না ফেরা মুখ

সময়ের পাখনায় অবিরত ধেয়েচলা জীবনের একটিই লক্ষ্য, ধাও শুধু সামনে ধাও। নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনে নতুবা বিকাশের ধারাবাহিকতায় আপন-পর ভেদ করে না করে শুধু সামনে এগোও। গতিশীলতা জীবনের ধর্ম-এতো মানতেই হবে। এই এগিয়ে যাওয়ার পথেই জীবন কোন না কোন এক পর্যায়ে এসে এমন জায়গায় নোঙর করে যেখানে থাকে আনন্দ ও নানা বিপর্যয় । যা ভাবতে এবং একান্ত কাছ থেকে দেখতে আড়ষ্টতায় ভরে যায় মন।

জীবনে প্রত্যাশাকে পূরণ করার বাসনায় অন্য সকলের মতো মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে সমস্ত পৃথিবীর বিকাশের সঙ্গে নিজের যোগসেতু নির্মাণের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার করিডোরে পা ফেলা। স্বপ্ন ও সাধকে একসঙ্গে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা সে তো এক কঠিন সাধনা। যেখানে চলা যেন পৃথিবী ঘোরা নয় নিজেই ঘোরা অবিরত। হার মানতে না চাওয়া চেষ্টায় পড়িমরি করে প্রচণ্ড বেগে ছুটতে থাকা সামনে আরো সামনে।

কিন্তু ছুটতে থাকলেই কী সব হয়? না হয়ে যায়-এ সফলতার জন্য প্রয়োজন হয় হিরণবরণ সৃজনশীলতা। আর ক’জনের বা তা থাকে। যাদের থাকে না তারা হয়ে যান অলস ব্যস্ত। এই অলসরাই হন সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত যাদের ব্যস্ততার মহামারি ভেঙ্গে দেয় মায়াময় চারপাশ। অক্ষমের গোপন ঈর্ষা গ্রাস করে এই অপ্রাপ্তির সীমাহীন যন্ত্রণা ভোগকারীদের। সম্ভাবনাময় আনন্দ ভরা জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে পূর্ণ বিকশিত হওয়া তাই সংকুচিত হয়ে আসে এই মহাজনদের। বিকশিত ভাবনাময় জীবনের পাশ ঘেঁষে অবরুদ্ধ পথে হাঁটতে শুরু করি নিজের সামান্য শক্তি নিয়ে। কিন্তু কোথায় ফুরাত-শুধু রুক্ষ্ম ধূসর মরু। যে দিকে তাকাই মরীচিকা আর মরীচিকা মরূদ্যান কই। বেসামাল মুসাফির টিকে থাকার পথে হাঁটছি নিরন্তর মজনু হয়ে। কিন্তু লাইলী নেই। মনে হাজারো আশার পাখি কলকলিয়ে ওঠে কিন্তু নন্দিত শিহরণে ছন্দিত পাখায় উড়াল দিতে পারে না। সুতরাং আর না সোজা কলেজ আর ঘরমুখো হওয়া, তা ছাড়া কী হবে, কী হবো সেটা বড় কথা নয়, শহীদুল্লাহর মত জ্ঞানানন্দ হবো তাও নয়। স্রেফ নির্জলা আনন্দ মাতনে ভাসতে থাকা যাক তরী কোথায় যায়?

তারপর প্রত্যক্ষ পাওয়া বঞ্চিত মন হু হু করে কথা বলে নিজের মধ্যে ‘সে আগুন জ্বলে যায়, সে আগুন জ্বলে যায়, দহে নাকো’ এমন কিছু সীমা ছাড়া বেদনায় ব্যথিত হয়ে। কয়েক মাসের ব্যবধানে মনের এক অজানা আনন্দ উৎসাদিত মনটাকে স্থির করে ফেলে। ভেতরে শক্তি জাগলো কী না তা বুঝতে পারিনি, তবে নিজের মধ্যে ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করে পবিত্র একটা জায়গা তৈরী করবার মতো ভাবনা কথা কয়ে উঠলো বুঝলাম নিজে নিজে। এমনি সুধাময় পরিসরে কার যেন একটা শুভ্র হাত নির্জন দুপুরে রাস্তা ধরে যেতে জানালার ভেতরে দিয়ে ভেসে উঠলো একবার নজর দিতেই ফিরে আসা নিজের মাঝে। অজানা আশঙ্কায় মনটা যতখানি না কেঁপে উঠলো তার চেয়ে বেশি মনে পড়েছিল বুদ্ধদেব বসুর ‘হাত’ কবিতাখানির কয়েকটি চরণ :

নিলাম তাহারই ফাঁকে পলকের তরে

একখানি সাদা হাত দেখে

দুইটি কবাট এসে বুঝিলো তখনই

দুই দিক থেকে।

মনের ভেতরে কবিতার চরণগুলো কোন এক অজানা পুলকে বার বার ধাক্কা দিলেও মন স্থির করে ধীরে ধীরে পা বাড়ালাম বাড়ির দিকে হৃদয় অনুরণিত হতে থাকল কবিতার পরের চরণ :

আবার দু চোখ ভ’রে ঘুম জ’মে এলো

সকল পৃথিবী অন্ধকার

-এই কথা না জেনেই মৃত্যু হবে মোর

হাতখানা কার।

তারপর অনেক মাস পেরিয়ে গেলেও হাতের মানুষটা সামনে আসেনি। তারুণ্যের কাজে-অকাজে পার হয়ে যেতে থাকল সময়। তবে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে অনেকবার চোখ রেখেছি সযতেœ জানালার সেই চোরা গলিতে কিন্তু কাক্সিক্ষত হাত আর নজরে আসল না ভুল করেও একবার। তাই মরুভূমির ধূসরতা নিয়েই খাঁ খাঁ করতে থাকি অনুক্ষণ। বর্ষা-বারির পেলব হাওয়ার দেখা নেই, বয়েসের ছাপ এবং তাপ বাড়তে থাকে সামনে। কিন্তু তারুণ্যের আত্মদান হয়ে ওঠে না কোন মানস কুমারীর জন্য। একটা নির্দিষ্ট সময়ে বোধ হয় সকালের মন পবনের নৌকা দিগি¦দিক দৌঁড়ায়। হাজারো স্বপ্ন ও অসংখ্য মায়াময় কামনা ঘুরপাক খায় দিবানিশি মনে। তেমনি একরাতে হরেক বাসনার মশাল জ্বালিয়ে রাস্তা চলতে গাছগাছালির আড়াল করা শুক্লাতিথিতে একটি মায়বী মুখের সঙ্গে দর্শন ঘটে আমার। সুযোগ ও ঘটে কিছু কথা বিনিময়ের ব্যস আর কথা নেই নিজের অজান্তে মনে বাজতে থাকে-‘একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে ওগো বন্ধু কাছে থেকো’- ছুটির অবসরে এক বিকেলে মেঠো পথ ধরে সন্ধান করতে বেরিয়ে ছিলাম সেই রাতের অপ্সরীকে।

পুরো পথ ভাবতে থাকি বেমানান শাড়ি পরা মনোহারিণীর কথা, যার শরীরে ভাঁজে ভাঁজে যৌবনের রহস্যময় আনাগোনায় আমায় পেয়ে বসে সুন্দরীর শরীরের ক্রম-বিকাশমান যৌবনকে দেখে অনভিজ্ঞ প্রেমের দহন। গ্রাম থেকে কিছুদূরের ভিন্ন একটি গ্রাম হতে থাকে পরিচিত, বাড়তে থাকে ভাবনার গভীরতা। কলেজ পড়–য়া মেয়েটির সঙ্গে একই রাস্তায় যাতায়ত হলেও কাছ থেকে দেখা, রাতের সাক্ষাৎ নিবিড়তা পায় না। মরেও বেঁচে থাকার অনেক প্রহরের পর নির্জন এক দুপুরের সামান্য কথা বিনিময় সম্পর্কের সুতোয় গিট ধরে দেয় দুজনার। সেই থেকে অবিনাশী কত ছন্দময় কথা, মধুর মিতালির লগ্ন মনের রঙিন জগতটাকে সজোরে টান মারে। গড়ে উঠতে থাকে স্বপ্নের বর্ণিল সৌধ। কিন্তু হাজারো কথার মাঝে হয়ে ওঠেনা না বলা কথাটি একে অন্যকে বলা। তবুও চলে অভিসার দু’জন দু’জনের মগ্ন ভাবনায়। আমার হৃদয়টি তার হৃদয় রেখে মনে মনে আমি বহন করে চলি অনুক্ষণ :

ঈ সখি কো ধ্বনি সহচরি মেলি

হামারি জীবন সঙে করতহি খেলি।

কিন্তু এতশত ঘটনা ঘটছে একে অপরের মনের গহীনে। পারস্পরিক অজানার অনুভবে কাছে থাকার এই ব্যাকুলতা নিরন্তর টানতে থাকে আমাকে চুপি চুপি তার একান্তে যেতে যেতে কিন্তু প্রাণ বিনোদিয়া কী আদৌ তা ভাবে এ প্রশ্নই নিজের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে আমার দিনরাত। হঠাৎ দেখার চকিত চমক সেই অস্থিরতা অন্যরকম দোলায় ভরে দেয় আমাকে। সামনে পেয়ে নিজের এক জোড়া জীবিত সজিব চোখকে ভাললাগার ক্যামেরা বানিয়ে তাই দেখতে থাকি তার ভিতর-বাহির। উঠে আসে তার রোদন ভরা আকুলতা। একটু ধীরে সৌন্দর্যের বর্ণিল বিস্ময় আকণ্ঠ পান করতে উদ্যত হতেই ঘোর কেটে আমি ছিটকে পড়ি অবারিত সৌন্দর্যের সেই সরোবর থেকে। কাছে যাবার এবং পাবার দিনরাতের আকুতি আমার নিথর হয়ে যায় এক মুহূর্তে। আমি জানিনা এর উত্তর। নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনে নিজেকে আবিষ্কারে আমার উত্তর মেলে, আমি কী তবে শুধু আকন্ঠ প্রেম পিয়াসী অনুভবে ছুটেছি তার প্রতি না কী কোনো স্থূলমোহ আমায় টেনেছে তার পানে?

চলার পথে রূপসীর কথার ছন্দ, মাধুর্য আর মায়াময় চেহারার মন্দিরা প্রতিনিয়ত অসহায়ভাবে আকুল করেছে যেমন আমাকে, তেমনি সেই সুন্দরীর রমণীয় প্রভা আমাকে করেছে দিনের পর দিন শূন্য নিঃসঙ্গ এবং নির্জন কল্পনা রাজ্যের এক অধিনায়ক। আমি হয়েছি তার আত্মবিস্মৃত নতজানু প্রেমিক। তারপরও কেন, দুহুঁ কোড়ে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া’ দশা। কেন?

অবশ্য যে কারণটা আমাকে আমার অবারিত আনন্দের মাতন থেকে হঠাৎ দূরে নিক্ষেপ করলো, বঞ্চিত করলো পরম পাওয়া থেকে তা হলো তার চলে যাওয়া। যে যাওয়ায় মানুষ চিরতরে হারিয়ে যায় চোখের সামনে। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া কেন সেখানে নেই। তবে কী আমার ভালবাসার কামনা ছিল শুধু তার অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের বিভায় ব্যাকুল হয়ে যাওয়া, না সৌন্দর্যের বর্ণিল বিস্ময় আকণ্ঠ পান করার উগ্র অনুভব? যার দারুণ প্রবাহ আমাকে জ্যোৎস্না তিথিতে পাওয়া অপ্সরীকে না পেয়েই হারানোর বেদনায় বিদ্ধ করলো চিরতরে।

কিন্তু যে ভাবনাটা মনের গহীন থেকে কাক্সিক্ষত মানবীকে পাওয়া থেকে আমায় চির-নির্বাসন দিয়েছে-তা ছিল অজানা এক আশঙ্কা! হাঁ সেই দুর্ভাবনায় আমাকে ছোট্ট মনের প্রাণবন্ত চাওয়াকে সেদিন কুঁকড়ে দিয়েছিল জনমের তরে। ফলে সর্বান্তকরণে চেষ্টা করেও আমার হৃদয়টা তার হৃদয়ে নোঙর করাতে পারিনি প্রেমের অকৃত্রিম শক্তি দিয়ে। চেতনার এমনি প্রান্তে দাঁড়িয়েই কী বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ‘মানুষ বড়ই পরাধীন।’ যা শুধু সুন্দর মুখ, ফর্সা ত্বক এবং কালোচুলের কবরী, সরোবরের মত স্বচ্ছ টলটলে চোখের কাছেই বাঁধা নয়, বাঁধা জীবনের নানা স্বপ্ন ভালোবাসো আর অস্তিত্ব টিকে রাখার দায়ে। সহজাত এ চেতনায় আমাকে সেই বয়ঃসন্ধিক্ষণের প্রান্ত থেকে জীবনের বিকাশ প্রবহমানতায় অন্য বন্ধনের দিকে সজোরে টান মেরে ছিটকে ফেলে দেয়। ফলে আমার সে সময়ের পুলকিত অনুভূতি ও স্পর্শকাতর হৃদয়ের স্থূল নিষ্কিৃতিহীন চাপ জীবনের প্রথম কাছে পাওয়া কমনীয় ও মানবিক সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত অনিন্দ্য তরুণীর ভালবাসা থেকে চির বঞ্চিত করে দিয়েছিলো। জীবনের এ পরিসরে এসে আমার ভাবনা এলোমেলো হয়ে যায় কূল পায় না কিছুতেই। কেননা যার দর্শন একদিন আমার প্রযুক্তির নতুন আবিষ্কারের চেয়েও অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চের দিকে টেনেছিল, যার কণ্ঠে আমার নামটি জেগে ছিল অন্তর কাঁপনো শিহরণ, যার সে ক্ষণের একটি কথা আমার কাছে কথা না হয়ে হয়েছিল শিশিরের মুক্তোর কণা, যা বর্ষা বাতাসের অনাবিল স্পর্শে আমার সারা গায়ে স্বর্গীয় সুষমা হয়ে ভালোবাসায় ঝরে পড়ত পরম সোহাগে। যাতে ভরে যেত আমার প্রাণমন প্রেমের প্লাবনে। অথচ কত কাছে পেয়েও তাকে রাখা হয়ে উঠলো না এ জনমে আমার।

চিরদিনের মত হারিয়ে গেল আমার না-বলা কথা আর না-বলা মানুষটি দৃষ্টির আঙিনা থেকে। যার শেষ কথাটি ছিল, ‘কিছু কথা বলতাম আমি।’ সরে এসেছিলাম বিজয়ের বেশে, ভেবেছিলাম হয়তো ডাক আসবে নির্ভরশীলতার প্রশ্রয়ে। প্রহরও গুণেছিলাম সাকুল্যে সাতদিন। তারপর এক মাসের ব্যবধানে নতুন সম্পর্কের বাঁধনে জড়ায়ে সে গেছে অজানা ঠিকানায়।

আমার দুর্বল অনুমান হয়তো এতেদিনে তার চুলে ধরেছে পাক। বয়সী হাওয়ায় মনটাও গেছে বুড়িয়ে। প্রীতিময় নরম চোখের চাউনি হয়তো তার হারিয়ে ফেলেছে কৈশোরিক ¯িœগ্ধতা। দুরন্তপনার চূড়ান্ত সময়ে আমার কামনার প্রিয়তমা কিছু না পেয়েই হারিয়ে গেছে আমার জগৎ থেকে। এখন নির্দয় সেই স্মৃতি যখন আমার সামনে এসে দাঁড়ায় তখন ধারাল হাওয়ার মত নিষ্ঠুর দুঃখময় অনুভব আমার বুকের ভেতরটা ভরে দেয় তপ্তদহনে। এতগুলো বছর পর কখনো কোনো অবসরে যখন আনমনা হয়ে পিছনে যাই বিষণœতায় অনেক দিনের না দেখাকে দেখতে নিজের ভেতরে তখন ঝিকিয়ে উঠি।

মাঝে মাঝে রহস্যের পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার একটা চকিত চেষ্টাও করি। নিখাদ প্রেমিকের চোখ দিয়ে যখন খুব গভীরে তাকে ফিরে দেখার চেষ্টা করি, চেষ্টা করি যখন মনের চোখে তার অতীতের সেই মায়াভরা না ফেরা মুখটা দেখতে, স্মৃতির ভেতর দিয়ে আসতে আসতে কেন জানি মমতার বেহাগে আপন চোখ দুটো আমার ঝাপসা হয়ে আসে। উদাসীন বাউলা মনের অনেক নিতল গভীরতা থেকে কণ্ঠে ভাসতে থাকে দীর্ঘশ্বাসের সুর:

শূন্য এ বুকে পাখি মোর

ফিরে আয়, ফিরে আয়।


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা