20728100_1464956210238134_7554614045820284866_n

নি য় মি ত বি ভা গ

                        শে ষ পা তা র  আ হ্বা ন

আনিফ রুবেদ
আলোর জন্য সূর্য আছে, আঁধারের জন্য কোনো কুর্য নেই
জগৎ যন্ত্রণার। জগৎ আনন্দের নয়। আনন্দ হলো যন্ত্রণা থেকে ক্ষণক্ষণের বিরতিমাত্র। যেমন, অন্ধকার ধ্রুব। আলো ছড়ানোর জন্য আঁধারের প্রয়োজন আছে, আঁধার নির্গতের জন্য কোনো আঁধারের প্রয়োজন নেই। আলোর জন্য সূর্য আছে, আঁধারের জন্য কোনো কুর্য নেই। সূর্যশক্তি, সবশক্তিই শেষ হয়, হবে একদিন। অন্ধকার স্বয়ম্। অন্ধকার সয়ংসম্পূর্ণ। এর বিনাশ নেই। তেমনভাবেই, জীবের জীবনযন্ত্রণা, যাপনযন্ত্রণা ধ্রুব।

পাথর। যা থেমে আছে সবসময়, তার কি কোনো গতি নেই, যাত্রা নেই? আছে। থেমে থাকাটাই তার গতি, থেমে থেকে থেকে বিলীন হয়ে যাওয়া তার যাত্রা উদ্দেশ্য।

গ্রহ। যা চলতেই আছে সবসময়, তার কি থেমে থাকা নেই? আছে। যা চলতেই আছে, তা চলার মধ্যে স্থির হয়ে আছে। চলাটা ধ্রুব। চলতে চলতে থামাতে বিলীন হয়ে যাওয়া তার যাত্রা— উদ্দেশ্য।

এবার আমার যাত্রা। এবার আমার যাত্রাপালা। এবার আমার যাত্রাপালা সম্পর্কে বলার পালা। এ যাত্রাপালার নট হিসেবে আমি আমার কাছে কী? আমার জন্য আমার চিন্তুা কী? অন্যান্য জীব আর মানুষের জন্য আমার চিন্তার রূপটা কেমন? এসব প্রশ্নের তীর তৈরি করে নিজেকে বিদ্ধ করা যেতে পারে, চিন্তানদীর তীরে বসে।

আমার যাত্রা রবীন্দ্রনাথের যাত্রা নয়। আমার যাত্রা লালনের যাত্রা নয়। আমার যাত্রা মুহম্মদ বা যিশুর যাত্রা নয়। এ আমারই যাত্রা।

আমার যাত্রা চেঙ্গিস খানের যাত্রা নয়। আমার যাত্রা হালাকু খানের যাত্রা নয়। আমার যাত্রা বুশ বা ট্রাম্পের যাত্রা নয়। এ আমারই যাত্রা।

আমি মানুষ, এটা ভাবতে আমার বিস্ময় জাগে। বিষময় বিস্ময় জাগে। আমি পোকা নই কেন? নই কেন অন্যান্য পশু? এসব প্রশ্নে মনে বিকার তৈরি করে খালি, পূর্ণ উত্তর পাওয়া যায় না। উত্তরের খ- খ-  যা কিছু পাওয়া যায় তা আরো অসহায় করে তোলে আমাকে। অসহায়ত্ববোধ প্রচ- রোদ হয়ে, নিদারুণ আগুন হয়ে দগ্ধ করে। এসব নিরুপায়ত্ব, এসব নিরুত্তরত্ব, আরো নিরুত্তাপ করে আমাকে, বরফ করে তোলে। চুপচাপ চিৎকার করার প্ররোচনা দেয়। চিৎকার করে সবকিছুকে চুপ করে দেবার প্ররোচনা দেয়। চিৎকার করে চুপ থাকার প্ররোচনা দেয়। অস্থির হলে, স্থির হবার ইচ্ছে জাগে। স্থির হয়ে থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে উঠি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, একটা বরফখ-ের গায়ে আগুন জ্বলছে। অথবা, একটা তীব্র অগ্নিকু- বরফ দিয়ে ঢাকা। অদ্ভূত এসব মানসিক যাত্রা। অদ্ভূত এসব শারীরিক যাত্রা। অদ্ভূত এসব মানসিক-শারীরিক যাত্রাপালা। অদ্ভূত।

মানুষ হিসেবে আমার ভাবতে খারাপ লাগে যে, পৃথিবীতে আমাকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়ের চেয়ে মেরে ফেলার উপায় বেশি। আমাকে সুস্থ রাখার উপায়ের চেয়ে, অনেক বেশি উপায় প্রস্তুত আছে আমাকে মানসিক আর শারীরিকভাবে অসুস্থ করার জন্য। ওষুধের টোটাল গুলির চেয়ে, বন্দুকের গুলির পরিমাণ বেশি জগতে। আটার চাইতে, বারুদের পরিমাণ বেশি। পরিমাণগত অর্থেই বেশি। কার্যকারীতাগত অর্থে আরো বেশি। একটা ওষুধের গুলিতে একজন মানুষকে বাঁচানো সম্ভব। একটা বন্দুকের গুলিতে একসাথে দশজনকে মারা সম্ভব। এক কেজি আটাতে একজনের একদিন যেতে পারে কিন্তু এক কেজি বারুদে কয়েকশ লোককে চিরদিনের মত বিদায় দেয়া সম্ভব। আমার ভাবতে খারাপ লাগে, আমি এ পৃথিবীর বাসিন্দা।

আমার ভাবতে খারাপ লাগে, পৃথিবীতে সব নীতিমালার প্রণয়ন আর প্রয়োগ করে মাস্তান শ্রেণির কিছু মানুষ। অবশ্য তারা যেকোনো নীতির বাইরে বসবাস করে। সব দেশ এবং সমগ্র পৃথিবীর চিত্র এটা। আমার ভাবতে খারাপ লাগে, যে মানব সন্তানকে আমি জন্ম দেব সে সন্তান এসে এসবের ভেতর পড়বে। অহেতুক এক পাজলের ভেতর পড়বে।

জগৎ শুধু যন্ত্রণার নয়। জীবন বিস্ময়েরও। বিষময় বিস্ময়ের।

শিশুকালের কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়ির কাছেই বন্যারক্ষা বাঁধ। তখন আমি আট-দশ বছরের মত। একা একা গিয়ে গ্রামরক্ষা বাঁধ মেরামত করতাম। সেসব কেউ করতে বলত না। এমনকি এটার তেমন কোনো দরকারও ছিল না। তারপরেও করতাম। এটা ছিল ‘মহৎ হবার সাধ জাগে’ খেলার মত। এ বাঁধ দিয়ে মানুষ হেঁটে যেত বাজার। বাজার থেকে ফিরত বাড়ি। একদিন, বাঁধ মেরামত করতে করতে দেখি, একটা সাপ কোথা থেকে বেরিয়ে একেবারে আমার সামনে প্রায় এসে পড়েছে। আমি ভয় পেয়ে যাই। ভয় পেয়ে সাপের মাঝ বরাবর কোদালের কোপ বসাই। সর্পের অর্ধেকটার যেদিকে লেজ আছে, সেদিকটা ঘুরে আমার বিপরীত দিকে পালাতে চেষ্টা করে। সর্পের অর্ধেকটার যেদিকে মুখ আছে, সেদিকটা আমার দিকে তেড়ে আসে। অর্ধসর্পের এভাবে তেড়ে আসাতে আমি আরো ভয় পাই। ভয় পেয়ে কোদালের উল্টো দিক দিয়ে সাপের মাথার উপর কষে বাড়ি বসিয়ে দিই। সাপের মাথা একেবারে থ্যাতলা হয়ে যায়। থ্যাতা মাথা নিয়ে সাপটা মরে পড়ে থাকে আমার পায়ের কাছে। বহু বছর পর এসব কথা মনে পড়ে মাঝে মাঝে। এসব ঘটনা, এসব দৃশ্য কেন তৈরি হয় বা হয়েছিল বুঝতে পারি না আজও।

‘নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের প্রাণ দিতেও আমি প্রস্তুত আছি’ একথা একদিন বলছিলাম একজনকে। সে বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। তাকে বলেছিলাম— ‘প্রাণ আর জীবনের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য আছে। প্রাণ প্রকৃতি থেকে পাওয়া। জীবন হলো, আমি যেভাবে থাকি বা থাকতে চাই, যেভাবে যাপন করি বা করতে চাই। প্রাণ জীবনের একটা অংশমাত্র’।

জীবনযাত্রাকে আমার ‘লম্বা’ বা ‘দীর্ঘ’ এ জাতীয় মনে হয় না। বৃত্তাকারও মনে হয় না। আমার মনে হয়, জীবন একটা জটিল পাজলের মত। একটা গ-ির ভেতর অনেকগুলো এলোমেলো গুটি আছে। এ মেলানোটা জীবন, মেলাতে চাওয়াটা জীবন। কিন্তু এটা কখনোই মেলে না। এবং যেহেতু মেলে না সেহেতু মানুষ যন্ত্রণা পায়। আমিও কষ্ট পাই। অল্পে যারা তুষ্ট, কষ্ট যাদের কাছে মিষ্ট, তারা জীবনকে মিষ্ট বলে। আমি বলি না। আমি অল্পে তুষ্ট না, কষ্ট আমার কাছে মিষ্ট না সুতরাং জীবনকে আমি মিষ্ট বলি না। আমি অল্পে তুষ্ট না, আমি চাই পৃথিবীর সবকিছুই সুন্দর হবে, ভালো হবে। আমি অল্পে তুষ্ট না, আমি চাই পৃথিবীর সকলেই ভালো থাকবে। কিন্তু জানি, এমনটা কোনোদিনই, কোনো এক মুহূর্তের জন্যেও সম্ভব না। সুতরাং জীবনের যাত্রাকে, সবসময় চরমতম উত্তপ্ত পথে ধাবিত হওয়া বলে মনে হয়। আমি উত্তপ্ত হয়ে বসে থাকি। সুতরাং জীবনের যাত্রাকে, সবসময় চরমতম শীতল পথে ধাবিত হওয়া বলে মনে হয়। আমি শীতল হয়ে দূর্বার গতিতে ভ্রমণ করি। মানুষের জীবনে কোনো ‘জীৎ’ আছে বলে মনে করি না। জীৎ মানে উল্টোদিকে হার।

এ লেখাটা চমৎকার, সুন্দর, সুদর্শন, সুশ্রাব্য, সুত্বাচ্য, সুস্বাদুভাবে লিখব বলে মনে করেছিলাম। কিন্তু তা হলো না। হয়ে গেল অমিমাংসিত সেই পাজলের মত — নাকের জায়গায় হাত, পায়ের জায়গায় কান, বুকের জায়গায় পেট। আফশোস জীবনের জন্যে। এ লেখাটার জন্যে।

তবে, মজার ব্যাপার আছে, তা হলো এটাও একটা — যাত্রা।

******************************************************

বঙ্গ রাখাল
অভিযাত্রিক জীবন আত্মবিসর্জনের শতরূপ
জীবনের প্রথম পাঠ মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি বোধহয় কেননা চলমান জীবনে আত্মজীবনের মুখোমুখি মনে পড়ে মায়ের বিবর্ণমুখচ্ছবি যা কিনা অনেকটা ভেঙ্গে পড়া আরশীর বিষাদগ্রস্ত বিশ^স্ততার রেখাচিত্র। মা, মায়ের প্রণীত জীবন আমাকে যাত্রাপথের বিদ্রোহী অভিযাত্রিক করেছে কিংবা একটুও করেনি। বাল্য বয়সে মায়ের শাড়ীর অন্তর জগতে বৃত্তাকারে লুকিয়ে লুকিয়ে শিখে গেছি আদর্শলিপির নীতিবিদ্যা আর মায়ের অধিতবিদ্যার উপমাবান্ধব কথার ব্যাখ্যায়িত বাস্তবতার প্রয়োজনীয়তা। আর বাবা, অনেকটা গান-পাগলা। গানের সুর তাকে বিমুগ্ধ করে রাখে। গ্রামীণ লোকগান যাকে বলি, গাজী, কীর্তন, এমনি কী অস্টক গানের আসরে পিতাকে বসে থাকতে দেখা গেছে। এই মৃত্যুপ্রাণ মানুষটির চতুষ্পাশের্^র সবকিছুই যেন গানকেন্দ্রিক। এই বাবাই জীবন পথের প্রথম জীবনে প্রতিস্থাপন করেছিল লালনের গান। রোপন করেছিল— এমনকি ভাবতে শিখিয়েছিল পূর্ণিমার জলেভাসা বাউলের গানের সুর-সন্ধানের নির্দিষ্ট সূচনা। তিনি আমাকে বলেছিলেন- তুমি কী লালনের মত পদ বাঁধতে পারো। না বুঝেই বলেছিলাম— পারিতো। তখনও জানি না কে এই লালন। এই বাবার কথা থেকেই এক ধরনের যন্ত্রণা আমাকে দুই এক কলম লেখার অনুপ্রেরণা জাগিয়েছিল। প্রথম জীবনে একটা সম্পাদিত গ্রন্থে আমার “চাষা” নামে একটি কবিতা প্রকাশিত এবং পরে দেখি ১০ জন কবিকে নিয়ে একটি সম্পাদিত কবিতার গ্রন্থ সম্পাদিত হবে। যেখানে কবির সমস্ত নাম, ঠিকানা এমনকি ছবি ও কবিতার পাশে প্রকাশিত হবে। সেই দিনের সেই ব্যাকুল মনকে স্থির করার জন্য মায়ের কাছে বলি। মা নিজের একমাত্র সন্তানের কবিতাগ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হবে বলে সেদিন কি-যে উৎসাহ দেখিয়েছিল তা সত্যিই আজ শুধুমাত্র স্মৃতির স্মৃতিপটে দৃশ্যমান। বাবা এই কাজে কোন আগ্রহ দেখায়নি। আমার হাতে নিজে কানের দুল দিয়ে মা বলেছিল, বাবা নাও। এটা স্বর্ণকারের কাছে রেখে এসো— পরে ছাড়িয়ে নিব। মায়ের উৎসাহেই আজ আমি যাত্রাপথের অভিযাত্রিক। মায়ের সেই দুল আর ছাড়িয়ে আনা হয় নি। তবুও মা কোনো কষ্ট পাননি। শুধু বলেছেন— আমার বাবা মানুষ হোক। গ্রন্থ বেরও হয়েছিল— ঢাকা থেকে কিন্তু আমি সেই গ্রন্থ মাকে দেখাতে পারিনি। হাতে দিয়ে বলতে পারিনি মা— এটা তোমার সেই কানের দুল। দেখো মা দেখো, এই গ্রন্থের সবচেয়ে উজ্জ্বল, দীপ্তিমান কবিতা মা এগুলো, এগুলো তোমার কানের স্বর্ণালংকার, দেখো চিক্ চিক্ করছে আর দুলছে তোমার কানের লতিতে। এভাবে শুরু হলো অভিযাত্রা। গ্রামের মঞ্চগুলোতে অভিনয় করি, নাটক লিখি, গ্রামের বাগধারা, প্রবাদ সংগ্রহ করি তবুও তৃষ্ণা মেটে না। করোটির মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে চলে। নিরব অশ্রুপাত করি আত্মঘাতী এই পথকে বেছে নেওয়ার জন্য। অবিরাম কবিতা লিখি, গবেষণার উপাদান সংগ্রহ করছি, আর দিন দিন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। যে কারণে অনেকের কাছে ঘরকুনো কিংবা অকর্মা ছেলে নামে পরিচিত। কলেজের বন্ধুরা জেনে গেছে আমি কবিতা লিখি মানে খারাপ হয়ে গেছি। হয়ে গেছি নাস্তিক। আমার কথাবার্তায় নাস্তিকের গন্ধ ছোটে। আপন জনদের এই সহ¯্রবার এতো এতো কথাগুলো মনকে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। কবি নামে ডাকলে লজ্জা লাগে। এখনো কবিতায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বাদ পাই, নারীর ঘ্রাণ, প্রকৃতির জীবন্ত চিত্র দেখতে পাই। তবুও নিজেকে কবি বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি না। অনেক ক্ষতের সাক্ষী আমার কবিতা। মানবিক আর বিকৃত চরিত্রের পরিচয়বাহীর লোরিটাও কবিতা। ব্যাখ্যাহীনভাবে বলে যায় কবিতার কথা। কবিতায় জীবন। জীবন হলেও নিয়মিত লিখি না। কারণ প্রতিনিয়ত সহবাসে তৃপ্তি কম। অনেকটা বীর্য স্খলনের পর— ক্ষমতাহীন হওয়ার মত। কিন্তু কয়েকদিনের ব্যবধানে হৃদয়ে সঞ্চারিত হয় নতুন উদ্যামতা আর সত্তাই বাড়িয়ে দেয় যৌথ বিশ^স্ততার বেগ যা সঞ্চারিত হয় কবিতার শরীরে। শব্দে শব্দে আমার অভিজ্ঞান তুলে ধরেছি কবিতায়। কবিতাও প্রত্যাখান করেনি আমায়। জৈবলিপ্সার সন্ধান আমাকে অনেকটা উদ্বেগ পাইয়ে দিলেও কখনো কখনো দিব্যপ্রশান্তি এনেছে কবিতায়। যাকে বলি বাড়ি, নারী, মদ, ঐশ^র্য কিংবা রাত্রিযাপনের আশ্রয়টুকুও কবিতা। কেমন করে এই কবিতার ভূত মাথায় ঢুকেছিল কারণ  অনুসন্ধানে নামলেও তথ্যের উদ্ভাবনের একটুকাল বিলম্ব করে ফেলেছি। তবুও নিগূঢ়সত্যে রূপান্তিত হয় বিরহের কাহিনি। আমার প্রপিতার মাথায়ও কবিতার পোকা ছিল অনেকটা আমারই মতো কিংবা বেশি বা কম। বোধ হয় আমার মতো কথকতায় বা জৈবমিলন তৃষ্ণা তারও ছিল এবং পূর্ব-পুরুষের এই যে শৌর্য আর সম্পর্কের জীন-গত পারম্পর্যতা তাই আমাকে যাত্রিক বানিয়েছে এবং যাত্রাপথের অক্লান্ত পথিক করেছে। এই পথ তো নয় কোন মসৃণ আমার চেহারার কাছে কখনো কখনো নিজের অসহায়তার চিত্র ধরা পড়ে। আমাকে বাস্তবতার মলিনছাপ গ্রাস করতে চায়। তবুও মর্ত্যরে পাখি হয়ে উড়ে যায় ঐ সুদূর আকাশ পানে, দীর্ঘশ্বাস জীবনেও বিম্বিত হয় কবিতার বহুমাত্রিকতা যা কি-না বিধ্বস্ত হয়ে ধরা দেয় জীবনের প্রতিকৃতি। এই অভিযাত্রিক জীবন কিংবা যাত্রার পথ বড় বেশি ক্ষুধার, বড় বেশি যন্ত্রণার যেখানে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে শুধু থাকে সময়ের বলিদান কিংবা আত্মবিসর্জনের ব্যঞ্জিত শতরূপ।

******************************************************

শিরবলী মোকতাদি
দরদভরা চোখে
হিসেবের খাতিরে অনেকগুলো বছর, কিছুটা কাল, জন্মের বিপরীতে ততোধিক মৃত্যু, সমাজ, সন্ত্রাস,স্নিধতার বিচিত্র রূপ দেখা হলো। বিন্দু-বিন্দু সময় পেরিয়ে আজ এই ভাষ্যে যা কিছুই লিখছি সেটা বর্তমানে দাঁড়িয়ে। তাহলে বিগত বিপুল এক অতীতের আততায়ী নিশ্চুপ, নিস্তব্ধে বাস করে আমার এ-মনে। সে রয়ে যায় ফোঁটায়-ফোঁটায় রক্তে মিশ্রিত হয়ে। ঘাপটি-মেরে বসে থাকে কোষের কমনীয় দ্বারে।

অতীত— কখনো আচমকা চুমুর ন্যায় লজ্জিত বালিকার খুলে যাওয়া বেণী। না-চেনা ফুলের অচেনা গন্ধের হাতছানি। অতীতে বালক ছিলাম। কিশোর হয়েছিলাম। অতীতে যুবক হতে হতে যন্ত্রণা পেয়েছিলাম। যাতনা সয়েছিলাম। জগৎকে এই ছিন্ন তো এই যুক্ত করেছিলাম। অতীত বড়োই আনন্দের, অতীত বড়োই তামসিক। অতীতের শত কোটি আঁচড়ে লিপিবদ্ধ এই দেহ-মন মগজখানি।

প্রায় প্রতিটি মানুষের ন্যায় এই দেশে আমারও গ্রাম ছিল। তথা গরীব আর গর্বিত মানুষ ছিল। মাত্রাভেদে তাদের মন, মানসিকতা, ম্যানার ছিল। যেমন ধরুণ, চৌকো-চৌকো দুএকটি মাঠ ছিল। মাঠে-মাঠে ফসলের সন্ত্রাস ছিল। অথচ চিরকালই আমি কখনো বৃত্ত, কখনো ত্রিভুজ, কখনো বা সরভুজরূপে দেখেছি সেইসব সাধের ক্ষেত্রফল।

বলি, এমনটা কেন? যে ভূমিতে, বেলে-বেলে দোআঁশ মাটিতে ফুটেছে সমূহ ঋতুর সম্ভারে বিচিত্র ফুল আর ফলের কথন; সেথা আমি কী করে দেখেছিলাম পাইন কিংবা পপির প্রতিফলন?

খুবই ছোট, ক্ষুদ্র সে সময়ে দলবেঁধে গিয়েছিতো পাঠ নিতে পাঠশালাতে। গিয়েছি বৃষ্টিতে ভিজে-ভিজে কুয়াশায় স্নাত হতে-হতে। গিয়েছি গর্বিত সর্ষেফুলের বিস্তারিত বুক চিড়ে মনকে অলিখিত মনের কাছে বন্ধক রেখে। গিয়েছি তপ্ত, স্মার্ট, ঝাঁঝালো লাল মরিচের বাগানের একান্ত পাশ দিয়ে। ফাগুনে-চৈত্রে কড়া-কড়া রৌদ্রের মাঝে নিজস্ব নৌকা বেয়ে। অথচ খুব মনে পড়ে সেইসব যাওয়াগুলো, ফেরাগুলো কেমন আলো-আঁধারির, অস্পষ্ট ডুবো চরের ন্যায়; হতে পারে জ্যোতস্না বাহিত মধ্যরাতের মতো মনে হতো।

হে আমার আল্লাহ রাসূল, কাব্যের কবিরাজ, হে আমার ভেষজ প-িত, ছলাকলার ঝাঁড়ফুক, হে আমার বিনিদ্র ডাক্তার! আমারে লক্ষণ দাও, লক্ষণে জ্ঞান দাও।

আমারও বন্ধু ছিল হাতেগোনা এবং সীমিত আপন। তারা সব ভাতৃসম। তাদের গণদেহে এই আমি নিজস্ব দেহখানি কত কত সম্মেলনে রেখেছি বাঁধিয়া। আমরা মাটি নিয়া, ধূলি নিয়া, কাঁদা নিয়া খেলেছি কতক। হয়তো তারা দেখে নাই। দেখেছি আমি

মাতাল করা গন্ধের কালো, ভেজা-ভেজা মাটির উপরে অবাঞ্ছিত রক্তের ছোঁয়ায় মুহূর্তে সে-মাটি মন খারাপ করা মেরুণ রঙে ডাইভার্ট হয়ে যায়। সেই তো ধূলি, আমি কেন হীরকখ- কিংবা সিলিকনে আঁকি তারে প্রভু!

প্রচলিত সমস্ত গ্রামই থাকে নদীর দুইপাড়ে। আমাদের গ্রাম নদী হতে বহুদূরে। ফলে আমি সাঁতার শিখিনি। এই গ্রাম বন্যাদূষিত নয়। তবু আমি কাল্পনিক নদীর কিনারে হেঁটেছি রাত্রি-দিন। তোমারই আলিঙ্গনে হে নদী! হে যাত্রাপথ— তোমার বাঁকে-বাঁকে কুড়িয়ে পাওয়া রেঞ্জ দিয়ে খুলেছি আমি কতনা রহস্যের বাগধারা। নিয়েছি তাদের আদরে-আপ্যায়নে। বাক্সে ভরেছি পরশ আর পশমে আবৃত করে।

সেইসব মীন, শঙ্খ-শামুকের নিঃসৃত ভাষা, গন্ধ, বাহার, কী চমক আর চটকদারি। আহা, মরি মরি!

সেইসব মাঝির মনোলোভা মাতৃভাষা। জলে-মাছে থাকতে থাকতে কেমন লোম ঝরে সারাদেহে গজে ওঠা আঁশ, আঁশটে গন্ধ। হঠাৎ নাবিক বলে ভ্রম হয় যেন।

সেকালে তুষার দেখিনি, দেখিনি পাহাড়। না খনি, না আগ্নেয়গিরি। দেখিনি সাগর, আপেলের বনে হাঁটিনি জানি। হে ভংয়কর বিদেশ! ফাঁকি দেয়া রাখালের রাজত্বমনি। তবু তুমি কী করে গেঁথেছিলে এই ধ্যানে, সেকি জামের জলসায় চুরি করে ঢুকেছিলে আঙুরের আহ্বানে? সরল গৃহিনীর ভুলে— ভুল করে জ্বলে ওঠা লেলিহান শিখায় মধ্যরাত্রির সেইসব গৃহের গর্জনে, তাপে, চিৎকার, শিৎকারে তুমি কী দিয়েছো ধরা ওগো আগ্নেয়গিরি, নির্লিপ্ত লাভা!

আমি ছোট থেকে বড়ো হই। বড়ো থেকে মাঝারিমাত্রিক। এই দেহে জাগতিক, শুদ্ধ-অশুদ্ধ, কাক্সিক্ষত-অনাকাক্সিক্ষত, চাওয়া না পাওয়ার, বেদনা-সুখের, শুভ-অশুভর বেঢপ ধাক্কা এসে লাগে। সকালে-দুপুরে-গোধূলি, রাত্রিকালে।

গতকাল যে ঘুঘুর ডিম করেছি চুরি, যে চারায় মারিয়েছি দুই পা। পরদিনই বুঝি সেই ঘুঘু একটানা কী করে অভিশাপ দিচ্ছে আমায়। যন্ত্রণায় কী করে সোজা হবার অপূর্ব কৌশলে ফের উঠে দাঁড়াচ্ছে লিকলিকে ঐ লাউয়ের ডগাখানি। আমাকে আশংকায় আবৃত করে। বুঝি আমি মায়ার ছেলেখেলা। এ মায়া কোথায় ছিল? কোথা হতে লাগল এর ছটা? এত মায়া, এত প্রেম, এত মান-অভিমান, এত ঘেমে ওঠা, এতটা ফেঁড়েফেঁড়ে দেখা, বিচ্ছেদের বন্দনায় নত হওয়া। ও সময়, কোথায় লুকিয়ে ছিলে তুমি?

বড়ো মানেই বসন্ত। বড়ো মানেই বৃহৎ। বড়ো মানেই বাস্তবতা। বড়ো হচ্ছি আমি। এক-পা মাটিতে রেখে অন্য পায়ে এগিয়ে যাবার যে ধ্বনি — দেখি আমি, বাস্তবে মানি আমি। অথচ মানুষ বলে দুই পায়ে হাঁটি।

বড়ো মানেই গ্রামছাড়া। গঞ্জ ঠেলে শহরে প্রবেশ করা। বড়ো মানেই মাটি আর কংক্রিটের বোঝাপড়া। বড়ো মানেই ছোট রে ছিন্ন করা। নানান রূপ আর রসায়নের মাত্রা খুলে-খুলে দেখা। সেখানে নানান চালাকি, নানান ভদ্রতা, সেখানে হিংসা, ক্লেদ, প্রতিহিংসার পথচলা।

দেখেছি গ্রাম কী করে বিলুপ্ত হতে চায় শহরের বুকে। শহর কী করে পালাতে চায় রাজধানীর পানে। এ এক অদ্ভুত সাপলুডু খেলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি প্রাণ, প্রতিটি ঘ্রাণ কী করে উঠছে নামছে নিত্যদিন, সকাল-বিকাল। এ দৌড়ে রাজা হতে রাজমিস্ত্রি, মাঝি হতে মহাজন, কৃষক হতে কর্পোরেট পিছিয়ে নেই কেউ। একদিকে মিডিয়ার ঝংকার অন্যদিকে মাদকের হাতছানি। একদিকে কঠিন ফাঁপর অন্যদিকে ফরিয়ার ফরমানি।

এসবই ঘটছে। ভেঙে যাচ্ছে গ্রাম। আলগা হচ্ছে শহর। স্থূল হচ্ছে প্রেম, নিভে যাচ্ছে মায়া, কায়ার কাঁপুনি। রাজা আসছে রাজা যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে রাজনীতি। শুকনো পাতার ন্যায় ফলে তো হবেই— ওহে অর্থনীতি।

ওই মানুষ। ওই ¯ স্নিগ্ধ আযান আর শঙ্খের ধ্বনি, ঐসব রাখালের মুচকি হাসির মাঝে কী ছিল অর্থ, তাহা আজও না জানি। আর কী সম্ভব হবে কোনদিন?

এই যে এতসব লিখছি, খুবই লজ্জা করে, অতীত আমাকে অঢেল দিয়েছে। বৈচিত্র্যে মোড়ানো এই দেশের অপূর্ব সব ঋতুর ক্যারিসম্যাটিক কারসাজিতে আজও আমি অন্ধ, বাকহারা হয়ে যাই। আজও আমি মুক্ত আকাশের পানে চেয়ে সদ্য তৈরি করা সেদিনের শিক্ষানবিশ ঘুড়ির সামান্য উড়েই ডিগবাজির আস্ফালন স্পষ্ট দেখতে পাই। সেই সুতো, সেই আঠার গন্ধ। চোরা শীতের মাঠে-মাঠে কুয়াশার হাহাকারে জ্যোৎ¯œায় নিজেকে দেখার আবিষ্কারের মূহুর্ত, আজও সেই নামতা পড়ার ধ্বনি— আমি না পরি ভুলিতে মহাজন। সেই পথ, সেইসব ভূতের ভাতৃভূমি। ও আমার শিমুল, ও আমার চোরকাঁটা, ভ্যাঁটফুলে নিবেদিত প্রেমের পরশখানি। ও আমার চালতা, চড়–ই, নির্বোধ শালিকের চাহনি। আমি তো ব্যাকুল গন্ধে তোমারই ওগো ছাতিম, ওগো বট। শ্যাওলায় জেগে থাকা পরী আর পেতিœর ভালোবাসায়।

তবু সে বাস্তব পিছু না ছাড়ে। আমি আরও বড়ো হই। মনে আর দেহে যন্ত্র আর যুগের ঝাপ্টা এসে লাগে। দেশ ছেড়ে এবার বিদেশ তোমারে চিনি। চিনি প্রদেশ, চিনি মহাদেশ। চিনি রীতি, ঢং আর বাহানা। ধীরে-ধীরে বিশ্বের বাঁকে-বাঁকে আমার এ-মন তোমারে ছাড়তে থাকি। তুমি বুঝতে শেখো, তুমি ভাবতে শেখো। তুমি ডুবে-ডুবে যতটাই ডুবন্ত, উড়তে-উড়তে ততটাই উড়ন্ত। তুমি কাল হতে কালান্তরে, এই আজ বর্তমানে, ফের অতীতে, মূহুর্তেই ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করি। কখনো বাস্তব কখনো বা অলীকের লক্ষ্যে গ্রহ-নক্ষত্রের নিকট আতœীয়ের আচরণে আমারে শুধাও ভবিতব্যের কথাখানি।

এ রকমই জীবনের প্রায় পূর্ণাঙ্গ চালচিত্রের অপূর্ব আখ্যান তৈরিতে যেখানে যখন যা কিছু দেখেছি, শুনেছি তখনই বিরাট এক প্রশ্নবোধকের কাছে বরাবর নত হয়েছি আমি। কেন, কোথায়, কীভাবে-দল ধেয়ে এসেছে আমারে বধ করতে। ঠা-া মাথায় অযথায় আগুন জ্বালিয়েছে তারা। আর আমি উত্তরের জন্যে শুধুই মরেছি। মেরেছি নিজেকেই বারবার।

এরে শুধাই, তারে শুধাই কেউবা হালকা  সনেহে কিছুটা পরশ দিয়ে, কেউবা ধমক আর ঠাপে তাড়িয়ে দিয়েছে যথা। অথচ দিনে-দিনে আমার প্রশ্নে বাড়ে চঞ্চলতা। আমার পাঁচ ইন্দ্রিয় পাঁচ হতে পঞ্চাশ দিকেই ছুটেছে অযথাই। জগতের বিবিধ স্বার্থকথার বিবিধ ব্যর্থতাকে কী করে সাজাই আমি, কী করে মেলে ধরি স্রোতের শর্করায়।

সেই যে আমার হারিয়ে যাওয়া পিকনিকের খাতা, সেই যে বর্ষার প্রথম পানিতে তোমাকে চেনা। এক চোখে শিউলি ফুল অন্য চোখে হাসা। কি করে ব্যক্ত করি এত গান, এত সুর এত-এত গন্ধের বৈভবে নিসর্গের কূটভাষা! উঁকিঝুঁকি দেওয়া চির রহস্যের এমন বেঢপ মুহূর্তে। ফলে, ক্রমেই কবিতায় নিয়েছি ঠাঁই। পাকে-পাকে জড়িয়ে ধরেছি তাকে। নানান সংবেদনে অন্তরঙ্গ ঘনত্বে রঙিন সুতোয় বুনতে চেয়েছি তাকে। কখনো সত্যের সাথে মিহি তুলোর ন্যায় সামান্য মিথ্যাকে জড়িয়ে। গড়তে চেয়েছি তাকে বাস্তবে, কখনো বা অদৃশ্য অলীক অন্য উপহাসে। সাজিয়ে তুলতে চেয়েছি চালতা কিংবা ভাঁটফুলের মসৃণ সুবাসে। নয়তো পাটপঁচার বিদঘুটে অবাঞ্ছিত গন্ধের সমাহারে।

কখনো সে ঝিলিক দেয় নিত্য কিরিচের মতো। কখনো বা জং-ধরা ভিখিরির থালার ন্যায় পড়ে থাকে অচেনা ধুলোয়। নানান ম্যাজিক আর মেঘ এসে ভর করে আমার এইসব কবিতার পথে। আমার দেখা, না-দেখা, বোঝা, না-বোঝার ত্রিশঙ্কু এই ভুবনে তবু সে প্রবেশ করে। কাজেই অজাত সতীনের ন্যায় সে এসে হানা দেয় রোজ। নানান উস্কানিতে, নানান মশকরাতে নিষিদ্ধ প্রলোভনে সে কেবলই ডাকে। তারে রচিতে বলে। আমি লিখি, কাটি। গ্রহণে, প্রত্যাখানে অস্থির এক ঝড় বয়ে যায় মগজে, মনে, কোষে, কণিকায়, হাড়ের অভ্যন্তরে। কখনো সে জিতে যায়। কখনো বা হারে। আমি ঘুমিয়ে পড়ি সদ্য লেখা কবিতার আশেপাশে। প্রতিটি পঙ্ক্তিকে সজোরে সাপটে ধরে।

******************************************************

সানাউল্লাহ সাগর
বাঁদুরের ইশকুলে রাত আসে : আমার ইশকুলে অচল কানাকানি
সকালটা শুরু হয়েছিলো পানিহীন। এক ধরনের অপবিত্র শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে। বিহারী মালিকের বাসায় ভাড়া থাকি। মালিকের সাথে আমার দুএকবার দেখা হয়েছে হয়তো। কিন্তু না সে, না আমি, কেউ কাউকে ওভাবে চেনার চেষ্টা করিনি। কারণ আমি প্রয়োজন মনে করিনি, হয়তো সেও করেনি। অথবা আমার মতো গোবেচারা টাইপের লোক দেখে তার কোনো আগ্রহ জন্ম নেয়নি। আসলে আমার তাকে কোনো প্রয়োজন হয় না। মালিকের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করে আমার সহ-বাসিন্দারা। তবে বিহারী মালিকের কিছু প্রশংসা করা যায়। রমজান মাসে আমাদের ফ্ল্যাটে থাকা চারজন সনাতন ধর্মলম্বী আর দুজন জন্মসূত্রে মুসলমান, যারা রোজা রাখে না। তাদের জন্যও তিনি নিয়মিত ইফতার পাঠাতেন। কি বলেন! এগুলোর সাথে লেখার বা লেখক যাপনের কোনো সম্পর্ক নেই! আমি বলি আছে। এইসব নুয়ে হাঁটা প্রতিটি মুহূর্তের সাথে লেখার সম্পর্ক আছে। মানুষের মধ্যে যে মানুষ থাকে সে আনমনে ছবি আঁকতে থাকে। সে সব কিছুই অত্যন্ত নিবিড়ভাবে দেখার চেষ্টা করে, দেখে। তার চোখের খাতায় সব টুকে রাখে। তারপর সেটা ঠিক সময় লেখা জন্মাবার প্রসব বেদনা উঠলে হাজির করে। নাচতে থাকে মদ-মাতাল নদীগুলো। রাত না হলেও রাতের তারারা হাতে হাতে চলে আসে আমার চারপাশে। তাদের হাতের থাকে অনেক নদী। যারা কথা বলে অথবা বোবা পাখির চরিত্রে অভিনয় করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। আর আমি! আমার বেঁচে থাকারা সেই রকম কোনো চেষ্টাই নেই! ভুল বললাম কিনা! বুঝতে পারছি না! নিজেকে আরেকবার জিজ্ঞেস করে নিই! ধুর সে তো আমার সাথে ক্ষোভে এখন আর  কোনো কথাই বলতে চাচ্ছে না। তার মধ্যেও শুরু হয়ে গেছে লুকোচুরি। ধুম করে আমি নামতে থাকি, নামতেই থাকি। কোথাও না কোথাও নেমে যাই…

লেখাটা যে অনেক সময় কেবল অজুহাত হয়ে যায় সেটা বলার এবং মেনে নেওয়ার মতো সাহস দুটোই আমার আছে। আশা করি সামনের দিনগুলোতেও থাকবে। কিন্তু অজুহাত কেনো! এই প্রশ্ন নিজেকে করলে নিজের নিজ থেকে যে জবাবগুলো আসে সেগুলো বেশ ভয়ংকর। সেইসব জবাব সবার সামনে দাঁড় করানো আসলেই অনেক কঠিন। এই কঠিন কাজটা করার সৎ সাহস সব সময় জোগার করতে পারি না বলেই মাঝে মধ্যে কিছু মিথ্যে কথা বলতে হয়। সত্যের মোড়কে মিশিয়ে দেই কিছুটা লেবু ও লবনের দোষও। কিন্তু ওই যে মেনে নেওয়া! তাকে তো মেনে নিতেই হয়। তাকে না মেনে নিয়ে কোথাও তো যাওয়া যায় না! কোথাও যে আমিহীন আমিটাকে পাঠাতে পারি না। সে সবখানেই আমির পুরোটাকে নিতে পারে না এটা সত্য করে বলতে পারি। কিন্তু অনেকটা আমিই সবখানে ঘুরেফিরে নিজের মধ্যে ঘুমাই। নিজের মধ্যে ফিরিয়ে দিতে থাকি ফুটপাত, সেক্স ওয়ার্কারের মিটিমিটি চোখ, রিকশার প্যাডেলে সাধু মুখগুলোর পা।  নিজের অজান্তেই আরো অনেক কিছু ফিরে আসে। আরো অনেক কিছু ফিরতে চায়। তারা দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দেয়। তারা দেখতে চায় আমার হাতে কোনো দুঃখ আছে কিনা। হাসিগুলো কেমন করে রোদ্দুর পুষে। আমি বাঘকে কি নামে ডাকি অথবা হরতাল হলে আমার মিথ্যা বকটা ক্যামনে হাত-পা নিয়ে টুপটাপ বিষ-টি কুড়ায়। আমি কোনো ইশারা দেই না তাকে। সে দাঁড়িয়েই থাকে। তারা দাঁড়িয়েই থাকে। আমি ঘুমালে সরি, সরি আমি অন্য জলে মুখ ধুয়ে এলে সে হুড়হুড় করে এসে পড়ে। বাকী থাকে না কিছুই। খুলতে থাকে সব। আমিও খুলে যেতে থাকি। অনাবৃত সব মুখের মুখোশে আমি একা। ঠিক সকলের একটা মুখ হয়ে যাই। সবশেষে দেখি একটাই মুখ সকলের মুখে। সেই মুখটা আমার মুখ। আমার অগনিত মুখ থেকে একটা মুখ খোয়া যায়। আমি আবার ঘুমাই। আমার হাত তুলি আবার বলি, আমার একটা মুখ চাই। আমার একটা মুখ লাগবে… হারিয়ে যাওয়া মুখটা আসে না। আমি তার শোকযাপন করতে স্কেচ তৈরি করি। নকল বানাই। অবিকল তার মুখ বানাতে বানাতে ক্লান্ত হই, ঝিমিয়ে যাই। ক্লান্তির সুযোগে সে আসে। আমার কাঁধে হাত রাখে। আমি হাসতে গিয়ে কেঁদে ফেলি। কাঁদি, কাঁদতেই থাকি…

কোথাও থেকে ইশকুল আসছে ভেবে আবার কোনো দিন আমি একলা একা জঙ্গল ঘাটি। জংলি ফুলে নাক বিক্রি করে দেই। নাকহীন আমাকে পরিচিত গাছেরা ডাকে। আমি বিভেদ খুঁজি। দিক খুঁজি। কোনো ডাকে সাড়া দেই না। চুপ হয়ে মুখ ঢাকি। প্রশ্ন করি উপরে উঠতে থাকা হাওয়াকে। মৃত্যু থেকে ফিরে আসা একেকটা শব্দকে। যারা প্রতি সপ্তাহে এনজিওর মতো সুদ পূরণ করে কারো না কারো টেবিলে লড়ে যায়। আমার বিস্ময় কাটে না। দেখি তাদের চোখে বড্ড ঘুম। আমি ঘুমকাতুরে হয়ে পড়ি। আমার অনেক ঘুম দরকার আবার সেটা টের পাই। আমার ঘুমগুলো বেঁচে আছে! ভেবে আর আমার ঘুম পায় না। আমি ঘুম ডাকি… রাতের বোতলে মাথার মূর্খতা ঢেলে ছিপিটা আটকে দেই।

তারপর খেলা শুরু হয়ে যায়। চলতে থাকে খেলা… খেলা চলে আর চলে…

আমি তখনো দর্শক-বন্দি এবং এতিম দর্শক আমি। যার হারানো ছাতা খুঁজতে বিষ-টিকে খুঁজে বের করাই জীবনের একমাত্র পণ।

সকাল থেকেই কিছু নিয়মের পিছন চেটে হাঁটতে হয়। বেছে বেছে কিছু দানবের নখ না কাটার কারণ নিয়ে অযথাই গবেষণা করতে হয়। এইসব আমার কিচ্ছুই না। আমি তো সেইসব লাউ-লতার ডগা থেকে বিন্দু বিন্দু শিশির ঠোঁটে নিয়ে আরেকটি ঠোঁটের জন্য শীত খুঁজি। একটা নদী খুঁজি, ঘাস খুঁজি বুক মেলাবো বলে। সেদিনের সেই পাবলিক বাসটা, যারা শরীরে বাংলা মদের নাম লেখা ছিলো! সেই বাস থেকে তোমাদের নামগুলো মুছে নিলে একে-একে। আমি শূন্য সেই বাসটায় ঢুকে পড়লাম। তখন ড্রাইভারও এক্সিডেন্ট করার পাল্লায় দৌড়। তখন আমি যাত্রী, আমিই চালক। আমার হাতেই টিকেটের বান্ডিল। কোনো যাত্রী নেই। গাড়ী থেমে আছে। কিইবা করার আমি তো গাড়ী চালাতে জানি না। আমি গাড়ীর ছাদে উঠে যাই। মাথায় ঝালকাঠীর গামছা বেঁধে হাক দিতে থাকি, ‘কেউ কি আছো? মিয়া আমারে আরেট্টু উরফে উডাইয়্যা দিবা? আমি এট্টু আহাশ ছুঁইতে চাই।’ মেঘগুলো কাছাকাছি চলে আসে। তাদের শরীরে বরফের গন্ধ। আমার তখন কথা বলতে সুবিধে হয়। আমি ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠি। বলতে থাকি কৈ মাছের ঝোল থেকে ক্যামনে আমি নৌকা হলাম! কেমন করে চাখোর মাঝি আমার সুবেদার চাচাকে কুত্তা বলে গালি দেয়। বলতে থাকি বলতেই থাকি। বৃষ্টিরা ততক্ষণে জেনে গেছে আমি আর একা নই। মেঘের সাথে আমার জব্বর পিরিতি শুরু হয়ে গেছে।

ঘুমের ঘোরে কি যে এক সাবলীল সুর তৈরি হয়, স্বপ্নঘরে তার স্বাধীন বিচরণ। মায়াময় নর্তকীদের নিবিড় আলিঙ্গন! সকালের কোমল আলো আর মধ্যবিত্ত ব্যস্ততার যৌথ প্রযোজনায় তৈরি হয় জীবনের চিত্রনাট্য। মাতাল শহর মুগ্ধ ছায়া অবৈধ হাট এইসব আমার চিরপরিচিত মানুষের চিরপরিচিত স্বর। হাঁটতে হাঁটতে মানুষ দেখি পড়তে পড়তে মানুষ দেখি অভ্যস্ত ভঙ্গিতে আন্তরিক পাঠ নেই মানুষের। সতেজ ভাবনায় অধ্যয়ন করি প্রতিটি প্রত্যন্ত বাঁক। এখানে আমার প্রতিটি নির্বাক ধ্বনি আমার প্রতিটি দৃষ্টিভ্রম আমাকে ঘুমের দরজায় স্বাগত জানায়। এই ঘুম ক্রমেই পবিত্র থেকে পবিত্র হয়ে ওঠে… যেদিন বরষা ছুঁয়ে জ্যোৎস্নায় তামাসা ভেবেছিলাম সেদিন থেকেই কি এক অসুখে ক্লান্ত পায়রা আমাকে বাগিয়ে নিলো। সকালে বেলা করে ঘুম থেকে উঠি। কাজের নামে সব অকাজে দিন চলে যায়। সূর্যের সাথে আলো পালালে নিত্যনিঃসঙ্গতা চারপাশের দেয়ালের পাছায় সুড়সুড়ি দেয়…তীব্র কামকাতর হয়ে আলোকণার যোনিতে নিদ্রিত অন্ধকার জেগে ওঠে…তখন নিজেকে মেলে দেই তারাদের মৈথুন ক্রিয়ার অভ্যন্তরে। চেনা হরফের ডানায় বিজয় শিৎকার আমাকে এলোমেলো করে দেয়। নগ্ন বৃত্তান্তে মাথার কার্নিশে হেঁটে চলে অস্থির দুনিয়া। মরুভূমির শূন্যতা আফ্রিকার বর্ণবাদ নিপীরিত মানুষের অবয়বে পুঁজি বাজারে মুদ্রিত ছবি সব জলছবি নিদ্রার বাড়িময় আমাকে খুঁজে বেড়ায়।

যেতে নাই বলে থামি না। চলি বলি অবেলার পা-ুলিপি। অক্ষরের ঋতু¯্রাবে চোখ-মুখ তলিয়ে যায়। কোনো বনলতা সেন নীরা কিংবা কখনো কখনো পরি’র মাতৃত্বে ভয় পাইয়ে দেয়। খুব ভয় পেয়ে যাই। ভয়ে ভয়ে যে জীবন ফড়িঙ হতে গিয়েও শুধু মরে যাওয়া খালের জোয়ার ভাটা দেখেছে। সেই জীবনেই মায়া আসে। পুঁটি মাছের নামে কলাই ফুলের শোক হঠাৎ করেই নাকে-মুখে লেগে যায়। শৈশবে বাবা’র পিটুনির ভয়ে পাড়া দৌড়ে দুষ্টমির প-িত হওয়া হওনি নায়ক হওয়ার ইচ্ছে ছিলো বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে ইচ্ছে পালিয়েছে… প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করার ইচ্ছে এখনো জিইয়ে রেখেছি… কখনো বা ভুল বাক্যে কাঁটাতারে মুখ ঘষে ক্ষত বাড়াচ্ছি। এসব করে করে কি কাঁটাতারে জড়ানো সরলপ্রবণ জীবন-যাত্রাকে বৃত্ত থেকে কঠিন করে তুলছি… হয়তো হয়তো না। তবুও বেঁচে আছি বাঁচার লোভে। অদৃশ্য সন্তানের মুখে চুমু খেয়ে খেয়ে তার প্রতিচ্ছবির বৈধতা দিতে চিৎকার করছি সময়ে-অসময়ে। কেউ কি ভর্ৎসনা করছেন? করুন! নতুন পথ দেখাবেন? কি দরকার! জাগতিক অসুখ ছেড়ে পরম অসুখের অপরিমেয় সুধা পান করছি এটাই আমার স্বনির্বাাচিত সঠিক পথ…

******************************************************

মাসুদার রহমান
সোনাপাড়া টু গুরগাঁও
১.দূর গুরগাঁওয়ের চিঠি আসে সোনাপাড়ার এক বিকেলে। গুরগাঁও? সোনাপাড়া তখনো জানেনি দিল্লীমুলুকের উপকণ্ঠে হরিয়ানা প্রদেশের এক শিল্পাঞ্চল; যান্ত্রিকশহর বিখ্যাত সুজুকি মারুতি মটরগাড়ির  কারখানা অধ্যুষিত গুরগাঁও-এর কথা। উল্লিখিত চিঠির প্রেরক মাননীয় রবীন্দ্রগুহ। রবীন্দ্র গুহ; এই নামটির সঙ্গে বেশ আগেই পরিচিত হয়েছি কৌরব, কবিতা ক্যা¤পাস, শহর ইত্যাদি লিটিল ম্যাগাজিন ও সাহিত্য পত্রিকা সূত্রে। এক ম্যাচাকার গদ্যভাষার উদ্ভাবক হিসেবেই জেনেছি ওঁকে।  কবিতা ক্যা¤পাসের প্রকাশনায় ওঁর হাসান তারিকের রুপালি ইলিশ কাব্যগ্রন্থ পাঠে বিস্মত হয়েছিলাম এই পত্র প্রাপ্তির অর্ধযুগ আগে। রবীন্দ্র গুহ হাসান তারিকের রুপালি ইলিশ কাব্যে লিখেছিলেন ‘সতীচ্ছদ কচি ঘাসের মতো পশুখাদ্য’— অনুভবের এমন প্রকাশ যে— শিউরে না উঠে পারি নি। বিস্ময় মুগ্ধতা জড়িয়ে যায় রবীন্দ্র গুহ ও তাঁর লেখালেখিকে ঘিরে। তাঁর নিম বেতান্ত পড়েছিলাম ওই ক্যা¤পাস সূত্রেই; তখন জেনেছি রবীন্দ্র গুহ ষাটদশকের বিখ্যাত হাংরি আন্দোলনে ছিলেন মলয় রায়চৌধুরীদের সঙ্গে। পরে সেই আন্দোলন থেকে বেরিয়ে এসে তিনি নিমসাহিত্য আন্দোলন করেন। শিল্প সাহিত্য স¤পর্কিত ষাটদশকের নানা মুভমেন্টের মধ্যে নিম সাহিত্য আন্দোলন বিশেষভাবে আলোচ্য। তবে বাংলাদেশে এই মুভমেন্টটির পরিচিতি তেমনটি নেই এখনো, নেই রবীন্দ্র গুহ স¤পর্কেও যথেষ্ট জানাশোনা। অথচ এই বাংলার বরিশালে জন্ম নেওয়া কবি কথাসাহিত্যিক শ্রী গুহ ৪৭-এর দেশভাগ ও হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বলি হয়ে এক সন্ধ্যায় নিজেদের বাড়িভিটে ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছিলেন। হয়ে গেলেন রিফিউজি-উদ্বাস্তু। আজ যিনি নিজেকে ছিন্নমূল বিবেচনা করেন। সে কথায় আরও কিছু পরে আসব।

২.

স্কুলবেলায় প্রায়শ বেড়াতে যেতাম পাশের রিফিউজি পাড়াতে। তখনও জানি না ‘রিফিউজি’ শব্দটি প্রকৃত অর্থে কি ঘটনা বহন করছে। জেনেছিলাম; ওইসব পাড়া বা মহল্লার লোকজনের অধিকাংশ দেশভাগ পরবর্তী সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা যারা সবাই মুসলমান বাঙালি। ওই মহল্লার ছেলেমেয়ে আমাদের সমবয়সী যারা আমাদের সহপাঠী আর আমাদের খেলার সাথীও তারা। কিন্তু ওদের সঙ্গে কি আমাদের কোথাও একটা পার্থক্য রয়ে গিয়েছিল? বিশেষ করে বড়দের মুখে যখন শুনতাম রিফিউজিদের স¤পর্কে নেতিবাচক কোনো মন্তব্য; তখন প্রশ্নটি কেবল মনে আসতো। পার্থক্যের কারণ আমরা ছোটোদের অনুভবে আসতো না। ওইসব পাড়া থেকে আসা সহপাঠীদের, বন্ধুদের সেই অর্থে কোনো ত্রুটি নজরে ছিল না আমাদের। ৪৭-এর দেশভাগের পরে নিজ জন্মভিটা ছেড়ে আসা একদল মানুষ যারা ধর্মে মুসলিম— ভাষাসূত্রে বাঙালি— এই মাটিতে দীর্ঘ সময় বসবাস করে মুক্তিযুদ্ধের মতো মহান আরও একটি রক্তাক্ত অধ্যায় অতিক্রম করে আশির দশকের দোরগোড়ায় এসেও তারা যেন এখানকার স্থায়ী বসবাসকারীদের চোখে তখনো রিফিউজি। এক আলাদা কমিউনিটির মানুষ। হতে পারে তারা নিজ ধর্মকে বড় অতœ-পরিচয় মনে করে সে সংক্রান্ত নিরাপত্তাহীনতায় দেশভাগ ও তার পরবতী সময়ে তাদের জমিজিরেত স¤পদ স¤পত্তি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যেনতেন ভাবে অন্য আর এক দল মানুষ যারা একই সংকটে ভুগতে থাকা এখানকার হিন্দু বাঙালি তাদের সঙ্গে পরিবর্তন (বদল করে) করে এপারে এসেছিল আর এপারের ওইসব হিন্দু বাঙালি পরিবার পাড়ি জমিয়েছিল ওপারে। সেই ৪৭-এ পাড়ি জমানো কথাসাহিত্যিক নিম আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা রবীন্দ্র গুহের মতো। ওপারে যারা গেলেন আমাদের সেই স্বজনরা কেমন আছেন তারা? ছিন্নমূল রিফিউজি উদ্বাস্তু এইসব নামের পরিচিতি থেকে কি তারা মুক্তি পেলেন? জানি না, তবে নিজ ধর্মকে সবচেয়ে বড় আতœ-পরিচয় মনে করে যারা অন্য ধর্মের মানুষের উপর নানামাত্রিক চাপ দিতে থাকল; নিরাপত্তা প্রশ্নে অস্থির করে তুলল এবং সেসব কারণে যারা এপার ওপার করলো নিজেদের ও পরিবার পরিজন তাদের আতœ-পরিচয় যেন ধর্মের চেয়ে ছিন্নমূল হয়ে বড় বেশি প্রকাশিত হল আজও। সেই কবে এ উপমহাদেশের মানুষের পিছু লাগা এক কু-ছায়া সাম্প্রদায়িকতার এ বিভেদ যেন পিছু ছাড়ে না। তাই তো দেশভাগ এবং পরবর্তী সময়ে এপার ওপার করল; আজও করছে যারা তাদেরও যেন সেই স্বস্তিটি আসে না, স্থিরতা আসে না। যারা রয়ে গেলেন সংখ্যালঘু হয়ে এপারে ওপারে তাদের নিরাপত্তা যেন গভীর জলে মধ্যে ভাসমান পানাটি ঢেউয়ে কাঁপিয়ে যায় সময় সময়। সে কারণে ওপার থেকে দাঙ্গার খবর কখনো কখনো আজও ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। এমনও খবর আসে গোহত্যার প্রতিবাদে সংখ্যালঘুদের উপর নেমে আসা নানামাত্রিক বর্বরতা তার কতটা গুজব আর কতটা যেন বাস্তব! এ জাতীয় গুজবও যে সমাজ ছড়ায় বা বহন করে যে সমাজ সাম্প্রদায়িকতাকে সাংঘাতিকভাবেই ধারণ করে আছে এ কথা নিশ্চিত। আবার এপারে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাথেও দেখা যায় নানা ধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানি। সংখ্যালঘুদের নিয়ে চলে রাজনীতির বাজারে বেচাকেনা।

৩.

অমিতাভ পাল সম্প্রতিক বাংলাকবিতায় বাংলাদেশের কবিতা খুব বেশি পরিচিতি পাওয়া নাম নয়; এমনটি মনে হয় আমার। হতে পারে এই কবি নিভৃত প্রচার প্রচারণার বাইরে বসেই কাজ করছেন। এই কবির কবিতা কিংবা তার কাজকর্ম নিয়ে তেমন পরিচিত ছিলাম না। পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত কবিতা ক্যা¤পাস পত্রিকার একটি ইস্যু  বাংলাদেশের আশির দশকের কবিতা নিয়ে স¤পাদক অলোক বিশ্বাসে সঙ্গে এই ইস্যুর অতিথি স¤পাদক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আশির কবিদের অনেকের মতো অমিতাভ পালের কবিতা স¤পর্কে আমার কিছু জানাশোনা হয়; পরে আরও কিছুটা গুরুত্বে আসেন এই কবি যখন হিলি সীমান্তে ২১ ফেব্রয়ারিকে কেন্দ্র করে এপার ওপার থেকে কয়েকজন কবি লেখক আমরা একত্রিত হচ্ছিলাম জিরো-পয়েন্ট নোম্যান্স ল্যান্ডে ভাষাদিবসে আমাদের প্রাণের শ্রদ্ধার্ঘ প্রকাশে; ভাষা ও শহীদের প্রতি। কবি অমল বসু আমার জন্য হাতে করে নিয়ে এসেছিলেন সদ্য প্রকাশিত ওই বাংলাদেশের আশির দশকের কবিতাসংকলনের একটি কপি। অমল বসুর সঙ্গী এক কবি অতনু গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে বাংলাদেশের কবিতা স¤পর্কে খুব আবেগী কিছু কথাবার্তা বলছিলেন এবং এক সময় জানালেন কবিতা ক্যা¤পাস পত্রিকার বাংলাদেশের আশির দশক কবিতা সংখ্যায় অমিতাভ পালের সংখ্যালঘুর মেয়ে কবিতাটি স¤পর্কে। জানালেন তার ভালো লাগা ও ওই কবিতাটির বাস্তবতা। কবিতাটি তাঁকে বিশেষভাবে আলোড়িত করেছে। ওঁর মন্তব্য আমাকে পুনরায় পড়িয়ে নেয় কবিতাটি। পূর্বের পাঠ আবেদন যেন পাল্টাতে থাকে।

একটি সংখ্যালঘুর বাড়ি গোপন অসুখে ভুগছে

গর্ভসঞ্চারী মেয়ের গর্ভের শিশুর মতো

বাড়িটি লুকিয়েছিল গাছের আড়ালে

টিনের চালে কাকের নখের দাগ

পেটে মাকড়সার ডিম

দরজায় বিবর্ণ পর্দা

বহুতল বাড়িদের সাথে তুলনার দূরত্ব কমিয়ে আনতে

বাড়িটির সন্ধ্যায় টিউবলাইট জ্বলে

টিনের চালে ফুটাতে আকাশের রং লাগানো

ঝাড়বাতির বাহার

ঘূণ আক্রান্ত দেয়াল তৈলচিত্রের মতো ঝোলে

পায়ের নীচে ফাটা মেঝের কার্পেট

উদাম বাথরুমের শ্যাওলা জড়িত পিচ্ছিল ইটের উপর দাঁড়িয়ে

বাড়িটি স্বপন দেখে নীলাভ ডিমলাইটে মোড়া

শোবার ঘরের দৃশ্যপট

আয়তনের স্ক্রু লাগান ডাইনিং ¯েপস

মেঘের কার্পেট আর আদুরে সোফার বিলাস

বাড়িটিকে ক্রমাগত শীর্ণ করে

সমুদ্রতীরের নারকেল গাছের মতো জলচ্ছাসের বাতাসে

কাঁপে পাঁজরের হাড়

শান্ত শংকাকুল নিরীহ একটি বাড়ি

সংখ্যালঘুদের মেয়ের মতো খোলা দরজা দিয়ে

তাকিয়ে দেখে সামনের প্রশস্ত মাঠ

একদিন সরু গলির বিছানা হয়ে গেছে

(সংখ্যালঘুর মেয়ে/ অমিতাভ পাল)

সাম্প্রদায়িকতার বর্বরতা চাপ তাপ হিংস্রতা মানুষকে মনুষ্যত্বকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে এভাবেই উৎকণ্ঠিত করে রাখে তাহলে আজও? প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত নানা ঘটনা এর সত্যতা বাস্তবতা এভাবেই কাঁপাতে থাকে বাঁশপাতা মাছের মতো গভীর জলের তলায় গিয়েও। উপমহাদেশের বাস্তবতা যেন এমনি। রমজান মাসের এক দুপুরে বন্ধু প্রণবকে বলি বড্ড খিদে, এসো কিছু খেয়ে নিই পাশের টঙের দোকানে; আতকে ওঠে যেন বন্ধুটি। সে ওই দোকানে খেতে যেতে রাজি নয়। আমি বলি লোকজন তো খাচ্ছে ওখানে, অসুবিধে কি? প্রণব জানায় রোজার মাস চলছে; তাই সেটা ঠিক হবে না। আমার বন্ধুটি অতিমাত্রায় অন্যের রোজায় ভক্তি শ্রদ্ধা ভয় নাকি সমীহবশে অভুক্ত থাকার প্রক্রিয়ায়, আমার বিরক্তি উদ্রেগ করে। অনেকেই যেখানে নিজের প্রয়োজনটি মিটিয়ে নিচ্ছে ঝামেলা ছাড়াই এবং কারও বিশ্বাসের অমর্যাদা না করেই সেখানে অসুবিধে কোথায়? আমার পিড়াপিড়িতে ও জানায় ওর এক তিক্ত অভিজ্ঞতা; কোনো এক পহেলা রমজানের। বিশেষ কারণে ঘরে সকালের-নাস্তা না সেরে বেরিয়ে আসতে হয়েছিলো ওকে এবং বেরুবার সময় ঘরে রাখা ফলের ঝুড়ি থেকে একটি কমলালেবু পকেটে ভরে নিয়েছিল, ব্যাপারটি এমন; সুযোগ মতো পথেই কোথাও মুখে দেওয়া। ওর মনেই ছিল না দিনটি পহেলা রমজান। একটি বাস-স্টপেজে ও কমলা লেবুটি পকেট থেকে বের করে মাত্র খোসা ছড়াতে গেছে আর রি রি করে তেড়ে আসা মানুষজন যেন ওকে পিষে মারে। দিনটি পহেলা রমজান স্মরণে এলে ভুল হয়ে যাওয়া জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেও যেন ভুল শুধরিয়ে নেওয়া যায় না।

৪.

হাংরি আন্দোলন যুক্ত হয়ে আবার তা থেকে বেরিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দেশ ছাড়ে যাওয়া কথাসাহিত্যিক কবি রবীন্দ্র গুহ নিমসাহিত্য আন্দোলন করেন। হাংরি বা ক্ষুধা নয় তিনি বুঝেছিলেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাস্তুচ্যুত একজন মানুষের জীবন অভিজ্ঞতা তিক্ততায় ভরা। সেই কিশোরবেলায় এক বিকেলে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে খেলে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা কিশোর রবীন্দ্র গুহ জানতেন না সন্ধ্যের পরে রাত্রির কোনো একটি অংশে তাকে পরিবারের সঙ্গে চিরদিনের মতো বাস্তুচ্যুত হতে হবে। সে সময় চলছিল দাঙ্গা আর দাঙ্গা নিয়ে নানা গুজব। তাকে ঘিরেই উত্তেজনা। ধর্ম নিয়ে দুটি শিবিরে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছিল উপমহাদেশের মানুষকে। শ্রী গুহ বলছেন; ত্যক্ত-বিরক্ত সাহিত্য-ই নিমসাহিত্যে। তার বিখ্যাত উপন্যাস  লোহারিয়া সূর্যের সাতঘোড়া নাভিকু ঘিরে শিকঞ্জের পাখি খামোশ সবটুকু জীবনের ত্যাক্তবিরক্ত খতিয়ান। সেখানে ভাষা এলো সাংঘাতিক এক ভাঙাচুরা রূপ নিয়ে। সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে নিজ ভিটে ছেড়ে নানা জায়গা ছিন্নমূল হয়ে নানা ভাষা আর পরিবেশে মিশে যেতে যেতে তার সাহিত্যেও তার ছাপ পড়লো। এক ডায়া¯পরিক টার্ন এলো তার লেখায়। তিনি অনুভব করলেন জীবন জুড়ে খুখু যুদ্ধ, যা মহাযুদ্ধের সামিল। সত্য দুধরনের; চাপানো সত্য আর আসল সত্য। জীবন জীবিকার জন্য ঘুরেছেন নানা জায়গায় কোনো জায়গাকেই তিনি স্বদেশের মর্যাদায় নিতে পারেন নি; তার লেখা এমনি অনুভবের অনুভূতি পাই। সাম্প্রদায়িকতার বলি হয়ে কথাকার রবীন্দ্র গুহ অনুভব করেন কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে বহুদূরের ভারতবর্ষ দেখার। প্রকৃতঅর্থে সাম্প্রদায়িকতায় ঢাকা কলকাতা চট্টগ্রামে তখন দূরের ভারতবর্ষের দেখা পাওয়া অনেক সহজ ছিল। আজও সহজ; খুব সহজ যখন ৪৭ ও তার পরবর্তী সময় থেকে ওপার থেকে আসা মানুষদের পাড়ায় অর্থাৎ, রিভিউজি পাড়ায় যখন যাই খুব গভীরভাবে লক্ষ করলে বুঝি এই লোকগুলোর কোথাও একটা যেন কি আছে। বিশেষ করে যারা বয়সে প্রবীণ, যাদের জন্ম ওপারেই। তারা ছেড়ে এসেছেন জন্মভিটে বাপ দাদার কবর একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে থেকে থেকে বেরিয়ে আসতে চায় দাবিয়ে রাখা বুকের অতল থেকে। তাই বেরিয়ে এলো সময়কালীন কবিদের অন্যতম জয় গোস্বামীর কবিতায়:

গরু ডাকছে, আমাদের পূরানো বাড়ির

সব গরু।

মুংলি নামে, ঘেঁটি নামে, লক্ষ্মী ও কমলা নামে

আমাদের পুরোনো বাড়ির

সব গরু,

ডাকছে,

দুশো মাইল দূর থেকে…শুধু

গরু নয়, গরুর রাখালও ডাকছে, বাড়ির মুনিষও ডাকছে,

দোহাল করিমভাই, ঘুঁটে-দেওয়া কুমারী মেয়েটা…

ডাকছে, শুধু ওরা নয়, মেয়েটার খোঁড়া বাপ, মুনিষের

ছেলেমেয়ে

রাখালের আধফোঁটা বউ…

বেড়ালের নাম মিঠু, সে-অ ডাকছে,

কুকুরের নাম ভোলা, সে-অ ডাকছে, হাঁস, মুরগি, খাল-বিল,

আমাদের রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, গাছপালা

সবাই চীৎকার করে ডাকছে ওই পঞ্চাশ বছর ও- ও-ই পঞ্চাশ

বছর দূর থেকে

গলা

চিরে যাচ্ছে,

শুনতে পাচ্ছ না?

(দেশভাগ : পঞ্চাশ বছর/ জয় গোস্বামী)

এই ডাক শুনতে পাচ্ছেন, জন্মভিটে ওপার থেকে আসা এপারে লোকজন, এপার থেকে যাওয়া ওপারে লোকজন। কিন্তু এটিও সত্য সামনে এসে নৃত্য করে সেই দুঃস্বপ্নের রাতগুলো।

******************************************************

রেজওয়ানুল হক রোমিও
মনের কোণে লুকিয়ে রাখি একলা আকাশ
হিন্দুপাড়ায় তখন ঘটা করে আরতি পালন করা হতো। আমরা মুসলমান পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে যোগ দিতাম সে উৎসবে। সবাই একত্রিত হতাম রাত কিছুটা গভীর হওয়ার সাথে সাথে। বানিয়ার মোড় পার হয়ে সামনে থাকা বাঁশ-বাগানের ভিতর দিয়ে যেতে গা ছমছম করে উঠতো। আমাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে সাহসী ছিলো তারা হাঁটতো রাস্তার পাশ দিয়ে। অন্ধকারে জ্বলে ওঠা দুএকটা জোনাকি এসে পড়তো আমাদের গায়ে। দারুণ মুগ্ধতা নিয়ে আমরা সেসব দেখতাম আর কখনো কখনো দুহাত দিয়ে তাদের চেপে ধরে উড়িয়ে দিতাম শূন্যে। বাঁশ-বাগান পার হয়ে আমাদের পথ মিশে যেতো বাঁকা-চাঁদের আলোয়। সে এক মোহনীয় ব্যাপার। আকাশের বুক চিরে নেমে আসা চাঁদের আলোয় সবকিছু অদ্ভুত রকম ভালো লাগতো তখন। মাঝে মাঝে দল বেঁধে ছুট দিতাম রাস্তার একপ্রান্ত হতে অন্যপ্রান্তে। এটা কোনো প্রতিযোগিতা ছিলো না, এমনটা করতাম আমরা মনের আনন্দেই। এসবের মাঝে এক ধরনের সুখ ছিলো। রাস্তায় চলতে চলতে কখনোবা মনের অজান্তেই বের হয়ে যেতো দুচারটে কবিতার লাইন। কবিতা বলতে আমাদের কাছে ছিলো রবীন্দ্র-নজরুল আর কিছুটা জীবনানন্দ দাশ। এভাবে কখন যেনো আমরা পৌঁছে যেতাম আমাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। রাস্তার দুপাশের দোকানে সাজিয়ে রাখা বাতাসা আর গরম গরম জিলাপির মোহনীয় গন্ধ বালক হৃদয়ে সৃষ্টি করতো দুর্নিবার আকর্ষণের। চারপাশ থেকে লোকজন এসে জমা হতো এই আয়োজনে। কেউ সবে এসেছে আর কেউবা ব্যস্ত বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য। ম-পের পাশ জুড়ে যুবকের মুখ থেকে বের হওয়া আগুনের ফুলকি আর বরুণা দিদির রাঙ্গা পায়ের অবিরাম নৃত্য মুগ্ধতার পরশ ছড়িয়ে দিতো আমাদের কল্পনার রাজ্যে। আরতি শেষে ধুম পড়ে যেতো প্রসাদ নেয়ার। ছোট ছিলাম বলে আমাদের অধিকার ছিলো সব থেকে বেশি। প্রসাদ নিয়েই এক অপরের হাতের দিকে তাকাতাম, যার ভাগে বেশি পড়তো সেদিন তার আনন্দের সীমা থাকতো না। এরপর বাড়ি ফেরার পালা। সেরাজ চাচার দোকান থেকে নিয়ে আসা দুটাকার বাতাসা কখনো কখনো সঙ্গী হয়ে যেতো পথের। দল বেঁধে ফিরে আসা বেলাল, ফিদ্দুস, রবিউল, সেরাজুলের বুকে তখন কত-শত স্বপ্নের আনাগোনা। এই পৃথিবী, আমাদের এই ছুটে চলা, বাঁকা-চাঁদের আলোয় মিশে যাওয়া গ্রামের মেঠোপথ সবকিছু  সুন্দর মনে হতো তখন। সব কিছু সুন্দর মনে হতো বরুণা দিদির মতো!

গ্রামের মিশে থাকা সবুজ প্রকৃতির মধ্যেই কেটেছে আমার দুরন্ত শৈশব। যেখানে রোদ্দুর ছিলো, ছিলো শঙ্খচিলের মিশে যাওয়া সোনালি আকাশ। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সাকোয়া নদীর অবিরাম ¯্রােত আমাকে টেনে নিয়ে যেতো কোনো এক নিরুদ্দেশ যাত্রায়, যেখানে আমার আমিকে আবিষ্কার করে যেতাম প্রতিনিয়ত। নদীর পাশেই বৃটিশদের রেখে যাওয়া স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে প্রকান্ড বটগাছ দুটি। গাছের চারপাশে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বাঙালিদের শোষণের অনেক গালগপ্প চালু আছে সাধারণ মানুষের মাঝে। আমরা তখন বৃটিশ-ইংরেজ অতসব বুঝতাম না তবে একবার দেখেছিলাম গাছের দখল নিয়ে পাশের গ্রামের সাথে কি ভয়াবহ রক্তারক্তি ব্যাপার। বালক হৃদয়ে তা নাড়া দিয়েছিলো প্রচন্ড রকম। দাদাকে বলেছিলাম, ‘বড় হলে আমিও ওরকম দুটো গাছ লাগাবো দেখিস’। এই একটি মানুষ যে আমার সকল অত্যাচার সহ্য করে যেতো নির্বিবাদে। যাতায়াতের তেমন কোনো সুব্যবস্থা ছিলো না বলে দাদাই আমাকে রোজ স্কুলে নিয়ে যেতো। রেললাইনের পাশ দিয়ে রাস্তা ছিলো বলে সাইকেল চালানোটা খুব একটা সহজ কাজ ছিলো না। তার উপরে হঠাৎ করে সাইকেল থেকে নেমে শিমুলের ডালে বসে থাকা পাখিগুলোকে দে এক ঢিল। দাদা জানতো কিছু বলে খুব একটা লাভ হবে না তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতো। আমার অন্যায় আবদারে তার এই নীরবতাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছিলাম, তাই খুব বেশি অসুবিধা হতো না। দাদা আজ মৃত্যুশয্যায়। আমার স্মৃতির আকাশে মেঘগুলো আজ তাই জমে আছে বৃষ্টি হওয়ার অপেক্ষায়। প্রতি বৃহস্পতিবার বাবা বাড়ি ফিরে আসতেন। বাবার প্রতীক্ষায় তেপতির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সময়গুলোকে খুব বেশি দীর্ঘ মনে হতো তখন। আমি চেয়ে থাকতাম সূর্যটার দিকে। পশ্চিম আকাশের বুকে সবটুকু আলো নিয়ে সে যখন অস্তগামী, ঠিক সেসময় দেখতাম বাবা কেমন হাসিমুখ নিয়ে হেঁটে আসছে আমার দিকে। আমার বাবা, যাঁর কাছ থেকে চিনতে শিখেছি পৃথিবীকে। অনুভব করেছি তাঁর হৃদয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নেয়ার এক অসম্ভব যন্ত্রণাকে। সত্য-মিথ্যা আর ধর্ম-অধর্মের বৃত্তের বাইরে গিয়ে তিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন এক অন্য পৃথিবীর গল্প যেখানে মানুষের সমর্পিত আত্মা স্থান করে নিয়েছে কিংবদন্তীর। তাই আর অন্য কোনো মহাপুরুষ সন্ধানের আবশ্যক হয়ে ওঠে নি আজ অবধি। বাবা চলে গেছেন শেষ বিকেলের সূর্যের মতোই আমাকে একা রেখে। জীবনের সকল অনুভূতির শিখা যে মানুষটি জ্বালিয়ে গেলেন সেখানে আমি আজও শুনতে পাই অস্ফুট এক বেদনার স্বর। যা আজও প্রতিনিয়ত ডেকে চলেছে আমাকে।

গ্রাম থেকে যেদিন শহরে চলে এলাম, সেদিন নতুন করে আবিষ্কার করলাম নিজেকে। এক অদ্ভুত শূন্যতা ঘিরে রেখেছিলো আমাকে। এ বুঝি গ্রাম্য এক ছেলের নাগরিক হওয়ার যন্ত্রনা! ইট-কাঠ-পাথরের দেয়ালে এ এক অন্য আমিকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস। এখানে নেই সবুজের সেই অবারিত প্রান্তর, নেই ভোরের শিশিরের ¯িœগ্ধ সে স্পর্শ। এখানে মানুষ নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে রঙ্গীন মোড়কে। সবাই ছুটছে, অন্তহীন সে ছুটে চলা। অর্থের ইমারত গড়ে জানান দিচ্ছে নিজেকে, ভুলে যাচ্ছে আকাশের ওপারে আর এক আকাশের কথা। সেখানে প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে, আছে শরৎ এর শঙ্খিনী আকাশ। কতসব মিথ্যা মোহ আবিষ্ট করে রেখেছে চারপাশ। নগরের কোলাহলে ছুটছে এক-ই অপরের পাশ ঘেঁষে, তবু যেনো একটুখানি দাঁড়ানোর বিরাম নেই। আধুনিক মানুষ হওয়ার পথে তাচ্ছিল্য করছে চারপাশের প্রিয় সবকিছুকে। বিচ্ছিন্নতাকে আলিঙ্গন করে নিচ্ছে সময়ের বিরুদ্ধ¯্রােতে গিয়ে। আমার এই নাগরিক জীবন আমাকে দিয়েছে ভিন্নতার স্বাদ। জীবনের বহুমাত্রিক দিকগুলোর উন্মোচন ঘটিয়ে বুঝতে শিখিয়েছে বৈরিতাকে আলিঙ্গন করে কিভাবে সামনে এগুতে হয়। আর তাই পথ চলাতে মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠলেও কখনও থেমে যেতে হয় নি। সভ্যতার পাশাপাশি জীবনের এই বৈপরীত্য আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। তবে মানুষের মাঝে মানবিক হওয়ার অভিনয় আমাকে কষ্ট দেয়, নিজেকে অস্তিত্বহীন মনে হয় তখন। তবে এটা ঠিক মিথ্যা কথার এই লাল-নীল শহরে এসেই প্রথম ভালোবাসা পেয়েছি, প্রেমে পড়েছি তার। আগন্তুকের মতো এসেছিলো সে আমার জীবনে। প্রথম যেদিন সে আমার সামনে এসেছিলো একটা নীল শাড়ি পড়ে, সেদিন আকাশে চাঁদ ওঠে নি কিন্তু আমার কাছে তার অপূর্ণতা ছিলো না বোধ করি। সব প্রথমের প্রতি মানুষের এক মোহ থাকে। এই মোহ মানুষকে করে তোলে চরম দুঃসাহসী। জীবনে প্রথম সে দুঃসাহসের সঞ্চার হয়েছিলো সেদিন। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো সময়। স্মৃতির পাতায় সেই আধোআলো ছায়া অপেক্ষা বাড়িয়েছে চাতকের মতো। তার মৌনতা আমাকে আরও বেশি আকর্ষিত করে তুলেছে। তাকে জানতে চাওয়ার সেই ব্যাকুলতার মাঝেই ছিলো নিজেকে নতুন করে অনুসন্ধানের প্রেরণা। প্রাচীরের ওপারে লাঠি লজেন্স ছড়ানো সেই দিনগুলো সত্যি অসাধারণ ছিলো। রেললাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে চলা রৌদ্রজ্জ্বল সেই দিন, দামিনীপাড়ার মোড়ে প্রতীক্ষারত ক্লান্ত বিকেল আর প্রথম মোবাইল ফোনের স্বাদে ডিজুইসের রাতভর অফার জুড়ে তার নির্লিপ্ত স্পর্শের মাদকতা আজও বিভোর করে রেখেছে আমাকে। তাই রাস্তার অলিতেগলিতে আমার মতো নচিকেতাদের ভিড় আজও চোখে পড়ে, মনে পড়ে রাত জেগে শোনা সেই গানের কথা, ‘হাজার এ কবিতা, বেকার এ সবিতা, তার কথা কথা কেউ বলেনা, সে প্রথম প্রেম আমার…’

এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, আমার জীবনের সব থেকে স্বর্ণালি সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিক্রান্ত জীবন। ছোটবেলা থেকেই লালন করে এসেছিলাম এই স্বপ্নটাকে। বাবা একদিন বলেছিলো, ‘জীবনে যা কিছু করিস না কেনো, সেখানে যেনো তোর নিবেদন থাকে, সত্যিকারের মানুষ হওয়ার প্রয়াস থাকে।’  আর তাই নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প চিন্তা আমার কাছে ছিলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি ছাত্রের মতো আমিও এখানে এসেছিলাম এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে। প্রথম যেদিন মতিহারের এই সবুজ চত্বরে পা রেখেছিলাম তা আমার স্বপ্নালু চোখকে শুধু আলোকিতই করে নি বরং সেই সাথে দিয়েছিলো নিজেকে আবিষ্কারের অফুরান বিস্ময়। এর পরতে পরতে মিশে থাকা আমাদের রাষ্ট্রিক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য আমার অহংবোধে জাগিয়েছিলো নতুনত্বের মাত্রা। দিগন্ত প্রসারিত সবুজের সম্মোহনে এর বিশালতা ব্যক্তিত্ব গঠনের পাশাপাশি দিয়েছিলো অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। পাখি ডাকা ভোরের প্যারিস রোড কিংবা ফাল্গুনের আবেশ ছড়ানো মুঠো মুঠো সোনা ঝরা রোদ শিখিয়েছে প্রকৃতির কাছ থেকে দুহাত ভরে শিক্ষা নেয়ার।  আর এই উপলব্ধিগুলোই আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে মানব থেকে বিশ্বমানব হয়ে ওঠার। শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ছাদে কাটানো এক একটি রাত আজও অমলিন হয়ে আছে স্মৃতির পাতায়। রাত জাগা পাখিদের সাথে গেয়ে ওঠা হেমন্ত মান্নাদের সেসব গান আমাদের যেনো টেনে নিয়ে যেতো কোনো এক অজানার পথে। আমরা তখন নিজেদের হারানোর এক ভয় অনুভব করতাম। পাশাপাশি চলা এতোসব প্রিয়জন একদিন হয়তো জীবনের চোরাবালিতে ডুব দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো একে অপরের থেকে। সেসব ব্যথা আমাদের গভীরভাবে ভাবাতো। আজ যেমন আমরা সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে! ছাত্ররাজনীতির সুতিকাগার এই বিশ্ববিদ্যালয় অধিকার আদায়ের যে মন্ত্র আমাদের চেতনায় জাগ্রত করে দিয়েছে তা যেমন সময়ে সময়ে প্রতিবাদের ভাষ্য হয়ে উঠে এসেছে তেমনি আবার মানুষ হিসেবে আমাদের প্রতিনিয়ত করে তুলেছে আধুনিক। মুদ্রার উল্টো পিঠের সাথেও পরিচয় হয়ে গেছে এখানে। জীবনের বর্ণিল আলোকচ্ছটায় সবুজ ক্যানভাসের পাশাপাশি রৌদ্রের দারুণ মূর্তি আমার মতো তরুণদের করে তুলেছে সন্দিহান। খুব বিশ্বাস নিয়ে যাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলে চলেছি, দেখেছি স্বার্থের প্রয়োজনে তারা কিভাবে কেটে পড়ে। অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ করে নিজের আশাতীত প্রেরণার পাশে দেখেছি ঘোর অমানিশা। মাঝে মাঝে নিজের কাছেই অবাক লাগে এই সব মানুষের সাথে পথ চলতে হয়, পিঠ চাপড়িয়ে জানাতে হয় শুভকামনা। তাই দিনশেষে ‘বন্ধু’ শব্দটিকে দারুণ ফ্যাকাশে মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে তাই বুঝেছি, ‘সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে! কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে সহজ লোকের মতো!’ তাই কোনোকিছুতে আজ আর বিস্মিত হই না। এতো কিছুর পরেও দিনশেষে আমাদের কিছু বিশ্বাসের জায়গা থাকে আর তা না হলে আমি মানুষ কেনো? আমাদের ভারতবর্ষের সূচনালগ্ন থেকে শিক্ষকদের বিশেষ এক স্থান আছে। কেনোনা তারাই আমাদের পথিকৃৎ। পৃথিবীর বাইরে গিয়ে তারাই আমাদের বিশ্বকে উপহার দেন। কিন্তু সময়¯্রােতে গুরুর সেই আসনটিও আজ নড়বড়ে। জীবনের বৃহত্তর এই পরিসরে এসে দেখেছি স্বার্থের প্রয়োজনে মেধাবীদের কিভাবে ব্যবহার করছে তারা। শিক্ষকতার মহান ব্রত নিয়ে যাঁরা এসেছেন এই পেশায় তাঁরাই শিক্ষাকে করে তুলেছেন বাণিজ্যমুখী। আমাদের মহানায়কেরা আজ তাই হারিয়েছে পিতৃত্বের আসন।

সময় আজ শুদ্ধতার সন্ধানে ব্যস্ত। যুদ্ধ আজ তাই শুধু নিজের সাথেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রতিপক্ষ এখন সকল স্বৈরতান্ত্রিক স্পর্ধা। যান্ত্রিক সভ্যতার পাশ ফিরিয়ে মানুষের সফলতা আজ শুধু নতুনের নির্মাণ নয়, বরং সেখানে ভাবনার অবকাশ তৈরি করে দিচ্ছে নিত্য নতুন। আকাশের দিকে তাকিয়ে যাঁরা এর বিশালতাকে স্পর্শ করার সাহস দেখিয়েছিলো একদিন, বলেছিলো নতুন পৃথিবী গড়বার কথা তাঁদের যুদ্ধে আমিও আজ সামিল হতে চাই। বলতে চাই আমিও তোমাদের-ই একজন। পৃথিবীর এই রণ নৃত্যে স্বাধীনতাটুকু আমিও পেতে চাই। ক্ষুধার যন্ত্রণায় সাতাশি কোটি নিরন্ন মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে বলতে চাই, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আমারও আছে। কালো চামড়ার আঁধার দিয়ে আলোকিত করতে চাই এ পৃথিবীর সকল আদিমতম ধূসরতাকে। মার্কসের আলোবর্তিকা তাই শুধু আজ মুগ্ধতা হিসেবে নয় বরং একবিংশ শতাব্দীর রূপরেখায় এর অবশ্যম্ভাবিতা আমাদের স্মরণ করতে হবে। এ সব কিছুকে জয় করতে হবে সময়ের বিরুদ্ধ¯্রােতে গিয়ে। নতুন করে শুরু করতে হবে জয়যাত্রা। সেই স্বপ্নটুকু নিয়ে এগিয়ে চলেছি নিরন্তর। চিরচেনা নদীর পাশ দিয়ে আকাশে পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে অসীমকে স্পর্শ করার যে স্পৃহা জেগেছে মনে তা আজ তা ছুঁতে চাই সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে গিয়ে। স্বপ্নকে সত্যি করার এক দুর্লভ ক্ষমতা আছে বলেই মানুষ আজও বেঁচে আছে। আর তাই সে প্রেরণা পায় প্রকৃতির কাছ থেকে, জীবনের কাছ থেকে। ‘মানুষ নাকি তার স্বপ্নের সমান বড়’- এই বিশ্বাসটুকু বুকে নিয়ে তাই স্বপ্ন দেখি বিশ্বজয়ের!

******************************************************

নাজ
রঙ এর অলিতে-গলিতে
ভেজা হ্যা-মেটে এক ফোঁটা সবুজ রঙ পড়েই চারপাশে বংশবিস্তার করে নদীর মতো গতিপথ সৃষ্টি করল। আর তখনই পৃথিবী কচি কলাপাতার সাজে সেজেছিলো। প্রাণের কলাহলে বোবা মেয়েটি যেন প্রথম কথা বলতে পেরে অবাক হলো। ফুলও ফুটলো। এভাবে অনেক প্রহর চলার পর হঠাৎ দূরের তমাল গাছটায় অন্ধকার নামলো। শিল্পীর বুকে আশঙ্কা হল যে অন্ধকার যদি তাকে আমাকে গ্রাস করে। সত্যি সত্যি অন্ধকার কাছে আসতে থাকল। ত্রাস তখন ক্ষোভের সৃষ্টি হল। অন্ধকার তাকে আচ্ছাদন করলে ক্রোধ আর এক বুক শূন্যতা কাটাতে সে বাঁশি হাতে তুলে নিল। বাঁশিতে কেবলই কর্কশ শব্দ বের হয়, কোমল মিষ্টিস্বরে পঞ্চমস্বর বের হয় না। গুরু মশায় বলেন সুর থাকে আকাশে, তাকে সাধনার দ্বারা বাঁশিতে আনতে হয়। হৃদয়ের সম্পূর্ণ বাতাস দিতে হয় সাউ-হোল্ডে, তবেই তো নোটেশন হোল্ডের ছটি ছিদ্রবন্ধ থাকা সত্তেও শ্রুতিমধুর পঞ্চমস্বর বের হয়। এই স্বর বের হলে তবেই বাঁশিবাজানো সম্ভব। আর তখনই ভৈরব বাজালে ভোরের অরুণ বর্ণ আভা আসবে। শিল্পিত মন পদ্মাসনে বসে চোখ বন্ধ করে কর্কশ সুরটি বাজায় আর আকাশে কোমল সুরটি খোঁজে। কারণ, ভৈরব বাজাতে না পারলে আলো আসবে না। আলো না এলে তার ক্যানভাসের সবুজ পৃথিবী কালো হয়ে থাকবে আর পৃথিবীবাসী আলো না পাওয়ার ক্রোধে এক একজন গোখরো সাপে পরিণত হবে। গোখরোদের দ্বারা সাধনা চলে না, এরা শুধু নিজের মধ্যে ক্রোধান্বিত হয় জৈবিক চাহিদার জন্য। ক্রোধ সাধনায় সিদ্ধির চরম বাধা। তাই পুরো পৃথিবীকে শান্তির সবুজ দিতে হলে তাকে ভৈরব বাজাতেই হবে। কিন্তু পঞ্চমস্বর খুঁজে না পেলে কিভাবে সে সারগাম করবে আর কিভাবেই বা রাগ বাজাবে। বাঁশি ফোকার ফলে মাথা ঝিমঝিম করে মনে হয় সে পড়ে যাবে, পৃথিবীতে আলো আনতে পারবে না। তার ভাবনা হয় তবে কী মানুষগুলো বিপথে যাবে! পৃথিবীতে কারো কোনো লক্ষ থাকবে না, সবাই কেবল অন্ধের মতো ছুটবে! না, তা হতে পারে না, আকাশের যে স্তরে পঞ্চমস্বর থাকুক তাকে আমার কাছে আসতেই হবে। কারণ, আমি এস.এম. সুলতানের ‘যাত্রা’ ছবিটি দেখেছি। শিয়াল ডাকা গভীর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি এই ছবিটির সঙ্গে। এ ছবিতে

ষাটটি ফিগার আছে, অথচ প্রথম দর্শনেই মনে হবে শত শত ফিগার। যারা অদম্য ইচ্ছা আর অসীম সাহস নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। যাদের পেশী এবং আকার দেখে ধারণা করা যায় তারা কি পরিমাণ শক্তি ধারণ করেন। পৃথিবীর কোনো অপশক্তির নিকটে তারা মাথা নোয়াবে না। তারা এগিয়ে যায় দৃঢ়-প্রত্যয়ে। এদের এক একজনের সঙ্গে প্রতি রাতে দীর্ঘক্ষণ ধরে কথাবার্তা হতো। আর তাদের শক্তির রহস্য কি তা কিন্তু তারা আমাকে জানিয়েছে। গভীর জ্বরে আমি যখন অবচেতন থাকতাম, তখন দেখতাম আমি এস.এম.সুলতানের সঙ্গে আকাশে উড়ছি তিনি বিভিন্ন মনোরম দৃশ্য দেখাচ্ছেন আর একটা কথা বারবার বলছেন। যদি তুমি সৎ স্বপ্ন দেখ আর সেজন্য শ্রম দাও, তবে তুমি আমার ছবির চরিত্রের মতো শক্তিমান হয়ে উঠবে। যারা প্রকৃতির শাসনে চলে না, প্রকৃতিকে শাসন করে। কারণ তারাই তো ঈশ্বর! তুমিও তো ঈশ্বর, তুমি নিজেকে জানার স্বপ্ন দেখ আর সাধনা কর। পূর্বে মূনি-ঋষিরা পদ্মাসন গ্রহণ করে চোখ বন্ধ করে নিজেকে খুঁজতেন। এখন ডিজিটাল সময়ে পৃথিবী খুব অস্থির আর সহজলভ্য। তাই ওভাবে ধ্যান না করে কোনো কাজে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। তা হতে পারে রং, হতে পারে সুর বা শব্দ প্রভৃতি। সাধকরা যেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বন্ধ রেখে তৃতীয় নয়ন দিয়ে আলো দেখেন! তুমিও সাধনার দ্বারা আলো আনতে পার। তখন দেখবে করুণায় মন ভরে উঠবে ক্ষোভ করার মতো কোনো প্রাণী বা বস্তু কিছুই থাকবে না। পরম শান্তি অর্জন হবে তোমার। সকল সমস্যার সমাধান হবে তুমি। পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণীকে তুমি ক্রোধ-মুক্ত করতে পারবে। যদি কোনো পথে যাত্রা করতেই হয় তবে আমার ‘যাত্রা’ ছবিটি দেখ। ওদের মতো বুক বাড়িয়ে মাথা উঁচিয়ে যাত্রা করো। তুমি জয়ী হবেই। তাই শিল্পীকে অসুস্থ হওয়া যাে ব না, যে পর্যন্ত না পঞ্চমস্বর খুঁজে না পাও সে পর্যন্ত ফুঁ দেওয়া বন্ধ করবে না। দেহে বাতাস যতক্ষণ আছে ততক্ষণ সে বাঁশিতে বাতাস দেবে, এই তাঁর প্রত্যয়। কর্কশ স্বরে বাঁশি বাজতে থাকে অনেক প্রহর। এক সময় পুরো শরীর অবসাদ হয়ে আসে। তখন ই মনে পড়ে জয়নুল আবেদীনের ‘সংগ্রাম’ ছবির কথা। কি অদম্য শক্তি আছে এই ছবিতে। কাদায় বসে যাওয়া একটি মালবাহী গাড়ীকে উঠানোর কি কঠিন সংগ্রাম চলছে গরুতে-মানুষে। শিল্পীকেও এমন সংগ্রাম করে যেতে হবে। আবেদীনের আরও একটি ছবি আছে ‘কালবৈশাখী’। ছবিটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। তথাপি ছবিটির রয়েছে সৎ-সাহস। ‘কালবৈশাখী’ ছবিতে দুজন নারী ঝড়ের মধ্যে পথ চলছেন, তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য এই দুই নারী আর কেউ নয়। এই সমাজের প্রত্যেককেই তাই। সবাই যেন জীবনের পথ পাড়ি দিচ্ছে— এই ঝড়ের মধ্যে। তবে কি মানুষের গন্তব্য মৃত্যু? হয়তোবা তা-ই। তবে কিছু কিছু মানুষ মৃত্যুকে ছাপিয়ে উঠে তাদের কর্মের দ্বারা। যে কর্মের লক্ষ্যে পৌঁছেছে— এই কালবৈশাখী পাড়ি দিয়ে। এই ঝড় যেন ‘ফুলসিরাত’ যা পাড়ি দিতে পারলে তবে আসবে শুভদিন। যারা এই ঝড়কে ভয় পায়, পথ এগোয় না তারা হয় অকর্মক। এরা নতুন নতুন চ্যালেন্স গ্রহণে পিছপা হয়। এই ছবিতে শিল্পী দুজন পুরুষকে দিতে পারতেন। তা না করে ছবির চরিত্রে এনেছেন দুজন নারী। যা থেকে বোঝা যায় এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের পথ চলা কতো দুর্গম! পথ চলাতে সবাইকে কঠিন পথটাই পাড়ি দিতে হবে। যা সহজে পাওয়া যায় তার মূল্য নিতান্তই তুচ্ছ। শিল্পীকেও কষ্ট করেই পৃথিবীতে আলো আনতেই হবে। কালবৈশাখীর ঐ দুই নারীর মতো শিল্পীর যাত্রা। যেখানে আকাশ কালো-অন্ধকার। বাঁশির সুর পূর্বের চেয়ে কোমল হয়েছে কিন্তু সুমিষ্ট হয়নি। অন্ধকারে শো শো করে বাতাস বইছে, শিল্পী বিভোর হয়ে পঞ্চমস্বর খুঁজে ফিরছে। যেমন করে নিখোঁজ সন্তানকে খুঁজে বেড়ায় তার মা। শিল্পীর বুক হাহাকার করে ওঠে, যদি না হয় পূর্ণ পরিতৃপ্ত। সহসাই রবীন্দ্রনাথ তাকে স্মরণ করে দেয় :

সন্ত্রাসের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান

সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ¤্রয়িমান-আ! আহা!

মুক্ত করো ভয়,

আপনা-মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়-আ! আহা!

সে বুঝতে পারে ‘যদি না হয়…’ বলে পৃথিবীতে কোনো বাক্য থাকতে পারে না। এই বাক্যে নিজের নিজেকে অপমান করা হয়। শঙ্কা, সঙ্কট থেকে মুক্ত হতে পারলে জীবনে সব হবে আর না পারলে কিছু হবে না। ফলে শিল্পী একাগ্রচিত্তে ভাবতে থাকে— অবশ্যই হবে। সুর আমার কাছে আসতে বাধ্য। কারণ আমার বিশ্বাস সুরকে চায়। আর আমার বিশ্বাসই ‘পরম’। একে চাইলে পৃথিবীর সব সম্ভব।

মোহাবিস্ট আর্টিস্ট এক ধ্যানে বাঁশি বাজাতে থাকে। সে যেন একটি কঠিন নেশার মধ্যে প্রবেশ করেছে, ছাড়তে পারছে না। নিজের না জানতেই তার দম বেড়ে গেছে। সুর কোমল হচ্ছে, কোমল পঞ্চমসুরটি যেন তাকে জগৎ সংসরের বাহিরে নিয়ে গেছে। নিজের সুর শুনে সে নিজেই বিমোহিত। সারগাম করার সময় মনে হচ্ছিল নদীর ঢেউ তরঙ্গায়িত হচ্ছে। যেন একটি নির্দিষ্ট গতিতে, যেমন করে বাতাস বয়। তার মাঝে পাখির ডাক শুরু হয়ে দূরে— হারিয়ে যায়। এমনি করে আর্টিস্টের বাঁশি বাজতে থাকে। যেন এই সুর কৃত্রিম কোনো সুর নয়। এটি প্রকৃতিরই অংশ। এক সময় দ্বিতীয় সুর আর ষষ্ঠ সুর কোমল করে, সে ভৈরবের আলাপ করলো। তারপর শুরু হলো বন্দীস :

ভোরা ভায়ো চিড়িয়া বোলে বন মে

ভানু দিত ভায়ি।

পুরা বা গাগান মে।

এই বন্দীসের সুর সাজানো হলে আন্ধকার ভেদ করে একটু আালো নামলো পৃথিবীতে। সেই আালোতে শিল্পী প্রথম তার ক্যানভাসের স্বপ্নের সবুজ পৃথিবীকে দেখতে পেলো। সুর যখন আাস্তে আাস্তে বাড়তে থাকলো আালোও ফুটতে থাকলো। সে আলোতে তার সামনের শিশু গাছটি দেখতে পেলো। সুর আাকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে আার চারদিক যেন আলোকিত হচ্ছে। শিশু গাছটির পর ক্ষেত আলোময় হলো। তারপর দূরের গ্রামটি এবং সর্বশেষ তমাল গাছ আন্ধকারের গুহা থেকে বেরিয়ে এল। চারদিকে পাখিদের কন্ঠে শিল্পীর বিজয় ধ্বনি বেজে উঠল। আনন্দে সব প্রাণীরা নৃত্য করতে লাগল।

আর পৃথিবীর গোখরাগুলো মস্তক অবনত করল সুরের মহিমায়। ঐভাবেই তারা দেখলো বাঁশিওয়ালার সুরের ধরণী। যেখানে মানুষের কোনো ক্রোধ নেই, মানুষ প্রত্যেকটা প্রাণীকে সম্মান করে। সবার প্রাণ শান্ত, যেন, বৃক্ষের সমান ধৈর্য্য নিয়ে সবাই জীবনতরী পাড়ি দিচ্ছে। প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান শরীর— মানবশরীর। এই শরীরই মুক্তির দ্বার। অথচ ক্রোধ, লোভ, হিংসা প্রভৃতি মানুষকে মুক্তি থেকে আনেক দূরে রেখেছে। এই সত্য আবগত হওয়ার পর সব মানুষ সাধনার দ্বারা তাদের রিপুসমূহকে সংযত করেছে। যা সম্ভব হচ্ছে শিল্পীর ছবি আর সুরের মধ্য দিয়ে। যেন জয়নুল আবেদিনের ‘বিদ্রোহী’ ছবির গরু বাঁধন খুলে মুক্ত হয়েছে। সাথে সাথে পৃথিবীর সব বাঁধন খুলে গেছে। মুক্ত হয়েছে মানুষ, মুক্তি পেয়েছে আত্মা।

******************************************************

     অনুবাদ

ইতালো ক্যালভিনোর গল্প
নিয়ানডার্থাল মানব
অনুবাদ : মহীবুল আজিজ
[ইটালো ক্যালভিনো (১৯২৩-১৯৮৫)-ও জন্ম কিউবায় এবং মৃত্যু ইটালিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উত্তর ইটালিতে জার্মান সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন তিনি। ‘অদৃশ্য শহর’, ‘শীতের রাতে যদি কোন পর্যটক’, প্রভৃতি বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা। তাঁর কুড়িটির মত গ্রন্থ ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। বর্তমান গল্পটি তাঁর ‘নিয়ানডারথাল ম্যান’ গল্পের অনুবাদ।]

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: আমি কথা বলছি ডুসেলডর্ফের কাছাকাছি অপূর্ব চিত্রময় নিয়ানডার্থাল উপত্যকা থেকে। আমার চারপাশে রয়েছে চুনাপাথরের পাহাড়ের বাঁক নেওয়া নৈসর্গিক দৃশ্যাবলী। আমার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রাকৃতিক গুহা এবং মানুষের তৈরি পাথরের খাদ দু’টোতেই ধাক্কা লেগে। ১৮৫৬ সালে এইসব পাথরের খাদের ওপর কাজ করবার সময় এই উপত্যকার সবচাইতে প্রাচীন মানুষদের একজনের খোঁজ মিলেছিল। প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার বছর আগে সেই মানুষ বসতি গড়েছিল এখানে। নিয়ানডার্থাল মানব: তাকে ঐ নামে ডাকাটাই তারা স্থির করেছিল— উপত্যকাটার নামানুসারে। আমি নিয়ানডার্থালে এসেছি তার সাক্ষাৎকার নেবার জন্যে। আমাদের গোটা সাক্ষাৎকারটা জুড়ে আমি তাকে ডাকবো নিয়ানডার সাহেব এই সরলীকৃত নামে। আপনারা হয়তো জেনে থাকতে পারেন যে নিয়ানডার সাহেব স্বভাবগতভাবে খানিকটা জড়তাযুক্ত, এমনকি খানিকটা বদমেজাজি-ও। এর কারণ অংশত তার বৃদ্ধ বয়স। নিজের যে-আন্তর্জাতিক খ্যাতি সে পেয়ে আসছে তার দ্বারাও তিনি বিশেষভাবে প্রভাবিত বলে মনে হয় না। তা সত্ত্বেও আমাদের অনুষ্ঠানের জন্যে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি যথেষ্ট বিনয়ের সাথে সম্মত হয়েছেন। এই যে তিনি আসছেন তাঁর চারিত্রিক কিছুটা স্থূল ধরনের চলনভঙ্গি নিয়ে। তাঁর চোখের ভ্রƒর বিখ্যাত জ্যায়ের নিচ থেকে তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন আমাকে। এতে আমি প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে তাকে কিছুটা অবিবেচক ধরনের একটা প্রশ্ন করতে উৎসাহিত বোধ করি। করি একটা সন্দেহাতীত ঔৎসুক্য থেকে যেটা আমাদের অনেক শ্রোতাই বোধ করে থাকেন। নিয়ানডার সাহেব, আপনি কী এতটা বিখ্যাত হবেন আশা করেছিলেন? বলতে চাচ্ছি: যতদূর আমরা জানি, আপনি আপনার জীবনে উলে¬খ করবার মত কিছু করেন নি। তারপর হঠাৎ করে আপনি দেখতে পেলেন আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। আপনি এটাকে ব্যাখ্যা করবেন কীভাবে?

নিয়ানডার: সেটা আপনার কথা। আপনি কী ছিলেন সেখানে? আমি হ্যাঁ, আমি সেখানে ছিলাম। আপনি না।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঠিক আছে, আপনি ছিলেন সেখানে। আচ্ছা, আপনার কী মনে হয় সেটাই যথেষ্ট?

নিয়ানডার: ইতোমধ্যে আমি সেখানে ছিলাম।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: আমার ধারণা, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিয়ানডার সাহেবের অসাধারণত্ব যতটা না সেখানে থাকার মধ্যে, তার চেয়েও বেশি তার সেখানে ইতোমধ্যে থাকার মধ্যে। সেখানে থাকাটার মানে তাহলে আরও অন্য অনেক-অনেকের চেয়েও পূর্বে থাকা। পূর্ববর্তিতা একটা বৈশিষ্ট্য যেটাকে কেউ অস্বীকার করতে চাইবে না, নিয়ানডার সাহেব। যাহোক অধিক বলতে কি … এমনকি তারও পূর্বে, এ-পর্যন্ত গবেষণা থেকে যতটা জানা যায়, এবং যেমন আপনি নিজেও নিশ্চিত করলেন, তাই না নিয়ানডার সাহেব? আমরা নিদর্শন পাচ্ছি, অনেক নিদর্শন, এবং অনেক মহাদেশে, মানুষেরই, হ্যাঁ, ইতোমধ্যে মানুষ হওয়া মানুষের …

নিয়ানডার: আমার পিতা …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঠিক লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বেকার অতীত …

নিয়ানডার: আমার পিতামহ …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: কাজেই আপনার পূর্ববর্তিতাকে, নিয়ানডার সাহেব, আপনাকে অস্বীকার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়, যদিও মনে হতে পারে যে এটা একটা আপেক্ষিক পূর্ববর্তিতা: ধরা যাক যে আপনিই প্রথম …

নিয়ানডার: তবে, আপনার পূর্বে …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঠিক বলেছেন। কিন্তু বিষয় তা নয়। আমি বলতে চাচ্ছি আপনিই প্রথম, বিশ্বাস করা হলো যে যারা পরে এসেছে তাদেরও প্রথম আপনি।

নিয়ানডার: সেটা আপনি মনে করেন। তার আগে ছিল আমার পিতা …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: কেবল তিনিই নন, কিন্তু …

নিয়ানডার: আমার পিতামহ …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: আর তারও পূর্বে? এবারে মনোযোগ দিয়ে ভাবুন একটু, নিয়ানডার সাহেব, আপনার পিতামহেরও পিতামহ!

নিয়ানডার: না।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ‘না’ বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?

নিয়ানডার: ভালুক!

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ভালুক! এক টোটেম পূর্বপুরুষ! আপনারা যেমনটি শুনতে পেলেন, নিয়ানডার সাহেব মনে করেন যে তার পরিবারের বৃক্ষ শুরু হয়েছে একটা ভালুককে দিয়ে। সন্দেহ নেই, প্রাণির টোটেমকে তার গোত্রের, তার পরিবারের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল!

নিয়ানডার: আপনার পরিবারকে বোঝাচ্ছেন আপনি! প্রথমে ছিল ভালুক, তারপর ভালুক গিয়ে আমার দাদাকে খেয়ে ফেলল… তারপর এলাম আমি… তারপর আমি গেলাম এবং ভালুকটাকে হত্যা করলাম… তারপর আমি ভালুকটাকে খেয়ে ফেললাম।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেব, আপনি আমাদেরকে যে মূল্যবান তথ্য দিচ্ছেন সেটা আমাকে একটা মুহূর্ত আমাদের শ্রোতাকে ব্যাখ্যা করে বলবার সুযোগ দিন। প্রথমে এলো ভালুক! এ-কথাটা আপনি কতটা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করছেন, আদিম প্রকৃতির পূর্ববর্তিতাকে অসাধারণ স্বচ্ছতার সঙ্গে বর্ণনা করে, জীববিদ্যাগত পৃথিবীর বর্ণনা করে— যেসবকিছু পশ্চাৎপটটাকে দাঁড় করায়। ঠিক কি-না, নিয়ানডার সাহেব?, মানুষের আবির্ভাবের অংকুর-পশ্চাৎপট। আর যখন মানুষ পা রাখে, বলতে গেলে ইতিহাসের পাদপীঠে, তখনই প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সংগ্রামের মহা-অভিযানের সূচনা। যে-প্রকৃতি প্রথমে আমাদের প্রতিপক্ষ, তারপর তা কালক্রমে আমদের ইচ্ছেশক্তির বশীভূত হলো। যে-প্রক্রিয়াটা হাজার-হাজার বছর ব্যাপী বজায় থাকল সেটাকে নিয়ানডার সাহেব খুবই কুশলতার সঙ্গে ভালুক-শিকারের নাটকীয় দৃশ্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করলেন। এই মিথটা প্রায় আমাদের ইতিহাসের সূচনালগ্নেরই।

নিয়ানডার: যে ছিল সে আমিই ছিলাম। আপনি না। সেখানে ছিল ভালুক। আমি যেখানে যাই ভালুক সেখানে আসে। যেখানে আমি সেখানেই আমার চারপাশে ভালুক, আমি নাই তো ভালুক নাই।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঠিক। মনে হচ্ছে আমাদের নিয়ানডার সাহেবের মানসিক দিগন্ত পৃথিবীর সেই অংশটা ছাড়িয়ে আর বেশিদূর পৌঁছায় না, যে-অংশটার উপস্থিতি তার ইন্দ্রিয়ানুভূতির অব্যবহিত সীমানার মধ্যে। সেটাকে ছাড়িয়ে সময় এবং মহাশূন্যের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাদির কোন প্রতিনিধিত্ব সেখানে নেই। তিনি বলছেন, ভালুকটা সেখানে যেখানে আমি ভালুকটাকে দেখতে পাই, আমি না দেখতে পেলে ভালুকটা নেই। সাক্ষাৎকারের বাকি অংশ চলাকালে কেউ চাইলে অবশ্যই এই সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখে সেই সীমানাকে অতিক্রম করে যায় এমন কোন প্রশ্ন করবেন না নিশ্চয়ই, আমি ঠিক বললাম তো? বিবর্তনচক্রের মধ্যকার একটা অতি প্রাথমিক স্তরের মনন-সক্ষমতা এটা…

নিয়ানডার: সেটা হলেন আপনি। কী বলছেন আপনি? আপনি কী জানেন? খাদ্য, ঠিক? একই খাদ্যের পেছনে আমি ছুটি, ভালুক ছোটে। দ্রুত দৌড়াতে সক্ষম প্রাণিদের পাকড়াও করবার ক্ষেত্রে আমি-ই সেরা; বড়-বড় প্রাণিদের পাকড়াও করবার ক্ষেত্রে ভালুক সেরা। ঠিক? আর তারপর হয় ভালুক সেগুলো ছিনিয়ে নেয় আমার কাছ থেকে অথবা আমি সেগুলোকে ছিনিয়ে নেই ভালুকের কাছ থেকে। ঠিক?

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: একদম পরিষ্কার, আমি একমত, নিয়ানডার সাহেব। আর চেষ্টার প্রয়োজন নেই। এটা একটা ব্যাপার, আমরা কীভাবে বলতে পারি, দু’টো পারস্পরিক আলাদা ধরনের প্রজাতির মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। একটা হচ্ছে ‘ হোমো’-জাতির প্রজাতি এবং আরেকটা ‘অরসুস’-জাতির প্রজাতি। অথবা, বলা ভাল: যেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা জীববিদ্যাগত ভারসাম্য, যদি আপনার পছন্দ হয়। টিঁকে থাকবার লড়াইয়ের নিষ্ঠুর হিং¯্রতার মাঝখানে একটা উহ্য বোঝাপড়ার ব্যাপার দাঁড়াল …

নিয়ানডার: আর তারপর, হয় ভালুকটা আামকে হত্যা করে, অথবা আমি হত্যা করি, ভালুকটাকে …

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: এই যে পাওয়া গেল, টিঁকে থাকবার লড়াইটা আবার ঝলকে উঠলো। সবচেয়ে ভালভাবে যে খাপ-খাওয়াতে পেরেছিল সেই জেতে, সবচেয়ে শক্তিশালী যে ঠিক সে নয়। আর,  নিয়ানডার সাহেব, তাঁর দু’টো অপেক্ষাকৃত খাটো পা সত্ত্বেও তিনি যথেষ্ট পেশল। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, আর নিয়ানডার সাহেবের প্রায় চ্যাপ্টা কপালের অবতল বাঁকা জায়গাটা সত্ত্বেও তিনি বিস্ময়কর রকমের মানসিক ধীশক্তির পরিচয় দেন… নিয়ানডার সাহেব, এখানেই আমি চাইছিলাম আপনাকে প্রশ্নটা করবার জন্যে। এমন কোন মুহূর্ত কী আপনার এসেছিল যখন আপনার মনে শঙ্কা জেগেছিল যে মানবজাতি পেছনে পড়ে যাচ্ছে? নিয়ানডার সাহেব, আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন মানে মানবজাতি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে হারিয়ে যেতে পারে?

নিয়ানডার: আমার পিতামহ… আমার পিতামহ মাটির ওপরে…

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেব ফিরে যাচ্ছেন সেই অধ্যায়ে যেটির মধ্যে অবশ্যই বিদ্যমান থেকে আসছিল, ধরা যাক, তাঁর অতীতের একটা ভীতিকর অভিজ্ঞতা… কিংবা বলা ভাল, আমাদের অতীতে।

নিয়ানডার: ভালুকটা মাটির ওপর… আমি ভালুকটাকে খেলাম… আমি, আপনি না।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: সঠিকভাবে বললে, আমি আরেকটা জিনিস জানতে চেয়েছিলাম। এমন মুহূর্ত কী আপনার এসেছিল যখন আপনার স্পষ্ট ধারণা হয় যে জিততে যাচ্ছে মানবজাতি-ই। এই নিশ্চয়তা যে এটা হতে যাচ্ছে ভালুক-ই যে মরে যাবে, আমরা না, কেননা, কোনকিছুই আমাদের অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারবে না। নিয়ানডার সাহেব, আপনি, একদিন আমাদের কৃতজ্ঞতা  লাভ করবেন, অর্থাৎ, এক মানবতার কৃতজ্ঞতা যে-মানবতা তার বিবর্তনের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছেছে। এ-কৃতজ্ঞতা এখন আমি এই মাইক্রোফোন মারফত আপনার নিকটে প্রকাশ করছি…

নিয়ানডার: উম্ম্… আমি, যদি আমাকে চলতে হয় তো আমি চলি… যদি আমাকে থামতে হয় আমি থামি… যদি আমাকে ভালুকটাকে খেতে হয় আমি থামি এবং ভালুকটাকে খাই… খাওয়া হলে পরে আমি চলতে থাকি, ভালুকটা থেমে স্থির হয়ে গেল, মাটিতে এখানে একটা হাড়, মাটিতে ওখানে একটা হাড়… আমার পেছনে আসে অন্যরা। তারা আসে, আসে যেখানে ভালুকটা আছে সেখানে, স্থির হয়ে থেমে পড়েছিল যেখানে, অন্যরা থেমে পড়ে, তারা ভালুকটাকে খায়… আমার ছেলে একটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে, আমার আরেকটা ছেলে আরেকটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে, আমার আরও একটা ছেলে আরও একটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে…

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেব এখন আমাদের জন্যে একটি শিকারি গোত্রের মানুষদের জীবনের এক চূড়ান্ত পর্যায়ের  মুহূর্তগুলোকে জীবন্ত করে তুলছেন। এক সফল শিকারের শেষে ধর্মাচারের ভোজসভা…

নিয়ানডার: আমার শ্যালক আরেকটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে, আমার স্ত্রী আরেকটা হাড্ডি কামড়াতে থাকে…

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেবের নিজের মুখের কথাই আপনারা যেমনটি শুনে থাকবেন, তাদের ধর্মাচারমূলক ভোজনে তাদেরকে মেয়েরা সহায়তা যোগাতে পারতো সবার শেষে। এ থেকে সমাজাভ্যন্তরের সামাজিক মর্যাদার একটা হদিস পাওয়া যাচ্ছে যেখানে মেয়েরা ছিল অস্বীকৃত…

নিয়ানডার: আপনি বোঝাতে চাইছেন আপনাদের মেয়েরা! প্রথমে আমি আমার স্ত্রীর নিকটে ভালুকটা নিয়ে আসি, আমার স্ত্রী আগুন জ্বালিয়ে ভালুকটাকে ঝলসায়। তারপর আমি চলে যাই কিছু তুলসি পাতা ছিঁড়ে আনবার জন্যে। তারপর তুলসি পাতা নিয়ে ফিরে এসে আমার স্ত্রীকে বলি: আচ্ছা এখন বলো, ভালুকের উরুর টুকরোটা কোথায়? আমার স্ত্রী বলে: আমি খেয়ে ফেলেছি, ঠিক আছে? তখনও পর্যন্ত সেটা কাঁচা রয়ে গেছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্যে, ঠিক আছে?

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: নিয়ানডার সাহেবের বর্ণনা থেকে শিকারি এবং খাদ্য-সংগ্রহকারী সম্প্রদায়ের মানুষদের সময়কার যে-ছবিটা পাওয়া যাচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে তখন নারী ও পুরুষের মধ্যে একটা কঠিন শ্রমবিভাজন ইতোমধ্যে প্রচলিত ছিল…

নিয়ানডার: তারপর আমি চলে যাই কিছু সুগন্ধি মসলার পাতা নিয়ে আসবার জন্যে। আমি ফিরে আসি সুগন্ধি মসলার পাতা নিয়ে এবং আমি জিজ্ঞ্যেস করি: আচ্ছা এখন, ভালুকের অন্য উরুর টুকরোটা কোথায়? আমার স্ত্রী বলে, আমি খেয়ে ফেলেছি, ঠিক আছে? পরীক্ষা করে দেখবার জন্যে যে সেটা এরিমধ্যে পোড়া পোড়া হয়েছে কিনা, ঠিক আছে? আর আমি বলি: আচ্ছা এখন, আপনি জানেন, কে যাচ্ছে ওরেগানো’র পাতা ছিঁড়ে আনবার জন্যে, জানেন না আপনি? আমি আপনাকে বলছি, আপনি যাচ্ছেন, আপনি যাচ্ছেন ওরেগানো’র পাতা আনবার জন্যে, হ্যাঁ, আপনি যাচ্ছেন।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: এই মনোরম ছোট্ট পরিবারটির বর্ণিল চিত্র থেকে আমরা নিয়ানডারথাল মানবের জীবন সম্পর্কিত অনেক নির্জলা তথ্য জড়ো করতে পারি। প্রথমত, তার আগুনের জ্ঞান এবং রান্নার ক্ষেত্রে সেটার ব্যবহার। দ্বিতীয়ত, সুগন্ধিযুক্ত ওষধি লতার পাতা সংগ্রহ করা এবং সেগুলোর ভোজন-প্রয়োগ। তৃতীয়ত, বড় আকারের ও দেহের বিভিন্ন অংশ আলাদা করে নিয়ে মাংস খাওয়া। এর জন্যে প্রয়োজন ছিল মাংস কাটবার সঠিক সরঞ্জামাদির ব্যবহার। কাজেই ফলস্বরূপ, চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালবার জন্যে একটা অত্যন্ত উন্নত পর্যায়ের সক্ষমতার প্রমাণ মিলে যায়। কিন্তু এ সম্পর্কে আমাদের অতিথির নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলবার আছে কিনা সেটা শোনা যাক। আমি প্রশ্নটাকে এমনভাবে সূত্রবদ্ধ করবো যাতে সেটা তার উত্তরটাকে প্রভাবিত না করে। নিয়ানডার সাহেব, আপনারা আপনাদের পাথরগুলো দিয়ে, হ্যাঁ, ঐসব চমৎকার গোলাকার পাথর আপনি এত দেখতে পাচ্ছেন সেখানে, আপনারা কী কখনও চেষ্টা করে দেখেন নি, আমি জানি না, সেগুলো নিয়ে খেলাধূলা করতে, সেগুলো আসলেই শক্ত কিনা সেটা পরখ করে দেখবার জন্যে সেগুলো দিয়ে একজন আরেকজনের সঙ্গে খানিকটা লড়ালড়ি?

নিয়ানডার: পাথর সম্পর্কে আপনি কী বলছেন? আপনি কী জানেন না আপনি পাথর দিয়ে কী করেন! ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্! পাথর দিয়ে আমি সেটাই করি: ঝন্ঝন্! পাথরটা আছে আপনার, ঠিক? আপনি সেটা একটা বড় পাথরের ওপর রাখেন, আপনি ঐ আরেকটা পাথর পাচ্ছেন। আপনি সেটার ওপর ঘষলেন, ধার হলো, ঝন্ঝন্। আপনি জানেন কোন জায়গাটায় আঘাত করতে হয় ধারালো? ওখানটায়! ওখানটায়ই আপনি আঘাত করেন: ঝন্ঝন্। একটা ধারালো আঘাত! করতে থাকুন! ওহো! তাতে করে আপনার আঙুলটাতে চাপ লাগলো! তারপর আপনি আঙুলটা একটু মুখে চুষে নিলেন। এরপর আপনি ওপর-নিচ করে-করে লাফাতে থাকলেন। তারপর অন্য পাথরটা আবার হাতে নিলেন আপনি। পাথরটাকে ফের বড় পাথরটার ওপর রাখলেন, ঝন্ঝন্। দেখেন, পাথরটা দুই টুকরো হয়ে গেল, একটা ভারী টুকরো আর একটা পাতলা টুকরো, একটা এভাবে বাঁকানো, আরেকটা ওভাবে বাঁকানো, যেটা ধরতে সহজ সেটা আপনি হাতে তুলে নিলেন। এভাবে, এরকম করে, আপনি আরেকটা পাথর তুলে নিলেন অন্য হাতে, ঐভাবে, ওরকম করে, আর আপনি আঘাত করলেন: ঝন্ঝন্! বুঝতে পারছেন আপনি সেখানে ঝন্ঝন্ করছেন, ঠিক সেখানে, করে যাচ্ছেন! ওহো! আপনি আপনার হাতের জায়গাটাতে ব্যাথা পেয়েছেন! তারপর আপনি আঙুলটা চুষলেন, এক পায়ের ওপর খাড়া হয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন, তারপর আপনি পাথরের টুকরোটা আবার হাতে তুলে নিলেন, অন্য টুকরোটা অন্য হাতে, ঝন্ঝন্! একটা ছোট টুকরো ছিটকে এলো, ওহো! আপনার চোখের মধ্যে! আপনি আপনার হাত দিয়ে চোখ ঘষতে থাকেন, এক লাত্থি মারেন পাথরটাকে, ভারী পাথরটাকে আবার হাতে তুলে নেন, তার সঙ্গে ছোট পাথরটাকেও, ঝন্ঝন্! আপনার পাথরটা আবার টুকরো হয়ে পড়লো ঠিক নিকটেই, ঝন্ঝন্! আবারও, ঝন্ঝন! আবার আরেকটা, এবং আপনি দেখতে পেলেন যে, যেখানটাতে পাথর টুকরো হয়ে গেছে সেখানটাতে সৃষ্টি হয়েছে একটা খাঁজ— যেটা খুব সুন্দর আর সুষম, তারপর আরেকটা খাঁজ, তারপর আরও একটা খাঁজ, সেটার মত একটার পর একটা চারপাশে, আর তারপর অন্য পাশটাতেও, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন! দেখুন সেটার পারপাশটা কি সুন্দরভাবে রূপ নিচ্ছে, সূক্ষ¥ থেকে সূক্ষ¥তর, ধারালো থেকে ধারালোতর…

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: আমাদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ…

নিয়ানডার: …তারপর আপনি এটাকে মৃদু আঘাত করতে থাকেন, এভাবে, ঝন্ঝন! ঝন্ঝন্! এবং আপনি ছোট্ট-ছোট্ট কণার টুকরো বের করলেন, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্! আপনি দেখুন এটা থেকে কিভাবে অনেক-অনেক ছোট্ট-ছোট্ট দাঁত বেরিয়ে আসে, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্!

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: হ্যাঁ, আমরা এটা বেশ ভালভাবে বুঝতে পেরেছি। আমাদের শ্রোতাদের পক্ষ থেকে আমাকে ধন্যবাদ দিতে…

নিয়ানডার: বুঝতে পেরেছেন কী? এখন আপনি এটাকে আরও একবার আঘাত করতে পারেন এখানে: ঝন্ঝন্! তারপর আবার পরবর্তীতে এটাকে আবার আঘাত করতে পারেন অন্যপাশটাতে, ঝন্ঝন্!

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: ঝন্ঝন্, ঠিক বলেছেন, আসুন তাহলে আমরা অন্য…

নিয়ানডার: …সেভাবে আপনি এটাকে সঠিকভাবে হাতের মধ্যে ধরে রাখতে পারেন, এই পাথর, এখন এটা কাজ করছে উভয় পাশ দিয়ে, তারপর শুরু হলো আসল কাজ, কেননা আপনি আরেকটা পাথর নিলেন আর সেটা রাখলেন বড় পাথরটার ওপর, ঝন্ঝন্!

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: এভাবে চলতেই থাকলো, একেবারে পরিষ্কার, ব্যাপারটা হলো আপনি কীভাবে আরম্ভ করছেন। চলুন এগিয়ে যাওয়া যাক…

নিয়ানডার: আরে না, একবার যখন শুরু করেছি, আমি থামতে চাই না, মাটিতে সবসময়েই পাথর রয়েছে, যেটাকে প্রথমটা থেকে আরও ভাল মনে হয়, তাই আমি প্রথম পাথরটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিই আর এই অন্যটা হাতে তুলে নিই, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্! আপনার আঘাতের ফলে অনেক-অনেক উড়ন্ত টুকরো হচ্ছে। অনেকগুলো আবার এমনকি আগের চেয়ে ভাল কাজ দিচ্ছে, কাজেই আমি সে-কাজটা করেই চলেছি, ঝন্ঝন্! ঝন্ঝন্! এবং এটা দেখা যাচ্ছে যে আমি ঠিক যেমনটি চাই সবগুলো পাথর ঠিক তেমনটাই হয়ে যেতে পারে। আর যত অধিক খাঁজ আমি সৃষ্টি করি তত অধিক আরও খাঁজ আমি সৃষ্টি করতে পারি, যেখানে আমি একটা খাঁজ সৃষ্টি করেছিলাম সেখানে আমি দু’টো খাঁজ সৃষ্টি করি। তারপর এই দু’টোর প্রত্যেকটাতে আমি আরও দু’টো খাঁজের সৃষ্টি করি, আর শেষে একটা বিপুল পরিমাণ পাথর ভেঙে টুকরো-টুকরোতে পরিণত হয়। আমি এই টুকরো-টুকরো পাথরগুলোর স্তূপের ওপর হাত দিয়ে আলতো চাপড় মারতে থাকি যে-স্তূপটা এই পাশটাতে ক্রমেই বেড়ে উঠছে, কিন্তু অন্য পাশে আমার হাতে রয়ে গেছে এক বিশাল পাথরের পাহাড় যেগুলো এখনও টুকরো-টুকরো করা বাকি।

সাক্ষাৎকার-গ্রহণকারী: এখন নিয়ারডার সাহেব আমাদের জন্যে যে-হতাশাকর, একঘেঁয়েমিপূর্ণ কাজের বিবরণ তুলে ধরলেন…

নিয়ানডার: একঘেঁয়ে! একঘেঁয়ে হলেন আপনি! আপনি কী জানেন পাথরের গায়ে কীভাবে খাঁজ সৃষ্টি করতে হয়, আপনি, একই রকম খাঁজ, আপনি কী জানেন একঘেঁয়ে করে কীভাবে খাঁজগুলোকে সৃষ্টি করা যায়? না, কাজেই কী বলছেন আপনি? আমি জানি এসব কীভাবে করতে হয়, ঠিক! আর যখন থেকে আমি শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই আমি দেখলাম এ-কাজের জন্যে আমার আঙুল  আছে, আপনি আমার এই বুড়ো আঙুলটা দেখতে পান? এই আঙুল যেটাকে আমি এখানে রাখি এবং অন্য আঙুলগুলো আমি ওখানে রাখি আর মাঝখানে থাকে একটা পাথর, আমার হাতে, শক্ত করে ধরা যাতে গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। যখন থেকে এটা আমি দেখলাম, আমি পাথরটাকে আমার হাতের মধ্যে ধরে রাখছি আর সেটাকে আঘাত করছি, এরকম করে, কিংবা ঐরকম করে, বলা ভাল, তারপর থেকে যা-যা আমি পাথর দিয়ে করতে পারি সেসব আমি সবকিছু দিয়েই করতে পারি। শব্দ দিয়ে, যে-শব্দ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, আমি এরকম করে শব্দ করতে পারি, এ এ এ, পি পি পি, নি নি নি, কাজেই শব্দ তৈরির কাজটা আমি কখনও  বন্ধ করি না। আমি কথা বলতে শুরু করি, বলে যেতে থাকি। আমি পাথরের কাজ শুরু করি যে-পাথর আমি কাজের জন্যে ব্যবহার করতে পারি। এই ফাঁকে এ-চিন্তা আমার মনে উঁকি দেয়, চিন্তা করলে আমি সম্ভাব্য সব বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে পারি। আমার মনে ভাবনা জাগে, নানা জিনিস সম্পর্কে অন্যরা যাতে বুঝতে পারে সেরকম কিছু আমি করতে চাই। যেমন ধরা যাক, আমার মুখে লাল রঙের ডোরাকাটা দাগ এঁকে দিলাম, বিশেষ কোন কারণ ছাড়াই এমনি, শুধু অন্যদের জানাবার জন্যে যে আমি আমার মুখে খানিকটা লাল রঙের ডোরাকাটা দাগ এঁকেছি। আমি ভাবি, আমার স্ত্রীকে আমি শুকরের দাঁতের একটা গলার হার বানিয়ে দেবো, বিশেষ কোন কারণ ছাড়াই, শুধু লোকেদের জানানো যে আমার স্ত্রীর একটা গলার হার আছে শুকরের দাঁতের এবং আপনার স্ত্রীর সেটা নেই। আমি জানি না আপনি কী ভাবেন আপনার কী আছে যা আমার নেই। আমি যা চেয়েছি তার সবই আমি পেয়েছি। সবকিছুই যেগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে পরবর্তীতে। ইতোমধ্যে আমি করে ফেলেছি। যা-কিছু আমি বলেছিলাম, ভেবেছিলাম, বুঝিয়েছিলাম, সবই ইতোমধ্যে হয়ে গেছে, যেগুলো সম্পর্কে আমি বলেছিলাম, ভেবেছিলাম এবং বুঝিয়েছিলাম। জটিলতার সমস্ত জটিলতা ইতোমধ্যেই ছিল। আমাকে শুধুমাত্র আমার এই বুড়ো আঙুলটা দিয়ে আর এই ফাঁকা মুষ্টিটা দিয়ে এই পাথরটাকে তুলে নিতে হয়। আর অন্য চারটে আঙুল পাথরটার ওপর এঁটে বসে এবং সবকিছুই সেখানে থাকে ইতোমধ্যে। অন্যরা যা পরে পায় তার সবই আমার এরিমধ্যে থাকে। সবকিছু যা অন্যেরা পরে জানতো এবং করতে পারতো তার সব আমার ইতোমধ্যেই জানা ছিল না কেননা সেটা ছিল আমারই কিন্তু এটা ‘ছিল’, কিন্তু এটা ছিল ইতোমধ্যেই, কিন্তু এটা ছিল সেখানে, অপর পক্ষে পরে অন্যরা তা পেয়েছিল এবং জেনেছিল এবং সেটা তারা করতে পারত কম থেকে আরও কম, সবসময়েই যা থাকা সম্ভব ছিল তার চেয়ে খানিকটা কম, আগে যা ছিল তার চেয়ে, যা আগে আমার ছিল, যা আগে আমি ছিলাম, আমি আসলেই ছিলাম তখন সবকিছুর মধ্যে এবং সবকিছুর জন্যে, আপনাদের মতন না, আর সবকিছুর মধ্যেই এবং সবকিছুর জন্যেই ছিল সবকিছু। এমনকি সমস্তকিছু ভুল যা পরবর্তীতে এলো তা-ও ইতোমধ্যেই ছিল সেই ঝন্ঝন্ ঝন্ঝন্ ঝন্ঝন্ ঝন্ঝন্-এর মধ্যে। কাজেই আপনি কী বলতে চান, আপনি কী ভাবেন আপনি কী, আপনি কী বোঝাতে চান এটা ভেবে যে আপনি এখানে আছেন যখন আপনি এখানে নেই, অথবা আপনি যদি এখানে থাকেনও সেটা কেবল আমি আসলেই ছিলাম বলে। এবং ভালুকটা ছিল বলে। পাথরগুলো, গলার হারগুলো এবং আঙুলের ঘাতগুলো এবং যা-কিছু আপনি হতে চান এবং তা হলো যখন সেটা সেখানে থাকে, থাকে।

******************************************************

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা-১৭
সুবিনয় শাফাত
প্রাচীন নালন্দা বা তক্ষশীলাকে সামনে রেখে আমরা একথা বলতে পারি যে, শিক্ষালয়কে আশ্রয় করে সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্য কিংবা দর্শন ও সংস্কৃতির চর্চা তেমন হয় নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সাধারণত প্রথানুগ মননশীলতার চর্চা করা হয়। পদ্ধতিগত নানা উপায়ে শাণিত করা হয় শিক্ষার্থীদের মেধাকে। ঠিক এমন আইনানুগ বা বিদ্যায়তনের বাইরে জন্ম নেন শিল্পী-সাহিত্যিক বা লেখকগণ। বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে এখানে প্রায় অর্ধ শতাধিক পত্র-পত্রিকার জন্ম ওই প্রাতিষ্ঠানিকতাকে ঊর্ধ্বে রেখেই। একালে সেই পত্র-পত্রিকাকে কেন্দ্র করে হাসান আজিজুল হক, মহাদেব সাহা, জুলফিকার মতিন, সেলিনা হোসেন, সনৎকুমার সাহা, আবুবকর সিদ্দিক, নাজিম মাহমুদ, মোস্তাক দাউদী, মোহাম্মদ কামাল, তারিক-উল ইসলাম, আযাদ কালাম, আমিনুর রহমান সুলতান তৈরি হয়েছেন। এঁরা কেউ বিশ্ববিদ্যলয় অঙ্গণে হলেও— তার বাইরে। তবে এঁরা ঠিক প্রথানুগ তকমা নেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে থেকে একপ্রকার সৃজনশীলতার চর্চা করেছেন। এঁদের সেই অবলম্বনের তীর— স্পর্ধা বা শব্দায়নের মতো পত্রিকা। এগুলো বেশিদিন টেকেনি কিন্তু ‘দাগ’ রেখে গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকেই বিভিন্ন সংগঠন ও বিভাগ থেকে ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক উদ্যোগে প্রচুর পত্র-পত্রিকা বা পুস্তিকা-বুকলেট বেরিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বিশেষ স্মর্তব্য, রাকসুর উদ্যোগে পত্রিকা প্রকাশ। রাকসু ‘হল-বার্ষিকী’ও বের করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীলতার বিকাশে রাকসুর ভূমিকা অনবদ্য। হাসান আজিজুল হক সম্পাদিত ‘প্রাকৃত’ ছেপে বেরোয় ১৯৯১ সালে। এর দুটি সংখ্যা বের হয়। দুটোই সমৃদ্ধ ছিল। প্রায় একই সময়ে দর্শন বিভাগের শিক্ষক এস এম আবুবকরের নেতৃত্বে যুক্তিবাদী সমিতি গঠিত হয়। তাঁরা ফোল্ডার করে একাধিক প্রকাশনা করেন। দীর্ঘায়ু আবৃত্তি সংগঠন স্বনন বরাবরই তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বা যুগপূর্তি-দশকপূর্তিকে কেন্দ্র করে অথবা যশস্বী কারো স্মরণোৎসবকে আমলে নিয়ে পুস্তিকা বা বুকলেট বের করে। স্বনন বরাবরই সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দকে ধারণ করেছে। এবং প্রকাশনায় তাঁদের শিরোনামও নির্বাচন হয়। এসব পুস্তিকার আকর্ষক ব্যক্তি— সনৎকুমার সাহা, আলী আনোয়ার, হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিন প্রমুখের মননশীল গদ্য। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নাট্যদলগুলোও নানা সময়ে পুস্তিকা বের করেছে। সবগুলোর নাম উল্লেখ করা কঠিন। তবুও সাক্ষ্যাৎ পশ্চাতের কিছু পত্রিকার নমুনা নিয়ে আমাদের উদ্দিষ্ট এ পর্ব :

‘কাহ্নপা সাহিত্যচক্রে’র জন্ম ১৯৯৭ সালে। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক অনীক মাহমুদের নির্দেশনায় এই বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র সোলায়মান সুমন ও শেখ সফিকুল ইসলামের প্রচেষ্টায় কাহ্নপা সাহিত্যচক্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে। সংগঠনটির বার্ষিক মুখপত্র রুদ্র বেরিয়েছে ছয়বার। অর্থাৎ ছয়টি সংখ্যা হয়েছে। ধ্রুব নামক সাহিত্যপত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। অনিয়মিতভাবে বের হয়েছে এর ৯টি সংখ্যা। ধ্রুবর সম্পাদকম-লীর সভাপতি অধ্যাপক অমৃতলাল বালা। ধ্রুবর সর্বশেষ সংখ্যা ২০১৩ তে বের হয়। বহতা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা পাঠচক্রের ছোটকাগজ। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। মেহরাজ মতিন সনির সম্পাদনায় ষান্মাসিক ৩টি সংখ্যার পরে— এখন বছরে একটি করে সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে— অনিয়মিতভাবে। বহতায় পাঠচক্রের লেখক ছাড়াও অন্য লেখকের লেখাও প্রকাশিত হয়েছে। সর্বশেষ দশম সংস্করণ ২৬ মার্চ ২০১৬র সম্পাদক নাহিদুল ইসলাম। নিরিখ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম একটি শিল্প ও সমাজ বিষয়ক সাময়িকী। ২০০৭ সালে সফিকুন্নবী সামাদী সম্পাদক ও অনুপম হাসানকে নির্বাহী সম্পাদক করে নিরিখের যাত্রা শুরু। এ সাময়িকীর নতুন-পুরাতন লেখকদের নিয়ে অনিয়মিতভাবে দশটি সংখ্যা বেরিয়েছে। তবে প্রথম সংখ্যার পর থেকে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন মোস্তফা তারিকুল আহসান। নিরিখের সর্বশেষ সংখ্যা দশম বর্ষ প্রথম সংখ্যা বেরয় ফেব্রুয়ারী ২০১৭ তে। চিহ্নপরিপূরক ছোটকাগজ হিসেবে ¯œানর যাত্রা ২০০৯ সালে। নিয়মিতভাবে এর ৪২টি সংখ্যা বেরিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছে।

ম্যাজিক লণ্ঠন চলচ্চিত্র, স্বপ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে আবির্ভুত হয় ২০১১ সালের জুলাইতে। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র চলচ্চিত্র বিষয়ক নিয়মিত কাগজ। কাজী মামুন হায়দারের সম্পাদনায় ৭ বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে ষান্মাসিক ম্যাজিক লণ্ঠন। এখন পর্যন্ত এর ১৩টি সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে। পত্রিকাটির বিশেষ দিক— চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা, চলচ্চিত্রের বই আলোচনা, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, নিউমিডিয়াসহ থাকে বাংলা ও বিদেশি মিডিয়া জগতের বিখ্যাত কোন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার। এবং প্রতি বছর ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা’র আয়োজন করে। ইতিমধ্যে ‘কথামালা’ বক্তৃতা করেছেন : রোকেয়া প্রাচী, কাজী হায়াৎ, জয়ন্ত চট্টপাধ্যায়ের মতো খ্যাতিমান অভিনেতা ও পরিচালকবৃন্দ। ‘কথামালা’র কথাগুলো ম্যাজিক লণ্ঠন-এ মুদ্রিত হয়। বলতে দ্বিধা নেই, এটি আকর্ষণীয় পত্রিকা।

ঘামর সম্পাদক সমজকর্ম বিভাগের শিক্ষক আরেফিন মাতিন। এর মোট তিনটি সংখ্যা। এর মধ্যে প্রথম দুটি আরেফিন মাতিন ছাত্রাবস্থায় আশির দশকে বের করেন। পরবর্তীতে ৩য় সংখ্যাটি গল্প সংখ্যারূপে প্রকাশ পায়।

আশির দশকের শব্দায়নর ধারায় ২০১২ সালে গণজাগরণ মঞ্চকে সামনে রেখে যোবায়ের শাওনের সম্পাদনায় বের হয় অতঃপর শব্দায়ন। গণজাগরণ-মঞ্চ আর যুদ্ধাপরাধী নিয়ে অনুভূতিমূলক কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত হয় বাঁশপাতা রঙের মলাটের কাগজটি। এটি মূলত কবিতার পত্রিকা। নবপর্যায়ে এর ৪টি সংখ্যা বের হয়েছে। সর্বশেষ মার্চ ২০১৭ তে প্রেমসংখ্যা বের হয়। হাসান আশরাফুল সজলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় শখের বসে। ২০১৩ সাল থেকে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখের দিন নবআনন্দে পাঠকের হাতে পৌঁছায় পত্রিকাটি। সম্পূর্ণ নতুন লিখিয়েদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর স্যাটায়ারধর্মী গল্প-কবিতা প্রকাশিত হয় এখানে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমাজ, রাষ্ট্র, প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতা শখের বসের মূল উপজীব্য। আনাড়ি দেয়াল লেখকের লেখনী সম্বলিত প্রচ্ছদ থেকে সর্বশেষ ৫ম সংখ্যার প্রচ্ছদ ‘ফুল ব্লাক’।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ছাড়াও চিহ্নপ্রাণনায় বের হয় চারুকলা বিষয়ক ছোটকাগজ একাঘর সংখ্যা। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে বের করে কৃষ্ণপ্রহর। ২০১১ সালে বাংলা বিভাগের কিছু সংখ্যক উদ্যমী ছাত্র প্রকাশ করে বিন্দু নামের একটি ছোটকাগজ। এর তিনটি সংখ্যা বেরিয়েছে। মাহবুব অনিন্দ্যর সম্পাদনায় বেরিয়েছে আরশীনগর। উত্তরণ নামে একটি কাগজ ২০১৭ সালের মার্চে প্রকাশিত হয়। এমন অনেক কাগজসৃজনের ধারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও চলমান। সমাজ-সাহিত্যের এই অবিচ্ছেদ্য সহায়ক নানান ধরনের কাগজগুলো চিরকাল বেঁচে থাকুক— এ কামনা সৃজনশীল সবার।

******************************************************

                                               গ্রন্থ ও পত্রিকা আলোচনা

পূর্বজন্মের কবিতা ॥ সিরাজুদ্দৌলা বাহার
সিরাজুদ্দৌলা বাহার প্রণীত পূর্বজন্মের কবিতা হাতে এসেছে, পূর্ণজৌলুস নিয়ে। এই বইমেলায় (২০১৭) বেরিয়েছে। শুভ্র-সফেদ ১০০গ্রাম অফসেটে চার ফর্মায় মুদ্রিত পরিচ্ছন্ন বাঁধাইয়ের কবিতাগ্রন্থ এটি। মৌহুর্তিক সৌন্দর্যের ঝলকে নাসারন্ধ্রে এসে পলকা বাতাসে ছুঁয়ে যায় এর নরোম গন্ধ। আগে তাঁর পাঁচটি কবিতার বই বেরিয়েছে, এটি ষষ্ঠ। নাম দিয়েছেন পূর্বজন্মের কবিতা। ক্রমাগত লিখে চলা এ কবিতা-মানব আমার কাছে প্রকাশ্য আসেন যমুনায় ভোর আসে কবিতার ভেতর দিয়ে। ওই গ্রন্থে নদীর-সঙ্গীতায়ন চোখে পড়ে। ধরে নিই ওর সিকস্তি-পয়োস্তি সংবাদ। তবে ওসব জীবন-সাড়ার উপকূল বিচ্ছিন্ন নয়। জীবনের বৈচিত্র্য মন্থন আর উপভোগের পাড়ভাঙ্গা তরঙ্গের কঠিন কোমল ও তীব্র আশ্লেষে জড়ানো। তা নিয়েই বাহারকে দেখি, তার গলা-কান-চোখের স্বর শুনি, তাঁর নাসারন্ধ্রের সৌগন্ধে আপ্লুত হই। ছিমছাম, সরল প্রক্ষেপণে গড়া তার অবয়ব, পূর্ণ কবিতাপ্রবণ, পূণ্য-মানুষ। কবিতা তো অলৌকিক আখ্যান। সংস্কৃতির পাড়ে বাঁধা। জীবনের প্রতিটি অবলম্বনে তা সিক্ত। সে সিক্ততা কোথায় রয়? কীভাবে? ম্যাথু আর্নল্ড ও টি.এস.এলিয়ট খুব ঘনিষ্ঠ করে কবিতার মাত্রা বুনেছেন। এর আগে জনসন, কোলরিজ, কীটস, টেনিসন, রবীন্দ্রনাথ কবিতা নিয়ে বহু কথা বলেছেন। বিশেষ করে কবি-সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ কতোভাবে তার অতীন্দ্রিয়-সত্তাকে বুনে দিয়েছেন শব্দের— ছন্দের ভেতরে। ধ্বনির আহ্বানে তপ্ত তার প্রকৃতি। উপনিষদ, বাইবেল, ক্যথিড্রাল, মন্দির-মসজিদ কিংবা বারামখানাজুড়ে কবিতার প্রাণময় উচ্ছ্বাস প্রণোদিত হয় সর্বব্যাপ্ত করে। এলিয়ট কবিতায় ‘বহিরাশ্রয়ী সংশ্লেষ’ বা ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’-র কথা বলেছেন :Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the exprision of personality, but an escape from personality. But, ofcourse only those who have personality and emotions know what it means want to escape from these thingsএতে কবিতা মন্ময় আবেগের বিপরীতে তন্ময় ও নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব প্রেরণাটি প্রশ্রয়, সেজন্য সে শরীরে বহন করে অনেক রহস্যময় প্রতীকতা, পুরাণ ও মৌহূর্তিক ইমেজ। তাঁকে গুরু মানা চলে। আবার কীটসও যে ‘ডিফেন্স অব পোয়েট্রি’র কথা বলেন তাও কবিতাসূত্রে অলঙ্ঘনীয়। আর একালের জীবনানন্দ দাশ মহাকালিক সৌরবিশ্বের বিচ্ছুরণের কণিকার ভেতরে কবিতাকে বেঁধে ফেলার কথা বলেন। সিরাজুদ্দৌলা বাহার কোনো গদ্যে বা ইশতেহারে কবিতার আশ্লেষ করেননি। ঠিক অনুভবের গভীরতায়, অভিজ্ঞতার নান্দনিকতার প্রলুব্ধতায় যে প্রণোদনা— তাঁকে তাই ঠিক ঠিক কাব্য করে তুলেছেন— বস্তুত ইঙ্গিতময়তা থেকে, প্রণতি জানিয়ে, দিকসঞ্চারী অভিবাদনে অবলুপ্ত করে; ভেতরের এক অনির্বচনীয় গুচ্ছে কবি লিখে ফেলেন : ‘একটি শাপলা ফুল/ একটি জীবন’। শাপলার ভাসমান অভিলাষ, তপ্ততার হাতছানি, গহীন রঙের প্রণয়— চোখে মন্থনার রূপ তৈরি করে। প্রণয়বসত গড়ে। প্রণয়িকার সন্ধিৎসাও নির্মাণ করে। কবিজীবন তখন তার ‘নিকষিত হেম’— হয়ে রয়। পুরো জীবনের রঙে সে নিজেকে রাঙায়, রাঙিয়ে তোলে। তাই শেষ স্তবকেও বলা হয় : ‘একটি ফুটন্ত শাপলা,/ আমার আকণ্ঠ জীবন’। ঠিক কোনো সংজ্ঞায় নয়— বোধের অনুরণিত যাঁতাকলই বিধৃত সংশ্রবের অনুকূল আশ্বাস প্রণয়ন করেন। ‘শাপলা’ ওই কাঠমোতেই হয়ে ওঠে ইমেজবন্দী। কার্যত, এ ইমেজটা একমুখি নয়, বিচ্ছুরিত— বহুরাঙা। ব্যবহৃতও হয় বহুময়রূপে। হাওয়া, আকাশ, মেঘ, জল, মাছ, পাখি কোনোটাই তুচ্ছ নয়, কবির কাছে। কারণ, When you sit doen to read poetry leave aside all religious bias তাই তা মিথও বটে। প্রত্যেকটি এই ভূগোলের ভেতরে মোড়ান এবং গড়াও। সেখানে আসঞ্জন-উল্লাস¯্রােতমন্থিত। সবটুকু ধরেই এ আলিঙ্গনের অনুরুদ্ধতা। এক অর্থে, এটি আত্মকথারূপেও আসক্তপ্রবণ, বলা যায়। এই প্রকৃতি-শৈশব-শ্রেষ্ঠা রসনিষ্পত্তির বাতায়নে সতত পুষ্ট। তাই নদীমুখি বা কেন্দ্রায়িত নদী; তাইতো নদীর ভেতরের অবলোকনে তা পাগলা-পারা। কবি বাহার বলেন : ‘পাগলা হারিয়ে আজ কবি আর পাগল হয়েছি।’ এর দার্শনিক অকুস্তলটুকু নিছক ধারণা নয়। ঐতিহ্যিক এবং মেধাময়। ব্যাপক অর্থে লেজেন্ডারিও। তাই এরূপ পাঠকৃতি আমাদের কৃষ্টিকে চিনিয়ে দেয়— দাঁড় করায় শ্রেয়োশীলতার খা-ব-অস্তিত্বে।

সিরাজুদ্দৌলা বাহার বিষয়ক এমন ভূমিকা পেরিয়ে ‘পূর্বজন্মে’র ইমেজের পাটাতনের কিছু অভিলক্ষ্য আমলে নিই। প্রথমে শরণ নিই নন্দনতাত্ত্বিক বুচারকে :The sting of the pain, the disquiet and unrest arise from the selfish element which in the world of reality clings to these emotions. The pain is expelled when the taint of egoism is removed[বাস্তব জগতের ভাবের সাথে যে স্বার্থ জড়িত থাকে, তা থেকেই অস্থিরতা, অশান্তি ও বেদনার দংশন তৈরি হয়। সে স্বার্থ বা অহং দোষমুক্ত হলে বেদনাও তিরোহিত হয়] এইটি এ সময়ের অর্থ! এলিয়ট থেকে যা বলেছি, কবি বাহার অভিজ্ঞতায় বিভাব, অনুভব ও সহচরী ভাবের সংযোগ ঘটিয়েছেন। কিন্তু রস তো অলৌকিক! তাই বলি, ভাবই রসে নীত হয় আর এই ভাব (আবেগ/ রোমান্টিক/ বস্তুসাপেক্ষ) তো অভিজ্ঞতার বা লৌকিকতার ভেতরেই সমস্থিত। সৌন্দর্যটি সেখানেই গড়ে ওঠে। সিরাজুদ্দৌলাহ বাহারের “প্রতিকৃতি” থেকে উদ্ধৃত করি :

                                                সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, শুধুই সশস্ত্র—

                                                কাঁধে চকচকে কালাশনিকভ!

                                                কালো আবলুস, কাফ্রি পুরুষ

                                                দু’উরুর ফাঁকে—

                                                পতাকার মত নমিত শিশ্ন

                                                নিচে—

                                                ঝুলন্ত অ-কোষ।

কবিতাটির মেসেজ কী? নামকরণেই বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত। এর আগের কবিতা “ফলাফল”ও তাই। উপমান ও উপমেয় যথাক্রমে পপিফুল ও দরোজা— আলাদা ইমেজ বসায়। স্তবকের ব্যবধানে বক্তব্যটি রসনিষ্পত্তির অবসর পায়, পরের স্তবকেই পূর্ণ-সংবেদ প্রতিষ্ঠিত। ততোধিক অর্থের রূপরেখায় আচ্ছন্ন হয়। একদল শিশুর জন্মরহস্যটি এ বাংলাদেশের ‘ম্যালথাস’ ধারণায় পর্যবসিত। তুচ্ছ সংবাদে বাহার সেটিকে কূলে পৌঁছে দেন। ওঁর কবিতা তাই তুচ্ছ থেকে বহুজ্ঞাপক  দৌত্য। দূরগন্ধবাহীতেও স্থিত। তবে তাঁর কবিতায় কিছু দৃশ্যচঞ্চল্যতা আছে, ধরে নিই “কাওয়াই ব্রিজের ছবি দেখে”, “পতিসর”, “অটোস্ট্যান্ডে এক অপরাহ্নে” ধরনের কবিতায় আমার ব্যক্তিগত আপত্তি আছে। কবিতাকে ওভাবে কঠিন বাস্তবানুগ করা চলে না। তাতে তার আহত হয়, কখনোবা মৃত্যুও। বাহার সে ধরনের চালে না গিয়ে “পাখি”, “পূর্বজন্মের কবিতা”, “নিয়তি”, “পাপ”— এমন ধারায় কুঁদে কুঁদে নিজেকে গড়ানো সমীচীন মনে হয়। এ গ্রন্থে ওঁর দৃশ্যচঞ্চল কবিতার রস তেমন আকুল করে না। তার চেয়ে দার্শনিক অভীপ্সায় মেরিট তৈরি হলে, সেটি নতুন অর্থ দান করে, ততোধিক অন্যর্থ পয়দায় প্রাবল্যময়ও বটে। নামকবিতাটি উদাহরণে আনি :

                …            …            …

                কে ছিলাম, কীবা নাম আর তুমি, তোমার কপাল

                চন্দন চর্চিত আর সাক্ষাতে চোখে চেয়েছিল—

                খোঁপায় হলুদ ফুল, লালশাড়ি, অপরূপ নর্তকীর সাজে

                তোমাকে বুঝিনি আমি, আমাকে তুমি বুঝেছিলে।

এটি কাব্যময় কবিতা। শুধু তাই নয়, আধুনিক কবিতারসের সরল বিচ্ছুরিত অনুভব দানার ভেতরে এক ধরেনের দার্শনিক-অতুল্যতা গড়ে ওঠে— যাতে শ্রুতি ও স্মৃতি দুটোই সন্নিষ্ঠতা পায়। তবে শুধু তাই নয়, তাত্ত্বিক বুচারের অভিমতটিও এ লক্ষ্যে আমাদের কানে পড়ে। সেটি হলো ‘ংঃরহম ড়ভ ঃযব ঢ়ধরহ’। এইটিই আসল কথা। বাহার বড় কবিতা যেমন লেখেন না তেমনি গুরুভার শব্দও প্রয়োগে শামিল নন। খুব চটুল কিছু বিষয়ও আছে। তবে সেক্ষেত্রে “হাটকথা” একটু ব্যতিক্রমী। কথন-রচন প্রয়াসও আছে। ছন্দ গাদ্যিক। প্রবাহ বহিরাশ্রয়ী সংশ্লেষময়। চলতি মেসেজটা আরও পাই “বিশ্বায়ন” নামে :

                                এখন কোথায় যাবে

                                কার কাছে

                                কেন ও কীভাবে—

                                                তোমার মুঠোয় আজ বন্দী তুমি

                                                তোমার শরীরে, তোমার শৃঙ্খল!

দারুণ! সরস কিন্তু কঠিন ও বিশদ। সহজময়তার ভেতরে প্রচুর আলোর দার্শনিক সন্তাপ। বিনয় মজুমদার কিংবা উৎপলকুমার বসুর কথা মনে হয়। তবে কিছুতেই আমাদের রুদ্র বা আবুল হাসান ধরনের নয়। আবিদ আজাদও নন। সিকদার আমিনুল হকও না। সত্তরে আবু হাসান শাহরিয়ার আর পরে খোন্দকার আশরাফ হোসেন। ধারাটি ¯্রােতরেখা পায়। তরঙ্গও বিচ্ছুরিত। তবে এ প্রতিশ্রুতিতে বাহার স্বীয়, স্বতন্ত্র। নব্বুই থেকেই লেখেন এপর্যায়ে এসে; তাঁর মতো হয়ে উঠেছেন, তাঁর ধারায় চলছেন। তবে আবার ওই একই কথা, দৃশ্যচাঞ্চল্য বুঝি ছাড়তে হবে তাঁর। লিরিকপ্রবণতার চেয়ে “পাপ” কবিতার ‘কোথাও কিছু একটা ঘটেছে/ তাই এই খরা-ঝড়-ঝঞ্ঝা-/বর্ষণ-প্লাবন’— এতেই প্রসিদ্ধি। এবং নতুনও। চিরনতুনময় হতে পারে। আকাক্সক্ষা ও আশা, অন্তত আমার।

আবার একটি উদ্ধৃত করি :

Love, that for very life shall not be sold,

                                          Nor bought nor bound with iron nor with gold

সুইনবার্নের এ কবিতাটিতে ঠিক প্রয়োজন বলে কিছু নেই, যতোটা মেলে কল্পনা-বিলাস। এই কল্পনা-বিলাস কেন্দ্রে রেখে বাহারের কিছু কবিতা আগে পড়েছি। নদীর কল্পনা, প্রকৃতিবাঞ্ছা তৎপরতা ছিল। এখানেও আছে ‘পাহাড়গুলো দুমড়ে মুচড়ে গোল ও সমতল’। সেটিকে বুঝি তাঁর কথায় ‘মানুষের পাপ’ থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর আদৌ কী প্রয়োজন আছে? কবিতা তো! তবে কবির হাতে কলম তুলে নিলে শুধু সাময়িক চাকচিক্য আর স্বস্তি-শান্তির বসতদায় কেন কবি নেবে? কবির তো সে কাজ নয়! “পরিকল্পনা” বা “তোমার কলম তুমি যারে দাও” আরও অনেক অভিব্যক্তি ধারণ করার শক্তি রাখে, সিরাজুদ্দৌলাহ বাহারের চিত্তে তা আছেও— কিন্তু কেন যে তার উপযোগিতা খোঁজা— কেন যে ধ্বংসপাত আর রক্তপাতের ভেতরে আটকে যাওয়া— ঠিক জানি না। কবি বাহার এ পর্যায় থেকে বেরুনোর শক্তি রাখেন, তাঁকে (ওঁকে) বেরুতে বলি। আজকের ভূমিতে ওসব ‘পশু আর পেশীর আজন্ম লড়াই’ প্রত্যক্ষ করার নেই, অধিক পরোক্ষ হয়ে নিজেকে আরও ‘খরভবষবংং ষরভব ড়ভ হরমযঃ’ করে তোলা সম্ভব। তাঁর পরবর্তী রচনায় সেটি পেতে চাই। কারণ, পদার্থময় চরণের স্মৃতি ও শক্তি তাঁর আছে। সেটি যেন সত্য হয়। চিরসত্যের কিছু উঠে আসুক তাঁর হাতে, সেটি অভাবিত নয়— নিরূপিত ও নতুনরূপে।

‘কবিতা বস্তুরূপ হইতে রূপের সংকেতলোকে পৌঁছায়’— সিরাজুদ্দৌলাহ বাহারের আটান্নটি কবিতায় সে ইঙ্গিতটির প্রবলতা পরি¯্রুত। সেটিকে আরও অভীপ্সিত করে তোলা সম্ভব হয় যদি তাতে তুমুল শ্রেয়ো ও প্রাপ্তিলোকের পদার্থময় অনুধ্যানের পটরেখার প্রতীক্ষা থাকে। পূর্বজন্মের কবিতা তা উৎরানোর পথমাত্র। তবে তাতে আরও নতুন পালক যুক্ত হতে পারে। আমিত্মক এ মন্ময়-পর্যালোচনায় তার প্রতীক্ষা ও প্রসারণ কামনা করি। এবং অবশ্যই তা চিরন্তনতার মোহ ও চিন্ময় যাতনার অভিক্ষেপ থেকে। জয়তু কবিকে।
শহীদ ইকবাল

******************************************************


বিজন অশ্রুবিন্দু ॥ সম্পাদক : মাহমুদ মিটুল
মার্চ ২০১৭ ॥ বরিশাল ॥ ++++++
‘ধানসিড়ি সাহিত্যপত্রে’র আয়োজনে বৃহত্তর বরিশালের আড্ডারুদের মুখপত্র বিজন অশ্রুবিন্দু। মার্চ ২০১৭ তে এটির নবম সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে। পত্রিকাটির ‘আমাদের সেকালের গ্রন্থকথা’ অংশে এককালে সাড়া জাগানো বৃহত্তর বরিশালের পাঁচজন লেখকের লুপ্তপ্রায় পাঁচটি গ্রন্থের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যেখানে রয়েছে অশ্বিনীকুমার দত্তের কর্ম্মযোগ, লোককবি আব্দুল গণি বয়াতি ও তাঁর জারি গান, আব্দুস শহীদের কারা-স্মৃতি, কুসুমকুমারী রায়চৌধুরাণীর ¯েœহলতা এবং বজলুর রহমানের জিজ্ঞাসা গ্রন্থের আলোচনা। দ্বিতীয় অর্থাৎ আমাদের একালের গ্রন্থকথা অংশে থাকছে চন্দ্রদ্বীপ অঞ্চলের সাতজন সমসাময়িক সাহিত্যিকের সাতটি গ্রন্থের আলেচনা এবং তৃতীয় অংশে আড্ডারুদের সাহিত্যকথায় তরুণদের উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশে প্রকাশ করা হয়েছে।

আমাদের সেকালের গ্রন্থকথা অংশের পাঁচটি আলোচনার মধ্যে অন্যতম একটি হল- আব্দুস শহীদের কারা-স্মৃতি। আব্দুস শহীদের কারা-স্মৃতি : একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া এবং খারাপ-স্মৃতির ভূমিকা শিরোনামে রায়হান আলীম ও সরদার ফজলুল করিমের আলোচনা দুটি বিজন অশ্রুবিন্দুর পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। কমরেড আব্দুস শহীদ (১৯১৭-১৯৯৬) কমিউনিস্ট পার্টির নিবেদিত কর্মী ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ সাত বছর পাকিস্তানের কারাগারে বন্দীজীবন কাটান। এর মধ্যে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিবর্ষণে সাতজন বিপ্লবী নিহত হয় এবং আব্দুস শহীদ আহত হন। আব্দুস শহীদের দীর্ঘসাত বছরের বিপ্লবীচিন্তার কথা ও জেলের প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ বিপ্লবীদের যৌথজীবনের কথাই হচ্ছে কারাস্মৃতি। কারাস্মৃতি লেখকের স্মৃতিচারণমূলক লেখা হলেও এটা বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে জড়িত। জনতার মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গকারী বিপ্লবীদের আন্দোলন, জীবনযাপন এবং আত্মত্যাগের কথা স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে গ্রন্থে।  অপামর জনসাধারণের আন্দোলনকে সঠিকভাবে জানতে এবং উপলব্ধি করতে আব্দুস শহীদের কারাজীবনের স্মৃতিকথা সমৃদ্ধ এবং অকাট্য দলিল। আব্দুস শহীদের সংবেদনশীল মন, দেশপ্রেমিক সত্তা এবং  লেখক মানসের অপূর্ব সমন্বয় এই গ্রন্থের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অবলুপ্তির পথে। আলোচকদ্বয় উক্তগ্রন্থের বিষয়বস্তু, প্রেক্ষাপট আলোচনা করে কারাস্মৃতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উল্লেখসাপেক্ষ গ্রন্থটির সংরক্ষণের দাবী জানিয়েছেন।

কুসুমকুমারী রায়চৌধুরানী বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক। আমাদের ‘সেকালের গ্রন্থকথা’ অংশে উল্লেখযোগ্য এই ঔপন্যাসিকের প্রথম উপন্যাস  স্নেহলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

বিজন অশ্রুবিন্দুর দ্বিতীয় অংশ সমসাময়িক সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের আলোচনা। এটি ২০১৬র বইমেলায় প্রকাশিত ফেরদৌস মাহমুদের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। আগন্তুকের পাঠশালার আলোচনায় মাহমুদ মিটুল বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য, কবিমানস এবং কবির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ আলোচনার বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে কবি নির্দিষ্ট শৃংখলে আবদ্ধ থাকেন নি- উন্মুক্ত করেছেন। সীমাবদ্ধতার গ-ি পেরিয়ে তার কবিতায় ব্যক্তি-সমাজ রাষ্ট্র ইতিহাস নানা রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘আগন্তুকের পাঠশালা’র তিনটি অংশে মোট ৪৬ টি কবিতা প্রকাশ পেয়েছে।

‘আমাদের একালের গ্রন্থকথা’ অংশে একটি অনবদ্য এবং অসাধারণ উপন্যাসের আলোচনা হল— ‘আবদুল জলিল যে কারণে মারা গেল : দুঃসহতার কালচিত্র’। ২০১৫ সালে একুশের বইমেলায় প্রকাশিত মঈনুল আহসান সাবেরের এই উপন্যাসটি ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কারে’ ভূষিত হয়। হোসনে আরা মনি আলোচিত এই উপন্যাসটিকে সাবলীল ভাষার মাধ্যমে আলোচনার বিষয়বস্তু করে তুলেছেন। মঈনুল আহসানের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল গুরুগম্ভীর বিষয়ের আটপৌরে প্রকাশ। ‘আবদুল জলিল যে কারণে মারা গেল’ উপন্যাসটি বর্তমান সময়ের প্রতিচ্ছবি। ঔপন্যাসিক এবং আলোচক দুজনের মাধ্যমেই আমরা দেখতে পাই যে, এখানে অনুপুঙ্খভাবে এসেছে সরকার যন্ত্রের কৌশলে মৃত্যুর কাছে পরাজিত হওয়া সাধারণ এক মানুষের কাহিনি।

‘আড্ডারুদের সাহিত্যকথা’ অংশটি বিজন অশ্রুবিন্দুর সর্বাধিক আকর্ষণীয় অংশ। তরুণ ও নবীনদের আড্ডাভূমি এবং মনের ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে এ অংশটি। এখানে আড্ডারুদের মোট ২১টি কবিতা এবং ১টি অনুগল্প প্রকাশ পেয়েছে। বিষয়ের বৈচিত্র্য প্রত্যেকটি কবিতার মধ্যে লক্ষ্যণীয়। যেখানে ভালোবাসা-প্রেম (জপমালা, সুখের লাইগা’ সে’); ইতিহাস (ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং ইমতিয়াজ মাহমুদ); স্বাধীনতা (আমাদের স্বাধীনতা, পরাধীন), আধ্যাত্মিকতা (পরাণ পাখি, জন্মাদ্ধবোধ); সাম্প্রদায়িকতা (অভিশাপ্ত); সমসাময়িক সমস্যা (মৃত্যুনগরে কবির প্রশ্ন, একজন কাবেরী এবং কতিপয়, বসন্ত বিলাপ) বিষয়গুলো মুখ্য হয়ে উঠেছে।

ছোটন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তার ‘একজন কাবেরী এবং কতিপয়’ উক্ত কবিতাটি প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ২০১৬ সালের মার্চ মাসে কুমিল্লা ক্যান্টরমেন্টে কলেজছাত্রী এবং নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ এবং হত্যাকা-কেই ঈঙ্গিত করেছেন। কবিতার কাবেরীর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে তনুকেই প্রতিফলিত করা হয়েছে। কবির ভাষায় :

                এক পাত্র সুধা আর দুগ-া অসুর ছিলো,

                একজন আবৃত্তি শিল্পী আর আটজন নিষ্ঠুর শ্রোতা ছিলো।

                বস্তির ঐ বদ্ধ ঘরে সেদিনও কাবেরী আবৃত্তি করেছিলো—

                রবি বা নজরুল নয়। গুণও নয়।

                ওর কণ্ঠে দিয়ে ঘৃণা ঝরেছিলো—

                নপুংসক জাতির জন্য ধিক্কার ঝরেছিলো।

‘মৃত্যুনগরে কবির প্রশ্ন’ কবিতায় ইয়াসিন হীরা ২০১৩ সালে সাভারের গার্মেন্টস রানা প্লাজার ভয়াল মৃত্যুর কথাই তুলে ধরেছেন। মাত্র ১০টি লাইনের এই কবিতায় মৃত্যু এবং ভুক্তভোগীদের আর্তনাত ভয়ালরূপে প্রকাশ পেয়েছে :

                রুদ্রর বাতাসে লাশের গন্ধ

                টুকরো টুকরো বোধ,

                ছিন্ন-ভিন্ন আর্তনাদ।

                তবুও রানার প্রসাদা…

                তবুও কালের পাম্পার…

‘বসন্ত বিলাপ’ কবিতায় তানভীর কায়ছার পরিবেশ দূষণের চিত্রকেই ফুটিয়ে তুলেছেন। কলকারখানার কালো ধোয়া, গাড়ী ও তামাকের ধোয়ায় আমাদের দেশের ষড়ঋতু এবং গাছপালা হারিয়ে যাচ্ছে একথাই কবিতার মূল বিষয়বস্তু।

হাসান মেহেদীর কবিতার দ্বিতীয় অংশটিতে পরাধীন বাংলাদেশের রূপ ফুটে ওঠে। গদ্যছন্দে লেখা কবিতাটিতে ’৭০র নির্বাচন, ষড়যন্ত্র করে পশ্চিম পাকিস্তানীদের ক্ষমতা দখল, পূর্ব-পাকিস্তানীদের উপর নৃশংস অত্যাচার, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদির চিত্রায়ণ রয়েছে উক্ত অংশটিতে। বিজন অশ্রুবিন্দু আমাদের সাহিত্যের একটি অসামান্য কাজ বলে মনে করি।
লিমু

******************************************************


শঙ্খচিল ॥ সম্পাদক : মাহফুজ পাঠক ও +++
+++++++++

সাধারণত কোনো বিশিষ্ট কবি-লেখকের প্রয়াণের পর তাঁকে নিয়ে বিশেষ স্মরণ সংখ্যা প্রকাশের চল এখন অধিক। ছোটকাগজ শঙ্খচিল-এর ‘শহীদ কাদরী’ সংখ্যাটিও প্রকাশ পেয়েছে কবির প্রয়াণের পর, কিন্তু সংখ্যাটি প্রকাশের জোগাড়যন্ত্র আরম্ভ হয়েছিল এর অনেকটা সময় আগেই। এজন্য পত্রিকার সম্পাদকদ্বয় মাহফুজ পাঠক ও ইকবাল মাহফুজ কবির কাছে চিঠি পাঠিয়ে অনুমতি-প্রার্থনাও করেছিলেন। সম্পাদকদ্বয় দুজনই তরুণ, কিন্তু তাঁরা ৩৫২ পৃষ্ঠার এই বিশেষ সংখ্যাটির নির্মাণ দারুণ দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেছেন, তা পাঠান্তে বলাই যায়। যেন সংখ্যাটি হয়ে উঠেছে শহীদ কাদরীর সমগ্র দিক ধারণ করে থাকা একটি কোষগ্রন্থ।

‘স্মৃতিমেঘ’ বিভাগে যেমন রয়েছে কবির ঘনিষ্ঠজন কবি আল মাহমুদ ও অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর রচনা, তেমনি আছে তাঁর বেশ ক’জন নিকটাত্মীয় আর এমনকি ব্যক্তিগত চিকিৎসক আমর আশরাফের অভিজ্ঞতার বিবরণও। এই বিভাগটি থেকে কবির শৈশব থেকে মৃত্যু অব্দি নানা অজানা ঘটনার বিবরণ মেলে। ‘জলছায়া’ বিভাগে যাঁরা ঠিক শহীদ কাদরীর ব্যক্তিগত সান্নিধ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে পাননি, কিন্তু তাঁর প্রতি অনুরক্ত ছিলেন বরাবরই— এমন কয়েকজন লেখকের আন্তরিক ব্যক্তিগত গদ্য সংকলিত হয়েছে। আড্ডাবাজ হিসেবে খ্যাতি ছিল শহীদ কাদরীর, তাঁর বেশ ক’টি সাক্ষাৎকার ও তাঁর সাথে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতি সংকলিত হয়েছে যথাক্রমে ‘সাক্ষাৎকার’ ও ‘আড্ডা’ বিভাগে। প্রথম বিভাগে কবিকে নিয়ে তাঁর তরুণকালের সুহৃদ কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার এক বিশেষ প্রাপ্তি বৈকি। আর দ্বিতীয় বিভাগের উল্লেখযোগ্য উপাদান হিসেবে রয়েছে প্রয়াত আরেক কবি সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে কাদরীর চকিত কিন্তু সহৃদয় সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতা। শহীদ কাদরীর কবিতার একাধিক দীর্ঘ মূল্যায়ন, তাঁকে নিবেদিত কবিতা, নিবেদিত গল্প, তাঁর কবিতা থেকে তৈরি গানসমূহের হালসাকিনও রয়েছে এখানে। কবির একাধিক অপ্রকাশিত চিঠিপত্র, তাঁর অগ্রন্থিত গদ্য ও কবিতাও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের মনে আকর্ষণ জাগাবে অবশ্যই। কাইয়ুম চৌধুরী ও মুর্তজা বশীরের মতো খ্যাতনামা শিল্পীদের আঁকা শহীদ কাদরীর একাধিক প্রতিকৃতিও এখানে মুদ্রিত হয়েছে। শেষাংশে কবির জীবনপঞ্জি সংক্ষিপ্ত হলেও সংহত-যথাযথ।

আর বিশেষ করে বলতে হয় শঙ্খচিল-এর মুদ্রণসৌকর্যের কথা। এত যতœবান প্রকাশনা সাধারণত বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজগুলোতে চোখে পড়ে না। চমৎকার অলংকরণ, রুচিশীল অক্ষরবিন্যাস আর শহীদ কাদরীর প্রচুর দুর্লভ ছবির সংযুক্তি একে অবশ্যদ্রষ্টব্য করে তুলেছে। তবে খটকা এই, এরকম সুসম্পাদিত-সুনির্মিত একটি বিশেষ সংখ্যায় কোনো সম্পাদকীয় নেই কেন?
মুহিত হাসান

******************************************************

সুরমস ॥ সম্পাদক : জফির সেতু
++++++++++++++
“বুঝিলাম সে তো কবি নয়— সে যে আরূঢ় ভনিতা, পা-ুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের পর বসে আছে সিংহাসনে— কবি নয়— অজর, অক্ষর অধ্যাপক; দাঁত নেই— চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি,

কবিতার সমালোচকদের এভাবেই সমালোচনা করেছেন জীবনানন্দ দাশ— সমালোচকদের সমালোচনার জবাবে। এর মানে এই নয় যে, সমালোচকদের জীবননানন্দ অপছন্দ করতেন, তিনি অপছন্দ করতেন সেইসব সমালোচকদের যারা চিন্তায় একদেশদর্শী, বিশ্লেষণে হয়তো বা অমূয়াপ্রবণ।

বোঝা যায়, সমালোচক আর কবির মধ্যে উপলব্ধির ফারাক বেশি হলে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারেন না, যদিও তার দরকারও খুব বেশি আছে তা নয়। কিন্তু কবিতার সমালোচনা কবিতার গতিপথকে বিশ্লেষণ করতে পারে দারুণভাবে।

সমালোচক যদি কেবলই নিন্দা করে যেতে থাকেন কিংবা প্রশংসা করে যেতে থাকেন তাহলে তা কারুরই কাজে আসেনা— না কবির, না পাঠকের।

তবে, “সমালোচকের উচ্ছ্বসিত আবেগপ্রসূত নিন্দা কিংবা প্রশংসার দিন আজ শেষ হয়েছে। একালের বাস্তবাদী মানসিকতা দিয়ে সমালোচকেরা সাহিত্যকে দেখেন। সমালোচনাতো ব্যক্তির বিশেষের দেখামাত্র নয়, অপরকে দেখতে শেখানোর চেষ্টাও তো বটে,”

— সাহিত্য বিচার: তত্ত্ব ও প্রয়োগ

উপরের এত কথা বলার প্রয়োজন হতো না, যদি সমালোচক আর কবির উপলব্ধির প্রকট পার্থক্য না থাকতো। প্রায়শই দেখা যায়, সমালোচক আর কবি পরস্পর বিরোধাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। একথা মানতেই হয় যে, কবিতার সমালোচনা, সমালোচনা সাহিত্যের মধ্যেঅন্যতম দূরূহ কাজ। আর এ কাজটিই সাবলীলভাবে করেছে সুরমস। কবিতা নিয়ে ‘সুরমস’ গদ্য কাগজ অনবদ্য বিশ্লেষণ করেছে।

সাহিত্যের আদি নির্দশন উপন্যাসও নয়, ছোটগল্পও নয়; সে হলো কবিতা— আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে পদ্য। কবিতা অনেকেই লেখ, কিন্তু ভালো কবিতা হয়ে ওঠে কোনগুলো এটি নির্ণয় করা কম কঠিন নয়— কেননা শেষ বিচারে কবিতা তো নন্দনতত্ত্বের বাইরে না। ফলে একজনের কাছে যা ভালো কবিতা, অন্যজনের কাছে তা নাও হতে পারে। তবে কি কবিতার ভালোমন্দের কোন বিচারই চলে না? তৈমুর খান, ভালো কবিতা’ চিরন্তন প্রঞ্জালোকের ব্যপ্তির অভিমুখে’ নিবন্ধে এ নিয়েই আলোচনা করেছেন। তিনিও মানছেন” “কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে কী দেখে এই ভালোত্ব তা আজ পর্যন্ত আমার কাছে স্পষ্ট নয়,” কবিতা যদিও কবির ব্যক্তির জীবনের একান্ত প্রচ্ছায়া, নিজস্ব অভিব্যক্তির ভাষা,তারপরও কবিতা থাকে সবই ব্যক্তি, সমাজ, ইতিহাস, দর্শন, এমনকী বিজ্ঞানও। তবে খটকা লাগে লেখক তৈমুর খান ফ্রয়েডীয় মনো বিশ্লেষণের সাহায্য নিয়েই কবিকে দেখতে চেয়েছেন। এটি হয়তো ভুল নয়— তবে একেবারে সঠিক নয়, দর্শন ও যৌন চেতনার বাইরেও মানুষের নানা মাত্রা রয়েছে। সেগুলোর ওপর আলোকপাত করলে কবিকে ও কবিতার ভালোত্বকে বোঝা হয়তো আরেকটু সহজ হতো।

জওয়াহের হোসেন, শেখর দেব, নেসার শহীদ, সুমন আজাদ, মেহেরুন নিশা তাদের রচনার মধ্যে কবিতাকে খুঁজেতে চেয়েছেন, বুঝতে চেয়েছেন নানা আঙ্গিক থেকে। কবিতা নিয়েও যে অনেক ভাববার আছে, এ ধারণাটি প্রায় মৃত প্রায় হয়ে উঠেছিল গত কয়েক দশকে— কবিতার পাঠক যদিও অন্যান্য সাহিত্য মাধ্যমের তুলনায় তুলনামূলক কমই। মানবমনের অনুভূতির আদিমতম শিল্পিত প্রকাশ কবিতার ভেতর পাওয়া যাবে তার আত্মিক পরিচয়— এমনকি চিন্তা কাঠামোও। এদকি থেকে উপরোক্ত লেখকদের প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবীদার। প্রত্যেকের লেখাই কবিতা বুঝতে  চাওয়া যেকোন পাঠকের কাছে ভালো লাগবে, এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

অমিতাভ চৌধুরী শতবর্ষ পরে আবারও ‘পড়ো জমিতে’ খনন করেছেন নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য। একটি প্রবন্ধে গোটা ইউরোপকে তুলে আনা সহজ কাজ নয়। ইয়েটসকে সামনে রেখে তিনি সে কাজ করেছেন অসাধারণ প-িত্যের সাথে।

সদ্য প্রয়াত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরীর উপর ও তাঁর “উত্তরাধিকার” কাব্যগ্রন্থের উপর ছোট কিন্তু যথার্থ আলোচনা করেছেন শামস্ আলদীন। এছাড়াও জফির সেতু, আজির হাসিব, মাসুদ পারভেজ অনবদ্য আলোচনা করেছেন কবি শামীম রেজা শামসের আনোয়ার ও মোহাম্মদ সাদিকের কবিতার উপর।

সমসাময়িককবিদের পাঠ না করলে কবিতার গতি-প্রকৃতি বোঝা যায় না সহজে। তারা সমসাময়িক দুজন কবির উপর আলোকপাত করে সেই কাজটিই করেছেন। প্রশংসার দাবীদার তারা নিঃসন্দেহে।

সুদূর কানাডার আদিবাসীদের কবিতার উপর লিখেছেন শাহানা আকতার মহুয়া। ভৌগোলিক পার্থক্য সত্ত্বেও মানুষের কাব্যচেতনার কোন এক জায়গায় যে এক সেতুবন্ধন আছে তা এ প্রবন্ধ পাঠ করলেই বোঝা যায়।

বাংলা কবিতার অন্যতম প্রাণ পুরুষ উৎপল কুমার বসু। তাকে যথার্থভাবে নিয়ে এসেছেন সঙ্ঘমিত্রা হালদার।

ওগডেন ন্যাশকে সামনে রেখে পাশ্চাত্যের ব্যঙ্গ কবিতার উপর বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেছেন জিললুর রহমান। পাঠকের ভালো লাগবে— এ প্রবন্ধটি তা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

এছাড়া সুমন গুণ, হেনরী স্বপন, পাবলো শাহি প্রমুখের কবিতা নিয়ে লেখাগুলো চিন্তার খোরাক জাগায়।

‘সুরমস’ কবিতার বিশ্লেষণে যে ভূমিকা রাখছে তা নিঃসন্দেহে কাব্যপ্রাণ সমস্ত পাঠকের মনের খোরাক জোগাবে এবং কবিতার পাঠকদের সামনে আরো নতুন নতুন দিক উন্মোচিন করবে এটাই প্রত্যাশা।
ফজলে রাব্বী

******************************************************


চৈতন্যপুর ॥ গওহর গালিব
শোভাপ্রকাশ, ঢাকা ॥ বই মেলা ২০১৭
‘মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তিতে এগিয়ে চলে সমাজ ও সভ্যতা’। ছোটগল্পও এর অনুগামী; এটি আদতে জীবনেরই শিল্পভাষ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে আরম্ভ করে বাংলা ছোটগল্পের বয়স দেড়শ বছর। এর মাঝে, এই সাহিত্য প্রকরণটির খোলনলচে বদলেছে কালেকালে, বারবার। আখতারুজ্জমান ইলিয়াসে’র মতো পাওয়ারফুল লেখকও সন্দিহান হয়ে উঠেছেন, বাংলা ছোটগল্পের ভবিতব্য নিয়ে— ‘বাংলা ছোটগল্প কি মনে যাচ্ছে?’ মানুষের জীবনে সংকট তো বহুমাত্রিক, কোনটি ধরে লেখক রচবেন তাঁর শিল্পভাষ্য? এরপরও বাংলা ছোটগল্পের প্রবাহমানতা স্থবির হয়নি, বয়ে চলেছে। তবে ¯্রােতটা ক্ষীণ। প্রশ্ন রয়ে যায় বিষয় নিয়ে, ভাষা নিয়ে, সর্বোপরি মান নিয়ে। অবশ্য এসব বিতর্ক-প্রতর্ক থামবে না, কালের গতিতে চলতেই থাকবে। অন্তত, যদতিন শিল্প আছে, মানুষের মগজ খাটাবার সুস্থতা-নান্দনিকতা আছে।

গওহর গালিবে’র লেখার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় বেশি দিনের নয়। পাঠের দ্বারোৎঘাটন ছোটগল্পের মাধ্যমেই; চিহ্নের ৩২তম সংখ্যায়। চৈতন্যপুর সংখ্যার বিচারে তাঁর তৃতীয় গল্পগ্রন্থ। পূর্ব-প্রকাশিত দুটি গল্পগ্রন্থ— চেনাতে অচিন এবং শেকড়ের ঘ্রান। এর বাইরে তিনি লিখেছেন স্বদেশ-সারথি নামের একটি উপন্যাস ও শিশুতোষ রচনা। একজন লেখকের প্রকৃত মানস তাঁর লেখার মাঝেই আঁকা থাকে। সেজন্য আকাশ-পাতাল হদিসের প্রয়োজন পড়ে না। প্রোক্ত দৃষ্টিকোন মেনে বলতে হয়— ক্রিয়েটিভিটি এই নবীন কথাকারের যাপনেরই একটা অনিবার্য অংশ। ‘যাপন’ শব্দটিতে সবিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি একারণে যে— চৈতন্যপুর গল্পগ্রন্থের সাতটিগল্প গৌণার্থে গওহর গালিবে’র যাপনেরই মুদ্রিতভাষ্য, মুখ্যার্থে জীবনাভিজ্ঞতার ফসল। চৈতন্যপুরর গল্পগুলি তিনি দাঁড় করিয়েছেন বাস্তবভূমিতে, এমনকি ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশনের শরীরী প্রশ্রয়ও এখানে একেবারে অনুপস্থিত। অর্থাৎ, নিজের দেখা ছড়িয়ে দিতে চান তিনি, সরলভাষ্যে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; উত্তরকালের তিন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের শক্তিমত্তায়-প্রচেষ্টায় ‘বাংলসাহিত্য ভাষা’র একটা মার্জিত কাঠামো দিয়ে গেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের লেখকদের প্রচলিত আলস্য। ফলে, ‘বাংলাসাহিত্য ভাষা’র কাঠামোগত নিরীক্ষাহীনতা প্রায় প্রথায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, নিজের জন্য একটা আলাদা-স্বকীয় ভাষা তৈরি করে লিখবেন; দু’একজন সতীনাথ ভাদুরী, কমলকুমার মজুমদার বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যে সে উদাহরণ বিরল। গওহর গালিব সেই প্রচলিত প্রথারই অনুগামী, প্রতিকূলের কেউ নন। সাতটিগল্প তাঁর বক্তব্যে-বিবরণে; যে ভাষা-শরীর পায়, তা পাঠকের গতানুগতিক পাঠোভ্যাসকেই প্রশ্রয় দেয়।

চৈতন্যপুরর সাতটিগল্পে যে জীবন আমরা পাই— আমাদের ছোটগল্পের প্রথাগত ‘সতীত’¡ অনুসারেই তা মানব জীবনের সমগ্রতার বার্তা দেয় না। একারণে- ‘উপন্যাসের তুলনায় ছোটগল্পের পাঠক বরাবরই কম’ কথাটি চৈতন্যপুরেও ধ্রুব। গল্পগুলোয় নি¤œিবত্ত, নি¤œ-মধ্যবিত্ত এবং নাগরিক মধ্যবিত্তের নকশা দাঁড় করাতেই গওহর গালিবে’র বিশেষ প্রচেষ্টা-আগ্রহ-যতœ। যেহেতু, ‘মানবসমাজে শ্রেণিভেদ বিশ্বজনীন’— সাহিত্য স্বাভাবিকভাবে সে ছবিই আঁকবে। প্রথমগল্প স্বীকারোক্তির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে নুরু’কে কেন্দ্র করে। যার দ্বিবিধ পরিচয় আমাদের সামনে উন্মুক্ত— প্রথমত নুরু ভিক্ষুক, এটি তার প্রধান পরিচয়। দ্বিতীয়ত নুরু পাগল, এটি অপ্রধান পরিচয়। নুরু’র সহজাত বোধ-বুদ্ধি-কায়দা তাকে অন্তত ‘নি¤œবর্গ’ তকমার উপরে তুলেছে। গ্রামীণ পটভূমির এ গল্পটি আদতে সমকালীনতায় পরিকীর্ণ। পটভূমিসহ নুরু’কে ঘিরে ভাষা পায় আমাদের পরিচিত অসুস্থতাই— গ্রাম্য রাজনীতি, নির্বাচন, অপদার্থ জনপ্রতিনিধি, হত্যা, ধর্ষণ, নেশা; তথাকথিত দেশজ সভ্যতার সকল উপাদান এখানে হাজির। আমাদের রাষ্ট্রীয় সামগ্রিকতার এক আঞ্চলিক-খ-িত রূপ স্বীকারোক্তি। এর পরিবেশ-প্রতিবেশ পাঠকের অপরিচিত নয়।

বিলবোর্ড গল্পটি নাগরিক জীবনের; সোজাকথায় দাম্পত্যের। কর্পোরেট ‘সমাজ ব্যবস্থায় উৎপন্ন ব্যক্তির বিশেষ কোন সমস্যা কী সংকট…’ এখানে মুখ্য। গল্পটির সূচনা কবিতা ও মৃদুলে’র সংসার বাঁধার প্রক্রিয়া দিয়ে। যা কিনা প্রেমেন্দ্র মিত্রে’র শুধু কেরানী গল্পের ছেলেটি আর মেয়েটি’র নীড় বাঁধার প্রাথমিক সুখস্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু, সময়ের বদলটা এখানে বড় বিষয়। কর্পোরেট ব্যবস্থায় ব্যক্তির আত্ম-সংকট, মিডিয়া, কর্মজীবী নারী বাড়িয়ে চলে কবিতা-মৃদুলে’র দাম্পত্যের উত্তাপ। নিত্যসংকট সেখানে আগুনে ঘৃতাহুতির আসন নেয়। ফলে, দুঃকজনক বিচ্ছেদে নীড় শুধু নষ্টই হয়না, হয় ভষ্মীভূত। কবিতা ও তাঁর বান্ধবী’র সংলাপ জানান দেয় বিলবোর্ডের নারীর দিকে তাকানো মৃদুলের মুগ্ধতা— ‘যে মানুষ মানুষের দিকে তাকায় না, বিলবোর্ডের দিকে মুদ্ধ দৃষ্টি মেলে থাকে- তাকে আর ফেরানো যায় কী’। না, ফেরানো যায় না। ফেরার মৃদুল সেই মধ্যবিত্ত ‘দ-িতঅপুরুষ’; যার ভাগ্য উইলিয়ম শেক্সপিয়র বহুকালপূর্বে রচনা করেছেন ‘টু বি অর নট টু বি’ সত্যভাষ্যে। তাই, বাস্তবতা ফেস করা থেকে সে মুক্তি খোঁজে, চায়। রক্ত-মাংসের দেহ নয়, বিলবোর্ডের উন্নতবক্ষাই তার আরাধ্য। এর সাথে দরকার দৈহিক-মানসিক মাস্টারবেশন। একজীবন কাটতে কতক্ষণ!

চৈতন্যপুর গ্রন্থটির নাম গল্প। সংকট সৃষ্টি এবং ফ্ল্যাসব্যাকে ঘটনা বর্ণনা গওহর গালিবে’র সহজাত প্রবণতা। এখানেও তার ব্যবহার আছে। আমরা দেখি— গল্পের শুরু হয় জয়নাল ও তাঁর পুত্র গুলজারের সম্পর্কের তিক্ততা দিয়ে। গুলজার বখে যাওয়া সন্তান, পিতার মুিদখানা দেখভালে তার নজর নেই— বেকার, বাবার অমতে বিয়ে করা যুবক, গর্ভবতী স্ত্রীর অপদার্থ স্বামী। গল্পে সংকটের মাত্রা চড়ে যায় কামার্ত গুলজার যখন হারান কবিরাজে’র স্কুলপড়–য়া মেয়েকে টেনে বাঁশঝাড়ে নিয়ে যায়, কাম চরিতার্থের উদ্দেশ্যে। গ্রাাম্য শালিসে দোররার আঘাতের পর নির্বাসিত হয় সে। তখন, লেখক আরেক দুষ্টবুদ্ধি খেলান এই ছোট্ট-গ্রাম্য-নষ্টের মাথায়। ‘ধর্মের তৈয়ার করা জমিতে অধর্মের বীজ বপনে’— গুলজার কাজে লাগায় বজলু চোরা’কে। মুসলমানদের দেয়া আগুনে জ্বলে ওঠে হিন্দুপাড়া। বিচারপ্রার্থী হারান কবিরাজ বাস্তুচ্যুত হন। হারান এখানে প্রতীক মাত্র। তার বৃদ্ধ-অসহায় মায়ের মতোই পড়ে থাকে শতসহ¯্র হতভাগ্যের বাস্তুভিটে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগরের ঘটনাকেই গুলজার চৈতন্যপুরে প্রতিস্থাপিত করে। প্রাণভয়ে পলাতক হারানে’র অনুপস্থিতে বজলুর মায়ের যে মানবিক সংকট উপস্থিত হয়, তা আমাদের চৈতন্যে নাড়া দেয়। কিন্তু হায়! সাম্প্রদায়িকতার, রাষ্ট্রদৈত্যের চৈতন্য নাড়াবে কে? তাই অশ্রুতেই ধুতে হবে সে পোড়া ছাই। তোমায় বলবো বলে গল্পটি কৈশোর উত্তীর্ণ প্রেমের তাপ ছড়ায়, রাজনৈতিক অব্যবস্থা যার শুভ্রতায় আঁকে ব্যর্থতার পদচিহ্ন। দিনটি ছিল বৃষ্টিভেজা— এক তরুণী বই ক্রেতা এবং প্রকাশকের অভিজ্ঞতা বদলের গল্প। অপরদিকে, বিপ্রতীপ এবং দ্বৈরথ গল্পদ্বয়ে নারী-পুরুষের মন নিয়ে কাটাছেঁড়া চলে। তবে, এখানকার পুরুষ চরিত্রগুলোও মৃদুল নামক আর্কিটাইপ থেকেই তৈরি, দ্বিধাজর্জর।

চৈতন্যপুর গল্পগ্রন্থের সাতটিগল্পে গওহর গালিব আমাদের সামজ, সমষ্টি, রাষ্ট্র ও ব্যক্তিক চেহারার যে ছবি আঁকেন, যুগভাষ্য দেন— তা প্রশংসার দাবিদার। তবে, ক্রমাগত বর্ধিষ্ণু নাগরিক সহিষ্ণুতা এই গল্পগুলোর টেস্ট কিছুটা পানসে করবে। নাড়াটা; সে হৃদয়েই হোক, কিংবা মগজেই হোক, আরো প্রচ- দরকার। যা পাঠককে আক্রান্ত করবে সহজেই। সামনের দিনে এই নবীন কথাকারের কাছ থেকে সাহিত্যমোদীরা আরো তৃষ্ণার জল পাবে, এমন প্রত্যাশা রাখছি।
নাজমুল হাসান পলক

******************************************************


বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত ॥ শহীদ ইকবাল
কথাপ্রকাশ, ঢাকা ॥ প্রথম প্রকাশ ঃ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬
সন্দেহ নেই, শিল্প-সাহিত্যই হল একটি জাতির মানস সম্পদ। বস্তুগত সম্পদ, যেমন— বাড়ী-ঘর, যানবাহন, পোষাক-পরিচ্ছদ, রেডিও-টেলিভিশন-টেলিফোন, গহনা-অলঙ্কার— এ রকম আরও আরও অনেক কিছুই, এমন কি গরু-ছাগল-ভেড়া, এগুলি মানুষের জীবন যাপনকে করে তোলে সুগম। তবে, এর প্রয়োজন হল ব্যবহারিক। দেহকে টিকিয়ে রাখার জন্য, তার আরাম-আয়েশের জন্য এ সবকে বিকল্পহীন বলে ভাবাও অযৌক্তিক নয়। কেন না, দেহ ছাড়া আত্মার, অন্ততঃ পৃথিবীতে, আর কি দাম আছে! জীবিত মানুষেরা তার শান্তি কামনা তরে, তার মুক্তিও চেয়ে থাকে, কিন্তু ঘটনা তো ঐ পর্যন্তই। আবার টাকা-পয়সা থাকলে বস্তু সম্পদের কোন অভাব হয় না। ক্রয় ক্ষমতাই রস্তু সম্পদ ভোগের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। তাই সম্পদের মালিকানা ও বণ্টন কিংবা ভোগের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া মানব সমাজে একটা বড় ব্যাপার। আর এ ভাবেই সমাজে শ্রেণীবিন্যাসই বলি,আর শ্রেণীবৈষম্যই বলি, সৃষ্টি হতে থাকে। এই সম্পদের মালিকানা ও তার বণ্টনের ভেতর দিয়েই প্রকাশ ঘটে ক্ষমতার। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও তার আইন-কানুন কিংবা সামাজিক কায়েমী স্বার্থবাদ সাহায্য করে এই ক্ষমতাকেই অব্যাহত রাখার। এক সময় এই ক্ষমতার বিবরণকেই পরিগণনা করা হত ইতিহাস বলে। রাজা-বাদশারাই ছিল এই ক্ষমতার নায়ক। কায়েমী স্বার্থবাদী শ্রেণীই ছিল তার পরিপুরক শক্তি। ঢাল-তলোয়ার ঘোরানো কিংবা যুদ্ধ-বিগ্রহ করা — এক কথায়, ক্ষমতার সামরিকায়নই ছিল সেখানে মুখ্য। এটাই ছিল রাজার নীতি অর্থাৎ রাজনীতি। এ কারণে রাজনৈতিক ইতিহাসকেই বিবেচনা করা হত ইতিহাস বলে। কিন্তু কালে কালে, সঙ্গত কারণেই, পরিবর্তিত হয়েছে সে বোধ। কেননা, মানুষের জীবন প্রবাহ তো কেবল রাজ-আনুগত্যের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে থাকে না। তার জীবনের বস্তু সম্পদ, সেখানে প্রাচুর্য় থাকুক আর তা সীমিতই হোক, তাকে সে পল্লবিত করে তুলতে চায় নিজেদের সৌন্দর্য চেতনার রঙ ও তুলিতে। রাজা-বাদশাদের সময়েও তা হয়েছে। এখন হয়ত তারা নেই, কিন্তু অন্য ফর্মে হলেও ক্ষমতার প্রতিভূরা তো রয়েছে। তবে তাদের ইতিহাসটাও, কেবল মাত্র ইতিহাস হয়ে নেই। তা পরিণত হয়েছে ইতিহাসেরই একটা অংশে। এ বাদে মানুষের জীবন প্রবাহের অন্যান্য দিকের, বিশেষ করে ভাব জগতের বিষয়গুলি, যেমন — স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, সঙ্গীত, ও সাহিত্যের ভেতর দিয়ে অবিরত সম্প্রসারণ ঘটছে তার মানস সম্পদের। আর কে না জানে, জৈবিকতা কিংবা বস্তুবাদিতা নয় — ভাব জগতের ঐ বিষয়গুলির ভেতর দিয়ে নান্দনিকতার যে প্রকাশ, তাই তাকে রূপ দিয়েছে পরিপুর্ণ মানবের।

আবার এটাও মনে না করবার কোন কারণ নেই যে, একটি জাতির সামগ্রিক পরিচয় খুঁজে পাবার জন্য রাজনৈতিক ইতিহাস যতটা প্রয়োজন,তার চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হল ঐ বিষয়গুলির অনুসন্ধান করা। কি ভাবে তা বিবর্তিত হয়েছে কিংবা তার রূপটাই বা কেমন, সেটা দেখতে গিয়ে যে বৈশিষ্ট্যগুলি পাওয়া যায়, তাই হয়ে দাঁড়ায় জাতিত্ব নির্দেশক। আর

আমরাও তো একটি জাতি। কাজেই, আমাদের জীবনে ঐ বিষয়গুলি কি ভাবে এসেছে, তা জানাটার কোন বিবল্প আছে কি? মোটামুটি ভাবে, ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে এই কাজটি শুরু হয়েছে। তার একটি প্রধান স্থান দখল করে আছে সাহিত্যের ইতিহাস।

এ প্রসঙ্গে যেটি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করার, তা হল, আমরা একটি ভাষাভিত্তিক জাতি। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও এটা বলে যে, ভাষাকে কেন্দ্র করেই আমাদের জাতিত্বের সূচনা ও বিকাশ। আমাদের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা— যার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটেছে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে একটি স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠা, তারও ভিত্তি ছিল ঐ ভাষা। আর এই ভাষাই হল সাহিত্যের মাধ্যম। এ ভাবে দেখলেও, সাহিত্যের ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে কতটা বেশী, তা বোধ হয় আলাদা করে বলার দরকার পড়ে না। সুতরাং শহীদ ইকবাল রচিত ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটি যে সেই প্রয়োজনীয়তারই ফসল, তাই বা অস্বীকার করা যায় কি ভাবে?

তবে বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত বা ইতিহাস না হয়ে এটা বাংলাদেশের হয়েছে কেন, তার শানে নজুলও, বোধ করি, আমাদের সবারই জানা। ১৯৪৭ সালে বাংলাভাষাভাষী অঞ্চল সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতি ও বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ডিভাইড অ্যা- রুল নীতির বাস্ত-বায়নের কারণে দুটো দেশের অংশ হয়ে গিয়েছিল। কেন হয়েছিল, এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করার সুযোগ বা প্রয়োজন এখানে কোনটাই নেই। তবে যেটা বলার, তা হল, এক অংশের  সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন হল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। আবার এটাও ঠিক যে, আলাদা রাষ্ট্র হবার কারণেই তার অধিবাসীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন রকম হয়ে তাদের সামাজিক ও সাংস্বৃতিক তথা জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে এনে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য। আকাক্সক্ষার নতুনতর প্রেক্ষিত ও অহরহ বিরাজমান রাস্তবতার পরিবর্তিত রূপের মুখোমুখী হওয়টা সৃষ্টিও করে চলেছে জাতিসত্তারও ভিন্নতা। এ জন্য, ভাষা এক হলেও অন্যান্য নানা বিষয়ের মতো সাহিত্যের ফরম্যাটের আলাদা হয়ে যাওয়াটাও অযৌক্তিক নয়। আবার  এটও সত্য যে, বর্ণমালা এক হলেও প্রকাশভঙ্গীর ক্ষেত্রে ভাষারও নতুন রূপ ধারণ করাটা বিচিত্র কি?

সেটা, হয়ত, ঠিকই আছে। তবে এ প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা সামনে নিয়ে আসা, বোধ করি, জরুরী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম যে দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার সাংবিধানিক পরিচয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। প্রচলিত অর্থে তাই বাংলাদেশ। তার একটি আয়তন আছে। তা ন্যুনধিক ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। সীমানা দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এ বাদে উত্তরে ও পূর্বে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রদেশ। পশ্চিমেও তাই। তরে বিশেষ ভাবে যেটা বলার, তা হল, পশ্চিম দিকের ভারতের এই প্রদেশের নাম পশ্চিম বঙ্গ। এই পশ্চিম বঙ্গ ও বর্তমানের বাংলাদেশ মিলে যার সাধারণ পরিচয় আমাদের কাছে — অবিভক্ত বাংলা কিংবা বঙ্গদেশ। আপনাদেরকে মূর্খ ভেবে স্কুলপাঠ্য এই তথ্যগুলো দিচ্ছি বলে বিজ্ঞ পাঠক আহত বোধ করবেন না। তবে কি এটা ঠিক নয় যে, এমন একটি ধারণা আমাদের মাঝে প্রচলিত রয়েছে, উক্ত অবিভক্ত বাংলা কিংবা বঙ্গদেশ ভেঙেই পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত পূর্ববঙ্গ, —পরে পূর্ব পাকিস্তান— যা এখনকার বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বঙ্গ গঠিত হয়েছিল? এমনটি আসলে হয়েছে বৃটিশ ভারতের প্রশাসনিক ইউনিটগুলো সম্পর্কে পরিজ্ঞাত না থাকার জন্যে। সেখানে দেখা যায়, যেটাকে বলা হয়েছে, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী —যা  বেঙ্গল নামে পরিচিত, তার ভেতরে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গ তো ছিলই, অধিকন্তু বিহার ও উড়িষ্যারও অংশ ছিল যুক্ত। শচীন্দ্রনাথ সেন তাঁর সিরাজদ্দৌলা নাটকে, এরও আগের আলীবর্দী খাঁকে নবাবই বলেছেন ‘বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার’। তার ধারাবাহিকতাই দেখা যায় বৃটিশ আমলে। এ থেকে রোঝা যায়, ১৯০৫ সালের যে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা, তা কেবল বঙ্গদেশের  হিন্দু-মুসলমানের ভাগাভাাগির ব্যাপার ছিল না, সেখানে পূর্ববঙ্গের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছিল আসামকেও।

কথাগুলো বলা এ জন্যই যে, আজকের দিনে যে ভূখ- বাংলাদেশ, তার সাহিত্যের ইতিহাসই হোক আর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে কোন বিষয়েয়ই হোক, তা কি কেবল ১৯৭১ সাল থেকে হিসেবের মধ্যে আনতে হবে? না কি ঐতিহাসিক কাল থেকে তার যে ভৌগলিক অবস্থান, সেখানে সংঘটিত বিষয়াবলীকে আলোচনার অন্তর্ভূক্ত করতে হবে? সে ক্ষেত্রে ভূখ-গত ধারাবাহিকতার পরম্পরাকেই আমরা গ্রহণ করেছি। এটা যে কেবল বাংলাদেশের জন্য আলাদা কিছু, তা নয়। পৃথিবীর সর্বত্রই এটা মেনে নেয়া হয়েছে। সে হিসাবে প্রাচীন যুগ(দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত) ও মধ্যযুগ(ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত)-এর  কেবল সাহিত্য নয়, সামগ্রিক ভাবে সব কিছুই ইতিহাসের উপাদান হয়ে রয়েছে। এমন কি আধুনিক যুগ— যার শুরু ধরা হয় ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে, তখন থেকে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ পর্যন্ত সময়ও এই ইতিহাসের অন্তর্ভূক্ত। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীতেও এ কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে।

পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের পরের বিষয়াবলীকে বাংলাদেশের বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। এটা, বোধ করি, করা হয় এ জন্যই যে, ঐ সময় থেকেই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে জাতিত্বের ধারণা ভিত্তি পায়। হিন্দু ও মুসলিম— এই দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়েরই মাতৃভাষা বাংলা। বৃটিশ ভারতে পরাধীনতার বোধ থেকে যে দেশপ্রেমের প্রত্যয় বিকশিত হয়, সেখানে ঔপনিবেশিক শাসন-মুক্তির আন্দোলনই হয়ে ওঠে প্রখর। রাজনৈতিক আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন ঘটে তার ভেতর। কংগ্রেস সর্বভারতীয় মানুষের প্রতিনিধিত্ব দাবী করে ভৌগলিক স্বাধীনতা লাভকে মুখ্য করে তোলে। অন্য দিকে মুসলিম লীগ সর্বভারতীয় মুসলিমদের সংগঠন রূপে আত্মপ্রকাশ করে, শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়। এ সময় বাঙালী হিন্দুরা সাধারণ ভাবে ছিল কংগ্রেসের অনুবর্তী। আর বাঙালী মুসলমানেরা ভোট দিয়েছিল মুসলিম লীগের পক্ষে। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পর পশ্চিম বঙ্গের অধিবাসী ভারতীয় হিন্দু বাঙালী নাগরিকদের,বোধ হয়, আত্মসন্তুষ্টি লাভের পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু পূর্ববঙ্গের বাঙালী মুসলিম নাগরিকদের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের ভেতর দিয়েও পুঁজির বিকাশ থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজেদের সম্প্রসারিত ও প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ সৃষ্টির যে সম্ভাবনার বথা তারা ভেবেছিল, সেখানে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা অতি দ্রুতই নেমে আসে। তখন নিজেদেরকে বাংলা ভাষী হিসেবে সনাক্ত করার তাগিদ অনুভব করতে থাকে। এই ভাষিক পরিচয়ই অন্য ধর্মাবলম্বী বাঙালীদেরকেও একই প্লাটফরমে সংগঠিত করতে অনুপ্রাণিত করে। বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’-ও এক সময় ‘মুসলিম’ পরিচয় ঝেড়ে ফেলে। তার পর তো রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারবাহিকতার ভেতর দিয়ে ঘটে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা — যা পূর্ববঙ্গকে পরিণত করে স্বাধীন ও সার্বভৈাম বাংলাদেশ-এ। এবং যার শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সাল থেকে। সুতরাং তখন থেকে বাংলাদেশের কর্মপরিধির সূচনা গণনাকে যৌক্তিক বলেই বিবেচনা করা যেতে পারে। এ কারণে, শহীদ ইকবালও, বোধ করি, তাঁর গ্রন্থের ভূমিকার প্রথম লাইনেই বলেছেন, ‘১৯৪৭ সালে বিভাগোত্তর পূর্ববাংলায় বাংলাদেশের সাহিত্যের বীজ রোপিত হয়’।

তবে ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমানায় সৃষ্ট সাহিত্যের ক্ষেত্রে, বোধ করি, আরও একটি বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে। ঢাকা— যা ১৯৪৭—এর পরের পূর্ববাংলা ও বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী, সেখানে বিভাগোত্তর কালের পূর্ব থেকেই বাংলা সাহিত্য চর্চার একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রভূমি ছিল। কিন্তু সে সময় প্রাদেশিক রাজধানী ছিল কলিকাতা। অনেক কবি-লেখকই— যারা বিভাগোত্তর কালে ঢাকায় চলে আসেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠাও ঘটে সেখানে। এ রকম য়ারা, তাঁদের অনেকের নামই ঊল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন,— সুফিয়া কামাল, ফররুখ আহমেদ, জসীম উদ্দিন, আবদুল কাদির, আহসান হাবীব, বেনজির আহমেদ, গোলাম মোস্তফা, শাহাদৎ হোসেন, বন্দে আলী মিয়া, শওকত ওসমান, আবু রুশদ মতিন উদ্দিন, কাজী আফসার উদ্দিন, সরদার জয়েন উদ্দিন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল ফজল,আবু জাফর শামসুদ্দিন, আবুল মনসুর আহমদ, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, আজিজুল হাকিম, শামসুদ্দিন আবুল কালাম প্রমুখ। এ ছাড়া, অধিকতর তরুণ আশরাফ সিদ্দিকী, চৌধুরী ওসমান, মযহারুল ইসলাম প্রমুখও কলিকাতা কেন্দ্রিক পত্রপত্রিকাতে লেখক হিসেবে আবির্ভূত হন। কাজেই শুধুমাত্র সময় হিসাব করে তাঁদের কলিকাতা-কেন্দ্রিক লেখাকে বাংলদেশের সাহিত্যের অন্তর্ভূক্ত না করারও কোন কারণ নেই। শহীদ ইকরাল এ রকম অনেক কবি-লেখকদেরই তাঁর আলোচনায় জায়গা দিয়েছেন। তবে আমার, মনে হয়, বিষয়টা আরও নির্দিষ্ট করা যেত। কেননা, ১৯৪৭ সাল শুধু তো সময়ের হিসাব নয়, তার আগের পরের ব্যাপারগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে জাতীয় মানস প্রবণতারও বিষয়।

ইতিহাস রচনা, তা যে বিষয়েরই হোক, কাজটি যে শ্রমসাধ্য ও সময়-সাপেক্ষ, সে নিয়ে  কারোই দ্বিমত না থাকারই কথা। শহীদ ইকবাল এক রকম ব্রত নিয়েই এটা করেছেন। শ্রমসাধ্য ও সময় সাপেক্ষ কাজ তাঁর আরও আছে।  এর পূর্বে তিনি ‘বাংলাদেশের উপন্যাস: রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য’, ‘বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস, ‘বাংলাদেশের কবিতার সংকেত ও ধারা’ সহ আরও অনেক ইতিহাসমূলক ও অন্যান্য প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটিও এ রকম শ্রম ও সময় প্রদানের জলন্ত উদাহরণ।

এক সময় বঙ্কিমচন্দ্র আক্ষেপ করেছিলেন বাঙালীর ইতিহাস নেই। সে অভাব পূরণ করার জন্য নিজেও ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে লেখাও শুরু করেছিলেন। আসলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে অতীত আবিষ্কারের যে অনুপ্রেরণা এসেছিল, তা ছিল এরই ফলাফল। সাহিত্যের ইতিহাসও এ ভাবেই লেখা শুরু হয়। আমাদের সামনে তার যে উদাহরণগুলি রয়েছে, তার কিছু কিছু  উল্লেখ করাটা, বোধ করি, অপ্রয়োজনীয় নয়। এতে, আশা করি, এই উদাহরণগুলো সামনে রেখে শহীদ ইকবালের কাজের ক্যানভাসকে মূর্ত করা যেতে পারে। দীনেশচন্দ্র সেন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুকুমার সেন, অসিত কুমার বন্দ্যেপাধ্যায়, গোপাল হালদার, — এঁদের লেখা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থগুলো আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান লিখিত একটি গ্রন্থ রয়েছে। তাতে অবশ্য সৈয়দ আলী আহসান লিখিত অংশ নিয়ে তখনই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। এ ছাড়া, আবু সুফিয়ান নাজিরুল ইসলাম কিংবা দীন মোহাম্মদ রচিত ইতিহাস গ্রন্থও কম-বেশী পরিচিতি পেয়েছিল। মুহম্মদ এনামুল হকের বইটিতে মধ্যযুগের মুসলিম রচিত সাহিত্য নিয়ে যে পর্যালোচনা রয়েছে, তা খুবই মূল্যবান। তার পরও, বোধ করি, আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থ যথেষ্ট নয়। এ কারণে, এ রকম একটি দুরূহ কাজ করতে শহীদ ইকবাল যে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং পর্যাপ্ত শ্রম ও সময় দিয়েছেন, তা অবশ্যই উল্লেখ করার মতো।

গ্রন্থ পরিকল্পনায় দেখা যায, সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক— কবিতা-উপন্যাস, ছোটগল্প-নাটক-প্রবন্ধ-অনুবাদ-শিশূসাহিত্য, এবং স্মৃতিকথা-আত্মজীবনী ও ভ্রমণ সাহিত্য নিয়ে যৌক্তিক কারণেই আলাদা আলাদা অধ্যায় সাজিয়েছেন। এবং তা খুব বিস্তৃত ভাবেই। তথ্যের সন্নিবেশও বেশ সমুৃদ্ধ। তবে ছড়াকারেরা এতে অভিমানাহত হতে পারেন। শিশুসাহিত্যের আলাদা অধ্যায় থাকলেও ছড়া তো কেবল শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা হয় না, বড়দের বিষয়ও তাতে উপস্থাপন করা যায়। বুড়োখোকারই তো ভারত ভেঙে ভাগ করেছে, আর ছড়াতে তা এসেছেও। টেলিফোন-মোবাইল-নেটের সুবিধা আজকাল আর চিঠিপত্র লিখতে উৎসাহ জোগায় না, তা বলে পত্রসাহিত্যও তো সাহিত্য হতে পারে। কিংবা ভূতের গল্প বা গোয়েন্দা কাহিনী বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী যারা লেখেন, ঈর্ষনীয় পাঠকপ্রিয়তা নিয়ে তারা অনুল্লেখিত  থেকে যাবেন, সেটাও একটা আক্ষেপের কারণ বৈ কি! সাহিত্যের ইতিহাসের মূল জিনিসগুলো এসেই গেছে। এটা করলে কলেবরও বৃদ্ধি পাবে সামান্যই। আর একটি বিষয় হল, কবি-লেখকদের ক্রম, দু‘চারটে জায়গায় কালানুক্রমিক হয়নি। সেগুলোও সহজেই সংশোধন যোগ্য। তবে এগুলো যে ইচ্ছাকৃত ভাবে হয়েছে— আমি তা মনে করি না। একটা বড় কাজ করতে গেলে সব দিকে মনোযোগ দেয়াটা হয়ে ওঠে না। শহীদ ইকবালের বয়স কম,আবার সময়ের সাথে সাথে সাহিত্যের বিস্তার থেমে নেই, সে জন্য, মাঝে-মধ্যেই পরিবর্ধিত সংস্করণের অনিবার্যতা দেখা দেবেই। তখন এই অপূর্ণতাটুকু আর থাকবে না, আশা করি।

ভূমিকাতে শহীদ ইকবাল একটা কথা বলেছেন, তা হল, ‘পঞ্চাশের দশকের বাসি, পচা, কর্কশ শূন্যতার মরুভূমিতে ষাটের দশক প্রাচুর্যময়তা পায়।’ কোন বিবেচনা থেকে তিনি কথাগুলো বলেছেন, ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমি কিন্তু পঞ্চাশ দশকের ব্যাপারটা অর্থাৎ বাংলাদেশের সাহিত্যের সময় গণনার শুরু যেখান থেকে, তার পজিটিভ দিকটাই তুলে ধরতে চাই। ‘নতুন কবিতা’ — কাব্যসংকলনের কথা তিনি নিজেই বলেছেন যেটা পঞ্চাশের দশক শুরুর বছর খানেক আগে প্রকাশিত হয়েছে। আবার পঞ্চাশের দশকেই হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলেন গুরুত্বই বা অস্বীকার করা যাবে কি করে? এ ছাড়া, ঐ দশকের ভেতরেই বাংলাদেশের কবিদের প্রতিনিধিত্বশীল অন্ততঃ দুটো কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। একটি মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ও আবু হেনা মোস্তফা কামাল সম্পাদিত ‘পুর্ববাংলার কবিতা’ এবং আবদুর রশীদ খান ও মোহাম্মদ মামুন সম্পাদিত ‘প্রেমের কবিতা’। আবদুল কাদির সম্পাদিত, মনে হয়, একটি কাব্য সংকলনও ছিল, —‘কাব্যবীথি। কবিতার বই কিংবা কাব্য সংকলন প্রকাশিত হলেই কবিতা আহা মরি হয়ে যায়, তা অমি বলছি না। এগুলোর উল্লেখ শুধু এ কারণেই করছি যে ঐ সমস্ত কাব্য সংকলনে যে সব লিখেছেন, তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশের কাব্য জগতকে করেছেন সমৃদ্ধিময়। আর শুধু কি কবিতার ব্যাপার? পঞ্চাশ দশকের মাথাতেই এসেছে আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘জেগে আছি’-র মতো গল্পগ্রন্থ কিংবা শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’- মাঝামঝি। আবু ইসহাকের ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’-র ঠিকানাও ঐ পঞ্চাশ দশক। এ ছাড়া, যারা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, শওকত ওসমানসহ, তাদের অনেকেরই ঊল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বেরিয়েছে এ সময়। পঞ্চাশ দশক সম্পর্কে কথা বলতে গেলে, একটি বিষয়, বোধ হয়, মাথায় রাখা প্রয়োজন, তা হল, যে জাতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা আমাদের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাকে প্রজ্জ্বলিত করে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছে, তার সূতিকাগারই ছিল সে সময়। জাতির সেই আত্যন্তিক চাহিদার প্রতিফলন ঘটেছে শিল্প-সাহিত্যেরও পরিশীলনে। বরং ষাট দশক, যে দশক সম্পর্কে শহীদ ইকবাল উচ্ছ্বসিত হয়েছেন, সেখানে কিন্তু আমার বক্তব্য একটু ভিন্ন। এটা ঠিক যে, সেটা ছিল রাজনৈতিক ভাবে সংগঠিত হবার দশক, যার পরিণতি মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু এ সময় শিল্প-সাহিত্যে যে একটি ঢং-এর ব্যাপার এসেছিল, তা কি অসত্য? তিরিশের অনেক কবিই যেমন আন্তর্জাতিকতাবাদের নামে সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে নানা রকম তাত্ত্বিক আগ্রাসনের স্বীকার হয়েছিলেন, সে রকমেরই একটি ব্যাপার ঢাকাতেও ঘটতে যাচ্ছিল। স্যাড জেনারেশন-না গোষ্ঠী-হাংরি জেনারেশন— এরা কি করেছিল? যে দেশে শিল্প বিপ্লবই হয়নি, সে দেশে ইনডাস্ট্রিয়াল সোসাইটির ভাইসেসগুলোকে অঙ্গভূষণ করে শুরু হয়ে গিয়েছিল নাচানাচি। যে দেশের মানুষেরা ডিক্লাসড হওয়া শেখেনি, সেখানে মার্কসীয় বদহজম হওয়া ছাড়া আর কি হবে?, তাও অনেক কবি-লেখকের সমাজ বিপ্লবের বাহন হয়েছিল। এ ধরনেরই একটি ব্যাপার এখন আবার বিশ্বপুঁজির মালিকেরা তত্ত্ব আকারে নিয়েও আসছে। সমাজের সার্থকতার সাথে এর কোন যোগ নেই, কিন্তু ধমক তো খেতে হচ্ছে উত্তর আধুনিকতার!

যা হোক, এগুলো তো মতামতের ব্যাপার। শহীদ ইকবালের সব কথা যে আমাকে মানতে হবে কিংবা আমার কথা তাকে, তাও তো নয়। কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাসের যে সব তথ্য মৌমাছির মতো তিনি সঞ্চয় করেছেন, তার কৃতিত্ব তো তার অবশ্যই প্রাপ্য।

শহীদ ইকবাল, তার এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন আহমদ শরীফ, আহমদ ছফা ও হুমায়ুন আজাদ-কে। কাদেরকে এক জন পছন্দ করেন, তার ভেতর দিয়ে তার মানস বৈশিষ্ট্যেরও পরিচয় ফুটে ওঠে। কাজেই এক জনকে বোঝার জন্য এটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই এই উৎসর্গ করার ভেতর দিয়ে শহীদ ইকবাল কেও আমরা অনেকটাই চিনে নিতে পারি। তবে কথা কিন্তু আমার শুধু এটুকুই নয়। এঁদেরকে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সময়ের সক্রেটিস’। এই গ্রীক দার্শনিকের নাম আমরা সবাই জানি। নাম তো জানি, কিন্তু আর কতটুক জানি? নিজেকে জানার নিরন্তর একাগ্রতা চিন্তায় ও অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসার এক সিমবলিক উপস্থাপনা রূপে তাকে, বোধ করি, শোকেসে সাজিয়ে রাখাটাই আমাদের আনন্দের কারণ হয়ে থাকে। তাই নিজেকেও জানা হয় না, তাঁকেও না। একই ভাবে আহমদ শরীফ কিংবা আহমদ ছফা কিংবা হুমায়ুন আজাদও তাই। তাঁদের তিনজনের অবস্থান হয়ত এক রকম নয়। কিন্তু যেটুকু তাঁদের কাছ থেকে আমাদের নেয়ার, তা তো নিতেই পারি।

‘বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশের কথাটা আমি একটু বিশেষ ভাবে বলতে চাই। সন-তারিখসহ কবি-লেখকদের ধরে ধরে তাদের প্রকাশিত গ্রন্থের একটি দীর্ঘ তালিকা এখানে সংযোজিত হয়েছে। তাই, শুধু ইতিহসের নয়, এটি একটি আকর গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছে বলে মনে করি।

আর কি বলব? মুদ্রণ শিল্পের মনোহারিত্ব বইটিকে করেছে দৃষ্টিনন্দন। বইয়ের স্থায়িত্ব নিয়ে অতি উৎসাহী কিংবা ভাব-ভঙ্গীতে বিপ্লবী হয়ে অনেকেই এখন প্রশ্ন উত্থাপন করে থাকেন। কিন্তু, আমার মনে হয়, বিষয়টা পাত্রের নয়, পাত্রে রাখা জ্ঞান-প্রবাহের। মানব সমাজ তা নিজের প্রয়োজনেই, প্রযুক্তিগত ধারাবাহিকতায়, ফর্ম যাই হোক, সংরক্ষণ করবে। গ্রন্থের স্থান যদি আর্কাইভেও হয, তা কি বাঁধাগ্রস্ত করতে পারবে জ্ঞান-পিপাসুদেরকে?

আশা করি, শহীদ ইকবাল রচিত ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটি পাঠক সমাজে সমাদর লাভ করবে।
জুলফিকার মতিন

******************************************************


সম্প্রতি প্রকাশিত পত্রিকা ও পুস্তক পরিচিতি

হৃদয়বর্ণের কবিতাগুচ্ছ
মহীবুল আজিজ
মনন প্রকাশন ॥ চট্টগ্রাম
প্রকাশ : স্বাধীনতার বইমেলা ২০১৭
‘লেখক-কবি-সাহিত্যিক-অধ্যাপক’- চতুর্বিধ পরিচয়ে মহীবুল আজিজ আমাদের কাছে বহুমাত্রিক মানুষ। লিখেও চলেছেন দুহাতে, অবাধ বিচরণে, সব্যসাচীর মতো। কবি মহীবুল আজিজের বড় গুণ সুখপাঠ্যতা। সদ্য প্রকাশিত হৃদয় বর্ণের কবিতাগুচ্ছও এর প্রমাণ দেয়। সঙ্গে এখানকার কাব্যভাবনাতে ও রয়েছে বহুমাত্রিকতার জলস্পর্শ। ‘প্রেম-প্রত্যাশা, বিরহ-সংশয়, মাটি-মানুষ, ইতিহাস- ঐতিহ্য-পুরাণ, ব্যক্তি-বিচ্ছিন্নতা, নস্ট্যালজিয়া থেকে রাজনীতি’— সবই তাঁর ঋদ্ধ কলমে-হৃদয়ে নির্মল বাণীরূপ পেয়েছে হৃদয়বর্ণের কাবিতাগুচ্ছর অর্ধশত কবিতায়। যা পাঠকের মনে রেখে যায় স্থায়ী স্পর্শের প্রয়াস। কাব্যকাঠামো নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট এখানকার বাড়তি পাওনা।

বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের আলোচনা ও অন্যান্য আরিফ হায়দার
অনার্য ॥ ঢাকা
প্রকাশ : বইমেলা ২০১৭
ব্যক্তি যখন আত্মনিমগ্ন হন কর্মে, তখন তার নামের সাথে জুড়ে বসে কাজের তকমা। যেমন- আরিফ হায়দার থিয়েটারের মানুষ। সেটা আগাগোড়াই। থিয়েটার নিয়ে তার ক্রিয়েটিভ-কর্মের পরিমাণ যেমন বিপুল, তেমনি ভাবনার পরিধিও অত্যাল্প নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণাও করেছেন থিয়েটার ভাবনা নিয়ে। এবার তার চাক্ষুষ রূপ আমরা পেলাম বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের আলোচনা ও অন্যান্য গ্রন্থে। অনার্যের করা বইটি পেশাদারি নিবন্ধ সংকলন। ভাবনার মার্জিতবুদ্ধিতে, প্রকাশের চারুতায় যা হয়ে উঠেছে অনন্য। যাকে সার্টিফাইড করেন হাসান আজিজুল হকও। এখানে বিষয় হিসেবে আরিফ হায়দার নির্বাচন করেন- বাংলাদেশের উল্লেখ্য কয়েকটি নাট্য সংগঠন এবং নাট্যচর্চা বিকাশে তাদের কনক্রিট ক্রিয়া-কর্মকে। গ্রন্থে’র একদিকে যেমন আছে উৎপল দত্তের মতো অভিনেতার সাথে চাক্ষুষ আলাপের বর্ণিল স্মৃতি, ঋত্বিক ঘটকের থিয়েটার সম্পৃক্ততা তেমনি অপরদিকে আছে রামেন্দু মজুমদার, আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদের মতো বিশিষ্ট নাট্যজনদের থিয়েটার ভাবনার সন্নিবেশ। নাটকের সাহিত্য-আঙ্গিক, উপস্থাপন-আঙ্গিক, মঞ্চ-স্থাপনা, অভিনয়ে স্টাইল নিয়ে লেখকের মৌলিক-অমৌলিক চিন্তাও গ্রন্থটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। ‘বিভক্তি নাট্যচর্চা রাজধানী মফস্বল’ শিরোনামের লেখাগুলোতে আরিফ হায়দার দৃকপাত করেন মফম্বলের নাট্যচর্চার সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে। নাট্যসংগঠনগুলো যখন স্লোগান নির্বাচন করছেন— ‘নাটক শাণিত হচ্ছে, শোষকেরা সাবধান’ তখন নাট্যচর্চার সংবাদ গরিষ্ঠের কাছে পৌঁছে দিতে এমন গ্রন্থ সময়ের চাহিদা বলেই মানতে হয়।

কবিতার ইন্দ্রজাল
জফির সেতু
বেহুলা বাংলা ॥ ঢাকা
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৭
কবিতার ইন্দ্রজাল জফির সেতুর প্রবন্ধের বই। কবিতার এক অর্থ তো ইন্দ্রজালই— যা ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়’। কবিতার সাথে গাঢ় আত্মীয়তা ইমোশনের। সুতরাং, মাথার বিষয় প্রবন্ধও যে এখানে হৃদয়জলে ভিজবে, পাঠের মায়া জন্ম দেবে— নামই এমন বার্তা দেয়। আর সেই সিম্ফনি ক্রমেই বাড়িয়ে চলে, জীবনানন্দ দাশ, বিনয় মজুমদার, আবুল হাসান, শহীদ কাদরীর মতো কবির উপস্থিতি। মোহনীয় প্রচ্ছদপটের কবিতার ইন্দ্রজাল তিন-পর্বে বিভাজিত। প্রথম পর্বে কবির আত্মবোধ, আত্মস্বীকার, নিয়ে খোঁজ চলে। আত্মবোধকে জফির সেতু মেনে নেন চেতনার অংশ হিসেবে। সঙ্গে এ পর্বে প্রকাশ ঘটেছে কবিতা-কাব্যকলা নিয়ে লেখকের মৌলিক-অমৌলিক চিন্তার। একখানে কবিতাকে তিনি দেখেন নৃত্যের যমজের চেহারায়। মুদ্রা ও শব্দের পাখায় ভর করে এক করে দেন দুটোকে : ‘নৃত্য মুদ্রার লীলা/ কবিতা শব্দের লীলা’। দ্বিতীয় পর্বে এসে পাঠের গতি কিছুটা শ্লথ হয়, এখানে প্রবন্ধের চেহারা মেলে বেশ। কিছুটা একাডেমিক। অশোকবিজয় রাহা, হাসন রাজা, দিলওয়ার, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, জিল্লুর রহমান, হেনরি স্বপনকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো ভাবনার ভাঁজ খোলে, প্রবিষ্ট করে চিন্তার নতুন পরত। তৃতীয় পর্বটি মূলত নস্ট্যালজিয়ায় পরাভূত-গর্বিত। জীবনানন্দ দাশ, বিনয় মজুমদার, আবুল হাসান, শহীদ কাদরীর কবিতার সাথে নিজের অ-বয়সকালের স্মৃতি মিশিয়ে জফির সেতু পৌঁছেন এক চিরলব্ধ রসায়নে। যেখানে খুঁজে ফেরা ‘আমি’র বিস্তার। ‘প্রবল প্রেম ছিল শিরায় শোণিতে আমার’— তাঁর এ উচ্চারণ- স্বীকারোক্তি কেবলমাত্র কোনো তীব্র ‘তরুণী’র জন্য নয়, কবিতার জন্যও। কবিতার ইন্দ্রজাল এ বিষয়ে আমাদের নিঃসন্দেহ করে।

কাব্যসমগ্র
বায়তুল্লাহ্ কাদরী
লেখাপ্রকাশ ॥ ঢাকা
প্রকাশ : বইমেলা ২০১৭
বাংলা ভাষায় শ্রেষ্ঠ কবিতা সংগ্রহের প্রচলন গত শতাব্দীর ঘটনা; অর্র্ধ-শতাব্দীরও অধিককাল অতিক্রান্ত হয়েছে। উত্তররৈবিক কবিদের অনেকেই অস্বস্তিবোধ করেছিলেন ‘শ্রেষ্ঠ’ অভিধাটি নিয়ে। নিজের শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় ‘বুদ্ধদেব বসু’ শ্রেষ্ঠ অভিধাটিকে দেখেছেন— ‘ওটা একটা চলতি কথা, ব্যবহারযোগ্য নাম মাত্র’। কাব্যসমগ্র এর পরের ঘটনা। স্বস্তিদায়কও বটে! কারণ, কবি এখানে মুক্তি পান নিজের সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের গুরুভার থেকে। লেখাপ্রকাশ থেকে সম্প্রতি বেরিয়েছে কবি বায়তুল্লাহ্ কাদরীর কাব্যসমগ্রর নতুন সংস্করণ। কলাপাতা রঙ্গের মনকাড়া প্রচ্ছদে। সমগ্রে সংকলিত কাব্য ৯টি— শীতাভ সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য, ত্রিনাচিকেতের নাচ, কিম্ভূত হবার কথা ছিল, প্রজন্ম লোহিত, আড়ম্বর, বিতিকিচ্ছিরি লাইফ যাচ্ছে, প্রিয় মধ্যবিত্ত, আমি ডাকছি আসুন, গোধূলির নূড়িশস্য, জগৎ ভ্রমিয়া। আছে, অপ্রকাশিত পা-ুলিপির একাংশ আমি পক্ষিগোত্র। নব্বুইয়ের দশকের অন্যতম প্রধান কবি বায়তুল্লাহ্ কাদরীর পরিচিতি সর্বজনবিদিত। এককথায় কবিতায় নিমগ্ন মানবসত্তা তিনি। ‘প্রকৃৃতি-প্রেম- জৈবিকতা’ বাণীরূপ পায় তাঁর কলমে, কবিতায়। কবিতার ভাষা, স্টাইল এবং দর্শনে বায়তুল্লাহ্ কাদরী পুরোপুরি আলাদা, নিজস্ব। কাব্যপ্রকরণের ক্ষেত্রেও তিনি স্পর্শ করেন নবতর মাত্রা। আর, পাঠকের জন্য নির্ভার হবার সব থেকে বড় সংবাদ হলো— তাঁর কবিতার মেদহীনতা, সুখপাঠ্যতা। ফলে, কাব্যসমগ্র পাঠে পাঠকের একটি ক্লান্তিরহিত-¯িœগ্ধ জার্নি হয়ে যায় তাঁর কাব্যভুবনের সাথে।

কতিপয় মুখস্থ মানুষ
আহমেদ মাওলা
বিদ্যাপ্রকাশ ॥ ঢাকা
প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৭
আহমেদ মাওলা পরিচিত প্রাবন্ধিক। কথাসাহিত্যক পরিচিতি তাঁর হালের সংযোজনা। অবশ্য নিয়মিত-অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লিখে চলেছেন অনেকদিন ধরেই। কথাসাহিত্যেকের মলাটবন্দী হয়ে সামনে এলেন, ২০১০ সালে। সেখানে বিষয় হিসেবে বেছেছিলেন, ভাষা আন্দোলনকে। এর পরিক্রমায় লিখলেন উপন্যাস কতিপয় মুখস্থ মানুষ। উপন্যাস হিসেবে এটি দ্বিতীয় রচনা, পরিণতও বটে। আহমেদ মাওলা উপন্যাস লেখেন- ‘সমাজের দিকে চোখ রেখে,’ তাকে ছাপিয়ে ওঠে ব্যক্তি। মূল্যবোধহীনতা, অবক্ষয়, লোভজর্জরতা যে সমাজের প্রাধান চারিত্র, তিনি সেই সমাজেরই আঁকিয়ে। আর, এসব বাণী পায় সমকালের মোড়কে। কতিপয় মুখস্থ মানুষের প্রোটাগনিস্ট আবদুল মতিন— ‘মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মজিদের পুত্র’ যার প্রাধান পিতৃপরিচয়। স্বাধীন দেশে যৌবনে লালিত রাজনৈতিক বিশ্বাস তার ভাষা পায় না। ভাষাহীনতা, ¯¦প্ন-ভঙ্গুরতা, কর্মজীবন মিলে তার শ্রেণিবদল ঘটে। সমাজের পাঁকে, যাপনের টেনশনে বিপর্যস্ত হন ব্যক্তি আবদুল মতিন। ‘নীল অত্যাচারে লাল হয়ে ওঠা’ তার পরিণতির ভাষ্য এমন : ‘সকালে সবাই দেখে বিদ্যুতের তারে ঝুলে আছে সম্পূর্ণ রঙ্গিন এক বাংলাদেশ। অখ- এক আবদুল মতিন’। ‘জীবনের ক্ষয় ও আত্মবিনাশ’-এ উপন্যাসের প্রধান টেক্্রট। কাহিনী বয়ন-নৈপূণ্যে কতিপয় মুখস্থ মানুষ অর্জন করে সমকালীন জীবনসত্যের অভিলক্ষ্য।

পানপাত্রে ডাইনির ঠোঁট
আরিফুল হক কুমার
প্লাটফর্ম ॥ ঢাকা
প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৭
‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দুইরকম উৎসারণ’— সুতরাং, মানতেই হয় মানব ও কবিতার ভাষা অভিন্ন। প্রকাশই তার ধর্ম-রীতি। সত্তুরের দশক থেকেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লিখে চলেছেন কবি আরিফুল হক কুমার। চলার পথে— ‘প্রেম, মিথ, নিসর্গ, সমকাল, স্বদেশ, সমাজ ও রাজনীতিকে করে তোলেন তাঁর কাব্যসারথি। কথা বলেন মানবের ভাষায়। প্রথমকাব্য ঘাসের আঙ্গোট বেরোয় ২০০৯ সালে। পরিণত কাব্য। পানপাত্রে ডাইনির ঠোঁট তাঁর পঞ্চম কাব্য। ক্রিয়েটিভ ইমাজিনেশন আছে; তবে, নামই বার্তা দেয় তাঁর কাব্যভুবন এখানে স্বপ্নালুতায়-ভাবালুতায় সিক্ত হবে না। বরং, চলতি যাপন, কালের অভিজ্ঞানে চড়ে যায় তার সিম্ফনি, কাব্যদেহ হয় রক্তাক্ত। যা থেকে বাদ পড়ে না পাঠক হৃদয়ও। সমকালীনতাই মূলভাষ্য আরিফুল হক কুমারের কাব্যটি। লেখনীর গুণপনায় তা হয়ে ওঠে দৃষ্টিগ্রাহ্য, সুখপাঠ্য। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর হামলা, নাসিরনগরের সাম্প্রদায়িক ঘটনা থেকে রাস্তায় পড়ে থাকা রেজাউল করিম সিদ্দীকির নিথর দেহ— কিছুই বাদ থাকেনা তার সর্বজ্ঞ দৃষ্টিতে। ফলে, বক্তব্যে-বিবৃতিতে পানপাত্রে ডাইনির ঠোঁট পায় সমকালীন প্রমাণ্যমাত্রা। ‘জননী আমাদের জন্মান্তর হোক/ তোমার আঁচল ছায়ায় নবজন্ম’—এমন উচ্চারণ সেখানে ঘটায় আশাবাদী ছেদ।

ভূমিপুত্রের শীতনিদ্রা
কাজল কাপালিক
চিহ্ন ॥ রাজশাহী
প্রকাশ : বৈশাখ ১৪২৪
কবি হিসেবে কাজল কাপালিকের আত্মপ্রকাশ যদি একতারাটি বেজে ওঠে কোথাও দিয়ে। বছর না ঘুরতেই আমরা তাঁর দ্বিতীয় কাব্য ভূমিপুত্রের শীতনিদ্রা হাতে পেলাম। এটা মানতেই হয় দ্বিতীয় কাব্যে তাঁর কবিসত্তা আরো সংহত হয়েছে। কবিতার বিষয় হিসেবে কাজল কাপলিক নির্বাচন করেন জীবনঘনিষ্ঠ অনেক কিছুই। তবে, সবকিছু ছাপিয়ে ভূমিপুত্রের শীতনিদ্রার ৩৯টি কবিতায় তিনি মুখ্য করে তোলেন নিত্যদিন-যাপনের অভিজ্ঞতাকেই। এ কাব্যের কবিতাগুলো টানাপাঠের তৃপ্তি দেয়।

দূর্বা
সম্পাদক : গাজী লতিফ
বর্ষ : ১৭ ॥ সংখ্যা : ১৩
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৫৫ ॥ মে ২০১৭
নবীনবাগ ॥ গোপালগঞ্জ
দূর্বা গাজী লতিফ সম্পাদিত একটি মাটিবর্তী ছোটকাগজ। পত্রিকাটির ১৭ বর্ষের ১৩ সংখ্যাটি স্বপ্ন সংখ্যা। স্বপ্নের বিভিন্ন উপস্থাপনা রয়েছে এখানে। প্রবন্ধ, আখ্যান, নিবন্ধ ও বিবিধ এই চারভাগে পত্রিকাসূচি বিন্যস্ত। স্বপ্নের বর্ণ, স্বপ্নের কলকব্জা, স্বপ্নের সাতকাহন বহুমাত্রিক রসদে পূর্ণ  সাতজন প্রাবন্ধিকের প্রবন্ধ। আখ্যানটিও বর্ণিল স্বপ্নপ্রভায়। নিবন্ধ অংশটি দীর্ঘ এবং অনেক নামিদামী লেখকের আনাগোনায় ঋদ্ধ। বিবিধও অনুরূপ। স্বপ্ন নিয়ে একটা নিরীক্ষার প্রয়াস আমরা পাই সংখ্যাটিতে। বেশ পরিপাটি, ব্যতিক্রম সূচিবিন্যাস, ঝকঝকে মুদ্রণ; সংখ্যাটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

পাঁপড়
সম্পাদক : অদ্বৈত মারুত
বর্ষ : ১৬ ॥ সংখ্যা : ১১
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৭২ ॥ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
পাঁপড় ছড়ার ছোটকাগজ, মূলত নবীনদের ছড়া ও কবিতা প্রকাশ করে। এর এগারোতম সংখ্যাটি সামনে এসেছে শিশুদের পাঠোপযোগী ছড়ার সন্নিবেশে। প্রত্যেকটা ছড়ার বিষয় ও ভাববস্তু আলাদা। শতাধিক  ছড়াকারের ভাবনা—চিন্তন এবং শিশুসাহিত্যের মূল্যয়নসহ পাঁপড় বিগত সংখ্যার সীমা অতিক্রম করেছে।

একাঘ্নী
সম্পাদক : নাজ
বর্ষ : ১ম ॥ সংখ্যা : ১ম
পৃষ্ঠা : ৪০ ॥ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
একাঘ্নী চিহ্নপ্রাণিত শিল্পের ছোটকাগজ। এটি ‘সময়ের সেবা না করে সময়কে সৃষ্টি করা’  স্লোগান নিয়ে সৃষ্টি। নাজ সম্পাদিত একাঘœীর প্রথম সংখ্যাতেই রয়েছে বিশেষ চমক। পত্রিকার অন্তর্জগৎ গতানুগতিক ধারার বাইরে এবং শিরোনামগুলোও মনকাড়া। প্রবন্ধ এবং নিয়মিতবিভাগ এই দুটি অংশে বিভাজিত সংখ্যাটি। প্রবন্ধ অংশে পাঁচটি প্রবন্ধ আছে— যেখানে ক্রম পেয়েছে শহীদ ইকবাল থেকে কাঞ্চন রায়ের লেখা। নিয়মিত বিভাগে মিডিয়া-বিমুখ একজন শিল্পীকে নাজ-র মূল্যয়ন এবং স্মৃতি দাসের— ‘ড. এবনে গোলাম সামাদের সাথে কিছুকথা’ পত্রিকাটিকে সমৃদ্ধ এবং অনেকাংশে ঋদ্ধ করেছে। পত্রিকাটির গেটআপ-মেকআপ রুচিসম্মত, নান্দনিক। একাঘ্নীর পথচলা দীর্ঘ হোক।

******************************************************

আত্মকথা ……………………………………….
হোসেনউদ্দীন হোসেন
লেখক ও বীর-মুক্তিযোদ্ধা হোসেনউদ্দীন হোসেন (জ. ১৯৪১)। থাকেন যশোরের ঝিকরগাছার কৃষ্ণনগর গ্রামে। লেখালেখি তার প্যাশন। তিনখ-ের বাংলার বিদ্রোহ কিংবা রণাঙ্গণে একাত্তর নামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতাড়িত গ্রন্থ ছাড়াও লিখেছেন কবি আহসান হাবীব বা টলস্তয়-ভলতেয়ারের মতো বিশ্বসাহিত্যের গুণী লেখকদের নিয়ে নানা আয়তনের গ্রন্থ। ভ্রমণপিয়াসী এ লেখক ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেক দেশ। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি তার কাছে স্মৃতিমুদ্রার এক বীররসাত্মক এপিক আখ্যান। প্রচারবিমুখ, নির্লোভ, স্বার্থত্যাগী, নিরহংকারী এ মানুষটির গল্প-উপন্যাস-কবিতার হাতও অপ্রশংসিত নয়। এই দুর্মুখ সমাজে ব্যতিক্রমী এ মানুষটি এখন প্রায়— আনন্দময়রূপে ‘একা’। তাঁর জীবন-অধ্যায়ের বিচিত্র অভিজ্ঞতার যে সুলুকসন্ধান তিনি এ অংশে ধারাবাহিকরূপে শুরু করলেন তা নিশ্চয়ই বর্তমান প্রজন্মকে অনেককিছু জানতে ও বুঝতে শেখাবে। অভিনন্দন এ গুণী লেখককে। (সম্পা.)

******************************************************

ধুলায় ধূসর-১
১. পূর্ব-পুরুষেরা
আমার জন্ম হয় ২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪১। ১০ই মহরম, ১৩৬২। ১৬ই ফাল্গুন, ১৩৪৮। সুবেহ সাদিকের রক্তিমাভা পূব আকাশে দেখা দিয়েছে। সেদিন ছিল শুক্রবার। মসজিদের আজান ভোরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সময় ছিল মনোরম ও শিশির স্নিগ্ধ।

যেহেতু মহরম মাসের ১০ম তারিখে আমার জন্ম, সেইহেতু আমার নাম রাখা হয় হোসেন। হোসেন শব্দের অর্থ সুন্দর বা সৌন্দর্যময়। একই তারখে এবং একই দিবসে কারবালা যুদ্ধে শহিদ হন হজরত ইমাম হোসেন। এই দিবসটি মুসলিম জগতে নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্মরণীয় ও বরণীয় দিবসটির পবিত্রতা উপলব্ধি করে আমার নামও রাখা হয় হোসেন। অর্থাৎ আমি যেন আশীর্ব্বাদস্বরূপ এই জগতে মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছি। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আমাকে উপঢৌকন হিসাবে আমার মায়ের কোলেই প্রেরণ করেছেন। বাতাসে বাতাসে ভাসছে আনন্দধ্বনি। যে পরিবারে আমার জন্ম হয়েছে, এই পরিবারটি কৃষি পরিবার। এককালে এই পরিবারের অগাধ ভূ-সম্পত্তি ছিল। এই দিগরে ছিল বিশেষ প্রতিপত্তি। সকলেই মান্যগণ্য করতো। পদবি ছিল ম-ল। সর্বসাধারণ ‘ম-ল’ না বলে ‘মোড়ল’ বলেই ডাকাডাকি করত। সামন্ততান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থায় গ্রাম সমাজের শালিশে বিচার থেকে গ্রাম শাসনের জন্য ছিল কর্তৃত্ব। সে প্রভাব ও প্রতিপত্তির আজ বদল ঘটেছে।

আমার পিতার নাম কলিমউদ্দিন। ডাক নাম কালু। কালু ম-ল নামেই ছিলেন সমধিক পরিচিত। মায়ের নাম আরিছননেছা। পিতা ঐতিহ্যসূত্রে লাভ করেন পিতৃ প্রদত্ত ভূ-সম্পত্তি। দাদার নাম তুবন ম-ল। পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, কোম্পানী আমলের আগে এই ম-ল পরিবারটি স্থানীয় পঞ্চায়েতের মোড়ল হিসেবে ছিল একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ভূমি-ব্যবস্থার আমূল বদল ঘটলে ম-ল পরিবারের অবস্থাও বদলে যায়। এখন এই স্থানটির নাম ঝাঁটি নগর। এখানে কপোতাক্ষ নদের নীতে জিন্নিংগজ নামে একজন ইংরেজদের নীল কুঠির ছিল। ঝাঁটি শব্দটি তিনি উচ্চারণ করতেন জান্টি নামে। জায়গাটি ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের পক্ষে উপযুক্ত স্থান। জিন্নিংগজ তার নীল ব্যবসার সুবিধার্থে ক্রমান্বয়ে গ্রামের মোড়লদের একত্রিত করেন এবং নীল উৎপাদনের বিপুল প্রসার ঘটান। ঝাঁটিনগর থেকে দক্ষিণের কলারোয়া পর্যন্ত ছিল জিন্নিংগজ সাহেবের একচ্ছত্র আধিপত্য। তাঁর নীল উৎপাদন এবং ব্যবসায়ের ব্যবস্থাপনার কর্ণধার ছিলেন আর একজন ইংরেজী বণিক হেনরী ম্যাকেঞ্জি। মনিরামপুরের রাজগঞ্জেও ছিল তাদের আর একটি শাখা কুঠি।

জিন্নিংগজ সাহেব মোড়লদেরকে বড্ড খাতির করতেন। তিনি নীল আবাদের জন্য যে গ্রামে যেতেন, সেই গ্রামে মোড়লদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। এর ফলে এলাকায় মোড়ল পরিবারের প্রভাব আবার বৃদ্ধি পায়। মোড়ল বংশের বংশমর্যাদা ছিল কিন্তু বংশবৃদ্ধি ছিল না। দাদার বাবা ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র সন্তান। বংশের লোকবল না থাকলেও প্রচুর জমি থাকার কারণে এলাকার লোকজন তাকে সমীহ করত। এই বংশটি ছিল এই গ্রামের আদি পরিবার। হিন্দু-মুসলিম যারা এই গ্রামে আদি বাসিন্দা ছিল তাদের মধ্যে কোন সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ও রেষারেষি ছিলনা। ছিল বর্ণ ও বর্গ প্রথা। মুসলমানদের মধ্যেও ছিল একই রকম উচ্চ ও নিচু বর্ণের প্রচলন। গোত্রের বর্ণানুযায়ী বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের বিধি ব্যবস্থার রীতি ছিল। এই রীতিনীতির বাইরে যাওয়ার কারো ক্ষমতা ছিল না।

সমাজের কোথাও কোনো বিরোধ ও গোলমাল দেখা দিলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মোড়লরা একত্রিত বসে যে রায় দিত, তা নিঃশর্তে মানতে বাধ্য হত সকলকে। সাজা হিসাবে ছিল ‘একঘরে’ করে রাখার মৌখিক আইন। মোড়লরা যা আদেশ-নির্দেশ করতেন সেইটাই হত সমাজে বলবৎ।

নবাগত জিন্নিংগজ সাহেব নীলের কারবার করতে এসে এই বিষয়টি ভালোরকমই মনস্তাত্ত্বিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, মোড়লরাই হচ্ছে গ্রাম সমাজের প্রধান। তাদেরকে কৌশলে বাগে এনে জিন্নিংগজ সাহেব নীলের কারবারে হাত দিয়েছিলেন। তাই দাদার বাবাকে সঙ্গের সাথী করে এ গ্রামে ও গ্রামে ঘুরতেন এবং নীলের কারবার মজবুত করে তোলেন।

জিন্নিংগজ সাহেবের ইংরেজ মহলেও ছিল বিশেষ প্রভাব প্রতিপত্তি। যশোহরেই প্রথম যারা কারখানা শিল্পের পত্তন ঘটিয়েছিলেন, জিন্নিংগজ ছিলেন তাদের অন্যতম। একটি রিপোর্টের মাধ্যমে জানা যায় :

The manufacture of Indigo by British entrepreneurship began in Jessore when Bond, a free merchant established a factory at Rupdia near jessore town in 1795. He wanted to establish another factory at Alinagar near Nowapara. In the beginning of 1796 tuft, another British citizen, obtained per mission to Indigo works in Mohammad Shahi, Taylor established Indigo factories at Mirpur in 1800 and in the same year gennigs opened an Infigo factory at Jhikargacha, nine miles west of Jessore.

এই সময় কোম্পানীর শাসন ব্যবস্থায় নানারকম সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। দস্যু ও তস্করের উৎপাতে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি দেখা দিয়েছিল। সারাদেশে চলছিল অরাজকতা। প্রশাসনিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে যশোহরকে জেলা হিসাবে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। কয়েক বছর আগে যশোহরের কালেক্টর ও জজ ছিলেন হেঙ্কেল সাহেব। তখন মুরলী ছিল জেলার সদর দপ্তর। এখন হেঙ্কেল সাহেবের বদলে রোক সাহেব তার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। তিনি মুরলি থেকে পার্শ্ববর্তী সাহেবগঞ্জে দপ্তর স্থানান্তর করেছেন। বেশ একটা গোছ গোছ সহকারে প্রশাসনের সবদিক নিয়ন্ত্রণ করে চালাচ্ছেন রোক সাহেব।

জিন্নিংগজ সাহেবের সঙ্গে রোক সাহেবের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই হেতু জিন্নিংগজ সাহেবের সঙ্গে থেকে সমাজে আরো মর্যাদাবান হয়ে উঠছেন দাদার বাবা মোড়লও। কয়েক বছরের মধ্যেই মৌজার নামও বদলে গেল। ঝাঁটি নগর বলে যে জায়গাটির নাম ছিল, তার নাম হলো জিন্নিংগজা। সেইসঙ্গে আমাদের গ্রামটির নাম বদল ঘটলো। ম্যাকোঞ্জি সাহেবের নামানুসারে গ্রামটির নামকরণ হলো: ম্যাকোঞ্জিগঞ্জ। জিন্নিংগজ নামটি স্থানীয় বাসিন্দারা উচ্চারণ করত জিন্নিংগজা। জিন্নিংগজা থেকে বর্তমান রূপ নিয়েছে ঝিকরগাছা। পরবর্তীকালে ১৮৮০ সালের দিকে কলকাতা-খুলনা রেলপথ চালু হলে এখানে একটি ষ্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ষ্টেশনটির নাম ফলকে লেখা হয় : ‘ঝিংকরগাছা’। ম্যাকেঞ্জি সাহেবের নামে বর্তমান কোনো মৌজা নেই। ম্যাকেঞ্জিগঞ্জের নামের বদলে মৌজার নাম হয়েছে কৃষ্ণনগর।

দাদীর বাবা জিন্নিংগজ সাহেবের নীল চাষের জন্য ভূমি বন্দোবস্তের মধ্যস্থতা করে দিতেন। ভূমি ব্যবস্থা ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে জমিদারের অধীন। নীল চাষ করে নীল ব্যবসায়ীরা রাতারাতি ধনবান হয়ে ওঠেন। এর ফলে যত্রযত্র নীল ব্যবসায়ীদের কুঠির সংখ্যা বাড়তে থাকে। জমিদারের আওতাভূত সামান্য কিছু জমি নিয়ে সাহেবরা প্রথমে রাইয়তের সাহায্যে নীল চাষ শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যে কুঠিয়ালের সংখ্যা অধিক পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় কুঠিয়ালদের মধ্যে দেখা দেয় ভূমি দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ। প্রথম বিবাদ শুরু হয় জমির সীমানা এবং প্রজাবিলি নিয়ে। এক কুঠিয়ালের সঙ্গে আরেক কুঠিয়ালের কোনো সুসম্পর্ক ছিলনা। চারদিকে দেখা দিতে লাগলো অরাজকতা। বিভিন্ন স্থানে লেঠেল বাহিনীর হামলা-পাল্টা হামলা হতে লাগলো। অবস্থা এমন সংকটাপন্ন হয়ে উঠলো যে জিন্নিংগজ সাহেব এবং রূপদিয়ার বন্ড সাহেব যশোহরের তৎকালীন কালেক্টর থমাস পোনের দরবারে গিয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করলেন যে, বিবাদমান বিষয়টি আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হোক।

কালেক্টর সাহেব এক ইস্তাহার জারি করে জানালেন যে, এক কুঠির দশ মাইলের মধ্যে অন্য কুঠি স্থাপন করা যাবে না। এ ব্যাপারে আইন প্রণয়নের জন্যে গভর্ণর জেনারেলের নিকট তিনি সুপারিশ করলেন। গভর্ণর জেনালের জবাব দিলেন যে, এ রকম আইন প্রণয়ন করলে ২০ মাইল বা লক্ষাধিক বিঘা জমির উপর একজন নীলকরের প্রাধান্য স্থাপিত হবে। যার ফলে জমিদাররা হবেন ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।

অতএব কালেক্টর সাহেবের ইস্তেহার কার্যকর হলো না। সমস্যা আরো প্রকট হয়ে উঠলো। নীল কুঠিয়ালরা দ্বিগুণ উৎসাহে যত্রতত্র কুঠি নির্মাণ করতে লাগলেন। কয়েক বছরের মধ্যে যশোহর জেলার সমগ্র অঞ্চল নীল উৎপাদনের বৃহত্তর ক্ষেত্র হয়ে উঠলো। কৃষকদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেল। নীল ছাড়া অন্য কোন ফসল উৎপাদন করতে তারা পারত না। কৃষকরা ছিল অসহায় ও নিপীড়িত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগে মূলত কৃষকরাই ছিল জমির মালিক। নিজের চাষ করা জমির উপর তার অধিকার ছিল। সেই অধিকার থেকে কোম্পানি সরকার তাদেরকে উৎখাত করলো। ১৭৯৭ সালে লর্ড ওয়েলেসলি ‘হপ্তম আইন’ নামে একটা আইন জারি করেন। এই আইন অনুযায়ী জমিদারদের প্রজার উপর জুলুম করার অধিকার দেওয়া হয়। রোইয়তরা জুলুমের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ জানিয়েও প্রতিকার পেত না। প্রজারা যাতে আইনের সাহায্য না পায় সেই জন্যে ১৮১২ সালে সরকার আর একটি আইন পাশ করে— সেই আইনটির নাম ছিল : পঞ্চম আইন। এই আইনটি ছিল বাংলার ও কৃষক প্রজাদের মৌলিক অধিকার ও স্বার্থবিরোধী। আইনে উল্লেখ ছিল যে, জমিদার ও জমিদারের গোমস্তাদের বিরুদ্ধে মামলা মকদ্দমা করাটা দ-নীয় অপরাধ। এই আইনটি যদিও জমিদারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, তবুও জমিদাররা সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। ১৮১৯ সালে আরো একটি নতুন আইন প্রবর্তন করেন কোম্পানি সরকার। তাতে জমিদারদের নিজ জমিদারি অধঃস্তন পত্তনিদার ও দরপত্তনিদারদের মধ্যে বিলি বণ্টন করে দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এর ফলে জমিদাররা, পত্তনিদাররা, দরপত্তনিদাররা প্রজাদের উপরে শোষণের মাত্রা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকার ছিল না। দেশের মধ্যে একটা গণঅসন্তোষ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগলো।

একদিকে চলছিলো প্রজাদের উপর আইনের সাহায্যে জুলুম, অন্যদিকে চলছিলো আইন বহির্ভূত জুলুম। জমিদাররা নানা অজুহাতে চালু করেছিল বে-আইনি কর। বাংলার কৃষি অর্থনীতিতে এতে করে মারাত্মক সঙ্কট দেখা দেয়।

১৮১৯ সালে অষ্টম আইন প্রবর্তিত হওয়ার পর যশোহর জেলার মধ্যে অসংখ্য তালুকের সৃষ্টি হয়। জমিদাররা নীল কুঠিয়ালদের নিকট থেকে উচ্চহারে সেলামি নিয়ে তাদেরকে বড় বড় পত্তনি প্রদান করেন। সদর কুঠিতে বসে জিন্নিংগজ সাহেব পত্তনি জমিগুলো নিয়ন্ত্রণ করবেন।

দাদার বাবা জিন্নিংগজ সাহেবের কর্মকা-ের সহযোগিতা করলেও তিনি কখনো তার অধস্তন কর্মচারি বা আমলা ছিলেন না। ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা নির্ভীক মানুষ। সাহেবের কুঠিতে নিয়োজিত ছিল অনেক দেশীয় কর্মচারী। কর্মচারীদের মধ্যে যিনি প্রধান ছিলেন তাকে বলা হত দেওয়ান বা নায়েব। মাসিক হিসেবে তিনি পেতেন যে আমলে ৫০ টাকা বেতন। নায়েবের অধীনে ছিল একজন গোরস্তা। রাইয়তদের হিসাবপত্রের তিনিই রাখতেন। নানারকম ফন্দিফিকির করে তিনি ঘুষ গ্রহণ করতেন এবং অসৎ উপায়ে প্রচুর পয়সার মালিক হতেন।

গোমস্তা ছাড়াও ছিল আরো কর্মচারি। যিনি জমি মাপামাপি করতেন, তাবে বলা হতো আমিন। নীল ওজনের জন্য ছিল ওজনদার। যারা কুলির কাজ করতো, তাদেরকে বলা হতো জমাদার। রাইয়তদের নীলচাষের জন্য যারা গ্রামের প্রভাবশালী মোড়ল-মাতুব্বর। সাহেবের সদর কুঠিতে গিয়ে প্রায়শঃ মোড়লরা সাহেবের কাজের সহায়তা করত। সাহেবের কর্মচারিবৃন্দ তাদের কুশি করার উদ্দেশ্যেই যথার্থ খিদমত করত। শ্রেণী-বিশেষ এক একজন মোড়লের জন্য বরাদ্দ ছিল আলাদা আলাদা ব্যবস্থা।

দাদার বাবা ছিলেন রাশভারি লোক। সাহেবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মাখামাখি ছিল বটে কিন্তু কথাবার্তা বলতেন খুবই কম। একটা সমস্যা হলেই বিশেষভাবে ডাক পড়তো দাদার বাবাকে। তিনি হাজির হতেন। দুজনে বসে শলাপরামর্শ করতেন। অনেকটা নির্ভরশীল ছিলেন দাদার বাবার উপর। বিশেষভাবে কোথায় ও গোলমাল হলো তার উপরই তিনি মীমাংসার জন্য দিতেন দায়িত্ব। কোনো উদ্বেগ-উত্তেজনা দাদার বাবার মাথায় ছিল না। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তিনি তার দায়িত্ব পালন করতেন। এই কারণে তিনি ছিলেন তার প্রিয় পাত্র। জিন্নিংগজ সাহেব খুশি হয়ে এটা ওটা মাঝে মধ্যে তাকে উপঢৌকন দিতেন। তার বাড়তি কোনো চাহিদা ছিল না। না ছিল ধনদৌলতের প্রতি মোহ, না ছিল কিছু আদায়ের জন্য কোনো কামনা-বাসনা এবং আকাক্সক্ষা। তার মনের মধ্যে ছিল একটা হাহাকার। মোড়ল বংশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথার মধ্যে ছিল একটা ভয়ঙ্কর দুশ্চিন্তা। সহায় সম্পত্তি আছে। বাগ-বাগিচা আছে। শতাধিক গৃহপালিত পশু আছে। গরুর সংখ্যা প্রায় অর্ধ শতাধিক। একদিকে ছাগল আর গরু, অন্যদিকে চাষাবাদের জমি। গরু-ছাগলের জন্য খড়ের মাঠ। বড় বড় দশটি ধানের গোলা, বাড়ির বাইরের প্রাঙ্গণে মাইন্দারদের জন্য বড় একটা বৈঠকখানা। বিশাল একটা গোয়ালঘর। শতাধিক ছাগল-গরুর লম্বা-চওড়া আস্তানা। প্রাঙ্গণের আর একটা কোণে বিশাল উঁচু একটা খড় আর বিচালির গাদা।

চারজন মাইন্দারের উপর দায়িত্ব রাতের বেলা নাঙলের গরুগুলোকে জাবনা দেওয়া। গোয়ালের নান্দা বেশ বড়সড়। বাতাসে ভাসতো খৈলের টাটকা গন্ধ। প্রতিটি গরু বলবান এবং স্বাস্থ্যবান। চাষাবাদের জন্য ছিল আরো পাঁচজন মাইন্দার। কোনো অভাব-অনটন নেই। অভাব কেবল একটাই। তার কোনো পুত্র সন্তান নেই। মনের মধ্যে দারুন একটা হতাশা। সমস্ত বাড়িটা যেন শূন্য, ফাঁকা হয়ে আছে। একটা পুত্র সন্তান ছিল। বিশ বছর বয়স হতে না হতেই রক্তবমি হয়ে মারা গিয়েছে। বাড়িটা শূন্য। কোনো আনন্দ উল্লাস নেই। এত কিছু বিষয় সম্পদ থাকলেও মনটা বিষণœতায় পরিপূর্ণ। এই গ্রামের আদি বাসিন্দা ছিলো এই বাংলা। বংশের কোনো ডালপালা নেই। জাতি-গোষ্ঠী নেই। শুধু কেবল একজনই একমাত্র বংশ খ-। অন্যান্য মোড়ল বংশ এই গ্রামে দু-একঘর আছে বটে, কিন্তু তাদের সঙ্গে এই পরিবারের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। বংশের ডালপালা না থাকার কারণে ম-ল পরিবারের ঘিরে পাড়াও গড়ে ওঠেনি। গোত্র ও গোষ্ঠী প্রথাও সৃষ্টি হয়নি। মাথার মধ্যে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তা শেষ পর্যন্ত কি তার পূর্বপুরুষের রক্তের ধারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে?

একটা নৈরাজ্য ও বিষণœতা তাকে মানসিকভাবে অস্থির করে তুলেছিল। বৈষয়িক চিন্তা তার মাথার মধ্যে বিশেষ ছিল না। মাথার মধ্যে একটা মাত্র চিন্তা, ম-ল বংশ কি শেষ পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে?

তৎকালের রীতি অনুসারে চৌদ্দ বছর বয়সে আট বয়সের এক বালিকা বিয়ে করেছিলেন তিনি। বালিকা বধু বয়স যখন তেরো, তখন তার গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয় তার প্রথম পুত্র সন্তান। ষোলো বছর বয়সেই তাকে বিয়ে দিয়েছিল। সংসারে কোথাও কোনো দুঃখ বিষাদ ছিল না। ম-ল পরিবারে ছিল এক আনন্দঘন সুখময় পরিবেশ। সেই আনন্দময় সংসার এখন নিরানন্দময় হয়ে উঠেছে। সামাজিক পরিস্থিতিও কেমন ঘোরালো হয়ে উঠেছে। যেন কোথাও কোনো সুখ ও আনন্দ নেই। ক্রমান্বয়ে ম-লের মনটা আরো অশান্ত হয়ে উঠলো। সংসার ভাঙছে। পৈতৃক সমাজটাও ভাঙছে। ভূমি ব্যবস্থার বদল ঘটছে। চাষাদের জমির ওপর কোনো অধিকার নেই। জমিজমার উপর নতুন নতুন খাজনা ও করের বোঝা চেপে বসেছে। এ রকম ব্যবস্থা এর আগে কখনো ছিল না। যে জমি অনাবাদি ছিল, সে জমির কোন খাজনা ছিল না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হানি হলে জমির খাজনা মওকুফ করা হতো। সে ব্যবস্থা এখন নেই। ফসল উৎপাদন হোক আর না হোক কোম্পানি সরকারের কিছু এসে যায় না। খাজনা আদায়ের জন্য কৃষকদের উপর জুলুম করা হচ্ছে। খাজনা পরিশোধ করতে না পারায় ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে চাষাদের। এরপরেও শুরু হয়েছে নতুন আর একটা উৎপাত। কুঠিয়াল সাহেবরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে হুকুম করছেন, নীল ছাড়া অন্য কোন ফসল উৎপাদন করা যাবে না।

কুঠিয়াল সাহেবরা জমিদারের সেরেস্তা থেকে জমি পত্তনি নিয়েছেন। ভূমির মালিক এখন কুঠিয়ালরা। সাবেকী গ্রাম সমাজ অনবরত ভেঙে পড়ছে। শান্তি-শৃঙ্খলা অবনতি ঘটছে। দস্যু তস্করের সংখ্যা বাড়ছে। খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে।

কর্ণওয়ালিসের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠত হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে সঙ্কটে পড়েছে গ্রামের চাষাভুষোরা। তাঁতিদের অবস্থাও ভালো নেই। তাদের ওপরেও শুরু হয়েছে নানারকম উৎপীড়ন। সুতো তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাকুর কাজ পুরোপুরি বন্ধ। বিলাত থেকে কলের যন্ত্রে সুঁতো তৈরি হয়ে আসছে। হাতগুটিয়ে বসে আষে গ্রামের তাঁতিরা। আগে এদেশ থেকে কাপড় ওদেশে যেতো। এখন বিলাত থেকে আসছে কলের তৈরি কাপড়। হু-হু করে দাম বাড়ছে। আধ পয়সার মাল এখন এক পয়সা।  মুদ্রা বিনিময়ে লেনদেন শুরু হয়েছে। এখন বাস্তব দৃশ্য তিনবেলা দুচোখে দেখছেন মোড়ল। সবকিছু বদলে যাচ্ছে। কিছুকাল আগেও এক একটা গ্রাম ছিল কয়েকশ’ বিঘা জমি আবাদি বা অনাবাদি জমির একটা এলাকা। এই গ্রামটার প্রধান ছিল ম-ল পরিবার। ম-লের উপর ছিল গ্রাম তদারকির দায়িত্ব। ম-ল গ্রামবাসিদের মধ্যকার সকল রকম সমস্যার মীমাংসা করত। খাজনা আদায়ের কাজ করত। গ্রামবাসিদের অবস্থা ও স্বার্থ নিয়েই তিনি ভাবনা-চিন্তা করতেন। তিনিই ছিলেন গ্রামের মূলকর্তা। গ্রামের সীমানা কখনো বদলে যায়নি। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ বা মারী মড়কে গ্রামগুলো বিধ্বস্ত হলেও সেই একই নাম, একই সীমানা এবং ছিল একই স্বার্থ। একান্নবর্তী পরিবারসহ গ্রাম। কে রাষ্ট্রের সম্রাট হলো, কোন রাজশক্তির পরিবর্তে কোন রাজশক্তি সিংহাসনে বসলো, এটা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা ছিল না। গ্রাম যে একই গ্রাম। একই ম-ল। সেই গ্রামের মাথা, সেই গ্রামের অধিকর্তা। তাঁর একমাত্র দায়িত্ব হলো গ্রামবাসিদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করা এবং যথাসময়ে রাজার সেরেস্তায় জমা দেয়া। কখনো কেউ এসে জোর জুলুম করে খাজনা আদায় করেনি। এমন কি ফসলের াঠ হুকুম দখল করে নির্দিষ্ট ফসল বোনার জন্য বাধ্য করেনি।

কুঠিয়ালদের ভয়াল চেহারা দেখে মোড়ল শঙ্কিত হয়ে উঠলো। তাদের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বেশ কিছু জমি ছিল। সেই জমিগুলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিদারের অধীনে চলে গেছে। দখলিস্বত্ব ব্যবস্থা নেই। প্রতি বছর খাজনা দিতে হয় জমিদারের সেরেস্তায়। একটু হেরফের হলে জমি অন্যের হাতে চলে যায়। প্রজার এ ব্যাপারে করণীয় কিছু নেই। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সেই জমিগুলোর উপরে যে খাজনা ও বাড়তি কর ধার্য করা হয়েছে, তা জমিদারের সেরেস্তায় দিতে গিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছে মোড়লকেও। অবশেষে সেই জমিগুলো জমিদারের সেরেস্তায় গিয়ে নিজের নামে পত্তনি নিয়ে আসতে হয়েছে। সেই জমির ওপরেও সাহেবের নজর পড়েছে। দুর্ভাবনায় আছেন মোড়ল। জিন্নিংগজ সাহেবও বিষয়টি জানতেন। সব চাষারাতো নীল চাষ করছে এবং নীল চাষের জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। কিন্তু তুবন মোড়ল তো নীল চাষ করছে না? তুবন মোড়লের উচিৎ নীল চাষ করা।

জিন্নিংগজ সাহেব একদিন বললেন, মোড়ল, তোমার জমিতে কি কি ফসল উৎপাদন হয়?

মোড়ল বললেন, ধান, পাট, ছোলা, মশুরি, রবিশস্য, আলু-পটল, বেগুন, কুমড়ো, ডাটা শাক, ঝিঙে, লাউ, উচ্চে, শসা, কাঁকুড়—মটোর—।

জিন্নিংগজ সাহেব মোড়লের পিঠ চাপড়ালেন, খুবই ভালো কথা। তুমার জমিটে খুউবই ভালো ফসল হয়। ধন্যবাদ। তবে নীল চাষ করলে কেমন হয়?

মোড়ল জবাব দিলেন, সবাই যদি নীল চাষ করে, তবে খাদশস্য আবাদ করবে কারা? লোকে তো না খেয়ে মরবে— আরে, লোকে কি খাবে আর না খাবে, তার কি দরকার? টুমিও খাচ্ছো, আমরাও খাচ্ছি। খাচ্ছে তো সবাই< এটা ভাবনা-চিন্তা করে আমাদের লাভ কি? সাহেব হাসতে হাসতে বললেন।

— সাহেব তুমি কি চাও, আমিও নীল চাষ করি?

— না, না, না। এটা কথার কথা মাত্র। সাহেব আবার পিঠ চাপড়ে দিলেন। আমি বলতে চাচ্ছি যে, নীলের আবাদ করলে কেমন হয়?

— মোড়ল বললেন, এই আবাদটা আমি করতে চাচ্ছি না সাহেব।

— সাহেব হাসলেন, সবাই করছে, তুমিই বা কেন করবে না মোড়ল?

— মোড়ল জবাব দিলেন না। ঝিম মেরে সাহেবের মুখের দিকে তাকালেন। সোজা সরল মানুষ। কোনো প্যাচঘোর বোঝেন না। শুধু উপলব্ধি করলেন, সাহেব ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এসেছেন। এবার তার ঘাড়েই সওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

জিন্নিংগজ সাহেব এতকাল ছিলো এলাকার মোড়লদের প্রতি নির্ভরশীল। তাঁর নীলের কারাব মোড়লরাই শক্তি জুগিয়ে শক্ত একটা অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে। নীল উৎপাদন করে তিনি নিজে বহু টাকার মালিক হয়েছেন এবং ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন। কিন্তু চাষারা নীল চাষ করে হয়েছেন নিঃস্ব ও গরিব। তারা মানুষের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি করেছেন, সে সম্পর্ক প্রীতির সম্পর্ক নয়— স্বার্থ ও মুনাফা লাভের জন্য সম্পর্ক। জিন্নিংগজ সাহেব বললেন, মড়োল, তুমিতো আমার সেরেস্তারই প্রধান মড়োল, তুমি নীল চাষ করলে অনেক লাভবান হবে। আমিতো ভালো রকমই দরদাম দিচ্ছি। সবাই আমাকে বলছে, তোমার জমিই নীলচাষের জন্য উৎকৃষ্ট।

মোড়ল ঘাড় বাঁকিয়ে জবাব দিলেন, না সাহেব, আমার জমিতে কখনো আমি নীল চাষ করব না। আমার জমি হচ্ছে ধান চাষের জন্য উৎকৃষ্ট। নীল চাষ আমি কখনোই করব না।

মোড়ল কুঠিয়ালদের মতিগতি বুঝতেন। সাহেবদের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, সে অভিজ্ঞতা ছিল এই নীল চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক ছিল না। নীল চাষ করে যে টাকা পাওয়া যেত, তাতে উৎপাদন খরচ উঠত না। যারা নীল চাষ করত তাদের খাজনা বাবদ সাহেব কেটে রাখতেন ১০ আনা, বীজ বাবদ ১০ আনা, চাষ করত হতো ১ ্ (এক) টাকা, বুনতে চার আনা, নিড়ান দেওয়া ৮ আনা, নীল গাছ কাটা বাবদ ৪ আনা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে মোট খরচ হতো ২ টাকা ১৪ আনা। এটা ছাড়াও ছিল কুঠিয়ালদের নিকট থেকে কর্জ বাবদ টাকা নেওয়ার একরারনামার ষ্ট্যাম্প খরচ বাবদ ২ আনা।

কোনোক্রমেই নীল উৎপাদন কৃষকদের জন্য লাভজনক ছিল না। এক বিঘা জমিতে নীল উৎপাদন হতো ৮ থেকে ১২ বান্ডিল। এটা ছিল আসল হিসাব। নীল চাষ করে যে টাকা পাওয়া যেতো, তা ছিল লোকসানের নামান্তর। মোড়ল বিষয়টি ভালোরকমই উপলব্ধি করে নীল চাষ করতে চাননি। একবার নীল চাষ করলে ইচ্ছামত ধান চাষ বন্ধ করা যেত না। কুঠিয়াল সাহেবরা নানারকমভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে চাষ করার জন্য বাধ্য করত। সবকিছু বুঝেশুনে জিন্নিংগজ সাহেবের প্রস্তাবটি নাকোচ করে দিলেন মোড়ল। জিন্নিংগজ সাহেব অবাক হয়ে গেলেন। মোড়লের চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল লৌহদ-ের মত। এলাকার বাসিন্দারা তাকে সামন্ত আমলের রীতিনীতি মোতাবেক মান্যগণ্য করত। কোথাও কোনো সমস্যার উদ্ভব হলে মোড়লই ছিলেন প্রধান শালিস বিচার কর্তা। তিনি কারো প্রতিপক্ষ ছিলেন না এবং প্রতিদ্বন্দ্বিও ছিলেন না। ছিলেন কৃষক সমাজের একজন সত্যিকার হিতৈষী। ঘাড় বাঁকা করে ম-ল সেই যে ‘না’ বললেন, অনেক চেষ্টা করেও জিন্নিংগজ সাহেব আর ‘হ্যাঁ’ বলাতে পারলেন না। তবুও ক্ষিপ্ত হলেন না জিন্নিংগজ সাহেব। ক্ষিপ্ত না হওয়ার কারণ ছিল একটা। সেই কারণটা ছিল এই—–ম-ল লেখাপড়া না জানলেও বৈষয়িক বিদ্যায় ছিলেন পাকা। তিনি জোতজমির চাষ সম্পর্কে ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। সে আমলে বাঙালির মূল পেশা ছিল কৃষিকাজ। সাধারণ চাষারা না জানতো জমিজমার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব, না জানতো টাকাকড়ি নিয়ে অঙ্কের হিসেব। চাষার হদ্দ বোকার মত কেবল জমিতে খাটাখাটুনি করত। চালাক-চতুর মানুষের পাল্লায় পড়ে শুধু নাজেহাল হতো।

ম-ল শুভঙ্করের বিদ্যা অর্জন করেছিলেন। কথায় কথায় ছড়া আওড়াতেন। ছড়াতেই ছিল অঙ্ক ছড়ানো। কৃষিকাজে ব্যবহৃত সমস্ত ছড়াও যে ছিল তার মুখস্ত। যেমন :

কুড়ো বা কুড়ো বা কুড়ো নিজে

কাঠায় কুড়োবা কাঠার নিজে

কাঠায় কাঠায় ধুল পরিমাণ

বিশ ধুলে হয় কাঠার প্রমাণ।

ধুনবাকি থাকে যদি কাঠা নিলে পর

ষোলো দিয়ে পুরে তারে সড়া ক-া ধর।

এই ছড়াটির অর্থ এখন কেউ বোঝেন না। তৎকালে নিরক্ষর মানুষ এই ছড়াটির সাহায্যে জমির মাপ ঠিক করে নিতেন। ম-ল জমির হিসেব জানতে বলেই অঞ্চলের চাষারা তাকে মান্যগন্য করতেন। কোথায়ও সমস্যা দেখা দিলে ম-লকেই মধ্যমণি হিসেবে ডাকা হতো। ম-লের প্রতি ছিল সকলেরই আস্থা। তিনি ছিলেন তার এলাকার একজন বিশ্বস্ত ও সৎ ব্যক্তি। এরকম  আরো অনেক হিসেব জানতেন ম-ল–

চারিতিলে ধান হয়, চারি ধানে রতি হয়।

আট রতিতে মাসা হয়, আট মাসাতে তোলা হয় ॥

চারি তোলাতে ছটাক হয়, চারি চঠাকে পুয়া হয়।

চারি পুয়াতে সের হয়, চারি সেরে বিঘা হয়।

পাঁচ সেরে পশুরি হয়, দশ সেরে ঢোক হয় ॥

চারি চোকে মন হয়, তৌলের লেখা শুভঙ্কর হয় ॥

জমির মাপ কিছুকাল আগেও ছিল বিঘা, কাঠা, ছটাক। তিন কাঠা এগারো ছটাক এখনো কেউ কেউ লিখে থাকেন। এই ছড়ার মধ্যে প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ আছে। বর্তমানকালে এই ছড়ার বিলুপ্তি ঘটেছে। তৎকালে মক্তব এবং টোলে মানসাঙ্ক মুখস্ত করানো হতো :

জমা খরচ শিশুগণ শুন সাবধানে।

জমা বড় খরচ ছোট করিবে লিখনে ॥

বাকিতে খরচে টেকি দিয়া জমা কর।

এইমত জমা খরচ কহিলাম দড় ॥

শুভঙ্কর দাম কহে শুন শিশুগণ।

ইহাকে বুঝিলে হয় বুদ্ধি বিচক্ষণ ॥

ম-ল নিরক্ষর ছিলেন। লিখতে পড়তে পারতেন না কিন্তু তার মুখস্তবিদ্যা ছিল আশ্চর্যজনক। একবার শুনলেই মুখস্ত করে ফেলতেন। তার ছিল প্রবল স্মরণশক্তি। জিন্নিংগজ সাহেবের বয়সের তুলনায় তার বয়স ছিল প্রায় অর্ধেকেরও কম। তবুও তিনি এই লোকটিকে বিশেষভাবে মর্যাদা দান করতেন।

জিন্নিংগজ সাহেবের নীলের কারবার একটু একটু করে যখন লাভজনক পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ করে বসন্ত রোগে মারা গেলেন তিনি। তার মৃত্যুর পর কারবারের হাল ধরলেন ফার্গুসন সাহেব এবং হেনরী মেকেঞ্জি হলে সদর কুঠির অধ্যক্ষ। ফার্গুসন সাহেব নীল চাষীদের প্রতি অত্যাচার ও নির্যাতন করতেন। জোরজুলুম করে চাষীদের নীল চাষ করতে বাধ্য করতেন। যারা তার নির্দেশ মানতো না— তাদেরকে তিনি শায়েস্তা করতেন তার পোষ্য লাঠিয়াল বাহিনী পাঠিয়ে। এর ফলে প্রতিটি গ্রামের চাষারা সশস্ত্র হয়ে উঠলো। ম-লের বাড়িতে এসে প্রতিকারের জন্য দেন-দরবার করতে লাগলো। ফার্গুসন সাহেবের ধারণা হলো যে, তুবন ম-লের ইঙ্গিতেই চাষারা নীল চাষ করতে অস্বীকার করছে।

কয়েকজন গৃহস্থ কৃষক আদালতে গিয়ে অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে মামলা দায়ের করে এলো। মামলার ফলাফল শূন্য। বিচারকের পাশে বসতেন কুঠিয়াল সাহেব। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতো ফরিয়াদিগন। রায় চলে যেতো কুঠিয়াল সাহেবের পক্ষে।

মন্ডলের পরামর্শ কোন কাজে আসত না। শুধু ম-লই নয়— অনেকেরই মানসম্মান বাঁচানো কঠিন হয়ে উঠলো। এর পরিণতি হলো এই যে, চাষীরা কুঠিয়ালদের অত্যাচারে গৃহবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে লাগলো। কয়েক মাসর মধ্যেই বুঝতে পারলেন ম-ল, এলাকার জোতজমি কৃষিক্ষেত সবকিছুই কুঠিয়ালরা একে একে গ্রাস করে নিয়েছে।

চাষাদের মধ্যে বিশাল একটা আতঙ্ক। পুরানো রীতিনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যারা যারা পুরানো আমলের জমিদার ছিলেন, তাদের অবস্থা আরো সঙ্কটাপন্ন। এই এলাকাটি ছিল চছাচড়ার জমিদারের অধীন। পরগনা সৈদপুর। প্রজারা জমিদারকে রাজা হিসাবে ভক্তি করতেন। এখন বর্তমান রাজা শ্রীকান্ত রায়ও বিপদগ্রস্ত। কোম্পানী সরকারকে তিনি বাড়তি রাজস্ব দিতে না পারায় তিরিশ হাজার টাকা দায়গ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ক্রমান্বয়ে রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তার হাত থেকে জমিদারি চলে যাচ্ছে। একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন শ্রীকান্ত রায়। কোম্পানি সরকার তার বার্ষিক রাজস্ব ধার্য করেছিল ৩ (তিন) লক্ষ টাকা। রাজার অবস্থান যখন নড়বড়ে, তখন কৃষকদের অবস্থান আরো বিধ্বস্ত। পায়ের তলার মাটি ধ্বসে পড়ছে। কোথায় গিয়ে যে একটু মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, সে বল ভরসা নেই। মাথাটা দুশ্চিন্তায় নিচু হয়ে যাচ্ছে।

আরো অনেক অনেক দুঃসংবাদ কানে আসতে লাগলো মোড়লের। শুধু যশোহরের রাজা শ্রীকান্ত নয়— নদীয়ার রাজারও একই হাল হয়েছে। দিনাজপুরের রাজবংশেরও একই অবস্থা। শোনা যেতে লাগলো, রাজপুরীর মহিলারা দেনার দায়ে রাজবাড়ির বাইরে বেরোতে পারছেন না। নাটোরের রানী ও রাজাকে রাজবাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়েছে। কোথায় কোথায়ও অসন্তোষ দানা বেধে উঠছে। এক একটা দিন যাচ্ছে, ম-লের মনও বিষণœতায় আক্রান্ত হচ্ছে। এ জীবনে অনেক কিছুই দেখেছে ম-ল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে বিগত আমলের অনেক ঘটনাবলী। নিজ চোখে তিনি দেখেছেন সেই নবাবী আমল, সেই সামন্ত সমাজ, চাষাদের জোতজমি হারানোর কোনো শঙ্কা নেই। জমিহারা হয়ে দেশান্তরী হওয়ারও কারণ নেই। দুর্যোগে ফসল নষ্ট হয়ে গেলে খাজনা আদায়ের জন্য কোনো কালে কোনো শাসকের জোরজবরদস্তি ছিল না। চাষারা জোতজমি চাষাাবাদ নিয়েই ছিল ব্যতিব্যস্ত। রাজার কাজ রাজা করেছেন, চাষারা করেছে জমি আবাদের কাজ। নগদ অর্থের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এখন অর্থই হয়ে উঠেছে অনর্থের মূল। কোম্পানি অর্থ ছাড়া আর কোনোকিছুই চেনে না। বাংলার কৃষি ব্যবস্থা এবং বাংলার গ্রাম সমাজের শাসন ব্যবস্থা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে। ঘরের বারান্দর বসে ম-ল এই ধ্বংসের দৃশ্য দুই চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। তিনি যে শুভঙ্করী অঙ্ক শিখেছিলেন, সেই অঙ্কের সঙ্গে বর্তমানের হিসেব কিছুতেই মিলাতে পারছেন না। না মিলছে জোতজমির হিসেব, না মিলছে জীবন যাপনের হিসেব। বারবার হিসেব মিলাতে গিয়ে তিনি হিমসিম খাচ্ছেন। জমিই যখন কৃষকের অধিকারে নেই— তখন কিসের হিসেব? তবুও তিনি মনে মনে হিসেব করেন :

কুড়োবা কুড়ো বা কুড়ো লিজ্যে

কাঠায় কুড়ো বা কাঠার লিজ্যে ॥

কাঠায় কাঠায় ধুল পরিমাণ

বিশ ধুলে হয় কাঠার প্রমাণ ॥

ধুল বাকি থাকে যদি কাঠা নিলে পর

ষোলো দিয়ে পুরে তারে সড়া গ-া ধর ॥

নাহ, এই অঙ্কের সঙ্গে কোনোকিছুই মিলছে না।

সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পুঁজিতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের কোনো মিল নেই। ম-লও মিল খুঁজে পাননি। সামাজিক মর্যাদা ছিল ভূমিকেন্দ্রিক। ছিলেন গ্রাম সমাজের শাসক। সেই শাসন ব্যবস্থায় ঘুণ ধরেছে। পারিবারিক আভিজাত্যে ধ্বস নেমেছে। ঠাঁটবাট, চোটপাট, হুকুমদারি মেজাজ ছিল বংশগত। এখন কোম্পানি দখলদারি প্রতিষ্ঠা করে একচেটিয়া ধনসম্পদের মালিক। সর্বক্ষেত্রেই চালাচ্ছে লুটপাট। মানুষের উপর লুটপাট, ভূমির উপর লুটপাট। কারবারে লুটপাট। স্থলপথে লুটপাট। জনপথে লুটপাট। সাবেকী রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সাবেকী সমাজ ব্যবস্থা নিজেদের স্বার্থে কোম্পানি ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়েছে। এইসব দৃশ্য তবুও দেখছেন ম-ল। একটা হতাশা মাথার খোঁড়লে ঢুকে গুরপাক খাচ্ছে।

তুবল সাহেব সমাচার

সম্ভবত বাংলা সন ১২৪০, ২৫শে অগ্রহায়ণ, ম-লের একপুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলো। দলিল দস্তাবেজ থেকে জানা যায় যে, এই পুত্র সন্তানটির নাম কোথাও কোথাও লেখা আছে তুরফান ম-ল, কোথাও কোথাও লেখা আছে তুফান ম-ল এবং কোথাও কোথাও লেখা আছে তুবন ম-ল। একই ব্যক্তির তিনটি নাম। জন্ম তারিখটা নিয়েও মতভেদ আছে। তৎকালে বয়স হিসেব করা হতো বিশেষ বিশেষ ঘটনাকে সাক্ষী রেখে। বন্যা, মড়ক, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রাজায় রাজায় যুদ্ধের ঘটনা ছিল সাক্ষী। প্রাচীনরা আঙুলে হিসেব করে বলতেন, সেবার বন্যায় তল্লাট ডুবে গিয়েছিল, কিংবা মহাদুর্যোগে বাড়িঘরদোর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল অথবা মড়ক মহামারিতে এলাকা বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছিল, তার কয়েক বছর আগে এবং কয়েক বছর পরে অমুকের জন্ম। এটাই ছিল জন্মের মৌখিক হিসেব। এর বেশি জানার উপায় নেই। কোন মাসে জন্মেছে, এই মাসটিই ছিল নির্ভুল। তবে তারিখটা নিয়েছিল নানারকম গোলমাল। মাসের ৭ দিন, না ১৫ দিন, না ২৪ দিন, এটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। তুরফান ম-ল বা তুফান ম-ল বা তুবন মন্ডলের সঠিক জন্মসন নিয়ে গোলমাল থাকলেও থাকতে পারে। কারণ চাষাভুষোরা লেখাপড়া জানবে না। অতএব, লিখেও রাখতো না। স্মরণশক্তির উপর বিষয়টি ছিল নির্ভরশীল।

ওই সময় ম-লের বয়স কত বছর ছিল, এটাও কেউ বলতে পারেন না। তবে বুঝা যায় যে, তিনি দীর্ঘজীবী ছিলেন। বয়স হেলে পড়লেও শরীরটা গাট্টাগোট্টা ছিল। সর্ষে তেলে মালিশ করা দেহটা মজবুত ছিল। পুত্র সন্তানের আবির্ভাবের সংবাদ শুনে উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন। নাবিকাতাড়ে একটা ছেলে হয়েছে, বংশের মর্যাদা রক্ষা করতে যে পেরেছেন, এটাই ছিল তার কাছে মহানন্দ। ছয় রাতের দিন ছেলের মঙ্গল কামনা করে তৎকালের রীতি অনুসারে সাড়ম্বরে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। খুশিতে গৃহবাড়ি মুখরিত হয়ে উঠেছিল। গৃহে ভেন্নার তেলের মধ্যে ল্যাকড়া ডুবিয়ে প্রতিটি ঘর আলোক সজ্জিত করে তোলা হয়েছিল। পরী ফকিরের দর্গায় গিয়ে মোরগ জবাই করে ভাত রেঁধে মানত দেওয়া হয়েছিল। গ্রামের মুরব্বিরা এসে ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দোওয়া দরুদ পড়ে আশীর্ব্বাদ করে গিয়েছিল। বাড়ীতে চলেছিল সারা রাত মচ্ছব। এটা কোনো ধর্মীয় উৎসব ছিলনা— এটা ছিল সামাজিক উৎসব। সকলেই বিশ্বাস করতো কোনো এক ফকিরের কেরামতি ছিল জন্মের ব্যাপারে। বিবিজানের কোমরে বাঁধা ছিল একটা রুপোর মান্দুলি। প্রতিদিন নিয়ম করে খেতে হয়েছে তিনবেলা মুরগির ডিম, কালো জিরে আর পানি পড়া। এটা ছাড়াও ছিল নানারকম তুকতাক। হুগলির ইমামবাড়াতেও গিয়ে নাকি মানত করে আসতে হয়েছে। অনেক কান্নাকাটি আর সাধ্যসাধনার পর এই ছেলেটির জন্ম।

দু’হাত উজাড় করে গরিব-দুঃখিদের মধ্যে কড়ি বিতরণ করলেন ম-ল। মানুষের দোওয়ার বরকতে এই শিশুর জন্ম। ছয়মাস পরে শিশুটা একটু নাদুস নুদুস হয়ে উঠলো।

বিবিজান হুকুম করলেন, মিয়া, আল্লার ওয়াস্তে ইবনে খোকার জন্যি আকিকার ব্যবস্থা করো। আমার সোনা মানিকের হায়াত দরাজ হোক। আমি ওর নামে দুটি খাসি ছাগল কুরবানি কত্তি চাই। প্রত্যেক ঘরে ঘরে গোন্ড বিলিয়ে দিতি চাই। মিয়া বললেন, শুকুর আলহামদোলিল্লাহ। তোমার সাধ আহলাদ, আমি পূরণ করব বিবিজান। বংশের মান-ইজ্জত রক্ষা করতে যা কিছু করণীয় কোনোটিই বাদ দোব না।

জাঁকজমক করে আকিকা দিয়েছিলেন ম-ল। যে ফকির বাবাজির মুরিদ হয়েছিলেন ম-ল, সেই ফকির বাবাকে ডেকে এনে আকিকার ব্যবস্থা করেছিলেন। ফকির বাবাজি তুকতাক পড়া একটি রূপার তাবিজ ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন সোনা মানিকের গলায়। তারপর দোয়া পাঠ করেন, হে আল্লাহ, আকিকাটি ম-লের ছেলে তুরফান-এর রক্ত, গোশত, হাড়, চামড়া এবং পশমের পরিবর্তে খাসি, ছাগল দুটির রক্ত, গোশত, হাড়, চামড়া এবং পশম দোজখের আগুনে সদকা করে দাও। অতপর বিসমিল্লাহ আল্লাহ আকবার উচ্চারণ করে জবাইয়ের কাজ করেন। সোনা মানিককে কোলের উপরে বসিয়ে মুখের মধ্যে রান্না করা ভাত যতœ করে খাওয়ালেন। ফকির বললেন, ম-ল, আপনার এই ছেলে একদিন কেউ কেন্ডা হবে। ম-ল বংশের নাম রাখবে। গলায় যে তাবিজটা ঝুলিয়ে দেওয়া হলো, এটা যেন কেউ ছিঁড়ে না ফেলে। এই বিষয়ে যে রকম চোটপাট দেখছি— বড় হলি না জানি আরা কি হবে।

ম-ল হাসলেন, আপনার দোয়া—

ফকির বাবা নিজের থুতনির উপর ঝুলে পড়া দাড়িতে ঘনঘন হাত বুলোলেন, এই ছেলে আপনার বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে ম-ল।

ফকির যে ভবিষ্যবাণী করেছিলে, ভবিষ্যতে তাই ফলে গেলো। ম-লের এদিক ওদিক যাওয়ার জন্যে একটা বলশালী ঘোড়া ছিল। অল্প বয়সেই সেই ঘোড়ার পিঠে চড়ে তুরফান ঘোড়াটাকে বশ করে ফেললো। এই ঘোড়াটা ছিল দারুণ চঞ্চল। কাউকে সে কাছে ঘেঁষতে দিত না। লাফ’াফ আর লাথি মেরে সওয়ারকে ছিটকে ফেলে দিত। এমন কি ম-লকেও সেবা করার ফলে দিব্যি শান্ত মেজাজের হয়ে উঠলো। তবে তুরফান ছাড়া অন্য কাউকে সে একটুও পাত্তা দিত না।

তখন এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ নয়। চাষাবাদের জমি ছাড়াও ছিল উঁচু খড়ের ভুঁই। মাঠের একটা নাম ছিল। শিয়ালখালির মাঠ। অচিনতলার মাঠ। খয়রামারির মাঠ। ভূতুড়ের মাঠ। মাঠের চারদিকে ঝোপঝাড় আর সেখানে বন্যজন্তুরা থাকে। রাতের বেলা পুরো তল্লাটে বন্যজন্তুর ডাকের শব্দ শোনা যায়। কেউ ঘর থেকে বেরোতে সাহস করে না। মাঝে মাঝে বন্য-বরাহ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে গ্রামের মধ্যে হানা দেয়।

তুরফান ইদানীং দক্ষ শিকারী হয়ে উঠেছে। তার বয়েসী যুবকদের নিয়ে রাতের বেলা ফাঁদ পেতে জীবজন্তু শিকার করে। গ্রামের মধ্যস্থলে একখ- অনাবাদি জমি। সেখানে তুরফান তার দলবল নিয়ে গিয়ে লাঠি খেলা আর কুস্তি খেলা করে। এর মধ্যে কুস্তিতে তুরফান বেশ পাকাপোক্ত হয়ে উঠেছে। হা-ডু-ডু খেলায়ও সে এখন সেরা। চারপাশের গ্রামগুলোর যুবকরাও তুরফানের ভক্ত হয়ে উঠেছে। ভূড়িহীন বলিষ্ঠ দেহ। লম্বা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাত। দেহের রং শ্যামলা। মাথায় বাবরি চুল। চোয়াল পর্যন্ত চওড়া জুলফি। ঠোঁটের নিচেই মোটা গোপ। পরনে সাদা ধুতি। হাঁটু এস্তেক বেড়। ধুতির একটা অংশ দিয়ে ঘাড়টা পেঁচানা। হাঁটলেই বুঝা যায় একজন বলিষ্ঠ পুরুষ হাঁটছে।

এই হেন তুরফানের বলিষ্ঠ দেহটা কেদিন নজরে পড়ে গেল মেকোঞ্জি সাহেবের। ঘোড়া দাবড়িয়ে তিনি দূরের এক গ্রাম থেকে দলবল নিয়ে সদর কুঠিতে ফিরছিলেন। সাহেব ওর বলিষ্ঠ শরীর দেখে অবাক হয়ে গেলেন। কে এই যুবক? কিছুই মালুম করতে পারলেন না সাহেব।

জমি মাপার আমিন সাহেবের কাছে এগিয়ে গেলেন।

— টুমি কি জানো, এই ছোকরাটা কে?

— পি সাহাব, আমি ওকে চিনি। ও আমাদের ম-লের ছেলে।

— ম-ল, কোন ম-ল?

— সাহাব, আমাদের ম-ল।

— মোড়লের বাচ্চা এত বড় হলো কবে?

— হা সাহাব, বড় হয়ে গেছে।

সাহেব ঘোড়ায় উঠলেন। দলবল নিয়ে সদর কুঠিতে চলে গেলেন।

যে সময়ের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে— ওই সময়ে হেনরি মেকিঞ্জি শুধু ঝিকরগাছা নীলকুঠির কুঠিয়াল ছিলেন না— ছিলেন পাঁচপুরা নীলকুঠির কুঠিয়ালও। ফার্গুসন সাহেব থাকতেন কলকাতায়। তিনিও মাঝে মাঝে এসে ব্যবসার তদারকি করে যেতেন। সময়টা ছিল নীল ব্যবসায়ের স্বর্ণকাল। যশোর ও নদীয়ার উৎপাদিত নীল ছিল পৃথিবীর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট। জগৎজোড়া ছিল এই নীলের চাহিদা। একটি রিপোর্টে এ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘The Indigo manufactured in this side of India is of prime quality and that of lower Bengal, especially which is produced in district of Noddea and Jessore, is probably the very finest in the whole world (para-12, P-21).-Bengal under the lieutenant Governors (VOL.I, P-258).s

যশোর-নদীয়ায় উৎকৃষ্ট নীল উৎপাদিত হলেও নীল ব্যবসায়ে প্রচুর অর্থ কামিয়েছেন কুঠিয়ালরা, কৃষকরা হয়েছেন শোষিত এবং নিঃস্ব। শুধু তাই নয়-কুঠিয়ালদের নিকট তারা দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই দেনা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। দেনার দায়ে তারা কুঠিয়ালদের কয়েকখানায় বন্দি হয়ে নির্যাতন ভোগ করেও রক্ষা পায়নি।

হেনরি মেকিঞ্জির এই হেনকর্মের কারণে কৃষকরা নীল চাষ করা বন্ধ করে দেয়। এমনকি মেকিঞ্জির বিরুদ্ধে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আদালতেও ফৌজদারি মামলা দায়ের করে। এতে করে আরো হিংস্র হয়ে ওঠেন হেনরি মেকিঞ্জি।

তখন এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যাতায়াতের সুব্যবস্থা ছিল না। দূরবর্তী অঞ্চলগুলো ছিল চলাচলের জন্য বিপজ্জনক। যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ।

******************************************************

ধা রা বা হি ক  র চ না

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব

সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব ৬
মুহাম্মদ হাসান ইমাম
                                                                                                               
[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয় দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে— এমন প্রত্যাশা নিয়েই এটি মুদ্রিত হচ্ছে।— সম্পা.]
                                                                                                                                            
অ্যাডর্নো তাঁর প্রবন্ধের শেষে বলেন, In so far as the culture industry arouses a feeling of well-being that the world is precisely in that order suggested by the culture industry, the substitute gratification which prepares for human being  cheat them out of the same happiness which it deceitfully project. The total effect of the culture industry  is one of the anti-enlightenment, in which as Horkheimer, and I have noted, enlightenment, that is the progressive technical domination of nature, becomes much deception and is turned into a means for fettering consciousness. It impedes the development of autonomous, independent individuals who judge and decide consciously for themselves.. ১ অ্যাডর্নোর এই পরিসমাপ্তিকালীন বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, গণতান্ত্রিক সমাজে সত্যিকার নাগরিক সচেতনতার জন্য এমন উপলব্ধি একান্তভাবে আবশ্যক।

সংগীত একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। এটি আমাদের ভাবকে প্রকাশ করতে যেমন সাহায্য করে, তেমনি অন্যের ভাবকে গ্রহণ করারও সুযোগ করে দেয়। আর শুধু গ্রহণ এবং প্রকাশেই এর সমাপ্তি নয়, সংগীতের সাধন আমাদের চিত্ত-বিনোদনের এক অপরিসীম আধার। আমাদের সচেতনতা, বুদ্ধির বিকাশ, মানবিকতার স্ফুরণ ও আবেগের পরিপক্বতার বিষয়গুলোকে সংগীত দারুণভাবে পরিশুদ্ধ করে। সংগীতের ইতিহাসের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, শুদ্ধ সংগীতের বিকাশ ঘটেছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রাকারকেন্দ্রিক পরিবেশে। ইউরোপে যেমন চার্চকেন্দ্রিক সংগীত একটি ধর্মানুভূতির বাতাবরণের বিভিন্ন রকম পরিবর্তনের ধারা বেয়ে সাধারণ্যে নেমে আসে; ভারতে সংগীত শিল্পীরা রাজ-রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সংগীতচর্চা করে আসেন শতাব্দীর পর শতাব্দী। তবে একেবারেই সাধারণ লোকচর্চার পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের গানের উৎপত্তি হতে দেখা যায়, যার সাথে মাটি ও মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি একাকার হয়ে আছে। এগুলো এক সময়ের যাত্রা, নাটক, রঙ্গমঞ্চে গৃহীত হয় এবং অপেক্ষাকৃত দীর্ঘসময় টিকে থাকে। এছাড়া ভাব-সংগীতের বিভিন্ন অলিগলিতে গীতিকারের সচেষ্ট সাধনায় অনেকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিভার গুণে এক ধরনের গান ভক্ত শ্রোতাদের বদৌলতে টিকে থাকে। যেটুকু টিকে থাকে, সেটুকুর অনুসন্ধান ও  মূল্যায়ন হয়তো সম্ভব হয়; আর যেটুকু টিকে থাকেনি তা সম্পর্কে জানাও অসম্ভব। তবে আজকের দিনে সংগীতের সমৃদ্ধি ও আয়োজন অনেক ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী। সংগীতকে অন্তত এখন আমরা শ্রেণিভেদে সমাদর ও মূল্যায়ন করে থাকি। একথাও সত্য যে, আজকে সংগীতে বিভিন্ন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এই পরীক্ষায় অনেক সময় শব্দের (ংড়ঁহফ) মাত্রা আমাদের সহজাত সীমানা পেরিয়ে যায়। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মানুষের বা সাধারণ শ্রোতাদের মধ্যে দারুণ বিভক্তি লক্ষ করা যায়। যারা গান করে আর যারা গান শোনেন শুধু তাদের মধ্যেই নয়, বৃহত্তর সুধীমহলে অনেক সময় বর্তমান গানের উচ্চস্বর ও বাজনা শ্রুতিকটু মনে হয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা সঙ্গীতবিজ্ঞানী নন। কিন্তু সমাজ ও সঙ্গীতের সম্পর্ক তাদের কাছে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। সংগীত সমাজকে কতোভাবে প্রভাবিত করে সেটি যেমন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সমাজ কিভাবে সংগীতের উৎপত্তি ও বিকাশকে প্রণোদনা দেয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ শতকের প্রেক্ষাপটে বলা যায় সংগীতের সমাজতত্ত্ব একটি পা-িত্যপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা যায়। সংগীত নিয়ে সঙ্গীতের মনস্তত্ত্ব, সঙ্গীতের নন্দনতত্ত্ব, সংগীতের শিল্পতত্ত্ব, সংগীতের দর্শন এমনকি সংগীতের পদার্থ-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ক্রমাগতভাবে সংগীতকে একটি বহুশাস্ত্রীয় বা গবেষণার বিষয় করে তুলেছে। সে কারণেই সংগীতের সমাজবিজ্ঞানী দার্শনিক অ্যাডর্নোর আবির্ভাব ও অবদান বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।

একজন কম্পোজার, সতীর্থ সমালোচকদের সহচার্য ও সাংস্কৃৃতিক সংযোগ অ্যাডর্নোকে সংগীত বিষয়ক পা-িত্য লাভে উৎসাহিত করেছিল। তার সঙ্গত সম্পর্কীয় তত্ত্ব প্রদানের সময়কে বিশ শতকের প্রথমার্ধ ধরা হয়। বিভিন্ন ধরনের ক্রুটি-বিচ্যুতি ও অস্পষ্টতা সত্ত্বেও অ্যাডর্নো সংগীতের সমাজতত্ত্ব প্রদানে প্রধান গুরু হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন।২ মায়ের কাছে হাতেখড়ি পাওয়া সংগীতকে প্রথম থেকেই দার্শনিকভাবে দেখার চেয়ে আন্তরিকভাবে শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। অ্যাডর্নোর দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক সংগীত বিশ্লেষণ যে বিষয়টিকে প্রধানত গুরুত্ব প্রদান করে তা হলো সংগীতের গতিময়তা ও মাধ্যমগত প্রকৃতি। তার আলোচনায় এসেছে সংগীতের ক্ষমতা; ভালো অথবা মন্দ যেভাবেই হোক না কেনো সংগীত আমাদের সচেতনতাকে রূপান্তর করতে পারে। অ্যাডর্নোর মতে, সামাজিক-সাঙ্গীতিক অনুসন্ধান ব্যাপক বিষয়বস্তুকে হাজির করে। জ্ঞানের দর্শন ও সমাজতত্ত্ব, সচেতনার দর্শন ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, সামাজিক সংহতি আধিপত্য ও দাসত্বের ইতিহাস তাই এই ব্যাপক পরিধির মধ্যে চলে আসে। অ্যাডর্নোর সংগীত বিষয়ক আলোচনা জানতে হলে এই ব্যাপক বিষয়-পরিধি প্রেক্ষাপট জানা দরকার।

অ্যাডর্নোর নেতিবাচকতার প্রকৃতিটা এরকম যে তিনি দীপ্তিযুগের যুক্তিবাদকে যথাযথ পথে অগ্রসর ও অনুসরিত হয় নি বলে মনে করেন। মানুষের এই ব্যর্থতা পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে বিশ শতকে ফ্যাসিজমের উত্থান, গণহত্যা, সন্ত্রাস ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যাডর্নোর মতে সচেতনতার রূপান্তর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের দিকেই অগ্রসর হয়েছিলো। সে কারণে অ্যাডর্নো দীপ্তিযুগের বহু প্রশংসিত যুক্তিকে তার দার্শনিক ব্যাখ্যায় তুলে ধরেন। অ্যাডর্নোর এমনতর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গভীরভাবে জানা প্রয়োজন। কারণ তার অনেক  আলোচনাতেই এই বিষয়টি প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছিল।৩ ডেনোরা বলেন,

Adorn’s critique of reason centre’s on the idea that Material reality is more complex than the ideas and concepts available for describing it. Reality-by which Adorno meant not only nature but also the specificity of lived experience-can’t be fully addressed by words, measurement concepts, and categories, all of which must be understood, at best as approximations of reality, as socially constituted ideas or images, of phenomena. In this respect, Adorno was, and remained throughout his life, a materialist and a philosopher of the actual. His work highlighted the disjunction between ideas and material reality, a within which the former might be useful, Indeed, even `effective’, but never be eternally or comprehensively ‘true’.

আসলে অ্যাডর্নো মনে করেন, আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে সমতা বিধান বিপদজনক। এ ধরনের বিপদ অ্যাডর্নোর মতে, আধুনিক সমাজে পণ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্যে লক্ষ করা যায়। একেই সম্ভবত অন্যের মধ্যে মূল্যের ধারণা ব্যক্ত করে। বিশ শতকে আসলে যুক্তির অতি ধারণা ও বাস্তবতার চেয়ে অবাস্তবতা ব্যক্ত করে। বিজ্ঞানের উপর আমাদের অগাধ আস্থা  এরকম একটা উদাহরণ। সুতরাং আজকের দিনে দর্শনের আর প্রধান কাজ হবে বাস্তবতার সাথে যুক্তির সমন্বয়হীনতাকে তুলে ধরা। মার্কস ও হেগেলের মতো অ্যাডর্নো বাস্তবতা সম্পর্কে কোনো ইতিবাচক জ্ঞান প্রদানে আন্তরিক ছিলেন না। তিনি কোনো ইউটোপিয়ার ধারণা ও প্রশ্ন করতেন না। বরং পাথর্ক্য ও বিরোধিতাকেই তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। তিনি মনে করেন এভাবেই চিন্তার শুদ্ধি সম্ভব। সুতরাং তার নেতিবাচক দ্বন্দ্ব-যুক্তির আত্মসমালোচনার সমার্থক।৫

অ্যাডর্নোর দর্শন সংগীতকে দর্শনের পর্যায়ভুক্ত করে এবং একইসাথে দর্শনকেও সংগীতের সমান মহিমায় আসীন করে। বিষয়টি একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক সমর্থিত হতে দেখা যায়।৬ সংগীত একটি সাংস্কৃতিক দিক যার মধ্য দিয়ে সামাজিক ও প্রতীতিগত প্রবণতা ফুটে ওঠে। সংগীত সম্পাদন একটি কর্মসম্পাদনের উপায় বলা যায়। সে অর্থে সংগীত সম্পাদনে কিছু বস্তু সমাহারের প্রয়োজন হয়। যেমন কণ্ঠস্বর, কণ্ঠস্বরের বিভিন্ন ধরণ, প্রেষণা, চিন্তা, দ্বন্দ্ব প্রভৃতি। এছাড়া রয়েছে সাক্সোফোন, ভাইব্রেটো, বেহালা, হারমোনিয়াম প্রভৃতি যন্ত্রের ব্যবহার। সংগীত সম্পাদন একটি সামাজিক বিষয়, কারণ এটি করতে সামাজিক মানুষের অংশগ্রহণ ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন দরকার হয়। অ্যাডর্নো মনে করেন এটি একটি রাজনৈতিক কর্মকা-ও বটে। যদিও বিষয়গুলো বির্তকের উর্ধ্বে নয়, তবে সংগীতের আনুষ্ঠানিক গুণাগুণ ও সংগীত সংকলকের সম্পাদনের গুণাগুণ দুটি আলাদা বিষয় হিসেবে মনে রাখা দরকার। অ্যাডর্নোর মতে সংগীত দুটি চেতনাগত কাজ সম্পন্ন করে আর এ দুটি কাজ আমাদের অবচেতন্যেই সম্পাদিত হয়। প্রথমটি হলো সামাজিক সমগ্রকে বিষয় হিসেবে অঙ্কিত করা; এখানে সংগীত মানুষকে সামাজিক দুর্দশা সম্পর্কে অবহিত করতে পারে। সংগীতের দ্বিতীয় কাজটি বিমূর্ত কার্যধারার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। সংগীত নির্ধারণ করে কিভাবে অংশ ও সমগ্রের মধ্যে সম্পর্ক অনুধাবিত হবে। এমন কাজের মধ্য দিয়ে সংগীত দেখিয়ে দেয় যে সামাজিক ও চেতনাগত সমগ্রের প্রেক্ষাপটে বিষয় (subject/being) ও বস্তু (material/nature) সম্পর্ক কী দাঁড়াবে।

সংগীতের ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে বাস্তবের সুন্দর সমন্বয় একক কণ্ঠস্বরের বিপরীতে এমন হওয়া উচিত যাতে তা সমষ্টিগত ঐক্যেও সুর ধ্বনিত করে। এই প্রসঙ্গে ডেনোরার বক্তব্যটি উল্লেখ করা যায় : A ‘good’  harmonisation, by contrast would be attentive to the needs of all the voices so that the ‘whole’ could be seen to emerge from a judicious arrangement of the parts. In such a composition, then, one might speak of the music as analogous to a collective ideal৭ অ্যাডর্নোর আরো বলেন যে, উপর্যুক্ত উদাহরণ থেকে কল্পনা করা যায় যে সাঙ্গীতিক সম্পর্ক কিভাবে সামাজিক সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষত (সমষ্টির আদর্শ) হিসেবে। সুতরাং অ্যাডর্নোর সংগীত ভাবনার গভীরতা এখানে সুস্পষ্ট। আসলে অ্যাডর্নো সংগীত নিয়ে নয় সংগীতের গঠন নিয়ে ভাবিত ছিলেন। অর্থাৎ সংগীতে কী কী উপাদানের সংমিশ্রণ ঘটে এবং কিভাবে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে, কীভাবে সংগীত অনুশীলন করা শুরু, এর জন্য কী ধরনের আনুষ্ঠানিক আয়োজনের প্রয়োজন হয়, সেটি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। অ্যাডর্নো সংগীত ইতিহাসের চালিকাশক্তিকে ধরার চেষ্টা করেন।

আসলে অ্যাডর্নো এমন একটি সময়ে সংগীতসহ অন্যান্য শিল্পকলা পর্যবেক্ষণ করেছেন যখন একটি সর্বব্যাপী পুঁজিবাদের রূপান্তর সবকিছুকে পণ্যে পরিণত করছিলো। সমাজে একতরফা যৌক্তিক— কৌশলগত পণ্যভিত্তিক পুঁজিবাদ এক ধরনের সমগ্রকতাবাদ ও অনান্দনিকতার বিষবাষ্প কালচার ইন্ডাস্ট্রি, হলিউড, বিজ্ঞাপন সংস্থা, ললিপপ মিউজিক কনসার্ট, জ্যাজ, রেডিও ও টেলিভিশনসহ সবকিছুকে ছেয়ে ফেলেছে। তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক সমাজতত্ত্ব একদিকে যেমন জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিষয়াবলী অবলোকন করেছে, অপরদিকে আভঁ গার্দ মিউজিশিানদেরকেও দেখেছেন। সংগীতকে আবার তিনি দুইভাবে ভাগ করেছেন। সত্যিকার সংগীত তার চর্চা ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে উচ্চমার্গীয় অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। এবং পুঁজিবাদেও ভুক্তভোগী আর্ত মানুষের কথা তুলে ধরে। আরেক গোছের সংগীত ঐতিহাসিকভাবে আরোপিত দাবিকে অস্বীকার করে সংগীতকে পশ্চাৎপদ অবস্থানে নিয়ে যায়। অ্যাডর্নো এই জাতের সংগীত সাধনাকে সুস্পষ্টভাবে শাণিত সংগীত সাধনার বিপক্ষে বলে মন্তব্য করেছেন। এসব সংগীত বিবর্তন ও বিচ্ছিন্নতার স্বপক্ষে কাজ করে বলে তিনি মনে করেন। মাহ্লার, স্কোয়েনবার্গ, বার্গ, ওয়েবার্ন ও ভিয়েনা স্কুলকে তিনি সত্যিকার সংগীত আন্দোলন মনে করতেন। অপরদিকে স্ট্রাভিনস্কি, হাইন্ডমিথ ও নিওকø্যাসিকাল সংগীত ধারাকে সত্য ও সুন্দরের শত্রু জ্ঞান করেছেন।৮

একজন দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে অ্যাডর্নোর সংগীত বিষয়ক পা-িত্য সংগীতের সমাজতত্ত্ব প্রণয়নের জন্য যাবতীয় সাংস্কৃতিক পুঁজি ধারণ করে বলে মনে করা হয়। ভিয়েনা সার্কেলের সুবিখ্যাত শিক্ষক অ্যালবার্ন বার্গ  ও স্কোয়েনবার্গের ছাত্র ও সহচার্য ধন্য অ্যাডর্নো সংগীতে যথেষ্ট পারদর্শিতা লাভ করেছিলেন। সে-কারণেই অ্যাডর্নোর সংগীত বিষয়ক রচনার সম্পর্কে সংগীত বিশেষজ্ঞদের তেমন প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় না।৯ সব ধরনের শিল্পকলার মধ্যে সংগীত সবচেয়ে সংবেদনশীল মাধ্যম যা আমাদের মধ্যে আবেগ ও অনুভূতি জাগ্রত করতে যথেষ্ট সক্ষম। কিন্তু সংগীতের এই  সক্ষমতা  নৈতিকতার মানদ-ে সর্বোৎকৃষ্ট নয়। সে-কারণেই জনপ্রিয় ও ধ্রুপদী সংগীতে আবেগ-সঞ্চারী অ্যাডর্নোর কাছে শেষ বিচারে যথেষ্ট বলে মনে হয়নি। অ্যাডর্নোর মতে এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ঠকবাজি এবং চটকদারী; প্রকৃত ও স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাসনের সমার্থক নয়। যত বড় সংগীতজ্ঞই হোক তাঁর সুর-সাধনা সন্তর্পনে বুর্জোয়া সমগ্রতাবাদের সমর্থক কি-না সেটি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতো।

অ্যাডর্নোর লেখায় একটা নৈতিকতার দিক রয়েছে। আর সেই কারণেই তিনি দার্শনিক হিসেবে সংগীত ও শিল্পকলার প্রশ্নে  এতোটা সংবেদনশীল আচরণ করেন। অনেকক্ষেত্রে তার বক্তব্য অতি-পরিশুদ্ধতার দোষে দুষ্ট মনে হয়। কিন্তু সমাজ ও সংগীতের সম্পর্ক অনুধাবনের জন্য অ্যাডর্নোর বক্তব্য অনুধাবন আবশ্যক। পুনর্জাগরণের সময় থেকে সংগীত তথা শিল্পকলা একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আবার এটাও ঠিক যে যৌক্তিকতাবাদের উত্থান অর্থনীতির ক্ষেত্রে যতোটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করে, সেরকম ’অযৌক্তিক’ বিষয়ের উপর সংকোচনের নীতি প্রয়োগ করে। সে-কারণেই সংগীত, নন্দনতত্ত্ব, শিল্পকলা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে যায়। এবং ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় কাঠমো থেকে বিযুক্ত হতে থাকে।  অর্থাৎ শিল্পের চর্চা ও পরিশীলন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের অভাবজনিত কারণে এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা শিল্পীর ব্যক্তিগত শিল্পচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শক্তি হিসেবে তার অবমূল্যায়ন ঘটতে থাকে।১০ আধুনিক সমাজ জীবনের যৌক্তিক— কৃৎকৌশলগত অবস্থা শিল্পীর ও শিল্পকলার সামাজিক বিচ্ছিন্নতার জন্য দায়ী। এমন অবস্থায় ব্যক্তি শিল্পীর পক্ষে শক্তিশালী সমাজ বা ক্ষমতা কাঠামোর সাথে লড়াই করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কাঠামোগত আধিপত্য শিল্পী ও শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর অধিক হারে বল প্রয়োগ করতে থাকে। অ্যাডর্নো বিষয়টিকে প্রত্যক্ষ করেন এবং আধুনিকতার বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন।১১ যেহেতু আধুনিক শিল্পকে স্ব-শাসন ও দুঃশাসনের মধ্যে এক অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়তে হয়। শিল্পীর এই দুরাবস্থাকে মার্কসবাদীসহ বিভিন্ন লেখক-সমালোচকরা বিভিন্নভাবে ব্যাখা করেছেন। যেখানে শিল্পকলা ও সাহিত্যচর্চায় নিবেদিত ব্যক্তিবর্গেরও ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার সূক্ষ্মদর্শী বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। তবে একথাও ঠিক যে, অ্যাডর্নোর সংগীত বিশ্লেষণের সমাজতাত্ত্বিক উৎকর্ষ অনেকের কাছেই দার্শনিক অস্বচ্ছতা বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

উইটকিন্স তার গ্রন্থে সমাজের প্রেক্ষাপটে সংগীত, এবং সংগীতের প্রেক্ষাপটে সমাজ বিষয়ক অ্যাডর্নোর সংগীতের সমাজতত্ত্বকে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। তবে তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, অ্যাডর্নোর বিস্তৃত ভাবনার জগতে অথবা জার্মানির ভাববাদী দর্শনের প্রেক্ষাপটে তিনি অ্যাডর্নোকে খোঁজার চেষ্টা করেন নি। যেহেতু মার্ক্সীয় ও ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের প্রেক্ষাপটে অ্যাডর্নোর মূল্যায়ন করেছেন, সেহেতু তিনি অ্যাডর্নোর উপর লিখিত প্রচুর পরিমাণ রচনার মূল্যায়নে ব্রতী হন। উইটকিন্স মনে করেন যে, সাহিত্যে যত সহজভাবে লেখককে তার সামাজিক প্রেক্ষাপটে বোঝা যায়, তার শ্রেণিগত অবস্থান নির্ধারণ করা যায়, সংগীতের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অত সহজ নয়। এ প্রসজ্ঞে তিনি বালজাকের লেখা তুলে ধরেন যাতে এঙ্গেলস ও লুকাস সামাজিকভাবে প্রগতিশীল সাহিত্যিক হিসেবে গণ্য করেন। সোনাটা বালজাকের সমসাময়িক সংগীতের ধারা। সেখানে মোজার্ট এবং বিথোভেনদের সম্মেলন ঘটেছিল। সংগীতের সম্মোহিত করবার বিরাট ক্ষমতা থাকলেও সাহিত্যের মতো সামাজিক বাস্তবতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে (ড়নলবপঃরাবষু) পাওয়া যায় না। সে-কারণেই সোনাটা ও সিম্ফনির মধ্যে সাহিত্যের গভীরতা পাওয়া যায় না বরং একটি কাঠামোগত সম্পর্কের ‘আকার’ পাওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো অ্যাডর্নোর সংগীতের সমাজতত্ত্ব বা সোনাটার মরফোলজি উপন্যাসের মরফোলজির মতই বুর্জোয়া সমাজ কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত। অ্যাডর্নো বিথোভেনের সোনাটা-কর্মের আলোকে বিশ শতকে সংগীতের বিকাশ প্রত্যক্ষণ করেছেন।১২ সংগীতের মৌলিক উপাদান বলতে অ্যডর্নো মোটিভকে বুঝিয়েছেন। এটি হতে পারে কর্ডের ওপর মৃদু আঘাতের সঞ্চালন অথবা স¦রলিপির আলোকে ছন্দময় সুরের সঞ্চালন। যেমন, বিথোভেন তার সিম্ফনির মধ্যে বিভিন্নভাবে মোটিভের সৃষ্টি করেছেন। এটি হতে পারে সজ্ঞায়িত বা সুললিত। এগুলো সম্ভব হতে পারে ‘জাষ্টাপজিশন’, ‘ইনভার্শন’, ‘মেলোডিক ডেকোরেশন’, ‘টিমব্রাল চেন্জেস’।১৩ সংগীতের কম্পোজিশন মোটিভের সুচিন্তিত পুনরাবৃত্তি ও বৈচিত্রায়ণ ছাড়া কিছুই না। অ্যাডর্নোর সংগীতের সমাজতত্ত্বে মোটিভ, থিন্ক, রিপিটিশন, ভ্যারিয়েশন, ডেভেলপমেন্ট, প্রভৃতি মূল প্রত্যয় হিসেবে এসেছে। অ্যাডর্নো সজ্ঞীতের বিশ্লেষণে একটি সংবেদনশীল উপাদানকে আবিষ্কার করেন এবং ব্যক্তি বা বিষয়ী  ও সমাজের সামষ্টিক ও বস্তুনিষ্ট নিয়ন্ত্রক শক্তির সমগ্রতাকে দেখার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ এখানে ’অংশ-সমগ্র’ সম্পর্ক সংগীত কম্পোজিশনের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে চলে আসে। এভাবেই অ্যাডর্নোর সংগীত বিশ্লেষণ সংগীতের মধ্যে সমাজস্থ ব্যক্তির সার্বিক পূর্বশর্তকে তুলে ধরে।

ওয়েগনারের লেখার সাথে অ্যাডর্নো ও হর্কহাইমারের এনলাইটেনমেন্ট-চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। ওয়েগনার দি রিং নামে একটি সংগীতনাট্য রচনা করেছিলেন, এই নাটকে ওয়েগনার সমস্ত মানব ইতিহাসকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ঈশ্বরের মৃত্যু ব্যতীত অশুভ শক্তির বিনাশ সম্ভব নয়। কার্টুনের যাবতীয় কলাকৌশল, হিসেবি পদক্ষেপ, প্রয়োজনীয় সন্ধি ও জোট গঠন, ও যৌক্তিক পদক্ষেপ সত্ত্বেও পৃথিবীতে শান্তি আসে নি। অর্থাৎ অশুভের বিতাড়ন ও মানবসমাজের উদ্ধার সম্ভব হয়নি। ওয়েগনারের লেখার মধ্যেও ব্যক্তি বনাম সমগ্রতাবাদ বিধৃত হয়েছে। প্রতিটি সংগঠন কাঠামো ও ব্যবস্থায় শক্তিশালীভাবে স্বৈরাচারী যা ব্যক্তিকে তার জীবন ভাবনা ও ভাবনার বাস্তবায়নে বাধা প্রদান করে এক্ষেত্রে বিবাহ ও পরিবার কোনো ব্যতিক্রম নয়। The Dialectic of Enlightement (১৯৮৬) গ্রন্থে অ্যাডর্নো ও হর্কহাইমার এনলাইটেনমেন্টকে যুক্তি-চর্চার মাধ্যমে মানবমুক্তির উপায় হিসেবে গ্রাহ্য করেন নি। বরং একে প্রকৃতির সাথে বিরোধপূর্ণ ও বিচ্ছিন্ন মানবসমাজে দাসত্বের উন্মোচক বলে মনে করেছেন। এনলাইটেনমেন্ট বিমূর্ত প্রত্যয়গত ব্যবস্থার অন্তরালে আমাদের এমন এক সামাজিক সম্পর্কের দিকে ঠেলে দেয় এবং অবশেষে কারাবন্দী করে যেখান থেকে স্বতঃস্ফূর্ততা সমাজানুগ প্রক্রিয়ার উদবোধন সম্ভব নয়। এধরনের প্রত্যয়গত ক্রমচ্চতার বিন্যাস পুঁজিবাদের বিকাশের মধ্যেই গ্রথিত। যার অর্থ হলো সবকিছুই বিমূর্ত বিনিময় মূল্যের ক্ষমতার কাছে নমিত। ওয়েগনারের সাথে অ্যাডর্নোর চিন্তার যথেষ্ট মিল থাকলেও সংগীতের প্রশ্নে ওয়েগনারের চিন্তা ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাৎমুখী মনে হয়। অ্যাডর্নো অবশ্য ওয়েগনারের সংগীত প্রগতিশীলতা ও আধুনিকতার রূপ প্রত্যক্ষ করেন। তবে অ্যাডর্নো মনে করেন যে, শিল্পের পণ্যায়ন ও বিভ্রম ব্যতীত আধুনিক বিশ্বমানুষের জন্য কিছু করতে পারে না।

উটকিন্সের মতে, অ্যাডর্নোর সংগীত ও সমাজবিজ্ঞানের কাঠামোবদ্ধকরণের তিনটি মডেল লক্ষ করা যায়। অ্যাডর্নোর মতে কন্ঠস্বর (ঃড়হধষ) থেকে কন্ঠস্বর-উত্তীর্ণ (ধঃড়হধষ) সংগীতের দিকে পরিবর্তন সাধিত হয়। বিথোভেনের শেষকাল থেকে কন্ঠস্বর সংগীতের শুরু এবং মাহ্লারের মধ্যেই তার সমাপ্তি। অর্থাৎ দ্রুপদী কন্ঠস্বর-সংগীত থেকে ভাষান্তরিত হয়। এই ভাষা কন্ঠস্বর-সংগীতের ভাষা হিসেবে আবির্ভূত হয়। এবং দ্বিতীয় স্তরের ভাষাকে অ্যাডর্নো ধ্রুপদী কন্ঠস্বর-সংগীতের ভাষা থেকে আলাদা মনে করেন। তৃতীয় পর্যায়ে স্কোয়েনবার্গ কন্ঠস্বরের ক্ষেত্রে একটি বিপ্লব সাধন করেন এবং স্বরধ্বনির কাঠামো লোপ পায় এবং স্বরমাত্রার বারোটি ধাপের মধ্যে দিয়ে নতুনভাবে সংগীত রচনা শুরু হয়।

অ্যাডর্নোর কালচার ইন্ডাস্ট্রি ও জ্যাজ সংগীতের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রেখেছেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে অনেকের মতে যন্ত্রের ব্যবহার ও দ্রুততার ভঙ্গি সম্বলিত জ্যাজ সংগীতকেই আধুনিক সংগীতের প্রবর্তক মনে করা হয়। বিশদশকের মধ্যে জ্যাজ সংগীত জনপ্রিয় ও বিনোদন সংগীত হিসেবে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। তাই সংগীতের পরবর্তী রূপটি এমন দাঁড়ায় যে, তা শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমকেও প্রভাবিত করে। তাছাড়া ‘লাইভ প্রোগ্রাম’ ও ‘পারফর্মার’ যেনো মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে জ্যাজ সংগীত শিল্পী নিজস্ব স্টাইল ও দ্যোতনা নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে জ্যাজ সংগীতের মধ্যেও সনাতন ও আধুনিক বিভক্তি চলে আসে। পরিশেষে আধুনিক নারীর আনন্দময় জীবনযাত্রার, আশা, হতাশা, দুঃখ, বেদনা জ্যাজ সংগীতের ভাষাকে আরো রূপান্তরিত করে। অ্যাডর্নো জ্যাজ সংগীতের সমালোচনায় বেশ উচ্চকন্ঠ ছিলেন। ১৯৩৬ সনে জ্যাজ সংগীতের ‘বিনির্মাণ’ (deconstruct) সাধন করেন এবং প্রগতিশীল বা অ্যাভঁ গার্দ হিসেবে জ্যাজের দাবীকে অস্বীকার করেন। এর আধুনিকতা, আদিমতা ও আফ্রিকান উৎপত্তিকেও তিনি অস্বীকার করেন। এই সংগীতের জনপ্রিয়তা তার মত করে ব্যাখ্যা করেন।১৪ বার্নস্টাইনের মতে, He (Adorno) saw jazz, like all the products of the mass culture industries, realizing, aesthetically the technologies of control and domination, Characteristic of mass industrial and mass political modernity. He (Adorno) perceived in jazz music, a masochistic submission to the dominating force of the collective over the indivisual. He drew on a Freudian psychoanalytical language to condemn jazz as castration music or as an aesthetic realization of an onanistic, narcisisistic and sexually regressive arrangements and orchestrations, he judged to be inferior derivatives- even trivialisations of what classical composers had invented decades earlier and used more meaningfully’ . Adorno did not ever soften the savagery of onslaugt on jazz in any of his later writings even though, by the time of his death in the late 1960s, a great deal more avant-garde. Jazz had appeared and the jazz scene was no longer as dominated by the dance bands as it had been in the 1930s and 1940s16

অনেকেই অ্যাডর্নোর জ্যাজ সমালোচনাকে শৈল্পিক উন্নাসিকতা হিসেবে দেখেছেন। ইউরোপ কেন্দ্রীকতা ও মার্কিন সংস্কৃতি-বিরোধিতা ও কৃষ্ণাঙ্গ-সংস্কৃতির বিরোধিতা তাকে আক্রান্ত করেছে বলে তাদের ধারণা। জনসংস্কৃতি সম্পর্কে অ্যাডর্নোর ধারণা এবং আধুনিক সংস্কৃতির সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বিচার করলে এ ধরনের অভিমুখীনতা জানা সম্ভব বলে মনে করা হয়। অ্যাডর্নোর কালচার ইন্ডাস্ট্রি ও বুর্জোয়া সংস্কৃতির পণ্যায়ন সম্পর্কিত আলোচনা এখানে  স্মর্তব্য। অ্যাডর্নো মনে করেন সত্যিকার অর্থে, জ্যাজ সংগীত একটি পণ্য বিষয়। এর বাজার মূল্যই উৎপাদনের এমন বিস্তৃতির কারণ। বাজারের সুত্র এবং প্রতিযোগী ও ভোক্তাদের বন্টন জ্যাজ সংগীতের উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ শক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে জ্যাজ সংগীতের শ্রেণী-নির্বিশেষ জনপ্রিয়তা ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। হারমনি ও মেলোডির আলোকে অ্যাডর্নো মনে করেন জ্যাজ সংগীত এসবের কোন গুণই ধারণ করে না। একে সংগীত না বলে এক ধরনের ’সম্পাদন’ বলাই যথেষ্ট।

আধুনিকতার ইতিহাস সম্পর্কে অ্যাডর্নোর ধারণাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তির সমস্ত দিককেই অধিনস্ত করা হয়। বস্তুগত সংস্কৃতিটির বিশেষ গুণাগুণ এবং বৈপ্লবিকভাবে বিশেষ শিল্পকর্মেরও অধীনতা নিশ্চিত করা হয়। বুর্জোয়া শ্রেণিকরণ সার্বজনীনতাকে মুখ্য মনে করে। কিন্তু অ্যাডর্নো বিশেষকে মুখ্য রাখতে আগ্রহী। ব্যক্তি মানুষ পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ, গুণগত দিক থেকে পৃথক। পুঁজিবাদের সার্বজনীনতার ধারণায় ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে আপোষ করতে বাধ্য হয়। আধুনিকতাবাদী চিন্তা ও চিন্তক শৈল্পিকভাবে এই বশীকরণ প্রক্রিয়ার বিরূদ্ধে সোচ্চার হতে চাইলে ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই সংঘর্ষে দুরকম ফলাফল লক্ষ করা যায়; (ক) শিল্পী নতুন ধরনের গুণাত্মক আবিষ্কারের সন্ধান করেন যাকে র‌্যাশনালাইজেশন বা যৌক্তিকরণ বলা হয়েছে। (খ) শিল্পী অধুনালুপ্ত গুণাত্মক বিশিষ্টতাকে আঁকড়ে থাকতে চায়। যাকে অথেনটিসিটি বলা হয়েছে। অর্থাৎ অ্যাডর্নোর ’ডায়ালেকটিক্যান এনলাইটেনমেন্ট’ এই দুই মেরুর ধরণকে তুলে ধরে। যেখানে যৌক্তিকরণ আসলে প্রগতিশীলতার পরিচায়ক। অন্যদিকে অথেনটিসিটি নস্টালজিক এবং প্রতিক্রিয়াশীল।১৭

সংগীত সম্পর্কে অ্যাডর্নোর সতর্ক ভাবনা এই রকম ধারণা দেয় যে, এটি শুধু বিনোদন ও মানসিক তৃপ্তির বিষয় নয়। সংগীত-ভক্তদের ভক্তির মধ্যেই সংগীতের সীমানা খোঁজা ঠিক হবে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে ভক্তদের হাত থেকে সংগীতকে উদ্ধার করারও প্রয়োজন হয়। যখন শিল্প ও নন্দনতত্ত্ব পরিস্থিতির স্বীকার এবং প্রান্তিক পর্যায়ে অবনতি হতে চলেছে, তখন অ্যাডর্নো অন্য দার্শনিকদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে আধুনিক মানুষ ও সমাজের সচেতনতাকে  নৈতিক ও ক্রিটিক্যাল দিক থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে অ্যাডর্নো একটি নৈতিক বিষয় হিসেবে দেখেছেন। দর্শনের মূল লক্ষ অর্থাৎ সঠিক জীবন যাপনের শিক্ষা থেকে কিছু বিচ্যুত হতে পারে না। সত্যিকার অর্থে, অ্যাডর্নো সংগীত ও সমাজের মধ্যের সম্পর্ককে গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার চেষ্টা করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বালজাকের লেখার কথা তুলে ধরেন যাতে এঙ্গেলস ও লুকাস তাঁকে সামাজিকভাবে প্রগতিশীল সাহিত্যিক হিসেবে গণ্য করেন। সোনাটা বালজাকের সমসাময়িক সংগীতের ধারা। সেখানে এডেন্স, মোজার্ট এবং বিথোভেনদের সম্মিলন ঘটেছিল। সংগীতের সম্মোহিত করার বিরাট ক্ষমতা থাকলেও সাহিত্যের মতো সামাজিক বাস্তবতাকে বস্তনিষ্ঠভাবে পাওয়া যায় না। সে কারণে সোনাটা ও সিম্ফনির মধ্যে সাহিত্যের গভীরতা পাওয়া যায় না বরং একটি কাঠমোগত সম্পর্কের আকার পাওয়া যেতে পারে। সোনাটার মরফোলজি উপন্যাসের মরফোলজির মতোই বুর্জোয়া সমাজকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। অ্যাডর্নো বিটোভেনের সোনাটা কর্মের আলোকে বিশ শতকে সংগীতের বিকাশ প্রত্যক্ষ করেছেন। সংগীতের মৌলিক উপাদান বলতে অ্যাডর্নো মোটিভকে বুঝিয়েছেন। কডের উপর মৃদু আঘাতের সঞ্চালন অথবা স্বরলিপিরি আলোকে ছন্দময় সুরের সঞ্চালন এই মোটিভের বহিঃপ্রকাশ। যেমন বিঠোভেন তার সিম্ফনির মধ্যে বিভিন্নভাবে মোটিভের সৃষ্টি করেছেন। এটা হতে পারে সংজ্ঞায়িত বা সুললিত।  এগুলো সম্ভব হতে পারে ‘জাস্টাপজিশন’, ‘ইনভার্সান’, ‘মডুলেশন’, ‘মেলোডিক ডেকোরেশন’, ‘ট্রিমব্রাল চেঞ্জেস’। সুতরাং সংগীতের কম্পোজিশন মোটিভের সুচিন্তিত পুনারবৃত্তি ও বৈচিত্রায়ণ ছাড়া কিছুই না। অ্যাডর্নোর সংগীতের সমাজতত্ত্বে মোটিভ, থিঙ্ক, রিপিেিটশন, ভ্যারিয়েশন, ডেভেলপমেন্ট প্রভৃতি মূল প্রত্যয় হিসেবে এসেছে। অ্যাডর্নো সংগীতের বিশ্লেষণে একটি সংবেদনশীল উপাদানকে আবিষ্কার করেন এবং ব্যক্তি বা বিষয়টা ও সমাজের সামাজিক ও বস্তুনিষ্ঠ নিয়ন্ত্রক শক্তির সমগ্রতাকে দেখার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ এখানে অংশ সমগ্র সম্পর্ক সংগীত কম্পোজিশনের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে চলে আসে। এভাবেই অ্যাডর্নোর সংগীত বিশ্লেষণ সংগীতের মধ্যে সমাজস্থ ব্যক্তির সার্বিক পূর্বশর্তকে তুলে ধরে।

একটি বিরোধপূর্ণ সমাজ মূলত প্রকৃতি শোষণ করার জন্য গড়ে ওঠে এবং সামাজিক সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্র এই বিরোধের চিহ্ন বহন করে। এমন সমাজে নিবর্তক শক্তি ও ব্যক্তির আধ্মাতিক চাহিদার মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অ্যাডর্নো মনে করেন বুর্জোয়া সংগীতের ধ্রুপদী উত্থান এমন বিরোধপূর্ণ সমাজের মতাদর্শকে ধারণ করে। সেই কারণেই বুর্জোয়া শিল্পকলা একধরনের মিথ্যাচার এবং সত্যের বদলে অসত্যের নির্মাণ। তবে বুর্জোয়া সমাজের এই শিল্পকলা একটি সামাজিক ভূমিকা পালন করে; যা মূলত সামজিক সংহতি নির্মাণে বুর্জোয়া সমাজের ক্রমউচ্চতাকে নির্দেশ করে। সুতরাং স্বরধ্বনি ব্যবস্থা বুর্জোয়া সমাজে ব্যক্তিক স্বরধ্বনির স্বাধীনতা হরণ করে। সোনাটা সংগীত এ কারণেই একটি অসম সমাজের স্তরিত কাঠামোকেই নির্দেশ করে। অন্যভাবে বলা যায়, বুর্জোয়া সমাজ হলো একটা সোনাটা-সমাজ। অ্যাডর্নো মনে করেন বুর্জোয়া সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশ ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও প্রকাশের স্বাধীনতা বিরোধী বরং একটি সর্বাত্মক-সামষ্টিক ব্যবস্থার উদ্রেককারী। যা মুক্ত ও স্বাধীন ব্যক্তিত্বগুণের অবসান দাবি করে। অ্যাডর্নো সমাজতান্ত্রিক সমাজের বিকাশকে সন্দেহাতীতভাবে অবলোকন করেননি। সমাজতান্ত্রিক সমাজ তার মতে, আরেক ধরনের বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের সমাজ। লুকাস উপন্যাসের বুর্জোয়া বাস্তববাদী ধরনকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখেছিলেন। বালজাক যেমন লুকাসের সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিঠোভেন তেমনি অ্যাডর্নোর সংগীতের সমাজতত্ত্বের  কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু। সার্বিক বিচারে অ্যাডর্নো লুকাসের মতোই স্বাধীনতাবাদী সংগীতে আস্থা রেখেছিলেন। আর সে কারণেই তার আলোচনা বিঠোভেন থেকে মাহ্লার ও বার্গ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। সংগীতের একটি উপাদান সেরকম অন্যান্য উপাদানের সাথে সম্পর্কিত না হওয়া পর্যন্ত অর্থহীন তেমনি ব্যক্তি একা একটি অহম মাত্র— যতক্ষণ না সে অন্য ব্যক্তিদের সম্পর্কিত না হয়। Individual orginally meant indivisible. That now sounds like a paradox. `Individial’ stresses a distinction from other; `indivisible’ a necessary connection. The development of the modern meaning from the orginal meaning is a record in language of an extraordi-nary social and politocal history. ১৮ সমাজের একজন হয়ে ব্যক্তিত্বের গঠন অ্যাডর্নোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তির এমন সমাজসঞ্জাত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা অ্যাডর্নো প্রত্যক্ষ করেননি। লুকাস অবশ্য সমাজতন্ত্রের মধ্যে ব্যক্তির মুক্তি ও নবজাগৃতি প্রত্যক্ষ করেন। আর দুজনেই আধুনিক শিল্পকলায় এবং আধুনিক সমাজ বিচ্যুতিকরণের প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন।

সত্যিকার অর্থেই অ্যাডর্নো সংগীত ও সমাজের সম্পর্ককে গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার চেষ্টা করেন।১৯ শিল্পীর নৈতিক দায়িত্ব আধুনিক সমাজের একটি প্রধান সত্য বলে অ্যাডর্নো মনে করেন। সামন্ত আমলে শিল্প স্বাধীন সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি বরং রাজদরবার ও চার্চের মধ্যে নিমজ্জিত ছিলো। রেনেসাঁর সময় থেকে এটি অনেকটা প্রগতিশীল ও স্বাধীন সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজস্ব ভূবন তৈরি করতে সক্ষম হয়। শিল্পীর ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতা অর্থনৈতিক জীবনের যৌক্তিকতার মধ্যে প্রতিফলিত হয়। এখানে ম্যাক্স ভেববের যৌক্তিকতার (ৎধঃরড়হধষরঃু) কথা চলে আসে। তিনি বলেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদের উন্মেষ ঘটেছে যৌক্তিক চিন্তা-ভাবনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও হিসাব সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে। এক্ষেত্রে আবার যথেষ্টভাবে সহায়তা করে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মীয় রীতি। যার মূল কথা ‘টাইম ইজ মানি’। এই যৌক্তিকতা জীবনের অযৌক্তিক ব্যক্তিবাদচর্চার সংকোচন। সেই সাথে সাথে আধুনিক সমাজ ও ক্ষমতাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে শিল্প ও নন্দনতত্ত্ব যেন অপ্রয়োজনীয় বাহুল্যে পরিণত হয়। এই মন্দের পাশাপাশি ভালো দিক হলো শিল্পী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমুক্ত হয় এবং স্বাধীনভাবে সংগীত সংকলন চিত্রকলায় মনোনিবেশ করতে পারে এবং বাজারের চাহিদা মোতাবেক তা বিক্রি করতে পারে।

তবে সংগীতের ক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রশ্ন ও সঙ্গীতকার হিসেবে গভীর অন্তর্দৃষ্টি অ্যাডর্নোকে সঙ্গীতবিজ্ঞানীদের কাছে আধুনিক সঙ্গীতের পুরোধা পুরুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, এমন নয়। অ্যাডর্নো’র সঙ্গীতের সমাজতত্ত্ব ও দার্শনিক ভাষা অনেকের কাছে বোধগম্য হয়ে ওঠেনি। কেউ কেউ অ্যাডর্নোর বক্তব্যকে সহজবোধ্যভাবে লেখার চেষ্টা করেছেন, যা অ্যাডর্নোকে বোঝার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। Adorno brings to musicology a consciousness that has been formed in the discourses of philosophy and sociology, and his constraction of musical project and perpases still appears alien to many musicologists.20বিথোভেনের শেষ কাল থেকে কণ্ঠস্বর সঙ্গীতের শুরু এবং মাহ্লারের মধ্যেই তার সমাপ্তি। অর্থাৎ ধ্রুপদী কণ্ঠস্বর সঙ্গীত থেকে ভাষান্তরিত হয়। এই ভাষা কণ্ঠস্বর, সঙ্গীতের ভাষা হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই দ্বিতীয় স্বরের ভাষাকে অ্যাডর্নো ধ্রুপদী কণ্ঠস্বর সঙ্গীতের ভাষা থেকে আলাদা মনে করেন। তৃতীয় পর্যায়ে স্কোয়েনবার্গ কণ্ঠস্বরের ক্ষেত্রে একটি বিপ্লব সাধন করেন এবং স্বরধ্বনির কাঠামো লোপ পায় এবং স্বরমাত্রার ১২টি ধাপের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে সঙ্গীত রচনা শুরু হয়। অ্যাডর্নোর কালচার ইন্ডাস্ট্রি ও জ্যাজ সঙ্গীতের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য রেখেছেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে অনেকের মতে যন্ত্রের ব্যবহার ও দ্রুততার ভঙ্গি সম্বলিত এই জ্যাজ সঙ্গীতকেই আধুনিক সঙ্গীতের প্রবর্তক মনে করা হয়।

অনেকে অ্যাডর্নোর জ্যাজ সমালোচনাকে শৈল্পিক উন্নাসিকতা হিসেবে দেখেছেন। ইউরোপকেন্দ্রিকতা ও মার্কিন সংস্কৃতি বিরোধিতা ও কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির বিরোধিতা তাকে আক্রান্ত করেছে বলে তাদেরও ধারণা। জন-সংস্কৃতি সম্পর্কে অ্যাডর্নোর ধারণা এবং আধুনিক সংস্কৃতির সমাজতান্ত্রিক বিশ্লেষণ বিচার করলে অ্যাডর্নোর এ ধরনের অভিমুখীনতা জানা সম্ভব বলে মনে করা হয়। অ্যাডর্নোর কালচার ইন্ডাস্ট্রি ও বুর্জোয়া সংস্কৃতির পণ্যায়ন সম্পর্কিত আলোচনা স্মর্তব্য। অ্যাডর্নো মনে করেন সত্যিকার অর্থে জ্যাজ সঙ্গীত একটি পণ্যবিশেষ। এর বাজার মূল্যই উৎপাদনের এমন বিস্তৃতির কারণ। বাজারে সূত্র এবং প্রতিযোগী ভোক্তাদের বণ্টন জ্যাজ সঙ্গীতের উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে জ্যাজ সঙ্গীতের উচ্চস্বর, কম্পন সৃষ্টির ক্ষমতা এখানে বাজারজাতকরণে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে জ্যাজ সঙ্গীতের শ্রেণি নির্বিশেষে জনপ্রিয়তা ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। হারমোনিও মেলোডির আলোকে অ্যাডর্নো মনে করেন জ্যাজ সঙ্গীত এসবের কোনো গুণই ধারণ করে না। একে সঙ্গীত না বলে একধরনের সম্পাদন বলাই যথেষ্ট।

আধুনিকার ইতিহাস সম্পর্কে অ্যাডর্নোর ধারণাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তির সমস্ত দিককেই অধীনস্ত করা হয়। বস্তুগত সংস্কৃতির বিশেষ গুণাগুণ এবং বৈপ্লবিকভাবে বিশেষ শিল্পকর্মেরও অধীনতা নিশ্চিত করা হয়। বুর্জোয়া শ্রেণিকরণ সার্বজনীনতাকে মুখ্য মনে করে। কিন্তু অ্যাডর্নো বিশেষকে মুখ্য রাখতে আগ্রহী। ব্যক্তি মানুষ পরস্পর দুই সাদৃশ্যপূর্ণ, গুণগত দিক থেকে পৃথক। ধীরে ধীরে পুঁজিবাদেও সার্বজনীনতা ধারণায় সামাজিকভাবে আপোষ করতে বাধ্য হয়। আধুনিকতাবাদী চিন্তা ও চিত্তক শৈল্পিকভাবে এই বশীকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাইলে ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই সংঘাতে দুরকম ফলশ্রুতি লক্ষ করা যায়; ক. শিল্পী নতুন ধরনের গুণাত্মক আবিষ্কারের সন্ধান করেন যাকে র‌্যাশনালাইজেশন বা যৌক্তিককরণ বলা হয়েছে। খ. শিল্পী অধুনালুপ্ত গুণাত্মক বিশিষ্টতাকে আঁকড়ে থাকতে চায়। যাকে অথেনটিসিটি বলা হয়েছে। অর্থাৎ অ্যাডর্নোর উরধষবপঃরপ ড়ভ ঊহষরমযঃবহসবহঃ এই দুই মেরুর ধরণকে তুলে ধরে। যেখানে যৌক্তিকীকরণ আসলে প্রগতিশীলতার পরিচায়ক; অন্যদিকে অথেনটিসিটি এস্টালজিক এবং প্রগতিশীল।২১

উইটকিন্স বলেন, অ্যাডর্নো শিল্পকলা ও সংগীত রচনার ক্ষেত্রে গভীর মনোযোগ প্রদান করেন। অ্যাডর্নোর মতে, শুধু ভালো সংগীত বা খারাপ সংগীত দেখা যায়—তা নয়, ভালো এবং খারাপ শ্রুতিও লক্ষণীয়। একজন গভীর মনোযোগ ও বিগলিত চিত্তে সংগীত শুনতে পারেন। আবার উদ্বেলিত ও উত্তেজিত চিত্তে সংগীত শ্রবণের চেষ্টা করেন। এ ধরনের শ্রবণকে অ্যাডর্নো পশ্চাৎমুখী শ্রবণ (ৎবমৎবংংরাব ষরংঃবহরহম) মনে করেন। আজকের দিনে সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রি এবং এদের সমস্ত কর্মের মধ্যে ’রিগ্রেসিভ লিস্নিং’ প্রত্যক্ষ করেন। কিন্তু সত্যিকার সংগীত মনোযোগ ও নিবেদিত চিত্ত দাবি করে। ভালো সংগীত কালচার ইন্ডাস্ট্রির বদৌলতে উপনিবেশিত হয়ে রিগ্রেসিভ লিসনিংয়ের বিষয়ে পরিণত হয়। ভালো সংগীতের পণ্যায়ন ও বিমূর্তায়ন অনেক সময় তাকে বিনোদনমূলক সংগীতের পর্যায়ে নামিয়ে আনে। যা মূলত ভালো সংগীতের সমগ্রতা থেকে বিশেষের খর্বকর বুঝায়। সত্যিকার সামাজিক সংগীত বা সামাজিকভাবে সত্যিকার সংগীত উপাদানগত দিক দিয়ে সমাজ ও কালসঞ্জাত হবে। অ্যাডর্নোর মতে,

, A composition is thus an interdependent whole, a developing process, a becoming. It has history within it and is transformed by the outer historical movement in which it participates. The receiver can only appreciate such a process to actively and sympathetically participating in its development, from the inside, as it were; it demands from the receiver.. a concentrative and absorved mode of listening in which no element, be it a rythm, a melody or a phrase, takes precidents over the developing totality.22

অ্যাডর্নোর মতে, ব্যক্তি মুক্তভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ সমাধা করে এবং তা করতে গিয়ে অন্যদের সাথে একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার কাজে একটি কালগত ও ঐতিহাসিক মাত্রা যুক্ত হয়। কিন্তু ব্যক্তি যদি সমষ্টির দ্বারা সম্যকভাবে নিপাতিত হয় এবং অন্যের সাথে তার সম্পর্ক যান্ত্রিকভাবে নির্ধারিত হয়, সেক্ষেত্রে তাকে একটি বিচ্ছিন্ন ও অনির্দিষ্ট বাস্তবতায় আক্রান্ত ভাবা যাবে। এমন কাঠামোগত অবস্থায় নিপতিত অবস্থা পরিবর্তন ও বিকাশ সম্পূর্ণভাবে অসম্ভব। সুতরাং বুর্জোয়া সমাজের অন্তর্বিরোধ প্রত্যক্ষ করা যায়, যখন ব্যক্তি স্বাধীনতা সামাজিক বাধার মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। সংগীতের ক্ষেত্রে ব্যক্তির মোটিভ বা কণ্ঠ কম্পোজিশনের সৃষ্টি করে। এ পর্যায়ে বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে তার সম্পর্ক কম্পোজিশনের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু সামাজিক বিষয় হিসেবে অন্যের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে যে নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি করে তাকে অ্যাডর্নো ব্যক্তিজীবন (বায়োগ্রাফি) ও সামাজিক জীবনের (ইতিহাস) সমন্বয়ে যে নতুন বাস্তবতা করে বিথোভেন সিম্ফনির মধ্যে এই প্রাথমিক সম্পর্কের কম্পোজিশনকে দ্বিতীয় স্তরের কম্পোজিশনে উত্তরণে ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। অ্যাডর্নোর সংগীত গবেষণার একটি বিশেষ দিক নিচ থেকে সংগীতের  সামাজিক কাঠামো অনুধাবন। এভাবেই সংগীতের সোনাটা স্তর থেকে বিথোভেন স্তরে উত্তরণ ঘটেছিলো।২৩

ভালো সংগীতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অ্যাডর্নো বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেন। যেমন যা কিছু সুন্দরভাবে গাওয়া হয়েছে তাই কি সংগীত? অথবা বিখ্যাত কম্পোজার এবং পারফর্মারের অংশগ্রহণ সামাজিক প্রথাসিদ্ধভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে তাই কি ভালো সংগীত? ভালো সংগীত কি শ্রোতার ওপর নির্ভর করে না? ভালো সংগীত কি ভালোভাবে সম্প্রচারিত হওয়া উচিৎ নয়? যেভাবে রেডিও-টেলিভিশন সম্প্রচার করে তাই কি ভালো সংগীতকে নিখুঁতভাবে পরিবেশন করা বুঝায়? একটা সিম্পনি যখন বাতাসে সম্প্রচারিত হয় তখন কি সেটি সিম্পনি থাকে। ট্রান্সমিশনের কারণে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে সেগুলো কি খুব সামান্য? শ্রোতারা কি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে বিথোভেন সি¤ফনি শোনে? এমনকি হতে পারে না যে শ্রোতারা শুধুমাত্র টিউন অথবা উত্তেজনা সৃষ্টিকারী স্টিমুলির দিকে বেশি মনোনিবেশ করে? সুতরাং উঁচুদরের ভালো সংগীত অনেক শ্রোতার কছে সুন্দরভাবে পরিবেশন এবং শ্রোতাদের পক্ষে সেসব সংগীত যথাযথভাবে– এমনকি অনেক ধরনের সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক ফ্যাক্টরের কারণে ভ্রমাত্মক রূপ পরিগ্রহ করতে পারে না? এমন সব প্রশ্নের অবতারণার পর অ্যাডর্নো কিছু অ্যাক্সিউম প্রস্তাব করেন। যেমন, (ক) আমরা একটা সমাজে বসবাস করছি যেখানে প্রচুর পরিমাণে পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে যা শুধু আমাদের প্রয়োজন পরিপূরণের জন্য নয় বরং মুনাফার জন্য। সুতরাং পণ্য উৎপাদনের পরিবেশ পণ্যেও উপর এবং মানবীয় সম্পর্কের উপর প্রভাব রাখছে। (খ) আমাদের এই পণ্য-সমাজে একটি প্রধান প্রবণতা হলো পুঁজির কেন্দ্রীভবন যা মুক্তবাজারের সংকোচন ঘটাচ্ছে এবং একচেটিয়া পণ্যের উৎপাদন নিশ্চিত করছে। ব্যাপারটি গণমাধ্যম শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। (গ) সমাজ যত বেশি তার স্থায়িত্বের প্রশ্নে বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছে ততো বেশি সব শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রচলিত ক্ষমতা ও সম্পত্তি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু প্রচলিত উৎপাদন শক্তির বর্তমান স্থায়িত্বের মধ্যে এর যৌক্তিকতা হারাচ্ছে। (ঘ) সেহেতু বর্তমান সমাজে উৎপাদন শক্তি যথেষ্ট উন্নত এবং একই সময়ে উপাদন সম্পর্ক উৎপাদন শক্তির প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে সে কারণে একটা বিরোধপূর্ণ সমাজ রূপ লাভ করছে। এই বিরোধপূর্ণ অবস্থা শুধুমাত্র য়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ তা নয়; সাংস্কৃতিক ভুবনেও আধিপত্য করছে। অর্থনৈতিক ভুবনে এই বিরোধিতা অনেকটা সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত, কিন্তু সাংস্কৃতিক ভুবনে এটি সেভাবে স্বীকৃত নয়।

এখন দেখা দরকার সংগীত কিভাবে এসব অ্যাক্সিউমের প্রেক্ষাপটে পণ্য হিসেবে কাজ করছে। আঠারো শতকের শেষের দিকে সংগীত তার সামন্ত শুভানুধ্যায়ী ও সংরক্ষকদের হারায়। তারপর সংগীতকে বাজারের মুখোমুখি হতে হয়। বাজার সংগীতকে নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ, সংগীত বিক্রয়ের সুযোগ আসে। প্রমিতকরণ ও ব্যাপক উৎপাদনের কারণে সংগীতের পণ্য চরিত্রের দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে।  যদিও সংগীত মহিমান্বিত বিষয় হলেও এখন লক্ষ নয় বরং উপায় হিসেবে গণ্য হচ্ছে। অন্যভাবে বলা যায়, সংগীত মানবীয় শক্তির প্রকাশ না হয়ে অন্যান্য ভোগ্য পণ্যের মত ব্যবহৃত হচ্ছে। সংগীত-শ্রবণও একটি ‘পণ্য-শ্রবণের’ পর্যায়ে নেমে এসেছে। শ্রোতা সব ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রণোদনা ব্যতিরেকে সংগীত ভোগের চেষ্টায় আগ্রহী থাকছে। এখানে সংগীতের স্বাদগ্রহণই মুখ্য। যা বেশী স্বাদের তাই ভালো সংগীত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।২৪

রেডিও কোম্পানি এমন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যেখানে বিভিন্ন  আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে শব্দের প্রদর্শনী মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, কি সংগীত গীত হচ্ছে বা কিভাবে তা পরিবেশিত হচ্ছে সেটি গৌণ হয়ে দাড়ায়। ক্রমবর্ধমান হারে প্রমিতকরণের ব্যাপারটি সংগীতের পণ্য চরিত্রের সাথে শৃঙ্খলিত। সংগীতানুষ্ঠান, সমবেত পরিবেশনা ও প্রমিতকরণের মধ্যে যে সাদৃশ্য দেখা যায় তা বিশেষ ব্যক্তির ‘অর্কেস্ট্রা ট্রেডমাক’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জনপ্রিয় সংগীত বা জ্যাজ সংগীতে মূল লক্ষ থাকে প্রমিতকরণের দিকে। এক্ষেত্রে সংগীতটি উগ্র, মধুর অথবা সংকর যাই হোক না কেন।

তৃতীয় অ্যাক্সিউমটি রেডিও সম্পর্কে মতাদর্শ সম্পর্কিত সামাজিক সমালোচনার বিষয়কে প্রাধান্য দেয়। বর্তমানে রেডিওতে প্রচারিত সংগীত শ্রোতাদের সামাজিক সমালোচনার অবকাশ রাখে না। বরং তারাই সামাজিক সচেতনতা তৈরি করে। রেডিও এমন একটি ভূমিকা পালন করে যা পরিবেশিত সংগীতের শিল্পগুণ ধারণ করে না। রেডিওর আত্মতুষ্টি ও প্রচারিত মতাদর্শ প্রাধান্য পায়। বিশেষত, রেডিও যেখানে একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিযুক্ত অগ্রসরতা ধারণ করে সেখানে এই দক্ষতা সংগীত অথবা সংগীত-শ্রবণের উৎকর্ষের জন্য কোন উদ্ভাবনী অনুপ্রেরণা রাখে না। রেডিও অবশ্যই সংগীত পুনরুৎপাদনের একটি নতুন কৌশল। কিন্তু রেডিও আধুনিক সংগীতের সম্প্রচারে খুব বেশি আগ্রহী নয়। বরং রেডিওর সমস্ত কার্যক্রম রেডিও-পূর্ব অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এটি পুনরুৎপাদনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সাংগীতিক মাস-কালচারের ক্ষেত্রে রেডিও গুরুত্বপূর্ণ বিরোধপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি করছে।

চতুর্থ অ্যাক্সিউমের প্রেক্ষাপটে বলা যায় প্রযুক্তিগত অগ্রসরতা সংগীতের অথবা সংগীত-শ্রবণের কোনো গুণগত উৎকর্ষ সাধন করছে না, বরং সংগীত কি রেডিও সংগীত সংস্কৃতির প্রসার ঘটাচ্ছে? জনগণের মধ্যে কি প্রত্যাশিত সংযোগ সাধন করছে। জনগণ কি সংগীত-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করছে, নাকি নিছক সংগীত-ভোক্তা হিসেবে তৈরি হচ্ছে। মোট কথা সংগীত তাদের জন্য কি ভূমিকা পালন করছে? আসলে সংগীত শ্রবণের ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংখ্যাগত দিক থেকে সংগীত সম্প্রচার বৃদ্ধি পেলেও শ্রবণের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনেকটাই চলচ্চিত্রের প্রতি তাদের আকর্ষণের মতো হচ্ছে বলে মনে হয়। যেমন, বিথোভেনের সিম্পফনি একটি সুসংহত সংগীত ধারা। এখানে সামগ্রিকতার মূল্য অপরিসীম; কোন অংশের তেমন কোন আলাদা মূল্য নেই। কেউ যদি এই সিম্পফনির শুধু মেলোডি যাচাই করতে যায় তাহলে তা অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে। সিম্পফনির পশ্চাৎপদ শ্রবণ মেলোডিকেই ধারণ করে। সে ক্ষেত্রে সিম্পফনি কাঠামোগতভাবে ব্যালাডের সমতুল্য হয়ে যায়। রেডিও-পূর্ব সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ এখন সংগীত শ্রবণ করে। কিন্তু আজকের সাধারণ মানুষের সংগীত-শ্রবণ আগের অভিজাত সংগীত শ্রবণের সাথে তুলনীয় নয়।

অন্যত্র সংগীতের সাথে ভাষার তুলনা করতে গিয়ে অ্যাডর্নো বলেন, সংগীত ও ভাষা সাদৃশ্যপূর্ণ।  সাংগীতিক বাগধারা অথবা সাংগীতিক বাচনভঙ্গি রূপক নয়। সংগীতকে আক্ষরিকভাবে ভাষা বলে মনে করা ঠিক হবে না। সংগীত একারণেই ভাষার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ যে সেখানে চয়নকৃত শব্দসমূহ শব্দাধিক অর্থে কালগত পরম্পরায় সজ্জিত। সংগীতের শব্দবিন্যাস যৌক্তিক; তা সঠিক অথবা সঠিক-নয় বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু সংগীতে যা বলা হয় তা প্রত্যাহার করার সুযোগ থাকে না। সংগীতের স্বরধ্বনি প্রতীকের মত। কনসেপ্ট না হলেও স্বরধ্বনিসমূহ এক ধরনের ‘ভোকাবল্স্’। সংগীত এক ধরনের ইনটেনশনহীন ভাষা। তবে সংগীতও তাৎপর্যবাহী ভাষা। সংগীত তার বিষয়বস্তু প্রকাশে ভাষার মতই সৎ এবং স্পষ্ট। ভাষার অর্থকরণ মানে ভাষা অনুধাবন করা, সংগীতের অর্থকরণ মানে সংগীত তৈরি করা বুঝায়। যথাযথভাবে সংগীত পরিবেশনের অর্থ হলো সংগীতের ভাষা যথাযথভাবে ব্যক্ত করা।২৫

হ্যাবারমাস অ্যাডর্নো সম্পর্কে সরাসরি কিছু মুল্যায়ন করেছেন যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য। উইলসনের বক্তব্যে তাই প্রতিধ্বনিত হয়ে বলে আমরা সেটি তুলে ধরবো :

Jurgen Habermas was a graduate student of Adorno’s Frankfurt University, he has become one of the most important interpreters of his former teacher’s work and, indeed, one of the most significant living philosophers. Despite the profound importance of Adorno toHabermas’s development, the ltter’s work, and the work of Honneth and Wellmer, is clearly conceved as a departure from central aspect of Adorno’s thinking. In particular, subsequent generations of Critical Theorists dissent from what is cast as Adorno’s overly pessimistic attitude to reason. Habermas, for instance, emphasixes this allegedly undue permission both in his reading of dialectic of Enlightenment in one of the pivotal chapters of his The Philosophical Discourse of Modernity (1985) and in hi attempt throughout his work to elaborate a social theory that will not succumb tonthose problems which are seen to damage Adorno’s thinking.

Habermas charges that Dialectic of Environment does not do justice the progressive potential ltent within modern rationality. Adorno and Horkheimer’ pessimism with regardto modern reason, habermas contends, is due to their one-sided view of it. In his voluminous The Theory of Commonicative Action and Horkheimer for having failed to pursue ‘the innerlogics of ifferent complexes of rationality’ (Habermas 1984). That is in particular, Adorno and Horkheimer do not value highly enough the potential of the division between knowledge, morals and taste.26

প্রদীপ বসু অ্যাডর্নোর সম্পর্কে আলোচনায় বলেছেন, শ্যোয়েনবার্গ একবার বলেছিনে, সংগীতের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক ততটুকুই যতটুকু সমাজের সঙ্গে দাবা খেলার সম্পর্ক। অ্যাডোনোর কাছে শ্যোয়েনবার্গের এই উক্তি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। অ্যাডোর্নো বলেন, নতুন সংগীত তার সামাজিক উদ্বেগ প্রকাশ করে তার বিশুদ্ধতার মাধ্যমে, যতি শুদ্ধভাবে সাংগীতিক গুণাবলী প্রকাশ পায়, ততই প্রবলভাবে তা সামাজিক অশুদ্ধতা ও অসুস্থতার প্রতি ইঙ্গিত করে। সংগীতের এই শুদ্ধিকরণ সামাজিক অশুদ্ধিকে ছলময় মানবিকতা দিয়ে চাপা দেয় না, যেন মানবিকতাবাদ ইতিমধ্যেই তার অভীষ্ট সাধন করেছে। অ্যাডোর্নো আরও বলেন যে শিল্পকৌশলের কঠিন রীতিনীতির জন্য যে বিচ্ছিন্নতা বর্তমান, তাই শিল্পের অন্তর্নিহিত বস্তুতে রূপ দেয়। …আধুনিক সংগীতের দর্শনে অ্যাডোর্নো লিখেছেন ‘নতুন সংগীত এই প্রচেষ্টার জন্য নিজেকে বলি দেয়। এই সংগীত নিজের উপর জগতের সব অন্ধকার, অপাধ আরোপ করেছে। এর ঐশর্য্যরে মূলে আছে দুর্দশা প্রত্যক্ষণের ক্ষমতা, এর সব সৌন্দর্য রয়েছে নিজেকে সৌন্দর্যের মায়া থেকে দূরে রাখার প্রক্রিয়ায়। এর মৃত্যু হয় অশ্রুত অবস্থায় কোন প্রতিধ্বনি না তুলেই কারণ কেউই এর সাথে সংশ্লিষ্ট হতে রাজি নয়। সংগীত যা অশ্রুত থেকে গেল সময়ের শূন্যগর্ভকালে তার পতন হয় বুলেটের মতো। আধুনিক সংগীতের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্দেশ্য হল এই শেষ অভিজ্ঞতা, যার উদাহরণ যান্ত্রিক, চিন্তাহীন সংগীত রচনার মধ্যে রয়েছে। আধুনিক সংগীতের লক্ষ্য হল বিস্মৃতি। এ হল ডুবন্ত জাহাজ থেকে শেষ হজম বার্তা।”২৭

তথ্যনির্দেশ

Adorno, Theodor 1991. “Culture Industry Reconsidered” The Culture Industry, Selected Essays on Mass Culture (Edited and with an introduction by M. Bernstein, Routledge, London, pp.55. Wvqvb e‡jb, Thus in the æCulture Industry’’ essay, Adorno equates mechanical reproduction per se with dominant illusionist aesthetic, even though he correctly perceives the functioning of the æillusion of reality” tendency of that aesthetic: “The more intensely and flawlessly his (the producer`s) techniques duplicate empirical objects, the easier it is today for the illusion to prevail that the outside world is the straightforward continuation of that presented on the screen. This purpose has been furthered by mechanical reproduction since the lightning takeover by the sound film.” Waldman, Diane 1977. “Critical Theory and Film: Adorno and ‘The Culture Industry’ Revisited” New German Critique, No. 12, (Autumn), p. 49. GQvov, Rviwf‡mi E³e¨wUI GcÖms‡M ¯§Z©e¨: Adorno’s critique of the culture industry, then, differs from an elitist defense of high art in the recognition that both ‘high’ and ‘popular’ culture are transformed and mutilated by their commodity character under monopoly capitalism. But even, those who have recognized this have nevertheless sometimes wanted to point to an emblanced in Adorno’s treatment of ‘high’ and mass culure.  Jarvis, Simon 1998. Adorno: A Critical Introduction, Polity Press, London.  p. 77

  1. 2. Shepherd, J. æSociology of Music”, in S. Sadie et al. (eds), The New Grove Dictionary of Music and Musicians,  p. 603-14
  2. 3. I‡Kvbvi G wel‡q we¯ÍvwiZ Av‡jvPbv K‡i‡Qb| †`Lyb, O’Conner, Brian 2004. Adorno’s Negative Dialectics: Philosophy and the Possobility of Critical Rationality,The MIT Press, London.
  3. 4. DeNora, Tia 2003. After Adorno Rethinking Music Sociology, Cambridge University Press, Cambridge, 9
  4. 5. DeNora, c~‡e©v³, c„. 10
  5. 6. Gillespie, S. 1995. æTranslating Adorno: Language, Music, and Performance” Musical Quarterly, 79:55-65
  6. 7. DeNora, c~‡e©v³, c„. 15
  7. 8. ‡MÖwmK e‡jb, His discussion of Bach, Schoenberg, and other composers reveal that Adorno evaluates their music in terms of composition. Unfortunately, he extends this approach to Jazz and popular music in general, and most academic textbooks suggest that this approach is all too prevalent in thinking about popular music. But these assumptions are no more appropriate for an aesthetic of jazz than an understanding of Aristotle’s poetics is for the films of Baster Keaton. Gracyk, Theadore 1992. æTheodor Adorno, Jazz and the Aesthetic of Popular Music”. The Musical Quarterly, Vol.76, No.4, p. 534
  8. 9. Rviwfm e‡jb, Adorno’s engagement with music is of particular importance to his work. By the time of his early philosophical manifestoes Adorno was already the author of a substantial body of music criticism, not only of the new music produced by the composers of the so-called second Viennese school,  Schoenberg, Berg and Weber , but also a range of other contemporary composers, such as Bartok, Krenok and Hindemith. This early work already indicates much of Adorno’s later trajectory as a music critic and philosopher of music. The primary difficulty faced by aesthetics could be seen with especial clarity in the case of criticism of contemporary music. The legitimation of avant-garde music through detailed musical analysis often relied on unelaborated or formalistic aesthetic pre-supposition, so that the genuine newness of the work had not been matched by a comparably advanced aesthetics. Jarvis, 1988.  c~‡e©v³ c„. 126
  9. 1 Witkin, Robert W. 1998. Adorno On Music, Routledge, London, p. 3

[1]1. Rviwfm e‡jb, The complaint that Adorno’s account of the culture industry lacks discrimination, however, is only one of the criticisms levelled against it. Much subsequent work has emphasized that whilst mass culture may not be popularly produced in the literal sense, the meanings and significance of cultural commodities are to an important extent producedvbybtheir cosumers rather than pre-determined by their producers,  Jarvis, 1998, c~‡e©v³ c„. 74

  1. 1 ¯y‹‡q‡cbnvDRvi e‡jb, In the framework of the philosophy of music, this is the dialectic of freedom and constraint which in Adorno’s view, is not to be idealistically dissolved through the transfiguration of constraint into an aesthetically internalized, supposedly authentic freedom. For Adorno, music does not simply mirror the socially current relation between freedom and unfreedom; it does not translate social happenings into their aesthetic counterparts. But it must be involved in what Hegel calls historical substance. Adorno writes that æBeethoven did not adapt himself to the ideology of the often-cited rising bourgeoisie of the era around 1789 or 1800; rather, he embodied its sprit. Hence, his unsurpassed success.” The ædouble character of art [as] social fact and autonomous entity” maintains in authentic works a tension between internal formal principle and social experiential content. It is a central idea of Adorno’s aesthetics that artworks can absorb social content only if they are overtly autonomous, that is, if they resist external functional constraint and obey only moods and demands emanating from the formal shaping of the material. Here too Adorno connects dialectically to Kant, specifically to Kant’s previously cited central thesis: æBeauty is the form of an objective purposefulness to the extent this purposefulness is experienced without the concept of a purpose.” Schweppenhauser, G. 2009. Theodor W Adorno: An Introduction (Translated By James Kolleston) Duke University Press, London. p.44
  2. 1 Witkin, 1998, c~‡e©v³ c„. 8
  3. 1 Thompson, Michael 2010. “Theodor W Adorno Defended Against His Critics, And Admirers: A Defense Of The Critique Of Jazz”, International Review Of The Aesthetics And Sociolology Of Music, Vol. 41, No. 1 (June), pp. 37-49
  4. 1 Bernstein, 1991
  5. 1 Witkin c~‡e©v³ c„ôv c„. 162
  6. 1 Boucher, Geoff 2013. Adorno Reframed, I. B.Taunis & Co. Ltd., London, p. 8 evDPvi Av‡iv e‡jb, Adorno’s philosophy of music represents a critical appropriation of Weber’s music sociology. In The Rational and Social Foundation of Music (1921),Weber presents the idea that music is involved in the process of rationalization characteristic of modernity medieval music was not only religiously inspired, but had a ceremonial function in religious ritual. Which lent its polyphonic fugue structures (its multi-voiced harmonies, which develop through set patterns of alteration and repetition, or ‘fugue’) a rigidly stereotyped, formulaic character. By contrast, from the Renaissance (1450-1650) through to the enlightenment (1650-1850), western European music broke with medieval formulae through the application of new, mathematical reasoning process to harmonic intervals, musical instruments and notation system. In a very period, what we know us ‘classical music’ develop the modern minor and major scales, the piano (with its fixed ’, chromatic’ semitone intervals represented by black and white keys), new string and wind its instruments, the orchestra arrangements and sonata form, double-stave notation with a commonly agreed set of symbols for notes, each of which has a fixed value, and so forth. Dominance of the ‘horizontal dimension of melody ,the succession of notes that comprises a characteristic sequence ,or motif, replaced the dominance of the ‘vertical’ dimension of polyphony , the simultaneous sounding of multiple notes in various combinations .This vertical dimension was itself restricted to a set of harmonies that can be precisely defined in mathematical terms , described by Adorno as the ‘homophonic’ sonata form’.(A paralled development in painting produced of the human from and natural world , and a break in the topics of painting from pre-set religious themes to prosaic suns from everyday life) Weber is characterised as describing this in terms of ‘the drive toward rationality ,that is , the submission of an area of experience to calculable rules ‘.His argument is that ‘this drive to reduce artistic creativity to the from of a calculable procedure based on comprehensible principles appears above all in music.’ †`Lyb, Weber, Max 1958 (1921).The Rational and Social Foundation of Music, Southern Illinois University press, New York.
  7. 1 Witkins, p.46
  8. 1 Witkins, p.21
  9. 2 †hgb, Boucher, c~‡e©v³ c„. 66-67
  10. 2 Boucher, 2013. c~‡e©v³ c„. 68
  11. 2 Witkins, page-182
  12. 2 Witkins. 2000. æWhy Did Adorno `hate’ Jazz”, Sociological Theory, Vol. 8, No. 1, 2000 pp.145-170
  13. 2 Adorno, Theodor W. 2008. Current of Music: Elements of a Radio theory (Edited with an Introduction by Robert Hullot-Kentor), Polity, London, p. 137 msMxZ wel‡q A¨vW‡b©v I Ab¨‡`i A‡bK †jLvi g‡a¨ D‡jøL¨: Phillips, Wesley 2015. Metaphysics And Music In Adorno And Heidegger, Palgrave Macmillan; Adorno, Theodor W. 1992. Mahler A Musical Physiognomy (Translated By Edmund Jephcott) The University Of Chicago Press Ltd, London; Thomson, Alex 2006. Adorno: A Guide For The Perplexed, Continuum, London; Thompson, Michael 2010. “Theodor W Adorno Defended Against His Critics, And Admirers: A Defense Of The Critique Of Jazz”, International Review Of The Aesthetics And Sociolology Of Music, Vol. 41, No. 1 (June); Kuspit, Donalel 1975. Critical Notes On Adorno’s Sociology Of Music And Art, The Journal Of Aesthetics And Art Criticis, Vol. 33, No. 3 (Spring). Adorno, Theodor W and Horkheimer, Max 2002. Dialectic of Enlightenment, Stanford University press, Stanford.
  14. 2 Adorno, Theodor W. 1993. “Music Language and Composition”, The Musical Quarterly, Volume 77, No 3, 1993 p. 4
  15. 2 Wilson, R. 2007. Theodor Adorno, Routledge, London, pp. 106-107

২৭. দেখুন, প্রদীপ বসু ২০১৪ (২০০৫), অনুরূপ কলকাতা। পৃ. ১৮৯-১৯০

******************************************************

[ট্রিলজি]

পূর্ব প্রকাশিতের পর

সমস্ত ধূসর প্রিয়
শহীদ ইকবাল
নয়ন মেলে
মানুষে মানুষে সম্পর্কগুলান আউলাইয়া যায়। যেদিন আকাশ সৃষ্টি হইছিল সেদিন বুঝি খুব ভালো বৃষ্টি আছিল না। দ-কলসের নাকফুলে কম মধু আছিল। এই স্কুলমাঠে এইবার নিয়া কতোজনের সভা হইছে— কে জানে! এখন কেউ আছেন, কেউ নাই। সাদাত, জিয়া বা ইন্দিরা মরার পর এখন চতুর্দিকে ছায়া আর ছবি নিয়া রাজনীতি শুরু হইছে। এদেশে রোদ ওঠে, নাচন ওঠে পাতার ওপর, ঝমঝম কইরা বৃষ্টি নামে আর তখন আজিজের দোকানে গফুর বিড়ির চাইতে আনসার বিড়ির কেনাবেচা খুব বেশি হয়। ওতে একপ্রকার আনন্দের ভাব গড়ে। দোকানের ওপর তখন বটগাছ থাকি টুপটাপ ফল পড়ে। সন্ধ্যার পর আলো ছাড়া রাতে ওইসব ফলের পীঠে বাদুড় কামড়ায়। কালাকিষ্টি কালছা রঙা বাদুড়। মাখনুন তখনও আস্ত বাদুড় দেখে নাই। তবে ম্যালা দিন সে ইলেকট্রিক তারে দুই ঠ্যাং দোলানো বাদুড় দেখছে। তখন চোখ ছাড়ানো দূরের কোনো অর্ধবৃত্তাকার ঝুলন্ত তারের কারসাজি দেখে। আর হঠাৎ তার কোনো এককালের এক আদুরে বন্ধুর কথা মনে হয়। ধূসর রঙে তখন অনেকবার সে ফিরি ফিরি আসে। এইরকম বিরাট কারেন্টের তারের ওপর উঠি সে মরণের শপথ নিছিল। তখন বুঝি তার এইটা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। সে ডেঞ্জার পজিশন পার হয়া বেশ উপরে উঠছিল। একসময় নীচে তাকাইয়া মাখনুনের দিকে তাকায়। অতঃপর সে কয়— ‘নানীক কোস গুলাব মরি গেছে।’— কেন সে এইসব কথা কইছিল ইহার পেছনের কারণ কী— কেউ জানে না। তবে সে অসহায় হয়া ডুকরি কান্দি ওঠে। চতুর্দিক তাকায়। কাউকে পায় না। ঝরঝর করি যখন পানি পড়ে তখন শীতের কুয়াশা চতুর্দিক ঘিরিয়া নিছিল। ঘাসের ডগায় ওস জমা হয়। সূর্য অস্ত গেলে অন্ধকারের ওপারে কিছু তার প্যাঁচায়। সে তারের ভেতর ঝিনঝিনা আবেগ জমাটবদ্ধ হয়। বাদুড় আর গুলাব কিংবা গুলাব আর বাদুড় একরকম হয়া টপাটপা ধরনের কাঁপায়। আর হঠাৎ হঠাৎ বাদুরের পতিত পোটলায় মধ্যে কী যেন দেখে সে কান্দিতেছিল। কারণ, ওটা ঘিরে আছিল অস্থির সব শুঁয়াপোকার দল। কোনো এক শাদা পচা লাশেও সে একদিন শুঁয়াপোকা পাইছিল। বুঝি সেটা অনেক আগে মটোরের তলে পড়ি কোনো মরা মানুষের গন্ধ শোঁকা শুয়াপোকা আছিল। তাছাড়া মরার বাড়িতেও নাকি শুঁয়াপোকা ঘোরে। তাই ওসব বাদ দিয়া সে তখন পাশের শিমুল ফুলের পোকাটা দেখে। তবে একইসময় সে অনেক ক্ষুধার্ত পাখিরও ওড়া দেখে, তখন তরতর করি ভোরের শুকনা রুটি মিশুদের টিনের চালোত পড়ে। তাতে কাক আসে, অনেকরকম পাখি বাসা ছেড়ে দৌড়াইয়া আসে, তখন দূরের তালগাছে বাবুই বা হলুদ ঠ্যাংয়ের শালিক গোঁ ধরি বসি থাকে— ঠোকরায়; কয়েকটা অপরিচিত পাখি বা খঞ্জনা কিংবা পেছনের দিকে ল্যাজ উঁচানো কালা রঙা চঞ্চল পাখিও পট পট করি পুরানা টিনোত ঠোকরায়, নানান ধ্বনিতে ডাকে, আনন্দে ল্যাজ দোলায় আর বিস্তর মর্মকথা কইয়া যায়। তখন খুব সতেজ রঙহীন বাতাসে, ফর্সা আলোর শিমুল গাছটার উঁচা ডালে আরেকটা কুয়াশামোড়া বাদুড়তারের ওপর মরি পড়ি থাকে। অথচ কালই বুঝি বাদুড়টা বটফল খাচ্ছিল। একটা রাত অথচ কতো সময়ের ব্যবধান! এই আলো বা সূর্যকে যতো পুনর্বার নতুন মনে হয় ততোই সে পূর্ণ ধারাবাহিক বা নতুন করিয়া কীসব বিশ্রম্ভ আনে। এরকমই আছিলেন মওদুদ বিএসসিও। মুকুল ভাইটা আলাদা হলেও খুব মায়া টানে। তাবে না মুকুল ভাই তো নয়! ঢাউস লম্বা মুকুলের কী কূল আছিল? সে কইছল কী— ‘ওসব হবানায়, ক্ষমতা ছাড়বানায়’। ‘ক্ষমতা’র বিবৃতি তার ছিল অনেকরম। যখন ডুবাপুকুরে মরা রাতে এক ভাই আরেক ভাইকে পিটায়, ফজরের ওক্তে গোয়াল ঘরোত আগুন দেয় আর হাঁটুর টাকলু ডাঙ্গে ফাটায় তখন ক্ষমতার আযান শিরিসের তল দিয়া হাঁটে। ‘ক্যা, দাউ করি আগুন নাগালি, ফির পিটাপিটিও করলি!’ তেমনই পেরসিডেন খালি বাঁশি ফুকায় আর মানুষোক জড়ো করে। নয়া মানুষ আনে। এখলাস মিঞাও আসে। সে নাকি এবারকার সার্কাসের হাতি। তাকে সঙ দিয়া সাজানো হইচে, তাই গাড়িত বসি থাকেন, গাড়ির ভেতর চকচকা বাসনাযুক্ত মানুষ হয়া গুণগুণগুণ করি ভ্রমরের আনন্দ নেয়। এখলাস মিঞা সর্ষেফুল দেখে আর ভুল শোধরায়। সেজন্য তার চেহারায় এখন নতুন রঙ। খাসা নাক। গায়ে সেন্ট। পুরানা কোলাপুরি বাদ দিয়া এখন তার কালা বুট। লম্বা খদ্দরের ওপর কটকটা সবুজ উত্তরীয়। চুলোত মেহেন্দী মাখাকলোপ। পাশে বেশ ডবকা ডবকা দুটা ফর্সা মহিলা। ওরা সম্মান করে এখলাস মিঞাক। একটু আদর দেয়, কানের রিং দোলায়, কখনোবা বিদেশি স্টাইলে পরামর্শও করে। জেডএমএলএ সাহেবও বেশ নরোম সুরে তাকে কাছে তুলি নেন। সেখানে পেছনে ম্যালা গাড়ি, বুঝি ধোঁয়া ওড়ে না বালু ওড়ে… কৃষ্ণচূড়া, কাঠালীচাঁপা, কামিনীর তীব্রতা ঘটায়; তবুও তো আর তার ধুলার দিনে ফেরা হয়না। মানুষগুলা বদলায়া যায়। পাওয়ার আর পিরিতি কীরকম পাল্টায়। এখলাস চাচা এখন এখলাস সাহেব। বেশ আনন্দ নিয়া কথা কন। অথচ এই তো সেদিন কতো নীতিকথা নিয়া জেল খাটলেন! যখন-তখন সেন্ট মাখেন আর ম্যালাগুলা আংটি হাতোত দিয়া কন, মিনিস্টার না হতি পারলে আর সরকারি দল কেন? নেতাকে ঠিকঠাক না রাখলে কীসের রাজনীতি আর কীসের দেশ! মাখনুনের এগুলো সহজ কথা মনে হয় না। তার বকুল ফুলের গন্ধকে মনে হয় ক্যাপস্টেন সেকারেটের গন্ধ। বিস্বাদ লাগে। সেকারেটের প্যাকেটগুলা রোশনাই ধরা। ওর দাম অনেক। সেদিন বিশু, মহি, আসাদ, পল্টু, মন্টু বেশ দান মারছে। ওদের কাছে এখনও অনেক কে-টু, সিজার, ক্যপস্টেনের প্যাকেট আছে। স্টার আর ব্রিস্টলও আছে। দান কম। ভোটের জন্য এখন অনেক ক্যপস্টেনের প্যাকেট পাওয়া যায়। ঢাকার মানুষগুলা ওসব খায় খুব! সেদিন এখলাস মিঞার পক্ষে ভোট চাইতে চাইতে সেই মোটা মানুষটা খালি সেকারেটে টান দেয় আর ফেলায়া দেয়। ‘এতো ট্যাকা পায় কোটে’— বিশু কয় শালা গোয়াত চর্বি কতো দেখ! ঠা-া গাড়ির ভেতর ফর্সা ফর্সা মোটা মোটা মাগি তাক নিয়া ঘিরি বসে। এটা নাকি জেটএমএলএর লোক। কোনোদিন এখানে তাকে দেখা যায় নাই। সে এখন এখলাস মিঞার এক নম্বর লোক। এখন এখানে অনেক ফেউ। ভোটের বাজার বেশ গরোম। অনেক পোস্টার আর ব্যানার দিয়া এলাকাটা ভরা। কতোদূর থাকি মানুষ আসে আর কী কী সব প্লান করে— কে জানে! তবে এখলাস মিঞা এখন বেসুমার ব্যস্ত। পিছে পিছে অনেক লোক যখন ঘোরে তখন সে ধর্ম-মন্দির-মসজিদ নিয়া কি কি কয়। সমস্যার বিস্তর সমাধানে তিনি যেন আঙ্গুল দাপানো পোষা কুত্তা, এক সময় বলেন— এলাকায় একটা আনন্দনগর গড়া দরকার। ওখানে তরুণ-তরুণীদের থাকার ব্যবস্থাও হবে। বিনোদন হবে। তোদের ম্যানেজার বানাবো আর দেখাশুনার জন্য কিছু কাজ করা হবে। সিনেমা হল বানানোর চেয়ে এটাই ভালো হবে। এর মাঝে বকুল নামের একজন তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সে বুঝিয়ে বলে ‘খাস জমি তো মেলা, ঘিরি ফেলালেই হলো’। কথাটা আর বেশিদূর নয়— মনে মনে ফন্দী আঁটে আর হাতের রিং প্যাঁচায় এখলাস মিঞা। মগোজে ঘোর লাগে। শর্ষে ফুল ঠিক চোখে পড়ে না, মনের বৃষ্টিতে হলুদাভ হাওয়া দোলে। তুমি বনফুল গো! তপ্ত জীবনের ভেতরে ফুরফুরা শীতল হাওয়া জুড়িয়া দেয়। তবে সে সেদিন পথচলতি ভিটার পাশে দেখিয়াছে যথারীতি পূর্বের ন্যায় অনেকের কব্বরে লাল ফুল ফুটি আছে। দ-কলসের অনেক চারা তখন এলোপাথারি মাথা দোলায়। শান্ত, মায়াভরা সে কব্বরের নীচে গায়েবী হয়। গরুটা কান দোলায়, ঝাড়ি দিয়া পাশের আখিরার দিকে শুনশান তাকায়া থাকে। আর কী রকম সব গাছ ঝুম মারে। তখন মাখনুনের এখলাস চাচার স্বভাবটা গুরুতররূপে কণ্ঠরোধ করে। পোশাকে-চলনে তার যে গতি তাতে চোখ-কান-মাথা খরাদাহে কর্কশ, কুণ্ঠিত। হাতের রগ ফোলা থাকে। কৃত্রিম তেজে গলার রগ কামড়ায়। কলোপ করা চুলে রুক্ষ্মতা তখন প্রকাশ্য। এই কিনা এখলাস মিঞা! কয়দিন আগেওনা— বিপ্লব না কী সব কয়া গালাগাল করছিল। সে এখন সব্বার কোমল বন্ধু। এখন এলাকাটায় বেশ জমাট অন্ধকার। ভোট ভোট গরমে চতুর্দিক কাঁপে। টপ করি বিজলী চলি গেলে আন্ধারের ভেতর কয়টা হারিকেন জ্বলে। তখন প্রহরী হ্যাজাক জ্বালানোর কাজে তৎপর হয়। কেরসিনের হারিকেনের আলোটা তখন মধুরঙা। সকলের মুখ অস্পষ্ট কালচে লাল। এলেকট্রিক লাইটের অভাবে থিকথিকা গরমে মাখনুনের আজ পড়ালেখা হয় না। সে অলস হাওয়ায় ঘোরে। স্বপ্ন বোনে। জীবনের অন্ধকার ছিনিয়া উদ্ধত হয়। কোন এক বাড়ির রমণীর শরীর আসিয়া ধরা দেয়। সেদিন সে মেয়েটির কোটি পেরুনো উন্নত সানুদেশ দেখছিল। তখন এক বিদ্যুৎ উত্তাপ তার চোখ ও শিরায় দমকা দিয়া ধরে। তারপর ওই কলাপাতার বুক-পীঠ কিংবা সদ্য পারুল ফোটা চিক্কন গাছটার মায়া তাকে বিতাড়িত করে না। এই অন্ধকারে পাশের জানালায় সে দাঁড়াইয়া যায়। জানালার ওপার তখন ফিঙ্গে নাচে, স্যাতস্যাঁতে ভঙ্গুর পুরানা প্রাচীরে ঠোকরায়। কিন্তু ভেতরে গমগম আওয়াজ আছে। বুঝি ভেতরে লুকানো কারো পদধ্বনি! কিংবা কঠোর আঙুলের মৃদু পদপাত। চরম প্রতিধ্বনিত মায়ার এ যেন করুণ বাতাসের বি¯্রস্ত বিসর্জন। মাখনুন হাঁটে, উন্মুক্ত প্রান্তরের টাটকা হাওয়ায় শরীরের আনন্দ প্রশমিত করে। বাইরের হাওয়ায় প্রশ্বাস ঘন হয়ে উঠলে দূরে কোনো গাছে পাখির ডাক শোনা যায়। শরীরে উষ্ণতা বাড়ে। কান পেতে রয়, কোঠা ঘরের নরোম শব্দের জন্য। মনের আয়নায় বিম্বময় থাকে স্কুলবারান্দায় হাঁটা ভরা বুকের শক্ত প্লাবনধরা মুখ। শাদা চোখ-পা-পাতলা জামার রঙ ঘিরে থাকে। পাখির শব্দ তখন দুর্বল। বেষ্টিত প্রাচীরের বাইরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাখনুন যখন কোটাঘরটার জানালার আলো দেখে— তখন মেয়েটির ওই মুখ আর বুক ছায়া দেয়। ঠিক চরম উষ্ণতা নিয়া শরীরটা আরও ঘিরি ধরে। মাখনুনের তখন স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের কথা মনে হয়। সবাই যখন স্যানড্স অব ডী বা উমর ফারুক আবৃত্তি নিয়া ব্যস্ত— তখন সে টাটকা টাটকা মেয়েটির বুক মাথায় রেখে সুখ পাওয়ার চেষ্টা করে। তবে এখন সে কী করবে! ফন্দী খোঁজার চেষ্টায় যখন নিমগ্ন তখন বিদ্যুৎবিহীন রাস্তায় কালো অন্ধকার দিয়া কে যেন ফটফট করে হাটি যায়। বিড়ির আগুন হাতে হনহন আওয়াজ করে। একজন যায় আবার অপরজন আসে। তখন মাখনুনের ভয় বাড়ে। লজ্জা পায়। সে কেন এখানে দাঁড়াইয়া? হস্তপদ ঠা-া হয়। ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎ আসিয়া গেলে সে হতাশাগ্রস্তও হয়। কেরসিনের ঘোলা আলোয় এখন বিদ্যুৎ ধরিয়াছে। সেখানে সে পরাজিত না পরাস্ত— ঠিক জানা যায় না। তবে মেয়েটির ঘোর এখনও কাটে নাই। সে তাহার ভারী স্তন নিয়া ধৃত, পাশের আলো এখন আর টিমটিমা না হলেও কিছু মনে হয় না, বুঝি হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায় তার। ইলেকট্রিক আলোটা বড় হলেও প্রাচীরবেষ্টিত কোটাবাড়ির চারদিক দাঁড়ানো আম-কাঁঠাল-বাতাবীর ঊর্ধ্বমুখি শাখা দিয়া আলোর ঝালোর উল্কি কাটে। সে উল্কি পায়ের তলায় হামাগুড়ি দেয়। বাইরের অনুসন্ধান তখন বিচ্যুত হয় কিন্তু মগজের অনুসন্ধান স্থিরভাবে টিকি থাকে। গোটা শরীরে মেয়েটার আঘ্রাণ রচিত হয়। এ রচনায় চোখ-গাল-চুল-নিতম্ব-পায়ের গোছা আর আজানুলম্বিত শরীর মিশি যায়। তখন অনেকগুলা মুখ সারি সারি দাঁড়ায়। পুরানা স্কুলের সেই কাজীর বাড়ির ম্যায়া, প্রভাতফেরী করা ফুলগোঁজা রীনা আপা কিংবা সেই কুলতলার বড় দোতলা বাড়ির বাড়ন্ত ম্যায়া। কেউ পর হয় না। সম্মুখসারিতে আসিয়া দাঁড়াইলে মাখনুন তাতে বিলীন হয়। তার পায়ের ধুলা আর উল্কিকাটা ছায়া-সরোবর ভরাট আবক্ষ বানায়। সে পেছনের অন্ধকারের দিক লুকায়। অনেকেই ঘিরিয়া ধরিলে লজ্জা চাপিয়া আসে। শরীরে ঠা-া বাতাস বয়। রাত কখন যেন গভীর হইয়া গিয়াছে। ঠিক সম্বিৎ ফিরিয়া আসা নয়, স্কুলপাশের শপ্রিগাছের নীচে ছোট্ট নতুন কালভার্টে বসিয়া পড়া। যখন হস্তমৈথুনের প্রস্তুতি নেয় তখন কয়েক গজ দূরে চালকলের কে একজন টর্চ ফিকায়। দুড়দাড় আওয়াজও আসে বাম দিক থেকে। দেওয়ালে পোস্টার লাগানো অনেকের অংশবিশেষ দেখা যায়। তবে সময়ধারায় সবকিছুর অবসান হলে তখন আন্ধারে মেয়েটার ছবি মস্তিষ্কে আবার আসন নেয়। অস্পষ্টতা বাড়তে থাকলে স্থানবদলপূর্বক মাখনুন শিরিসতলার নিরাপদ স্থানে যায়। যেখানে একদিন খকসো কিংবা বিশু কিংবা ডুবাপুকুর গ্রামের কে যেন শিশ্ন ঝাকাইয়া দ্রুত পৌরুষ দেখাইয়াছিল। তবে তাহাদের তখন বিয়ার বয়সের লক্ষণ আছিল। তয় মাখনুনও বিলক্ষণ বুঝি সেখানেই দাঁড়াইয়াছে। সে মাগি মানষের তালে পড়ছে। এবার পীঠের চামড়া থাকবে না। তাই টর্চ লাইটের ভয়ের চেয়ে নিজের ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। মোড়ের বটতলায় তখন সদ্য রিলিজ পাওয়া নসীব সেনেমার গান বাজে। দিলে শরম লাগা উহু-আহার টোনে মাখনুন অবদমিত হয়। সে বটতলা ছাড়িয়া অন্ধকারের ভিতর দিয়া বাড়িতে আসিয়া ঢোকে। পুরানা দালানে হেলান দিয়া বাড়ির সকলেই তখন নতুন রেডিওর নব ঘুরিয়া চলছে। ভোটের খবর বিষয়ে কীসব কথাবার্তা চলে। সেখানে এখলাস চাচার প্রসঙ্গ বড় হয়। কুমেদপুর, ডুবাপুকুর, বাঁশখালি, পতœীচড়া প্রভৃতি এলাকায় ভোটবাক্স যায়, স্কুলমাস্টাররা এসব ভোটকেন্দ্রের অপিসার হলে মাখনুনের বাপের সেখানে যাবার প্রস্তুতি শুরু হয়। খোঁজখবর রাখা আর নিরাপত্তা-নিশ্চয়তার মাঝে সকলের মতো মাখনুনের বাপেরও সরকারের অনুগত কথাবার্তাই মুখে গুরুত্ব পায়। অন্ধকার হলেও বাইরে তখন অনেক মানুষ গমগম করে। শর্ষে ক্ষেতে, ধানভরা ডুলির পাশে, পলের পুঞ্জের ওপাশে, ঘন বাঁশঝাড়ের নীরবতায় আর অনেক সার করা পাতাছায়া বাড়ির পিড়ালীর শীতল নিথরতায় বাতাসে হল্লা তোলে। মানুষের ভেতরে চকচকা হয়া এখলাস কমরেড দিনরাত গলা বাড়ায়, হাত নাড়ে। হাতের ওপর চিকনাই জ্বলে। দরবেশি আংটি ভেতর থাকি আলো চকমকায়। তার কণ্ঠে মেলেটারির গুণগান। প্রসঙ্গক্রমে আইয়ুব শাহীর রেফারেন্সও আসে। সরকারি লোক হিসেবে তিনি আগের মতোই নানারকমের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়া চলেন।

পূর্বাচলের দিগন্ত ঘিরিয়া যখন তুমুল বাতাস ওঠে, একটা ঝড়ের সংকেত ঘনাইয়া আসে। পাড়ার টোলঘরের দোকানে ঘোলা বাল্বের দুলুনি ওঠে। তখনও বই ভাঙ্গেনি। বুঝি আরও বিক্রির নেশায় ভয়েস অব আমেরিকার পরিক্রমা চলে। বটতলায় টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে। ভোটের পোস্টারগুলা রঙ বদলায়। কে যেন বলে বাতাস বাড়ছে। তাড়াতাড়ি হাঁটো। একসঙ্গে বজ্র-বিদ্যুৎ রোষানল তোলে। ভোটের বাজারে এ বাতাসের দর আলাদা। কিন্তু তার আগেই বজ্র আর দপ করা নিভন্ত আলোর ভেতরে বাদলা ঝরা পরিবেশ নতুন রূপ নিয়া দাঁড়ায়। রাস্তার ওপরের বড় কৃষ্ণচূড়াটায় তখন অসহায় দুলিয়া ওঠে। অন্ধকারের সঙ্গে পাগলা হাওয়ার ঝড় চতুর্দিক ঘিরি ধরে। এ পরিবেশে মাখনুনের বাপ বিব্রত হন। দ্বিধায় পড়েন। ভোটকেন্দ্রের উদ্দেশে কালকের রওনা কেমন হবে? এ ঝড়ের পরিণতি রুধিয়া দেয় সমস্ত উদ্যমতা। কিন্তু সরকারের আদেশ, তাও আবার মেলেটারিদের কায়-কারবার ঠিক নিজে নিজে যেন বিপদাচ্ছন্ন বচসায় নিপতিত হয়। মাখনুনের ঘুম ভাঙিয়া যায়। দমদম আওয়াজে চতুর্দিক লোপাট। মড়মড় আওয়াজ আর কড়াৎ কড়াৎ শব্দ চতুর্দিক তখন হামাগুড়ি দেয়। বাইরের আমগাছটায় কী এক শব্দ হয়, বুঝি কোনো ভাঙ্গনের আওয়াজ। হতে পারে সওদাগরের জাহাজ ডুবির আওয়াজ। সর্বস্ব হারানোর অভিশাপ। কিন্তু সে অভিশাপ কেন শুধু হামাগুড়ি দিয়া সাধারণের হয়, কেন তা বড়লোকের নয়। মাখনুনের মগজে যখন এসব বিলোড়ন আসে তখন এখলাস মিঞার ভোটে যে শাপে বর কিছু হতে পারে তা অনেকেই ধরিয়া নেন। বিপর্যস্ত ধানের ক্ষেত আর ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ভোটের মধ্যে না ঢুকিয়াই কাগজে-কলমে ভোটের অধিকারী হইবেন— এ আর নতুন কী! ওখানে সহজেই সব অধিকার পয়দা হইবে। বর্ষণমুখর কামিনী নিঃশব্দে রহিয়া যায়। আর অনিশ্চিত ঘুম আসিয়া রূপদিয়ার চতুর্দিক ছাইয়া ফেলে। তবে বিরূপ প্রকৃতির ধ্বংসাবশেষ চিহ্ন রূপদিয়ার প্রতিটি স্থাপনায়— রাস্তায়, দেয়ালে, টিনের চালায়, বড় বড় গাছে রহিয়া যায়। কোথাও কোথাও কান্নার আওয়াজ আসে। কেউ কেউ অসহায় হইয়া এখলাস মিঞার নিকট ধর্ণা দেয়। আশ্রয়ও চান। আরও কন ভোটোত সকলের দোয়া থাকপি। মাখনুন যখন এখলাস মিঞার এসব কা- দেখিয়া ফেরে তখন তার বাপ কাটাদুয়ারের উদ্দেশে সাইকেলে রওনা হন। সাথে কে যেন আরও দুই মাস্টার। তবে সরকারি মার্কার এখলাস মিঞা আশীর্বাদের কিনারা স্পর্শ করেন। সর্বত্র গিয়া তার সাগরেদের দল আশা আর ভয় পুঁজি করে। এমনটা বলে যে, ‘জেটএমএলএর বাড়ি না খালে কামডা ঠিক মতো কইরেন বা…’— নোফফার মামা আসিয়াও সেদিন একই গপ্পো মারছিল। আর বিশু কিংবা রিপন আরও জোব্বার, খড়কু গাছুর ভাই সগ্গলেই— বেশ করিয়া এখলাস মিঞার সুসংবাদ গায়। হায়! ক্যমানে সে সেদিন বুড়া কুত্তাটা বেহায়া মাগির গাওত হাত দিয়া হাসাহাসি করছিল!— তাই কি-না এতো আদরের মানুষ! ঝড়ের মধ্যেই আজ তার বাড়তি শোডাউন হবি। কিন্তু এখন তো মানুষ কান্দোনে ব্যস্ত। গরোম গরোম ভোট অফিসোত কে কে যেন চাল নেয়, আটা নেয়— আর লাইনোত দাঁড়ানোর কথা কয়।

নয়ন মেলে ভুবন দেখা কঠিন। সত্যমিথ্যা, ছলনা আর অবিশ্বাসে ভরা সবটুকু জেবন। মওদুদ বিএসসি আজ কী কইতেন— তার চায়া বড় প্রশ্ন ফৌজি মেলেটারি তার প্রার্থীদের পায় আর কেউ পায় না কেন! তবে কী আবার আইয়ুব মার্কা কিছু হতে যাচ্চে! তাইলে দ্যাশ স্বাদীনের কী দরকার আছিল? অনেকগুলা ২টাকা দামের ভিউকার্ডে তখন ভীড় করে কী কী সব দেখা চলে। রঙীন রঙীন ভিউ কার্ড। অমিতাভবচ্চন, শ্রীদেবী, টাবুদের সব চকচকা ছবি। সেদিন মাখনুন মিশুর হোটেলের টেবিলের নীচে অনেকগুলা দেখেছে। অনেক বড় ক্যাসেটের সাথে দ্রিম দ্রিম আওয়াজ আর শ্রীদেবীর ভিউকার্ড নিয়া অনেকের মধ্যে খারাপ খারাপ কথা চলে। কথার পীঠে যখন অনেক কথা তখন মাখনুনকে বিশু ডাকে। হাতে তার কী যেন আছে! বুঝি আজিজের দোকানে নতুন আসা শীনটার মতোন লম্বা মোর সেকারেট। এদিকে এখলাস মিঞা মাখনুনোক ডাকে। ‘ওইডা কী?’— ‘তুই কোন ক্লাসে উঠচিস!’ মাখনুন তখন আগের কেনা শেখ সাহেবের, মাওলানা ভাসানীর ছবি দেখায়। বলে, ওসব কোথায় পাস? আমার নেতার ছবি নাই— বলার পর সে আব্দুল গফুরের কসমেটিক্স দোকানের চৌকাঠে পা দিয়া কয়, কী মিঞা— আমগো নেতার ছবি কই! ভোট দিছ? সামনের দিন আনবা তো! মাখনুন তখন হাসে। তবে স্মৃতিসৌধ কিংবা অপরাজেয় বাংলার ছবি নিয়া সে কয়, এগুলা স্বাধীনতার প্রতীক… ওসব জায়গায় গেলে মন ভরে যায়। মস্কোর কথা মনে আসে। কিন্তু বড় বড় বৃষ্টির ফোটা শুরু হলে এখলাস মিঞা উঁচা গাড়িত চড়ি চ্যালাদের নিয়া পবনপুর যাওয়ার তাগিদ দেন। সেখানে নাকি গোলমালের আভাস। চেলারা গুণগুণ করি কানাঘুষা করে জেডএমএলএ সাহেব নাকি ওখানে কী কাজ করার কথা! কিন্তু এলোমেলো হাওয়াতখন কেমন এক গরোম পরিবেশ পয়দা করে। চারদিক সূর্যের আলো ঝাঁঝাঁ করে ঠিকরে পড়ে। বৃষ্টির ফোটা দড়দড় করে। কিন্তু তখনই বেশ ঝনঝন করা আওয়াজে মাইকের ধ্বনি ঝাপাইয়া আসে। আসিতেছে… আসিতেছে… সুলতানা ডাকু, জাভেদ ও রোজিনা অভিনীত এরপর আর কিছু ভালো লাগে না। তখন মাখনুন পোস্টারের দিক তাকায়। নায়িকার কালারমার্কা গাল আর বুক-পেটে চোখ ধরে আসে। পোস্টারের কোণায় লেখা আংশিক রঙীন। এই রঙীনে কী আছে ঠিক জানা নাই। তবে সাদাকালো আর রঙীনের পার্থক্য তার কাছে ধোঁয়াশা থাকে।

******************************************************

শেষ পাতার আহ্বান

জীবন রঙিন বসন্তেরই ইতিহাসে …
স্বপ্ন আর বসন্তের যোগ অবিচ্ছিন্ন। বসন্ত রঙ্গীন, স্বপ্নীল, চিরতারুণ্যেরও। অস্তরাগের আলোর মতো স্বপ্নসাধ্যময়। কোনো বয়সে এসব বাঁধা যায় না। চলেও না। কারণ, জীবনের উপভোগ তো নির্ধারিত বয়সের সীমায় কখনো আটকায় না! লেখকরা যৌবনের প্রলুব্ধতা তৈরি করেন। স্বপ্নকে বোনেন। নির্ধারিত তারে ছন্দ দিয়ে জীবনকে সাজানোর বরণ ডালা রোপণ করেন— প্রত্যেককের জন্য, প্রতিটি মানুষের জন্য। এই সত্যটুকু নিশ্চয়ই কোনো তারুণ্যের এবং যৌবনেরও। স্মৃতি, স্বপ্ন আর ন্যায়সত্য দিয়ে গাঁথা হয় মুদ্রা-শব্দ। তাই তো সে চলে শব্দ নিয়ে বহুদূর, সকলকে নিয়ে। আর প্রত্যেককের জীবনের মধ্যেই আছে এসব উল্লাসের আখর! লেখক প্রত্যেককের জীবনকে নিয়েই এমনসবের ঘোষণা দেন। তাই এমন এক পৃথক ঘোষণা এখানে তৈরি হোক…

পরবর্তী সংখ্যায়

ই-যোগাযোগ : shiqbal70@gmail.com

ফোন : ০১৭২৪-৮৬২০৬৯ ॥ এ বিষয়ে লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রি.


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা