ff

নি য় মি ত — বি ভা গ

বড়ো প্রতিষ্ঠান তাদের বৃহৎ পাঠকবর্গকে
আমার লেখা থেকে বঞ্চিত করেছে...

সাধন চট্টোপাধ্যায় (জ. ১৯৪৪ খ্রি.)
সাধন চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

[১৯৪৪-এ সাধন চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম বাংলাদেশের বরিশালে। পড়াশুনা পদার্থবিদ্যা নিয়ে। হঠাৎই সাহিত্যজগতে প্রবেশ। ১৯৭০ সালে প্রথম উপন্যাস প্রকাশ ‘অগ্নিদদ্ধ’। এখনও পর্যন্ত পঁচিশটির মতো উপন্যাস, ছশোর কাছাকাছি ছোটগল্প এবং চারশোর অধিক প্রবন্ধ লিখেছেন। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘জলতিমির’, ‘মাটির অ্যান্টেনা’, ‘গহীন গাঙ’, ‘পানিহাটা’, ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে’। গল্পগন্থের মধ্যে ‘বাছাই ৪৯’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘গল্প সমগ্র ১ এবং ২’, ‘গল্প ৫০’ প্রধান। প্রবন্ধগ্রন্থ ‘কথাপট’, ‘সময়ের সাত-পাঁচ’,‘অক্ষরে বদ্ধজীবন’ প্রভৃতি। সম্পাদনা করেছেন ‘নীললোহিত রবীন্দ্রসংখ্যা’, ‘বৈশাখী’, ‘তারাশঙ্কর সংখ্যা’, ‘শূন্য দশকের গল্প’, ‘দেশভাগের গল্প’, ‘অসীমান্তিক’ ইত্যাদি। পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বঙ্কিম পুরস্কার’, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শরৎস্মৃতি স্বর্ণপদক’, ‘নাগ-পাশ’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসেবে ‘বি.এফ. জে. এ পুরষ্কার’। সম্মানিত ও সম্বধিত হয়েছেন নানা প্রতিষ্ঠানে। এ হেন লেখকের সঙ্গে আড্ডার আসরে মোস্তাক আহমেদ— সাধন চট্টোপাধ্যায় এখানে অনেক বেশি অকপট।]

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মোস্তাক আহমেদ

মোস্তাক আহমেদ : সাধনদা, শুরুতেই জানতে চাইবো আপনার জন্ম, শৈশব, বাল্য, কৈশোরের কথা— পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের কথা

সাধন চট্টোপাধায় : আমার জন্ম ১৯৪৪ সালের ১৮ জানুয়ারি, বরিশাল জেলার অখ্যাত একটি গ্রাম শোলনাতে। গ্রামটি ছিল মাধবপাশার জমিদারদের অধীনে। আমরা চট্টোপাধ্যায় পরিবার বিশাল লম্বা একলপ্তে অনেকটা জমি কেন্দ্র করে, নানা ভিটায় আত্মীয় স্বজন ও জ্ঞাতিরা ছড়িয়ে থাকতাম। মাঝখানে, বিশাল ফুটবল মাঠের মতো এজমালি উঠোন ছিল।

আমার ঠাকুরদাদা বরদাকান্ত চট্টোপাধ্যায় উত্তরের ভিটায় থাকতেন বলে, আমরা চিহ্নিত হতাম উত্তর ভিটার পরিবার হিসেবে। ঠাকুরদার দুই বিয়ে। প্রথম পক্ষে এক ছেলে এক মেয়ে। দ্বিতীয় পক্ষে তিন ছেলে এক মেয়ে। তখনকার যৌথ পরিবারে সৎ ভাই, সৎ বোনের কোনো ফারাক থাকত না।

আমার বাবা রমণীকান্ত চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সর্ব-কনিষ্ঠ। ফলে আমার কোনো কাকা, নেই। তিন জ্যাঠা। আর দুই পিসি। ছোট পিসি অল্প বয়সে বিধবা হয়ে এক পুত্র নিয়ে পাকাপাকি আমাদের পরিবারের একজন হিসেবে থাকতেন।

বাবা কলিকাতা এবং বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সিভিল কনট্রাকটরের নানা ফার্মে কাজ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বর্ধমানের পা-বেশ্বরের এক জোতদার বন্ধুকে নিয়ে ছোটখাটো একটি ফার্ম গঠন করেন। পানাগড় এয়ার বেস তৈরির সময় বেশ কিছু কাজে চুক্তিবদ্ধ হয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। কাজের চাপে বাবা তাঁর সেজদা অর্থাৎ আমার সেজো জ্যাঠাকেও ঐ ফার্মে নিয়ে আসেন। পানাগড় তখন গভীর জঙ্গলে ঠাসা। সেজো জ্যাঠা ওখানেই কর্মরত অবস্থায় ম্যালেঞ্জাইটিস ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। দেশেভাগের পর, যৌথ পরিবার ভেঙ্গে গেলে সেজো জ্যাঠিমার তিন পুত্র ও তিন কন্যার দায় দায়িত্ব বাবই ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলেন। বহুদিন আমরা একসঙ্গে থাকতাম। এমনকি, বিধবা জ্যাঠিমা পরিচর্যা ও ¯েœহ-ভালোবাসায় আমি বড়ো হই। তিনি আমাকে সন্তানের চাইতেও বেশি ভালোবাসতেন।

যুদ্ধ থেমে গেলে, ক্যাবিনেট মিশন কিংবা দেশভাগের খড়্গ জাতির কপালে ঝুলতে থাকলেও, বাবা তাঁর পার্টনারের সমস্ত অনুরোধ উপেক্ষা করে, দেশের বাড়ি গিয়ে জমি-জমা, কন্ট্রোলের দোকান, পুকুর কাটানো, বাগান কেনা— পায়ের ওপর পা তুলে বাকি জীবন কাটাবেন বলে পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ করেন। হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ায় দেশের বাড়ি— আমাদের শত্রু সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাবা প্রাণনাশের ভয়ে রাতের অন্ধকারে আমাদের নিয়ে পালিয়ে আসাতে বাধ্য হন। সব সম্পত্তির দায়-দায়িত্ব অর্পণ করে আসেন কালু খাঁ নামক জনৈক সহচরের কাছে। মজার কথা, আজও তার বংশধরেরা আমাদের সকল সম্পত্তি যথারূপে রেখে দিয়েছি। আমি তিন বছরের বালক অবস্থায় গ্রাম ছাড়লেও, আজও চোখ বুজলে ধূসর কিছু কিছুু ছবি, বন-জঙ্গল, পথ-ঘাট, আদি বৃক্ষসকল দেখতে পাই।

মোস্তাক আহমেদ : জীবনানন্দ জন্মেছিলেন বরিশালে, আপনিও— কেমন অনুভূতি হয় এ বিষয়টি ভাবলে? আপনার সেই ছোটবেলায় জীবনানন্দকে কখনও দেখেছিলেন?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : অনেকেই আমার দেশ বরিশাল শুনে কিঞ্চিত আশ্চর্য হয়। ‘আইতে শাল, যাইতে শাল/ তার নাম বরিশাল’— বরিশালের মানুষ নাকি খুব প্যাঁচালো ও মারকুটে হয়। আমার মধ্যে দুয়ের কোনো পরিচয় চিহ্ন না পেয়ে, একটু হতাশ হয়। তখন আমার মনে পড়ে জীবনানন্দ দাশ বা অশ্বিনী দত্তের কথা। এমন অনুভবপ্রবণ ও শুদ্ধ চেতনার মানুষ যে জেলায় জন্মেছেন, সেখানকার মানুষ সম্পর্ক নির্বিশেষে এমন প্রবাদ তৈরি হয় কীভাবে? আসলে, ‘শাল’ মানে বাঁশ বা গোঁজ নয়। ওটা হবে আইতে সাল/যাইতে শাল। বাংলা প্রেসিডেন্সির মধ্যে বরিশাল একমাত্র জেলা— যেখানে রেললাইন পাতা যায়নি। খাল-বিল-নদীতে জলে জল। তাই ওদেশে যেতে এক বছর, ফিরতেও এক বছর। আইতে সাল/যাইতে সাল।

জীবনানন্দ ৪৬ সালে বরিশালের বি.এম. কলেজের অধ্যাপনা যখন ছেড়ে দেন, আমার বয়স তখন দুই। তাঁকে দেখবার প্রশ্নই ওঠে না। দেশভাগের পর আমরা জলে শ্যাওলার মতো ভেসে ভেসে কখনো সেন্ট্রাল প্রভিন্স (বর্তমান ছত্রিশ গড়), বর্ধমান— আসানসোল কাটিয়ে ৫৩ তে আসি সোদপুর। ৫৪ সালে জীবনানন্দ দুর্ঘটনায় মারা গেলেন যখন, তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

মোস্তাক আহামেদ : উদ্বাস্তু সমস্যা বাংলার ক্ষেত্রে এক বড়ো সমস্যা, দীর্ঘদিনের সমস্যা। আপনিও জন্মেছিলেন ওদেশে… তারপর মির্জাপুর স্ট্রিট, মদ্যপ্রদেশ, আসানসোল, সোদপুর… শিকড় খোঁজার লড়াই। কীভাবে অতিক্রম করেছেন সেসব লড়াই বা ক্রাইসিসকে?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : সত্যি বলতে, জীবনের দশ-বারো বছর পর্যন্ত দেশের কোনো জাতীয় সংকটকে ব্যাপক অনুভবের বাস্তবতা জন্মায় না। বাল্যের রহস্য, রোমাঞ্চ, কাল্পনিক ছেলেমানুষির মধ্য দিয়েই জীবনের পর্বটুকু অতিক্রান্ত হয়। আজ চোখ বুজলে টের পাই, মির্জাপুরের সংসারে জ্যাঠামশাইয়ের ঘাড়ে ওঠার জন্য উদয়াস্ত কীভাবে সংসার-প্রদীপের সবটুকু তেল-কালি নিঃশব্দে বইতে হয়েছিল। আসানসোলের বুধাডাঙ্গা অঞ্চলে থাকতাম। চারপাশে আগুরি বা স্থানীয় উগ্র ক্ষত্রিয়দের বাস। খুবই মারকুটে, হিং¯্র। মাঝে মাঝে ওরা আমাদের রেইড করত। গাছে চড়ে খেলছি বা ছোটাছুটি করছি— হঠাৎ চারপাশ থেকে ঢিল ছুঁড়ল বা চাকা চালানোর দ-টি দিয়ে শপাং করে আঘাত। প্রতিবাদ করা যেত না, তাহলে শাস্তি বেড়ে যেত। আমাদের অপরাধ, আমরা বাঙাল, ও অঞ্চলে মাইনরটি সে সেময়। যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম, সেখানে আগুরি মাস্টারমশাইরা ছিলেন। আমায় ভালোবাসতেন, কিন্তু মাঝেমধ্যেই রসিকতা করতেন ‘বাঙাল মনুষ্য নয়, উড়ে এক জন্তু/ লাফ দেয় গাছে গাছে, লেজ নাই কিন্তু।’ আমাদের ওপর এভাবেই কিছু কিছু মানসিক টর্চার চলত। খারাপ লাগলেও, ও বয়সে ভুলে যেতে সময় লাগত না।

কিন্তু দেশভাগের অন্যান্য জ্বালা বিশেষত দারিদ্র্য, শ্রম, অনিশ্চিতয়তা, স্মৃতিতাড়না থেকে আত্মপরিচয়ের সমস্ত সংকটে আমার বাবা-মা-দাদা-দিদিরাই বেশি আক্রান্ত হয়েছে, বড়ো হয়ে যখন এসব বুঝতে পারি, বেদনা আরও বৃহৎ চেহারা নিয়ে মনকে আঘাত করে।

মোস্তাক আহমেদ : লেখালেখির জগতে ঠিক কীভাবে প্রবেশ? কবে? কোনো অনুপ্রেরণা কী কাজ করেছিল?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : এ বিষয়টা বহুবার উল্লেখ করেছি। পরিণত বয়সে, চাকরিতে ঢুকে, লেখা শুরু করি। লেখক হবার বাসনা ছিটেফোঁটাও ছিল না আমার। বিজ্ঞান পড়ে, বরং বিজ্ঞানী হব, এমন একটি ইচ্ছে নাইন-টেনে উঠলে, মনে উঁকি দিত। একটু-আধটু গদ্য বা কবিতা পাঠ, মুখস্ত করতে সেভেন-এইট অবধি সামান্য ইনটারেস্ট ছিল। ব্যাস্। স্কুল ফাইনাল পাশ করে, বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট, পরে পদার্থবিদ্যায় অনার্স নিয়ে পড়া। সঙ্গে বিজ্ঞানী হবার স্বপ্ন।

উদ্বাস্তু পরিবারে বারো আনা যা ঘটে, দারিদ্র-সংগ্রাম, পিতা অসুস্থ অচল হয়ে পড়ায় সংসার সামলাতে চাকরিতে ঢোকে। সে যুগে চট করে চাকরি মিলত। ঢুকে গেলাম হায়ার সেকন্ডারি স্কুলে ফিজিক্স পড়াতে। স্বপ্ন মরতে চায় না বিজ্ঞানী হওয়া কোনো একদিন হয়তো ঘটে যাবে। বই পড়া আমার নেশা। তো, গ্রীষ্মের দীর্ঘ ছুটির আগের দিন লাইব্রেরিতে স্যারের কাছে কোনো বিজ্ঞানের বই চাইলাম। এক মাস ধরে যা তারিয়ে পড়ব। স্যার  অনেক  খুঁজেও প্রয়োজনের কোনো বই না পেয়ে, ঢাউস একটা উপন্যাস দিয়ে বললেন, মাসটা চালাও। নতুন করে বিজ্ঞানের বই আনিয়ে দেব তোমায়।

বাড়িতে ফিরে দেখি বিমল মিত্র মশাইয়ের তৎকালীন জনপ্রিয় উপন্যাস ‘সাহেব বিবি গোলাম’। কী আর করি। ধীরে ধীরে পড়ে ফেললাম। ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, এরকম আমিও লিখতে পারব।

শুরুহল সাহিত্যচর্চা। ছাই! অনভিজ্ঞ কলমে কী লিখব? কয়েকদিন পর, হঠাৎ পাড়ার এক দাদার কাছে পেলাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’। উনি পড়তে দিলেন।

পড়ে আমার সত্তার মধ্যে ভূমিকম্প ঘটে গেল। মনে হল, এটাই প্রকৃত সাহিত্য চর্চা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্ধ ভক্ত হয়ে গেলাম। আমাকে গ্রাস করে ফেললেন। যেহেতু উনি পোশাকি নাম ত্যাগ করে, ডাক নামে লিখতেন, আমিও সাহিত্যর্চচার তান্ত্রিকতায় নামতে, আমার পোশাকি নাম চন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায়কে পরিত্যাগ করে ডাক নাম সাধন চট্টোপাধ্যায় হয়ে গেলাম। তন্ত্র সাধনা সেই থেকে অনির্বাণ চলছে।

মোস্তাক আহমেদ : আপনার লেখা প্রথম গল্প ‘বন্যা’ প্রকাশ পায় ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ‘নন্দন’ পত্রিকায়। কেমন ছিল সেই প্রথম প্রকাশের অনুভূতি?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : কোনো কিছুই শূন্য থেকে হয় না। প্রয়োগ ও চর্চার মধ্য দিয়ে ক্রমাগত ঘটতে ঘটতে ‘শূন্যই’ কিছু হয়ে ওঠার জন্ম দেয়। লিখতে তো এলাম, কী লিখব, কেমন করে লিখব, কোথায় ছাপা হবে। এইসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ তিমিরে ছিলাম। এ-অবস্থায় ‘নন্দন’ পত্রিকার খবর দিল একজন। তখন সি.পি. এম-এর সাহিত্য মুখপত্র ছিল না— পরে হয় তা। কিছু তরুণ পত্রিকাটা শুরু করেছিল। ঐতিহ্য কিংবা চালচুলো কিছুই ছিল না। কেন জানি আমার মতো তরতাজা যুবককে পেয়ে বর্তে গেল। আসলে, মূলত ওরা রাজনৈতিক কর্মী— ভেবেছিলাম আমিও পুরোপুরি ওদেরই গোত্রের। কিন্তু আমি যে লেখক হতে গেছি। ওরা ঠিক বুঝে ওঠেনি। ওরা আমার হাত মকসো করার গল্প শুনে উৎসাহিত করেছে, শেষে ‘বন্যা’ গল্পটা ছেপেই দিল। আর মানুষের নেশার স্বপ্ন তো বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ। ভাবলাম আমিও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একজন ক্ষুদে সংস্করণ হয়ে গেলাম। পরে বুঝেছি, কাঁচা গল্পের স্বাক্ষরটি না থাকলেই ভালো হত। আজ অবধি কোনো সংকলনে আমার গল্পটি রাখিনি। সম্প্রতি ‘জলদচি’ পত্রিকা লেখকের প্রথম গল্প বিশেষ সংখ্যায় নাছোড়বান্দা হয়ে গল্পটি পুনর্মুদ্রণ করেছে।

মোস্তাক আহমেদ : আপনার পড়াশুনো পদার্থবিদ্যা নিয়ে, অথচ সাহিত্যচর্চায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেছেন— এক্ষেত্রে পড়াশুনো, পেশা আর লেখার মধ্যে কোনো বিরোধ তৈরি হয়নি? কীভাবে সামলেছেন সেসব?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর, কি ভারত মহাসাগর— ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়, চরিত্র, ঢেউ-স্রোতের বিভিন্নতা থাকলেও, যখন বাষ্প হয়ে মেঘ এবং মনসুন হয়ে ক্ষেত-খামার, মাঠ-পাহাড় ¯œাত করে, ফসল ফলায়, কোনো বিরোধ থাকে না। বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস— জ্ঞান, যুক্তি ও অনুভবের ভিন্ন ভিন্ন লজিক থাকলেও, বোধ ভিন্ন ভিন্ন জন্মায় না— একটিই অখ- বোধ। আকাশের মতোই চেতনা নিরুঙ্কুশ ও একক। ভিন্নভিন্ন প্রকোষ্ঠ নেই। ম্যাটার ও ডার্ক ম্যাটার— উভয়ের ভারসাম্যেই যেমন বিশ্ব, বিজ্ঞান-সাহিত্য-দর্শনের আপাত ভিন্নতার মধ্য দিয়েই আমাদের জীবনবোধ। এতে কোনো বিরোধ হয়নি, বরং সমন্বয়ের মন্ত্র আমার কর্মজীবনকে বর্ণিল করে রেখেছিল।

মোস্তাক আহমেদ : প্রায় ছশোর কাছাকাছি ছোটোগল্প, চারশোর কাছাকাছি প্রবন্ধ, পঁচিশটির মতো উপন্যাস লিখেছেন। এর মধ্যে কোনটি লিখতে আপনি বেশি পছন্দ করেন? এই পছন্দের কারণ কী?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : আমার কাছে লিখন প্রক্রিয়াটি খুবই কষ্টসাধ্য অংশ। অনন্ত চিন্তার মালা গেঁথে যেতে যতটা মজা পাই— লিখতে গেলেই কেমন যেন দম আটকে, পথ রুদ্ধ হয়ে আসার অবস্থা হয়। সব ভাষার সাহিত্যেই কিছু কিছু লেখক আছেন, প্লট বা ঘটনা, চরিত্র নিজেই গুটিগুটি তাঁদের কলমের ডগায় এসে ধরা দেয়। লিখতে পেরে যেন তাঁদের বুকের মধ্যে এক ধরনের ক্যাথারসিস্ ঘটে— তাঁরা মুক্তি পান। লেখা তাঁদের কাছে আত্ম-বিনোদনের ব্যাপার।

আবার কোনো কোনো লেখক আছেন— যাঁদেরকে প্লট-ঘটনা বা কিছু একটা প্রকাশের জন্য নিজেদেরই ভাবনাচিন্তার পথ ধরে হেঁটে যেতে হয়। ফলে, এই জাতীয় লেখকদের কাছে লেখার অর্থ সত্তার রক্তক্ষরণ। আবার বেশ কিছুদিন না লিখেও তাঁরা থাকতে পারে না। অজ্ঞাত কোনো কিছুর প্রসববেদনা তাঁদের শারীরিক অস্থিরতা আনে। আমি আছি দ্বিতীয় শ্রেণিটিতে।

ছোটগল্প, প্রবন্ধ লিখতে রক্তক্ষরণটি বেশি হয়, উপন্যাস লেখার তুলনায়। এখানে চলবার অনেকটা পথ পাই বলে, টেনশন বা আততি কম। স্পিড বোট নিয়ে দীঘি বা বিল দিয়ে ছুটতে গেলে সর্বদা সতর্কতায় টান টান থাকতে হয়, কখন বুঝি জল ফুরিয়ে ডাঙায় ধাক্কা খেল জলযানটি। সাগরে অবিশ্যি ছুটলে এ-আশঙ্কা থাকে না। ছুটবার মজা ও স্বাধীনতা বেশি পাই।

মোস্তাক আহমেদ : আপনার গল্প ও প্রবন্ধের সংখ্যা পরিমাণগত দিক থেকে অনেক বেশি। এত লেখার কী কোনো দরকার ছিল? আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যেখানে অতি-উৎপাদন একটি সামাজিক ব্যাধি, এই পরিমাণ লেখা কী তারই প্রভাবজাত? এখনও তো লিখে চলেছেন অনবরত…

সাধন চট্টোপাধ্যায় : বিনয়ের সঙ্গে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করি এখানে। কোনো লেখককে যদি শুধুই লিট্ল ম্যাগাজিন লিখে জাতীয় স্তরে উঠে আসতে হয়, বেশি লিখে পাঠকের কাছে পৌঁছানো ছাড়া ছিন্নপথ কী আছে? বাণিজ্য পত্রিকা, সংবাদপত্রের রবিবাসরীয়, বড়ো বড়ো সপ্তাহিক পাক্ষিক বা মাসিক পত্রিকা যে হারে একদা বিজ্ঞাপন করত, প্রচার সংখ্যা যত বেশি ছিল— কোনো লেখকের পক্ষে পাঠকের চোখে আটকে পড়াটায় কোনো বিঘœ ঘটত না।

আমি সারা পশ্চিমবঙ্গের এমন কোনো জেলা নেই— যাদের অঞ্চলে প্রকাশিত ছোটোখাটো কাগজে লিখিনি। এমনও পত্রিকায় লিখেছি, যার সূচনা সংখ্যাটি ছাড়া আর কোনো কিছু বেরোয়নি। লিট্ল ম্যাগাজিনের অসুবিধে, তাকে পাঠক খুঁজে নেয়। না খুঁজলে সে অবিক্রিত পড়ে রইল। অর্থাৎ আমিও। কিন্তু সংবাদপত্র বা বৃহৎ পাক্ষিক পাঠকের দরজায় গিয়ে হাজির হয়। বারে বারে হাজির হয়। পাঠক সে লেখা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় চেখে দেবেই। আমাকে প্রচুর লিখে এ-জন্যই স্বীকৃতি আদায় করতে হয়েছে।

এছাড়া, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির বাজার অনেকদিন ধরেই নানা ধরনের প্রচারের প্রভাব আছে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, দল, সংস্থা, চ্যানেল থেকে শুরু করে স্বয়ং লেখকের কৃৎকৌশলের কেমিষ্ট্রিতে একটা হৈ-চৈ ফেলে দেয়ার যে নিখুঁত বিকোনোর পদ্ধতি আছে— কোনোকালেই আমার স্বাধীনসত্তাকে তা উৎসাহ দেয়নি। আমি মনে করি, প্রচারযন্ত্রটি যারাই ধার দেবেন আমাকে, তাদের জন্য কিছু মূল্য আমাকে গুণতে হবে এবং তা পাকাপাকি হবে না। এই এঁটো-প্রচার কোনোকালেই আমাকে আকর্ষণ করেনি। দুষ্ট পথ আমি এড়িয়ে গিয়ে নিজেকে ক্রমাগত শিক্ষিত করতে করতে গেছি। এ জন্য লিট্ল ম্যাগাজিনই আমার কাছে খোলা ছিল এবং আছে। তাই সংখ্যায় বেশি লিখতে বাধ্য আমি। তাছাড়া কিছু লিখতে না পারলে সপ্তাহান্তে আমি শারীরিক অসুস্থতা বোধ করি। সবকিছু মিলেমিশে পরিমাণটি বেশি। তবে লিখে পয়সা পাই না, ফলে এত লেখার জন্য আমার সত্তার চাপই একমাত্র কারণ।

মোস্তাক আহমেদ : এই প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে যে, বাংলার সাহিত্যিকেরা কী একটু বেশি পরিমাণে লিখতে পছন্দ করেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় থেকে আজকের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী— অনেকের ক্ষেত্রেই একথা খাটে…। পাঠকরাই বা এত লেখা পড়বেন কীভাবে?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : মোটা রচনাবলী, ঢাউস কোনো উপন্যাস বাঙালি পাঠক চাক্ষুষ করলেই অবচেতনে সমীহ-সম্মান জন্মায়— হয়তো ইনি খুব বড়ো লেখক। বাঙালি পাঠক তাদের প্রিয় লেখকদের কাছে বহু প্রসব আসা করে থাকে। আবার, লেখাই যাঁদের জীবিকা অর্থ উপার্জনের জন্য বেশি লিখতে তাঁরা বাধ্য হন। মাননীয় প্রফুল্ল রায়ের কাছে গল্প শুনেছিলাম,তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলম থেকে কম শিল্পমানের একটি উপন্যাস পড়ে তিনি লেখক সম্পর্কে কিছু প্রতিকূল মন্তব্য করেছিলেন। লোকমুখে তা তারাশঙ্করবাবুর কানে যায়। পরে হঠাৎ কোথাও প্রফুল্লদার সঙ্গে সাক্ষাৎ হতেই প্রবীণ লেখক মন্তব্যটি যাচাই করে নিয়ে বলেছিলেন, হ্যাঁ, হে ছোকড়া! জানা আছে কি, আমার পরিবারে দৈনিক কত পাত পড়ে? সব আমাকে লেখা দিয়ে তুলতে হয়।’ বোঝা গেল, বাংলা সাহিত্য লিখে খেতে গেলে, সংখ্যা ও গুণমানে বাঁধা পড়ে থাকলে চলে না।

রবীন্দ্রনাথ তো লেখালিখির সব রীতিতে চর্চা করেছেন, শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করেছিলেন লেখালিখির টাকা থেকেই। বক্তৃতা,বিদেশ ভ্রমণ, বিতর্ক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি-পরিবেশ, নানা সম্ভাষণ— রবীন্দ্রনাথ তো বাঙালি জীবনে অপরিহার্য, রচনার পরিমাণ বেশি হবেই। রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাসের সংখ্যা তো বেশি নয়।

আবার কম পরিমাণে লিখেছেন, এ উদাহরণও আছে বাংলা সাহিত্যে। বঙ্কিম, শরৎ, বিভূতিভূষণ, সতীনাথ ভাদুড়ী, জগদীশ গুপ্ত, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, পরশুরাম পরিমাণে কি বেশি লিখেছেন?

তবে, স্বাধীনতার পর প্রযুক্তি ও মানুষের অবকাশ যাপনের নিত্যনতুন পন্থা হাতে আসায়, পাঠ্যপ্রবণতা কমে যেত, লেখার সংখ্যা কমেনি বরং বেড়েছে। এর কারণ, বাংলা প্রকাশনা পরিচিত লেখকদের নিয়ে এখন সব ধরনের লেখায় উৎসাহিত করছে। ভূত, ডিটেকটিভ, ধর্ম থেকে উপন্যাস, গল্প, ভ্রমণ কাহিনি— সবকিছুই। এখানে ‘পাল্প সাহিত্য’ বলে ভিন্ন কোনো শিবির নেই। সিরিয়াস সাহিত্য পাল্প-সাহিত্যে মিলেমিশে একাকার।

মোস্তাক আহমেদ : অনেক কথাসাহিত্যিকই জীবনের শুরুতে কবিতা লিখেছেন। আপনি কখনও কবিতা লিখেছেন বলে জানা যায় না। কেন? কবিতা ভালো লাগে না?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : আমার মনে হয়েছে, অনুভূতির বিশুদ্ধ নির্যাস হল কবিতা। শব্দের যাদুকর না হলে এ খেলায় অবতীর্ণ হওয়া মুশকিল। প্রথম থেকেই সযতেœ আমি ও রাস্তা এড়িয়ে গেছি। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমার প্রথম প্রেম কবিতায়। কোনো পত্রিকা হাতে এলে আমি প্রথমে কবিতা, পরে প্রবন্ধ এবং সবশেষে ইচ্ছে হলে গল্প পড়ি। কবিতা আমাকে চিন্তা ও অনুভূতিগতভাবে পুনরুজ্জীবিত করে, মলিনতা সাফ করে দেয়।

মোস্তাক আহমেদ : ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ শুরু ধরলে আপনি পঞ্চাশ বছরের উপর লেখালেখি করছেন। সুদীর্ঘ এই লেখক জীবনের যদি আত্মমূল্যায়ন করতে হয়, তবে কীভাবে সেই আত্মমূল্যায়ন করবেন?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : আত্মমূল্যায়ন, বিশেষ করে নিজের সৃষ্টির, দুরুহ কাজ। অহং থেকে সম্পূর্ণ নিজেকে বিচ্ছিন্ন না করতে পারলে, ফাঁকি থেকে যাবে। আমার লেখার কোনো মূল্য থাকবে না। নুতন প্রজন্ম ভুলে যাবে— এ সত্য কোনো লেখকই সহজে মানেন না। অথচ বিগত দিনের বহু লেখক আজ বিস্মৃত। আমি কি সে দলে পড়ব? নাকি কাল পেরিয়ে, যুগ অতিক্রান্ত করে, কিছু লেখক যেমন গল্প-উপন্যাসে জরুরি হয়ে আছেন, আমারও কিছু গল্প বা দু-একখানি উপন্যাস সে গোত্রে স্থান পাবে-আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব প্রায়ই চেতনায় জেগে ওঠে। এই অনিদিষ্টতায় মাঝে মাঝে দোলায়িত থাকি তবে, সাহিত্যে পাঠক কী চায়, তা নিয়ে কোনোদিন ভাবিনি, আমি যা সত্য হিসেবে বুঝেছি, তাই প্রকাশ করেছি। জীবনের অনেক কিছু ত্যাগ করেছি সাহিত্য সৃষ্টির জন্য। কিন্তু সে সত্য তো একান্ত আমার। মহাকাল শুনবে কেন? তবু আমার সত্তার কোন ক্ষীণ আশা পোষণ করে চলেছি রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বশোক’ কবিতার কয়েকটি বাক্যকে আঁকড়ে ধরে— ‘আজকে আমি ডেকে বলি লেখনীকে,/লজ্জা দিয়ো না।/কূল ছাপিয়ে উঠুক তোমার দান।/দাক্ষিণ্যে তোমার/ঢাকা পড়–ক অন্তরালে/ আমার আপন ব্যথা।’

মোস্তাক আহমেদ : প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব কিছু জীবনদর্শন থাকে, থাকাটাই স্বাভাবিক। আর শিল্পী-সাহিত্যিকেরা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি দেখেন— আপনার জীবনাদর্শনের ভিত্তি ঠিক কীরকম?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : আমার সত্তা প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতির মধ্যে লীন হয়ে থাকতে ভালোবাসে। তাই প্রযুক্তির প্রতি আমার অনীহা বেশি। সহজ ও সরল জীবনযাত্রা, গূঢ় ও জটিল ভাবনার মধ্যে একপ্রকার মুক্তির স্বাদ অনুভব করি। তাই আধুনিক জীবনযাত্রায় বস্তু দাপট আমাকে দমবন্ধ করে তোলে। জীবনের আন্তঃনিয়মানুবর্তিতায় আমি স্বাভাবিক বোধ করি।

মোস্তাক আহমেদ : ব্যক্তিক জীবনে আপনি কি কোনো একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী? এই বিশ্বাস আপনার সৃষ্টিকে কীভাবে প্রভাবিত করে? আর সেই মতাদর্শগত কারণে কোনো সমস্যা…

সাধন চট্টোপাধ্যায় : আমি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী নই; যে যে পথে মানুষের মুক্তি আসে সব কিছু থেকেই আমার গ্রহণের কিছু আছে। বিশ্বাসের বর্তমান এই অবস্থানে এসে দাঁড়াতে, জীবনের অনেক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হয়েছে। আমার প্রথম উপন্যাস ‘অগ্নিদগ্ধ’-এ আমি দেখাতে চেয়েছিলাম, বিপথগামী কৈশোর কীভাবে মানুষের দাবি ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে শুদ্ধি লাভ করেছিল। যেমন আগুনে পুড়ে লোহা ইস্পাতে পরিণত হয়।

আজ উপলব্ধি হয়, মানুষ পাকাপাকি ওভাবে শুদ্ধ হয় না। ইতিহাসের বৃহৎ কালখ-ে, ব্যক্তি ও সমষ্টিগত মানুষের ওপর নানামুখীন শক্তির একটি উপলব্ধ শক্তি (জবংঁষঃধহঃ ভড়ৎপব) ক্রমাগত শুদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে চলে টোটাল শুদ্ধি ঘটে না। অসীমের পানে ধেয়ে চলে শুধু।

মোস্তাক আহমেদ : ‘নকশালবাড়ি ৫০’-এ এসে আপনার ভাবনা এখন কীরকম? আপনি তো সেই উত্তাল সময় প্রত্যক্ষ করেছেন, লেখালেখিতে কম হলেও তার প্রভাব আছে। আজ কী মনে হয়?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : আগের প্রশ্নেই বলেছি, এখন আমি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে মানুষের মুক্তির প্রত্যাশা করি না। তবে এ হচ্ছে ব্যক্তি আমির বিষয়ীগত ভাবনা বা ঝঁনলবপঃরাব ঃযরহশরহমং। লেখক হিসেবে আমার দায়িত্ব মানুষের আবেগ, চিন্তাভাবনা নিয়ে ঘর করা। তাই যে কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে আমার কৌতূহল। ১৯৬৭ সালে প্রথম নকশালবাড়িতে কৃষক অভ্যুত্থান ঘটবার পর, লেখক হিসেবে, সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি শিলিগুড়ি গিয়ে চারু মজুমদারের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। পরে, কানু সান্যালের সঙ্গে এই আন্দোলন সংক্রান্ত অনেক কথাবার্তা হয়। লক্ষ করেছি, সব আন্দোলনের যেসব আশু উদ্দেশ্য তা নিয়ে যতটা উৎসাহী এঁরা দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য নিয়ে এঁদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত।

সাধারণ মানুষ যে কোনো আন্দোলনে আশু উদ্দেশ্যেই প্রাণ দেয় বা ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য টের পায় অনেক পর, তখন তারা সমগ্র পদ্ধতিটার ওপরই হতাশ হয়ে, নিজেদের অগ্রসর ভাবনাচিন্তার সঙ্গে পশ্চাৎপর ভাবনার মাননসই সমঝোতা গড়ে নেয়। এতে ক্ষতি হয় মানবতন্ত্রের।

তবে, আশু উদ্দেশ্যের জন্য নেমে পড়লেও, রাষ্ট্রযন্ত্র তা দমাতে যে পীড়নের পথ বেছে নেয়, তার বিরুদ্ধে লেখকদের দাঁড়াতে হবে। আমার সে সময়ের লেখালিখির মধ্যে সেই উত্তালতার চাপ আছে এবং তা ন্যায্য বলেই মনে করি।

মোস্তাক আহমেদ : আঙ্গিক না বিষয়বস্তু, ভড়ৎস না পড়হঃবহঃ— কোনটি সাহিত্যের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? আপনার লেখায় কোনটি প্রাধান্য পায়?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : ফলের শাঁসকে ধারণ করে আছে খোসা। কোনটা অধিক জরুরি? এখানে ‘এ’ অথবা ‘ও’-র মধ্যে ছোটো বড়ো বলে কিছু হয় না। দুয়ের যৌথসত্তাই হচ্ছে সম্পূর্ণতা, শিল্প সম্পূর্ণতার কথা বলে। দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঋড়ৎস রিঃযড়ঁঃ ঈড়হঃবহঃ— আপাত পাঠকের চোখ ধাঁধিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যায় এবং ঈড়হঃবহঃ রিঃযড়ঁঃ ভৎড়স- কে পাঠক করুণা করে। ভাবে, ইস! ঠিকভাবে লিখতে পারলে দারুণ হোত। দুয়ের কোনো ক্ষেত্রেই পাঠকের চেতনা আলোকপ্রাপ্ত হয় না।

মোস্তাক আহমেদ : বক্তব্যের সাহিত্য না সাহিত্যের বক্তব্য— কোনটাতে আপনার বিশ্বাস? সেই বিশ্বাসকে কীভাবে প্রতিষ্ঠা দেওয়া সম্ভব বলে মনে হয়?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : আমি সাহিত্যের বক্তব্যে বিশ্বাসী। বক্তব্যের সাহিত্যকে আমার নিছক প্রপাগান্ডা বলে মনে হয়। এজন্য নিজেকে শিল্পী হিসেবে তপস্যার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হয়। মুক্ত মন, শেখবার প্রবণতা এবং গভীর অধ্যায়ন— তিনটি গুণ শিল্পীকে অর্জন করতেই হবে।

মোস্তাক আহমেদ : যে-কোনো সৃজনশীল লেখার ক্ষেত্রে প্রায়োগিক তত্ত্ব ও তথ্য থাকা কতটা জরুরি বলে মনে হয়? আদৌ কী এগুলো ভাববার দরকার আছে?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : দীর্ঘপথ ভ্রমনের আনন্দ ও নিরাপদে পৌঁছনোই যাত্রীর একমাত্র লক্ষ্য। আসলে, এই ভ্রমণ আনন্দের মধ্য দিয়ে সে অর্জন করে একপ্রকার মুক্তি। এই মুক্তি জীবনীশক্তি বাড়িয়ে তোলে। কীভাবে স্ট্রিয়ারিং চালিয়ে পথের বাঁক, খানাখন্দ বাঁচিয়ে, ক্লাচে-ব্রেকে কখন কতটুকু নিয়ন্ত্রণের দরকার— এসব চিন্তা ড্রাইভারের অর্থাৎ চালকের। তাকে এগুলো জানতেই হবে। সফল প্রয়োগ না হলে তো যাত্রী নিশ্চিন্তে পৌঁছে আনন্দ, মুক্তি ও মানসিক পুষ্টি অর্জনে সক্ষম হবে না।

পাঠক ও লেখকের মধ্যেও, চালক ও যাত্রীর সম্পর্কে। চালক যেমন কথায় কথায় স্টিয়ারিং এর কৃৎকৌশল জানিয়ে যাত্রীর জানলা দিয়ে প্রকৃতি দেখার বিরক্তিচ্ছেদ ঘটায় না, লেখকও তেমনি পাঠককে কোনো জ্ঞান দেন না। লেখক নিজেকে শিক্ষিত করতে না পারলে খানাখন্দে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। তাই, ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান, রাজনীতি, আইন, রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে লেখকের কিছু তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকা অবশ্যই জরুরি। আধুনিক সাহিত্য নিছক চোখে দেখা বা অভিজ্ঞতার ডানায় ভর করে চলে না। বোধ ও কল্পনাশক্তিকে পুষ্ট করতে হয়। কেউ কেউ চলতি রসিকতায় বলেন, শিশুকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় হরলিক্স তুমি খাও কেন? উত্তরে বলবে এমনি—এমনি খাই।

ভিতরে শতকরা কোন পুষ্টি কতটুকু আছে— জানার কী দরকার? ঠিকই। কিন্তু শিশু তো হেল্থ ড্রিঙ্কটা নির্বাচন করেনি। তাকে খেতে দেয়া হয়েছিল। যিনি দিচ্ছেন, তিনি শতকরা জেনেই দিচ্ছেন, নইলে নির্বাচন করে বাজার থেকে ঐ বস্তুটি সংগ্রহ করবে কেন? লেখক তো কখনও শিশু হতে পারে না।

মোস্তাক আহমেদ : বর্তমানে প্রকাশিত লিট্ল ম্যাগাজিনগুলি কী আদৌ লিট্ল ম্যাগাজিন? আপনার দীর্ঘ লেখালেখির জীবনে লিট্ল ম্যাগাজিনের যে উত্থান-পতন, বিবর্তন-পরিবর্তন লক্ষ করেছেন তা যদি একটু আমাদেরকে জানা… আপনার নিজস্ব লেখালেখিতে লিট্ল ম্যাগাজিনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : লিটল ম্যাগাজিনের কোনো একশৈলিক সংজ্ঞা নেই। যুক্তির খাতিরে যদি ধরে নেই, লিট্ল ম্যাগাজিনের নিদিষ্ট সংজ্ঞা আছে— সময়ের সঙ্গে তা বদলাতে বাধ্য। বুদ্ধদেব বসু নড়বড়ে একটি সংজ্ঞা বানানোর চেষ্টা করেছিলেন, তা বর্তমানের ‘পরিচয়’, ‘অনুষ্টুপ’, ‘নন্দন’ থেকে ‘কবিতীর্থ’, ‘কোরক’, ‘ইস্ক্রা’, ‘কবিপত্র’ ইত্যাদি অসংখ্য চলমান লিট্ল ম্যাগাজিনগুলো বাতিল করে দিয়েছে। কেউই আজকাল স্বাল্পায়ু নয়। তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ পেরিয়ে শতবর্ষের দিকে চলেছে। এবং নিয়মিত প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে ‘অনিয়মিত’, ‘স্বল্পায়ু’ কথাগুলো এখন আবাস্তব, হাস্যকর।

তবে হ্যাঁ, যৌবনে আমরা লিট্ল ম্যাগাজিনগুলোতে যে আদর্শ, প্রাণবত্তা ও দ্রোহের চিহ্ন পেতাম, এখন তা স্তিমিত । ঈড়হপবঢ়ঃ যেন বদলে যাচ্ছে  চিন্তা, রস ও সৃষ্টির  নানা মত, নানা ধারা এবং বিভিন্ন বাতাবরণ না হলে তা কোনো জাতিকে প্রতিনিধিত্ব কবতে পারে না। যখন কোনো একচেটিয়া শক্তি, বড় হাউস সদম্ভে ঘোষণা করে— বাংলাসাহিত্য-সংস্কৃতি বলতে তারাই একমাত্র অদ্বিতীয়ম— তখনই লিট্ল ম্যাগাজিন বিদ্রোহের ধ্বজা উড়িয়ে বড়ো প্রতিষ্ঠানের অসারতা প্রমাণ করতে এগিয়ে আসে। ফলে, আদর্শ, গুণমানই তাদের কাছে ধ্রুবতারা হয়ে দাঁড়ায়। কোনো বিখ্যাত নাম স্টারডম বা জনপ্রিয়তা লিট্ল ম্যাগাজিনকে প্রলোভিত করতে পারে না। হ্যাঁ, জনপ্রিয়তা ও লেখার গুণমান উপরিপাত ঘটলে, লিট্ল ম্যাগাজিন তাঁদের আহ্বান জানিয়েছে। অতীতে এবং বর্তমানেও। ক্ষমতা, বিজ্ঞাপন সংগ্রহ, বৃহৎ সংবাদপত্রে কালিক প্রশংসা, প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার বা পারিবারিক উপার্জনের উৎসস্থল হিসেবে লিট্ল ম্যাগাজিনকে যদি ব্যবহার করা হয়, আর পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করে যত কুৎসিত ধান্দাবাজি চলে— তখন আর লিট্ল ম্যাগাজিনের পুরোনো গৌরব অক্ষুণœ রাখা যায় না।

গত শতাব্দীর সত্তর-আশি-নব্বই দশকে লিট্ল ম্যাগাজিনের যে চারিত্রিক গৌরব এবং বৈশিষ্ট্য লক্ষ করতাম, নানা ক্ষেত্রে এখন ঘটে গেছে রূপান্তর। বেশ কিছু লিট্ল ম্যাগাজিনের সঙ্গে প্রকাশনা ব্যবস্থা, কলেজ ষ্ট্রিটের ঠিকানা সংযুক্ত হয়েছে— ছোটো ছোটো প্রকাশনা সংস্থা মুদ্রণ সৌষ্ঠব ও মূল্যবান কিছু গ্রন্থ প্রকাশনার মধ্য দিয়ে আজ বাণিজ্য ও বিগ হাউস নয়, আবার কট্টর পন্থার লিট্ল ম্যাগাজিনও নয়— মাঝারি শ্রেণিবিন্যাস ঘটে গেছে। এর ভালো দিক, মন্দ দিক, আদর্শের ধ্বজা— সবকিছুই এখন মিডিয়ার একচ্ছত্র দাপটের সঙ্গে দলীয় গাঁটছড়ার নতুন প্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। তবে এখন লিট্ল ম্যাগাজিন নিছক ‘আঁতুড়’ ঘর নয়, তথাকথিত বিগ হাউসের লেখকরাও ঠ্যালায় পড়ে, এই ভুবনের আশ্রয় খুঁজছে। তাই নতুন সংজ্ঞার খোঁজ জরুরি হয়ে পড়ছে।

মোস্তাক আহমেদ : তথাকথিত বড়ো প্রতিষ্ঠানের লেখক আপনি নন। কোনো আক্ষেপ কাজ করে? বড়ো প্রতিষ্ঠান তো আপনাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারত… বড়ো প্রতিষ্ঠানে লিখতে না পারাটাও কী এক ধরনের সীমাবদ্ধতা নয়? আপস কোথায় করতে হয় না… কোথাও কম কোথাও বেশি…

সাধন চট্টোপাধ্যায় : লেখার বিষয়ে আজ অবধি কোনো আপস আমায় করতে হয়নি। কম কিংবা বেশি— কোনো কিছুই নয়। মনে পড়ছে, আশির দশকে বামপন্থার রমরমায়, একটি বৃহৎ বামপন্থী সংগঠনের শারদীয়তে উপন্যাস নিয়ে, শেষ পর্যন্ত ছাপেনি। কৈফিয়তে বলেছে, ওটা ছাপলে আসন্ন নির্বাচনে তাদের দলীয় ক্ষতি হতে পারে। ভদ্রতার খাতিরে বাতিল লেখাটির কম্পোজ রূপটি আমার ফিরিয়ে দিয়েছিল এবং তা থেকেই প্রখ্যাত একটি প্রকাশক গ্রন্থাগারে উপন্যাস প্রকাশ করে দেয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে তারাই আমার গল্প ফের আমন্ত্রণ জানিয়ে ছাপছে। বৃহৎ একটি বামপন্থী সাহিত্য পত্রিকা আমন্ত্রিত শারদ গল্প বাদ দিয়ে দিল। ফোনে কারণটুকুও জানায়নি। পত্রিকা বাজারে বেরুলে খোঁজ নিয়ে জানলাম আমার গল্পটি চাপালে নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর নিয়ে তাদের সমর্থকদের মধ্যে ভুল বার্তা যেত। পরে সে পত্রিকা আমার উপন্যাস-গল্প নিয়মিত ছাপছে, আমি আমার কোনো অবস্থান বদলাইনি।

বড়ো প্রতিষ্ঠানে না-লিখতে পারাকে সীমাবদ্ধতা মনে করি না আমি। বড়ো প্রতিষ্ঠানে পঞ্চাশটির বেশি গল্প, উপন্যাস লিখেও বাংলা সাহিত্যের অবগুণ্ঠনে চলে গেছেন, এক্ষুনি ডজন খানেক লেখকের নাম উল্লেখ করতে পারি। আবার সেখানে না লিখেও পাঠকলেখকের সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে— এমন উদাহরণও বিরল নয়। একে একে দুই এর মতো এ কেমিস্ট্রি অত সহজ নয়।

আমি বড়ো প্রতিষ্ঠানে লিখলে আরও জনপ্রিয় ও বেশি পাঠক পেতাম কিনা এ নিয়ে আজ ভাবনা নেই আমার উলটে ভাবি, বড়ো প্রতিষ্ঠান তাঁদের বৃহৎ পাঠকবর্গকে আমার লেখা থেকে বঞ্চিত করেছে।

মোস্তাক আহমেদ : আপনি সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকার বিশেষ সংখ্যা, বর্তমানে ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদকম-লীর সঙ্গে যুক্ত। বিচিত্র এই সম্পাদনার অভিজ্ঞতা নিয়ে যদি কিছু বলেন…

সাধন চট্টোপাধ্যায় : নানা সম্পাদনার দায়িত্বে থেকে অভিজ্ঞতা হয়েছে সম্পাদনার কাজটি খুবই দুরূহ এবং পরিশ্রমসাধ্য। এ পরিশ্রম প্রায় সকলেই এড়িয়ে চলে বলে বাংলায় প্রকৃষ্ট সম্পাদনার কাজ নেই। নিজেকেও আমি এই অসম্পূর্ণতার দোষ থেকে মুক্ত রাখতে চাই না। কোনো সম্পাদনার কাজ অবিচ্ছিন্ন স্বাধীনতা ও নিঃস্বার্থভাবে করা যায় না। দুই মলাটের মধ্যে কিছু সংকলিত করলেই সম্পাদনা বোঝে। আমার মনে হয়, অনুবাদ ও সংকলন করবার নিয়মিত ওয়ার্কশপ দরকার। চাই যথেষ্ট অর্থব্যয়। চটজলদি, কম খরচে, বাজিমাৎ করার প্রবণতাই শতকরা পঁচানব্বই ভাগের। আর সংকলকরাও খানিকটা ক্ষমতা লাভ করে খুশি। বৃহৎ দায়বদ্ধতা বোধ করেন না।

মোস্তাক আহমেদ : আপনি তো অনেক পুরস্কার পেয়েছেন— পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বঙ্কিমস্মৃতি পুরস্কার, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎ পুরস্কার, ‘নাগপাশ’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসেবে বিএফজেএ পুরস্কার এবং আরও আছে। এই স্বীকৃতি কী যথেষ্ট বলে মনে হয়? তাছাড়া পুরস্কার নিয়ে যেভাবে চারদিকে বিতর্ক ওঠে…

সাধন চট্টোপাধ্যায় : মানুষের সজ্ঞায় (ওহংঃরহপঃ) কি স্বীকৃতির চাওয়া-পাওয়ার কোনো সীমা আছে? যথেষ্ট হয় কখনো? মানুষের জমির লোভের মতো। লিও টলস্টয়ের বিখ্যাত গল্পটি— মানুষের বেঁচে থাকতে কত জমির প্রয়োজন?-এর মতো, সূর্য ডুববার শেষ মুহূর্তেও বেচারা কৃষক বাড়তি দু-পাক বেশি ঘোরার কথা ভাবে।

মোদ্দা কথা, কোনো পুরস্কারই লেখককে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। তবু তা পেতে গিয়ে কত জটিল থেকে জটিলতর রাজনৈতিক গেম সাজাতে হয় বা সাজিয়ে তোলে নানা ব্লক, গোষ্ঠী, দলীয় পরিচয়।

আসল কথা, কোন লেখককে সাহিত্যসাধকরা কতটা কাল জুড়ে মনে রাখবে, তা কখনই কোনো পুরস্কার ভধপঃড়ৎ হতে পারে না। আমরা তো গুগুল না ঘেঁটে বলতে পারব না ২০০০ সালে কে নোবেল পেয়েছিলেন সাহিত্যে; কিন্তু টলস্টয় বা গর্কিকে মনে রেখে দিয়েছি— খোঁজ রাখি না তাঁরা উক্ত পুরস্কারটি আদৌ পেয়েছিলেন কি পাননি।

মোস্তাক আহমেদ : বয়স ৭০ পেরিয়ে এসে— আজকের ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার বোধ আপনাকে কীভাবে ভাবায়? লেখালেখিতে তার প্রভাব কতখানি?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : আজকের বলে নয়, মানুষ তার অন্তর্মানুষের অস্তিত্বকে ক্রমাগত পরিশুদ্ধ করে যেতে ধর্ম বা অধ্যাত্মবাদকে অবলম্বন করবেই। তা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ভার নয়। এটাই মানবতন্ত্রের চিরকালীনতার যাত্রা। লেখকের কোনো বড়ো সৃষ্টির মধ্যে এই বোধ লীন হয়ে থাকে। আমার ক্ষেত্রেও তাই। ব্রহ্মা-ের ডার্ক ম্যাটারের মতো সহজে চোখে পড়বে না। এ অনুভব সত্তর পেরিয়ে ক্রমশ আমাকে একপ্রকার চুম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে।

মোস্তাক আহমেদ : একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসাবে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার মতামত কী? এই পরিপ্রেক্ষিতে বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়ে যদি দু-চার  কথা বলেন…

সাধন চট্টোপাধ্যায় : রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যত কম বলা যায়, ততই আততি থেকে বাঁচোয়া। বুদ্ধিজীবী? পশ্চিমবঙ্গে? হাঃ! হাঃ! হাঃ!

মোস্তাক আহমেদ : আপনার নিজের কোন্ লেখা সবচেয়ে প্রিয়? জানি, এরকমভাবে বাছা কঠিন। তবু বিশেষ কারণে কোনো লেখার প্রতি কী একটু বেশি দুর্বলতা আছে? কেনই বা সে দুর্বলতা?

সাধন চট্টোপাধ্যায় : না। আমার কোনো লেখার প্রতিই এমন পক্ষপাতিত্ব জন্মায়নি। বরং, কিছু লেখা আছে, বর্তমানে ভাবি, না লিখলেও চলত।

মোস্তাক আহমেদ : যে লেখা লিখতে চেয়েছিলেন অথচ এখনও লেখা হয়ে ওঠেনি— যে আক্ষেপ এখনও তাড়িয়ে বেড়ায়— যে স্বপ্ন এখনও ঘুম ভাঙিয়ে দেয়…

সাধন চট্টোপাধ্যায় : বটেই। বয়স যত গড়াচ্ছে, আক্ষেপ বাড়ছে। জীবনের রৌদ্রকরোজ্জ¦ল দিন চলে গেল, বিকেল নামছে, অথচ আদিগন্ত মাঠের এখনও বিপুল ফসল তোলা হল না। কিছুটা অনিদ্রারোগে আক্রান্ত হচ্ছি সম্প্রতি। অবচেতনের জন্যই হয়তো! ধন্যবাদ মোস্তাক। কবি ও অধ্যাপক হিসেবে তোমার প্রশ্নগুলোয় কেন জানি নিজের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাবার সুযোগ পেলাম!

************************************

‘ফুলেরও ভার নেয় না সময়’

মোহাম্মদ কামাল (জ. ১৯৫৬ খ্রি.)
কবি মোহাম্মদ কামালের সাক্ষাৎকার
[মোহাম্মদ কামাল, মূলত কবি। আবৃত্তিশিল্পের চর্চা করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘায়ু আবৃত্তি সংগঠন ‘স্বননে’র মধ্যমণি। কবি কামালের ‘নান্দনিক’ বিচরণ ও পর্যবেক্ষণ বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলকে ঘিরে। কবিতার চর্চা, আবৃত্তি ও আবৃত্তির সংগঠন করা কিংবা আলোকচিত্রীর অভিব্যক্ত প্রেষণা নিয়ে এখন একটু ব্যতিক্রমী জীবনযাপন তাঁর। এই পুঁজি-বাণিজ্যের প্রতিক্রিয়াশীল যুগে এরকম জীবনাচরণ সচরাচর আমাদের চোখে তেমন পড়ে না। শিল্প-সংস্কৃতির জগতের বিরল ব্যতিক্রম এ মানুষটির সঙ্গে আলাপচারিতার কিছু অংশ এখানে অবিকৃতরূপে পত্রস্থ করা হলো— সম্পাদক]

চিহ্ন :     আমরা একটু গোড়ার দিক থেকেই আসি, আমরা দেখছি— আপনার জন্ম ১৯৫৬ তে। আপনি তো রাজশাহীতেই বড় হয়েছেন, নাকি রহনপুরে?

কামাল :                আমার জন্ম নানাবাড়িতে, সেটা বৃহত্তর রাজশাহীতে। আমি রাজশাহী বলতেই সুখবোধ করি আরকি! পরে তো দুটো জেলা হয়ে গেল বা অনেকগুলো জেলা হয়ে গেল। সেখান থেকে মাতৃভূমির প্রতি যে টান সেটা আমার চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রতি সবসময়ই থাকবে।

চি :         আপনার কবিতার মধ্যে, প্রথম কবিতার বই এখানে অরণ্য ভয় ও অন্যান্য কবিতা; এখানে কিন্তু রহনপুরের বেশ কিছু কবিতা দেখছি। রহনপুরের যে লালমাটি, রুক্ষ্ম আবহাওয়া— নানাভাবে আপনার কবিতায় এসেছে।

কা :        এগুলো ছিল। তারপর, চেতনাগতভাবে ইলা মিত্রের যে ভাবনা লেখকদের ভেতর সেইটাও কাজ করেছে। ছোটবেলায় আব্বার কাছে কিছু গল্প শুনেছি, ইলা মিত্রের গল্পও শুনেছি। তাছাড়া নিজের ভূমি, ট্রেনে আসতে গিয়ে নাচোলের ওপর দিয়ে আসা; আমরা একসময় ঘাসুরা পর্যন্ত হেঁটে গেছি।  তারপর অরেকটা জায়গা পাশাপাশি, একটা প্রাইমারি স্কুল আছে, যেখানে সাঁওতাল বিদ্রোহটা হয়েছিল। ওখানে লালপতাকা উড়িয়ে দিয়ে পুলিশকে মারা হয়েছিল। আবার, আমি যখন রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদে, তখন ‘দৈনিক বার্তা’র সাহিত্যপাতাটা দেখতেন রণজিৎ দাশ। অসীমের (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক ও কবি অসীম কুমার দাস) সঙ্গে খুব ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমরা দেখলাম সাহিত্যের অন্যান্য অঙ্গনের যারা, তাদের সঙ্গেও তার খুব বন্ধুত্বের সম্পর্ক; আখতারুজ্জামান ইলিয়াস থেকে শুরু করে রফিক আজাদ। রফিক আজাদ এখানে আসলেন, আনুষ্ঠানিক আহ্বানে আসা, শিল্পকলা একাডেমিতে কবিতা পড়লেন। এনাদের ভেতরে কিছু বিষয় আছে, কিছু পান না করলে এদের ঠিক মেজাজ আসে না। অবশ্য তার সাথে আমার আগেই আলাপ হয়েছিল, অসীম সাহার প্রেসে। আমরা যখন পাশ করলাম ঢাকায় মাঝেমাঝে যেতাম, ওখানকার আড্ডাতেও আমরা হাজির থাকতাম। ওখানে নির্মলেন্দু গুণের সাথে দেখা, রফিক আজাদের সাথেও দেখা; অদ্ভুতভাবে তিনি আমাদের অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। মনে রেখেছিলেন; অনেকেই আছেন, আলাপ হয়েছে। অবশ্য, শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রেও; উনি আমার নাম একবারই শুনেছিলেন, তারপর আর বলতে হয়নি কখনো। একবার উনারই বই আমি অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য এগিয়ে দিলাম; ‘কামাল’ লিখলেন। তো রফিক আজাদ এখানে যখন আসলেন; কবিতা পড়ার পর শিল্পকলা একাডেমির নিচেই আমাকে বললেন— ‘আমার ঠিক জমলো না’। পড়ে ঠিক তৃপ্ত হলেন না। কবিতা তো আবেগ থেকে আসে, সেটাও ছিল— কিন্তু যে মনোসংযোগ দিয়ে পড়া, আবেগে উদ্বোধিত হওয়া, সেটা অসম্পূর্ণ ছিল। তারপর হঠাৎ রণজিৎদার কথা উঠতেই বললেন— ‘উনার সাথে দেখা করতে যাবো’। এবার উনাদের দুজনকে যুক্ত করে দিয়ে আমি মুক্ত হয়ে গেলাম। ওরা আড্ডা দিতে থাকলেন। আমাদের; বিশেষ করে অসীম, আমি, সরকার মাসুদ, আরিফুল হক কুমার গোষ্ঠীবদ্ধভাবে আমরা যারা ছিলাম তার বাইরেও রণজিৎদা প্রত্যেকেরই কবিতা ছেপেছিলেন, নিয়মিত ছাপতেন। লেখা চেয়ে তাগাদাও দিতেন। ঐ সময়েই আমি ‘বরেন্দ্র সিরিজ’ লিখেছিলাম। এরপরও আমি দুএকটি কবিতা লিখেছিলাম। একটা লিখেছিলাম তুলনা দীর্ঘকবিতা ইলা মিত্র মারা যাবার পর। পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। লিখতে লিখতে আমার মনে হয়েছিল যে আমার আরো গভীরে যাওয়া দরকার। প্রকৃতির বর্ণনা দিয়ে আমি সেরে দিলাম; তা নয়, কোথায় যেন মনে হচ্ছে মানুষের কথা বলা, তাদের বেদনার কথা বলা, সংগ্রামের কথা বলা দরকার। যার ফলে আমি থেমে গেছি; ঐভাবে আর এগিয়ে যাওয়া হয়নি। এবং, এ এলাকাগুলোতে তাদের সাথে নিবিড়ভাবে ওঠাবসা সেটাও হয়ে উঠেনি।

চি :         আমরা দেখি— আপনি কবিতার মধ্যেই থেকেছেন নানাভাবে। কিন্তু, আপনার কবিতার বই তো একটিই বেরিয়েছে…

কা :        এক অর্থে দুটো; মাঝখানে আমার লেখা খুব কমে গিয়েছিল, এখনো তাই। কিছুদিন অগে ফেসবুকে তাও পাঁচ-সাত লাইন লিখতাম। এখন হয়তো দুটো লাইন লিখলাম, কখনো তাও করিনা।

চি :         আমরা দেখছি কবিতার প্রতি আপনার যে প্রেম বা ভালবাসা, সেটা নিবিড়; একধরনের অন্তর্লীন বিষয় আপনার মধ্যে আছে— কবি মোহাম্মদ কামাল ও কবিতা। সেদিক থেকে অনেকেই যেভাবে কবিতার বই বের করে, ক্রমাগত বের করছে, যখন-তখন বেরুচ্ছে, কবি না হয়েও পাঁচটা-সাতটা কবিতার বই অনেকের আছে। কিন্তু, আপনি সেদিকটায় যাননি এবং আপনার কথায় আমরা বুঝতে পারছি— আপনার কবিতা যখন আসছে না, তখন আপনি লিখছেন না। বা, কবিতার যখন ফ্লো আসে অন্যকিছু করছেন বা ভাল লাগলে একলাইন-দুলাইন লিখছেন। সেইজন্যই কি বেশি কবিতার বই করেননি, বা হয়নি? আসলে হওয়ার তো সুযোগ ছিলই আপনার ক্ষেত্রে!

কা :        হওয়ার সুযোগ ছিল, আছেও। একটা পা-ুলিপি করতে গিয়ে আবার একটু পিছিয়ে আসলাম যে ফেসবুকে যেগুলো আছে, সেগুলোও যুক্ত করি। আরোও কিছু আছে, গতবছরই এটা বের হবার কথা ছিল। যার ফলে পিছিয়ে গেলাম আরকি! তবে, সামনে একটা সম্ভাবনা বা ইচ্ছে আছে। আরেকটি বিষয় আমার বা আমার প্রজন্মের ক্ষেত্রে হয়েছে— সাংঘাতিকভাবে একটা দুঃসময় আমরা এই ক্যাম্পাসে কাটিয়েছি। এরশাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে কবিতার যে শৈল্পিক বিষয়ের ওপর আমরা জোর দেব সেটা হয়ে ওঠেনি। এবং, দেখা গেল যে আমাদের ভেতরে একটা মোহ তৈরি হয়েছে, রাজনীতি নিয়ে বা ঐ সময়ের একটা কবিতা আমরা লিখলাম; সেইটা অধিক জনপ্রিয় হতো বা সেটাকে দিয়ে আমাকে চিহ্নিত করা হতো। এগুলো হয়েছে। যেমন— আমার ‘পেঁচা’ বলে একটা কবিতা আছে; সেইটাকে কেউ হিসেবে আনবে না। কিন্তু, দেখা যায় ‘এখানে অরণ্য ভয়’ নিয়ে সবখানে আলোচনা আছে। শামসুর রাহমানের একটা অসামান্য কবিতা; ভাষা আন্দোলনের পরপরই সেটা হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশের সংকলনে ছাপা হয়েছিল। দেখা গেল যে ঐটা উনি কোনো কাব্যগ্রন্থভুক্ত করেনেনি। কবিতাটি আমাকে নাড়া দিয়েছিল; পরবর্তীতে যে মৌলবাদী সময়ের উত্থান ঘটলো, তখন এটা আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। একদিন ‘জাতীয় কবিতা উৎসব’ এর মঞ্চের পাশে কথা প্রসঙ্গে উনাকে বললাম— ‘আপনার একটা কবিতা হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত সংকলনে ছিল, আপনি এটা কোনো গ্রন্থভুক্ত করেননি কেন?’ বললেন— ‘এটা একটু রাজনীতিমনস্ক কবিতা বলে এড়িয়ে গেছি।’ উনার প্রথম দিকের কাব্যগুলোতে কিন্তু তাই আছে। উনি এগুলোকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন; লিখেছেন হয়তো সময়ের তাগিদে। পরের বছরই উনি ১০০টি রাজনৈতিক কবিতা নামে একটি বই বের করলেন এবং প্রথম কবিতাটি এটাই ছিল। এরকম কিছু বিষয় ছিল। আর, আমি নিজেও আমার প্রতি একধরনের অসম্পূর্ণতা বোধ করেছি; যেমন কবিতা হয়ে উঠছে কিনা, হচ্ছেনা, এসব। যেমন— হাসান আজিজুল হক, উনি অনেক বড় মানুষ; অনেক কিছু লিখলেও দেখা গেল যে ‘শকুন’ এ এসে উনি অনুপ্রাণিত হলেন, একেবারে নতুনধারায় বেগবানভাবে উড়তে লাগলেন। এটা তিনি অনুভব করেন বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। এবং ‘শকুন’ এর ঘনবদ্ধ দৃশ্যগুলো ভোলার নয়। আমার ‘এখানে অরণ্যভয়’ কবিতাটি ১৯৮২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি রাত ১২ টা ১ মিনিটে শহীদ মিনারে পড়েছিলাম। ফোল্ডারে ছাপা হয়েছিল। রাজাভাই (তসিকুল ইসলাম রাজা) আমাকে হঠাৎ করে বললেন— কামাল একটা ফোল্ডার বের করছি, আপনার একটা কবিতা দেন। আমি ঐ কবিতাটি দিয়েছিলাম। তখন রাত ১২ টা ১ মিনিটে কবিতা পড়া হতো, ক্যাম্পাসের সব কবিরাই কবিতা পড়তো, তারপরে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কর্মকা- ছিল। আবৃত্তির বিষয়টা তখনো অতটা দানা বেঁধে ওঠেনি। ‘স্বনন’ তো আস্তে আস্তে ঐ সময়েই শুরু আরকি। আমার কবিতাটি পড়ার পর দেখা গেল ঐটা নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হলো। কপিগুলো তখনই শেষ হয়ে গেল। পরেরদিন দেখি বাদশাভাই খুব খাতির করছেন, তার বোধহয় দলভুক্ত করার একটা প্রবণতা ছিল; আমি একটু এড়িয়ে যাওয়া শুরু করলাম ঐখান থেকে। কয়েকজন শিক্ষকও কবিতাটি নিয়ে বেশ আগ্রহ দেখালেন। এমনকি নাজিম মাহমুদ এইটার প্রেক্ষিতে আরেকটি কবিতা লিখেছিলেন; আমার কবিতার একধরনের প্রশংসা করে বা জবাব হিসেবে।

চি :         এইটা খুব একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার আর কি …

কা :        এটা বোধহয় একদিনে তৈরি হয়নি, আমার ঐ কবিতা যদিও খুব সহজভাবে লেখা। আমি পড়তাম সাইকোলজি বিভাগে, ক্লাশ সেরেই এদিকে চলে আসতাম, আড্ডা দিতে। আপনাদের ‘চিহ্নমঞ্চ’র পাশেই আমরা বসতাম, ভিসির বাড়ির এইপারে। দুপুরবেলা আমাদের একটা কাজ ছিল— প্যারিস রোডের ঐ মাথা থেকে এই মাথা একবার হাঁটতে হবে। দলবেঁধে। তখন তো ছবি তোলার এতটা চল ছিল না; তাহলে প্রচুর ছবি হয়তো ফেসবুকে চলে আসতো। এই হাঁটার প্রভাবটা আমার কবিতাতেও আছে— ‘বৃক্ষে বৃক্ষে বহুদূর ছায়ার মাদুর রোদের ত্রিপল…’। কিন্তু জোহার প্রতি যে আমার একটা অসাধারণ ভক্তি তৈরি হয়, সেটা দেশের সামগ্রিক অবস্থা মিলিয়েই। আমি তখন কলেজিয়েট স্কুলে পড়ি ক্লাশ সিক্সে। ছাত্র সংগঠনগুলো যারা শহরে সক্রিয় ছিল, আমাদের মিছিল করে নিয়ে আসতো। সেইরকম একটা মিছিলে জোহার মাজারে এসেছিলাম ১৯৬৯ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি, জোহা মারা গিয়েছিলেন ১৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিনের ছবিটা মনে আছে; প্রচুর ফুলের তোড়া পড়েছে, সেগুলো একটু মলিন হয়ে আছে। তারপর যেদিন ঘটনাটা ঘটে আমাদের এলাকায় তো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছিল। পৌরসভাতে নিয়ে গিয়ে তাঁর লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল। আরেকটা ব্যাপার ছিল; আমরা যেখানে রোজ পত্রিকা পড়তাম সেখানেই শহীদ নুরুল ইসলামের মৃত্যু হয়। এখন যে মসজিদটা আছে তার উল্টোদিকে কোনায় একটা ডিসপেনসারির বারান্দায় পত্রিকা বিক্রি করতো; অনেকদিন ধরে ইট দিয়ে ওখানে ফুল সাজিয়ে রাখা হতো। তাঁকে স্মরণ করে বোধহয় ‘সিটি কলেজে’র সামনের মাঠে একটা শহীদ মিনার করা হয়েছিল। তারচেয়েও একটি ঘটনা আমাকে বেশি নাড়া দিয়েছিল; আমরা থাকতাম তখন ফায়ার ব্রিগেডের ওদিকে, ওখানে ভেতরের একটা বাসায়। আমার পথের ভেতরেই পড়তো রাজশাহী কলেজ, মেয়েদের হোস্টেল। সেখানে একটা তেঁতুল গাছ ছিল, রাস্তার ওপারে পাওয়ার হাউসের দিকে যাওয়া যেত। ঐ কোনার উপরে আরেকটি ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, ছেলেটির নাম সাত্তার, মাদ্রাসা স্কুলের ছাত্র ছিল। গুলিটা এমনভাবে লেগেছিল যে ¯œায়ুতন্ত্র নষ্ট হয়ে গিয়েছিল; যার ফলে তার কোনো অনুভূতি কাজ করতো না। এগুলো আমার ভেতরে কাজ করেছিল। তারপর, এখানে আরেকটি ছাত্রআন্দোলন হয়েছিল, বিএনপি তখন ক্ষমতায়, তাদের দু’জন মন্ত্রীকে আটকে দেয়া হয়েছিল। কয়েকদফা দাবিতে এখানে অনশন চলছিল, অনশন ভাঙ্গাতে এসে তারা আটক হয়েছিল। তখন গোলাগুলি হলে শিক্ষকরাও নিগৃহিত হয়েছিলেন।

চি :         আপনার কবিতার মধ্যে আমরা নানা বিষয় পাচ্ছি— জীবনানন্দ দাশ তো আছেনই, শাহজাহান সিরাজ, পূর্ণেন্দু পত্রী, শামসুর রাহমান, জোহা কিংবা ১৯৮০ সালের নভেম্বরে বোধহয় মতিহারে একটা কিছু ঘটেছিল…

কা :        সেটা ছিল মোশতাক এলাহীর বিষয়; ও ছিল ছাত্রলীগের কর্মী। সে সময়ে হরতাল ছিল। সেইটাকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে ঘটনাটা ঘটে। আমি সেই সময় ক্যাম্পাসে ছিলাম না, রাজশাহী কলেজে ছিলাম। শিবিরের প্রথম যে মারামারির ঘটনা ঘটে, সেদিনও ‘স্বননে’র একটা অনুষ্ঠান ছিল, আপনাদের বিভাগের সামনে; তখন ছাত্রলীগ করতো একটা ছেলে মুক্তার; মেশতাক দাউদীদের সমসাময়িক। শিবিরের চার-পাঁচ জন মারা গিয়েছিল, তখন আবু ভাইয়ের ক্যান্টিন ছিল বি, এন, সি, সির ওদিকটায়; ঘটনাটা ওখানেই ঘটে, কেসে মুক্তারের নাম যুক্ত করে দেয়া হয়। তখন মুক্তার ‘স্বননে’র অনুষ্ঠানে ছিল, এইটা প্রমাণ করতে গিয়ে নাজিম মাহমুদকে সাক্ষী দিতে হয়েছিল কোর্টে গিয়ে— যে ও আমাদের কবিতার অনুষ্ঠানে ছিল, মারামারিতে ছিল না। যার ফলে ও পার পেয়ে যায়।

চি :         এখানে আমাদের যেটি কথা, সেটি হচ্ছে— শামসুর রাহমানের কবিতার মধ্যে আমরা যেমন ঢাকা শহরের অলিগলি কিংবা ঢাকা শহরকে দেখছি, বায়ান্ন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ বা পরবর্তী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত; আপনার লেখালেখির মধ্যেও আমরা দেখছি যে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় একটা বড় জায়গাজুড়ে আছে। হয়তো এটা গোটা বাংলাদেশেরই চিত্র; প্রতীকীভাবে আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি। ঠিক আছে, কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন, যেহেতু আপনি কবিতার মানুষ সেখানে আসলে জীবনানন্দ দাশ যেমনটা বলেছেন যে— কবিতার মধ্যে ঐতিহ্য-ইতিহাস, কাল-কালত্তোরের আহ্বান থাকবে। আপনি একটু আগে বলছিলেন যে শামসুর রাহমান ১০০টি রাজনৈতিক কবিতা সংকলন করেছেন আলাদাভাবে; এবং রাজনৈতিক কবিতা জন্যই তাঁর ঐ কবিতাটি প্রথমদিকের কাব্যগ্রন্থগুলোতে আসেনি। সেখানে রাজনীতির সঙ্গে কিংবা সমসাময়িক বিষয়ের সঙ্গে কবিতার যে আবেগ, সেটা কি কন্ট্রাডিক্ট করে, এ বিষয়ে আপনার মতামতটা কি?

কা :        আসলে আমাদের মনের সংগঠনটাই এমন যে এই মুহূর্তে একটা টেলিফোন আসলো আমার বাড়িতে অসুস্থ, তাই নিয়ে কথা বললাম। আবার দেখা যাচ্ছে যে এখানে অন্য পরিম-লের কথা উঠে আসছে; কবিতাও কিন্তু তাই, রাজনৈতিক বিষয় থাকবে আবার প্রেমের অনুভূতিগুলোও কাজ করবে। আমার ক্ষেত্রে অন্তর্লীনভাবে একটার সাথে আরেকটার সম্পর্ক সবসময়ই থেকেছে। আর, ক্যাম্পাস তো আসলে ‘ঘাসের ভেতরে ঘাস’, চিরসবুজ। মতিহার তো ভালবাসার একটা জায়গা।

চি :         হুম, সেটা ঠিক আছে।

কা :        সেখানে প্রেমও ছিল, ব্যর্থতাও ছিল; আবার রাজনীতিও ছিল। কিন্তু আমাদের সাংঘাতিক একটা প্রতিজ্ঞা ছিল। এরশাদবিরোধী আন্দোলন ছিল। তারপর আসলো রাশিয়া ভেঙে যাওয়া; এবং একটা সময় ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন, লেনিন, লেনিন’ বলে কামরুল হাসান মন্জু একটা ক্যাসেট বের করলেন। চারদিকে ঐ অনুরণন লেনিন, লেনিন বলে। জোহার মাজারের বলয়টার নিচে ঐ লাইনটাই লেখা ছিল। আমার আব্বার অসুস্থতার সময় মাসখানেক বাইরে ছিলাম, এক বন্ধুর মেসে থাকতাম, ঢাকায়। ঐ সময় মেহাম্মদ সামাদ আবার ঐ মেসেই ছিল; কবি, এখন ঢাকায় ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ এর সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। একজন রাজনৈতিক নেতার মেনিফেস্টো তার প্রথম কবিতার বই। সেইসময় সর্বক্ষণ পুলিশ অনুসরণ করছে আমাকে। আমাকে এইসব অতিক্রম করে যেতে হয়েছে। তখন বসুনিয়া শহীদ হলেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় মিছিলে ট্রাক তুলে দেয়া হলো। সেই সময় পূর্ণেন্দু পত্রীর একটা কবিতার আলোকে আমার কিছু লাইন চলে আসে। আমি তাঁর প্রতি ঋণস্বীকার করে নিয়েই লিখেছিলাম; সেইটাতে ছিল— ‘রক্ত জার্সি পেয়ে গেছি/ ঘাতক এবার যুদ্ধ হবে/ হাওয়ার জিহ্বা বলে গেল/ তুমি নাকি একতরফা যাবজ্জীবন ইজারা নিয়েছো/ এই বাংলার সব হাততালি/ ধনুস্টংকারের মতো তুমি নাকি বেঁকে যাচ্ছো/ মালা পেয়ে, মালা পেয়ে পেয়ে, মালা পেয়ে/ অথচ জানোনা কাল তোমার ছায়াকে কারা পুড়িয়েছে মতিহারে।’ ঢাকা থেকে এখানে যখন আসলাম, তখন এরশাদের পতন ঘটে ঘটে অবস্থা। ছাত্রলীগ কর্মীরাও ধরে নিয়েছে এরশাদের পতন অবধারিত। কিন্তু, কোথায় কি রাজনীতির খেলা ঘটে গেল; দেখা গেল বহাল তবিয়তেই এরশাদ রয়ে গেল। তো ঐ সময়ের যে হতাশাটা, আমি এখানে আসলাম, রাস্তাঘাটে হাঁটতে গিয়ে মনে হলো যে এইখানে আমি যদি ঐ কবিতাটি মঞ্চে উচ্চারণ করি, তাহলে সবাই তিরস্কার করবে। সাত দিনের ভেতরে এটা ঘটলো এবং কবিতাটি আমার ভেতর থেকে উড়ে গেল। শামসুর রাহমান কবিতাটি ছাপানোর পর প্রশংসা করেছিলেন। তখন উনি বিচিত্রাতে ছিলেন। আরেকটি কবিতা পড়তাম ‘শপথ’ নামে। পরবর্তীতে ঐ কবিতাগুলো পড়তে আর প্রাণিত বোধ করতাম না। মনে হতো কবিতাগুলো এই সময়ের জন্য নয়। তখন আমরা আমাদের যেভাবে নির্মাণ করেছিলাম; মাঝখান থেকে এসে আমাদের বিশ^াসগুলো ভেঙে গেল। এটা আমাদের ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে বড় রকমের ক্ষতি করেছে। এবং, আমার নিজের ক্ষেত্রেও আমি অনেকদিন কবিতা লিখতে পারিনি। অসীমের লেখার ক্ষেত্রে অসীম ধৈর্য ছিল; ও মাঝেমাঝে বলেই দিত— কামাল কবিতাটি আরেকবার পারলে লিখ। ওর কবিতা নিয়ে আমি আমার জায়গা থেকে বললেন ও রিরাইট করেছে। এই পরস্পর বোঝাপরার মধ্য দিয়ে নিজেদের গুছিয়ে উঠবার ক্ষেত্রে ঐ সময়টা খুব কাজে দিয়েছিল। অসীম পাশে না থাকলে আমার পুননির্মাণটা এভাবে হতো না।

চি :         এখন তো আর অসীম স্যারের সঙ্গে ঐভাবে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না?

কা :        খুব কম। এখানে ঐ ঘটনাটা (ইংরেজির শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর নির্মম হত্যাকা-) ঘটার পর আমি দুএকদিন এসে, না পেয়ে ফিরে গেছি। তখন আর আসিনি। ও এখন বাড়িতেই থাকে, সন্ধ্যার পরপরই চলে যায়।

চি :         এখন আমরা একটু ‘স্বনন’ এর দিকে আসি। আপনি একেবারে গোড়া থেকেই এই দীর্ঘায়ু আবৃত্তি সংগঠনের সাথে আছেন; সেখান থেকে একটা জিজ্ঞাসা— আবৃত্তি কি কবিতাকে নষ্ট করে নাকি কবিতার উজ্জ্বলতা আরো বৃদ্ধি করে? যেমন— হুমায়ুন আজাদের একটা কথা বাজারে প্রচলিত আছে— ‘আবৃত্তিযোগ্য কবিতা, কবিতা নয়’। আবৃত্তির মানুষ হিসেবে আপনি এই কথাটিকে কিভাবে দেখছেন?

কা :        আসলে নীরব ধ্যানের মধ্যে অনুভূতির যে জাগরণ বা প্রবহমানতা; তার যে বিস্তৃতি, সেইটা তো কণ্ঠে আনা সম্ভব নয়। সেদিক থেকে কথাটি ঠিক আছে। আপনি একটা কবিতা পড়লেন, তারপর নীরব হয়ে গেলেন— সেইটা যতই বলেন, কণ্ঠ সাধনার মধ্যে দিয়ে আনা সম্ভব নয়। যখন ‘বনলতা সেন’ পড়ি, বনলতা সেনকে নিয়ে চোখ বন্ধ করলে পথের যে রেখাগুলো আমার ভিতরে আলোকিত হয়ে ওঠে, সেটা তো কণ্ঠের ভেতরে আনা যাবে না। বরং, আবৃত্তির মাঝে একটু ছুঁতে চাওয়ার প্রচেষ্টা থাকে, হয়তো আমি একটু ছুঁয়ে দিলাম, সেখান থেকে আপনার মনে একটা আলোকপ্রাপ্তি ঘটে। রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে যেটা হয়— রবীন্দ্রনাথ তাঁর জায়গা থেকে নিজের মতো করে লিখেছেন, আমি আমার ভেতরে যে আলোটা পাই, সেখান থেকে আমার দৃষ্টিকোণ দিয়ে তার মূল্যায়ন করি। আবার যিনি উচ্চতর বোধের মানুষ, তিনি হয়তো সেইখান থেকে রসটুকু নিতে পারেন। আরেকটু বেশি নিতে পারেন। যিনি আরেকটু উচ্চ জায়গা থেকে দেখছেন, তিনি সেখান থেকে আরো গভীররস আস্বাদন করছেন। আরেকটা ব্যাপার— ভাল কবিতা, শিল্পোত্তীর্ণ-কালোত্তীর্ণ কবিতা; সেগুলোর ক্ষেত্রে রসের জায়গা থেকে, অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আরো গভীরে যাওয়া যায়। আলী আনোয়ার স্যার ২২ শে শ্রাবণের একটা অনুষ্ঠানে একবার বলেছিলেন— ‘আমি প্রথম জীবনেই রবীন্দ্রনাথকে পড়েছিলাম, সব রচনাই পড়েছিলাম। কিন্তু দেখা গেল যে চল্লিশ বছর বয়সে উনি যে রচনাটি করেছেন— সেটা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান, প্রবন্ধ যাই হোক; এ বয়সে গিয়ে আমি রচনাটির সাথে আরো একাত্ম হতে পারছি।’ সেখান থেকে আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথকে চূড়ান্তভাবে উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকেও আশি বছর বাঁচতে হবে। খলিলুল্লাহ বলে একজন লোক ছিলেন, উনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করেননি। নিজে বই পড়ে পড়ে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। উনার একটা মজার তথ্য আছে— উনি কোরআন শরীফ অনুবাদ করেছিলেন পুরোটা; বড় লেখা কেউ ছাপতে চায় না, নিজেই খরচ করে একটা কি দুটো খ- বের করেছিলেন ওপার থেকে। তার খুব গ্রহণযোগ্যতা ছিল এবং বিভিন্ন সময় প্রশাসনও তাকে ব্যবহার করেছিল সামনে রেখে এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। উনি ছবি তুলতে দিতেন না, থান পরিধান করতেন, মাঝে মাঝে খালি গায়ে থাকতেন, টাকা হাতে ধরতেন না। অন্য কেউ পাশে থাকতেন, তাকে দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতেন। আমরা যখন দেখা করতে গেলাম আশি বছর পার হয়ে গেছে, প্রচ- গরম সেদিন, হোটেলে বসে খাচ্ছিলাম, প্রচ- ঘাম দিচ্ছে, উনি পাশে বসে। বলা হলো আপনার সময়ের কেউ নেই এখন; একটা তুলনাহীন রুক্ষ্মতা নিয়ে বললেন উনি— ‘আমার সময়ের সব মানুষ মাটির নিচে চলে গেছে, আমি একা বেঁচে আছি।’ এই যে কষ্টের উপলব্ধি, ঐ বয়সে না গেলে আমরা তো বুঝতে পারবো না। সুতরাং, অভিজ্ঞতার একটা বিষয় থেকে যায়।

চি :         আমরা দেখছি আপনি কবিতা নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে থাকলেও— কোনো নির্ধারিত গোষ্ঠী বা ঘরানার সাথে তেমন করে জড়িয়ে পড়েননি। ‘স্বনন’ এর সাথে গোড়া থেকে আছেন এবং ‘স্বনন’ ই করছেন। রাজশাহীতে তো আরো অনেক সংগঠন আছে, যেমন কবিকুঞ্জ; আপনি হয়তো এগুলোতে যান, কিন্তু ওভাবে কোন বৃত্ত বা গোষ্ঠীর মধ্যে আমরা আপনাকে দেখছি না। একেবারেই নিজস্বভাবে একটা নির্লিপ্ত জীবনযাপন করছেন। প্রশ্নটা যদিও একটু ব্যক্তিগত; তবুও এটার কি কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে?

কা :        আপনারা আসলে বিষয়টাকে যেভাবে মূল্যায়ন করতে চাচ্ছেন, এটা ঠিক তেমন নয়। আমি ‘রবিবাসরীয় সাহিত্য সংসদ’ এর সাথে খুব গভীরভাবে যুক্ত ছিলাম। ‘কবিকুঞ্জে’ও প্রথম দিকের সভাগুলোতে ছিলাম, ওদের সদস্য ছিলাম, কবিতাও পড়েছি, পত্রিকায় নামও ছাপা হয়েছে। বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় আছে, যা কখনো কখনো ব্যক্তিগত; তাই সামষ্টিক জায়গা থেকে সরে আসাটা কষ্টদায়ক হলেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আর, আমি এটাও মানি কবিতার ক্ষেত্রে নিজের সমালোচনার জায়গাটিই সব থেকে বড়। ভাবনার ভেতরে অনেকেই ছিলেন, যেমন— আপনাদের একজন শিক্ষক তাঁর দ্বারাও অনুপ্রাণিত হয়েছি। কাজী আবদুল মান্নান— উনি খুব প্রাজ্ঞ মানুষ ছিলেন। কবিতার দিকে হয়তো খুব বেশি যেতেন না, কিন্তু কবিতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমি তাঁর মুখে অসাধারণ কিছু উপমা বা বিশ্লেষণ শুনেছিলাম। হয়তো আমার কবিতা উনি পড়েছিলেন বা শুনেছিলেন। উনি খুব ধরা দিতেন না। কিন্তু, দৃষ্টিতে কোথায় যেন নমনীয়তা নিয়ে আমাকে দেখতেন। বা, কখনো একটা কথা ঠেলে দিতেন, এটা করে দেখাও। রাজশাহী কলেজের কাছে একটা আলোচনা সভায় উনি তিনটা কবিতার উদাহরণ দিয়েছিলেন। ‘শপথ’ নামে সলিল চৌধুরীর একটা কবিতা আছে। তবে উনি নাম বলেননি, সলিল চৌধুরীর নামও বলেননি, এটা ঝুলিয়ে দিয়ে বললেন— ‘১৯৭২ সালে এটা পরিবর্তন এ বেরিয়েছিল, তোমরা কেউ পারলে সংগ্রহ করো এবং আমাকে বলতে হবে কবি ও কবিতার নাম’। তখন কলকাতার দেশ পত্রিকার শেষের দিকে সংস্কৃতির ওপর একটা নিবন্ধ থাকতো; কোথায় কোন কবিতা প্রকাশ হয়েছে, পড়া হয়েছে, কোন কবিতাটি ভাল হয়েছে এসব আরকি। ঐ শিরোনামও আমি অনুসরণ করতাম। তো উনি এটা বলে ‘কাকদ্বীপ অহল্যা’র কিছু বর্ণনাও দিলেন। এটা চল্লিশের দশকে ঘটেছিল; বোধহয় ১৯৪৮ সালে। কাকদ্বীপ; ঐ এলাকাটা বিদ্রোহীরা দখল করে নেয়। সেখানে পুলিশ আক্রমণ করে, আগেই বার্তা পেয়ে যুবক ও কৃষকরা সেখান থেকে সরে গিয়েছিল। কাউকে না পেয়ে এক কৃষাণী অহল্যা, তাকে দলন করে পুলিশ হত্যা করে। অহল্যা ছিলেন সন্তানসম্ভাবা, এই ঘটনা নিয়েই লেখা ‘শপথ’ কবিতাটি। কবিতাটিতে অসাধারণ কিছু লাইন আছে— ‘সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে হরতাল হয়েছিল/ সেদিন আকাশের জলভরা মেঘ/ বৃষ্টির বেদনাকে বুকে চেপে ধরে থমকে দাঁড়িয়েছিল/ এই পৃথিবীর আলো বাতাসের অধিকার পেয়ে/ পায়নি যে শিশু জন্মের ছাড়পত্র/ তারই দাবী নিয়ে সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে/ কোন গাছে কোন কুঁড়িরা ফোটেনি/ কোন অঙ্কুর মাথাও তোলেনি/ প্রজাপতি যতো আরও একদিন গুটিপোকা হয়েছিল/ সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে হরতাল হয়েছিলো।’ তিনি বললেন এই সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে নেই। উনি শঙ্খ ঘোষের আরেকটি কবিতার কথা বলেছিলেন, ‘বাবরের প্রার্থনা’। এ কবিতায় একটা শব্দের কথা বলেছিলেন। আমি এটাও যোগাড় করলাম।

চি :         কাজী আবদুল মান্নান (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক) এসব কবিতা পড়তেন তাহলে? আমি তো ভাবতাম উনি অন্য জগতের মানুষ!

কা :        শুধু পড়তেন না, সাংঘাতিকভাবে বিশ্লেষণ করতেন। যেটা অন্যকেউ পারতেন না। কাজী আবদুল মান্নান বলতেন— আমরা ভেতো বাঙালি সাধারণভাবে প্রাচীনকাল থেকে বলে এসেছি যে ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। তো সেইসময়ে খেয়ে-পরে বাঁচলেই ভাল ছিল। আরকিছুর দরকার ছিলনা। কিন্তু, আধুনিক একটা সন্তানের তো আরো বেশি কিছু লাগবে, তার মোবাইল লাগবে, ল্যাপটপ লাগবে, আরো অনেক কিছু। এই যে এখন আর দুধে-ভাতে থাকছে না; ‘বাবরের প্রার্থনা’য় কবি বলেছেন— ‘এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম/ আজ বসন্তের শূন্য হাত-/ ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও/ আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।’ এই যে ‘স্বপ্নে থাক’ উনি এই শব্দটাতে জোর দিলেন। বললেন এটা ওখান থেকেই এসেছে, এবং এই ‘স্বপ্ন থাক’ হলো আধুনিক বোধ। আরেকটি কবিতা ‘আট বছর আগের একদিন’— এখানে উনি বলেছেন ‘মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের ¯্রােত ভালোবেসে।’ উনি ‘সঙ্ঘারাম’ শব্দটিতে জোর দিয়ে বললেন— ‘সঙ্ঘারাম’ বৌদ্ধদের উপাসনালয়, সেখানে বসে ‘বুদ্ধং স্মরণং গচ্ছামি’ ক্রমাগত জপ করা হয়; মশা কি করছে লাশকাটা ঘরে? সে লাশকাটা ঘরে লাশকে ঘিরে ক্রমাগত জিকির করছে— ‘রক্ত খাবো, রক্ত খাবো, রক্ত খাবো’ বলে। মশা শোষকের একটা প্রতিনিধিত্ব করছে কবিতাটিতে। এইসব মিলিয়ে আমি খুব উদ্বোধিত হয়েছিলাম। আগে কবিতার জায়গায় দুর্বোধ্য যেসব বোঝানো হতো সেসব আনা হতো। যেমন— সুধীন দত্ত কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন অপ্রচলিত; অর্থটা অভিধান দেখে নিলেই শেষ। আবার ধরেন যে বিষ্ণু দে’র কবিতা; একটা শব্দের মধ্যে পুরো কাহিনী বা মহাভারত লুকিয়ে আছে। শামসুর রাহমান কবিতায় ‘লিথি’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, শব্দটা না বুঝলে তো হবেনা। বা, ‘ইকারুসের আকাশ’। শামসুর রাহমান আমাকে প্রভাবিত করেছেন নানাভাবে। তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ আমার সার্বক্ষণিক পাঠ্য। আরেকজন আমাকে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত করেছিল; ঘনবদ্ধতার জায়গাটায় আমি তাঁর কাছে অনুপ্রাণিত হয়েছি— তিনি আবুল হাসান।

চি :         বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আবৃত্তি সংগঠন ‘স্বননে’র কথা বলছিলাম। একই সাথে নাজিম মাহমুদের মতো উচ্চ সংস্কৃতিবান মানুষ ‘স্বননে’র সাথে জড়িত ছিলেন। অবশ্য আরো অনেকেই ছিলেন— হাসান আজিজুল হক, আলী আনোয়ার, সনৎকুমার সাহা; আপনি এর শুরু থেকে অদ্যাবধি আছেন। এই জায়গা থেকে বাংলাদেশের আবৃত্তিচর্চা নিয়ে আপনার কাছে শুনতে চাই এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কেমন করছে, আগে কেমন ছিল? নাজিম মাহমুদরা তো চলেই গেলেন। শামসুর রাহমান, তসলিমা নাসরিনও এসেছিলেন ‘স্বননে’র অনুষ্ঠানে। ‘স্বননে’র বুকলেটগুলোতে বিভিন্ন লেখা থাকতো; জীবনানন্দের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘স্বনন’ রুচি-চিন্তা-মননের প্রকাশ আবৃত্তিচর্চার কাজ করত। এখনও করছে। আমরা আসলে আউটপুটটা জানতে চাচ্ছি— রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়, ‘স্বনন’, এসব মানুষের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশের আবৃত্তিচর্চার অবস্থাটা কি?

কা :        ধারাবাহিকতা থাকলেও সামষ্টিক আবৃত্তি চর্চাটা কিছুদিন আগে শুরু হয়েছে। ভাষার পরিবর্তন হয়, আবৃত্তিচর্চার ধারাতেও পরিবর্তন হয়। আমরা আগে থেকে মনের মধ্যে নিয়েছি পাহাড়ী সান্যাল, শম্ভূ মিত্র, সব্যসাচী বা প্রদীপ ঘোষ; বাংলাদেশে যদি বলি ‘স্বনন’ এর শুরু থেকেই ছিলেন গোলাম মোস্তফা বা নাজিম মাহমুদ। তারপর আমাদের আলোড়িত করে পরিবর্তিত বাঁকের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। কবিতা লেখা, আবৃত্তি বা লেখালেখির ক্ষেত্রে একটা একাডেমিক বিষয় আছে। তবে, এসবে লাবণ্য আনতে হলে তাকে অবশ্যই সৃজনশীল বা শিল্পমনস্ক হতে হবে। নইলে হবেনা। আমি আগে থেকেই কবিতা পড়তাম। ভর্তি হবার পর জানলাম নাজিম মাহমুদের একক একটা কবিতার অনুষ্ঠান হবে। তখন রবীন্দ্রকলাভবনে (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)র তিনটা বিল্ডিং ছিল; মাঝখানে ফাঁকা ছিল, সেখানে তাঁর কবিতা পড়ার অনুষ্ঠানটি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ, শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে অনেকের কবিতাই তিনি পড়েছিলেন। সেগুলো আমাদের মনে আবহ তৈরির ক্ষেত্রে কাজ করেছিল। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মনিরুজ্জামান— তার মনের ভেতরে প্রথম একটি সংগঠন তৈরির আগ্রহ জাগে। সেখানে শুরু থেকেই নাজিম মাহমুদের একটা ভূমিকা ছিল। তিনি হলগুলোতে গেছেন, কবিতা পড়েছেন, শিখিয়েছেন। সে নাজিম মাহমুদকে গিয়ে বলে আমি একটা আবৃত্তির সংগঠন করতে চাই। তারপর, সে দেড়শ ছেলেমেয়ে নিয়ে শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের গ্যালারিতে সমবেত হয়, সেখানে অনেক শিক্ষকও ছিলেন। বাংলা বিভাগের আসাদুজ্জামান স্যার ছিলেন; পরে মতের মিল না হওয়ায় তিনি আর থাকেননি। সেখান থেকেই আরম্ভ। অনেক বড় বড় মানুষকে ডেকে এনে কর্মশালা করা হয়েছে। তাদের মাঝে ওয়াহিদুল হক ছিলেন, খুলনা থেকে এসেছিলেন অসিতবরণ ঘোষ। হাসান আজিজুল হক উচ্চারণের ক্লাশ নিলে আমরা আগে থেকেই এসে বসে থাকতাম। আতাহার আলী— বাংলা বিভাগের ছাত্র, উচ্চারণের ক্লাশের ব্যাপারে ওর অনাগ্রহ থাকলেও এ ব্যাপারে আগ্রহ ছিল। এবং অভিনয়ের জায়গাতেও হাসান আজিজুল হকের অসাধারণ একটা পারঙ্গমতা আছে। নামটা তিনিই দিয়েছিলেন— ‘স্বনন’। স্লোগান তৈরি করে দিয়েছিলেন কবি জুলফিকার মতিন ‘যতদূরেই যাই আমরা স্বনন পরিবার’। অনুষ্ঠান হলে সবাই আসতেন, এভাবে সবারই একটা শুভেচ্ছা ছিল। সনৎ স্যার তো খুব প্রাজ্ঞ মানুষ, সামনে থেকে কিছু হয়তো করতে চাইতেন না; তবে, আমাদের অন্তর্লীন চেতনা তৈরির জন্য উনি গভীরভাবে কাজ করেছিলেন। পরামর্শ দিতেন, ‘স্বনন’ এর স্যুভিনিয়রে যেসব লেখা তিনি দিয়েছেন, সেগুলো পড়লেও দেখা যায় একটা গভীর বোধকে তিনি লালন করেন। এছাড়া শহীদুল ইসলাম স্যার ছিলেন, শিশির স্যার ছিলেন, জাহিদুল হক টুকু স্যার ছিলেন। একটা কাজকে অনুপ্রাণিত করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সেই কাজটা নাজিম মাহমুদের পাশাপাশি উনারা করেছেন। ‘স্বনন’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে জামিল চৌধুরী একটা বিপ্লব সাধন করেছিলেন উচ্চারণের ক্ষেত্রে। উচ্চারণের ক্লাশগুলো উনি নিতেন। বাংলা একাডেমি একটা সিরিজে ১০০ টি বই বের করেছিল, সেখানে উচ্চারণের একটা বই ছিল। আমরা অনেকেই কিনেছিলাম। হাসান আজিজুল হকের সক্রেটিস বইটিও এই সিরিজে ছিল। ওয়াহিদুল হক, জামিল চৌধুরী আমাদের নিরন্তর অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। এইভাবে আমরা এগিয়ে গেছি। কিন্তু, পরবর্তীতে যারা মেধাবী ছিল, উচ্চারণের ক্ষেত্রে তারা খুব আগ্রহবোধ করেনি। কিছু ছেলেমেয়ে আমরা দেখেছি— তারা মনে হতো যে যাচাই করতে এসেছে, তারা থাকলে আরো এগিয়ে যেতো। যেমন— রানারা ছিল, জয়ন্তদা ছিল। জয়ন্তদা তো গানের ক্ষেত্রেও অসাধারণ একটা সাফল্য পেয়েছে। আমার জায়গায় আমি নিজেকে খুব এগিয়ে যাওয়া মানুষ, মেধাবী মানুষ মনে করিনা। পরবর্তীতে অনেক মেধাবী ছেলেই এসেছে, কিন্তু দেখা গেল তারা অধিকাংশই সাধারণ। তবে, সাধারণ হলেও উচ্চারণের ক্ষেত্রে তারা অনেকটা এগিয়ে গেছে।

চি :         ‘স্বনন’ তো এখনো কাজ করে যাচ্ছে, মেধার তারতম্য থাকবেই। আমাদের আবৃত্তিচর্চাটা কি আগের থেকে নেমে গেছে! না, আসলে সংস্কৃতির প্রচ- শক্তি হিসেবে আবৃত্তি তো প্রত্যক্ষ দৃষ্টিগোচর হয়না, দৃশ্যমান হয়না। আবৃত্তি একটা সংস্কৃতিমগ্নতা, মননশীলতার জন্ম দেয়। নানাভাবে বিচ্ছুরিত হয়, সেই জায়গাটিতে ‘স্বনন’ কাজ করছে, ঠিক আছে। এখন আমাদের যেটা কথা, সেটা হচ্ছে— ‘স্বনন’ যেহেতু আমাদের আবৃত্তির জগতের একটা বড় অংশীদার, সেখানে আবৃত্তির জগতটার অবস্থাটা কি? আপনি কি এই অবস্থানে তৃপ্ত, এর ভবিষ্যৎটা কি?

কা :        বিষয়টা হচ্ছে এর মধ্যে রাজনীতিকরণ হয়েছে তো; যেমন নেতৃত্বে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় যদি থাকতেন, বা তার ভূমিকাটা যদি পূর্ণাঙ্গ হতো; আরো কিছু কথা মনে হচ্ছে, আমি বলতে চাচ্ছি না আসলে। পারিবারিক কারণ, প্রয়োজন, বাস্তবতায় উনি নাটকে চলে গেছেন। তারপরেও উনি যে গভীরতা ধারণ করেন, তার পাশাপাশি কিন্তু ঐভাবে তৈরি হওয়ার বিষয়টা কমে গেছে। পরবর্তী প্রজন্মেরা ঐভাবে আসেনি আরকি! তবে অনেকেই বলতে পারে আবৃত্তির চর্চা বেড়েছে বা এখান থেকে দুএকজন বাড়ি-গাড়ি করেছে বা সাংসারিক উপার্জন চলছে। এমনও কথা আছে কলকাতায় গেলে কেউ কেউ লাখটাকাও সম্মানী পায় আরকি! তাদের দেয়া হয়, হয়তো কোন প্রোগ্রামে অংশ নিল বা চ্যানেলের অনুষ্ঠান ওখানে একটা পেশাদারী ব্যাপার আছে, দেখা গেল পাড়ার কোনো ছেলে পাড়ারই কোনো অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করলো তাকে ৫০০ টাকা দেয়া হলো। আমাদের এখানে কিন্তু সেটা নেই। সব দিক থেকে না হলেও কেউ কেউ কিন্তু খুব ভাল আবৃত্তি করছে। যেমন— শান্তর কথাই বলি, পেশাদারিত্বের জায়গায় গেলে যে পরিশ্রম বা সময়টা দিত, সেটা হচ্ছে না; কিন্তু শান্ত খুব ভাল আবৃত্তি করে। কাম্যুর একটা লম্বা কবিতা এখানে পড়েছিল, অসাধারণ লেগেছিল। বা, আপনাদেরই ছাত্র মিঠু, সতীশ চন্দ্র রায়; ও কিন্তু খুব নিবিড়ভাবে কাজ করে। এবং, আবৃত্তির ক্ষেত্রে, একটা কর্মশালা পরিচালনার ক্ষেত্রে মিঠু স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা চলে। আরেকদিক থেকে শান্তও তাই। মাঝে মাঝে আমি হাসির ছলেই বলি— আবৃত্তিটা এমন, যেন তেল ফুটছে, সেখানে একটা পাঁপড় দিলে যেমন নিজের মতো করে বেরিয়ে আসে। সেখানে কবিতার আবেগ কিংবা আর বিষয়গুলো যেন ভাজা ভাজা হয়ে গেল। বয়স গেলে সেগুলো আবার ভেঙেচুরে একটা জায়গায় চলে আসে। যেমন— সবাই বলে শম্ভূ মিত্রের গলায় যা ছিল, রেকর্ডে তা পাওয়া যায় না। রেকর্ডিং করতে করতে তো কিছু খোয়াও যায়। কিন্তু, দেখা গেল উনি শেষ বয়সে দুটো রেকর্ড বের করেছিলেন, একটা রবীন্দ্রনাথের ওপর, আরেকটা জীবনানন্দের ওপর। উনি খুব নমনীয়তা নিয়ে পড়েছিলেন; কিন্তু এমন একটা গভীরতায় গেছেন, আমার কাছে মনে হয়েছে যে— এগুলোকে অনুসরণ করলে আবৃত্তির ক্ষেত্রে একটা বাঁক বদল করে নেয়া যায়। এইটা উনি পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে গেছেন। আজকের দিনে আবৃত্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। চ্যানেলগুলোর উচ্চারণেও আমরা এ বিষয়টি দেখি। প্রমিত উচ্চারণের ক্ষেত্রে জনগণের মাঝেও সচেতনতা তৈরি হয়েছে। কতগুলো ক্ষেত্রে অসাধারণ কিছু ঘটনা আমাদের ভেতরে ভেতরে ঘটেছে। যেমন— সিলেটের একটা ছেলে ছিল, উচ্চারণের সমস্যার কারণে ও সবার সাথে পড়তো না। কিন্তু, চলে যাবার দিন যখন বললো— ‘কামাল ভাই আমি একটা কবিতা পড়ি’; দেখা গেল কোথাও কোন সমস্যা নেই। এবং, ও কিন্তু ওটা সারাজীবন বহন করবে। আসলে আমাদের সংগঠনের ভেতরে সবসময়ই একটা নিরন্তর সাধনা চলতো, বড়রা যতটুকু জানে সেখান থেকেই ছোটদের তৈরি করার চেষ্টা করতো। এটা নিজেদের ভেতরে ভেতরেই চলতো। তারপর ধরেন কিছু চাকমা ছেলেমেয়ে আসে ওদের সাথেও আমরা মানিয়ে নিই। এমনকি ওরা কোরাসে থাকলেও আমরা বিরক্তবোধ করি না। বাহির থেকে হয়তো দেখা যায় উচ্চারণ ঠিক হচ্ছে না, তবে শেষদিকে এসে অনেকটাই ঠিক হয়ে যায়। এইভাবে ভেতরে ভেতরে বিষয়গুলো চলতে থাকে। আমাদের একটা প্রবণতা হলো একটু দুএক বছরের সিনিয়র হলেই জুনিয়রদের একেবারে শাসনে নিয়ে কথা বলা। ফলে, হয় কি যারা বেরিয়ে যায় পরবর্তীতে ডিপার্টমেন্টে এসে কথা বলার মতো লোক পায় না, শিক্ষকদের কাছে তো অনেকেই ঘেষতে চায় না। এখন কেউ যদি এসে বলল আমি ‘স্বনন’ করতাম, তবে তাকে আপন করে নেয়া যায়। ফলে, এই ছেলেগুলো, সংগঠন করা ছেলেরা চাকুরির ক্ষেত্রে অফিসে গিয়ে যত সহজে মিশতে পারে অন্যরা তা পারে না, এটা একটা প্লাস পয়েন্ট। এজন্য সংগঠন করা ছেলেদের অনেক প্রতিষ্ঠানই পছন্দ করে।

চি :         আমরা এবার শেষদিকে আসবো। আপনি ‘স্বনন’ এর সঙ্গে এখনো আছেন, কাজ করছেন; এখানে আমাদের বিশ^বিদ্যালয়ের ছেলেরা যায়-আসে এবং এই যে আনকোরা ছেলেমেয়েদের আপনি একটা অনুশীলনের মধ্যে রেখেছেন। তারা একটা সংগঠন, একটা এক্সপেরিমেন্টের ভেতরে আছে। ইদানিং আমরা দেখছি আলোকচিত্রী হিসেবেও আপনার একটা ক্রিয়াশীলতা দেখা যাচ্ছে— ফেসবুকে বা বিভিন্ন জায়গায়। বেশি বলা হবে কি না জানিনা; এবং যে ক্যাপশনগুলো আপনি দিচ্ছেন, এটা আসলে কি, এটাও কি কবি হিসেবে কবিতার মধ্যে আছেন, কবিতার তো নানা রঙ আছে, সেটারও একটা টেস্ট পাচ্ছি আপনার থেকে। আমি দেখেছি এত নিখুঁত এবং আপনি যেভাবে ক্যাপশনগুলো দিচ্ছেন, সেটা অনেকটাই কাব্যিক, ইঙ্গিতধর্মী, সেখানেও একটা চিত্রকল্পের চর্চা চলছে নানাভাবে। আপনি হয়তো কাজটা আনন্দের সাথেই করছেন, বা কিছু সামনে না রেখেই করছেন, কিংবা দৈনন্দিনতার ভেতরেই কাজটা চলছে; তবে এটাকে আমি নান্দনিকতার একটা পার্ট হিসেবেই দেখতে চাই। এবং, দীর্ঘসময় ধরে আপনি এই কাজটি করছেন। যেমন— সেদিন আপনি রহনপুরে গেলেন, সেখানে আমি দেখতে পাচ্ছি দো-তলা মাটির বাড়ি, জমি, শ্রমিকদের কাজের দৃশ্য, সূর্য উঠছে-ডুবছে, প্রকৃতি কিংবা নানাধরনের চিত্রকল্প আমরা আপনার আলোকচিত্রের মাধ্যে পাচ্ছি। আমরা মনে করছি আসলে এখন আপনার কবিতা হয়তো কম লেখা হচ্ছে বা কবিতার জায়গাতে কবিতা আছে; কিন্তু এই জিনিসগুলোও আপনি হাত ধরাধরি করে চালাচ্ছেন; এবং তা শিল্পচর্চার অংশ বলেই মনে হয়। এখন আপনার যাপিত জীবনটা আসলে কেমন, সেটাই জানতে চাই?

কা :        আসলে ফটোগ্রাফির বিষয়টি আমার মনে ছোটবেলা থেকেই ছিল; এটা আমার আব্বার মাধ্যমে এসেছে, কবিতাও তাঁর মাধ্যমেই আসা। আমার জায়গা থেকে ব্যাখ্যা দিই; একটা কবিতা আছে, জয়ন্তদা একবার পড়েছিলেন, এখন আর খুঁজে পাইনা। অনর্গল একটার পর একটা ফুলের নাম যুক্ত করে একটা কবিতা, মানে পরপর বলে যাওয়া আরকি! আর, উনি এমনভাবে পড়তেন মনে হতো যে বুকের ভেতর ফুলগুলো ফুটছে। আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, একটার পর একটা। আব্বা আরেকটা উদাহরণ দিয়েছিলেন; উনি বলেছিলেন যে তিন রকমের কবিতা— একটা হচ্ছে যে আঙ্গিনায় একটা শুকনো কাঠ পড়ে আছে, একজন বললো যে— ‘সামনে একটা শুকনো কাঠ পড়ে আছে’। সেটাকে আরেকটু কাব্যিকভাবে উপস্থাপন করলে— ‘শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠতি…’। আরেকজন বললেন— ‘নীর রসো তরুবর…’। আমি অনেক শিক্ষকের কাছে হয়তো কবিতার ব্যাখ্যা শুনেছিলাম, তবে এটা আমার মনে দাগ কেটে যায়। এই যে ঘনবদ্ধতার ব্যাপার, গভীরতার ব্যাপার, এগুলো তো মানুষের ভেতরে ভেতরে তৈরি হয়। জীবনের ভেতরে এগুলো আছে; রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলায় যে অসাধারণ কবিতা লিখেছিলেন সেগুলোরও একটা ঐতিহ্য আছে। আমার কাছে মনে হয়েছে শামসুর রাহমানের একটা কবিতা নিয়ে; উনার একটা কবিতা আছে ‘মা’ বলে— মাকে কোনদিন গান গাইতে দেখেননি। সেই কবে রাতে শিশুকে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়েছিলেন, মধ্যবিত্ত মুসলিম নারীর যে অতৃপ্তি সেটি ফুটে উঠেছে। তার একটা ছবি এঁকে গেছেন তিনি। কিন্তু, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন কি— ‘মাকে আমার পড়ে না মনে’। আমার মনে হয় ভেতরে পারিবারিক ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে এই অনুশীলন গুলো করার সুযোগ ছিল। আব্বা ফিজিক্সের শিক্ষক ছিলেন, উনার একটা ক্যামেরা ছিল ডিপার্টমেন্টেই, তারও আগে থেকেই তিনি ছবি তুলতেন। একবার উনি গিয়েছিলেন পাকিস্তানে, সেখানে পিকনিকের অনেক ছবি তুলেছিলেন। এবং, আমিও ছোটবেলা থেকে ক্যামেরা ঘাড়ে নিয়েই চলেছি। আমার ভেতরে আবার নাটটা-স্ক্রুটা খুলে দেখার একটা প্রবণতা ছিল; ক্যামেরা খুলে ফেলেছি, আবার লাগাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। এমনও হয়েছে যে ক্যামেরাটাই বাদ চলে গেছে। তারপর কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেক ছবি তুলেছি; ‘স্বনন’ এর ২৫ বছর পর্যন্ত আমার প্রায় এক বস্তা ছবি আছে। সেগুলো এখন আমার হাতে নেই। শহীদুল ইসলাম স্যার একদিন বলেই বসলেন— ‘তুমি তো এমন ছবি তুলেছো নাজিম মাহমুদের যে— নাজিম মাহমুদ বন্ধু মানুষ, তার মুখটা মনে পড়ে না, তোমার তোলা ছবিটা দেখে আমরা তাকে মনে করি; তো তুমি আমার একটা ছবি তুলে দিও’। আমি বললাম, এটা তো সাজিয়ে হয় না, দেখি আমার চোখে থাকলো। একদিন শহীদ মিনারে বিকেলবেলা উনাকে দেখলাম, তো চট করে ক্যামেরা এনে একটা ছবি তুলে ফেললাম। পরে দেখা গেল তার কন্যার কথা, ওটাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবি। তারপর শুনলেন জাপানে ওটা বড় করে বাঁধিয়ে নেয়া যাবে— তখন আবার আমার খোঁজ পড়লো যে, আমার ঐ নেগেটিভটা দাও। তাকে পাঠিয়ে দিলাম, তারপর ওরা বড় করে বাঁধালো। অনেক ছেলেমেয়ে আছে ওদের হয়তো অসতর্ক মুহূর্তে বা আমি আড়াল থেকে ছবি তুলেছি, ওটা ওদের মনের মধ্যে থেকে গেছে।

                এখন আমার একটা ফোন আছে, সেটি দিয়ে ছবি তুলেই ফেসবুকে দেই। আমার কিছু ফটোগ্রাফার বন্ধু আছে এদের প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার ক্যামেরা। আমি ভোররাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখলাম ঘন কুয়াশা, তো আমার মনে হলো প্যারিস রোডের কি অবস্থা, তাড়াতাড়ি চলে আসলাম, কেউ নেই, চারিদিকে ফাঁকা, এখন কেউ যদি দুটো থাপ্পর দিয়ে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে ক্যামেরাটা নিয়ে যায় তো কিছুই করার নেই। আমি মোবাইল নিয়ে ঘুরি আর মোবাইলগুলো আগের মতো ছিনতাই হবার প্রবণতাও কমে গেছে। আর হলে হবে। এই মোবাইলের সীমাবদ্ধতা নিয়েও; একটা ছবি যেমন এখানে আসার আগেও দিয়েছি, একটা মাছরাঙার; এখন আমি যদি লং-শটে যেতে পারতাম তাহলে অসাধারণ একটা ছবি হতো, তার তো উপায় নেই, কাছে গেলে আবার উড়ে যাবে। যেমন— সেদিন নদীর ধারে দেখলাম বুলবুলির একটা বড় ঝাঁক, প্রায় দুইশত মতো, ঐদিকে অফোটা কাশফুল দুলছে; এরকম একটা মজার কম্পোজিশন ছিল। আমি কাছ থেকে তুলতে গেলাম তো উড়ে গেল। আবার এমন ঘটে আমি ছবি তুলতে গেলাম তখন কেউ বললো— ‘এই ছবি তুলছে, ছবি তুলছে’, মানে তাকাতে বললো। এরকম হলে হয় কি, অমূল্য কিছু জিনিস হারাতে হয়। তারপরও কম্পোজিশনের একটা বিষয় আছে। আরেকদিন মেঘের আভাস পেয়েছিলাম সাবাশ বাংলাদেশের মাঠে। সেদিন নদীর ধারে যাবারও ইচ্ছে ছিল, নদীর ধারে গেলে আসাধারণ দৃশ্য পেতাম। কিন্তু, আমার মনে হলো সাবাশ বাংলাতেই যাই, ওখানে গিয়ে মনে হলো ফিনিক্স পাখির মতো অবয়ব মেঘের, তো কিছু ছবি তুললাম মেঘের তো সেগুলোর ভেতর থেকেও আবার বাছাই করতে হয়। আরেকদিন এখানে রবীন্দ্রমেলা হচ্ছিল, সাবাশ বাংলাদেশে, ওয়াহিদুল হক কথা বলছিলেন, হঠাৎ দেখলাম যে— দেবদারু গাছগুলো তখন অতো বড় ছিল না। বড় হলে ঐ দৃশ্য দেখা যেত না। আলোক-রশ্মি সেখানে প্রতিফলিত; মনে হলো যে বিষফোঁড়ার মেজাজ নিয়ে কোথাও একটা বিষ্ফোরণ হয়েছে, পুরো অগ্নিকু- তৈরি হয়েছে। আমি তখন চট করে একটা ছবি তুলেছিলাম। এরকম করে সবসময় হয় না আরকি! যেমন— কিছুদিন আগে দেখলাম, রাজশাহী কলেজের একটা ছবি, আমার এক বন্ধু শেয়ার করেছে বৃষ্টিতে রাজশাহী কলেজ বিল্ডিংটার একটা অসাধারণ ইমেজ তৈরি হয়েছে, একটা অভাবিত দৃশ্য আরকি! এখন আমি তো শুকনো খটখটে মৌসুমে গেলে ঐ ছবি পাবো না; যার ভাগ্যে সেটা থাকে আরকি! যার ফলে আমার হাতে আমি যা তুলছি আরেকটা মুহূর্ত পরে গেলেই তা পরিবর্তিত অবস্থায় চলে যাবে। মোসলেমউদ্দিন বলে একজন বাউল ছিল, ক্যাম্পাসে গান করতো, এখন মারা গেছে; আকাশে মেঘের একটা অসাধারণ দৃশ্য তৈরি হয়েছিল, আমাকে বললো একটু আগে এলেই ছবি তুলতে পারতে। আমি বললাম আপনার মনে তো ছবি আঁকা হয়ে গেছে; আমার ভাগ্যে ছিল না বলেই তুলতে পারিনি। এরকম কিছু চলমান ব্যাপার থাকে মানুষের জীবনযাত্রার অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে যেতে পারে, পরে আর পাওয়া যায় না। এখন মোবাইলের সুবিধার কারণে হয়তো চট্ করে ছবি তুললাম; তবে এক্সপোজারটা জানতে হয়, কিছু কারেকশনও করতে হয়, আলোর একটা ব্যাপার থাকে।

চি :         আমাদের যেটা কথা সেটা হচ্ছে যে— একটা নান্দনিক বোধ আপনি লালন করেন। এখন তো একটা কর্পোরেট সোসাইটি চলছে; আমাদের জেনারেশনের মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প, আবৃত্তি, কবিতা, গল্পের এই যে সবকিছু মিলে আমার মনে হয় এক ধরণের একটা বাণিজ্যিক সময় চলছে। এই সময়টা আসলে অনেকটা অপাংক্তেয় অনেকের কাছে, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রও দৃঢ়ভাবে সেই জায়গাটা নিচ্ছে। সেক্ষেত্রে এখন আপনার যে এতদিনের জার্নি, আপনার প্রজন্ম বা দেশ নিয়ে আপনার স্বপ্ন কিংবা আপনি কি মনে করছেন? আমাদের মনে হয় যে নান্দনিকতার বোধ একটা মানুষের অনিবার্য বিষয়। যদিও এটা যে আমাদের আহার বা অন্যকিছু মেটায়, তা নয়। কিন্তু, নান্দনিকতা বোধ না থাকলে সে তো আসলে মানুষই নয়। অন্য প্রাণীর থেকে মানুষের পার্থক্যটা আমরা এভাবেই বিচার করি। তো মানুষের এই জায়গাগুলো ক্রমশই ন্যারো হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্য এবং ভোগের প্রবণতা সব দখল করে নিচ্ছে। বাংলাদেশ তো বটেই আমরা গোটা বিশ^ব্যবস্থার মাঝেই এটা দেখছি। এখন এই বয়সে এসে, এই অবস্থায় এসে এতদিনের আপনার যে চর্চা, চিন্তাভাবনা এবং অনেককে আপনি দেখেছেন, এখনও তার একটা চর্চার মধ্যে আপনি আছেন। এখন আপনার পারসেপশন; মানুষ হিসেবে যারা আছে; আমাদের বাংলাভাষা, বাঙালি-সংস্কৃতি, বাংলাদেশ, আবৃত্তিচর্চা, নতুন প্রজন্ম, তাদের মূল্যবোধ, তৈরি হওয়া বা সৃজনশীলতা, এটা আসলে কোন পর্যায়ে আছে, এটা নিয়ে কি স্বপ্ন দেখা যাবে না আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? শেষ জিজ্ঞাসা— আপনি আশাবাদী কি না?

কা :        এখন যদি সামগ্রিক অর্থে ধরেন আমি যখন রাজশাহী এসেছিলাম তখন রাজশাহীর যে ভাষা; যে সুরে কথাগুলো বলতো, সে ভাষাগুলো পরিবর্তিত হয়েছে। ‘স্বনন’ এর ভেতরেও কিন্তু কথার গতি বেড়েছে। সময়ের সঙ্গে এ বদলগুলো ঘটে। আরেকটা জিনিস হয়; একেবারেই যারা নতুন প্রজন্ম, এখন যারা আপনাদের ছাত্রছাত্রী, তাদের মাঝে দেবশ্রী বলে একটা মেয়ে আছে, শ্রাবণী বলে একটা মেয়ে আছে বা কণিকার কথা বলি এরা কিন্তু আমাদের বয়সে আসলে অনেক ভাল করবে, ঋদ্ধ একটা যায়গায় যাবে। ধরা যাক মিঠু, শান্ত এরা কিন্তু তাদের ব্যক্তিত্ব নিয়ে এগিয়েছে। তখন আপনি যেমন শিক্ষক হিসেবে আপনার তৈরি করা ছাত্রদের কাছ থেকে যে আচরণটা পাচ্ছেন, সেটা কিন্তু আনন্দের; এটা একধরণের নির্মাণ। আমিও তাদের একটা গ্রহণযোগ্যতার জায়গায় দেখছি, এটাও আনন্দের। অনেকদিনের ফসল আরকি, এইভাবে সামাজিকভাবে কিন্তু আবহটা তৈরি হয়। আবৃত্তির ক্ষেত্রে যে কথাগুলো আগে শুনতে হতো, সেখান থেকে  আবহাওয়াটা সারাদেশেই এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কাজ করে যাচ্ছি; আর্থিকভাবে যে লাভবান হয়েছি, তা হয়তো নয়। আর, সবকিছুর মূল্য যদি নির্ধারণ করতে যাই, প্রকৃতমূল্য কখনোই পাওয়া যাবে না। এই বাঁচাটা; রাজ্জাকে (সদ্যপ্রয়াত চলচ্চিত্র অভিনেতা)র কথা মনে হচ্ছে, উনারা একটা স্বপ্নময় সময় তৈরি করেছিল। কিন্তু, আমরা যদি পেছনে তাকাই, তো ছবিগুলোর হয়তো ত্রুটি ছিল। বা, সবসময় আমার মনে হয়েছে যে কোথায় যেন একটা অসম্পূর্ণতা থেকে যাচ্ছে। ওপারের ছবি বা সত্যজিতের ছবির প্যারালালে আমরা ছবি পাচ্ছি না। এখানে আমরা অনেকেই নিজেদের মতো করে পিঠ চাপরাচ্ছি, কিন্তু ঐ মাত্রায় যেতে পারছি না। এখন আমরা সত্যজিৎকে গদগদ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম— গৌতম ঘোষের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বা ঐ ছবিটা দেখেছেন কি? উনার ছবিগুলো কেমন? একটু উদাসভাবে বললেন যে— আমার যে ছাত্রটি সবচেয়ে ভাল ছবি বানাতে পারতো, সেই তো এখন ছবি বানাচ্ছে না। তিনি বলেছিলেন ঋতুপর্ণের কথা। পরে আমরা ঋতুপর্ণের মাঝে সে প্রতিভা দেখেছি। তো এই বিষয়গুলো তো আছেই, অনেক ক্ষেত্রে কথা বলার গতি বেড়েছে, কথা বলার ধরনে পরিবর্তন হয়েছে। সেই দিকগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশাপ্রদভাবে অনেকেই এগিয়েছে, আমরা যদি দশ বছর বাদে মূল্যায়ন করি তারা অনেক এগিয়ে থাকবে। তাদের হাত ধরে আবার অনেকেই এগিয়ে যাবে।

                এখানে যারা কাজ করতো বিশেষ করে মেয়েদেরকে সাংঘাতিক প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়; একটা মেয়েকে জানতাম ওর কবিতা শোনার জন্য একশ জন হাজির হতো। অনেক তরুণ শিক্ষকও তার সঙ্গে আলাপ করার জন্য মুখিয়ে থাকতো। একদিন দেখলাম একজন শিক্ষক ‘স্বনন’কে দাওয়াত করেছে; আমি ভাবলাম, এটা তো হবার কথা নয়, পরে বুঝলাম এই কারণে হয়েছে। পরে, বিয়ের পরে মেয়েদের এতটাই বদলে যেতে হয় যে ক্যাম্পাসে আমি একটা সংগঠন করতাম; এমনকি ‘স্বননে’র মতো সংগঠন এটাও তাদের অস্বীকার করতে হয়। বিশেষ করে মেয়েরা আড়ালে চলে যায়। এবং, সাংঘাতিকভাবে বলতে হয় আবৃত্তিটাও একটা রাজনীতিকরণের জায়গায় চলে গেছে। ‘আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ’ এর যদি মূল্যায়ন করা যায়, তাহলে যারা নেতৃত্বে ছিল, তারা একটা বিশেষ ধরনের; তাদের সরে যেতে হয়েছে। জয়ন্তদা থাকলে আরো ভাল হতো। এ সমস্ত বিষয়গুলো আছে। ফলে আমি মনে করি যে; আরেকটা বিষয়— আমরা কবিতা লিখছি, অনেক মানুষই লিখে যাচ্ছে। মহাকালে একবারই রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায়। শহীদ কাদরী বলেছেন যে— শামসুর রাহমান তাঁর একটা সেরা কবিতা লিখতে গিয়ে হয়তো দশ-বারোটা কবিতা লিখেছেন, তারপর অমন একটা কবিতা বেরিয়েছে। তো আমাদের সামষ্টিক পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে ভাল কিছু বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় আছি। ‘স্বননে’র ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট পরিশ্রম করে, তারাও ভাল কিছু একটা করবে। আরেকটা বিষয় হলো— ধ্রুপদী ধারার কবিতা ছেলেমেয়েরা এখন আর আগের মতো পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে কবিতা আসছে না বা ভাল কবিতার পরিবেশ বুঝে হচ্ছে না। গানের ক্ষেত্রেও আমরা এ বিষয়গুলো দেখছি। রিহের্সাল নেই, দুঘণ্টা বা চারঘণ্টা আগে গিয়ে কণ্ঠ দিয়ে চলে আসলাম, ফলে ঐভাবে প্রাণটা আসছে না। এই বিষয়গুলো আছে।

চি :         তাহলে, ঠিক আছে কামাল ভাই।

***********************************

অনুবাদ

পার্ল লন্ডনের ক্লাসে সি.কে. উইলিয়ামস

কবিতা আসলে একধরনের সার্বভৌম শৃঙ্খলা
ভাষান্তর : মাহবুব অনিন্দ্য

১৯৮৮ সালের মার্চে সি. কে. উইলিয়ামস আসেন পার্ল লন্ডনের ক্লাসে। সময়টা ছিলো তার ক্যারিয়ারের জন্য উল্লেখযোগ্য। সে সময়ে তার বয়স হয়েছিলো ৫১ বছর আর ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড (১৯৮৭) নামে সপ্তম কবিতার বই বেরিয়েছে। এর মধ্যে  সেই বই পেয়েছে ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ড।

এই বইতেই তিনি প্রথম বেছে নেন আট লাইনের ছন্দোবদ্ধ স্তবক এবং এর মধ্য দিয়ে তিনি হুইটম্যানীয় দীর্ঘ লাইন ও স্তবকের স্টাইল থেকে বেরিয়ে আসেন (১৯৮৩ সালে প্রকাশিত টার-এ এ ধরনের  দীর্ঘ কবিতার ফর্ম অনুসরণ করেছিলেন তিনি)। ওগুলোকে উলিয়ামসের নিজস্ব ঘরানার দীর্ঘ কবিতাও বলা যায়। সমকালীন অনেকের কবিতায় এটি নতুনভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এমনকি তার পরবর্তী বেশ কিছু বইতে এ ধরনের  দীর্ঘ পঙক্তি ও স্তবকের কবিতা দেখা যায়। দীর্ঘ কবিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই স্টাইল তার নিজের চিন্তা ও অনুভূতি প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়। টার থেকে ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড-এর পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এ ধরনের  শৃঙ্খলা বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার পরেও প্রতিবারই নতুন থিম এবং অর্থ তৈরি হয়েছে।

ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড-এর লেখাগুলো অনেকটা ডায়েরি-কবিতার মতোই গতিশীল আর ঘটনাবহুল। উইলিয়ামসের কবিতা নিয়ে ড্যান চেশন বলেন, বিচ্ছিন্নতার প্রতি তার পক্ষপাতের মাত্রা ঠিকই আছে। এছাড়া, শিল্পে বাস্তবতার চিত্রায়নে যে-ধরনের গভীরতা ও বিস্তার দরকার, সেটিও তার লেখায় পুরোপুরি পাওয়া যায়।

কবিতাগুলো ১৯৯৪ সালে তার সিলেক্টেড পোয়েমস-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। কবিতাগুলোতে একদিকে যেমন ভালোবাসা ও স্মৃতি-শ্রুতির মতো অন্তঃস্থ অবস্থার বিকিরণ আছে, তেমনি আছে বৃহৎ বস্তুবিশে^র সাথে কবির নিজস্ব বোঝাপড়ার স¦াক্ষর। উইলিয়ামসের কবিতা প্রসেঙ্গ ক্রিস্টিয়ান উইম্যানের ধারণা অনেকটা এরকমই। চার্লস সিমিক এই নির্বাচিত কবিতাগ্রন্থটিকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও মৌলিক কাব্যগ্রন্থগুলোর একটি বলে আখ্যায়িত করেন।

সি. কে. উইলিয়ামস প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে এক সেমিস্টার পড়ান। থাকেন একাধারে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে। তার জন্ম নিউজার্সির নিউওয়ার্কে। পড়ালেখা করেন ব্ল্যাকনেল ও পেনসিলভ্যানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার রিপেয়ার (১৯৯৯) পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত হয়। এছাড়া সিঙ্গিং (২০০৩)-এর জন্য তিনি ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পান। এই সাক্ষাৎকারটি আলেকজান্ডার নিউবাউয়ার সম্পাদিত পেয়েট্রি ইন পারসন: টুয়েন্টি ফাইভ ইয়ারস অব কনভার্সেশন উইথ আমেরিকা’স পোয়েট বই থেকে নেয়া। বইটি ২০১০ সালে আলফ্রেড এ. নফ থেকে প্রকাশিত হয়।

লন্ডন : কবিতা দিয়ে শুরু করি। জানতে চাই কবিতায় কোন বিষয়গুলো অনিবার্য কিংবা কবিতা লেখার ক্ষেত্রে বিবেচনার জায়গাগুলো কী? ওয়ালেস স্টিভেন্স একবার বলেছিলেন, ‘সমসাময়িক কবি বা উপন্যাসিকদের লেখার বিষয় এখন ঈশ^র বা সমাজ নয়, ইমাজিনেশন।’ এক্ষেত্রে আপনার মতামত জানতে চাই।

উইলিয়ামস : নাহ। সত্যি বলতে, এ ধরনের  বক্তব্য আমার কাছে ঠিক মনে হয় না। আমি এর চেয়ে ভালো উদ্ধৃতি দিতে পারি এই মুহূর্তে। দক্ষিণ আফ্রিকার ঔপন্যাসিক অঁদ্রে ব্রিঙ্ক বলেন, ‘আমরা আসলে একটি নয়, দুটি সভ্যতার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাস করছি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে পশ্চিমা-পুজিবাদী-খ্রিস্টান-শিল্পায়িত সাম্রাজ্য, অন্যটি প্রাচ্যের সমাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্য।’ এরকম এক সময়ে—তার মতে, ‘লেখকের দায়িত্ব হচ্ছে প্রত্যক্ষ প্রমাণ হাজির করা আর মানবিক মূল্যবোধগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। তাছাড়া লেখকেরাই সমাজের মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেন। ব্রিঙ্ক আরো সুন্দরভাবে কথাগুলো বলেছিলেন। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি  আমার বেশি পছন্দ।

এক্ষেত্রে আমার মনে হয়, স্টিভেন্সের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই ভাসাভাসা। এ ধরনের  বক্তব্য দিয়ে যে-কেউ দার্শনিক বনে যেতে পারে। কিন্তু বিষয়টা তারা ঠিকঠাক জানে না। এই বক্তব্য একেবারে ঠিক নয়।

লন্ডন : ইজরায়েলি লেখক আহারন অ্যাপেলফিল্ড একবার বলেছিলেন, ‘হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া কারো অভিজ্ঞতার কথা লেখা হলে তা কেমন হতে পারে?’ তার মতে, ‘প্রতিদিনের অসংখ্য ঘটনা আমাদের প্রত্যেককেই কমবেশি স্পর্শ করে কিন্তু এ ধরনের  বিষয়কে আমি সাধারণত আমার লেখার মধ্যে নিয়ে আসতে চাই না।’ আপনি কি তার এই মত সমর্থন করেন?

উইলিয়ামস : না, আমার নিজের মধ্যে এরকম ঘটনা বা বিষয়ের বেশ প্রভাব আছে। প্রতিদিনের অনেক ঘটনাই আমাদের অনেক বেশি উদ্বিগ্ন করে। মাঝে-মাঝে মনে হয়, সংবাদপত্র পড়া বন্ধ করে দেবো। সেটা সম্ভব না। এমনকি আমার কবিতার জাগতেও এই ঘটনাগুলো প্রভাব বিস্তার করে। আমার প্রথমদিকের অনেক কবিতা বলতে গেলে খোলামেলা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লেখা।

বেশিরভাগ ইহুদির মতো আমিও ইজরায়েলি জীবন ও ঘটনাবলী নিয়ে চিন্তা করি। হলোকাস্ট নিয়ে আমি কিছু কবিতা লিখেছি। এগুলোকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। সম্প্রতি এক কনফারেন্সে একজন আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কেউ যদি প্যালেস্টাইনিদের নিয়ে কবিতা লেখে, তাহলে সেটা কেমন অভিজ্ঞতা হতে পারে?’ আমি অনেক চিন্তা করে দেখেছি। ভেবেছি, আমি কি এটা করতে পারি? হলোকাস্ট নিয়ে লেখা কবিতাগুলোর মতো প্যালেস্টাইনিদের নিয়ে কি আমার পক্ষে কবিতা লেখা সম্ভব?

আমি ঠিক জানি না। এমন নয় যে, সব ঠিকঠাক করে বসলাম আর বললাম ঠিক আছে, আমি লিখবো। এভাবে আসলে হয় না। এটা হয়ে যায়। এখন ঠিক আমি জানি না এ-বিষয়ে আমি কী করতে পারি। এ ধরনের  বিষয় হয়ত আমার জন্য নয়। হয়ত তারা নিজেরাই নিজেদের নিয়ে সবচেয়ে ভালো কবিতা লিখে ফেলতে পারে।

লন্ডন : কবিতায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ব্যবহার বিষয়ে আপনার কথা জানতে চাই। এটা কি অন্তঃস্থ ও বাহ্যিক দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য?

উইলিয়ামস : হ্যাঁ, অনেকটা সেরকমই। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনের দিকে বেশি তাকাতে পছন্দ করি। আমার ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড-এ যে-ধরনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলা আছে, সেটা নিয়ে আমি আর তেমন আগ্রহী নই। এই বইয়ের অনেক কবিতায় আমি আসলে বাইরের জগতের দিকে বেশি দৃষ্টি দিয়েছি। অন্যদের দিকে চোখ মেলে তাকিয়েছি আর আমার কবিতাজগতের ভেতর তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করেছি।

ওখান থেকে অনেক অসমাপ্ত লেখা রয়ে গেছে। আরও ৫০টি বা তার কিছু কমবেশি কবিতা—ওগুলো নিয়ে এখনও মাঝে মাঝে বসি আবার থামিয়ে দিই। কিন্তু আবার এগুলোর দিকে যখন তাকাই, আমাকে আর টানে না। আসলে, ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড লেখার সময়টা খুবই অসাধারণ ছিলো। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি চারপাশে শুধু কবিতার পর কবিতা দেখতাম, লিখতে-লিখতে নোটবই ভরে উঠত। এখন আর সেরকম মনে হয় না। সেসব দিন এখন অতীত। এখন আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে অন্তর্মুখীনতা। আমার এখনকার লেখা কবিতাগুলোর কোনো ডিটেল নেই। এগুলো সবই ভাষা।

স্টুডেন্ট : প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জগত থেকে অন্তর্জগতের দিকে তাকালে কী মনে হয় আপনার? একটা কৃত্রিম আভিজাত্যের ব্যাপার কি চলে আসে? এতে করে পাঠকের মনেই-বা কী প্রতিক্রিয়া হয়?

উইলিয়ামস : এটা সত্যিই দারুণ একটা প্রশ্ন। আমার মনে হয় ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড-এর কবিতাগুলো খুবই কঠিন, খুব সহজে এগুলোকে বর্ণনা করা যায় না। তাছাড়া, নস্টালজিয়া বা রিজেন্টমেন্টের মতো অন্তর্জাগতিক কবিতাগুলোও পড়া বেশ কঠিন। অনেক লোকেই এগুলোর মর্ম বুঝতে পারে না। কিন্তু এ ধরনের  বিষয়ই আজকাল আমাকে বেশি টানে। সেই অর্থে, বলা যায়, আমার লেখার পাঠকেরা সংখ্যায় অল্পই। ‘অভিজাত’ শব্দটিকে এক্ষেত্রে কিছুটা বিতর্কিত মনে হয়। আমেরিকায় এখন কহড়-িঘড়ঃযরহমহরংস বা বুদ্ধিবৃত্তিবিরোধিতা নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু ওখানকার অনেক বিষয় বা সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা উচিত। কেননা পুনরুজ্জীবন ছাড়া সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কবিতাও ব্যতিক্রম কিছু নয়। আর, এ ধরনের  প্রবণতাকে ‘অভিজাত’ বললে আমি কোনো সমস্যা দেখি না।

স্টুডেন্ট : আপনি এখন একটা ভিন্নদিকে মোড় নিচ্ছেন। এতে আপনার অন্তর্মুখীনতার ছাপ পাওয়া যাচ্ছে। আপনার আগের কাজগুলো থেকে এটিকে এক অর্থে উল্লম্ফন বলা যায়। কিংবা, এমনও হতে পারে যে, রাস্তাটিকে আপনি নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন?

উইলিয়ামস : এক্ষেত্রে অন্য কবিদের প্রভাব থাকতে পারে। কয়েক বছর ধরে আমি জন অ্যাশবেরির কবিতা মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলাম। তার কিছু ছাপ হয়ত এখানে থাকতে পারে। তিনি বিশেষ একটা পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন, যা হয়ত আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি তা করতেও চাই না। সেল্ফ পোট্রেইট ইন আ কনভেক্স মিরর অথবা দ্য ওয়েভ-এর মতো দীর্ঘ কবিতাগুলো তার অসাধারণ সাহিত্যপ্রচেষ্টা। এই কবিতাগুলোতে তার সচেতনতার ছাপ পড়েছে। আমি ওরকম লিখতে পারি না। এছাড়া, আমার মনে হয়, এভাবে আমি লিখতে চাই না। তবে এ ধরনের  বিষয় আমাকে আকর্ষণ করে। নিজের দিকে তাকানোর বিষয়টা সিদ্ধান্তমূলক কিছু ছিলো না। অন্যদের কবিতা পড়তে থাকলে এ ধরনের  একটা বিষয় চলে আসে। একসময় মনে হয় যে, এভাবে হয়ত আমিও লিখতে পারি। তবে আমি সারার্থটুকু নিই। অ্যাশবেরি পড়তে-পড়তে এটা এমনিই চলে এসেছিলো।

লন্ডন : আপনার টার ও ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড আমাদের কাছে খুবই আনন্দদায়ক লেগেছে। অনেকটা একারণে যে, এতে আপনার বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত হওয়া যায়। যেন এটা আমরা আপনার চোখ দিয়ে পড়ি।

উইলিয়ামস : আপনি কি আই (ও)-এর কথা বলেছেন। না কি-

লন্ডন : না, আমি আই (বুব)-এর কথা বলছি। আই (ও)-নিয়ে কথা বলার সাহস আমার নেই। আমি সেই চোখের কথা বলছি, যা মানুষের অন্তরকে উন্মোচন করে। কবিতার রহস্যগুলোকে মেলে ধরে। আমি বিশেষভাবে ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড-এর ¯েœা-২-এ আপেলের ‘উজ্জ্বল লালত্ব’ (ইষধুরহম জবফহবংং) নিয়ে চিন্তা করছি। ভাবছি এ ধরনের  রহস্যউন্মোচনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। এই প্রক্রিয়াটা কি সবসময় চলমান থাকে?

উইলিয়ামস : আমি আসলে চোখ দিয়ে দেখি না। আমার আছে ইমাজিনেশন। আমরা তো চোখ দেখি না, কল্পনা দিয়ে দেখি। আর এই দেখার ব্যাপারটাও একেজনের কাছে একেকরকম। ওই আপেল আসলে একধরনের স্মৃতিকল্পনা। কবিতা আসলে একইসাথে স্মৃতির ও ভালোবাসার। আপেলের ডিটেল থেকেই বোঝা যায়, আমাদের ভালোবাসার স্মৃতিগুলো কতটা অবিশ্বাস্য আর অসাধারণ হতে পারে।

লন্ডন : আপনার কবিতায় এরকম অসাধারণ উপমা দেখা যায়। যেমন লাভ: বিগিনিংস-এর ‘ঋধরঃযভঁষ যবধৎঃ, ংহড়ৎঃরহম ধমধরহ, / ংঃধসঢ়রহম রহ রঃং ংঃধষষ.’ এ ধরনের  উপমা সত্যিই অনন্য।

উইলিয়ামস : আমারও তা-ই মনে হয়। (হেসে) এই কবিতাটা প্রতিবার পড়তে গেলে মনে হয়, আমি কীভাবে এটা লিখেছিলাম? কোত্থেকে পেলাম এটা? বিষয়টা হয়ত অনুসন্ধান করা যায়, হয়ত আমি তা করতেও পারি। কিন্তু আমার মনে হয় যে, এ রকম কবিতা কখনো আর হবে না। এটা হবার নয়।

লন্ডন : কিন্তু এ ধরনের  অসাধারণ কাজ আপনি করে চলেছেন। এবার আমরা আপনার কবিতার বিবর্তন নিয়ে কথা বলতে চাই। টার-এর প্রকরণ ও অবয়ব থেকে ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড-এর বিবর্তনে কোন বিষয়গুলো ভূমিকা রেখেছে? কী অনুভব করছিলেন সে সময়ে?

উইলিয়ামস : এটা আসলে একটা প্রায়োগিক ব্যাপার ছিলো। টার-এর কবিতাগুলো শুরু থেকে প্রায় তিন-চার বছর লেগেছে শেষ করতে। আমার লেখার ধরন ছিলো এরকমই। আমি তখন লম্বা সময় ধরে কবিতার ভেতরে থাকতাম আর লিখে যেতাম। টার শেষ করার পরে দেখি, অনেক কবিতাই অসমাপ্ত রয়ে গেছে। এর মধ্যে  কিছু আবার অনেক বছর টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এগুলোর কোনোটার দিকে তাকিয়ে হয়ত ভেবেছি, এটা কিছুতেই আর পরিণতি পাবে না। ৩০ লাইনের দীর্ঘ কবিতা ছিলো সেটি। এক স্তবকে আট লাইন। পরে মনে হলো এটা তেমন খারাপ কবিতাও নয়। দ্য পার্ক ছিলো ওটা। তারপর আবিষ্কার করি দ্য ফাউন্টেন। প্রায় একই ধাঁচের কবিতা।

এরপর আমি পুরোনো সব কবিতার খসড়া নিয়ে চিন্তা করতে থাকলাম। ওখান থেকে দেখলাম, যে-কবিতাটি এতদিন ২০ পংক্তির ছিল তা হয়ে গেল আট পংক্তির, আট পংক্তিরটা চার। এভাবে আমি একটা রাস্তা পেয়ে গেলাম। তারপর কবিতারা যেন নিজেরাই হয়ে উঠতে লাগলো।

অনেকেই মনে করে, কবিতার ফর্ম এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত বা সংকীর্ণ বিষয়, যেখানে নির্দিষ্ট একটা জায়গার মধ্যে চিন্তা করতে হয়। আসলে তা নয়, ফর্ম নিজেই জেনারেটিভ। আট পংক্তির ফর্ম আমার জন্য সেরকমই ব্যাপার ছিল। এটা যেভাবে নিজের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করে, তা সত্যিই অসাধারণ।

এভাবে আমি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে থাকলাম। ঠিক করলাম, একটা গ্রামাটিক্যাল ইউনিট যাতে পংক্তির শেষে গিয়ে শেষ হয়। এর কিছু এক পংক্তিতে লিখবো বলে ঠিক করলাম, অন্যগুলোকে অর্ধেক পংক্তিতে ভাগ করলাম, আর কিছু বসালাম একসাথে জোড়া পঙক্তিতে। এভাবে যতবার আমি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে থাকি, আর  ততবারই সেখানে নতুন ‘থিম’ বা অর্থ তৈরি হয়।

স্টুডেন্ট : আপনি একটা কঠিন রাস্তা নিয়েছেন। এক অর্থে, ‘উল্লম্ফনের ভেতর দিয়ে যাওয়া’ বলতে পারি একে। আধুনিক কবিতা নিয়ে আপনার মতামত বা অবস্থানের বিষয়টি জানতে চাই। কবিতাকে আপনি ঠিক কোথায় দেখতে চান? (আধুনিক কবিতার ভবিষ্যত কী?) না কি, আপনি কেবলই নিজের কবিতা নিয়ে চিন্তা করতে চান?

উইলিয়ামস : আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি শুধু আমার কবিতা নিয়ে চিন্তিত। আমার মতো মধ্যবয়সী কবির সুবিধা হচ্ছে এসব বিষয় নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতে হয় না। তবে অনেক প্রশ্ন আমাকে তাড়িত করে, এতদিন কী লিখলাম আমি? আমিটাই-বা কে? আমার পাঠকই বা কারা? যদিও এটা আমার নিজের সংগ্রামের জায়গা। যখন আমি ওই লম্বা পংক্তিতে লেখা শুরু করলাম, লোকে বলতে লাগল এগুলো কবিতা না, গদ্য। এ ধরনের  কথার সাথে তর্ক করার কোনো মানে নেই। তাছাড়া, তর্ক করার মতো টেকনিক্যাল জ্ঞানও আমার ছিলো না তখন। হয়ত এখনো নেই। আমি শুধু জানতাম এগুলো কবিতা। এখন ভালো লাগে এই ভেবে যে, অন্যরাও এগুলোকে কবিতা ভাবছে।

কবিতা লেখার ক্ষেত্রে শুরু থেকে একটা বিষয় আমি করেছি, আর সেটা হচ্ছে কোনো কিছুকেই ফেলে না-দেয়া। লেখালেখির শুরুর দিকে আমি নাটক-গল্প-প্রবন্ধ লিখতাম। তারপর একপর্যায়ে ঠিক করলাম, এভাবে আর লিখবো না। ভাবলাম গল্প, নাটক বা প্রবন্ধের আইডিয়া পেলে সেটিকে কবিতায় প্রকাশ করবো। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমি আরো বেশি বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠতে থাকলাম। এমন নয় যে, একে সরাসরি কবিতায় প্রয়োগ করা যায়, তবে যারা কবিতা পড়ে তাদের অনেকেই বুদ্ধির চর্চা করে। কবিতার পাঠকরা একইসাথে নৃতত্ত্ব, দর্শন ও ভাষাতত্ত্ব পড়ে। তাহলে কবিতায় কেন আমরা এগুলো ব্যবহার করতে পারবো না।

স্টুডেন্ট : কখনো কি এরকম মনে হয়েছিলো যে, আপনার আইডিয়াগুলো নাটক বা গল্পের চেয়ে কবিতার সাথে বেশি যায়?

উইলিয়ামস : নাহ, আমি আসলে ওভাবে ভাবতে চাই নি। সে সময়ে আমি অতটা বুদ্ধিমান ছিলাম না। তবে কবি হওয়ার ব্যাপারে ততদিনে মনস্থির করে ফেলেছি। তাই নিজেকে আর ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে চাই নি।

স্টুডেন্ট : কোনোকিছুকেই বাদ না-দেয়ার ব্যাপারটি একটু ব্যাখ্যা করবেন? এখানে আমরা অনেকেই শিখেছি যে, কবিতার পরিসর থেকে প্রচুর জিনিসকে বাদ দিতে হয়।

উইলিয়ামস : আমার দ্বিতীয় বই প্রকাশের পরবর্তী এক ঘটনার কথা বলি। এটি প্রকাশিত হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধের হতাশা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। বইটির অনেক কবিতা সেইসব দুঃখ আর বেদনার অভিপ্রকাশ। সেই ভয়ানক নৈরাশ্য আর ক্ষোভ মিলে পাপ ও পঙ্কিলতার একটি অধিবিদ্যাগত ইমেজ তৈরি করে। এই বই প্রকাশের পর আমি ভীষণ ভেঙ্গে পরি। তারপর থেকে মনে হয়েছে, প্রত্যেকটা বই প্রকাশের পর আমি বিষণœতায় আক্রান্ত হতাম, যদিও তখন এটা আমি বুঝি নি। তাছাড়া, তখন আমার বিয়ে বিচ্ছেদ হয় এবং আমি এক ভয়ানক অবস্থায় উপনীত হই। একটা পর্যায়ে এ-ও মনে হয় যে, আমি হয়ত আর কবিতা লিখতে পারবো না। তখন আমার অবস্থা একটা ঘূর্ণাবর্তের মতো। জীবনের কোনোকিছুই ঠিক নেই। সেই সময়ে আমি দুটি কবিতা লিখি, খসড়া হিসেবে। লম্বা পংক্তিতে। এগুলোকে কবিতা ভাবি নি, কারণ তখন আমি আর কবি নই। এরপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি ফিল্মের চিত্রনাট্য লিখবো আর ফিল্ম ডিরেক্টর হবো।

এরপর একদিন আমি কবিতাগুলো পড়ি আর আমার মনে হতে থাকে যে, হয়ত কিছু একটা আমি লিখেছি। এগুলোতে আমার চেতনার এমন কিছু বিষয় প্রকাশিত হয়েছে, যা আগে কখনো লেখা হয় নি। কিছুদিন পরেই বুঝতে পরি, আমি যে-ধরনের কবিতা লিখেছিলাম সেগুলো এক ধরনের রেটোরিক্যাল কোডের মতো—অল্প কিছু লোকই এদের অর্থ উদ্ধার করতে পারে। তার মানে, বিপুল সংখ্যক মানুষ এখান থেকে বিযুক্ত। তাতে আমিও অনেকখানি অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছি।

আর একটা বিষয় বোধহয় কাজ করেছে একই সময়ে—যেভাবে আমি কথা বলি তার কাছাকাছি একটা ধরন আমি বেছে নিতে চেয়েছিলাম। ওয়ার্ডসওয়ার্থও ঠিক এটাই বলতেন; তিনি চাইতেন মানুষ যেভাবে কথা বলে সেভাবে লিখতে। আমার অবস্থান এক্ষেত্রে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছাকাছি।

লন্ডন : চার্লস সিমিকের কথাটাই বলি। আমার মতো হয়ত আপনারও তা পছন্দ হবে। তার মতে, ‘কবিতা লেখার ক্ষেত্রে এর ভেতরকার অনুভবটাই সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপার। নিরেট বাক্যের চেয়ে অনুভূতির মূল্য অনেক বেশি।’ এই সহজ কথাটা বুঝতে আমার অনেক বছর লেগেছে। আপনি কীভাবে এটিকে ব্যাখ্যা করবেন?

উইলিয়ামস : আসলে এটাই কবিতার ইতিহাস। সিমিক হয়ত একভাবে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। কবিতার ইতিহাস হচ্ছে এর পংক্তি ও বাক্যের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস। মানুষের কথোপকথনের যে-ধরন, এটা তার চেয়ে আলাদা কিছু। এখানে ভাষাকে কৃত্রিমভাবে সাজানো হয়। কবিতার পংক্তি হচ্ছে একধরনের সার্বভৌম একক আর এটিই এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেমন সঙ্গীতকেও আমরা একটা সার্বভৌম জিনিস মনে করতে পারি। এখানে একটা অক্টেভের ভেতর আটটা নোট থাকে। এর মধ্যে কোনোগুলোকে আবার হাফনোটে ভাগ করা যায়। ভারতবর্ষে আবার এই বিভাজনটা ভিন্নভাবে করা হয়।

এভাবে একবার একটা নিয়ম প্রতিষ্ঠা হলে সেটি মানুষের স্বাভাবিক সচেতনতার ভেতর স্থায়ী রূপ লাভ করে। কবিতার পংক্তিকে একধরনের সার্বভৌম শৃঙ্খলা বলা যায়।

লন্ডন : আমরা এবার সেই প্রত্যক্ষণের ধারণা নিয়ে কথা বলতে পারি। আমার মনে হয়, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কবিতায় কথা বলা মানে—কোনো বিষয়ের বাহ্য দিক কেবল নয়, এটা ভেতরের বিষয়ও। মিল্টনের ‘ফধৎশ ফধৎশ, ফধৎশ ধসরফ ঃযব নষধুব ড়ভ হড়ড়হ আসলে একপ্রকার প্রত্যক্ষণমূলক কবিতাই (রিঃহবংং ঢ়ড়বঃৎু)।এ ধরনের  বিষয়ের দিকে বোধহয় আপনি ইঙ্গিত করেছিলেন?

উইলিয়ামস : ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড-এ আমি আসলে অন্তর্গত ও বাহ্য প্রত্যক্ষণকে আলাদা করে দেখি নি। এটিই সম্ভবত এই বইয়ের দ্বান্দ্বিক দিক। কবিতাগুলোর ক্রমবিন্যাস ঠিক করতে গিয়ে বুঝতে পারি এটা খুবই কঠিন কাজ। এর কবিতাগুলো অধিকাংশই প্রত্যক্ষণমূলক এবং অভ্যন্তরীণ ক্রিয়ার অংশ। এগুলো সেই অর্থে চিত্রকল্পবাদী কবিতা না, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটা গভীর ভাববাদী রূপান্তরের ব্যাপার ঘটেছিলো।

লন্ডন : এ ধরনের  অসাধারণ বিষয় দেখা যায় পল ওয়েইগকে উৎসর্গ করে লেখা খব চবঃরঃ ঝধষারল্ক কবিতায়। আমার কাছে এটিকে আপনার সেরা কবিতাগুলোর একটি মনে হয়।

উইলিয়ামস :  জেনে ভালো লাগলো। আপনি কি এ ধরনের  কবিতা লিখতে পারেন? (হাসি দিয়ে) গ্যালওয়ে কিনেল এটি লেখার ব্যাপার আমাকে সাহায্য করেছিলেন। তার কাছে অনেক পরামর্শ পেয়েছি।

লন্ডন : তাই? কবিতায় বোধহয় এরকমই হয়। যন্ত্রণা থাকে এর কেন্দ্রে। গভীর যন্ত্রণা। এই কবিতা লেখার সময় আপনিও কি এরকম কিছু অনুভব করেছিলেন?

উইলিয়ামস : এরকম কোনো বিধিবদ্ধ ব্যাপার আছে বলে আমার মনে হয় না। ওয়েইগের জন্য আমি কাঁদকে কাঁদতে লিখেছি বলা যায়। জীবনে এরকম অনুভূতি আর কখনো হয় নি।

স্টুডেন্ট : আপনার লম্বা পঙক্তির কবিতার দিকে ফেরা যাক। আপনি কি কখনো মাত্রা হিসেব করে লেখেন?

উইলিয়ামস : না। আমি এই কাজটা করি মূলত বাক্যের ভর দিয়ে। সম্প্রতি আমি একটি বই পড়ছিলাম। ওখানে ওয়াটের কবিতা বিশ্লেষণ করে স্যার থমাস জানান, তার লেখায় সিলেবল গণনা করা একটা মস্ত ভুল। আসলে উনি নিজেও বাক্য নিয়ে কাজ করেছেন। আমার কাজও তার মতোই। আমার খুবই অবাক লাগে কাউকে আমার কবিতায় সিলেবল হিসেব করতে দেখলে। আমি এটা কখনো করি না।

স্টুডেন্ট : আপনি কি কখনো কোনো বিশেষ ফর্ম নিয়ে কাজ করেছেন?  বা সনেট? বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ কাঠামোতে?

উইলিয়ামস : না, একবার আমি ৫০টি সনেটের একটা সিরিজ লিখেছিলাম। এর প্রত্যেকটি ছিল ভিন্ন-ভিন্ন অন্ত্যমিলের।

স্টুডেন্ট : কবিতাগুলো কি প্রকাশ করেছিলেন কোথাও?

উইলিয়ামস : না, ওগুলো আর নেই। ফেলে দিয়েছি। ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড-এ একটা কবিতা আছে গবফঁংধ নামে। ৫০টি সনেটকে একসাথে করে আট লাইনের রূপ দিয়েছি।

‘Medusa’

Once, in Rotterdam, A whore once, in a bar, sailor’s bad, a hooker bar, opened up her legs-

Her legs my god, were logs- lifted up her skirt, and rubbed herself, with both hands rubbed herself,

There, right there, as though what was there was something else, as though

The something else

Was something she just happened to have under there, something that she

Wanted me to see.

All I was was twenty, I was looking for a girl, the way we always, all of us,

Looking for the girl, and the woman leaned back there and with both hands

She mauled it,

Talking to it asked it if wanted me, laughed and asked me if I wanted it, while my virginity.

That dread I’d fought so hard to lose, stone, was rising back inside me like a wall.

স্টুডেন্ট : কবিতায় একটা বিষয় রেওয়াজে পরিণত হচ্ছে কি-না, অনেকেই প্রথমদিকে ছোট ছোট পংক্তি দিয়ে শুরু করার পরে লম্বা পংক্তি লেখার দিকে যাচ্ছে।

উইলিয়ামস : কবিতার অনেক ধরনের রেওয়াজ বা ফ্যাশন আছে। কিন্তু আমার মনে হয় কবিতার পংক্তির দৈর্ঘ্য দিয়ে দিয়ে কোনো ফ্যাশন তৈরি করা সম্ভব। ব্লেক লম্বা পংক্তিতে লিখেছিলেন। ক্রিস্টোফার স্মার্টও এটাই করতেন। তারপর হুইটম্যানও অনেক লম্বা পংক্তিতে লিখেছেন। কিন্তু কেউ সেভাবে তাকে অনুসরণ করে নি। আমি দশ মাত্রার পাঁচ স্বরাঘাতবিশিষ্ট (রধসনরপ ঢ়বহঃধসবঃবৎ) কবিতা আবিষ্কার করেছি এমনটা নয়, নিজের জন্য এরকম একটা কিছু আমার দরকার হয়েছিলো। এগুলোকে লোকে কবিতা বলে গ্রহণ করাতে ভালো লেগেছে। কবিতায় পংক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। এটি নিয়ে আমি ইচ্ছামতো কাজ করেছি। পরে এগুলো সাবজেক্টের সাথে মিশে গেছে।

লন্ডন : অনেকেই বলেন যে, কবিতায় সাবজেক্ট একটা তুচ্ছ বিষয়। চাইলে যে কোনো বিষয়কেই আপনি সাবজেক্ট করতে পারেন। এ বিষয়ে আপনার কী মত? স্ট্যানলি কুনিজ বলেছিলেন কবিতা তার টেকনিকের কারণে উৎকর্ষ লাভ করে না, কবি যখন নিজের মধ্যে কিছু একটা অনুভব করেন তখনই তা বিশেষ হয়ে ওঠে।

উইলিয়ামস : আপনি দুটো প্রশ্ন করেছেন। প্রথমটি হচ্ছে, সাবজেক্ট কি গুরুত্বপূর্ণ? দ্বিতীয় প্রশ্ন, সাবজেক্টকে পরে অনুধাবন করা যায় কি-না? আসলে, উনিশ শতক পর্যন্ত কবিতায় সাবজেক্ট তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। তখনকার কবিতা ছিলো অনেকটা সঙ্গীতের মতো। মানুষ যেভাবে গান করে, সেরকম। আর বেশিরভাগ কবিতাই ছিলো প্রেমের কবিতা। প্রেম সম্পর্কে সবকিছুই লোকে জানে, প্রেম করুক বা না-করুক। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, কবিতা নিজে কীভাবে সুর তৈরি করে। এটি খানিকটা সুর করার মতো ব্যাপার। যেমন, মোজার্তের থিম নিয়ে লোকে তেমন ভাবিত নয়। উনি যা-ই করেন, মানুষ পছন্দ করে।

কবিতার ধরন নিয়ে বলতে গেলে, বিশ শতকের দিকে সাবজেক্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপর কবিতার ঐতিহাসিক দায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এক্ষেত্রে দুজনের নাম উল্লেখ করতে হয়। একজন জুলস মিচেল, অন্যজনের নাম অঁদ্রে ম্যালরক্স। দ্য ভয়েস অব সাইলেন্স-এ ম্যালরক্স উনিশ শতকে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের ভূমিকার বিবর্তন প্রসঙ্গে বলেন, ঈশ্বরের মৃত্যু হলে-(অবশ্য ঈশ^র আক্ষরিক অর্থে মৃত্যুবরণ করেন, না-কি আমাদের সচেতনতার ভিন্ন কোথাও তার অবস্থান নির্ণিত হয় সেটি জানা যায় না) আর্ট কীভাবে ধর্মের কিছু ঐতিহাসিক ভূমিকার স্থান দখল করে। এ সময় সাবজেক্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে-এর প্রতিফলন দেখা যায় ব্লেক ও শেলীর লেখায়। পরবর্তীতে হুইটম্যানের লেখার বিষয়বস্তু খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কবিতায় সাঙ্গীতিক আবহ তৈরি করার ক্ষমতা তাকে করে তুলেছে মহৎ একজন কবি।

লন্ডন : শেষ প্রসঙ্গ। থিওডোর রোথেক তার সাম রিমার্কস অন রাইম-এ বলেছেন, ‘মানুষের মনের পরিবর্তনের সাথে মিলিয়ে কবিতাকে পরিবর্তন হতে হয়। অন্যথায় কবিতা হারিয়ে যায়। মনের গতির সাথে কবিতার পরিবর্তন কী করে সম্ভব?

উইলিয়ামস : এই কথার সাথে আমি কিছুটা দ্বিমত পোষণ করি। এই কথাটাকেই ঘুরিয়ে হয়ত বলা যায়, কবিতা মানুষের মনকে নাড়া দেয়, পরিবর্তন করে। কবিতা অর্থ তৈরি করে। কবিতার অন্যতম এক বৈভব বলা যায় একে। মানুষ ভাবনার বাইরে কবিতা মানুষের মনের পরিবর্তন করতে পারে। আর একারণেই হয়ত, কবিতাকে আমাদের প্রয়োজন।

************************************

 

অনুবাদ

 

অভিবাসী জীবনের কথক, চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন কথাসাহিত্যিক অ্যামি তানের সাক্ষাৎকার

আমাকে যেমন মানুষের উপলব্ধি নিয়ে ভাবতে হয় তেমন এটাও মনে রাখতে হয় মানুষকে জ্ঞান দেয়া আমার কাজ না— অ্যামি তান

অনুবাদ : মোজাফ্ফর হোসেন

চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকান কথাসাহিত্যিক অ্যামি তানের জন্ম ১৯৫২ সালে, আমেরিকার ওকল্যান্ড শহরে। বাবা জন তান ছিলেন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, পরবর্তীকালে ব্যাপটিস্ট মন্ত্রী হন। তিনি চীনা গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে পরিবার নিয়ে আমেরিকায় চলে আসেন। যখন তানের বয়স ১৫ বছর তখন তার বাবা এবং ভাই ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর মা ডেইজি তান কন্যা অ্যামি এবং ছোটছেলেকে নিয়ে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমান। এই সময় অ্যামি জানতে পারে যে চীনে থাকতে তার মায়ের আরো একবার বিয়ে হয়েছিল। তাদের ঘরে চারটি সন্তানও আছে। তার মায়ের ঐ জীবন নিয়েই অ্যামি লেখেন তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জয় লাক ক্লাব’। উপন্যাসটি লেখার আগে তিনি ১৯৮৭ সালে চীনে গিয়ে তার সেই সৎ-বোনদের সাথে দেখা করেন।

অ্যামির প্রথম বই ‘ফিশ চিকস’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। এটি একটি ছোটগল্পের সংকলন। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জয় লাক ক্লাব’। উপন্যাসটি এক চীনা পরিবারের গল্পকে উপজীব্য করে লেখা। গল্পে চারজোড়া মা-মেয়ের সম্পর্কের ভেতর দিয়ে আমেরিকায় অভিবাসন গ্রহণ করা একটি পরিবারের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং কমুনিস্ট চীনে নানা ভোগান্তির ইতিহাস তুলে আনা হয়েছে। উপন্যাসটি প্রকাশের পরপরই অ্যামি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন। বেস্টসেলার বইয়ের খেতাবও পায়। উপন্যাসটি অবলম্বনে ১৯৯৩ সালে একই শিরোনামে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র। এরপর তিনি আরো ৫টি উপন্যাস লেখেন যেগুলো বিশ্বজুড়ে পাঠকনন্দিত হয়। প্রথম উপন্যাসের মতো দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য কিচেন গড’স ওয়াইফ’ও মার্কিন অভিবাসী এক চীনা নারী এবং তার আমেরিকায় জন্ম নেওয়া মেয়ের সম্পর্কের সংকট নিয়ে লেখা। তৃতীয় উপন্যাস ‘দ্য হান্ড্রেড সিক্রেট সেনসেস্’ বোনদের সম্পর্ক নিয়ে লেখা। ‘দ্য বোনসেটার’স ডটার’ শীর্ষক চতুর্থ উপন্যাসটিও এক চীনা নারীর আমেরিকায় অভিবাসী জীবনে জন্ম নেয়া মেয়ের সাথে বোঝাপড়ার গল্পকে উপজীব্য করে রচিত। সর্বশেষ উপন্যাস ‘দ্য ভ্যালি অ্যামেজমেন্ট’ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। এই উপন্যাসেরও বিষয়বস্তু অভিবাসী জীবনের মা-মেয়ের সম্পর্ক। এর বাইরে প্রকাশিত হয় অ্যামির একটি প্রবন্ধের বই ও দুটি শিশুতোষ গ্রন্থ। লেখালেখির জন্য অ্যামি তান বিশটির বেশি আমেরিকান ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।

অ্যামি তানের দুটি সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হলো। প্রথম সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয় ২০০৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় লেখকের বাসভবনে। অ্যামির প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জয় লাক ক্লাব’ নিয়ে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন মার্কিন কবি ও লেখক ডানা জিওয়া। লেখকের সর্বশেষ উপন্যাস ‘দ্য ভ্যালি অ্যামেজমেন্ট’ নিয়ে দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয় গুডরিডস থেকে, ২০১৩ সালে।

প্রথম অংশ

প্রশ্ন : আপনি ওকল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। আপনার বাবা-মা চীনা। আপনি কি দ্বিভাষিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন?

অ্যামি তান : পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত আমার বাবা-মা আমার সঙ্গে চীনা ভাষায় (মান্দারিন) কিংবা চীনা এবং ইংরেজির মিশ্রণে কথা বলেছেন। তবে তারা আমাকে মান্দারিন ভাষায় কথা বলতে কখনো জোর করেননি। অতীতের কথা ভেবে, এটা দুঃখজনক, কারণ তারা মনে করেছিলেন আমেরিকাতে আমার সফল হওয়া ইংরেজি জানার ওপর নির্ভর করছে। পরে, পরিণত বয়সে আমি চীনা ভাষা শিখতে শুরু করি। এখন আমি আমার বোনদের সাথে যখন থাকি তখন চীনা ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করি, ওরা আবার ভালো ইংরেজি বলতে পারে না। আমার ভেতর অন্য একটা আমি ফিরে আসছে, ঐ ভাষা শিক্ষার ভেতর দিয়ে।

প্রশ্ন : শৈশবে কোন ধরনের বই পাঠ করতেন আপনি?

অ্যামি তান : পাবলিক লাইব্রেরিতে আমার চোখের সামনে যে সকল লোকগল্পের বা রূপকথার বই এসেছে সবই পড়েছি। বাস্তব থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য আশ্চর্যরকমের সুন্দর এক জগত সেটা। আমি ‘পলায়ন’ শব্দটি সচেতনভাবে ব্যবহার করছি, কারণ পেছনে তাকালে আমি দেখতে পাই, আমাদের পরিবারে নানা সংকট-উৎকণ্ঠা ছিল সবসময়; ফলে আমি আশ্রয় নিতে চাইতাম বিপরীত এক পরিস্থিতির ভেতর। এইসব গল্পের নিজস্ব উৎকণ্ঠা ও সমস্যা ছিল, তবে সেগুলো আমার না। এবং সেগুলো সাধারণত শেষদিকে এসে সমাধানের পথ খুঁজে পেত। এটা বেশ তৃপ্তিকর। আপনি এসবের ভেতর দিয়ে যেতে পারেন এবং অকস্মাৎ একধরনের সমাপ্তি ঘটবে। যদিও এটি ঐন্দ্রজালিক, তবে আপনি একটা সমাধান পাবেন। আমি মনে করি যে, প্রতিটা নিঃসঙ্গ শিশু-কিশোর রূপকথার গল্পের জগতে পালিয়ে যেতে চায়। তাছাড়া কোন শিশুটা জীবনের কোনো না কোনো ক্ষেত্রে এসে নিজেকে একাকী মনে করেনি?

প্রশ্ন : ‘দ্য জয় লাক ক্লাব’ উপন্যাসটি ভীষণভাবে আধুনিক চীনা ইতিহাস আশ্রিত। এটা কি সম্পূর্ণরূপে আপনার পারিবারিক ইতিহাস, নাকি আপনার কল্পনা-প্রসূত ঘটনার সমাহার?

অ্যামি তান : অনেকে মনে করেন আমি বুঝি চীনের ইতিহাস খুব ভালো করে জানি। যখন বেড়ে উঠছিলাম, তখন আমি জানতামই না যে চীনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটেছিল— চীন সম্পর্কে আমার ইতিহাস-জ্ঞানের দৌড় এমনই। আমার বাবা-মাও এসব নিয়ে কথা বলতেন না, কারণ তখন ছিল ম্যাককার্থির সময়, যখন চীনা হওয়া মানেই আপনি কমুনিস্ট কি-না সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। বোনদের সাথে দেখা করার জন্য এক কিশোরীর প্রথমবারের মতো চীনে যাওয়ার গল্পটি লিখেছিলাম আমি নিজে প্রথমবারের মতো বোনদের সাথে দেখা করতে চীনে যাওয়ার পরপরই। আমি বলবো, গল্পটির কিছু কিছু অংশ, বিশেষত আবেগটা আমার ব্যক্তিজীবন থেকে এসেছে।

প্রশ্ন : আপনার উপন্যাসের ‘জয় লাক ক্লাব’টি একইসঙ্গে বিনিয়োগ এবং জুয়া খেলার ক্লাব। আপনি শিশুকালে না কিশোর বয়সে এ ধরনের ক্লাব সম্পর্কে জানতে পারেন?

অ্যামি তান : আমি বেড়ে উঠেছি এই ক্লাবের সঙ্গেই। আমার পরিবারের লোকজন বন্ধুদের সাথে দেখা করতো। তারা সব চীনা ছিল। সকলেই অভিবাসী। তারা আশা করতো তারা একদিন আমেরিকান ড্রিমের নিজেদের একটা ভার্সন খুঁজে পাবে। আমেরিকান ড্রিমগুলোর একটি ছিল— সৌভাগ্য এবং শ্রমের সহায়তা নিয়ে আপনি সফল হতে পারবেন, আর সফলতা মানেই হলো আনন্দ। আনন্দ এবং সৌভাগ্য এমন একটা বিষয় যা সকলে বুঝতে পারতো।

প্রশ্ন : আপনার উপন্যাসের এই শিরোনামের প্রতীকী অর্থটা কি?

অ্যামি তান : আমি মনে করি না, সৌভাগ্য এবং আনন্দ চীনা সংস্কৃতিতে আলাদা কিছু। সকলেই সৌভাগ্য এবং আনন্দ চান। এবং সৌভাগ্য কোথা থেকে আসে সে বিষয়ে আমাদের সকলের আলাদা একটা বোধ আছে। আপনি লটারির দিকে তাকান। আপনি দেখবেন কোটি কোটি মানুষ নিয়তিতে বিশ্বাস করে। চীনের সবখানেই এই বিশ্বাসটা আছে। চীনের অসংখ্য দোকান ও হোটেলের নামে সৌভাগ্য শব্দটি আছে। পরিকল্পনাটা হলো বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে সৌভাগ্য শব্দটা সংযুক্ত করে আবেদন তৈরি করা। আমি মনে করি সেটা আমার জীবনেও সত্যি। আপনি সৌভাগ্যের প্রতি আকৃষ্ট হন, কারণ আপনি এটার পেছনে ছোটেন। আমি নিজেও মনে করি, আমাদের নিয়তিতে বিশ্বাস হলো প্রত্যাশা করার মতো। কোনো কোনো মানুষ যখন কোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ আশা হারিয়ে বসেন তখনও তাকে নিয়তির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।

প্রশ্ন : আপনার মা নাকি চাননি আপনি লেখালেখি করেন— আপনি কি এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

অ্যামি তান : আমার মা এবং বাবা ছিলেন প্রবাসজীবনে। তারা বাস্তবজ্ঞান-সম্পন্ন মানুষ। তারা চেয়েছিলেন সন্তানরা নতুন দেশে উন্নতি করুক। তারা চাননি আমরা দরিদ্র শিল্পী হয়ে বেঁচে থাকি। শিল্পচর্চা মনে করা হতো বিত্তশালীদের কাজ—এটা আপনি করতে পারবেন যদি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হয় আপনার। যখন আমার মা দেখলেন যে আমি মেডিকেলের প্রস্তুতিপাঠ ছেড়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেছি, তিনি ভেবে নিয়েছিলেন আমি গরিব জীবনযাপন করতে চলেছি; এটা এমন একটা স্বপ্ন যা শেষ পর্যন্ত আমাকে কোনো গন্তব্যে পৌঁছে দেবে না। আমি নিজেও জানতাম না শেষ পর্যন্ত আমাকে এটা কোথায় নিয়ে যাবে। হঠাৎ করেই আমাকে লেখক হওয়ার সিদ্ধান্তটি নিতে হয়েছে। আমার ছয় বছর বয়স থাকতেই বাবা-মা চেয়েছেন আমাকে ডাক্তার করে গড়ে তুলতে; আমি তাদের সব পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছি।

প্রশ্ন : ‘দ্য জয় লাক ক্লাব’ উপন্যাসটি নিয়ে আপনার মায়ের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

অ্যামি তান : যখন আমি উপন্যাসটি লিখছি ততদিনে আমার লেখালেখি-বিষয়ক তার ধারণার পরিবর্তন এসেছে। এর অংশত কারণ আমি অর্থনৈতিকভাবে সফল লেখক। শুরুটা হয়েছিল ‘বিজনেস রাইটার’ হিসেবে। ভালোই আয় হচ্ছিলো। তাকে নতুন একটা বাড়ি কিনে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমাকে ডাক্তার করে মায়ের সেটাই উদ্দেশ্য ছিল—পর্যাপ্ত টাকা আয় করে বৃদ্ধবয়সে তার দেখভাল করা। যেহেতু আমি সেটা লেখক হিসেবে করতে পারছি, তাই তিনি খুশিই ছিলেন। যখন আমি ঠিক করলাম উপন্যাস লিখবো এবং তাকে বললাম, তার অতীত-জীবন জানার জন্য তার সাক্ষাৎকার নেবো, তখন তিনি আরো খুশি হলেন। তারপর যখন সেটি প্রকাশিত হল এবং ভালোই চললো তখন তিনি বললেন, ‘আমি সবসময় জানতাম ও লেখকই হবে, কারণ ওর কল্পনাশক্তি প্রখর ও অনিঃশেষ!’ আমরা ইতিহাসের পুনপাঠ করছিলাম। আমার ধারণা নিজের স্বপ্ন-প্রত্যাশার কথা স্মরণ করা মায়ের জন্য ভালো হয়েছিল।

প্রশ্ন : একটা একান্ত প্রশ্ন করি— আপনি কিশোরী বয়সে আপনার বাবা ও ভাইকে হারান। এই ঘটনার প্রভাব আপনার জীবনে কিভাবে পড়েছিল?

অ্যামি তান : সেটা এমন একটা সময় ছিল যখন আমি আমার পুরানো সব বিশ্বাস ঝেড়ে ফেলেছিলাম। আমার বাবা মন্ত্রী ছিলেন। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন। আংশিক নয়, পরিপূর্ণ বিশ্বাস। তিনি মনে করতেন, আমাদের জীবনে ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটুক না কেন, সবই ঈশ্বরের ইচ্ছাতে ঘটে। আমিও তখন সেটাই মনে করতাম। নিয়মিত চার্চে যেতাম। আমি লক্ষ্মী মেয়ে হওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি বিস্মিত হতাম ভেবে কেন ঈশ্বর আমার সঙ্গে কথা বলছেন না; কারণ আমি খারাপ কিছু করতাম না। যখন বাবা ও ভাই অসুস্থ হলেন এবং ছয়মাসের ব্যবধানে চলেও গেলেন, আমি ঈশ্বরের ওপর খুব চটে গেলাম। আমি কারো সঙ্গে কথা বলতে পারছিলাম না, কারণ সকলের ভাষ্য ছিল, ‘যা হয়েছে ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই হয়েছে’, অথবা, ‘এমনটা হয়েছে কারণ হয়ত তোমার বাবা অন্যায় কিছু করেছেন এবং ঈশ্বর তাকে শাস্তি দিয়েছেন’। আমি অল্পবয়সে এতসব বুঝিনি। পরে আমাকে আমার মতো করে সবকিছু ভাবতে শিখতে হয়েছে। আমার বিশ্বাসের জায়গাটা নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে।

আমি এখন বলছি না যে, আমি আমার বাকিটা জীবন ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করবো অথবা আমাদের ব্যাখ্যার বাইরে যে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটে সেটা উড়িয়ে দেবো। আমার বিশ্বাসটা হলো, ঐশ্বরিক শক্তি আমার নিজের ভেতর থেকে আসবে। এবং সেটা আমার নিজের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ, সে আমি লেখক হই বা না হই। সবসময় তুমি তোমার সত্যটা কিভাবে উদ্ঘাটন করবে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা হতে পারে সৎলোকের নিকট থেকে অথবা খুব বাজে কোনো অভিজ্ঞতা থেকে; তবে তোমাকে আপন শক্তির ওপর আস্থা রাখতে হবে। আমাকে আমার নিজের জিজ্ঞাসাগুলো খুঁজে নিতে হয়েছে। এবং আমাকে আত্মস্বীকারোক্তি দিয়ে শুরু করতে হয়েছে। এখন একজন লেখক হিসেবে আমার মনে হয়, কোনো গল্পের সূচনা হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত হলো ‘বিভ্রান্তি’।

প্রশ্ন : মার্কিন সাহিত্যে ‘দ্য জয় লাক ক্লাব’ উপন্যাসটির ব্যাপক ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে, কারণ এর মধ্য দিয়ে আমেরিকার মূলধারার সাহিত্যে চীনা মার্কিনী অভিবাসনের জটিল ইতিহাস উঠে এসেছে। লেখার সময় কি আপনার একবারো মনে হয়েছিল যে আপনি নতুন একটি জগত উন্মোচন করতে চলেছেন?

অ্যামি তান : আমার কাছে এটি আজব এক পরিবারের আজব এক গল্প ছাড়া মোটেও কিছু মনে হয়নি। আমার কল্পনাশক্তি যথেষ্ট প্রখর হওয়া সত্ত্বেও আমি ভাবিনি যে এই গল্প অন্য কোনো পরিবারের সাথে মিলে যাবে বা মিলিয়ে চিন্তা করা হবে। আমি বইটি লিখতে চেয়েছি একান্ত ব্যক্তিগত কারণে। এর মধ্যে অন্যতম হলো লেখার কৌশলটা রপ্ত করা। আমি সবসময় গল্প লিখতে পছন্দ করেছি, আর সবচেয়ে পছন্দ করেছি পড়তে। আরেকটি কারণ হলো নিজেকে বোঝার চেষ্টা করা, আমি কে সেটা অনুধাবন করা। অনেক লেখকই লিখে থাকেন তাঁদের বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেতে। তাঁরা তুলে ধরতে চান বিশ্ব সম্পর্কে তাঁদের ভাবনাগুলো। আমি একধরনের হযবরল এবং ব্যক্তিগত ইতিহাস ধরে লিখেছি, সেটা যে কারো জীবনের অর্থ উদ্ধারে কাজে আসবে ভাবতে পারিনি।

প্রশ্ন : আমেরিকার অভিবাসন অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখিত এটি একটি মহান কাজ। আপনি কি লেখার সময় সচেতন ছিলেন সে ব্যাপারে?

অ্যামি তান : আমি যদি সেটা আদৌ ভাবতাম তবে আমি আমার মা এবং বাবার অভিবাসন অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতাম। কিন্তু আমি সেটা গ্রহণ-বর্জনের ভেতর দিয়ে করেছি। আমেরিকা সম্পর্কে আমার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো আপনি আপনার মতো করে নিজের পরিচিতি এখানে তৈরি করতে পারবেন। আপনার সেই স্বাধীনতা আছে। তবে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নেই, কারণ আমাদের কতগুলো সীমাবদ্ধতা থাকে যেটা আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বা অন্ধবিশ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তবে এটা থেকে লেখক হিসেবে বিস্ময়কর স্বাধীনতা পাওয়া যায়। কারণ স্বাধীনতার আরেক রূপ সৃজনশীলতাও বটে। আপনি আপনার পরিচিতি তৈরি করছেন। লেখক হিসেবে আপনি যা চাইবেন তাই-ই সৃষ্টি করতে পারবেন।

প্রশ্ন : আপনার লেখালেখির ক্ষেত্রে কি কোনো আদর্শ ছিল নাকি আত্মপ্রবণতা থেকে লিখতেন?

অ্যামি তান : আমি পেছনে তাকালে বুঝতে পারি অবচেতনে কিছু কিছু বই বা কোনো কোনো লেখক আদর্শ হিসেবে কাজ করেছে। যেমন রূপকথার গল্প, বাইবেল, বিশেষ করে বাইবেলের যে সুরের ধারা। লরা ইনগালস ওয়াইল্ডারের ‘লিটল হাউস ইন দ্য বিগ উডস’ বইটির কথাও বলতে পারি। এখানে বর্ণিত বাড়িটি আমার খুবই প্রিয় হয়ে ওঠে। ওয়াইল্ডার নিজের শৈশবের একাকীত্ব জীবনকে উপজীব্য করেই এই কল্পিত গল্পটি ফেঁদেছেন। তিনি একশবছর আগে বেঁচে গেছেন, কিন্তু তাঁর জীবনটা যেন আমারই জীবন। বালিকা জেন আয়ারকেও সবকিছু থেকে দূরে রাখা হয়েছে এবং তাকে নিজের জীবনের পরিণতি নিজে নির্ণয় করতে হয়েছে। কেউ তাকে বুঝে উঠতে পারে না। পঠনপাঠনের বাইরে যাদের প্রভাব ভীষণভাবে ছিল তারা হলেন আমার বাবা-মা। বাবা নীতিবাণী লিখে আমাদের জোরে জোরে পড়ে শোনাতেন। সেগুলো ঠিক ধর্মীয় না, নিজের জীবন-সম্পর্কিত উপলব্ধি। এরপর অবশ্যই আমার মায়ের কথা বলতে হবে। তিনি এমন করে আমাকে গল্প শোনাতেন যেন সবকিছু তার সামনেই ঘটছে। গল্পবলার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট শিল্পশৈলী জানা ছিল তার। অধিকাংশ গল্প তার নিজের জীবন থেকে নেয়া, তাই যে আবেগ ফুটে উঠত সেটা তৈরি করা ছিল না। আমি মনে করি, এটা এমন একটা শক্তি যা সকল লেখক অর্জন করতে চান— সত্য, প্রকৃত আবেগ, এবং সেই আবেগটা আবিষ্কার করা, একইভাবে ক্রোধ, বিস্ময় এবং হতাশাকে উপস্থাপন করা। আমার মা আমাকে আবেগপ্রবণ সত্যকে চিনিয়েছেন, যেটি আপনি বইয়ে খুঁজে পাবেন না। আপনাকে এমন কারো সঙ্গে থাকতে হবে যিনি এটা উপলব্ধি করেছেন নিজের জীবনে এবং তার জীবনটাই একরকম এর উপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রশ্ন : আপনি কি আরো কিছু বলতে চান?

অ্যামি তান : আমি যে মনে করি পড়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তার পেছনে অনেক কারণ আছে। এটা আমাকে আশ্রয় দেয়, বিশেষ করে জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোতে। পাঠ থেকে আমার মনে হয়েছে, আমার সঙ্গে যা ঘটছে তার ভিন্ন একটা পরিণতি আমি দাঁড় করাতে পারি। পড়ার সঙ্গে কল্পনাশক্তি নির্মাণেরও সম্পর্ক আছে। আপনি যখন একটা বই পড়বেন তখন কতগুলো অপরিচিত চরিত্রের সঙ্গে মিশে তাদের দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ সবকিছু ভাগ করে নিতে পারবেন। আপনিও তাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠবেন। এভাবে ভাবলে পাঠের গুরুত্বটা আমরা বুঝতে পারবো। এখন যখন এক সংস্কৃতির মানুষ অন্য সংস্কৃতির মানুষকে বুঝতে পারছে না, এমনকি একটি গোষ্ঠীর ভেতরেও বোঝাপড়ার ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, তখন পাঠের বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না।

হতে পারে আমার লেখার প্রধান বিষয় মা-মেয়ের সম্পর্ক। সাথে গল্পগুলো এমনকিছু বিষয় নিয়ে যা আমি বিশ্বাস করি। আমার মায়ের কাছ থেকে এটা পেয়েছি— বিশ্বকে প্রশ্ন করার প্রবণতা এবং পরিবর্তন করার ইচ্ছা।

প্রশ্ন : আপনার আলোচ্য বইটি পড়ার সময় রূপকথার অনেক উপকরণ পেয়েছি। বাস্তবতা এবং কল্পনার একটা মাঝামাঝি জায়গা— স্বপ্নে ঠাসা, কুসংস্কার এবং পৌরণিক কাহিনি। আপনি কি লেখার সময় বইটির উপকরণগুলোকে বাস্তবসম্মত হিসেবে বিবেচনা করেছেন?

অ্যামি তান : আমার মা আমাকে সবধরনের সম্ভাব্যতার বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছেন। আমি মনে করি আমরা যাকে জাদুবাস্তবতা বলি, সেটাই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের বিশ্বাস থেকে অনেক সময় নির্ধারিত হয় কি ঘটবে, কারণ আমরা সেটা ঘটাই অথবা আমরা দেখি যে সেভাবেই ঘটে।

মন্ত্রী হিসেবে আমার বাবা আমাকে বাইবেল থেকে অনেক কাহিনি পড়ে শুনিয়েছেন যেগুলো রূপকথার গল্পের মতো। একটা বালক চাম-গুলতি দিয়েই বিশাল দৈত্যকে মেরে ফেলছে। কেউ হয়ত কয়েকদিন মৃত থাকার পর জেগে উঠছে। কেউ হয়ত ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য হাজার হাজার রুটি তৈরি করে ফেলছে। এই কাহিনিগুলো থেকে খ্রিস্টধর্মের বিশ্বাস সম্পর্কে বোঝা যায়, সেটা আমরা জানি, তবে এটা থেকে এও বোঝা যায় রূপকথা বিষয়েও অসাধারণ দখল আছে।

জীবন আমরা যা ভাবি তার চেয়ে অনেক বড়। কিছু কিছু ঘটনা ঘটতে পারে যার কার্যকারণ আমরা বুঝে উঠতে পারি না। আমরা এটাকে বিশ্বাস বা কুসংস্কার কিংবা রূপকথা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারি। আমরা কিভাবে দেখবো সেই সম্ভাবনাটা অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। আমি আমার নিজের জীবনে যা ঘটেছে সেটাকে আমি লেখকের দৃষ্টি দিয়ে দেখি এবং কখনো কখনো আমি মনে করি সেগুলো কোনো রূপকথার অংশবিশেষ।

দ্বিতীয় অংশ

গুডরিডস : ‘দ্য ভ্যালি অ্যামেজমেন্ট’ উপন্যাসের মূল বিষয় হলো বেইমানি। বা বিশ্বাসঘাতকতা। আপনি কি এই বিষয়ে অনেক ভাবেন?

অ্যামি তান : আমি নিজে বেঈমানির ভেতর নিক্ষিপ্ত হয়েছি। নিক্ষিপ্ত হওয়া মানেই বেঈমানির শিকার হওয়া। এবং আপনি তাদের আর আপনার জীবনে ফিরে দেবেন না যারা আপনাকে পরিত্যাগ করেছে। আপনার বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করা কিংবা আপনাকে শারীরিকভাবে পরিত্যাগ করা। আমার বাবার মৃত্যুও আমার কাছে বেইমানির মতো মনে হয়েছে। ‘কিভাবে তুমি পারলে ছেড়ে যেতে এবং আমাকে ও মাকে এভাবে অসহায় অবস্থার ভেতর রেখে যেতে?’ যদিও তার চলে যাওয়াটা দুর্ঘটনা মাত্র। আমার মা তার আগের পক্ষের তিন কন্যাকে চীনে ফেলে এসেছে। যখন তাদের সুখী করার জন্য তাকে প্রয়োজন ছিল তখনই তিনি আরো অসুখীর কারণ হয়ে চলে এসেছেন। আমি মনে করি বেইমানির বিষয়টি আমাদের পরিবারের ভেতরেই ছিল। আমার মা তার মাকে হারিয়েছেন যখন তার বয়স মাত্র ন’বছর। তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। সেটিও একরকমের বেইমানি। স্বেচ্ছায় ছেড়ে যাওয়া। কাজেই এটা আমাদের পরিবারের ইতিহাসে আছে। বারবার পুনরাবৃত্তি ঘঠেছে। আমার মাকে তার মা করেছেন, আমার মা তার মেয়েদের সাথে করেছেন। আমার অবশ্য কোনো সন্তান নেই যার সঙ্গে আমি এইরকম আচরণ করতে পারি।

প্রশ্ন : শিশুদের সঙ্গে আরো একভাবে বেইমানি করা যায়, তাদের একটা পরিচয় দিয়ে সেটি কেড়ে নেয়ার ভেতর দিয়ে। এই উপন্যাসে ভায়োলেট, যে আধা আমেরিকান আধা চাইনিজ, সেই সংগ্রামটা করে যাচ্ছে।

অ্যামি তান : ভায়োলেটের পরিচয় সে না চাওয়া সত্ত্বেও বদলে যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত। সে মনে করছে সে আমেরিকার সুবিধাভোগী মেয়ে, এরপর সে হতাশ হচ্ছে, আবার সে আধা চাইনিজ হয়ে উঠছে, এবং সবশেষে তার অবস্থান হচ্ছে হতচ্ছাড়া এক নারী। সে পরবর্তীকালে নিজেকে প্রথম শ্রেণির যৌনদাস হিসেবে আবিষ্কার করছে। একসময় এই জগতে সে তার জনপ্রিয়তাও হারাচ্ছে। জীবনের এসব নানাক্ষেত্রে হয় আপনাকে ধরে রাখতে হবে অথবা চালনা করতে হবে— চালনা করতে হবে আত্মসম্মান তৈরির দিকে, অথবা তা টিকিয়ে রাখতে। আমাকে সেটা করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আমি লক্ষ্য করেছি যখন আমরা সুইজারল্যান্ডে ছিলাম। লোকজন সেখানে আমাকে অন্যদৃষ্টি দিয়ে দেখত। আমি হঠাৎ করেই যেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠলাম। আমার মনে হলো, দারুণ ব্যাপার, এখানে আমাকে সকলে আবেদনময়ী মনে করছে। তবে একইসঙ্গে যখন আপনাকে তারা ধর্ষণ করতে চাইবে সেটা নিশ্চয় কাক্সিক্ষত বিষয় হবে না। আবারো সেই অস্তিত্বের সংকট চলে আসে। ভায়োলেট চরিত্রটি সৃষ্টির ভেতর দিয়ে আমি সেই খেলাটি কিছুটা খেলেছি।

প্রশ্ন : আপনার মা একবার বলেছিলেন, আপনি যে গল্পগুলো লিখছেন সেটা খুব ভালো বিষয়। কারণ যখন আপনি আপনার অতীত পুনর্লিখন করেন তখন আপনি চাইলে কিছুটা পরিবর্তনও করতে পারেন। আপনি কি সেটা করেছেন বা পেরেছেন করতে?

অ্যামি তান : তিনি মনে করতেন পুনর্লিখনের ভেতর দিয়ে অতীতটা পরিবর্তন করা যায়। আর আমার জিজ্ঞাসা হলো, তার কি কোনো প্রয়োজন আছে? তিনি মনে করতেন তার অতীতটা গ্লানিকর, সে কারণে এটা আড়াল করতে চাইতেন। আমি মনে করি, কেউ মনে রাখবে না তিনি এবং তার মা কি পরিমাণ কষ্ট ও বঞ্চনা সহ্য করেছেন। প্রকাশ করার ভেতর দিয়ে মানুষ জানতে পারছে। একাত্ম হচ্ছে। গল্পগুলো মোটাদাগে বানানো হলেও মানুষজন পড়তে পড়তে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হচ্ছে।

প্রশ্ন : নিজের অতীতটা খোলাখুলিভাবে উপস্থাপন করতে পারা সাহসী কাজ বটে।

অ্যামি তান : আমি আমার মা সম্পর্কে যা কিছু লিখেছি তা আমি তার চোখে চোখ রেখেও বলতে পারি। মা নিজেও তার যৌনজীবন নিয়ে খোলামেলা আলাপ করতেন, খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ না হলেও। তিনি যা বলতেন— এই লোকটি তাকে বিছানায় নিতে চেয়েছে, লোকটি তখন তাকে দাঁড় করিয়ে অন্য মেয়েদের সঙ্গে বিছানায় কি করেছে, সে তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে রাজি করাতে চেয়েছে; মা তখন ডাইরিয়ার ভান করে কেটে পড়েছে। এইসব অদ্ভুত ও মজার কা-। যখন তিনি সত্তরে, তখন তিনি একজনের সাথে ডেটিং করছিলেন। তিনি বললেন, ‘লোকটি আমাকে স্পর্শ করে বলল, খুব কোমল, তরুণীদের মতো। আমি নিজের মায়ের মুখ থেকে এসব কথা শুনতে চাইতাম না। তিনি বলতেন, তোর ভাইয়ের কারণে তোর বাবার সাথে একমাস কিছু করতে পারিনি। এসব কথা আমার বইতে এসেছে। আমি চাইলেও কারো কাছে এসব বলতে পারতাম না— আমার নিজের যৌনজীবনের কথা, স্বামীর সঙ্গে আমার বিছানায় সম্পর্কের কথা। কিছু কিছু দৃশ্য এই উপন্যাসে আনতে হয়েছে। আমি আগে কখনো লিখিনি কারণ পাঠক ভাববে এসব বুঝি আমার নিজের জীবনের কথা।

প্রশ্ন : লোকজন যদি ভাবেও যে আপনার তৃপ্ত যৌনজীবন আছে, সমস্যা কোথায়?

অ্যামি তান : না, সবটা তৃপ্ত না (হেসে)। আসলে আমি চাইনি পাঠক মনে করুক, এটা আমি। কোনো পাঠক কোনো যৌনদৃশ্যে লেখককে বসিয়ে কল্পনা করুক, সেটা আমি চাইনি। তাছাড়া আমি যৌনদৃশ্যের ভালো বর্ণনাকারীও নই। আমি আমার সম্পাদককে বলেছি, আমাকে গতানুগতিক যৌনদৃশ্য লিখতে বলো না।

প্রশ্ন : আপনি এই লেখাটি শুরু করার আগে যৌনদাসদের জীবন নিয়ে খুব বেশি কি জানতেন?

অ্যামি তান : আমি মনে করতাম, এই বিষয়ে নতুন করে কিছু লেখা খুব সহজ কাজ না, কারণ এত বেশি লেখা হয়েছে যে বিষয়টা একঘেয়ে হয়ে গেছে। এরপর আমি পারিবারিক অ্যালবামে দাদির একটি ছবি পাই যেটি দেখে বোঝা যায় তিনি যৌনদাস ছিলেন। এটা আমাদের জন্য গ্রহণযোগ্য আবিষ্কার ছিল না, কারণ আমরা তাকে পরিবারের আইকন হিসেবে জানতাম। তিনি আমাদের কাছে মিথের চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। দেখা গেল তার সম্পর্কে এতদিন যা জেনে এসেছি— ন¤্র-ভদ্র-সংসারী-ঘরকুনো— ঠিক তার উল্টো ছিলেন তিনি।

প্রশ্ন : ছবিটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল? ধাক্কা খেয়েছিলেন নিশ্চয়?

অ্যামি তান : হুম। ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিলাম। এরপর আমি কল্পনা করার চেষ্টা করলাম, তিনি কেমন জীবন কাটিয়েছেন। তিনি কেমন বোধ করতেন। একটা বিষয় ভেবে আমি আনন্দিত হলাম যে তিনি সংসারী-ঘরবন্দি নারী ছিলেন না।

প্রশ্ন : আপনি বলেছেন যে আপনি যৌনদাসদের নিয়ে লিখতে চাননি কারণ এটা প্রাচ্যদেশীয় বিষয় হয়ে উঠতে পারত। এখানে অনেক মানুষ আছেন যাদের চীন সম্পর্কে জ্ঞান হলো আপনার বই পর্যন্ত। এই কারণে কি আলাদা কোনো দায়িত্ববোধ কাজ করে আপনার ভেতরে?

অ্যামি তান : আমাকে যেমন মানুষের উপলব্ধি নিয়ে ভাবতে হয় তেমন এটাও মনে রাখতে হয় যে মানুষকে জ্ঞানী করে তোলা আমার কাজ না। কেউ কেউ আছেন যারা মনে করেন আপনি তাদের শিক্ষাদান করছেন। আমি মোটেও তা করছি না। আমি নিজে নিজে কিছু শিখছি। অতীতে এমন কিছু লোক দেখেছি যারা আমার উপন্যাসের মা চরিত্রদের ভাঙা ভাঙা ইংরেজি কথোপকথনের কারণে আমার সমালোচনা করেছে। আমি মনে করি এটা মনে করা মিথের মতোই যে যারা অল্পবয়সে অন্যদেশ থেকে এখানে এসেছে শুদ্ধ ইংরেজি বলবে। লোকজনের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমি কোনো আদর্শ চরিত্র সৃষ্টি করিনি। কাজেই এই যুদ্ধের ভেতর দিয়ে আমাকে শুরু থেকেই যেতে হয়েছে। তবে আমি মনে করি, পাঠকদের নিজস্ব বিবেচনা আছে বা থাকা উচিত।

**************************************

 

সের্গেই ইয়েসেনিনে (১৮৯৫-১৯২৫)র অনুবাদ কবিতা
মূল রুশ থেকে অনুবাদ : দিলীপ কুমার নাথ

[সের্গেই আলেক্সান্দ্রোভিচ ইয়েসেনিন বিংশ শতাব্দীর রাশিয়ার অন্যতম সুপরিচিত ও জনপ্রিয় লিরিক কবি। স্বল্প জীবনে অতুলনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করেন। মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯১৩ সালে ভর্তি হন ও বছর দুয়েক পড়াশোনা করেন। ১৯১৫ সালে লেনিনগ্রাদ (সেণ্ট পিটার্সবার্গ) যান এবং আলেকজান্দার ব্লকসহ কয়েকজন কবির সাথে পরিচিত হন। ব্লক ইয়েসেনিনের কবিতা পড়ে চমৎকৃত হন ও তার কবিতা প্রকাশে সহায়তা করেন। ইয়েসেনিন রুশ বিপ্লবে অনুপ্রাণিত হন, সমর্থন করেন ও বিশেষত এক আমেরিকান মহিলাকে বিয়ে করে কিছুদিন আমেরিকা ও ইওরোপ ভ্রমণের পর তাঁর রুশ বিপ্লবে আস্থা আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বিপ্লবোত্তর অস্থির পরিস্থিতির আলোকে কিছু কবিতায় বলশেভিক সরকারের সমালোচনা করায় তাঁর অধিকাংশ রচনা স্তালিন ও ক্রুশ্চেভ আমলে নিষিদ্ধ ছিল। ব্রেঝনেভ আমলে সেগুলি পুনঃপ্রকাশিত হয়। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন বেশ অস্থিরচিত্ত। পাঁচ বার তিনি বিয়ে করেন, তাঁর সর্বশেষ স্ত্রী ছিলেন লেভ তলস্তয়ের এক নাতনী। জীবনের শেষ দুবছর প্রচুর মদ্যপান ও মানসিক বিকারের মধ্যে কাটান কিন্তু তাঁর উৎকৃষ্ট কবিতার অনেকগুলিই সেই অস্থির সময়ের ফসল। লেনিনগ্রাদের একটি হোটেলে আত্মহত্যার পূর্বে নিজ হাতের কব্জি কেটে সেই রক্তে শেষ কবিতা লেখেন। অনূদিত ‘বিদায়, হে বন্ধু, বিদায়’(১৯২৫) তাঁর সেই সর্বশেষ কবিতা। ‘পার্শিয়ান মোটিভ‘(১৯২৪) এ আছে তাঁর অনুপম ও শ্রেষ্ঠ লিরিক কবিতাগুলি। অনূদিত ‘শাগানে, আমার শাগানে’ পার্শিয়ান মোটিভের অন্তর্গত। ককেশাসে ১৯২৪ সালে ভ্রমণের সময় শাগানে নাম্নী এক স্কুল শিক্ষিকার সাথে তাঁর পরিচয় হয়। কবির জন্মস্থান রাশিয়ার রিয়াজানের হাজার হাজার মাইল বিস্তীর্ণ প্রান্তর সমভূমি ‘স্তেপ’, রাইক্ষেতের (রাই বার্লি জাতীয় দানাশষ্য— যা রুটি, হুইস্কি প্রস্তুতি ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়) রাইশীষের সাথে তাঁর চুলের রূপকল্প, তাঁর জন্মভূমির উন্মুক্ত স্থানের দৃশ্যমান পূর্ণচাঁদের সাথে পার্বত্য ককেশাসে পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে দেখা খ-িত চাঁদের পার্থক্যের চমৎকার রূপকল্প কবিতাটিতে উঠে এসেছে।]

(১)

বিদায়, হে বন্ধু বিদায়।

(কবিতাটি পৃথিবীর বহু ভাষায় বার বার অনূদিত হয়েছে। বাংলায়ও অনূদিত হয়েছে। মূল কবিতায় অন্ত্যমিল প্যাটার্ণ অইঅইঈউঈউ. সেই অন্ত্যমিল রাখার চেষ্টা করেছি।)

বিদায়, হে বন্ধু, বিদায়

প্রিয়তম, আছ তুমি হৃদয়ে আমার,

নিয়তির এ বিচ্ছেদ আমাদের দেয়

আগামী দিনে আশা মিলন আবার।

বিদায় বন্ধু, নৈঃশব্দের এ বিদায় উষ্ণতাবিহীন

দুঃখ নেই এ বিদায়ে, ভ্রƒকুঞ্চনে দেখাবো না ব্যথা,

মৃত্যু সে তো এ জীবনে নতুনত্বহীন,

কিন্তু বেঁচে থাকা নয় কোন নতুনতর কথা।

(২)

শাগানে, আমার শাগানে

(মূল রুশে অন্ত্যমিল প্যাটার্ন অইইঅঅ; ইঈঈইই; ইউউইই, অঊঊঅঅ; অঋঋঅঅ অনুবাদে রাখার চেষ্টা করেছি।)

শাগান, আমার শাগানে!

হতে পারে আমি উত্তরের যথা,

তোমাকে শোনাতে চাই প্রান্তরের কথা,

ঢেউ খেলানো রাইক্ষেত চাঁদের জোছনে।

শাগানে, আমার শাগানে।

হতে পারে আমি উত্তরের যথা,

শতগুণ বড় চাঁদ আছে সেখানেতে,

শিরাজের সৌন্দর্য যত কর না ব্যাখ্যাতে,

রিজানের প্রান্তর থেকে সুন্দর নয় তথা।

হতে পারে আমি উত্তরের যথা।

তোমাকে শোনাতে চাই প্রান্তরের কথা,

রাইশীষ থেকে আমি এনেছি এ চুল,

বাঁধো তুমি চুল নিয়ে হাতের আঙ্গুল—

এতে আমি পাবনাকো এতটুকু ব্যথা।

তোমাকে শোনাতে চাই প্রান্তরের কথা।

ঢেউখেলানো রাইক্ষেত চাঁদের জোছনে

অনুমান কর দেখে কুঞ্চিত এ কেশ।

উপহাস কর প্রিয়া, হাসো তুমি বেশ,

জাগিয়ো না শুধু তুমি স্মৃতি এই মনে

ঢেউ খেলানো রাইক্ষেত চাঁদের জোছনে।

শাগানে, আমার শাগানে!

উত্তর, সেখানেও আছে এক মেয়ে,

অবিকল তুমি যেন, দেখো তুমি

চেয়ে,

হয়ত আমার কথা ভাবছে সে মনে …

শাগানে, আমার শাগানে।

**********************************

 

শ্রীজগদানন্দ রায়
………………..
রসায়নীবিদ্যার উন্নতি

গত কুড়ি বৎসরে জড়বিজ্ঞানের নানা বিভাগে যে উন্নতি হইয়াছে, তাহা দেখিলে অবাক্ হইতে হয়। এই দ্রুত উন্নতিতে পুরাতন সিদ্ধান্তগুলি নূতন মূর্ত্তি গ্রহণ করিয়া এমন হইয়া দাঁড়াইয়াছে যে, এখন দেখিলে তাহাদিগকে চিনিয়া লওয়া কঠিন হয়। কয়েক বৎসর পূর্ব্বে হেলম্হোজ্, হার্জ ও কেল্ভিন্ বৈজ্ঞানিকগণ যে সকল সিদ্ধান্তকে অভ্রান্ত বলিয়া গিয়াছেন, এখনকার নূতন আবিষ্কারে তাহাদেরও পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়াছে। শারীরবিদ্যা, জীবাণুতত্ত্ব ও চিকিৎসা-বিজ্ঞানও উন্নতির পথে দ্রুত ধাবমান হইয়াছে। ভূতত্ত্ব, জ্যোতির্ব্বিদ্যা ও মানবতত্ত্বের ন্যায় প্রাচীন শাস্ত্রও তাহাদের পুরাতন মূর্ত্তিগুলিকে অক্ষুণœ রাখিতে পারে নাই, কীটদষ্ট প্রাচীন পুঁথির জীর্ণ পাতা ত্যাগ করিয়া তাহাগিকেও নবীন রূপ গ্রহণ করিতে হইয়াছে। ডারুইনের অভিব্যক্তিবাদ বহু পূর্ব্বে প্রচারিত হইলেও যাঁহারা ইহার সুপ্রতিষ্ঠার সহায় ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে দুই একজন এখনো জীবিত আছেন। বৃদ্ধ ওয়ালেস্ এখনো অভিব্যক্তিবাদ প্রসঙ্গে পুস্তকাদি লিখিতেছেন। কিন্তু সম্প্রতি জীবতত্ত্ব সম্বন্ধে যে সকল নূতন তথ্য সংগ্রহ করা হইয়াছে, তাহাতে অভিব্যক্তিবাদেরও সংস্কারের প্রয়োজন দেখা যাইতেছে।

গত দশ বৎসরের মধ্যে রসায়নী-বিদ্যায় যে সকল উন্নতি ও পরিবর্ত্তনের লক্ষণ প্রকাশ পাইয়াছে, তাহার আলোচনা করিতে গেলে, রেডিয়ম্ (জধফরঁস) ধাতুর আবিষ্কারের কথা মনে পড়িয়া যায়। এই অদ্ভুত জিনিসটি হইতে অবিরাম কয়েক জাতীয় তেজোরশ্মি ও তাপ নির্গত হয়। এগুলির মধ্যে একটিকে অতিসূক্ষ্ম জড়-কণিকা বা শক্তি-কণিকা বলিয়া স্থির করা হইতেছে। ডাল্্টন্ তা¤্রলৌহাদি ধাতু এবং হাইড্রোজেন, অক্সিজেন্ ও গন্ধক প্রভৃতি অধাতুকে যে, মূল পদার্থ বলিয়া প্রচার করিয়াছিলেন, রেডিয়ম ও অপর ধাতু হইতে অতিসূক্ষ্ম অণুর নির্গমন দেখিয়া তাহা স্বীকার করিতে সঙ্কোচ বোধ করিতেছেন। এই অণুগুলি হাইড্রোজেনের ন্যায় লঘু বস্তুর পরমাণু অপেক্ষাও অনেক ক্ষুদ্র। প্রায় হাজারটি কণিকা একত্র না হইলে, তাহারা গুরুত্বে বা আকারে এক পরমাণু প্রমাণ হাইড্রোজেনের সমান হয় না।

ডাল্টনের নিয়মে পরমাণুকে বিভাগ করা যায় না। রেডিয়ম্ জিনিসটা হাইড্রোজেন্, নাইট্রোজেন্ বা স্বর্ণ-রৌপ্যের ন্যায় একটা মূল পদার্থ, সুতরাং ইহার পরমাণু অবিভাজ্য হইবারই কথা। কিন্তু অবিভাজ্য পরমাণু গুলিকেই এখন বিভক্ত হইতে দেখিয়া প্রচলিত রাসায়নিক সিদ্ধান্তে বৈজ্ঞানিকদিগের বিশ্বাস শিথিল হইয়া আসিতেছে। কেবল রেডিয়মের পরমাণুই এই প্রকারে বিভক্ত হয় না, ইউরেনিয়ম্ (টৎধহরঁস) প্রভৃতি আরো অনেক মূল-পদার্থের পরমাণুকে এই প্রকারে বিশ্লিষ্ট হইতে দেখা গিয়াছে, এবং বিশ্লেষণের ফলে, যে অতি সূক্ষ্ম কণিকার উৎপত্তি হইতেছে, তাহারা আকৃতি-প্রকৃতি সকল জিনিসেই এক দেখা যাইতেছে। সকলে ভাবিতেছেন এই অতিসূক্ষ্ম কণিকাগুলিই বিশ্বের একমাত্র উপাদান এবং ইহাদেরই সংযোগ-বিয়োগে তা¤্রলৌহ ও শিলামৃত্তিকা প্রভৃতি নানা যৌগিক-অযৌগিক উৎপন্ন হইয়া জগতকে এত বিচিত্র ও এত সুন্দর করিয়া তুলিয়াছে। সুতরাং আভাস পাওয়া যাইতেছে যে, তা¤্রলৌহ বা হাইড্রোজেন্, নাইট্রোজেন প্রভৃতি সেই সত্তরটি মূল-পদার্থের কোনটিই প্রকৃত মূলপদার্থ নয়, সেই রেডিয়ম প্রভৃতি ধাতুর দেহনির্গত সূক্ষ্মকণাই বিশ্বে একমাত্র মূল জিনিস।

জগতের সমস্ত বস্তুই এক মূলপদার্থ দ্বারা গঠিত, এই মহাসত্যটির আভাস পাইয়া রসায়নশাস্ত্র কম গৌরাবান্বিত হয় নাই। একই মহাশক্তিকে আশ্রয় করিয়া যে, একই পদার্থ বিচিত্র মূর্ত্তিতে প্রকাশ পাইতেছে, ইহা দেশবিদেশের দার্শনিকগণ বহুপূর্ব্বে প্রকারান্তরে স্থির করিয়াছিলেন। বিজ্ঞান আজ সেই পরম সত্যটিকে চাক্ষুষ দেখাইবার উপক্রম করিয়া ধন্য হইয়াছে।

রেডিয়ম ধাতুর আবিষ্কারের ইতিহাস অনুসন্ধান করিলে দেখা যায়, ফ্রান্সের ভুবন-বিখ্যাত প-িত ক্যুরি সাহেবের পতœী মাডাম্ ক্যুরিই ইহার সন্ধান পাইয়াছিলেন। জনৈক মহিলা দ্বারা এই প্রকার একটা বৃহৎ আবিষ্কারের সূত্রপাত বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপার। যাহা হউক রেডিয়ম্ আবিষ্কারের পর ফরাসী ও ইংরেজ বৈজ্ঞানিক ব্যতীত অপর কেহই এই জিনিসটি লইয়া নাড়াচাড়া করিতে পারেন নাই। পিচ্ ব্লে-ি (চরঃপয নষবহফব) নামক যে আকরিক পদার্থ হইতে রেডিয়ম্ ঘটিত বস্তু সংগ্রহ করা হয়, তাহা পৃথিবীর সর্ব্বত্র পাওয়া যায় না, কাজেই উহা সাধারণ বৈজ্ঞানিকদিগের নিকট দুর্লভ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। এখন রেডিয়মের ন্যায় তেজোনির্গমনক্ষম প্রায় চব্বিশটি ধাতুর অস্তিত্ব জানা গিয়াছে। ইহাতে রসায়নবিদগণের গবেষণার খুবই সুবিধা হইয়াছে। থোরিয়ম্ (ঞযড়ৎরঁস) নামক ধাতুটি খুব দুর্লভ নয়। আজকাল গ্যাসের শিখার উপরে যে সাদা রঙের আবরণ লাগাইয়া আলোকের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হইতেছে, তাহা সেই থোরিয়ম্ঘটিত উপাদানে প্রস্তুত। ইহার পরীক্ষায় জর্ম্মান্ প-িত অধ্যাপক হান্ (চৎড়ভ. ঙঃঃড় ঐধযহ) আরো কতকগুলি তেজোনির্গমনক্ষম নূতন পদার্থের আবিষ্কার করিয়াছেন। এই পর্য্যন্ত রেডিয়ম্ লইয়া যে সকল পরীক্ষা চলিতেছিল, তাহাতে বিশুদ্ধ রেডিয়মের ব্যবহার করা হয় নাই। ইহাকে বিশুদ্ধ আকারে পাইবার উপায় জানা ছিল না। কাজেই রেডিয়ম্ ও ব্রোমিনের (ইৎড়সরহ) মিশ্রণজাত রেডিয়ম্-ব্রোমা-ইড্কে নাড়াচাড়া করিয়া তৃপ্ত থাকা ব্যতীত আর উপায় ছিল না। সম্প্রতি মাডাম্ ক্যুরি বিশুদ্ধ রেডিয়ম্ প্রস্তুতের এক পদ্ধতি আবিষ্কার করিয়া গবেষণার এক বৃহৎ অভাব মোচন করিয়াছেন।

অধিক তাপ ও অধিক ঠা-ায় পদার্থের অবস্থা কি প্রকার হইয়া দাঁড়ায়, তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখা অনেক সময় আবশ্যক হয়। কিন্তু পদার্থকে খুব উষ্ণ বা শীতল করিবার উপায় বৈজ্ঞানিকগণ এ পর্য্যন্ত আবিষ্কার করিতে পারেন নাই, কাজেই অনেক পরীক্ষা দুঃসাধ্য বলিয়া পরিত্যক্ত হইয়া আসিতেছিল। বৈদ্যুতিক চুল্লীতে এখন নানা পদার্থকে অনায়াসে তিন হাজার ডিগ্রি পরিমাণে উষ্ণ করা যাইতেছে। একশত ডিগ্রি তাপে জল ফুটিতে আরম্ভ করে, ইহার তিন শত গুণ তাপ যে কত অধিক তাহা আমরা অনায়াসে অনুমান করিতে পারি। চাপ দিয়া ও শীতল করিয়া বায়ুকে জলের ন্যায় তরল পদার্থে পরিণত করা যাইতেছে। এই তরল-বায়ুর ন্যায় শীতল বস্তু এ পর্য্যন্ত দেখা যায় নাই। আজ কাল ইহা দ্বারা নানা পদার্থকে শীতল করিয়া অনেক পরীক্ষাদি হইতেছে।

হাইড্রোজেন্ বায়ুকে যে কোন কালে তরল করা যাইবে, পূর্ব্বে বৈজ্ঞানিকগণ তাহা কল্পনাই করিতে পারেন নাই। সম্প্রতি ইহাও সুসাধ্য হইয়াছে। তরল-হাইড্রোজেনের তাপ, তরল-বায়ু অপেক্ষাও অনেক কম। উষ্ণতার সীমা সেণ্টিগ্রেডের শূন্য ডিগ্রিতে নামিলে জল বরফে পরিণত হয়। তরল বায়ুর উষ্ণতা অপেক্ষা কেবল ষাইট্ ডিগ্রি মাত্র কম, কিন্তু তরল হাইড্রোজেনের উষ্ণতাকে এখন বরফের তুলনায় ২৫২ ডিগ্রি কম দেখা যাইতেছে। বিজ্ঞানজ্ঞ পাঠক অবশ্যই জানেন, বৈজ্ঞানিকগণ পদার্থের একটা নিস্তাপ অবস্থা কল্পনা করিয়া থাকেন। উষ্ণতার মাত্রা বরফের শৈত্যের ২৭৩ ডিগ্রি নীচে নামিলেই সেই নিস্তাপ অবস্থা আসিয়া পড়ে। ইহাতে পদার্থের অণুর কম্পন রহিত হয় এবং সংকীর্ণ পাত্রে আবদ্ধ রাখিলেও এই অবস্থায় বায়বীয় পদার্থ চাপ-ধর্ম্ম ত্যাগ করে। সুতরাং দেখা যাইতেছে, তরল হাইড্রোজেনের সাহায্যে শীতল করিবার উপায় উদ্ভাবন করিয়া, বৈজ্ঞানিকগণ সেই নিস্তাপ ও নিস্পন্দ অবস্থার খুব কাছাকাছি আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। আর কোন প্রকারে উষ্ণতাকে কুড়ি ডিগ্রি নীচে নামাইতে পারিলেই জড়ের সেই স্তব্ধ প্রকৃতির সহিত প্রত্যক্ষ পরিচয় হইবে। প্রায় বারো বৎসর পূর্ব্বে ইংল-ের রয়াল ইনিস্টিটিউসনের অধ্যাপক ডিওয়ার (উবধিৎ) তরল হাইড্রোজেন্ প্রস্তুতের উপায় আবিষ্কার করিয়াছিলেন। এখনো সেই উপায়েই হাইড্রোজেন্্কে তরল করা হইতেছে।

বিজ্ঞানের কোন আবিষ্কারই এক বারের চেষ্টায় এক দিনে সুসাধিত হয় নাই। কোন বিশেষ উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য করিয়া দীর্ঘকাল গবেষণা করিলে তবে অভীষ্টের সন্ধান পাওয়া যায়। ইহাতে যে অর্থ ব্যয় হয় তাহার পরিমাণ বড় অল্প নয়। যে তরল-বায়ু ও তরল-হাইড্রোজেন্ আজকাল নানা পরীক্ষার প্রধান সহায় হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহার প্রস্তুত-উপায়ের আবিষ্কারেও বহু ব্যয় হইয়া গিয়াছে। ডাক্তার মন্ড (উৎ. গড়হফ) নামক জনৈক জর্ম্মান্ ধনী ইহার সমগ্র ব্যয় বহন করিয়াছিলেন। যাহা সত্য, তাহাকে কোন ক্রমেই ব্যক্তি বা জাতিবিশেষের সম্পত্তি করিয়া রাখা যায় না। ইহা জানিয়াও আধুনিক নানা আবিষ্কারের কর্ত্তৃত্ব লইয়া নানা দেশের বৈজ্ঞানিকগণ বৃথা বাগ্বিত-ার প্রশ্রয় দিয়া থাকেন। ইংরাজ বৈজ্ঞানিক ডিওয়ার সাহেবের গবেষণার আনুকূল্যে জর্ম্মানের দান সত্যই আধুনিক যুগের একটা নূতন কথা।

ত্রিশ বৎসর পূর্ব্বেও জৈব রসায়ন-শাস্ত্রের (ঙৎমধহরপ ঈযবসরংঃৎু) বিশেষ কোন উন্নতির লক্ষণ দেখা যাইত না। সেই পুরাতন কয়েকটি ব্যাপার লইয়া বৈজ্ঞানিকগণ তৃপ্ত থাকিতেন। অনেকের বিশ্বাস ছিল, জৈব বস্তুকে আমরা বিশ্লেষ করিতে পারি, কিন্তু উপাদানগুলিকে একত্র করিয়া তাহাকে গঠন করিতে পারি না। এখনো যে বিশ্বাস সম্পূর্ণ অপনীত হইয়াছে, তাহা বলা যায় না তথাপি বৈদ্যুতিক চুল্লীর উষ্ণতা ও তরল হাইড্রোজেনের শীতলতাকে ব্যবহারে লাগাইয়া গত কয়েক বৎসরে বৈজ্ঞানিকগণ জৈব পদার্থের সংগঠনে কতকটা কৃতকার্য্য হইয়াছেন। প্রবীণ জর্ম্মান্ প-িতগণ বেক্ষণাগারে দিবারাত্রি পরীক্ষা করিয়া যে সকল রহস্যের সন্ধান পাইতেছেন, সে গুলিকেই কারখানার কাজে প্রয়োগ করিয়া বাণিজ্যের যে কত উন্নতি করিতেছেন, তাহার ইয়ত্তা হয় না।

যে গভীর বায়ুর আবরণ আমাদের পৃথিবীকে ঘিরিয়া রহিয়াছে, অক্সিজেন্ ও নাইট্রোজেন্ নামক দুইটি স্বচ্ছ বায়বীয় বস্তু তাহার প্রধান উপাদান। সচরাচর আমরা যে সকল বস্তু দেখিতে পাই, তাহাতে প্রচুর অক্সিজেন্ ও নাইট্রোজেন্ আছে, কিন্তু এগুলিতে উহারা সংযুক্ত অবস্থায় থাকে বলিয়া সেই সকল পদার্থ হইতে অক্সিজেন্ বা নাইট্রোজেন্ সংগ্রহ করিয়া কাজে লাগান কঠিন হয়। তা ছাড়া এ প্রকারে যে অক্সিজেন্ ও নাইট্রোজেন্ পাওয়া যায় তাহার পরিমাণও অধিক হয় না। কিন্তু এই প্রকারে নাইট্রোজেন্ সংগ্রহ করা ব্যতীত আর উপায় ছিল না। মানুষ নাইট্রোজেনের সমুদ্রে ডুবিয়া থাকিয়াও মুক্ত নাইট্রোজেন্কে কি প্রকারে কাজে লাগান যাইতে পারে, তাহা জানিত না। গত কয়েক বৎসরের চেষ্টায় বায়ুর নাইট্রোজেনকে আজ কাল নানা কার্য্যে প্রয়োগ করা হইতেছে।

নাইট্রোজেন্যুক্ত যে সকল পদার্থ আজ কাল ব্যবসায় বাণিজ্যে পরিহার্য্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহাদের নাম করিতে গেলে, প্রথমেই নাইট্রিক্ এসিড্ নামক দ্রাবকের কথা মনে পড়িয়া যায়। কলকারখানার কাজে ইহার ন্যায় অত্যাবশ্যক বস্তু আর খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণ বায়ুর নাইট্রোজেন লইয়া নাইট্রিক এসিড্ প্রস্তুত করিবার জন্য দীর্ঘ কাল চেষ্টা করিয়া আসিতেছিলেন। সম্প্রতি ইহাদের চেষ্টা সার্থক হইয়াছে। বায়ুর নাইট্রোজেনে বিদ্যুৎ পরিচালন করিয়া ইংরাজ বৈজ্ঞানিক হান্পসন্ (উৎ. ডরষষরধস ঐধহঢ়ংড়হ) নাইট্রিক এসিড্ প্রস্তুতের এক উপায় আবিষ্কার করিয়াছেন। ইতিমধ্যেই নরওয়ের এক বৃহৎ জলপ্রপাতের নিকট এই উপায়ে এসিড্ প্রস্তুতের জন্য এক কারখানার প্রতিষ্ঠা হইয়াছে। জলপ্রপাতের শক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হইতেছে এবং তাহারই সাহায্যে নাইট্রিক্ এসিড্ প্রস্তুতের কার্য্য চলিতেছে।

সোরা (ঝধষঃঢ়বঃৎব) জিনিসটা আমাদের কম প্রয়োজনে লাগে না। জমির উর্ব্বরতা বৃদ্ধির জন্য ইহা একটি উৎকৃষ্ট সার। তা ছাড়া বারুদ প্রভৃতি প্রস্তুতে ইহার যথেষ্ট ব্যবহার আছে। স্বভাবতঃ নানা স্থলে যে সোরা উৎপন্ন হয়, এ পর্য্যন্ত তাহাই সংগ্রহ করিয়া লোকে কাজ চালাইত। নাইট্রোজেন্কেই ইহার প্রধান উপাদান দেখিয়া, বায়ুর নাইট্রোজেন লইয়া কোন প্রকারে জিনিসটাকে প্রস্তুত করিবার জন্য খুব চেষ্টা চলিতেছিল। বায়ুর ভিতর দিয়া বিদ্যুৎ পরিচালন করিয়া বৈজ্ঞানিকগণ সম্প্রতি কৃত্রিম সোরার প্রস্তুতে কৃতকার্য্য হইয়াছেন।

আমোনিয়া জিনিসটাও নাইট্রোজেন্-প্রধান, এবং কারখানায় ইহার ব্যবহারও যথেষ্ট। বায়ুর নাইট্রোজেন্ হইতে ইহারও এক প্রস্তুত-উপায় অল্পদিন হইল আবিষ্কৃত হইয়াছে। অধ্যাপক হাবের (ঐধনবৎ) নামক জনৈক জর্ম্মান্ ইহার উদ্ভাবক। আমোনিয়া প্রস্তুতের নূতন কারখানার প্রতিষ্ঠার আয়োজন চলিতেছে। অনেকে আশা করিতেছেন, হয় ত অল্পদিনের মধ্যে জিনিসটা খুব সুলভ হইয়া দাঁড়াইবে।

ভূ-গর্ভ হইতে তা¤্রলৌহ ও স্বর্ণরৌপ্য প্রভৃতি ধাতুগুলিকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখন তাহারা বিশুদ্ধ অবস্থায় থাকে না। নানা বিজাতীয় বস্তুর সহিত মিশ্রিত হইয়া সেগুলি আকারে-প্রকারে এমন বিচিত্র অবস্থায় থাকে যে, সেগুলিকে ধাতু বলিয়া চিনিয়া লওয়া কঠিন হয়। এই সকল অবিশুদ্ধ ধাতুকে শুদ্ধ করিবার জন্য যে সকল উপায় প্রচলিত আছে, তাহাদের কোনটিই সহজ বা অল্পব্যয়সাধ্য নয়। স্বর্ণ বা রৌপ্যকে যদি ঠিক স্বর্ণ বা রৌপ্যের আকারেই খনিতে পাওয়া যাইত, তাহা হইলে সেগুলি এত দুর্ম্মূল্য হইয়া দাঁড়াইত না। অনেক স্থলেই জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ধাতুকে শুদ্ধ করিতে হয়। গত ত্রিশ বৎসরের চেষ্টায় বিদ্যুতের সাহায্যে যে সকল শুদ্ধিপ্রথার আবিষ্কার হইয়াছে, তাহা রসায়ন-শাস্ত্রকে কম উন্নত করে নাই। স্বর্ণ, রৌপ্য ও তা¤্র এই তিনটি প্রধান ধাতুকে আকরিক যৌগিক পদার্থ হইতে আজকাল এত সহজে বিচ্ছিন্ন করা হইতেছে যে, তাহার বিবরণ শুনিলে বিস্মিত হইতে হয়। লৌহ জিনিসটা সুলভ হইলেও ইহাকে বিশুদ্ধ অবস্থায় সংগ্রহ করা বড় কঠিন। অথচ বিশুদ্ধ লৌহের যথেষ্ট প্রয়োজন আছে। সাধারণ লৌহে তার প্রস্তুত করিতে গেলে, যে শ্রম লাগে, বিশুদ্ধ লৌহ লইয়া কার্য্য করিলে তাহার শতাংশ শ্রমেরও আবশ্যক হয় না। তা ছাড়া বৈদ্যুতিক যন্ত্রাদিতে এই প্রকার লৌহের চুম্বক ব্যবহার করিলে অল্প শক্তিতে অনেক কাজ আদায় করা যাইতে পারে। জার্ম্মানির লিপ্জিক্ (খবরঢ়ংরপ) নগরের কারখানায় যে বিশুদ্ধ লৌহ প্রস্তুত করা হইতেছে, তাহা দ্বারা আজকাল অনেক যন্ত্রাদি নির্ম্মাণ করিয়া পরীক্ষা চলিতেছে। সাধারণ যন্ত্রের তুলনায় বিশুদ্ধ লৌহনির্ম্মিত কলে প্রায় আড়াই গুণ অধিক কাজ পাওয়া যাইতেছে। ইহা কম লাভের কথা নয়!

এক সূর্য্যরে তাপই পৃথিবীর সমগ্র শক্তির ভা-ারকে পূর্ণ করিয়া রাখে। যে কয়লা পোড়াইয়া আমরা বাষ্পযন্ত্র বা বিদ্যুতের যন্ত্র চালাইতেছি, তাহা উদ্ভিদের দেহে সঞ্চিত শক্তি ব্যতীত আর কিছুই নয়। উদ্ভিদ্ আবার অতি প্রাচীন যুগে সেই শক্তি সূর্য্যতাপ হইতে আহরণ করিয়া দেহে সঞ্চিত রাখিয়াছিল। কাজেই কয়লার শক্তিকে সৌরশক্তিরই রূপান্তর বলিতে হয়। যে জলপ্রতাপকে শৃঙ্খলিত করিয়া আজকাল নানা কাজ করাইয়া লওয়া হইতেছে অনুসন্ধান করিলে দেখা যায়, তাহাদের শক্তিও সৌরশক্তি। পর্ব্বত-চুড়ায় জলের সঞ্চয় সূর্য্যতাপেরই কাজ। এই জলই সেই সৌরশক্তিকে বক্ষে ধরিয়া রাখে এবং তার পরে নীচে নামিবার সময় তাহারই বিকাশ দেখায়। বুদ্ধিমান মানুষ এই সুযোগ ছাড়িতে চায় না, নি¤œগামী জলের প্রবাহ দ্বারা চাকা ঘুরাইয়া অনেক কাজ করাইয়া লয়।

কয়লায় যে শক্তি সঞ্চিত থাকে, পোড়াইলেই তাহা তাপালোকে পরিণত হইয়া ক্ষয় প্রাপ্ত হইতে থাকে। ক্ষয়ের সময় ষোল আনা শক্তিকেই যদি আমরা কাজে লাগাইতে পারি, তাহা হইলেই আমাদের লাভ হয়, কিন্তু অতি উৎকৃষ্ট যন্ত্রেও কয়লা পোড়াইলেও সমগ্র শক্তিকে আমরা কাজে লাগাইতে পারি না; অধিকাংশই বৃথা তাপালোক উৎপন্ন করিয়া এবং পার্শ্বের জলস্থলবায়ুকে অনাবশ্যক গরম করিয়া নিয়তই নষ্ট হইতেছে। হিসাব করিলে দেখা যায়, এই অপব্যয়ের পরিমাণ শতকরা ৮৫ ভাগ। অর্থাৎ এক শত ভাগ শক্তির মধ্যে কেবল ১৫ ভাগ মাত্র কল চালায়। এই অপচয় বড় অল্প নয়। দীর্ঘকাল এক প্রকার বাজে খরচের প্রশ্রয় দিতে থাকিলে, কয়লার অভাবে কল-কারখানা বন্ধ হইবার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। এই সকল কারণে বিজ্ঞানসম্মত প্রথায় কয়লা পোড়াইয়া, তাহার অধিকাংশ শক্তিকে কাজে লাগাইবার জন্য আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণ যথেষ্ট চেষ্টা করিতেছেন। গত কয়েক বৎসরের রসায়ন-শাস্ত্রের ইতিহাস অনুসন্ধান করিলে দেখা যায়, ইহারা উদ্দেশ্য-সিদ্ধির পথে যেন কতকটা অগ্রসর হইয়াছেন। সাধারণ চুল্লীতে পোড়াইলে কয়লা হইতে যে কতকগুলি অনাবশ্যক বাষ্প উৎপন্ন হয়, তাহাই শক্তিকে ক্ষয় করায়। আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণ এই সকল বাষ্পকে ছাড়িয়া না দিয়া, তাহাদিগকে কলে পোড়াইবার ব্যবস্থা করিতেছেন এবং আংশিক কৃতকার্য্যও হইয়াছেন। এই প্রকারে কয়লা পোড়াইতে আরম্ভ করিলে, এখন যে পরিমাণ শক্তি কজে লাগানো যাইতেছে তাহার অন্ততঃ চতুর্গুণ শক্তি আমাদের করায়ত্ত হইবে বলিয়া আশা হইতেছে। তা ছাড়া কয়লার বাষ্প প্রস্তুত করিতে গেলে, যে আল্কাতরা ও আমোনিয়া উৎপন্ন হইবে তাহাও নষ্ট হইবে না।

এই ত গেল অজৈব রসায়নের (ওহড়ৎমধহরপ ঈযবসরংঃৎু) উন্নতির কথা। জৈব রসায়নের নানা বিভাগে গত কুড়ি বৎসরে বহু উন্নতির লক্ষণ প্রকাশ পাইয়াছে। কৃত্রিম রবার, কৃত্রিম শর্করা এবং নানা জাতীয় কৃত্রিম রঙ্গ ও গন্ধদ্রব্য প্রস্তুত করিয়া জর্ম্মানি প্রভৃতি দেশগুলি কি প্রকারে ধনশালী হইয়া দাঁড়াইতেছে, তাহার বিশেষ বিবরণ প্রদান নিষ্প্রয়োজন। কৃত্রিম নীল প্রস্তুতের উপায় উদ্ভাবনের পর হইতে আমাদের দেশ হইতে নীল চাষ এক প্রকার লোপ পাইয়াই গিয়াছে। সুলভ কৃত্রিম রঙ্গ হাতের গোড়ায় পাইয়া লোকে এখন আর মহার্ঘ লাক্ষারস বা মঞ্জিষ্ঠা রঞ্জনকার্য্যে ব্যবহার করে না। যাহা হউক এই সকল কৃত্রিম জিনিসের প্রস্তুতোপায় কি প্রকারে আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহা আলোচনা করিতে গেলে জৈব রসায়নশাস্ত্রের অধিকারে আসিয়া পড়িতে হয়। আমরা প্রবন্ধান্তরে ইহার আলোচনা করিব।

জৈব রসায়ন-শাস্ত্রের ইতিহাস অনুসন্ধান করিলে, হইাকে একটা সম্পূর্ণ নূতন শাস্ত্র বলিয়া বোধ হয়। প্রাচীন বৈজ্ঞানিকগণ সত্যই ইহার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতে পারেন নাই। প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্মমৃত্যু ও উন্নতি-অবনতি একটা সৃষ্টিছাড়া বিশেষ নিয়মে নিয়মিত হয় বলিয়া ইহাদের একটা বিশ্বাস ছিল এবং এই বিশ্বাসই তাঁহাদিগকে জৈব রসায়নের মূলতত্ত্বানুসন্ধানে নিরস্ত করিত। একই মহানিয়মের অধীন হইয়া যে ধাতু-অধাতু, জড়-অজড় সকল বস্তুই ব্রহ্মা-ে অবস্থান করিতেছে এই মহা-সত্যটিকে আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণই প্রত্যক্ষ দেখিয়াছিলেন, সুতরাং ইহারা জীবরাজ্যের প্রণালীকে মানুষের দুরধিগম্য মনে করিতে পারেন নাই। গত কয়েক বৎসরে বৈজ্ঞানিকগণ নানা আবিষ্কার দ্বারা জৈব রসায়ন শাস্ত্রের যে উন্নতি করিয়াছেন তাহা সত্যই বিস্ময়কর। অতি অল্পদিনের মধ্যে ইহারা প্রায় দেড়লক্ষ জৈব পদার্থের বিশ্লেষ করিয়া, তাহাদের খুঁটিনাটি ব্যাপার আবিষ্কার করিয়াছেন। এই র্কায্য যে, কত শ্রম ও কৌশলসাধ্য তাহা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিকগণ অক্লান্ত পরিশ্রমে তাহার সুসাধন করিয়া বিজ্ঞানের একটা বৃহৎ অভাব মোচন করিয়াছেন।

শিল্পীর কৌশলে যেমন কেবল ইট, চূর্ণ ও কাঠ সুদৃশ্য অট্টালিকায় পরিণত হয়, সেইপ্রকার অঙ্গার, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন্ ও নাইট্রোজেন্ প্রভৃতি কয়েকটি মূলপদার্থের অপূর্ব্ব সম্মিলনে এই জীবজগতের গঠন হয়। প্রকৃতি যে কৌশলে প্রাণী ও উদ্ভিদকে সৃষ্টি ও পোষণ করিতেছেন, তাহা আবিষ্কার করিয়া পরীক্ষাগারে জৈব পদার্থ প্রস্তুত করিবার একটা প্রবল আকাক্সক্ষা আধুনিক বৈজ্ঞানিকদিগকে অভিভূত করিয়াছে। যে কৌশলে জড় জীব হইয়া দাঁড়ায় কোন কালে তাহা বিজ্ঞানের আয়ত্তে আসিবে কি না, তাহা অবশ্যই এখন বলা চলে না। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে সহজ জৈব পদার্থ প্রস্তুতের যে সকল উপায় জানা গিয়াছে, তাহা দেখিলে, বৈজ্ঞানিকগণ যে তাঁহাদের লক্ষ্যের অভিমুখে ক্রমেই অগ্রসর হইতেছেন তাহা বুঝা যায়।

জৈব পদার্থকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যাইতে পারে। প্রথম, বসা অর্থাৎ চর্ব্বি; দ্বিতীয়, কার্বো হাইড্রেড্ অর্থাৎ অঙ্গার ও হাইড্রোজেন্ যুক্ত সামগ্রী; তৃতীয় প্রটিনস্ অর্থাৎ দেহের মাংসাদির প্রধান উপাদান।

বহুদিন হইল ফরাসী বৈজ্ঞানিক বাঁৎলো (ইধৎঃযবষড়ঃ) পরীক্ষাগারে কৃত্রিম চর্ব্বি প্রস্তুতে কৃতকার্য্য হইয়াছিলেন। কৃত্রিম কার্বোহাইড্রেড্ আজ প্রায় কুড়ি বৎসর ধরিয়া জর্ম্মানিতে প্রস্তুত হইতেছে। চিনি জিনিসটা এই শ্রেণীভুক্ত। এখন কৃত্রিম শর্করা বাজারেই সুলভ। কিন্তু গত দশ বৎসরের চেষ্টাতেও কেহ প্রটিন্ পদার্থটি প্রস্তুতের উপায় নির্দ্ধারণ করিতে পারেন নাই। কিন্তু চেষ্টা নিরর্থক হয় নাই। জীবনের ক্রিয়ায় প্রাণী ও উদ্ভিদের দেহে যে সকল পরিবর্ত্তন হয়, তাহার প্রকৃতি এই চেষ্টায় প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছে। জীবনের ক্রিয়া ও রাসায়নিক ক্রিয়া যে অভিন্ন এখন তাহা স্বীকার করিতেই হইতেছে; পুষ্টি, বৃদ্ধি, সন্তান-জনন প্রভৃতি সকল জৈব ব্যাপারেরই মূলে রসায়নের মূলতত্ত্ব বর্ত্তমান। কৃত্রিম জৈব পদার্থ প্রস্তুত করিতে গিয়া বৈজ্ঞানিকগণ জীবতত্ত্বের যে সকল রহস্যের কথা প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা আধুনিক বিজ্ঞানকে যথেষ্ট লাভবান করিয়াছে।

জৈব পদার্থের এক শ্রেণীর উপাদানকে বৈজ্ঞানিকগণ সেলুলোস্ (ঈবষষঁষড়ংব) বলেন। ইহাতে কেবল অঙ্গার ও হাইড্রোজেনেরই প্রাধান্য দেখা যায়। গাছের ছাল, আঁশ, কাঠ এবং তুলা প্রভৃতি অনেক জিনিস এই পদার্থেই গঠিত। কৃত্রিম সেলুলস্ প্রস্তুতের উপায় আবিষ্কৃত হওয়ায়, এখন যে ইহা দ্বারা কত ব্যবহার্য্য দ্রব্য প্রস্তুত হইতেছে তাহার ইয়ত্তা হয় না। এই সকল দ্রব্যের জন্য পূর্ব্বে মানুষকে যথেষ্ট ক্লেশ স্বীকার করিতে হইত। কাগজ, নির্ধূম বারুদ, কৃত্রিম রেসম, কৃত্রিম কেশ ও চর্ম্ম প্রভৃতি প্রস্তুত করিতে এখন কৃত্রিম সেলুলসের ব্যবহার হইতেছে।

বাজারে আজকাল নানা জাতীয় রঙের গুঁড়া অল্পমূল্যে বিক্রয় করা হয়, সেগুলিকেও জৈব রসায়ন শাস্ত্রের উদাহরণ বলা যাইতে পারে। আল্কাতরা হইতে এই সকল রঙ প্রস্তুত করা হয়। জার্ম্মানি এই রঙ্গের ব্যবসায়ে সকল জাতিকে পরাজিত করিয়াছে। অনেক সময় দেখা যায়, জৈব পদার্থকে কৃত্রিম উপায়ে প্রস্তুত করিতে গেলে, অত্যন্ত অধিক ব্যয় হয়; কাজেই এই প্রকারে প্রস্তুত দ্রব্য বাজারে স্থান পায় না। কিন্তু রঙ সম্বন্ধে এ কথা বলা চলিতেছে না। আজকাল এত অল্প ব্যয়ে নানা জাতীয় কৃত্রিম রঙ প্রস্তুত হইতেছে যে, প্রাণী ও উদ্ভিদের দেহজাত রঙের আর আবশ্যকতা দেখা যাইতেছে না। শেফালি বা পলাশ ফুলের রঙে এখন আর কেহ বস্ত্র রঞ্জন করে না। জর্ম্মানির রঙ এখন অলক্তক রসকেও নির্ব্বাসিত করিয়াছে। নীলের জন্য বিদেশে ভারতের যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। সুলভ কৃত্রিম নীল এখন নীলের চাষের উচ্ছেদ করিয়াছে। বাঙ্গলাদেশে আর নীলের আবাদ নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।

রবার আধুনিক সভ্যতার একটা প্রধান উপকরণ। গাড়ীর চাকা, জুতার তলা, এবং গায়ের কোর্ত্তা প্রভৃতির প্রস্তুতে ইহার যথেষ্ট ব্যবহার আছে। তা’ছাড়া কল-কারখানার কাজে এবং সৌখীন ও খেলার জিনিস প্রস্তুতে ইহার ব্যবহার অপরিহার্য্য বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। এ পর্য্যন্ত রবারের জন্য রবার-গাছের চাষ করিতে হইত, কাজেই জিনিসটার মূল্যও বড় কম ছিল না। বহু চেষ্টার পর জর্ম্মানির রসায়নবিদগণ কৃত্রিম রবার প্রস্তুতোপায় আবিষ্কার করিয়াছেন। হিসাব করিলে দেখা যায়, প্রতি বৎসরেই এখন প্রায় কুড়িলক্ষ মণ রবারের ব্যবহার হইতেছে; ইহার মূল্য প্রায় তেইশ কোটি টাকা। বলা বাহুল্য অল্পদিনের মধ্যে বাজারে সুলভ কৃত্রিম রবার দেখা দিবে। আজ দশ বৎসর হইল জর্ম্মান্ প-িত ডাক্তার হফ্ম্যান্ কৃত্রিম রবার প্রস্তুতের উপায় আবিষ্কার করিয়াছেন।

যে সকল প্রাকৃতিক দ্রব্য সংগ্রহ করিয়া আমরা কাজ চালাই, সেগুলি সকল সময়ে ঠিক্ আমাদের মনের মত হয় না। কাজেই নানা ব্যয়সাধ্য উপায়ে কার্য্যােপযোগী করিয়া সেগুলিকে কাজে লাগাইতে হয়। গাছের আঁশগুলি যদি কাগজের মত সাদা হইয়া জন্মাইত, তাহা হইলে কাগজ-প্রস্তুতের জন্য তাহাদিগকে নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আর সাদা করিতে হইত না। ইহার ফলে বাজারে কাগজ সুলভ হইত। বিশেষ বিশেষ জৈব পদার্থ প্রস্তুত করিতে গিয়া বৈজ্ঞানিকগণ সেগুলিকে অবিকল প্রকৃতির অনুকরণে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেন না, কৃত্রিম জৈব জিনিসগুলি যাহাতে ঠিক্ ব্যবহাররোপযোগী হইয়া কারখানা হইতে বাহির হয়, তাহারি প্রতি সকলের দৃষ্টি আছে। রবার প্রস্তুত করিতে গিয়া, বৈজ্ঞানিকগণ রবারের অনুরূপ আরো কতকগুলি নূতন দ্রব্য প্রস্তুত করিয়াছেন। শুনা যাইতেছে এগুলি রবার অপেক্ষাও কার্য্যােপযোগী হইয়াছে।

কর্পূর জিনিসটা সম্পুর্ণ জৈব। জাপান সা¤্রাজ্যের এবং ফিলিপাইন্ দ্বীপপুঞ্জের অনেক স্থানে কর্পূর বৃক্ষের চাষ করিয়া ব্যয়সাধ্য প্রক্রিয়ায় কর্পূর সংগ্রহ করা হইত। বলা বাহুল্য ইহাতে জাপানের যথেষ্ট লাভ ছিল। এখন বাজারে যে কর্পূর বিক্রয় হয় তাহার বারো আনা কৃত্রিম। আকৃতি প্রকৃতিতে ইহা অবিকল জৈব কর্পূরের অনুরূপ। আজকাল স্ফটিক (অসনবৎ) জিনিসটা খুবই সুলভ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। চিরুণী চুরুটের নল, গলার হার প্রভৃতি অনেক জিনিসই আজকাল অবিকল স্ফটিকের ন্যায় অর্দ্ধ স্বচ্ছ পদার্থ দিয়া গড়া হইতেছে। বলা বাহুল্য এগুলি আকরিক স্ফটিক নয়; বহু পরিশ্রমে রসায়নবিদ্গণ কৃত্রিম স্ফটিক প্রস্তুতের যে উপায় উদ্ভাবন করিয়াছেন তাহা দুর্লভ স্বাভাবিক স্ফটিককে নির্ব্বাসিত করিয়াছে।

জৈব রসায়নশাস্ত্রের উন্নতিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানও কম লাভবান হয় নাই। অহিফেন বা তা¤্রকুটসার প্রভৃতি উদ্ভিদবিধ পূর্ব্বে উদ্ভিদ হইতেই সংগ্রহ করা হইত। এখন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তাহা কারখানাতেই অতি সহজে প্রস্তুত করা হইতেছে।

প্রাণীশরীরে আদ্রেনালিন্ (অফৎবহধষরহ) নামক এক পদার্থে আপনা হইতেই সঞ্চিত হয়। জীবনের কার্য্যে ইহার যথেষ্ট প্রয়োজন আছে। শরীরের কোন অংশে বিশেষ কারণে রক্ত আবদ্ধ হইয়া পড়িলে, সেখানে এই পদার্থটা স্বতই উৎপন্ন হইয়া রক্তের চাপকে নিয়মিত করে। সম্প্রতি ডাক্তার ষ্টলজ্ (ঝঃড়ষু) নামক জনৈক বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক প্রাণিশরীরের এই পদার্থটিকে কয়লা হইতে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করিয়াছেন। শরীরের কোন অংশে ইহার প্রলেপ দিলে, রক্তকোষগুলি সঙ্কুচিত হইয়া প্রলেপযুক্ত অংশটিকে প্রায় রক্তশূন্য করে। অস্ত্রচিকিৎসায় এই পদার্থটি বিশেষ সহায় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অস্ত্রপ্রয়োগে যখন বৃথা রক্তপাতের আশঙ্কা হয়, চিকিৎসকগণ তখন দেহের রুগ্ন অংশে ইহার প্রয়োগ দিবার ব্যবস্থা করেন। ইহাতে রক্ত চারিদেকে ছড়াইয়া পড়ে কাজেই অস্ত্র প্রয়োগে আর রক্তপাত হয় না।

জৈব রসায়নের উন্নতিতে গন্ধদ্রব্যের প্রস্তুত-বিধির এক যুগান্তর উপস্থিত হইয়াছে। ফুল সংগ্রহ করিয়া শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া দ্বারা গন্ধ-দ্রব্য প্রস্তুত প্রণালী এখন প্রায় লোপ পাইতে বসিয়াছে। ফুলের যে অংশ গন্ধের উৎপাদক তাহা বিশ্লেষ করিলে কতকগুলি মূল গন্ধ-দ্রব্যের সন্ধান পাওয়া যায়। এক গোলাপের আতরে এই প্রকার প্রায় কুড়িটি মূল গন্ধের মিশ্রণ আছে। রসায়নবিদ্গণ কৃত্রিম উপায়ে এই সকল মূল গন্ধদ্রব্য প্রস্তুত করিবার উপায় উদ্ভাবন করিয়াছেন। এই প্রকারে প্রস্তুত গন্ধ-দ্রব্যগুলিকে নানা প্রকারে মিশ্রিত করিয়া ইহার এখন শত শত সুন্দর গন্ধ-দ্রব্য প্রস্তুত করিতেছেন। কৃত্রিম সুলভ আতরকে এখন সত্যই স্বাভাবিক আতর হইতে পৃথক করা কঠিন। গত বৎসরে এক জর্ম্মানি হইতেই প্রায় ত্রিশ কোটি মুদ্রার গন্ধ-দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য বিদেশে প্রেরিত হইয়াছে।

[লেখকের নিজস্ব বানানরীতি অক্ষুণ্ন আছে।]

***************************************

মঞ্জুর আহমদ
………………..
ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্ব

নিদ্রামগ্ন মানুষের চৈতন্য থেকে পার্থিব জগতের বাস্তব রূপ যখন বিলুপ্ত হ’য়ে যায় তখনই তার মনশ্চক্ষে এক অপরূপ স্বপ্নরাজ্যের দ্বার উন্মোচিত হয় এবং সে এক রহস্যময় স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ শুরু করে। এই স্বপ্নরাজ্য চিরকালই মানুষের কাছে যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনি রহস্যময় বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ফলে আদিকাল হতেই মানুষ স্বপ্নের রহস্য উদ্ঘাটনে অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠেছে এবং স্বপ্ন সম্পর্কে বিভিন্ন লৌকিক ও অলৌকিক ব্যাখ্যা দান করেছে। মনোবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণভাবে বলা যায় যে, ঘুমন্ত মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তাধারাই মানসিক প্রতিরূপ (সবহঃধষ রসধমব) ধারণ করে স্বপ্ন আকারে প্রতিভাত হয়। এখন প্রশ্ন ওঠে যে কোন ধরনের চিন্তাধারা ঘুমন্ত ব্যক্তির মনে উদিত হয়, এবং কেন? এ প্রসঙ্গে ফ্রয়েড যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে অনন্য ও অভাবিতপূর্ব।

বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভেই ভিয়েনার প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড তার সুপ্রসিদ্ধ মনঃসমীক্ষণিক মতবাদ (চংুপযড়ধহধষুঃরপ ঃযবড়ৎু) উপস্থাপন করেন। এ মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি মানুষের স্বপ্ন ব্যাখ্যা করেছেন। সে জন্যই তার স্বপ্নতত্ত্ব আলোচনার পূর্বে তার মনঃসমীক্ষণিক মতবাদের দুএকটি মৌলিক বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

প্রথমত আমরা উল্লেখ করতে পারি যে, ফ্রয়েড মানুষের মনকে সজ্ঞান (পড়হংপরড়ঁং) ও নির্জ্ঞান (ঁহপড়হংপরড়ঁং) নামক প্রধান দুটি স্তরে বিভক্ত করেছেন। ভাসমান হিমশৈলের মত মনের এক তৃতীয়াংশ মাত্র উপরের সজ্ঞান স্তরে বিরাজ করে; বাকী দুই তৃতীয়াংশ নির্জ্ঞান স্তরে নিমজ্জিত থাকে। মানুষের জন্মগত প্রবৃত্তিসমূহ এবং লজ্জাজনক ও পীড়াদায়ক অনুভূতিসমূহ এই নির্জ্ঞান স্তরে অবস্থান করে এবং এগুলো এতই কুৎসিৎ, জঘন্য ও ঘৃণ্য প্রকৃতির হয় যে, এগুলো কোনক্রমেই ব্যক্তির নিজের কাছেই অনুমোদনযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে এগুলো সাধারণভাবে সজ্ঞান স্তরে প্রবেশের কোন সুযোগই পায়না। নির্জ্ঞান মন সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তির অগোচরে থাকলেও, তা কিন্তু পরোক্ষভাবে তার আচরণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। নির্জ্ঞান মন সম্পর্কে ফ্রয়েডের এই ধারণা প্রায় সকল মনোবিজ্ঞানীরই অকুণ্ঠ স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং এদিক দিয়ে ফ্রয়েডের অবদান নিঃসন্দেহে অবিস্মরণীয়।

দ্বিতীয়ত আমরা উল্লেখ করতে পারি যে, ফ্রয়েড অদস (ওফ), অহম (ঊমড়) ও অতি-অহম নামে মনের তিনটি সত্ত্বার কথা বলেছেন। অদস হচ্ছে মানুষের আদি সত্ত্বা বা আদিম প্রবৃত্তি যা সর্বদাই সুখ আহরণ করে অযৌক্তিকভাবে ভোগীর ভূমিকা গ্রহণে প্রয়াসী। অদস যেহেতু আদিম, অযৌক্তিক ও অশালীন কামনা বাসনার আধার, সেহেতু এটা সম্পূর্ণরূপে নির্জ্ঞান স্তরে অবস্থিত। অতি-অহম হচ্ছে মানুষের নৈতিক সত্ত্বা যা সর্বদাই কঠোর ন্যায়নীতি অনুসরণ করে অযৌক্তিকভাবে ত্যাগীর ভূমিকা গ্রহণে প্রয়াসী। অহম হচ্ছে মানুষের বাস্তব সত্ত্বা যা মানুষের ভোগ ও ত্যাগ লিপ্সার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত সমন্বয় সাধন করেÑ অন্তরের কল্পজগৎ ও বাহিরের বাস্তব জগতের সাথে একটি বাস্তবধর্মী সংযোগ স্থাপন করে। অহমই হচ্ছে মনের নির্বাহী সত্ত্বা যা মনের সঙ্গত ও বস্তুনিষ্ঠ আকক্সক্ষাগুলো পূরণের যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং অসঙ্গত, অবাস্তব বা অবৈধ আকাক্সক্ষাগুলোকে অবদমন করে নির্জ্ঞান স্তরে প্রেরণ করে ও সেগুলোকে সজ্ঞান স্তরে প্রবেশে বাধা দান করে। সুতরাং অহম সজ্ঞান মনের প্রহরী রূপেও কাজ করে।

তৃতীয়ত মানুষের সফল প্রেষণা বা প্রেরণার উৎসরূপে যৌন তাড়নাকেই ফ্রয়েড প্রায় এককরূপে প্রাধান্য দিয়েছেন। ফ্রয়েডের মতে মানুষের এই যৌন তাগিদগুলো এরূপ অসামাজিক অবৈধ ও অশ্লীল ধরনের হয় যে, মানুষ তা নিজের কাছেই স্বীকার করতে যেয়ে চরমভাবে বিব্রত ও পীড়িত বোধ করে। ফলে এগুলো অবদমিত হয়ে নির্জ্ঞান স্তরে প্রেরিত হয়। এই অতৃপ্ত কামনা বাসনাগুলো অবদমিত হলেও এদের শক্তি কিন্তু নিঃশেষিত হয় না। স্বীয় তৃপ্তি লাভের জন্য এগুলো অহরাত্র সচেষ্ট থাকে।

ফ্রয়েডের মতে মানুষের অতৃপ্ত কামনা-বাসনাই স্বপ্ন সৃষ্টির মূল কারণ। মানুষের নিদ্রিত অবস্থায় যখন অহমের প্রহরাকার্য কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে তখনই অবদমিত কামনাগুলো সংগোপনে মনের সজ্ঞান স্তরে প্রবেশ করে এবং আকাক্সিক্ষত বস্তুও মানসচিত্র (সবহঃধষ রসধমব) সৃষ্টি করে আংশিকভাবে আত্মতৃপ্তি লাভের চেষ্টা করে। অতৃপ্ত কামনা-বাসনাসঞ্জাত এই মানসচিত্রগুলোই নিদ্রিত ব্যক্তির কাছে স্বপ্নরূপে প্রতিভাত হয়। কাম্যবস্তুর মানসিক প্রতিচ্ছবি গঠন মনের একটি স্বাভাবিক ধর্ম। যেমন উপবাসরত ব্যক্তির মানসপটে মনোলভা সব খাদ্যবস্তুর প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। এই মানসিক প্রতিচ্ছবি গঠনকে ফ্রয়েড অদস (ওফ) এর প্রাথমিক প্রক্রিয়া (চৎরসধৎু ঢ়ৎড়পবংং) রূপে আখ্যায়িত করেছেন। কাম্যবস্তুর মানসিক প্রতিচ্ছবি গঠন করে অদস কিছুটা আত্মতৃপ্তি লাভ করে। কারণ অদসের কোন বাস্তব জ্ঞান নেই। ফলে বস্তুর বাস্তুরূপ ও এর মানসিক প্রতিরূপের মধ্যে কোন পার্থক্যবোধ অদসের থাকে না। সে জন্যই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে অদস কিছুটা আত্মতৃপ্তি অর্জনে সক্ষম হয়। সুতরাং অদসের প্রাথমিক প্রক্রিয়াই আমাদের কাছে স্বপ্নরূপে উপস্থাপিত হয়। অর্থাৎ নিদ্রিত অবস্থায় আমাদের নির্জ্ঞান মনে অবস্থিত অদসের কারণগুলো যখন সজ্ঞান স্তরে প্রবেশ করে বিভিন্ন মানসিক প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি করতে থাকে তখনই আমরা স্বপ্ন দেখি। সে জন্যই ফ্রয়েড স্বপ্নকে মানুষের নিষিদ্ধ কামনা পূরণের প্রয়াস রূপে ব্যাখ্যা করেছেন।

মানুষের কামনা বাসনাগুলো কোন কোন ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষরূপে স্বপ্নে আত্মপ্রকাশ করে তৃপ্তিলাভ করতে পারে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পরোক্ষভাবে আত্মপ্রকাশ করে। এদিক দিয়ে বিচার করে ফ্রয়েড শিশুদের স্বপ্ন ও বয়স্ক ব্যক্তিদের স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছেন। যেহেতু শিশুদের কামনা বাসনাগুলো অত্যন্ত সরল ও নিষ্পাপ, সেহেতু এগুলো স্বপ্নে সরাসরি আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু বয়স্ক ব্যক্তিদের কামনা বাসনাগুলো এতই কলুষযুক্ত ও অবাঞ্ছিত হতে পারে যে এগুলো ব্যক্তি ঘুমন্ত অবস্থাতেও নিজস্ব রূপ নিয়ে সরাসরি সজ্ঞান স্তরে প্রবেশ করতে পারেনা। এগুলো যদি সরাসরি নিজস্ব রূপ নিয়ে সজ্ঞান স্তরে প্রবেশের চেষ্টা করে, তবে এদের কদর্য ও বীভৎস রূপ দেখে নিদ্রিত ব্যক্তির অলস ও অসতর্ক অহমও এরূপ সহসা চমকতি হয়ে উঠবে যে, ব্যক্তির তৎক্ষণাৎ নিদ্রাভঙ্গ হবে। সে জন্যই মানুষের নিষিদ্ধ ও অবদমিত কামনাগুলো কিছুটা পরিবর্তিত রূপ নিয়ে, কিছুটা ছদ্মবেশ ধারণ করে সজ্ঞান স্তরে প্রবেশ করে।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে ঘুমন্ত ব্যক্তির অহম যেমন কিছুটা অলস ও অসতর্ক হয়ে তার প্রহরা কার্যকে শিথিল করে দেয়, অদসের কামনাগুলোও তদ্রূপ কিছুটা ছদ্মরূপ ধারণ করে। ফলে এগুলো নির্বিঘেœ সজ্ঞান স্তরে প্রবেশ করে স্বপ্ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এদিক দিয়ে বিচার করে ফ্রয়েড বলেছেন যে স্বপ্ন হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে অহম ও অদসের মধ্যে একটি পারস্পরিক আপস সম্পাদন। এই পারস্পরিক আপস সম্পাদনের ফলেই অহম যেমন কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে, অদসও তেমনি কিছুটা ছদ্মরূপ ধারণ করে। যদি এই আপস সম্পাদিত না হত তবে একদিকে অদসের কামনাগুলো যেমন বীভৎস রূপ নিয়ে সজ্ঞান স্তরে প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হত, তেমনি অপরদিকে অহমকে সদা সন্ত্রস্ত ও জাগ্রত হয়ে থাকতে হত এবং মানুষ নিদ্রাসুখ থেকে বঞ্চিত হত। স্বপ্নের মাধ্যমে অহম ও অদসের মাঝে একটি আপস নিষ্পত্তি হচ্ছে বলেই মানুষ নির্বিঘেœ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে নিদ্রাসুখ ভোগ করতে পারে।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে মানুষের অবদমিত আদিম কামনাগুলোই তন্দ্রাচ্ছন্ন অহমের অলস ও অসতর্ক মুহূর্তে কিছুটা ছদ্মবেশ ধারণ করে আত্মতৃপ্তি লাভের চেষ্টা করে। যেহেতু এগুলো ছদ্মরূপ ধারণ করে সজ্ঞান স্তরে প্রবেশ করে, সেহেতু স্বপ্নের আসল উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য স্বপ্নদ্রষ্টার কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত থেকে যায় এবং স্বপ্নকে সে নিছক কল্পনা প্রসূত কিছু অবান্তর ও নির্দোষ ঘটনা বলে মনে করে। স্বপ্নের ঘটনা প্রবাহ কোন যুক্তিপূর্ণ অর্থই আমাদের কাছে বহন করে না; অথচ স্বপ্ন আমাদের কাছে তৃপ্তিদায়ক ও মধুময় বলে প্রতিয়মান হয়। কারণ আমাদের আদিম প্রবৃত্তিগুলো আমাদের অজ্ঞাতসারেই স্বপ্নের মাধ্যমে কিছুটা তৃপ্তিলাভ করে।

সুতরাং স্বপ্নে দৃষ্ট ঘটনা প্রবাহ এবং এর মূল কারণ বা উৎস আপাত দৃষ্টিতে ভিন্ন ধরনের হয়। সেজন্য ফ্রয়েড স্বপ্নের দুটো দিকের কথা উল্লেখ করেছেন। একটিকে তিনি বলেছেন ব্যক্ত স্বপ্নরূপে (গধহরভবংঃ ফৎবধস পড়হঃবংঃ) এবং অপরটিকে বলেছেন সুপ্ত-স্বপ্নাকাক্সক্ষা (খধঃবহঃ ফৎবধস ঃযড়ঁমযঃ)। স্বপ্নের যে দৃশাবলি বা ঘটনাবলি আমরা জাগ্রত হয়ে স্মরণ করতে পারি ও অন্যের কাছে বর্ণনা করতে পারি, সেটাকে তিনি ব্যক্ত স্বপ্নরূপ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই ব্যক্ত স্বপ্নরূপ নাটকীয় কিছু ঘটনাপ্রবাহ মাত্র। এর কোন অর্থ বা তাৎপর্য আমাদের কাছে পরিদৃষ্ট হয় না। আমরা এটাকে ঘুমন্ত মানুষের অলস মস্তিষ্কপ্রসূত কিছু অবান্তর ও অহেতুক চিন্তাধারারূপে মনে করি। কিন্তু ফ্রয়েডের মতে এর আসল অর্থ নিহিত রয়েছে সুপ্ত স্বপ্নাকাক্সক্ষায়। যে অবদমিত কামনা ছদ্মবেশে মনের সজ্ঞান স্তরে প্রবেশ করে স্বপ্নের চিত্ররূপ সৃষ্টি করেছে, সেই কামনাকেই ফ্রয়েড বলেছেন সুপ্ত স্বপ্নাকাক্সক্ষা। অর্থাৎ সুপ্ত স্বপ্নাকাক্সক্ষাই ছদ্মবেশ ধারণের মাধ্যমে ব্যক্ত স্বপ্নরূপে রূপান্তর লাভ করেছে। ছদ্মবেশ ধারণের জন্য সুপ্ত স্বপ্নাকাক্সক্ষার প্রকৃতি এরূপ পরিবর্তিত হয়ে যায় যে, এর স্বরূপ আর কোনক্রমেই সনাক্ত করা যায় না। যে প্রক্রিয়ায় সুপ্ত স্বপ্নাকাক্সক্ষা ছদ্মবেশ ধারণ করে ও ব্যক্ত স্বপ্নরূপে রূপান্তর লাভ করে সেটাকেই ফ্রয়েড স্বপ্ন প্রক্রিয়া (ফৎবধস ঢ়ৎড়পবংং) বলেছেন। সুতরাং স্বপ্ন প্রক্রিয়া হচ্ছে সুপ্ত-স্বপ্নাকাক্সক্ষার স্বরূপ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে স্বপ্ন তার আসল রূপের পরিবর্তন সাধন করে। স্বপ্নের এই আত্মরূপ পরিবর্তনের ক্রিয়াকলাপকেই সামগ্রিকভাবে ফ্রয়েডের ভাষায় স্বপ্নের কারুকার্য (ফৎবধস-ড়িৎশ) বলা হয়।

ফ্রয়েডের বর্ণিত স্বপ্নের কারুকার্য সত্যই অভিনবত্ব ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। স্বপ্নের কারুকার্য সাধনের জন্য বিভিন্ন রকমের কলাকৌশল ব্যবহৃত হয়। ফ্রয়েড এগুলোকে স্বপ্নকৌশল (উৎবধস সবপযধহরংস) নামে আখ্যায়িত করেছেন। এই কলাকৌশলগুলো বর্ণনার মাধ্যমেই তিনি স্বপ্ন-কারুকার্যের বৈচিত্র্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি মূলত চার ধরনের স্বপ্ন কৌশলের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হচ্ছে ‘প্রতীকীকরণ’ (ঝুসনড়ষরুধঃরড়হ), ‘ঘনীকরণ’ (ঈড়হফবহংধঃরড়হ), ‘স্থানান্তরকরণ’ (উরংঢ়ষধপবসবহঃ), ও ‘গৌণ অনুযোজনা’ (ংবপড়হফধৎু বষধনড়ৎধঃরড়হ)।

প্রতীকীকরণের ধারণায় ফ্রয়েডের স্বকীয় মৌলিকত্বের অনবদ্য পরিস্ফুটন ঘটেছে। তিনি মনে করেন যে মানুষের অবদমিত আদিম কামনার অনেক আত্ম উপাদনই প্রতীক (ঝুসনড়ষ) আকারে স্বপ্নে আত্মপ্রকাশ করে। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে ফ্রয়েড মানুষের যৌন তাড়নার ওপরই প্রায় একক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

তার মতে আমাদের অবদমিত অধিকাংশ কামনা বাসনাই যৌনমূলক। আর এই যৌন কামনাগুলো সরাসরি স্বপ্নে আত্মপ্রকাশ না করে প্রতীকের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। ফ্রয়েড বিভিন্ন মানুষের স্বপ্ন বিশ্লেষণ করে বহু যৌন ধর্মী প্রতীক উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা দুএকটি প্রতীকের কথা এখানে উল্লেখ করতে পারি। কলা, পেন্সিল, লাঠি প্রভৃতি পুরুষাঙ্গের প্রতীক; দরজা, সুরঙ্গ, গহ্বর প্রভৃতি স্ত্রী যৌনাঙ্গে প্রতীক; ঘোড়ায় চড়া, সাইকেলে চড়া, পাহাড়ে ওঠা প্রভৃতি রতিক্রিয়ার প্রতীকরূপে ব্যবহৃত হয়। আমরা আমাদের শিল্প, সাহিত্য, পৌরাণিক উপকথা, দৈনন্দিন কথোপকথন প্রভৃতি বিভিন্ন উৎস থেকে এই প্রতীকগুলো লাভ করি। কিন্তু স্বপ্ন দেখার সময় আমরা এগুলোকে এদের ব্যক্ত অর্থে গ্রহণ করি। ফলে স্বপ্নের আসল তাৎপর্য আমাদের কাছে অনুদ্্ঘাটিত থেকে যায়।

যখন একই স্বপ্ন একাধিক (কিছু সাদৃশ্যপূর্ণ) কামনা বাসনা একত্রে ওতঃপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত ও সংবদ্ধ হয়ে একটি সংক্ষিপ্তরূপ ধারণ করে, তখন তাকে ‘ঘনীকরণ’ (ঈড়হফবহংধঃরড়হ) বলা হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কামনা বাসনা পরস্পর সংবদ্ধ এরূপ একটি সংক্ষিপ্ত রূপ ধারণ করে যে, এগুলোর কোনটিকেই আর পৃথকরূপে সনাক্ত করা যায় না। ফলে স্বপ্নের আসল তাৎপর্য স্বপ্নদ্রষ্টার কাছে দুর্জ্ঞেয় থেকে যায়।

স্বপ্নের গুরুত্ব যখন মূল কেন্দ্রিয় বিষয় থেকে বিচ্যুত হয়ে কোন অপ্রাসঙ্গিক বা অকিঞ্চিৎকর বিষয়ের ওপর আরোপিত হয়, তখন তাকে ‘স্থানান্তরকরণ’ (উরংঢ়ষধপবসবহঃ) বলে। সুপ্ত স্বপ্নাকাক্সক্ষার যেটি মুখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটি ব্যক্ত স্বপ্নে গৌণ রূপ ধারণ করে। অপর পক্ষে অন্য কোন অপ্রাসঙ্গিক বা অবান্তর বিষয় স্বপ্নের এই কেন্দ্ররূপে ব্যক্ত স্বপ্নে প্রতিভাত হয়। স্বপ্নের এই কেন্দ্র পরিবর্তনের জন্য স্বপ্নের প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ দিকটি স্বপ্নদ্রষ্টার কাছে সম্পূর্ণরূপে গুরুত্বহীন ও অপ্রয়োজনীয় অংশে পরিণত হয়। ফলে এদিকে তার মনোযোগ মোটেও আকৃষ্ট হয় না এবং স্বপ্নের আসল অর্থ তার কাছে দুর্বোধ্যই থেকে যায়।

এূল স্বপ্নচিত্রের সাথে কিছু অতিরিক্ত বিষয় ও দৃশ্যপট সংযোজন করাকেই ‘গৌণ অনুযোজনা’ (ঝবপড়হফধৎু বষধনড়ৎধঃরড়হ) বলে। মানুষের আদিম কামনা বাসনাগুলো যেমন অযৌক্তিক, তেমনি খাপছাড়া ও পরস্পরবিরোধী হয়। ফলে স্বপ্নের মূলচিত্র রূপটি খ–বিখ- ও অসঙ্গতিপূর্ণ হয়। এধরনের বেখাপ্পা স্বপ্ন স্বভাবতই স্বপ্নদ্রষ্টার নিদ্রার বেঘাত ঘটাতে পারে। সুতরাং অতিরিক্ত কিছু দৃশ্য সংযোজন করে মূল স্বপ্নের ফাঁকগুলোকে পূরণ করা হয় এবং এটিকে অধিকতর সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলা হয়। এই গৌণ অনুযোজনার জন্যই আমাদের স্বপ্ন কিছুটা সঙ্গতিপূর্ণ, যুক্তিপূর্ণ ও ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহের রূপ লাভ করে। ব্যক্তির সাম্প্রতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও ঘটনাবলী থেকেই গৌণ অনুযোজনার বিষয়বস্তু গৃহীত হয়। ফলে ব্যক্তি স্বভাবতই বিশ্বাস করে যে স্বপ্ন তার সাম্প্রতিক জীবনের প্রতিফলন মাত্র। সুতরাং এদিক দিয়েও স্বপ্নদ্রষ্টা সহজেই বিভ্রান্ত হয় এবং স্বপ্নের আসল রহস্য তার অগোচরেই থেকে যায়।

সুপ্ত স্বপ্নাকাক্সক্ষার প্রকৃতি এতই কদর্য যে এগুলো আমাদের নিজেদের কাছেই অত্যন্ত পীড়াদায়ক ও মর্মঘাতী হয়ে ওঠে। এদের কদর্যতা ও বীভৎসতাকে লুক্কায়িত রাখার জন্যই স্বপ্নে উপর্যুক্ত কলাকৌশলগুলো ব্যবহৃত হয়। একটি স্বপ্নে একাধিক বা সবগুলো কলাকৌশলেই প্রযুক্ত হতে পারে। সামগ্রিকভাবে এই কলাকৌশলের প্রয়োগকেই স্বপ্নের কারুকার্য বলা হয়েছে। কোন কোন সময় স্বপ্নের কারুকার্য এর উদ্দেশ্য সাধনে (অর্থাৎ সুপ্ত স্বপ্নাকাক্সক্ষার স্বরূপ পরিবর্তনে) ব্যর্থ হতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে স্বপ্নদ্রষ্টার সহসা নিদ্রাভঙ্গ হয়ে যায়। আমরা অনেক সময়ই কোন স্বপ্ন দেখে হঠাৎ হতচকিত হয়ে জেগে উঠি। এর অর্থই হচ্ছে যে আমাদের সেই স্বপ্নের কারুকার্য সফল হয় নি।

ব্যক্ত স্বপ্নরূপকে ক্রমশ ব্যাখ্যা করে করে সুপ্ত স্বপ্নাকাক্সক্ষা উদঘাটনের প্রক্রিয়াকেই ফ্রয়েড স্বপ্ন ব্যাখ্যা (উৎবধস রহঃবৎঢ়ৎবঃধঃরড়হ) নামে অভিহিত করেছেন। একজন অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মনঃসমীক্ষক (ঢ়ংুপযড়-ধহধষুংঃ) মনঃসমীক্ষণিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে ব্যক্ত স্বপ্নরূপ বিশ্লেষণ করতে পারেন। এরূপ ক্রমশঃ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি যে ইঙ্গিতসমূহ লাভ করেন, তা মনঃসমীক্ষণিক তত্ত্বের প্রেক্ষিতে যাচাই করে তিনি সহজেই সুপ্ত-স্বপ্নাকাক্সক্ষা উদ্ঘাটন করতে পারেন। সুতরাং মানুষের নির্জ্ঞান মন (যা ব্যক্তির নিজের কাছেই অজ্ঞাত ও দুর্বোধ্য থাকে) সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য স্বপ্ন ব্যাখ্যা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। সে জন্যই ফ্রয়েড বলেছেন যে, মানুষের নির্জ্ঞান মনে প্রবেশের জন্য স্বপ্ন একটি প্রশস্ত রাজপথ।

ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্বের অভিনবত্ব নিঃসন্দেহে আমাদের চমৎকৃত ও বিস্ময়াভিভূত করে। কিন্তু অনেক মনোবিজ্ঞানীই ফ্রয়েডের এ তত্ত্বের বিরোধীতা করেছেন। আলফ্রেড আডলার (অষভৎবফ অফষবৎ) এর মতে স্বপ্ন একটি মানুষের জীবনধারার (খরভব ংঃুষব) প্রতিফলন ঘটায় এবং সম্ভব্য ভবিষ্যৎ ঘটনার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিচয় বহন করে। কার্ল গুস্টাভ্ ইয়ং (ঈধৎষ এঁংঃধু ঔঁহম) স্বপ্নের কিছুটা গূঢ়তাত্ত্বিক (হুংঃরপধষ) ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে যৌথ নির্জ্ঞান (ঈড়ষষবপঃরাব ঁহপড়হংপরড়ঁং) মনের এমন সব সুপ্ত অভিজ্ঞতা সমূহ স্বপ্নে প্রতিফলিত হয়, যা ব্যক্তির কোন বর্তমান সমস্যা সমাধানের জন্য গূঢ় ইঙ্গিত বহন করে। অনেকেই মনে করেন যে শারীরবৃত্তীয় উত্তেজনার ফলেও বহু স্বপ্নের উৎপত্তি ঘটে। সুতরাং সাম্প্রতিক মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে বিভিন্ন স্বপ্নকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু ফ্রয়েড স্বপ্নকে মাত্র একটি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বিচার করেছেন। এটিই হচ্ছে ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্বের মূল সীমাবদ্ধতা। তিনি তাঁর এই সঙ্কীর্ণতার গ-ী অতিক্রম করতে পারেন নি; কারণ তিনি শুধুমাত্র মানুষের আদিম জৈবিক রূপটির ওপরই গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তবে আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের অনেকেই এবং নব্য ফ্রয়েডবাদীরা মানুষের সুকুমার ও সৃজনশীল সামাজিক রূপটির গুরুত্বকে কোনক্রমেই উপেক্ষা করার চেষ্টা করেন নি। তাই তাঁরা ফ্রয়েডের বহু তত্ত্বেরই কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং ফ্রয়েডের তত্ত্বকে পরিমার্জিত করে ফ্রয়েডের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন।

[উৎস : ‘অহ্ম’ (মনস্তত্ত্ব পত্রিকা) ॥ ৩য় সংখ্যা ॥ ১৯৮৪॥ রাজশাহী]

*****************************************

 

                                               গ্রন্থ ও পত্রিকা আলোচনা

 

আহমদ ছফা : আলোকপথের অভিযাত্রী ॥ সরদার আবদুস সাত্তার
সুচয়িনী পাবলিশার্স, জানুয়ারি ২০১৭ ॥ ঢাকা

আহমদ ছফা (৩০.০৬.১৯৪৩-২৮.০৭.২০০১) বাংলাদেশে তাঁর কালের সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। এই ব্যতিক্রমধর্মিতা তাঁর যাপিত জীবন, লালিত বোধ-বুদ্ধি-প্রত্যয় এবং লেখক হিসেবে অনুসৃত বিষয় ও রীতি সকল ক্ষেত্রেই কম-বেশি প্রতিফলিত। মোদ্দা কথা তিনি আর দশজনের মতো নন। তিনি আলাদা, তিনি ভিন্ন রকম। সমাজের প্রচলিত আচারনিষ্ঠতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতার সিংহভাগেরই পরোয়া করেন নি। তিনি ছিলেন সর্বৈবই ‘তাঁর’ মতো। নিজস্ব এক ধরনের স্বকীয়তাকে ধারণ করেই আহমদ ছফা বাংলাদেশের চিন্তা ও সাহিত্যচর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। সেই ব্যক্তিত্বকে নিয়ে সরদার আবদুস সাত্তার রচিত আহমদ ছফা : আলোকপথের অভিযাত্রী আমাদের বর্তমান বিবেচনার বিষয়।

আহমদ ছফা : আলোকপথের অভিযাত্রী  আহমদ ছফাকে নিয়ে লেখকের দীর্ঘদিনের যতেœ লেখা একনিষ্ঠ শ্রম ও গভীর মননে সমৃদ্ধ ‘আপন মনের মাধুরী’ মাখানো প্রগাঢ় ভালোবাসায় সিক্ত একখানি বৃহৎ কলেবর গ্রন্থ। গ্রন্থটি লেখকের দীর্ঘদিনের লালিত একটি স্বপ্নের বলা যায় এক ধরনের আত্মিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ। সেই স্বপ্ন এবং দায়বদ্ধ আকাক্সক্ষাটির কথা লেখক তাঁর স্মৃতি জাগানিয়া হুমায়ুন আহমেদ গ্রন্থটি প্রকাশের পর বর্তমান প্রাবন্ধিককেও জানিয়েছিলেন। হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর এক যুগ আগে আহমদ ছফা মৃত্যুবরণ করলেও তাঁকে নিয়েই লেখক লিখলেন পরে। বোঝা যায় তাঁর লেখার পূর্ব-প্রস্তুতি অতি সামান্য ছিল না। অবশ্য লেখকের ব্যক্তিগত শারিরীক সীমাবদ্ধতাও এই বিলম্বের অন্যতম কারণ হতে পারে। আমরা ভেবে অবাক না হয়ে পারি না, মাত্র তিরিশ বছর বয়সেই গ্লুকোমায় আক্রান্ত একজন মানুষ যার ‘দিনরাতগুলো তো অনেক আগেই ২৪ ঘণ্টার বদলে ১২ ঘণ্টায় পরিণত হয়েছিল’ এই বয়সেও (জ. ১৯৫২) কতটা শ্রম এবং প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হলে এই রকম একটি প্রায় সকল অর্থেই নিটোল গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। অবশ্য এ কথা সাম্প্রতিক সময়ে লেখা লেখকের সকল গ্রন্থ সম্পর্কেই প্রযোজ্য। তাঁর এই অসাধ্য সাধন এই কথাই শুধু প্রমাণিত করে চলেছে কোনো সীমাবদ্ধতাই মানুষকে পরাজিত করতে পারে না।

আহমদ ছফার সঙ্গে লেখকের প্রায় তিন দশকের সাহচর্য, বন্ধুত্ব ও তাঁর লেখার পঠন-পাঠনের প্রতিফলন এই গ্রন্থ। গ্রন্থটির দুই ভাগ। এক ভাগে আছে আহমদ ছফা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ লেখকের ভাষায় ‘স্মৃতির জানালা’; অন্য ভাগ ছফার সৃষ্টি সম্পর্কে ‘পর্যালোচনা’। দুইটি ভাগেই আলোচ্য প্রসঙ্গসমূহকে লেখক বিষয়ানুসারে সাজিয়েছেন চমৎকার সব শিরোনামে। প্রথম ভাগের ‘স্মৃতির জানালা’ অংশে আছে নয়টি প্রবন্ধ, যেগুলোর শিরোনাম যথাক্রমে ‘ভাঙা নৌকার মাঝি’, ‘সমুদ্র ছুঁয়ে আসা’, ‘শুভকর্মে, প্রতিবাদে, প্রতিরোধে’, ‘উত্তরের অবারিত আঙ্গিনায়’, ‘পুবের পাহাড়ে-জঙ্গলে’, ‘রবীন্দ্রনাথের দিকে যাত্রা’, ‘কাছের মানুষেরা’, ‘গোধূলি বেলায়’ এবং ‘আজও ঝরে অশ্রুর অফুরান মুক্তাবিন্দু’। দ্বিতীয় ভাগের প্রবন্ধসমূহ ‘জেগে আছে বাংলাদেশ’, ‘সাহসের আগুনে জ্বলে ওঠা তিমিরবিনাশী সঙ্গীত’, ‘মহাবিদ্রোহের রণরক্তময় আলেখ্যের সন্ধানে’, ‘বাঙালী মুসলমানের মানস-দর্পণ’, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও অলাতচক্র’, ‘আধুনিক পুরাণ’, ‘গুরুবন্দনা’ এবং ‘অসমাপ্ত প্রেমকথা’। কোনো প্রথাবদ্ধ গবেষণাগ্রন্থ না হলেও পাঠকের কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসার কথা মনে রেখে লেখক পরিশেষে সংযুক্ত করেছেন ‘ব্যবহৃত বইপত্র’ নামে একটি অতিক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

প্রথমেই ‘ভাঙা নৌকার মাঝি’। এই অধ্যায়ের মূলবক্তব্য দুঃসময়ের মুখোমুখি উপনীত বিপদাপন্ন মানুষের প্রতি আহমদ ছফার আন্তরিক সহযোগিতা। গ্রন্থকার নিজেও তার সাক্ষী। কিন্তু আনুষঙ্গিক বিষয় হিসেবে এখানে উঠে এসেছে জার্মানি, জার্মানি প্রবাসী বাঙালি, জার্মান তরুণ-তরুণী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, কোলকাতা, অন্নদাশঙ্কর রায়, লীলা রায়, দাউদ হায়দার, ইন্দিরা রায়, সিকান্দার আবু জাফরের পৈতৃক বাড়ি, তসলিমা নাসরিন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর স্ত্রী, হাওড়া কলেজ, জীবনানন্দ দাশ, কলকাতার বইপাড়া কলেজ স্ট্রিট, প্রকাশক শিবপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, প-িত রাহুল সাংকৃত্যায়ন, পূর্ণেন্দু পত্রী, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, হুমায়ূন আহমেদ, আশরাফ সিদ্দিকী, আবদুল্লাহ আল মামুন, সত্যজিৎ রায়সহ নানা প্রসঙ্গ যা পাঠককে আনন্দিত ও আন্দোলিত করে। ‘সমুদ্র ছুঁয়ে আসা’ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে জার্মান সরকারের আর্থিক সহায়তায় গড়ে তোলা আহমদ ছফার এনজিও ‘বাংলা জার্মান সম্প্রীতি’ সংক্ষেপে বিজিএস-এর কথা, ফাদার বয়েলে ক্লাউস নামে এক জার্মান পাদ্রী ছিলেন যার পৃষ্ঠপোষক। এই এনজিওর মাধ্যমেই আহমদ ছফা বাড়িয়ে দেন তাঁর সেবাব্রতী হাত  সাম্প্রদায়িক হামলায় বিধ্বস্ত কক্সবাজারের সমুদ্র-উপকূলের একটি গ্রাম মাতারবাড়ির সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি। প্রসঙ্গক্রমে এসেছে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, সাংবাদিক নাজিম উদ্দীন মাস্তান, বাবরি মসজিদ ধ্বংস প্রসঙ্গ। বাদ যায়নি ছফার একান্ত ব্যক্তিগত প্রেম প্রসঙ্গও (পৃ. ৪৬)। ‘শুভকর্মে, প্রতিবাদে, প্রতিরোধে’ এবং ‘উত্তরের অবারিত আঙ্গিনায়’ অংশেও মুখ্যত আছে বিজিএস-এর কার্যক্রমেরই বিবরণ। এই বিবরণের বিস্তার ধরেই এসেছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও স্থানের কথা। বিশেষভাবে আছে মওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়, নড়াইল ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, সৈয়দপুর বিমানবন্দর, দিনাজপুর শহর, বিজিএস-এর অতিথিশালা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াকিল আহমদ, প্রাক্তন মন্ত্রী আজিজুল হক, শিল্পী এস. এম. সুলতান ও তাঁর শিল্পকর্ম, হাসনাত আবদুল হাই, ওস্তাদ ফজলুল হক, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, হুমায়ুন আজাদ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, আহমদ শরীফ এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা। ছফার ব্যক্তিগত সুহৃদজনের কথা তো আছেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে আহমদ ছফার গভীর অনুরাগী সলিমুল্লাহ খান তাঁর (ছফার) জার্মান সম্পৃক্ততায় মনঃক্ষুণœ হয়েছিলেন। জনাব খান লিখেছেন, ‘আমি ১৯৮৬ সনের পর দেশ ছাড়িয়া যাই। মধ্যিখানে একবার ১৯৯১ সনে দেশে আসিয়া দেখিলাম আহমদ ছফাও জার্মান জাতির একাংশের সহিত গাঁটছড়া বাঁধিয়াছেন। দেখিয়া কষ্ট পাইলাম। কিন্তু তাঁহার বিচার করিলাম না। আমার সেই সাধ হয় নাই। সাধ্যও ছিল না।’ (অহমদ ছফা সঞ্জীবনী : ২৮) কলেজ জীবনে চট্টগ্রাম স্বাধীন করার কিশোরবেলার রোমান্টিক এবং কা-জ্ঞানহীন পদক্ষেপের জন্য ছফাকে মুখোমুখি হতে হয় দুঃসহ এক জীবন সংগ্রামের। যেখানে তাঁকে বরণ করতে হয় দিনমজুর, গৃহভৃত্যসহ স্কুল শিক্ষকের জীবন। ছফা-জীবনের এই অধ্যায়েরই প্রাঞ্জল প্রকাশ ‘পুবের পাহাড়ে-জঙ্গলে’। এই পর্বেই ছফা আক্ষরিকভাবে উপলব্ধি করেন মুনাফালোভী পূঁজিতন্ত্রের শোষণ-নিপীড়ন কতটা মর্মান্তিক হয়। আহমদ ছফার অনুরোধে সরদার আবদুস সাত্তার অধ্যাপক ড. নাসিম আখতার হোসাইনকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে অনুবাদ করেন মার্টিন কেম্পচেনের জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব ধহফ এবৎসধহু গ্রন্থটি। এই গ্রন্থ অনুবাদ এবং প্রকাশের বিশদ বিবরণী ‘রবীন্দ্রনাথের দিকে যাত্রা’ অধ্যায়। আহমদ ছফার অনুপ্রেরণায় রবীন্দ্র-অভিমুখী হন লেখক। (পৃ. ১৪৪) পর্যায়ক্রমে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখে ফেলেন রবীন্দ্রনাথ : আমাদেরই লোক, রবীন্দ্রনাথ : গল্পগুচ্ছের বাংলাদেশ এবং রবীন্দ্রনাথের ঘুমভাঙানিয়া এবং দুখজাগানিয়ারা নামে আরো তিনটি গ্রন্থ। আহমদ ছফাকে নিয়ে লেখা গ্রন্থটিতে অধ্যায়টির এমন নামকরণে পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন। পূর্বাপর অধ্যায়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পাঠক হয়তো প্রথমে ভাববেন রবীন্দ্রনাথের দিকে এই যাত্রা আহমদ ছফার। আমার অন্তত তাই মনে হয়েছে। লেখক এবং আহমদ ছফার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কিছু মানুষের গল্প ‘কাছের মানুষেরা’, দুর্যোগে-দুর্বিপাকে যাঁরা সর্বদাই পারস্পারিক সাহায্য-সহযোগিতায় নিবেদিত। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ডা. কামরুজ্জামান, ডা. মাহমুদুর রহমান, খায়রুল আলম সবুজ ও ড. সিদ্দিকুর রহমান। আছে শিল্পী কাজী আবুল কাশেম, হুমায়ুন আজাদ, শামসুর রাহমান, হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ আলী আহসান, শিল্পী ছবিউল আলম, বেগম সুফিয়া কামাল এবং অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ। অধ্যায়টির গুরুত্বপূর্ণ অংশ অধ্যাপক রাজ্জাক প্রসঙ্গ। এখানে অধ্যাপক রাজ্জাকের ব্যক্তিত্ব ও মননশীলতার বর্ণনা যেমন আছে, তেমনি আছে ছফার হয়ে ওঠায় তাঁর সুগভীর প্রভাবের পরিচয়। লেখকের ভাষায়, ‘একজন চিন্তাশীল এবং অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লেখক হিসেবে ছফাভাইয়ের বেড়ে ওঠার পেছনে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের ভূমিকাটাই ছিল সব থেকে বেশি কার্যকর।’ (পৃ. ১৭৩) ছফা-জীবনের শেষ অধ্যায়ের বিবরণ ‘গোধূলি বেলায়’। বিশেষভাবে এসেছে তাঁর অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী এবং পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ গ্রন্থ প্রসঙ্গ। লেখক ছফার জীবনের সঙ্গে গ্রন্থ দুটির নানা সম্পর্কসূত্রকেও চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। প্রসঙ্গক্রমে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আহমদ ছফার বাংলা বিভাগ ত্যাগ, তাঁর সাহিত্যচর্চা, ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সৃষ্টি হওয়া সাম্প্রদায়িক হিং¯্রতাসহ নানা বিষয়। আছে বাংলা একাডেমির বই মেলা শুরু প্রসঙ্গ। বিজিএস ত্যাগসহ আহমদ ছফার নানা রকম প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির অপ্রিয় খতিয়ানও এখানে হাজির করেছেন লেখক। আহমদ ছফার মৃত্যুর করুণ বেদনা-বিহ্বল অভিব্যক্তি ‘আজও ঝরে অশ্রুর অফুরান মুক্তাবিন্দু’।

গ্রন্থটির দ্বিতীয় ভাগ ‘পর্যালোচনা’ অংশে  আটটি অধ্যায়ে লেখক আহমদ ছফা রচিত আটটি গ্রন্থের আলোচনা করেছেন। এই পর্বেও লেখক অধ্যায়গুলোর বিষয়ানুগ শিরোনাম দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জুলাই মাসে ভারত থেকে প্রকাশিত আহমদ ছফার জাগ্রত বাংলাদেশ গ্রন্থের আলোচনা ‘জেগে আছে বাংলাদেশ’। লেখক প্রতিটি অধ্যায় ধরে তার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন গ্রন্থটির মাধ্যমে আহমদ ছফা ‘পালন করেছেন বিবেকবান বুদ্ধিজীবী এবং প্রেরণা-সঞ্চারকারী লেখকের প্রাণবান ভূমিকা।’ ছফার দূরদর্শিতায় অবাক না হয়ে পারা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায়েই তিনি অটুট প্রত্যয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ‘স্বাধীন সংগ্রামী বাংলার জয় সুনিশ্চিত।’ এই পর্বের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘সাহসের আগুনে জ্বলে ওঠা তিমির বিনাশী সঙ্গীত’-এ লেখক আলোচনা করেছেন বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৭২) গ্রন্থ নিয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে আহমদ ছফার ছিল সীমাহীন স্বপ্ন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় বিধ্বস্ত এবং ক্রুদ্ধ আহমদ ছফার দুর্বিনীত প্রতিবাদ বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস। বুদ্ধিবৃত্তির বিদ্যমান সুবিধাবাদী কাঠামোকেই যাবতীয় অব্যবস্থার প্রধান হেতু নির্দেশ করে তিনি কামনা করেন তার নতুন বিন্যাসের। লেখক পর্যাপ্ত উদ্ধৃতি দিয়ে গ্রন্থটির বিস্তারিত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। পর্যালোচনার এক স্থানে লেখক  আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান রচিত ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ নিয়ে আহমদ ছফার বক্তব্যের বিপক্ষে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তা যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য নয়। আমাদের বিবেচনায় ছফার বক্তব্যই সঠিক। ইতিহাস সচেতন আহমদ ছফার সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস (১৯৭৯) গ্রন্থের আলোচনা ‘মহাবিদ্রোহের রণরক্তময় আলেখ্যের সন্ধানে’। লেখক এখানেও পর্যাপ্ত উদ্ধৃতির অবতারণা করে গ্রন্থটির বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেছেন। গ্রন্থটির অপূর্ণতা হিসেবে তিনি যথার্থই এ বিষয়ে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনার অনুপস্থিতিকে চিহ্নিত করেছেন। আহমদ ছফার খ্যাতনামা বাঙালী মুসলমানের মন (১৯৮১) গ্রন্থের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা ‘বাঙালী মুসলমানের মানস দর্পণ’ অধ্যায়। এখানেও লেখক অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি ও তথ্যসহকারে গ্রন্থটির প্রতিটি অধ্যায়কেই বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। গ্রন্থটির পরবর্তী চারটি অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধ ও অলাতচক্র’, ‘আধুনিক পুরাণ’, ‘গুরুবন্দনা’ ও ‘অসমাপ্ত প্রেমকথা’ যথাক্রমে আহমদ ছফার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস অলাতচক্র (১৯৯৩), প্রকৃতি ও মানব জীবন বিষয়ক মহাকাব্যিক উপন্যাস পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (২০১৫), অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে লেখা যদ্যপি আমার গুরু এবং আত্মজৈবনিক উপন্যাস অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী (১৯৯৬) গ্রন্থের আলোচনা। প্রতিটি গ্রন্থই সরদার আবদুস সাত্তার তাঁর স্বভাবসুলভ নিষ্ঠা এবং পরিশ্রম দিয়ে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছেন। তুলে ধরেছেন গ্রন্থগুলোর সার্বিক বিষয়বস্তু। গ্রন্থকারের মতামতের সঙ্গে প্রয়োজন মাফিক সংযুক্ত করেছেন নিজস্ব অভিমতও।

সরদারের ভাষা প্রয়োগ ও বাচনভঙ্গি অত্যন্ত সাবলীল। কোনো পাঠকই তাঁর গ্রন্থপাঠে ক্লান্তি বোধ করবেন না। তবে বিশেষণ পদের অতি ব্যবহার ও আবেগের প্রাবল্যে অনেক স্থানেই ভাষা তার কাক্সিক্ষত বন্ধন অটুট রাখতে সক্ষম হয় নি। স্মৃতিচারণ বলেই হয়তো লেখক সব জায়গায় ঘটনার সন তারিখ উল্লেখ করেন নি, করলে গ্রন্থটি তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে আরো গুরুত্ববহ হতো।

প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বাইরে আহমদ ছফাকে নিয়ে রচিত আরো দুইটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ মোরশেদ শফিউল হাসানের ‘ছফা ভাই : আমার দেখা আমার চেনা’ (২০০২) এবং সলিমুল্লাহ খান রচিত ‘আহমদ ছফা সঞ্জীবনী’ (২০১০)। সরদার আবদুস সাত্তারের গ্রন্থটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এদের মধ্যে পারস্পরিক সাদৃশ্য, স্বাতন্ত্র্যের পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈপরীত্যও দৃষ্টিগোচর হয়। যেমন আহমদ ছফার সাংগঠনিক ক্ষমতা সম্পর্কে মোরশেদ শফিউল হাসান তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘আসলে সংগঠন করবার লোক তিনি ছিলেন না।’ (মোরশেদ : ৪০) একই বিষযে সরদারের অভিমত, ‘ছফাভাইয়ের সাংগঠনিক ক্ষমতা তো বরাবরই অসাধারণ।’ (সরদার :৪৫) মোরশেদ শফিউল হাসান ছফার সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিস্তারিত কোনো বিচার বিশ্লেষণ করেন নি। সংক্ষিপ্ত পরিসরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকেই তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখায় দোষেগুণে ম-িত  রক্ত-মাংসের মানুষ আহমদ ছফার যে চিত্র পাওয়া যায়  কোনো কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও সরদার এবং খানের রচনায় তেমনটি পাওয়া যায় না। তাঁদের লেখায় প্রতিফলিত ছফা হয়ে উঠেছেন প্রায় অতি মানব। সলিমুল্লাহ খান তাঁর গ্রন্থে আহমদ ছফার সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি যেভাবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক পটভূমির পরিপ্রেক্ষিতে ছফা-সাহিত্যের মূল্যায়ন করেছেন সরদার তেমনটি করেন নি। ছফা বিশ্লেষণে খান যে পা-িত্যের বিস্তার ঘটিয়েছেন তা সরদারে নেই। সরদারে আছে পর্যাপ্ত উদ্ধৃতি সমৃদ্ধ সহজ বিশ্লেষনের সরল অভিব্যক্তি, যেখান থেকে পাঠক মূল রচনা পড়া না থাকলেও ছফা সাহিত্যের মর্ম উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। একটি বিষয় উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় তা হলো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আহমদ ছফার মূল্যায়ন প্রসঙ্গ। মোরশেদ শফিউল হাসানের অতি সংক্ষিপ্ত পরিসরের পর্যালোচনায়ও প্রসঙ্গটি বাদ যায় নি। তিনি তাঁর গ্রন্থের ৩৪-৩৬ পৃষ্ঠায় শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গে আহমদ ছফার বস্তনিষ্ঠ মূল্যায়নের যথার্থ পরিচয় স্পষ্ট করেছেন। ‘বস্তুত বাঙালী জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য গীতাঞ্জলি নয়, বলাকা নয়, সোনার তরী নয়,‘আর দাবায়ে রাখবার পারবা না’।’ সহ মুজিব সম্পর্কে আহমদ ছফার গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরে মোরশেদ স্পষ্টভাবেই লিখেছেন, ‘গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও ইতিহাসবোধ থাকলেই কেবল এমন বাক্য রচনা করা যায়, ¯্রফে স্তুতির জন্য যার প্রয়োজন হয় না।’ বাদ পড়ে নি সলিমুল্লাহ খানের পর্যালোচনা থেকেও। তিনি লিখেছেন, ‘..আহমদ ছফার মনে শেখ মুজিব কখনোই বীরের আসন হইতে সরিয়া যান নাই।’ (খান: ২৮) অথচ সরদারের বৃহৎ কলেবরের গ্রন্থটিতে প্রসঙ্গটি অনুপস্থিত। আহমদ ছফার চিন্তাকে যথার্থভাবে উপলব্ধির স্বার্থেই বিষয়টি অতীব জরুরি ছিল। আহমদ ছফার ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ ও ‘তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান’ প্রবন্ধ দু’টি যাঁদের গোচরীভূত নয়, আওয়ামী লীগ ও মুজিব সম্পর্কে ছফার কঠোর সমালোচনার সাক্ষাৎ পেয়ে  গ্রন্থটি পড়ে তাঁরা এ বিষয়ে ভুল ধারণার শিকার হবেন। গ্রন্থের নাম আহমদ ছফা : আলোকপথের অভিযাত্রী না হয়ে আলোকপথের অভিযাত্রী হলেই সুন্দর হতো।

মানুষকে কাছে টানবার আপন করে নেবার যেমন এক ভুবনমোহিনী ক্ষমতা ছিল ছফার, তেমনি তাঁর ছিল মানুষকে দূরে ঠেলার শত্রু করে তোলারও এক অলৌকিক ক্ষমতা। আহমদ ছফার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বিবেচনায়ও এর ছাপ খুববেশি অস্পষ্ট নয়। তাই দেখা যায় একদিকে কারো কাছে তিনি ‘মহাত্মা’, কারো কাছে ‘চিন্তা নায়ক’, কারো কাছে ‘আলোকপথের অভিযাত্রী’; অন্যদিকে আবার এর বিপরীত বিবেচনাও দুর্লক্ষ নয়। আমাদের বিবেচনায় বাংলাদেশ ও বাঙালির সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করতে হলে আহমদ ছফাকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।

মাহবুব বোরহান

*******************************

শফাত শাহের লাঠি ॥ মোহাম্মদ সাদিক
চৈতন্য পাবলিকেশন, গ্রন্থমেলা ২০১৭ ॥ সিলেট

বিশ্বসভ্যতার কর্পোরেট দ্বান্দ্বিকতার রক্তক্ষরিত করতলে বসে সংস্কৃতি-নৈসর্গিক অতীতকাতরতা বর্তমানের স্বদেশ ভাবনা ও ভবিতব্য ভবিষ্যতের শীতল সন্দিগ্ধস্বপ্নকে বিন্দুবদ্ধ করে কবি মোহাম্মদ সাদিক তাঁর শফাত শাহের লাঠি কাব্যে স্পন্দিত কথায় কাব্যভা-ারকে শব্দায়িত করেছেন। আধুনিক বিশ্বে মানুষের জীবন জটিলতার নান্দনিক প্রতিচ্ছবির পাশাপাশি বাউল তত্ত্ব ও দার্শনিক ঐতিহ্য ‘আধ্যাত্মিকতার সুরে পাঠকের সামনে উন্মোচন করেছেন। তাঁর কবিতার শব্দ রহস্যের নাচানাচির যে সরল প্রতিভূ শফাত শাহের লাঠি (২০১৭) কাব্যকে এক আলাদাভাবে চিন্তা করার পথ বাতলিয়ে দেয়। কাব্যগ্রন্থে সর্বমোট ১৫১টি কবিতা আছে। এই সমস্ত কবিতার আষ্টেপৃষ্ঠে সচেতনভাবে বিচরণ করলে এ কাব্যটিতে নি¤েœাক্ত ভাবধারা লক্ষ করা যায়:

ক.          কবিতায় বর্তমানের স্বদেশ, যান্ত্রিক জীবনের পর্যদস্তুর আত্মচিৎকার ও কর্পোরেট বিশ্বসভ্যতার রক্তক্ষরণ।

খ.           প্রকৃতির বৈচিত্র্য বৈভবে নিজের ভিতর বাহিরকে এক আধ্যাত্মিক মরমী সাধনায় মাটি মানুষ ও প্রেমকে এক অভিন্ন উপায়ে দেখবার প্রয়াস।

গ.           দার্শনিক ও বাউল তত্ত্বের আলোকে চিরাচারিত জীবনকে বিশ্ব কাব্যসাহিত্যের ক্যানভাসে বিচিত্র ভাবনায় উদ্ভাবন।

কবির কর্ম কাব্য রচনা এবং তা সম্ভব হয় যার বলে তার নাম প্রতিভা (ওহঃঁরঃরড়হ/ রসধমরহধঃরড়হ) স্বজ্ঞা বা কল্পনা। ভারতীয় নন্দনতাত্ত্বিক ভামহ এ বিষয়ে বলেছিলেন— ‘কাব্য নির্মাণের পক্ষে প্রতিভাই মুখ্য। বলা যায় প্রতিভা কাব্যের নৈসর্গিক, সহজ, বা সহজাত, জন্মসূত্রেই প্রাপ্ত।’ শব্দার্থ সাহিত্যে ‘কাব্যং-সাহিত্যং’ কাব্যভাষা অর্থে শব্দ ও অর্থ উভয়ের মনোহারী যথোপযুক্ত বিন্যাসভঙ্গী। সে অর্থে কবিতার শব্দ বিন্যাস ভাব ও ভাষার বিন্যাস পরস্পর সাম্য ও সুভোগ একটি কাব্যকে তার গুণে বৈচিত্র্য, চারুত্ব, হৃদ্যত্ব, সৌন্দর্য বা চমৎকারিত্ব পাঠকের মন ও মননকে জাগ্রত করে তোলে। মোহাম্মদ সাদিক সে ক্ষেত্রে সচেতনতার বহুল প্রয়াস চালিয়েছেন এখানে। শাফাত শাহের লাঠি কাব্য এই সুষম শব্দের সুগঠিত বর্ণনায় আমাদের সমাজের শ্রমজীবী মানুষগুলোর জীবনের কথা ‘শিকড়ের শিলালিপি’ কবিতায় চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন।

নির্যাতিত নিসর্গের মতো পোড়া পল্লি আমাদের/ চোখের সামনে বেড়ে উঠেছে কালো মাঠ/ গায়ের রাখাল সেই মাঠ থেকে প্রতিদিন-বেদনার/ গাভীগুলো ঘরে নিয়ে আসে আর কেঁদে বলে ওখানে শুকিয়ে কাঠ আমাদের সুখ। আবার কবি এই সমাজ-রাষ্ট্রের বিস্তর অসঙ্গতি ও অর্থনৈতিক পরাভব সময় উপযোগী সংকীর্ণতাবোধকে লেহনযোগ্য করে পাঠকের সমীপে তুলে এনেছেন। এটা বিচক্ষণতার পরিচায়ক বটে। তাই এই ব্যক্তিপ্রতিভার আত্মখচিত উপলব্ধি শিল্পসংহত অবয়ব আত্মনির্মাণে সুসংহত সেতুবন্ধন শিল্প সাহিত্যের অঙ্গনে কাব্য ভা-ারকে একদিন উঁচু আসনে স্বীকৃতি দান করবে, বলতে পারি, ঞযব ঃযড়ঁমযঃং ড়ভ ঢ়ড়বঃৎু রহ সধশরহম রহঃবৎ-ৎবষধঃরড়হংযরঢ় নবঃবিবহ ষরভব ধহফ ধৎঃ রং ধহড়ঃযবৎ রহঃবহফ.

লক্ষ লক্ষ বছর ধরে একোন কাঁথা বুনলি আপা

এ কোন নিখুঁত গাছ-গাছালি; স্বচ্ছ বকুল; অশ্রুবিন্দু

হাতের আঙুল সূঁচের ডগায়বিদ্ধ হয়ে লালচে আবির

লাগল কাঁথার কোমল বুকে

তবু তো তোর শিল্পকলা শেষ হল না, শেষ হল না!

কবিতাটিতে নৃতাত্ত্বিক, জাতিগত সমসাময়িক বিভাজনগুলো বিশ্লেষণ করে উঁচু নিচু শিল্প, সংস্কৃতি পণ্য বর্তমান যে বাণিজ্যিক করণে দর কষাকষি চলছে কবি তাতে শঙ্কিত। কবি মোহাম্মদ সাদিক জানতে চেয়েছেন— ‘লক্ষ লক্ষ বছর ধরে একটি কাঁথা বুনলি আপা /তবু তো তোর শিল্পকলা শেষ হল না, শেষ হল না।’

কবি সাদিকের এ কাব্যে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের বৈভবে আধ্যাত্মিক মরমী সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে মাটি মানুষ ও জাগতিক প্রেমকে উপজীব্য করে একাব্যে অধিকাংশ কবিতাই রচনা করেছেন। দেহের দুঃখ, জলান্তর, দেহ, লিলুয়া বাতাসে কান্দে, জল টলমল, আদম হাওয়ার রাত, আট কুঠুরি নয় দরজা কে লইবো খবর, সর্বত্র বিরাজিত তুমি, মানচিত্র, একে শূন্যে দশ, গুরু উপায় বলো না, তিন সত্যি ইত্যাদি কবিতা আকর্ষণীয়।

প্রসঙ্গত, মানব অস্তিত্বকে ভিত্তি করে তত্ত্ব ও তথ্যের রূপরেখায় মরমী কবি, সাধক সুফী বয়াতী, বাউলদের সাধনার উৎপত্তি। মানবত্মাকে পরমাত্মার সাথে মিলন ঘটিয়ে আত্মজাগরণ, আত্মবিলাপ ও আহাজারির করুণ বিলাপ এ মরমী ধারার দিকদর্শন। আধ্যাত্মিক ধ্যান জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মরমী ধারার সাধককে আত্মশক্তি বা আত্মতৃপ্তি। ওই সময়ে বাংলার লোক সাহিত্যে পঞ্চপা-বদের মতো পঞ্চম মরমী কবি, আধ্যাত্মিক সাধক, দার্শনিকের মধ্যে আত্মতত্ত্বের ও আত্মবিশ্লেষণগত দিকদর্শন লক্ষ করা যায়। ফকির লালন শাহ্, বাউল কবি দুদু শাহ, মরমী কবি হাছন রাজা, পাগলা কানাই মরমী কবি- পাঞ্জু শাহ অস্তিত্বগত মরমী ধারার রহস্য উন্মোচন করেন। মোহাম্মদ সাদিক মরমী কবি হাছন রাজার দেশের মানুষ, ছোটবেলা থেকেই যে তাঁর জীবনবোধ ও মরমী দর্শনের প্রতি এক ধরণের কৌতূহল ছিলো। ‘শফাত শাহের লাঠি’ কাব্যের অন্তর্গত কবিতাগুলোর ভাষায় :

দেখে মনে হবে এই দেহে

এখন এখানে কোন মানুষের বাস নেই,

মানুষটি হয়তো

কোন অপরাহ্নে পাখি হয়ে গেছে।

এ কাব্যের শেষ ‘অনুকাব্য’র মধ্যকার ছোট ছোট কিছু অনুকবিতায় মরমী ও আধ্যাত্মিক ভাবনা পাঠকের নিকট ধাঁধা সৃষ্টি করে। কবিতা পাঠ করতে করতে বাধ্য করে। কিছুক্ষণ ভেবে কবি তাই যেন বলে : ‘কেউ জানে না তা শুধু জানে বাউলে/ ডানায় খড়মে থাকে পরম প্রেমের/ কিছু ভালবাসাবাসি।’

ফরহাদ হোসেন

*******************************

অনুধ্যানে নজরুল ॥ মাওলা প্রিন্স
মুক্তদুয়ার, আগস্ট ২০১৭ ॥ ময়মনসিংহ

মানুষ মানুষ হয়ে জন্মায় না। তাকে মানুষ হতে হয়। মৃত্যুর পর মানুষ মানব থেকে যায়। শরীরী মৃত্যু হলেও কীর্তিমানের কর্ম তাঁকে চিরজীবিত রাখে। এমনি এক কীর্তিমান মানব কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁকে নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করেছেন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক ও গবেষক মাওলা প্রিন্স। কর্মজীবনে তিনি সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক। অনুধ্যানে নজরুল গ্রন্থপাঠের আগে তার কালোত্তরের প্রতিশ্রুতি : প্রসঙ্গ সাহিত্য গ্রন্থের সাথে পরিচয় ঘটে। গ্রন্থটি পাঠ করে বেশ চমৎকৃত হয়েছি। বিশেষ করে প্রবন্ধগুলোর শুরুতেই কবিতা ও গানের ব্যবহার ব্যতিক্রম লেগেছে। মঞ্জুর এলাহির করা সুন্দর প্রচ্ছদে বইটি বেরিয়েছে ‘মুক্তদুয়ার’ থেকে। অনুধ্যানে নজরুল গবেষণামূলক গ্রন্থ। কবিতা ও গান, ছোটগল্প ও উপন্যাস, অভিভাষণ ও চিঠি নামে তিনটি অধ্যায়ে মোট এগারটি প্রবন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া পরিশিষ্টে নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যেকটি প্রবন্ধই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকা ও জার্নালে প্রকাশিত। এখানে প্রবন্ধগুলো সংকলিত হয়েছে। প্রথম প্রবন্ধ ‘নজরুলের বিদ্রোহী : প্রসঙ্গ পুরাণ’। পৌরাণিক কাব্যব্যাখ্যায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় পুরাণের ব্যবহার দেখানো হয়েছে। পুরাণ দেশ ও কালের অতীত, এর কোন লেখক নেই। পুরাণ অনেকটা আলো-আঁধারির অবস্থা, সত্য ও মিথ্যার গল্প ছবি। পুরাণ সমাজের অভ্যন্তরে বহমান এক সামাজিক চর্চা। ঐ.ই. ঋৎধহশষরহ যথার্থই বলেছেন : গুঃযং সধু নব বাবহঃং ড়ভ ঃযব সরহফ ধং ঃযবু ধৎব ফৎধসধঃরুবফ রহ হধৎৎধঃরাব ভৎড়স ঃযধঃ রং ঃৎঁসং ড়ভ ঃযব হধঃঁৎধষ ধং যরংঃড়ৎরপধষ বাবহঃং. পুরাণের উপর নজরুলের যথেষ্ট দখল ছিল। লেখক বিষয়ভিত্তিক ও শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে সুন্দরভাবে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পুরাণগুলো আলোচনা করেছেন। তবে প্রবন্ধের শুরুতে পুরাণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিলে পাঠক বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে পারতেন। পুরাণ নিয়ে আরেকটি প্রবন্ধ ‘নজরুল কাব্যে পুরাণ : প্রবাহমালা ও পরিসংখ্যান’ প্রথম অধ্যায়ে সংযোজিত হয়েছে। নজরুলের কবিতার প্রামাণিক দৃষ্টান্ত দিয়ে পুরাণের বহুবিধ ব্যবহার এখানে দেখানো হয়েছে। নজরুলের সৃৃষ্টিকর্মের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে গান। গান যে শুধু সুর, তাল ও লয়ের মাধ্যমে হৃদয়কে পুলকিত করে তা নয় সেটি সাহিত্যিক মর্যাদাও অর্জন করতে পারে ‘বুলবুল : কাব্যসত্যের রূপ-রূপায়ণ’ প্রবন্ধে সেটি মাওলা প্রিন্স দেখিয়েছেন। আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে ধ্রুপদ শিল্পগুলোকেও নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে এখানে। নজরুলের গানে সংমিশ্রণ বা ফিউশন করা যাবে কিনা এটি নিয়ে দীর্ঘ আলোকপাত করা হয়েছে। যদিও ফিউশন অসার প্রমাণিত হয়েছে। নজরুল সঙ্গীতে ফিউশন প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক মূল্যায়ন প্রবন্ধে লেখক দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মতামত উল্লেখ করেছেন। আবার গজল ও শ্যামাসঙ্গীতের কারণে অনেকে তাঁকে কবির পাশাপাশি গীতিকার হিসেবে মূল্যায়ন করে। শুধু গান-কবিতা নয় ছোটগল্প ও উপন্যাসেও তার প্রভাব রয়েছে। ‘নজরুলের ছোটগল্প : বিষয় ও বিন্যাস’, ‘মৃত্যুক্ষুধা ও পদ্মানদীর মাঝি : ঐতিহ্য — পরম্পরা’ এবং ‘বাংলা উপন্যাসে নজরুলের প্রভাব : একটি অন্সুন্ধানী পাঠ’ প্রবন্ধে নজরুলের অনালোচিত দিক উঠে এসেছে। প্রেম ও প্রকৃতি, সমাজ ও সংস্কার এবং জননী ও জন্মভূমি ইত্যাদি বিষয়ভিত্তিক ভাগ করে গল্পগুলো চমৎকারভাবে আলোচনা হয়েছে। মিলনহীন কৈশোর প্রেমের বিলম্বিত উচ্ছ্বাস, বঞ্চিতের হাহাকার, প্রেমাকাংক্সক্ষায় উন্মুখ, ক্ষত—বিক্ষত প্রেমিক হৃদয়ের যাতনা আবার প্রকৃতির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার দিকটিও নজরুলের গল্পে উঠে এসেছে। মাওলা প্রিন্স বিষয়গুলোকে দৃষ্টান্তসহ তুলে ধরেছেন যা পাঠককে মুগ্ধ করে। ‘ভালোবাসাকে কি কুৎসিত চক্ষে দেখছে আজ — কাল লোকেরা। মানুষতো নয় যেন শকুনি! দুনিয়ায় এত পাপ! মানুষ এত ছোট হলো কি করে? তাদের মাথার উপর অমন উদার অসীম আকাশ আর তারই নিচে মানুষ কি সঙ্কীর্ণ, কি ছোট! তাঁর শিল্পীসত্তা ক্ষমতা, আদর্শগত দিন না বুঝেই অহেতুক অনেকে অসার মন্তব্য করে। আবার অনেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই বিষয়গুলো লেখক পরিষ্কারভাবে সমাধান দিয়েছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসের সাথে কাজী নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে ‘মৃত্যুক্ষুধা ও পদ্মানদীর মাঝি : ঐতিহ্য — পরম্পরা’ প্রবন্ধে। চরিত্র-চিত্রণ, বিষয়াঙ্গিক ও দার্শনিক দিক থেকে দুটির গাণিতিক ও জ্যামিতিক মিল উঠে এসেছে। এর পেছনে দুই সাহিত্যিকের মন ও মননের মিল থাকার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন তাঁর নতুন পৃথিবী ময়না দ্বীপের কথা বলেছেন তেমনি নজরুলও মানুষের জয়গান গেয়েছেন। প্রাবন্ধিকের তুলনামূলক বিশ্লেষণে পাঠক নতুন করে চিন্তা করার যথেষ্ট খোরাক পাবে। নজরুলের ব্যক্তিগত জীবনের অন্তরঙ্গ দিক এবং তাঁর মনে লুক্কায়িত ইচ্ছার প্রকাশ ঘটেছে অভিভাষণ ও চিঠি-পর্বের দুটি প্রবন্ধে। চিঠির মাধ্যমেই ব্যক্তি মানুষের একান্ত পরিচয় ও আশা—বেদনার চিত্র পাওয়া যায়। ‘নজরুলের অভিভাষণ : অন্তরঙ্গ অবলোকন’ এবং ‘নজরুলের চিঠি : ইচ্ছার দলিল’ প্রবন্ধ দুটির মাধ্যমে তাঁকে একেবারে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্যের অনুভূতি হয়েছে। সুখপাঠ্য প্রবন্ধ দুটি অবশ্যই পাঠককে মুগ্ধ করতে সক্ষম হবে। বিভিন্ন চিঠির অংশবিশেষ পাঠ করেছি আর বারবার আপ্লুত হয়েছি। এত শক্ত কথা এত সহজে বলা যায়? ‘স্কুল-পালানো ম্যাট্রিক পাশ না করা পল্টন ফেরত বাঙালি ছেলে কী নিয়েই বা সমাজে প্রতিষ্ঠার আশা করবে! আমার একমাত্র ভরসা মানুষের হৃদয়। আমি মুসলমান কিন্তু আমার কবিতা সকল দেশের সকল কালের এবং সকল জাতির। কবিকে হিন্দু—কবি, মুসলমান কবি ইত্যাদি বলে বিচার করতে গিয়েই এত ভুলের সৃষ্টি। আমি আপাতত এইটুকুই বলে রাখি যে, আমি শরিয়তের বাণী বলিনি আমি কবিতা লিখেছি।’ গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশ পাঠ করে এক নজরে নজরুলের সাহিত্যকর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয় পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে পাঠকের মনে নজরুলের সাহিত্যপাঠের আকাক্সক্ষা জন্মাবে। অনুধ্যানে নজরুল গ্রন্থের প্রতিটি প্রবন্ধই সুখপাঠ্য। ভাষা সরল এবং সাবলীল। তবে জ্যামিতিক ও পরিসংখ্যান বিষয়ক তথ্য-উপাত্তের মধ্যে পাঠকের খেই হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। তথ্যবহুল, প্রাঞ্জল এই গ্রন্থটি পাঠ করে পাঠক নজরুলকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন, সন্দেহ নেই।

মো. আল আমিন

*******************************

গাধা ॥ সম্পাদক : মলয় সরকার
সংখ্যা ৫ ॥ এপ্রিল ২০১৭ ॥ হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ

গাধা পত্রিকার আফসার আমেদ সংখ্যা হাতে এলো। সাদা ধবধবে শরীর; চোখে আনে এবং মুশায়েরার সিমন দ্যা বোভোয়ার, জাঁ পল সাত্র্, স্যামুয়েল ব্যাকেট সংখ্যাগুলির চকিত রোমন্থন। প্রথমে আফসার আমেদ নিয়ে দুটো কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি; তাও অবশ্য পত্রিকার প্রসাদেই। কারণ, এপার বাংলার সাহিত্য, ওপার বাংলার সাহিত্য কিংবা আমাদের সাহিত্য, ওদের সাহিত্য— এই সংকীর্ণ কনসেপ্টগুলো আমাদের ঊষর মগজে এমনভাবে সেঁধিয়ে গেছে যে— আফসার আমেদের মতো বাংলাভাষার শক্তিমান লেখকরাও সে র‌্যাডক্লিফীয় ভূগোল ভেদ করে আমাদের পাঠের জগতে পাখা মেলবার ফুসরত পান না। রয়ে যান কাঁটাতারের ওপারেই। বিশ্বায়ন কিংবা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার বুলি যতই আওড়ানো হোক; শাসকদের কমিটমেন্ট ছাড়া ওগুলো আসলে ধোপে টেকে না। আফসার আমেদের জন্ম ১৯৫৭ সালে, হাওড়ার বাইনানে। ছেলেবেলা কেটেছে দারিদ্র্যের মাঝেই; আফসার জানাচ্ছেন— ‘শৈশবটা কেটেছে দারিদ্র্যে, খাওয়া-দাওয়া, পোশাকের আস্বাচ্ছন্দ্যে।’ কিন্তু, তিনি ছিলেন সেই প্রতিভার আধিকারী— যেখানে ব্যক্তিপ্রতিভার আপরিমেয়তায় আভিভূত না হয়ে পারা যায় না। তাইতো কিশোর বয়সে ওঁর প্রথম লেখা পেয়েই চমকে গিয়েছিলেন পরিচয় পত্রিকার দেবেশ রায়ের মতো ডাকসাইটে সাহিত্যিক ও সম্পাদক। আর, ব্যক্তি আফসারকে সুধাংশুশেখর দে আমাদের সামনে তুলে ধরেন চমৎকারভাবে— ‘বাংলা ভাষায় একটি শব্দবন্ধ বহুল ব্যবহৃত হয়। সেটি হল মাটির মানুষ। এই শব্দবন্ধটির দুটি অর্থ হতে পারে। প্রথম, নিরীহ, ভালো মানুষ, নির্বিরোধী মানুষ এবং দ্বিতীয়, আক্ষরিক অর্থ যদি ধরা যায়, মাটির কাছাকাছি মানুষ। মাটি-সম্পৃক্ত মানুষ। এই শব্দগুচ্ছের দুই অর্থই আমার দেখা একজন মানুষের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। তিনি আফসার আমেদ।’ আফসার আমেদ মূলত কথাসাহিত্যিক; লেখেন গল্প-উপন্যাস। কবিতা যে তাঁর হাতে আসেনি, তা নয়। বরং ছেড়েছেন, এবং চমৎকার করে শুনিয়েছেন সেই সম্পর্কছিন্নের কথা— ‘অনেক কবিতা মুদ্রিত হয়েছে। কিন্তু সেগুলো রাখিনি। নিজেকে গদ্যের সৃষ্টিতে যাবার যোগ্য করে তোলার জন্য কবিতা আমার অবলম্বন। আমার গদ্যে হয়তো কবিতার আভা থাকে। আখ্যানকে কবিতায় মিশিয়ে দেওয়ার অবচেতন ইচ্ছে বোধহয়। কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলে তার দায় অনেক।’ প্রথম উপন্যাস ঘরগেরস্তি (১৯৮১) দিয়েই আফসার আমেদ নজর কেড়েছিলেন নিষ্ঠ পাঠকমহলের। তাঁর অন্য উপন্যাসগুলোর মাঝে— সানু আলির নিজের জমি (১৯৮৪), ধানজ্যোৎ¯œা (১৯৯২), বিবির মিথ্যা তালাক ও তালাকের বিবি এবং হলুদ পাখির কিস্সা (১৯৯৪), কালো বোরখার বিবি ও কুসুমের  গন্ধ এবং চল্লিশজন লোক (১৯৯৫), মেটিয়াবুরুজে কিস্সা (১৯৯৭), হিরে ও ভিখারিনি সুন্দরী রমণী কিস্সা (২০০৬) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া রয়েছে তার বেশকিছু গল্পগ্রন্থ; এখনো দুহাতে গল্প লিখে চলেছেন বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। আফসার আমেদের সাহিত্য পড়ানো হয় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাঁর ধানজ্যো¯œা (১৯৯২) উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়েছেন মৃণাল সেন, নাম আমার ভুবন (২০০২)।

ব্যক্তি আফসার আমেদকে নিয়ে বলা হল, এবার বলা যাক সাহিত্যিক আফসার ও পত্রিকায় তাঁর সাহিত্যিক মূল্যায়ন নিয়ে। কেন লেখেন আফসার? কেমন করে হলো তাঁর লেখক জীবনের সূচনা? সে উত্তর আমরা পেতে পারি তাঁর নিজের কলমেই— ‘বিশেষত গ্রামের মানুষ জীবন নিসর্গ আমার বাল্যকৈশোরে যে ঘনিষ্ঠতায়, সত্যে, ঔদার্যে ও সহজাত অনুভূতিতে ধরা দিয়েছিল, তার সাক্ষাৎ তেমনভাবে আমার সঙ্গে ঘটছিল না সেই সব সাহিত্যপাঠের ভিতর। আর সেই তাড়নায় বুঝি বা লিখতে বসা আমার।’ এভাবেই নিজের লেখক জীবনে প্রবেশের গল্প শোনাতে শোনাতে আফসার পৌঁছে যান এক দারুণ সত্যে— ‘লেখা চালিয়ে যেতেই হয়। লিখে যাওয়াই বুঝি আর এক মুক্তি।’ পত্রিকায় আফসার আমেদের সাহিত্যিক মূল্যায়ন নিয়ে উনিশটি লেখা সন্নিবেশিত হয়েছে; লেখাগুলোতে গভীর বোধ, পাঠ, পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট। প্রথম লেখাটি দেবেশ রায়ের; শিরোনাম ‘ধানজ্যোৎ¯œার ভিন্ন ভুবন’। আফসার আমেদের গল্প ভঙ্গি নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত মূল্যবান— ‘যেন একটা জীবন যাপনের মাঝখান থেকে মাথা ফুঁড়ে তুলে গল্পটি বলতে শুরু করেন।’ নবারুণ ভট্টাচার্য তাঁর আলোচনা এগিয়ে নেন মূলত দুটি আখ্যান নিয়ে— বিবির মিথ্যা তালাক ও তালাকের বিবি এবং হলুদ পাখির কিস্সা এবং কালো বোরখার বিবি ও কুসুমের গন্ধ এবং চল্লিশজন লোক ঘিরে। লেখকদের নিয়ে তিনি বলেন— ‘লেখকরা হলো হাঁপানিওয়ালা দৌড়বীর। তাদের রিলে রেসেও দৌড়াতে হয়, আবার ম্যারাথনও শেষ করতে হয়।’ কবিতা চন্দের লেখাটির পরিধি বেশ বড় ও তাৎপর্যবহ; ‘আফসার আমেদ ও নীড়ভাঙা প্রেম’ শিরোনামে তিনি আলোচনা করেছেন আফসার আমেদের পরিচয় নির্দেশক কিছু উপন্যাস নিয়ে। রামকিশোর ভট্টাচার্যের কলমে উঠে এসেছে সাহিত্যিক আফসার আমেদের মুসলমান মানস। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে সার্থক দাসের লেখাটিকেও; যেখানে আলোচিত হয়েছে আফসার আমেদের সাহিত্যে মুসলমান মানসের নানাদিক। ‘আফসার আমেদের ছোটগল্পের মানস ও দৈহিকতা’— তাঁর গল্পের শরীর ও আত্মা বুঝতে বেশ সহায়ক বলে মানতেই হয়। রামকুমার মুখোপাধ্যায় এখানে আফসারের গল্পকার মানস খোঁজার প্রয়াস দেখান মূলত পাঁচটি গল্পের সিঁড়ি বেয়ে, গল্পগুলো— ‘খরা’, ‘ডিপটিউবওয়েলের দাম কত?’, ‘গোনাহ্’, ‘জিন্নত বেগমের বিরহমিলন’, এবং ‘ভয়’। গল্পকার আফসারকে নিয়ে এখানকার মূল্যায়নও মনে রাখার মতো— ‘আফসারের গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর চরিত্রগুলির মানস-দৈহিকতা। যদিও ভাষার পরিচিত বিন্যাসে মানস শব্দটির অবস্থান দৈহিকতার আগে কিন্তু আফসার দৈহিকতাকে প্রতিষ্ঠা করেছেন মানসের সামনে।’ গ্রাম ও প্রকৃতির বুকেই বড় হয়েছেন আফসার, হয়েছেন লেখক। সোহরাব হোসেনের লেখাটিতে আমরা দেখতে পারি তাঁর গল্পে গ্রাম জীবনের পরিবর্তনের রেখাচিত্র। সঙ্গে তাঁর গল্পের সামাজিক-ঐতিহাসিক মূল্য। এর বাইরে আফসার আমেদের ছোটগল্পের নানাদিক নিয়ে কথা বলেছেন সমীক ঘোষ ও পৃথা কু-ু। গাধার এবারের অতিথি সম্পাদক মোস্তাক আহমেদের কথা বিশেষ করে না বললেই নয়; আফসার আমেদের জীবন ও কাজ নিয়ে তাঁর তথ্যনিষ্ঠ লেখাগুলি-সাক্ষাৎকারটি না থাকলে আফসার আমেদের সার্বিক পরিচয় পেতে আমাদের মতো কাঁচা পাঠকদের বেশ বেগ পোহাতে হতো। আর, ‘নিজেকে নিয়ে নিজে’ শিরোনামে আফসার আমেদের চারটি লেখা সন্নিবেশিত হয়েছে এ সংখ্যায়। এখানে তিনি শোনান মূলত তাঁর জীবন ও সাহিত্যিক হয়ে ওঠার গল্প। বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার প্রাপকের প্রতিভাষণ দিতে গিয়ে আফসার স্মরণ করিয়ে দেন তাঁর লেখক জীবনের কমিটমেন্টের কথা— ‘আমৃত্যু লিখব। লিখে যেতেই হবে। কেন-না লেখা দিয়ে যদি কিছু করা যায়। সমাজবিশ্বে মানুষের কত দুঃখ-দুর্দশা, কত অপ্রেম-অসহায়তা, অসাম্য, নীচতা, হিংসা, বঞ্চনা আর অসম্মান, তার বিরুদ্ধে লিখে যেতেই হবে। কেন-না, এখনও গেল না আঁধার, এখনও রহিল বাধা…।’ আজকাল যখন আর্টের-সাহিত্যের জগতটা ভরে উঠেছে অশিল্পীতে, প্রতিশ্রুতিহীনতায়; যেখানে লেখার প্রকরণিক উৎকর্ষতার বালাই নেই, লেখার বিষয়ও বছরের পর বছর ঘুরেফিরছে একই আস্তাকুঁড়ে— তখন আফসার আমেদের এই প্রতিশ্রুতি, আঁধার-বাধা তাড়াবার সংকল্প আমাদের আশান্বিত করে। শেষে, পত্রিকাটির বিষয় ও শৈলী নিয়েও দুটি কথা বলতেই হয়; পত্রিকা সম্পাদনা যে নেহাতই বারোয়ারি রচনার সংকলন নয়, পরিশ্রমের, নিষ্ঠার, বিদ্যা-বুদ্ধির কাজ— সম্পাদক মহাশয় সে প্রমাণ রেখেছেন। আর, প্রচ্ছদসহ অলংকরণের যে মার্জিত নান্দনিকতা, তা পত্রিকাটির আভিজাত্য স্মরণ করিয়ে দেয়। এবারের সংখ্যায় দু-একটি মুদ্রণপ্রমাদ দেখা গেছে; তবে, হাতে গোনা। আশাকরি, গাধার আগামী সংখ্যায় তা কাটিয়ে ওঠা অবশ্যসম্ভব হবে।

নাজমুল হাসান পলক

*******************************

এবং মানুষ ॥ সম্পাদক : আনোয়ার কামাল
জুলাই ২০১৭, বর্ষ ০৩, সংখ্যা ০৮ ॥ ঢাকা

এবং মানুষ : মস্তিষ্কে নৈসর্গিক বরিষণ

সাহিত্যে বর্ষা ঋতুর প্রভাব প্রাচীনকাল থেকেই পরিব্যপ্ত। কালিদাস বিরচিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ মেঘদূত তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এরপর থেকেই ক্রমান্বয়ে দিন যত অতিবাহিত হয়েছে বর্ষা নিয়ে সাহিত্য পল্লিতে ততই ঘষামাজা হয়েছে। মধ্যযুগের পদাবলী সাহিত্য থেকে শুরু করে বর্তমান কালের আধুনিক কবিদের কলমে পর্যন্ত বর্ষার বরিষণ ঘটেছে বিভিন্ন মাত্রার বৃষ্টিপাতে। কাব্যলক্ষ্মীর বিপুল ভা-ার যেন বর্ষা ঋতু সমৃদ্ধ করেছে দাতাকর্ণের অকুণ্ঠদানের মতই। আর সেই দানেই ভরে উঠেছে, কবি ও প্রেমিকদের হৃদয়। সাথে সাথে বর্ষার মাধুর্য ও ঋতু বৈচিত্র্যের বিচিত্রতা প্রভাবিত করেছে সাহিত্যের পাতাকে। ঋতু পরিক্রমায় গ্রীষ্মের দাবদাহ স্বর্গসমতুল্য পৃথিবী নামক গ্রহটির তাপিত বুক শীতল করে তোলে। মানব জীবনের আত্মিক দিকের মতই বাহ্যিক দিকেও বর্ষার বিশেষ প্রভাব। সাহিত্যাঙ্গনে যেমন বর্ষার আত্মিক দুর্যোগের ঘটনা লক্ষ্য করা যায় তেমনি যাপিত জীবনেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিস্তর লীলা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে সুখ দুঃখের পাশা খেলে চলে।

সাহিত্য বিষয়ক ছোট কাগজ এবং মানুষ বর্ষা সংখ্যায় বর্ষা নিয়ে এমনই বিপুল আয়োজনের পশরা সাজিয়েছে। ছোট কাগজটির সূচি বিন্যাসের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে বর্ষা নিয়ে রচিত কবিতা। যাতে স্থান পেয়েছে বর্তমান সময়ের খ্যাতিমান কবিসহ উদীয়মান কবিদের শক্তিশালী কবিতা। এছাড়াও প্রবন্ধ, ছোটগল্প, অণুগল্পসহ বিদেশী সাহিত্যের কিছু কবিতা ও গল্প। যা কাগজটির সমৃদ্ধি ঝুড়ি কানায় কানায় পূর্ণ করেছে। ‘মুক্তচিন্তা’ নামক অধ্যায়টি এ কাগজটির নতুন একটি সংস্করণ।

পত্রিকাটির শুরুতে আহমদ রফিক ও আকমল হোসেন রচিত যথাক্রমে ‘মুক্তচিন্তা ও বাংলাদেশ’ ও ‘চিন্তার স্বাধীনতায় ভয় কেন?’ নামে দুটি লেখা আমরা হাতে পাই। এখানে আহমদ রফিক বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার সূচনা ও এর ফলাফল সম্পর্কে মতামত তুলে ধরেছেন। উনিশ শতকের শেষ দিকের কয়েকজন মনীষীর হাত ধরে বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার সূচনা ঘটেছে বলে তাঁর মতামত। বাঙালি দুই সম্প্রদায় তথা হিন্দু মুসলমানের দ্বন্দ্ব, সংঘাত, বৈষম্য ও নানাবিধ কারণে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও উদার মানসিকতার বিকাশ ঘটেনি বলে তিনি মনে করেছেন। তিনি রোকেয়া ও দেলোয়ার হোসেনসহ আরও মহান ব্যক্তিত্বের উদাহরণ টেনেছেন।

আকমল হোসেনের বক্তব্যও ঠিক ঐ ধরনের। চিন্তার স্বাধীনতায় জেল, জুলুম আর চাপাতির ব্যবহার বন্ধ করে তিনি কলমের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি সংবিধানের তকমা টেনে সরকারের নীরবতা ও মৌলবাদী অপশক্তির চোখ রাঙানির কথা বলেছেন যা মুক্তচিন্তার পথকে দুর্গম করে তুলেছে।

পত্রিকাটির সূচিক্রমে আমরা এর পরেই প্রবন্ধ অংশে নুরুল করিম নাসিম এর ‘মেঘবালিকা, কোথায় তোমার ঘর?’ প্রবন্ধটি পাই। এখানে তিনি তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করেছেন। অনুপম হাসান ‘কবিতায় বর্ষা ও বিরহ যাপন’ নামক প্রবন্ধে সাহিত্যে বর্ষার আদ্যপান্ত তুলে ধরেছেন। কালিদাসের মেঘদূতের যক্ষ-বিরহ স্মরণ থেকে শুরু করে বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা কৃষ্ণের প্রেম-বিরহের অনুষঙ্গ বর্ষার যোগসূত্র আবদ্ধ করেছেন। তারপর তিনি আধুনিক কবিদের কাব্য মানসিকতার সামান্য পরিচয় তুলে ধরেছেন।

বেলাল হোসেনের প্রবন্ধ ‘অনুগল্পের নেপথ্য ভূমি’ তে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনুগল্পের অস্তিত্ব ছিল কি না এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। অনুগল্পের সৃষ্টিতে লিপিকাকে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, কিন্তু তিনি এর বিরোধীতা করেছেন। তিনি বলেছেন ‘অনুগল্পের আদিরূপ বলে লিপিকার কোন ভূমিকা নেই। যদি ধরে নিই, অনুগল্পের চিহ্নরূপ লিপিকায় আছে, তবে লিপিকার ঐতিহাসিক ভূমিকাকেই বরং বিকৃত এবং খাটো করা হবে।’ উল্লেখ্য, এখানে লিপিকা বলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত একটি গ্রন্থের কথা বলা হয়েছে।

এবং মানুষ এর বর্ষা সংখ্যার সমৃদ্ধ সংকলন হচ্ছে বর্ষার পদাবলি-১ ও বর্ষার পদাবলি-২। এ অংশে কবিতার যে পসরা বসেছে তাতে বর্তমান সময়ের তরুণ কবিদের বর্ষা ভাবনা ফুটে উঠেছে। বিশিষ্ট কবি নির্মলেন্দু গুন রচিত ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি এ পত্রিকার বিশেষ সংযোজন। কবিতাটি যেন বিন্দুর মধ্যে বিশাল একটি সিন্ধু। মতিন বৈরাগী’র ‘মধ্য দুপুরের বৃষ্টি’ কবিতাটিতেও যেন প্রাণের স্পন্দন। মানব মনের বৃষ্টি সিক্ত অনুভূতির আপাদমস্তক বর্ণনা তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে—

বৃষ্টি হচ্ছে

দূর এক গাঁয়ে তোমার মুখ আমার আয়নায় বাসনা হয়ে উড়ছে

শ্রেণিতে বেঞ্চিতে আমরা ভিজছি

তুমি বলছো বৃষ্টি আমি বলছি বৃষ্টি: ফিসফিস

তোমার মুখ কাঁপছে, বৃষ্টির ফোটায় তোমার মুখ

‘জলগর্ভ’ কবিতাটিতে গোলাম কিবরিয়া পিনু’র বহুমাত্রিক ধারণার প্রকাশ ঘটেছে। আটটি স্তবক বিশিষ্ট কবিতাটিতে কবির উচ্চতর ভাববিন্যাস সত্যিই প্রশংসার যোগ্যতা রাখে। এছাড়াও কবি কামরুল ইসলামের ‘গৌড়ীয় প্রেমলিপি’ কবিতায় যে মহাকব্যিক সুষমা প্রকাশিত হয়েছে তাও কম প্রশংসার যোগ্যতা রাখে না। এ কবিতাটিতে কবির ব্যবহৃত উপমা-উৎপেক্ষা প্রয়োগ সত্যিই অভূতপূর্ব। কবিতাটি পড়ে কবি সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতার কথা আমার মনে পড়ে যায়। ঐ কবিতাটিতে বাঙালি জাতির পরিচয় তুলে ধরতে কবি যে সমস্ত ঐতিহাসিক বিষয়বস্তুর কথা উল্লেখ করেছেন তা বাংলা সাহিত্যে আর কোন কবির রচনায় লক্ষ করা যায় না। ঠিক তেমনি বর্ষা সমাচার সাজাতে ‘গৌড়ীয় প্রেমলিপি’ তে কামরুল ইসলাম এমনই ঐতিহাসিক বিষয়বস্তুর ব্যবহার ঘটিয়েছেন। কবিতাটির পুরোটা জুড়ে রয়েছে ঐতিহাসিক আবহের মাদকতার সাথে বর্ষার কাব্যিক সংযোগ। যা কবিতাটির ভাবের গভীরতাকে অতলে পৌছে দিয়েছে। লৌকিক ও পৌরাণিক অনুষঙ্গে ইতিহাসের মিশ্রণ, বর্ষার ভাব গভীরতায় এ কবিতাটি নিরন্তর প্রশংসার দাবিদার। এবং মানুষ এর যে কোন কবিতা থেকে স্বতন্ত্র এ কবিতাটি কবি কামরুল ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাববিন্যাস পাঠক মহলে আদৃত করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

বর্ষার পদাবলি-২ এর কবিতাগুলোতে মূলত প্রেম, বিরহকাতরতার ইঙ্গিত, প্রাকৃতিক অবস্থা, মনস্তাত্ত্বিক আবেদন ইত্যাদির ঘনঘটা লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে পদ্মনাভ অধিকারী, চন্দনকৃষ্ণ পাল, কামরুল বাহার আরিফ-র কবিতা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। অন্য কবিতাগুলোতে বর্ষার দিনে মানবিক অবস্থার উত্থান অবনতি গতানুগতিক। নির্মলেন্দু পোদ্দারের ‘চাষ’ কবিতাটি এ অংশের বিশেষ সংযোজন বলে আমার মনে হয়। মানবিক আবদনের ঋতু বর্ষাতে চাষীর বীজতলা, শষ্যক্ষেত ও সোনালী ধানের স্বপ্ন-সঞ্চারণ কাব্যিক মোহনায় কবিতাটিকে অন্যতম করে তুলেছে—

আমন ধানের ক্ষেত সবুজের ছবি

নীরব কবিতা দোলে কিষাণীর চোখে

নিয়তির হাতে রেখে হাত আগামীর পথে

চাষীর স্বপ্ন জমে কিষাণীর নরম বুকে।

উল্লেখ্য, কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকের একটি লাইন ‘পশ্চিমাকাশে দাবন মেঘের লুকোচুরি’ তে ‘দাবন’ শব্দটি খুব সম্ভবত দানব শব্দের ধ্বনি বিচ্যুতির ফলস্বরূপ।

এবং মানুষ এ যে সমস্ত গল্পগুলো স্থান পেয়েছে সেগুলো খুবই চমকপ্রদ। গল্পে প্লটের বিন্যাস থেকে শুরু করে কাহিনী পর্যন্ত প্রত্যেকটি বিষয়ই অত্যন্ত নান্দনিক। গল্পগুলোর মধ্যে সালেহ চৌধুরী রচিত ‘রকিংচেয়ার’ এ দাম্পত্য জীবনের একাগ্রতা নিঃশর্ত ভালবাসার শর্তে দুজনের জীবন অতিবাহিত করার চিরচারিত নিয়ম ও বাঙালি নারীর স্বামীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ গল্পকার ফুটিয়ে তুলেছেন। মনোজিৎকুমার দাস-এর ‘কাম, কামিনী ও পরিণতি’ গল্পে জমিদার শ্রেণির জঘন্যতা, নারী লোলুপতা ও তাদের পরবর্তী বংশধরদের করুণ জীবনধারণের কথা তুলে ধরেছেন। দীলতাজ রহমানের ‘প্রাণের আলোয়’ গল্পে তরুণ যুগলের প্রেম অতঃপর দাম্পত্যজীবন শুরু— একক সংসার, অনুপরিবার, ও প্রতিবেশির কুচক্রে দাম্পত্য কলহ ইত্যাদির সন্নিবেশ ঘটছে। এছাড়াও তপন দেবনাথ রচিত ‘চোখের আলোয় দেখেছিলাম’ গল্পে বিদেশিনীর সাথে একজন ভারতীয়ের প্রণয় রবীন্দ্র সংগীতের মধু মুর্ছনা ইত্যাদি বিষয় ফুটে উঠেছে। এছাড়া অন্যান্য গল্পগুলোও চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

ছোট কাগজটিকে সমৃদ্ধ করেছে অনূদিত বিদেশী সাহিত্য। বিদেশি ছ্টোগল্প ও কবিতার বাংলা অনুবাদ বাংলা সাহিত্য সমাদৃত। ছোট কাগজটিতে স্থান পেয়েছে ইটালো ক্যালভিনো’র গল্প। এবং শার্ল বোদলেয়ার ও মোং চও ন্যু’র কবিতা। অনুবাদগুলো খুবই চমকপ্রদ। শার্ল বোদলেয়ার এর কবিতার অনুবাদ বুদ্ধদেব বসু করেছেন খুবই পাকা হাতে। অদিতি ফাল্গুনী কতৃক বোদলেয়ার এর অনুবাদটিও প্রাঞ্জল।

সাহিত্যের নতুন ধারার সংযোজন হলো অণুগল্প। পাঠক সমাজের উপর লেখকদের প্রভাব ছোটগল্পের চেয়ে অণুগল্পে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং মানুষ এর অণুগল্পগুলো ঠিক সেই ধারায় পাঠকবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বলে আমার মত।

এবং মানুষ এর সর্বশেষ সংযোজন কথা সাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবেরের সাক্ষাতকার। তাঁর ৬০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবং মানুষ তার সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছে। পিতা আহসান হাবীব এর মতই তিনি ও একজন আদর্শ মানুষ। তাঁর চিন্তা ভাবনা বোধের জায়গা ইত্যাদি উক্ত আলাপচারিতায় ফুটে উঠেছে যা উদীয়মান লেখক সাহিত্যকদের দিশারী হতে পারে।

সর্বিাপরি এবং মানুষ এর ‘বর্ষা’ সংখাটি একটি সমৃদ্ধ সংখ্যা। এ সংখ্যায় চিরায়ত বর্ষা নিয়ে আনোয়ার কামাল যে পসরা সাজিয়েছেন তা প্রশংসার দাবিদার। পরিশেষে আমি এবং মানুষ সাহিত্য বিষয়ক ছোট কাগজটির পরবর্তী সংখ্যার আরও সমৃদ্ধির কথা ব্যক্ত করছি যা এ সংখ্যাটির মতই মানুষের ভাবনার মস্তিষ্কে নৈসর্গিক বরিষণে সিক্ত করে তুলবে।

আহমদ মোস্তাক

*******************************

অরণি ॥ সম্পাদক : মাহমুদ কামাল
সংখ্যা ২২ ॥ জানুয়ারি-জুন ২০১৭ ॥ টাঙ্গাইল

বিষয়ের বহুমাত্রিক বোধে অরণির যাত্রা। স্মরণ, কেন লিখি, দুই বঙ্গের কবিতা, গল্প, অনুবাদ, ভ্রমণ— কোনো কিছুই বাদ যায় নি অরণির ক্রোড় থেকে। সবকিছুর জারিত রূপ নিয়েই অরণিযাত্রা। কবি রফিক আজাদ (১৯৪১-২০১৬), পশ্চিমবঙ্গের প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক শচীন দাশ (১৯৫০-২০১৬), বহুমাত্রিক লেখক সাযযাদ কাদির (১৯৪৭-২০১৭) এবং লিটিলম্যাগ সম্পাদক ও কবি অরুণ সেন (১৯৫৮-২০১৬) স্মরণে এবারের অরণির ২২তম সংখ্যাটি।

‘ভাত দে হারামজাদা’ পঙ্ক্তির প্রবক্তা রফিক আজাদ। যিনি জীবন-প্রভাত থেকে মৃত্যু-মুহূর্ত অবধি বিচিত্র অনুভবে নিজেকে রচনা করে গেছেন। চিন্তার ও কর্মের বহুধা ও বর্ণালি অভিব্যক্তিতে তাঁর জীবন বিপুল, বিচিত্র ও জটিল হয়ে প্রকটিত হয়েছে। বয়স তাঁর যতই বেড়েছে ততই তিনি হয়েছেন উৎসমুখী অভিযাত্রিক। হয়তো সে কারণে নাগরিক কোলাহল থেকে সরে গেছেন তিনি সাধারণ মানুষের কাছে কর্মস্থল বিরিশিরিতে। যাকে তিনি ‘ঘরে ফেরা’ বা ‘আপন শেকড়ে ফেরা’ বলে মনে করতেন আজীবন। গোলাম শফিকের রফিক আজাদ : কবি ও মানুষ লেখায় কবি রফিক আজাদ সম্পর্কে এমনসব তথ্যই মেলে অনায়াসে। স্বল্পায়তনে স্মৃতির কথায় শচীন দাশ শিরোনামের লেখাটি লিখেছেন ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ মুকুল। লেখাটিতে স্থান পেয়েছে শচীন দাশের জন্ম, বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া এবং চারপাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশে তাঁর মানসগঠন, কর্মজীবন, সাহিত্যকর্ম, পুরস্কার ও সম্মাননা ইত্যাদি প্রসঙ্গ। লেখাটি পাঠে পাঠকবর্গ শচীন দাশ সম্পর্কে কিছুনা কিছুইতো পেতেই পারেন। তবে এটাও সত্য যে, পাঠক ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ মুকুলের কাছ থেকে আরও কিছু জানার প্রত্যাশা রাখেন। ফলে একটা অতৃপ্তির স্বাদ থেকেই যায়! বাংলাদেশের সদ্যপ্রয়াত কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক— এক কথায় বহুমাত্রিক লেখক সাযযাদ কাদিরকে স্মরণ করে আবদুস শুকুর খান লিখেছেন সন্ন্যাসী কবি সাযযাদ কাদির স¤্রাটের মতো চলে গেলেন নামের লেখাটি। লেখাটি পড়ে পাঠক এই বোধে উপনীত হয় যে, লেখকের কোন দেশ নেই, লেখকের সৃষ্টি ভালো কোন কবিতা, গল্প, উপন্যাস সীমানা টপকে চলে যায় দেশ থেকে দেশান্তরে, কাল থেকে কালান্তরে। কবি-লেখক নিজেও জানেন না যে, তাঁর লেখার কদর কখন হবে। কবি সাযযাদ কাদির এই বোধটাই বিশ্বাস করতেন বলেই বলতে পেরেছেন, ‘আমরা যে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, তার মূল্যায়ন সহজে হয়না, অপেক্ষা করতে হয়। জীবন চলে যাবে তবুও প্রাপ্তি হবে না। নিজের মতো করে লেখো— জয় একদিন আসবেই।’ ঋতপত্রপুরুষ তরুণ সেনকে নিয়ে লিখেছেন স্বতন্ত্রসম্পাদক ফরিদ আহমদ দুলাল কবি অরুণ সেনকে নিয়ে সামান্য লেখাটি। অর্থাৎ একজন সম্পাদকের চোখে অন্য আরেকজন সম্পাদককে দেখা। এখানে অরুণ সেনের কবিসত্তার চেয়ে ঋতপত্র সম্পাদনার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। আর পাওয়াটাও অযথার্থ নয়। নিয়মিত একটা কাগজ প্রকাশ করা খুব বেশি বিড়ম্বনাই বটে। কারণ, একটা কাগজ প্রকাশ করতে হলে যে কতটা নিষ্ঠা-আন্তরিকতা-শ্রম বিনিয়োগ করতে হয়, কতটা বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়, সেটা একজন সম্পাদকই ভালোভাবে জানেন এবং বোঝেন। অরুণ সেন এই বিড়ম্বনায় বিড়ম্বিত একজন মানুষ বিধায় আজ তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হচ্ছে। মূলত সদ্যপ্রয়াত এ ধরনের কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদককে স্মরণ করার বিষয়টি নিঃসন্দেহে পত্রিকার প্রশংসনীয় দিক।

প্রবন্ধ অংশের প্রথম প্রবন্ধ রিষিণ পরিমলের বাংলা কবিতায় প্রতিবাদ : অরুণ মিত্র ও দীনেশ দাস নামক প্রবন্ধ। প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে কবি ও শিল্পীদের প্রতিবাদের নানরূপ ভাষা ও আঙ্গিক দেখাতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), এবং বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২)’র কবিতায় প্রতিবাদ দেখিয়েছেন, পাশাপাশি অরুণ মিত্র ও দিনেশ দাসের কবিতার প্রতিবাদের ধরণটিই মুখ্য বিষয় হিসেবে রেখেছেন। যা থেকে পাঠক কবি অরুণ মিত্র ও দিনেশ দাসের কবিতায় প্রতিবাদের স্বর ও স্বরগ্রাম ভিন্নদৃষ্টিতে দেখতে সক্ষম হন। আলী রেজার জীবনানন্দ দাশ : নিসর্গ ও নির্জনতার কবি প্রবন্ধটি স্বল্পায়তনের প্রবন্ধ। প্রাবন্ধিক যে শিরোনাম ব্যবহার করেছেন সেখানকার ‘নিসর্গ কবি’ কথাটা মানলেও ‘নির্জনতার কবি’ কথাটা অনেক সমালোচক মানতে নারাজ। কেননা, জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) যখন একা একা ঘরে বসে কবিতার ধ্যান করেন, কোন সভা-সমাবেশে যান না , কল্লোলর অফিসে যান না তখন বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) তাঁকে ‘নির্জনতার কবি’ বলে আখ্যায়িত করে ছিলেন। কিন্তু ‘নির্জনতার কবি’ বললেই জীবনানন্দ দাশের সবটাই আসে যে না, বরং খাটো করা হয়— এটা বোধ হয় এখনকার সকল সমালোচক বেশ ভালোভাবেই জানেন। তাছাড়া আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) যখন জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে আলোচনা করেন তখন আর এ প্রবন্ধের কোন গুরুত্ব থাকে না বললেই চলে। এছাড়া এ প্রবন্ধের শিরোনামের সাথে প্রবন্ধের তেমন কোন গুরুগম্ভীর যুক্তি বা আলোচনা স্থান পায়নি। তাই বর্তমান সময়ে এ ধরনের প্রবন্ধ সম্পাদক না ছাপালেই ভালো করতেন বলে বিবেচ্য।

কেন লিখি অংশে লিখেছেন সৈয়দ আহমদ আলী আজিজ, আলী ইমাম, নুরুল করিম নাসিম, তাহমিনা কোরাইশী, আনোয়ার আজাদ এবং মাসুদুল হক। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে এই ‘কেন’-এর উত্তর দিয়েছেন সাজিয়ে-গুছিয়ে। নতুন প্রজন্মে যারা লিখতে চায়, নিজের মেধা-মননকে শাণিত করতে চায়, মগজের কারফিউ ভাঙতে চায়, তারা এসকল লেখকের উত্তর থেকে অনেক ‘কেন’-এর উত্তর পেয়ে যেতে এবং নিজের মনের ভেতরের তাগিদ থেকেই নিজেকে প্রশ্ন করার ভেতর দিয়ে লেখার প্রেরণা বোধ করতে পারবেন বলে বোধ হয়। এটা পত্রিকার ভালো দিক।

গল্প অংশে রয়েছে ছয় জন লেখকের ছয়টি গল্প। আব্দুল মান্নান সরকারের তৃষ্ণা গল্পটি বেশ চমৎকার এবং সুখপাঠ্যও বটে। চন্দন আনোয়ারের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ১৪২২ গল্পটি সময়-উপযোগী গল্প। এ গল্পে গল্পকার বর্তমান সময়ের রাজনৈতিককর্মীদের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন তীক্ষ্ম বুদ্ধি এবং তীক্ষ্ম ভাষায়। যাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ মেয়ে পর্যন্ত রেহাই পায় না। গল্পটি পড়লে হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪)’র ধর্ষণ প্রবন্ধের কথাটি মনে পড়ে যায় বার বার। গল্পকার যখন দ্রৌপদীর কথা বলেন তখন পাঠকের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, ভারতীয় পুরাণের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত দ্রৌপদীদের বস্ত্রহরণ হচ্ছে, তারা কেবল ভোগের সামগ্রী হিসেবেই গণ্য। এর বেশি কিছু নয়! ব্রাউনমিলার বলেছিলেন, ‘শুরুতে পুরুষ ছিল প্রাকৃতিক লুণ্ঠনকারী আর নারী ছিল প্রাকৃতিক শিকার’ এবং আজো তাই রয়ে গেছে। তৃষ্ণা গল্পটি পড়লে ব্রাউনমিলার এ কথাই সত্য বলে ধরা দেয়। চপল বাশারের ফিরে আসা গল্পটা শুরুর দিকে বেশ ভালোই ছিল। মাঝখানে কেবল কাহিনি আর কাহিনি। শেষটাও বেশ ভালো। তবে বাংলা সিনেমায় (নেতিবাচক অর্থে অবশ্যই না) এ রকম কাহিনি আহরহ মেলে। এখানে নতুনত্ব কেবল মুক্তিযুদ্ধের বিষয়কে যুক্ত করার প্রসঙ্গ। সবমিলিয়ে গল্পটিকে মোটামুটি ভালো বলা চলে। মাসউদ আহমদের সালিশ, নাহিদ হাসান রবিনের জাল এবং শারদুল সজলের একরাতে সম্পূর্ণ জীবন গল্পত্রয়ীকে গল্পের কোন সাঁচে সাজানো যায় না। এ ধরনের গল্প পত্রিকার মান খুব একটা উন্নত করেছে বলে বোধ হয় না। স ম আজাদের অনুবাদ ফ্রাঞ্জ ফ্যানোন : তুচ্ছদের কণ্ঠস্বর লেখাটি বেশ মান সম্মত। লেখাটি পাঠককে ফ্রাঞ্জ ফ্যানোনের মানবতার মানবিকীকরণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভে সাহায়ক হয় এবং তাঁর সম্পর্কে আরো বেশি জানাতে আগ্রহী করে তোলে। ইয়েমেনি ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্যকার ও সাংবাদিক ইয়াসির আবদেল বাকীর লেখা অনুবাদ করেন বিদ্যুত খোশনবীশ কালো বিড়াল নামে। এটি একটি ছোট গল্প। মানুষ তার কৌতূহল মেটানোর জন্য বা আনন্দ পাবার জন্য এক সময় কোন অপরাধ করে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে মানবহৃদয় কলুষিত হয়, অপরাধবোধে বিদ্ধ হয়, পাপচেতনায় বন্দি হয় এবং জীবনের কোন না কোন সময় তার জাগ্রতচেতনা জাগরিত হয়, তখন সে তার পূর্বের অপরাধকে বারবার দেখতে পায়। ফলে মুক্তি মেলে না, শান্তিরাজ্য থেকে যায় তার আওতার বাইরে। এ গল্পের ফ্যাকাশে মুখের লোকটির ক্ষেত্রে এটাই ঘটেছিল। কারণ, সে দশ বছর আগে যুবক বয়সে নিজের মনের কৌতূহল মেটানোর জন্য একটা কালো বিড়ালকে গাড়ি-চাপা দিয়ে হত্যা করেছিল। তারপর থেকে তার মনের সমস্ত সুখ অনুপস্থিত। তবে এ বোধটা নতুন নয়। অনেক বছর আগে ১৯৬৮ সালে আমাদের দেশের নাট্যকার জিয়া হায়দার (১৯৩৬-২০০৮) তাঁর শুভ্রা সুন্দর কল্যাণী আনন্দ নাটকে এ দার্শনিক বোধটাই প্রকাশ করেছিলেন। এ নাটকের শুভ্রাও তার পুতুল খেলার বয়সে কালো বিড়ালের বাচ্ছাগুলো পানিতে ফেলে হত্যা করেছিল। শুভ্রার অন্তর থেকে সমস্ত শুভ্রতা, সমস্ত শান্তি বিদায় নিয়েছিল সেদিন। কিন্তু এ বোধগুলো এদেশ থেকে সে দেশ, একাল থেকে সেকালে কিভাবে যে চলে যায়— সেটাই ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়! সে যায় হোক, অনুবাদ দুটি বেশ চমৎকার। এ ধরনের অনুবাদমূলক লেখা পত্রিকার মানকে উন্নতই করেছে বটে। তাছাড়া ভ্রমণকাহিনি এ পত্রিকায় একটা ভিন্নতার স্বাদও এনেছে।

জুলফিকার মতিনের যাওয়া তো হবে না কবিতা দিয়ে কবিতা-১ অংশের কবিতা শুরু হয়েছে। কবিতাটি বেশ চমৎকার। কবি শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে মিথ-পুরাণকে আশ্রয় করে অতীত থেকে বর্তমানের স্তব্ধতা তুলে ধরেছেন বোধ ও বোধির সমন্বয়ে। বিশাল অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে আছে ছিদ্রহীন অনিঃশেষ মহাজাগতিতে। এখন তাই ‘মৌনতাই ভাষা হয়ে গেঁথে দেয় বর্ণের মিছিল’। মৃত সৈনিকের মতো অপাপবিদ্ধ সব ঝাউগাছ সারি সারি দাঁড়িয়ে নীরবে। কেউ কিছু বলছে না, দেখেও সবাই না দেখার ভান করছে! এ অনিয়মই নিয়ম হয়ে দাঁড়িছে অতীত থেকে বর্তমানে। তাই কবি বলেছেন, ‘নদীজলে ছায়া পড়ে— ভেঙে মূর্তি গড়ে— হয় ছত্রখান,/ তবু তা হবে না শেষ যোজন যোজনব্যাপী গল্পবলা রাত যেন শাহেরজাদীর।’ সত্যিই তাই। হাফিজুর রহমান একাত্তরের চুকনগর হত্যাকা-কে আশ্রয় করে লিখেছেন একাত্তরের চুকনগর কবিতা। কবিতাটি পড়লে সেই ভয়াল স্মৃতিই স্মরণে এসে যায়। তাছাড়া তিনি ১০ই জানুয়ারি কবিতাটি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে লিখেছেন। কবিতাটি পড়লে মনে হয় বঙ্গবন্ধু এখনই বুঝি নামছেন এবং পাঠকও হয়ে যায় সাড়েসাতকোটি জোড়া চোখের একজোড়া চোখ। এখানেই  কবিতা দুটি সার্থকতা। হাসান হাফিজের চারটি কবিতাও বেশ ভালোই। তবে পাহাড়সমান ঋণের প্রহর, জোড়া পঙ্ক্তি ভাঙাচোরা-২ এবং নাসরীর নঈমের হাইকু কবিতা তিনটি পাঠকের মনে অনেকটা জায়গা করে নেয়। কারণ, কবিতা তিনটির ছোট ছোট পঙ্ক্তি বেশ সজীবতায় সমুজ্জল। আইউব সৈয়দের শীত সমগ্র নামের চারটি কবিতা মূলত শীত ঋতুকেই কেন্দ্র করে লেখা। তবে কবি যখনই বলেন, ‘পাখির মৌন ভাষার শীত-লিপি…’ কিংবা ‘শীতের নাগরিক হও ঝরা পাতায়…’ তখনই আমাদের চেতনা পাল্টে যাই, শীত ধরা দেয় ভিন্নার্থে। আনোয়ার কামালের চারটি কবিতার মধ্যে প্রিয় মেঘগুলো, ধূসর সময়, ঈশ^র আমাকে কাঙাল করে রেখেছে কবিতাত্রয়ী পাঠকের মনে সাড়া জাগায়। পড়তেই যেন ভালোলাগে। তবে শেষ কবিতা কাঁটাতার পড়তে গেলে সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫)’র বাঙলা ছাড়ো কাব্যের নাট্যকল্প কবিতার কথা মনে পড়ে যাই। আঙ্গিকবিচারে কবিতাটি নাট্যকল্প কবিতার মতোই, তবে বিষয়ে ক্ষেত্রে ভিন্ন। তাছাড়া ‘কবিতা-২’ এবং ‘পশ্চিমবঙ্গের কবিতা’ নামে আরও দুটি কবিতাংশ রয়েছে। ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কবিতার পর দুটি প্রবন্ধ, আবার কবিতার পর ছয়টি গল্প এবং পুনরায় কবিতা। তাও আবার একজন কবির অনেকগুলো কবিতা। সংখ্যাবিচারে ৩৫ জন কবির ১০২ টি কবিতা। অর্থাৎ কবিতার ফাঁকে ফাঁকে অন্যান্য বিষয়ের সামান্য ঝলক। তবে কবিতাগুলোর মধ্যে অকবিতাই বেশি। পাঠক এতে করে খুব একটা স্বস্তি বোধ করবেন বলে মনে হয় না। বরং সম্পাদক যদি কবিতার সংখ্যা কমিয়ে অন্যান্য বিষয়ের দিকে নজর রাখতেন, তাহলে বোধ হয় পত্রিকার মেদবহুল স্থুল শরীর সুঠাম শারীরে পরিণত হতে পারতো। পত্রিকায় বেশ কিছু বানান ভুল রয়েছে। কোথাও কোথাও কিছু কিছু বর্ণ বাদ পড়েছে, আবার কোথাও কোথাও বেশি বেশি আ-কার (া), এ-কার ()ে যোগ হয়েছে, কোলন (:)-এর আগে এবং কমা (,)-এর পরে স্পেস নেই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শব্দের প্রথমে এ-কার ()ে-এ মাত্র ব্যবহার হয়ে গেছে। এটা দৃষ্টি নান্দনিক নয়। সব মিলিয়ে পত্রিকাটি পাঠককে হতাশ করেনি, নতুন কিছু দিয়েছে।

সম্পাদক ‘সম্পাদকীয়’তে বলেছেন, ‘এক বছর বিরতির পর অরণি প্রকাশ পেল। এই বিরতির কৈফিয়ত সাদামাটা। লেখার সঙ্কট আগেও ছিল এখনও আছে। তাই বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন।’ কথাটি বর্তমান সময়ে ‘বাস্তব-সত্য’ হলেও অরণি এ কথার বিরুদ্ধে অবস্থান করুক, নিয়মিত প্রকাশ পাক, নতুনভাবে এগিয়ে যাক এবং নতুন এবং তরুণ লেখক তৈরি করুক। অরণির কাছে এই শুভ কামনা সবসময়।

বিরহান্ত কৃষ্ণ

*******************************

কার্পাস ॥ সম্পাদক : শফিক আজিজ
ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বর্ষ ০১, সংখ্যা ০১ ॥ সবুজবাগ, সাভার, ঢাকা ১৩৪০

কার্পাস— শিল্প সাহিত্যের শুদ্ধ বুনন। প্রথমেই স্মরণগদ্য— এখানে সৈয়দ শামসুল হক এবং তাঁর মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস নিষিদ্ধ লোবানকে নিয়ে লিখেছেন মোজাফ্ফর হোসেন; অনুপম হাসানের শহীদ কাদরীর স্বেচ্ছানির্বাসন ও অন্তহীন কাব্যযাত্রা নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক স্মরণগদ্য এবং মানচিত্র চিবিয়ে খাওয়া কবি রফিক আজাদের কবিতা সময়স্পর্শী ইশতেহারের ভাষাসূত্রের অপারেশন চমক ও চমৎকারীত্বের দাবী রাখে। যে কোন যুদ্ধে নারীরা তৃতীয়পক্ষ বা নিরপেক্ষ থাকা স্বত্ত্বেও প্রতিপক্ষের আঘাত তাদের ওপরই নেমে আসে বেশি। নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাসের বিলকিস চরিত্রটি তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। এ উপন্যাসে একই সাথে উঠে এসেছে, মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির আত্মত্যাগ এবং বর্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীদের ধর্মীয় বিশ্বাস। মোজাফ্ফর হোসেন সৈয়দ হকের এই দৃষ্টিদর্শনকেই আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। গদ্যটি নিশ্চয় প্রসংশার দাবী রাখে।

‘শহীদ কাদরীর স্বেচ্ছা নির্বাসন ও অন্তহীন কাব্যযাত্রা’ শিরোনামায় শহীদ কাদরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেছেন অনুপম হাসান। মাত্র ৪টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১৪৭টি কবিতা লিখে তারকাকবির খেতাব অর্জন করেছেন শহীদ কাদরী। তার কাব্যগ্রন্থের নামকরণের মধ্যেই কবিতার ধরণ অনায়াসে উপলব্ধি করা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে বর্বর আইয়ুব খানের শাসনামলে নির্যাতিত বাঙালির ব্যক্তি অধিকার নিয়ে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ: উত্তরাধিকার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরই তিনি যেন তার প্রিয়তমাকেই খুঁজে পেলেন এবং তাকে অভিবাদন জানিয়ে লিখলেন: তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা। বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপরিবারে হত্যাকা-ে তিনি শোকে এতোটাই বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসন নিলেন এবং লিখলেন: কোথাও কোন ক্রন্দন নেই নামক কাব্যগ্রন্থ। বহুদিন বিদেশের মাটিতে প্রবাস জীবনযাপন করে তিনি প্রিয়তমার বিরহে কাতর হয়ে পড়েছিলেন এবং তার ভালবাসার আকুতি জানিয়ে প্রেমের অর্ঘ্য পৌঁছাতে লিখলেন: আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা অনেকটা শিথিল হওয়ায় তিনি দেশে ফেরার সমস্ত বন্দোবস্ত করেন কিন্তু শরীরযন্ত্রেও বাধায় তিনি ফিরলেন একেবারেই লাশ হয়ে। অনুপম হাসানের কাদরীর এই আবেগটাকে ধরে উপাদেয় গদ্যটিও মনকাড়ানো।

একক কবিতা— বিন্যাসে স্থান পেয়েছে নির্মেলেন্দু গুণ, পবিত্র সরকার, খালেদ হোসাইন, আমিনুল ইসলামসহ ১০ জন কবির কবিতা। বাঙালির  চিরন্তন আকাক্সক্ষার প্রিয় স্বাধীনতা আর এই স্বাধীনতার গৌরববাহী প্রতীক জাতীয় পতাকা নিয়ে পতাকার গান শিরোনামে নির্মেলেন্দু গুণের কবিতাটি একটি চমকপ্রদ কবিতা। এই একটি পতাকার জন্য, স্বাধীনতার জন্য, আমাদের কারো পিতা, কারো মাতা, কারো ভাই, কারো বোনের বুকের তাঁজা রক্ত ঢেলে দিতে হয়েছে রাজপথে। কবির ভাষায়:

কী আছে এমন দেশমাতৃকার

গৌরববাহী এই পতাকার ন্যায়?

বুঝি না বুঝি না বুঝি না হায়-;

দাও না দাও না কেউ বুঝিয়ে আমায়।

এছাড়া আমিনুল ইসলামের কবিতায় মহান ভাষা দিবসের প্রতিবাদী ছাত্রসমাজের একটা প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়েছে। চুমু অথবা প্রতারণার মোড়ক উম্মোচন করেছেন তিনি। অন্যান্য কবিতাও অনেকটা হৃদয়স্পর্শী।

সাহিত্য আলোচনা অংশে, মাহবুবুল আলম চৌধুরীর রাজনৈতিক সচেতনতা নিয়ে জুনান নাশিত। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চাঞ্চল্যকর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস বাবর। মানুষ কথাবাহিত জীব। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের স্পর্শকাতর বিন্দুগুলো এবং তাদের নিত্যদিনের সমস্যা-সংকট, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না হুমায়ূনের মতো এতো ভালো করে আর কেউ দেখেন নি। দেশমাতৃকার ও মহান স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর অভিনিবেশের মহত্তম প্রকাশ জলিল সাহেবের পিটিশন একটি অনন্য গল্প। এই গল্পটিকে নিয়েই কাটাছেড়া করেছেন ইলিয়াস বাবর। জাতিসত্তার কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদার কবিতা নিয়ে একটি তুলনামূলক পাঠ- প্রয়াস করেছেন আশরাফ জুয়েল। বাঙালি জাতির প্রাণের ভাষা- বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রাচীন ইতিহাস নূরুল হুদার কবিতায় কীভাবে এসেছে সেটাই দেখিয়েছেন আশরাফ জুয়েল। আলোচনার শুরুতে প্রাচীন জনপদ ও উপজাতিগুলোর আলোকপাতও করেছেন, আলোচক এবং পাঠক জুয়েল।

গুচ্ছ কবিতা পর্ব অংশকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্বে- হাবীবুল্লাহ সিরাজী, সরোজ দেব, মুজিব ইরম, কামরুল ইসলামসহ ১৪ জন কবির কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে- পিয়াস মজিদ, শামীম হোসেন, মাসুদার রহমান, রিঙকু অনিমিখসহ ১৫ জন কবির উদীপ্ত কবিতা। এবং তৃতীয় পর্বে- মৃত্তিকা গুণর কবিতাসহ ৯ জন উঠতি কবির কবিতাও খানিকটা তৃপ্তি আনতে সক্ষম হবে বলে মনে হয়। শামীম হোসেনের কবিতা যেমন :

মেঘ আমার দেহে থাকে চোখে সমুদ্র

তোমাকে বলেছি আমি গুহাচিত্র দেখো

প্রবহমান ¯্রােতের উজানে হেঁটে

দাঁড়াও দিগন্তে।

পত্রিকার ব্যতিক্রমী স্বাদ যাত্রাপালার আগমনে। সাইমন জাকারিয়ার মানুষগুরু লালনসাঁই। সেখানে লালন চরিত্রের সাথে সমাজের ধর্মীয় এবং আর্থিক নেতৃত্বকে একইসাথে দাঁড় করিয়ে তিনি সংলাপের মাধ্যমে লালনের মহত্ব তুলে ধরেছেন। প্রথমে বৈষ্ণব তারপর মাওলানা, কাঙাল, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, এবং আকরাম ও দুদ্দু শাহের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। যে চরিত্রগুলোকে তিনি টার্গেট করেছেন তারা প্রত্যেকেই সমাজের, রাষ্ট্রের, আন্দোলনের নায়ক। তাঁদের সাথে লালনের এক ধরণের চিন্তা, অধ্যাত্ম ভাবনা এবং দর্শনের তফাৎ— সাইমন জাকারিয়া দেখিয়েছেন।

মুক্তগদ্য অংশে স্বকৃত নোমান, স্বপন সৌমিত্র এবং মোহাম্মদ শহীদুল ইসলামের বিচরণ লক্ষণীয়। শহীদুল ইসলাম ঋতুবৈচিত্র্যে বাঙালি কবির প্রাণময়  উচ্ছ্বাস শিরোনামে বাংলার চিরন্তন রূপটি তুলে ধরেছেন। প্রতিটি ঋতু হাজির হয় ভিন্ন ভিন্ন সাজে বাংলার শ্যামল আঙিনায়। এই সৌন্দর্যের পুজো করেছেন কবি-সাহিত্যিকরা। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, হুমায়ুন কবীরসহ আরও কতিপয় কবির কাব্যসৌন্দর্যের কথা উদ্ধৃতিসহ উঠে এসেছে ঋতুবৈচিত্র্যে বাঙালি কবির প্রাণময়  উচ্ছ্বাস লেখাটিতে।

গল্প লিখেছেন দীলতাজ রহমান, মাদল হাসান, আনিফ রুবেদ, মুহম্মদ মহিউদ্দিন, নাহিদা নাহিদ, হাসান মেহেদী, আহমেদ পিন্টু প্রমুখ গল্পকার। গল্পের রঙ, রূপ, চরিত্র, চিত্রিত জগত এবং শৈলি ও জার্নি প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন। স্বতন্ত্র।  দীলতাজ রহমানের গল্পে যেমন পাই দাম্পত্যের বিবাদ, অশান্তি অর্থাৎ প্রজাপতির ভাঙা ডানা। আবার আনিফ রুবেদের গল্পে শুদ্র শ্রেণির মানুষ, মানুষের ভেতরের ক্ষোভ, নিজেদের রক্তের ওপর উচ্চশ্রেণির কালিমা— যেন চির প্রবাহিত। যার দরুণ নিজের সন্তানকে খুন করে পিতা, ঝোঁকে, মাতাল অবস্থায়, প্রতিশোধের দহনে। ভিন্ন স্বাদ। ভিন্ন প্রবাহ ও প্রেম। শুরু করে শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠতে দেয়নি।

প্রত্যয় হামিদ রচিত বব ডিলানের নোবেল পুরস্কার সম্পর্কিত বব ডিলান: সাহিত্যের নোবেল এক মহাবিস্ময় শিরোনামে বিশ্বসাহিত্যের হালচাল তুলে ধরেছেন। বব ডিলান একজন গীতিকার ও সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও কী করে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন এই প্রশ্ন রেখে আবার একই সাথে সমাধানও দিয়েছেন যুক্তি দিয়ে। মিস্টার হামিদ বলেছেন, সঙ্গীত সাহিত্যেরই একটি অংশ। বব ডিলান যেমন গীতিকার তেমনি কবিও। তাই তার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার যুক্তিসঙ্গত। তিনি এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। প্রত্যয় হামিদের যুক্তিসঙ্গত আলোচনা আমাদের অন্তর্নিহিত বিতর্ককে দমন করেছে।

ময়মনসিংহ গীতিকার আশ্রয়ে আনন জামানের জুঁইমালার সইমালা নাটকটি ভিন্ন সংযোজন। এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মহুয়ার আদলে গড়া জুঁই চরিত্রটিকে বিকশিত করেছেন। যেখানে দারিদ্র্য আছে, ক্ষুধা আছে, আছে প্রেম এবং নিরেট ট্রাজিক পরিণতি আত্মহননের সিদ্ধান্ত। নাট্যকার ঋণ স্বীকার করে আমাদের নাটকের পটভূমি বুঝতে সহায়তা করেছেন। তবে নাটকটির সংলাপের ভাষায় কিছুটা অসামঞ্জস্য রয়েছে তবুও নতুন ইমেজের চেষ্টা খারাপ লাগবে না।

কার্পাস তার দেহে সাহিত্যের সবগুলো শাখাকে ছুঁয়ে জাতে আসার চেষ্টা করেছেন। যেখানে অন্যান্য পত্রিকায় নাটক, যাত্রাপালা দেখাই যায় না সেখানে কার্পাস এই দুজনকে ধারণ করেছেন। অনেকটা সফলও হয়েছেন। পত্রিকার বানান অসতর্কতা কিছুটা লক্ষ করা যায়। কার্পাস যে ঘোষণা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে, মসলিনীয় কারুকার্যের পুনরুদ্ধার, নিজের ধ্বংসের অন্তর্গত বেদনার মুক্তি। যেন সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী এবং আরামপ্রদ হোক এই কামনায়।

অদ্বৈত অনুপম

*******************************

সম্প্রতি প্রকাশিত পত্রিকা ও পুস্তক পরিচিতি

 

 

 

বাঙালী মুসলমান ও তার মন
জুলফিকার মতিন
চিহ্ন ॥ রাজশাহী
মার্চ ২০১৭

কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক জুলফিকার মতিনের সুউচ্চ অন্তর্ভেদী চিন্তনপ্রয়াসের অনবদ্য ফসল বাঙালী মুসলমান ও তার মন বুকলেটটি। দীর্ঘায়তন এ প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্যপত্র চিহ্নর ৩০ তম সংখ্যায়। বাঙালি মুসলমানের মন শিরোনামে আহমদ ছফার বিখ্যাত-প্রচলিত প্রবন্ধটির থেকে এ প্রবন্ধটির স্বাদ একবোরেই আলাদা। বাঙালী মুসলমান ও তার মন-এ প্রবাহিত হয়েছে বাঙালি মুসলমান নিয়ে লেখকে চিন্তাধারার স্বতন্ত্র¯্রােত। ধর্মীয় জাতিসত্তা বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে অঙ্গীভূত হলেও সাম্প্রদায়িকতার চর্বিত চর্বণ এখানে নেই। বিপরীতক্রমে বাঙালি জাতির আত্ম-পরিচয়ের সঙ্কটটিকে সুনিপুণভাবে খতিয়ে দেখার প্রয়াস রয়েছে প্রবন্ধটিতে। বাঙালি পরিচয়ের সঙ্গে উক্ত নামধারী জাতির ধর্মীয় পালাবদলের ইতিহাস পুস্তিকাটির একটি অভিনব সংযোজন। আর, এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ধর্মীয় পালাবদলের প্রক্রিয়ায় বাঙালির মুসলমানিত্ব অর্জনের ধারাকে বলিষ্ঠ কিংবা স্থায়ী করা নয়; বরং বাঙালি চেতনার উদার অসাম্প্রদায়িক চালিকাশক্তিকে পুনরুদ্ধার করা। পুস্তিকাটি মননশীল পাঠকদের অবশ্য সংগ্রহযোগ্য।

*******************************

কমলাক্ষের অকাল বোধন
অদিতি ফাল্গুনী
আগামী প্রকাশনী ॥ ঢাকা
ফেব্রুয়ারি ২০১৭

অদিতি ফাল্গুনী হালের পরিচিত-প্রতিশ্রুতিশীল কথাকার। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থেও সংখ্যা আট। গল্পের বাইরে অনুবাদ ও গবেষণাতেও সিদ্ধহস্ত তিনি। তার নবম গল্পগ্রন্থ কমলাক্ষের অকাল বোধন ফেব্রুয়ারির বইমেলায় বেরিয়েছে ‘আগামী প্রকাশনী’ থেকে। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন— ‘বাগদা ফার্মে চোখ হারানো ডø জেন টুডুকে’। অন্যান্য গল্পগ্রন্থের মতো এ গ্রন্থেও অদিতি ফাল্গুনীর মনোভূমি সুদূরপ্রসারিত। প্রথম গল্পটি পুলিশ-রাষ্ট্র-রাজনৈতিক নেতা-চিনিকল কর্তৃপক্ষের ত্রিমুখী সংঘর্ষে চোখ হারানো কমলাক্ষ বাস্কের। সেই অদিতির গল্পের অকাল বোধিত ভূমিপুত্র। গল্পটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রামাণ্যতার দাবিদার। কমলাক্ষের অকাল বোধন-এ অদিতির গল্পভুবন সর্বব্যাপী— একদিকে যেমন আছে, অপরদিকে তেমনি আছে অনন্তসাধন স্যার- রাজপ্রাসাদের দাসী মন্থরার কথা। পুরাণের বিনির্মাণে রামায়ণর অভিশপ্ত কুঁজো-বৃদ্ধা মন্থরা এখানে হয়ে উঠেছে অনন্য মানবী। গল্পগুলির গাঁথুনি অত্যন্ত সুসংহত।

*******************************

শব্দে আঁকা নারী
ইমরোজ সোহেল
অনিন্দ্য প্রকাশ
ফেব্রুয়ারি ২০১৭

টাকার বিনিময়ে অফিসকে দেহ দিয়েছেন কবিতাকে মন- এমনটাই নিজের সম্পর্কে বলেছেন ইমরোজ সোহেল। তাঁর পঞ্চম কবিতার বই শব্দে আঁকা নারী। শব্দের সম্মোহনে নারীকে স্বাগত জানিয়েছে, এঁকেছেন কবিতায়। যান্ত্রিক জীবনের জট, মুখোশের আড়ালের মানুষ, প্রেম, প্রেমের জন্য অপেক্ষা-আকুতিই শব্দে আঁকা নারীর উপজীব্য। কবিতার স্বর ক্লাসিক, শব্দ পরিচিত, উপাদান সহজ-সস্তা হলেও কবিতাগুলোতে আলাদা টান আছে। কবিতার নাও কে ইমরোজ সোহেল শব্দের-ছন্দের বৈঠায় দুলিয়ে দুলিয়ে চালাচ্ছেন যেন। আশা করি তিনি ভবিষ্যতে দৃষ্টিনন্দন ঘাটে পৌঁছাতে পারবেন।

*******************************

অস্তগামী জংশন
নাসিরুদ্দিন শাহ্
চৈতন্য প্রকাশনী, সিলেট
ফেব্রুয়ারি ২০১৭

‘কবিতা আমাকে কলমিলতার মতোই রেখেছে আপন কষ্টি-উত্থান আঙিনায়’। কবিতার সাথে এ রকম সম্পর্ক করে নিয়েছেন নাসিরুদ্দিন শাহ্। অস্তগামী জংশন তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই। হতাশা, পরাভূত স্বাধীনতা, তথাকথিত গণতন্ত্র, প্রেম ও বিত্তের বিচ্ছেদের কাতরতার ভেতর দিয়েও কবি এক নতুন স্বপ্ন-ছক এঁকেছেন এই কাব্যগ্রন্থে।  পৃথিবীর সমস্ত শপথ ভেঙে পড়েছে যেন ক্লান্তির নেশায়। দিনদিন প্রেতাত্মার  অধিপত্য, দাপট বেড়ে যাচ্ছে। কবি নাসিরুদ্দিন এটাকে মেনে নিতে পারছেন না তাই তিনি শব্দে-কবিতায় আমাদের স্পষ্ট করে দিয়েছেন। অস্ত করে দিতে চেয়েছেন। অস্তগামী জংশন কাব্যটি আশা করি পাঠকের দৃষ্টি কাড়বে।

*******************************

বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ
ড. মর্ত্তুজা খালেদ
জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা
জুলাই ২০১৭

মেধাবী গবেষক ও অধ্যাপক মর্ত্তুজা খালেদ এর গবেষণাধর্মী ও ইতিহাসসমৃদ্ধ বই¬— বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক চেতনার। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পৃষ্ঠপোষকতায় সম্পাদিত গবেষণা প্রকল্পের ফসল গ্রন্থটি। বাংলার সাথে মুসলমানের সম্পর্ক, শিল্পবিপ্লব, অর্থনৈতিক রূপান্তরের সাথে মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান, সাম্প্রদায়িকতা, উপমহাদেশের বিভক্তি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমানের ভূমিকা প্রভৃতি ঐতিহাসিক বিষয়গুলোকে খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ আছে বইটিতে। বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থান, বিকাশ-বিস্তৃতি এবং তদ্সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ইতিহাস সম্পর্কেও  বিশদভাবে জানতে সহায়ক এ গ্রন্থটি।

*******************************

প্লাস্টিক মানুষ শুন্য বাড়ি ও অন্যান্য
নবনীতা বসু হক
ঈক্ষণিকা প্রকাশনী
ফেব্রুয়ারি ২০১৭

নবনীতা বসু হক প্রসিদ্ধ গল্পকার, দুই বাঙলাজুড়ে। ১৯৯৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশ পায়। এবং তিনি ভারতীয় নারী লেখিকার গল্প নামে একটি সংকলনও সম্পাদনা করেছেন। প্লাস্টিক মানুষ শুন্য বাড়ি ও অন্যান্য নবনীতা বসুর সদ্য প্রকাশিত গল্পের বই। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন বারো বছর বয়সী ঊর্জা ইমান। এতে তিনি বিশটি ছোট অবয়বের গল্পের স্থান নিশ্চিত করেছেন। গল্পগুলো একটা দীর্ঘ সময় ধরে লেখা। তাই এটি সচেতনভাবে হোক আর অচেতনভাবে হোক সমকালকে ধারণ করেছে। কল্পকাহিনি, কুহক ও চারপাশের পরিচিত চরিত্রসকল তাঁর গল্পে স্থান করে নিয়েছে। গল্পগুলোর ভিত্তিভূমি সমাজ, রাষ্ট্র এবং অভিজ্ঞতা। গল্পের ভাব ও ভাষা ফুরফুরে হলেও গল্পগুলো নিছকই গল্প  নয়, গল্পের ভেতর দিয়ে সত্য শিল্প-আস্বাদের পটভূমি বিন্যস্ত হয়েছে। পাঠক একটু সচেতন ও দূরদৃষ্টির হলে মন কাড়বে বলে আশা করা যায়। নবনীতা বসুকে অভিনন্দন।

*******************************

আনর্ত
সম্পাদক : রহমান রাজু
প্রথম সংখ্যা ॥ রাজশাহী
নভেম্বর ২০১৭

‘অন্তর্বতী থিয়েটার কাগজ’ স্লোগানকে সামনে রেখে রহমান রাজু সম্প্রতি সম্পাদনা করেছেন আনর্ত নামের নাট্য বিষয়ক পত্রিকা। থিয়েটার, থিয়েটারওয়ালা, থিয়েটার স্টাডিজ এবং গ্রাম থিয়েটারর পর আনর্তর আবির্ভাব বাংলাদেশের থিয়েটার কাগজের ক্ষেত্রে এক নতুন সংযোগ। এ নামগুলো এক সঙ্গে উচ্চারণের দাবি রাখে। আনর্তর প্রথম সংখ্যা এটি। কিন্তু পত্রিকাটি দেখে কোনোভাবেই বোঝার সাধ্য নেই যে, এটিই প্রথম সংখ্যা! ‘সম্পাদনা যে নিছক সংকলন নয়, গভীর বোধ ও অসীম পরিশ্রমসাধ্য কর্মযজ্ঞের বিষয়’ —এরই প্রমাণ মেলে সংখ্যাটির পরতে পরতে। আনর্তর এই সংখ্যায় মলয় ভৌমিকের নাটক ‘উত্তরখনা’ এবং লেডি গ্রেগরি থেকে অনূদিত নাটক ‘চন্দ্রোদয়’ প্রকাশসহ বাংলাদেশের নাট্যচর্চা, চিন্তা এবং প্রয়োগের বিশ্লেষণী এবং গভীরদৃষ্টিসমৃদ্ধ প্রবন্ধের পাশাপাশি বিশ্বনাট্য বিষয়ক বেশকিছু মনোগ্রাহী আলোচনা স্থান পেয়েছে। নাটকের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নাট্যজন এবং সাহিত্যের সাধারণ পাঠক, লেখক, সমালোচক— সকলের জন্যই এটি মূল্যবান আকর কাগজ হিসেবে গভীর অন্তর্ভেদী এবং বাস্তবানুগ ভূমিকা রাখতে সমর্থ হবে বলে আশা করা যায়। আনর্ত এগিয়ে যাক; সাহিত্য এবং রঙ্গালয়ের বন্ধুর পথে বন্ধু হয়ে চলুক সবসময়।

*******************************

কৃষ্ণপ্রহর
সম্পাদক : হাসান ঈমাম সুইট
চতুর্থ সংখ্যা ॥ রাজশাহী
আগস্ট ২০১৭

কৃষ্ণপ্রহর। কালো অধ্যায়। বাঙালির ইতিহাসের কলঙ্কিত শোকাবহ আগস্ট। কৃষ্ণপ্রহরে তুলে ধরেছে বাঙালির হৃদয়ের ক্ষতকে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ জারিত, বোধ-চিন্তাকে তুলে ধরতেই কৃষ্ণপ্রহরের জন্ম। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেশকিছু গবেষণামূলক প্রবন্ধ, গল্প, ছড়া, গান, প্রবীণ-নবীন কবিদের কবিতাসহ একটি নাটক ও সংগঠনের কার্যক্রমের বয়ান সংখ্যাটিকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে সংখ্যাটির অধিক সফলতার দাবী রাখে বেশকিছু গবেষণামূলক প্রবন্ধ। একজন বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য কতোটা প্রয়োজন ছিল, প্রবন্ধগুলো পাঠে তা কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়। কৃষ্ণপ্রহরের কাজ, কাজের প্রয়াস আরও বিস্তৃত হোক।

*******************************

অ্যালবাম
সম্পাদক : মনজু রহমান
শরৎ-হেমন্ত ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ॥ রাজশাহী-ঢাকা

কবিতা বিষয়ক বয়োজ্যেষ্ঠ ছোটকাগজ অ্যালবাম। ৪১ বছর পূর্বে এর যাত্রা শুরু এবং পৌঁছেছে ৪১  সংখ্যায়। নবীণ-প্রবীণ কবির কবিতা, মুক্তগদ্য আর স্মৃতিচারণার সংমিশ্রনে পাথরচাপাগুল্ম কবি শহীদুল্লাহ্কে নিয়ে ক্রোড়পত্রের জ¦লন্ত হেঁসেলে যে উপাদেয় উপহার দিয়েছে তা নিঃসন্দেহে উপভোগ্য। ৪১ জন কবির গভীর পর্যবেক্ষণশক্তির স্মারক সব কবিতা অ্যালবামকে যেন মহীরূহে দাঁড় করিয়েছে, যার ছায়ায়, কাব্যসুধায় পথিককুলের শরীরে প্রশান্তির প্রলেপ পড়ে। পাতার ফাঁকে ফাঁকে স্মৃতিচারণ আর মুক্তগদ্যের সারস ফল অ্যালবামকে দিয়েছে পরিপূর্ণতা, আরো বেশি  বৈচিত্র্যময়তা। সূচির প্রথমেই রয়েছে কবি মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সাদাকালো ছবিসম্বলিত সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল। কবি মুহম্মদ শহীদুল্লাহর যাই, আলো অন্ধকারে যাই কাব্যগ্রন্থ নিয়ে রেজাউল করিম চৌধুরীর আলোচনা এছাড়া অন্য দুটি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে মাহমুদ হাসান এবং এ.কে. আজাদের তথ্যসমৃদ্ধ তীক্ষœ গদ্যও বেশ মনোগ্রাহী। সম্পাদক মনজু রহমানের নেয়া কবির সাক্ষাৎকারটি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কুমার দীপের “কবিতা, তুমি কার?” গদ্যটায় মিলের পথে চলতে না পেরে অমিলের পথে চলা, বলা, ছন্দহীন কবি পদবী প্রত্যাশীদের নিন্দে করা হয়েছে। সমীর রায়চেীধুরীর “প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ধারণা”, ইলিয়াস বাবরের “কবিতার ঘোরে থাকে পৃথিবীর সময়”, সানাউল্লাহ সাগরের “সমকালীন সাহিত্যচর্চা ও সম্পাদকের প্রতিভা অন্বেষণ” শিরোনামার মুক্তগদ্যগুলোও চমৎকার। বিশেষত সুব্রত সেনের “দুঃসময়ের ম্যানিফেস্টো” মুক্তগদ্যটিকে মুকুটের ভূমিকায় বসানো যায় অনায়াসে। এছাড়াও নারীদের চলমান নিরাপত্তাহীনতার হাহাকার ধ্বনিত হয়েছে পারু পারভীনের পঞ্চপদ্যে। এবং প্রয়াত দুজন সাহিত্যিককে নিয়ে মনজু রহমান এবং মাহমুদ হাসানের স্মৃতিচারণ গদ্যের মাধ্যমে পত্রিকার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। পত্রিকাটি নিঃসন্দেহে ভালো লাগার।

কবিতাকে বুকে-পিঠে ধারণ করে অ্যালবাম যে গন্তব্যের দিকে পা বাড়িয়েছে, সেই গন্তব্যের পথ মসৃন এবং ঝকঝকে হোক এই প্রত্যাশাই করি। জয়তু অ্যালবাম।

*******************************

মুক্তির উৎসধারা
সম্পাদক : নুরুল আলম মাসুদ
অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদযাপন পরিষদ ॥ নোয়াখালী
অক্টোবর ২০১৭

মানুষের মুক্তির আওয়াজ নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামাজিক বিপ্লব, অক্টোবর বিপ্লব।  মহামতি লেনিন এই বিপ্লবকে সার্বজনীন করে তুলেছিলেন। ২০১৭ এই বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন করা হয়। এ উপলক্ষে— অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদযাপন পরিষদ, নোয়াখালী প্রকাশ করেছে মুক্তির উৎসধারা নামে একটি স্মারকপত্রিকা। অক্টোবর বিপ্লব কি করেছিল, তার উদ্দেশ্য কি এবং তার প্রভাব পরবর্তীকালে কতটুকু বিস্তার লাভ করেছে— এমনই দশটি প্রবন্ধ, নোয়াখালী কমিটি পরিচিতি এবং সংযুক্তি দিয়ে লালমলাটে সাজানো হয়েছে পত্রিকাটি। অক্টোবর বিপ্লবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এছাড়া অক্টোবর বিপ্লবের শিক্ষা, অঙ্গীকার ও অর্জন, বিপ্লবের শতবর্ষ স্মরণ, বিপ্লবের সাথে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক, সমাজতন্ত্রে নারী প্রভৃতি বিষয় নিয়ে ঋদ্ধ করার মতো প্রবন্ধ রয়েছে সংখ্যাটিতে। বেশ ছিমছাম। বিপ্লবের আদর্শকেই যেন ধারণ করেছে। সংখ্যাটি অক্টোবর বিপ্লব সম্পর্কে অনেককেই আগ্রহী করে তুলবে।

*******************************

 

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা ১৮
আলী ইউনুস

‘গোল্ড বাংলাদেশ’—¬¬বিতর্কচর্চার লক্ষ্যে পথচলা শুরু ২০০৫ সালে। শত চ্যালেঞ্জকে উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সংগঠনটি। সময়টাও বেশ! ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল। এক যুগেরও বেশি সময়ের সাফল্য, অর্জন ও সুনাম নিয়ে বিতর্কচর্চায় সমুন্নত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক সংগঠন ‘গ্রুপ অব লিবারেল ডিবেটরস গোল্ড বাংলাদেশ’। প্রতি বছর জাতীয় বির্তক প্রতিযোগিতা, আন্তঃক্লাব, ফ্রেশার্স ডিবেট চ্যাম্পিয়নশীপ, বিতর্ক বিষয়ক কর্মশালা ও পহেলা বৈশাখে ছাত্র-শিক্ষক রম্য বিতর্কের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই অগ্রযাত্রার ধারা অব্যাহত রেখেছে সংগঠনটি। দেশের সকল বির্তক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কৃতিত্ব অর্জনের নজির রয়েছে সংগঠনটির সদস্যদের। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকদের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে সংগঠনটি। যেখানে অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে তারা যুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। যুক্তির বোঝাপড়াটাও মিলিয়ে নিতে শিখছে। এর মধ্য দিয়ে সত্যিকার একজন দক্ষ বিতার্কিক হয়ে উঠারও সুযোগ অর্জন করেছে। সংগঠনের কার্যক্রম হিসেবে সপ্তাহের প্রত্যেক মঙ্গলবার বিতর্ক সেশন অনুষ্ঠিত হয় দুুটি পর্বে। একটি গ্রুপ জুনিয়র সদস্যদের আর একটি সিনিয়রদের। বির্তকের বিষয় প্রত্যেক সেশনে ভিন্ন এবং তাত্ত্বিক ও তাথ্যিক। দুপক্ষের তুমুল বির্তক। বির্তক সেশন শেষে নিয়মিত চায়ের আড্ডায় সংগঠনের সদস্যরা। এখানেও থামেনি বিতর্কের রেশ। বিতর্কের বিষয়টিকে তারা খুবই চ্যালেঞ্জ এবং উপভোগ্য হিসেবে গ্রহণ করে প্রতিযোগী বিশ্বের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই তাদের সংগঠনে যে কেউ বিতর্কচর্চায় যুক্ত হতে পারে। নবীন শিক্ষার্থীদের ভেতর বিতর্কের আলোড়ন সৃষ্টি করতে ‘ফ্রেশার্স ডিবেট চ্যাম্পিয়নশীপ’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে গোল্ড বাংলাদেশ বিতর্কের সংগঠনটি। পরে গোল্ডের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, সঙ্গে একজন বিতার্কিক হয়ে ওঠার সর্বাত্মক সহযোগিতাও করে সংগঠনটি। বিতর্কচর্চার বড় প্রাপ্তি নিজের গুরুত্ব, ব্যক্তিত্ব তৈরী করা যা সংগঠনের মেম্বারদের মধ্যে তৈরী হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। ১৪২২ থেকে বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে ‘পহেলা বৈশাখে ছাত্র-শিক্ষক রম্য বিতর্কে’র আয়োজন বেশ উপভোগ্য এবং শিক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিতর্কের মাধ্যমে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছে। আর সেই বন্ধন রক্ষার আয়োজনে গোল্ড বাংলাদেশের ভূমিকা প্রশংসনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যুক্তিবাদী দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে নিজের প্রাপ্য স্থান বুঝে নিতে ২০১৭-এ ‘জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা’র আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করে সংগঠনটি। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতাও থাকে। বিতর্ককে শিল্প হিসেবে এগিয়ে নেয়া ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া, যুক্তিশীল সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন এবং পড়াশুনার পাশাপাশি নিজেদের দক্ষ সংগঠক হিসেবে গড়ে তোলার আকাক্সক্ষা নিয়ে কাজ করছে ‘গ্রুপ অব লিবারেল ডিবেটরস’ (গোল্ড বাংলাদেশ)। এখানে শুধু বিতর্কচর্চাই হয় না, বিতার্কিক ও বিতর্ক অনুরাগী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা উৎসাহিতও করা হয়। এক যুগ আগে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি এখন আগের চেয়ে তরুণ ও সবুজের মতো সবল। তবে বিতর্কের মতো সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে সঠিক চর্চা অনেকক্ষেত্রে সম্ভব না হলেও গোল্ড বাংলাদেশ শুধু কর্পোরেট বা স্পন্সর নির্ভর না হয়ে শিক্ষার্থীদের চাঁদা ও সাবেক সদস্যদের সহযোগিতায় স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে উত্তরের বেশ কয়েকটি জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গোল্ড বাংলাদেশ কর্মকা-ের প্রসার ঘটাতে পেরেছে। শুধু স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে যাবে সংগঠনটি এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তবে এমন উদ্যোগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বিকল্প নেই। কারণ কূপম-ূকতা নয়, একটি মনন ও যুক্তির নিরিখে সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিতর্ক ও বিতার্কিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করে। এক যুগ ধরে পথচলায় সংগঠনটির রয়েছে অনেক সুনাম, অর্জন। আশা করি একদিন প্রতিষ্ঠিত এবং বিতর্কচর্চার মডেল সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে সংগঠনটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক সংগঠন অথচ একটা প্রাচীর দিয়ে একটা অনুষদের ভেতর কি তাকে আটকে রাখা যায়? যায় না। ‘বিএফডিএফ’— এমনি একটি সংগঠন যার জন্ম হয়েছিল একটা ঘরের মধ্যে, একটা অনুষদের মধ্যে, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৮- এ। কিন্তু তাকে ঘরে আটকানো যায়নি। ছড়িয়ে পড়েছে ২০১৪তে। এখন সংগঠনটি কোনো নির্দিষ্ট ফ্যাকাল্টির নয়, সকল বিভাগের সকল ফ্যাকাল্টির। কিন্তু জন্মনাম তাই বিএফডিএফ থেকে গেছে। বিএফডিএফ এর পূর্ণরূপ— ‘বিজনেজ স্টাডিজ ফ্যাকাল্টি ডিবেটিং ফোরাম’।  সাংগঠনিক আদলটাও পরিচ্ছন্ন, স্টান্ডার্ট-স্মার্ট।  সংগঠনটি জন্মের দুবছরের মাথায় জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রয়াসী হয়েছে। ২০১০এ ১ম, ২০১১তে ২য় এবং ২০১৪তে তৃতীয়বারের মতো আন্তবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে নিজেদের সাংগঠনিক এবং বিতার্কিক অবস্থানের জায়গাটি পরিষ্কারভাবে জানান দেয় সংগঠনটি। ২০১৭ তে আর.ইউ ওপেন ডিবেট কম্পিটিশনের আয়োজন করে যেখানে স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকরা অংশগ্রহণ করে, এবং এখানে একই জেনারেশনের তিনবয়সী মত/ জ্ঞানবুদ্ধির উপস্থাপিত হয়। নিজেদের ঝালিয়ে নিতে সপ্তাহের ওয়ার্কশপ হিসেবে শনিবার, রবিবার, মঙ্গলবার এবং বৃহস্পতিবার রবীন্দ্র ভবনের ছাদে চলে বিতর্কের কৃৎকৌশল এবং সমসাময়িক বিষয় আশয় নিয়ে তুমুল ঝড়। বিতর্ককে বিতর্কের জায়গায় নয় বরং জ্ঞানবুদ্ধির পরিমাপক হিসেবে মনে করে সংগঠনটি। যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি, বিতর্কচর্চা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মুক্তবুদ্ধির প্রস্ফুটন করতেই প্রত্যেক বছর আয়োজন করে নবীনবরণ, ফ্রেসার্স ডিবেট প্রতিযোগিতা, হল ডিবেট প্রতিযোগিতার। সংগঠনটির বর্তমান সদস্য সংখ্যা শতাধিক। সংগঠনটি এখন দাঁড়িয়ে যাওয়া সংগঠন, কিন্তু অনেক বেগ পেতে হয়েছে। ¯্রােত উজানে গেছে। এখন যে কোন আয়োজনে সংগঠনটির সাগরেদের অভাব নেই কিন্তু সংগঠনটি ভাবছে অন্যভাবনা, বিতর্ককে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনা। বিতর্কের মাধ্যমে নিজেদের বোধবুদ্ধি অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ভাবনা।

রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি নামে আরও একটি বিতর্কের সংগঠন রয়েছে। তবে সংগঠনটি পাবলিক কার্যক্রমে সক্রিয় না হলেও নিজেদের মধ্যে ঢিলেঢালা করে বিতর্কচর্চা অব্যহত রেখেছে। যা হোক, সাংগঠনিক— অসাংগঠনিক যাই হোক— রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কচর্চা একটি আন্দোলনের নাম। যে আন্দোলনে প্রত্যহ সামিল হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলন আরো বেগবান হবে এবং এমনটাই সকলের প্রত্যাশা।

*****************************

 

 

কী লিখি কেন লিখি ১২

 

জীবনানন্দ দাশ
কেন লিখি

জীবন ছাড়িয়ে কোনও মানবীয় অভিজ্ঞতা থাকা কি সম্ভব? কবির অভিজ্ঞতা যা আকাশ পাতাল সমস্তই উপলব্ধি ক’রে নিতে চায় তা-ও তো মানবীয়। অবশ্য, এ-রকম কবি আছেন—বা কাব্যনিয়তির পথে এমন সব মুহূর্ত মাঝে-মাঝে এসে পড়ে যখন মনে হয় কবির ভাবনাপ্রতিভা এমন এক অপরূপ অপ্রশান্তির আস্বাদ পেয়েছে যা জীবনের কোনও ব্যবহারের ভিতরেই ধরা পড়ে না, জীবনের প্রতিবিম্বও নয়, আমাদের এই ইতিহাসস্মৃত জীবন ছাড়িয়ে কবিমানসের কোনও অনন্য অভিজ্ঞতার দেশে চ’লে গিয়েছে। কোনও কবি যদি এ-রকম মনে করেন তা হলে বুঝতে হবে যে, তিনি কালকের বা আজকের নিত্য ব্যবহার্য সমাজপদ্ধতির বাইরে কোনও কিছুর কথা ভাবছেন, কিন্তু তবুও জীবনের বাইরে কোথাও চ’লে যেতে পারেন নি। কারণ, জীবন—এই জীবনের পদ্ধতি যে-কোনও সমাজ ও সমবায়-পদ্ধতির চেয়ে বড়, এরই ভিতরে মানুষের সমবায়-ব্যবস্থা বার-বার ভেঙ্গে যাচ্ছে ও নতুন ভাবে গ’ড়ে উঠছে। আমাদের এই গ্রহের জীবন-সাক্ষ্যের সব-চেয়ে স্মরণীয় দৃষ্টান্ত মানুষ; কোন বিস্ময়কর প্রমত্ততার মুহূর্তেও নিজেকে অন্য রূপ কল্পনা করা তার পক্ষে কঠিন; তার কল্পনাপ্রতিভার চমৎকার সংহতির মুহূর্তে মানবজীবন সম্পর্কে সব-চেয়ে মূল্যবান কথা আবিষ্কার করবার কিম্বা নতুন ভাবে প্রচার করার সুযোগ সে পায়। এই সব সময়ই হচ্ছে কাব্য বা শিল্প সৃষ্টির সময়।

যাঁরা মনে করেন কবিতা যে-কোনও সময়ে সৃষ্ট হতে পারে, কারণ কবিতা সমীচীন গদ্য বা ভূয়োদর্শী সম্পাদকীয় মন্তব্যের মতই,—কবিতা সম্পর্কে তাঁদের ধারণা অন্য রকম হবে। তাঁদের মত হয়তো, মানুষের ভূয়োদর্শী মনই কবিতা রচনা ক’রে যেতে পারবে—গদ্যে কী পদ্যে, এবং সে-কবিতার ভাষায় ও অর্থে কোনও দিব্য ইঙ্গিত বা দিব্যতার স্পর্শ থাকবে না, কিম্বা থাকা অবান্তর, বা অপরাধ।

থাকা অপরাধ। তাঁদের কারু হয়তো এই মত। অনেক স্থলেই তাই দেখছি সৎ সম্পাদকীয় উক্তিই যেন কবিতা। কিন্তু কবিতা বাস্তবিকই কি তা-ই? যে-কোনও সুস্থ ও সমীচীন মানস অসুস্থ বা অন্যবিধ সমাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উক্ত রকমের মন্তব্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন,—এবং অহরহ ক’রে যেতে পারেন। এর জন্য আত্মভ্রষ্ট হৃদয়াবেগ ও কল্পনাপ্রতিভাকে সুনিয়ন্ত্রিত করবার মত কোনও বিশেষ সুযোগ বা প্রতীক্ষার দরকার আছে ব’লে মনে হয় না। কারণ, তাঁদের মতে কাব্য রচনা সম্পর্কে ভাবনাপ্রতিভা ও হৃদয়াবেগের কোনও প্রশ্নই ওঠে না।

কবিতা লেখার কাজ খুব উন্নত ভাবে সম্পন্ন করার পক্ষে রচয়িতার সচেতন জীবনদর্শী মন ও সেই মনোভাব ভাষায় প্রকাশ করবার মত লিপিকুশলতাই যথেষ্ঠ। কিন্তু এই দু’টো জিনিসের উৎকৃষ্ট সামঞ্জস্যে যে-সুলিপি প্রবর্তিত হয় কবিতা কি তা ছাড়া অন্য কিছু? আমার মনে হয়, এই সুলিপি সত্যই খুব ভালো জিনিস। কিন্তু সুসমাচারের মত এই সুলিপি—এই সমস্ত জিনিসকেই অবান্তর ক’রে দিয়ে কবিতা নিজের চরিত্রবলে নিজেকে প্রাসঙ্গিক ক’রে তোলে। পূর্বজ কবিরা একে মনে করতেন মায়াবল। অতটা সাহস আমার নেই। আমি একে কবিতার চরিত্র ব’লে অভিহিত করেছি। যে-কোনও রচনাসৌষ্ঠবকে অপ্রাসঙ্গিকতায় পরিণত ক’রে দু’-একটা লাইন, কয়েকটি লাইন কিম্বা সম্পূর্ণ একটি জিনিস অবিসংবাদী ভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে কবিতা হয়।

কবিতার সংজ্ঞা ও কবিতাপাঠ সম্পর্কে ধারণার স্পষ্টতা লেখক ও পাঠক উভয় শ্রেণির ভিতরেই সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে দেখা দেবে—এ-আশা স্পষ্টভাবে পোষণ করবার মত কোনও উৎসাহ অভিজ্ঞ মানবের হৃদয়ে আজ হয়তো নেই। কিন্তু সে- আশা যাতে চির-কালই ছলনার মত না থেকে যায় সে-জন্য আধুনিক লেখকেরা আবার অবহিত হয়ে উঠছেন।

লেখক হিসেবে আমিও অবহিত হয়তো,—কিন্তু অসমর্থ। আমার দৃষ্টিপন্থাও সূর্য ও তপতীকে আশ্রয় ক’রে; হয়তো তপতীকেই অবলম্বন করেছি বেশি—কোনও এক ভবিষ্যতে বিশেষ ক’রে সূর্যাশ্রয়ী হবার জন্য। কবিতা কী,—কী তার কাজ,—কী ক’রে কবিতা গ্রহণ করতে হবে,—এই সব জিজ্ঞাসা সম্পর্কে কবির ও পাঠকের ধারণা ক্রমশই আরও পরিচ্ছন্ন না হলে উভয় পক্ষই অস্বস্তি বোধ করবেন। আমার এবং যাদের আমি জীবনের পরিজন মনে করি তাদের অস্বস্তি বিলোপ ক’রে দিতে না পেরে, জ্ঞানময় করবার প্রয়াস পাই এই কথাটির প্রচার ক’রে যে, জীবন নিয়েই কবিতা; যদি ভাবা যায় যে, কবিতা মানুষের আধুনিক জীবনকে নিরন্তর ভবিষ্যতের শ্রেয়তর সামাজিক জীবনে পরিণত ক’রে চলেছে তা হলে সে-ধারণা ঠিক হবে না। কবিতার ঐতিহ্যের সংস্পর্শে এসে বুঝে নিতে পারা যায় যে, কবিতা মানুষের জীবনের কল্যাণমানসকে অপরোক্ষ ভাবে চরিতার্থ করবার সুযোগ না দিয়ে বরং জীবনের স্বর্গ ও আঘাটা সবরেই ভয়াবহ স্বাভাবিকতা ও স্বাভাবিক ভীষণতা আমাদের নিকটে পরিস্ফুট করে; আমাদের হৃদয়, ভাবনা ও অভিজ্ঞতার সৎ কী অসৎ পরিণতির পথে কৃষ্ণপক্ষের সূর্যের মত (ভেবে নেওয়া যাক) উপস্থিত হয়; আমাদের জ্ঞানপিপাসু স্বভাবকে সর্বতোভাবে সব কথা জানিয়ে দেবার চেষ্টা করে; আমাদের ভাবনাকে সর্বমানবীয় পরিসর দেয়; অভিজ্ঞতার আত্মপ্রসাদের ভিতর আত্মনাশ ও সকলের সর্বনাশ রয়েছে জানিয়ে দিয়ে তাকে মহত্তর ভাবে গ্লানিহীন ক’রে দিতে চায়; হৃদয়কে ক্রমশই বিশুদ্ধ করে।

এই করে। এবং এই সমস্ত করে ব’লেই আমাদের গতি পরিণতির কাহিনি নিয়েই কবিতা; পরিণতিশীল জীবনকে পূর্বোক্ত উপায়ে সজাগ ও শালীন ক’রে তুলবার ভার কবিতার উপর।

কিন্তু তবুও কবিতার উপর বাস্তবিক কোনও ভার নেই। কারু নির্দেশ পালন করবার রীতি নেই কবিমানসের ভিতর; কিম্বা তার সৃষ্ট কবিতায়। অথচ সৎ কবিতা খোলাখুলি ভাবে নয়, কিন্তু নিজের স্বচ্ছন্দ সমগ্রতার উৎকর্ষে শোষিত মানবজীবনের কবিতা, সেই জীবনের বিপ্লবের ও তৎপরবর্তী শ্রেষ্ঠতর সময়ের কবিতা। মহৎ কবির ভাবনা সূক্ষ্ম, হৃদয় আন্তরিক (আশা করা যেতে পারে), অভিজ্ঞতা সজাগ, ও চেতনা-অবচেতনা ঐকান্তিকভাবে সক্রিয় থাকার দরুণ ব্যবহারিক পৃথিবীতে এ-রকম মানুষের কাছ থেকে জীবনের উন্নতশীল ভাঙাগড়ার কাজে শুভ ও সার্থক আত্মনিয়োগ দাবি করা যেতে পারে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় কবিতা- ও শিল্প-সৃষ্টির ভিতরেই তিনি ঢের বেশি স্বাভাবিক ও স্মরণীয়—এমন-কী অধিকতর মহৎ—বাস্তব কার্যক্ষেত্রে তেমন নন।

এ-রকম উক্তি করতে গিয়ে আমি সত্যই আত্মবিস্মৃত কী-না তা সমসাময়িক কবি-বন্ধুরা বিচার ক’রে দেখবেন।

আমার মনে হয়, এই সমস্ত উপরোক্ত বিষয় অনুভব ক’রে আমি লিখি। কিন্তু কবিতা বা সাহিত্যই শুধু নয়, সুলিপি সৃষ্টি করবার জন্যও (এই সমস্তই ব্যক্তিগত প্রয়াসের ও আকাক্সক্ষার কথা, সফলতার কথা নয়) লেখা প্রয়োজন মনে করি। আজকের দুর্দিনে মানুষের নিঃসহায়তার রূপ কী রকম, কী ক’রে তা কাটিয়ে উঠে জীবনের শুভ অর্থ বোধ করতে পারা যায়, এ-সব বিষয় নিয়ে যে-কোনও প্রবীণ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও তার লিপিময় প্রকাশ মূল্যবান জিনিস। যদিও এ-কথা স্বীকার ক’রে নিতে হবে যে, অগণন কবিমনীষীর সৎ জীবননির্দেশের সমুদ্র আমাদের হৃদয়ের কাছে থাকতেও তা’ প্রায়শই আমাদের জন্য লবণাক্ত হয়ে রয়েছে,—এবং তার পাশেই ছড়িয়ে রয়েছে জীবনের অন্নপূর্ণা মরীচিকা,—তবুও তাতে এ-জিনিস প্রমাণিত হয় না যে, কবিতা ও সাহিত্য ও সুলিপির ইতিহাস বিশ্বমানুষের ভাবনাকে ও চেতনাকে মূল্যজ্ঞানময় ও চরিত্রবান ক’রে তোলে নি।

শোষিত মানবজীবনের, সেই জীবনোৎসারিত বিপ্লবের, ও সেই বিপ্লবের শেষে আশাভরসার সমাজের, কবিতা ছাড়াও আরও অনেক কিছু নিয়েই কবিতা মহৎ হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই সমস্ত কাজও সময়, দেশে, প্রকৃতি ও প্রেমের ঐকান্তিক জিনিস হয়েও কেবলই শ্রুয়মান, ধ্যেয়মান ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জীবন সম্পর্কে সচেতন ও অভিজ্ঞ;—ও এই অভিজ্ঞতা—এই সুজাতার থেকেই উৎসারিত।

কেন লিখি, মাঘ ১৩৫০

***********************

ধা রা বা হি ক  র চ না

বিচিত্র সমাজতত্ত্ব
সংগীতের সমাজতত্ত্ব -৭

মুহাম্মদ হাসান ইমাম

                                       

[প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সমাজবিজ্ঞানের পরিধির মধ্যে চমকপ্রদ বিষয়বস্তু আছে যা সাধারণ্যে প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া, ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ে সরলভাষ্যের সাথে পরিচিত হলে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের ধারণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিষয়টির প্রয়োগসাফল্য সৃষ্টি হবে। যদিও লেখক সমাজবিজ্ঞানের পরিব্যপ্ত বিষয়বস্তুর তাত্ত্বিক বিতর্ক সম্পর্কে অবগত আছেন, তবুও সমাদৃত সমাজবিজ্ঞানের পরিক্ষেপ থেকে অন্যান্য বিষয়াবলী দেখার ব্যাপারে আরো উদ্যোগ লক্ষ্য করতে চান। এই ধারাবাহিক রচনাটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের যাত্রা। — চিহ্ন সম্পাদক]

                                       

সংগীতের সমাজ-সংলগ্নলতা

দেশ ও সংস্কৃতিভেদে সংগীত ও অন্যান্য শিল্পকলার ব্যাপক বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। এই পার্থক্য যেমন দেশ থেকে দেশে পরিলক্ষিত হয় তেমনি একটি দেশের ভেতরে অনেক রকম সংগীত লক্ষ করা যায়। যেমন বাংলাদেশে আমরা সংগীতের শ্রেণীবিভাগ করলে দেখতে পাই লোকসংগীত, ধর্মীয় সংগীত, রাগ সংগীত, আধুনিক সংগীত ইত্যাদি। সুতরাং স্থান-কাল-পাত্র-ভেদে সংগীতের এই যে পার্থক্য তার পেছনে ক্রিয়াশীল মানুষ, তার পরিবেশ ও প্রতিবেশ। সুতরাং সংগীতের সামাজিক সংলগ্নতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রায় অবান্তর। উলিয়াম ও টেমোতির মতে, Scholars in the social sciences and humanities emphasize that the distinction between music and æNot music” is ultimately a social construct- on that is shaped by and shapes social arrangements and cultural assumptions. Given that the construction of what we think of as music is so widely accepted. It’s sociocultural underpinings can often be invisible. .. music can be conceptualized as both object and activity.1

সংগীত অনেক সময় নিছক বস্তু হিসেবে পরিগণিত হয়। যেন, মুহূর্তের সৃষ্টি, বিশেষ দেশ কালের প্রেক্ষাপটে বিশেষ উপযোগ সহকারে একটি সামাজিক সৃষ্টি নয়। এভাবে সংগীতের উপলব্ধি এক ধরনের বিমূর্তায়ন ছাড়া কিছুই নয়; অর্থাৎ দেশকালের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ব্যঞ্জনা নিয়ে সংগীতের যে উদ্ভাসন তাকে খাটো করে দেখা হয়। কীর্তন শুধু দেশকাল নিরপেক্ষ এক ধরনের সংগীত নয় বরং দেশকালের প্রতিনিধিত্বশীল একটি শিল্পকলা। ব্যাকের সংগীত আবার ধর্মীয় নয় বরং জাগতিক উপলক্ষে সম্পাদিত। Sociologists treat music as different kinds of object as inllustrated by but to of the following times in the literature: music as an intitutionalized system of tonality and music as a commodity both have long stories undergrround the view of music as a return and/or recorded text that can be possed circlulated and inspected.. লক্ষবস্তু হিসেবে সংগীতের সাফল্য এর কোডবদ্ধকরণ বা নোটেশনের আনুষ্ঠানিকতাকে ছাড়িয়ে যায়।

অনেক ক্ষেত্রে সংগীতকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে দেখা যায়। সংগীতের ক্রয়-বিক্রয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে। তবে আজকের পণ্যের যে রূপ সংগীত ধারণ করেছে তা হয়তো একেবারেই নতুন। ইতোপূর্বে রাষ্ট্র, চার্চ, অভিজাততন্ত্র সংগীতের যে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে তার মধ্যেও ক্রয়-বিক্রয়ের ধারণা ছিল। আঠারো শতকে সংগীতের পণ্য-রূপটি স্পষ্ট হতে শুরু করে। এ সময় সংগীতের লিখিত প্রকাশনা ও সত্ত্বাধিকার আইন আবির্ভূত হয়। শব্দ ও স্বরলিপির নতুন রূপ সংগীত সংকলকদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন বাজারের ভিত্তি প্রদান করে। এছাড়া সংগীত সম্পাদনের স্থানও বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। বর্তমানে সংগীত সম্পাদনের জন্য প্রকাশক ও লেখকদেরকে অর্থ-মূল্য দিতে হয়। প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে সাথে উনিশ ও বিশ শতকে সংগীত তাৎক্ষণিক সম্পাদনের বিষয় থেকে আস্তে আস্তে ছাপানো পৃষ্ঠায় স্থিতি লাভ করে। প্রযুক্তিগতভাবে ধারণকৃত সংগীত সম্পাদনের বিষয়টি বিক্রয়ের জন্য ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে।২

অবজেক্ট হিসেবে সংগীতের সচেতন নিরীক্ষা সামাজিক নির্মাণের প্রসঙ্গ নিয়ে আসে। কারণ, সংগীতের বস্তÍুরূপ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে বিশিষ্টতা ধারণ করে। সংগীতের মতো অনেক ধরণের শিল্পকর্মকেই প্রকৃতির দান মনে করার প্রবণতা রয়েছে। সাতদিনে সপ্তাহ হওয়ার ধারণাকে অনেক সময় এমন প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত বলে মনে করা হয়। তবে অনেক প-িত মনে করেন সংগীতকে অবজেক্ট হিসেবে বিবেচনা না করে বরং প্রক্রিয়া বা কর্মকা- হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ। অবজেক্ট হিসেবে চিহ্নিত করলে সংগীতকে কতগুলো নিদিষ্ট গুণাগুণের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলা হয়। কিন্তু প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য করলে সংগীত একটি প্রকাশমান শিল্পকলা হিসেবে গণ্য করা যায়। সুতরাং সংগীত একটি জিনিস নয় বরং কর্মকা- যা জনগণ সাধিত করে। সংগীত শব্দটি সংগীত কর্মকা-ের একটি তাৎক্ষণিক বাস্তবতা বিবর্জিত প্রত্যয়গত উপলব্ধি যা প্রকৃত পক্ষে খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় না। আর যা পাওয়া যায় তা চলমান, গতিময় এক ধরনের সাংগীতিক আয়োজন। এছাড়া সংগীত একটি সম্পাদনের বিষয়। একটি পারফমিং আর্ট। যখন আমরা ধ্রুপদী সংগীতের কথা বলি তখন এমন কিছু শিল্পীর সংগীত সাধনার, কথা চলে আসে যারা বিশেষ সংকলকের নোটেশনের ভিত্তিতে বিশেষ তাল, মান, লয়ে, রাগ-রাগিণী কে প্রকাশ করেছেন।

সংগীত একটি একক প্রপঞ্চ নয়। সে কারণেই একটি সংজ্ঞায় সংগীতকে বিধৃত করা মুশকিল। তবে সংগীত কি এবং কী নয় এই ধারণার মধ্য দিয়ে একটি সীমানা চিহ্নিত করা যায়। সামাজিক বিজ্ঞানীরা সংগীত এবং না-সংগীতের মধ্যে যে ব্যবধান টেনেছেন তা আসলে একটি সামাজিক নির্মাণ। সামাজিক নির্মাণ বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে যে সংগীত সামাজিক ব্যবস্থাদি ও তার সংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণার ফলশ্রুতি। তবে সংগীতের পেছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক কারণসমূহ অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্য থেকে যায়। সংগীতকে অবজেক্ট এবং অ্যাকটিভিটি হিসেবে আলোচনার সুত্রপাত্র  করলে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া স্বাভাবিক।

প-িতগণ সম্পাদনের মধ্যে অ্যক্টিভিটি বা কর্মকা-ের বিষয়টি বিশেষ দৃষ্টিগ্রাহ্য করেন।৩  সংগীতায়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকাকে যুগপৎভাবে বিবেচনা করলে সংগীত অবশ্যই একটি প্রক্রিয়া বিশেষ। সংগীতায়োজনের মধ্যে যেসব কর্মকা- নিহিত থাকে তার লোকপদ্ধতিতাত্ত্বিক প্রতীকী আন্তঃক্রিয়াবাদীকরণে সমাজতত্ত্বের বিষয়াদী চলে আসে। সমাজবিজ্ঞানের এই বিভিন্ন তাত্ত্বিক অ্যাপ্রোচসমূহ সমাজে ব্যক্তিবর্গের সামষ্টিক আন্তঃক্রিয়া অনুধাবন ও উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেয়। সংগীতায়ন সামষ্টিক কার্যক্রমের একটি উজ্বল উদাহরণ।

জনপ্রিয় সংস্কৃতি কথাটির মধ্যেই সংগীতের পিছনে জনগণ ও সমাজের সংশ্লিষ্টতা চলে আসে। অ্যাডর্নো থেকে শুরু করে মার্ক্সবাদী ও অমার্ক্সবাদী অনেকেই জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মকা-কে বিবেচনায় এনেছেন। সাম্প্রতিককালে গণসংস্কৃতি ও অভিজাত সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য নিয়ে বিতর্ক করেছেন। এ দুধরনের সংস্কৃতির মধ্যে গুণগত পার্থক্য তেমন দেখা হয়নি। ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, ফোকলোর ছাড়াও শিল্পের সমাজতত্ত্ব, গণমাধ্যম, ভাষা প্রভৃতি বিষয়গুলো জনপ্রিয় সংস্কৃতির আলোচনায় ব্যাপৃত হয়েছে। মুখার্জী বলেন, Popular culture as it is discussed here includes both æfolk” or æpopular” beliefs, practices, and objects rooted in local traditions as well as æmass” beliefs, practices and objects generated from political and commercial centers. Conventionally object taken to be part of popular culture are readable objects, written or visual materials for which these are available traditions of interpretation and criticism.4 †evjg¨vb e‡jb, Approaching music as merely an object or an activity risks treating it as set apart and self-contained rather than as part of and inseparable from, social life.5 Many scholars thus focus on how music is embedded in social life (e.g. social retations). G‡ÿ‡Î ‡W‡bviv e‡jb, A range of strategies through which music is mobilized as a resource for produccing the scenes, routines, assumptions and occasions that constitute social life.6 মানুষই সংগীতকে তাদের নিজেদর কাছে পরিপার্শ¦ জগতের নিমিত্তে অর্থময় করে তোলে। নৃবিজ্ঞান জনপ্রিয় সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশেষ দৃষ্টিকোণ অবলম্বন করে। এদের মধ্যে একটি হলো কাঠামোগত অ্যাপ্রোচ। লেভি—স্ট্রসের ধারণা, ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নৃবিজ্ঞানে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। জনপ্রিয় সংস্কৃতির অধ্যয়নে কাঠামোবাদের প্রভাব ব্যাপক ও সাধারণ। নৃবিজ্ঞানী ক্লিফোর্ড গিজ সংস্কৃতি ব্যবস্থাকে সমাজ ব্যবস্থা থেকে আলাদা করে দেখেছেন। তিনি মানবীয় স্পিসিজের ক্ষেত্রে প্রতীকের ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাপক বিশ্লেষণ করেন। তিনি কোন বিশেষ পদ্ধতির অনুগত না হয়ে প্রতীকী ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন এবং সমাজ ব্যবস্থার সাথে সম্পর্ক নির্ধারণ করে।

নৃবিজ্ঞানী ও ফোকলোরবিজ্ঞানীদের অবদানের একটি প্রধান ক্ষেত্র হলো সাংস্কৃতিক জীবনে পারফরমেন্সের ভূমিকা। সংগীত সৃষ্টি দারুণভাবে সামাজিক। যদিও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিই সংগীতের উদ্গাতা। এমনকি এটি তার অন্তরমহিমান্বিত। ওয়েবার সনাতন ধারার নিয়মনীতি অনুসরণের মধ্যে অবশ্য সংগীত সৃষ্টির সামষ্টিক রূপ প্রত্যক্ষ করেন। এ পর্যায়ে ব্যক্তি ও সংগঠন সম্মিলিত প্রয়াস রাখে। সংগীতের বিভাজন করতে গেলে এর মানগত ধারাক্রম ধরা পড়ে। উচ্চাঙ্গ সংগীতকে উচ্চে স্থান দিলে অন্যান্য সংগীত বিভিন্ন অবসংস্কৃতির মধ্যে পড়ে যা ক্রমান্বয়ে নীচের দিকে পর্যায়ভুক্ত হয়। অনেক সময় এক ধরনের সংগীত পর্যায়ে একাধিক শ্রেণীর মানুষের আনুগত্য ও আকর্ষণ লক্ষ করা যায়।৭ Music consequently plays a complex role: It upholds stratification when people use it to reinforce social distinctions but undermines it when used to reach across distincitions As such music enters into social relations and helps to consitute fundamental distinctions on a micro and macro-level.8.৮ সমাজবিজ্ঞানীরা জনপ্রিয় সংস্কৃতির আলোচনাকে কেন্দ্র করে মাস সোসাইটি শব্দ দুটির চয়ন করেন। তবে মাস সোসাইটির ধারণা পরবর্তীতে ব্যাপক বির্তকের সৃষ্টি করে এবং অনেকক্ষেত্রেই প্রত্যাখাত হয় অনুরূপভাবে মাস কালচারের প্রশ্নে দীর্ঘ বিতর্কের পর এমন ধারণায় পৌছায় যে এর মাধ্যমে মূলত শ্রোতাম-লী অধ্যয়ন করা যেতে পারে যারা সাংস্কৃতিক ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন উৎপাদনকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। অবশ্য কালচার ইন্ডাস্ট্রির বিষয়টি পরবর্তীতে অ্যাডর্নো ও হর্খাইমারের আলোচনায় ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। ষাটের দশকে এসে জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবে বিচারের সম্মুখীন হয় অপরদিকে আলথুসার ও গ্রামসির আলোচনায় মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির সূচনা ঘটে। এর রাষ্ট্রের পরিচালনার ক্ষেত্রে মাস কালচারের সম্পর্ক আলোচনা করেন। আলথুসার জনপ্রিয় সংস্কৃতির মধ্যে মতাদর্শের উৎস খোঁজার চেষ্টা করেন। অপরদিকে গ্রামসি ইডিওলজিকে হেজিমনি হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন।৯

The basic assumption then is that music is a form of social behavior that gives rise to verious types to sociability for the purpose of this paper sociability is divided into three categories: (a) that which embraces the feeling of belonging to a group a family a community or a nation; (b) that which embraces the feeling of togetherness through the performance of music be it religious, classical, popular or folk and (c) that which promotes the formation of interest groups of organizations and of societies. These three types refer to all persons engaged in any way with music: as listeners as performers as teachers as commentators, and as composers.10

শুরু থেকেই মানুষ জানতে চেয়েছে সংগীত কি এবং কেনো তা মানুষকে আলোড়িত করে। তবে এইরকম চেষ্টা করতে যেয়ে প্রথমে তাদেরকে যে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে সংগীত কী? সংগীত কী করে? সংগীতকে সুচিহ্নিত করতে না পারলে এসব প্রশ্ন জানা কঠিন। সংগীত বিষয়ক আলোচনায় সংগীতের সারবস্তুকে জানার  জন্য যেসব উদ্যোগ দেখা যায় তার মধ্যে সারবস্তুর স্বয়ংক্রিয়তা নিজস্বতা ও আত্মনির্দেশমূলক বিশ্লেষণ দেখা যায়। এগুলোকে একত্রে সাধারণভাবে অনপেক্ষ সংগীত বা অ্যাবসলুট মিউজিক বলা হয়ে থাকে। যদিও এর দ্বারা বিভিন্ন রকমের সংগীতের প্রকৃতিকে জানা যায় তবুও সংগীতের নিজ ভুবনের মধ্যে থেকে তার ক্রিয়া করাটা অতি মাত্রায় অমূলক বিবেচনা। রিচার্ড ওয়েগনার মনে করেন আত্মবিমোহিত সংগীত বা শিল্প যত শুদ্ধই হোক না কেন তা সমাজে কোন উদ্দেশ্যমূলক ক্রিয়া সাধন করতে সক্ষম নয়, যাকে আমরা অনপেক্ষ বা অসংশ্লিষ্ট সঙ্গত বলে থাকি। তবে অসংশ্লিষ্ট সত্তার দিকেই ওয়েগনার পরিশেষে ঝুকে পড়েন। এই বির্তকের শুরুতে সব শিল্প সম্পর্কেই দুটি ধারণা দায়ী। প্রথমটি হলো আকার (ফর্ম) ও বিষয়ের (কনটেন্ট) সম্পর্ক। সংগীত কারো সম্পর্কেই প্রযুক্ত নয় এমন ধারণা হতে পারে যদি তা একটি কবিতা, একটি নাটক, একটি উপন্যাস, একটি চিত্র বা একটি ভাস্কর্যের সাথে তুলনা করা যায়। সংগীতের বিমূর্ততাকে উপলব্ধি করতে সমালোচক ও দার্শনিকদের যথেষ্ট সময়ে লেগেছে। একসময় তারা সংগীতকে একটি ভিন্ন মাত্রার বিমূর্ত শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টির আকার ও বিষয়বস্তুর মধ্যে পার্থক্য আবশ্যক হয়ে ওঠে। বিষয়বস্তু বলতে একটি অবজেক্ট, একটি ঘটনা, একটি ধারণা বা আবেগকে বুঝানো হয়েছে। ঊনিশ শতকের সমালোচকরা যুক্তি দেখান যে, সংগীতের আকারই এর বিষয়বস্তু। আকার ও বিষয়বস্তুকে এক করে দেখার বিষয়টির সামনে নিয়ে আসায় তারা সংগীতের নন্দনতত্ত্বকে সর্বোচ্চ স্থান দেন। ১৮৭৭ সালে সাহিত্য সমালোচক ও উপন্যাসিক ওয়াল্টার পিটার বলেন যে,  ‘অষষ ধৎঃ পড়হংঃধহঃষু ধংঢ়রৎবং ঃড়ধিৎফং ঃযব পড়হফরঃরড়হ ড়ভ সঁংরপ.’ হ্যান্সলিক যুক্তি দেখান যে, শব্দ সংগীত জীবনের পারিপার্শ্বিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে না। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ডামাডোলের মধ্যে সংগীত নিজ গুণেই অক্ষত থাকে। সংগীতের সমাজ বিধ্বংসী শক্তি অনেক আগেই সক্রেটিস চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। প্লেটোর রিপাবলিক উল্লেখ করে যে রাষ্ট্রের  অভিভাবক সমাজ কোন ক্রমেই নতুন ধরনের সংগীত সম্পর্কে সাবধান থাকবে কারন এটি যে সমস্ত সমাজব্যবস্থার জন্য ধ্বংসাত্মক হতে পারে।

স্কোয়েনবার্গ, স্ট্রাভিন্সকি ও হাইন্ডমিথ সংগীতের সমাজ সংলগ্নতা সম্পর্কে তেমন কিছু বলেননি। কিন্তু সংগীতের বিশ্লেষণ সংগীতের মধ্য থেকেই করা অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। আমরা সংগীত শুনি এবং সংগীত সম্পর্কে যখন চিন্তা করি তখন একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতেই করি। এমন অবস্থায় শুদ্ধ বা বিমূর্ত সংগীতের অচলায়তনিক ধারণা ধোপে টেকে না। লোকসংগীতবিজ্ঞানীরা বিষয়টি আরো নিশ্চিত করেন। মোজার্ট এবং ব্যাকের সংগীত আমরা ‘অ্যাবসলুট সংগীত’ হিসেবে শ্রবণ করতে পারি, আবার বিশেষ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটেও শ্রবণ করতে পারি, আবার মিশ্রিত রূপেও অনুধাবন বা উপভোগ করতে পারি। কিন্তু এটি সংগীতের গুণাগুণকে উহ্য রেখে শ্রোতার পছন্দ-অপছন্দের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রকৃত প্রস্তাবে কোন ধরনের শ্রবণই একটি অপরটির চেয়ে উন্নততর নয়। ১৫৫০-১৮৫০ সালের মধ্যে সংগীতের প্রকৃতি ও ক্ষমতার মধ্যে সংযোগের যে গুণাগুণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো :

  1. Expression which placed fundamental importance on musics ability to convey and arouse ideas or emotions;
  2. Form which gave priority to the structure of music;
  3. Beauty, which privileged that quality as central to the art;
  4. Autonomy which emphasized the independence of music from all other forms of art from the world at large, or both; and
  5. Disclosiveness, which valued music as an organon of knowledge a means by which to gain access to truth.

সংগীতের সামাজিক নির্মাণ: গ্রন্থভিত্তিক পর্যালোচনা

  1. Gary McPherson, The Child As Musician: A Handbook of Musical Development, Oxford: Oxford University Press, 2006

ক্স            মনে করা হয় সংগীত শ্রবণ মানুষের শৈশব থেকেই শুরু হয়। এবং কারো কারো মতে ভ্রুণ অবস্থায় শিশুরা সংগীতের শব্দতরঙ্গ বুঝতে পারে। যদিও মাতৃ শ্বাস-প্রশ্বাস গর্ভাবস্থায় শিশুর জন্য সহজেই শ্রবণীয় হয় তবুও বাইরের কিছু শব্দ শিশুর কানে পৌছায়। এ বেশী ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ অবশ্য মাতৃশরীর অনেকটা প্রতিহত করে অথবা নি¤œগামী করে। নবজাত শিশু ক্রমান্বয়ে সংগীতের সাথে উন্নততর সংযোগ ঘটাতে পারে। তবে স্বাভাবিকভাবেই শিশুর নিউরোতাত্ত্বিক বিকাশের ওপর নির্ভর করে। শিশুর অন্তঃকর্ণ যা শব্দের কম্পনকে বুঝতে পারে। এবং মস্তিষ্কে পৌছাতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, মস্তিষ্কের বিকাশ যেমন শারীরিক বিকাশের সাথে সাথে উন্নতি লাভ করে সেরকম বাইরের উদ্দীপকও মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করে। সেদিক থেকে বলা যায় সংগীতের ছন্দায়িত সুর শিশুর মস্তিষ্কের উন্নয়নে সহায়তা করে। মাতৃগর্ভে শিশুর হৃদস্পন্দন ও শব্দ শ্রবণের মধ্যে সংযোগ লক্ষ করা যায়।

ক্স            একজন শিশু মাতৃগর্ভে যে শব্দগুলোর সাথে প্রতিনিয়ত পরিচিত হয় সেগুলো হল মায়ের কন্ঠস্বর, তার হৃৎস্পন্দন, তার চলাফেরা, তার শ্বাস-প্রশ্বাস এবং পরিপাকজনিত পাকস্থলির শব্দ। জন্মগ্রহণের পর শুধু শ্রবণ নয়, মায়ের চলাফেরা ভারসাম্য রক্ষা প্রভৃতি বিষয়গুলো নিউরোবুদ্ধি বিকাশে প্রভাব রাখে। তবে জন্মপূর্ব ও জন্মপরবর্তী বিষয়াবলী শিশুর কাছে সম্পর্কিত বিবেচিত হয়। শিশুর এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সাংগীতিক অভিমুখীনতার বিকাশ ঘটে। আবেগগত বহিঃপ্রকাশ- শারীরিক হোক অথবা মানসিক হোক- শিশুর মন ছুঁয়ে যায়। সেহেতু মাতৃগর্ভেই তার ইন্দ্রীয়সমূহের প্রাথমিক বিকাশ ঘটে। উপর্যুুপরী উদ্দীপকসমূহের আলোড়ন তাকে  তখন থেকেই কিছুটা ইন্দ্রীয় অনুভূতিশীল করে তোলে। শিশু বয়সের প্রত্যক্ষণ ও ভাষার সাংকেতিক ইঙ্গিত শিশুরা বুঝতে শিখে। অর্থাৎ ভাষা শিক্ষার আগেই ভাষার অন্তর্গত ভঙ্গি তারা আত্মস্থ করতে চেষ্টা করে।.১১

ক্স            গর্ভস্থ শিশুর সংগীত শ্রবণ মোটেও প্রাপ্তবয়স্কদের মতো নয়। তারা ভাঙা বা সচেতনার এমন মাত্রা অর্জন করতে পারে না যার দ্বারা সংগীতকে সংগীত হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। তবে শব্দ মাতৃগর্ভের বিভিন্ন রাসায়নিক পারিপার্শ্বিকতা ভেদ করে একটি সহনশীল মাত্রায় শিশুর মস্তিষ্কে আলোড়ন সৃষ্টি করে। যেহেতু সংগীতের বিট আলাদা এবং অনেকটা হৃদপিন্ডজাত বিটের মত সেকারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সংগীত শিশুর কাছে একেবারেই অর্থহীন নয়। ইদানিং উদ্ভিদ জগতে সংগীতের প্রভাব নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে প্রাণীজগতের ওপর সংগীতের প্রভাব নিয়েও কাজ হচ্ছে। তবে শিশু জন্মগ্রহণের পর মায়ের কন্ঠসরের ফ্রিকোয়েন্সি ও গতি সম্পর্কে প্রথমত ওয়াকিবহাল হবার চেষ্টা করে। এবং খুব তাড়াতাড়ি শব্দের পার্থক্য এবং শব্দকে চিনতে সক্ষম হয়। ক্রমেই ভাষার বা উচ্চারণের সাথে পরিচিতি হওয়ার সাথে সাথে শিশুর আচরণগত প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। যা মানবেতর বা মানুষ নয় এরকম প্রাণীদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় না। গর্ভাবস্থায় শব্দের অনুরণন ভৌত রাসায়নিক স্তর অতিক্রম করে আসে। কিন্তু শিশুর স্বাধীন অস্তিত্বের  কাছে দৈহিক ও শাব্দিক উদ্দীপকসমূহ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ক্রিয়া করে। শৈশবকাল থেকেই শিশু সেবা প্রদানকারী মা ও অন্যান্যদের বিভিন্ন রকম স্ব—শব্দ আচরণের সাথে পরিচিত হতে থাকে। ছড়া গান, বা প্রায়—সংগীত জাতীয় উচ্চারণের সাথে যে পরিচিত হয়ে থাকে। ঘুমপাড়ানি গান এক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যে সুরেলা কন্ঠমিশ্রিত সংগীতের বিপরীতে শিশুর প্রতিক্রিয়া কতটা গভীর। শিশুকে লক্ষ করে যা বলা হয় তা শিশুরা অনেক বেশী আগ্রহ সহকারে শোনে। মায়ের কথার ছোট ছোট বাক্যও সুরেলা কন্ঠ স্বাভাবিকভাবে শিশুদের অধিকতর আকর্ষিত করে। এর সাথে যখন আবেগের সংমিশ্রণ ঘটে তখন তা আরো আকষর্ণীয় হয়ে ওঠে। ছোট বয়স থেকেই শিশুরা তাদেরকে লক্ষ করে গাওয়া গান বেশী আগ্রহ সহকারে শোনে। খেলাধুলা করার সময় বা নাচ শেখানোর সময় সাধারণত যে কন্ঠমাত্রার উচ্চারণ ধ্বনি শিশুরা পছন্দ করবে ঘুমানোর সময় তা করবেনা কারণ ঘুমানোর সময় সে নিচু মাত্রার গান বেশী পছন্দ করবে। বড় হবার সাথে সাথে মানুষের সংগীত শিল্পকলার বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে তার পছন্দ নির্দিষ্ট হতে থাকে। গবেষকরা বলছেন সংগীত শিক্ষার ক্ষেত্রে শিশুকাল থেকে শিক্ষা প্রদান করলে অধিকতর সাফল্য আসবে এমন ধারণা ঠিক নয়।

ক্স            সংগীতের প্রতি আগ্রহ ও সংগীতপ্রিয়তা সম্পর্কে জেনেটিক প্রভাব কতটুকু সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও বিষয়টি একেবারেই অমূলক নয়। এছাড়া শিশুরা প্রথম বছরের মধ্যেই সুরেলা ও ছন্দায়িত সংগীতের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়। তবে এই সময়ে মস্তিষ্কের বিকাশে সংগীত কতটুকু প্রভাব রাখে তা এখনও সঠিক করে বলা মুশকিল। এক বছর বয়সের পরে সংগীত ও মস্তিষ্কের মধ্যে সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে পূর্ণবয়স্ক মানুষের সংগীত আগ্রহ বিচার করে দেখা গেছে যত কম বয়স থেকে সে সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করেছে তার মস্তিষ্ক তত বেশী সংগীত সহযোগী হয়ে উঠেছে।

ক্স            শিশুরা তাদেরকে নির্দেশ করে বলা বাক্যকে বিশেষ মনোযোগ সহকারে নেয়। তবে এটি স্বাভাবিক যে মা-বাবার আবেগময় বক্তব্য তাদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় ও মনোযোগের দাবীদার। এক্ষেত্রে মা-বাবার সুরেলা আওয়াজ তাদেরকে মোহিত করে। শৈশবে সংগীত শিক্ষার শুরু আকাক্সিক্ষত অবধারিত সাফল্য নিয়ে আসবে এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। তবে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের পারিবারিক পরিবেশ সাংগীতিক সাফল্যের অনুকূলে যায়।

ক্স            সকল শিশুই কি সমানভাবে সাংগীাতিক মেধা বা মস্তিষ্ক অর্জন করে? যদিও এমন প্রমাণ পাওয়া যায় সে গর্ভবতী মায়ের সংগীত-স্পৃহা বা সংগীত-শ্রবণ পরবর্তীতে শিশুর আচরণে প্রতিফলিত হয়। সংগীত ও সংগীত বিষয়ক দক্ষতা কে কতটা অর্জন করতে পারবে সেটি শিশু অবস্থায় তার আকর্ষণ ও আসক্তির ওপর নির্ভর করে। জন্মগত আসক্তি এখানে অবজ্ঞা করা যায় না। কারণ মস্তিষ্কের বিকাশকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে জন্মপূর্ব অবস্থাতেই সংগীতের একটা আবহ মস্তিষ্ক বিকাশে লক্ষ করা যায়; যা আবার শিশুর মাতৃগর্ভস্থ অবস্থা, মাতৃ¯েœহ, ও পারিবারিক আবহ নিরপেক্ষ নয়।

ক্স            শিশু বয়স থেকে পরবর্তীতে সংগীত শিক্ষার সাথে মস্তিষ্ক বিকাশের কয়েকটি সংযোগ রয়েছে। সংগীত বা ভাষার ‘পিচ ভ্যারিয়েশন’ অনুধাবনের জন্য প্রশিক্ষণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সংগীত শেখার পেছনে জেনেটিক ফ্যাক্টর কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি সত্যিই একটি জটিল বিষয়। ‘নেচার ও নারচার’ বিষয়ক বিতর্ক এখানেও প্রযোজ্য। জিন ও পরিবেশের পারস্পরিক প্রভাব বিবেচনা করলে শিশু বয়সের সংগীত শিক্ষা তার জিনকে সাড়া প্রদানে উৎসাহিত করে। সংগীতজ্ঞদের উপর গবেষণায় দেখা গেছে জীন ও অভিজ্ঞতা সংগীতের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। সংগীত প্রশিক্ষণ মস্তিষ্কের বিকাশ ও কার্যকারীতাকে যথেষ্টভাবে অনুকূলবর্তী করে। পরিশেষে বলা যায় সংগীত প্রতিভার পেছনে তার ক্রিয়াশীল মস্তিষ্ক মনস্তত্ত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তির অন্তঃস্থ ফ্যাক্টরগুলোর মতো পারিবারিক ও সামাজিক পরিম-ল, প্রেষণা, স্বীকৃতি ও সহযোগিতা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

ক্স            মানুষ যে সংগীত-সমৃদ্ধ প্রাণী এমন প্রমাণ লক্ষ করা খুব কঠিন নয়। অনেক পশুপাখি তাদের আচরণের ক্ষেত্রে বাচনিক শব্দাবলী ব্যবহার করে। কিন্তু সেগুলো খ- প্রকৃতির ও সমধর্মী। সংগীতের কাঠামো, সুর, লয়, ছন্দ এবং ভাষার অর্থবহ ব্যবহার পাওয়া যায়। এছাড়া, সংস্কৃতিবান মানুষ ক্রমাগত তার শিল্পকর্মের উর্দ্ধতন সাধিত করে আসছে। ক্রমাগতভাবে সংস্কৃতির আকশচুম্বী কাঠামো গড়ে তুলেছে। এক্ষেত্রে কাঠামো ভেদে ক্রিয়ার বৈচিত্র্য যেমন রয়েছে, তেমন দেশ জাতি সংস্কৃতির ভূগোল ও পরিবেশ-প্রতিবেশ ও ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক বৈচিত্র্য সাধিত করেছে। সুতরাং সাঙ্গীতিকতা মানুষের অনন্য গুণ। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুসারে Musicality refers to it as the state ‘musical’, which in turn, is defined as being fond of, or skilled in music. The adjective ‘musical’ is often attached to a range of other terms, for example ability, aptitude, talent, and potential. In the literature thees terms are often used interchangeably, although there has been a tendency for the term ‘musicality’ to be adopted inconsideration of wheather being musical is a species-specific characteristic of human beings. His involves speculation about the evolutionary basis of musical behaviour, and consideration of evidence that examines wheather the neural structure that facilitate the perception and appreciation of music, and the development of musical skills are universal. Other terms tend to be adopted when individual differences in musical skill are considered.12ক্স               সাঙ্গীতিক সক্ষমতা বলতে একজন মানুষের বংশগত বা জেনেটিকভাবে প্রাপ্ত গুণাবলীই হোক অথবা পটেনশিয়াল প্রবণতার ভিত্তিতেই হোক বা উভয়ের সংমিশ্রণেই হোক, প্রাপ্ত ও প্রদর্শিত প্রতিভাকে বুঝানো হয়েছে। ’হিউম্যান জেনোম প্রজেক্ট’ সংগীতের প্রশ্নে জেনেটিক গুণাবলীর অন্তর্র্নিহিত অবস্থান আবিষ্কার করতে আশাবাদী।

ক্স            সাঙ্গীতিক স্বাক্ষরতার শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষণের সমান্তরাল একটা বিষয়। এখানে স্বাক্ষরতার ক্ষেত্রে সাধারণত আমরা যে অক্ষরজ্ঞান বুঝি সেটি প্রযোজ্য নয়। শিশুদের জন্য সংগীত-স্বাক্ষরতার মাত্রাকে কণ্ঠের মাধ্যমে সুরের মাধুর্যকে আত্মস্থ করার উপর গুরত্ব দেয়া হয়। লিখিত স্বরলিপির সাহায্যে সংগীতের মৌলিক শিক্ষার যে সনাতন পদ্ধতি এ পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়েছ তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয় বলে গবেষকরা মনে করেন। এমন অনেক সংগীত শিক্ষার ধরন রয়েছে যেখানে ‘মিউটেশনের’ গুরুত্ব নেই বললেই চলে। শিশুদের পক্ষে স্বরলিপি উদ্ধার করা ও তা অনুসরণ করা দুঃসাধ্য বিষয়। সংগীত পাঠ বা সংগীত তৈরীর বিষয়টি শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করে।

ক্স            সংগীতের ক্ষেত্রে পরিশুদ্ধ স্বরলিপি অনুসরণ সংগীতের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সাধারণ আকর্ষণ নষ্ট করতে পারে। সুরের মাধুর্য সম্পর্কে শিশুর আগ্রহ নষ্ট করতে পারে। এ ধরনের যে কোন শাস্তি ও শিক্ষা আজকের গবেষকদের মতে প্রয়োজনীয় নয়। ‘স্টাফ নোটেশনের’ ওপর অপ্রয়োজনীয় গুরুত্বারোপ শিশুশিল্পীর সৃজনশীল ক্ষমতাকে নষ্ট করে, এমনকি স্মরণ রাখার সক্ষমতাকেও নষ্ট করে। অনেক খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী শাস্ত্রীয় সংগীতের অনেক কিছুই না জেনে পিয়ানো, হারমোনিয়াম ও গিটার সহযোগে প্রাথমিকভাবে সংগীত আয়ত্ব করেছেন। তবে বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা কোন কোন শিল্পীকে অজ্ঞাতভাবেই আগ্রহী করে তোলে এবং সফল সংগীতশিল্পী হতে সাহায্য করে।

ক্স            সংগীত-স্বাক্ষরতার ক্ষেত্রে শ্রবণের উপর গুরুত্বারোপ ও সঠিক শ্রবণ সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বারোপ করা উচিত। সাংগীতিক স্মরণশক্তি বিকাশের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। সরল ও সাধারণভাবে পরিচিত সংগীতগুলো আয়ত্ব করার ওপর গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে লোকসংগীত কোন অবজ্ঞার বিষয় নয়। কারণ তা অনেক সময় সহজ ও সাবলীল বলে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

  • ক্স বড়দের উপস্থিতিতে সংগীত সম্পাদন বা আয়োজন করতে শিশুদের উৎসাহিত করা উচিৎ। উপরিউক্ত ধারণাগুলো ইংল্যান্ডের শিল্পী চেরিলের বাল্যশিক্ষা পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা উদ্ধার করেন। হারগ্রিভস্ বলেন, Children should be encouraged to experience and enjoy music first, so that the acquisition of formal musical skills can occur inductively as a natural outcome of this process.13
  • ¯^iwjwc wkÿvi mgq Aek¨B KZ¸‡jv welq G‡m c‡o †h¸‡jv ms‡ÿ‡c D‡jøL Kiv n‡jv:
  1. Features: the marking on the page that form the basis of notation. These involve awareness of the features of the lines and curves of the musical symbols and notes, and knowledge that they are both systematic and meaningful.
  2. Letters/musical notes and sings: consistent interpretation of features allows the child to attend to and recognize basic symbol units such as individual notes, clef signs, time signature, dynamic marking, sharp, flats, and so forth.
  3. Syllables/intervals: structural analysis of melodic patterns involves recognizing the systematic relationships between adjoining notes (e.g. intervals).
  4. Words/groups: the transition from individual notes to groups of notes occurs via structural analysis of the component intervals, or by visual scanning of the whole musical idea (e.g. chord, scale run). This represents the first level of musical meaning; however, at this level the meaning attached to individual clusters are dicontextualized and isolated.
  5. Word groups/motifs or note grouplets: combination of clusters form a motif or motif grouplets, a level of musical meaning equivalent to understanding individual phrases and clauses in text. These may vary in length according to their musical function.
  6. Ideas/musical phrase or figure: in music an individual idea is expressed by combining motif into a musical phrase.
  7. Main Idea/musical idea: the combination of musical phrases yields a musical idea, equivalent in text processing terms to the construction of a main idea from a paragraph.
  8. Themes/musical subject: understanding of the musical subject involves imposing a sense of musicality on to the score such that the component musical phrase and subject are taken beyond technical proficiency to include variation of sound, mood, dynamics, and so forth in ways that allow for individualized interpretation of the score.14

ক্স            ম্যাকফার্সনের মতে, যদিও জেনেটিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ, এমন সংকেত যথেষ্ট পাওয়া যায় যে সংগীত শিক্ষা গাঠনিক পর্যায়ে মস্তিষ্কের পরিবর্তন আনে। এ পর্যায়ে সংগীত শিক্ষার মাত্রার উপর পরিবর্তনের মাত্রা নির্ভরশীল। এই পরিবর্তনসমূহ কাঠামোরূপে দেখা যেতে পারে (মরফোলজিক্যাল বা এ্যানাটোমিক্যাল পরিবর্তন) এবং ক্রিয়া হিসেবেও দেখা যেতে পারে (যেমন মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালনজনিত সক্রিয়তা, ইলেকট্রোফিজিওলজিক্যাল সাড়াপ্রদান)। তবে এ ধরনের গবেষণা সাধারণত বয়ঃপ্রাপ্তদের উপর করা হয়েছে। প্রশিক্ষিত এবং অপ্রশিক্ষিত সংগীতজ্ঞদের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য দেখা দেয়ায় তা সংগীতের সাধারণ শিক্ষার অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যান্য চলকসমূহের অনুপস্থিতিতে শিশুদের ক্ষেত্রে সংগীত শিক্ষার প্রভাব স্পষ্ট।

ক্স            সাংগীতিক সক্ষমতার সামাজিক নির্মাণ সম্পর্কে তাত্ত্বিক গবেষণার বিকাশ রয়েছে। স্থায়িত্বশীল আগ্রহ ও আত্মশৃঙ্খলাবোধ শিশুদের সাংগীতক সক্ষমতার একটি ভালো নির্দেশক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সংগীত সম্পাদন সংক্রান্ত মূল্যায়নের স্কেল, স্বরলিপি, ও তাল সংক্রান্ত সঠিকতা গুরুত্বপূর্ণভাবে নির্দেশ করে। এরপরে যথাক্রমে সরল সম্পাদন, বৈপরীত্য ও কৌশলগত সাবলীলতা লক্ষ করা গেছে। অবশ্য স্বকীয়তা (ড়ৎরমরহধষরঃু) নীচু মাত্রা লাভ করে। সংগীতের বিভিন্ন ক্ষেত্রের গবেষক, শিক্ষক, ও মনস্তত্ত্ববিদদের অভিমত অনুযায়ী সংগীত সম্পাদনের ব্যাপারটি প্রত্যক্ষণগত সচেতনতা, সৃষ্টিশীল অনুধাবন, প্রেষণা ইত্যাদির ভিত্তিতে পার্থক্য করা যায়। শিশুদের সাংগীতিক সক্ষমতা নির্ণয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সংগীত কর্মকা-ে তাদের সৃষ্টিশীল প্রকাশন-উন্মুুখতা।

ক্স            সার্বিকভাবে সংগীতজ্ঞদের মূল্যায়ন সংগীতে যন্ত্রের ব্যবহার (৫৬%) বলে উল্লেখ করেছেন। এরপরে আসে শ্রবণ ও অনুধাবন (৪৭%), তারপরে আসে আবেগময় প্রকাশ (৪১%), সাংগীতিক শ্রবণ (২৯%) এবং শেষত সংগীত সংকলনের সক্ষমতা (২৯%) বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, ব্যক্তিগত নিষ্ঠা ও প্রকাশের ভাষাকে (২৮%), কৌশলগত দক্ষতা (২৭%), সংগীত মূল্যায়ন (২৪%), সংগীতের প্রতি সাড়া প্রদান (২৩%) এবং অগ্রগতি ও বিকাশকে (২০%) উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্স            সংগীতের প্রতি শিশুদের নন্দনতাত্ত্বিক অভিমুখীনতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে অনেক বিষয় এসে পড়ে। যেমন, নন্দনতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা, নন্দনতাত্ত্বিক বিচারবোধ, নন্দনতাত্ত্বিক পছন্দ, আবেগময় সাড়াপ্রদান, সংগীতের মূল্যায়ন, সংগীতের প্রশ্নে অগ্রাধিকার, সাংগীতিক স্বাদ-গ্রহণ ক্ষমতা, প্রভৃতি। এর মধ্যে নন্দনতাত্ত্বিক সাড়া প্রদান অপেক্ষাকৃত জটিল এবং সমস্যাসঙ্কুল। আসলে নন্দনতত্ত্ব একটি দার্শনিক তত্ত্ব যা প্রাচীন গ্রিক ঐতিহ্য থেকে এসেছে এবং আঠারো শতকে পশ্চিমা বিশ্বে এটি শক্তিশালী দার্শনিক ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটি দেখার চেষ্টা করে মানুষ কিভাবে শিল্পকলা ও ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করছে বা লক্ষ করছে বা মূল্যায়ন করছে। সাড়া প্রদান বলতে এক ধরনের আন্তঃক্রিয়ার ফলাফল বুঝানো হয়েছে, যাকে পাতন, উদ্দীপনা, আচরণবাদী প্রশিক্ষণ অথবা বিবেচিত আত্মমগ্নতা বলা যায়। সংগীত শিক্ষার ক্ষেত্রে এই সাড়া প্রদানের বিষয়টি সমাজতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি আধেয় বিষয় হিসেবে দেখা হয়। শিশুরা সাধারণত আবেগময় দিকের চেয়ে সংগীতে ব্যবহৃত শব্দের গুণাবলীর দিকে আকর্ষিত হয়। সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেনি এমন শিশু ও বয়ঃপ্রাপ্তরা সংগীত-বহির্ভূত বিষয়ের প্রতি বাচনিকভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। সংগীত- বহির্ভূত বলতে এখানে ‘টিম্বার’, ‘টেম্পো’ ও ‘ডিনামিক্স’ বুঝানো হয়েছে। সংগীতের বস্তুগত দিক, প্রকাশভাষা এবং আকরণ ও কাঠামোগত বিষয়ের প্রতি শিশুদের আকর্ষণবোধ লক্ষ করা যায়।

ক্স            সমাজতাত্ত্বিক গবেষণাসমূহ সাধারণত সংস্কৃতি উদ্ভাবনের পেছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সংগঠন, সামাজিক ক্রিয়া, আন্তঃব্যক্তিক আন্তঃক্রিয়া, ও সামাজিক প্রক্রিয়ার দিকে গুরুত্ব দেয়। নন্দনতত্ত্বের সমাজতাত্ত্বিক অভিক্ষেপসমূহ সংগীত-অন্তস্থিত বিষয় ছাড়াও বাইরের বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেয়, যাতে সাড়া প্রদানের অন্যান্য উপাদানগুলো আবিষ্কার করা যায়। ডেনোরার মতে, sociologists across a wide range of specialist areas have devoted themselves to the question of how material-cultural and aesthetic media may be understood to provide models and candidate structures for the production and achievement of emotion and feeling within specific social settings.16 এতে করে সংগীত কিভাবে ভোগ করা হয় এবং সংগীত আসলে কি করে তা সামাজিক জীবনে বিধৃত করা সহজ হয়। এছাড়া, সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের ব্যাপক পরিধিতে সংগীত অনুশীলনের ধরনটি আবিষ্কার করা সহজ হয়। সংগীতকে একটি সমাজ নির্বিশেষ স্বয়ংক্রিয় বিষয় হিসেবে না দেখে তার সামাজিক উৎপত্তি খোঁজার দিকে সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টি নিবন্ধ থাকে। অন্যভাবে বলতে গেলে বলা যায়, লোকসংগীতবিজ্ঞানের (বঃযহড়সঁংরপড়ষড়মু) যে বিষয়টি সংগীতবিজ্ঞানী নৃবিজ্ঞানীদের আকর্ষণের বিষয় তা চলে আসে অর্থাৎ সংগীতের কাঠামো ও বিষয়বস্তু (সংগীতবিজ্ঞান) এবং তাদের সাংস্কৃতিক ক্রিয়া (নৃবিজ্ঞান) পরিজ্ঞাত হয়।

ক্স            ডেনোরা আরো মনে করেন যে, আবেগ, জ্ঞান এবং অনুভূতি জাগ্রত করার ক্ষেত্রে সংগীতকে ব্যবহার করার নিমিত্ত আসলে এক ধরনের ‘নন্দনতাত্ত্বিক প্রযুক্তি’; এটি আসলে আহম ও সামাজিক ব্যবস্থায় আবেগের উদ্ভাসনের উদ্যোগ যেহেতু নান্দনিক উপলব্ধির ব্যাপারটি এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সে কারণে তা আর স্বতঃস্ফূর্ত থাকে না। অর্থাৎ নান্দনিক এজেন্সি হয়ে দাঁড়ায় নান্দনিক ইনস্ট্রুমেন্ট। বিস্তৃত প্রেক্ষাপট থেকে নন্দনতত্ত্ব আবেগের সামাজিক বিস্তারকে নির্দিষ্ট করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সংগীতের মধ্যে নৃতাত্ত্বিক সাড়া প্রদানের বিষয়টি সমাজতাত্ত্বিকভাবে সাংগীতিক স্বাদ ও পছন্দ-অপছন্দের অগ্রাধিকারের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয়, যদিও সংগীতের মূল্যায়ন আরো ব্যাপক বিষয়। বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে সংগীত শিক্ষক ও গবেষকরা সংগীতের সামাজিক মনস্তত্ত্ব পর্যবেক্ষণ করেন। বয়ঃসন্ধিকালে সংগীতপ্রিয়তার বিষয়টি সে কারণে সংগীতের বিশেষ ধরনকে তাদের আচরণ ও পছন্বদ-অপছন্দের সাথে মিলিয়ে দেখেন। জেন্ডারভিত্তিক সংগীত প্রণোদনার বিষয়টিও সমাজতাত্ত্বিভাবে বিবেচিত হয় যেমন তরুণীরা রোমান্টিক জনপ্রিয় সংগীত এবং নিত্য-উদ্দীপক সংগীতের প্রতি আকৃষ্ঠ থাকে বলে মনে করা হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাত্রা লক্ষ করা যায়। দর্শক-শ্রোতাদের দৃষ্টিকোণ থেকেও নন্দনতাত্ত্বিক গবেষণা হয়েছে এবং সেক্ষেত্রে দেখা গেছে ধ্যানমগ্ন শুদ্ধ সংগীতের চেয়ে নিত্য-উদ্দীপক বা অংশগ্রহণ-উদ্দীপক সংগীতের দিকে নন্দনতাত্ত্বিক মনোভাব সরে যাচ্ছে। কিছু গবেষক শিশু-কিশোরদের সংগীতপ্রিয়তার বিভক্তি এভাবে করেছেন যে, (ক) আবেগময় প্রকাশ, (খ) নান্দনিক উপভোগ, (গ) বিনোদন, (ঘ) যোগাযোগ, (ঙ) শারীরিক উদ্দীপনা, (চ) সামাজিক মূল্যবোধের প্রকাশ, (ছ) ধর্মীয় প্রথার গ্রাহ্যতা, (জ) সংস্কৃতির চলমানতা এবং সামাজিক সংহতি। এই নয়টি আলাদা সাংগীতিক ক্রিয়াকে শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় বলে মনে করা হয়।

  • ক্স ব্লাকিং মনে করেন সাংগীতিক কাঠামোসমূহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও জীবতাত্ত্বিক কাঠামোসমূহের চেয়ে আলাদা কিছু না। তিনি বলেন, Functional analyses of musical structure cannot be detached from structural analyses of its social function: the function of tones in relation to each other cannot be explained adequately as part of a closed system without reference to the structures of the socio-cultural system of which the musical system is a part, and the biological system to which all music makers belong.15

ক্স            সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় যে বিষয়টির উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা হরেছে সেটি হলো সংগীতের নন্দনতত্ত্ব ক্রমাগত সনাতন ধারা থেকে সরে এসে ব্যক্তি জীবনে সংগীতের ‘ব্যবহারের’ দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা লাভ করছে। সংগীতকে সামাজিক সম্পর্কের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করার নান্দনিক প্রবণতা প্রকটতর হচ্ছে। পারফর্মেটিভ সংগীত সম্পাদনের দিকে শিশু-কিশোরদের আগ্রহ বাড়ছে। শিশুদের নান্দনিক সাড়া প্রদানের বিষয়টি অনুপুঙ্খভাবে জানতে হলে তাদের এককভাবে সংগীত উপভোগ করার চেয়ে সাংগীতিক এ্যাকশন ও এজেন্সির দিকে প্রলুব্ধ হওয়ার প্রবণতাকে যাচাই করা দরকার। একক শ্রোতা বা নন্দনতাত্বিক সাড়া প্রদায়ী হিসেবে শিশু-কিশোরদের মূল্যায়ন যতটা না অর্থপূর্ণ হচ্ছে তার চেয়ে তাদের সমবেত সংগীত শ্রবণ ও সাড়া প্রদানের বিষয়টি নান্দনিক বিচার ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বেশী অর্থপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ক্স            কোন্ বয়সে শিশুরা সংগীতের আবেগময়তা প্রত্যক্ষ করতে পারে এমন প্রশ্ন মনে আসাই স্বাভাবিক। তাছাড়া বড় হওয়ার সাথে সাথে কিভাবে এই আবেগ পরিপক্বতা লাভ করে সেটিও জানার বিষয়। শিশু-কিশোরদের আবেগের প্রত্যক্ষণ বিষয়টি নিয়ে অনেক গবেষণা রয়েছে। সংগীতের আবেগকে প্রত্যক্ষ করার বিষয়টি গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে এক তাত্ত্বিক কাঠামোয় আবদ্ধ করা যায়। প্রথমেই দেখা যাক আবেগের সংজ্ঞা কি বলে বা সংগীতের আবেগ বলতে কি বোঝায়।

ক্স            আবেগের সংজ্ঞা দেয়া খুব সহজ নয়। তবে ক্রিয়া ও কাঠামোকে আলাদা করতে পারলে ব্যাপারটি অনেকটা সহজতর হয়। ক্রিয়াকে বা আবেগের ক্রিয়াকে বিভিন্নভাবে চিন্তা করা যায়। অধিকাংশের মতে এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার, সচেতন প্রচেষ্টার ফল নয়। আবেগ কিছু শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন আনে, যেমন, হৃদস্পন্দন বাড়ায় বা রাগান্বিত করে । তবে আবেগ উদ্রেককারী বা উদ্দীপক ঘটনার উপর আলোকপাত না করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে আবেগ নিজের থেকেই শনাক্ত হবার মতো পুর্বনির্ধারিত গুণাবলীর সমাহার। যেমন, হাসি-কান্না বা চিন্তা ইত্যাদি। আবেগ একটি অবস্থার প্রলম্বিতকরণ এবং পরস্পরের সাথে যোগাযোগের উপায়, অথবা বলা যায় এটি একটি নিজস্ব অবস্থা যা নিজেকে ব্যক্তি হিসেবে সম্প্রসারিত করে। কাঠামোগতভাবে আবেগ কিছু সত্তার সম্মিলন যেমন সুখ, দুঃখ, চেতনা বা ভীতি প্রভৃতি। এটি মাত্রাগত প্রত্যয় হিসেবে নেতিবাচক ব্যবস্থা থেকে ইতিবাচক আবেগের দিকে সম্প্রসারিত হতে পারে। যাকে আন্তঃক্রিয়ামূলক মাত্রা থেকে উত্থানমূলক মাত্রার দিক অগ্রসর হওয়া বুঝাতে পারে। আবেগ অনেক সময় সক্রিয়তা, সংবদ্ধতা, আচরণ, পরিবেশগত উদ্দীপক প্রভৃতির সাথে সম্পর্কিত। আবার আবেগময় কাঠামো ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার ইঙ্গিতবহ ভাবা যেতে পারে। যেমন, সুখ, দুঃখময়তা বা সংক্ষুব্ধতা, এগুলো ভিন্ন ভিন্ন স্মারক অবস্থার উদ্রেক ঘটাতে পারে। আমরা যখন একটি সুরেলা সংগীত শুনি তখন একের পর এক সুরেলা সংগীত প্রত্যাশা করি। এখান থেকে অন্য মাত্রায় প্রস্থান করা অনেকটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সংগীতের ক্ষেত্রে আবেগের বিষয়টি অনেকে  দুভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, যেমন, শ্রোতার মনের অবস্থার সাথে সংগীতের প্রাসঙ্গিকতা; আরেকটি হলো সংগীতের অন্তঃস্থিত আবেগময়তা যা শ্রোতার মধ্যে যে কোন অবস্থায় সঞ্চারিত হয়।

ক্স            নবজাতক তাদের জীবনের প্রথম দশ সপ্তাহের মধ্যে অনাগ্রহ এবং সন্তুষ্টি সম্পর্কে আগ্রহ দেখায় এবং পরবর্তী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে তারা সুখ-দুঃখ, বেদনা-আনন্দ, বিস্ময় ও ভয় সম্পর্কে জাগৃতি লাভ করে। এগুলোও সাত মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়। গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে, এই মৌলিক আবেগগুলো তাদের মধ্যে জীবতাত্ত্বিকভাবে অধিষ্ঠিত। কারণ, সাত মাসের মধ্যে শিশুরা মুখাবয়ব মিশ্রিত আবেগসমূহকে চিহ্নিত ও আলাদা করতে পারে এবং দশ মাসের মধ্যে সামাজিক উদ্দীপকের প্রেক্ষাপটে তার ক্রিয়া সম্পাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আসে। বিহ্বলতা, লজ্জা, অপরাধবোধ, দ্বেষ ও গর্ব করতে গিয়ে তারা দ্বিতীয় পর্যায়ে অপেক্ষাকৃত জটিল আবেগসমূহ আয়ত্ব করে সাধারণত দুই বছর বয়সের পর শিশুরা সামাজিক বিধি-বিধানের প্রেক্ষাপটে নিজেকে এবং অপরকে বুঝে ওঠার মত আত্মসচেতনতা লাভ করে। তবে একথা ঠিক যে, শিশুর প্রত্যক্ষ সাংস্কৃতিক পরিম-ল তাদেরকে সাংস্কৃতিকভাবে নির্দিষ্ট আবেগ প্রকাশে সক্ষমতা দান করে। তিন বছর বয়স থেকে শিশুরা বয়ঃপ্রাপ্তদের মতো সাবির্ক আবেগীয় পরিম-ল সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। সাধারণত মায়ের কাছে থেকে পাওয়া আবেগীয় তত্ত্ব তাদেরকে এ বয়সে প্রতিক্রিয়া  জানাতে সাহায্য করে। যেমন, আগুন বা তাপের প্রতি পিতামাতার প্রতিক্রিয়া থেকে সে শিক্ষা নেয় এসব ক্ষেত্রে  কিরূপ আচরণ করতে হবে। তিন থেকে ছয় বছরের মধ্যে বাহ্যিক কারণ ও ফলাফল সম্পর্কীয় তাদের আবেগগত পরিপক্বতা ক্রমাগত পরিপূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়।

ক্স            সংগীত বা বাদ্যযন্ত্রের প্রেক্ষাপটে শিশুদের বাচনিক যোগাযোগ প্রক্রিয়া অনেকটাই বাবা-মার আবেগের অনুকূল পথে এগুতে থাকে। নিজস্ব শিক্ষার বাইরে এই বাচনিক শিক্ষার স্তরে ছন্দময়তা তাদেরককে প্রায় একক উপায় হিসেবে গ্রহণ করে। আমরা যেমন বিদ্যালয় পর্যায়ে শিশুদের আনন্দদানের জন্য ছড়ার সাথে পরিচিত করাই। ছড়ার অর্থের চেয়ে ছন্দ তাদেরকে বেশী আকৃষ্ট করে। আর অর্থ যেটুকু তারা আয়ত্ব করে তা মা-বাবার ইঙ্গিত থেকেই পায়। সুতরাং আবেগগত প্রত্যক্ষণ অন্যান্য বিষয়ের মতো সংগীত শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রধান ভূমিকা পালন করে। আর আবেগগত বৌদ্ধিক পর্যায়ে আসতে শিশুদের আরো সময় লাগে। বৃহত্তর সামাজিক আন্তঃক্রিয়া এক্ষেত্রে তাদেরকে উত্তরোত্তর সাহায্য করে।

ক্স            সংগীতের ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঈশ্বর প্রদত্ত গুণাবলী ও প্রতিভার মত বিষয় নিয়ে প্রবল বিতর্কের সূচনা হতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে আবার সেই প্রকৃতি/পরিবেশ (হধঃঁৎব/হঁৎঃঁৎব) বিষয়ক বিতর্কটি চলে আসে। আসলে এ বিষয়ে একটি বৃহত্তর রূপরেখা চিন্তা করা যায়। যার মধ্যে প্রকৃতি-প্রদত্ত ও প্রতিভার মতো বিষয়গুলো ছয়টি উপাদানের মধ্যে দিয়ে বিকশিত হতে পারে বলে মনে করা হয়েছে, (ক) প্রকৃতি-প্রদান, বিকাশ-প্রক্রিয়া, ব্যক্তি অন্তঃস্থিত ফ্যাক্টরস, পরিবেশগত উদ্দীপক, সুযোগ এবং প্রতিভা। ব্যতিক্রমী সক্ষমতা মনোবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে আলোকিত হতে দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হলো সংগীতজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, দৃশ্যকলা শিল্পী, বা লেখকদের মধ্যে বিশেষ গুণাবলী কিভাবে ব্যাখা করা যায়। এক্ষেত্রে অন্তর্গত অভীপ্সা নাকি পরিবেশ কোনটি বেশী কার্যকরী ভূমিকা রাখে এক্ষেত্রে ‘আইকিউ স্কোর’ একটি বিশেষ পরিমাপক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সংগীতসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিভার বিশ্লেষণে তা সম্যকভাবে প্রয়োগযোগ্য নয় বলে মনে করা হয়েছে।১৭ গেইন১৮ প্রকৃতি প্রদত্ত গুণাবলীর সাতটি ক্ষেত্রের কথা বলেছেন যা ব্যক্তি অন্তঃস্থিত গুণাবলীর সমার্থক।

  1. ১. Intellectual: potentials required for learning to read, speak, and understand concepts; dimensions include the potential for fluid reasoning, being able to think abstractly, memory, a sense of observation, and metacognition.
  2. Creative: potentials related to be able to think divergently when solving problems and to produce work that is representative of such thinking; dimensions includes aspects such as inventiveness; imagination, originality, and retrieval fluency.
  3. Socio-affective: Social and affective abilities used when communicating with others; dimensions include perceptiveness, tact, leadership, and persuasion.
  4. Sensory-motor: potentials that influence sensory (visual, auditory, sense of smell and touch) and motor (strength, endurance, reflexes, co-ordination) development that may then give children an advantage with their learning.

ক্স            এই চারটি ‘প্রাকৃতিক’ গুণাবলীর সংমিশ্রণ সাংগীতিক প্রতিভা বিকাশে সাহায্য করতে পারে। সৃষ্টিশীলতা সাংগীতিক প্রতিভার বলিষ্ঠ উপাদান না হলেও একটি আবশ্যক উপাদান হতে পারে, যা সংগীত,  সংগীত সম্পাদন, ও সংগীত উৎকৃষ্টকরণে সহায়ক হতে পারে। একইভাবে মটর অ্যাপটিটিউড অর্থাৎ মানুষের দৈহিক সক্ষমতা যা আমাদের দ্রুতি, স্থায়িত্ব, শক্তি, নমনীয়তা এবং কুশলতা প্রভৃতি সংগীত সম্পাদনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। বিশেষ ধরনের সংগীতে কোন্ বিশেষ ধরনের গুণাবলীর সংমিশ্রণ বেশী কার্যকরী হবে তা বলা কঠিন। বিকাশ প্রক্রিয়ায় দশ বছর বয়স একটি মাইলস্টোনের মতো ধরে নেয়া হয়, যার আগে যে কোন শিক্ষায় পারদর্শী হওয়া কঠিন। সংগীতের ক্ষেত্রে এটি আরো কঠিন কারণ শিশুর সাধনা ও বিকাশ এক্ষেত্রে একটি চলমান প্রক্রিয়া। উচ্চমানের দক্ষতা লাভের ক্ষেত্রে অনুশীলনের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন। দুজন শিশু একই সমান অনুশীলন করে সমান দক্ষতা লাভ নাও করতে পারে। সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুশীলনই কেবল উচ্চ দক্ষতা অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে কাজ করে। সংগীতের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর বিকাশের জন্য ব্যাপক সন্দর্শন, সঠিক নির্দেশনা, ও মনোনিবেশ আবশ্যক। বিখ্যাত শিশুশিল্পীরা জন্মগতভাবেই সংগীতজ্ঞ হয়ে ওঠে না। বরং দীর্ঘ ও কঠিন সাধনা উচ্চস্তরের শিল্পী হতে সাহায্য করে।

ক্স            ব্যক্তি অন্তঃস্থিত উদ্দীপনাকে পাঁচ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও দৈহিক ফ্যাক্টরের সম্মিলন মনে করা হয়েছে। এগুলো কিছুটা জেনেটিক গুণাবলীর প্রভাবের সাথে সম্পৃক্ত, যেমন, প্রেষণা শিশুদের সাধনাকে এবং কাজের ধরনকে বুঝার ক্ষেত্রে ব্যপক ভূমিকা রাখে। এক কথায় প্রেষণা সংগীতে নিয়োজিত হবার সংখ্যাত্মক ও গুণাত্মক দিকটি প্রভাবিত করে। কিছু কিছু ছেলেমেয়ে ব্যতিক্রমী সাফল্য প্রদর্শন করতে পারে বিশেষত সাইকো-মটর, বুদ্ধিবৃত্তি, ইন্দ্রীয়-উপলব্ধি, কল্পনাশক্তি, এবং বিকাশের ক্ষেত্রে আবেগময়তা ইত্যাদি। একে অনেক গবেষক সম্প্রসারিত সচেতনতা, উদ্বেলিত আবেগের সঞ্চার এবং বৌদ্ধিক এবং দৈহিক সক্রিয়তার উচ্চতার মাত্রার অধিকারী বলে উল্লেখ করেছেন।১৯ সংগীতের ক্ষেত্রে কিছু ছেলেমেয়ে বিশেষ ধরনের সংগীত উত্তোলিত প্রেম, গভীর আবেগগত নিষ্ঠা, অথবা বিশেষ ধরনের যন্ত্রের শব্দের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। মনস্তাত্ত্বিক মাত্রাসমূহের সমন্বিত রূপ ‘গিফ্টেড’ প্রতিভার অধিকারী বলে চিহ্নিত হয়। তবে এদের মধ্যে উৎকন্ঠা ফুরিয়ে যাওয়া, অসুস্থ আত্মসমালোচনা, ও হতাশার সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা তৈরী করতে পারে। অসাধারণ প্রতিভাধর শিশু সংগীতকারদের ক্ষেত্রে পরিবেশের সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ বেশ কঠিন। তবে কিছু কিছু পরিবেশগত উদ্দীপক নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং তাতে দেখা গেছে পিতামাতা, ভাইবোন, শিক্ষক এবং কিছু ঘটনাবলী তাদের জীবনে সাফল্যের ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখে। সুতরাং এখানে বলাই যায় যে, পরিবার একটি বড় ধরনের পরিবেশগত প্রভাব রাখতে সক্ষম। শিশু বয়সেই পিতামাতার দিক নির্দেশনা ও সঠিক পরামর্শগুলো শিল্পী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী কাজে লাগে।

  • ক্স উইনের মতে, There has to be someone pushing, a parent or a teacher. Every one of the kids I’ve guided has someone like that in their lives, pushing them, sometimes gently, sometimes horribly, sometimes, unfortunately, to the point of driving the child away from music. It’s the quality of parental pushing that helps determine the eventual outcome of the prodigy.20

ক্স            শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবার অভ্যন্তরীণ প্রণোদনা যতটা সঠিক বলে মনে হয় বাহ্যিক প্রণোদনা অর্থাৎ কিছুটা সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের অভীপ্সা ক্ষেত্র বিশেষে শিশু সংগীতকারদের মধ্যে হতাশা ও ব্যর্থতার সূত্রপাত ঘটায়। আত্মশৃঙ্খলাবোধ, পরিশ্রম, বিদ্যায়তনিক সাফল্য ইত্যাদির সাথে যুক্ত করে যে পরিবারসমূহ একটি আদর্শ জীবনশৈলী পরিবেশ দিতে পারে তাদের শিশুদের সাফল্য অর্জন অনেকটা পরিমিতিবোধের মধ্যে জাগ্রত হয়। শিশুরা শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত গুণাবলীকে আলাদা করতে শেখে এবং শিক্ষকের ব্যক্তিগত উষ্ণতা তাদেরকে বেশী আকৃষ্ট করে। বলা হয়ে থাকে যে, লিউপোল্ড মোজার্ট তার ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি খুবই সদাশয় ও যতœবান ছিলেন। উল্লেখ যে, নেচার/নার্চার বিতর্কের চেয়ে এই দুইয়ের আন্তঃক্রিয়া শিশুর সংগীত প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রে অধিক মূল্যবান। মায়ের সুরেলা কন্ঠের তারতম্য প্রত্যক্ষণের মধ্যদিয়ে গর্ভস্থ শিশু বা নবজাতকের শ্রবণ ও সযতœ অভিজ্ঞতার বিকাশ শুরু হয়। গর্ভস্থ শিশুর পারিবারিক পারিপার্শ্বিক অ্যামনিউটিক তরল এক্ষেত্রে মাতৃকন্ঠ অনুধাবনের সহায়ক হয়। মায়ের কন্ঠ বা সংগীত, স্বরমাধুর্য ও ছন্দ সে সময় শিশুর মধ্যে সঞ্চারিত হয়। এ সময় শিশুর ও মায়ের দেহ অন্তঃস্থিত শিশুসত্তার রক্ত প্রবাহকে আন্দোলিত করে।২১

ক্স            ভূমিষ্ঠ হবার পর সন্তানের মায়ের আবেগময় কন্ঠ শব্দ-সংস্কৃতির অভিজ্ঞতার পাদপীঠ তৈরী করে। স্বরধ্বনির ইতিবাচক-নেতিবাচক, পছন্দ-অপছন্দ তথা ভালো লাগা না-লাগা ক্রমবর্ধমান আবহ তৈরী করে। জাগ্রত ও নিদ্রারত অবস্থায় মায়ের কন্ঠ মাধুর্য শিশুর মধ্যে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। শিশুরা জন্মের প্রথম বছরেই বস্তুগত সংস্কৃতির ধ্বনি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তাদের কন্ঠের বিকাশ সাধিত করতে পারে। তবে অধিকতর অগ্রসর পিতামাতার সাংগীতিক গুণাগুণের সাথে আন্তঃক্রিয়ার ফলে শিশুরা উচ্চতর ’পিচ’ মাত্রায় ধরতে ও গাইতে পারে; দীর্ঘ লয়ের সাথে পরিচিত হয়; সরল কিন্তু বিশেষভাবে দোলায়িত স্বরভঙ্গি আয়ত্ত করতে পারে।২২ তবে বয়ঃপ্রাপ্তদের মত দৈহিক প্রক্রিয়াসমূহের বিকাশ না হওয়ায় একটি শিশুসুলভ অপরিপক্বতা স্বরযন্ত্রের এবং স্বর-প্রকাশের ক্ষেত্রে থেকে যায়। এটি অদ্ভূত শোনালেও সত্য যে, শিশুদের জন্য ক্রন্দন গাঠনিক স্বরধ্বনিমূলক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ক্রন্দন সব ধরনের পরবর্তী পর্যায়ে স্বরধ্বনির বীজ ধারণ করে। ছড়া বলার ও শেখার বিষয়টিও পিতামাতার সংগীত সাধনার গুণাগুণকে দারুণভাবে এসময় শিশুদের স্বরধ্বনিক পরিপক্বতা সাধনে সাহায্য করে। মায়েদের সাথে তাদের সখ্য একটি প্রধান উৎস হলো ছড়াকাটা। এক বছরের মধ্যেই তারা নিজেদের ভাষা শৈলীর মাধ্যমে স্বরধ্বনিক বৈচিত্র্য আনতে সক্ষম হয়। সন্তানদের মধ্যে বাবা-মার সংগীত বিষয়ক অন্তঃক্রিয়া তারতম্য স্বরধ্বনিক বিকাশের ব্যবধান আনতে পারে।

  • ক্স স্কুলজীবন শিশুদের সাংগীতিক আত্মআবিষ্কার, আত্মমূল্যায়ন ও পারস্পরিক তুলনার অপার সুযোগ এনে দেয়। স্কুল শিক্ষকদের আগ্রহ, উৎসাহদান ও স্বীকৃতি প্রদান শিশুদের সংগীত স্পৃহাকে দারুণভাবে আন্দোলিত করে। এছাড়া সম্মিলিত কন্ঠে গান গাওয়ার প্রচেষ্টা ও অভ্যেস স্কুল জীবনেই শুরু হয়। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে এবং মেয়েদের কন্ঠস্বরের ব্যাপক পরিবর্তন আসে। যদিও শিশু বয়সে ছেলে ও মেয়েদের কন্ঠস্বরের তেমন পার্থক্য ধরা পড়ে না কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালে এ ব্যবধান সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্টোরি ও অন্যান্যদের মতে, Whereas the actual dimensions and growth of the vocal instrument are similar across sexes during childhood, during puberty the male vocal tract becomes significantly longer and develops a greater circumference. In contrast, the growth of the female vocal tract is less marked, being about 15-20% shorter than in the male and with a different internal ratio of resonating spaces, mainly because the neck (pharynx) is relatively shorter compared with that of the male.23

ক্স            গ্যাকল২৪ তার গবেষণার নিরিখে বলেন, মেয়েদের কন্ঠস্বর পরিবর্তনে চারটি ধাপ লক্ষণীয়, (ক) বয়ঃসন্ধি পূর্ব ধাপ: এ সময় কন্ঠ হালকা ও বাঁশির মতো গুণাবলী ধারণ করে এবং কিছুটা অপরিবর্তনীয় থাকে; (খ) ঋতুপূর্ব স্তর: এগারো থেকে বারো বছরের মধ্যে মেয়েদের এই স্তরে মহিলা কন্ঠস্বরের আবির্ভাব ঘটে। এ সময় সংগীতের কোন মাত্রাটি তার জন্য উপযুক্ত তা অনেকটা বোঝা যায়। (গ) ঋতু-পরবর্তী ধাপ : এ সময় কন্ঠস্বর অনেকটা সীমাবদ্ধ সুবিধাজনক বিস্তারের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। (ঘ) বয়ঃপ্রাপ্ত মহিলা কন্ঠ স্তর: এ সময় কন্ঠের সুবিধাজনক বিস্তার বৃদ্ধি পায় এবং শ্বাস গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ধ্বনি মাত্রার মধ্যে সুসমন্বয় লক্ষ করা যায়। সংগীত সাধনের উপযুক্ততা এবং শ্বাস গ্রহণের মাত্রাও কমে আসে।

ক্স            সাংগীতিক সৃজনশীলতা বা সংগীত বিষয়ক সংস্কৃতির সামাজিক আয়োজন বিবিধ বিষয়ের সাথে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেয়। এ সময় তারা ব্যক্তিগত-পারিবারিক পরিম-ল থেকে স্কুল বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সংগীত শিক্ষার যাত্রা শুরু করে। এতে করে অনুষ্ঠান আয়োজন, সাংগঠনিক কর্ম সম্পাদন, আয়োজকম-লী ও অভিভাবক সমাজের সাথে তাদের আন্তঃক্রিয়ার সুযোগ আসে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের সংগীতের সাথে পরিচয় ঘটে এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের শিল্পীদের সাথে সম্মিলন হয়। তাছাড়া, সংগীত সম্পর্কীয় বক্তব্য ও সংগীত রচনার সুযোগ আসে। সুতরাং একসাথে সে অনেকগুলো বিষয়ের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসমাবেশে সংগীত আয়োজনের কারণে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক যন্ত্র ও যন্ত্রীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং সংগীতের সুসংবদ্ধতা ও সুরমাধুর্য বৃদ্ধির জন্য এসব যন্ত্রের কৌশলী ব্যবহার তাদেরকে নতুন ধরনের অভিমুখীনতা দান করে। পারিবারিক পরিমন্ডলে এই উদ্দীপনাময় উচ্ছ্বাসমৃদ্ধ গণস্বীকৃতির সুযোগ অনেকটা সীমাবদ্ধ। সম্প্রদায়গত জীবনে অংশগ্রহণের ফলে বিভিন্ন বয়সের শিশু ও বয়ঃপ্রাপ্তদের সম্মিলিত প্রয়াস তাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করে। সুতরাং এটি স্বাভাবিক যে, সাংগীতিক সৃজনশীলতা বা সৃষ্টিশীলতা ও সংগীত বিষয়ক সংস্কৃতির এই বৃহত্তর আয়োজনে শিশুদের সক্রিয় অংশগ্রহণও আলাদা গুণগত মাত্রা যোগ করে।

ক্স            সংগীতে সৃজনশীলতা কী? সে সম্পর্কে আভিধানিক ব্যাখ্যায় পাওয়া যায় যে, সক্ষমতা প্রদর্শনের এটি একটি ক্ষেত্রভূমি যা প্রেষণা, বিযুক্তি-সংযুক্তি চিন্তা, পরিবেশ এবং ব্যক্তিত্বের মতো বিভিন্ন বিষয় জড়িত। এগুলোকে সক্ষমতা প্রদানের ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দিকে সক্ষমতার দক্ষতা বলতে সাংগীতিক প্রবণতার প্রত্যয়গত উপলব্ধি, কারিগরি দক্ষতা, নান্দনিক অনুভূতি ইত্যাদি চলে আসে। যত বেশী সক্ষমতার অবস্থা সমৃদ্ধ হবে এবং শিশুদের তা ধারণ করার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে তত বেশী শিশুরা সৃজনশীল চিন্তার অধিকারী হবে।২৫ তবে সংগীতে সৃজনশীল সাফল্য অংশগ্রহণকারীদের শর্ত ও সুনির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বনের উপর অনেকখানি নির্ভর করে। আবার সমষ্টিগত এই সাফল্য অনেকখানি নির্ভর করে তাদের জন্য সংকলিত সংগীত ও তার উপস্থাপনের ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে শিশুদের নিজেদের মূল্যায়ন। সুতরাং আন্তঃপ্রবিষ্ট ব্যষ্টিক ও সামাজিক ফ্যাক্টরসমূহের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংস্কৃতি নির্বিশেষে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, সংগীতে সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য সাংস্কৃতিক পরিম-ল বিরাট অবদান থাকে।

  • ক্স আমরা এতদিন জেনে এসেছি যে, শিশুরা বড়দের কাছ থেকে শিল্প ও ভাষাগত প্রকাশ শিখে। এক্ষেত্রে তাদের মনোযোগ কিছুটা নিস্ক্রিয়তার শিকার হতেই পারে কারণ তারা বড়দের একটি অংশ নয়। যেহেতু সংস্কৃতির বৃহত্তর অংশ জুড়ে বয়স্কদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত থাকে, সেহেতু শিশুরা সংস্কৃতিগতভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিম-ল থেকে বঞ্চিত হবে এটিই স্বাভাবিক। মিউজিকোলজিস্টদের মতে, শিশুদের সংগীত বিচার করে দেখা গেছে তারা এখনো যেন আদিম অবস্থায় বিরাজ করছে। সুতরাং সমাজতাত্ত্বিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক গবেষণা এক্ষেত্রে অনেকখানি অবদান রাখতে পারে। উল্লেখ্য, Socialization of music cultural norms has been of interest to scholars who contribute to an enculturative paradigm, where adult-to-child socio-cultural education is examined for its influences in raising (musical) citizens within  26

ক্স            নৃবিজ্ঞানী ও লোকসংগীতবিজ্ঞানীদের মতই সমাজবিজ্ঞানীরাও শিশুদেরকে অবহেলার শিকার হতে দিতে চান না। বরং তাদেরকে সামাজিক-সংস্কৃতিক ক্ষেত্রভূমির কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। শিশুদের নিজস্ব জগৎ নির্মাণের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের বদলে সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন। এখানে তারা দেখতে চান শিশুরা কিভাবে পরিবার ও বয়স্কদের মাধ্যমে অপ্রত্যক্ষভাবে বিকশিত হচ্ছে। শিশুকে শিশু হিসেবে অনুধানের চেষ্টা করা, তাদের নিজস্ব পরিচিতি, বন্ধুমহলে তার বেড়ে ওঠা, পরিবারের মধ্যে তার অবস্থান এবং শিশুদের উপর বড়দের আধিপত্যমূলক আন্তঃক্রিয়া সমাজবিজ্ঞানীদের পদ্ধতিগত আবিষ্কারের একটি নতুন দিক। কোন কোন সমাজবিজ্ঞানী শিশু ও শিশুকালের মর্যাদার রূপরেখা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এসব উদ্যোগ স্বাভাবিকভাকেই শিশুদের সংগীত শিক্ষার অবস্থা আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দিয়েছে।

টীকা ও তথ্যনির্দেশ

William, Roy G. and Timothy, J. Dowd, 2010. “What is Sociological about Music”. Annual Review of Sociology, p. 183-203. Music as an institutionalized system of tonality means fundamentally, that certain notes are regularly utilized and repeated frequnetly enough that they can be treated as things: the sonic building blocks for songs symphonies, and other compositions. One fundamental aspect of tonality is the division of pitch into distinct tones (i.e., notes). Although this division could be approached in highly idiosyncratic fashion, Weber (1958) points to a remarkable uniformity found across time: a system of tonality, he argues, that began in and sets apart the west. This system emared as the divison of pitch shifted from an adhoc opproach to one of systematic culculation based partly upon advances in mathematics and acoustics. This eventually resulted in equal temperament by the early 1700s – those 12 notes per octave (C.C-sharp, D, D-Sharp, etc) that are equidistant from each other and that permit a song to be transposed easily from one key to another (e,g., when the melody and harmony for “Happy Birth Day” can be shifted up or down in terms of pitch while retaining it’s character). As the divison of pitch grew more rational via the calculations envoled in equal temperament, so too did other elements in this system: Harmonic element grew somewhat predictable and stable (such as the common usage of major chords); Written notation that detailed these note and harmonies grew more precise; and manufacture of standardized intruments capable of playing the notes of equal temperament grew more prevalent as exemplified by the piano capturing the 12 notes per ovtave via its white and black keys (William and Timothy, c~‡e©v³)|  eÛm e‡jb, I believe there is no one in the world so intensive so leaden that he is not moved by song. Theophrastus highly said in the second book on music that the essence of music is the movemnet of the soul, which drives away evils from the soul invadedl by confusion. If music did not have this effect of drawing the soul where it wants, is would become in essence. (Bonds, M K, Absolute Music: The History of an Idea, Oxford: Oxford University Press, p. 48).  wZwb Av‡iv e‡jb, The centrality of language in the new ideal of musical expression did nothing to enhance the prestige of instrumental music, whic cnotinued to be regarded as inferior in kind to vocal music vincenzo Galilei, for one, belittled the artificial nature of instruments and the music they produced (Bonds, c~‡e©v³, p. 58). The idea that instrumental music was by it’s very nature inferior to vocal music would never the less remain the satandard view until the beginning of the nineteenth century; only at that poirt did any significant number of critics and philosphers begin to entertain the notion that instrumental music’s freedom from the constraints of language and representation might actually make it a superior mode of a expression. In the meantime, instrumental music moved to the forefront of the debute about the essence of the art, Aided by the new conception that music – and now for the first time in the specfic sencse of instrumental music – consituted a langusage in it’s own right a language capble of giving voice to emotins in ways that nventional language could not. (Bonds, p. 61-62)

2 The commodifation music is now common place and a fact of life in most societies, Which Adorno (2002) and others lament. What exactly is owend – the motes on the page, the performance, the technological reproduction is a matter of conflict, whose adjudication has far-reaching consequences for the social dynamics of music  (†`Lyb Leyshon et al. 2005, Sanjek and Sanjek 1991)

3 A small musicological positions is inherently sociological because it highlights the interwining of music and interaction. Smalls approach focases on the verieties of across involed in the on going activity of music yet small ten to focous on actor associated with musical performance, (William and Timothy)

4 Chandra Mukharjee e‡jb Mass is a common people with very positive atributes that may be potentially positive social force.  So by  mass culture we understand culture of the most own people Revolutionary mass has some special meaning of political tone but mass is ashumed and then often  divided into two parts uper and lower ends of the mass market the better kind of mass entertinement mass society would be a society organized or achieved in such ways. DBwjqvgm& e‡jb, Mass society as also been used as a term in radical even revolutionary criticism (Remond Williams, “Culture and Masses” in Rainford Guins and O. Z Flues, Popular Culture A Reader, NY: Sage Publication 2005).

5 Bohlman. 1999. ( p.xi).

6 DeNora, Tia 2000. “Music in Everyday Life” Cambridge: Cambridge Univesity Press, Ch. 9 McPherson, c~‡e©v³ p.10 Mv 23. g¨vKdvimb Av‡iv e‡jb, Embeddedness of music complicates the construction of meanning as meaning is not solely located in either a musical object or activity. Drawing inspiration from ..we address to broad approaches to this complication: those who emphasize the musical object (what we lebel hare as textualists) and those who emphasize the activity (contextualists).

7 If musical differentiation and hierarchy aligned smoothly with the stratifacation of society, sociology of music would have little to say about broader social distinctions such as race, class and gender. However, various aspeets of music sometimes invert stratification, turning it on its head. Although white listeners have sometimes devalued music by African Americans because of racial associations .. they sometimes imbue black with a positive value .. and white with a negative value (Cantweel 1997, Gazian 2003).

8 William and Timothy (2002; 2004).

9 Student of popular culture have treated much of the Theory emanating from fance as means for educating the critical eye rather than as vessels carrying the truth. Thus they have fallen quite comfortable integrating the two directions of structural analysis and including ideas from post structuralism as nevisions of structuralism. They have taken tendencies in theories of interpretations and converted them into tecniques for cultural interpretation by using them to describe and explain empirical phenomena, particularly life–style in subcultures. Their work has helped to make the theoretical richness of the post two decades more available to traditional students of popular culture. ..In general Adorno believes that the more shophisticated an artistic form, the more inherently individualized it is, the less likely it is to submit to the authority of the social system, the more likely it is to posit a human freedom anti-thetical to the repressive unity of socity (“Adorno’s sociology of music and Art.” The Journal of Aesthetics and Art Criticism, Vol. 33. No. 3,  pp. 321-327). ..Music is, as Sir Jack westrup puts it, not something which comes out of the blue; it is man–made. It is a conscious social phenomenon created by man to fulfill an individual and collective need. Man is considerd here as a social being whose music is a form of social behaviour that enables him to identify himself both as a culturally motivated indivisual and as a collective member whose characteristic is socio–cultural interaction with other members of his cultural community.

10          Riedel, Johannes, 1964., “The Functions Of Sociability In The Sociology Of Music And Music Education”, Journal Of Research In Music Education, Vol 12, No, 2, pp 149-158. Current methodologies and teenologies do not enable us to state beyond doubt whether observed differences in musical ability in chidren are the sole result of genetic inheritance learing or an interaction between the two. There are musical that we share similar brain structures that respond to music and that exposure to music and engagement with it improve messured musicality. p. 15

1[1]             McPherson, Gary 2000, The Child Musician: Gary McPherson, The Child as Musician: A Handbook of Musical Development, Oxford: Oxford University Press, 2006. msMxZ m¤ú‡K© g¨vKdvm©b e‡j‡Qb, What does fetus perceive when it perceive music? Clearly, not what an adult perceive, first, the fetus has no language or reflective awareness with which to process the music. Second, music perception always depends strongly on previous musical experience. Thus, it is important to define what is meant by music. If music is an integral feature of human culture, then it can hardly be relevant to the fetus, which– romantic-progressive objection to the contrary has not yet been initiated into that culture. For that initiation runs parallel to the acquisition of language and does not begin until about one year after birth

[1]2          McPherson, Gary, c~‡e©v³, Chater “Musicality” pp. 2 of 22

[1]3 Hargreaves, D.G. (1986). The Developmental Psychology of Music, Cambridge: Cambridge University Press.

14             Cantwell, R.H. and Millard, Y. (1994). “The Relationship Between Approach to Learning and Learning Strategies in Learning music.” British Journal of Educational Psychology, 64, p. 45-63.

15          Denora, T.  2001. “Aesthetic Agency and Musical Prctice: New Directions in the Sociology of Music and Emotion”, In P. N. Juslin and J. A. Sloboda (eds.), Music and Emotion: Theory and Research, Oxford: Oxford University Press, pp. 161-180  pp.164

[1]6             Blacking, J. 1973. How Musical is Man? Seattle: University of Washington Press, p. 30

[1]7 Hettinger., H. R. and Carr, M. 2003 “Cognitive Development in Gifted Children: Toward a More Precise Understanding of Emerging differences in Intelligence”. Educational Psychology Review, 15(3), p. 215-246.

18             Gagne, F. 1993. “Constructs and Models Pertaining to Exceptional Human Abilities”, In K. A Helleer, F.J. Monks, and A.H. Passaw (eds.), International Handbook of Research and Development of Giftedness and Talent, New York: Pergamon, pp. 69-87; See also Gagne, F. 2003. “Transforming Gifts into Talent: DMGT as a Development Theory”, In N. Colangelo and G. A. Davis (eds.), Hamdbook of Gifted Education, Boston: Allyn and Baccon, pp. 60-74

[1]9          Coleman, L. J. and Gross, R. L. 2000. “Social –Emotional Development and the Personal Experiences of Giftedness.” In K. A. Heller, F. j. Monks, R. J. Sternberg and R. F. Subotnik (eds.) , International Handbook of Giftedness and Talent, New York: Elsevier, pp. 203-212

20             Winn, M. 1979. The Pleasures and Perils of being a Child Prodigy. Times Magazine, 12-19, p. 38-45.

2[1]             Weleh, G.F.  2006. “The musical Development and Education of Young Children”. In B. Spodek and O. Saracho (eds.), Handbook of Research on the Education of Young Children, Mahwah, NJ: Lawrence ErIbaum. Associates Inc.  pp. 251-267

22             Thurman L. and Welch, C. 2000, Body Mind and Voice: Foundations of Voice Education.. Iowa City, Iowa: National Center for Voice and Speech. Pp. 12-24

23          Story, B. H., Titze, I. R. and Haffman, E. A. 1997. Volumetric Image-Based Comparison of Male and Female  Vocal Tract Shapes, National Center for Voice and Speech Status and Progress Report, 22, pp. 153-161

24             Gackle, L. (2000). “Understanding Voice Transformation in Female Adolescents” In: L. Thurman and G.F. Welch (eds.) Body mind and voice: Foundations of voice education. Iowa: National Center for Voice and Speech. pp. 739-744.

25             Webster., P. 2002. “Creative Thinking and Music, Advancing a Model”, In T. Sullivan and L. Willingam (eds.), Creativity and Music Education, Canada: Britania Printers and Canadian Music Educators Association. pp. 16-34

26          Waterman, R. 1956. Music in Australian Culture- Some Sociological and Psychological Implication In EE. T. Gaston (ed), 1955. Music Therapy, pp. 40-49.

*************************

আত্মকথা ……………………………………….

 

হোসেনউদ্দীন হোসেন (জ. ১৯৪১)
লেখক হোসেনউদ্দীন হোসেন (জ. ১৯৪১)। একাত্তরের রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা। থাকেন যশোরের ঝিকরগাছার কৃষ্ণনগর গ্রামে। লেখালেখি তার প্যাশন। তিনখ-ের বাংলার বিদ্রোহ কিংবা রণাঙ্গণে একাত্তর নামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতাড়িত গ্রন্থ ছাড়াও লিখেছেন কবি আহসান হাবীব বা টলস্তয়-ভলতেয়ারের মতো বিশ্বসাহিত্যের গুণী লেখকদের নিয়ে নানা আয়তনের গ্রন্থ। ভ্রমণপিয়াসী এ লেখক ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেক দেশ। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি তার কাছে স্মৃতিমুদ্রার এক এপিক আখ্যান। প্রচারবিমুখ, নির্লোভ, স্বার্থত্যাগী, নিরহংকারী এ মানুষটির গল্প-উপন্যাস-কবিতার হাতও প্রশংসিত। এই দুর্মুখ সমাজে ব্যতিক্রমী এ মানুষটি এখন প্রায়— আনন্দময়রূপে ‘একা’। তাঁর জীবন-অধ্যায়ের বিচিত্র অভিজ্ঞতার যে সুলুকসন্ধান তিনি এ অংশে ধারাবাহিকরূপে শুরু করেছেন তা নিশ্চয়ই বর্তমান প্রজন্মকে অনেককিছু জানতে ও বুঝতে শেখাবে। অভিনন্দন এ গুণী লেখককে। (সম্পা.)

ধুলায় ধূসর-২

চারদিকে ছোট ছোট নদী, খাল আর বাওড়। সদরকুঠির পশ্চিম পাশ ঘেঁষে চলে গেছে হরিহর নদ। নৌপথই হলো যাতায়াতের পক্ষে উত্তম। কপোতাক্ষ বিধৌত নব্বইটি গ্রামে মেকেঞ্জি সাহেবের তত্ত্বাবধানে নীলের চাষ চলছে। কোথাও কোনো হুড়হাঙ্গামা নেই। সাহেবের হুকুমেই রাইয়তরা তটস্থ। তবে এলাকার মাঝে মাঝে বৈঙড়ে বাহিনীর উপদ্রব দেখা দিয়েছে। এসব দমন করার জন্য সরকার দায়িত্ব প্রদান করেছে জমিদারদের। জমিদারের পাইক পেয়াদার সংখ্যা ছিল নগণ্য। কোথাও কোনো রকম অঘটন ঘটে গেলে করণীয় কিছু ছিল না।

শান্তি শৃঙ্খলার রক্ষার জন্য সরকার বিশেষ বিশেষ স্থানে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করেছিলো বটে— কিন্তু তার লোকবল না থাকায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ম্যাকেঞ্জি সাহেব বিষয়টা নিয়ে দারুণ উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। বিশাল একটা অঞ্চল ম্যাকেঞ্জি সাহেবের উৎপাদন ক্ষেত্র। কৃষকদের গতিবিধি তার কাছে ভাল বলে মনে হচ্ছিল না। এক অঞ্চল থেকে আরেকটি অঞ্চলের দুরত্ব কম নয়। এই দুটি অঞ্চলের মধ্যে নব্বইটি মৌজা। কোথায় কোন গ্রামে কি ঘটছে, এটা তার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। অতএব, নিজেদের ব্যবসায়ের স্বার্থে নিরাপত্তা রক্ষা করা দরকার। মনে মনে ম্যাকেঞ্জি সাহেব একজন বুদ্ধিমান ও বলশালী লোক খুঁজছিলেন। সদর কুঠিতে ফিরে এসে ম্যাকেঞ্জি সাহেব দেওয়ানকে তলব করলেন। দেওয়ান ছিলেন কৃষ্ণকান্ত ভট্টাচার্য্য। কাজেকর্মে ছিলেন তুখোড়। স্থানীয় লোকেরা তাকে বলত ফিকিরবাজ। তিনি তাড়াহুড়া করে সাহেবের সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন :

বলুন হুজুর

আমি মন্ডলের ব্যটাকে দেখলাম, ভেরি নাইস। তাকে আমার এখানে আনার জন্যে ব্যবস্থা করো। আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই।

জি হুজুর, আমি তাকে এখানে উপস্থিত করার ব্যবস্থা করছি।

দেখো, তাকে সম্মান সহকারে এখানে তুমি আনবে। অন্য কেউ নয়।

পরের দিন তিনি স্বয়ং মন্ডলের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। ম-ল দেওয়ানকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। এই লোকটিকে তিনি একটুও পছন্দ করতেন না। তবুও খাতির করে বৈঠকঘরে বসতে দিলেন। দেওয়ান বললেন, ম-ল, গরজ বড় বালাই তাই আসতে হয়েছে। কোনো সমাচার আছে নাকি ম-ল জানতে চাইলেন।

হ্যা, ম-ল, আলবত সুসমাচার আছে।

বিষয়টা একটু খোলাসা করে বলেন?

আপনার ছেলের সঙ্গে সাহেব একটু বাতচিৎ করতে চান।

ও এই ব্যাপার? অন্য কিছু নয়তো?

না ম-ল, উনি খুশি হয়েই এই প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।

আমি ভেবেছিলাম আমার ব্যাটা তো লায়েক হয়ে গেছে, না জানি কোন অপরাধ করলো কি না?

না, না, না। ওসব কিছু না। আমি সঙ্গে করে সদর কুঠিতে নিয়ে যাবো, আবার সঙ্গে করে আপনার বাড়িতে পৌঁছে দেব। ম-ল বাড়ির অন্দরমহলে গিয়ে তুরফানকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন।

আদাব, আদাব, দেওয়ানজী। তুরফান দেওয়ান মহাশয়ের সামনে এসে দাঁড়ালো।

ম-লের ব্যাটাকে তিনি এর আগেও দেখেছেন। তখন সবেমাত্র সে কৈশরে পা দিয়েছে। বেশ কিছুকাল আগেকার কথা সে চেহারার সাথে বর্তমান চেহারার কোন মিল নেই। ব্যাটা এখন স্বাস্থ্যশরীরে সুশ্রী বলবান একজন মর্দ মানুষ হয়ে উঠেছে। তাগড়া জোয়ান। উঁচু বুক। প্রশস্ত কাঁধ। মেদহীন শরীর। মাথায় ঝাকড়া চুল। আয়ত নেত্র। সুঠাম বাহু। গাল পর্যন্ত জুলফি। গায়ের বর্ণ যদিও শ্যামলা, তবুও তার বিদ্যুতের মতো ঝিলিক রয়েছে। দেওয়ান বললেন, আমার সাহেব তোমাকে ছালাম দিয়েছে বাবাজি। তাঁর সদর কুঠিতে গিয়ে তোমাকে একটু দর্শন দিতে হবে। তুরফান পিতার দিকে তাকালো। ম-ল বললেন, সাহেব যখন দেওয়ানজীকে পাঠিয়েছেন, অবশ্যই তুমি তার সঙ্গে যাবে।

ঠিক আছে চলুন।

ম-ল বললেন, বাবা, তুমি উনার সঙ্গে গিয়ে সাহেবের সঙ্গে দেখা করে এসো। দেওয়ান তুরফানকে নিয়ে সদরকুঠির দিকে হাঁটতে লাগলেন। ঘন বসতিপূর্ণ গ্রাম নয়। কয়েকটি পাড়া নিয়ে গ্রামটি গঠিত। বাজনদার পাড়া, সর্দার পাড়া, মৃধা পাড়া। কপোতাক্ষের পাড় ঘেঁষে হিন্দু পাড়া। সদর কুঠির পুব্ বরাবর সাহেবদের সমাধিক্ষেত্র। বেশ কয়েকজনের সমাধি আছে এখানে। সমাধিক্ষেত্রের দক্ষিণে একটা চলাচলের রাস্তা। ইটের প্রাচীর দিয়ে সমাধিক্ষেত্রের সীমানা বেড়া দেয়া রয়েছে। জিন্নিংগজ সাহেবের পরিবারের সমাধিক্ষেত্র। এখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন জিন্নিংগজ সাহেব, তার স্ত্রী মরিয়ম এবং তার অকালমৃত দুটি সন্তান। আরো বেশ কয়েকটি কবর রয়েছে এখানে। অধিকাংশ মারা গেছেন মহামারি-মড়কে।

দেওয়ানজির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে তুরফান এসে সদরকুঠির প্রাঙ্গনে গিয়ে দাঁড়ালো। সচরাচর সাহেবের অনুমতি ছাড়া এই কুঠিরে প্রবেশ করা নিষেধ। চারজন দারোয়ান জমের মতো চেহারা। চৌপহর পাহাড়া দিচ্ছে। দক্ষিণের বাধা অঞ্চল থেকে এদের আনা হয়েছে। দেওয়ানজির পেছনে তুরফান সদরকুঠির ভেতরে গিয়ে সাহেবের সামনে এসে উপস্থিত হলো।

সাহেব ছালাম।

তোমাকেও ছালাম।

দেওয়ান কৃষ্ণকান্ত ছিলেন হুকুমের দাস। তিনি তার কর্তব্য পালন করেছেন। সাহেবের কুঠিতে এসে তুরফান ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। সাহেব জিজ্ঞেস করলেন তোমার নাম কি?

তুরফান।

তুরফান?

জ্বি হুজুর, কেউ কেউ তুফান বলেও ডাকে।

তুরফান নয়। আমি তোমাকে তুবন বলে ডাকব। তোমাকে দেখে আমার পছন্দ হয়েছে।

সাহেব নিজে নিজেই হো হো করে হাসলেন নিজের আসন থেকে উঠে এসে তুরফানের হাতে হাত রাখলেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে ঝাকি দিয়ে করমর্দন করলেন। তুরফানের হাতের তালু শক্ত। সাহেব উপলব্ধি করলেন বাহুতে প্রচুর কুয়ত। বাঘের সঙ্গেও লড়াই করার মত শক্তি ও সাহস আছে এই নওজোয়ানের।

তুবন, আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু হয়ে গেলে। হরহামেশা আমার সঙ্গে তুমি থাকবে। রাজি আছো তো? তুবন বিনয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। খাতির করে কেদারায় তুরফানকে বসিয়ে দিলেন সাহেব।

এখন থেকে এই কেদারায় তুমি বসবে। এটা তোমার জন্য বরাদ্দ করা হলো। কোনো শরম নেই। বন্ধুর কাছে বন্ধু এসে বসবে।

তুরফান ম-ল সাহেবের সান্নিধ্যে এসে তুবন সাহেব হয়ে গেলেন। বাজনদার পাড়ার আর একটি নাম ছিল খলিফা পাড়া। এই পাড়ার অনেকেই দর্জির কাজ করত। আশেপাশের গ্রামের অভিজাতদের পোশাক পরিচ্ছেদ বানানোর কাজ ছিলে এদের। সাহেবদের পোশাকও বানিয়ে দিত এরা। এই পাড়াটা ম-ল পরিবারের উত্তর পাশে। পাড়াটা পাশাপাশি হলেও বর্ণ ও বর্গের দিক থেকে নি¤œজাতের। মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত কিন্তু কুলিন নয়। অনেকটা হিন্দু সম্প্রদায়ের পতিত ও দলিত শ্রেণির সমমর্যাদাসম্পন্ন। তাই বাজনদার পদবির পরিবর্তে ওরা খলিফা পদবি গ্রহণ করে দর্জি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিত। অর্থাৎ একটা ধাপ থেকে উপরের আরেকটা ধাপে উঠে নতুন একটা গোত্র তৈরী করেছিল। এই দর্জি গোত্রের একজন নামজাদা পোশাক নির্মাতার নাম ছিল হুজু খলিফা। সে সাহেবদের পোশাক তৈরী করে দিত। সাহেব তাকে তলব করলেন এবং হুকুম করলেন, আমার বন্ধু তুবনের জন্য পোশাক বানিয়ে দাও।

হজু খলিফা কয়েকদিনের মধ্যে সাহেবের ইচ্ছানুযায়ী তুবন সাহেবের জন্যে কুর্ত্তা বানিয়ে দিলো। সবুজ রঙের কুর্ত্তা। ফার্গুসন সাহেব কলকাতা থেকে কিনে আনলেন শোলার হ্যাট। রঙটা খয়েরি রঙের। আমজাম করে তুবন সাহেবের হাতে উপঢৌকন দিলেন ম্যাকেঞ্জি সাহেব। তুবন সাহেব খুশিমনে গ্রহণ করলেন। এলাকায় সকলের কাছে মান্যগণ্য লোক হয়ে উঠলেন তুবন সাহেব। ঘোড়ায় চড়ে সাহেবের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন এদিকে ওদিকে। গায়ে সবুজ রঙের কুর্ত্তা। মাথায় হ্যাট। সাহেবের অধীনস্থ নব্বইটি গ্রামের আমজনতার কাছে তুবন সাহেবের নাম ছড়িয়ে পড়লো। ম্যাকেঞ্জি সাহেব ছিলেন একগুয়ে প্রকৃতির লোক। নিজের ব্যবসার স্বার্থে গায়ের জোর দেখাতেন। এটা নিয়ে কোথায়ও কোথায়ও ঝুট ঝামেলা হতো। জোরজবরদস্তি করে জমিও দখল করতেন। কৃষকের মধ্যে দেখা দিতে লাগলো অসন্তোষ। তাদের নালিশ করার কোন জায়গা ছিল না।

কলারোয়া তখন নতুন মহকুমা। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল লতিফ। তার এজলাসে গিয়ে ভুক্তভোগী কৃষকরা ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালো। অভিযোগ মারাত্মক। জবরদস্তি করে জমি দখল। বিষয়টি উপলব্ধি করে আবদুল লতিফ সাহেব পরোয়ানা জারি করলেন। ফার্গুসন সাহেব এবং ম্যাকেঞ্জি সাহেব পরোয়ানা পেয়ে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। তারা ভাবতেই পারেননি একজন বাঙালি মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট তাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করবেন। ক্ষিপ্ত হয়ে তারা আবদুল লতিফের বিরুদ্ধে বাংলা সরকারের বরাবর একটা অভিযোগপত্র পেশ করলেন। অভিযোগে বলা হলো যে, আবদুল লতিফ সাহেবের এই মহকুমায় যোগদান করার আগে ঝিকরগাছা কনসার্নের অধীন নব্বইটি গ্রামের কোনো কৃষকই নীল চাষ করার ব্যাপারে উত্তেজনা প্রকাশ করেনি এবং আপত্তি জানায়নি। এলাকাটি ছিল শান্তশিষ্ট। আবদুল লতিফ সাহেব সরকারের ক্ষমতা পেয়ে কৃষকদের নীল চাষ করতে নিষেধ করছেন এবং চাষের জন্য যে চুক্তিনামা ছিল, তাও তারা মানতে অস্বীকার করছেন।

ম্যাকেঞ্জি আরো অভিযোগ করেন যে— যখনই একজন রাইয়ত তাঁর এজলাসে অভিযোগ করে তখনই সেই অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা তা তদন্ত না করে আবদুল লতিফ সাহেব নীল চাষ না করতে রাইয়তদের পক্ষে হুকুমদান করেন। শুধু তাই নয়— দেওয়ানী আদালতে মামলাও করতে বলেন।

ম্যাকেঞ্জি সাহেব আরো অভিযোগ করেন যে, তিনি কয়েকজন নেতার নাম উল্লেখ করে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল লতিফ সাহেবের নিকট একটি দরখাস্তের মাধ্যমে জানান যে উক্ত ব্যক্তিগণ তার কারখানার কর্মচারীদের কাজ না করার জন্য উত্তেজিত করছিল, কিন্তু তিনি তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে কারখানার কর্মচরীদের গ্রামে প্রবেশ বন্ধ করার জন্য পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দেন। এমনকি নীলকরদেরকে তিনি অপমানিত করে থাকেন। বিচারক হয়েও তিনি বিচার করেন না। এটাই তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। সম্পূর্ণ বিদ্বেষপ্রসূতভাবে তিনি কারখানা মালিকদের শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে অপকর্মতৎপরতায় লিপ্ত। তাকে অচিরেই বদলি করা হোক। যে সকল ভুক্তভোগী রাইয়তবৃন্দ মহকুমা হাকিম আবদুল লতিফের এজলাসে দেওয়ানী মামলা দায়ের করেন, তারা সবাই ছিলেন নীল চাষী এবং ম্যাকেঞ্জি সাহেবের কনসার্নের অন্তর্গত। নীল চাষী আসানউল্লাহ ম-ল, জাকের ম-ল ও তোতাগাজী ছিলেন ফরিয়াদি। বিবাদি ছিলেন কনসার্নের মালিক কলকাতার ব্যবসায়ী ডব্লিউ এফ ফার্গুসন ও প্রধান নির্বাহী ও কনসার্নের অন্যতম অংশীদার হেনরী ম্যাকেঞ্জি।

রাইয়তরা যে ফরিয়াদ জানিয়েছিল, আবদুল লতিফ তা বাস্তবায়িত করেছিলেন। পুলিশ পাঠিয়ে নীলকর লাঠিয়ালদের হাত থেকে রাইয়তদের রক্ষা করার ব্যবস্থা করেন। এমনকি ম্যাকেঞ্জিকে কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেন যে, তোমার কোনো অভিযোগ থাকলে আদালতে এসে মামলা দায়ের করো। নিরীহ চাষীদের উপর কোনরকমের অত্যাচার করার অধিকার তোমার নাই। আবদুল লতিফ ছিলেন আইনের প্রতি বিশ্বাসী। তিনি নীলকর সাহেবের অন্যায় কাজের প্রশ্রয় দিতেন না। তাদের সকল রকম বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ম্যাকেঞ্জির কাছে মনে হয়েছিল ধৃষ্টতা। তিনি ছেড়ে দেওয়ার বান্দা ছিলেন না। একজন নেটিভ কর্মচারীর এই হেন দুঃসাহসিক কর্মকে তিনি ধৃষ্টতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনে করেন। তিনি আবদুল লতিফকে শায়েস্তা করার জন্য নীলকর সাহেবদের নিয়ে গোলবৈঠক করলেন। গোলবৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো যে, এই নেটিভকে যে কোনো উপায়ে হোক কলারোয়া থেকে সরাতে হবে। তা না হলে নীল ব্যবসা পাততাড়ি গুটিয়ে তাদেরকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। ঘোড়া দাবড়িয়ে লোক-লস্কর নিয়ে যশোহর থেকে নদীয়া পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াতে লাগলেন ম্যাকেঞ্জি সাহেব। যেখানেই যান, সেখানেই গিয়ে গালাগালি দিতেন আবদুল লতিফকে। বুড়বক কাঁহেকা, নফর কাহেকা, হামার সাথ লড়াই করার হিম্মত দেখানোর আস্পদ্দা ভেঙে দেব তোর। হামি এংরেজ, আর তুই ব্যাটা নফর নেটিভ। কানুন ক্যায়সা হায়, দেখায়ে দেঙ্গে। খোদ গভর্নরের সমীপে আবদুল লতিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে একটা দরখাস্ত দিলেন ম্যাকেঞ্জি সাহেব। মূল অভিযোগ হলো, নীলকুঠিয়ালদের কারখানা শিল্প ধ্বংস করে দিচ্ছেন একজন নেটিভ মহকুমা হাকিম আবদুল লতিফ। তিনি এংরেজ কুঠিয়ালদের শত্রু। রাইয়তদের ক্ষেপিয়ে সরকারের বিপক্ষে বিদ্রোহ করার জন্য উস্কানি দিচ্ছেন। গভর্নর বিষয়টি তদন্তের জন্য তাঁর সচিব মি. গ্রেকে দায়িত্ব দিলেন। সচিব মহোদয় দায়িত্ব দিলেন নদীয়া বিভাগের কমিশনার মি. বিডওয়েলকে। মি. বিডওয়েল বিষয়টি তদন্ত না করেই বদলি করার জন্য সুপারিশ করলেন।

আবদুল লতিফ ছিলেন সৎ, ন্যায়ানুগ এবং কর্তব্যপরায়ন ব্যক্তি। কোম্পানি সরকারের অধীন চাকরি করলেও দেশীয় লোকদের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। কারোর প্রতি তার কোন বিদ্বেষ ছিল না। অবহেলিত কৃষকদের দুঃখ দুর্দশা মোচনের জন্য যা কিছু করণীয় তা তিনি একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন। তিনি কলারোয়া মহকুমা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে আরো অনেক সমাজহিতৈষী কাজের দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। মি. লারমার নামক একজন নীলকর সাহেবের অভিযোগের ভিত্তিতে নদীয়ার ম্যাজিস্ট্রেট একটি তদন্ত করেন। তদন্তে দেখা যায় যে, বাগ আঁচড়ায় লামার সাহেব বেআইনিভাবে সশস্ত্র সমাবেশ করেননি। কাগজপুকুরিয়ার দারোগা উল্লেখ করেছেন একই কথা। কিন্তু আবদুল লতিফ লিখেছেন যে, ওই দারোগার প্রতিবেদন বিশ্বাসযোগ্য নয়। দারোগার সঙ্গে লারমার সাহেবের যোগসাজস রয়েছে। লারমারের অভিযোগ ছিল যে, বিদ্রোহী কৃষকরা জমিতে উৎপাদিত নীলগাছ উৎপাটন করে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মামলায় লারমার সাহেবের মোক্তার মহোদয়কে তার প্রমাণ দেখানোর জন্য সাক্ষী আনতে নির্দেশ দেন আবদুল লতিফ।

এই তদন্ত প্রতিবেদনে তদন্তকর্তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লেখেন যে, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল লতিফ নীল চাষীদের অভিযোগ শুনে যে সব হুকুমজারি করেন এবং ওই সকল গ্রামে বরকন্দাজ প্রেরণ করেন তা কখনো নীল চাষী ও নীলকরদের সঙ্গে চুক্তিভঙ্গের বিষয় ছিল না কিন্তু বিষয়টির ফল অনুরূপ হয়ে উঠেছিল। বরং তদন্তকর্মকর্তা স্পষ্ট করে লিখেছেন যে সেখানকার নীল চাষীরা অধিকাংশ ছিল ফরাজী আন্দোলনের সদস্য এবং তারা ছিলেন বিপজ্জনক ও হট্টগোল সৃষ্টিকারী। কলারোয়ার অধীন কুশোডাঙ্গা ও পিছলাপোল গ্রামে মওদুদ বরকন্দাজকে পাঠানোর ব্যাপারটি সম্পর্কে লিখেছেন যে কলারোয়া সদর দপ্তর থেকে গ্রাম দুটির দুরত্ব মাত্র তিন মাইল। সেখানকার নীল চাষীদের অভিযোগপত্র পাঠ করে কোনরকম তদন্ত না করেই কৃষকদের রক্ষার জন্য বরকন্দাজ পাঠিয়েছেন। এর ফলে পাশাপাশি গ্রাম দুটির জনসাধারণ উৎসাহিত হয়ে নীলকরদের বিরুদ্ধে মারমুখী হয়ে ওঠে। আবদুল লতিফ এই তদন্তের বিরুদ্ধে বলেন বিষয়টির অপব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, ২২ তারিখে এবং পিছলাপোল গ্রামের অধিবাসীরা আদালতে নালিশ পেশ করে তার পরের দিন ২৩ তারিখে। পিছলাপোল গ্রামের অধিবাসিরা কুশোডাঙ্গা গ্রামের অধিবাসি কর্তৃক উৎসাহিত হয়েছে এই অভিযোগটি আদৌ সত্য নয়। তবুও তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল লতিফের উপরে দোষ চালিয়েছেন। তৎকালীন সামাজিক ও রাষ্ট্রিক প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সমস্ত দেশেই ছিলো নীলকরদের ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি। একদিকে জমিদার কর্তৃক শোষণ নিপীড়ন, অন্যদিকে ছিলো নীলকরদের জোরজবরদস্তি। ডাকাতি রাহাজানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তুবন সাহেব ম্যাকেঞ্জি সাহেবের সঙ্গে নদীয়া ও যশোহর জেলার বহুস্থান পরিদর্শন করেন। তিনি দেখেছিলেন জোর জুলুম ও নির্যাতনের ভয়ে অসংখ্য লোক পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামের ভিটেমাটি ফেলে পার্লিয়ে গিয়েছে। জনবিহীন গ্রামগুলো জঙ্গলে পরিণত হয়ে উঠেছে। নীলকর সাহেবরাও ডাকাতি-রাহাজানির ভয়ে মাঝেমাঝে আতঙ্কিত হয়ে কুঠিগুলোতে কড়াকড়িভাবে পাহারার ব্যবস্থা করতো। সবচেয়ে আতঙ্কের মধ্যে দিনযাপন করত গৃহস্থ চাষারা। জমিদার শ্রেণী ইংরেজ শাসকগণের সাহায্যে কৃষককে তার জমির দখলিস্বত্ত্ব থেকে উচ্ছেদ করার জন্য যে নিষ্ঠুর উপায় অবলম্বন করে তার তুলনা মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিরল। যে দুটি প্রধান উপায়ে চাষীকে দখলিস্বত্ব থেকে উচ্ছেদ করে, তার প্রথমটি হলো ব্যাপক ও তীব্রভাবে উৎপীড়ন এবং দ্বিতীয়টি হলো তাদেরই পোষ্য ডাকাত দ্বারা সর্বস্ব লুণ্ঠন। এই অবস্থা শুরু হয় তুবন সাহেবের বাবার আমল থেকে। বিষয়টি ছিল বাস্তব। ১৮৫৯ খ্রীস্টাব্দে খাজনা ও জমির বিক্রয় সংক্রান্ত আইন পাস হওয়ার আগে এই কৃষক উচ্ছেদের পালা অব্যাহতভাবে চলেছে। জমিদার শ্রেণীর এই অবাধ লুণ্ঠন ও ডাকাতির প্রধান সহায়ক ছিল ইংরেজ বণিক রাজ স্বয়ং। ইংরেজ শাসকগনের সাহায্যেই জমিদাররা নির্বিঘেœ পেশাদার গু-া-ডাকাতদের দ্বারা বাংলার কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে মেরুদ- ভেঙ্গে দেয়। এই কাজটি যাতে জমিদাররা নির্বিঘেœ করতে পারে তার জন্যই ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে গ্রামাঞ্চলের শান্তি রক্ষার ভার গ্রামবাসিদের পরিবর্তে জমিদারদের উপর অর্পন করে। গ্রাম অঞ্চল শান্তি রক্ষার উদ্দেশ্যে পাইক-বরকন্দাজ প্রভৃতি নিয়োগের ক্ষমতাও জমিদারদের দেওয়া হয়। জমিদাররা সচ্চরিত্র গ্রামবাসিদের পরিবর্তে গ্রামের পেশাদার ডাকাত ও গু-াদের দারোগা, পাইক-পেয়াদা বরকন্দাজ প্রভৃতিরূপে শান্তি রক্ষার কাজে নিযুক্ত করে। উল্লেখ করা যায় যে, এদের কোনো সেরেস্তা থেকে বেতন দেওয়া হতো না। বেতনের পরিবর্তে তাদেরকে ডাকাতি ও লুটপাটের অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। জমিদারের পরামর্শক্রমে তারা ডাকাতি ও লুটতরাজ করত। এই অদ্ভুত ব্যবস্থা সম্পর্কে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ইংল্যান্ডের বোর্ড অব ডাইরেক্টরস এর নিকট এক স্মারকলিপিতে জানান :

বর্তমানের অস্থায়ী ম্যাজিস্ট্রেট কার্যবিবরণী থেকে দেখা যায় যে, পুলিশের চাকরী জমিদার ও তাদের কর্মচারীদের দ্বারা সর্বাপেক্ষা কুখ্যাত ডাকাত ও গু-াদের নিকট বিক্রয় করে দেয়। এই ডাকাত ও গু-ারা অবাধে গ্রামের পর গ্রাম লুটপাট করে ছারখার করে দেয়। সকল জমিদারির অবস্থা অল্পবিস্তর একই রকম। প্রত্যেক জমিদারের আছে একটি করে পোষ্য ডাকাত দল। প্রত্যেকটি প্রধান ডাকাত দলের কোন না কোন জমিদারের সঙ্গে রয়েছে গভীর সখ্য ও যোগাযোগ।

১৮৩৭ সালের একটি পুলিশ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ‘জমিদারের বেতনভুক্ত ডাকাত, পুলিশ ও চৌকিদারগণকে পূর্বে ছুটি দেওয়া হতো। ডাকাতির দিন গ্রামে হাজির থাকলে পাছে কেউ তাদেরকে ডাকাতের সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করে, সেইজন্যই ডাকাতির আগে তাদেরকে ছুটি দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হতো।’ এইভাবে ইংরেজ শাসকগণ নবসৃষ্ট জমিদার গোষ্ঠীর সাহায্যে পরিকল্পনা মোতাবেক চাষীদের জমিজমা থেকে উচ্ছেদ করে বাংলার গ্রাম সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। জমিজমা হারিয়ে চাষী সম্প্রদায়ের একাংশ প্রাণের ভয়ে ডাকাতি ও দস্যুবৃত্তির পথ বেছে নেয়। আর অধিকাংশ চাষী মরিয়া হয়ে জমিদার ও ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথে অগ্রসর হয়। ইংরেজ শাসকগণ তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের স্বার্থে চাষী সম্প্রদায়কে জমিজমা থেকে উচ্ছেদ করে যে ডাকাতি বা দস্যুবৃত্তির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে, সেই ডাকাতি ও দস্যুবৃত্তি তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আর আটকে রাখতে পারেনি। এর ফলে তাদের শাসন ব্যবস্থাও বিপণœ হয়ে পড়ে। অবশেষে বাধ্য হয়ে ইংরেজ শাসকবৃন্দ ১৮৩৫ সালে বিশিষ্ট সামরিক কর্মচারীদের নিয়ে এক ‘ডাকাতি কমিশন’ নিয়োগ করেন। এই কমিশনের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও বাংলায় ডাকাতি দমন করা সম্ভব হয়নি। ১৮৫৩ সালে মার্শম্যান একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন : ‘বাংলাদেশে প্রায়ই ডাকাতি হচ্ছে এবং এটা বিশেষভাবে হচ্ছে কলকাতার আশেপাশের জেলাগুলিতে। বাংলাদেশে ডাকাতি একটি স্বাভাবিক অপরাধ হিসেবে গণ্য।’ ১৮৫৩ সালে আর একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ওয়েলবি জ্যাকসনকে ডাকাতি তদন্তের জন্য ভারার্পণ করা হয়। তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন লেখেন : ‘বাংলাদেশে ডাকাতি এখন একটি সাধারণ ঘটনা। ডাকাতরা লোক খুন করছে। সকলেই অবগত আছে যে— জমিদারদের লাঠিয়ালরাই ও ভাড়াটে গু-ারা ডাকাতি করে থাকে। আমাদের পুলিশ বাহিনীর পক্ষে এই ডাকাতি দমন করা সম্ভব নয়।’ এই হেন পরিস্থিতিতে নীলকরদের কুঠিতে কোথাও কোথাও ডাকাতি হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো শাসকগণকে ভীতি ও সন্ত্রস্ত করে তোলে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় বিশে ডাকাতের কথা। স্থলপথের চেয়ে নৌপথে ছিল বিপজ্জনক। সচারচর নৌপথেই বেশি ডাকাতি সংঘটিত হত। কারখানায় যে নীল উৎপাদিত হত, তা নৌপথেই চালান হয়ে চলে যেত কলকাতায়। নৌকার বহরের উপর ডাকাতরা সুযোগ বুঝে হামলা করত। মাঝিমাল্লাদের গলা কেটে লাশ ভাসিয়ে দিত নদীর উজানে। এটা ছিল জনপদে ভীতির একটা ঘটনা। ম্যাকেঞ্জি সাহেবের নৌবহরের উপরে কয়েকবার হামলা চালিয়েছিল ডাকাত দস্যু তস্কররা। ম্যাকেঞ্জি সাহেব ঘটনাগুলো শুনে হতবাক হয়ে গেলেন। কারা যে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা তিনি নির্ণয় করতে পারলেন না। তুবন সাহেবকে বললেন, এই হামলাতো আমার নৌকার মাঝিমাল্লাদের উপরে নয়— খোদ আমার উপরেই হামলা। কারা যে হামলা করেছে, একটু গোপন তল্লাসী করে জানাও। ঝিকরগাছার পশ্চিম দিকে কপোতাক্ষের তীর ঘেঁষে একটি গ্রাম। গ্রামের নাম মিশ্র দেয়াড়া। চাঁদ খাঁ চৌধুরী নামে একজন জমিদার বাস করেন। জমিদার মানে তালুকদার। তিনি খারিজা ও বাজেয়াপ্তি জমির অধিকারী ছিলেন। বড় শালা শওকতের সঙ্গে বাস করতেন। তিনি গোপনে একটি ডাকাত দল গঠন করেছিলেন। নৌপথে বড় বড় বাণিজ্য বহর চলাচল করত। সুযোগ বুঝে তার দল নৌবহরের উপর হামলা ও লুণ্ঠন চালাতো। বাইরের কেউ জানতো না যে চাঁদ খাঁ চৌধুরীই এই ডাকাতদলের কর্তা। তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিশাল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছিলেন। তুবন সাহেব গোপনে অনুসন্ধান করে জানতে পারলেন যে, নীল নৌকার বহরের বাইরে যে সশস্ত্র হামলা হয়— এই হামলার প্রধান নায়ক চাঁদ খাঁ চৌধুরী। তাঁর ডাকাত দলেরই কা- এটা। পাল্টা একটা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল ম্যাকেঞ্জি সাহেবের। কলারোয়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল লতিফের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার কারণে পরিকল্পনাটি ভেস্তে চলে যায়। আর একটা উটকো ঝামেলা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। চারদিকে নিজের অধীনস্থ এলাকার তখন নানা রকম উৎকণ্ঠা সমস্যা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিলো। বিভিন্ন গ্রাম থেকে নানা রকম বিপজ্জনক খবর আসছিল। ফরাজিপন্থীরা নীলকরদের বিরুদ্ধে চাষীদের রুখে দাঁড়ানোর জন্য দল গঠন করছে। আবদুল লতিফ যদি চাষীদের পক্ষ না নিতেন, তা হলে এই সমস্যার উদ্ভব হত না। মাথায় ক্রোধের আগুন নিয়ে একবার কলকাতা, একবার নদীয়া ছুটাছুটি করে বেড়াতে লাগলেন ম্যাকেঞ্জি সাহেব। শেষ পর্যন্ত ম্যাকেঞ্জি সাহেবই জিতলেন। কোম্পানির সরকার বদলী করলেন আবদুল লতিফকে। তাঁর বদলে কালারোয়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে এলন বাবু কিশোরীকুমার মিত্র। বিডওয়েল কর্তৃক আবদুল লতিফের বদলি সম্পর্কে ১৮৮৩ সালে ১৫ জুলাই ৎবন ধহফ ৎধুুবঃ মন্তব্য করা হয় :

next january he (Abdul Latif) promoted by lord Dalhousie in his capacity of Government of bengal, to a higher grade and placed incharge of the newly formed sub-division of Kalaroa, in the name district which was afterwards called the sub-division of Sathkira now in Khulna. There he at once showed his mettle, for it was the young Deputi magistrate of Kalaroa who lied the seeds of the emancipation of the peasantry from slavery to Indigo, he was removed, but without a stain.

আবদুল লতিফ ছিলেন প্রকৃত অর্থে কৃষক দরদি। তাই তিনি কোম্পানি সরকারের অধীন চাকরী করলেও নীলকরদের অন্যায় জুলুমের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা মোতাবেক কৃষকদের রক্ষা করার জন্য পদক্ষেপ নেন। আবদুল লতিফের বদলির আদেশ শুনে ম্যাকেঞ্জি সাহেব হো-হো করে হাসলেন। সদরকুঠিতে একটা আনন্দ উৎসবের আয়োজন করলেন। আশেপাশের নীলকরদের আমন্ত্রণ জানালেন। দুদিন ধরে চললো উৎসব। কলকাতা থেকে পাঁচজন বাইজি সঙ্গে করে আনলেন ডব্লু. এফ. ফার্গুসন। জমায়েতটা বেশ জাকজমক ছিল। একদিকে ছিল ব্যান্ডের বাজনা, অন্যদিকে ছিল গ্লাসের টুংটাং শব্দ, তামাকের ধোঁয়া, নাচগান আর মদ্যপান। খাবার ছিল প্রতিজনের জন্য দুটো কিংবা তিনটে মদের বোতল এবং হাল্কা কারী। হুকা ছিল বাড়তি আয়োজনের মধ্যে বিশেষ একটা সামগ্রী। হুকায় তামাক সাজানোর জন্য ছিলো বেশ কয়েকজন হুকা বরদার। সব সাহেবরা নিজ হুকা সঙ্গে করে এনেছিলেন। হুকাগুলো ছিল রূপার চেন দিয়ে বাঁধানো। তামাকে ছিল মিষ্টি সুঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণে সাহেবরা মাতাল হয়ে হৈ হৈ করে নাচনেওয়ালিদের জাপটে ধরে নাচানাচি করেছিল। দুদিন পরে উৎসব শেষে সাহেবরা যার যার কুঠিতে চলে গিয়েছিল। পুরোপুরি ব্যাপাারটা তুবন সাহেবও উপভোগ করেন। নেটিভদের জন্য ছিল খাওয়া দাওয়ার আলাদা আয়োজন। কুঠিরের কর্মচারিরা নিজেদের জন্য নিজেরাই রান্না করেছিল। হুকা বরদার আর সাহেবদের ঘোড়ার গাড়ির সহিসরা শরিক হয়েছিল তাদের সঙ্গে। সব সাহেবেরা সঙ্গে করে এনেছিলেন তাদের সেবাকারীদের, একজন কেশ সজ্জাকর, ন’জন পার্শ¦চর।

উৎসবও শেষ। ব্যান্ডবাজনাও শেষ। ম্যাকেঞ্জি সাহেবের দাপটও আরো বেড়ে গেল। তবুও তার একটা ভয় থেকে গেল। ডাকাতের ভয়। বিশে ডাকাতের মতো কেউ না কেউ যেন আর গজিয়ে ওঠে। সবচেয়ে ভয় ছিল আচমকা হামালার। বিশে অর্থাৎ বিশ্বনাথ সর্দার ছিলেন নদীয়ার যশোহর জেলার নীল কুঠিয়ালদের আতঙ্ক। বিশ্বনাথের অভ্যূত্থান ঘটে চুর্নী নদীর তীরবর্তী এলাকায়। তিনিই ছিলেন প্রথম কৃষক বিদ্রোহী। ইংরেজরা তাকে ডাকাত বলে কুখ্যাত ও বিখ্যাত করে। তিনি হাসখালি, মন্নুর হাট, কৃষ্ণপুর, বাবলাবন, রানীনগর, চন্দননগর, চৌগাছা, খালবোলিয়া, গোবিন্দপুর, আসান নগর প্রভৃতি গ্রামে নীলকুঠি আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেন। নীলকরদের জব্দ করা তার প্রতিজ্ঞা হয়ে ওঠে এবং সেই প্রতিজ্ঞা পালনও করেন। যশোহর এবং নদীয়ায় বিশ্বনাথ ছিলেন নীলকরদের আতঙ্ক। তিনি এককভাবে নীলকরদের অমানবিক নিষ্ঠুর নির্যাতনের প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। নীলকরদের নির্যাতন কেমন ভয়ঙ্কর ছিলো, তার একটি বর্ণনা পাওয়া যায় তৎকালের ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়’ :

নীলকরদিগের কার্যের বিবরণ করিতে হইলে প্রজা-পীড়নেরই বিবরণ লিখিতে           হয়। তাহারা দুই প্রকারে নীলপ্রাপ্ত হয়ে প্রজাদিগকে অগ্রিম মূল্য দিয়া তাদের           নীল ক্রয় করেন এবং আপনার ভূমি কর্ষণ করিয়া নীল প্রস্তুত করেন। সরল      স্বভাব সাধুব্যক্তিরা মনে করিতে পারেন, ইহাতে দোষ কি? কিন্তু লোকের কত             ক্লেশ, কত আশাভঙ্গ, কতদিন অনশন, কত যন্ত্রনা যে এই উত্তরের অন্তর্ভুক্ত        রহিয়াছে, তাহা ক্রমে ক্রমে প্রদর্শিত হইতেছে। এই উভয়ই প্রজানাশের দুই অমোঘ উপায়। নীল প্রস্তুত করা প্রজাদিগের মানুষ নহে। নীলকর তাহাদিগকে         বল দ্বারা তদ্বিষয়ে প্রবৃত্ত করেন, ও নীলবীজ বপনার্থে তাহাদিগের উত্তমোত্তম               ভূমি নির্দিষ্ট করিয়া দেন। দ্রব্যের উচিত পণ প্রদান করা তাহার নীতি নহে,              অতএব তিনি প্রজাদিগের নীলের অত্যন্তমূল্য ধার্য করেন। দ্রব্যের উচিত পণ            প্রদান করা তাহার নীতি নহে। নীলকর সাহেব স্বাধিকারের একাধিপতি স্বরূপ, তিনি মনে করিলেই প্রজাদিগের সর্বস্ব হরণ করিতে পারেন, তবে অনুগ্রহ       করিয়া দাদন স্বরূপে যৎকিঞ্চিত যাহা প্রদান করিতে অনুমতি করেন, গোমস্তা           ও অন্যান্য আমলাদের দপ্তর ও হিসাবাদি উপলক্ষে তাহারও কোন না কোন     অর্ধাংশ কর্তন যায়? এ কারণে প্রজারা যে ভূমিতে ধান ও অন্যান্য শস্য বপন           করিলে অনায়াসে সংবৎসের পরিবার প্রতিপালন করিয়া কাল যাপন করিতে             পারে, তাহাতে নীলকর সাহেবের নীল বপন করিলে তার লাভ দূরে থাকুক,              তাহাদিগের দুশ্চেধ্য ঋণজালে বদ্ধ হইতে হয়। অতএব তাহারা কোনক্রমেই         স্বেচ্ছানুসারে এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হয় না। বিশেষত কৃষিকার্যই তাহাদের উপজীব্য,           ভূমিই তাহাদের একমাত্র সম্পত্তি এবং তাহারই উপর তাহাদের সমুদয়     আশাভরসা নির্ভর করে। কোন ব্যক্তি এমত সঞ্চিত ধনে জলাঞ্জলি দিয়া   আত্মবধ করিতে চাহে? কিন্তু তাহাদের কি উপায়ন্তর আছে? প্রবল প্রতাপাদিত্যের মহাবল পরাক্রান্ত নীলকর সাহেবের অনিবার্য অনুমতির       অন্যথাচারণ করা কি দীন দরিদ্র ক্ষুদ্র প্রজাদিগের সাধ্য? … এই ভূমির           নাম—খাতাই জমি- খাতাই জমির প্রসঙ্গ মাত্রে প্রজাদের শোকসাগর উচ্ছ্বসিত    হয়ে ওঠে। (‘জাতি বৈর’, যোগেশচন্দ্র পৃ. ৯৫-৯৬)

উপরে বর্ণিত বিষয়ের লাঘবের জন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা ছিল না কারণ নীলকর সাহেবরা আইনের কথা শুনলে হো হো করে হাসতেন। ম্যাকেঞ্জি সাহেবও তেমনি হো হো করে হেসেছিলেন। কোনো আইনই তাদের দাপট থামাতে পারেনি। তারা ছিল ইংরেজ শাসনের আইনের দ্বারা সুরক্ষিত এবং শক্তিতে বলিয়ান। ইচ্ছা ও প্রয়োজনানুসারে নীল চাষীদের রক্তপাত, হত্যা প্রভৃতিতে ও যেন তাদের ছিল আইনসম্মত অধিকার—ইংরেজ সরকারের আইন নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রযুক্ত হত না। এই হেন অন্যায় কাজ তুবন সাহেবও দেখেছেন। তার গ্রামের অধিকাংশই চাষীর ছিল খাতাই জমি। কি উপায়ে তাদের নির্যাতন করা হয় নিজেও লক্ষ্য করেছেন। অনেক চাষীরা এসে তার কাছে পীড়নের কথা বলত। এই নির্যাতন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করত কিন্তু মুখ ফুটে তিনি সাহেবদের বলতে পারতেন না। তুবন সাহেব ছিলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমি-জমার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বের চতুর্থ শ্রেণীর স্বত্বাধিকারী। চতুর্থ শ্রেণীর স্বত্বাধিকারীগণ যে ভূমি স্বত্ব লাভ করে তার নাম ‘মৌরসী মোকারররী’। ‘মৌরসী’ শব্দে পুরুষানুক্রমিক এবং ‘মোকারররী’ শব্দে খাজনার হার নির্দিষ্ট বোঝায়। সুতরাং তালুকদারীর ন্যায় এই স্বত্ব পুরুষানুক্রমিক এবং ভোগদখলযোগ্য। এরাও পত্তনিদারদের ন্যায় মেয়াদী বা হস্তান্তরের অযোগ্য শর্তে জমি বিলি করতে পারত। এসব জমি তার বাবার আমলে সাহেবদের কুদৃষ্টিতে পড়েছিল। বাবার প্রবল ব্যক্তিত্বের কারণে তা কোনো রকমে কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পায়। বর্তমানে একই অবস্থানে আছে। সাহেবদের মনোতুষ্টি না করতে পারলে, তাকেও হয়তো বিড়ম্বনার যন্ত্রণা বহন করতে হতো। ভুক্তভোগী চাষীদের ফরিয়াদ করার কোন জায়গা নেই। আগে মোড়লরা গ্রামে সালিশ বিচার করতেন। এখন সেই মোড়লরাই বিপদগ্রস্ত। সাহেবদের হুকুম পালন করতে হয়। হুকুমদারের হুকুম না শুনলে ঘোরতর অপরাধে সাব্যস্ত করা হয়। দারুণ একটা সংকটাপন্ন অবস্থা। বিপদগ্রস্ত চাষারা তুবন সাহেবের কাছে এসে ধন্না দিতে লাগলো :

মোড়ল, এ বছর ধান, পাট, তামাক চাষ করা হলোনা। সাহেবের হুকুম

মোড়ল, আমার খেজুর বাগানটা এবার বেদখল হয়ে গেল— সাহেবের হুকুম—

মোড়ল, তিন বিঘে জমিতে বাঁশবাগান ছিল, একটা বাঁশও নাই— সাহেবের হুকুম—

চাষের জমি, আম কাঁঠালের ভূঁই, তছনছ হয়ে গেল— সাহেবের হুকুম—

মোড়ল, তুমিতো সাহেবের সঙ্গে থাকো, এই বিপদ থেকে একটু বাঁচাও

মোড়ল, সাহেবের উৎপাতে শেষ হয়ে গেলাম—

এলাকার প্রায় গ্রাম থেকে চাষারাও এসে তুবন সাহেবের দহলিজখানায় উপস্থিত হতে লাগলো। বেশ কয়েকজন গেরস্থ চাষীর ঘরবাড়ী তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। গৃহপালিত পশু, গরু ছাগল পর্যন্ত কেড়ে নিয়ে আসা হয়েছে। কাউকে কাউকে দড়ি দড়া দিয়ে বেঁধে আঁধার কুঠিতে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সারা মুল্লুকজুড়ে চলছে সন্ত্রাসী কর্মকা-। প্রতিকারের কোনো উপায় নেই। চারদিকে দেখা দিচ্ছে একটা সামাজিক অস্থিরতা। চাঁচড়ার রাজার কাছে গিয়ে যে অভিযোগ জানাবে, সেটাও সম্ভবপর নয়। তিনিও এখন অথর্ব। নতুন ভূমি ব্যবস্থার কারণে সমাজে একটা নতুন শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে। তারাই এখন ইংরেজ শাসনের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তম্ভ। এই শ্রেণীটি গ্রাম শাসন এবং শোষণ করে শুধু নয়— বাবু সমাজ নামে একটি সমাজেরও উদ্ভব হয়েছে। এই সমাজটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইংরেজরা। চাঁচড়ার রাজা ও এখন ইংরেজের সেবাদাস। তুবন সাহেব চাঁচড়ার রাজপরিবারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতেন। এই পরিবারটি এখন টিকে আছে ইংরেজ সরকারের দয়া ও করুণার উপরে। যশোহরের কালেক্টর টুকার সাহেবের মহানুভবতায় তাদের জমিদারিটা ফিরে পেয়েছেন। যদি তিনি দয়া না করতেন, তা’হলে সমুদয় জমিদারির জমাজমি চলে যেত নীলামে। এসব ইতিহাস তুবন সাহেবের বাবার কাছে শুনছিলেন তুবন সাহেব। এখন রাজা রানীর কণ্ঠের পুত্র বরদাকণ্ঠ জমিদার। তার বাবার মৃত্যু যখন হয় তখন তিনি নাবালক। সাবালকত্ব হওয়ার পর কোর্ট অব ওয়ার্ডসের নিকট থেকে তিনি জমিদারি ফেরত পেয়েছেন। ইংরেজ কালেক্টরের সুপারিশে ‘রাজা’ উপাধি পেয়েছেন। ম্যাকেঞ্জি সাহেবকেও তিনি নানা কাজে সহযোগিতা করেন। কোম্পানি এখন তার বাবা-মা। ইংরেজের প্রতি তার অসীম কৃতজ্ঞতা, ভক্তি ও শ্রদ্ধা। অতএব তার কাছে প্রতিকারের জন্য না যাওয়াই উত্তম। কিভাবে কৃষকদের বাঁচানো যায়, গভীরভাবে ভাবতে লাগলেন তুবন সাহেব। একজন গ্রাম্য মোড়লের কিইবা করণীয়? তার হাতে তো কোনো রাজশক্তি নেই। ম্যাকেঞ্জি সাহেবই বা তার কথা শুনবেন ক্যানো? তারা তো তাদেরই প্রয়োজনে জবর দখল করছেন। তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে একটু কিছু করলেই প্রবল শক্তি প্রয়োগ করে দমন করছেন। ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করে দিচ্ছে নীলকর সাহেবরা। তুবন সাহেব রাইয়তদের সমস্যা ও সঙ্কটের বিষয়টি জেনেও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করলেন না। পাহাড়ের মত মৌন হয়ে গেলেন। তিনি বুঝলেন, কৃষকের জমিই হল তার একমাত্র অবলম্বন। চাষীর জমিই হচ্ছে তার প্রধান। জমি ছাড়া চাষীরা বাঁচতে পারে না। ক্রমান্বয়ে চাষীরা ভূমিহীন হয়ে যাচ্ছে। একে তো ভূমির উপর তাদের মালিকানা নেই, এমন কি দখলি স্বত্ব নেই। এখন তারা হুকুমের দাস। সাহেবদের হুকুম না মানলে চালানো হয় নানা রকমভাবে উৎপীড়ন ও নির্যাতন। শুধু চাষীরা যে নিপীড়িত হচ্ছে তাও নয়। তাঁতীরাও দুর্ভোগের শিকার। সমস্ত সমাজটাই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। যারা এর আগে ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিল তারা ও তাদের ব্যবসায় টিকাতে না পেরে মহাজনী কারবারে নেমেছে। এটা হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যাপার— জমির দাম বেড়ে যাচ্ছে। জমির দাম বাড়তে থাকার কারণে, তারা সেখানে অর্থ বিনিয়োগ করছে। এর জন্য আরো বেড়ে যাচ্ছে জমির দাম। আসল চাষীরা পড়ে যাচ্ছে পুঁজিপতি নেহাই আর জমিদার হাতুরের মধ্যখানে। পুঁজিপতিরা শুরু করেছে দাদনের ব্যবসা। শোষণ প্রক্রিয়া বহুমুখী হয়ে উঠেছে। এতে করে চাষীরা চাষাবাদ করে নিজেদের অবস্থার বদল ঘটাতে পারছে না। আরো সর্বস্বান্ত হচ্ছে। এরকম অবস্থার মধ্যে বাতাসে একটা সংবাদ ভেসে এলো। এক কান থেকে আর একে গেল সংবাদটা। কলকাতার কাছে ব্যারাকপুরে সেপাইরা ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে দিয়েছে। গুলী করে মেরেছে গোরা সৈন্যদের। সেপাইদের এইগেন কার্যালাপে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। পরস্পরের মধ্যে তারা উত্তেজনা প্রকাশ করতে লাগলো। বহরমপুরে বিদ্রোহের সংবাদ প্রচার শুরু হওয়া মাত্রই যশোহর ও নদীয়া জেলার কৃষকরা গোপনে গোপনে সংঘবদ্ধ হতে লাগলো। নীলকরদের গতিবিধিও অনেকটা নিশ্চল হয়ে গেল। তারা অতি সতর্কতা সঙ্গে এদিকে ওদিকে চলাচল করতে লাগলো। চেহারায় ফুটে উঠেছে একটা ভয়ার্ত ভাব। কখনো কিভাবে যে ক্রুদ্ধ কৃষকরা দলবদ্ধভাবে তাদের উপর হামলা করবে। এটাই নিয়ে ছিলো তাদের বড় দুর্ভাবনা। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে বিদ্রোহের খবর বাতাসে ভেসে আসতে লাগলো। শোনা গেলো, বহরমপুরে হাজার হাজার কৃষক সেপাইদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সমবেত হয়েছে। তারা গিয়ে হাজির হচ্ছে স্বাধীন বাংলা নবাবের বংশধর বহরমপুরবাসী ফেরেদুন খাঁর আস্তানায়। তাকে এই যুদ্ধে নেতৃত্বদানের জন্য তারা মনোনীত করেছে। নদীয়া ও যশোহর থেকে কৃষকরা যাচ্ছে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বহরমপুরের দিকে। চারদিকে একটা উত্তেজনা ও টানটান অবস্থা। কতরকম কথা কানে আসছে। শোনা গেল, যশোহর পরাগ ধোপা নামক একজন ব্যক্তি ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে উত্তেজিত করছে। এই লড়াইয়ে সামিল হওয়ার জন্য জনগণের মধ্যে প্রচার চালাচ্ছে। কেউ কেউ ছোট ছোট দল ও সংগঠন করে বহরমপুরে চলে গেছে। যারা যাচ্ছে, তারা অধিকাংশই নীলকরদের দ্বারা নির্যাতিত ও উৎপীড়িত।

সরকার মধ্যবিত্ত ও জমিদার শ্রেণীর উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল। চাঁচড়ার জমিদার সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে তালুকদার ও মহাজন গোষ্ঠীকে সমবেত করে বিদ্রোহ দমনের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা পালন করছেন। তার অধীনস্থ এলাকায় ঢোল সহরত করে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, যারা বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে সমূলে উৎখাত করা হবে। অতএব, সাবধান, কোনো প্রজা যেন হিংসাত্মক কাজে অশগ্রহণ না করে। বিদ্রোহ যাতে যশোহর জেলায় ছড়িয়ে না পড়ে এবং কেউ যেন এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ না করে, এ জন্য তিনি নিজের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেন। ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড’ নামক একটি সাময়িকপত্রে একটি প্রতিবেদনে বলা হয় :

সরকার জমিদারের নিকট আবেদন করলেন এবং জমিদারগণ রাজভক্ত প্রজার      মত সরকারের সাহায্য করতে লাগলেন। জমিদারগণ গাড়ি ও গরুর         মালিকদের অর্থদানের প্রতিশ্রুতি দিলেন এবং তাদেরকে রক্ষা করার দায়িত্ব                 নিলেন। জমিদারগণই সরকারকে অগ্রীম অর্থ দিলেন এবং তারা এরকম আরো       বহু প্রতিশ্রুতি দিলেন। যা একমাত্র জমিদারগণই দিতে পারেন। এর ফলে অল্প           কয়েকদিনের মধ্যে রানিগঞ্জে ৭০০০ গাড়ি মজুত হলো। বাংলার জমিদারগণ        তাদের প্রত্যেকটি হাতী বিনা খরচে সরকারের হাতে তুলে দিলেন।… তারা    স্বেচ্ছায় ও আনন্দে তাদের ক্ষমতানুসারে ইংরেজ সরকারকে সাহায্য করেন। (ইন্ডিয়া ফিল্ড, ১১ ফ্রেরুয়ারি ১৯৫৯)

যশোহরে রাজা বরদাকণ্ঠ রায় গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি এবং হাতী সংগ্রহ করে সরকারকে সাহায্য করেন। তার অধীনস্থ এলাকার এমন কোন গৃহস্থ কৃষক ছিল না যে তাদেরকে গরুসহ ঘোড়ারগাড়ি বরদাকণ্ঠ রায়ের নির্দেশে তার হাতে তুলে দিতে বাধ্য করেন। প্রায় কয়েক হাজার গরু, গাড়ি, ও ঘোড়াসহ তিনি ইংরেজ সরকারকে প্রদান করে প্রভুভক্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তুবন সাহেবের নিজের ছিল প্রায় ১৫টি গরুর গাড়ি। প্রতিটি গাড়ির জন্য ছিল ২টি করে বলবান বলদ। বিনা খেসারতে রাজা বরদাকণ্ঠ রায়কে ইংরেজদের সাহায্যের জন্য তুবন সাহেব দিয়ে এলেন। রাজার আদেশে তিনি উপক্ষো করতে পারেন নি। উল্লেখযোগ্য যশোহর জেলাও ছিল একটি বিদ্রোহভাবাপন্ন। সি. ই. বাকল্যান্ড সাহেব তার ইবহমধষ ঁহফবৎ খরবঁঃবহধহঃ এড়াড়ৎহড়ৎং নামক গ্রন্থে লিখেছেন :

সিপাহী বিদ্রোহকালে বাংলা সরকারের অধীন এমন একটিও জেলা ছিল না যে,         যা প্রত্যক্ষ বিপদের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেনি, অথবা যেখানে ভয়ঙ্কর                বিপদের আশঙ্কা ছিল না। (ভলুম : ১, পৃ. ৬৮)

বহরমপুরের বিদ্রোহের সংবাদ জানামাত্রই কৃষ্ণনগর, যশোহর ও সমগ্র       বিভাগে একটা ভয়ঙ্কর অবস্থা দেখা দেয়। (পৃ. ৩২)

অচিরেই হয়ে ওঠে বহরমপুর বিদ্রোহের একটা কেন্দ্র। যশোহর ও নদীয়ার বিভিন্ন এলাকার বিদ্রোহী কৃষকরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রাতের বেলা বহরমপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছে। যুদ্ধে যাওয়ার লোকের অভাব ছিল না। অভাব ছিল নেতৃত্বের। ফেরেদুন খাঁ বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবার সিরাজুদ্দৌলার বংশের অধঃনস্থ পুরুষ হলেও শৌর্যবীর্যে তেজিয়ার ছিলেন না। ছিলেন দুর্বল প্রকৃতির লোক। বিদ্রোহীরা তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করলেও তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেননি। বিদ্রোহীরা এলমেলো হয়ে ঘুরাঘুরি করতে লাগলো। এই বিদ্রোহের প্রধান শক্তি ছিল কৃষক সম্প্রদায়। কৃষকরা কোনো শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল কৃষি শ্রমিক, মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত কৃষক এবং গৃহস্থ ধনী কৃষক। এরা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার শোষণ ও নির্যাতনে পিষ্ঠ হলেও নতুন করে সমাজের ধারণা, এমনকি কোনো আদর্শও এরা লালন করত না। বিদ্রোহ কালে মুক্তির জন্য রাজা ও রানি কিংবা ভূস্বামীগোষ্ঠীর বংশধরের নেতৃত্বে মুখোপেক্ষী ছিলো। অথচ এই বিদ্রোহের মূলে ছিল কৃষক জনসাধারণ। বিদ্রোহের প্রাথমিক পর্যায়ে জনসাধারণ সিপাহীদের পাশে এসে দাঁড়ায় কিন্তু নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফলে সমগ্র বিদ্রোহটা নিস্তরঙ্গ হয়ে গেলো। ইংরেজ ঐতিহাসিক শধুব তার ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ঃযব ংবঢ়ড়ু ধিৎ গ্রন্থে লিখেছেন :

হাজার হাজার লোকের বহরমপুর শহরে সমাবেশ ঘটেছিল। তারা যে ব্যক্তিটির নির্দেশ পেলেই বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ত, সেই ব্যক্তিটি নিজে দুর্বল হলেও একটি বিখ্যাত নামের মর্যাদায় যথেষ্ট শক্তিশালী ছিলেন। (ভলুম ১, পৃ. ৪৯৮)

ফেরেদুন খাঁনের সাহস না থাকায় বংশ মর্যাদার শক্তি কাজে লাগাতে পারেননি। তবে এ বিষয়টি বাস্তব যে, সিপাহী বিদ্রোহ কালে যশোহর থেকে রসদ ও যানবাহন সংগ্রহ করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। কৃষকদের নিকট থেকে যা আদায় করা হয়েিেছল তা ছিল জবরদস্তিমূলক। এ ব্যাপারে সরকারকে একটা ‘ইমপ্রেসমেন্ট অ্যাক্ট’ পাস করতে হয়। এই সময় তুবন সাহেব ছিলেন বিপদাপন্ন। এলাকার গ্রাম্য মোড়লদের সমন্বয়ে সরকারের পক্ষে যে দল গঠন করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন তার প্রধান। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সরকারের সমস্ত কাজে সহায়তা ও সহযোগিতা করার। খাদ্য ও যানবাহন সংগ্রহ করা, কৃষকদের মতিগতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা। বহিরাগত লোকদের চলাচলের প্রতি নজর রাখা। কোন কোন গ্রামের কোন কোন লোক লাপাত্তা হয়ে গেছে, তার একটি তালিকা তৈরি করার নির্দেশও তিনি পান। নির্দেশ পেলেও তিনি কোন কিছু করেননি। ম্যাকেঞ্জি সাহেবও ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। রাজা বরদাকণ্ঠ ছিলেন তার সব রকমের আশা ভরসা। রাজা তার সেরেস্তার লোক বল বাড়িয়ে দিলেন। পাইক পেয়াদা বরকন্দাজগণ সদা পাহারারত ছিল। একটা অশুভ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য রাজার বাহিনী ছিলো মোতায়ন। এতদসত্ত্বেও পরিস্থিতি ছিলো গুমোট, ঘোলা ও ভীতিপ্রদ।

বাইরে যতই ঢাকঢোল পিটানো হোক না কেন, ভেতরটা ছিল অস্থির ও অশান্ত। তুবন সাহেব সবকিছু জানলেও কোনোকিছু প্রকাশ করতেন না। প্রকাশ করাটা ছিল বিপজ্জনক। চোখ খোলা রেখে চলতেন। যে কোনো মুহূর্তেই সমস্যা আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমনকি প্রাণদ-ও হতে পারে। রাজনীতির বিষয়টা এ চাষীদের মাথায় কখনো ছিল না। সমাজে তখনো এটা নিয়ে কারো চিন্তা ভাবনা ছিল না। রাজার সঙ্গে প্রজার সম্পর্কও গভীর ছিল না। কে কখন রাজা হলো আর না হলো তাও তারা জানতো না। চাষাবাদ করে ফসল উৎপাদন করাই ছিল মূল কাজ। গ্রাম ছিল গ্রামই। গ্রামের মোড়ল মাতব্বররাই যা আদেশ-নির্দেশ করতেন সেটাই মেনে চলতো গ্রামবাসীরা। সেই গ্রামগুলো এখন অশান্ত হয়ে উঠেছে। তুবন সাহেব লক্ষ্য করলেন যে, সাহেবরাও ইদানীং আর বেশি বাড়াবাড়ি করছেন না ঝিম মেরে রয়েছেন। দেশের পরিস্থিতি বুঝে চলাফেরা করছেন।

তুবন সাহেব ছিলেন গ্রামাঞ্চলের উঁচু রাইয়তদের একজন। তার পূর্বপুরুষরা এর আগে বিশেষ সুবিধাভোগী অবস্থানে ছিলেন। এখনো তিনি গ্রামের প্রধান বা ম-ল। ‘ম-ল’ শব্দটার অর্থ হলো ‘মোকাদ্দাস’-এর খুব কাছাকাছি। এরা নিজেরাও কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং গ্রামের ভূমিদাসদের কাজে লাগাতেন। খাজনা সংগ্রহের দায়িত্ব যেহেতু এদের উপর ছিল, সেইহেতু ভূমিকরের বোঝা নিচু রাইয়তদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ারও একটা মওকা ছিল। রাইয়তদের জোতের আয়তন ছিল বিভিন্ন। কোনো কোনো রাইয়তদের ছিল ২০০ বিঘা পর্যন্ত জমি এবং তিন-চার রকমের যন্ত্রপাতি। এইসব রাইয়তদের জমিতে চাষাবাদ চালানো হতো জন খাটিয়ে। জনমজুরেরা কাজ বাবদ পেতো একটা জমিবন্দ-চাকরান, যেটা ছিল বাগানের অনুরূপ, অর্থাৎ ধরা যেতে পারে গ্রামাঞ্চলের মানুষের এই অংশটার উপর চলত সামন্ততান্ত্রিক শোষণ। তবে অধিকাংশই রাইয়তদের জোতের পরিমাণ ছিল ১৬ বিঘা ধানী জমি। এইসব রাইয়ত ফসলের অর্ধেকটা কর হিসাবে দিয়েও পরিবার প্রতিপালন সহজে করতে পারত। কোনো রকম সমস্যার মধ্যে তাদের কখনো পড়তে হয়নি।

প্রতি বিঘা জমিতে সর্বমোট উৎপাদন খরচা হতো ৬ টাকা খাজনা দেওয়ার পর উচুঁ রাইয়তদের হাতে অবশিষ্ট থাকতো ৬০০ টাকা অবধি এবং নিচু রাইয়তদের হাতে থাকতো ৫০ টাকা। মোগল আমলে, এমনকি কোম্পানির বিজয়ের পরেও, অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগেও গৃহস্থ ধনী চাষীদের খাজনা দেওয়া অনেকটা এড়াবার সুযোগ ছিল, তাদের মোট আয় ফসলের অর্ধেকের বেশি ছিল, এবং তাদের ক্ষেত আমাদের জমি ও ভিটেমাটির খাজনা না দিলেও চলত।

খাজনা পরিশোধ এবং উৎপাদন ব্যয়ের পর নিচু রাইয়তদের আয়ের যে পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট থাকতো, সেই টাকা দিয়ে তাদের সংসার নির্বাহ হতো খুব ভালোভাবেই। তৎকালে বাংলার কৃষিজীবি জনসমষ্টির প্রধান প্রধান ব্যক্তিদের সম্পত্তি, জোত জমি আর ক্ষেতখামারের আয়তনে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও খরচের ভাগটা ছিল কম। এখন নানারকম করের বোঝা চাষীদের উপর চাপিয়ে  দেওয়া হয়েছে। ভূমির খাজনা বাড়ানো হয়েছে, পূজাপার্বনের জন্য, তীর্থ যাত্রার জন্য, জামাই বিদায়ের জন্য দফায় দফায় দিতে হচ্ছে কর। এখন যুদ্ধ চলছে, এর জন্যেও সরকারের সেরেস্তায় বাড়তি কর দেওয়ার জন্য চাঁচড়ার রাজাবাবু হুকুম করেছেন।

গ্রামের খেটে খাওয়া চাষারা খবরটা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো। কোথা থেকে যে যুদ্ধের জন্য টাকা যোগান দেওয়া যায়, এই নিয়ে মাথাটা প্রায় বিগড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। যে কোনো উপায়ে হোক, যুদ্ধের খরচের জন্য সরকার বাহাদুরের সেরেস্তায় টাকা জমা দিতে হবে। চারদিকে জোর একটা তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। প্রজারা হতভম্ব।

রাজা বাহাদুর তাবৎ ম-লদের তাঁর দরবারে হাজির হওয়ার জন্য এত্তেলা দিয়েছেন। ১৬ই পৌষ। রাজা প্রধান প্রধান ম-লদের ডেকে একটা সভা করবেন বলে জানিয়েছেন। ম-লদের মধ্যে চলছে নানা তোড়জোড়। অঞ্চলের বিভিন্ন কাছারি থেকে নায়ের গোমস্তারা ম-লদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। স্বয়ং রাজাই তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার দাওয়াত দিচ্ছেন।

শুধু রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ নয়— মহামান্য কোম্পানি সরকার বাহাদুরের একজন রাজপ্রতিনিধির সঙ্গেও সাক্ষাৎ হবে। দারুন একটা খোশ খবর। এর আগে বেশ কয়েকবার চৈত্রের শেষে পুণ্যাহ উৎসবে রাজবাড়িতে গিয়েছেন তুবন সাহেব। রাজা জরির পোষাক পরে আসনে বসতেন। তাঁর মাথার উপরে বিশাল একটা রঙবেরঙের ছাতা। তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে দুজন দর্শনধারী প্রহরী পাখা দোলাচ্ছেন। মস্তকে লাল শিরস্ত্রাণ। রাজার সামনে বিশাল আকারের একটা রূপোর থালা। ধবধবে শাদা চাদরে আসনটা মুড়ানো। এক একজন ম-ল ধীর পায়ে এসে মস্তক অবনত করে থালার উপওে রৌপ্য মুদ্রা দান করে প্রমাণ জানাচ্ছেন। রাজা ডান হাতের মধ্যমা আঙুল উঁচু করে প্রণামের জবাব দিচ্ছেন। এটাই নাকি রাজদর্শন।

এবার শোনা যাচ্ছে লোকমুখে নানারকম কথা। আজ একরকমের কথাতো কাল আর এক রকমের কথা। স্বয়ং ছোট লাটবাহাদুর নাকি আসছেন। তাঁকে স্বাগতম জানানোর জন্য চলছে শাহী আয়োজন। তিনিই রাজার প্রজাবৃন্দের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। রাজার প্রজা মানে কোম্পানি সরকারের প্রজা। যেহেতু বঙ্গের ছোট লাটবাহাদুর আসছেন, সেইহেতু চলছে সাহেবকে বিপুল সম্ভাবনা জানানোর বিপুল আয়োজন। একমাত্র ম-লরাই এই সভায় হয়েছেন আমন্ত্রিত। নানারকম রঙবেরঙের কথা বাতাসে ভেসে আসছে। যশোহর জেলায় যত সাহেবসুবোরা আছেন, তাদেরও মধ্যে একটা চাঞ্চল্য। তারাও চাঁচড়ার রাজবাহাদুরের আতিথ্য গ্রহণ করবেন। বাংলার ছোট লাটবাহাদুরকে কখনো গ্রামের মানুষ দেখেনি। রাজা নদীপথে আসবেন, না, স্থলপথে আসবেন, এ বিষয়টি নিয়ে নানারকম উড়োখবর আসছে। প্রজাদের মধ্যে বাড়ছে অজানা কৌতূহল। কেউ বলছে স্থলপথে। তুবনসাহেবকেও অনেকেই এসে বিষয়টি জানার জন্যে কৌতূহল প্রকাশ করলো। তিনিও জানেননা ছোট লাট কোন পথে আসবেন।

ম-লদের মানসিক অস্থিরতা দিনদিন বাড়তে লাগলো। মনের মধ্যে টানটান উত্তেজনা। তারাও একটা শঙ্কার মধ্যে দিনযাপন করতে লাগলো। সাহেবের সামনে তারা কিভাবে গিয়ে দাঁড়াবে, এটাই নিয়ে শঙ্কা। এর আগে তারা কখনো কোনো রাজনকে দিব্যচোখে দেখেনি। এমনকি রাজা বরদাকান্তকেও দেখেনি। রাজা তার জমিদারি এলাকায়ও কখনো পদধূলি দেননি। মানসিক অস্থিরতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

এদিকে প্রবল শীত। পৌষমাসের হাড়কাঁপানো গ্রামগুলো স্থবির ও নির্জীব। কনকনে শীতের বাতাসে প্রকৃতি বিবর্ণ ও মৃতপ্রায়। এদিক ওদিক যাওয়াও শীতের প্রকোপে দুর্গম হয়ে উঠেছে। শীতে শরীর কুঁকড়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। গৃহের বাইরে দাঁড়ালেই বুঝা যায় শীতের বাতাস কত নির্মম।

১৬ই পৌষ। সকালবেলা থেকে উত্তরের হিমেল বাতাস বইতে শুরু করেছে। ঠা-ায় হাত পা অবশ হয়ে আসছে। তুবন সাহেব এই শীতে ঘোড়ার আস্তাবল থেকে তার ঘোড়া বের করে এনে ঘোড়ার পীঠের ওপর বসলেন। সূর্য তখন বেশ উপরে উঠে গেছে। তুবন সাহেবের গ্রামের বাড়ি থেকে চাঁচড়ার রাজবাড়ির দূরত্ব পাকা ১০ মাইল। রাস্তার অবস্থা ভালো নয়। মাঠের ওপর দিয়েই একেবেঁকে গেছে মেঠো পথ। বিল বাওড়, নদী, ঝোপজঙ্গল। কোথায় কোথায়ও বন্য জন্তু জানোয়ার আছে। সঙ্গে একজন সহিস রয়েছে। তাঁর কাজ হলো ঘোড়াটি রক্ষণাবেক্ষণ করা। হাতে একটা বর্শা। অগ্রভাগে তীক্ষè ফলা।

ঘোড়াটি যেমন তেজি, তেমনি হুশিয়ার। কোথায়ও কোনো বিপদের গন্ধ পেলে সজাগ দৃষ্টি তুলে থমকে দাঁড়ায়। তুবন সাহেব মোকাবেলা করার জন্য তৈরী হয়ে ওঠেন। তবে এই পথে তেমন কোনো ঝুট ঝামেলা নেই। মাঝে দুটি নদ-নদী পার হতে হয়। বাড়ি থেকে একটু দূরে হরিহর, তারপর মাঠ। ডাইনে বাঁয়ে কয়েকটা বিল, তারপর মুক্তোশ্বরী। মুক্তোশ্বরীর পাড়েই একটা হাট। এখানে রয়েছে একটা খ্রীস্টান মিশনারী। যীশুর ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে কয়েকজন ইংরেজ পাদ্রী শ্রীরামপুর থেকে এসে বসত করছেন। মুক্তোশ্বরীর উপরে একটা কাঠের সেতু বানিয়ে এপারে ওপারে যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে। এই কারণে স্থানটিকে এলাকার লোকে বলে পুলের হাট। তারপরে চাঁচড়ার রাজবাড়ি।

তুবন সাহেব ঘোড়া দাবড়িয়ে চাঁচড়ায় এসে দাঁড়ালেন। একটা বিশাল আকারের শামিয়ানা টাঙানো। চারদিকে ঘের দেওয়া। তিনটি প্রবেশ পথ রয়েছে। প্রথম প্রবেশ পথ হলো সাহেবদের জন্য, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় প্রবেশ পথ হলো ম-লদের জন্য। প্রবেশপথের বেশ একটু দূরে কয়েকজন কর্মচারি ম-লদের হাতে তুলে দিচ্ছেন একটি করে প্রবেশ পত্র।  প্রবেশ পত্র ছাড়া কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছেনা। তুবনম-ল একটা প্রবেশ পত্র নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। ভেতরেও রয়েছে আসনে বসানোর বুকে তকমা আঁটা  বেশ কয়েকজন রাজকর্মচারি। তুবন সাহেবকে দ্বিতীয় সারির একটি আসনে নিয়ে গিয়ে বসানো হলো।

দেখতে দেখতে সভাস্থল পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো। কোথায়ও কোনো গুঞ্জন নেই। একটা ভাব-গম্ভীর পরিবেশ।

একটু পরেই শুরু হলো সভা। মঞ্চে এক এক করে অতিথিরা এসে বসলেন। শুরু হলো ইংরেজি ব্যান্ড বাজনা। বৃটিশ পতাকা উত্তোলন। যশোরের কালেক্ট ও জেলা-ম্যাজিস্ট্রেট মি. রায়কেশ (গৎ. জধরশবং) বৃটিশ পতাকা উত্তোলন করলেন। হিপ্হিপ্ হুররে বলে একটা ধ্বনি উঠলো। সকলেই খাঁড়া হয়ে দাঁড়ালো। শুরু হলো সমবেত কন্ঠে বৃটিশের জাতীয় সংগীত। এই খবরের কোনো অনুষ্ঠানে এর আগে নেটিভ ম-লদের উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। দারুণ একটা দৃষ্টি আকর্ষণীয় সভা। মুগ্ধ নয়নে তুবন সাহেব মঞ্চের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

রাজা বরদাকান্ত রায় মি. রায়কেশ সাহেবের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন। আবার হাততালি দেওয়া হলো। রাজা বিনয়ের সঙ্গে বললেন, মি. লর্ড, আপনার সামনে যারা আজ দাঁড়িয়ে আছে, এরা সকলেই বৃটিশ রাজের ভৃত্য ও প্রজা। এরা আপনাকে প্রণাম জানাচ্ছে। স্যার এরা আপনার প্রতি মোস্ট অবিডেন্ট। এরাই আপনার প্রতি অনুগত এবং মোস্ট ফেইথফুল। আপনিই এদের রক্ষক এবং প্রভু। বৃটিশ ক্রাউনের পক্ষে এরা সমর্থন জানাচ্ছে। যে সকল নরাধম, আপনাদের বিরুদ্ধে মিউটিনি করেছে, তাদেরকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে এবং নস্যাৎ করার জন্য আপনার নিকট অঙ্গীকার করতে  এসেছে। আমি নিজে আপনাদের জান পরান দিয়ে সাহায্য করেছি। রসদ যোগান দিচ্ছি। খাদ্যসম্ভার দিয়ে সহযোগিতা করছি। প্রচুর পরিমাণে মাল বহনের জন্যে গাড়ি, বলদ, ঘোড়া ও হাতি দিয়েছি। প্রয়োজনে যা কিছু লাগে, আপনাদের জন্য ব্যয় করতে কৃপণতা দেখাব না।  আমার অধীনের নেটিভরা আপনার প্রতি একান্ত অনুগত। মিউটিনি দমনের জন্য তারা যুদ্ধকর দিতেও প্রস্তুত। আমি অচিরেই আপনার হাতে একটা মোটা রকমের অর্থ যাতে প্রদান করতে পারি, তার জন্যে অঙ্গীকার করছি। জয় হোক বৃটিশ রাজ্যের, জয় হোক ইংল্যা- অধিপতির। ঈশ্বর আপনাদের সহায়ক হোক। জয় ব্রিটিশ রাজের জয়। সমবেত কণ্ঠে জয়ধ্বনি উঠলো, জয় হোক বৃটিশ রাজের, জয় হোক ইংল্যা- অধিপতির। সাহেব গম্ভীর হয়ে বসেছিলেন, শেষে হাস্য করে উৎফুল্ল প্রকাশ করলেন। সভাস্থলে ঘন ঘন হাততালি পড়তে লাগলো।

মি. রায়কেশ সাহেবের শরীর মেদবহুল নয়। মাঝারি গড়নের চেহারা। মাথায় হাল্কা-পাতলা চুল। প্রায় ছ’ফুট লম্বা। দেখতে দর্শনধারী। চোখ দুটো হাল্কা নীল। তিনি মঞ্চের উপরে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। গলার স্বর বেশ ভারী। ভাঙা ভাঙা বাংলায় ভাষণ দিলেন :

রাজা বরদাকান্তকে ধন্যবাদ। গর্ভনরের পক্ষ থেকে তাঁর শুভ কর্মের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তিনি খুব ভালো মানুষ আছেন। আমরা তাঁর সমুদয় কাজের প্রশংসা করছি। দেশের মধ্যে কতিপয় দুষ্ট লোক অশান্তি সৃষ্টি করছে। পরম ঈশ্বর আমাদেরকে এদেশে পাঠিয়েছেন তোমাদের মঙ্গলের জন্য। তোমাদের সভা করার দায়িত্ব ঈশ্বর আমাদের উপর অর্পণ করেছেন। এটাই হলো ঈশ্বরের ইচ্ছা। এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদী দুষ্টলোকেরা গোলমাল ও হঠকারি কার্যকলাপ সৃষ্টি করেছে। ওইসব গোলমালকারিদের প্রলোভনে কিংবা তাদের খপ্পরে যারা পড়েছে, তাদের নির্ঘাত মৃত্যু। তোমরা তাদেরকে ধরিয়ে দাও, তোমাদেরকে সরকার পুরস্কৃত করবেন। ভালো কাজের জন্য রয়েছে ভালো পুরস্কার। তোমাদের মধ্যেই রয়েছে সেইসব পাপীষ্ঠরা। ওদের থেকে তোমরা তাদেরকে ধরিয়ে দাও, তোমাদেরকে সরকার পুরস্কৃত করবেন। ভালো কাজের জন্য রয়েছে ভালো পুরস্কার। তোমাদের মধ্যেই রয়েছে সেইসব পাপীষ্ঠরা। ওদের থেকে তোমরা সাবধানে থাকবে। রাজা বরদাকান্ত যে কারণে কর দিতে বলেছেন, এই কারণের মধ্যে রয়েছে যর্থাথতা। তোমাদেরকেই ওরা ক্ষতি করছে। তোমাদেরকেই এই ক্ষতিপূরণের মাসুল দিতে হবে। আমরা যে কোনো উপায়ে হোক, ওদেরকে পরাজিত করবই। এবং প্রকাশ্যেই গাছের ডালে ঝুলাবো। ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যারা গিয়েছে, অবশ্যই তারা ধ্বংস হবে। পরম করুণাময় ঈশ্বর আমাদের পক্ষে আছেন। জয় বৃটিশ রাজের জয়- জয় ইংলিশ ক্রাউনের জয়। জয় কোম্পানি সরকার বাহাদুরের জয়।

মি. রায়কেশ সাহেব তার ভাষণ স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ করলেন। সভাস্থলে জয়ধ্বনি উঠলো। হিপহিপ হুররে। হিপহিপ হুররে। হিপহিপ হুররে। জয় বৃটিশ রাজের জয়। মি. রায়কেশকে রাজপ্রহরীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মঞ্চ থেকে সুশৃঙ্খলভাবে বাইরে নিয়ে গেল। রাজা বরদাকান্ত রায় ও সাহেবের সঙ্গে মঞ্চের বাইরে চলে গেলেন। সভাস্থল থেকে সারি বেধে ম-লরা বেরিয়ে এসে রাজার প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠলো। তুবন সাহেব বিভিন্ন পরগনা থেকে আগত ম-লদের বেশভূষা ও চলনভঙ্গি দেখে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বিচিত্র মানুষ। বিচিত্র রকমের বেশভূষা।

আগে চাঁচড়ার রাজার অধীনে ছিল বিশাল একটা অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলোকে বলা হয় পরগনা। প্রায় ৭টি পরগনার মালিক ছিলেন চাঁচড়ার রাজা। ৭টি পরগনার নাম ছিল : (১) রামচন্দ্রপুর, (২) হাসেনপুর, (৩) রংদিয়া এবং রহিমদিয়া, (৪) চিংগুটিয়া, (৫) ইউসুফপুর, (৬) মালয়, সোবনা, সোবনাল, (৭) সাহস।

এ‘ছাড়াও বেশ কয়েকটি ছোট ছোট পরগনা তিনি তার অধীনে এনেছিলেন। এই পরগনার নাম হলো যথাক্রমে— টাল্লা, পালুস, ডাটলা এবং কলকাতা। বর্তমানকালে রাজার জৌলুস সাবেক আমলের মত নেই। অনেক পরগনা এখন হাতছাড়া হয়ে গেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের কাছ থেকে কলকাতার অতি নিকটে বেশ কিছু জমি অনুদান হিসেবে লাভ করে। এই জমিগুলো ছিল হুগলির সালাহউদ্দিন নামক একজন ব্যক্তির মালিকানায়। তিনি পরবর্তীকালে জানতে পারেন যে চাঁচড়ার জমিদারের ৪ আনা সম্পত্তির বর্তমান কোনো উত্তরাধিকারী নেই। তাই তিনি তার পূর্বের জমির ক্ষতিপূরণ হিসাবে এই ৪ আনা সম্পত্তি দাবি করে মালিকানা স্বত্ব গ্রহণ করেন। এই ৪ আনা স্বত্বের অধিকাংশ জমি ছিল সৈয়দপুর পরগনার অন্তর্গত। উক্ত সম্পত্তি ১৭৫৬ সাল থেকে ১৭৫৮ সাল পর্যন্ত ছিল সম্পূর্ণ মালিকবিহীন। এই অংশটুকু বাদে বাদবাকি অংশ চাঁচড়ার জমিদারের আওতাধীন। সৈয়দপুর পরগনার মধ্যে রয়েছে এখনো চাঁচড়ার রাজার ১২ আনা অংশ। এই পরগনাটি গঠিত হয়েছে সাহাশপুর ও সৈয়দপুর পরগনার সমন্বয়ে। তাই এর নাম এখন সাহাশপুর পরগনা নয়— সৈয়দপুর পরগনা। দলিল দস্তাবেজে সৈয়দপুর পরগনা বলে লেখা আছে। রাজার আর একটি বড় জমিদারির নাম ইউসুফপুর পরগনা। এই পরগনার বিস্তৃতি ভৈরব নদ থেকে ইছামতি নদী পর্যন্ত। কলকাতা থেকে যশোর পর্যন্ত যে জনপথটি ‘যশোর সড়ক’ নামে পরিচিত, এই সড়কের উত্তরপাশের ঢাকা সড়ক পর্যন্ত ছিল তার জমিদারির এলাকা। এই পরগনার নাম ইউসুফপুর পরগনা। তুবন সাহেব সৈয়দপুর পরগনার অধীন রাজার একজন প্রজা। বংশানুক্রমে প্রজা। শুধু প্রজা নন, একজন বিশিষ্ট ম-লও বটে। তার মত হাজার হাজার ম-ল রাজার ডাকে এই সভায় এসে উপস্থিত হয়েছে। কেউ এসেছে চুগাচাপকান পরে, মাথায় পাগড়ি, কেউ এসেছেন ধুতি আর আলখেল্লা পরে, মস্তক মু-ন, কেউ এসেছেন পরনে ধুতি, গায়ে ফতুয়া। কেউ এসেছেন পাজামা আসকান পরে। কাঁধে পশমি চাদর। সকলেরই চেহারায় একটা মার্জিত গাম্ভীর্য। বিচিত্র কিসিমের মানুষের সমাগম। সারা মাঠ জুড়ে মানুষ আর মানুষ। এত মানুষ এর আগে কখনো চোখে পড়েনি তুবন সাহেবের। কে কোন পরগনা থেকে এসেছে, তা তার জানা নেই। সকলেই রাজার প্রশংসায় মুখর।

অনেকেই কোম্পানি শাসনের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানাচ্ছে। আর একদল হ্যাঁ, হ্যাঁ, শব্দ করে ঘাড় নেড়ে সেপাইদের গোষ্ঠী উদ্ধার করছে। এংরেজের শাসনই হচ্ছে উত্তম শাসন। আমরা এংরেজের শাসন ছাড়া অন্য কারো শাসন মানি না— মানব না। আমাদের রাজা যেদিকে— আমরাও সেদিকে। জয় এংরেজ কোম্পানির জয়, জয় রাজা বাহাদুরের জয়।

যারা যেদিক থেকে এসেছিল, তারা সেদিকেই হেঁটে যেতে লাগলো। কেউ যাচ্ছে ভৈরবের দিকে, কেউ যাচ্ছে মুক্তোশ্বরীর দিকে। নদীর কূলে তাদের জন্যে বড় বড় বজরা নোঙর করা আছে। যারা স্থলপথে এসেছিল, তারা সব ঘোড়ায় চড়ে যাত্রা শুরু করলো। তুবন সাহেব চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। চারদিকে জনস্রোত। মানুষ যাচ্ছে আর যাচ্ছে। বিশাল একটা কা-। রাজবাড়ি পেছনে পড়ে রইল। সভাস্থল শূন্য হয়ে গেল। তুবন সাহেব হাঁটতে হাঁটতে একটা গাছের তলায় এসে দাঁড়ালেন। তার ঘোড়ার সহিস তার ঘোড়াটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার জন্যেই দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে সে। শীতের সূর্য মাথার ওপরে। রৌদ্রে তেজ নেই। বাতাসে হীমেল ¯্রােত। শরীর কাঁপিয়ে বাতাস ছুটে যাচ্ছে। তুবন সাহেব ঘোড়াটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। ঘোড়াটি মাথা নাড়াতে লাগলো। সহিস ঘোড়াটির পীঠে সওয়ার হয়ে বসলো। তার পেছনে বসলেন তুবন সাহেব। ঘোড়াটির মুখের লাগাম ধরে টান দিতেই ঘোড়াটি দৌঁড়াতে শুরু করলো। চাদরে শরীর আর মুখ ঢেকে নিশ্চুপ বসে রইলেন তুবন সাহেব। শীতের বাতাসের ভেতর দিয়ে ঘোড়াটি দ্রুতবেগে ছুটে যেতে লাগলো।

****************************

শেষ পাতার আহ্বান

 

জীবন রঙিন বসন্তেরই ইতিহাসে …

স্বপ্ন আর বসন্তের যোগ অবিচ্ছিন্ন। বসন্ত রঙ্গীন, স্বপ্নীল, চিরতারুণ্যেরও। অস্তরাগের আলোর মতো স্বপ্নসাধ্যময়। কোনো বয়সে এসব বাঁধা যায় না। চলেও না। কারণ, জীবনের উপভোগ তো নির্ধারিত বয়সের সীমায় কখনো আটকায় না! লেখকরা যৌবনের প্রলুব্ধতা তৈরি করেন। স্বপ্নকে বোনেন। নির্ধারিত তারে ছন্দ দিয়ে জীবনকে সাজানোর বরণ ডালা রোপণ করেন– প্রত্যেককের জন্য, প্রতিটি মানুষের জন্য। এই সত্যটুকু নিশ্চয়ই কোনো তারুণ্যের এবং যৌবনেরও। স্মৃতি, স্বপ্ন আর ন্যায়সত্য দিয়ে গাঁথা হয় মুদ্রা-শব্দ। তাই তো সে চলে শব্দ নিয়ে বহুদূর, সকলকে নিয়ে। আর প্রত্যেককের জীবনের মধ্যেই আছে এসব উল্লাসের আখর! লেখক প্রত্যেককের জীবনকে নিয়েই এমনসবের ঘোষণা দেন। তাই এমন এক পৃথক ঘোষণা এখানে তৈরি হোক…

****************************

 

দীপ্ত উদাস
………………..
তখনো ডোবেনি চাঁদ

‘গাজাঘাট’-এ নৌকো এসে ভেড়ে। ময়ূরপক্ষী, সাম্পান, ছইতোলা, পালতোলা, মাছধরা, ডিঙ্গা, খোলতরী আরো কতো কতো। নৌকো আসে মাঝিহীন। যেন নৌকোরা আগে থেকেই তাদের গন্তব্য জানে। ভেসে ভেসে তাই চলে এসেছে একা-নির্জনে। পানি পাড়ে আঁছড়ে পড়ে কিংবা আমাদের মনে। মনপাড়ে পানি আঁছড়ে পড়লে আমাদের মন পুলকিত হয়Ñ তখন কেনো যেনো আমরা উল্লাস করি-সকলে মিলে। কেউ লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে, হাঁটুপানি মাড়িয়ে, কোমরপানি ভিজে নৌকোয় উঠি। আর ওদিকে চাঁদআলোগাছপাতা আলপনার পরশ বুলিয়ে দেয়Ñ আমাদের নৌকোয়, জলে-মাথাতে। গগনশিরিস, কড়ইয়ের ছিটঝির পাতার উপর চাঁদের আলো পড়ে, বিপরীতে তারই আন্ধার পড়ে মাটিতে, জলে, আমাদের মাথায়, বাতাসের গায়ে।  যারা এই আলো-আন্ধার নিয়ে ঘোরে মাথায়, বুকে, পীঠে তারা নিজেদের ‘ক্লাসিক’ ভাবতে থাকে। তখনো সবাই নৌকোয় উঠতে পারেনি এমন সময় কোথা থেকে কে যেনো এনাউন্স করে এক মোহনীয় সুরেÑ ‘গাজার নৌকা পাহাড়তলী যায়…’। সকলে একমুহূর্তের জন্য ফ্রিজ হয়ে যায়। ঐ একমুহূর্তে তারা অনেককিছু ভাবে। যারা নতুন পাহাড়তলীর যাত্রী তারা যেমন ভাবে তেমনি যারা পুরাতন তারাও একই কথা ভাবে। ‘পাহাড়তলী কোথায়?’ কিন্তু ‘উত্তর নাহি মেলে’। তারা উত্তর পাবার অপেক্ষাও করে না। তারা সকলেই ভাবে কোনোদিন যাই নাই আজ যাবো। কোনোদিন দেখা হয় নাই আজ দেখবো। জানবো, চোখ জুড়াবো, শরীর জুড়াবোÑ ভাবতে ভাবতে আরো অনেক ভাবনা এসে শপাং শপাং করে কল্পনার রাজ্যে বেতবাড়ি মারলে দরজা খুইলা যায়। তখন, একমুহূর্ত সবাই সবার দূরে চলে যায়। শরীর সবার কাছে থাকে কিন্তু মনগুলো একেকটা রাজ্যের অধিপতি হয়ে ঘুরে বেড়ায় নিজ নিজ রাজ্যে। হঠাৎ কল্পনায় ছেদ ঘটে একটা আহ্বানে। সবার মাঝ থেকে একজন মাঝির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আন্ধারে তাকে চেনা যায় না, সে পরিচয়ও দেয় না, কেবল তার কণ্ঠস্বর শোনা যায়। দরাজ কণ্ঠে সে একবার বইলা ওঠে, ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দেয়…’ বাকি সবার সম্বিত ফেরে। কল্পনার রাজ্য থেকে ‘গাজাঘাটে’ নিজেকে আবিষ্কার করে। তখন মুখ চাওয়া-চাওয়ি কইরা সকলেই বুঝতে পারে যে, তাদের ‘উল্লাসের’ সময় উপস্থিত। যে ভাবে পারে তারা ‘উল্লাস’ করে। একসাথে এককণ্ঠে তারা গায়, ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে, ছলছলাইয়া চলুক রে নাও মাঝ দইরা দিয়া…।’ যে যার মতো হাত, পাকো দিয়া বৈঠা বানিয়ে ফেলে। হাতবৈঠা কিংবা পা বৈঠা দিয়ে নৌকোকে মাঝ দইরার দিকে নিয়া যায়। হঠাৎ করে তারা একে অপরের প্রতিযোগী হইয়া ওঠে। উল্লাসের প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। কেন এই প্রতিযোগিতা তারা করে তাদের মধ্যেকার কেউই তা জানে না।  শুধু জানে যারা যতো মাঝদইরায় যেতে পারবে মাঝ-দইরা ততো বেশি সৌন্দর্য নিয়ে তাদের সামনে ধরা দেবে। ওরা কেউ কোনোদিন মাঝ-দইরা দেখে নাই। ‘গাজাঘাট’ থেকে তারা প্রত্যেকবার এমন কইরাই রওনা দেয়, দইরা ঘোরে, মাঝ-দইরার কেউ কেউ দেখা যায়। যারা মাঝ দইরার দেখা পায় তারা আর ফেরে না। তার মাঝ-দইরা দেখার গল্প শোনে পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা। মাঝ-দইরায় না গেলেও ‘পাহাড়তলী’ তারা সকলেই চেনে, গেছে, বা যায় অথবা যাবে। ‘পাহাড়তলী’ যাওয়া যায়। ‘মাঝ-দইরায়’ সকলে যেতে পারে না। তবে উল্লাস থেমে থাকে না। সবাই কেমন বাইচ-নৌকোর মাঝি হয়ে ওঠে। মনের আনন্দে, উল্লাসে, হাত-পা চালায়। নৌকো চালায়। হাসিমুখগুলান চাওয়া চাওয়ি কইরা নৌকো বাইচ করে। কারো সাথেই কারুর বাহাস হয় না। কেউ কাউরে আগে থেকে চেনে না, জানে না তারপরও এক আকাশ, বাতাস, চাঁদ, সুরুজ, গাছরে সাক্ষী রাইখা তারা বাইচের মাঝি হয়। নৌকো বাইতে বাইতে উল্লসিত হয়।

তখনো রাতের আন্ধার শরীরে চাঁদ আলপনা আঁকতে শুরু করেনি, চাঁদের আলো ফোটেনি। সকলে আঁন্ধার সাঁতরে কিংবা হাতরাতে এসে ঘাটপাড়ে উপস্থিত হয়। চোখগুলো পরিচিত চোখ খোঁজে। হাওয়া বইতে শুরু করেনি তখনোও। গাছের পাতারা অপেক্ষা করে হাওয়ার। গাজাঘাট। এক বিখ্যাত শব্দবন্ধন। শব্দবন্ধনের কারণেই বা মোহ কিংবা অজানা কারণেই ‘ঘাট’ সবার মাঝে এক মোহনীয় স্থানে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে চাঁদ মুখ তোলে। আধধূসর সাদা মুখ। দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানী বয়সের ন্যুব্জতা, ঠোঁটের ফাঁকে বাঁকা হাসি নিয়ে আকাশ জুড়ে আলোর রূপোলি পসরা নিয়ে উদিত হয়। হাওয়ার মন উদ্বেলিত হয়, খলখল করে ওঠে। হাওয়ার খলখলানি গাছের পাতা থেকে শুরু করে মায়া হরিণ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পাতাগুলো একেকটা তুলি হয়ে যায়। আলপনা আঁকার তুলি। মাটির শরীরে আলতো করে ছায়াপরশ বুলাতে থাকে। চাঁদ ওঠে-আলো ফোটে-বাতাস বয়-পাতা নড়ে-মাটি, নদীর পানিতে আমাদের মনের নকশা আঁকা হতে থাকে।

‘উল্লাসের’ ক্লান্তি আসে না, মানুষ ক্লান্ত হয়। তখন বাইচাররা জিরিয়ে নেয়। নিজেরা অপরের উদর-উরুতে মাথা রেখে, হেলান দিয়া ক্লান্তি দূর করতে থাকে। তখন আবার ‘উল্লাস’ ভর করতে থাকে কণ্ঠে। ‘গাজাঘাট’ থেকে ওঠা প্যাসেঞ্জাররা কণ্ঠে কণ্ঠ মেলায় আবার ‘পুবের আকাশ রাঙা হলো সাথি-ঘু-মা-ই-য়ো-না আর জাগো রে…’ কোরাসের সুর খানিকটা দূর যাইতে যাইতে সারা সাগরে ছড়াইয়া যায়। এমন সময় অদ্ভূত আলামতের মতোন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা টের পায় সবাই। দ্যাখে দাবাঘর প্রিন্টওয়ালা গামছা মাথায়-মুখে বান্ধা কিছু মানুষ চকচকা নৌকো নিয়ে তাদের, আমাদের সবার নৌকো-ডিঙ্গার কাছাকাছি ভেড়ে। তেলচিটচিটা নৌকো থেকে তাদের সোনারাঙা নৌকোয় ওঠার ফরমান দেয়। তারা, আমরা সবাই বিভ্রান্তের মতো পথ হারানো কৃষকের মতো দিশা হারিয়ে ফেলি। আমরা আবিষ্কার করি আমাদের হাত-পা-মাথা থাইকা শক্তি হারায়া যায়। নিজের শরীর আর নিজের থাকে না, অন্যের ভর চায়, হেলান দেবার খুঁটি খোঁজে। তখন কই থাইকা কি হয়া যায়, কেমনে হয় আমরা কেউই তা বুঝতে পারার আগে আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয় সচল হয়ে মস্তিষ্ক পর্যন্ত একটাই বাক্য সুরাকায়ে পৌঁছে দেয়Ñ ‘শোনো তালিবান তালিবান আমি তোমাদের দলে নেই, আমি ধর্মে মুসলমান আছি লালনের সঙ্গেই…।’

সূর্যের আলোর নরম বুলনিতে সবাই একে একে সজাগ হতে থাকে। কেউ পরে কেউ আগে। কিন্তু সবার অবস্থার সাথে সবার প্রায়ই মিলে যায়। সবার মাঝে অবাক হবার প্রবণতা আমাদের এক সন্ধিৎসু মনের জানালা খুলে দেয় আমরা আর যাই ঘন না কেন, সবাইকেই অবাক হতে দেখে আমি, আমরা সকলে অবাক হই। দেখি, আমরা আমাদের যে স্থানে শেষবার দেখেছিÑ সেই মাঝ দইরায় কিংবা ‘পাহাড়তলির কাছাকাছি কোন এক জায়গায় যেখানে আমরা উল্লাস করেছি, অনুরোধ কিংবা অনৈতিক আদেশ তুচ্ছ করেও উল্লসিত হয়েছি যখন কেবল আমরা আমরাই ছিলাম, ভয়হীন, আবেগহীন, স্বপ্নালু নাবিক সেনা, আমরা সেখানে নেই। আমরা কত বছর বা যুগ আগে আমরা দিনরাত গণনা করে বের করার মতে পরিস্থিতি আমাদের মস্তিষ্ককে সায় দেবে না কিন্তু আমাদের মাথার চুল, শরীর চামড়ায় লেগে থাকে তার ছাপ। কালো চুলে সাদা রঙের উঁকিঝুঁকি, চামড়ার নি¤œগমন আরো বড় বিষয় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা বালু আর ‘সাদা সিদে’ একজোড়া করে পা আমাদের বিচলিত করে। আমরা এতোসব ভাবার আগেই কিংবা আমাদের আরো কিছু, অনেক কিছু ভাবা উচিৎ ভেবে যখন আমরা মনে করি যে আমাদের ‘গাজাঘাট’ ‘পাহাড়তলীর’ রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য আরো কিছু ডকুমেন্ট নিয়া ভাবা দরকার তার আগেই মেয়েলি কোরাস আমাদের বাধ্য করে। আমরা বালুতে থুবড়ানো মাথা তুলতে বাধ্য হই। মুখ তোলার আগেই আমাদের নিয়ে কোরাসীয় অভিযোগ আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায়। আমরা ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি, তুমি, তুমি, তুমি মিলে তোমরা সদলবলে… আমি কখনো যাইনি জলে… অনেক অজানা কথা কথা বলেছিলে… যদি ভালোবাসা নাই থাকে… শুনে আমাদের চোখ যা দেখে তাতে আমাদের মনের সন্দেহ দূর হয়। আমরা সন্দেহের প্রতিফলিত রূপ দেখতে পাই। আমরা একে অপরকেও দেখি। বালুমুখ একেকজনকে অপরিচিতের মতো লাগে। কেবল চোখ ছাড়া। চোখগুলোতে ঠিক আগের মতোই বিশ্বাস থাকে, হাহাকার থাকে, স্বপ্ন থাকে, উচ্ছলতা গড়িয়ে নোনতা স্বাদের পানি থাকে কেবল থাকে না বাইপাস পথ। তখন আমরা কিছুই আড়াল করতে পারি না। তখন আমরা সমাপনী সংগীত গেয়ে মনের উল্লাসের খোরার সেটাই এখন কোনো গল্প নাই, গল্পে কোনো কথা নাই, দিনমানে সূর্য নাই, রাত্রিরেতে চন্দ্র নাই।’

****************************

নূর নিহাল
………………..
শব্দবিলে ছায়াহাসি…

জীবন স্বপ্নসুখ বসন্তের নাম। আলোছায়া অন্ধকারে জোনাকির উড়াল। কখনও কুয়াশায় ফোঁটা ফোঁটা শিশিরে সেলাই দুঃখের বুননে ধৈর্যের অনড় অঙ্ক কষে শেষবেলায় নকশী হাসি— এ যেন চূড়ামণি সুখ। অপেক্ষার তুড়ি তোলে আঙুলের ডগায় ছুটে চলা স্বপ্নের পিছু আকাশ সম চিত্তের দোলনে অহর্নিশ দূর বহুদূর…। মাঝদুপুরে থমকে যাওয়া কিছুবেলা গন্তব্য ভুলে দাঁড়ানো জটিল সমাজ সময় পরিসংখ্যান ঘাটে। হতাশার চোখ জ্বলে জল পড়ে, এলোপাথাড়ি ঝড়গতি বয়ে যায় স্বপ্ন স্বদেশে, থামার নয় তবুও থামতে হয় কিছুবেলা, পুনরায় হেঁটে চলি গন্তব্য নিরুদ্দেশে যদি পাই কোন হারিকেনওয়ালা পথের শেষে!

ফুল ভালোবাসি, মানুষও; ভলোবাসি না শুধু সমাজের অসুখ। দীর্ঘকাল বেয়ে ওঠা মাটিস্বপ্ন ঘাসের সবুজ চোখ ভালোবাসি। মাঝে মাঝে মনে হয় ঘাস হয়ে বাঁচি, মাটিতে লুটাই সবুজ জোছনায়; দমবন্ধ সমাজ হতে পালাই পাখিদের চোখে নিই আশ্রয়। চারপাশ এতো ঘৃণিত লজ্জার বাহুতে পৃথিবী আঁকা, মুখোশ আবৃত জনে জনে কথারা উড়ছে কেবল নাটাইহীন ঘুড়ির মতো, আকাশও থু থু দেয় মানুষের লোভে! মনে হয় পোশাকের প্রয়োজনে হয়ে গেছি অরণ্যচারী। আদিম উদ্যম সমাজ এই, পালাতে গিয়েও ফিরে আসি বারবার, ফিরতে হয় অসুখ নির্মূল চিরদিনের স্বপ্ন পাঠশালায় মানুষ হবার দায়।

কুসংস্কার করিডোরে হাওয়ায় আওয়াজ পাই— নষ্ট শহরে কুকুর আর মানুষের চেহারা আলাদা দেখি না, পার্থক্য খুঁজে পাই না জল— মূত্রের! বড়ই অভাগা অকালে জন্ম হয়ত— বৃথা জনম আমার। বাড়ন্ত কলমের বয়স মাঝে মাঝে থমকে যায় অচল খাতার বুকে। শব্দতে নিরবধি বুনে যাই পা-ুলিপির স্বপ্ন, দুএকটা শব্দ বেঁচে থাকবে বলে হেঁটে চলি ক্লান্তিহীন… আগাছার আগুনে পুড়ে ভস্মতায় খোঁজে লাবণ্য সুদিন— এ যেন জীবনময় বৃক্ষের গোড়ায় অকারণে খোঁজে মরা ছায়ারহস্য। অসৎ আকাশের চেয়ে সৎ বৃষ্টিকণা হয়ে বাঁচতে শিখি প্রতিদিন, ঘুমের দুয়ার খোলে প্রথমে দেখি সূর্যের চালাকি— আলোর নিষ্পাপ মুখ, ঈর্ষা হয় কেনো আলোজন্ম হলো না আমার! ভাবি মানবের মনে আলোরোপন খুব প্রয়োজন— লাগাতে হবে আলোর গাছ চারদিকে মানুষের মন মন্দিরে, তবেই না আলোজন্ম হবে আমার, একদিন এই আলো পৌঁছুবে আমি হতে আমরায়।

বই পাঠে মনযোগ বেশ, পৃথিবী পাঠে মনযোগ নেই আমাদের— নেই মানুষ পাঠেও। আমরা কেবল উড়ছি প্রতিযোগিতার নির্জীব শহরে, যেখানে পা-িত্য জাহিরই বড়; জ্ঞান আমাদের হোচটের বস্তু হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের গিলে খাচ্ছে প্রতিযোগিতার আকাশ, গিলে খাচ্ছে আমাদের সৃষ্ট স্বভাব। গ্রন্থগত বিদ্যায় আমরা বেশ পারদর্শী অথচ চারপাশ আমাদের শিখতে বলে— কানবন্ধ সৌজন্য ভাবের কালা হয়ে আমরা কেবল উড়ছি গিলছি বিগত বুলি নতুন মোড়কে পুরাতন কিছুতে! কার চেয়ে কে এগিয়ে জ্ঞানের ঘুঙরে, কে পারে ক’টি মুখস্থ বুলি— ওসব প্রতিযোগিতায় মত্ত আমরা দিনরাত্রি। ওদিকে পার হয়ে যাচ্ছে ছুটন্ত ঘোড়ার বয়স, গুটিয়ে নিচ্ছে পৃথিবী তার মায়াবাস্তবতা চিরসৌন্দর্যের আখর অরণ্যলতার পাহাড়ি মায়া সভ্যতার তৃষ্ণা। সীমাবদ্ধতায় আটকা পড়ছে আমাদের চোখ— হচ্ছে না সার্বজনীন, যেন পরে আছি চোখে অদ্ভুত সানগ্লাস। কোথায় যেন আমরা সীমাবদ্ধ, দলিলে মুখ ফোটছে না— বিগত চেহারায় আমরা মুখোশি নায়ক বারবার। কোথায় যাচ্ছি আমরা!

আমরা যাচ্ছি— উদাম সময়ে, যেখানে মুখোশের ছড়াছড়ি নীরবতার নামে হয় নষ্টদের পূজা, গুরু-শিষ্যের তুচ্ছতায়, ব্যাকরণ ভুলে পঁচা নর্দমায়। উদার পরিচয়ে স্বার্থের কাক হয়ে উঠছি, পৌঁছুতে পারছিনা আমি হতে আমরায়; পেয়ে বসেছে আমাদের ‘আমি’ নামের অহং অগ্নি— পুড়ে পুড়ে খাক হচ্ছে মানবিক পশম। আসলে তলানিতে জ্ঞানশূন্য, ভাবের ভুবনে শুধু শ্রেষ্ঠত্বের আওয়াজ বাজে— আমরা ভাবের ডুগডুগি, তুমুল বেজেই যাচ্ছি…বেজেই যাচ্ছি…।

লেখক হওয়ার আগে মানুষ হওয়া জরুরি। যদিও মানুষ হওয়া যায় না, মানুষ হয়ে ওঠার বিষয়— দীর্ঘ বাস্তবতার সিঁড়ি অতিক্রমে অভিজ্ঞতার ঝাঁজ একদিন বলে উঠবে আপনি পৃথিবীর সার্বজনীন স্বজন। স্ব-সৃষ্টিতে আমরা যথেষ্ট সৎ ও সততার বাক্য আঁকছি অবিরাম কিন্তু বাস্তবে আমাদের রূপরেখা অন্যকথা বলে— আমরা বহুরুপী ভ-, হৃদয়ের সত্যটুকু উজাড় উদার কাগজে পারছিনা লিখতে; শুধু নিজের কাল্পনিক চরিত্রেই সাঁতরে মরছি যে যার মতো করে। কলমকে পরিয়ে দিচ্ছি আশ্চর্য পোশাক অথচ প্রকৃত ¯্রষ্টার কর্ম কলমকে উলঙ্গ করে সত্যকে আলো দেখানো সমাজ সময়ে কালেভাদ্রে। লেখক হওয়া সহজ, ¯্রষ্টা হয়ে উঠতে পারে ক’জন! এখানেই মানুষপাঠ অতিজরুরি। আগাম সীমাহীন পথরেখা আঁকতে পারে যে চোখ তাকেই বলি দূরদর্শী শিল্পের ¯্রষ্টামুখ; যেখানে দেখার চোখ তৈরি হওয়া জরুরি তেমনি বৃষ্টিকে  বিশেষ জল না বলে বৃষ্টি বলার সাহসও অর্জন জরুরি । যারা ইতিমধ্যে কালকে গন্তব্য বানিয়েছেন তাদের জন্য বলি কচ্ছপদমে হাঁটুন লিখতে লিখতে শিখুন, শিখতে শিখতে শান দেন মনন-মস্তিষ্ক, তৈরি করুন দূরদর্শী চোখ, স্ব-সৃষ্টিতে বিভোর না হয়ে পৃথিবীপাঠে বিমুগ্ধ হোন জ্বালিয়ে রাখুন চিন্তার বাতি, কথা হোক স্ফূলিঙ্গ! সৃষ্টি হোক শুদ্ধতায় পরিশুদ্ধ কারুময় সত্যের শব্দবিল।

লেখক মাত্রই শব্দের গায়েন নন, শব্দবাক্যের নেপথ্য কালের পাখি, জীবন ফেরিওয়ালা একসময় নির্বাক বৃক্ষ ছায়ারহস্য; অমৃত বেদনা ধরে— ঝরে ঝরে যায় ভাঙ্গারোদে নিজের ছায়ায়, সময়ের সাক্ষী মরীচিকা নন— জীবন্ত দলিল প্রাণবন্ত জোছনা কালান্তরের আশ্চর্য। অবিরাম গেয়ে চলেন মানুষের গান মানবতার দায়— খুলে দেখতে চান মাটির ভিতর পিঁপড়ার দুঃখ ঘাসফুল হাসি, প্রকৃতিতে পাতেন সংসার পাখিবন্ধু কলরবে ভাষা ব্যাকরণে এককালে হয়ে ওঠেন বনলতা; সমাজ মানচিত্রের দুঃখবোধ হয় পাঠশালা— লেখক হয়ে ওঠেন আলো, নেভে না   কোনোকালে।

নদীজল বয়ে যায় নিরন্তর— নেই তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ক্লান্তিহীন কোন পিপাসায় মাঠে ঘাটে অরণ্যবিলে ছুটে চলা! কোন স্বপ্নের পিছু হাটে মাঠের পিঠে! জানি নেই তার কোন কানাকড়ি গন্তব্যও স্বপ্ন, তবু বিলায়ে যায় প্রাণের পিপাসা— ঘাটে ঘাটে ফেরি করে মানবতা, কি এক উদারতায় তৃষ্ণা মিটায়ে চলে বন-বাদাড়ে খালে বিলে হাওয়ার টানে অস্তিত্ব দেয় সপে! সতেজ সত্য সুন্দরের মতো এককালে ঘুমায়ে পড়ে মাটির বুকে, মাটির শুষ্কদানা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় জলের যৌবন; ঠিক তাই একজন সৃষ্টিশীল ¯্রষ্টা জলের ন্যায় জলসুন্দর, আয়ু মাড়িয়ে ফলান সভ্যতার প্রতিষেধক— যা মানবতার অসুখের প্রয়োজনে চিরন্তন। শব্দভূক নন, লেখকের ডাকনাম সূর্য কালের রাখাল— মাটি ও পৃথিবীর আমৃত্যু সঙ্গী যে ¯্রষ্টা।

অগ্রজ অনুজের প্রশ্নে ¯্রষ্টা কখনও নবীন প্রবীন নন, চিরন্তন তরুণ; সৃষ্টিতে ভাবের ভুবনে কথার কারিগরি শিল্প ক্যানভাসে তারুণ্যতা ধরে রাখার যোগ্যতা অর্জন ও নূতনত্বের সন্ধানই ¯্রষ্টাজনের মূল তপস্যা। অর্জনের বয়স শেষ হবার নয়— পুরনোও হয় না কখনো; শিখবার মানসিকতা হয়ে ওঠা বা তৈরি করার ব্যাপার এখানে। কালের দোরগোড়ায় কোনকিছুই গুরুত্বহীন নয়— আজকের নবীন আগামীর কালের সূর্য আমাদের গবেষণার জাদুঘর। ভাবে তারুণ্যতার পাশাপাশি সৃষ্টিতে নবীনতা কালান্তরে টিকে থাকার হিম্মত রাখে চিরদিন। প্রকৃত শিল্পজন করুণার ভিখারি নন, পৃথিবীর রহস্য সৃষ্টির প্রয়োজনে অজানা অন্বেষক— মেঘমরুভূমি ডিঙায়ে ছুটতে থাকেন অনাবিল যুগের ডানায়; কারো পূজোতে ফুল হতে আসেনি সে, করুণাতে বিকিয়ে যেতেও আসেনি নষ্টদের হাটে— এসেছে পৃথিবীর কথা বলতে, দুঃখ শুনতে সকলের, জীবনবোধের নতুনত্বে উজাড় করে বিলিয়ে দিতে নিজেকে, যার ধ্যান— সমাজ সময় মানুষের কল্যাণ; অর্থবিত্ত খ্যাতি যশ পদতলে মথিত হয় তাঁর। এই শিল্পজন স্রষ্টা সব জাতিতে সমান, মানবিকতার চূড়ামণি— কালের খতিয়ান।

জীবন স্বার্থকতার প্রবাদে সর্বাগ্রে একজন শিল্পসত্য মানুষ হয়ে ওঠা প্রয়োজন। ধ্যান-তপস্যা-সাধনার গন্তব্য যেন হয় শিল্পিত সমাজ— সভ্যতার বিকাশে, সত্য হোক আলোপিয়াসী সবসময় সবকালে প্রকৃত ¯্রষ্টাজনের কালের কলমে।

**************************************

 

সুবন্ত যায়েদ
………………..
নবায়ণ করি প্রেম

কুয়াশার মতো বৃষ্টি হচ্ছিলো। কয়েকটা বাদুড় পথ খুঁজে না পেয়ে কাছে কোথাও চিৎকার জুড়ে দিলো। রাতের ট্রেন এখনো বুঝি যায় নি। এনালগ স্টেশনে ঘণ্টা বাজলো। তখন আমার চোখ দুটো বুজে আসতেই দরজার বাইরে এসে কে দাঁড়ালো। চিঠি! চিঠি! আমার চোখজুড়ে কুয়াশার পর্দা। তার মুখ চেনা গেলো না। তাকে বললাম এখন তো চিঠি আসে না। চিঠি চিঠি বলে এখন তো কারো ডাক শোনা যায় না। কিন্তু আমার কাছে এ অবেলায় চিঠি! হঠাৎ মনে হলো এখন রাত কোথায়। অথবা কুয়াশার মতো বৃষ্টি। বাদুড়গুলো পথ পেয়ে উড়ে গেছে নাকি। ডিজিটাল স্টেশনে এখন তো আর ঘণ্টা বাজে না। তারপর আমি চোখ ধাঁধাঁনো আলোয় চিঠি মেলে ধরলাম। কিন্তু বার্তা কোথায়। সাদা কাগজে দেখি ছবি এলো। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ঝিরিঝিরি আলো আঁধারের ছবি। চোখে কিছু ধরে কিংবা ধরে না। চোখের কোটরে একটু ব্যথা করে উঠলো। দেখা গেলো ছবির প্রিন্টও একটু ভালো হলো তবু দৃশ্য ভালো বোঝা গেলো না। ক্রমেই চোখের ব্যথা বাড়তে বাড়তে তীব্র হয়ে উঠলে ছবির প্রিন্টও উন্নত হয়ে গেলো। দৃশ্য এলো। জীবিতের মতো কষ্টে চোখ মেলে রাখলাম। দেখা গেলো বড়ো এক পদ্মপুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। দেখলাম পাতা আছে কুঁড়ি নাই ফুল নাই পদ্মপুকুরে। কোনোদিকে বাতাসের কোনো পরশ নাই। আশৈশব এক পদ্মপুকুরের স্বপন ছিলো। মনের ভেতরে বীজের বেড়ে ওঠা ছিলো। সবুজ ছিলো রোদ হাওয়ার পরশ ছিলো। কিন্তু প্রধান ছিলো তার ফুল, শিশুর মতোন কুঁড়ি। সেখানে রূপরানি এসে কুড়ির ঘোমটা খুলে ছন্দে ছন্দে গান বাঁধতো। হায় পুকুরের পদ্মকুড়ি। এ যেনো স্বপনের উপরে গুড়ো গুড়ো ছাই। কিভাবে যে দুঃস্বপন স্বপনের উপরে উপগত হয়ে যায়। জীবনের উপরে মৃত্যুর মতোন। যেনো ঘোর এক ধাঁধাঁ আমার এইসব স্বপন। চলাচলে কোনো পরিণতি নাই গৌরব নাই। স্বার্থকতা বহু দূর থেকে দূর যার কোনো ঠিকানা নাই। আমি ডুবে যাচ্ছিলাম। ডুবতে ডুবতে নিঃশ্বাস কমে এলো যখন, তখন এক ভেলা ভেসে এলো। তাতে বধূর মতো ঘোমটা মাথায় কে। যেনো পদ্মপুকুরের জলপরি। বললাম সুন্দরী তোমার ঘোমটা তোলো। ভেলাখানা কূলে ভেড়াও। বলো তো এ পদ্মপুকুরের ব্যাখ্যা কি? না তুমি পদ্মপরি! বলো তো আমার স্বপনের পদ্মপুকুরে কেন কুড়ি নাই ফুল নাই। মাতাল করা দোদুল হাওয়া নাই? জলপরি না পদ্মপরি কূলে না এসেই ঘোমটা সরালো। হায় হায়। আমি আঁৎকে উঠে চোখ ঢাকলাম। কী বিভৎস কী কুৎসিত। আমার দেহ কাঁপলো পায়ের তলায় মাটি কাঁপলো। পদ্মপুকুরে জল ফুলে ওঠার শব্দ মনে হলো। তুমি ফুলখেকো কুড়িখেকো খোক্কস? কে তুমি? কে….?   সে বললো প্রেতাত্মার মতো হেসে, ছলনার মতো পরিহাস করে। আমাকে হায় ভুলে গেলে। আমি তো সে তোমার রূপরানি। কিন্তু আমার সে রূপ-হরণ হয়ে গেছে। হরণ হয়ে গেছে বসন্তপুরে। ইচ্ছের বাতাসের ঘূর্ণিতে পড়ে আমি তখনো প্রাচীন সমুদ্রতীরে দৌড়ে চলি। কোন দিকে যে চলি, পৃথিবীর পেছন পানে কিনা যেখানে আদম হাওয়ার ফসলের মাঠ এখনো জেগে ওঠে। গন্ধমের বাগানে সুশীল সাপ ছয় পায়ে চলে। কিংবা আরো অনেক দূর এগিয়ে, হারানো ইতিহাস ঐতিহ্যের কাছাকছি কোনো সময়ে। যেখানে আমাদের মা-শিশুদের জমিনে এখনো বুলবুলিতে ধান খায়। আতা গাছে তোতা ডাকে আর দুধ মাখিয়ে মা খোকারে ডাক পাড়ে। খোকা তখন উড়াল দিয়েছে কাকেরে সঙ্গী করে। কাক জানে না বসন্তপুরের ঠিকানা। কতোবার সে দেহের তাপে ছানা ফুটিয়ে তুললো। বুকের পালক ঝরালো। ছানাগুলো তবু উাড়াল দিয়েছে বসন্তপুরে। সেখানে তারা ডানার বাতাসে মন্ত্রণা ছড়ায়। উড়ে উড়ে রূপবানদের ডেকে ডেকে যায়। সম্মিলিতভাবে সেখানে তারা বসন্ত নামায়। সেখানে কুৎসিত কিছু টেকে না। কিংবা কুৎসিত কিছু জানে না বসন্তপুরের ঠিকানা। কাক এবার উড়াল দিয়েছে খোকারে সঙ্গী করে অথবা খোকা কাকেরে সঙ্গী করে। এখন এদিকে আর উৎসব হয় না। মানুষ ভুলে গেছে প্রাণের উৎসবের সুর। মানুষ এখন আসলে তার যাত্রা জানে না। তবু এতো মানুষ কোন দিকে যে ছোটে। খোকা ও কাক জানে না। আমিও কি জানি? বসন্তপুরের ঠিকানা? সেখানে তো কুৎসিত কিছু টেকে না। আমার রূপ-হরণ হয়ে গেছে। এখন আর মন্ত্র আসে না। পদ্মপুকুরেও কুড়ি হয় না ফুল ফোটে না। কিংবা আমার রূপতো ছিলো আমাদের মায়ের জোসনাভরা উঠোনে। সন্ধ্যায় ছোলাপোড়া উৎসবে, ঘ্রাণে। বাহির বাড়ির উদোম হাওয়ার ছন্দে। দেবদারু চূড়ায় হুতুমের গা র্শিশিরে আহ্বানে। সন্ধ্যায় গফুরের তালপুকুরে ধপ্ ধপ্ শব্দ। ওখানে নাকি গলাকাটা ভূত চরে। সন্ধ্যারাতে তাল পড়ে কিন্তু ভূতে খায়। অনুর দাদা স্বপন দেখে কয় রাতের তাল ভূতের আর দিনের তাল মনুষ্যের। ডানপিটে অরুণ আর বরুণ তবু পথ হাতড়ে সন্ধেবেলায় তালতলায় যায়। দুইজোড়া তাল কুড়িয়ে সোনাভানুর জোসনাভরা উঠোনে এনে কয় ভূতে বর দিয়েছে। লোকজনের চোখ উল্টায়, হায় হায়। কিন্তু  হরণ হয়ে গেছে তোমার সে রূপরানির রূপ। তাই তো আর তারে চেনো না। এ  বেলায় ভেলায় ওঠো দেখি। কোথায় সে বসন্তপুর। খোকা ও কাক উড়াল দিয়েছে।

ছবির প্রিন্ট র্ঝিঝিরে হতে থাকলো। চোখের ব্যথাও কমে আসতে লাগলো। তারপর আঁ ধা র আঁ…ধা…র…। অগণন প্রতিদ্বন্দ্বী আঁধার। চোখ দুটো খুলে গেলো। হায় স্বপন। পদ্মপুকুর। খুব নিঃসঙ্গ বোধ হতে থাকলো। রাতের অস্বচ্ছ কালো বুকে বিঁধে গেলো। কোথায় যেনো যন্ত্রণা করে উঠলো কয়েকবার। এমনি যন্ত্রণার পুরোনো স্মৃতি মনে পড়লো। বড্ড অস্বচ্ছ ধোঁয়াশা। হাতড়ে হাতড়ে দেখতে গেলে ক্ষত বাড়ে। ধোঁয়াশা কাটে না। মরণের সময়ও কি এমন মনে পড়ে! হায়, এমন মরণ কবে মরেছিলাম। মরণের আগে দূরন্ত কিশোরীর মতো। আগুনে পোড়া কীটের মতো। এমন রাত অবশ্য বিঁধে গেলো। কিংবা চিরদিনের জন্য একটি আঁধার। ভেতরের ভাগ সবটুকু কালো। উপরে ছলনার মতো নষ্ট। সেখান থেকেই কি কান্না ওঠে হঠাৎ হঠাৎ। আলালের মায়ের শোক করার মতো। দুলালের বৌয়ের শোক যাপনের মতো। কান্না ওঠে যেন সমস্ত চরাচর জুড়ে। কোথাও কোমলতা নাই ঠাঁই নাই। অন্ধকারের বিপরীতে রোদ্দুর নাই। অসম দীর্ঘপথ, পথিকের প্রাণে দম নাই। এতো ভাঙন এতো ক্ষত। কান্না। তবু হাসির রোল ওঠে দিকে দিকে। ও যেনো কান্নার বিপরীতে হাসি নয়। হাসির বিপরীতে হাসি নয়। বরং কান্নার বিপরীতে কান্না। নয়তো মানুষ কেনো হাসে এমন, বুকের তলে আগুন চেপে ধরে। ভেতরের কান্না বাইরে এসে ঠা-ঠা হাসি হয়ে বিস্ফোরণ ঘটে। মানুষ বড্ড নগ্নভাবে হাসতে শিখেছে। কিন্তু ভেতরে এতো ভাঙন কেউ মেরামত করতে শেখে নি কেনো? মানবসভ্যতা যে এতোদূর এগোলো, পৃথিবী কাছে এলো আর গ্রহ-নক্ষত্রের ঘোমটা খুলে গেলো, কিন্তু আড়াল পড়ে গেলো হৃদয়। কিন্তু এখন আমি কোন পথে চলি, স্বপন আজ আড়াল তুলে দিলো। হৃদয়ের চাপাকান্না চারদিক থেকে শোনা গেলো। কী এক চিঠি এলো বসন্তপুরের বার্তা নিয়ে। ঠিকানা বোঝা গেলো না। খোকা ও কাক নাকি উড়াল দিয়েছে। আর আমার হৃদয়েও যাত্রার ডাক এসেছে। কিন্তু কোথায় সে রূপরানি আর তার ভেলাখানা!

আমি আবার স্বপ্নের অধ্যায়ে ডুবি। যেখানে চিরজীবী সবুজ প্রাণের মতো বাঁচে। সেখানে দেখি কুয়াশার মতো মায়াময় বৃষ্টি হয়। কয়েকটা বাদুড় ফিরে এসে কাছে কোথাও চিৎকার জুড়ে দেয়। এনালগ স্টেশনে ঘণ্টা বাজে। রাতের ট্রেন যেন স্বপ্নের এপার-ওপার যাত্রা করে। তখন দরজার বাইরে চিঠির কথা বলে কে ডাক পাড়ে। তার মুখ চেনা যায়। রূপরানি। ছায়া যেমন কায়ারে সঙ্গী করে নেয় কিংবা কায়া ছায়ারে। আমিও তাকে সঙ্গী করে নিই অথবা সে আমাকে। তারপর যাত্রা করি, বসন্তপুরে।

**************************************

রেজওয়ানুল হক রোমিও
………………..
ফুরিয়ে যায় যদি আকাশের নীল

অন্ধকারে ছেয়ে আছে পুরো পৃথিবী। সভ্যতার পালাবদলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া রূপকথাগুলো এর জমকালো আয়োজনে অট্টহাসিতে মত্ত আজ। মৃত্তিকার ঘ্রাণ নিয়ে একদিন যে মানুষ বুঝেছিলো তার অনতিক্রম্য পথ শুধু সময়ের ব্যাপার, আশা-নিরাশার এই দোদুল্যমান পথে তারপর সে আর ফিরে তাকায় নি। ফিরে তাকানোর আর কোনো প্রয়োজনও পড়ে নি। স্বপ্নের ফানুস উড়িয়ে সে ছুটে চলেছে অবিরাম। মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্য করেছে জীবনের কাব্যিক সন্ধ্যাগুলোকে। পরাহত হৃদয়ের পাশে প্রিয়জনের আঁকা ছবির দিকে তাকিয়েছে কঠিন গ্লানি নিয়ে। উৎসব করেছে রাত্রির নিভে যাওয়া শেষ তারাদের সাথে যারা তার মতো একাকী, অসহায়। বুকের কফিনে জমে থাকা ময়লার আস্তরণে প্রিয়তমার হাসিমুখ অনাকাক্সিক্ষত সুর নিয়ে তাই আজ আর পিছু ডাকেনা, বলেনা আর হারিয়ে যাওয়ার উন্মত্ততা নিয়ে সেইসব অভিষিক্ত সময়ের কথা। স্বৈরতন্ত্রী জেনেও মানুষ এসবকে মেনে নেয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে, রাজতিলক পরিয়েছে নিজের স্পর্ধার শেষ বিন্দুতে গিয়ে। সুখী হওয়ার চিরায়ত মন্ত্র তাকে আশ্বস্ত করতে পারে নি। এভাবেই ছুটে চলতে চলতে একদিন মনে পড়েছে পরবর্তী প্রজন্মের কথা। যার মধ্যে দিয়ে একদিন আঁকা হবে নিজের বসন্ত রাঙানো ভবিষ্যৎ। তারপর সে চোখ মেলে তাকিয়েছে আলোর দিকে, ঘ্রাণ নিয়েছে বৃষ্টির নিবিড়তম পবিত্রতার কাছে গিয়ে। জেনেছে বেঁচে থাকার আসল সৌন্দর্য। যে সুপ্ত মনোবাঞ্ছা পূরণে কেটে গেছে তার অসংখ্য বিনিদ্র রজনী, যার আতিথ্য লাভের পরম্পরায় উদাসীনভাবে কেটে গেছে স্বর্ণালি সময়ের ডাক, সে সবের জন্য অসহায় মনে হয়েছে নিজেকে। ইচ্ছে করে সময়ের লাগাম টেনে ধরে আর একবার ফিরে যেতে। ফিরে যাওয়ার গভীর বেদনা হাতছানি দেয় তাকে। পিছনে ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে একরাশ হতাশার ছাপ যখন তার শূন্যতাকে উসকে দেয়, ঠিক তখন জীবনের এই গোলর্ধে এসে তার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা তাকে বুঝিয়েছে, মানুষ কতটা একা তার নিজের ছায়ার কাছে! নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করার ভাষা তার জানা থাকে না তখন।

বয়ে চলা সময়ের মাঝেই মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে চলেছে প্রতিনিয়ত। কখনো হয়েছে প্রেমিক, কখনওবা বিপ্লবী। এই পথেই রচিত হয়েছে গল্প, কবিতা আর উপন্যাসের প্লট। মানুষ থেকে বিশ্বমানব হয়ে ওঠার পথেই কখনো কখনো সে মুখোমুখি হয় আয়নার সামনে। নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সে। ভাষা হারিয়ে ফেলার মাঝে এক ধরনের সৌন্দর্য আছে। আমরা অস্বীকার করি তাকে দায় এড়ানোর ছলে। প্রথাগত চিন্তার বাইরে নিজেকে নিয়ে ভাবার সুযোগ আমাদের ক’জনেরই বা হয়। নিছক খ্যাতির বিড়ম্বনার কাছেই পরাজিত হই আমরা সকলে। নিজেকে মোহগ্রস্ত করে রাখতে খুব বেশি ভালোবাসি বলেই নিজেদের অতিক্রম করতে পারি না আমরা। আর তাই আমাদের মাঝে এতো বিভেদ। পারমাণবিক নেশা ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের শরীরের প্রতিটি নিউরনে। বিশ্বযুদ্ধও থামাতে পারেনি আমাদের গগনচুম্বী প্রত্যাশাকে। প্রকৃতির বিশাল উদারতাকে মানুষ ঠেলে নিয়ে গেছে অনিবার্য ধ্বংসের দিকে। অথচ এসবের মাঝেই রচিত হওয়ার কথা ছিলো একদিন বসন্তের গল্প! কি নেই এই পৃথিবীতে? এই বিশ্বব্রহ্মা-ের আলো ছায়ার পথে রচিত হওয়ার জন্য রয়েছে অনাবিল সৌন্দর্য। চারদিকে রহস্যাবৃত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপাদানগুলোও বেঁচে থাকার তৃষ্ণা জাগাতে পারে। সুনীল আকাশের বুকে বিস্ময় জাগানিয়া সৃষ্টির সম্ভার শুধু ধ্রুবতারার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় বরং মানব মনে এর সৌন্দর্য পিপাসা ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। বিশাল জলরাশি কিংবা ফ্রেমে বাঁধা পর্বতের নান্দনিক চিত্রকল্পও আমাদের নতুনত্বের স্বাদ দিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। ফাল্গুনের আগুনঝরা সন্ধ্যায় প্রকৃতির সমারোহে ডেকে ওঠা পাখিদের গান স্বাগত জানায় নবপ্রাণের স্পন্দনকে। মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, পায় বেঁচে থাকার আশ্বাস। আর এই বিশ্বসংসারের আমিও একজন প্রতিনিধি। প্রকৃতির এই চিরন্তন সৌন্দর্য স্পর্শ করে আমাকেও। আর তাই হয়তো এ হৃদয় কখনো কখনো বেজে ওঠে প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য পেয়ে :

এই জল ভালো লাগে;Ñ বৃষ্টির রূপালি জল কতো দিন এসে

ধুয়েছে আমার দেহÑ বুলায়ে দিয়েছে চুলÑচোখের উপরে

তার শান্ত ¯িœগ্ধ হাত রেখে কতো খেলিয়াছেÑআবেগের ভরে

ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চ’লে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে;

বিদায় সবসময়ই বেদনার কথা বলে। কিন্তু এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিদায়ের রাগিণীর সাথে সাথে নতুনের আগমন জীবনকে পুনরায় জানার সুযোগ করে দেয়। আর তাই নতুনের আবেদন চিরন্তন। সময়ের সাথে সাথে নিজেকে পরিবর্তনের ধর্ম তাই আবশ্যক হয়ে পড়ে। নিজেকে তাই প্রতিনিয়ত নতুন করে নির্মাণ করে চলেছি এই ভাঙ্গা গড়ার খেলায়। গ্রামের মেঠো পথ থেকে উঠে আসা এক বালকের কাছে শহরের লাল-নীল নিয়ন আলোর ছটা তাই আজব লাগে। কোথায় হাওয়ায় ভেসে  উড়ে বেড়ানো সেই বকুলতলার মাঠ? কোথায় শিশির ছড়ানো সকালে পায়ের ছোপছোপ দাগ? কোথায় রাতের আকাশে মিশে যাওয়া জোনাকি আর লক্ষ্মী পেঁচার ডাক? এ এক সময় ছিলো সবকিছু ভালো লাগতো যখন। যখন জীবনের বয়ে চলা অনাবিল ¯্রােতে অনাকাক্সিক্ষত কোনো কিছু চোখে পড়তো না। নিতান্তই সহজ সরল ছিলো জীবনের চাওয়া-পাওয়া। রাখাল পীরের মাজারের মাটিপোড়া খেলে নাকি জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়! বিশাল বড়ো এক বটগাছের পাশেই ছিলো উঁচু এক মাটির ঢিবি। হিন্দু-মুসলমান সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে মাটি সংগ্রহ করতো। মাটি নেয়া শেষ হলে আয়োজন করা হতো সিন্নীর। বড়ো বড়ো বটপাতায় করে দেয়া হতো সেসব। অনেকের মনের আশাপূরণ হওয়ার কথা শুনে চুপিচুপি একবার গিয়েছিলাম সেখানে।  সমস্যার সমাধান হয়েছে কিনা বুঝিনি, তবে একথা সত্য বুঝেছি বিশ্বাস মানুষকে অনেকদূরে নিয়ে যেতে পারে। শৈশবের ফিকে হয়ে আসা সেই দিনগুলো আজ ভীষণ কষ্ট দেয়। বাবার কাছে বায়না ধরতাম বান্নীর মেলাতে যাবো বলে। সময় থাকলে রাজি হয়ে যেতেন তিনি। আমার মতো বালকের কাছে এসব দিনের প্রাপ্তি মানে ভিন্ন কিছু। করতোয়া নদীর পাশে বিশাল প্রান্তর জুড়ে বান্নীর মেলার আয়োজন করা হতো। গ্রামের মানুষ তেমন বিশেষ কোনো উৎসবের স্বাদ পেতো না বলে এটিই থাকতো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। সব ধর্ম বর্ণের মানুষের আগমন ঘটতো এখানে। গরম জিলাপীর মোহনীয় গন্ধকে উপেক্ষা করার শক্তি কারও ছিলো না। পুতুল নাচ দেখার আয়োজন করা হতো বেশ ঢোল পিটিয়েই। মাটির তৈরি খেলনার জিনিসপত্র নিয়ে বসে থাকা দোকান গুলোতে থাকতো বালক-বালিকার উপচে পড়া ভীড়। সব থেকে ভালো লাগতো বাতাসার দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হাতি-ঘোড়ার সারি। ভোর রাত পর্যন্ত চলতো এই মেলা। ছোট ছিলাম বলে রাত বেশি হওয়ার আগেই ফিরতে হতো আমাদের। বাড়ির জন্য নিয়ে আসা খাবারের পুটলি জোর করে চেপে রাখতাম বুকের সাথে। আহা ফেলে আসা সেই সব দিন! বাবার অকৃত্রিম ভালোবাসার সেই সব দিন সত্যি অসাধারণ ছিলো। পরম মমতায় আগলে রাখা সেই বুকের মতো চিহ্নের ছাপ আর কোথাও পাই নি। তাঁর হাত ধরেই শিখেছি জীবনের প্রতিটি ধাপ। শুধু সত্যকে অবলম্বন করে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন বলে তার উপর ভীষণ অভিমান হয়। মনে হয় পুরো পৃথিবীর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছি আজ আমি। জীবনের প্রতিটি বসন্তের পাশে যে বৈপরীত্যও আছে সে শিক্ষা লাভের আবশ্যকতাও ছিলো আমার। তাহলে আজ আর নিজেকে এতটা নিঃস্ব মনে হতো না, অসহায় মনে হতো না!

জীবনের পালাবদলে কিছু কিছু অভিজ্ঞতা নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা জোগায়। তখন ঠুনকো কোনো কারণে সুখী মনে হয় নিজেকে। মনের কোণে তখন উদয় হয় সুপ্ত বাসনার জলছবি। প্যারিস রোডে পাখিদের নীড়ে ফেরা দেখে মনে হয়েছে শুধু এর জন্য হলেও তো হাজার বছর বেঁচে থাকা যায়। শহীদুল্লাহ্ কলাভবনের সামনে দাঁড়িয়ে গাছের আড়াল থেকে দেখা আকাশের বাঁকা চাঁদটিকে কতোটা আপন মনে করে অনুভব করা যায় তা শুধু প্রেমিক হৃদয়মাত্রই অনুভব করতে পারে। একে শুধু নিছক ভালোবাসা বলতে আমি নারাজ। জীবনের অপার সৌন্দর্যের এই হাতছানি দেখার সৌভাগ্য আমি পেয়েছি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে। জীবনকে অনুসন্ধান করার সর্বোত্তম জায়গা এর থেকে আর কিছু হতে পারে না। এখানে এসে দেখেছি সবুজ, দেখেছি জীবনের বিচিত্র সম্ভার কি উন্মুখতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার মতো মানুষকে তাই এই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন টেনেছে অপরিসীম ভালোবাসা দিয়ে। এর কোলে মাথা রেখে পরম মমতায় কেমন করে কেটে গেলো এতগুলো বছর তা ভাবতে সত্যি অবাক লাগে। বৈশাখের সেই রৌদ্রজ্জ্বল দিন স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করে ভেসে ওঠে। প্রভাত ফেরির গানে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে আনন্দের বর্ণিল ঢেউ আর সাথে প্রিয়তমার লাল টিপ। সবকিছু, সবটুকু জুড়ে ভালো লাগা। সময়ের এই চরাচরে ভালোর পাশাপাশি মন্দের ¯্রােতকেও গ্রহণ করেছি নিবিড়ভাবে। সব আলোর পাশে তো আঁধার থাকবেই। তবেই না জীবনের পূর্ণতা, তবেই না জীবনের সার্থকতা। আর তাই যখন নিজের সত্তার খুব কাছে গিয়ে জানতে চাই এই ছুটে চলার মানে তখন নিজেকে পূর্ণ মনে হয়। কোথাও কোনো অপূর্ণতা রেখে সমাপ্ত হয়নি এ যাত্রা পথের। আর তাই জীবনের প্রতিটি বসন্তে এ হৃদয় ডেকে উঠে বলে :

এভাবে অনন্তকাল যদি চেয়ে থাকতে পারতাম!

যদি এক বরষা, আগুন ঝরা রৌদ্র

বসন্ত, ফাল্গুন গান গেয়ে যেতো

যদি আবার এক জীবন পাই

আমি বার বার অজ¯্রবার

শুধু তোমাকেই পেতে চাইবো…

একটি একটি করে চলে যাচ্ছে প্রতিটি দিন। প্রতিটি দিন নতুন করে ভাবতে শেখায় নিজেকে। নিজের স্বপ্নের পথে ছুটে চলার জন্য উপেক্ষা করতে হয়েছে কতো স্বপ্নরঙ্গিন বসন্তকে। অশ্বত্থের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়েছে জীবনের পালাবদল। রাত জেগে থাকা পাখিদের কণ্ঠের সাথে মিতালী রেখে দেখতে হয়েছে ভোরের রক্তিম আভা। রুমঝুম বৃষ্টির একাকীত্বের সাথে বেঁধেছি জীবনের গভীর ¯্রােত। অপ্রাপ্তিকে আড়াল করে রাখতে চাইনি বরং দেখাতে চেয়েছি এর মধ্যে থেকেও বের করে নিয়ে আসা যায় পরম সুখ। লিখতে লিখতে কখনো হৃদয়কে দিতে হয়নি ভাষা হারানোর সান্ত¦না। কারণ মানুষ কখনো পরাজিত হয় না। লেখক কখনো পরাজিত হতে পারে না। কেনোনা তার পরাজয়ে থেমে যাবে জগৎ এর সকল সৃষ্টিশীলতা। আচ্ছা কখনো কি এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা আছে যে, ফুল ফুটছে অথচ কেউ তা বলছে না, আকাশের অই নীলকে কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারছেনা কলমের আছড় দিয়ে! প্রতিকূলতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করার ইতিহাস আছে বলেই আবার নতুন করে আশার সঞ্চার হয় জীবনে। এখানেই জীবনের শ্রেষ্ঠত্ব। আর এই লেখরাই শ্রেষ্ঠত্বে পথের প্রধান কারিগর। বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশে সর্বোচ্চ নিবেদন দিয়ে স্বপ্নের পথে পাড়ি দিতে হবে। ফেরারি সময়ের হাত ধরে নতুনের অনুসন্ধানের অভিপ্রায়ে চিনতে হবে নিজের স্বপ্নের পথ। ফেনিল উচ্ছ্বাসে ভেসে আসা সমুদ্রের জোয়ারে একদিন কলম্বাসও পেয়েছিলো সফলতার স্বাদ। ডি রোজিও একদিন কুসংস্কারের বুকে আগুন লাগিয়ে পাল্টে দিয়েছিলো আমাদের ভাবনার জগৎ। রবার্ট ফ্রস্ট হাজার মাইল পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন জীবনের অন্তিম দিনটি পর্যন্ত। পুরো পৃথিবীকে স্বপ্নের আখরে বুনেইতো একদিন রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বমানবের প্রতিচ্ছবি। তাহলে আর নিজেকে হেলায় হারিয়ে ফেলা কেনো? জীবনের প্রতিটি দিন হোক তাহলে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার অফুরান প্রয়াস। বেঁচে থাকি বিশ্বাসটুকু নিয়ে।

**************************************

 

আরিফ তুরহান
………………..
ধূসর সময়ে রঙিন বসন্তের দুঃস্বপ্ন

সুর্যের রক্তিম চুম্বনে পৃথিবীর সফেদ অন্ধকার কেটে যাওয়ার আগেই চড়ুই পাখিগুলো ছটফট করে। জানালা খুলে দিলে ডানা ঝাপটিয়ে তাদের আকাশের দিকে উড়ে যায়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণে গাঁথা একেকটি পৃথিবী। আর আমার ঘরের তৃতীয় প্রজাতির প্রাণিটি, যে হয়তো আমার অবচেতন মনেই শুধু আবদ্ধ, পৃথিবীর রস ও গন্ধের পূর্ণ ব্যবহার করে সেগুলোর রোমন্থন করছে। আমার কাছে তার বয়স আমার পৃথিবীর বয়সের সমান। চোখ বুক দেহের কোষ ভরে তার কতো রঙিন স্বপ্ন, সাধ, সুখস্পর্শ ছিলো! কতো কল্পনা করোটিতে! জীবনতরণীতে কতো ক্লেশ, খেদ, নির্বেদ, প্রমোহ, পুলক ছিলো তার। এখন ইটের স্তূপে ক্ষয়ে যাওয়া জীর্ণদেহ— স্বপ্নহীন, সাধহীন; বয়স যার শরীর থেকে নারীচিহ্নটুকুও প্রায় মুছে দিয়েছে; যৌবন যার বর্ষা চলে যাওয়ার পর পাড় ভাঙা পদ্মার মতোন নির্মেদ নির্বিকার; বৃহন্নলা। ‘অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের’ মতো ঘরের এক কোণে পড়ে থাকে। তার সমস্ত শরীর জুড়ে প্রাণটুকুই এখন শুধু অবশিষ্ট। প্রাণ ও প্রাণির দ্বন্দ্ব হয়তো তার ভেতর প্রকট; জীবন্তিকার জীবন সে হয়তো আর চায় না- কিন্তু এগুলো বোঝার আর কোনো উপায় নাই। তার ভাষা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মতোন যদিও বা কানে আসে, কিন্তু তা শব্দে রূপান্তরিত হয় না।

আমার রঙিন বসন্তকে সে দিনে-রাতে খুব কাছ থেকে দেখছে। সময়কে গায়ে মেখে একটু-একটু করে বড় হচ্ছি প্রকৃতির আর সব উপাদানের সাথে, যাদের ভেতর প্রকৃতি তার বয়সকে লুকিয়ে রেখেছে। আমার চোখে হয়তো ভেসে ওঠে তার অতীত উপসঙ্গমের ইতিহাস। তার বহুকাল না দেখা, যা সে আর কোনো দিন বোধ হয় দেখবে না, নিসর্গের নরম নিঃশ্বাসে সবুজ রক্তের শস্যক্ষেতের হৃৎস্পন্দন। আমার চোখ ভরে থাকা তার যাপিত অনদ্যন্তকাল। অনাগত সময় দেখর জন্য বিস্ফারিত চোখে অপলকে চেয়ে থাকা। কড়কড়ে রোদের পর নির্লিপ্ত অন্ধকার শীতল পৃথিবীর বুকে নামা অপরূপ নক্ষত্রের পথ শেষে মানুষের শরীরের গন্ধ নিয়ে যখন ঘরে ফিরি, সেসব অজানা মানুষের ঘ্রাণ আর ওঁম পাবার জন্য তাকে বুকের হাপর সজোড়ে টানতে হয়; ও-টুকুতেই জীবনের উদ্দীপ্ত প্রতিভাস নিরন্তর জানান দেয় তার বেঁচে থাকা; শরীরকে একটুকরো কয়লার মতো উত্তাপ দেয়।

তারপর ভিজে অন্ধকার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম অমোঘ নিয়মে। সমাজ-সভ্যতার কতো রং গায়ে এসে লাগলো আমার। বুকের হাড় জলে জলে গলে গলে পড়ে নতুন হাড় গজালো হৃদপি-কে রক্ষা করতে। আমায় অধিকার করলো অস্পৃশ্য ‘অধরার মাধুরী’; মুগ্ধ করলো আমায়, রক্তের সাথে বয়ে গেলো হৃদয়ে। আর বেরুলো না। ক্যাবারের লাস্যময়ী হাত ছেড়ে দিলো আমার; দুহাতে জামা খুলে উন্মত্ত উদ্যাম কোলাহলে নাচতে থাকলো আমার দিকে চেয়ে; আমি সামনে এগিয়ে চললাম নষ্ট গহ্বরে নামার জন্য।

জানালা আর দেয়ালের ছোট্ট গহ্বরের মধ্যে বৈদ্যুতিক পাখা চড়ুইটি পেরোতে পারলো না। কতো পাখি শীত পেরোতে পারেনি! ঝরা পাতার তলে হারিয়ে গেছে!  সেও পারলো না।

ঘরটিতে এখন আর কেউ থাকে না। শীত শেষে চড়ুই পাখিগুলোও দুজোড়া নতুন ছানা নিয়ে চলে গেছে। দেয়শলাই বাক্সের মতো লাল দালানে থাকতে থাকতে একঘেয়েমি কাটানোর জন্য মাঝে মাঝে আমিই গিয়ে থাকি। কতো ধরনের মানুষ তাদের রঙ আর গন্ধ নিয়ে অকারণে তাদের অজান্তে নির্বাক উদ্দীপনা ছড়িয়ে যায়! এখন গগনচূড়া সবুজ পাতা নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। জগতে কতো প্রজাতির পাখি উড়ছে পরাঙ্মুখ হয়ে! ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় দূরের সবুজ পাতার নরম ডালগুলো উদাস-মৃদু বাতাসে একে-অপরের সাথে গা ঘষছে। সেখানেও হয়তো কিছু প্রাণি তাদের জগত নিয়ে ব্যস্ত। একান্ত নিজেদের জগত।

**************************************

সুবিনয় শাফাত
………………..
বসন্তরাগে রাঙা সন্ধ্যায়

পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে মেরুদ-ের মতো খাড়া খাল। খালের পাড় ঘেষেই রাস্তা। খালের এপারে-ওপারে আবাদি জমি খানিক দূরে দূরে বসতি কোথাও কোথাও বাঁশঝাড় বাগান আর পুকুর। খালের দক্ষিণ পাড়ে ঝড়– মন্ডলের বাড়ি। বাড়িতে যেতে ছোট একটা সাঁকো পার হতে হয়। কোন এক কালে এ বাড়ির মেম্বর সাহেবের ইটের ভাটা ছিলো। তার কিছু প্রায় মাটি সমান ইট পরে আছে সাঁকো পার হবার পরেই। বামদিকে, প্রায় মাটি সমান ইট আর কাদা দিয়ে গাথা টিনের কাঁচারী ঘর। চাটাইয়ের বেড়া দেওয়া। ঘরের ভেতরে মাটির পুরুট একটা চকি মতো। পুরনো আমলের বাড়ি। সেই আমলের কোন এক ঘর ভেঙ্গে ছোট ছোট কয়েকটা ঘর তৈরী করা হয়েছিলো দেখেই বুঝা যায়। এমনি একটা ছোট ঘরে ঝড়– মন্ডল ও তার স্ত্রী সন্তানদের বসবাস। ছোট পরিবার কিন্ত উপার্জনের রাস্তা বলতে দুএকবিঘা জমি আর ছোট মুদিখানার দোকান ছাড়া কিছুই নাই। ঝড়– মন্ডলের ছেলেরা দিনে দিনে বড় হচ্ছে। প্রায় সমবয়সী ছেলেদের কৈশোর থেকে যৌবনে পর্দাপণ করার সময় এখন। ছোট ঘরটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হয়ে দাড়িয়েছে সবার। আবদুল গনি নিজের বসবাসের জন্য পরিত্যক্ত কাঁচারী ঘরকেই পয়-পরিষ্কার করে থাকা শুরু করেছে। একা থাকার পর থেকে আবদুল গনির কি একটা হয়েছে। কথা কম বলে, ধ্যানেমনে তাকিয়ে কোন এক দীক্ষা নেয় আবদুল গনি। ধীরে ধীরে কন্ঠস্বরের স্ফীত পরিবর্তন। ঘরে সে থাকে ঠিকই কিন্তু পড়াশুনা যে কতটুকু হয়, হিসাব কষে তা মেলানো মুশকিল। কিছুদিন হলো সারাদিন ঘরে বসে আয়নার দিকে তাকিয়ে কমলার কোয়ার মতো ঠোঁট দুটিকে নিজেই কামড়াতে থাকে। এই বে-হিসাবী সময় এ সময়ের মধ্যেও একটা মেয়ে ভাবনায়  এসে বেশ খানিকটা সময় লুটে নিয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় চঞ্চল সাজুনিয়ালা একটা মেয়েকে দেখেছিলো আবদুল গনি। মেয়েটা কার প্ররোচনায় পড়ে যে এতদিন পর আবদুল গনিকে একটা চিঠি লিখেছে। তার হিসাব করার অবকাশ চিঠি পাওয়ার পর থেকে হয়নি। অনেক আগে এক আত্মীয়ার বাড়িতে কঞ্চিতে বেতখেলা দেখেছিলো। একটা মিথ্যা নাম ছাড়া আর কিছুই জানা হয়নি তখন। ভুলেও কখনও ভাবিনি তার কথা।

চিঠি পাওয়ার পর থেকে কত শত অদ্ভুত চিন্তা যে মাথার মধ্যে খেলা করছে আবদুল গনির। কবে দেখা হবে, কি কথা হবে, কেমন করে দেখা হবে, কার মাধ্যমেই বা দেখা হবে। মহাকালের এই বিশ্বব্রহ্মা-ে তিনভাগ জল একভাগ স্থলের মধ্যে প্রেয়সীকে দেখার জন্য লগ্ন আর উত্তম জায়গাটির বড় অভাব। দেখা হবে আগামী বসন্তে। আগামী বসন্তে গনিদের দোকানে হালখাতা। এবারের হালখাতায় গ্রামের খরিদ্দার শ্রেণির কিছু গায়েন নিয়ে গান হবে ঝড়– মন্ডলের বাড়িতে। গ্রামের অনেক মানুষ তো আসবে। সেখানে জোহরাকে চাইই আবদুল গনির। শীতের কুয়াশা ভেদ করে বসন্তের আগাম আগমনের মতো জোহরা এসেছে বিকেলে। ব্যস্ততার পাঠ চুকিয়ে গনি ঘরে ঢুকেই দেখে এলোমেলো বইগুলো পরিপাটি, বালিশটা ঠিক তার ঠিক স্থানে, মাথার ক্যাপটা ঘরের খুটির তারের সাথে ঝুলানো, ক্যাপহীন কলমগুলো ক্যাপ পরিয়ে কলমদানীতে রাখা। গনির মধ্যে জোহরার কল্পনা এমনভাবে জেকে বসেছে। যে মনের মধ্যের এ কল্পনা ক্ষান্ত দেয়ার ক্ষমতা অনেক আগেই হারিয়েছে। বেলুনের মতো হার্ট-বিটে কেউ যেনো দ্রুত হাওয়া দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। এই উদ্বেগ নিয়ে বাড়িতে ঢুকেই দেখে বাড়ির রাস্তা সোজাসুজি টিবওয়েলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। অনেক আগের দেখা ঝাপসা; এখন সম্পূর্ণ পরিপূর্ণ উত্তালতা নিয়ে। এই উত্তালতার সমুদ্রে গনি যেনো এক আনাড়ি  নাবিক মাত্র। মুর্হুতেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল গনির। কি করবে, কি করা উচিত ঠিক বুঝতে পারছে না। হঠাৎ হকচকিয়ে অস্পট শুকনো গলায় বলে একটু পানি হবে? জোহরা হাসতে হাসতে পানি দিল। পানি শেষ করেই বলে পরে কথা হবে। অস্থির উদ্বিগ্ন মনটাকে নিয়ে ডানে-বায়ে না তাকিয়ে সোজা নিজের ঘরে গেল গনি।

অন্ধকারে ঘরের মধ্যে মনের আলো জালিয়ে বসে আছে গনি। আজ চিন্তার আকাশ জুড়ে একমাত্র জোহরার আনাগোনা। অন্য কারো নিয়ে ভাবনার তিল পরিমান সময়ও যেনো অস্বস্তিকর নরক মনে হয়। বাড়িতে এই উৎসবের সমারোহের কোলাহলের মধ্যে দ-ায়মান মূর্তির মতো নিজের ঘরে বসে আছে। কৈশরে থেকে যৌবন পর্দাপনের পর একটা চিঠি আর একটা মেয়ের ভাবনা যেনো গনিকে পৃথিবীর সব থেকে বড় অকর্মণ্য করে তুলেছে। রাজা সে জোহরাকে নিয়ে নিজের ভাবনার জগতে। এই ভাবনার মধ্যে রঙিন স্বপ্নের সময় কেবল বাড়াতেই ইচ্ছে করে গনির। কিন্ত বাস্তবে কতটাই বা সত্য রঙিন স্বপ্নগুলো। বাস্তবিক সময়ই বা কার জন্য অপেক্ষা করে। গানের আসর শুরু হয়ে গেছে ঝড়– মন্ডলের বাড়িতে। হঠাৎ অন্ধকারে গনির ঘরের দরজার মৃদু শব্দ। এতক্ষণে কোন ব্যস্ততার জন্য কেউ আসনি গনির ঘরে। সচরাচর খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ যায় না ও ঘরে। দরজার কড়ার শব্দ শোনার পরেও গনি বসার জায়গায় অনড় ভাবছে। আলো নেই। ধীরে ধীরে কাছে যাওয়ার পরে বুঝতে পারে সে জোহরা বাদে আর কেউ নয়। কি মাতাল করা মনোমুগ্ধকর গন্ধ মেয়ে মানুষের শরীর থেকে বের হয়। এর আগে কখনো পায়নি গনি। সেই রাতে কপালে আর চোয়ালে চুমু দিয়েছিলো জোহরা। তিমির অন্ধকার চোখ দুটোকে আড়াল করেছিলো। অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে কয়েক মুর্হুতের জন্য জোহরা বাহুদ্বয় দ্বারা সজোরে আড়ষ্ট করেছিলো গনিকে। বিদ্যুৎ বেগে শিহরণ জেগেছিলো যুগলের। পুরনো ঋতুর পাতাগুলোকে বসন্ত যেভাবে বাতাস দিয়ে বিতাড়িত করে। তেমনি করে যৌবন বিদ্যুৎ শিহরণ দিয়ে শৈশব কৈশরকে বিতড়িত করেছে। কৈশরের সমস্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে যৌবনে পদার্পনের অনুমতি যেনো আজ পেয়ে গেল আবদুল গনি। যৌবনের সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলো গনিকে সম্মুখে নিয়ে যেনো যজ্ঞ করছে। চোখ বন্ধ করলেই গনির শরীরকে যাপটে ধরে জোহরা বারবার শিহরণ দিয়ে যায়। ক্ষণিকের এই অনুভূতিই যৌবনের প্রথম আবিষ্কার গনির। চোখ বন্ধ করলে শরীরের এই বিদ্যুৎ রেখার যে আনন্দ বারবার শিহরিত করে গনিকে। সত্যিই কিনা কি আবিষ্কার করেছে গনি। শৈশবের শেষে যেনো এ সত্যই অনুসন্ধান করেছে সে। যৌবন বলতে মনে হয় শিহরণই। দুনিয়ার কোন নেশা অনুভূতিই নেই এর মতো। প্রতিটি কাজের আদিম উদ্যমতা যেনো ফুলে ফেপে উঠেছে। সময়ের আগেই প্রত্যেক কাজের সমাপ্তি ঘটছে নিজের অজান্তেই।

অনেকদিন এক স্বপ্নিল স্বপ্নের মধ্যে কেটেছে গনির। শীতকে ঠেলে বসন্ত একদিন আধিপত্য বিস্তার করেছিলো। আজ মনে সেই বসন্তরই অবসান ঘটেছে গনির। গনির শরীরের সেই শিহরণ আর চোখ বন্ধ করলেই আসে না। সবকিছু ভারী ভারী মনে হয়। সেই উদ্যমতার সমুদ্র একেরারে নিষ্কাসন করা হয়েছে। গনির শিহরণ জাগানোর যৎসামান্যটুকু নেই। একবার বুঝেছে শৈশব থেকে যৌবনের ফারাক কতটুকু। প্রথম অনুভূতির সময় কত আনন্দেই করে পার করেছে। আজ তার আবসান ঘটেছে। স্বাদ তাকে অবসাদের রূপে সম্মুুখে দাড়িয়ে আছে। যৌবনের শিহরণের নেশা গনিকে অন্য কোনো নতুন শিহরণে যাবার কলাকৌশল অবলম্বন করার প্রচেষ্টা চালায়। ভেবেছিলো যৌবনে এর থেকে অধিক অনুভূতিও জোহরাই তাকে দিতে পারে। পরের বসন্ত পর্যন্ত নতুন অনুভূতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিলো গনিকে। পরের বসন্তের এক মধ্যাহ্নে মদন দেবের আরাধনা করেছিলো গনি। আরাধনা করে মদন দেবকে সন্তুষ্ট হয়তো করেছিলো কারণ কাক্সিক্ষত নতুন অনুভূতির আক্ষেপ সে করেনি। পেয়েছিলো ক্ষণিকের অবসাদ। নতুন অনুভূতিকে ছাপিয়ে বিষণœতা তাকে ঘিরে ধরেছিলো চারপাশ জুড়ে। বিবেকের সমস্ত দংশনে মনের আকাশের সাথে সেদিনের আকাশ নীল বর্ণ ধারণ করেছিলো। ঘোরতর এই বিবর্ণ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজেছিলো পাগলের মতো। পৃথিবীতে মুক্তির পথই তো সব থেকে কঠিন। কিসে মুক্তি মেলে? কার সাধ্য মুক্তির পথ ঠিক করে নিতে পারে? মুক্তির জন্য তো বন্ধন হতে হয়। আগে বন্ধন হয়ে তবেই তো মুক্তি মেলে। বন্ধনই তো মুক্তি দান করে। সেদিনের সেই মধ্যাহ্নের পর অপরাহ্ণে পাশের গ্রামে বাসুতি মেলায় গিয়েছিলো গনি ও তার বন্ধুরা। মেলার মাঠের পাশেই প্রকা- দিঘি। দিঘির পাড়ের বেশ উঁচু ও প্রশস্ত চারচালা জুড়ে মাঝারি দেবদারুর গাছ। দেবদারু গাছগুলো শুধুমাত্র দিঘির চারপাশ ছায়া করে রেখেছে। পশ্চিমের আকাশের বিপরীতে শান বাঁধানো ঘাট। সেদিনের বৃদ্ধ সূর্যের গোধূলি বেলার আলো এসে পড়েছিলো দিঘির মাঝখানে। তখন গনিরা দিঘির ঘাটে বসে একজন আরেকজনকে দিঘিতে নামানোর চেষ্টা করছিলো। মধ্যাহ্নের পর থেকে গনি বিষণœতার মধ্যে পড়েছে। দীর্ঘ দিনের স্বপ্নের সফলতার পর নিজের ভেতরে প্রচন্ড উন্মাদনা সত্ত্বেও হয়তো গনি উদাস। চাঁদ আর দিঘির জলের দিকে তাকিয়ে হয়তো ভাবে বসন্তের সন্ধ্যা, গোধূলির সূর্য, আর দিঘির জলের এই ত্রিমিলনের সমন্বয়ক সে। তার কারণেই আজ এই মহামিলন উৎসব। যৌবনের চরম সত্য সে উদ্ঘাটন করেছে। অনিবার্য সত্য ঘটে গেছে তার জীবনে। এ সত্য থেকে তো কেবল ঋষিরা মুক্ত হতে পারে। কিন্ত গনি তো ঋষি হতে পারেনি। এ সত্য তার জীবনকে দুঃসাহসিকতার মুখে দাঁড় করিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গ্রহণ করেছে। সত্য এড়িয়ে যাবার ক্ষমতা সবার থাকে না। সত্যকে তো গ্রহণ করতেই হয়— না হলে পীড়া ভোগ করতে হয়। যৌবনের পীড়া গনি ভোগ করতে চায়নি তাই মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ক্ষণিকের পীড়া তাকে ঠিকই মেনে নিতে হচ্ছে— তা থেকে মুক্তির জন্যই এই ত্রিমিলনের সমাহার বাসুতি মেলার দিঘির পাড়ে। এ যেনো নতুন জীবনে দায়িত্ব তুলে নেওয়ার আয়োজন। আজ ত্রিমিলন স্থলে  স্নান করবে গনি। বসন্তরাগের রাঙা সন্ধ্যা হবে রঙিন জীবনে বসন্তের ইতিহাস।

**************************************

চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা ২০১৯
একটি প্রান্তমুখো সাহিত্য-উদ্যোগ হিসেবে চিহ্ন সাহিত্য-শিল্পে নিবেদিত লেখক-সম্পাদক-পাঠকদের মেলবন্ধনের প্রণোদনায় চতুর্থবারের মতো চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা ২০১৯ আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০১৯-এ বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দুদিনব্যাপী এ মেলা অনুষ্ঠিত হবে। লেখক-সম্পাদক-পাঠকদের এ মিলনমেলায় বিনামূল্যে রেজিস্ট্রেশনের জন্য যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে।

 

 

চিহ্নপুরস্কার ২০১৯

সৃষ্টিশীলতার মগ্ন অভীপ্সায় ব্যাপৃত লেখক-সাহিত্যিকদের যথাযোগ্য স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদানের আকাক্সক্ষা নিয়ে প্রচলিত চিহ্নপুরস্কার চতুর্থবারের মতো প্রদান করা হবে ২০১৯ সালে। সৃজনশীল ও মননশীল দুটো ধারায় ২(দুই) জন লেখককে এ পুরস্কার প্রদান করা হবে। প্রত্যেকের জন্য পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩০(ত্রিশ) হাজার টাকা ও একটি সনদপত্র। এ পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশের লেখকদের কাছ থেকে সৃজনশীল ও মননশীল ধারার বই আহ্বান করা হচ্ছে। লেখক নিজে কিংবা যে কোন ব্যক্তি-লেখকের পক্ষে প্রকাশিত আগামী ৩১ জানুয়ারি ২০১৯-এর মধ্যে পাঠাতে হবে, ১৩০ শহীদুল্লাহ কলাভবন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী-৬২০৫ ঠিকানায়।

চিহ্ন ছোটকাগজ সম্মাননা ২০১৯

দুই বাংলার ছোটকাগজের চিহ্নসম্মাননার জন্য অন্যূন ৩(তিন)টি সংখ্যা আগামী ৩১ জানুয়ারি ২০১৯-এর মধ্যে পাঠান। প্রেরণের ঠিকানা : ১৩০ শহীদুল্লাহ কলাভবন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বাংলাদেশ। মুঠোফোন : +৮৮০১৭৪০০১৬০৪৩, ০১৭৪৩৪৪৬২১৮ ও ০১৭২৮৭৬৫০১৩।

চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা নিবন্ধন
দুদিনব্যাপী চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলায় অংশগ্রহণেচ্ছুদের জ্ঞাতার্থে তথ্যনম্বরসমূহ
নিবন্ধন : +৮৮০১৭২৮৭৬৫০১৩ ॥ shiqbal70@gmail.com ॥ subidsapekkha@gmail.com
স্টল বরাদ্দ : +৮৮০১৭২৮৭৬৫০১৩ ॥ +৮৮০১৭৪০০১৬০৪৩ ॥ subidsapekkha@gmail.com

বিশেষ দ্রষ্টব্য : চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলায় অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন ও স্টল বরাদ্দের সর্বশেষ যোগাযোগের তারিখ ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ খ্রি.। বিস্তারিত জানতে ই-মেইল করুন  shiqbal70@gmail.com এবং  subidsapekkha@gmail.com চিহ্ন ওয়েবপেজ www.chinnofoundation.org দেখুন।

শেষ পাতার আহ্বান
রোদ এসেছে সোনার জাদুকর …

এ এক নতুন আড্ডা। কৃষাণ-কৃষাণীর আড্ডা। শ্রমী মানুষের সমাবেশ, তেপান্তরের মাঠে। রোদ তাদের অঙ্গে। ফলে ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন/কে কার অলংকার’। ওই মাঠের জীবনে ‘সোনার জাদুকর’ সোনা ফলায়। মন তাদের নিষ্পাপ, নির্লোভ দোষে তারা এ সমাজে গুণের কদরে দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু সারল্যে আর গরিমা তো তারাইÑ এ সোনার বাংলায়, সোনার কাঠি তাদের। লিখুন এদেশের ক্ষেতমজুর জাদুকরদের নিয়ে আপনার স্বপ্ন-ভাবনা।

পরবর্তী সংখ্যায়
ই-যোগাযোগ : shiqbal70@gmail.com
ফোন : ০১৭২৪-৮৬২০৬৯, ০১৭২৮-৭৬৫০১৩
এ বিষয়ে লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ৩০ জুন ২০১৮


Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /home/chinnofo/public_html/wp-includes/class-wp-comment-query.php on line 399
আলোচনা