
আমানুল্লাহ (নাটক)— ১ টাকা
জঙ্গলের খবর (ছোটদের উপন্যাস)— ১ টাকা
গল্পের আসর (গল্পের বই)— আট আনা
চোর জামাই (হাসির গল্প ও ছড়া)— ছয় আনা
বাঘের ঘরে খোগের বাসা (কাসির গল্প)—- ছয় আনা।
যেভাবে বিজ্ঞাপিত হয়েছে, সেভাবেই তুলে দিলাম, কেবল আগের দিনের টাকাÑ আনার চিহ্ন হুবহু দেয়া সম্ভব হল না। এছাড়া বিজ্ঞাপন রয়েছে যে বইগুলির, সেগুলি হল :
১ম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা— ‘সুজনের গান’—- গিরীন চক্রবর্তী
১ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা—- অলৌকিকা (গল্পের বই)— গোপাল বটব্যাল
১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা—- কেশবতী (ছোটদের গল্পের বই)— শ্রীমনোনোহন ঘোষ
‘সাধনা’— এই নামে একটি সচিত্র মাসিক পত্রিকা’র বিজ্ঞাপনও দেখতে পাওয়া যায় দ্বিতীয় সংখ্যায়।
এ ছাড়া, অন্য বিজ্ঞাপনাদি কি ছিল, তা নিয়েও কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক। এ ব্যাপারটা যদি প্রচারের একটা মাধ্যম, তা হলেও এ কাজে অর্থ ব্যয় কেউ করতে চায় না। প্রচার ছাড়াও, যত আংশিকই হোক, এর ভেতর দিয়ে জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় বিষয় ও উপকরণাদির যেমন পরিচয় পাওয়া যায়, অনুরূপভাবে সেই অঞ্চলের একটা পরিপ্রেক্ষিতের ছবিও ফুটে ওঠে। ব্যবসা-বাণিজ্যের খবরও তাতে থাকে।
‘ভোরের আলো’র সর্বপ্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদের অর্ধ পৃষ্ঠা জুড়েই ছিল ‘মণিকার নারায়ণ চন্দ্র মান্না আসল রত্ন বিক্রেতা’র বিজ্ঞাপন। পরবর্তী একটি সংখ্যার প্রচ্ছদে ও চতুর্থ কভারেরও অর্ধ পৃষ্ঠা জোড়া এই ‘আসল রতœ বিক্রেতার বিজ্ঞাপন দেখতে পাওয়া যায়। আপ-টু-ডেট ফ্যাসানের যাবতীয় অলঙ্কারাদি নির্ম্মেতা— ‘শ্রীভূতনাথ পাল’-এরও বিজ্ঞাপন রয়েছে একটি সংখ্যায়। এ ছাড়া, শীতের পোষাক বিক্রেতা হরিশঙ্কর দে, দি সুবারবণ ইলেকট্রিক কোং, ‘ভারতের সর্বশ্রেষ্ট ও সর্বপ্রথম কাঁটা ও নিক্তি প্রস্তুতকারক গিরিশ চন্দ্র ঘোষ’, ‘সেগুন কাঠের বাক্স সমেত অতিশয় মজবুত’ ‘দ গ্রাণ্ড লিলি ফুলুট’,— প্রো—এস, সি, মাকাল, সেখান সকল প্রকার হারমোনিয়াম, অর্গন, এসরাজ ও বেহালার যাতীয় সরঞ্জাম পাওয়া যায় ও মেরামত করা হয়। একাধিক সংখ্যায় ‘হেকিম এম, এস, জামান’ আছেন ‘ধাতুদৌর্ব্বল্য ও শক্তিহীনতা চিরতরে দূর করিতে অদ্বিতীয় ‘কস্তুরী পিল’ ও ‘একবার সেবনে এক বৎসর গর্ভ হয় না’— এমন ‘গর্ভনিরোধ বটিকা’ নিয়ে। ‘সর্বপ্রকার মানবের অশান্তি, রোগ, দারিদ্র দূর করিতে একমাত্র দৈব অর্থাৎ ঐশ্বরিক শক্তিই সক্ষম’— বলে শ্রীকামাখ্যা নাথ ঘোষ দাবী করেছেন, তার ‘একমাত্র পুনশ্চকরণ সিদ্ধ কবচ এবং যন্ত্রই উক্ত দৈবশক্তির আধার এবং সমুদয় অভীষ্ট পূরণ করিতে সক্ষম’। আবার ‘সিদ্ধেশ্বর আশ্রম’—এ গেলে ‘রত্ন ধারণেই দুর্ভাগ্যের অবসান ও সঙ্গে সঙ্গেই সৌভাগ্য আনায়ন করে’। এর সঙ্গে আর যে বক্তব্য আছে, বর্তমানের ফ্যাটালিস্টিক সমাজ মানস, বোধ করি, তার উত্তরাধিকারই বহন করছে। যেমন :
গ্রহ বৈগুণ্যই সকল অশান্তি ও দুঃখ কষ্টের কারণ। তজ্জন্য বহু প্রাচীন কাল হইতে অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্য একমাত্র মুনি নির্বাচিত বিশুদ্ধ রতœ ধারণেই সম্ভব। মহাভারতে দেখা যায় সূর্য তনয় কর্ণের “মণিময় কুণ্ডল” ছিল বলিয়া সদ্যজাত শিশু অবস্থায় জলে ভাসিয়া প্রাণরক্ষা হইয়াছিল এবং কুরুক্ষেত্র মহাসমরে মনিময় কুণ্ডল ছিল তাহাকে কেহই পরাজিত করিতে পারে নাই। এইরূপ ভুরি ভুরি প্রমাণ রহিয়াছে। /৫ পয়সার ডাকটিকেট পাঠাইয়া সবিশেষ জ্ঞাত হউন।
বিজ্ঞাপন ইরেজীতেও রয়েছে,— প্রোঃ বি বসাকের রাবার স্টাম্প তৈরীর জন্য বি. পিন অ্যণ্ড কোং, কংক্রীট প্রোডাক্টস অ্যাণ্ড কনস্ট্রাকশন কোং ও দি সুবারবান ইলেকট্রিক কোং—এর। পত্রিকাটি দেখে এটা বোঝা যায়, এক দল সজ্জন সাহিত্যমনষ্ক মানুষ জাতীয় চেতনা উজ্জীবিত করার আকাক্সক্ষায় একটি সংগঠন, ‘সিঁথি বাণীমন্দির’-এর প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছিলেন। ‘ভোরের আলো’ প্রকাশ করা হয়েছিল তাদের আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে জনসমক্ষে নিয়ে আসার জন্য। সাহিত্য সেবা ছিল তার উপলক্ষ্য। এটা ঠিক যে প্রথম মহাযুদ্ধের সময় থেকে বৃহত্তর ভারতবর্ষীয়, বিশেষ করে নগরকেন্দ্রিক মানুষের জীবনের যে পরিবর্তন, তার একটা তাত্ত্বিক ভিত্তিভূমি দাঁড় করানোর প্রচেষ্টাও ছিল অব্যাহত। সেটা কনভেনশনাল হবে, না, বৈপ্ল¬বিক,— দ্বন্দ্বটা ছিল সেখানেই। এটাকে, অনেকে রক্ষণশীলতা ও প্রগতিশীলতার দ্বন্দ্বও বলে থাকেন। আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও বলে সমাজ প্রবাহের মধ্যে এই দ্বন্দ্বটাই চিরকালীন। এই দ্বন্দ্বই আসলে সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। স্পষ্টই বোঝা যায়, যারা ‘ভোরের আলো’ প্রকাশ করেছিলেন, তারা ছিলেন কনভেনশনাল। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। আর এই সম্মানটুকু তাদের প্রাপ্যও বটে।
এটা যেমন একটা ব্যাপার, তেমনই আরেকটি বিষয় হল, পত্রিকা শিল্প-সাহিত্যের হতে পারে, লেখার মধ্যে প্রতিভা কিংবা মেধার ছাপও না থাকতে পারে, কিন্তু তা তো জীবনপ্রবাহ বিযুক্ত নয়। লিখিত ইতিহাস যখন আমরা পাই না, তখন নিদর্শনাদির ভেতর দিয়েই আমরা পারিপর্শ্বিকতার চেহারাটা দেখে নিতে চাই। আর লিখিত ইতিহাস থাকলেই যে তার প্রয়োজন নেই, সে কথাটা বলাটাও মূর্খেরই কাজ। তাকে সম্পূর্ণতা দেবার একটা তাগিদ সব সময়েই থেকে যায়।
‘ভোরের আলো’র মধ্যে তার কিছুটা পাওয়া গেলেও যেতে পারে। আর এ জন্যই আমার এত কথা বলা।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা