ধমনি সম্পর্কে দুএক প্রস্থ কথা

ধমনি সম্পর্কে দুএক প্রস্থ কথা

পর্যায়ক্রমে গল্প, পতিতা এবং গালি সংখ্যা নিঃসন্দেহে ধমনির বিশেষত্বের পরিচয় বহন করে। তারই ধারাবাহিকতায় ধমনির এবারের সংখ্যা মহাজন (উনত্রিশতম সংখ্যা)। ধমনি গালি, পতিতা, মহাজন বা ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে’ (ত্রিশতম সংখ্যা) বিষয় নিয়ে কাজ করলো কেন? ‘মহাজনের’ আয়োজনমালায় প্রবন্ধ, (স্বদেশি মহাজন, বিদেশি মহাজন) কবিতা ও গল্পবেষ্টিত। এবং সমস্ত আয়োজনে মহাজনের স্বাদ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। আলোচনায় যাওয়ার আগে মহাজনের স্বরূপ জানা দরকার। সংস্কৃত এই শব্দের আক্ষরিক অর্থ ধরলে এর মানে দাঁড়ায় মহান ব্যক্তি, আরেক অর্থ বহুজন। ‘মহাজন’ শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হলেও আভিধানিকভাবে— বণিক, কুসীদজীবী, বড় বেপারি, আড়তদার, যে ব্যক্তি মূলধন যোগায়, বৈষ্ণব পদকর্তা, অতি ধার্মিক বা মহৎ ব্যক্তি ইত্যাদি বুঝায়। তবে মহাজন শব্দটি শুধুমাত্র এ শব্দগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, কালিক ব্যবধানে এর বিভিন্ন রূপ আমরা দেখতে পাই। বিশেষ করে কর্পোরেট সমাজব্যবস্থায়।
মহাজনী ধারণাটি অনেক প্রাচীন একটি ধারণা। সামন্ত অর্থনীতিতে জমিদারই মহাজন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে জমিনির্ভর অনুৎপাদনশীল খাজনাদার গোষ্ঠী আধিপত্যের খুঁটি গেড়ে বসে। আর এতেই মহাজনী কারবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে এ ব্যবস্থার রূপ পরিবর্তিত হয় মাত্র। অর্থ-বাণিজ্যে সেই জায়গা নেয় প্রতিষ্ঠান তথা ব্যাংক। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্র এখন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার অধীন। এই শাসনব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ বিশ্বব্যাংক, আই.এম.এফ বা আঞ্চলিক অর্থকরী প্রতিষ্ঠান। এদের নাম হতে পারে বৈশ্বিক মহাজন। আগের কালের মহাজনদের জন্য ঋণের মুনাফাই ছিলো মুখ্য। এজন্য সর্বস্বান্ত হতো কৃষকেরা। আর বর্তমানের বৈশ্বিক মহাজনদের কাছে মুনাফা গৌণ। বরং শর্তাবলীর খোপে ফেলে দেশের গতিমুখ নির্ধারণ করাই মুখ্য। এই প্রক্রিয়াতেই সবার অজান্তে দেশের জমি, বন, পাহাড়, খনিজ সম্পদের প্রকৃত মালিক কে বা কারা তা অস্পষ্ট। আনু মুহাম্মদের ‘মহাজনের রূপ রূপান্তর’ লেখায় তা স্পষ্ট। আবার ‘মহাজন নাকি ‘মা…আ…জন, ‘মা-জন’ বা ‘মাহাজন’ শিরোনামের লেখায় মহাজনের ভিন্ন রূপ দেখি। সেখানে মহাজনই হতে পারে ব্যক্তির আদর্শের নায়ক। কাজে, কর্মে, সততায়, আদর্শে, ব্যক্তিত্বে মহাজন আমাদের স্বাপ্নিক করে তোলে। যখন মহাজন সকলের ভেতরে প্রাণময় হয়ে বারবার বৈলা চলেন- ‘বিশ্বাস কর, বইয়ের ব্যবসা করছি কিন্তু মহাজন হই নাই। কিংবা যখন স্কুলে শেখায় : ‘মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন/ হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়/ সেই পথে লক্ষ্য করে স্বীয় কীর্তি ধ্বজা ধরে/ আমরাও হবো বরণীয়।’ বিশ্বজুড়ে মহাজনী কারবারের যে ব্যাপকতা তা শিল্প-সাহিত্য বিশেষ করে নাট্যসাহিত্যে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। ইংল্যাণ্ড ও ইউরোপের সমাজে মহাজনী প্রথার অনেক করুণ ঘটনা রয়েছে। সম্ভবত তারই প্রতিফলন ঘটেছে শেকস্পিয়ারের, ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকে। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’সহ অনেক নাটক, গল্প, উপন্যাসেও তা দেখতে পাই। এমনকি স্বাধীনতা পূর্বকালের সামাজিক নাটকগুলোর খল চরিত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মোড়ল, মাতবর দেখতে পাই। বাংলা নাটকের বাঁক পরিবর্তন এবং ‘মহাজন’ চরিত্র ফরিদ আহমদ দুলাল এর লেখায় তা স্পষ্ট।
ধমণিতে প্রকাশিত প্রত্যেকটি কবিতায় মহাজনের স্বাদ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান। অনেকটা এর শিরোনামগুলো পড়লেও তা বোঝা যায়। যেমন সাযযাত কাদিরের ‘মহাজনের বাড়ি’, আবিদ আনোয়ারের ‘কদম মাঝির স্বগতোক্তি’, মোশাররফ হোসেন ভূঞার ‘বন্ধক’, আমজাদ দোলনের ‘মহাজনী নৌকা’, জাহীদ ইকবালের ‘জমিদার প্রথা’, আহমদ আজিজের ‘গরিবের পদ্য’, মহিবুর রহিমের ‘লালনের মনমহাজন’ ছাড়াও অন্যান্য কবিতায় মহাজনের সার্থক রূপায়ণ ঘটেছে। সাযযাত কাদিরের ‘মহাজনের বাড়ি’ কবিতায় :
বড় বড় বাড়ি, তাতে বড় বড় দোষ।
বাড়ির ভেতরে সাপ করে ফোঁস ফোঁস ॥
মহাজন তাতে গড়ে আস্ত গরাদ।
হাতে চাঁদ দিতে চেয়ে গলে দেয় ফাঁদ ॥
আবার গল্পগুলোতে এর প্রভাব বিদ্যমান। চন্দন আনোয়ারের ‘সাঁওতাল মেয়ের ঈশ্বর’ গল্পটিতে সহজ-সরল সাঁওতাল মেয়ে বিন্দী। যাকে মাতবরের ছেলে রুস্তম প্রথমে আখক্ষেতে এবং পরে চেয়ারম্যানের ছেলে শফিকসহ নির্জন বাঁশঝাড়ে ধর্ষণ করে। আর এটিকে ইস্যু করে চেয়ারম্যান ও বিপক্ষ দলের মধ্যে ঝামেলা বাঁধলেও ন্যায়বিচার পায়না বিন্দী। মহাজনী চরিত্র যে দুঃখী, সম্বলহীন মানুষের কষ্টের কারণ হয় এ গল্পটিতে তা স্পষ্ট। আবার মনি হায়দারের ‘জিহ্বায় লাল লাল ছোপ’ গল্পে মহাজন আমিরুদ্দীনের যৌন লালসার পরিচয় পাওয়া যায়। অসহায় রমণীদের কাজ দেওয়ার ওছিলায় সম্ভ্রমটুকু কেড়ে নেয়। প্রথমে মিষ্টি করে কথা বলে বা তাতে কাজ না হলে ছল, প্রতারণা বা শারীরিক শক্তি খাটিয়ে রহিমা বা লিপি বেগমের সর্বনাশ করে। আর সোলেমানের মতো লোক মধ্যপন্থা অবলম্বন করে উভয়ের কাছে সুবিধা আদায় করে ঢাকা শহরে সাত-তলা ভবনের ফাউন্ডেশন দেয়।
স্বদেশি মহাজন বিষয়ক প্রবন্ধগুলোতে মহাজনের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে তা অনেকটা শিকারের আশায় ওঁৎ পেতে থাকা হিংস্র পশুর মতো। যেখানে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ তাদের শিকারের বস্তু। অপরদিকে পরদেশি মহাজন বিষয়ক ‘জাপানে এদো যুগের মহাজন সংস্কৃতি আজও সচল’ প্রবন্ধে প্রবীর বিকাশ সরকার যে মহাজনের চিত্র এঁকেছেন তা আমাদের একেবারেই অপরিচিত। জাপানে এদো যুগে (১৬০৩-১৮৬৮) মহাজনি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিলো। কৃষক, কারিগর, মহাজন ও অস্পৃশ্যজাতির মধ্যে মহাজনদের অবস্থান তৃতীয় হলেও শাসকদের সাথে তাদের সুসম্পর্ক ছিলো। তারা অধিক মুনাফা নয় বরং ভোক্তার সুবিধাকে প্রথম বিবেচনায় আনত। তাদের কাছে পণ্যের গুণগত মান এখনকার মতো সে যুগেও মুখ্য ছিলো। আর পণ্য বিক্রি করার ক্ষেত্রে আচার-ব্যবহার শিক্ষা দিতেন মহাজনরা। এক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মুখে পড়লে বাকিরা সাহায্যে এগিয়ে আসতো। বস্তুত এই সংস্কৃতি আজও জাপানে প্রচলিত আছে।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা