নিয়মিত বিভাগ

কী লিখি কেনো লিখি ৯

কেন লিখি
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়েই যে সব কথা জানানো যায় না, সেই কথাগুলো জানাবার জন্যই আমি লিখি। অন্য লেখকেরা যাই বলুন, আমার এ বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই যে, তাঁরা কেন লেখেন সে-প্রশ্নের জবাবও এই।

চিন্তার আশ্রয় মানসিক অভিজ্ঞতা। ছেলেবেলা থেকেই আমার অভিজ্ঞতা অনেকের চেয়ে বেশি। প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণের কথাটা বাজে। আত্মজ্ঞানের অভাব আর রহস্যাবরণের লোভ ও নিরাপত্তার জন্য প্রতিভাবানেরা কথাটা মেনে নেন। মানসিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের ইচ্ছা ও উৎসাহ অথবা নেশা এবং প্রক্রিয়াটির চাপ ও তীব্রতা সহ্য করবার শক্তি অনেকগুলি বিশ্লেষণযোগ্য বোধগম্য কারণে সৃষ্টি হয়, বাড়ে অথবা কমে। আড়াই বছর বয়স থেকে আমার দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাস আমি মোটামুটি জেনেছি।

লেখার ঝোঁকও অন্য দশটা ঝোঁকের মতোই। অঙ্ক শেখা, যন্ত্র বানানো, শেষ মানে খোঁজা, খেলতে শেখা, গান গাওয়া, টাকা করা ইত্যাদির দলেই লিখতে চাওয়া। লিখতে পারা ওই লিখতে চাওয়ার উগ্রতা আর লিখতে শেখার একাগ্রতার ওপর নির্ভর করে। বক্তব্যের সঞ্চয় থাকা যে দরকার সেটা অবশ্য বলাই বাহুল্য, — দাতব্য উপলব্ধির চাপ ছাড়া লিখতে চাওয়ার উগ্রতা কিসে আনবে!

জীবনকে আমি যেভাবে ও যতভাবে উপলব্ধি করেছি অন্যকে তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ ভাগ করে দেওয়ার তাগিদে আমি লিখি। আমি যা জেনেছি এ জগতে কেউ তা জানে না (জল পড়ে পাতা নড়ে জানা নয়)। কিন্তু সকলের সঙ্গে আমার জানার এক শব্দার্থক ব্যাপক সমভিত্তি আছে। তাকে আশ্রয় করে আমার খানিকটা উপলব্ধি অন্যকে দান করি।

দান করি বলা ঠিক নয়— পাইয়ে দিই। তাকে উপলব্ধি করাই। আমার লেখাকে আশ্রয় করে সে কতকগুলি মানসিক অভিজ্ঞতা লাভ করে— আমি লিখে পাইয়ে না দিলে বেচারি যা কোনদিন পেত না। কিন্তু এই কারণে লেখকের অভিমান হওয়া আমার কাছে হাস্যকর ঠেকে। পাওয়ার জন্য অন্যে যত না ব্যাকুল, পাইয়ে দেওয়ার জন্য লেখকের ব্যাকুলতা তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি। পাইয়ে দিতে পারলে পাঠকের চেয়ে লেখকের সার্থকতাই বেশি। লেখক নিছক কলম-পেষা মজুর। কলম-পেষা যদি তার কাজে না লাগে তবে রাস্তার ধারে বসে যে মজুর খোয়া ভাঙে তার চেয়েও জীবন তার ব্যর্থ, বেঁচে থাকা নিরর্থক।

কলম-পেষার পেশা বেছে নিয়ে প্রশংসার আনন্দ পাই বলে দুঃখ নেই, এখনো মাঝে মাঝে অন্যমনস্কতার দুর্বল মুহূর্তে অহংকার বোধ করি বলে আপসোস জাগে যে, খাঁটি লেখক কবে হব।
১৯৪৪
[উৎস : লেখকের কথা, ১৯৫৭]

শেষ পাতার আহ্বান || সহসা আমারে চিনেছি আমি

আমার জীবনবোধ
কানাই সেন

মানুষের জীবনবোধ তার সহজাত বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা গড়ে ওঠার পেছনে অনেকগুলো বিষয় কাজ করে। এই প্রতীতি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াগুলো কখনো জ্ঞাতসারে, কখনো অজ্ঞাতসারে জীবন ভাবনায় জড়িয়ে যায়। কখন কীভাবে কোন্ পরিস্থিতিতে বা কোন্ মানুষের সংস্পর্শে এর উন্মেষ ঘটবে এটা সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসার আগের মুহূর্তেও জানা যায় না। বিভিন্নভাবে জীবনদৃষ্টি বা জীবনবোধ গড়ে ওঠে। কখনো কারণটা খুব বড়ো মাপের, কখনো বা তুচ্ছাতিতুচ্ছ। সে বিষয়গুলো তুলে ধরতে গেলে প্রথমেই আসবে পরিবেশের কথা। এক্ষেত্রে অজস্র উদাহরণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ এবং ওয়ার্ডসওয়ার্থ দু’জনের কথা সর্বাগ্রে পড়বে। দু’জনেই প্রকৃতিকে দেখেছিলেন যেমন চোখের আলোয়, তেমনি হৃদয়ের আলোতেও। দু’জনের মনেই ছায়া ফেলেছিলো প্রকৃতির মর্মের ছবি। প্রকৃতি তাঁদের ভাবনায় মনের আয়নায়, চোখের কাজল। তাঁদের অনুভবে প্রকৃতি ধরা দিয়েছিলো জীবন্ত সত্তায়। যদিও দু’জনের উপলব্ধির দুরত্ব অনেকটাই। এর পাশাপাশি বিশেষ কোনো মানুষ তথা ব্যক্তিত্বের সাহচার্য, তাদের আচরণীয় জীবন, কোনো লেখক বা কবির বিশেষ সৃষ্টি বিদ্যুতালোক—মুহূর্তে জীবনভাবনার দিগন্তকে অদ্ভূত আলোয় ভরিয়ে দিতে পারে।

অনেক বছর আগে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটা কবিতা পড়েছিলাম। কবিতার নাম ‘লোকটা জানলোই না’। ন’ লাইনের সাদামাটা আপাত বর্ণহীন ছোট্ট কবিতা। অতি সাধারণ একজন হিসেব সচেতন মানুষের জীবন কথা। তবে নিঃসন্দেহে গভীর অর্থবহ এবং বিন্দুতে সিন্ধু। মনে নাড়া দিয়েছিলো। নাড়া দিয়েছিলো বললে সবটা বলা হবে না। বলা যেতে পারে কবিতাটির অতল স্পর্শ ব্যঞ্জনায় মন সারা দিয়েছিলো। এর নিহিত তাৎপর্যের সঙ্গে গভীর একাত্মতা অনুভব করেছিলাম। এর ঝঙ্কারের সঙ্গে আমার আবিষ্ট মনের বোধ বেজে উঠেছিলো একই সুরে। কবিতাটা উল্লেখ করছি :
বাঁ দিকের বুক পকেট সামলাতে সামলাতে
হায় হায়
লোকটার ইহকাল পরকাল গেলো।
অথচ
আর একটু নিচে
হাত দিলে সে পেত
আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ
তার হৃদয়
লোকটা জানলোই না।

লোকটার আয়নায় নিজেকে দেখলাম। দেখলাম আমার চারপাশের অসংখ্য পরিচিত মানুষকে। বাঁ দিকের পকেট সামলানো অতি সচেতনতার জন্যই মানুষের নিজের কাছে অজানা থেকে যায় তার হৃদয়ের সংবাদ। জমা-খরচের হিসেবের বেড়াজালে জড়িয়ে যায় তার ইহকাল-পরকাল। সারা জীবনের আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের কথা জানাই হয় না।

সেই প্রথম আমার হৃদয় খোঁজা শুরু। হৃদয়ের সোনার কাঠির ছোঁয়ায় জীবনের সত্যিকার উত্তরণ ঘটে এমন বোধ বিদ্যুৎ চমকের মতো সমস্ত চেতনাকে আলোড়িত করলো। এই বোধ অব্যাখ্যাত, অনির্বচনীয়। বলতে সংকোচ নেই তারপর থেকে কোনো জামায় আমি বুক পকেট রাখিনি। যাতে অজ্ঞাতেও বুক পকেট চাপতে না হয়। কবিতার ‘বুক পকেট’ হয়তো তথাকথিত পরিধেয় জামার নিত্য ব্যবহার্য বুক পকেট নয়। হৃদয়-সংবাদ জানার ব্যাপারে অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে এটা নিছক অতি ক্ষুদ্র একটা প্রক্রিয়া মাত্র। তবু বুক পকেট বাতিল করার মধ্যে শুরু হলো আমার নিজের হৃদয় চেতনার প্রস্তুতি। হৃদয় খোঁজার, হৃদয় জানার সাধনায় আমি অন্তত আর কোনো বাইরের বাধা রাখতে চাই নি।

একটা কবিতা মানুষের জীবনবোধ তৈরি করে দিতে পারে; জীবনের স্বরূপ ও উদ্দেশ্য চিনিয়ে দিতে পারে এটা যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ তো আর রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়ির ছাদ থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্য ডোবার পর চারপাশের নির্জনতায় অন্ধকার নেমে আসার শিহরিত অনুভূতির মধ্যে আত্মপোলব্ধির ঘটনা কিংবা সদর স্ট্রিটের রাস্তার শেষে ‘ফ্রি স্কুলে’র বাগানে গাছের দিকে তাকিয়ে পল্লবের আড়াল থেকে সূর্যোদয় দেখার মুহূর্তে অত্যাশ্চার্য উপলব্ধির ঘটনার মতো নয়। নজরুলের আত্মপোলব্ধি তথা নিজেকে চেনার সে প্রলয় মাতনের মুহূর্ত, যা কবিকে বিদ্রোহী সত্তায় চিহ্নিত করলো এবং রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় আদিকবি বাল্মীকির হৃদয়ে উন্মত্ততার যে ছবি :

যেদিন হিমাদ্রীশৃঙ্গে নামি আসে আসন্ন আষাঢ়
মহানদ ব্রহ্মপুত্র অকস্ম্যাৎ দুর্দম দুর্বার
দুঃসহ অন্তর বেগে তীরতরু করিয়া উন্মূল
মাতিয়া খুঁজিয়া ফিরে আপনার কূল-উপকূল,
তট-অরণ্যের তলে তরঙ্গের ডম্বরু বাজায়ে
ক্ষিপ্ত ধূর্জটির প্রায়….।
এসব প্রবল উপলব্ধি তো নতুন বিশ^ সৃষ্টির সঙ্গেই তুলনীয়।

আমার কবিতা পড়ার ঘটনা সাধারণ একজন মানুষের অতি সাধারণ ঘটনা মাত্র। ব্যাপারটা পরে অনেকবার ভেবেছি। একটা যুক্তির ব্যাখ্যাও খোঁজার চেষ্টাও করেছি। পরে বুঝেছি ব্যাপারটা হৃদয়ের অনির্বচনীয় অনুভূতি সম্পর্কিত তাই কারণ খোঁজা সত্যিই নিরর্থক। তবে সুভাস মুখোপাধ্যায়ের ‘লোকটা জানলোই না’ কবিতাটা যে আমার মনে বিশেষ উপলব্ধি জাগিয়েছিলো একথা স্বীকারে দ্বিধা নেই।

আমার মনে হয় সবারই জীবনবোধ গড়ে ওঠার জন্য হৃদয় আলোড়িত করা একটা বাহিরের ঘটনার অভিঘাত জরুরি। যেমন, অতলস্পর্শ কোনো দুঃখের অভিজ্ঞতা, প্রিয় গান-কবিতা, প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য, নববর্ষের মেঘ, শরৎ সকালের রোদ্দুর ইত্যাদি। একটু বিশ্লেষিতভাবে বলতে গিয়ে সাধকের মূর্তি আরাধনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করছি। মূর্তির বাইরের কাঠামো— তার রঙ-সাজসজ্জা সাধারণভাবে মনে রূপের একটা অনুভূতি জাগায়। এবং সেই পথেই ভালোলাগার উপলব্ধি— তারপর সৌন্দর্যবোধ কিংবা ভক্তিভাবনা যেটাই হোক জেগে ওঠে মনের গভীরে।  সে-বোধ হৃদয় মন আলোড়িত করে। এ এক আশ্চর্য উদ্ভাস। বাইরের ব্যাপারের পথ ধরে মনের যে প্রতিক্রিয়া তার মধ্য দিয়েই জীবনের স্বরূপ বেরিয়ে আসে। মানুষ নিজেকে চিনতে পারে। অন্তত নতুন করে চেনার চেষ্টার জন্য একটা অবস্থান, একটা সূত্র বা একটা দার্শনিক চেতনা পেয়ে যায়।

এরপর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার জগতে ডুব দিলাম নিত্য নতুন মণিমাণিক্য, নতুন বিস্ময় আর নতুন নতুন মাত্রা আবিষ্কারের খোঁজে। একই সঙ্গে শুরু হলো ব্যক্তি সুভাষকে চেনার প্রক্রিয়া। যদিও এই একটা কবিতার মধ্যে আমি পেয়েছিলাম কবির জীবন-সত্যের ধ্র“বতারার সংকেত। ব্যক্তি সুভাষ আর অন্য বিস্ময় অন্য শ্রদ্ধাবোধ— একটা মানুষ কতোটা সংবেদনশীল, মানবিক হতে পারে তার উদাহরণ হিসেবে। আমার এই জানার প্রচেষ্টা কোনো রাজনৈতিক আদর্শ ভাবনার দৃষ্টি থেকে নয়। তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়ে জীবনধারা বদলে দিয়েছিলেন কিনা, বামপন্থা ছেড়ে দক্ষিণপন্থায় আস্থা রেখেছিলেন কি কারণে সেসব বিষয়গুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্যও নয়। তাঁর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলাম উদার, আত্মভোলা, মনেপ্রাণে আত্মনিষ্ঠ এক কবিকে। যিনি সুবিধাবাদকে ঘৃণা করেন, কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় অবস্থান বদল করেন না, মন যাতে সাড়া দেয় না এমন কাজ কদাপি করেন না। সবুজ সারল্যই যার শোভা, যিনি সত্তর উত্তীর্ণ বয়সে পাঁচ-সাত বছরের শিশুদের সঙ্গে অনায়াসে শিশু হয়ে মিশে যেতে পারেন, তাদের সঙ্গে খেলনা নিয়ে খেলা করতে পারেন। শিশুদের কল্পনার সাথে মিশিয়ে দিতে পারেন নিজের শিশু-কল্পনা। সবচেয়ে বড়ো কথা ভুল করলে তা স্বীকার করতে তিনি অকুণ্ঠ। বরং ভুল করেছিলেন বলে অনুতপ্ত হন। ভাড়া বাড়িতেই তাঁর জীবন কাটে। তিনি নিঃসন্তান কিন্তু তাঁর সংসারে অনেক মানুষের ভিড়। আমরা যাদের পরগাছা ভাবি তারাই সুভাষ দম্পতির আপনজন, পরম নির্ভরতার জায়গা। আত্মার আত্মীয়। তারা কবির দত্তক নেওয়া ছেলেমেয়ে, কাজের মাসি কিংবা রান্নার দিদি। এদের নিয়েই কবির সংসার। এদের সঙ্গে প্রতিদিন খাবার ভাগ করে খাওয়া। দত্তক নিতে সুভাষ কখনো দ্বিতীয়বার ভাবেননি।

মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে লিখেছেন— ‘শক্তির (কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে একদিন ওর বাড়িতে গেলাম… গীতাদির সঙ্গেও আলাপ হলো, ওদের  প্রথম পালিত সন্তান পুপেকেও দেখলাম, তখনো তোতা, পাপু আসেনি। বাড়ি ভর্তি কুকুর, বেড়াল পাখি আর বই। সুভাষদা ওকে বলেছিলেন— ‘শক্তি তোমরাও একটি সন্তান দত্তক নাও, তাহলে আরও একটি মানুষ তো আলোয় ফিরে আসবে।’ শক্তি বলেছিলো ‘আমার তো আপনার মতো সাহস নেই দাদা।’ বাড়ি সর্বদাই সরগরম। কে অতিথি কে গৃহস্থ বোঝা যেতো না। একটা মেলা মেলা ভাব। আমার কোনো চেনা বাড়ির সাথে মিল নেই অথচ মনে হলো এ বাড়িটা আমার সবচেয়ে আপন।’

কবি জয় গোস্বামী সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণমূলক লেখা, ‘মেঝেয় শোয়ানো রইল লাঠি’তে বলেছেন— ‘একদিন রাজনীতির কাজ ও কবিতার কাজ এক সঙ্গে শুরু করেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। রাজনীতি তার কাছে কূটনীতির কলাকৌশলের নব নব উদ্ভাবন ছিলো না। মানুষের প্রতি ভালোবাসার যে-কাজ তারই এক নাম রাজনীতি, তারই এক নাম কবিতা— এমনি ভেবেছিলেন সুভাষদা। তাই নিজের পরিবারে একের পর এক দত্তক নিয়েছেন।… নিজের জন্য বাড়ি করতে পারেন নি। কী করেই-বা করবেন। কিন্তু নিজের জীবন, সুভাষদা-গীতাদির জীবন, তাদের একলার জীবন ছিলো না। সেই জীবনের সবটুকু দিয়ে দিয়েছিলেন তারা, নিজের ব্যক্তিগত সাধ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিলেন মানুষকে ভালোবাসার কাজে। সেই তাদের রাজনীতির কাজ। যা কূটনীতির কাজ নয়। যে কাজ করতে পারে কেবল সত্যিকারের কোনো সাহসী, সত্যিকারের কোনো কবি।’

একটি সাক্ষাৎকারে হাইডেলবার্গ বিশ^বিদ্যালয়ের লোথার লুৎসে এবং অলোকরঞ্জনকে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন— ‘বাড়ির লোকেরা এমনকি যারা বাড়িতে কাজ করে তারাও, আমার বাড়িতে লেখা কবিতার ওরা প্রথম শ্রোতা।’ তাইতো রান্নাঘর থেকে তড়িঘড়ি সুধাদিকে পাঠানো হয় ‘অন্তাক্ষরী’ কবিতাটি শোনার জন্য। ‘খুবই রোগা। চুল সাদা, টান করে পেছনে খোঁপা করা। উবু হয়ে মেঝেতে সুধা পিসি।’ কবিতা পাঠের পর সুধা পিসির অভিমত জানার জন্য উদগ্রীব কবি। ‘সুধা পিসির জবাব ভালই তো হয়েছে তবে যেমন শুনি তেমন নয় এটা, আলাদা।’ সুভাষদা একগাল হাসলেন। ‘ঠিক বলেছো এটা একটু আলাদা।’ এই হলো সুভাষ মুখোপাধ্যায়। বাড়ির ঝি কিংবা দিনরাতের কাজের লোকের বিদায় বেলায় ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান হয়, তাদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থাও করা হয়।

এই মানুষ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যেই আমি খুঁজে পেয়েছি সত্যিকার জীবনের তটভূমি। যিনি নিজেই নিজের উপমা। আমার জীবনাদর্শ চিনিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর একটা কবিতা, একটা জীবন —চিরকালের কবিতা, চিরন্তন মানবিকতার প্রতীক এ কথা স্বীকারে আমরা কুণ্ঠা নেই। জীবনপথ চিনিয়ে দেওয়ার ধ্র“বতারা হিসেবে এর চেয়ে বড়ো আদর্শ, অন্তত আমার কাছে আর কিছুই হতে পারে না।

নিজেকে জানবার ব্যাপারে, প্রকাশের ব্যাপারে আমি কখনোই অকুণ্ঠ নই। তবে এক হীনমন্যতা বলা যাবে না। বরং একে বলা যেতে পারে অন্তর্মুখীতা। অনেক মানুষ চিনবে জানবে; আমাকে কিংবা আমার কাজ বা সৃষ্টিকে সাগ্রহে গ্রহণ করবে, উচ্ছ্বসিত হবে, প্রশংসা করবে এতে তৃপ্তি আছে, সুখ আছে এবং সঙ্গে অহংকারও আছে। এই অহংকারী হওয়ার ব্যাপারে আমার অনীহা।

আমার নিজের কাছে নিজের সৃষ্টি (তা যতো সাধারণ বা তুচ্ছ হোক না কেনো) আস্বাদনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা। হয়তো বা হাস্যকর ব্যতিক্রমী। সৃষ্টির ব্যাপারটা আমার কাছে একটা খেলা। আমি যেমন গল্প কবিতার স্রষ্টা, তেমনি একই সঙ্গে সেই গল্প কবিতার সহৃদয় পাঠক এবং সমালোচকও। নিজেই গায়ক নিজেই তার মুগ্ধ শ্রোতা। আর এই পথেই তৃপ্তির আবহে আবর্তিত হই সারা দিনরাত, আবহমান। নিজের মনের গভীরে ডুব দিয়ে যেমন নিজেকে খুঁজি (কখনোই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নয়), তেমনি অন্যের মন চিনতে চাই নিজের মনের আয়নায়। এবং এ পথেই আমি নিজেকে এবং অন্যকে বারবার নতুন করে জানি, নতুন করে চিনি। সেই অভিজ্ঞতাকেই সহজভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করি গল্প কবিতা কথকতায়।

একটা প্রচলিত কথা আছে— দুঃখ ভাগ করলে কমে আর আনন্দ ভাগ করলে বাড়ে। এ কথা জেনেও আমি কিন্তু কখনোই দুঃখ ভাগ করতে চাই না করিও না। বরং দুঃখে ডুব দিয়ে সুখ খুঁজি। আসলে দুঃখই আমার অহংকার। আমার ভালোবাসা আমার চিরন্তন প্রেমিকা। দুঃখের ঢেউয়ে সুখের নৌকা ভাসিয়ে আমার অন্তহীন যাত্রা।

কেউ কেউ হয়তো একে নেতিবাচক জীবনদর্শন বলে ভাবতে পারেন। কেউ মরু ঝড়ে বালিতে মুখ গুঁজে থাকা উটপাখির তুলনাও আনতে পারেন। এক্ষেত্রে একটা আত্মজিজ্ঞাসা অনিবার্য যে, দুঃখকে স্বীকার করা, বরণ করার সাহসী মন কি সবার থাকে? দুঃখের মধ্যেই আমি নিজেকে খুঁজে পাই। তিল তিল করে দুঃখ সঞ্চয় করে রাখি তাকে সুখের মুক্তোয় সাজাবো বলে। তাকে সাজাই হৃদয়ের রঙে, ভালোবাসার ফুল-পল্লবে। এ যেনো নিত্য বাসরশয্যা। অবগুণ্ঠিতা প্রেমিকার সঙ্গে মেঘের দোলনায় দোলা। মনের গভীরে অঝোর বৃষ্টি। — কিন্তু রামধনু রঙের খেলা অন্তহীন দিগন্তে।

মানুষের স্নেহ ভালোবাসা যা পেয়েছি তাতেই আমি খুশি। তাই আমার পথের সঞ্চয়। সেই স্নেহ ভালোবাসা অনেকগুন ফিরিয়ে দেবার জন্যই সব আয়োজন, সব সচেষ্টতা, আন্তরিকতা।

আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি— হৃদয় উপলব্ধির কোনো বিকল্প নেই। সেই আলাদিনের প্রদীপ হৃদয়ের সবচেয়ে আকাক্সিক্ষত বর্ণময় ফুল ভালোবাসা। ভালোবাসাই জীবনের শেষ সমাধান। এই বিশ^াসই আমার পথ— আমার জীবন— আমার জীবনবোধ।

একা নব্বই
মাসুদার রহমান

‘নৈঃসঙ্গ্য’-এই শব্দটির পাশে আরও একটি শব্দ বসালাম, তাতে কি শব্দটির নিঃসঙ্গতা ঘোচে! আরও আরও শব্দে একটি বাক্য লিখে ফেলি। বাক্যের পরে আরও বাক্য, বাক্যের নিঃসঙ্গতা ঘোচে কি? আসলে ‘নৈঃসঙ্গ্য’ এমনই। হাজার সঙ্গেও সে নিঃসঙ্গ। একা। জীবনে সেই একাকীত্বের ছেদ নেই, বিরাম ও বিরতি নেই। এমন একাকীত্ব পেয়ে বসলে মানুষ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, দিনে-দুপুরে সকালে-সন্ধ্যায় পূর্ণিমা-অমাবশ্যায় বেভুল হয়ে পড়ে। ভবঘুরে বাউণ্ডুলে জীবন নিয়ে পথে নামে। ‘পথই পথিককে পথ দেখায়’- যারা পথে নেমে গেলো, পথ কি সত্যি তাদের পথ দেখিয়েছে? না হলে ঘর পালানো বাড়ি ছাড়ানো আমাদের আলিমদ্দিন কেনো আর ঘরে ফিরে এলো না! সে প্রায় বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতো। দু-চার বছর পর হঠাৎ একদিন  উদয়। অল্প কয়েকদিন মা ভাইদের সঙ্গে কাটিয়ে আবার নিরুদ্দেশ। কখনো এ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছি। সহসা উত্তর দিতো না। অনেক পীড়াপীড়ির পর সংক্ষেপ জবাব, ভালো লাগে না রে…। তারপর আবারও উধাও, যুগ পেরিয়ে গেছে আর ফিরে আসে নি আলিমুদ্দিন। পথ কি তাকে পথ দেখিয়েছে? তার ভালো লাগায় পৌঁছে দিয়েছে! এর জবাব কি আর কখনো পাবো? আলি ভাই কি কখনো ফিরে এসে জানাবে!

নৈঃসঙ্গ্যের ধরা বাধা কোনো কারণ নেই, নিজ অনুভব থেকে এমনি জেনেছি। জেনেছি এর কোনো কারণ তো নেই-ই, বিধি ব্যাকরণও নেই। নেই বলেই ভারী মেঘঢাকা বর্ষায় ও বর্ষণে মন কেমন করে। গ্রীষ্ম শেষে তাপলীন হেমন্তে কি হারানোর ব্যাকুলতায় কাতর হই। তখন মাঠে মাঠে ধানজমিতে সোনালি রং পড়তে শুরু করেছে। পতঙ্গভূক পাখিদের নিমন্ত্রণ জানিয়ে জমিতে বাঁশ বা গাছের ডাল পুঁতে দেয়া হয়। কতো রঙ-বেরঙের পাখি। ওরা উড়ছে। দুপুর ও বিকেলের পিছনে। পতঙ্গ ও ফড়িং-এর পিছনে। ঝাড়ে ও পাতায় ঘাপটি মেরে থাকা পোকাটিও কোনো কোনো পাখির অনুসন্ধানি চোখ এড়ায় না। ছোঁ মেরে তুলে আনে ঠোঁটে। এই দৃশ্যেও হয়তো কোনো পাখিকে দেখি, যে এসবের মধ্যে নেই। সে একাকী কেবল দাঁড়ে বসে থাকে। ভাবটি এমন সবকিছুর ছবিই যেনো তুলে নিচ্ছে ওর ক্যামেরা। পাখিটি কি ক্যামেরাম্যান? ক্যামেরার পিছনে ক্যামেরাম্যান সম্ভবত নিঃসঙ্গ, একা।

২.

জীবনে প্রথম দেখা দার্শনিক তিনি, আমাদের পরিবারের একজন সদস্য কায়মদ্দিন নানা। সংক্ষেপে বলতাম কায়-নানা। শিল্পী সুলতানের আঁকা পেশিবহুল মানুষদের একজন। তামাটে বর্ণ সুঠামদেহী এই মানুষটি গৃহস্থ পরিবারের একজন কাজের মানুষ হয়ে ক্ষেতখামার হালবলদ কামিন কামলা দেখতেন। এমন কি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা না থাকার পরেও আমরা ছোটদের পড়াশোনা সম্পর্কিত উপদেশ থেকে শুরু করে যাবতীয় সামলাতেন। শুনেছিলাম শৈশবেই আমাদের বাড়ির একজন সদস্য হয়ে আসেন তিনি। তার মুখেই শুনতাম বৃটিশ-হিন্দুস্থান-পাকিস্তানের গল্প। মুক্তিযুদ্ধের গল্প। মানুষের অভাব ও দারিদ্র্যের গল্প। জীবন ও বঞ্চনার গল্প। তার শৈশব ও বাপ দাদাদের অনটনের সংসারে যা হয়েছিলো। শীতবস্ত্রহীন মানুষের মাছধরা জাল মাদুর খড়বিচালি কিংবা চট ব্যবহারে অভিনব শীত নিবারণ। কায়নানা বাতাসের নড়াচড়া বা গন্ধ শুঁকেই যেনো বলে দিতে পারতেন আজ রোদ না বৃষ্টি, মেঘ না কুয়াশা। পর্যবেক্ষণে ছিলো পতঙ্গ-পিঁপড়েদের চলা। পাখিদের উড়াল। বুঝে ফেলতেন ঝড়ের পূর্বাভাস, খড়া বা বৃষ্টির সম্ভাবনা।

দাদীমার সঙ্গে নাতিনাতনিরা ৫০ মাইল দূরে তার বাবাবাড়ি যাচ্ছি। (সে সময় বার্ধক্যের কাছাকাছি দাদীমা, সুতরাং তার বাবার বেঁচে থাকার প্রশ্নই নেই। ছিলেন তার ভাই।) মহিষের গাড়িতে ছৈ বাঁধা। মধ্যরাতের পর যাত্রা শুরু হলে দু-এক স্থানে বিশ্রাম ও মহিষদের জলভোজন শেষে পরদিন দুপুরের পর পৌঁছানো যায় গন্তব্যে। এ যাত্রার একমাত্র কাণ্ডারি আমাদের সেই কায়-নানা। তিনিই গারোয়ান, তিনিই আমাদের নিরাপত্তা দাতা।

সরু ও কাঁচা সব রাস্তাঘাট। আমাদের গ্রাম হতে পূর্বে ও পশ্চিমে এক এক (১+১=২) করে দুইটি নদী। তা পারাপারে কোনো ব্রিজ-কালভার্ট ছিলো না। খরা মৌসুমে কেবল মাত্র রবিঠাকুরের ছোটনদীর হাঁটুজল পেরিয়ে গোরুর গাড়ি চলাচল। যে কারণে বর্ষা নামার পূর্বেই এলাকার মানুষজনকে নিত্য প্রয়োজনীয় গার্হস্থ্য রসদ ১৫ মাইল দূর থানা সদর থেকে ক্রয় করে আনতে হতো। এই সব দ্রব্যের মধ্যে লবণ কেরোসিন ডাল রসুন পেঁয়াজ মসলাপাতি প্রধান। আর চাল তো নিজের জমিতেই উৎপাদিত ধান থেকে পাওয়া। বরং তা নিজ চাহিদার অতিরিক্তটুকু বিক্রয় করে এসব কেনাকাটা; জীবন নির্বাহ চলে। বর্ষা শুরু হলেই পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো এই সব গ্রাম। জলকাদা নদী পেরিয়ে কোথাও যাওয়া সহজ ছিলো না। এই বর্ষা যাপনের প্রস্তুতি আমাদের পরিবারের হয়ে পুরোটিই করতেন কায়মদ্দিন নানা। এই মানুষটিকে কখনো দুঃখে ভারাক্রান্ত হতে দেখিনি। অনটনের সংসার, অনেক সন্তানের জনক। সন্তানের মৃত্যু, স্ত্রী বিয়োগেও মানুষটি তেমনি। শুধু একবার কাঁদতে দেখেছি, যেদিন আমার দাদার (দাদু) মৃত্যু হলো। যে মানুষটির পাশে সারাজীবন ছায়ার মতো লেগে থেকেছেন। জানিনি তার চলে যাওয়ায় তিনি কি একটু নিঃসঙ্গ হলেন? কার কাছে এই প্রশ্নের জবাব পাবো? আজ যে তিনিও নেই!

৩.

আমার জন্মের ১বছর ৮মাস ২০দিনের মাথায় আমার সহোদর মিঠুর জন্ম হলো। শুনেছি তখনি আমি দাদীমার কাছে আশ্রয় নিই। অনুমান করছি আড়াই তিন বছর বয়স, খিদেই মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেছে, দাদীমার বুকে মুখ লাগিয়েছি।

মনে পড়ে ছেলেবেলা থেকেই খুব ঘন ঘন জ্বরে পড়তাম। মজার বিষয় চোখ বন্ধ করলেই কতো রকম আলো ফুটত মনের চোখে। সেই সঙ্গে খুব নিঃসঙ্গ বোধ হতো। বোধের শূন্যতা তৈরি হতো। আবার একটা সময় ছিলো খুব মরে যেতে চাইতাম। বলা বাহুল্য তা আর হয়নি। ওই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে আমি একা একটি বাড়িতে থাকতাম! বাড়িটার টানা বারান্দায় সারাদিনে দু-একটি বিড়াল শুধু হেঁটে যেতো। সামনের প্রশস্ত উঠোনে দু-এক ঝাঁক শালিক বুলবুলি অন্যান্যরা। জানালা খুলে উত্তরে তাকালে ঘন কলাবন, আর নানা সব গাছপালার সবুজ। পূর্বের জানালা ঘেঁষেই হাস্নাহেনা গাছ। তারপর ছুটে চলা ধানখেত। আর সে সময়ই জেনেছি, কবিতা একাকীত্বের পাশে এক ঝাড় হাস্নাহেনা।

৪.

গ্রামের আকাশে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ঘরে আসছে সকলে। রাখাল আসে গোরুপাল নিয়ে শীত কুয়াশার গায়ে আরও কিছু গাঢ় রঙ ছড়িয়ে দেয় ধুলোর। পথ বেয়ে আসে হাটফেরত লোকজন, ঘরমুখো কিষাণ ও কামলারা। পাখিরাও নীড়ে ফিরছে, ফেরার আগে এপাখি ওপাখির সঙ্গে সাক্ষাতে আরও একবার সরব হয়ে ওঠে। অনেক শব্দ বাঁশগাছালির ঝোপেঝাড়ে। বিদায় বন্ধুগণ, ভালো থেকো সবাই, শুভ সন্ধ্যা! অনুভবে অনুবাদে এই তো আসে। শিশুরা আসছে তাদের খেলার  জায়গা ছেড়ে। অল্প অন্ধকারে অস্পষ্ট হয়ে আসে ধানসমুদ্র মাঠের মধ্যে একলা দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা গাছটি। অচেনা মানুষের মতো। তার মতো আমারও কোথাও যাওয়া হয় না। জ্বর ও যন্ত্রণা নিয়ে বিপন্নতার ঘাটে বসে থাকি। শানবাঁধা পুকুরের নির্জনতায় কেউ আসে না। দু-একটি করে কেবল জোনাকি আসছে। অল্প অল্প করে অন্ধকারও গাঢ় মুখ দেখায়। কতো তারা ফুটছে আকাশে। চোখ তুলে তাদের আকাশের গায়ে যত না দেখতে ভালো লাগে তার চেয়ে পুকুর জলের গভীরে। ডানাহীন বালকের প্রতিবিম্বের জগত, ছায়া ও মৌথুনের জগত জলের গভীরে। জলেও একবার ডুবে গিয়ে প্রাণে বিপন্ন হচ্ছিলাম। বয়স বারো, তখনো সাঁতার শিখিনি। হবে কোনো গ্রীষ্মের দিনে, সবাই উৎসব করে গোসলে পুকুরে নেমেছি। সাঁতার না জানা  পাড়ের কাছাকাছি থাকি। কখন যে কার দেখে একটু গভীরে পা রেখেছি আর অতল জলে তলিয়ে যাচ্ছি। যতই পাড়ে আসবার চেষ্টা করি, তাতে করে আরও গভীরে তলিয়ে যাই। এই দেহ জলে সমর্পিত হলে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আমার পাড়ে যাবার ইচ্ছে ও আকুলতাকে। জেনেছি, জলে ও দেহে, দেহে ও দেহে কি যে গভীর আহ্বান।

রাতে ঘুম আসছে না খুব বৃষ্টিতে, কুয়াশায়। ধানসমুদ্র মাঠে অচেনা সেই একলা গাছটি কতো কিংবদন্তি তাকে ঘিরে। কেউ জানে না কি নাম এই গাছটির । এমন গাছ এলাকায় আর কেউ দেখেছে? এপাশ ওপাশ করে ঘুমিয়ে গিয়েছি, জেগে গেছি মধ্যরাতে খুব বৃষ্টিতে ভেবেছি, ধানসমুদ্রের মাঠে একলা গাছটি কি খুব কষ্ট পাচ্ছে ঝড়জলের রাতে। শীত ও কুয়াশায় কি খুব কষ্ট হচ্ছে ওর। আমার নিঃঙ্গতার পাশে সব সময় ধানসমুদ্রের একলা  গাছটি। একদিন দেখি সেও নেই। ধূ-ধূ মাঠ শুধু জ্যোৎস্নায় কেঁদে যাচ্ছে।

৫.

নদীর শিয়রে ঝিমধরা বিকেলগুলো, বসে থাকা জলের শিয়রে। জলের গভীর হতে শুশুকটি তার দেহ তুলে কি দেখাতে চায়? আমি তার বুক দেখে ফেলি। শস্যের ভারে নুয়ে আসা ফসলের মতো বুক। একদিন নদীপাড়েই দেখা হয়ে গেলো অদ্ভুত সেই লোকটির সঙ্গে। পরনে ঢিলেঢালা পোশাকের লোকটি অন্যদের থেকে সত্যি আলাদা। তিনি গ্রাম-গঞ্জে ঘুরেঘুরে বিভিন্ন স্কুলে কিছু সম্মানির বিনিময়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ছবি আঁকা শিখিয়ে থাকেন। কয়েকদিন পর বুঝতে পারি লোকটি চোখে খুব ভালো দেখতে পান না, দৃষ্টি অনেকটা ক্ষীণ। গান গেয়ে চলা কোনো পাখিও তার নজরে আসছেনা। পাখির ডাক শুনে আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, পাখিটির রঙ কী? কিংবা জলে লাফিয়ে ওঠা গাঙ শুশুকটিকে আবছা দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেন, কী মাছ ওটা? সেই তিনিই একদিন আমাকে পরামর্শ দিলেন; দৃষ্টিশক্তি যেভাবে বাড়ানো যায়। ‘প্রখর সূর্যের দিকে বেশখানিকক্ষণ প্রত্যেকদিন নিয়ম করে তাকিয়ে থেকে অথবা রাতে রেলগাড়ির আলোর দিকে তাকিয়ে’। নিঃসঙ্গ বালক বেলায় তা বিশ্বাস করেছিলাম। কাউকে জিজ্ঞেসও করি নি তা সত্যি বা মিথ্যে। একদিন শুধু পরখ করেছিলাম এবং চোখ নিয়ে সমস্যায় পড়ি। কেনো সেই অদ্ভূত লোকটি একজন নগণ্য বালকের সঙ্গে চোখ পোড়ানোর এই খেলাটি খেললেন! আজ এতোদিন পরেও তা ভাবতে গিয়ে বোধের শূন্যতা অনুভব হয় মাথার মধ্যে।

৬.

একাকিত্বের পাশে আরও কেউ কেউ থাকে, ক’জনকে মনে রাখা যায়! প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে লেখা যায় ক’জনের কথা! একজন আমার নৈঃসঙ্গ্যের পাশে সব সময় ছিলো। শৈশবে তার অবয়ব দীর্ঘতর; মধ্যাহ্নে খর্বাকৃতি আর মধ্যাহ্ন পেরুতে থাকলেই তার দীঘলতা আবারও বিস্তারময় চঞ্চলতা লাভ করে। সে আমার ছায়া, তাকেও প্রাণময় ভেবেছি। না হলে এমন হয় কেনো? সেই শৈশবে প্রতিটি বালক যখন খেলায় বিকেল উন্মত্ত করে রাখছে তার বিপরীতে আমার শরীরে জ্বর আর যন্ত্রণা নিয়ে দেখছি আমার ছায়া দীর্ঘতর হয়ে উঠছে। সন্ধ্যার কুপি জ্বলে উঠলে আমাদের গার্হস্থ্য বাড়ির উঠোনে মাটির দাওয়ায় কামিন কামলাদের রাত্রিকালিন খাবার বৈঠকে দাঁড়িয়ে দেখতাম কোথায় দাঁড়ালে আমার ছায়া কতোটা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে, খাটো হয়ে যাচ্ছে। মাটির দেয়ালে প্রতিফলিত নিজের ছায়ার সঙ্গে খেলেছি কতোভাবে।

আমার শৈশব আমার সকালবেলা সে সময় চলে গেছে। ভাবছি, এখন তো আমার মধ্যাহ্নও পেরিয়ে যাবার সময় এলো। সকালের দীর্ঘতর ছায়া মধ্যাহ্নে ছোট হয়ে এসেছিলো। মধ্যাহ্ন পেরিয়ে যাবো। আবারো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে আমার চিরদিনের এই সঙ্গীটি। দীর্ঘতর হবে আমার শ্বাসকষ্ট ও আমার নৈঃসঙ্গতা।

৭.

জীবনে নৈঃসঙ্গ্যকে এড়াতে পারি নি। আলিভাই-এর ছিলো  ঘরছাড়া নিরুদ্দেশও হতে পারি নি। কায়মদ্দিন নানার মতো এতো বড়ো দার্শনিক জীবনও আমার নয়। তাই শব্দের পাশে শব্দ বসিয়ে নিরুদ্দেশ খেলা করি। কেউ তাকে কবিতা বললে বলুক!

পথের সন্ধানে গেলে, পথ কভু নাহি মিলে,
কেবল পদচিহ্ন আঁকে পথরেখা…
শামীম সাঈদ

‘সহসা আমারে চিনেছি আমি’! এ বড়ো অদ্ভুত কথা! অদ্ভুতই বটে। কে কবে চিনেছে কারে? আর কে-ই বা নিজকে চিনেছে? এ প্রশ্নের মীমাংসা কোথায়? হয়েছে কি মীমাংসা কখনো? আর একে অন্যেরেই বা চিনে কেমনরূপে! তাও যদি বা সম্ভবপর কথা হয়, কিন্তু আত্মচেনা? সেও কি চেনা যায়? তবে মানুষের আত্মপরিচয় জিজ্ঞাসা দুর্মর, নিশ্চয়ই! মানুষ জানতে চায়—সে কে, মানুষ কে, মানুষ কি; জানতে চায় মানুষ তার সত্তার পরিচয়, জাতিপরিচয়, রাষ্ট্রিক-সামাজিক পরিচয়, জন্মপরিচয় কিংবা পিতৃপরিচয় ও জন্মসূত্র। তবু এতো কিছু জিজ্ঞাসার পরেও তার পরম জিজ্ঞাসা, সে (মানুষ) আসলে কে? দর্শনচিন্তার মধ্যে অতিপ্রাকৃত, প্রাকৃতিক ও ঐশ^রিক ব্যাপার-স্যাপার যখন প্রধান প্রবণতা তখন দার্শনিকগুরু মহাত্মা সক্রেতস্ই প্রথম (সম্ভবত) দর্শনচিন্তার মধ্যে মানুষকে স্থান দিয়েছিলেন; বলেছিলেন—‘নো দাইসেল্ফ’ অর্থাৎ নিজেকে জানো (চেনো)। একথা তিনি বলেছিলেন মানুষের উদ্দেশ্যে, তা সে সমষ্টিমানুষ হোক কিংবা ব্যক্তিমানুষ হোক। মানুষ নিজেরে চিনুক প্রকৃষ্টরূপে, আত্মমর্যাদায়; দেবতা কিংবা অতিপ্রাকৃত যেনো মানুষের মর্যাদার চেয়ে বেশি কিছু নয়, এই  রূপে। কিন্তু, মানুষ কি নিজেকে চিনেছে কখনো? দার্শনিক সক্রেতস্ যেভাবে বলেছেন সেভাবেও কি মানুষ চিনেছে নিজেকে? আচ্ছা, মহাত্মা সক্রেতস্ এই কথাটি বলবার পূর্বেও কি মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা ছিলো না? ছিলো নিশ্চয়ই। মানুষের আত্মজিজ্ঞাসার ইতিহাস মানুষের অস্তিত্বের ইতিহাস থেকে কিছু নতুন নয়, বটে। মানুষের এই আত্মজিজ্ঞাসা—কে আমি? এই জিজ্ঞাসাটি প্রকৃতপক্ষে তখন থেকে যখন থেকে মানুষ তার জৈবিক অস্তিত্বকে টের পেয়েছে। তার (মানুষের) বিস্ময় জেগেছে নিজের অস্তিত্বে, তার বেঁচে থাকায়, তার সংগ্রামে ও বিকাশে! নানান  প্রশ্ন, তবে শেষ প্রশ্নটি—‘কে আমি?’ বোধ করি এখনও তা (তল) হীন প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। এর তল করা যায় নি আজও। ফলে কেউ যদি বলে ওঠে ‘সহসা আমারে চিনেছি আমি’ তবে তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাই। তাকাতে হয়, লোকটাকে দেখে নিতে, বুঝে নিতে হয় লোকটি নিজেকে চেনার দাবিতে আর সকলকে কি কি চেনাতে, জানাতে চায়! আর লেখক কি এমন কেউ যে সকল থেকে বিচ্ছিন্ন, একক, একা; যে নিজেকে প্রকৃতই চিনে ফেলে? মানুষ (সমাজের সাধারণ) যদি না পারে আপনারে চিনতে, তবে লেখক কীভাবে পারেন নিজেকে চিনতে? লেখক কি সমাজের সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একার আত্মপরিচয় খুঁজে পায়, যেখানে সমাজে ব্যক্তির আত্মপরিচয় স্বীকৃতিহীন, ধোঁয়াসা, জটিল-কুটিল উদ্দেশ্যপ্রবণ মীমাংসাহীন? ফলে জিজ্ঞাসা আছে, চূড়ান্ত জবাব নেই। পথের সন্ধান আছে, পথের সন্ধানে গিয়ে পথ হয়ে চলেছে কিন্তু চূড়ান্ত গন্তব্য জানা নেই। মানুষ কোথা হতে আসে আর কোথা চলে যায়! আর এই আসা ও যাওয়ার মাঝে মানুষ একটি সমাজরূপ সত্তার জঠরে বসবাস করে, যা বহুমুখী জটিলতায় এমন দুর্বোধ্য যে, সেখান থেকে সহসা কারোর আত্মপরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠা সহজ নয়, ফলে সম্ভবত মানুষের আত্মজিজ্ঞাসার উৎসভূমও এই। কিন্তু মানুষ অধিকবার এর বাহিরে গিয়েই তার আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করে। সমাজের বাহিরে কি তা পাওয়া সম্ভব? এই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তরটি কেবল সমাজ গভীরেই পাওয়া সম্ভব, মানুষের জন্য। তবে সমাজের ব্যক্তিসমাবেশের জন্য এও এক সত্যি যে, যদিও সকলেরই জিজ্ঞাসা থাকে কিন্তু সকলেরই অনুসন্ধান থাকে না, অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণী পথ মাড়ান না সকলে; কিন্তু লেখক অভিজ্ঞতার প্রপঞ্চে কার্য-কারণের অনুগামী হন অনুসন্ধান মানসে, তবু চূড়ান্ত জানা হয় না তার, পরমে পৌঁছানো যায় না, কেনো না, সকলের মতো লেখকেরও জীবনকাল খণ্ডিত, অভিজ্ঞতার লীলাভূমি আয়ুষ্কালে সীমায়িত। যাপন যদি শেষ হয়, অভিজ্ঞতার দিনপঞ্জি টুকে রাখে কার্য-কারণের ফলশ্র“তির অপেক্ষা। সুতরাং লেখকের পক্ষেও বলা সম্ভব নয় যে—‘সহসা আমারে চিনেছি আমি’, কেনো না, সহসাই সেই ক্ষণ রূপান্তরে প্রক্রিয়ায় গড়িয়ে চলে অনন্তকালের অভিমুখে। যেমন জানা যায় নি জীবনের উৎস ক্ষণ।

লেখক কিংবা মানুষ নিজেকে কী রূপে চিনতে চায়, চেনাতে চায়? কোন স্বরূপকে বলতে চায় তার আত্মপরিচয়? সার্বজনীন মানুষের কিংবা নির্দিষ্ট স্থান-কালের লেখকের স্বরূপটি কীভাবে নির্মিত হয়? এই সকল প্রশ্নের মুখে সহসা চিনে ফেলার ক্ষেত্রে যে সঙ্কটটি হাজির হয় তা হলো স্বরূপের সঙ্কট। আমরা যদি কোনো কিছুকে চেনার জন্য ঐ বস্তুটির, বিষয়টির স্বরূপ নির্ধারণ করতে না পারি তবে চেনার কাজটি হয়ে দাঁড়ায় দৃষ্টিহীনের আকাশ দেখার মতো। কারণ দৃষ্টিহীনের অভিজ্ঞতায় দৃশ্যের ধারণা থাকে না। যদি স¦রূপ ধারণা থাকে তবে বাতাসেও পাহাড় দেখা যায়। সুতরাং প্রথমত পাহাড় স্বরূপ ধারণা তৈরি হতে হয় অভিজ্ঞতায়। তবে মানুষের ‘স্বরূপ’ ধারণাটি কী? যদিও এই ‘স্বরূপ’ শব্দটি দিয়ে কোনো কিছুর গাঠনিক, অবয়বগত কিংবা অভিজ্ঞতাজাত প্রতিভাসমূলক ধারণায়িত মানকে বোঝানো যেতে পারে। কিন্তু, মানুষের যে জৈব-শারীরিক গঠন, এই গাঠনিক অস্তিত্বমান, বস্তুগত অবয়বকে তার স্বরূপ হিসেবে মানুষ নিজেই স্বীকার করে নি। তা না-করে বরং গুণগত, অধরা, ধারণায়িত সত্তাস্বরূপ কল্পনা করেছে, যা ধারণায় মূর্ত হলো না কোনো কালেই; আজও নয়। ফলে মানুষ যে নিজেকে চিনে ফেলবে তার নিজস্ব স্বরূপে, তার সেই ধারণারূপ অভিজ্ঞতা কই? আর এই স্বরূপ কেবল অভিজ্ঞতাতে, বোধে এলেই চলবে না, তার সংজ্ঞায়নও জরুরি হয়ে পড়ে, কেনোনা, মানুষ সকলকিছুকে ভাষাচিহ্নে রূপের মুকুরে দেখতে চায়, চিনতে ও জানতে চায়। মানুষ চায় তার ধারণায়িত অবয়বটি অন্যের বোধের ক্যানভাসে এঁকে দিতে, অন্যের অভিজ্ঞতার মুকুরে নিজেকে বিম্বিত করে চিনতে চায়। ফলত, এর ভাষাগত সংজ্ঞায়ন জরুরি, এর অবয়বগত ধারণার আন্তব্যক্তিক অভিব্যক্তি কিংবা সামাজিক যোগাযোগে একটি সামাজিক অবয়ব তৈরি করতে।

মানুষের স্বরূপ কী? এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে স্বরূপের সংজ্ঞায়ন যেভাবে হতে পারে, যেভাবে বুঝবার চেষ্টা হতে পারে, তা হলো এই যে, সংজ্ঞায়ন একটি অর্থ ও মান আরোপমূলক প্রক্রিয়া যা ভাষাচিহ্নে আরোপ করে মূর্তিমান করে তুলতে হয়। সুতরাং স্বরূপমান আরোপিত হতে হয়। এই মানারোপকরণ যেহেতু প্রক্রিয়ামূলক প্রপঞ্চ, সেহেতু তা ব্যক্তি এককের মাধ্যমে রূপায়িত হতে পারে না। তাই প্রশ্ন পুনঃ, স¦রূপ কি কেবল ব্যক্তিমানুষের? লেখকের একার? সার্বজনীন মানুষের, সকল ব্যক্তিসমাবেশের অন্তস্থ একজন সদস্যরূপে লেখকের আত্মপরিচয়মূলক স্বরূপমান সংজ্ঞায়ন কে করে? এই স্বরূপটি কোথা থেকে উৎসারিত হয়? আমি যখন মানুষ, আমি যখন সামাজিক ব্যক্তি একক, আর আমি যখন লেখক, একক—আমি কে? এই প্রশ্নের স্বরূপমান বা পরিচয়জ্ঞাপক উত্তরটি আসতে হয় অপর থেকে, সমাজ থেকে। ফলে, লেখকের একক, একা হয়ে ওঠা হয় না। লেখকের স্বরূপ সংজ্ঞায়ন ও ধারণায়ন যদি লেখক নিজেই করেন, তবু সমাজ-সাধারণ্যের মধ্যে তা সঞ্চারিত করতে হয় ও তার স্বীকৃতি পেতে হয়। ফলে, সামাজিক মানুষের নিজেকে চেনার ক্ষেত্রে আরেক প্রতিবন্ধকতা হলো যে, তার শুধু নিজেকে চিনে ফেললেই চলে না, তার স্বরূপটিকে সমাজের অন্যান্যের সামনেও প্রতিভাসিত করতে হয়, তাকে সেই স্বরূপে স্বীকৃত হতে হয়। স্বীকৃতি বিনা তার (লেখকের) কিংবা মানুষের আত্মপরিচয় কি ও কার কাছে? আর আত্মস্বরূপের সংজ্ঞায়ন যদি কেউ নিজেই করে থাকেন ও উচ্চকিত বলে ওঠেন—‘সহসা আমারে চিনেছি আমি’ তবে তাও শেষ কথা হয়ে থাকে না। ঝামেলা আরেকটি বাঁধে, আর তা হলো কোনো মানুষের স্বরূপটি সে নিজে তৈরি করে না, তা তৈরি হয় সমাজের মধ্যে থেকে, তার ওপরে আরোপিত হয় সমাজ থেকে এবং তা উদ্ভাসিতও হতে হয় সমাজ-দর্পণে। সুতরাং লেখক এখানে এক নির্ভরশীল সামাজিক একক মাত্র, কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়। আর লেখকের পক্ষ থেকে সমাজমুকুরে আত্মপ্রতিকৃতি এঁকে দেয়াটাও সহজ কাজ অবশ্যই নয়, কেনোনা, এখানে পারস্পরিক ও বহুমুখী স্বার্থ-সমীকরণ ক্রিয়া করে। ফলে আত্মস্বরূপসংজ্ঞায়ন প্রকল্পনাটি ধোপে টিকে না। তবে, ‘মানুষের স্বরূপ কী?’ এ প্রশ্নের সমাধান/উত্তর যা-ই হোক না কেনো; আমি কে, আমি কি, আমি কোথা থেকে এলাম—এই সকল প্রশ্নের উত্থাপন যেমন নানাবিধ সমস্যা তৈরি করেছে, তেমনি কিছু সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে মানুষকে পথ দেখিয়েছে ভাবিকালের দিকে। কিন্তু এই সরল প্রশ্নটি মানুষকে জড়িয়ে ফেলেছে বহুগুণ জটিল সমাজ-সংস্কৃতির কর্ম-সম্পর্কের জালের ভিতর। এখানে লেখকও একজন জালাবদ্ধ মীন, কিন্তু জানা হয় নি এই জালজটিল ফাঁদ কে পেতে আছে, মহাকালের কোন ক্ষণে। কিংবা মানুষই কি এই ফাঁদের নির্মাতা নয়? হ্যাঁ, চূড়ান্তভাবে মানুষ এই জালটিকে সমাজরূপেই চিহ্নিত করেছে, চিনেছে। ফলে এখানে তো লেখকের একার কোনো কীর্তি নেই! এবং ফলে প্রশ্ন তো আরেকটি, সমাজ যদি জটিল জাল হয়ে থাকে, তবে কে শিকারি? এবং মাছ কিংবা লেখকগণ বা অন্যান্য মানুষেরা যদি স্বয়ং শিকারি হয় তবে বিবিধ মাৎস্যন্যায়ের ভিতর লেখকের অবস্থান কী, মহিমা স্বরূপ কী? সমাজপ্রেক্ষিতের ভিতর থেকে চিরায়ত মাৎস্যন্যায়ের কবলে পড়ে তবে কে বলতে চায়—‘সহসা আমারে চিনেছি আমি’—কে, কে বলে? কে দাবি করে এই কথা? তিনি কি লেখক? কে লেখক? লেখক কেনো চিনতে চায় নিজেকে? লেখক কেনো চেনাতে চায় নিজেকে? এইরূপে চেনা যায় না, চেনানো যায় না, কেবল আত্মচেনার প্রচেষ্টাটি একটি প্রগতিমূলক ঘূর্ণনশীল চাকা। কিংবা তা পশ্চাৎ গতিশীল হলেই বা কে আটকায়? ফলে দিগি¦দিক রূপান্তরের মুখে লেখক কিংবা অপরাপর মানুষের—‘সহসা আমারে চিনেছি আমি’র মতো আত্ম চিনে ফেলার দাবিটি কি দুরভিসন্ধিমূলক নয়? লেখক সমাজে এই দুরভিসন্ধির অংশ নয় মোটেই। ফলে লেখক নিজেকে চিনতে চায় না, কেবল জিজ্ঞাসার অনুগামি হয়, জিজ্ঞাসা নিয়ে হাজির হয় নিজের কাছে ও সমাজের মানুষের নিকটে। তখন উত্তরানুসন্ধানটি হয়ে ওঠে যৌথ প্রচেষ্টা। লেখক একক নয়, একা নয়। লেখক সামাজিক, রাজনৈতিক।

জেহনাসিব
অহ নওরোজ

প্রপাতের জলকণার সুরভী অন্যরকম- বহু আগে থেকেই সেটা আমি জানি।

বিশাল নদীর অনেক ওপরে ভেসে থাকা মেঘের মতো সে রাতেও মেঘ ছিলো আকাশে। জ্যোৎস্নার রুপালি রেখা মেঘ কেটে কেটে যে রাতে দূর পাহাড়ের কোনো এক জনহীন ভৌতিক উপত্যাকায় কুহক চাঁদনীরাত রচনা করে, সে রাত কি পাষাণফলক না হয়ে পারে!

নিরুৎসব জীবন আমার। পাহাড়ের গা ঘেঁষে চন্দ্রনীল হয়ে থাকে বিশাল উপত্যাকা। কিন্তু সাধ্য কার, আলোর দাগে হাত রাখে? আমি ছুঁয়ে দেখতে পারিনা। দীর্ঘতম আলোকরেখা আরো বেড়ে যায়, তবু ছুঁয়ে দেখার সক্ষমতা থেকে যায় অধরায়।

এভাবে ঘর ভরে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার, ছায়ার মাঝে বেজে ওঠা শব্দরাত, অথবা সমুদ্র সুরভিত বালিহাঁস, কিংবা আলোকিত হলঘরে বসন্তের রতিবিলাস রোদ চকচকে জলের মতো মান্ধাতা আমলের ভেদরেখা পেরিয়ে আমাকে ব্যথা দেয়। আমি টের পাই ব্যথাগুলো যাবতীয় প্রেমের মতো শুচি। ঘাসের ভেতরে ঘাস হয়ে জন্মানোর আকাক্সক্ষার মতো আনন্দ হয়ে ধরা দেয়। অতঃপর নিজেকে আবিষ্কার করি এক আলোবিদ্ধ ককপিটে। এরপর দেহের গভীরে কোনো প্রতিদেহে জন্ম নেয় স্বচ্ছ সুন্দর এক উজ্জ্বল প্রান্তর। যেখানে বৃক্ষেরা জীবিত, প্রাণিরা রহস্যময়। যার চারিধারে শুধুই ঝকঝকে কালো আবলুশের মতো প্রলম্বিত ছায়া।

তবু এই ছায়ার মাঝে শূন্য থেকে মহাশূন্যে, ইথার থেকে ইথারে, আলোতে, আঁধারে, কুয়াশামাখা হেলাঞ্চির প্রান্তরে, শিলা হয়ে খসে পড়া মেঘের মতো হাওয়াদের বুকে ভেসে তারার মতো অদৃশ্য হয়ে যাবার সুখ পাওয়া যায়। এভাবেই স্বরচিত শয্যায় সঙ্গীহীন হয়ে সহজেই আকাশ ভ্রমণ করি কিংবা পিলসুজ হয়ে স্বপ্ন দেখি মেঘের দীঘিতে আলেয়ার। এভাবেই পাখিদের সমস্ত বিলাপ হয়ে ওঠে জ্যোৎস্নার গান।

কে জানে বেঁচে থাকার কথা কার! তবু এ এক সৌভাগ্য আমার।

লেখক, অহং ও সত্য
খোরশেদ আলম

যেভাবেই ভাবি না কেনো জীবন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। মানুষ নিজেকে সবসময় নিরাপদ করে তুলতে চায়। কিন্তু জীবনের ধর্মই তা নয়। সেখানে একটার পর একটা সমস্যা কিংবা সম্ভাবনা এসে হাজির হয়। ফলে জীবন সবসময়ই নতুনভাবে বিন্যস্ত হয়। আমরা চাই বা না-চাই জীবন মানুষকে সরলরৈখিক পথ ছেড়ে বক্রতার কাছে নিয়ে যায়। এটাকেই চিন্তাশীল মানুষ বাস্তব বলে রায় দেয়। ভবিতব্য কারুরই জানা থাকে না, তবুও মানুষ ভবিষ্যতের জন্য নীড়বাঁধে। মানুষের ভেতরে সুপ্ত থাকে আরেক মানুষ। এই মানুষ কখনো নিজেকে আড়াল করে, কখনো প্রকাশ করে। মানুষে মানুষে ভিন্নতা রচনা করে মানুষে মানুষে বৈচিত্র্যের ইতিহাস। গুণী মানুষ নিজেকে আবিষ্কারের পথ ধরে আত্মার বিকাশকে প্রাধান্য দেন। নিরন্তর অন্তরসাধনার ভেতর দিয়ে তাঁরা খুঁজে নিতে চান একটিমাত্র জন্মের অসীম সম্ভাবনা। মানুষ এমন এক জীব যে অন্তরের শক্তি জাগরণের মধ্য দিয়ে অন্বেষণ করতে পারে মহামূল্য জীবন। বস্তুশক্তির প্রাধান্যকে অতিক্রম করে সে উঠতে পারে অনেক ঊর্ধ্বে।

এর মানে এই নয় যে, মানুষ বস্তুকে অস্বীকার করে সবসময় তুরীয়লোকে গমন করবে। কারণ মানুষের দেহসত্তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বস্তুসত্তা। লালন বলেছিলেন, ‘যা আছে ভাণ্ডে, তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে।’ কাজেই দৈহিকসত্তাকে অস্বীকার করা যায় না মোটেই। কায়া ছাড়া ছায়া নেই। যুগে যুগে অন্তর্শক্তি বিশ্বাসীরা তাই মানুষের মধ্যেই সৃষ্টি জগতের রূপ আবিষ্কার করেছেন। দেহ সাধনার বিচিত্র মার্গ অতিক্রম করেই তারা অন্তর্শক্তির কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ধরেও বলা যায়, জীবনকে সার্থক করার প্রয়োজন রয়েছে মানুষের। এই সার্থকতা আসতে পারে নানাভাবে। কখনো নিবিড়-নিবিষ্ট আত্মার সাধনায়, কখনো পরার্থ কামনায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় :

…ভূমাকে আকাক্সক্ষা করাই আত্মার মাহাত্ম্য— ভূমৈব সুখং নাল্পে সুখমস্তি, এই কথাটি-যে মানুষ বলতে পেরেছে, এতেই তার মনুষ্যত্ব। ছোটতে তার সুখ নেই, সহজে তার সুখ নেই, এইজন্যেই সে গভীরকে চায়— তবু যদি তুমি বল, ‘আমার হাতের তেলোর মধ্যে সহজকে এনে দাও’…

‘…যদিচ স্বার্থ আমার কাছে সুপ্রত্যক্ষ ও সহজ এবং পরার্থ গূঢ়নিহিত ও দুঃসাধ্য, তবু স্বার্থের চেয়ে পরার্থই সত্যতর এবং সেই দুঃসাধ্যসাধনার দ্বারাই মানুষের শক্তি সার্থক হয় সুতরাং সে গভীরতর আনন্দ পায়, অর্থাৎ এই কঠিন ব্রতই আমাদের গুহাহিত মানুষটির যথার্থ জীবন— কেননা, তার পক্ষে নাল্পে সুখমস্তি। (শান্তিনিকেতন)

আজকের পৃথিবীতে আত্মসাধনা কিংবা এই পরার্থ কামনা ‘হেডোনিস্টিক’ দর্শনের ভারে ডুবে যাচ্ছে। ফলে মানুষের অন্তর্গত সাধনার স্থলে প্রাধান্য বিস্তার করছে বস্তুপূজা। সেখানে বস্তুশক্তিকে জানার প্রয়াস নেই। বস্তুর শক্তিকে জানার পরিবর্তে মানুষ সাধনা করছে ভোগের। এই ভোগ তাকে নিয়ে যাচ্ছে সর্বনাশের মহাগর্তে। এ-সত্য আবিষ্কার করেই আমি ‘সহসা চিনেছি আমারে।’ কারণ আমিসত্তার নিয়ন্ত্রণ আমার দেহাতীত নয়। আমার শরীর যখন আমাকেই মানে না তখন বুঝতে পারি আমি আমাতে নেই। তখন আমি নির্জনতা খুঁজি। এই নির্জনতা নৈঃসঙ্গ্য নয়। আমার চৈতন্যের গভীর গোপন রাগিণীর মধ্যে আমি আমাতে আপনার রূপ অন্বেষণ করি। এই রূপ-অন্বেষণ প্রক্রিয়াতেই আবিষ্কার করি রূপাতীত কোনো সত্তার মাধুর্য। এই ভয়াবহ বস্তুতান্ত্রিক পৃথিবীতেও নিজেকে প্রশ্ন করি— কেনো প্রকৃতির মাধুর্য আমার সত্তার মধ্যে আবেগঘন শান্তভাবের সৃষ্টি করে। কেনো মানুষের মঙ্গল কামনায় হৃদয় সিক্ত হয়ে ওঠে? কেনো আত্মভোগের মধ্য দিয়ে জীবন বিবমিষা হয়ে ওঠে? পুনরায় তাকে শাসানোর মধ্য দিয়ে মানবিক মঙ্গল ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণের আকাক্সক্ষা জাগে? কেনো হিসেবি দুনিয়া নিজের গভীর সত্তার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হয়? একি মানুষের নিয়তি নাকি মানবিক মঙ্গল সাধনারই অন্য এক বিশ্ব?

বস্তুত লেখক হয়ে ওঠার ইচ্ছাটাও এক বৃহত্তর ঐক্যসাধনার সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া। যে জীবন মানুষ যাপন করে যায় তা ছায়া হয়ে থাকে মানুষের ইতিহাসে। সেই ছায়াকেই কায়া বানাতে হয় বর্ণমালার বিন্যাসে। এই বর্ণমালাই হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের সঞ্চয়, হয়ে ওঠে অনন্ত সম্ভাবনার পথে নিজেকে চালিত করার এক সুগভীর প্রত্যয়। আজকের উত্তরাধুনিকতা অবশ্য এই গভীরতাকে অস্বীকার করে। করুক তা। একাডেমিক দর্শনের মৌল ভাবনাগুলোর মধ্যদিয়েও তো নিজেকে প্রবোধ দেয়ার উপায় তৈরি হলো না। তাহলে এই নিরন্তর বহমান সত্তার ঘরবাড়ি কোথায়? মানবিক যন্ত্রণাকে উস্কে দিয়ে তো আধুনিকতাও মানুষকে এক সাংঘাতিক পীড়িত অবস্থার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বটুকু অস্বীকারের মধ্য দিয়েই তো তৈরি হচ্ছে পরস্পরবিরোধিতা কিংবা ভয়াবহ শত্র“তা। বিশ্বাসের পৃথিবীর পতন তো মানুষকে সুখি হতে দিচ্ছে না! মানুষ মানুষকে নিরঙ্কুশভাবে ভালোবাসতেও পারছে না। ভালোবাসার এই কমতিপড়া বিশ্বে প্রকৃতই মানুষের মুক্তি নেই।

এসব কথা সেই অর্থে সাহিত্যিক নয়, যতটা দর্শনানুভবের। কিন্তু দর্শন ছাড়া সাহিত্য কোথায়? যে লেখকের কাছে হাত পাতছি, দেখছি একেকটা মহাদর্শন। অস্বীকারপ্রবণ আধুনিকতাও পক্ষান্তরে যন্ত্রণা প্রশমনকামী। ফলে শিল্প-সাহিত্যের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ভাষাবক্রতা। এই বক্রতা ক্রমশ বাস্তবতাকেই আবিষ্কার করতে থাকে। যে ভয়ানক বাস্তবের মধ্য দিয়ে অসুখি দেহসত্তাকে প্রকাশ করতে হয়। যন্ত্রণা যদি স্পর্শই করে মানুষকে তাহলে তার মুক্তি কোথায়? শিল্প তো মানুষকে মুক্ত করতে চায় না। সে চায় মানুষের চিন্তামুক্তি ঘটুক। আর এই চিন্তামুক্তি তো কখনো এই নয় যে, মানুষের বহমান বেদনাকে প্রশমিত করবে। বরং চিন্তামুক্তি এটুকুই— মানুষ পৃথিবীকে জানতে শিখবে। এই জানা তার ভেতরের অন্ধকারকে দূর করে। কিন্তু শিল্পের কাজ খবরদারি করাও নয়। তার কাজ তার উপমা-বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে জীবনকেই প্রকাশ করা।

লিখতাম না কখনো, যদি না এইসব ভাবনা আমার মধ্যে প্রবল আলোড়ন তুলতো। কোনো এক নিবিড় আবেগঘন হার্দিক অবস্থার মধ্য দিয়েই নিজের আবিষ্কার করি। এই আবিষ্কার আত্মসত্তার আবিষ্কার। এও ভাবি— মানুষ তার ইতিহাসকে স্বর্ণাক্ষরে খচিত করে রাখতে চায়। স্বীয় ভাবনার মর্মার্থকে ভবিষ্যতের কাছে সঞ্চয় করে রেখে যেতে চায়। এই সঞ্চয়ে তার বৈষয়িক কোনো লাভালাভের চিন্তা নেই। বরং ভাবনার নতুনত্ব দিয়ে অগ্রসরমান পৃথিবীকে সে ঋণী করতে চায়। একটা অহং সেখানে সত্তার আলাদাকরণ চিহ্ন হয়ে ওঠে।

এটা সত্য— কখনো কখনো এই অহং অহংকার বা আত্মপ্রচার প্রবণতার মধ্য দিয়ে সত্তাকে হারাতে থাকে। তখন লেখক হয়ে পড়েন জীবিত থেকেও নির্জীব সত্তা। সেই নির্জীব সত্তাকে দিয়ে আর যাই হোক পৃথিবী ঋণী হয়ে ওঠে না। বরং আঘাত আর প্রত্যাঘাতের মধ্য দিয়ে তা লেখককেই ক্রমশ খুন করতে থাকে। কেনোনা সত্য এমন এক জিনিস যাকে অস্বীকার করার সাধ্য কারো নেই। লেখককে সেই সত্যের সাধনাই করতে হয়। সেখানে সকল লেখকের সত্তা এক কিন্তু প্রকাশটাই কেবল বিচিত্র।

আমি চিনেছি আমারে সহসা
মেহেদী উল্লাহ

খুব কাছ থেকে অতি প্রবলভাবে ইচ্ছা তো করে অনেকগুলো সন্ধ্যাকে একলগে টেনে আনি। কিন্তু সম্ভব হয় না, হবে কি? তা সত্ত্বেও একটা মাত্র সন্ধ্যাকে চোখের ইশারায় নিজস্বতার মধ্যে প্রবিষ্ট করাই গোধূলি থেকে ছিনিয়ে। নিজেকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মাথার গহীনে খেলা করে গানের সুরটা ‘আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি’। আমাদের ছাত্র অমল বুঝি বাঁশি ধরেছে! ও একদিন শুনিয়ে ছিলো। তারপর থেকে পরের কারণে স্বার্থ দিয়ে একাকী জগত-সংসার নিয়ে ভাবতে গেলেই সুরটা মাথায় নড়েচড়ে, কানে আরাম দেয়। নিজেকে চেনা বা নিজের নাম লইয়া কান্নার প্রশ্নটা ফাঁস হয়ে যায়। মনে হয়, সন্ধ্যা সব প্রশ্নের উত্তর জেনে গেছে। কেবল আমাকে ছাড়া। সে শুধায়, নিজেকে নিজেই লও চিনে নিজ গুণে!

অনেক কাল আগে, ঠিক কবে মনে নেই। মনে যে থাকবে না, তা সেই কালেই মনে হয়েছিলো। আমি ছিলাম কোনো স্বাধীন রাজার সেনাপতি। য্দ্ধু করেছি, ক্লান্ত শরীর নিয়ে তাঁবুতে ফিরেছি। তারপর কতো কী করেছি! ভয়ে কেউ কিচ্ছুটি বলতো না। ঈর্ষা করতো, দেখে যেতো, প্রয়োজনে অধস্তন হিসেবে পাহারা দিতো রাত জেগে, সূর্য উঠলে আয়েশ শেষ হতো, আবার যুদ্ধ। অসি!!!

জীবনকালীন এই সময়ে চেয়ে দেখি রাজার যুগ নাই, তবুও কেনো যেনো বারে বারে খাপে তরবারিটিই খুঁজি। মনে পড়ে যায় তখনই, আমি সেনাপতি ছিলাম সেই অনেক কাল আগে, যখন এই যুগের আমির জন্ম হয়নি, ফলে এখন তরবারি থাকবে কোত্থেকে?

তরবারি খুঁজে না পেয়ে হাতিয়া চলে যেতে ইচ্ছে করে। খালি হাতে হাতিয়া। এই বুঝি, আমার জন্য একটা দুইমাথাওয়ালা ট্রেন এসে থামবে, তবে দুইমাথাওয়ালা সাপের মতো না, ঠিক দুইমাথাওয়ালা ট্রেন থাকলে যেমন দেখতে হতো তেমনই। আমি ট্রেনে উঠে হাতিয়া যেতে যেতে মাঝপথে গিয়ে মনে পড়বে, ট্রেনে তো হাতিয়া যাওয়া যায় না, হায় হায়! তখনই চেইন টানবো। হাতিয়া আর যাওয়া হবে না, কিন্তু হাতিয়া যেতে ইচ্ছে করতে থাকবে ট্রেনেই। অথচ চেইন টেনে ট্রেনটাকে মাঝপথে থামাতে হবে এই কথাও আমি বারে বারে জানতেই থাকবো, মনে পড়তেই থাকবে। যতোবার যাবো ততোবার।

ট্রেনে ভুলেও যদি কোনো দিন চলে গিয়ে হাতিয়া নেমে পড়ি, উপকূলে অসংখ্য হরিণ মানুষের বদলে আমাকে স্বাগত জানাবে। স্লোগান দিবে, ‘এই লেখার লেখকের আগমন, শুভেচ্ছা, স্বাগতম!’ আমি হরিণের কণ্ঠস্বর এই প্রথম শুনে চিনতে পারবো, হ্যাঁ হরিণরা স্লোগান দিলে এমনই শোনায়, কিন্তু কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবো না, কারণ কেউ কখনো হরিণকে স্লোগান দিতে শুনেছে? ফলে আনন্দদায়কভাবে আমি চিরতরে খুশি হয়ে যাবে। হরিণদের মায়াবী চোখে ট্রেনের হুইসেল কেনো জানি শব্দের বদলে আলো ফেলবে। তারা সেই আলো সামলে নিয়েই স্লোগান দিতে শুরু করেছে একটু আগে, আমি যথেষ্ট খেয়াল করেছিলাম। আরো মজার ব্যাপার, নিজেকে আর নিজে মনে হবে না, মনে হবে কে যেনো ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আমাকে হাতিয়া পাঠিয়েছে। তখন ভারপ্রাপ্ত হিসেবেই হয়তো, মনে একটু বিষাদও হবে, ইশ্, যদি আমি নিজেই ভারপ্রাপ্ত কেউ না হয়ে হরিণের সমাদর নিতে পারতাম! কিন্তু আমি যে ভারপ্রাপ্ত এটা হরিণরা কখনোই জানতে পারবে না। এতে নিরীহ হরিণদের প্রতি আমার মায়া হবে! সেই থেকেই তো এদের নাম তোমরা দিলে, মায়াহরিণ! আমার যে মায়া লেগেছিলো! অস্বীকার করতে পারবে, কোনো প্রমাণ আছে কারো কাছে যে, এদের নাম অন্য কারণেই কেউ রেখেছিলো মায়াহরিণ?

তারপর খুব আকালের দিনে আমি হয়তো কখনো কারো পাকা দালানের কোনো কলাপসিপল গেটের ভেতরে বসে সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্বে রত ছিলাম। আকাল ছাড়াও আরো একটা কারণ থাকতে পারে, গার্ড সাজার আগে আমি হয়তো অতিরিক্ত স্বাধীনতা ভোগ করেছিলাম। যার দরুন আমি নিরাপত্তার দায়িত্বে, রাত এগারোটা থেকে ভোরের আলো ফরশা না হওয়া পর্যন্ত আমি গেট থেকে নড়বো না, চড়বো না, যদি এর মধ্যে জায়গাটা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, অথবা সকাল থেকেও সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি সেখানেই থাকবো। অদ্ভূত শোনালেও সত্য, এককালে আমি সত্যিকারভাবে পত্রিকার শ্রেণিবদ্ধ বিজ্ঞাপনে চোখ রাখতাম নিরাপত্তা প্রহরী আবশ্যক বিজ্ঞাপনের পোস্টগুলোতে। আমার সেটা হওয়া হয়নি। কারণ আমি তখনো মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতার পর্ব শেষ করতে চাই নি।

এসব ছাড়াও আমাকে চলে যেতে হতে পারে অন্য কোনো গ্রহে, অন্যত্র বেড়াতে যাচ্ছি জেনেও আমার হাতে থাকবে, এই গ্রহের উৎকৃষ্ট কিছু নিদর্শন; একটা মেটালের কচ্ছপ, মার্কেসের নিঃসঙ্গতার একশ বছর, হাঁসের পালক ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু কেনো থাকবে আমি জানবো না। হোস্টরা অবাক হয়ে জানতে চাইবে, এসব কেনো? এর চেয়ে ভালো কিছু এখানে এভেলএভল। তারা আমাকে অফার করবে, আপনার পূর্ব স্মৃতিতে বর্তমান এমন জাতীয় কিছু আমাদের কাছে চাইতে পারেন, আমরা এনে দিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। আমি তাদের উত্তর করবো, জাতীয় ফল কাঁঠাল আমি খাই না, এছাড়া যে কোনো জাতীয় কিছু হলেই তো হয়। তারা ঠিকাছে বলে আমার জন্য জাতীয় খেলা হাডুডুর আয়োজন সম্পন্ন করতে থাকবে। আমি তার আগেই বলবো, আমি যেহেতু সঙ্গে বাঁশি আনি নি, তাই এই খেলা বাদ রাখা হোক! এছাড়া আমি তাদের একটা মহামূল্যবান কথা শোনাতে থাকবো, পৃথিবী বিষয়ে। আমি বলতে থাকবো, এখন পর্যন্ত মানবজাতির প্রধান সীমাবদ্ধতা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সঙ্গে প্রতিটি মানুষের পরিচয় নেই। টের না পেলেও প্রতিটি মানুষ এই আফসোস নিয়েই মারা যায়, যাচ্ছে, যাবে। পৃথিবীতে থাকাকালীন আমার কয়েকটি শেষ ইচ্ছার কথা মনে পড়তে থাকবে। একবার আমি ব্যাঙের শরীরে সুতা দিয়ে মশার কয়েল বেঁধে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম, তাতে সে সারা ঘরে ধোঁয়া ছড়িয়ে দেবে ভেবেছিলাম। দেড় বছর ধরে একটা ময়নাকে নিজের নাম শেখানো শেষে এক ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে যাবেন তা শোনাতে, কিন্তু পোষা ময়না চমকে দিলো ঠিকই, তবে আমার নাম ধরে ডেকে। একবার একটা চা-দোকানের সমস্ত নিজের শরীরে টাঙিয়ে ঘুরবো আর বিক্রি করবো ভেবেছিলাম, খড়ের গাদার তলে বসে গোপনে শত শত শামুকের জিব ঠোঁট ছিঁড়বো ভেবিছিলাম। একটা অন্ধকার উৎসব চালু করার খুব ইচ্ছা ছিলো আমার। অমাবস্যার রাতে অতীব আন্ধারে দলবেঁধে কথা ছাড়া গিয়ে বসে থাকার কথা ছিলো আমাদের ১৫ মিনিট ২৪ সেকেন্ড।

এইভাবে সন্ধ্যার সাধারণ অন্ধকার হয়ে অমাবস্যার অসাধারণ অন্ধকারের ভেতর দিয়ে আমি নিজেকে নিয়ে আরো ভাবতে চেয়েও হয়তো ভাববো না, কেনোনা দৃশ্যত দৃষ্টিতে, অন্ধকারে অন্ধকার ছাড়া অন্য রঙ হারিয়ে যায়।

আমি বারে বারে এক ধরনের অসিরিয়াস সময়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে চাইবো। আমার মনে পড়তে থাকে, ‘তিরোধানের মুসাবিদা’ ও ‘রিসতা’ লেখার সময় আমি এতো সিরিয়াস কেনো ছিলাম? আমি একটা অসিরিয়াস ভঙ্গিতে এই বইয়ের গল্পগুলো  লিখেছি। এই সেই সময়, যা না এলে আমি বুঝতেই পারতাম না জীবন কেমন, যে জীবনের অভিজ্ঞতা এই ধরনের গল্পগুলো লেখার জন্য প্রযোজ্য ছিলো। আমি একটা অন্যরকম জগতে চলে গিয়েছিলাম, যে জগতে এমন কনটেন্ট বিরাজ করছিলো, যা গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, ভিন্ন রকম জায়গা থেকে গল্প বলতে সাহায্য করেছে। আমি ‘ব্রেকআপের ব্যাকআপ’, ‘সাবস্ক্রাইবার অব সালমন দ্য ব্রাউন ফিশ’ ধাঁচের গল্পগুলো লিখতেই পারতাম না যদি না এমন সময় মোকাবেলা করতাম। আমার অসিরিয়াসনেস আমাকে স্বস্তি দেয় এখন।

আমি বাস্তব জীবন থেকে খুব কমই সাহায্য নিই। প্রকৃতি আমাকে খুব কমই আকৃষ্ট করে। আমার লেখার একটা আলাদা জগত আছে, যা আমি নিয়ন্ত্রণ করি নিজে, একজন সাধারণ লেখক সমাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাই একে শেখানো-পড়ানো বা এর ছায়া অবলম্বন করা বোকামি হয়তো। বুঝতে পারি, আমার যে জগত; লিটারেরি টার্মে তাকে বলে ‘ইউটোপিয়া’। আমি আমার ঘোর নিয়ে ভালো আছি, পাঠক এই ঘোর থেকে আনন্দ পেলে আমার ভালো লাগবে, আমি তাঁদের সমাজ-সংস্কৃতি শিক্ষা দেওয়ার জন্য লিখি না। এটা তাঁরা নিজেরাই বুঝতে পারে তারা কী করবে। পত্রিকার পাতাগুলো বাস্তবের গল্পে ভরা। লেখক যা কল্পনা করতে পারেন না, সেরকম ভয়ংকর বা সুন্দরে ঠাসা পত্রিকাগুলোর পাতা, তেমনই এক কাল কাটাচ্ছি আমরা। আমার গল্পগুলো সেরকমই যা পত্রিকার ফিচার থেকেই জন্ম নেয়। গল্পগুলোর মা ফিচার। আমি যে কনটেন্ট নিয়ে গল্প বলি, তা হয়তো একটা ফিচার আইটেম ছাড়া কিছুই নয়। ফিচারগুলো আমার গল্পের চেয়ে বেশি ইহজাগতিক, এগুলো মানুষকে প্রয়োজনের কথা বলে। যেমন, নতুন পোশাক লেগিংস নিয়ে একটা ফিচার হলে, পোশাকটি কোথায় পাওয়া যায়, এর ডিজাইন কেমন, এর সঙ্গে আরো কী কী পরলে সুন্দর মানাবে তা মেয়েরা জানতে পারে, কিন্তু আমার গল্প পড়ে সে একই গল্পে একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বা একাধিক বিষয়ের ওপর একটা ফিচারই পড়লো, তার হয়তো কোনো কাজেই আসবে না, তবু সে পড়তে চাইবে বারবার, যেখানে লেগিংস নিয়ে ছাপা হওয়া ফিচারটা হয়তো একবারই সে পড়ার আগ্রহ পায়। তাতেই তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। আবার ওই মেয়েটি যে লেগিংস নিয়ে পড়ে, সঙ্গে আমার গল্পও পড়ে, দেখা গেলো তারই ছোটবোন লেগিংস নিয়ে পড়ে কিন্তু আমার গল্পের প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই, এমনটিই বেশি ঘটছে বলে আমার ধারণা। না হলে তো আমার বই লক্ষ লক্ষ কপিই বিক্রি হতো, যেখানে লেগিংসের পাঠক লক্ষ লক্ষ। গল্পের জগত ছাড়াও, এমনি আমি যখন কথা বলি একটা নিজস্ব বয়ান ও ভঙ্গিতে কথা বলি, যে ভাষা কাঠামো আমার সমাজে এক্সিস্ট করে না, এতে আমার সম্পর্কে বেশিরভাগই ধারণা করে, আমি অ্যাবনরমাল। এটাই আমার উপভোগের বিষয়। তারা আমার ব্যাপারে আগ্রহী হয়, আমি এমন কেনো! এভাবে কথা বলি কেনো, এমনভাবে চলি কেনো? তারা হয়তো আমার ফেসবুক আইডিতে ঢুঁ মারে। তখন একটা বোঝাপড়া দাঁড়ায় যখন দেখে, আমার এমনি কথার সঙ্গে লেখালেখিরও মিল আছে। তারা বিবেচনা করে, উনি এমনই। আমার আর তাদের উদ্দেশে কিছুই বলার থাকে না। তাদের থাকে কি না আমি জানি না। বেশিরভাগই লেখালেখি ও জীবনকে খুব সিরিয়াসলি নেয়, তারা ভাবে, সাহিত্য বা জীবন এগুলো স্বর্গীয় বা পরিশুদ্ধ হওয়া উচিত যা এমনি খুব তুচ্ছ আর সাধারণ চালচলন থেকে আলাদা। সাহিত্য বা জীবনকে সিরিয়াসলি নিতে শেখায় একাডেমি। যা ঠিক নয়। সাহিত্যের চেয়ে এমনি তুচ্ছ জীবন-যাপন  অনেক  গুরুত্বপূর্ণ। কেউ হয়তো একটা জীবন সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও আনন্দময় উপায়ে কাটিয়ে দিলেন, কিন্তু সাহিত্যের ধারেকাছেও  তিনি নেই, লিখলেন না, তিনি লেখক না জন্য! মজার না! আমার ক্রিয়েট করা নিজস্ব জগত আমাকে লিখতে বাধ্য করায়, এমন জগত না থাকলে আমি লিখতাম না। সবাই হয়তো, চাঁদ দেখতে খুব আগ্রহী, কিন্তু আমি চাঁদ দেখারই সময় পাই না, আমি ধরে নিই আশপাশে বন্যা চলতেছে, বাড়ির ভিটার কাছে পানি, পানিতে সয়লাব হয়ে ওটা দ্বীপ হয়ে ভাসছে, সেই পানিতে চাঁদ এমনভাবে নিয়মিত পড়ে, যে আমি ওখানে দেখি, আকাশে না। আমি হয়তো অচিরেই একটা অন্ধকার উৎসব চালু করতে আগ্রহী। লোকে পূর্ণিমা পালন করে, মাঘী পূর্ণিমা যেমন, আমি হয়তো অমাবস্যা পালনে আগ্রহী, কৃষ্ণপক্ষের সময়ে, অন্ধকারে জীবনের সব হতাশা মিশিয়ে দিয়েই আলোতে ফিরবো।

এভাবেই আমি যে প্রসঙ্গেই যাবো, এই লেখা কেবলই সন্ধ্যার আন্ধার থেকে অমাবস্যার আন্ধারের দিকেই যাবে! খুব অন্ধকারে ঝড়-বৃষ্টি হলে কেমন হয়! আমার একটাই ইচ্ছা জাগে। কেবলই মনে হয়, কে যেনো আমার জন্মের আগে একটা বটগাছ লাগিয়ে রেখেছিলো। আন্ধারিতে ঝড়ের সময় সেটার নিচে দাঁড়িয়ে ভিজতে ইচ্ছে করে। বারবার যাবো, যতবার যাবো, গিয়ে দেখবো গাছটা আসলে পাকুড়!

স্বপ্নসাগরের ঢেউ
নাসিমুজ্জামান সরকার

‘আজি স্বপ্নসাগর ওঠে উচ্ছলিয়া
তোরা শুনতে কি পাস?
তোরা শুনতে কি পাস?’

আমাদের সমাজ বলতে গেলে এককথায় দাতা ও গ্রহীতার সমাজ। এখানে কেউ দেয়, কেউ গ্রহণ করে। সম্মান অপেক্ষা সম্মানী, পূজা অপেক্ষা পূজনীয়ের দাম এখানে চড়া। যারা সম্ভ্রমী ও সংযমী, যারা শক্তি ও সামর্থে বিশ্বাসী, যারা ঠিক গ্রহীতা হতে জানে না এবং যারা নির্বোধ, তারা হাতে তুলে নেয় কাগজ-কলম। এরা লিখতে চায়। লেখক হওয়ার উদ্দেশ্যও সুবিধাবাদীদের। অনন্তনক্ষত্র সূর্যের প্রতিটি অস্ত স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি দিবসের অবসান হলো। মৃত্যুমুখী যাত্রার পথে সময়ের মূল্য বুঝি হলো না। ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমি, চাঁদের বুড়ি, অজস্র রূপকথা আর থ্রিলারের শক্তি এভাবেই নিস্তেজ হয়ে আসে। ওসবে আর পোষায় না। এখন আরো জীবন্ত, আরো অনেক বাস্তব, একেবারে রক্ত-মাংসের জীবন চাই। জীবনের সন্ধান চলতে থাকে। মানুষের টিকে থাকার লড়াই আর জীবন সংগ্রামে কতো কতো গল্প তৈরি হয়। তবু শৈশবের স্মৃতি পিছু ছাড়ে না। লোকালয় শেষে বিস্তীর্ণ প্রান্তর, অসংখ্য আবাদি জমি, বিরাট বিল। এই বিলে একসময় অসংখ্য জলাশয় ছিলো। জলাশয়ে শাপলা, শালুক, পদ্ম ফুটতো। বর্ষায় পাওয়া যেতো অগণিত দেশি মাছ। সেই জলাশয়গুলো এখন নেই। শাপলা, শালুক, পদ্ম আর ফোটে না। দিঘি কেটে বাণিজ্যিকভাবে সেখানে মাছ চাষ হয়। বিলের কাচা রাস্তার ধারে বুড়ো বট আর অশ্বত্থ গাছ আজও অসহায়ভাবে বেঁচে আছে। লোকালয় থেকে সবচেয়ে কাছে রাস্তার কিছুটা নিকটে একটি নতুন বটগাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সেই বটগাছ ঘিরে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন দানাবাঁধে। বটগাছের তলায় আমাদের আড্ডা জমে, গল্পের আসর বসে। এই বিলের একটি বৃহত্তর অংশ জুড়ে নাকি বন্দর হবে, রাস্তার সংস্কার হবে, জীবনের মান বাড়বে ইত্যাদি প্রসঙ্গ ওঠে। এই সমস্ত ঘিরে পুঁজিবৃত্তিক ঘরোয়া কথা চলে, কথার পিঠে কথা, কথার শেষ হয় না। এক কথা শেষ হতে না হতেই কথার রূপান্তর ঘটে, প্রসঙ্গ থেকে আমরা প্রসঙ্গান্তরে চলে যাই। গল্প তবু থামে না। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত শুরু হলে তবেই আমরা ঘরে ফিরি। এতো গভীরতর বাস্তব তবু মনে দাগ কাটে না। গল্পের সঙ্গী হয় অসহায় প্রকৃতি। গ্রামে লোডশেডিংয়ের খুব প্রাদুর্ভাব। গ্রীষ্মের চাঁদনি রাতে ঘরে মন বসে না। মাঝরাতে বের হই আমরা। নিকটের ডিপকলে ফসলি জমিতে পানির সেচ হয়। ডিপঘরের ছাদে বসে গল্পের মহড়া চলে। ঘরে ফিরে এইসব গালগল্প বানাই, টেনে লম্বা করার চেষ্টা করি।

…এক বিলাসী রাজার খুব গল্প শোনার শখ। রাজাকে প্রতিদিন নতুন নতুন গল্প শুনিয়ে সন্তুষ্ট করতে হয়। এভাবে গল্প শোনাতে শোনাতে রাজ্যের সমস্ত গল্পের ভাণ্ডার শেষ হয়ে আসে। গল্প শোনানোর আর কাউকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। এদিকে গল্পকার ঠিক করার দায়িত্ব রাজ্যের তিন উজিরের ওপর। তিন উজির অনেক খোঁজ করে কিন্তু নতুন গল্প শোনানোর আর কাউকে খুঁজে পায় না। একথা শুনে রাজা ভীষণ রুষ্ট হন। তিন উজিরকে তিনি নির্দেশ দেন সমস্ত রাজ্য আলাদাভাবে একদিন ও একরাতের জন্য পর্যটন করে আসতে। এই পর্যটনের অভিজ্ঞতা রাজাকে তাদের শোনাতে হবে। তিন উজির নির্দেশমতো আলাদা আলাদাভাবে রাজ্য পরিদর্শনে বের হয়। দুইজন ঠিকঠাক রাজ্য পরিদর্শন করে। কিন্তু তৃতীয়জনের রাজ্য পরিদর্শনে বিঘœ ঘটে। তার বৃদ্ধা মা সেদিন ভোরে মারা যায়। সারাটা দিন তার অনাহারে কাটে। তার আর রাজ্য পরিদর্শন করা হয় না। কিন্তু রাজার আদেশ শিরোধার্য। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে গভীররাতে সে রাজ্য পরিদর্শনে বের হয়। কিন্তু রাতে ঘুমন্ত লোকালয়ে সে কী পরিদর্শন করবে এই ভেবে তার খুব দুঃখ হয়। সমস্ত লোকালয় নির্জন। আয়েশী মানুষেরা সবাই গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত। হাঁটতে হাঁটতে সে একটি দুটি ধ্বনি শুনতে পায়। কয়েকটি পীড়িত জন্তু-জানোয়ারের আর্ত-ধ্বনি। সে আবার হাঁটতে থাকে। এবার সে মানুষের ক্রন্দনধ্বনি শ্রবণ করে। লোকালয়ের আরো ভেতরে গেলে আর্ত-পীড়িত, অসহায় আর ক্ষুধার্তদের চিৎকার ও ক্রন্দনধ্বনি আরো প্রকট হয়। শেষরাতে সে গৃহে ফেরে। বিছানায় শুয়ে সে নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ভোররাতে সে এক স্বপ্ন দেখে। ঘুম থেকে উঠে তিন উজির রাজদরবারে উপস্থিত হয়। রাজা প্রত্যেককে নিজ নিজ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে শোনাতে বলেন। প্রথম উজির সমস্ত রাজ্যের খোশখবর আর রাজার প্রশংসাবাণীতে মুখরিত অভিজ্ঞতার কথা শোনায়। দ্বিতীয় উজির রাজ্যের সমস্ত রাজকর্মচারী এবং প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলার কথা বর্ণনা করে এবং বোঝাতে চায় যে, সে কেবল একাই দায়িত্বের সাথে রাজকার্য পালন করছে। তৃতীয় উজির প্রথমেই রাজার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। তার সেই দিনের অসহায়ত্ব ও রাতের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে এবং শেষরাতের স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে। রাজা কৌতূহলী হয়ে তার স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চায়। উজির তখন সেই রাতের স্বপ্নের কথা বর্ণনা করে …সহস্র নক্ষত্ররাজি, বিস্তীর্ণ দিগন্ত আর প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে হেঁটে চলে একলা এক অভিমানী বালক। সে বড়ো হতে চায়, ধনী হতে চায়। তাই সে পথে পথে পরশপাথর খোঁজে। কিন্তু কোনো পরশপাথর সে পায় না। নিভৃতে, নিঃশব্দে হেঁটে  চলে অনন্ত পথ। পথ আছে, তবু পথের শেষ নেই। ভাবনা আছে, বিষয়ের অন্ত নেই। কে সে? নিজেকে সে চিনতে পারে না। সমস্ত পথে কাঁটা-কাঁকর আর বন্য জন্তু-শ্বাপদের ভয়, নিয়ত পিছলে পড়ার আশঙ্কা। তবু ভয় কী, আছে পথপ্রদর্শক, অনন্ত প্রজ্বলিত নক্ষত্র, সেই তো পথ দেখাবে। সমস্ত ভয় থিতু হয়ে আসে। রাত নির্জন হলে অকস্মাৎ পথের চারপাশ থেকে ধ্বনিত হয় চিৎকার, কেবলি কান্নার আর্ত-ধ্বনি। ঘরে ঘরে মানুষের অনিঃশেষ অসহায়ত্ব, গভীর দুঃখ আর চিরন্তন ক্ষুধা। পীড়িতের আর্ত-চিৎকার কারোর কানে যায় না, কেউ শোনে না, সবাই ছুটতে চায়, কেবলি ছুটতে চায়। ক্ষ্যাপাটে বালক দেখে আর ভাবে, আর্ত-পীড়িতদের এই কান্নার কি কোনো শেষ নেই? সমাজের যারা কিছু পায় তারা আরও আরও চায়। স্বপ্ন নেই, উদ্দেশ্য নেই, কেবলি চাওয়া। তাদের পেট হয়ে ওঠে যেনো দরিয়া, কামনা জাগে জোয়ারের মতো। পৃথিবীর সমস্ত সুন্দর যেনো সে একাই গ্রাস করবে। এরা তখন রূপকথার দৈত্য হয়ে ওঠে। আর সমাজে যাদের তেমন কিছু নেই তারা কিছু পেতে চায়। চিমনির সাইরেন, কাস্তে-কোদালের টুংটাঙে তাদের ঘুম ভাঙে। এই এক বৃহত্তর মানবগোষ্ঠী, এদের বর্ণহীন একপেশে জীবন। বাল্য হতে বিদ্যা নয়, অর্থ উপার্জনের বুদ্ধি দিয়ে পরিজনদের এরা সন্তুষ্ট করে। বেড়ে উঠতে গিয়ে কেবলি মার খায়। সমাজে একদল মারনেওয়ালা আছে, যাদের মেরেই আনন্দ। মার খেতে খেতে এদের কেউ কেউ শেখে, বাঁচতে হলে জোর লাগে আর জোরের লাগে জবরদারি। এভাবেই এরা ক্ষমতাশালী প্রভুদের গোলাম হয়। বালক এদের চিনতে শেখে। হাঁটতে হাঁটতে সে দেখে চারপাশে অসংখ্য চুরি আর লুটতরাজ হচ্ছে। এই সমস্ত দেখে তার মনে হতাশা জাগে। বড়ো হওয়ার স্বপ্ন তার উবে যায়। সে তখন ভাবে, কিছু করা দরকার। সহস্র এতিম আর অসহায়দের জন্য কিছু করা দরকার। সমাজের এইসব অন্যায় তাকে যন্ত্রণা দেয়। ক্লান্ত বালক এক বটবৃক্ষের নিচে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভেঙে সে দেখে, এক দেবদূত দাঁড়িয়ে আছে। দেবদূতের সাথে তার কথোপকথন হয়। দেবদূত বালককে জিজ্ঞেস করে যে তার কী চাই। বালক উত্তর দেয়- ‘পরশপাথর’। দেবদূত বালককে দুটি বর দেয় যার একটিকে তার বেছে নিতে হবে। এক. কেবল মিথ্যে ছাড়া সমস্ত অন্যায়কে বিনাশ করার শক্তি আর সম্পদশালী হওয়ার বর। দুই. সৃষ্টির বর। দেবদূত জানায়, তার সিদ্ধান্তই হবে তার পরশপাথর। এই বলে দেবদূত জ্বলন্ত সূর্যের দিকে বিলীন হয়ে যায়। বালক দেবদূতের দিকে হাত বাড়ায়। ওমনি উজিরের ঘুম ভাঙে।

উজিরের গল্প শেষ হয়। কলমে গল্পের বেগ আর বাড়ে না। কুসুমভোরে পাখির কলতানে ঘুম ভাঙে বা কখনো নির্ঘুম রাতের সঙ্গী হয় রাতজাগা পাখির ডাক। নিস্তরঙ্গ হৃদয়ে স্বপ্নের ঢেউ জাগে। অস্বস্তিকর মুহূর্ত সেই পর্যটকের পায়ে পা মেলানোর চেষ্টায় কেটে যায়। বালক হয়ে ওঠে রূপকথার নতুন নায়ক। কোলাহল মুখর হলে এই সব ভাবকল্পনা নিথর হয়ে আসে। শুরু হয় নৈমিত্তিক জীবন। তবু কোনোকিছুতে স্বস্তি নেই। সারাক্ষণ পদাতিক হয়ে পর্যটক লংমার্চ করে। সহসা পর্যটকের সহযাত্রী হতে ইচ্ছে হয়। মানুষের ভেতরের এইসব গহীন অন্ধকার খুব কাছ থেকে দেখে মনে হয়- নাহ্, কিছু হওয়া নয়, কিছু করা দরকার। এভাবেই পথে পথে জীবনকে চিনতে শেখা, দেখতে শেখার শুরু। গুরুজনরা যেমন বলে, ‘বড়ো হও, অনেক বড়ো হও’ অর্থাৎ সম্মানী হও, বড়ো চাকুরে হও, সম্পদশালী হও। ওসব কথায় মনে আর সাড়া জাগে না। বড়ো হওয়ায় সুখ আছে, স্বস্তি নেই। অনেকেই তো অনেক কিছু হয়। এই যেমন- কেউ আর্মি বা সরকারি আমলা, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ডাক্তার বা মাস্টার, কেউ বড়ো রাজনীতিজ্ঞ বা সফল ব্যবসায়ী এবং এরকম অনেক কিছু। তারা হয় অথচ কিছু করে না। কিছু হওয়া আর কিছু করায় অনেক তফাৎ। তাই এরা কেউ থাকেও না, কালে বিলীন হয়ে যায়। এদের কেউ মনে রাখে না। এদের একচালা টিনের ঘর তিনতলা বা পাঁচতলা বা সাততলা ভবন হয়। একটি থেকে দুটি বা চারটি হয়, দামি দামি গাড়ি হয়, এর বেশি আর কিছুই হয় না। কাজেই হওয়ায় মহত্ত্ব নেই, কিছু করা দরকার, বিশেষ কিছু করা দরকার। এভাবেই গতিপথ বদলে যায়, বদলায় সিদ্ধান্ত ও মতামত। হৃদয়ে স্বপ্নসাগরের ঢেউ উছলিয়া ওঠে। তবু পথের শেষ হয় না। নক্ষত্রের সহযাত্রী হয়ে আকাশ ছুঁতে ইচ্ছা জাগে। কিন্তু আকাশ ঢের দূরে, আকাশের নাগাল মেলে না। কিছু করাও হয়ে ওঠে না। কারণ, এই পুঁজিভিত্তিক সমাজে কিছু করতে চাইলে কিছু হতে হয়। তাই আগে কিছু হও। এজন্যই হতে চাওয়া।

সহসা কলমে ভরসা জাগে। কাগজে-কলমে গড়ে তুলি স্বপ্নের কারিগর। কিন্তু কেবল কলমের জোরে মুক্তি মেলে না। কলমের আর কতোটুকু জোর! গল্পের সেই বালক নিশ্চই সৃষ্টির বরই বেছে নেবে। কারণ, সৃষ্টিতেই মহত্ত্ব, সৃষ্টির মধ্যেই পরশপাথর। সভ্যতাসৃষ্টি, শিল্পসৃষ্টি, মানুষ সৃষ্টি। সৃষ্টিই সকল মিথ্যাকে পরাজিত করে অন্যায়কে বিনাশ করতে পারে। আর যারা সৃষ্টিশীল, যারা বিদ্রোহী, তাদের কোনো অভাব থাকে না। এটুকুই হোক আগামি যাত্রার সম্বল। এর বেশি আর কিছু নয়। বাকিটুকু বাকিই থাক। সৃষ্টির প্রতিশ্র“তি থাক, উপযুক্ত সময়ের প্রতীক্ষা থাক। মেঘে ঢাকা তারাদের মতো লেখক আপাতত বিলীন হলো, কবি হলো নির্বাসিত…

‘প্রেমের দায় যাকে সংসার থেকে নির্বাসিত করেছে ধ্যানে

যার ক্ষণিক বিচ্ছেদ অসামাজিক যাপনে নিন্দিত হয়েছিলো

তবু সেই থাকবে স্বতন্ত্র, মেঘমুক্ত আকাশে যেমন

সূর্যের একক আধিপত্য ঘোষিত হয়

সকল সামাজিক নটদের ভিড়েও তার দীপ্তি উপযুক্ত সময়ে তেমনি প্রদর্শিত হবে।’

কবিতাকে ছুঁতে পারিনি…
নাজমুল হাসান পলক

‘কবিতা’ শব্দটি কবে শুনেছিলাম মনে নেই, তবে জন্মেছিলো এক মায়া, ‘যা জলের মতো ঘুরে ঘুরে বুকের ভিতরে একা কথা কয়েছিলো’। স্কুলে বুড়ো কলাপাতার বুকের মতো কপাটওয়ালা লাইব্রেরি ঘরটায় প্রবেশের অধিকার ছিলো না আমাদের, পুরনো বইয়ে ঠাসা কাঠের আলমারিতে ‘শতরঞ্চির ঘুঁটি’র মতো সাজানো সামন্ত আমলের ঘরখানা আগলে রাখতেন ইংরেজির মাস্টার সুনীল তালুকদার। কেরানি থেকে মাস্টার বনা সুনীল বাবুর হাতের ছিপছিপে বেতখানার তখন ত্রিশ বছরের কিংবদন্তি। পুরনো বইয়ের পৃথিবীতে এই মানুষটিও ছিলেন রীতিমতো নিঃসঙ্গ, ছোট্ট এক চৌকিতে পরিপাটি বিছানা পাতা ছিলো, মাঝে মাঝে সেখানে বসতেন-শুতেন। আর কপাটের পাশে পোতা আয়নায় কেশবিরল মাথার পরিচর্যা করতেন। একদিন দরজার ফাঁক দিয়ে আমরা তিনজন উঁকি দিয়েছিলাম ঘরখানায়, সবচেয়ে কাছের আলমারিটার তৃতীয় তাকের একটি বইয়ের ‘সোনার জলে’ লেখা নাম হৃদয়ে ‘বদ্ধ বাতাসে’র মতো ঘুরতো অনেকদিন ‘সঞ্চয়িতা’। বাড়ি ফিরে জেনেছি, ওটি কবিতার বই, রবীন্দ্রনাথের কবিতা। ছড়া, গদ্য শোনা কান কবিতা শব্দটি কি সেদিনই প্রথম শুনেছিলো! মনে চেপে বসেছিলো, ওমন একটি বই নিজের করে পাবার ইচ্ছে। কিন্তু বইয়ের বড্ড অভাব ছিলো মফস্বলটায়, পড়ার বইয়ের, কেনার বইয়ের, আর বদ্ধ বাতাসের মতো ইচ্ছে ‘সঞ্চয়িতা’র। মাসে একবার স্কুলে উইপোকায় খাওয়া বইগুলোকে জড়ো করে কলতলার পাশের গাঁদা বাগানটায় বহ্নুৎসব করতেন নাইটগার্ড মকবুল হোসেন। তারপর, পুবের দরোজাটা দিয়ে মাঠের খানিকটা ঘাসছোঁয়া হিমেল বাতাস এলে পোড়া বইয়ের মর্মরে কঙ্কালগুলো নিমিষেই ছড়িয়ে যেতো, পশ্চিমের টানা বারান্দা জুড়ে। ছুটির পর আমার ছোট্ট গোলাপী বার্মিস জুতো জোড়া ভয় করতো ওগুলো মারাতে, কেমন মায়া হতো, খুবই নির্মম ছিলো, সেই পোড়া কঙ্কালগুলোর শব্দহীন ভাঙ্গনের অনুভব!

একদিন আবিস্কার করলাম আঙ্গিনার ‘বনসাই’য়ের মতোন সুন্দর দেখতে পেয়ারা গাছটায় সারাদিন ঘোরে কিছু সবুজ পাখি, পাকা-ডাসা পেয়ারার লোভে। সেই লোভ সংক্রমিত হলো আমার হৃদয়ে, পেয়ারার না, কবিতার, কবিতা লেখার। কিন্তু, যেটি সৃষ্টি হলো, হ্যাঁ সৃষ্টিই বলবো! সেটি ছড়া, কুড়ি লাইনের একটি ছড়া। আমার ‘কাছের মানুষ’ বাবা বলেছিলেন, ওটি ছাপিয়ে দেবেন কোনো পত্রিকায়। কিন্তু ছাপা হলো না। তারপর সবুজ পাখিদেরই মতোন বৈশাখের সন্ধ্যায় দেখা দিয়েছিলেন এক বৃদ্ধ, সত্তর বছরের সাদা মোহনীয় বৃদ্ধ, কবি সরকার মোহাম্মদ আবদুর রশিদ। কথা দিয়েছিলেন ‘প্রবাহ পত্রিকায়’ ছাপাবেন আমার ‘নতুন সৃষ্টি’। সপ্তাহখানেক বাদে স্ট্রোক, মৃত্যু। স্বপ্ন হলো পরিত্যাক্ত! পেয়ারা গাছের সবুজ পাখিগুলো অনেকদিন নাড়াচাড়া করতো হৃদয়ে। তারপর, একদিন উড়ে গেছে, আজ তাদের ‘ছায়াছবিসম’ কিছুও নেই হৃদয়ে আমার।

অনন্ত মিছিলের পথ…
রেজওয়ানুল হক রোমিও

টিপটিপ বৃষ্টির আকাশে গাঢ় নিবিড়সন্ধ্যা পথে ডেকে যায় রূপকথাগুলো। বান্নীর মেলা থেকে নিয়ে আসা বাবার হাতের মোয়ামুড়কি আর ধনচে পাতার সন্দেশের স্বাদ আজও লেগে আছে অধরের আষ্টেপৃষ্ঠে। শৈশবের পথে পথে ডাঙ্গুলি খেলায় মুখরিত সেইসব দিন, আজন্মলালিত স্বপ্নের হাতধরে বেড়ে ওঠে কোনো এক কাব্যিক সন্ধ্যার আয়োজনে। ক্যান্টপাবলিকের বারান্দায় সোনাঝরা রোদে সুন্দরী ঈশিতার বাঁকা চোখে চেয়ে থাকা হাসি জীবনের নব নব সঞ্চারে দোলা দিয়ে গেছে অফুরান প্রত্যাশার আলো জ্বেলে। রাতজাগা পাখিদের মতো জীবনের উৎস সন্ধানে কখনও থেমে থাকেনি, জড়িয়ে পড়েছে মৃত্তিকার অস্পৃশ্য টানে আরব্য রজনীর ইতিকথা হয়ে। আহা! সেইসব দিন, সেইসব রাত…

তারপর পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়। মেধা, শ্রম আর চিন্তার মননে জটলাপাকানো গোলকধাঁধায় রথী-মহারথীদের চৌম্বক পথে এগিয়েচলা বিস্ময়ের মিছিলে আমাদের মতো বালকেরা মিশে গেছে অজান্তে। পাখি ডাকা ভোরের নীরবতায় কস্মিন স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি শৈশবের পালতোলা নৌকার স্রোত, শুভ্র কাশবনের ওপারে দিগন্ত বেষ্টিত সাদা মেঘের ভেলা উড়তে উড়তে কখন যেনো বদলে গিয়েছে সবকিছু। অজানা আওভানে মেঘদূত হয়ে ওঠা প্রিয়ার সমস্ত সত্ত্বার আবির্ভাবে হাসডাঙ্গার পাশে পড়ে থাকা অতসী ভাবীর ছোপছোপ পায়ের দাগে, মুচকি হাসির বাহানা নিয়ে সারারাত জেগে থাকে তারাদের দল। সুদূরের এক বিস্ময় ডানা মেলে আবছা আলোয় মাতামুহুরির পাশে বকুলের ঘ্রাণে বিভোর স্বাপ্নিক সব আয়োজন কথা বলে, গান গায়, ‘তোমার ওই বসন্ত রাঙা ঠোঁটে, এঁকেছি আমার প্রেমের পরাজয়…’

এরপর ইট-কাঠ-পাথরের এই যান্ত্রিক শহরে অবিরাম ছুটে চলা, ছুটতে ছুটতে নাভিশ্বাস অতঃপর একরত্তি সুখের সন্ধানে রিভোট্রিলের আড়ালে নিজেকে দেখা। বন্য শ্বাপদের মতো তৈরি করা পৃথিবীতে রোজরাতে স্বপ্নেরা উঁকি দেয় অযাচিত সব প্রশ্ন নিয়ে, মেলেনা উত্তর। শত সাধনার প্রাপ্তিযোগের আয়নায় তাকিয়ে তখন নিজেকে খুঁজি অসম্ভব যন্ত্রণা বুকে নিয়ে। মানবীয় সত্ত্বার চিরন্তন পরিচয়ে শত শতাব্দীর কল্লোলে সামিল হয়েছে যাঁরা, নব নব আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে মরুর বুকে এনেছে সবুজ, তাঁদের সমাধির পাশে আজ একান্ত কিছু বেদনার কথা জোনাকীর আলো হয়ে প্রতিবাদ জানাতে চায় ঘোর অমাবস্যার বুকে। আমরা তখনও চেয়ে চেয়ে দেখি। পৃথিবীর এই ক্রমমুক্তির পথে আমাদের নিশ্চল নীরবতা হাহাকার করে ওঠে, চেতনার নিউরনগুলোকে করে দেয় শ্লথ। বংশ পরম্পরায় জীবনের গভীরতর অনুসন্ধান আক্ষেপের কালিমা লেপন করেই শুধু সমাপ্তিরেখা টানেনা, বীর্যের মাঝে প্রতিষ্ঠা করে যায় অসীম শূণ্যতার সরোবর। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ব্যবধানে ক্লিশে হয়ে ওঠা রীতিনীতি অমোঘ সভ্যতার আড়ালে দাঁত কেলিয়ে জানান দেয়, প্রভাতের সূর্য যথানিয়মে পশ্চিম আকাশে উঠলেও প্রতিদিন এক-ই বার্তা নিয়ে আসেনা।

অতঃপর এ ভ্রমণ জেনেছে সবটুকু সত্য বুকে নিয়ে মানুষ কখনও কখনও খুব একা হয়ে যায়। ভালোবেসে যারা একদিন শামিল হয়েছিলো জীবনের জয়গানে, সময়ের বিবর্তনে আজ তারা খসে পড়ে গেছে দূর নক্ষত্রের মতো। এই মাধবীলতার দেশে শূণ্যতায় সৃষ্ট অভিজ্ঞতা চিনিয়েছে দৃঢ় সংগ্রামের পথ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্জনের প্রয়াস আজ তাই শুধু নিছক প্রাপ্তি বলে মনে হয়না বরং প্রিয়জনদের স্বার্থপরতাই দিয়েছে নিজেকে সৃষ্টির বিশাল আকাশ। মহানায়ক হয়ে একদিন যে সত্যের সূর্যকে চিনতে শিখিয়েছিলো, এক ফালি বাঁকা চাঁদের গল্পে অমরত্বকে দেখিয়েছিলো বৃদ্ধাঙ্গুলি, তাঁর সৃষ্ট মিথ্যার পথেই হেঁটে যেতে হবে। এ আমার নীরবে মেনে নেয়া নয়, নিজেকে প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সংকল্প।

সকল বাধা উপেক্ষা করে নিজেকে নির্মাণের এই আবেদন হৃদয়ের গহীনে নাড়া দেয়। সময়ের বৈরিতায় সুপ্ত প্রতিধ্বনিগুলো তাই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে অব্যক্ত বেদনার ভারে। অলিন্দের শেষ স্পন্দনে রাষ্ট্র নামক যন্ত্রের প্রহসন বিবেকের জানালায় স্বাধীনতার অর্থ খোঁজে। দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ সময় তাই মার্কসের আলোকবর্তিকার পথে আজও নিবিড় অনুসন্ধানে ব্যস্ত। অতিআধুনিকতার আড়ালে সত্য-সুন্দর অভিনয়ের স্বৈরতান্ত্রিক স্পর্ধা শুধু বৈষম্যর আঁধারকেই ঘনীভূত করেনা, বিনাশ করে সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে প্রাপ্ত সকল নমস্য অঙ্গীকার। মুক্তির মিছিলে তাই আজ খুঁজে পেতে হবে সেইসব ফসিলের চাপা কন্ঠস্বর যাঁদের শ্রমে শাণিত হয়েছে সভ্যতার শেষ চিঠিখানি। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাঁরা গড়তে চেয়েছিলো কবিতার মতো পৃথিবী, তাঁদের রথে সারথী হয়ে পৌঁছাতে হবে প্রতিশ্র“তির গন্তব্যে।

সংস্কৃতি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা-১৫

সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে নাটক। আর সেই নাটক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে সমকাল নাট্যচক্র। ১৯৮১ সালের ২৫ শে নভেম্বর রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো সমকাল নামের এই নাট্য সংগঠনটি। চরম এক বৈরিসময়ে সমকাল তাদের পথচলা শুরু করে। সমকালের উদ্দেশ্য ছিলো শোষিত মানুষের পক্ষে আর শোষকচক্রের বিরুদ্ধে কাজ করা। গণ-মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তারা তাদের কাজ করে চলেছে। তাদের প্রদর্শিত নাটকগুলোর মধ্যে এর প্রতিফলন দেখা যায়। নাট্যচর্চার মাধ্যমে সামজিক বৈষম্যের প্রতিবাদ করে চলেছে সমকাল নাট্যচক্র। শোষিত মানুষের অধিকারের কথা এবং তাদের সচেতন করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে এ সংগঠনটি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আশা এবং সমস্যাগুলো নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরেছে তারা। গ্র“প থিয়েটারের যে আদর্শ সেই আদর্শকে সামনে রেখেই সমকাল দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছে সাফল্যের সাথে। সমকাল নাট্যচক্র পথনাটক নিয়ে বেশি কাজ করে। পথনাটকের পাশাপাশি মঞ্চনাটক নিয়েও কাজ করে সংগঠনটি।

‘নাটক শানিত হচ্ছে শোষকেরা সাবধান’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে সমকাল নাট্যচক্র। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অন্যতম একটি প্রগতিশীল নাট্য সংগঠন সমকাল। বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা পরিচালিত হয় এই নাট্য সংগঠনটি। রাকসু (রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) ভবনের নিচতলায় সমকাল তাদের সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করে। সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে প্রতিদিন বিকাল ৫:০০ থেকে শুরু হয় নাটকের মহড়া। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সমকাল নাট্যচক্র এ পর্যন্ত ৬১ টি নাটক প্রযোজনা করেছে যার মধ্যে মঞ্চনাটকের সংখ্যা ১৪টি। ১৯৮১ সালের ৮ই মে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে তাদের প্রথম মঞ্চনাটক প্রদর্শিত হয়। নাটকের নাম তথাপি সূর্য আসে নাটকটির নাট্যকার ছিলেন শ্যামল ভাদুড়ী। এই মঞ্চনাটকটির দুটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে তারা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে মঞ্চনাটক ছোট বকুলপুরের যাত্রী এই নাটকটির নাট্যরূপ দিয়েছেন সুদীপ সরকার। এটি চারবার প্রদর্শিত হয়েছে। ধ্বস নাটকটির নাট্যকার শ্যামল ভাদুড়ী এর মঞ্চায়নের সংখ্যা দশ বার। নাজিম মাহমুদ এর নাট্যরূপ দেওয়া নাটকটির নাম উজির ঘোড়ার গপ্পো এটি প্রদর্শিত হয়েছে চার বার। নবান্ন নাটকটির নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য এর মঞ্চায়নের সংখ্যা চার বার। ছাপ্পান্ন জন কুশীলব অভিনয় করে এই নাটকে। সৎ মানুষের খোঁজে নাটকটির রূপান্তর করেন আলি যাকের যা এ পর্যন্ত মঞ্চস্থ হয়েছে ছয় বার। টিটো রেদওয়ানের নাটক চক্রবূহ যার চারটি প্রদর্শনী করেছে তারা। মনোজ মিত্রের নাটক নৈশভোজ এই নাটকটির বারটি প্রদর্শনী হয়েছে। সাঁওতালদের জীবন ব্যবস্থা ও তাদের অধিকার নিয়ে সেঙ্গেল নাটকটি। সাঁওতালরা যে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত সেই বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হয়েছে এর পাশাপাশি তাদের সচেতন করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখানো হয়েছে। এর নাট্যকার টিটো রেদওয়ান। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস কবি অবলম্বনে মঞ্চনাটক কবি। নাটকে একটি যুবকের কবি রূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। সাইমন জাকারিয়ার নাট্যরূপ দেওয়া এ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে তিন বার। মঞ্চনাটক শকুন্তলা এর নাট্যরূপ দিয়েছেন সেলিম আল দীন যা প্রদর্শিত হয়েছে তিন বার। শ্রমিক অধিকার নিয়ে নাটক একটি অবাস্তব গল্প। শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যার কথা এখানে উঠে এসেছে। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকদের জীবনে যে দুঃখ নেমে আসে তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই নাটকে। শ্রমিকদের এই সমস্যা সমাজের ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জোঁক একটি ক্যাম্পাস ভিত্তিক মঞ্চনাটক। ক্যাম্পাসের বিভিন্নপ্রকার অনিয়মের বিষয় এখানে তুলে ধরেছেন নাট্যকার। ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক অবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাসহ সার্বিক বিষয় এখানে উঠে এসেছে। এইসব অনিয়মের কারণে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক রকম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। এই অনিয়মগুলো দূর করা উচিত এবং বর্তমান কিছু ব্যবস্থার আশু পরিবর্তন প্রয়োজন। এর নাট্যকার ও নির্দেশক আজমল হুদা মিঠু। মঞ্চনাটক তনয়া তাদের সর্বশেষ ৬১তম প্রযোজনা। এই নাটকটি মূলত তনয়াদের নিয়ে। সভ্যতার এই চরম ক্ষণে মানুষ এখনও লিঙ্গভেদে বিভক্ত হয়ে শুধুমাত্র মেয়ে হবার কারণে জঘন্যতম বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে আজকের মেয়েদের। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তারা বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার হয়। মেয়েদের শুধুমাত্র ভোগের বস্তু হিসাবে মনে করা হয়ে থাকে। আমরা মানুষ হিসাবে তাদের চিন্তা না করে আজও মেয়ে হিসাবেই মনে করি। আমরা কে নারী, কে পুরুষ, সেটা বড় কথা না আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা মানুষ। বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা যে জরুরি সেই কথা উঠে এসেছে এই নাটকের মধ্যে। এর নাট্যকার এবং নির্দেশক আজমল হুদা মিঠু।

এই মঞ্চনাটকগুলো ছাড়াও সমকাল নাট্যচক্র আরো ৪৭টি পথনাটকের প্রযোজনা করেছে। এই পথনাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে নাট্যকার হিরেন ভট্টাচার্য। ছত্রিশটি প্রদর্শনী হয়েছে এ পথনাটকটির। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়েছে এ নাটকে। এখানে আরো দেখানো হয়েছে যে ইতিহাসে শ্রমজীবী মানুষের কথা থাকে না এবং অনিয়মের মাত্রা বেড়ে গেলে গণজাগরণের সৃষ্টি হয়। হয়ত নয়ত নাটকটিতে দেখানো হয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্তা ব্যক্তিদের বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের চিত্র। যারা সাধারণ মানুষকে নানা উপায়ে শোষণ করে চলেছে। এই নাটকটি প্রদর্শিত হয়েছে তেত্রিশ বার এবং এর নাট্যকার রাধা রমন ঘোষ। পাগলা গারোদ নাটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কেই পাগলা গারোদ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ব¦বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পড়ানোর ব্যর্থতা এবং সেশনজটের বিষয় এখানে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতন করার জন্য এই নাটকটি। চল্লিশটি প্রদর্শনী হয়েছে এর। ইতুত নাটকটি সাঁওতালদের নিয়ে। সাঁওতালদের মধ্যে জোর পূর্বক একপ্রকারের বিয়ে প্রচলিত আছে যাকে বলা হয় ইতুত। তবে পাশ্চাত্যের আদিবাসীদের মতো অতোটা বলপূর্বক নয়। দাও ফিরিয়ে সে অরণ্যতে সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখানো হয়েছে এখানে। মহাবিদ্যাতে দেখানো হয়েছে সমাজব্যবস্থার নানা ধরনের ত্র“টি। সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত এইসব ত্র“টির কারণে। এর নাট্যকার মনোজ মিত্র এবং আটাশ বার প্রদর্শিত হয়েছে এ নাটকটি। দেশের মানুষ যখন পেট্রোল বোমার আঘাতে জর্জরিত তখন তার প্রতিবাদে বুমেরাং নাটকের সৃষ্টি। সমাজের মানুষকে সচেতন করার জন্যই এ প্রযোজনা। অশুভ শক্তির হাতে যে সমাজের মানুষ বন্দি এবং সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া একান্ত প্রয়োজনীয় সেই বিষয়গুলো নিয়ে নাটক ফোঁড়া। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক দুইটি নাটক যুদ্ধ স¦াধীনতা ও পরাধীন স্বাধীনতা। এই পথনাটকগুলো বিভিন্ন সময় প্রদর্শিত হয়েছে। শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে তারা নাটকের প্রদর্শনী করে থাকে। সমকাল পথনাটক উৎসবও করেছে বিভিন্ন নাট্য সংগঠনের অংশগ্রহণে।

সমকাল নাট্যচক্র ২০০৫ সালে দুই যুগ পূর্তি উৎসব করেছিলো ৩দিন ব্যাপী। সেই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন নাট্য সংগঠনের নাটক প্রদর্শিত হয়েছিলো। স্বনন আবৃত্তি ও গণশিল্পী সংস্থা গণ-সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলো। ‘গৌরবে সৌরভে ৩০ বছর’ এই শিরোনামে ৩০ বছর পূর্তি উৎসব করেছিলো তারা। ২০১১ সালে ৩০ বছরে পদার্পণ করে সমকাল নাট্যচক্র সেই উপলক্ষ্যে ২০১২ সালের ২২শে ও ২৩শে ফেব্র“য়ারি দুই দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে নাটক, গীতিআলেখ্য, কবির লড়াই পরিবেশনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর উৎসব পালন করে তারা। ২০১৫ সালে সমকাল নাট্যচক্র ৩৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করে।

সমকালের মাধ্যমে অনেক দক্ষ নাট্যকর্মী সৃষ্টি হয়েছে। এই দক্ষ নাট্যকর্মী সৃষ্টির জন্য সমকাল বিভিন্ন প্রকার কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। নাট্য বিষয়ক কর্মশালা, উচ্চারণ বিষয়ক কর্মশালা, সাংগঠনিক কর্মশালা। এর সাথে সাথে বিভিন্ন সময়ে পাঠচক্রের আয়োজনও করে তারা। গুণীজনদের উপস্থিতিতে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রকার কর্মশালা। পথনাটক, মঞ্চনাটককে সামনে রেখে প্রতি বছর নতুন নতুন কর্মী সংগ্রহ করে সমকাল। এই দীর্ঘ সময়ে পথ চলতে যেয়ে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে সমকালের কর্মীদের। সকল রকম প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে তারা তাদের সংগঠনের আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। তাদের এই সৃষ্টিশীল পথচলা বহমান নদীর মতো হোক। নব নব সৃষ্টির আনন্দে মেতে থাকুক সমকাল নাট্যচক্র।

গ্রন্থ ও পত্রিকা আলোচনা

সাহিত্য : সৃজনে-মননে

বইটির ডার্ক মেরুন-কালোর কম্বিনিনেশনের মাঝে সাদা-হলুদ-সবুজে দীপ্যমান ‘সাহিত্য সৃজনে মননে’ শব্দ ক’টি। তার ওপরে গোটাগোটা অক্ষরে লেখা রহমান রাজু। নতুন বইয়ের ভেতরকার পাতার গন্ধ অনেকেরই ভালোলাগে, কেউ কেউ আকৃষ্ট হন ফ্লাপে, আবার কারো কারো মুগ্ধতা অ্যাবস্ট্রাক প্রচ্ছদে, মজার বিষয় হলো বইটিতে এর প্রত্যেকটি আবেদন অবদমনের ব্যবস্থা আছে। বইটির পাঠক্রমের স্পষ্ট তিনটি বিভাজন চোখ এড়াবার মতো নয়। বিষয়কে তিনভাগে ভাগ করার প্রথম পর্বের পাঠক্রমের শিরোনামা দেখে মুক্তগদ্য অনুমান হয়, পরের পর্বে গদ্যসাহিত্য, নাটক, কবিতার গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ পাওয়া যাবে তা শিরোনামাগুলোই বলে দেয়, শেষ পর্বের আকর্ষণ, ‘কাগজবিষয়ক’ প্রবন্ধ। পেছনের সব পাতা স্কিপ করে একছুটে একেবারে একশ চৌত্রিশ পৃষ্ঠায় পৌঁছাই।

‘ঔচিত্যবিচারে সাহিত্যের কাগজ’, ‘সময়ের সাহিত্য’ মূলত সময়ের ছিদ্রগুলো আবিষ্কার করাটাও সময়েরই দায়, কেননা সময়ের ভেতর দিয়ে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে বিভ্রমের ছিদ্র পথে। তাতে রোল শোরগোল হচ্ছে কিন্তু কাজের কাজ? হচ্ছে না। আমরা কেবল গ্রহণ করেছি মেজাজ তাও সেটার ভেতর আছে যথেষ্ট মেকিপনা। কিছু একটা হচ্ছিলো তাও আগের কাগজগুলোতে (কল্লোল, কালিকলম, প্রগতি, ধূপছায়া, পরিচয়, পূর্বাশা, কবিতা…)। ‘লিটলম্যাগাজিন’ বলতে যে মেজাজ ‘যতদিন বাঁচবে ততদিন ঝাঁঝ নিয়েই বাঁচবে। মরবে তবু নতি স্বীকার করবে না।’ ব্যাপার হলো বর্তমান সময়ের ‘ম্যাগাজিন’রা বাঁচছে বহুদিন কিন্তু তাপ-উত্তাপ-প্রতাপ তো নেই সাথে সাথে ‘নিষ্ক্রিয়তা’ও নেই। করছে তাবেদারি, চাটুকারিতা আর তদবিরে চলছে পারস্পারিক জুতা পরিষ্কার পর্ব। লেখক ‘যতটা না গাঠনিক পরিচয় তার চেয়েও বেশি গুরুত্ববহ তার চারিত্রিক পরিচয়’ বলতে গিয়ে ‘লিটলম্যাগাজিন’র ‘আসল’ ব্যাখ্যা দেয়া প্রসঙ্গে নানা অনুসঙ্গ টেনেছেন। তাতে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায় গুমর, যারা আসলে ‘লিটলম্যাগাজিন’র সাথে সম্পৃক্ত তারাই এই কনসেপ্টের সাথে কতোটা হৃদয়ঘনিষ্ঠ? তাই তিনি ‘রিয়েল’ ও ‘স্টিক’ শব্দ দুটির আলাদা অর্থ করে ‘রিয়েলস্টিক’ শব্দটির অর্থ যে ‘আসলকাঠি’ নয় সেইরকম ‘লিটল’ ও ‘ম্যাগাজিন’র আলাদা অর্থ আর ‘লিটলম্যাগাজিন’র অর্থও যে এক নয়, তা বলার সফল চেষ্টা করেছেন। সম্পাদক-লেখক-পাঠক কতোটা দায়বদ্ধ এই কাগজে তা লেখকের কথায় স্পষ্ট। কতোটা খুঁতখুঁতে, মেজাজি, কোমল, ধী-সম্পন্ন যোদ্ধা এবং মনোভাব-মনন-প্রয়োগে কেমন হতে হয় তা সীমিত পরিসরে এ প্রবন্ধটি লেখকের প্রজ্ঞার পরিচয়বাহী। পাশাপাশি একটি কথা না বললেই নয় তা হলো, অল্প জানা পাঠক বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন প্রবন্ধের ভেতরকার ‘লিটলম্যাগাজিন’ কিংবা ‘লিটলম্যাগাজিন’ চোখ পড়লে। কোনটা আসলে প্রয়োগে সঠিক? এই বিবেচনায়। ছোটকাগজের ‘শিকড় থেকে শেখর’ কেমন হওয়া উচিৎ তার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে উদাহরণ স্বরূপ কণ্ঠস্বর ও চিহ্ন থেকে নেয়া দুটি অংশের ‘কিছু শব্দের’ উল্লেখ প্রবন্ধটিকে ছোটকাগজকর্মীদের জন্য অবশ্য পাঠ্য করে তুলেছে।

এবার একটু প্রথমের দিকে আসা যাক, ‘গ্রন্থপ্রসঙ্গে’ বলতে গিয়ে রহমান রাজু বলেছেন, ‘এ গ্রন্থের প্রবন্ধগুলো ছাপা হয়েছিলো বিভিন্ন দৈনিকের পাতায়—সাহিত্যের কাগজে আর গবেষণা-পত্রিকায়।’ আবার বলছেন, ‘কিছুটা আমি আর কিছুটা অন্য—এ মিলিয়ে এ গ্রন্থের ভাবনাবৃত্ত’। সুতরাং এ ব্যাপারে ধারণা করাই যায় যে, বিভিন্ন বয়সের সময়ের ফসল তাঁর এই বইটি। হয়তো প্রথম যৌবনের কিছু, দ্বিতীয় যৌবনের বাকিগুলো। তাই নানা কৌণিক দৃষ্টিকোণ বইটির মান বিবেচনায় প্রয়োগ করে পাঠ করা যথার্থ বলে অনুমেয়। ‘মানিকের জননীতে বাঙালি নারীর চিরন্তন মাতৃরূপ’- দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম শব্দ হলো ‘মা’ বা ‘মাদার’। একজন প্রগতিকামী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’র মাধ্যমে নারী ও তার মাতৃরূপ আলোচনায় আনার তাগিদে ‘মা’ নিয়ে সৃষ্টি হওয়া প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের আদ্যপান্তসাহিত্য সৃষ্টির উদঘাটন করেছেন গ্রন্থকার। যেই লেখক সমাজ ও শিল্পের দায় কাঁধে নিয়ে জীবন ও সাহিত্যকে অভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছেন তিনি নারীত্ব-মাতৃত্বকে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন তাঁর সাহিত্যে সে সম্পর্কে রহমান রাজুর বক্তব্য হলো, ‘তাঁর জননী ভালো মন্দ মেশানো এক জননীর জীবনআলেখ্য যা বাঙালি সমাজের চিরন্তন মাতৃরূপের পরিচয়বাহী’। সাহিত্য : সৃজনে-মননে গ্রন্থে যাঁদের আলোচনায় এনেছেন গ্রন্থকার তাঁরা মূলত প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ও যুদ্ধোত্তর পোঁড়খাওয়া মানুষ। সাহিত্যিকও বটে। তাই তাঁদের অভিজ্ঞতায় আছে যেমন বঞ্চনা-হতাশা-দৈন্য তেমনি তাঁদের লেখনিতে ফুটে উঠেছে যাতনার উত্তরণ, হতাশার মুক্তি, বেদনা অবসানের গান। পঁয়ত্রিশ বৎসর কলমি বুননে যার কেটেছে গল্পের সাথে সেই ‘নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পে উপেক্ষিত জনজীবন’ নিয়ে এ পর্বের আয়োজন। প্রতিনিধিত্বকারী সাহিত্যিক না হলেও বাস্তবতার উপস্থাপনে যিনি আবেগকে জলাঞ্জলি দিয়ে ‘হাতুড়ি পেটা শব্দে’ স্বসমাজের প্লটেই গল্পের অবগাহন করিয়েছেন। গল্পে উপস্থাপন করিয়েছেন জটবাঁধা গ্রামজীবনের হাঁড়ি, ডোম, মুচি বাগদি, কাহার সম্প্রদায়ের বিপর্যস্ত জীবনবাস্তবতার সাথে লড়ে যাওয়া চরিত্রগুলোকে। তাতে নিঃসন্দেহে তিনি নিজের ভেতর দিয়ে বিশ্ববাসীর হয়ে গেছেন। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পগ্রন্থের বেশকিছু গল্পের সামারাইজেশন গল্পকারকে অতি সহজে চিনিয়ে দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন গ্রন্থকার এ পর্যায়ে। সেবায় যারা মহৎ, সংগ্রামে আদিম কিন্তু প্রাত্যহিক অধিকার বঞ্চনা যাঁদের সঙ্গী তাঁদের কথা যেমন তাঁর গল্পে উঠে এসেছে তেমনি ধনীক শ্রেণির সহনশীলতার মনোভাব জাগরুকতাও তাঁর গল্পের অন্যতম মোটিভ। যিনি সার্কাসের পারফর্মার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার প্রাণান্তকর অবস্থার সৃষ্টি হলেও দর্শকের তালির মাত্রা বজায় রাখতে তার কাজ চালিয়ে যেতেই হয় অগত্যা কিন্তু ‘যার ব্যথা সেই বোঝে’ গোছের চরিত্র যাঁর লেখায় স্থান পায় এমন লেখক যাঁকে ব্যঙ্গসাহিত্য রচয়িতা বলাই যৌক্তিক তিনি তেমনি একজন লেখক যাঁর কলমের ডগায় ‘যেনো সমাজবিজ্ঞানীর লেন্সে ধৃত সাহিত্যরূপায়ণ তাঁর’, আবুল মনসুর আহমদ তেমনি একজন লেখক। পাঠক্রমে ‘আয়নায় সময় ও সমাজের ব্যঙ্গচ্ছবি’ থাকলেও প্রবন্ধ শুরুর আগে শিরোনামায় দেখি ‘আবুল মনসুর আহমদের আয়না : সময় ও সমাজের ব্যঙ্গচ্ছবি’ দিয়ে গ্রন্থকার আবুল মনসুর আহমদের শৈশবের পুঁথিপাঠ শ্রবণ থেকে কীভাবে পারিবারিকভাবে মুসলিম মিথের সাথে পরিচয় ঘটে সেই কথা ফুটে উঠেছে। লেখকের জীবনের খুঁটিনাটি বর্ণনা লেখকের লেখার পাল্স বুঝতে অপার সহায়ক। পরবর্তীতে প্রসঙ্গক্রমে আবুল কালাম শামসুদ্্দীনকে উৎসর্গিত ও ‘আয়নার ফ্রেম’ নাম দিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ভূমিকার আয়না নামক গল্পগ্রন্থের নানা গল্প নিয়ে আবুল মনসুর আহমদের চিন্তার প্রগাঢ়তা, সমাজ বাস্তবতায় ধর্ম যে কিছু মানুষকে সময় থেকে পিছিয়ে রাখছে, ধর্ম নিয়ে ব্যবসায়ী কিছু মানুষের ফায়দালোটার কথা নির্মলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। গল্পের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, এই উপমহাদেশে হয়তো ‘থিয়েটার পাড়ার লোকদের সাথে লড়াই করা যায় কিন্তু এই বাংলাদেশে বসে ঠাকুরের মহিমার সঙ্গে লড়াই করা যায় না’। তাতে তাঁর গল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন সুবিদাবাদী একদল মানুষকে চিনতে পারে সমাজ অপর পক্ষে সচেতন মানুষের করণীয় কাজটি ঠিকঠাক বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন আবুল মনসুর আহমদ। আর এক্ষেত্রে নানা গ্রন্থ ঘেটে তাঁকে সহজ করে সামাজিক-রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক  করে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন গ্রন্থকার। বাঙালি জাতীয়তাবাদী যুক্তিনির্ভর সত্য প্রকাশে অকুণ্ঠ কণ্ঠস্বর আবদুল হক। ‘আবদুল হকের বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে’— বলতে গিয়ে সিকান্্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত আবদুল হকের প্রবন্ধের কথা উঠে আসে। যাতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও বাঙলায় তার প্রভাব বিস্তারে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়া, পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলাদেশ’ রাখার প্রতিবাদে আবদুল হকের যুক্তিযুক্ত লিখনী প্রতিবাদ, চেতনাহীন বাঙালিকে বাঙালি মুসলমান বোঝানো প্রসঙ্গে ‘ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেই’ তার প্রসঙ্গ টেনেছেন। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মধ্যবিত্তের আর মুসলিম সংস্কৃতি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক গণ্ডিতে বৃত্তাবদ্ধ ‘বাঙালি মুসলমান’ যে নিজেকে মুসলমান মনে করেছে, বাঙালি মনে করেনি তার তীব্র যুক্তিনিষ্ঠতা প্রকাশ পেয়েছে তার লেখায়। বাঙালিকে ‘বাঙালি মুসলমান’র বোধ জাগাতে তিনি বিভিন্ন সময়ের নানা পত্রিকায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লিখনী নিয়ে হাজির হয়েছেন তাতে বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত গোষ্ঠীর টনক নড়েছে সাতচল্লিশ, বায়ান্ন, ছেষট্টি ছাড়াও সংকটকালীন সময়ে। বাংলার ইতিহাসের টার্নিং রাইটার আবদুল হক, এ প্রবন্ধের আলোচ্য। ‘আবদুল্লাহ আল মামুনের নাটকে শান্তির প্রত্যাশা’- প্রবন্ধে দেশভাগের পর বাঙালির মাতৃভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র, ছাত্র আন্দোলনের তোপের মুখে সমঝোতার টালবাহানা, মুক্তিযুদ্ধের মতো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জয়লাভ বাঙালি জাতির ইতিহাসের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে, অমলিন থাকবে চিরকাল। তবে, ‘প্রাপ্তির অধিক অবক্ষয় প্রাধান্য পায়। প্রাপ্তিটাই হয়ে ওঠে প্রশ্নবিদ্ধ’। ঠিক সেরকমই তাঁর নাটকগুলোতে উঠে এসেছে তৎকালীন সময় ও সময়ের প্রেক্ষাপট। যাতে সুবচন নির্বাসনে, ক্রীতদাস, তোমরাই, কোকিলারা, মাইক মাস্টার, শান্তি নামক নাটকগুলোতে রূপকের আড়ালে সমাজের তৎকালীন অবস্থা যেমন উঠে এসেছে তেমনি বর্তমান সময়েরও দর্পণ হয়ে ভূগোলের সাথে মিশে আছে। ফলত তাঁর নাটকগুলোর প্রতীয়মান বিষয় খুবই স্পষ্ট যে, স্বাধীনতার জন্য লক্ষ প্রাণ আর সম্ভ্রম আমরা সম্প্রদান করেছি তার মূল্য আমরা কীভাবে দিচ্ছি, কাক্সিক্ষত শান্তি আজ নির্বাসনে নয় কী! একুশ শতকের একুশ বছর বয়সের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এ পর্যায়ে আলোচ্য। ‘যুগান্তরের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য’— যাঁকে কিশোর কবি, জনমনের কবি, জনজীবনের কবি, শ্রেণিচেতনার কবি, শ্রমজীবী মানুষের কবি, যুদ্ধ কবি, বিপ্লবী কবি বলা নিয়ে নানান সমীহের ব্যাপার জড়িত। হয়তো অল্প বয়সে সাহিত্যে অনেক বেশি কিছু দিয়ে গেলেন বলে কিংবা তাঁর সাহিত্য সাহিত্যের জন্য দরকারি হয়ে উঠেছে বলে, তিনি একটু বেশি কদর পাবার যোগ্য। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াবস্থায় সঞ্চয় হাতে লিখে সম্পাদনা করা থেকে সপ্তমিকা প্রকাশ অথবা পঞ্চাশের মন্বন্তরে কিংবা ফ্যাসিস্ট আক্রমণের বিরুদ্ধে নানা কর্মসূচি পালনে রাজনীতির পাশাপাশি ‘কবি’সত্তায় যাপন করা জীবনের বেশির ভাগ অংশের নিখুঁত উপস্থাপন ঘটিয়েছেন রহমান রাজু। যেখানে সাহসী কবি নিষ্পাপ শিশুর মতো পথ অতিক্রম করে চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। প্রবন্ধগুলোর কোনোটিতে ‘তথ্যবুটিকা’ দেয়া আছে আবার কোনোটিতে নেই। কৌতূহলী পাঠকের জন্য কিছু সুবিধা হয়েছে এ ব্যাপারে। তবে প্রত্যেক প্রবন্ধের শেষটা কেমন যেনো ফরমায়েশি পরিসমাপ্তি। ঠিক ভিন্ন বিষয়ে একই পাঠ যেমন।

‘নস্টালজিয়া’— শব্দটির অর্থ কতো আকারে-প্রকারে উপস্থাপিত হলে একজন মানুষ স্বপ্রণোদিত নস্টালজিক হতে পারে তা এই মুক্তগদ্যটি না পড়লে বোঝা মুশকিল। নস্টালজিয়া মানুষের ভেতর কিভাবে জিইয়ে থাকে এবং তা সাহিত্যে স্থান পায় আবার তা অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে তার আদ্যোপান্ত এখানে উপস্থাপিত নানা উদাহরণ সহকারে। ‘নস্টালজিয়া আমার আমিকে খুঁজে পাওয়া’— গদ্যে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে কেনো নস্টালজিয়া ‘অনিবার্য’ হয়ে ওঠেনি এ ব্যাপারে কুয়াশাচ্ছন্ন ঘোরটি পরিষ্কার করেন নি লেখক। উদাহরণে এসেছে পাশ্চাত্যের কবি-সাহিত্যিক এবং শেষে ‘একাত্তরের চিঠি’কে লেখা ‘চিঠি’ বাংলাদেশের ইতিহাসের নৃসংশতা আমাদের ‘নস্টালজিক’ করে তোলে। ‘আকাশে উড়িয়া যায় কিশোরমনঘুড়ি—’তে কতো যে ওড়াওড়ি শৈশব-কৈশরে। কতো স্বপ্ন, বুকপকেটে জোনাক পোকা রেখে বারবার দেখার মতো করে শুরুর ‘নস্টালজিক’ গদ্যটিকে প্রারম্ভ গণ্য করলে এই গদ্যকে বিস্তার মানতে হয়। শৈশবে ঘুড়িকে নিজের আয়ত্বে আনার কৌশল থেকে নেয়া জীবনঘেষা শিক্ষা, একসময় পারিবারিক প্রনোদনায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইতে চাইতে অন্য আরেক পেশায় যুক্ত হয়ে যাপন করা জীবনেও যে বলিষ্ঠ গীতা রাণীর স্মৃতি ‘যে ঘুড়ি ঘুরিয়া ঘুরিয়া জীবন ঘিরিয়া ঘরে’র বাইরে যেতে পারে না সেই স্মৃতিচারক দেশের ইস্টিয়ারিং ধরার নানা অসঙ্গতির প্রকাশ করে যায় অবলীলায় শেষাবধি। ‘ঘামের ভেতর নোনাস্বাদ পাই তৃতীয়বার। সমুদ্র স্নানে পাই শেষবার। জীবনের সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজি স্বাদ বিবেচনায় শ্রমে অথবা  দুঃখে। নুনের মতো ভালোবাসার নতুন গল্প হয় সমুদ্র আমার! নোনাজলি ভালোবাসা’। বয়সের একটি অধ্যায় যা প্রত্যেক মানুষের শেষ জীবন কিংবা ব্যস্ততার জগতে অবসর যাপনের খোরাক হয়, আনন্দ দেয়, খানিক উচ্ছ্বাসে মনকে লম্ফ-ঝম্ফ করায়, বেদনার জারক উৎপন্ন করে, পোঁড়ায়, সুখও দেয়। শেষে এও বলতে হয়, ‘জগৎ সংসারে মিছেসব করে বালুঘর নির্মাণে স্বপ্ন জাগে। ভাঙবে আবার গড়বে। কখনো বৃত্তাবর্তে কখনো ত্রিকোণোমিতিতে অথবা বিপ্রতীপে নয়তো সমান্তরালে।’ কতো আকারে-প্রকারে একজন মানুষ ইচ্ছেদহন গ্রহণ করতে পারেন, কতোটা নস্টালজিক না হলে এই বর্ণনা লেখায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় আবার পড়েও ঠিকঠাক বলে প্রকাশের মাধ্যমে অন্যকে বোঝানো কতোটা কষ্টের তা আসলে এই গদ্যটি না পড়লে বলা অসম্ভব। এসব নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘সমুদ্র আমার! নোনাজলি ভালোবাসার জ্যামিতি!’ ‘গল্প নিয়ে স্বল্পকথা’য় গল্প নিয়ে বেড়ে ওঠা জীবনের একটি মানব জীবনের স্মৃতি হাতরানোর বর্ণনা ফুটে ওঠার সাথে সাথে ছোটগল্প নিয়ে কাকে বলে, কীরকম হওয়া উচিৎ, প্লট কেমন, চরিত্রই বা কী, ভাষা, সমাপ্তি নিয়ে অনেকের মতামত যেমন উল্লেখ করেছেন তেমনি ‘কী বলছি তারও অধিক সত্য হলো কীভাবে বলছি। গল্প হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই কীভাবেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবের মধ্যে নির্মেদ ব্যাপারটি ভেবে দেখবার। গল্পে অনাকাক্সিক্ষত বয়ানে মেদ বাড়িয়ে বেঢপ করে তুলবার কী খুব প্রয়োজন আছে। বরং ঈশ্বরভবন থেকে নেমে আসা ঐশ্বরিয়ার মতো সৌন্দর্যমুদ্রাযুক্ত নির্মেদ গল্প নিশ্চয় পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে।’ -এই গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটির উল্লেখ করেছেন। সেটুকু ভেবে দেখবার। তবে এই অংশটুকু কিছুটা মুক্তগদ্য বাকিটা প্রবন্ধ বা কিছুটা প্রবন্ধ বাকিটা গদ্য, এ অংশের প্রথম ‘নস্টালজিয়া’র বর্ণনার গদ্যের মতো। মুক্তগদ্য নাকি অন্যকিছু!

সচেতন পাঠকমাত্রই কিছু ভুল বানানকে চোখে সঠিক ভেবে পাঠে মনোনিবেশ করে, মূলত ভুল ভুলে মূল পাঠে মনোযোগ দেয়। কিন্তু এই ভুল যদি মাত্রাতিরিক্ত হয় তবে অগত্যা বিরক্তি আসে। সচেতনতার অভাবে ‘সেনসিটিভ’ (আবদুল্লাহ আল মামুন, কল্লোল… এর মতো) কিছু বানানের ভুল, সাহিত্যমোদী খুঁতখুঁতে পাঠককে পীড়া দেয় নিশ্চয়। ইলেক বা লোপ চিহ্নের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ব্যবহার না করলেও বিভিন্নমুখী সাহিত্যের সন্নিবেশ গ্রন্থটিকে মৌলিকত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। উপরন্তু গ্রন্থটির বিষয়গুলো পাঠকের রজ্জুতে শীতল নি¤œগামী পরশ বইয়ে দিতে সক্ষম শরীরের বিন্দু-বিসর্গতক।
দীপ্ত উদাস

সবুজ আগাছা কিছু

বাংলা ছোটগল্পের সফল নির্মাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; এ কথা মেনে নিয়েও গল্পভাবুকেরা গল্পের মূলকে গুহা-মানবের সময়কালে নিয়ে দাঁড় করান। তাঁদের মতে মানুষ যখন ভাষা আয়ত্ব করতে পারে নি তখন তারা ইঙ্গিতে গল্পরস আস্বাদন ও বিতরণ করতো। তবে আদিম মানুষের বলা সেই গল্প সময় সন্তরণে আজকের যে রূপ পরিগ্রহ করেছে তা একবারেই সে সময়ের সঙ্গে মেলে না। যেহেতু বদলে যাওয়াই সময় ও অস্তিত্বের ধর্ম তাই বদলের ধারায় আজকের দিনের যে গল্প তা এতো বেশি জীবন অনুসঙ্গী এবং বুননে-বিষয়ে জটিল যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ অসাধ্য হয়ে পড়ে। অথবা মুহূর্তের অমনোযোগিতা পাঠককে মূল বিষয় থেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে যে পূর্ববর্তী পঠনশ্রম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অথবা মধ্যবর্তী কালপরিক্রমা এবং মধ্যবর্তী সময়ের গল্পের সাথে পাঠকের পরিচয় না থাকলে সেকাল-একালের মধ্যে ঠিক যোগসূত্রতা রক্ষা হয় না। ফলে গল্পরস আস্বাদন যথার্থ হয়ে ওঠে না। ইতিবাচক করে বললে বলতে হয় এ সময়ের গল্প কেবল নিবিষ্ট ও মেধাবী পাঠকের রসের আধার।

এমনি নিবিষ্ট পাঠকের গল্প সবুজ আগাছা কিছু গ্রন্থের গল্পগুলো। গল্পকার বিনয় করে এগুলোকে আগাছা বললেও এ গ্রন্থের গল্পগুলো বাঙালি জীবনের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতার স্বচ্ছ প্রতিনিধিত্ব করছে। গ্রন্থের চারটি গল্পে প্রতিভাত হয়েছে গল্পকারের সমাজ-দৃষ্টির বহুকৌণিক মনস্কতা। সমাজে ঘটে যাওয়া নানান কুসংস্কার ও মুক্তিযুদ্ধের মতো বাস্তবতার কথা তিনি বলেন নিবিড় মমতায়; গভীর অন্তরদৃষ্টি ও বর্ণনার পারঙ্গমতায় কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারে না। বরং কখনো কখনো বর্ণনার অতিকথন গল্পদেহে ক্লান্তির সৃষ্টি করে; ব্যত্যয় ঘটে গল্পের গতিময়তায়। গল্পগ্রন্থে সন্নিবেশিত চারটি গল্পের মধ্যে তিনটি গল্পই অবয়বে বেশ বড়। তাই একটানে পড়ে ফেলা কিংবা হঠাৎ করে শুরু হয়ে হঠাৎ শেষ হওয়ার মতো ঘটনা বা গল্পের একমুখি টান এ গল্পগুলোর ক্ষেত্রে ঘটে না। আর গল্পের বিষয় নির্বাচন করার ক্ষেত্রে গল্পকার সত্তর পরবর্তী বাংলাদেশকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘অপ্রতিবিম্বিত ছবি’ এক শ্রেণির ভণ্ড ধর্ম ব্যবসায়ীর সমাজের ভিতরে অন্যায়-চর্চার কথা আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। ধর্মীয় শিক্ষা প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে ঘটে চলে নিরন্তর অন্যায় ও ব্যভিচার। আর ধর্মের রক্ষক তৈরির নামে নৃশংস মনুষ্যত্বহীন মানুষ গড়ার অপচেষ্টার যে প্রয়াস এক শ্রেণির মানুষরূপী ঘাতকের মধ্যে বিদ্যমান তার নিখুঁত চিত্র আঁকেন গল্পকার এ গল্পে। গল্পের প্রধান চরিত্র গেন্দা। তার বাবার অন্তিম ইচ্ছে অনুযায়ী ‘পাখিডুবি কওমি মাদ্রাসা’য় ভর্তি করে তার মা। গেন্দা নামকরণে তার সামাজিক স্ট্যাটাস মূর্ত হয়ে ওঠে; সে এক অন্ত্যজ-নিরীহ ও নির্যাতিত সমাজের স্মারক। আর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘পাখিডুবি’ গেন্দার মতো পাখিদের জীবন-সমুদ্রে চিরতরে ডুবিয়ে দেয়ায় পাঠককে অশ্র“সিক্ত ভাবনার জগতে নিয়ে যায়। চরিত্রের নামকরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা পদ্ধতি-পরিবেশ পরিচয় করানোর মধ্যদিয়ে গল্পকার গভীর সমাজমনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রচলিত বহুধারার শিক্ষাব্যবস্থার সবই যে মানুষ গড়ার কারখানা নয়; বরং উল্টোচিত্র বিদ্যমান তা গল্পকার বলেন অত্যন্ত সাহসের সাথে। গল্পে উল্লেখিত মার্কা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান থেকে শুরু করে সমস্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে লুণ্ঠনবৃত্তি ও সমকামীতার মতো অনৈতিক চর্চা এবং নবীন শিক্ষার্থীকে অনৈতিক পথে প্রলুব্ধ করার ক্ষেত্রে বেহেস্ত লাভের লালসা সৃষ্টি এবং শহীদ হওয়ার মতো গৌরবের ঘুমপাড়ানী গান শুনানো হয়। পুরো গল্প জুড়ে এসব বর্ণনার ক্ষেত্রে গল্পকারের বিশ্বস্ততা ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রমাণ পাওয়া যায় :

আব্বার ইচ্ছে পূরণ করিবার লাইগে তুমি আমারে মাদ্রাসায় পাডাইলা।… আমার দিক কেমুন কইরে তাকায় সবাই! এইখানের বেবাকেই যেন কীবা!… বাড়ি থেকে আসার সাথেই আমারে যি ১২৪০/= দিয়ে দিছিলা হুজুর নিয়া নিছে। এক ট্যাকাও আমারে দিল না। জান আম্মা, ঠিকমুতন খাবারও দেয় না- দিনে দেড়বার কি দুইবার। নঙ্গরখানায় মাটির কাদা হাতে ফকিরের নাহাল লাইন ধরন নাগে। আমি খাবার চাইতে পরি না, শরম লাগে। যাও দেয়, অন্য ছাত্ররা তার আদ্দেকই আবার কাইড়ে নেয়।… আম্মাগো, মুনে কয় যেন জেলখানাত বন্দি আছি।… ৩০-৩৫ হাতের ঐটুকু ঘরের মদ্যে পরায় ১০০ জুন ছাত্রের থাকা খাওয়া।…

আমার শরীলে আন্ধারে এডা হাত যেনবর খালি বিড়বিড় করে, আমি একটু ঘুমান ধরলেই। আমি ঘুমাইতে পারি না। কয়ডা বড় বড় ছাত্র আছে। আমার খারাপ সন্দেহ লাগে। আমার দম বন্ধ অয়ে যায়। (পৃ. ১৪-১৫)

গল্পের শুরুতে গল্পকার তাঁর মনোজগতে ঘটে যাওয়া প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। যে প্রতিক্রিয়ার উৎস একবিংশ শতকের প্রথম দশকের বাংলাদেশ। তবে এ বাস্তবতা নিত্যদিন চলমান। গল্পের শুরু মাকে লেখা সন্তানের পত্রের মাধ্যমে। চিঠির আদলে লেখা এ গল্পে প্রত্যেক চিঠির সময়কাল উল্লিখিত। ফলে গল্পের সময়বাস্তবতার দিকে আলোকপাত করতে আমাদের অধিক ভাবতে হয় না। বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকার ঘরে কথকের সামনে যা ঘটে চলে তা আসলে উল্লিখিত সময়পর্বেরই ব্যথাদীর্ণ শৈল্পিক প্রকাশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা শিশু-কিশোর নির্যাতনের এ এক চিরচেনা চিত্র। সেইসঙ্গে শিশু-কিশোর বয়সেই বোধের গতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে বোধহীন বিবেকহীন যে যন্ত্র নির্মাণ করে এসব প্রতিষ্ঠানের কারিগরেরা তারা পরবর্তীতে সংখ্যাবৃদ্ধিতে নিয়োজিত থাকে। ফলে অশুভের চাষ চলে নিরন্তর চক্রাকারে :

আমাদের প্রেরণা সৈয়দ আহমেদ বেরেলভীর ঐতিহাসিক বাণী : যদি কোনো ব্যক্তি তামাম দিন রোযা রাখে, তামাম রাত ইবাদতে অতিবাহিত করে; এমনকি নফল পড়তে পড়তে পা ফুলে যায় এবং অপর এক ব্যক্তি জিহাদের সংকল্প নিয়ে দিনে বা রাতে এক ঘণ্টা কাল বারুদ পোড়ায়, যাতে কাফিরের মোকাবেলা করতে গিয়ে, বন্দুক চালাতে গিয়ে তার চোখ একটুও না কাঁপে, সেরূপ ক্ষেত্রে সেই আবেদ কখনো এ মুজাহিদের মর্যাদায় পৌঁছাতে পারবে না। (পৃ. ৩১)

বোধের এই শিক্ষা গেন্দাকে নিরন্তর ভাবিত করে। শহীদের পর্যায়ে পৌঁছানোর ব্যর্থতা তাকে নিরন্তর মানসিক পীড়া দিতে থাকে। এক সময়ে তার মনে হয় বিধবা মায়ের অসংযমী চলাফেরা ও আচরণ তাকে শহীদের স্বাদ গ্রহণ থেকে বিরত রাখছে। সে মাকে ত্যাগ করে জিহাদের পথে নিজেকে সমর্পণ করে। কিন্তু ইপ্সিত লক্ষ্যে যেনো কিছুতেই পৌঁছানো হয়ে ওঠে না। সে হতাশায়-ব্যর্থতায় ছটফট করতে থাকে। সে এতোদিনের অসংযমী আচরণে দৈহিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। জিহাদী ট্রেনিং নিতে তাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে :

অথচ আমার কি হলো! আমি আজও মরদে মুজাহিদের যথার্থ ট্রেনিং গ্রহণ করতে সক্ষম হলাম না। অস্ত্রহাতে আমার নিশানা একদমই ঠিক হয় না, হাত কাঁপে থরথর! বারুদ পুড়িয়ে শক্তিশালী বোমা বানাতেও আমি সিদ্ধহস্ত নই। জিহাদের কঠিন প্রশিক্ষণ নিতে গেলেই অসুস্থ হয়ে পড়ি। এহেন জিন্দেগি তো আমি চাই না। আমি আমার অসহায় মুসলিম ভাইদের জন্য কিছু করতে ব্যাকুল আছি। কিন্তু কি সেই সহজ পথ বাতিলকে খতমের এবং নিজে নিশ্চিত শহীদ হবার। আমি জানি না! আমার মন বিষণœতায় ছেয়ে আছে এবং ছেয়ে থাকে সারাক্ষণ। (পৃ. ৩১)

জীবন সম্পর্কে এমনি ভ্রান্ত ধারণা লাভের পর এক কিশোর মৃত্যুর কোলে শায়িত হয়। তার অপমৃত্যুর এই বেদনা লেখকের চিত্তকে ব্যাকুল করে তোলে আর তাই মৃত্যুর পর তার ছায়াউপস্থিতি আসলে লেখকচিত্তেরই প্রকাশ। এক রক্তাক্ত কিশোরের আত্মা ছুঁয়ে যায় লেখককে; তাঁকেও রক্তাক্ত করে। তাই লেখকের আত্মকথন ‘আমার চোখ, আমার পোশাক, আমার আপাদ-মস্তক, আমার বিছানা তাজা রক্তে ভেজা! রক্তভেজা চেটচেটে বিছানায় খোলাচোখে সারারাত পড়ে রইলাম! একফোঁটা ঘুমও কি আমার আর হলো; কখনো হবে না?’…

পুনশ্চ: এই গল্পে উল্লিখিত একটি বর্ণও বানোয়াট কিংবা অসত্য নয়। বিশ্বাস করেন বা নাই করেন, মানুষ কি কিছু বানাতে পারে; কখনো!

গ্রন্থের দ্বিতীয় গল্প ‘পথ দেখানো পথিক’ অবয়বে দীর্ঘ। মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে এ গল্পে। পরিণতির দিক থেকে গল্পবয়ান শুরু করেন গল্পকার। ফলে গল্প হয় নস্টালজিক। দুই প্রজন্মের জীবনেতিহাসের বর্ণনায় গল্প গড়ে উঠেছে। দুই প্রজন্মকে একসুতোয় বাঁধতে গিয়ে গল্প তার স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে। বর্ণনার অতিবচন কখনো কখনো বিরক্তির উদ্রেক ঘটালেও গল্পে কাব্য অনুসঙ্গের ব্যবহার ও নাট্য আবহ তৈরির মাধ্যমে গল্পকার সহজেই এ সীমাবদ্ধতাকে উতরিয়ে যান। নাট্য আবহ গল্পদেহে আবরণ সৃষ্টি করে। ফলে গল্পপাঠে আকাক্সক্ষার সৃষ্টি হয়। পাঠক মনে করে এই বুঝি গল্পের জট খুলবে কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না; গল্প-পাঠ এগিয়ে যায় শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। পাঠককে জ্যা-বদ্ধ ধনুকে আটকে রেখে গল্প পাঠে বাধ্য করার ক্ষেত্রে গল্পকারের মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে রূপকল্প রচনার ক্ষেত্রেও পারঙ্গমতার পরিচয় লক্ষণীয় :

আমরা ঝাঁঝালো রোদ থেকে ঘরে প্রবেশ করেছি। সুতরাং আমাদের মনে হবে ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর। কোথাও কিছু দেখতে পাব না। কিছু অপেক্ষা শেষে চোখ অভ্যস্ত হয়ে উঠলে দেখব- ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিমকোণ হতে একটি হাতল চেয়ার টেনে যুবকের দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন শেখ আয়াতউল্লাহ। ঘাড়ের গামছায় পাকা পিতরাজ কাঠের চেয়ার মুছতে মুছতে সরল স্বীকারোক্তি করেন (পৃ. ৫১)…

বাবাজী শহরে তাইলে হাছাই খানসেনারা ঢুকছে? যুদ্ধ কি তাইলে নাগলই!

যুবক এবার উত্তেজিত। সে উঠে শিনা টান করে দাঁড়ায়। চোখ তার জ্বলন্ত আঙরার মত টকটকে হয়ে উঠলেও সম্ভবত কিছু দেখতে পায় না। আন্ধারে হাতরাতে থাকে। এবং হাতরিয়ে অন্ধের লাঠি পায় যেন। যুবক শেখ আয়াতউল্লার হাত চেপে ধরে অকষ্মাৎ শক্ত করে।… বাতাসের তোড়ে ঘর মড়মড় করে, দোলে উঠে। এই বুঝি ভাঙে। ঘর জুড়ে আঁধার। ছয় দুগুণে বারটি ভয়ার্ত চোখ ছাড়া কিছু দেখা যায় না। ঝড় শুরু হয়ে গেছে, কালবোশেখী ঝড়। ঝড়ের তাণ্ডবের ভিতর কে যেন ডুকরে কেঁদে উঠে। ডুকরে ডুকরে কাঁদে। আমরা ঝড় ও কাঁন্নার শব্দ শুনি। (পৃ. ৫৩)

এ ঝড় ও কান্না যুদ্ধের অনিবার্যতা আর ভয়াবহতা প্রকাশ করে। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দুই মায়ের দুই সন্তান খায়রুল আর ফকির। প্রকৃতি বিচারে তাদের মায়ের কোল শূন্য করে যুদ্ধে যোগদান;- মাতৃস্নেহবঞ্চিত সকল মুক্তিযোদ্ধার প্রতিনিধিত্ব প্রকাশক। আর তাদের মায়ের হাতে সযতেœ বড়ো করা লাউগাছ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী খায়রুল আর ফকিরের পরিচায়ক। লাউয়ের ডগার মতো তারা ‘পথ দেখানো পথিক’। আবার লাউগাছের ফলবান হয়ে ওঠার ভাবনা এই দুই যোদ্ধার মাধ্যমে মুক্তিলাভের সম্ভাবনার দ্যোতক; এই মুক্তিকামীতার পরিচর্যা করছে এ গল্পের গৃহকর্ত্রী। তিনি নিজের সন্তান যুদ্ধে পাঠিয়ে প্রতিবেশীর নানা প্রশ্ন, সন্দেহ আর কূটকৌশল পাশ কাটিয়ে নিজের বাড়ির বিজন স্থানে আশ্রয় দেন একদল মুক্তিযোদ্ধাকে। একদিকে নিজেদের সংবৎসরের কথা না ভেবে অপর দিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ সকল মুক্তিযোদ্ধার অন্নের ব্যবস্থা করা এবং খানসেনা নিধনে তাদের পরিকল্পনার অংশ হওয়ার মাধ্যমে তিনি সার্বজনীন মাতা হয়ে যান। ফলে গল্পের সমস্ত চিত্রকে ছাপিয়ে গৃহকর্ত্রী এবং গৃহকর্ত্রীর হাতে লাগানো লাউগাছ বিষয়ক ভাবনাই পাঠকের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। আর এ কারণেই লাউ গাছের জৈবিক বৃদ্ধির রূপক পাঠককে ভাবিত করে;- সমরাস্ত্র সজ্জিত খান সেনাদের বিপক্ষে আমাদের বিজয় মিলবে তো?

হয়ে ওঠা পরিণত বয়সী লাউগাছে দুধসাদা ফুলের দেখা মিললেও পাওয়া যায় না ফলের পূর্বাভাস। যদিবা পাওয়া গেলো ফলবতী হবার লক্ষণ, উৎকণ্ঠা বাড়ায় তা আরও। ফলের আকার পেয়ে ওঠা ভ্রুণ অগ্রে ফোটা ফুলেল স্তনের সবুজ রগ দিয়ে দুধ টেনে টেনে পুষ্ট হতে পারবে তো। পুষ্ট হবার আগেই আসবে কি মড়ক-কীটের আক্রমণ? সইতে পারবে তো, যদি আসে!

অবশেষে এক রাতে, রাতভর বৃষ্টির পর সব সন্দেহের অবসান ঘটে। বৃষ্টি প্রকৃতি প্রদত্ত জল পতন নয়; যুদ্ধে শত্র“পক্ষ হটাতে মনুষ্যসৃষ্ট গুলি বিনিময়ের আবহ।… এমতাবস্থায় গাছে আর পরিস্ফুট হয় না নতুন ফলের সম্ভাবনা। গাছের ডগা, পাতা কুঁকড়ে আসে, স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা হারায়। ধুলি মলিন হয়। অথচ গৃহকর্ত্রী মেয়ের সাহায্যে নিয়মিত পরিচর্যা দেয় গাছে। তার তখন একটাই আশা:… তার বাড়িতে সবজির বাগান হবে, আঙ্গিনা-মন ভরে উঠবে শীতল-সবুজ সমারোহে। (পৃ. ৪৭)

গৃহকর্ত্রীর এমন আশাবাদ প্রকাশ করেও লেখক তৃপ্ত হতে পারে না ফলে তিনি অজান্তে গল্পের চরিত্র হয়ে যান। আর সুপ্ত বাসনার কথা পাঠক সমক্ষে তুলে ধরেন কৈফিয়তের ভঙ্গিমায়। তিনি পরোক্ষে বাঙালির অতীত আশা-ভঙ্গের কথা স্মরণ করেন। সাতচল্লিশের ভারত বিভাজনে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিলো তা এই ভূ-খণ্ডের মানুষকে স্থায়ী শান্তি দিতে পারেনি। বরং অল্প দিনের ব্যবধানে শোষণ আর ত্রাসণের যে বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছিলো তা এই বঙ্গের মানুষকে রক্তাক্ত করে;— দেহে-অন্তরে। সেই বাস্তবতার ইতিহাস পাঠ এ কালের মানুষকেও শিহরিত ও প্রতিবাদী করে। আর শিল্পী মানসকে তা করে আরো বিচিত্র ব্যঞ্জনায়। ফলে এ সময়ের মানুষ হয়েও গল্পকার শঙ্কিত হন। আর তাই মুক্তিযুদ্ধের মহান প্রেক্ষাপটে দেশীয় কুচক্রী মহল আর পাকিস্তানি অস্ত্রধারীদের ভয়াবহতা বিবেচনায় পুনর্বার আশা ভঙ্গের আশঙ্কায় শঙ্কিত হন গল্পকার। আর তার অতীতচারণ হয় লাউগাছের মতো অতি সংবেদন, কোমল অথচ আশা জাগানিয়া মাথা উঁচু করা লতার রূপকে :

আমাদের সন্দেহ হবে- লাউগাছ শুধুমাত্র লাউগাছ নয়। বস্তুত কোন স্বপ্নের নাম ও বাস্তব চিহ্ন। যা নস্যাৎ করতে অলক্ষ্যে সার্বক্ষণিক তৎপরতা ছিল দৃশ্যের ভিতর ও বাইরে। লালিত স্বপ্ন বাস্তব আকার লাভ করল অথচ স্বাপ্নিক ফল ভোগ করতে পারল না;… আমাদের কৌতুহল গৃহকর্ত্রীর ছেলে ও তার ফিরে আসা না আসার সাথে লাউগাছের কার্যকারণ সম্পর্ক; সর্বোপরি একটি স্বপ্ন কিংবা লাউগাছ কী প্রক্রিয়ায় ভূ-দুনিয়ায় মাথা তুলে দাঁড়ায়- সামনে রেখে এগোতে চাইবে। যা আমাদের প্রেরণা হয়ে উঠবে অস্বস্তিকর সময় মোকাবেলা করবার। (পৃ. ৪৮)

গল্পের ভিতরে গল্প। অনেকগুলো উপাধ্যায়ে বিন্যস্ত এ গল্পে গল্পকার ইঙ্গিতে গল্পের প্রান্ত সীমায় গিয়ে স্থিত হন। গল্পের শেষ লাইন— ‘এবং সুরু ফল পেতে অনুসন্ধিৎসু হয় আবার….।’ সুরু এ গল্পে তিন বছরের নিষ্পাপ শিশু। তার ফলাকাক্সক্ষা আর লাউগাছের বেড়ে ওঠা একই সুতোয় গাঁথা একই সত্যের ভিন্নতর প্রকাশ। আশাবাদী গল্পকার বিভিন্ন রূপক-উপমার সফল প্রয়োগ করে সংশয়ের বাতাবরণ তৈরি করলেও শেষাবধি এক শুভ সময়ের ইঙ্গিত দিয়ে যান।

তৃতীয় এবং আকারে সবচেয়ে ছোট গ্রন্থবদ্ধ গল্পটির নাম ‘প্রহরে প্রহরে গল্প’। আকারে ছোট হলেও এ গল্পের আত্মিক তাৎপর্য সবচেয়ে গভীর। সময়ের আবর্তনে আলোকিত সত্য-অসত্যের চাপে বিতারিত প্রায় সমগ্র মানবকুল থেকে। এমনি এক সত্যের রূপকাশ্রয়ী প্রকাশ এ গল্প। জোছনা এ গল্পে সদর্থক রূপক। আবার কখনো ব্যক্তি-চরিত্র প্রকাশক। রূপক-প্রকৃতি আর ব্যক্তি একাকার এ গল্পে। ফলে জীবনের বিভিন্ন প্রহরে ঘটে চলা বহুমাত্রিক ঘটনার প্রকাশ ঘটেছে জোছনার বিভিন্ন প্রহরের বাস্তবতা অবলোকনের মাধ্যমে। সমাজে ঘটে চলা বিচিত্র নঞর্থক ঘটনার সাক্ষী প্রকৃতি-জোছনার হৃদয়ক্ষরণ আসলে সংবেদনশীল মনের আত্মিক প্রকাশ। যেখানে ব্যক্তি ব্যথিত হয় সমাজের ক্লেদ-পঙ্কিলতা, জরাগ্রস্থতা, রক্তাক্ততা, অন্যায়-অবিচার, ক্ষমতার অপব্যবহার আর কলুষ আক্রান্ত হওয়া দেখে।

‘প্রহরে প্রহরে গল্প’ এমনি এক সৃষ্টি; যেখানে জোছনা নামক শুভবোধ মার খাচ্ছে নিয়ত। শহরের সমস্ত অন্যায় ও জটিলতাকে পাশ কাটিয়ে জোছনা গ্রামে পালিয়ে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে চায় কিন্তু সেখানেও নগরের ছোঁয়া। সর্বত্র মানুষ হয়ে উঠেছে জটিল ও নৃশংস। বিশ্বায়নের প্রভাবপুষ্ট আজকের গ্রাম আর আলাদা নয়। স্যাটেলাইটের প্রভাবে সংস্কৃতি ও ভাবনা প্রায় অভিন্ন। সেখানেও রাতের অন্ধকারে ঘটে চলে নগর সদৃশ ঘটনা। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে গ্রাম তার চরিত্র হারিয়েছে। ফলে গ্রামের মানুষের মধ্যে ঐত্যিহিক চিরকালীন বন্ধন আর চোখে পড়ে না। বরং সেখানেও এখন পরশ্রীকাতরতা আর স্বার্থপরতার চর্চা;- ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে তৈরি হয়েছে বিচ্ছিন্নতা ও বিভেদের দেয়াল। বিভেদের জালে আবৃত হওয়ায় প্রকৃত উন্নয়ন— যাকে আমরা বলি আত্মিকমুক্তি তা কখনোই সম্ভব হয় নয়; গল্পকার তা বলেন রূপকে। বিভেদের ভিত্তি তাই তাঁর কাছে মনে হয় রক্তজলের নদী :

সেতু দিয়ে কী গড়িয়ে যায়-আসে এপাড়-ওপাড়? মানুষ, সময়, উন্নয়ন, আধুনিকতা, আর, আর…?

সেতুর নিচে ধাবমান রক্তজল অথবা জোছনা গলা পুঁজের নদী? সেতো সীমারেখা বিভেদের।… সেতুর অপর নাম সমঝোতা। সমঝোতা! কার সাথে কার? সময়ের সাথে সময়ের; ইতিহাসের সাথে ইতিহাসের; মনের সাথে মানুষের; নয়তো… নয়তো? (পৃ. ৭৭-৭৮)

মানুষের সাথে মানুষের প্রকৃত সমঝোতা ঘটেনি বলেই লেখকের মনে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। বরং পুঁজিকে প্রধান অবলম্বন ভাবায় মানুষে মানুষে যে বিচ্ছেদ দেখা দিয়েছে তাতে করে খুন, হত্যা, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা আজকাল হামেশাই ঘটে। এ গল্পেও আমরা এমনি এক নৃশংস ঘটনার সাথে পরিচিত হই যেখানে গল্পকার কালো কাকের রূপকে মানুষের মনের অন্ধকার, অন্ধকার জগতের বাস্তবতা এবং জীবন নামক আলোকের বিপরীতে অন্ধকারের দর্শন করিয়েছেন। বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় নগর-শহর-গ্রাম সর্বত্রই জীবন সংশয়পূর্ণ এ সত্যই প্রতীয়মান হয় এ গল্পের বাস্তবতায়। ফলত দেখি গ্রামের যে বাস্তবতায় স্নিগ্ধতা আর অনাবিল সুখ কল্পনা করি আমরা; সেখানে শিউলি, কামিনী, হাস্না-হেনার ঘ্রাণকে হার মানায় খুনির হাতের রক্তমাখা ছুরি; আর মাটির সোদা ঘ্রাণকে কলুষিত করে অকালে অপমৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া যুবকের রক্ত। দৈশিক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় সত্য উচ্চারণ যখন নিরাপদ নয় তখন শিল্পী খুঁজে নেন ইঙ্গিতের পথ। এবং এ গল্পে গল্পকার তা স্বীকারও করেন নির্বিকার নির্লিপ্ততায় :

নেমে আসে সাতটি কাক! লাগে ধন্দ, সত্যি কাক নাকি? ভোরের শরীর ভেবে ভুল করার মত আলো যদি না হয় তবে কাকের পা কীভাবে জোছনায় ডোবে! তথাপি এখানে কোন ভুল হয় নাই যে, কাকের মতই কুককুচে কালো সাত দুগুণে চৌদ্দটি পা- নিশ্চিত কাকের পা শক্ত, কঠিন, নির্মম-দাঁড়ায়।… মানব না কাক না যম?… দেখতে মানুষের মত দুইপেয়ে জানোয়ার যেহেতু! আনাগোনা উৎরে উঠে যায় উৎপাতে। মানুষের মধ্যে এক প্রকার মানুষ আছে যাদের কাজ শুধু জবাই দেওয়া আর মাংসের ভাগা দেওয়া,… পূর্বোক্ত মানুষেরা কসাইদের মত চাক্কু, ছুরি, চাপাতি প্রভৃতি নিয়ে চলাফেরা করে! বুঝা যায় কাদের কথা বলা হচ্ছে? এইসব সবারই জানা সবারই দেখা। আমরা যদিও শব্দ করে ওদের কথা বলে অভ্যস্ত না।… ঠারেঠুরে বলার চেষ্টা তাই আমারও। (পৃ.৭৯)

বৃহৎ জনগোষ্ঠির মুখ বুজে সমস্ত অন্যায় সহ্য করার পরিণামে আমাদের মানবিক চিন্তা ও শুভবোধগুলো মরে যায়। আর জোছনা-প্রকৃতি মুখ লুকায় নীলে বিষাক্ত হয়ে। অথবা লোকালয়, নদী, ফুলের বাগান, মানুষ, প্রান্তর, ধানক্ষেত সকল কিছুকে ভুলে গিয়ে সমুদ্রে মেশে; অথবা আত্মহত্যা করে। আসলে এই বিষময় বাস্তবতায় ‘জীবন্ত চন্দ্রমুখী নারী অসহায়।’ তার অসহায়তার সুযোগে সকল অন্যায় বিকল্প পথে চালিত করে ক্ষমতাশীল সমাজ। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে সহজেই বেভুলো করে দেয় মানুষের মন। মার খায় মানুষের প্রতিবাদী চেতনা। ‘বাতাসের প্রেমে বাঁশঝাড়ে বাজনা বাজে। বাঁশপাতার ন্যায় মুদ্রা ঝরে আসমান থেকে। আর মুদ্রার নিচে হারিয়ে যায় যুবকের দেহ।’ এ যুবক বর্তমান সময়ের, পরাজয়ের প্রতীক। শত্র“র অস্ত্রের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত যার শরীর। যে শরীরের রক্ত-মাংস মাটিতে অনিচ্ছাকৃত মিশিয়ে মাটির উর্বরা বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। অত্যন্ত ব্যথাময় দৃশ্যের বর্ণনায় গল্পটি সহজেই পাঠকনন্দিত হয়ে ওঠে। সেইসঙ্গে বর্ণনায় সৃষ্টি হয় বেদনারাজ্যের চিত্রকল্প :

কামিনী-হাস্না ঝোপ থেকে কেন দুইটি অভিন্ন অগ্নিজিভ যুবকের বুকে প্রবেশ করে তীব্র বিদ্যুৎ ফলার মত,…। ছটফট করতে করতে মাটিতে শুয়ে পড়ে যুবক। আহত হয় জোছনা। অপরাধবোধে পীড়িত হয়ে জোছনার মুখ ফ্যাকাশে হয়। তখন জগৎ নিস্তব্ধ; নিঃসাড়! আহত জোছনা অপরাধীর মতো তাকায় চাঁদের দিকে। চাঁদের চোখে রক্ত! তাছাড়া যুবকের মুখ বিষে নীল হতে হতে কালো হয়ে যায়।… আর জোছনা, ওর শেষ লাবণ্যটুকু হারিয়ে ফেলে ঐ কালোতে! (পৃ. ৮৪)

প্রকৃতিতে প্রহরের পর্যায়ক্রমিক বিচরণ থাকলেও এ গল্পের প্রহর বিচরণ অষ্টমে এসে থেমে গেছে। যেখানে জীবনের শুভ সকালের আশা করা যায়; কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না। গল্পকার চাঁদের অষ্টপ্রহরের বিচরণে চাঁদের স্নিগ্ধ আলোতে নষ্ট জীবনের যে সকল নষ্ট দৃশ্য পাঠককে দেখান তাতে করে এ গল্পে এসে আশাবাদ ম্লান হয়ে যায়। চাঁদ পুরো গল্পে ফ্লাড লাইটের ভূমিকায় থাকলেও শেষাবধি তার পরাজয় পাঠককে কোনো আলোকিত শৃঙ্গে স্থিত করে না।

গ্রন্থের শেষ গল্পের নাম ‘জাল’। এ গল্পের বিষয়-ভাবনা মুক্তিযুদ্ধ। তবে মুক্তিযুদ্ধকে ছাপিয়ে নর-নারীর হৃদয়বৃত্তিক প্রকাশই গল্পে মুখ্য হয়ে উঠেছে। মাকড়সার নিজের সৃষ্ট জালে আবদ্ধ হয়ে কীভাবে জীবনের শেষ বলিদান দেয়; তারই রূপকে এ গল্পের নর-নারীর জীবন-ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সেবা-শুশ্র“ষা করতে করতে এক সাধারণ গ্রাম্য বধূ কীভাবে কামনার জালে আবৃত হয়েছে সে চিত্র বর্ণনে গল্পকার সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। ইঙ্গিতের আবরণে মোড়ানো বর্ণনায় গল্পকার অন্যান্য প্রাণিকুলের স্বভাবের সঙ্গে মানব-স্বভাবের তুলনামূলক বর্ণনা দিয়ে গল্পটি যথার্থ শিল্পমানে উন্নীত করেছেন। মানব প্রবৃত্তির চিরায়ত অথচ লুকানো স্বভাবের কথা গল্পকার তুলে ধরবেন এরকম ইঙ্গিত আমরা পাই গল্পের শুরুতে— কবিগুরুর কবিতার চরণ পাঠে। ‘তোমারে আমি কখনো চিনি নাকো,/ লুকানো নহ, তবু লুকানো থাক।’ যদিও এ কবিতার মূল কথা অন্য সত্য প্রকাশক। তবে খণ্ডিত এ কবিতার্থ এ গল্পে লুকানো মানব-স্বভাবের চিরন্তন সত্য কামনা চরিতার্থের ইঙ্গিতও প্রকাশ করে।

দ্বীপ-সদৃশ বাড়িতে শাশুড়ি-বউয়ের পুরুষসঙ্গবিহীন অবস্থান তাদের প্রতিনিয়ত নিষিদ্ধ অথচ চিন্তন চাওয়ার অভাববোধে তাড়িত করে। এ বাড়ির একমাত্র পুরুষ-কর্তা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে; তাই নবপরিণীতার দৈহিক অতৃপ্তি প্রকাশ স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা দেখি প্রায় বিগত-যৌবনা শাশুড়ির মধ্যেও এক প্রকার দীর্ঘশ্বাস। যা সমাজে প্রকাশিতব্য নয়, কিন্তু লুকানো স্তরে ঘটে চলে। তার পরিচয় পাওয়া যায় রাতে শাশুড়ি-বৌয়ের শয়ন-শয্যায় প্রকাশিত আচরণে :

শইল্ল মদ্যে ছন্তাই করে গো মাই, ছন্তাই করে। ঘুম ধরে না। বুইড়ে হাড়ে যে এত ছন্তাই কী জন্যে করে। আজরাঈল আমারে চোহে দ্যাহে না।…

আচানক জোছনা বধূর চুলে জড়িয়ে প্যাঁচিয়ে যায়! শাশুড়ি দেখে কচি লাউপাতার উপর জোছনার খেল। সে বুকে টেনে নেয় বউকে। মুখের উপর হাত বুলায়। কুঁচকানো চামড়ার শক্ত হাতে বৃদ্ধা চুল আর জোছনার জট ছাড়াতে ব্যস্ত হয়। পুষ্ট লাউচারা বয়স বধূর।… অল্পকাল আগে স্বামী সোহাগ প্রাপ্তি। অল্পকাল— বুঝিবা স্বপ্নেই।…

তারপর কতদিন গত হলো। ফসলের ঘ্রাণ ধুয়ে বিষ্টি এল ঝুম। বিষ্টি বানে ভেজা জবা কতবার নেতিয়ে যায়। এবং মধু-বুকে ডানা মেলে বধূ আবার তাকায় রোদে।…

শিহরিত হয় হয় বধূ।… শাশুড়ির হাত জমে যায় বধূর তলপেটে।… বধূ দেহে জড়ানো শাড়ির প্যাঁচ খোলে আলগা করে শরীর।… বধূ অন্ধকারে শাড়ি ছুঁড়ে মারে। শাশুড়ির হাত স্তব্ধ পড়ে থাকে যেমন ছিল তেমনি বউয়ের তলপেটে। (পৃ. ৮৯-৯০)

পুরো গল্প জুড়ে আদি রসের বিস্তৃতি। এবং বর্ণনা প্রকাশে এই বিশেষ দিকে গল্পকারের বিশেষ ঝোঁক লক্ষ করা যায়। যা গল্পের শিল্পমান বিষয়ে প্রশ্ন জাগায় পাঠকের মনে। আর উরুতে বাঁশের টুকরো বিদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা বধূর সেবা-যতœ-সান্নিধ্যে ক্রমশ সুস্থ হয়ে ওঠার প্রেক্ষিতে বধূর প্রতি অযাচিত টান অনুভব তাকে মুক্তিযুদ্ধের অপ্রয়োজনিয়তা ও মুক্তিকে অর্থহীন করে তোলে। বরং সে উল্টো তত্ত্ব আবিষ্কার করে বধূকে বলে তার মতো সুন্দরী বৌ ঘরে রেখে তার স্বামী কেনো এবং কেমন করে এতো দিন দূরে আছে। চিরায়ত আদিম প্রবৃত্তি ক্রমশ তার মধ্যে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। বিপরীত দিক থেকে তৃষিত বধূরও সম্মতি মেলে। গল্পকার এসব কামনাসূচক বর্ণনার প্রকাশ করেন পতঙ্গ-প্রাণির আড়ালে। জৈবিক অনুসঙ্গ ও দৈহিক আকাক্সক্ষা ও কামনা পূরণের মাধ্যম হিসেবে ফুল-পাখি-প্রজাপতি-মাকড়সা-নদীর আশ্রয় নেন।

জালে আটকা পড়েছে প্রজাপতি। প্রজাপতির মিহি পাখার আর্তি শোনা যায়। মাকড়সা জালের আঠায় আটকা তার পা আর এক পাখা। এক পাখার হাওয়ায় ভর করে সে মুক্তির জন্য ছটফট করে। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে মাকড়সা। প্রজাপতির পাখায় যেখানে বহুত রঙের ঝিলিক মাকড়সা চুম্বন করে সেখানে।… মাকড়সা আয়েসে চেটে ভক্ষণ করে প্রজাপতির অস্থির দেহ।…

শুকনো কাঁথা হাতে ফিরে এসেছে বধূ।… কাঁথার জমিনের ঠিক মাঝখানে একটি বৃত্ত। বৃত্তের ভিতর প্রস্ফুটিত গোলাপ জবার ডালে বসে আছে কোকিল।…

ভেজা মেঝের উপর লুটোপুটি খায় নকশী কাঁথা। করুণ ও শীতল হয় জবা ও কোকিল। (পৃ. ১০৩-৪)

আদিরস প্রকাশক এ গল্পে মানুষের চিরন্তন আকুতির জায়গা পুনর্বার রূপায়িত হয়েছে; যা বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ নয়। উপমা-রূপকের সার্থক ব্যবহারে নির্মিত এ গল্পে মানুষের চিরন্তন চাওয়া তথা কামনার জয় হয়েছে। কিন্তু শুভবোধ, কর্তব্যপরায়নতা ও দেশপ্রেমের হয়েছে পরাজয়। তবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বর্ণনায় লেখক পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন।

গ্রন্থে সন্নিবেশি চারটি গল্পেই আঞ্চলিক ভাষার সফল প্রয়োগ বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর বহন করছে। একইসঙ্গে চরিত্রানুগ সফল ভাষা প্রয়োগ গল্পকারের গভীর পর্যবেক্ষণ দৃষ্টির পরিচায়ক। তবে কখনো কখনো চরিত্রের বক্তব্য ও লেখকের বক্তব্যের মধ্যে শব্দগত-ভাষাগত পার্থক্য রক্ষিত হয় নি। আর মুদ্রণজনিত ত্র“টিও বেশ চোখে পড়ার মতো; তবে তা অসতর্কতাজনিত বলেই আমরা ধরে নিতে চাই। গল্পপাঠে লেখককে বর্ণনাপ্রিয় বলেই মনে হয়। কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টিকে এড়িয়ে যায় না। গল্পের বিষয় নির্বাচনও সমকালীন সামাজিক সমস্যানির্ভর। ফলে সমকালীন সমাজ-সচেতন গল্পকার হিসেবে চিনে নিতে আমাদের অধিক ভাবতে হয় না।
নিত্য ঘোষ

পাতা ও পতত্রি

প্রতিটি গল্প সৃষ্টি হওয়ার আগে লেখকের মনোজগতে সৃষ্টি হয়ে যায় আর একটি জগত। সেই জগতের ছোট ছোট রোমাঞ্চগুলো কোনোভাবে মুছে ফেলা যায় না বলেই বার বার গল্পের সৃষ্টি হয়। সে রোমাঞ্চগুলোতে আরো কিছু রঙ-মিশিয়ে গল্পকার নিয়ে আসেন নতুন নতুন চরিত্র। গল্পের চরিত্ররা গল্পকারের ওই জগতে একেক জায়গায় বসতি গেড়ে নেয়। এর ফলে গল্প হয়ে ওঠে যথাশ্রাব্য। গল্প বলা বা গল্প শোনার প্রবণতা মানুষের আদিম অভ্যাস। সাহিত্যে ধারাটি অর্বাচিন হলেও কেটে গেছে অনেকটা সময়। হয়ে গেছে অনেক পরিবর্তন। পূর্বে গল্প মুখে মুখে প্রচলিত ছিলো, গল্পের ধারাও ছিলো প্রাচীণ। কালের পরিক্রমায় কাগজে গল্পের সংরক্ষণের ফলে গল্পকারকে হতে হয়েছে কৌশলী। গল্প বলার ধরন, বাক্যগঠনের সাবলীলতা, শব্দ প্রয়োগের কৌশল, ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ইত্যাদির সংমিশ্রণে সর্বোপরি লেখকের নিজস্ব ভাষায় আজ গল্প এসেছে নতুন দিগন্তের দ্বারপ্রান্তে।

এই নব্য দুয়ারের আধুনিক গল্প লিখছেন বহু আধুনিক গল্পকার। সৈকত আরেফিন তাঁদের মধ্যে এক অনন্য নাম। পাতা ও পতত্রি তাঁর প্রথম প্রকাশিত এবং একমাত্র গল্পগ্রন্থ। এজন্য তাঁর সফলতা বা বিফলতা নির্ণয় করা এখনই সম্ভব নয়। গ্রন্থটি উৎসর্গিত হয়েছে ‘শহীদ ইকবাল ও চিহ্নবন্ধুদের। যারা তাঁর লেখকসত্তাকে অহর্নিশ জাগিয়ে রাখে। পাতা ও পতত্রির অধিকাংশ গল্পজুড়ে আছে বৃক্ষ-লতা-পাতা আর পাখির কথা। পাতা ও পাখিদের নিয়ে গল্প তাই নামকরণটা বুঝি হয়েছে পাতা ও পতত্রি। প্রচ্ছদপটও তেমন— দুটি পাতা-পাখি একে অপরের দিকে চঞ্চু বাড়িয়ে আছে। ১১টি গল্পের সমন্বয়ে প্রকাশিত এ গল্পগ্রন্থে  আছে ভিন্নতা ও মিলনের সহাবস্থান। সৈকত আরেফিন পেশায় একজন শিক্ষক সাথে সাথে তিনি একজন গল্পকার— এখানে বিস্ময়ের কিছু নেই। বিস্ময় এখানে যে, তাঁর কথা বলা বিশেষ করে তার শ্রেণি-বক্তব্য বা স্বাভাবিক কথা বলার ভঙ্গি আর গল্পের বর্ণনাভঙ্গি একই গতির— মোলায়েম। তাঁর গল্প ও জীবন যেনো একই সূত্রে গাঁথা।

‘একটি আকাশ ও কয়েকটি ঘুড়ির গল্প’তে ফুটে উঠেছে এক যুবকের ঢাকা শহর দেখা। সাথে সাথে সেখানকার একাকী জীবনে প্রচণ্ডভাবে নস্টালজিক হয়ে স্মরণ করেছে তার প্রেমিকাকে, তার বাল্য-জীবনকে। দুরন্ত কৈশোর, কৈশোরের স্মৃতি তাকে করে রেখেছে কাতর। বাল্যকালের গ্রামজোড়া প্রকৃতি তাকে বারবার ফিরে ফিরে ডাকে। এ গল্পটিকে একটি মুক্তগদ্য বা গল্পহীন গল্প হিসাবে বিবেচনা করা যায়। ‘বৃত্ত’ গল্পটিও পূর্বের গল্পের ধারায় বহমান। তবে এখানে বালকের বয়সের একটু পরিবর্তন চোখে পড়ে।

শেষ গল্প ‘গুল্ম ও লতা’। এটাও একটা মুক্ত গদ্য। কাহিনিহীন গল্প। একটি অপরিণত বয়ঃসন্ধি সময়ের নস্টালজিয়া। লেখক এ গল্পে বাস্তবতাকে চিত্রিত করেছেন। যৌবন-প্রাপ্তির প্রথম সময়ের যে আকর্ষণ তা উঠে এসেছে মোবাইল ফোনে প্রেম-ছুঁই-ছুঁই আবহে। বা একই বয়সে একটি যুবক তার চলাচল কেমন হয়। সেটাও দেখতে পাই আমরা এখানে—

রিকশার হুড ফেলে আমরা পার্ক মোড় থেকে কলেজ রোডে যাই। বিপনিগুলোতে ললনারা কেনাকাটা করতে আসে। আমরা এ দোকান ও দোকান যাই। সেলসম্যানকে এটাসেটা বের করতে বলে বস্ত্র বা দ্রব্যাদির চেয়ে ললনাদের চোখ, মুখ, শরীর দেখতে আগ্রহী হই। সুন্দর মেয়েরা এ দোকান ও দোকান ঘুরে বেড়ায়, তাদের সঙ্গে আমরাও ঘুরতে থাকি।

এখানে উল্লেখ্য যে লেখক গ্রন্থজুড়ে গল্পের চরিত্রের বয়সের কথা বলেননি। বরং বর্ণনার পারদর্শিতায় চরিত্রের বয়স নির্ধারণ করতে পাঠক দ্বিধান্বিত হন না। এমনি করে লেখক শেষোবধি গল্পের চরিত্রের বয়সের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। এক কিশোর বালক গ্রন্থের প্রথমে প্রবেশ করে বেরিয়ে যায় টগবগে যুবক হয়ে। চরিত্রের বয়স নিয়ে তিনি যেমন সচেতন তেমন তাদের নাম নিয়েও । গল্পগুলোতে মানুষের প্রতি গল্পকারের সম্মানসূচক মূল্যায়ন প্রদর্শন পরিলক্ষিত হয়। নিক নাম বা ডাক নামে সম্বোধন করতে দেখা যায় খুব কম। প্রতিটি গল্পেই এইধারা চলতে দেখি। গল্পের চরিত্রেরা সবাই বড়ো বড়ো নামধারী— রেজাউল করিম ওরফে রিজু, ইসমাত আরা খাতুন, বিষ্ণুপদ শীল, মামুনুর রহমান সিরাজ প্রমুখ।

লেখক ঘটনাগুলো সার্বজনীন করতে গিয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষের বিভিন্ন নাম ব্যবহার করেছেন যেমন ‘বৃত্ত’ গল্পে— ‘বিষ্ণুপদ শীল বা মামুনুর রহমান সিরাজ বা রফিকুল ইসলাম আমাদের চা খাওয়া বা কোনোদিন দু-একটা বিস্কুট বা আধপোড়া সিগারেটও সাধে।’ তেমনিভাবে সম্বোধনের বেলাতেও আমরা তেমন উদাহরণ পাই— ‘ঘুমিয়ে পড়া মা কিংবা ভাবী বা বোনটাকে ডেকে তুলি।’ অথবা ‘অন্য ঘরে আমাদের দাদা বা দাদি বা মৃত্যু ঘনিয়ে আসা বয়স্ক চাচা গোঙরাতে গোঙরাতে আর গোঙরায় না। আমাদের মা, ভাবী বা চাচাত ভাই বোনেরা তার স্বরে কাঁদে।’ এই বারবার উচ্চারিত নাম এবং সম্বোধনগুলো গল্প-পাঠে পীড়া দিলেও ঘটনাগুলো সার্বজনীন মনে হয়। লেখকের স্মৃতিতে বারবার একই চরিত্ররা ঘুরে ঘুরে এসেছে। তাদের সাথেই লেখকের ওঠা-বসা, চলাফেরা। তাই ইসমাত আরা খাতুন বা বিষ্ণুপদ শীলেরা তার গল্পে ঢুকে পড়ে নির্দ্বিধায়, হর-হামেশায়।

লেখকের ভিন্ন ধারায় বর্ণিত ‘ডানায় রোদের গন্ধ’ গল্পে একজন প্রাপ্তবয়স্ক যুবকের প্রেম তুলে ধরেছেন লেখক। গল্প কথক এখানে জীবনাশঙ্কাগ্রস্থ এক ভয়ার্ত যুবক। কিন্তু জীবনের চরম বাস্তবতা তাকে মেনে নিতেই হয়। তাকে অতিক্রম করার কোনো উপায় নেই। সদ্য গড়ে ওঠা প্রেম আর প্রেমিকার সাথে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া বাস্তবতায় তাকে মিলিয়ে নিতে হয় নিজের জন্মের ইতিহাস। আর এই চরম সত্য যখন প্রেমিকা জেনে যায় তখন তাকে ছেড়ে চলে যায়। গল্পের শেষে লেখক একধরনের কুহেলিকা সৃষ্টি করেছেন ‘দ্বিতীয় ভুল’ শব্দ ব্যবহার করে। কি সে দ্বিতীয় ভুল? জানা খুব কষ্টের। কিন্তু এই গল্পের একটা চরম দর্শন এই কুহেলিকায় ঢাকা পড়ে না— ‘চোখের সামনে থাকলে মুগ্ধতা আসতেই পারে, তবে অনুপস্থিতিও একপ্রকার ওষুধ যা মুগ্ধতাকেও ম্লান করে দেয়।’

সাধারণভাবে ছোটগল্পের ধারণ ক্ষমতা একটি স্বল্প সময়ের ছোট্ট ঘটনা। কিন্তু ঘটনার প্রয়োজনে ঘটনার আবর্তে অনেক অতীত এবং ভবিষ্যতের গল্পও বলতে হয় গল্পকারকে। সে ক্ষেত্রে লেখক বেশ কৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকেন— বিশেষ করে দৃষ্টিগোচর হয় ঘটনার সূত্র ধরে গল্প নিয়ে আসাকে। কিন্তু সৈকত আরেফিনের গল্প বর্ণনার ধরন একটু আলাদা। তিনি অতীত এবং ভবিষ্যতের গল্প বলেন ভিন্ন পন্থায়। উপশিরোনামে হঠাৎ করেই আনেন গল্পের পরিবর্তন। প্রথমবার গল্পপাঠে আবছায়া হয়ে থাকে, মনে হয় গল্পের শেষটা বুঝি আগেই পড়লাম। বর্ণনার শেষ বিন্দুতে এসে সমস্ত ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। তেমনই গল্প হলো ‘বৃত্ত’, ‘ঘাইহরিণ’, ‘হারানো বিজ্ঞপ্তির খসড়া’ এবং ‘ইহা একটি ভালোবাসার গল্প’।

‘ইহা একটি ভালোবাসার গল্প’ নামক গল্পে লেখকের চিরচেনা সবুজ মতিহারে প্রচলিত ভালোবাসা নামক ছল-খেলার পরিণাম তুলে ধরেছেন। আর সাথে সাথে তিনি এই পবিত্র শব্দের অপব্যবহারের প্রতি ঘৃণাও প্রদর্শন করেছেন। গল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, এ গল্পে তিনি অসাধারণ ইমেজের ব্যবহার করেছেন। যেমন : ডার্ক-১ এ—

কলাগাছের ওপাশে আঁধারটা যেখানে আরো ঘন হয়ে আড়াল তৈরি করেছে, সেখান থেকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আরো কিছু ধ্বনি ধারাবাহিক কোরাস তৈরি করে। সাপের ফোসফোস বা বেজির হিসহিসের মতো এই কোরাসের সঙ্গে মানুষের শীৎকার আশ্লেষের মিল খুঁজতে হলে খুব খেয়াল করে শুনতে হবে।

আবার ডার্ক-২-এ একই ইমেজ ধরতে গিয়ে লেখক বলেছেন—

… ছাতিম গাছের নিচে বসে একজোড়া তরুণ-তরুণী ব্যাঙের আর্তনাদ শোনে না। তারা বোধলুপ্ত হয়। তাদের দুটো শরীর তখন একটা ছায়া তৈরি করে। মিশে যেতে যেতে তরুণটির ভেতরে জ্বলে ওঠে আগুন আর তরুণীটি মোম হয়ে যায়। আগুনের উত্তাপে মোম তো গলবেই।

একই ফর্মের গল্প ‘ঘাইহরিণ’-এ গল্পকার ‘বোধন-পর্ব’, ‘কুয়াশা ভ্রমণ’, ‘উত্থান কিংবা পতন’ ও ‘পাদটিকা’ উপশিরোনামে এক যুবকের আত্মত্যাগের গল্প বলেছেন। অসৎ চেয়ারম্যান বাবার অসততার গ্লানি মেনে নিতে না পেরে তার শেষ পরিণতি হয় মৃত্যু। সমাজস্থ কালগ্রাসী দুর্নীতির বিপরীতে অবস্থানরত মানবতার প্রতীক হিসেবে গল্পকার দাঁড় করিয়েছেন অয়ন নামের এক যুবককে। সে না পারছে তার বাবার বিরোধিতা করতে, না পারছে তা নীরবে মেনে নিতে। অবশেষে সামাজিক অবদমনের শিকার হয়ে তাকে করতে হয় অস্তিত্ব ত্যাগ।

কাহিনি এবং বেদনা প্রধান গল্প ‘ঘাইহরিণ’ এবং ‘কাননে কুসুমকলি’। ঘাইহরিণের অয়নের মৃত্যু যতোটা না মর্মাহত করে তারও চেয়ে বেশি আঘাত হানে শেষোক্ত গল্পের নায়ক অমলকান্তি। ‘হিংস্র ধর্মরাজনীতির শিকার সে, পঙ্গু, অক্রিয়।’ কিন্তু একদিন সাধারণের মতোই তার ছিলো অধিকার, ছিলো যোগ্যতা। তার ছিলো হাসি-খুশি মন আর গান গাওয়ার প্রবল আগ্রহ। কিন্তু ধর্মরাজনীতির আগ্রাসনে তার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়ে যায়। স্বপ্নভঙ্গের বিপরীত অভিশাপ অমোচনীয় এটাকেই জানিয়ে দেবার জন্য লেখক গল্পটি রচনা করেছেন।

সৈকত আরেফিনের গল্পে শব্দবুনুনি এবং শব্দসৃষ্টি দৃষ্টি এড়াতে পারে না। তবে লেখকের শব্দ-যোজনার যে পারঙ্গমতা পরিলক্ষিত হয় তা অনস্বীকার্য। ‘বাড়ি’ শব্দযোগে তিনি তৈরি করেছেন নতুন নতুন শব্দ, যেমন— নগরবাড়ি, মেসবাড়ি, জাহাজবাড়ি, মনবাড়ি ইত্যাদি। তেমনিভাবে কালোকুলো মেয়ে, বৃষ্টিতে একসা হয়ে যাওয়া, শাদা থকথকে কুয়াশা, রিনরিন করে হাসা, রোদের তুতুতুতু করে কাঁপা ইত্যাদি শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। এই ধরনের শব্দচয়ন সাহিত্যে খুব একটা চোখে পড়ে না।

লেখক শব্দ আমদানিতে যে সচেতনতার অবলম্বন করেছেন সেটাও মুগ্ধকর। আদিম সাহিত্যরসটি বুঝাতে লেখককে সন্ধান করতে হয়েছে সমার্থক শব্দ— ‘রিরংসা একেবারে কেটে যায় না।’ আবার রূপক শব্দ ‘পরিভ্রমণ’ও ওই একই রস বুঝাতে ব্যবহার করেছেন। অন্যত্র দেখি— ‘…রোদ্দুর কমলার সারা মুখে হুটোপুটি খায়।’ লুটোপুটি-ই যেখানে স্বাভাবিক ছিলো সেখানে হুটোপুটি শব্দযোগে ভাবটা একটু জমানোর চেষ্টা করেছেন। আবার পরিবেশ বদলের চিন্তাটাও লেখককে করতে হয় বরাবর। আগে আমরা যেখানে পড়েছি ঘরের কোণে কুঁজো ভর্তি জল, সেখানে আধুনিক লেখককে লিখতে হয় প্লাস্টিকের পট ভর্তি মিনারেল ওয়াটার। লেখক সৈকত আরেফিনও তেমনি আপডেট গল্পকার। যেমন তিনি লিখেছেন— ‘শার্শি দিয়ে রোদ ঢুকে গেলে যেমন দৃশ্যকল্প তৈরি হয় তেমনি মিহি উজ্জ্বল ধুলোও ওড়ে বাতাসে।’ পূর্বে যেখানে জানালার কবাটের উল্লেখ পাই, লেখক সেখানে শার্শি শব্দ এনেছেন সময়ের প্রয়োজনে।

সঙ্গীতপ্রিয় লেখক সৈকত আরেফিন গল্পের মেলবন্ধনে এনেছেন বিভিন্ন গানের চরণ। বিশেষত তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রীতি চোখে পড়ার মতো।

একজন মার্ক্সবাদী কমরেডের যুদ্ধজীবনের একটি রাত নিয়ে লেখা গল্প ‘নীলপাখির পালক’। গল্পটি পড়তে গিয়ে মনে পড়ে চে গেভারা, হিলদা বা অ্যালিদা, ফিদেল কাস্ত্রের কথা। একটি সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্নে তাঁরাও এমন বিভোর ছিলেন। তাঁদেরও ছিলো উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ এবং পলায়নপর কিন্তু গতিশীল জীবন। এ গল্পের নায়ক, গল্পকথকও স্বপ্ন দেখে সাম্যবাদী সমাজের। এমন সমাজে নিজের পার্টিরও বিলুপ্তি ঘটবে বা তার প্রয়োজনিয়তা থাকবে না এ কল্পনাও কমরেড করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।

প্রথমে যে বিস্ময়ের কথা বলেছিলাম সেখানেই তার পরিণতি নয়। বরং তারও কিছু বাকি আছে এখনও। যে মানুষটি নরম স্বভাবের, কথা বলেন স্বাবলীল ভাষায়, নিখুঁতভাবে। জীবন চলার গতিও ধীর তাঁর কলমে এমন বিদ্রোহভাবাপন্ন গল্প যখন রচিত হয় সেটা আবার গল্পকথকের বর্ণনায়— বিস্ময় এসে যায় তখনই। তাঁর বুকের মধ্যে পুষে রাখা দ্রোহের এখানেই শেষ নয়। তা শেষ হবারও নয়। বরং তা আরও জ্বলবে দ্বিগুণ ঔজ্জ্বল্যে। একদিন দ্রোহের আগুনে রঙিন হবে মনের জগত। তখন আর গল্পে রঙ মেশানোর প্রয়োজন হবে না।
রফিক সানি

ঋতপত্র অরুণ সেন সম্পাদিত
[প্রয়াত অরুণ সেনকে স্মরণে রেখে]

নিয়মিত অনিয়মিত, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখন ছোটকাগজ হচ্ছে, তাতে থাকছে বিভিন্ন আয়োজন, হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ক সংখ্যা। যদিও অধিকাংশ ছোটকাগজই সাহিত্যের সকল ধারা একীভূত হয়েই প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু খেয়াল করলে অনুমান করতে কষ্ট হবে না যে, একক বিচারে কবিতার কাগজই এগিয়ে আছে। চট্রগ্রাম থেকে প্রকাশিত এবং অরুণ সেন সম্পাদিত ঋতপত্র একটি কবিতারই ছোটকাগজ, ইতোমধ্যে যার পনেরোটি সংখ্যা বের হয়েছে এবং সদ্য বের হওয়া ষোলোতম সংখ্যাটি আমার হাতে এসেছে। ঋতপত্রর সাথে আমার পরিচয় নতুন নয়, এটা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে সংখ্যা করে থাকলেও মূলত এটা কবিতারই কাগজ এবং এ বিষয়টিই সর্বদা প্রাধান্য পেয়ে থাকে। ঋতপত্রর ষোলোতম সংখ্যাটি সাধারণ সংখ্যা। পাতা ওল্টাতেই চোখে পড়ে সূচি। এ সংখ্যার সূচিপত্র বিন্যস্ত হয়েছে ‘প্রবন্ধ’ ‘গুচ্ছ কবিতা’ ‘দুটি কবিতা’ ‘কবিতা’ ‘দীর্ঘ কবিতা’ ও ‘অনুবাদ কবিতা’ নিয়ে, যেখানে নতুন পুরাতন থেকে শুরু করে উপস্থিত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ের লেখক। শুরু হয়েছে প্রবন্ধ দিয়েই। প্রথমেই ‘বিস্মৃত কবি দিনেশ দাস : জন্মশতবর্ষ পেরিয়ে’ শিরোনামে আহমদ রফিক মূলত প্রকাশ করেছেন গোপন উষ্মা, গত শতাব্দীর তিরিশের কবি যিনি শিল্পসর্বস্ব ভাবনার যুগে সমাজ চেতনা হৃদয়ে লালন করে কাস্তেটায় শান দেবার সাহস দেখিয়েছিলেন যা কাব্যমহলে আলোড়ন তোলে। ‘বেয়নেট হ’ক যতো ধারালো/কাস্তেটা শান দিও বন্ধু,–/ এ যুগের চাঁদ হলো কাস্তে!’ প্রবন্ধকার আহমদ রফিকের কথায়, ব্যক্তি চেতনা ও শৈল্পিক চেতনাকে একাত্ম করে নিয়ে সংগ্রামী মতাদর্শের প্রকাশ করে যারা খ্যাত হয়েছেন, তাদের ভেতরে সুভাষ-সুকান্তকে স্মরণ করা হয় কখনো কিন্তু স্মরণ করা হয় না পূর্বাপর সংগ্রামী এবং সমাজ সচেতন কবি দিনেশ দাসকে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে তেমনি বাংলাদেশে তার সংগ্রামী কাব্যিক প্রকাশের ওপর অবহেলা ও বিস্মৃতির ধুলোস্তর ক্রমে পুরু হয়ে উঠেছে। তাই সূত্রাকারে এ রচনায় তিরিশ-চল্লিশের কবি, এক কথায় প্রতিবাদী সংগ্রামী কবি দিনেশ দাসকে স্মরণ। সন্জীদা খাতুনের রচনাটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন নিয়ে যার ব্যাপ্তি হলো উনিশ্শ একষট্টি থেকে একাত্তর, সুতরাং সহজেই অনুমেয় তখন আমাদের কাঁধে এমনই এক দুঃশাসন চেপে বসেছিলো যে অর্থনৈতিক শোষণ তো বটেই, বাংলা সংস্কৃতিকেও মুছে ফেলার চেষ্টা চলে, যার শুরু হয়েছিলো রাষ্ট্রভাষা থেকে বাংলাকে নাকোচ করে দিয়ে আর আন্দোলনও শুরু হয়েছিলো বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার অধিকার নিয়ে, এভাবে যদিও বাঙালির ইতিহাসে বায়ান্ন এসেছিলো তবুও সাংস্কৃতিক আক্রমণ নিয়মিত ছিলো, ধর্মকে কেন্দ্র করে সাহিত্যিকদের বিভক্ত করে ফেলা হয়েছিলো যে, রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে উপস্থিত করা হয়েছিলো নজরুলকে এবং সেসময় সর্বত্র রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের মতো ঘটনা ঘটে আর এরই ভেতর দিয়ে কিছু সাহসী সাংস্কৃতিক কর্মী, একষট্টি সনে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে এগিয়ে এলেন উদযাপনের জন্য, সন্জীদা খাতুনের বাস্তব এসব অভিজ্ঞতার বর্ণনায় ‘বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ (১৯৬১-১৯৭১) শিরোনামের প্রবন্ধটি। হায়াৎ মামুদের ‘একজন আধুনিক পাঠকের দৃষ্টিতে জসীম উদ্দীন’ প্রবন্ধে হায়াৎ মামুদ নিজেই একজন আধুনিক পাঠক যিনি ব্যাখ্যা করেছেন জসীম উদ্দীনের কাব্যধারা সম্পর্কে যে, গতানুগতিক আধুনিক ধারা থেকে তার বিমুখতার কারণ এবং প্রতিষ্ঠিত ও চিরস্থায়ী কবিখ্যাতি সত্ত্বেও স্মরণীয় কেউ তাকে অনুসরণ করেনি, হায়াৎ মামুদের কথায়, ‘তিনি নিজেকে তাঁর ‘আলাদা’ পাঠকের কথা বলেছেন তা তৈরি হয়েছে তিনি কবি হিসেবে ‘আলাদা’ হওয়ার কারণেই। তাঁর নিজের মনোগঠন, আমার বিবেচনায়, তাঁকে ঠেলে দিয়েছিলো এমন এক কাব্যধারার পথে হাঁটতে যা পরিত্যক্ত হয়েছিলো অনেক আগেই। সেই পথ গাথাকাব্য বা ballad এর।’ ‘রবীন্দ্র চিন্তায় ধর্মনিরপেক্ষতা’ বিষয়ে ড. করুণাময় গোস্বামী পাশ্চাত্যে দেয়া তার বক্তৃতার কথা বলেছেন, যেখানে তিনি প্রসঙ্গত রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ‘গোরা’র দৃষ্টান্ত এনেছেন এবং যেখানে ‘গোরা’র ভাবনা ছিলো ‘ভারতবর্ষে যদি সাম্প্রদায়িক প্রীতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হয় তাহলে সর্বজনীন ঈশ্বর চাই, এমন উপাসনালয় চাই যেখানে সকল ভারতবাসীর অধিকার নিশ্চিত থাকে, কেননা সব কথার সার কথা হচ্ছে, মানুষ যে বিভক্ত সে ঈশ্বরের নামেই’। এবং উপমহাদেশে এই সত্য যে কতোটা প্রকট বিভিন্ন সময়ে আমরা তা নগ্নভাবে দেখেছি, আর আমাদের রক্তে এই বিভাজ্যতা মিশে আছে বলে উপলক্ষ পেলেই তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ‘গোরা’র ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এই বিভাজ্যতা মুছেফেলার কথাই বলেছেন এবং ড. করুণাময় গোস্বামী রবীন্দ্রনাথের এই চিন্তা দর্শনের দিকগুলোই তুলে ধরেছেন। অরুণ দাশগুপ্ত লিখেছেন সম্প্রতি কবি নাসির আহমেদের ‘কবিতা সংগ্রহ’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ড নিয়ে। অরুণ দাশগুপ্ত এখানে মূলত নাসির আহমেদের কাব্যভাবনা, রচনাশৈলী, বিষয়-বৈচিত্র, কালচেতনার প্রাচুর্য বিষয়ে তার মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন। ‘হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতা : অন্তহীন স্রোতে সাম্পান’ এই শিরোনামে সৌমিত্র শেখরের কন্ঠেও আক্ষেপের সুর, হাসান হাফিজুর রহমান, অনেকেই তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বড়ো করে দেখেন, অথচ তিনি প্রথমত কবি, আর এই বিষয়টিই তাঁর সমকালীন কিছু ব্যক্তিত্বের কথা উদ্ধৃত করে, তার জীবন ও কালবিচারে সৌমিত্র শেখর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। দ্বিজেন শর্মার মন্তব্য থেকে একটি উদ্ধৃতি, ‘আমাদের প্রজন্মে হাসান ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। এটা আমার দৃঢ় ধারণা। কিন্তু তার প্রতিভা বিকাশের জন্যে আমাদেরযুগটি মোটেও অনুকূল ছিলো না। আমরা ছিলাম প্রতারক কালের বাসিন্দা। কঠোরতা নয়, প্রতিবন্ধ নয়, সমকালের প্রতারক চরিত্রের জন্যই আমরা কমবেশি বিভ্রান্ত, বি¯্রস্ত হয়েছি। আমরা পাকিস্তান নামক এক রাষ্ট্রের উপনিবেশ এই সত্য উপলব্ধিতে আমাদের কেটেছে পুরো দুটি দশক। এ ছিলো এক মারাত্মক পরিস্থিতি। অন্যথা হাসান অবশ্যই বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি হতো।’ বাংলা ভাষার ইতিহাস সুপ্রাচীন। আমাদের পূর্বেও অনেক সভ্যতা, জনপদ, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলতো, বাংলা ভাষার চর্চা করতো, সময়ের কারণেই সেসব সভ্যতার, জনপদের দৃশ্যান্তর ঘটেছিলো, কিন্তু এই সময়ে এসে সেগুলো আবিষ্কার হয়েছে, হচ্ছে। নৃপেন্দ্রলাল দাশ এমনি একটি বিষয় সামনে এনেছেন, জানাচ্ছেন মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা পাহাড়ে আবিষ্কৃত দুটি তা¤্রশাসনের কথা, যা কিনা বাংলা ভাষার আদি নিদর্শনের প্রকৃষ্ট উপস্থাপনা সিলেটের স্থানীয় উপভাষার প্রয়োগ। ‘আমার একটা নদী ছিলো’তে মাহমুদ কামাল জানাচ্ছেন এক যন্ত্রণার কথা, অন্ধ ভবিষ্যতের কথা যে, নদীমাতৃক এই দেশে, এই বাঙলার জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা কবি সাহিত্যিকদের অন্তর্জগতে নদীর প্রভাব অসামান্য, আর তাই নদী নিয়ে রচিত হয়ে এসেছে অসামান্য সব কাব্য-কবিতা। ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার ধারা মূলত যে সকল বাস্তবতার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে, সে সকল বিষয়ের ওপর আলো ফেলে এবং প্রসঙ্গত অন্যান্য বিষয় আলোচনায় এনে শহীদ ইকবাল লিখেছেন ‘আমাদের কবিতার অঙ্কুরোদ্গম : চাঞ্চল্য ও চিন্ময়তা।’ এ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে যতীন সরকারের সাক্ষাৎকার।

অরুণ সেন ষোলোতম সংখ্যাটি প্রকাশের পর প্রয়াত হয়েছেন। অসামান্য এই মানুষটির কর্মযোগ কখনোই মিলিয়ে না যাক ঋতপত্র বেঁচে থাক, এটুকুন প্রত্যাশা করি। কবি অরুণ সেনের প্রতি প্রণতি।
সুবন্ত যায়েদ

পাঠক কহেন…

পাঠ : চিহ্ন ¬৩০
সম্পাদক : শহীদ ইকবাল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কের চিহ্ন
ইমরান কামাল
খুলনা

চিহ্ন ৩০ নিয়ে আলাপ শুরুর আগে চিহ্নর সঙ্গে আমার সম্পর্কের জায়গাটা আগে নির্ধারণ করে নিতে চাই। প্রথমত আমি চিহ্নর পাঠক। বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র যখন ছিলাম তখন ঢাকাই চিন্তাচর্চার অলিগলি খুড়তে খুড়তে চিহ্নর সাথে আমার যোগ হয়েছে। সেইকালে বলা যাবে¬— আমার এবং চিহ্নর মুখোমুখি হয়ে পড়াটা একরকম ‘দুর্ঘটনা’। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মতো ‘দুর্ঘটনা’। কলম্বাস ভুল করে আমেরিকা আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। আমি ভুল করে চিহ্ন পড়তে শুরু করেছিলাম। সেইকালে ঢাকা আমার ভেতরে এক রকম বদ-আত্ম-অভিমান পয়দা করেছিল। সেই অভিমানের ফল— চিহ্ন দীর্ঘদিন আমার কাছে মফস্বলের ছোটকাগজ হয়ে থেকেছে। কিন্তু এখন মনে হয় কোথাও আত্ম-অভিমানের বদখেয়ালের মধ্যেই এক ধরনের দরদও তৈরি হচ্ছিল। কারণ যেমন করেই হোক আমি চিহ্নকে আবিষ্কার করেছিলাম। এখন আমি চিহ্নর নিবাসের চাইতেও প্রান্তিক এক জনপদে বাস করি। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ে থেকে, পড়িয়ে পেট চালাই। চিহ্নর সাথে এখন আমার যোগ আপাতদৃষ্টিতে আগের চাইতে ঘনিষ্ঠ। কারণ এখন চিহ্ন আমার কাছে আসে। নিয়মিতই আসে। কারণ, ব্যক্তি-সম্পর্ক। এখন যখন ভাবতে বসি, প্রশ্ন জাগে, এই নয়াসম্পর্ক, যে আমি চিহ্নর পাঠক তাকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা? সেখান থেকে আর একটি প্রশ্ন সামনে আসে—বাংলায় লিটলম্যাগাজিন আন্দোলন বিস্তারে ব্যক্তিসম্পর্ক ফলদায়ক নাকি বিপদের কারণ হয়েছে? এখানে একটু বলে রাখি, যা বিকাশের কারণ তাই আবার বিপদের কারণ হবে যদি বোঝাপড়ায় গলদ থাকে।

কাঠের ঘোড়ায় ট্রয়ের ঈগল নত নীলাকাশ ছেড়ে পথের ধুলায় হত! (কাসান্দ্রা, বিষ্ণু দে)

এতো মিথ। তা দেখে বিষ্ণু দে বিস্মিত হন কেনো? স্মরণ করি ট্রয়বাসীদের যারা সেই ঘোড়াকে তাদের বিজয়ের প্রতীক ও দেবতার উপহার রূপে গ্রহণ করেছিল। সেই ঘোড়াকে তারা নগর-কেন্দ্রে টেনে নিয়ে গেলে তা হয়ে উঠেছিলো স্বাধীনতার প্রতীকও। বিষ্ণু দে’র বিস্ময় সেখানেই। দিনের আলোয় যে সম্পর্ক ছিলো মুক্তির প্রতীক, রাত নামতেই তা হয়ে গেলো পরাধীনতার আতুর। অপ্রাসঙ্গিক হলেও মনে রাখতে হবে, এ কবিতা ১৯৫৩-তে প্রকাশিত নাম রেখেছি কোমলগান্ধার কবিতাটির অংশ।

‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক’ বিষয়ে ফেরা যাক। লিটলম্যাগাজিনের বিকাশের সঙ্গে ব্যক্তিসম্পর্কের যোগ আছে, এটা বুদ্ধদেব বসুর অনুধাবন। লিটলমাগাজিনের চরিত্র বুঝতে এই বিচার দীর্ঘদিন থেকেই আমাদের কাজে এসেছে সন্দেহ নেই। বুদ্ধদেব এই সম্পর্কের একটা বৃত্ত এঁকেছেন, নাম রেখেছেন— গোষ্ঠীসাপেক্ষ অখণ্ডতা। এই চিন্তাকে আর একটু প্রসারিত করলে দাঁড়ায়— পাঠক-লেখক-সম্পাদকের এমন সক্রিয় অবস্থা যা মানুষকে অখণ্ডচর্চার দিকে ধাবিত করে। অর্থাৎ ‘মেল’ যখন সাধারণ দশায় পরিণত। এই দশাই লিটলম্যাগাজিনের উৎপাদন-ক্রিয়ার প্রাণশক্তি। বুদ্ধদেব থেকে এগোলে অন্তত এইভাবে এসে স্থির হওয়া যায়। প্রশ্ন হলো এই সক্রিয় মিলন ঘটে কীভাবে? মিলনের প্রয়োজনইবা পড়ে কেনো? প্রথমেই উঠতে পারে মানের কথা। সাহিত্যিক মূল্যবোধ, সৌন্দর্য, শুদ্ধ সাহিত্য এমনসব প্রসঙ্গকে টেনে এনে একচালের বিচার হতে পারে (বুদ্ধদেব যেমনটা করেছেন)। কিন্তু অন্যচাল বিচারেও বোধকরি প্রয়োজন আছে। সেই অন্য বা অপরচালটার এক্ষণের নাম রাখা যাক ‘ভাবাদর্শ’। বুদ্ধদেবের যুগে নিত্যদিনের ভাবাদর্শের বিচার করার সুযোগ ছিলো না। আলথুসার এবং গ্রামশির ভাব এদেশে পৌঁছানোর পর সে বিচারের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই এসময়ে দাঁড়িয়ে এতোটুকু বলে রাখা যায়— ভাষা-সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি প্রসঙ্গে নির্দিষ্ট পাঠক-লেখক-সম্পাদকের ভাবাদর্শিক বোঝাপড়ার নৈকট্য থেকে গোষ্ঠীভিত্তিক অখণ্ডতা তৈরি হয়। এই ভাবাদর্শিক বোঝাপড়া মোটেই নির্বিষ নয়। সে তার চিন্তা সানায় পূর্বেই স্থিত তার চাইতে বড়ো কোনো সাহিত্যিক উৎপাদন কাঠামোর বিরুদ্ধে। কেনো? ইস্পাতের যুগে প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সাহিত্যিক উৎপাদন কাঠামোয় মোটাদাগে তিন পক্ষের পরিষ্কার অবস্থান ছিল। যে পাঠক সে পাঠক, তার কাজ ভোগ করা। যে লেখক তার কাজ সাহিত্য উৎপাদন করা আর যে সম্পাদক তার কাজ পাঠকের কাজে বিক্রয়যোগ্য রূপে সাহিত্য হাজির করা। এই বাজার ব্যবস্থার সরল যোগে লেখকের কাছে পাঠক হলো কল্পনার বস্তু। এমন এক গায়েবি জীব যে জনভীড়ের মধ্যে মিশে আছে। যদি পাঠককে লেখক নাই চিনতে পারলে তার মন বোঝে কী করে? কী করে জনপ্রিয় সাহিত্য তৈরি হয়? এর উত্তর নিহিত পাঠকদের বাসনা সম্বন্ধে লেখকের সাধারণ ধারণায়। একটি নির্দিষ্ট সময়ের নির্দিষ্ট পরিবেশের মানুষের এমন কিছু চাহিদা থাকে যা সাধারণ। সেই সাধারণ চাহিদার সঙ্গে বাসনার যোগ থাকে। লেখক লিখতে বসেন সেই বাসনাকে মাথায় রেখে। লেখক-পাঠক সম্পর্কটি তখন দাঁড়ায় খাওয়া এবং খাওয়ানোর। এই কর্মে প্রতিষ্ঠানেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দিতে পারে ‘আপনি লেখক কি লিখলে পাঠক খাবে?’ এই প্রক্রিয়াতে তিনেরই স্থান নির্দিষ্ট, ইস্পাতের মতো অনড়। তিন পক্ষের এই বিযুক্ততা-বিচ্ছিন্নতা ইস্পাতের যুগে প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রি সাহিত্যিক উৎপাদন কাঠামোর পয়লা বৈশিষ্ট্য।

In a society based upon the division of labour, belongs to a very old level of bourgeous consciousness; it is an economy made from stubborn self-interset, an economy which flies in the face of the fact that it is only the exchange of spacialized skills which keeps the whole mechanism going in the first place. (Theodor W Adorno, The Culture Industry)

লিটলম্যাগাজিন আন্দোলন (ভুলে গেলে চলবে না এ আন্দোলন দাঁড়িয়েছিলো ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’র নিচে) এই বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে মেলকেন্দ্রি সাহিত্যিক উৎপাদন ব্যবস্থা দাঁড় করাতে চেয়েছিল। ফলে ব্যক্তিসম্পর্ককে গুরুত্ব না দিয়ে তার উপায় ছিলো না (সংযুক্তি : সাধারণ দশা বা গোষ্ঠীভিত্তিক লড়াইয়ের পাশাপাশি ‘বিশেষ দশা’ বলে একটি শব্দকে আমাদের চিহ্নিত করতে হচ্ছে। আমি মানুষ এ আমার সাধারণ দশা, আমি ‘ক’ এ আমার বিশেষ দশা। এই দুই দশার লড়াই সর্বত্রই চলছে। লিটলম্যাগাজিনের জগতের এই ‘বিশেষ দশা’ আছে। তা নাহলে এক চিহ্নতেই আজকের কাজ চলতো)। কিন্তু আমরা সাইবার স্পেসে বাস করছি। আমাদের আত্মপরিচয় নির্ধারণ করে দিচ্ছে ফেইসবুক। কেবল পাঠকদের যুগ বিলুপ্ত। এখন যে কেউ পাঠক, যে কেউ লেখক। খেয়ালে আনার বিষয়— ইস্পাতের যুগে লেখা ছিলো পণ্য, তারপর লেখক হলো পণ্য আর এখন পাঠকই পণ্যে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিসম্পর্ক লিটলম্যাগাজিনকে যেভাবে সেকালে নির্মাণ করতো তা এখন একই কায়দায় করতে পারবে এমনটা আর বোধকরি ভাবার অবকাশ নেই। চিহ্নর সঙ্গে ব্যক্তিসম্পর্কে স্তরে এসে নিজের পাঠককে হারিয়ে ফেলার এই বোধহয় মূখ্য কারণ।

বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চর্চার দর্শন ও চিহ্ন ৩০-এর চিহ্নায়ন

এ পর্বে আমার নিজেকে সম্পূর্ণ অন্য একটি প্রসঙ্গে হাজির করতে হবে। আমার প্রথম আর দ্বিতীয় পর্বের আলাপের দূরত্ব বিস্তর। তবে এতে একই সাথে চা আর সিগারেট খাওয়ার যতটুকু তৃপ্তি ততটুকু বোধ হয় পাওয়া যাবে। অর্থাৎ তৃতীয় কোনো স্বাদ। এ পর্বের আলোচনা চিহ্ন ৩০ এ নির্দিষ্ট। আর নির্দিষ্ট করে বললে তা নির্দিষ্ট সে সংখ্যার বিশেষ অংশটিকে কেন্দ্র করে। বিশেষ অংশ আছে মানে তার অন্য একটি অংশও আছে। চিহ্ন এর নাম রেখেছে নিয়মিত অংশ। চিহ্ন ৩০ সংখ্যাটি এই দুটি পর্বে বিন্যস্ত। যা নিয়মিত তা আগে থেকেই চলে আসছে। ফলে তা হয়ে উঠছে। হয়ে ওঠা ইতিহাসকে বাদ রেখে বোঝা মানে অনর্থ প্রযোজনা। তাই আলোচনা না করে শুধু দুটি প্রশ্ন আপাতত পরবর্তী আলোচনার খাতিরে তুলে রাখা যাক। প্রথমত, যারা চিহ্ন-এ লিখছেন তাদের সাথে ভাবাদর্শগত সম্বন্ধ সে কীভাবে গাঁথে? দ্বিতীয়ত, ফেইসবুক যুগে এসে চিহ্ন নিজেকে কোন ভূমিকায় দাঁড় করাচ্ছে?

এবার বিশেষ অংশে মন বসানোর পালা। ৩০ সংখ্যার অংশটির নাম ‘ক্রোড়পত্র’, বিষয় ‘বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চর্চার দর্শন’। ঠিক এই সময়ে এমন বিষয় তুলে এনে চিহ্ন যে প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে সন্দেহ নেই। সময়ের কারণেই এই ‘ক্রোড়পত্র’ আমার আগ্রহের কারণ হয়েছে। ‘ক্রোড়পত্র’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘গ্রন্থপ্রদত্ত পৃথকভাবে মুদ্রিত পত্র’ আমি বাংলা করি ‘আলগাভাবে জুড়ে দেওয়া বা চড়িয়ে নেওয়া’। চিহ্ন নিজ শরীরে বিষয়টি চড়িয়ে নিয়েছে, তার মানে বিষয়টিকে বিষয়ী তার অনুগামী চিন্তা দিয়ে পাঠ করতে চাইছে? কিন্তু ক্রোড়পত্র শব্দটি আগাম সাক্ষ্য দিচ্ছে এই গায়ে চড়ানো বিষয়টি ঠিক পাঞ্জাবী, ফতুয়া কিংবা শার্টের মতো শরীরের আকার নেবেনা। চাদরের মতো আলতোভাবে গায়ে জুড়ে থাকবে। যাতে প্রয়োজন হলে একপাশে সরিয়ে রাখতে কষ্ট না হয়। আলগাভাবেই হোক আর বিশেষার্থেই হোক, এ সময়ে এই গায়ে চড়িয়ে নেওয়া আলাদা গুরুত্ব বহন করে তাতে বোধকরি সন্দেহের অবকাশ নেই।

এবার আসা যাক ‘ক্রোড়পত্রে’র অন্দরমহলে। এ বিষয়ে আটজন বিদগ্ধ ভাবুকের চিন্তা চিহ্নপাটাতনে দাঁড়িয়েছে। চিন্তাসমূহ খুটে বিচারের অবকাশ এ লেখায় নেই তবে ছুঁয়েছেনে কিছু প্রশ্ন তোলার সুযোগটুকু আছে। এখানে আটটি লেখার মধ্যে আহমদ ছফার লেখাটি মাত্র আমার আগ থেকে পড়া। এখানে অবশ্য লেখাটি সংক্ষেপিত আকারে পুনমুদ্রিত। তাতে ছফার মূলবক্তব্য মোটামুটি অটুট থেকেছে। যারা কাটছাট করেছেন তাদের চেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। বাকি বিদ্বৎজনদের রচনাসমূহ আমার কাছে নতুন। বাংলায় মুসলমানদের আগমন কৈন্দ্রিক তত্ত্বতালাশ, বাঙালি ও মুসলমান এই দুই পরিচয়ের লড়াই, বাঙালি মুসলমান ও বাংলায় মুসলমানদের জাত ও সম্প্রদায়ের বিকাশ বিস্তার, সেক্যুলারিজমের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের বোঝাপড়া, উপনিবেশকদের বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানের সংগ্রাম, বাঙালি মুসলমানের চিন্তাচর্চার বিস্তার ইত্যকার বিষয়ই মোটামুটি প্রবন্ধসমূহে ছড়িয়ে আছে। প্রায় সবগুলো আলোচনাতেই ‘বাঙালি মুসলমান’ ঘটনাটিকে ইতিহাসের নিরিখে বিচারের চেষ্টা আছে। তার সামাজিক ও উৎপাদন সম্পর্ক বিচারের স্পষ্ট ছাপও আছে। এখানে আলাদা করে কোনো লেখাকে চিহ্নিত করে আলাপ তুলতে চাই না। সংকলন হিসেবেই এই ‘ক্রোড়পত্র’ যে অখণ্ড রূপ দাঁড় করিয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে আমার নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করার মধ্য দিয়েই আলোচনার ইতি টানবো। এ সংকলন মোটামুটি প্রমাণ করতে চেয়েছে, ত্রয়োদশ শতকেই বাংলায় মুসলমানদের আগমন ঘটেছিলো এবং এই আগমনের পেছনে দুটি দিক নির্দিষ্ট করা হয়েছে এক. সামরিক ও দুই. ধর্মীয়। কিন্তু ভারতবর্ষের সমুদ্রপথের ইতিহাস (Radhakumud Mookerji,Indian shipping; a history of the sea-borne trade and maritime activity of the Indians from the earliest times) খুঁজতে গেলে সমুদ্র বাণিজ্য নামে আরো একটি কারণ সামনে এসে পড়বে (অধ্যাপক জুলফিকার মতিন গৌণার্থে এই কারণটিরও উল্লেখ করেছেন)। ভারতবর্ষের পাশেই আরব সাগর। সে সাগরের ওপর আরব বণিকদের আধিপত্য ত্রয়োদশ শতাব্দীর অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। এ বাণিজ্য যে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো ইতিহাসে তারও খোঁজ মেলে। ফলে বলা যায়, আরব সাগরেও খণ্ডিত ভারতবর্ষের নানা জাতির সঙ্গে আরবীয়দের ফ্রন্টিয়ার ছিল। ত্রয়োদশ শতকের আগে এই ফ্রন্টিয়ারের সঙ্গে বাংলার কী সম্বন্ধ ছিলো তা বোধকরি নতুন সন্ধানের ক্ষেত্র হতে পারে। এবার আসা যাক উপনিবেশকদের বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানের লড়াই ও তাদের চিন্তাচর্চার প্রসঙ্গে। হানাফি তরিকা, ওহাবী আন্দোলন, সালাফি মতগুলোর সঙ্গে সেক্যুলার বাঙালি মুসলমানের বোঝাপড়া কীরূপে ঘটেছিলো তা এই সংকলনে পরিষ্কার নয়। যে কৃষক চৈতন্য এককালে ওহাবী পথকে আঁকড়ে ধরেছিলো তার ঐতিহাসিক বিকাশ প্রসঙ্গে কোনো স্বচ্ছ ধারণাও এখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। মোদ্দা কথা কোন উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তারের মধ্য দিয়ে সেক্যুলার বাঙালি মুসলমান ছেলেটি ও ইসলামিক মতাদর্শ আঁকড়ে ধরে থাকা ছেলেটি পরস্পরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকছে তার বিচারই মনে হয় এই মুহূর্তের জরুরি কাজ। তারপর আসছে বাংলায় মুসলমানদের জাত ও সম্প্রদায়ের বিকাশ বিস্তারের প্রসঙ্গটি। অধ্যাপক জুলফিকার মতিন এখানে এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। চিহ্নর উসিলায় আমি স্রেফ আমার একটি অভিজ্ঞতা তার সাথে বিনিময় করতে চাই। ঢাকায় থাকার কালে কয়েক দফা আড়িয়াল বিলে বেড়াতে যাবার সুযোগ আমার হয়েছিল। তখন বিলটিকে কেন্দ্র করে মানুষের আন্দোলন চলছে। বেড়াতে গিয়ে এক বৃদ্ধার সাথে আমার পরিচয় হয়। তিনি শিক্ষিত মানুষ ছিলেন না। তখন তার কাজ হয়েছিলো সারাদিন বিলের কোনো প্রান্তে গিয়ে বসে থাকা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি বিল পাহারা দিতেন। আড়িয়াল বিলের আন্দোলনে এভাবে তিনি জনতার কাতারে সামিল হয়েছিলেন। আমি তার কাছে বিল পাহারার কারণ জিজ্ঞাস করতেই তিনি বিলের ইতিহাস সম্পর্কে আমাকে সচেতন করার চেষ্টা শুরু করে দেন। বৃদ্ধার ভাষ্য মতে, আড়িয়াল বিল খনন করেছিলেন হযরত আলি। বিবি ফাতেমা নাকি এই বিল খননের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং হযরত আলি সেই বিল খননের পবিত্র দায়িত্বটি সম্পন্ন করেছিলেন। বৃদ্ধা যে বিলটি পাহারা দেন তার পিছনে কারণ ছিলো এই। বলাবাহুল্য এটি মিথ। কিন্তু বৃদ্ধার কাছে এটি ইতিহাস। এমন বৃদ্ধারা এভাবেই প্রান্তের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করে রাখেন। আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করেন। মজার বিষয় হলো বৃদ্ধাকে যখন আমি জিজ্ঞাস করলাম আপনি কোন সম্প্রদায়ের মানুষ, কোন তরিকা অনুসরণ করেন? তিনি জবাবে হযরত, ফাতেমা, আলি এমন কিছু নাম আউড়ে গেলেন। আমি পরে বৃদ্ধার পরিবারের অন্য এক বয়স্থকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন তারা সুন্নী। ঘটনাটি এখনো আমার মনে দাগ কেটে আছে কারণ আমিও শুধু জানি আমার পরিবার সুন্নী সম্প্রদায়ভুক্ত কিন্তু কোন তরিকার জানি না। ঘটনাটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য, আমি দেখতে পাই বাংলায় মুসলমানদের মধ্যে যে তরিকাগত ভাগ-ছেদ তা এখনো একরকম কিতাবী সাওয়াল জবাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। আমাদের সুবিধা হলো আমরা আরবের মতো বহু জাত-সম্প্রদায়-তরিকা-মতবাদে অতোটা বিভক্ত নই। এই ভাগভেদ আমরা একভাবে ভুলেও বসেছি। ওটাই বাঙালি মুসলমান হিসাবে আমাদের মিলের একটা কারণ। আশ্চর্যজনকভাবে শিয়া সম্প্রদায়ের বহু আচার আমরা গ্রহণ করেছি। পালন করছি। লালনও করছি। আমাদের প্রতিবেশী অপর ধর্মসমূহ থেকেও আমরা আচার বিচার গ্রহণ করতে পেরেছি মেলের শক্তি সমাজে আছে বলেই। দ্বিতীয় কারণ মনে হয়, জমিদারী ও ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তৃতীয় কারণ বাংলার ভাবান্দোলনের ধারা যা বস্তুত বিকশিত হয়েছিলো অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে। মীর মশাররফ হোসেনের মতো চিন্তাশীল বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা বাংলায় যে কখনোই খুব বেশি ছিলো না কথাটা বলছি সে সিদ্ধান্ত মাথায় রেখেই।

জাত, সম্প্রদায় প্রসঙ্গে আরেকটি প্রশ্নে নজর দেওয়া আজকে খুব জরুরী। প্রশ্নের প্রসঙ্গটি মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলি সাহেবকে লেখা কাজী আবদুল ওদুদের পত্র থেকে আমি ধার করেছি। ওদুদ লিখছেন, ‘বৈজ্ঞানিক সত্য বলতে যা বোঝায় সেখানে অবশ্য শাস্ত্র বড়ো, গুরু নন। কিন্তু তার বাইরে যেগুলোকে গড়ৎধষ ঞৎঁঃয বলা হয়, অর্থাৎ যে-সব সত্য নিয়ে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ও ব্যক্তিতে সমাজে প্রতিদিন কারবার চলে সেসব ক্ষেত্রে গুরু বাস্তবিকই ‘শাস্ত্রের চাইতে বড়’ (কাজী আবদুল ওদুদ, নির্বাচিত প্রবন্ধ)। এটা অত্যন্ত মুশকিলের কথা, ওজনদার কথাও। সে বিচারে যেভাবে ওদুদ বলতে চান— হযরত ইসলামের চাইতেও বড়। তিনি বড়ো বলেই তার জীবনাদর্শকে সবধর্মের মানুষ অনুসরণ করতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো এমন ধারণা কী বাংলায় নতুন কিছু। শ্রী চৈতন্য কি বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের চাইতেও বড়ো নন? কিংবা রামকৃষ্ণ। ভারতবর্ষের বহু আউলিয়াকেই এই নজিরের মধ্যে ফেলা যায় (উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও একই বিচারের তলে ফেলা যায়)। তাহলে মোটা দাগে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে শুধু বাংলা নয় বৃহত্তর ভারতবর্ষেই ধর্মের প্রকাশ কি ধর্মতত্ত্ব কৈন্দ্রিক না ব্যক্তিকেন্দ্রিক, মিথিক?  ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার সুবিধা হলো তাকে বানিয়ে নেওয়া যায়, মতবাদকে পাল্টাতে গেলে ভাঙতে হয়।

আজকে আরবে, উত্তর আফ্রিকায়, পাকিস্তানে, অফগান অঞ্চলে যে রাজনৈতিক সুন্নী ইসলাম মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তার পেছনে চলমান নয়া উপনিবেশবাদের শোষণ ও জাত-পাত কেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তারের লম্বা ইতিহাস আছে। পাশ্চাত্যে যে ইসলাম পথে ঘাটে জঙ্গিত্ব দেখাচ্ছে তার পেছনে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অপর হয়ে থাকার জ¦ালা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের তরুণতুর্কীরা এ লড়াই ইসলামের কোন চিন্তা-দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য চালাচ্ছে, কার বিরুদ্ধে চালাচ্ছে? বাংলার কৃষক যে শোষণের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে যেভাবে ওহাবী হয়ে উঠেছিলো তরুণতুর্কীগণ কী সেই উত্তরাধিকার বহন করেন (বহন করে থাকলে মেল নষ্টের পায়তারা তারা করে কেনো)? ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার, প্রতীকচর্চার সুবিধা আছে কিন্তু তার অসুবিধাটিও কিন্তু ভয়ানক। মাইকেল এ্যাঞ্জেলোর দ্য লাস্ট জাড্জমেন্ট চিত্রকর্মটির দিকে তাকালেই ভয়াল দৃশ্যটি চোখে পড়ে— তুমি সেই পবিত্র আত্মাকে দেখো যে ক্রুশে ঝুলে আছে, চোখে জল, মুখে আধোস্ফূট বুলি— প্রভু ওদের ক্ষমা করো। আমি সেই প্রবল আত্মাকে দেখি যে উঠে এসেছে, হাতে জাহান্নামের আগুন, তোমাদের সমস্তটাই যে মুছে দেবে, ক্ষমা কোনো সমাধান হতে পারে না। একই পত্র থেকে আবদুল ওদুদকে উসিলা করে শেষ করছি, ‘…প্রতীক-চর্চা খুব খারাপ নয়, এর দ্বারা কেবল যে অনর্থই হয় তা নয়। এর সঙ্গে সমর্পণ-ধর্মের, সৌন্দর্যবোধের ও প্রেমধর্মের যোগ রয়েছে। এটি মন্দ হয় তখন যখন এটি উৎকট আকার ধারণ করে…তাতে জ্ঞান ও মানুষের সাথে সহজ সম্পর্ক নষ্ট হয়। আর এই দুই নষ্ট হলে মানুষের কল্যাণও আর করা যায় না’ (কাজী আবদুল ওদুদ, নির্বাচিত প্রবন্ধ)।

পাঠ : চিহ্ন ¬৩০
সম্পাদক : শহীদ ইকবাল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

চিন্তার ছাপচিহ্ন
মোহাম্মদ শেখ সাদী
চট্টগ্রামা

মানুষ যে চিন্তাশীল এবং যুক্তিশীল প্রাণি, তা নিয়ে সন্দেহ করা চলে না। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে মানুষ তার জীবনে উৎকর্ষ সাধনে চিন্তা করে চলেছে। সেই চিন্তা কখনো সাহিত্য, দর্শন-শিল্পকলার নানা শাখায় যুগান্তকারী দর্শনরূপে গণ্য হয়েছে। দিনে দিনে মানবসভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে, সাহিত্য ও মানববিদ্যায়, শিল্প ও দর্শনচর্চায় অপরিসীম উৎকর্ষ সাধন করছে। পরিবর্তনশীল সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় চিন্তা ও দর্শনের জগতে মুসলমানরা পিছিয়ে রয়েছে বলে কথিত হয়। অধিকাংশ যুক্তিবাদী মানুষ মনে করেন, ধর্মতাত্ত্বিক অন্ধবিশ্বাস কিংবা ধর্মীয় গোঁড়ামী যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তার প্রতিকূল হওয়ায় মুসলিম-চিন্তা-দর্শন এগুতে পারেনি; পারে না। তবে ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিকিৎসা-দর্শন চিন্তায় আরবের মনীষীরা উৎকর্ষের চরম স্বাক্ষরবাহী। মুসলমানদের অবদান এক্ষেত্রে অপ্রতুল নয়। কিন্তু ভারতবর্ষীয় বাঙালি সমাজে পশ্চাৎপদ মুসলমানদের চিন্তা-দর্শন কতোদূর এগুলো? দর্শন-চর্চার উৎকর্ষ তথা অগ্রসরমানতা বিচার বিশ্লেষণ করতে প্রয়াসী হয়েছে শহীদ ইকবাল সম্পদিত চিহ্ন পত্রিকাটি। তা-ও আবার ‘বাঙালি মুসলমানদের চিন্তা-চর্চার দর্শন’ নিয়ে। চিহ্নর ১৬ তম বর্ষে ৩০ তম সংখ্যার এই বিশেষ আয়োজনটি তাই অনেকটা মূল্যায়নধর্মী ও তাৎপর্যবাহী। একবিংশ শতাব্দীতে চিন্তা-দর্শনের ক্রমবিকাশের ধারায় তা কেবল আত্মগত বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়াস নয়; বরং তা পিছনে ফিরে দেখা এবং নব তাৎপর্যের আলোকে চিহ্নিত সমস্যাবলী দূরীভূত করে দর্শন চিন্তার জগৎ তথা নিজস্ব সমাজকে প্রগতির শিখরে পৌঁছানোর তৎপরতা।

‘বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চর্চার দর্শন’ ক্রোড়পত্রটিতে আটজন প্রাবন্ধিকের বিশিষ্ট প্রবন্ধসমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। নানামাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বাঙালি মুসলমান-সমাজ ও দর্শনের উৎকর্ষ-অপকর্ষ, সংকট-সমস্যা, দ্বন্দ্ব ও প্রতিকারের আভাস-ইঙ্গিত উপস্থাপিত হয়েছে। সমাজ-পরিবর্তনের নানাসূত্র বেয়ে আজকের মুসলিম সমাজ ও তার চিন্তা-দর্শন কোন সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে তারও একটি সুস্পষ্ট পরিপ্রেক্ষিত প্রতিফলিত হয়েছে এসব লেখায়। তবে প্রবন্ধগুলোকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে গেলে অনেকের লেখায় কিছু একপাক্ষিক বিষয়ে অধিক গুরুত্বসহ শিরোনামের ব্যাপকতাকে স্পর্শ করতে না পারার বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয়। সবগুলো প্রবন্ধ মিলে ‘ক্রোড়পত্র’টিকে করেছে বিশেষ মর্যাদায় সমাসীন। ব্যাপক তথ্যে-তাৎপর্যে এই সংখ্যাটি পাঠক-হৃদয়ে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য একটি সংখ্যা হওয়ার দাবি রাখে। ঔপনিবেশিক আমলে ইউরোপেীয় শিক্ষা-দর্শনের অভিঘাতে ভারতবর্ষে যে জোয়ার বইয়েছিলো— তার প্রভাবে হিন্দু সমাজ প্রথম জাগলেও মুসলমানদের জাগরণ ঘটতে বিশ শতকের প্রথম পাদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। তবে জুলফিকার মতিন ‘বাঙালি মুসলমান ও তার মন’ প্রবন্ধে মুসলমানদের স্বরূপ উদ্ঘাটনে হয়েছেন আরও শেকড়সন্ধানী। অসাধারণ এই প্রবন্ধটিতে আর্য-অনার্য, বাঙালীত্ব ও মুসলমানিত্ব, বাঙালি মুসলমানদের মানসগত গঠনের উৎসসন্ধানসহ আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের বহুমুখী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে— যা অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ও চমকপ্রদ মনে হয়েছে। সংকটের নানামুখী আভাস, যা একাল পর্যন্ত বিস্তৃত; তা-ও উপেক্ষিত থাকে নি তাঁর প্রবন্ধে। অতি সাম্প্রতিক কাল-প্রবণতা ও বাংলাদেশের মুসলমানদের ধর্মীয় গোঁড়ামী, যুক্তিবাদী মনস্কতার অভাব সংকটকে যে আরও জটিলতর করে তুলছে— তারও একটি নির্মোহ গ্রহণযোগ্য চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি। বলা যায়- প্রবন্ধটি প্রায় বাঙালি মুসলমানদের চিন্তা-দর্শন ও মননের সার্বিকতাকে স্পর্শ করেছে।

মধ্যযুগে যখন দেব-দেবী নির্ভর সাহিত্য রচিত হয়, মানুষ যখন ভাবনার কেন্দ্রে ছিলো না, তখন মুসলমান কবিরাই মানবমহিমা প্রথম প্রচার করেছিলো। বাঙালি মুসলিম মনীষীর অন্যতম চিন্তক আহমদ শরীফ তাঁর বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য- গ্রন্থে মুসলমানদের অবদান সবিশেষ উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, আহমদ শরীফ মুসলিম নামধারী কিন্তু ধর্মবিশ্বাসী নন। তাহলে কোনটা মুসলমানদের অবদান বা চিন্তা-দর্শন? কোনটি হিন্দুর? কোনটাই বা বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের? এসব নিয়ে বিতর্ক করা চলে! সবইতো মানুষের অবদান! মানুষ যেহেতু কোনো না কোনো ধর্মের অনুসারী বা কিছু বিশ্বাসের অনুগত এবং সে যেহেতু সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে বসবাস করে কিংবা তারও যে রয়েছে বিশেষ জাতিসত্তা বা জাতীয়তা— এসমস্ত কারণেই সমাজ-রাষ্ট্রের পরিবর্তনশীলতার সকল ফ্যাক্টরকে আত্মস্থ করে মানুষকে বিকশিত হতে হয়। মুসলমানও একটি জাতি এবং বাঙালিও একটি জাতি। একটির ঐক্যসূত্রের উপাদান ধর্ম; আরেকটির ভাষা। তাই সমস্যাও হয়েছে প্রকট।

হাবিব আর রহমানের ‘বাঙালি মুসলমান সমাজ : ইতিহাসের ঘুমভাঙা’ — প্রবন্ধে তিনি ইতিহাস পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে মুসলমান সমাজের ক্রমবিকাশ ও চিন্তা-চেতনার বৈপ্লবিক পর্যায়গুলোকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি শুধু ঔপনিবেশিক আমল থেকে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন- যা আরও দূর অতীত থেকে সূচনা করা যেত। সওগাত পত্রিকা ও শিখা-গোষ্ঠীর ভাবান্দোলন মুসলিম সমাজ ও  মানসে জীয়নকাঠির ন্যায় সজীবতা ও জোয়ার এনে দিয়েছিলো। তাঁর প্রবন্ধে দুটো দিকই গুরুত্বের সাথে উপস্থাপিত হয়েছে। তৎকালীন দৈনিক ও সাহিত্য পত্রিকা যে মুসলিম চিন্তা-দর্শন বিকাশে জাদুকরী ভূমিকা পালন করেছিলো, তা আমরা সবাই জানি।

‘বাঙালির মননচিন্তা’ প্রবন্ধে মোস্তাক আহমাদ দীন বাঙালির লোকায়ত সাহিত্যধারার চমৎকার আলোচনা ও তথ্যসন্নিবেশ করেছেন। চৈতন্য প্রভাবিত ভাবান্দোলন কীভাবে পরবর্তীকালের সমন্বয়ী ভাবনায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন— সে বিষয়ে রাজা রামমোহনকে নিয়ে তিনি চমৎকার আলোচনা করেছেন। তবে তাঁর প্রবন্ধের প্রায় পুরোটা জুড়ে কেবল শিরোনাম বহির্ভূত মনীষীদের পর্যালোচনা। শুধুমাত্র শেষ অনুচ্ছেদে এসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’র আলোচনা দিয়ে প্রবন্ধটিকে তিনি জারিত করলেন বাঙালি মুসলমান শব্দের সরোবরে। তবে তাঁর প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ও রসভাষ্যের আমি একজন সমঝ্দার পাঠক। গৌতম গুহ রায়ের ‘অখণ্ড উত্তর বাংলার মুসলমান সমাজ : এক অভিন্ন উৎস’— ঐতিহাসিকতার আদলে বিশ্লেষিত একটি বিশেষ অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর খতিয়ান মাত্র। তা সামগ্রিকতাকে স্পর্শ না করলেও আমাদের জ্ঞান-ভাণ্ডারকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে।

‘মুক্তবুদ্ধির উপাসক আবুল হুসেন’ শীর্ষক প্রবন্ধে শরীফ আতিক-উজ-জামান শিখা-গোষ্ঠীর পুরোধা আবুল হুসেনের জীবন ও কর্মের নানান বিরল বক্তব্য, যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী উক্তি উল্লেখ করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, যুগের তুলনায় অগ্রসর চিন্তাবিদ আবুল হুসেনকে তৎকালীন মুসলিম সমাজ ধারণ করতে পারেনি। তবে মুক্তবুদ্ধিচর্চার অন্যান্য মনীষীরাও কম গুরুত্বপূর্ণ নন। মোতাহের হোসেন চৌধুরী, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার প্রমুখ মুসলিম বিপ্লবী চিন্তকের কথাও স্মরণীয়।

আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক চিন্তক ও লেখক। বোধকরি কেউ আমার এই সুদৃঢ় উক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন না। বাঙালি মুসলমানের মন তাঁর কালজয়ী মৌলিক গ্রন্থ। বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহাসিক-নৃ-তাত্ত্বিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের চুলচেরা উৎসগত বিশ্লেষণে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি মৌলিক। বলা যায়, বাঙালি মুসলমানের ব্যুৎপত্তিগত স্বরূপ উদ্ঘাটন তিনি করেছেন। বাঙালি মুসলমানের মন গ্রন্থ থেকে অংশবিশেষ নিয়ে মুদ্রিত আহমদ ছফার প্রবন্ধটি ক্রোড়পত্রটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা এবং তারই ‘ভাবশিষ্য’ জাকির তালুকদার আহমদ ছফার আতশকাচ দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছেন। তবে আতশকাচ আহমদ ছফার হলেও ফাঁকে ফাঁকে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী মৌলিকতা আমাদের মুগ্ধ করে।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, চিহ্নর এই বিশেষ আয়োজন সার্থক হয়েছে। আত্মমূল্যায়নের এই প্রয়াস নবচিন্তা-দর্শন বিকাশের নব নব দ্বার উন্মোচিত করবে বলে বিশ্বাস করি। কালের পরিক্রমায় বাঙালি মুসলমানদের আত্মদর্শন-চিন্তার একটি বিশেষ ছাপচিহ্ন চিহ্নর ৩০তম সংখ্যাটি— যা পাঠ করে পাঠকসমাজ সমৃদ্ধ হবে। সমস্যা-সংকট নিরসনে চিন্তকেরা প্রয়াসী হবে নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচনে। আহমদ ছফার মতে ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ ও ‘অপরিণত’ বাঙালি মুসলমান সমাজ একদিন পরিণত অবয়ব পাবে, তাঁর চিন্তা-দর্শনও পৃথিবীতে দীপ্তি ছড়াবে এমনটি আশা আমরা করতেই পারি।

নির্ধারিত ক্রোড়পত্র অংশটি ছাড়া চিহ্নর অন্যান্য নিয়মিত বিভাগগুলো নবীন-প্রবীণ লেখক ও পাঠকের চিন্তা ও চরিত্রের রসায়ন, বলা যায়। আছে কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-অনুবাদসহ বই ও পত্রিকা আলোচনা এবং কয়েকটি ধারাবাহিক (সিরিজ)। এগুলো কোনোটা নিরীক্ষাধর্মী কোনোটা দুর্বল গোছের। নতুনদের লেখায় সম্ভাবনা আছে কিন্তু পরিমার্জিত বলা যায় না। বস্তুত, চিহ্নর প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে থাকলেই এই নিয়মিত বিভাগগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার মূল্যায়ন করা সম্ভব। তবে সংগ্রহে রাখার মতো এ পত্রিকাটির বয়স যেমন বেড়েছে তেমনি নিশ্চয়ই দায়িত্বও বেড়েছে। এই অনুভব সম্পাদক নিশ্চয়ই ধারণ করেন। পত্রিকাটির সমৃদ্ধি কামনা করি।

অনুবাদ

‘The Lotos-Eaters’ ও ‘রূপালী স্নান’

টেনিসন ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম একজন প্রসিদ্ধ এবং প্রশংসিত কবি। ১৮৫০ সালে ওয়ার্ডসওয়ার্থের উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর আবির্ভাব। তিনি আসলে ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রতিনিধিত্বকারী কণ্ঠস্বরও বটে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আধুনিক কবি শামসুর রাহমানও বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রতিনিধিত্বকারী কণ্ঠস্বর। ওই সময়ের বিখ্যাত বাংলাদেশি কয়েকজন কবির অন্যতম একজন তিনি। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ (Art for Art’s sake) এবং ‘জীবনের জন্য শিল্প’ (Art for Life’s sake) এ দুটো আপ্তবাক্যের সন্নিবেশ-ই উভয় কবির কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কবিতা দুটোতেই পরিপূর্ণতা পেয়েছে পাঠকের জন্য একটি সৌন্দর্য আর আনন্দময় জগত সৃষ্টির প্রচেষ্টা যেখানে কোনো নৈতিকতা শিক্ষা কিংবা মূল্যবোধচর্চা কোনো বিচার্য বিষয়ই নয়। আর এতেই ফোটে ওঠে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ এই আপ্তবাক্যের সমস্ত সারবত্তা। একই সাথে উভয় কবিতায়ই উঠে এসেছে মানবজাতির অব্যাহত দুঃখ-দুর্দশার কথা এবং তাদের সার্বজনীন চাওয়া আসলে এই কঠিন বাস্তবতা থেকে পরিত্রাণ লাভ, এ-সত্যটিও উঠে এসেছে তাঁদের কবিতার মাধ্যমে। ‘The Lotos-Eaters’ ছাড়াও টেনিসনের কাব্যচর্চার শুরুর দিকের আরও কয়েকটি কবিতাকে, যেমন ‘The Lady of Shalott’, ‘The Palace of Art’, ওই একই বৈশিষ্ট্যের নিরিখে আলাদা করা যায়। ওই কবিতাগুলোতে পারিপার্শ্বিক সংঘাতময় অবস্থা থেকে মুক্ত কাব্যিক সত্তার জন্য আলাদা একটি পৃথিবী গড়ে তুলেছেন কবি। এক্ষেত্রে ‘The Lady of Shalott’ কবিতাটির নারীসত্তাকে বাস্তবতার প্র্রতিঘাতের প্রভাবমুক্ত রেখেছেন। প্রথমত, তার আবাসস্থল মানব সভ্যতা ঘেঁষা নয়, বরঞ্চ দূরবর্তী একটি দ্বীপে তার একচিলতে ঠাঁই। দ্বিতীয়ত, একটি উঁচু দেয়ালঘেরা ভবনে তিনি থাকেন যেখানে বাইরের পৃথিবীর কারোর পক্ষেই প্রবেশ সহজসাধ্য নয়। তৃতীয়ত, সুউচ্চ ভবনটির একেবারে ওপরের তলায় থাকেন ওই মহিলা। আর সর্বোপরি, সরাসরি বাইরের কঠিন বাস্তবতার জগত থেকে সম্পূর্ণই বিচ্ছিন্ন তিনি। কাব্যিক সত্তার মধ্যে ওই একই রকমের বাস্তব জগতের প্রতি ভীতি আর এ-কারণে সব ছেড়ে বাস্তবিক কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অবস্থানের সুন্দর অভিব্যক্তি পরিলক্ষিত হয় ‘The Palace of Art’ কবিতায়। শেষোক্ত কবিতা দুটো পাঠে পাঠকগণ লক্ষ করে থাকবেন শেষ দিকে এসে কাব্যিক সত্তাকে অনিবার্য এক করুণ পরিণতি বরণ করে নিতে হয় কেননা তখন বাস্তবতার বিপরীতেই তার অবস্থান এবং বাস্তবতা প্রকৃতপক্ষে ভীষণ নির্দয়। টেনিসন তাঁর অপর কবিতা ‘The Lotos- Eaters’-এ আর শামসুর রাহমান তাঁর ‘রূপালী স্নান’ কবিতায় নতুন এক ধরনের সত্তার সাথে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন যে সত্তা সবরকমের দুঃখ-দুর্দশামুক্ত সুখ, স্বাচ্ছন্দ আর মুক্তির অপার সম্ভাবনাময় এক নতুন পৃথিবীর বাসিন্দা। যাই হোক, এর বাইরেও দু’জনেই ‘জীবনের জন্য শিল্প’ এই আপ্তবাক্যকেও ধারণ করেছেন তাঁদের কাব্য সাধনায়। কাব্যিক জাদুমন্ত্রের এই মেলবন্ধন যে কোনো মন্ত্রমুগ্ধ পাঠককে নাড়া দেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে কেউ একই সাথে এ দুটো কবিতা পড়লে অবধারিতভাবে এই সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হবে যে সাংস্কৃতিক ব্যবধান, বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি পঁচিশ বছরের ব্যবধান সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এ দুটো কবিতা আশ্চর্যজনকভাবে অভিন্ন। এরপরের আলোচনাকে তাই এ দুটো কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক মেলবন্ধন কেন্দ্রিক করে ফেলাই হয়তো শ্রেয় হবে।

পারিপার্শ্বিকতা

‘রূপালী স্নান’ ও ‘The Lotos-Eaters’ কবিতা দুটোরই পারিপার্শ্বিকতা প্রকৃতির পটভূমিকায় নিহিত। শেষোক্ত কবিতাটির পরিশ্রান্ত নাবিকেরা ঘরে ফেরার পথে এমন একটি দ্বীপে পৌঁছায় যেখানে সময়টা চিরন্তন আলো-আঁধারির এক বিকেলে থমকে আছে। সূর্য সব সময় রক্তিম অবস্থায় পশ্চিম দিগন্তে দীপ্তি ছড়ায় আর সান্ধ্যকালীন চাঁদটাও ঠিক মাথার ওপরের আকাশে সদা ভাস্বর। অগুণতি জলধারা পাহাড়ের চূড়া থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে সমুদ্রপানে বয়ে চলে সর্বদা। পর্বতশৃঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা সফেদ তুষার। দ্বীপটির বালুকারাশি সূর্যালোকের জন্য হলদে বর্ণের। কোথাও কোথাও দ্বীপটিতে শৈবালের আচ্ছাদন আর কোথাও-বা সুগন্ধি বৃক্ষরাজি ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সমস্ত দ্বীপ ঘিরে পাইন আর তালগাছের সারি। পদ্মফলের সুগন্ধি রেণু বাতাসে মিশে মিশে বাতাসকে ভারী মিষ্টি আর প্রাণবন্ত করে রেখেছে সবসময়। নাবিকদের অবসর উপভোগের এবং পরিশ্রান্ত শরীরকে বিশ্রামের প্রগাঢ় আশ্রয়ে এলিয়ে দেবার সবচেয়ে সুন্দর ও পরিপূর্ণ একটি স্থান যেনো এই দ্বীপ। এখানে অবধারিতভাবেই সব সময় বিকেলের জয়জয়কার; ব্যস্ত সকাল অথবা কোলাহলমুখর দুপুর কিংবা সুনসান মৃত্যুসম রাতের নয়। বিকেলের শান্তবুকে সবাই একটুকু প্রশান্তির অনুসন্ধানে ব্যাপ্ত হয় আর মুক্তি চায় শ্রান্ত-ক্লান্ত-অবসাদগ্রস্ত জীবনের টানাপড়েন থেকে। চিরকালীন এক বিকেলেই তাই নাবিকদল পৌঁছে যায় ওই দ্বীপে :

In the afternoon they came unto a land,

In which it seemes always afternoon

দ্বীপের সময়ের ন্যায় নাবিকরাও যেনো জীবনের পড়ন্ত বিকেলে উপনীত। জীবনের সব উৎকর্ষ পেছনে ফেলে, আর ব্যস্ততাকে বিদায় দিয়ে জীবনের সমস্ত দায়ভার থেকে নিষ্কৃতিই পেতে চায় তারা সবাই। পুনর্বার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবার কোনো অভিলাষ নেই তাদের মনে। আর তাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার মুখোমুখি হতে না হতেই তাদের বোধোদয় ঘটে, ‘Confusion is worse than death’। এই হলদে বালুকারাশি তাদের নিঃশেষিত জীবনীশক্তি আর ক্ষয়িষ্ণু ইচ্ছা শক্তিরই প্রতিচ্ছবি বটে। এখানে সেখানে ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শীতল আর গভীর শৈবালে ঢাকা ভূমি তাদের জন্য প্রশান্তিময় বিছানা। সেখানেই বিশ্রাম নেয় তারা, স্বচ্ছন্দেই। তবে সে-দ্বীপের নদীর স্রোত ভীষণ রকমের ধীর, ক্রমশ নিচের দিকে ছুটে চলা অবিশ্বাস্য কোনো ধোঁয়ার গতির সাথেই যার তুলনা চলে। অথচ ধোঁয়া সব সময় একই গতিতে কোনো প্রকার তাড়াহুড়া ছাড়াই ওপরের দিকে উঠে হাওয়ায় মিশে যায়। এসব দেখে মনে হয় মানবজাতির ন্যায় ক্লান্তিতে অবশ হয়ে আছে নদীগুলোও। তাই এদের বয়ে চলাটা শুধু বয়ে চলা নয়, বরং চলতি পথে পরিশ্রান্ত মানুষের ন্যায় উঁচু পাহাড়ি বাধায় থেমে থেমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে পুনরায় ছুটে চলে আপন গতিপথে, তারপর আবার উঁচু কোনো বাধার সম্মুখে থামে এবং পুনর্বার চলতে শুরু করে। ছোট ছোট নদীগুলো যেনো কোনো এক ক্লান্ত মুসাফির যে চলতিপথে থামে আর বিশ্রাম নেয়। অতঃপর পুণরায় ছুটে চলে:

And like a downward smoke, the slender stream

Anon the cliff to fall and pause and fall did seem.

A land of streams! …

মন্ত্রমুগ্ধের মতো সূর্যটাও পশ্চিম আকাশের প্রগাঢ় আশ্রয়ে ঠায় ভেসে থাকে। সূর্যাস্তের এ-রূপ অবলোকন করার মাঝে ভীষণ আনন্দ নিহিত। সূর্যাস্তের এ-চিরস্থায়ী অনড় অবস্থান অবশ্য পরিশ্রান্ত নাবিকদের মনে আনন্দ জাগায়। তবু সূর্য নিজেই তখন পরিভ্রমণ করতে করতে ভীষণ ক্লান্ত আর বিশ্রামে মগ্ন। তবুও সাঁজের বেলার এই চিরস্থায়ী বিলম্ব সবকিছু ছাপিয়ে নাবিকদের আনন্দানুভূতিকেই দীর্ঘায়িত করে। বহতা বাতাস এখানে বিস্ময়কর রকমের মৃদু এবং প্রবল আরামদায়ক, ভীষণ শ্লথ আর অচেতন চিত্তে ছুটে চলে অবিরাম। মনে হয় ভয়ংকর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা কেউ একজনের মতো হাঁপিয়ে উঠেছে বাতাস। তবু সবকিছু জুড়েই যেনো মিশে আছে স্বচ্ছ বাতাসের ছোঁয়া। অবশ্য উন্মত্ত সাগরও ক্লান্তির ঊর্ধ্বে নয় মোটেই :

but evermore

Most weary seem’d the sea, weary the oar,

Weary the wondering field of barren foam.

আকাশের বুকে জাজ্বল্যমান উজ্জ্বল চাঁদটিও বাড়িয়ে দেয় আনন্দের মূর্ছনা। দ্বীপটি ঠিক এ কারণেই শ্রান্ত-ক্লান্ত প্রতিটি মানবাত্মার শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। আফিম ফুল এ সুখে বিভোর হয়ে যেনো নুয়ে পড়ে গভীর ঘুমে। পদ্মফুলের স্বপ্নিল সুগন্ধি ধূলায় ভারী হয়ে থাকে বাতাস। আর সুন্দর ওই আকাশ থেকে বৃষ্টির ন্যায় ঝরে পড়ে সুরের ধারা। সবার চোখ সেখানে অর্ধ-নিমীলিত, সুখনিদ্রায় বিভোর। সেখানে চিৎকার করে নয়, লোকজন কথা বলে ফিসফিস করে আর দিনাতিপাত করে অতীতের সুখস্মৃতি রোমন্থন করে করে। অনন্য সূর্যাস্ত তাদের সাহস আর প্রেরণা জোগায় কষ্টের গ্লানি বহন থেকে বেরিয়ে আসতে আর উৎসাহ জোগায় জীবনের অফুরন্ত সুখের সে-রাজ্যে ছুটে যেতে আর ভুলে যেতে ভীষণ বেপরোয়া সব কষ্ট আর ঘেন্নার ওই নীল সাগর। এই ভুলে যাওয়াটুকু তাদের খুব ভালো লাগে আর প্রকৃতির বুকের লালিত জলের ধারের ঘাসের বুকে (galingale), চিরকালীন স্রোতে কোনো ফুলের (amaranth) সজীবতা গায়ে মেখে, ঔষধি কোনো পুষ্পবৃক্ষের (moly) ছায়ায় সুখী হয় খুব পূর্ণতা প্রাপ্তিতে। প্রকৃতির এ-বদান্যতাটুকু পরিশ্রান্ত সেনাদের জীবনের নিবিড় টিকে থাকার আশার আলো জ্বালে, বেদনাতে একরাশ প্রশান্তির পরশ বুলায় আর জীবনের গোধূলিতে নিবিড় আশ্রয়স্থলের নিশ্চয়তা প্রদান করে।

অবশ্য টেনিসনের জীবন আর কর্মে প্রকৃতির অবদানই মূলত মুখ্য। এজন্যই তাঁকে হয়তো বনবাদাড়, পুষ্পশোভিত বাগান আর স্রোতধারার কবি বলা হয়। ‘The Lotos-Eaters’ কবিতার পটভূমি রচনায় অনেকগুলো উৎসের আশ্রয় নিয়েছিলেন টেনিসন। অনুসন্ধান করে করে আমরা জানতে পারি এ-কবিতা আসলে হোমারের ওডিসির নবম অধ্যায়ের। ট্রোজান যুদ্ধ শেষে নিজ দেশ ইথাকায় ফেরার পথে ইউলিসিস ও তাঁর সহযোদ্ধারা পদ্মফুল শোভিত একটি অদ্ভুতুড়ে দ্বীপে কোনো এক জাদুকরের জাদুর মায়াজালে আটকা পড়েছিলেন। আর সেখান থেকে তিনি সঙ্গী সৈন্য-সামন্তসহ ফিরে যাওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। হোমারের অনবদ্য সৃষ্টি এ-ক্ষুদ্র অধ্যায়টুকুই কবির হাতে এসে বিশদ রূপ লাভ করেছে। তাছাড়া বাইবেল-এ বর্ণিত সৃষ্টির সূচনাতে এডেনের বাগানেও পদ্মফুলের বিবরণ পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য ভূমিকা পরিবর্তিত হয়ে পদ্মফুল তখন জ্ঞানফল। সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসটি টেনিসন এবং তাঁর বন্ধু হ্যাল্লামের স্পেন ভ্রমণ। পিরেনিজ পর্বতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর এর আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ‘The Lotos-Eaters’’ কবিতার পাশাপাশি Oenone আর Mariana in the South কবিতাগুলোর উৎসমূল।

অপরদিকে সুন্দর এবং মনোমুগ্ধকর একটি সান্ধ্যকালীন মুহূর্তে শুরু হয় ‘রূপালী স্নান’ কবিতাটি। জীবনের পথে ঘুরতে ঘুরতে কবি সাঁজের বেলায় উপনীত হয়ে জীবনের গভীর অনুসন্ধান ও উপলব্ধিতে মগ্ন। The Lotos-Eaters’ কবিতার মতো এখানেও তাৎপর্যপূর্ণভাবে সময়টা পড়ন্ত বিকেল কিংবা সন্ধ্যা :

শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ
অথবা প্রখর ধু-ধু পিপাসার আঁজলা-ভরানো পানীয়ের খোঁজ
শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহ্নের কাছে এসে রোজ
চাইনি তো আমি।
কথকের কণ্ঠে এখানে উঠে আসে কেবল খাদ্য আর পানীয়ই জীবনের সব নয়। তিনি এখানে শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামের স্বপ্নে বিভোর :
কবির এই ক’টা পঙ্ক্তিতে আসলে ছড়িয়ে রয়েছে রোমান্টিকতার আচ্ছাদন। ক্ষুৎপিপাসার উপস্থিতি পরিলক্ষিত হলেও তা অন্ন ভোজ কিংবা সুপেয় জলের তেষ্টা ওসবের ঊর্ধ্বে। কেননা এসব খিদা নিতান্তই জৈবিক। কিন্তু সব ছাপিয়ে চোখ বা মনের খিদাই মুখ্য। কবির চোখের সামনেই পৃথিবীর বর্ণিল আর দ্যুতিময় সৌন্দর্যের পশরা একের পর এক থরে-বিথরে সাজানো। ঘাসের বুকের আশ্রয়ে থেকে থেকে তিনি সেসব দেখেন মুগ্ধ হয়ে…

সবুজ মখমল ঘাসের বিছানাতে তিনি তাই স্বচ্ছন্দ বিশ্রামের একটুকরো আশ্রয় পেয়ে যান আর তার আশপাশে কাঠবিড়ালি আর খরগোশেরা খেলা করে। সন্ধ্যার আঁকাবাঁকা সর্পিল নদীর শান্ত জলে তৃষ্ণার্ত চেয়ে চেয়ে দেখেন চাঁদের সুগভীর প্রাকৃতিক স্থিরচিত্র। ঝিঁঝিঁপোকার মন মাতানো সুরে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকেন তিনি। হৃদয়ের সমস্ত বন্ধ-দ্বার খোলে দিয়ে যুগ যুগ ধরে তারাদের আশ্রয়স্থল হয়ে থাকা বিষণœ আকাশপানে চেয়ে থাকেন অপলক। অলস মৌমাছির গুনগুন গানে তাঁর মনে আগুন জ্বালে। হারানো দিনের প্রেমের কবিতা পাঠেই যেনো তিনি রৌদ্রস্নান করেন। অনন্য সাধারণ এ-আনন্দ ও এরকম আরও অনেক উপাদান ও উপাচারে ভরপুর সদ্যসৃষ্ট এ-পৃথিবী নিষ্ঠুর-নির্দয় বাস্তবতা থেকে বাঁচিয়ে রাখে তাঁকে। দুটো কবিতার পারিপার্শ্বিকতা আসলে অপরূপ সৌন্দর্যের ছটায় ভরপুর আর অতিমাত্রায় বাস্তব। উভয় ক্ষেত্রেই অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে থাকা কথকদের এসব সঙ্কটাপন্ন অবস্থা থেকে পালিয়ে বাঁচতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে এ-দুটো কবিতাই।

শিরোনাম

শিরোনামের মিল থাকাকে অস্বাভাবিক ও উদ্ভট মনে না হলেও অন্তত শুরুতেই কারো কারো মনে হতে পারে দুটো কবিতার শিরোনামের মিল একদম কল্পনাতীত। তবে অন্তর্নিহিত ভাবের দিক থেকে দুটো কবিতাই একই রকমের। পদ্মফুল বৃক্ষের সৌন্দর্য-ছটা দেখে ও এর ফলের অপার্থিব স্বাদ নাবিকদেরকে যেকোনো ধরনের অতীতের অসহ্য সংশ্রব থেকে নিষ্কৃতি দেয় এবং তারা সব ভুলে গিয়ে প্রবেশ করে আরামদায়ক ও তৃপ্তির এক নতুন পৃথিবীতে। পদ্মফুল বৃক্ষ কিংবা ফল অবলোকন করেই নাবিকেরা সব ভুলে নতুন এক স্বপ্নময় প্রশান্তির জগতের সন্ধান লাভ করে যেন। নিজ নিজ নাবিক কিংবা যোদ্ধা পরিচয় ভুলে তারা হয়ে উঠে পদ্মফুল প্রেমিক আর ছুটে যায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড়ের কোলাহলহীন কোলাহলে, সেসব বাসিন্দা যারা যুগ যুগ ধরে ওই দ্বীপে থেকে থেকে নিজেরা হয়ে উঠেছে একেকজন পদ্মফুল আর ফলের প্রেমিক। ওই ফলের স্বাদ আস্বাদনের সাথে সাথে তাদের কঠিন জীবনজুড়ে চলতে থাকা সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটে। আর তাদের মন থেকে কর্পূর হয়ে উড়ে যায় প্রিয়জনদের সাথে দেখা করার কিংবা তাদের সান্নিধ্যে ফিরবার এবং দৈনন্দিন কার্যাবলীতে ফিরে যাবার উদগ্র বাসনা। এই দ্বীপে স্থায়ী আবাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠে তখন সবাই :

  And all at once they, ‘Our island home

 Is far beyond the wave, we will no longer roam.’

‘The Lotos-Eaters’  কবিতার নাবিকেরা কঠোর পরিশ্রমের জীবন থেকে অব্যাহতি লাভের আশায় ব্যাকুল। তারা চায় সুখ ও স্বচ্ছন্দময় জীবনের নিশ্চয়তা। ‘রূপালী স্নান’ কবিতায়ও সংঘাতময় বাস্তবতাকে দূরে ঠেলে একই রকম শান্তি ও সুখের অনুভূতিময় জীবনের কামনাই ফুটে উঠেছে। কবিতার শিরোনামের ইংরেজি ভাবানুবাদ হতে পারে sprightly bathঅথবা ‘celestial bath in divine dews’। এমন অবগাহন শেষে যে-কেউই সব প্রকার বাধার দেয়াল অতিক্রম করে ও সব ধরনের পার্থিব সেবা-যতেœর আশা ভুলে পা ফেলতে পারে নতুন এক পৃথিবীতে। কবিতাটির শিরোনাম বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে কবির লেখা প্রথম কাব্য প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে অর্থাৎ প্রথম প্রচেষ্টা বা দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে প্রথম গান। আলোচ্য কবিতাটি ওই কাব্যের প্রথম কবিতা। কবি আসলে এই ‘রূপালী স্নান’ কবিতায় অবগাহনের মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র করে নতুন জীবন শুরু করতে চান। হয়তো এ অবগাহনটুকু কবির পুনর্জন্মের কিংবা কোনো রূপকথার নদীতে অবগাহনের মাধ্যমে জীবনের সমস্ত দুঃখদুর্দশাময় অতীত ধুয়ে ফেলার। নিরাপদ একটি আশ্রয় চান তিনি যেখানে ভুলে থাকতে পারবেন ‘হিংস্র নেকড়ের পাল’ কিংবা অনেক বেনামি প্রেত’ যারা ঠোঁট চাটে সন্ধ্যায়।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই শামসুর রাহমান চমৎকারিত্ব ও সৌন্দর্যময় একটি পৃথিবী সৃষ্টির প্রচেষ্টাতে মত্ত ছিলেন যেখানে তাঁর পীড়িত মন আশ্রয় লাভ করতে পারে। … বাস্তবতা বা জীবন নামক এক সজারুর কাঁটার আঘাতে তিনি রক্তাক্ত, ক্ষত-বিক্ষত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের আর মুক্তির সন্ধানে আকুল হয়ে আছেন… ‘রূপালী স্নান’ কবিতায় কবি শামসুর রাহমান ভয়ার্ত একজন এবং তিনি তাই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সবকিছু থেকে বেশ দূরে।

সুতরাং, ‘The Lotos-Eaters’ এবং ‘রূপালী স্নান’ কবিতা দুটোতে কঠিন বাস্তবতা থেকে দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়াটাই মুখ্য। গভীর অনুসন্ধান রয়েছে দুটো কবিতাতেই এবং তা দেখে সহজেই বলা যায় যে অন্তর্নিহিত ভাবের দিক থেকে কবিতা দুটোর মিল স্পষ্ট।

বিষয়বস্তু

দুটো কবিতার মধ্যে বিষয়বস্তুগত দিক থেকেও মিল লক্ষণীয়। ‘The Lotos-Eaters’’ কবিতায় জীবনের শেষমুহূর্তে উপনীত ক্লান্ত একদল সৈনিককে দেখতে পাই আমরা। ক্লান্ত শরীরকে একটু এলিয়ে দিতে পারে এরকম একটি উপকূলের সন্ধ্যানে ব্যাপ্ত তারা। জীবন সংগ্রামে কিছু কিছু সময় এসে মানুষ ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সবপ্রকার কোলাহল থেকে, বন্ধন থেকে দূরে সরে গিয়ে একটুখানি বিশ্রাম নিতে চায়। এরকম অনুভূতি পুরো কবিতাজুড়েই পরিলক্ষিত হয় :

All things have rest: why sould we toil alone,

We only toil, who are the first of things

And make perpetual moan,…

Nor ever fold our wings,

And cease from wanderings

কবিতার আরেকটু গভীরে ডুব দিলে অনুভব করতে পারা যাবে সবকিছু পরিত্যাগ করার ব্যাপারটি কবিতাটিতে তীব্রভাবে বিদ্যমান, আর এজন্যই নাবিকদের মনের গহীনে তা সুপ্তাবস্থায় বিরাজমান। নিষ্ক্রিয় ভাব বা পালিয়ে বাঁচার ব্যাকুলতাটুকু কবিতাটিতে পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছে নিশ্চিতভাবে। গুঁটিয়ে নেয়া বা অবসর গ্রহণ কবিতাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু। দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত পৃথিবীর বদলে তারা আশ্রয় নিতে চায় এমন এক পৃথিবীতে যেখানে রয়েছে অবারিত সুখ আর বিলাসের ছড়াছড়ি। নাবিক-যোদ্ধারা এক সময় পিতৃভূমিতে কর্মক্ষম আর ভীষণ সমর্থ ছিলো ও ট্রয়ের যুদ্ধক্ষেত্রে বীরদর্পে লড়েছিলো, আজ তারা সব ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে বিশ্রামটুকুই চায়। এমনকি কিছু কিছু সময় তারা সানন্দে মরতে রাজী হয়ে যায়। মৃত্যু তাদের কাছে তখন ভয়ংকর কিছু নয়, বরং মৃত্যুতে যেনো একটু বিশ্রাম খুঁজে পায় তারা। ধ্বংসের চূড়ায় উঠে মানসিকভাবে ভীষণ ক্লান্ত কায়াই এখানে পরিলক্ষিত হয়েছে এই কবিতায়। এমতাবস্থায় মানব হৃদয় মৃত্যুর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে, ‘Give us long rest or death, dark death, or dreamful ease..’ আত্মগরিমাটুকু বিসর্জন দিয়ে তারা চায় পদ্ম-খেকোদের দ্বীপে নোঙর ফেলতে আর আর চায় ভুলে যেতে তাদের মানবিক দায়ভারটুকু। এই প্রবণতাটা সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তির পরিচায়ক। অবশ্য এটাও সত্য যে তারা বর্ণনাতীত দুর্ভোগের শিকার; শুরুতেই যুদ্ধের ময়দানে, তারপর অথৈ সাগরে একের পর এক প্রতিকূলতায় ভরপুর বিরুদ্ধ পরিবেশে। এখন তারা উঁচু উঁচু ঢেউ পাড়ি দেবার উৎসাহটুকু হারিয়ে বাকী জীবন বিশ্রামের অতল আশ্রয়ে কাটিয়ে দিতে চায়। কর্মমুখর জীবনের পাতা চিরতরে বন্ধ করে দিতে চায়। সৃষ্টির সেরা হিসেবে তবু তাদের জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচলে হবে না। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সব প্রতিকূলতার মোকাবিলা করাই তাদের কাজ। তাদের আলস্য স্পষ্টতর হয়ে উঠে যখন তারা বলে :

Let what is broken so remain.

The gods are hard to reconcile

একাধিকবার তাদের কণ্ঠে এ-সংকল্পটুকু শোনা যায় যে তারা আর যাযাবর ঘুরে ফিরে বাঁচতে চায় না। এই প্রবণতা চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায় যখন তারা ঘোষণা দেয় :

Surely, surely, slumber is more sweet than toil, the shore

Than labour in the deep mid ocean, wind and wave and oar;

Oh rest ye, brother mariners, we will not wander more.

কবির অন্য অনেক কবিতাতেই পালানোর জন্য অস্থির আকাক্সক্ষা ও ভাববিলাসী অতীত স্মৃতিবিধুরতার ভাব পরিলক্ষিত হয়। সহজভাবেই এ-ব্যাপারটি ‘’The Lady of the Shallot’ I ‘The Palace of Art’ কবিতা দুটোতে লক্ষ করা যায়। ‘The Lady of the Shallot’ কবিতার ভদ্রমহিলা কঠিন বাস্তবতার একেবারে বাইরের এক সত্তা। নিজস্ব ভাববিলাসী সৃষ্টিশীলতার জগতে আত্মনিমগ্ন তিনি। কখনোই তাকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় না। নিজেকে গুঁটিয়ে নেয়ার এ-ধারাটি ‘The Palace of Art’ কবিতায়ও সমানভাবে বিদ্যমান যেখানে মহৎ শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো বিশাল এক প্রাসাদোপম অট্টালিকায় শিল্পীসত্তা বাস করে ও শিল্পের খাঁটি রস আস্বাদনে ব্যাপ্ত থাকতে চায়, আর চায় বহির্বিশ্বের সর্বপ্রকার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে। কোনো এক নৈসর্গিক উপত্যকার সন্ধানে মত্ত সে সত্তা তাই শেষ পর্যায়ে নিজের সমস্ত রাজকীয় পোশাক-আশাক ছুঁড়ে ফেলে হয়ে ওঠে প্রকৃতিরই একজন।

‘রূপালী স্নান’ কবিতায় বিরুদ্ধভাবাপন্ন পারিপার্শ্বিকতায় শ্রান্ত-ক্লান্ত শামসুর রাহমান। পারিপার্শ্বিক জগতটা মনের মতো না হওয়ায় কবি মনে মনে নতুন একটি জগত গড়ে তোলেন ওই কবিতায়। জীবনের কঠিনসব বাস্তবতা এড়িয়ে সে জগত স্বপ্নিল স্বাচ্ছন্দের এবং প্রাণোচ্ছল আনন্দের। প্রকৃতির স্নেহময় বুকের এমন একটি জগৎ যেখানে আছে সবুজ ঘাসের বুকে খরগোশের স্বাচ্ছন্দের ঘোরাঘুরি, সান্ধ্যকালিন রক্তিম সূর্যালোকে কাঠবিড়ালির সানন্দ চলাচল, সর্পিল নদীর বুকে ধূসর চাঁদের আঁকিবুঁকি, তারাভরা রাতের মলিন আকাশ, একদল ঝিঁঝিঁপোকার ডাকাডাকি, গুনগুন গান করতে থাকা একদল মৌমাছি, সহস্র বছরের ভালোবাসাময় কবিতার উষ্ণতার পরশ, মদের পেয়ালায় চূর হয়ে কুমারীর কণ্ঠের সুরসুধায় মত্ত থাকা; এসব কিছুই বাস্তব জগতের ব্যস্ত জীবনের সমস্ত কোলাহল আর যান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত। কল্পনার জগতেই বুঁদ হয়ে থাকেন তিনি। সমস্ত কঠিন বাস্তবতা থেকে দূরে- ভয়ানক সব নেকড়েকে পেছনে ঠেলে নিজস্ব এক জগতের গভীরে ডুব দিয়েছেন কবি। ‘রূপালী স্নান’ কবিতায় কবির নান্দনিক মন খুব শক্তিশালী যা অপার্থিব স্বপ্নময় সৌন্দর্যের ছটায় বিমোহিত। এ দুটো কবিতার বিষয়বস্তুগত মেলবন্ধন খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। ‘ঞযব খড়ঃড়ং-ঊধঃবৎং’ কবিতার যোদ্ধারা নিজেদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত ঢেউয়ের সাথে সংগ্রাম করা থেকে মুক্ত, ক্রমশ বেড়ে চলা অত্যাচারী-শোষকদের নাগপাশমুক্ত, ঢেউয়ের তালে তালে জাহাজের এদিক সেদিক গড়াগড়ির কষ্ট থেকে মুক্ত। ‘রূপালী স্নান’ কবিতায় একদল নেকড়ের তাড়া খেয়ে কবি স্বর্গীয় শিশিরে গভীর অবগাহনে সান্ত¡না খুঁজে পান। উভয় কবিতাতেই অবসর গ্রহণ আর পলায়নবাদ স্পষ্টতই প্রতীয়মান।

মরণ

উভয় কবিতাতেই মরণের প্রেক্ষাপট একাধিকবার করে প্রতীয়মান। গভীর আনন্দে থেকে বেদনার চোরাবালিতেই নিয়ে যেতে মৃত্যু জীবনের সমাপ্তি ঘোষণা করে। ‘The Lotos-Eaters’ কবিতার নাবিকেরা একেবারে শেষপর্যায়ে এসে বুঝতে পারে তারা যথেষ্ট পরিমাণ দুর্ভোগের শিকার হয়েছে, প্রথমবার যুদ্ধক্ষেত্রে এবং তারপর সাগরের উন্মত্ত বুকে। ওই দ্বীপের স্বতঃস্ফূর্ত জীবন আর তাদের ক্রমাগত সংঘাতময় জীবনের বাস্তব দৃশ্যাবলী চোখের সম্মুখে দেখে তাদের একটু বিশ্রামের জন্য, থেমে যাওয়ার জন্য, সবকিছু ছেড়ে দেয়ার আকাক্সক্ষাটুকু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ওই দ্বীপে প্রকৃতির পরিপূর্ণ সমাহার তাদের চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠে। সূর্য, বহমান বাতাস, নদী, রসাল আপেল- সবকিছুই স্থবির এখানে যেনো তারা জীবন থেকে ছুটি নিয়ে বিশ্রামে মগ্ন। একমাত্র নাবিকেরাই এসব থেকে বঞ্চিত। তাদের কাছে জীবন ছিলো অদম্য ছুটে চলা, কোথাও বাঁধা না পড়ার নাম। জীবন তাদের কাছে এক আমরণ শাস্তিভোগ।

বেঁচে থাকাটাই অসহায় তাদের কাছে তখন নির্যাতনের সামিল। মৃত্যুতেই তারা একমাত্র মুক্তির পথ দেখতে পায়। তখন তারা মৃত্যু চায় আর ভাবে একমাত্র মৃত্যুতেই সুখময় স্বপ্নিল জীবনের সম্ভাবনা নিহিত কিংবা এই দুঃখ-দুর্দশা থেকে বাঁচতে মৃত্যুই একমাত্র উপায় : ‘’Give us long rest or death, dark death, or dreamful ease.’ জীবন তখন নির্দ্বিধায় কবরে কিংবা শ্মশানে ছুটে যায়, আলিঙ্গন করে যেনো মৃত্যুকে। জীবনের শেষকথা হলো মরণ। তারা জিজ্ঞেস করে, কী দরকার এতো রাগ পুষে রেখে আর তাড়াহুড়া করে? নির্যাতনের শৃঙ্খল থেকে ওরা আমাদের বাঁচাবে না? তারা ভাবে, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে তা নিজ প্রচেষ্টায় অর্জন করাই শ্রেয়। নাবিকেরা উপলব্ধি করে :

…  a mound of grass.

Two handful of white dust, shut in an urn of brast

কবিতাটিতে নিঃসীম দুর্দশা থেকে মুক্তির সম্ভাব্যতা নিয়ে আসে মৃত্যু। ব্যস্ত জীবনের ধু¤্রজাল থেকে জীবনকে বিশ্রামের সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয় মৃত্যু। মৃত্যুতেই নিহিত স্বচ্ছন্দের আর আরামের এক নতুন জীবনের অপার সম্ভাবনা।

অবশ্য ‘রূপালী স্নান’ কবিতায় মৃত্যুকে ঠিক এরকম করে দেখা হয়নি। কেবল তৃতীয় স্তবকে এসে প্রথম মৃত্যু কথাটির উল্লেখ আমরা দেখতে পারি। মৃত্যু এখানে অপাংক্তেয়। কবিও সেটাকে সহসা মেনে নিতে পারেন না। উৎকণ্ঠিত মনটাকে কেবল কল্পনার এক জগতে নিয়ে স্থির আর প্রশান্ত করে তুলতেই সেখানে এসে হানা দেয় মৃত্যু কোনো পূর্বলক্ষণ ছাড়াই। কবিও তাই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেন না। তাঁর কথায় :

          ভাবিনি শুধুই পৃথিবীর বহু জলে রেখা এঁকে

          চোখের অতল হ্রদের আভায় ধূপছায়া মেখে

          গোধূলির রঙে একদিন শেষে খুঁজে নিতে হবে ঘাসের শয্যা।

আকস্মিক মৃত্যু ভীতি পুনরায় কবির মনে ঝেঁকে বসে পরবর্তী দুটি স্তবকে। শত চেষ্টায়ও অমোঘ এ-পরিণতির কথা মন থেকে সরাতে পারেন না তিনি। মনের কোনো এক গোপন কুঠুরিতে সুপ্ত সে ভীতি তাই বারংবার ফিরে ফিরে আসে কবির মনে। পার্থিব জগতের প্রতি কবির নিখাদ ভালোবাসাটুকুও তাই এখানে প্রকাশ্যে ফুটে ওঠে। তিনি হারিয়ে যেতে নয়, পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ আহরণেই মত্ত থাকতে চান আজীবন। আসলে এতে করে এখানে মৃত্যুর প্রতি কবির অনাস্থা কিংবা অনীহাও দৃঢ়ভাবে ভাস্বর হয়ে উঠে। কেননা দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে কবি বলে উঠেন :

শিশিরের জলে স্নান করে মন তুমি কি জানতে

বিবর্ণ বহু দুপুরের রেখা মুছে ফেলে দিয়ে

চলে যাবে এই পৃথিবীর কোনো রুপালি প্রান্তে?

পরবর্তী স্তবকে কবি তাঁর পূর্বানুমানের নিরিখে নির্ধারিত পরিণতি সম্পর্কে সুনিশ্চিত হয়ে যান। কোনোরকম প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই মৃত্যু এসে হানা দেবে তাঁর জীবনে, কবি তা বুঝতে পারেন। আসলে মৃত্যুই মানুষের জীবনের চিরন্তন বাস্তবতা। একদল হিংস্র নেকড়ের লালায়িত চোখের সম্মুখে বন্দী তিনি, তাদের বর্বর আর বুভুক্ষু জীবনে সম্ভাবনাময় এক শিকার তিনি। এখানে এসে কবি তাঁর জীবনের সবচেয়ে খারাপ পরিণতির কথা ভাবতে বসেন, দৈবদৃষ্টিতে দেখতে পান নর্দমায় ভেসে থাকা তাঁরই কদর্য লাশ। তাঁর সচেতন সত্তার পেছন পেছন যেনো ঘুরঘুর করতে থাকে মৃত্যু ভীতি। আর এভাবেই ‘রূপালী স্নান’ কবিতার মৃত্যু আর ‘The Lotos-Eaters’ কবিতার মৃত্যু একই সমান্তরাল হয়ে যায় কেননা উভয় কবিতায়ই মৃত্যু সুখের এবং আনন্দের বিনাশ ঘটায় : ‘ধ্বংসাত্মক মৃত্যুর বিপরীতে দাঁড়িয়ে জীবনের কাব্য এমন একটি ভ্রমণের কথা বলে যা সাহিত্যের সমস্ত নান্দনিক প্রয়াসের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই পরিগণিত। মৃত্যু অনিবার্য, তবে অনস্বীকার্য বিষয়টি হচ্ছে শামসুর রাহমানের পুরো কবি জীবন-ই মৃত্যুকে অস্বীকার করে যাবার প্রয়াসের অপর নাম।’

অশুভ অপশক্তি সম্বন্ধে সচেতনতা

দুটো কবিতাতেই সমগ্র বিশ্বজগতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সর্বপ্রকার খারাপ বস্তু ও ব্যক্তি সম্বন্ধে সম্মক একটি ধারণা স্পষ্টতই প্রতীয়মান। এসব খারাপ বা ক্ষতিকর বস্তু বা বিষয়ের কবল থেকে কেউ-ই মুক্ত নয়। অথচ এসবের হাতে বন্দী সমগ্র মানবজাতি। বস্তুত মানবজাতির ইতিহাস মানুষের অসংখ্য দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত হবার ইতিহাস। বোদলেয়ারের ‘সর্বগ্রাসী অশুভ ছায়া’-ই এখানে দুটো কবিতাতেই বিরাজমান। নাবিকদের দল এখানে নির্যাতিত-নিপীড়িত মানবজাতি ও মানবতার পরিচায়ক। এ-বিষয়টিই ‘The Lotos-Eaters’ কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে :

Why are we weigh’d upon with heaviness,

And utterly consumed with sharp distress

কিন্তু এখানে সবাইকে মৃত্যু অব্দি দুঃখ-দুর্দশা চোখ বুজে সহ্য করে যেতে হবেই, এটাই যে অমোঘ বাস্তবতার নাম। কবি তাই জানেন এক দুঃখের পরিসমাপ্তির পর তাঁকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে ছুটে আসবে আরও অসংখ্য অগণিত সুতীব্র কষ্ট। এমতাবস্থায় পৃথিবী ছেড়ে প্রস্থাণ-ই পারে সবাইকে মুক্তি দিতে, ঠিক একারণেই মৃত্যু সবার জন্য একটি কাক্সিক্ষত স্বপ্ন হয়ে যায়। অশুভ সে কালো ছায়ার সাথে ক্রমাগত লড়ে যেতে যেতে জীবন সমস্ত অর্থবাচকতা ও সৌন্দর্য হারিয়ে নিতান্তই নির্জীব হয়ে পড়ে :

Trouble on trouble, pain on pain

Long labour unto aged breath

নাবিকদের প্রতিকূল মহাসাগরের বুক চিরে ছুটে চলা বিপজ্জনক এক ভ্রমণের ন্যায় সবার জীবন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশার এ ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাসের ন্যায় সুদীর্ঘ। মানবতার অবস্থা আসলে এ ক’টা চরণেই ফুটে উঠে :

… the wasted lands,

Blight and famine, plague and earthquake, roaring deeps and fiery sands,

Clanging fights, and flaming towns, and sinking ships, and praying hands.

কবির ক্রমশ বেড়ে ওঠার দিকে আলোকপাত করলে অবশ্য বলতে হয় ১৮৪২ সালে এ-কবিতার সংস্করণে মূলভাবের বিশেষ পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এ-পরিবর্তন কেবল শব্দের পরিমার্জন বা পরিবর্ধন মাত্র নয় যেমনটি এফ. এইচ. সাইক (১৯০৬ : ১০৫-১০৬) বলেছিলেন। এর পূর্বে ও পরে কবি এ-কবিতায় অনেকগুলো নতুন উপাদানের সন্নিবেশ ঘটিয়েছিলেন এবং এমন কিছু অভিব্যক্তি যুক্ত করেছেন, যেমন ‘dear is the memory’, যা কবিতাটিকে অনেক মানবিক উপাদানে ভরপুর করে তুলেছে। পদ্মখেকো হওয়ার পথে নাবিকেরা দায়িত্ব ও কর্তব্যকর্মকে হেলায় অস্বীকার করে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ তারা সমস্ত মানবতাকেই অস্বীকার করে বসে। সর্বোপরি তারা যেনো লুক্রেশিয়াসের স্রষ্টাদের (dear is the memory) সমপর্যায়ের হয়ে যেতে চায়। আর এ-উচ্চাকাক্সক্ষার চূড়ান্ত পরিণতিই তাদের জীবনজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন দুঃখবাদ কিংবা হতাশাবাদ। ১৮৩২ সালের সংস্করণে এ-তীব্র ধ্বংসবাদের মনোভাব সেভাবে কবিতাটিতে ছিলো না। আসলে তখন কবিতাটি ছিলো ভোগবাদী চিন্তাধারার-ই কাব্যিক প্রদর্শনী। ‘oenone’ কবিতার ওয়াইনোনির বেড়ে ওঠা তাই কবির বেড়ে উঠার সমান্তরাল।

‘রূপালী স্নান’ কবিতায়ও অশুভ শক্তির সাথে একধরনের সচেতন ঘোর দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। শামসুর রাহমানের শুরুর দিকের কবিতায় ‘বিভিন্নভাবে বোদলেয়ারে প্রভাব কবিচিত্তে বিদ্যমান যা পরবর্তীতে তিনি কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। অন্ধকার ছাপিয়ে তাঁর কবিতাগুলোও সূর্যমুখী ফুল হয়ে ফুটে। কবির মনস্তাত্বিক অবস্থার নিরিখেই এ-কবিতার চিরস্থায়ী অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তা ব্যক্ত হয়েছে। একারণেই সবসময় তাঁর মনে হয় তাঁকে তাড়া করে ফিরছে একদল হিংস্রপ্রাণি। ভয়ানক এই অনুভূতি থেকে তিনি মুক্ত নন। কবিচিত্তকে সবসময় উৎকণ্ঠার ভেতর রাখে একদল রক্তপিপাসু বুনো নেকড়ে। ‘কবি রূপালী শিশির বিন্দুতে অবগাহন করলেও আশপাশের বিপদসংকুল পরিবেশ পরিস্থিতি ভুলে থাকতে পারেন না- আক্রমণোদ্ধত, হট্টগোলে পরিপূর্ণ এবং ভয়ংকর শহুরে বাস্তবতা তাঁর খুব কাছেই ওঁতপেতে থাকে।’ হিংস্র বন্যপ্রাণিগুলো এখানে কেবল বন্য প্রাণিমাত্র নয়, ওগুলো সমস্ত সময়ের সব স্থানের সবরকমের অশুভ শক্তির-ই প্রতিনিধিত্ব করে। সমগ্র মানবসভ্যতার ইতিহাস জুড়েই এদের অবস্থান। আর এসবে ভীতসন্ত্রস্ত কবি কেঁদে উঠেন :

          এইটুকু ছিল গাঢ় প্রার্থনা-

          ঈশ্বর! যদি নেকড়ের পাল দরজার কোণে ভিড় করে আসে-

          এইটুকু ছিল গাঢ় প্রার্থনা

কবিতার শেষ দুটি স্তবকে কবির মৃত্যু ভীতি আরও বেশি পরিমাণে দৃষ্টিগোচর হয়। সময়ের গতিশীলতায় তাঁর প্রবল অসহায়ত্ববোধ বেড়ে চলে এবং তাঁর করুণ পরিণতিও যেনো সুনিশ্চিত হতে থাকে। তখন স্রষ্টার কাছেই তাঁর ব্যাকুল প্রার্থনা স্রষ্টা যেনো তাঁকে এমতাবস্থায় রক্ষা করেন। সর্বগ্রাসী ভীতি থেকে তবুও তিনি মুক্ত নন। নিম্নোক্ত চিত্রকল্পে কবির চূড়ান্ত পরিণতি ভাস্বর :

                   কোনো-একদিন গাঢ় উল্লাসে ছিঁড়ে খাবে টুঁটি

                   হয়তো হিংস্র নেকড়ের পাল…

পরবর্তী স্তবকে এসে তিনি হয়ে ওঠেন অতীব দুর্দশাগ্রস্ত, তখন তিনি সুনিশ্চিত নিজের চূড়ান্ত পরিণতির ব্যাপারে। কিছুতেই আর কবি সান্ত¡না খুঁজে পান না। তখন তাঁর মনে একটাই ভয় কলুষিত এ-অশুভ ছায়া তাঁর জীবন কেড়ে নিবেই : ‘আমরা হতভম্ব হয়ে চেয়ে দেখি, কল্পিত নান্দনিক ভুবনে আশ্রিত কবির ধ্যান ভেঙ্গে যায়। আর তাঁকে মুহূর্তেই পেয়ে বসে অশুভ কোনো ছায়ার আতঙ্ক।’

স্রষ্টার অবস্থান

দুটো কবিতাতেই স্রষ্টার অবস্থান ভীষণ তাৎপর্যময়। ‘The Lotos-Eaters’ কবিতায় লুক্রেশিয়ো স্রষ্টারা নাবিকদের পক্ষে ছিলেন না। এমনকি পক্ষে ছিলেন না ট্রয়ের যুদ্ধেও। সমুদ্রপথে তাদের বিপদসংকুল যাত্রাকালে বরং তারা ছিলেন শত্র“ভাবাপন্ন। ফলশ্র“তিতে নাবিকদের দিকে ক্রমাগত ধেয়ে আসছিলো একের পর আরেক বিপদ। কিন্তু যখন তারা ওই পদ্মফুলের দ্বীপে প্রকৃতির সান্নিধ্যের জীবন আর তাদের দুঃখ-দুর্দশা জর্জর জীবনের মধ্যকার বিস্তর পার্থক্যটুকু দেখে, তাদের মধ্যে প্রতিবাদী সত্তারা জেগে উঠেছিলো ধীরে ধীরে : ‘Why should we only toil, the roof and crown of things?’ অথচ তাদের এ-প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তারা পায়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য তাদের স্রষ্টারা সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। স্রষ্টাদের সাথে তাদের বোঝাপড়াটা তাই অসম্ভব। এজন্যই কোনোপ্রকারের সাহায্যের আশা তারা করে না, এমনকি তখন মানসিক মনোবলটুকুও তারা হারিয়ে ফেলে।

তাদের অবলোকন তাই এরকম … smile in secret, looking over wasted lands’ এখান থেকেই তারা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, এখন থেকে তারা এই পদ্মফুলের দ্বীপে স্রষ্টার মতো রাজসিক হালে চলবে আর ভুলে যাবে সব পিছুটান ও দুশ্চিন্তা। সব সম্পর্ক আর দায়ভার অস্বীকার করার প্রবণতা গড়ে উঠে তাদের মধ্যে। শ্লেষাত্মক একটি পন্থাই ওরা বেছে নেয় :

 Let us swear an oath, and keep it with equal mind,

In this hollow lotos-land to live and lie reclined

On the hills like Gods together, careless of mankind.

‘রূপালী স্নান’ কবিতায়ও স্রষ্টার অবস্থান ‘ঞযব খড়ঃড়ং-ঊধঃবৎং’ কবিতার মতন। শামসুর রাহমানের স্রষ্টা অবশ্য গ্রীক স্রষ্টাদের চাইতে ভিন্ন। কিন্তু এখানে স্রষ্টার সাহায্য চেয়ে প্রার্থনা শেষপর্যন্ত নিরর্থক-ই বলা যায়। শেষমুহুর্ত পর্যন্ত তবু তিনি প্রার্থনা করে যান। বিনিময়ে স্রষ্টার কোনো সাড়া পান না কবি। আমরাও দেখি তাঁর প্রাণান্ত কান্না শেষপর্যন্ত নিরর্থক-ই থেকে যায়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাই তাঁকে মেনে নিতে হয়। স্রষ্টা কাউকে কোনো সাহায্য করেন না। প্রকাশ্য বিরোধিতার প্রবণতাটুকুও এখানে সমানভাবে বিদ্যমান। ভাগ্যের এ-করুণ সম্ভাব্যতা জেনেও কবি পদ্মখেকোদের ন্যায় নিজের স্বপ্নের জগত নিজেই গড়ে তোলেন, কল্পনায় :
তোমার রাজ্যে একা-একা হাঁটি
আমি সম্রাট!

অতীতের প্রতি পিছুটান

উভয় কবিতাতেই ভাস্বর কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া অতীতের প্রতি পিছুটান। অথচ অতীতে কেবল স্মৃতির ভেলায় চড়েই পৌঁছানো যায়। ফেলে আসা সে সুখসময়ের জন্য বিলাপ ‘রূপালী স্নান’ কবিতার শুরু থেকেই প্রতীয়মান। ফেলে আসা দিনগুলোর অভাববোধে ভারাক্রান্ত প্রতিটি নাবিকের মন। অথচ কে না জানে, হারানো দিন কখনো ফিরে আসে না। পথহারা এসব পথিকের একমাত্র মুক্তির পথ তাই ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিচারণ থেকে কিছু প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া :

And sweet it was to dream of father-land,

Of child, and wife, and slave;

কোরাসের চতুর্থ অংশে এসে নাবিকেরা অনুভব করতে পারে তারা পার্থিব সব সম্পর্ক আর বন্ধন থেকে দূরে সরে এসেছে। সমস্ত সুখ ও বিশৃঙ্খলাময় সময় আজ আর কোনো বর্তমানের ঘটনা নয়, সব অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া ঝাপসা স্মৃতিমাত্র। সে সুখস্মৃতিই তাদের অন্তরকে ভারাক্রান্ত করে ফেলে। কালের স্রোতে ভেসে যাওয়া দিনগুলো আর ফিরে আসবে না কিংবা যা ছিলো ঠিক মনের মতো সব বিলীন হয়ে গেছে ফেলে আসা সময়ের চোরাবালিতে। আর তাই অতীত তাদের কাছে দুর্বিষহ :

 All things are taken from us, and become

Portions and parcels of the dreadful Past.

কোরাসের পঞ্চম অংশে এসে তারা অতীতের স্মৃতিচারণ করে। আশৈশব নিষ্কলুষ দিনগুলো তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় সারাক্ষণ। ষষ্ঠ অংশে এসে তাদের সে স্মৃতিচারণ হয়ে ওঠে খুব কষ্টকর। জীবনসঙ্গীনীদের সাথে একান্তে কাটানো সুসময়ের কথা তাদের মনের কোণে উঁকি দিতে থাকে। শেষবিদায়ের অশ্র“ঘন মুহূর্তটিই যেনো ক্ষণকালের জন্য তাদের চোখের সম্মুখে ভেসে ওঠে, তারপর হারিয়ে যায়। কিন্তু এতে শুধু দুঃখের আর কষ্টের তীব্রতাই বাড়ে। তাদের মনের গহীনে তখনো একটাই অনুভূতি, সবকিছু বদলে যাবে। আর আগের মতো থাকবে না কখনোই :

Dear is the memory of our wedded lives,

And dear the last embraced of our wives

And their warm tears, but all hath suffered change;

টেনিসনের অন্য অনেক কবিতায়ই অতীতের প্রতি পিছুটান পরিলক্ষিত হয়। তবে ফেলে আসা দিনগুলোর প্রতি পিছুটান সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় তাঁর ‘Tears, Idle Tears’ কবিতায়। টেনিসন কবিতাটি লিখেছিলেন মনমাউথশায়ারে অবস্থিত টিন্টার্ন আবিতে ভ্রমণকালে যেখানে তাঁর পূর্বসূরি রোম্যান্টিকতার জনক উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর বিখ্যাত tintern abbey ’ কবিতাটি রচনা করেছিলেন। এর বিষয়বস্তু ছিলো সময়ের বয়ে চলা আর তারুণ্যের আনন্দ দীপ্তিমান সময়ের হারিয়ে যাওয়া। তাছাড়া জায়গাটি টেনিসনের বন্ধু হ্যাল্লামের সমাধিস্থলের পাশেই। এসব প্রসঙ্গই ঘুরেফিরে এসেছে কবিতাটিতে। শরৎকালীন মাঠের আনন্দদীপ্তি দেখে কথকের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে আর বেদনায় মন দোলে ওঠার ফলশ্র“তিতে দু’চোখ আর্দ্র হয়ে আসে। অতীতের স্মৃতিগুলো সবসময় স্বচ্ছ, শোকময় আর অদ্ভুতুড়ে হয়ে থাকে। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা ভেসে ওঠে মানসপটে। নিত্যদিনের প্রোজ্জ্বল সূর্যোদয়ের মতোই ভাস্বর সে স্মৃতি। কিন্তু সেই সাথে তা সূর্যাস্তের ন্যায় বেদনাবিদূরও বটে। অতীত স্মৃতি আসলে প্রথম প্রেমের মতোই নিখাদ ও গভীর। এসবের তুলনা কেবল হারানো প্রেমিকার উষ্ণ চুম্বন এবং তাকে হারানোর জন্য মনের গভীর থেকে জেগে ওঠে বেদনার বুনো ঢেউয়ের সাথেই চলে। এখন এই স্মৃতিগুলোও যেনো ‘Death in life’।

‘রূপালী স্নান’ কবিতায় অতীতের প্রতি পিছুটানও স্পষ্টতই প্রতীয়মান। কিন্তু ব্যাপারটিকে কবিতাটিতে যেমন খুব বড়ো পরিসরে তুলে ধরা হয়নি তেমনি একেবারে উড়িয়েও দেয়া হয়নি। বরং এই কবিতার মূল সুর সৃষ্টিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে অতীতের প্রতি পিছুটান। পারিপার্শ্বিক অবস্থা কবির অনুকূলে না থাকায় তিনি নিজ মনে একটি সুখময় আশ্রয়স্থল বিনির্মাণ করে সেখানেই আশ্রয় গ্রহণ করেন। কবির বর্তমান আর ভবিষ্যতের পুরোটাই হিংস্র নেকড়েদের অভয়ারণ্য এবং সেখানে তিনি মোটেই নিরাপদ নন। আর একারণেই তিনি সবক’টা বর্তমান ছেড়ে যেনো পালিয়ে যান অতীতের আশ্রয়ে। স্বপ্নের রাজ্যে থেকে থেকে তিনি অতীতের বুকেই যেনো বিলীন হয়ে যান। আর ‘হাজার বছরের ঢের পুরনো প্রেমের কবিতা’-র রোদে পিঠ দিয়ে বসেন। হারানো সবক’টা রাত তাঁর মনের চোখে উঁকি দেয় যখন তখন। পদ্মখেকোদের ন্যায় তিনিও নৈরাশ্যের বার্তাবহে আশার আলো জ্বালিয়ে বেঁচে থাকেন :

ঝিঁঝির কোরাসে স্তব্ধ, বিগত রাত মনে করে

উন্মন-মনে হরিণের মতো দাঁতে ছিঁড়ি ঘাস

সমসাময়িক অবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী উপাদানসমূহ

টেনিসন প্রকৃতপক্ষে ক্রমাগতভাবে শিল্পায়ন আর নগরায়নের চাপে পিষ্ট হতে থাকা সমসাময়িক মনমানসিকতাকে সামগ্রিকভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধজুড়ে পরিশ্রান্ত জীবনের দুর্বিপাক থেকে নিঃশ্বাস ফেলতে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ এবং তাদের পালিয়ে যাওয়ার একটি পথ খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে এই কবিতায়। ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রতিনিধিত্বকারী কবিতা না হলেও এবং কবির প্রথম দিকের কবিতা হয়েও ‘স্বপ্নিল আবেশ’-এর এক পরিবেশ সৃষ্টি করে এ-কবিতা ওই সময়ের পাঠকদের জন্য অনিন্দ্য সুন্দর আর স্বচ্ছন্দে ভরপুর একটি আশ্রয়স্থল তৈরি করে দেয়। একের পর এক গ্রাম উজাড় করে গড়ে উঠেছিলো তখন অসংখ্য কলকারখানা। অসুস্থ এক তাড়াহুড়ার আর নির্দয় বস্তুবাদের ক্রমবিকাশ-ই ছিলো ওই সময়ের বৈশিষ্ট্য। ওই সময়ের জনমানুষের ক্রোধান্বিত অনুভূতির অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলার জন্যই বিপুল জনপ্রিয় হয়েছিলো তাঁর কবিতাটি। রাতারাতি তিনিও ওই সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি ও ওই সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী কণ্ঠস্বর। শামসুর রাহমানের ‘রূপালী স্নান’ কবিতায়ও ওই একই কথাই প্রযোজ্য। বিংশ শতাব্দীর ঘটনাবহুল দ্বিতীয়ার্ধের মানুষের মনের মর্মপীড়া তিনি যথার্থভাবে উপলব্দি করতে পেরেছিলেন, ‘… এজন্যই তাঁর কবিতা হুট-হাট উজ্জ্বল হয়ে ওঠা কোনো আলোকধারা, নিঃসঙ্গ শান্তি কিংবা বিমূর্ত সৌন্দর্য নয়। বরং বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা-ই ছড়িয়ে যায় পাঠকের মনের গহীনে।’ বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন শামসুর রাহমানের কাব্য প্রতিভা বিকশিত হচ্ছিলো ঠিক তখন বাঙ্গালি জাতীয় জীবনে আত্মপরিচিতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ ধীরে ধীরে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিলো। জাতীয় চেতনার প্রতিফলন ঘটেছিলো শামসুর রাহমানের কবিতায়। কেননা যখনই লোকজন প্রতিটি পদক্ষেপে মোকাবিলা করছিলো ভয় আর আতংকের ঠিক তখনই তিনি তাঁর ‘রূপালী স্নান’ কবিতার মাধ্যমে পাঠকদের জন্য সৃষ্টি করেছিলেন মুক্তি আর অবকাশের নিশ্চয়তার একটি কাব্যিক প্রাসাদ : ‘স্বর্গীয় শিশিরধারায় (রূপালী স্নান) অবগাহিত হয়ে কবি তাঁর অসাধারণ সব কবিতা রচনা করেছেন যা তাঁকে আমাদের ভাষা আন্দোলন, অধিকার আদায়ের আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, উন্নয়ন সংগ্রাম, বুদ্ধিজীবী আন্দোলনসহ সবধরনের আশাব্যঞ্জক সংগ্রামের ইতিবাচক ও কাব্যিক ভাষ্যকারে পরিণত করে।’

নৈর্ব্যক্তিকতা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

নৈর্ব্যক্তিকতা এ কবিতা দুটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ‘The Lotos-Eaters কবিতার নাবিকরা কিংবা ‘রূপালী স্নান’ কবিতার কথক উভয়ই লক্ষণীয় রকমের নৈর্ব্যক্তিক। পদ্মখেকোদের দ্বীপ কিংবা কবির স্বপ্নভূমি দুটোই আসলে কর্মচাঞ্চল্যহীন নিষ্ক্রিয়তার। কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনাই নেই সেখানে। সবকিছুই যেমনটি আছে ঠিক তেমনটিই থেকে যাবে সবসময়। আদতে কিছুই ঘটে না সেখানে। সবকিছুই এখানে স্থির, অনড় ও অপরিবর্তনশীল। নেই কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা। ‘A land where all things always seem’d the same!’ ওখানকার লোকজন কোনো পরিবর্তন সাধন করতে পারে না একেবারে। তারা চেষ্টা কিংবা সাধনার মধ্যে কোনো সম্ভাবনা দেখতে পায় না বিধায় কোনো চেষ্টাও করে না। দীর্ঘদিনের এই অকর্মণ্য অবস্থা তাদের ভেতরে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছে। তারা শেষপর্যন্ত অস্থির আয়েশি জীবনই বেছে নেয় ও পরবর্তীতে এ-সিদ্ধান্তের পক্ষে কিছু প্রমাণ লাভ করে যা তাদেরকে অকর্মণ্য হতেই উৎসাহ প্রদান করে। ‘রূপালী স্নান’ কবিতায় অকর্মণ্যতা ঠিকভাবে ফুটে না উঠলেও শেষ স্তবকে তা ভালোভাবেই প্রতীয়মান। কবিতাটি শুরুই হয়েছে কবির উপলব্দি দিয়ে যেখানে তিনি অনুভব করতে পারেন যে তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে অশুভ কিছু ছায়া যাদের করাল গ্রাস থেকে তাঁর কোনো নিষ্কৃতি নেই আদৌ। অশুভ সে ছায়ার কাছে আত্মসমর্পণ না করলেও তিনি চিরস্থায়ী এক নিরাপত্তাহীনতার ভেতর দিয়েই দিনাতিপাত করেছেন। তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা অশুভ ওই কালো ছায়ার হাতে তিনি একেবারে অসহায়। স্রষ্টার কাছে তাই তাঁর আকুল প্রার্থনা : ‘ঈশ্বর! ঈশ্বর!’ তাঁর সে আর্তচিৎকারে ঈশ্বর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন না। তিনি নিজেও ওই অপশক্তিকে প্রতিহত করার কোনো চেষ্টা করেন না। স্রষ্টার কাছে তাঁর ঐকান্তিক প্রার্থনা অবশ্যম্ভাবী ওই ঘটনা এড়াতে কোনো কাজে আসে না। সাহসিকতার সাথে ওই ঘটনার মোকাবিলায় তিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেও ব্যর্থ হন। তিনি যেনো অকর্মণ্যতার এক দুর্ভেদ্য শৃঙ্খলে বন্দী। তিনি তখনো আত্মমগ্ন হয়ে স্বপ্নরাজ্যের সুখে প্রলুব্ধ হয়ে তার স্বাদ আস্বাদনে নিমগ্ন। এখানে তিনি পদ্মখেকো ‘মধুভূক’ যে দিবারাত্রি কবিতার মধু আহরণে ব্যস্ত। সবকিছু ভুলে তিনি সান্ত¡নার অনুসন্ধানে বিভোর থেকে যান। তবু তিনি ‘শিশিরের জলে স্নান’ করে চলেন। কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে হলে তাঁর তখনো অনেক শক্তি ও সাহস প্রয়োজন : ‘রূপালী স্নান’ কবিতার কবি ভয়ার্ত আর মনে মনে অনুভব করেন, পাশবিক বাস্তবতার মুখোমুখি হবার মতো বাচনিক বীরত্ব এখনো তিনি অর্জন করেননি।’

পরিসমাপ্তির দিক দিয়েও এ-দুটি কবিতার মধ্যে মিল পরিলক্ষিত হয়। ‘The Lotos-Eaters’ কবিতার নাবিকদল নিশ্চিত হতে পারে যে তারা ওই দ্বীপটিতে আটকা পড়েছে। প্রশান্তি আর নিরাপত্তার এ-ভূস্বর্গ থেকে তারা কখনোই প্রস্থান করতে পারবে না। তখন তাদের একমাত্র দাবী বিশ্রাম আর তারা ক্রমশ নিকুচি করতে থাকে অশান্ত মহাসাগরের আর এর বুকের নিরলস ঢেউয়ের যেখানে সবাইকে প্রতিনিয়ত লড়ে যেতে হয় অশান্ত ঢেউয়ের বিরুদ্ধে :

Surely, surely, slumber is more sweet than toil, the shore

Than labour in the deep mid-ocean, wind and wave and oar;

Oh rest ye, brother mariners, we will not wander more.

‘রূপালী স্নান’ কবিতায় কবি নিজ কল্পনার রাজ্যে বিভোর। প্রোজ্জ্বল কাব্যিক পঙ্ক্তিমালা রচনা থেকে কেউ তাঁকে একচুলও নড়াতে পারে না। পদ্মখেকোদের মতো তিনিও আধো-ঘুম আর আধো-জাগরণের ভেতর দিয়েই অতিবাহিত করে চলেন তাঁর সময় তাঁরই নিজের জগতে। প্রশান্তির পরশ খুঁজে পান যেনো ওই আত্মার স্বর্গীয় নিরাপত্তা বেষ্টনীতে যেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই তাঁর নেই। স্বর্গীয় রূপালী শিশিরেই তিনি অবগাহনে মত্ত থাকতে চান, ‘তবু শান্ত রুপালি স্বর্গ-শিশিরে স্নান করি আমি।’

ছন্দের গাঠনিক দিক থেকে ‘The Lotos-Eaters’ কবিতার প্রথম অংশটি স্পেন্সার আর থমসনের কবিতার ছন্দের মতো। এ-কবিতায় স্পেন্সারের পাঁচ পর্বের অপ্রস্বর-প্রস্বর (lambic Pentameter) আট লাইনের স্তবক এবং এরপরে ছয় স্বরাঘাতের আলেকজেন্ড্রিয় ছন্দ-কৌশলও ব্যবহৃত হয়েছে। এর অন্ত্যমিল কখকখখগখগগ। প্রথম স্তবকের শান্ত-কোমল ধারা-বিবরণীর সুরের পরে যখন কোরাসে গাওয়া শব্দময় আর দ্রুতলয়ের ওই পরের অংশগুলো আসে তখন কবিতার ধরনেও আসে তাৎপর্যময় পরিবর্তন। বলা চলে অন্ত্যমিলগত সামঞ্জস্য ওই দুটো কবিতাকে আরও সমান্তরালে নিয়ে এসেছে। ‘রূপালী স্নান’ কবিতার অন্ত্যমিল নিয়ে কোনো সংশয় জাগে না কারো মনে। কিছু ব্যত্যয় সত্ত্বেও তাই এ-কবিতার পাঁচ-ছয় মাত্রার ছন্দ অন্য সবকটা ছন্দের সাথে সুন্দরভাবেই মানিয়ে যায়। কিন্তু চমৎকার অন্ত্যমিল থাকা সত্ত্বেও পাঠকেরা কবিতাটিকে অমিত্রাক্ষর ছন্দের বলেই মনে করেন : ‘নতুন প্রজন্মের পাঠকদের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। এমনকি কতিপয় কবি ও সমালোচকও এর ঊর্ধ্বে নন। এঁরা সবাই মনে করেন শামসুর রাহমানের কাব্যচর্চার মূল ভিত্তি হচ্ছে অমিত্রাক্ষর ছন্দ। তাঁর অক্ষরবৃত্ত ছন্দ এতো বহুল পরিচিত যে মনোমুগ্ধকর কবিতাগুলো ভুলবশত অমিত্রাক্ষর ছন্দের বলেই ধরে নেয়া হয়।’ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে তাঁর প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে কাব্যের কোনো কবিতা-ই অমিত্রাক্ষর ছন্দের নয়। বরং ছন্দ-কৌশল বিষয়ে তাঁর সুনিপুণ দক্ষতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই কাব্যে। ‘রূপালী স্নান’ কবিতাটি আদ্যন্ত মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। ওই কবিতার ২৩তম পঙ্ক্তিতে তিনি নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি বিভিন্ন ব্যাপারে ‘ছন্দে ও মিলে কথা বানানোর’ লজ্জাজনক কাজটিকে নিজের করে নিয়েছেন।

‘The Lotos Eaters’ কবিতার মূল ভিত্তি গ্রীক জনপ্রিয় লোকগাঁথা হোমারের ওডিসি। ‘রূপালী স্নান’ কবিতায়ও বেশকিছু গ্রীক ও বাইবেল-এ উল্লেখিত লোকগাঁথার ব্যবহার, উদাহরণস্বরূপ-চৌত্রিশতম, আটত্রিশতম ও শেষ পঙ্ক্তির শুরুর দিকে, পরিলক্ষিত হয়। আলংকারিক ভাষা যেমন উপমা (Simile), রুপকালঙ্কার (Metaphor) আর পরিবর্তিত গুণবাচক কিছু উপমার (Transferred Epithets) ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় উভয় কবিতাতেই। স্বরসাদৃশ্য (Assonance) আর অনুপ্রাসও (Alliteration) গীতপ্রধান কবিতা দুটোতে বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। পাঠকের শ্রবণেন্দ্রিয়ের শ্রেষ্ঠ নৈবেদ্য আসলে এ-কবিতা দুটো। ‘ঞযব The Lotos-Eaters’ পাঠককে হাতছানি দিয়ে ডাকে সুরের আবেশে অর্ধনিমীলিত চোখে, হৃদযন্ত্রের চলমান সুরে মগ্ন হয়ে, আকাশ থেকে ভেসে আসা স্বর্গীয় কোনো সুরের মূর্ছনা, ফুলের পাঁপড়ি থেকে পানিতে টুপটাপ গড়িয়ে পড়া, বহমান স্রোতধারা আর মহাসাগরের গর্জন বিমোহিত হয়ে শুনতে। তেমনি ‘রূপালী স্নান’ কবিতাও আমাদের বিমোহিত করে ঝিঁঝিঁপোকাদের ঝিঁক ঝিঁক গানের সুরের মূর্ছনায়, মৌমাছিদের ডানার ভোঁভোঁ শব্দের মোহময় ছন্দে, উর্বশী রমণীর পায়ের নূপুরের নিক্বণ ধ্বনির মাদক উন্মাদনায়, আকাশে ভেসে বেড়ানো জোনাকি মেয়ের আলোর নূপুরের আলোকছটায়। এমনকি দুটো কবিতাতেই রয়েছে দুর্বোধ্য চিত্রকল্পের ব্যবহার যা পুরো কবিতাকেই ভাস্বর করে তোলে ঠিক চোখের সম্মুখে।

উপসংহার

কবিতা দুটো পড়ার সময় কিছু কিছু ব্যাপার অর্থাৎ গঠনগত দিক কিংবা মূল বিষয়বস্তু সবই যেনো খাপে খাপে মিলে যায়। আর এসব থেকে কবিতা দুটোর মধ্যকার সামঞ্জস্য অনুধাবন করা কোনো কঠিন কিছু হওয়ার কথা নয়! একসাথে দুটো কবিতার পঠন একজন সচেতন পাঠকের চোখে ভিন্ন সময় এবং পরিসরের দু’জন প্রথিতযশা কবির মধ্যে আশ্চর্য রকমের মিল খুঁজে পেতে সাহায্য করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। হতে পারে শামসুর রাহমান ‘ঞযব খড়ঃড়ং ঊধঃবৎং’ কবিতাটি থেকেই তাঁর কবিতার মূল সুর খুঁজে পেয়েছিলেন। হতে পারে ‘রুপালী স্নান’ কবিতাটি ভিক্টোরিয়ান যুগের তাঁরই পূর্বসূরি কর্তৃক রচিত কবিতাটির পুনর্লিখন। তবুও শামসুর রাহমান নিজস্ব কিছু চিত্রকল্প, রূপক আর অভিব্যক্তির সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন এ-কবিতায়। এটাও নিশ্চয় প্রশংসনীয়।

[Praxis (Rajshahi University, English Department Journal) vol. 6-এর একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে রাসেল রাজু]

সম্প্রতি প্রকাশিত নির্বাচিত পুস্তক ও পত্রিকার পরিচিতি

আধুনিকতা ও আত্মপরিচয়: মতাদর্শিক নির্মিতি ও সাহিত্যিক বিস্তার ॥ সুমন সাজ্জাদ
চৈতন্য ॥ সিলেট, ২০১৬
গ্রন্থসূচিতে দেখা যায়, পাঠসূত্র ছাড়া ‘দেশ’ ও ‘দেশান্তর’ নাম দিয়ে যথাক্রমে পাঁচ ও দশটি লেখা এক করে গ্রন্থের কাঠামো বুনেছেন লেখক। ‘আধুনিকতা’র সঙ্গে ‘আত্মপরিচয়’ শব্দটি কী বিবাদ করে! চিহ্নিত বা মতাদর্শগত কোনো জ্ঞানপীঠ কী এখানে তৈরি হয়েছে নাকি স্থান-কালসূত্রে বিবর্তিত বিস্তারকৌশলের ধারা নিয়ে কিছু বলা হচ্ছে— সেরকম একটা বিভ্রান্তিতে পড়তে হয় প্রথমেই, নামকরণের সূত্রে। পরে পুরোটা পরিষ্কার না হলেও হতাশ না হয়ে বরং তৃপ্তিই জমে ওঠে ওতে। বইটির প্রধান আকর্ষণ, বাংলা ও বাঙালিকে সাহিত্য-দর্শনে-ইতিহাসচিন্তায় কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলে নয়, পূর্বাপর ও আনুপূর্বিক করে তোলা— বিশ্বভাবনা-কাঠামোর সঙ্গে, তার প্রযুক্তি ও প্রয়োগকৌশল কিংবা প্রায়োগিক দিকগুলো মিলিয়ে নিয়ে বিস্তর বৈশ্বিক পাঠ নির্মাণ। দীনেশচন্দ্র সেনের বাংলার ইতিহাস-ধর্ম নিয়ে সৃজনশীল ব্যাখ্যা আছে, নজরুল এমনকি একালের আহসান হাবীব, ওয়ালীউল্লাহ্, রাহমান পর্যন্ত তার অনেকদূর বিস্তৃতি, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্বগত অভীক্ষায়— তাছাড়া বইটির সাহিত্য-সংস্কৃতি অধ্যয়নে চলতি বিশ্বের নানা মতাদর্শিক দৃষ্টিকোণ ও একালের তত্ত্ব ও তত্ত্বকারের প্রণীত ব্যাখ্যার সমর্থন-অসমর্থনের সঙ্গত আচরণও অভিব্যক্ত লেখকের লেখায়— কার্যত লেখক ‘অপরতা’ ও ‘প্রতিরোধে’র ঘরানাকে মূল্যবোধের কেন্দ্রে রেখে কাজটি করেছেন। এটি অবশ্যই আদর্শিক এবং অনেক তাৎপর্যপূর্ণ সমালোচনা-কাঠামো। গ্রন্থকারের সৃজনী-কথনে কখনো নিয়মতান্ত্রিক একাডেমিক স্বর সুরক্ষিত না হলেও তাতে ‘অমোঘ আমোদ’ এতোটুকু বিনষ্ট হয় না। সমৃদ্ধির, সম্ভাবনার ধারাবাহিকতায় অনেক পাঠকই আগামী কোনো গ্রন্থে লেখককে আরও আস্থায় নেবেন, এমনটা আশা করা যায়।

কমলকুমারের গল্প : জীবনজ্যোতির উদ্ভাস ॥ চঞ্চল কুমার বোস
সুচয়নী পাবলিশার্স ॥
ঢাকা, ২০১৬
বিরলপ্রজ বাংলা গল্পলেখক কমলকুমার মজুমদারকে দারুণ মেধাবী মনে হয় শব্দ-তৈরি ও নির্বাচনের স্বাতন্ত্র্যে, বিশেষ কৌশলে মতিলাল পাদ্রী কিংবা লাল জুতোর স্বপ্নকে স্বকালবিদ্ধ করায় কিংবা তার ভেতরে পলে পলে যখন যুক্ত করেন সত্য-মিথ্যা-আলো-আঁধার-বাস্তব-অবাস্তবের কঠোরকঠিন আঘাত হানার অভাবিত সব কলাকৌশল আর টুকরো টুকরো সব এনিকডৌট। তবে ভুললে হয় না তিনি আছেন— বলছেন, বলে চলেছেন— গল্পপঠনে এমনসব ভুললেই যেনো পাঠক খেই হারিয়ে ফেলেন। পেছন ফিরিয়ে আবার পড়তে হয়। আর এটাও তো সত্য ‘নির্বাচিত লেখক’, ‘সিরিয়াস লেখক’ (তকমা না তো!) তো পাঠকের গভীর মনোযোগ দাবি করবেনই। কমলকুমার পেঁয়াজের খোসার মতো ক্রমশ একের পর এক খুলে ফেলেন সমাজ-ইতিহাসের ভেতরে লুক্কায়িত মানবচরিত্রের কৃত্রিম পোশাক, তাতে মানুষের যেনো প্রথম সূর্য উদয় হয়। যথার্থ মানুষের রূপ মেলে। কমলকুমারের গল্প : জীবনজ্যোতির উদ্ভাস পড়লে চেনা যায় এ রকম কমলকুমারকে। আমাদের মনে হয় তখন এই গবেষকের প্রতি আরও দাবি ওঠে, বক্ষ্যমান গল্পকারের প্রকরণকৌশল নিয়ে তিনি যেনো আর একটি বই লেখা হয়। সেটা খুব জরুরি। কমলকুমারের গল্প : জীবনজ্যোতির উদ্ভাস-এ তেরটি প্রবন্ধ আছে। কমলকুমারের জীবনদৃষ্টির পরিচয় আছে তাতে। সমাজ ও রাজনীতির তত্ত্বকে আরোপ করা নয়, জীবনকেই দেখা; শব্দের ভেতর বোধের রঙ ও রেখার পর্যবেক্ষণ অবলোকন করা— নিবিড় পঠন-দৃষ্টির ভূগোলে অনেকটুকুন দেখা যায় তাতে।

ঔপন্যাসিক চিনুয়া  আচেবে : পাঠ ও বীক্ষণ ॥
মুহম্মদ মুহসীন সম্পাদিত
কবি প্রকাশনী ॥
ঢাকা, ২০১৬
চিনুয়া আচেবের পরিচিতি বাংলাভাষীদের কাছে নানাভাবে। এ বিষয়ে গুণগত জ্ঞান সৃষ্টির বই খুব একটা চোখে পড়ে না। আর বাংলা ভাষা তো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যতায় আর এক ‘ইগবো’। এসব বই একদম সূক্ষ্ম জ্ঞানচর্চার আধার। তার পরিমাণ এদেশে অন্য জনপদ যাই হোক বিশ্ববিদ্যালয়েও বেশি নেই। বইটি হাতে নিতে পারেন সর্বরকম পাঠক। বাংলা ভাষায় চিনে ফেলা সম্ভব হবে চিনুয়া আচেবে ও তাঁর আফ্রিকাকে। খুব সম্ভব করে মিলিয়েও পড়া যায় আমাদের বাংলা অঞ্চলকে— যেখানে উপনিবেশি মদ আর ভাড়ার চতুর্দিকে বেশুমার গিজগিজ করছে। এখনও তো প্রায় সবাই আমরা চোখ-কান-হৃৎপিণ্ড বন্ধক দিয়ে রেখেছি উপনিবেশ তথা বিশ্বায়ন তকমা পরা তহসিলদার পোষ্য রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে। উকুনকোরা তো এদেশে একই রকমে এদেশেও হেঁটে বেড়াচ্ছে, সংস্কৃতি-ভাষা-মর্যাদা কী আছে! প্রশ্নগুলো মিটে যেতে পারে এই বইটি পঠনে। এখানে নিজেকে চিনে ফেলাও অসম্ভব মনে হবে না।

নির্বাচিত শ্যামল সিংহ
এখন (বাংলা কবিতার কাগজ উদ্যোগ)
জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত, ২০১৪
কবিতা তো তেমনভাবে সামাজিক বা রাজনৈতিক কমিটেডের বিষয় নয়— যদিও কবিকে ওসব পেরিয়ে তাবৎ উপাচারের ওপারে ‘শেষ পর্যন্ত মানুষ’ কথাটি বলতে হয়। শ্যামল সিংহের মৃত্যুর এগারো বছর পর বেরিয়েছিলো এই বই। তিনটি কাব্য আর কিছু অপ্রকাশিত কবিতা। ঢংটি তার তিন/চার শব্দের কয়েকটি বাক্যে চিন্তার গুহায় ঢুকে জীবন নিয়ে শ্লেষ-বিদ্রƒপ করা। ওতেই বলা হয়ে যেতো সমাজ-রাজনীতির বিকার সমস্ত কথাবার্তা। বইটির স্বাদ আলাদা, কবিতার অর্থ ও ইঙ্গিতময়তার কারণে। বলার রীতিও গৎবাঁধা নয়। ‘চাঁদ ও খোঁড়া বেলুনওয়ালা’, ‘সূর্যাস্ত আঁকা নিষেধ’, ‘জেগে উঠছেন বাঘাযতীন’ এমন নাম তার কাব্যের আর কবিতা এমন : ‘আঁচল পুড়ে ছাই হয়ে গেল/ শ্লেট ভেঙে বেরিয়ে পড়ে মহিষ’, ‘ফিল্মের শেষ দৃশ্যে/ তোমার হাতে কে দিয়ে গেল বাঁশী? আমাদের চোখে পুড়ছে স্টেশন’। এখন ছাই/ শ্লেট/ মহিষ চিত্রকল্প কিংবা মীমাংসিত দৃশ্যে বাঁশী আর চোখে পোড়া স্টেশন কী প্রতীকী কিছু মহার্ঘ্য আনে, পাঠকের কাছে। শ্যামল সিংহের বেশ কিছু কবিতা না পড়লে মননের মুকুর চেনা যায় না আর উপলব্ধির উচ্চতাও ঠিক সেভাবে রচে না।

শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ স্মরণ ॥ শুভেন্দু ইমাম সংকলিত ও সম্পাদিত
শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন পর্ষদ
সিলেট
১৫ ফেব্র“য়ারি ২০১৬
বাউলসম্রাট লালন শাহের পরে শাহ আবদুল করিম নানাভাবে খ্যাতিমান। এ পর্যায়ে শাহ আবদুল করিম শেষ জীবনপ্রবাহে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধার কল্যাণে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে একপ্রকার সম্মান পেয়েছেন। তিনি যে কতো বড় লোকসাধক সে পরিচয়ও অনেকেই জেনেছেন— বোধ করি লালনের তুলনায় বেশ দ্রুততায়। শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে পঠন-পাঠন, উচ্চতর ডিগ্রিও হয়েছে ইতোমধ্যেই। শতবর্ষ বাঁচেননি এ বাউল। কিন্তু ঠিক শতবর্ষের মাথায় পেপারব্যাকে একটি সমৃদ্ধ স্মরণ-সংকলন প্রকাশ করেছে শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ স্মরণ উদ্যাপন পর্ষদ। প্রবেশক অংশে বাউলের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন তপোধীর ভট্টাচার্য, তুষার কর, মোস্তাক আহমাদ দীন, রমী চক্রবর্তী, সোমব্রত সরকার ও সুমনকুমার দাশ। পরিশিষ্টাংশে ত্রয়ী করে জীবনপঞ্জি, গ্রন্থপরিচয় ও পর্ষদের বিবরণ ছাপানো হয়েছে। খুব চটজলদি শাহ আবদুল করিমকে জানা যাবে। সংকলনটি প্রকাশে দিনক্ষণ বাঁধা না থাকলে বুঝি এটি আরও সমৃদ্ধ করা যেতো। তবুও তথ্য ও জানার তাৎক্ষণিক কাজটি যে কোনো পাঠক এতে করতে পারবেন।

সাহিত্য কথনিকা ॥ আরজুমন্দ আরা বানু
কথাপ্রকাশ ॥
ঢাকা ২০১৫
পুস্তক রচনার ক্ষেত্রে অতিশয় যত্বানন ও শ্রমী হওয়ার চেয়েও বেশি সত্য যেটি তা হলো জ্ঞানচর্চার খাতায় নতুন কিছু যুক্ত করার প্রবণতা। আর সেক্ষেত্রে শক্তি-সাহস ও যোগ্যতা একেবারে নির্বিকল্প। সাহিত্য কথনিকায় ৭টি প্রবন্ধ সন্নিবিষ্ট। এক্কেবারে নতুনই মনে হয় সবক’টি প্রবন্ধ। জানা গেছে আনকোরা ও নতুন কিছু ভাবনা। গবেষণায় সবকিছুই যে প্রয়োজনীয় গণ্য হবে— তা নয়, তবে অপ্রয়োজনীয় (?) কিছুও অনুসন্ধান করতে হয়— ইতিহাসলগ্নতা কিংবা পূর্বাপর হয়ে ঐতিহ্যের ধারা চিহ্নিতকরণের প্রয়োজনে। গ্রন্থটিতে বিষয়ে ও বিশ্লেষণে বেশ নতুনত্ব পরিলক্ষিত, অনুমান করি। শিশুতোষ ছড়া-কবিতার বিশ্লেষণ চমৎকার, মনে করিয়ে দেয় বাল্য ও কৈশোরের অনেক পদ্য ও কবিতাকে— কোনোটা নীতি, কোনোটা মাহাত্ম্যমূলক আবার কোনোটা দেশপ্রেমমূলক। ঠাকুরমার ঝুলি, নজরুল ইসলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শহীদুল্লা কায়সারের মতো লেখকদের অন্য জায়গায় পড়া হলেও এখানকার পাঠে এতোটুকু ক্লান্তি আসে না, শক্তিশালী কিন্তু সহজবোধ্য গদ্যে অনেককিছু ব্যাখ্যেয় হয়ে ওঠে; আর তাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন না একেবারে প্রান্তিক কবিয়াল কাঙাল হরিনাথও। আশ্চর্য, তিনি উপন্যাসও লিখেছেন! আরও পাওয়া যায়, বাংলা সাহিত্যের প্রথম ছয় উপন্যাস— যেখানে নতুন করে ধরা পড়ে মনোত্তমা, বিজয় বসন্ত। লেখকের এ উন্মোচিত দিকগুলো অনেকের কাজে লাগবে ভবিষ্যতে সহায়ক হবে। চিন্তার স্পষ্টতায় প্রবন্ধকারের মনস্কতার গদ্য সাবলীল ।

উত্তরকালের সাহিত্য ॥ আহমেদ মাওল
বিদ্যাপ্রকাশ ॥
ঢাকা ২০১৬
আমাদের পরিচিত প্রবন্ধকার আহমেদ মাওলা যে গ্রন্থটি রচনা করেছেন তাতে ধরা পড়েছে বিভাগোত্তর ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর কাল। দর্শনশাস্ত্রে কালকে ‘ধারণা’ রূপে পেলে তিনি তাতে গ্রথিত করেন সাহিত্যকে— ব্যাখ্যা করেন, পাঠ রচনা করেন— সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, শওকত ওসমান হয়ে আমাদের এই চাক্ষুষ সময় পর্যন্ত, মানুষ-চরিত্র-জীবন-সমাজ-সংস্কৃতি-সংস্কার অনেককিছু অবধারিত হয়ে থাকে তাতে। বইটির প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠা জুড়ে এসব কম্ম ঘটে চলে। তাতে করে পাঠক নিজেকেও চিনে ফেলেন। বইটিতে মুদ্রণপ্রমাদ আছে কিছু, কার্যত বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত এ লেখাগুলোয় ছত্রে ছত্রে দায় ও স্বকালবিদ্ধতার সঞ্চরণ চিহ্নিত। সূচি তিনটি অংশে বিন্যস্ত, উপন্যাস-গল্প-কবিতার বিশ্লেষণ। লেখকের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সূত্র নিশ্চয়ই চিন্তন-কাঠামোর বিস্তৃতি ঘটিয়ে ভবিষ্যতে আরও অনেককে এ পথে সানন্দে আগ্রহী করে তুলবে— এই প্রত্যাশা জাগে।

robert frost : A critical Study in Major Images and Symbols গৌরাঙ্গ মোহন্ত
শ্রাবণ ॥ ঢাকা, ২০০৯
মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার নিবিড় পাঠ ছিলো আমাদের শামসুর রাহমানের। ফ্রস্টকে নিয়ে তিনি বাংলা ভাষাভাষীদের আগ্রহকে অনেকটাই উস্কে দিয়েছেন। কবি গৌরাঙ্গ মোহন্ত পাঠ-অভিজ্ঞতায় রবার্ট ফ্রস্টকে ধরে সুলিখিত এ গ্রন্থটি রচনা করেছেন। ‘ইমেজ’ ও ‘সিম্বল’ নিয়ে ইংরেজি ভাষায় সহজবোধ্য এ গ্রন্থটিতে ‘অ্যা সার্ভে অফ ফ্রস্ট ক্রিটিসিজম’, ‘ফ্রস্ট : ইনটু হিজ ঔন’, ‘ইমেজেস এ্যন্ড সিম্বলস : অ্যা স্টাডি ইন থিওরি এন্ড প্রাকটিস’ ছাড়াও চতুর্থ অধ্যায়ে আছে ইমেজ এন্ড সিম্বল নিয়ে মূল আলোচনা। এ পর্যায়ে তিনি ফ্রস্টের কবিতাকে তাঁর জীবনব্যাপী তিনটি পর্যায়ে ভাগ করে আদি, মধ্য ও অন্ত্য শিল্প-ক্রমোন্নতি দেখিয়েছেন। বইটি আমাদের হাতে এসেছে সম্প্রতি কিন্তু পাঠে বেশ মুগ্ধ হওয়ার ব্যাপার ঘটেছে। ইমেজ ও সিম্বলের উদ্দাম অনুভূতি যেন ফ্রস্ট পেরিয়ে আমাদের এ অঞ্চলের লেখকদের স্পর্শ করে বসলো। কারণ, সাহিত্য তো কোনোকালেই ভূগোলবৃত্তে বন্দী নয়, তাই ‘ফ্রস্ট ইউনিভার্স’ কিছুতেই কারো অমূলক মনে হয় না।

বাংলার বেদে : প্রকৃতি ও পরিচয় ॥ নূর-ই আলম সিদ্দিকী ॥ চিহ্নপ্রকাশন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৬
‘বেদে’ বা ‘বাইদ্যা’দের ঠিক সম্প্রদায় বা গোত্রের ফাঁদে ফেলতে আমরা নারাজ। ওঁদের কৌম সংস্কৃতি বা নৃ-বৈশিষ্ট্য অনেককালের পুরনো ও দীর্ঘতায় উজ্জ্বল। বাংলায় এক সময় বেদেদের সম্মান-আত্মসম্মান বা আচরণিক সংস্কৃতির উচ্চতা কম ছিলো না। কিন্তু ক্রমশ তাঁরা এখন সংকুচিত ও বৃত্তাবদ্ধ। ‘স্যবলটার্ন’ নয় শুধু, ওঁরা হারাতে বসেছে— ওঁদের সবটুকু সত্তা-অস্তিত্ব, নানাভাবে। ধর্মে, কর্মে, জীবনযাপনে ওঁরা আধিপত্যের কর্তৃত্ব পেতে পেতে এখন অবশিষ্টরূপে ক্বচিৎ দৃকপাত অংশে পরিণত হয়েছে। নূর-ই আলম সিদ্দিকী রচিত এই গ্রন্থে বেদেদের চিহ্ন ধরা পড়েছে। তাদের শেকড়-অস্তিত্ব, বিকাশধারা যৌক্তিক স্বরে অনুপুঙ্খ পাঠ রচনা করেছেন তিনি। বেশ পরিশ্রমসাধ্য কাজ এটি।

দৃষ্টি ॥ সংখ্যা ২৫
সম্পাদক : বীরেন মুখার্জী
ফেব্র“য়ারি ২০১৬, ঢাকা
গত ফেব্র“য়ারিতে বেরিয়েছে বীরেন মুখার্জী সম্পাদিত ‘দৃষ্টি’। কবিতার কাগজ এটি।
৯০-র ত্রিশজন কবির কবিতা ও কবিতার পাঠ মূল্যায়ন নিয়ে গ্রোথিত ক্রোড়পত্র অংশটি। মুক্তগদ্য ও হায়াৎ মামুদের সাক্ষাৎকারসহ গল্প-অনুবাদ-রিভিউ ছাপা হয়েছে। এটি পাঠে একসঙ্গে পাঠকের দুটো প্রাপ্তি ঘটতে পারে, এক. সাম্প্রতিক কবিতার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে লক্ষ্যযুক্ত ধারণা অর্জন, দুই. গত সিকি বছরের কবিতালোকের সৌন্দর্যের বৃত্ত ও তার উচ্চতার মানদণ্ড নির্ণয়; তবে এখানে কবিতা মূল্যায়নে ও নির্বাচনে আরও সংযত হওয়ার প্রয়োজন থেকে যায়— কারণ, কবিতার মতো চৌম্বক বিষয়ে প্রচুর মানুষের আগ্রহ আছে কিন্তু কবিতাকে পাওয়া খুব সহজ কথা নয়। সেজন্য কবি-নির্ণয়ে এখানে ‘সম্পর্কসূত্র’ কিংবা ‘নৈর্ব্যক্তিকসূত্র’ যে কোনোটি সততায় রক্ষা যদি ভুল হয়— তবে নিশ্চয়ই তা কালচরিত্রকে বিভ্রান্ত করতে পারে। দৃষ্টিনন্দন মুদ্রণ পারিপাট্যে কাগজটির পাঠনে পাঠকের প্রাপ্তি কম নয়।

গল্পপত্র ॥ সংখ্যা ৮         
সম্পাদক : মাসউদ আহমাদ
মে ২০১৬, ঢাকা
পরিচ্ছন্ন কাগজ গল্পপত্র। ব্যানারহেডে লেখা ‘গল্প ও গল্পভাষ্যের কাগজ’। কবি জীবনানন্দ দাশের গল্পকৃষ্টি নিয়ে এ সংখ্যাটি। মূল্যবান লেখা আছে এতে। অনেকেরই জানা আছে, জীবনানন্দকে চিনতে ভূমেন্দ্র গুহ নামক এক চির-নিবেদিত আত্মার কথা। এখানে তাঁর সাক্ষাৎকার-মূল্যায়ন নিয়ে তিনটি প্রবন্ধই পাঠকের জন্য জরুরি। এখানে ছোটগল্প ও উপন্যাস মূল্যায়ন করেছেন অনেক বোদ্ধা লেখক। ‘আমার জীবনানন্দ’ শিরোনামে লিখেছেন প্রশান্ত মৃধা, আহমাদ মোস্তফা কামাল, টোকন ঠাকুরসমেত ক’জন। কী যে পৌরাণিক জীবন ছিলো মানুষটার! তাই অনেক প্রপঞ্চমাখা গল্পসল্প জড়ানো কথামালা নিয়ে লিখেছেন অনেকেই। আছে ‘পাঠকের চিঠি’— আর তাঁকে নিয়ে হরিশংকর জলদাসের বই লেখার গল্প-অভিজ্ঞতা। কবিতার বাইরে অন্য জীবনানন্দকে পাওয়া যাবে এ পত্রিকায়। সম্পাদক নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাবার যোগ্য।

ধা রা বা হি ক  র চ না

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব

সংগীতের সমাজতত্ত্ব-৪

                               

[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ্য করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। — চিহ্নসম্পাদক]

আমরা যে ব্যবহার-মূল্যের বিনিময়ের কথা বলছি যে সেই ব্যবহার-মূল্য সম্পর্কে যথার্থ বলা হয়েছে যে, একে খাটো করে দেখলে আর যেটুকু থাকে তা হলো শ্রম-মূল্য। অর্থাৎ ব্যবহার-মূল্যকে বিমূর্ত ভাবলে পণ্যের পেছনে প্রদত্ত যাবতীয় শ্রম, মেধা, বস্তুত মতো যাবতীয় উপাদানের অবলুপ্তি ঘটে। তখন এক কথায় পণ্য বলতে ‘মানবীয় শ্রমের বিমূর্ত মূল্য’ আর কিছুই থাকে না। বাজারে যখন পণ্যটি বিনিময়-মূল্য লাভ করে তখন পণ্যে প্রদত্ত ব্যক্তিক শ্রম-সময় বা মূল্য বিবেচিত হয় না। সামগ্রিক শ্রম ব্যবস্থায় পণ্যে একটি বিনিময় মূল্য নির্ধারণে সাহায্য করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কসীয় প্রত্যয় হলো ফেটিশিজম। এর মাধ্যমে পণ্যের রহস্যময়তাকে বুঝানো হয়েছে ‘ফেটিস’ পূজার নৃতাত্ত্বিক সংকট থেকে। সোজা কথায় আমরা এমন অনেক কিছুর শক্তিকে পূজা-অর্চনা করি যা আসলে তার নেই। পণ্যের এমন প্রত্যক্ষণ অনেকটা বাহ্যিক মনস্তাত্ত্বিক ও গুণাগুণের একচেটিয়া ধারণা থেকে আসে যা আসলে সত্য নয়। পুঁজিবাদে পণ্যের এমন ফেটিশিজম দেখা যায়।

সমকালীন প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতের তত্ত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত প্রত্যয়সমূহের নানা রকম ব্যবহার হতে পারে। বিভিন্ন শাস্ত্রে এ ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভ্রান্তি ঘটতে পারে। চিন্তা-চেতনা ও দর্শনের আলোকে সংগীতকে পণ্য বিবেচনা করা হয় না। সুতরাং, বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় আমরা কীভাবে ফেটিশিজমের ধারণা সংগীতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবো? অথবা আর কোনো মার্সবাদী বিকল্প আছে কি যা সংগীতের তত্ত্বায়নের কাজে লাগে?

ক্লুমপেনহাওয়ারের মতে সমকালীন প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত তত্ত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে পূর্বের আলোচনা কাজে লাগাতে বলে বেশ কিছু জিনিস বিবেচনায় আনা দরকার। যেমন, পুঁজিবাদ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রেই মার্কস্ পণ্য-পূজার তাড়না লক্ষ করলেও এমন ঘটনা অন্যান্য শাস্ত্রেও ঘটে। বিশেষত সংগীতের আলোচনায় কষ্টকর বলেও ফেটিশ-ভিত্তিক চিন্তা পদ্ধতির প্রয়োজন আছে। কারণ এখানেও পণ্যের ব্যাপারটি চলে আসে। সংগীত যতোই ‘একাডেমিক’ বিষয় হোক না কেনো তার সাথে মতাদর্শের চেয়ে পাঠের বিষয়বস্তু পুনরুৎপাদনের বিষয়টি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। সংগীত শাস্ত্রের অধ্যয়নের প্রশ্নে পেশাগত ও বিদ্যায়তনিক ভূমিকা-দ্বয়ের মধ্যে একটা জবরদস্তির ভাব রয়েছে। এছাড়া, সংগীত-তত্ত্বের বিষয় কি হবে এ নিয়েও মতানৈক্য রয়েছে। সংকলকের চিন্তা, কাজের কাঠামো, বিশ্লেষণের ব্যক্তিগত নান্দনিক প্রতিক্রিয়া, একজন প্রাজ্ঞ শ্রোতার প্রতিক্রিয়া, একটি বিশেষ ঐতিহাসিক স্টাইলের প্রেক্ষাপটে সংকলকের গৃহীত ব্যবস্থা, প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় আসতে পারে। অন্যান্য শিল্প-ঘেষা শাস্ত্রসমূহের ক্ষেত্রেও এমন মতানৈক্য লক্ষ করা যায়। তবে সংগীতে ক্ষেত্রে বলা যায় যে ‘সংগীত-অধ্যয়ন’ একটি একক প্রত্যয় হিসেবে গ্রহণ করা মুশকিল। চতুর্থত সংগীতকে একটি শাশ্বত, আধ্যাত্মিক, ও অন্তর্গত বিষয় হিসেবে জ্ঞান করলে সংগীত-ইতিহাস বা সংগীত-তত্ত্বের মতো ব্যাপারগুলো স্পষ্ট হয় না। সেকারণে সংগীতকে পণ্য হিসেবে প্রত্যক্ষ করার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যাত হয়ে এসেছে। শেষত, সংগীত-তত্ত্বের মার্কসীয় বিশ্লেষণ-আকাক্সক্ষী উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না।

সমালোচকরা মনে করেন সংগীতের ব্যবহার-মূল্য তার নান্দনিক মূল্যের মধ্যেই প্রোথিত। সুতরাং মার্কসীয় পণ্য-মূল্যের সাথে নান্দনিক মূল্যের একটা বিরোধ দেখা যায়। মার্কস মূল্যতত্ত্ব অনুসারে অবশ্য সংগীতের রহস্যময়তার মাধ্যমেই এই নান্দনিক মূল্যের উত্থান হয়েছে। ক্লুমপেনহাওয়ার ভাষায় : The fetish nature of institutional music theory his not only in its examination of material aspects of piers an the source of value (in the form at aesthetic value of meaning). But also in its concernment of the social nature of conception or appropriation behind them style of investigation into the material properties or musical pieces১ অর্থাৎ মূল্য-আরোপের ক্ষেত্রে মার্কসীয় ও অমার্কসীয় পার্থক্যটি মূল্য সংগীতের ফেটিশকৃত উপায়নের ধারণাকে গ্রহণ করা বা করার উপরে নির্ভরশীল। ফেটিশিজমের কারণে সংগীতের ইতিহাস, সংগীত-তত্ত্ব, লোকসংগীত তত্ত্ব প্রভৃতি পরস্পর আলাদা শাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছে। সংগীত-সৃষ্টির বিষয়টিকে খণ্ডিতভাবে দেখার প্রবণতা ও নান্দনিকতার খোলস পড়ানোর পেছনে অধিবস্তুর ধারণা কাজ করে। পরিশেষে বলা যায় সংগীতের ফেটিশ চরিত্রের সন্তোষজনক শেষ বিশ্লেষণ পাওয়া যায়নি। তবে সংগীতের নান্দনিকতা যেভাবে মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মার্কসীয় মূল্যতত্ত্বের বিচার সেভাবে হয়নি। এ্যার্নোর বক্তব্য সেভাবে মার্কসীয় বিশ্লেষণের সহযাত্রী হতে পারেনি। On the fetish character in music and the that of listening.২ পুঁজিবাদের আগমন যৌন বিকৃতি ও সমকালীন শ্রোতাদের বালসুলভতাকেই তুলে ধরে।৩

পুঁজিবাদের আগমনের সাথে সংগীতের সম্পর্ক বিধান করতে গিয়ে সামাজিক বাস্তবতার সার্বিক নিরিখে সংগীতের মূল্যায়ন খুব একটা হয়নি বলে জানা যায়। মার্কসীয় সূত্রের প্রয়োগ আরো সংকীর্ণভাবে বলেছে। তবে সংগীতের কর্ম কীভাবে পরিবর্তিত হয় সে প্রসঙ্গে জানা যায় যে, পুঁজিবাদী আধুনিকতা ও বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্বের একটা সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত এ সময়কালের সংগীত সীমাবদ্ধ ও অন্তর্গতভাবে কাঠামোবদ্ধ। সোনাটাও ‘সঙ’ ফর্মে এদের দেখা যায়। পিটার স্যামুয়েল বলেন, This class of forms uses techniques of symmetry, restitution, and internal development to achieve domestic climate and clear closures. If thus stands in contrast to open-ended, additive, or variation forms that are characteristic, for example, of pre-modern music’s (reveal of which may residually survive in modern societies of various reasons).৪

প্রাক্-পুঁজিবাদী বা প্রাক্-রেনেসাঁ বা প্রাক্-আধুনিক সমাজের সংগীতে নাটকীয় উত্থান-পতন লক্ষ করা যায় না। সাদৃশ্য, পুনরুক্তি, অর্থগত ও সুরের মধ্যে াবৎংব ভিত্তিক সম্পর্ক বিরল, স্বরের উত্থান-পতনসহ যৌক্তিকতা বক্তব্য ও অন্তর্গত বিভাগ লক্ষ করা যায় না। প্রাক্-আধুনিক সংগীতে মাত্রার বৃদ্ধি দিয়ে একই বক্তব্য উচ্চারিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার কাওয়ালী অথবা উত্তর ভারতের ভোজপুরী চৌতালের উল্লেখ পাওয়া যায়। উচ্চাঙ্গ সংগীত অনেকটা উন্মুক্ত। এখানে কাঠামো যথেষ্ট সহজভাবে সংবদ্ধ ও দৈর্ঘ্য অনেকটা স্থানীয় প্রথাগতভাবে নির্ধারিত। পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া সমাজ সংগীতের এই ফর্মের ক্ষেত্রে অদৃশ্যপূর্ব যৌক্তিকীকরণ ঘটায়।

আর্থ-সামাজিক জীবনের পরিস্ফূটনে এই যৌক্তিকীকরণ পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির বদৌলতে মানবসমাজ বা আদিম প্রকৃতি-নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন নাগরিক জীবনের দুয়ার খুলে দেয়। আর্নল্ড হোসার রেনেসাঁর ক্ষেত্রে যৌক্তিকরণের বিষয়টিকে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Social History of Art (1957)-এ সুন্দরভাবে তুলে ধরেন  the rationalism which now dominates the whole intellectual and material life of the time. The principle of unity which now become authoritative in art – the unification of span and the unified standards of proportion, the restriction of the arts. We representation to one single theme, and the concentration of the composition into one immediately intelligible form – are also in audience with this new rationalism. They express the same dislike for the incalculable and incontrollable as the economy of the same reredos with its emphasis on planning, expediency, and calculability… the things that are new felt as “beautiful” are the logical continuing of the individual parts of the whole5.

আরেকটি বিষয় হলো সংগীতের এই পুঁজিবাদী ধরন সমষ্টিগত ধ্যান-ধারণা পরিবর্তে ব্যষ্টি-কেন্দ্রিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কণ্ঠ, ছন্দ, তাল ও মধুরতার দিক থেকে সংগীত ছোট এবং ব্যক্তিগত বা কখনো কখনো নিতান্তই ব্যক্তিক অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে যা কাঠামোগতভাবে সুসংবদ্ধ।

বুর্জোয়া সমাজের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তির মুক্তি। মার্কস বলেছেন, মানুষের ব্যক্তিসত্তার আবির্ভাব ইতিহাসের পথ বেয়ে এসেছে। প্রাক্-পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ একটি সাধারণ সত্তার অধিকারী ছিলো।৬ একজন কৌম-সদস্য গোষ্ঠীচেতনার মধ্যে সমাহিত থাকে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে নতুন দ্বৈতাবস্থার সৃষ্টি করলো। বুর্জোয়া সমাজে যুক্তিবাদের গুরুত্বের সাথে সাথে বুর্জোয়া অহমের অভ্যুদয় ঘটলো। শিল্পের প্রতিটি শাখায় এই অহমের কারণে একক সংগীত, একক চিত্র অংকন, একক সাধনার জগত তৈরি হলো। ম্যারোথি বলেন, In music, the main formal repression of ‘ego-centeredness’ is the roles song, emerging as the central category of bourgeois music, and entailing all the other consequence in total system, rhythm, polyphony and other formal elements of music.৭

আজকের আবেগময় রোমান্টিক গান দু’জন স্বাধীন সত্তার মধ্যে গীত হতে দেখা যায় যারা অনেকভাবেই সামাজিক বিধিনিষেধ-মুক্ত। এরা ইতিহাসীন ভারচুয়াল জগতের আবেগতাড়িত শুকশারী। সুতরাং আজকের আধুনিক সংগীত বর্ণনামূলক এক অন্তবঙ্গলোকের কথা বলে, সম্পর্কের কথা বলে, যা একান্ত ব্যক্তিগত ও প্রেমজ।

মার্কস ও সংগীতের আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা হিন্দুস্থানী সংগীতের বিশ্লেষণ দেখবো। কুরেসী দু’জন হিন্দুস্থানী ওস্তাদ— গায়ক নাসিরউদ্দিন খান ও সারেঙ্গীবাদক বাহাদুর খানকে অন্তরঙ্গভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁদের মজলিশ-মাহফিলে যাওয়া-আসা করেন এবং সে সুবাদে সামন্ত আমল থেকে পুঁজিবাদী পর্বে উত্তরণের সময় হিন্দুস্তানী সংগীতের পরিবর্তন সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

সামন্তবাদ সংগীত ও শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করে বলে সাধারণভাবে জানা যায়। এ ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চালু ছিলো। সামন্ত সময়ের পৃষ্ঠপোষকতাকেই সবাই শ্রদ্ধাসহ স্মরণ করেন। তাদের খাবার আসতো রাজ-দরবার থেকে। বিয়ে, সামাজিকতা, অথবা নিজস্ব বিনোদনের জন্য তাদের গান গাওয়ার ডাক পড়তো দরবারে। এসব মাহফিলে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আসতেন আমন্ত্রিত হয়ে। শ্রোতাদের সবাই সংগীতের কদর বুঝতো এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধা, শালীনতা, ও মনোযোগ সহকারে সংগীত ও যন্ত্রসংগীত শ্রবণ করতো।

উত্তরাধিকারসূত্রে সামাজিক স্বীকৃত এসব সংগীতকাররা সামাজিক অক্ষমতা ও অপমানের মুখোমুখী হয়নি এমন নয়। আসলে ভূম্যধিকারী শ্রেণি তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলেও সময়ের সাথে সাথে তারা বিভিন্ন রকম বৈষম্যের শিকার হয়। বৃটিশ শাসনের অগ্রগতির সাথে সাথে সামন্তশ্রেণির মধ্যে পরিবর্তন আসতে থাকে। এসব পরিবর্তনের সাথে সাথে ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবারগুলি অমর্যাদা ও অর্থকষ্টের সম্মুখীন হয়।

রেডিও স্টেশন ও একাডেমিক ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থা ক্রমাগত নিচে নামতে থাকে। বংশগত পেশাকে ধারণ করে টিকে থাকা ক্রমান্বয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কুরেশী বলতে চেয়েছেন সংগীতিক উৎপাদ ছাড়াও শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম যেমন সাহিত্য, শিল্পকলা, প্রভৃতির সাথে সামন্ত আমল থেকেই একটি সমাজ অর্থনৈতিক- কাঠামো কাজ করেছে। এই কাঠামোর মধ্যে একটি শ্রেণি, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা, ভূমি, মজুর শ্রেণি, ও সেবার সম্পর্ক জড়িত। এখানে উত্তমর্ণ-অধোমর্ণের সম্পর্ক রচিত হয়। সুতরাং মার্কসীয় উৎপাদন সম্পর্কের বিষয়টি এসে পড়ে। সমাজে প্রচলিত প্রধান উৎপাদন পদ্ধতি শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয় সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পণ্য উৎপাদনব্যবস্থার বাইরে শোষণমূলক উৎপাদনরীতি প্রচলিত আছে বলে মনে করা হয়। অনুরূপভাবে উৎপাদনসম্পর্ক ব্যবস্থাও উদ্বৃত্ত শ্রম শোষণের সহায়ক। সমাজের বৈষম্যমূলক কাঠামো ও শ্রমশোষণের জন্য ক্ষমতার অসম ব্যবস্থার সাথে এই উৎপাদন সম্পর্ককে দায়ী করা যায়। সংগীতসহ যাবতীয় উৎপাদন কৌশলের ওপর উৎপাদন সম্পর্ক শোষণমূলক প্রক্রিয়ায় কাজ করে।

টীকা ও তথ্যনির্দেশ

[1]   Henry Klumpenhower, “Commodity-Form, Disavowal, and Practices of Music Theory”, in Qureshi op. cit. p. 30

2   T Adorno “On the Fetish Character in Music and the Regression in Listening” In The Essential Frankfurt Reader, edited by Andew Arato and Eike Gebhardt, Urizen Books, NY 1978

3   Henry Klumpenhower, Henry, op. cit. p. 37

4   Peter Manuel, “Formal Structure in Popular Music as Reflection of Socio-Economic Change” in Modernity and Musical Structure – Neo-Marxist Perspectives on Songs Form and its Successors, pp. 60-62

5   Cited in Peter Manuel, p. 31

6   Karl Marx, Pre-capitalist Economic Formations, Lawrence and Wishast, London, 1964, p. 96

7   Janos Marothy, Music and the Bourgeois, Music and Proletarian, Translated by Eva Roma, Budapest, Akademiai Kiado, 1974

[ট্রিলজি]
ধারাবাহিক

সমস্ত ধূসর প্রিয়
শহীদ ইকবাল

নয়ন মেলে পর্ব
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
জ্যোতিনবাবুর ভিটা নিয়া যখন খুব গ্যাঞ্জাম তখন মাখনুন বকুলতলার পাশে দাঁড়াইয়া হাতে ত্যানা প্যাঁচায়। নাকে ধরে। স্থির চোখে তাকায় অসহায় মানুষটার দিকে। ধূতি তার মলিন লিকলিকা এখন। চক্ষু কোটরাগত। গত রাতে ভালো ঘুম হয় নাই। প্রভাতে পরাস্ত রাঙা ঘোড়ার লেজের ধ্বনি তাহাকে দুঃস্বপ্নের শিহরণ দিয়াছে। যৌবনের বাঁশি ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। তারপর সেই স্রোতে বাইরের কমলা আলো ঢুকিয়া পড়ছে। আখিরা পাড়ে স্রোত গড়ায় আর কী কী সব ময়লা

টানিয়া আনে। তড়াক করি একসময় ডুবি যায় রোদ। বেশ ঘনঘোর কালো মেঘ উঠি আসে। শীর্ণ বাতাস ঘন হয়। ভারী করে আর হেমন্তের শীষকে আঘাত দেয়। ঘাড়ে ঘাড়ে দোলা বাড়তে থাকে। শন শন আওয়াজে বিপিনবাবুর দোকানটাও আর খোলা হয় না। হায়রে নিয়তি! বহুদূর থাকি আখিরার পাড়ে গাড়াব্যাড় গ্রামের কান্নার আওয়াজ তীরবেগে বহাইয়া আসে। হুহু করা ফড়িং-শালিক তুচ্ছ বাতাসে সাঁতরায়। ওড়ে কিন্তু ওড়ে না। কিন্তু কার না-থাকা হাহাকার ধ্বনি পাকা পাতায় ভৈরবি বোল তোলে, বিদায় আর্তি ঘন করে, তারপর তাহাতে নীল পাল তোলা জলধারায় ছিন্ন তরী ভাসায়, ওখানে কে এক পানসী ভিড়ায়— তড়পায় এবং অব্যক্ত কথা আওড়ায়। তখন বৈকালি মুখমুন্দা বাতাসে জ্যোতিনবাবুর ঘরে কোপ পড়ে। সরাও জিনিসপাতি— পরনের কাপড়-ট্রাঙ্ক-লোটাকম্বল-তৈজসপত্র। ‘ক্যা রে বা!’— প্রতিবাদ ছাড়াই, তোতলায়— জল ঝরায় আর কান্দোনের ফোয়ারায় বহায়। তখন উহার টিকলিতে ছাপ পড়ে, উহা খাস জমি, সরকার লইবে তো তাই পরোয়ানা আসিয়াছে। বাড়ির সেই নিকানো উঠানে এখন আর কেউ নাই। একাকী তিনি। মন আজ তাহার চৌচির। পৃথিবীর তৃষ্ণা লযেন ফুরাইয়া গিয়াছে। যে কোণায় একদিন জিলাপি খাওয়ার আসর বসিত, এখন সেখানে বিরানভূমি। কাক আর কূজন আসিয়া বসে। সেই সর্বস্ব হারানো জ্যোতি কাকা আবার বুঝি পুরানা লাঠি-লজেন বিক্রেতার বেশ ধরিয়াছেন। ছিন্ন রঙজ্বলা ফতুয়া আর মাটি ছেচড়ানো ধূতি তাহাকে বেআব্র“ করিয়াছে। খেয়াল-খাতির সব বিস্বাদে পরিণত হইছে। কেউ তাহার পক্ষে নাই। অনেক চীৎকার তার কানে আসে কিন্তু কোনোটাই তাহার নিজের পক্ষে নয়। নির্বিকার তিনি, এখন তার মন শব্দহীন। চৈতি হাওয়ার ধুলায় নদীর সেই তীর বহাইয়া অসহায় ক্রন্দন ধাইয়া আসে। প্লাবিত করে বকুল আর কাছারির কোণার কাঠবেড়ালির মন। কোথা থাকি লেবুপাতার ঘ্রাণ ছাড়াইয়া পড়ে। বুড়া বকুলগাছটার প্রশাখা তখন নোয়াইয়া নিচে নামে। টুপটাপ চুপিসারে বকুল ঝরে। মৃসণ ভরা গন্ধ বৃষ্টির শব্দ আনে। চিরকালের মহত্ব সে বলিয়া যায়। উহাতে হুল ফোটায়। হলুদ বোল্লাটা বাজে নেশায় শশব্যস্ত ঘোরাফেরা করে। একসময় কাছারির পাড়ে চাকে আসিয়া বসে। গুণ গুণ শব্দ তখন হারায়া যায়। এ পরিবেশটা খুব কর্কশ। কেউ আবার তাহাতেই ঘন সুখ পায়। গলামুখ ভরাইয়া বসে। চোখের লোভ টনটন করে। নদীপাড়ের হাওয়ায় কাকের পাখায় ঠাঁই নেওয়া অনুৎপুষ্টরা আওয়াজ তোলে। কী এক কালা ছায়া বিড় বিড় করে বাতাস লাগায়। কালার অন্য রূপ ধরি আসে। কিন্তু এসব বেহায়া পরিবেশের তো তোয়াক্কা করিবার সময় নাই। বুঝি কোনো নবজাতকের খাদ্যেও চাহিদা বিরল। তবু বুঝে ওঠার আগেই নিকানো উঠানের ঠাণ্ডা ঘ্রাণ পলিমাটির ফাটায় আটকিয়া যায়। উহাতে বুকপীঠ একাকার। হুংকার দেন তখন এক হাবিলদার, ‘ওখানে কারো থাকার জায়গা নাই’। তড়াক করি কানে ঝাট্ মারে। ওকি! পাকিস্তান আর্মির আওয়াজ নাকি! ভারী প্রশ্ন দুর্বল হয়, এতোকালের টিনের ছাপড়া আর চালের নাড়া খসি পড়ে। ঝরি যায়। মানুষটা তো মেলা আগে থাকি এটি বাস করছে! এসব ঘনছায়া উল্কির মধ্যে তখনও বকুলছায়া দুলদুল করে। কেউ কথা কয় না। সত্য কথা নরোম রোদে ভাসি ওঠে, সাঁতরায়। হু-হু হাওয়ায় রোগা পাতলা অসহায় বোবা মানুষটার চোখোত তখন রোদপড়া আয়নার কাঁপুনি ধরি সরাসরি করে— ‘জায়গা নাই’ই ই— নাইইই— মানে? দুনিয়াটা কেডা দখল করলো? শকুনননন, শকুনের দল নাকি পুলিশের দল— নাকি মরা গোরুর ওপর পড়ছে কানা শকুনের ভয়কালো নখের আঁচড়। ট্যাকা দেছে ক্যাডা! তাইলে এতোকাল চোখোত পড়ে নাই, তখন কার আছিল! নাইইইই… ইডা না কলিকাল— তাই মগোজোত ডাং পড়ে, চোখটার ভেতর কমলা রোদ গোল হয় আর রঙটা ফ্যাকাশে মুখমুন্দা ছায়া পড়ে, তখন রঙের সাথে রঙ গুলাইয়া ভাসে। আর কিছু মনোত থাকে না। এক সময় নুয়ে পড়া নীল-শাদা আকাশ ঘিরি আসে। নাইইইইই ধ্বনি বড়ো হয়, কানের পর্দায় তা বজ্রাহতের মতো শোনায়, দ্রিম দ্রিম আওয়াজ ওঠে— ওসব বাঘের না সিংহের হুংকার— নাকি তা ক্রমশ ছোট হতে হতে কুত্তার আর্তনাদে পরিণত হয়— ঠিক বোঝা যায় না। নাহ্, অক্ত দিমু… জান দিমু এ মাটি ছাড়মু না। বকুলছায়া তখনও স্থির, একসময় তা দূরে চলি যায়। তবে একদিন যে ছায়ার দাগে জ্যোতিন কাকা নিয়মিত দোকান থাকি ঘরে ফিরতেন, সেই প্রদীপটা ¯স্নানে যাইতো, দোকানের অন্যান্য জিনিস আগুনের তাপে ভাজা চলিত— এখন ওখানে কালো কালির কল্লোল, সেখানে কিছুই নাই, খালি চলাফেরার পুরনো দাগ। সে ছায়াপাত এখন অধিক চঞ্চল। থানা-পুলিশ দিয়া ধ্বংসের পাড়ে সব সেখানে তলিয়া গিয়াছে। শকুনের দল সবটুকু ভাঙ্গি দিছে। এভাবে বুঝি দুনিয়ায় ভাঙ্গাগড়ার কাজে মানুষ শামিল হয়। পাড় ভাঙ্গে, গড়ে। এপাড়-ওপাড় ধ্বসে স্রোতরেখায় পরিবর্তন আসে। কুলু কুলু রব দিয়া নদীর স্রোতরেখা বহাইয়া চলে, চিরকাল। এই পথেই তো উজান থাকি একদিন জ্যোতিন কাকার নৌকা ভিড়িয়াছিলো। পূর্বাপর সে বজরায় আসার গপ্পো কতো করতালিতে মুখরিত, আর তার ছায়া ধরিয়া ওই ওসরার কিনারায় তখন অবসরের আলাপ জমি ওঠে— কী যে মন্দ্রমধুর গোল গোল গপ্পো পাকান। মাখনুন, বিশুরা তখন কত্তো ছোট। দমফাটা হাসি আর রোমাঞ্চকর সরীসৃপ প্রেমের কাঁপা কাঁপা গল্পের মায়া সেখানে স্বরচিত। ছায়া কাকীমা তখন ওসব শুনিয়া মুচকি হাসি দিয়া ভাঙ্গা দরোজায় আটান নিজেকে। ছায়া কাকীমাকে নিয়া রভস-রঙ্গ বিশ্রম্ভালাপের সেই দুর্জয় কাহিনির মর্মবীণার আসর জমিয়া তুলছিলো। লযেন রাজা আসিয়াছে, রাজকন্যারে কাঁধে নিয়া, তাই বাদ্য বাজাও। শানশওকত বান্ধা বজরায় তখন নামিয়া আসার অকুণ্ঠ কেচ্ছা। চুরি করি মুসলিম মাইয়া বিবাহের শাস্তি ধারণ করিয়া এক আঁচলে সে এখানে আসিয়া উঠিয়াছিলো। আসো… আসো সক্কলে দেখিয়া যাও, হিন্দুর ঘরোত চান্দের নাকান মোসলমান বউ। স¹লেই তাহা উৎসুক নিয়া দেখে। সুন্দর মুখের পানে তাকিয়া কেউ কিচ্ছু কয় নাই। অতঃপর এই ভিটায় তাহার গোড়াপত্তন হইয়া যায়। ঠিক-ঠিকানাহীন এক মানুষ তখন ঠিকানা খুঁজিয়া পাইছিলো। তখন এই কাছারি জুড়িয়া কাঁধে কিছু পান আর কচি বাচ্চাদের লাঠি-লজেন নিয়া আয়-উপায়ের নিঃশব্দ ব্যবস্থা হয়। মাখনুনের মনে আছে এখলাস চাচা সেদিন বয়সে কম হইলেও ভরা গলায় কন : ‘জ্যোতি কী আছে রে!’ চকচকা আধুলি ফেলেন, ‘বাকি যা হয় অরে চকলেট দে’— আশ্চর্য তার লালটি দুধরাঙ্গা মুখ আর বিশাল বিজয়ী ভঙ্গি। মাখনুন সাজতে সাজতে নিজেকে অনেকগুলা গেট সাজানো কাগজে দেখে। ঠাণ্ডা বাতাসে ওসব পত্পত্ করি ওড়ে। সেলিব্রিটি এখলাস চাচা তখন লাল গালিচার ওয়াগ্স। অশ্বের উপর হাঁটেন। রশি টানেন। অনেক মানুষ তাকে ঘিরি ধরে। বড়ো বড়ো ফটোক দিয়া হ্রেষাধ্বনি চলে। মেলা দূরের অশ্বক্ষুর ধ্বনি অকুণ্ঠ হয়। অশ্বারোহী আসিয়াছে, সেই বখতিয়ারের অপরাজিত অ্যারাবিয়ান হর্স, ডার্ক হর্স, ব্লাক হর্স সভ্যতার বিজয়ী প্রতিধ্বনি তুলিয়া আনিয়াছে— তখন ক্যাপস্টেন সিগারেটের ধোঁয়ায় কালছা স্বপ্ন বুরবুরি দেয়, হাঁটে, গাছে ওঠে। শুখ্ টান দিলে মাখনুনের হাফ প্যান্টের ভেতর পিঁপড়া ঢোকে। এটে-ওটে কামড়ায়। এখলাস উদ্দিন ডাক পাড়ে, ক্যারে পুলিশ-থানার ভয়ে শুকাচিস ক্যা! নাম্। নে, এক অপরিচিত পা-ফাটা মজুর তার নাম বলে আর সেকারেট নেয়। আমার আরও আছে— খা। না না— ঘোরের ভেতর তখন মাখনুনের দুই দিনের হাগা না হওয়া গোন্দঅলা পাদ বারায়। বিলের বাতাত থাকি টানা টনটনা বাতাস নাকোত লাগে। তখন কয়, গোমভাদলা নাকি রে! জমিত তোরা জান দেস কিন্তু সোনার ফসল তো ফলে না। সুদখোররা চূষি নেছে তামান। হবে না, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। তখন অনেক সারি সারি লোক পালা হয়। খদ্দরের পাঞ্জাবী আর শাদা পাজামা পরা কমরেড এখলাস কোলাপুরির মধ্যে আঙ্গুল দিয়া উঁচা ভিটার ওপর উঠি রগটান করি কয়, ক্ষেতমজুর-শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে হবে। রাষ্ট্র কখনো তা দেয় না। মাখনুন পায়ের আঙ্গুলের ওপর হাতের শাহাদত আঙ্গুলও কাঁপে, ঘামে— কিন্তু তিনি আরও বলেন, চার্চিল, রুজভেল্ট-নেহেরু নিয়া কী জানি কীসব কথা। বোঝা যায় না। হ, সুখনগরের হেডস্যার আসে, ভ্যাট-ভ্যাট শব্দে কাঁচা রাস্তায় মানুষ সরাইয়া বকুলতলার আন্ধার কোনাত দাঁড়ায়— তখন কে লযেন ধাক্কা দেয়। মাখনুনের ঘোর কাটে। পিঁপড়ার নাকান সরসর করি ওঠে বিষ। দুম করি দেখে অনেককালের রপ্ত অভ্যাসে সাঁতরাইয়া সেই বকুলতলার মাঠোত জ্যোতিনকাকার জমিত আছাড়ি-পাছাড়ি করি কান্দোন পাড়ে। কেউ আপত্তিও করে না। বড়ো স্কুলের হেডস্যার এই বাণিজ্যিক এলাকায় জ্যোতিকে কতো সম্মান দিছেন। কিছু কওয়ার আগেই তাহার হাতে সকল বাসনা পুরিয়া দিয়াছেন। তখন সিকি আর আধলি দিয়া তার গুদরি খুঁতিতা ভরি গেছিল। মেলা জমা পড়ে। তারপর হেডমাস্টার সশব্দে চলি গেলে কাছারির ওপারোত দলিল লেখকের লম্বা সারি মাড়িয়া সাবরেজিস্ট্রারের দপ্তরোত নির্ধারিত ঠিকানায় নতমস্তকে স্যারের দিকে তাকান আর সেকারেটের প্যাকেট দেন। এখন সেই জ্যোতিনের কান্দোন কেটা দেখে! সব ভাসানো স্মৃতি ভাসি বেড়ায়। তার জেবনের জয়-পরাজয় মাটিত মিশি যায়। এই ভূমিতে লযেন সব আটকি গেছে। ওই কোনার গভীর পুকুরে হলুদিয়া শাদা হাঁস পঙ্গর দেয়। হঠাৎ শোনা যায় ছায়া কাকীমা ফিট হচেন। পানি ঢালো। হুড়পাড় শুরু হয়। দাঁত নাগিচে। বাচ্চু হোঁতা চলি আসে। খুব কষি ষাট মারে। জাগা ফাঁকা হয়। তখন চতুর্দিকে বিরতির মাত্রায় আরও অলসতার ছেদ পড়ে। এর মধ্যে মাইকে কীয়ের এক সভার খবর প্রচার করা হয়। কানের পাশ দিয়া বাতাস লাগলে মেঘে ঢাকা তারার নিষ্পাপ নায়িকার মুখ তখন নাকি দীপালির মুখোত ভাসি ওঠে। আসছে ৭ তারিখ জনসভা হবি। গরম খোরমার কথা মনে হয় তখন। মিটিংয়ের পর গরোম গরোম খুর্মা মনে হয়। লোভ আর  অনেক কিছু ভাঙ্গাচোরার পর আঁধার নামলে খুর্ম্যাত মাছি পড়ে। চিনিত কামড়ায়। মিষ্টির দোকান থাকি আলো আসে। আলোর ধারাতে জোনাকি আর কালা পিঁপড়া সার ধরি হাঁটে। ধলা দোকানদার কী লযেন কয়। দুই ছালা তিন ছালা খুর্ম্যা চিকচিকা মিষ্টি নিয়া বাতাসে ওড়ে। মাখনুনের কোল জুড়ে তখন নায়িকার মুখ ভাসে, মরি যাওয়া দীপালি আর ঋত্বিকের নায়িকা না কি ছায়া কাকীমা হৈ চৈ করে। ফিট হওয়া কাকীমা এখন বেহুঁশ মতোন, খালি তাকান বা কিচ্ছু কন না। তারপরও ওই পুকুর থাকি কৈ-মাছ ভাসি আসে আর বিচিত্র রঙের বাহারি মাছ ভরাবর্ষায় ঝুপ করি পুকুরোত নামে। ওস্তাদের মতোন শিকার ধরার কৌশলে যখন ক্ষিধা কলিজায় পটল চেরা মওয়া মাছের জন্য তালুতে চাটি মারে তখন চচ্চড়ি আর ঘন ঝোলের কৈ-মাছ গরোম ভাতোত ফুরফুরা হাওয়া তোলে। উপরের চোয়ালের ভেতরে যখন চিনির সুখ ছাওয়া মিষ্টি গড়ায় কিন্তু তখন দূর থাকি দড় দড় করি ভাদোরমাসি তাল পড়ে। তার ভেতরেই জ্যোতিন কাকার ময়লা মাখানো ধুতি মাটিত ছেঁচড়ায়। ছায়া কাকীমা তখন অন্ধ অপলকভাবে হরিনাম জপেন— আর কন, ‘এ জেবনের বুঝি মরণ নাই রে…’।

ওদিকে মিশুর হোটেলে তখন কুঁড়েঘর মার্কার মানুষরা চা খায়া কানে কানে আলাপ চালায়। ভোট করা নয়, জোট করা নিয়া ঢাকার সংবাদ তখন খুব জরুরি হয়। স্বৈরশাসকের দমন-পীড়ন আর যত্র-তত্র পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ নিয়া একতার কথা শুরু হলে— দপ্ করি রহমান হকার সংবাদ আর ইত্তেফাক ফেলি দিয়া কয়— পেরসিডেন তো দ্যাশোত নাই, মন্ত্রী কাইল রংপুরের কালেক্ট্রি মাঠে ঝাড়া বক্তৃতা দিছে। ‘ভোট হবে, সবাই ভোট করুন’— বাধা দিলে দলগুলো ভুল করবে। এর মাঝে সুখনগর হাইস্কুলের মাঠে ছোট ছোট দলের খণ্ড খণ্ড সভা হয়। সে সভায় মাখনুন সমস্বরে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ শ্লোগান দেয়। অনেকের মধ্যে কে একজন গলা ফাটি লেনিনবাদ বলি চিক্কুর পাড়ে। এ্যার মানেটা কী! মুষ্টিমেয় পাবলিক ইতিউতি তাকায়। তখন স্কুলঘরোত বারান্দার ছায়াটা মাটিতে নামে— তারপর ছোট্ট মঞ্চোত দাঁড়ায়া কয়— ঢাকা ভার্সিটিত ছাত্রের ওপর তো ট্রাক চালাইছে, গুণ্ডাবাহিনি দিয়া ছাত্র-জনতাক পিটাছে, কয়দিন পর দেখবেন আপনাদেরও পিটানো হবে। কথা বলা যাবে নাহ্…। মেলেটারি দিয়া আপনাদের মুখ বন্ধ করি দেওয়া হবি। মার্শাল ল আর উঠপা নায়। শুধু ভোট ভোট খেলা চলবি কিন্তু ভোট দিবার পারবেন না। সর্বশেষ বক্তা খুব সুস্বাদু গলায় আরও কীসব বলে। ভালো-মন্দ মিশি তিনি হাসির রোল তোলেন। মাখনুন তখন ওপাশ দিয়া হেঁটে স্কুলমাঠের উত্তর কোণাত কামিনী গাছের তলার দিকে যায়। তখন সেখানে কেরাণী স্যার কী নিয়া লযেন ব্যস্ত থাকেন। ভয়ে মাখনুন ওখান থাকি সরি আসে। কাল বুঝি এই স্কুলোত বার্ষিক অনুষ্ঠান হবি। বিরাট প্যান্ডেলের পেছনের ঘরোত তারই তোড়জোড়। আবৃত্তি আর নাটকের রেহার্সেল হয়। কিন্তু কলেজের বারান্দাত রাতের রেহার্সেলের দিকেই তার টান বেশি। ওখানে সেরাজের আর লুৎফার রোমহর্ষক ক্রন্দন তাকে টানে। মনে আছে, সেদিন খুব ভরা বৃষ্টি আছিল। ঠিক নাম মনে নাই। মীরজাফর আর মীরমর্দন মিলি নবাবের ভরাতরী করি ভরাডুবি হাতির পীঠোত তুলি দিয়া শরীরের টুকরা মাংস নিয়া চলে তার উল্লাস! সব বেঈমান! বেঈমানরা মরে না। মঞ্চোত সে হাতি দেখে এই প্রথম। বেঈমানদের শান-শওকত দেখে। জাতীয় বেঈমানও তৈরি হছে। এখানে সে গেটিসবার্গ এড্রেস পড়া দেখে। কেউবা চার্লস কিঙ্গসলি পড়ে। এসব নাম শুনি সে ভালো ছাত্র হবার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তোতলা মাখনুনের লজ্জা হানা দেয়। ভয় যায় না। সাহস হারি ফেলায়। তখন সে কোণাত বসি পড়া শোনে আর অভিনয় দেখে। একসময় ঘোর আসে। মান্ষেরটা আর কতো শোনা যায়! তোতলামুখে একসময় কুঁকড়ি যায়। নেতৃত্ব না পাওয়ায় যন্ত্রণা হয়। কিন্তু ভেতরে অভিনয়ের স্বপ্ন গিজগিজ করে। দিলীপ কুমারের ঠোঁটে শঙ্কর জয়কিসান গুণগুণ করে। কীভাবে লযেন এক ফুরফুরা মেজাজ ধরি আসে। সেরাজ হতে চায়? মোগলে আযমের সেলিমও স্বপ্নে আসে। কখনোবা মরা মওদুদ বিএসসি আবার ভাসি ওঠে। মগোজের চারপাশে এমনসব ঘূর্ণি উঠলে দেখা যায় দূর থাকি মেঘ নামি আসছে। ফাঁকা মাঠ দিয়া তখন হু-হু করি দমকা বাতাস প্যান্ডেলের মধ্যে হুহু করি ঢুকি পড়ে। দূর থাকি তখন বিশু, হাবলিদারের বেটা, হাবলু, ময়েজ আর মন্টু আসে। কে যানি কয়, শালা সেকারেট টানতিছে। আড়ার ভেতরোত আরও কী কী করছে চারজন। তখন অজানা কষ্ট ঠিক বনের আড়াত ঢুকি পড়ে। কোনোরকমে একটা ধূসর মাইয়া মানষের ছবি মনোত আসে। ‘এক পরদেশি মেরা দিল লে গায়া’ স্বর করে। ‘আওয়ারা’ ছবির ধ্বনিতে তখন নার্গিসের চক্ষু ও চিবুক ধরি আসে। দুর্বার হাওয়ায় তখন মাখনুনের কণ্ঠ কাঁপে। লুকাচুরি করে, আড়ালে লুকায়। উঁচু পরিত্যক্ত বক্তৃতায় মঞ্চের পেছনোত ইংলিশ প্যান্টের বোতাম খোলে। তারপর নার্গিসের শরীর খোঁজে। অনেক সুখ চাপি ধরে। ডান হাতের শিশ্নর মণি চিকন করি নাড়ে। শিহরণের ছায়া চোখের সামনে দোলে। দোলায় নাচে আর তড়পায় নার্গিস নয়তো মধুবালা। তার ছায়া ভাসে। দোল ওঠে। তাতে তার নিজের ভেতর ঢুকলে খুব সাহস বাড়ে। মনের হাওয়ায় তখন নাটকের পাট। রোল করার জন্য সে হাত ধরে। বই মুখস্থ করে। রসভঙ্গ হয় দমকা ধুলিঝড় নিয়া। ওপরোত তখন অন্যদের আড়াল করে নিজের নিরাপত্তা নেয়। ইতিমধ্যে হাতের তালুতে বেগ তৈরি হয়। নার্গিস আর রাজকাপুরের চান্দরাতের নৌবিহারে গড়পরতা শামিল হলে উচ্ছলতার তাপ মুঠোবন্দী হয়। খেঁচতে খেঁচতে সে নিজের ভেতরে ঢুকে পড়ে। মেঘভাঙ্গা বৃষ্টি তখন শুরু, হাতের বেগ গতিপ্রাপ্তি হওয়ায় ক্লান্ত। নার্গিস সরি যায়। তার ওপর শান্তশ্রী কিংবা একটু আগে দেখা ছোট্ট বুক উঁচা মাইয়াটা গালোত ঘষে। এক পর্যায়ে অনেক ক্ষীপ্রতায় কয়েক ফোঁটা গরম আঠা ঘন হয়া উত্তরমুখে ছিটকে পড়ে। ক্রমশ অনাস্থা আসন নেয়। কিন্তু তখনও কিংসলির ধ্বনি শেষ হয় না। নির্মিয়মান মঞ্চের কোণাত পড়ালেখার সংকল্প নিয়া মগজের ভেতর হাঙ্গামা ধূন তোলে। কিন্তু হঠাৎ দূর থাকি বিশুটা ডাক পাড়ে। রাতের নটায় ছবিত যাওয়ার কথা কয়। নতুন ছবি তো! হ মাখনুনের লেখা ছোট্ট নোট বইয়ে তখন সে সেনেমার নাম ক্রমিকরূপে যুক্ত হয়। ‘গলি থেকে রাজপথ’ ছবির পোস্টারের নুড সীন নিয়া বিশুই মাল দেখার কথা কয়। শরীর-চকচকা মুখ সত্যিই মাখনুন মিশুর হোটেলে খবরের কাগজের দিকে তাকায়। এক রমণীর নাচের মুদ্রায় পশ্চাৎ দুলুনি, তাতে সেটা দেখতে কেমন লাগছিলো। কিন্তু চোরাই মনে তাহার আকর্ষণ বাড়ে। বিশু তাই দেখবে? ওর বাড়িত তো কিছু কয় না! মন খারাপ করি আবার কিংসলির দিকে ঝুকি পড়ে, ভালো ভালো করে মুখ ফেরায়। কিন্তু কিছু হয় না। লযেন ঝুলতে থাকে আকাশের কালো মেঘ। হাওয়ায় হাওয়ায় হেলি চলে। ইংলিশ কবিতা পড়া ভাইটার জন্য করুণা হয়। ভালো পড়ালেখা থাকলে কি হয়! কেউ সুন্দরী মাইয়ার মুখওলা ছবি দেখা কী বাদ দিবি। বালের পড়ালেখা। সে আবার হস্তমৈথুনের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু জায়গা নাই। তখন সামনে এগুনোর পরিবেশ দরকার হয়। প্রচুর হওয়ায় ওড়ানো বালুধুলা আচ্ছন্ন করে। হেরিংবোনের রাস্তার শিমুল গাছের তলায় ধুলায় পা ডুবাইয়া সে দুটা ফুল কুড়ায়। বিচিত্র বর্ণ আর রঙের প্রলাপ শরীরে মাখায়। ফুলের বনে অনেক রং অপরূপ জীবনের হাতছানি দেয়। ফুলের বোঁটাতে কালছা বান্দন আর ঘন কমলার কিরণরেখায় তখন জন্মরহস্য খোঁজা চলে। হঠাৎ রিফুজিবাড়ির কোণার দিকটা থাকি একটা কাউলাকাউলি আসে। কে যেনো এন্ড্রিন খাইছে। হরি বোল আওয়াজও বিস্তৃত হয়। অনেকেই তখন এসব মরণোৎসব ছাড়িয়া অধিক মার্বেলখেলায় মত্ত থাকে। কে এক যোয়ান অনেকগুলা মার্বেলের মালিক, সে শুধু দান মারে। হৈচৈ উপেক্ষা করি টুপটাপ ফড়িং বসে গোলাপের মাথায়। কচিডগায় বাতাসের দোলা ভরিয়া আসে। সে দোলে গর্তের মার্বেল আর পকেটের মার্বেল হার জিতের কণ্ঠস্বর শোনায়। মাখনুন তখন অন্য প্রান্তে দুজন ব্যক্তির হোদলা শরীরের দিকে তাকায়। ‘জেনারেল গদি ছাড়’ মার্কা মোটা লেখার ভেতর দিয়া সে স্কুলমাঠের প্রান্তরে চোখ ফেলায়। ঘাসের ওপর ওরা দাবা খেলে নৌকা খাওয়ার উল্লাস ওঠে। এবার বুঝি মন্ত্রী টালমাটাল। রাজা এখন নিরাপদ নয়। তাই শোরগোল ঘনীভূত হয়। পান্টির আগায় কিছু মানুষ লাফায়, চিক্কুর দেয়। এলেকশান নাকি জেটএমএলএ কী কী সব কয়। কিন্তু ক্যরম খেলাটাই তার সহজ। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জোট যখন দুর্গামন্দিরের পাশে স্ট্রাইক হাতে নেয় তখন তার গা শির শির করে। কত্তো প্রাচীন একটা মন্দির! খেলার ফাঁকে ফাঁকে সে তাকায়। ওর কোণায় বুঝি মূর্তি আছে। আলোও দেখা যায়। মূর্তি আর মানুষ বুঝি এক নয়! ধন্দে পড়ে। তখন সূর্যডোবার কালে স্কুলের অনুষ্ঠানের আনন্দে নাচে। তাই আজ সে পড়িবে দ্য সেনডস অব ডী!
(চলবে)

লেখমালা সম্মাননা ২০১৬

চিহ্ন
সম্পাদক : শহীদ ইকবাল
সম্মাননাপত্র

অতীত থেকে প্রেরণা ও শিক্ষা নিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে যে ছোটকাগজটি সৃজনশীল নবীন-প্রবীণ লেখকদের সম্মিলন ঘটিয়েছে এবং সাহিত্যের মননশীলতাকে এক অন্যধারার উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, তার নাম ‘চিহ্ন’। এই ছোটকাগজটিকে নানা সমাহারে সার্বভৌম হয়ে উঠতে দেখি ‘এর পাঁচ লেখকের মুখোমুখি’, ‘চিহ্নমেলা এপার বাংলা-ওপার বাংলা’, ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’, ‘কথাশিল্পের কারুকর্ম’, ‘কবিতা সংখ্যা’, ‘বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চর্চার দর্শন’ সংখ্যাগুলোতে।

‘চিহ্ন’ ছোটকাগজের অন্তরালে যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষতায় সম্পাদনার পাশাপাশি অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশবিদেশের বাংলা ভাষাভাষি প্রতিশ্র“তিশলি কবি-লেখকদের মিলনমেলার আয়োজনসহ তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব বিচারে সম্মাননা জানাতে কুণ্ঠাবোধ করেন না, তিনি চিহ্নপ্রধান প্রাবন্ধিক শহীদ ইকবাল। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত মেধার স্ফুরণ আমরা লক্ষ করি বিষয়-বিষয়ীর ক্ষেত্রে চিন্তা ও মননে পরিবর্তনের বাঁক প্রতিটি ‘চিহ্ন’-এর অবয়বে। তারই ফলশ্র“তিতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে যে বাংলা গদ্যের সূচনা তার আজকের অবস্থানকে ‘চিহ্ন’ নির্ণিত করে ‘কথাশিল্পের কারুকর্ম’-এর বর্ণাঢ্য আয়োজনে। শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নে চোদ্দ শতকের লেখকগণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এ। আবার ‘বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চর্চার দর্শন’-এর ভিতর দিয়ে বাঙালি মুসলমানগণের চিন্তার মানসজগত আবিষ্কারে ব্রত ‘চিহ্ন’ পাঠকের সামনে মেলে ধরে ইতিহাস ও সমাজসচেতন চেতনালোক, কল্পনা-প্রতিভা।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই বিচিত্র রসবোধে উজ্জীবিত ‘চিহ্ন’ ছোটকাগজ ও তার সম্পাদক শহীদ ইকবালকে লেখমালা জানাতে লেখমালা সম্পাদনা পরিষদ কুণ্ঠিত নয়। ‘চিহ্ন’ ও তার সম্পাদককে লেখমালা সম্মাননা জানাতে পেরে লেখমালা সম্পাদনা পরিষদ আজ গর্বিত।

মামুন মুস্তফা 
সম্পাদক  

সজল বিশ্বাস
সহ-সম্পাদক

এ বছরেরই ১৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার হলে মননশীল শাখায় চিহ্নকে লেখমালা (ত্রৈমাসিক সাহিত্য কাগজ) সম্মাননা দেয়। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, কবি শিহাব সরকার ও লেখমালা সম্পাদক কবি মামুন মুস্তাফাসহ অনেকে এতে উপস্থিত ছিলেন। নিরাভরণ এ অনুষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী ও প্রগতিশীল চিন্তার স্মারক লেখমালার বিশুদ্ধ অগ্রযাত্রার মাইলফলক বলা যায়। সহযোদ্ধা বন্ধুদের কৃত্য ও চিন্তাক্ষেত্রে এ পত্রিকাটির আমরা দীর্ঘায়ু কামনা করছি। (সম্পা.)

শেষ পাতার আহ্বান
আকাশ পানে তুলে মাথা

‘আকাশ পানে তুলে মাথা’- কথাটি অনেকভাবে রবীন্দ্রনাথই বলেছেন।
আর মানুষের মন আর স্বপ্ন যদি আকাশের মত বিশাল হয় তবে সে বুঝি জাগতিক সবকিছুই মিটিয়ে নিতে পারে। নিজেকে দহন দানে পুণ্য করতে পারে। মানুষ যদি প্রকতির অংশ হয়, আকাশ আর সমুদ্র যদি তার আত্মাকে গতিধারায় প্রভাবিত করে- তখন মুছে যায় তার ক্ষুদ্র অনেককিছু। আবার এর মাঝে অন্য কথাও মনে করা যায়। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতার অমঘ বার্তা কী আকাশ পানে মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি নয়! কোন কবি যেনো বলেন, সবাই তো মানুষ তবে শিরদাড়াটা সোজা ক’জনের!
শ্রাবণের মেঘের মতো আসা-যাওয়া, চন্দ্রের মতো অভিমানিনী, মাঘের সূর্য ওঠার মতো সকালের নিদ্রা- এসব তুলনা মানুষের অভিধানে আছে। হরহামেশা তার প্রকাশো ঘটে। আকাশের মতো বিস্তার, পাহাড়ের মতো শান্ত, সমুদ্র-তরঙ্গের মতো উচ্ছ্বাস- সবটুকু তো মানবজীবনেরি সারবস্ত আর মানুয়াশের জন্যি মহান। শুধু কোনো কালসীমায় বা বয়সের ভেদে নয়, আকাশ-বৃষ্টি-মেঘ-আগুন-বায়ু কিংবা রং-রুপ নিয়ে মেঘের কোলের ছির-অভিব্যক্ত আকাশ তো নব নব দৃষ্টি ফোটায়, অবশেষে কূল-কিনারা তার- অনেককেই মুগ্ধ করে। চিরকাল করে, সব বয়সেই করে। তাইতো রবীন্দ্রনাথ বলে ‘ব্যাথা মোর উথবে জ্বলে ঊর্ধ্ব-পানে’ । এমন সৃষ্টি নিয়ে লিখুন পরবর্তী সংখ্যায়।

লিখুন….. পরবর্তী সংখ্যায়

ই-যোগাযোগ: shiqbal70@gmail.comchinnoprokashon@gmail.com

অথবা saikatarefeen@gmail.com

ফোন : ০১৭১৯১৩২৬৫১ || এ বিষয়ে লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ খ্রি.


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা