50314526_809495946058671_3871654047995920384_n

ধা রা বা হি ক  র চ না

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব

সংগীতের সমাজতত্ত্ব ৯
মুহাম্মদ হাসান ইমাম

……………………………………………………………………………………

[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলি দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সম্পা.]

……………………………………………………………………………………

 সংগীতের বিবর্তন একটি দ্ব্যর্থবোধক প্রত্যয়। এটি যেমন জীবতাত্ত্বিক বিবর্তন বুঝায়, তেমনি সাংস্কৃতিক বিবর্তনও বুঝায়। সংগীতের সক্ষমতার জীবতাত্ত্বিক বিবর্তন এবং সক্ষমতার ফলাফলের সাংস্কৃতিক বিবর্তন বুঝিয়ে থাকে। সংগীতের সক্ষমতার বিবর্তন অবশ্যই জীবতাত্ত্বিক অভ্যূদয়; সংগীত ব্যবস্থা, সংগীত-শৈলীর ঐতিহাসিক পরিবর্তন এখানে সমুচ্চারিত। সংগীতের স্বভাব ও ডিনামিক্সের জীবতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে নির্দেশ করা যায়। একে আরেক অর্থে ডারউইনের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের তত্ত্ব দিয়েও ব্যাখ্যা করা সম্ভব। সংগীতের সাংস্কৃতিক উপাদান যেমন, সাংগীতিক যন্ত্র, সাংগীতিক টেক্সট, সাংগীতিক স্টাইল, সাংগীতিক মিথ, সাংগীতিক স্কেল যা সাংস্কৃতিকভাবে তৈরী ও স্থানান্তরিত হয়। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতো সাংস্কৃতিক নির্বাচন সংগীতের বিভিন্নতা নিয়ে আসতে পারে। সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো সংগীতের কিছু অংশ সুর বা ধরণ গৃহীত হতে পারে আবার বাকিটা পরিত্যক্ত হতে পারে। এখান থেকে সংগীতের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে একটি ডারউইনিয় ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে প্রাকৃতিক নির্বাচন, সাংস্কৃতিক নির্বাচন ও সামাজিক নির্বাচনকে একই ধারায় ফেলা যায় এই অর্থে যে প্রাকৃতিক নির্বাচন জীবতাত্ত্বিক হলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নির্বাচন পুরোপুরি জীবতাত্ত্বিক নয়। কারণ, এই দুটি ক্ষেত্রে সামাজিক মানুষের মনন ও আবেগের, পছন্দ ও মূল্যবোধের এবং দেশকালের পরিবর্তনশীল বাস্তবতার প্রভাব লক্ষণীয়। সংগীতের বিচিত্র ধারার বিকাশ সে কারণে এক ধরনের বিবর্তনবাদী নির্বাচন বৈ কিছুই নয়। আর এই নির্বাচনের পেছনে মানুষের কলাকৌশল ও অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের ফলশ্রুতি।

ক্স            মিউজিক্যাল বায়োলজির যাত্রা সবে শুরু হলেও আগামী দিনে এর গভীরতর অনুসন্ধান চলতে থাকবে এবং আমরা সংগীতের ক্ষেত্রে জীবতাত্ত্বিক ফ্যাক্টরকে যে উদাসীনতায় আক্রান্ত করেছি সে ভুলও ভাঙবে। জীবতাত্ত্বিক ফ্যাক্টরের সাথে মানুষের নিউরোলজিক্যাল ফ্যাক্টরের সংযোগ সাধন কঠিন হবে না। যখন আমরা দেখতে পাবো বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতি (অতিজৈবিক) ও জীবতাত্ত্বিক (জৈবিক) প্রণোদনার এক মহাসম্মিলন ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে। পৃথিবীর বিচিত্র দেশ ও সমাজের প্রেক্ষাপটে সংগীতের বিচিত্র ধারা তখন ব্যাখ্যা করতে গেলে সামাজিক প্রেক্ষাপটকে অবজ্ঞা করা যাবে না। সংগীতের ক্ষেত্রে পশু-পাখি ও অন্যান্য প্রাণীকুলের শাব্দিক অবদান বা স্বরসৃষ্টির ক্ষেত্রে কথ্য শ্রুতির অবদানকে একসময় চূড়ান্ত বলে ভাবা হলেও তার যে একটা কণ্ঠ-নিশ্রিত অবদান আছে তা অস্বীকার করা যায় না। সামান্য কয়েক বছর আগে জীববিজ্ঞানীরা বানর, নরবানর বিশেষ করে বানরদের শব্দ তৈরির উদ্দেশ্য বিবেচনা করে আশ্চর্য হয়েছেন। ডোনাল্ড গ্রিফিন পশুদের মধ্যকার কণ্ঠ-নিশ্রিত যোগাযোগকে বেদনার বহিঃপ্রকাশ বলেছেন। This approach assumes that vocalizations of monkeys and other animals are displays of emotion or affect, much like our own facial expressions.1

ক্স            সুতরাং পশু-পাখিদের এই সংকেত প্রদান যেমন অর্থপূর্ণ তেমনি অর্থহীন। পশুদের আবেগ ও প্রতীকী সংকেত প্রদানের ব্যাপারটি গবেষকদের কাছে অর্থপূর্ণ বিবেচিত হয়েছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্রিয়া সম্পূর্ণ করে এবং অবশ্যই তা অন্যদের লক্ষ করে উচ্চারিত হয়। সে অর্থেই এই সংকেত প্রদানকে যোগাযোগের উপায় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে কিছু কিছু বিষয় বক্তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নির্দেশ করে। এসব ক্ষেত্রে অর্থ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। আবেগনিঃসৃত ডাকাডাকি পশু-পাখিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। বিভিন্ন ধরনের শিকারীদের আগমনের কারণে কৌশল হিসেবে তারা ভিন্ন ধরনের শব্দ করে থাকে। পশু-পাখিদের এই যোগাযোগপূর্ণ আচরণে বাক্যের ব্যবহার তেমন দেখা যায় না।

ক্স            তবে তাদের অভিনব শব্দ-সৃষ্টি এবং পাখিদের গান তারা বংশ পরম্পরায় শিখনের মাধ্যমে পেয়ে থাকে। সংগীত না হলেও সংগীত-সদৃশ্য কথামালা পাখিদের মধ্যে বেশি উচ্চারিত হয়। নাইটিঙ্গেল সর্বাধিক গান গেয়ে থাকে যা পর্যবেক্ষকদের মতে ২০০ ধরনের। একই ধরনের ছোট বড় বিভিন্ন প্যাকেজের খ- খ- প্রকৃতির হয়ে থাকে। এই পাখিটি অনেক ধরনের শব্দ বারবার উচ্চারণ করছে বলে মনে হলেও একধরনের গান দুইবার গায় না। কিন্তু সব পশু-পাখির মধ্যেই তাদের যোগাযোগপূর্ণ শব্দ-সংকেত আচরণ বংশ পরম্পরায় সীমিত আয়ত্তের মধ্যে নির্বাপিত। শুধুমাত্র মানুষই তার ভাষা আবিষ্কারের দক্ষতার কারণে অনেক দূর অগ্রসর হতে পেরেছে।

  • The fact that many animal calls are fundamentally affective and non-symbolic augurs well for the prospect of some kind of commonality between those sounds and music. Both are immensely rich in emotional meaning. But generally speaking, neither animal song nor, except in very special cases, human music is usually viewed as meaningful in the strict, referential, symbolic sense.2

ক্স            পশু-পাখির সংগীত খোঁজা ও অনুধাবনের আগে একটি কথা আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, সৃষ্টিশীলতা মানুষের সংগীত সৃষ্টির মৌলিক চাহিদা। মানবীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংগীতকে প্রাচীন এবং সার্বজনীন মনে করা যেতে পারে। শুরু থেকেই মানুষ সংগীতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যন্ত্র ব্যবহার করে আসছে। প্রাইমেট পর্যায় থেকে সংগীত বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করেছে। মানবপূর্ব প্রাইমেটদের সময় থেকে সংগীত তাদের কাঠামোর দিক দিয়ে একটি বিশেষ অঞ্চলভেদে একই ধরনের সংগীত করে থাকে। মানুষের সাংগীতিক আচরণের ক্ষেত্রে উচ্চকণ্ঠ প্রবণতা থেকে নি¤œ স্তরে নেমে আসার বিবর্তন লক্ষ করা যায়। আদি হোমিনিড থেকে মানুষের পর্যায়েও এই আচরণ লক্ষণীয়।

ক্স            অধিকাংশ সংগীত আবেগ-সংশ্লিষ্ট এবং শ্রোতা ও গায়ককে তা গভীরভাবে আন্দোলিত করে। ছন্দ, স্বরকম্প তাদের অঙ্গসঞ্চালনকে প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে শ্রোতৃম-লীর হাততালি বা নৃত্য সহযোগী উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। কখনো কখনো নৃত্য সংগীতের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। পাখির ডাক ও পাখির গান আমাদের পরিপার্শ্ব জগতে এক অবিছিন্ন পরিম-ল এবং তাদের সামাজিকীকরণের জন্য চমৎকার পরিবেশ। তবে পাখির ডাকের চেয়ে পাখির গান অনেক বেশি জটিল। পাখিরা যখন নিজেদের পরিচয় দেয় অথবা ভূখ-গত সীমানার প্রতিরক্ষার কথা বলে অথবা তাদের সঙ্গী সাথীদের সঙ্গমের আকাক্সক্ষায় ডাকে তখন তা সংগীতের চেয়ে আলাদা শোনায়। তবে এ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণকৃত গান গাওয়া পাখিদের ক্ষেত্রে শিখনের প্রয়োজন দেখা গেছে। গান গাওয়া পাখি তাদের মোট সংখ্যার প্রায় প্রায় অর্ধেক (৯০০০)। সুতরাং সংগীত শিক্ষা তাদের নিত্য জীবনে একটি ব্যাপক ব্যাপার। তবে সরল উচ্চারণ ক্ষমতার কারণে অনেক পাখি গান গাইতে পারে না (যেমন, হাঁস, মুরগী, ঘুঘু)। এমনকি আমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বানর এবং এপ উচ্চারণের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। কিন্তু অনেক ধরনের গান গাওয়া পাখি, মানুষ, তিমি মাছ, এবং ডলফিনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টি করে। এবং তাদের উচ্চারণকে আয়ত্ত করার চেষ্টা করে। সবদিক বিবেচনা করে বলা যায় পশু-পাখিদের মধ্যে সংগীত শিক্ষার দুটি ধাপ লক্ষণীয়। প্রথমটি হলো শিক্ষণ, দ্বিতীয়টি হলো অনুশীলন। তবে স্পেসিস ভেদে এই দুটি ধাপ অনেক সময় দুটিকে জড়িত করে ফেলে।

ক্স            গিবনরা হলো প্রাইমেট গ্রুপের অত্যন্ত বিশেষায়িত শ্রেণী যারা এ পদের মতো উন্নত নয়। তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কারণে সহজেই চেনা যায়। এদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে এমন বিষয়গুলো হলো সহজেই ডালে ডালে বিচরণ করতে পরে। গাছের কচি পাতা এদের ভক্ষণের প্রধান খাদ্য। এদের হাত-পা লম্বা এবং চলাচলের উপযোগী।৩ থর্প এদের গানকে বোঝার জন্য একটি সংজ্ঞা ব্যবহার করেন। What is usually understood by the term song is a series of notes, generally of more than one type, uttered in succession and so related as to form a recognizable sequence or pattern in time. গিবনরা উচ্চৈঃস্বরে এবং লম্বা ডাক দিয়ে থাকে। অবস্থা বিশেষে এই ডাকের সময় দশ থেকে তেরো মিনিট স্থায়ী হয়। সাধারণত সকালবেলা তারা এভাবে গান গেয়ে থাকে। বিভিন্ন স্পেসিসের গিবনদের গানের মধ্যে তারতম্য করা যায়। এছাড়া দ্বৈত সংগীতও তারা করে থাকে। দ্বৈত গানের ক্ষেত্রে সাধারণত মহিলা গিবনরা খ- খ- শব্দের ব্যবহার করে থাকে, যেখানে পুরুষদের স্বর একটানা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়।

ক্স            সংগীত এবং ভাষা পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত। শুধুমাত্র স্বর উৎপাদন করতে পারলেই ভাষা আবিষ্কার সম্ভব নয়। মানুষের ভাষা প্রাণীদের ভাষার চেয়ে অনেক বেশি গুণগত পার্থক্য নিদের্শ করে। এই গুণগত পার্থক্য আবার ভাষা থেকে ভাষায় আলাদা হয়ে যায়। প্রাণীদের ক্ষেত্রেও তেমনি ঘটে থাকে। ভাষা এবং উচ্চরণের বিষয়টি বিবেচনা করতে হলে প্রথমেই বিবেচনা করতে হয় জীবতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। যোগাযোগের বিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল সামাজিক বিবর্তনের সমাজকাঠামোগত দিক। Since the social system, the network of social behaviors and interactions, supplies the framework and field for possible communicative interactions, evolutionary change there may result in drastic and discontinuous transitions at the level of communication and vocal signals. Thus, the connection between sociality and mental capacities, including communicative ones, becomes a central issue for understanding the primate order.4

ক্স            যেহেতু যোগাযোগ সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার একটি অংশ সেহেতু এটি সামাজিক সংগঠনের বাইরের কিছু না। এবং এর বিবর্তন সমাজব্যবস্থার বিবর্তন থেকে স্বাধীন নয়। যদি আমরা ধরে নিই ভাষা ও সংগীতের বিবর্তনমূলক ইতিহাস প্রাইমেট যোগাযোগের মধ্যে প্রোথিত। তাহলে আমরা অনেকটা বাধ্য  হবো প্রাইমেট সামাজিকতাকে ভাষা ও সংগীত সক্ষমতার একত্রিত বিবর্তনকে মেনে নিতে। একই পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত মানুষ ভাষা এবং সংগীত আয়ত্ত করলো কিন্তু আরেকটি বিরাট সংখ্যক প্রজাতি পারলো না। বিষয়টি অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করে। ডারউইনের ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ যেভাবে জীবতাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সহজ সমাধান দিয়েছেন সত্যিকারের গবেষণায় আজকে দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ সংস্কৃতিবান ও সংগীতজ্ঞ হতে পেরেছে কিন্তু মানুষের অতীত আত্মীয়-স্বজনরা তা পারলো না কেন বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে জানানো দরকার। স্থানাভাবে আমরা এদিকে আর অগ্রসর হতে সমর্থ হচ্ছিনা বরং সংগীত ও ভাষার বিবর্তনবাদী তত্ত্ব কি বলছে সে সম্পর্কে দেখার চেষ্টা করবো।

ক্স            মলিনো তার প্রবন্ধে ফ্রান্জ্ বোয়াস (১৮৫৮-১৯৪২) এবং ফার্ডিন্যান্ড সস্যুরকে (১৮৫৭-১৯১৩) মুখোমুখি করে সিনক্রোনিক ও স্ট্রাকচারালিস্ট আপ্রোচকে তুলনা করেন; যেখানে হিস্টোরিসিস্টকে খাটো করে দেখানো হয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞানে এই দুটি দৃষ্টিকোণের ব্যবহার এখনো প্রভাবশালী। বিবর্তনবাদী চিন্তাকে বিশুদ্ধ ভাবার ক্ষেত্রে বিবর্তনবাদী চিন্তার প্রশ্রয় পেয়েছে। তবে বিবর্তনবাদী চিন্তার ক্ষেত্রে সামাজিক ডারউইনবাদের প্রবেশ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে মানবিক বুদ্ধি বিকাশের আলোচনায় আজকের দিনে সামাজিক-জীবতাত্ত্বিক অধিগমকে অধিকতর প্রশ্রয় দেয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ এবং পশুর মধ্যে বুদ্ধি বিকাশের পার্থক্য আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। পশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্রে ডারউইনের তত্ত্ব প্রয়োগ করা যেতে পারে এমন ধারণা অধিক বিজ্ঞানীরা পোষণ করেন। সাথে সাথে এমন বিপদজনক ধারণা প্রশ্নে একটু ভীতিও লক্ষ করা যায়। আসলে বিজ্ঞানীরা ‘Decent with modification’ বিষয়টি সম্পর্কে একমত নন। পরবর্তীতে ডারউইনের তত্ত্ব নিয়ে আরো বিতর্কের সূত্রপাত হয়। যেমন রিচার্ড ডকিন্স বিশ্বজনীন ডারউইনবাদের প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। তার মতে মাইক্রো এবং ম্যাক্রো উভয় ক্ষেত্রেই ডারউইনবাদের প্রয়োগ সম্ভব। তিঁনি একটি প্রকল্প দাঁড় করান যা নিম্নরূপ। Evolution = replication + variation + selection + isolation of populations.5

ক্স          Descent of Man and Selection in Relation to Sex (1874) গ্রন্থে ডারউইন তাঁর বিবর্তনবাদকে সাংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রয়োগের কথা বলেন। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেন, ভাষার গঠন ও পরিবর্তন জীবন্ত স্পেসিসের বিবর্তনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি আরো লেখেন, The formation of different languages and of distinct species, and the proofs that both have been developed through a gradual process, are curiously parallal.6 তবে এটি সাধারণভাবে গ্রাহ্য যে এমন জীবতাত্ত্বিক বিবর্তনের মেকানিজম সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। এ ধরনের প্রয়োগ প্রচেষ্টা ডারউইনবাদের দ্রুত প্রসারণের সমর্থকদের সন্দেহাতীত ভ্রান্তি। একটি মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবেও বিতর্কের সৃষ্টি করে। ডারহাম সংস্কৃতির একটি প্রমিত সংজ্ঞা প্রদান করেন : Culture are systems of symbolically encoded conceptual phenomenna that are socialy and historicaly transmitted within and between population.7 এই অবস্থা যুক্তিযুক্তভাবে মানবীয় স্পেসিসের ক্ষেত্রে দ্বৈত উত্তরাধিকারের সূচনা করে। সংস্কৃতিকে জেনেটিক সিস্টেমের আওতাভুক্ত করে ফেলে কিন্তু আসলে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার জেনেটিক উত্তরাধিকার ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ এবং আংশিকভাবে আলাদা। ডারহাম আরো বলেন যে, ‘All human culture are related by historical derivation’ তবে অন্তত দুইভাবে সাংস্কৃতিক প্রতীকসমূহ জেনেটিক ব্যবস্থা থেকে পৃথক। প্রথমত, ডারউইনের জীবতাত্ত্বিক বিবর্তনে অর্জিত বৈশিষ্ট্যসমূহের রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করা হয় নি। অন্যদিক দিয়ে বলা যায় সাংস্কৃতিক বিবর্তন ল্যামার্কীও সিদ্ধান্তের অনুরূপ।  এক প্রজন্মের আহরিত তথ্য পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চালিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত জেনোটাইপ ভ্যারিয়েশনের ক্ষেত্রে মিউটেশন কার্যকরী ভূমিকা রাখে এবং জীবতাত্ত্বিক বিবর্তনকে সম্ভব করে। সাংস্কৃতিক ভ্যারিয়েশন আংশিকভাবে নির্বিচারে ঘটে। এবং নির্দিষ্টভাবে অগ্রসর হতে পারে। একে অর্থজেনেটিক প্রপঞ্চ বলা হয়েছে যা জীবতাত্ত্বিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এমন নির্দেশিত বিবর্তনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে সমস্যা বা বাধা মানুষকে সমাধান খুঁজতে আগ্রহী করে তোলে। সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন কা- দেখা যায়।৮

ক্স            সংগীতবিজ্ঞানী, ভাষাবিদ এবং সাধারণভাবে মানবীয় বিজ্ঞান সম্পর্কে যেকোনো বিশেষজ্ঞদের আগ্রহ থাকলে তারা তথ্যের ট্রান্সমিশন ও ট্রান্সফরমেশন ব্যবস্থা দুটির সম্পর্ক নিয়ে কাজ করতে পারতো। অন্যভাবে আমরা কালচারাল ট্রান্সমিশন সম্পর্কে গবেষণা করতে পারি যা আবার মানসিক মডিউলের জীবতাত্ত্বিক বিবর্তনের উপর নির্ভরশীল। মানসিক মডিউল আবার আংশিকভাবে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া যা নির্দেশিত বিবর্তনের জন্য দায়ী। মোটকথা, বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক ডারউইনবাদের জন্য কাজ করতে হলে সাংস্কৃতিক একক আবিষ্কার করতে হবে। যেমন রেপ্লিকেশনের একক, ভ্যারিয়েশনের একক, সিলেকশনের একক যা জীবতাত্ত্বিক।

ক্স            বিবর্তনে জিনের ভূমিকার মতো কাজ করে। রিচার্ড ডকিন্স তার বিখ্যাত ঞযব ঝবষভরংয এবহব (১৯৭৬) গ্রন্থে এর নাম দেন ‘মেমে’ যার মাধ্যমে তিনি তথ্যের একককে বুঝিয়েছেন যা সাংস্কৃতিক ট্রান্সমিশনের সময় এক মস্তিষ্ক থেকে অন্য মস্তিষ্কে স্থানান্তরিত হয়। এমন বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায় যে সংগীতের সাংস্কৃতিক ট্রান্সমিশনের সময় আংশিকভাবে হলেও শিক্ষণ প্রণালী স্থানান্তরিত হতে পারে। কোন পর্যায়ে সাংস্কৃতিক বিবর্তন ঘটে? এটি কিভাবে সম্ভব হয়? জেনেটিক বিবর্তনের সাথে এর মিল কোথায়? অথবা ল্যামার্ক আসলে কি বলতে চেয়েছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য সংগীত, ভাষা ও সম্পর্কিত অন্যান্য প্রপঞ্চের ওপর গবেষণা করা দরকার।

তথ্যনির্দেশ

Griffin, D.R. 1992. Animal Minds. Chicago University Press, Chicago.  Premack stated that man has both affective and symbolic communication. All other species, except when tutored by man, have only the affective form. Premack, D. 1975. “On the Origins of Language” In M.S. Gazzaniga and C.B. Blakemore (eds.) Handbook of Psychology Academic Press, New York, pp. 591-605

2   Wallin, Nils L.; Merker, Bjorn, and Brown, Steven 2001. The Origins of Music. MIT Press.

3    Thorpe, W. H. 1961. Bird Song, Cambridge University Press, Cambridge, p. 15

4 Ujhelyi, M. 1979. Connection between Social Structure and Individual Learning Ability, Tajekoztato, 3, pp. 49-69

5   Dawkins, R. 1983. Universal Darwinism In D. S. Bendall (ed.) Evolution from Molicules to Man,Cambridge University Press, Cambridge, pp. 403-425

6   Darwin, C. 1874. Descent of Man and Selection in Relation to Sex, Hurst, New York, p. 106.

7   Durham, W. 1991. Coevolution: Genes, Culture and Human Diversity, Standford University Press, Standford, CA, p. 167

8   Barkow, J. Cosmides, L. and Tooby, J. 1992. The Adapted Mind: Evolutionary Psychology and the Generation of Culture, Oxford University Press, Oxford.

*************************************************

আত্মকথা ……………………………………….

হোসেনউদ্দীন হোসেন (জ. ১৯৪১)

লেখক হোসেনউদ্দীন হোসেন। একাত্তরের রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা। থাকেন যশোরের ঝিকরগাছার কৃষ্ণনগর গ্রামে। লেখালেখি তার প্যাশন। তিনখ-ের বাংলার বিদ্রোহ কিংবা রণাঙ্গণে একাত্তর নামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতাড়িত গ্রন্থ ছাড়াও লিখেছেন কবি আহসান হাবীব বা টলস্তয়-ভলতেয়ারের মতো বিশ্বসাহিত্যের গুণী লেখকদের নিয়ে নানা আয়তনের গ্রন্থ। ভ্রমণপিয়াসী এ লেখক ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেক দেশ। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি তার কাছে স্মৃতিমুদ্রার এক এপিক আখ্যান। প্রচারবিমুখ, নির্লোভ, স্বার্থত্যাগী, নিরহংকারী এ মানুষটির গল্প-উপন্যাস-কবিতার হাতও প্রশংসনীয়। এই দুর্মুখ সমাজে ব্যতিক্রমী এ মানুষটি এখন প্রায়— আনন্দময়রূপে ‘একা’। তাঁর জীবন-অধ্যায়ের বিচিত্র অভিজ্ঞতার সুলুকসন্ধান— ধারাবাহিক এ অংশে বয়ান করে চলেছেন। লেখাটি সমাজ-ইতিহাসের অনুধ্যানসূচক বলে মনে করা যায়।(সম্পা.)

ধুলায় ধূসর-৪

তুবন সাহেব আবার তুবন ম-ল হলেন। ছিলেন হেনরী মেকেঞ্জির একান্ত সহচর। ১৮৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮৬০ সালের জুন পর্যন্ত হেনরী মেকেঞ্জির কুঠিবাড়িতে তিনি ভুলেও পদার্পণ করেননি। বিদ্রোহের কালটা তিনি রাইয়তদের সঙ্গে কাটাচ্ছেন। সনাতনের আমবাগানে বসে বিদ্রোহীদের সাহস ও শক্তি জোগায়েছেন। লাঠিয়াল-বাহিনী, সড়কি-বাহিনী, বল্লম-বাহিনী উপযুক্তভাবে গড়ে তুলেছেন। সেই সময় তার নেতৃত্বের প্রতি সকলেই ছিলেন আস্থাশীল। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষকে সহজভাবে গ্রহণ করা। কাউকে তিনি ছোট বলে ভাবতেন না। যার যে গুণ আছে— সেই গুণকে কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহিত করতেন। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থাও করতেন। কোনো ব্যক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেন না। সকলকে সমমর্যাদা দিতেন।

বিদ্রোহের পরবর্তীকালে তুবন সাহেব এলাকার যুবকদের লাঠিখেলা, সড়কি-বল্লম খেলা এবং মল্লখেলা অব্যহত রেখেছিলেন। প্রতিবছর পয়লা ফাল্গুনে সাড়ম্বরে খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। আশেপাশের গ্রাম থেকেও প্রতিযোগীরা এসে অংশগ্রহণ করত। পাঁচ দিন ধরে চলত উৎসব। উৎসব শেষে দক্ষ খেলোয়াড়দের তিনি উপঢৌকন দিতেন এবং শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের বিভিন্ন উপাধিতে বিভূষিত করতেন। উৎসবটি হয়ে উঠেছিল আকর্ষণীয়। হাজার হাজার লোক এই উৎসব দেখতে হাজির হত। উৎসবের খবরটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কলকাতা থেকেও বাবুরা বজরায় নৌপথে এখানে এসে মেলাটা দর্শন করে যেতেন। একটা আনন্দ-উল্লাসের মেলায় পরিণত হয়ে উঠেছিল।

বাংলার রাইয়তরা কখনো দুর্বল শক্তিহীন ছিলনা। সুন্দর সুগঠিত শরীর, কর্মে দক্ষ বাঙালি যুবকরা ছিল অসীম সাহসী। শোষণ আর নির্যাতনের যাঁতাকলে ফেলে তাদেরকে শক্তিহীন করে রাখা হয়েছিল। পূর্বপুরুষেরা ছিল বলবান ও প্রাণবান। তাদের সেই শরীরের রক্তধারা বিদেশী বেনিয়ারা নির্যাতনের মাধ্যমে খর্ব করে দেয়। বাঙালির পরিচয় হয়ে ওঠে ভীরু কাপুরুষ ও ভেতো বাঙালি।

সেই বাঙালিদের মধ্যে তুবন ম-ল নতুন প্রাণসঞ্চার করলেন। তিনি বুঝেছিলেন, বাঙালিরা প্রাণহীন হয়ে উঠেছে। বলহীন হয়ে উঠেছে। তেজহীন হয়ে উঠেছে। তাদের জীবনে কোনো উৎসাহ ও উদ্দীপনা নেই। খেলার প্রবর্তন করে তিনি দুশমনের মোকাবেলা করতে হাতে তুলে দিলেন বাঁশের লাঠি, বাঁশের সড়কি, লোহার বল্লম এবং বেতের ঢাল। দেশীয় কায়দায় রণকৌশলে পটু করে তুললেন। বীর-বাঙালি হয়ে উঠলো যোদ্ধা-বাঙালি।

উৎসবে প্রতিবছর নতুন নতুন খেলার সংযোগ করলেন তুবন ম-ল। তলোয়ার খেলা, হা-ডু-ডু খেলা এবং অতীতকালে বাঙালিরা যে সকল খেলা প্রচলন করেছিল, সেই সকল খেলা পুনরায় তিনি চালু করে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।

বীরত্বে মহত্বে এবং উদারতায় তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা ছিল সকলেরই অনুকরণীয়। তাঁর দেখাদেখি এই অঞ্চলের বহু গ্রামের বহু যুবক শরীর-চর্চায় যেমন মনোযোগী হয়ে উঠেছিল, তেমনি বিভিন্ন দেশীয় খেলায় হয়ে উঠেছিল সুদক্ষ।

হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সখ্য ও সুসম্পর্ক। কৌলিন্য প্রথা সমাজে যদিও বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তিনি এই প্রথা কখনো মান্য করেন নি। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে কর্মজীবী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কর্মজীবী ব্যক্তিগণকে সমভাবে মর্যাদাবান বলে মনে করতেন। কোনো সম্প্রদায়গত ভেদবুদ্ধি দ্বারা নিজেকে কখনো পরিচালিত করেন নি। তার বন্ধুসুলভ আচরণের কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন প্রীতির চোখে দেখতেন, তেমনি মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে আপনজন বলে সম্মান জানাতেন। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন উগারচেতা সমাজহিতৈষী সমাজপতি। তাই তিনি উভয় সম্প্রদায়ের যুবকদের নিয়ে গ্রাম্যমেলার প্রবর্তন করে গ্রাম-সমাজে নতুন আন্দোলন সৃষ্টি করেন। এই আন্দোলন ছিল শক্তিচর্চার আন্দোলন। এই আন্দোলন ছিল নিপীড়িত জনগণের ঐক্যের আন্দোলন, শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আন্দোলন। এই আন্দোলনের মধ্যে ছিলনা কোনো মুসলিম মাহাত্ম্যের প্রকাশ এবং ছিলনা কোনো হিন্দুমাহাত্ম্যের প্রকাশ। কোনো রাজনৈতিক দর্শন ও কোনো ধর্মীয় ভাবাদর্শ এই জাগরণের মধ্যে তিল পরিমাণ ছিল না।

শুধু এই অঞ্চলে নয়— বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এই জাগরণের উত্থান হয়েছিল। শুরু হয়েছিল শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশীয় লাঠিয়াল বাহিনী, সড়কি বাহিনী এবং বল্লম বাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে শোষক জমিদার, শোষক মহাজন, শোষক শাসকবৃন্দের শক্তি নড়বড়ে হয়ে উঠেছিল। তারা এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য যে রাস্তা তৈরি করেছিল— সেই রাস্তাটির নাম : ‘বিভেদ তৈরির রাস্তা’। ইংরেজরাই শাসনের উদ্দেশ্যে এই কূটকৌশল প্রয়োগ করেছিল।

বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জমিদাররা প্রজার উপর এক নতুনমাত্রার জুলুম প্রবর্তন করে। এই জুলুম ছিল খাজনা বৃদ্ধির জুলুম। উনিশ শতকের চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকগুলোতে, বিশেষ করে সিপাহী বিদ্রোহের পর (১৯৫৭-৫৯) ভূমিজরিপ ও কর নির্ধারণের কাজ শেষ হওয়ার ফলে রাইয়তদের ব্যক্তিগত ভূমি মালিকানার অধিকারে দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত ভূমি মালিকানা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় পণ্য বনাম মুদ্রা সম্পর্ক উন্নয়নে। এইভাবে জমি পণ্য হিসেবে গণ্য হলে জমির মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়। তখন এ দেশীয় বণিক, মহাজন ও সামন্তরা তাদের সঞ্চিত অর্থ লগ্নি করা শুরু করে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে। আস্তে আস্তে জমি হয়ে ওঠে মহাজনদের নিকট ঋণ প্রদানের বিনিময়ে একটা অর্থ আয়ের ক্ষেত্র। পরবর্তীকালে জমি বন্ধকী রাখার মাধ্যমে বণিক, মহাজন ও সামন্ত ভূস্বামীরা কৃষকদের জমি দখল করতে সমর্থ হয়। কৃষকরা নিজ ক্ষেতের মালিকানা সেই জমিই চাষাবাদ করত এবং প্রজা হিসাব করভারে জর্জরিত হত।

কৃষকরা বিদ্রোহ শুরু করলে সরকার প্রবর্তন করে ‘দশম’ আইন। এই আইনেও চাষীদের কোনো উপকার হয়নি বরং অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। শোষণের ক্ষেত্র শুধু নীল চাষ ছিলনা— ছিল জমিদার মহাজনের বে-আইনি খাজনা আদায়ও। বিদেশী ইংরেজদের মূল সমর্থক ছিলেন জমিদার মহাজন শ্রেণী। এই সকল সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর ব্যক্তিগণ কৃষক বিদ্রোহকে নস্যাৎ করবে ভিন্ন পথে এই আন্দোলনটি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। কৃষক বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিল কৃষকরা। কেউ তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেনি— বরং নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ হয় এবং সংগ্রাম পরিচালনা করে। হিন্দু-মুসলমান কৃষকের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিলনা। মূলমন্ত্র ছিল কৃষক-মুক্তি। এ সম্পর্কে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেন :

বাংলাদেশ তার কৃষককুল সম্পর্কে গর্ববোধ করতে পারে, … … শক্তি নেই, অর্থ নেই, রাজনৈতিক জ্ঞান নেই, এমনকি নেতৃত্ব নেই, তবুও বাঙলার কৃষকরা এমন একটি বিপ্লব সংঘটিত করতে পেরেছে যাকে অন্য দেশের বিপ্লবের থেকে কি ব্যাপকতায়, কি গুরুত্বে কোনোদিক থেকেই নিকৃষ্ট বলা চলে না।

এই বিদ্রোহকে নিষ্ক্রীয় করার জন্য ‘কমিশন’ গঠন করতে হয়েছিল। বিশেষ করে ইংরেজ ও তাদের দেশীয় সমর্থকরা ভীত হয়ে ওঠেন কৃষকদের সঙ্ঘবদ্ধ যুদ্ধংদেহী সাহসী ভূমিকা দেখে। বাইরের কোনো অস্ত্র নয়— তাদের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, বন্দুক-কামান নয়— বাঁশের লাঠি, সড়কি, বল্লম, তীর-ধনুক, ইট-পাটকেল, কাঁচাবেল, ভাতের থালা, পোড়ামাটির বাসন। বাঙালি মেয়েরাও অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। শপথ নিয়েছিল হয় জিতবো, নয় মরব।

এই বিদ্রোহে কোনো জাতপাত ছিলনা। সকলেই ছিলেন একটি জাত— চাষা। কোনো বর্গ বর্ণ ছিলনা। উঁচু-নিচু ছিলনা। পরিচয় ছিল বাংলার চাষা। যে অস্ত্র তারা তৈরি করেছিল, সেই অস্ত্র ছিল পূর্বপুরুষের ব্যবহৃত অস্ত্র। এটাই ছিল বাংলায় কৃষকদের প্রথম জাতীয় জাগরণ ও গণবিদ্রোহ। এই জাগরণের মূলমন্ত্র ছিল আমরা বাংলার কৃষক। আমরা ভিনদেশী নয়— আমরা বাংলার মাটির সন্তান। এই ভূমি অন্য কারো নয়— এই ভূমি বাংলার চাষার। আমরা আমাদের ভূমির অধিকার চাই। শুধু অধিকার নয়ই— রক্ষা করারও দায়িত্ব রয়েছে বাঙালি কৃষকদের। রক্ষা করার জন্য অস্ত্র একান্ত আবশ্যক। এই দার্শনিক বোধ নিয়ে তুবন ম-ল গ্রাম্যমেলার আয়োজন করেন।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ নাম ব্যবহার করে হিন্দু শিক্ষিত অভিজাতরা কলকাতাকেন্দ্রিক চৈত্রমেলা বা হিন্দুমেলা প্রবর্তন করে। কিন্তু তা তুবন ম-লের মেলার মত হয়ে ওঠেনি। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২ এপ্রিল (বাংলা ১২৭৩ সালের চৈত্র সংক্রান্তির দিন) এই  মেলার প্রথম অধিবেশন হয় বেলগাছিয়া ভিলায়। উদ্দেশ্য ছিল স্বজাতীয়দের মধ্যে সুসম্পর্ক রক্ষা ও স্বদেশীয় ব্যক্তিগণকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বদেশের উন্নতিসাধন করা।

লক্ষ্যযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই যে, ‘স্বদেশীয় ব্যক্তিগণ’ বলতে এই মেলার প্রবর্তকবৃন্দ মনে করতেন ‘হিন্দু মহোদয়গণ’ এবং ‘জাতীয়তাবাদ’ বলতে মনে করতেন ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’। উদ্দেশ্য মহৎ নয়। অর্থাৎ যারা হিন্দু অভিজাত সম্প্রদায়ের লোক, তারাই ছিলেন এই মেলার মূল আয়োজক। মেলার উদ্দেশ্য প্রচারের জন্য একটি জাতীয় সভার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। হিন্দু মেলায় ও বাংলার প্রাচীন শৌর্য ও বীর্যের স্মৃতি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। লাঠি-খেলা, তলোয়ার-খেলা, শরীর-চর্চার প্রদর্শনী এবং স্বদেশী পণ্যজাত ব্যবহার সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়ে জনগণকে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করা হলেও  জনগণ উদ্বুদ্ধ হয় নি। এই মেলা ছিল হিন্দুদেরকে জাগিয়ে তোলার জন্য। বরং এই মেলা যে ক্ষতি সাধন করেছিল, তাতে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দেয়। হিন্দু অভিজাতরা ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’ এবং মুসলমান অভিজাতরা ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ তৈরি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই স্বদেশী আন্দোলনের মধ্যে বিদ্যমান ছিল বিদেশীয় চিন্তার প্রভাব ও কূট-কৌশল।

এই মেলা সম্পর্কে সেই আমলেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন :

আমি চিরকাল স্বদেশী। বিদেশী পোষাক পরিচ্ছদ, ভাবভাষা আমার দু’চক্ষের বালাই। এই জন্যে অনেক সময়ে আমার আত্মীয়দের সঙ্গে আমার মতের বিরোধ হইয়াছে, স্ত্রী স্বাধীনতা আমি অপছন্দ করিনা, কিন্তু আমার বরাবর ভয় হয় পাছে কিছু বাড়াবাড়ি হইয়া যায়। আমি গোড়া থেকেই স্বদেশী কালচার ধরিয়া বসিয়া আছি, ঘরের মধ্যে আছি। … … কখনো আমি বাড়ির বাহিরে কোন বড় কাজ করিতে পারিলাম না। বক্তৃতা দিলাম কিন্তু কাহারও মন ভিজিল না। দেখ, এরকম স্বদেশী আমাদের দেশের ফ্যাশান হইয়াছিল, কিন্তু তাহাদের মধ্যে একটা বিলাতী গন্ধ ছিল। রঙ্গলালই বল, আর রাজনারায়ণ বাবুই বল, তাঁহাদের চধঃৎরঃরংস-এর বারো আনা বিলাতী, চার আনা দেশী। ইংরেজ যেমন চধঃৎরধঃ আমিও সেইরকম চধঃৎরধঃ হব এই ভাবটা তাদের মনে খুব ছিল। বল দেখি, আমি তোমার মত চধঃৎরধঃ হইব কেন? আমি আমার মত চধঃৎরধঃ হইতে না পারিলে কি হইল।

তিনি বিষয়টির মধ্যে দেশাত্মবোধ খুঁজে পাননি। আদতে ইংরেজদের তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে মেলায় যে বিদেশী কালচার আমদানী করেছিলেন, তা স্পষ্ট করে বলেছেন :

নব গোপাল একটা ন্যাশনাল ধূয়া তুলিল, আমি আগাগোড়া তার মধ্যে ছিলাম। সে খুব করিতে পারিত, কুস্তি, জিমন্যাস্টিক প্রভৃতি প্রচলন করার চেষ্টা তার খুব ছিল, কিন্তু কি রকম হওয়া উচিৎ, সেসব পরামর্শ আমার কাছ থেকে লইত। একটা মেলা বসাইবার কথা বালিনি, — তাঁতি-কামার-কুমোর ইত্যাদি লইয়া। আমি বললাম— ওসব তো দেশের সকলের জানা আছে; দেশী Painting দেখাতে পারো? মেলার ক্ষেত্রে গিয়া দেখি, প্রকা- ছবি, খাটানীয়ার সম্মুখে ভারতবাসী হাত জোড় করিয়া বসিয়া আছে। আমি বলিলাম— উল্টে রাখ, উল্টে রাখ, এই তুমি Painting দেশী করাইছ? আর আমাদের ন্যাশন্যাল মেলায় এই ছবি টাঙাইয়াছ? ছবিখানা সরাইয়া রাখা হইল। তাঁর ঝোঁক ছিল, বড় বড় ইংরেজকে নিমন্ত্রণ করা। আমি অনেক কহিয়া তাহাকে নিবৃত্ত করিলাম— (মনোমোহন বসু— ধীরেন্দ্রনাথ ঘোষ, ভারতবর্ষ, ১৮ শ বর্ষ, ২য় খ-, ২য় সংখ্যা, ১৩৩৭ বাংলা, পৃ. ৩০৮)।

তুলনামূলকভাবে বলা যায় যে, তুবন ম-ল যে গ্রাম্যমেলা প্রবর্তন করেন, তার মধ্যে ছিল খাঁটি বাঙালিয়ানা। ছিল ঐতিহ্য, ছিল দেশীয় প্রাণ মাতানো গন্ধ এবং বাংলার শক্তি-সাধনার প্রাণবন্ত চেতনা। সাম্প্রদায়িকতার বীজ এই মেলার মধ্যে নিহিত ছিল না। ছিল মেহনতী মানুষের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বসূলভ বন্ধন। ঢাকের আওয়াজে যে সুরমুর্ছনা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত, তাতে আনন্দ আমোদিত হয়ে উঠতো এই দিগন্তের জনগণ। সেখানে ইংরেজীয়ানার কোনো রকম প্রভাব ছিলনা।

*************************************************

শেষ পাতার আহ্বান

চাঁদের আলোয় পেঁপের ছায়া ধরতে যদি পারো…

‘ছায়া’ ধরার গল্প কেমন? ওকে ধরেইবা কী লাভ! কেউ কী ছায়ার পেছনে ছোটে? এই কর্কশ পুঁজি-বাণিজ্যের যুগে কজন ছায়ার আলো চোখে দেখে! উপভোগের পৃথিবীকে কে উল্লাসে গ্রহণ করতে পারে? যন্ত্র যেখানে অধিকার করে মন, লালসা যেখানে ঘিরে ধরে প্রজন্মের বাসনাকে— সেখানে ছায়াবাজির গল্প কে শোনে, কতোই না তা অমূলক! চাঁদের আলোর  স্নিগ্ধতায় পেঁপের ছায়ার মর্ম এ যুগে তো পাগলের প্রলাপ।
লিখুন পরবর্তী সংখ্যায়…

 

নাহিদা আশরাফী
………………..
জীবনের কাছে যাবো

হাতের কাছে ভরা কলস তৃষ্ণা মেটে না

কোথা থেকে শুরু করি। কেমন করে শুরু করলে লেখাটি হয়ে উঠবে পরিপাটি। অনেকটা বোটানির অনিন্দিতা ম্যামের শাড়ির মতন। অথবা নিটোল গড়নের এক রাজস্থানি বালিকার গোলাপি ঠোঁট প্রায় ছুঁয়ে থাকা কালো তিলের মতন। যে তিলের দিকে তাকিয়ে চোখ অন্ধ হলেও চোখের শোকে হৃদয় ব্যাথিত হয় না। আহা তিল তো নয়। এক উদ্ভাসিত চাঁদ। আমি সেই তিলে জোছনা খুঁজে মরি। মরতে মরতে আবারো মর্তে ফিরে আসি। বালিকা হারিয়ে যায়। অতি দ্রুত দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে কাঁটাতার। জোছনায় লোহায় গড়া তারগুলোকে লতাগুল্মের মত মনে হয়। আর কাঁটা যেন রাতের হাসনাহেনা। যে জোছনা কাঁটাতারকে হাসনাহেনা করে দেয় আমি সেই জোসনা থেকে ফিরতে চাই না। আমার পৃথিবী জুড়ে থাকে রাজস্থানি বালিকা, জোছনা আর আমি। চাঁদের আলোয় ¯œান সেরে আমার পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে রাত। তার চুল থেকে টুপটাপ ঝরে পরে জোছনার কণা। আমি শিউলি ভেবে জোছনা কুড়াই।

বুকের বা পাশের জানালাটা আনমনেই খুলে রেখেছিলাম। তখন কি আর জানতাম ছাইরঙা এক জোড়া সকাল আর নিসিন্দা পাতার মতন তিনটে রাত্রি সেই খোলা জানালা গলিয়ে টুক করে ঢুকে যাবে আমারই অন্তর প্রদেশে।

আমি তো আশ্রয় দেবার কেউ ছিলাম না, ফেলে দেবারও না। আমি নিজেই যে আশ্রিত এই জল-জঙ্গলের আশ্রমে। আমিই যে খেলনা এক প্রকৃতি মায়ের। চোখের সামনে দু’দুটি ঘর। একটা জলের আর একটা মৃত্তিকার। মা সেই ঘরে নিটোল হাতে রুপোর আলো লেপে আমায় ছেড়ে দিলেন। বললেন, ‘এবার তুমি যাও বাছা। যত্ত খুশি জীবন কুড়াও।’

আমি বেড়িয়ে পরলাম। মাথার উপরে আস্ত এক রুপোর থালা নিয়ে। থালা উপচে পরছে রুপালী পারদ। সেই আলোয় আমি এক পরিব্রাজক, এক আবিষ্কারক। নিজেকে আবিষ্কারের ব্যাকুলতা আমাকে জোছনার মতই গৃহত্যাগী করেছে।

‘ও জোছনা তোমার জন্ম বৃত্তান্ত শোনাবে আমাকে? এত রাতের গৃহত্যাগে তোমার কলঙ্ক হয় না? জাতকুলে তোমায় নিয়ে নিন্দা হয় না? তোমার রহস্যময়ী রুপের ছটা নিয়ে পাড়াপড়শি কানাঘুষো করে না? তোমার প্রেমিকই বা কে? অনেক কিছু জানতে ইচ্ছে করে। জানাতেও ইচ্ছে করে। এসো পাশে বসো।’ জোছনা এসে  পাশে বসে। ঠোঁটে তার রহস্যময় হাসি চোরাগোপ্তা হামলার মত বুকে বেঁধে।

রাজস্থানি বালিকার চোখে আমি মেঘ রঙের অভিমান আর ছাই রঙা ঈর্ষা দেখতে পাই। অভিমান থেকে ভালোবাসা আর ঈর্ষা থেকে প্রেমকে আলাদা করতে পারি না আমি। আমি এক হাত বাড়িয়ে দেই জোছনার দিকে আর এক হাত কালো তিলের দিকে। এত সৌন্দর্য্য! এত রহস্যময়তা। আমি চোখ মেলতে পারি না। অন্ধকারে হাতরে মরি। তীব্রতর এক ঘ্রাণ আমাকে অবশ করে দেয়। আমি নিজেকে সমর্পণ করি জোছনা আর গোলাপী গালের তিলের কাছে। খুব সন্তর্পণে চোখ খুলি। একি! কোথায় জোছনা? কোথায় রাজস্থানি বালিকা? সব তো হারিয়ে গেল মূহুর্তেই। তার মানে যা ভেবেছি যা অনুভব করেছি সব তবে ছায়া? ছায়া তবে অনুভব করা যায়?

কী বলিতে চাই সব ভুলে যাই,/ তুমি যা বলাও আমি বলি তাই।

এই যে ভালোবাসা, এই যে লুকিয়ে রাখা অনুভব যা কেবল খিড়কি খুলে আকাশ দেখেই তৃপ্ত হত; তার সেই আধেক খুশির উঠোন জুড়ে হঠাৎই এক ব্যাকুল বোধন। হঠাৎই মনে হলো এ ধরায় আমাদের আনাই হয়েছে ছায়া ধরার খেলা খেলতে। সে ছায়া কখনও সূর্যে তাপে পোড়ানো কখনও চাঁদের মায়ায় ¯œান করানো। একটা গান মনে এলো…

‘ছায়াবাজি পুতুল রূপে বানাইয়া মানুষ /যেমনি নাচাও তেমনি নাচি পুতুলের কি দোষ।’

তাই তো! পুতুলতো কোন দোষ করেনি। তার মানে ছায়া ধরার এই যে উন্মাদনা, এই যে আকাক্সক্ষা, এই যে অদৃশ্যের পেছনে ছুটে চলা বা দৃশ্যায়নের রুপান্তরিত রূপের পদতলে নিজেকে বিসর্জন দেয়া; এজন্যে অন্তত আমাকে বা আমাদের দোষ দেয়া চলে না। আমাদের দিয়ে কেউ করিয়ে নিচ্ছে সব। কে সে? সেই কি তবে প্রকৃতি মাতা যিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন জীবন খুঁজে নেবার জন্য? নাকি অন্য কেউ, অন্য কোন খানে?

জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি এই যে নিরন্তর যাত্রা, এই যে ছুটে চলা তার কোথায় আমার ইচ্ছেরা স্বাধীন? যে পায়ে চলছি সে আমার ইচ্ছাধীন নয়, যে চোখে দেখছি সে আমার বাধ্য নয়, যে হাতে স্পর্শ করছি সে আমার নির্দেশে নয়। এমনকি যেসব ইন্দ্রিয় আমাকে অনুভবের রাস্তায় চালিত করে তারাও আমার ব্যাকুলতাকে প্রশ্রয় দেয় না। আর আমার হৃদয়, সে তো সুস্পষ্ট প্রতিবাদী। চাই এক তো দেয় আরেক। কাল ভাবলে মহাকাল সামনে আনে, রূপ ভাবলে অরূপের ভাবনায় ডুব দেয়, আলো ভাবলে আলোর নিচের অন্ধকারও সামনে আনে, চাঁদ ভাবলে ঝলসানো রুটি…

আমি গণিতবিদ হলে হয়ত যোগবিয়োগ বা গুণভাগের করাতকলে ফেলে বের করে দিতাম, এই যে আমি সে মূলত আমি নই। আমার ছায়া। জ্যোতির্বিদ হলে গ্রহ নক্ষত্রের হিসেব কষে প্রমাণ করতে চাইতাম। কিন্তু এই যে গণিতবিদ বা জ্যোতির্বিদ; তারাও কি যা করছে তা নিজের ইচ্ছেতে করছে? কোথাও কেউ একজন হাওয়াকল নিয়ে বসে আছে যার কাছে অগণিত বেলুন। বেলুনে হাওয়া ফুকে ছেড়ে দিচ্ছে। আমরা তার ইচ্ছেতে নেচে গেয়ে বেড়াই। পিনের খোচায় বেলুন ফাটলো তো শেষ। এই নিরন্তর খেলায় আমার আমি তো কোথাও নেই। ছিলামও না। যা ছিলাম তা হল এক ইচ্ছের ছায়ামাত্র। একটা দীর্ঘশ্বাসের অবয়ব মাত্র। একটা হাহাকারের কায়া মাত্র।

‘নিজের কাছে অচেনা তুই মনরে দিলি পরবাস।/ সেই নিরন্তর একজনাতে হইলো না তোর বসবাস।’

যে আমি আমাকে জানি না কিন্তু আমার ছায়া জানে আমার সবটুকু। আমি তাকে প্রশ্ন করি, ছায়া উত্তর দেয়…

– বালিকা কই?

– সে তো তোমারই ছায়া

– জোছনা?

– সেও তাই

– আমি?

– তুমিও তাই

– তুমি

– তোমার ছায়াতেই

– এখন দিন না রাত।

– ছায়াদের পৃথিবী একরকম। দিনরাতের ভেদ নেই।

– ছায়াদের পৃথিবী আছে?

– তোমার ছায়াতেই পুরো পৃথিবী

প্রশ্ন করে করে কতদূর এসেছি মনে নেই হঠাৎই আমার চোখে ভেসে ওঠে এক পরিচিত পৃথিবী। একটা চৌচালা ঘর, দুটি বকুল গাছ, একটা পদ্মপুকুর, শান বাধানো ঘাট, ছ‘জোড়া কবুতর, একটা বড় হাসনাহেনা আর তিনটে শেফালির চারা। একটা খাটের উপর দুটি শিশু, পাশেই জুবুথুবু জড়িয়ে শুয়ে থাকা এক বৃদ্ধা। আমি ঘুরে ঘুরে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাই, আলনায় পরিপাটি ভাঁজ করা দুটো ডুরে ছাপা শাড়ি খুব চেনা চেনা লাগে। শিশু দু’টি নড়েচড়ে ওঠে। ছোটটি মা মা বলে কেঁদে ওঠে। আমি ছুটে যাই। আমার বুকের ভেতরে পাড় ভাঙ্গার শব্দ শুনি। ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দেই। সারাগায়ে চুমু খাই পাগলের মত। কি ভেবে ও চুপ হয়ে যায়। আমি শিশু দুটির মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। কোথাও কি দেখেছি ওদের? খুব চেনা কেন মনে হয়? খুব আপন…

কখন ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে বৃদ্ধার শান্ত সৌম্য মুখখানির সামনে এসেছি টের পাইনি। একি! এ আমি কাকে দেখছি? এ যে আমারই প্রতিচ্ছবি। আমারই প্রতিবিম্ব। যেন বা সুদূর কোন এক জন্মে সে আমিই ছিলাম বা আমিই সে। আমার সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

কত সব দৃশ্য, কত সব রঙ, হাসি, কান্না মেঘের মত আমার স্মৃতির দেয়াল ভিজিয়ে দিতে চাইছে। নবান্নের ধানের ক্ষেত, একটা মেঠো পথ, একটা চায়ের দোকান, স্মৃতির সুই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত করছে আমার অনুভব। ঘর ছেড়ে আমি আবার জোছনায় নেমে আসি। আমার মাথার উপর জোছনা, পায়ের তলায় জোছনা। হাতের মুঠোয় জোছনা। অস্পৃশ্য অথচ সুস্পষ্ট। উঠোন পেরুতেই সারি সারি শুপারি গাছ, পেঁপে গাছের রমণীয় বুক ঢেকে আছে রুপালী আঁচল। যে আঁচল আঁকা মিহি জোছনার সুতোয়। উঠোন পেরুলেই সারি সারি শুপারি গাছ। একটু দূরে কোন হিজলের বনে পেঁচা ডেকে ওঠে। মর্মে বাজে বিষণœতার ভায়োলিন। এ বড় চেনা সুর। এ বড় চেনা ডাক। ‘আমি তারে পারিনা এড়াতে।’

– ও ছায়া তোমার কেন ছায়া নেই?

– আছে তো।

– কই? কোথাও যে পাইনা তারে।

– নিজেকে পেলেই তাকে পেতে।

– নিজেকে পাওয়া যায়?

বাতাসের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাই আমি। সেই দীর্ঘশ্বাসে উড়ে যায় কিছু মৃত পাতারা। আমার কেন যেন শিশু দুটির কাছে ফিরতে ইচ্ছে করে। শাড়ি দুটির কাছেও। ক্লান্ত আমার সিথান একটা একটা মোলায়েম বালিশ খোঁজে। যত আমি ঘরের দিকে যেতে চাই কোন এক অদৃশ্য চোরাবালি আমাকে এক অচেনা প্ল্যাটফর্মে দিকে ধাবিত করে।

তুমি ফিরাবে কি শূন্য হাতে আমারে…

এত আলো কেন? চোখ অন্ধ করা আলো। হুইসেল বাজিয়ে এত আলো কেন ছুটে আসছে আমাকেই গ্রাস করতে?

চাঁদের আলোয় রক্তের রঙ কেমন? ট্রেনের বাঁশি, পায়ের ছোটাছুটি, এম্বুলেন্সের কাতর কান্না, সবুজ গাউন- সব কিছুর রঙ বদলে যায় চাঁদের আলোয়। স্বার্থপরতা, বিশ্বাসহীনতা, কপটতার রঙও কি বদলে যায়? একাকিত্বের ছায়া কেমন? এসব ভাবতে ভাবতে আমার কেবলই ঘুম পায়। আমি ফিরতে চাই আমার ইচ্ছের কাছে। আমার তীব্রতর অভিমানের জাল কেটে যতবারই বেরুতে চাই যান্ত্রিকতার ক্লোরোফর্ম আমাকে ততই বিবশ করে। তবু এলোকেশী আকাক্সক্ষারা স্বপ্নে ভাসায় শিউলি খোপার পরিপাট্য। আশা জাগে। মোহ ভাঙে। হাসপাতালের কেবিন থেকে করিডোর দেখা যায়। করিডোরে থেকে আকাশ। আকাশ থেকে মেঘ। মেঘ থেকে বর্ষার বেপরোয়া গতি। আকাশের উচ্ছন্ন মতিতে কেপে ওঠে ভেজা শাড়ি, ডুবে যায় সাজ। ভেসে যায় নাগরিক অজুহাত।

ভেসে যাক। যত খুশি ডুবে যাক। তবু জীবনের কাছেই যাবো আজ। যে জীবনে অপেক্ষায় থাকে দু’টি শিশু, এক জোড়া ডুরেছাপা শাড়ি, একটা সৌম্য শান্ত মমতাময়ী বাহুডোর, একটা নিকানো উঠোন, একটা ঘর যার পেছনের বাঁশঝাড় চাঁদের টিপ কপালে নিয়ে অপেক্ষার মালা বোনে। আমি ফিরবোই। আমাকে ফিরতেই হবে। আমি ঘর ভোলানো জোছনা নয়, জোছনার মায়া মাখা ঘর চাই।

ওহে জীবন, শূন্য হাতে আমাকে ফিরায়ো না।

*************************************************

 

কাজী শোয়েব শাবাব
………………..
ছায়াবাজি

‘ছায়াবাজি’ শব্দটা শুনলেই ফিরে যাই শৈশবে। কে যেন হ্যারিকেনের সামনে হাত রেখে দেয়ালে তাকাতে বলেছিল। দেয়ালে হাতি, জিরাফ, খরগোশ, পাখি, মানুষের মুখ আরো কতো কি। বিস্ময়ে একবার হাতের দিকে, একবার দেয়ালের দিকে। হাত দেখে কল্পনা ভেস্তে যেত। কী করে ওই হাতের বিপরীতে ছায়া মূর্ত হতো— ভাবতাম। অনেক চেষ্টা করে কোনোভাবে কিছুটা পাখি, হাতির দোলানো শুঁড়, মানুষের আধামুখ ছাড়া অন্য কিছু বানাতে পারিনি। সেই জাদুকরের কথা মনে নেই। মনে আছে শুধু হ্যারিকেনের সামনে রাখা কু-লী পাকানো দুই হাতের কারিশমা।

ইশকুল পালিয়ে লাল সাইকেল নিয়ে চলে গেছি চেনা মানুষ থেকে দূরে আত্রাই নদীর পাড় ধরে পাটিচড়ায়। সেখানে নদীর ধারে বনের ছায়ায় পাতাকুড়ানি মেয়ে আর বিচ্ছিন্নভাবে চরে বেড়ানো গরু-ছাগল। সারাদিন বসে থাকা, গুনগুন করে গেয়ে ওঠা, কী যেন ভাবা আর দেখা। জলের ধার ঘেঁষে কাদাখোঁচা হেঁটে গেলে পিছে পিছে হেঁটে গেছি। নরম বালিতে পায়ের অবতল ছাপে জমে ওঠা জল আর চিকচিকে বালি। মাথার ওপরে সূর্যকে রেখে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখতাম আমার ও কাদাখোঁচার বিগত পায়ের ছাপ। একটা চিল অনেকক্ষণ ঘুরপাক খেতো ওপরে। চিলের ছায়া গা ছুঁয়ে গেলে শিহরণ জাগতো। ছায়ার পিছে ঘুরে ঘুরে ধরবো ধরবো করেও ধরতে না পেরে ঘেমে হাঁপিয়ে ওঠা। বোঝাই যেতো— ডানার গতির বিপরীতে পায়ের সীমাবদ্ধতা। যেমন সীমাবদ্ধতা অনুভূতির বিপরীতে ভাষার।

চরের প্রখর রোদে পড়ে থাকা বুকফাটা মৃত ঝিনুকের ছড়ানো খোলের ছায়া মেলে রাখা ছোট ছোট বইয়ের মতো। অল্প ¯্রােতের কিনারে জমে থাকা সূত্রাকার শৈবালদাম। নিচে ছায়ায় লুকানো ব্যাঙাচি, শামুক, জলপোকা আর ছোট ছোট মাছের জীবন। ভেসে আসা দুটো জলঢোঁড়া শৈবাল-ছায়ায় শঙ্খ লাগে। বিনুনির মতো জড়ায় ডোরাকাটা শরীর সর্পিল ঢেউয়ে। দেখি আর পাথরের মতো বসে থাকি অনড়। ভয় হতে থাকে— যদি সেই ছায়া থেকে ভুশ করে ভেসে ওঠে জলমাশনা!

আঁধারে আমাদের ছায়াও পালিয়ে যায়। আসলে কি তাই? নাকি আরও গহন ছায়ায় একাত্ব হয়ে প্রবেশ করি বিশাল মায়ারাজ্যে। বনে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে কেটে রাখা রোদমাখা আয়তাকার মাটি। মৃতদেহ চেপে রাখা নতুন মাটি। একপাশে পোঁতা যোগচিহ্নের মতো ফ্যাকাশে কাঠের ক্রুশ। ক্রুশের ভৌতিক ছায়া দু’হাত মেলে এগিয়ে আসে। পেছনে তাকাবার সাহস হয়নি। ছায়াভয় তাড়িয়ে নিয়ে গেছে বন ছেড়ে একছুটে গ্রামের দিকে।

শহরে এসে সোডিয়াম আলোর নিচে দাঁড়িয়ে দেখেছি তোমার ছায়া তোমার চেয়েও বেশি সুগঠিত, সুন্দর, কাছাকাছি, সমর্পিত। দু’জনের দূরত্ব ছাপিয়ে ছায়ারাই মিলিত হয় হলুদ আলোর নিচে ঈষৎ অন্ধকারে।

এই কর্কশ পুঁজি-বাণিজ্যের পৃথিবীতে আলো আর ছায়া নিয়ে কত না কর্পোরেট খেলা! মিডিয়া, পোস্টার, বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ডে বিভাজিত নারীমুখের কোলাজ। অর্ধেক আলো, অর্ধেক ছায়া। ছায়াকে খল বানিয়ে (একই নারীমুখ) নতমুখে অপরাধীর মতো উজ্জ্বল মুখের পেছনে দাঁড় করানো। অথবা বিভাজিত মুখের বাঁ পাশে বিষণœ ছায়া (কালো), ডান পাশে উজ্জ্বল আলো (সাদা)।

এই লিখাটি লিখতে লিখতে দেখছি খাতার ওপরে নড়ছে-চড়ছে আমার ছায়া। হ্যাঙ্গারে ঝোলানো শার্টের ছায়া নির্বিকার ঝুলে আছে শূন্যরেখায়। ছায়াই লিখিয়ে নিচ্ছে আমাকে দিয়ে। আলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্যক্তি বা বস্তু যতটুকু আড়াল করে নিজেকে, ততটুকুই তার একান্ত ছায়া। দৃষ্টি জুড়ে সব আলো ও ছায়ার বিন্যাস। অবচেতনে ছায়া নিয়ে যায় কল্পলোকে। বারবার মনে পড়ে— যেখানে আলো নেই সেখানে ছায়া। সুকুমার রায় এর ‘ছায়াবাজি’ বহুরৈখিক। ‘চাঁদের আলোয় পেঁপের ছায়া ধরতে যদি পারো…’ আপেক্ষিক ও রূপকাশ্রয়ী। শিশুর কাছে ছায়া ধরা যেমন, কিশোর-যুবক বা বৃদ্ধের কাছে সেই ছায়া অন্যভাবেও ধরা দিতে পারে বা অনুভূত হতে পারে। প্রসঙ্গত কবি ওমর আলীর কিছু পঙক্তি মনে এসে গেলো,

বিঁধে যায়, আমার ধনুক থেকে পাটখড়ির মুখে

        বাঁশ বা লোহার শলাকার তীর

    বিদ্ধ করে নরম পেঁপে গাছের দুধের শরীর।

আর কোনো কবি হয়তো জ্যোৎ¯œা রাতের ¯িœগ্ধতায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে উর্বর মাটিমুখী ঝরানো পেঁপেস্তনী কালো মেয়ের শরীর।

*************************************************

 

মারুফ নয়ন
………………..
এই ছায়া শিরোনামহীন

ছায়া চিরকালই ছায়া, যা সত্য নয়, অসম্ভব রকমের মিথ্যা। ছায়ার ধর্মই হলো ধোঁকা দেয়া, মিথ্যা প্রবোধ, আর আশ্বাসে বিশ্বাসে জড়িয়ে ফেলে শ্বাসরুদ্ধ করে গোপনে খুন করা। নিজস্ব আবেগ অনুভূতি ও মানবিকতার জগৎ থেকে আলাদা জগৎ সৃষ্টি করা, যেখানে মিথ্যা থরে থরে সাজানো অথচ সেগুলো সত্যের মতো দেখায়। মিথ্যাগুলো অনেকটাই লোভনীয়, জ্বলজ্বল করা হীরা মাণিক্যের মতো, যার লোভ সামলানো অনেক কষ্টসাধ্য। এই ছায়াবাজির খেলায় নিঃস্ব হওয়া ছাড়া কিছু নেই। দিনশেষে মানুষ নিজের কাছে হেরে যায়। ফলে রক্তে মাংসে গড়া মানুষগুলো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, অনূভূতিহীন, পাষাণ-পাথর। তাই মাঝে মধ্যে মনে হয়— ঠিক এর পূর্বে মানুষগুলো কেমন ছিলো?

সে সময়ের মানুষগুলো যেন কেমন সহজ সরল ছিল, ঠকাতে জানতো না, দাদীকে দেখেছি- অতি সরল- সহজ ও সোজা, বিনয়ী একজন মানুষ। চাকুরী করতেন সরকারী। বিন্দুমাত্র অহংকার ছিলো না। সেই সুযোগে সুবাদে ঔষুধ এনে বিলি করতেন গ্রামের সাধারণ মানুষগুলোর মধ্যে। তার প্রতি মানুষের ভক্তি, ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ দেখে আমি যেন কেমন করে সেই দিনগুলোতে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠি। সেই দিনগুলো কত সুন্দর ছিল, আকাশে রোদ ঝলমল করতো, চাঁদের আঁলোয় উঠোনে শীতলপাটি বিছিয়ে গল্পের রাতগুলো ছিল অন্যরকম মনোমুগ্ধকর, সেই পক্ষীরাজ ঘোড়া, এক রাজার কুমার, রাজকন্যা আর দৈত্য-দানবের গল্প, ভয়ের শিহরণ বয়ে যেত শরীরে।

মাথার উপরে টিনের চালে রাতভর বৃষ্টির রাত ছিলো। তারপর কল-কারখানা এলো, যন্ত্র এলো, পরিবর্তনের পূর্বাভাস এলো। মানুষের মতো যন্ত্র আবিষ্কৃত হলো, অবিকল মানুষই, কিন্তু মানুষ নয়। মানুষের আদলে দেখতে, কাজ-কর্ম ও কথাবার্তা ঠিক মানুষের মতো। আমি রীতিমতো অবাক হলাম, এও কি সম্ভব। তারপর চাষের মাঠেগুলোতে জোড়া মহিষ কিংবা বলদের পরিবর্তে হাল এলো, হালের সেই বলদগুলো বিক্রি করে বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, মাকে কানে কানে বললেন, ‘এইসব আর কি প্রয়োজন, নতুন যন্তরপাতি আইতেছে, মানুষ আধুনিক হইতাছে, আমরা ক্যান এমন থাকুম।’

বাজারে উন্নত জাতের শস্য বীজ এলো, সার-কীটনাশক এলো। প্রতিবেশী কৃষক জমির মিয়া তারপর থেকেই জমিতে বেশী করে সার কীটনাশক প্রয়োগ করতে থাকলেন। কিসের এক পরিবর্তন, তবুও চারদিকে কিসের অভাব, হাহাকার। শান্তির অভাব নাকি তৃপ্তির অভাব, নাকি সামান্যে তুষ্ট হবার অভাব।

এক সময় বন্ধুরা মিলে হাটঁতাম কুয়াশায় অন্ধকারে শীতের মধ্যে, উদ্দেশ্যহীন। কখনো উদ্দেশ্যও জুটে যেতো, খেজুরের রস। আজকাল আর তেমন কিছুই চোখে পড়েনা। বন্ধুরা সব কে কোথায় হারিয়ে গেলো চোখের পলকেই। আর চোখে পড়ে না বাহারী রকমের পিঠা-পুলির আয়োজন, ধোঁয়া উঠা উনুনের পাশে বসে কাটানো কত সন্ধ্যা।

আগে তাঁতপাড়ায় যেতাম, ওপাড়ায় শ্যামলীদের বাড়ি। আহা শ্যামলী, কত চিঠি লিখেছি, ডাকবাক্সে ঠিকানা সমেত ফেলে এসেছি। সে সব চিঠি কি পৌঁছেছিল, এই যান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে? যে তাঁতীরা সারা রাত ধরে ওপাড়ায় শাড়ী বুনতো, তাদের কাছাকাছি যাওয়া হয় নি কতদিন!

নদীর কাছাকাছি যাবার অভ্যেস ছিল পুরোনো, আজকাল সেখানে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে, বড় বড় সব মেশিন দিয়ে তোলা হচ্ছে বালি, যে পুকুরের অবাধ জলে সাঁতার কেটে বেড়ে উঠেছিলাম, তাও ভরাট হচ্ছে।

মাটির দেয়ালগুলো আর কোথাও চোখে পড়েনা। সেগুলো ভেঙ্গে দিয়ে নতুন করে তোলা হচ্ছে ইটের দেয়াল। আজকাল কোথাও আর চোখে পড়েনা, মাটির বাড়ি।

সবকিছু বদলে যাচ্ছে, সদ্য বেড়ে উঠা শিশুগুলো খুব সকালে স্কুলে ছুটছে। ব্যাগের ভারে নুইয়ে পড়ে যে শিশুটি, তার মাথার উপর চাপিয়ে দেয়া হয় আস্ত একটা সিলেবাস। পরে ধীরে ধীরে বুঝতে শিখে যায়, জীবন একটা দীর্ঘ সংগ্রাম, লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। বিদ্যার লড়াই, জীবিকার লড়াই, অর্থের লড়াই ইত্যাদি ইত্যাদি।

আগের সময়টা অন্যরকম ছিল, গোলাভরা ধান ছিল, মাঠ ভরা ফসল ছিল। পুকুর ভরা মাছ ছিল, গোয়াল ভরা গরু ছিল, মানুষের মনের অনাবিল সুখ ও শান্তি ছিল। সে সময় সুখের ঘোরে মেতে ছিল মানুষ।

আজকাল আর সন্ধ্যার বাতাসে ঘ্রাণ পাওয়া যায় না বেলী কিংবা ঝরা বকুলের, গন্ধ আসে কারখানার পোড়া ধোয়া বিষাক্ত বর্জ্যের। দূরের পুঁথিপাঠের আসর থেকে ভেসে আসে না সুর, ধ্বনিত হতে থাকে না কারো পরিচিত কণ্ঠস্বর।

*************************************************

 

অর্বাক আদিত্য
………………..
অদ্ভুত আঁধার এসেছে পৃথিবীতে আজ

তাকে চেনেন না এমন মানুষ মুন্সিরহাটে মেলা ভার। একনামে চেনেন, শুধু নামেই নয় বরং তার নাম উচ্চরণের সাথে সাথে কত যে গালগল্প মানুষের মনের ভেতর অজান্তেই চলে আসে তার ইয়াত্তা নেই। কেউ বলেন লোকটা বড্ড পরহেজগার ছিলো, কেউ বলেন ও শালা ভেক ধরেছে, সংসারে টিকতে না পেরে এমন দশা। আবার যারা একটু আধটু শিল্পটিল্প বোঝেন তারা বলেন লোকটাকে সুন্দরে ধরেছিল আর ছাড়েনি, তাই এমন দশা। লোকটা চুপচাপ থাকেন, যার তার সাথে কথা বলেন না, আবার যাকে মনে ধরে তার রেহাই নেই। রেহাই বলতে মুগ্ধ করে রাখেন অন্য জগতে, যে জগতে আমরা যে কেউই প্রবেশ করলে ভুলে যাবো সংসার, ধর্ম, এমনকি ক্ষুধাও মোটকথা একান্ত মৌলিক কাজ যা আছে সেইসব ছাড়া সবটাই ভুলে যাবো। কৃষ্ণা পিসির দোকানে যদি তার একবার দেখা হয়ে যায়, তো আমার আর সেদিন কোন কাজকর্মের কথা মনে থাকে না। মা বারবার খাবার জন্য ডাকলেও, মনে হয় লোকটার কাছে আর একটু বসি, একটু উদ্ভট, অদ্ভুত কথাবার্তা শুনি। হ্যাঁ তার সব কথাগুলোকে মনে হয় উদ্ভট, অদ্ভুত, অলৌকিক অথচ কি গভীর মনোযোগ থাকে তাতে, মনে হয় কোথাও এর একটা প্রাসঙ্গিকতা আছে, মনে হয় কোথাও একটা সফটনেস আছে। লোকটার যে কেন আমাকে মনে ধরেছে, সেই কারণটা বহুবার উদ্ধার করতে চেয়েও পারিনি। এই মানুষটা আমার প্রিয় নান্নু ভাই। মানে নান্নু পাগলা। বয়সে আমার বাবার থেকে সামান্য কম হবে, বিয়ে সাদি করেনি, কারণ খুব কম বয়সেই তার পাগল খ্যাতিটা জুটে গিয়েছিল। মূলত তার কাছেই আমার শৈশবের জন্ম হয়েছিল, কৈশরেরও যৌবনেরও খানিকটা। কেননা এখনো বাড়িতে গেলে তার কাছেই বেশিরভাগ সময় কাটে। আগের মতোই মুগ্ধ হয়ে শুনি তার গল্প। তার গল্পে এতটা ফেন্টাসি এতটা রুচিবোধ থাকে যে, অনেক শিক্ষিত মানুষের ভেতরেও সেটা খুঁজে পাওয়া দুস্কর। এবারের গ্রীস্মের ছুটিতে বাড়িতে বেশ কিছুদিন কাটানো হয়েছে, সচরাচর এতবড় ছুটি বাড়ি ছাড়ার পর এর আগে কখনো কাটাই নি। বাড়িতে গেলে যা হয় আরকি, নান্নু ভাইয়ের সাথে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ানো। এবারও তাই হয়েছে। তবে এবারের ঘোরাঘুরির মধ্যে অন্যরকম স্বাদ ছিল, স্মৃতি ছিল। ভরা পূর্ণিমায় আমি নান্নুভাই, আর আমার কয়েকজন বন্ধু (যারা আধা-আধুনিক এই গ্রামে থাকে, পড়ে, বাপের সংসার দেখে আরকি) সবাই হাঁটছি প্রাইমারি স্কুলের বিশাল মাঠের ভেতর দিয়ে। নান্নুভাই হঠাৎ আমাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, এই তোরা একটু দাঁড়া, বলেই একটা সিগারেট জ্বালালেন। আমরা ভাবলাম নান্নুভাই বোধহয় সিগারেট জ্বালানোর জন্য আমাদের খানিকক্ষণ স্থির হতে বললেন। তিনি আসলে সিগারেট জ্বালানোর জন্য আমাদের দাঁড় করাননি, দাঁড় করিয়েছেন অন্য একটা কারণে, যে কারণটাই আমার স্মৃতিতে এখনো টগবগ টগবগ করছে। বিস্ফোরকের মতো। সেই স্মৃতিটা সেই কাহিনীটা সেই গল্পটা যে কতজনের কাছে করেছি, তা আমারই মনে নেই, তারপরও স্বস্তি পাইনি। এবার যেহেতু ছায়াধরার গল্প আহ্বান করেছে চিহ্ন, ভাবলাম গল্পটা এবার চিহ্নকে শোনানো যাক। গল্পটা যতবার যতজনের কাছে করেছি, ততবারেই তার কিছুটা পোশাক আশাক পাল্টেছে, তবে মূল গল্পটা অবিকৃত রেখেছি। যাহোক, নান্নু ভাই সিগারেট ধরিয়েই আমাদের ছায়ার দিকে তার দৃষ্টি দিলেন। তার দৃষ্টি আমাদের ছায়ার দিকে দেখেই আমি অনুমান করলাম নান্নুভাই বোধহয় এবার আমাদের চারজনের সাথে অদৃশ্য অথচ দৃশ্যত অন্যচারজনের একটা গল্প শোনাবেন। কাজেই এই ভেবে আমি তার দিকে আর বেশি মনযোগ রাখতে পারিনি। কিন্তু না, একদম চুম্বকের মতোই তিনি আমার মনোযোগ তার দিকে কেন্দ্রীভূত করলেন। শোনালেন অন্য গল্প, আমাদের বললেন, এই তোরা তোদের নিজের ছায়াকে ধরতে পারবি? আমরা খানিকটা অবাকই হয়েছি। এই ভরাপূর্ণিমায় আমরা কখনো আমাদের এই মনোমুগ্ধকর ছায়াকে ধরবার কথা ভাবিনি। বরং ভেবেছি, কার প্রেমিকা কে, কে কার সাথে শুয়েছে অথবা নজরুল-রবিঠাকুরের কোন রোমান্টিক গানের কথা। আমরা নান্নু ভাইকে বললাম, ছায়া আবার ধরা যায় নাকি? তিনি একটা বিস্ময়কর হাসি হাসলেন। যেমন হাসি আমরা সিনেমা বা নাটকে নায়কের গুরুতর বিপদের সময় খল নায়ককে হাসতে দেখেছি অথবা খল নায়কের দারুণ দম্ভ প্রকাশের পর নায়ককে হাসতে দেখেছি। নান্নুভাই ঠিক সেইরকম একটা হাসি হাসলেন। নান্নুভাই যেহেতু রহস্যজনকভাবে হাসছেন নিশ্চয় তিনি এর একটা দারুণ গল্প শোনাবেন। এজন্য আমি একটু কায়দা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে, অনেকটা গুরুগম্ভীর করে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই আপনি কি ধরেছেন কখনো আপনার ছায়াকে? আমার প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই তিনি শুরু করলেন তার ছায়া ধরার অলৌকিক কাহিনী। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যাচ্ছি সেই কাহিনী, কখনো মনে হচ্ছে তিনি ছায়া ধরাটাকে ‘বাউলিয়ার’ দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, কখনো মনে হচ্ছে ‘নো দ্যাই সেলফ’ জাতীয় কিছু হয়তো শোনাচ্ছেন আমাদের, আবার কখনো মনে হচ্ছে এসব তত্ত্ব-তথ্য কিছু না তিনি তার দেখার অভিজ্ঞতা থেকে ক্রমশও ছায়াবিবর্তণের গল্প শোনাচ্ছেন। ঠিক ধরতে পারছিলাম না, একবার ঠাহর করছি একভাবে পরক্ষণেই মনে হচ্ছে না এটা নয় তিনি অন্যকিছু বোঝাচ্ছেন। নান্নুভাই প্রথমেই পরিবেশের রূপসজ্জার বর্ণনা দিলেন। আমাদের যেখানটায় তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন তার সামনেই পাঁকাগমক্ষেত, মৃদুবাতাসে গমের একটা সুচালো তারের সাথে আরএকটা তারের স্পর্শে তৈরি হচ্ছিল নৈঃশব্দের সঙ্গিত, পাশেই নারিকেল গাছের সারি হাওয়ায় পাখির মতো ডানা ওড়াচ্ছে এবং ঠিক তার ওপরেই রৌপ্যধাতুর চাঁদ। চাঁদ তার জোছনাগুলোকে স্তরে স্তরে ¯্রােতের মতো আমাদের ছায়ার দিকেই প্রবাহিত করছে। এই বর্ণনার পরেই আমাদের চোখে আমাদেরই ছায়াকে মনে হচ্ছিল, অপরূপ অপ্সরারও উর্ধ্বে। ছায়াগুলো যেন ঝলক দিচ্ছে নূরের মতো, ঘুমের ভেতরের কাক্সিক্ষত স্বপ্নের দৃশ্যের মতো। আমাদের প্রত্যেকের ইচ্ছে হচ্ছিলো এই ছায়ার সাথে একটু শুয়ে পড়ি, গল্প করি। কোন চোখধাঁধানো সৌন্দর্য দেখলে মানুষের যা যা করতে ইচ্ছে করে, আমাদের প্রত্যেকের তাই তাই করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। নান্নুভাইয়ের বাধা সত্তেও আমরা আমাদের ছায়ার সাথে শুয়েছি, কথা বলেছি, তাকে না হারানোর আকুতি আবেদন করেছি।

এই শহরে, দালানে দালানে আবৃত এই শহরে আমাদের কোন নান্নুভাই নেই। আমাদের পূর্ণিমা অমাবশ্যা নেই, আমরা একদম ফাঁকা ভয়ানক স্মৃতিশূন্য। শুধু দেহ ধরে আছি, দেহের ভেতরের সবটাই শুষ্ক। রস নেই, আহ্লাদ নেই, অস্থিরতা নেই। গল্প নেই। আমাদের গল্পের পুঁজি নেই। ঐতিহ্য বলি বা সংস্কৃতি বলি কিচ্ছু নেই। ছায়া ধরবার নতুন স্মৃতি নেই, গল্প নেই। আছে আলগা আলতো অনুকরণের নির্দয় হৃদয়। শুধু একটা বাক্যই অবলম্বন আছে প্রশান্তির জন্য-‘অদ্ভুত আঁধার এক এসছে পৃথিবীতে আজ’।

*************************************************

 

নাজ
………………..
শিল্পীত মনের রঙের খেলা

প্রতিদিন সকালে শিল্পী নির্মল মন নিয়ে মায়াবী আসনে বসেন। আসনটা আধুনিক যুগের টেবিলের মতো অত উঁচু নয়, বেশ খানিকটা নিচু; এই এক ফিট হবে। মেঝেতে বসে আসনে ক্যানভাস রেখে ছবি আঁকতে হয়। খানিকটা বিদ্যাসাগরের পড়ার আসনের মতো। আসনে বসলে শিল্পীহৃদয় প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। রাতের নির্জনতাকে ভেদ করে যখন পাখিরা কিচিরমিচির করে ওঠে, তখন তিনি ঘুম থেকে ওঠেন। তারপর তিনি নিয়মানুবর্তী হয়ে বেশ কিছু কাজ করেন। সেই সব কাজেই জীবনের স্বাদকে উপলব্ধি করে বিস্মত হন! আহা রে, জীবন! জীবনের এই মূল্যবান সময়কে চিত্তের স্থিরতায় শিল্পী উপভোগ করেন। তবুও কেনো জানি, মায়াবী আসনে না বসলে প্রাণটা চঞ্চল হয়ে ওঠে। সম্ভবত ওই আসনের অদৃশ্য শক্তি আছে। তা না হলে শিল্পী কেনোইবা আধ্যাত্ম আকর্ষণ অনুভব করেন ওই আসনের প্রতি! আসনে শিল্পীর ডানদিকে বিভিন্ন মাপের তুলি মাটির ফুলদানিতে রাখা; তার পাশের্^ ছোটো মাটির পাত্রের মধ্যে আরো একটি ছোট্ট চমৎকার নকশা করা মাটির পাত্র আছে। আসনে আসার সময় শিল্পী কিছু শিউলি ফুল ও পানি এনেছিলেন। এবার তিনি পাত্র দুটো আলাদা করে, উভয়টাতে পানি ঢালেন। চমৎকার ছোট্ট পাত্রে শিউলি ফুল ছড়িয়ে দেন; অন্য পাত্রের পানি, রঙ লঘু করা, তুলি ধোয়া, প্রভৃতি কাজের জন্য রেখে দেন। কাঠের তৈরি আসন যেনো প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। আসনের ওপর রাখা সাদা ক্যানভাস, তুলি, পানি, শিউলি ফুল মুখরিত হলো। তবুও সবাই কেমন যেনো প্রাণজুড়ে শূন্যতা বোধ করছে। শিল্পী তাদের শূন্যতা বুঝতে পেরে, মুচকি হেসে রঙের বাক্সের দিকে তাকালেন। তুলি, পানি, শিউলি ফুলের সারিতে সুন্দর নকশা খচিত একটি কাঠের বাক্স আছে। তিনি এবার এটি খুললেন; ভিতরে ভাগ ভাগ করে রঙ, তুলি ও রঙ গুলানোর পাত্র রাখার ব্যবস্থা করা। এই বাক্সটা যতবার খুলেন, ততবার তিনি একটু কেমন যেনো হয়ে যান। কেননা উনি ভাবেন কোন রঙটা নেবেনবদনার মতো নীল বলে উঠেআমাকে নাও, আমি সমাজের দুর্দশার ও মানুষের নিয়তির কথা বলতে চাই। একই সঙ্গে হয়তো হলুদও বলে, আমি আনন্দের মতো আলোকবার্তার সংবাদ দেবো সবাইকে। এভাবে সব রঙগুলো আবেদন করতে থাকে তাঁর কাছে। কিন্তু শিল্পী সবসময়ই চেয়েছেন চিত্রকর্মে সমাজের মাধ্যমে নিজের গল্প বলতে। ফলে দুটো ঘটনা ঘটে, কখনো তাঁর ইচ্ছামতো রঙ নেন; আবার কখনো রঙ তাকে প্রভাবিত করে। তিনি না চাইলেও অনেক সময় কেবলই রঙ/ক্যানভাসের আবেদন অনুযায়ী ছবিতে রঙ ব্যবহার করা হয়ে যায়। এরকম কতো সময় গেছে তিনি হয়তো একটা পর্যায়ে গিয়ে ছবি আর শেষ করতে পারছেন না। তখন রঙ/ক্যানভাসে কামনা/ইচ্ছা অনুযায়ী রঙ ব্যবহার করে সেই ছবিটি ভালো পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। তাই শিল্পী রঙকে শ্রদ্ধা-সম্মান করেন। কিন্তু যখন একই সঙ্গে অনেক রঙ ভিন্ন ভিন্ন আবেদন করে, তখন শিল্পী বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পরেন; এখনও তাই হলো। প্রতিটি রঙের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র, তাদের অভিব্যক্তিও আলাদা। তাদেরকে বোঝা, তাদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া গড়ে তোলা সত্যি খুব কঠিন। কেননা একই সঙ্গে এরা আবেদনময়ী এবং অভিমানী। শিল্পীর কখনো কখনো মনে হয়েছে সে শূন্য; তাঁর আসলে কোনো ক্ষমতা নেয়। মায়াবী আসনে বসলে কীভাবে যেনো ছবি হয়ে যায়! অনেকে ছবি দেখে যখন বলেন, কী অসাধারণ চিন্তা, কী করে আঁকলেন?

শিল্পী লজ্জায় পরে যান, খুব বিনয়ের সঙ্গে বলেন আমি জানিনা, আসলে কীভাবে যেনো হয়ে যায়! তবে হ্যাঁ রঙের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। ধূসর কী পরিমাণ গাঢ় হলে হৃদয় গুমরানো ব্যথা আসে। নীলের সঙ্গে কোন রঙ মিশালে বেদনা তীব্র হয়, তা আমি অনেকটা জেনে ফেলেছি। প্রতিটা রঙ তো জীবন্ত, তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়।

এভাবে মায়াবী আসন হয়ে উঠেছে শিল্পীর জীবনের অনন্য অধ্যায়। সে আর আসন এক হয়ে গিয়েছে; অনেকটা পরিবারের মতো। যার সদস্য রঙ, তুলি, ক্যানভাস, পানি, শিউলি, মায়াবী আসন ও শিল্পী। তবে দূর আত্মীয় অনেকে ঘুরতে আসে মাঝে মাঝে এই পরিবারে। এসেই বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি থাকে তাদের নজর। এটা ওটা নিয়ে উপদেশও দিয়ে ফেলে শিল্পীকে। এমন এক দূর আত্মীয় লিপ্সা। সে মাঝে মাঝে এসে শিল্পীর গা ঘেঁষে বসে; তাঁর খোঁজ-খবর নেয়। সে কেমন আছে, অভাবে আছে কী না, বিয়ে করে সংসার কেনো করছে না এমন অনেক প্রশ্ন। তখন শিল্পীর মনে হয়, লিপ্সা কতই না আপন! অতিথি সেবায় মনোনিবেশ করেন শিল্পী। অতিথি তুষ্ট হয়ে কয়েকদিন থাকে; শিল্পীকে বলে, তুমি কতো ভালো ছবি আঁকো, তোমার রেখা, টোন আর রঙের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে দেয়। কিন্তু তোমাকে দেখে কেবলই দুঃখ হয়, তুমি এই অজপাড়া গাঁয়ে পরে আছো। শহরে বড় বড় শিল্পপতিগণ তাদের ফরমায়েশ মতো শিল্পীকে কাজ করতে দেন। তাদের পছন্দ মতো কাজ করার ক্ষমতা তোমার আছে, আমিতো দেখছি তোমার চিত্রকর্ম, তুমি অনায়াসে পারবে। তুমি সেগুলো করো না কেনো? কত শিল্পী এভাবে নাম ডাক করছে, অর্থও কামিয়েছে। তুমিও এতো দিনে অনেক অর্থের মালিক হয়ে যেতে। সমাজের লোকজন কতো সম্মান করতো!

শিল্পী :    আমি তো অনেক টাকার মালিক হতে চাই না আর এখানকার লোকজন আমাকে অনেক সমীহ করেন।

লিপ্সা :  একটু হতাশ হয়ে বলেন, সবাই অর্থের পিছনে ছুটে, আমাকে তারা হৃদয়ে ধারণ করেন। আর আমি নিজে এসে তোমার কাছে ধরা দিচ্ছি, তবুও তোমার টনক নড়বে না!

শিল্পী :    তুমি কে বলতো? কী চাও? আর কেনোই বা আসো আমার কাছে?

লিপ্সা :  পৃথিবীর সব মানুষ ধূপ-ধুনা দিয়ে নতোমস্তকে আমায় পূজা করে। আর তুমি এতো উদাসীন কেনো? আমি চাই তোমার দু চোখ লালসার স্বপ্নে বিভোর করতে।

শিল্পী :    আমি না চাইলে, তুমি তো তা পারবে না। সে শক্তি আমি তোমায় দেয়নি। আমি শিল্পী, আমি নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করি। সে কথা তুমি জানো না?

লিপ্সা :  এতো আত্মবিশ^াস তোমার? তুমি আমায় উপেক্ষা করো!

শিল্পী :    হ্যাঁ করি। নেহাতই তুমি অতিথি বলে সেবা করছি; তাই বলে ভেবো না, আমার মন তোমার অধিকারে।

লিপ্সা :  সাধকের মতো কথা বলছো তুমি।

শিল্পী :    সাধক আমি হয়েছি কি না, জানি না। তবে সে চেষ্টাই আমি করি।

লিপ্সা রিক্ত হস্তে মনঃকষ্টে শিল্পীর গৃহ ত্যাগ করে। বিস্মিত হয় তার মন। সাধক হওয়ার চেষ্টাতেই এমন! সাধক হলে তো এই গৃহে প্রবেশ করা যাবে না! কিন্তু শিল্পীকে কখনো উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায় না। তিনি শান্ত হৃদয়ে মায়াবী আসনে বসে ক্যানভাসে লিপ্সার মতো নীলচে বেগুনী রঙ দেন। সেটির মধ্যে অভিসার আঁকবেন তিনি। রাতে গভীর অন্ধকার নামার পূর্ব মুহূর্তে রাধা অভিসারে বেরিয়েছেন। অভিসার শব্দ শুনলে অল্প বয়সের ছেলে-মেয়েরা কেমন যেনো শিহরণ অনুভব করেন। শিল্পী অবশ্য অন্য রকম ভাবছেন, রাধা ক্রমাগত অভিসারে যাচ্ছেন; গন্তবে হয়তো পৌঁছানো যাচ্ছে কিন্তু আকাঙ্খা পূরণ হচ্ছে না। কৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথমেই মান-অভিমানের পালা; এটি শেষ হতে না হতেই বিষণœ বিদায়ের ঘণ্টা বেজে ওঠে। এই যে ক্রমাগত যাত্রা এটি তো প্রত্যেক মানুষই করে তার কাঙ্খিত লক্ষ্যের দিকে পৌঁছানোর জন্য। এমন কি শিল্পী নিজেও তাই করেন। একটার পর একটা ছবির রচনা করা, নতুন নতুন চিন্তার জন্ম দেওয়া; এতো কেবলই ক্রমাগত যাত্রা। ছবি জন্ম দেওয়ার পূর্বে নতুন চিন্তা যখন মাথায় ঘুরপাক খায় তখন শিল্পী অবস্থা বেহাল। খানিকটা মা-এর প্রসব যন্ত্রনার মতো। তো এই অবস্থার পর যখন একটা ভালো চিত্রকর্ম দাঁড়ায় তখন হয়তো খানিকটা আত্মতৃপ্তি আসে। আর যদি পছন্দ মতো ছবি না হয়, তবে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়। সে যাই হোক আত্মার তাড়না থেকেই তো এই যাত্রা। কেউ জ্ঞানের জন্য, কেউ অর্থের জন্য, কেউবা ঈশ^রের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য ক্রমাগত এই যাত্রা করেন। এটিকেই হয়তো অনেকে বলেন ‘অভ্যাস করা’। এই অভ্যাস করতে করতে কেউ হয়তো সেই অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছান; আর কেউ তার পূর্বের পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। পুরো জীবন ধরেই প্রত্যেক মানুষ রাধা আর তাদের সাধনা অভিসার আর লক্ষ্যে পৌঁছানো কৃষ্ণ। কৃষ্ণ ঈশ^র সম, তাকে এই ছোঁয়া যায় তো পরক্ষণে অতলে তলিয়ে যায়। শিল্পী অভিসার আঁকছেন আর ভাবছেন রাধা-কৃষ্ণের চিত্র সেই মুঘল মিনিয়েচার থেকে আঁকা শুরু হয়ে আধুনিক যুগের অনেক শিল্পীই এঁকেছেন। ফলে এখন নতুন কিছু বিষয় নিয়ে ছবি আঁকা প্রয়োজন। তখনই আর একজন দূর আত্মীয় আসলো; তার নাম অহম। সে এসেই দম্ভভরে শিল্পীকে বলে সামনে শীত আসছে; তুমি তো গদি কেনার কোনো ব্যবস্থায় করছো না। পুরো শীত কী মেঝেতে বসে এই আসনে কাজ করবে?

শিল্পী :    হ্যাঁ তাই করবো।

অহম :  তুমি একজন শিল্পী, ভালো ছবি আঁকো তোমার ভাব থাকবে না!

শিল্পী :    আচ্ছা ওসব নিয়ে পরে কথা হবে, তুমি এখন একটু বাদাম চিবাও।

অহম :  আমি খাবো বাদামের মতো তুচ্ছ জিনিস!

শিল্পী :    বাদামকে তুচ্ছ বলছো ওর কতো গুণ জানো?

অহম :  কেবল এই জন্যই তোমার কাছে আসতে ভালো লাগে না। তবুও আসি, যদি তুমি আমার সান্নিধ্যে, আমার কিছু গুণ রপ্ত করতে পারো।

শিল্পী :    তোমার সব গুণতো উন্মূল; মানুষের সে গুনের দ্বারা যা কিছু প্রাপ্তি হয় তাতে কোনো শিকড় গজায় না; খুব আলগা। বাস্তবিক  তুমি তো কারো কোনো উপকারেই আসো না। উপকারের নামে মানুষের গুণগুলোকে ধ্বংস করো তুমি।

অহম :  তুমি ভুল বুঝেছো। আমি মানুষকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে তৈরি করি। বিশ^াস না হলে দেখো, আমাকে যারা হৃদয়ে ধারণ করে তাদের স্বমহিমাময় গাম্ভীর্য। সমাজের সকলেই তাদের ব্যক্তিপূজা করে।

শিল্পী :    আচ্ছা অহম, বলোতো, পৃথিবীতে কেউ কী দম্ভ করে চলতে পারে?

অহম :  অবশ্যই পারে। তা না করলে মানুষের কোনো দাম থাকে না।

শিল্পী :    কার কাছে দাম থাকে না।

অহম :  অন্য মানুষদের কাছে।

শিল্পী :    অন্য মানুষদের কাছে দাম পাওয়া কী খুব গুরুত্বপূর্ণ? প্রকৃতির দিকে তাকাও সবাই বিনয়ী; বৃক্ষ থেকে শুরু করে পানি এমনকি মাটি পর্যন্ত বিনয়ী।

অহম :  তাদেরও কিন্তু দম্ভ আছে ভূমিকম্প বা যে কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ তারই নিদর্শন।

শিল্পী :    সেগুলো তো মানুষেরই সৃষ্টি করা পরিবেশের ফল। বাস্তবিক দম্ভ মানুষকে বড় বা জ্ঞানী করে না, বরং মানুষের পূর্ববর্তী জ্ঞানকে ভস্মিত করে ফেলে। ফলে সে মানুষ হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে মূর্খের মতো দম্ভভরে চলে। অহংকার যখন হেরে যায় তখন সে আরো অহংকারী হয়ে ওঠে এবং তার সহদর ক্রোধ এসে ভর করে তাকে। পূর্বের যা সাধনা সবকিছু নষ্ট করে দেয় ক্রোধ; মানুষকে জ্ঞানশূন্য করে ফেলে। এমত অবস্থায় অহম অগ্নিমূর্তি ধারণ করে।

অহম :  তাহলে তুমি আমায় মানো না?

শিল্পী :    মনি বা মানি না, তা নয়। বরঞ্চ আমি বলি কী, তুমি একটু শান্ত হও; একটু ভেবে দেখো তো তুমি সকলের হৃদয়ে স্থান পেয়েও, তুমি কিন্তু ভীষণ একা। আসলে অহংকারীর কেউ থাকে না। খুব ভালো হয় তুমি নিরঅহংকারী হলে।

অহম :  আমি তোমার সাহস দেখে খুব অবাক হচ্ছি। তুমি তো আমার অস্তিত্ব বিলীন করার কথা বলছো!

শিল্পী :    যে অস্তিত্ব মানুষের ক্ষতি করে তাকে রেখেই বা কী লাভ? অহম দম্ভ ভরে স্থান ত্যাগ করে। আর কেবলই ভাবতে থাকে কী করে শিল্পী হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়া যায়! শিল্পী ভাবছে, আমি সেই রাধা-কৃষ্ণে পড়ে আছি! পৃথিবী জুড়ে প্রায় সকল মানুষকে প্রভাবিত করছে অহম, তাকে তো ছবিতে ধরা প্রয়োজন। কেননা ছবিতে বেশির ভাগ সময় পুঁজিপতির লোলুপ দৃষ্টি ও সাধারণ মানুষের দুর্দশা কথা উঠে আসে। কিন্তু সেই লোলুপ দৃষ্টির পেছনে যে প্রবৃত্তি কাজ করে, সেটি তো গুরুত্বপূর্ণ। সেটি নিয়ে কোনো শিল্পী কথা বলে না। অনুরূপভাবে অনেকে পুলিশ, সরকার ও ক্ষমতাবানদের ত্রুটি নিয়ে কথা বলে; কিন্তু রাষ্ট্র ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে কেউ কথা বলে না। তো মানুষের চরিত্রকে পরিবর্তন করতে বলার পূর্বে, তাঁর প্রবৃত্তিগুলোকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাই নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। তাই তো শিল্পী চিন্তিত অহমের অবয়বই বা কেমন আর তার রঙই বা কী! অবশ্য এখন অভিসারটা শেষ করতে হবে। রাধার শাড়ির জন্য ধূসর বর্ণ তৈরি করছে শিল্পী। এমন সময় হাস্য উজ্জ্বল মুখে হাজির হয় ঈর্ষা। কী শিল্পী, কী সব আঁকছো? তোমার সমসাময়িক সব শিল্পীরা এতো ভালো ছবি আঁকে, তারা সবাই বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে। তুমি কী করছো?

শিল্পী :    আমি রাধার অভিসার আঁকছি।

ঈর্ষা :     ওই নিয়েই থাকো, সবাই বিষয়বস্তুতে কেমন নতুনত্ব এনেছে দেখছো না? অবশ্য তুমি দেখবেইবা কী করে, তোমার তো ফেসবুক নেই, ইন্টারনেটও চালাও না। তুমি কী! এই যুগে বসবাস করে সেই মান্ধাতার আমলে পরে আছো? শুধু শুধু ছবি এঁকে গেলেই হবে? ছবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে না?

শিল্পী :    ছবি প্রতিষ্ঠিত হবে সেই আশাতে আমি ছবি আঁকছি না। আর ফেসবুক এখনো প্রয়োজন হয়নি; প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই ব্যবহার করবো। এখন একটু একটু ইনটারনেট ব্যবহার শিখে ফেলেছি। ভেনিসের শিল্পী ম্যানটেগনা, ফ্রানসিসকো-ফ্রানসিয়া, কোরিজ্জিও, এনটোনেল্লো-ডা-মেচ্ছাইনা প্রভৃতিদের কাজ আমি দেখি।

ঈর্ষা :     নেট ব্যবহার করছো, খুব ভালো কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত যদি নাই হও তবে কেনো ছবি আঁকছো?

শিল্পী :    ভালো লাগা থেকে; আর সমাজের অনেক মানুষের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত অনেক সুবিধা নিচ্ছি, তাদের জন্য কোনো কাজ না করলে নিজেকে খুব কর্মহীন মনে হয়। তাই আমার সামর্থে যা কুলোয় আমি তাই করি অর্থাৎ ছবি আঁকতে জানি, তাই সে কাজটি করি।

ঈর্ষা :     অর্থাৎ দ্বায়বদ্ধতা?

শিল্পী :    সে রকমই তো মনে হয়। আসলে শুনো, ছবি না আঁকলে না, বুকের মধ্যে কেমন জানি হয়। সেটা কি আমি জানি না।

ঈর্ষা :     কিন্তু তোমায় দেখলে আমার খুব হিংসা হয়। সবাই নিজেদের মধ্যে এতো প্রতিযোগিতা করে, পরশ্রীকাতরতায় বিভোর হয়ে থাকে। কেবল তুমি এই বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকো কী করে?

শিল্পী : কারণ আমি জানি যে, পরশ্রীকতরতায় কিছুই প্রাপ্ত হয় না। কেবলই নিজেকে বিদ্বেষের দহনে পুড়ানো হয়। হিংসা প্রথমে নিজে জ¦লে তারপর অন্যদেরও জ¦ালায়।

ঈর্ষা :     না না ওইভাবে দেখছো কেনো? হিংসা কিন্তু কাজের অনুপ্রেরণা জোগায়।

শিল্পী :    সেটা ক্ষণস্থায়ী আবেগ, কাজের প্রতি স্থায়ী ভালোবাসা হিংসা কখনোই আনতে পারে না। বরঞ্চ হিংসাকে যদি আত্মত্যাগে রূপান্তর করা যায়, সেটি হৃদয়ে প্রশান্তি আনে। কেউ যদি খুব অন্যায়ও করে ফেলে, তবুও তার মঙ্গল কামনা করা উচিৎ তা না হলে হিংসা কেবলই সমাজকে কলুষিত করে।

ঈর্ষা :     তোমার আসলে ধারণাই নেয় আমার উৎসাহে কতো মানুষ অসাধ্য কাজ সাধ্য করে ফেলে।

শিল্পী :    অসাধ্যকে সাধ্যে আনতে কেবল আত্মবিশ^াস প্রয়োজন। ঈর্ষার কোনো প্রয়োজন নেই।

ঈর্ষা :     তুমি আমাকে বুঝতে পারছো না।

শিল্পী :    তোমাকে আমি যা বুঝেছি তার চেয়ে বেশি বুঝতে চাই না। ঈর্ষা চলে যায়, যাওয়া আগে শিল্পীকে বলে ‘আজ আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু দেখো কোনো এক সময় তুমিই আমাকে স্মরণ করবে’। প্রয়োজন হলে অবশ্যই স্মরণ করবো তোমাকে আমি ভালোবাসি কিন্তু তোমার চরিত্রের ওইসব ত্রুটি আমি খুব অপছন্দ করি। শিল্পীর মনে হয় ঈর্ষার রঙ কালো, আর ঈর্ষা সাধনার পথে বাধা সৃষ্টি করে তাই অভিসারের ব্যকগ্রাউ-ে রাতের মতো কালো রঙ দেন। কেননা কৃষ্ণের কাছে পৌছানোর জন্য অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়ায় অন্ধকার। আর এভাবে একটি বাধা অন্য বাধার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যেমন, প্রথমে একজন মানুষের কাছে আসে খ্যাতি বা অর্থেও মোহ। সেটি অর্জন হলে আসে অহম। অহমসম্পূর্ণ মানুষের কাঙ্খিত বস্তু না পেলে হৃদয়ে স্থান নেয় ক্রোধ। আর  সেই কাঙ্খিত বস্তু যদি অন্য কেউ পেয়ে গেলে উপস্থিত হয় হিংসা এভাবে একটি মানুষ বিনাশের দিকে এগিয়ে যায়। শিল্পীতো ছবি আঁকে কিন্তু লিপ্সা, অহম ও ঈর্ষার মতো অনেকে এসে বাধা সৃষ্টি করে। তারা প্রভাবিত করতে চায় তাদের স্বকীয় স্বত্ত্বার মাধ্যমে। যে সত্ত্বার গুনাবলি সমাজের জন্য ক্ষতিকারক। শিল্পী যদি তা ধারণ করে তবে বৈশ্বয়িক হয়তো অনেক কিছু অর্জন হবে কিন্তু রঙ তাঁর সঙ্গে কথা বলবে না, ছবি তাঁর কাছে ধরা দেবে না। যদি পরিবারের সদস্যই না থাকে তবে বৈশ্বয়িক বস্তু দিয়ে সে কী করবে? তাই শিল্পী একাগ্রচিত্তে ছবিই এঁকে যায়।

*************************************************

 

আদিত্য আবরার
………………..
জেগে উঠছে শিউলিতলা ভোরে, চাঁদের রাতে

পাখির কূজন মানুষের কানকে উদ্বেলিত করে। গাছের সবুজ ছায়া শরীর ও মনকে নির্মল অনুভূতি দেয়। যদিও বেঁচে থাকার জন্য এসব আবশ্যিক কিছু না। জোসনা রাতের মায়া কিংবা ভরাচাঁদে প্রিয়ার মুখ তো বানোয়াট। জীবন নির্মম সত্য হয়ে ওঠে তখন, যখন পিচঢালা রাস্তার ছোট ছোট নুড়ি পাথরগুলো জুতার শোলের সাথে বাড়ি খেতে খেতে খড়খড় আওয়াজ তুলে অস্তিত্ব জানান দেয় যে, আমরা বেঁচে আছি এখনো। পদদলিত হওয়ার অপমান আর সূর্যের সাথে অব্যর্থ বাকবিত-তায় আমাদের চক্ষুজল চারটি দিকেই অস্তমিত হয়েছে।

জীবনে ছোটো বড়ো অনেক গল্প আসে। গল্প আসে ছোটো একটি সমাধির। সংকীর্ণ একটা জায়গার চারপাশ বাঁশের বাতা দিয়ে ঘেরা। কোনো কোনো বাঁশের ব্যাড়াগুলো শুকিয়ে কড়কড়ে। এরা নিজেদের বয়স প্রমাণে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত, এরাও বুড়ো হয়, এদেরও বোধ হয় ক্লান্তি আসে। আবার কোনো কোনো সমাধির ব্যাড়ার বাতাগুলো একেবারে কাঁচা। বাঁশের উপরিভাগ সবুজ হলেও ভেতরটা থাকে একটু লালটে লালটে। এমন রঙধরা ব্যাড়াও তার সদ্য পাহারাদার নিযুক্ত হওয়ার কাহিনিও বর্ণনা করে কত সহজে!

মেইন গেটের সাথে লাগোয়া, টাইলস অথবা মোজাইক পাথর দিয়ে বাঁধানো জায়গাগুলো পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় অশান্ত মানুষগুলোর। পরিশ্রম, ঘাত-প্রতিঘাত, অসম্মান কিংবা নির্লজ্জ বেহায়া হয়ে যাদের বসবাস ছিল ধরণীতে, অর্থই জীবন; এটা ভেবে যারা কতগুলো সস্তা উপাধির জনক হয়েছিলো, তাদের জায়গা এই সমাধিস্থানের প্রথম সারিতে। মানুষজন তাদের আশান্বিত ব্যক্তির সমাধিস্থলে পৌঁছাক আর না পৌঁছাক, উন্নত একটা জায়গা তাদের চাই ই চাই।।

দু’বছর বয়সে প্রস্থান করা আনহার কবর দেখতে একজন মানুষ সমাধিস্থানের রাস্তা ধরে হাঁটছে। কতৃপক্ষ আনহার সমাধি শুরুর দিকে দিতে দেয়নি বলে নয় বিঘা জায়গা নিয়ে বানানো সমাধিস্থানের শেষ মাথা পর্যন্ত তাকে হাঁটতে হয়। মানুষটা যে হাঁটছিলো সমাধির দিকে, সে তখন পেছনে ফিরে যায়।

একবছর পেরিয়ে গেল কয়েকদিন আগে। প্রথম বার্থডে হওয়াতে আয়োজনটা বেশ আড়ম্বরপূর্ণই হয়েছে। খুশিখুশি অনেকজনের অনেককিছু দিয়ে আলমারির তাকগুলো ভরিয়ে ফেলেছে বাচ্চার মা। সোহানুরের অফিস কলিগসহ আরো কয়েকজনের ছেলেমেয়েকেও দেখেছে, স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা অঙ্কুরের মতো টাটিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠছে তাদের বাচ্চারা। কিন্তু আনহা, আনহার ক্ষেত্রে এমন ব্যতিক্রম কেন? সেই দুই তিনমাসের মতো ছোটই রয়ে গেল। অল্পতেই কান্নাকাটি। এ এক দারুণ যাতনা। যখন জন্মেছিলো বাচ্চাটি, তখন একেবারে বাবার মতো মুখ। মনে হলো, সেই-ই যেনো আবার ফিরে এসেছে শৈশবে ফিরিয়ে নেবে বলে।

তানহা আজও তার মেয়ের নাম আনহা রাখা নিয়ে আলোচনায় মেতে ছিলো। আনহাকে নিয়ে তার উচ্ছ্বাস মাত্রাতিরিক্ত। এটা ভালো। ডাক্তার এসেছে। সবাইকে একটু অন্যদিকে যেতে বলো, বলতে বলতে সোহান ভেতরে  ঢোকে। চেকাপ শেষ হওয়ার পরদিন থেকে সোহান প্রতিদিন আনহাকে কোলে নিয়ে অনেকসময় বসে থাকে। বাবা হয়ে মেয়ের মেয়ের মৃত্যুর প্রহর গোনা পৃথিবীর সবচে নিষ্ঠুরতম কাজ। তার উপর যে মেয়ের মুখের ভেতরে নিজের শৈশব খুঁজে পেয়েছিলো। তখন প্রথম দিনটির কথা মনে পড়ে। রক্তনাভি আটকিয়ে নরম কাপড়ে মুছে বাবার হাতে তুলে দেওয়া মুহূর্ত। সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া নরম লাল ঠোঁট, বন্ধ চোখ আর নিঃশ্বাস নেওয়াতে উঁচু নিচু হওয়া পেট দেখেই ফেরত দেয় কোনো মহিলার কোলে। সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া বাচ্চার ভার পৃথিবীর খুব কম পুরুষই সহ্য করতে পারে।

আনহার প্রথম আওয়াজ নিয়ে কেউ কখনো মাতম করে না। কিংবা কোনোকিছু বলে সবাইকে খুশি করে দিক সেটা ভাবার বয়সে তখনো পৌঁছেনি ঠিকঠাক। কিন্তু সোহান, অথবা প্রতিটা বাবার চাওয়া থাকে প্রথম ডাকটা আমাকেই ডাকুক। আর মায়েরাও সাধারণত তাই করে, তারা প্রথমে বাবার নামটাই শেখায় বাচ্চাকে। দশ মাসের যৌথ জীবনের মাহাত্ম্য তাদের ছোটো ছোটো অনেক চাওয়ার উর্ধ্বে তুলে রাখে।

ছোট্ট কবরটাকেও ঘিরে রাখার জন্য গোরস্থানের লোককে টাকা দেওয়া হয়েছিল। ওরাই বাতা কেটে ব্যাড়া দিয়ে দিয়েছিলো কবরের চৌহদ্দিতে। এখন সাদা সাদা বাঁশগুলোর গায়ের রঙ কালচে হয়ে ঝরে ঝরে পড়েছে। তার উপরে এসে পড়েছে শিউলি ছোঁয়া জোসনার ছায়া। সোহান হাঁটুমুড়ে বসে ঝরে পড়া বাঁশের গায়ের উপর থেকে জোসনা আর তার ছায়া ছুঁয়ে দেখে। আর উপরে তাকিয়ে দেখে, আধফোটা শিউলি জোসনার আলোয় নক্ষত্রের মতো জ্বলছে। এখন তারা ফুটে উঠবে আর ভোরবেলা হতে হতে ঝরে পড়বে ছোটো এই সমাধিস্থলে। এভাবে সবই হবে পৃথিবীতে। কেবল আমার শৈশব হয়ে ফুটে উঠলো না আনহা। সে অনুচ্চ স্বরে বলে, তোমার বুঝি দারুণ ঘুম, তবে ঘুমোও, ঘুমোই বাউ-ুলে, ঘুমোও এবার।

*************************************************

 

নাফিস অলি
………………..
জ্যোৎস্নার বন

ব্যস্ত সমস্ত দিনের শেষে রাজানগরে এখন আর রাত নামে না। রুটিন মাফিক ডিউটি শেষে সূর্যটা ছুটি নিলে বিশ্রামের আয়োজন করে পৃথিবী। এসময় চোখ ধাঁধানো নানান আলো দিয়ে ক্লান্ত পৃথিবীটাকে জাগিয়ে রাখার নির্মম চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে শহর। রাজানগরের জনগণ এক তরুণ উদ্যম নিয়ে ঘরের বাইরে বের হয়। শহরের শপগুলো থেকে ভেসে আসা প্রবল মিউজিকের তালে তাদের শরীর হেলেদুলে ওঠে। একদল দর্শনার্থী রাত দেখার আশায় শহরে এসে বেদনা নিয়ে ফিরে যায়। রাত জাগা পাখিরা দিন ভেবে দালানের কার্নিশে অলস ঘুমিয়ে থাকে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে উজ্জ্বল স্ক্রীনে চলে নতুন কোনো প্রযুক্তির বিজ্ঞাপন। হঠাৎ এসময় রাজানগরের ঝকঝকে সড়কে দেখা যায় কজন পুরানো মানুষকে। যে মানুষদের ছবি শহরের মিউজিয়ামে সযতেœ বাঁধাই করে রাখা আছে। আজকাল এমন সব প্রাচীন মানুষের দেখা মেলে কেবল সিনেমার পর্দায়। পুরানো মানুষ দেখার জন্য সিনেমা হলের বাইরে লম্বা সারি পড়ে। সিনেমায় দেশসেরা অভিনেতারা বুড়ো সেজে অভিনয় করেন। দেখে জনগণ রোমাঞ্চিত হয়, তৃপ্তি পায়।

এখন মানুষের বয়স বাড়ে না। এমন পুরানো মানুষ বাস্তবে এখন আর দেখা যায় না। তাই সড়কের ধারের মানুষটাকে দেখে শহরের জনগণ প্রথমে একজন নামকরা অভিনেতা ভেবে ভুল করে। পরে মানুষটার হাবভাবে কিছু প্রাচীন অভ্যাস আর চেহারায় হারানোর ভীষণ ক্ষত দেখে তারা অনুমান করে; এটা সত্যিকারের পুরানো মানুষ হবে। সাহসী কিছু যুবক বীরবিক্রমে এগিয়ে গিয়ে প্রচ- ফ্ল্যাশ জ্বেলে মানুষটার সাথে সেলফি তোলে। দু’জন যুবক যুবতী নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে পুরো কর্মকা- দেখে চলে। সিনেমার পর্দায় বুড়ো দেখে রোমাঞ্চ অনুভব করলেও সত্যিকারের বুড়োতে তাদের মনে সংশয়ের সৃষ্টি হয়। লোকটা হয়তো তার প্রাচীন চামড়ার ভাঁজে ভীষণ কোনো জীবাণু বয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষটার এতসব নিয়ে মাথাব্যথা নাই। সে সারাক্ষণ তার ক্ষীণ দৃষ্টির চোখ দুটো শহরের অনিন্দ্য সুন্দর ঝলমলে আলো এবং সদ্য নেমে আসা ফ্ল্যাশের অভিশাপ থেকে আড়াল করে রাখতে চেষ্টা চলায়। শহরের এই আলোর অতি উজ্জ্বলতায় সে যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছে। আলো থেকে চোখ দুটো আড়াল করে সে তার হারিয়ে যাওয়া জিনিস খোঁজে। রাজানগরের মানুষ এখন আর রাস্তায় নেমে কিছু খোঁজে না। হাতের যন্ত্রের সাহায্যে সবকিছু খুঁজে বের করে পলকেই। তাই মানুষটার খোঁজাখুঁজির এই আদিম অভ্যাসটা কারও চোখে পড়ে না। হারিয়ে ফেলা জিনিস খুঁজতে এবার সে আদিম মানুষের মতো এদিক-সেদিক হাঁটতে শুরু করে। হেঁটে কিছুদূর চলে এলে তার মনে হয়, কেউ তার পিছু নেয়নি। ততক্ষণে যুবকেরা বুড়োর সাথে তোলা সেলফি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। হঠাৎ এক মুহূর্ত পেছন ফিরে তাকিয়ে বুড়োর দুঃখ বেড়ে যায়।

সে হেঁটে হেঁটে চারপাশের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য কিছুটা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়। হোঁচট খাওয়ার ভয়ে নড়বরে পা দুটো সাবধানে ফেলতে গিয়ে তার মনে হয়, এই মসৃণ কেউ কখনও হোঁচট খাবে না। এখানে রাস্তার পাশে ফুলে ফুলে সুগন্ধি স্প্রে করে দিচ্ছে একজন কর্মচারি। মুহূর্তেই রাতের ফুলের সৌরভে ভরে ওঠে জায়গাটা। মানুষটা এইসব বীভৎস দৃশ্য থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যকিছু ভাবতে চায়। তার মনে পড়ে, একসময় অচেনা একজন লোক দেখে একদল কিশোর পিছু নিত। সে হেঁটে চলে এলো, কেউ তার পিছু নিল না। কেউ দু’কদম এগিয়ে এলো না তার দিকে। মানুষটার ভারি দুঃখ হয়।

এইতো সেই জোৎ¯œার বন। এখানে একদল জোনাকিপোকা বড় একটা গাছের গায়ে জোৎ¯œা নামাতো। নিভু নিভু আলোয় জায়গাটা স্বর্গ হয়ে উঠতো। আর চারপাশের ছায়াগুলো হয়ে উঠত জীবন্ত। জোৎ¯œার বন থেকে দু’একটা জোনাকিপোকা ধরে ছেলেরা কাঁচের বয়ামে ভরে রাখতো। অভিমানী জোনাকিপোকার দল শহর ছেড়ে কোথায় চলে গেছে তার খবর কেউ জানে না। আধো আলোর জোৎ¯œার বন আজ আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। জোনাকিপোকারা এত আলো সইবে কীভাবে!

বুড়োর ক্লান্ত লাগে। সে পা ভেঙ্গে বসে পড়ে। না, দীর্ঘ যাত্রার জন্য নয়। পৃথিবীর ক্লান্তিটা যেন সে অনুভব করে। পৃথিবীর দুঃখে তারও মন খারাপ হয়। দু’জনের কারও চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেয়ার মতো উপায় নাই। সে একটু আঁধার খোঁজে। যে আঁধারের শেষে আলো দেখে হৃদয় নেচে উঠতো। আঁধারের রূপ কতদিন দেখে না সে! মানুষটা ফুঁপিয়ে ওঠে।

হঠাৎ তার নিঃশ্বাস থেমে যায় ভীষণ উত্তেজনায়। একটা লম্বা কালো মতো জন্তু তার সাথে চলছে। সে থেমে গেলে জন্তুটাও থেমে যাচ্ছে। তার নিজের চোখকে বিশ্বাস হতে চায় না। সে চোখ দুটো ডলে ডলে সজাগ করে আবার তাকায়। না, তার দেখার ভুল নয়। একটা ছায়া। জোৎ¯œার বনের সেই ছায়া! হতভম্ব মানুষটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরেধীরে নুয়ে ছায়াটাকে ধরতে যায়। কিন্তু ছায়াটা তাকে পেছন ফেলে এগিয়ে চলে। মানুষটা ছায়াটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দু’ হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরতে চায় তাকে। কিন্তু পারে কই? ছায়া! সেতো শৈশবের মতো, যাকে ধরা যায় না।

*************************************************

 

সাঈদ কামাল
………………..
জ্যোৎস্নার -রাতের খেলা

পৃথিবীর চেয়ে প্রতাপশালী গ্রহ হলো আমাদের অন্তরাত্মা। একদিন মনে হলো আমার, আমি তো কখনো অন্তরাত্মার দিকে যাত্রা করিনি। পৃথিবী ক্রমশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে জেনে, কিংবা পৃথিবীর জন্য নিজেকে অযোগ্য মনে করে অন্তর গ্রহের দিকে যাত্রা শুরু করলাম ভাদ্রের জোসনাময় এক রাতে। আমি বের হয়ে এলাম পৃথিবী থেকে। তারপর হাঁটতে থাকলাম, দেখলাম অন্তরগ্রহের পথেও পৃথিবীর মতো উপাদান ছড়িয়ে আছে। এতো পথ অলিগলি, কোন পথে যে স্বচ্ছলতা আছে। আমি নিজেকে ছেড়ে দিলাম পথের উপরে। পথ আমাকে টেনে নিয়ে যাক ইচ্ছেখুশিতে।  তখন আমি আর পথের দিকে তাকালাম না। দেখলাম বিশাল এক আকাশ ছাপিয়ে যাচ্ছে চাঁদটা। আমি এমন তথ্য জেনে বের হয়েছিলাম যে, এটা ভাদ্রমাসের চাঁদ। এখন মনে হলো, অন্তরগ্রহে কোনো ভাদ্রমাস থাকে না, কিংবা আশ্বিন অগ্রাহায়ন, অথবা জীবনবাবুর হেমন্ত। এখানে বারোমাস ধরে অন্ধকার আর জোসনায় মিলে-মিশে থাকে। আকাশের ওপরে আকাশ ছাপিয়ে জোসনা জেগে ওঠে। এ এক অদ্ভুত জোসনা, কখনো মনে হয় জলের মতো স্বচ্ছ, হাত বাড়ালে তরলের মতো উঠে আসে। কখনো শঙ্খ লাগা ছায়ার মতো আলো আঁধার। আমি দেখলাম, চাঁদের আলো ক্রমেই স্বচ্ছ হয়ে আসছে। সবুজ বৃক্ষের গা ছুঁয়ে হাওয়া বয়ে আসছে। তখন আমি আকাশ ছেড়ে নিচে তাকিয়ে দেখি চেনা সব দৃশ্য আড়াল হয়ে গেছে। দেখলাম অদ্ভুত এক নদী, যাকে উষ্ণতাহীন ফরসা রঙের খনি মনে হলো। এতো উজ্জ্বলতা নিয়ে তবে কোনো নদীও বহে যায়! মনে হলো চেনা এক নাম দিয়ে দিই এই নদীর। কংশ। নামকরণ হয়ে গেলে তারপর পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। আমি জানি পৃথিবীর মানুষের সভ্যতার ছোঁয়া এখানে লাগেনি। এখানে চোখ ধাঁধাঁনো ল্যাম্পপোস্টের ব্রিজ পারাপার হয়ে যায়নি। এখানে কোনো ধাতব নৌকা বয়ে যায়নি। মাছেদের প্রাণ বধ করবে বলে এখানে জেলেরা অভিশপ্ত জাল নিয়ে আসেনি। এই নদী শুধু বহে চলে, নিরন্তর বহে যায়। আমার মনে পড়লো, এমন আয়তনে আমাদের শৈশবের এক নদী ছিলো। নাম ছিলো তার কংশ। সে সময় কতো দিন কংশ নদী পাড়ি দিয়েছি। সে স্মৃতি বুকে নিয়ে আমি এই কংশের জলে নেমে পড়লাম। এই জল হৃদয় ছোঁয়া শীতল। আমি হাঁসের মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে মধ্য নদীতে এলাম। মনে হলো, আমার হাত তখন সোনার কাঠি রূপোর কাঠি। আমি তাহলে একটা নির্দেশ করি, কিছু একটা হয়ে আসুক আমার সামনে। সুতরাং একাকী এই অন্তরগ্রহে আমি একটু সঙ্গ পেতে পারি। এসব ভাবতেই দেখলাম, চাঁদের সুতীব্র ও স্বচ্ছ আলোয় শাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত এক নারী শরীর। আমরা তখন ¯্রােতে ভেসে যেতে থাকলাম। যেনো শৈশবের সে ভেলা ভাসানো মন্থর কলা গাছ।

সে বললো, যাত্রা জানো?

বললাম, জানি না।

আমারে চেনো?

চিনি না।

সে তখন দূরে দেখালো, আমরা ধান ক্ষেত পার হয়ে যাচ্ছি। অন্তরগ্রহ কি তাহলে ছেড়ে চলে যাচ্ছি! কারণ অন্তরগ্রহে ধানক্ষেত থাকে কিনা জানি না। হয়তো সবি থাকে। ধানক্ষেত, নদী ও আকাশ, জোসনা, আর চাইলে নারীহৃদয়। কখনো বিষণœ অপেরার সুর। তখন সত্যিই এক গান ভেসে আসছিলো। তার ভেতরে আমার ডাকনামে কে যেনো ডাকলো কয়েকবার। এই ডাক শুনে আমি হিম হয়ে যেতে থাকলাম। কে ডাকে! ডাক নামে! তখন মেয়েটি আবার সামনে চলে এলো। মুহূর্তেই তাকে আমি ভুলে গিয়েছিলাম।

সে বললো, আমি ডাকছিলাম। আমাকে চেনো না?

বললাম, মনে পড়ছে না।

তোমার জন্য আমার অপেক্ষা ছিলো।

আমার জন্য অপেক্ষা!

হ্যাঁ, সেই রবীন্দ্রনাথের যুগ থেকে, যখন অন্তর বিষয়ক এক গ্রহ ক্রিয়েট হলো।

আমার মনে পড়লো না কিছু। সে তখন সামনে এগিয়ে গেলো। এবং জলের ভেতরে একটি ছায়াবৃত্ত তৈরি করলো। বললো, ধরো তো ওই ছায়াবৃত্তটা।

আমি ধরতে গেলাম, অমনি আমি জেগে উঠলাম আরেক ভূবনে। দেখলাম আমার হাত পা ছোটো হয়ে এসেছে। চারপাশে জেগে উঠেছে ধানক্ষেত, দেবদারু বন, প্রাচীন রেলস্টেশন, অবাধ জোসনা রাতের পেঁপে বাগান। সেখানে প্রলম্বিত হয়ে আছে নিশ্চল ছায়া।

তখন মেয়েটি আবারো সামনে চলে এলো। দেখলাম ছোটো একখানি মুখ। এ যে সুর্বণলতা! তুমি সুর্বণলতা! তুমিও তবে ফিরে আসতে জানো! তবে চলো, আমরা জেগে উঠি এক খেলায়, চাঁদের আলোয় পেঁপের ছায়া ধরবার খেলা। আমরা এই খেলা ছেড়ে কোথাও ফিরে যাবো না।

*************************************************

 

মুহিম মনির
………………..
আলোর ছায়া

ঘটনা ঘটা-না-ঘটার সঙ্গে ভাবা-না-ভাবার কোনো সম্পর্ক নেই। আমিও ভেবে রাখিনি যে, এমনটি দেখব, এমনটি হবে। তারপরও চোখের সামনে চোখের পলকেই ঘটে গিয়েছিল ওসব। জোছনার জলে যখন জগতের অঙ্গশোভা ¯œাত হচ্ছিল, প্রকা- পাকুড় গাছটায় ডানা ঝাপটিল অন্ধ বাদুড়, তখন শুনেছিলাম সেই কণ্ঠস্বর। নরম কোমল আর কাতর। ‘ফুলটিকে ফেলে দিলেন?’ কথাটি কর্ণকুহর বেয়ে বুকের ওপর আছড়ে পড়েছিল। ধুকপুক করে উঠেছিল ভেতরটা। তড়িঘড়ি করে তুলতেও গিয়েছিলাম ফুলটিকে।

ঐ যে আকাশপাতালের মিলনরেখা দেখছেন না, ওখানেই, হ্যাঁ ওখানেই ঘটেছিল ঘটনাগুলো। সেখানে শুধু পাকুড়ই না; পদ্মফোটা পুকুরও আছে একটি। তার স্থবির জলকিনারে গজানো ঘাসদামে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি শিমুলগাছ। এ সময়টাতেই তো ফুল ফোটে, না? সম্ভবত এখনো ফুটে আছে লাল পাপড়ির ফুলগুলো। বন বলেন আর বাগানই বলেন, ওটা আমাদের। ওখান থেকে একটি ফুল তুলে আপনাকে দিলে কেউ কিছু বলবে না নিশ্চয়। চলুন, শিমুলতলার দিকে এগোনো যাক!

দুপুরের একটু আগে ও যখন জমিরুদ্দনের অনাবাদী জমি থেকে ছাগলটাকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিল, তখন থামালাম তাকে,

আলো, আজ বিকেলে একটু শিমুলতলায় এসো। কেমন?

কেন ভাইয়া, কোনো দরকার ছিল কি?

দরকার? দরকার তো বটেই। অদরকারি হলে বিকেলের আলোইবা একসঙ্গে মাখতে চাওয়া কেন! কিন্তু গলাতে দলা পাকিয়ে থাকা ভীরুতা ভেদ করে অতো কথা তো আর মুখ দিয়ে বেরোয় না। তাই কথারা ঘূর্ণিঝড় তুললেও ঘুরেফিরে ওই পর্শুকার তলেই আত্মগোপন করে। তখন নির্বাকে পলায়ন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না বেচারার। আমিও ইতঃস্তত করতে করতে সরে পড়েছিলাম। তবে শেষবারের মতো বলেছিলাম,

এসো কিন্তু।

আসব বা আসব না বা দেখি, এ জাতীয় কোনো কথাই ও বলেনি। তারপরও আমি ধরে নিয়েছিলাম যে, ও আসবে। নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ কিনা, তাই।

বিকেল বেলা। পশ্চিমাকাশগলা কোমল আলো চকচক করতে লাগল পুকুরজলে, সে-জলে আলোড়ন তুলতে থাকল অব্যক্ত কথারা, তবু তখনো ও এল না। বরং উল্টো সফেদ এসে ওলোটপালোট করে দিল সবকিছু। বাজে সব কথা বলে গেল সে। আর আমার ভেতরটাও কেমন করতে শুরু করল।

আজকাল এসব হয়েই থাকে, বলে কেটে পড়েছে সফেদ। জ্বলুনি ধরিয়ে গেছে আমার হাত দুটোয়। যেন রেখায় রেখায় কিলবিল করছে বিরক্তি। অন্তত এ অস্বস্তিটা কাটাতে হলেও দুটো চড় দেয়ার দরকার ছিল। কিন্তু যে কারণেই হোক, সেটা হয়নি। দশ ক্লাস পর্যন্ত একসঙ্গে পড়াটাও একটা কারণ হতে পারে।

সন্ধ্যা নামের পাখিটি ডানা মেলছে পাতায় পাতায়, পাকুড়-শিমুলের ডালপালায়। ফার্নদের ফাঁকে ফাঁকে মাথাচাড়া দেয়া কচুপাতারা নাচছে নাকি কাঁপছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। চিত্তপ্রাসাদে কেবল দুলতেই দেখা যাচ্ছে তাদেরকে। কিংবা কোনো কারণে আহাজারি করলেও করতে পারে পাতাগুলো। তাদেরই আশপাশে চরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা মোরগ-মুরগি। কালো মুরগিটার ডানার তলে লুকোচুরি খেলছে কয়েকটি ছানা। মাতৃ¯েœহ পাবার জন্য যাদের পিতৃপরিচয়ের প্রয়োজন পড়েনি।

না, এত কিছু নয়। এমন কিছুও নয়। কিংবা আসলে কোনোকিছুই নয়। সফেদ আমার বন্ধু বলেই যে তার সব কথা বিশ্বাসযোগ্য, তাও নয়। তাহলে; তাহলে নিজেকে এতটা খোঁচানোর কী আছে? আর যদি কিছু হয়েই থাকে, তো হয়েছে। ওসব নিয়ে এত কিছু ভাবছি কেন? সফেদের জায়গায় আমি হলে যে এমনটি ঘটত না, তাই-বা বলছে কে? না, এসব নিয়ে আর এতটুক্ওু ভাবব না। ভেবেছি, ভেবে দেখেছি, ওকে নিয়ে ঘর বাঁধতে চাই। ব্যাস! ল্যাঠা চুকে গেল। কিন্তু আলো এখনও আসছে না কেন? এভাবে আর কতক্ষণ? দেখতে দেখতে একাকীই সূর্যাস্ত দেখলাম আমি। কয়েকটা মশা এসে রক্ত চুষতে শুরু করল। তবুও সরলাম না সেখান থেকে।

আদৌতে ও আসবে তো! ওর আসা-না-আসা নিয়ে এবার সংশয়ী হয়ে উঠলাম। ভেঙে পড়তে চাইল ভেতরের মানুষটি। ভাবলাম, সফেদের কথাগুলো যদি সত্যি হয়, তবে ও তো আসবে না। আসার কথাও নয়। ন্যাড়া কি আর বারবার বেলতলায় যায়? একজন প্রেমপ্রতারিত মেয়ে কি এত সহজেই আরেক জনের প্রেমিকা সাজতে পারে? না, পারে না তো। নাকি পারে? হয়তো পারে, খুব সহজেই পারে; নয়তো না-পারাই রয়ে যায়। প্রকৃতির প্রত্যেকেই তো স্বতন্ত্র। ক’জনই-বা ক’জনের কথা জানে?

আচ্ছা, সফেদ আবার সে আঙুলটিকে ভেঙে দেয়নি তো, যেটি আজও আমার কাছে একটি অধরা ঘাসফড়িং?

হঠাৎ করেই প্রশ্ন জেগে উঠল। ভেঙে দেয়নি তো; ভেঙে দেয়নি তো সে…. পাগলের প্রলাপ বকতে লাগল মনটা। বিরক্তি আর বিতৃষ্ণার সবটুকু ঝাল ঝাড়তে চাইলাম আলোর ওপর। আচ্ছা, আমি কি ওর জন্যই অপেক্ষা করছি? নিজের কাছেই জানতে চাইলাম। উত্তরও এল, হ্যাঁ, ওর জন্যই তো টুকটুকে শিমুল ফুলটি হাতে করে আছি। যদি তা-ই হয়, তবে এসব ভাবছি কেন? ভাবতে তো চাই না। কিন্তু কে ভাবাচ্ছে আমাকে? আমার সমাজ সম্মান সামাজিকতা? কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। টের পাই ভেতরের তোলপাড়।

যদি তা-ই হয়, তবে কী দরকার একটা এঁটো মেয়ের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ার?

এঁটো! কিসের এঁটো? খবরদার! এসব বলবে না।

বলব, হাজার বার বলব। তোমাকে দেবার মতো কী আছে ওর?

কী নেই ওর? সবই তো আছে। ¯িœগ্ধতাভরা ছিমছাম সুতন্বী শরীর। লাবণ্যময় চেহারা। কোমর অব্দি চুল। দু-হাতের দশটি আঙুল। টানা-টানা চোখ, বাঁশের বাঁশির মতো নাক, গোলাপ-ফোটা ঠোঁট। নীরবে কাছে ডাকার মতো নির্মল আহ্বান। কী-ই? কী নেই ওর? সবই তো আছে। যা দেখে প্রেমে পড়েছি, তার সবটাই তো আছে।

সবটাই আছে?

হ্যাঁ, সবটাই আছে।

কিন্তু সতীত্ব নেই।

নিকুচি করি শালার সতীত্বের! যে-সতীত্ব শুধুই নারীর, তাকে নিকুচি করি আমি।

তাই নাকি? বড্ড সাহসী পুরুষ তো তুমি! তাহলে আলো তোমার বউ হচ্ছে। তাই তো?

বউ? পুরুষ হৃদয়ের বড়ো আবেগের শব্দ যে। এবার সত্যি-সত্যিই বড়ো রকমের ভাঙচুর শুরু হয় ভেতরে। খুব করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারি না। আর লড়তেও পারি না নিজের সঙ্গে। যুগ-যুগান্তরের যন্ত্রণা এসে হুল ফোটাতে শুরু করে সারা শরীরে, মগজের ডাইরিতে, কলিজার খাঁজে খাঁজে। এ সুযোগে সোৎসাহে কে যেন বলে ওঠে,

হুম; সফেদের সব কথাই সত্য। সত্যিই আলো ওর সঙ্গে শুয়েছিল।

সন্ধ্যা সেঁধিয়ে গেল রাতের ভেতর। ঘাসের বুকে ঢলে পড়ল নগ্ন চাঁদের জ্যোৎ¯œা। সে জ্যোৎস্নালোকে দেখলাম, কে যেন নেমে আসছে শিমুলগাছের মগডাল থেকে। শব্দ হচ্ছে সড়সড় সড়সড়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সামনে এসে দাঁড়াল একটা রাত্রিবর্ণ ছায়া। অনেকটা সফেদেরই মতো দেখতে। জন্তুর মতো করে জিভ চটকাতে চটকাতে বলল,

এভাবেই চেটে খেয়েছি ওকে। এঁটো করে দিয়েছি ওর বুক-পেট-পিঠ সব। সবটুকুই এঁটো করে দিয়েছি আমি। হা-হা…

দপ করে জ্বলে উঠল আমার চোখ দুটো। কষে একটা চড় মারতে গিয়েই ছিটকে পড়ল ফুলটা। অমনি কানে এল,

ফুলটিকে ফেলে দিলেন?

নারী কণ্ঠস্বর শুনে ঘাড় ঘেরাতেই দেখি, আমার দিকে তাকিয়ে আছে আরেকটি ছায়া। আলো, আলোই সে। ছায়ার ছদ্মবেশে এলেও, নাগিনীর মতো দেহ বাঁকিয়ে দাঁড়ালেও, চিনতে ভুল হল না তাকে। তড়িঘড়ি করে ছিটকে পড়া ফুলটি কুড়োতে গেলাম। আর তখনই কিনা, নাগিনীর মতো কোমর বাঁকিয়ে আলোর ছায়া ছোবল দিতে আসলো বুক বরাবর। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আর দেখলাম, চোখ বন্ধ করলেই পুরো পৃথিবী একক ছায়া। আড়ালে যার অদেখা আলো আছে। সেই আলো নির্বিঘেœ আমার বুকে এসে ছোবল দিকে যাক।

*************************************************

 

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
………………..
চিরদিন চাঁদের নিচে

চাঁদ একটা ফাঁদ। আমার কাছে চাঁদ বরাবরই একটা ফাঁদের মতো ব্যাপার। ছোটোবেলা থেকে জানি, সন্ধ্যাবেলা আকাশে তাকিয়ে চাঁদের পেছন পেছন দৌড়াচ্ছি, বঁড়শির ফাতনার নিচে মাছ যেমন ছুটে বেড়ায়। তারার ফুলেরা জোছনার ওপারে ঘুম যায়। আর পৃথিবীর গভীরে, আমি জাগ্রত, আমি শুধু। চাঁদ তৃষ্ণার্ত স্বপ্নময় একাকী, শীতল জলে নেমে আসে ডুবে ডুবে জল খাবে বলে।

চাঁদ একটা শূন্য। প্রকৃত অর্থে শূন্য হলো পৃথিবীর ভিত্তি। এটাই মহিষের শিং। কিংবা ঈশ্বরের একমাত্র স্তন— সুধাময়। চাঁদ সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। তবু কোনোদিন আষাঢ়ের পূর্ণিমায় সিদ্ধার্থ গৌতম ঘর ছেড়ে কোথাও পালিয়ে গিয়েছিলো, পালানোর সময় তার পিছে পিছে চাঁদও গিয়েছিলো। চাঁদ আসলে আমাদের কল্পনা। আমরা স্বভাবতই সূর্যের বিপরীতে চাঁদকে বানিয়েছি কোমল আলোর গোলক। এটাও কবিদেরই কাজ।

চাঁদ একটা পাথর। ছিন্নগর্ভ তেপান্তর হা করে থাকে চিরদিন। চাঁদ নুয়ে আছে এই মাঠের উপর। ছিন্নগর্ভ তেপান্তরের মুখ। ওইসব স্মৃতি নিয়ে তোমাদের ঘর। একটি চুল মৃত্যুর পাশে। একটি মৃত্যু আসে একটি চুলের সুতোয়। কার চুলে নদী হবে অভিমান! মৃত্যু ফিরে যাবে। নদীজলে ভিজে উঠবে রাতের উৎকণ্ঠ শিথান। বিড়ালচোখের রাত ডুবে আছে নাগরিক নর্দমায়। নর্দমার জল ক্রমে কাল-শীতে জমে আনত পাথর। খুব রাতে পুড়ে একপ্রস্থ চাঁদ আর একা বিলবোর্ড। বিলবোর্ডের দৃশ্যে ছিলো দেখা যায় শাদা, শূন্যজানলা ঘর— পাথরের।

চাঁদ একটা ছায়া। কখনো ছায়ানট বেজে ওঠে আমার শিরার ভিতর। আমি তখন বাম হাতে আকাশ থেকে আলগোছে মুছে দিই খরারাত্রির চাঁদ। তারপর ঘরের সবগুলি আলো মুছে দিই পরপর, চোখের ইশারায়। আমি গাই মনে ঘুমপাড়ানি গান, আর বুনো-চাঁদ আকাশকে ঘিরে ফেলে। আমি মূর্তিমান নৃত্যের বাহন, আমার ছায়া সম্পর্কে আমি জানি, জোছনায় আমিও ছায়াহীন। আর চাঁদ নিজেই একটা ছায়া, তাই তার ছায়া থাকে না।

*************************************************

 

আহমেদ ইউসুফ
………………..
কল্পনার নির্জন গান

মনটা উড়ছে। কে জানে কেন উড়ছে। মাঝে মধ্যেই মনটা উড়ে বেড়ায় সবর্ত্র। উড়তে উড়তে একসময় বহুদূর চলে যায়। কত দূর যায় পরিমাপ করা মুশকিল! এই উড়ামন উড়ে উড়ে কত কি যে কত কল্পনা করে! কখনো কখনো কল্পনা রাজ্যে অবিরাম উড়ে বেড়াই।

কোন এক মহামানব বলেছিলেন, জ্ঞানের চেয়ে কল্পনার দাম, গুরুত্ব বেশি। তাই কি মন উড়ছে? যত সব উদ্ভট কল্পনা করছে? কল্পনা কারা করে? অলস অকর্ম্মন্যরা? না হলে কেন তারা ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে কোটি টাকার স্বপ্ন দেখবে? কেন ঘুমুতে চাইবে করপোরেট বিলাস বহুল এপার্টমেন্টে? তবে কিছু মানুষ অসম্ভবকে সম্ভবও করেছে। কর্দপহীন মানুষ মুকুট পরে সফল হয়েছে। কত মেথর, মুচি, মুটে, ন¤্র, শুদ্র, দিনমজুরের ছেলে হয়েছে কবি, শিল্পী, গায়ক, চিত্রশিল্পী, বড় বড় নাট্যকার, নভেলিস্ট!

কত মুনি, ঋষি, নবী-রাসুল! এ ক্ষেত্রে দেবদেবী, রাক্ষস, দেবদূত, স্বর্গ, নরক যোজন যোজন এগিয়ে। কবর, হাশর, কিয়ামত কত না বিচিত্রময় নান্দনিক উদাহরণ! অথবা জান্নাতে কত না আকর্ষণময় হুরপরীদের বিচিত্র বর্ণিল বর্ণনা!

আমি কৃষকপুত্র। বাস্তবতার লাঙল জোয়াল গরু অধুনা কালের ট্রাক্টর আমাকে টানে না। আমাকে টানে রাত জেগে পাখি ধরার গল্প, আমাকে টানে বিরামপুরের ভুতপ্রেতœীর গল্প। কী করে পাশের  বাড়ির টগবগে যুবকটাকে ডাইনিভূতটা গাছ থেকে ফেরে মেরে ফেললো। অথবা আরবের জ্বিনপাহাড়-কতই না মহাবিস্ময়কর! পিরামিডের স্ফীংসরা আমােেক নিয়ে যায় দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তরেÑ যেখানে নেই জনমানব, নেই কোন প্রযুক্তির ছোয়া… নিশিথিনী ডাকিনী ডাকছেÑ আর আমি মরিচীকার বিভ্রমে ছুটছি মায়াবী কুহকে…

নবী মুহাম্মদ এর মিরাজ আমাকে অধিক টানে। আহা যদি পেতাম বোররাক, রফরফ! যদিও আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বহুদূর এগিয়েছে কিন্তু পয়গম্বর মুসা এর আজদাহা, সুলায়মান এর বাতাসে উড়ে বেড়ানো তক্তার সিংহাসন কিংবা আংটির কেরামতি; কিংবা দুর্গা-লক্ষ্মীর বাহন, গণেশের মা দর্শনই বিশ্বদর্শন এবং  মুহাম্মদ এর জিবরাইলের ডানায় এত কিছু দর্শন.. এখন কি সম্ভব? হ্যাঁ, লোকে মঙ্গলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাচ্ছে মহাকাশের দূর যাত্রায়… জানি একবার রকেট গিয়েছিল চাঁদের বুকে… কিন্তু আর কই? আর কই? প্রযুক্তি তো কত এগিয়ে গেল!

মনটা উড়ছে আজÑ বলেছি  সূচনাতেই। কেন উড়ছে, কি ভাবছে সে? আজকের কল্পবিজ্ঞান কি আমাকেও সেদিকে টানছে? আসিমভ, জাফর ইকবাল, মার্ক টোয়েনরা কি ডাকিনীর কুহকে ডাকছে?

কী ব্যর্থতা আমার? কাকে চেয়ে কাকে পাই নি? কিংবা চাঁদনীরাতের  আলোয় নিমগাছ হবার স্বপ্নটা? যেখান দিয়ে শাহ নন্দিনী বেরিয়ে যেত অন্য যুবকের অভিসারে! বরং আজকে হে মন, তুমি চলো চাঁদের দেশে, চাঁদের আলোয় পেঁপের ছায়ায় ধরো কল্পরাজ্যের ভবঘুরে জীবন।

মাঝে মাঝে  পাভেল হতে চাই। মাঝে মাঝে হতে চাই কবি নিতাই; হায়, জীবন এত ছোট্ট কেনে? হতে চাই কপিলাও, মাঝি, আমারে নিবে? হতভাগ্য সিরাজদৌলা হলে মন্দ হত নাÑ বিট্রিশদের কুটিলতা, ক্রুরতা দেখা যেত অথবা দেখা যেত মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা! আচ্ছা সাদ্দামের ফাঁসির দড়ি যদি ঝুলত গলায়? বুশ-ব্লেয়ারের মহাশয়তানি কি দেখতে পেতাম! অথবা পঁচিশে কালরাত্রি? দারফুর সুদান হলে কেমন হত? অথবা নির্যাতিত রোহিঙ্গা…তবে কি বুঝতে পারতাম সুচির বিভৎসতা! মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনানন্দের করুণ কমলা লেবু হলে কেমন হয়? জানি এত কিছু অতিক্রম করে একদা নোবেল লরিয়েট হতে চেয়েছিলাম; লিখতে চেয়েছিলাম দ্যা ওয়াস্ট ল্যান্ড কিংবা ডা. জিগাভো, আন্না কারেনিনা। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি কেন লিখতে চাইনি, তা জানি না, তবে যৌবনে প্রচ- ভালোবেসেছিলাম সুরবালা, হৈমন্তী, পাগলা মেহের… এখন তো না হতে পেরেছি শেকসপীয়ার, না কীটস, না হতে পেরেছি কালিদাস! না হতে পেরেছি পাড়ার কবি! কবিতার হয়ে মাঝে মাঝে বাঁকুম বাঁকুম ডাকছি…

ভাবছি এবার কল্পরাজ্যের চাঁদ হবো। চাঁদের আলোয় খাবো পেঁপের ছায়া.. ও ভোর, নদী, শাহ নন্দিনী ও অন্যান্য!

আমার চাঁদের আলোয় কি হবে অমৃতভাসানের বেহুলা? অর্ফিয়ুসের বাঁশি? দিওয়ানে মদিনা? হয়ে  যাবে খাদিজার গল্প? যত স্বপ্ন কর্পূর হয়ে গেছে ততই স্বপ্ন পুনর্জীবিত হবে জ্যাক দেরিদার বিনির্মাণে… তারপর লিখে ফেলবো সেই অমর কবিতা শেষ পংক্তি :

শেষ শীতরজনীর উষ্ণ কাঁথা ও বালিশে

স্বর্গের অমৃত সঙ্গমের ঠোঁটে পাবে…

*************************************************

 

সুবিনয় শাফাত
……………..
ছায়া, আবছায়া মিল

প্রজন্মের সুপ্ত লালসা তখনো আমাদের গোগ্রাসে গ্রাস করেনি। তাইতো তখনো আমরা ছায়ার পেছনে ছুটি। উন্মাদের মতো ছুটি। কী এক অস্থিরতা! কী এক বিষণœতা আমাদের ভেতরে থেকে ক্রমাগত অবশ করে। আমরা তখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা। তখনো ছোটাছুটি করি পাগলের মতো। কোরাসে গান গাই সমস্বরে। দলবেধে উচ্চস্বরে গান গাই। কই? তখনো আমাদের অস্থিরতা স্থির হয় না। বিষণœতা বিলীন হয় না। অবশ হওয়া পাঁজর তখনো সক্রিয় হয় কই?। তবুও আমরা ছুটি, পাগলের মতো ছুটি!

বিকেলে ছুটি! দলবেধে ছুট দেই। ফার্মহাউজে যাই। সবুজ ধানের শীষের দিকে তাকিয়ে থাকি নিষ্পলক। কখনো ঝরা বা অঝরা সাদা ফুলের দিকে এক ধ্যানদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ নিই। লাল রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ডিপটিওবয়েলের নির্মল জল ড্রেন থেকে হাতে তুলি। জলকে হাতের এপিট-ওপিট করি। পান করি নির্দ্বিধায়। তবুও আমরা সাবেকী মানসিকতা নিয়ে পুনরায় হাঁটা শুরু করি শ্মশানের দেয়াল ঘেঁষে। শ্মশানের নিথর নিস্তব্ধতার সাথে মিল খোঁজাবার চেষ্টা করি। দেয়ালিকা  লিখন, অমর অমর বাণী পড়ি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু মনোযোগ ঠিক অমর বাণীর কাছে থাকে না। শ্মশানচারী সন্ন্যাসীর মতো নিরবতাকেই বেশি পড়ি আমরা। নিরবতাকে বেশি বুুঝবার, অবলোকন করবার চেষ্টা করি। পাই, কী যেনো একটা খুঁজে পাই। কোথায় যেনো একটা  প্রশান্তির ছোয়া পাই। দেয়ালিকা পড়া শেষ হয়। তবুও আমরা পড়ি। নিস্তব্ধ নিথর নিরবতাকে পড়ি। পড়ি আর দুুপুরে পোড়ানো তরতাজা মানুষের ছাই উড়ে যেতে দেখি ঘুর্র্ণি বায়ুতে। খুলি হাড় হাড্ডি সব ভস্ম হয়ে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে পরে চন্দনার জলে।

হায় চন্দনা! সেই চন্দনা। কোন এক ভরা যৌবনে এই চন্দনাকে জন্ম দিয়েছিল পদ্মা। কিন্তু আজ! আজকের এই চন্দনাকে দেখে কে বলবে যে এ চিরযৌবনমতী পদ্মার কন্যাসম। এও একদিন পূর্ণযৌবনা ছিল। করুণামতী মলিন চন্দনাকে দেখে বোঝার কোনো সূত্রই আজ আর অবশিষ্ট নেই। শ্মশানের বটবৃক্ষের আবছায়া আর আমাদের অবসন্ন ছায়ার সাথে মিলিয়ে প্রশান্তির আশ্রয় খুঁজি। মিল পাই। কোথায়? মনের কোণের কোন এক কোণায় মিলাই। তাতে আমাদের অবসন্ন গ্রস্ততা কমে কই? ঠিক তখনো আমাদের উপলব্ধিতে আসে না।

আবারও আমরা হাঁটা শুরু করি দলবেধে। শুকনা নর্দমাক্ত চন্দনার দিকে তাকাই আর ভাবি। কাদাপানি আর আর্বজনা নিয়েই তো চন্দনা বয়ে চলে বছরের পর বছর। তবু তো নিরাভিমান চন্দনা মাতৃ¯্রােতরূপে বয়ে চলে। ভাবি যেনো মাতৃ¯েœহের প্রতি এক টুকরো বিষাদমান আবছায়া নিয়ে চন্দনাও সুদূরগামী হয়। অবগাহনের সুদূর প্রত্যাশী হয়ে। আর তখনো চন্দনার দুকূলে নরম কাদার উপর জন্মানো কচুরিপানা ফুলও অজানা সুভাস ছড়ায়। শনশন নিঃশব্দ নিয়ে কচুরিপানার ফুলও ভেজা আর্দ্রতা দিতে চায় শুকনো সরু চন্দনাকে। তাইতো সে ছায়া দেয় চন্দনার বুকে ঢলে পরা দিনের অস্তগামী সূর্যের শেষ মুহূর্তেও। আমরা নিশ্চুপ হাঁটি আর তাকিয়ে দেখি সরু চন্দনার বাঁক নেওয়া পর্যন্ত। চারিদিক থেকে ততক্ষণে মাগরিবের আজানের করুণ সুর আমাদের কর্ণকুহরে তীর বেগে ছিদ্র করে। আজানের করুণ সুর শ্রবণ করতে করতে আমরা হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়াই চন্দনার বুকে পোতা কাঠের ব্রিজের উপর। সন্ধ্যায় মানুষের বাড়ি ফেরার ভিড় থেকে অনেকটা দূরে। তখনো আমরা করুণামতী চন্দনার দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকিয়ে থাকি আর গান গাই। দলবেধে সমস্বরে, আবার দলবেধে উচ্চস্বরে গান গাই। ‘পদ্মার ঢেউ রে, আমার শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা…’।

*************************************************

 

শেষ পাতার আহ্বান
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না…

কতোদিন জবা-জুঁই আর বকুলের পাশে কামিনী বা শিউলিকে রেখেছি। ওরা বিলিয়ে সব করে রব— সকলের তরে। আর অনেক মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ আছেন— যারা তাদের আলাদা করে গ্রহণ করেন। কারণ, তাঁরাও যে ওদের গোত্রীয়! তাই ঘুম হয় না এমন মানুষদের। এই নির্ঘুম কাতরের এখনকার ধারার নতুন বন্ধু কারা? লিখুন তারা এ সময়ে, এমন নির্ঘুম বাসনা নিয়ে, আগামী সংখ্যায়…

 

পরবর্তী সংখ্যায়
ই-যোগাযোগ : shiqbal70@gmail.com
ফোন : ০১৭৩৭-৩৫৪৬৮৪, ০১৭২৮-৭৬৫০১৩
এ বিষয়ে লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ৩০ জুন ২০১৯

*************************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা