67089695_1205629756286621_1569702463835996160_o

ধা রা বা হি ক র চ না

আত্মকথা ……………………………………….

হোসেনউদ্দীন হোসেন (জ. ১৯৪১)

লেখক হোসেনউদ্দীন হোসেন। একাত্তরের রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা। থাকেন যশোরের ঝিকরগাছার কৃষ্ণনগর গ্রামে। লেখালেখি তার প্যাশন। তিনখ-ের বাংলার বিদ্রোহ কিংবা রণাঙ্গণে একাত্তর নামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতাড়িত গ্রন্থ ছাড়াও লিখেছেন কবি আহসান হাবীব বা টলস্তয়-ভলতেয়ারের মতো বিশ্বসাহিত্যের গুণী লেখকদের নিয়ে নানা আয়তনের গ্রন্থ। ভ্রমণপিয়াসী এ লেখক ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেক দেশ। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি তার কাছে স্মৃতিমুদ্রার এক এপিক আখ্যান। প্রচারবিমুখ, নির্লোভ, স্বার্থত্যাগী, নিরহংকারী এ মানুষটির গল্প-উপন্যাস-কবিতার হাতও প্রশংসনীয়। এই দুর্মুখ সমাজে ব্যতিক্রমী এ মানুষটি এখন প্রায়— আনন্দময়রূপে ‘একা’। তাঁর জীবন-অধ্যায়ের বিচিত্র অভিজ্ঞতার সুলুকসন্ধান— ধারাবাহিক এ অংশে বয়ান করে চলেছেন। লেখাটি সমাজ-ইতিহাসের অনুধ্যানসূচক বলে মনে করা যায়।(সম্পা.)

ধুলায় ধূসর-৫

তুবন সাহেব আবার তুবন ম-ল হলেন। ছিলেন হেনরী মেকেঞ্জির একান্ত সহচর। ১৮৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮৬০ সালের জুন পর্যন্ত হেনরী মেকেঞ্জির কুঠিবাড়িতে তিনি ভুলেও পদার্পণ করেনেনি। বিদ্রোহের কালটি তিনি রাইয়তদের সাঙ্গে কাটিয়েছেন। সনাতনের  আমবাগানে বসে বিদ্রোহীদের সাহস ও শক্তি জোগায়েছেন। লাঠিয়াল বাহিনী, সোড়কি বাহিনী, বল্লম বাহিনী উপযুক্তভাবে গড়ে তুলেছেন। সেই সময় তার নেতৃত্বের প্রতি সকলেই ছিলেন আস্থাশীল। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষেকে সহজভাবে গ্রহণ করা। কাউকে তিনি ছোটবলে ভাবতেন না। যার যে গুণ আছে— সেই গুণকে কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহিত করতেন। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থাও করতেন।  কোনো ব্যক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেন না। সকলকে সমমর্যাদা দিতেন।

বিদ্রোহের পরবর্তীকালে তুবন সাহেব এলাকার যুবকদের লাঠিখেলা, সড়কি-বল্লম খেলা  এবং মল্লখেলা অব্যহত রেখেছিলেন। প্রতিবছর পয়লা ফাল্গুনে সাড়ম্বরে খেলোয়াদের মধ্যে প্রতিযোগীতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। আশেপাশের গ্রাম থেকেও প্রতিযোগীরা এসে অংশগ্রহণ করত। পাঁচদিন ধরে চলত উৎসব। উৎসব শেষে দক্ষ খেলোয়াড়দের তিনি উপঢৌকন দিতেন এবং শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের বিভিন্ন উপাধিতে বিভূষিত করতেন। উৎসবটি হয়ে উঠেছিল আকষর্ণীয়। হাজার হাজার লোক এই উৎসব দেখতে হাজির হত। উৎসবের খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কলকাতা থেকেও বাবুরা বজরায় নৌপথে এখনে এসে খেলাটা দর্শন করে যেতেন। একটা আনন্দ-উল্লাসের মেলায় পারিণত হয়ে উঠেছিল।

বাংলার রাইয়তরা কখনো দুবর্ল শক্তিহীন ছিল না। সুন্দর সুগঠিত শরীর, কর্মে দক্ষ বাঙালি যুবকরা ছিল অসীম সাহসী। শোষণ আর নির্যাতনের যাঁতাকলে ফেলে তাদেরকে শক্তিহীন করে রাখা হয়েছিল। পূর্বপুরুষেরাও ছিল বলবান ও প্রাণবান। তাদের সেই শরীরের রক্তধারা বিদেশী বেনিয়ারা নির্যাতনের মাধ্যমে খর্ব করে দেয়। বাঙালি পরিচয় হয়ে ওঠে ভীরু কাপুুরুষ ও ভোতা বাঙালি।

সেই বাঙালিদের মধ্যে তুবন ম-ল নতুন প্রাণসঞ্চার করলেন। তিনি বুঝেছিলেন, বাঙালিরা প্রাণহীন হয়ে উঠেছে। বলহীন হয়ে উঠেছে। তেজহীন হয়ে উঠেছে। তাদের জীবনে কোনো উৎসাহ ও উদ্দীপনা নেই। খেলার প্রবর্তন করে তিনি দুশমনের মোকাবেলা করতে হাতে তুলে দিলেন বাঁশের লাঠি, বাঁশের সড়কি, লোহার বল্লম এবং  বেঁতের ঢাল। দেশীয় কায়দায় রণকৌশলে পটু করে তুললেন। বীর বাঙালি হয়ে উঠল যোদ্ধা বাঙালি।

উৎসবের প্রতিবছর নতুন নতুন খেলার সংযোগ করলেন তুবন ম-ল। তলোয়ার খেলা, হা-ডু-ডু খেলা এবং অতীতকালে বাঙালিরা যে সকল খেলা প্রচলন করেছিল, সেইসকল খেলা পুনরায় তিনি চালু করে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।

বীরত্বে-মহত্বে এবং উদারতায় তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা ছিল সকলেরই অনুকরণীয় তাঁর দেখাদেখি এই অঞ্চলের বহু গ্রামের বহু যুবক শরীরচর্চায় যেমন মনোযোগী হয়ে উঠেছিল, তেমনি বিভিন্ন দেশীয় খেলায় হয়ে উঠেছিল সুদক্ষ।

হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সখ্য ও সুসম্পর্ক। কৌলিন্য প্রথা সমাজে যদিও বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তিনি এই প্রথা কখনো মান্য করেননি। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে কর্মজীবী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কর্মজীবী ব্যক্তিগণকে সমভাবে মর্যদাবান বলে মনে করতেন। কোনো সম্প্রদায়গত ভেদবুদ্ধি দ্বারা নিজেকে কখনো পরিচালিত করনেনি। তার বন্ধুসূলভ আচরণের কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন প্রীতির চোখে দেখতেন, তেমনি মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে আপনজন বলে সম্মান জানাতেন। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন উদারচেতা সমাজহিতৈষী সমাজপতি। তাই তিনি উভয় সম্প্রদায়ের যুবকদের নিয়ে গ্রাম্য মেলার প্রবর্তন করে গ্রাম-সমাজে নতুন আন্দোলন সৃষ্টি করেন। এই আন্দোলন ছিল শক্তিচর্চার আন্দোলন। এই আন্দোলন ছিল নিপীড়িত জনগনের ঐক্যের আন্দোলন, শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আন্দোলন। এই আন্দোলনের মধ্যে ছিল না কোনো মুসলিম মাহাত্ম্যের প্রকাশ এবং ছিল না কোনো হিন্দুমাহাত্ম্যের প্রকাশ। কোনো রাজনৈতিক দর্শন ও কোনো ধর্মীয় ভাবাদর্শ এই জাগরণের মধ্যে তিল পরিমাণ ছিল না।

শুধু এই অঞ্চলে নয়— বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এই জাগরণের উত্থান হয়েছিল। শুরু হয়েছিল শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশীয় লাঠিয়াল বাহিনী, সড়কি বাহিনীর এবং বল্লম বাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে শোষক জমিদার, শোষক মহাজন, শোষক শাসকবৃন্দের শক্তি নড়বড়ে হয়ে উঠেছিল। তারা এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য যে রাস্তা তৈরি করেছিল— সেই রাস্তাটির নাম, ‘বিভেদ তৈরির রাস্তা’। ইংরেজরাই শাসনের উদ্দেশ্যে এই কূটকৌশল প্রয়োগ করেছিল।

বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জমিদাররা প্রজার উপর এক নতুনমাত্রার জুলুম প্রবর্তন করে। এই জুলুম ছিল খাজনাবৃদ্ধির জুলুম। উনিশ শতকের চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকগুলোতে বিশেষ করে সিপাহী বিদ্রোহের পর (১৮৫৭-৫৯) ভূমিজরিপ ও কর নির্ধারণের কাজ শেষ হওয়ার ফলে রাইয়তদের ব্যক্তিগত ভূমিমালিকানার অধিকার দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত ভূমি মালিকানা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় পণ্য বনাম মুদ্রা সম্পর্ক উন্নয়নে। এইভাবে জমি পণ্য হিসাবে গণ্য হলে জমির মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়। তখন এদেশীয় বণিক মহাজন ও সামন্তরা তাদের সঞ্চিত অর্থলগ্নি করা শুরু করে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে। আস্তে আস্তে জমি হয়ে ওঠে মহাজনদের নিকট ঋণ প্রদানের বিনিময়ে একটা অর্থ আয়ের ক্ষেত্র। পরবর্তী কালে জমি বন্ধকী রাখার মাধ্যমে বণিক, মহাজন ও সামন্ত ভূস্বামীরা কৃষকদের জমি দখল করতে সমর্থ হয়। কৃষকরা নিজক্ষেতের মালিকানা সেই জমিই চাষাবাদ করত এবং প্রজা হিসাবে করাভাবে জর্জরিত হত।

কৃষকরা বিদ্রোহ শুরু করলে সরকার প্রবর্তন করে ‘দশম আইন’। এই আইনেও চাষীদের কোনো উপকার হয়নি বরং অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। শোষণের ক্ষেত্র শুধু নীল চাষ ছিল না— ছিল জমিদার-মহাজনদের বেআইনি খাজনা আদায়ও। বিদেশী ইংরেজদের মূল সমর্থক ছিলেন জমিদার-মহাজন শ্রেণি। এই সকল সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির ব্যক্তিগণ কৃষক-বিদ্রোহকে নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে ভিন্নপথে এই আন্দোলনটি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। কৃষক-বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিল কৃষকরা। কেউ তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেনি— বরং নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ হয় এবং সংগ্রাম পরিচালনা করে। হিন্দু-মুসলিম কৃষকের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। মূলমন্ত্র ছিল কৃষক মুক্তি। এ সম্পর্কে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেন :

বাংলাদেশ তার কৃষককূল সম্পর্কে গর্ববোধ করতে পারে … … শক্তি নেই, অর্থ নেই, রাজনৈতিক জ্ঞান নেই, এমন কি নেতৃত্ব নেই, তবুও বাঙলার কৃষকরা এমন একটি বিপ্লব সংঘটিত করতে পেরেছে যাকে অন্যদেশের বিপ্লবের থেকে কি ব্যাপকতায়, কি গুরুত্ব কোনোদিক থেকেই নিকৃষ্ট বলা চলেনা।

এই বিদ্রোহকে নিষ্ক্রীয় করার জন্য ‘কমিশন’ গঠন করতে হয়েছিল। বিশেষ করে ইংরেজ ও তাদের দেশীয় সমর্থকরা ভীত হয়ে ওঠেন, কৃষকদের সঙ্ঘবদ্ধ যুদ্ধংদেহী সাহসী ভূমিকা দেখে বাইরের কোনে অস্ত্র নয়— তদের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, বন্দুক-কামান নয়— বাঁশের লাঠি, সড়কি, বল্লম, তীর-ধনুক, ইটপাটকেল, কাঁচাবেল, ভাতের থালা, পোড়ামাটির বাসন। বাঙালি মেয়েরাও অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। শপথ নিয়েছিল হয় জিতব, নয় মরব।

এই বিদ্রোহে কোনো জাতপাত ছিল না। সকলেই ছিলেন একটি জাত-চাষা। কোনো বর্গবর্ণ ছিল না। উঁচুনিচু ছিল না। পরিচয় ছিল বাংলার চাষা। যে অস্ত্র তারা তৈরি করেছিল, এই অস্ত্র ছিল পূর্বপুুরুষের ব্যবহৃত অস্ত্র। এটাই ছিল বাংলায় কৃষকদের প্রথম জাতীয় জাগরণ ও গণবিদ্রোহ। এই জাগরণের মূলমন্ত্র ছিল আমরা বাংলার কৃষক। আমরা ভিনদেশী নয়— আমরা বাংলার মাটির সন্তান। এই ভূমি অন্য কারো নয়— এই ভূমি বাংলার চাষার। আমরা আমাদের ভূমির অধিকার চাই। শুধু অধিকার নয়— রক্ষা করারও দায়িত্ব রয়েছে বাঙালি কৃষকদের। রক্ষা করার জন্য অস্ত্র একান্ত আবশ্যক। এই দার্শনিক বোধ নিয়ে তুবন ম-ল গ্রাম্য মেলার আয়োজন করেন।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়য়ার্ধে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ নাম ব্যবহার করে হিন্দু শিক্ষিত অভিজাতরা ‘কলকাতাকেন্দ্রিক চৈত্রমেলা’ বা হিন্দুমেলা প্রবর্তন করেন, কিন্তু তা তুবন ম-লের মেলার মত হয়ে ওঠেনি।

১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২ এপ্রিল (বাংলা ১২৭৩ সালের চৈত্র-সংক্রান্তির দিন) এই মেলার প্রথম অধিবেশন হয় বেলগাছিয়া ভিলায়। উদ্দেশ্য ছিল স্বজাতীয়দের মধ্যে সুসম্পর্ক রক্ষা ও স্বদেশীয় ব্যক্তিগণকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বদেশের উন্নতিসাধন করা।

লক্ষ্যযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই যে, ‘স্বদেশীয় ব্যক্তিগণ’ বলতে এই মেলার প্রবর্তকবৃন্দ মনে করতেন ‘হিন্দু মহোদয়গণ’ এবং ‘জাতীয়তাবাদ’ বলতে মনে করতেন ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ নয়। অর্থাৎ যারা হিন্দু অভিজাত সম্প্রদায়ের লোক, তারাই ছিলেন এই মেলার আয়োজক। মেলার উদ্দেশ্য প্রচারের জন্য একটি জাতীয় সভার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। হিন্দু মেলায়ও বাংলার প্রাচীন সৌর্য ও বীর্যের স্মৃতি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। লাঠি খেলা, তলোয়ার  খেলা, শরীর চর্চার প্রদশর্নী এবং স্বদেশী পণ্যজাত ব্যবহার সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়ে জনগণকে দেশত্মবোধে উদ্বুুদ্ধ করা হলেও জনগণ উদ্বুদ্ধ হয়নি। এই মেলা ছিল হিন্দুদেরকে জাগিয়ে তোলার জন্য। বরং এই মেলা যে ক্ষতিসাধন করেছিল, তাতে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দেয়। হিন্দু অভিজাতরা ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’ এবং মুসলিম অভিজাতরা ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ তৈরি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই স্বদেশী আন্দোলনের মধ্যে বিদ্যমান ছিল বিদেশীয় চিন্তার প্রভাব ও কুটকৌশল।

এই মেলা সম্পর্কে সেই আমলেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তাঁর স্মৃতি কথায় উল্লেখ করেছেন :

আমি চিরকাল স্বদেশী। বিদেশী পোষাক-পরিচ্ছদ, ভাবভাষা আমার দু’চোক্ষের বালাই। এই জন্যে অনেক সময়ে আমার আত্মীয়দের সঙ্গে আমার মতের বিরোধ হইয়াছে, স্ত্রী স্বাধীনতা আমি অপছন্দ করিনা, কিন্তু আমার বরাবর ভয় হয় পাছে কিছু বাড়াবাড়ি হইয়া যায়। আমি গোড়া থেকেই স্বদেশী কালচার ধরিয়া বসিয়া আছি, ঘরের মধ্যে আছি। … … কখনো আমি বাড়ির বাহিরে কোন বড় কাজ করিতে পারিলাম না। বক্তৃতা দিলাম কিন্তু কাহারও মন ভিজিল না। দেখ, এরকম স্বদেশী আমাদের দেশের ফ্যাশান হইয়াছিল কিন্তু তাহার মধ্যে একটা বিলাতী গন্ধ ছিল। রঙ্গলালই বল, আর রাজনারায়ণ বাবুই বল, তাঁহাদের চধঃৎরঃরংস-এর বারো আনা বিলাতী, চার আনা দেশী। ইংরেজ যেমন চধঃৎরড়ঃ আমিও সেই রকম চধঃৎরড়ঃ হব এই ভাবটা তাদের মনে খুব ছিল। বল দেখি, আমি তোমার মত চধঃৎরড়ঃ হইব কেন? আমি আমার মত চধঃৎরড়ঃ হইতে না পরিলে কি হইল।

তিনি বিষয়টির মধ্যে দেশাত্মবোধ খুঁজে পাননি। আদতে ইংরেজদের তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে মেলায় যে বিদেশী কালচার আমদানী করেছিলেন তা স্পষ্ট করে বলেছেন :

নবগোপাল একটা ন্যাশনাল ধূয়া তুলিল, আমি আগাগোড়া তার মধ্যে ছিলাম। সে খুব করিতে পারিত, কুস্তি, জিমন্যাস্টিক প্রভৃতি প্রচলন করার চেষ্টা তার খুব ছিল। কিন্তু কি রকম হওয়া উচিৎ সেসব পরামর্শ আমার কাছ থেকে লইত। একটা মেলা বসইবার কথা বলিল, তাঁতি-কামার-কুমোর ইত্যাদি লইয়া। আমি বলিলাম— ওসব তো দেশের সকলের জানা আছে; দেশী চধরহঃরহম দেখাইতে পারো? মেলার ক্ষেত্রে গিয়া দেখি, প্রকা- ছবি, খাটানীয়ার সম্মুখে ভারতবাসী হাত জোড় করিয়া বসিয়া আছে। আমি বলিলাম— উল্টে রাখ, উল্টে রাখ, এই তুমি দেশী চধরহঃরহম করাইছ? আর আমাদের ন্যাশনাল মেলায় এই ছবি টাঙাইয়াছ? ছবিখানি সরাইয়া উল্টাইয়া রাখা হইল। তাঁর ঝোঁক ছিল, বড়বড় ইংরেজকে নিয়ন্ত্রণ করা। আমি অনেক কহিয়া তাহাকে নির্বৃত্ত করিলাম— (মনোমোহন বসু— ধীরেন্দ্রনাথ ঘোষ, ভারতবর্ষ, ১৮শ বর্ষ, ২য় খ-, ২য় সংখ্যা, ১৩৩৭ বাংলা, পৃ. ৩০৮)।

তুলনামূলকভাবে বলা যায় যে, তুবন ম-ল যে গ্রাম্য মেলা প্রবর্তন করেন, তার মধ্যে ছিল খাঁটি বাঙালিয়ানা। ছিল ঐতিহ্য, ছিল দেশীয় প্রাণমাতানো গন্ধ এবং বাংলার শক্তিসাধনার প্রাণবন্ত চেতনা। সা¯প্রদায়িকতার বীজ এই মেলার মধ্যে নিহিত ছিল না। ছিল মেহনতী মানুষের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বসূলভ বন্ধন। ঢাকের আওয়াজে যে সুরমূর্ছনা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত, তাতে আনন্দে আমোদিত হয়ে উঠত এই দিগরের জনগণ। সেখানে ইংরেজিয়ানার কোনো রকম প্রভাব ছিল না।

অভিজাত হিন্দু সম্প্রদায়ের মত মুসলমান অভিজাতরাও পাল্টাপাল্টি ধর্মীয় লেবাস পরিয়ে মুসলিম সংগঠন তৈরি করে। ফলে বাংলায় বাঙালি সমাজে একটা বিতিকিচ্ছি অবস্থা সৃষ্টি হয়। একদিকে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে ‘হিন্দুকালচার’, অপরদিকে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে ‘মুসলিম-কালচার’। বাঙালি ঐতিহ্য ও সৃষ্টি নিয়ে উভয় সম্প্রদায়ের অভিজাতদের কোনো চিন্তা-চেতনা ছিল না। উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষক, কামার, কুমার, ছুতোর, তন্তুবায়, জেলে, মালো এবং অন্যান্য নিম্ন শ্রেণির অধিবাসীদের মধ্যে যে একটা লোক পরম্পরায় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এই সংস্কৃতিকে উভয় সম্পদায়ের অভিজাতরা কখনো নিজেদের সংস্কৃতি বলে মেনে নেননি। সংস্কৃতি বলতে তারা মনে করতেন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। লৌকিক সংস্কৃতিকে তারা কোনোকালেই আমলে আনেননি। বরং ঘৃণা করতেন। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর মুসলমান অভিজাতরা তাদের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন তার মধ্যে ছিল নবাব আব্দুল লতিফের ‘মোহামেডান লিটারারী সোসাইটি’ (১৮৬৩) আমির আলী খান বাহাদুরের ‘ন্যাশনাল মোহামেডান এসোসিয়েশন অব ক্যালকাটা’ (১৮৬৪), ‘ইন্ডিয়ান লিগ’ (১৮৭৫), এবং ‘সেন্ট্রাল মোহামেডান এসোসিয়েশন’ (১৮৭৬)। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে উৎপাদক শ্রেণির কোনো সম্পর্ক ছিল না। এমন কি তারা জানতও না অভিজাতদের কোনো কার্য ও উদ্দেশ্যের খবর। কর্মজীবী উৎপাদকদের ভাগ্য ও জীবনব্যবস্থা নিয়ে তাদের কোনো আন্দোলনও ছিল না। দুই ধর্মের মধ্যে কোন্ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এটাই নিয়েই ফ্যাসাদ ও বচসা সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব আরো পাকাপোক্ত করেছেন।

এদেশে আবহমানকাল থেকে চালু রয়েছে কৃষি-সংস্কৃতি। অর্থনীতি গড়ে উঠেছে ভূমি ও কৃষি উৎপাদনের মাধ্যমে। ধর্ম কখনো উৎপাদনের সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠেনি। মানুষের জীবনভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল কৃষি-সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি নিয়ে ইংরেজ আমলের অভিজাতদের সামান্যতম বোধশক্তি ছিল না। এই ভাবনাটাকে সমূলে উচ্ছেদ করার জন্য ধর্মীয় জিগির তোলা ছাড়া তাদের কর্মকা-ের মধ্যে আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই ধর্ম নিয়ে উভয়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল এবং এই ঠেলাঠেলি শেষ পর্যন্ত গ্রাম-সমাজটাকেও ভেঙ্গে দিয়েছিল। এমন একটা ধর্মীয় মনোভাব সৃষ্টি করে দেওয়া হয়ে যে, এই কর্মের নেতৃত্বে আছে কারা? হিন্দু না মুসলমান? উভয় সম্প্রদায়ের যৌথভাবে মিলেমিশে কোনো কর্মকা- বা অনুষ্ঠান করাও ছিল বিপজ্জনক।

তুবন ম-ল এবং তার সহযোগিরা গ্রামবাংলার হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে অস¯প্রদায়িক প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলে বাৎসরিক ক্রীড়ার আয়োজন করেছিলেন, এটাকেও শেষ পর্যন্ত মতলববাজরা কুনজরে দেখতে শুরু করেন। ইংরেজরা দেখতেন বাঙালি-জাতীয়তার শক্তিসঞ্চয়ের উন্মোচন, ভবিষ্যত-বিপ্লবের সূচনা ও জাগরণের পূর্বাভাসের লক্ষণ ও মুক্তিআন্দোলনের বিকশিত রূপ এবং ঔপনিবেশিক শক্তিকে প্রতিহত করার মহড়া। ধর্মবিদরা দেখতেন হিন্দু শক্তি বড়, না মুসলিম শক্তি বড়। ব্রিটিশের পর কোন শক্তি ক্ষমতায় আসীন হবে অর্থাৎ মূল লক্ষ ছিল পৃথক পৃথকভাবে ধর্মচেতনাকে উজ্জীবিত করে ধর্মের পতাকা উড্ডয়ন করা। হিন্দু-মুসলিমের মিলিত সমাজ। একমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বৈবাহিক পদ্ধতি বাদে সবকিছু ছিল এক রকম। এমন কি বেশভূষাও ছিল একই রকম। গ্রাম-পঞ্চায়েতে কে মুসলিম, কে হিন্দু এটা নিয়ে বাকবিত-া ছিল না। ম-ল মানে গ্রামের ম-ল। জনবসতির ম-ল। অকালের ম-ল। তিনিই সর্বেসর্বা। তার নেতৃত্বের প্রতি ছিল প্রজা-সাধারণের আস্থা। সেই সমাজব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবুও তুবন ম-লদের প্রতি রয়েছে বর্তমান আস্থা। ধর্মবিদরা ধর্মে ধর্মে ভাগ করলেও গ্রামসমাজটা তেমনিই রয়েছে। তুবন ম-লের গ্রাম-সংস্কৃতির মধ্যে ধর্মের কোনো জিগির না-থাকায় গ্রামের এই উৎসবটা আরো জমজমাট হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েক বছরের মধ্যে বারোয়ারি মেলায় পরিণত হয়ে উঠেছে এই অনুষ্ঠানটি। না-আছে এই মেলায় কোনো হিন্দুয়ানি গন্ধ, না-আছে মুসলমানি গন্ধ। খ্রিস্টান সাহেবদের ও শাসকদের তুষ্ট করার কোনো আয়োজন নেই। এই মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল লাঠি, তলোয়ার, সড়কি, বল্লম ও কুস্তি প্রদর্শনী। হাজার হাজার মানুষ এই প্রদর্শনী উপভোগ করত। চারদিকে প্রচার হয়ে গিয়েছিল ‘বাঙালির খেলা’ বলে। সবচেয়ে দর্শনীয় খেলা ছিল ঢাল, তলোয়ার ও সড়কি খেলা। এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে সমবেত হয়ে লড়াই করছে, এই দৃশ্য দেখে জনগণ উল্লাসে ফেটে পড়ত।

বাঙালির সংস্কৃতির এই উৎসবটি তুবন ম-ল বেশিদিন চালু রাখতে পারেননি। মাত্র এই উৎসবটির বয়স হয়েছিল পনেরো বছর। ১৮৭৮ সালে ভাইসরয় লিটন (১৮৭০-৮০) একটি আইন জারি করেন। এই আইনটি ছিল ভারতীয় অস্ত্র আইন বিধি। এই বিধি অনুসারে ভারতীয়রা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্যে দেশীয় অস্ত্র রাখার অধিকার হারায়। অতএব ভীতির কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে এই যুদ্ধযুদ্ধ খেলার উৎসবটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে ক’বছর এই মেলাটি চালু ছিল, স্থানীয় জনগণের মধ্যে একটা জাগরণও দেখা দিয়েছিল। অনেকেই এই উৎসবটিকে ‘তুবন ম-লের মেলা’ বলে অভিহিত করেছিল।

যে আমলের কথা বলছি, ওই আমলটি (১৮৭০-১৮৮০) ছিল একটি ক্রান্তির আমল। ওই সময়ে বাংলায় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীদের বামপন্থী অংশ গণআন্দোলনের ডাক দেয়। ব্রিটিশ শাসকরা এই আন্দোলনকে অশুভ-চক্রান্ত বলে মনে করে। এ সম্পর্কে একজন সরকারি কর্মকর্তা এলান হিউম তার একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষিত ব্যক্তিরা গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিলে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে পারে।

বামপন্থী আন্দোলনটি ব্যাপক আকার ধারণ করে সত্তর (৭০) দশকের শেষ দিকে। সত্তর দশকের পর ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ব্রিটিশের বিভেদরীতির ফলে মারাত্মক হয়ে ওঠে। হিন্দুরা হিন্দুদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তোলে এবং মুসলমানরা মুসলমানদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তোলে। গ্রামপর্যায় পর্যন্ত বিভেদনীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। উগ্রপন্থী হিন্দু এবং উগ্রপন্থী মুসলমান ভদ্রমহোদয়রা কোন্দল করে বাঙালি সমাজটাকে এলোমেলো করে দেয়। কোথাও কোথাও সম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে। উভয় ধর্মের উগ্র ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সদস্যরা ছিলেন উচ্চবর্ণ ও বর্গের লোক। তারা কখনো বাংলার খেটে খাওয়া জনসাধারণের সঙ্গে ওঠাবসা, খাওয়া-দাওয়া এবং চলাফেরা করতেন না। সমগ্র গ্রামবাংলায় অনভিজাত কৃষক ও খেটে খাওয়া জনগণের জন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। অশিক্ষা ও কুসংস্কারপূর্ণ সমাজের লোকদের জন্য বিদ্যালয় না-থাকায় পুরোটা সমাজ ছিল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।

ওই সময় ইংরেজ সরকার গ্রামপর্যায়ে গ্রামের বালক-বালিকাদের জন্যে গণশিক্ষা ব্যবস্থার একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। উক্ত পরিকল্পনায় অল্প খরচায় পাঠশালা প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণভাবে দেশীয় ভাষায় শিক্ষাবিস্তার ও উন্নয়নের স্বার্থে গ্রামের মোড়লদের নিকট অভিমত চেয়েছিলেন। তুবন ম-ল নিরক্ষর ছিলেন বটে কিন্তু তার বৈষয়িক জ্ঞান ছিল অনেক উচ্চে। তিনি গণশিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিলেন। সরকার পাঠশালা প্রতি মাসিক পাঁচ টাকা বরাদ্দ করেন। শিক্ষা ব্যবস্থার হাল-অবস্থা ছিল তৎকালে দারুন সংকটাপন্ন। একমাত্র অভিজাত বর্গদের পুত্রসন্তানরা ইংরেজি বিদ্যা অর্জনের জন্য কলকাতায় গিয়ে লেখাপাড়া শিখতেন। হিন্দু সন্তানরা ভর্তি হতেন সংস্কৃত কলেজে, হিন্দু কলেজে এবং সুমলিম সন্তানরা ভর্তি হতেন কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায়। গ্রামের সাধারণ মানুষের সন্তানদের জন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। এর ফলে সাধারণ মানুষের শিক্ষার প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না। এমন কি পাঠদানের জন্য শিক্ষকের অভাব থাকার কারণে গ্রামে কোনো বিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। তৎকালের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে তুবন ম-ল নিজের বাড়ির বৈঠকখানায় সাময়িক পাঠশালার কার্যক্রম শুরু করেন, কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এত নগন্য যে, এক বছর চলার পর বিদ্যালয়টির কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এই বিদ্যালয়ে শিক্ষা দেওয়া হত পাঠ, লিখন এবং কিঞ্চিত গনিত। এই শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল পত্রলিখন, জমিজমার হিসাব, ব্যবসা ও তেজারতির খাতাপত্র রাখা পর্যন্ত।

শেষ পর্যন্ত সরকারের এই উদ্দেশ্য সফলিত হয়নি। গুরুজনরাও পাঁচ টাকার বিনিময়ে গুরুগিরি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

ছোট লাট গ্রান্ট সাহেব গ্রাম্য বিদ্যালয় সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, সেই অভিজ্ঞতা ছিল আশাব্যঞ্জক নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই গ্রাম্য বিদ্যালয় সম্পর্কে খোঁচামেরে যে অভিমত প্রকাশ করেন, তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় তৎকালের গ্রামসমাজের প্রকৃত অবস্থা :

সরকার যে ভাবিয়েছেন বিদ্যালয় পিছু মাসিক পাঁচ সাত টাকা ব্যয় করিয়া কোনো শিক্ষা পদ্ধতির প্রবর্তন করিবেন, আমার মতে দেশের বর্তমান অবস্থায় তাহা কর্য্যকর হইবার কোনো সম্ভাবনা নাই। পাঠ, লিখন এবং কিঞ্চিত গনিত শিখাইতে যাঁহারা কোনো রূপে সমর্থ নিজ নিজ গ্রামের প্রতি আকর্ষণ যতই থাক এমন যৎসামান্য বেতনে তাহাদিহকে কার্য্যগ্রহণে প্রবৃত্ত করিতে পারা যাইবেনা। বাংলাদেশে এইরূপ শিক্ষাপদ্ধতির প্রচার যদি সরকারের উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে গুরুমহাশয়দের অল্প কিছু মাসিক বেতনের ব্যবস্থা, তাঁহাদের পাঠশালাগুলোতে খান কয়েক মুদ্রিত পুস্তকের প্রবর্ত্তন এবং সেগুলো সরকারী পরিদর্শনের অধীন করিলে সহজেই উদ্দেশ্য সাধিত হইবে। কিন্তু আমি বলিতে বাধ্য, এরূপ শিক্ষা, নগন্য হইলেও জনসাধারণের মধ্যে (যদি জনসাধারণ কথার অর্থে শ্রমিক শ্রেণী বুঝিতে হয়) বিস্তৃত হইবেন। কেননা, এখনও পর্য্যন্ত বিহারে বা বাংলায় এই শ্রেণী হইতে অল্প সংখ্যাক বালকই পাঠশালায় শিক্ষার্থী হয়।

শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থার উপরই ইহার কারণ আরোপিত করা যায়। সাধারণত অবস্থা এতই খারাপ যে, ছেলেদের শিক্ষার দরুন তাহারা কোনো রূপ ব্যয়ভার বহন করিতে অসমর্থ। একটু বড় হইলেই যখন কোনোরূপ কাজ করিয়া যৎসামান্য কিছু উপার্জন করেতে উপযুক্ত হয়, তখন আর তাহারা ছেলেদের পাঠশালায় রাখিতে পারে না। তাহারা ভাবে এবং সম্ভবত এভাবনা যথার্থ যে, ছেলেদের কিছু লেখাপাড়া শিখাইলেই তাহাদের অবস্থার উন্নতি হইবে না, তাই ছেলেদের পাঠশালায় পাঠাইতে তাহাদের কোনোরূপ প্রবৃত্তি থাকেনা। (ঊফঁপধঃরড়হ উবঢ়ঃ. ড়পঃড়নড়ৎ ১৮৮০, ঘড় ৫৩)

তৎকালের সমাজ সম্পর্কে যে ধারণা এখানে পাওয়া যায় তা ছিল যথার্থ বাস্তব। জনসাধারণের জীবন-যাপনে অর্থনৈতিক সংকট এত তীব্র ছিল যে, উপার্জন ছাড়া অন্যকিছু নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ ছিল না। পুরোপুরি বাঙালি সমাজটা দারিদ্রের কষাঘাতে নির্জীব হয়ে পড়েছিল। সেইহেতু জ্ঞানার্জনের জন্য লেখাপড়া শিখতে হবে, এরকম আশা ছিল হতাশাব্যঞ্জক। এমন কি বিত্তবান শ্রেণির মধ্যেও লেখাপড়ার প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না।

বিদ্যার সঙ্গে বুদ্ধির একটা সম্পর্ক আছে। যে সমাজের লোক বিদ্যা ও বুদ্ধিহীনতার মধ্যে বসবাস করে, সেই সামাজটাই হলো দাসত্বের সমাজ। পুরোপুরি সমাজটা যে দাসত্বের শিকলে বাঁধা পাড়ছিল এই ঘটনার মধ্যে তা উপলদ্ধি করা যায়। যেটুকু সরকার করেছিল, তা দাস সমাজের জন্যেই করেছিল। এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, এরকম শিক্ষাব্যবস্থা বাঙালি জনসাধারণের জন্য সন্তোষজনক ছিল না। তৎকালে ইংল্যান্ডে এবং এদেশে একটা ধরাণা সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, উচ্চ শ্রেণির শিক্ষার জন্য যথেষ্ট করা হয়েছে, এখন দরকার সাধারণ শ্রেণির জন্য শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা। তৎকালে শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে যে ধারণা প্রদান করা হয়, সেই ধারণাটি ছিল অমূলক। সমস্ত দেশটাকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য যে কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করার প্রয়োজন ছিল, সরকার সে দিকে দৃষ্টিপাত করেননি। উচিৎ ছিল গ্রামপর্যায়ে জনসাধারণের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা এবং শিক্ষকদের সরকারিভাবে উপযুক্ত বেতন প্রদান করা। সরকার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব না-দিয়ে— গুরুত্ব দিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষার প্রতি। ১৮৩৬ সালে প্রতিটি জেলায় যেমন সরকারিভাবে জেলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য গ্রামের দিকে সেরকমভাবে সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেননি। এমন কি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহোদয় জনগণের হিতার্থে সরকারকে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেখানেও তিনি তার প্রতিবেদন উল্লেখ করেছিলেন :

একশত বালককে লিখন-পাঠন এবং কিছু অঙ্ক শেখানো অপেক্ষা একটি মাত্র ছেলেকে উপযুক্তরূপে শিক্ষিত করিয়া তুলিতে পারিলে প্রজাদের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষা প্রচারে সরকার অধিকার সহায়তা করিবেন। সমস্ত দেশটাকে শিক্ষিত করে তোলা নিশ্চয় বাঞ্ছনীয়, কিন্তু কোনো রাজসরকার এরূপ কার্যভার গ্রহণ করিতে অথবা সাধন করিতে পারে কিনা সন্দেহ (১৮৫৯, ২৯ শে সেপ্টেম্বর)।

এতে প্রমাণিত হয় যে, গ্রামপর্যায়ে সাধারণের জন্য গণশিক্ষা পরিকল্পনা উচ্চশিক্ষিত প-িত ব্যক্তিরাও বাস্তবায়ন করার বিপক্ষে ছিলেন। প-িত বিদ্যাসাগর মহাশয়ও দাবি করতে পারতেন যে, বাংলার জনগণকে নিরক্ষর মুক্ত করতে হলে গণশিক্ষার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হোক। কিন্তু তা করেননি। সবার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা সুগম করার পক্ষে শিক্ষিত নাগরিকদের কোনো রকম ভূমিকা না-থাকায় ছোট লাট গ্রান্ট সাহেব পরিকল্পনাটি চালু না-করার জন্য বড় লাটের নিকট সুপারিশ করনে।

বাংলার কৃষিসমাজ-ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে অধপতনে যাচ্ছিল। কৃষিসহ অন্যান্য উৎপাদন-ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। ভূমির সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও অন্যান্য উৎপাদকদের মেরুদ- খাঁড়া করে দাঁড়ানোর শক্তি ছিল না। সামন্ততান্ত্রিক শোষণের চেয়ে পুজিতান্ত্রিক শোষণ ও নিপীড়ন যে কতটুকু নির্মম ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল, সেই দিন বাংলার জনগণ  মর্মেমর্মে উপলদ্ধি করেছিলন। শুধু যে ব্রিটিশরা শোষণের সঙ্গে যুক্ত ছিল তা নয়। এদেশের নব্য জমিদার শ্রেণি, বণিক শ্রেণি এবং ইংরেজি জানা শিক্ষিতদেরও দাপট কম ছিল না। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের আখের গুছিয়ে নেওয়া। ইংরেজদেরকে অন্ধভাবে অনুকরণের প্রবণতা দেখা দেয়। সেই সময় বাংলায় যে জীবনব্যবস্থা অর্থনৈতিকও সামাজিক-ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়, তা বাঙালিদের জন্য সুখকর ছিল না। এই ব্যবস্থা উপলদ্ধি করে ব্রিটিশ শাসকদের উদ্দেশ্যে অক্ষয় কুমার দত্ত লিখেছিলেন :

তোমার অধিকারে আমাদের স্বাস্থ্যক্ষয়, বলক্ষয় ও ধর্মক্ষয় ঘটিতেছে। তুমি অধিক বিতরণ কি সংহরণ করিতেছ কে বলিতে পারে? তুমি শিক্ষাদান করিতে গিয়া অশেষ দোষ করে দুর্মূল্যতা দোষ ও তৎসহকৃত অধর্ম বংশের বৃদ্ধি করিতেছ… যাবতীয় জাগ্রতকাল পয়সা-টাকা, দরদাম, আকাল-আক্রা, দলিল-দস্তাবেজ, সাক্ষী-সাবুদ, উকিল-কৌশনী, কোর্ট-মকদ্দমা, জাল-জালিয়াত— এ’ সমস্ত অবিচার মন্ত্রাদি জপ ও পুনশ্চরণ করাই কি মানবকুলের পরমার্থ হইল?

উল্লেখ্য ‘তুমি শিক্ষাদান করিতে গিয়া অশেষ দোষ কর দুর্মূল্যতা দোষ’ বাক্যটির মধ্যে দত্ত মহাশয় যেভাবে তার শ্লেষ প্রকাশ করেছেন, এই অভিব্যক্তিটি শুধু তার নয়— সকল বাঙালির অভিব্যক্তি। ব্রিটিশ আমলে বাংলার সমাজব্যবস্থার কি রকম হাল-হকিকত ছিল, তার উদাহরণ উপরিউক্ত বাক্যের মধ্যে বিদ্যমান।

বাংলায় শিক্ষাব্যবস্থা ইংরেজ আমলেরও আগে ছিল। প্রতিগ্রামেই বিদ্যালয় ছিল। ইংরেজরা দখল করার পর সেই বিদ্যালয়গুলির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। প্রতি চারশত জনগণের জন্য ছিল একটি করে বিদ্যালয়। লেখাপড়ার ধরণও ছিল আলাদ। স্বাস্থ্যক্ষয়, বলক্ষয়, আয়ুক্ষয় ও ধর্মক্ষয়ের কোনো সম্ভাবনা ছিল না। পরস্পরের সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি ছিল। ফন্দিবাজ, ধড়িবাজ, ধাপ্পাবাজদের দৌরাত্ম্য ছিল না। জাল-জালিয়াত ছিল না। ব্রিটিশের শিক্ষাব্যবস্থায় সুনীতির পরিবর্তে কুনীতির উদ্ভব হয়েছে। দুর্নীতি হয়েছে শিক্ষার মূলনীতি। ঠকবাজ, ভাওতাবাজদের আধিপত্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। হিংসা-দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা সামাজিক মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দিয়েছে। সম্পত্তি ও অর্থ উপার্জনের উপায় হয়ে উঠেছে শঠতা ও লুণ্ঠণবৃত্তি। সততা, সৎশিক্ষা, শুভবুদ্ধি, বিবেক, বিবেচনা এবং বিচারবোধ ক্রমান্বয়ে লোপ পেয়েছে। বিদ্যমান কাল হয়ে উঠেছে পয়সা, টাকা, দরদাম, আকাল, আক্রা, দলিল, দস্তাবেজ, সাক্ষী-সাবুদ, উকিল-কৌশলী, কোর্ট-মকদ্দমা ও জাল-জালিয়াত সর্বস্ব।

নবাবী আমলের শিক্ষাব্যবস্থায় যে ন্যায়নীতি ও আদর্শ ছিল, কোম্পানি বাংলা দখলের পর সেই শিক্ষাব্যবস্থা একেবারেই লোপ পায়। প্রকৃত পক্ষে দাবি করা যায় যে, দেশীয়দের জন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থা ইংরেজদের প্রবর্তন করার পরিকল্পনা ছিল না। ওয়ারেন হেস্টিং এদেশে ইংরেজি শিক্ষার বদলে প্রাচ্যবিদ্যা প্রচলনের পক্ষপাতি ছিলেন। এই পক্ষপাতিত্বের কারণে তিনি ১৭৮০ বা ৮১ খ্রিস্টাব্দে নিজের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত করেন কলকাতায় আলিয়া মাদ্রাসা। সেখানে আরবি ও ফারসি ভাষার মাধ্যমে মুসলিম আইন শিক্ষার ব্যবস্থা প্রবর্তন করনে, কিন্তু এই বিদ্যালয়টি পরিচালিত হয় য়্যূরোপীয় আদর্শে। বাংলায় এটাই ছিল কোম্পানি আমলে ব্রিটিশদের কর্তৃক প্রথম বিদ্যালয়। সেই সময় কোম্পানির বড় কর্তারা অনুভব করেছিলেন যে, সমগ্র দেশটার উপর যদি স্থায়ীভাবে এবং আরো বিজ্ঞান সম্মতভাবে শোষণ চালাতে হয়, তাহলে কোম্পানি শাসনের উপযোগী একটা শিক্ষা তৈরি করা একান্ত আবশ্যক। এই শোষণ ও শাসন উপযোগিতার জন্যে তিনি কতকগুলি সামাজিক স্তর সৃষ্টি করনে। কোম্পানির উপর নির্ভরশীল ছিল তাঁর তৈরি কারা নব্যস্তরগুলি। এর মধ্যে প্রাধান সামাজিক স্তরে ছিলেন নব্যজমিদার শ্রেণি। এই শ্রেণিটিই ছিল কোম্পানি সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী খুঁটি ও রক্ষক। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে এই রক্ষা-ব্যবস্থাকে আরো সুদৃঢ় করে তোলা হয়। হেস্টিং ঔপনিবেশিক বাংলায় একটা দাস-সমাজ এবং ব্রিটিশের উপর নির্ভরশীল একটা পরাধীন-সামাজ কাঠামো তৈরি করার উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পনাটির বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন। ওয়ারেন হেস্টিং দেশীয়দের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষাদানের পক্ষপাতি ছিলেন না। ভারত সম্পর্কে তিনি বহু অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং ফার্সি ও হিন্দি ভাষায় তিনি ছিলেন সুপ-িত। ফলে এদেশে শাসনের জন্য কোম্পানি সরকার কি ধরনের পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ তা হেস্টিংই ভালো করে বুঝতেন।

মুসলিম শাসনকালে দরবারি ভাষা ছিল ফার্সি। এই ফার্সি ভাষা গ্রাম বাংলার চাষাভুষো এবং শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ পড়তেও পারত না এবং বলতেও পারত না। দরবারি ভাষায় কথা বলত মধ্য এশিয়া থেকে যারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এদেশে নবাব-বাদশাদের অধীন নফর হয়ে বসতিস্থাপন করেন, সেইসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তিবর্গ। বাংলার গণমানুষের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বাঙালি সমাজের আচার-আচরণও তারা কখনো গ্রহণ করেননি। খান্দানি হিসেবে নিজেদের তারা আলাদাভাবে পরিচিত করে তোলেন। বাংলার সংস্কৃতিকে তারা ‘পৌত্তলিক-সংস্কৃতি’ বলে মনে করায় নিজেদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি চালু করেন। এই ক্ষেত্রেও ধর্মীয় লেবাস পরানো হয়। নাম দেওয়া হয় ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতি। তারাও বাঙালি মুসলমানদেরকে মধ্য-এশিয়ার আচার-আচরণ, পোষাক, খানা-পিনা, তাহজিব-তমুদ্দিন এলেম যেভাবে শুরু করেন, ব্রিটিশরাও সেই একই পথ গ্রহণ করেন।

ইংরেজরা রাজকার্য পরিচালনা এবং ধর্মপ্রচারের জন্য বাংলা ভাষা রপ্ত করা শুরু করে। উনিশ শতকের প্রথম দশকেই খ্রিস্টান মিশানারিরা এ কাজটি গ্রহণ করে এবং তারা প্রতিষ্ঠিত করে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মিশনারি স্কুল। এছাড়া ইংরেজ রাজকর্মচারিদের বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য লর্ড ওয়েলেস্লি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত করনে। এর ফলে নেটিভদের সঙ্গে ইংরেজদের ভাবের আদান-প্রদান করা সহজতর হয়। এই কলেজে বাংলা ভাষা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজ রাজকর্মচারিদের শিক্ষা দেওয়া হত।

যশোহরে পুলের হাটে খ্রিস্টান মিশানারিরা একটি বিদ্যালয় করে। যারা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করত, তাদের এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেখানো হতো। শিক্ষার বিষয় ছিল ধর্ম এবং ইংরেজরা যে ঈশ্বর কর্তৃক প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ শাসক, এ সম্পর্কে মিশনারিরা নব্য খ্রিস্টান হওয়া এ দেশীয়দের জ্ঞানদান করত। শুরু হয়েছিল মিশনারি বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল উইলিয়াম কেরী কর্তৃক অনূদিত বাইবেলের বাংলা সংস্করণ। কেরী বিশ্বাস করতেন যে, বাংলা শেখানোর ক্ষেত্রে ইংরেজি না-জানাটা কোনো বড় সমস্যা নয়।

কলকাতায় ইংরেজির প্রয়োজনে বিদ্যালয় গড়ে উঠলেও বাঙালিদের প্রয়োজনে একমাত্র মাদ্রাসা ছাড়া অন্য কোনো আধুনিক শিক্ষালয় গড়ে তোলা হয়নি। তবে এক শ্রেণির দেশীয় লোক মুন্সি, খিদমতগার, খানসামা এবং ইংরেজদের চাকর হওয়ার জন্য লালায়িত ছিল। তারা সামান্য কিছু ইংরেজি শব্দ মুখস্ত করে ইংরেজদের পেছনে পেছনে ছুটে বেড়াত। আরো একটি সুবিধাবাদী শ্রেণির উত্থান ঘটেছিল এই কালে। এরা ইংরেজি বণিকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে দালালীও মৎসুদ্দিগীরি করে রৌপ্যমুদ্রা অর্জন করার উদ্দেশ্যে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ছুটাছুটি করে বেড়াত। এদের মধ্যে অনেকেই ভাঙা ভাঙা অশুদ্ধ ইংরেজি জানত। কিন্তু শুদ্ধ ইংরেজি ভাষাশিক্ষা লাভের জন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তখনো গড়ে ওঠেনি।

তৎকালীন বাঙালি সমাজের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন দেখা দেয়। যারা এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা সকলেই ছিলেন হিন্দু কুলিন সম্প্রদায়ের লোক।

প্রকৃতপক্ষে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের আগে পর্যন্ত কোম্পানি বাংলায় শিক্ষাবিস্তারের উদ্দেশ্যে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে সরকার কলকাতা মাদ্রাসায় ইংরেজি শিক্ষার জন একটি বিভাগ খুলেছিল। এটাই হচ্ছে বাংলায় ইংরেজি ভাষাশিক্ষার জন্য সরকারের প্রথম উদ্যোগ। এই ঘটনার পরপরই ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ফার্সি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। বহুগুনে বেড়ে যায় ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব।

মেকলে এই দেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের দাবি জানিয়েছিলেন বটে কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন :

আমাদের এখন যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে এমনি একটি শ্রেণী তৈরি করা— যে শ্রেণীটি হবে সম্পূর্ণ আমাদের। আমরা এই দেশের লক্ষ লক্ষ লোককে শাসন করছি। এই লক্ষ লক্ষ শাসিত লোকদের মধ্যে আমরা ভাবের আদান-প্রদানকারী হিসাবে এই শ্রেণীটি তৈরি করতে চাই। এই নব্য শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা হবে রক্তে ও রঙে¢ ভারতীয়, আর রুচিতে, মননে, চিন্তায়, মতবাদে, নীতিধর্মে এবং বুদ্ধিতে হবে ইংরেজের অনুগসারী— (আজিকার ভারত— রজনীদাস দত্ত, ১ম ভাগ, পৃ. ১৫৯-৬০)।

ইংরেজরা যে শ্রেণিটি এদেশে তৈরি করতে চেয়েছিলেন, সেই শ্রেণিটি গঠিত হয়েছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই। তারা ইংরেজি শিক্ষার দিকে বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়েছিল। মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী ছিল না। ফলে মধ্যযুগীয় ভাবচেতনা সম্বল করে নিজেদেরকে পাশ্চদগামী করে তোলে।

তুবন ম-ল বাঙালি মুসলিম সমাজের এ হেন দুর্গতি উপলদ্ধি করে সরকারের প্রস্তাবিত গণশিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তাবায়ন করার জন্য মত প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নিজেও ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলা রপ্ত করেছিলেন। সাহেবদের সঙ্গে দীর্ঘদিন চলাফেরা করায় ইংরেজি ভাষায় ভাববিনিময় করা তার পক্ষে সহজ হয়েছিল। তিনিও উপলদ্ধি করেছিলেন সকলের জন্য একটা শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু তা হলো না। ধর্ম প্রচারের জন্য মিশনারির সাহেবরা গ্রামে গ্রামে এসে স্থানীয় জনগণকে খ্রিস্টান হওয়ার জন্য নানা রকম প্রলোভন দেখাচ্ছিল। তুবন ম-ল লক্ষ্য করেছিলেন যে অনেক দরিদ্র মুসলমান আভাবের কারণে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে। তাদের জন্য মিশনারিরা গড়ে তুলছে স্কুল। বিশেষ করে খ্রিস্ট ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল নিম্নবর্ণীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। তারা কলকাতায় গিয়ে মিশনারি বিদ্যালয়ে সাহেব হওয়ার আকাক্সক্ষায় ইংরেজি বুলি শিখেছিল। শতাব্দির দ্বিতীয় ভাগে নতুন আঙ্গিকে কলকাতায় ইংরেজরা ইংরেজি বিদ্যালয় গড়ে তোলে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাও এ ব্যাপারে পিছিয়ে ছিল না। অর্থাৎ ঘড়ৎস পড়হভষরপঃ যুগ শেষ হয়ে নতুন যুগের আবির্ভাব ঘটেছিল। এই যুগেরও মুনলমানরা মধ্যযুগীয় মতাদর্শের প্রতি তখনও অটল। তাদের মনোবৃত্তি অতীতমুখী। কোনো মুসলমানের সন্তান অগ্রগামী শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট নয়। কে লেখাপড়া শিখে বিদ্বান হলো আর না-হলো—  এটা নিয়ে চিন্তার কোনো কারো কারণ ছিল না। তুবন ম-লরাই যে গ্রামে বসে এই দৈন্যদশা দেখেছেন, তাও নয়। মুসলিম সমাজে তো অনেক খান্দানি মহোদয়রা রয়েছে, তারও কিছু করার উদ্যোগ নিচ্ছিল না। অর্থাৎ মুসলিমদের জন্য চলছিল সঙ্কটকাল। সৈয়দ আমির আলী ও আব্দুল লতিফ মহোদয়গণ গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য কোনো স্কুল গড়ে তোলার চেষ্টা করেননি। যে বিদ্যালয়গুলি গড়ে উঠেছিল, তার শতভাগ চেষ্টা ছিল হিন্দু বাবু মহোদয়দের।

১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি শিক্ষাসংক্রান্ত একটি ‘ডেসপ্যাচ’ পাশ করে। এতে কোম্পানির শিক্ষানীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। মূল বিষয়টি ছিল এই যে, ভরতবর্ষ ব্রিটিশের কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ এবং ব্রিটেনের পণ্যদব্য বিক্রয়ের একটি বাজার। সেইহেতু বাজারটা মজবুত করার জন্যই নতুন শিক্ষাপ্রকল্প প্রবর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থার মূল বিষয় ছিল না। মূল বিষয় ছিল ব্রিটেনের অধীন ভারতকে বাজারী ব্যবস্থায় পরিণত করা। এটাই উপযোগী করে তোলার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা কোম্পানি প্রবর্তন করেছিল।

প্রকৃতপক্ষে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত করার পরিকল্পনা কোম্পানি সরকারের উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল সুবিধাবাদি একটি শ্রেণি তৈরি করে শাসন ও শোষণ ব্যবস্থাকে কায়েমি করে তোলা। অবশেষে সেটাই পাকাপোক্ত হয়ে উঠেছিল।

পরবর্তীকালে মুসলমানরাও আলিগড়িবিদ্যা অর্জন করে সুযোগ-সুবিধার ভাগিদার হয়। গ্রাম্য জনগণের মধ্যে এই শিক্ষার কোনো উপকার সাধিত হয়নি। খান্দানি এবং অখান্দানির মধ্যে বৈষম্য আরো পাকাপাকি হয়ে উঠেছে। পোশাকে-আশাকে, খানা-পিনায়, চলনে-ফেরনে কারোর সঙ্গে কারোর মিলমিশ ছিল না। গ্রাম্য চাষাভুষোরা আরো হত দরিদ্র হয়েছে। তাদের জন্য না-ছিল শিক্ষাকার্যক্রম, না-ছিল গ্রাম্য পাঠশালা, না-ছিল সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। সারাটা জীবন গ্রাম্য জনগণ অচল ও অধম হয়ে শোষণ ও শাসনের শিকার  হয়ে দুঃখ ও দারিদ্রের মধ্যে দিন যাপন করেছে। শিক্ষার কোনো কিছুই অনুশীলন ও অনুধাবন করতে পারেনি। এই ছিল তুবন মন্ডলের সমকালীন সমাজ চিত্র।

তুবন ম-ল বিচার বিভাগের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। গ্রাম্য শালিস-বিচারে তিনি যে রায় প্রদান করতেন, তার মধ্যে ছিল বিবেক ও বিবেচনা শক্তি। এই জন্য তিনি তার এলাকায় ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি বলে পরিচিত গয়ে ওঠেন। তাই ইংরেজ সরকার তাকে যশোহর ফৌজদারি আদালতে জুরি হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এই পদটি ছিল তৎকালে একটি সম্মানীয় পদ। কেউ কেউ তাকে জুরি সাহেব বলেও অভিহিত করতেন। সবার মতামতের ঊর্ধ্বে ছিল তার মত। কাউকে যাতে অন্যায় করে সাজা বা দ- দেওয়া না-হয়, তা তিনি বিবেক দ্বারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন। অন্যান্য জুরিরা তার বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন।

তিনি বলতেন ন্যায় এবং অন্যায়-এর একটা মাত্রা আছে। অপরাধের পশ্চাদবর্তী কারণ আছে। পরিকল্পিত ও আকস্মিক ব্যাপার আছে। জমি-জমার জাল-জালিয়াত, নানান ফন্দি-ফিকির ও সমাজবিরোধী কাজ অহরহ ঘটছিল। এসব বিষয়ে আদালতে মামলা-মকদ্দমার পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল। অধিকাংশ বিচারক, হাকিম, জজ, ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ইংরেজ। কিছু কিছু দেশীয় হাকিম বিচার করার দায়িত্ব পালন করতেন। বিচার-ব্যবস্থা খুব উন্নত ছিল না বটে— কিন্তু তাদের হাকডাক ছিল। আদালতে মুহুরি, মোক্তার ও উকিলরা ছিলেন ধূর্ত ও ফন্দিবাজ। হাকিমদের তারা যুক্তিতর্ক দিয়ে মামলার রায় আদায় করে নিতেন। ইংরেজ বিচারকরা দেশীয় ভাষা বিশেষ জানতেন না। দু-একটা দেশীয় শব্দ ভাব-বিনিময় করার জন্য ব্যবহার করতেন। উচ্চারণের মধ্যে ছিল জড়তা। ইংরেজি-বাংলা শব্দ মিশিয়ে একটা জগাখিচুড়ি ভাষা তারা সৃষ্টি করতেন।

তুবন ম-ল সাহেবদের সঙ্গে মিশে তেমনি ইংরেজি ও বাংলা শব্দ মিশিয়ে কথা বলতেন। সাহেবরা তার কথা বুঝতেন এবং মাথা ঝাঁকাতেন। কখনো কখনো বিড়বিড় করে মন্তব্য করতেন, ইয়ে ইয়ে, আই আন্দারস্তান্দ, হামি টুমার কদা বুঝিতে পারিয়াছি।

তুবন ম-লের আমলে অপরাধ, দারোগা-পুলিশের ভূমিকা, আদালতে জজ-ম্যাজিস্ট্রেট ও উকিল-মোক্তারদের কার্যক্রম কি রকম ছিল— তার বিবরণ স্পষ্ট জানা যায়, তৎকালীন নথিপত্রের মাধ্যমে। কোথাও কোথায়ও কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে থানার দারোগা তদন্ত করতেন। তদন্তের মধ্যেও ছিল উৎকোচ আদায়ের ব্যবস্থা। দারোগা ঘনঘন বিবাদি এবং বাদির বাড়িতে গিয়ে হানা দিতেন। এতে করে লাভ হত এই যে, উভয় পক্ষ তদন্তকারী কর্মকর্তাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে গোপনে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করত। আদালতে উকিল-মোক্তাররাও ছিলেন ফন্দিবাজ। ঔপনিবেশিক আমলের কোনো এক জমিদারের বাড়িতে একবার ডাকাতি হয়েছিল। এই ডাকাতি হওয়ার মূলে ছিল ‘উইল’-এর দলিল হস্তান্তর করা। এই বিষয়টি নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর একটি অসমাপ্ত উপন্যাসে দারোগা, উকিল-মোক্তার এবং আদালতের বিচারকদের বিচার-ব্যবস্থার কার্যক্রমের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা ছিল সে আমলের কোনো কাল্পনিক চিত্র নয়, বরং বাস্তব। তিনি লিখেছেন যে ডাকাতি করতে গিয়ে ডাকাত সর্দারসহ কয়েকজন ডাকাত ধরা পাড়ে। থানার দারোগা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে তদন্ত করতে যান এবং ধৃত ডাকাতদের মধ্যে একজন ডাকাত সর্দারের নাম ছিল রঘুনাথ। রঘুনাথ সেই আমলে একজন কুখ্যাত ডাকাত হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দারোগা সম্পর্কে বলেছেন :

দারোগা বাবু লোকটি নিতান্ত মন্দ নহে এবং কর্মচারী হিসাবেও তিনি অনেক ভাল। মোকদ্দমার ‘কিনারা’ বা ‘আস্কারা’ করিতে অথবা নিজের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করিতে তিনি কখনো অযতœ করিতেন না, এবং তদ্ধেতু বে-আইনি কিছু করিবার প্রয়োজন হইলে তাহাতেও তিনি পশ্চাদপদ হইতেন না। জিদ নামক জিনিষটা তাহার কিছু  বেশী মাত্রায় ছিল। বর্তমান মোকদ্দমায় এই জিদ অতি প্রবলভাবে দেখাদিল। তিনি বিপুল উৎসাহের সাহিত মাধবকে আশ্বাস দিয়ে কহিলেন, আপনি নিশ্চিন্ত থাকিবেন ছোট বাবু। আমি মূল আসামীদিগকে ধরিব।

এবম্বিধ প্রবোধবচনে ছোট বাবু আশ্বাসিত হইয়া দারোগাবাবুর সৎকারে মনোনিবেশ করিলেন। দেখিলেন, সনাতন সকল ব্যবস্থাই করিয়াছে। মৎস্য, দুগ্ধ, অপর্যাপ্ত পরিমাণে আহৃত হইয়াছে। দারোগাবাবু সদলবলে আহারাদি সমাপন করিয়া কিঞ্চিৎ বিশ্রামান্তে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন

(বারি-বাহিনী, শচীশচন্দ্রের গ্রন্থাবলি, পৃ. ৩২০)।

তৎকালে সম্মানিত ব্যক্তিগণকেও আদালতে বিচারকার্যের জন্য নিয়োগ দেয়া হত। এদেরকে অবহিত করা হত অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট। মহকুমায় একজন এম. বি. উপাধিধারী চিকিৎসক ছিলেন। তিনি চিকিৎসাও করতেন এবং হাকিমগিরিও করতেন। বঙ্কিম বাবু উল্লেখ করেছেন :

ডাক্তর বাবুর এস্থলে একটু পরিচয় প্রদান না করিলে পাতকগ্রস্ত হইতে হইবে; অতএব, কিঞ্চিৎ পরিচয় প্রদান করিলাম। ইনি শুধু ডাক্তারী করনে না। অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যও করেন। তদ্ধেতু দুই পয়সা হয় কিনা জানিনা; কিন্তু পরশ্রীকাতর বিশ্বনিন্দুকেরা কহিয়া থাকে, বাদী আসামীর গৃহে রোগ না থাকিলেও ডাক্তার বাবুর তথায় ডাক পড়ে এবং চারি টাকার স্থলে আট টাকা দক্ষিণাও প্রাপ্তি হয়। এই হাকিমের নাম ডাক যথেষ্ট আছে। আসামী হইয়া তাঁহার বিচার বেষ্টনীর মধ্যে সহজে কেহ আসিতে চহিত না; তা মহকুমা-ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়িতেন না— তাহাতে দুই চারিটা সবিধাজনক মোকদ্দমা এই হাকিম প্রবরের নিকট আসে, এদ্বিষয়ে তিনি যতœবান হইতেন, কেননা ম্যাজিস্ট্রেট বাবুর কোনো ভৃত্যের রত্রি দ্বিপ্রহরে শিরঃপীড়া ঘটিলে ডাত্তার বাবু মুক্তকচ্ছ অবস্থায় ছুটিয়া আসিয়া তাহার সেবায় ব্রতী হইতেন। এরূপ সজ্জন ব্যক্তিকে পুরস্কৃত না করিয়া ক্ষুণœ করিলে মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট মহাপাতকে নিমজ্জিত হইতেন (বারি-কাহিনী, ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ, শচীশচন্দ্রের গ্রন্থাবলি, পৃ. ৩২২)।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজেও ছিলেন আদালতের হাকিম। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছিল প্রচুর। তাঁর লেখনির মধ্যে সে আমলের যে সামাজিক চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে, তা ছিল বাস্তব। এখনো এদেশে বিদ্যমান রয়েছে, ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা ও বিচারব্যাবস্থা সেই ধারা। থানা থেকে কোর্ট-কাছারি পর্যন্ত সেই পুরাতন ব্যবস্থা টিকে রয়েছে।

তিনি তাঁর গ্রন্থে এই অব্যবস্থার ত্রুটিও নিখুঁতভাবে চিত্রিত করেছেন। কোথায়ও কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশের কাজ হয়ে দাঁড়ায় অর্থ কামানো। একজন তদন্ত করলে, আর একজন আসেন তদন্ত করতে। তদন্তের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন :

আজিও ডাকাতির তদন্ত পুলিশ হইতে চলিতেছে। দারোগা বাবু তদন্ত করিয়া চলিয়া যাইবার দুইদিন পরে ইনসপেক্টর বাবু তদন্তে আসিয়াছিলেন। তখন তাহার সৎকারার্থে মাধবের গৃহে ছাগমাংসের অবতারনা হইয়াছিল। উক্ত অবতারনিকার দুইদিন পরে পুলিশ সাহেবের আবির্ভাব হইয়াছিল। তখন সেখ পাড়ায় পক্ষিহননের মহাধুম পড়িয়া গিয়াছিল। এইরূপে কর্তৃপক্ষ তদন্ত করিতে আসিয়া হত্যাকার্যের বিপুল সহায়তা করিলেন। আর যিনি যখন আসিয়াছিলেন তিনি তখন রাজমোহনের বিরুদ্ধে আপাততঃ কোনো প্রমাণাদি ছিল না, তথাপি তাহাকে এই ডাকাতিতে সংক্ষিপ্ত করিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা চলিতেছিল (বারি-বাহিনী, শচীনচন্দ্রের গ্রন্থাবলি, পৃ. ৩২৩)।

তৎকালে এদেশের পুলিশ কর্মকর্তারা অসৎ উদ্দেশ্যে বাড়তি অর্থ উপার্জনের জন্য কিছু কিছু লোককে ফাঁসিয়ে আসামী বানাতে পারদর্শী ছিল, তা এই গ্রন্থের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। শুধু তাই নয় মোকদ্দমার সাক্ষীগণ ও দারোগার কথায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হত। আমমোক্তারেরাও ছিলেন ফন্দি-ফাঁকিবাজিতে আরেক ধাপ উপরে। এমনি একজন মোক্তার শ্রী যুক্ত হরিদাস রায় সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র উল্লেখ করেছেন :

হরিদাস বাবুর এস্থলে কিঞ্চিৎ পরিচয় না দিলে অঙ্গহানি হইবার সম্ভবনা; অতএব নিম্নে তাঁহার যৎকিঞ্চিৎ পরিচয় প্রদান করিলাম। হরিদাস বাবুর বয়স কত তাহা ঠিক করিয়া বলা দুুরূহ ব্যাপার। তিনি কখন বলেন বাষট্টি, আবার স্থান বিশেষে বলেন চুয়াত্তর; সন্ধ্যার পর কখনো কখনো চল্লিশ বলিয়াও ব্যক্ত করিয়াছেন। তাহার কেশ বহুরূপী নামধেয় জীবের ন্যায় কথনো শুভ্র, কখনো কৃষ্ণ, কখনো পিঙ্গল। তিনি ব্যবসায়ে মোক্তার। কিন্তু বুদ্ধিশক্তি ও অর্থোপার্জন ক্ষমতার সমতুল্য ব্যক্তি সমুদয় সহরে ছিলনা। একবার এক দুরন্ত সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট রূপে জিলাতে আসিয়াছিলেন। তিনি নালিশের দরখাস্ত লইতে বড়ই নারাজ। মোক্তার বাবুরা দরখাস্ত লইয়া আসিলে তিনি তাহাদের গালি দিয়া বিতাড়িত করিতেন। গালিটা তাঁহারা প্রচুর পরিমাণে আহার করিতে পাইতেন বটে, কিন্তু উদরের আহার্য্য কিছুই জুটিত না। সকলে পরামর্শ করিয়া হরিদাস বাবুর আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। তিনিও এ সম্বন্ধে নিশ্চেষ্ট ছিলেন না। মনে মনে একটা সঙ্কট স্থির করিয়া তিনি একদিন বেলা এগারোটার সময় একটা সুদীর্ঘ বংশ লইয়া কাছারিতে গমন করিলেন; তবে প্রবেশ পথে না গিয়া ময়দান সন্নিধানে দ-ায়মান রহিলেন। এদিকে দরখাস্ত গ্রহণের সময় উপস্থিত হইলে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আসিয়া বিচারাসনে উপবেশন করিলেন এবং চিরন্তন প্রথা অনুসারে মোক্তর বাবুদের প্রচুর পরিমাণে বাক্যসুধা পান করাইতে প্রবৃত্ত  হইলেন। সাহেব যখন এম্ববিধ সুখাদ্য ভোজ্য পরিবেশণে ব্যস্ত তখন আকস্মাৎ বাতায়ন পথে এক বংশদ- দৃষ্ট হইল। বংশ ক্রমেই অগ্রসর হইতে লাগিলেন এবং অবশেষে সাহেবের সম্মুখে আসিয়া স্থির হইলেন। বংশ বিনা আভরণে আইসেন নাই,  তাহার শিরোদেশে একখানি দরখাস্ত রজ্জুদ্বারা আবদ্ধ হইয়া দোদুল্যমান অবস্থায় বৃদ্ধের বিতায়মান শুভ্র শ্মশ্রুরাজির ন্যায় প্রকাশ পাইতেছিল। সাহেব তদ্দৃষ্ট চীৎকার করিয়া উঠিলেন— কোন্ হ্যায়, কোন্ হ্যায়? দূর হইতে উত্তর আসিল— ‘দরখাস্ত হ্যায়’। সাহেব আদেশ করিলেন— উস্কো পাকড়াকে লে আও। হরিদাস বাবুর পলায়নের ইচ্ছা আদৌ ছিল না। তিনি অচিরে সাহেবের সম্মুখে আনীত হইলেন। তাহার শুভ্রকেশ বিম-িত পক্ব আম্রের ন্যায় মূর্ত্তি দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, এ কেয়া হ্যায়? হরিদাস বাবু নির্বিকার চিত্তে কহিলেন— ‘হুজুর এঠো বাঙ্গালা দেশকো বংশ হ্যায়। আপকো পাশ্ হাম আসলে গালি খাতা হ্যায়। তাই ইসকো ভেজ দিয়া— যেৎনা খুসী ইস্কো গালি দিজিয়ে, আর হামার দরখাস্ত লিজিয়ে’। সাহেব— প্রকৃত ইংরেজের প্রকৃতিই এইরূপ— প্রীত হইলেন এবং তদবধি শান্তভাব অবলম্বন করিলেন।

হরিদাস বাবু ছিলেন চালাক-চতুর ব্যক্তি। সে আমলে যারা আদালতে মোক্তারী করতেন, তারা ছিলেন অর্ধশিক্ষিত মানুষ। আইন শাস্ত্রেও তাদের বিশেষ কোনো জ্ঞান ছিল না। মাইনর স্কুল থেকে তারা বিদ্যা অর্জন করে মোক্তারশিপ্ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আদালতে গিয়ে আইন ব্যবসা শুরু করতেন। সমাজেও এদের মূল্য ছিল যথেষ্ট। দেশের সব আদালতেই হরিদাস বাবুর মত চালাক-চতুর মোক্তার বিদ্যমান ছিল। দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সাহেবদের কৃপালাভের আশায় এইসব মোক্তার বাবুদের কাছে ধরনা দিত। বিশেষ করে পঞ্চায়তি প্রাপ্তির জন্য ধনী ব্যক্তিরা লালায়িত ছিল। এর জন্য ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের নিকট সুপারিশ করার জন্য মোক্তার বাবুদের শরণাপন্ন হত। অর্থ ছাড়া তারা সুপারিশ করতেন না। বলতেন, আগে টাকা, তারপর সুপারিশ। ধনী ব্যক্তিরা মোক্তার বাবুদের খুশি করে গৃহে গিয়ে আনন্দে আত্মহারা হত। এরকম ঘটনার খবর অনেক আছে। কোনো এক ধনাঢ্য ব্যক্তি পঞ্চায়তি পদের জন্য কোনো এক মোক্তার বাবুকে টাকা দিয়ে খুশি করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা যায় যে, পাদপ্রার্থী ব্যক্তি দেখলেন, তার গ্রামস্থ পঞ্চায়েতের গরু, ছাগল, থালা, বাটি নীলামে উঠেছে। তিনি অনুসন্ধান করে জানতে পারলেন, চাকরির ত্রুটির কারণে সরকার বাহাদুরের হুকুমে পঞ্চায়তের ভাগ্যের এরূপ বিপর্যয় ঘটেছে। পদপ্রার্থী ধনী ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ সদর মোকামে গিয়ে তার মোক্তার বাবুকে কেঁদে বললেন, মহাশয় রক্ষা করুন, আমি আর পঞ্চায়তির পদ চাইনে, আমাকে বাঁচান।

মোক্তার বাবুর হাতের মুঠোর মধ্যে একটি কলম ছিল, তিনি তা সজোরে দূরে নিক্ষেপ করে সতিশয় বিরক্তি সহকারে বললেন, বল কি! এই মাত্র যে আমি সাহেবকে ধরে তোমার চাকরির ব্যবস্থা করে এলাম। এখন আর উপায় নেই— তোমাকে পঞ্চায়তি করতেই হবে। পদপ্রার্থী অনেক অনুনয় বিনয় করে আর পঞ্চাশটি রৌপ্যমুদ্রা মোক্তার বাবুর হাতে প্রদান করে চাকরির দায় থেকে অব্যহতি লাভ করলেন।

তৎকালের ফিকিরবাজ মোক্তার বাবুদের স্বভাবই ছিল একই রকম। সে কালেন আদালতের হাকিমদের সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন :

সে কালের হাকিমেরা মূর্খ ও অযোগ্য ছিলেন— আইনের স্বরূপ দর্শনে অসমর্থ বিধায় আসামীদের মুক্তিদান করিতেন এবং হৃদয়ের দৌর্ব্বল্য প্রযুক্ত স্বদেশবাসীকে জেলখানায় প্রেরণ করিতে বড়ই অনিচ্ছুক ছিলেন। একবার একজন সে কালের হাকিমের নিকট একজন তস্করের বিচার হইতেছিল। প্রকাশ যে, সে একদা নিশীথে কোনো দোকান হইতে দুই সের ত-ুল চুরি করিয়াছিল। তখন দেশে বড় অন্নকষ্ট— তাহারা স্ত্রী-পুত্র দুইদিন হইতে অনাহারে ছিল— নিজে পীড়িত, উপার্জনে অক্ষম। অনশনকাতর বালক-বালিকার ক্রন্দন সহ্য করিতে না পারিয়া সেই দুইসের ত-ুল অপহরণ করিয়াছিল। আরও লইতে পারিত, কিন্ত সে তাহা লয় নাই। হাকিম সমুদয় অবস্থা অবগত হইয়া বড়ই বিচলিত হইলেন এবং চক্ষু মুছিয়া অপরাধীকে একদিনের মেয়াদ দিলেন। অপরাধী গৃহে ফিরিয়া আসিয়া দেখিল, কে তাহাকে একবস্তা চাউল পাঠাইয়া দিয়াছে। অনুসন্ধানে জানিল, হাকিমেরই এই কাজ (বারি- বাহিনী, শচীশচন্দ্রের গ্রন্থাবলি, পৃ. ৩২৯)।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর সমকালীন আর একজন তরুণ বিচারক সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন :

এসব দুর্বলচিত্ত বুড়া হাকিমের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হইয়া গিয়াছে। সেই চিতাধৈত বারি প্রেক্ষণার্দ্রে ভূমিতে নবীন হাকিমদিগের জন্ম। আমরা যে নবীন হকিমের কথা বলিতেছিলাম, তিনি যদিও বাঙ্গালী, তথাপি বাঙ্গালা ভাষায় উকিলবাবুরা স্থান বিশেষে ইংরেজীতে অনুবাদ করিয়া দিয়া হাকিমের বিশেষ সাহায্য করিতেন। হাকিম বিলাতে গমন করেন নাই, কিন্তু ইউরোপে প্রদেশের মানচিত্র দেখিয়াছেন এবং দার্জ্জিলিং গিয়াছিলেন বলিয়া কিম্বদন্তী আছে।

সে যাই হোউক, হাকিম প্রবর যথাকালে আসিয়া বিচারাসনে উপবেশন করিলেন এবং পুত্র শোকার্তর ন্যায় গাম্ভীর্য অবলম্বনপূর্বক সমবেত উকিল মোক্তারের প্রতি কটাক্ষপাত করিলেন। প্রথমেই ছোট মোকদ্দমার ডাক হইল। সিপাহী একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোককে আনিয়া কাষ্ঠবন্ধনীর মধ্যে তুলিল। হাকিম তাহার অপরাধ জিজ্ঞাসা করিলে কোর্ট বাবু কহিলেন, এই ব্যক্তি গত রাত্রে কুৎসিত স্থানে মদ্যাদি পান করিয়া রাস্তায় হল্লা করিতেছিল। ইহা এই ব্যক্তির প্রথম অপরাধ নহে, পূর্বেও কয়েকবার এইরূপ অপরাধে ইহার দ- হইয়াগিয়াছে।

হাকিম । এই ব্যক্তি কি করে?

কোর্ট বাবু। আজ্ঞে, ইনি স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রের সম্পাদক।

হাকিম। সম্পাদক পদের উপযুক্তই বটে। দেশের  লোক কেন যে, এমন দুশ্চরিত্রের কাগজ পড়ে, তা আমি বুঝতে পারিনা। ইচ্ছা ছিল একে রাস্তার মাঝে দাঁড় করিয়ে চাবুক লাগাতে; তা’ এবার সেটা না করে এক হপ্তার জন্যে জেলে দিলুম (বারি-বাহিনী, শচীশচন্দ্রের গ্রন্থাবলি, পৃ. ৩২৯)।

তুবন ম-লও আদালতে এরকম অনেক ঘটনা দেখেছেন। দেখেছেন দারোগা মহোদয়দের দাপট। এলাকায় হত্যা, রাহাজানি ও চুরি-ডাকাতি হলে দারোগারা গ্রামের উপর সদলবলে চড়াও হয়ে নির্বিচারে মারপিট করে ত্রাস সৃষ্টি করত। ঘরবাড়ি ফেলে গ্রাম থেকে পলায়ন করত গ্রামের অধিবাসীরা। গ্রামের মধ্যে ক্যাম্প বসিয়ে ছাগ এবং মৎস্য ভক্ষণ করার উৎসবে মেতে উঠত। কখনো কখনো দুষ্টলোকের গৃহবাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করত। কয়েকদিন ধরে চলত এই অমানবিক নিষ্ঠুর নির্যাতন ও লুটতরাজ। পুলিশ সেপাইদের পরিধানে থাকত খাঁকি হাপ্ প্যান্ট ও মাথায় লাল পাগড়ি। লাল পাগড়ির আগমনের বার্তা পেলেই গ্রামের মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হত। ঘোড়া দাবড়িয়ে জনবসতি তছনছ করে দিয়ে যেত লাল পাগড়িওয়ালারা। কোনো ব্যক্তিই লাল পাগড়ির ধারের কাছে যাওয়ার দুঃসাহস ছিল না। তবুও দস্যু-তস্কর ও ডাকাতদের উপদ্রব কম ছিল না। এখানে-ওখানে চুরি-রাহাজানি হত। বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে খুনোখুনির লোমহর্ষক ঘটনা ঘটত। এরকম বেশ কিছু হত্যা ও দুর্ধর্ষ ঘটনার মামলায় বিচারকার্যের সহায়তার জন্য তুবন ম-লকে জুরি হিসাবে আদালতে হাজির হতে হয়েছিল।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায় যে, যশোহর জেলার কোনো এক থানার কোনো এক গ্রামে একটি হত্যাকা- ঘটেছিল। এ ব্যাপারে পুলিশ তদন্ত করে ফৌজদারী আদালতে বিচারের জন্য মামলা রুজু করে। মামলাটির বিষয় ছিল এরকম—

মোমরেজ মৃধা তার একমাত্র কন্যা রুসি খাতুনকে পোনের বিনিময়ে যাদবপুর গ্রামের আক্কেল সর্দারের পুত্র রজব আলী সার্দারের সঙ্গে বিবাহ দেয়। মেয়ের বয়স ছিল ৯ বছর এবং রজব আলীর বয়স ছিল ১৪ বছর। মোমরেজ মৃধা এবং আক্কেল সর্দার উভয়েই ছিলেন চাষী গৃহস্থ। গ্রামে তাদের উভয়েই ছিল বিশেষ প্রভাব-প্রতিপত্তি। আক্কেল সর্দারের পুত্র রজব আলী সর্দার অল্পবয়সে বখাটে হয়ে গিয়েছিল। সে গ্রামের এবং এলাকার দুষ্ট লোকের সঙ্গে মেলামেশা করত। তার স্বভাব-চরিত্র এত মন্দ হয়ে গিয়েছেল যে তার ভয়ে পুরো এলাকাটা সদাসর্বদা সন্ত্রস্ত হয়ে থাকত।

রজব আলী সর্দারের সবচেয়ে মন্দদোষ ছিল যে, গ্রাম্য ললনা এবং সুন্দরী বধূদের সুযোগ পেলেই সে ইজ্জত হরণ করত। এ ব্যাপারে সালিশ-বিচার করেও স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। রজব আলী সর্দারের শ্বশুরকুল তার এই হেন দুষ্টকর্মের প্রতি ছিল অসন্তোষ্ট। তার স্ত্রীর বয়স যখন ১৪ বছর, তখন তার শ্বশুরকুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, রজব আলী সর্দারের মত কুলাঙ্গারের ঘরে তার কন্যাকে তারা আর পাঠাবে না।

ঘটনাটি জানাজনি হয়ে গেল। রজব আলী সর্দার তার স্ত্রীকে ঘরে তুলে আনার জন্য ঘনঘন শ্বশুর বাড়িতে যাতায়াত করতে লাগল। মোমরেজ মৃধা বলল, আমরা আমাদের মেয়েকে তোমর বাড়িতে পাঠাব না। মেয়ে এখন সাবালিকা হয়েছে। সে এই বিয়ে স্বীকার করে না। এই বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সালিশ-বিচার হয়েছিল। মৌলবী-মওলানাদের ডাকা হয়েছিল। মেয়ের কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। মেয়ে জবাব দিয়েছিল, আমি বর্তমানে সাবালিকা, আমি এই বিয়ে স্বীকার করি না। একজন অসৎ-মন্দ লোককে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

এই ঘটনাটি নিয়ে সওয়াল-জওয়াব হয়েছিল। ফতোয়াবাজরা নানারকম ফতোয়া দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত একজন মুফতি এসে ফয়সালা করে দিয়েছিলেন যে, নাবালিকা বয়সে বাপ-মা যদি তার কন্যাকে বিবাহ দেয়, কন্যা সাবালিকা হলে সে বিয়েকে সে যদি অস্বীকার করে, তাহলে ইসলামি বিধান মতে মেয়ের সিদ্ধান্তই সঠিক। কোনো জোরজবরদস্তি চালানো অন্যায়।

এই বিষয়টির চূড়ান্ত নিস্পত্তি হাজেরান মজলিসেই হয়ে গিয়েছিল।

রজব আলী সর্দার এবং তার পক্ষের দলবল গোস্সা হয়ে হাজেরান মজলিস থেকে উঠে গিয়েছিল।

ঘটনার পনোরো দিন পর ঘটল আর একটি ঘটনা। দুষ্ট লোকের মাথায় দুষ্ট খেয়াল জেগে উঠল। তারা প্রতিশোধ-লিপ্সায় উন্মত্ত হয়ে উঠল। সেদিন ছিল অমাবশ্যা রাত। রজব আলী সর্দার ১৫/২০ জন দুষ্ট লোক নিয়ে রওনা হলো শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। হাতে দেশীয় অস্ত্র। বাঁশের লাঠি। খোনা, বল্লম। পনোরো মাইল পথ রাতের অন্ধকারে হেঁটে গিয়ে রাত দুপুরে চড়াও হলো শ্বশুর বাড়িতে। আকস্মিক এই হামলায় হতবাক হয়ে গেল মোমরেজ মৃধা। ঘরের দরোজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে গেল দুষ্ট লোকেরা। একটা হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। রুসি খাতুনের হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে যেতে লাগল। মোমরেজ মৃধা মেয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। বলশালী দুর্বৃত্তগণ মারপিট করতে লাগল। গৃহবাড়ির মহিলাদের চিৎকার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পাড়ার লোকেরাও ডাকাত ডাকাত বলে লাঠিসোটা নিয়ে ছুটে আসল। একটা খেরের মধ্যে আটকে যাওয়ার উপক্রম দেখে দৃর্বৃত্তরা মোমরেজ মৃধার বুকে ছুড়ে মারল ধারালো বল্লম। মোমরেজ মৃধা মাটিতে চিৎকার করে লুঠিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে ভেগে গেল দুর্বৃত্তরা। ঘটনাস্থলে মারা গেলেন মোমরেজ মৃধা। একটা লোমহর্ষক ঘটনা। পরদিন দুপুর বেলা দারোগা-পুলিশ এসে লাশটা তুলে নিয়ে গেল। এরপর থেকে একটার পর একটা তদন্ত। দারোগা বাবু এলেন, ইনেস্পেক্টর এলেন। মহকুমা পুলিশ অফিসারও এলেন।

প্রধান আসামী রজব আলী সর্দার, পিং আক্কেল সর্দার, সাকিন যাদবপুর থানা, শার্শা, জেলা যশোহর। রজব আলী সর্দারের ইয়ার-দস্তিরাও আসামী হয়ে গেল। পুলিশ ঘোড়ায় চড়ে আসামীদের তাবড়ানো শুরু করল। আশেপাশের এমন কোনো গ্রাম ছিল না যে, পুলিশের দাবড়ানিতে আতঙ্কিত ছিল না।

দুর্বৃত্তরা সকলেই ছিল পলাতক। আক্কেল সর্দারের গৃহবাড়িও জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। ধানের গোলা ও গরু-ছাগল লুটপাট হয়ে গিয়েছিল। ভিটেয় কোনো জনমানুষের চিহ্ন ছিল না। আসামীরা বনে-জঙ্গলে গিয়ে গা ঢাকা দিয়েছিল। কে কোথায় গিয়ে যে অবস্থান করত লোকালয়ের জনগণ জানত না। সমগ্র অঞ্চল জুড়ে ছিল পুলিশি আতঙ্ক।

প্রায় ৬ মাস পলাতক ছিল আসামীরা। অবশেষে নিরূপায় হয়ে ফৌজদারী আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়েছিল।

ভারতীয় দ-বিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করেছিল পুলিশ। ডাকাতি, লুটপাট, নারী অপহরণ ও নরহত্যার অভিযোগে মামলাটি সাজনো হয়েছিল। সাক্ষী ছিল ২০ জন। দুর্বৃত্তদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রসস্ত্র আলামত হিসাবে জব্দ করা হয়েছিল।

স্বীয় কৃতকর্মের জবানবন্দি দিয়েছিল হাকিমের কাছে প্রধান আসামীসহ আরো কয়েকজন। পুলিশ প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে, দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালনই হচ্ছে তাদের মূল কর্তব্য।

এই ক্ষেত্রে মামলার তদন্ত বিলম্ব হয়েছিল বটে— কিন্তু তদন্তে কোনোরকম গাফেলতি ছিল না। পুলিশ ২০ জন আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল। মামলা চলাকালীন পুরোটা সময় আসামীরা জেল-হাজতে ছিল। হাকিমের নিকট জামিনের আরজি পেশ করা সত্ত্বেও হাকিম কোনো আসামীকে জামিন মঞ্জুর করেননি।

এই হত্যা মামলার শুনানী হয়েছিল পুরোপুরি আড়াই বছর। বিবাদি পক্ষের উকিলরা নানাবিধ সমস্যার কথা বলে মামলার কার্য বিলম্বিত করার চেষ্টা করেছিল। হাকিম ছিলেন জাতিতে ইংরেজ এবং কঠোর প্রকৃতির। তিনি বিচারের কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেছিলেন। বিবাদি পক্ষের উকিল মোক্তারদের অযৌক্তিক দাবি গ্রাহ্য করেননি। সরকার পক্ষের উকিল ছিলেন যদুগোপাল রায়। তিনি ছিলেন আইন শাস্ত্রে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি। যুক্তিতর্কে তার সমকক্ষ দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি আর কেউ ছিল না। ঘুষ-দুর্নীতি এবং অবৈধভাবে রোজগারের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ ছিল না। বিবাদি পক্ষ অর্থের প্রলোভন দেখিয়েও এই নীতিবান লোকটির চরিত্র হনন করতে পারেননি। শোনা যায় যদুগোপাল রায় বালক বয়সে পিতৃহীন হন। অত্যন্ত দরিদ্রতার মধ্যে লেখাপড়া শিখেছেন। কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। অবশেষে আইন শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ওকালতি ব্যবসায় মনোযোগী হন। এই কার্যে নিষ্ঠার জন্য অচিরেই তার নমযশ চারদিকে ছাড়িয়ে পড়ে। তিনি হয়ে ওঠেন একজন সৎ আইনজ্ঞ ও বিজ্ঞ ব্যক্তি। বিচারক হাকিম তার যুক্তিতর্ক ও আইনের ব্যাখ্যা শুনে মুগ্ধ হন। যদুগোপাল রায় এজলাসে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন :

মি লর্ড, প্রতিপক্ষ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনাটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলক। গৃহ-বাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট, নারীর ইজ্জত হরণ ও গৃহকর্তার হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে তারা ঘটনাস্থলে এসেছিল।

প্রতিপক্ষ যুক্তি দেখাচ্ছেন, মূল আসামী রজব আলী সর্দার তার বৈধ স্ত্রী রুসি খাতুনকে নিজঘরে তুলে নেওয়ার জন্য তার শ্বশুর মোমরেজ মৃধার বাড়িতে দলবলসহ আগমন করে এবং রাত্রে থাকার বন্দোবস্ত করে। রাত দুপুরে শ্বশুর মোমরেজ মৃধা তার কন্যাকে জামাইয়ের বাড়িতে পাঠাবে না বলে সাক্ষীদের নিয়ে গোপন ষড়যন্ত্র করে এবং দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করে। হঠাৎ করে এই আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে শ্বশুর পক্ষের লোকজনের সঙ্গে তাদের হাতাহাতি ও বচসা হয়। এই হাতাহাতি ও বচসার সময় শ্বশুরের পক্ষের লোকজন তাদের দিকে বল্লম ছুড়ে মারে। ঘটনাক্রমে সেই বল্লমটি মোমরেজ মৃধার বুকে বিদ্ধ হয়।

মি লর্ড, প্রতিপক্ষের যৌক্তি খোঁড়া-অযৌক্তিক। রুসি খাতুনের সঙ্গে আসামী রজব আলীর বিবাহের বিষয়টি চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে যায় ঘটনার ১৫ দিন আগে। বৈবাহিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায় গ্রামের মোড়ল-মাতব্বর এবং আলেম ব্যক্তিদের সালিশ-বিচারের মাধ্যমে। অতএব রুসি খাতুনকে স্ত্রী দাবিতে গৃহে তুলে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আসামী গ্রাম্য সালিশ-বিচার যদি অমান্য করেন, তাহলে তিনি আদালতে মামলা-মকদ্দমা দায়ের করে বিষয়টির নিষ্পত্তি চাইতেন। তিনি সে পথ পরিহার করে বেআইনিভাবে দুর্বৃত্তদের নিয়ে মোমরেজ মৃধার বাড়িতে রাত দুপুরে আক্রমণ করে মারাত্মক অপরাধ ঘটিয়াছেন। ঘরের দরজা ভাঙচুর, অর্থ ও সোনাদানা লুট, রুসি খাতুনকে টানা-হেঁচড়া ও পরিধানের বস্ত্র খুলে নেওয়া এবং পরিশেষে মোমরেজ মৃধাকে বল্লম ছুড়ে হত্যাকা- ঘটিয়েছেন।

আসামী পক্ষে উকিলরা যে যুক্তি প্রদর্শন করেছেন, এই যুক্তির আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। মামলার সমুদয় সাক্ষীবৃন্দের সাক্ষ্যেও অপরাধের প্রকৃত ঘটনার বিবরণ আছে। এই আক্রমণ ও হত্যাকা- ছিল পূর্বপরিকল্পিত। আইনের প্রতি বিশ্বাস নেই। প্রতিটি আসামী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। ১ নং আসামী থেকে ২০ নং আসামী এলাকায় কুখ্যাত ডাকাত, লুটেরা ও খুনি হিসাবে সুপরিচিত। থানায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নস্থানে এরা এর আগেও অপরাধমূলক কা- ঘটিয়েছে। প্রতিটি আসামী দাগী। থানায় কুখ্যাত ব্যক্তিদের নামের তালিকায় এদের নামও লিপিবদ্ধ আছে।

পুলিশ যে অস্ত্রগুলি জব্দ করেছে, এই অস্ত্রগুলো যে তারা বহন করে এনেছিল, এটা ১ নং আসামী থেকে ২০ নং আসামীগণ স্বীকার করেছেন।

মি লর্ড, ভারতীয় ফৌজদারী দ-বিধির যে সকল ধারা এই মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে সাজা প্রাপ্তির জন্য উত্থাপন করা হয়েছে তা মহামান্য আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

আদালত যথাযতভাবে মনোযোগ সহকারে উকিল যদুগোপাল রায়ের বক্তব্য শুনলেন। তিনি বিচারকসূলভ ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে এজলাসের বেঞ্চে বসে থাকা জুরিগণের দিকে তাকিয়ে বললেন, মাননীয় জুরি মহোদয়গণ, বিচারের শুনানী সমাপ্ত। বাদি এবং বিবাদি পক্ষ উভয়েই যুক্তিতর্ক দাখিল করেছেন। আপনাদেরকে ৪৫ মিনিট সময় দেওয়া হলো। আপনারা এজলাসের পার্শ্ববতী ঘরে গিয়ে আপনাদের সকলের যুক্তি ও মতামত প্রদান করুন।

আদালতের হাকিম বিচার কাজের মূলতবী ঘোষণা করলেন। জুরিগণ উঠে গিয়ে পার্শ্ববর্তী কক্ষে নিজেদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করলেন।

জুরিগণের সংখা ছিল পাঁচজন। একজন মুফতি, একজন ব্রাহ্মণ, একজন হাই স্কুলের হেড মাস্টার ও দুজন ছিলেন সমাজপতি।

হেড মাস্টার বললেন, মুফতি সাহেব আপনিই বলুন, ফাঁসি না দ্বীপান্তর?

ব্রাহ্মণ বললেন, দস্যু-তস্কররা সমাজটা দখল করে নিচ্ছে। আপনারা যে অভিমত দেবেন আমি তাই মেনে নেব।

সমাজপতি শেখর হালদার তাকালেন তুবন ম-লের দিকে। কী বলেন দাদা?

তুবন ম-ল জিজ্ঞাস করলেন ধারা কি কি?

মুফতি সাহেব বললেন, ধরাতো দেখছি পাঁচটি।

তুবন ম-ল, বললেন এইতো আসল জিনিস।

ব্রাহ্মণ বললেন, এসব শাস্ত্র আমার জানা নেই। ডেকেছ এসেছি। হাজিরা দেওয়া ছাড়া আইন সম্পর্কে কিছু জানিনে। আপনাদের মতই হলো আমার মত।

মুফতি বললেন, ইসলামি শাস্ত্র পড়া আছে। ইংরেজের আইন হলো, আলাদা। কখনো পড়িনি। ধারা ও বিধি সম্পর্কে বিশেষ কোনো ধারণা নেই। ম-ল আপনি যা বলবেন সেটাই সমর্থন করব।

শেখর হালদার বললেন, ম-লদা, আপনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন।

তুবন ম-ল বললেন, লিখুন, জুরিগণ এই মত প্রকাশ করেছেন যে, বাদিপক্ষ তাদের অভিযোগ প্রমাণিত করেছেন। সেই হেতু ভারতীয় ফৌজদারী দ-বিধির উল্লেখিত ধারামতে সাজা প্রদান করার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে মহামান্য আদালতের প্রতি প্রার্থনা জানাচ্ছে।

************************************************

সম্প্রতি প্রকাশিত ও নির্বাচিত

                                                        বই-পত্রিকা পরিচিতি

ত্রিমাত্রিক পরিচয়ে সালিম সাবরিন ঋদ্ধ— কবি, গবেষক এবং সম্পাদক। আগামী প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে তাঁর গবেষণা-প্রবন্ধ সংকলন ভাষা সা¤্রাজ্যবাদ ও মানবাধিকার। সভ্যতায় আগ্রাসনের ইতিহাস, মানব ইতিহাসের তুল্যই সুপ্রাচীন; আর, দুঃখজনক হলেও স্বীকার্য— এক্ষেত্রে বর্তমানকাল অবধি অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ক্রিয়াশীল রয়েছে ভাষা। ভাষিক আগ্রাসন সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রধান এক নিয়ামক। ভাষার এই সা¤্রাজ্যবাদী চরিত্রের দরুণ— পৃথিবীর নানা প্রান্তের জনগোষ্ঠী হারিয়ে ফেলছে তাদের স্বকীয়তা, আত্মপরিচয় ও অধিকার। তারা হয়ে উঠছে শেকড়চ্যুত; খানিকটা নিজভূমিতে পরবাসী। প্রাচীন থেকে সমকালীন বিশে^র ভাষা পরিস্থিতি, ভাষিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতার চারিত্র সালিম সাবরিন উন্মোচিত করেছেন ভাষা সা¤্রাজ্যবাদ ও মানবাধিকার গ্রন্থটির চারটি দীর্ঘ, পরিশ্রমলব্ধ গবেষণা-প্রবন্ধে।

************************************************

মহীবুল আজিজের লেখক পরিচিতি বহুমাত্রিকতা অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে তাঁর সবিশেষ ও বিরল গুণ— ‘রচনার সুখপাঠ্যতা’। খড়িমাটি থেকে সদ্যপ্রকাশিত শব্দসমর ও অন্যান্য প্রবন্ধ পুস্তকটিও এই পরিচয়ে মানানসই। গ্রন্থটি সম্পর্কে লেখকের ভাষ্য— ‘যেসব বিষয় নিয়ে লিখতে আমি আনন্দ ও অনায়াস বোধ করি এমন ছাব্বিশটি প্রবন্থ এতে আছে। মূলত সাহিত্য উপজীব্য হলেও ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাবিষয়ক কিছু রচনাও গ্রন্থিত হলো।’ এমন স্বীকারোক্তি গ্রন্থটির বিষয় ও কালিক বিস্তার সম্পর্কে আমাদের সন্দেহশূন্য করে। মহীবুল আজিজ দীর্ঘকাল ধরে ব্যক্তি ও ব্যক্তি ভাবনা নিয়ে লিখেছেন; উন্মোচন করেছেন ব্যক্তির ভাবনাবিশে^র ভূগোল। তার পরিচয় যেমন গ্রন্থটিতে নিহিত রয়েছে; তেমনি রয়েছে সাহিত্যের সমান্তরালে শিক্ষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর সময়গত ভাবনার বিবর্তন।

************************************************

বাংলাদেশের কবিতায় স্বাচ্ছন্দ্যহীন, তথাকথিত পদ্য¯্রষ্টা কবিযশপ্রার্থীর সংখ্যাই অধিক। এই সংখ্যাধিক্য কাটিয়ে যে ক’জন কবি গুরুত্বসহযোগে বিবেচ্য; তাঁদের মধ্যে বিরলপ্রজ কবি আবু হাসান শাহরিয়ার বিশিষ্ট। প্রায় চার দশকের কবিতাচর্চায় তিনি নিজেকে বারংবার যেমন ভেঙেছেন— তেমনি বিনির্মাণ করেছেন নব নব অনুষঙ্গে। কবিতামগ্নপ্রাণ এই কবি কবিতাকে জ্ঞান করেছেন ‘একার সন্ন্যাস’ রূপে। বিমূর্ত প্রণয়কলা আবু হাসান শাহরিয়ারের পঞ্চদশতম কাব্যগ্রন্থ; কবির নিজস্ব, অভিনব অনুষঙ্গের চল্লিশটি কবিতা সহযোগে কাঠামো পেয়েছে গ্রন্থটি। গ্রন্থটিতে কবিতার সমান্তরালে স্থানলাভ করেছে বিখ্যাত বাঙালি চিত্রশিল্পী এবং ভাস্করদের কলাকীর্তি; যা বহন করে কবির কলাপ্রবণ হৃদয়ের প্রোজ্জ্বল স্বাক্ষর। সার্বিকভাবে আবু হাসান শাহরিয়ার বিমূর্ত প্রণয়কলায় নির্মাণ করেছেন তাঁর কবি জীবনের এক নতুন বাঁক। যেসকল কবিতাপ্রেমী কবিতায় প্রতিনিয়ত নব-আস্বাদ সন্ধান করেন, গ্রন্থটি তাদের নিকট বিশিষ্ট কাব্যগ্রন্থরূপে গ্রহণীয় হবে বলেই বিশ্বাস।

************************************************

নাইজেরিয়ার সমস্যা বিখ্যাত আফ্রিকান লেখক চিনুয়া আচেবের The trouble with Nigeria গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ। একটি মূল্যবান ভূমিকাসহ অনুবাদ করেছেন এহলাম হোসেন। চিনুয়া আচেবে ঔপন্যাসিক, কবি, সমালোচক ও প্রাবন্ধিকরূপে খ্যাত; সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে সচেতনতা তাঁর সাহিত্যিক খ্যাতিকে বিশ^জুড়ে বিশিষ্ট করে তুলেছে। নাইজেরিয়া ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে গত শতাব্দীর ষষ্ঠ দশকের প্রারম্ভে। কিন্তু, স্বাধীনতা অর্জনের পর এই ভূখ-ের মুক্তিকামী জনসাধারণকে এক নতুন সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়— সেটি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার তল্পিবাহক নিজেদের শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে লালিত ব্যবস্থা ও সমস্যার বিরুদ্ধে। চিনুয়া আচেবের নাইজেরিয়ার সমস্যা গ্রন্থটি রাষ্ট্রের এই আভ্যন্তরীণ সমস্যার বিশ্লেষণ; ইতিহাস নির্ভতরা যে বিশ্লেষণে সবিশেষ মাত্রা সংযুক্ত করেছে। আফ্রিকান সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘকাল কাজ করা এহলাম হোসেনের প্রাঞ্জল অনুবাদে গ্রন্থটি নাইজেরিয়া সম্পর্কে বাঙালি পাঠকদের কৌতুহল নিবারণের সমান্তরালে চিন্তারও খোরাক জোগাবে।

************************************************

ভ্রমণকে কখনো অভিহিত করা হয় পিপাসা; কখনোবা নেশা হিসেবে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষের সঙ্গে ভ্রমণ শব্দটির যোগ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ভ্রমণের কাহিনি, আনন্দ, অভিজ্ঞতা অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অভীপ্সা থেকেই জন্ম ভ্রমণ সাহিত্যের। পৃথিবীর অপরাপর ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যও দিন দিন ঋদ্ধ হয়েছে। নাহিদ হাসান রবিন সম্পাদিত সাহিত্যপত্র অপরাজিতর বিংশতম সংখ্যাটি কাঠামো পরিগ্রহ করেছে বিভিন্ন স্বাদের ১৫ টি ভ্রমণকাহিনির সম্মিলনে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জনপদ সম্পর্কে আগ্রহীদের সংখ্যাটি মনোযোগ আকর্ষণ সক্ষম— একথা দ্বিধাহীন ভাবেই ব্যক্ত করা চলে।

************************************************

পত্রিকা করাটা নেহাতই সাহিত্য চর্চার জন্য নয়, লেখাকে জীবনের দায় নিতে হয়, লেখাও হয়ে ওঠে সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার দর্পণ; খানিক অর্থে প্রতিবাদ। মির্জা রানা সম্পাদিত তূর্যনিনাদর চতুর্থ সংখ্যাটি এ কথাই স্মরণ করিয়ে দিল। এবারের সংখ্যাটি বিভিন্ন স্বাদের ৮ টি প্রবন্ধ ও একটি পত্রিকা পর্যালোচনায় ঋদ্ধ। যেখানে ক্রম পেয়েছে— বদরুদ্দীন উমর হতে আরম্ভ করে সাগর আল হেলালের লেখা। সাহিত্যের সমান্তরালে সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি সম্পর্কে নানা মূল্যবান ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে লেখাসমূহে।

************************************************

ধারাবাহিকভাবে পত্রিকাটি অন্তশ্চক্ষু দিয়ে দেখলে, কলকাতার অনেক কাগজের ভীড়ে যাপনচিত্র আলাদা কাগজ কয়েকটি কারণে। এক. ওর কবি ও কবিতাভাবনা একটা সময়কে চিহ্নিত করে এগুচ্ছে— প্রায় প্রতিটি সংখায়, দুই. অনুবাদের ভেতর দিয়ে অন্যভাষার কবিতার স্বাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে কবি-বিবরণ, আকর্ষণীয় নির্বাচন ও কথকতা মিলে একপ্রকার আলাদাগোছের পরিবেশনা, তিন. পুনর্বার করে পেছনের কাজগুলোকে স্মরণ করে নিজের মতো পরিকল্পনামাফিক কিছু করা— প্রয়োজনে পূর্বের কাজগুলো সংগ্রন্থন করা, চার. আলাদা ধরনের ‘ক্রোড়পত্র’— যেমনটা এ সংখ্যায় পেয়েছি ‘আমার বাবা’। অরুণ মিত্র, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো চৌদ্দজন বাবার কথা। বেশ প্রাপ্তি। আর পরিচ্ছন্নতায় ফার্স্ট ক্লাস। এর সবকটি সংখ্যাই সংগ্রহের যোগ্যতা রাখে।

************************************************

‘উলুখাগড়া’র জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯ সংখ্যাটি একদম জুলাইয়ের দাগেই হাতে আসলো। খুব নিয়মিত এবং পরিকল্পিত পত্রিকাটি। এর কর্ণধার সিরাজ সালেকীন অত্যন্ত সিরিয়াস মানুষ। যা পরিকল্পনা— তাই বাস্তবায়ন। কবি চঞ্চল আশরাফকে বেছে নিয়েছেন তিনি— এ সংখ্যায়। নব্বুইয়ের এ কবি এমনকি তার নির্বাচিত গল্পও কাটাছেঁড়ায় এসেছে। আলোচকবৃন্দের প্রায় সবাই সাহিত্যের অধ্যাপক, ফলে তত্ত্বময়তার তপ্তকথায় চঞ্চল আশরাফ একটা পাঠ-উচ্চতা পেয়ে গেছেন। অবশ্য এটা তাঁর প্রাপ্য। অন্য প্রবন্ধগুলোর মধ্যে মানিকের গল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট শিল্প-সমালোচক, অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক; বাংলাদেশের মেলা নিয়ে লিখেছেন ফোকলোরের শিক্ষক উদয় শংকর বিশ্বাস আর আছে পোস্টমর্ডান নিয়ে শিমুল মাহমুদের প্রবন্ধ। ‘উলুখাগড়া’য় কবিতা আর গল্প তো নিয়মিতই কিন্তু কবিতা এবার বিশেষায়িত হয়েছে আদিবাসীদের কবিতা নিয়ে। সিকান্দার আবু জাফরকে জন্মশতবর্ষে স্মরণে এনেছেন সৌভিক রেজা। এরকম সব মিলে ‘উলুখাগড়া’ তার পূর্বাপর কৃতিত্ব বহাল রেখেছে এবং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির উত্তরকালকে আগামীতে চিহ্নিত করতে পারবে বলেই মনে হয়।

************************************************

আমাদের দেশে কাগজ চর্চার যে ঐতিহ্য, সেখানে বড় জায়গা নিয়ে আছে কেন্দ্রিকতা; ঢাকা যেখানে মোড়ল। কিন্তু, সকলে যে এটি মানবে, হজম করবে এবং প্রান্তিকতার দোহাই মেনে ছাঁটা মাপমতো চলবে— এমনটা ভাবার সময় এখনো নিকটবর্তী হয়নি। শোয়েব শাহরিয়ারের সম্পাদনায় বগুড়া থেকে সদ্য প্রকাশিত কাগজ প্যারাডাইম-এর প্রথম সংখ্যা এমনটিই মনে করিয়ে দিল। প্যরাডাইমের এই সংখ্যাটি পরিচর্যা পেয়েছে— প্রবন্ধ, গল্প, নিবন্ধ ও কবিতার সন্নিবেশে। লেখকের তালিকাতে পরিচিত-অপরিচিত উভয় কেতারই উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। তবে, সবথেকে আশার কথা জেনারেশনের ক্রাইসিসটা প্যারাডাইম উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। চতুর্পাশে ব্যবস্থার যে ভঙ্গুরতা, কর্পোরেট প্রযতেœ যন্ত্র সর্বস্বতা; ক্ষয়িষ্ণু মানুষের রবার্ট স্টিভেনস লুইসের বিখ্যাত বদমায়েশ মি. হাইডের তুল্য ডিজিটাল অপমানুষে রূপান্তর; সেখানেই প্যারাডাইম নিজের কমিটমেন্ট রাখতে উদ্যোগী-প্রয়াসী। পত্রিকাটির অঙ্কুরআর্তি— ‘মানবিক কল্যাণই হবে সভ্যতার একমাত্র শুভ মন্ত্র’। প্যারাডাইম পাঠকসমাজে সমাদৃত হবে, নিজস্ব পথচলা দীর্ঘ করবে— আমরা এমন প্রত্যাশা রাখছি।

************************************************

শেষ পাতার আহ্বান
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না…

কতোদিন জবা-জুঁই আর বকুলের পাশে কামিনী বা শিউলিকে রেখেছি। ওরা বিলিয়ে সব করে রব— সকলের তরে। আর অনেক মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ আছেন— যারা তাদের আলাদা করে গ্রহণ করেন। কারণ, তাঁরাও যে ওদের গোত্রীয়! তাই ঘুম হয় না এমন মানুষদের। এই নির্ঘুম কাতরের এখনকার ধারার নতুন বন্ধু কারা?

দীপ্ত উদাস
………………..
পটভূমির ভেতরে গিয়ে তোমায় দেখি নাই

অন্ধকার আমাদের প্রিয় হয়ে ওঠে তখন। আমরা ইচ্ছে করলেই তখন টুপ করে ডুবে যেতে পারতাম অন্ধকারে আবার সেখান থেকে অনায়াসে সাঁতরে উঠে যেতে পারতাম আলোর কিনারে। আমরা সেসবের সবই মনে রাখতে পারতাম। আমাদের সবার কাছে আমাদের সবার মুখ খুব পরিচিত আর আপন হয়ে উঠেছিলো, আমরা অন্ধকারে পাশাপাশি হেঁটে যেতেও পরস্পরের শরীরের ঘ্রাণ অনুভব করতে পারতাম। বলে দিতে পারতাম তার নাম, ঠিকানা, গন্তব্য। শুধু উদ্দেশ্য বুঝতাম না। ওটা অবশ্য কখনো আমরা বুঝতেও চাইনি। মূলত আমরা অন্ধকারের সাথে এতো ঘনিষ্টভাবে মিশে গিয়েছিলাম, আমাদের কেউ না তখন আলাদা করতে পেরেছে না এখন পারবে। আমরা আলোকে কখনো ভয় পেতাম না। আমরা অনেক আলোর ঝলকানি দেখতে দেখতে সওয়া হয়ে গিয়েছিলাম। তবে আমাদের ভেতর অনেকে ফুলের সুবাসকে, মাটির ঘ্রাণকে, জোনাকির আলো, রাতের অন্ধকারকে জীবনের তরঙ্গে ভাসিয়ে এমনভাবে গিঁট দিয়ে নিলো তারা তা ছাড়া আর কিছু বুঝতো না। আমরা ভয় পাওয়া শিখলাম সেই প্রথমবার। তখন থেকে আমরা জিজ্ঞাসু হতে শিখলাম, অন্ধকারে যেতে ইচ্ছে হলো। অথচ আমাদের প্রথম বিনিদ্র হবার খবর কেউ রাখলো না। আমরা তখন কেউ কেউ কারো কারো শরীরে ঢলে পড়ে সেই ঘটনার উদ্বোধন করলাম। সব খবর ছাপিয়ে আমরা কেমন যেনো বেখবরের খপ্পরে পড়ে গেলাম। যেখানে আমরা সব ভুলে গিয়ে এক প্রশান্তির নিদ্রা যাপনের কথা ছিলো আমরা তা পারলাম না। ‘এই মাতোয়ালা রাইত’ আমাদের পেয়ে বসলো। অন্ধকার হলেই আমরা ছুটতে শুরু করতাম। কোথায় যেনো যেতাম, এক রাজ্যে। আলকাতরাগোলা অন্ধকার, চিকন এক সুর ভেসে আসার মতো কান ঝাঁঝাঁ হবার মতো এক শব্দ আমাদের কানে ভেসে আসতো। মোহন করা সব আয়োজন। কী নিপুণতার সাথে তারা আপ্যায়ন করতো। কতো দূর দূর থেকে কতো কতো মানুষ আসতো, চলে যেতো। একেকজন একেক সুবাস নিয়ে আসতো আর আমাদের ঘুম খেয়ে ফেলতো। আমাদের ঘুম খেয়ে ফেলেছিলো। আমাদের ঘুম খেয়ে ফেলেছে।

অন্ধকারে পথ বলে মূলত কিছু থাকে না। পথিকের পা যেদিকে সায় দেয় সেকিটাই পথ হয়ে ওঠে। কোনো অজানা সুবাস পথিককে যেদিকে টানে সে দিকটাতেই পথ রচিত হয়। আমরা সুবাসের দিকে ছুটি। রাত হয়, অন্ধকার ঘন হয় আমরা অন্ধকারের মাঝামাঝি বসি। আমরা গোল হই কিংবা গোল হয়ে বসতে ভুলে যাই না অথবা একজনের পর একজনের হাতে ঘুরতে থাকা লাল একটি আলো আমাদের বসার জায়গাটিকে বৃত্তের মতো করে তোলে। আগুনের মতো সেই আলোকে আমরা ঠোঁটের কাছাকাছি নিয়ে যতœ করে চুম্বন করি। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না। দূরে থেকে যারা দেখে তারা আমাদের বলে, আপনারা অন্ধকারে লাল আলো দিয়ে বৃত্ত বানান, তাই না? একটা লাল আলো শূন্যে ঘুরে ঘুরে বৃত্ত হয়ে ওঠে। জানেন, আমরা প্রত্যেকদিন এই বৃত্ত দেখার জন্য অপেক্ষা করি। দেখতে দেখতে মাথায় ঝিম ধরে যায় কেমন জানি, তারপরও ভালো লাগে, কখনো খারাপ লাগে না। আমরা তখন বৃত্ত বানানো দেখার কথা ভুলে যাই না। দেখতে দেখতে খারাপ লাগলে আবার একটু খারাপ লাগলে তারপরে একটু জিরিয়ে নেই তারপর আবার আপনাদের বৃত্ত বানানো দেখি। কীভাবে বানান এই বৃত্ত আপনারা?

তখন এসব কথা বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হয়। মনে মনে আমরা ভাবি ইনি কে? এনাকে তো আমরা কখনো মনে রাখতে চাইনি। আমরা লাল আলো আবার ঠিক লালও নয় এক ধরনের সুবাস আমরা এক হাত হতে আরেক হাতে দিয়েছি, সুঘ্রাণ পাশাপাশি রেখেছে, বৃত্ত তো বানাইনি। লাল আলো তো কখনো বৃত্ত বানাতে পারে না। কীভাবে কী হয়েছিলো তার আমরা আর কিছুই মনে করতে পারি না। এক আলোর কথা মনে পড়ে যায় তখন। অন্ধকারে খোলা আকাশের নীচে আলো এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরতে থাকলে তাকে বুঝি বৃত্তের মতো দেখায়! আকাশে কী বৃত্ত হয়? আলোর বৃত্ত। এরকম রসিকতা করা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো পথ থাকে না। এমনকি এরকম ধাঁধাঁয় পড়ে আমরা আমাদের ভুলে যাই। কিন্তু সামনাসামনি আমরা এমন এক বৃত্ত ধাঁধাঁয় পড়ে তখন আমরা বলি, আমরা তো রোজ বৃত্ত বানাই না। মাঝে মাঝে যেদিন আলো কম থাকে অন্ধকারে ঘুটঘুটা হয় সেদিন যদি বাতাস অনেক রকম সুবাস বয়ে নিয়ে আসে সেদিন আমরা পথ বানাই। লাল আলোর সোজা পথ। এ পথে কেউ কারো পরিচিত নয়, আপন নয়, আত্মীয় নয়, কাউকে কারো মনে রাখার দায় নেই। এবং আমরা তাদের বলি তোমরা আর এই পথে তাকিও না। এই পথ সকলকে ভুলোমনা বানিয়ে ছাড়ে। যা যা মনে রাখা দরকার তার সবটাই ভুলিয়ে ছাড়ে। অন্ধকারকে আপন করতে করতে আলোকে ভুলিয়ে ছাড়ে তখন আলোকে আর মনে পড়ে না, অন্ধকার ঠিক কেমন হয় তাও ভালোভাবে বোঝা যায় না। এমন এক মিলমিশ অবস্থায় পৌঁছায় যেখানে আলো আর অন্ধকার দুইজন দুইজনকে ভুলে যায়। একাকার হয়ে দুইজন দুইজনকে মনে রাখতে পারে না। ওই ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে’র মতো এক অবস্থা।

তখন আমাদের মনে হয় আমরা এখনো মিশে যেতে পারিনি। অন্যরা আমাদের কীভাবে দেখছে! তারা দেখছে অথচ আমরা তাদের দেখছি না। তখন আমরা বাদাম-খোসাসহ বাদাম খাই, রোদে হেঁটে বেড়াই, সবুজের সাথে মিশে যাই, আর বন্ধুরা আসে তখন, বলে জানিস এই ফুলটার নাম? বকুল। সুবাস, আহা সুবাস। রাতের বেলা বাতাস উঠলে আমাদের এখনো সেই বন্ধুর কথা মনে পড়ে, আমাদের বকুলসুবাসের ভেতর আমরা আমাদের বন্ধুকে দেখি। বকুল সুবাস তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। বেলী, বনজুঁই, চামেলি, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ, কুরচি, শিউলি, সন্ধ্যামালতি, রজনীগন্ধার সুবাসের আড়াল দিয়ে আমরা কাঠগোলাপ দেখি। কাঠগোলরাপে নীচে যাই। পুকুরপাড়ে কাঠগোলাপের গাছ, এই একটাই দৃশ্য আমাদের চোখে থাকে। আমরা এর বাইরে আর ভাবি না। মূলত কাঠগোলাপহীন পুকুর কিংবা পুকুরহীন কাঠগোলাপ আমরা কল্পনা করতে পারি না। কাঠগোলাপের গাছের নীচে বসে আমরা আকাশ থেকে ভেসে আসা কোনো ফুলের সুবাস নিই। সুবাস পাবার আশায় রাত পার করি। রাতের পর রাত আসে, সুবাস আসে, তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নিই। এবার আমাদের ফুলের পাশে ফুল সাজানোর সময় এসেছে। ফুলের সুবাস এবার ছড়িয়ে দেবার সময় এসেছে। খুব সাধারণ সাধারণ ফুল আমরা সংগ্রহ করি। আমরা সাধারণ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে না আসতেই আমাদের চারপাশ আবার ফুলের সুবাসের পাশাপাশি ‘খেল তুমি তোমার ইচ্ছে মতো’র সন্ধান পাই। আমরা আবার বৃত্তে ফিরে যাই। বৃত্ত বাড়ে। এক বৃত্তের ভেতর থেকে আমরা ছায়ার মতো মিশে যাই। আমরা বলি এখানে এলে ‘তোমার একহাতে দেব টুকটুকে লাল বেলুন আর অন্য হাতে সুঁচালো আলপিন’। এই হাতে নিয়ে নতুনেরা যাত্রা শুরু করে। নতুন পথে পুরোনো যাত্রা কিংবা পুরোনো পথে নতুনের আবির্ভাব। অন্যরা বিব্রত হয় নতুনেরা হয় না। ওরা বেলুন আর আলপিন হাতে নিয়ে ঘোরে। কখনো চিন্তা করে। কেন এই আলপিন, কেন এই বেলুন? আলপিন বেলুন, বেলুন আলপিন করে করে তারা নাকে বকুল, জবা, শেফালির সুবাস পায়। তারা প্রেমের গ্রাম মোহিনীতে যায়। পুকুরপাড় খোঁজে। কাঠগোলাপের বকুল গ্রাম। কখনো পায়, কখনো হারায়, হারিয়ে যায়। খুঁজতে খুঁজতে ওরা কাঠগোলাপের পুকুরপাড় হারিয়ে ফেলে। ওরা নতুনের সন্ধান পায়। আমরা হারিয়ে যাই। ওরা খুঁজে পায় জোড়াপুকুর। তালগাছ ঘেরা শান্ত পুকুর। দুপুরগুলোতে তারা পুকুরপাড়ে যায়। রোদের বেলা ঘুরে ঘুরে ওরা নিজেদের রং কালো করে। রং কালো না হলে নাকি ওদের চলে না। আমরা চিন্তায় পড়ি। ওরা হাসি, মুচকি হাসে। বলে আমরা পরিপক্ক হতে পুড়ছি। না পুড়লে মাটি শক্ত হয় না। কবিতা লেখা যায় না। ঠিক সেই সময় আমরা ওদের গল্প শুনি, আমাদের মাথার উপর দিয়ে একটা বাজখাই শব্দ ভেসে যায়। আমরা জলের দিকে তাকাই। দেখি। নড়ছে। সূর্যের আলো বাতাসের সাথে দুলে দুলে তালপাতায় পরশ বুলিয়ে জলের সাথে দুলে ঢেউ তৈরি করছে। আমাদের মনও নড়ে ওঠে। ওরা হাত প্রসারিত করে দূরে দেখার ইশারা করে। আমরা দূরে তাকাই। পুকুরের আরেক পাড়ে দেখি। দেখি, আলোছায়ায় বধূ দুপুরের গোসলের নামে নিজেকে মেলে ধরে। আমাদের চোখে তখন ওদের হাতের লাল বেলুন আর আলপিনের দিকে আটকে থাকে। ওরাও নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকে। আবার বিব্রত হয়। ওরা কখনো আলপিন ছুঁড়ে দিতে চায় কখনো বেলুন উড়িয়ে দিতে চায়। ইচ্ছে অনিচ্ছার মাঝে আমাদের সবার নাকে সেই পরিচিত সুবাস বয়ে যায়। তখন সেই কাঙ্খিত সুবাস ভেসে আসে। অন্ধকার আসে, ঘুম আসে না। আলো সরে যায় ধীরে, দূরে। আমরা পরস্পরের কাছ থেকে সরে যাই। তখন থেকেই মূলত আমরা নাঘুমের রাত জাগতে থাকি। ওদের শেখানো কবিতাকে আপন করে নিই। আমরা দূরে থেকে প্রতি রাতে মনে মনে সবার কথা মনে করে, সুবাসের কথা মনে করে ঘুমোতে পারি না। প্রত্যেকের শরীরের একান্ত সুবাসে কথা মনে করে আমরা ঘুমাতে পারি না। কিন্তু ওই যে যারা দূরে থেকে আমাদের বেলুনের মতো বৃত্ত বানানো দেখতো  তারা ভাবে আমরা তাদেরকে মনে রাখিনি। তবে রাত এলে সেই রাতগুলোর কথা মনে করি, মনে পড়ে। হাজার চেষ্টাতেও ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’কে এড়াতে পারি না। তবে আমরা পোড় খাই, নিয়ত হারাই, হারাতে হারাতে পাই কিংবা পেয়ে সুখি হবার ভান ধরি, রাত জাগি আর বলি,

‘তোমারে ছাড়ার ফিলিংস হচ্ছে,

হোক—

আমি অনেক-কিছুই- ছাইড়া-আসা-লোক!’

************************************************

নাফিস অলি
………………..
গান ও ঘ্রাণ বিষয়ক গল্প

সন্ধ্যাবেলায় বাতাস বয়ে যায় ধীরে। মিহি বাতাস তুলার মতো উড়ে। নানান জাতের পাখি ঘরে ফেরে উড়ে উড়ে। নানান চেহারার মানুষ ঘরে ফেরে হেঁটে হেঁটে। কেউ আবার ঘর ছেড়ে বের হয় হেঁটে হেঁটে। মানুষের মাথার ওপর পাখি ছোটে। পাখির ডানার তলে মানুষ হাঁটে। পথঘাট, মানুষ আর পাখিদের শরীরে লেপে যায় বাতাস। দুপুরের পর যে সময়টুকু ঘুমিয়েছিল পথঘাট, ছুটি নিয়েছিল পথচারী, সবাই জেগে ওঠে সায়ন্তন বাতাসে। সবাই জেগে ওঠে পাখির কিচিরমিচির শব্দে। এই যে সন্ধ্যা এসেছে হঠাৎ; আবার মিলিয়ে যাবে একটু পরে, এরপর নামবে দীর্ঘ নিরাপদ রাত। সে রাতে পাখিরা বসে থাকবে তাদের ঘরে, কিংবা দাঁড়িয়ে থাকবে; কেউ আবার ঠ্যাঙ ওপরে তুলে শুয়ে থাকবে। মানুষেরা বসে থাকবে তাদের ঘরে কিংবা বাইরে। কেউ আবার দাঁড়িয়ে থাকবে কিংবা ঠ্যাঙ ওপরে তুলে শুয়ে থাকবে পাখির মতো। এখানে রাত নামলে মানুষ আর পাখি এক। পাখি আর মানুষ এক। অথচ মানুষ পাখি না, পাখি মানুষ না। তবু মানুষ আর পাখি এক। পাখি আর মানুষ এক। যেন সবাই পাখি কিংবা সবাই মানুষ। পাখিরা প্রতি সন্ধ্যায় উড়ে আসে ডানায় ভর করে। তারপর দাঁড়িয়ে থাকে, বসে থাকে কিংবা চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। পাখিরা পাখি, তাই ক্লান্ত হয় না প্রতিদিন উড়ে উড়ে। মানুষেরা মানুষ তাই প্রতিরাতে ক্লান্ত হয়। ক্লান্ত হয়ে ঘুমায়, আবার ঘুমিয়ে ক্লান্ত হয়। যে পাখিটা দাঁড়িয়ে থাকে সে চাইলে বসতে পারে। কিন্তু বসে না। যে পাখিটা শুয়ে কিংবা বসে থাকে, সে দাঁড়ায় না। তার ধর্মে নাই। পাখি তার মতো থাকে। যে মানুষ চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে, সে শুয়ে শুয়ে ক্লান্ত হয়ে একসময় উঠে বসে। যে বসে থাকে সে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে। মানুষ বসে থেকে ক্লান্ত হয়, শুয়ে থেকে ক্লান্ত হয়, দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়। মানুষ ক্লান্ত হয় সে মানুষ তাই। ক্লান্তি পাখিদের ধর্মে নাই তারা পাখি তাই।

সন্ধ্যাবেলায় বাতাস বয়ে যায় ধীরে। কত ধীরে? ক্লান্ত হয়ে গেলে যত ধীরে ছোটে। বাতাসও কি তবে ক্লান্ত হয়? বাতাস কি মানুষ?। পাখি?। বাতাস ক্লান্ত হয় তার অনুভূতি আছে তাই। যার অনুভূতি আছে সে ক্লান্ত হয়, ধ্বংস করে। বাতাস ধ্বংস করে। উড়িয়ে দেয় পাখিদের ঘরবাড়ি। পাখিরা কিছু মনে করে না। তবু বাতাস উড়িয়ে দেয়। ধ্বংস করে। যার অনুভূতি নাই সে ধ্বংস করে না। পাখিরা ধ্বংস করে না। বাতাস ধ্বংস করে, আনন্দ পায় তাই।

বাতাস বয়ে যায় ধীরে। পথের ধারে, পাখিদের ঘরের পাশে কিছু একটা নড়ে ওঠে তখন। পাখির মতো কিংবা মানুষের মতো। ডানা ঝাপটানোর শব্দ ভেসে আসে ভেতর থেকে। আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কেউ মানুষের মতো। সন্ধ্যা এসেছে তাই ঘরে ফেরে ডানা ঝাপটে। সন্ধ্যা এসেছে তাই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে বুকের গভীর থেকে। সে কি তবে পাখি?। কিংবা মানুষ যার ডানা গজিয়েছে? সে আসলে মানুষ থেকে পাখি কিংবা পাখি থেকে মানুষ হয়ে উঠেছে। তাই সে মানুষ এবং পাখি। পাখি এবং মানুষ। সে যে পাখি কিংবা মানুষ হয়ে উঠেছে তা কেউ জানে না। পাখিদের মতো এই মানুষ কিংবা পাখিটার জীবন। কেবল মানুষের যেমন বেদনা আছে, পাখি কিংবা মানুষটারও বেদনা আছে। তবে তা পাখিদের মতো সীমাবদ্ধ। এছাড়া তার জীবন পাখির। পাখিরা তারা ভয় পায়, প্রকৃতি ভয় পেতে বলে তাই। তারা দারুণ গান গায়, প্রকৃতি গাইতে বলে তাই। প্রকৃতির ছকের বাইরে তারা যায় না। পাখিরা গান জানে? খুব শৈল্পিক তারা? বাবুই শিল্পী পাখি। কিন্তু সে কি শেখে কারও কাছে? সব বাবুই কেন নিখুঁত শিল্পী? পাখিরা তাদের পছন্দে কিছু করে না। তাদের পছন্দ অপছন্দ নেই। তাই তাদের পাপ পুণ্য নেই। পাপ পুণ্য মানুষের আছে। পাখিদের ক্ষমা নেই, মানুষের ক্ষমা আছে। ক্ষমা আছে বলে মানুষ অন্যায় করে। পাখির কোনো ক্ষমা নেই তাই সে অন্যায় করে না। যার ক্ষমা নেই সে অন্যায় করে না। তাই পাখি পবিত্র। মানুষ অপবিত্র। পবিত্রের সৌন্দর্য নেই, মানুষের সৌন্দর্য আছে। মানুষ বদলায়। ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। আর বদলে গেলে সৌন্দর্য বা কদর্য ফুটে ওঠে। একইভাবে থাকলে সুন্দর অসুন্দর বুঝা যায় না। তখন অসুন্দরকে সুন্দর মনে হয় অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে। আবার সুন্দরকে অসুন্দর মনে হয় একঘেয়েমি এসে যায় বলে। পাখিরা বদলায় না। মানুষ বদলায়। পাখি বাগানে হাঁটে। হেঁটে হেঁটে খাবার খোঁজে। খাবার হাতে নিয়ে পাখির দিকে এগিয়ে গেলে সে উড়াল দেয় ভয়ে। বন্দুক নিয়ে এগিয়ে গেলে সে উড়াল দেয় ভয়ে। উড়াল দেয়া পাখির ধর্ম। মানুষের ধর্ম আবিষ্কার করা। মানুষ আবিষ্কার করতে গিয়ে তার সৃষ্টিকর্তার ঈর্ষার কারণ হয়। তাঁর অবাধ্য হয়ে ক্রোধে পড়ে। মানুষ মহান; তার সৃষ্টিকর্তাকেও অমান্য করতে পারে। সৃষ্টিকর্তার ক্রোধ জাগাতে পারে। পাখিরা তা পারে না। পাখিরা জানে না ভয় কী। পাখিরা জানে না প্রেম কী।  প্রবল ঝড়ে উড়ে যেতে যেতে পাখি জানে না কী ঘটছে। সে কেবল অসুবিধায় পড়ে স্থির থাকতে পারছে না বলে। তাই প্রকৃতি তাদের শেখায়, ঝড় হলে পালাও। প্রকৃতি মানুষকে শেখায় না। মানুষ সব নিজে শেখে। দলবদ্ধ হয়ে নিজেরা শেখে। মানুষের হাঁটা শিখিয়ে দিতে হয়। কথা বলা শিখিয়ে দিতে হয়। মানুষ প্রকৃতি থেকে জন্মগতভাবে কিছু শেখে না বলে মৃত্যু পর্যন্ত শিখতে পারে। আকাশে উড়তে পারে, প্রহ নক্ষত্র জয় করতে পারে। একজন মানুষ যার অনুভূতি পাখি হয়ে গেছে কিংবা একজন পাখি যার শরীর মানুষ হয়ে গেছে তার মধ্যে আটকে আছে একটা ছোট্ট কুঠুরি। সেই কুঠুরিতে থাকে একটা চটচটে সত্বা। তার জীবনে নতুন কিছু ঘটে না যাতে সে আনন্দিত হতে পারে, ভয় পেতে পারে, রোমাঞ্চিত হতে পারে, হাসতে পারে, কাঁদতে পারে। সে পাখি তাই এমন জীবন তার। পাখিদের জীবন কত পুরানো আর একঘেয়ে, পাখিরা তা বুঝতে পারে না। কিন্তু সে বুঝতে পারে, মানুষ তাই। আর বুঝতে পারে না বলে পাখিরা কখনো আত্মহত্যা করে না। মানুষ আত্মহত্যা করে। এই মানুষ কিংবা পাখিটা আত্মহত্যা করে না, সে পাখি তাই। পাখিদের সাথে তার এই তফাৎ। আবার মানুষের সাথে তার এই তফাৎ। একটা জানালা খুলে যায় হঠাৎ। যেখানে একজন মানুষ কিংবা পাখি নড়েচড়ে উঠলো একটু আগে; পৃথিবী আর জানালার ওপাশে একটি সুড়ঙ্গের রচনা হয়। যে জানালাটি কখনো খোলা হয়নি কিংবা সেখানে একটি জানালা থাকতে পারে বলে কারও মনে হয়নি; সেই জানালা কিছু প্রাগৈতিহাসিক ঘ্রাণ কুড়িয়ে এনে গলে গলে ওপাশে পাঠায়। তখন আসে ঘ্রাণ।

ঘ্রাণ কী আসলে? পাখিদের মতো? মানুষের মতো? তাদের অনুভূতি থাকে? সে জানে, ঘ্রাণের মৃত্যু নেই। তারাই একমাত্র অমর। পৃথিবীর আদী অধিবাসী। ঘ্রাণ একটা বীজে থাকে। কোথা থেকে আসে তারা? কেউ জানে না, কিন্তু থাকে। বীজ থেকে গাছ হয়। তারা ছড়িয়ে পড়ে ডালে আর পাতায়। ঝড়ে পড়লে পাতার ঘ্রাণ শুষে নেয় মাটি। পুরানো একটা পাতা যার শরীর ক্ষয়ে গেছে, তার মাঝেও ঘ্রাণ বেঁচে থাকে। বাঁচতে হয়। তাদের মৃত্যু নেই; পরকাল নেই। আলাদা জন্মানো দুটো ফুলের কেন একই ঘ্রাণ হয়? শতবছর পরেও তারা কিভাবে ফিরে আসে? ঘ্রাণের মৃত্যু নেই তাই। বাতাসের গায়ে লেপ্টে থাকা এইসব ঘ্রাণে মিশে আছে মৃত্যু। হ্যা মৃত্যু! ঘ্রাণে মিশে আছে মৃত্যু। তবে তারও মৃত্যু আছে! ঘরের ভেতরের মানুষ কিংবা পাখিটা যার নড়াচড়া একটু আগে দেখা যায়; যার আগে কখনো মৃত্যু হয়নি এবং যে প্রায় পৃথিবীর সমান বয়স নিয়ে বেঁচে আছে সে খুশি হয়ে ওঠে।

পাখিদের জীবনে মৃত্যু ছাড়া সবকিছু পুরানো। সৃষ্টির শুরুতে পাখিরা বেঁচেছিল, এখনো বাঁচে। কেবল মৃত্যু নতুন। মৃত্যু একবার তাই কখনো পুরাতন হয় না। কেবল মৃত্যুর সময় পাখিরা অনুভব করতে শেখে। নতুন করে জন্ম নেয় তারা। অনুভূতির জন্ম হয় তাদের। তবু এই মৃত ঘ্রাণ বা ঘ্রাণের মৃত্যুর জন্য তার বহুকালের অপেক্ষা ছিল এমন নয়। সে আসলে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে না। কেবল নতুন কিছু ঘটবে বলে খুশি হয়ে ওঠে এমনভাবে যেন এসবের জন্য তার বহু আয়োজন। প্রতিদিনের শ্বাসপ্রশ্বাস (যদিও সে কখনো লক্ষ্য করেনি তবু জানে এসব ঘটে), মাথার ওপরের ছাদে সূর্যের ওঠানামা, শরীরের ভেতরে হাড়ের বেড়ে চলা চড়চড় শব্দে- এই সমস্ত কিছু একই নিয়মে চলে। আর এই প্রকৃতির বুড়িয়ে যাওয়া সেও নিয়ম হয়ে গেছে অনেক আগে। এই মহাবিশ্ব যেন একটা পাখি। একটা বুড়ো পাখি। তার পুরানো শরীর আর বুড়ো পৃথিবীতে সবকিছু সেকেলে। মানুষ কিংবা পাখিটার শরীরের ভেতর মাংসের তলায় রক্ত চনমন করে ওঠে আর খুলির ভেতর উত্তেজনার জন্ম নেয়। এতএত কাল পরে, সেই জন্মের দিনের পর নতুন কিছু ঘটবে জীবনে, তাদের। বাতাসে ভেসে এসেছে মৃত্যুঘ্রাণ। পৃথিবী এবং মানুষ কিংবা পাখিটা গভীর নিঃশ্বাসে বুকের ভেতর টেনে নেয় সে ঘ্রাণ।

************************************************

রেজওয়ানুল হক রোমিও
………………..
এমন নির্ঘুম বাসনা নিয়ে

কোনো এক নির্জন রাতে, চারদিকে স্তব্ধ, সব মৌনতাকে তখন বুকে নিয়ে জানতে ইচ্ছে হয়, বেঁচে আছি কেনো? এমন নয় যে এ প্রশ্ন আজ নতুন করে উদয় হয়েছে। পৃথিবীর সম্মোহন জাগানিয়ারূপ যতোবার নিজের সামনে এসে এভাবে ধরা দিয়েছে, ঠিক ততোবারই সৃষ্টি হয়েছে এমন বোধের। নির্ঘুম চোখে কোনো নক্ষত্র ভেজারাতকিংবাশ্যামাদা’র সেই পালতোলা নৌকার ¯্রােতে ভাসতে ভাসতে এক যুবক যখন অস্বীকার করে যেতো জীবনের সকল পার্থিব আয়োজনকে তখন মনে হতো, ‘সব, সব কিছু তুচ্ছ এ জীবনময়’! তাহলে এ কিসের প্রতীক্ষা? অবিনাশী আগুন বুকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে তবু কেনো ফুরায় না পাখিদেও গান? জীবনের নব নব উৎসরণের সন্ধানে, কোন রাত জাগা পাখি এসে ডেকে যায় তারে? একি শুধু বেঁচে থাকার অভিলাষ নাকি একশত অলোকবর্ষ অতিক্রম করে মুগ্ধতার আড়ালে ডেকে যাওয়া অমরত্ব পিয়াসী স্বাপ্নিক মানুষের পথচলা, যার সীমাহীন প্রয়াস নিজেকে গড়ে তোলে মানুষ থেকে মহামানবের পথে। তখন সে হয়ে ওঠে অবিসংবাদিত একক কোনো সত্ত্বা যাঁকে ঘিওে শুরু হয় নতুন এক আলাপচারিতার। অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকা চোখ গুলো তখন সেই অবিনশ্বর তার পিছু নেয়। নিজেদের দিকে তাকিয়ে তারা অনুভব করে বেঁচে থাকা এক সৌন্দর্যের নাম। অলোকিত মানুষ হয়ে যাঁরা বেঁচে থাকেন এবং প্রতিনিয়ত বলে যান সম্ভাবনার কথা, তাঁদের কর্মময় জীবন ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য নতুনের পথে।

গময় কখনো কখনো তুচ্ছ করে রেখে যায় সব কিছু। দিশাহীন হয়ে ওঠে ভেতর-বাহির। নিজের পরাজয়ের বৃত্তটাকে মনে হয় ভয়ংকর কিছু। এক চিলতে রোদ্দুর জাগাবার মানুষ যাঁরা, যাঁদের দিকে তাকালে মনে হয় বেঁচে থাকবার জন্য এখনো অন্তহীন সম্ভাবনা নিজের ভেতরে লুকায়িত রয়েছে, সুতরাং এখান থেকে হতে পারেন বযাত্রা। বিশাল প্রস্তর ক্ষয়ে স্বপ্ন নামক পৃথিবীতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আয়োজন শুরু হয় তখন। যাদের বেঁচে থাকা দুঃসহ হয়ে উঠে ছিলো, তাদের হাত ধরেই শুরু হয় রাত্রিরচনা। অসংখ্য সন্ত্রাস বুকে নিয়ে বিরামহীন ছুটে চলার কাব্য তখন স্বপ্নালু চোখে-মুখে, শান্তি দেয় নামুহূর্তে কোনো অবকাশ। সমস্ত প্রথাকে ভেঙ্গে নতুন চিহ্নকে প্রতিস্থাপনের চর্চায় মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। এ নতুন আহ্বানে সাড়া দেয় সময়ের সাহসী সন্তানেরা। তাদের হাত ধওে সমসাময়িক ভাবনার পলেস্তার খসে বেজে ওঠে ভাঙ্গনের সুর। এ সময় প্রিয়জন হয়ে কাঁধে হাত রাখে কিছু নতুন মানুষ। ওরা বন্ধু হয়ে পাশে থাকে, কখনও বা প্রতিপক্ষ হয়ে জানান দেয় বৈরীবৃষ্টির। সুযোগ সন্ধানী এসব মানুষের আনাগোনার মাধ্যমে সঞ্চার হয় নতুন অভিজ্ঞতার। সবকিছু থেকেও কেনো জানি কিছু অমোঘ শূণ্যতায় সুদূরে মিলিয়ে যায় নিজের প্রত্যাশিত আলোকরেখা। তখন একা একা মনে হয়, খুব একা একা। এ সময় প্রয়োজন পড়ে সঞ্জীবনী কোনো শক্তির। যদি তোর ডাকশুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলরে— এই মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় হৃদয়কে শুধু সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় না বরং তার সাথে সাথে মানসিক দৃঢ়তাকে সংঘবদ্ধ করে তোলে নতুন কিছুর প্রত্যাশায়। ফেনিল উর্বরতার সিঞ্চনে নদীপথ আলোকিত কওে সভ্যতা তখন গড়ে ওঠে জনপদে। সেখানে রচিত হয় অসংখ্য ত্যাগ আর মহিমার গল্প। হাহাকার করে ওঠা মাতৃহৃদয় বারংবার ডেকে যায়। কিন্তু ওরা তো মুক্তি পাগল। ওরা সন্ধান পেয়েছে নববার্তার। তাই আর পিছনে ফিওে তাকানো নয়। সব কিছু তুচ্ছ কওে ছুটে চলে সম্মুখ পানে। ক্রমশ নিয়ন আলোর মতো টিমটিম কওে জ্বলতে থাকা অজ¯্র স্বপ্ন গুলো দিশেহারা কওে রাখে তাদের। পথ প্রদর্শক হয়ে এ সময় হাজির হয়, সময়ের সাথে সাথে আধুনিক হয়ে ওঠা মানুষ গুলো। যাঁদের মুখায়বে নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয়। সমস্ত কারফিউ ভেঙ্গে শুদ্ধতার চর্চা করে সোনালি সম্ভার নিয়ে তাঁরা নতুন প্রজন্মকে উপহার দিতে চায় বিভেদহীন সমাজ। বিশ্বজনীন তার অভেদ মানচিত্রে বৈষম্য-ক্ষুধা-দারিদ্র দুয়ার এড়িয়ে সমৃদ্ধিও কথা বলেন তাঁরা। স্বপ্নবাজ তরুণেরা রূপান্তরিত হওয়ার বাসনা নিয়ে নিজেদেও দিকে তাকায়। এইতো পথ, এইতো পাথেয়। এ পথে আলো জ্বেলে এ পথেই ক্রম মুক্তি হবে। সাধনার দ্বারা নিজের অমিত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে মুক্তির সোপান প্রস্তুত কওে তারা। এই নবনির্মাণ শতাব্দীর বিচিত্র কল্লোল পথে শিহরণ জাগায়। প্রথাগত চিন্তাকে এখনো যারা আঁকড়ে ধওে আছে, যাদের কাছে পরিবর্তন মানে এখনো নতুন কোনো স্পর্ধা, তারাও বুঝতে পাওে সময় এসেছে দু’হাত প্রসারিত করে নতুনকে গ্রহণের।

কিছু অমোঘ সত্য আমাদের সামনে নিয়ে আসে রূঢ় বাস্তবতাকে যার মধ্যে দিয়ে আবর্তিত হয় আমাদের অতীত, বর্তমান আর ভবিষৎ নামক রূপরেখা। আমাদের বয়ে চলা স্বপ্ন গুলো অজুহাত খোঁজে তখন। মনে হয় জীবনের বিপুল ঐশ্বর্যকে উপেক্ষা কওে তলস্তয়ের মতো গৃহহীন হয়ে যাই। হয়তো তখন খুঁজে পাবো জীবনের ভিন্ন কোনো মানে, ভিন্ন্ কোনো অভিধানে। প্রেরিত সত্যের নৈসর্গিক আবাহনে বিস্তর জাল বুনে যাবে একান্ত কথা গুলো আর রূপকথার মতো কল্পিত মনুষ্য সমাজ অফুরান শক্তি নিয়ে প্রোথিত হবে নবরূপে, নামিয়ে দেবে বুকের ভেতরে শক্ত হয়ে জমে থাকা জগদ্দল পাথরটিকে।সভ্যতার বিনির্মাণেএসব সঞ্চয় মহীরূহ হয়ে ধরা দেবে একদিন। আমাদের সংঘবদ্ধ ক্ষুদ্র প্রয়াস সৃষ্টির অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে আহ্বান জানাবে। পক্ষান্তওে সৃষ্টির একক অবিনশ্বরতা বদলে দেবে চারপাশ, নতুন দিনের আলোয় উদ্ভাসিত হবে আমাদেও পরবর্তী প্রজন্ম। তারা ভালোবাসবে প্রকৃতিকে। তারা ভালোবাসবে প্রতিটি সত্যকে, যে সত্যের উদ্দাম দ্যুতিসমাজের জন্য বয়ে আনবে সর্বাঙ্গিন মঙ্গল। উৎকণ্ঠা নয় বরং ভালোবাসার সফেদ সুনীল আকাশে তারা ছড়িয়ে দেবে শান্তির পায়রা।

এমন অজ¯্র স্বপ্নের সন্ধানে রোজ হেঁটে চলি। আকাশের সবচেয়ে উঁচু তারাটার সাথে মিতালি রেখে দেখি মানুষ কেমন করে বাঁচে? কেমন করে হাসে? কেমন করে নিজের নির্মল স্বপ্ন গুলোকে বুকে নিয়ে পাড়ি দেয় পুরোটা জীবন। তারপর সেই স্বপ্ন পরিবর্তিত হয় এক জীবন থেকে আরেক জীবনে। কবিতার মতো শৈশবকে ঘিরে বেড়ে উঠি। সন্ধ্যার সে শান্ত উপহারের যবনিকাপাত হলে ¯িœগ্ধ আলোয় দেখি পিতার হাসি মুখ। শ্রমসিক্ত জননীর চেয়ে থাকা পথে নিজের সাফল্য আর সম্ভাবনাকে রোজ হিসেব করি। সেই স্বপ্নের পথে রোজ দেখা হয় আরও কতো স্বপ্নের ফেরিওয়ালার সাথে। নমস্য জানাই তাদের। পথে নেমে বারবার তাকাই তাঁদেও ঋদ্ধতার দিকে। খুব কওে টানে তাঁদেও আলো-ছায়াময় জীবন। বুঝতে পারি কোনো পরাজয়ই জীবনের শেষ কথা নয় আবার কোনো জয়ই চরম কোনো সার্থকতার পরিসমাপ্তি নিয়ে আসেনা। জয়-পরাজয়ের এ হিসেব নিরন্তর। সৃষ্টি জগৎ এর অভাবনীয় বিস্তার এভাবেই মানুষকে সফলতার চূড়ায় নিয়ে গেছে। নিজের স্বপ্নকে গড়ে তোলার জন্য দিয়েছে বিশাল সম্ভার। সুতরাং পেছনে ফিওে তাকাবার আর কোনো অবকাশ নেই। এগিয়ে যেতে হবে সময়ের হাত ধরে। ভালোকিছুর পাশে যে বৈপরীত্য আছে তাকে মেনে নিয়ে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার চেষ্টা বন্ধুর পথকে কওে তুলবে সহজসাধ্য। যে মোহে মায়াজাল পেতেধরা দেয় বাস্তবতার অসংখ্য বৃশ্চিকরূপ সেখানে নিজেকে চেনাতে হবে নিত্য নতুন ভাবে। তাহলেই সকল অবসন্নতার দুয়ার পেরিয়ে ধরা দেবে সফলতা।

এমন নির্ঘুম বাসনা নিয়ে ছুটে চলেছি প্রতিনিয়ত। মৃত্তিকার গহীন থেকে উঠে আসা স্বচ্ছ স্ফটিক জলের মতো শীতলতা সঞ্চয় করি। মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়- এমন কিছু প্রবাদ প্রতীম বাক্য নিয়ে রোজ ফিকে হওয়া  স্বপ্নের উনুনে তা দেই। প্রতিধ্বনি হয়ে বারবার ফিওে আসা সেই সকল অস্পৃশ্য শব্দরাশি, মশাল জ্বালিয়ে রাখে মনের ভেতরে। সেই পথে নিঃশব্দে হেঁটে চলি। অনেক অমাণিশা ছড়িয়ে আছে এর পরতে পরতে। সে সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্থির হয়ে থাকি। কামিনী বা শিউলীর মতো যারা রোজ গন্ধ বিলিয়ে যায় তাদের কাছে সন্ধান করি অগ্রসর হওয়ার প্রেরণায় কেমন কওে নিজেকে উৎসর্গ করে যেতে হয়। নিজের স্বপ্নকে বুকে নিয়ে পাড়ি দিতে হয় এক সমুদ্দুর পথ। যে পথ বিজয়ের, যে পথ জানান দেয়া নিজের অহংবোধের…।

************************************************

শামসুল কিবরিয়া
………………..
রাত জাগার বৃত্তান্ত : যন্ত্রণা কিংবা মাদকতা!

ঘুমে চোখ জড়াতে জড়াতে হঠাৎ ভেঙে যায়, কোনদিন বা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে করতেও ঘুম আসেনা। নিত্যদিনের সংঘাতময় নাগরিক জীবনে নিদ্রা একটু একটু করে চলে যেতে থাকে দূর কোন অচেনা জগতে। আর তখন হয়তো আমি স্মৃতিতাড়িত হই। শৈশব বা কৈশোরের দিনগুলো আসে  ফুলের সুবাস নিয়ে। তখন কামিনী বা হাসনাহেনার বৃষ্টিবাহিত সুবাস মনের কোণে জাগিয়ে তুলতো কোমল অনুভূতি। এক অকৃত্রিমতার সাথে আরেক কৃত্রিমতার যুগলবন্দি ঘটতো।

গন্ধ ছড়ানো ফুল হয়তো লজ্জাবতী। তাই এদের বেশির ভাগই রাতে জেগে উঠে। সবার চোখের আড়ালে থেকে একটানা গন্ধ বিলোতে থাকে। আর এ গন্ধের সম্মোহনে মানবচিত্ত হয় পুলকিত। বিবমিষাময় জগতে এটি কম কি?

ফুলের গন্ধ বাড়ে, সাথে রাত বাড়ে আর ফেসবুকে আলোড়ন উঠে, হাতের মুঠোয়  ঘুরতে থাকে বিশ্বটা। এ মোহময় জগত বাকি সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। রাতের নির্জনতা বা ফুলের গন্ধ মনে আর কোন অনুভূতি জাগায় না। মোহময়তায় ডুবে থাকতে থাকতে নির্ঘুম রাতের ব্যাপ্তি বাড়ে। বিশ্বায়ন, মুক্ত অর্থনীতি আমাদেরকে ঘুম পাড়ানি গানের বদলে দেয় মাদক, পর্ণ মুভি— আর আমরা রাত জাগি। ফলে আমরা সূর্যোদয় দেখি না, আমরা সূর্যাস্ত দেখি না। নিয়ন আলোর রহস্যময়তা আমাদেরকে ধোঁকা দেয়। আর এ আলোর ফাঁকে ফাঁকে পড়ে থাকে গৃহহীন মানুষেরা।

একাকি কে? তুমি? আমি? কে-ই বা একাকি থাকতে পারে! এ ওর সাথে ও এর সাথে নানা ধরণের সম্পর্কের বাঁধনে জড়িয়ে যাই একাকিত্বের সুর লীন হয়ে থাকা সত্ত্বেও। নানা মাত্রিক সম্পর্কের মাঝখানে দিনে দিনে বেড়ে উঠে রাগ, অভিমান— ন্যূনতম মতদ্বৈততায়। আরে ও প্রান্তে কে? সে আমার প্রিয়জন, একান্ত আপন। দেশে মুঠোফোনের প্রসারের কালে ফ্রি মিনিটের সুযোগ নিয়ে আমি রাত জাগতাম। তুমিও জেগে থাকতে আমার সাথে। আমাদের কথা হতো, আমাদের প্রেম হতো, রাতজাগা ফুলের সাথে জেগে জেগে ভোর হতো। সেসব দিন বিগত হলেও এখনো মাঝে মাঝে স্মৃতিতে ভেসে উঠে দিনযাপনের  অমোছনীয় চিত্রমালা।

তুমি কি এখন রাত জাগ?  কোন এক রহস্যময়তায় ডুবে থাক রাতব্যাপী? তুমি এখন গন্ধ নাও টবে রাখা সুবাস ছড়ানো ফুলগুলো থেকে? টববন্দি ফুল। আহা, টববন্দি ফুল, বড় একা লাগে তাদেরকে। তুমিও কি কোন একাকিত্ব অনুভব করো? নাকি যৌথতার অনুভবে মিশে যাও তাদের সাথে? স্থান এবং কাল এবং সম্পর্কের দূরত্বের কারণে অজনাইে থেকে যাবে আমার কাছে তোমার বর্তমান জীবনপ্রণালী।

আমরা সবুজায়নের কথা শুনতে শুনতে বড় হই কিন্তু গাছ কেটে ফেলি নির্দ্বিধায়। আমরা বনসাই করি শৈল্পিক মনোবৃত্তি নিয়ে। এরই ফাঁকে হাওয়ায় উড়ে চলে যৌথতার চিহ্নগুলো। তুমি আবর্তিত হতে থাকো তোমার জগতে আর আমি চলি আমার বৃত্তে। তবু আমাদের কাছে উৎসব আসে। ফুলেরা ছড়িয়ে থাকে সারা উৎসবে। আমরা ফুল চালাচালি করি ভালোলাগার অনুভবে। কিন্তু বৃন্তচ্যূত একাকি ফুলের কষ্ট আমরা অনুভব করতে পারিনা।

রাতজাগার ক্লান্তি আসেনা। কেননা আমরা তখন মেতে থাকি মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমুতে। প্রবাসী স্বামী রাতে কল দেয় বউয়ের সাথে একাকি কথা বলতে। তরুণ প্রেমিক প্রেমিকা রাতে মেলে ধওে একে অপরের কাছে। যৌনতাও কি মিশে তাকে এর সাথে? হয়তোবা। এ ধরণের আলাপনের জন্য রাতই তো উত্তম। এ সময় কাঙ্খিত জনকে পাওয়া যায় একান্তে। রাতজাগা পাখিদের সাথে তাই তাদের মিতালী গড়ে উঠে। ফোরজি’র স্পিড নিয়ে সমালোচনা করতে করতে আমরা ভুলে যাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কথা। বিশ্বায়ন বলে—মুক্ত হও, মুক্ত হও, দ্বার খুলে দাও, বাজার অবাধ করে দাও। হ্যাঁ তুমি স্বপ্ন দেখ, না পারলে আমরাই স্বপ্ন দেখাব তোমাকে, তুমি নতুনের আহ্বানে সাড়া দিবে বিনা প্রশ্নে, তাই তোমাকেই আমাদের দরকার। তাই তোমার জন্য আমরা নানা ধরণের প্যাকেজ অফার করি, রাত জাগার সুযোগ করে দেই। কিন্তু রাতের আঁধারে মুদ্রার ভৌগোলিক সীমা  অতিক্রমণ কেউ দেখতে পায়না।

দিনযাপনের গ্লানি চোখের কোণে জমা হলে রাতের ঘুম উবে যায়। পারিবারিক জমা খরচের হিসাব বা সম্পর্কের টানাপোড়েন, চাকরি বা ব্যবসা সংক্রান্ত নানান প্রতিকূলতা মাথার ভেতর ভনভন করে। এই দুঃসহ অভিজ্ঞতা রাতকে প্রলম্বিত করে। মস্তিষ্কের কোণে কোণে যেন পোকা কামড় দিতে থাকে। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠে অযাচিত ঘটনাগুলোর পরম্পরা। মনের ভেতরে চলতে থাকে এমনতরো নানান প্রশ্ন কিংবা শঙ্কা যার হয়তো কোন ভিত্তি আছে বা আদৌ যা কোন যুক্তির ধার ধারে না। ঘুমের জন্য অন্তহীন অপেক্ষা তাই শেষ হয়না। একদিন কাটে, দুদিন কাটে, এভাবে দিন এগুতে থাকলে বাধ্য হয়ে নিতে হয় ক্লোনাজিপাম ট্যাবলেট। ঘুমের রাজ্য তখন নিকটে আসে; ফুলের গন্ধ নিতে নিতে বা কোন ফুলেল গন্ধ ছাড়াই। ঘুম নেমে এলেই প্রশান্তি আসে। ট্যাবলেটকে মনে হয় অমৃত।

নির্ঘুম রাতের সহচরীদের সবাই কি ঘুমিয়ে পড়ে যখন তোমার দু’চোখ ভরে ঘুম নেমে আসে? নাকি কেউ কেউ ‘কাব্য লেখার ভাঁজ’ খুলে বসে? এদের জাগরণ হয় শিল্প সৃষ্টির উন্মাদনায়। মনের ভেতরের উথাল পাথাল ঢেউ ঘুমকে দূরে ঠেলে দেয়। শব্দের সাথে শব্দ মেলাতে মেলাতে, বাক্যের সাথে বাক্য মেলাতে মেলাতে এরা ঢুকে পড়ে নিদ্রাহীনতার জগতে। ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ মনের কথা বলার জন্য এরা এদিক-ওদিক হাতড়াতে থাকে ক্লান্তিহীন। যদি মনের মতো একটি শব্দ এসে যায়, যদি মনের মতো একটি বাক্য এসে যায়, কি যে প্রশান্তি আসে তখন। এত সময়ের পথচলা আদৌ কষ্টের কোন প্রলেপ বসাতে পারেনা। শব্দের ব্যঞ্জণার সাথে ফুলের সুবাস মিলে একাকার হয়ে যায়। এ এক মাদকতা জড়ানো অনুভব, এক ঘোরলাগা জগতে পরিভ্রমণ। বৈষয়িক হিসাব নিকাশের সাথে যার কোন সম্পর্ক নাই। সৃজনের এই যাত্রাপথে একাকি থাকা লাগে— নিজে ছাড়া অন্য যে কেউ এখানে অনাহূত।

************************************************

মিনহাজ শোভন
………………..
ফুলের গন্ধ ও ঘুমের আসা না আসা

আকাশ, ফুল, সবুজ, গ্রাম শব্দগুলোর অন্য আরেক অর্থ আছে। আরেক ভাব আছে। এদের সমার্থক শব্দ হিসেবে ধরা যায় সৌন্দর্যকে। এসব অর্থ, সমার্থক শব্দ কিংবা সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে আরেকটা জিনিস আছে সেটা আর্ট, শিল্প অথবা কলা। এই আকাশ, ফুল, সবুজ, গ্রাম, সৌন্দর্য কিংবা আর্ট বা শিল্পকে ছাপিয়ে আরো একটা জিনিস আছে সেটা সৃষ্টি। সৃষ্টি আর নেশা পরিপূরক। কখনো আবার সামর্থক  হিসেবেও ব্যবহার করে শব্দ দুটোকে। আর এসবের উপরে যার অবস্থান সেটা ¯্রষ্টা। যিনি শিল্প সৃষ্টি করেন। তবে ¯্রষ্টা, শিল্প আর সৌন্দর্য সর্বদা হাত ধরে চলে। যেখানে সৌন্দর্য নেই সেখানে শিল্প কিংবা ¯্রষ্টা মূল্যহীন। এই যে বলা হচ্ছে ফুলের কথা, ‘ফুল’ শব্দটা শুনলেই আমাদের সৌন্দর্যের ইন্দ্রিয় পুরোপুরি সজাগ হয়ে ওঠে। আমাদের কোমল অনুভূতির বিভিন্ন রকম বিস্তার ঘটে। কারণ মানুষ তার সৌন্দর্যের সংজ্ঞার সাথে ফুল পুরোপুরি কানেক্ট করতে পারে। আর তাই ফুলকেন্দ্রিক আমরা কত রকম অনুভূতির কথা বলে যাই। ফুলের গন্ধে ঘুম না এলে তাই  আমরা একলা জেগে থাকার কথা বলি।

ফুল অথবা সৌন্দর্য কিংবা শিল্প

একটা বাড়ির কথা বলা যাক। ধরা যাক ইট-পাথরের একটা বাড়ি। আভিজাত্য আর সৌন্দর্যে মোড়া। আভিজাত্য বলতে সৌন্দর্যের যে দিকটা আমাদের মনে ভেসে ওঠে, সেটা হলো উচ্চশ্রেণীর রুচিবোধ। যেমন আঙিনাজুড়ে সুশোভিত বাগান। দেয়ালে দেয়ালে রুচিশীল শিল্পকর্ম ও বিবিধ নকশা। এসব তো একটা বাড়ির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় অনেকটা। কিন্তু এসবের যে ক্রিয়েটর থাকে, এসবের মালিকানা তার নয়। এর মালিক অন্য আরেকজন। কোন তৃতীয় পক্ষ। যে তার চরম শিল্পবোধ থেকে সৃষ্টি করেছেন এমন একটা শিল্পকর্ম। শিল্পবোধ সম্পন্ন এই মানুষ গুলোকে যদি কখনো কোনদিন জবা-জুঁই, বকুল, কামিনী কিংবা শিউলীর পাশাপাশি রেখে চিন্তা করেন খুঁজে পাবেন তাদের মাহাত্ব্য। কতটা আত্মত্যাগী হলে আসলে মানুষ নিজের সমস্ততা বিকিয়ে সৌন্দর্যম-িত করতে পারে অন্যের বাগান।

একটা ফুলের জন্মই হয় আজন্ম অন্যের তরে নিজের সৌন্দর্যকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্যে। আর নিজেকে অন্যের তরে বিলিয়ে দেওয়ায় তার স্বার্থকতা। ফুলের এই বিলিয়ে দেবার ইচ্ছেকে কখনো ছোট করে দেখা সম্ভব নয় কারো। দক্ষিণের বাতাসের সাথে মিশে ভাসতে ভাসতে আসা কয়েকটা শব্দ কিংবা কয়েকটা অক্ষর যখন একটা অনেক বড় গল্প কিংবা কাহিনী রচনা করে ফেলে তখন সে শব্দ কিংবা অক্ষরকে কখনো অবহেলা করা যায় না। সাদা কিংবা হলদেটে এই শহরের প্রচীর ডিঙয়ে দূরে অনেক দূরে সবুজের সমারোহ থেকে যে শব্দের কিংবা অক্ষরের সৃষ্টি সে শব্দ কিংবা অক্ষর থেকেই আসে শিল্প। সেখানেই সৌন্দর্য আর শিল্প বেড়ে ওঠে একা একা। শিল্প কিংবা সৌন্দর্য কখনো আভিজাত্যের কাছে থাকেনি। থাকবেনা কখনো। যা শিল্প কিংবা সৌন্দর্য তার সৃষ্টি আভিজাত্য থেকে দূরে, অনেক দূরে।

সমস্ত আভিজাত্যকে পায়ে দলিয়ে অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে গেলে তবেই মেলে সৌন্দর্যের দেখা। শহরের বিলাসিতা কখনো সৌন্দর্য ছিল না। সুন্দর ছিলো গ্রাম; গ্রামের মেঠো পথ; সবুজের সমারোহ; আকাশ, বাতাস। দারিদ্রতা কিংবা অভাববোধ থেকে শিল্পের সৃষ্টি। এই দারিদ্রতা কিংবা অভাববোধ যুগে যুগে সৃষ্টি করে গেছে অসামান্য সব শিল্পকর্ম। আকাশ কিংবা মহত্বকে শুধুমাত্র সেই বোঝে যার দেখার শক্তি আছে; ভাবার শক্তি আছে। ভাবনা কিংবা দৃষ্টি আপনা-আপনি ভেতর থেকে কিংবা পূর্বজন্ম থেকে আসে না; সেটা তৈরি করতে হয় বাইরে থেকে; আকাশ থেকে। সৌন্দর্য, শিল্প, আকাশ কিংবা ফুল সামর্থক শব্দ। এর সবগুলোই আসে অনুভব কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অনুভব কিংবা অনুভূতি এক হয়ে সৃষ্টি হয় সুন্দরের। যার উৎপত্তি দূরে ঐ আকাশে কিংবা গ্রামে। সবুজ ফসলের মাঠ, হলুদ কিংবা শুভ্র ফুলের বাগান অথবা সোনালী ধানের মাঠের ওপর দিয়ে দক্ষিণা বাতাসের সাথে বয়ে চললে খুজে পাওয়া যায় শিল্পের আসল ঠিকানা। যে ঠিকানার নিখুঁত ছবি একজন কারিগর দক্ষ হাতে ফুটিয়ে তোলে আভিজাত্যের  পাতায়। সবুজ কিংবা আকাশের মানে খুঁজে পাওয়া যায় তাদের শিল্পের ছোঁয়ায়।

ভালোবাসা

ভালোবাসা হচ্ছে নেশার আরেক রূপ। আবার অন্যভাবে চিন্তা করলে ভালোবাসাকে আমরা দেখতে পাব সুন্দরের আরেক রূপ হিসেবে। যা সুুন্দর তাকে আমরা ভালোবাসি। মানুষ যেমন সুন্দরের পূজারি ঠিক তেমনি ভাবে ভালোবাসারও পূজারি। আকাশ, নীল, গ্রাম, সবুজ, ফুল কিংবা সুন্দরকে আমরা ভালোবাসি। আমারা ভালোবাসি মা অথবা সুন্দরকে। পৃথিবীর যা কিছু আমরা দেখি কিংবা চিন্তা করি তার মাঝে সব থেকে সুন্দর হচ্ছে মা। সব থেকে ভালোবাসার জিনিস এটা। আমরা ফুল, সুন্দর কিংবা ভালোবাসার সমার্থক হিসেবে মাকে ধরতে পারি। পৃথিবীর সব থেকে নিঁখুত শিল্পী হচ্ছে মা। যে তার মনের ইচ্ছা, বাসনা কিংবা সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে এক ব্যপক শিল্পকর্ম তৈরি করে। যার ফলাফল হিসেবে জন্ম হয় আমার। এই আমি একটা অমূলক শব্দ। যাকে বিভাজন করলে পাওয়া যায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনেক পরিচয়। আমার ভেতরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিচয়গুলো আমার ভালোবাসা; আমার নেশা কিংবা টান।

সৃষ্টি, নেশা কিংবা ¯্রষ্টা অথবা শিল্পী

সৃষ্টি এক অদ্ভুত নেশা। যে নেশায় একজন ¯্রষ্টা অথবা শিল্পী মত্ত থাকে সবসময়। এই নেশামত্ত মানুষগুলো একটু অন্যরকম; সকলের থেকে আলাদা। এরা সর্বদা খুঁজে ফেরে সৃষ্টির উপকরণ। নতুন কিছু সৃষ্টির নেশা সর্বদা পেয়ে ধরে এদেরকে। আকাশ কিংবা বাতাস; সবুজ কিংবা গ্রাম; ফুল কিংবা সৌন্দর্যের মাঝে এরা খুঁজে ফেরে নিজের জীবনকে। মাদক কিংবা মত্ত থাকার নেশার থেকে আরো শক্তিশালী হচ্ছে সৃষ্টির নেশা।

এই আকাশের কি অপরূপ সৌন্দর্য; বাতাসের আলাদা গন্ধ; ভিন্নরকম শব্দ। সবুজ কিংবা সোনালী ধানের মাঠের অন্য আরেক গন্ধ; আরেক সৌন্দর্য। এই সবুজে মোড়া গ্রাম; গ্রামের মেঠো পথ; দূরের আকাশ; সেখান থেকে ছুটে আসা বাতাসের করুণ শব্দ; সোনালী ধানের গন্ধ; সবুজ ঘাসের ভিন্নতর স্বাদ। আকাশ কিংবা বাতাসে ভেসে বেড়ানো পাখির দল। সবুজের সমারোহে ভাসতে থাকা প্রজাপতি। এসব কিছুই একজন ¯্রষ্টার চোখে ধরা পড়ে এক অন্যমাত্রায়। সাধারন কিংবা স্বাভাবিক নিয়মে আমরা ভাবতে পারি না যা কিছু।

একজন ¯্রষ্টা কিংবা শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে জন্ম নেয় সবকিছু। অন্য এক মাত্রা পায় সমস্ততা। আকাশ কিংবা নীল হয়ে ওঠে জীবস্ত। মানুষের অপরিচিত মনে হয় সবকিছু। একটা পরিচিত দৃশ্যকে অকপটে অপরিচিত এক দৃশ্যে দৃশ্যায়িত করতে পারায় শিল্প। আর এই শিল্প জন্ম হয় এক গুণী শিল্পীর হাত ধরে। আর এই শিল্পীর তৈরি হয় নিভৃতে। যার ¯্রষ্টা আর কেউ নয় শিল্পী নিজেই। ধীরে ধীরে ¯্রষ্টা অথবা শিল্পী হয় ওঠা মানুষগুলো নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারে না। পারে না থামিয়ে রাখতে; রাতে ঘুম হয় না তাদের। সৃষ্টি কিংবা শিল্পের নেশায়। তাদের ইচ্ছে হয় আপনাকে অন্যের তরে বিলিয়ে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে। এ মানুষগুলো ভালোবাসে শিল্পের তরে নিজেকে বিলিয়ে দিতে।

************************************************

আতিদ তূর্য
………………..
একটা জীবন ফুল হয়ে যাক

গরমকাল চলছে। চারিদিকে ভ্যাপসা গরম। বিদ্যুৎ খুব কম সময়ই থাকে। রাত হলে হারিকেন জ¦ালিয়ে জানালা খুলে দিয়ে পড়তে বসি। থেকে থেকে বাতাস আসে, লবণশরীর কিছুটা জুড়ায়। তেমনই একটা রাতে আকাশ ভেঙে জোসনা নেমেছে। পড়তে পড়তে কখনো উদাসীন হয়ে জানালার বাইরে দিয়ে আলোকিত উঠানটাকে দেখছি। পাশের গোয়ালঘরে সদ্য জন্ম নেওয়া বাছুরটার গা চেটে দিচ্ছে আমাদের গাইগরুটা। একটু দূরে ছেলে—মেয়েদের হৈ—হুল্লোড় শোনা যাচ্ছে। লুকোচুরি খেলায় যে মুচি সাব্যস্ত হয়েছে সে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ভীষণ তর্ক জুড়ে দিয়েছে। ঠিক তখনই কিছু বুঝে ওাার আগেই আনাহূত অতিথির মতো জানালা গলে ঢুকে পড়ে একরাশ হা¯œাহেনা! নাসিকারন্ধ্র দিয়ে ভুরভুর করে হা¯œাহেনার স্নিগ্ধতা মগজে গিয়ে পৌঁছায়। এমন মাদকতায় আচ্ছন্ন হয়ে মুহূর্তেই যেনো অসাড় হয়ে পড়ি। তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণে আবিষ্ট হয়ে মুখস্থ করতে থাকা ইংরেজি প্যারাগ্রাফে সাময়িকভাবে ইস্তফা দিই। এদিকে মায়ের পূর্বনির্ধারিত নিষেধাজ্ঞা রাতের বেলায় হা¯œাহেনা গাছের নিচে যাওয়া যাবে  না। মা বলেন, হা¯œাহেনা ফুলের তীব্র মিষ্টি গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে রাতের বেলায় সাপ এসে গাছের নিচে এসে বসে। এখন জানি সাপেদের ঘ্রাণেন্দ্রিয় কতোটা ক্ষীণ! যদি তারা বসে গাছের নিচে তো সেটা হতে পারে পোকা খাওয়ার জন্য। কিন্তু তখন আমাকে কে আটকায়! সরেজমিনে গাছের কাছে গিয়ে এই সৌরভ না নিলে মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো। অগত্যা বিড়ালের মতো পা টিপে পাশের ঘরে শোওয়া মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে উঠানে গিয়ে হা¯œাহেনা গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। চোখ বন্ধ করে এই তীব্র অসহনীয় ঘ্রাণসমুদ্রে আমিও নামলাম আর মনে হলো জীবনের একমাত্র অর্থই হলো এই হা¯œাহেনা গাছের তলায় এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, মানুষের আর যেনো কোনো কাজ থাকতে নেই। অনেক পরে জেনেছি কাজী নজরুল ইসলামের বেলাতেও নাকি এমন সম্মোহনী ব্যাপার ঘটেছিলো। পুত্রের মৃত্যুর পর পুত্রশোকে কাতর নজরুল যখন সন্ধ্যায় বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ান তখন পাশেই সদ্যজাত হা¯œাহেনা ফুটেছিলো। হা¯œাহেনার অপার্থিব ঘ্রাণ কবিকে যেন একঝটকায় বাস্তব পৃথিবী থেকে স্বপ্নাতুর কোনো এক জগতে নিয়ে গিয়েছিলো যেখানে জীবনের জৈবিক ব্যাপারগুলো অনুপস্থিত। কতোক্ষণ জানিনা তবু একটা সময় পর ধীরে ধীরে ধাতস্থ হতে থাকি। ঘোরলাগা পায়ে কিছুক্ষণ বাদে রুমে ফিরে আসি। জানালাটা খোলাই থাকে। জানালা গলে মশা এসে উপদ্রব করে। তবু হাস্নাহেনার গন্ধের দরুন কিছুই যেনো টের পাই না। এভাবে সে আামাকে নিজ ক্রোড়ে আশ্রয় দিয়ে সারারাত ঘ্রাণস্তন্য পান করায়। রাতের ¯িœগ্ধতায় তার সরব উপস্থিতি যেমন করে টের পাই দিনের কোলাহলে সেটি একেবারেই পাওয়া যায় না। এমন মানুষও আমাদের চারপাশে আছেন যারা হা¯œাহেনার মতোই দিনের (প্রচারের) আলোয় না এসে নিভৃতে গন্ধসুধা ঢালেন। মানুষকে মানুষ হিসাবে বেড়ে ওঠার অনিবার্য স্বপ্ন দেখান। পলান সরকার তেমন—ই একজন মানুষ যিনি বৃদ্ধ শরীর নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে মানুষের কাছে নিজের সংগ্রহে থাকা বই পৌঁছে দেন পড়ার জন্য। তিনিই হয়ে উঠেছেন স্বয়ং লাইব্রেরি। জ্ঞানের এই সৌরভ তিনি বিলিয়ে গেছেন আমৃত্যু কোন প্রকার জাগতিক স্বার্থ ছাড়া। পশুবৃত্তি থেকে মানুষের বের হয়ে আসার একমাত্র সমাধান হলো বই পড়া। বই মানুষের মাঝে প্রধানত যে বোধের জন্ম দেয় তা হলো সচেতনতা। মানুষ তার প্রতিটি কাজে সচেতন হলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে বাধ্য। আমাদের দেশের নি¤œপেশাজীবীসহ সব শ্রেণির মানুষেরা যদি সবাই বই পড়তে জানতো তাহলে এদেশে দরিদ্র মানুষ থাকলেও কোনো অসুখী মানুষ থাকতো না বা কেউ কারো জন্য হয়ে উঠতো না অনিরাপদ। শরতের শিউলি ফুল ভোরের শিশিরের সাথে ঝড়ে পড়ে রোদ ওঠার আগেই। শিউলির এই অকালমৃত্যু যে মহৎ কারণ সে রেখে যায় এই ধরণীর পরে সৌরভ আর সৌন্দর্য। বইফুলের সৌরভ গ্রহণের জন্য মানুষের ইন্দ্রিয় প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত এ ব—দ্বীপে ইনসোমনিয়া—ই তবে সকলের ব্রত হোক।

************************************************

বদরুদ্দীন রাব্বানী
………………..
ডাক দিয়ে যায় পাতায় পাতায়

দীর্ঘদিন পর শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি দূরের মেঘালয় পাহাড়ে মিশে যাওয়া নৈসর্গিক সৌন্দর্য, রূপের ঝাঁপি খুলে বসা ঝোপঝাড়, নগরায়ণের ছোঁয়া লাগা গ্রাম্যপ্রকৃতি, স্যাঁতসেতে মাটি থেকে উঠে আসা জলজ গন্ধ আমাকে আর আকর্ষণ করে না। নধর ফুলের মৃদু দুলুনি কেমন বিবর্ণ! ছোট্ট খালের ও-পাড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা লাঠিম গাছের জীর্ণ পাতার নিঃশব্দ নড়াচড়া আমার ভেতরে বিভ্রম তৈরি করে– কেমন নিঃসঙ্গ আমি স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই। তেমন সুখস্মৃতি মেলে না। রুক্ষ করোটিতে বিষাদের খাঁ খাঁ কিছু মুহূর্ত জীবন্ত হয়। দীর্ঘ অসুস্থতায় আমি কি তবে ক্ষয়ে গেলাম নিয়তির প্রচ্ছন্ন নিষ্ঠুরতায়? তবে কি অসুস্থতা বিষাদের আরেক নাম?

মিহি বাতাস অনুভূতি ছুঁয়ে যায়। বিষাদের আধিক্য তীব্র হাওয়ার হলকার মতো স্নায়ুতে ছোবল হানে। দুঃখের মুহূর্তগুলো ভাসমান নীল হয়ে ডানা ঝাপটানো প্রজাপতির মতো উড়ে। তখন দূরের নাম না-জানা ফুলের ঘ্রাণ নাকে লাগে শুনি ঝরাপাতার বিউগল। কার শূন্যতা জেগে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে। কাকে যেন খুঁজি বনে বনে, মনে মনে। মেঘভাঙা তপ্তরোদে ঢেউ কেটে সর্পিল গতিতে এগুচ্ছে ট্রলার। নদীজুড়ে ছোট ছোট ভাসন্ত ডিঙি নৌকা। বালিকার নৃত্যের মতো ঢেউয়ের সারি। পাড়ঘেঁষে কাশফুলের ঘন বন। হঠাৎ ট্রলারের পোঁ পোঁ। আমার আকাঙ্খার, স্বপ্নের, বহু প্রতীক্ষার তের সমুদ্দুর পাড়ি দেয়া শহর জাগতিক উচ্চাশার প্রাণকেন্দ্র। উঁচু সুপারি গাছের মতো বিল্ডিং। সে এক জাদুরাজ্য স্বপ্নেরা নাকি মেঘের মতো আকাশে ওড়ে, কখনো রঙিন হয়, কখনো বাঁকা হয়, কখনো ঘুড্ডি হয়ে গোত্তা খায়। করোটির অন্ধকারে চলে স্বপ্নের উন্মাতাল নৃত্য ।

ঢেউয়ের তালে ছিটকে পড়া পানির আওয়াজের মতো শব্দ তুলে সে কী বলেছিল এখন স্মরণ হয় না। শুধু প্রতীক্ষিত বেদনার মতো রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে অস্থায়ী মেঘখ-ের নিচে সবুজ ক্যানভাসে আঁকা খেলাঘরের মতো ছবি ভাসে। বিস্মৃতিতে তলিয়ে গেছে সব খনার বচনের মতো মায়াবী অবয়ব, হাসনাহেনার মতো হৃদয়কাড়া কিশোরী শরীরের ঘ্রাণ।

এখন বৃষ্টি হোক পঙ্কীলতায় আকীর্ণ পথঘাট, বনবাদাড় ধুয়ে দিক। আমার বিস্মৃতির সমস্ত জঞ্জাল মুছে দিক তীব্র বারিধারা। এই তল্লাটে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক প্রেম, পাতাবনের সকল পাতায় পাতায় ছড়িয়ে যাক। হৃৎপি-ের প্রবল ধুকপুকানি আর নৈঃশব্দের সুড়সুড়ির অবসান ঘটিয়ে শ্রান্তির শীতল হাওয়া বয়ে যাক।

চারিদিকে ঝরাপাতার মতো বিষাদ নরম মৃত্তিকা ছুঁয়ে ছুঁয়ে বিরহী বাতাসে উড়ে যায় সুখ। অবগুণ্ঠনে ঢাকা প্রকৃতিতে ভাবনার অনুরণন গুলো অর্থহীন এলোমেলো হয়ে কেমন ফিকে হয়। সে ছিল অবগুণ্ঠনে ঢাকা প্রকৃতিতে সুন্দরের প্রতিমা। সুরমার জলে লাফার্জের কোমল আলোর তিরতির কাঁপনের মতো তার চোখের পাতা উঠানামা করত। সূর্যের ম্রিয়মাণ আলো রূপোলি জলের উপরে প্রবাহিত হচ্ছিল, পাতায় পাতায় ছিল সোনারঙ। ডগমগ উচ্ছ্বাসে প্রেমের কাতরতা মেখে আবারও কথা বলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কালের নিরন্তর ঘূর্ণনে আমি ঘুরে চলি। নদীর সাথে ফুলের সাথে কতো কথা কই।

তার চোখ দুটো শাদা, ডুমুরের ফুল। দীর্ঘ চুলের সারি, কালো মেঘ। ওই চোখেই আমি নিভৃতে কাঁদি।

এই চরাচরজুড়ে শূন্যতা নামে, পাতায় পাতায় করুণ হাহাকার জাগে। রেইনট্রি গাছের আগা ছুঁয়ে রাত নামে। চেতনাহীন অতল আঁধারে ট্রাকের ঘর্ঘর দুঃস্বপ্ন হয়ে ঘায়েল করে। নৃত্যপর আলো-আঁধারির জড়াজড়িতে স্মৃতি উস্কানি দেয়। নিঃশ্বাসের খুচরো আওয়াজে শুধু খ- খ- দৃশ্য চনমনিয়ে উঠে।

************************************************

ফারজানা শারমিন আঁখি
………………..
সত্য গল্প মিথ্যা গল্প

বিশাল আকাশ। আকাশের ওপারে আকাশ। নীল, গাঢ় নীল। রং দেখতে ভাল লাগে। মনিটরে চোখ রাখতে রাখতে সে বড় ক্লান্ত। ডাক্তার বলেছেন প্রকৃতির রঙ দেখতে। সবুজ দেখতে। নীল গ্রহের সবুজ বৃক্ষ সব! আচ্ছা বৃক্ষ ছাড়া প্রকৃতিতে আর কিছু কি সবুজ রঙের আছে? ঋতু সবুজ শাড়ি পরত। ঋতু এখন কোথায়? সে জানে না। জানতেও চায় না। কি হবে জেনে!

কোথা থেকে শুরু করব? সম্পূর্ণ জীবনযাপন সে তো এক গল্পযাপন। গল্প শুনতে আমার বরাবরই ভাল লাগত কিংবা বলতে। যাপনের গল্প শুনতে শুনতে আমি চেয়েছি সর্বশ্রেষ্ট গল্প লিখতে। এমন এক গল্প যা শুনে বাঁচতে ইচ্ছে করবে।  কিন্তু আমি পারছি না! পারছি না লিখতে সেই মন্ত্রমুগ্ধ করা গল্প! কিসের গল্প আমি লিখব? কোন এক মানব-মানবীর প্রেমের গল্প? প্রেমের গল্পে আমার বিশ্বাস নেই। এই সময়ের প্রেমগুলোর উপর আমার বিশ্বাস নেই একেবারে! যা বিশ্বাস করি না তা লিখব কি করে! আমি একবিংশ শতকের মানুষ। গল্পের ভিতরে সময়কে বাঁধা যায়। লোকে পড়ে জানতে পারে সেই সময়কে। তৃতীয় বিশ্বের একটি স্বল্পোন্নত দেশের তরুণের মনের যাতনা প্রকাশ করব আমি কিভাবে? আচ্ছা আমি তবে কিছু আবল-তাবল গল্প বলি। শুনুন আপনারা।

গোপাল স্যারের কথা খুব মনে পড়ছে। তিনি বলতেন বিশ্বাসের কথা, ঈশ্বরে বিশ্বাসের কথা। তিনি আমাদের বলতেন, (আমি আজও শুনতে পাই) তোমাদের একটা কথা বলি শোন। ঈশ্বরে বিশ্বাস করা খুব জরুরি। হয়ত তুমি পরীক্ষায় বসেছ ঠিক সেই মুহূর্তে তোমার কলম থেমে যেতে পারে, যেতেই পারে। আমরা মানুষেরা বড় বেশি দুর্বল! তিনি এরকম অদ্ভুত সব কথা বলতেন। সেই গোপাল স্যার কোন একদিন ট্রেনে কাটা পড়েন। তিনি আত্মহত্যা করেন। আমি জানি না তিনি কেন আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন কিন্তু তিনি তো বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন! তার মৃত্যুর খবর পড়ে, হ্যা পড়েছিলাম, ফেসবুকে পড়েছিলাম, আমি হতাশা বোধ করেছিলাম। স্কুল ছেড়েছি পাঁচ বছর, আর এই পাঁচ বছর পর এমন এক অসহনীয় সংবাদ। মৃত্যু, মৃত্যুর খবর। এই একবিংশ শতকে আমি কেবল মৃত্যুর খবর পাই। এই শতকটিকে আমি চিনতে পারিনা। নিজেকে অবাঞ্চিত বাসিন্দা মনে হয়। কিংবা নিজেকে মনে হয় মেটামরফোসিসের সেই বিশাল পতঙ! কিন্তু আমার ছিল পূর্ণচন্দ্র দেখবার অভিজ্ঞতা। একবার মায়ের সাথে গিয়েছিলাম নানা বাড়ি। সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল। পথটা ছিল মেঠো পথ। তখনও পিচ পড়ে নি, তখনো চাঁদের আলোতে ভেসে যেত চরাচর। সেই সন্ধ্যাটি ছিল চাঁদনি রাত। বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছিল সে রাতে। চোখ বন্ধ করে সে সন্ধ্যার কথা মনে করলে আমার শরীরের উপর দিয়ে পবিত্র বাতাস বয়ে যায়। যখন এখানে এলাম তখন দেখলাম কেউ আকাশের দিকে তাকায় না। জিজ্ঞেস করলে বলে লাভ কি! সত্যি লাভ নেই তো কোন। আমার এখানে একজনের সাথে আলাপ আছে। ল্যাপটপটা সারাতে গিয়েই আলাপ হল। সে নিজেকে বলে কম্পিউটার মাস্টার। তার দিন কাটে কম্পিউটারে গেইম খেলে। তাকে আমার মনে হল পেট মোটা মাকড়সা। যে নড়তে চড়তে পারে না খুব একটা। কিংবা মনে হল সে একটা স্থূল ব্যাঙ। সে বলল, আমি দিন দিন ভাল গেমার হয়ে উঠছি। আমেরিকা, ইউরোপে আমার গেমার বন্ধু আছে, ওদের সাথে চ্যাট করতে করতে আমার ইংরেজিটা ভাল হয়ে গেছে। আমার আর ছেলেটির কথা শুনতে ভাল লাগছিল না। গোপাল স্যারকে মনে পড়ছিল। তিনি গেইম খেললেই পারতেন। তার অনেক বন্ধু থাকত বিদেশে। তিনি তো আমাদের ইংরেজীই পড়াতেন। তার ইংরেজী আরো ভাল হয়ে যেত। গেইম খেলতে খেলতে তার মাথায় ট্রেনে মাথা দেওয়ার চিন্তা আসত না। হে একবিংশ শতাব্দী তুমি মানুষদেরকে গেমার বানিয়ে দাও। আমি আবার ছেলেটার দিকে ঘুরে তাকালাম। সে বলছিল, ‘দেখ, আমি গেম খেলে আনন্দ পাই মানে গেমকে ভালবাসি। বলতে পার গেমের সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক। তবে যে মেয়েটিকে আমি প্রেমিকা হিসেবে পেতে চেয়েছিলাম সে আমাকে গ্রহন করে নি। সে সময়টাতে আমি কিন্তু ডিপ্রেশনে ভুগতে পারতাম। কিন্তু এই গেমই আমাকে বাঁচিয়ে দিল।’ ছেলেটা হাসছে, তাকে ডিপ্রেশনে ভুগতে হয় নি সে সেই আনন্দে হাসছে! গোপাল স্যারকে আমরা হাসতে দেখি নি কখনো। তার স্ত্রী কি এক কঠিন অসুখে আক্রান্ত ছিলেন। তাকে প্রায়ই ইন্ডিয়াতে নিতে হত। তাই হয়ত তার মুখ মলিন থাকত। আমি নিজেও গম্ভীর ধাঁচের মানুষ। ঋতু তো বলত, তুমি দারুণ অহংকারী। ছেলেটা আবার শুরু করেছে, তোমার কী মনে হয়? এই গেম খেলা নিয়ে। আমি বললাম, আমার কিছুই মনে হয় না। সে বলল, তুমি আমার কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছ না, তাই না? আমাকে নড়েচড়ে বসতে হল এটা বোঝানোর জন্যে যে আমি তাকে গুরুত্ব দিচ্ছি, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এই গেইম বানিজ্যের বিশাল বাজার রয়েছে বলেই তো মনে হয়। গেইম ব্যবসায়ীরা চাইবেই তাদের বানিজ্যের প্রসার হোক, যে কোন ব্যবসায়ীর মতোই তারা বাজার দখল করতে চাইবে। আহা, তুমি গেমকে কেন বাজার হিসেবে দেখছ, ছেলেটিকে বিরক্ত মনে হলো। তুমি ভাবতে পারবে না কত মানুষকে বাজে কাজ থেকে বিরত রাখছে এই গেম। এই আমার কথাই ধর না। আমি গেম নিয়ে থাকি বলে কত ঝামেলা থেকে বেঁচে যাই। আমাদের পাড়ার এক ছেলে ইয়াবা নিত। পরে জানাজানি হল, তার বাবা-মায়ের কত বড় অপমান। আমি ওসব করার সুযোগ পাই না গেম খেলি বলেই তো। অনেকে তো জঙ্গী হয়ে যাচ্ছে! ‘হ্যা,তুমি যা বলছ তা ঠিক হতেই পারে’, আমি বললাম। আমার ফেলে আসা একটা দৃশ্য মনে পড়ে গেল। নুরু, বিলু, পারু, শ্যামলী, শিবলু, শিল্পী আরো অনেকগুলো মুখ আমি মনে করতে পারলাম, কারো মুখ মনে পড়ল, নাম মনে পড়ল না। আমি দাঁড়িয়ে আছি। ওরা বদন খেলার কোর্ট তৈরী করছে। ওরা কানেকানে বলে নিয়েছে মৃদুল কিন্তু দুধভাত। ওরা আমাকে সবসময় দুধভাত বানায়। আমি নাকি কিছুই পারি না কিন্তু আমার ধারণা আমি বেশ ভাল খেলি। আমি ভাবলেই তো হবে না, ওদের ও ভাবতে হবে। আগে আমাকে দেখলে ওরা বলত, তুই বাদ, তুই বাদ। পরে আমি এমন মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে শুরু করলাম তারা আমাকে দুধভাত করে নিল। না নিয়ে উপায় ছিল না, আমি ওদের খেলার কোর্টের মাঝখানে শুয়ে পড়েছিলাম যে। ‘তুমি আমার কথা সহজভাবে নিতে পারলে না তো?’ ছেলেটির কথা কানে যেতেই নুরু, বিলুরা হারিয়ে গেল। আমি ওর কথাগুলো শুনতে চেষ্টা করলাম।‘বলছি, তুমি আমার কথাকে সহজভাবে নিতে পারলে না তো? আসলে কেউই পারে না। মানুষেরা অপরের ভাললাগাকে সবসময় অর্থহীন প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগে। আমি কিন্তু উদারমনা। কোন মানুষ যদি একটা বিষয়কে আঁকড়ে ধরে ভাল থাকতে পারে তো থাকুক না। মানুষজন কেন যে সব সময় লোকের পিছে লাগতে চায় আমি বুঝি না!’ আমি মনে মনে বলি হ্যা, খারাপ আবার কি, পৃথিবীতে খারাপ বলে কিছু নেই। যার যা  ভাল লাগে সে তো তাই করবে, তাই তো করা উচিত। আমার মিঠুর কথা মনে আছে। সে মুরগীর বাচ্চার গলা মটমট করে ভেঙ্গে ফেলত। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলত, আমার ভাল লাগে। এই কারণে মিঠু ওর বাবার হাতে কম মার খায় নি। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে মিঠু ভুল কিছু করে নি। ওর যা ভাল লাগত ও তো তাই করত! পৃথিবীতে আদর্শ আচরণ বলে তো কিছু নেই। আমি অতি উৎসাহে বলতে থাকলাম, ‘তুমি ঠিকই বলেছ শীতল, তুমি ঠিকই বলেছ। তুমি আমাকে গেমার বানিয়ে দাও। আমি গোপাল স্যারের মৃত্যুকে ভুলে যেতে চাই, আমি ঋতুর চলে যাওয়াকে ভুলে যেতে চাই, আমার যে অনেক ভাল লেখা লিখার কথা ছিল সে সব কিছু আমি ভুলে যেতে চাই। আমি সব কিছু ভুলে নিশ্চিন্ত জীবন কাটাতে চাই। তোমার ইংরেজ বন্ধুদের সাথে চ্যাট করতে চাই। বিলু, নুরু, পারুদের ছবি যেন আর কখনই আমার সামনে ভেসে না ওঠে তুমি সেই ব্যবস্থা কর, শিতল।’ ‘তুমি এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছ কেন? তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই। আজকেই আমি সবগুলো গেমিং গ্রুপে অ্যাড করে দিব।’ তাই কর। আমাকে দ্বিধাহীন কর। ‘আমার কেন যেন কান্না পেতে লাগল। গেমার হওয়ার আনন্দ আমাকে কেন যেন আর স্পর্শ করতে পারছে না। আমাকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। শীতল বলল’ তোমার কি ক্ষুধা পেয়েছে? তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন? আমার কাছে পিৎজা আর কোল্ডড্রিংস আছে। তুমি নেবে? আমি এখন কোল্ডড্রিংস খাচ্ছি আর পিসিতে কাউন্টার স্ট্রাইক গ্লোবাল অফেনসিভ খেলছি। অল্প দিনের মধ্যেই ভাল গেমার হয়ে উঠছি। এলিসা এন্ডারসনের সাথে খুব চ্যাট হচ্ছে আজকাল। যাক যা কিছু ভুলতে চেয়েছিলাম ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি সে সব। তবে ডাক্তার ছেলেটা ঝামেলা করছে। সে মনিটরের সামনে থেকে চোখ ফেরাতে বলছে, বলছে আকাশ দেখতে। আমি ঠিক করেছি ডাক্তারের কথা আমি শুনব না। আকাশ দেখে কি লাভ! আকাশ দেখে পাগলেরা।

************************************************

মেহজাবিন পান্না
………………..
জলপদ্মের ঘ্রাণ

আমি একটা পথ ধরে হেঁটেছি। জীবনানন্দ হেঁটেছিলেন পৃথিবীর পথে, হাজার বছর ধরে। মানুষ হেঁটে যায়। প্রেম, কাম কিংবা সময় ছাড়িয়ে; হাঁটাটাই মূখ্য। আমিও হেঁটেছি। ওই কাব্যিক পথের দু’পাশে ছড়ানো ছিটানো আসমান রঙা জলাধার। টলটলে জলে শিহরণ জাগিয়ে মাঝখানে ফুটে আছে স্বর্গীয় নীলোৎপল। কিভাবে ভুলি? এই হাঁটার পথে আমারে ভোলায়নি কোন চুলখোলা রমণী, আমারে ভোলায়নি কোন শরৎবাবুর কলমে অঙ্কিত নারী, আমারে ভোলায়নি কোন আজন্ম দুঃখবতীর বাড়ানো হাত- আমারে ভুলিয়েছে শুধু একটি পদ্ম। একবার পথের ধারে খানিক থমকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর যারে সময় নিয়ে গিয়েছিলো পেছনে, ফেরত পাইনি আর। এখন আমি ঠায় দাঁড়িয়ে, গন্ধ পাচ্ছি, নীলোৎপলী গন্ধ; আমার কোন ব্যক্তিগত পদ্ম নেই।

পথের ধারের ওইসব টলটলে জলাধার, ওইসব নির্জন কাননের কাছে আমি ঋণী, আমারে ঋণ দিয়েছে ওরা রোজ। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম বকুলতলায়, আমার পায়ের কাছে ছড়ানো ছিটানো শুভ্রতা, পাপড়ি করে বইয়ে আনা গুচ্ছ গুচ্ছ শরৎ-এর মেঘ। আমার পায়ের কাছে ঋণ ছড়ায়ে রেখেছে প্রকৃতি, থমকে দাঁড়িয়ে খানিক তাকিয়ে হেঁটেছি আমি। রাক্ষুসে সময় গিলে নিয়েছে ওই বকুলতলা। আমি এখন ঠায় দাঁড়িয়ে, গন্ধ পাচ্ছি, শুভ্ররঙা বকুলী গন্ধ; পেছনে রেখে আসা একটা থমকে দাঁড়ানো সময়ের পাপড়ি ভেংচি কাটে… কিভাবে ঋণ শোধ করি?

আমার হাঁটা পথের ক্লান্তি আমায় ছোঁয়নি কখনো। ইট পাথরের পথে পায়ের তলায় নিজেদের পেতে দিয়েছে কোমল কচিপাতারা, ক্ষণিক পর পর; আমার শরীর জুড়ে যে অতিদূর হেঁটে আসার- ছুটে যাওয়ার গন্ধ- সস্নেহে মায়ের মতোন মুছে নিয়েছে মাধবীলতা! ও তো ফুল নয়, আমার মায়ের-ই আঁচল। হাঁটতে গিয়েই স্বর্ণলতায় বেঁধেছে কতবার হাত, একটু থেমেছি বৈকি, দ্বিগুণ গতিতে ছুটে এসেছি আবার অনুকুল হাওয়ায়। ওরা আমার স্বপ্নে আসে, আমি টের পাই জাগ্রত চক্ষুর কোনায় ওদের অশ্রুর ঘুমন্ত ছদ্মবেশ! আজকাল ওরা হাঁটে, চোখের কোনা বেয়ে গালের পাশ ধরে ঠোঁট অবধি ছুটে… হায় ঈশ্বর, একদা আমিও ছুটেছিলাম কাঠগোলাপের ভাঁজ বেয়ে, যে পথে প্রজাপতি রঙা অপরাজিতা কবিতা হয়ে ফুটে আছে অজ¯্র… আমি হেঁটেছি নীল রঙা ডানায়- পাশ ধরে, পাতা অবধি! মনে পড়ে খুব।

ওই যে, ওই পথে নদী তীরের জমাট বেঁধে ওড়া কাশফুলের মাথায় মাথায় স্বপ্ন খেলেছে। দলা দলা পুঞ্জীভূত সুখ, গুচ্ছ গুচ্ছ মুগ্ধতা জমাট বেঁধে ছিলো হাসনাহেনা, গাঁদা, বেলী ফুলের কোলে। লজ্জাবতী ফুলের মতোনই হালকা স্পর্শে গুটিয়ে নিয়েছে যেন সময় আজ। অথচ পথের ধারের কৃষ্ণচূড়ায় আগুন লেগেছে হাজারবার, কুড়িয়ে নিয়েছি লাল রঙা নক্ষত্রগুলি কত। অমন করে রক্তজবা ছুঁয়েছি, গোলাপের পাপড়ি গিলে নিয়েছে কত গোপন কথা আমার। ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকার ঘন সুসজ্জিত পাপড়ির মতোন করে থরে থরে জমা হয়েছে ঋণ কতশত। কি করে শুধবো?

ওইসব পথের পাশে থমকে দাঁড়ানো সময়গুলি, গন্ধ পাচ্ছি তোমার আজ। যেখানে দাঁড়িয়ে, ওখানে তোমাদের অবিরাম বিচরণ। বাতাসে পাপড়ি সমেত নড়ে উঠার শব্দ, পাতায় পাতায় সুরেলা ভায়োলিন। থমকে দাঁড়িয়েই গন্ধ পাচ্ছি একদা থমকে দাঁড়ানোর। এমন পরিচিত মুহূর্ত, পরিচিত গন্ধে বসত করেছি কত কত মহাকাল। চোখ বুজলেই ফেলে আসা ফুলেল সময়ের গন্ধ আরো তীব্ররকম অনুভব করা যায়। চোখ বুজে আছি। নস্টালজিক পাপড়িগুলো ক্যাফেইন মেশানো। ঘুম আসেনা একদম।

************************************************

মারুফ আহমেদ নয়ন
………………..
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না

ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা, না আসবারই কথা। মায়ের হাতে লাগানো সেই সব বকুল বেলীর চারা একদিন বড় হয়, ধূপের মতো গন্ধ বিলায় একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে। খোলা জানালার পাশে শুয়ে বসে থাকা সেই সব দিন রাত্রীর গল্প কাউকে বলা যায় না। আমার পিতারও ঘুম হতো না শুনেছি সে গল্প শৈশবে এসে, আমার মৃত্যু চিন্তায় তিনি বড় ভীত হয়ে পড়েছিলেন। সারা রাত জেগে আমাকে পাহারা দিতেন, যেনো যমদূত আমাকে না ছোঁয়, সারাদিন শহরে ঘুরতেন ডাক্তারদের কাছে, কেউ যদি বলেছে এ কবিরাজ ভালো, তবে তার কাছে নিয়ে ছুটে গেছেন, শুধু একটিই আশা, যদি বেঁচে যাই। নব্বই দশকের সর্বশেষ সময়ে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে জন্মানো এক অসুখী শিশু, তার দীর্ঘ অসুস্থতা, মৃত্যুর মুখোমুখি থেকে আয়ুর জোরে ফিরে আসা, সেই সব গল্প যৌবনে এসে ফিকে হয়ে যায়। যৌবনে এসে ক্ষুধা পিপাসা বাড়ে, সাদা রুটির চেয়ে তখনও গোলাপকে বেশী প্রিয় মনে হয়নি, তখনো কালো তিলের বিনিময়ে সমরখন্দ আর বোখারাকে বিকিয়ে দেবার ইচ্ছে হয়নি। তখন সেই না বোঝা-বুঝির দ্বন্দ্বে প্রেমে পড়ি, প্রেম বাড়ে, না ঘুমিয়ে রাত জেগে গোপনে চাঁদের আলোয় লেখা সেই সব চিঠির না ছিল ডাকবাক্স না ছিল পিয়ন, হাতে হাতে যেনো কি করে পৌঁছে যেতো। আবার চিঠির উওর পাবার আশায় দীর্ঘ অপেক্ষায় দিনগুলো যখন মধুর হয়ে উঠছিলো, তখনো জানা ছিলনা এর শেষে দীর্ঘ তিক্ততা বিরহ বিচ্ছেদ ব্যথায় কাতর হবার দিনগুলো ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। প্রতিবেশী সুন্দরী পর্দাথবিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্রী এতো দুঃখ দিতে পারে জানা ছিল না। সেইসব দিন-রাত্রী প্রেম, পরাজয়, ক্ষোভ আর দীর্ঘ হতাশায় ঘুম হতো না। বন্ধন সুতো জুড়ে রেখেছিলাম এক পাথরের সাথে, যে কথা বলতে জানতো না। পাথর যে কখনো কথা বলতে পারে এমন আশা করাও বোকামী ছিল। এভাবেই একদিন কবিতাকে পেয়েছিলাম, যাত্রাবিরতিতে থেমে যাওয়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিলো, আমাকে সেই কবেই শহরগামী উজ্জ্বল আলোর ট্রেন ছেড়ে গেছে। আমার কিছু হয় না, যা যা হবার কথা ছিল, এভাবেই একদিন আতœহত্যাপ্রবণ কালো গোলাপের গান হলাম, জুঁই জবা, কিংবা বকুল-বেলীর পাশে ফুটে থেকেও আজন্ম এক কাঁটা ফুল হলাম। গৃহত্যাগী গৌতমের মতো একদিন নির্বাণের গান শুনে পথে বেরিয়ে পড়েছিলাম, আমার নির্বাণ হলো না, সাধুসঙ্গ হলো না, কিছুই হলো না। ঘরে ফিরে আসি, আনত মুখ নিয়ে, সে সময় শহর জুড়ে শাহ নেওয়াজ ভাই আবৃত্তি করতেন, কোন খেয়ালে যেনো একদিন ডেকে নিলেন, সেই খেয়ালে বহুদিন গল্প-গুজবে কাটিয়ে দিয়েছি, কোনোদিন মির্জা গালিব, আল্লামা ইকবাল, হাফিজ, আর ওমর খৈয়ামের কবিতা নিয়ে বলতেন। আবার কোনোদিন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ আর জয় গোস্বামীতে দিন মান কেটে যেতো। আবার কোনদিন শুধু আবুল হাসান, ‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র মায়াবী করুণ’— এইসব গল্প ভুলে যাই, অনেক দিন আগের গল্প মনে পড়ে, যে গল্প বলতে বারণ, কাউকে বলা যায় না। পিতার যৌবন বয়সে মেলা থেকে কিনে তরলা বাঁশের আড়বাঁশি আর কবিতা ও উপন্যাসের না দেখানো বইগুলো এক সময় দৃষ্টিতে আসে, তাই দিয়েই রাত জাগা শুরু। আমায় সুন্দর ধরেছিল আর ছাড়েনি, তারপর ধরেছিল কবিতা সে লক্ষ কোটি গুণ সুন্দর, সে আর ছাড়েনি, একদম নিঃশেষ করে ফেলেছে। তারপরের গল্প বলি, এমনই বেপরোয়া সময়ে দেখা হয় কবির পাগলের সাথে, যিনি কবিতার জন্য সংসারী হলেন না। বাপের অর্থ-বিত্ত মদ নারী আর নর্তকীর পেছনে শেষ করে দিলেন, শুনেছি পায়ের ঘুঙগুরের শব্দে ঝন ঝন করে বাইজীর পায়ের কাছে পয়সা ছিটিয়ে দিতেন, তার সমান অর্থ আর সম্পদশালী ব্যক্তি খুব কমই ছিলো, একদিন তিনিই আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘যাকে সুন্দর ধরে তার কি আর কিছু টিকে রে, পাগলা’ কবির ভাই, আমার বোধ হয় আর কিছু টিকলো না, এভাবেই যখন তার পাশে অঝোর ধারায় কেঁদেছিলাম, শ্রাবণ মেঘের দিনে, তিনি মাথায় হাত রেখে শোনাচ্ছিলেন :

আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে

থাকি-তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে। আমি আক্রোশে

হেসে উঠি না, আমি ছারপোকার পাশে ছারপোকা হয়ে হাঁটি,

মশা হয়ে উড়ি একদল মশার সঙ্গে; খাঁটি

অন্ধকারে স্ত্রীলোকের খুব মধ্যে ডুব দিয়ে দেখেছি দেশলাই জ্বেলে-

কবির ভাই, সেদিন কি বোঝালেন, কি বুঝলাম, কেন কাঁদলাম, ভেবে পাইনা, নিজেকে নিয়ন্ত্রণহীন হিসেবে আবিষ্কার করি, সারা রাত কবিতার বইয়ে মুখ গুজিয়ে কাটিয়ে দিই। পিতা সকালে ফজরের নামাজে যান, মার ওযুর পানি গড়িয়ে পড়ে, আমার ঘুম আসে না, ঘুমোই না, এভাবেই শরীরকে রোধ-ব্যাধির আঁতুড় ঘর বানিয়ে ফেলি। মূলত এইসব কিছু আমাকে নিশাচর পাখি বানিয়ে ফেলেছিলো, কাউকে বলতে পারি না, পুরোপুরি বুঝে উঠি না নিজেকেই, যেনো আমি দুর্বোধ্য আমাকে বোঝে না কেউ। বন্ধুরা ভুল বোঝে, আপনজনেরাও তেমন। তার পূর্বের গল্প বলি, দূরে গোপীনাথের মেলা হতো, যাত্রা-গান হতো প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে, তার থেকে আরো দূরের গ্রামে বাউল-বিচ্ছেদী গানের আসর বসতো গভীর রাতে, সারা রাত শিল্পীরা দুঃখ যাপনের সেই গানগুলো গাইতে থাকেন, আমি একা একা অন্ধকারে সে দিকে হেঁটে হেঁটে চলে যাই। কোনদিন পকেটে পয়সা থাকে না, সেদিন ফুল তোলা রুমাল থাকে, কোনদিন পকেটে পয়সা থাকে, যাবার কোন পথ থাকে না। এভাবেই একটা জীবন কেটে যায়, ঘরে ফিরি না, অজানা বিচ্ছেদ ব্যথায় কাতর হতে থাকি, সারা দিন সারা রাত উদ্ভ্রান্তের মতো পথে পথে ঘুরতে থাকি। আর পিতার ফসলী জমির আল পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে  গম ক্ষেত আর সবজি ক্ষেতগুলোর দিকে চিৎকার করে বলি, দেখো এই যে রোপিত বীজ, শস্যের লকলকে সবুজ পাতা, আমিও তোমাদের মতোন, দেখো, আমি নষ্ট নয়, হতেও পারি নি। কেনো আমাকে কেউ বোঝে না, ঘরেও না বাইরেও না। যার জন্য সবকিছু এলোমেলো করে ফেলি এমন কি সেও নয়। তাকে কি অভিশাপ দেবো জলমুখী ফুলের মতো, না দিতে পারি না। এভাবেই জীবন কেটে যায় নিজের জন্য শোক করতে করতে, পৃথিবীতে এতো আলো, এতো ফুলের সৌরভ চারদিকে, এতো হাওয়া ফুসফুস ভরে গ্রহণ করি, তবুও যেনো কিছুই গ্রহণ করতে পারি না, আলো সহ্য হয় না, অন্ধকারও নয়। নিজে আলোকিত নই বলে, চাঁদেরও তো নিজস্ব আলো নেই, তবুও সে কেমন করে উজ্জ্বল, আমি মানুষ, নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কি মানুষ-ই, না কি অন্যকিছু, ফুলের বনে ফুটে থাকা বিষধর কীট, লতাপাতা। নিজেকে প্রশ্রয় দিই, নিজেকে অজানা সাহস দিই, তবুও নিজেকে বুঝতে পারি না, সবার কাছাকাছি থেকেও যেনো আলাদা হয়ে যাই। এর পূর্বের গল্প বলি, তোমার টবে লাগানো লতা ফুলগুলো মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে, ভরা পূর্ণিমার রাত আর চাঁদ নেমে আসে তোমার ছাদে, তুমি ভিজতে থাকো, ঘন ঘন পায়চারি করতে থাকো, তোমাকে দেখি অনেক নিচু থেকে অন্ধকার এক জানালা দিয়ে, যেভাবে একদিন ভিনসেন্ট ভ্যানগগ রাতের আকাশ দেখতো জানালা দিয়ে, এভাবেই বুঝি স্টারী নাইট, সূর্যমুখী ফুল আর নিঃসঙ্গ গম ক্ষেত আঁকা হয়েছিল। এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি, শীত প্রধান সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে উড়ে আসা পাখিদের মতো নিজেকে করুণ আর ব্যাথিত মনে হয়, যেনো কতোদিন রক্তমাখা পালক বিছিয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম সাদা সাদা বরফের গায়। তারপর ঘুমের ভেতরে স্বপ্ন দেখি, পৃথিবীর উত্তর মেরু, দূরে এস্কিমোদের গ্রাম, ছয় মাস দিনের পর ছয় মাস রাত, খাদ্য বলতে কাঁচা মাছ, মাংস আর কিছু ঘাস, এভাবেই কেটে যায় যুগের পর যুগ। বরফ ঘুমে তলিয়ে যায় ইগলু ঘরে, তোমার ওষ্ঠে, আর গ্রীবার লাজুক ভাঁজে ক্রমাগত চুম্বন ঢেলে দিই, তারপর গ্রীষ্ম আসে সবকিছু গলে যায়। মনে পড়ে যেনো আমিই সিল মাছে, আমার বুকের তেলে আগুন জ্বালানো হয়েছে আগুন, উজ্জল আলো। অথবা যেনো আমিই নিজেকে ক্ষুধা ভেবে গিলে ফেলেছি, কেউ জানেনা। আতœহত্যা প্রবণ সাদা ভাল্লুকের দল হাঁটাহাটি করে। কেউ বোঝেনা আমাকেও আমিও  নিজেকে নয়। নিজেকে বিশ্বাস করতে পারি না, প্রতিবেশীনির এক ঝাঁক সাদা পায়রাগুলো উড়ে আসে, শান্তির বার্তা নিয়ে, তাদের গম ও শস্যের দানা ছড়িয়ে দিই উঠোনে, তাদের চোখে অন্ধকার ও হিমযুগ দেখি, আমি কফিনের ভেতর বন্দী মানুষ, তারপর ভাবতে থাকি, পৌরাণিক ফুলের গান, পাখির গান, শুধুমাত্র একটি সোনার আপেলের লোভে দীর্ঘক্ষণ ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলে সাদা পাথরের উপর। এতোকিছু ভাবতে ভাবতে ক্রমেই নিঃসঙ্গ হচ্ছিলাম, মূলত তাড়িয়ে নিচ্ছিলো এক অদ্ভুত অন্ধকার, মূলত এভাবেই গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিলাম কেউ জানতো না, এভাবেই একা হই, অন্ধকার হই, আতœহত্যাপ্রবণ গোলাপের গান ভালবাসি, যে দুঃখ দেয় তাকে অভিশাপ দিই না। নিজেকেই একদিন নিজে নিজে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি, ‘তোর কেন কেউ বন্ধু হলোনা, স্বজন হলোনা, তুই কেনো দশ দিগন্তের অন্ধকার হলি, দেখিস না চারদিকে এতো আলো চোখ ঝলসে যায়, চারদিকে এতো সুখ, সঙ্গম, কামনায় বাসনার ভেতরে তুই কেন কামনা করিস, অনন্ত ঘুম, যা মৃত্যুর মতোন’।

************************************************

মুহিম মনির
………………..
ঝরে গেছে সমস্ত ফুল

শীতে সর্ষেফুলগুলির যে গন্ধ থাকে বা শরৎকালে শিউলির, তেমন একটা মধুর গন্ধ ধূলোর গায়েও থাকে। অথচ এটা জানতামই না। যেদিন মিম বলল, ‘ধূলোর গন্ধটা বেশ মিষ্টি! না ভাইয়া?’ সেদিনই প্রথম অনুভব করলাম ধূলোর গায়েও গন্ধ আছে। এবং তা মিষ্টি।

মিম বলতে…

আমার কাকাতো বোন।

ছোটোকালেই তো মাকে হারিয়েছিল। না?

তার মানে মনে আছে আপনার!

আছে আরকি। সব কি আর ভোলা যায়?

আমার সৌভাগ্য ভাই। যৎসামান্যের কথাগুলো যে অসামান্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন, সে বেশ বুঝতে পারছি। চলেন না আমার ঘিঙজি ঘরটায় একটু বসবেন! ঐ যে, ফুলফোটা ডুমুরগাছটি দেখছেন না? অমাবস্যার চাঁদে চকচক করছে চারপাশ। ঝিঁঝিঁ ডাকছে ঝাউগাছে। থেকে থেকে ঝোপঝাড় থেকে উড়ে যাচ্ছে যাযাবর পানকৌড়ি। ওখানে ঘাসের বেড়াঘেরা যে আধভাঙা বাড়িটি, সে বাড়িতেই থাকতাম একসময়। বাবা-মা এখনো ওখানেই থাকেন। আমার অগোছালো ঘরটাও হয়তো আছে ওইভাবে। আজো বইপত্র কাগজপাতিতে ভরে আছে হয়তো। যাবেন?

হুম, যাওয়াই যায়। জানেন, আমারও বেশ আগ্রহ জাগছে। কোথায় থাকতেন, স্মৃতি কুড়োতেন, এ ফাঁকে একটু দেখে নিলে মন্দ হয়না।

তাহলে চলুন, ঐদিক দিয়ে যাই! ওখানে একটা বকুলগাছ আছে। সেটা নিয়ে একটা গল্পও আছে। শুনবেন?

নিশ্চয়।

একদিন মিমের কী খেয়াল হলো কে জানে। বিকেলের দিকে বলল,

ভাইয়া, চল না বকুল ফুল কুড়িয়ে আনি!

আমার সাধ্য কোথায় অবাধ্য হবার? তাই ঝোপঝাড়ের কাঁটাল লতাপাতার আঁচড় হজম করে বকুলগাছটির নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঝিরঝির করে ঝরে পড়ল কয়েকটা বকুল।

কী সুগন্ধ! তাই না?

হুম।

এখানেই কি এসেছিলেন সেদিন?

হুম।

গাছ অবশ্য আছে একটা, কিন্তু কই, কোনো ফুল তো দেখছি না।

সমস্ত ফুল ঝরে গেছে!

আর পুকুরটার জলও কী ভীষণ কালো!

অথচ এ কালো জলে কত আলোই-না ঝরে পড়ত সে-দিনগুলোয়! বেশ শালুক ফুটত তখন। ছোপ ছোপ সবুজপাতার ফাঁকে চিকন চিকন ডগা; আর ডগায় ডগায় ফুটে থাকত শাদা শাদা ফুল। আমরা প্রায়ই আসতাম। পুকুরপাড়ে চুপচাপ বসে থাকত মিম। আমি নেমে পড়তাম পানিতে। তুলে-আনা শালুকের লতি দিয়ে মালা গাঁথত সে। আর সে-মালা গলায় সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরতাম দু’জন। ‘তোরাকে তো ভালুই মানাইছে রে। লিচ্ছাকা মাইগ-ভাতার মনে হইছে। হে হে…।’ এভাবেই টিপ্পনী কাটতেন দাদি। মাঝে মধ্যে পাড়ার কাকিরাও তাল মেলাতেন তাঁর সঙ্গে। সেসব শুনে আমার খুব হাসি পেত। কিন্তু মিমের রাগটা চড়ে যেত সপ্তমে। মালাটা তো ছিঁড়তোই; সঙ্গে সঙ্গে মুখের ওপর বলেও বসত, ‘এই আঁড়ি। তোমার সঙ্গে আর কখনো গিয়েছি তো… দেখে নিও। কক্ষনো যাবো না।’

তারপর তো আবার যেতেন। তাই না?

সে আর বলতে হয়? ক’দিন বাদে ও-ই ডেকে নিয়ে যেত। মাঝে মধ্যে মায়া দেখিয়ে কী বলত জানেন? বলত,

ভাইয়া, তুমি না সত্যিই খুব ভালো।

কেন রে মিম?

বা রে! ভালো না-হলে কি আর ফুল তুলে দিতে?

শালুক তোলা তো ওয়ানটুয়ের ব্যাপার। বুঝেছিস?

হুম, বলেছে তোমাকে! গায়ে কাঁটা ফোঁড়ে না বুঝি?

বাহ! তাহলে তো বলা যায়, বরের দিকে যথেষ্টই খেয়াল ছিলো বালিকা বউয়ের। হা হা…

বালিকা বউ! বেশ বললেন তো! কিন্তু সে আর হলো কই! বেশ ফুলপাগলী মেয়ে ছিল মিম। আমার জানালার ধারে কাগজ ফুলের গাছও লাগিয়েছিল সে। সে-গাছে ফুল ফুটত। কী সুন্দর লাল লাল ফুল! ছোট্ট ছোট্ট পাতার ফাঁকে ছোট্ট ছোট্ট ফুল। ফুলফোটা শাখাটিকে মনে হতো হুবহু তার হাতের মতো। আমার প্রকাশিত গল্পটিতে যে ফুলগাছের কথা আছে, সে গাছটিই সেটা।

তাই নাকি? তাহলে তো পড়তে হয় গল্পটি।

তাহলে যে ঘরের দিকে যেতে হয়। হা হা… চলুন গিয়ে দেখা যাক, ম্যাগাজিনটা আছে কিনা। আজকাল ইঁদুরের যা উপদ্রব বেড়েছে!

‘ইঁদুর’ নামে তো একটা গল্পও লিখেছেন সোমেন চন্দ। জয়তু ইঁদুর! তা আর কদ্দূর? হা হা…

এই তো এসে গেছি।

এটাই আপনার ঘর?

হুম। … আরে একি! পেলেন কোথায়?

এই তো শেল্ফেই ছিলো।

তাই বলেন। ভাবছিলাম, পড়টড়ে ছিলো বুঝি।

এটিই কি…

হুম, এ ম্যাগাজিনেই আছে গল্পটা।

বাহ! পড়ি?

নিশ্চয়।

‘রাত দেড়টার মতো বাজলেও, ঘুম আসি আসি করলেও, তাই শেষ পর্যন্ত ঘুমুতে পারছিনা। আধো ঘুম আধো জাগরণে গল্প করছি ফুলগাছটির সঙ্গে। জ্যোৎস্নালোকে অসম্ভব রূপবতী বনে গেছে সে। দুধেল জোছনায় ভিজে যাচ্ছে তার নাকফুল কানের দুল আর দেহপল্লব। মৃদু বাতাস বিনুনি কাটছে চিকন শাখায়, পুষ্পমঞ্জরি আর পাতায় পাতায়।’ কিন্তু গাছটি কোথায়? দেখছি না তো।

তাই তো! আমিও তো দেখছি না। … একি! কে করল এটা!

অথচ এটি ছিল ফুলগাছ!

************************************************

বৃশালী বর্ণ
………………..
বিহঙ্গীপুরাণ

‘রজনী হোস না অবসান, আজ নিশীথে আসতে পারে আমার বন্ধু কালাচান’

যে সাধক যেমন জীবনের সাধনা করেন, সেই সাধক তেমন জীবনের দেখা পান, যদি তার সাধনায় একাগ্রতা থাকে, সততা এবং শতভাগ নিবেদন থাকে। বণিক পৃথিবীর কাছে যিনি সমস্তকিছুকে তুচ্ছ করে মাড়িয়ে দিয়ে ‘জীবনের সাধনা’ করেন তিনিই সাধক। সাধকের বেছে নেওয়া পথই সাধককে চালিত করে, মোড় নেওয়ায়, দূর্ঘটনার সম্মুখীন করায় আবার সমাধানের পথ বাতলে দেয়। জীবনের সত্যিকার উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য সফল করার পন্থা কি? দৃষ্টি কেমন হওয়া দরকার? দর্শন কেমন হওয়া দরকার— এসবের উত্তর খোঁজেন নিজের যাপনের ভেতর দিয়ে অথবা পূর্বসাধকদের কীর্তিকর্ম ও ইতিহাস থেকে। কেউ কেউ নিজের যাপনে খুঁজে পান, কেউ কেউ চর্চা করেন পূর্ববর্তীদের। যারা নিজের যাপনে খুঁজে পান তারা হন ঐশ্বরিক আর যারা পূর্বসূরিদের জীবনের ভেতর দিয়ে খুঁজে পান তারা হন পরিশ্রমী। তবে ঝুঁকি দ্বিতীয় শ্রেণির ক্ষেত্রে কারণ এই শ্রেণির অনেকে বুঝতেই পারেন না কে দেবতা আর কে অসূর। যার ফলে অর্ঘ্য চলে যায় ভুল জায়গায়। এই বণিক সময়ে ভুল মানুষেরাই সবথেকে বেশি অর্ঘ্য পাচ্ছেন যার কারণে আমার এই ভয় সবসময়ই কাজ করে যে আমি কি আমার সত্যিকারের দেবতাকে চিনতে পারবো? এখন প্রশ্ন হতে পারে ‘আমার দেবতা’ আসলে কে? কে, এই উত্তর পেতে হলে আমার প্রকৃতি আমাকে জানতে হবে। আমি আসলে কি চাই? আমার সেই চাওয়াকে পূর্ণতা দিতে আমার কতটুকু সামর্থ আছে? সেই সামর্থের প্রয়োগ আবার কতটুকু করতে পারবো? এইসব প্রশ্নের উত্তরে আমার কাছে আমার দেবতার মূর্তি প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি হচ্ছেন আমার গঙ্গা দা। যার মূর্তির সামনা-সামনি হলেই আমি আমাকে ভুলে যাই। আমার মনে হয় তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ট ফুলটা অর্পণ করি। আমার একমাত্র সাধনা তাকে ঘিরেই। স্বপ্নের ও জাগালেন ভেতর তাকেই জঁপ করি। তিনি আমাকে সাধনার স্পর্ধা দিয়েছেন। এখন আমি রজনীকেও অবসান না হওয়ার অনুজ্ঞা উচ্চরণ করি। সাধনা করতে গিয়ে যে ঘোর তৈরি হয়, যে অন্ধকার তৈরি হয় সেই অন্ধকারে তাকে খুব করে কাছে পেতে ইচ্ছে করে। আর তখনই বারী সিদ্দীকির সেই গান কণ্ঠে অজান্তেই চলে আসে — ‘রজনী হোস না অবসান, আজ নিশীথে আসতে পারে আমার বন্ধু কালাচান’।

‘কে হায় হৃদয় খুড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’

বহু উৎসব চলে গেছে, বহু আয়োজন এখন আর মনেই নেই। তবে কিছু কিছু উৎসব আমাদের দাঁগ কেটে থেকে গেছে, যেন অনন্তকালের জন্য তার স্থায়ী নিবাস। তাকে উপেক্ষা করার শক্তি আমাদের নেই। তাকে বরং বরণ করতে হয় সেই ফুল দিয়ে যে ফুল কেউ দেখেনি, যার গন্ধের সাথে পরিচয়ও নেই কারো; তাকে বরণ করতে হয় সেই আলিঙ্গন ও হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে, যেভাবে কারো সামনে কখনো যাওয়া হয় নি। তেমনি এক উৎসব ডাঙাপাড়ার নববর্ষের’র উৎসব। চাকচিক্য নেই, আধুনিকতার ছোঁয়া নেই। একদম গাইয়া। সাদাসিদে। একটা চৌকিই মঞ্চ। আর খড়, ঘাসই প্যান্ডেল। খালি গলায় গান গাচ্ছেন ফকির গওহর কাকা, সুধীরকাকা, গঙ্গা দা’রা। কোন ঘোষণা ছাড়াই বেজে উঠছে বাঁশি, হারমোনিয়াম বাজছে, ডোল, তবলা, খমক, ঝুনঝুনি। বিছানার চাঁদর দিয়ে বানানো দোকানে হরেক রকমের খাবার, খেলনাপাতি, ব্যাঙগাড়ি। এ রকমই উৎসবের আয়োজনে যখন গঙ্গা দা গাচ্ছেন ‘কদমডালে বসিয়া আছে কানুহারামজাদা’ তখন বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল। কে এই কানু? কানু কি গল্পের, উপন্যাসের যেমন চরিত্র তেমনি কোন চরিত্র? কদমডাল কেনো? এইসব প্রশ্নের ঘনঘটায়, এই আয়োজনটাকে তেমন উপভোগ করতে পারি নাই। কিন্তু থেকে গেছে দাঁগ কেটে কেটে। এরপর বহু উৎসব চলে গেছে, আমি মেলানোর চেষ্টা করি সেই উৎসবের সাথে, মেলে না। সেই গানের সাথে মেলানোর চেষ্টা করি গান, মেলে না। সেই সাজগোজ, সেই অনুভূতি, আবেগ মেলাতে চাই, মেলে না। মেলে না বলেই কি সেই উৎসবটাই থেকে গেছে? পিঠে এলানো লম্বাচুল, গেরুয়া পাঞ্জাবি, ধূতি, গলার গামছা কি কানুর বেশভূশা? আমি জানি না কিন্তু গঙ্গা দা’কে আমি আজীবন কানুর চরিত্রে স্থাপন করেছি। সেই উৎসবও আমার কাছে কানাই দর্শনের উৎসব হয়ে থেকে গেছে। উৎসব এলেই যেন জীবনানন্দ আমার সম্মুখে স্বয়ং মূর্তি নিয়ে শোনান তারই রচিত কবিতা, কবিতার পংক্তি— ‘কে হায় হৃদয় খুড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’।

‘হৃদয়ে অবাধ্য মেয়ে’

বৃষ্টিতে ভেজার আমন্ত্রন বহু পেয়েছি। কোনদিন ভিজেছি বন্ধুত্বের দাবী থেকে, কোনদিন ভিজেছি ইচ্ছায়, কোনদিন অনিচ্ছায়। অনেকগুলো ভিজে যাওয়া আমি হারিয়ে ফেলেছি, সেগুলো আর কোনমতেই স্মরণে আনতে পারি না। হয়তো অনেক দিনবাদে কোন বন্ধুর সাথে দেখা হলে যদি মনে করিয়ে দেয় তবেই আবছা আবছা মনে আসে। কিন্তু তার স্পর্শ অনুভব করতে পারি না। পারি না বলতে আসে না। জোর করে স্পর্শ করতে গেলে আরও দূরে সরে যায়। বালিকা বিদ্যালয় ছুটির পরে সেই যে ছাতা না থাকার কারণে ভিজেছি, সেই ভেজার দিনটাই এখনও আমাকে ভিজিয়ে রেখেছে। যেভাবে তরতাজা বৃষ্টি ভেজায়, সেইভাবে। দুটো পাড়া পেরুলেই আমাদের বাড়ি। প্রথম পাড়াটার পর কিছু দূর বসতি নেই তারপর দ্বিতীয় পাড়াটা এর পরেই আমাদের পাড়া। ত্রিশ মিনিটের হাঁটা পথ। মাটির রাস্তা, দুধারে শিশু, সেগুন, ইউক্যালিপটাস। রাস্তার পাশেই মানুষের বসতি, টিনের ঘর। ঝমঝম নৃত্য বৃষ্টির। প্রথম পাড়াটা পেরুতেই বৃষ্টির কুয়াশায় কিছুটা আন্দাজ করতে পাচ্ছিলাম কেউ একজন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ভিজছেন। কৌতুহল বশত গতি কিছুটা বাড়িয়ে কাছাকাছি যেতেই আমার চোখ বিস্ময়ে ঢলোমলো। সেই গঙ্গা দা। যিনি কিছুটা যাযাবর, কিছুটা বেহেমিয়ান। গেরুয়া কাতুয়া আর সাদা পাঞ্জামায় যখন বৃষ্টির দানাগুলো গঙ্গা দার গাল বেয়ে বেয়ে মাটিতে পড়ছিলো, মনে হচ্ছিল মুক্তোর এই অলংকার পেতে মাটি যেন দানভিক্ষা করে হাত বাড়িয়ে আছে দাদার দিকে। সেই প্রথম কোনকিছু বিবেচনা না করেই গঙ্গা দা’কে জড়িয়ে ধরেছিলাম। কেন ধরেছিলাম? কিসের চৌম্বক? কে, তাকে জড়িয়ে ধরতে বলেছিল? আমি জানি না তবে আজও বৃষ্টি ভেজার দিনে সেই দৃশ্য চোখে ভাসে আর মান্দাকান্তা দিদি যেন পড়ে শোনান তার ‘হৃদয়ে অবাধ্য মেয়ে’ র কবিতা, পংক্তি।

‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোন দাবী-দাওয়া/ এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া’

গল্পদাদুকে মনে পড়ে। কেন মনে পড়ে? জানি না, তবে শীত বা শরৎ হোক অথবা রাতটা জোছনার বা অমাবশ্যার হোক দাদু কাচারি ঘরে বাঁশের মাচানে বসে ডাকতেন— ‘কই রে সাতভাতারীরা, আয়, গল্প করি। এতো পড়ে লাভ নাই, তোদের অই বিদ্যার চাইতে গল্পগুলা বেশি কাজে দেবে। তোদের তো মনের ভেতর পিরীতের কইতর বাকবাকুম বাকবাকুম করছে। মন তো বইয়ের ভেতরে নাই। আয়, গল্প করি।’ ছোট থেকেই দাদুর গল্পশুনে বড় হয়েছি। রাক্ষস-খোক্ষসের গল্প, ভূত-পেতিœর গল্প, রাজকুমার-রাজকন্যার গল্প, লাইলি-মজনুর গল্প, শিরি-ফরহাদের গল্প, রহিম-রূপবান, ইউসুফ- জোলেখার গল্প, রাধা-কৃষ্ণের গল্প। আমাদের বয়সের ওপর ভিত্তি করে ক্রমে ক্রমে দাদু এইসব গল্প করতেন। দাদুর বলার ঢঙ, আসর জমিয়ে রাখার কৌশল, আমাদের নির্ঘুম মাঝরাত অব্দি নিয়ে যেত প্রায় দিনই। দাদুকে বোধহয় এ জন্যই মনে পড়ে।  সেদিন অমাবশ্যার রাত, বাজার বসানো জোনাকির আলো ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিতে ধরছে না। দাদু গল্প জুড়েছেন— ইউসুফ-জোলেখার গল্প। রসিয়ে রসিয়ে সেই গল্পে দাদু যে সুর তৈরি করেছিলেন আজ অব্দি আর কেউই তা পারেন নি। ইউসুফের অতুলনীয় রূপ, আমাদের নিজেদের জোলেখা ভাবতে শিখিয়েছিল। রূপের নূরানী দেখে জোলেখাদের হাত কাটার বর্ণনা, আমরা হা করে শুনতাম। আজও আমি দাদুর সেই ইউসুফকে খুঁজে বেড়াই। কাউকে দেখে চোখ আনন্দে ভরে উঠলে আমি সেদিন ছুরি, চাকু, কাঁচি, বটি থেকে শতহাত দূরে থাকি। কিন্তু তবুও রক্তাক্ত হই অদৃশ্য কোন ছুরির আঘাতে। আর রক্তাক্ত কণ্ঠে গুনগুন করে ওঠে কবির সুমনের সেই গান — ‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোন দাবী-দাওয়া/ এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া।’

‘সমুদ্র কিনারে বসে চাতকী মরে জল বিনে’

শক্তির ভঙ্গিতে বলতে হয় সে বড় সুখের সময় নয়, শোকের সময়ও নয়। তাহলে কেমন সময়? সুখ ও শোকের মাঝামাঝি কি সমাচ্ছন্ন সময়? না পারা যায় বুক ফাঁটাতে, না পারা যায় দুখ ফাঁটাতে! অস্থির সময়। আবছায়া আবছায়া। বোঝা যায় আবার বোঝা যায় না। হাসতে হাসতে অশ্রু ঝরে আবার অশ্রুর দাগ মোছনের আগেই হাসির রেখা দৃষ্টিগোচর হয়। বড় মায়াবী এবং রহস্যজনক। যেন এরকম খেলার ছকে ইচ্ছেকৃত ঢুকে পড়েছি। একবার লাথি খাচ্ছি আর একবার আদর সোহাগ। ধরবো ধরবো করে যখনই বাড়াই হাত, হাতের পঞ্চআঙুল-তালু তখনই ফুরুৎ করে উড়ে যায় সেই আধেয় প্রজাপতি। রতি রতি গন্ধ ছড়ায়। সেই দৃশ্য সবাই দেখতে পারে না, কেউ কেউ পারে। যারা ভালোবাসা বোঝেন, মানুষের হৃদয় বোঝেন, যাদের হৃদয় পবিত্র, নিঃষ্কলুস, নিঃঝঞ্ঝাট— তারাই বোঝেন। কিন্তু এ ধরনের মানুষেরা সংখ্যালঘু। বিধি-ব্যবস্থা-সংস্কারকে যারা নমঃ নমঃ করেন, তারাও বুঝেও ‘অবুঝা’। গঙ্গা দা কি বোঝেন না— স্বপ্নের ভেতর, জাগরণের ভেতর, ঘোর-বেঘোরের ভেতর আমি তাকে তপস্যা করি। ফুল দেই, বেলপাতা জল দেই। আমার সামর্থের সমস্তটুকু তাকে সমর্পন করি। বোঝেন না! হয়তো বোঝেন, কিন্তু সমাজ-সময়-সভ্যতা হয়তো তাকে ‘না’ বোঝার ভান করতে শিখিয়েছেন। শুকলা দিদির বিয়ের রাতে যেদিন গঙ্গা দার হাত ধরে বলেছিলাম, চলেন পালিয়ে যাই। মুক্তি চাই, মুক্তি চাই। সাধনার পরিণতি চাই। সেদিন গঙ্গা দা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে চোখ আকাশে তুলে কি যেন ভেবেছেন। তার ভাবনা অবয়বে প্রকাশ পায়নি। মুখেও একটা শব্দও উচ্চরণ করেন নি। কি ভেবেছেন তিনি? তিনি কি লালন সাঁইজির মতো মনের মানুষকে অভিযোগ করেছেন— ‘হায়রে বিধি ওরে বিধি এই কি ছিল তোর মনে/ সমুদ্র কিনারে বসে চাতকী মরে জল বিনে’!

************************************************

সুবন্ত যায়েদ
………………..
একা ও নিশ্চুপ জেগে থাকা রাত

আমার কোনো কাজলা দিদি ছিলো না। কিন্তু মাকে কতোবার আমি মা গো বলে ডেকে আমাদের বিলু মাঝির কথা জিজ্ঞেস করেছি। বিলু মাঝি কিভাবে মাঝি হলো মা? সে তো মধ্যরাতে বাঁশি বাজাতে বাজাতে আমাদের শিরিশ ঢাকা আঙিনা দিয়ে যেতে যেতে একটু থামতো। তার বাঁশিতে সুর উঠতো না। সে বুঝি থমকে থাকে মা? মা বলে, শিরিশের পাশে তোমার দাদু ঘুমায় যে! তোমার দাদু তো বিলু মাঝির গল্পের বন্ধু। তারা বিকেল চিনতো, তারা রাত্রি জানতো, তারা নদীতে পুবালি হাওয়ায় নাও ছেড়ে দিতো। তাদের গল্পের ভেলা কোথায় কোথায় ভেসে চলতো। তারা রাত্রি জেগে জেগে জল ও হাওয়ার ভেতরে গল্প তৈরি করতো। তারা ঝলমলে নক্ষত্রের আকাশ দেখে, কিংবা জোসনা প্লাবনের চরাচর দেখে গল্প বানাতো। তারা গল্প বানাতো জেগে জেগে কিংবা ঢেউয়ের দোলে মৃদু ঘুমোতে ঘুমোতে। তাদের এই গল্পের চরিত্র এতোটা মোহময় হয়ে গেলো যে, এখানকার মানুষেরে কাছে পুরাণের মতো চরিত্র হয়ে দাঁড়ালো। আমাদের বিলু মাঝিও আজন্ম বাঁশিতে ফুঁক দিতে জানতো। তোমার দাদার সাথে যখন তার গল্পের রাত্রি রচিত হতো, তখন একেকটা রাতে, আমাদের নদীবাহিত গ্রামগুলোতে বিলু মাঝির বাঁশি আর তোমার দাদুর ভাওয়াইয়া গান সেইসব রাতের মুর্ছনা বাড়িয়ে দিতো। মানুষজন জেগে থাকতো কিংবা জেগে উঠতো সে সুরে। হয়তো বাঁশি থেমে যেতো, তোমার দাদুর গান সেও দূরে সরে যেতো ক্রমশ। কিন্তু তীরবর্তী গ্রামের মানুষের মনে সে মুর্ছনা ঘণ্টাধ্বণির মতো বয়ে যেতো। মানুষ সেসব রাতে নক্ষত্রভরা রাত্রির মতো একা ও নিশ্চুপ জেগে থাকতো আর বলতো, এমন রাতে ঘুম আসে না।

এখন তোমার দাদু নেই। সেইসব রাত্রের গল্পের মতো সে চিরতরে গল্পলোকে চলে গেলো। আমাদের বিলু মাঝি তারপর একা একা, এইসব দীর্ঘ রাতে বাঁশি বাজিয়ে ফেরে। তার ঘুম আসে না। তোমার দাদু তো আর জাগে না। সে একলা জেগে থাকে।

মা গো! বিলু মাঝি যখন আমাদের আঙিনায় শিরিশতলায় এসে হঠাৎ থমকে যায়। হয়ত দাদুর সাথে সেইসব গল্পদিনের স্মৃতি মনে করে। তারপর তো আর বাঁশি বাজে না। কিন্তু আমার ভেতরে সে বাঁশির সুর জেগে থাকে। আমার আর ঘুম আসে না যে! হয়তো তোমারো ঘুম আসে না। আমরা একলা একা জেগে উঠি আমাদের ভেতরে ভীষণ করুণ এক আশ্রয়ে। আমাদের ঘুম আসে না।

************************************************


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা