নি য় মি ত–বি ভা গ

চিত্তের প্রসারতা মস্তিষ্কের মুক্তি
………………………………………

নিয়মিত বিভাগ

কী লিখি কেন লিখি ১০

জফির সেতু
কেন লিখি?

স্নানের বাসনা রাখি; এতকাল জন্মান্ধ ছিলাম
পিপাসায় দগ্ধপ্রাণ ছন্নছাড়া ধুলোমাখা আমি
অনেক ঘুরেছি বনে; সমূহ দ্বিধাবর্জিত আজ
ঘৃণা করি ঈশ্বরকে; তোমাকেই প্রণাম জানাই!

আমাকে রেখেছ বন্দি প্রবৃত্তির অন্ধ কারাগারে
প্রস্তুতিতে আয়ু নষ্ট; অপেক্ষায় ছিলাম সংকোচে
ভেবে দেখো ক্ষুব্ধ করে রেখেছ আত্মা পিঙল শরীর
নির্বেদে শতচ্ছিন্ন যা দিতে পারো অলোক আফিম। … (অংশত)

কবিতাটি লিখেছিলাম এক শীতের রাতে। সেটা উনিশ শ চুরান্নব্বই সাল। ডিসেম্বর মাস। শীত পড়তে শুরু করেছে আমাদের পাহাড়ি শহরে। কুয়াশায় ছেয়ে যাচ্ছে গাছপালা, মাঠ, পথ, আকাশ।
আমি থাকতাম একটা পাহাড়ঘেরা বাড়িতে। টিলার ওপরে আমার ঘর। টিনের চাল। পাশেই একটা মাঠ। চারদিকে গাছের সারি। নিম-জারুল ইত্যাদি। তখন আমি খুব নিঃসঙ্গ ছিলাম। সারা সন্ধ্যা মাঠে কাটিয়ে রাত নামলে একা ফিরতাম ঘরে। ঘরে ফেরা মানে বই নিয়ে বসে পড়া। বিদ্যুতের ঘোলা আলোয় শেষরাত অবধি সেটা চলত। এটা রোজকার রুটিন। তেমনই এক সন্ধ্যা ছিল সেদিন। আমার মন কী কারণে খারাপ ছিল। বিষণœ ছিলাম সারাদিন। এমন প্রায়ই ঘটে।

হ্যাঁ, কলেজে আমার পরীক্ষা চলছিল। আগামীকাল একটা কঠিন একটা বিষয়ে পরীক্ষা। প্রস্তুতি ওইরকম নেই। আসলে নোট করে পড়ার অভ্যাস আমার ওই রকম ছিল না। সবগুলো টেক্সট পড়তাম। আর রেফারেন্স। পরীক্ষা এলে টেনশন বেড়ে যেত। এবারও তাই হলো। এটাও বিষণœতার একটা কারণ হতে পারে।

শামীম শাহান সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রন্থী বেরুবে আবার। লেখা দিতে হবে। লেখা মানে কবিতা। কবিতাও লেখা হচ্ছে না। মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে। না, কবিতা নেই। টেবিলে বসি, কবিতারা আসেনা। বিকেলে একটা টিলার মতো পাহাড়ে উঠেছিলাম। বিকালে। নামতে নামতে সন্ধ্যা নামে। একবার পিছলে পড়ে গেলাম। স্পষ্ট মনে আছে।

চিরপরিচিত মাঠ পেরিয়ে আমার আবাস। আমি মাঠের ওপারে পা রাখতেই চোখে পড়ে, পশ্চিম আকাশে চাঁদ রক্তিম হয়ে আছে। কিন্তু আমার চোখের সামনে কুয়াশার মেঘ। চাঁদটাও কুয়াশার জালে ম্লান হয়ে আছে। হঠাৎ আমার মনে একটা চিত্রকল্প আসে। আমি গুনগুন করে উঠি।

‘আমি পারি, কৌমার্যের অহং ছিঁড়ে আনতে কুয়াশার রক্তিম চাঁদ।’

মাই গড! আমি আর কোনোদিকে ফিরেও তাকাইনি।

হনহন করে ঘরে এসে পড়েছিলাম। অসাধারণ একটি পঙ্ক্তি মাথায় খেলে গেলে আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হলো।

আসলে তখন আমার সংকটকালও চলছিল। প্রেমের বা সম্পর্কের। আমি ঠিক ভালো ছিলাম না। আমি গেলাম সোজা টেবিলে। খাতা নিয়ে বসে পড়লাম। কিন্তু না, আর কোনো পঙ্ক্তি মাথায় আসছে না।

কদিন আগে একটা কবিতার বই হাতে আসে। জয় গোস্বামীর। ঘুমিয়েছো, ঝাউপাতা? বইটি কার মাধ্যমে পেয়েছিলাম আজ আর মনেও পড়েনা। বইটি আমার মন কেড়েছিল। আমি বুঁদ হয়ে পড়েছিলাম। প্রতিটি কবিতা প্রায় মুখস্থ হয়ে পড়ছিল তখন।

বইয়ের প্রথম কবিতা কবিতার নাম ‘স্নান’। ‘সংকোচ জানাই আজ; একবার মুগ্ধ হতে চাই।’ প্রথম পঙ্ক্তি। অসাধারণ। রক্ত কেমন করা লাইন। পুরো কবিতা। প্রত্যেকটি ইমেজ।

আহা এমন কবিতা যদি লিখতে পারতাম। আফসোস হয়।

আমি স্নানেই ডুবে গিয়েছিলাম।

কিন্তু কবিতাটি পড়েছিলাম তারও অনেক আগে একটি প্রেমের কবিতার সংকলনে। ওটি সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। অথচ আশ্চর্য কবিতাটি আমার ততটা চোখে পড়েনি অর্থাৎ আমাকে নাড়া দেয়নি। তখন থেকে আমি বুঝতে পারি অভিজ্ঞতা ও জীবনপদ্ধতির সঙ্গে কবিতার আস্বাদনের একটা সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ কারণে বিশেষ কবিতা ব্যক্তিবিশেষের উপাদেয় হয়ে ওঠে।

তখন তো লেখালেখি শুরু হচ্ছে। অনেকটা এগিয়ে যাচ্ছি। দ্রুত। লাফিয়ে লাফিয়ে। রুচি পরিবর্তন হচ্ছে, পাঠাভ্যাস বদলাচ্ছে, লেখকও পরিবর্তন হচ্ছে। কবিতার পঠনপাঠনের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। স্বপ্ন পরিবর্তন হচ্ছে।

আমার মনে আছে এর ঠিক আগে, কয়েক রাত জেগে জেগে একটি উপন্যাস লিখে শেষ করেছি। আনন্দের সাগরে ভাসছি।

আসলে হয়েছি কী, সদ্যসমাপ্ত করেছিলাম সারোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিপাসা উপন্যাসটি। শরৎ-বিভূতি-মানিক-রবীন্দ্র-নজরুলের উপন্যাসের বাইরে প্রথম কোনো উপন্যাস পড়ার অভিজ্ঞতা। আমার অবাক লাগে রবীন্দ্র-মানিক-বিভূতির উপন্যাস যেখানে আমাকে লেখার প্রেরণা দিতে পারেনি, কিংবা প্রভাবিত করতে পারেনি, সেখানে সরোজ বন্দোপাধ্যায় পড়েই মাথার ভেতরে পোকা ঢোকে উপন্যাসের। বন্দর বাজার থেকে একটা ডায়েরি কেনা হলো ওইদিন, আর রাতেই উপন্যাসের শুরু। পরপর পাঁচ রাতের লেখা হয়ে গেল ধূসর প্রান্তর উপন্যাসটি। পিপাসা প্রেমের উপন্যাস ছিল, নায়িকার নাম বিদিশা। মনে আছে আমি পিপাসার নায়িকার আদলে আমার নায়িকা কেয়াকে সৃষ্টি করি। আর আমার বুক ভরে গেছে গর্বে, আমি তাহলে উপন্যাস লিখে ফেললাম? প্রতি মুহুর্তে উপন্যাসের প্রত্যেকটি চরিত্র আমার ভেতরে হাঁটাচলা করছে, প্রত্যেকটি ঘটনায় উজ্জীবিত আমি। প্রত্যেকটা লেখা শেষ হলে এমন হতোই, সেটায় পরে আসছি।

‘স্নান’ কবিতাটি আমাকে প্রভাবিত করেছিল। আমি বেরুতে পারছিলাম না। আমি প্রভাব এড়াতে চাইতাম। আমার বন্ধুরা জানেন কবিতা লেখার শুরু থেকেই আবুল হাসানের কবিতা আমাকে গ্রাস করেছিল। আসলে আমার কবিতা-লেখার যুদ্ধ ছিল আবুল হাসান থেকে বেরিয়ে আসা। আমি তখন হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। কিন্তু একবার পেয়ে গেলাম সাক্ষাৎ রবীন্দ্রবাণী। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছেন, বড়ো কবির প্রভাব থেকেই নতুন কবির জন্ম। কথাটা ওইরকমই। পরে আরও জানতে পারলাম, রবীন্দ্রনাথ নিজেও একদা বিহারীলাল হতে চেয়েছিলেন। এবং পৃথিবীর প্রায় সকল বড়ো কবি অগ্রজদের হাত ধরে হাঁটতে শিখেছেন।

সুতরাং আমার মাথার ভেতরে যে-চিত্রকল্প খেলা করেছিল চাঁদটি দেখে, এবং কোনো বিশেষ কুমারীর প্রতি প্রবল যৌনবাসনা আমাকে বিষণœ করে তুলেছিল তাই পঙ্ক্তি আকারে আমার কাছে উপস্থিত হয়। এবং অবশ্যই তাতে ঘৃত ঢালেন জয় গোস্বামীই।

আমি অশান্ত হয়ে উঠি, টেবিলে ছটফট করি, কিন্তু কবিতা আর আসেনা, চিত্রকল্পও না, পঙ্ক্তিও না। কিন্তু কাল তো পরীক্ষা দিতে হবে। আমি পরীক্ষার জন্য মনোযোগী হলাম। এ-বই ও-বই হতে নিলাম, পাতা উল্টালাম, কাজের কাজ কিছু হলো না। পরীক্ষার দুশ্চিন্তা একদিকে, অন্যদিকে মাথার ভেতরকার ওই পঙ্ক্তির জ্বলন্ত অগ্নি। ওই চিত্রকল্পের দাহ। আমার অস্থিরতা বেড়েই চলল। একসময় হতাশায়, অবসাদে আমি বিছানায় গেলাম। কাল চার ঘণ্টার পরীক্ষা দিতে হবে। তখন মধ্যরাত। ঘণ্টাদুয়েক পর ঘুম ভেঙে গেল আমার। আসলে ওটা ঘুম ছিলনা। আধো তন্দ্রা, আধো জাগরণ।

বাইরে বেশ ঠা-া। পা হিম হয়ে যাচ্ছে। আমি মাথার পাশের জানালাটি খুলে দিই। শীতের হাওয়া ঘরে ঢোকে। মনে হলো আমার মুখ হিম হয়ে গেছে। বেশ কুয়াশা পড়েছে এবার। মাঠটা দেখা যায় না। গাছগুলোকে মূর্তির মতো মনে হয়। চারদিকে গভীর নীরবতা। ঠা-া বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে। আর টিনের চালে শিশিরের শব্দ। জানলাটা বন্ধ করে দিলাম আবার।

হঠাৎ শীতের বাতাসের মতোই আমার মাথার ভেতরে আরেকটি বাক্য উঁকি দিল, ‘স্নানের বাসনা রাখি’ এবং সঙ্গে সঙ্গেই পরের টুকরো, ‘এতকাল জন্মান্ধ ছিলাম’। আমি অস্থির হয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। আলো জ্বালিয়ে দিলাম। টেবিলে ঝুঁকে খাতাটি উল্টালাম। শাদা পাতায় কলম ধরলাম। মনে হলো আমার ভেতরটা গরম হয়ে গেছে। চামড়ার নিচে আগুনের ফুলকি। আমি লিখে চলেছি। অনিঃশেষ শব্দ আর চিত্রকল্প মাথায় ভর করছে। কলম দৌঁড়াচ্ছে।

কম্বল গা থেকে সরিয়ে ফেললাম। আমি ঘেমে যাচ্ছি। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ফ্যান ছেড়ে দেব? না, সে-সময়টুকুও নেই। হ্যাঁ, নিজের অজান্তেই ছন্দ কবিতাটিতে বাসা বেঁধে ফেলেছে। অক্ষরবৃত্ত ছন্দ এগিয়ে যাচ্ছে ভাবকে সঙ্গতি রেখে। আঠোরো মাত্রার পঙ্ক্তি। আট ও দশ মাত্রা। আমার ভেতরে এক মহাসমুদ্রের কল্লোল। সংক্ষুব্ধ সফেদ উড়ছে বাতাসে। জলের সঙ্গে জলের সংঘর্ষ চলছে। জন্ম হচ্ছে আগুনের, পাখির, পাথরের।

এভাবেই বত্রিশ পঙ্ক্তির কবিতা শেষ হলো ঘণ্টা দেড়েকের মাথায়। সমাপ্তিসূচক শেষ পঙ্ক্তি ‘নস্যাৎ করি নিয়তির বশ্যতা : সকল প্রশংসা তোমার’ তখন বেরিয়ে এলো তখন মনে হলো, আহা এইবার মুক্তি, এই বুঝি শান্তি এলো জীবনে। মুহূর্তে কেটে গেল অস্থিরতা। মনে হলো আমি স্বাভাবিক হয়ে উঠছি। আর এতক্ষণ আমি মোটেও স্বাভাবিক মানুষ ছিলাম না।

আমি জানলা খুললাম। আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ভোর আসন্ন। পৃথিবীটাকে আমার খুবই সুন্দর মনে হলো। বেঁচে থাকাটাও সুন্দর। মনে পড়ল ফজল শাহাবুদ্দীনের একটি কবিতার লাইন, ‘বেঁচে থাকা মানে আশ্চর্য সুন্দর!’ আমি কবিতাটির নাম দিলাম ‘মিতভাষণ’। পড়লাম পরপর তিনবার। এবার তাহলে ঘুমানো যায় নিশ্চিন্তে। শান্তির ঘুম। কিন্তু বুঝেছিলাম, কবিতাটি জয় গোস্বামীর ‘স্নান’ কাবতাটিরই কাব্যিক ও সৃষ্টিশীল প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই কবিতা আমার। কবিতাটি সাহস করে আমার প্রথম কবিতার বই বহুবর্ণ রক্তবীজ-এ ‘মুখবন্ধ’ নামে সংকলিতও করেছিলাম। প্রভাব হোক আজও আনন্দ পাই কবিতাটি আমারই— এই ভেবে। এখন কথা হচ্ছে, এই কবিতাটি জন্মলগ্নে বা তার আগে আমার ভেতরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেটা কী? কেন আমার এমন হয়েছিল? কেন আমি উন্মাদের মতো ছিলাম? কেন লিখি?

আমার মনে হয় এ-প্রশ্নে উত্তর খুঁজলে কবিতা-জন্মের গভীর বেদনার কারণও খতিয়ে দেখতে হয়। কিন্তু কী এই মনোবেদনার হেতু? কেনই-বা এই অন্তর্দাহ, জীবন-জ্বর? কেউ কি বলে দিতে পারে! সকল কবির বেলায় এমন মুহূর্ত আসে বলেই জানি। তাহলে, কেন এই?

আমার জন্ম সিলেটি জোতদার মুসলিম কৃষক পরিবারে। জন্মেই শুনেছি নজরুলের কথা। রবীন্দ্রনাথ দূরের মানুষ। দুখু মিয়ার গল্প স্কুলে আর ফুরোয়না। বাড়িতেও না। আসানসোলের রুটির দোকানে কাজ করতেন ছোটোবেলা। বিশাল কবি। মারি ত গ-ার, লুটি তো ভা-ার। কবি হিসেবে নজরুলই আমার আদর্শ সেই ছোটোবেলা থেকেই। আমিও নজরুল হতে চাই। কিন্তু কেন নজরুল হবো?

মানুষ আমার নাম বলবে। স্কুলে আমি পাঠ্য হবো। সবাই আমার কবিতা পড়বে। কবি হিসেবে সবাই আমাকে সম্মান করবে। অর্থাৎ আমি খ্যাতিমান হতে চাই। আমি খ্যাতি পেতে চাই। খ্যাতির জন্য কবি হতে চাই। আমি লিখতে চাই। এই আমার লেখকজীবনের প্রথম স্বপ্ন। এটা সত্য কথা। কলম কখন ধরেছিলাম এটা আর মনে পড়ে না। এখন এটাই মনে পড়ে আমার কবিতার দুটো খাতা ছিল। একটা প্রেমের। একটা বিদ্রোহের, বিপ্লবের। দুই ধরনের কবিতাই লিখতাম আমি। নজরুলের কবিতার বই কেনা হয়ে গেছে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে। জামা না-কিনে বই কিনি। জুতো না-কিনে বই কিনি। নজরুলের কবিতা পড়ি একদিকে, আর আমার কবিতা রচনা চলে আরেক দিকে। অগ্নিবীণা ও দোলনচাঁপা আমার খুব প্রিয়। আমার গানের খাতা ভরে যাচ্ছে অগ্নিবীণা ও দোলনচাঁপার বিদ্রোহ ও প্রেমভাবে। বুকের ভেতর কখনো কড়ি, কখনো কোমল :

মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য

আমি আসলে নজরুলের কপি। নজরুলের ব্যর্থ সংস্করণ। নজরুলের শব্দ-ছন্দ-ভাব সব আমার দখলে। এটা কলেজে ওটার দ্বিতীয় বছরের ঘটনা। আমি পৃথিবীর কবি। মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান।

সলতে পাকানো হয়েছিল তারও আগে। হাওর অঞ্চলে আমাদের বাড়ি। একদিকে নদী, একদিকে হাওর। গ্রামের মধ্যে দূরত্ব আনেক। গরমের দিনে প্রবল বাতাস বয়, চারদিকে। শীতের দিনে তো কথাই নেই। ঠা-া হিম শীতের বাতাস। পাশে হিন্দুদের গ্রাম। নমঃশূদ্র পাড়া। সন্ধ্যা হলেই ঢোল-করতাল ইত্যাদি বাদ্যের বাজনা বাজে। নদীতে ঢেউয়ের শব্দ বারোমাস। বন্যার সময় হাওরের পানির থইথই, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসে পৃথিবী। আর শুকনো-বর্ষা মৌসুম জুড়ে গান. চারদিকে গানের সুর। করতালের শব্দ। বাউলগান. মরমি গান, মালজুড়া গান। হিন্দু-মুসলিম সকল পাড়ায়। আমাদের বাড়িতে ছিল সাহিত্যের আমেজ। বর্ষা এলেই সন্ধের পর উঠোনে বসত পুঁথিপাঠের আসর। বাবা পুঁথি পড়তেন সুর করে। চাচারা পড়তেন। চাচাত ভাইরাও পড়তেন। মাঝরাত পর্যন্ত চলতো ছেলেবুড়ো, নারী-পুরুষের আসর। কারবালার কাহিনী, জঙ্গনামা, সোনাভান, সয়ফুলমুলক-বদিউজ্জামালের কাহিনির আনন্দ-বেদনা সবাইকে স্পর্শ করত।

আমার ঘুমের ভেতরও হানা দিত অনেক চরিত্র। বিশেষ করে পরীদের সঙ্গে মানুষের প্রেমকাহিনি। আমার মনে হতো নিশ্চয়ই কোনো পরীর সঙ্গে আমার প্রেম হবে একদিন। পরীর সঙ্গে আংটি বদল হবে, আমি আমার প্রেয়সীকে আনতে যাব পরীস্থান। কিন্তু সে-পরীদের কেউ আসেনি আমার জীবনে।

আমার মাও পুঁথিপাঠের আসরের অন্যতম শ্রোতা ছিলেন। সময় সময় সবাইকে খাবার পরিবেশন করে আবার নায়ক-নায়িকার দুঃসহ দিনে ‘হায়’ ‘হায়’ করে আহাজারি করতেন। আবার সকালে ঘুম ভাঙতো আম্মার কোরানপাঠের সুরে। আব্বাও পালংকে কোরান পাঠ করছেন। আমি ঘুমের ভেতরেই তাদের সুরেলা পাঠ শুনছি। ওদিকে প্রায় প্রতিদিনই বেলা-ওঠা পর্যন্ত ওসমান চাচার উচ্চৈঃস্বরে কোরান-তেলাওত পাড়াকে আধ্যাত্মিক জগতে নিয়ে যেত। মক্তবে প্রভাতী সুর শেষ হয়ে যায়নি। ইজা জুল জিলাতি আরদু জিলজা লাহা। অমা খালকনাল ইনসানা লিয়া বুদুন।

শীতকালে আমাদের ওখানে আরও দুইটা ঘটনা ঘটত হামেশা। খড়-বিছানো উঠোনে বা ধান তোলার মাঠে কেচ্ছ-কাহিনি বসত। কেচ্ছা বলার জন্য দূর গ্রাম থেকে আসতেন আমাদের এক নানাভাই। লম্বা চুল। শাদা ও কুঁকড়ানো। অভিনয় করে কেচ্ছা বলতেন। গাইতেনও কাব্য করে করে। আমি তার ভক্ত ছিলাম। আবার, প্রতিবছর পাশের গ্রামে যাত্রাপালাও বসত। ছোটো আকারের। আমাদের যাওয়া নিষেধ ছিল। তবে বড়ভাইয়েরা যেতেন। আর আমরা যারা ছোটো, ইচ্ছে হতো একরাতেই বড়ো হয়ে উঠিনা কেন? আরও বড়ো হয়ে শুনেছি ঘাটুদের কথা। ঘাটুগানের কথা। তরে কে দিল পিরিতের বেড়া লেচুর বাগানে। বিয়ের সময় সারা গ্রামেই গীত হতো। বিয়ের গীত। ধামাইলও হতো। বৃত্তসহকারে হাতে তালি বাজিয়ে। আম্মাও গাইতেন। তার প্রতি সবার একটা আগ্রহ ছিল। কোনো কোনো রাতে ঘুম ভাঙলে দাদির মুখে ব্রতের গীত শুনতে পেতাম। দাদি একাকী একটি কক্ষে শুতেন। আমি মাঝে মাঝে তার সঙ্গে ঘুমাতাম। তবে তার নিত্য সঙ্গী ছিল আমার ছোটোবোন সিতারা। কখনো গাইতেন আব্বাসউদ্দীনের গান। আমার হারকালা করলাম রে আমার দেহ কালার লাইগা রে…।

বড়ো চাচার মুখস্থ ছিল গোটা মনসামঙ্গল। তিনি গ্রামে দুই সঙ্গী আত্তর চাচা ও জয়ের বাপকে নিয়ে বর্ষাকালে উঠোনে নেচে-গেয়ে বেহুলা ভাসান শুনাতেন। স্কুলে ও বাড়িতে কবিতা মুখস্থ করার জন্য উৎসাহ দেওয়া হতো বেশ। সুতরাং পাঠ্য বইয়ের সকল কবিতাই ঠোটস্থ হয়ে গিয়েছিল আমার। এমনকি বড়ো কবিতা পড়লে ওপরের ক্লাসের কবিতা আগেবাগেই গ্রাস করে নিতাম। বাড়িতে মেহমান এলে ছোটোদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো। আর এর পরের কাজই হতো আমাদের নতুন অতিথিদের মুখস্থ কবিতা শুনানো। এপর্বের শেষে পেতাম দশটাকা ইনাম। ভাবতাম, প্রতিদিন কেন নতুন মেহমান বাড়িতে আসেন না! আমার মনে হয় এসব বিষয় কবিতার প্রতি আমার আলাদা টান তৈরি করে। অর্থাৎ, কবিতার ভাব, সুর, ছন্দ ইত্যাদির প্রতি একটা আকর্ষণ। কিন্তু কেউ কখনো আমাকে বলে দেয়নি কবিতা লিখতে। কিংবা কবিতা লিখেন এমন লোক তখনও দেখিওনি। কিন্তু কবি যে খুব সম্মানের এটা বুঝতাম। আর একটা জিনিস বুঝতাম, কবিতা অন্যরকম একটা ব্যাপার। কিন্তু কবিতা লিখব এটা ভাবিনি।

আমার মনে আছে একবার অঘ্রান মাসে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। তখনও শহরে বসবাস শুরু হয়নি। ছোটো চাচা হাট থেকে একঢোঙা খই নিয়ে এসেছিলেন। ঢোঙাসমেত কিছু খই আমাকে আমার বোন পারুল দিয়ে যায়। খই খাওয়ার পর ঢোঙা খুলে পড়তে থাকি। ওটা আমার একটা স্বভাব ছিল। লেখা কিছু পেলে পড়তে চাইতাম। এটা ছিল একটা বইয়ের পাতা। আমি এপিঠ-ওপিঠের কবিতাগুলো পড়ি। একদিকে রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’, অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’। পাঠ্যবইয়ের বাইরে প্রথম এমন একধরনের কবিতা আমি খুঁজে পেলাম, যার কিছুই যেন আমি বুঝতে পারলাম না। আবার বুঝলামও। পড়ে আমি খুব আনন্দ পেলাম। আবার পড়লাম। মনে হলো এ-দুই কবিতার ভেতর কীরকম একট রহস্য আছে, একধরনের গোপন কথা আছে যো আমাকে আনন্দ দেয়। আমার মনে হলো এধরনের কবিতা আমাকে আরও পড়তে হবে। কবিতাগুলো পড়ে ফটিক ঘরের বাইরে এসে বিকালের রোদ দেখে আমার খুব আনন্দ হলো। আঙিনার নিচে ঘাসের ওপর আম্মার শাড়ি রোদে মেলে-দেওয়া ছিল, সেটাও ভালো লাগল। দেখলাম আকাশ থেকে কুয়াশা নামছে, অন্ধকার গ্রাস করছে পৃথিবীকে। আমার খুব ভালো লাগছিল। কোনো কবিতা পড়ার পর এমন ভালো আর কখনো লাগেনি। রাতে উঠোনে হাঁটছি, আমি আকাশে তাকাই। আকাশকে অন্যরকম মনে হয়। চাঁদ, তারা, নক্ষত্র জ্বলছে নিভছে। আমার ভেতরে গভীর ভাব আসে। পৃথিবীকে রহস্যঘেরা মনে হয়। মনে হয় জীবনও রহস্যময়। কিছু বুঝি, কিছু বুঝি না। আমি ওই রহস্যের অংশী হতে চাই। আমার কবিতা লিখতে ইচ্ছে হয়।

কলেজে ভর্তি হবার পর ইসলামপুর বাজারে পাগল-কিসিমের এক লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়। প্রথম পরিচয়েই বললেন, কাল একটা কবিতা দিও তো। আমার পত্রিকায় ছাপাব। আমি বললাম, আমি তো লিখি না। তিনি বললেন, লিখ না তো কী হইছে। আমারে দিবা কাইল! আসলে আমার খাতা ভরে উঠছে নজরুলীয় কবিতায়। আমি বাংলার দ্বিতীয় বিদ্রোহী কবি। কেউ জানেনা। তিন-চারদিন বাদে উদীয়মানের প্রথম পৃষ্ঠায় আমার কবিতা ছাপা হয়। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে আমার অন্যরকম এক অনুভূতি হয়, যা এর আগে কখনো হয়নি। ওই আধবয়েসি লোকটাকে আমার দেবদূত বলে মনে হয়। তিনি ঘোষণা করলেন, প্রতি মাসে আমার একটি করে কবিতা ছাপাবেন। আমার নেশা পেয়ে গেল। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার নেশার মতো বড়ো নেশা পৃথিবীতে আর নেই। আমার মনে হলো, কালো হরফে মুদ্রিত নিজের নামটি দেখার জন্য আমাকে লিখতেই হবে। একদিন আবিষ্কার করলাম লিটলম্যাগে আমার লেখা ছাপা হচ্ছে আর তখন নজরুল হওয়ার বাসনা আমার ভেতর থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। কেন জানি মনে হতে লাগল নজরুল বড়ো কবি নন। বড়ো কবি হচ্ছেন বুদ্ধদেব, বিষ্ণু, জীবনানন্দ দাশ এরা। রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত টানা গেল না। এ-সময় একটা ঘটনা ঘটে। এক অচেনা তরুণী আমাকে নীল খামে প্রতিদিন পত্র লিখতে শুরু করে। সে আমাকে চেনে, আমার কবিতার ভক্ত। কিন্তু আমি তার নাম পরিচয় কিছুই জানিনা। একটা রহস্যের জালে আটকা পড়ে যাই আমি। সে ধরা দেয় না। কিন্তু প্রতিদিন লিখে, কবি আমি আপনার কবিতা পড়তে চাই। মেয়েটি আমাকে অস্থির করে তোলে। আর আমার মনে হয়, জীবনে বেঁচে থাকতে হবে আর এই মেয়েটির জন্য কবিতা লিখতে হবে। আমি পূর্ণ উদ্যমে মেয়েটির জন্য কবিতা লিখতে চাই। লিখিও। দৈনিকের সাহিত্য পাতা বলি, আর লিটল ম্যাগাজিন বলি যেখানেই আমার কবিতা ছাপা হয় সে তা যোগাড় করে ফেলে। আর আমাকে তাজ্জব করে দিয়ে উদ্ধৃতিসুদ্ধ পত্র লেখে। আমার অবস্থা আবদুল করিমের গানের মতো, আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা। মেয়েটি একসময় হারিয়েও যায়। কিন্তু কবিতা লেখার অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে। কবিতা না-লিখে আর পারিনা। কবিতা জীবনযাপনের একটা অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। মনে হয় কবিতাই বেঁচে থাকার একটা প্রক্রিয়া। কবিতাই জীবন।

জীবনানন্দ দাশের বহুবিখ্যাত উক্তিটি সবসময় আমার মাথার ভেতরে ঘুরপাক খায়। ‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দুই রকম উৎসারণ।’ কথাটা আমার কাছে খুব রহস্যজনক বলে মনে হয়। কেননা ওই যে বলা হলো ‘একই জিনিসের’ সেটা আবার কী? যেটাই হোক কবিতা ও জীবন সমান ধাতুতে তৈরি। আমার নিজেরও তা মনে হয়। না-হলে কবিতার সঙ্গে জীবনের যোগটা এমন নিবিড় হয় কীভাবে? জীবনযাপন করতে হয়। মানুষকেও কবিতাযাপন করতে হয়। লিখে বা না-লিখে। কাব্যবোধ জিনিসটা তো সকলের ভেতরেই রয়েছে। এখন, কোনো মানুষকে যদি বলা হয় বেঁচে আছেন কেন? বেচারা ধাক্কা খাবেন মারাত্মক। নিজেকেই প্রশ্ন করবেন বারবার, কেন বেঁচে আছি? কিন্তু জবাব কী আসবে ভেতর থেকে? কে কাকে জবাব দেবে? কবির বেলায়ও এমন নয়কি? কবি কেন কবিতা লিখছেন? কেন কবিতা লিখেন? প্রশ্নটা মামুলি। উত্তরটা কিন্তু কঠিন। আমার মনে হয়না ‘এই জন্য লিখি’ ভেবে কবিতা লিখেন কেউ। যেমন ‘এই জন্য বেঁচে থাকি’ ভেবে কেউ বেঁচে থাকেন। এমনটা হলে মানুষ বাঁচতে পারত না। মানুষকে আত্মহত্যা করতে হতো। কেননা আশা বা স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার আঁড়ি আছে। মানুষ বড়ো বেশি বাস্তব নিতে পারে না। আসলে কবি কবিতা যাপনের জন্যই লিখেন। উদ্দেশ্য নিয়ে কবিতা লেখা হয়না। উদ্দেশ্যভিত্তিক শিল্প শিল্প নয়। এটা আমার ধারণা। হ্যাঁ, সমাজ বদলের জন্য কেউ কেউ কবিতা লিখেন। অতীতেও লেখা হয়েছে। কিন্তু সে-সব রচনার শিল্পগুণ প্রশ্নাতীত নয়। অনেকে সেসবকে বাতিল করেও দিয়েছেন। উপযোগের অন্য মাধ্যমও আছে। কবিতাকে তো আগে কবিতা হয়েই উঠতে হবে। এই বিতর্ক বিশ্বজুড়ে। আর্ট ফর আর্টস সেইক। আর্টস ফর লাইফ সেইক। আমিও আমার নজরুল-আক্রান্ত যুগে সমাজবদলের স্বপ্ন দেখেছি। ভেবেছিলাম বিদ্রোহ ও বিপ্লবের কবিতা লিখে পৃথিবীকে পাল্টে দেবো। সমাজ বদলের স্বপ্ন আমার মারা যায়নি। কিন্তু দিনবদলের কবিতা থেকে আমি ফিরে এসেছি। একটা সময় মনে হয়েছে আমাকে কবিতাই লিখতে হবে। আমার মনে হয়েছে বেঁচে থাকার মধ্যে যেমন একধরনের নিরর্থকতা আছে, কবিতা লেখাও একধরনের নিরর্থক আয়োজন। এই আয়োজনের সঙ্গে মানবঅস্তিত্বেরও একটা সম্পর্ক রয়েছে। আসলে কবিতা লেখার ভেতর দিয়ে আমি জানান দিতে চাই আমি আছি।

মানুষ কুয়াশা ভেজা ঘাসে ঘুরে বেড়ায়। সূর্যাস্তবেলায় রক্তিম আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা না করলেও তখন হতো। কিন্তু সে অর্থহীন ওই কাজটি করে। পুলকিত হয়, আনন্দ পায়। অর্থহীনতার মধ্যেও দেখা যায় জীবনের গভীর তাৎপর্য লুকিয়ে আছে। সে কারণে মানুষ কবিতার মতো অর্থহীন আয়োজনে এক একটা জীবন পার করে দেয়। ঘাসের পেলব স্পর্শ কেউ অনুভব করে, কবি সে অনুভূতিকে ভাষায় রূপ দেয়। দুজনের অনুভূতিই কবির। জীবনের। বেঁচে থাকার। আর হয়ত একারণে এ-অর্থহীনতাই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

জীবনের যদি কারণ থাকে, কবিতারও কারণ আছে নিশ্চয়। কিন্তু সেটা কী? অথবা, কেন এই জীবন, কেন এই কবিতা লেখা? মানুষ উন্নত প্রাণী। সে প্রেম করে, তার অভিমান আছে। মানুষ শিল্পবোধসম্পন্নও। ইতর প্রাণীও প্রেমিক, অভিমানী। পেঙুইন প্রেমিক, আবার পাখি অভিমানী। এরা শিল্পবোধসম্পন্নও। না-হলো মানুষের মতো উচ্চাঙ্গের শিল্পস্রষ্টা। পেঙুইন সঙ্গিনীর জন্য প্রতীক্ষা করে, বাবুই অসাধারণ বাসা বোনে। প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলবেন ওটা বায়ালোজির জন্য। আবার ময়ূর পেখম মেলে কেকা ডাকে নেচে নেচে ময়ূরীর মন ভোলায়। ময়ূরীর সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ আছে বলে ময়ূর যেমন সুন্দর হয়েছে, তেমনি নাচ-গানেও পটু হয়েছে। এটা জীবধর্ম। ডারউইন বলছেন, যৌননির্বাচনের প্রয়োজনে সৌন্দর্যের উৎপত্তি।

আমরা মানলাম। তাহলে, এটাও বলতে বাঁধা নাই নারীদেহের সৌন্দর্যও যৌননির্বাচন হতে উৎপন্ন। সুতরাং শিল্পবোধও একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। এটা জীবনচক্রের অন্তর্গত। আর মানুষের জীবনযাপন যদি জৈবমানবিক প্রক্রিয়া হয়, তাহলে কবি-সৃষ্টির প্রক্রিয়াও জৈবমানবিক। আর এ-ধর্ম মানুষের জৈবমানবিক ধর্ম। পশুর সৌন্দর্যবোধ বা সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানুষের পার্থক্য এখানে যে, মানুষ এই প্রক্রিয়াকে মানবিকীকরণ করেছে। মানুষের এই প্রক্রিয়া একই সঙ্গে শরীরী ও অশরীরীও। প্রাণিকুলের রূপ-রং-রস-সুর-রেখা-ভঙ্গি ও বিচিত্রতা যেমন অস্তিত্বরক্ষার প্রক্রিয়া, কবিতা তেমন কবির অস্তিত্বরক্ষারও একটা প্রক্রিয়া। মিলনের পূর্বে ময়ূর কেন মাতাল হয়ে নাচে যেমন জানে না, কবিও তেমনই জানে না, কেন সে কবিতা লেখে। ময়ূরকে নাচতে হয়, কেকা স্বর তুলতে হয়; আর কবিকেও কবিতা লিখতে হয়।

আমার ভেতরে নিরন্তর একটা অস্তিত্বরক্ষার তাগিদ অনুভব করি। আমার বোধ ও অভিজ্ঞতা অন্যমানুষের মধ্যে সঞ্চারিত করারও একটা তাগিদও অনুভব করি। চিরকাল মানুষ এটা করে এসেছে। মানুষ মাত্রই সৃষ্টিশীল। সে-সৃষ্টিশীল মানুষ আলতামিরা গুহায় পশুশিকার শেষে পশুর রক্তমাখা হাতের ছাপ গুহার দেয়ালে স্থায়ী করে রেখেছে। সেখানেও রয়েছে তাদের বোধ ও অভিজ্ঞতার সাক্ষ্য। শিল্প ও কবিতার ছোঁয়া সেখানেও। ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করতে করতে যেমন পশু হত্যা করেছে, তেমনি নিজের বোধ ও অভিজ্ঞতা অন্যের মনে সঞ্চারিত করতে গুহার দেয়ালে রক্তের আলপনাও এঁকেছে। প্রশ্ন হলো, কেন এটা করেছে? আমার উত্তর, অস্তিত্ব বিস্তারের প্রয়োজনেই করেছে।

আমি ক্ষুধার্ত হলে যেমন ছটফট করি, ‘মুখবন্ধ’ কবিতাটি লেখার জন্যও সমান ছটফট করেছি। আর দুই ছটফটই অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে। প্রথমটা জৈব, আর দ্বিতীয়টা মানবিক। সুতরাং এখন আমি যেমন সমাজবদলের জন্য লিখি না, কাউকে মুগ্ধ করার জন্যও না। কবি হওয়ার জন্যও না। একটা সময় অমরত্বের আকাক্সক্ষা মনে ছিল। এখন তাও নেই। আগে কবিতা লিখে ছাপানোর জন্য পাগল হয়ে উঠতাম। এখন একটি কবিতা লেখা হয়ে গেলে পড়ে থাকে কম্পিউটারে মাসের পর মাস। নিজেই পড়ি মাঝেমধ্যে। মনে হয় নিজের জন্যই লিখেছি। কবিতা-লেখা এখন বেঁচে থাকার শর্তে পরিণত হয়েছে। মনে হয় বেঁচে থাকতে হলে কবিতাই লিখতে হবে। আজ যদি না-লিখতে পারি কাল নিশ্চয়ই লিখব। অপর মানুষ কবিত্ব অনুভব করে, আমি লিখি। কিন্তু কবিতাই শর্ত। মানুষের জন্য কবিতা অপরিহার্য। কিন্তু জানি কি, কেন লিখি?

আমি একটা ধূসর পোকা নই। এজন্য আমি লিখি।

————————————-

শে ষ পা তা র  আ হ্বা ন

সুবিদ সাপেক্ষ
স্পর্শে পাই আকাশ ছোঁয়ার সাহস

পোড়ের আগুন আর একবার উস্কে দিয়ে আবার হুকো টানতে আরম্ভ করলো ছেবারত। দগদগে আগুনের ওমে এবার বেশ আরাম অনুভব করলো সে। এক নাগাড়ে অনেকক্ষণ ধরে এই কাজ দুটোই করে চলেছে ছেবারত বুড়ো। না আরেকটা কাজও সে করে চলেছে। কান খাড়া করে শব্দ শোনার চেষ্টা করছে। অন্যকে বুঝতে না দিলেও ভিতরে ভিতরে প্রচ- আমুদে এ বুড়ো মানুষের সঙ্গ পেতে, তাদের সাথে কথা বলতে বেশ মজা পায়। আর শব্দ শোনার তাগিদটা তা থেকেই। এবার শব্দ একটু পেলো, তবে তা মানুষের নয়, গোয়ালের গরুগুলোই ঘনঘন নিঃশ^াস ছাড়ছে আর যাবর কাটছে। দাঁতের কর্ষণে একটা বেশ শব্দ হচ্ছে। ছেবারত আবছা অন্ধকারে কেবল গরুর চকচকে চোখগুলো আবিষ্কার করতে পারলো। এবার আর বসে থাকা যায় না, মধুবিড়ি আর হুকোর আগুনে জর্জরিত শালটা গায়ে মুড়ি দিয়ে বাইরে আসলো ছেবারত। দু-তিন বার গলা খেকারী দিয়ে কেশে নিলো সে। যদিও উদ্দেশ্য গলার কফ পরিষ্কার নয়। এখনও যে পোড়ের পাড়ের সেই সভ্যরা আসেনি। যাদের কাছে সে প্রতিদিন নানা অযুহাতে গল্প শোনে। শোনে বিশাল এ গ্রামের প্রতিদিনের হালচাল। এখানকার মানুষের সুখ-দুঃখ। সুতরাং আশেপাশের সেই গল্প বলা মানুষগুলোকে জানান দেওয়ার জন্য যে তার এই কাশা-কাশি তা অনেকটা পরিষ্কার। থেমে থেমে হুকোতে টান দেয় আর মাঝে মাঝে আশেপাশে তাকায় গল্পবলা মানুষদের অপেক্ষায় থাকা বুড়ো ছেবারত। হ্যাঁ, বুড়ো ছেবারত। ভালো নাম মোহাম্মদ ছেবারত সরকার। কালো ছিপছিপে গড়নের চুল-দাঁড়ি পাকা মোহাম্মদ ছেবারত সরকার আশেপাশের ৫-৭ টি গ্রামে ছেবারত বুড়্যা নামেই পরিচিত। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ আর বাড়ি ভর্তি ছেলে-পুলে-নাতি-নাতনি নিয়ে বুড়োর বেশ বড় সংসার।  … না কেউ আসছে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভোররাত কতোটা দূরে বা কাছে তা আঁচ করার চেষ্টা করে তবে কুয়াশার কারণে তা ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। আজ মনে হয় একটু আগে ভাগে ঘুম ভেঙ্গে গেছে বুড়োর। এইভাবে আরো কিছুক্ষণ কাটলে এবার ছেবারত বুড়োর সম্বিত ফিরে আসে। চরপাড়ার দছিজল মুন্সির গলার আওয়াজ ভেসে আসছে উত্তর দিক হতে।… ‘উট বাহে, আর ঘুম্যান না। ঘুম থাকি নমাজ উত্তম, উট বাহে…’। এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ বলে আজান দিতে শুরু করে দছিজল মুন্সি। বড় সুরেলা গলা দছিজল মুন্সির। আর নিঃস্তব্ধ শীতের সকালে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে যেন মধুর ধারা ভেসে আসছে। দছিজল মুন্সির আযান শুরু হলে বুড়ো যেন অন্য কেউ হয়ে যায়। এক্ষণে তাই নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। গোয়াল ঘরের পিছনে পুকুর। পুকুরের উত্তর পাড়ে বাড়ি বজলা ভাটিয়া আর ইসলাম ভাটিয়ার। আসল নাম বজলার রহমান আর ইসলাম। সহোদর। নদী ভাঙ্গনে চর থেকে এসেছে বলে সবাই নামের সাথে ভাটিয়া যোগ করেছে। অনেকে সম্বন্ধ অর্থেও ভাটিয়া শব্দটি ব্যবহার করে। যেমন ভাটিয়া জামাই। তবে এ গ্রামে এখন তারা অনেক পুরোনো। দুই ভাইয়ে কেস্তা (রূপকথার গল্পের মতো) বলতে বেশ ওস্তাদ। বার বার গলা খ্যাকারী দিয়ে বজলা ভাটিয়া পুকুরের পাড় বেয়ে নিচে নেমে ওযু করে। নাক পরিস্কার আর পানি মুখে গড় গড় ধ্বনি স্পষ্ট শুনতে পায় ছেবারত বুড়ো। খু খু করে কেশে বুড়োও তার বার্তা পাঠায়। খানিক আগে হুকোর আগুন নিভে গেলেও বুড়ো এতক্ষণ টের পায় নি। বুড়ো ধীরেধীরে পোড়ের পাড়ে যায়। আর একবার পোড় খোঁচায়ে কয়েকটা ঘুটের আগুনের দলা হুকোয় উঠিয়ে নেয়। সাবধানে পোড়ে খোঁচায়। আগুন নিভে গেলে যে সব শেষ। আগুনকে যতœ করে বাঁচিয়ে রাখলে যে তার গল্প শোনা হবে।

— বাজান উটচেন গো?

— কেটা, আইজল?

— হ

— হ; উটনু খানিক আগোত।

আইজল বুড়োর বড় ছেলে। বাপের মত অতোটা চুল-দাঁড়ি না পাকলেও আধা-পাকা চুল-দাঁড়িতে বোঝা যায় তারও বেশ বয়স হয়েছে। আইজল গরুগুলোর দিকে মুখ করে একটু একটু আগুনে খোঁচায়। এবার বাপের দিকে মুখ না ফিরিয়েই বলে— বাজান ধলা বকনটারতো এবারো গাব আটকিল নে। কি করি ওটাক নিয়্যা।

— গাওত ত্যাল ধচ্চে। নাক ফোঁড়ে দেস আর একন্যা কম খোরাকি দেস। গাও কমলি আপনি গাব হবি।

এরই মধ্যে এসে পড়ে আলীর নানী, কাচোর নানী, ওমুরাল্লী বুড়ো, মজি মিয়া, ময্নের দাদী। এবার বুড়ো বেশ চনমনে। অল্প কিছুক্ষণ পরে বজলা ভাটিয়া, ছমিরুদ্দীন মুন্সি নামাজ শেষে পোড়ের পাড়ে এসে বসে। এরা প্রত্যেকেই পোড়ের পাড়ের নিয়মিত মুখ। ফজরের আযানের কিছু আগে-পিছে সবাই এসে হাজির হয় এখানে। সাথে দু-চার জন ছোট সদস্য। ওরা আসে দুটো নেশায়। প্রথমটি কেস্তা শোনা আর দ্বিতীয়টি পোড়ের আগুনে আলু পুড়ে খেতে। দুটোই ওদের জন্য খুব মজার। যদিও ছেবারত বুড়ো মাঝে মাঝেই খেপে গিয়ে বলে—

— ইস্, বালিরশালিরা আচ্চে খালি আলু খাবার নাম করি আগুনগুল্যা শ্যাষ করের। ক্যারে আলু তো পরেও পুড়ি খাবার পাবু। ধমকে কাজও হয়। কেউ আলু নিয়ে আসলেও নিয়ে আসে একেবারে ঝুরো আলু।এগুলো দ্রুত পোড়া হয়। বুড়ো আবার ওদের আসাটাকে সমর্থনও করে। নানা কথার ভীড়ে ওদের কেস্তা  শোনার আবদার থাকে যে। আর রূপকথার এসব কেস্তা শুনতে বুড়োর যে কী আমোদ হয় তা মনোযোগী বুড়োর দিকে তাকালে বোঝা যায়।

— ক বাহে বজলা। শুনবের চায় কী করব্যু। ক একট্যে।

আরও কিছু সমর্থন আসে। তখন আর বজলা ভাটিয়ার না বলে উপায় থাকে না। অন্য সময় হলে একটু ছন্দে ছন্দে ছিলুম কেটে নিতো— ‘কেস্তা কম কেস্তা কম, কেস্তা হলো কী, জর্দা দিয়ে এ্যাকনা পান না খিল্যালে কেস্তা বাড়ায় কী’। বড়দের আসরে তা আর হলো না। কেস্তা চলতে থাকে। আর এ সময় দেখা যায় বুড়োর সে কী মনোযোগ! বজলা ভাটিয়া হঠাৎ হঠাৎ থেমে আগুন খোঁচায়— আর বার বার বলে—

— কোনটি নে থামনু বাহে?

মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা বুড়ো বলে ওঠে—

— ঐ যে বাহে গজার মাছটা যখন্যে ধরব্যের ধরে তখনে আর ওটা উটি থাকে না। আরেক জায়গ্যাত জ্যায়্যা থাকে।

— হ মনে হচে।

মাঝে মাঝে ছোটরাও ধরিয়ে দেয়। আবার বলা শুরু করে— দ্যান করি মাঝি অনেকক্ষণ মাছটা ধরব্যের চেষ্টা করে। খানিকক্ষণ পর দেকে মাছটা নাই। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও দেকে মাছটা কোনোঠাই নাই নাই নাই। এ্যারপর খানিক দূরে দেকে নাল শাড়ি পরা এ্যাকনা গোরা ফুলফুলে বউ। তাই খালি খলখল করি হাসে…। কেস্তা চলতে থাকে। কোনো কোনো দিন হয়তো কাচোর নানী গল্পো ধরে তার এই সরকার বাড়িতে আসার শুরুর দিনগুলোর কথা— লাঠি খেলা, হাডুডু খেলা, পাতা খেলা, জারি গান, পাঁচ ফকিরের গান, ভাসানের গান, মনু গীদেলের গান নিয়ে সেই সময়ের মজার মজার কত গল্প! চলে আছরাল্লী বুড়ো, আপতাপ বুড়ো, রমজান গাড়িয়ালদের বীর আখ্যানপর্ব। কখনো বা গিদালী বুড়ি ময্নের দাদী কথার ফাঁকে ফাঁকে গীত ধরে— তোর পায়োত নালো নালো জুতে

মাতাত সোনার টুপি

তোর বাপোকো দেখছোম

শুয়ের চরাইতে।

আস্তে আস্তে নিভে যায় পোড়ের আগুন। বেলা বাড়তে থাকে। একে একে উঠে যায় সবাই। ছেবারত বুড়ো তখনো পোড়ের পাড়েই বসে থাকে। হয়তো একটু জোরে-শোরে হাক দেয়— ক্যারে বাবা অবু। মেলা বেলা হয়্যা গ্যালো গরুগুলাক এখন বাই কর।

স্মৃতির সাথে আড্ডায় কখনো কখনো আমরা এভাবেই ব্যস্ত হই। হারিয়ে যাই সময় থেকে সময়ের গভীরে। খুঁজে ফিরি নিজের অস্তিত্বকে। যেখানে পোড়ের পাড়ের সেই আড্ডা শেষ হয়, নিভে যায় আগুন। সত্যিই কী আগুন নিভে যায়, শেষ হয় গল্প! নাকি আবার নতুন করে উঁকি দেয়। স্পর্শ করে আকাশকে।

—————————————

সুবন্ত যায়েদ
পথ ও প্রান্তরের বেভুল পথিক

কোথাও পাখির শব্দ শুনি;

কোনো দিকে সমুদ্রের সুর;

কোথাও ভোরের বেলা রয়ে গেছে—তবে।

অগণন মানুষের মৃত্যু হলে—অন্ধকারে জীবিত ও মৃতের হৃদয়

বিস্মিতের মতো চেয়ে আছে;

এ কোন সিন্ধুর সুর :

মরণের—জীবনের?

স্বপ্নের ভেতরে তুমুল উৎসব অনুভব করে যাই। পথে চলতে থাকি গোধূলীর আলো ছায়ায়। তখন জ্যোতিষী মশাই ধ্যান করে পশ্চিমে তাকিয়ে কয়ে যান তুমিও তাকাও। আমিও তাকাই। দেখো নক্ষত্র দেখা যায়। জগতসংসারে এখন অশুভ বলে কিছু নাই। রক্তের ভেতরে উৎসবের তুমুল জোয়ার অনুভব করে যাই। সেদিন শরতের আকাশে চাঁদ। ঝিলের জলে মৎসকন্যাদের মহলে কানাকানি। ঈশ্বরের আশির্বাদপুষ্ট পেজা পেজা পবিত্র মেঘ ঝিলের জলে পূণ্য¯œান করে আরো ফুরফুরে উড়ে যায়। জীবনানন্দকে দেখা যায় তুলি নিয়ে শূন্যের বুকে আঁকিবুকি কাটতে। এই যে আপনি, মাথাটা গেছে। ওপাশের মাঠে কুয়াশা নেমেছে, উন্মুখ সাদা ক্যানভাস। মনের মাধুরী গুলিয়ে কবিতা আঁকুন। আর আমিও কোনো ফেরিওয়ালা নই। টোকাই জন্মে শুধু কবিতা টোকাই। এখন আমাদের পৌরাণিক জীবনের যাত্রায় প্রাচীন গন্ধ লুট হয়ে গেছে আর মন বিচ্ছিন্নতাবাদী সত্যতায় সদালাপী ভূমিকায় দেখিয়ে গেছে মিথ্যের নিখুঁত প্রলাপ। ক্ষতের আড়ালে আছে মসৃণ সুস্থতা। তুমুল হৃদয়হীনতার ভেতরে চলে অনন্ত প্রেম। আর প্রাণের ভেতরে টুকরো টুকরো মৃত্যু জীবনের গতিবেগ বাড়াচ্ছে। আমরা এখন কোন পথে চলি! শুধু বছর কুড়ি নয়, মৃত্যুর সমান জীবনের পথযাত্রায় ইস্যুকৃত বেদনা বুকের উষ্ণতলে ঠাঁয় নিয়েছে। রেললাইনে সভ্যতার যুগে লাইন মাপা দূরত্বে সবুজ পাতাদের বসবাস, হাজার মাইল পেরিয়ে এসেও তবু ছুঁয়ে যায়— দেখা হয় কই? খোঁজ নিয়ে জেনেছি, বনলতা সেন নাটোর ছেড়ে লন্ডনের অভিবাসী। অন্ধকার ছেড়ে সে এখন আলোর মুখোমুখি। তবু জীবন বাবু, এই পৃথিবীর বুকের ভিতর কোথাও শান্তি আছে! বুকের বামে হাত দিলে ধুকপুকানি কথা কয়। ফিরে আসে সমুদ্রের ধারে, ফিরে এসো পথের প্রান্তরে…

এ কি ভোর?

অনন্ত রাত্রির মতো মনে হয় তবু।

একটি রাত্রির ব্যথা সয়ে—

সময় কি অবশেষে এ রকম ভোর বেলা হয়ে

আগামী রাতের কালপুরুষের শস্য বুকে করে জেগে ওঠে।

প্রতিটি ভোর যদি পুনর্জন্মের মতো হতো, সকালের রোদে নতুন মন্ত্রণায় নিত্য জেগে উঠে কবির চোখে— তবে পৃথিবী দেখতাম। বালকের চোখে খোদিত একপ্রকার মুগ্ধতা। আহা পৃথিবীর রোদ! আয়নার প্রতিফলনে বিপরীত দৃশ্য পরিমাপ কতোটুকু গভীরতা মাপা যায়— ওই আয়নার? তবু ঘুমচোখে আয়নার মুখোমুখি হই। ভোরের সত্তায় রোদ এসে হাওয়ার মতো কোমল নাড়া দিক। আমাদের স্কুলের ঘণ্টাবাদকের জীবনেতিহাস। আয়না দৃশ্য দেখায়। সাতটা নয় এখন আটটা ঘণ্টা বাজে, টুং টাং। এখন নতুন এই পৃথিবী মহাশয়। প্রস্তরযুগের মানুষ বিশ্বাস রাখে নাই। ততোদিনে ক্ষয়ে গেছে কাঞ্চন পাহাড়ের চূড়া। সমৃদ্ধি ঘটেছে পিরামিডের। কিন্তু মনের ভেতরে ক্ষয়ের বাড়ন্ত অঞ্চলের বাঁধ দেবে কে? এভাবে মহাবিদ্রোহের আয়োজন ঘটে। মঞ্চস্থ হয় উত্তাল নৃত্যতাল। দ্রিম দ্রিমি বাজনা ওঠে দশ দিক। বার্তা পৌঁছে যায়। তখন রক্তের ভেতরে পঙ্গপালের মতো শৃঙ্খলহীন শোষণ। সুস্থির হলে দেখা যায় কোমল ক্লান্ত প্রাণ তবু সবুজ সতেজ, উদ্ধত। সুন্দর অসুন্দরের কাছে নয় বরং সুন্দরের কাছেই পরাজয় মানতে জানে। এই তবে শক্তি ক্ষয় ও দুর্বলতার বিপরীতে নতুন অনুসন্ধান। কিন্তু আমারও জীবনের অধ্যায়ে এখনো যোগহীন যাবতীয় রতন! একদিন যে স্বপ্নের অধ্যায়ে তুমুল উৎসব অনুভব করেছিলাম— আমার জন্যই যাবতীয় রতন, পৃথিবী জেগে উঠেছিলো উদার অনিকেত সংকেতে। জীবনজয়ের জ্যোতিষী মশাই ক্ষণে ক্ষণে রাজ্য জয়ের মতোন গেয়েছিলো জীবনের গীত। আমি পথে চলেছিলাম। অভিবাদন জীবনানন্দ দাশ তব রচিত আনন্দলোকে। প্রথম স্তর পেরিয়ে যান, ওইখানে সুরঞ্জনা আছে। যেখানে বাতাস আর আকাশের ওপার, সেই খানে তার হৃদয় ঘাস হয়েছে। তারো আগে, নক্ষত্রের রুপালী আগুনভরা রাতে, দুটি চোখ আনন্তকালের জন্য নিভে গেছে। তবু মৃত্তিকার মতো আলো হয়ে আসে, আকাশের আড়ালে। কেউ কেউ তাকে সূর্য বলে ভ্রম করে। কিন্তু পতন ঘটে যায়। স্বপ্নের অধ্যায়ে নক্ষত্রগুলো খসে খসে পড়ে। পৃথিবী এক বিশাল প্রজাপতির রঙ্গিন পাখার আশ্রয়তলে, কিন্তু ঝরে গেছে পাখার আলগা রঙ। এখন ধূসর অপ্রিয় যাপনের কাল। মাথার উপরে অবলম্বন খুঁজি তবু তার আনত সত্তা। অহর্নিশ মিথ্যে অহং— হায় বেঁচে থাকা, দায়হীন। উদ্ভ্রান্ত মন্ত্র উড়ে যায়, ট্রামের লাইনে…।

কোথাও ডানার শব্দ শুনি;

কোনো দিকে সমুদ্রের সুর—

দক্ষিণের দিকে,

উত্তরের দিকে,

পশ্চিমের পানে।

সৃজনের ভয়াবহ মানে—

তবু জীবনের বসন্তের মতো কল্যাণে

সূর্যালোকিত সব সিন্ধুপাখিদের শব্দ শুনি;

ভোরের বদলে তবু সেইখানে রাত্রিকরোজ্জ্বল

হ্বিয়েনা, টোকিয়ো, রোম, মিউনিখ— তুমি?

জেগে উঠি, চিরকালের সত্যে। পথ ও প্রান্তরের বেভুল পথিক, পথ চলি। পৃথিবীর চেয়ে যদি বড়ো সত্য কিছু থাকে, সে সত্তা আমি। অথচ কতো ক্ষুদ্র থেকে তা উদ্গীরিত, জীব। মহাবিশ্ব সমান হৃদয়ের ভার নিয়ে চোখ মেলেছে, এক ঝাঁক বিস্ময়মাখা মুখ। সাদা প্রান্তরে কুয়াশা নামলে মেঘেরা তবু আড়াল অপ্রিয়। হাত বাড়িয়ে কাকে ছুঁই, সবকিছুই হৃদয় ঘষে নেওয়া, ছুঁয়ে যাওয়া। একদিন কিসে বিভোর হয়েছিলাম, সে ধূসর অতীত তবু আলোড়িত। তবু আকাশ সমান আকণ্ঠ ঘোর যেন। একটি জন্মের মন্ত্রণা ছিলো অনেক নতুন জন্মের। পাথরে সুপ্ত আগুনে তুমুল পোড়াতে শিখেছি। যেমন নক্ষত্র, খসে গিয়ে ভাগাড়ে পড়ার যন্ত্রণা নিয়ে পড়তে পড়তে স্বর্গের হৃদপি-ের ওপর তড়াসে ঘটেছে পতন। সুতরাং দুচোখের ভেতর দিয়ে গভীরে, আরো গভীরে জগতের উজ্জ্বলতম বিস্ময়। তার ভেতর দিয়েই পথ, সীমানাহীন নির্দেশনা। ভোরের বেলার মাঠে নগ্ন পা, নীলকণ্ঠ পাখি অভিবাদন করে। কতো কাল আগে, অতিথি পাখিরা সমস্ত শীত জুড়ে চরাতো। নীলপালক এখনো রাজত্ব করে, ভোরের শিশির মেখে নদীটা বয়ে চলে, ধানসিঁড়ি, প্রাচীন গন্ধ বুকে। হৃদয়ের খুব কাছে তার ঢেউ ভাঙ্গে। ভোরের প্রথমভাগের রোদে প্রান্তরজোড়া ঘাসে শিশিরকণা আকাশ পানে চেয়ে থাকি— বাতাস-আকাশ-নক্ষত্র-নীড় খুঁজি— এই প্রকৃতির পালক বেয়ে, নিবিড় হয়ে।

——————————————-

মাকছুদা ইয়াছমিন রুমকি
খুঁজে ফেরা

আকাশ—! আলো বহন করে, বায়ু সঞ্চারণ করে, জল ধারণ করে। অর্থাৎ আকাশ বাহক, সঞ্চারক এবং ধারক। গ্রহ নক্ষত্রগুলো যেন নিজেদের গ-ি না পেরোয় তাতেও কত শাসন তার। কত ব্যাপক কত বিস্তৃত। নাই সীমা নাই অন্ত। না যায় ধরা না ছোঁয়া। ভাবতে ভাবতে কেবলই বিস্মৃত হয় হৃদয়, ভাবুক মন কেবলই উদাস হয়ে ঘুরে বেড়ায় দিক থেকে দিগন্তে। একের পর এক কী লীলা চলে ওখানে! ঠিক পৃথিবীর বুকে করা মানবলীলার মতই। যে লীলার লোভ দেব-দেবী ও সামলাতে পারে না। তাই নানা অজুহাতে স্বর্গলোকের সুখ ছেড়ে মর্ত্যে এসে মানুষ বনে যায়।

ছোটবেলায় আকাশের দিকে চেয়ে ভাবতাম মই বা সিঁড়ি কিছু একটা বেয়ে অনেক কষ্ট হলেও আকাশের বুকে পা রাখবো। কিছুটা বড় হবার পর ভাবতাম আকাশে তো কখনো পা রাখা যাবে না তবে আমি আকাশ ছুঁয়ে দেখবো। এখনও আকাশ নিয়ে ভাবি তবে অন্যভাবে আর তা হল, আকাশকে ছোঁয়ার চেয়ে তার দিকে মাথা তুলতে পাওয়ার আনন্দই যেন বড় আনন্দ। কারণ যখন আকাশ দেখি তখন উদারতা যেন সমস্ত মনটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, আমার ক্ষুদ্রতাগুলো অনায়াসে মিলিয়ে যায় তার কৃষ্ণগহ্বরে। ঠিক যাদুর মত কাজ করে মনের উপর। লুকিয়ে রাখা মনের ভাবনাগুলো নিয়ে আকাশের দিকে তাকালে বিব্রত হতে হয়। কাঁচের চেয়েও স্বচ্ছ দর্পণ যেন মেলা আছে ওখানে, কিছুই আর লুকোনো থাকে না। তা মনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে সার্থক হয়ে ওঠে। চলমান ছবির কী অপরূপ সমাবেশ! যখন ঘন অন্ধকার ঘিরে এসে মনকে গিলে ফেলতে চায় তখন মাঝে মাঝেই দেখি আকাশ কাঁদছে অবিরল ধারায়। চেষ্টা করলেও নিজেকে আটকে রাখতে পারি না, যেন আমার কান্নার ¯্রােতে আমাকেই সিক্ত করি। কেমন অদ্ভুত যেন মানব মন! যদি অদ্ভুতই না হবে তবে কি করে নিজের দুঃখগুলোকে ঝরতে দেখে আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়ে? নিমিষেই ঝরাকান্নার বিন্দুগুলোকে মুক্তোর দানা মনে হয়।  যা ঝিনুকের মুখ বুজে সহ্যের ফসল। আবার কখনো অপূর্ব পেঁজা মেঘের দলে স্বপ্নকে ভেসে যেতে দেখি, হাতাছানি দিয়ে অনবরত ডেকেই চলে আয় আয় আয়…।

আমার কল্পনাগুলো একটু বেশিই আগোছালো। তাইতো অসীম আকাশকে আমি মাঝে মাঝে বেঁধে ফেলি সীমার মাঝে। বাঁধতে ভালো লাগে। মন্নুজানের মাঠে দাঁড়িয়ে চারকোণা আকাশ আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করে। অবাক দৃষ্টিতে চোখ মেলে সাদা, কালো, লাল, নীল রঙের খেলা দেখি। আবার কখনো বা রংধনুর রং মিলান্তে আমার সমস্ত মনে রং ছিটিয়ে দেয়। রাতে আমার বন্ধু তারাটির সাথে বেদীতে বসে বা শুয়ে গল্প করতে করতে কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবে গল্প হয় এক পাক্ষিক, সে নিরব ¯্রােতা। নিরব বলে যে তার অনুভূতি নেই সেকথা ঠিক নয়। অনুভূতি প্রকাশের ভঙ্গি তার অসামান্য, যা শুধু আমিই বুঝি। কখনো কখনো অর্ধবৃত্তাকারে মেঘেদের দলবল নিয়ে ঢেকে থাকে আকাশ। যমুনার মাঝখানে নৌকোয় বসে দেখতে যেন আরো অনন্য মনে হয়। মেঘদের সে কী দৌরাত্ম্য! যুদ্ধ তো অনেক সময় লেগেই যায় দুর্বল আর সবলের। সবল মেঘমালা দেখতে দেখতে নিমেষেই গ্রাস করে ফেলে অসহায় মেঘদের। ঠিক আমাদের সমাজের, আমাদের পৃথিবীর মানুষদের মত। আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার মত।

ঊষার যে আলোর ছটা দিনের আভাস দেয় কিছুক্ষণ পরেই তা হয়ে ওঠে ভোরের রক্তিম সূর্য, পরক্ষণে তেজধারী দুপুর রোদ, তারপর নুয়ে পড়া বিকেলের পর গোধূলীর অস্তাচলে হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ রবি। মানব জীবনের সাথে কি আশ্চর্য মিল তার! পার্থক্য শুধু সময়ের। কে বলেছে প্রকৃতির বৈচিত্র্য আর মানব জীবনের বৈচিত্র্য অভিন্ন?

পিতা-মাতার সমন্বয় কি আকাশ একাই নয়, যার প্রসবিত সন্তান মানবশিশুর মতই ওই দিবাকর। তাই মাঝে মাঝে বাবা-মার মাঝে আকাশ আবার আকাশের মাঝে বাবা মাকে মিলিয়ে ফেলি। মেলাতে ভালো লাগে। ছায়াবৃত্ত জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়ায় আকাশ পানে মাথা তুলে। কখনো হারিয়ে যাই আবার কখনোবা আমিকে খুঁজে পেয়ে গচ্ছিত রাখি আমারই মাঝে।

——————————————–

অনুবাদ

কাফকার রূপক গল্প

নার্সিসাসের কুয়ো : এক সত্তাশূন্য আমি
ডব্লিউ. এইচ. অডেন
ভাষান্তর : রায়হান রাইন

এ জীবনের একান্ত ব্যাপার তার আনন্দগুলি নয়, বরং আমাদের উচ্চতর জীবনে আরোহণের ভয় : এ জীবনের নিজস্ব জিনিস তার নিদারুণ যন্ত্রণা নয়, বরং ওই ভয়ের কারণে আমাদের আত্মদগ্ধতা।  ফ্রানৎজ কাফকা

শুদ্ধ প্যারাবল, যে সাহিত্য-রীতি সম্পর্কে একজন সমালোচক কেজো কথা খুব কমই বলতে পারেন তার শ্রেষ্ঠ, সম্ভবত সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী হলেন কাফকা। যখন কেউ নাটক দেখেন বা উপন্যাস পড়েন, সেই নাটক বা উপন্যাসে তারা রূপক-গল্পের তাৎপর্য পেতে পারেন, তারা মুখোমুখি হতে পারেন এক কল্পিত ইতিহাসের— তার চরিত্র, অবস্থা, ঘটনাবলি যদিও পাঠক-দর্শকের জীবনের সদৃশ হতে পারে কিন্তু কখনোই অভিন্ন নয়। যেমন ম্যাকবেথ-এর অভিনয় দেখতে গিয়ে আমি ইতিহাসের কিছু বিশেষ ব্যক্তিকে তাদের নিজেদের গড়া ট্র্যাজেডির মধ্যে জড়িত হতে দেখি। আমি নিজের সঙ্গে ম্যাকবেথের তুলনা করতে পারি, ভাবতে পারি যে আমিই তা করেছি এবং নিজেকে ওই অবস্থায় অনুভবও করতে পারি, কিন্তু আমি আমার নিজের স্থান-কালে দৃঢ়ভাবে আটকে থেকে একজন দর্শকই থেকে যাই। কিন্তু একটি শুদ্ধ প্যারাবলকে এভাবে পড়া যায় না। যদিও প্যারাবলের প্রধান চরিত্রের একটি যুৎসই নাম (মাঝে মধ্যে, যদিও তাকে কেবল ‘কোনও এক লোক’ কিংবা নিছক ‘ক’ বলা হতে পারে) এবং নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অবস্থান তাতে  নির্দেশিত থাকতে পারে কিন্তু এসব বিবরণ প্যারাবলের তাৎপর্যের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। একটা প্যারাবলের অর্থ, যদি থাকে, খুঁজতে হলে আমাকে আমার বস্তুনিষ্ঠতা বিসর্জন দিতে হবে এবং আমি যা পড়ছি তার সঙ্গে মেলাতে হবে আমার আত্মসত্তাকে। প্যারাবলের ‘অর্থ’ প্রকৃতপক্ষে, প্রত্যেক পাঠকের কাছে আলাদা। সে কারণে একজন সমালোচক অন্যের কাছে প্যারাবলের ব্যাখ্যা দিতে পারেন না। শিল্প ও সমাজের ইতিহাস, ভাষা, মানব প্রকৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে তার উৎকৃষ্ট জ্ঞানের কল্যাণে একজন ঋদ্ধ সমালোচক উপন্যাস এবং নাটকের বিষয়গুলিকে পাঠককে তাদের নিজেদের করে দেখাতে পারেন যা তারা আগে সেভাবে দেখেননি। কিন্তু যদি তিনি একটি প্যারাবল ব্যাখ্যা করেন তবে এর দ্বারা তিনি কেবল তার নিজের ভেতরটাকেই উন্মোচন করবেন। তার লেখাটি হয়ে উঠবে প্যারাবলটি তার ওপর যে ক্রিয়া করেছে তার ফলাফলের বর্ণনা। অন্যের কাছে এর পাঠ-প্রতিক্রিয়া কীরূপ হবে সে সম্পর্কে তার কোনও ধারণা থাকে না বা তিনি তেমন ধারণা করতে পারেন না।

বাস্তব জীবনে কেউ একটি চরিত্র দেখে ভাবতে পারে, ‘লোকটি শেক্সপীয়র বা ডিকেন্সের উপন্যাস থেকে সরাসরি নেমে এসেছে’, কিন্তু কখনোই কেউ একটি কাফকার চরিত্রের দেখা পাবে না। আবার, কাফকীয় অভিজ্ঞতা যদিও হতে পারে, নিজের অভিজ্ঞতাকে কেউ কখনোই ডিকেন্সীয় বা শেক্সপীয়রীয় বলে ভাবতে পারে না। যুদ্ধকালীন সময়ে একবার পেন্টাগনে আমাকে এক দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর দিন কাটাতে হয়েছিল। আমার কাজ শেষে বাড়ি ফেরার তাড়া নিয়ে আমি দ্রুত নেমে আসতে থাকি দীর্ঘ কয়েকটি করিডোর পেরিয়ে এবং চলে আসি একটি ঘোরানো-দরজার কাছে যার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একজন প্রহরী। প্রহরী আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ আমি জবাব দেই, ‘বেরুবার চেষ্টা করছি?’ ‘আপনি তো বাইরেই আছেন’ সে বলে। এক মুহূর্তের জন্য আমি অনুভব করি, আমিই ‘ক’।

গতানুগতিক ঔপন্যাসিক এবং নাট্যকারের ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত জীবন ও চরিত্র সম্পর্কিত জ্ঞান তাদের কাজকে বুঝবার ক্ষেত্রে প্রায় কোনোই উপকারে আসে না, কিন্তু একজন প্যারাবল লেখকের ক্ষেত্রে, যেমন কাফকা, ব্যক্তিগত জীবনের তথ্যাদি, আমার বিশ^াস, বিশেষভাবে উপকারী, নেতিবাচকভাবে বলতে গেলে অন্ততঃপক্ষে সেসব কাউকে তার ভুলপাঠ থেকে বিরত রাখবে (‘যথার্থ’ পাঠ সব সময়েই নানারকম)।

ম্যাক্স ব্রডের জীবনীর নতুন সংস্করণে তিনি একজন চেক লেখক, বোজেনা নেমকোভার (১৮২০-১৮৬২) উপন্যাস ‘দ্য গ্র্যান্ডমাদার’- এর বর্ণনা দেন। পটভূমি রিজেঙ্গবার্গের একটি গ্রাম যা এক দুর্গের শাসনাধীন। গ্রামবাসীরা চেক ভাষায় কথা বলে আর দূর্গবাসীরা জার্মান ভাষায়। দুর্গের মালিক ডাচ মহিলা অত্যন্ত দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ; কিন্তু তাকে প্রায়শ ভ্রমণের কারণে অনুপস্থিত থাকতে হতো এবং তার ও চাষীদের মধ্যে মধ্যস্থতা করত একদল অভব্য গৃহস্থভৃত্য এবং স্বার্থপর ও অসৎ কিছু কর্মচারী, সে কারণে গ্রামে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটছে সে সম্পর্কে ডাচ মহিলার কোনো ধারণা ছিল না। অবশেষে গল্পের প্রধান নারী চরিত্রটি অনেক রকম বাধাবিপত্তি এড়িয়ে ডাচ মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সফল হয়। তখন সে তাকে সত্য কথাগুলো জানায়, আর এভাবে গল্পের আনন্দময় সমাপ্তি ঘটে।

এ তথ্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় নেমকোভার দূর্গের কর্মচারীরা বদমাশ হিসেবে খোলাখুলিভাবেই উপস্থাপিত, এর থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যেসব সমালোচক কাফকার দূর্গবাসীদের স্বর্গীয় অনুগ্রহের প্রতিনিধি হিসেবে ভেবেছেন তারা সবাই ভুল করেছেন এবং এরিখ হেলারের পাঠই মূলত সঠিক।

কাফকার উপন্যাসে দূর্গ যেনবা রহস্যবাদী খ্রিস্টীয় দানবের এক দুর্ভেদ্য রক্ষীনগরী, অসহিষ্ণু আত্মার কলাকৌশলের বিরুদ্ধে যা সফলভাবে দাঁড়ানো। স্বর্গীয়ত্বের এমন কোনো বোধগম্য ধারণার কথা আমার জানা নেই যা ওইসব সমালোচকদের ধারণাকে বৈধতা দিতে পারে যারা দূর্গের ভেতর ‘স্বর্গীয় আইন ও দয়া’-এর উদ্ভাস দেখতে পান। গল্পের কর্মচারীরা সততার ব্যাপারে একবারেই ভাবলেশহীন, যদি তারা দুষ্টপ্রকৃতির নাও হয়। না তাদের আইন না তাদের কর্মকা-, কিছুতেই ভালোবাসা, ক্ষমা, সহৃদয়তা বা মহানুভবতার চিহ্নমাত্র নেই। তাদের বরফশীতল কেতাদুরস্তপনা দিয়ে তারা কোনো শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলতে পারে না, কেবল ভয় আর প্রতিক্রিয়া ছাড়া।

ড. ব্রড প্রথমবারের মতো একটা গুজবও প্রকাশ করেছেন, তা যদি সত্যও হয়, ঘটে থাকবে কাফকার গল্পেই, তার জীবনে নয়। ঘটনাটি হলো নিজের অজ্ঞাতে কাফকা ছিলেন এক পুত্রের জনক যে পুত্রটি  ১৯২১-এ সাত বছর বয়সে মারা যায়। গল্পটির সত্যতা যাচাই করা অসম্ভব কেননা পুত্রের মা ১৯৪৪ সালে জার্মানদের হাতে ধরা পড়েন এবং তারপর তার সম্পর্কে আর কিছু জানা যায় না।

আমার ধারণা শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে ‘দ্য ট্রায়াল’ এবং ‘দ্য ক্যাসল’- এর মতোই কাফকার সুন্দরতম একটি কাজ পাওয়া যাবে তার ‘দ্য গ্রেট ওয়াল অফ চায়না’- এর ভল্যুমে, যার সমস্তটা লেখা হয় তার জীবনের শেষ ছয়টি বছরে। এই লেখা যে জগতকে চিত্রায়িত করে তা আগের গ্রন্থগুলিরই জগত এবং তাকে কেউ রমরমা অবস্থা বলবে না বরং এতে আছে এক লঘু স্বর— যে মর্মন্তুদ যন্ত্রণা ও হতাশার বোধ ‘দ্য পেনাল কলোনি’র মতো গল্পগুলোকে অসহনীয় করে তোলে, তা ওতে নেই। অস্তিত্ব হয়তো আগের মতোই জটিল ও হতাশাজনক কিন্তু চরিত্রগুলো আরও খেয়ালিভাবে সেই পরিস্থিতি থেকে অব্যাহতি নেয়।

কেউ বলতে পারেন, একটি রূপক গল্প বীরোচিত অভিযানের পদ্ধতিটিকে গ্রহণ করে এবং ব্যাপারটাকে উল্টে দেয়। প্রথাগত অভিযানে একজন বীর আগে থেকেই জানে যে তার লক্ষ্য হলো রাজকুমারী, প্রাণ-ঝর্ণা ইত্যাদি। এসব লক্ষ্যবস্তু থাকে সীমাহীন দূরত্বে এবং বীর সচরাচর আগে থেকেই জানতে পারে না কোন পথে যেতে হবে কিংবা কী কী বিপদ আছে সেই পথে। কিন্তু কিছু কিছু সত্তা থাকে যারা দুটো ব্যাপারই জানে এবং তারাই অভিযাত্রীকে সঠিক পথ-নির্দেশ ও সতর্ক-সংকেত দিয়ে দেয়। তাছাড়া লক্ষ্যবস্তুটি থাকে সবার কাছে কাক্সিক্ষত। সবাই তা পেতে চাইবে কিন্তু তা কপালে জুটবে কেবল পূর্বনির্ধারিত নায়কেরই ভাগ্যে। যখন তিন ভাই পরপর অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা চালায় প্রথম দুভাই তাদের ঔদ্ধত্য এবং আত্মভিমানের জন্য ব্যর্থ হয়, সফল হয় কনিষ্ঠ ভাইটি তার অনভিমান এবং দয়ার্দ্র হৃদয়ের কারণে। কিন্তু কনিষ্ঠের মনে অগ্রজ দুভাইয়ের মতোই আত্মবিশ^াস ছিল যে, সে জয়ী হবে।

অন্যদিকে কাফকার রূপক গল্পগুলোর লক্ষ্যবস্তু প্রধান চরিত্রটির নিজের কাছেই এক অদ্ভুত বিষয় : তার কোনো প্রতিযোগী নেই। কোনো কোনো সত্তার দেখা সে পায় যারা তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করে, তাদের অনেকেই বিপত্তি ঘটায়, বেশির ভাগই থাকে ভাবলেশহীন এবং কারুরই পথের নিশানা সম্পর্কে ক্ষীণতম ধারণাও থাকে না। একটি আপ্তবচনে যেমন বলা হয় : ‘লক্ষ্য আছে তবে অর্জনের উপায় নেই, যাকে উপায় বলা হচ্ছে তা অনিশ্চিত।’ সাফল্যে বিশ^াসী হওয়া দূরে থাকুক, কাফকার চরিত্রেরা বরং শুরু থেকেই ভাবতে বাধ্য হয় সে ব্যর্থতার দ-প্রাপ্ত;  সে যা তাই হবার কারণে সে যেহেতু দ-প্রাপ্ত, সে নিজেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিস্ময়কর ও অনিঃশেষ চেষ্টা চালিয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, লক্ষ্যে পৌঁছার স্রেফ ইচ্ছাটা নিজেই একটি প্রমাণ, এমন নয় যে সে মনোনীত কেউ বরং সে বাস করছে বিশেষ এক অভিশাপের থাবার ভেতর।

সম্ভবত একটাই প্রধান পাপ, অসহিষ্ণুতা। অসহিষ্ণুতার কারণেই আমরা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছি, আমরা আর ফিরেও যেতে পারি না অসহিষ্ণুতার কারণেই।

তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়, সুখি হবার একটি নিখাদ সম্ভাবনা আছে : কারও ভেতরকার অবিনাশী উপাদানগুলোতে বিশ^াসী হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই না করা।

প্রথম ধরনের অনুসন্ধানগুলোতে, নায়ক জানে তার কী করা উচিত এবং তার একটাই সমস্যা ‘আমি কি পারব?’ অডিসিউস জানে, সে অবশ্যই সাইরেনদের কুহকী সঙ্গীত শুনবে না; সানগ্রিয়েলের অভিযানে বেরুনো বীরযোদ্ধা জানে সে ধর্মচ্যুত হবে না; একজন গোয়েন্দা জানে সে অবশ্যই সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারবে। কিন্তু ‘ক’- এর সমস্যা হলো ‘আমার কী করা উচিত?’ সে সত্য বা মিথ্যা কোনো বিকল্প দ্বারাই প্রলুব্ধ বা প্রত্যাখ্যাত হয় না, সে গতির নিছক উল্লাসে মেতে দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারে না। সে নিশ্চিত যে ‘এখন’ যা সে করছে তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ যদিও সে জানে না বিষয়টার কেমন হওয়াটা সঙ্গত ছিল। যদি সে ভুলকিছু ‘অনুমান করে’ এগোয়, তবে ফলাফলের দুর্ভোগ তাকে মেনে নিতে হয় যেন ভুল পথটা সে নিজেই ‘নির্বাচন করে’ নিয়েছিল, একই রকমভাবে সে আবার ভুলটার জন্য দায়িত্ববোধও অনুভব করে। অন্যদের দেয়া নির্দেশ এবং পরামর্শকে যদি তার কাছে উদ্ভট ও স্ববিরোধী মনে হয় সে এটাকে অশুভকামনা হিসেবে বা তার প্রতি অন্যদের বিদ্বেষ বলে মনে করতে পারে না— বিষয়টিকে সে তার নিজের ক্ষেত্রে ভালো প্রমাণ হতে পারে বলেই মনে করে।

প্রথাগত অভিযাত্রী বীরের জন্য ‘শৈলশিখর’ থাকে নিশ্চিত, হয় তা স্পষ্টত প্রকাশিত, যেমন অডিসিউসের ক্ষেত্রে, অথবা অপ্রকাশিত, যেমন রূপকথার নায়কদের ক্ষেত্রে; প্রথম ক্ষেত্রে অভিযানের সফল অর্জন তার বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়; দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি স্পষ্ট করে যে কেউই বিজয়ী বীর নয়: প্রচলিত অর্থে বীর হবার মানে হলো ‘সঠিক’ কে অর্জন করা— তার ব্যতিক্রমী কর্ম ও সহজাত ক্ষমতা যেমনই হোক না কেন, এসবের সঙ্গে ‘আমি’কে যুক্ত করা যায় না। কিন্তু ‘ক’ প্রথম থেকেই ‘আমি’, এবং এই ‘আমি’ হওয়ার ভেতর দিয়ে সে একাকী, এভাবেই সে অস্তিত্বশীল হয়, কোনো সহজাত ক্ষমতা বা কর্ম নয় বরং তার মধ্যে থাকে কেবল নানা দোষত্রুটি।

যদি ‘দ্য ট্রায়ালে’র ‘ক’ নির্দোষ হয় তবে সে আর ‘ক’ থাকে না, তখন সে হয়ে ওঠে ‘থ্রু দ্য লুকিং গ্লাসে’র অরণ্যের নামহীন হরিণশিশু। ‘দ্যা ক্যাসলে’ ‘ক’ অক্ষরটি একটি শব্দ হয়ে উঠতে চায় : ‘ভূমি জরিপকারী’, অর্থাৎ অন্য সবার মতো একটা সত্তা সে হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু এই অর্জন যেন তার জন্য নয়।

প্রচলিত অভিযাত্রার জগৎ বিপজ্জনক হতে পারে, কিন্তু তা প্রকাশ্য, নায়ক বীর যে-কোনো দিকে যাত্রারম্ভ করতে পারে যেমন সে কল্পনা করে। কিন্তু কাফকার জগৎ বদ্ধ, যদিও তার প্রায় কোনো ইন্দ্রিয়জ বৈশিষ্ট্যই নেই; কিন্তু এটা মূলত এক শরীরী জগৎ। এর বস্তু আর মুখগুলো হতে পারে অস্পষ্ট, কিন্তু পাঠক তাদের শ^াসরুদ্ধকর উপস্থিতিতে নিজেকে ভাববে অবরুদ্ধ : আমার ধারণা কোনো কল্পিত জগতেই সবকিছু এত ‘ভারি’ নয়। এক পা এগুলেই সব শক্তি নিঃশেষিত হয়ে যাবে। নায়ক নিজেকে ভাবে একজন কয়েদী এবং মুক্ত হবার চেষ্টা করে কিন্তু সম্ভবত জেলযাপনই একমাত্র অবস্থা যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, স্বাধীনতা তাকে যেন ধ্বংস করে ফেলবে।

যত বেশি ঘোড়া তুমি জুতে দেবে, সবকিছু ততই জোরেসোরে এগোবে— কোনো স্থাপনা থেকে একটা গুঁড়ি খুলে নেয়া নয়, বরং অসম্ভব হলো চিহ্নগুলো মুছে ফেলা, যাতে ভ্রমণটা হয় আনন্দময় আর শূন্যগর্ভ।

‘দ্য বারৌ’ (বিবর) গল্পের বর্ণনাকারী নায়কটি এক অনির্দিষ্ট প্রজাতির জন্তু কিন্তু সম্ভবত সে গর্তবাসী এক নিশাচর প্রাণী, তবে সে মাংশাসী জন্তু নয়। সে একা বাস করে, কোনও সঙ্গী ছাড়া, তার নিজের প্রজাতির কারও সঙ্গেও কখনো তার সাক্ষাৎ ঘটেনি। এক বিরতিহীন ভীতির মধ্যে সেও বাস করে, তাকে কেউ অনুসরণ করতে পারে, কোনো জন্তুর দ্বারা সে আক্রান্ত হতে পারে— ‘আমার শত্রু অগুন্তি’, সে বলে, কিন্তু আমরা কখনো জানতে পারি না তারা দেখতে কেমন হতে পারে এবং প্রকৃতপক্ষে কখনো একজনেরও সাক্ষাৎ পাই না। বিবরটি তার ধ্যানজ্ঞান, এটাই তার জীবনের প্রধান কাজ। সম্ভবত, প্রথম যখন সে ওটা খুঁড়তে শুরু করে বিবর-দূর্গটির ধারণা যতটা না গুরুত্ববহ ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল খেলার বিষয়। কিন্তু বিবরটা যতই বড় এবং চমৎকার হয়ে উঠেছে ততই প্রশ্নটা তাকে তাড়া করেছে, ‘পুরোপুরি দুর্ভেদ্য একটা বিবর বানানো কি সম্ভব?’ কখনোই সে নিশ্চিত হতে পারে না যে, আরও কোনো অভাবনীয় হুশিয়ারী নেই, এটাও তার মনোযন্ত্রণার একটা কারণ। তাছাড়া যে গর্তটি বানাতে সে পুরোটা জীবন ব্যয় করছে তার কাছে সেটা অতি মূল্যবান আর যেভাবে সে নিজের জীবনকে রক্ষা করে তেমনি সে এই বিবরটিকেও রক্ষা করে যাবে।

আমার একটা প্রিয় পরিকল্পনা হলো চারপাশের বস্তুগুলো থেকে দূর্গঘরটিকে বিচ্ছিন্ন করা, অর্থাৎ আমার নিজের উচ্চতার সমান করে এর দেয়ালের পুরুত্বকে ঠিক রাখা এবং দূর্গঘরের চারদিকে একই সমান চওড়া কিছু মুক্তাঞ্চল রাখা… আমি সবসময় এই মুক্ত জায়গার ছবি ভেবেছি— এবং যুক্তিযুক্তভাবেই ভেবেছি এই চমৎকার আস্তানাটির কথা। বৃত্তীয় দেয়ালের বাইরে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকার কী যে আনন্দ, নিজেকে টেনে তোলা, আবার পিছলে নেমে যাওয়া, অবস্থান ভুলে গিয়ে নিজেকে শক্ত মাটির উপর খুঁজে পাওয়া, এবং এই সমস্ত খেলা আক্ষরিকভাবে বলতে গেলে খেলতে থাকা দূর্গঘরটির ওপরেই, মোটেও সেটার অভ্যন্তরে নয়; দূর্গঘরটিকে এড়াতে, এটি থেকে চোখদুটিকে বিশ্রাম দিতে যখন কেউ তেমনি চাইছে, এটি দেখার আনন্দ থেকে নিজেকে স্থগিত করা পরবর্তী সময় পর্যন্ত, একইসঙ্গে আবার ওটাকে ছেড়ে থাকাও নয়, বরং আক্ষরিকভাবেই কারো থাবার ভেতর ওটাকে রক্ষা করে যাওয়া…

সে ভাবতে শুরু করে, ওটাকে রক্ষা করার জন্য, গোপন প্রবেশপথের বাইরে ঝোপ-জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে থেকে নজরদারী করাটা কাজের কিছু হয় না। বরং পর্যবেক্ষণের কাজটাতে অংশ নেবার জন্য  মৈত্রীসংঘের সাহায্য নেয়ার সম্ভাবনাকে সে বিবেচনায় আনে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় তার উল্টো।

… সে কি এর জন্য আমার কাছ থেকে প্রতিদান দাবি করবে না, সে কি নিদেনপক্ষে বিবরটাকে দেখতে চাইবে না? মুক্তভাবে কাউকে বিবরে ঢুকতে দেয়াটা নির্ভেজালভাবেই যন্ত্রণার ব্যাপার আমার জন্য। ওটা আমি তৈরি করেছি আমার নিজের জন্য, পর্যটকদের জন্য নয় এবং আমি ভাবছি, তার ঢুকবার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করব… এমনিতে আমি তাকে ঢুকতে দিতে পারি না, হয় আমি তাকে আগে ঢুকতে দেব, যা ভাবাই যায় না, অথবা আমরা দুজন একসঙ্গে নামব, এতে তার কাছ থেকে যে সুবিধাটি পাব তা হলো তার ওপর নজর রাখতে পারা এবং আমি কি আদৌ তার উপর বিশ^াস রাখতে পারি?… সম্ভবত দূরের কারো ওপর আস্থা রাখা সম্ভব; কিন্তু বাইরের কারো ওপর পুরোপুরি বিশ^াস রাখা যেতে পারে যখন তুমি থাকো গর্তের ভেতরে, অর্থাৎ অন্য ভুবনে, এক্ষেত্রে, আমার কাছে মনে হয় তা হবে অসম্ভব।

এক সকালে অস্পষ্ট বাঁশির মতো হল্লার শব্দে সে জেগে উঠল। গোলমালটা কিসের তা সে বুঝে উঠতে পারল না। হতে পারে নিছক বাতাস, কিংবা কোনও শত্রু। এ সময় থেকে সে এক হিস্টিরীয় উদ্বিগ্নতার থাবার ভেতর পড়ে যায়। তবে এই অদ্ভুত জন্তুটি (যদি তা আদৌ জন্তু হয়) কি তার অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং যদি তাই হয় তবে, কী জানে সে? গল্পটি শেষ হয় কোনও সমাধান ছাড়াই। এডউইন মুইর বাতলে দেন, গল্পটি শেষ হবে অদৃশ্য শত্রুটির দৃশ্যমান হবার মধ্য দিয়ে, যার কবলে পড়ে গল্পের চরিত্রটি মারা পড়বে। এ সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। প্যারাবলটির গোটা শরীর জুড়েই আছে এই বিষয়টি যে পাঠক জানতে পারে না বর্ণনাকারীর নিজের মনের ভয়ের কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রামাণিকতা আছে কি না।

আমরা কাফকার রচনার যতই প্রশংসা করি, ততটাই তার চূড়ান্ত নির্দেশনার ওপর আলো পড়ে যে, ওগুলো ধ্বংস করে ফেলা উচিত। তার এই অনুরোধের মধ্যে প্রথমত কেউ এক ধরনের উদ্ভট আধ্যাত্মিক আত্মাভিমানকে খুঁজে পেতে প্রলুব্ধ হবে। তিনি যেন নিজেকেই বলছেন, ‘আমার কাছে মূল্যবান হতে পারে যদি আমি এমন কিছু লিখি যা চূড়ান্তভাবে নিখুঁত হয়। কিন্তু কোনো লেখা যত চমৎকারই হোক নিখুঁত হতে পারে না। তাই, আমি যা-কিছু লিখেছি আমার কাছে তা মূল্যহীন এবং সেসব ধ্বংস করে ফেলা উচিত।’ কিন্তু ড. ব্রড এবং অন্যান্য বন্ধুরা ব্যক্তি-কাফকা সম্বন্ধে আমাদের যা-কিছু বলেন তা এই ব্যাখ্যাকে অর্থহীন করে দেয়।

এটা স্পষ্ট যে প্রচলিত অর্থে শিল্পী বলতে যাকে বোঝানো হয় কাফকা নিজেকে তেমন ভাবতেন না, অর্থাৎ এমন একজন যিনি বিশেষ একটি কাজে নিজেকে নিবেদিত করেছেন, যার ব্যক্তিক অস্তিত্বের সঙ্গে শিল্প-নির্মাণের সম্পর্কটি আকস্মিক। যদি এমন কেউ একজন থাকেন যার সম্পর্কে বলা যায় ‘ন্যায়নিষ্ঠার জন্য ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত’ তবে তিনিই কাফকা। সম্ভবত তিনি তার নিজের লেখা সম্পর্কে বলবেন যে, এটা ঈশ্বর অনুসুন্ধানে তার একটি ব্যক্তিগত কৌশল। তিনি কখনো বলেছেন, ‘লেখা প্রার্থনার একটি ধরন।’ এবং কোনো লোকই তার প্রার্থনা যদি খাঁটি হয় তাহলে তা অন্যকে শুনতে দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন না। অন্য একটি পরিচ্ছেদে তিনি তার লেখার লক্ষ্য সম্পর্কে বলেন এভাবে :

কিছুটা যেন এমন যে, কেউ একজন পদ্ধতিগতভাবে কৌশলগত দক্ষতার সাথে একটি টেবিলে হাতুড়ি ঠুকছে, এবং একইসঙ্গে আদৌ কিছু করছে না, এমনভাবে না যে, লোকজন বলতে পারে : ‘টেবিলে হাতুড়ি ঠোকার ব্যাপারটা তার কাছে কিছুই না,’ বরং ‘টেবিলে হাতুড়ি ঠোকার ব্যাপারটা আসলে টেবিলে হাতুড়ি ঠোকার ব্যাপারই, কিন্তু একইসঙ্গে সেটা কিছুই না,’ যেখানে নিশ্চিতভাবেই হাতুড়ি ঠোকা তবু হয়ে ওঠে দুঃসাহসিক, অমোঘ, আরও বাস্তব, এবং যদি তুমি চাও, আরও বেশি অর্থহীন।

কিন্তু কারণ যাই হোক লেখা প্রকাশে কাফকার অনীহা পাঠককে অন্ততঃপক্ষে সেইভাবে তার লেখা পড়তে সতর্ক করে যেভাবে তিনি নিজে তা পাঠ করেন। কাফকা সম্ভবত সেইসব লেখকদের একজন যিনি ভুল লোকদের দ্বারা পঠিত হবার জন্য দ-প্রাপ্ত। যাদের ওপর তার লেখার যথার্থ প্রভাব পড়বে তারা তার লেখা পড়েন না এবং যাদেরকে তার লেখা মুগ্ধ করে তাদের ওপর তার লেখার প্রভাব হতে পারে মারাত্মক, এমনকি ক্ষতিকরও।

আমি একথা বলতে প্রবৃত্ত হই যে, কেউ একজন তখনই কাফকা পড়বে যখন তার শরীর ও মন ভালো হজমশক্তি সম্পন্ন অবস্থায় থাকবে, যাতে সে যে-কোনো খুঁতখুঁতে কাটাছেঁড়াকে রুগ্ন অস্থিরতা বলে বাতিল করতে প্রলুব্ধ হয়। কেউ যখন লঘুচিত্তে থাকে তখন তার সম্ভবত কাফকা থেকে দূরে থাকাই সঙ্গত, কেননা যদি তার অন্তর্দর্শনের ক্ষমতা না থাকে, যা সর্বদা কাফকার মধ্যে ছিল শুভজীবনের প্রতি একই রকমের আবেগ সহ, তবে সেই পাঠক তার নিজের পাপ ও দুর্বলতাসহ সহজেই এক মেরুদ-হীন নার্সিসীয় মুগ্ধতায় অধঃপতিত হবে।

যারা গুরুত্ব সহকারে অশুভ ও দুঃখভোগ সম্পর্কে চিন্তা করে তাদের কেউই বস্তুজগৎকে অন্তর্গতভাবে অশুভ ভাবার খ্রিস্টীয় রহস্যবাদী মত পোষণ করার সম্ভাব্যতাকে এড়াতে পারে না, এবং কাফকার কিছু বক্তব্য বিপজ্জনকভাবে এই মত স্বীকার করে নেবার পর্যায়ে পড়ে।

শুধু একটাই আধ্যাত্মিক জগৎ আছে; যাকে আমরা শরীরী জগৎ বলি, আধ্যাত্মিক জগতের মধ্যে সেটাই খারাপ ।

শরীরী জগৎ কোনো মায়া নয়, কিন্তু তার ভেতরকার অমঙ্গলই শুধু আমাদের কাছে স্পষ্ট করে শরীরী জগতের ছবি তৈরি করে দেয়।

কাফকার নিজের জীবন এবং লেখালেখি সামগ্রিকভাবে প্রমাণ করে, তিনি সহৃদয়ভাবে আধ্যাত্মিক রহস্যবাদী ছিলেন না, একজন প্রকৃত রহস্যবাদীকে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দিয়ে সব সময় বোঝা যায়। তিনি নিজেকে আধ্যাত্মিক অভিজাত সম্প্রদায়ের একজন সদস্য বলে মনে করেন এবং সব রকম পার্থিব আকর্ষণ ও সামাজিক বাধ্যবাধকতাকে তাচ্ছিল্য করেন। খুব মাঝে মধ্যে, তিনিও তার নিজের যৌনজীবনে এক নৈরাজ্যিক অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দিতেন, এই অর্থে যে শরীর যেহেতু অসংশোধনীয়, কাজেই তার ক্রিয়াকলাপে নৈতিক বিচার প্রযোজ্য হতে পারে না।

যে কাফকাকে ড. ব্রড জানতেন সেই কাফকা কিংবা তার গল্পের কোনো নায়ক, কেউই কোনো আধ্যাত্মিক উন্নাসিকতার চিহ্ন প্রদর্শন করে না, যদিও ড. ব্রড তাদের মধ্যে সেরকম বিষয়গুলো খুঁজে পান। তারা এমনকি অন্য কোনো জগতে অস্তিত্বশীল কোনো উচ্চতর জীবনের কথাও ভাবে না : তারা এই জগৎ এবং ব্রহ্মা-ের মধ্যে যে পার্থক্য করে তাতে এমন বোঝায় না যে দুটি আলাদা জগৎ বিদ্যমান, বরং এটা বোঝায় যে বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের যে অভ্যাসগত ধারণা আছে তা প্রকৃত ধারণা নয়।

সম্ভবত, যখন তিনি তার লেখাগুলো ধ্বংস করে ফেলা হোক এমনটা চেয়েছিলেন, কাফকা তার অনেক  অনেক ভক্তের প্রকৃতি সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন।

[দি ডায়ার্স হ্যান্ড এন্ড আদার এসেজ: ডব্লিউ. এইচ. অডেন, র‌্যানডম হাইজ, নিউইয়র্ক, ১৯৪৮]

—————————————–

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা-১৬
প্রতিমা মিত্র প্রীতি

সৌহার্দ্য সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনার জাগরণে আত্মপ্রত্যয়ী দক্ষ আলোকিত মানবসম্পদ গড়ে তোলার তীব্র উন্মাদনায় ধীরে ধীরে ২৭ বছর অতিক্রম করলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক ফোরাম। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞানচর্চা, তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ, মননচর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালের ৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদপত্র পাঠক ফোরামের। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে এর নাম হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক ফোরাম। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনাব আরিফ হাসনাত। ৭৯ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ সংগঠনটির বর্তমান সদস্য সংখ্যা পাঁচ হাজার। এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মহব্বত আলী সবুজ এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আরিফ হাসনাত। ফোরাম একটি স্বেচ্ছাসেবী ক্যারিয়ার গঠনমূলক সংগঠন। অবাধ জ্ঞানচর্চা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে দক্ষ ও উন্নত মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এটি কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য পাঠক ফোরাম বছর জুড়ে নিয়মিতভাবে দেশি-বিদেশি পত্রিকা পাঠ, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, বাংলা উপস্থাপনা কোর্স, ইংলিশ স্পোকেন কোর্স, গণিত কোর্স, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ উদ্যাপন এবং সময়োপযোগী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সেমিনার ও আলোচনা সভা আয়োজন করে থাকে। ফোরাম অগ্রণী ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা নিয়ে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষাকে বাস্তবমুখী, কর্মমুখী, গবেষণামুখী করার জন্য প্রযুক্তিমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে ফোরাম ২০১০ সালে প্রযুক্তিমুখী উচ্চশিক্ষা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। একটি জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য জাতিকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। সুশিক্ষিত ছাত্র সমাজ তাদের নৈতিকতা, তারুণ্য ও মেধা দ্বারা গবেষণালব্ধ ফসল দিয়ে তাদের অর্জিত শিক্ষাকে বাস্তব অর্থে কাজে লাগিয়ে জাতিকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছাতে পারে। শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন ঘটিয়ে তাদেরকে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ২০১১ সালে ফোরামের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জাতীয় উন্নয়ন ও ছাত্র সমাজ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে। সুনীতি ও সুশাসন পরিপূরক বিষয়। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ উন্নত জাতি ও আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সুশাসনের কোন বিকল্প নেই। আর তা অর্জন করতে হলে আমাদের তরুণ সমাজকে সুনীতি, দক্ষ ও আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য পাঠক ফোরাম দুই যুগ পূর্তি উপলক্ষে ২০১৩ সালে সুশাসন ও সুনীতি : আগামীর বাংলাদেশ ও তরুণ সমাজ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে। এ সেমিনারের মুখ্য আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এছাড়া জীবনমুখী কণ্ঠশিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাসের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান। ফোরামের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ২৬ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ২০১৫ সালে মুক্তবাজারে দক্ষ জনশক্তি তৈরীতে ব্যক্তিগত প্রস্তুতি শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারের মুখ্য আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল। এছাড়া জীবনমুখী কণ্ঠশিল্পী হায়দার হুসেইন ও ভারতীয় সংগীত শিল্পী কুমার জয়ন্ত লাল-এর পরিবেশনায় সংগীতানুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসি চত্বরে জীবনের কথা, আর্থনীতির কথা শীর্ষক এক গণবক্তৃতার আয়োজন করে পাঠক ফোরাম। গণবক্তৃতায় প্রধান অতিথি ছিলেন ড. আতিউর রহমান। পাঠক ফোরাম সদস্যদের জন্য নিয়মিত অধিক সংখ্যক দেশী-বিদেশী সংবাদপত্র পাঠের ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া নিয়মিতভাবে সভা-সমিতি, সিম্পোজিয়াম, সেমিনার, মতামত জরিপ, পাঠচক্র, সাধারণ জ্ঞানের আসর, অন্তঃকক্ষ ও আন্তঃহল বিতর্ক প্রতিযোগীতা, শিক্ষামূলক ডকুমেন্টারী ফিল্ম প্রদর্শন, শিক্ষা সফর, উপস্থিত বক্তৃতা, উপস্থাপনা কোর্স, লাঙ্গুয়েজ কোর্স, ড্রাইভিং কোর্স ইত্যাদির আয়োজন করা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে নির্মল আনন্দ লাভ, জ্ঞানের অন্বেষণ এবং নৈতিক মূল্যবোধচর্চার মাধ্যমে সদস্যদেরকে পূর্ণাঙ্গ ও দক্ষ মানব হিসেবে গড়ে তোলা জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে ছাত্রছাত্রীদেরকে প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা গ্রহণের সাহায্যার্থে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তিমূলক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছে। তাছাড়া ফোরাম নিয়মিতভাবে শিক্ষামূলক পত্রিকা প্রকাশ করে। সদস্যদের পড়াশোনার সুবিধার্থে ফোরাম স্বয়ংসম্পূর্ণ পাঠাগার স্থাপন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রেও ফোরাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সদস্যদেরকে স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে উন্নত জাতি গঠনে তাদেরকে সম্পৃক্ত করা লক্ষ্যে ফোরাম কাজ করে যাচ্ছে।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠক ফোরাম বিশেষ ‘অ্যাডমিশন ফোরাম বুলেটিন’ প্রকাশ করে থাকে। পাঠক ফোরাম প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি অর্থের অভাবে ২০০৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে পাঠক ফোরাম মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করলেও অর্থের অভাবে দুটি সংখ্যা প্রকাশের পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। পাঠক ফোরাম সপ্তাহে ৬ দিন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে যা ফোরামের সদস্য ছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্র্র্থীদের জন্য উন্মুক্ত।

নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পাঠক ফোরাম বিগত কয়েক দশক ধরে গঠনমূলক ও সময়োপযোগী কর্মকা- পরিচালনার মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে পূর্ণাঙ্গ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক ফোরামের পথচলা হোক মসৃণ। স্বপ্ন, সাধ আর কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের সৃষ্টিশীল চেতনায় নিরন্তরভাবে ধাবিত হোক যুগ-যুগান্তরে।

—————————————-

                                               গ্রন্থ ও পত্রিকা আলোচনা

বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ ॥ নূহ উল আলম লেনিন

বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ গ্রন্থটি বছর ব্যবধানে হাতে এলেও খুব প্রফুল্লচিত্তে পড়ে দেখার সুযোগ হলো, এই সাম্প্রতিক কিছু কর্মপ্রয়াসের ভেতরে। শিরোনামটিই মুগ্ধ করেছে। সাথে সাথে আরও প্রশ্ন জমে উঠেছে, এমন একটি বিস্তর-বিষয় কীভাবে লেখক হাতবন্দী করলেন— বিশেষত, শিরোনামের সঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দী কোনো সাল-সময় উল্লেখ না করে! বস্তুত, মনে করি বাঙালি সমাজ ও সাহিত্য একটি এন্তার চলনশীল ও বিবর্তমান বিষয়। অতঃপর সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ— যার আন্তর্পুনর্গঠন মানবপ্রবাহে ধৃত, ফলে তার স্বরূপও জটিল ও ঘোরানো-প্যাঁচানো। নূহ-উল-আলম লেনিন যুক্তি-পারম্পরিক কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন— বক্ষ্যমান কাজটি করতে গিয়ে। প্রথমেই ‘সম্প্রদায়িকতা’ ও ‘মৌলবাদের’ ভিত্তি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন তিনি। এই কঠিন ও চৌম্বক বিষয়টিকে মানবেতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে সভ্যতার অগ্রগমন, সম্প্রসারণ ও পরিচর্যার পথ-পরিক্রমা ধরে, কেন এবং কীরূপের দিকচিহ্ন ক্ষেত্র সমীক্ষণ করেছেন। ধর্ম-বিশ্বাসের ‘ভাইরাস’ কিংবা ধর্ম ‘আফিম’ নামক কোনো কিছু হলেও সমাজ ও গোত্রে তার প্রভাব ও চলকগুলো চিরকাল সক্রিয় থেকেছে, মানবসমাজও তাকে প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার করেছে। অজানা থেকে ভয় কিংবা চলতি সমাজে কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার বিস্তারসূত্রতার ফলে নির্মিত কাঠামো থেকে ‘ধর্ম’-ধারণা তৈরি হয়। সেটি পুরাণে-ঐতিহ্যে-ইতিহাসে পরিণতও হয় বিশ্বাস ও কর্তৃত্বের প্রয়োগ কৌশলের ওপর ভিত্তি করে। আলোচ্য গ্রন্থটির সবচেয়ে আগ্রহের দিক এ লক্ষ্যে নির্মিত প্রথম অধ্যায়টি। এটির কাঠামো নির্মাণ, শিরোনাম ও উপ-শিরোনাম কিংবা কর্ম-পরম্পরার ছাকনি দিয়ে সম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের ভিত্তি ও বিকাশ, তথ্যপ্রমাণের  আলোকে দেখানোর প্রয়াস করেছেন। গ্রন্থকার বলেছেন : ‘মূলত বিশ এবং চলমান একুশ শতকে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ শব্দদ্বয় মানবসভ্যতার বিশেষ একটি সংকটের কূটাভাস (ঢ়ধৎধফড়ী) হিসেবে অভিব্যক্ত হয়েছে। সভ্যতার অভিনব সংকটের পরিচয়বাহক এই শব্দযুগলের মূলে রয়েছে রাজনীতি বিজড়িত ধর্মবুদ্ধি।’ এই শব্দযুগলের (‘সাম্প্রদায়িকতা’ এবং ‘মৌলবাদ’) শব্দার্থ, নৃবৈশিষ্ট্য ও তার গভীরতর মনস্তত্ত্বের ইতিহাস অত্যন্ত আস্থার ভেতর দিয়ে কালচিহ্নিত করার অবকাশ পেয়েছেন লেখক। বিষয়গুলো খুব স্পর্শকাতর— তাতে গবেষক জ্ঞানভিত্তিক একপ্রকার অর্থ যখন দাঁড় করান তখন দায়িত্ব নিয়েও তা করতে হয়। স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করে নিজের প্রশ্নের উত্তরকে প্রকাশ করেতে হয়। মনগড়া বা ‘করুণা’পরবশ হয়ে কিছু চলে না। তবে অনেক ক্ষেত্রে মনে হতে পারে, আলোচনায় সময়ক্রম-শৃঙ্খলা রক্ষা ব্যাহত কিংবা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষণ আছে কিন্তু পূর্ণ ও সামগ্রিক পাঠ-নির্ণয়ের যোগ্যতা অনবদ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে লেখকের হাতে— একথা দ্বিধাহীন করে বলা যায়। সেমেটিক ধর্মের ইতিহাস এবং তার চর্চায় কর্তৃত্ব ও ক্রমাপসারণ বেশ উদ্দীপনাময় অনুষঙ্গ, এ অধ্যায়টিতে। ধর্ম যদি বিশ্বাসের কেন্দ্রসত্য হয় এবং সেটি অনেকান্তরূপে পলে পলে সামষ্টিক সত্তার কান্না-হাসিতে দোলা লাগায়, গড়ে তোলে ধারণার সৌধ, প্রপঞ্চরূপে সক্রিয় থাকে জীবনের ব্যবহার্য কাঠামোর পরতে পরতে— এক সময় তা কর্তৃত্ব হাতে তুলে নেয়, চার্চের রিচ্যুয়াল পৌঁছে যায় রাষ্ট্রভবনে, তখন রজ্জু বাঁধা পড়ে শিরদাঁড়ায়, ‘কেউ চালায় কেউ চলে’— ভাবনায় ভবের কক্ষ ভরে যায় কূপম-ূকতায়, কুসংস্কারে; রাষ্ট্রও তখন সে মতে চলে— বাইরের চাকচিক্যের পরিবেশনায় শুধু আধুনিকতার রঙ মাখা, গতিময় কিন্তু ছিন্ন ও পলাতক মন প্রথার ঘরে আশ্রয়ে থাকে, অবদমিত থাকে; তখনই মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রপঞ্চ গড়ে ওঠে। তা ছড়িয়েও পড়ে। গ্রাস করে। এক পর্যায়ে ভোগ আর পুঁজির মৌরসীপাট্টার সাথে আসর জমিয়ে বসে। কোলাহল করে হ্যাঁ-নার তদবীরে বসে, তকদীর (ভাগ্য) নির্ধারণ করে— বলে, চালায় কিছু পৌরাণিক ঢোল আর বিশ্বাসের আগুন-পাখা। নূহ-উল আলম লেনিন দীর্ঘ ও প্রধান এ অধ্যায়টিতে কোনো মনগড়া কথা নয় তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছেন প্রপঞ্চের উপলভ্য রূপ। লেখক প্রাচীন যুগ থেকে অদ্যাবধি এর একটি সালতামামিও হাজির করেছেন। যেহেতু কাজটি সমাজ ও সাহিত্যকেন্দ্রিক সেহেতু সমাজ-ইতিহাসের পাঠে বেদ-বাইবেল, কোরাণ-পুরাণ অনুরুদ্ধ হয়ে ওঠে। খুব তাৎপর্যময় ব্যাখ্যা। গবেষক, একটি প্রবণতা ধরে এগিয়েছেন, নিজস্ব নিপুণতার অবয়ব তাতে পরিগৃহীত, বলনে-চলনে চাঞ্চল্য আছে। নির্মোহ ও নিরাসক্ত বচনে তিনি ধর্ম-ইতিহাস ভা-ারে গড়ে তোলেন সম্প্রদায় তথা মৌলবাদের মুকুর অনুসন্ধানচিত্র। অনুসন্ধিৎসার ভেতরে থেকে, এবং ভেতরের সমাজযুক্তি ও ইতিহাসের ইঙ্গিত তাতে উৎকীর্ণ। গবেষকের লক্ষ্য সমাজ ও সাহিত্যে তার প্রকোপ বা অধিষ্ঠান দেখানো। সেজন্যই মানববিদ্যার স্বরূপে সময়প্রবাহে তার ওই অকুণ্ঠ স্বরূপ-নির্ণয়।

বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ বিষয়টির বাউন্ডারি যে অনেক দূর বিস্তৃত— তা যে-কেউ বলবে, তবে লেখক কোনো সময়বৃত্তে একে ফেলেন নি, এটি পুরো গবেষণাকে এক ধরনের হতোদ্যমে ফেলতে পারে বৈকি। যেমন তিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘মৌলবাদ’ প্রপঞ্চ জ্ঞান করেছেন তেমনি ‘সমাজ’ও  যে প্রপঞ্চ নয়— তা বলা যায় কী! দ্বন্দ্বশীল সমাজ ও তার বিবর্তনই মানবেতিহাস। সেটি সভ্যতার বিনির্মাণও। সভ্যতার ক্ষয় যেমন আছে বিকাশও আছে। মানুষের চিন্তাধর্মও তার সঙ্গে যুক্ত। আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে বর্তমান কর্পোরেট পুঁজিব্যবস্থা পর্যন্ত সমাজের যে রূপ-কাঠামো কিংবা জনসম্পৃক্তির অভিব্যঞ্জনা— তা তো প্রপঞ্চই সাক্ষ্য করে। কোন পরিকাঠামোয় তাকে ফেলা যায়! কীভাবেই বা তার মূল্যায়ন করা যায়। বা আরও বলা যায়, মৌলবাদকে সে কীভাবে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়েছে— কীভাবে তা সমাজে প্রতিষ্ঠা ও বিপত্তি তৈরি করেছে— প্রশ্নগুলোর নির্ধারিত উত্তর মেলা কঠিন, তার চৌম্বক অভিজ্ঞানও সংকটময়— তাহলে গবেষক কীভাবে উদ্দিষ্ট গবেষণাকে বিবেচনায় নেবেন! ঠিক একটু ভিন্নপথ ওই সাহিত্যের। সমাজ-অনুসৃত যা কিছু তাই তো সাহিত্য। সাহিত্যও সমাজকে অনুগত করে চলে। তারও কালপরিক্রমা মানব-মনস্তত্ত্বকেন্দ্রিক। সুতরাং গবেষকের কালসৃজনের পাঠে অনুগত হওয়া আবশ্যক। যেটি তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন লেখক। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য নিয়ে, পরে ১৮০১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত। সাম্প্রদায়িকতার বিচিত্র-বীক্ষণ এতে চিহ্নিত। গবেষকের পরিশ্রম প্রশংসনীয়। কিন্তু আগেই যেটি বলেছি, শিরোনামার বিস্তৃতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই গভীরে প্রবেশের অবসর মিলেছে কম। দ্বিতীয় অধ্যায়ের সমাজ-প্রপঞ্চ বিষয়ক মত অতঃপর তার সৃজিত মৌলবাদ— কী এবং কেন— তার মূল্যায়ন একটা দৃষ্টিকোণের রসায়নে সম্পন্ন লেখকের হাতে। কিন্তু সেটিতে গবেষণার-অভিজ্ঞান অর্জন একটু কঠিনই বলা যায়। তবে যে নূহ-উল আলমের মনস্বীতার চিহ্ন ধরা পড়েনি তা নয়, লক্ষ্য-অনুরুদ্ধ হওয়ায় উল্লম্ফনের ব্যাপার ঘটেছে। উনিশ শতকী সমাজের সাম্প্রদায়িকতা, সাহিত্যে তার প্রভাব, জনজীবনে তার নানা রূপ— রূপায়ণ একটা ঘোরাল-প্যাঁচানো সিঁড়ির মতো। তার অনেক প্রান্তও আছে। পলে পলে সে অনুষঙ্গও পাল্টায়, পাল্টিয়েছেও। সেই খবরাদি চটজলদি আছে প্রবন্ধকারের লেখায়। গভীরের আলোটুকু কখনো স্পষ্ট কখনোবা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। প্রশ্নও উদয় হয়, মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িকতা বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যে কীভাবে ছিল? ইতিহাসের ফেরারিরূপে বঙ্কিম কী সাম্প্রদায়িক না অসাম্প্রদায়িক? বিশেষত, তার সমকালে— হঠাৎ করেই কেউ এতো বড় একজন লেখককে কোনো লেবেলে আঁটানো যায়? কিংবা রবীন্দ্র-বিচারে গেলে (আবদুশ শাকুরের রবীন্দ্র জীবনী) তার পরিবারে কিংবা হিন্দুমেলার উৎসবের ভেতরে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে অসাম্প্রদায়িক হয়ে উঠলেন! এরপর মুসলিম লীগ, বঙ্গভঙ্গ ও তার রদ এবং আরও পরে গান্ধীজীর অহিংসা, দেশবন্ধু ও সুভাসবসুর (আজাদ হিন্দ ফৌজ) বিপরীতে গান্ধীজীর কংগ্রেসের (‘ভারত ছাড়’) কর্মসূচি প্রভৃতি ম্যাটার সাহিত্যে কীভাবে প্রতিফলিত— এবং ওইরূপ মনস্তত্ত্ব; বিভাগোত্তর পর্বে পূর্ব-বাংলার বাঙালি মুসলমানের অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার উন্মেষ ও ভাষা আন্দোলন থেকে পূর্ণায়ত মুক্তিযুদ্ধ— যেটি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে সমাজভিত্তিক শ্রেণিশোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণমুক্তির পূর্ণ প্রয়াস— যেটি নূহ-উল আলম লেনিন দেখিয়েছেন পঞ্চম অধ্যায় পর্যন্ত— আলাদাভাবে বিন্যস্ত করে— তা পূর্বের বিষবাষ্পের বিপরীত মুহূর্ত কিন্তু সবটুকু মাটি থেকে মহীরূহ হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে বিনাশ করে ওই অপধারারই প্রত্যাবর্তন! তবে কী ওই সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ— তার প্রভূত কর্তৃত্ব ছিলই— এই ভূখ-ে প্রোথিত হয়ে, নূহ-উল আলম লেনিনের থিসিসের বাঙালির সমাজ ধারণাটি সে উত্তর অবমুক্ত করে। এবম্প্রকারে তার বিস্তৃতিও প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সাহিত্যে— তা গড়ায় একাল পর্যন্ত— সমাজ উৎসারিত সেই বিষবাষ্প ধারার করুণ ও ক্লিন্ন রূপ উন্মুক্ত— তৃতীয় থেকে পঞ্চম অধ্যায় পর্যন্ত। এক ধারাবাহিক সঞ্চরণ গবেষকের প্রদ্যু¤œ ইশারায় নিহিত। কথার ইশারায় তিনি অনেক কিছু চিহ্নিত ও চিত্রায়ণ করেন। সত্যের অভিজ্ঞানে হন নিরাসক্ত ও অনলস। ধরা পড়ে কীভাবে এই বিষবৃক্ষটি রোপিত ও তার ফসল গোলায় ওঠে— যতোই বলি সমাজ আধুনিক, চলনে ও অভ্যাসে নতুন কিন্তু গোড়ায় এবম্বিধ কিছু ভাইরাস-ভ্রƒণ রয়েই যায়। সে কারণে, একটি রাষ্ট্রের স্থপতিকে সমূলে বিনাশের চেষ্টা— এদেশেরই কিছু বেপথু কুলাঙ্গার সন্তান কর্তৃক— আশ্চর্য! তা মুহূর্তেও কোনো প্রতিক্রিয়া তোলেনি। ভ্রান্তির করাল গ্রাস গ্রহণ করে ওই বিষ, যা রোপিত ছিল হয়তো আগেই। সে কারণে উৎপাটনের দায় নিয়ে বাংলার স্থপতি বুঝি ‘নিয়তি’র চাকায় পিষ্ট হয়। বক্ষ্যমান গ্রন্থের গবেষক লেনিন অনিবার্যরূপে সেই তথ্যটি সত্য করে তোলেন। অসত্যের নিন্দিত ভ্রান্তমুখ অপসারিত করার প্রত্যয়ে। তিনি বুঝিয়ে দেন স্বরূপ-কথা। সেইটিই এই গবেষণা-গ্রন্থের মূল্যবান দিক।

উপর্যুক্ত কথকতার প্রামাণ্যরূপে গ্রন্থাকারের কিছু উক্তি উদ্ধৃত করা যেতে পারে :

(ক) রবীন্দ্রনাথ ধার্মিক ছিলেন। সম্প্রদায় বিশেষের আবেগ-ঐতিহ্যকে তিনি প্রশ্রয় দিয়েছেন বটে, তবে সংকীর্ণতাকে নয়। ধর্মের আচার সর্বস্বতা, ধর্মের নামে মানুষে মানুষে ভেদ-বৈষম্য, ধর্মান্ধতা, কূপম-ূকতা সর্বোপরি সাম্প্রদায়িকতাবাদকে তিনি মানুষে মানুষে হিন্দু-মুসলমানে মেলবন্ধনের প্রতিবন্ধক মনে করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ প্রত্যাশিত হিন্দু-মুসলমানের সমস্যার সমাধান হয় নি; বর্র সাম্প্রদায়িক বিভেদের চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতি, জাতীয়তার অবৈজ্ঞানিক ও প্রতিক্রিয়াশীল তত্ত্ব তথা সাভারকার-জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। (পৃ. ২২০)

(খ) মুসলমান সমাজে ছবি আঁকা, গান গাওয়া ও ভাস্কর্য তৈরি করা রীতিমতো পাপজনক কাজ বলে গণ্য হতো। নজরুল-আব্বাস উদ্দীন গানকে মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় করেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান প্রমুখ ভেঙে দেন ছবি আঁকার বাধা। … সাহিত্যের মতোই চারুকলায় ও ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসঞ্জাত সৃজনশীলতার এক মুক্তধারা সৃষ্টি হয়েছে। (পৃ. ৩০৯)

(গ) কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মে ঘুরেফিরে সমকালীন সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ-প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির ফলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংকট প্রবল আকার ধারণ করে। সেই সংকট তাঁকে বিচলিত করেছে। ফলে, তীব্র ঘৃণা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ধিক্কার জানিয়েছেন তিনি। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মনুষ্যত্বের জয়গান গেয়েছেন। (পৃ. ২২৯)

(ঘ) প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলে রাজার ধর্মই ছিল প্রজার ধর্ম। তবে ভারতবর্ষের ইতিহাসে এ বৈশিষ্ট্য একেবারে নিরঙ্কুশ ছিল না। রাজার ধর্ম রাষ্ট্র ও সমাজে কর্তৃত্ব করেছে বটে; কিন্তু সর্বজনীন প্রজার ধর্ম হয়ে ওঠেনি। বাঙালি সমাজ-গঠন কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়— বহু জাতি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ও বর্ণের মানুষের মিশ্রণ এতে ঘটেছে। (পৃ. ১১৮)

(ঙ) দৃশ্যত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্টিকর্মে সাম্প্রদায়িকতার প্রতিফলন পীড়াদায়ক। তাঁর প্রবন্ধ, উপন্যাস, খ-কবিতা প্রায় সর্বত্রই এর কমবেশি প্রতিফলন সুস্পষ্ট। মুসলমানদের তিনি যখন ‘যবন’, ‘ম্লেচ্ছ’- ইত্যাদি বলে আখ্যায়িত করেন, স্বাভাবিকভাবেই মুসলমান পাঠক তাতে আহত বোধ করেন। তাঁর উপন্যাসে মুসলমান চরিত্রগুলো দুর্বল, হীনরূপে চিত্রিত হয়েছে। অনেক সময় মুসলমান যুবতীর সঙ্গে হিন্দু যুবকের প্রেমচিত্র অঙ্কন করে তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিয়েছেন। নির্মোহ দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যায়, সংষ্কারমুক্ত পরম ধার্মিক বঙ্কিমচন্দ্র নিজে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতাবাদে আচ্ছন্ন না হয়েও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতাকে শিল্পসম্মতরূপে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বিশেষ শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। (পৃ. ২১০)

গ্রন্থকার তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এরূপে তুলে ধরলে কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়। এমন উদ্ভূত প্রশ্ন উল্লিখিত থিসিসের জন্য গুরুত্বহীন নয়। বোধ করি গ্রন্থ প্রণয়নের যৌক্তিকতাও তো তাই— যা প্রশ্নের জন্ম দেয়। যা হোক, বঙ্কিম-রবীন্দ্র-নজরুল কিংবা তৎ-পরবর্তী লেখক-সংস্কারকবৃন্দ সম্পর্কে উপরের মন্তব্যে ভিন্নমত আনা যায়। প্রশ্ন তোলা যায়, বঙ্কিম কীভাবে সম্প্রদায়িক? বঙ্কিম নিজেই তার উপন্যাসের চরিত্র মানলে, সমকালে তাঁকে নিয়ে স্ববিরোধ-বিরোধ-বিতর্ক-প্রতর্ক কম হয়নি। কিন্তু তাঁর সময়ে তো কোনো বাঙালি বাংলার ইতিহাস লেখেননি— তাঁকে পড়তে হয়েছে ইউরোপীয়দের রচিত ইতিহাস— যেখানে সাম্প্রদায়িকতার উস্কানি কম ছিল না। আর এও তো সত্য, যিনি শিল্পি, যাঁর হাতে গড়ান সার্থক মুসলিম চরিত্র, তারা তো উপেক্ষিত হয়নি— তাছাড়া যে সমাজে স্বধর্মের অনেক কাজের দায়ও তার স্কন্ধে নিতে হয়েছিল— ‘সাম্য’, ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ রচয়িতার মানবহিতৈষী শিল্প-অঙ্গীকার তো অমূলক বিবেচনা করা যায় না কিছুতেই— সেখানে তিনি কীভাবে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট হন— বিশেষ করে উনিশ শতকের সমাজবাস্তবতাকে স্মরণে রাখলে! ‘কমলাকান্ত’ অভ্রান্ত শিল্পি, সমাজের বিবর্তমান ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন না— তাই তাঁর কল্পিত প্রতিমার রঙ দ্বিধাজর্জর কিংবা সংশয়াচ্ছন্ন। সেটি তো শিল্পেরই স্বভাব! একইভাবে নজরুলও স্বীয় ধর্মের ভেতর দিয়ে হিন্দুর পাশাপাশি মুসলমানদেরও কা-ারী হয়ে ওঠেন— এর কারণ, ধর্ম নয়— ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে সকল ধর্মের মানুষকে জাগানো। সর্বজনীন ঐক্য স্বীয় শক্তির ভেতর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তার মুখ্য উদ্দেশ্য। নজরুল ঐক্য চেয়েছিলেন। উভয় ধর্মের পুরাণ-ইতিহাস তো ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতিরই ত্রিবেণীসঙ্গম। সেখানে মানুষ বড়। কিন্তু কেউ কেউ নজরুলকে মুসলমান বানিয়েছে— ধর্মীয় রাষ্ট্রের জিগির তুলে। তুচ্ছ ও সংকীর্ণজ্ঞানে রবীন্দ্র-নজরুল মুখোমুখি আবার কখনোবা অবিশ্বাস্যভাবে বিপরীতেও দাঁড় করিয়েছে। পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয়ভাবে নজরুলকে ‘মুসলমান’ বানানোর চেষ্টা হয়েছে, তাঁর রচনার সংস্কারেরও চেষ্টা হয়েছিল— নজরুল বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের যুগপুরুষ বলেই হয়তো সকল বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন— এবং বাঙালির কবিরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, স্বাধীন বাংলাদেশেও নজরুলের আগমন ও মসজিদের পাশে স্থাপিত সমাধিসৌধ নির্মাণে সাম্প্রদায়িকতাসুলভ মনোভাবের প্রশ্নটি তো দুর্লক্ষ্য থাকে না! নজরুল সর্বদা মানুষের কবি হতে চেয়েছেন, তবে তাঁর রচনাবলী সঙ্গে আমাদের নজরুলচর্চা কী আয়রনি! নূহ-উল আলম লেনিন বেশ দ্রুততায় এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেও সামগ্রিক বিবেচনায় একটি সমাজ-ধর্মের ইতিহাসগত পরিকাঠামো নির্ণয় করেছেন তিনি। যেখানে ইতিহাসের বাঁকে আর পথে-প্রান্তরের প্রতিঘাতে সমাজ-পরিবর্তনের নিশানা আর সৃজনশীল নির্মাতাদের অবলম্বি করে তোলেন। এ প্রয়াসটুকু চলতি গবেষণায় হয়তো নতুন নয় কিন্তু নূহ-উল আলম লেনিন ছয়টি অধ্যায়ের ভেতর দিয়ে তত্ত্বগত দিক ও তার জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেছেন— এবং পরিশিষ্ট অংশটি সংযুক্ত করে সাম্প্রতিক প্রবণতাকেও যুক্ত করছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে চলতি সমাজের সাম্প্রদায়িকতার কর্তৃত্বমূলক দুরভিসন্ধির কালোছায়া।

উপসংহার ও গ্রন্থপঞ্জিসহ বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ গ্রন্থটি (৩৬৮ পৃ.) ২০১৫ র বইমেলায় প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। সুশীল পাঠকের উপলব্ধিতে বইটি নতুন জ্ঞান ও চিন্তা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।

শহীদ ইকবাল

————————————————

কষ্টের আধুনিক হিমাগার ॥ আহ্মেদ মেহেদী হাসান নীল

বড়ো পুকুরিয়ার কয়লার খনি অনেকেই দেখেছেন। ভ্রমণ-পিপাসু যারা এখনও তা দেখেননি তারা নিশ্চয় আশুভ্রমণের তালিকায় ঐ নামটি রেখেছেন। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে গেলেই একবার তা দেখে আসবেন এমন প্রবল ইচ্ছা সবাই লালনও করেন। প্রকৃতপক্ষে ওখানে গেলে তেমন কিছুই দেখা যায় না। বিরাট প্রাচীর দিয়ে চারিপার্শ্ব ঘেরা। বিরাটাকার গেট। সেই গেটের ভেতরে ঢুকতে নিশ্চিতভাবে কোনো কর্মকর্তার সুপারিশ প্রয়োজন। ভেতরে গিয়ে একটি জিনিস দেখা যায়— অনেক অনেক শ্রমিক ভেতরে ঢুকে খনন করে বের করে আনছে কালো কালো কয়লা। এই কয়লা বের করতে গিয়ে সবার পরিধান্যে তো বটেই— কারো কারো নাকে, কারো কপালে আবার কারো মুখম-ল কয়লার ময়লা লেগে হনুমান-দশা হয়ে যাচ্ছে। সারাদিন কয়লা খনন ও বহন করে পরিশ্রান্ত শ্রমিক বিষণœতা নিয়ে ঘরে ফিরছে। অথচ এই শ্রমিকদের অধিকাংশই জানে না কয়লার মধ্যে কী ধন আছে। আছে কতো সঞ্চিত আগুন।

এই কথাগুলো বললাম তার কারণ আহ্মেদ মেহেদী হাসান নীলের কাব্য কষ্টের আধুনিক হিমাগার দেখতে একটি কবিতার বই হলেও প্রকৃতপক্ষে তা এক কয়লার খনি। এখানে নামলে উঠে আসা বড়ো দায়। গলগল করে পড়ে যেতে ইচ্ছে করে কবিতাগুলি। বিষাদ বিষাদ আর বিষাদ। বিষাদভ্রমণ শেষে পাড়ে এসে বসলে মনে হয় যেনো কিছুই পাইনি। তবে একেবারে কিছুই পাওয়া যায় না তেমনটা নয়। কয়লার খনির মতো এখানে পাওয়া যায় কিছু নিখাঁদ কষ্ট আর হনুমানদশা চেহারা। তবু বারবার এতে ডুব দিতে কেনো যে ইচ্ছে হয় জানি না।

আজ চোদ্দই নভেম্বর দুই হাজার ষোল তারিখে যখন আমি এই বইটি পুনর্বার পড়ছি তখন আকাশে পূর্ণ পূর্ণিমা-চন্দ্রের প্রকা- দাপট। মেঘের ছিঁটে-ফোটাটিও নেই সেখানে। আর আজ চাঁদের অবস্থান পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে। জানা গেছে আঠারো বছর পর চাঁদটি এখানে পুনরায় আসবে। বইয়ের নাম-পত্রের পর প্রথম পাতায় উৎসর্গে একটি নাম— শহীদ ইকবাল, এই প্রতাপশালী ‘চাঁদ দেখার চেয়ে যাঁর মুখ দেখা ভালো’। নির্দ্বিধায় বিস্মিত হতে হয়। কালিদাস রবীন্দ্রনাথদের প্রকৃতিপ্রেমকে উপেক্ষা করে অনেকেই চাঁদের তুলনা এনেছেন তাদের নিছক প্রেমের মায়াবিনীর নামে। তবে এই প্রথম কোনো শিষ্যের কাছে তার গুরুর সাথে চাঁদের তুলনাও রহিত হয়ে গেলো। তুলনা চলে এলো সূর্যের। এ ব্যাপারে এই কাব্যের মীমাংশা কবিতাটি উল্লেখ্য :

যে-কোনো একজন থাকবে

হয় সূর্য নয়তো তুমি

পৃথিবীতে একসাথে এতো তাপের দরকার নেই।

এমন তাপ, এমন আগুন কাব্যের প্রতিটি পাতায় পাতায় রয়েছে। কখনো সে আগুন ঝলসে দিয়েছে কবিতার শিরোনামকে কখনও কবিতাকে। আগুনে আগুনে কবি ঘোষণা করেছে আত্ম-পরিচয় :

আর আমি আছি ধুতুরা ফুলের পাপড়ি পান করে

ডুমুরের সুরভি ছিনিয়ে নিয়ে এখনো আছি

কোনো আগুন পারে না পোড়াতে আমায়

কোনো সমুদ্রও পারে না ডোবাতে। [এ আগুন শিরোনামহীন]

অন্যত্র,

রাতের তারারা, অন্ধকার, ব্যাঙের ডাক; উনারা জানেন

আমি অন্যকিছু আমি অন্য পাখি

হে শালবন হে অরণ্য আর হে মানবী

হ্যা, আমি পর্বত

আর হ্যা, আমি আগ্নেয়গিরি…  [আগ্নেয়গিরি]

‘কবিতা অনেক রকম। আহ্মেদ মেহেদী হাসান নীল তরুণ কবি, তারুণ্যের বিস্তর প্রবাহ কবিতার প্রাচ্ছয়াময় কণারাশিকে আক্রান্ত করে : নীল সেখানে নীলকণ্ঠ। যে সমাজ-ভূমিকেন্দ্রে তার চলমানতা সেখানে পিচ্ছিল পা ফেলে চলছে সে— প্রেম-যৌনতা-শরীর-লাবণ্য তৃষাদিপি-।’—গ্রন্থখানির ফ্ল্যাপদেশে লেখা অর্ঘ্যপ্রাপ্ত বিশ্লেষকের বিশ্লেষণ এটা। নীল সম্পর্কে চরম বিশ্লেষণের ফলাফলের নির্যাসটুকু এখানে উপস্থাপন করেছেন তিনি। আমার ধারণা এই কথাগুলোর সারব্যাখ্যা করলেই পাঠকের বুঝতে আর বাকী রইবে না যে কষ্টের আধুনিক হিমাগার কী— আর আহ্মেদ মেহেদী হাসান নীল কে!

পিতাহীন সংসারে চরম দ্রারিদ্র্যের মাঝে বড়ো হয়ে ওঠে আমাদের এই কবি। লাঞ্চনা-গঞ্জনা-ধিক্কার-ন্যক্কারের শিকারে তার মানসিক শরীরের চামড়া বিক্ষত। ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছে বীভৎস ভালোবাসা আর চরম ঘৃণার এক উদ্বেলিত আদর্শ। যখনই তার পাশে কোনো বন্ধু মনের খেয়ালে গেয়ে ওঠে ‘বাবা কতো দিন দেখিনি তোমায়…’ নীল তখনই তাকে থামিয়ে দেয়। বাবাকে নিয়ে কোনো গান গাইতে নিষেধ করে। বাবার প্রতি তার ঘৃণা আছে যতোটুকু স্পর্শকাতরতার মাত্রাটা ঠিক ততোটুকু। কয়লাখনির ঠিক মধ্যখানে কবি যে মণিটি স্থাপন করেছে সেটা তার পিতার কাছে প্রাপ্ত ‘নিখুঁত কষ্ট’ :

আমার অকাল বয়সে যখন পিতা ছেড়ে গেছে

দিয়ে গেছে ব্যর্থতার বিষাদ বারুদ উৎসব—

আমার-ই জলভরা নয়নের চতুর সীমানায়

বিপদাপন্ন বরফগুলো তখন জলের বদলে

সনিয়মে তিনভাগ আগুন হয়ে

‘নিখুঁত কষ্ট’র ঠিক উল্টো পাতায় ‘নীলাশ্রম’-এ কবি তার যাপিত জীবনের দগদগে কষ্টের আরও বর্ণনা ব্যক্ত করেছে। বলেছে :

আপাদমস্তক যার গুঁটি গুঁটি বসন্তের কান্না

একের পর এক জন্ম নিয়েছে কালো মেঘ অস্থিমজ্জা জুড়ে

যার শৈশব দেহ কেটেছে

সহনে আর দহনে

তার যৌবনগুলোও

এলোমেলো…

কষ্টের এই মহান সেনাপতি আঁতিপাঁতি করে খুঁজেছেন কষ্ট, কষ্টের ঐশ্বর্য। সংসারে, সমাজে, সন্ন্যাসে, নিশীথপল্লিতে সে ওই একটি জিনিসই খুঁজে ফিরেছে। কষ্ট খুঁজতে গিয়ে অস্ত্র চালিয়েছে জননীর বুকে পিতার বুকে। স্বর্ণা, রেশমি, মাধবীদের বুকে ছোরা বসিয়ে দিয়ে যে রস সে পান করেছে তার প্রকৃত নাম ‘কষ্ট’। আর তার একমাত্র প্রতিফল নিকষ অন্ধকার :

অন্ধকার বাড়ানোর জন্য কপালে দেশলাই ঠুকে আগুন জ্বালাই

এতো উষ্ণ হয়ে গেছে আমার কপাল!

রেশমি, একবার ফিরে এসো

বরফগলা কংক্রিট আর খাঁ খাঁ রোদ্দুরের দেশে

একটু ছুঁয়ে দেখো নিবিড় অন্ধকারগুলো নরম ঠোঁট দিয়ে

চিবুক দিয়ে

স্তন দিয়ে

তোমার…

নীল আমাদের খুব ভালো বন্ধু। ভালো ক্রিকেট খেলে। হঠাৎ দেখি বন্ধুত্ব ছেড়ে খেলাধুলা ছেড়ে একদল সাহিত্যের ছেলেদের সাথে আড্ডা দেওয়া শুরু করেছে। এরই মধ্যে বিন্দু ও ¯œান নামের দুটি কাগজে ওর কিছু কবিতাও ছেপেছে। দেখে খারাপও লাগে ভালোও লাগে। তখনও অবশ্য ওর ভেতরের কষ্টটা অতোটা অনুমান করতে পারিনি। পরে জেনেছি ওর কষ্টগুলো স্তূপীকরণের একমাত্র উপায় হিসেবে সে বেছে নিয়েছে কবিতাকে। লিখে চলেছে : ‘দুঃখ দাওয়াত নিয়ে আসে’, ‘¯œাত কপাল’, ‘আমার প্রস্থানের পদ্য’, বিদীর্ণ সময়’, ‘জল জল অভিযোগ’, ‘স্বার্থহীন শত্রু’, ‘আগুনের দেনায়’ ‘প্রতিশ্রুতির পাঠশালা’, ‘আমার উরু অধর বাহু’, ‘মনে রেখো প্রিয়তমেষু’র মতো সব অসাধারণ কবিতা। ৫৬টি কবিতা নিয়ে তৈরি হলো কষ্টের আধুনিক হিমাগার-র পা-ুলিপি। প্রকাশ হলো ঢাকার অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে। একে একে লেখা হতে থাকলো আরো অনেক অনেক পা-ুলিপি, যেগুলো প্রকাশের অপেক্ষায়। মূলকথা কবিতা হয়ে উঠলো তার জীবনের একমাত্র প্যাশন। কবিতার মতো হয়ে উঠলো তার জীবন। চলনে-বলনে, আচার-আচরণে এমন কবিসুলভ মানুষ দেখা যায় খুব কম। ফলে আমরা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা অনেকটা গর্ব-ই করি তাকে কাছে থেকে দেখতে পেরে। কিন্তু কোন খেয়ালে, কীসের দুঃখে, কোন ক্ষোভে সে অনুজদের নিষেধ করলো জানি না :

কেউ কবিতা লিখতে চাইলেই আমি নিষেধ করি

লিখো না ভাই এসব উদ্বাস্তু বিষয়

বড়ো বেশি যন্ত্রণা হয়!

যতোই বাঁচতে চাও বাঁচার মতোন জীবন পাওয়া যায় না

…            …            …

না হয় অন্য কিছু করো

কুলিমজুর দিনমজুর যখন যা পারো

তবু কবিতা লিখো না

যতোই হাতে নিয়ে ঘোরো বিষের বা-িল, হাজারটা ট্্িরপটিন

মরণের রাস্তা খুঁজে পাবে না।      [কবিতা লিখো না]

সামন্তবাদের পর পুঁজিবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদের ঘোরতর চক্রান্তের শিকার আধুনিক সাহিত্য। তথ্য-প্রযুক্তির যুগের নামে ছড়িয়ে দেয়া ইন্টারনেট এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, মেসেঞ্জারসহ হাতে হাতে পৌঁছে দেয়া এ্যান্ড্রয়েড ফোনের চাপে পিষে মরার উপক্রম কাগুজে সাহিত্যের। কবির সম্মুখে একটাই প্রশ্ন সত্যকার অর্থে কি ‘কবি ও কবিতার রাত ফুরিয়ে গেছে’? তাহলে আমরা যারা এই বাদানুবাদের ভিড়ে এখনও তলানিতে পড়ে আছি, যারা এখনও দিনের যেকোনো ভাগে একটু অবসর পেলে অথবা ঘুমের আগে নিয়ম করে সাহিত্যের পাতায় মুখ গুঁজে একটু শান্তি পাই তাদের কী উপায়?

তবে আহ্মেদ নীল হতাশ নয়। সে কবিতার মধ্যে প্রাণ খুঁজে পায়। পায় বেঁচে থাকার স্বপ্ন। যেখানে জীবন নেই সেই বিরাণ ভূমিতে কবিতা কেনো কোনো শিল্পের কোনো অর্থ নেই। এই মতবাদে সে বিশ্বাসী। তাই শেষ কবিতায় লিখেছে :

বাঁচো,

বাঁচতে হয় বলে, বাঁচতে হবে বলে

তুমি পারলে আমি পারবো, আমরা পারলে মানুষও পারবে।

[অনুপ্রাণন প্রকাশন— ঢাকা ॥ নভেম্বর ২০১৪]
রফিক সানি

———————————————-

ডায়ালের জাদু ॥ মাসুদার রহমান

মাসুদার রহমান (জ. ১৯৭০) একুশ শতকের কাব্যধারার জগতে এক নতুন মুখ। তাঁর জীবনভাবনার উপলব্ধি থেকে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। উত্তরবঙ্গ সিরিজ (২০১২), সমুদ্র (২০১৩), ডাকবাংলো (২০১৫) কাব্যগুলি সমকালের কাব্যধারায় পাঠকের চিত্তের মনোহারি অভিমুখ। তাঁর সর্বশেষ কাব্য ডায়ালের জাদু (২০১৬)। রাজশেখর বসুর ভাষায় : ‘কবি শব্দটি এসেছে বর্ণনাত্মক ও কাব্যকর্মক কবৃ ধাতু থেকে (কবৃ বর্ণেইত্যস্য ধাতো: কবিকর্মনোরূপম্)’ এখানে বর্ণনা বলতে শব্দপ্রকাশ এবং কবিকর্মক হলো কবির সর্বদিক থেকে এক নতুন দার্শনিক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। সেই অনশ্বর, অব্যয় ও অপরিবর্তনীয়ের প্রতিচ্ছায়া যা মানুষের ক্রিয়াকর্মে ধরা পরে ব্যাপক অর্থে সে সমস্ত ক্রিয়াকর্মই তো কবিতা। ডায়ালের জাদুর ‘মহাজন বাড়ি’ কবিতায় আছে : ‘এক গ্লাস রক্তের শরবত/ আঙুর সাদৃশ্য কয়েকটি চোখ/ আর গরীব গৃহস্থের একজোড়া অ-কোষ দিয়ে/ গৃহস্বামী ব্রেকফাস্ট সারছেন।’— এমন কবিতাটিতে সমাজ জীবনে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে কাছে থেকে দেখবার যে দৃষ্টিভঙ্গি, গ্রামীণ জীবনের যে চালচিত্রের মাঝে অসহায় মানুষগুলোর অবক্ষয় ও ভাঙনের সৌধ রোরুদ্যমান  প্রতিচ্ছবি— তা বিদ্যমান।

শেলি বলেছেন : ‘অ ঢ়ড়বঃ ঢ়ধৎঃরপরঢ়ধঃবং রহ ঃযব বঃবৎহধষ, ঃযব রহভরহরঃব ধহফ ঃযব ড়হব’— মাসুদার রহমানের ভাবনায়— কবিতা যে সৌখিন বিলাসবস্তু নয় বরং কবিতা মানুষের আদ্য প্রেরণ— তাই তিনি সমকালকে সাক্ষী রেখে প্রকৃতির সৌন্দর্যের ভিতর ফুটিফাটা করে চক্ষের পুতলির মতো বুদ্ধির কলকাঠি সঞ্চালনক্ষম নিগূঢ় তত্ত্ব রহস্যের মূর্ত প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর কবিতায় দেখি : ‘পাতা কুড়োনির মেয়ে সন্ধেবেলা/ বিস্ময়ের ডালিয়া ফুল পুতে এলে/ গোধূলীর পাড়ে/ জোনাকি ও তারার পোষাকে রাত্রি আসবে।’— এখানে তার শিল্পবুনুনে কবিতার ছন্দ গতি অলংকারের অনুপ্রাসে এক অপূর্ব চিত্রকল্প ফুটে উঠেছে।

ডায়ালের জাদুর বিচারের পূর্বে টি. এস. এলিয়টের দৃষ্টিতে বলতে পারি : ‘ঊাবৎু ৎবাড়ষঁঃরড়হ রহ ঢ়ড়বঃৎু রং ধঢ়ঃ ঃড় নব, ধহফ ংড়সবঃরসবং ঃড় ধহহড়ঁহপব রঃংবষভ ধং, ধ ৎবঃঁৎহ ঃড় পড়সসড়হ ংঢ়ববপয…’ অতএব ঈড়সসড়হ ংঢ়ববপয অবশ্যই পড়ষষড়য়ঁরধষ ভড়ৎস যা কাব্যকে ‘আধুনিক’ অভিধায় অভিহিত করতে সাহায্য করে। ডায়ালের জাদু কাব্যের ৬৪টি কবিতার মধ্যকার যেসব কবিতাকে সেই আধুনিক অভিধায় অভিহিত করতে পারি, সেসব কবিতা যেমন : কবি, সকাল, কারখানা, হানাবাড়ির রহস্য, রাত পাহারার কবি, মঙ্গা, মহাজন বাড়ি ও কাব্যের নাম কবিতা— ডায়ালের জাদুকে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে পারি :

কারখানার বন্ধগেট; তালা নয় ঝুলে আছে

শ্রমিকের কর্তিত মাথা

এ পথে আসেনি কেউ

লোহার শরীর মরিচা হয়ে ঝরে গেছে

এখন বেড়ে ওঠে আগাছার কাল—

যুগচিহ্ন অঙ্গে ধারণ করেই কাব্য আবির্ভূত হয়; আর তারই ফলে কালান্তরে তা হয়ে যায়— অপ্রচলিত-অতীতের নিদর্শন। যদি না তাতে যুগোপযোগী প্রবহমানতা না থাকে। সে ক্ষেত্রে ডায়ালের জাদু কাব্যটির বেশ কিছু কবিতা দুর্বলতারও ছাপ আছে। বলাবাহুল্য— কমলালেবু, এ্যাডলফ হিটলারের ঘোড়া, রূপকথা, দাম্পত্য, সাইকেল, আলুচাষ কবিতাগুলি আবেগ ভরা ভস্মে ঘি ঢালার মতো মনে হয়েছে। যা কবি একটু সচেতন হতেন তবে সৌজন্যচিতভাবে তা এড়িয়ে যেতে পারতেন :

ঘুমের মধ্যে কথা বলছে বউ

ঘুরেফিরে বলছে ওর ছেড়ে আসা

প্রেমিকের নাম

বলুক না…

এরকম কিছু কবিতায় কবি গতানুগতিক গড্ডালিকা-প্রবাহে গা ভাসিয়ে রোমান্টিক কবি হওয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন, যার কোন প্রয়োজন ছিলো না। কেননা এমনিতেই কবিতায় রোমান্সের ভাব ফুটে ওঠা স্বাভাবিক ছিল। কবি আপদমস্তক কতখানি পাশ্চাত্যের সাহিত্য পাঠ করেন জানি না তবে, এলিয়টের রোমান্টিক ভাবনায় যেমন সমকালের প্রকৃতি, নগর পল্লীর সৌন্দর্য একীভূত করে ঠিক তেমনই কবি মাসুদারের ডায়ালের জাদু যাদু দেখানোর অভিপ্রায় আছে :

জঙ্গল তোমাকে টানে; তার গভীরে

কোথাও এক হানাবাড়ি

যাকে ঘিরে লোকালয়ে অনেক গল্প কথা।

টি.এস. এলিয়টের ঞযব ঞড়বিৎ বা ঞবিহঃু গরহঁঃবং কবিতায় মানুষের যে কোনো বাসনাই যে সামগ্রিক স্মৃতির সাযুজ্যে প্রতীকে রূপ নেয় তা ডায়ালের জাদুর ভিতর লক্ষণীয়। সমরৈখিক অবস্থান থেকে বলতে চাই কবিতাকে কবিতাই হতে হবে। কেননা প্রকৃত কবিতা বিশ্লেষণের অতীত, নিত্য নতুন অর্থের অবস্থানে এক অপার সম্ভাবনা নিয়ে সে কালান্তরে যাত্রা করে :

কালো পিপড়েগুলো মুখে সাদা

ডিম নিয়ে

কোথায় যাচ্ছে?

এই প্রশ্নে আমাদের বয়সী দাদীমা

প্লাবনের আভাস রেখে যান।

মাসুদার রহমানের কবিতায় সমকাল ভাবনার সাদৃশ্য যতটা সফলতা আছে ব্যর্থতার মর্মটাও ততটাই। কবিতার ভাবনায় সমকাল ছাড়িয়ে ত্রিকাল দর্শন করতে পারাই কবির শক্তি, সেক্ষেত্রে কবি কতটা সফল তা কবিতার আষ্টেপৃষ্ঠে বিচরণ করলেই বোঝা যায়। তাঁর কিছু কবিতা অবশ্যই কবির ভাবনাকে ছাড়িয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে যুগকে অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু পুরাদুস্তর সকল কবিতায় সমকাল ভাবনার রোমান্টিক চেতনার আলেখ্য দুর্বল— যা যুগকে অতিক্রম করবে না। এখন প্রশ্ন যুগকে অতিক্রম করতে পারাই কী কবিতার সফলতা? আসলে আমি সেকথা বলতে চাইনি বরং বোধের সৌধকে বিনির্মাণ করে নিরঙ্কুশ কবিতার মধ্যকার যে গভীরতা, প্রবাহ, সং¯্রব তরঙ্গ বা সংবেদনশীলতা তাই ধরতে চেয়েছি। সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্রকাঠামো, বিশ্বভাবনা, নারী, প্রেম, রোমান্টিকতার প্রেক্ষাপট ও ক্ষমতা কবিতার যন্ত্রণায় এই সম-সাময়িক নৈরাশ্য, ব্যথাতুর আবেগ কবিতার ভিতর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করবে— ডায়ালের জাদু সে কারণেই স্মরণীয়। পরবর্তী কাব্যে কবির আরও সাফল্য কামনা করি।

[আরক, বরিশাল ॥ ফেব্রুয়ারি ২০১৬]
আনন্দ কিশলয়

———————————————-

স্পর্ধা সবসময়ে ॥ সম্পাদক : হাবীব ইমন
দ্বাদশ বর্ষ ॥ ১ম সংখ্যা ॥ নভেম্বর-জানুয়ারি ২০১৭ ॥ ঢাকা

‘দ্রোহকালের সাহিত্য কাগজ’ স্লোগানকে সামনে রেখে হাবীব ইমন সম্পাদনা করেছেন স্পর্ধা সবসময় নামের পত্রিকা। বলেছেন তিনি : ‘আজ আমরা বারো বছর অর্থাৎ এক যুগপূর্তির সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছি, দ্রোহকালের সাহিত্য কাগজ হিসেবে।’ এ কাগজে তিনি মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা, ও গণসংস্কৃতি স্পর্ধার সাথে কতটুকু প্রতিফলন ঘটিয়েছেন— সেটাই দেখবার বিষয়। সদ্য মহাপ্রয়াত কবি-লেখক সৈয়দ শামসুল হককে এই যুগপূর্তি সংখ্যাটি উৎসর্গিত করা হয়েছে। প্রবন্ধ, রাজনীতি, শ্রদ্ধাঞ্জলি, কথোপকথন, গল্প, মুক্তগদ্য, কবিতা, অনুবাদ কবিতা, মুক্তপদ্য, প্রকৃতি, চলচ্চিত্র, সবিশেষ, চিত্রকলা, চিত্র-কাব্য, বইকথা, হৃৎকলমের টানে নিয়ে পত্রিকাটির আয়োজন।

প্রবন্ধ অংশের প্রথম প্রবন্ধ আহমদ রফিকের বর্তমান রাজনীতি ও গণসংস্কৃতির পথ-অন্বেষণ। প্রবন্ধের শিরোনামটা চমৎকার। তবে প্রবন্ধের নামের সাথে ভেতরের তেমন একটা মিল নেই বললেই চলে। প্রাবন্ধিক প্রথমে গণসংস্কৃতিচর্চার বিভিন্ন সময়ের কথা ব্যক্ত করেছেন, সাথে সাথে বর্তমান কিছু সমস্যার, বিশেষ করে রাজনৈতিক সমস্যার কথা বলেছেন। এবং কিছু জিজ্ঞাসাও রেখেছেন। কিন্তু উত্তর দেন নি! প্রবন্ধের শিরোনাম দেখে পাঠক অনেক কিছু পাবার আশা করেছিলো, কিন্তু প্রবন্ধটি পড়ে পাঠকের আশা হতাশায় পরিণত হয়েছে। এরপর শহীদ ইকবালের অস্তাচলের পুনরাবৃত্তি ও তথৈবচ আড়ালকথা প্রবন্ধ। প্রবন্ধে তিনি বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশের ইনফরমেশন টেকনোলজির প্রভাব ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। প্রবন্ধটি বর্তমান সময়োপযোগী। পড়ে মনের একতারার তারে টান লেগেছে, টং করে বেজে উঠেছে। নাড়া দিয়েছে চৈতন্যের চেতন প্রবাহে। আমাদের ‘মেজরিটি সম্প্রীতি’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক মারুফ রসুল বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলেছেন। প্রতিদিন হর-হামেশাই বক্তৃতা-বিবৃতিতে, প্রবন্ধ-নিবন্ধে, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে, টেলিভিশন টক শোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা দেখছি, শুনছি। কিন্তু আমাদের জাতিগত জীবনে এর প্রভাব নেই বললেই চলে। এর কারণ হিসাবে প্রাবন্ধিক দায়ি করেছেন সাংবিধানিক স্বীকৃত ‘রাষ্ট্রধমর্’ হিসাবে ইসলামকেই ঘোষনা দেওয়ার বিষয়টিকেই। আমাদের মূল ভুল দিয়ে শুরু। স্বকৃত নোমানের বাংলা উপন্যাসের আদিকাল ও হাসানআল আব্দুল্লাহর মধ্যযুগের কবিতা একটি পর্যালোচনা প্রবন্ধদুটির বিষয় নতুন নয়। অনেক প্রবন্ধ রচিত হয়েছে এসব বিষয়ে। এবং প্রবন্ধদুটির নতুনত্ব তেমন নেই বললেই চলে। আরশাদ সিদ্দিকীর স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা কবিতা প্রবন্ধে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা কবিতার অর্জন ও বিসর্জনের কিছু নতুন পাঠের কথা বলেছেন। বাংলা কবিতায় দশকের রাজনীতি প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ নূরুল হক বাংলা কবিতায় কবি-অকবিদের দশককেন্দ্রিক রাজনীতির নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দশককেন্দ্রিক কবিতায় রাজনীতিকে বাদ দিয়ে মহাকালের নিক্তিতে কাব্যচর্চা ও কাব্যবিচারের কথা বলেছেন। নয়া উদারনীতিবাদ ও উগ্র মৌলবাদী দর্শনের কলে প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক অভিনু কিবরিয়া ইসলাম বর্তমান সময়ে সমাজের সুযোগসুবিধাগ্রস্ত, তথাকথিত ‘উচ্চশিক্ষা’য় শিক্ষিত তরুণরা ধর্মের উগ্র মৌলবাদী ব্যাখ্যাকে ধারণ করে যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তার কথাই ব্যক্ত করেছেন। আমরা এতো উন্নত প্রযুক্তি হাতের কাছে পেয়েও সংস্কৃতিবান মানুষ হতে পারে নি। আমরা এখনো জ্ঞানের আলোর দীপ্তি গ্রহণ করতে পারে নি। হতে পারে নি মানুষ! পত্রিকার শ্রদ্ধাঞ্জলি অংশে কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৈয়দ শামসুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। সাখাওয়াত টিপু কাজী নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি স্বরূপ রচনা করেছেন দুখু মিয়ার ভবিষ্যত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জাকির তালুকদার রচনা করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ধর্মে ফেরেন লেখাটা বেশ চমৎকার! পিয়াস মজিদ সৈয়দ শামসুল হকের প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ রচনা করেছেন অপ্রতিম সৈয়দ শামসুল হক। লেখায় তিনি সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ ও মুক্তগদ্য স্বল্পে আলোচনা করেছেন।

রাজনীতি অংশে রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রাজনৈতিক মতবাদ বিকৃতি ও বিচ্যুতি শিরোনামে। লেখক মূলত তাঁর লেখায় মার্কসবাদকেই ‘বৈজ্ঞানিক’ মতবাদ বলেছেন। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও মার্কসবাদের চর্চা হয়েছে এবং নানা বিকৃত ও বিচ্যুতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। তিনি মূলত তাঁর লেখায় আমাদের দেশে মার্কসবাদী রাজনীতিচর্চার ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। কথোপকথন অংশে রয়েছে কবি আসাদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন রনজু রাইম। সমকালীন রাজনীতি, শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর এই সাক্ষাৎকার। গল্প অংশে রয়েছে চারটি গল্প। প্রথমেই মলয় রায়চৌধুরীর এই রোগের নাম চাই গল্পটি। প্রচলিত ধারার গল্প নয় এটি। গল্পকার নিজেই বলেছেন, ‘একটি গল্পহীন গল্প’। গল্পের কিছু কিছু কথা মন ছুঁয়ে যায়। যেমন— সঙ্গমের চেয়ে যোনির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার আনন্দ বেশি।/ বিছানাকে অন্ধকারে আরণ্যক করে তোলাই ফুলশয্যা।/ পশুরা জানতে পারে না যে মানুষ হলো সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী।/ ঈশ্বরও কেবলমাত্র একজন এবং তাঁর নাম যৌনতা।/ প্রেম তখনই সফল যখন তা প্রেমিক ও প্রেমিকা দুজনকেই ধ্বংস করে দ্যায়। মিলটন রহমানের নামানুষ গল্পটি কাল্পনিক। মৃন্ময় চক্রবর্তীর এক মুক্তিযোদ্ধার গল্প নামের গল্পটি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক হলেও একটু আলাদা ধাচের। এ গল্পের মুক্তিযোদ্ধা দাদুর কাহিনি বড়োই মর্মান্তিক। তবে সুদেষ্ণা দাশগুপ্তের অর্ধবৃত্ত গল্পটি মনের বৃত্তটিকে পূর্ণ করতে সক্ষম হয় নি! অর্ধবৃত্ত অর্ধবৃত্তই রয়ে গেছে! অপেক্ষার মিছিল নামে সম্পাদক হাবীব ইমন যে মুক্তগদ্যটি রচনা করেছেন, সেখানে যে মানুষটার কথা তিনি বলেছে তার বয়স বাড়ছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঘুমও কমছে। তার ‘এক পাশে আশা- আকাক্সক্ষার খানিক আলো, অপর পাশে হতাশার গাঢ় অন্ধকার।’ নিজের সাথে নিজে লড়াই করে বেঁচে আছে সে। মাঝখানে কেটে যাচ্ছে সময়। জীবনের বাস্তবতা এখন এমনই। দুরত্ব বাড়ছে, কাছের মানুষ চলে যাচ্ছে দূরে। ‘সবাই তার গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কেউই যেতে পারছে না। অপেক্ষার মিছিল।’ তিনি এই গদ্যটির মাধ্যমে বর্তমান আধুনিক মানুষের জীবনযাত্রার কথা হয়তো বলতে চেয়েছেন। কারণ, এখনকার মানুষের জীবনই এমন। এই গদ্যের কিছু কিছু শব্দ চোখে পড়ার মতো। যেমন— ঘাটা-ঘাটুনি, টকর টকর কথা বলা, গরমের গন্ধ প্রভৃতি। কবিতা অংশে রয়েছে কিছু কবিতা। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল লিখেছেন বব ডিলানের নোবেল প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়া কবিতা। এ কবিতায় তিনি বব ডিলানকে অভিবাদন-অভিনন্দন জানিয়েছেন। কাজল চক্রবর্তী জীবন্ত এক পাখি কবিতায় চে গেভারার বিপ্লবের কথা ব্যক্ত করেছেন। সাথে সাথে নেরুদা, লোরকা, কীটস, লেলিন ও মার্কেসর কথাও বলেছেন। মোয়াজ্জেম হোসেন আরমান সৈয়দ শামসুল হকের নিবেদন স্বরূপ লিখেছেন বেহারা কবিতা। এসব কবিতা আসলে নামেই কবিতা, বাস্তবে কিছু নয়! এছাড়া এ অংশের তেমন কোনো কবিতা  পাঠকের মনে কড়া নাড়ে না! মুক্তগদ্য অংশের প্রণব আচার্য্যরে তিনটি কবিতা চোখে পড়ার মতো । মোটামুটি তা মুক্তপদ্য হিসাবে চালানো যায়। অনুবাদ কবিতা অংশে রয়েছে উইলিয়াম ব্ল্যাকের একটি কবিতা। কবিতাটি ভাষান্তর করেছেন মিল্টন রহমান বিধ্বস্ত গোলাপ নামে। ভালোই  লেগেছে। সাথে সাথে নীচে উইলিয়াম ব্ল্যাকের প্রাথমিক পরিচয়ও দেওয়া রয়েছে। সৌরভ মাহমুদের এ জীবনে আমি ঢের শালিক দেখেছি  লেখাটা প্রকৃতি বিষয়ক। এ লেখায় তিনি বিভিন্ন উপন্যাস বিশেষ করে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ব্যবহৃত ‘শালিক’ পাখির পরিচয় দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি উপন্যাসের নাম, কবিতার নাম ও নানান প্রজাতির শালিকের ছবি দিয়ে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এ ধরনের লেখা এর আগে কখনো দেখি নি। একটা নতুন ধারনা।

চলচ্চিত্র অংশে রয়েছে দুটি চলচ্চিত্র নিয়ে অলোচনা। মীর মোশাররফ হোসেন মেক্সিকান চলচ্চিত্রকার আলসান্দ্রো গনজালেজ ইনারিতুর রেভরেন্ট চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেছন। রেভরেন্ট চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি মারদাঙ্গা হরিউডি বাস্তবতাকে দাঁড় করিয়েছেন প্রশ্নের মুখে। এ চলচ্চিত্র নিয়ে লেখক বেশ চমৎকার আলোচনা করেছেন। আলোচনাটা পড়ে সিনেমাটা দেখার আগ্রহও জন্মাবে সবার মনে— এটা বলা যেতে পারে। নির্মলেন্দু গুণের কবিতা অবলম্বনে নির্মিত নেকাব্বরের মহাপ্রণায় নিয়ে অলোচনা করেছেন সৌমিত্র শেখর। মোজাফ্ফর হোসেন তাঁর   ডিলানের সাহিত্যে নোবেল : বিপক্ষে-যুক্তি  লেখাতে ডিলানের নোবেল প্রাপ্তির বিপক্ষে অনেকগুলি যুক্তিসঙ্গত যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। লেখাটা ছাপিয়ে সম্পাদক নিঃসন্দেহে স্পর্ধার পরিচয় দিয়েছেন। আবার এই সংখ্যায়ই ববডিলানের নোবেল প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়া কবিতাটিও ছাপিয়েছেন। এ কবিতায় বব ডিলানকে অভিবাদন- অভিন্দন জানানো হয়েছে। তাহলে সম্পাদক কোন পক্ষে? ডিলানের নোবেল প্রাপ্তির পক্ষে, না বিপক্ষে; নাকি দ্বিমুখীনীতি অবলম্বনকারী? রাজীব জবরজং-এর ¯œানহীন বগলে মধুপখির প্রেম শিরোনামের চিত্রকাব্যটি বেশ মনোমুগ্ধকর। ‘ছবিও কথা বলে’— এ কথার যথার্থ পরিচয় মেলে চিত্রকাব্যটি দেখে। অঞ্জন আচার্যের বাংলাদেশের চিত্রকলার ক্রমবিকাশ চিত্রকলার ইতিহাস বিষয়ক রচনা। লেখাটা পড়লে বাংলাদেশের চিত্রকলার ক্রমবিকাশ সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা লাভ করা যায়। প্রণব আচার্য্য বিরচিত কয়েকটি ভেড়া ও একটি মানুষ গল্পগ্রন্থের আলোচক খালেদ রাহীর আলোচনাও বেশ মনোগ্রাহী। তিনি এই আলোচনায় বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। পত্রিকার একেবারে শেষে রয়েছে হাসান রাশেদের মোবাইল ফোনের ইতিকথার পরের-কথা লেখাটি। সম্পাদক এই অংশের নাম দিয়েছেন হৃৎকলমের টানে। লেখাটা সম্পাদক না ছাপালেই ভালো করতেন।

সম্পাদক সূচিপত্রে বিভিন্ন বিভাগের বিষয় একই সাথে দিয়েছেন। কিন্তু পত্রিকার ভিতরে প্রবন্ধ অংশের মধ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি, কবিতা অংশের মধ্যে প্রকৃতি, চলচ্চিত্রের একটা একখানে আরেকটা অন্যখানে দিয়েছেন। এটা দৃষ্টি নান্দনিক নয়। প্রত্যেক লেখকের লেখার পাশে লেখকের ছবি সংযোগ করেছেন সম্পাদক। পত্রিকায় বেশ কিছু বানান ভুল রয়েছে। কোথাও কোথাও কিছু কিছু বর্ণ বাদ পড়েছে। আবার কোথাও কোথাও বেশি বেশি আ-কার (া), য-ফলা (্য) পড়ে গেছে। সব মিলিয়ে পত্রিকাটি পাঠকে নতুন কিছু দিয়েছে। পত্রিকাটি বেঁচে থাক। স্পর্ধা দেখাক সবসময়।

বিরহান্ত কৃষ্ণ

——————————————

শিল্পধাম ॥ সম্পাদক : আবুল ফজল
৩য় সংখ্যা ॥ শ্রাবণ ১৪২৩ ॥ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

শিল্পধাম নতুন লেখকদের পত্রিকা। তৃতীয় সংখ্যাটিতে তার পূর্ণ বিকাশ লক্ষ করা যায়। পত্রিকার প্রতিটি অংশেই তরুণ লেখকদের সমাগম। পত্রিকা খুলতেই একটি চিত্র দেখতে পাওয়া যায় যেটি ১৯৭১ এর যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের। এরপরেই উৎসর্গ। উৎসর্গ করা হয়— সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ এবং শহীদ কাদরীকে। সূচিপাতায় সাজানো হয়েছে ধারাবাহিকভাবে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, মুক্তগদ্য, পা-ুলিপি, অনুবাদ, সাক্ষাৎকার এবং ধারাবাহিক। বিগত দুটি সংখ্যার ধারাবাহিকতায় এই সংখ্যায়ও একই ধরণের সূচিবিন্যাস দেখতে পাওয়া যায়। যথারীতি সম্পাদকীয় থাকার কথা থাকলেও এই সংখ্যায় নেই কোনো সম্পাদকীয় লেখা। রেজওয়ানুল হক রোমিওর কবিতা দিয়ে মূল পত্রিকা শুরু। নিজস্ব অনুধাবন শক্তি, হৃদয়পটে বেঁচে থাকা একফালি স্বপ্নের কথা বলেছেন। অগোচরে বাহুল্য জীবনের অভিপ্রায় মৃত্যুরেখাকে ইতি টানতে চেয়েছেন এভাবে— ‘কালরাতে একটি আত্মার সাথে কথা হয়েছিলো/ অশরীরী আত্মা, মৃত্যুর স্বাদ যে ভোলেনি’ (রাতের ব্যানার/আজাদ মাহমুদ)। যন্ত্রনার হাটে সব মেকি রাষ্ট্রের কঙ্কালসার। বিভ্রমে কেটে যায় কবিআত্মা। কবিতা কিংবা পদ্য অথবা পদ্যের মতো কবিতা। ভাষার ভীষণ স্ফূলিঙ্গ এবং উচ্ছ্বোসিত আবেগ থেকে বের হয়ে আসে— ‘তাই গিলে ফেলা শিখে নাও/কান্না গেলার শিক্ষাটা সবচেয়ে কাজে দেয় সারাটা জীবন।’ নাসিমা সাদিয়া এবং সুমাইয়া শিমুর কবিতা দুটো প্রায় একই প্যাটার্নের। সেই ছিপছিপে আবেগ, নিজস্ব কথন এবং অপ্রয়োজনীয় সর্বনাম পদের ব্যবহার। ছন্দ কিংবা অলঙ্কারের স¦ার্থে নয় বরং ‘আমি’ ‘তুমি’ ব্যাপারটা এক ধরনের ফোবিয়ার মতো লক্ষ্য করা যায়। শাহনাজ পরাভীন মৌ এর পরিবর্তন কবিতাটি একটু আলাদাভাবে দেখা যায়— ‘শকুনের চোখে চোখ থেকে শুরু করে/পিঁপড়ের নাক আপ্লুত খুশিতে।’ পত্রিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নতুন লেখকের পা-ুলিপি প্রকাশ। সাধারণত ধারাবাহিক কিংবা পর্বে প্রকাশ করে থাকে অধিকাংশ পত্রিকা তবে শিল্পধাম পুরো পা-ুলিপি ছাপাতে কার্পণ্য করেনি একবিন্দু। নুসরাত নুসিনের পা-ুলিপির কোনো শিরোনাম না থাকলেও ২৭ টি আলাদা শিরোনামে পদ্য সাজানো। প্রতিটি পদ্যে প্রায় একই বিষয় ঘুরপাক খায়। সেই অন্ধকার, চিরনিদ্রা, কোলাহল, জলছায়া, নস্টালজিয়া এগুলো জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আমরা শিখেছি। দেখেছি মহাজাগতিক কল্পের অসম্ভব স্কেচ। নুসরাত নুসিনের কবিতায় অনেকটাই এই ব্যাপারগুলো চলে এসেছে— ‘শেকড় গভীরে ছড়িয়ে একমাত্র বৃক্ষই এভাবে চেয়ে থাকতে পারে/চোখের শীতল যাত্রায় উদ্বাস্তু আদিম প্রয়াস।’ অথবা ‘ অন্ধকার ভালোবেসে যে পাখি ভোরের মুখ খুলে গেলে সেও চায় আলো।’ গল্পের শুরু কথা দিয়ে। সম্পাদকের উদ্দেশ্যে গল্প পাঠিয়েছেন রফিক সানি— যার নাম দিয়েছেন ‘গল্প নয় চিঠি’। চিঠির মতো এ গল্পের শুরুটা সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু প্রবহমান চালচিত্রের মধ্য দিয়ে। স্মৃতিচারণে গিয়ে গল্পকার এক ধরণের ড্রামাটিক মুডে গল্পটি এগিয়ে নেন। গল্পের শুরুটা হয় শেষের দিকে। কাল্পনিক বিচ্ছিন্ন স্বপ্নের মাঝে বায়োলজিক্যাল পিতৃত্ব গল্পটির চেতনাকে অনেকাংশে উস্কে দেয়— ‘মা তখন যেমন জানতেন ভূত বলতে কিছু নাই’ কিংবা ‘সূর্যের আলোয় চোখ ফিরিয়ে দেখি, আমার পাশে চিত হয়ে পড়ে আছে আমার বাবার লাশ। সমস্ত শরীর কর্দমাক্ত।’  সুবন্ত যায়েদের লেখা গল্পটির কাহিনী সার গল্পের শিরোনামেই দেখতে পাওয়া যায়— ‘একটি ছিনতাই এবং পুলক আর তার মুখোশ সম্পর্কিত কিছু কথাবার্তা। তানভীর আজমলের ‘কালিদাস মারা গেছেন’ গল্পের বিশেষ কোনো চরিত্র পাওয়া যায় না। স্তূপাকারে পড়ে থাকা এক অন্তহীন চাওয়ার বিশেষ মুহূর্তমাত্র। স্বপ্নঘোর আলহাজ ইলিয়াস উদ্দিন এর জীবন-মৃত্যুর আদলে দীপ্ত উদাসের গল্প দূর এক আঁধারের পানে… দূরে থাকা স্বজনদের পীড়া এবং জীবনাবসানের দীর্ঘ প্রতিক্ষায় গল্পটি কাল্পনিক ক্যানভাসে দৃশ্যায়িত। এছাড়াও প্রতিক্ষার ক্ষণ পেরিয়ে উন্মাদনায় কারো জন্য অহেতুক দৃষ্টিপাত হয় শামীমা আক্তারের ‘পরবাসে মন কাঁদে’ নামক গল্পে। প্রবন্ধ অংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ এবং উৎপলকুমার বসুর ‘পুরীসিরিজ’ কাব্য নিয়ে আলোচিত। বলাকার শতবর্ষ নিয়ে অন্তরা বিশ্বাস কাব্যে সারাংশ তুলে ধরেন। সংক্ষিপ্ত এ আলোচনায় কবিতার অন্তর্নিহিত কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় আধুনিক কবিদের অন্যতম। ব্যতিক্রম লেখনি এবং জীবন ধারণে তার লেখায় আলাদা মাত্রা। শাকিলা আলম তার প্রবন্ধে ‘হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য’ কাব্যের কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে ব্যাখ্যা করেছেন। মুক্তগদ্য সাহিত্যের আলাদা একটি প্যাটার্ন। এখানে সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের তথ্যমূলক আলোচনা খুব কমই হয়ে থাকে। তবে মনস্তাত্বিক আলোচনায় যথেষ্ট প্রজ্ঞা থাকে। মুক্তগদ্য অংশে সবুজ ম-লের গদ্য ‘প্রকৃতি ও পুরুষ’। শিরোনামেই অনুমান করা যায় দুটি সেপারেট বিষয়কে একোমোডেশান করার প্রচেষ্টামাত্র। উত্তম পুরুষ ব্যবহারে গদ্যটির শুরু ‘আমি প্রকৃতি’ দিয়ে। তবে বিষয় ছেড়ে অপ্রাসঙ্গিক উদাহরণ টানার বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। পুরুষ অংশে প্রকৃতির ঝুলন্ত সীমারেখাকে জন্মের সাথে সন্ধিক্ষণের পার্থক্য দেখা যায়। অনুবাদ মূলত ভাষান্তর। ভাব চুকে নিয়ে শব্দকে সাহিত্যে মূল্যায়ন করা। অন্যদিকে, বিদেশী লেখকদের সাথে আমাদের খুব বেশি পরিচয় নেই। সেক্ষেত্রে সবসময় লেখকের পরিচয়টা দিয়ে রাখা ভালো; যদিও পত্রিকায় কোনো লেখকের সাধরণ পরিচয়ও দেওয়া হয়নি। সাধারণত সাহিত্য পত্রিকায় একটি অনুবাদই বেশি দেখা যায়। শিল্পধাম পাঁচটি অনুবাদ খুব যতেœর সাথেই মূল্যায়ন করা হয়েছে। আরিফা সুলতানের অনুবাদটি রাশিয়ান নাট্য এবং গল্পকার আস্তন চেখভ এর লেডিস গল্প থেকে। এছাড়াও যে চারটি অনুবাদ— জেন স্পিডের প্রতিশোধের রেসেপি (জবপরঢ়ব ভড়ৎ জবাবহমব) থেকে, এডওয়ার্ড ওয়েলেনের খুন গোপন থাকে না (গঁৎফবৎ রিষষ ড়ঁঃ), জেমস হেল্ডিং এর তালাকের ছুতো (এৎড়ঁহফ ভড়ৎ ফরাড়ৎপব), রাশেদ এহসানের অনুবাদ কর্তৃত্বশীল হওয়ার শিক্ষণতত্ত্ব (খবধৎহঁহম ঃড় নব ঝঁঢ়বৎরড়ৎ) এবং ধরাবাহিক অংশ কেনো লিখি। বিখ্যাত লেখকদের লেখক হওয়ার নেপথ্য কিংবা কেনই বা লেখেন। মূলত এই দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে চারটি লেখা। সীমন দ্য ব্যোভওয়ার লেখা দিয়ে শুরু। সীমন তাঁর লেখায় নিজের ব্যক্তিগত জীবন এবং দ্বিতীয় লিঙ্গ বইটির দর্শনিক জায়গা থেকে আলোচনা করেছেন। প্রসঙ্গত উঠে এসেছে সার্ত্রের সাথে তাঁর পথচলার মুহূর্ত। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তিনি তার বইটি প্রসঙ্গে বিভিন্ন উদাহরণ টেনেছেন। এবং নারীদের বিষয়ে তার বইয়ের সমালোচনার জবাবও দেন। এ অংশটি নেওয়া হয়েছে খোরশেদ আলম সম্পাদিত সীমন দ্য ব্যোভওয়ার সঙ্গে কথোপকথন থেকে। আকাশ অম্বরের অনুবাদে হানস মাগনুস এনৎসেনবারগারের লেখায় রাজনীতি এবং রাষ্ট্র দর্শনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আলোচনায় কবিতার চিন্তভাবনার কথা বলেছেন তিনি। শুরুতেই তিনি বলেছেন— কবি একজন সর্বভূক…/আমাদের কোনো নালিশ নাই…/কিছুই লুকোবার নেই আমাদের।’ এ অংশে আরো দুজন লেখকের লেখার অভিজ্ঞতা একং লেখ্যদর্শন আলোচিত হয়েছে— আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান এবং ইতালিয়ান দার্শনিক উমবার্তো ইকো। সাক্ষাৎকার অংশে ‘অতীত ও বর্তমান সন্ধিস্থাপন’ শিরোনামে রমিলা থাপারের সঙ্গে আলাপন। মূল সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন রণবীর চক্রবর্তী এবং ভাষান্তর করেন নাফিসা তাবাসসুম। প্রথম প্রশ্নটি তাঁর রচিত ঞযব ঢ়ধংঃ ধং ঢ়ৎবংবহঃ এবং ভারতীয় ইতিহাস নিয়ে। উত্তরে তিনি ইতিহাস, ভারতীয় অবস্থা, উদ্বেগ এবং প্রত্নতাত্তিক বিষেয় বিষদ আলোচনা করেন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রশ্নের বিপরীতে তিনি জাতীয়তা, রাজনীতি, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, ধর্মের সংজ্ঞা, এবং বুদ্ধ সম্বন্ধে আলোকপাত করেন। তাঁর সহজ ব্যাখ্যায় খুব সহজেই ভারতীয় ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির মূলধারার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারা যায়। রামায়ণ পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থাকেও মেনে চলে ও তুলে ধরে? তিনি শুরু করেন— ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। রামায়ণ সমাজের নতুন এক প্রত্যাবর্তনকেও তুলে ধরে যেখানে পরিবার, সম্পত্তি, রাজপদ, প্রশাসনকেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে।’ সর্বোপরি, নতুন লেখকদের শিল্পধাম নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ। নতুন চিন্তাচেতনা, নতুন বোধোদয় পত্রিকার অগ্রযাত্রার পাথেয় হয়ে উঠুক। এই ধারাবাহিকতায়— নতুন লেখকদের সম্মুখপথ আরো সুদৃঢ় হবে। শিল্পধামর কাছে এই প্রত্যাশা।

অতন্দ্র অনিঃশেষ

———————————————-

শব্দ ॥ সম্পাদক : সরোজ দেব
৪৪ বর্ষ ॥ ২য় সংখ্যা ॥ গাইবান্ধা

‘শব্দ’ ধ্বনি (ঝড়ঁহফ) নয়। শব্দ দিয়ে কথা হয়। হয় অর্থ, কবিতা, সংগীত, গল্প, উপন্যাস। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে ফ্রেমে বাঁধা যায় একটি পূর্ণ জীবনকে। আর এই শব্দের বারুদ যার পরতে পরতে ঠাসা থাকে, তার নাম ছোটকাগজ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উক্তি : ‘লেখক নিছক কলম-পেষা মজুর। কলম-পেষা যদি তার কাজে না লাগে তবে রাস্তার ধারে বসে যে মজুর খোয়া ভাঙে তার চেয়েও জীবন তার ব্যর্থ, বেঁচে থাকা নিরর্থক।’ সুতরাং, আর্টের প্রশ্ন সরিয়ে রাখলেও লেখার এক প্রকার সামাজিক উপযোগিতা ও লেখকের দায়বদ্ধতা রয়েছে। কারণ, লেখকও সমাজেরই অংশ। জনসাধারণের সাথে তাদের কোন বিপ্রতীপ অবস্থান নেই। সরোজ দেব সম্পাদিত শব্দ— ‘সাহিত্য ও শিল্পভাবনার ছোটকাগজ’। অবশ্য, ছোটকাগজের প্রথাগত ও একাডেমিক সংজ্ঞায়নের প্রতি সংশয় থেকেই সরোজ দেব শব্দকে আমাদের সামনে পরিচয় করিয়ে দেন, একটি আন্দোলন হিসেবে, পাঠক ও লেখক তৈরির ক্লাসিক জায়গা হিসেবে। শব্দর পাঠক ও লেখক তৈরির এই আন্দোলন করে চলেছে চুয়াল্লিশ বছর ধরে। সুতরাং, কালের পরিসরে এ যাত্রাকে আমরা বিবেচনায় নিতে পারি এক বিরামহীন নিরীক্ষা-লগ্ন প্রয়াস হিসেবে।

শব্দর চুয়াল্লিশ বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যার পাঠন্মোচন করতে হয় মননশীলতার হাত ধরে, প্রবন্ধ দিয়ে। ‘উনিশ ও বিশ শতকে উত্তরবঙ্গীয় সাংস্কৃতিক মানসিকতা বিকাশের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট’— শিরোনামে আনন্দ গোপাল ঘোষর প্রবন্ধটি উত্তরবঙ্গীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্যের নিরিখে ঋদ্ধ, যতেœর দাবিদার। কনসট্যানটিন পাউসতোভস্কির ‘জগৎ : বীক্ষণ কৌশল’ ও গোবিন্দ পুরুষোত্তম পা-ের ‘সংস্কৃতিতে হিং¯্রতা’ প্রবন্ধ দুটি অনুবাদ করেছেন যথাক্রমে চিত্ত ভট্টাচার্য ও কঙ্কন সরকার। পাউসতোভস্কির প্রবন্ধে লেখকের দৃষ্টির পাশাপাশি এসেছে অন্তর্দৃষ্টির প্রসঙ্গ। সাথে, স্মরণীয় উক্তি : ‘যাঁদের কবিতা ও অঙ্কিত শিল্পকর্মের প্রতি আগ্রহ নেই তাঁদেরকে আমি লেখক বলে গণ্য করি না। খুব জোর তারা অলস ও দাম্ভিকতা সর্বস্ব অন্যদিকে মিথ্যা বিদ্যাভিমানী মানুষ বলে বিবেচিত হতে পারেন।’ ‘যুবসমাজের অবক্ষয় : সমাজ ও বাস্তবতা’ শিরোনামে কবি-সম্পাদক আনোয়ার কামাল তুলে আনেন সাম্প্রতিক পরিবেশ-প্রতিবেশ। ‘পরিবার থেকে পলিটিক্স’ প্রবন্ধটির টেক্সট বহুচর্চিত হালেও আগ্রহ জাগানিয়া। প্রবন্ধের দ্বিতীয় বিভাগটি পুরোপুরি সাহিত্যের দখলে, যেখানে আলো ছড়িয়েছেন পুনর্মুদ্রিত জীবনানন্দ দাশ। এছাড়া ফেরদৌসী রহমান বিউটি এবং ড. নাসিমা আক্তারর মনন-ভাবনা বিশেষ উল্লেখ্য। শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দর ‘বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ’-এর পুনর্মুদ্রণ আরেকবার আমাদের সাহিত্য চেতনাকে শাণিয়ে দিল। ফেরদৌসী রহমান বিউটি সীমিত-সীমাবদ্ধ পরিসরে আলোচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও সমাজ ভাবনা প্রসঙ্গে। পুনর্ব্যক্ত করেছেন রবীন্দ্রনাথর শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়কে। ড. নাসিমা আক্তারর ‘কথাসাহিত্যে নজরুল’ রচনাটি মূলত একাডেমিক। নজরুলের রচনা তথ্য সন্নিবেশের পাশাপাশি আছে ক্ষীণ পর্যালোচনাও।

‘কাব্যকথন’ শব্দর একটি স্বতন্ত্র বিভাগ, কবিতার বই নিয়ে কথা বলবার জায়গা। গোলাম কিবরিয়া পিনুর মুক্তিযুদ্ধের কবিতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে খানিকটা ইতিহাস-রাজনীতি চর্চিয়ে হিমেল বরকত এখানে আবিষ্কার করেন আশাভঙ্গের কারুণ্যতা। ‘লিটলম্যাগ ও ছোটকাগজী’য় গ্রন্থালোচনা বিভাগে ছোটকাগজ এবং মানুষ নিয়ে ইলিয়াস বাবরর লেখাটি নিটোল, সুখপাঠ্য। দেড় পাতার লেখাটি একবার পাঠে, যে কোন পাঠকই চোখ বুলিয়ে আসতে পারেন, মানুষ নিয়ে কাজ করা এবং মানুষর চতুর্থ সংখ্যাটিতে। সঞ্জয় সোমর কাব্য ‘আমার অজ্ঞাতবাসের নীরব কবিতা’— এবারে স্থান পেয়েছে গ্রন্থালোচনায়। ইবনে সিরাজর চমৎকার গদ্যে উঠে এসেছে সঞ্জয় সোমের কাব্যভাবনা— অন্তহীন নৈঃশব্দের চৈতন্যে নিরবচ্ছিন্ন ভাবনার ডিঙা, নির্ভীকতা এবং সত্তার জটিলতর কূটাভাস। ‘স্মৃতিকথা’ বিভাগে ‘স্মৃতির সুবর্ণ সময়’ শিরোনামে মো. আব্দুল মান্নানের পোক্ত কলমে মেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ ও বাংলাদেশের জন্মকথার টুকরো টুকরো স্মৃতির ঝলক।

সাহিত্যের প্রায় সব শাখাকেই স্পর্শের প্রয়াস আছে শব্দর চুয়াল্লিশ বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যায়। এর ধারাবাহিকতায় আমরা পাই ভ্রমণ সাহিত্যও। অবশ্য, এক্ষত্রে ‘সাহিত্য’ শব্দটি প্রয়োগে কিছুটা সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ‘বরাকের স্রোত শিরোনামের হৃদয়ছোঁয়া লেখাটিতে তনুশ্রী পাল তুলে আনেন আসামের বাঙালি ও বাংলাভাষা আন্দোলনের স্মৃতিময় রোমন্থন, সাথে বেদনার গল্প। এ বিভাগের আরেকটি সংযোজনা ‘কলকাতা টু দিল্লীরুট’; মোদাচ্ছেরুজ্জামান মিলুর প্রথম ভারত ভ্রমণের স্মৃতি। ওপার বাংলার কবি, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার, অভিনেতা ও লোক-গবেষক শচীমোহন বর্মণ আলোকিত করেছেন এবারের ‘বিশেষ রচনা’ বিভাগটি। সাহিত্য নিয়ে ছোটকাগজীয় এক্সপেরিমেন্ট খানিকটা চোখে পড়ে শব্দর এবারের কবিতা আয়োজনে। এপার-ওপার বাংলা মিলিয়ে এ আয়োজনে রয়েছে প্রায় শতাধিক কবিতা। নবীন-প্রবীণ কবিদের চমৎকার মেলবন্ধন, কবিতাগুলোর আস্বাদেও এনেছে বহুমাত্রিকতা। প্রথম কবিতাতেই আমরা দেখি— কাজী রোজীর আশাবাদী প্রত্যয় : ‘ধানের গোলায় দেখেছি আগামীর ভবিষ্যৎ’। এমন উচ্চারণ আমাদের আশাবাদী করে বাংলার চিরন্তনতা সম্পর্কে। পরবর্তী কবিতা ‘বৈশাখী শক্তির ঘুড়িতে’ও কবি করেছেন প্রচ–খর বৈশাখী যৌবনের প্রার্থনা। গোলাম কিবরিয়া পিনুর কবিতার ভাষা একেবারেই মানুষের, তাতে শান দিয়েছেন প্রশ্নের পাথরে, এমনকি প্রশ্নের মাঝেই রয়েছে সুপ্ত প্রত্যয় : ‘আমরা কি ছেড়ে দেব শুঁয়োপোকার কাছে/ আমাদের বীজ ও বীজতলা?/ আমরা কি ছেড়ে দেব কাঠপিঁপড়ের কাছে/ আমাদের মাথার মগজ?’ পিন্টু রশিদের কবিতা ‘প্রকৃতির কাছে নতজানু হও’ আমাদের তাড়িত করে আরেক জন মহাপুরুষের জন্য। যিনি আসবেন, পথ দেখাবেন, উদ্ধার করবেন। সংঘাত, হঠকারিতা নয়। বরং, মানুষের আপন আশ্রয় প্রকৃতি। সবুজের মাঝেই রয়েছে নীলস্বপ্ন— এমন বার্তাই প্রকাশ্য পিন্টু রশিদের কবিতা ভাবনায়। ‘ওপার বাংলার কবিতা’ শিরোনামের দুটি বিভাগে আছে ২৩ জন কবির কবিতা। প্রেম, যাপন, আবার কখনোবা জীবন যন্ত্রণা মুখ্যতা পেয়েছে কবিতাগুলোতে। এছাড়া ছড়ার সংযোজনা শব্দর নান্দনিকতায় এনেছে আলাদা মূর্ছনা।

এবার নজর দেয়া যেতে পারে সাহিত্যের আধুনিক(!) অনুষঙ্গ ছোটগল্পের দিকে। ছোটগল্পের তিনটি বিভাগের গল্পকার : মনি হায়দার, জাকির হোসেন, কঙ্কন সরকার, লক্ষ্মী নন্দী, আলপনা সোম, চন্দ্রশিলা ছন্দা, হাফিজুল হিলালী বাবু এবং শাহাদত হোসেন সুজন। মনি হায়দারের গল্প ‘উৎসবে’র চরিত্র চিত্রনেই পরিচয় ঘটে একরাশ মুগ্ধতার, এক্সপেরিমেন্টের। বাংলা ভাষার একেকটি বর্ণমালা চরিত্র হিসেবে আলো নিয়ে উপস্থিত ‘উৎসবে’। ‘তোমরা বর্ণমালারা অনেক শক্তিশালী তোমাদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে না’- চোখে আগুন জ্বলা কালো দৈত্যের এমন উচ্চারণ আমাদের আশান্বিত করে ভাষার শক্তিমত্তা সম্পর্কে। গল্পের শেষে একেকটি বর্ণমালার রক্তে ফোটে একেকটি উজ্জ্বল ফুল— রফিক, শফিক, বরকত, জব্বার। আমরা আপ্লুত হই শহীদ স্মরণে। ‘দলিল মিয়া’ ও ‘স্পন্দন’ গল্পদুটির টেক্সট একেবারেই সাদামাটা। ‘এ কেমন মা’ গল্পটির টোন সাম্প্রতিক বিবেচনায় গুরুত্বের দাবিদার। চাকরিজীবী মায়ের সময় স্বল্পতা, তার সঙ্গে সন্তানের মানসিক সংকট তৈরী করে’— এটিই গল্পটির উপজীব্য। অবশ্য শেষ পর্যন্ত আশ্রয় মেলে মায়ের অপত্যস্নেহেই : ‘সমুদ্রের পার আছে তল আছে তার/ অতল অপার  স্নেহ মাতৃস্নেহ  পারাপার।’

প্রত্যেক লেখকেরই রয়েছে এক সচেতন প্রস্তুতিপর্ব— অর্থাৎ, লেখক হয়ে উঠতে হয়। ছোটকাগজগুলো এই লেখক হয়ে উঠার জায়গা। যা নবীন লেখকদের আশ্রয় দেয়, ছায়া দেয়, দেয় প্রেরণা। শব্দ এই ভূমিকাটিই পালন করে আসছে দীর্ঘ চুয়াল্লিশ বছর ধরে। শব্দর এই নিরলস পথচলা নিঃসন্দেহে অভিবাদনযোগ্য।

নাজমুল হাসান পলক

———————————————-

পাঠক কহেন…

পাঠ : চিহ্ন ¬৩১
সম্পাদক : শহীদ ইকবাল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

চিহ্নের উজ্জীবনসূত্র
গৌরাঙ্গ মোহান্ত
ঢাকা

মাঝে মাঝেই ভাবি, অধ্যাপক শহীদ ইকবাল কোথা থেকে এতো শক্তি লাভ করেন! ‘চিহ্ন’-এর ৩১-তম সংখ্যা বরাবরের মতো বিজ্ঞাপনশূন্য। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে গাঁটের টাকা খরচ করে ২৮৮ পৃষ্ঠার উজানমুখো এ পত্রিকাটির সৃজনস্পন্দন সচল রাখতে হয়। প্রকাশনার বাইরে ‘চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলা ২০১৬’ আয়োজনের ব্যাপকতা আমাকে বিস্মিত করে তোলে। কেন্দ্রে টঙ্কাদীপ্তির যেমন প্রভাব রয়েছে তেমনি প্রান্তধামে হৃদয় ঋদ্ধির প্রাচুর্য। আমি বিশ্বাস করি অসম্ভব হৃদয় ঋদ্ধি অধ্যাপক শহীদ ইকবালকে সমুদ্রগামী করে তুলেছে।

নি¤œবর্গীয় মানুষের মহাজীবনের রূপকার মহাশ্বেতা দেবী এবং আধুনিক চেতনার ধারয়িত্রী নূরজাহান বেগমের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত হয়েছে ‘চিহ্ন’-এর সংখ্যাটি। এ নিবেদন প্রয়াসের সাথে চিহ্নচরিত্রের রয়েছে গভীর অনুবন্ধ। শহীদ ইকবালের ‘সমস্ত ধূসর প্রিয়’ ট্রিলজির ‘নয়ন মেলেপর্ব’ প্রান্তিক মানুষের দুঃখ-বেদনা, প্রেম, শরীরচেতনা, দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক বোধের দীপ্র প্রকাশ। সাধু, চলিত ও রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে লেখক যে প্রকাশভঙ্গি আয়ত্ত করেছেন তা প্রান্তবাসীর জীবনাচরণের অকৃত্রিম রূপায়ণে আবশ্যিক। এ ট্রিলজির সাথে ইমানুল হকের সাক্ষাৎকারের একটি অন্তর্গত সাদৃশ্য রয়েছে। তিনি পিছিয়ে থাকা মানুষদের বিষয়ে উচ্চারণ করেন, ‘তারা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা মানুষ’। আমাদের দৃষ্টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘অন্ধরাও তো কিছু দেখতে পায়, আমরা আসলে জীবন্মৃত, আমরা বেঁচে আছি কি মরে গেছি জানিনা, আমরা বেঁচে থাকার ভান করে আছি, কিংবা চিন্তাহীন বেঁচে আছি, আমাদের আসলেও কোনো চিন্তা নাই, আমাদের এতো গল্প কবিতা লেখা হবে, এই ডেকোরেটর কর্মীকে নিয়ে লেখা হবে কী? কিংবা যারা বাঁধাই করে আমাদের এতো সুন্দর বই উপহার দিচ্ছে, তাদের কথা কোথাও লেখা হবে কি?’ ‘চিহ্ন’ দর্শন নিয়ে ইমানুল হক ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। চিহ্নমেলার সৃজন-উদ্দীপক আয়োজন জাতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। ‘অভিবাদন— জাতি গঠনের কাজে ব্রতী চিহ্নমেলা’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি তার প্রত্যয়কে বাক্সময় করে তোলেন, ‘…জাতিকে জাগাতে হলে জাগাতে হয় তার আত্মমর্যাদাবোধকে। আত্মমর্যাদা জাগলে বিকশিত হয় ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি। আর এ সবের পরিণতি জাতির নব-উজ্জীবন।  সেই আত্মমর্যাদাবোধ ও জাতি জাগরণের লক্ষ্যে কাজ করছেন চিহ্নমেলা – বিশ্ববাঙলার সংগঠকেরা।’

‘চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলা ২০১৬’ শীর্ষক ক্রোড়পত্র আত্মানুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার ধারণা জন্মেছে। ‘বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ নিয়ে হাসান আজিজুল হক, আনিসুজ্জামান, সনৎকুমার সাহা, জুলফিকার মতিন, সেলিনা হোসেন, রুহুল আমীন প্রামাণিক ও ইমানুল হক আড্ডায় অংশগ্রহণ করেন এবং চিন্তার দিগন্তকে বিস্তৃত করে তোলেন। তাদের দৃষ্টিতে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান— এঁরা সকলেই শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তবে সনৎকুমার সাহার একটি ইঙ্গিত আমাকে স্পর্শ করেছে। গৌতম বুদ্ধকে আমরা বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি কিনা সে বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। গৌতম বুদ্ধের যুগে বাঙলা ভাষা না থাকলেও প্রাকৃত ভাষা বিদ্যমান ছিলো এবং প্রাকৃত মাগধি ও প্রাকৃত মৈথিলির একটি অংশ বঙ্গভাষী অঞ্চলভুক্ত ছিলো বলে তিনি অবহিত করেন। ‘বাঙালির ইতিহাস’ (আদিপর্ব) গ্রন্থে নীহাররঞ্জন রায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, বাঙলার ‘উত্তর-সীমায় সিকিম এবং হিমাচল-কিরীট কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র-তুষারময় শিখর…গুপ্ত স¤্রাট সমুদ্র গুপ্তের আমলেই দেখিতেছি নেপাল তাহার রাজ্যের পূর্বতম অংশের উত্তরতম প্রত্যন্ত দেশ।’ এ ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সনৎকুমার সাহার বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

কবিকে জানার জন্য তাঁর গদ্য অবিকল্প ভূমিকা পালন করে। ‘চিহ্নমেলার হাত ধরে শিকড় চিহ্নের সন্ধান’ নিবন্ধে উমাপদ কর চিহ্নমেলার পরিবেশ নিয়ে যেমন আলোচনা করেছেন তেমনি তিনি ব্যক্ত করেছেন তাঁর সংক্ষিপ্ত কাব্যপ্রত্যয়। তাঁর ‘আলোর হাঁসুয়া’ কাব্যটির অর্থ নিয়ে আড্ডারুগণ ঔৎসুক্য প্রকাশ করলে তিনি জানান ‘অন্ধকারকে কাটতে এর জুড়ি নেই।’ উমাপদ করের কাছে বাংলাদেশ তীর্থতুল্য। এদেশে তাঁর পূর্বপুরুষগণ জীবন অতিবাহিত করেছেন। আদিমাতৃভূমির প্রতি তাঁর আন্তরিক টান আমাদের উদ্বেলিত করে। তিনি তাঁর নিবন্ধে মাসুদার রহমানের সহযোগিতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। যে বিষয়টি তিনি তাঁর নিবন্ধে প্রকাশ করেননি তা কম আনন্দদায়ক নয়। রাজশাহী থেকে ফিরে তিনি ঢাকায় আমাদের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠেন। একটি সন্ধ্যায় দীর্ঘ সময় ধরে উমাদা, রোবায়েত ও আমি জগন্নাথ হলের পুকুর পাড়ে সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার কৃৎ-কৌশল নিয়ে আলোচনায় ব্যাপৃত হই। তিনি কিশোরগঞ্জে চলে যান পূর্বপুরুষের জন্মভিটে, বাবার পূর্বতন কর্মস্থল আজিমুদ্দিন হাই স্কুলের সন্ধানে। হাই স্কুল দেখতে পেলেও তিনি বাস্তুভিটে প্রত্যক্ষ করতে পারেননি। ঢাকায় ফেরার পর আবার তাঁর সাথে আমরা আড্ডার আয়োজন করি। শিকড়ের চিহ্ন দর্শনের জন্য তার সজল আকুতি আমাদের অভিভূত করে, ‘শিকড়ের কিছু চিহ্ন তো স্পষ্ট হলো মননের মনিকোঠায়। এর মূল্য তো কম নয় আমার কাছে। দাদু ছিলেন নামকরা কবিরাজ। তাঁর নাম মা-বাবার মুখে শুনেছেন কোনো কোনো বয়ষ্ক মানুষ। কিন্তু বাড়ির হদিস তাঁরা জানেন না। এই বা কম কী? ধুলো সংগ্রহ করে আনিনি, সে রইলো আমার অন্তরে। একটা চিনচিনে ব্যথা কি আমাকে ঘিরে ধরেছিলো? চোখ কি সজলতা থেকে বাষ্পাকারের দিকে ছুটে গিয়েছিলো? হয়তো। আমি কি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলাম? একটা আশার আলো ঝিলিক তুলেই কি হারিয়ে যাচ্ছিলো আমার মধ্যে? হতেও পারে।’

কবি হিসেবে মাসুদার রহমানকে চিনবার জন্য ‘একানব্বই’ জরুরি বলে মনে করি। তাঁর এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে নৈঃসঙ্গ্য চেতনা, সাবঅলটার্ন মানুষ এবং কবিতার পটভূমি বিস্ময়করভাবে স্ফুরিত হয়েছে। কবিতাকে তিনি দেখেন ‘একাকীত্বের পাশে এক ঝাড় হা¯œাহেনা’ হিসেবে। তাঁর গ্রাম সোনাপাড়া কবিতা ও ধান শস্যের উৎস ভূমি। কবিতাময় গ্রামের পরিবেশ এঁকেছেন পরম হৃদ্যতার সাথে, ‘রাতে ঘুম আসছেনা খুব বৃষ্টিতে, কুয়াশায়। ধানসমুদ্র মাঠে অচেনা সেই একলা গাছটি কতো কিংবদন্তি তাকে ঘিরে। কেউ জানেনা কি নাম এই গাছটির। এমন গাছ এলাকায় আর কেউ দেখেছে? এপাশ ওপাশ করে ঘুমিয়ে গিয়েছি, জেগে গেছি মধ্যরাতে খুব বৃষ্টিতে ভেবেছি, ধানসমুদ্রের মাঠে একলা গাছটি কি খুব কষ্ট পাচ্ছে ঝড় জলের রাতে। শীত ও কুয়াশায় কি খুব কষ্ট হচ্ছে ওর। আমার নিঃসঙ্গতার পাশে সব সময় ধানসমুদ্রের একলা গাছটি। একদিন দেখি সেও নেই। ধূ-ধূ মাঠ শুধু জোৎ¯œায় কেঁদে যাচ্ছে।’ ‘ডায়ালের জাদু’ কাব্যের কবিতায় বিশেষত ‘বৃষ্টির রাতে’ এবং ‘ধানসমুদ্রের মাঠ ও একলা গাছটি’র ভেতর কবির গ্রাম মাঠ ও গাছের প্রতিচ্ছায়া ভাস্বর হয়ে উঠেছে । ‘বৃষ্টির রাতে’ কবিতায় যখন তিনি উচ্চারণ করেন ‘এই ঝড় ও বৃষ্টির রাতে ধানসমুদ্রের একাকী গাছটি/সেও তবে উঠে গেছে নিঃসঙ্গ কবির ডেরায়!’ তখন অকৃত্রিম সংবেদনার বিষয়টি মূর্ত হয়ে উঠে। ‘ধানসমুদ্রের মাঠ ও একলা গাছটি’ কবিতায় যখন উচ্চারিত হয় ‘ধানসমুদ্র মাঠের মধ্যে একাকী গাছটির কথা ভাবি/ঘন বৃষ্টির রাতে এবং খুব শীত/তার একটি চাদরও নেই কিংবা একটি ছাতা/দিনের বন্ধুত্ব নিয়ে পাখি আসে/দিন শেষে ফেরে/তারপর বিষাদ ও বিষণœতা/সংক্রামক/আমিও বিষণœ হই। এই বিষণœতা ভাল/বাহু ও আঙ্গুলগুলো আকাশে ছড়িয়ে/গাছটির পাশে গাছ হয়ে আমিও দাঁড়াব’ তখন কবির সমস্ত নিঃসঙ্গ সত্তা আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘চিহ্ন’ পাঠে কবি, কথাশিল্পী ও গবেষকগণকে চিনে নেবার সুযোগ পাই, নিজেকে ঋদ্ধ করে তুলি।

—————————————————

পাঠ : চিহ্ন ¬৩১
সম্পাদক : শহীদ ইকবাল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

অনেক বাধা পেরিয়ে
সদ্যসমুজ্জ্বল
নড়াইল

একদিন এক করে বেঁচে থাকা জীবনে পড়ার সুয়োগ খুব কম। কিন্তু পড়তে হয় পরের দিনের আয়ু বাড়ানোর জন্যে। সে পড়াটাও পরিকল্পিত নয়। চোখের সামনে যা আসে বিক্ষিপ্তভাবে সেটাই পড়ি। এভাবেই চলছে আমার কিংবা আমাদের নাগরিক দিন। এসবের মাঝে লিখতে পারা মানে সোনার হরিণ হাতে পাওয়া। সত্যিকার অর্থে তেমন লেখার সুযোগ নেই। যদিও আমি লিখেই জীবনের দায় মেটাচ্ছি। বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই, যা লিখছি তা কেবল মেধা বিক্রি বৈ কিছু নয়। তবে দায় ও কর্তব্যের নিয়ত প্ররোচনা আমার প্রেরণা। তবুও খানিকটা গুটিয়েও রাখতে হয় নিজেকে, নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে। কিন্তু বিধি বাম। চিহ্ন ৩২-এর সহযোগী সম্পাদকের আহ্বানে প্রথমে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিলাম। কীভাবে সম্ভব! যদিও সম্ভব না করে উপায়ও ছিল না। তাই চিহ্ন ৩১ সংখ্যার পাঠ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানাতেই হলো।

সম্প্রতি শেষ হয়েছে ‘চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলা’। চিহ্ন ৩১ সংখ্যার শুরুতেই ‘চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলা’র ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়েছে। ক্রোড়পত্রের প্রথমে প্রকাশিত হয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সাতজন জীবন্ত কীংবদন্তীর আলাপচারিতা। হাসান আজিজুল হক, আনিসুজ্জামান, সনৎকুমার সাহা, জুলফিকার মতিন, সেলিনা হোসেন, কবি রুহুল আমিন প্রামাণিক ও ইমানুল হক (ভারত) আলাপচারিতায় অংশ নেন। তাঁরা বাংলাভাষী, এবং মূলত বাঙালি। তাদের চোখে অর্থাৎ ‘বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ কারা সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাদের কথোপকথন এগিয়ে যায়। এদের মধ্যে আলোচক ছিলেন প্রধানত ছজন। হাসান আজিজুল হক ছিলেন আড্ডার সঞ্চালক। তাঁদের আলোচনায় বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিচেতনা, বাঙালির চিন্তা-চেতনা প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে। এসবের উৎকর্ষ সাধনে যারা অবদান রেখেছেন কথকবৃন্দ তাদের নামও উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁদের মুখে পাঁচ জনের নাম বেশি উচ্চারিত হয়েছে। রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান— এঁরা বাঙালির নিশ্বাস; সমস্ত আশ্রয় শেষে এঁরাই বাঙালির শেষ আশ্রয়স্থল। এই মনীষী মহলের বাইরেও আমরা কিছু নাম যুক্ত হতে দেখি আড্ডাবাজ নায়কদের মুখে। ভুসুকুপা, শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ, চৈতন্যদেব বাংলা ও বাঙালির চেতনার অনেকটা স্থান দখল করে আছে। অবশ্য খানিকটা আলো-আঁধারীর মতো সমর্থনের তীরটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দিকেই ছিলো। কিন্তু কোনো আলোচকই কোনো একককে শ্রেষ্ঠ বলে মেনে নিতে নারাজ। এই কার্যকারণবশত সপ্তপা-বদের মুখ থেকে কোনো শ্রেষ্ঠতম বাঙালির নাম জানতে পারি না। কোনো মীমাংসা ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়। আড্ডাবাজদের মতে, আমাদের কাছেও স্পষ্ট, এরা নিজস্ব কর্মকা-ে কিংবা চেতনা-যাতনায় প্রত্যেকেই শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

ক্রোড়পত্রের দ্বিতীয় আয়োজন আমাকে একটু ভিন্ন প্রণোদনায় উদ্বেলিত করেছে। কয়েক জন চিহ্নআড্ডারু ‘চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলা ২০১৬’তে আগত চিহ্ন-আত্মীয়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় মজে ছিলো। কবি ও সম্পাদক সুকুমার ম-ল (ভারত), জুলফিকার কবিরাজ, কবি অমিতাভ চক্রবর্তী (ভারত), কবি মাকিদ হায়দার, সম্পাদক সঞ্জয় সাহা (ভারত), বীরেন মুখার্জী, সম্পাদক মোমিন হৃদয়, সম্পাদক লুৎফুর রহমান সাজু, সম্পাদক সাফিয়ার রহমান, সম্পাদক আলী এহসান— এঁরা বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষা; ব্যাপক অর্থে বাংলা সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি-চর্চার চাকা সচল রাখতে পরিশ্রমী নাবিক। এই নাবিকদের সঙ্গে আড্ডারু তরুণদের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে এদের জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আশা-হতাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি কিংবা এরা কেন লেখেন, কী লেখেন, কাদের জন্য লেখেন, লেখার উদ্দেশ্য কী ইত্যাকার নানাবিধ প্রসঙ্গ। এই যুগনায়কদের কথার সারাংশ মেলে মোমিন হৃদয়ের বচনে- ‘মানুষে মানুষে এই যে চারিদিকে এতো ব্যবধান। এই ব্যবধান কমানোর জন্য লিখি। আর লেখার মধ্য দিয়ে আমি যেন বেঁচে থাকতে পারি¬— লেখার ক্ষেত্রটা আমার প্রেরণা।’

তারেক রেজা, ইমানুল হক, অতনু ভট্টাচার্য, উমাপদ কর, এস এম তিতুমীর, হাসান রাকিব— এঁদের ‘চিহ্নমেলা বিশ্ববাঙলা ২০১৬’র অভিজ্ঞতার ‘বয়ান’ ক্রোড়পত্রের তৃতীয় আয়োজন। অভিজ্ঞতা বর্ণনে সকলেই সচেতন। অমনোযোগী ছাত্রের মতো কেউ নন। কেবল মাঠের ‘গরু’ দেখেই তারা বিদায় হননি। রঙে-স্পর্শে-দর্শনে সবাই চিহ্নমেলা উপভোগ করেছেন— বিষয়টি তাঁদের লেখা পাঠে আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়। সবার মুখে মেলার নিরঙ্কুশ প্রশংসা আর নিজেদের অভিজ্ঞতা পাঁচালি বেশি শোনা গেলো। অতঃপর, সবাই মুগ্ধ— চিহ্নমেলার মনোলোভা তৃতীয় কা- পাঠে। অবশ্য সেখানে আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম!

ক্রোড়পত্রের শেষ আয়োজন চিহ্ন কর্তৃক পুরস্কৃত দুজন লেখকের দুটি মূল্যায়নধর্মী আলোচনা নিয়ে। চিহ্ন সৃজনশীল ও মননশীল শাখায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ দুজন লেখককে পুরস্কৃত করে। ২০১৬ সালে সৃজনশীল শাখায় কবি মোস্তাক আহমাদ দীন এবং মননশীল শাখায় গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, গবেষক শরীফ আতিক-উজ-জামানকে চিহ্ন পুরস্কৃত করেছে। বাংলা সাহিত্যে (তাঁদের) মুখর পদচারণা থাকলেও চিহ্ন এঁদেরকে আমাদের কাছে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এদের দুজনকে নিয়ে মূল্যায়নধর্মী আলোচনা লিখেছেন যথাক্রমে কুমার দীপ ও দিব্যদ্যুতি সরকার। আলোচকদের আলোচনার মাধ্যমে পাঠক সহজে লেখকদ্বয়ের বোধের উত্তরণের জায়গাটি চিহ্নিত করতে পারেন। কবি মোস্তফা আহমাদ দীনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কবি কুমার দীপ বলেছেন, ‘হাসান-রুদ্র প্রমুখে ¯œাত আমি এই সময়ের তরুণ হয়েও অনেক তরুণ বা তরুণোত্তর কবিদের কবিতা বুঝি না; তাদের ভাব-ভাষাকে নিজের করে নিতে পারি না; এইসব তীব্র সীমাবদ্ধতা অকপটে স্বীকার করেই দীনের কবিতা পাঠ ও পাঠোত্তর প্রতিক্রিয়া প্রকাশে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। …পাঠক হিসেবেই দেখতে চেয়েছি তার কবিতাকে। কিছু পঙ্ক্তি আর দু-চারটা কবিতা আমাকে স্বস্তি ও আনন্দ দিয়েছে, …কিন্তু কবিতায় আমি সব ধরণের জীবনসত্য প্রকাশের পাশাপাশি যে শিল্প ও সুন্দরের স্বরূপ সন্ধান করি, তার দেখা খুব একটা পাইনি।’ এই ভাষ্যের সত্যতা কতটুকু সে বিষয়ে কুমার দীপ নিজেই সন্ধিহান। কারণ পাঠক হিসেবে নিজের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি ইনি আগেই স্বীকার করেছেন। তাই কবি মোস্তাক আহমাদ দীনের মূল্যায়ন আমরা সময়ের কাঠগড়ায় উঠিয়ে দিতে পারি। অপরপ্রান্তে  শরীফ আতিক-উজ-জামানকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে দিব্যদ্যুতি সরকার প্রশংসার ডালা নিয়ে হাজির হয়েছেন। শরীফ আতিক-উজ-জামান মূলত প্রবন্ধ, অনুবাদ ও ছোটগল্পে নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন। তার কাছ থেকে আমরা বিশ্বসাহিত্যের কিছু মূল্যবান গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ পেয়েছি। লেখক কিংবা অনুবাদক হিসেবে যে-কারো সীমাবদ্ধতা থাকবেই। কিন্তু আতিক-উজ-জামানকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে দিব্যদ্যুতি সরকার কুমার দীপের বিপরীত ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাই শরীফ আতিক-উজ-জামানের সৃষ্টির স্থায়িত্বের দায়ও আমরা সময়ের হাতে ছেড়ে দিলাম।

চিহ্নর নিয়মিত বিভাগ নিয়ে আমার বিশেষ কৌতূহল। বিশেষ করে ‘কী লিখি কেন লিখি’ এবং ‘শেষ পাতার আহ্বান’-এর লেখাগুলো আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। কেন লিখি? সম্ভাবত মানিকই প্রথম লেখকদের ভাবতে শেখান এই বিষয়ে। মানিক কেন লিখতেন তার কৈফিয়ৎ ‘কেন লিখি’ শিরোনামের এই লেখায় স্পষ্ট করেছেন। তা ছাড়া লেখক হয়ে হওয়ার সূত্রটিও আমাদের দেখিয়ে দেন। ‘দাতব্য উপলব্ধির চাপ ছাড়া লিখতে চাওয়ার উগ্রতা কিসে আনবে!’ তার এই বয়ান সব কালের সব যুগের লেখকদের কাছে বেদবাক্যস্বরূপ। যতটুকু মনে পড়ছে, মানিকের এই লেখাটা আগে চিহ্নর কোনো একটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। বোধ করি, নতুন কোনো লেখা না পাওয়া সাপেক্ষে এই লেখাটির পুনঃমুদ্রণ করা হয়েছে।

‘অচেনারে ভয় কী আমার ওরে/অচেনারে চিনে চিনে উঠবে জীবন ভরে’। এক অনিবার্য সত্যের মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের দাঁড় করিয়েছেন এই গানের মধ্য দিয়ে। আমাদের ভেতরের আচেনা মানুষটিকে না জেনে না চিনে অন্যকে চেনার কিংবা জানার দুঃসাহস দেখাই। আপনকে চেনার কথা নানা ছলে বহু মনীষী বলেছেন। সক্রেটিসও বলেছেন ‘নিজেকে জানো’। কারণ নিজেকে জানার মধ্যেই প্রকৃত সত্য লুকিয়ে থাকে। চিহ্নর একত্রিশতম সংখ্যায় ন’জন লেখক নিজেদেরকে এই যন্ত্রণাদায়ক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। কানাই সেন, মাসুদার রহমান, শামীম সাঈদ, অহ নওরোজ, খোরশেদ আলম, মেহেদী উল্লাহ, নাসিমুজ্জামান সরকার, নাজমুল হাসান পলক, রেজওয়ানুল হক রোমিও— সবাই যাপিত জীবনের আখ্যান উপস্থাপন করেছেন, ব্রতী হয়েছেন সত্য উদ্ধারে। বলতে সংকোচ হচ্ছে, জীবনসত্যের গূঢ় তত্ত্বটি তাদের জবানীতে অনুপস্থিত; এই কারণে বললাম— আমি তো দেখি নিজেরে তোমার মাঝে। অবশ্য লেখকগণ যেভাবে নিজের সম্পর্কে বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন তাতেই কা-জ্ঞানহীন অবোধ আমি মুগ্ধ। স্বীকার করছি আমি একটি শব্দও নিজের সম্পর্কে লিখতে পারবো না।

জীবন ছাড়া কি গল্প হয়! কিন্তু পীড়িত জীবনকে কজনইবা গল্প বানায় কিংবা পীড়িত জীবনের দায় কজনইবা নেওয়ার সামর্থ্য রাখে। সবুজ ম-ল ব্যতিক্রম; তাই তিনি লেখক। যে জীবনে গল্প নেই কিংবা যে গল্পে জীবন নেই তা কখনো মনুষ্যবিষয়ক নয়। সবুজ ম-ল গল্পের জীবন কিংবা জীবনের গল্প শুধু খোঁজেননি— গল্পের সামজিক সম্পর্কও তিনি নির্ণয় করেছেন। জীবনের গভীরে প্রথিত ব্যবহারিক জীবনের অনুষঙ্গও হয়ে ওঠে আমাদের ভাবানার মৌল উপাদান। আমাদের ক্লান্ত জীবনে সময়ের মাপকাঠি নির্ণিত হয় হতাশার ধারাপাতে। সবুজ ম-ল নিজেও হতাশ-ধারাপাতের নিশ্চিত পাঠক। তাই তিনি বলতে পেরেছেন, ‘সংকুচিত জীবনের ক্ষণটিতে নিঃশ্বাসের পালা কামারের ঝাপরের মতো ওঠানামায় ব্যস্ত থাকে। আগুনটা তাতিয়ে দেওয়াই তার কাজ।’ ‘ইতি হতঃ চিরকৌমার্য্য’ পূর্ণতা পায় ‘তারপর লবণাক্ত জল চাঁদের আলোয় লবণাক্ত স্বাদ গ্রহণে তৎপর হয়। সঞ্চিত তরল ফোঁটা শেষ হওয়ার কালে দ্রুত থেকে ধীর হয়, পাতলা থেকে গাঢ়। নিঃসরণ শেষে একসময়ে স্তব্ধ হয় আদান-প্রদানের মানসিক যুদ্ধ।’র পর্যায়ে এসে।

গল্পকার সাব্বির জাদিদ আমাদের গল্পসাহিত্যে বেশ দাপিয়ে বেড়াবে; আমার বিশ্বাস। রাষ্ট্রীয় যন্ত্রণার এমনতর ছায়াছবি খুববেশি দেখা যায় না সচারচর। সাব্বির জাদিদ সাবলীল, সেইসঙ্গে শক্তিমান। স্বপ্নপোড়া মানুষের বাস্তব রূপায়ন যেন ‘এ জার্নি বাই হর্স এন্ড ফিস’ গল্পটি। বিশ্বাস সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। কিন্তু না! কিছু বিশ্বাস আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে দেয় না। যে বিশ্বাসের প্রথম শর্ত স্থবিরতা, অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া। কতিপয় ছন্নছাড়া স্বপ্নবাজ মানুষের জন্য আজকের এই পৃথিবী এত সুন্দর। যদিও তাদের স্বপ্ন পূরণের এই পথ মধুর নয়। ‘নিয়মে বিশ্বাসী’ ‘সামাজিক মানবজাতি’ এই ছন্নছাড়াদের প্রধান বাধা। ‘সামাজিক মানুষ’ ইচ্ছে শব্দটাকে কোনোভাবেই আমলে নেয় না। যদি যন্ত্রণা পেতে হয় এই ভয়ে! আবার যারা ইচ্ছের ভেলা ভাসাতে চায় তাদের চলার পথে এরাই ‘না’ ‘না’ বলে চিৎকার করে। এই চিৎকার ছিলো আছে থাকবে এবং মানুষ ইচ্ছে কিংবা স্বপ্নের পিছনে দৌড়াবে। এটাই নিয়ম।

কবি জুলফিকার মতিন, কবি ইউসুফ মুহাম্মদ, কবি সায়ীদ আবুবকর, আযাদ কামাল, শামীম হোসেন, নূহ-উল-আলম লেলিন, শিবলি মোকতাদির— এঁদের কবিতা নিয়ে চিহ্নর কবিতা-আয়োজন। এই সংখ্যায় প্রবন্ধ লিখেছেন— আখলাকুর রহমান, মাসুদ পারভেজ ও মহীবুল আজিজ। সমাজতান্ত্রিক ইকোনমির রূপরেখা নামক প্রবন্ধে আখলাকুর রহমান উদাহরণসহযোগে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠমো আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উৎপাদন সম্পর্ক ও সম্পত্তির মালিকানা, অর্থনীতির বিধি, সম্পত্তির মালিকানার ধরণ, পূর্ব পরিকল্পনা ও সুষম বিকাশ, কাজের অনুপাতে সম্পদ বণ্টন, শ্রমের সামাজিক বৈশিষ্ট্য, পণ্যোৎপাদন, পণ্যের মূল্য ও মূল্যবিধি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সামগ্রিক আলোচনা পাঠে এটুকু বোধগোম্য যে, প্রাবন্ধিক সমাজতান্ত্রিক ইকোনোমির একটা সঠিক ও নির্ভরযোগ্য রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন। তবে সাহিত্য পাতায় অর্থনীতিবিষয়ক প্রবন্ধের যোগসূত্র কতটুকু তা ভাবার বিষয়।

‘সংশয়ের সাহিত্য’ শিরোনামের প্রবন্ধটিতে মাসুদ পারভেজ কিছু যৌক্তিক জায়গা আমাদের সামনে এনেছেন। যারা সাহিত্যচর্চায় ব্রতী তাদের চিন্তার কিংবা চেতনার জায়গা অনেকাংশে অস্পষ্ট। তা ছাড়া সাহিত্যচর্চার চেয়ে সাহিত্যকে প্রচার করার ব্যাপারটা মুখ্য হয়ে উঠেছে। মিডিয়ার দৌরাত্ম্য এখন এতটাই প্রকট যে, মিডিয়ার দারস্থ না হলে প্রচার কিংবা প্রসার সম্ভব নয়। হচ্ছেও তাই। যারা প্রচারবিমুখ তারা সত্যিই থেকে যাচ্ছে লোকচক্ষুর আড়ালে। তবে এটাই শেষ কথা নয়। যোগ্যতমের ঊর্ধ্বতন টিকে থাকবে, অর্থাৎ সেরা সাহিত্য মানুষের মনে স্থান পাবেই।

মহীবুল আজিজ ‘অনুপম সেন : এক সুসংস্কৃত মন ও মনন’ শিরোনামের প্রবন্ধটিতে সামজবিজ্ঞানী অনুপম সেনকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। মূলত সামজবিজ্ঞানী হলেও প্রাবন্ধিক সাহিত্যিক অনুপম সেনকে পরিচিত করতে চেয়েছেন, যা লেখকের বক্তব্যে স্পষ্ট— ‘…তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্ম সেই ভাবনা দ্বারা পরিচালিত। হ্যাঁ, ‘সাহিত্যকর্ম’ শব্দটি আমি জ্ঞানতই ব্যবহার করছি এ স্থলে। আমরা তো জানি, যে-জিনিসের মধ্যে ‘সহিতত্ব’ নিহিত থাকে তা-ই সাহিত্য পদবাচ্য।’ লেখকের এই বক্তব্য আমাদের অনুপম সেন পাঠে অনুপ্রাণিত করে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বেশ কিছু সংগঠন নিয়মিত সংস্কৃতিচর্চায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। প্রতি সংখ্যায় চিহ্ন একটি সংগঠনকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। এবার সমকাল নাট্যচক্রকে আমাদের সামনে এনেছে চিহ্ন। ১৯৮১ সালের ২৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি ৬১টি নাটক প্রযোজনা করেছে, যার মধ্যে ১৪টি মঞ্চ নাটক। তা ছাড়া রনিক দাস অপুর লেখার মাধ্যমে আমরা সংগঠনটির যাবতীয় কর্মকা- সম্পর্কে জানতে পারি। গ্রন্থ ও পত্রিকা আলোচনাপর্বে রহমান রাজুর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘সাহিত্য : সৃজনে মননে’, শেখ নাজমুল হাসানের গল্পগ্রন্থ ‘সবুজ আগাছা কিছু’, সৈকত আরেফিনের গল্পগ্রন্থ ‘পাতা ও পতত্রি’, অরুণ সেন সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘ঋতপত্র’ আলোচিত হয়েছে। আলোচনা করেছেন যথাক্রমে দীপ্ত উদাস, নিত্য ঘোষ, রফিক সানি, সুবস্ত যায়েদ। পাঠক কহেনপর্বে আমরা খুলনার ইমরান কামাল ও চট্টগ্রামের মোহাম্মদ শেখ সাদীর চিহ্ন ৩০-এর পাঠ পরবর্তী অনুভূতি সম্পর্কে জেনেছি। অনুবাদ অংশে অনুবাদক রাসেল রহমান ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম কবি টেনিসনের ‘ঞযব খড়ঃড়ং-ঊধঃবৎং’ ও শামসুর রাহমানের ‘রূপলী ¯œান’ নামক কবিতার তুলনামূলক আলোচনা সমৃদ্ধ একটি প্রবন্ধের অনুবাদ চিহ্ন পাঠকদের পাঠের সুযোগ করে দিয়েছেন। কবিতা দুটির পারিপার্শিকতা, শিরোনাম, বিষয়বস্তু, মৃত্যুচেতনা, অশুভ অপশক্তি সম্বন্ধে সচেতনতা, ¯্রষ্টার অবস্থান, অতীতের প্রতি পিছুটান প্রভৃতি বিষয়ের তুলনামূলক আলোচনা উঠে এসেছে প্রবন্ধটিতে। সম্প্রতি প্রকাশিত নির্বাচিত পুস্তক ও পত্রিকার পরিচিতি অংশে যেসব পত্রিকার নাম উল্লিখিত হয়েছে সেগুলোর নাম পূর্বেই জেনেছি। অবশ্য বাকি সমস্ত গ্রন্থই আমার অপরিচিত। সুবিদা এই, গ্রন্থগুলো সম্পর্কে এক নজরে জেনে নেওয়া গেল।

যার ধর্ম এগিয়ে যাওয়া তাকে বাধা দেওয়া যায়, আটকানো যায় না। চিহ্নও অনেক বাধা পেরিয়ে এখনো সমুজ্জ্বল। চিহ্ন’র এই গতি সূর্যের মতো তেজি; বায়ুর মতো তার চঞ্চলতা। আরো সফল সাধনার সারথি হবে চিহ্ন নিশ্চিত জেনেছি আমি কিংবা আমরা— জানবে পরবর্তী সময়ের ধারকেরাও।

———————————————

 

সম্প্রতি প্রকাশিত পত্রিকা ও পুস্তক পরিচিতি

ধানসিড়ি
সম্পাদক : মুহম্মদ মুহসীন
বর্ষ : ২৫ ॥ সংখ্যা : ৭ ॥ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৪৩২
অক্টোবর ২০১৬ ॥ বরিশাল

পত্রিকাটির প্রচ্ছদে কবির স্কেচ, সেই একটিই প্রতিকৃতি যাঁর— জীবনানন্দ দাশ— তাঁকে ঊর্ধ্বে রেখে শামসুদ্দীন আবুল কালাম ও আলেহো কার্পেন্তিয়ের। আরও দুটো মুখচ্ছবি গল্পকার মহীবুল আজিজ ও কবি মাসুদ খানের। পত্রিকাটির সূচি বিন্যস্ত হয়েছে এই পাঁচকে আবর্তিত করে।

‘ধানসিড়ি’ পূর্ণায়ত মননশীল কাগজ। এটির চারিত্র্য-স্বাতন্ত্র্য ও মূল্য উচ্চতাস্পর্শী বলে বিবেচ্য— কয়েকটি কারণে— এক. বরিশালের ভূগোলে বেড়ে ওঠা এক ‘কলমপেশা মজুর’কে বিচিত্র পর্যবেক্ষণে মূল্যায়নের অভিপ্রায়, দুই. বিদেশী অনিবার্য একজন সাহিত্যিকের পাঠ-নিরীক্ষণ, তিন. পুরস্কারপ্রাপ্ত দুজনের প্রাপ্তি ও যোগ্যতা নির্ধারণ— সে লক্ষ্যে বিস্তর পত্রপুটে বিষয়ান্যাস, চার. জীবনানন্দকে সর্বোপরি-রূপে প্রাত্যহিকতায় আলোয় আনা— চকিত, তাৎক্ষণিক এসব আয়োজন ও ব্যাপারসমূহকে আমলে নিয়ে— এমনটা জানানো যায়, ‘ধানসিড়ি’র পাঠকদের জন্য এ এক মজার অভিজ্ঞতা। আর এ অভিজ্ঞতাকে উপলব্ধ করবার সুযোগ করে দিয়েছেন— সম্পাদক মুহম্মদ মুহসীন। এ এক অসীম পরিশ্রমসাধ্য কর্মজ্ঞান— তাঁকে প্রণতি জানাই, অন্তস্তল থেকে— এমন একটি নতুন ‘ধানসিড়ি’ আমাদের হাতে তুলে দেবার জন্যে।

দ্যোতনা
প্রধান সম্পাদক : গৌতম গুহ রায়
বর্ষ : ৩৭ ॥ সংখ্যা : ১ম ॥ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৮৮
নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০১৬ ॥ জলপাইগুড়ি ॥ ভারত

‘সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনিবার্য কাগজ’ দ্যোতনা ‘অবিভক্ত বাঙালি সত্তার প্রতিবেদন’। মহাশ্বেতা দেবী, শহীদুল জহির, উৎপল কুমার বসু বিষয়ে মূল্যবান লেখা আছে। লিখেছেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, সমর রায়চৌধুরী প্রমুখ। সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী নিয়েও ঋদ্ধ আলোচনা আছে। আছে দেবেশ রায়, বেলাল চৌধুরী ও পবিত্র সরকারের গদ্য। গল্প, কবিতা, সাক্ষাৎকার নিয়ে দ্যোতনা পাঠযোগ্য একটি সংখ্যা।

বুনন
সম্পাদক : খালেদ উদ-দীন
সংখ্যা : ৩ ॥ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৭৬
নভেম্বর ২০১৬ ॥ সিলেট

প্রয়াত কবি ওয়ালী কিরণকে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ‘বুনন’। কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ লিখেছেন এখনকার লেখকদের অনেকেই। ভ্রমণাখ্যান শাকুর মজিদের হাতে আর মলয় রায়চৌধুরী থেকে ইশরাত ঝুম পর্যন্ত কবিতা লিখেছেন অনেকেই। কিছু নিরীক্ষাপ্রবণ গল্প ও কবিতা নিয়ে ‘বুননে’র মুদ্রণ ছিমছাম, পারিপাট্যময় ও আকর্ষণীয়।

ধমনি
সম্পাদক : আবদুল মান্নান স্বপন
বর্ষ : ১২ ॥ সংখ্যা : ১ম ॥ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২২৪
নভেম্বর ২০১৬ ॥ বাজিতপুর ॥ কিশোরগঞ্জ

‘ধমনি’ বরাবরই বিষয়ভিত্তিক। আর প্রতিটি বিষয়েও থাকে তার চমক। এ সংখ্যার বিষয় ‘ওস্তাদ’। কবিতা ও গল্পসমেত পত্রিকাটির বিশেষত্ব— নবতর বিষয়ের দৃষ্টিকোণে। ২৬টি প্রবন্ধ আছে “ওস্তাদ” বিষয়ে। নানা মননের নিরীক্ষাপ্রবণ গদ্যের সমাহারে বৈচিত্র্যময় এ সংখ্যাটি। কবিতাগুলো বেশ নির্বাচিত, পাওয়া যায় চেনা ও নতুন পথের অনেক প্রান্ত পর্যায়ের লেখককে। পত্রিকাটি সংগ্রহে রাখবার মতো।

কাব্যকথা কাকবিদ্যা
শিমুল মাহমুদ
অনুপ্রাণন প্রকাশন ॥ ঢাকা
প্রকাশ : অক্টোবর ২০১৬

কথাকার হলেও শিমুল মুখ্যত কবি— আর সেটা প্রমাণ হয় কাব্যকথা কাকবিদ্যার মধ্যে। শিমুল বয়স্থ হয়ে উঠেছেন— এ কাব্যে। অনেক পার্থক্য, এখন— পূর্বের চেয়ে। বোধ ও প্রজ্ঞার অনুরণন অনেককিছুর রকমফেরকে অতিক্রম করে চলছে, বলা যায়। ছোট্ট ছোট্ট কবিতা, চার-পাঁচ কিংবা অধিক পংক্তির ভেতর গড়িয়ে চলে অব্যক্ত অনুভূতির চরণশীল অভিব্যক্তি। এ অভিব্যক্তি গড়ে দেয় পাঠককে। কবির ভেতরে ছন্দে ননীর মতো তনুর আরাম আমাদের অনুভূতির দরোজাকে খুলে দেয়, নিয়ে চলে দূরায়ত স্বস্তিগ্রহে। ৫৩টি কবিতা চলতি ও চলনসই জীবনের পুনর্পাঠ— প্রেম-রোমান্স বাচ্যার্থ ও ব্যঙ্গার্থকে ঘিরে আনে নতুন প্রণয়রমণবাসনা। মিথ তাঁর অভিভূত গ্রহ। আমরা পড়ে ফেলি এ মতে কাব্যকথা কাকবিদ্যা কবিতাখানি।

শওকত ওসমান : আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
সৈয়দ তৌফিক জুহরী
চিহ্নপ্রকাশন ॥ রাজশাহী
প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৭

আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কালসাক্ষ্যরূপে জীবন্ত হয়ে ওঠে। মনে পড়বে, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন কিংবা উইনস্টন চার্চিলের অটোবায়োগ্রাফির উপযোগিতা। গান্ধী-নেহেরুও চরিত্র হয়ে ওঠেন অটোবায়োগ্রাফির গুণে। শওকত ওসমানের লেখা আত্মস্মৃতি ও স্মৃতিকথার একপ্রকার মূল্যায়ন এখানে আছে। এটি গবেষণাধর্মী কাজ। এ ধরনের বিষয় নিয়ে শওকত ওসমানের শিল্প-ধারণার একটি আলাদা মূল্যায়ন এখানে নজরে আসবে।

বইটি জন্মশতবর্ষে প্রকাশ পেল, তাতে এমন একজন লেখকের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার ঋণ কিছুটা হলেও লাঘব হলো। বইটি পাঠানুরাগীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।

শওকত ওসমান জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ
সম্পা. : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বাংলা একাডেমি ॥ ঢাকা
প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৭

শওকত ওসমান জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। শওকত ওসমানের জীবন ও সাহিত্য মূল্যায়ন করে কিছু মৌলিক প্রবন্ধ এখানে ছাপা হয়েছে। এছাড়া দুঅংশে প্রবন্ধ-স্মৃতিকথাভিত্তিক কিছু লেখা সন্নিবিষ্ট আছে। আরও আছে নির্বাচিত রচনা ও গ্রন্থপঞ্জি। পুনর্মুদ্রিত এবং স্মৃতিচারণমূলক লেখাগুলো বর্ষিয়ান অনেকের— যা গ্রন্থটির মান ও উচ্চতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। কথোপকথন পর্বটিও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া একুশে ফেব্রুয়ারি বিষয়ক লেখকের একটি বক্তৃতাও পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সম্পাদনায় সংগ্রহে রাখার মতো এ গ্রন্থটির মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র তিনশত টাকা।

উলুখাগড়া
সম্পাদক : সিরাজ সালেকীন
সংখ্যা : ২২ ॥ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৮২
জানুয়ারি-মার্চ ২০১৭ ॥ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

উলুখাগড়ার ২২ তম সংখ্যাটিতে যথারীতি অপ্রচল-সনিষ্ঠ কবি ও গল্পকারের সমাবেশ ঘটেছে। এতে চারটি মৌলিক প্রবন্ধের বিষয় ‘বাইসাইকেল থিভস্ : কালের লাঞ্ছনার মানচিত্রায়ণ’, ‘লায়লী আশমানের আয়না থেকে সংঘর্ষ’, ‘প্রযুক্তির সংস্কৃতি’, ‘অহিংসার নারী : স্বর্গচ্যূত অপ্সরী কিংবা নারী’; এছাড়া আছে কথাশিল্পী হরিশংকর জলদাসের কেন-লিখির বয়ান। শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে সৈয়দ হক ও শহীদ কাদরীকে যথাক্রমে ইসমাইল সাদী ও সৌভিক রেজার প্রবন্ধে। ‘উলুখাগড়া’র বিশেষ সংযোজন অংশটি বরাবরই আকর্ষণীয়— এতে এবার যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের কবিতার আঙ্গিক-পরীক্ষণ। চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাট ও সত্তর দশকের কবিতা নিয়ে আছে চারটি প্রবন্ধ। পত্রিকার ‘দুষ্প্রাপ্য’ শিরোনামে হাবিব আর রহমানের সম্পাদনায় বেরিয়েছে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখার্জী ও আবদুল কাদিরের পত্রাবলী। বলতেই হয়, উলুখাগড়া প্রথম থেকেই যে স্বভাবে সামর্থ্যবান বর্তমান সংখ্যাতেও তা অক্ষুণœ রয়েছে।

যদি একতারাটি বেজে ওঠে
কাজল কাপালিক
চিহ্নপ্রকাশন ॥ রাজশাহী
প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৭

পাঁচটি অংশে বিভক্ত যদি একতারাটি বেজে ওঠে কাব্যটি। কবিতাগুলো নস্ট্যালজিক ও প্রেমপ্রবণ। মোট কবিতা ২৮টি। প্রত্যেকটি বস্তুনির্যাসকে ছাড়িয়ে গেছে বেগের আবেগের উচ্ছ্বাস। তাই তা কোমলপ্রবণ, কিছুটা তারল্যও। প্রথম কাব্যগ্রন্থে কবির প্রচেষ্টার সংবেদ আছে। যদিও তিনি ছড়ানো-ছিটানো লেখেন অনেকদিন— কিন্তু এই প্রথম জনসমক্ষে আসা, মলাটবন্দী হয়ে। আশাপ্রদ হবার মতো অভিঘাত নিয়েই তাঁর কাব্যভুবনে আমাদের স্বাগতম, সন্দেহ না করেই বলি; তিনি দ্বৈরথে জড়িয়ে পড়–ন ও চলুন, চিরকাল— কবিতার ভেতরে আরও অধিক কবিপ্রবণতায়।

——————————————–

ধা রা বা হি ক র চ না

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব
সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব- ৫

মুহাম্মদ হাসান ইমাম
[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হলো।— সম্পাদক]

থিওডর অ্যাডর্নো

অ্যাডর্নো (১৯০৩-১৯৬৯) সঙ্গীতের ক্ষেত্রে সমাজতাত্ত্বিক অবদানের জন্য বিংশ শতাব্দীর এক অবিস্মরণীয় নাম। জার্মানীর এই ব্যক্তিত্ব একজন দার্শনিক, একজন সমাজবিজ্ঞানী, একজন সঙ্গীতবিজ্ঞানী, একজন সঙ্গীত ও সাহিত্য সমালোচক বটে। এছাড়া, তিনি নন্দনতত্ত্ব, চলচ্চিত্র এবং সংস্কৃতি সমালোচক। তিনি আরো অনেক বিষয়ে পারর্দশী যা আমাদের মন ও মনন গঠনে বিরাট অবদান রেখে গেছে। মহাঘাতক হিটলার তাঁকে অর্ধ-ইহুদী বলে গণ্য করতেন। জীবনরক্ষার খাতিরে তিনি যুক্তরাজ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন। তবে যুদ্ধত্তোর জার্মানিতে ফিরে এসে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রণোদনার অবারিত বিকাশ ঘটান এবং নিজ বক্তব্যের গুণে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। সমাজ সমালোচনার ক্ষেত্রে তাঁর সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। আমরা আধুনিকতার নামে এক বিভ্রান্তিকর আত্মপ্রতারণার শিকার হচ্ছি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মানবমুক্তির জন্য এবং সকল অধিবাসীর জন্য একটি নিরাপদ বিশ্ব সৃষ্টির সক্ষমতা মানুষের থাকলেও ভয়ংকর দূর্বিপাকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না।

অ্যাডর্নো মনে করতেন, বিমূর্ত উপায় ছাড়া সঙ্গীত তেমন কিছু বলে না এবং কোন ধারণাও ধারন করে না। এ সত্ত্বেও অ্যাডর্নো সঙ্গীতের বুদ্ধিবৃত্তিক তাৎপর্যের কথা তুলে ধরেন। সঙ্গীতের সম্ভাবনা সম্পর্কে তাঁর তেমন সন্দেহ ছিল না বটে, কিন্তু দর্শন ও সঙ্গীতের সমস্যা-সঙ্কুল সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে তিনি আলাদাভাবে সঙ্গীত সমালোচনায় অবতীর্ণ হন। এক্ষেত্রে সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, নন্দনতত্ত্ব, শিল্প, দর্শনের মত বিষয়গুলোকে সংস্কৃতির বৃহত্তর কাঠমোবদ্ধ রুপরেখায় আলোচনা করতে ব্রতী হন।

অ্যাডর্নো সঙ্গীতকে শুধুমাত্র বিনোদনের বিষয় ভাবতে পারেন নি, বরং সামাজিক ও দার্শনিকভাবে অর্থপূর্ণ ভেবেছেন।একইভাবে তিনি শিল্পকলাকেও ব্যক্তিক রুচির আওতাধীন ভাবতে পারেন নি। শিল্পকলার দার্শনিক তাৎপর্য তাঁর দর্শনের নিজস্ব ধারণার সাথে একীভুত হয়ে গেছে। অ্যাডর্নো সঙ্গীত-বিদ্বেষী নয় বরং গভীরভাবে সঙ্গীত প্রেমিক হিসাবে দর্শনকে সঙ্গীতের মত সঙ্গীত-কম্পোজিশন, ও সঙ্গীতকে দর্শনের মত দর্শন-সমৃদ্ধ ভাবতে চেয়েছেন।

আধুনিক সমাজে আনন্দকে কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে যা কর্ম এবং আনন্দ উভয়কেই ব্যর্থ করে। এ প্রসঙ্গে কার্ল মার্কস এর বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যয়টি স্মরণীয়। পণ্য থেকে শ্রমের বিচ্ছিন্নতা, উৎপাদন থেকে উৎপাদকের বিচ্ছিন্নতা একসময় নিজের থেকে নিজের বিচ্ছিন্নতাকে অনিবার্য করে তোলে। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ সম্পর্কে কার্ল মার্কসের ভাবনা অ্যাডর্নোর আনন্দ ও কর্মের বিচ্ছিন্নতার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। অ্যাডর্নো আধুনিক সমাজে সঙ্গীতের মতো দর্শন, সমাজতত্ত্ব ও সাহিত্য-সমালোচনা ও ইতিহাসের আত্মপ্রবঞ্চনামুলক নিঃসঙ্গ চর্চা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বলে মনে করেন।

সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্ব যে আধিপত্যশীল ধারণাগুলো উপস্থাপন করেছে, যেমন ধর্মের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠার অবক্ষয়, বা প্রাকপুঁজিবাদী অবশেষসমুহের বিলুপ্তি, বা প্রযুক্তিগত ও সামাজিক বিভাজন ও বিশেষায়ন প্রকৃতপক্ষে সাংস্কৃতিক নৈরাজ্যের জন্ম দিচ্ছে— এমন ধারণাগুলো সর্বাংশে টিকে না যখন আমরা দেখতে পাই সংস্কৃতি জীবনের সর্বত্র ছাপ রেখে চলেছে।

অ্যাডর্নো মনে করেন, সকল সঙ্গীত সে যতই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হোক না কেন বাস্তবত সামষ্টিক অধ্যায় সম্বলিত। প্রতিটি একক শব্দ আমাদেরকে নির্দিষ্ট করে। সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব বিষয়ে বারটি বক্তৃতা প্রদানের ঠিক তিন বছর পূর্বে তিনি এমন ধারণা ব্যক্ত করেন।১ ১৯৬১-৬২ সনে অ্যাডর্নো যখন ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বক্তৃতাগুলো দিয়েছিলেন তখন তিনি পরিপক্বতার এক মধ্যেখানে উপস্থিত। এর ত্রিশ বছর আগে তিনি ‘On the social situation of musicÕ2 শীর্ষক প্রবন্ধ  প্রকাশ করেন। সুতরাং সঙ্গীত-ভাবনা তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির সমস্ত বিষয়ের সাথে জড়িত ছিলো। অর্থাৎ চার দশকব্যাপী তিনি সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব বিষয়ে প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে কর্মক্ষম ছিলেন। ইতোমধ্যে ১৯৬৮-র জর্মান সংস্করণ হিসেবে তিনি প্রথম বইটি প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থ একদিকে সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব অন্যদিকে ফ্রাংকফুর্ট স্কুলের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। জর্মানিতে সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব নিয়ে কাজ করার একটি ঐতিহ্য থাকলেও বর্হিবিশ্বে বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুপস্থিত ছিল। তবে ১৯৬৩ সনে লন্ডনে আলফন্স সিলভারম্যান সোশালজি অফ মিউজিক শীর্ষক একটি গ্রন্থপ্রকাশ করেন। অ্যাডর্নোর রচনা সহজ অনুধাবনীয় নয়, কিন্তু সিলভারম্যানের রচনা সহজবোদ্ধ ছিল। ১৯৭৩ সনে পল হানিংশাইমের রচনার সংকলন মিউজিক এন্ড সোশালিটি প্রকাশিত হয়। হানিংশাইম একজন জার্মান, যিনি হিটলারের আমলে মার্কিন য্ক্তুরাষ্ট্রে চলে যান। তিনি জার্মানিতে ফ্রাঙ্কফুট স্কুলের সাথেই সম্পৃক্ত ছিলেন। অ্যাডর্নো ও হর্খাইমার Dialectic of Enlightment3 প্রকাশ করেন ১৯৭৯ সনে যেখানে তাঁরা কালচার ইন্ডাস্ট্রি ধারণা ব্যাখ্যা করেন। এছাড়া, Philosophy of Modern Music4,  On Popular Music5, Culture Industry6, Culture Industry Reconsidered7|

যাহোক, উইলসনের মতে, The influence of Adornos intense in music in particular in worth mentioning again here. Music does not unless in the most abstract way – represent or  tell us anything, and it does not – at least straight forwardly – contain idea. (It was for this reason that music was accorded a low rank in certain stands of eighteenth century aesthetics.) But despite – or, indeed, because of – music’s proclamation relationship with philosophy. Adorno insists on its intellectual significance. If music can be thought of in terms of its truth or untruth, then the philosophical interpretation of art is not to be diverted to the statements that artwork contain, but rather to the why in which artworks are put together, how they are composed. This kind of musically inspired thinking so to speak, in one of the most difficult and distinction aspects of Adornos thought.8 সুতারাং সঙ্গীতের বক্তব্য বা অন্তর্নিহিত ধারণা নয় বরং কম্পোজিশন অ্যাডর্নোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কিন্তু অ্যাডর্নোর সঙ্গীত সম্পর্কীয় পূর্ববর্তী ধারণা বলে যে, সঙ্গীত শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, বরং সামাজিক ও দার্শনিকভাবে অর্থপূর্ণ।

অ্যাডর্নো বলেন, [It] should take its bearings from the social structures that leave their imprint on music, and on what we call material life in the most general sense.9 অসাবধানে প-িতেরা সঙ্গীতের বহিরাবণ, পুনরুচ্চারণ ও সঙ্গীত গ্রহণের উপর গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন। অন্যদিকে, Adorno in sharp contrast, insists that the social complexion of music is found no its own interior, not simply in its effective links with society.10 He demands the social deciphering of musical phenomena as such with close attention to the objective social constitution of music in itself.11 সংগীতের কম্পোজিশনে সামাজিক ছাপ পড়ে থাকে এবং সঙ্গীতের সমাজতত্ত্বকে এই সামাজিক ছাপকে বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। যখন সঙ্গীতের অর্ন্তনিহিত এই জগত উন্মিলিত করা যাবে তখনই সমাজবিজ্ঞানী উৎপাদনশক্তি ও সঙ্গীত-উৎপাদনের পরিস্থিতির আন্তঃক্রিয়াকে অর্থবহভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে। সঙ্গীতের অভিজ্ঞতা ও কল্পনাশক্তির গুরুত্ব অ্যাডর্নো সঙ্গীতে সামাজিক ডিকোডিংয়ের জন্য আবশ্যিক মনে করেন।

ব্লোমস্টারের মতে অ্যাডর্নোর সঙ্গীত নিয়ে আলোচনার মর্মমূলে সনাতন মানবিকতাবাদী ধারণা কাজ করে। যার কারণে তিনি শিল্পকলার ক্ষেত্রে পরম স্বাধীনতার পক্ষপাতি। তিনি সঙ্গীতের বুর্জোয়াকরণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। সমাজ ও সঙ্গীতের মধ্যে বিরোধিতার ধারণা এবং ব্যাপক উৎপাদনের কারণে শিল্পকলার বিচ্ছিন্নতা মেনে নিতে পারেননি। সঙ্গীতের অন্তর্নির্হিত শক্তিকে নিবৃত্তকরণ এবং মতাদর্শ ও ভুল-সচেতনতার ধারক বানাতে গিয়ে সংগীতের উদ্বুদ্ধকরণ-শক্তি নষ্ট করা হয়।

অ্যাডর্নোর ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয় যা আমাদেরকে সার্বিকভাবে সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের পুঁজিবাদী রূপান্তরকে বুঝতে সাহায্য করবে। Dialectic of Enlightenment [1944] গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় ÔThe Culture Industry : Enlightment As Mass DeceptionÕ— এ অ্যাডর্নো ও হরখাইমার সুস্পষ্টভাবে সংস্কৃতির এই সর্বব্যাপী প্রাধান্য ও রূপগত বৈচিত্রের ধারণা দিয়েছেন। তাঁরা চলচ্চিত্র, রেডিও ও পত্রিকাসমূহের মধ্যে একটি সমন্বিত সিস্টেমকে বিরাজমান বলে দাবি করেছেন। জাকজমকপূর্ণ শিল্প ব্যবস্থাপনা ভবন ও প্রদর্শনী কেন্দ্রসমূহ দেশভেদে একই রকম কর্মকা- দৃষ্টিগ্রাহ্য করে। পুঁজিবাদের পরম ক্ষমতার বদৌলতে একটি এলাকার অধিবাসীরা প্রযোজক অথবা ভোক্তা হিসেবে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে সংযুক্ত হতে থাকে। এসব কেন্দ্রের সাহায্যে ক্ষুদ্র পরিসর ও বৃহৎ পরিসরে মানুষ সংস্কৃতির একই মডেল আয়ত্ত করে চলেছে।

চলচ্চিত্র বা রেডিওকে আর শিল্পকলা হিসেবে ভনিতা করতে হয় না। তারা ব্যবসাকে মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং উপস্থাপনের গুণে ব্যবসাভিত্তিক এক সংস্কৃতিচর্চার আদর্শকে গ্রহণ করেছে। একই সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রির সাথে জড়িত এমন ভাবনা তাদেরকে প্রলুব্ধ রাখে। প্রযুক্তির এই ভূমিকা প্রযুক্তির বিকাশের আইনগত পরিণতি নয় বরং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর অনিবার্য কার্যক্রম বলা হয়। অ্যাডর্নো মনে করেন, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ হয়তো টেনে ধরা যেতো, কিন্তু ব্যক্তির সচেতনতা ইতোমধ্যেই এই নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। টেলিফোন ও রেডিওর পার্থক্য লক্ষ্য করলে ব্যাপারটি সহজেই অনুধাবন করা যায়। টেলিফোনে ব্যক্তির যতটা নিয়ন্ত্রণ আছে রেডিওতে সম্ভবত নেই। প্রথমটি ব্যক্তির ভূমিকার উপর নির্ভরশীল যেখানে ব্যবহারকারি পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেন। দ্বিতীয়টি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে শ্রোতা হিসাবে গণ্য করে কর্র্তৃত্বপূর্ণভাবে এদেরকে রেডিও কর্মসূচির সাধারণ ভোক্তা হিসেবে গণ্য করে। যদিও কিছু বেসরকারি রেডিও-কার্যক্রম দেখা যায় কিন্তু তারাও বিনোদোনমূলক অনুষ্ঠানের বাইরে যেতে পারেনা এবং উপর মহলের নীতিগত পরিবেষ্টনে আবদ্ধ থাকে।

এসব প্রচারমূলক কার্যক্রমের সাথে যারা জড়িয়ে থাকেন, তারা নিঃসন্দেহে যথেষ্ট প্রতিভাবান এবং জিনিয়াস। এবং তারা রেডিও কার্যক্রম পরিচালনায় বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং পেশাজীবীদের দ্বারা নির্বাচিত। সুতরাং তারা ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’র সাথে মননগতভাবে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে এক ধরনের একাত্মতা অনুভব করেন। এবং পাবলিক সেন্টিমেন্ট, পাবলিক কনজামশান এবং পাবলিক চয়েসকে তাদের অনুষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পৃক্ত করতে যথেষ্ট পারদর্শিতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, বিটোফেন বা জ্যাজ বা তলস্তয়ের একটি নোভেলকে তারা তাদের প্রয়োজনমাফিক অনুষ্ঠান সময়ের সাথে সম্পৃক্ত করেন এবং সেক্ষেত্রে সাধারণত তেমন উচ্চবাচ্য থাকে না। এটি সম্ভব হয় এ কারণে যে, সাধারণ মানুষ দেখে সমাজের কৃতিমান ও বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এই প্রচারণার সাথে জড়িত। এছাড়া আরেকটি জিনিস লক্ষণীয় যে, রেডিওর কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পেশাজীবীরা এমন কোনো বিষয়বস্তু বা দৃষ্টিকোণকে প্রশ্রয় দেন না যা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, প্রচার মাধ্যমের পরিপন্থী হয়।

আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় যা আজকের দিনে আমরা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলগুলোর প্রচারণা, অনুষ্ঠান এবং নীতি-নির্ধারণ ইত্যাদির সাথে দেখতে পাই। সেটি হলো তাদের সাথে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক শিল্প সাধনা, পাবলিক বিজনেসের সাথে একটি সুন্দর সম্পর্ক থাকে; এ সম্পর্ক অবশ্যই অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল। অ্যাডর্নো উদাহরণ দিয়ে সেই সময়ের রেডিওর প্রেক্ষাপটে বলেছেন যে, একটি ইলেকট্রিকাল ইন্ডাস্ট্রির সাথে একটি রেডিও কোম্পানির নির্ভরশীলতার সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। আবার একটি মোশন পিকচার ইন্ডাস্ট্রির সাথে ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা দেখা যায়। এবং এক্ষেত্রে তাদের সম্পর্কটি সম্পূর্ণ প্রকাশ্য নয়; এবং গভীর বিবেচনা ছাড়া এ সম্পর্ক আলাদা করাও কঠিন। আজকে আমরা টিভি অনুষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের দিকে লক্ষ করলে দেখতে পাই যে, মূল অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তিকাল তার একটি বিরাট অংশ জুড়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়; তারা বহু সুন্দর সুন্দর অনুষ্ঠানের স্পন্সর করে। একাধিক শিল্প-ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান স্পন্সর করছে। সেটি শুধু টেলিভিশন, রেডিওর ক্ষেত্রেই নয়; এর বাইরেও এখন পাবলিক যেকোনো অনুষ্ঠানের, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও তারা স্পন্সর হিসেবে এগিয়ে আসছে। এই আসার পিছনে একটি অর্থনৈতিক কারণ অবশ্যই আছে। যেমন ধরা যাক, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের একটি ইভেন্ট তারা করতে চান। সে ব্যাপারে তারা যে বাজেট তৈরি করেছেন, সে বাজেটের সিংহভাগ কোন বহুজাতিক কোম্পানি বা শিল্প প্রতিষ্ঠান দিতে রাজি আছেন। কিন্তু তারা তার পরিবর্তে অনুষ্ঠানের প্রচারণা, উপস্থাপনা এবং অনুষ্ঠানসূচি তৈরি করার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে চান। এমনও প্রস্তাব আসে যে, ‘নাইনটি পার্সেন্ট কন্ট্রোল’ তাদের থাকবে। প্রধান অতিথি হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠানের লোক থাকবে, স্পন্সরের লোক থাকবে এবং বিশেষভাবে মঞ্চ তৈরির ক্ষেত্রে ও সাজসজ্জায় কোম্পানির লোগো এবং দ্রব্যাদির প্রচার প্রাধান্য পাবে। এমন প্রস্তাব সংস্কৃতির স্বাধীন বিকাশের যে প্রচলিত পন্থা, তাকে ব্যাহত করে এবং সংস্কৃতির যে ‘শিল্পায়ন’ সেটিকে উজ্জীবিত করে।

সমস্ত বিষয় এখন ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’র ভিতর দিয়ে প্রস্ফুটিত হতে বাধ্য হচ্ছে। আগের দিনে একজন চলচ্চিত্র দর্শক দেখতে চাইতেন যে, তার দেখা চলচ্চিত্রটি আসলেই বাস্তব জীবনের একটি অংশ কি না। অর্থাৎ বাস্তব জীবন বিরাট বিস্তীর্ণ; তার একটি অংশ নিয়ে এই চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। অন্য কথায় বলা যায়, বাস্তবতা চলচ্চিত্রের একটি সম্প্রসারিত রূপ। কিন্তু বর্তমানে চলচ্চিত্র একটি শিল্প হিসেবে গণ্য হবার পর যান্ত্রিক এবং অন্যান্য কৌশলগত প্রযুক্তির সাহায্যে এতো বেশিভাবে বাস্তবতার অনুরূপ চলচ্চিত্র তৈরি করছে যেনো মানুষ বা দর্শক সেই চলচ্চিত্র দেখে মনে করছে যে সেটিই বাস্তবতার সম্প্রসারিত রূপ।

‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’র একটি বড়ো ধরনের সাফল্য যে, তারা প্রচারিত সাধারণ এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্প উপাদানগুলোকে গ্রহণ করে এমন একটি শিল্প উপহার দিচ্ছে, যাকে দর্শক-শ্রোতারা মনে করে অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। আর দর্শক-শ্রোতাদেরও যেন কল্পনা শক্তি লোপ পাচ্ছে। তারাও মনে করছে বাস্তব জীবন চলচ্চিত্রের জীবন থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। এবং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, চলচ্চিত্রের প্রদর্শিত জীবনভঙ্গি, দর্শন, আলাপচারিতা, সঙ্গীত তারা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে চায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিষয়টি বেশি করেই দেখা যায়। এক্ষেত্রে একটি ব্যাপার বলে রাখা ভালো যে, চলচ্চিত্রের এমন প্রতিক্রিয়া সাধারণ্যে অনেক সামাজিক জটিলতার সৃষ্টি করছে।

সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যাচ্ছে যে, একটি বিশেষ ভঙ্গির বিশেষ শিল্পীর, বিশেষ গায়কি তারা গ্রহণ করে সেটাকে এমন ধরনের ইফেক্ট দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে ‘আইডল’ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। সার্বিকভাবে কালচার ইন্ডাস্ট্রি মানুষের শিল্প-ভাবনা এবং শিল্প-সমালোচনার পথ অনেকটা সীমিত করে দিচ্ছে। কারণ, তারা যা তৈরি করছে, তাদের যা ‘ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট’, সেটিকে গ্রহণযোগ্য করবার সর্বত আয়োজন তাদের মধ্যে থাকছে। এক্ষেত্রে অ্যাডর্নোর একটি বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, Ô…all the other films and products of the entertainment industry which they have seen….have taught them what to expect they react automatically.Õ আসলে মানুষের মনের মধ্যেই, বিশেষ করে, শিল্প সমাজের মানুষের মনের মধ্যেই বিনোদন শিল্প একটা আস্থা অর্জন করতে বসেছে। এবং ক্রেতারা অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মতো সেই শিল্প উৎপাদটি কিনছে, উপভোগ করছে।

ÔThe culture industry as a whole has moulded … as a type unfailingly reproduced in every product. All the agents of this process from the producers to the womens’ clubs take good care that the simple reproduction of the mental state is not… extended…Õ ‘এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি’ তার নিজস্ব ভাষারও আবির্ভাব ঘটিয়েছে। নিজস্ব শব্দাবলীর বাক্য তৈরির ক্রমাগত চাপ শিল্পীরা বা পারফরমাররা অনুভব করছে। স্টার পারফরমাররা যখন কিছু তৈরি করেন বা পুনর্নির্মাণ করেন, তখন তারা এইসব ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক-প্রযোজকদের ভাষা, শব্দাবলী অত্যন্ত সাধারণভাবে এবং সচ্ছলভাবে গ্রহণ করছেন; যেনো এটিই শিল্পের ভাষা।

ষাটের দশকে অ্যাডর্নো যেমন অ্যামেরিকা বা পশ্চিমা দেশগুলোকে যা লিখেছেন আমরা আজকে তা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করছি। এবং এক্ষেত্রে অ্যাডর্নো আমাদেরকে দারুণভাবে তার ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’র ধারণার মাধ্যমে শিল্পকলা এবং সংস্কৃতিচর্চায় ব্যবসায়ী ও বাহারী শিল্প-প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রভাব উপলব্ধি করবার সুযোগ করে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির নিজস্ব আদর্শ, ভাবনা বা স্টাইল এতোটাই দুরন্ত এবং দুর্বিষহ হয়ে ওঠে যে, অনেক সময় সৃজনশীল আর্টিস্ট বা কম্পোজার-প্রোডিউসারদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। এই দ্বন্দ্বের ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটি অসম দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। কারণ কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির যে শক্তি, সামর্থ্য এবং সাংগঠনিক প্রভাব এবং শ্রোতা সাধারণের সাথে তাদের যে সমঝোতা, তার বিপক্ষে এই দ্বন্দ্ব খুব একটা কাজে আসে না।

আন্তঃশাস্ত্রীয়তা বিশেষ প্রত্যক্ষণ অ্যাডর্নোকে দর্শনের সাহিত্যিকতা, সাহিত্যের দার্শনিকতা, বা সমাজপাঠে সাহিত্য ও দর্শনের অমোঘ প্রভাবকে স্বীকার করতে প্রলুব্ধ করে। মোটকথা অ্যাডর্নোর সাহিত্য সমালোচনা ও শিল্প সমালোচনাকে দর্শন থেকে আলাদা করা যায় না। আবার সমাজ থেকে আলাদা করা যায় না। আবার সব কিছুকেই তাঁর সময় থেকে আলাদা করা যায় না। পরস্পর সংলগ্নতাকে তিনি যেভাবে দেখেছেন তা একঅর্থে নতুন; আর সেটি করতে গিয়ে বিশেষ শাস্ত্রকে তুচ্ছ জ্ঞান করেননি। সাহিত্যের দার্শনিকতা অ্যাডর্নোর কাছে কোন পাঠ্যের অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ, সাধারণভাবে কি লেখা হলো তা নয়। অ্যাডর্নো বলতে চান The philosophical significance of a work like Finnegan’s Wake by the novelist James Jayes (1882-1941), for example, her much more to do with its narrative form, its diction and syntax, and what it does to the they idea of a work of art, rather those with any pre-established philosophical position that it might be taken to illustrate. This means for Adorno, that a philosophical interaction of literature would have to be the closest possible needing of nay given text, rather than the identification of whatever general ideas it might be held to contain.12

কালচার ইন্ডাস্ট্রির আলোচনায় অ্যাডর্নো দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে, এটি আসলে শিল্পকলা নয়, কারণ শিল্পের সাথে মননের সংযুক্তি থাকতে হবে। সুতরাং কালচার ইন্ডাস্ট্রিকে শিল্পকলা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাবতে হবে। উইলসন বলেন, For Adorno, it is significant both that the culture industry is happy to refer to itself in this kind of way and that the real significance of describing culture as an industry has been forgotten. Adorno discusses the meaning of industry in this content in the essay in which he reflects on the account of the culture industry developed in Diabetic of Enlightenment, Culture Industry Reconsidered.13

Culture Industry Reconsidered শীর্ষক রচনায় অ্যাডর্নো খোলসা করে যা বলেন তার অর্থ এ রকম : ১৯৪৭ সালে হর্খাইম সহযোগে অ্যাডর্নো ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’ বিষয়ক প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশ করেন। খসড়া পর্যায়ে তাঁরা ‘মাস কালচার’ শব্দটি রেখেছিলেন। পরবর্তীতে তা বাদ দিয়ে ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’ শব্দটি রেখেছেন। আসলে মাস কালচার বলতে সংস্কৃতির সেই অংশ বুঝায় যা জনগণের ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্ভাসিত হয়। বলা যায়, জনপ্রিয় শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। এই সমকালীন জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও গণসংস্কৃতি কালচার ইন্ডাস্ট্রি সম্পূর্ণ আলাদা। কালচার ইন্ডাস্ট্রি নতুন ও পুরাতনের গুণগত সম্মিলন ঘটিয়ে পরিকল্পিত পণ্য উৎপাদন করে যাতে ভোক্তার চাহিদা মিটে ও ভোক্তার চাহিদার প্রকৃতিও নির্ধারণ করা হয়।

সংস্কৃতির আলাদা আলাদা শাখাগুলো কাঠামোগত দিক দিয়ে এই ধরনের এবং তাদের বিন্যাস অনেকটা অবিচ্ছিন্ন। অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রীভবন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এমনটা সম্ভব করেছে। কালচার ইন্ডাস্ট্রি উপর থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভোগ্যপণ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সংস্কৃতির যে ভালো-মন্দ তারতম্য যুগ যুগ ধরে চলমান আছে তার পার্থক্য কমিয়ে আনে। উচ্চমার্গীয় শিল্পের অনন্যতাকে বিনষ্ট করা হয়। নিচু শ্রেণির শিল্পকলার নিজস্বতাকেও ধ্বংস করা সভ্যতার চমকপদ ধারা সাহায্যে। এই সাধারণ শিল্পকলার একটি নিজস্ব বিদ্রোহবোধ থাকে; কিন্তু তাকে হার মানতে বাধ্য করে সামাজিক সহায়তার অনুপস্থিতির কারণে। সাধারণ মানুষের সচেতনাকে কব্জা করা হলেও মানুষ তাদের লক্ষ্য নয়— মানুষকে যন্ত্রপাতির সাথে লটকিয়ে দেয়া হয়। ক্রেতা হিসেবে মানুষ চূড়ান্ত ভূমিকা লাভ করতে পারে না। কালচার ইন্ডাস্ট্রি তাদের বিষয় হিসেবে গণ্য করে বিষয়ী হিসেবে নয়।

গণ-সংস্কৃতির নামে একটি নির্বিরোধ প্রত্যয় ব্যবহারের চেষ্টা চলে কিন্তু বাস্তবে জনগণের সংস্কৃতির নামে শিল্পমালিকদের কণ্ঠই আধিপত্যশীল থাকে। কালচার ইন্ডাস্ট্রি গণসংস্কৃতির নামে নিজেদের মানসিকতাকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। এই মানসিকতা অনেকটা অপরিবর্তনীয় ও অপরিবর্তনীয়ভাবেই গৃহীত। গণমানুষ তাদের কর্মকা-ের পরিমাপক নয় বরং তাদের নিজস্ব মতাদর্শই এখানে মূল বিবেচ্য। মূল্য লাভের মধ্য দিয়েই কালচার ইন্ডাস্ট্রি তাদের সাংস্কৃতিক পণ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। কালচার ইন্ডাস্ট্রির যাবতীয় কর্মকা- লাভালাভের নগ্যতাকে প্রকাশ করে। তারা অনেক সময় এই মুনাফাকেন্দ্রিক মানসিকতাকেও সাংস্কৃতিক আকার দেওয়ার চেষ্টা করে।

ক্ষমতাশালী ও নির্দেশ প্রদানকারীরা এসব কালচার ইন্ডাস্ট্রির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। তারা মুনাফা অর্জনের সব সুবিধাগুলো বাস্তবায়নে একনিষ্ঠ থাকে। একে সর্বব্যাপী একটি কর্মকা- হিসেবে গড়ে তোলে। সংস্কৃতি তার দুরাবস্থার জন্য নিজস্ব গুণেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে সংস্কৃতির সার্বিক আত্মীকরণ ও অন্তর্ভুক্তি মানবীয় সত্তাসমূহকে ভিত্তিহীন করে দেয়। এক সময় এসব ইন্ডাস্ট্রির পণ্য আর ঠিক পণ্য থাকে না এবং সেগুলো মুনাফার জন্য প্রস্তুত হয় না। সংখ্যার দিক দিয়ে একেক সাংস্কৃতিক আইটেম এতো বেশি উৎপাদিত হয় যে তারা মুনাফার উদ্দেশ্যে বিক্রি হয় না। আর পণ্যসমূহের স্বাধীন অস্তিত্ব নিজেকেই নিজেদের বিজ্ঞাপনে পরিণত করে। পরিশেষে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞাপনের বদৌলতে কালচার ইন্ডাস্ট্রি একটি শুভেচ্ছা প্রস্তুতকারক জনসংযোগে পরিণত হয়। সাহিত্যকে পণ্যে রূপান্তরিত করা ব্যবস্থাটি সক্রিয় থাকে। আঠারো-উনিশ শতকের বাণিজ্যিক উপন্যাস থেকে এর যাত্রা শুরু। একই ধরনের পণ্যের অনেক কপি তৈরির প্রযুক্তিগত দক্ষতাই এই ধরনের ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় গুণগত দক্ষতা।

সুতরাং ‘ইন্ডাস্ট্রি’ শব্দটিকে এখানে একেবারে আক্ষরিকভাবে নেয়ার কিছু নেই। পণ্যের প্রমিতকরণ, বণ্টন-প্রযুক্তির যৌক্তিকীকরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিষয় নয়। যদিও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে শ্রমবিভাজনের বিস্তার, যন্ত্রপাতির সংস্থাপন ও উৎপাদনের উপায় থেকে শ্রমের বিচ্ছিন্নতার বিষয়গুলো দৃশ্যমান তবে নিয়োজিত শিল্পী-কুশলী ও নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিদের মধ্যকার সংঘাত দূরীভূত করা হয়।

মতাদর্শই শিল্পীর ব্যক্তিক প্রতিভাকে বাণিজ্যিক ব্যবহারে প্রণোদিত করে। যত বেশি পদ্ধতিগত অমানবিকতা অবলম্বন করা হবে ততো বেশি সাফল্যজনকভাবে ইন্ডাস্ট্রি শিল্পীদের ব্যাপ্তি ঘটায়। কালচার ইন্ডাস্ট্রির কৌশল বলতে বাহ্যিক বণ্টন ও যান্ত্রিক পুনরুৎপাদন বুঝায়। অভ্যন্তরীণ শৈল্পিক জগতে এই কৌশলের কোন হস্তক্ষেপ থাকে না। ভোক্তাদের সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে কালচার ইন্ডাস্ট্রির ভূমিকার প্রশ্নে শিল্প-সমালোচক ও সমাজবিজ্ঞানীরা যথেষ্ট সাবধান করে আসছেন। এরা যে নন্দনতত্ত্ব ও সত্য-মিথ্যা প্রচার ও প্রসার ঘটাচ্ছে তাকে সমালোচনাহীনভাবে গ্রহণ করার কোন কারণ নেই। (অসমাপ্ত)

তথ্যনির্দেশ

১.            এই বক্তৃতাগুলোই পরবর্তীতে Introduction to the sociology of music (translated by E.B. Ashton). New York, Seabury, ১৯৭৬ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২.           ১৯৩২ সনে মাত্র তিরিশ বছর বয়সে তিনি এ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।

৩.   T Adorno and M Horkheimer, Dialectic of Enlightment, Verso, London, 1979

  1. T Adorno, The Philosophy of Modern Music, Seaburu Press, New York, 1980
  2. T Adorno, “On Popular Music” in S. Frith and A Godwin, (eds.), On Record, Rock Pop, and the Written Word,Routledge, London, 1990
  3. T Adorno and Max Horkheimer, “The Culture Industry: Enlightenment as Mass Deception” in Dialectic of Enlightenment(Translated by Andy Blunden,) 1998
  4. T Adorno, “Culture Industry Reconsidered”,Social Research, 39:2 (Summer, 1972)
  5. Ross Wilson, Theodor Adorno.Routledge, London,2007, p. 4
  6. Ross Wilson, পূর্বোক্ত

১০.  Cited by W.V. Blomster, Review of the Introduction to the Social of Music, in NOTES, Vol. 3, No. 4, 1977), p. 3830-3832.

  1. Ross Wilson, পূর্বোক্ত

১২.         Ross Wilson, পূর্বোক্ত

১৩.         Ross Wilson, পূর্বোক্ত

————————————————-

[ট্রিলজি]

পূর্ব প্রকাশিতের পর

সমস্ত ধূসর প্রিয়

শহীদ ইকবাল

নয়ন মেলে পর্ব
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
ভরা বাতাসে চার্লস কিংসলি মগজে শান দেয়। শানানো মগজে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে কীসব বাড়াবাড়ি রকমের চাপ পয়দা হয়। কিংসলি আর অন্তর্বাসের ঘ্রাণ রোগা আকর্ষণ তৈরি করে। তাতে বাতাসে আগুন! তখন ওপার থেকে চিকন মিহিস্বর কানে আসে। কার স্বর! কে— কে ডাকে? বিকেল গড়িয়ে তখন মুখমুন্দা সন্ধ্যা। ওটা বুঝি হুমায়ুন কবিরের কবিতা, নাকি বিশুর সুর করে পড়া রহিমুদ্দির ছোট্টবাড়ির গল্পো। তখন ঘিরি ধরে সেই শুকনা পুরানা স্যাঁতসেঁতে চৌকির ওপর বসা দিনগুলার চিকমিকা রোদের ঠাসা হলুদ আলো। ওপারে তখন মুখর হয়ে ওঠে গোলশেনারার কর্কশ কণ্ঠ। এ কেমন গলা গো! এ এলাকায় এর তীক্ষèতা আলাদা। সে এজমালি পুকুরে খেড়– দিয়া মাছধরার শোরগোলে উচ্চৈঃস্বরে হাকায়। ‘মাগুরের ভাগ মোক দেও’— বিচিত্র মাছের ছলকানি যখন খলার মধ্যে দাপদাপি করে— গোলশেনারার স্বর তাতে আরও দ্বিগুণ হয়। চোখ আর মুখ তাতে ঠিকরে পড়ে, কালশি আলোয় মুখের ছবি ভাসে। কম-বেশি হলি মারি ফেলাম— তখন ঠিক ওপাড় থেকে দস্তিদার মশায় শুভ্র মেজাজে এসে দাঁড়ান। এই চৌধুরীবাড়ির বড় উচ্চাসীন ব্যক্তিটি একটু আলাদা। মাখনুনের মনে আছে উনি সর্বদা নরোম বেশ পরেন। ঠিক ফাদারদের মতো। মাথায় ঝালরওয়ালা উষ্ণীষ আর গেরুয়া বস্ত্র। টকটকে ফর্সা চেহারার সেই মানুষটার এখন এই দশা কেন? কীসব কানে আসে। মাখনুনের কান্না মনে হয়। মরা নানীর কথা মনে আসে। চোখ দিয়া পানি চোয়! হায় দস্তিদার! বিশাল চৌধুরী বাড়িতে তার আলাদা ঘর উঁচু খাট, চকচকা জাজিম আর কোণায় কোণায় সিন্দুক। বড় বড় সে সিন্দুকের চারি তার কাছে থাকে। দস্তিদার মশায় যা কন— সই। সদর দরোজার পর গোথিক স্টাইলের এই একমাত্র ঘর। ওখানে সবার প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু কী যে হলো— সব শেষ। চোখের পাতায় কলাপাতার রঙ হলুদ হয়ে গেছে, পুকুর শুকে গেছে, পুকুরের মাছ তড়পানিও নাই, ঋতুমতি নারীরা রূপহীন হয়ে ভরদুপুরেও এখন ঘুমিয়া চলে। লাঙলের ফলায় আর ধার নাই, জমির কর্ষণ দুর্বল। নীরব আর ছন্দহীন এ বাড়িতে নাই-ধ্বনির বাসা ধরিয়া আসে। দস্তিদার মশায়েরও শ্রদ্ধা নাই। নিমগাছের শান্ত সুশীতল বাতাসে এখন কর্পোরেট হাউজের গন্ধ। এখানে নহবতখানা নাই। কোনোকালে বুঝি কেউ এ কড়িবর্গার তলে আর কেউ আসিবে না। কবুতর দল অশান্তি পয়দা করিয়া ছাড়িয়া গিয়াছে। হায়রে— অনেক মানুষের সমারোহে হ্যাজাকের আলোর ভেতরে যে চৌধুরী মিঞার দাফন হয়, সে মাটি নীরব-নিস্পন্দ। মাখনুনের মনে পড়ে, কত্তো মানুষের মেলা— সক্কলে মিলিয়া আদরে আর যতেœ চৌধুরীকে কব্বরে শোয়ায়, তারপর আলো ক্রমে কমে, নিভে আসে, তিনি একা হন— তারপর ওপারটা ঘন অন্ধকার, বুঝি তাহাতে সাপ বেড়ায়, ভেতরের দিকে গর্ত করে। গর্তের ভেতরে আলজিহ্বা দিয়া মরা চৌধুরীর মাথা, নাক আর চোখের মণি শোঁকে। তিরতিরা গোলাপজলের গন্ধে সাপটা মুথা ঘুরি দাঁড়ায়। শাদা কাপড়ের পাশ দিয়া বেশ কয়েকবার হাঁটাহাঁটি করে, পরে উপরের দিকে সরু গর্ত দিয়া বের হয়। কেরামুন-কাতেবিন আসচে, গায়েবী আওয়াজ— কত্তোদিন হলো, কব্বরখান শুকি গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে যায়। শিরিসের পাতা টপটপ পড়ে। এখন ঝুর ঝুর ঝরে পড়ে কড়িবর্গার ঘুণ, গথিক গেটে আর আলো নাই, শ্যাওলা ধরতে ধরতে মর্চে পড়তে পড়তে খসে পড়েছে সব জৌলুস। উঁচু বারান্দায় দস্তিদারের সিন্দুক জুড়ে আর সকালের মৃদুমন্দ আলো আর ছায়া ফেলে না। শাদা কবুতর পাখা ওড়ায় না, চিক্কন ঠোঁটে খুঁদকুড়ানো বৌ কোথায় হারিয়ে গিয়াছে। সেই দস্তিদার মশায় আহা তার বসন এখন মলিন, চোখ কোটরাগত, লোলচর্ম শিথিলে দুর্বল। পায়ের চটিজোড়া পুরনো দিনের হাহাকারের ভেতর অনেক স্মৃতি নিয়ে বিক্ষত হয়। আঙ্গুলের নখে শুভ্রতা কবেই পরাস্ত হয়ে পালিয়া গিয়াছে। তবুও দস্তিদার এলে সকলেই সংযত হয়। গোলশেনারার গলাও কমিয়া যায়। ঠিক সমানে সমানে সব মেলে। আপত্তি করে না কেউ। সন্ধ্যার কালো আলো ঘনিয়া আসার আগেই মিলিয়া যায়। মাখনুন দেখে ধীরে ধীরে দস্তিদার মশায়ও তার কুটিরের দিকে ন¤্র পায়ে এগিয়া আসচেন। ভগ্ন স্বাস্থ্য কিন্তু ঋজু ও প্রশস্ত গলা। মাথায় চুল নেই, শরীরে পৈতা, পরণে ধুতি, মেরুদ- সোজা। যে পথে তিনি আসিলেন সে পথেই তিনি মিলাইয়া যান। ক্ষণিক পরেই সূর্যডোবার মুহূর্ত। তবুও এ শান্ত পুকুরে মাছ কমে না। গুরুজনরা কন, এজমালি পুকুরে বরকত বেশি। তাইতো ওপারে দেখা যায় ঢেউতোলা স্বচ্ছ পানিতে চঞ্চল মাছের আওয়াজ। মাছ যানি দাপায়। পতপত করি ওড়ে। কী এক চঞ্চল জীবনের সংবাদ গাহিয়া যায়। তখন পানির ওপরে ছায়া ধরা শপ্রি পাতায় মাখনুনকে পেছনে ফিরে টানে। ঘিরে আসে মৌতাতের মোহন মায়া। কতোকাল সে ভেবেছে এই নিধুয়া পাথারের চওড়া সড়ক দিয়া বহুদূর সে চলিয়া যাইবে। নতুন নতুন কেচ্চা ফাঁদিবে। ছাড়িবে রূপদিয়া, ডুবাপুকুর কিংবা খকশো আর মওদুদ বিএসসির কব্বর। কারণ, কব্বরে কীসের এক টিটকিরি টিকটিকির লাফ পাড়ে। কব্বরে আসি সে প্রশ্ন করে। লম্বা দাড়িত হাত বোলায় আর কয় ‘অই ছোঁড়া গান্ধীরে চেনাস! সব স্টুপিডের দল।’ ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম কার লেখা ক’— মাখনুন তোতলায়। ওসবের নাম শোনে নাই। খালি একদিন সুবহান মাস্টার কইছিল প্রোটোপ্লাজম…। প্লাজম আর গান্দি কী এক নাকি! নাকি একই পোকা। লজ্জায় সে তাক কিছু কয় না। কান খাড়া করি খালি শোনে। কিন্তুক শোনা যায় না। খালি সাঁতরায় আর দাবড়ায়। প্লাজম নিয়া আরও কী কী সুতামার্কা আলাপ ধরছিল তাক কবার পারে নাই। তখন স্কুল বারান্দাত গোলমাল কানোত পড়লে, আর মনে থাকে না কিছু। সোঁত ওঠে আর স্কুলঘর ঘিরি ধরে। শালা কালী মন্দিরোত ঢুকি কেটা জানি হাগি থুচে। তাই নিয়া ফটিককে সন্দো করলে দাঙ্গা বাধি যায়। পুকুরের নামাত সার বান্দি কয়জন ছোরা বাইর করে। মেলা মানুষ এক হয়া চতুর্দিকে হেন্দুবাড়ি আক্রমণের আয়োজন করে। সে আয়োজনে ঘর পোড়ে, বাড়ি পোড়ে, পলের পুঞ্জ পোড়ে। তখন হল হল করি আগুন বাড়ে আর আগুন ধরি যায়। আগুনোত পল্লি পোড়ে। কাউলায়— চিক্কুর দেয়। মাহিরের ভিটা, জামতৈল, চিরাকতলা, আমলির পাথার শোঁ শোঁ আওয়াজে হুপহুপ করি দৌড়ায়। হুকার ধূমার নাকান ফোৎ ফোৎ করি তখন ধোঁয়া দৌড়ায়। গোলশেনারাও ছায়া হয়া ভাসে। দাঁতের ফাকোত খিলান দিয়া মাছ হাতড়ানোর জন্যি ঠেলি সান্দায়— মাখনুনোক ধাক্কা দেয়। ঘোর ছাড়ি সে দাঁড়ায়। হুঁশ হয়। কীসের একটা জবরদস্তি প্রবল হয়া ওঠে।  সেসব কঠিন পত্রপাতায় মিলাইয়া গেলে সেনডস অব ডী কিংবা উমর ফারুক নিয়া স্কুলবার্ষিকীর প্রোগ্রামে হৈচৈ শুরু হয়। শশব্যস্ত হয়া সব শোরগোলে মুখর করে। এক হয়া ধপ ধপ করি তাল ঠোকে। আর সব নির্ভয়ে নীল আকাশ রয়েছে নুয়ে— বলে শরীরে হাত বোলায়। গলার কম্পনে জলতরঙ্গ দোলে। তখন তাতে মাখনুন আড়ালে নাচে। পালায়। দূরে আরও দূরে। মওদুদ বিএসসির দিকে পালায়। খকসোক ডাকে। পেছনের বেঞ্চিত বসি শালা একলা একলা তোতলায়। ঘুপসির অন্ধকারে দাঁড়ায়। অবুঝ পাষাণী ভেতরে ভেতরে পোড়ায় আর কান্দে। কিছু দোদুল দুল আলোছায়ার বিস্তার মনের পর্দাত নাচি বেড়ায়। পেছনের দিকে লোক খোঁজে। কে কে কেডা? এখন তো কতোজনই নাই। মওদুদ বিএসসি, মুকুল ভাই নাই। তারা আবার পাতায় পাতায় আর ছায়ায় ছায়ায় বুঝি কইবে কথা? এখলাস চাচা কই— হায়! জ্যোতিনবাবুর অঝোর নয়নের কান্না— সেই যে হারাইলেন— আর দেখা নাই। এখন নাকি বিছানাত শুতি খালি চান্দ দেখেন আর পাগলা সব ভুলা ভুলা কথা কয়া যায়। ভিটাটাত নাই কেউ রে— তাই হাহাকার ওঠে : ক্যা দেপোকের মাও— ওটি চালার বাতাত যে জর্দার কউটা থুচনো— তাক কোনটে গেলো!— হ হ ওটা না অপুর জন্যে দুর্গা নুকি থুচিল— হাঃ হাঃ। হাসে আর পাড়ের ওপর দিয়া স্বপ্নময় হাঁটে। দূর থাকি মন্দিরের অন্ধকারে পিট পিট মারি হাসে আর লক্ষ্মীটা কয়, ‘ক্যা বাবু, তোমাক না কছিনু, ভিটাটার তুমি  দলিল করি নেও। তখন তো গাওত নাগান নাই… এলা…হাহ্ হা— বেশ ঘোর জমি ওঠে জ্যোতিন বুড়োর চোখোত। নাচে আর আলোর ধূপ একসাথে মিষ্টি মিষ্টি বাসনাত মিশি— আরতি ধরায়…। কই রে পবিত্র, আলম, গোকুল, সুশীল, বিপিন, মজিদ, মুকুল, লক্ষ্মণ, কার্তিক, রবীন ধর— একসাথ আরতি করি। আইজ সারা রাত আরতি হবে। চতুর্দিকে আলোর রোশনাই আর ব্যালতলার কাঁসারির থোপে বাজনা— বাজাহ, বাজা সবাই। কোনোকালে থামবি না। চলুক শালা! কতো ট্যাকা নাগে দেম। গর্জে ওঠে জ্যোতির মুখ। দুর্গা তখনও ঝকঝকা। উঁচা চৌচালা মন্দিরটার আটকোণা ছাদে— দশটা সিঁড়ি আর বারান্দা ধরে ঢুলি মত্ত হয়া নাচে আর বাদ্য বাজায়। পুরোহিত মন্ত্র জপতে শুরু করেন। ঘুম চোখে নাচি ওঠে বোল আর উলুধ্বনি ঘিরিয়া ধরে পুরা অন্ধকার। বেলগাছে তখন কাঠবেরালি খেলা করে আর ছোপ ছোপ কালা অন্ধকার ভূত হয়া ওঠে, মা-দুর্গার আশীর্বাদ নেয়। চোক্ষে গড়ায় অশ্রু, বুঝি কানের দিক দিয়া গড়ায়, সর্দি জমি নাকোত— আর ছায়া দেখেন কই রে পবিত্র! ওহ হো তোক তো কালিমন্দিরের ধারোত সব্বাই আটকালি। তারপর নাইইইই…। জ্যোৎ¯œা ভাসা আলোর চোখ মুঞ্জি যায়। জিগায় আর কয় : সোনার মানুষ সব সোনার পিরিত করে— বাউরা সব বাউরা। হাঃ হাঃ হা।

বিশুটার জন্যে সেদিন আর জ্যোতিনবাবুকে দেখতে যাওয়া হয়নি মাখনুনের। আর সে দেখারইবা কী? খালি খাড়ায়া থাকা আর কাপড় শোঁকা। অক কেটা পোছে। পোদ্দারি তো খালি এই ক্লাসের বন্ধুদের নিয়া। অরাই মাখনুনোক নিয়া যা করে! বিশু না হলে অর যাবারও সাহস নাই। এখন কাম খালি দোকানোত বসা আর ক্যাসের ট্যকা চুরি করি পাইনঅ্যাপেল খাওয়া। চকচকা পাইনঅ্যাপেল বিস্কুট। মচমচা। খালি খোল আর খাও। একদিন ধরা পড়লে হয়! গোপনে গোপনে সেদিন তো ষান্মাসিক পরীক্ষার প্রশ্নও বিক্রি করছে। নতুন বই পাল্টানোর নাকান নয়া প্রশ্নও ইটের ফাঁক দিয়া চুরি করি মানষোক দিছে। সেই নিয়া তো তুলকালাম কা-, মাখনুন ভয়ে সিটায়া যায়। বাপ একবার যদি জানে যে, প্রশ্ন চুরি করি মানষোক দিছে— তাইলে মরণ। কিন্তু আল্লার কী কাম— সেটা বেশিদূর যায় নাই। কারণ, ওই দিনই সন্ধ্যার পরে বিরাট ঝড় শুরু হয়া যায়। সে ঝড়ে অনেক পুরানা কৃষ্ণচূড়া গাছের ডাল একমাত্র জরুরি রাস্তার ওপর ভাঙ্গি পড়ে। কারেন্টের তার ছিঁড়ি যায়। স্কুলঘরের চাল উড়ি যায়। থানার মাঠে পুলিশের থাকা ঘর আর বড় আমগাছটার ডাল ভাঙ্গি পড়ে। ওই আমগাছের তলায় তো কতো আসামীর বাঁশডলা আর ঝুলিয়া পেটানোর দৃশ্য সে দেখেছে। এসব তছনছের ভেতরে পরীক্ষা বন্ধ হয়া যায়। হেডমাস্টার ওইদিন লুঙ্গি হাঁটুর ওপর তুলি স্কুলঘরের অফিসে ঢুকে দেখেন— সব নষ্ট হয়া গেছে। তাড়তাড়ি তিনি দপ্তরী চাচাক ডাকেন। কিন্তু বিস্ময়কর, কোন অজানা কারণে সে রাতেই দপ্তরী চাচা মারা যান। হেডস্যার তখন দিশেহারা। ঝড়ের রাতের তা-ব আর দপ্তরীর মৃত্যু তিনি এক করতে পারেন নাই। ভাগ্য ভালো যে, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটা আগেই হয়া গেছিল। মঞ্চ আর অন্যান্য স্মৃতিভেজা সামগ্রী তখন তছনছ করি একাকার। মাখনুন প্রকৃতির এ তা-ব নিয়ে প্রশ্ন খোঁজে। জেডএমএলএ মার্কা শক্তিও বুঝি এতে ফেল— তাই সে স্কুলের পাশে বসি নীরবে ত্যানা শোঙগে। বিড়াল হাঁটে। কলেজের ঠা-া বারান্দা দিয়া এক অচেনা মানুষকে দেখে। ঠিক চেনে না, আবার চেনেও। বুঝি এই চালকলের মেনাজার। সেখানকার বড় বড় কাজ আর টাকা লেনদেন সে দেখাশোনা করে। লোকটা দূর থেকে তার দিকে তাকায়। আবার হাঁটে। একটু আড়ালে কলেজের বারান্দাটা শেষ হলে পেছনে কয়েকবার তাকিয়ে সে ভেতরে ঢোকে। মাখনুন এক নয়নে স্কুল মাঠের দিকে তাকায়। কবে আবার স্কুল শুরু হবে ঠিক নাই। ততোদিন বুঝি টিও সাহেবের ছেলে আর থাকবেন না। সারের ব্যাটাও না। স্কুলের আনন্দটাই মাটি। যদি একমাস পর চালু হয়— তবে নতুন কেনা ব্যাগটাও আর ওদের কেউ দেখতে পাবে না। তবে প্রটোপ্লাজম আপাতত আর পড়ার দরকার নাই। তাতে স্বস্তি পায়। ডগডগা চোখে আর দ্য কাউ পড়ারও দরকার নাই। প্যান্টির ওপর মারগুলা আপাতত না হলে ভালোই। কিন্তু হুপ করি ওই লোকটা কলেজের আন্ধার ঘরোত ঢুকলো ক্যা। ওসব দেখলে তার ভয় করে। ভয়ে ভয়ে নুনুর গোড়াটা ছোট হয় আর ক্যামন ক্যামন যেন করে। তবে হেডস্যার ঠিক একটু পরেই বের হয়ে আসেন। তখন তাকে না দেখার ভান করে সে সরে পড়ে। কোণার গলি ধরে সে পার্কের দীঘির দিকে রওয়ানা হয়। সেখানে আজ কেউ নাই। তবে দূরের ডাক আসে। নতুন ছবি আসছে— সেনেমা হলে। নাম তার ‘মরণের পরে’। শ্রেষ্ঠাংশে… শোনার আগেই শব্দটা বাতাসে মিলিয়ে যায়। দূরে শহরের ডাক, সেখানে নতুন নতুন সিনেমার খবর মামা নিয়া আসেন। তবে হঠাৎ তার সাইকেল নষ্ট হইলে তিনি সাথে নিয়া সামনের বাজারে যান। সেখানে এক ছোট্ট জনসভা চলে। সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সকলকে কোন পাতিমন্ত্রী আহ্বান জানান। তিনি কবি-জেনারেলের পতাকাতলে আসার জোর দাবি জানান। মন্ত্রীর গেরুয়া পাঞ্জাবী আর দামী রিস্ট-ওয়াচের  উত্তোলিত হাত দিয়া জেডএমএলএ মনোনীত ব্যক্তিকে পরিচিত করান। আর দম্ভের সঙ্গে বলেন কবি সাব অনেক স্কুল কলেজ সরকারি করছেন। আপনাদেরটাও হয়েছে, আরও হবে। আমরা আপনাদের বিদেশিদের দিয়া সুন্দর রাস্তা বানাইছি। আপনার গাঁয়ে রাস্তা পাকা হইচে— কে করছে? এই ব্যক্তি করিছে। তাকে আপনাদের কৃষাণ-কৃষাণীর মার্কায় ভোট দেবেন। নইলে সুখ নাই। কারো কথা শুনবেন না। হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও করে নিজেদের সম্পদ ধ্বংস করবেন না। এসব নষ্ট হলে আর পাবেন না। হাসপাতাল,এম্বুলেন্স করে দিয়েছি। তাই কোনো মেয়ে মানুষের কথায় নাচবেন না। আপনাদের ঘরে মা-বোন আছে; তারা গৃহে থাকে— আর এরা বেপর্দা খালি পুরুষ মানষের লগে দিনরাত কী করছে তার ঠিক না। শরীয়ত নষ্টের কাম। আপনারা পুরুষ মানুষের দিকে আসেন। আল্লার কাম করেন, তার আদেশ-নির্দেশ মানেন। সেই কারণে, পার্লামেন্টে ইসলামকে গুরুত্ব দিয়া প্রধান বিল পাশ করানো হবে। ইসলামকে আইনি মর্যাদা দেওয়া হবে। এইসব বেপর্দা আর চলবে না। আল্লার আইন আপনারা চান!— হাত উঠান, দুই হাত উঠান— তাহলে এই মার্কায় ভোট দেন, এবং তাকে সংসদে পাঠান।— এভাবে বক্তৃতা চলাকালীন মামা মাখনুনকে বাড়ি যেতে কয়। সিনেমা দেখা নিয়া পরে কথা হবে। ততোক্ষণ সভা ভাঙলে, সে গাছের দিকে তাকিয়া অদ্যকার সিনেমার রোদপড়া চকচকা পোস্টারের দিকে তাকায়। নায়িকাদের দিকে আকর্ষণ বেশি। সেখানে সহজে চোখ পড়া কঠিন। অনেক লোকের যাতায়াত হওয়ায় মাখনুন তাকায় আবার পেছন ফেরে— তখন হঠাৎ এখলাস চাচাকে রিক্সায় দেখে। দাড়িমুখ আর ভর্তি মাথার চুলে তার প্রতি আরও আকর্ষণ বলে। কিন্তু তিনি চেনেন নাই। অচিন হওয়ার কারণ কী? বুঝি তার পরিবর্তন আসিয়াছে। কানে কানে আসে উনি এখন সরকারি দলের লোক— সেখানেই চলছেন, মন্ত্রী বিদেয় করতে।

স্কুল বারান্দায় তখনও বেশ লোক। বুঝি ঘরোয়াভাবে এখানেই এখলাস চাচার সম্বর্ধনা। খুশবু আর দামী পাইপের ধোঁয়ার পাশাপাশি ঠিক সমাদর আছে, কিন্তু পুলিশ-স্তাবকের সংখ্যা কম নয়। তাহারা মিলিটারী অফিসারগণের সম্পর্কে কী সব কয়। মার্শাল ল নাকি মার্শাল নিয়া কী কী সব হয়। স্কুল মাস্টার প্রিজাইডিংদের সরকারি আদেশের পক্ষে কাজ করতে বলা হয়। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা, বোমাবাজি নয়, মেকানিজমটা হবে অন্য। তারই শলামরামর্শ হবে রাতে।

(চলবে)

———————————————-

বাংলাদেশের ৫০ বছরের গল্প ও গল্পকার

অজিত কুমার নিয়োগী   :               ধূসরলিপি (১৯৬৪)

অদিতি ফাল্গুনী             :               ইমানুয়েলের গৃহে প্রবেশ (১৯৯৯), তিতা মিঞার জঙ্গনামা (২০০৯), চিহ্নিত বারুদ বিনিময় (২০০৭), বানিয়ালুকা ও অন্যান্য গল্প (২০১৩), ধৃত-রাষ্ট্রের বালিকারা (২০১৪)

অনামিকা হক লিলি         :               নিলম্বন (১৯৮৩), ব্যঞ্জনা (১৯৮৪), যাতনা (১৯৮৮), অষ্টপ্রহর (১৯৯০), কুরে কুরে (১৯৯১), আমি তোমাদেরই লোক (২০০২), কলম তুমিই বলো (২০০৩)

অরূপ তালুকদার             :               রংবাজ ফেরে না (১৯৬৯)

আ. ন. ম. বজলুর রশীদ :               পথ ও পৃথিবী (১৯৬৪)

আকবরউদ্দীন  :               অসমাপ্ত কাহিনী ও অন্যান্য গল্প

আকবর হোসেন               :               আলোছায়া (১৯৬৪)

আকমল হোসেন নিপু     :               জলদাসের মৎস্যঘ্রাণ (১৯৯৮), বুড়ি চাঁদ ডুবে যাবার পরে (২০০৩), আমরা খুব খারাপ সময়ে বেঁচে আছি (২০০৬)

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস           :               অন্য ঘরে অন্য স্বর (১৯৭৬), দুধভাতে উৎপাত (১৯৮৫), খোঁয়ারি (১৯৮৯), দোযখের ওম্ (১৯৮৯), জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল (১৯৯৭)

আজিজুর রহমান             :               কালো ফিতা (১৯৬৫), দেশী ফুল (১৯৬৫), একটি অচল আনি (১৯৬৬), উপস্থিত সুধীম-লী (১৯৭৮), পা-ুলিপি ও গয়নার বাক্স (১৯৭০), স্বনির্বাচিত গল্প (১৯৭৮), বুনোবৃষ্টি (১৯৮৪), নিজের বাড়ি (১৯৮৮)

আতা সরকার     :               বিপজ্জনক খেলা সম্পর্কে রিপোর্ট, নিষিদ্ধ রাজনীতির গল্প, সুন্দর তুমি পবিত্রতম, ব্রেকহীন বাস চলছে চলছে (১৯৯৭), সাহসী মানুষের গল্প, নির্বাচিত গল্প, রে স্বপ্ন রে দুবৃত্ত

আফলাতুন         :               অলৌকিক পাখি (১৯৮৮)

আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন       :               চিরকুট (১৯৮১), নেপথ্য নাটক (১৯৮২), ওম শান্তি (১৯৮৩),শালবনের রাজা (১৯৮৩), নলখাগড়ার সাপ (১৯৮৩), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৯৬), আনন্দ ভুবন (১৯৯৭), মনোনীত গল্প (১৯৯৩), সোনার শরীর (১৯৯০), কলেজ গার্ল (১৯৯১), নীল ছবির নায়িকা (১৯৯০), নির্বাচিত প্রেমের গল্প (১৯৮৮)

আবদার রশীদ   :               নানান রঙ্গ (১৯৭৩) ও রঙ্গ ষোড়শী (১৯৭৫)

আবদুর রশীদ ওয়াসেকপুরী         :               অলিগলি কতপথ (১৯৫৯)

আবদুল গাফফার চৌধুরী               :               কৃষ্ণপক্ষ (১৩৩৬), সম্রাটের ছবি (১৯৫৯), সুন্দর হে সুন্দর (১৯৬০)

আবদুল মান্নান সৈয়দ     :               সত্যের মতো বদমাশ (১৯৬৮), মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা (১৯৭৭), চলো যাই পরোক্ষে (১৯৭৩), গল্প ১৯৬৪ (১৯৭০), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৭), মাছ মাংস মাৎসর্যের রূপকথা (২০০২), কেন আসিলে ভালোবাসিলে (২০১০)

আবদুল হাই মাশরেকী    :               কুলসুম (১৯৫৪), বাউল মনের নকশা (১৯৭১)

আবদুশ শাকুর   :               ক্ষীয়মান (১৯৬১), এপিটাফ (১৯৭৬), ধস (১৯৮২), বিচলিত প্রার্থনা (১৯৮৩), নৈসর্গিক গল্প (১৯৯৭), গোলাপধোলাই (১৯৯৭), গল্পসমগ্র (২০০২), আঘাত (২০০৬), টোটকা (২০০৬)

আবুবকর সিদ্দিক            :               ভূমিহীন দেশ (১৯৮৫), মরে বাঁচার স্বাধীনতা (১৯৮৭), চরবিনাশকাল (১৯৮৭), কুয়ো থেকে বেরিয়ে (১৯৯৪), ছায়াপ্রধান আঘ্রান (২০০০), কান্নাদাসী (২০০৬), বামাবর্ত (২০০৭), মুক্তিলাল অভ্যুদয় (মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প) (২০০৮), কালোকুম্ভীর (২০০৮), হংসভাসীর তীরে (২০০৮), শ্রেষ্ঠ গল্প (২০০৭), গল্পসমগ্র ১ম খ- (২০০৮)

আতোয়ার রহমান            :               হলদে লতা (১৯৬৪), বলয় (১৯৬৭)

আন্ওয়ার আহমদ           :               সতর্ক প্রহরা (১৯৮৩)

আনোয়ার পাশা :               নিরূপায় হরিণী (১৯৭০)

আনিস চৌধুরী   :               গল্পসংগ্রহ (২০০৭)

আবু ইসহাক       :               হারেম (১৯৬২), মহাপতঙ্গ (১৯৬৩)

আবু জাফর শামসুদ্দীন  :               জীবন (১৯৪৮), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৬২), শেষ রাত্রির তারা (১৯৬৬), এক জোড়া প্যান্ট ও অন্যান্য (১৯৬৭), রাজেন ঠাকুরের তীর্থযাত্রা (১৯৭৮), ল্যাংড়ী (১৯৮৪), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৮)

আবুল ফজল     :               মাটির পৃথিবী (১৯৪০), আয়ষা (১৯৫১), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৬৪), নির্বাচিত গল্প (১৯৭৮), মৃতের আত্মহত্যা (১৯৭৮)

আবুল মনসুর আহমদ    :               আয়না (১৯৩৫), ফুড কনফারেন্স (১৯৪৪), আসমানী পর্দা (১৯৬৪)

আবু রুশ্দ           :               রাজধানীতে ঝড় (১৯৩৮), প্রথম যৌবন (১৯৪৮), শাড়ী বাড়ী গাড়ী (১৯৬১), মহেন্দ্র মিষ্টান্ন ভা-ার (১৯৮৫), স্বনির্বাচিত গল্প (১৯৭৯), দিন অমলিন (১৯৮৫), বিয়োগ ব্যথা (১৯৯৬), নির্বাচিত গল্প (১৯৯০), গল্পসমগ্র (২০০০)

আল মাহমুদ      :               পানকৌড়ির রক্ত (১৯৭৫), সৌরভের কাছে পরাজিত (১৯৮৩), গন্ধবণিক (১৯৮৬), প্রেমের গল্প (১৯৯১), ময়ূরীর মুখ (১৯৯৪), আল মাহমুদের গল্প (১৯৯১), গল্পসমগ্র (১৯৯৭)

আলাউদ্দিন আল আজাদ             :               জেগে আছি (১৯৫০), ধানকন্যা (১৯৫১), মৃগনাভি (১৯৫৩), অন্ধকার সিঁড়ি (১৯৫৮), উজান তরঙ্গে (১৯৬২), যখন সৈকত (১৯৬৭), আমার রক্ত স্বপ্ন আমার (১৯৭২), জীবন জমিন (১৯৮৮), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৫), মনোনীত গল্প (১৯৮৭), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৭), শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প (১৯৯৯)

আশরাফ উজ জামান     :               অরণ্য পর্বত নদী ও সমুদ্র (১৯৪৯), খেয়া নৌকার মাঝি (১৯৫২)

আশরাফ সিদ্দিকী            :               রাবেয়া আপা (১৯৫৫), প্যারিস সুন্দরী (১৯৭৫), শেষ নালিশ (১৯৯২)

আশীষকুমার লোহ           :               অনেক তারার আকাশ (১৯৬৬)

আহমদ ছফা      :               দোলা আমার কনকচাঁপা (১৯৬৮)। এছাড়া নিহত নক্ষত্র (১৯৬৯), বুলবুল চৌধুরী (জ. ১৯৪৭), টুকা কাহিনী (১৯৬৮), পরমানুষ (১৯৯৭), নির্বাচিত গল্প (১৯৯৭) তাঁর গল্পগ্রন্থ

আহমদ মীর       :               লালমোতিয়া (১৯৬৫)

আহমদ রফিক  :               অনেক রঙের আকাশ (১৯৬৪)

আহমাদ মোস্তফা কামাল              :               এক প্রকার দ্বিতীয় মানুষ (১৯৯৮), আমরা একটি গল্পের জন্য অপেক্ষা করছি (২০০০), অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে (২০০৪), ঘরভর্তি মানুষ অথবা নৈঃশব্দ্য (২০০৭)

ইমতিয়ার শামীম              :               শীতঘুমে একজীবন (১৯৯৬) এরপর গ্রামায়নের ইতিকথা (২০০০), কয়েকটি মৃত মুনিয়া (২০০২), মাৎসন্যায়ের বাকপ্রতিমা (২০০৫)

ইমদাদুল হক মিলন         :               ভালোবাসার গল্প (১৯৭৭), নিরন্নের কাল (১৯৭৯), প্রেমের গল্প (১৯৮৩), হে প্রেম (১৯৮৩), ফুলের বাগানে সাপ (১৯৮৩), বালিকারা (১৯৮৩), আহারী (১৯৮৪), তোমাকে ভালোবাসি (১৯৮৫), নির্বাচিত প্রেমের গল্প (১৯৮৫), বাছাই গল্প (১৯৮৬), তাহারা (১৯৮৬), মর্মবেদনা (১৯৮৮), প্রেম নদী (১৯৮৮), প্রেমিক প্রেমিকা (১৯৮৮), বারো রকম মানুষ (১৯৮৮), ভালোবাসার নির্বাচিত গল্প (১৯৮৯), যদি জানতে (১৯৯০), প্রেম ভালোবাসা (১৯৯০), ভালোবাসা (১৯৯০), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯০), গোপন দুয়ার

ইফফাত আরা   :               রোদনভরা বসন্ত (১৯৮৯), নোনাস্বাদের জীবন (১৯৯০), একাকী অন্ধকারে (১৯৯৪)

ইবরাহীম খাঁ        :               আলু বোখরা (১৯৬০), উস্তাদ (১৯৬৭), দাদুর আসর (১৯৭১), মানুষ

ইসহাক চাখারী   :               জানালা (১৯৬৭), স্বপ্নের কুশীলব (১৯৬৭), প্রথম কৃষ্ণচূড়া (১৯৭২), বিপরীত মানুষ (১৯৭৭)

এহসান চৌধুরী  :               একাত্তরের গল্প (১৯৮৬)

ওয়াসি আহমেদ :               বীজমন্ত্র, তেপান্তরের সাঁকো, শিঙা বাজাবে ইসরাফিল (২০০৬)

কাজি আফসার উদ্দিন আহমদ  :               কোলাহল (১৯৪৭), কালনাগিনী (১৯৫২), জ্বালাও আলো (১৯৫৪), যুদ্ধের ভয়ঙ্কর গল্প (১৯৫৪), নূতন প্রেম (১৯৫৫)

কাজী ফজলুর রহমান    :               দর্পণে প্রতিবিম্ব (১৯৮৭), যাত্রী (১৯৮৭), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৮৮), বিশ্বাসঘাতক (১৯৯১)

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর              :               মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম (২০০৫), স্বপ্নবাজি (২০০৭)

কায়েস আহমেদ               :               অন্ধতীরন্দাজ (১৯৭৮), লাশ কাটা ঘর (১৯৮৭)

খালেদা এদিব চৌধুরী       :               অন্য এক নির্বাসন (১৯৭৬), জন মনিষ্যির গল্প (১৯৮২), পোড়ামাটির গন্ধ (১৯৮৫)

গজনফর আলী :               ভাববিলাস (১৯৫৭)

চৌধুরী শামসুর রহমান   :               ফুটপাত (১৯৬০)

জহির রায়হান    :               জহির রায়হানের গল্পসমগ্র (১৯৭৯)

জাকির তালুকদার            :               স্বপ্নপুরাণ কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ (১৯৯৭), বিশ্বাসের আগুন (২০০০), কন্যা ও জলকন্যা (২০০৩), কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই (২০০৬), হা-ভাতভূমি (২০০৬) ও মাতৃহন্তা ও অন্যান্য গল্প (২০০৭)

জাফর তালুকদার             :               অন্নদাস (১৯৯০), মানুষের গন্ধ (১৯৯০), প্রেমের গল্প (১৯৯১), নির্বাচিত গল্প (২০০৪)

জুলফিকার মতিন            :               রাখ তোমার উদ্যত বাহু (১৯৯৯), পাগল হবার রূপকথা (১৯৯৯), আকাশ বাসর (১৯৯৯), অন্যরকম (২০০০), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (২০০১), অন্ধকারের জন্তুরা (২০০৭)

জুবাইদা গুলশান আরা   :               কায়াহীন কারাগার (১৯৭৭), বাতাসে বারুদ রক্তে নিরুদ্ধ উল্লাস (১৯৮৬), হৃদয়ে বসতি (১৯৮৯)

জ্যেতিপ্রকাশ দত্ত             :               দুর্বিনীত কাল (১৯৬৫), বহে না সুবাতাস (১৯৬৭), সীতাংশু তোর সমস্ত কথা (১৯৬৯), পুনরুদ্ধার, প্লাবনভূমি, উড়িয়ে নিয়ে যা কালো মেঘ (১৯৯২), ফিরে যাও জ্যোৎস্নায়, নির্বাচিত গল্প, গল্পকল্প ও বাঁচামরার জীবন (২০০৫), যে যায় সে যায় (২০১২)

জোবেদা খানম :               খুকুর এ্যাডভেঞ্চার (১৯৬৭), একটি সুরের মৃত্যু (১৯৭৪), জীবন একটি দুর্ঘটনা (১৯৮১)

ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ          :               মুক্তিযুদ্ধের অশ্রুত বাঁশি, গোধূলি রং খেলা (১৯৬৬), অলকাপুরী (১৯৮৬), মখমলে আলপিন (১৯৮৯), নূর হোসেনের পদধ্বনি (১৯৯৪), নাইট কুইন

তাপস মজুমদার               :               মঙ্গল সংহিতা (১৯৯৫), একটি দশ টাকার নোট (১৯৯৬), কেউ কাউকে চেনে না (১৯৯৭)

তাসাদ্দুক হোসেন             :               অরণ্য শিশির (১৯৬৩), বিকেলের শেষ প্রার্থনা (১৯৭৯), উত্তমাশা অন্তরীপে (১৩৮৪)

দিলারা জামান   :               অস্তরাগ (১৯৬২), আর্শিতে আমি (১৯৭৬), মৃগয়ায় শরবিদ্ধ (১৯৮৬)

দিলারা হাশেম    :               হলুদপাখির কান্না (১৯৭০), সিন্ধুপারের উপাখ্যান (১৯৮৮), নায়ক (১৯৮৯)

দৌলতুন্নেসা খাতুন           :               গল্পমঞ্জুরী (১৯৬২)

নাসরীন নঈম    :               এখানে পিঞ্জর (১৯৮৪), আর যে পারি না মিলাপু (১৯৯০), সহসা দুপুরে দহন (১৯৯১), অপত্য স্নেহের ডালপালা (১৯৯৯)

নাজমা জেসমিন চৌধুরী :               অন্য নায়ক (১৯৮৫), মেঘ কেটে গেল (১৯৮৮)

নাসরিন জাহান :               স্থবির যৌবন (১৯৮৫), বিচূর্ণ ছায়া (১৯৮৮), সূর্য তামসী (১৯৮৯), পথ, হে পথ (১৯৮৯), সারারাত বিড়ালের শব্দ (১৯৯১), আশ্চর্য দেবশিশু (১৯৯৫), পুরুষ রাজকুমারী (১৯৯৬), সম্ভ্রম যখন অশ্লীল হয়ে ওঠে (১৯৯৭), এলেন পোর বিড়াল (২০০৬), নারীবাদী গল্প (২০১০), ছেলেটি যে মেয়ে মেয়েটি তা জানে না (২০১০)

নেয়ামাল বাসির :               ধূপছায়া (১৯৬৯)

নির্মলেন্দু গুণ     :               আপন দলের মানুষ (১৯৮৫)

নীলিমা ইব্রাহীম :               রমনা পার্কে (১৯৬৪)

পাপড়ি রহমান  :               লখিন্দরের অদৃষ্ট যাত্রা (২০০০), হলুদ মেয়ের সীমান্ত (২০০১), মহুয়া পাখির পালক (২০০৪), অষ্টরম্ভা (২০০৭), ধূলিচিত্রিত দৃশ্যাবলি (২০১০)

পারভেজ হোসেন             :               ক্ষয়িত রক্তপুতুল (১৯৯০), বৃশ্চিকের জাল ও অন্যান্য (১৯৯৩), স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯৪)

পূরবী বসুর          :               পূরবী বসুর গল্প, আজন্ম পরবাসী, সে নহি নহি, নিরুদ্ধ সমীরণ

প্রশান্ত মৃধা          :               কুহকবিভ্রম (২০০০), ১৩ ও অবশিষ্ট ছয় (২০০১), আরও দূর জন্ম-জন্মান্তর (২০০৪), শারদোৎসব (২০০৬), বইঠার টান (২০০৬), গল্পের খোঁজে (২০১১)

ফরিদা হোসেন  :               অজন্তা (১৯৬৫), ঘুম (১৯৮৫), শাড়ী (১৯৮৭), একটি শীতল মৃত্যু (১৯৮৭), হিমালয়ের দেশে (১৯৯৪), নির্বাচিত গল্প (১৯৯৪), ক’জনার কথা (১৯৯৪)

বন্দে আলী মিয়া :               তাসের ঘর

বশীর আল হেলাল            :               আনারসের হাসি (১৯৭৪); প্রথম কৃষ্ণচূড়া

বিপ্রদাশ বড়–য়া :               সাদা কফিন (১৯৮৪), যুদ্ধজয়ের গল্প (১৯৮৫), গাঙচিল (১৯৮৭), নদীর নাম গণতন্ত্র (১৯৮৭), বীরাঙ্গনার প্রেম (১৯৮৭), উল্কি একটি প্রেমের গল্প (১৯৮৮), স্বপ্নমিছিল (১৯৮৯), আকাশে প্রেমের বাদল (১৯৮৯), স্বপ্ন সমুদ্রে বনদেবীরা আছে (১৯৯০), নির্বাচিত প্রেমের গল্প (১৯৯০), আমি মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করি (১৯৯১), স্বপ্নসুন্দরী (১৯৯৪), অলৌকিক চুম্বন (১৯৯৫), আমি একটি স্বপ্ন কিনেছিলাম (১৯৯৬), ফিরে তাকাতেই দেখি বঙ্গবন্ধু (১৯৯৭)

বুলবন ওসমান  :               প্রত্যালীঢ় (১৯৬৭), মুকুরে মুখ (১৯৬৯)

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর     :               অবিচ্ছিন্ন (১৯৬০), দূর দূরান্ত (১৯৬৮), কণ্ঠস্বর (১৩৭৪), বিশাল ক্রোধ (১৩৭৬), মু-হীন মহারাজ (১৯৭৪), এক ধরনের যুদ্ধ (১৯৮৪), গণতন্ত্রের প্রথম দিন ও অন্যান্য গল্প (১৯৯২), বিপ্লব দীর্ঘজীবী থেকে (১৯৯৭)

ভাস্কর চৌধুরী     :               তাঁর রক্তপাতের ব্যাকরণ (১৯৮৪), বাষট্টি বিঘা নদী (১৯৮৬), কোথায় নিবাস (১৯৮৬), পতনের সময় (১৯৮৭)

মকবুলা মনজুর :               সায়াহ্ন যূথিকা (১৯৭৮), শকুনেরা সবখানে (১৯৮৯), নক্ষত্রের তলে (১৯৮৯), মকবুলা মনজুরের প্রেমের গল্প (১৯৮৯), একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৯১), দিনরজনী (১৯৯৩)

কিশোর গল্প        :               রঙিন মাছ (১৯৮২), অপূর্ব উপহার (১৯৮২), নদীর ওপারে মেলা (১৯৮৬), কিশোর মহাভারত (১৯৮৭), সূর্য কিশোর (১৯৮৮), নির্বাচিত কিশোর গল্প (১৯৮৯), ছোট ছোট রূপকথা (১৯৮৯)

মঈদ-উর রহমান             :               ময়ূরের পা (১৯৫৮)

মঈনুল আহসান সাবের :               পরাস্ত সহিস (১৯৮২), এরকমই (১৯৯০), ভিড়ের মানুষ (১৩৯৬), অরক্ষিত জনপদ (১৯৮৩), আগমন সংবাদ (১৯৮৪), চারদিক খোলা (১৯৮৫), স্বপ্নযাত্রা (১৯৮৪), নির্বাচিত (১৯৯৯)

মনিরা কায়েস    :               মাটিপুরাণ পালা (১৯৯৯), জলডাঙ্গার বায়োস্কোপ (২০০১), ধুলোমাটির জন্মসূত্র (২০০৪), কথামনুষ্যপুরাণ (২০০৭)

মশিউল আলম  :               আবেদালির মৃত্যুর পর (২০০৭) গল্পটি রচনা করেন। তাঁর অন্যান্য গল্প রূপালি রুই ও অন্যান্য গল্প (১৯৯৪), আমি শুধু মেয়েটিকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম (১৯৯৯), মাংশের কারবার (২০০৪)

মঞ্জু সরকার  :               অবিনাশী আয়োজন (১৯৮২), মৃত্যুবাণ (১৯৮৫), পুরাতন প্রেম ও অন্যান্য গল্প (১৯৮৬), উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা (১৯৯০), আনন্দ যাত্রা (১৯৯৫), অপারেশন জয় বাংলা (১৯৯৭), মঙ্গাকালের মানুষ

মঞ্জুশ্রী চৌধুরী              :               জাগ্রত যে ভালো (১৯৮৪), বিষকন্যা (১৯৮৯), সোনার খাঁচা (১৯৮৯)

মতিন উদ্-দীন আহমদ :               চালাক হওয়ার পয়লা কেতাব (১৯৫৮), তিন চেরাগ তিন শামাদান ফাউ (১৯৬৪), এ-তো বড় রঙ্গ যাদু (১৯৬৯)

মযহারুল ইসলাম             :               তাল তমাল (১৯৫৯)

মফিজ উদ্দীন আহমদ   :               রূপ (১৯৬৬), স্টার সার্কাস (১৯৭৭)

মবিন উদ্দীন আহমদ      :               কলঙ্ক (১৯৪৬), হোসেন বাড়ীর বৌ (১৯৫২), ভাঙাবন্দর (১৯৫৪)

মহীবুল আজিজ :               গ্রাম উন্নয়ন কমপ্লেক্স ও নবিতুনের ভাগ্যচাঁদ (১৯৮৮), দুগ্ধগঞ্জ (১৯৯৭), মৎস্যপুরাণ (২০০০), আয়নাপড়া (২০০৬)

মাফরুহা চৌধুরী               :               অরণ্যগাথা ও অন্যান্য গল্প (১৯৭৬), কোথাও ঝড় (১৯৮০), স্খলিত নক্ষত্র (১৯৮১), বিমূর্ত বৃত্তে (১৯৮৪), বিদীর্ণ প্রহর (১৯৮৩), নিঃশর্ত করতালি (১৯৮৪), মাফরুহা চৌধুরীর প্রেমের গল্প (১৯৮৬), শব নিয়ে বসবাস (১৯৮৭), ছায়া পথের মানচিত্র (১৯৮৮), মাফরুহা চৌধুরীর নির্বাচিত গল্প (১৯৯০)

মামুন হুসাইন     :               শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি (১৯৯৫), মানুষের মৃত্যু হলে (২০০০), আমার জানা ছিল কিছু (২০০০), বালক বেলার কৌশল (২০০২), নিরুদ্দেশ প্রকল্পের প্রতিভা (২০০২), কয়েকজন সামান্য মানুষ (২০০৩), একটি স্মারকগ্রন্থের জীবনপ্রণালী, রাষ্ট্রযন্ত্রের খেলাধুলা, যুদ্ধাপরাধ ও ভূমিব্যবস্থার অস্পষ্ট বিবরণ (২০১১), অন্ধজনের জাতককথা (২০১৪)

মাহবুব তালুকদার            :               সুবর্ণ জয়ন্তী

মাহমুদুল হক     :               প্রতিদিন একটি রুমাল (১৯৯৪), নির্বাচিত গল্প (২০১০)

মাহ্বুব-উল্ আলম           :               মফিজন (১৯৪৬), তাজিয়া (১৯৪৬), পঞ্চঅন্ন (১৯৫৩), গাঁয়ের মায়া (১৯৪৯)

মালিহা খাতুন     :               মনের রং লাল (১৯৮৭), মন ভালো নেই (১৯৯০), স্মৃতি তুমি বেদনা (১৯৯৩)

মুনিরা চৌধুরী     :               মেঘ ও অতলান্তে (১৯৮৪), বুনোঘ্রাণ (১৯৮৪), সূর্য মৃত্তিকা (১৯৮৫), নির্জন (১৯৮৬)

মুস্তাফা পান্না      :               লোকসকল (১৯৮৪), কৃষ্ণপক্ষের প্রতিবাদ (১৯৮৯)

মিন্নাত আলী       :               আমার প্রথম প্রেম (১৯৫৯), মফস্বল সংবাদ (১৯৫৮), যাদুঘর (১৯৬৯), চেনা ও অচেনা (১৯৮০)

মিরজা আবদুল হাই         :               ছায়া-প্রচ্ছায়া (১৯৭৬), বিস্ফোরণ (১৯৭৮), ফিরে চলো (১৯৮১)

মুশতারী শফী     :               একটি যুদ্ধ (১৯৭৩), শঙ্খচিলের কান্না (১৯৮৩), জীবনের রূপকথা (১৯৮৪), এমনও হয় (১৯৮৫)

মোহাম্মদ ফজলুল করীম              :               কাজল দীঘির পদ্ম (১৯৬৯), রূপের মোহে (১৯৬৯)

রবীন্দ্র গোপ        :               রোদহীন বসতি (১৯৮০), পরাণের স্বাধীনতা (১৯৮৬), স্বপ্ন ও চাঁদের কঙ্কাল (১৯৯০), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৯৭), যুদ্ধজয়ের গল্প (১৯৯৭)

রশীদ হায়দার     :               নানকুর বোধি (১৯৬৭), অন্তরে ভিন্ন পুরুষ (১৯৭৩), মেঘেদের ঘরবাড়ি (১৯৮২), উত্তরকাল (১৯৮৭), তখন (১৯৮৭), আমার প্রেমের গল্প (১৯৮৮), পূর্বাপর (১৯৯৩), মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প (২০০৫)

রাজিয়া মাহবুব  :               খাপছাড়া (১৯৫৮), স্বনির্বাচিত গল্প (১৯৬২), দূরভাষিণী (১৯৬৯), মুখরিত গহনে (১৯৮৩)

রিজিয়া রহমান  :               অগ্নিস্বাক্ষরা (১৯৬৭), নির্বাচিত গল্প (১৯৭৮), হারকিউলিসের আগুন (২০১০)

রাবেয়া খাতুন     :               মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, আমার এগারোটি গল্প, নির্বাচিত ছোটগল্প

রাহাত খান           :               অন্তহীন যাত্রা (১৯৭৫), অনিশ্চিত লোকালয় (১৩৮০), ভালো মন্দের টাকা (১৯৮১), আপেল সংবাদ (১৯৮৩)

রেজাউর রহমান               :               অভয়ারণ্য (১৯৮৬), বাক্সবন্দী সব (১৯৮৭), বিস্মৃত এক ভুবন (১৯৮৮), ওরা কোথায় যে যায় (১৯৮৯), সেই কলস পেয়ে যাবেই (১৯৯৪), স্মৃতির মানচিত্রে তারার ফাঁদ (১৯৯৫)

লায়লা সামাদ     :               দুঃস্বপ্নের অন্ধকারে (১৩৭৩), কুয়াশার নদী (১৩৭৬), অরণ্যে নক্ষত্রের আলো (১৯৭৫), অমূর্ত আকাক্সক্ষা (১৯৭৮)

শামসুদ্দীন আবুল কালাম              :               শাহেরবানু (১৯৪৫), পথ জানা নেই (১৯৪৮), অনেক দিনের আশা (১৯৪৯), ঢেউ (১৯৫৩), দুই হৃদয়ের তীর (১৯৫৫), পুঁই ডালিমের কাব্য (১৯৫৩)

শামসুল ইসলাম :               কুসুমের ঋতু (১৯৬৬), সিগারেট ও অন্যান্য গল্প (১৯৭৬)

শওকত ওসমান :               উপলক্ষ্য (১৯৬৮), উভশৃঙ্গ (১৯৬৮), জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প (১৯৫১), নেত্রপথ (১৯৬৮), পিঁজরাপোল (১৯৫১), প্রস্তরফলক (১৯৬৪), সাবেক কাহিনী (১৯৫৩), এবং তিন মির্জা (১৯৮৬), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৪), মনিব ও তাহার কুকুর (১৯৮৬), বিগত কালের গল্প (১৯৮৭), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৭৪), পুরাতন খঞ্জর (১৯৮৭), হন্তারক (১৯৯১), রাজপুরুষ (১৯৯৪)

শাহরিয়ার কবির :               একাত্তরের যীশু (১৯৮৫), মহাবিপদ সংকেত (১৯৯০), জনৈক প্রতারকের কাহিনী (১৯৯৬)

শাহাদুজ্জামান  :               কয়েকটি বিহ্বলগল্প (১৯৯৬), পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ (১৯৯৯), কেশের আড়ে পাহাড় (২০১২), অন্য এক গল্পকারের গল্প নিয়ে গল্প (২০১৪)

শাহেদ আলী       :               জিবরাইলের ডানা (১৯৫৩), একই সমতলে (১৯৬৩), শা’নযর (১৯৮৬), অতীত রাতের কাহিনী (১৯৮৬), অমর কাহিনী (১৯৮৭)

শহীদ আখন্দ      :               জনতায় নির্জন (১৩৮০ বাং), অনিবার্য বান্ধব (১৯৭৯), যখন পারি না (১৯৮২), হাল্কা হাসির গল্প (১৯৯৬)

শহীদ সাবের       :               এক টুকরো মেঘ (১৯৫৫), ক্ষুদে গোয়েন্দার অভিযান (১৯৫৮)

শহীদুল জহির    :               পারাপার (১৯৮৫), ডুমুর খেকো মানুষ অন্যান্য গল্প (২০০০), ডলু নদী হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪)

সরদার জয়েনউদ্দীন      :               নয়ান ঢুলী (১৯৫২), বীরকণ্ঠির বিয়ে (১৯৫৫), খরস্রোত (১৯৫৫), অষ্টপ্রহর (১৯৭০)-এরপর বেলা ব্যানার্জীর প্রেম (১৩৮০)

সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্        :               বুধবারের রাতে (১৯৭৩)

সাদ কামালী       :               নিঃশব্দ অন্তিমে (১৯৯২), অভিব্যক্তিবাদী গল্প (১৯৯৬), উপকথার আপেল (১৯৯৬), আগুনের গ্রহণ (২০০০)

সাদেকা শফিউল্লাহ          :               নিষিদ্ধ সুখের যন্ত্রণা (১৯৭৮), যুদ্ধ অবশেষে (১৯৮০), শর্তহীন নিঃশব্দে (১৯৮১), অনুভূতির রং (১৯৮২), কলঙ্কের সুগন্ধ (১৯৮৪), অক্ষম বৈঠায় (১৯৮৫), চয়ন (১৯৮৭), যন্ত্রণার সঞ্চয় (১৯৯০), তার তরে (১৯৯১)

সুশান্ত মজুমদার               :               রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও (১৯৮৪), ছেঁড়াখোঁড়া জমি  (১৯৮৫), শরীরে শীত ও টেবিলে গু-াপা-া (১৯৮৮), জন্ম-সাঁতার (১৯৯৮)

সুচরিত চৌধুরী   :               আকাশে অনেক ঘুড়ি (১৯৬১)

সিকান্দার আবু জাফর    :               যাদুর কলস (১৯৬৮)

সুব্রত বড়–য়া      :               জোনাকী শহর (১৯৭০), কাচপোকা (১৯৭৫), অনধিকার (১৯৭৭), আত্মচরিত ও অন্যান্য গল্প (১৯৮৯), ভালোবাসা ভালোবাসা (১৯৮৯), তৃণা (১৯৯৩)

সেলিনা হোসেন :               উৎস থেকে নিরন্তর (১৯৬৯), জলবতী মেঘের বাতাস (১৯৭৫), খোল করতাল (১৯৮২), পরজন্ম (১৯৮৬), মানুষটি (১৯৯৩), নির্বাচিত গল্প (১৯৯৩), মতিজানের মেয়েরা (১৯৯৫), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (২০০০), আকাশপরী (২০১২)

সেলিম মোরশেদ              :               কাটা সাপের মু-ু (১৯৯৩), বাঘের ঘরে ঘোগ (২০০৮)

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্          :               নয়নচারা (১৯৪৫), দুই তীর ও অন্যান্য গল্প (১৯৬৫)

সৈয়দ ইকবাল    :               একদিন বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য গল্প (১৯৮৬), ভালোবাসার পাঁচ পা (১৯৮৭)

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম               :               স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯৪), থাকা না থাকার গল্প (১৯৯৫), প্রেম ও প্রার্থনার গল্প (২০০৫)

সৈয়দ মুজতবা আলী       :               চাচা-কাহিনী (১৩৫৯), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৬১), শ্রেষ্ঠ রম্যরচনা (১৯৬২)

সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ      :               আগুনের বিপদ আপদ (১৯৯৪), শাদা কাহিনী (১৯৯৬)

সৈয়দ শামসুল হক           :               তাস (১৯৫৪), শীতবিকেল (১৯৫৯), আনন্দের মৃত্যু (১৯৬৭), প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান (১৯৮১), প্রেমের গল্প (১৯৯০), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯০), গল্প সমগ্র (২০০১)

হরিপদ দত্ত         :               সূর্যের ঘ্রাণে ফেরা (১৯৮৫), একটি পুরাতন উর্দি (১৯৮৮), কালবেলার গল্প (২০০৫), গল্প সমগ্র (২০০৫)

হাজেরা নজরুল                :               জোনাকীর আলো (১৯৬৮), ফসিলে সূর্যগ্রহণ (১৯৮৬), সুবর্ণসখী (১৯৮৩), সময়ের ফুল (১৯৮৩), ঘাসের পাখনায় আমার পালক (১৯৯০)

হারুন হাবীব       :               বিদ্রোহী ও আপন পদাবলী (১৯৮৫), লালশার্ট ও পিতৃপুরুষ (১৯৮৫), অন্ধ লাঠিয়াল (১৯৯৯), স্বর্ণপক্ষ ঈগল, গল্পসপ্তক

হাসনাত আবদুল হাই       :               একা এবং একসঙ্গে (১৯৭৭), যখন বসন্ত (১৯৭৭), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৯), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯৪)

হাসান আজিজুল হক      :               সমুদ্রের স্বপ্ন ও শীতের অরণ্য (১৯৬৪), নামহীন গোত্রহীন (১৯৭৫), আমরা অপেক্ষা করছি (১৯৮৯), রোদে যাবো (১৯৯৫), পাতালে হাসপাতালে (১৯৮১), মা মেয়ের সংসারে (১৯৯৭), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৭), রাঢ়বঙ্গের গল্প (১৯৯১), হাসান আজিজুল হকের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯৫), স্বনির্বাচিত গল্প (২০১২)

হাসান হাফিজুর রহমান :               আরো দুটি মৃত্যু (১৯৭০)

হেলেনা খান        :               ফসলের মাঠ (১৯৬৭), বৃষ্টি যখন নামলো (১৯৭৮), কালের পুতুল (১৯৭৮), একাত্তরের কাহিনী (১৯৯০), পাপড়ির রং বদালায় (১৯৯১), নির্বাচিত গল্প (১৯৯৩), ছায়া কালো কালো (১৯৯৭), কারাগারের ভেতরে ও বাইরে (১৯৯৭)

হুমায়ুন আজাদ :               যাদুকরের মৃত্যু (১৯৯৬)

হুমায়ূন আহমেদ               :               খাদক, একটি নীল বোতাম, জীবনযাপন, খেলা, অসুখ, ফেরা

হুমায়ুন কাদির   :               একগুচ্ছ গোলাপ ও কয়েকটি গল্প (১৯৬৬), আদিম অরণ্যে এক রাত্রি (১৯৭০), শীলার জন্য সাধ (১৯৭৯)

হুমায়ূন মালিক  :               ধ্রৌমযজ্ঞ (২০০৫), গোলাপসংহিতা (২০০৬)

হোসনে আরা শাহেদ       :               গিন্নীর ডায়েরী (১৯৮৬), জীবন থেকে (১৯৮৬), তির্যক (১৯৯২), জীবনানন্দের জামিন (১৯৯০), ঊষ্ণ চা, শীতল হৃদয় (২০০১), কেন এ দুয়ারটুকু (১৯৮৩)

—————————————————

শেষ পাতার আহ্বান
তুমি অভিযাত্রিক, ঝড়ে-বৈশাখে-বর্ষায়

অভিযাত্রা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বরাবরই দর্শন-কথা আওড়াতেন। তাঁর মতে যাত্রাটাই মুখ্য, গন্তব্য নয়। কিন্তু এ যাত্রায় বাধা অনেক, কখনো তা প্রকৃতির কখনোবা বস্তুজগতের বিচিত্র উপাদানের। কিন্তু তবুও যাত্রা থেমে থাকে না, তার অবিচল অভিযাত্রা সকলকেই মুগ্ধ করে, এগিয়ে নেয়, রোমান্সকাতর করে তোলে। বিষয়টি সকলের জীবনেই ঘটে থাকে। সবাই এমন উদযাপনের মধ্যেই বাস করে। হয়তো কারোটা প্রকাশ্য, কারোটাবা অপ্রকাশ্য। কিন্তু ‘যাত্রা’ ছাড়া মানুষ নেই। অভিযাত্রার পিয়াসী রথে সবাই সম্মুখগামী। কিশোরকালে বা নবযৌবনে এ অভিপ্রায় আরও অধিক প্রাচুর্যময়। মনে-স্বপ্নে এ রঙ লুটায় কখনোবা ভাসিয়ে দেয়, অধিকার করে চিত্ত। কিন্তু তার রূপ ও রঙ কী! এক একজনের কাছে তা এক এক রকম। জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোও সব একরকম নয়। নিজ নিজ চিন্তা ও ধারণায় তা পাল্টায়ও, রাশি রাশি আনন্দ আর সময় ধারাপ্রবাহে তার জিৎ নানারকমের। তাই লিখুন, লিখে বলুন আপনার আশা-ভরসা আর আনন্দের কথাটি ছাপা হবে …

পরবর্তী সংখ্যায়

ই-যোগাযোগ : shiqbal70@gmail.com অথবা saikatarefeen@gmail.com

ফোন : ০১৭৬৬-৬১৯৫৪৬ ॥ এ বিষয়ে লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ৩০ জুলাই ২০১৭ খ্রি.


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা